Blog

  • রণজিৎ গুহ ।। নিম্নবর্গের ইতিহাস

    রণজিৎ গুহ ।। নিম্নবর্গের ইতিহাস

    [ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহকে আলোচিত নিম্নবর্গের ইতিহাস অধ্যয়ন অথবা সাবলটার্ন স্টাডিজ গ্রুপের ‘গুরু’ হিশেবে মান্য করেন খোদ এই গ্রুপে তাঁর সহ–ইতিহাসবিদেরা। সাবলটার্ন স্টাডিজ গ্রুপ যখন আত্মপ্রকাশ করে, তখন একমাত্র রণজিৎ গুহ ভিন্ন বাদবাকিরা ছিলেন নিতান্তই তরুণ ও অপরিচিত। অনেকেরই লেখাপত্র প্রথম প্রকাশিত হয় সাবলটার্ন স্টাডিজের কালেক্টিভ ভলিউমে। রণজিৎ গুহ গত শতাব্দীর আশির দশকে নিতান্ত অপরিচিত ও অনভিজ্ঞ গবেষকদের নিয়ে যে প্রকল্প শুরু করেছিলেন, বিশ্বজুড়ে আজ তা সমাদৃত এবং আলোচনা–সমালোচনা–বিতর্ক মিলিয়ে ইতিহাস–চর্চার প্রতিষ্ঠিত এক পদ্ধতি। সাবলটার্ন স্টাডিজ আজ আর গ্রুপ হিশেবে ক্রিয়াশীল না থাকলেও, সাবলটার্ন তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ প্রত্যেকের কাজই নানা ডালপালাসমেত বিস্তৃত হয়েছে এবং গুরুত্বের সাথে পর্যালোচিত হচ্ছে।

    ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ শীর্ষক রণজিৎ গুহের এই প্রবন্ধটিকে রণজিৎ গুহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখা হিশেবে ধরে নেয়া যায়। এই প্রবন্ধটি বাংলা ভাষায় লিখিত নিম্নবর্গের অধ্যয়ন গ্রুপের একেবারে প্রথমদিককার কোনো লেখা। মূলত ১৯৮২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বাংলায় দুটি বক্তৃতা করেন গুহ, যা পরবর্তীতে ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ শিরোনামে এক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে প্রবন্ধটি ১৯৯৮ সালে গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায় এর সম্পাদনায় প্রকাশিত নিম্নবর্গের ইতিহাস বইতেও স্থান পায়। বর্তমান ভার্সনটির উৎস পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও গৌতম ভদ্রের সেই বই। অরাজের তরফ থেকে বইয়ের অন্যতম সম্পাদক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে প্রবন্ধটি প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হলে তিনি সানন্দে সম্মতি দেন। অরাজ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।

    রণজিৎ গুহের এই প্রবন্ধে ভারতবর্ষের ইতিহাস–রচনা ও ইতিহাস–পদ্ধতি সংক্রান্ত মৌলিক প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ হাজির আছে। ফলে অরাজ মনে করে প্রবন্ধটি বর্তমান প্রজন্মের পাঠক–বিশ্লেষকদের মনোযোগ ও পর্যালোচনার দাবিদার। – সম্পাদক]

    রণজিৎ গুহ

    ১. ইতিহাসবিদ্যার সংকট ও উচ্চবর্গের ইতিহাস

    আমরা ইতিহাসবিদ্যার একটা সংকটের মধ্যে আছি। আমার নিজের পড়াশুনার মূল বিষয় ইংরেজ আমলের ভারতবর্ষ। তাই ইতিহাসবিদ্যা বলতে আমি বােঝাব সেই স্মৃতি বা প্রতীতির কথা যার বিশদ প্রকাশ ওই যুগ প্রসঙ্গে আমাদের মৌখিক বা লিখিত বক্তব্যে। এই ইতিহাসবিদ্যার যে কর্তা তার চৈতন্যের বিশিষ্ট রূপটির নাম হিসেবে ইতিহাসচেতনা শব্দটাও কখনও কখনও ব্যবহার করব। আর সংকট বলতে বােঝাতে চাই সেই বিশেষ অবস্থা যখন যে–কোনও ভত্তনমার্গে অগ্রগতির তাগিদ—যার উৎস সমাজের প্রয়ােজনে বা ব্যক্তির প্রতিভায় বা উভয়ের সমন্বয়ে—যখন সেই তাগিদ ওই জ্ঞানমার্গের তত্ত্ব বা অভ্যাসের পুঁজি দিয়ে আর মেটানাে যাচ্ছে না। এই অর্থেই ইতিহাসবিদ্যার একটা সংকটের মধ্যে আমরা আছি।

    এই সংকটের একটি প্রধান লক্ষণ তামার আলােচনার বিষয়। কিন্তু সেই বিচারের ভূমিকা হিসেবে এই ইতিহাসবিদ্যার ইতিহাস সম্পর্কে দু–একটি কথা আবার মনে করিয়ে দিতে চাই। আমরা যে ইতিহাস লিখি, পড়ি ও পড়াই, তার উৎপত্তি ইংরেজের ক্ষমতালিপ্সায়। পলাশির যুদ্ধের আগেও আমাদের ইতিহাস লেখা হত। কিন্তু সে ইতিহাসের ধাঁচ ছিল পৌরাণিক, অর্থাৎ যেখানে ঐহিক ঘটনা ও সম্পর্কগুলিকে দেখা হত পারত্রিক ঘটনা ও সম্পর্কের ক্ষণিক ও একান্তই গৌণ প্রতিভাস হিসেবে। যেমন ধরুন, কালকেতু ব্যাধের জীবন একান্ত বাস্তব হওয়া সত্ত্বেও তার স্বাতন্ত্র্য নেই। তার জীবন নীলাম্বরের স্বর্গচ্যুতির ইতিহাসের এবং তাও আবার পার্বতীর অলৌকিক জীবনী এবং তাঁর পূজার ইতিহাসের একটি অধ্যায় মাত্র—যেন বন্ধনীর মধ্যে বন্ধনী, বৃত্তের মধ্যে বৃত্ত। অবশ্য ঐহিক ইতিহাসের একটি ধারাও ব্রিটিশ রাজত্বের আগে চালু ছিল। আরবি–ফারসি ইতিহাসবিদ্যার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এবং মুঘল বাদশাহের বা তাঁদেরই সমকালীন ছােট–বড়–মাঝারি নানা সামন্ত ভূস্বামীদের আশ্রিত এই ধারাটির উপজীব্য ছিল, এক কথায় যাকে বলা যায় রাজকাহিনী। কাহিনীর নায়করা কখনও দিল্লীশ্বর, কখনও বা কোনও আঞ্চলিক ক্ষুদে ঈশ্বর— কিন্তু ঐতিহাসিকের কাছে তারা সকলেই জগদীশ্বর। তাদের বংশাবলী, দিগ্বিজয় ইত্যাদি ছাড়াও শাসনব্যবস্থা, রাজস্বের হার, ভৌগােলিক তথ্য এবং ওই ধরনের আরও কিছু সাম্প্রতিকতার ছাপ এই জাতীয় ইতিহাসে বিরল নয়। কিন্তু প্রভুর জীবনই যেহেতু প্রজা ও রাষ্ট্রের জীবনের একমাত্র প্রতিভূ, তাঁর প্রতিভা ও কীর্তির ছটায় উজ্জ্বল অথচ সংকীর্ণ ক্ষেত্রটির বাইরে সবটাই অন্ধকার ছিল। তা ছাড়া আরও একটা কথা ভাবতে হবে। রাজরাজড়ার নামাংকিত এই রচনাগুলিকে কি সত্যিই ইতিহাস বলা যায়? এগুলি সমসাময়িক ও আঞ্চলিক তথ্যের আকর সন্দেহ নেই। কিন্তু অতীতকাল সম্পর্কে পরিপ্রেক্ষিতের যে গভীরতা ইতিহাসবিদ্যার প্রধান লক্ষণ তার। অভাব এ রচনায় তো খুবই স্পষ্ট। আসলে লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে এই সব রচনা যখনই নেহাৎ সাম্প্রতিকতা বা বর্তমানেরই একান্ত গা–ঘেঁষা অদূরবর্তী অতীতের আওতা ছাড়িয়ে যায়, তখনই তার মধ্যে হয় পৌরাণিক ধরনের অলৌকিকতা এসে পড়ে কিংবা সেই অতীতের গভীরতা কেবলমাত্র সন–তারিখের দ্বারা চিহ্নিত হয়ে ইতিহাসকে পরিণত করে বর্ষপঞ্জীতে।

    কিন্তু যে ইতিহাসচেতনায় অতীতকাল শুধু চক্রাকারে ঘােরে কিংবা যার বহতা শুধু সামন্ত শাসকদের অগভীর জীবনযাত্রার খাতেই সীমাবদ্ধ, তা দিয়ে বাণিজ্য–ধনবাদ থেকে শিল্পাশ্রয়ী ধনতন্ত্রে উত্তরণের যুগে কিংবা আরও পরিণত ধনতন্ত্রের যুগে ঔপনিবেশিক রাজ্য শাসনের কাজ চালানাে যায় না। কারণ সেই শাসনের বাস্তব ভিত্তি ভারত ভূখণ্ডের যে পণ্য বা কাঁচামাল রপ্তানি করা ও যন্ত্রস্থ করা তার শর্তই হল আর এক ধরনের সময় যে–সময় সরল রেখায় চলে, যা দিয়ে সদাগরি হাওয়ার সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্যের ছন্দ মেলানাে হয় ঔপনিবেশিক যুগের আদিপর্বে, যে–সময়ের কাঁটায় কাঁটায় ল্যাংকাশায়ারের সূতাকলের বাঁশি বাজে, মেশিন চলে, এবং দুনিয়ার প্রথম যন্ত্রসভ্যতায় যে–সময়ের সঙ্গে শিল্প, পুঁজি ও শ্রমের সংগম থেকেই সৃষ্টি হয় এক নতুন ধরনের সময়–কল্পনা যার নাম মেহনতি–সময়।

    সময়ের এই নতুন ধারণা যে–ইতিহাসবিদ্যার প্রাণশক্তি, ইংরেজ এদেশে আসার ফলে তা আমাদের চিন্তায় প্রতিষ্ঠিত হল। তবে এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে ভারতে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার শুরু ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন থেকে নয়, ইংরেজ শাসনব্যবস্থা থেকে—এবং সেই শাসনব্যবস্থা, বলাই বাহুল্য, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের চেয়েও পুরনাে। কথাটা একটু জোর দিয়ে বলতে চাই, কারণ একটা কুসংস্কার এক সময় চালু ছিল এবং এখনও হয়তাে আছে এই মর্মে যে ইংরেজরা পাশ্চাত্য সভ্যতার আদর্শে আমাদের দীক্ষিত করার জন্যে যে–সব বিদ্যায় উৎসাহ দিয়েছিল ইতিহাসবিদ্যাটাও তার অন্যতম। কথাটা যে একেবারেই ভুল তা কোম্পানির আদিপর্বের নথিপত্র ঘাঁটলেই বােঝা যায়। কারণ পলাশির যুদ্ধের কিছু পরেই যখন বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনা দেখা দিল—সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটা হয়তাে ১৭৬৫ সাল যখন কোম্পানি দেওয়ানি হাতে পেল কিংবা তারও কিছু আগে যখন নবাব তিনটে জেলা (‘সিডেড ডিস্ট্রিকস) তাদের দিয়ে দিলেন—তখন থেকেই ভারতবর্ষের ইতিহাস ইংরেজ শাসনের হাতিয়ার হল। কারণ লুঠপাটই যেখানে দেশজয়ের উদ্দেশ্য সেখানে ইতিহাস অবান্তর। গােয়া বা দিল্লির অতীত (বা ভবিষ্যৎ) নিয়ে আলবুকার্ক বা নাদির শার মাথা ঘামানাের দরকার ছিল না। লুঠেরার কাছে বর্তমানটাই একমাত্র সত্য। কিন্তু জয় যখন বিজিত দেশে ক্ষমতা কায়েম করার আকাঙক্ষায় পরিণত হয়, বিজেতাকে তখন ইতিহাসচেতনা ব্যবহার করতে হয় প্রভু সংস্কৃতির একটি প্রধান উপাদান হিসেবে। সব বিজেতার পক্ষেই একথা খাটে, তবে অবস্থা ভেদে ওই চেতনার বিশিষ্ট রূপটি ধরা পড়ে মৌখিক বা লিখিত বক্তব্যে।

    তান্যান্য দেশের মতাে ভারতবর্ষেও উপনিবেশের পত্তন হয়েছিল পাশ্চাত্য শক্তির অস্ত্রবলের সাহায্যে। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই এদেশের সেই শিশুরাষ্ট্র তার স্বকীয় ভঙ্গিতে বেড়ে ওঠে। এই স্বকীয়তার নানা দিক ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েই সেই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস যার অনেকখানিই এখনও গবেষণার বিষয় বলে গণ্য হতে বাকি। বর্তমান প্রসঙ্গে তার শুধু একটি দিকই লক্ষ করতে বলি। তা হল এই যে কোম্পানি আমলের প্রথম পর্বে তার সেনাবলের কথা বাদ দিলে বলা যায় যে ভূমিরাজস্ব এবং দেওয়ানি বিচার সংক্রান্ত শাসনব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রই এদেশে ঔপনিবেশক রাষ্ট্রের মুখ্য অবয়ব হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এই অবয়বটি যেমন ইংরেজ রাজশক্তির বিকাশকে ত্বরান্বিত করে তেমনি আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার সূচনা এরই মাধ্যমে। কারণ আগেই বলেছি যে এদেশে পাশ্চাত্য ইতিহাসচেতনাকে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ‘লিবারল’ আদর্শের উৎসাহে নয়, রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে ও তাগিদে। দেওয়ানি হাতে নিয়েই ইংরেজ টের পায় যে এ দেশের কৃষিব্যবস্থা অতি প্রাচীন, জমির সঙ্গে রাজা ও প্রজার সম্পর্ক এখানে নানা সনাতন প্রথায় নিয়ন্ত্রিত, এবং জমির মালিকানা, ফসলবােনার কায়দা ইত্যাদি সব কিছুই এক সাবেক সংস্কারের অঙ্গ। অতীতকে উপেক্ষা করে এখানে রাজস্ব সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই সে যুগের সরকারি কাগজপত্রে ঐতিহাসিক বিবৃতির অভাব নেই। যাঁরা লালদিঘি ও গােলদিঘি পাড়ায় নথিখানার ধুলাে ঘেঁটেছেন তাঁরা সকলেই জানেন এইসব বিবৃতি কত অমূল্য তথ্যে ভরা, কত বিচিত্র বিষয়ে সমৃদ্ধ। প্রাক–ব্রিটিশ, বিশেষ করে মুঘল আমলের রাজ্যশাসন, ভূসম্পত্তির অধিকার, কৃষিব্যবস্থা, বাণিজ্য–ব্যাপার ইত্যাদি, সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের বহু প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলােচনা এইসব সরকারি কাগজপত্রে হামেশাই পাওয়া যায়। কেউ যদি বলেন যে এগুলি ঐতিহাসিক তথ্যের আকরমাত্র কিন্তু সত্যিকারের ইতিহাস নয়, তা হলে অবিচার হবে। কারণ যদিও সদ্য প্রকাশিত সবচেয়ে আনকোরা বইটি বা প্রবন্ধটির তুলনায় হয়তাে একটু কম পরিপাটি মনে হতে পারে, তবু একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে আঠারাে শতকের শেষে বা উনিশ শতকের গােড়ায় লেখা এইসব রচনায় তথ্য ও যুক্তির সমন্বয় এবং কার্যকারণ সূত্রে সাজানাে বিশ্লেষণ পদ্ধতির মধ্যে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার প্রধান গুণগুলি সবই বর্তমান। তবে যে বিশেষ অবস্থায় এই ইতিহাসবিদ্যার উৎপত্তি হয়েছিল তার ফলে এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ—বলা যায় জন্মলক্ষণ—প্রথম থেকেই চোখে পড়ে। তার মধ্যে গুটিদুয়েক বর্তমান প্রসঙ্গে উল্লেখযােগ্য।

    প্রথম লক্ষণটি এই যে, এই ইতিহাসবিদ্যার জন্ম এ দেশে ইংরেজ রাজশক্তির ঔরসে এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই তা ঔপনিবেশিক শাসনদণ্ডকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। যাঁরা এই ধারায় প্রথম ইতিহাস লেখেন.তাঁরা সকলেই হয় সরকারি কর্মচারী কিংবা সরকারের প্রসাদপুষ্ট ও ইংরেজ শাসনের সমর্থক বেসরকারি সাহেব মেমসাহেব। তাঁরা যে ইতিহাস লেখেন তার উদ্দেশ্য হয় একেবারে সরাসরি শাসনব্যবস্থার প্রয়ােজন সিদ্ধ করা কিংবা বেসরকারি রচনা হলেও কার্যত তার সাহায্যে ব্রিটিশ প্রভুশক্তি ও প্রভুসংস্কৃতিকে আরও জোরদার করা। এমন কী এইসব লেখকরা যখন অতীত বিষয়ক বক্তব্যগুলি রিপাের্ট, মিনিট বা ওই জাতীয় সরকারি নথি হিসেবে না লিখে নিছক ইতিহাস হিসেবেই লেখেন তখনও বিজেতা ও শাসকের দৃষ্টির কাছে ঐতিহাসিকের ৮ পরিপ্রেক্ষিত সংকুচিত হয়। উইলিয়ম হান্টারের মতাে প্রতিভাবান এবং উদারচেতা ব্যক্তিও এইরকম সংকীর্ণতার উর্ধ্বে নন।

    ইতিহাসচেতনায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার এই প্রভাব ইতিহাসবিদ্যার চরিত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। ইউরােপে বুর্জোয়াদের অভ্যুদয়ের সময় এই বিদ্যা তদানীন্তন সমাজে সামন্তশ্রেণীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভুত্বের নির্মম সমালােচনায় ব্যাপৃত ছিল। আঠারাে শতকের প্রথমার্ধে আলােকপ্রাপ্তির যুগ থেকে সেই সমালােচনা সামন্তশক্তির তিন প্রধান অর্থাৎ রাজা, জমিদার ও পুরােহিতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে এবং নিরন্তর আক্রমণ চালিয়ে ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক জয়ের পথ প্রশস্ত করে। অথচ দেখুন, ওই ইতিহাসবিদ্যাই যখন একটি পাশ্চাত্য বুর্জোয়া শক্তির মাধ্যমে এদেশে উপনিবেশ গড়ার কাজে ব্যবহৃত হল তখনই তার ভূমিকা পালটে গেল, এমন কী বলা যায় উলটে গেল। কারণ যদিও তা ফরাসি বিপ্লবের বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং তারই পরিণতি জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও জাতিভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে প্রেরণা দিয়েছিল পশ্চিম ইউরােপে, ভারতবর্ষের বিশেষ পরিস্থিতিতে তাই হয়ে দাঁড়াল জাতীয় স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় ইংরেজ শাসনের অনুকূল। অর্থাৎ সে আর তখন প্রভুশক্তির সমালােচক নয়, নতুন ভূমিকায় সে প্রভুশক্তির স্তাবক।

    এই ইতিহাসবিদ্যার আর–একটি জন্মলক্ষণ হচ্ছে উচ্চবর্গের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। এই পক্ষপাতিত্ব শাসকদেরই মনােভাবের প্রতিফলন। কারণ ইংরেজদের রাজত্ব যখন শুরু হয় তখন আমাদের সমাজ রীতিনীতি ভাষা ভূগােল ইত্যাদি বিষয়ে সাড়ে পনেরাে আনাই তাদের অজানা ছিল। এরকম একটা অপরিচিত দেশে তার কৃষিব্যবস্থা ও মালিকানার সনাতন ও জটিল রহস্য ভেদ করে সেখান থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করাও সেই বিদেশি রাজশক্তির পক্ষে তখন শক্ত কাজ। তবে আঠারাে শতকের ব্রিটিশ সমাজের আদর্শ অনু্যায়ী কোম্পানির কর্তৃপক্ষের ধারণা হয় যে এদেশেও সমাজের প্রধান স্তম্ভ সেইসব সম্রান্ত ব্যক্তি বা গােষ্ঠী যারা বেশ বড় বড় ভূসম্পত্তির মালিক, এবং তাদের সঙ্গে একটা বােঝাপড়া হলেই রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনের সমস্যা মিটে যাবে। এইসব তথাকথিত ন্যাচারল–লিডার্স’ বা স্বভাবনেতাদের খুঁজে বের করা, তাদের স্বত্ব অধিকার ইত্যাদির সংজ্ঞা ও সীমা নির্ণয়, এবং তাদের পাওনাগণ্ডার হিসেব নিয়ে ঐতিহাসিক আলােচনা সরকারি কাগজপত্রে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে। এরই ফলে এতদ্দেশীয় উচ্চবর্গের স্বার্থ ও সুবিধা একই সঙ্গে স্বীকৃতি পায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রনীতিতে এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদ্যায়। ইতিহাসের মুখ্য বিষয় হিসেবে এই উচ্চবর্গের স্থান তখন ইংরেজদের ঠিক পরেই। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল অপেক্ষাকৃত প্রাচীন সামন্তবংশের উত্তরাধিকারী, অনেকে আবার জমিদারি অন্য নামে হলেও কার্যত জমিদারি বন্দোবস্তের কল্যাণে কায়েম নয়া–সামন্তশ্রেণীর প্রতিভূ। এরাই স্বভাবনেতার মর্যাদা পেল ভূসম্পত্তি সংক্রান্ত নতুন আইনকানুনের ফলে। আর ঠিক এইভাবেই পাশ্চাত্যে যে ইতিহাসবিদ্যা সামন্তবাদের বিরােধিতায় সক্রিয় ছিল, ঔপনিবেশিক অবস্থায় সে তার মূল চরিত্র পালটে পরিণত হল পরিশ্রমলব্ধ ফসলের উদ্বৃত্তে পুষ্ট এক নয়া–সামন্তশ্রেণীর তানুকূল জ্ঞানকাণ্ডে। ইতিহাসকে এই শ্রেণীর সপক্ষে ওকালতির ভূমিকায় নামাবার জন্যে কতদূর যাওয়া সম্ভব তা যাঁরা ফ্রান্সিস, শাের ও কর্নওয়ালিসের মিনিটগুলির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা সকলেই জানেন।

    যে দুটি জন্মলক্ষণ বর্ণনা করা হল তা একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই স্পষ্ট বােঝা যাবে যে আঠারাে শতকের যে ইতিহাসবিদ্যা ইংরেজের ক্ষমতালিপ্সার ফলে একটা ঔপনিবেশিক বিদ্যায় পরিণত হয়েছিল, ভারতের বিশেষ অবস্থায়, ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই তার ঝোঁক ছিল উচ্চবর্গের সপক্ষে। আমরা যে ইতিহাস লিখি, পড়ি, পড়াই বা অন্যথা চর্চা করে থাকি তার প্রেরণা সবটাই সেই ইতিহাসবিদ্যার আদিকল্প থেকে পাওয়া। টমাস কুন দেখিয়েছেন যে এক–একটি ঐতিহাসিক অবস্থায় জীববিদ্যা রসায়নবিদ্যা পদার্থবিদ্যা প্রভৃতি নানা বিষয়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটে এক–একটি আদিকল্পকে আশ্রয় করে। তারই ভিত্তিতে এক–একটি বৈজ্ঞানিক গােষ্ঠী বা ঘরানা গড়ে ওঠে, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক চিন্তা ও পরীক্ষা চলে তার আদর্শে রচিত নানা মডেল বা প্রতিকল্পকে কেন্দ্র করে, সেইসব চিন্তা ও পরীক্ষার ফল আবার বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলির (যথা ইনস্টিটিউট, ল্যাবরেটরি, ইউনিভার্সিটি ডিপার্টমেন্ট ইত্যাদির) উদ্যোগে এবং পত্রপত্রিকা, পাঠ্যবই, নানা ধরনের তালিমি–কেতাবের মারফত ওই আদিকল্পটিকেই প্রচার করে বিজ্ঞানের নানা শাখায় বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যার্থীদের মধ্যে। তারপর কিন্তু একটা সময় আসে যখন তত্ত্বে ও প্রয়ােগে এইসব আন্দোলনের ফলেই সেই একই বিদ্যার ক্ষেত্রে এমন সব নতুন প্রশ্ন ওঠে বা সমস্যা আবিষ্কৃত হয় যার উত্তর বা সমাধান আর প্রতিষ্ঠিত, সর্বসম্মত আদিকল্পটি থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। তখনই সেই পুরনাে আদিকল্পে সংকট ঘটে; প্রগতির দাবি মেটাতে পারে না বলেই তার প্রভাব ক্রমে–ক্ৰমে ক্ষীণ হয়ে আসে এবং শেষ পর্যন্ত নতুন প্রশ্নগুলির উত্তর বা উত্তর–খোঁজার পক্ষে অনুকূল আর এক শক্তিশালী নতুন আদিকল্প তার অগ্রজকে হঠিয়ে দিয়ে নেতৃত্বের ভূমিকাকে নামে বিজ্ঞানের সেই বিশেষ শাখায়।

    বিজ্ঞানে শুধু নয়, যে কোনও জ্ঞানকাণ্ডেরই অগ্রগতির পথ এইভাবে তার আদিকল্পগুলির আয়ুষ্কাল দিয়ে মাপা যায়। ইতিহাসবিদ্যার ক্ষেত্রেও একথা সত্য। যে–ইতিহাসবিদ্যার সাহায্যে আমরা ঔপনিবেশিক যুগের অতীতকে বুঝতে বা বােঝাতে অভ্যস্ত তারও প্রেরণা আঠারাে শতকের ইউরােপ থেকে নেওয়া এবং পরাধীন ভারতের বিশেষ অবস্থায় ঢেলে সাজা একটা প্রৌঢ় আদিকল্প। ইতিহাসবিদ্যার সংকট বলতে আমি সেই আদিকল্পের সংকটের কথাই বােঝাচ্ছি।

    আগেই বলেছি যে এই আদিকল্পটি প্রাক–ঔপনিবেশিক আমলে ইতিহাসবিদ্যার চালিকা শক্তি আর এক আদিকল্পকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গা দখল করেছিল, আর তখন থেকেই ইতিহাসচেতনা পৌরাণিক কল্পনার স্বর্গ ছেড়ে মাটির পৃথিবীতে নেমে আসে এবং অলৌকিক সময়ের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে ঐহিক সময়ের সহজ রাস্তায় পা চালাবার সুযােগ পায়। ফলেই অতীত ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও বাস্তব জীবনের নানা অজানা দিক তখন উদ্ভাসিত হয়েছিল ইতিহাসের আলােকে। এটা যে একটা মস্ত বড় লাভ তা অস্বীকার করার কোনও মানে হয় না। কিন্তু সেই সঙ্গে একথাও মনে রাখা দরকার যে উচ্চবর্গের ইতিহাস সম্পর্কে যে পক্ষপাতিত্ব প্রাক্তন আদিকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, নতুনটিতে তার কোনও ব্যতিক্রম হল না। শুধু আগে যেখানে ঠাকুরদেবতা ও রাজরাজড়ার লীলাকেই ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তু বলে মনে করা হত, এখন তারই বদলে ইতিহাসের পাতা জুড়ে বসল ইংরেজের মাহাত্ম ও ইংরেজশাসিত সমাজে যাদের টাকা জমি জাত পেশা বা চাকরির জোর বেশি তাদেরই মাহাত্ম। এই মুষ্টিমেয়র ইতিহাসকেই চালানাে হল এবং এখনও চালানাে হচ্ছে ভারতর্ষের ইতিহাস বলে।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    উচ্চবর্গের পক্ষপাতী এই আদিকল্পের প্রভাব ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস প্রসঙ্গে চিন্তায় ও লেখায় এতই পরিষ্কার যে সে বিষয়ে কিছু বলা বাহুল্য নয় শুধু এই জন্যেই যে ঝোঁকটা প্রায় সর্বব্যাপী, সুতরাং অতিরেকের বশে সচরাচর চোখে পড়ে না বলেই ধরে নেওয়া হয় ওটা যেন অবিসংবাদী সত্য, যেন তা অতীতের সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাটির ধ্রুবগুণগুলির অন্যতম। অথচ ঝোঁকটা ঠিক এইরকম হবার ফলেই ওই অভিজ্ঞতা তার জোর, জটিলতা ও ঘনত্ব অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। ইংরেজ আমলের রাজনৈতিক জীবন, বিশেষ করে জাতীয় আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের সমস্যা নিয়ে যে বিরাট সাহিত্য গড়ে উঠেছে, উদাহরণস্বরূপ তার কথা আলােচনা করলেই আমার বক্তব্য স্পষ্ট হবে।

    এই সাহিত্যের প্রায় সবটাই দুটি প্রতিকল্পকে আশ্রয় করে লেখা। দুটিই উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গির বাহন। উভয়েরই প্রতিপাদ্য এই যে সে যুগের রাজনীতি বলতে প্রধানত, এমন কী কেবলমাত্র উচ্চবর্গের রাজনৈতিক আকাঙক্ষা, আদর্শ ও কর্মকাণ্ডকেই বােঝায়, এবং জাতীয়তাবাদ সেই রাজনীতিরই অন্যতম, এমন কী মুখ্য প্রকাশ। তবে মৌলিক সাদৃশ্য সত্ত্বেও এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে অভিন্ন নয়। কারণ উচ্চবর্গের যে অগ্রণী শক্তিগুলির তারা প্রবক্তা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও উপায়ে পার্থক্য, এমন কী অবস্থা বিশেষে দ্বন্দ্বও কখনও কখনও দেখা দিত। এই মৌলিক সাদৃশ্য এবং গৌণার্থে কিছু কিছু বিরােধিতার সমন্বয়ের জন্যেই উচ্চবর্গের পক্ষপাতী চিন্তাধারা দুটি ইতিহাসবিদ্যার ক্ষেত্রে একত্রিত হয়েও তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করে।

    প্রথম ধারাটির বৈশিষ্ট্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রশক্তি এবং তারই সহায় ও ফলগত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আলােকে ভারতবর্ষের ইতিহাস বিচার করা। এই ধরনের ইতিহাসের চর্চা ও প্রচার হত এবং এখনও হয়ে থাকে ব্রিটিশ লেখক ও বিদ্যাস্থানগুলিরই মাধ্যমে। তবে অন্যান্য দেশে, এমন কী এদেশেও তার অনুকারীর সংখ্যা কম নয়।

    এই ধারাটির মূল কথা হচ্ছে এই যে ভারতবাসীর একজাতীয়তা বলতে যা বােঝায় তার বাস্তব সংগঠন ও চৈতন্যরূপ ইংরেজ শাসন, তৎসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক আদর্শ এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনও কোনও শাসকের ও সমষ্টিগতভাবে শাসকগােষ্ঠীরই প্রতিভার ফল। এক ধরনের সংকীর্ণ ব্যবহারবাদী চিন্তায় যেমন সব কিছুই ব্যাখ্যা করা হয় প্রেরণা ও প্রতিক্রিয়ার খেলা হিসেবে, ইতিহাসবিদ্যার এই ধারাটিতেও জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করা হয় এই বলে যে তা শুধু রাজশক্তির প্রয়ােজনে সৃষ্ট সুযােগসুবিধা শিক্ষাদীক্ষা আইনকানুন ইস্কুল–আদালত ইত্যাদির প্রেরণায় উৎসাহিত ভারতীয় উচ্চবর্গের আচরণ ও মনােভাবের সমষ্টিমাত্র। এই ব্যাখ্যাটির এক সাবেক সংস্করণে ইংরেজের আমদানি লিবারল’ সংস্কৃতিকেই জাতীয়তাবাদের প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হত। তবে এখন সেই দা–কাটা বক্তব্যকে আরও একটু পালিশ করে দেখানাে হচ্ছে যে কজনকে বি এ ডিগ্রি দেওয়া হল শুধু তারই ওপর জাতীয়তার প্রসার নির্ভর করে না, ওটা আর এক রকম শিক্ষাপ্রণালী বা লার্নিং প্রসেস–এর ফল। এই প্রণালীটি সম্পর্কে ব্যবহারবাদীরা পরীক্ষানিরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে খাবারের লােভ দেখালে ইদুরের মতাে জন্তুকেও শিক্ষিত করে তােলা যায়। একটা খাঁচার মধ্যে জটিল ধাঁধার মতাে চলাচলের পথ বানিয়ে তার কোনও দুর্গম অংশে একখণ্ড পনীর রেখে দিন। তারপর একটা শাদা ইঁদুর ছেড়ে দিন খাঁচার মধ্যে। কৃষ্ণের জীবটি অবশ্য দু–একবার রাস্তা হারিয়ে ফেলবে, ভুল করবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখবেন গােলােকধাঁধার প্যাঁচগুলি বহু চেষ্টায় রপ্ত করে সে ঠিক বুঝে নিয়েছে কেমনভাবে ওই খাদ্যবস্তুর কাছে পৌঁছনাে যায়। ইদুরের পক্ষে যা সম্ভব তা ভারতবাসীর অসাধ্য হবে কেন? কারণ এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দেখতে গেলে ইংরেজ আসার আগে ক্ষমতা বা রাজশক্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণাচিন্তা যা ছিল তার মধ্যে পলিটিকসের লেশমাত্র নেই, এগুলি নেহাৎ সনাতন সংস্কার মাত্র। তারা এসে তাদের শাসনকে রূপায়িত করল নানা ঔপনিবেশিক সংস্থায়, তা পরিচালনার জন্যে নিয়ম বেঁধে দিল। নিয়ম ভাঙলে কী সাজা হবে তাও ঠিক করে দিল আইনকানুন দিয়ে এবং ওইসব কিছু যাতে উচ্চবর্গের বােধগম্য হয় তার জন্যে একটা সংস্কৃতিকেও চালু করে দিল রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম ও বিস্তার করার উদ্দেশ্যে। এইসব সংস্থা ও তৎসংক্রান্ত সংস্কৃতি যে রাষ্ট্রীয় চিন্তা ও কর্মের উপলক্ষ ও বিষয় তারই নাম পলিটিকস এবং আলােচ্য ধারাটি অনুযায়ী সেই পলিটিকসে উচ্চবর্গের দীক্ষিত হওয়ার প্রণালীটির—‘লার্নিং প্রসেসটিরই—নাম জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদের এই ব্যাখ্যায় আদর্শনিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ জনসেবার স্থান নেই, আছে শুধু ঔপনিবেশিকতার বরে পাওয়া অর্থ যশ ও ক্ষমতার লােভ আর সেই লােভের লক্ষ্যগুলিতে পৌঁছনাের জন্যে ইংরেজ ও ভারতীয় উচ্চবর্গের মধ্যে এবং শেষােক্তদের নিজেদের মধ্যে সহযােগিতা ও সংঘাতের কাহিনীই, এই মতে, জাতীয় আন্দোলনের মূল কথা।

    অপরপক্ষে দ্বিতীয় প্রতিকল্পটির ছাঁচে সাজানাে ইতিহাসবিদ্যায় জাতীয় আন্দোলনকে উচ্চবর্গের নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ ও চালিত নির্ভেজাল আদর্শবাদী সংগ্রামের চেহারা দেওয়া হয়। এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রধানত ভারতীয় ঐতিহাসিকদেরই কাজ, তবে বিদেশে ‘লিবারল’ চিন্তাধারায়ও এর প্রকাশ বিরল নয়। এই ব্যাখ্যায়ও তারতম্য ঘটে। জাতীয় সংগ্রামের নায়ক রূপে উচ্চবর্গের অবদান এতে সর্বস্বীকৃত হলেও সব ব্যক্তি, সংস্থা, নীতি ও তার বিশেষ বিশেষ প্রয়ােগ সম্পর্কে মূল্যায়ন সকলের এক রকম নয়। তবে মােদ্দা কথাটা সম্পর্কে দ্বিমত নেই। সে কথাটা হচ্ছে এই যে আমাদের জাতীয় সংগ্রাম উচ্চবর্গের মাহাত্ম্য ও আদর্শনিষ্ঠার কাহিনীমাত্র, এবং এই প্রতিপাদ্যটিকে বিশ্বাসযােগ্য করার জন্যে ইংরেজের সঙ্গে তাদের সহযােগিতার চেয়ে বিরােধিতার দিকটাই বাড়িয়ে দেখা হয়, শােষক ও উৎপীড়ক হিসেবে তাদের সামাজিক ভূমিকা প্রায় অস্বীকার করেই জনসেবায় তাদের অগ্রণী ভূমিকার কথা বলা হয়, জাতীয় আন্দোলনের রাজনীতি ব্যবহার করে তারা যে রাজদত্ত ক্ষমতা ও সুযােগসুবিধার গৌণ ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি মারামারিতে লিপ্ত ছিল সেকথা চেপে গিয়ে শােনানাে হয় স্বার্থলেশহীন আত্মত্যাগের অলীক রূপকথা। এইভাবেই বুর্জোয়া–জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে জনগণের বিশাল আন্দোলনগুলি পরিণত হয়েছে উচ্চবর্গের সংকীর্ণ জীবনবৃত্তান্তে।

    এই পক্ষপাতদুষ্ট ইতিহাস থেকে অবশ্য অনেক কিছুই শেখার আছে। দেশি ও বিদেশি উচ্চবর্গের নানা ব্যক্তি ও গােষ্ঠীর কাজকর্ম ও চিন্তাধারা, তাদের ঐক্য অনৈক্য, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি তার চালক ও সহায়কদের মনােভাব, গণজীবন ও গণমত সম্পর্কে তাদের ধারণা ইত্যাদি অনেক তথ্যের আকর এই ভাষ্য। তবে এই ইতিহাস থেকে যা সবচেয়ে শেখার কথা তা হচ্ছে এই যে ইতিহাসচেতনা কখনও শ্ৰেণীচৈতন্যের সীমা অতিক্রম করতে পারে না।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    কিন্তু এই ধরনের ঐতিহাসিক চিন্তা ও রচনার মধ্যে যা শিক্ষাপ্রদ তা অস্বীকার না করেও বলা যায় যে তার সাহায্যে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে । সমগ্রভাবে বােঝা সম্ভব নয়। কারণ সেই অভিজ্ঞতার অন্যতম এবং মুখ্য উপাদান জনসমাবেশ, যা বলতে আমি বােঝাতে চাই সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ও . তাদের সমবেত কার্যকলাপের সমন্বয়। এই অর্থে জনসমাবেশ যে কদাচিৎ এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে উচ্চবর্গের প্রতিনিধিস্থানীয় ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমেই সম্ভবপর হয়েছিল তা যেমন সত্যি, তেমনই একথাও সত্যি যে সেই সমাবেশ অনেকবার এবং বহু ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছিল জনসাধারণের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র উদ্যোগে, এমন কী সচেতনভাবেই ওইসব ব্যক্তি ও সংগঠনের তােয়াক্কা না রেখে, বরং তাদের বিরােধিতা করেই। সেই উদ্যোগের ফলস্বরূপ যে অজস্র জমায়েতের কথা জানা যায় ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাবের আগেই, তার দৃষ্টান্তগুলি না হয় বাদ দিচ্ছি, কারণ অনেকে হয়তাে বলবেন যে তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রকট ছিল না, যদিও ১৮৫৭–র মহাবিদ্রোহ বা ১৮৯৯–১৯০০ সালের বিরসাপন্থী বিদ্রোহের মধ্যে জাতীয়তার অংকুর বা পূর্বাভাস যাঁদের চোখ পড়ে না অথচ সরকারি চাকরির অধিকার নিয়ে উনিশ শতকে উচ্চশিক্ষিতের বিক্ষোভ বা কংগ্রেসের প্রথম দশ বছরের কার্যকলাপে যাঁরা জাতীয়তাবাদের প্রকাশ দেখতে পান, তাঁদের মনশ্চতে চাশে ধরেছে বলতে হবে। তবু এসব কথা আপাতত বাদ দিয়ে যদি ঔপনিবেশিক আমলের সেই পর্বটির কথাই শুধু ধরা যায় যখন জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব একেবারেই সন্দেহের অতীত, তখনও বহু বিরাট আন্দোলন ঘটেছে যার সবটাই বা অনেকখানিই জনসাধারণের স্বতন্ত্র উদ্যোগের দৃষ্টান্ত, যেমন অসহযােগ যুগের কোনও কোনও সমাবেশ, ১৯৪২–এর অগাস্ট সংগ্রাম, কিংবা দেশভাগের পূর্বাহ্নে নৌবিদ্রোহকে উপলক্ষ করে শ্রমজীবী জনতার অভ্যুত্থান।

    উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গির বাহন ইতিহাসবিদ্যার সাধ্য নেই যে জাতীয়তাবাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা স্বীকার করে কিংবা ব্যাখ্যা করে। কারণ তা হলেই মেনে নিতে হয় যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধু উচ্চবর্গের কৃতিত্ব নয়, এবং সেই অস্বস্তিকর সত্যটা তাদের স্বার্থ ও আদর্শের—ইডিয়ােলজির—বলগায় বাঁধা ইতিহাসের সঙ্গে খাপ খায় না। অথচ ওই ধরনের সমাবেশের ব্যাপক ও সংগ্রামী ভূমিকা এতই স্বতঃপ্রকাশ যে তা উপেক্ষা করা চলে না। সুতরাং ওই ইতিহাসে সাক্ষ্যপ্রমাণ সব উড়িয়ে দিয়ে জনসাধারণের যা স্বতন্ত্র সৃজনী প্রতিভার ফল, উচ্চবর্গ তাকে আত্মসাৎ করে চালিয়ে দিচ্ছে নিজেরই চিন্তা ও কাজ বলে। এক কথায়, এই বিদ্যা ভারতবাসীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার বিস্তার, গভীরতা ও জটিলতাকে উচ্চবর্গের পক্ষপাতী একটা প্রশস্ত, অগভীর, অতি সরল কীর্তিগাথায় পরিণত করেছে।

    অথচ যে আদিকল্প থেকে এই ধরনের ব্যাখ্যার উদ্ভব হয়েছে, একদা ইতিহাসবিদ্যার প্রগতি ঘটেছিল তারই জোরে। একথা আমি আগেই বলেছি। তারই জোরে তখন ইতিহাসচেতনায় দেবলীলার পরিবর্তে মানুষের ঐহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং জের টেনে—শেষ পর্যন্ত একথাও স্বীকৃতি পেয়েছিল যে ভারতের ইতিহাসে কেবল ইংরেজেরই নয়, ভারতবাসীর (যদিও উচ্চবর্গের অন্তর্ভুক্ত মুষ্টিমেয় ভারতবাসীর) অবদানও আছে। সেই ধাক্কার জোরেই তখন অতীতের কত নতুন দরজা খুলে গিয়েছিল, নতুন তথ্যের খনি আবিষ্কৃত হয়েছিল, রাষ্ট্র সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কত নতুন সম্পর্ক উদ্ভাসিত করেছিল আগলভাঙা হঠাৎ আলাে। কিন্তু সেই আদিকল্পটি আজ বৃদ্ধ, সে তার সৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটা মােটেই নতুন ব্যাপার নয়। এক সময় জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা হত ভূকেন্দ্রিক আদিকল্পকে আশ্রয় করে। কোপারনিকাস তারই ভিত্তিতে এমন সব প্রশ্ন করে বসলেন যে ওই টলেমীয় বিদ্যার সাহায্যে তার উত্তর মেলে না। এইসব নতুন প্রশ্নের চাপেই শেষ পর্যন্ত সেই পুরনাে আদিকল্প ভেঙে পড়ল, তার জায়গা জুড়ে বসল সূর্যকেন্দ্রিক আদিকল্প, এবং জ্যোতির্বিদ্যায় মধ্যযুগীয় চিন্তার রাজত্ব শেষ হল। আলেকজর কোয়ারে, টমাস কুন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে এইভাবেই বিজ্ঞানের এক একটি শাখায় সংকট ঘটেছে যখন প্রতিষ্ঠিত আদিকল্পগুলির নিজ প্রতিভাবলেই এমন সব সমস্যা তৈরি হয়েছে যার সমাধান তাদের তত্ত্ব ও অভ্যাসের অধীন নয়, আর তখনই নতুন কোনও আদিকল্প এসে সেই সংকট সমাধান করেছে।

    আমরাও ইতিহাসবিদ্যার একটা সংকটের মধ্যে আছি। কারণ তারই অভ্যাস থেকে এমন সব প্রশ্ন উঠেছে যার উত্তর পুরনাে আদিকল্পটি থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। এই প্রশ্নগুলির একটা সম্পূর্ণ তালিকা তৈরি করে শােনাতে গেলে আপনাদের সময় নষ্ট হবে, কারণ তা অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। গবেষকদের জিজ্ঞাস্যের পার্থক্য এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নতুন নতুন প্রশ্ন বা পুরনাে প্রশ্নই নতুনভাবে উঠছে ও উঠবে। তবে তাদের প্রবণতায় মােটামুটি মিল আছে। সেই মিলের কথা মনে রেখে তাদের বিষয়বস্তুটির একটি সাধারণ বর্ণনা তৈরি করা যায়। প্রশ্নগুলি প্রায় সবই গড়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসাকে ঘিরে। জিজ্ঞাসাটা এই: আমাদের জাতীয়তার আন্দোলনে রাজনৈতিক সমাবেশের চরিত্রটা কী ছিল? বিষয়টা নতুন নয়, কারণ প্রচলিত ইতিহাসবিদ্যার পক্ষেও তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। যা একেবারেই নতুন তা হচ্ছে প্রচলিত উত্তরগুলি সম্পর্কে সাম্প্রতিক ইতিহাসচেতনার অসন্তোষ এবং সেই অসন্তোষেরই পরিণতি হিসেবে একদা–অপাংক্তেয় তথ্যকে সম্মানিত করা ঐতিহাসিক বক্তব্যের মধ্যে, ওই কারণেই এতদিন যা বিশ্লেষণের নিঃসংশয়িত পদ্ধতি বলে গণ্য হত তাকে আবার যাচাই করে নেবার চেষ্টা, আর সবচেয়ে বড় কথা–ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাসকে বিচার করা নতুন তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে।

    দু–একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে কথাটা হয়তাে আরও পরিষ্কার করে বলা যায়। যেমন একথা যদি সত্যি হয় যে ভারতবাসীর রাজনৈতিক চেতনার উৎপত্তি হয়েছিল ইংরেজের শাসনব্যবস্থা থেকেই এবং তার বিকাশ ঘটে ওইগুলিকে আশ্রয় করেই, তাহলে দেশীয় রাজ্যে প্রজা–আন্দোলন হয়েছিল কোন প্রেরণায় ? সেখানে তাে অভ্যন্তরীণ, বিশেষ করে গ্রামীণ, শাসনসংস্থায় ইংরেজরা হাত দেয়নি। কিংবা যদি উচ্চবর্গের প্রতিভাই জাতীয়তাবােধ ও জাতীয় আন্দোলনের একমাত্র কারণ হয়ে থাকে তাহলে তাদের প্রতিনিধিস্থানীয় সংগঠন বা ব্যক্তির সর্দারি ছাড়াও, এবং তাদের নেতৃত্ব ও পরামর্শ উপেক্ষা করেই যে সব ঐতিহাসিক গণসমাবেশ ঘটেছিল তার ব্যাখ্যা কেমন করে হয় ? উচ্চবর্গের উদ্যোগসিদ্ধ খাড়াখাড়ি সমাবেশই যদি গণ–আন্দোলনের একমাত্র বাহন হয়ে থাকে, তা হলে নিম্নবর্গের মধ্যে ক্ষমতা ও মর্যাদায় সমকক্ষ শ্রেণী গােষ্ঠী জাতি বা সমূহ যে নিজেদেরই উদ্যোগে বারবার সামিল হয়েছে আড়াআড়ি সমাবেশে তার তাৎপর্য বােঝার উপায় কী? এই যে লাখলাখ লােক জেল পুলিশ কালাপানি ফাঁসি নিদেনপক্ষে বেকারি ও অন্নাভাবের অনিবার্য সম্ভাবনা সত্ত্বেও সাড়া দিয়েছিল দেশের ডাকে, আসলে কি তারা সকলেই বা অধিকাংশই নেমিয়ার–বর্ণিত পিঁপড়ের মতাে রাজদন্ত সুযােগ–সুবিধার মধুভাণ্ডের দ্বারাই শুধু আকৃষ্ট হয়েছিল? নিঃস্বার্থ আদর্শের কণামাত্রও কি নেই তাদের চৈতন্যে? তাদের সেই চৈতন্য কি নিপ্রাণ ও স্কুল জড়পিণ্ড মাত্র যার আলাে সবটাই ধার করা উচ্চবর্গের জীবন্ত ও প্রখর চৈতন্য থেকে, পৃথিবীর আলাে যেমন ধার করা সূর্য থেকে? যদি তা সত্য না হয়, যদি নিম্নবর্গের চৈতন্যকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা বলে স্বীকার করা হয়, তাহলে তার বৈশিষ্ট্য কী এবং উচ্চবর্গের চিন্তাভাবনা, আদর্শ ও মানসিকতার সঙ্গে তার সংঘাত ও সমঝােতা—এক কথায়, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক—বুঝব কোন তত্ত্ব বা বিশ্লেষণ পদ্ধতির সাহায্যে?

    এইসব প্রশ্ন উঠছে প্রচলিত আদিকল্পটির অভ্যাস থেকেই, অথচ তার সাধ্য নেই এগুলির উত্তর দেয়। এইটাই সেই আদিকল্পের সংকট। এই সংকটের নানা লক্ষণ দেখা, যাচ্ছে ইতিহাসবিদ্যায়। লক্ষণ শুধু এই নয় যে নতুন সমস্যাগুলির মুখােমুখি হয়েও তা সমাধান করতে পারছেন না বলেই উচ্চবর্গের মুখপাত্ররা আগের চেয়েও বেশি তারস্বরে বলার চেষ্টা করেছেন যে ঔপনিবেশিক যুগের রাজনীতি ও জমায়েতের অভিজ্ঞতা সবটাই দেশি বা বিলিতি বুর্জোয়াদের কৃতিত্ব। লক্ষণ আরও এই যে এমন কী যাঁরা জাতীয়তাবাদে ও জাতীয় আন্দোলনে নিম্নবর্গের ভূমিকা সত্যিই বুঝতে ও বর্ণনা করতে চান, সেই সব লেখক ও গবেষকও অনন্যোপায় হয়ে উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গিতেই শরণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং সমাজের নীচের তলার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সমাবেশগুলিকেও দলাদলি বা খাড়াখাড়ি জমায়েতের গতানুগতিক ছকে সাজাবার চেষ্টা করছেন। প্রচলিত আদিকল্পটি দেউলে হয়ে গেছে বলেই নিম্নবর্গের চৈতন্যের সুস্থ প্রকাশ বিদ্রোহী সমাবেশগুলি যেমন ঐতিহাসিক বক্তব্যের মধ্যে তাদের স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, তেমনি জাতপাতের ঝগড়া ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তার অসুস্থ প্রকাশকেও গণসমাবেশেরই আর একটি চেহারা বলে স্বীকার না করে চালানো হচ্ছে কেবলমাত্র ইংরেজেরই ভেদনীতির কুফল বলে। অর্থাৎ আবার সেই একই কথা—নিম্নবর্গের মানুষের চেতনায় স্বকীয়তা বলে কিছু নেই: তার মধ্যে যেটুকু ভাল মন্দ তার সবটাই যথাক্রমে দেশি ও বিদেশি উচ্চবর্গের কাছ থেকে পাওয়া।

    উচ্চবর্গের পক্ষপাতী এই ইতিহাসবিদ্যার সংকট থেকে বেরােতে হলে সমালােচনা দিয়েই শুরু করতে হবে। সমালােচনাই নতুন পথ খোঁজার উপায়। আমি খোঁজার কথাই বলছি, পৌছনাের কথা নয়। কারণ পৌছে যাব শুধু তখনই যখন একেবারে নতুন কোনও আদিকল্পকে বসানাে যাবে পুরনােটির জায়গায়। এই ধরনের পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ শুধু নয়, অনেক এগনাে–পেছনাে, হারিয়ে যাওয়া, হোঁচট খাওয়া তার স্বভাবসিদ্ধ, এবং সেজন্যেই জ্ঞান–বিজ্ঞানের ইতিহাসে আকস্মিকতার অভাব নেই। সুতরাং এই পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ একেবারে নির্ভুলভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা অবান্তর হবে। তবে যে–সংকটের কথা এতক্ষণ আলােচনা হল তার লক্ষণগুলি মনে রেখে বলা যায় যে ইতিহাসবিদ্যাকে ঢেলে সাজাতে হলে নিম্নবর্গের দিকে চোখ ফেরাতে হবে, ঔপনিবেশিক ভারতের সমাজ সংস্কৃতি অর্থনীতি এবং সব কিছুরই ওপরে রাজনীতিতে তাদের বিশিষ্ট ভূমিকা কী ছিল তা নির্ণয় করতে হবে, সেই উদ্দেশ্যেই নতুন তথ্য খুঁজতে ও পুরনাে তথ্যকে নতুনভাবে পড়তে হবে, দরকার হলে বিশ্লেষণের পুরনাে কায়দা ছেড়ে নতুন কায়দা তৈরি করে নিতে হবে, আর এই সব কিছুকে সম্ভব করার জন্যেই তথ্যাশিত অভ্যাসের সঙ্গে মেলাতে হবে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    ২. নিম্নবর্গের রাজনীতি ও ইতিহাসবিদ্যার দায়িত্ব

    উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গ বলতে কী বােঝায়, এ–পর্যন্ত তার কোনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করিনি। তবু এই শব্দ দুটি যে ঔপনিবেশিক সমাজের মধ্যে একটা মৌলিক ভেদের স্কুল সংকেত হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে কারও ভুল হবার কথা নয়। আমার বাকি বক্তব্যের প্রস্তাবনা করছি ওই দুটি শব্দের সংজ্ঞা দিয়ে।

    উচ্চবর্গ বলতে আমি বােঝাতে চাই তাদেরই, ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে যারা প্রভুশক্তির অধিকারী ছিল। প্রভুস্থানীয়দের দু–ভাগে ভাগ করা যায়—বিদেশি ও দেশি। বিদেশি প্রভূগােষ্ঠীর মধ্যে যারা এই সংজ্ঞাসম্মত তারাও দু–ধরনের—সরকারি ও বেসরকারি। সরকারি বলতে গণ্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অভারতীয় কর্মচারী ও ভৃত্য সকলেই; আর বেসরকারি বলতে গণ্য বিদেশিদের মধ্যে যারা শিল্পপতি, বণিক, অর্থব্যবসায়ী, খনির মালিক, জমিদার, নীলকুঠি চা–বাগান কফিক্ষেত বা ওই জাতীয় যে সব সম্পত্তি প্লাটেশন প্রণালীতে চাষ করা হয় তার মালিক ও কর্মচারী, খ্রিস্টান মিশনারি, যাজক, পরিব্রাজক ইত্যাদি।

    দেশি প্রভূগােষ্ঠীর মধ্যেও একটা মােটা ভাগ ছিল সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থের পার্থক্য অনুযায়ী। সর্বভারতীয়দের গণ্য বৃহত্তম সামন্ত প্রভুরা, শিল্পে ও বাণিজ্যে লিপ্ত সবচেয়ে শক্তিমান বুর্জোয়ারা এবং ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রে বা শাসনযন্ত্রের অন্যত্র যারা ছিল সবচেয়ে উচ্চপদের অধিকারী।

    দেশি প্রভুগােষ্ঠীর আঞ্চলিক বা স্থানীয় প্রতিনিধিরাও আবার দু–রকমের। এক রকম হচ্ছে তারাই যারা আসলে সর্বভারতীয় প্রভূগােষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বিশেষ বিশেষ অবস্থায় ক্ষমতাবিন্যাসের আঞ্চলিক বা স্থানীয় উপাদান হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর এক রকম হচ্ছে তারা যাদের প্রভুত্ব ষােলাে আনাই আঞ্চলিক বা স্থানীয়, কিংবা যারা অন্য সব অর্থে প্রভুগােষ্ঠীর মধ্যে গণ্য না হলেও আঞ্চলিক বা স্থানীয় অবস্থায় প্রভুগােষ্ঠীর স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কাজ করে, নিজেদের সামাজিক সত্তার ধর্ম অনুযায়ী কাজ করে না।

    এই শেষােক্তদের, অর্থাৎ দেশীয় প্রভুগােষ্ঠীর স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের সম্পর্কে একটা কথা কিন্তু খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখা দরকার। কথাটা এই যে সামগ্রিক ও শুদ্ধ অর্থে উচ্চবর্গের এই অংশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার অসমতা, এবং সেই অসমতার কারণ দ্বিবিধ: এক–সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের আঞ্চলিক বৈষম্য; আর দুই—এই অংশটির সামাজিক গড়নের সাংকর্য, অর্থাৎ তার অন্তর্ভুক্ত উপাদানগুলির মধ্যে গুণগত পার্থক্য। এই দ্বিবিধ অসমতার ফলেই যে–শ্রেণী বা সমূহ এক অঞ্চলে প্রভুস্থানীয় বলে গণ্য তারাই আবার অন্যত্র আর এক প্রভুগােষ্ঠীর অধীন। একাধারে প্রভুত্ব ও অধীনতার প্রতীক বলেই তাদের মানসিকতা, রাজনৈতিক আদর্শ ও আচরণ, সখ্য ও শত্রুতার ঝোঁক বা তাৎপর্য সবক্ষেত্রেই এক নয়, বরং অর্থ ও উদ্দেশ্যের নানারকম স্ববিরােধিতায় তা প্রায়শই অস্পষ্ট ও জটিল হয়ে দেখা দেয়। ঔপনিবেশিক যুগে ভূস্বামীদের মধ্যে যারা নিঃস্ব হয়ে পড়ে, গ্রামভদ্রদের মধ্যে যারা আর্থিক বা সামাজিক ক্ষমতায় একটু খাটো, মাঝারি কৃষকদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত ওপরের দিকে এবং ধনী কৃষকশ্রেণী—এরা সকলেই আমার সংজ্ঞার শুদ্ধ অর্থে নিম্নবর্গের অন্তর্গত হলেও বহুক্ষেত্রেই অবস্থার চাপে ও চৈতন্যের অন্তর্দ্বন্দ্বে উচ্চবর্গের সপক্ষে কাজ করে। আদর্শের বিশুদ্ধতা থেকে বাস্তবের এই বিচ্যুতি ও তারই পরিণামে যে ঐতিহাসিক জটিলতার সৃষ্টি হয় তার সন্ধান, বিশ্লেষণ ও বর্ণনাই গবেষণার দায়িত্ব।

    ঔপনিবেশিক ভারতে যারা এই সংজ্ঞা অনুযায়ী উচ্চবর্গের অন্তর্গত, সমগ্র জনসংখ্যা থেকে তাদের বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তারাই নিম্নবর্গ। এর মধ্যে শহরের শ্রমিক ও গরিব, সর্বোচ্চ পদের আমলাদের বাদ দিয়ে মধ্যবিত্তের বাকি অংশ, গ্রামের ক্ষেতমজুর, গরিব চাষি ও প্রায়–গরিব মাঝারি নিম্নবর্গের মধ্যে গণ্য। তা ছাড়াও এই সংজ্ঞার শুদ্ধ অর্থে গণ্য হবে নির্বিত্ত ভূস্বামী, অপেক্ষাকৃত হীনবল গ্রামভদ্র, অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন মাঝারি কৃষক এবং ধনী কৃষকরাও—যদিও, একটু আগেই যেমন বলেছি, এদের ভূমিকা স্পষ্ট নয় বরং দোটানায় জটিল এবং বাস্তবে এরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের সামাজিক সত্তার নিয়ম অনুযায়ী কাজ না করে উচ্চবর্গের স্বার্থ অনুযায়ী চলে।

    আমার বক্তব্য থেকে একথা হয়তাে এতক্ষণে পরিষ্কার হল যে উচ্চবর্গ নিম্নবর্গের বৈপরীত্য ব্যবহার করে ইংরেজশাসিত ভারতবর্ষে ক্ষমতাবিন্যাসের মূল সূত্রটি সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণায় আমি পৌছতে চাই। এই বৈপরীত্যের ওপর জোর দিয়ে ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস ব্যাখা করার চেষ্টা প্রয়ােজন মনে করি এই জন্যে যে প্রচলিত বিশ্লেষণ–পদ্ধতিগুলির সাহায্যে তখনকার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে সমগ্রভাবে বর্ণনা করা সম্ভব নয়, এবং সম্ভব নয় বলেই নিম্নবর্গের ভূমিকা উপেক্ষিত হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিগুলি দু–ধরনের; তাদের মধ্যে একটিকে বলা যায় মােটা কায়দা, অন্যটিকে মিহি কায়দা।

    মােটা কায়দার বিশ্লেষণে শুধু ইংরেজ ও ভারতীয়দের সম্পর্কটাই রাজনীতির বিষয় বলে স্বীকৃত হয়। ফলে ঐতিহাসিক যদি বিদেশি উচ্চবর্গের পক্ষপাতী হন তা হলে ওই যুগের অভিজ্ঞতা শাসকদের অভিজ্ঞতায় আত্তীকৃত হবে, আর তিনি যদি দেশি উচ্চবর্গের পক্ষপাতী হন তা হলে তা আত্তীকৃত হবে জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের চিন্তায় ও কাজে। উভয়তই নিম্নবর্গের ঐতিহাসিক চেতনা ও কর্মের কোনও স্বীকৃতি নেই।

    মিহি কায়দার বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য জাতি ও শ্রেণীগত সম্পর্ক বিচার করা। সমাজের নীচের তলার বাস্তব অবস্থা বােঝার পক্ষে মােটা কায়দার চেয়ে এটি অনেক বেশি কার্যকর। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগের রাজনীতি সম্পর্কে কোনও সামগ্রিক ধারণা তৈরি করা সম্ভব নয় কেবলমাত্র জাতভেদ ও শ্রেণীভেদের ভিত্তিতে। কারণ বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ফলে জাতে–জাতে ও শ্রেণীতে–শ্রেণীতে পারস্পরিক সম্পর্কের চেহারাটা সর্বত্রই এক রকমের নয়। এই অবস্থায় বিশ্লেষণের কাজ যদি ক্ষমতাবিন্যাসের একটি সাধারণ সূত্র আশ্রয় না করে এগােয় তা হলে জাতনির্ণয় ও শ্ৰেণীনির্ণয় যতই সূক্ষ্ম ও চুলচেরা হবে, ঐতিহাসিক বিবৃতি ততই বিব্রত হবে অনাবশ্যক তথ্যের বহুলতায় এবং শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি হবেই একরকম অনেকত্ববাদী বা প্লুরালিস্ট বর্ণনায় যা আসলে অতীতকে সম্যক বােঝার দায়িত্ব এড়াবার নামান্তর মাত্র।

    সুতরাং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উপায় হিসেবে এমন একটা মৌলিক ও কেন্দ্রীয় ধারণা তৈরি করে এগােতে হবে যা দিয়ে ক্ষমতাসূচক সব সম্পর্কই বােঝা বা ব্যাখ্যা করা সম্ভব, যা শ্রেণীসম্পর্ক–জাত সম্পর্ক, শাসকশাসিতের সম্পর্ক ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ সম্পর্ক থেকে ভিন্ন প্রকৃতির অথচ ওই সম্পর্কগুলি সবই যার অন্তর্নিবিষ্ট। উচ্চবর্গ নিম্নবর্গের বৈপরীত্য এই রকমই একটা কেন্দ্রীয় ধারণা। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কোনও অভিব্যক্তি নেই যা এই দ্ব্যক সম্বন্ধ দিয়ে বােঝা বা বােঝানাে যায় না। জাত শ্রেণী সম্প্রদায় ও অন্যান্য সমূহের নানা অংশের মধ্যে, রাজাপ্রজা স্ত্রীপুরুষ জ্যেষ্ঠকনিষ্ঠ প্রভৃতির মধ্যে, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সর্বত্র ক্ষমতাবৈষম্য সেই বৈপরীত্যের বিশেষ বিশেষ প্রকাশ। এবং তা যেমন সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রকট, আঞ্চলিক ক্ষেত্রেও তেমনি। এক কথায়, যুক্তিসিদ্ধ এবং প্রয়ােগে নমনীয় বলেই, অভিজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য ও সামান্যতা উভয়কেই বােধগম্য করতে পারে বলেই এই ধারণাটি এত শক্তিশালী।

    এই বৈপরীত্যের কথা মনে রাখলে ঔপনিবেশিক আমলের রাজনীতি সম্পর্কে একটা প্রচলিত এবং প্রায় স্বতঃসিদ্ধ বলে স্বীকৃত বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। বিশ্বাসটা এই যে ভারতের রাজনৈতিক জীবনের সবটাই একটিমাত্র উপাদানে তৈরি, সেই উপাদান ইংরেজ–প্রবর্তিত উদারনৈতিক শিক্ষাসংস্কৃতি থেকে নেওয়া বা তারই প্রত্যক্ষ ফল, এবং ওই রাজনীতির ক্ষেত্রটি খণ্ড। ইতিহাসের সব ব্যাখ্যাতেই—তা ঔপনিবেশিকতার পক্ষপাতী হােক কিংবা জাতীয়তাবাদের পক্ষপাতী হােক—সব ব্যাখ্যাতেই এই কথাটা অবিসংবাদী বলে অনুমিত হয় এবং এটাকে সত্য বলে ধরে নিয়েই বক্তব্য সাজানাে হয়ে থাকে।।

    কিন্তু একটু ভাবলেই বােঝা যাবে যে বিশ্বাসটা অমূলক। কারণ ইংরেজ আমলের। ইতিহাস উচ্চবর্গের রাজনীতির পাশাপাশি আর একটি রাজনীতির অস্তিত্ব এতই স্পষ্ট যে সে বিষয়ে ভুল হবার উপায় নেই। সেই রাজনীতির ক্ষেত্রে নিম্নবর্গই নায়ক, উচ্চবর্গ নয়; নিম্নবর্গের প্রতিভাই সেই রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত সব চিন্তা ও কাজের চালিকা শক্তি। এক কথায়, তা রাজনীতির একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র। ক্ষেত্রটির বৈশিষ্ট্য, তার ঐতিহাসিক উৎপত্তি, সমাবেশের চরিত্র, আদর্শরূপ ও বাস্তব ভিত্তি অনুযায়ী সংক্ষেপে বর্ণনা করছি।

    প্রথম বৈশিষ্ট্য এই যে এই রাজনীতির মূল উপাদানগুলি ইংরেজ রাজত্ব শুরু হবার আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল, কিন্তু সেই অর্থে সনাতন হলেও প্রাকব্রিটিশ যুগের উচ্চবর্গীয় রাজনীতির মতাে তা ঔপনিবেশিক অবস্থার চাপে নষ্ট বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি। বরং নতুন অবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে এবং তারই মধ্যে চেতনা ও ব্যবহারের নানা দ্বন্দ্বের ফলে আকারে ও গুণে কিছু নতুনত্ব নিয়ে তা ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে গেছে—এবং এখনও বােধ হয় কাজ করে যাচ্ছে (যদিও স্বাধীন ভারতের কথা আমি বর্তমান আলােচনার বাইরে রাখতে চাই)। মােটামুটি বলা চলে যে, ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও বিকাশের দিক থেকে বিচার করলে নিম্নবর্গের রাজনীতির ক্ষেত্রটি পুরনাে হয়েও আধুনিক এবং উচ্চবর্গের রাজনীতির তুলনায় তার পরিপ্রেক্ষিতের গভীরতা ও তার সত্তার ঘনত্ব অপেক্ষাকৃত বেশি।

    এই রাজনীতির দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নিম্নবর্গের সমাবেশের কায়দায় ও চরিত্রে। উচ্চবর্গের উদ্যোগজাত সমাবেশকে যদি খাড়াখাড়ি বলে বর্ণনা করা যায় তাহলে নিম্নবর্গের। উদ্যোগজাত সমাবেশকে আড়াআড়ি বলে বর্ণনা করা চলে। ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার জন্য ইংরেজরা যেসব সংস্থা এদেশে চালু করেছিল এবং প্রাক–ঔপনিবেশিক আমলে সামন্তশাসনের সহায়ক যেসব সংস্থা তখনও একান্ত অকেজো হয়ে যায়নি, সেগুলিই ছিল খাড়াখাড়ি সমাবেশের উপায়। কিন্তু আড়াআড়ি সমাবেশের প্রধান উপায় নিম্নবর্গের সমাজে কুটুম্বিতা ও আঞ্চলিকতার প্রত্ন বিধিব্যবস্থা কিংবা শ্রেণীসংস্থা বা এই দুই–এর নানারকম সমন্বয়। উচ্চবর্গের জমায়েতের ঝোঁক প্রধানত ছিল আইনের মধ্যে থেকে বরং আইনকে আশ্রয় করেই কাজ চালানো, আইনভঙ্গের মধ্যে যথাসাধ্য লিপ্ত না হওয়া; নিম্নবর্গের জমায়েত যথাসম্ভব আইনসংগত রাস্তা ধরে এগােত ঠিকই, কিন্তু প্রয়ােজন হলে তা বেআইনি এমনকি হিংসাত্মক হয়ে উঠত অপেক্ষাকৃত সহজে এবং আরও তাড়াতাড়ি—তাই এই জমায়েত উচ্চবর্গের কাছে অনেক সময়েই খুব অপ্রত্যাশিত ও স্বতঃস্ফুর্ত মনে হত। ঔপনিবেশিক যুগে নিম্নবর্গের এই জমায়েতের। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী রূপ দেখা যায় তৎকালীন কৃষকবিদ্রোহগুলিতেই। শহুরে মধ্যবিত্ত, শ্রমিক বা অন্যান্য গরিব জনতার সমাবেশেও তখন ওই প্রকার বিদ্রোহী কৃষক জমায়েতের আদিকল্পটির বহু লক্ষণ স্পষ্টই চোখে পড়ে। উচ্চবর্গের পক্ষপাতী ইতিহাসবিদ্যার পক্ষে নিম্নবর্গের জমায়েতের এই বৈশিষ্ট্যগুলি স্বীকার করা সম্ভব নয়, কারণ করলেই যে–আদিকল্পটি সেই ইতিহাসবিদ্যার ভিত্তি তাকে অস্বীকার করতে হয়।

    এই রাজনীতির তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আদর্শগত। নিম্নবর্গের সামাজিক সত্তা যে সব উপাদানে তৈরি তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চৈতন্যের স্তর ও রাজনৈতিক লক্ষ্য সব ক্ষেত্রে সমান নয়। তাই তাদের আদর্শগুলির মধ্যে অমিল, এমন কি পরস্পরবিরােধিতাও ছিল, এবং তারই ফলে সেই রাজনীতির সামগ্রিক আদর্শের চেহারাটা অবস্থাভেদে এক–এক রকমের হয়ে দেখা দিত। মােটামুটি বলা চলে যে, কোনও পরিস্থিতি বা ঘটনার মধ্যে এই রাজনীতির এক বা একাধিক উপাদান যখন অন্য উপাদানগুলির চেয়ে বড় হয়ে উঠত তখন তারই প্রভাবে অন্তত সাময়িকভাবে সেই রাজনীতির আদর্শগত গুণ ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হত। ফলেই অবস্থাভেদে এই আদর্শের নানান ধারার মধ্যে কিছু কিছু প্রকারভেদ ও অসমতা লক্ষ করা যায়। তবে অসমতা সত্ত্বেও যা সর্বত্র প্রকট তা হচ্ছে। উচ্চবর্গের প্রতি আনুগত্য ও বিরােধিতার সমন্বয়। এই দুটির আপেক্ষিক গুরুত্বেও আবার তারতম্য ছিল, কিন্তু বিরােধিতা যখন আনুগত্যকে ছাড়িয়ে যেত তখনই নিম্নবর্গের রাজনীতির মৌলিকতা এবং উচ্চবর্গের রাজনীতি থেকে তার পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠত।

    এই রাজনীতির চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটির মূলাধার প্রকৃতির দেওয়া ও মানুষের তৈরি সেই বাস্তব অবস্থা যা দিয়ে নিম্নবর্গের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা, তাদের কায়িক ও মানসিক শ্রমের সংগঠন, এবং সর্বোপরি জীবিকা ও শ্রমের শর্তস্বরূপ শােষকশােষিতের ক্ষমতাগত সম্পর্কগুলি নির্ধারিত হয়। উচ্চবর্গের ইতিহাসবিদ্যায় এই সবকিছুই একটা সংকীর্ণ অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত হয়েছে। তার পক্ষে কিছুতেই স্বীকার করা সম্ভব নয় যে সেই অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা আসলে প্রভুত্ব ও অধীনতার সূত্রে নিয়ন্ত্রিত এবং এই দুটির টানাপােড়েনেই নিম্নবর্গের রাজনীতির অনেক নকশা বােনা হয়ে থাকে।

    নিম্নবর্গের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে এতক্ষণ যা বলেছি সে বিষয়ে দুটি কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার, নইলে অনেক বাজে তর্কে সময় নষ্ট হবে। প্রথম কথাটি হচ্ছে এই যে বৈশিষ্ট্যগুলি আমি যেভাবে বর্ণনা করলাম তা তাদের শুদ্ধ রূপ। বলাই বাহুল। যে ঔপনিবেশিক যুগের বাস্তব রাজনীতির অভিজ্ঞতার মধ্যে বৈশিষ্ট্যগুলিকে অবিকল এই রূপেই দেখার চেষ্টা নিরর্থক। স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে এই বৈশিষ্ট্যগুলি তাদের সাধারণ চরিত্র অক্ষুন্ন রেখেই এক–এক অবস্থায় এক–এক ভঙ্গিতে কাজ করবে। আমি তাদের শুদ্ধ রূপটিকেই তুলে ধরেছি শুধু এই জন্যেই যে, আমার উদ্দেশ্য একটি তাত্ত্বিক প্রস্তাবের মূলসূত্রগুলি এখানে উল্লেখ করা। কিন্তু আমিই যখন আবার কোনও বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করতে বসব তখন আমার কাজ হবে সেই তত্ত্বের আলােকে ওই অভিজ্ঞতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলির মিশ্ররূপকে পূর্বোক্ত শুদ্ধরূপের সঙ্গে তুলনা করা এবং তুলনার ফলে যে পার্থক্য ধরা পড়বে তা দিয়েই সেই ঐতিহাসিক বিষয়টার অনন্যতা বর্ণনা করা।

    এ প্রসঙ্গে আমার দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে এই যে, বৈশিষ্ট্যগুলির একটা পাকা ফর্দ বানিয়ে পেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয় এবং তা করাও সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস নিয়ে এখন পর্যন্ত যা কাজ হয়েছে তারই ভিত্তিতে একটা সাধারণ ধারণাকে মােটা কথায় সাজিয়ে বলা গেল। গবেষণা যতই এগােবে এবং নিম্নবর্গের ইতিহাস নিয়ে চিন্তায় ও লেখায় আমাদের চেষ্টা যতই ব্যাপক ও নিপুণ হবে, বৈশিষ্ট্যগুলির চেহারা ততই বিশদ হয়ে উঠবে। তবে একান্ত সঙ্গত কারণেই অসমাপ্ত এই বর্ণনা থেকে একথাটা হয়তাে পরিষ্কার হয়ে থাকবে যে প্রচলিত আদিকল্পটিকে আশ্রয় করে ঔপনিবেশিক আমলের রাজনীতি সম্পর্কে যে অদ্বৈতবাদী ধারণা ইতিহাসবিদ্যায় স্বতঃসিদ্ধ বলে মান্য, তা দিয়ে ওই যুগের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সমগ্রভাবে বােঝা বা ব্যাখ্যা করা যায় না, বরং সেই অদ্বৈতবাদী ধারণাটিই আসলে ওই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় উচ্চবর্গের প্রাধান্য কায়েম রাখার ও নিম্নবর্গের ভূমিকা অস্বীকার করার মূল শর্ত।

    এই বৈশিষ্ট্যবিচারের ভিত্তিতে তা হলে নিঃসন্দেহেই বলা চলে যে ঔপনিবেশিক যুগের রাজনীতির ক্ষেত্রটি দ্বিধাবিভক্ত। কিংবা অন্য উপমায় বলা যায় যে, উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের চৈতন্য ও কর্মের বাহন দুটি স্বতন্ত্র ধারা বয়ে চলেছে ওই রাজনীতির মধ্যে। তবে সেই সঙ্গে একথাও বেশ জোর দিয়েই বলা দরকার যে স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও ওই ধারা দুটি পরস্পর নিরপেক্ষ নয়। নিরপেক্ষ নয় তাদের বৈপরীত্যের জন্যেই। বিপরীত বলেই যে কোনও দ্বণুক সম্বন্ধের রাশি দুটির মতাে তাদের একটি অপরটির অস্তিত্ব সূচনা করে, ঘােষণা করে।

    কিন্তু এই সাধারণ অর্থ ছাড়াও একটি বিশেষ অর্থে তারা সম্পৃক্ত। সম্পৃক্ত এই কারণে যে উচ্চবর্গের কোনও কোনও অংশ কখনও কখনও এই দুটি ধারাকে তাদের নিজেদের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে মেলাতে চেষ্টা করেছে উভয়বর্গের একত্রিত সমাবেশে। বিশেষ করে বুর্জোয়াদের চেষ্টায় এই ধরনের সমাবেশ কয়েকটি বিরাট সাম্রাজ্যবাদবিরােধী সংগ্রামের উপলক্ষ ও হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, যদিও তা সব ক্ষেত্রেই নেতাদের অভিপ্রেত ছিল এমন নয়, বরং তাদের মধ্যে আপসের মনােবৃত্তি, জঙ্গি গণ–আন্দোলনের তেজ সম্পর্কে তাদের ভয় এবং নিম্নবর্গের চৈতন্যের নানা দুর্বলতার ফলে এইসব লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তাদের প্রতিশ্রুতিও পূর্ণ হয়নি। আন্দোলনে ভাঁটা এসেছে যখন, তখনই আবার বেণীবন্ধ শিথিল হয়ে পড়েছে এবং রাজনীতির স্বতন্ত্র ধারা দুটি তাদের নিজ নিজ খাতে ফিরে গেছে। উচ্চবর্গের নেতৃত্বেই এই দুটি ধারা কখনও আবার মিলিত হয়েছে এমন সব জমায়েতে যা সাম্রাজ্যবাদকে আঘাত করা দূরে থাকুক কার্যত তাকেই সাহায্য করেছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা সামন্তশ্রেণীর অন্তর্ঘাতী হিংস্রতার অস্ত্র হিসেবে নিম্নবর্গকে ব্যবহার করে। তবে সমাবেশের উদ্দেশ্য প্রগতির অনুকূলেই হােক বা প্রতিক্রিয়ার অনুকূলে, একথা লক্ষ করার মতাে যে এই দুটি ধারা বা ক্ষেত্রের প্রতিচ্ছেদে বিস্ফোরণ ঘটেছে বারেবারেই, কারণ ঠিক তখনই উচ্চবর্গের নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করে তারই উদ্যোগজাত আন্দোলনের মধ্যে নিম্নবর্গের রাজনীতি তার বৈশিষ্ট্যগুলিকে মুদ্রিত করেছে।

    এই প্রতিচ্ছেদের বহু দৃষ্টান্ত আছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে। কিন্তু উচ্চবর্গের অগ্রণী শ্রেণী বুর্জোয়াদের নেতৃত্ব সেই সব আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে নিতে পারেনি, তাকে পরিণত করতে পারেনি জাতির মুক্তিযুদ্ধে এবং বুর্জোয়াশ্রেণীর সর্বেশ্বরতা প্রতিষ্ঠা করে বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাবার দায়িত্বও পূর্ণ করতে পারেনি।

    অপরদিকে নিম্নবর্গের রাজনীতির ক্ষেত্রে নানা স্বতন্ত্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে ঠিকই, তবু তাও জাতীয় আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করতে পারেনি। তার প্রধান কারণ হয়তাে ইংরেজশাসিত ভারতে শ্রমিকশ্রেণীর তাপরিণত অবস্থা তার বাস্তব জীবনে ও চৈতন্যে। ফলে শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামী ঐক্য গড়ে ওঠেনি, তাদের সর্বেশ্বরতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এবং নয়া–গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটাবার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি নিম্নবর্গের মধ্যে অগ্রণী যারা তারাও।

    এই দ্বিবিধ ব্যর্থতাই ঔপনিবেশিক যুগের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মর্মবস্তু। আমাদের চিন্তায় ও বক্তব্যে এই বিষয়টিকে যদি সম্যক গুরুত্ব দিতে হয় তাহলে ইতিহাসবিদ্যায় উচ্চবর্গের পক্ষপাতী আদিকল্পটির বিরুদ্ধে সচেতনভাবেই বিদ্রোহ করতে হবে, আমাদের সাধনাকে নতুন তাত্ত্বিকতা, নতুন তথ্য ও নতুন পদ্ধতি দিয়ে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে, উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের রাজনীতির বৈপরীত্য ও তাদের সম্পৃক্তি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ ও বর্ণনা করতে হবে, এবং সেজন্যই নিম্নবর্গের ভূমিকাটিকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে।

    এই প্রস্তাবসম্মত কাজ অর্থাৎ গবেষণা ও লেখা ঠিক কীভাবে এগােবে তার খুঁটিনাটি আগে থেকে বর্ণনা করার চেষ্টা নিরর্থক। যে কোনও সৃষ্টিশীল প্রয়াসের মতাে ইতিহাস রচনার মধ্যেও আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতের চমক হামেশাই দেখা যায়। এই আকস্মিকতা একদিকে যেমন নতুন তথ্য আবিষ্কার ও পুরনাে তথ্যকে নতুন ভাবে দেখার অবশ্যম্ভাবী ফল, অপরদিকে অতীত অভিজ্ঞতার সঙ্গে ঐতিহাসিকের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার লীলাই তার কারণ। সুতরাং নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ্যার প্রগতি কোনও ফতােয়া বা ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। তবে তার মূল লক্ষের দিকে চোখ রেখে দু–একটি কথা বলতে চাই যা হয়তাে এই অভ্যাসের একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে কাজে লাগাতে পারে।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    এই কাজে যাঁরা নামতে চান তাঁদের প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে নিম্নবর্গের ইতিহাস নিছক তথ্য থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্গলিত হবে না। তথ্য ছাড়া ইতিহাস হয় না ঠিকই, কিন্তু তা নিছক তথ্য নয়। নিছক তথ্য আভিধানিক শব্দের মতাে। ওই শব্দগুলিকে অভিধান থেকে বাছাই করে তুলে যদি বাক্যবন্ধে সাজানাে যায় তবেই পারস্পরিক সম্পর্কের আলােকে তারা তাদের বিশিষ্ট অর্থে ব্যক্ত হবে। শব্দ বাছাই করা ও সাজানাে যেমন বক্তার চৈতন্যের অভিব্যক্তি ভাষায়, তথ্য বাছাই করা ও সাজানাে তেমনি ঐতিহাসিকের চৈতন্যের অভিব্যক্তি ইতিহাসবিদ্যায়। তথ্য বাছাই ও সাজানাের জন্যে তাই একান্ত সচেতনভাবে দুটি মূল ধরে এগােলে দিভ্রান্তির সম্ভাবনা কম। সূত্র দুটি সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত বলা হয়েছে, তাই এখানে শুধু উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে।

    এক নম্বর সূত্র:

    ঔপনিবেশিক ভারতে রাজনীতির ক্ষেত্রটি অখণ্ড নয়, দ্বিধাবিভক্ত। তার মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র ধারা—উচ্চবর্গের রাজনীতির ধারা ও নিম্নবর্গের রাজনীতির ধারা। স্বতন্ত্র হলেও এই ধারা দুটি পরস্পর নিরপেক্ষ নয়। তারা বৈপরীত্যে বাঁধা এবং বেণীবন্ধের মতাে কখনও কখনও তারা ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছেদে যুক্ত হয়, কখনও আবার নিজ নিজ খাতে বয়ে চলে।

    দুই নম্বর সূত্র:

    নিম্নবর্গের ইতিহাস শুধু ঘটনার পারম্পর্য আশ্রয় করে বােঝা বা লেখা যাবে না। ঘটনা বা সাধারণভাবে বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে উচ্চবর্গের সঙ্গে নিম্নবর্গের সম্পর্ক পরিষ্কার করে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই সম্পর্ক আসলে প্রভুত্ব ও অধীনতার সম্পর্ক, বৈপরীত্যের দ্ব্যণুক সম্পর্ক।

    এই দুটি সূত্র ধরে গবেষণা, আলােচনা ও রচনার বিষয়বস্তু এবং বিশ্লেষণপ্রণালী সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত প্রস্তাব আমি রাখতে চাই। এই প্রস্তাবটি কোনও পাকা প্রোগ্রাম নয়। এই সবটাই আমার ব্যক্তিগত চিন্তা অভ্যাস অভিজ্ঞতা ও রুচির অপরিণত এবং ইদানীন্তন নিদর্শন মাত্র। কাজ যত এগােবে ততই এই প্রস্তাব আরও পরিশীলিত হবে, এবং আশা করি সকলেই নিজ নিজ চিন্তা ও অভ্যাসের সাহায্যে এটিকে বদলে ও শুধরে নেবেন।

    এই প্রসঙ্গে আমার প্রথম মন্তব্য এই যে নিম্নবর্গের অন্তর্ভুক্ত সকল শ্রেণী গােষ্ঠী ব্যক্তি ও সমূহকে ঐতিহাসিক গবেষণা ও বক্তব্যের বিষয় বলে স্বীকার করতে হবে সচেতনভাবে। এদের মধ্যে শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম ও শহরের গরিব জনতা ইত্যাদি গণ্য তাে বটেই। কিন্তু ঔপনিবেশিক সমাজে প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটা যাদের জীবনে খুবই প্রকট অথচ যারা আমাদের ইতিহাসচিন্তায় এখনও প্রায় অনুপস্থিত সেই আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও নারীদের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ করে ভাবতে ও লিখতে হবে। এইদিকে এগােতে গেলেই পরিষ্কার বােঝা যাবে যে উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গি ও তার বাহন। প্রচলিত আদিকল্পটি আমাদের পথ জুড়ে আছে। তাই ১৯১৮ সালের আমেদাবাদ সুতাকলে ধর্মঘটের ইতিহাস যখন লিখতে বসব তখন যেন মনে রাখি যে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা মহাত্মা গান্ধী, শংকরলাল ব্যাংকার ও অনসূয়া সারাভাইয়ের জীবনীর অধ্যায় মাত্র নয়, তার মধ্যে ধর্মঘটীদের চৈতন্যের—শ্রেণীচেতনা যার অন্যতম উপাদান—তার একটি মূল্যবান ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস মহাদেব দেশাই বা তেন্ডুলকরের পক্ষে লেখা সম্ভব হয়নি, তা আমাদেরই লিখতে হবে একেবারে আর–এক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, আর একটি আদিকল্পের প্রেরণায়। এ কাজে হাত দিলে দেখা যাবে যে উনিশ শতকের কৃষকবিদ্রোহগুলিকে নেহাৎ উদ্দেশ্যবাদী কায়দায় বিংশ শতাব্দীর জাতীয়তা ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে অঙ্গীভূত না করে তাদের স্বমহিমায় দেখতে গেলে বিদ্রোহী চৈতন্যের একটি প্রধান লক্ষণ যে ধর্মচেতনা তাকে উড়িয়ে দেওয়া তাে যায়ই না যেমন একজন বামপন্থী লেখক তাঁর বহুল প্রচারিত রচনায় করেছেন, বরং ধর্মবিশ্বাসকে সেই চৈতন্যের একটি ধ্রুবগুণ বলে স্বীকার করতে হয়। এ কাজে হাত দিলেই দেখা যাবে যে রাজনৈতিক জীবনী–সাহিত্য পুরনাে ইতিহাসবিদ্যার প্রভাবে শুধু উচ্চবর্গের গুণকীর্তনে মুখর; আমরা চাই যে তার মধ্যে তিতুমীর, সিদো, কানহু, মাদারি পাসীর কীর্তি উচ্চারিত হােক। আমরা এমন ইতিহাস চাই যার মধ্যে মেয়েরা অতীত সমাজের তথ্যকণিকা মাত্র নয়, যার মধ্যে তারা ঐতিহাসিক সত্য বলে স্বীকৃত; যার মধ্যে আদিবাসীরা কৃষকদের জীবন ও আন্দোলনের সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে ব্যতিক্রম বলে বিবেচিত হবে না, কৃষক সমাজের সবচেয়ে নিঃস্ব ও সংগ্রামী অংশ বলেই বিবেচিত হবে; যার মধ্যে বর্ণানুক্রমে নিম্নতম বলে গণ্য যারা তাদের আন্দোলনগুলিকে উচ্চবর্গের তানুকারী তথাকথিত সংস্কৃতায়নের সিঁড়ি বলেই শুধু বর্ণনা করা হবে না, বরং তানুকরণের পাশাপাশি এমনকী তার চেয়েও বেশি যে আক্রোশ ও তজ্জনিত প্রতিবাদ ওই সব আন্দোলনের স্বভাবসিদ্ধ তাও বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার বিষয় বলে মানা হবে।

    আমার দ্বিতীয় মন্তব্য এই যে নিম্নবর্গের ইতিহাসে গণসমাবেশের প্রসঙ্গটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কারণ প্রচলিত আদিকল্পটির চাপে ইতিহাসবিদ্যার ঠিক এইখানটাতেই অনেক বিকৃতি ও অসত্যকে একেবারে স্বতঃসিদ্ধের আসনে বসানাে হয়েছে। গণসমাবেশের প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাকে তাই নতুন করে বিচার করার, নতুনভাবে তার মূল্যায়নের সময় এসেছে। যাঁরা নিম্নবর্গের ইতিহাসের এই দিকটা নিয়ে কাজ করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্যে দু–একটি কথা বিশেষ জোর দিয়ে বলতে চাই।

    (১) মনে রাখবেন যে পুরনাে আদিকল্পটির প্রভাবে ইতিহাসবিদ্যায় সাধারণত সব গণসমাবেশকেই, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংক্রান্ত সমাবেশগুলিকে শুধু খাড়াখাড়ি জমায়েত বলেই ধরে নেওয়া হয়। কারণ, এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী উচ্চবর্গের প্রেরণা ছাড়া জনগণ কিছুতেই রাজনীতির ক্ষেত্রে সক্রিয় হতে পারে না। নিম্নবর্গের ইতিহাস লিখতে গেলে এই একদেশদর্শিতা প্রথমেই বর্জন করা দরকার। জমায়েতের মধ্যে খাড়াখাড়ি ও আড়াআড়ি এই দুটো কায়দাই কাজ করছে এই অনুমান আশ্রয় করেই গবেষণার প্রকল্প তৈরি করতে হবে। তা যদি না করেন তাহলে আড়াআড়ি জমায়েতের সাক্ষ্য চোখেই পড়বে না, বা পড়লেও তাকে খাড়াকাড়ি জমায়েতের সাক্ষ্য বলে ভুল হবে নির্ঘাৎ।

    (২) উচ্চবর্গের দৃষ্টিতে জনসমাবেশের অন্তর্নিহিত পার্থক্যগুলি সহজে ধরা পড়ে না, পড়লেও তার তাৎপর্য বােঝা বা ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। কারণ, ধরে নেওয়া হয় যে সেই সমাবেশ উচ্চবর্গের চৈতন্যের আধার মাত্র, সুতরাং তার নিজস্বতা নেই, আর সেই নিজস্বতার প্রকাশ যে দ্বন্দ্বে ও বৈষম্যে তাও আলােচনার মধ্যে আসে না। নিম্নবর্গের ইতিহাস কিন্তু সেই জমায়েতে রাজনীতির পালটা ও স্বতন্ত্র ধারাটির খোঁজ করবে, আর খোঁজ পেলে—অর্থাৎ তা যদি তথ্যসম্মত হয়—তার মধ্যে নিম্নবর্গের চৈতন্যের অসমতা, স্তরভেদ, উপাদান–ও–অবস্থাভেদে তার বিভিন্ন প্রকাশ ইত্যাদির বিশ্লেষণ করে সেই বিশেষ জমায়েতটির অনন্যতাকে বর্ণনা করবে। এখানে মনে রাখা উচিত যে জমায়েতের পাত্রস্থানীয় শ্রেণী, গােষ্ঠী বা সমূহের বাস্তব জীবন ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যই এই অনন্যতার একমাত্র কারণ নয়। একই স্থানে একই পাত্রের চৈতন্যে একই সমাবেশের মধ্যে কালভেদে গুণগত পরিবর্তনের অনেক উদাহরণ আমাদের ইতিহাসে, বস্তুত সব দেশের ইতিহাসেই পাওয়া যায়। ষােড়শ শতাব্দীর জার্মান কৃষকবিদ্রোহে, ফরাসি বিপ্লবের সমকালীন মহাত্রাসের (লা গ্রাঁদ প্যর) মধ্যে, জার্মান ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে পূর্ব আফ্রিকার মাজি–মাজি অভ্যত্থানে, আমাদের নিজস্ব নীলবিদ্রোহে, যুক্তপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে ১৮৫৭–৫৮ সালের কৃষকবিদ্রোহগুলিতে, উত্তরবঙ্গে দেবী সিং–এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে—অর্থাৎ যেখানেই জমায়েতের মেজাজ জঙ্গি ও আয়ুষ্কাল অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ, সেখানেই চৈতন্যের এই গুণগত পরিবর্তন দেখা যায়। অন্যত্র আমি এই পরিবর্তনকে ইংরেজিতে ‘সেকেন্ড ওয়েভ‘ বলে বর্ণনা করেছি। উপমাটা একটু বদলে বাংলায় এর নাম দেব ‘দ্বিতীয় ধাক্কা’, কারণ সত্যিই এই দ্বিতীয় পর্যায়ে সমাবেশের মধ্যে আপসের চেয়ে আঘাতের প্রবণতা হঠাৎ অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে, তিক্ততা ও হিংস্রতা ভীষণ বেড়ে যায়, শ্রেণীসংগ্রামে দীর্ণ হয়ে সমাজ গৃহযুদ্ধের কাছাকাছি পৌছে যায়। এই ধাক্কা সামলাতে উচ্চবর্গকে হিমশিম খেতে হয়।

    (৩) একথা যদিও সত্য যে স্থানকালপাত্র ভেদে এক–একটি সমাবেশে তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবুও তাদের মধ্যে, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত জঙ্গি জমায়েতগুলির আকৃতিগত মিল আছে অনেক। গ্রামাঞ্চলে প্রজাবিদ্রোহ, শহরের গরিব জনতার অভ্যুত্থান (যেমন ধরুন, রাওলাট সত্যাগ্রহের সময় দিল্লিতে), গ্রামে ও শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদির মধ্যে আঞ্চলিকতায়, উদ্দেশ্যে এবং সামাজিক পরিচয়ের নানা পার্থক্য সত্ত্বেও দেখা যাবে যে প্রায় একই রকমের কিছু কিছু উপায় ও সংকেতের সাহায্যে নিম্নবর্গের প্রতিনিধিরা তাদের মিত্রপক্ষকে একত্র করতে ও শত্রুপক্ষকে আঘাত করতে চেষ্টা করেছে সব ক্ষেত্রেই। এই সাদৃশ্যের মূল কারণ উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের মধ্যে প্রভুত্ব ও অধীনতার অতি প্রাচীন সম্পর্ক এবং প্রভুর বিরুদ্ধে অধীনের বহুকালব্যাপী, যদিও ব্যর্থ, প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদের চূড়ান্ত, সর্বাঙ্গীণ, সনাতন ও সার্বত্রিক রূপ কৃষকবিদ্রোহ। তারই ঐতিহ্য নিম্নবর্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ধ্রুব উপাদান, এবং ঠিক সেই জন্যেই ঔপনিবেশিক যুগে নিম্নবর্গের সব রকম জঙ্গি জমায়েতেই কৃষকবিদ্রোহের কিছু কিছু লক্ষণ আদর্শে না হােক আকারে দেখা যাবেই। তাই আমার মনে হয় নিম্নবর্গের সমাবেশের ইতিহাস নিয়ে যাঁরা কাজ করতে চান, এমন কি যাঁরা গ্রামসমাজের বাইরে অকৃষক জনতার সমাবেশ নিয়ে কাজ করতে চান, তাঁদের পক্ষেও কৃষকবিদ্রোহের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

    এবার আমার প্রস্তাবটি সম্পর্কে তৃতীয় মন্তব্যে আসি। একথা বলাই বাহুল্য যে নিম্নবর্গের ইতিহাসে তাদের অর্থনৈতিক জীবনকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতি নিয়ে কাজ ইংরেজ রাজত্বের মধ্যেই আরম্ভ হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে কাজ পরিমাণে যেমন বেড়েছে, গুণেও তেমনি উন্নত হয়েছে। নিম্নবর্গের ইতিহাস লিখতে হলে এই কাজ থেকে অনেক কিছুই শিখতে হবে। তবে বিষয় নির্বাচন ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে দুটি কথা মনে রাখা দরকার।

    প্রথম কথাটি এই যে ঔপনিবেশিক সমাজের অর্থনৈতিক জীবনে উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের মধ্যে প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটি যে বিশিষ্টরূপে প্রকট হয় তা শােষক শােষিতের সম্পর্ক। তাই অর্থনীতির যে–কাঠামােটা আশ্রয় করে সেই সম্পর্ক প্রধানত গড়ে ওঠে—অর্থাৎ উৎপাদন ব্যবস্থা; অর্থনীতিকে সক্রিয় রাখার জন্য আবশ্যক লেনদেনগুলির মধ্যে যা কিছুই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শােষক–শাসিতের সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে—যথা, মজুরি, খাজনা, ঋণ ইত্যাদি; এই সম্পর্কের অবশ্যম্ভাবী যে দারিদ্র্য, বেকারি, দুর্ভিক্ষ, জমি হারানাে, ফসলের ন্যায্য ভাগ থেকে বঞ্চিত হওয়া, আবার অপরপক্ষে শােষকদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে শােষিতের সামান্য একটি অংশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে অধিকাংশকেই দরিদ্রতর করে তােলা—এই ধরনের সমস্যাকেই আমার মনে হয় নিম্নবর্গের ইতিহাসে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ, এইসব বিষয়ে কাজ করতে গেলেই যে তথ্য আবিষ্কৃত হবে, যে প্রশ্ন উঠবে, সমাধানের জন্য যে নতুন কৌশল ও তত্ত্ব আশ্রয় করে এগােতে হবে, তা থেকে বারবারই একথা পরিষ্কার হয়ে উঠবে যে শােষক–শােষিতের সম্পর্কটি অর্থনৈতিক জীবনে প্রভুত্ব–অধীনতার সম্পর্কের বিশিষ্ট প্রয়ােগ মাত্র।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    এই প্রসঙ্গেই আমার দ্বিতীয় কথা—দৃষ্টিভঙ্গির কথাটা এসে পড়ে। ঔপনিবেশিক সমাজে নিম্নবর্গের ইতিহাসে নিছক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বলে কিছু নেই। ধনতন্ত্রের পূর্ববর্তী অন্য যে কোনও সমাজের মতাে সেখানেও অর্থনীতির অন্তর্গত সব সম্পর্কই আসলে ক্ষমতার সম্পর্ক বা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, রাজনীতির সম্পর্ক দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মজুরির হার, খাজনার হার, সুদের হার, সেখানে অবাধ কেনাবেচা চাহিদা–জোগানের নিয়ম মেনে চলে না, চলে শেষপর্যন্ত স্থানীয় সমাজে মালিক জমিদার মহাজনের প্রতিপত্তি ও শাসনের নিয়ম অনুযায়ী এবং উচ্চবর্গের এইসব আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের উপরওয়ালা, তাদের সকলেরই পােশাক রাজশক্তির শাসন অনুযায়ী। তাই নিম্নবর্গের অর্থনৈতিক জীবনের সব বর্ণনার মধ্যেই ক্ষমতার এই সম্পর্কটিকে, অর্থাৎ প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই জন্যেই ঔপনিবেশিক যুগের যন্ত্রশিল্পের ইতিহাস শুধু যদি কলকারখানার বর্ণনা, মজুরি ও মুনাফার হার ও পরিমাণ, এমন কি লভ্যাংশের বখরা নিয়ে মালিক–মজুরের মধ্যে কড়াগণ্ডার লড়াই বলেই দেখা ও লেখা হয়, তা হলে ক্ষমতার সম্পর্কটি তার মধ্যে হয় ধরা পড়বেই না, বা পড়লেও গৌণভাবে। তাই কারখানার মালিকানার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রভুত্বের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক ও যান্ত্রিক নিয়মের বহির্ভূত শাসনের চাপে উৎপাদন পদ্ধতিকে প্রভাবিত করার জন্য কাজের সময় শ্রমিক ও যন্ত্রের মধ্যে মালিক বা তার প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বসূচক হস্তক্ষেপ, কলকারখানার বিষয়ে সরকারি আইনকানুনের ভূমিকা, কারখানার বাইরে বস্তি, লাইন, চল বা মহল্লায় মালিক মহাজন প্রভৃতির সঙ্গে শ্রমিকের সম্পর্ক, ইউনিয়ন বা ওই জাতীয় সংস্থায় অশ্রমিক নেতা বা কর্মী ও শ্রমিকের মধ্যে ক্ষমতাবৈষম্যের খেলা, কারখানার জন্য শ্রমশক্তি জোগান দেওয়ার ব্যাপারে সর্দারি প্রথা ও সেই সূত্রে গ্রামসমাজের সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রভাব শহরের শ্রমিক জীবনে—এই সব কিছুই যন্ত্রশিল্পের অর্থনৈতিক দিকগুলির সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হবে। তেমনিই আবার বলা যায় যে কৃষকের কত জমি আছে, কত খাজনা বা কর তাকে দিতে হয়, সুদে আসলে তার কাছে মহাজনের কত পাওনা, ফসলের দর ও লাভ–লােকসানের হিসেব এই সব দিয়েই শুধু অর্থনৈতিক ইতিহাস যদি লেখা হয়, তা হলে তা তথ্যসমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকজীবনের একপেশে সুতরাং বিকৃত বর্ণনায় পর্যবসিত হবে। কারণ কৃষকজীবনের সত্য ওই তথ্যগুলির মধ্যে বিদ্যমান নয়। প্রভুত্ব ও অধীনতার যে বিশিষ্ট সম্পর্ক ওই সব তথ্যের ধারক তারই মধ্যে কৃষকজীবনের সত্যকে সন্ধান করতে হবে, সেই সত্যের আলােকেই ওই সব তথ্য অর্থময় হয়ে উঠবে। ঔপনিবেশিক ভারতের গ্রামজীবনে সেই সম্পর্কের মূল কথা জমিদার, মহাজন ও সরকার—এই ত্রিশক্তির সঙ্গে কৃষকের ক্ষমতাগত সম্পর্ক। সেই সম্পর্কই অর্থাৎ রাজনীতিই ঔপনিবেশিক আমলের অর্থনীতির প্রধান ধ্রুবগুণ। নিম্নবর্গের অর্থনৈতিক ইতিহাসকে তাই ব্যাপক অর্থে যা রাজনৈতিক ইতিহাস নামে পরিচিত তারই শাখা বলে ভাবা যায়, যদিও নিঃসন্দেহেই তা । সেই জ্ঞানকাণ্ডের একটি প্রৌঢ় ও বহু পল্লবিত শাখা।

    নিম্নবর্গের ইতিহাস বিষয়ক প্রস্তাবটি সম্পর্কে আমার চতুর্থ মন্তব্যে চৈতন্যের দুটি লক্ষণের কথা বলতে চাই। এ যাবৎ আমার সব বক্তব্যের মধ্যে আমি প্রভুত্ব–অধীনতার সম্পর্কটিকে রাজনীতির মর্মস্থলে রেখেছি, বলেছি যে এই সম্পর্কটিই একাধারে রাজনীতির মুখ্য উপাদান ও তার নিয়ন্ত্রক। প্রভুত্ব ও অধীনতা যথাক্রমে সেই সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত বর্গদুটির—অর্থাৎ উচ্চের ও নীচের—চৈতন্যের সাধারণ গুণ। নিম্নবর্গের ইতিহাস নিয়ে আলােচনা হচ্ছে, তাই অধীনতার চরিত্রটি পরিষ্কার করে বােঝা দরকার। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে প্রভুত্ব ও অধীনতা যেমন দ্ব্যক বৈপরীত্যের সূত্রে বাঁধা, অধীনতাও তেমনি একটি দ্ব্যক সত্তা যা নিজেই আবার দুটি রাশির বৈপরীত্য দিয়ে গড়া। সেই রাশি দুটি হচ্ছে সহকারিতা ও প্রতিরােধ। নিম্নবর্গের ইতিহাসে দুটি রাশিই সক্রিয়ভাবে উপস্থিত, যদিও অবস্থাভেদে একটি অপরটির চেয়ে জোরদার হয়ে ওঠে এবং অধীনদের চৈতন্যে হয় একটি বা অন্যটি তার প্রাধান্য কায়েম করে সাময়িকভাবে। তাই একথা মনে করা ভুল হবে যে প্রতিরােধই নিম্নবর্গের চৈতন্যের একমাত্র উপাদান। বরং অসাম্য সত্ত্বেও যেহেতু সমাজ সাধারণত স্থিতিশীল তাই অত্যুক্তি না করেই বলা চলে যে সহকারিতাই প্রতিরােধের চেয়ে সাধারণত বেশি শক্তিমান। তবে একথাও সত্যি যে প্রতিরােধ বিদ্রোহের পর্যায়ে না পৌঁছলেও সহকারিতার পাশাপাশি তার একটি ধারা যতই ক্ষীণ হােক তা সব ঐতিহাসিক অবস্থায়, এমন কি দৈনন্দিন জীবনেও, সব সময়েই বয়ে চলেছে। যেমন অপরপক্ষে বলা যায় যে প্রতিরােধের চূড়ান্ত রূপ বিদ্রোহের এমন কোনও নজির ইতিহাসে নেই যার মধ্যে সহকারিতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

    নিম্নবর্গের চৈতন্যের অপর যে লক্ষণটি বিশেষ উল্লেখযােগ্য তা হচ্ছে ধর্মভাব। ধর্মভাব বলতে আমি শুধু ধর্মীয় সংস্থার প্রতি আনুগত্য বােঝাচ্ছি না, বােঝাচ্ছি চেতনার সেই ঐতরিক বা এলিয়েনেটেড’ অবস্থার কথা যার প্রভাবে জড়জগৎ বা জীবজগতের কোনও সত্তাকে, বাস্তবের বা ভাবনার অন্তর্গত কোনও বিষয়কে তা যথার্থভাবে ধারণার মধ্যে আনতে পারে না, এবং এক বিষয়ের উপর আর এক বিষয়ের গুণ আরােপ করে। ফলে যা ঐহিক তাকে অলৌকিক বলে মনে হয়, যা একান্তই মানবিক তাকে দৈব বলে ভুল হয়। ঐতরিকতার আতিশয্যেই কর্তা কখনও কখনও নিজের সৃষ্টিকেই সঠিকভাবে চিনতে পারে না। যা তার নিজের প্রতিভাজাত তাকে সে অন্যের কৃতিত্ব বলে বর্ণনা করে। তাই মঙ্গলকাব্যের কোনও মহৎ কবির পক্ষে বলা সম্ভব যে তাঁর রচনা তাঁর নিজের নয়, আরাধ্যা দেবী তাঁকে দিয়ে লেখাচ্ছেন: কবি যন্ত্র, দেবী যন্ত্রী। তাই সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা সিদো ও কার পক্ষে বলা সম্ভব হয় যে ইংরেজ শাসকরা যদি তাঁদের পরােয়ানা শিরােধার্য করে গঙ্গার ওপারে চলে না যায় তা হলে লড়াই বাধবে, কিন্তু তা ইংরেজের সঙ্গে সাঁওতালের লড়াই নয়, ইংরেজের সঙ্গে ঠাকুরের লড়াই। অর্থাৎ বিদ্রোহের ঠিক পূর্ব মুহুর্তেও বিদ্রোহী নেতারা তাঁদের যত্নসাধ্য বিশাল কর্মকাণ্ডটিকে নিজেদের সৃষ্টি বলে চিনতে পারছেন না, ঐশ্বরিক বলে কল্পনা করছেন।

    এই ধরনের ধর্মভাব নিম্নবর্গের রাজনীতির একটি প্রধান উপাদান। উচ্চবর্গের ইতিহাসবিদ্যায়—ইংরেজ শাসকদের লেখায় বা আমাদের স্বদেশীয়দের মধ্যে অনেক “লিবারেল’ ঐতিহাসিকের লেখায়ও—এই চেতনাকে শুধু ধর্মোন্মাদ বলেই দায় সারা হয়, যেন ‘আসল’ রাজনীতি বলতে তাঁরা যা বােঝেন তা একেবারেই আলাদা জিনিস। তাপরপক্ষে, নিম্নবর্গের প্রতি যাঁদের সহানুভূতি আছে তাঁরাও অনেক সময় এই ধর্মচেতনার সাক্ষ্য নিয়ে একটু বিব্রত বােধ করেন এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার মধ্যে সেই সাক্ষ্য হয় একেবারেই চেপে যান কিংবা উড়িয়ে দেন এই বলে যে ওটা আসল কথা নয়, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাটাই আসল কথা, এবং সিদো কানহু বিরসা প্রমুখ বিদ্রোহী নেতারা নিজেরা ধর্মে বিশ্বাস করতেন না, শুধু কুসংস্কারগ্রস্ত কৃষকজনতাকে জমায়েত করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা ধর্মের জিগির তুলেছিলেন। এক কথায়, উভয়পক্ষই ‘আসল’ রাজনীতি বলতে ধর্মভাবরহিত চৈতন্যের একটি বিশেষ রূপকে বােঝেন।

    এটা একটা মারাত্মক ভুল এবং এ বিষয়ে সতর্ক না হলে নিম্নবর্গের ইতিহাস লেখা দুষ্কর। ঐতিহাসিককে মনে রাখতে হবে যে প্রত্যেক দেশেই ধনতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশের আগে, জাতীয় রাষ্ট্র গড়ে ওঠার আগে, এমন কী তার পরেও বহুদিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চোখে, বিশেষ করে রাজধানী ও শহর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে গ্রাম ও মফঃস্বলে যারা থাকে তাদের চোখে রাষ্ট্রের সামগ্রিক চেহারাটা সহজে ধরা পড়ে না। তারা রাষ্ট্রশক্তিকে দেখে তার স্থানীয় প্রতিনিধিদের ক্ষমতার গােপদে। আর তাদের ধারণায় রাষ্ট্রের সামগ্রিক ও স্থানীয় রূপের মধ্যে যে ফাঁকা জায়গাটা থাকে তা তারা ভরে দেয় ক্ষমতার প্রকৃতি ও প্রয়ােগ সম্পর্কে নানারকম অলৌকিক বিশ্বাস দিয়ে। এইজন্যেই ক্ষমতার পিরামিডের তলায় যারা একেবারেই মাটির কাছাকাছি সেই নিম্নবর্গের কাছে পিরামিডের শীর্ষস্থ রাজশক্তিকে দেবশক্তি বলে মনে হয়। তাই জারের অধীন রাশিয়ায় জারেরই কসাক বাহিনীর হামলায় পর্যদস্ত জনতা জারের কাছেই সুবিচার প্রার্থনা করে, এমন কী বিদ্রোহ করে জারের নাম নিয়েই। কারণ যে রাষ্ট্রকে তারা জানে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মারফৎ, কসাক বাহিনীই তার প্রতিভূ তাদের কাছে; কিন্তু স্বয়ং জার আর একটি, আরও শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রতিভূ। এই দ্বিতীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বাস্তবে নয়, কল্পনায়; তাকে যা চালায় তা মানুষের ইচ্ছাশক্তি নয়, দৈবশক্তি; ক্ষমতার যে নিয়মের দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে তা নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বের সংজ্ঞায় সাজানাে কোনও সংবিধান নয়, তা নিয়ন্ত্রিত হয় ধর্মচিন্তার দ্বারা। এক কথায় বলা যায় যে সেই রাষ্ট্র একটি অলীক রাষ্ট্র।

    শিল্পী: এস.এম. সুলতান

    এই অলীক রাষ্ট্র নিম্নবর্গের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকে যে বারবার প্রভাবিত করেছে এ কথা সকলেই জানেন। উদাহরণগুলি সুপরিচিত: যেমন, আঠারাে শতকে দেবী সিং–এর বিরুদ্ধে উদ্যত সশস্ত্র কৃষকজনতা কোম্পানির দোহাই দিয়েই কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়; উনিশ শতকের শেষভাগে বাঙালি ও মারাঠি কৃষক মহারানির নাম করেই মহারানির সাম্রাজ্যের স্থানীয় প্রতিনিধি ও তাদের পােষ্য উচ্চবর্গের বিরুদ্ধে লড়াই করে, ইত্যাদি। জানা কথা: অলমিতিবিস্তরেণ। শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট যে এই ধরনের দৃষ্টান্তে কোম্পানি ও মহারানি বা একই বিশ্বাসের প্রকারান্তরে লাটসাহেব, মেজিস্টর সাহেব, জজ সাহেব প্রমুখ ধর্মাবতারের স্থান নিম্নবর্গের চেতনায় দেবদেবীর সঙ্গেই।

    এই প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় উল্লেখযােগ্য মনে করি। অলীক রাষ্ট্রবাদের। ঐতিহাসিক রূপ সম্পর্কে মার্কস বলেছেন যে এই প্রকার চিন্তা সেই সব শ্রেণীরই চৈতন্যের বৈশিষ্ট্য যারা উঠতির মুখে, যাদের মধ্যে ক্ষমতার আকাঙক্ষা দেখা দিয়েছে কিন্তু সেই আকাঙক্ষাকে বাস্তবিক করার জন্য আবশ্যক উপাদান ও অবস্থা সমাজে তখনও তৈরি হয়নি। সেই বাস্তব ভিত্তির অভাবেই ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে যুক্তিসিদ্ধ ও সুসংগত কোনও ধারণাকে আশ্রয় করে গড়ে উঠতে পারে না, আর সেজন্যেই তা মগ্ন হয়ে থাকে অলীক রাষ্ট্রবাদের দিবাস্বপ্নে।

    আমি মার্কসের এই কথাটিকে তাঁর অসামান্য চিন্তার মধ্যেও একটি অসামান্য রত্ন বলে মনে করি। অলীক রাষ্ট্রের ধারণাটি যদিও প্রাচীন এবং তার কাল্পনিক আকৃতি পুরাকাল থেকেই বার–বার চিত্রিত হয়েছে সাহিত্যে ও লােকগাথায়, তবু কেবল প্লেটো ও রুসাের কথা বাদ দিলে মার্কসের পূর্বসূরীদের মধ্যে যাঁদের চিন্তা দিয়ে রাষ্ট্রদর্শনের তাত্ত্বিক বুনিয়াদ রচিত হয়েছে তাঁরা প্রায় সকলেই শুধু রাষ্ট্রের সুপরিণত ও সর্বাঙ্গে সম্পূর্ণ আদর্শ রূপটি সামনে রেখে তাঁদের বক্তব্য তৈরি করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাে সমুদ্রফেন থেকে সদ্যোঙ্খিতা আফ্রোদিতির মতাে হঠাৎ নিখুঁত ইতিহাস নিরপেক্ষ মূর্তিতে আবির্ভূত হয় না। তার জন্মের ইতিহাস এক–একটি শ্রেণীর বা সমূহের সামাজিক সত্তা ও চেতনার উন্মেষ ও বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই পরিণত রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলির সঙ্গে পরিচয় ছাড়া যেমন কোনও সমাজের রাজনৈতিক চেতনাকে বােঝা বা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, তেমনি অপরিণত রাষ্ট্রশক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্থাৎ সেই সমাজে প্রচলিত অলীক রাষ্ট্রবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত না হলে তার রাজনৈতিক ইতিহাসকে সমগ্রভাবে বােঝা বা ব্যাখ্যা করা যায় না। এই জন্যেই টমাস মাের, সাঁ সিম, ফুরি, কাবে, ওয়েন প্রভৃতির চিন্তাকে পাশ্চাত্যের বুর্জোয়া ও শ্রমিকশ্রেণীর জন্ম ও বয়ঃপ্রাপ্তির ইতিহাসে উপক্রমণিকার মর্যাদা দেওয়া হয়।

    ঔপনিবেশিক যুগে ভারতের ইতিহাসেও নানা শ্রেণী ও সমূহের অপরিণত রাষ্ট্রচিন্তার—অলীক রাষ্ট্রবাদী চিন্তার নিদর্শন অনেক আছে। অন্যত্র যেমন আমাদের দেশেও তেমনি বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর বা সমূহের ক্ষমতার আকাঙক্ষা এই চিন্তার মাধ্যমেই ব্যক্ত হয়েছে। সমাজে ও বাস্তব জীবনে সেই আকাঙ্ক্ষাকে সফল করার জন্য আবশ্যক বনিয়াদ তখনও তৈরি হয়নি। ফলে অলীক রাষ্ট্রবাদের মধ্যে ওই সব শ্রেণীর বা সমূহের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেমন সূচিত হয়েছে, তেমনি সূচিত হয়েছে সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির অন্তরায় ইংরেজ রাজশক্তিকে হঠিয়ে দিয়ে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে ক্ষমতায় পরিণত করার অক্ষমতা। ওই যুগের উচ্চনীচ উভয়বর্গের অলীক রাষ্ট্রবাদেই আকাঙক্ষা ও অক্ষমতার এই দোটানা বেশ স্পষ্ট। এই জন্যেই উচ্চবর্গের রাজনীতি সম্যক বােঝা সম্ভব নয় বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, ভূদেব মুখােপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস, মহাত্মা গান্ধীর হিন্দ স্বরাজ–এর সাহায্য ছাড়া। কারণ ভারতীয় উচ্চবর্গের অগ্রণী যে বুর্জোয়াশ্রেণী সর্বেশ্বরতা কামনা করেও তা আয়ত্তে আনতে পারেনি, ওই সাহিত্য আসলে, তাদেরই সেই ব্যর্থতার সাক্ষী। এ বিষয়ে এখানে বিস্তারিত বলার সুযােগ নেই। শুধু এ কথাটাই বলে রাখি যে ভারতবর্যে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী চৈতন্যের মধ্যে একটা অলীকরাষ্ট্রবাদী উপাদানের অস্তিত্ব আমার কাছে খুবই পরিষ্কার। এই উপাদানটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ ও বর্ণনা না করলে জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আশা করি কোনও কোনও তরুণ ঐতিহাসিক এই জটিল, দ্ব্যর্থময় ও একান্তই গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার ক্ষেত্রটি তাঁদের প্রতিভায় উজ্জ্বল করে তুলবেন অদূর ভবিষ্যতে।

    নিম্নবর্গের চিন্তায়ও অলীক রাষ্ট্রবাদ ওইরকম দোটানায় এবং পরস্পরবিরােধী অর্থের দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ। এক দিকে আকাঙক্ষা, অন্যদিকে বাস্তবে ও চৈতন্যে সেই আকাঙক্ষা সফল করে তােলার জন্য প্রয়ােজনীয় উপাদানের অভাব ও তজ্জনিত দুর্বলতা। একদিকে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সিদো কানহুর হাতে গড়া সাঁওতাল ফৌজ, ভারতের নানা স্থানে সারা ঔপনিবেশিক যুগ ধরে হঠাৎ এক একটি জঙ্গি সমাবেশকে উপলক্ষ করে কয়েকদিনের জন্য বিদ্রোহীদের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা—এক দিকে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষার এই নির্ভীক আত্মঘােষণা ও অপর দিকে ব্যর্থতা, পরাজয়, পলায়ন, হতাশা। আকাঙক্ষা ও অসাধ্যতার ভাবমূর্তি হিসেবে তাই বিদ্রোহীদের অসম্পূর্ণ রাষ্ট্রদর্শন কখনও কখনও তাঁদের পরােয়ানা, জবানবন্দি, গােয়েন্দা পুলিশ বা মিলিটারি রিপাের্টে তাঁদের কথার টুকরাে টুকরাে উদ্ধৃতি মারফত আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব। তাঁরা নিরক্ষর, কোনও বঙ্কিম ভূদেব গান্ধী তাঁদের হয়ে কলম ধরেননি, সুতরাং তাঁদের বক্তব্য কখনও তাঁদের নিজের ভাষায় শােনা যায় না। কিন্তু তাঁদের শত্রুপক্ষীয় সরকার–সাহুকার–জমিদারদের লেখা নানা বিবরণে ওই রাষ্ট্রচিন্তার রূপটিকে বারে–বারেই বর্ণনা করা হয়েছে, কারণ নিম্নবর্গ যখন ক্ষমতার লড়াই–এ লিপ্ত হয় তখন যারা ক্ষমতাবান তাদের শুনতে হয় নিম্নবর্গ কী বলতে চাইছে, তা লিখে রাখতে হয় সরকারি বেসরকারি কাগজপত্রে।

    এই সব সাক্ষ্য থেকে এ কথাটা বেশ পরিষ্কার হয় ওঠে যে নিম্নবর্গের আকাঙক্ষা ও অসাধ্যতার এই দ্বন্দ্বই তাঁদের চিন্তায় ধর্মভাবকে কায়েম করে রেখেছে। তাই সাঁওতাল হুলের একটি বিখ্যাত যুদ্ধের মধ্যেই সিদো কানহু পুজায় বসেন এবং বন্দুকের টোটা ঠাকুরের দয়ায় গলে জল হয়ে যাবে এই বিশ্বাসের ফলে তাঁদের পরাজয় ঘটে। এইভাবেই অলীক রাষ্ট্রবাদের যে দিকটা আকাঙ্ক্ষার তা নিম্নবর্গকে উৎসাহিত করেছে তার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকতা নিয়ে জমায়েত হতে, আর যে দিকটা অসাধ্যতার তা তাকে বাধ্য করেছে দৈব ও পারলৌকিকতার আশ্রয় নিতে। নিম্নবর্গের চৈতন্যকে যখন আমরা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উদ্যোগী হব তখন যেন তার এই ধর্মাশ্রয়ী দোটানা চরিত্রের গুরুত্ব ও জটিলতা স্বীকৃতি পায় আমাদের গবেষণায়, আমাদের রচনায়।

  • রণেশ দাশগুপ্ত ।। শ্রেণীদৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের চিত্তভূমি

    রণেশ দাশগুপ্ত ।। শ্রেণীদৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের চিত্তভূমি

    রণেশ দাশগুপ্ত

    জনগণের যে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণী বাংলাদেশ তথা পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামে ব্রতী, তাদের চিন্তাচেতনার গতিধারা সম্পর্কে একটি সঠিক ধারণা বৈপ্লবিক শ্রেণীদৃষ্টিতে যাচাই করে দুই ভাবে পাওয়া যেতে পারে। প্রথমত বিগত চব্বিশ বছরে পর্যায়ে পর্যায়ে যে লােক-অভ্যুদয় হয়েছে, তার ঘটনাবলির মধ্যকার চেতনার উত্তরণগুলি বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণীর চিন্তার নব নব উপাদান বের করে আনা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত গত চব্বিশ বছরে যেসব রাজনৈতিক নিবন্ধ রচনা এবং সাহিত্য চর্চা ও সৃষ্টি হয়েছে তার হিসাব-নিকাশ করলেও মুক্তিসংগ্রামের চেতনার উপাদানগুলির সাক্ষাৎ পাওয়া যেতে পারে।

    এখানে লােক-অভ্যুদয়ের ব্যাপারটিকে প্রাথমিকভাবে যাচাই করে নিতে গেলে দেখা যাবে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে লক্ষ্য অর্জনে ব্রতী গণ-আন্দোলন শ্ৰেণীসজ্জার দিক দিয়ে পরিমাণগতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে আসছে। জনগণের একটি বিশেষ অংশ, ছাত্রসমাজ, বরাবরই এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা হিসেবে। রয়েছে। ছাত্রসমাজ উনিশশ বায়ান্নর বাংলা ভাষার সংগ্রামের স্রষ্টা ছিল। তারাই উনিশ শ উনসত্তরের গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি সমন্বিত এগার দফা আন্দোলনের স্রষ্টা হয়েছে। গণ-আন্দোলনের উদ্যোগ গ্রহণকারী ছাত্রসমাজের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান হারে সংগ্রামী জনতার সংযােগ স্থাপিত হয়েছে গত চব্বিশ বছরে । স্বাধীন পূর্ব বাংলার ঘােষণাটিও এসেছে ছাত্রসমাজের মধ্য থেকে।

    শ্রমিকশ্রেণী বসে থাকেনি। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব-বিরােধী সংগ্রামে পূর্ব বাংলার সাধারণ ধর্মঘট প্রমাণ করেছিল যে মূলত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব শ্রমিকশ্রেণীর হাতেই যাওয়া উচিৎ। কিন্তু এ ঘটনা পারম্পর্য রক্ষা করতে পারেনি। এই কারণেই সংগ্রামী ছাত্রসমাজকে শ্রমিকশ্রেণী বরং লালন করারই দায়িত্ব নিয়েছে। পূর্ব বাংলার গণমুক্তিসংগ্রামের ছাত্রসত্তাকে জনৈক বুদ্ধিজীবী পূর্ব বাংলার একটি ছাত্র সম্মেলনে কাব্যিকভাবে উপস্থিত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য: নদীমাতৃক পূর্ব বাংলার একটি নতুন ধরনের নদী। হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন। এই নদী পূর্ব বাংলার মুক্তি আন্দোলনের প্রাণ।

    হৃদয়গ্রাহী হলেও এটা নৈসর্গিক ব্যাখ্যা —বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়। এতে ছাত্রসমাজের চরিত্রের পরিবর্তশীল রূপটি অথবা ছাত্রসমাজের সঙ্গে সংযুক্ত পূর্ব বাংলার ব্যাপকতম জনগণের সক্রিয় ও সচেতন ভূমিকা বেরিয়ে আসে না। তবু এই ধরনের ব্যাখ্যা যে সামনে আসে, তার কারণটিও ইতিহাসের দিক দিয়ে সত্য। ছাত্রসমাজের পতাকাতেই পর্যায়ে পর্যায়ে শহিদের বুকের রক্ত ঢেলে আঁকা হয়েছে পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের লক্ষ্যমাত্রা।

    এই ঐতিহাসিক সত্যটি সামনে রেখে কিছুটা গভীরে যাবার চেষ্টা করলে দুটি বিষয় আমাদের চোখে পড়বে। প্রথমত ছাত্রসমাজের চেতনার বৃত্তটি ক্রমাগত প্রসারিত হয়ে এসেছে অর্থাৎ ছাত্রসমাজের চিন্তাধারা নতুন নতুন লক্ষ্যমাত্রা লাভ করেছে। দ্বিতীয়ত ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে পূর্ববাংলার জনগণও মুক্তিসংগ্রামের আদর্শকে প্রসারিত করে নিয়ে এসেছে।

    কিন্তু গভীরে যাবার চেষ্টা থেকেই স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে আসতে বাধ্য। এই যে চিন্তাধারার বৃত্তের সম্প্রসারণ —এই যে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম থেকে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধে উত্তরণ—এতে কি ছাত্রসমাজ এবং জনগণের সম্পর্কের মধ্যে ভিতরে ভিতরে কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি? নিপীড়িত শ্রমিকশ্রেণী এবং কৃষকদের সঙ্গে কি ছাত্রসমাজের চেতনাগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি? এই প্রশ্নের কিনারা করতে গিয়ে প্রথমত যদি ছাত্রসমাজের দিকে তাকানাে যায়, তবে একটি ছবিও নজরে পড়বে। সেটি এই যে ছাত্রসমাজের কাঠামােটা গত চব্বিশ বছরে ভিতরে ভিতরে বদলে গিয়েছে এবং এই পরিবর্তনে শ্রমিকশ্রেণী ও কৃষকদের চেতনার ঘনিষ্ঠ সংযােগ রয়েছে। দ্বন্দ্বাত্মক বস্তু-গতিবাদের দর্শনের আলােকে বিষয়টি আলােচনাযােগ্য।

    এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করা দরকার। পাকিস্তানের শাসক ও শােষকচক্র পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশকে দমন করে রাখার জন্য  যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করে এসেছে, তার মধ্যে শিক্ষা-সঙ্কোচন নীতি অন্যতম। আইয়ুব খানের আমলের প্রথম দিকে—গত দশ বছরের মধ্যে— একটা সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ‘মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করার জন্য যে বাদশাহিত জারি হয়েছিল, তা দুই তিন বছর পরেই পরিত্যক্ত হয়। কায়েমি শাসক ও শােষকরা অচিরেই বুঝতে পারে, যে কোটি কোটি ছেলে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করতে পারে, তারা শুধু মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য উচ্চশিক্ষার জন্যও আগ্রহী হয়ে উঠবে। প্রাথমিক শিক্ষার মহাপরিকল্পনা মন ওঠে। কিন্তু শিক্ষার প্রসারের জন্য পূর্ব বাংলার জনসাধারণের তাগিদকে লক ওঠানাে যায়নি। পূর্ব বাংলার গণ-মুক্তিসংগ্রামের বৈষয়িক লক্ষ্যমাত্রাগুলি। অর্জিত হয়নি বলেই অবৈষয়িক বা আত্মিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে জোর পড়েছে বেশি।

    পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের এটি বৈশিষ্ট্য। লােক-অভ্যুদয়ের তরঙ্গরাশি। যখন প্রশমিত হয়েছে, তখনাে শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি। আপাতদৃষ্টিতে যখন ব্যর্থতা এসেছে, তখন প্রস্তুতি চলেছে নতুন অভ্যুত্থানের। এই প্রস্তুতি যতটা বাস্তব উপকরণজাত (অবজেকটিভ), তার চেয়ে বেশি মানসিক উপকরণজাত (সাবজেকটিভ)। যা সাধ্য, তার চেয়ে সাধনা বেশি। যা করণীয় তার চেয়ে ভাবনা বেশি। শিক্ষার ক্ষেত্রে জনগণের নিজস্ব উদ্যোগ-আয়ােজনের আপেক্ষিক ব্যাপকতা এই কারণেই সম্ভব হয়েছে। পূর্ব বাংলার জনগণ খালি হাতে-পায়ে বন্যা নিরােধের ব্যবস্থা করতে পারেনি। পারেনি ভারী শিল্প স্থাপন করতে। অথচ নতুন বিজ্ঞানের জগতের দিকে এগিয়ে চলার তাগিদ নষ্ট তাে হয়ই নি, বরং প্রত্যেকটা বড় বড় লােক-অভ্যুদয় এই তাগিদকে উস্কে দিয়েছে। এ কারণেই শাসকচক্রের শিক্ষা সঙ্কোচন নীতি অগ্রাহ্য করে নিদারুণ লাঞ্ছনা আর উপেক্ষা এবং অসহনীয় দারিদ্র্যের মধ্যেও পূর্ব বাংলায় শিক্ষাবিস্তার ঘটেছে। গ্রামে গ্রামেও স্থাপিত হয়েছে মহাবিদ্যালয় বা কলেজ।

    এই শিক্ষাবিস্তারের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজের ভিতর শ্রেণীসজ্জার পরিবর্তন ঘটেছে।

    পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজে নাগরিক উচ্চ বা নিম্ন মধ্যবিত্তের যে প্রাধান্য ছিল, ইতােপূর্বে তা অক্ষুন্ন থাকলেও কৃষকসমাজ থেকে সােজাসুজি আসা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ছাত্র আন্দোলনে নতুন চিন্তার উপকরণ যােগ হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বিশ বছর আগেও পূর্ব বাংলার অধিকাংশ ছাত্র-সম্মেলনে ছাত্রসমস্যার প্রতিকারের দাবির অনুপাতে জাতীয় সমস্যাবলি সমাধানের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে অনেক বেশি। ছাত্রসমাজই যেখানে ভাষা থেকে শুরু করে খাদ্য এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের দাবিতে আয়ােজিত গণ-বিক্ষোভের জাতীয় হােতা সেখানে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিপূর্বে বিভিন্ন নির্যাতিত শ্রেণী ও স্তরের বক্তব্য-বিচারে ছাত্রসমাজ যে পরিমাণ সহানুভূতির পরিচয় দিত, তার তলনায় বাস্তবায়নের তাগিদে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা তাদের পক্ষে কম সম্ভব হত। ছাত্রসমাজের নতুন চরিত্র গড়ে ওঠায় (অর্থাৎ ছাত্রসমাজে বিশেষ করে দরিদ্র কৃষকের সংখ্যানুপাতিকতা বৃদ্ধি পাওয়ায়) নির্যাতিত শ্রেণী ও স্তরের বক্তব্য একটা বিশেষ ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা লাভ করেছে।

    কথাটার এখানেই শেষ নয়। ছাত্রসমাজের অভ্যন্তরেই শুধু নয়, ছাত্রসমাজ এবং জনগণের বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের মধ্যকার সংযােগের ক্ষেত্রেও ছাত্রসমাজের নতুন চরিত্রের প্রতিফলন প্রণিধানযােগ্য।

    গত দুই দশকে এ ব্যাপারে দুটি ঘটনা ঘটেছে। ১৯৫২ সালে বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজে একটি আদর্শবাদী সাধনার প্রবর্তন করে। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনে যারা আত্মনিয়ােগ করে, তাদের পক্ষে ছাত্রসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা পাঁচ ছয় বছরের বেশি সম্ভব হয় না। অত্যন্ত কর্মঠ ও বৈপ্লবিক চেতনাসম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও ছাত্র জীবনােত্তর জীবনে আসে অসংলগ্নতার সমস্যা।

    প্রথম দিকে, যখন ছাত্রজীবন শেষ করে কৃষক বা শ্রমিক আন্দোলনে অবিলম্বে অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারটা ছাত্রসমাজে পরিষ্কার হয়নি, এ সমস্যা অত্যন্ত প্রকট ছিল।

    সে সময় ছাত্র আন্দোলনের অনেক সেরা কর্মী পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যােগদান করেছিল। জনবিচ্ছিন্ন এই সার্ভিসের কৃত্রিমতার খােলসের মধ্যে অনেক তাজা এবং বিপ্লবী মন অবরুদ্ধ হয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে একবার যখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই সার্ভিসের জিঞ্জির ভেঙ্গে গেল তখন দেখা গেল, অনেক অবরুদ্ধ মন মুক্তি পেয়েছে এবং অতীতের সংগ্রামী সূত্র তুলে ধরেই যেন জেলায় মহকুমায় মুক্ত এলাকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বিনা দ্বিধায়। এই মুক্তবিহঙ্গরা যে দিগন্ত স্থাপন করেছে। তাদের চোখের সামনে সেটা বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একটা স্বাভাবিক আত্মিকতা স্থাপনেরই প্রয়াস।

    তবে এতে পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামে ছাত্রসত্তার প্রমাণ পাওয়া যায় নতুনভাবে। ছাত্রসমাজের আদর্শবাদ আজো প্রাক্তন ছাত্রদের মনে কাজ করে চলেছে।

    দুই দশকের দ্বিতীয় ঘটনা: ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা ছাত্রজীবন শেষ। হওয়া ছাত্র, শ্রমিক এবং কৃষকদের মধ্যে বিপ্লবী সংগঠক হিসেবে কাজ করার। একটা রেওয়াজ গড়ে তুলেছে।

    প্রগতিবাদী প্রত্যেকটি ছাত্রদলের মধ্যে একটা শাখা । প্রবণতা কম বেশি গড়ে উঠেছে অর্থাৎ ছাত্রসমাজের মধে। শাডি সংযােগ স্থাপনের একটা সূত্র স্থাপিত হয়েছে। গত দুই দশকের প্রথম দশকে যত ছাত্র শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে বিপ্লবী সংগঠন হিসেবে তার তুলনায় এই দশকের ছাত্রসমাজের মধ্য থেকে বিপ্লবী সংগঠন বেরিয়ে এসেছে তুলনামূলকভাবে বেশি। এর একটা কারণ নিশ্চয় এই যে শমিক কৃষক আন্দোলনের ভূমিকা স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় এবং প্রভাবশালী ।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    শুধু ছাত্রদের একটি অংশই নয় কিছু সংখ্যক ছাত্রী ও যে লাল নিশান নিয়ে কিংবা লালটুপি পরে কৃষক সমাবেশে যােগ দিয়েছে তাতে আনুষ্ঠানিকতা অনেকখানি অতিক্রান্ত হয়েছে নিশ্চয় । কোন কোন চমক বিক্ষোভে লাল নিশানধারী কিংবা লালটুপি পরিহিত ছাত্রছাত্রীরা কৃষকদের তুলনায় সংখ্যায় বেশি —নিন্দুক এবং শুভার্থী উভয়ের কাছ থেকেই এ অভিযােগ এসেছে। এতে হয়তাে কৃষক আন্দোলনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে প্রকৃতপক্ষে প্রকাশিত হয়েছে পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের বিশেষ সত্যটি। ছাত্রসমাজই এখনাে চূড়ান্ত পদক্ষেপের প্রধান উদ্যোক্তা থেকে গিয়েছে।

    অবশ্য গত এক দশকে ছাত্রসমাজের কাঠামাের যে চরিত্রবদল হয়েছে। এবং ছাত্র ও ছাত্রী উভয়েরই মধ্যে শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে বৈপ্লবিক সম্পর্ক স্থাপন করার যে ধারা প্রবর্তিত হয়েছে, তাতে জনগণের ছাত্রসত্তা একটি গণমুখী রূপ নিয়েছে—এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। এই পটভূমিকে চোখের সামনে রাখলে পূর্ব বাংলার বর্তমান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লবী মমভূমি অনুধাবন করা সহজ হবে।

    যে ছাত্রসমাজ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নির্দিষ্ট করেছে, তারাই সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ব্যাপারে উদ্যোক্তা হবে। এ বিশ্বাসকে উপরােক্ত বিশ্লেষণ একটা সঙ্গতি দিতে সক্ষম।

    গত চব্বিশ বছরে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ এবং তারই পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য মেহনতি মানুষের চিত্তভূমি যে বৈপ্লবিক সমৃদ্ধি লাভ। করেছে সেটা একটা পরম্পরার মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয়ে এগিয়ে এসেছে।

    বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিতে একে দেখার অর্থ একে ভেঙ্গে ঢুকলো। টুকরাে করে দেখা নয়। যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বাতাবরণের মধ্যে শ্রমিককৃষক ও অন্যান্য মেহনতি মানুষের মুক্তির অনিবার্যতা রয়েছে তা ভেঙ্গে ফেলে দেবার ব্যাপার নয়। বাংলার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত মেহনতি মানুষের মুক্তি অনিবার্য করে তােলাই একে বৈপ্লবিক শ্রেণীদৃষ্টিতে দেখা ।

    ছাত্রসমাজের বিকাশের ধারাটি পুরােপুরি বুঝতে পারলে পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের বিপ্লবী চিত্তভূমি অনুধাবন করা যাবে অনায়াসেই। পূর্ব বাংলার শমিকশ্রেণী ও কৃষকরা ইতােমধ্যে যে বৈপ্লবিক চিত্তভূমি গড়ে তুলেছে, তাকে সরাসরি বিশ্লেষণ করারও একটা পথ আছে। সেটা প্রথাসিদ্ধ পথ। তবে ছাত্রসমাজের চরিত্র যখন বদলে গিয়েছে তখন এদিক থেকে বিশ্লেষণে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত একই সিদ্ধান্তে উপনীত হব।

    স্বাধীন শােষণমুক্ত বাংলা ছাত্রসমাজ এবং মেহনতি মানুষ উভয়েরই চিন্তাচেতনার ফসল।

    ১৯৭১

  • হরবংশ মুখিয়া।। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি

    হরবংশ মুখিয়া।। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি

    অনুবাদ: তনিকা সরকার

    [এই রচনাটি ১৯৬৮ সালে আকাশবাণী আয়োজিত ‘বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিততে রেডিও-প্রচারকের ভূমিকা’ শিরোনামের আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সভার পঠিত রচনাগুলির সংকলন যা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদ’-এর বাংলা ইউনিটের তত্ত্বাবধানে সংকলনটির বাংলা অনুবাদ করেন তনিকা সরকার। লেখাটি অনলাইন পাঠকদের জন্য অরাজে পুনঃপ্রকাশিত হলো। লেখাটি নেয়া হয়েছে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বইটির তৃতীয় মুদ্রণ (১৯৯৩) থেকে। মূল গ্রন্থের বানান ও ভাষারীতির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।- সম্পাদক]
    মুগল দরবার

    বহুকাল যাবৎ আমাদের সাতশো বছরেরও বেশিদিনের মধ্যযুগের ইতিহাসকে ‘মুসলমান আমল’ বলে অভিহিত করা হয়ে এসেছে, এবং আজকের দিনেও এই কথাটির যথেষ্ট ব্যবহার দেখা যায়।

    একাদশ বা এয়ােদশ শতক থেকে ভারতে যে নতুন শাসকগােষ্ঠী ক্ষমতালাভ করলেন তারা ইসলামধর্মাবলম্বী ছিলেন, যদিও তাদের পূর্ববর্তী শাসকশ্রেণী ছিলেন হিন্দু; আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় আমাদের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার পেছনে এই যুক্তিই কাজ করেছে। ডাঃ থাপার আগেই এই ধরনের ব্যাখ্যার অনেক গুরুতর ত্রুটি খুঁজে বার করেছেন। তাছাড়াও, এর অন্তর্নিহিত দুটি ধারণা সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে।

    প্রথমত, রাজার জীবনের, বা রাজবংশের, কি বড়ােজোর শাসকগােষ্ঠীর ইতিহাসকে ভারতের ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, এবং এক্ষেত্রে বাজার ব্যক্তিগত ধর্মই সবচেয়ে বড়ো কথা। দ্বিতীয়ত, আরবদেশ থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত ইসলামধর্মের যে সহস্র বছরেরও বেশি দিনের ইতিহাস, তাকে একেবারেই পরিবর্তনবিহীন বলে মনে করা হয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে স্থান-কালভেদে তার যতো পরিবর্তন ঘটেছে তা গ্রাহ্যই করা হয়নি। সপ্তমশতকের আরবদেশে মুসলমান সমাজ সাম্যনীতির মৌলিক গুরুত্ব ছিলো, কিন্তু তা সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতকের ভারতবর্ষে বা তার আগে কি পরে অন্যান্য জায়গাতে স্বেচ্ছাতন্ত্র ও সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হলাে। যদিও তা সাম্যনীতির সম্পূর্ণ বিরােধী। তাছাড়া, ইসলামধর্ম বিভিন্ন লােকের কাছে বিভিন্ন অর্থ বহন করে এনেছে। আলাউদ্দীন খল্‌জী ও মহম্মদ তুঘলক, আকবর ও ঔরংজেব, ‘উলেমা তাণ ও সুফি সন্তরা—এঁরা সকলেই মুসলমান হলেও প্রত্যেকেই ইসলাম সম্বন্ধে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পােষণ করতেন।

    সুতরাং মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস যাকে বলা হয় তা প্রকৃত ইতিহাসের অংশমাত্র, এবং যে দিকটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, আসলে তার গুরুত্ব খুবই কম। সমাজবিবর্তনের ক্রমবিকাশ আর উৎপাদন পদ্ধতির অদলবদল, এবং তার ফলে সমাজের গড়নের পরিবর্তন—এই সবই হলো প্রকৃত ইতিহাসচর্চার উপজীব্য। এইভাবে রচিত ইতিহাসই হতে পারে অতীতসমাজের সামগ্রিক ইতিহাস, এখানে শাসকের ব্যক্তিগত ধর্ম কী ছিলো সেটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে যে ধরনের রাজনৈতিক ইতিহাস আমরা পড়ে এসেছি তাও শাসকশ্রেণীর বংশবিবরণী ছাড়া কিছুই নয়। শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত আঞ্চলিক ধর্মীয়, জাতিগত ইত্যাদি নানারকমের গােষ্ঠীগুলির প্রায় কোনােরকম পর্যালােচনাই এখনাে পর্যন্ত হয়নি, অথচ এগুলির দ্বন্দ্বসংঘাত এবং আপােষের চাপেই শাসকশ্রেণীর সেই সময়ের নীতি নির্ধারিত হতাে।

    মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে খুব সহজলভ্য তৎকালীন উপাদান, অর্থাৎ সেযুগের ঐতিহাসিকদের লেখা। এদের প্রায় প্রত্যেকের লেখাই হলাে সেযুগের রাজদরবারের ইতিহাস, যথা জিয়াউদ্দিন বরনির তারিখ-ই-ফিরুজশাহী বা আবুল ফজলের আকবরনামা ইত্যাদি। পরবর্তী ঐতিহাসিকরা কিন্তু এইসব লেখা ব্যবহার করার আগে এদের চরিত্রের বিশেষ কোনাে বিশ্লেষণ করেননি।

    সেযুগের যে ঐতিহাসিকদের তথ্যের ওপর আমরা খুবই নির্ভর করি, তাদের প্রত্যেকের বিষয়েই যে কথাটি বিশেষভাবে প্রযােজ্য তা হলো এরা প্রত্যেকেই হয় রাজ-অমাত্য, অথবা সেই পদপ্রার্থী ছিলেন। ফলে তারা সকলেই দরবারের কোনাে না কোনো উপদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতেন। তাই রাজদরবার ছিলাে তাদের আলােচনায় কেন্দ্রবিন্দু, তাঁদের লিখিত ইতিহাসের সব ঘটনাই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ ভাবে এর সঙ্গে জড়িত থাকতো। দরবারের অবস্থার সঙ্গে তাঁদের রচনার ভাষার পর্যন্ত যােগ থাকত।

    উদাহরণ হিসেবে খুব বিতর্কমূলক একটি শব্দ ধরা যাক—“হিন্দু” শব্দটি।

    সেযুগের ঐতিহাসিক অভিজাত অমাত্যশ্রেণীর লােক ছিলেন বলে তারা এই শ্রেণীর চরিত্রের ও কাঠামাের বা রাজার সঙ্গে এর সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন চাইতেন না। জিয়াউদ্দিন বরনি ছিলেন চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একজন অন্যতম তত্ত্ববিদ ও পেশাদার ঐতিহাসিক। ইনি তার বইটিতে এই দুটি দিকের ওপরে বিশেষ জোর দিয়েছেন (তার বইয়ের নাম ফতও-য়া-ই জাহান্দারী, অধ্যাপক মহম্মদ হাবিব ও বেগম আফসর খান The Political Theory of the Delhi Sultanate নামে বইটি ইংরিজিতে অনুবাদ করেছেন)। বরনি একদিকে বলেছেন যে শুধুমাত্র উচ্চকুলজাত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই অর্থাৎ মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণীরাই দরবারের উচ্চপদ পেতে পারেন, যাতে তার গঠন ও চরিত্রের কোনাে পরিবর্তন না হয়; অন্যদিকে তিনি একটি উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপন করতে বলেছেন, যার সভার সব নিয়ম সুনির্দিষ্ট থাকবে, যার সভ্যেরা সকলেই উচ্চবংশের হবেন এবং কোনােরকম ভয় বা প্রত্যাশা না রেখে তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। এই উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপিত হলে সম্রাট ও অভিজাতশ্রেণীর মধ্যেকার সম্পর্ক একটা প্রতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, যার ফলে কোনাে যথেচ্ছা সম্ভব হবেনা।

    জিয়াউদ্দিন বরনি

    এই স্থিতাবস্থার এক প্রধান বিপদস্বরূপ ছিলেন হিন্দু রাজা, রাও, রাণা, জমিদার প্রভৃতি। আমরা পরে দেখবাে যে এরাও ছিলেন বৃহত্তর শাসকশ্রেণীরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজেই যখন সেযুগের ঐতিহাসিকরা হিন্দুদের বিনাশকামনা করতেন, তখন তাঁরা হিন্দু বলতে এই গোষ্ঠীর কথাই চিন্তা করতেন। পুরাে হিন্দু সমাজ ধ্বংস করা তাঁদের অভিপ্রায় হতেই পারে না, বিশেষ করে যেখানে হিন্দু কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনার ওপর নির্ভর করে হিন্দু রাজা ও মুসলমান ইক্তেদারদের তাঁদেরও বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নির্বাহিত হতাে। সুতরাং এই ঐতিহাসিকরা যখন ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী হিন্দু সমাজভুক্ত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কথাই মনে করতেন। এক্ষেত্রে ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অর্থে, ধর্মীয় অর্থে নয়।

    শাসকশ্রেণীর আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও আপােষ সেযুগের ঐতিহাসিক দের শব্দচয়নে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই শাসকশ্রেণীর মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই লােক ছিলেন। এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে সামাজিক স্তরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কোনাে যােগ ছিলােনা।

    দ্বিতীয় তদানীন্তন ঐতিহাসিকদের লেখায় তথ্যনিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিগত মতামতের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিলাে। যা সত্যই ঘটেছে তা নিয়ে তাঁরা যতাে না লিখতেন, তার চেয়ে বেশি লিখতেন যা তাঁদের মতে হওয়া উচিত ছিলাে সে-বিষয়ে।

    আজকের দিনের ইতিহাসবিদদের অনেকেই সে যুগের ঐতিহাসিকদের ব্যবহৃত পরিভাষা থেকে তখনকার পুরাে সমাজের অবস্থা বুঝে নেবার চেষ্টা করেন।[১] তাই শাসকশ্রেণী আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষকে তাঁরা মনে করেন বৃহত্তর সমাজের মধ্যেকার সংঘর্ষ। আলাউদ্দিন খলজী বিদ্রোহী হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে দমননীতি প্রয়ােগ করেছিলেন, তাই তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন একজন ধর্মোন্মত্ত সম্রাট যিনি হিন্দুদের সহ্য করতে পারতেন না। আমরা মনে রাখিনা যে মুসলমান ইক্তেদারদেরও (তাদের মধ্যে খুব ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিও অনেকেই ছিলেন যারা কোনাে অর্থেই বিদ্রোহী ছিলেন না) দমন সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-ইতিহাস রচনা করতে আলাউদ্দিন কিছুমাত্র দ্বিধা করেননি এবং জিয়া বনি আক্ষেপ ক’রে বলেছিলেন যে আলাউদ্দিন তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় বা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামীয় ধর্মনীতি একটুও মেনে চলতেন না। সেরকম, শা-জাহান বা ঔরংজেব রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বা পরিবারকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে করা হয় যে, তারা সমগ্র হিন্দুসমাজের ধর্মান্তরের চেষ্টা করেছিলেন।

    এছাড়া, আধুনিক ঐতিহাসিকরা সেযুগের ঐতিহাসিকদের সমস্ত লেখার ওপরে এত আক্ষরিকভাবে নির্ভর করেন যে সেইসব লেখার কোনখানে যে খাটি তথ্য আর কোনখানে যে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আশা ইত্যাদি এসে পড়েছে তা তারা একেবারেই আলাদা করে দেখেন না। যে কোনাে উপাদানের ওপর এতােটা নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক। তাছাড়া এটাও লক্ষণীয় যে আজকের দিনে যিনি যতো গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিক, তিনি ততােই সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকদের লেখার ওপর নির্ভর করেন। এই শতকের বিশ, তিরিশ ও চল্লিশের “জাতীয়তাবাদী”[২] ঐতিহাসিকরা এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণের মােকাবিলা করতে ঐকান্তিক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারাও একই প্রথায় এই চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক মনােভাবসম্পন্ন ঐতিহাসিক দের মতাে তাঁরাও রাজদরবারের বাইরের বৃহত্তর সমাজ ও তার ক্রমবিকাশের ধারা অধ্যয়ন করেননি। দ্বিতীয়ত, পূর্বোক্ত ঐতিহাসিকদের মত তারাও অন্য ধরনের তথ্য হয় লক্ষ্য করেননি, আর নয়তাে ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেছেন, যদিও নিঃসন্দেহে তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক ভালাে ছিলো।

    সুতরাং সাম্প্রদায়িক বা জাতীয়তাবাদী—উভয় শ্রেণীর ঐতিহাসিকদেরই আলােচনার মূল ধরন একই রকম থেকে গেছে। এর ফলে বিশেষ একটি পর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিককে সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকের বক্তব্য মেনে নিতে হয়েছে।

    এই বক্তব্যের সমর্থনে উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন, এই সেদিন পর্যন্ত মনে করা হতো মধ্যযুগীয় ভারতে বিশেষ কোনাে শাসকের ব্যক্তিত্বই সেসময়ের ইতিহাসের কেন্দ্রস্বরূপ ছিল, তার শাসনকালের সব ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দায়ী তার ব্যক্তিগত চরিত্র বা ইচ্ছা। তাই, আলাউদ্দীন খলজি কেবল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যেই বিশাল ভূখণ্ড জয় করলেন। অথবা, মহম্মদ বিন্ তুঘলকের উন্মত্ত পরিকল্পনার পেছনে ছিলাে সামঞ্জস্যবিহীন, পরস্পরবিরােধী ধাতুতে গড়া তার চরিত্র। কিংবা আকবরের উদার ধর্মনীতি তার উদার মানসেরই প্রতিফলন। যদি আকবরের উদার ধর্মনীতিকে আমরা তার মানসিক উদারতার পরিচয় হিসেবে দেখি, তাহলে ঔরংজেবের ধর্মান্ধতাকে তার গোড়া ধর্মীয় নীতির কারণ বলে মেনে নিতেই হবে।

    সুতরাং গোঁড়ামি বা উদারতা রাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থার চাপে এবং গােষ্ঠী ও দলগত আনুগত্যের ঘাত-প্রতিঘাতে নীতি-নির্ধারিত হয়, বিভিন্ন শাসকের ধর্মান্ধতা ও উদারতা দিয়ে নয়। সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকও আকবরের উদারতার যথেষ্ট প্রশংসা করতে পারেন, কারণ তাহলে অন্য সব শাসকের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতার অভিযােগ সহজেই আনা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী আখ্যা দিয়ে আকবরের প্রশস্তি করা প্রথমত অনৈতিহাসিক কারণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটি সম্পূর্ণ আধুনিক; মধ্যযুগীয় ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা (অথবা মধ্যযুগীয় অন্য যে কোনাে রাষ্ট্র) স্বভাবতই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে। ধারণাটি এতােই আধুনিক যে আমাদেরও কেউ কেউ এখনাে পর্যন্ত এটি নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারেন নি, বাস্তবে অনুসরণ সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-ইতিহাস রচনা করা তো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের প্রশস্তি করে কোনাে লাভই হয় না। কারণ এর ফলে আকবরের অর্ধশতাব্দীর শাসনকাল বাদ দিলে বাকি সাড়ে ছয় শতকের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধর্মপ্রধান বলে মনে করতে হয়। কাজেই আকবরের শাসন হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের মূলসূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন, আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক ঘটনামাত্র।

    যখন আমরা ইতিহাসচর্চার ধারা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারব, যখন বিশেষ কোনাে শাসক বা শাসকশ্রেণীর ইতিহাসমাত্র না পড়ে সমস্ত সমাজের ইতিহাস পর্যালােচনা করবাে, একমাত্র তখনই আমাদের ইতিহাসচেতনা প্রকৃতই এবং যুক্তিযুক্তভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারবে। সমগ্র সমাজের ইতিহাস, তার চরিত্র ও গঠনভঙ্গি, যার থেকে পরস্পরবিরােধী হওয়া সত্ত্বেও কাছাকাছি সময়ে বা একই সঙ্গে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিরােধ, সেই সম্প্রীতি ও বিরোধের ক্ষেত্র—এই সবই আমাদের আলােচনার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। তাহলে জাতীয়তাবাদী বা সাম্প্রদায়িক মনােভাবের ঐতিহাসিকদের মতো সমাজ-ইতিহাসের কোনাে একটি দিকের ওপর বিশেষভাবে আলােকপাত করার জন্যে অন্য একটি দিক সম্বন্ধে আমাদের নীরব থাকতে হবে না।

    [২]

    সপ্তম শতকে আরবদেশে ইসলামধর্মের অভ্যুত্থান সমসাময়িক পৃথিবীর পক্ষে বিশেষ একটি প্রগতিশীল প্রভাব। যখন ধর্মগুরু মহম্মদ একেশ্বরবাদ প্রচার করলেন—এক আল্লাহ ছাড়া আর দ্বিতীয় ঈশ্বর নেই—তখন তিনি একটি বিরাট সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন। কারণ, একেশ্বরবাদ তত্ত্বের মধ্যে সাম্যনীতিও নিহিত। যদি ঈশ্বর এক হন এবং যদি তিনি সব মানুষকে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তো তাঁর কাছে সবাই সমান, যেমন পিতার কাছে সব সন্তান সমান। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষই প্রতেক মানুষের সমান। এই মূল ধারণা থেকে মুসলমান সৌভাত্রের (“মিল্লাৎ”) ধারণাটি গড়ে উঠলাে। এছাড়া ইসলাম ধর্মে কোথাও সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠী, এমন কি সংকীর্ণ কোনো পুরােহিতগােষ্ঠীরও স্থান ছিলো না।

    কিন্তু সপ্তম শতকের শেষ অথবা অষ্টম শতকের শুরু থেকে ইসলামধর্ম যখন বিরাট এক ভূখণ্ডের ওপর ছড়িয়ে পড়লো এবং প্রকাণ্ড সব সাম্রাজ্য গড়ে উঠলাে, তখন থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজা (যিনি ঈশ্বরদত্ত অধিকারের দাবিতে রাজ্যচালনা করেন) ও তার অধীনস্থ সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠীর আবির্ভাব হলাে। বিশেষ করে, অনুন্নত সভ্যতা ও শাসনপ্রণালীর অধিকারী পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের পরেই বেশি করে এই নতুন রীতি প্রবর্তিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে সামাজিক সাম্য ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো তার বিপরীতে । সুলতান মামুদ গজনী প্রথম বিধিসম্মতভাবে স্বীকৃত সুলতান—এই স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক সাম্যের ধারণা স্পষ্টই লােপ পেলাে। তাই একাদশ ও ত্রয়ােদশ শতকে আমরা দেখতে পাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাটেরা তাদের সাম্রাজ্যবিস্তার করার জন্যে কেবল কাফেরদের নয়, পরস্পরের বিরােধিতা করেছেন। তুর্কিরা একটি সাহসী, যুদ্ধব্যবসায়ী শাসকশ্রেণী হিসেবে রাজ্যজয়ের উদ্দেশ্যে ভারতে এলেন, অসিধারী ধর্ম-প্রবর্তকের ভূমিকা নিয়ে নয়।

    সুলতান মাহমুদের দরবার

    ভারতবর্ষে কীভাবে তুর্কিশাসন প্রতিষ্ঠিত হােল?—বহুসংখ্যক হিন্দুকে হত্যা করে, না জোর করে তাদের ধর্মান্তর ঘটিয়ে? তুর্কি-আক্রমণের বিরুদ্ধে যে কোনােরকম গণপ্রতিরােধ একেবারেই দেখা দিলো না তারই বা কারণ কী?

    দ্বাদশ বা ত্রয়ােদশ শতকে তুর্কিরা প্রায় বারাে হাজার সৈন্য নিয়ে এখানে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। উন্নততর রণকৌশল ও সংগঠনের ফলেই তাদের জয়লাভ সম্ভব হলো, যদিও কোনো কোনো হিন্দু রাজার সামরিক বল ও অর্থনৈতিক সম্পদ তুর্কিদের চেয়ে বেশি ছিলাে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সমগ্রীভূত শক্তিকে পরাজিত করা আর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা এক নয়, এবং তারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিলেন প্রথমটিই অপেক্ষাকৃত সহজ। যদি তারা কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরে পূর্বতন সরকারী কর্মচারীদের পদচ্যুত করে নিজেদের লােক নিয়ােগ করতেন তাহলে তাদের যে প্রতিরােধের মুখােমুখি হতে হতাে তা পরাস্ত করার ক্ষমতা তাদের ছিলো না। তাই বেশি ক্ষমতাশালী শাসকদের পরাজিত করার পর পুরােনাে শাসকগােষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে (অর্থাৎ রাজা, রাণা, জমিদার, চৌধুরী প্রভৃতি) তারা একটি রফা করলেন, সেই রফা অনুযায়ী ঠিক হলো যে জমিদার শ্রেণীর লােকেরা তাদের পুরােনাে জমি, পদমর্যাদা, সুযােগ-সুবিধা সবই রাখতে পারবেন, যদি তারা প্রতিবছর সুলতানকে একটি নির্দিষ্ট খাজনা দিতে সম্মত থাকেন। যতােদিন এই কর তারা ঠিকমতো নির্দিষ্ট সময়ে দেবেন (কর দেওয়া মানেই সুলতানের আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া) এবং পরস্পরকে আক্রমণ না করবেন, ততদিন তাদের স্থানচ্যুত করা হবে না এবং তাদের নিজস্ব এলাকার শাসনব্যবস্থাতেও হস্তক্ষেপ করা হবে না।

    কাজেই, শাসনব্যবস্থার নিম্নস্তরে হিন্দুরাই সর্বেসর্বা রয়ে গেলেন। এইভাবে তারাই ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্য পত্তনে সাহায্য করলেন এবং শাসনব্যবস্থার ভারও তাদের হাতেই রইলাে। তাদের সাহায্য না পেলে তুর্কিদের বেশিদিনের জন্যে ভারতে অবস্থান কোনােমতেই সম্ভব হতােনা। তাই তারাও শাসকশ্রেণীরই অংশভুক্ত রয়ে গেলেন তুর্কিদের মতাে তাদের অস্তিত্ব কৃষকের অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতাে। আগেই বলা হয়েছে যে, বরনি প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা ‘হিন্দু’ বলতে বুঝিয়েছেন হিন্দুসমাজের যে-অংশটি শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত তাদের কথা।

    প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে শাসকশ্রেণীর মধ্যে যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তাকে প্রায়ই ধর্মীয় বা আদর্শগত রূপ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা মহম্মদ তুঘলকের শাসন কালে আলি শাহ, নাথুর বিদ্রোহের কথা মনে করতে পারি। নাথু নামে এক খলজিকে কিছু জমি দেওয়া হয়েছিলো তার থেকে তিনি রাজস্ব আদায় করতেন। কিছুদিন পরে ভরন নামে এক হিন্দু ব্যক্তি সরকারের কাছে নাথুর বিরুদ্ধে রাজস্বের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযােগ আনলেন। তার ফলে নাথুর জমি ভরনকে দিয়ে দেওয়া হলো। নাথু ও তাঁর ভাইরা একজন কাফেরকে তাদের ওপরে বসানাের বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে আবেদন করলেন কিন্তু আবেদন অগ্রাহ্য হওয়ায় তাঁর বিদ্রোহ করলেন।

    রাষ্ট্র যে কখনাে ব্যাপকভাবে সব হিন্দুদের মুসলমান ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বা প্রচণ্ড উৎসাহে ইসলামি আদর্শ প্রচার করেছিলেন এ রকম কোনাে প্রমাণ নেই। ধর্মান্তরের চেষ্টা একমাত্র হয়েছে রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনাে কোনাে ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে, কখনােই ব্যাপকভাবে সাধারণের মধ্যে নয়। এবং আশ্চর্যের কথা হলো এই ধরনের চেষ্টাও হয়েছে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের মাঝামাঝি সময়ে, প্রথম দিকে নয়। অথচ প্রথম দিকে এ-ধরনের প্রচেষ্টা হলে তা আরাে অর্থ পূর্ণ হতো। কেউ কেউ তর্কের খাতিরে বলতে পারেন যে, রাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিলাে এইসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবার ধর্মান্তর গ্রহণ করলে তাঁদের অনুচররাও তাদের অনুসরণ করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় হলো শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিদেরই ধর্মান্তরের কথা উঠতো যারা হয় বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্ট্রের বিরােধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিলাে তাদের ক্ষমা করা এবং তাদের গুরুত্বের কথা মনে রেখে তাঁদের কাছ থেকে নির্দ্বিধ আনুগত্যের স্বীকৃতি আদায় করা। মধ্যযুগে ধর্মকে জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতাে বলে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে সম্রাটের ধর্মকে গ্রহণ করাকেই আনুগত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মনে করা হতাে। তা নইলে কেনই বা অন্যান্য বিশ্বস্ত ও কর্মপটু হিন্দু রাজা, রাণা ও রাজপুত পরিষদের বেলায় ধর্মান্তর-গ্রহণের কথা বলা হতাে না। 

    কেউ এভাবে তর্ক করতে পারেন যে, জিজিয়া করের সাহায্যে হিন্দুদের ওপর চাপ দেওয়া হতাে, মুসলমান হবার জন্য। অবশ্য মুসলমান হলেও তাঁদের “জাক” কর দিতে হতো এবং এই করটি কেবলমাত্র মুসলমানদেরই দেয় ছিলাে। দ্বিতীয়ত, জিজিয়া সম্বন্ধে যেসব তথ্য জানা যায় তা সবই নিতান্তই অস্পষ্ট। চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতা বলেছেন যে, দক্ষিণ ভারতে এক হিন্দু রাজবংশ (‘জামােরিণ’) তাঁদের ইহুদি প্রজাদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করতেন। ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান শাসকরা তাদের মুসলমান প্রজাদের ওপরেও জিজিয়া কর বসাতেন বলে আমরা জানি। তাছাড়া ফিরােজ তুঘলকের শাসনকাল বাদ দিলে অন্য সব সময়ে জিজিয়ার আওতা থেকে নারী, শিশু, পঙ্গু, ব্রাহ্মণ ও সৈন্যেরা বাদ পড়তেন। তর্কের খাতিরে যদিই বা ধরে নেওয়া হয় যে জিজিয়া করের উদ্দেশ্য ছিলো সম্পূর্ণই ধর্মীয়, তাহলেও একথা মনে করার কোনাে কারণ নেই যে হিন্দুরা তাদের ধর্ম সম্বন্ধে এমনই উদাসীন ছিলেন যে সামান্য একটা কর এড়াবার জন্যে ধর্মত্যাগ কতে পারতেন (বিশেষত যেখানে পুরােপুরি এড়াবার কোনাে প্রশ্নই ওঠেনা, কারণ মুসলমান হলেও, তাঁদের ‘জাক’ কর দিতে হতো)। তাছাড়া যদি মনে করতে হয় যে, হিন্দুরা কিছু টাকা বাঁচাবার জন্যেই ধর্মান্তর গ্রহণ করতেন, তাহলে আমরা কেনই বা ধরে নেবোনা যে রাষ্ট্রও শুধুমাত্র আর্থিক কারণেই এই কর বসিয়েছিলেন ?

    মন্দির ধ্বংস করার ব্যাপারেও একই কথা খাটে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা যেরকম উৎসাহের সঙ্গে সেসব কথা বর্ণনা করে গেছেন, আজকের দিনের গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিকরাও ঠিক একইভাবে তা বর্ণনা করেছেন। হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার উদ্দেশ্য আর যাই হােক না কেন, হিন্দুদের মুসলমান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা নিশ্চয় নয়। কেননা কী করে আমরা ভাবতে পারি যে, কোনাে সম্প্রদায়ের হৃদয় জয় করা যায় তাদের মন্দির ধ্বংস করে? এই ধ্বংসক্রিয়া তাদের মনে ইসলাম সম্বন্ধে প্রেম নয়, বরং ঘৃণারই উদ্রেক করতে পারে। তাহলে এধরনের কার্যকলাপের উদেশ্য তাঁদের ধর্মান্তরিত করা নয়, নিশ্চয়ই অন্য কোনাে অভিপ্রায় ছিলাে। এটা লক্ষণীয় যে সাধারণত কেবলমাত্র শত্রুপক্ষের এলাকায় মন্দিরগুলিই ধ্বংস করা হয়েছে। মন্দিরগুলি ষড়যন্ত্র বা বিদ্রোহের কেন্দ্র হয়ে না দাড়ালে (যেমন ঔরংজেবের আমলে হয়েছিল) সুলতানের নিজের এলাকার মধ্যে কখনােই তা ধ্বংস করা হতােনা। শক্ত এলাকায় মন্দির ধ্বংস করা যেন জয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাে। প্রসঙ্গত উল্লেখযােগ্য যে, মুসলমান আক্রমণের বহু আগেই অনেক হিন্দু শাসক তাঁদের শত্রু এলাকায় গিয়ে একই কাজ করেছেন। পারমার রাজা সুভাত বর্মণ (১১৯৩-১২১০  খ্রীষ্টাব্দ) গুজরাট আক্রমণ করে দাভয় ও ক্যাম্বে অঞ্চলে বহুসংখ্যক জৈন মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। পূর্বোল্লিখিত কাশ্মীরের রাজা হর্ষ তার রাজভাণ্ডার পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে তাঁর নিজের রাজত্বেই চারটি বাদে আর সব মন্দির লুণ্ঠন করেছিলেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনাে প্রতিবাদ হয়নি। অথচ, আরাে বেশি অর্থের প্রয়ােজন হওয়ায় যখন তিনি অধীন সামন্তবর্গের ওপর কর বাড়িয়ে দিলেন তখন তাঁকে শ্রীনগরের পথে পথে টেনে নিয়ে ঘােরানাে হয়েছিলাে। এবং পরিশেষে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো।

    ধর্মান্তরীকরণ যে হতাে একথা কেউ অস্বীকার করছেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়েই তা ছিলাে ইচ্ছাকৃত বর্ষায় কিংবা হয়তাে সুফি সন্তদের জনপ্রিয়তার ফল ; তাঁরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাস করতেন এবং তাদের সঙ্গে তাঁদের ভাষাতেই কথা বলতেন। আমাদের প্রতিপাদ্য শুধু এইটুকুই যে রাষ্ট্র কখনাে ধর্মান্তরের জন্য কোন ব্যাপক প্রচেষ্টা করেনি। সেরকম কিছু করলে তদানীন্তন গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবং অনেক অতিরঞ্জনসহ সে তথ্য লিপিবদ্ধ করে যেতেন।

    সম্রাট অশােক যদিও সর্বপ্রকারে বৌদ্ধধর্ম প্রচলন করার এবং জনসাধারণকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় সরকারিভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিলেন, তবুও আমরা তাকে একজন মহান সম্রাট বলে মনে করে থাকি। কিন্তু মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্র কখনো ধর্ম প্রচারে কোনাে আগ্রহ দেখায়নি—তবু জনমানসে তা কেবলমাত্র ইসলামধর্ম প্রসারের একটি মাধ্যম হিসেবেই রয়ে গেছে। এই ধারণার পেছনে আছে আমাদের সুপ্ত সাম্প্রদায়িক মনােভাব বা মুসলমানধর্ম গ্রহণের বিরােধিতা পােষণ করে এসেছে। এইধরনের মনােভাবকে দমন করার জন্যে আমাদের সচেতনভাবে চেষ্টা করা উচিত।

    ভিক্ষুদের সাথে সম্রাট অশোক

    আমরা এখানে এরকম কোনো ইঙ্গিত করছি না যে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণই ধর্মনিরপেক্ষ ছিলাে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটিই সাম্প্রতিক কাজেই মধ্যযুগে বা তারও আগে এই আদর্শের প্রয়ােগ ঐতিহাসিকভাবে সম্ভব ছিল না। সুতরাং রাষ্ট্র যদি কখনাে ধর্মপ্রচারে লিপ্ত হয়েও থাকে, তাহলে অশােকের ক্ষেত্রে যেমন তা হয়েছে, এক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত।

    তবে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা নেতিবাচকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলাে; অর্থাৎ, রাষ্ট্র ধর্মকে রাজনীতির পরে স্থান দিতে, রাজনীতির উর্ধ্বে ধর্মকে তুলে ধরতো না। সুলতানরা উলেমাদের অনেক মাইনে দিয়ে অল্প দায়িত্বের পদে নিযুক্ত করতেন, যাতে তারা সাধারণ লােকের ওপর তাদের যা প্রভাব আছে তার সবটাই সুলতানদের রাজনীতিক প্রয়ােজনে খাটাতে পারেন এবং উলেমারাও অধিকাংশই সুলতানের নির্দেশ পালন করতে যথেষ্ট আগ্রহী থাকতেন এবং প্রায়ই ইসলামধর্মের নিয়ম-কানুন তাঁর সুলতানের সুবিধা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতেন। সুফিরা উলেমাদের রৌপ্যের বিনিময়ে এই আত্মবিক্রয়ের তীব্র নিন্দা করতেন এবং সেই নিন্দা ন্যায়সঙ্গত ছিলো। এ বিষয়ে অনেক উদাহরণ থেকে একটি বিচিত্র দৃষ্টান্ত তুলে ধরলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। বাদাউনি নামে আকবরের সমসাময়িক একজন রাজসভার ঐতিহাসিক বলেছেন যে যদিও ধর্মত একজন পুরুষের মাত্র চার স্ত্রী থাকতে পারেন, তবু সম্রাট আকবরের ন’জন স্ত্রী ছিলেন।আকবর উলেমাদের এক সভায় প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। সম্রাটের প্রসাদভিক্ষু একজন অতি আগ্রহী উলেমা বলে উঠলেন যে কানুন অনুসারে একজন মুসলমানের ২-২, ৩-৩, ৪-৪ জন পত্নী, অর্থাৎ সব মিলিয়ে আঠারোজন পত্নী থাকতে পারেন। অন্য কেউ কেউ তখন একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে করে বললেন যে প্রকৃতপক্ষে আইন-সম্মত সংখ্যা হােল ২, ৩, ৪—অর্থাৎ নয়।

    [ ৩ ]

    ধর্মান্তরের (স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে) সঙ্গে-সঙ্গেই নব্য মুসলমানরা যে শাসকশ্রেণীর পুরােপুরি অংশ হয়ে যেতে পারতেন তা নয়। প্রকৃতপক্ষে উচ্চস্তরের মুসলমানের নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করতেন। বরনি একটি স্বরচিত ‘ফরমা’ মিথ্যা করে খলিফা মামুদের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। ফরমাটি খলিফার নামে চলতো বলে তা কেবল মুসলমানদের সম্বন্ধেই প্রযােজ্য ছিলো। এটি

    হ’লো—“সব ধরনের গুরুদের কঠোরভাবে আদেশ করা হচ্ছে যেন তাঁরা শুকর এবং ভল্লুকের গলায় সােনার শিকল না পরান বা কুকুরের গলায় জোর করে মণিমাণিক্য পুরে না দেন…অর্থাৎ, ক্ষুদ্র, সামান্য, দীনহীন ব্যক্তিদের, দোকানদার ও নিম্নজাত জনকে তাঁরা যেন প্রার্থনা, উপবাস ইত্যাদি ব্যাপারের নিয়ম ছাড়া অন্য কিছু না শেখান…”

    অন্যদিকে শাসকশ্রেণী গঠিত হয়েছিলাে মুসলমান ও হিন্দু, বা ‘ইক্তেদার’ (পরে যাদের ‘মনসবদার’ বলা হতাে) এবং জমিদার এই দুই পক্ষকে নিয়েই। প্রথমে ইক্তেদারদের সকলেই তুর্কি জাতীয় ছিলেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার উর্ধ্বভাগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তুর্কি নন এমন কোনাে ব্যক্তি ক্ষমতালাভ করতে পারতেন না। পরে অবশ্য ভারতীয় মুসলমান, এমন কি হিন্দুদের নামও উচ্চপদের তালিকায় পাওয়া যেত। মােগলদের সময়ে অবশ্যই রাজপুতরা এবং রাজা টোডরমল, বীরবল প্রমুখ আরাে কেউ কেউ রাজ্যের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী পদ অধিকার করেছেন। জমিদাররা প্রত্যেকেই প্রথম দিকে হিন্দু হিলেন, যদিও পরে কয়েকজন মুসলমান জমিদারদের নামও জানা যায়।

    বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন গােষ্ঠীর মধ্যে মধ্যে ক্রমাগত বিরােধ চলতাে। এবং কোনাে সংঘর্ষেরই নির্দিষ্ট কোনাে সীমানা (আঞ্চলিক, ধর্মীয় অথবা জাতিগত) ছিলােনা। মুসলমান ওমরাহগণ সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেন এবং নিজেদের মধ্যেও কলহ-বিবাদ করতেন। হিন্দুরাও ঠিক একই কাজ করতেন। এবং উভয় পক্ষই যেমন পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ করতেন তেমনি নিজেদের মধ্যেও কলহ করতেন এবং সবেরই মূলে ছিলাে রাজত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ দখল। এ সত্ত্বেও দুপক্ষেরই অনেক ব্যাপারে মিলও দেখা যেতাে। উভয়েই কৃষকের অতিরিক্ত উৎপন্ন দ্রব্যের ওপর নির্ধারিত খাজনার দ্বারা জীবন নির্বাহ করতেন এবং তাঁদের প্রভূত আয়কে ছাড়িয়ে যেতো ভােগবিলাসবহুল জীবনযাত্রা। ঋণভার ছিলাে মর্যাদার নির্দেশক—এই পরিমাণ যাঁর যত বেশি, তার সম্মানও সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পেতো। তাদের জীবনযাত্রা ওপরওয়ালাদের অনুকরণ করে চলতাে। চাক-শিল্পের যে তারা এতােটা পৃষ্ঠপােষকতা করতেন তা আসলে সেযুগের মূল্যবোধের একটি পক্ষে ফলবিশেষ ছাড়া কিছু নয়। পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করে তারা তাদের আশ্রয়ভুক্ত কবি বা সঙ্গীতদের সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা করতেন। এবং, সর্বোপরি তারা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ লােক সম্বন্ধে গভীর অবজ্ঞা পােষণ করতেন।

    এর আগে আমরা একটি প্রশ্ন তুলেছিলাম: তুর্কি আক্রমণের সময়ে, বা পরে মােগল আক্রমণের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে কোনাে প্রতিরোধ দেখা যায় নি কেন? গণ-প্রতিরোধের যা নিদর্শন পাই, তা সপ্তদশ শতাব্দীতে, যখন মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং আগ্রা—মথুরা অঞ্চলের কৃষকরা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।

    এর দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। প্রথমত তদানীন্তন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে তাদের রাজপুত এদের হয়ে লড়াই 

    মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি করার কোনাে উৎসাহ জনসাধারণ খুঁজে পেতেন না, বিশেষত যেখানে প্রভুরা আজকের দিনেও রাজস্থানের মােট লােকসংখ্যার শতকরা আট ভাগেরও বেশি নন। এমনিতেও সাধারণ লােকের কাছে তুর্কিরা মােটামুটি পরিচিত ছিলেন কারণ রাজপুতদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি সম্পর্ক ছিলো। কেননা রাজপুতের একসময়ে একই ভূখণ্ড থেকে এসেছিলেন এবং তুর্কিদের মতাে একই স্তরের সংস্কৃতির অন্ত ভুক্ত ছিলেন। তাছাড়া তুর্কিদের মধ্যে এমন ভয়াবহ কিছু ছিলােনা যা তারা আগেই রাজপুতদের মধ্যে দেখেননি। দ্বিতীয়ত তুর্কি তদানীন্তন রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামাের ওপর কোনােরকম আঘাত করেননি, কেবলমাত্র ওপরদিকে সামান্য, আংশিক পরিবর্তন করেছিলেন।

    কাজেই, যা কিন্তু বিয়ে তা শাসকশ্রেণীর মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। এই সংঘাত সাম্রাজ্যের শাসকশ্রেণীর অন্তর্বিরোধও হতে পারতো যেমন হিন্দু ও মুসলমান জায়গিয়াদের অসংখ্য বিদ্রোহ; আয় দুটি শাসকগােষ্ঠীর মধ্যে বিরোধও হতে পারতাে, যেমন দেখা গিয়েছিলাে রাণা প্রতাপের ব্যর্থ বীরত্বপ্রকাশে। প্রকৃতপক্ষে প্রতাপ সমগ্র ভারতবর্ষ তাে নয়ই, এমন কি সমগ্র রাজপুতানার সঙ্গেও লড়াই করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছিলেন শুধু তাঁর নিজ রাজ্যাংশটুকুর জন্যে।

    একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার আমাদের লক্ষ্য করা উচিত, সপ্তদশ শতকে যখন মারাঠা, শিখ ও জাঠ অভ্যুত্থান দেখা দিলে এবং মােগল রাষ্ট্রের সঙ্গে মারাঠী ও শিখদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ বাধলাে, তখনো কিন্তু সামাজিক জীবনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। এমন কি, ঔরংজেবের সর্বাধিক স্বৈরাচারের পর্বেও হয়নি। অথচ যদিও আমাদের রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা সরকারিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, তবুও আমাদের জীবনকালেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এত ঘন ঘন হয়েছে যে আমরা কেউ কেউ হয়তাে সেগুলির অমানুষিকতা ও অন্ধ গোঁড়ামি সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়েছি। মারাঠা, শিখ ও জাঠ অভ্যুত্থানের প্রকৃত কারণ ছিলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয় এবং যদিও বিবাদমান দলগুলি মুখে অন্যরকম প্রচার করতেন, তবুও বিরােধ সেইসব স্তরেই আবদ্ধ থাকতো।

    এ প্রসঙ্গ শেষ করার আগে আর একটি কথা বাকি থেকে যায়; রাজপুতরা যদিও তুর্কিদের ঢের আগে ভারতে আসেন, তাঁরা কিন্তু এযাবৎ তাঁদের স্বতন্ত্র সত্তা বরাবর বাঁচিয়ে এসেছেন এবং আজ অবধি তা পরিহার করার কোন লক্ষণও দেখা যায়না। চৌহান, পরিহার, শােলাঙ্কি— অদ্যাবধি আমাদের পরিচিতমহলে এ নামগুলি শােনা যায়। কিন্তু যেসব বিরাট রাজবংশ এককালে ভারতবর্ষ শাসন করেছেন তাঁদের বংশধররা আজ কোথায়? সেই দাশবংশ, খলজীবংশ, তুঘলক বংশ, লােদীবংশ, এমনকি সেই মােগলরা যাদের কেন্দ্র করে মাত্র একশাে বছর আগেও বিরাট বিদ্রোহ ঘােষিত হয়েছিলাে, তারা কোথায় গেলেন? দেখা যাচ্ছে এই ভারতীয় জীবনের মূল ধারণাটির সঙ্গে একেবারে মিশে গেছেন এবং নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দিয়ে এই জীবন প্রবাহকে তারা যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন আর কোনাে কিছুতেই তা হয়নি।

    পাদটীকা:

    ১. এমন কি যাঁরা রীতিমত সচেতনভাবে ধর্মনিরপেক্ষ তায়াও প্রায়ই এই দুই

    করে থাকেন।

    ২.  “জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক বলতে তাঁদের বােঝানাে হয়েছে, যারা মনে করেন ভারতে মধ্যযুগের ইতিহাস হলো সাম্প্রদায়িক ঐক্যের যুগ, নিরবচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক বিরোধের চিত্র নয়।

  • বিপন চন্দ্র ।। আধুনিক ভারতের ঐতিহাসিক ও সাম্প্রদায়িকতা

    বিপন চন্দ্র ।। আধুনিক ভারতের ঐতিহাসিক ও সাম্প্রদায়িকতা

    অনুবাদ: তনিকা সরকার

    [এই রচনাটি ১৯৬৮ সালে আকাশবাণী আয়োজিত ‘বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিততে রেডিও-প্রচারকের ভূমিকা’ শিরোনামের আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সভার পঠিত রচনাগুলির সংকলন যা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদ’-এর বাংলা ইউনিটের তত্ত্বাবধানে সংকলনটির বাংলা অনুবাদ করেন তনিকা সরকার। লেখাটি অনলাইন পাঠকদের জন্য অরাজে পুনঃপ্রকাশিত হলো। লেখাটি নেয়া হয়েছে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বইটির তৃতীয় মুদ্রণ (১৯৯৩) থেকে। মূল গ্রন্থের বানান ও ভাষারীতির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।- সম্পাদক]

    বিপন চন্দ্র

    প্রথমেই বলে নেওয়া ভালাে যে আধুনিক ভারতে সাম্প্রদায়িকতা কী কারণে আবির্ভূত এবং বর্ষিত হয়েছিল সে প্রসঙ্গ এই রচনার মূল উপজীব্য নয়। এখানে প্রধানত আলােচনার বিষয় হলো ভারতবর্ষে ইতিহাস-রচনা এবং শিক্ষণের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা-বিস্তারের যােগ। সেইসঙ্গে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা কেন সাম্প্রদায়িকতার অনুকূলে থেকেছেন সে সম্বন্ধেও কিছু আলােকপাতের চেষ্টা করা হবে। আজকের দিনে এ কথাটা অনেকেই মানবেন যে গত একশাে বছর সাম্প্রদায়িকতা প্রসারের জন্যে ভারতে ইতিহাসশিক্ষা অনেকটাই দায়ী। প্রকৃতপক্ষে, একটুও অত্যুক্তি না করেই বলা চলে যে ঐতিহাসিকদের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিই বরাবর ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক মতবাদকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিলে সাম্প্রদায়িক মতবাদের আর বিশেষ কিছুই বাকি থাকে না।

    [১] 

    প্রথমেই দেখা যায় যে জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা, উভয়েই একই ধরনের একটি আধুনিক প্রক্রিয়ার ফল। এই প্রক্রিয়া হলো সমস্ত দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ঐক্য। এর ফলে আনুগত্য এবং অন্যান্য যােগসূত্রগুলি আরো ব্যাপক করবার প্রয়ােজন দেখা দিলো। রাজনীতিক জীবনের ভিত্তিরূপ দরকার হলো নতুন ঐক্য নীতির। কাজে কাজেই, দুটি মতবাদই মূলত আঠারো শতকের পরবর্তী আধুনিক লক্ষণ। দুই দলই অতীতকে সাক্ষ্য মানার চেষ্টা করেন, অতীতের মতবাদ, আন্দোলন ও ইতিহাসের সঙ্গে যােগাযােগ স্থাপনের চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অতীতেও এই দুটি মতবাদের অস্তিত্ব ছিলাে। বস্তুত ডাঃ রমিলা থাপার এবং শ্রীহরবংশ মুখিয়া তাঁদের আলােচনায় দেখিয়েছেন যে ভারতে ইতিহাসের প্রাচীন এবং মধ্যযুগে সাম্প্রদায়িক চেতনার অস্তিত্ব ছিলাে না।

    জাতীয়তাবাদও সেইরকমই একটি সম্পূর্ণ নতুন সাংগঠনিক নীতি ও মতবাদ। প্রথমদিকের জাতীয়তাবাদী নেতারা, যেমন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, লােকমান্য তিলক একথা মানতেন এবং ভারতবর্ষকে তারা মনে করতেন এমন একটি জাতি, যা সবে গড়ে উঠছে। মতবাদ হিসেবে জাতীয়তাবাদ সার্থকতা পেলো এই কারণে যে তা প্রকৃত সত্যের যথার্থ প্রতিফলন ভারতীয় জনসাধারণের সমগ্র স্বার্থ বিশেষ করে একটি শত্রুর (বিদেশী সাম্রাজ্যবাদ) বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যই ক্রমশঃ এক হয়ে মিশে যাচ্ছিল। এমন কয়েকটি বিশেষ বিশেষ স্থানে ও স্তরে আবির্ভূত হলো, যেখানে এই নতুন জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে উঠতে পারেনি। অন্যভাবে বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদ গভীরে প্রবেশ করতে পারলাে না বলেই সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হলাে। 

    এই পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে ব্যাপকতর যােগাযােগ ও ঐক্যের প্রয়ােজন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছিলাে। কিন্তু সেখানে যখন নতুন সংগঠননীতিটি (অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ) বিশেষ গভীরে পৌঁছাতে পারলাে না, তখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমন কি নতুন গড়ে ওঠা রাজনীতিক জীবনেও পূর্বপ্রচলিত স্তরভেদ ও বিভেদনীতিকে আহ্বান জানানাে অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ালাে। অর্থাৎ এভাবে বলা যায় যে, যেখানে একাত্ম-চেতনার প্রয়ােজন ছিল অথচ নতুন জাতীয়তাবাদী ঐক্য গড়ে ওঠেনি সেখানে যখন ঐক্যের সন্ধান করা হলাে, তখন দরকার হল আরো পুরােনাে, অধিকতর পরিচিত একতাবোধের—এই নতুন পরিস্থিতিতে সেগুলি যতােই অনুপযুক্ত হােক না কেন। ধর্মীয় একাত্মতাবােধ শুধু নয়, বর্ণগত, উপজাতিগত, ভাষাগত এবং আঞ্চলিক ঐক্যবােধ—সবই একই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করলাে। যেমন, মহারাষ্ট্রে যদিও এখানকার মতাে আগেও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা যথেষ্ট প্রবল ছিলাে, তবুও তার নেতাদের সব উদ্দেশ্য বানচাল হয়ে গেলাে ব্রাহ্মণবিরােধী আন্দোলনের জন্যে। মাদ্রাজেও অনুরূপ ঘটনা ঘটলাে। দক্ষিণ পাঞ্জাবে (আজকের হরিয়ানায়) জাঠদের বর্ণাশ্রয়ী আন্দোলনের ফলে হিন্দু সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হলেন।

    সুতরাং সাম্প্রদায়িকতাকে অতীতের অবশেষ অথবা সনাতন মতবাদের পুনরুত্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাম্প্রদায়িকতার মূলে বরাবরই থেকেছে, গত একশো বছরের ইতিহাসের ধারা সম্বন্ধে একটি মিথ্যা চেতনা। পরে আমরা দেখবাে যে, সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাপে ঐতিহাসিকরা এটিকে অতীতের অমৃত ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

    [২]

    সমসাময়িক রাজনীতি এবং আধুনিক ভারত ইতিহাস রচনা এই দুই ক্ষেত্রেই সাম্প্রদায়িকতার ফলে একটি বিশেষ ধারণা স্বীকৃতি পেয়েছিলাে। তা হলাে, ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় গােষ্ঠী ছিলাে, এবং এত্যেকটি গােষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ এক ছিলাে। তারা এই সবকটি ক্ষেত্রে একক সত্তা হিসেবে কাজ করতে পারতাে। হিন্দুদের বা মুসলমানদের ‘কথা’ বা ‘চিন্তা’ সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা এমনভাবে উল্লেখ করতেন যাতে মনে হতাে যেন এরা প্রত্যেকেই এক একটি স্বতন্ত্র সত্তা। এমন কি, কখনাে কখনাে তাঁয়া ‘হিন্দু নেতা’ বা ‘মুসলমান নেতাদের’ সম্বন্ধেও লিখতেন। এইভাবে দ্বি-জাতিতত্ত্বকে তাঁরা (কেউ কেউ আবার শিখদের এবং অন্যান্যদের টেনে এনে এই তত্ত্বের সম্প্রসারণ কয়েছেন) মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ভারতের ইতিহাসে টেনে এনেছেন এবং ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অবতারণা করেছেন।

    সাম্প্রদায়িক মনােভাবাপন্ন ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, হিন্দু ও মুসলমান কখনােই গ্রামে অথবা আঞ্চলিক, স্থানীয় বা অন্য কোনাে স্তরে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি অখণ্ড গােষ্ঠী গড়ে তুলতে পারেননি। কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমানদেরও যে ধর্মের ও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে আলাদা করে কোনাে স্বতন্ত্র ঐক্যবদ্ধ সত্তা গড়ে ওঠেনি, একথাও তারা অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ, তারা একথা মানেন যে অতীতে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ে মিলে একটি জাতির সৃষ্টি করতে পারেননি; কিন্তু তারা অস্বীকার করেন যে আলাদা করে হিন্দু জাতি বা মুসলমান জাতি বলেও কিছু ছিলােনা।

    আশ্চর্যের বিষয় হলো যে সব ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও আমলাবর্গ ইতিহাসচর্চায় ‘হিন্দু-মুসলমান তত্ত্বটির গােড়াপত্তন ও লালন করেছেন, তাঁরাই আবার বর্ণ এবং জাতিকে (বাঙালী জাতি, পাঞ্জাবী জাতি, মারাঠা জাতি) ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির মূলনীতি হিসেবে দেখিয়েছে। ঠিক যেভাবে তাঁরা দিল্লীর সুলতানদের আমল অথবা মােগল সাম্রাজ্যে মুসলমান আধিপত্যের কথা বর্ণনা করেছেন ঠিক সেইভাবেই তাঁর অষ্টাদশ শতকে মারাঠী সাম্রাজ্যের ওপর ব্রাহ্মণ আধিপত্যের কথা লিখেছেন। তারা যেমন মুসলমান শাসন, মুসলমানদের কার্যকলাপ এবং মুসলমান দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন, ব্রাহ্মণদের বিষয়েও ঠিক তেমনিভাবেই তারা একই কথা বলেছেন। কিন্তু ভারতীয় ঐতিহাসিক শেষােক্ত দৃষ্টিকোণটি গ্রহণ করেননি। এইভাবে আমরা দেখতে পাই সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক ধারণা কীভাবে ভারতীয় ইতিহাস রচনাকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন, জি, এস, সারদেশাই লিখেছেন, “যদিও বলা হয় যে মাধব রাও ও নারায়ণ রাও’র শাসনকালে দেশস্থ এবং কোঙ্কণস্থ (ব্রাহ্মণগণ) পরস্পরের সঙ্গে ঘাের বিবাদে লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু তা একেবারেই ঠিক নয়। আমি দেখাতে পারি যে উভয় জাতেরই কিছু কিছু লোক অন্য পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছেন (মেন্ কারেন্ট স্, পৃ. ১৮২)।” অথচ সারদেশাই একই যুক্তি অনুসারে হিন্দু ও মুসলমানদের পরস্পর বিরােধিতার তত্ত্ব খণ্ডন করতে অস্বীকার করবেন। অর্থাৎ, ভারতীয় সমাজকে যদিও বিশেষভাবে ধর্মের ক্ষেত্রে বিভক্ত, এমন কি বিখণ্ডিত বলে মনে করা হয়েছে, হিন্দু সমাজকে কিন্তু একটি অখণ্ড সত্তা বলে দেখা হয়েছে। এই মনােভাব ঐতিহাসিক সত্যের প্রতিফলন নয়, এ হলো সারদেশাই প্রমুখ ঐতিহাসিকদের সীমিত জাতীয় সংহতিবােধ।

    সাম্প্রদায়িকতাবাদী লেখকরা অবশ্য ধর্ম ছাড়া আর কোনাে সাংগঠনিক নীতি স্বীকার করেন নি। কিন্তু এই মনােভাবের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে অন্যরাও তাদের অনুসরণ করছেন, কেবল ধর্মের জায়গায় তারা বর্ণ ইত্যাদিকে স্থান দিয়েছেন। বস্তুত আজকের দিনে অনেক পাশ্চাত্য লেখক মনে করেন যে বর্ণ ও ভাষার ওপর ঝোঁক দেবার প্রবণতা আরাে জোরদার করা উচিত। যেমন তাঁরা দাবি করেন যে ভারতে জাতীয় আন্দোলনের উন্মেষের কারণ সাম্রাজ্যবিরােধী, জাতীয়তাবাদী চেতনা নয়, অথবা সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় ঐক্যবদ্ধতাও নয়, তা হলাে বর্ণগত ও ভাষাগত আনুগত্য ও সংহতির চাপ। বর্ণবাদী ও ভাষাবাদী এবং অন্যধরনের সাম্প্রদায়িকতাবাদী (যেমন শিখ সাম্প্রদায়িকতা) বহু ভারতীয়ও একই কথা বলছেন।

    [৩] 

    ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে কতকগুলি কারণ ছাড়া সাম্প্রদায়িকতা আধুনিক ভারতীয় চেতনার অত গভীরে অনুপ্রবেশ করতে পারতো না। এবিষয়ে আলােচনার আগে আমি যে ব্যাপারে জোর দিয়ে বলতে চাই, তা হলাে যে, যতক্ষণ না আমরা বুঝতে পারছি চেতনার কতটা গভীরে এই মনােভাব অনুপ্রবেশ করেছে, ততক্ষণ এই বিষয়টিও আমরা পুরােপুরি ধরতে পারব না। আমার এক ছাত্র সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে আলােচনার পর একবার বলেছিলো যে প্রত্যেকবার আলােচনার পর সে মনে করে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব থেকে সে একেবারে মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু পরবর্তী আলােচনা শুরু হলে আবার সে বুঝতে পারে যে এখনাে তার মনে যথেষ্ট ছাপ রয়ে গেছে। আসলে, আমরা যারা নিজেদের ‘পাকা জাতীয়তাবাদী বলে মনে করে থাকি, এমন কি আমাদের মধ্যে যারা সক্রিয়ভাবে জাতীয় সংহতি গড়ে তােলার চেষ্টা করেন, তাঁদের অনেককেই গূঢ় অথচ গভীরভাবে সাম্প্রদায়িকতা প্রভাবিত করেছে। এটা প্রধানত ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির ফল, যে চিন্তাধারায় আমরা প্রায় প্রত্যেকেই শৈশব থেকেই বর্ধিত হয়েছি।

    শিল্পী: মীরা ভার্মা

    আগেই বলা হয়েছে যে জাতীয়তাবাদী মতবাদ বিশেষ গভীরে সঞ্চারিত হতে পারেনি বলে সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব অটুট থেকে গেছে। যেখানে বিজ্ঞানসম্মত জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়ে গেছে, যেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের আবেদন লােকের ওপর রেখাপাত করবেনা। সাম্প্রতিক চেতনা ওপর এই ধরনের আবেদন ব্যর্থ হয়, অথচ প্রাত্যহিক জীবনে ধর্ম এতে প্রভাবশালী বলে লােকে সাম্প্রদায়িকতাকে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করে। গােড়ার দিকের জাতীয়তাবাদী নেতারা এ ব্যাপারটি খুব ভালাে করে বুঝতেন। তাই তাঁরা শুধু জাতীয়তাবাদের কথাই প্রচার করতেন না, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে গড়ে তােনার ও তার সম্প্রসারণের চেষ্টা করতেন। অন্যদিকে জওহরলাল প্রমুখ উনিশশাে কুড়ি ও তিরিশের নেতারা ভুল করে বলেন যে পাশ্চাত্য সমাজের মতাে এখানেও জাতীয়তাবাদ সমাজের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে গেছে, কাজেই তাদের কর্তব্য হলাে তাকে লড়াইয়ের স্তরে উপনীত করা। তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুতে তাঁদের আন্দোলনের রূপ ছিলাে প্রধানত জনসাধারণকে বলা যে সাম্প্রদায়িকতা হলো জাতীয়তাবিরােধী। কিন্তু যেসব লােক আছে। জাতীয়তাবাদী নন, তাঁদের মধ্যে একথা একেবারেই সাড়া জাগলাে না। উনিশশাে সাতচল্লিশের পরও এ ভুলটি রয়ে গেলাে। আমাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলি, আমাদের গণসংযােগের মাধ্যমগুলি যথা সংবাদ পত্র ও আকাশবাণী এবং রাজনৈতিক দলগুলি জনসাধারণের মধ্যে জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ধারণা ও চেতনা প্রচারিত করার কোনাে চেষ্টা করেননি। জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদের প্রতি তাদের মৌখিক আবেদন বহু ব্যক্তির উপরে কোনাে রেখাপাত করেনি। অন্যদিকে তাদের নিজেদের জাতীয়তাবাদও খুব স্পষ্ট নয় বলে তাদের এই আবেদনের ফলে অনেক সময় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আরাে বেশি শক্তিলাভ করেছে।

    [৪]

    জনগণকে আধুনিক জাতীয়তাবাদের নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বটি খুব দুরূহ মনে হওয়ায়—বিশেষত এক্ষেত্রে যখন সাধারণ মানুষকে তাদের জীবন ও স্বার্থের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরােধী আন্দোলনের যােগটি বুঝিয়ে বলতে হতাে—অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা একটি সহজ পন্থা অবলম্বন করলেন। তারা পুরনাে চেতনা, অর্থাৎ ধর্ম-চেতনার প্রতি আবেদন জানালেন। একথা সত্যি যে তাদের উদ্দেশ্য ছিলাে সম্পূর্ণই আধুনিক এবং মহৎ। কিন্তু এভাবে তাঁরা যে শুধু জনগণের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দুর্বল করে দিলেন তা নয়, তাঁদের নিজেদের চিন্তা এবং লেখাও সাম্প্রদায়িকতা দোষদুষ্ট হয়ে উঠলাে। লােকমান্য তিলক, প্রথম দিকের সন্ত্রাসবাদীগণ, অরবিন্দ ঘােষ এবং অংশত গান্ধী (যেমন ‘রামরাজ্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক এবং খিলাফৎ সম্বন্ধে তাঁর নীতি )—এরা সকলেই এর উদাহরণ। এর ফলে অন্যভাবেও জাতীয় সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত হলাে। যে জাতীয় আন্দোলনের ভিত্তি হলাে হিন্দু শাস্ত্র তার ধর্মীয় চিত্রকল্প এবং আচারপ্রথা, তা মুসলমানদের কেমন করে অনুপ্রাণিত করবে? নিম্নবর্ণের নিপীড়িত (হিন্দু) জনগণের তখনও যথেষ্ট আত্মােপলব্ধি হয়নি, অন্যথা তারাও উচ্চবর্ণের মানসিকতার এই সব প্রতীক ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। দক্ষিণ ভারতে এরকম অভ্যুত্থান প্রায় ঘটতে চলেছিলাে।

    ভারতীয় জাতীয় চরিত্রের নিন্দা করার উদ্দেশ্যে এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র লাভ করার ব্যাপারে ভারত কতটা অনুপযুক্ত তা প্রমাণ করার জন্যে ব্রিটিশরা ভারতীয় ইতিহাসকে ব্যবহার করতেন। এর ফলে ভারতীয়দের ইতিহাস রচনা ও রাজনীতিতে আরেক রকমের বিকৃতি দেখা দিলাে। এই বিজ্ঞানবিরােধী ও অনৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিরােধে ভারতীয়রাও সমান অনৈতিহাসিক এক দৃষ্টিভঙ্গি খাড়া করলেন। তারা অতীতের মাহাত্ম্য কীর্তন শুরু করলেন। এখানে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক যাথার্থ্য বিচারের সুযােগ নেই। স্পষ্টতই এর উৎস ছিলাে জাতীয় আত্মচেতনা এবং গর্ববােধ। কিন্তু জাতীয়তাবাদের দিক থেকে যা দুর্ভাগ্যজনক হয়ে দাঁড়ালাে তা হলো মাহাত্ম্যকীর্তনের জন্য যে-অতীতকে বাছা হলে তা প্রাচীন যুগ। অংশত এর কারণ হচ্ছে মােগল-শাসনের স্মৃতি তখনাে লােকের মনে বেশ স্পষ্ট ছিলাে, তাই এই পর্বের গৌরবসাধন করা ঠিক সম্ভব ছিলােনা। অন্যদিকে প্রাচীন যুগ ছিলাে দূর অতীত এবং সে-যুগ সম্বন্ধে একমাত্র সরকারী বা প্রায়-সরকারী নথিপত্র থেকে জানা যায়। মােগলযুগের স্মৃতি সম্বন্ধে যা বলেছি তা মারাঠা সাম্রাজ্য বা রণজিৎ সিংহের শাসন সম্বন্ধেও খাটে, সুতরাং সাম্প্রদায়িকতার পূর্ণ বিকাশের আগে তাদের শাসনের গৌরবগাথাও রচিত হতে পারেনি। এইভাবে ধীরে ধীরে কিছু কিছু উপকথা তৈরি হলাে যার প্রত্যেকটি সুস্থ, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করে তুললো, এগুলি সাম্প্রদায়িকতার শক্তিবৃদ্ধি যদি না-ও করে থাকে এর প্রসারণের সুযােগ করে দিলো। বেশ কিছু গোঁড়া জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি এসবে বিশ্বাস করতেন এবং এগুলির প্রচার করতেন বলে এ-ধরনের উপকথার সর্বনাশী শক্তি এবং ক্ষমতা সীমাহীনভাবে বেড়ে গিয়েছিলো।

    উপকথা গুলির মধ্যে প্রথম হলাে ভারতীয় সমাজ ও সভ্যতা সম্বন্ধে এই বিশ্বাস যে প্রাচীন ভারতে সংস্কৃতির সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো, তখন ছিলো ভারতের স্বর্ণযুগ। তারপর মধ্যযুগে ক্রমশ তার অবনতি ঘটতে লাগলো, এবং মধ্যযুগ অভিহিত করা হলাে। অধঃপতন ও পরাধীনতার যুগ বলে। পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনের ফলে অবস্থার খানিকটা উন্নতি হলো বটে, কিন্তু অতীত গৌরব ও সভ্যতার পুনরুদ্ধারের গুরু দায়িত্ব এখনাে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আবার বলছি, ভেবে দেখা উচিত যে কয়জন হিন্দু আছেন যারা এই ধারণার মূল প্রতিপাদ্যে বিশ্বাস করেননা। এর থেকে অতি সহজেই পরের ধাপে চলে আসা যায়, অর্থাৎ অবনতির জন্যে ইসলাম বা ‘মুসলমান শাসন এবং বিজাতীয় পাশ্চাত্যকে দায়ী করা। স্বভাবতই মুসলমানরাও এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে আরবযুগের কীর্তিকে ‘স্বর্ণযুগ’ বলে মনে করতে লাগলেন, কারণ তাদের পক্ষে নিজেদের ধর্মকে ভারতীয় সভ্যতার ‘অবনতির কারণ হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলােনা। বলাই বাহুল্য যে সাম্প্রদায়িকতাকে উৎপাটিত করতে হলে আমাদের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলসমূহ ও গণ সংযােগের মাধ্যম—প্রত্যেককেই এই অযৌক্তিক ও অনৈতিহাসিক মতের প্রচার বন্ধ করতে হবে। বরং তাদের তুলে ধরতে হবে যুগে যুগে ও বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের রূপটি। এরই মধ্যে মাদ্রাজের ডি. এম. কে আন্দোলন এটি অস্বীকার করছে। যখনই নিম্নবর্ণের লােকেরা সবাক্ এবং আত্মসচেতন হয়ে উঠবেন, তখনই তাঁর স্বর্ণযুগের এই প্রতিরূপটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। কারণ এর মূলে আছে বর্ণাশ্রমধর্ম ও উচ্চবর্ণের আধিপত্য। উপজাতিরাও এ ধারণাটি পছন্দ করতে পারেননা।

    দ্বিতীয় উপকথাটির উৎপত্তির মূলে ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগকে অদ্বিতীয় বলে প্রমাণ করার প্রয়ােজন। বস্তুগত সত্যকার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই একথা খাটতে পারে না, যদিও কোনাে উন্মাদ বলে থাকে প্রাচীন ভারতে বিমান ও পারমাণবিক বােমা সবই ছিলো। সুতরাং এই উপকথা তৈরি করা হলো যে ভারতীয় সভ্যতা ছিলাে আধ্যাত্মিক এবং বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার চেয়ে উন্নততর। কাজেই অরবিন্দ ঘােষ বললেন পশ্চিমে যেখানে যুক্তি, বিজ্ঞান ও নির্মাণকৌশলের উৎকর্ষ ঘটেছে, সেখানে ভারতে পরিবর্ষিত হয়েছে আত্মিক শক্তি, যা মানুষের অন্য সব শক্তির উর্ধ্বে কার্যকরী হতে পারে, আত্মলব্ধ প্রজ্ঞা, দর্শনসম্মত ধর্মজীবনের সামঞ্জস্যবােধ, অনাদি ও অনন্তের অনুভব।” এমনকি, ভারতবর্ষের বর্ণভেদ প্রথাও নাকি পশ্চিমের শ্রেণীভেদের চেয়ে শ্রেয়, কারণ শ্রেণীভেদ কেবল মাত্র বস্তুভিত্তিক, কিন্তু ভারতীয় বর্ণভেদের মূলে আছে আধ্যাত্মিক ও নৈতিকভিত্তি। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে প্রায় একই সময়ে চীনের কনফুসীয় মতাবলম্বী ম্যাণ্ডারিন বা অভিজাতশ্রেণীও একই জিগির তুলেছিলেন কারণ তারাও বিশ্বাস করতেন যে কনফুলীয় চীনের সভ্যতা আধুনিক পাশ্চাত্য ইউরােপীয় সভ্যতার চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলাে। সুতরাং তারাও বলতেন “চৈনিক শিক্ষা থাকবে মূলনীতি হিসেবে এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা থাকবে বাস্তবে প্রয়ােগের জন্য।” ভারত এবং চীন, জায়গাতেই পশ্চিমী লেখক এবং শাসকগণ এই মতবাদকে উৎসাহ দিতেন কারণ তারা চাইতেন যে এই দুইদেশের মানুষ যেন শাসন ও অর্থনীতির বস্তুভিত্তিক কাজের দায়িত্বটা তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা আধ্যাত্মিক কার্যকলাপে নিমগ্ন থাকুন।

    তৃতীয় উপকথাটি আর্যত্ব প্রসঙ্গে। “টিউটন’ ও ‘অ্যাংলাে স্য্যাকসন’ উপকথার অনুকরণে সাদা চামড়ার মানুষের বর্ণ বৈষম্যনীতির প্রতিক্রিয়ায় এটি রচিত হয়েছিলো। এই উপকথা অনুযায়ী ভারতীয় ‘আর্যজাতি’ ভুক্ত এবং খাটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও সমাজ হলাে বৈদিকযুগেয় আর্য সমাজ ও সংস্কৃতি।

    এই তিনটি উপকথাই পশ্চাদমুখী মনােভাবের বলবৃদ্ধি কতো এবং প্রগতি ও ভবিষ্যতে বিশ্বাসকে খর্ব করে সুস্থ জাতীয়তাবাদের পরিপন্থী হয়ে দাড়ালাে। উদাহরণস্বরূপ, এই মনােভাব লােককে সাহসের সঙ্গে নিজের সমাজের ঐতিহাসিক দুর্বলতা মেনে নিয়ে বর্তমানে ও ভবিষ্যতে তার প্রতিকারে সচেষ্ট হতে দেখায়নি। বরং, অতীতের গৌরব স্মরণ করেই দিন কাটাতে উৎসাহ দিয়েছে। এছাড়া এইসব উপকথা থেকে এই বিশ্বাস গড়ে উঠলো এবং প্রতিফলিত হলাে যে ভারতীয় ইতিহাসের ধারা সমস্ত বিশ্ব ইতিহাসের অচ্ছেদ্য অংশ নয় তা হ’ল সম্পূর্ণ একটি ব্যতিক্রম।

    আগেই বলেছি, এইসব উপকথা স্বভাবতই বেশির ভাগ ভারতীয়ের কাছে গ্রহণযােগ্য নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মতবাদগুলি খাঁটি ভারতীয়ত্ব প্রসঙ্গে হলেও আসলে প্রত্যেকটি ধারণাই পশ্চিম থেকে নেওয়া। স্বর্ণযুগের ধারণাটি, এবং জনগণকে অতীতের গৌরবে উদ্বুদ্ধ করা—এসবই পাশ্চাত্য জাতীয় আন্দোলন থেকে সচেতনভাবে ধার করা হয়েছে। ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের ধারণাটি প্রথমে ইংরেজরা প্রচার করেছিলেন ভারতীয়দের বােঝাবার জন্যে যে তারা বাস্তব, দৈনন্দিন দায়িত্ব বহন করতে অক্ষম। আর্য’ উপকথাটির মূল কোথায়, তা আর গােপন নেই। কিন্তু ইটালি, গ্রীস বা পােল্যাণ্ডে এর ফলে ততােটা ক্ষতি হয়নি, কারণ সেখানে ভারতের মতাে সমাজে এতো বিবিধ ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতি নেই। কাজেই এখানে জাতীয়তাবাদে ও দেশের কাজে আত্মত্যাগে সকলকে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে এগুলির বিশেষ মূল্য তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে গেলো—অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় পর্যায়ের জাতীয়তাবাদী নেতাদের জীবনকালেই তা নিঃশেষিত হলো। কিন্তু তার দীর্ঘ মাশুল আজও গুণতে হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে ইতিহাসের অপব্যবহার সংশােধন করার জন্যে আন্তরিক চেষ্টা করতে গেলে আমাদের এইসব উপকথাগুলিকেও ধ্বংস করতে হবে।

    [৫] 

    এই প্রবন্ধে আমার প্রধান বক্তব্য হলাে যে একধরনের ভারতীয়দের মধ্যে, বিশেষত ঐতিহাসিকদের মধ্যে, সাম্প্রদায়িকতা প্রসারের কাৰণ হচ্ছে এই মতবাদগুলির সাহায্যে ‘পয়ােক্ষ’ ভাবে অথবা খিড়কি দুয়ার দিয়ে জাতীয়তাবাদ প্রচার করা যেতো। সাম্প্রদায়িক মতবাদী লােকেরা সাম্রাজ্যবাদ, অর্থাৎ ভারতীয় জনগণকে যে বিদেশী শক্তি শাসন ও শােষণ করছে, তার বিরুদ্ধে না গিয়েও নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে মনে করতে পেরেছেন। অর্থাৎ, এর ফলে ব্যক্তিগতভাবে কোনাে বিপদের ঝুঁকি না নিয়েও তারা জাতীয়তাবাদী মনােভাব পােষণ করতে পেরেছেন। এই ব্যাপারটি আরেকটু বিস্তারিতভাবে বলা দরকার।

    বেশির ভাগ আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকই জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে বিশেষ সােজাসুজি, স্পষ্ট, প্রত্যক্ষ আগ্রহ দেখাননি এবং সেরকম আগ্রহ থাকলে যে ধরনের প্রসঙ্গ উঠতে পারতাে তার কোনো আলােচনাও করেননি। ভারতের মানুষ যেসব প্রকাণ্ড সমস্যার ভারে জর্জরিত, তার কোনো কিছুই তাঁদের কাজে-অর্থাৎ তাদের গবেষণার বিষয়-নির্বাচনে অথবা গবেষণার ধরনে প্রতিফলিত হয়নি। দেশের পক্ষে অথবা ঐতিহাসিকদের পক্ষে তখনকার সংগ্রামী জাতীয় আন্দোলনকে সবচেয়ে প্রধান ও কেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে তাঁরা দেখেননি। প্রকৃতপক্ষে, আমার মনে হয় যে তারা যদি এব্যাপারের আদৌ কোনো গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তা জাতীয় আন্দোলনকে নয়, তা হলে সরকার প্রদত্ত সাংবিধানিক পরিবর্তনকে, এবং ব্রিটেনের অভিভাবকত্বকে যার ফলে ব্রিটিশ শাসন ধীরে ধীরে ‘সহৃদয় একাধিপত্ব’ থেকে ‘সহৃদয় গণতন্ত্রে পরিণত হবে। সুতরাং অধিকাংশ আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকই জাতীয় অনুভূতি সম্বন্ধে খুব বেশি সজাগ ছিলেন এবং তাকে বিশেষ স্বীকারও করতেন না।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এর ফলে তাঁরা উভয় সঙ্কটে পড়ে গেলেন। ১৮৭০ সন থেকে, বিশেষত ১৯০৫ থেকে ভারতবর্ষে শাসকের সঙ্গে শাসিতের, বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ‘উদীয়মান জাতীয় আন্দোলনের মৌলিক রাজনৈতিক সংগ্রাম চলছিলাে। এই তীব্র, সজীব বিরােধের যুগেও অধিকাংশ ভারতীয় ঐতিহাসিক শাসিতের পক্ষে সক্রিয়ভাবে যােগ দিতে পারলেন না, কারণ তারা প্রায় সকলেই সরকারী অথবা সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। অথচ নিতান্ত বশংবদ ছাড়া অন্যদের পক্ষে শাসকদের পক্ষে থাকাও শক্ত হয়ে দাঁড়ালাে। তাছাড়া তারাও জাতীয় আন্দোলনের সময়কার মানুষ, তাই তাদের নিজস্ব জাতীয় অনুভূতি প্রকাশের পথ খুঁজতে লাগল।

    এই উভয়সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রধান উপায় হলাে পরােক্ষ বা ‘খিড়কি দুয়ারি’ অথবা ‘মিথ্যা’ যা জাতীয়তাবাদ আঞ্চলিকতা অথবা সাম্প্রদায়িকতার রূপ নিলো; এর ফলে এদের জাতীয় অনুভূতিও পরিতৃপ্ত হলো, অথচ সরকারকেও চটাতে হলো, কেননা সরকার যখন তারতীয় সমাজের ক্ষেত্রে সবরকমের বিভেদনীতিকেই প্রশ্রয় দিতেন। সুতরাং বাস্তবজীবনে জাতীয়তাবাদী হওয়ার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরােধিতা করার অক্ষমতার দরুন যাকে ‘বিভ্রমসৃষ্টিকারী জাতীয়তাবাদ’ বলা যায় এমন এক আশ্চর্য প্রবণতা দেখা দিলাে। অবস্থাটা এমনই দাঁড়ালো যে জাতীয় আন্দোলনের চরম পর্বেও যারা ব্রিটিশের দেওয়া খেতাবের জন্যে ব্যাকুল ছিলেন, এমন কি খেতাব পেয়েও যেতেন, তারাই আবার রাজপুত বা শিখ বা মারাঠা দলনায়কদের কথা লিখতে গিয়ে প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠতেন। এইসঙ্গে বলে নেওয়া যায় যে, ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী সাম্প্রদায়িক দল ও ব্যক্তি সম্বন্ধেও একথা প্রযােজ্য। সক্রিয়ভাবে সাম্প্রদায়িক দলভুক্ত ব্যক্তি বা প্রায় কখনােই, বিশেষত ১৯১৯-এর পরবর্তী সংগ্রামের যুগে সক্রিয় জাতীয়তাবাদী হতেন না।

    ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে যারা পরােক্ষ জাতীয়তাবাদী, তাদের অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছিলো ব্রিটিশ শাসনের নিন্দায় নয়, অষ্টাদশ, উনবিংশ এবং তার পূর্বতন শতকের ভারতীয় শাসকদের প্রশংসায়। প্রত্যক্ষভাবে তারা সাম্রাজ্যবাদের বিরােধিতা করতেন না, যেমন ঐতিহাসিক অনুশীলনের সাহায্যে ব্রিটিশ শাসনের যথা চরিত্র, প্রকৃত স্বার্থ এবং শােষণমূলক নীতি উদ্ঘাটনের চেষ্টা তার করতেননা। তাঁদের জাতীয় অনুভূতি পরােক্ষ ছিলাে বলে তাঁর প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতীয় সাম্রাজ্যগুলির এবং অষ্টাদশ, উনবিংশ শতকের রাজ্যগুলির শাসকদের যশােগান করতেন এবং পাঞ্জাবে, রাজপুতানায়, মহীশূরে, এমন কি জাঠদের মধ্যেও এবং সবচেয়ে বেশি করে মারাঠাদের মধ্যে রীতিমতো জাতীয়তাবাদ আবিষ্কার করতেন। এইসব অনেক ভারতীয় শাসকদের শাসনকে তারা গণভিত্তিক এবং জনহিতৈষী বলে চিত্রিত করতেন। এক্ষেত্রে আমরা নানারকম সুমধুর বর্ণনা শুনতে পাই, যেমন— ‘মাতৃভূমির মুক্তিসাধন’, ‘স্বদেশ’, ‘দেশের সন্তান’, ‘জাতীয় কল্যাণ’, ‘জনপ্রিয় নেতা’ ইত্যাদি। কিন্তু যারা প্রকৃতই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, যেমন ১৮৫৭ বিদ্রোহের নেতারা, তাদের গৌরব খুব কমই স্বীকৃতি পেয়েছে। এইসঙ্গে লক্ষণীয় যে কোনাে পেশাদার ঐতিহাসিক ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের কোনো দিক নিয়ে আলােচনা করেননি। অন্যদিকে পরোক্ষ জাতীয়তাবাদ বহুলাংশে ভারতের ইতিহাসচর্চা ও রাজনীতির ক্ষতি ও বিকৃতি ঘটিয়েছে।

    [৬]

    বহু আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিক সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে অতীতেও টেনে নিয়ে গেছেন এবং হিন্দু-মুসলমানের যে বিরােধ ১৯শ এবং বিংশ শতকেও চলছে তাই দিয়ে আঠারাে শতকের রাজনীতির ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিরােধকে অনেকেই অষ্টাদশ শতকের প্রধান সমস্যা বলে মনে করেছেন। আগেই বলেছি, এই সাম্প্রদায়িক মনােভাবের ফলে হিন্দু, শিখ ও মুসলমানদের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সামাজিক তথা রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে। এই মনোভাবের চরম পর্যায়ে গিয়ে ‘ইসলাম’ শব্দটিতে প্রায় প্রাণরােপণ করা হয়েছে—যেমন বলা হয় ইসলাম বিজয়ী হলো, ইসলাম চিন্তা করল, ‘ইসলাম’ স্থির করল, ইসলাম’ লাভবান হল। মােগলদের এবং অন্যান্য মধ্যযুগীয় মুসলমান শাসকদের বিদেশী বলে মনে করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। কোনাে কোনাে ঐতিহাসিক এমন কি শাসন ও ভূমিরাজস্বের ব্যাপারেও ‘হিন্দু ও মুসলমান’ নীতির কথা বলে থাকেন। মারাঠা সাম্রাজ্য ও রাজ্যসমূহ, রাজপুত রাজ্য ও রাজ্যাধিপতি, জাঠদলনায়ক —সবকিছুই একসঙ্গে একত্রিত করা হয় ‘হিন্দুরাজ্য’ নামে, অন্যদিকে দক্ষিণ ও উত্তরের মুসলমান শাসনাধীন রাজ্যগুলিকে আলাদা করে ‘মুসলমান রাজ্য’ বলা হয়। এই মনােভাবের এবং ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের কৃপায় আমরা এই ধরনের বিশেষীকরণে এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে আমরা মনেই রাখিনা যে পৃথিবীর অন্য কোথাও অনুরূপ পর্ববিভাগ নেই। আশ্চর্যের বিষয়, এদের কেউই ব্রিটিশ শাসনকে খ্রীষ্টান শাসন বলে অভিহিত করবেন না, অথচ মােগলশাসনে যে কয়জন সরকারী কর্মচারী মুসলমান ছিলেন, এই আমলে তুলনায় তার চেয়ে ঢের বেশি সংখ্যক কর্মচারী খ্রীষ্টান ছিলেন।

    আসলে সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকরা মারাঠা, রাজপুত, এমন কি রণজিৎ সিংহের শাসনাধীন পাঞ্জাবেরও রাজ্যগুলির ‘হিন্দুত্ব’ প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক তথ্যের যথেচ্ছ অপব্যবহার করেছেন। প্রথমেই একটি ছবি বা ধারণা খাড়া করা হয়েছে এবং তারপরে ভর সমর্থনে তথ্যগুলিকে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যেসব তথ্য বা ঘটনা এই ধারণার সঙ্গে খাপ খায়নি সেগুলির ব্যাখ্যা করার সময় সেইসব হিন্দু রাজ্যাধিপতিদের ( যারা প্রায়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, ‘দুষ্টলােক’ বা হিন্দু হিসেবে মন্দ’, অথবা ‘জাতি এবং সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসহন্তা’ বলে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখানাে হয়েছে । তথাকথিত কোনো ‘ভাল’ হিন্দু শাসকের কোনাে কাজ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালে তাকে ব্যতিক্রম বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যখন দেখা যায় যে হিন্দু রাজারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেননি, এমন কি সাধারণত যাকে হিন্দুধর্মের রক্ষাকার্য বলা হয় তার জন্যেও নয়, এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যেও খময় সম্প*য় হিসেবে সংঘবদ্ধভাবে তারা। দাড়াননি, তখন এক মনে করা হয় না যে সে সময়ে কোনেরকম সাম্প্রদায়িক মানসিকতাই ছিলােনা। বরং সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকরা সেক্ষেত্রে মনে করেন যে হিন্দুরা স্বভাবতই বিত অথবা স্বার্থপর।

    [৭]

    সুতরাং ইতিহাস প্রণয়নে সাম্প্রদায়িকতা হলাে ‘পরােক্ষ জাতীয়তাবাদের একটি দিক এবং সেই সঙ্গে সমসাময়িক সাম্প্রদায়িকতার প্রতিফলন। এ হলো ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলমান জাতীয়তাবাদকে আরো অতীতে টেনে আনার ফল।

    কিন্তু তাছাড়াও এটি হলাে পাশ্চাত্য প্রচেষ্টার অনুসরণ। যে সব ভারতীয় পাশ্চাত্য ইতিহাস অধ্যয়ন করেছেন, তাঁরা খানিকটা চেষ্টা কয়েন ক্যাথলিক-প্রটেস্টান্ট সংঘর্ষকে ভারতে হিন্দু-মুসলমান বিরোধে রূপায়িত করতে। তাছাড়া, তারতীয় রাজ্যগুলির হিন্দু ও মুসলমান চরিত্র, অষ্টাদশ শতক বা তার আগে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ এবং উনবিংশ ও বিংশ শতকের হিন্দু-মুসলমান বিরােধ-এ সবের বিষয়ে মূল সামান্যীকরণ ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং প্রচারকেরা আগেই করে গেছেন, ভারতীয়রা তাদের অনুসরণ করেছেন মাত্র। তাঁদের পক্ষে এ চেষ্টা সহজ ছিলো। কারণ ব্রিটিশ আমলারা ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যায়, অথবা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শাসক এবং ‘বীর’দের মাহাত্মকীর্তনে আপত্তি করতেন না। কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিন্দা করার চেষ্টাকে তারা সব সময়ে দমন করতেন।

    বহু ঐতিহাসিকের সাম্প্রদায়িক মনােভাবের মূলে আছে সামরিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের প্রতি অখণ্ড মনোেযােগ, যার ফলে ধর্মের প্রসঙ্গ তাঁদের কাজের পক্ষে অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কূটনৈতিক এবং সামরিক মৈত্রীর জন্যে আবেদন করার সময় অনেকরকম কথা বলা হয় এবং তাঁদের মধ্যে সঙ্গতি রাখার চেষ্টা করা হয়। বৈবাহিক কুটুম্বিতা আত্মীয়তা, ভাষা, জাতি, বর্ণ এবং এইসঙ্গে ধর্মের কথাও তােলা হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এইধরনের মৈত্রীর মূল উদ্দেশ্য থাকে শুধুই স্বার্থ।

    যদি ব্যাপকতর সংজ্ঞার্থ অনুসারে ইতিহাস লেখা হতাে, তাহলে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণই লােপ পেতো। যেমন অর্থনৈতিক ইতিহাস উদঘাটিত করতে শ্রেণীস্বার্থ, শ্রেণী-ঐক্য এবং শ্রেণীবিরােধ যা ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে যায়। অর্থনৈতিক শােষণের ছবি স্পষ্ট হলে সমধর্মী সব মানুষের মধ্যে সাম্য ও ঐক্যের ধারণাটি ঘুচে যেতাে। এইভাবে যদি সমাজের শ্রেণী ভাগ করা হয় যার একভাগে আছে যারা অতিরিক্ত উৎপাদন করে এবং অন্যভাগে আছে যারা সেই উৎপাদন আত্মসাৎ করে, তাহলে দেখা যাবে যে উভয়পক্ষেই নানাধর্মের লােক আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস তাহলে দেখাতে পারতো সুলতানদের অথবা মােগলদের আমলে মুসলমান শাসন বলে কিছু ছিলােনা। কারণ সব মুসলমানই শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেননা। মুসলমান জনসাধারণ হিন্দু জনসাধারণের মতােই দরিদ্র এবং নিপীড়িত ছিলেন। উপরন্তু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রাজা, অমাত্য, গােষ্ঠীপতি এবং জমিদার সকলেই তাঁদের নিকৃষ্ট, ইতর জীব বলে গণ্য করতেন। সামাজিক ইতিহাস প্রতিপন্ন করতে পারতাে যে হিন্দুদের মধ্যে যেমন জাতিভেদ ছিলো, মুসলমানদের মধ্যেও শরীফ, মুসলমানরা নিজেদের ‘আজ্‌লফ’ বা নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন । শাসনপদ্ধতির ইতিহাস পড়লে চাকুরিতে নিয়ােগপদ্ধতি, রাজনীতি, শাসন-ব্যবস্থার ভিত্তি ইত্যাদি স্পষ্ট হয়ে উঠতে এবং বােঝা যেত মধ্যযুগীয় অষ্টাদশ শতকের রাজ্যগুলিকে হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে দেখা একান্তই ভ্রান্ত এবং প্রকৃত শাসনব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতা একেবারেই খাটতােনা। মারাঠা, মােগল, এমন কি ব্রিটিশ আমলেও খাজনার বিলি-ব্যবস্থায় যথেষ্ট মিল ছিলো। এমন কি, রাজনৈতিক ইতিহাসও যত্ন করে পড়লে বােঝা যেতো যে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার মতাে ভারতীয় রাজ্যগুলিতেও রাজনীতি নির্ধারিত করতে ধর্ম নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ। শাসক ও বিদ্রোহী, উভয়েই নিজেদের জাগতিক স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিরাবরণ হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করতেন। সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস পড়লে দেখা যেতো সমাজের উচু স্তয়ে যেমন সাংস্কৃতিক আদান প্রদান ও সমন্বয় ছিল এবং একটি যৌথ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেরকম নিচের দিকে গ্রামেও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সৌহার্দ্য ছিলাে। এও দেখা যেত যে অষ্টাদশ শতকে, এমন কি বিশ শতকেও উচ্চশ্রেণীর একজন মুসলমানের সঙ্গে একজন নিম্নশ্রেণীর মুসলমানের চাইতে একজন সমশ্রেণীর হিন্দুর সাংস্কৃতিক যোেগ ঢের বেশি ছিলো; কিংবা একজন পাঞ্জাবী হিন্দুর সংস্কৃতির সঙ্গে একজন বাঙালী হিন্দুর চাইতে কোনাে পাঞ্জাবী মুসলমানের অনেক বেশি নৈকট্য ছিলো। সেরকম, কোনাে বাঙালী মুসলমানও পাঞ্জাবী মুসলমানের থেকে নিশ্চয়ই কোনাে বাঙালী হিন্দুর প্রতি বেশি আত্মীয়তা অনুভব করতেন।

    আকবরের সভায় ধর্মীয় বিতর্কের আয়োজন

    সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসচর্চা ধর্ম ছাড়াও অন্য ধরনের সামাজিক বিভেদ ও বৈচিত্র্য স্পষ্ট করে তুলতে; যথা সম্প্রদায় ও বর্ণগত বৈষম্য । যেমন ধরা যাক অষ্টাদশ শতকের মাদ্রাজে ‘ডান-হাতি জাত ও বাঁ হাতি’ জাতের তীব্র সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষকে দ্বি-জাতিতত্ত্বের আলােয় বিচার করা কি ঠিক হবে ? জনসংখ্যা বিষয়ক খুব সাধারণ। একটি তথ্য-১৯০১ সালে রাজপুতানায় রাজপুতরা ছিলেন মােট জনসংখ্যার শতকরা ৬৪ ভাগ মাত্র — এটা মনে রাখলেই মধ্যযুগীয় রাজপুত রাজ্যগুলির তথাকথিত ‘জাতীয়’ বা ‘হিন্দু’ সংগ্রামগুলিকে নতুন আলােয় দেখা যায়। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবন এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের অগ্রগতিতে তাদের অবদান বিচার করলে বােঝা যায় ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি কোনােমতেই খাটেনা। এ-ও বলা যায় যে ঐতিহাসিকরা যদি সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতীয় আন্দোলন নিয়ে সত্যি আলােচনা করতেন, তাহলে তারা সাম্রাজ্যবাদবিরােধী সংগ্রামে ভারতীয় জনগণের একই রকম স্বার্থ ও পরাধীন অবস্থা লক্ষ্য করতে বাধ্য হতেন।

    উনিশশো বিশ এবং তিরিশের যেসব ঐতিহাসিকরা সাম্প্রদায়িক মনােভাবসম্পন্ন ছিলেন, তাদের কাজ সব বাতিল করে দেওয়া উচিত হবেনা। তাদের অনেকেই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা সম্বন্ধে পুরােপুরি সচেতন ছিলেন না। যখন ইতিহাসের এক অধ্যায় সম্পূর্ণ হলাে কেবল তখনই সব ঘটনা ও মনােভাবের পুরো তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে উঠলাে। কিন্তু আমরা ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের দিনগুলির ভেতর দিয়ে এসেছি এবং প্রতিনিয়তই জাতীয় সংহতির প্রয়ােজন অনুভব করছি। আমাদের বুঝতে হবেই যে সাম্প্রদায়িকতা আমাদের প্রায় কিছুই দিতে পারেনা। এর ফলে শুধু যে, প্রচণ্ড ক্ষতি হয়ে গেছে তাই নয়, ভবিষ্যতেও আরাে অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। যেমন, মুসলিম লীগের দ্বি-জাতিতত্ত্ব প্রণয়নের ঢের আগেই ব্রিটিশ ও ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তার একটি পূর্বতন সংস্করণ খাড়া করেছিলেন, যাকে বলা যেতে পারে একজাতিতত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে ভারতীয় জাতির মানে হলো হিন্দুজাতি, ভারতীয় জনগণ বললে হিন্দু জনগণকে বােঝায়, মুসলমান শাসন ছিলো বিদেশী শাসন সুতরাং ভারতে মুসলমানরা বহিরাগত বিদেশী মাত্র ছিলেন, ইত্যাদি।

    [৮]

    ভারতে জাতীয় আন্দোলন এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার মান্দোলন যেহেতু ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল বিশেষ এবং যেহেতু একটি নতুন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে অনেক হাতড়ানাে, অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনেক ভুলভ্রান্তির মধ্য দিয়ে এদের সৃষ্টি হয়েছিলাে, সেইজন্যে এটা অনিবার্য ছিলো যে, এদের মধ্যে পরস্পরবিরােধী অনেক কিছুই থাকবে। সুস্থ ও অসুস্থ, দু-ধরনের প্রবণতাকে এরা স্বভাবতই সৃষ্ট ও বর্ধিত করেছিলো। যে সময় ভারতের মানুষ জাতীয়তাবাদের পথ হাতড়ে বার করতে শুরু করেছিলেন তখন পরিবর্ধমান জাতীয় অনুভূতির সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণাশ্রয়িতা ইত্যাদি অনেক কিছু যে মিশে থাকবে এটাও অবশ্যম্ভাবী। গতিশীল আন্দোলনের নেতৃবর্গ ও তাদের উত্তরপুরুষদের অবিরাম কর্তব্যই হলো নীর থেকে ক্ষীর বেছে নেওয়া। অকৃতকার্য হলে তার দায়িত্ব হবে পথিকৃৎদের নয়, তাঁদেরই—যেমন ভুল চিন্তার প্রায়শ্চিত্ত তাদেরই করতে হবে।

    দুর্ভাগ্যবশত অতীতের সবকিছু দ্বিধায় গ্রহণ করার ফলে ভারতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ধারাগুলির মধ্যে স্বচ্ছতা ও পৃথকীকরণের অভাব ঘটেছে এবং এর ফলে অতীতে ও বর্তমানে প্রচুর ক্ষতি হয়ে গেছে। উনিশ শতকের সমাজ-সংস্কার এবং বিশ শতকের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলিকে আমরা সমালােচনার উর্ধ্বে বলে মনে করি। রাজা রামমােহন রায়, স্বামী দয়ানন্দ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘােষ, লােকমান্য তিলক, লাজপৎ রায়, গান্ধীজী প্রমুখ সকলের বিষয়ে আমরা কেবলই গতানুগতিক স্তোকবাক্যের পুনরুক্তি করে থাকি। আমাদের গণসংযােগের সব মাধ্যমগুলি, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক, আকাশবাণী সকলেই একভাবে তাদের নিরঙ্কুশ প্রশংসা করে চলেছে। ফলে, সাম্প্রদায়িক মনােভাবাপন্ন ব্যক্তিরা এবং অন্যান্যরা তাঁদের জীবনের নেতিবাচক দিকগুলি নিজেদের সুবিধার জন্যে ব্যবহার করতে পারেন। আমরা তাে জনসাধারণকে বিশেষত অল্পবয়স্কদের কখনােই একথা বলিনা যে এইসব মহাপুরুষরা প্রকৃতপক্ষে মানুষই ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও বােধশক্তি এবং কার্যকলাপ অভ্রান্ত ছিলােনা।

    যদিও সেসময়ের পক্ষে তাদের ভুলভ্রান্তি হয়তাে মার্জনীয়, তবু তখনও তার জন্যে অনেক ক্ষতি হয়েছিল এবং অন্য এক ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে গেলে তার ফলে খুবই সর্বনাশ হয়েছে। অনবরত তাদের প্রশংসা করার প্রবণতা এক হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণাশ্রয়িতা এইসবের কাছে হার মানা। কারণ গােখলে, রানাডে, দাদাভাই নওরােজী এবং বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ কোনাে কোনাে নেতাকে আমরা তাঁদের যথার্থ ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করে থাকি, জাতীয়তাবাদের পথে তাঁদের বিরাট অবদান স্বীকার করেও বলি যে তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরােধিতা যথেষ্ট দৃঢ় ছিলােনা। একথা মনে রাখাও অনুরূপ প্রয়ােজন যে উনবিংশ এবং বিংশ শতকের বহু ভারতীয় নেতাদের প্রচুর অবদান থাকলেও ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক বিচারে, জাতিভেদপ্রথা সম্পর্কে, ঐতিহাসিক সমস্যা অথবা ভারতীয় সমাজগঠন সম্বন্ধে বা সংখ্যালঘু ধর্মীয় গােষ্ঠীগুলির ব্যাপারে তাদের চিন্তাতেও অনেক দুর্বলতা ছিলাে। আমাদের পাঠ্যপুস্তক, সংবাদপত্র, আকাশবাণী এবং রাজনৈতিক নেতাদের এইসব ব্যক্তিদের ওপর নির্বিচারে সবকিছু মহত্ত্ব আরােপের চেষ্টা থামাতেই হবে, কারণ এ চেষ্টা পরােক্ষভাবে হলেও জাতীয় সংহতিকে দুর্বল করে তােলে।

    [৯] 

    ইতিহাস সম্বন্ধে সাম্প্রদায়িক মনােভাব, পরােক্ষ জাতীয়তাবাদ, ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে না গিয়েও জাতীয়তাবাদী’ হওয়া, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী লােকের মনেও সাম্প্রদায়িকতার গভীর ও সূক্ষ্ম প্রভাব জাতীয় গণসংযােগ ও শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতার পরাজয়, এমন কি সাম্প্রদায়িকতার প্রচার সকলকেই সন্তুষ্ট রাখার বিপজ্জনক নীতি, সমগ্র অতীত, বিশেষত জাতীয় আন্দোলনের সাম্প্রতিক ইতিহাসকে সমালােচনার উর্ধ্বে বসানাের চেষ্টা-একটা বিশেষ পরিচিত দৃষ্টান্ত দেখালেই সবকিছু পরিষ্কার হবে। তা হলাে জাতীয় মহাপুরুষ সৃষ্টি ও প্রচার।

    উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জাতীয়তাবাদের সূচনায় যখন দেশের নেতারা জাতীয় চেতনা প্রসারের কাজ হাতে নিলেন, তখন মনে করা হয়েছিলে যে “জাতীয় মহাপুরুষ”-দের উদাহরণ তুলে ধরলে তাদের কাজ ত্বরান্বিত হবে। জাতীয় চেতনা যাদের পক্ষে বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করা কঠিন, জাতীয় মহাপুরুষদের কেন্দ্র করে তাঁদের চিত্তকেও দেশপ্রেমের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। সুতরাং এই মহাপুরুষেরা জাতীয় আবেগের প্রতীক হয়ে দাঁড়ালেন এবং এখনাে ব্যাপকভাবে তাঁদের এভাবেই ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত বহু লেখক, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ জাতীয় মহাপুরুষ পূজা প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের দেশ প্রেমের প্রকাশ খুঁজেছেন এবং তা তাদের প্রাত্যহিক জাতীয়তাবাদী প্রচার কার্যের অংশ ছিলাে। তৃতীয়ত, বৃটিশদের ধারণা ছিলো ভারতীয়দের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা, ইচ্ছা এবং তার জন্যে সংগ্রাম করার দৃঢ় সংকল্পের একান্ত অভাব আছে, সুতরাং এই মতটি খণ্ডন করার জন্যেও কিছু কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের গৌরবকীর্তনের প্রয়ােজন দেখা দিয়েছিলো। সবশেষে, সাম্প্রদায়িক নেতারা তাদের নিজেদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মতের সমর্থনের জন্যে এক আন্দোলনের যথার্থ, বাস্তব বীরদের আরােহণ ঠেকানাের উদ্দেশ্যে অন্য প্রতীক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ সবের ফলে রাণা প্রতাপ, গুরুগোবিন্দ সিংহ এবং শিবাজী প্রমুখ অনেক ঐতিহাসিক চরিত্রকে সংবাদপত্র, ইস্তাহার, গল্প, কবিতা এবং নাটক, বিদ্যালয় ও আকাশবাণীর সাহায্যে “জাতীয় মহাপুরুষ” হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়েছে।

    এটা পরিষ্কার করে বােঝা দরকার যে মহাপুরুষ সৃষ্টির এই প্রক্রিয়ার পেছনে কোনো ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ বা বিচারের ব্যাপার ছিলােনা। সবটাই ছিলাে রাজনীতির প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক কৌশল এ চেষ্টার ফলে এটি সম্ভব হয়েছিলো। বিশেষ একজন কোনাে মহাপুরুষকে বেছে নেওয়া ও তার সামাজিক ও রাজনৈতিক উপযােগিতার সঙ্গে ঐতিহাসিক তথ্য, অবদান এবং বিশ্লেষণের প্রায় কোনাে যােগ ছিলােনা। মহাপুরুষ’ সৃষ্টি করা হয়েছিলো আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির উদ্দেশ্যসাধনের জন্যে। সেই উদ্দেশ্যর মাপকাঠিতেই তাদের রাজনৈতিক উপযােগিতা বা সার্থকতা বিশ্লেষণ করতে হবে, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নয়। 

    আমরা এবার দেখবাে যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নানাকারণে যাঁরা বলিষ্ঠ সংগ্রাম করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে থেকে রাজনৈতিক কারণে সৃষ্টি এইসব বীরদের বেছে নেওয়া হয়নি। বাহাদুর শাহ, ঝাঁসির রাণী, নানাসাহেব, তাঁতিয়া টোপী, ফৈজাবাদের মৌলান আহম্মদুল্লাহ, কুঁয়ার সিং প্রমুখ ১৮৫৭-র বিদ্রোহীবৃন্দ, ঝিনের রানী, দেওয়ান মূলরাজ, বাসুদেও. বি. ফাড়কে, চাপেকার ভ্রাতৃদ্বয়, সাঁওতাল ও নীল বিদ্রোহের নায়করা এবং আরো পরে ক্ষুদিরাম বসু, কল্পনা দত্ত প্রভৃতি–জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের সমগ্র তালিকায় কিন্তু এদের বেছে নেওয়া হয়নি।

    সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে নীল বিদ্রোহের ওপর রচিত ‘নীল দর্পণ’-এর মতো প্রকৃতই অগ্নিগর্ভ, যথার্থ আধুনিক জাতীয়তাবাদী নাটকটি সমস্ত উত্তর ভারতে একবারও অভিনীত হয়নি এবং বই হিসেবেও একটিও বিক্রি হয়নি। বরং জাতীয়বাদের উদ্বোধন ঘটেছিলাে পৃথ্বীরাজ এবং হকিকৎ রায়কে কেন্দ্র করে জনপ্রিয় নাটকের মাধ্যমে। স্বভাবতই ক্রমশ মুসলমান সাম্প্রদায়িকরাও এর উত্তরে তাদের নিজস্ব পৃথক মহাপুরুষদের সৃজন করলেন এবং এদের খুঁজে বার করতে গিয়ে ক্রুসেড’ বিয়ােধী সংগ্রামী যুগে পর্যন্ত তাদের ফিরে যেতে হয়েছিলাে।

    কেন এরকম হ’লাে? মহাপুরুষ-পুরাণ সৃষ্টির সময়ে তার পেছনে প্রধানতম কারণ নিশ্চয়ই ছিলে ব্রিটিশ শাসকদের মনােভাব। যথার্থ জাতীয়তাবাদ অথবা সাম্রাজ্যবাদবিরােধিতার কোননারকম প্রকাশকে তারা একেবারেই বরদাস্ত করতেন না। যারাই তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার বিয়ােধিতা করেছিলেন, তাদের গৌরবকীর্তনে তারা বিশেষভাবে বিরূপ ছিলেন। ১৮৫৭-র বীরদের স্বপক্ষে যারাই কিছু লিখতেন বা বলতেন, তাঁদের দমন করতে তারা কিছুমাত্র দ্বিধা করতেন না। বিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক—যাঁরা প্রায়ই সরকারি পৃষ্ঠপােষকতার ওপর নির্ভর করতেন, তাঁরা আমলাদের বিশেষ অপ্রীতিভাজন হবার মতাে কোনাে ঝুঁকি নিতে চাইতেন না। অন্যদিকে আমলারাও পরােক্ষ জাতীয়তাবাদকে উৎসাহই দিতেন, কারণ তাদের বিভেদপন্থী নীতির সঙ্গে তা বেশ মিলে যেতে। ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক, বর্ণাশ্রয়ী এবং প্রাদেশিক মহাপুরুষদের গুণগান করা চলতো এমন কি উৎসাহ দেওয়া হতাে। যতক্ষণ না ব্রিটিশরাজের ঘার বিরােধিতা করেছেন তাঁদের উল্লেখ করা হচ্ছে। শুধু ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে নয়, বাস্তব রাজনীতিতেও ব্রিটিশদের সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক দের এবং জাতিভেদ প্রথার সমর্থকদের পূর্ণ সহযােগিতা বারবার চোখে পড়ে, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তারা এক সঙ্গেই লড়াই করেছেন।

    ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ

    এ তথ্যটিও লক্ষণীয় যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ‘নরমপন্থী’ যুগেই অধিকাংশ মহাপুরুষ-পুরাণের সৃষ্টি হয়েছিলাে। শিবাজী, গুরুগগাবিন্দ সিংহ, রাণা প্রতাপ—এদের ‘জাতীয় বীরে’র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, জাস্টিস রানাডে, মদনমােহন মাসব্য, রমেশচন্দ্র দত্ত এবং প্রথমযুগের অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী তিলক। সেদিনের জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশ শাসনকে পূর্বতন শাসকদের তুলনায় ঐতিহাসিক বিচারে অগ্রগামী মনে করতেন এবং সেজন্য যারা তার প্রতিষ্ঠার বিরােধিতা করেছিলেন, তাঁদের প্রশংসা করতে অপারগ ছিলেন। উপরন্তু সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে শাসকদের অপ্রীতিভাজন হ’তেও তারা ঠিক ইচ্ছুক ছিলেন না। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশদের তিলকবিরােধী অভিযানের কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। মুসলমান বিরােধী নেতারূপে শিবাজী-বন্দনায় শাসকগােষ্ঠীর একেবারেই কোনো আপত্তি ছিলেন। তাঁর হস্তক্ষেপ করলেন তখনই, যখন তাদের মনে হলাে যে তিলক শিবাজীপূজার মাধ্যমে ব্রিটিশবিরােধী মনােভাব প্রচার করেছেন। আমি আবার বলতে চাই যে প্রথমযুগের জাতীয় নেতাদের এই মহাপুরুষ সৃষ্টির কিছু সঙ্গত কারণ ছিলো। অজানা এক সমুদ্রে তাঁর সবেমাত্র পাড়ি দিতে আরম্ভ করেছিলেন, নিজেদের কার্যাবলীর সম্পূর্ণ তাৎপর্য সম্বন্ধে তারা তখনাে অবহিত ছিলেন। তাদের বিরাট অবদান গ্রহণ তরে তশদের ভুলগুলি শুধরে নেওয়ার দায়িত্ব ছিলাে পরবর্তী জাতীয়তাবাদীদের।

    ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয় সংহতিকে দুর্বল করার কাজে এধরনের মহাপুরুষ সৃষ্টি—রাণা প্রতাপ, শিবাজী, গুরুগােবিন্দ সিংহ ইত্যাদি যারা মধ্যযুগে মােগল শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে উপকথা রচনা—অন্য যে কোনো মতবাদের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলােনা। এক কলমের খোঁচায়, প্রায় স্বতঃসিদ্ধভাবে এই ধরনের মহাপুরুষ-পুরাণ দ্বি-জাতিতত্ত্ব বা মূল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির যাথার্থ্য প্রমাণ করে দিয়েছিলো। কী হিসেবে তারা ‘জাতীয়’ নায়ক, এবং তাদের সংগ্রাম কী অর্থে ‘জাতীয়’ সংগ্রাম। তারা বিদেশীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ছিলেন বলে? কী অর্থে মােগলেরা বিদেশী? কারণ তারা মুসলমান ছিলেন। রাণা প্রতাপ, শিবাজী এবং গুরুগােবিন্দ সিংহের জাতীয়তাবাদের ঐক্যসূত্র কী ছিলাে? তারা হিন্দু বা অ-মুসলমান ছিলেন। এভাবে মহাপুরুষ-পুরাণগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করেছিলাে।

    যে শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তি শিবাজী কিংবা রাণা প্রতাপের জাতীয় নেতা হিসেবে গৌরব গান শুনেছে সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বিশ্বাস করবে যে মধ্যযুগের ভারতে একটি হিন্দু জাতির অস্তিত্ব ছিলাে এবং তা ‘বিদেশী মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগাগােড়া লড়াই করে এসেছে। আজও আমাদের পাঠ্যপুস্তক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গণসংযােগের মাধ্যমগুলি এবং বিশেষ করে আকাশবাণী মধ্যযুগের মহাপুরুষ-পুরাণগুলি ব্যবহার করছেন জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করার জন্যে। এই প্রবণতা আরাে বেশি করে দেখা যায় বিশেষ কোনাে জাতীয় সঙ্কটের সময়। এ ব্যাপারে পথিকৃৎদের চেয়ে তাঁদের দায়িত্ব আরাে বেশি, কারণ এর ফলে যা ক্ষতি হতে পারে তা আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং বাস্তবজীবনে প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদবিরােধী সংগ্রাম করেছেন এমন ঐতিহাসিক চরিত্রের বিষয়ে এখন যথেষ্ট জানা যায়। এইসব মহাপুরুষপুরাণের অযৌক্তিকতা ও উদ্ভটত্ব বেশ বােঝা যায় যখন শেঠ গােবিন্দদাস প্রমুখের রচনার মত অসংখ্য বেতার-নাটকে প্রত্যেকটি জমিদার ও জায়গিরদারদের তুচ্ছ বিবাদ-বিসংবাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের অনুসন্ধান চলে, যদি অবশ্য জমিদারটি রাজপুত বা হিন্দু হন এবং শাসক মুসলমান।

    আর একবার বলি। এর সঙ্গে ঐতিহাসিক সত্য ৰা সততার সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-ইতিহাস রচনা কোনাে সম্বন্ধ নেই। কারণ সব মহাপুরুষ-পুরাণ প্রকৃত ঐতিহাসিক রচনা নয়। এগুলি রাজনীতির সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক উপযােগিতার মাপকাঠিতে এগুলি বিচার্য। দ্বিতীয়ত, এইসব মহাপুরুষরা জাতীয় নেতা ছিলেননা বলতে গিয়ে আমি কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করছি না। নিশ্চয়ই তাদের নিজেদের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে শিবাজী, রাণা প্রতাপ বা গুরুগােবিন্দ সিংহের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিলো। কিন্তু তা জাতীয় সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। অন্যথায় আমরা যদি সাম্প্রদায়িকতাকে অতীতে নিয়ে গিয়ে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রূপে দেখি, তাহলে অন্যেরা তাদের ধর্মনিরপেক্ষ, সংহত জাতীয়তাবাদকে অতীতে নিয়ে গিয়ে এদের ভারতীয় ঐক্য, রাষ্ট্র এবং অতএব জাতীয়তার পরিপন্থী হিসেবে চিত্রিত করতে পারেন। দ্বিতীয় মতটি যে উদ্ভট তা সবাই স্বীকার করবেন; প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটিও কিন্তু সমান অলীক। তাছাড়া যে যুগে জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব ছিলােনা, সে যুগের কাউকে জাতীয়তাবাদী না বলাটা নিন্দনীয় নয়। জাতীয় নায়ক হওয়াই একমাত্র সম্মান নয়। তাহলে আমরা একথা ঘােষণা করি না কেন যে, অশােক, হর্ষ, গুরু নানক, চৈতন্য বা আকবরকে জাতীয় নায়ক না বলা মানে তাদের অপমান করা? আসলে আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শিবাজী, রাণা প্রতাপ, গুরুগােবিন্দকে সাম্প্রদায়িকে যেভাবে অপব্যবহার করেছেন তার অবসান ঘটানাে। বস্তুত রাণা প্রতাপ আকবরের চেয়ে বা শিবাজী ঔরংজেবের চাইতে বড়ড়া জাতীয় নায়ক ছিলেন না। কাল্পনিক ইতিহাসে তাদের ওপর একটি মিথ্যা ‘জাতীয়’ চরিত্র আরােপ করে আমরা আধুনিক ও সাম্প্রতিক ইতিহাসে জাতিবিরােধী ও সংহতি-বিরােধী কাজ করছি।

    মহাপুরুষ-পুরাণের সাম্প্রদায়িক দিকটি আরেকভাবে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যদিও অশােক, চন্দ্রগুপ্ত বা হর্ষ তথাকথিত স্বর্ণযুগের লােক ছিলেন, তবু তাদের জাতীয় নেতা রূপে চিত্রিত করায় সাম্প্রদায়িকদের প্রায় কোনাে উৎসাহ দেখা যায়নি। তার কারণ, সাম্প্রদায়িকেরা জানেন যে মুসলমানবিরােধী মনােভাব জাগ্রত করার কাজে এইসব নাম ব্যবহার করা যায়না। এদের ‘জাতীয়তাবাদ’ মুসলমানবিরােধী বা সাম্প্রদায়িক হওয়া সম্ভব নয়। এটা বেশ কৌতূহলপ্রদ যে তথ্যনিষ্ঠার নামে আজকের একজন প্রধান সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক ঝাঁসির রানী এবং নানী সাহেবকে খর্ব করার চেষ্টা করেছেন, যদিও তাঁরা ছিলেন হিন্দু এবং সত্যিকারের এক বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছেন। কিন্তু তারা তাে কোনাে মুসলমান শাসকের বিরুদ্ধে যাননি, এমনকি মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একজন মুসলমানকেই সম্রাট বলে স্বীকার করেছিলেন।

    সংখ্যালঘু এবং অবদমিত গােষ্ঠীগুলির ওপরে নেতিবাচক প্রভাবের দ্বারা এইসব উপকথাগুলি জাতীয় সংহতির কতটা ক্ষতি করেছে তা আমাদের একেবারেই তুচ্ছ করা উচিত নয়। যে জাতীয়তাবাদে জাতীয় নায়কের বিদেশী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ‘জাতীয় সম্মান পেয়েছেন, তাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে সােৎসাহে যােগ দেওয়া কোনো মুসলমানের পক্ষে সহজ নয়। নিম্নবর্ণ এবং নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে যতই সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা ছড়িয়ে পড়বে, ততােই নিশ্চয়ই তার জমিদার, দলাধিপতি ও শাসকদের (যারা তাদের শোষণ ও পীড়ন করেছেন) গৌরবগানে একই রকমভাবে আপত্তি জানাবেন।

    এইসব মহাপুরুষ-পুরাণের পরিবর্তে অন্য কোনো যথার্থ জাতীয় মহাপুরুষ নিয়ে উপকথা সৃষ্টি করতে আমি বলছিনা। এখন সময় এসেছে সাধারণের সামনে খাটি মানুষকে, তার অবদানের ভালােয়-মন্দয় মেশানাে সম্পূর্ণ দিকটি তুলে ধরার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আকাশবাণী ও গণসংযােগের অন্যান্য মাধ্যমগুলির, রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের, এই দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। এইভাবে আরাে ভালো করে জনসাধারণকে রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া যাবে এবং উন্নততর সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা যাবে। কিন্তু যদি কোনাে কারণে মহাপুরুষ-পুরাণ সৃষ্টির প্রয়ােজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, তাহলে তাদের উপযােগিতা ও বাস্তব ভিত্তি সম্বন্ধে বিশেষ চিন্তা করে তা বাছাই করতে হবে।

  • রমিলা থাপার ।। সাম্প্রদায়িকতা ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনা

    রমিলা থাপার ।। সাম্প্রদায়িকতা ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনা

    • অনুবাদ: তনিকা সরকার
    [এই রচনাটি ১৯৬৮ সালে আকাশবাণী আয়োজিত ‘বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিততে রেডিও-প্রচারকের ভূমিকা’ শিরোনামের আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সভার পঠিত রচনাগুলির সংকলন যা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদ’-এর বাংলা ইউনিটের তত্ত্বাবধানে সংকলনটির বাংলা অনুবাদ করেন তনিকা সরকার। লেখাটি অনলাইন পাঠকদের জন্য অরাজে পুনঃপ্রকাশিত হলো। লেখাটি নেয়া হয়েছে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বইটির তৃতীয় মুদ্রণ (১৯৯৩) থেকে। মূল গ্রন্থের বানান ও ভাষারীতির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।- সম্পাদক]
    রমিলা থাপার

    মূল প্রবন্ধ:

    ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যায় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব প্রসঙ্গে যখন কথা হয়, তখন সাধারণত অনেকেই ধরে নেন যে প্রাচীন যুগ নিয়ে যারা লিখেছেন তাদের উপরে এই ধরনের প্রভাব হয় একেবারেই নেই অথবা থাকলেও তা খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়। অথচ ভারতীয় ইতিহাসের অনুশীলনে ও ব্যাখ্যায় সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব মোটেই শুধু মধ্যযুগীয় ও আধুনিক যুগের ইতিহাসেই আবদ্ধ থাকেনি; মূলতঃ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণের ফলে প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে চেতনা ও তার ব্যাখ্যাও বিকৃত হতে পারে। ইদানীংকালের সাম্প্রদায়িক ভাবধারা পরীক্ষা করে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তা প্রাচীন ইতিহাস থেকে বুদ্ধিগত সমর্থন খুঁজছে। হিন্দু সাম্প্রদায়িকেরা যেমন প্রাচীনকালে একটি আদর্শ হিন্দু-সমাজের চিত্র খাড়া ক’রে তুলতে চেষ্টা করেন এবং ভারতবর্ষের সব দুর্ভাগ্যের জন্যে ‘মুসলমান’দের আগমনকে দায়ী করেন, ঠিক তেমনি সাম্প্রদায়িক মুসলমানেরাও মধ্যযুগের গোড়ার দিক (অর্থাৎ একাদশ বা ত্রয়োদশ শতক) থেকে বিভেদনীতির উৎস সন্ধান এবং প্রমাণের চেষ্টা করেন।

    আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা সমসাময়িক মতবাদপ্রসূত হ’তে পারে। এ কথা অল্পদিন আগেও ঐতিহাসিকদের মতামত সম্বন্ধে বিশেষভাবে খাটতো কারণ তখন ইতিহাস রচনা ছিলো (এবং এখনো অনেক ক্ষেত্রে তাই আছে) বিশ্লেষণের বিশেষ চেষ্টা না ক’রে শুধুমাত্র ঘটনাপরম্পরা সাজিয়ে যাওয়া। ঐতিহাসিকরা তাদের নিজন্য পছন্দ অনুযায়ী ঘটনাগুলি বাছাই করতেন এবং তাদের নির্বাচনের ধরন থেকে তাদের পক্ষপাত বোঝা যায়। যেসব উৎস থেকে ঐতিহাসিক তার তথ্য সংগ্রহ করেন, সেগুলির কোনটিকে তিনি কতটুকু মুল্য দেন এবং  প্রামাণিকতার বিচার বিশ্লেষণ করে যাচাই করতে তিনি কতটা রাজী, তার দ্বারাও ঐতিহাসিকের ভাষা প্রভাবিত হয়।

    আর্টওয়ার্ক : কর্ণ ইন কুরুক্ষেত্র
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনায় সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা বুঝতে হলে প্রথমে বোধ হয় বিগত কয়েকটি শতকে ইতিহাস-প্রণয়নে সমসাময়িক চিন্তাধারার প্রভাব বিচার করা উচিত। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস সম্বন্ধে আধুনিক রচনা ও প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে এবং তখন থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত মতবাদের দিক দিয়ে তিনটি প্রধান ধারা লক্ষ্য করা যায়ঃ প্রাচ্যবাদী, হিতবাদী ও জাতীয়তাবাদী।

    পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ইয়োরোপ ও এশিয়ার মধ্যে রীনিচ্যের প্রসারের ফলে বহু ইয়োরোপীয় পণ্ডিত এবং ধর্ম প্রচারক এশিয়ার সংস্কৃতি বিষয়ে ক্রমশঃ আগ্রহশীল হয়ে উঠলেন । ভারতবর্ষের ক্ষেত্র এই আগ্রহের সূচনা দেখি ভাষাচর্চায়— বিশেষতঃ সংস্কৃত ও পারসিক ভাষা শিক্ষার মধ্যে। এই ভাষাচর্চা নতুন উদ্যমে শুরু হলে আঠারো শতকের শেষে রয়াল-এশিয়াটিক সোসাইটির গোড়াপত্তনের পর থেকে। যাকে ধ্রুপদী ইতিহাস বলে, সেবিষয়ে আলোচনাগুলি লিপিবদ্ধ হলো সুবিন্যস্তভাবে। এ কাজ প্রধানত যে পণ্ডিতরা করতেন তাঁদের প্রাচ্যবাদী বা ভারততত্ত্ববিদ (ওরিয়েন্টালিস্ট বা ইন্দলজিস্ট) বলা হতো। তাঁদের মধ্যে যারা সংস্কৃত অধ্যয়ন করেছিলেন তারা আর্য-ভাষীদের সংস্কৃতির রীতিমত ভক্ত হয়ে উঠলেন । তারা এক ইন্দো-ইয়োরোপীয় দেশখণ্ড এবং সংস্কৃত ও গ্রীক সংস্কৃতির বংশগত ঐক্য সম্বন্ধে মতের প্রচলন করলেন। আর্যদের তারা একই ধরনের ভাষা-ভাষী— একটি গোষ্ঠী হিসেবে না দেখে একটি জাতি হিসেবে দেখতে লাগলেন এবং ভারতবর্ষে আর্য সংস্কৃতির ইয়োরোপে গ্রীক সংস্কৃতির চারিত্রিক রূপান্তরের মধ্যে পারস্পরিক যোগ খোঁজার চেষ্টা চলতে লাগল। প্রাচ্যবাদীরা বৈদিক যুগের অকুণ্ঠ গুণগান করতে লাগলেন সাম্প্রদায়কতা ও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনা এবং তাদের ধারণা হলো প্রাচীন ভারতে মোটামুটি একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা ছিল । সেই ব্যবস্থার মধ্যে যে সব ছন্দ ছিল তা প্রচ্ছন্ন রেখে তারা তার গৌরব কীর্তনই বেশি করে করতে লাগলেন। তাদের এই ধারণার সঙ্গে গোঁড়া হিন্দুদের মতের পুরোপুরি মিল হলো, কারণ হিন্দুরা এমনিতেই বেদ ও বৈদিক নর মাহাত্ম্যে বিশ্বাসী ছিলেন।

    যে সব ভারতীয় ঐতিহাদিক পরে এই চিন্তাধারার অবলম্বন করেন, তাঁরা প্রাচ্যবাদীদের প্রাচীন ভারতীয় সমাজের মাহাত্ম্য-কীর্তনের পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলি কাজ করেছে তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। সবচেয়ে স্পষ্ট যে কারণটি তা হলো বেশির ভাগ প্রাচ্যবাদী পণ্ডিত তাদের নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং শিল্পবিপ্লবের ফলে ইয়োরোপে যে সব ঐতিহাদিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তার সম্বন্ধে তারা সবিশেষ সন্দিহান ছিলেন । এর ফলে তারা অন্যত্র রামরাজ্য খুঁজে বেড়াতেন এবং বেশির ভাগই প্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতায় তা আবিষ্কার করতেন । আদর্শরূপে চিত্রিত প্রাচীন ভারতের সঙ্গে নিজেকে  সংশ্লিষ্ট করার এরকম একটি দৃষ্টান্ত হলেন ম্যাকসমূলার, যিনি নিজের নামটি সংস্কৃত ক’রে মোক্ষমূলর-এ রূপান্তরিত করেছিলেন। এই ধরনের আদর্শীকরণ অনেক সময় আধুনিক ভারতের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হতো। ম্যাকসমুলার যদি তাঁর জীবনকালে উনিশ শতকের ভারতবর্ষকে সচক্ষে দেখে যেতেন তা হ’লে তার প্রতিক্রিয়া কী হ’তো এ চিন্তা ‘ কৌতূহল জোগায়। প্রাচ্যবাদীদের লেখা অনেক ভারতীয়কে প্রভাবিত করেছিল এবং উনবিংশ শতাব্দীর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে অনেকগুলিই (যথা আর্য সমাজ) বৈদিক সংস্কৃতির আদর্শকে ভারতীয় ঐতিহ্যে ভিত্তি বলে প্রচার করতো। পাশ্চাত্যজগতেরও কোনো কোনে চিন্তাধারার ওপর এই মতামতের যে ছাপ পড়েছিলো তা রোমান্টিক আন্দোলন বা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে বোঝা যায় । গোবিনে (যিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী দার্শনিকদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ) ‘আর্যজাতি’ ও ভারতের বর্ণবিন্যাস সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব ধারণার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে তাঁর চিন্তা-ধারার প্রবর্তন করেন। এইজাতীয় ধারণা পরিণতি লাভ করলো বিংশ শতকের জার্মানিতে হিটলারের মতবাদে।

    অন্য একটি কারণেও প্রাচ্যবাদীরা প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতিকে সমর্থন করার চেষ্টা করতেন, তা হ’লো হিতবাদীদলের সঙ্গে বিতর্কে তারা ক্রমশ পরাজিত হচ্ছিলেন। হিতবাদীরা হ’লেন উনিশ শতকের বিশেষ প্রভাবশালী একদল ব্রিটিশ দার্শনিক। তারা সুনিশ্চিত জানতেন যে ব্রিটিশদের আগমন ভারতবর্ষের পক্ষে দৈবানুগ্রহবিশেষ, কারণ ব্রিটিশ শাসন ও আইনের ফলে ভারতবর্ষের অনগ্রসরতা দূর হবে। সঙ্গে সঙ্গে এযাবৎ নিরবচ্ছিন্ন ভাবে যে সব স্বেচ্ছাচারী শাসকরা রাজত্ব করেছেন তাদের ধারাও শেষ হবে এবং ভারতবর্ষের মানুষ রাজনৈতিক চেতনা লাভ করবে। হিতবাদীদের মধ্যে জেমস মিল ভারতীয় ঐতিহাসিক চিন্তাধারার ওপরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তার “ব্রিটিশ-ভারতের ইতিহাস’’-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক বোধহয় তা এক হিসেবে ভারতীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার সূচনা করেছিলো এবং পরে দ্বিজাতিতত্ত্বের ঐতিহাসিক সমর্থন জুগিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ভারতীয়
    ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করার রীতি প্রচলন করেন। এই তিনটি অধ্যায় হলো হিন্দু সভ্যতা, মুসলমান সভ্যতা এবং ব্রিটিশ সভ্যতা ( বিচিত্র হলো, খৃষ্টান সভ্যতা নয় )।

    জেমস মিল
    ১৭৭৩-১৮৩৬

    মিল্‌ যে এরকম একটি কাঠামো জোর ক’রে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন তা তার হিতবাদী দর্শনের চিস্তাগত ও রাজনৈতিক পটভূমি থেকেই বোঝা যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হ’লো এই যে, পরবর্তী যুগের ঐতিহাসিকরা এই পর্ব-বিভাগ নির্বিচারে মেনে নিয়েছিলেন । একেবারে এখনকার কথা বাদ দিলে এই পর্ব-বিভাগের যৌক্তিকতা বিচারের কানো চেষ্টাই ভালভাবে করা হয়নি। মিলের লেখা ছিলো সাধারণভাবে স্বীকৃত সর্ধপ্রথম ভারতের ইতিহাস এবং এর প্রভাব এতোই বেশি যে এখনো অনেকে তার মূল ধারণাগুলিতে বিশ্বাস করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক ভারতীয় ইতিহাসকে অতীত,মধ্য এবং আধুনিক যুগে বিভক্ত করেন বটে, কিন্তু এই বিভাগের মূলেও আছে মিলের মতবাদ, অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশগুলির ধর্মের পরিবর্তন। ভারতীয় শাসন বিভাগের আমলাদের প্রাথমিক পাঠ্যসূচীর অন্তর্গত ছিলো মিলের ইতিহাস এবং উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের অধিকাংশই এই শ্রেণী থেকে এসেছিলেন। মিলের ইতিহাসের আর একটি দিক হ’লো। হিন্দু সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিরূপতা। তিনি একে বর্ণনা করেছেন পশ্চাদমুখী এবং প্রগতি ও যুক্তির পরিপন্থী হিসেবে । তিনি যার নাম দিয়েছেন “মুসলমান সভ্যতা” সে-বিষয়ে তিনি একটু বেশি সহানুভৃতিশীল ছিলেন, যদিও সে সম্পর্কেও তিনি কখনো-কখনো বিরূপ সমালোচনা করতে ছাড়েন নি । এর ফলে প্রাচ্যবাদীদের একটি অংশ এবং পরবর্তাকালের ভারতীয় ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ কিছুটা বাধ্য হয়েই ‘হিন্দুসভ্যতা’র সমর্থন করেছেন, যদিও তার জন্যে তাদের প্রাচীন অতীতকে অতিরিক্ত গৌরব দান করতে হয়েছে।

    বিশ শতকের গোড়ার দিকের ভারতীয় ঐতিহাসিকরা জাতীয় আন্দোলনের দ্বারা স্বভাবতঃই প্রভাবিত হয়েছিলেন। নিজেদের জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক না বললেও তাদের ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যায় প্রায়ই জাতীয়তাবাদী মনোভাবের ছাপ থাকতো । তারা প্রাচ্যবাদীদের রচনাবলির ওপর আরো বেশি ক’রে নির্ভর করতেন এবং আবার শুরু হলো প্রাচীন ভারতের (এখন থেকে যা প্রায়ই ‘হিন্দু ভারত’ ব’লে অভিহিত হতে লাগলো) গুণগান। প্রাচ্যবাদীদের কাজের তাই দু’ধরনের ফলাফল দেখা যায়ঃ অতীত ভারতের পুনরাবিস্কারের পথিকৃৎ হিসেবে তারা জাতীয়তাবাদীদের অতীত সম্বন্ধে আগ্রহের ভিত্তি স্থাপন করেন; এরই সঙ্গে আবার ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমর্থন কারে তারা অতীতের অন্ধ পুজারীদের হাতে অস্ত্র যোগান।

    অতীতের গৌরবগান নিশ্চয়ই কিছুদূর পর্যন্ত ন্যায্য ছিল, কারণ সব জাতীয় আন্দোলনেই তা দেখা যায়। এই ধরনের আন্দোলনে দেশজ ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্র দেশজ ঐতিহ্য বলতে ঐতিহাসিক সংস্কৃতি আদি নিদর্শন বোঝায়। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যেখানে আছে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, অতীতপুজা সেখানে বর্তমানের লাঞ্ছনার মধ্যে সান্তনা আনে। ফলে যাঁরাই অতীতের সমালোচনা করেন, তাদের প্রায় সর্বদাই জাতীয়তাবাদবিরোধী ব’লে মনে করা হয়। অতীত মাহাত্ম্যকীর্তনের একটি প্রতিক্রিয়া হ’লোঃ প্রথম যুগের ভারতীয় সমাজে কোনোরকম দ্বন্দ্ব বা বিরোধের, বিশেষত সামাজিক-অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধের অস্তিত্ব স্বীকার করার অনিচ্ছা । ধর্মশাস্ত্র প্রমুখ তত্ত্বগ্রন্থগুলিকে প্রাচীন ভারতের বাস্তবচিত্র বলে গ্রহণ করা হ’লো এবং এর ফলে সেযুগের জীবনকে একেবারে আদর্শ ব’লে ধ’রে নেওয়া হলো । ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের পেছনে যে সমস্ত লক্ষ্য বা অভিপ্রায় কাজ করে, সেগুলির বিশ্লেষণ করা আধুনিক ইতিহাসচর্চার একটি প্রধান অঙ্গ। কিন্তু এই ধরনের বিশ্লেষণের কোনো চেষ্টা আগেকার ঐতিহাসিকরা করেন নি । আগেকার দিনের অধিকাংশ ঐতিহাসিক আসতেন ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ পরিবার থেকে, কারণ এই সব বর্ণের লোকেরাই প্রধানত সেযুগে সংস্কৃতচর্চার সুযোগ পেতেন। সুতরাং সংস্কৃত উপাদানগুলির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ বিশেষ হ’তোনা । বিদেশী শাসন থেকে মুক্তিলাভ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি যেসব মূল্যবোধ জাতীয় আন্দোলনের পক্ষে অপরিহার্য ছিলো, অতীতযুগের তাদের সন্ধান চলতে লাগলো এবং অতীতেও তাদের অস্তিত্ব ছিলো একথা ধরে নেওয়া হ’লো। উদাহরণম্বরূপ বলা যায়, বিদেশী শাসনের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন ছিলো, কেননা উত্তরভারতের ইতিহাসে খৃষ্টপূর্ব ৬০০ সাল থেকে ৫০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বারবার বিদেশী আক্রমণ ও অধিকারের নিদর্শন আছে।

    আর্টওয়ার্ক: ভারতমাতা
    শিল্পী: মকবুল ফিদা হুসেন
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হ’লো তারা কেউই মিলের পর্ব-বিভাগ সম্বন্ধে কোনো রকম প্রশ্ন তোলেননি।
    অংশত এর কারণ হ’লো  সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসকে প্রায় সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে রাজনৈতিক ও রাজবংশের ইতিহাপচর্চায় নিমগ্ন থাকা। ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে মুসলমান রাজবংশের সংখ্যা খুব বেড়ে যায়, তাই কেবল রাজবংশের ইতিহাসের কথা ভাবলে এ যুগকে “মুসলমানযুগ’’ বলে মনে হতে পারে। কিন্ত এই ধরনের পর্ব-বিভাগের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতের গুণগান মূলত হিন্দুযুগের গুণগান হয়ে
    দাঁড়ায়। এর ফলে দুই যুগের মধ্যে পৃথকীকরণ আরো বেশি অনড় হয়ে ওঠে।

    বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে ভারতের রাজনৈতিক জীবনে মুসলমান বিচ্ছিন্নতাবাদের সূচনার ফলে এই ব্যবধান আগে বেড়ে গেলো । হিন্দুশক্তির পতনের জন্যে মুলমানদের আগমনকে সহজেই দায়ী করা চলে; এর জন্যে বিশেষ বুদ্ধি খাটাতে হয় না। তুর্কিরা কী করে এত সহজে তাদের ক্ষমতা স্থাপন করলেন তা সেযুগের সমাজ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা অল্পই হয়েছে। “মুসলমান যুগ’’-কে অধপতনের যুগ বলে ধরে নেওয়া হলো এবং মনে করা হলো যে তার দুর্বলতার জন্যেই ব্রিটিশশাসন স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। তাছাড়া, একথাও বলা, হতো যে মুসলমান যুগে হিন্দু এবং মুসলমান এই দুই ‘জাতির’ উদ্ভব হয়েছিল এবং আধুনিক জাতীর রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর একমাত্র পরিণতি হতে পারে সমগ্র দেশকে হিন্দু ও মুললমান অধিকৃত দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রে ভাগ করা। একথা বিশেষ ভেবে দেখা হলো না যে ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং জাতি সমার্থক নয়। উনিশশো তিরিশ চল্লিশের দশকের সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে এই ব্যাখ্যা ও বিভেদ আরো তীব্র হয়ে ওঠে । পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে কিন্তু  সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকদের সমস্যার কোনো সমাধান হলোনা । বাস্তবে মুসলমান সংস্কৃতির সঙ্গে আজও হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের যুঝতে হচ্ছে। কাজেই তাঁরা চেষ্টা করেন হয় তাকে তুচ্ছ করতে, অথবা তার বিদেশীয়ানাকে বড়ো করে তুলতে।

    আমরা এতক্ষণ ভারতীয় ইতিহাসের পর্ব-বিভাগের সূত্রপাত বিষয়ে আলোচনা করলাম । এখন “হিন্দযুগ’ এই পরিভাষাগুলির যৌক্তিকতা বিচার করে দেখা যেতে পারে ।

    মনে করা হয় যে, খৃষ্টপূর্ব ১০০ সাল থেকে ১২০০ শ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত যে যুগ তা হলো হিন্দুযুগ, কারণ তখন সমস্ত উপমহাদেশের শাসক-বংশগুলি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলো । কিন্তু রাজবংশের ইতিহাসের ভিত্তিতেও এ যুগকে হিন্দুযুগ মনে করা সঠিক নয়, কারণ মৌর্য, ইন্দো-গ্রীসিয়, শক, কুষাণ প্রভৃতি বহু প্রধান রাজবংশই অহিন্দু ছিলো । অনেক রাজাই ছিলেন বৌদ্ধ, এবং হিন্দুবিদ্বেষী না হলেও তাঁরা সচেতনভাবে নিজেদের বৌদ্ধ বলে পরিচয় দিতেন। তাহলে কি আমরা মনে করবো যে খ্রষ্টপূর্ব ৫০০ সাল থেকে ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত একটি বৌদ্ধযুগ-ও ছিলো? আজকের ভারতে যদি যথেষ্ট সংখ্যক বৌদ্ধ থাকতেন, তাহলে হয়তো এ ধারণাটি-ও স্বীকৃতি পেতো । ‌

    ভগবত পুরাণ

    পর্ব-বিভাগের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু কথাটির প্রকৃত অর্থ কি, এপ্রশ্নও তোলা যেতে পারে। ভারত সম্পর্কিত প্রাক ইসলামীয় উপাদানসমূহে কথাটি পাওয়া যায় না। হিন্দ্ ( ইন্ডিয়া ) দেশে যাঁরা বাস করতেন তাদের বর্ণনা করার জন্যে প্রথমে আরবরা এবং পরে অন্যরা এটি ব্যবহার করতেন । অর্থাৎ “হিন্দু” সংজ্ঞাটি গোড়ায় হিন্দুরা নিজেরা  বা ব্যবহার করেন নি, এটি ছিলো একটি বিদেশী শব্দ যা পরে হিন্দুরা গ্রহণ করেছেন । আজকের দিনে আমরা যাকে হিন্দু বলে স্বীকার করি, অতীত যুগে তার প্রায় কোনো পরিচয়ই মিলবে না। আজকের অর্থে হিন্দুর উন্মেষ ঘটে গুপ্তযুগের পরে, পঞ্চম খ্রীষ্টাব্দে। প্রাকমুসলমান যুগের ভারত বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলি যে নিজেদের হিন্দু বা কোনো ঐক্যবদ্ধ ধর্মসম্প্রদায় বলে মনে করতেন না তার প্রচুর প্রমাণ প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক উপাদান থেকে পাওয়া যাবে। বৌদ্ধদের নিজস্থ ধর্সসংগঠনের যে রূপ ছিলো তা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক হিন্দুধর্মের, বিশেষত ভক্তি- সম্প্রদায়ের লক্ষণগুলি বিশেষভাবে মধ্যযুগেই দেখা দিলো, যদিও সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকরা এ যুগকে অবক্ষয়ের যুগ বলে মনে করেন।

    গোড়ার দিকে, অর্থাৎ সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত নিজেদের মুসলমানদের থেকে পার্থক্য নির্দেশের জন্য হিন্দুরা যে পরিভাষা ব্যবহার করতেন তারও আলোচনা করা উচিত। লক্ষণীয় হ’লো আজকের দিনে সেযুগের ইতিহাস লেখার সময় আমরা আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই একসঙ্গে “মুসলমান” ব’লে অভিহিত করি। কিন্তু আকরগ্রন্থগুলিতে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যস্ত এইসব বিভিন্ন লোকদের বর্ণনায় “মুসলমান” শবের ব্যবহার বিরল। সেযুগের আকর-গ্রন্থে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার না ক’রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সংজ্ঞার্থ ব্যবহার করা হ’তো। যেমন তুর্কিদের বলা হতো তুরস্ক এবং আরবদের বলা হ’তো যবন। পশ্চিম এশিয়া বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আগত গ্রীক, রোমীয়, আরব নির্বিশেষে সকলকেই যবন বলার রীতি ছিলো । সংস্কৃতি ‘‘যবন” কথাটি প্রাকৃত যৌনা থেকে গৃহীত এবং যোনা কথাটি এসেছে “অয়োনিয়া’’ থেকে। কারণ পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সর্বপ্রথম এবং ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপিত হয় আয়োনীয় গ্রীকদের।

    তুর্কি, পারসিক এবং আরবদের বর্ণনায় ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দটিও ব্যবহার করা হ’তো । এই শব্দটিও প্রাচীন এবং ঋগ্বেদে সর্বপ্রথম এর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেসৰ লোক অনার্য্ ভাষা-ভাষী ছিলেন এবং আর্য্ সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিলোনা প্রধানত তাদের সন্বন্ধেই শব্দটি ব্যবহৃত হ’তো । সুতরাং উত্তর ও মধ্যভারতের বিভিন্ন অংশের অনার্য্ ভাষী উপজাতিগুলিই ছিলো প্রথম ‘গুচ্ছ’। পরে শব্দার্থের প্রসার ঘটায় সব বিদেশীদের ক্ষেত্রেই কথাটি ব্যবহৃত হ’তে লাগলো। এখানেও  ‘ম্লেচ্ছ’ শব্দটি ধর্মীয় পরিভাষা নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সাংস্কৃতিক অর্থে ব্যবহৃত হ’তো। সুতরাং আরব ও তুর্কিদের যখন ‘ম্লেচ্ছ’ বলা হ’তো তখন তাদের ভিন্ন সংস্কৃতিসম্পন্ন বলেই বোঝানো  হতো। এবং তার। রাজনৈতিক শক্র বা মিত্র উভরই হতে পারতেন । ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আরব, পারসিক এবং তুর্কিদের বাণিজ্য ও যুদ্ধের মাধ্যমে যে রকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো তাতে বিরূপ ধর্মীয় মনোভাব থেকে থাকলে তা নিশ্চয়ই সেষুগের ঐতিহাসিক আকরগ্রস্থ-গুলিতে প্রকাশ পেতো। এই উপমহাদেশে তু্র্কিরা রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিঠিত হবার পরই প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে স্বাতন্ত্র্য –নির্দেশের সুচনা হয়। হিন্দুধর্মের নিজন্ব গঠন যেরকম ছিলো, তাতে তার পক্ষে ভিন্ন ধর্মের লোকেদের শুধুমাত্র ধর্মীয় সত্তা হিসেবে দেখা সম্ভব ছিলোনা।

    আর্টওয়ার্ক: আকবর
    শিল্পী: তুলসী
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    পরিশেষে বিচার্য যে মিলের পর্ব-বিভাগ যদি কেবল পরিবর্তনশীল বংশাবলীর ইতিহাসের ভিত্তিতে রচিত হয়, তাহ’লেও তা সমর্থনযোগ্য কিনা। ভারতের ইতিহাসকে শুধু গাঙ্গেয় উপত্যকাকেন্দ্রিক বংশধারার বিবরণমাত্র বলে মনে করলে এরকম একটি পর্ব-বিভাগ হয়তো ব্যবহার করা যায়। ত্রয়োদশ শতকের গোড়া পর্যন্ত সত্যিই এ অঞ্চলের রাজবংশগুলি মোটামুটিভাবে হিন্দুই ছিলো এবং তারপর থেকে এখানে একের পর এক মুসলমান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। কিন্তু সমগ্র উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এরকম পর্ব-বিভাগ মেনে নেওয়া যায়না। খুব ওপর ওপর দেখলেও সমস্যা দেখা দেবেঃ ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মুললমান রাজবংশগুলি স্থাপিত হয়েছিলো । যেমন আরবরা সিদ্ধুদেশ জয় করে সেখানে অষ্টম শতকেই তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। একাদশ শতকে পাঞ্জাবের একটি অংশ তুর্কি অধিকারভুক্ত হয় এবং ত্রয়োদশ শতকে উত্তর ভারতের বিরাট এলাকা জুড়ে তারা আধিপত্য বিস্তার করেন। দাক্ষিণাত্যে প্রথম মুসলমান রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয় চতুর্দশ শতকে। সুদূর দক্ষিণে মুসলমানের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় আরও বহু পরে। সুতরাং মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো একটি বিশেষ তারিখ দেওয়া যায় না। অধিকাংশ পাঠ্যতালিকায় খুব শিথিলভাবে কাল-নির্ণয় করা হয় ১০০০ খ্রীষ্টাব্দ অথবা ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ যদিও এই তারিখটি কেবলমাত্র উত্তর ভারতের একটি অংশের সম্বন্ধে ব্যবহার করা যায়।

    ভাষাগত প্রমাণের ওপর নির্ভর ক’রে বহিরাগত একটি আর্যজাতি অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন। তাদের মতে এই জাতি উত্তর-ভারতে এসে পাঞ্জাব ও গাঙ্গেয় উপত্যকায় বসবাস করতে শুরু করে, এবং যে সভ্যতা গড়ে তোলে তার বিষয়ে আমরা বৈদিক সাহিত্যের মাধ্যমে জানতে পারি। গত তিরিশ বছরে এমন অনেক প্রত্বতাত্ত্বিক তথ্য আমাদের গোচরে এসেছে যার ফলে আর্যসংস্কৃতি বিষয়ে আমরা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়েছি। এই সমস্যাটির অন্য কতকগুলি অংশও খুঁটিয়ে বিচার করার ফলে সমস্যাটি সম্বন্ধে আমাদের ধারণা অনেক বদলে গেছে। যেমন একটি স্পষ্ট ও পৃথক আর্যজাতির অস্তিত্ব প্রমাণ করা এখন খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুরূপ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্যসংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ বলে মনে করা এবং ধরে নেওয়া যে দেশজ সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে এই সংস্কৃতি তার ওপর আরোপিত হয়েছিলে। এ সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য অর্থপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র যখন আমরা মনে করি যে ‘‘আর্য’’ কথাটি একই ভাষাভাষী একটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নৃতাত্বিক অর্থে, কোনো জাতির বিষয়ে নয়। আমাদের একথাও মনে রাখতে হবে যে বৈদিক সাহিত্যে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ প্রতিফলিত হয়েছে, অবশ্য যদি কখনোই এ দুটি সম্পূর্ণ-ই পৃথক সত্তা হ’য়ে থাকে।

    আর্টওয়ার্ক: গনেশা
    শিল্পী: সুজাতা
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    আজ পর্যন্ত যেসব স্বীকৃত ইতিহাস গ্রন্থ লেখা হয়েছে তাতে এই ধরনের সাম্প্রতিক গবেষণার প্রভাব খুবই বিরল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপরীত ধারার প্রতিই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যার ফলে যারা আর্যসভ্যতার গৌরব কীর্তন করতে চান তাদের সুবিধে করে দেওয়া হয়েছে। আর্যসংস্কৃতির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবার জন্য হরপ্পার সভ্যতাকে পর্যন্ত আর্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা কো হয়, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য এর সম্পূর্ণ বিপক্ষে। ভারতবর্ষকে আর্যদের বাসভূমি বলে প্রতিপন্ন করারও চেষ্টা হয়ে থাকে। এর ঐতিহাসিক যাথার্থ্য যাই হোক না’কেন, আসলে এর উদ্দেশ্য হলো একটি ভুয়ো জাতীয় অহমিকাকে প্রশ্রয় দেওয়া। এবং যে আর্যসংস্কৃতিকে কেউ কেউ ভারতীয় সভ্যতার মূল বলে মনে করেন তাকে সম্পূর্ণ দেশজ বলে প্রমাণ করা। নিঃসন্দেহে এঁদের পক্ষে স্বীকার করা খুবই কষ্টকর যে বৈদিক সভ্যতা মূলত এবং সম্পূর্ণত ভারতীয় ছিলোনা। আর্যসস্কৃতির যে পরিমাণ গুণগান করা হয় তার ফলে ঠিক সে পরিমাণে ভারতীয় ইতিহাসের হিন্দু ব্যাখ্যার শক্তিবৃদ্ধি করা হয়। বৈদিক সাহিত্যে যে সভ্যতার কখা আছে তা যে প্রধানত দেশজ একথা তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যায়। কিন্ত এর পর উচিত ছিলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে প্রাক-বৈদিক সভ্যতাগুলির অনুশীলন করে বৈদিক সভ্যতার উদ্ভবে তাদের কতটা অবদান আছে তার পর্যালোচনা করা। যারা জোর করে বলার চেষ্টা করেন যে ভারতীয় ইতিহাসে আর্যসংস্কৃতির বিশেষ প্রাধান্য ছিলো, তারা প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেন এবং সাহিত্যিক উপাদানগুলিরও যথোচিত বিশ্লেষণ করেননা। সবচেয়ে শোচনীয় হলো যে, আর্য জীবনযাত্রার বর্ণনাও পুরোপুরি ঠিক হয়না । যেমন আর্যরা কোনো উপলক্ষে গোমাংস খেতেন না বা মদ্যপান করতেন না, একথা বলার অর্থ হলো সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যকে একেবারেই অস্বীকার করা।

    আর্যসমস্যা ছাড়াও অন্য কয়েকটি সমস্যা সম্বদ্ধেও আমাদের পূর্ণ-বিবেচনা প্রয়োজন। গুপ্ত আমলের স্বর্ণযুগের তত্ত্বটি পরস্পর বিরোধিতায় ভরা। একথা বলা হয় যে, তা ছিলো হিন্দু নবজাগরণের যুগ, অথচ সেষুগের প্রধান শিল্পনৈপুণ্যের নিদর্শন মেলে বৌদ্ধ চিত্রকলায় ও ভাস্কর্যে যা বৌদ্ধমঠগুলির অনুপ্রেরণায় নির্মিত হয়েছিল । বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এই কৃতিত্ব ছিলো অংশত দেশজ এবং অংশত বিশ্বজনীন। প্রথমদিকের ঐতিহ্য, অর্থাৎ চরক, শুশ্রুত, আর্যভট এবং কিছু পরে বরাহমিহিরের কাজের ধারা থেকে একথা বোঝা যায়। যদিও অহিংসাকেই হিন্দু ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ অবদান বলে মনে করা হয় তবুও সমুদ্রগুপ্তের গৌঁরব-কীর্তনের প্রধান ভিত্তিই হলো তার সামরিক বিজয়। হিন্দু নবজাগরণের প্রধান নিদর্শন তাহলে রয়েছে কালিদাসের রচনায়, প্রথমদিকের পুরাণগুলিতে এবং গুপ্তরাজাদের মুদ্রা ও শিলা-লিপিগুলিতে, যা থেকে মনে হয় তারা হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাহলে এই হিন্দু জাগরণকে কি ‘স্বর্ণযুগে’র অপরিহার্য অংশ ব’লে মনে করা যায়?

    প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস-সম্পর্কে এমন অনেক ধারণা প্রচলিত আছে যেগুলি সরাসরিভাবে সাম্প্রদারিক না হলেও সহজেই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিলে যেতে পারে। এর কারণ এই ধারণাগুলির ঐতিহাসিক যথার্থ্য প্রায় কখনোই বিচার করা হয়না । এরকম একটি ধারণা হলো ভারতীয় সংস্কৃতির আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে স্বতঃসিদ্ধ বিশ্বাস। আজকের দিনে কথাটি ধরে নেওরা হয়েছে যে ভারতীয়রা সর্বদাই আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চিন্তায় নিমগ্ন থেকেছেন এবং দৈনন্দিন জীবনের পার্থিব ব্যাপারকে তুচ্ছ করেছেন। কিন্তু এই ধারণাটি মোটামুটি সাম্প্রতিক, কারণ উনবিংশ শতকের লেখকরা এটিকে ব্যাপকভাবে প্রচলিত করেন। প্রাচীন ভারতে যাঁরা রামরাজ্য অনুসন্ধান করতেন এবং যাঁরা বিশ্বাস করতেন যে এই ধারণাটির ফলে ভারতীয়রা দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলি (অর্থাৎ যন্ত্রশিল্পের প্রচলন, প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি এবং বিদেশী শাসন থেকে মুক্তিলাভ) সম্বন্ধে উদামীন হয়ে পড়বেন, তারাই এই মতবাদের প্রবক্তা। ভারতীয় পণ্ডিতরা এই ধারণাটিকে সোৎসাহে স্বাগত জানালেন কারণ এর ফলে তাদের পরাধীনতার গ্লানি শান্ত হলো । খুব কম লোকেই প্রশ্নটিকে যথার্থভাবে আলোচনা করতে বাজি ছিলেন। আধ্যাত্মিকতা ঠিক কাকে বলে, এবং সমগ্র সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে তা কি বুঝায়? বেশিরভাগ লোক মনে করতেন ভারতীয় সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক উপাদানের অর্থ ছিলো নিশ্চিত অবকাশের সুযোগে অনন্তের ধ্যান করা। কিন্তু আধ্যাত্মিকতা তো ভারতীয় সংস্কৃতির একচেটিয়া ছিলোনা। ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা বলতে যা বোঝায় তা অন্য অনেক প্রাচীন সংস্কৃতির মধ্যেও পাওয়া যায় এবং ঐতিহ্য অনুগামী বহু সমাজেই তার পরিচয় মেলে। একথায় বিস্মিত হবার কিছু নেই যে, প্রাচীন ভারতীয়রা কখনোই নিজেদের নিকট বা দূরের প্রতিবেশীদের চেয়ে বেশি অধ্যাত্মবাদী বলে মনে করতেন না। গ্রীক, চীনা, আরব ইত্যাদি অন্যান্য বিশিষ্ট সভ্যতাসম্পন্ন দেশ থেকে যে সব পর্যটকরা ভারতে আসতেন তারাও এখানে কোনো অসাধারণ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক লক্ষণ দেখতে পান নি। আরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো সমাজের কোন্‌ শ্রেণী আধ্যাত্মিক কার্যকলাপে অর্থাৎ অনন্তের ধ্যান, অতীন্দ্রীয় ভাব, আর দার্শনিক চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন? স্বভাবতই তারা সংখ্যায় অত্যন্ত অল্প । সমগ্র আর্য সম্প্রদায়ের খুবই ছোটো একটি অংশ উপনিষদের অনুশাসনগুলি মেনে চলতেন। এমন কি, ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলিও ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী রচনা করেছিলেন। এই ধরনের সাহিত্য যে আজও টিকে আছে তার মানে এই নয় যে সমাজের সব লোকই পুরোহিত এবং ঋষি ছিলেন। বৈদিক সাহিত্যই প্রমাণ করে দেয় যে সেই সম্প্রদায়ের লোকেরা দৈনন্দিন জীবনের পার্থিব ব্যাপারগুলি সম্বন্ধে যথেষ্টই অবহিত ছিলেন। খ্রীষ্টাব্দের প্রথম কয়েকটি শতকে বহু নতুন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও দার্শনিক চিন্তাধারা বেশ সক্রির ছিলো; অথচ এই যুগের সৃষ্টিশীল সাহিত্য, যেমন কালিদাসের নাটক থেকে, রাজসভায় অধ্যাত্মবাদের বিশেষ কোনো অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায় না। হিন্দু অধ্যাত্মবাদ সম্পর্কে সবচেয়ে খাঁটি কথা বোধহয় হিন্দু ঐতিহ্য থেকেই জানা যায়। এখানে মানুষের চতুর্বর্গ সম্বন্ধে বলা আছে, তা হলো ধর্ম, অর্থ কাম ও মোক্ষ। এর মধ্যে কেবল শেষোক্ত অবস্থারই লক্ষ্য বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকতা । সুতরাং পার্থিব সম্পদ ও সুখকে যথোপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং— চতুরাশ্রমের মধ্যে সুসামঞ্জস্য ও সংগতিই তার লক্ষ্য।

    ভারতীয় সংস্কৃতির আধ্যাত্মিক ভিত্তির আর একটি দিক হলো অহিংসা। জাতীয় আন্দোলনে গান্ধীর অহিংস নীতির অনুষঙ্গে এই দিকটি বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। ভারতীয় দর্শনচিস্তায় অহিংসাতত্ত্বের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বৌদ্ধ এবং জৈন দর্শনের মূল ও হিসেবে এই চিন্তা প্রথম তাত্ত্বিক স্বীকৃতি পায়। অবশ্য দর্শন হিসেবে অহিংস ভারতের একচেটে সম্পত্তি নয়। প্রথম দিকের খ্রীষ্টধর্ম একই মত প্রচার করেছিলো, যদিও তার তুলনায় বৌদ্ধশিক্ষায় এর গুরুত্ব অনেক বেশী ছিল। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষে বেশিদিন টে’কেনি। অহিংসার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক তাৎপর্যের মধ্যে তফাৎ করা দরকার । কার্যতঃ হিংসা-নীতি কতটা পরিহার করা হতো, সে-বিষয়ে অল্পই প্রমাণ আছে। আক্রমণ প্রায়ই হিংসাত্মক রূপ নিতো। ভারতীয় ঐতিহ্যে অনেক বড়ো বড়ো ঘটনাই হিংসার সঙ্গে জড়িত। মহাভারতের যুদ্ধ ও ভগবদ্গীতা তার উদাহরণ।

    আর্টওয়ার্ক: অশোকা
    শিল্পী: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এর একমাত্র উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলেন সম্রাট অশোক, যাঁর চরিত্রের অসাধারণত্ব শুধুমাত্র ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক পটভূমিকাকে ছাপিয়ে উঠেছে। অত্যন্ত নির্দয় সামরিক অভিযানের পর তিনি ধীরে ধীরে অহিংসার পথ গ্রহণ করেন এবং তার চাইতেও বড়ো কথা, তিনি অহিংসাভিত্তিক একটি রাজনীতির সূচনা করেন। কিন্তু সমস্ত বিশিষ্ট ক্ষমতাবান ঐতিহাসিক চরিত্রের মধ্যে একমাত্র তিনিই এই নীতির প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সম্বন্ধেও অনেক বিচিত্র পরম্পর-বিরোধী মত আছে। একদিকে যেমন অহিংস নীতির জন্যে তাঁর প্রশংসা করা হয়, অন্যদিকে মৌর্যসাম্রাজ্যের পতনের জন্যেও অনেকে তাঁকে দায়ী করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এই সমালোচনা শোনা যায় যে অহিংসা-নীতির ফলে দেশ সামরিকভাবে দুর্বল ও নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলো এবং উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে নি। অজাতশক্র, চন্দ্রগুপ্ত, মৌর্য, কণিষ্ক সমুদ্রগুপ্ত হর্ষ, দ্বিতীয় পুলকেশিন্‌, মহেন্দ্রবর্মন, পল্লব, রাজেন্দ্র চোল প্রমুখ প্রথমদিকের ভারতীয় ইতিহাসের মহাবীররা বিজেতা বলেই বীরের সম্মান পেয়েছেন। ভিনসেপ্ট স্মিথের অনুকরণে বছরের পর বছর ইতিহাসের হাজার হাজার ছাত্র সমুদ্রপ্তকে ভারতের নেপোলিয়ন আখ্যা দিয়ে এসেছেন—  রাজা এবং উপজাতীয় সর্দারদের একের পর এক পরাজিত ও উচ্ছেদ করেছিলেন বলে তার যশোগান করেছেন। এর মধ্যে অহিংসার স্থান কোথায় তা বোঝা শক্ত।

    আর একটি প্রসঙ্গেও দৃষ্টিভঙ্গির অসঙ্গতি দেখা যায়। বেশির ভাগ প্রচলিত ইতিহাসের বইতে গজনীর মামুদ মন্দির ও প্রতিমা ধ্বংস-কারীরূপেই চিত্রিত হয়েছেন । ধরে নেওয়া হয় যে এই কাজের সহজ ব্যাখ্যা হ’লো তিনি মুসলমান। ইসলামধর্ম প্রতিমা পুজার বিরোধী, তাই শুধু একজন মুসলমানই মন্দির ও প্রতিমা ধ্বংস করতে পারেন। এ কথাও ধরে নেওয়া হয় যে, সব মুদলমান শাসকই প্রতিমা ধ্বংস করতে উদ্যত থাকতেন, যদি না অন্য কোনো বাধা এসে তাঁদের নিবৃত্ত করতো। মামুদের ব্যবহারের অন্য কোনো কারণ খোঁজবার বিশেষ চেষ্টা করা হয়না। হিন্দুরাজাদের মধ্যেও কেউ কেউ মন্দির ও প্রতিমা ধ্বংস করেছিলেন কিনা এই প্রশ্নটি উঠলেই অবশ্য অন্য ধরনের যৌক্তিকতা খোঁজা হয়। একাদশ শতকে কাশ্মীরে হর্ষ নামক একজন রাজার কথা জানা যায়, অত্যন্ত সগঠিতভাবে মন্দির ধ্বংসের কাজে লেগেছিলেন। কলহনের রাজতরঙ্গিনী থেকে জানা যায় যে হর্ষ ‘‘দেবোৎপাটননায়ক” (আক্ষরিক অর্থে, যিনি দেবতাদের উৎপাটিত করার কাজে নিযুক্ত হয়েছেন) নামে বিশেষ একজন কর্মচারীকে নিযুক্ত করেছিলেন যার প্রধান কাজ ছিলো মন্দির লুঠ করা। একথা বলা যায় না যে, তিনি স্বভাবতই একজন কালাপাহাড় ছিলেন— আসলে তার মন্দির লুঠের উদ্দেশ্য ছিলো অর্থসংগ্রহ, যা তিনি অন্য কাজে ব্যবহার করতেন।

    এতক্ষণ পর্যন্ত যেসব মন্তব্য করা হয়েছে তার উদ্দেশ্য শুধুই সাম্প্রদারিক দৃষ্টিভঙ্গির নিন্দা করা নয়। এই মন্তব্যর পেছনে দুটি প্রধান অভিপ্রার আছে। প্রথমতঃ ইতিহাসের দাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা হলো নিম্নমানের ইতিহাস রচনা। প্রত্যক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক না হয়েও যেক্ষেত্রে মানসিক জড়তার ফলে প্রচলিত মতগুলিই গ্রহণ করা হয়, সেক্ষেত্রেও ইতিহাস রচনা নিম্নমানের হবে। ইতিহাস হ’লো একটি অগ্রগামী বিদ্যা যাতে নতুন গবেষণার রীতি এবং বিশ্লেষণের কৌশল ব্যবহার করা হয়। ইতিহাস রচনার ধারা পর্যবেক্ষণ করলে এইসৰ কৌশলের পরিবর্তন পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।’ প্রচলিত ধারণাগুলি সর্বদাই যাচাই করা উচিত এব সাক্ষ্য-প্রমাণ দুর্বল হলে তাদের বর্জন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয় কারণ সাম্প্রতিক পরিস্থিতি।
    মিথ্যা ইতিহাস রাজনীতিমূলক উপকথা রচনায় সাহায্য করছে—ঐতিহাসিকরা তাঁদের অধীত বিদ্যায় এই অধঃপতন মেনে নিতে পারবেন না। যেহেতু ঐতিহাসিকরা সচেতনভাবে অথবা অচেতনভাবে চিন্তার দিক দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্বাসের জনক হতে পারেন, সেজন্য ইতিহাসের বিশ্লেষণ রাজনৈতিক মতবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বলাভ করে।

    প্রাচীন ভারতের ইতিহাসচর্চায় আজকাল ক্রমশ নানাধরনের নতুন অনুসন্ধান পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে, নতুন ধরনের উপাদান কাজে লাগানো হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের ক্ষেত্রেই আবদ্ধ নয়, সব প্রাচীন সভ্যতার চর্চাতেই এই পদ্ধতি অনুসৃত। এর কারণ হলো সমাজবিজ্ঞান, বিশেষ করে নৃতত্ত্ববিদ্যা ও প্রত্নতত্ত্ব গবেষণার অগ্রগতি। তাছাড়া সব ধরনের সমাজের সুষ্ঠু আনুক্রমিক-চর্চার ফলে প্রাচীন সমাজের ঐতিহাসিক অনুশীলনে নতুন পরিপ্রেক্ষিত দেখা দিয়েছে।

    এসবের ফলে সাহিত্যিক উপাদানের বিশ্লেষণী অনুশীলনে অনেক উন্নতি হয়েছে প্রাচীন অতীতের ওপর নতুন আলোকপাত করে। এই ধরনের বিশ্লেষণে অনেক প্রশ্ন ওঠে। প্রথমত, যে পুঁথিটি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা কী তত্ত্বমূলক আলোচনা, না বাস্তব অবস্থার বর্ণনা? ধর্মশান্ত্রগুলি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার সময় এই প্রশ্নটির বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা আছে। যদি সর্বদাই একথা মনে রাখা হয় যে প্রকৃতপক্ষে শাস্ত্রগুলি আইনের দলিল এবং এগুলি সবসময় বাস্তব পরিস্থিতির বর্ণনা না করে ব্যবহারের, ওচিত্য বিচার করে, তাহলে প্রাচীন ভারতের সমাজচর্চা আরো অনেক সঠিক হবে। জাতিভেদ প্রথার বর্ণনায় ধর্মশস্ত্র গুলিতে যে বর্ণবিভাগের আলোচনা আছে, তা একসময় প্রামাণিক ব’লে ধ’রে নেওয়া হ’তো। সমাজবিজ্ঞানের আলোয় এই বিশ্বাসের এখন পুনর্মুল্যায়ন হচ্ছে।

    দ্বিতীয়ত উপাদানগুলিকে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। কোনো একটি বিশেষ উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে কি সমগ্র সমাজের প্রতিফলন পাওয়া যায়, না বিশেষ একটি গোষ্ঠীর? প্রাচীন সাহিত্যের যেটুকু নিদর্শন পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই রাজা, প্রধান পুরোহিত, ‘মঠ-বিহার, সমৃদ্ধ বণিক প্রমুখ সমাজের অভিজাত শ্রেণীদের সম্পর্কে । ফলে সমাজের ওপরতলার বিষয়েই অনেক বেশি খবর আমরা পাই। তাছাড়া, অধিকাংশ ঐতিহ্যানুসারী পুরানো সমাজে ওপরতলার লোকেরাই কেবল শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন এবং সেই কারণে একমাত্র তারাই পারতেন সাহিত্যের মাধ্যমে তাদের কাজকর্মের বিবরণ রেখে যেতে । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে কালিদাসের নাটক থেকে রাজা ও রাজসভার সদস্যদের চমৎকার ঐতিহাসিক বর্ণনা মেলে কিন্তু সমগ্র ভারতীয় সমাজের সবশ্রেণীর লোকই যে তার নাটকের চরিত্রদের মতো কাজ করতেন, এরকম ভাবা, অত্যন্ত অনৈতিহাসিক হবে। তাই সমগ্র ছবিটি পেতে গেলে অন্য ধরনের উপাদান খোজা এবং ব্যবহার করা উচিত।

    আদি যুগের বৌদ্ধ সাহিত্য  ব্রাহ্মণ্যসাহিত্যের উৎকৃষ্ট পরিপূরক, কারণ তাতে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজের অপর এক অংশের কার্য-কলাপ, কেননা উপাদানগুলি বিচ্ছিন্নভাবে যেহেতু সমাজের বিশেষ গোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতিফলন, সেজন্য তা একদেশদর্শী হতে বাধ্য। নানাধরনের উপাদান সর্বদা ব্যবহার করার চেষ্টা যে কতটা জরুরি তা এ থেকেই বোঝা যায় যে, শুধু ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির উপকরণের ওপর নির্ভর করলে সম্রাট অশোকের রাজত্বের বিবরণ কিছুই পাওয়া যেতো না। পুরাণের রাজবংশ তালিকায় তাকে শুধু একজন মৌর্য রাজা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তার শাসনের বিষয় আমরা জানতে পেরেছি ব্রাহ্মণ্যসাহিত্য থেকে নয়, তার নিজের শিলালিপি এবং বৌদ্ধ উপাদান থেকে।

    ব্রাহ্মণ্যসাহিত্যে চার্বাক ও লোকায়তদর্শনও বিস্ময়করভাবে প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। বস্তুবাদী দর্শনের ধারার অস্তিত্বের প্রমাণ আমরা বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবিক সাহিত্যে এবং দু-একটি শিলালিপি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পেয়েছি।

    আর্টওয়ার্ক: কথাকলি
    শিল্পী: শৈলেশ
    সূত্র: মোজার্ট

    প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিকদের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্পূর্ণ প্রাথমিক উৎস হলো প্রত্নতত্ত্ব। প্রত্নতাত্বিক খননকার্য-প্রণালী আজ এতদূর উন্নত হয়েছে যে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য ইতিহাস রচনায় নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য হতে পারে। দুঃখের বিষয় প্রাচীন ভারত নিয়ে যে সব ঐতিহাসিকরা কাজ করেছেন তারা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান খুব কমই ব্যবহার করেছেন। সাহিত্যিক উপাদানে প্রধানত সমাজের অভিজাত শ্রেণীর জীবনযাত্রার কথা জানা যায়, কিন্ত প্রত্নতত্ত্ব থেকে শুধু ওপর তলাকার নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের কথাও আমরা জানতে পারি। খননকার্যের দ্বারা বাসস্থান, শহর প্রভৃতি পুরাকীর্তিগুলির পুনরুদ্ধারের ফলে সর্বস্তরের মানুষের কথা জানা যায়। সাহিত্য থেকে এখনে পর্যন্ত প্রধানত রাজবংশতালিকা এবং রাজাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে । প্রত্নতত্ত্বে রাজাদের নাম নিয়ে ব্যস্ত নয়। হরপ্পার বিভিন্ন শ্রেণীর নাগরিকদের সম্বন্ধে আমরা আজ এতো খবর জানতে পেরেছি যে তাদের দৈনন্দিন জীবনের ছবি পুনরুদ্ধার করা খুব শক্ত নয় যদিও তাদের একজন শাসকের নামও আমরা জানিনা। প্রত্নতত্ত্ব তাই প্রমাণ করেছে যে রাজবংশতালিকা কারো-কারো মনে কৌতূহল জাগালেও অতীতের প্রকৃত অনুসন্ধানে তার গুরুত্ব অল্পই। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান এইভাবে প্রাচীন ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

    প্রত্নতত্ত্বের একটি গুরুত্ব হলো তা আমাদের জ্ঞানের ফাঁকগুলি ভরিয়ে দিতে সাহায্য করে। প্রাচীন সাহিত্যে যে সব কাল্পনিক গল্প আছে তাদের ওপরে নির্ভর করে নয়, প্রত্নতত্ত্বের বাস্তব উপাদানের ভিত্তিতেই আমরা আজ সুদূর অতীতে ভারতীয় ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করতে পারছি। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো যে ভারতসভ্যতার ভিত্তি— হরপ্পা এবং হরপ্পা পরবর্তী সস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের ধারণা আজ স্পষ্টতর হয়েছে। ইন্দো-গাঙ্গেয় উপত্যকায় আর্যসভ্যতার আবির্ভাব কোনো সাংস্কৃতিক মরুভূমিতে ঘটেনি। তৎকালে প্রচলিত ও পূর্ববর্তী সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে একে আজ বিচার করতে হবে।

    প্রত্নতত্ত্বের তথ্য হলো খননকার্যের দ্বারা প্রাপ্ত কীর্তিগুলি এবং সেই তথ্যের আলোতে সাহিত্যিক উপাদান গৃহীত বা বর্জিত উভয়ই হতে পারে। গাঙ্গেয় উপত্যকার আদি বাসস্থানগুলি থেকে যে ধরনের চিত্রিত ধূসর মাটির বাসন পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে আমাদের এই ধারণাই হয়, যে তারা ছিলেন বেশ সাদাসিদে মানুষ, (নাগরিক) সভ্যতার পালিশবিহীন আদিম কৃষিজীবী। বৈদিক সাহিত্যে যে অতিরঞ্জিত ছবি আমরা পাই তার অনেকখানিই বোধ হয় সাহিত্যিক কল্পনা। হস্তিনাপুরের খননকার্যের ফলে অবশ্য সাহিত্যিক উপাদানের বিলক্ষণ সমর্থন পাওয়া গেছে । মহাভারতে যে প্লাবন ও ধ্বংসের কথা বর্ণিত আছে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে তার প্রমাণ মেলে । কৌশাম্বীতে সবচেয়ে পুরোনো যে অবশেষ পাওয়া গেছে তা হস্তিনাপুরের বন্যার সমকালীন। কৌশাম্বীতে যে রাজধানী স্থানাস্তুরিত করা হয়েছিল এটি তার একটি ইঙ্গিত। মৌর্যযুগ সম্পর্কেও সাহিত্যিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলি অনেক জায়গায় বেশ মিলে যায়।

    প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের আর একটি ফল হ’ল পরিসংখ্যান। মাটির বাসন, পুঁতি ও নানাধরনের ছোটখাটো যন্ত্রপাতি ইত্যাদি দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিষ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেছে। মৃৎকার্য যেমন সংখ্যাতাত্বিক অনুসন্ধানের উৎকৃষ্ট ভিত্তি। শুধু যে মাটির বাসনের আকার ও প্রকৃতি থেকে জীবনযাত্রা সম্বন্ধে তথ্যলাভ করায় তা নয়, বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে বিশেষ ধরনের মৃৎশিল্পের প্রাধান্য থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য বা লোকপ্রচারণের প্রমাণ মেলে । মৌর্যদের ঠিক পূর্ববর্তাকালে এবং মৌর্যযুগে উত্তরাঞ্চলের বিখ্যাত সুমসৃন কালো মাটির বাসন বা সেযুগে বিলাস সামগ্রীরূপে ব্যবহৃত হ’তো তা যেসব অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে তার এলাকা এবং মৌর্যসাম্রাজ্যের প্রকৃত পরিধি মোটাগুটি এক। মুদ্রা নিয়েও উৎকৃষ্ট সংখ্যাতাত্ত্বিক গবেষণা সম্ভব।

    শিলালিপিচর্চাকে সাধারণত প্রত্নতত্ত্বের অংশ হিসেবে দেখা হয় যদিও তা হ’লো প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের সংযোগস্থল। কোনো বিশেষ-যুগের তথ্য সন্ধানে সাহিত্যিক উপাদানের তুলনায় শিলালিপি সাধারণত অনেক বেশি সঠিক খবর দেয়। শিলালিপি নাতিদীর্ঘ হ’তে বাধ্য কারণ তা প্রস্তুত করা যথেষ্ট কঠিন। সুতরাং প্রশস্তিগুলি বাদ দিলে অধিকাংশ শিলালিপিতে অল্পকথায় জরুরি খবর দেওয়া থাকে। উপাদান হিসেবে সাহিত্যের তুলনায় শিলালিপির আরো একটি সুবিধে হলো একবার খোদাই হ’য়ে গেলে তার আর কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। সাহিত্যের পুনর্লিখন বা সম্পাদনা   কিন্তু বন্থ শতাব্দী ধরে চলতে পারে এবং এখানে নানারকম পরিবর্তন বা পরিবর্ধন খুবই সম্ভব। শিলালিপিতে শুধু রাজনীতি প্রসঙ্গে সংবাদ পাই না, অনেক সময় তার চাইতেও বেশি খবর জানা যায় সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে। গুপ্ত-পরবর্তী যুগের ভূদান বিষয়ক শিলালিপিগুলি আইনসম্মত দলিল ব’লে অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান এবং এগুলির ফলে সমগ্র যুগটি সম্বন্ধে আমাদের ধারণা বদলে যেতে পারে। উদাহরণন্বরূপ বলা যায় যে বহুদিন পর্যন্ত মনে করা হ’তো এইসময়ে বর্ণভেদপ্রথা আরো কঠোর ছিলো এবং তুর্কি ও আফগান আক্রমণের যুগে ভারতের দুর্বলতার এটি একটি বড়ো কারণ। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে বেশি কঠোর হয়ে ওঠা দূরে থাক, এযুগে বর্ণাশ্রম প্রথা যথেষ্ট শিথিল ছিলো।

    আর্টওয়ার্ক: ভর্তৃহরির নীতিশতক
    সংগ্রহ: রণদীপম বসু
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    প্রত্নতত্ত্বের বোধহয় প্রধান সুবিধা হলো ঐতিহাসিককে তা বাধ্য করে রাজবংশ ও রাজ-সম্পর্কিত ঘটনার নিষ্ফল গবেষণা ছেড়ে সমগ্র সমাজের অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণের দিকে যেতে। স্থাবর ভগ্রাবশেষ নিয়েই প্রত্নতত্ত্বের কারবার, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য পরিবর্তনের মধ্যে। ফলে প্রাচীন অতীতের সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিবিদ্যায় পরিবর্তন প্রভৃতি বহু উপেক্ষিত দিকগুলি প্রত্নতত্ত্ব আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাজবংশের ইতিহাস সামগ্রিক ইতিহাসের ছোটো একটি অংশমাত্র।

    সাহিত্যিক উপাদানের বিশ্লেষণ বা প্রত্নতত্ত্ব থেকে নতুন তথ্যের সন্ধান এমনিতে যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক উৎস সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণার বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতাও (শিক্ষা আর চেতনা উভয় অর্থেই প্রাসঙ্গিক) বিচার করে দেখতে হবে। রাজবংশের ইতিহাসের মূল কথা বংশতালিকা নয়, তা হলো ক্ষমতার সংজ্ঞা এবং বণ্টন। রাজাই কি ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন, নাকি বিভিন্ন ছোটো ছোটো সংগঠন এবং দপ্তরের মাধ্যমে তার বিকেন্দ্রীকরণ হতো? যদি প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের তথ্যটি, অথবা প্রাচীন ভারতীয় রাজার সর্বাঙ্গীণ প্রজারঞ্জনের ধারণাটির সমালোচনা করতে হয়, তাহলে সঠিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের সাহায্যে তা করতে হবে। কোনোক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কাঠামো বিষয়ে সঠিক ও সম্যক জ্ঞান ছাড়া ক্ষমতার নীতি নির্ধারণ করা যায়-না। ক্ষমতার নীতি বণ্টন বিষয়ে বুঝতে হলে সবচেয়ে বেশি দরকার অর্থনৈতিক বণ্টন ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান- শ্রম ও উৎপাদন, রাজস্ব আদায়ের এই দুটি ভিত্তি সম্বন্ধে উপলব্ধি। অর্থনীতিবহির্ভূভ অন্যান্য কারণগুলিরও (যথা ধর্মমোহ) গুরুত্ব আছে, কিন্ত একই পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলি বিচার্য। সামাজিক কাঠামো বুঝতে গেলে বর্ণভেদ প্রথার বিবর্তন অনুসন্ধান করতে হবে। বর্ণাশ্রমধর্মের নীতি অনুযায়ী সত্যিই কি সমাজ জীবন চলতো? তা’হলে এতো ক্ষত্রিয় রাজার আবির্ভাব হয়েছিল কী করে ? নীতি এবং বাস্তবের মধ্যে ফারাকের এটি একটি মাত্র উদাহরণ। অথবা এই ফারাক কি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যাপারেই ছিলো ? বর্ণাশ্রম প্রথার গড়ন ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কোন্‌ কোন্‌ ব্যাপারে মিল ছিলো ?

    এর চাইতেও, গুরুত্বপূর্ণ হ’লো নানাধরনের গোষ্ঠীর মধ্যে এনিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা অল্পই কাজ করেছেন।সব সমাজেই সংঘাত ও বিরোধের প্রকাশ থাকে, কিন্তু প্রাচীন ভারতের ক্ষেত্রে এগুলি প্রায় কখনোই সঠিকভাবে নিরূপিত বা আলোচিত হয়নি। প্রায়ই বিরোধগুলি এড়িয়ে চলার একটি ঝৌক দেখা যায়, অবশ্য যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা মধ্যযুগে আসি। তখন আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিক প্রাণপণে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের তালিকা নির্ণয়ে এবং সেগুলির গুরুত্ব উল্লেখ করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কিন্তু ১২০৬ সালের পরবর্তী ধর্মভিত্তিক হিন্দু-মুসলমান বিরোধগুলিও ঠিক মতো বুঝতে গেলে আগেকার বিরোধের চরিত্র জানা দরকার। প্রাচীন যুগে সিংহাসন দখল, রাজহত্যা এবং যুদ্ধ ইত্যাদি রাজনৈতিক বিরোধের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায়। বাকি সমাজের ওপর এদের কী ধরেনের প্রভাব পড়তো? ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বও দেখা দিতো। বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মতবিরোধ থেকেও নিশ্চয়ই তাদের নিজেদের ধরনের সংঘর্ষ বাধতো বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে খানিকট। অসহিষ্ণুতা না থাকলে সম্রাট অশোকের পক্ষে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রচার করার এত দরকার হতো না। ব্রাহ্মণ ও চার্বাকবাদীদের যে মতপার্থক্যের ফলে সমস্ত ব্রাহ্মণ্য দার্শনিক সাহিত্য থেকে চার্বাক চিন্তার সব চিহ্ন মুছে ফেলা হয়েছিলো, সে বিরোধের স্বরূপ কী ছিলো? বিশেষ বিশেষ ধর্মের প্রতি কেন বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী আকৃষ্ট হতেন, যেমন বৌদ্ধধর্মের প্রতি বণিকসম্প্রদায় ও রাজ-পরিবারের মহিলারা? সমগ্র ভারত ইতিহাসে অধিকাংশ জৈনরা কেন বণিকসম্প্রদায় থেকে আসতেন? বিরোধের মূলে কি এইসব হেতু ছিলো?

    আর্টওয়ার্ক: থ্রিডায়ানেস্টি
    শিল্পী: মকবুল ফিদাহ হুসেন
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    বিরোধ কখন সংঘর্ষের আকার ধারণ করতো, এ প্রশ্নটিও সমান প্রাসঙ্গিক। আর্যদের সঙ্গে দস্যু ও পাণিদের বিরোধ কী ধরনের ছিলো? প্রচলিত মতানুযায়ী সত্যিই কি তা বর্ণভিত্তিক ছিলো, না তা সাংস্কৃতিক বিরোধের ফলে ঘটেছিল? আদিবাসীদের সঙ্গে যাদের বহিরাগত মনে করা হ’তো, তাদের বিরোধের চরিত্র কি? গ্রীক সিথিয়ানরা কীভাবে ব্রাত্যক্ষত্রিয় নামে অভিহিত হলেন, ভারতীয়সমাজে কীভাবে তারা মিশে গেলেন? আরব ও তুর্কিদের সম্বন্ধে প্রাক-ত্রয়োদশ শতকের ভারতীয়দের ঠিক কী ধারণা ছিলো ?

    এই ধরণের প্রশ্ন তোলার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বুদ্ধির খেলা নয়। একমাজ এইসব প্রশ্নের ভেতর দিয়েই ইতিহাস চর্চা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে । দু’ভাবে এই প্রশ্ন গুলির প্রাসঙ্গিকতা বোঝানো যায়। প্রথমত, ভারত ইতিহাসে প্রত্যেক যুগ সম্বন্ধেই- এই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে এবং ওঠা সঙ্গত। সমাজ বিবর্তনের প্রতিস্তরেই এগুলি সঙ্গত প্রশ্ন। ভারত ইতিহাসের যথার্থ ধারাবাহিকতা এইসব প্রশ্নের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা থেকেই ধরা পড়বে। দ্বিতীয়ত, অতীতের নানাসময় সম্বন্ধে ধারণার ওপরে এগুলি আরো স্পষ্ট আলোকপাত করবে। তার ফলে আমরা লাভ করবো অতি মূল্যবান তুলনামূলক বিচারের অন্তর্দৃষ্টি এবং ভারত ইতিহাসের ধারা নির্ণয়ে কোন কোন হেতু প্রধান এবং কোনগুলি অ-প্রধান ছিলো তা বুঝতে পারবো। একমাব্জর তখনই ভারতীয় ইতিহাসের ওপর ইসলামীয় প্রভাবের সঠিক চরিত্রটি আমাদের বোধগম্য হবে এবং সেইসঙ্গে ভারত-অতীত সৃজনের পেছনে যত ধরনের শক্তি কাজ করেছে তাদের সম্বন্ধেও সত্য ধারনা জন্মাবে ।

     

     

  • নোম চমস্কি ।। মূলধারার গণমাধ্যম কীভাবে মূলধারা হয়ে ওঠে

    নোম চমস্কি ।। মূলধারার গণমাধ্যম কীভাবে মূলধারা হয়ে ওঠে

    অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

    সম্পাদকের নোট: নোম চমস্কির এই লেখাটি ১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল জেড নেটে। ২০০৭ সালে ড. মুসতাক আহমেদ সম্পাদিত “গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি” বইয়ে লেখাটির অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয়। এখানে সেটিরই আরেকটু পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হলো।

    নোম চমস্কি

    আমি কেন মিডিয়া বিষয়ে লেখালেখি করি, তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হলো: আমি এই পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিটা সম্পর্কেই আগ্রহী। এবং এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির যে অংশটির সাথে সহজেই বোঝাপড়া করা যায়, তা হলো মিডিয়া বা গণমাধ্যম। এটি প্রতিদিনই প্রকাশিত হয়। আপনি চাইলেই একটি নিয়মমাফিক পরীক্ষা চালিয়ে দেখতে পারেন। গতকালের জিনিসপত্রগুলোর সঙ্গে আজকের জিনিসপত্রগুলোর তুলনা করে দেখতে পারেন। সেখানে কোন জিনিসটা যাচ্ছে, কোনটা যাচ্ছে না, এবং কীভাবে বিভিন্ন বিষয় তুলে আনা হচ্ছে- এ সম্পর্কে আপনি প্রচুর তথ্যপ্রমাণ পাবেন।

    আমার মতে, কোনো স্কলারশিপ বা ধরেন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক জার্নালের থেকে মিডিয়া খুব আলাদা কিছু না। যদিও এখানে কিছু বাড়তি চাপ থাকে, কিন্তু এটি একেবারে ভিন্ন কোনো জিনিস না। এরা একে অপরের সাথে লেনদেন করে। একারণে মানুষ খুব সহজে এগুলোর মধ্যে আসা-যাওয়া করতে পারে।

    মিডিয়া বা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে গেলে আপনাকে সেটির দিকে গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে সেটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়ে। জানতে চান: পুরো সমাজে তাদের ভূমিকা কী? কীভাবে তারা অন্যান্য কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা-কাঠামোর সাথে সম্পর্কিত? আপনার ভাগ্য ভালো হলে, আপনি ঐ প্রতিষ্ঠানের তথ্য-ব্যবস্থার হর্তাকর্তাদের কাছ থেকে অভ্যন্তরীণ কিছু দলিলপত্র পেয়ে যাবেন। যার মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন তারা আসলেই কী করছে। (এটি মূলত এক ধরনের দীক্ষায়ণ ব্যবস্থা) । তার মানে এই না যে, জনসংযোগ দপ্তরের বিতরণ করা লিফলেটগুলো থেকে আপনি এগুলো পাবেন। তারা সত্যিই কী করতে চায়, তা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে যে কথাবার্তাগুলো হয়, সেখান থেকে আপনি পাবেন এই তথ্যগুলো। এরকম খুবই মজার মজার প্রচুর দলিলপত্র আছে।

    মিডিয়ার চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রে এই তিনটিই হলো তথ্য পাওয়ার সবচে বড় উৎস। এগুলোকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। যেভাবে একজন বিজ্ঞানী পর্যালোচনা করেন জটিল অনু-পরমাণু বা অন্য কিছুকে। এজন্য প্রথমে এর কাঠামাটির দিকে নজর দিন। তারপর এই কাঠামার ওপর ভিত্তি করে, মিডিয়া পণ্যগুলো কেমন হবে বলে মনে করছেন, তা অনুমান করুন। এবার মিডিয়া পণ্যগুলো নিয়ে অনুসন্ধান চালান এবং দেখুন যে, এটি আপনার অনুমানের সাথে কতোটুকু মেলে । মিডিয়া পণ্যগুলো বৈশিষ্ট্য এবং মিডিয়ার ধরন ও কাঠামো সম্পর্কে যে পরিষ্কার অনুমান, তার সঙ্গে এটি কতটুকু মেলে তা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। প্রায়োগিকভাবে এটিই মিডিয়া বিশ্লেষণের কাজের শেষ অংশ।

    তো, আপনি কী পেলেন? সবার আগে আপনি দেখবেন যে, অনেক রকম মিডিয়া আছে, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে। যেমন বিনোদন মিডিয়া (হলিউড, টেলিভিশন সিরিয়াল ইত্যাদি) অথবা দেশের বেশিরভাগ সংবাদপত্র। তারা জনগণকে দিক-নির্দেশনা দিচ্ছে।

    মিডিয়ার আরেকটি ধরন আছে। তা হলো: এলিট বা মহাজনী মিডিয়া । এগুলোকে কখনো কখনো বিষয়বস্তু নির্ধারণী মিডিয়াও বলা হয়, কারণ তাদের হাতে অনেক রিসোর্স থাকে। যেমন, নিউ ইয়র্ক টাইমস বা সিবিএস, এই ধরনের মিডিয়াগুলো। তারা একটি ছক তৈরি করে, যে ছকমাফিক সবাই পরিচালিত হয়। এদের গ্রাহকদের বেশিরভাগই হলো: সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ। যে মানুষগুলো নিউ ইয়র্ক টাইমস পড়ে, তাদের বেশিরভাগই বিত্তবান, এবং যেটিকে অনেক সময় রাজনৈতিক শ্ৰেণী বলে, তার অংশ। এই মানুষগুলো আসলে চলমান কায়দার রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। তারা মূলত কোনো না কোনো ক্ষেত্রের এলিট। হতে পারে তারা রাজনৈতিক এলিট, ব্যবসায়িক এলিট (যেমন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ বা এরকম কিছু), বিদ্যাজাগতিক এলিট (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) অথবা সাংবাদিক, যারা মানুষের চিন্তাভাবনা বা কোনো কিছু সম্পর্কে কীভাবে ভাবতে হবে, তার ছক তৈরি করে দেয়।

    এলিট মিডিয়া একটি কাঠামো তৈরি করে, যে কাঠামোতে অন্যরা পরিচালিত হয়। আপনি এ্যাসোসিয়েট প্রেসের দিকে তাকান। তারা একঘেঁয়েভাবে একই ধরনের সংবাদ উৎপাদন করে চলেছে। মধ্যরাতে এদের কাজ শেষ হয়, এবং প্রতিদিনই সেখানে একটি জিনিস লক্ষ্য করা যায়, যেখানে বলা থাকে “সম্পাদকদের জন্য বিজ্ঞপ্তি: আগামীকালের নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ এই সংবাদগুলো প্রথম পাতায় থাকবে।” এর মানে হলো: আপনি যদি ডায়টন বা ওহাইও-র কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক হন এবং কোনটি সংবাদ— তা নির্ধারণ করার মতো সামর্থ্য যদি আপনার না থাকে; অথবা আপনি যদি এটি নিয়ে ভাবতেই না চান, তাহলে ঐ বিজ্ঞপ্তিটি আপনাকে বলে দেবে: কোনটা সংবাদ। আঞ্চলিক ঘটনাবলীর বদলে আপনি ঐ সংবাদগুলো দিয়েই আপনার পত্রিকার এক চতুর্থাংশ জায়গা ভরিয়ে ফেলবেন। যার ফলে আপনার পাঠকের মনোযোগ ঘুরে যাবে অন্যদিকে। এই সংবাদগুলো আপনি আপনার পত্রিকায় রাখছেন কারণ নিউ ইয়র্ক টাইমস বলে দিচ্ছে: আগামীকাল কোন ঘটনাগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। আপনি যদি ডায়টন বা ওহাইও-র কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক হন, তাহলে আপনি এ ধরনের কিছু কাজ করতে বাধ্য হবেন, কারণ তথ্য জোগাড় করার মতো রিসোর্স আপনার হাতে নেই। যদি আপনি এই পথের বাইরে আসেন, এবং এমন কোনো সংবাদ ছাপেন, যা বড় প্রেসগুলো সমর্থন করে না, তাহলে আপনি শীঘ্রই এ সম্পর্কে সতর্কবাণী শুনতে পাবেন। (সম্প্রতি সান হোসে মারকিউরি নিউজ-এর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা এ বিষয়ের একটি নাটকীয় উদাহরণ।১) তাতে, কেউ যদি বেলাইনে চলে যায়, তাহলে তাকে লাইনে আনার জন্য ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর এমন অনেক পথ আছে। আপনি যদি এই ব্যবস্থা বা কাঠামাটাকেই ভাঙার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি সেখানে বেশিদিন টিকতে পারবেন না। এই কাঠামাটি খুবই ভালোভাবে কাজ করে। বোঝাই যায় যে, এগুলো দৃশ্যমান ক্ষমতা কাঠামাগুলোরই কারসাজি।

    ছবি: মিডিয়া কনট্রোল
    শিল্পী: আলফ্রেডো গারজন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই এলিট সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। জনগণকে অন্য যে কোনো কিছু করতে দাও, কিন্তু তারা যেন আমাদেরকে বিরক্ত না করে। (আমরা মানে সেই মানুষগুলো যারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে) সাধারণ মানুষ পেশাদারী খেলায় আগ্রহী হোক। প্রত্যেকে পেশাদারী খেলাধুলা, যৌন কেচ্ছা, ব্যক্তিত্ব, তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা বা এরকম যে কোনো কিছু নিয়ে মেতে থাকুক। যে কোনো কিছু যতক্ষণ পর্যন্ত না এটি কোনো গুরুতর আকার ধারণ করে। অবশ্যই গুরুতর সমস্যাগুলো বরাদ্দ থাকবে বড় মানুষদের জন্য। আমরা সেগুলোর দেখভাল করবো। এই এলিট, বিষয় নির্ধারণী মিডিয়াগুলো আসলে কী? যেমন, নিউ ইয়র্ক টাইমস বা সিবিসি? প্রথমত, এগুলো খুবই লাভজনক বৃহৎ কর্পোরেশন। এছাড়াও এগুলোর বেশিরভাগই হয় আরো বড় কোনো কর্পোরেশনের সাথে যুক্ত, নয়তো পুরোটাই কোনো বড় কর্পোরেশনের (যেমন জেনারেল ইলেকট্রনিক্স, ওয়াশিংটন ইত্যাদি) মালিকানাধীন। ব্যক্তি-মালিকানা অর্থনীতির (প্রাইভেট ইকোনোমি) একেবারে উপরের সারিতে এসব ক্ষমতাকেন্দ্রের অবস্থান। এগুলোর কাঠামো খুবই স্বৈরতান্ত্রিক। কর্পোরেশনগুলোর কাঠামো মূলত স্বৈরতান্ত্রিক ও ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হয় উপর থেকে। সেখানে যা ঘটছে, তা যদি আপনি পছন্দ না করেন, এবং এ নিয়ে কথা বলেন, তাহলে আপনাকে বের করে দেয়া হবে। বড় বড় মিডিয়াগুলো এই ব্যবস্থারই একটি অংশ মাত্র।

    তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার জায়গাটি কেমন? সেখানেও দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। তারা যাদের সাথে সম্পর্কিত এবং যাদের সাথে লেনদেন করে; সেগুলোও অন্যান্য বড় বড় ক্ষমতাকেন্দ্র- রাষ্ট্র, অন্যান্য কর্পোরেশন বা বিশ্ববিদ্যালয়। দীক্ষায়ণ প্রকৌশলের অংশ হিসেবে মিডিয়া খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে। ধরুন, আপনি একজন রিপোর্টার। আপনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকা বা এরকম কোনো বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করবেন। আপনি ধরেই নেবেন যে, বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আপনার একজন বিশেষজ্ঞ খুজে নিতে হবে। তিনিই আপনাকে বলে দেবেন যে, কী লিখতে হবে। অথবা আপনাকে যেতে হবে বুকিং ইন্সটিটিউট বা আমেরিকান এন্টারপ্রাইস ইন্সটিটিউট- এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানে। তারাই আপনার কলমে শব্দ যুগিয়ে দেবে। বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোও মিডিয়ার সঙ্গে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।

    উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। হ্যাঁ, সেখানে হয়তো কিছু স্বাধীনচেতা মানুষ পাওয়া যাবে। তেমন ব্যতিক্রমী মানুষ মিডিয়াতেও আছে। অন্যান্য বড় কর্পোরেশন, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রেও এরকম মানুষ পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নিজে পরনির্ভরশীল। এরা বিভিন্ন সাহায্যের জন্য বাইরের অনেক উৎসের উপর নির্ভর করে। যেমন, তারা নির্ভর করে বিত্তবান মানুষ, রাষ্ট্র, বড় বড় কর্পোরেশনের ওপর, যেগুলো তাদের ভর্তুকি দেয়। (রাষ্ট্র, কর্পোরেট ক্ষমতার সাথে এতো ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত যে, আপনার খুব কষ্ট হবে এগুলোকে আলাদা করতে।) বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের বহিরাগত উৎসগুলো দিয়ে পরিবেষ্ঠিত থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেসব মানুষ ঐ প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না, তাদেরকে স্বাভাবিকভাবেই দূরে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে জীবনের সমস্ত পর্যায়েই এই একই ঘটনা ঘটে। যারা খুবই বিরক্তিকর লোক, মুক্ত চিন্তাভাবনা করে; তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সব রকমের ফিল্টারিং যন্ত্র প্রস্তুত থাকে! আপনাদের মধ্যে যারা কলেজে পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন যে, এই পড়াশোনার ব্যবস্থাটা দুইটি শিক্ষার সঙ্গে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ। এই দুইটা শিক্ষা হলো— পূর্ববিধান মান্য করা ও অনুগত থাকা। আপনি যদি এই শিক্ষা না মানেন, তাহলে আপনি একটি সমস্যা সৃষ্টিকারী মানুষ। এই শিক্ষাদীক্ষাগুলো কাজ করে এক ধরনের ফিল্টারিং যন্ত্র হিসেবে; যার কারণে মানুষ সত্যি সত্যিই, সৎভাবে সমাজের ক্ষমতাশক্তি নির্মিত বিশ্বাস, আচার আচরণের কাঠামাকে আত্মস্থ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাভার্ড, প্রিন্সটন, বা ছোট-বড় নানাবিধ কলেজগুলোর কথা। এগুলো সামাজিকীকরণের শিক্ষা দেয়। আপনি যদি হাভার্ডের মতো জায়গাতে থাকেন, তো দেখবেন: সেখানে অনেক সময় নিয়ে যে জিনিসটা শেখানো হয়, তা হলো আদব-কায়দা। কীভাবে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষদের মতো ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে সঠিক ভাবনাগুলো ভাবতে হয়— এরকম আরো অনেক কিছু।

    আপনি জর্জ অরওয়েলের এনিমেল ফার্ম পড়ে দেখেন, এটি অরওয়েল লিখেছিলেন ১৯৪০-এর মাঝামাঝি সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাত্নকবাদী রাষ্ট্র-কাঠামোকে ব্যঙ্গ করে এটি লেখা হয়েছিল। বইটি ব্যাপক সাড়া জাগায়। সবাই খুব পছন্দ করে। কিন্তু তিনি এনিমেল ফার্ম বইটির যে ভূমিকাটি লিখেছিলেন, তা প্রকাশিত হয়নি। এটি প্রায় ৩০ বছর পর সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। তাঁর কাগজপত্রের মধ্য থেকে কেউ একজন এটি খুঁজে পেয়েছিল। এনিমেল ফার্মের এই ভূমিকাটি ছিল “ইংল্যান্ডে সাহিত্যকর্মের উপর সেন্সরশিপ” প্রসঙ্গে। বইটি সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাত্নকবাদী কাঠামোকে ব্যঙ্গ করে লেখা হলেও, তিনি বলেছিলেন: ইংল্যান্ডও খুব আলাদা কিছু না। কেজিবি আমাদের ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না ঠিকই। কিন্তু শেষ ফলাফলটা আসে একই রকম। যে মানুষগুলো মুক্ত চিন্তাভাবনা করে অথবা যারা ভুল ধরনের চিন্তা করে, তাদের ছেঁটে ফেলা হয়।

    ছবি: মিডিয়া (২০১৪)
    শিল্পী: ইয়াছের আবু হামেদ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অরওয়েল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পর্কে খুবই কম কথা বলেছেন। মাত্র দুটা বাক্য। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন: কেন এরকম ঘটে? এক নম্বর কারণ হলো: প্রেসগুলোর মালিক বিত্তবান মানুষেরা, যারা চায় নির্দিষ্ট কিছু জিনিসই জনগণের কাছে পৌছাক। আরেকটি যে কারণের কথা তিনি বলেছেন, তা হলো: যখনই আপনি মহাজনী বা এলিট শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ঢুকবেন; যখনই আপনি অক্সফোর্ডের উপযুক্ত স্কুলগুলোতে ঢুকবেন; তখনই আপনি শিখে যাবেন যে, কিছু জিনিস নিয়ে কথা বলা ও চিন্তাভাবনা করা ঠিক না। এটিই হলো মহাজনী প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিকীকরণ ভূমিকা। আর আপনি যদি এই ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারেন, তাহলে স্বভাবতই আপনাকে রাস্তা থেকে নামিয়ে দেয়া হবে। এই দুইটি বাক্যই মোটামুটি পুরো কাহিনী বলে দেয়।

    আপনি যখন মিডিয়ার সমালোচনা করবেন আর বলবেন যে, “দেখেন এখানে এন্থনি লুইস বা তার মতো অন্য কেউ লেখালেখি করেন।” তখন তারা খুবই খেপে যাবেন । তারা বলবেন, “কেউ আমাকে বলে দেয় না যে, কী লিখতে হবে। আমার যা ইচ্ছা আমি তাই লিখি । এই চাপ, বাধা এগুলো নিয়ে কথাবার্তাগুলো সব ফালতু কারণ আমি কখনোই কোনো চাপের মধ্যে থাকি না।” খুবই সত্যি কথা । কিন্তু আসল ঘটনা হলো: তাদেরকে কী লিখতে হবে, তা কেউ বলে দেয় না কারণ জানাই থাকে যে, সঠিক জিনিসটিই লেখা হবে। এবং তারা যে সঠিক জিনিসটিই লিখে যাবে, তা হাতে-কলমে প্রমাণ না করতে পারলে তারা ওখানে থাকতেই পারবে না। যদি তারা মেট্রো ডেস্ক বা এরকম কোনো জায়গা থেকে থেকে তাদের পেশাগত জীবন শুরু করে, এবং যদি ক্রমাগত ভুল ধরনের সংবাদ লিখতে থাকে; তাহলে তারা আজকের সেই অবস্থানে কখনো পৌছাতেই পারতো না, যেখানে তাদের যা খুশি, তাই বলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর ক্ষেত্রেও এই একই ঘটনা। এখানে আরো বেশি মতাদর্শিক শৃঙ্খলা থাকে। তারা সবাই এই একই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এসেছে।২

    আচ্ছা, তো, আপনি এই পুরো ব্যবস্থাটির চেহারা দেখলেন। তাহলে সংবাদপত্রগুলো কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন? এটি খুবই পরিষ্কার। আপনি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর কথা চিন্তা করেন। এটি একটি কর্পোরেশন এবং এটি পণ্য বেচে। এখানে পণ্য হলো পাঠক। আপনি যখন সংবাদপত্র কেনেন তখন তা থেকে তাদের কোনো লাভ আসে না। তারা এটি খুশিমনে ইন্টারনেটে বিনাপয়সাতেই দিতে পারে। তাদের আসলে লোকসান হয় যখন আপনি সংবাদপত্রটা কেনেন। কিন্তু এখানে আসল পণ্যটি হলো পাঠক। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে: সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ, যেমন যারা সংবাদপত্রে লেখালেখি করেন, সমাজের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তগুলো নেন; সেই মানুষেরাই হলো পণ্য। আপনাকে অবশ্যই একটি পণ্য বাজারে বেচতে হয়। আর এখানে স্পষ্টতই এই বাজারটি হলো বিজ্ঞাপনওয়ালারা। টেলিভিশন, সংবাদপত্র যাই হোক না কেন, সবক্ষেত্রেই তারা [বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে] পাঠক-দর্শককে বিক্রি করে। কর্পোরেশনগুলো তাদের গ্রাহক-পাঠক-দর্শককে বিক্রি করে অন্য কর্পোরেশনের কাছে। মহাজনী মিডিয়ার বেলায়, এটি একটি বিরাট ব্যবসা।

    তো, কী ঘটবে বলে আপনি মনে করেন? এই বিদ্যমান অবস্থার মধ্যে মিডিয়া পণ্যের চরিত্র কেমন হবে বলে আপনার মনে হয়? মোটাদাগে আপনি কী অনুমান করবেন? স্পষ্ট একটি অনুমান তৈরি হবে যে: মিডিয়া কন্টেন্টে যা দেখা যায়, যা দেখা যায় না এবং এগুলোকে যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো হয়; সবকিছুতেই ক্রেতা-বিক্রেতা, [সমাজের] বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং মিডিয়ার সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য ক্ষমতা-কেন্দ্রগুলোর স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে। এমনটি না ঘটলে, তা হবে অলৌকিক ঘটনা।

    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এবার আসে সবচে কঠিন কাজটি। এবার আপনি বুঝতে চেষ্টা করবেন যে, আপনি যা অনুমান করছেন, সত্যিই কী সেভাবে ঘটনাগুলো ঘটছে? আপনি নিজেই বিষয়গুলো বিচার করে দেখতে পারেন। [প্রমাণ হিসেবে] এই পরিষ্কার কথাবার্তাগুলোর উপরে অনেক জিনিসপত্র আছে। যেগুলোকে অনেক কঠিন যাচাই-বাছাইয়ের সাপেক্ষে বিচার করা হয়েছিল। এমন কঠিন যাচাই বাছাইয়ের কথা কেউ হয়তো চিন্তাও করতে পারবে না। এবং সেগুলো খুব ভালো অবস্থাতেই টিকে আছে। কার্যত, আপনি সামাজিক বিজ্ঞানে এমন কিছুই পাবেন না, যা খুবই জোরের সাথে কোনো উপসংহারকে সমর্থন করে। যেটি খুব অবাক করার মতোও কিছু নয়। কারণ সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কাজ করে, তাতে সেগুলোর সাথে কোনোভাবেই সম্পর্ক না রেখে কোনো কিছু উপস্থাপন করা হলে, তা হবে একটি অলৌকিক ঘটনা।

    এর পরে আপনি যা আবিস্কার করবেন, তা হলো: এই বিষয়গুলো সব জায়গাতেই ট্যাবু হয়ে আছে। এগুলো নিয়ে কথাবার্তা হয় না। আপনি কেনেডি স্কুল অফ গভর্মেন্ট, স্ট্যানফোর্ড বা অন্য যে কোনো জায়গায় যান, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা এ ধরনের অন্য যে কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেন। দেখবেন যে, সেখানে এই প্রশ্নগুলো তোলা হয় না। এখান থেকে এটি বোঝা যায়: যারা এখানে পড়াশোনার জন্য আসেন, তারা জানেনই না যে, এখানে কিছু বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হয় না। এবং ঘটনাগুলোর পেছনে থাকা প্রমাণাদির বিষয়ে আলোচনা করা যায় না। হ্যা, আপনি এটিকে সত্য বলেই ধরে নিতে পারেন। আপনি যদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে নজর দেন তাহলে আপনি হয়তো বলবেন, হ্যাঁ, এটি তো হবেই। কারণ এই লোকগুলো কেন উন্মোচিত হতে চাইবে? কেন তারা সমালোচনাত্মক বিশ্লেষণকে স্বীকার করবে, যখন সেগুলোর উত্তর দেয়ার দায় তাদের উপরই বর্তায়? উত্তর হলো, তাদের [এসব সমালোচনা] মেনে নেয়ার কোনোই কারণ নেই। বস্তুত, তারা এটি করেও না। আবারও বলছি, এটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেন্সরশিপ নয়। যারা ঐসব অবস্থানে থাকেন, তারা স্বভাবতই এটি করেন না। এটি যেমন বামপন্থীরা করেন (যাদেরকে ডাকা হয় বামপন্থী বলে), তেমনি ডানপন্থীরাও করেন। যেহেতু আপনার সম্পূর্ণভাবে সামাজিকীকরণ ঘটে গেছে এবং আপনি সেভাবেই দীক্ষিত হয়েছেন; ফলে কিছু ভাবনা আপনার মাথায় এমনিতেই আসবে না। ঐ ভাবনাগুলো যদি আপনার মাথায় থাকে, তাহলে আপনি সেখানে থাকতেই পারবেন না। এবার আপনি দ্বিতীয় একটি অনুমান করতে পারলেন। তা হলো: প্রথম অনুমানটার ব্যাপারে আলোচনা করা যায় না।

    শেষে আপনাকে নজর দিতে হবে দীক্ষায়ন মতবাদের কাঠামোটির দিকে; যার মধ্য দিয়ে এই সব কিছু পরিচালিত হয়। মিডিয়া, বিজ্ঞাপনওয়ালা, বিদ্যায়তনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি জায়গার মানুষগুলোসহ তথ্য ব্যবস্থার উপরের দিকের মানুষগুলো যখন একে অপরের জন্য লেখালেখি করেন, তখন কী ঘটতে হবে– সে সংক্রান্ত কোনো রূপকল্প কী তাদের মাথায় থাকে? আমি তাদের গ্রাজুয়েশন বক্তৃতার কথা বলছি না। গ্রাজুয়েশন বক্তৃতার সময় অনেক মধুর মধুর কথা বলা হয়। কিন্তু এই মানুষগুলো যখন নিজেদের মধ্যে লেখা আদান-প্রদান করেন, তখন তাদের বক্তব্যগুলো কী থাকে?

    এটি জানার জন্য আপনাকে মূলত তিনটি জায়গার ওপর নজর দিতে হবে। প্রথমটি হলো: জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রি। আপনি জানেন যে, এটি হলো প্রধান বাণিজ্যিক প্রোপাগান্ডা ইন্ডাস্ট্রি। তো, এই জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রির নেতারা কী বলছেন? দ্বিতীয়ত, দৃষ্টি দিতে হবে: আমরা যাদেরকে বুদ্ধিজীবী, মহৎ চিন্তাবিদ বলি, তাদের দিকে। সেই মানুষগুলো, যারা গণতন্ত্রের প্রকৃতি বা এরকম অনেক কিছু নিয়ে চমকপ্রদ সব বই লিখছেন, তারা কী বলেন? তৃতীয়ত, আপনাকে নজর দিতে হবে বিদ্যায়তনিক শাস্ত্রের দিকে। বিশেষত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যেসব অংশের দিকে, যেগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্যের বিষয়গুলো জড়িত এবং যেগুলো গত ৭০-৮০ বছর ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে আছে।

    এই তিনটি জায়গার দিকে খেয়াল করেন। দেখেন যে, তারা কী বলে। এবং যারা এসব ব্যাপারে লেখালেখি করেন, সেসব অগ্রগামী ব্যক্তিদের দিকে তাকান। তারা সবাই বলেন যে, (আমি প্রায় হুবহু উদ্ধৃত করে বলছি) সাধারণ জনগণ হলো “অবোধ ও অবাঞ্চিত বহিরাগত”। জনগণের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের যেসব জায়গা, সেখান থেকে তাদের অবশ্যই সরিয়ে রাখতে হবে। কারণ তারা এতোটাই নির্বোধ যে, যদি তারা এর মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাহলে শুধু গোলমালই পাকাবে। তাদের কাজ শুধু “পর্যবেক্ষণ করা”, “অংশগ্রহণ করা” নয়।

    সব কিছু চালানোর লক্ষ্যে, আমাদের মধ্যে থেকে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের বেছে নেয়ার জন্য তারা শুধু একবার ভোট দেবে। তারপর তাদের উচিৎ বাড়ি যাওয়া এবং অন্য কোনো কাজ করা। যেমন ফুটবল খেলা দেখা বা অন্য যে কোনো কিছু করা। কিন্তু এই “অবোধ ও অবাঞ্চিত বহিরাগতদের” অবশ্যই শুধু “পর্যবেক্ষক” হতে হবে, “অংশগ্রহণকারী” না। যাদেরকে “দায়িত্বশীল ব্যক্তি” বলা হয়, তারা হবে অংশগ্রহণকারী। অবশ্যই একজন লেখক হবেন সেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের একজন। কিন্তু লেখক নিজেকে কখনো এই প্রশ্নটা করেন না যে, কেন আমি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি আর কেন অন্য কেউ জেলে থাকে? উত্তরটা খুবই সোজা। কারণ তিনি ক্ষমতার অধীন ও ক্ষমতার প্রতি অনুগত এবং অন্য কেউ হয়তো স্বাধীন। কিন্তু লেখক অবশ্যই কখনো এই প্রশ্নটি তোলেন না। সুতরাং সেখানে কিছু বুদ্ধিমান মানুষ থাকবে, যারা সবকিছু চালাবে এবং অন্য কেউ সেখানে ঢুকবে না। (আমি একটি একাডেমিক জার্নাল থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি) “মানুষ তাদের নিজেদের ব্যাপারে নিজেরাই ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে— এরকম কোনো গণতান্ত্রিক ভ্রান্তযুক্তির দ্বারা আমাদের [দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের] বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। মানুষ এমনটি পারে না। তারা তাদের ভালোমন্দ বিচার করতে পারে না। সুতরাং তাদের ভালোর জন্য আমাদেরকে এটি করে দিতে হবে।” এই ধারার চিন্তা আসলে লেনিনবাদের সাথেও খুব মিলে যায়। আমরা তোমাদের জন্য সব কিছু করে দিই, আর তা করি সবার ভালোর জন্য। আমার ধারণা, ঐতিহাসিকভাবে এক মতবাদ থেকে আরেক মতবাদে লাফ দিয়ে যাওয়াটা যেমন, স্টালিনবাদের প্রতি অত্যুৎসাহী থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার সমর্থক বনে যাওয়া— এটি এতো সহজে হতে পেরেছে, তারণ দুটিই মূলত একই রকম অবস্থান। মানুষ খুব সহজেই এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে আসতে পারে। আপনাকে খুব বেশি লাফ মারতে হয় না এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে যেতে। আপনার শুধু একটু ভিন্ন ভিন্নভাবে হিসেব কষতে হয় যে, কোথায় ক্ষমতাটা আছে। এক জায়গায় আপনি ভাবেন যে এটি এখানে, আরেক জায়গায় ভাবেন এটি ওখানে। মূলগত প্রশ্নে আপনি আসলে প্রায় একই রকম অবস্থানেই থাকেন।

    জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রীগুলোর অবস্থাটা কী? এগুলোর জন্ম হয়েছিল কিভাবে? এটির খুবই মজার একটি ইতিহাস আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ছিল এক্ষেত্রে একটি মোড়-ঘুড়ানো ঘটনা। সেখান থেকেই এটির অনেক কিছু এসেছিল। এটির প্রভাবেই দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছিল । ১৮ শতকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার একটি অন্যতম ধনী অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। ২০ শতকের শুরুর আগপর্যন্তও ব্রিটেনের উচ্চবিত্ত মানুষেরা মানসম্পন্ন জীবনযাপন, স্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবিতা অর্জন করতে পারেনি। অন্য কারো কথা তো দূরে থাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যধিক সম্পদশালী ছিল, তাদের অনেক সুযোগ-সুবিধাও ছিল। ১৯ শতকের শেষের দিকেই দুনিয়ার অন্য যে কারো তুলনায় তাদের অর্থনীতিই সবচেয়ে মজবুত ছিল। কিন্তু বিশ্ব দৃশ্যপটে তাদের কোনো বড় ভূমিকা ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলো, প্যাসিফিকের কিছু কিছু অংশ; এই পর্যন্তই বিস্তৃত হয়েছিল, তার বেশি না।

    দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ঘটনাগুলো আরো নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুরো বিশ্বই কমবেশি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরই দেখা গিয়েছিল একটি বড় পরিবর্তন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঋণগ্রহীতা রাষ্ট্র থেকে ঋণদাতা রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটেনের মতো অতো বড় না হলেও, এই প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট বিশ্ব মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ক্রীড়ানক হয়ে উঠেছিল। এটি এক ধরনের পরিবর্তন, কিন্তু আরেক ধরনের পরিবর্তনও হয়েছিল।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই, সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার ব্যাপারটি প্রথমবারের মতো দেখা যায়। ব্রিটিশদের একটি তথ্য মন্ত্রণালয় ছিল, এবং এটি তাদের সত্যিই খুব প্রয়োজনও ছিল। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ভেতরে না আনতে পারলে তারা খুব সমস্যায় পড়তো। এই তথ্য মন্ত্রণালয় প্রধানত সংশ্লিষ্ট ছিল প্রোপাগান্ডার সাথে। ‘হানদের’ নৃসংশতা নিয়ে অনেক মিথ্যা রটনা আর এরকম আরো অনেক কিছু তারা প্রচার করতো। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকান বুদ্ধিজীবীদের দিকে। তারা ভেবেছিল যে, আমেরিকান বুদ্ধিজীবীরা দায়িত্ববান এবং তাদেরকে সহজেই ধোঁকা দেয়া যাবে ও অন্য যে কারো চেয়ে তাদের কাছেই প্রোপাগান্ডাগুলো বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে। তারা তাদের নিজেদের প্রচার ব্যবস্থা দিয়ে এগুলো প্রচার করবে। তো, একারণেই ব্রিটিশ প্রচার ব্যবস্থার তীরটা তাক করা ছিল আমেরিকার বুদ্ধিজীবীদের দিকে। এবং এটি সত্যিই খুব ভালো কাজ করেছিল । ব্রিটিশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের দলিলপত্রগুলো থেকে দেখা যায় (অনেকগুলোই এখন প্রকাশিত হয়েছে), তাদের লক্ষ্য ছিল: পুরো দুনিয়ার চিন্তা-জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা। এটি ছিল একটি গৌণ লক্ষ্য। মুখ্য লক্ষ্যটি ছিল: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তা-জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা। ভারতের মানুষরা কী ভাবছে তা নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা ছিল না। ’তৎপর’ আমেরিকান বুদ্ধিজীবীদের বিভ্রান্ত করে, ব্রিটিশ নির্মিত রটনাগুলো গ্রহণ করাতে পুরোপুরি সফল হয়েছিল এই তথ্য মন্ত্রণালয়। ব্রিটিশদের এটিতে খুবই গর্ব বোধ করার কথা। কারণ এটির জন্যই তাদের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। এটি না হলে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যেতে পারতো।

    শিল্পী: জেমগাস জাহারানস

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। উইড্রো উইলসন ১৯১৬ সালের নির্বাচনে জিতেছিলেন একটি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেসময় ছিল শান্তিকামী দেশ। এটি সবসময়ই এরকম। সাধারণ মানুষ কখনই কোনো বিদেশী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় নি। দেশটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘোর বিরোধী ছিল। উইলসনও নির্বাচনে জিতেছিলেন একটি যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে থেকে। “বিজয়বিহীন শান্তি”— এটিই ছিল তাঁর নির্বাচনী শ্লোগান। কিন্তু উইলসনের যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। তখন প্রশ্নটি ছিল যে, কিভাবে এই শান্তিকামী জনগণকে চরম জার্মানবিরোধী করে তোলা যায়, যেন তারা সব জার্মানকে খুন করার জন্য উন্মত্ত হয়ে যাবে? তখনই দরকার হয় প্রোপাগান্ডার। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবং একমাত্র ব্যাপক একটি রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা এজেন্সি গঠন করা হলো। এটিকে বলা হতো কমিটি অন পাবলিক ইনফরমেশন (সুন্দর অরওয়েলিয়ান টাইটেল)। এটিকে ক্রিল কমিশনও বলা হতো। যে মানুষটা এটি পরিচালনা করতেন, তাঁর নাম ছিল ক্রিল। এই কমিশনের কাজ ছিল প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে মারমুখী, প্রবল জাতীয়তাবাদের নেশায় উন্মত্ত করে তোলা। এটি চমৎকার কাজ করেছিল। মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই মানুষ উন্মাদের মতো যুদ্ধে যাওয়ার জন্য জিকির করতে শুরু করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যেতে সক্ষম হয়।

    অনেক মানুষই [প্রোপাগান্ডার] এই সাফল্যে অভিভূত হয়েছিল। একজন [বিশেষ] মানুষ এটি দিয়ে অভিভূত হয়েছিলেন এবং এর মধ্যে ভবিষ্যতের জন্যও কিছু ইশারা ছিল। সেই মানুষটা হলেন হিটলার। আপনি যদি ‘মেইন কাম্ফ’ পড়েন তো দেখবেন, সেখানে তিনি কিছু যুক্তিসহ সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে, জার্মানী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরেছিল কারণ জার্মানী প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে হেরেছিল। তারা আমেরিকান ও ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডার সাথে প্রতিযোগিতা শুরুই করতে পারেনি। আর এই ব্যাপারটিই তাদের পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে, পরেরবার তারা তাদের নিজেদের একটি প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। আর তারা সেটি সত্যিই করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। আমাদের খেয়াল করার মতো আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তা হলো: আমেরিকার ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও খুব অভিভূত হয়েছিল প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থার এই কর্মকাণ্ডে। তাদের সেসময় একটি সমস্যা হচ্ছিল। দেশটা আনুষ্ঠানিকভাবে আরো বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছিল। অনেক মানুষ ভোট দেওয়ার মতো এরকম আরো অনেক কিছু করতে পারছিল। দেশটা ক্রমাগত সম্পদশালী হয়ে উঠছে, অনেক মানুষ (রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারছে, অনেক নতুন অভিবাসী আসছে ইত্যাদি।

    ফলে ব্যক্তিগত ক্লাবের মতো করে সবকিছু চালানো ক্রমাগত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কী করতে হবে? তাহলে অবশ্যই জনগণের চিন্তা-জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে! আগে শুধু কিছু জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। রকফেলারের ছবি আরো সুন্দর বানানো বা এধরনের কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করে আনা হতো। কিন্তু একটি পুরোদস্তুর জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রি আগে কখনোই ছিল না। দৈত্যাকার এই ইন্ডাস্ট্রির জন্ম হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এর সামনের সারির মানুষেরা সবাই ক্রিল কমিশনে ছিলেন। ক্রিল কমিশন থেকে আসা প্রধান মানুষগুলোর একজন হলেন এডওয়ার্ড বার্নেস। “প্রোপাগান্ডা” নামে তার একটি বই আছে। সেসময় প্রোপাগান্ডা বিষয়টা নেতিবাচক কোনো অর্থ বহন করতো না। এই বিষয়টার মধ্যে খারাপ বাতাস ঢুকে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। কারণ তখন এটি জার্মানী আর এরকম খারাপ জিনিসগুলোর সাথে যুক্ত ছিল। কিন্তু সেসময় (যখন এডওয়ার্ড বার্নেস বইটি লিখেছিলেন) প্রোপাগান্ডা শব্দটা দিয়ে তথ্য বা এরকম কিছু বোঝাত। এডওয়ার্ড বার্নেস “প্রোপাগান্ডা” বইটা লিখেছিলেন ১৯২৫ সালের দিকে। এটির শুরুতে তিনি বলেছিলেন, তিনি এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলো প্রয়োগ করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থা এবং ক্রিল কমিশনের শিক্ষা থেকে তিনি বলেছেন, “একজন সৈন্য তার দেহকে যেভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখে। সেভাবে জনগণের মস্তিস্কও শৃঙ্খলিত করে রাখা সম্ভব। অসভ্য মানুষগুলো যেন সোজা পথে থাকে, তা নিশ্চিত করার জন্য মস্তিস্ক শৃঙ্খলিত করে রাখার নতুন সব কলাকৌশল অবশ্যই ব্যবহার করা হবে। কলাকৌশলগুলো ব্যবহৃত হবে বুদ্ধিমান মানুষদের মাধ্যমে। আর আমরা এখন এটি করতে পারবো কারণ এসব নতুন সব কৌশল আমাদের হাতে আছে।

    এই বইটিই জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রির প্রধান ম্যানুয়াল। বার্নেস এ লাইনের একজন গুরু। তিনি রুজভেল্ট/কেনেডি ধারার একজন যথার্থ উদারনৈতিক। গুয়েতেমালার গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত অভ্যুত্থানের পেছনে যে জনসংযোগমূলক কাজগুলো ছিল, সেখানে তিনি কলকাঠি নেড়েছিলেন।

    তার আরেকটি বড় কাজ, ১৯২০ সালের শেষের দিকে যার কারণে তিনি খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন, তা হলো: নারীদের সিগারেট খাওয়াকে মদদ দেওয়া। সেসময় নারীরা ধূমপান করতো না, এবং তিনি এ নিয়ে অনেক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। যেমন মুভি স্টার, মডেলরা মুখে সিগারেট জ্বালিয়ে পর্দায় আসছে— এমন সব ইতিবাচক প্রচার। এজন্য তিনি খুব প্রশংসা পেয়েছিলেন। এই ইন্ডাস্ট্রির একজন সামনের সারির ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। আর তার বইটা ছিল একটি সত্যিকারের ম্যানুয়াল।

    ক্রিল কমিশনের আরেকজন সদস্য হলেন ওয়াল্টার লিপম্যান। ইনি গত ৫০ বছরের মধ্যে আমেরিকান সাংবাদিকতার একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। ১৯২০ সালের দিকে প্রগতিশীল বিবেচনা করা হতো, এমন অনেক প্রগতিশীল রচনা তিনি লিখেছেন গণতন্ত্র নিয়ে। তিনিও [প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়] প্রোপাগান্ডা নিয়ে কাজটির শিক্ষা পুরোপুরি প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: একটি নতুন শিল্প এসেছে গণতন্ত্রে। তার নাম হলো “সম্মতি উৎপাদন (manufacturing consent)”। এটি আসলে তাঁর ধারণা। আমি আর এডওয়ার্ড হারম্যান এটি ধার করেছিলাম আমাদের বইয়ের জন্য। কিন্তু আসলে এটি এসেছিল লিপম্যানের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, “সম্মতি উৎপাদন” গণতন্ত্রের পদ্ধতিতে একটি নতুন শৈলী। আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক মানুষের যে বিষয়ে ভোট দেয়ার অধিকার আছে, তা তাদের না করতে দিলেও হয় সম্মতি উৎপাদনের কারণে। আমরা এটিকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছি। কারণ আমরা সম্মতি উৎপাদন করতে পারি এবং এটি নিশ্চিত করতে পারি যে, তাদের পছন্দ ও আচরণ এমনভাবে ছকবদ্ধ হবে যে, যদি তাদের অংশগ্রহণ করার কোনো আনুষ্ঠানিক পথ থাকেও, তবুও আমরা তাদেরকে যা করতে বলবো, তারা সবসময়ই সেটাই করবে। তাই, এভাবে আমাদের একটি সত্যিকারের গণতন্ত্র থাকবে। এবং এটি খুব ভালো কাজ করবে। এটিই প্রোপাগান্ডা এজেন্সির কর্মকাণ্ড থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ব্যবহারিক দিক।

    বিদ্যায়তনিক সামাজিক বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানও এই একই রকম জিনিস থেকেই এসেছে। যোগাযোগশাস্ত্র ও বিদ্যায়তনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা হলেন হ্যারল্ড গ্রাসওয়েল। প্রোপাগান্ডা পর্যালোচনা বিষয়ে একটি বই তার একটি মূখ্য অর্জন। কোনো গণতান্ত্রিক ভ্রান্তযুক্তি দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। এসব বিষয় আমি আগে যেগুলো উদ্ধৃত করেছিলাম— এগুলো নিয়ে তিনি খুব খোলাখুলি আলোচনা করেছেন। এগুলো এসেছে (ল্যাসওয়েল ও অন্যান্যদের) বিদ্যায়তনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান শাস্ত্র থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোও যুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে একই রকম শিক্ষা নিয়েছিল। বিশেষত ইংল্যান্ডের কনজারভেটিভ পার্টি। তাদের সে সময়ের দলিলপত্রগুলো এখন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তারা ব্রিটিশ তথ্য মন্ত্রণালয়ের অর্জনগুলো শনাক্ত করেছিল। তারা দেখছিল যে, দেশটা দিন দিন বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশটা খুব বেশি দিন কিছু মানুষের সম্পত্তি হিসেবে থাকবে না। এ থেকে তাদের সিদ্ধান্ত ছিল যে, প্রোপাগান্ডার কৌশলগুলোর প্রয়োগ ঘটিয়ে রাজনীতিকে পরিণত করতে হবে রাজনৈতিক যুদ্ধে। মানুষের চিন্তাজগৎ নিয়ন্ত্রণে যে কৌশলগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খুব চমৎকারভাবে কাজ করেছিল।

    এটিই হলো [দীক্ষায়নের মতবাদ] আর এটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথেও খুব মানিয়ে চলে। কীভাবে কর্মকাণ্ডগুলো চলে সে সম্পর্কে যে অনুমানটি আমরা করেছিলাম, সেটিও খুব শক্ত ভিত্তি পায় এর মধ্য দিয়ে। অনুমানটি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিতও হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি নিয়েও আলোচনার সুযোগ নাই। এই সব কিছুই এখন মূলধারার আলোচনার অংশ, কিন্তু তা শুধু প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মানুষদের জন্য। কলেজে গিয়ে আপনি যদি পড়তে চান যে, কিভাবে মানুষের মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রণ করা হয়— সে সংক্রান্ত লেখাপত্রগুলো; তাহলে তা পড়তে পারবেন না। ঠিক যেমন সাংবিধানিক চুক্তির সময় জেমস মেডিসন যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলো আপনি পড়তে পারবেন না। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো কীভাবে “বিত্তবান সংখ্যালঘু লোকদেরকে সংখ্যাগুরু জনগণের হাত থেকে রক্ষা করা যায় এবং এটিকে এমনভাবে পরিচালিত করতে যায় যেন এটি সাফল্য অর্জন করতে পারে। এটিই হলো সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু কেউ এটি পড়ে না। যদি আপনি অনেক পরিশ্রম না করেন তাহলে কোনো একাডেমিক জার্নাল-স্কলারশিপে এই জিনিস খুঁজে পাবেন না।

    এটিই হলো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং এর পেছনে যে মতাদর্শগুলো থাকে সেগুলোর মোটামুটি একটি চেহারা। আমি এভাবেই দেখেছি। এখন আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আপনি কী খুঁজতে চান।

    অনুবাদকের টীকা

    ১. ১৯৯৪ সালে ভিয়েতনামে বৈদেশিক ব্যুরো চালু করেছিল সান হোসে মারকিউরি নিউজ। তারা ছাড়া আমেরিকার আর মাত্র একটি সংবাদপত্র ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সেদেশে ব্যুরো খুলেছিল। এ নিয়ে সেসময় স্থানীয় আমেরিকান কমিউনিটির বিরোধীতার মুখে পড়ে পত্রিকাটি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তারা ভিয়েতনামেনর কমিউনিস্ট সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করছে।

    ২. চমস্কির এইরকম কথাবার্তার জন্য তিনি অনেক জায়গাতেই প্রশ্নবিদ্ধ হন। প্রশ্নকারীরা চমস্কির কাছ থেকে উদাহরণ চান এরকম ঘটনার। এরকম ঘটনার প্রচুর উদাহরণ তার কাছে আছে বলে দাবি করেন চমস্কি। যেমন এক সাক্ষাৎকারে তিনি এরকম ঘটনার দুইটা উদাহরণ দিয়েছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ রে বানোর নামে এক সাংবাদিক ছিলেন যিনি এল সালভাদরে আমেরিকান কার্যকলাপ নিয়ে একটি রিপোর্ট করেছিলেন। এটির ফলে তাকে মেট্রো সেকশনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর কিছুদিন পরে তাকে চাকরি থেকেই বের করে দেয়া হয়। সে হারশ নামে আরেকজন রিপোর্টারও নিউ ইয়র্ক টাইমস ছেড়ে দেন কারণ তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছিলেন, সেগুলো তাকে করতে দেয়া হয় নি। (Understanding Power, Noam Chomsky, p-21)

  • নিজেকেই যখন ভয়! বাংলাদেশের বিদ্যাপীঠে ‘স্বাধীনতা’র প্রসঙ্গ

    নিজেকেই যখন ভয়! বাংলাদেশের বিদ্যাপীঠে ‘স্বাধীনতা’র প্রসঙ্গ

    [বাংলা এই রচনাটি আমারই এপ্রিলের শুরুতে লিখিত ইংরাজি একটা রচনার অনুবাদ। এসব বিষয়বস্তুতে নিজে আগ্রহ বোধ করি এমন প্রকাশনাস্থল খুব বেশি নয়; আমার নিজের ইংরাজিও জগতের যে কোনো পত্রিকায় হুমহাম করে পাঠানোর মত নয়, এখনো। ফলে কিছু দেরি হলো। ২৫শে মে ২০২১–তে ইংরাজি রচনাটি সম্পাদকীয় ডেস্কের ভাষা–সম্পাদনাসমেত প্রকাশিত হচ্ছে লরেন্স উইশার্ট প্রকাশনীর এনার্কিস্ট স্টাডিজ জার্নালের ব্লগ সেকশনে। অনুবাদটি অল্প দুচারটা বাক্য সংযোজনসমেত আদি ইংরাজি–খসড়ার বাংলারূপ। – মানস চৌধুরী, ২২শে মে ২০২১]

    শিল্পী: ভাসিলি কান্ডিনস্কি

    মুস্কিলের পরিস্থিতি

    বাংলাদেশের বিদ্যাজগতীয় ‘স্বাধীনতা’ বিষয়ে বলতে যাওয়া ভাল রকমের ভেজালের বিষয়। এরকম ভেজালে আমি আগেও পড়েছি যখন ইউরোপীয় শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের প্রেস স্বাধীনতা বিষয়ে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, অন্তত দুইবার। এরকম আলোচনায় দুইটা গুরুতর সমস্যা ঘটে থাকে যার দুটোই আন্দাজ/পূর্বানুমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রথমত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, প্রশ্ন করতে যাঁরা আসেন তাঁরা ধরেই নেন যে তাঁরা ‘স্বাধীনতা’র দেশ থেকে আসছেন— তা বিদ্যাজগত হোক বা সংবাদজগত— যা কিনা আমি আবার নিঃশর্তে মেনে নেয়ার জায়গায় নাই। দ্বিতীয়ত, যাঁরা আলাপ প্রস্তাব করেন তাঁদের নির্দিষ্ট কতগুলো প্যারামিটার বা মানদণ্ড সাজানো থাকে। এদুটোর সঙ্গে সম্পর্কিত করে আমার তৃতীয় সমস্যাটা দেখা দেয়। যত আমি সংজ্ঞা কিংবা পূর্বানুমান/আন্দাজকে তদন্ত করতে আগাই, ততই আমাকে সাব্যস্ত করা সম্ভব হয় বাংলাদেশের বিপজ্জনক পরিস্থিতির বিষয়ে তেমন গা করছি না এমন একজন লোক হিসাবে। অবশ্যই সেটা সত্য নয়। স্বাধীনতাপ্রেমী যেকোনো পেশাজীবীর মতো আমিও আমাদের পরিস্থিতি সম্বন্ধে চিন্তিত। বরং আরো বেশি চিন্তিত যখন পুরা বিষয়টাকে আমি বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখি।

    নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই শাসনব্যবস্থার জন্য ‘সুনাগরিক’ পয়দা করার লীলাভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এটা খুব সরল শোনাচ্ছে নিশ্চয়ই, কিন্তু এটা এরকমই। ইউরোপ মহাদেশে বুর্জোয়া জাগরণের কাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান পক্ষ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে ‘প্রজ্ঞা’ আর ‘জ্ঞান’–এর জগতে বুর্জোয়া স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে দরকষাকষি চলে আসছে। একটা জানা ইতিহাস আবার করে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে এই কারণে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গণতান্ত্রিক, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে র‍্যাডিক্যাল, রাজনৈতিক চিন্তার উদ্রেককারী হিসাবে দেখানোর লাগাতার বাগাড়ম্বর চালু আছে। যদিও সারা দুনিয়াতেই শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধাচরণ করতে দেখা গেছে, তথাপি এগুলোকে দেখা দরকার ব্যবস্থাগত মগজধোলাইয়ের মধ্যে আচমকা সব অভিব্যক্তি হিসেবে; এবং কিছুতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক ফলাফল হিসাবে নয়, যতই না কেন গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশের সব ‘লক্ষ্য–উদ্দেশ্য/মিশন’ লেখা থাকুক।

    বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ নিয়ে মাতামাতি

    বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ একটা বড়সড় আলোচ্য বিষয়, বিশেষত সেসব বিদ্যাকর্মীদের মধ্যে, যাঁরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘স্বায়ত্বশাসন’ নিয়ে গর্ববোধ করে থাকেন। মাঝেমধ্যে এই অধ্যাদেশটা নিয়ে জন–আলাপসালাপ বেশ মাত্রাতিরিক্ত ধরনেরই হয়ে থাকে। ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনৈতিক শব্দমালার মধ্যে ‘স্বায়ত্বশাসন’ খুবই পরিচিত এবং যেকোনো জমায়েত–প্রতিবাদে বারংবার উচ্চারিত হয়ে থাকে। বিদ্যাকর্মী হিসাবে আমার এই হৈচৈটা একটু বেশি রকমের উদ্দীপ্ত লাগে, অবশ্য সেটা বাংলাদেশের দীর্ঘ সামরিক শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সারাক্ষণই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্বশাসনকে নস্যাৎ করতে চেয়েছে। এমনকি আমি নিজেও একজন ‘তরুণ রাজনীতি–সচেতন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র’ হিসাবে এবং পরে একজন ‘নবীন শিক্ষক’ হিসাবে এই পদটা নিয়ে বেশ অভিভূত ছিলাম। আরো প্রশ্নমনস্ক মন নিয়ে ভাবলে ১৯৭৩ অধ্যাদেশকে ‘আধুনিক’ যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাধারণ একটা পথপ্রণালীই মনে হবে। আদিতে ইংরাজিতে লিখিত এই অধ্যাদেশটি নয়া স্বাধীনতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের জন্য একটা সূচনা পদক্ষেপ ছিল যা ৬০–এর দশকে রাষ্ট্রযন্ত্রের লাগাতার হস্তক্ষেপের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমনে সম্ভবত বেশ ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এই ভূখণ্ডে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, সাকুল্যে পাঁচটা আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে এবং তাদের জন্য এগুলো রাষ্ট্রবিরোধী এবং/বা ‘জাতীয়তাবাদী’ উত্থানে মদদ–দেবার প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র। তাদের সেজন্য এগুলো দমন করতে হয়েছে, নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে এরকম নিয়ন্ত্রণ করবার তেমন কারণ ছিল না। অধিকন্তু, এই অধ্যাদেশটা পড়তে বেশ নিষ্প্রাণ আর খসখসেও বটে। আমার বক্তব্য হচ্ছে, প্রাথমিক খসড়াটা প্রতিষ্ঠানের বিন্যাস নিয়ে বলে, পদমর্যাদা নিয়ে বলে, আইনগত বিধান ইত্যাদি নিয়ে বলে; কিন্তু কিছুতেই শিক্ষাদর্শন নিয়ে গুরুতর কিছু বলে না কিংবা শিক্ষার্থী–শিক্ষকের ‘সম্পর্ক’ নিয়ে দিকনির্দেশনা দেয় না। এই অধ্যাদেশের আরেকটা খামতি হচ্ছে যাকে আধুনিক দুনিয়া ‘পোস্টগ্রাজুয়েট’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে জানে সেটার বিষয়ে নিস্পৃহতা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কমবেশি ‘নিম্নস্নাতক’–ভারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবেই শুরু হয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সাথে বিশেষ তাল মেলানো হয়নি।

    যাহোক, আমার উদ্দেশ্য এই অধ্যাদেশকে খাটো করা নয়, বরং খানদুই সামান্য বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেয়া: প্রথমত, বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর প্রশ্নে কমবেশি কাছাকাছি বিধানপ্রণালী দিয়েই গড়ে উঠেছে; দ্বিতীয়ত, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাস্তবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানেই, গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল নিশ্চিত করার জন্য নিছক একটা নথি বানানোর চেয়ে বেশ কিছু বেশি পদক্ষেপ নিতে হয়। এতটাই সিধাসরল হলে অধিকাংশ রাষ্ট্রেই মানুষজনের সুখ নিশ্চিত থাকত। সবার নিশ্চয়ই মনে পড়বে যে খুব বেশি কোনো রাষ্ট্রে কোনো বৈষম্যমূলক আইন নেই— তা জাতিবিদ্বেষ বলুন, বা ব্লাসফেমি, বর্ণ বা লিঙ্গ ভেদাভেদ এবংবিধ। সারা দুনিয়াতে লিখিত–দলিলকে ভিত্তি করে যেসব রাজনৈতিক আলাপ–আলোচনা চলে তাকে আমি ঘোরতর অপছন্দ করি।

    শিল্পী: মার্ক শাগাল

    ক্লাসরুমে কোনো পাহারাদার নাই

    বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষত পাবলিকগুলোতে, ক্লাসরুম একেবারে পাহারামুক্ত, অন্তত সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত। আমার পাঠকদের আমি নিশ্চিত করছি যে এই পাহারামুক্ত জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক দীর্ঘকাল ধরে উপভোগ করেছেন— তাঁদের নিজেদের জীবনের সাফল্যের গল্প করে, বিদেশ সফরের গল্প করে, পরিবারের খান্দান নিয়ে, সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে, রাজনৈতিক আইকনদের তিনি কতটা বন্দনা করেন তা নিয়ে গল্প করে, এবং আরো মেলাকিছু; তাঁদের হাতে থাকা সিলাবাসের সঙ্গে দূরবর্তী কোনো সম্পর্কস্থাপনেরও কোনোরকম পরোয়া না করেই। এরকম একটা পরিস্থিতিতে, কোনো শিক্ষক অনায়াসেই উপরের বিষয়বস্তুগুলোর তুলনায় আরেকটু সিরিয়াস ধরনের আলাপ তুলতেই পারেন; যার মধ্যে থাকতে পারে রাষ্ট্রযন্ত্র, দুর্দশাগ্রস্ত প্রশাসন, কর্পোরেট গোষ্ঠী, বহুজাতিক সংস্থা, মুনাফামূলক ব্যবস্থা, এবং সম্ভবত মিলিটারি ও তার রাষ্ট্রোর্ধ্ব নেক্সাস নিয়ে। এখন আপনারা একটা জটিলতার কথা বলতে পারেন যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ থাকতে পারেন যাঁরা এসব খবর ‘পৌঁছে’ দেবেন প্রশাসনের কাছে কিংবা ‘দায়িত্বরত’ প্রতিষ্ঠানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কাছে। এটাই এই কাজে একমাত্র ঝুঁকি হতে পারে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে শিক্ষকদের অনেকেই, অধিকাংশ যদি নাও হন, আরেকটা সহজ রাস্তা বেছে নিয়েছেন। আমি আশা করি পাঠকেরা বুঝবেন যে কোথায় ঠিক করে তাকাতে হবে। কোন পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যাকর্মীরা গুরুতর বিষয়ে কথা বলবার ক্ষেত্রে নিজেদের সেল্ফ–সেন্সরশিপের মতবাদে দীক্ষিত করেছেন কিংবা ক্লাসরুমে আবোলতাবোল কথাবার্তা বলার তালিম নিয়েছেন সেগুলো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে।

    কোভিড–১৯ ক্লাসরুম পরিবেশের আমূল রূপান্তর ঘটিয়েছে। সারাদেশে ইন্টারনেটের সুলভতা বিষয়ে সরকারের লাগাতার দাবির মধ্যে, শিক্ষকতা মুখ্যত অনলাইন পদ্ধতিতে সরে গেছে। কার্যত এতে শিক্ষকেরা আগের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি নিরীক্ষার মধ্যে থাকার পরিস্থিতিতে আছেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেলায় ক্লাসরুম নিরীক্ষা মোটামুটি নৈমিত্তিক একটা কার্যক্রম, মুখ্যত যেটাকে কর্তৃপক্ষ ‘গুণমান নিশ্চিত করার’ কারণে করা হয় বলে থাকেন। তাছাড়া, বাংলাদেশে কেবল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েই বা কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতিটা চালু আছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা যদিও এক্ষেত্রে খুব ভিন্ন ছিল যেখানে শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক মূল্যায়ন আমার খণ্ডকালীন চাকরিটাকে লম্বা করতে পারেনি। সেটা অবশ্য বেশ আগের কথা, আর খুবই অল্প সময়ের জন্য; ঠিক উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করার মতো নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো এটা চালু হয়নি তবে ইউজিসিতে আলাপ–আলোচনা চলছে বলে শোনা যায়। সাধারণভাবে বললে, গুণমান নিশ্চিতকরণের সঙ্গে ‘সেন্সরশিপ’ কিংবা ‘নজরদারি/সার্ভেলিয়েন্স’–এর কোনো সম্বন্ধ থাকার কারণ নেই যেমনটা আজকের আলোচনার প্রসঙ্গ। স্থাপত্যের কিছু দিকও আমাকে আগ্রহী করেছে। অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ঘরের জন্য কাচের দরজাতে উৎসাহী, যেসব শিক্ষকদের ব্যক্তিগত বসবার ঘর আছে। এই দরজাগুলো ‘স্বচ্ছতা’র প্রসঙ্গে একটা মজাদার আয়রনি বলা চলে যেহেতু অনেক বিশ্লেষক এই দরজাগুলোর প্রয়োজন দেখতে পান কর্মক্ষেত্রে যৌন–হয়রানি বন্ধের জন্য, এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্কবৃদ্ধির জন্য নয়। যাহোক, তবুও এসবের মধ্যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ও বাইরে এতক্ষণ যে আলাপ করলাম তাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রোর্ধ্ব নেক্সাস নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন সুদূরপরাহত।

    সাইবারস্পেস–ভীতি এবং প্রতিবাদ হিসাবে গালমন্দের চর্চা

    ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টে, এই আইন বিদ্যাকর্মী ও সংবাদকর্মী উভয়কেই নানান মাত্রায় আক্রান্ত করছে। তবে উদাহরণসমেত আরো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে সিটিজেন সাংবাদিকেরা অধিকতর ঝুঁকিতে আছেন, একেবারেই তাঁদের কার্যপদ্ধতির কারণে। বিদ্যাজগতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে কেন আমি অন্যান্য পেশার উদাহরণ টানছি তা স্পষ্ট করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করব যাতে তাঁরা অনুধাবন করেন যে বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে কীভাবে ‘অভিব্যক্তি’র ‘প্রত্যাশিত’ রূপ কেবল নির্দেশ করাই হচ্ছে না, বরং ‘গড়ে দেয়া’ হচ্ছে এবং ‘হুকুমদারি’ চলছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, আমি আসলে এটা পরিষ্কার করতে চাই যে নিয়ন্ত্রণকামী আচরণ বাহ্যত পাবলিক পরিসরে আরো বেশি শক্তিশালী; আর সাইবারস্পেস ‘জনপরিসরের’ ক্ষেত্রে অবশ্যই জোরদার নতুন দশা তৈরি করেছে। আমি আরো বলতে চাই যে সাইবারস্পেসের মতামত–অভিব্যক্তির তুলনায় বিদ্যাজগতের কাজকর্ম অনেক কম নজরদারির মধ্যে আছে; শ্রেণীকক্ষের কার্যক্রম আরো কম আছে। ‘বিদ্যামূলক’ লেখালেখির ক্ষেত্রে ইংরাজি রচনা তেমন কোনো রাষ্ট্রীয়–রাডারে থাকে না। তার তুলনায় বাংলা (বিদ্যা) রচনা অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু দৈনিক পত্রিকার কোনো রচনার তুলনায় কম, আর ফেসবুক পোস্টের তুলনায় আরো কম। সমসাময়িক বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রপাতির (বর্তমান সরকার, মন্ত্রীবৃন্দ, সরকারের সুনজরে থাকা কর্পোরেট গোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র, এবং অবশ্যই মিলিটারি) সমালোচনা করার ক্ষেত্রে মোটামুটি এটাই সর্বাত্মক রিস্ক–গ্রাফ।

    শিল্পী: গিওর্গি কোভাজনাই

    তাহলে, পরিশেষে এটা পেশাজীবীর চয়েসের বিষয় যে তিনি কমফোর্ট–জোনে থাকবেন, নাকি কনফর্মিস্ট–জোনে থাকবেন, গুরুতর ক্ষেত্রে এমনকি এমন একটা জোন একমাত্র সেটাই তিনি জানেন। তাঁদের ক্লাসরুম কর্মকাণ্ড তদন্ত হয় না, তাঁদের বিদ্যারচনা কমই গায়ে মাখা হয়, ইংরাজি রচনা এমনকি আরো ঝুঁকিমুক্ত। তাহলে সমালোচনামূলক অবস্থান থেকে এত দীর্ঘকাল দূরে দূরে থাকা তাঁদের কেবল সেল্প–সেন্সরশিপের কারণেই হতে পারে। এই প্রবণতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের নিয়োগদান ব্যবস্থার একটা ফলাফল, আরো কিছু বিষয়সমেত। ‘মিডিওক্রিটি’ একটা কর্কশ শব্দ, অসম্মানজনকও বটে, কিন্তু বাংলাদেশী বিদ্যাজগতের সাম্প্রতিক নিয়োগব্যবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেউ এই শব্দটা ছাড়া আর কিছু খুঁজে নাও পেতে পারেন। মতাদর্শিক/নিউলিবেরেল বিশাল বদলের মধ্যে ‘সাকসেস’ কিংবা ‘ক্যারিয়ার–ড্রাইভ’ কথাগুলোর যে মানে দাঁড়িয়েছে, তাতে অধিকাংশ বিদ্যাকর্মীর কপালেই ঝুঁকি কিংবা হুমকি–ধামকির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। আনুগত্যের ক্রমবর্ধমান দশার মধ্যে, অল্প কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক যাঁরা এখনো গণতান্ত্রিক অনুশীলনের উপর জোর দেন কিংবা ক্রিটিক্যাল জ্ঞানের রাস্তা খোঁজেন, অধিকাংশই যাঁরা মানবিকী–সমাজবিদ্যার লোকজন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি দিনকে দিন দুরূহ হয়ে উঠছে। শিক্ষকদেরকে তাঁদের মতামতের জন্য গুরুতর অভিযোগ করা হচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, এবং রুটিনমাফিক শাস্তি দেয়া হচ্ছে – সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু ঘটনা এরকম ঘটেছে।

    অজনপ্রিয়তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সমাপনী হিসাবে আমি কয়েকটা কথা বলব। প্রথমত, বাংলাদেশের সরকার, অথবা সরকারের কিছু কিছু অংশ, অতিসম্প্রতি অভূতপূর্ব সব সাইবার–ফোবিয়া আচরণ করছেন যাকে কৌতূহলী লোকজন সরকারের অপ্রস্তুতি হিসাবে দেখতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সরকারের এতসব পক্ষ আছে (আমি এখানে চাঞ্চল্যকর কোনো আবিষ্কারের দাবি করছি না, তবে সত্যি সত্যি লোকজন দেখতে পাই যাঁরা যুক্তি সাজানোর সময়ে এই সাধারণ বিষয়টা লক্ষ্য করেন না) যে কখনো কখনো সরকারের হেডকোয়ার্টার বা থিংকট্যাংক সব ধরনের ‘নির্যাতন’ বা ‘শাস্তি’ সম্বন্ধে পরিপূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকে বলে মনে হয় না (যদি না মিডিয়া সম্প্রচার ঘটে)। তৃতীয়ত, ডিএসএ এবং কাছাকাছি আইনগুলো আসলে করছে সেই কাজটা যা কিছু কাল আগেরও সংঘবদ্ধ গুণ্ডাদের ভূমিকা ছিল (গত ২/৩ দশকের ঘটনার একটা তালিকা হতে পারে এরকম, যদিও কেবল এতটুকুই নয়: সাংবাদিকের হাত বা পা কেটে ফেলা, পিটিয়ে মেরে ফেলা, শিক্ষককে পেটানো বা চড়–লাগানো, চাকরি খেয়ে ফেলা, কয়েকটার উদাহরণ হিসাবে)। চতুর্থত, সাইবার–ব্যবহারকারীরা, শিক্ষকরাও আছেন যার মধ্যে, প্রায়শই নজরদারিতে থাকেন আর টার্গেট হয়ে পড়েন তাঁদের ‘মুহূর্তীয়’ মতামত বা অভিব্যক্তির জন্য, এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের, পদ্ধতিগত, সুশৃঙ্খল বিশ্লেষণের জন্য নয়। শেষোক্ত কথাটা কিছুটা বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

    ধামকাধামকি (বুলিং) আর ঠাট্টামস্করা (মকিং) কে বৌদ্ধিক–সাংস্কৃতিকভাবে ঠিক কখনোই গুলিয়ে ফেলবার মতো জিনিস নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে সাইবার পরিমণ্ডলের মাতমের মধ্যে সেটাই ঘটছে, সরকারের পর্যাপ্ত পরিমাণ বাতিকগ্রস্ত আচরণের কারণে আরো বেশি, অন্তত বাংলাদেশে। বহু ‘ঠাট্টামস্করার’ চেষ্টা কার্যত ‘বুলিং’ বা ‘এবিউসিভ’ বর্গে পড়ে যেতে পারে (আইনের ভাষায় ‘ডিফেমেটরি’); ঠিক তাতেই আমার মনে হতে থাকে যে ভেদরেখাটা খামোকা সূক্ষ্ম হয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের চালাকি করে ম্যানিপুলেট করা সম্ভব হচ্ছে। পরিহাসের বিষয় যে, সাইবার–বাসিন্দারা লাগাতার প্রতিপক্ষকে বুলিং আর এবিউসিং করতে থাকেন। নারীরা সুলভ টার্গেট ধারাবাহিক পুরুষালি–ব্যাটাগিরির, প্রায়শই যা দল বেঁধে হয়ে থাকে। আর সরকারের–অনুগতরা এই শাসকদের যথেষ্ট অনুগত–নয় বলে ভাবেন যাঁদের তাঁদেরকেই করতে থাকেন। বুলিং/হুমকিধামকি বাংলাদেশে একটা ধারাবাহিক সাইবার ঘটনা এবং যতক্ষণ না সরকার বা এর নেক্সাসের প্রতি ঘটছে এসব আচরণ রোধ করার তেমন কোনো চেষ্টা নেই। এখন অবধারিত প্রশ্নটা আসে: ‘জনগণ’ যদি ‘সরকার ব্যবস্থাকে’ বুলি করেন আমি কি তাতে মনভার করব? বোঝাই যাচ্ছে, আমি তা করব না। কিন্তু তাঁরা – জনগণেরা – সত্যিকার অর্থে এমন একটা ব্যবস্থাকে বুলি/হুমকি করতে পারেন না যে ব্যবস্থা খোদ ধারাবাহিকভাবে তার সাধারণ মানুষকে ‘বুলিং’ করে চলেছে। বরং কিছু একটা করতে গিয়ে এই অভিযোগের ফাঁদে তাঁরা পড়তে পারেন যদি এবং যতক্ষণ না ঠাট্টামস্করার সূক্ষ্ম সব রূপ পুনরাবিষ্কৃত হয়, যা কিনা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দানা বাঁধবে। এটা একটা চক্কর আসলে। চারপাশে যখন এত কম সহযোদ্ধা, এতটাই শক্তভাবে যখন হাজারে–বিজারে সহকর্মী সেল্ফ–সেন্সরশিপ চালাচ্ছেন, যখন লঘুদৃষ্টির সাফল্যপীড়িত সব বিদ্যাকর্মীদের ভিড়, তখন যে কোনো পদক্ষেপই বৃহৎ পদক্ষেপ। আমার ধারণা সূক্ষ্মতা আর ধৈর্য আমাদের প্রস্তুতির একদম কেন্দ্রে থাকতে হবে।

  • সাংবাদিকতা: ভাবতে হবে গোড়া থেকে

    সাংবাদিকতা: ভাবতে হবে গোড়া থেকে

    আর্টওয়ার্ক: ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে শিল্পী: পেড্রো এক্স মলিনা সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার মান, ক্রমাগত কোণঠাসা হতে থাকা, টিকে থাকার উপায়–কৌশল ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল অনেকদিন ধরেই। সাংবাদিক–লেখকদের তুলে নিয়ে যাওয়া, গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেওয়া; এসবও চলছিল জোরতালে। অল্প কদিন আগেই তো জেলের ভেতরে মারা গেলেন লেখক মুশতাক। ১০ মাস কারাভোগের পর জামিন পেলেন কার্টুনিস্ট কিশোর। জামিন পেলেন সাংবাদিক কাজল। এসব গলা চেপে ধরা, শ্বাস না নিতে পারার মতো পরিস্থিতি চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। বিশেষকরে সর্বশেষ ‘নির্বাচন’–এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যা আরও তীব্র হয়েছে।

    সম্প্রতি আবার দেশের সাংবাদিকতা জগতে তোলপাড় ফেলেছে প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে ৫ ঘণ্টা ধরে আটকে রেখে হেনস্তা এবং ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট–এর আওতায় মামলা দেওয়ার ঘটনায়। কেন–কীভাবে ঘটতে পারছে এসব ঘটনা? দেশে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী? সত্যিই কি সাংবাদিকরা তাদের পাঠক–দর্শককে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানাতে পারবেন? নাকি শুধু প্রেস রিলিজ থেকে সংবাদ করে যেতে হবে? আর সত্যিই কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে হেনস্তা ও জেলে যেতে হবে রোজিনা ইসলাম, কাজলসহ আরও অনেকের মতো?

    কীভাবে তৈরি হলো এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি? কেন পত্রিকাগুলোতে কার্টুন ছাপা বন্ধ হয়ে গেল? কেন সংবাদ সম্মেলনগুলোতে শুধু তেলতেলে বক্তব্য ছাড়া সত্যিকারের কোনো প্রশ্ন থাকে না? সাংবাদিক হত্যার বিচার হয় না কেন? সংবাদমাধ্যমগুলো কী সত্যিই আপামর জনসাধারণের জন্য কাজ করে? নাকি একটি বিশেষ শ্রেণির উদ্দেশ্য–স্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে কাজ করে? এই সাংবাদিকতা কি সত্যিই স্বাধীন সাংবাদিকতা নাকি পুঁজি–ব্যবসা ও ক্ষমতার সামনে নতজানু সাংবাদিকতা?

    বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আদতে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের স্বর। তারা দুনিয়াকে উপস্থাপন করে এই শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই শ্রেণীর ভালোমন্দ, নীতি–নৈতিকতা অনুসারে। কারণ তাদের ব্যবসাও এই শ্রেণীকে ঘিরেই। পত্রিকায় বা চ্যানেলে বা অনলাইন পোর্টালে যাদের উদ্দেশে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়; তারা সেই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণী। ফলে এরাই নিউজরুমগুলোর টার্গেট অডিয়েন্স। বাংলাদেশে সে অর্থে বলতে গেলে সত্যিকারের কোনো গণমাধ্যম কখনো দাঁড়ায়ই নাই। যেটি সব ধরনের ক্ষমতা ও পুঁজির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের কথা ভাববে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্যও কাজ করবে; মুক্ত তথ্য সরবরাহ বজায় রাখবে সমাজের সব শ্রেণি–পেশার মানুষের জন্য।

    ছবি: মিডিয়া কনট্রোল | শিল্পী: আলফ্রেডো গারজন | সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের এই হেনস্তা ও জেলে যাওয়ার ঘটনায় সাংবাদিকতা কমিউনিটির প্রায় সবাই–ই অন্তত এই জায়গায় একাট্টা হয়েছেন যে, ‘না, এমনটা চলতে পারে না। আমরা যা করছি, তা অপরাধ না। এজন্য কোনোভাবেই জেল–জুলুম–হয়রানি করা যায় না।’ কিন্তু উত্তরণের পথ কী? তা যদি আমরা খুব ভালোভাবে তলিয়ে না দেখি… একদম গোড়া থেকে… তাহলে উত্তরণের কোনো পথ আগামীতে পাওয়ার আশা নেই। আবার দু–দিন পর থেকে সবাই সেই একই ধারায়, একই প্রক্রিয়ায় কাজে ফিরে যাব, এবং দু–দিন পর আবার নতুন কারও সাথে এমনটা ঘটবে। আবার আমরা রাস্তায় দাঁড়াবো। চলতে থাকবে দুষ্টচক্রের মতো! এই দুষ্টচক্র ভাঙা যায়, যদি আমরা সমস্যার একদম গোড়ায় গিয়ে চিন্তা করি।

    সাংবাদিকতা কী? সমাজে সাংবাদিকতার ভূমিকা কী? কাজ কী? সাংবাদিকতার সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক কেমন হবে? কীভাবে সাংবাদিকতা সত্যিকার অর্থেই জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে? স্বাধীন সাংবাদিকতা–ই বা কীভাবে হয়? সাংবাদিকরা কি স্বাধীন–সৃজনশীলভাবে কাজ করতে পারেন? বেতন–ভাতা ঠিকঠাক পান? বার্তাকক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ আছে? বার্তাবিভাগে কি সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে? বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর কি কোনো পলিসি–নীতিমালা–গাইডলাইন আছে? সবার জন্য উন্মুক্ত অবস্থায়? শিশু বা জেন্ডার বিষয়ে তাদের পলিসি কী? তারা কী সমর্থন করে, আর কী করে না? আমি একজন পাঠক–দর্শক হিসেবে জানতে পারব তাদের এই পলিসি সম্পর্কে? বা খুবই সাধারণ একটি বিষয়: প্রতিটা সংবাদমাধ্যমের কি নিজস্ব বানান–রীতি আছে? দেখা যাবে: এগুলো নেই, পাওয়া যায় না।

    ছবি: ফ্রিডম অফ প্রেস | শিল্পী: মাহমুদ রিফাই | সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পাঠক–দর্শকদের কথা বাদ দিলেও, সাংবাদিকদের নিজেদের সুরক্ষা, ভালো থাকা, ও ভালোভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আরও অনেক ধরনের উদ্যোগ দেখা যায় আন্তর্জাতিকভাবে। সাংবাদিকরা কোথাও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে কী করবেন; তার প্রোটোকল থাকে। যৌন হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হলে, ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যাহত হলে, মানসিক চাপে ভুগলে; কী করবেন, তার প্রোটোকল থাকে। সবার জানা থাকে: এমনটা ঘটলে কী করতে হবে। আমাদের এখানে এসব বিষয় তো অনেক দূরের ব্যাপার, সাধারণ একটা বানানরীতি পর্যন্ত নাই। অনেক সাংবাদিক ঠিকঠাক বেতনও পান না। ছাঁটাই, অসম্মানের শিকার হলেও কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। প্রতিবাদ জানাতে গেলেও মালিকপক্ষ ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে তাদের ঠেঙিয়ে তুলে দিতে পারে। কোথাও টুঁ শব্দ করার বা অভিযোগ জানানোর জায়গা নেই। কেন তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি? সাংবাদিকরা কি এমনটাই চান?

    যারা বড় সাংবাদিক; সাংবাদিক নেতা, নিউজরুমের হর্তাকর্তা; তারা হয়তো পরিস্থিতির বদল না–ই চাইতে পারেন। কিন্তু দুই–তিন বছর ধরে কাজ করছেন— এমন সাংবাদিক? মিড ক্যারিয়ার সাংবাদিক? ভবিষ্যতে সাংবাদিক হবেন বলে ভাবছেন এমন আগ্রহীরা? আপনারাও কি এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই কাজ করতে চান? নাকি এমন পরিবেশ চান, যেখানে সত্যিকার অর্থেই জনস্বার্থে সাংবাদিকতা করা যাবে? যে সাংবাদিকতা পুঁজি ও ক্ষমতার গ্রাস থেকে মুক্ত থাকবে? নিউজরুমের প্রতিটি সাংবাদিক ও কলাকুশলীদের সর্বোচ্চ সৃজনশীল বিকাশের মতো পরিস্থিতি থাকবে। সত্যিই স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে। নিউজরুমের সিদ্ধান্তগ্রহণে সক্রিয়ভাবে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। অর্থনৈতিক, শারিরীক ও মানসিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকবে। সত্যিই এভাবে বদল চাইলে অনেক মূলগত প্রশ্ন এখন সামনে আনতে হবে এবং সেগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝাপড়া তৈরি করতে হবে।

    শুধু যে ব্যক্তি সাংবাদিকের সুরক্ষা নিশ্চিত ও বিকাশের জন্যই এই বদলটা জরুরি, তাও নয়। এটি আসলে খোদ সাংবাদিকতা পেশা ও নিউজরুমগুলোরই ভবিষ্যতে টিকে থাকার প্রশ্ন। এগুলো যদি মোকাবিলা করতে না চাওয়া হয়, যেভাবে চলছে সেভাবেই চালিয়ে যেতে থাকা হয়; তাহলে অচিরেই প্রথাগত নিউজরুমগুলো ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। কারণ এখন নিউজরুমগুলো থেকে যে ধারায় সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা পাঠকপ্রিয় বা পাঠকের আস্থা অর্জন করতে পারছে খুবই কম। খুবই সীমিত একটি গণ্ডির মধ্যে নিজেদের বন্দি করে ফেলেছে বেশিরভাগ নিউজরুম। সেখানে নাই কোনো নতুনের চর্চা; নাই কোনো নতুন–সৃজনশীল উদ্যোগ। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ ক্রমেই বিমুখ হতে শুরু করছে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে। তিনশ শব্দের সেই একই একঘেঁয়ে ধরনের সংবাদ পড়ার চেয়ে এখন একটা মিম অনেক আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট জগতে। এবং এই প্রবণতাই যে ভবিষ্যতে বাড়বে, তা অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না।

    ছবি: ফ্রেস ফ্রিডম | শিল্পী: ইমাদ হাজ্জাজ | সূ্ত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রয়োজনীয়তা যখন তৈরি হয়েছে, তখন আগামীতে নতুন ধারার সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠানও হয়তো দেখা যাবে। তা ছোট–বড় যে আয়তনেরই হোক। এবং তারা যদি সত্যিই জনস্বার্থমূলক বিষয় নিয়ে কাজ করে, সাংবাদিকতার মানোন্নয়নে কাজ করে; তাহলে অচিরেই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করবে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে। এবং বেশি বেশি মনোযোগ দেবে নতুন ধারার সেসব মিডিয়ার দিকে। এগুলোও ভাবা উচিৎ নিউজরুমগুলোর হর্তাকর্তাদের।

    মানুষ যখন চোখের সামনে দেখে যে, একটি পত্রিকার মালিক অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ভিকটিমের নামেই পত্রিকায় কুৎসা-গীবত রটানো হচ্ছে, তখন মানুষের সেই সাংবাদিকতায় আর আস্থা থাকে না। এমন হাজারও উদাহরণ দেওয়া যাবে, যে জন্য মানুষের আস্থা থাকছে না মূলধারার সংবাদমাধ্যমের উপর, এবং সর্বোপরি সাংবাদিকদের উপর। ফলে এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাস্তায় ট্রাফিক সার্জেন্টও চাইলে সাংবাদিককে একটা থাপ্পড় বসিয়ে মামলা দিয়ে দিতে পারে। এতটাই সম্মানহীন ও ঠুনকো হয়ে পড়েছে এই সাংবাদিকতা পেশা। সবাই জানে: সব কিছুর মতো, সাংবাদিকতাও ক্রয়যোগ্য। এটাও শেষপর্যন্ত কেনাবেচারই হিসাব।

    তো, আমরা এই পুঁজি–মুনাফা–ক্ষমতারই তোষামদ, হেফাজত করে যাব; নাকি সত্যিকার অর্থেই গণমুখী সাংবাদিকতা কীভাবে করা যায় এবং সমাজে নিজেদের সম্মান কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করব— তা এখন আমাদের ভাবতে হবে জোরেসোরে।

  • যোরাহ্ নীল হার্স্টন ।। কালোমানুষ হতে আমার যেমনটা লাগে

    যোরাহ্ নীল হার্স্টন ।। কালোমানুষ হতে আমার যেমনটা লাগে

    ভাষান্তর: আনতারা ফারজানা তন্বী

    “আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনটার কথা যেদিন আমি প্রথম কালো মানুষ হয়েছিলাম।”

    যোরাহ্ নীল হার্স্টন (১৮৯১ – ১৯৬০) একজন আফ্রো–আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী, ঔপন্যাসিক, ও অধিকার কর্মী; বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধজুড়ে আফ্রো–আমেরিকান সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রথম সারির চিন্তক। ১৯২০–এর দশকে ‘হার্লেম রেনেসাঁ’ নামে খ্যাত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠকদের একজন। মার্কিন নৃবিজ্ঞানের সূচনাপর্বের ইতিহাসে খুব স্বতন্ত্র এক চরিত্র, ঔপন্যাসিক ও লেখক হিসেবে মার্কিন সাহিত্যেও যোরাহ্ কালজয়ী হিসেবে চর্চিত হন এখনো। এই রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘হার্লেম রেনেসাঁ’র তুরীয় পর্বে (১৯২৮) ‘ওয়ার্ল্ড টুমোরো’ সাময়িকীতে, যখন এক সারি আফ্রো–আমেরিকান লেখক নিজের আত্মসত্তা নিয়ে অকপট ভাষ্য লিখছিলেন। ১৭টি খেয়ালি অনুচ্ছেদে আত্মসত্তাকে অনুভবের যে বিবরণ যোরাহ্ হাজির করেছেন তা আমেরিকার অধিকার আন্দোলনের এক কাব্যিক মাইলস্টোন হিসেবে পঠিত হয় এখনো।– সম্পাদক

    ছবি: যোরাহ্‌ নীল হার্স্টনের পোর্ট্রেট

    ১। আমি কালো মানুষ, কিন্তু এ নিয়ে আমি কোনো আফসোসের আবহ তৈরি করি না শুধু এটুকু ছাড়া যে, আমিই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ‘কালামানুষ’ যার মায়ের দিকের নানা একজন ইন্ডিয়ান চিফ ছিল না।

    ২। প্রথম যেদিন ‘কালামানুষ’ হলাম, সেদিনটার কথা খুব মনে আছে। তেরো বছর বয়স পর্যন্ত ফ্লোরিডার ছোট একটি কৃষ্ণাঙ্গ শহর এ্যটনভিলে থাকতাম আমি। পুরো শহরটাই ছিল আমার মতো কালো মানুষদের শহর। ততদিন পর্যন্ত শাদা মানুষ বলতে দেখেছি একমাত্র যারা শহরের রাস্তা ধরে অরল্যান্ডো আসা–যাওয়া করত। স্থানীয় শাদারা ধুলো–মাখা ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে–বেড়াত, উত্তরের ট্যুরিস্টরা চলাচল করত গাড়িতে, ধূলিময় গ্রামের রাস্তা ধরে। দক্ষিণের লোকেরা শহরের লোকদের চিনত, এবং তারা এই পথে যাওয়ার সময় নির্বিকারভাবে আখ চিবাতে চিবাতে শহরটা পার হতো। অবশ্য উত্তরের ওরা একটু আলাদা ছিল এদিক দিয়ে, খুব সাবধানে মাঝে মাঝে গাড়ির পর্দা সরিয়ে তাকাত আমাদের দিকে। আর এদিকে তাদেরকে দেখার জন্য গ্রামবাসিরা সন্তর্পণে বেরিয়ে আসত, ভয় পেত কাছে যেতে। দেখত বারান্দার আড়াল থেকেই। খুব উৎসুক কেউ কেউ সাহস করে বারান্দার বাইরে সামনের দিকে চলে আসত, গ্রাম দেখে ট্যুরিস্টরা যে আনন্দ পেত, গ্রামের শেষ মাথা পর্যন্ত যেতে থাকা ট্যুরিস্টদের দেখে তারা সমান আনন্দ পেত।

    ৩। সামনের বারান্দাটিতে যাওয়া গ্রামের অন্যান্যদের জন্য বেশ সাহসী ও বিপজ্জনক কাজ মনে হলেও আমার জন্য তা ছিল গ্যালারি সিটের মতো। গেটের খাম্বার একদম উপরের অংশটা ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। জন্মসূত্রে প্রথম রাতেই দেখতে যাওয়া নাটক–পাগল দর্শকের জন্য প্রেক্ষাগৃহের সেরা আসনটির মতো। আমি শুধু তাদের আটপৌরে নাটক দেখাটা উপভোগই করতাম না, এগুলো যে আমার ভালো লাগে সেটা পাত্র–পাত্রীদের জানাতেও দ্বিধা করতাম না। প্রায়ই চলতি পথিকদের সাথে আমি কথা বলতাম। তারা আমার স্যালুটের উত্তর দিলে আমি হাত নাড়তাম, এরকম কিছু একটা বলতাম: “হাওডি–ডু–ওয়েল–আই–থ্যাংক–ইউ–হোয়ার–ইউ–গোয়িন?” তখন মোটরগাড়ি বা ঘোড়ার যাত্রীরা খানিক থামত, খানিক ভদ্রতাসূচক কুশল বিনিময় করত, কেউ বা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্প করত। কথা বলতে বলতে আমি তাদের সাথে ‘পথের খানিকটা’, ফ্লোরিডার এই দিকটাতে লোকে যেমন বলে, যেতে চাইতাম। কিন্তু এই আলাপের মাঝে যদি আমার পরিবারের কেউ সামনের দিকটাতে এসে পড়ত, এই দেন–দরবার খুব রুঢ়ভাবে ভেঙে যেত। তারপরও, আমিই ছিলাম প্রথম ‘ওয়েলকাম টু আওয়ার স্টেইট” ফ্লোরিডিয়ান এবং আশা করি মিয়ামি চেম্বার অফ কমার্স দয়া করে সেটা খেয়াল করবেন।

    ৪। এই সময়টাতে কালো মানুষদের সাথে শাদা মানুষদের পার্থক্য বলতে আমি বুঝতাম শুধু এটুকুই যে তারা এই শহর দিয়ে শুধু যাতায়াত করে, কখনো এখানে থাকে না। তারা আমার কথা আর গান শুনতে পছন্দ করত, আমাকে ‘পারসে–মে–লা’ নেচে দেখাতে বলত, এবং এসব করার জন্য সদয় হাতে তাদের খুচরা রুপার মুদ্রাগুলো দিয়ে দিত। এটা আমার কাছে খুব অদ্ভূত লাগত যে এসব আমি এমনি এমনি করতেই এত পছন্দ করতাম যে পয়সাগুলো যেন আমাকে থামানোর জন্য দেয়া ঘুষ, শুধু যারা দিচ্ছে তারা তা জানে না। কিন্তু কালোমানুষরা কখনো আমাকে পয়সা দিত না। তারা আমার এই মজা করার প্রবণতাগুলোকে প্রশ্রয় দিত না, কিন্তু হাজার হোক আমি তাদের নিজেদেরই যোরাহ্ ছিলাম। আমি তাদের লোক ছিলাম, কাছের হোটেলগুলোর কাছে, গাঁ–গ্রামে আমি ছিলাম প্রতিদিনের যোরাহ্।

    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স (১৯১৭ – ২০০০)

    ৫। কিন্তু পরিবারের পরিবর্তনটা আসতে শুরু করে যখন আমার বয়স তেরো, এবং আমাকে তারা জ্যাকসনভিলের স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। আমি এ্যটনভিল ছেড়ে যাই, করবী ফুলের এক শহর আর আগের যোরাহ্‌কে পেছনে রেখে। জ্যাকসনভিলের পাড়ে আমি যখন নৌকা থেকে নামলাম, আমি আর সেই যোরাহ্ থাকলাম না। দেখা গেল একসমুদ্র পরিবর্তন আমার জীবনকে গ্রাস করেছে। আমি আর সেই অরেঞ্জ কাউন্টির যোরাহ্ নেই, আমি হয়ে গেলাম একটা ছোট কালো মেয়ে। আমি পদে পদে টের পেতে থাকলাম এই পাল্টে যাওয়া। টের পেলাম আমার মনের অন্তঃস্থলে, টের পেলাম আয়নায়, আমি হয়ে গেলাম একটা ক্ষীপ্র গতির বাদামী বর্ণের মানুষ যেটা সে না পারবে ঘষে মুছে ফেলতে, না পারবে এই বর্ণিল পরিচয় থেকে পালাতে।

    ৬। আমি কিন্তু কোনো আফসোসরত ‘কালো’ নই। এজন্য আমার ভেতরে বা দৃষ্টির গভীরে কোনো তীব্র দুঃখ জমে নাই। এ নিয়ে আমি আদৌ কিছু মনে করি না। যারা ছিঁচ–কাঁদুনে নিগ্রোহুড চর্চা করত, মানে কালো হওয়াটাকে যারা মনে করত প্রকৃতির অসৎ এক বিচার যা তাদের পতিত করে রেখেছে এবং তাদের বাদবাকি চিন্তা ভাবনার মূলে ছিল এই মনোভাব। এমনকি আমার এই দিগ্বিদিক ক্ষত–বিক্ষত জীবনেও আমি দেখেছি দুনিয়া আসলে শক্ত মানুষদের কদর করে এবং চামড়ায় কোনো এক বর্ণিল কণিকার উপস্থিতির তারতম্য তাতে খুব একটা হেরফের ঘটায় না। না, নিজের রঙ নিয়ে দুনিয়ার কাছে কান্নাকাটির সময় আমার নেই, তারচেয়ে আমি বরং আমার ঝিনুক খোলার ছুরিটি ধার দিয়ে সময় কাটাব।

    ৭। আমার কনুইয়ের কাছে সবসময়ই কিছু মানুষ আছে সদা আমাকে মনে করিয়ে দিতে যে আমি ক্রীতদাসের নাতনি। কিন্তু এটা কখনোই আমার ভেতরে কোনো বিষণ্ণতা জাগাতে পারেনি। দাসপ্রথা এখন ষাট বছর আগের অতীত। এটা অপসারণের অপারেশন সফল হয়েছে এবং রোগী এখন সুস্থ আছে, ধন্যবাদ। দাসপ্রথা বিলোপের ভয়াবহ সংগ্রাম, যা আমাকে সম্ভাব্য দাস থেকে একজন আমেরিকান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, আমাকে বলেছে দৌড়ের লাইনে দাঁড়াতে, আমেরিকার পুনর্নির্মাণ বলেছে ‘রেডি হও’, আর তার পরের প্রজন্ম বলেছে ‘ছুটে যাও’ আর আমি এক উড্ডীন সূচনা করেছি যে জীবনের সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে তাকিয়ে কাঁদার সময় আমার নাই। দাসত্ব হচ্ছে সভ্যতার জন্য আমার চুকানো মূল্য, এবং এই বিনিময় আমার ইচ্ছাতে ঘটেনি। দাসত্ব ছিল কিছু লোকের দুর্ধর্ষ এক অভিযানের ফল যার দাম আমি শোধ করেছি আমার পূর্বসূরিদের জীবনের বিনিময়ে। গৌরব করবার মতো এত বড় কারণ পৃথিবীতে আর কারও নেই। এখন জয় করবার জন্য আছে পুরো দুনিয়া, হারাবার নেই কিছুই। ভাবতেই ভালো লাগে যে এখন আমার যে কোনো কাজের জন্য আমি দ্বিগুণ নন্দিত বা নিন্দিত হবো। কোনো জাতীয় মঞ্চের কেন্দ্রে থাকাটা আসলেই উত্তেজনাকর যখন এর দর্শকরা বুঝে উঠতে পারছে না যে তারা হাসবে নাকি কাঁদবে।

    শিল্পী: বিওফোর্ড ডিলানেই (১৯০১-১৯৭৯)

    ৮। আমার শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশির অবস্থান ছিল আমার চেয়ে করুণ। কোনো বাদামি ভুত খাবার সময় আমার পাশের চেয়ারটি উপরে তুলত না। বিছানায় ঘুমানোর সময় কোনো কালো ভুত আমার পায়ে পা তুলে দিত না। কারো যা আছে তা ধরে রাখার খেলাটা নতুন করে কিছু পাওয়ার খেলার মতো উত্তেজনাকর না।

    ৯। নিজেকে আমার সারাক্ষণ কৃষ্ণাঙ্গ মনে হতে থাকে না। বরং এখন আমি নিজের অবচেতনে হিজরতের আগের সেই এ্যটনভিলের যোরাহ্‌কে খুঁজে পাই। নিজেকে আমার সবচেয়ে বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মনে হয় যখন আমাকে তীক্ষ্ণ কোনো শ্বেতাঙ্গ পটভূমির বিপরীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়।

    ১০। উদাহারণ হিসেবে বার্নাডের কথাই বলি। ‘হাডসনের জলের ধারে’ এলে আমি নিজের বর্ণ টের পাই। হাজার হাজার শাদা মানুষদের ভিড়ে আমি একাই যেন এক অন্ধকার পাথরের মতো ভেসে ওঠি, আবার ডুবে যাই, কিন্তু এই ভাসাভাসির মাঝেও আমি অনড়, সেই আমিই থাকি। যখন জোয়ারে ডুবে যাই, আমি আমিই থাকি, নেমে যাওয়া বান আবার আমাকেই উদ্ভাসিত করে।

    ১১। আবার কখনো কখনো ঘটনা পুরো উল্টো ঘটে। আমাদের মাঝে একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ বসলে বৈসাদৃশ্যের তীক্ষ্ণতা আমার জন্য সমানই থাকে। যেমন যখন আমি ‘নিউ ওয়ার্লড ক্যাবারে’র বদ্ধ বেজমেন্টে একজন শাদা মানুষের সাথে বসি, আমার রঙ প্রকট হয়। আমরা বলার মতো কথা হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে থাকি আর জ্যাজ শিল্পীরা সেই শূন্যতা পুষিয়ে দেয়। জ্যাজ বাজনদারদের পরিবেশনের যে নাটুকে চরিত্র, তাতে এটা ঘনঘন ঘটতে থাকে। দুই পরিবেশনার মাঝে এরা কোনো ফাঁপা কথায় না মেতে পরেরটা শুরু করে দেয়। সুর, লয় আর মাদকীয় ছন্দে জ্যাজ আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করে তোলে, হৃদয়কে বিদীর্ণ করে। এই অর্কেস্ট্রা আরো তুঙ্গে উঠতে থাকে, পেছনের পায়ে উত্তুঙ্গ ভর রেখে তারস্বরে আদিম চিৎকারকে ফিরিয়ে আনে, তাকে আবার বিদীর্ণ করে ফেলে, জঙ্গলের গহীনে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত খামচে ধরে রাখে। জ্যাজ ধর্ম আমি নিধর্মী হয়ে অনুসরণ করি, উদযাপন করি। নিজের ভেতরেই আমি এক ক্ষ্যাপাটে নাচ শুরু করি, নিঃশব্দে চিৎকার করি, উল্লাসে চিৎকার করি; নিজের কুঠারটি আমি নিজের মাথার উপরে ঘোরাতে থাকি, কোনো একটা কিছুর দিকে নির্ভুল নিশানায় ছুঁড়ে মারি! আমি জঙ্গলে আছি এবং জঙ্গলের নিয়মে চলি। আমার মুখে লাল–হলুদ আঁকিবুকি, আমার শরীর নীল রঙ মাখা। আমার হৃৎপিণ্ড দামামার তালে বাজতে থাকে। আমি কিছু একটাকে খুন করতে চাই, ব্যথা দিতে চাই, মৃত্যু দিতে চাই, কিন্তু সেটা কী তা আমি জানি না। ঠিক তখনই বাজনাটা থেমে যায়। অর্কেস্ট্রার শিল্পীরা তাদের ঠোঁট মুছে নিতে থাকে, আঙুলগুলোকে বিশ্রাম দেয়। শেষ মুর্ছনাটুকুর সাথে আমি আস্তে আস্তে কুঁকড়ে সভ্যতা নামের আলতো প্রলেপটার নিচে ফিরে আসতে থাকি এবং দেখি যে আমার শাদা বন্ধুটি নিজের সিটে নিশ্চল বসে থেকে শান্তভাবে সিগারেট টানছে।

    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স (১৯১৭ – ২০০০)

    ১২। ‘এদের এখানে মিউজিকটা ভালো হয়’, টেবিলে আঙুল বাজাতে বাজাতে সে বলে।

    ১৩। মিউজিক। লাল–নীল আবেগের শিশিরগুলো তাকে স্পর্শ করেনি। আমি যা অনুভব করেছি সেটা সে শুধু শুনতে পেয়েছে। আমার থেকে সে বহুদূরে, আমি তাকে আমাদের মাঝে জেঁকে বসা সমুদ্র আর মহাদেশ পেরিয়ে আবছা দেখতে পারছি। নিজের শুভ্রতা নিয়েও সে বড় বিবর্ণ, আর বিপরীতে আমি দারুণ বর্ণিল।

    ১৪। কখনো কখনো মনে হয় আমার কোনো জাতিবর্ণ নেই। আমি শুধু আমিই। যেমন, নিজের হ্যাটখানা নিজের নির্দিষ্ট কায়দায় মাথায় দিয়ে আমি যখন হার্লেম সিটির সেভেনথ অ্যাভিনিউতে হাঁটতে বের হই, নিজেকে তখন ফোর্টি সেকেন্ড স্ট্রিট লাইব্রেরির সামনের দুর্বিনীত সিংহগুলোর মতো মনে হয়। আমার অনুভব যেটুকু বুঝতে পারি, ‘বৌল মিচে’র রাস্তায় রাজকীয় বাহনে বসা পেগি হপকিন্স জয়েসের জমকালো পোশাক, খুব অভিজাত ভঙ্গীতে দুলতে থাকা হাঁটু জোড়া আমার বাসনায় কোনো দাগ কাটে না। আমার ভুবনজুড়ে শুধু যোরাহ্ উদয় হয়। আমি কোনো জাতিবর্ণের নই, আমি কোনো সময়ের নই। আমি পুঁতির মালা গলায় শ্বাশ্বত সেই নারীত্ব।

    ১৫। আমেরিকান নাগরিক এবং কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া নিয়ে আমার আলাদা কোন অনুভূতি নেই। আমি বড় জোর এই সীমান্তজুড়ে উত্থিত মহাত্মার এক ক্ষুদ্র কণা। ভুল বা শুদ্ধ যাই হোক, এটা আমার দেশ।

    ১৬। কখনো কখনো টের পাই যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছি, কিন্তু সেজন্য আমার রাগ হয় না। এসব আমাকে বড় জোর আশ্চর্য করে। একজন মানুষ কীভাবে আমার আনন্দময় সঙ্গ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারে? এটা আমার বুঝের বাইরে।

    ১৭। কিন্তু সর্বোপরি, নিজেকে আমার একটি দেয়ালে ঠেক দিয়ে রাখা ইত্যাকার জিনিসে ঠাসা বাদামি ব্যাগ মনে হয়। দেয়ালের বিপরীতে আরও সব সাদা, লাল এবং হলুদ ব্যাগের সাথে রাখা এক ব্যাগ। ভেতরের সব ঢেলে বের করলে দেখা যায় এলেবেলে সব অমূল্য, অথচ মূল্যহীন ছোট ছোট জিনিস। একটি স্বচ্ছ জলজ হীরে, সুতা–শূন্য নাটাই, ভাঙা কাঁচের কিছু টুকরো, একটু তার, একটা দরজার চাবি যে দরজা বহু বছর আগেই ভেঙে গেছে, জং ধরা একটা ছুরি, এক জোড়া পুরোনো জুতো যা তুলে রাখা ছিল সেই রাস্তার জন্য যে রাস্তা না কখনো ছিল এবং না কখনো হবে, চাপানো জিনিসের ভার বইতে না পেরে বেঁকে যাওয়া একটা পেরেক, একটি বা দুটি শুকনো মরা ফুল যারা সামান্য সুগন্ধ এখনো ধরে রেখেছে। আপনার হাতে এখন সেই বাদামি ব্যাগটি। মেঝেতে পড়ে আছে তার ভেতরের হাবিজাবি সবকিছু— এই ব্যাগের এসব হাবিজাবির মতো আর সব ব্যাগও কি খালি করে দেখা যায়, সবগুলোর সব জিনিস কী একসাথে ঢিবি করে রাখা যায়, কোনো জিনিস অদল–বদল না ঘটিয়ে কি ব্যাগগুলো আবার ভরে রাখা যায়, এক টুকরো রঙিন কাঁচ এদিক–অদিক হলে হয়তো খুব কিছু আসে যায় না। হয়তো প্রথম বিশালকায় ব্যাগটি এভাবেই প্রথম ভরা হয়েছিল— কে জানে?

  • রাম শেপার্ড ভীনাভেণী ।। ভারতের দেশজ হার্ড ইম্যুনিটির ধারণা কি কোভিড-১৯ এর সমাধান দিতে পারে?

    রাম শেপার্ড ভীনাভেণী ।। ভারতের দেশজ হার্ড ইম্যুনিটির ধারণা কি কোভিড-১৯ এর সমাধান দিতে পারে?

    অনুবাদ: নাঈমা নুসরাত যূথীকা

    ডক্টর রাম শেপার্ড ভীনাভেণী বর্তমানে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্মের বোর্ড অব স্টাডিজের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ডক্টর রামের “ভারতের দেশজ হার্ড ইম্যুনিটির ধারণা কি কোভিড–১৯ এর সমাধান দিতে পারে ?” নামক গবেষণা পত্রটি প্রথম প্রকাশ করে চাইনিজ জার্নাল Traditional Medicine Research- ২০২০ এর মে মাসে। পরবর্তীতে জুলাই ২০২০ এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা (WHO) তাদের বিশ্ব সাহিত্য এবং কোভিড–১৯ সম্পর্কীয় গবেষণা পত্রের মধ্যে এটিকে অন্তর্ভূক্ত করে। ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন নাঈমা নুসরাত যূথীকা। যূথিকা ভারতের হায়দারাবাদে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী হিসেবে রয়েছেন বর্তমানে।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মহামারির সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করতে প্রাচীন প্রচলিত রোগ নিরাময় পদ্ধতিগুলোকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রচলিত এবং দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি এক্ষেত্রে আমাদের নতুন দিশা দেখাতে পারে। এই গবেষণাপত্রে ডক্টর রাম শেপার্ড ভীনাভেণী ভারতীয় প্রাচীন হার্ড ইম্যুনিটির ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কোভিড–১৯–এর সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ভারতীয় এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি আমাদের ভাবনাকে এক নতুন পথে চালিত করতে পারে। প্রচ্ছদ ও ভেতরে ব্যবহৃত তিনটি পেইন্টিং ধ্রুব চন্দ্র রায়ের আঁকা।  – সম্পাদক

     

    প্রাচীনকাল থেকেই ভারতের গ্রামগুলোতে মেষপালকরা পশুদের ভাইরাসজনিত মহামারি রোধ করতে ভেষজ ঔষধের মাধ্যমে পশুর ইম্যুনিটি বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে । মেষপালকরা টিকা দেওয়ার আগে ভাইরাসের তীব্রতা কমিয়ে দেয় আম্মা টাল্লি (স্থানীয় নাম) গাছ থেকে প্রাপ্ত পাতার রসের সাহায্যে। এই ছবিটি ২০২০ সালের মে মাসে ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের সিদ্দীপেট জেলার উরুমাদলা-রামচন্দ্রপুর গ্রাম থেকে তোলা হয়েছে। পশুর অনাক্রম্যতা অর্জনের জন্য টিকাকরণ করছেন ভীনাভেণী রাজাইয়া (বামে) এবং তার পুত্র ভীনাভেনী লক্ষ্মণ (ডানে)।

    পটভূমি: করোনা ভাইরাস[১] কোভিড–১৯ নামে পরিচিত। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের মানুষের মধ্যে প্রথম কোভিড–১৯ দেখা যায়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মহামারির আকার ধারণ করে।[২][৩] প্রথম একশ দিনের মধ্যে প্রায় ১,৪৩১,৯৭৩ জন আক্রান্ত হয় সারাবিশ্বে, যাদের মধ্যে ৮২,০৯৬ জন প্রাণ হারায়।[৪] অভাবনীয়ভাবে এটি ২০২টি দেশে ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বের প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই মারণ ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। এমন কোনো উপযুক্ত ওষুধ বা টিকা ঠিক এখন পর্যন্তও উদ্ভাবিত হয়নি যা কোভিড–১৯–এর বিরুদ্ধে পুরোপুরি লড়াই করতে সক্ষম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসকে “১ নম্বর জনশত্রু (Public Enemy)” হিসেবে ঘোষণা করে এবং মানব ইতিহাসে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেছে।[৫]

    লন্ডনের কয়েকজন বিজ্ঞানী কোভিড–১৯–এর মৃত্যুর হার সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, এটি মৌসুমী ইনফ্লুয়েঞ্জার[৬] থেকেও ১০–২০ গুণ বেশি মারাত্মক। অনেক মহামারি–বিজ্ঞানিই মনে করেন, করোনাভাইরাসের প্রকোপ ১৯৫৭ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হতে পারে।

    তবে এটি ১৯১৮–এর ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির মতো বিপর্যয়কর হবে বলে মনে করছেন না মহামারি–বিজ্ঞানিরা।[৭] বিশেষজ্ঞরা ঠিক যেভাবে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তার থেকে বেশি গতিতেই এটি বেড়ে চলেছে। কারণ কোভিড–১৯ এ প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আক্রান্তের সংখ্যা ১০,০০,০০০ জনে পৌঁছাতে মাত্র ৬৭ দিন লেগেছিল। আরও ১০,০০০ জন আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে মাত্র ১১ দিন।[৮] তৃতীয় ১০০,০০০ জন ৪ দিনে এবং চতুর্থ ১০০,০০০ জন আক্রান্ত হয় মাত্র ২ দিনে।[৯] বর্তমানে কোভিড–১৯, ৫ কোটিরও বেশি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে।[১০]  

    পৃথিবীজুড়ে সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন এবং স্বেচ্ছা–বিচ্ছিন্নতার মতো কঠিন জিনিসগুলো মানুষকে মানতে বাধ্য করা হচ্ছে এই সংক্রামক ব্যাধির দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে। একইভাবে এটাও বাস্তব যে, দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন মেনে নেয়াও সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। এমনকি যদি আমরা এক বা দুই মাস পরে লকডাউন বন্ধ করে দিই, তবুও সারা পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ আসার অনেক বড় সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। কারণ কোনো ব্যক্তিকে ১৫ দিন বিচ্ছিন্ন করে রাখলেই যে আমরা সংক্রমিত ব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারছি তা নয়।[১১] তাই বর্তমান কোভিড–১৯ মহামারি সামাল দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক উপায় এবং নিরাময়ের পদ্ধতি বের করতে হবে আমাদের।

    সুতরাং এই পর্যায়ে ভারতীয় মেষপালকদের অভিজ্ঞতা থেকে করোনভাইরাস মহামারিটির সম্ভাব্য সমাধানের দিকে মনোনিবেশ করা যেতে পারে। যারা প্রাচীন কাল থেকেই দেশীয় ভেষজ জ্ঞানকে অনেকভাবে কাজে লাগিয়েছে। মহামারি সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানের জন্য পটটি কাটটু (হার্ড ইম্যুনিটি) নামক এক অনন্য অনুশীলন করে আসছে মেষপালকরা। যা কিনা তাদের জনগণ, পশুপাল এবং গবাদি পশুদের সাহায্য করেছে।

    ছবি: :ধ্রুব চন্দ্র রায়

    হার্ড ইম্যুনিটির দেশজ ধারণাঃ প্রাচীন লোককাহিনি এবং প্রথাগত জ্ঞান থেকে জানা যায়, যখন কোনো রাখাল অচেনা বিক্রেতার কাছ থেকে বা কোনো দূরবর্তী স্থান থেকে কয়েকটি নতুন ভেড়া কিনে আনে, তখন সে ১৫ দিনের জন্য ভেড়াগুলোকে তার পুরানো ভেড়ার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এই পৃথকীকরণটি সঙ্ঘবদ্ধ অনাক্রম্যতা বা হার্ড ইম্যুনিটির দারুণ একটি পদ্ধতি। নতুন ভেড়ার পাল ১৫ দিনের কোয়ারানটাইনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরই কেবল পুরনো পালের সাথে একসাথে রাখার অনুমতি দেয়া হয়। যদি কেউ নতুন ভেড়ার পাল পৃথকীকরণের নীতি লঙ্ঘন করার চেষ্টা করে তবে পশুর কাউন্সিল কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে। যখন ভাইরাসজনিত রোগের কোনো লক্ষণ পশুদের মধ্যে দেখা দেয় যেমন– কাউপক্স, শিপপক্স, সেক্ষেত্রে এই রোগ এবং তার সংক্রমণের অনিবার্যতা দূর করতে সঙ্ঘবদ্ধ পৃথকীকরণ কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আনতে পারে না। যদিও রাখালরা ভাইরাস শব্দটি সম্পর্কে পরিচিত নয়, কিন্তু তাদের এরকম ধারণা আছে যে, বহিরাগত কোনো এক ধরনের জীবাণু তাদের পশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। ভাইরাসের ক্ষতিকারক সংক্রমণকে প্রশমিত করার জন্য এবং পশুদের শক্তিশালী করে তোলার জন্য মেষপালকরা পটটি কাটটু নামক চিকিত্সার একটি সাধারণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা হার্ড ইম্যুনিটি নামে পরিচিত। ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এই পদ্ধতিটি এখনো প্রচলিত আছে।

    ‘হার্ড ইম্যুনিটি’র ভাবনাটি আধুনিককালে প্রথম গ্রহণ করা হয় ১৯২৩ সালে, যা পরীক্ষামূলক গবেষণার মাধ্যমে মানুষের মোট জনসংখ্যার অনাক্রম্যতার তারতম্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই গবেষণার মাধ্যমে হার্ড ইম্যুনিটি একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসাবে স্বীকৃতি পায়।[১২] ১৯৩০ এর দশকে এ ডাব্লিউ হেড্রিচ বসন্ত রোগ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা যায় কোনো শিশু যদি একবার  বসন্ত রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠে, পরবর্তীতে তার মধ্যে সে রোগ ফিরে আসার প্রবণতা কমে যায়।[১৩] এই গবেষণার আলোকে বলা হয়, জনগণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গণটিকা দেয়া হলে তাকে আমাদের আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে হার্ড ইম্যুনিটি বলে, যেহেতু গণটিকার নির্দিষ্ট কোর্সটি শেষ করার পর মানুষের অনাক্রম্যতা বেড়ে যায়। 

    আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারণার বিরূদ্ধে, তারা মনে করেন হার্ড ইম্যুনিটি প্রাথমিকভাবে কোনো প্রাকৃতিক পদ্ধতি নয়, যেহেতু হার্ড ইম্যুনিটির জন্য টিকাকরণ আবশ্যক। এ পদ্ধতিতে, প্রাকৃতিক পদার্থ যেমন গাছপালা এবং অন্যান্য ওষধের দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত একটি ক্ষতিকারক ভাইরাস কোনো একটি সুস্থ পশুর শরীরে প্রবেশ করানো হয়। মেষপালকদের পর্যবেক্ষণে সেই পশুটির শরীরের ভাইরাস একের পর এক সমস্ত পশুপালকে সংক্রমিত করবে। এর ফলে প্রাণীদের ভেতরের অ্যান্টিজেনগুলো দ্রুত শক্তিশালী অ্যান্টিবডি তৈরি করে কম শক্তিশালী ভাইরাসের আক্রমণে প্রতিক্রিয়া জানাবে। যার ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পশুগুলোর অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি পাবে।

    ছবি: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    হার্ড ইম্যুনিটি অর্জনের প্রক্রিয়া ও আচার বিধি:  মেষপালকদের প্রধান সাধারণত দেশজ চিকিত্সা সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা রাখেন এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তার থাকে। তিনি ভাইরাল সংক্রমণের দ্বারা আক্রান্ত বিভিন্ন গ্রামে বাস করা পশুপালের মধ্যে একটি সমীক্ষা চালান এবং মারাত্মকভাবে সংক্রামিত পশুর সন্ধান করেন। তারপর তিনি সংক্রমিত একটি প্রাণী খুঁজে বের করেন যার অবস্থা সংকটজনক হলেও সেটি নিশ্চিতভাবে লড়াই করে বেঁচে উঠার ক্ষমতা রাখে। এই মারাত্মকভাবে সংক্রমিত পশুটিকে অন্যান্য পশুপালের সাথে রাখা হয় যাতে বাকি পশুপালের মধ্যেও রোগটি ছড়াতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে তিনি লোকের অনুরোধে অথবা টাকার বিনিময়ে সংক্রমিত ভেড়াটিকে একটি অসংক্রমিত পশুপালের কাছে নিয়ে আসেন। মেষপালক প্রধান আম্মা টাল্লি ছেট্টু (ছবি–১) নামক গাছের পাতা থেকে রস সংগ্রহ করেন এবং মোটা পাতার তৈরি পাত্রে সেই পাতার রস সংরক্ষণ করেন। তারপর আক্রান্ত পশুর রক্ত থেকে সিরাম/প্লাজমা সংগ্রহ করে পাতার রস মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করেন। একটি হীরা কাটার ধাতব যন্ত্র এবং একগুচ্ছ অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের সহায়তায় তিনি স্বাস্থ্যকর ভেড়ার কানের প্রান্তে একটি ছোট ক্ষত তৈরি করেন এবং আক্রান্ত প্রাণীর কাছ থেকে সংগ্রহিত সিরাম/প্লাজমা ও পাতার রস জৈব সংশ্লেষণের মাধ্যমে ভাইরাস সেই ভেড়াটির দেহে প্রবেশ করান। একইভাবে সমস্ত প্রাণী ধীরে ধীরে সংক্রমিত হয়। এরপরে, পুরো পশুপালকে ১৫ থেকে ২১ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়।

    ছবি:  আম্মা টাল্লি গাছ (a) আম্মা টাল্লির পাতা ও বীজ (b)। ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের সিদ্দীপেট জেলার উরুমাদলা-রামচন্দ্রপুরে আম্মা টাল্লি গাছ রয়েছে।

    এই কোয়ারেন্টাইন চলার সময়ে রাখালরা সংক্রমণের তীব্রতার মাত্রা বোঝার জন্য প্রতিটি ভেড়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা খুবই যত্নের সাথে পর্যবেক্ষণ করেন। যে মেষগুলোর মধ্যে মৃদু সংক্রমণ হয়েছে তাদের পশুপালের মধ্যে রাখার অনুমতি দেয়া হয়। যাদের অবস্থা সংকটজনক তাদেরকে পৃথক স্থানে রাখার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো আম্মা টাল্লির পাতার রস প্রয়োগের ফলে সমস্ত মেষ মৃদু সংক্রমিত হয়। ভাইরাসটি যদি প্রাকৃতিকভাবে আক্রমণ করে তবে পুরো পশুপাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। মেষপালক প্রধানের তত্ত্বাবধানে যদি এই প্রক্রিয়টি করানো হয় তাহলে পশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি খুব কম থাকে। ভাইরাস এবং ভেড়ার প্রতিরোধের লড়াইয়ে, ভেড়াদের সহজাত অনাক্রম্যতা এই মৃদু সংক্রমণকে রোধ করতে সক্ষম হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে নিজে থেকেই সুস্থ হয়ে ওঠে ভেড়াগুলো। মৃদু সংক্রমণ দীর্ঘ সময় ধরে কোনো প্রাণীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না। এই প্রক্রিয়ার ফলে পশুপালগুলি মহামারির ঝুঁকির মধ্যে থাকে না আর।

    মেষপালকদের আদিবাসী স্বাস্থ্যসেবার এই প্রক্রিয়ার অসংখ্য উদাহরণ বর্তমানে ভারতেও লক্ষ করা যায়। আধুনিক জিনবিদ্যা সম্পর্কে ধারণা না থাকা সত্ত্বেও সংকর প্রাণী প্রজননের ব্যাপারেও তাদের অসাধারণ জ্ঞান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ওরা সাধারণত পশুপাল থেকে একটি ভেড়া বাছাই করে বাকি পশুদের থেকে যথেষ্ট দূরত্বে রাখে। রাখাল সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি মেষ বাছাই করার এবং প্রজননের এটি অন্যতম প্রাথমিক নিয়ম। এ বিষয়টি পরোক্ষভাবে প্রমাণ করে যে জৈবিক বা জিনগত সম্পর্ক যত দূরের হবে আসন্ন মেষশাবকের স্বাস্থ্যের অবস্থা ততই শক্তিশালী এবং ততই অনাক্রম্য হবে। বর্তমান সময়ে যারা জিনবিদ্যা নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ করে আধুনিক চিকিৎসকরা তাদের এই ব্যাপারে সচেতন করেন। জিনবিদ্যা উদ্ভাবনের আগেই রাখালরা এই ধারণাটি আবিষ্কার করেছিল।

    (চলবে)

    তথ্যসূত্র– 

    ১। https://www.goodrx.com/blog/what-does-covid-19-mean-who-named-it/

    ২। Epidemiology Group of the New Coronavirus Pneumonia Emergency Response Mechanism of the Chinese Center for Disease Control and Prevention. Epidemiological characteristics of the new Coronavirus pneumonia [published online ahead of print, 2020 February 17]. Chin J Epidemiol. (Chinese)

    ৩। Wang C, Horby PW, Hayden FG, et al. A novel Coronavirus outbreak of global health concern. The Lancet 2020, 395: 470–473.

    ৪। https://covid19.who.int/

    ৫। https://www.usnews.com/news/world/articles/2020-02-11/world-must-consider-coronavirus-public-enemy-number-one-who

    ৬। https://theconversation.com/how-big-will-the-coronavirus-epidemic-be-an-epidemiologist-updates-his-concerns-133133

    ৭। https://www.washingtonpost.com/health/coronavirus-forecasts-are-grim-its-going-to-get-worse/2020/03/11/2a177e0a-63b4-11ea-acca-80c22bbee96f_story.html

    ৮। https://www.technologyreview.com/2020/03/17/905244/what-is-herd-immunity-and-can-it-stop-the-coronavirus/

    ৯। https://economictimes.indiatimes.com/news/politics-and-nation/coronavirus-cases-in-india-live-news-latest-updates-march23/liveblog/74765889.cms

    ১০। https://www.worldometers.info/coronavirus/

    ১১। https://www.forbes.com/sites/brucelee/2020/03/18/what-percentage-have-covid-19-coronavirus-but-do-not-know-it/#45578c4f7e90
    ১৩। Sencer DJ, Dull HB, Langmuir AD. Epidemiologic basis for eradication of measles in 1967. Public Health Rep 1967, 82: 253–256.

     

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। আপনি কি নৈরাজ্যবাদী? উত্তরটি আপনাকে চমকে দেবে!

    ডেভিড গ্রেইবার ।। আপনি কি নৈরাজ্যবাদী? উত্তরটি আপনাকে চমকে দেবে!

    •  অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

    গ্রেইবারের এই লেখাটি Are You An Anarchist? The Answer May Surprise You! শিরোনামে ২০০০ সালে বের হয়েছিল। বর্তমান অনুবাদটি theanarchistlibrary তে আর্টিকেলটির যে সংস্করণটি রয়েছে সেখান থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। –সম্পাদক

    ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)

    আপনারা হয়তো এরইমধ্যে শুনেছেন যে, নৈরাজ্যবাদী কারা এবং তাদের বিশ্বাস কী। শতভাগ সম্ভাবনা যে, আপনারা তাদের সম্বন্ধে বাজে কথাই শুনেছেন। অনেকে মনে করে— নৈরাজ্যবাদিরা হিংস্রতা, বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের সমর্থক, তারা সকল প্রকার শৃঙ্খলা ও সংগঠনের বিরোধী এবং তারা উন্মত্ত নিহিলিস্ট, যারা কেবল সব কিছু উড়িয়ে দিতে চায়। বাস্তবে, এগুলো সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। নৈরাজ্যবাদিরা খুব সাধারণ মানুষ, যারা বিশ্বাস করে: মানুষ কারো দ্বারা বাধ্য না হয়েও যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। এটি খুব সহজ একটি ধারণা। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাবানদের কাছে এই ধারণাকে সব সময়ই বিপজ্জনক মনে হয়েছে।

    সহজ করে বললে, নৈরাজ্যবাদী বিশ্বাসগুলো দুটি প্রাথমিক অনুমানের দিকে ঝুঁকেছে। প্রথমত, সাধারণ পরিস্থিতিতে, মানুষকে সুযোগ দেওয়া হলে তারা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ও শালীন হতে পারে এবং কারও দিকনির্দেশনা ছাড়াই নিজেকে এবং তাদের কমিউনিটিকে সংগঠিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। সর্বোপরি, নৈরাজ্যবাদ হলো এমন সব সাধারণ শিষ্টাচারের (বা সৌজন্যের) সহজ নীতি গ্রহণ করা যেগুলো সবাই মেনে চলে। এবং যৌক্তিক পরিণতির কথা চিন্তা করে শুধু সেগুলো মেনেই জীবনযাপনের সাহস দেখানো। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের মধ্যে দিয়ে আপনি হয়তো নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছেন নৈরাজ্যবাদী।

    দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক।

    ১) জনাকীর্ণ বাসে উঠার জন্য যদি কোনো লাইন থাকে, তাহলে কি আপনি নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করেন? এবং আরেকজনকে কনুই মেরে সামনে এগিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন? এমনকি সেখানে পুলিশের অনুপস্থিতি থাকলেও?

    আপনার উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়ে থাকে, তবে আপনি নৈরাজ্যবাদীদের মতো কাজ করতে অভ্যস্ত। নৈরাজ্যবাদের সবচেয়ে প্রাথমিক নীতিটি হচ্ছে: স্ব–সংগঠন। ধারণাটি অনেকটা এরকম যে, মানুষ কোনো মামলা বা সাজার ভয় ছাড়াই, একে অপরের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত বোঝাপড়ায় আসতে এবং একে–অপরকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে সক্ষম।

    প্রত্যেকে বিশ্বাস করে, তারা নিজে যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। তারা আইন ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় মনে করে, কারণ তারা মনে করে না যে, অন্যরাও যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। এখন প্রশ্ন হলো, অন্যরাও তো আপনার সম্পর্কে একইরকম ভাবতে পারে? নৈরাজ্যবাদিরা যুক্তি দেখান: প্রায় সব অসামাজিক আচরণই ভাবতে বাধ্য করে যে, আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, কারাগার ও সরকার থাকা জরুরি। কিন্তু সেই অসামাজিক আচরণগুলো দেখাই যায় সেসব পদ্ধতিগত বৈষম্য ও অন্যায়ের কারণে, যা তৈরি হয় সেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, কারাগার ও সরকারেরই মাধ্যমে। পুরো ব্যাপারটিই একটি দুষ্টচক্রের মতো। মানুষ যদি অনুভব করে যে, তাদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নাই, তাহলে তারা স্বভাবতই রাগান্বিত, কট্টর, এমনকি হিংস্র হয়ে ওঠে। যা তুলে ধরে ক্ষমতাশীনরা তখন সহজেই দেখাতে পারে যে, এইসব লোকের মতামতের আসলেই কোনো গুরুত্ব নাই। একবার যখন কেউ বুঝতে পারে তার মতামত, অন্য সবার মতামতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তখন সে লক্ষণীয়ভাবে সহানুভূতিশীল বা বুঝদার হয়ে ওঠে। সারসংক্ষেপ হলো: নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বয়ং ক্ষমতা এবং ক্ষমতার প্রভাব যা মানুষকে বোকা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলে।

    ২) আপনি কি এমন কোনো ক্লাব, ক্রীড়া দল বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্য, যেখানে সব সিদ্বান্ত কোনো এক নেতা চাপিয়ে দেন না বরং সবার সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে নেওয়া হয়?

    আপনার উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি এমন এক সংগঠনের সদস্য, যারা নৈরাজ্যবাদী নীতিতে কাজ করে। আরেকটি মৌলিক নৈরাজ্যবাদী নীতি হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সমিতি। এটি সাধারণ জীবনে গণতান্ত্রিক নীতিগুলো প্রয়োগ করে দেখার মতো বিষয়। পার্থক্য কেবল এই যে, নৈরাজ্যবাদিরা এমন এক সমাজ গঠনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন, যেখানে এভাবেই সব কিছু সংগঠিত হবে। বিভিন্ন গ্রুপ পরিচালিত হবে সব সদস্যের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে। ফলে, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বা বড় কর্পোরেশনের মতো উচ্চ–নিচ পরম্পরার সংগঠনগুলোর আর প্রয়োজন হবে না। এমনটিও যে সম্ভব, তা হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না। বা হয়তো করবেন। কিন্ত যতবারই আপনি হুমকির পরিবর্তে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন; যখনই আপনি কারও সাথে চুক্তি করেন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে; বা যখনই আপনি অন্য ব্যক্তির বিশেষ পরিস্থিতি বা জরুরি প্রয়োজনগুলোর কথা বিবেচনা করেন; তখনই আপনি আচরণ করেন নৈরাজ্যবাদির মতো। এমনকি আপনি হয়তো সেটি নিজে উপলব্ধিও করছেন না।

    নৈরাজ্যবাদ হলো সেই পথ, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তার পছন্দমতো কাজ করতে পারে, তার মতোই মুক্ত অন্যদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে এবং এর ফলে অন্যদের প্রতি তার যে দায়বদ্ধতা আছে, সে ব্যাপারে সচেতন হয়। এখান থেকে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: সমকক্ষ ব্যক্তির সাথে মানুষ যুক্তিযুক্ত ও সুবিবেচকের মতো আচরণ করে। কিন্তু মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, অন্য কারও কাছে যদি বেশি ক্ষমতা থাকে, তাহলে তাকে আর বিশ্বাস করা যায় না। কাউকে এ ধরনের ক্ষমতা দিয়ে দেখেন, কোনো না কোনোভাবে সে তার অপব্যবহার করবেই।

    ৩) আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ স্বার্থপর, অহঙ্কারী, জঘন্য লোক, যারা জনস্বার্থের কোনো তোয়াক্কা করে না এবং আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাস করি যা নির্বোধ ও পক্ষপাতদুষ্ট?

    যদি আপনি ‘হাঁ’ উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আজকের সমাজ নিয়ে নৈরাজ্যবাদী সমালোচনার একজন সমর্থক– অন্ততপক্ষে বিস্তৃত রূপরেখা বিবেচনায় নিলে। নৈরাজ্যবাদিদের মতে, ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্থ হয় এবং যারা পুরো জীবন ক্ষমতার সন্ধানে ব্যয় করে, তাদের হাতেই ক্ষমতাটি সবচেয়ে কম থাকা উচিত। নৈরাজ্যবাদিরা এও বিশ্বাস করে যে, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে সৎ ও যত্নবান আচরণের পরিবর্তে স্বার্থপর ও বিবেকহীন আচরণের জন্য বেশি পুরস্কৃত করে। বেশিরভাগ মানুষই তা–ই মনে করে। পার্থক্য হলো: বেশিরভাগ মানুষ ভাবে না যে, এই ব্যাপারে তাদের কিছু করার আছে। এমন যে কোনো কিছু তাদের করার আছে, যা বিষয়গুলো আরো খারাপ করে তুলবে না। এবং এই দিকটাতেই সবচে বেশি গুরুত্বারোপ করে ক্ষমতাবানদের বিশ্বস্ত সাগরেদরা।

    কিন্তু তা যদি সত্য না হতো তখন?

    এবং এটি কি বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ আছে? রাষ্ট্র বা পুঁজিবাদের অনুপস্থিতিতে কী ঘটবে, তা নিয়ে সাধারণত যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, তার বেশিরভাগই দেখা যায় পুরোপুরি মিথ্যা। এসব কিছুই আপনি যাচাই করে নিতে পারবেন। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সরকার ছাড়াই বাস করত। বিশ্বের অনেক জায়গায় আজও মানুষ জীবনযাপন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। তারা সবাই একে অপরকে হত্যা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কারা এমনভাবে বসবাস করে যেমনটা অন্য যে কোনো জায়গায় করা হতো। অবশ্যই জটিল, শহুরে, প্রযুক্তিগত সমাজে এসব বিষয়ের জটিলতা থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তি, এসব সমস্যার সমাধান আরও সহজ করে তুলতে পারে। আমরা আসলে চিন্তাও করতে শুরু করিনি যে, প্রযুক্তিকে যদি সত্যিই মানুষের প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করা যেত, তাহলে আমাদের জীবন কেমন হতো। আমরা যদি টেলিমার্কেটজীবী, আইনজীবী, কারারক্ষী, অর্থনীতি বিশ্লেষক, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, আমলা, রাজনীতিবিদদের মতো সমস্ত অকেজো বা ধ্বংসাত্মক পেশা থেকে মুক্তি পাই; আমাদের সেরা বৈজ্ঞানিক মাথাগুলোকে যদি মহাকাশ অস্ত্র বা শেয়ার বাজার ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা থেকে থেকে মুক্ত করতে পারি; কয়লা খনন বা বাথরুম পরিষ্কার করার মতো বিপজ্জনক বা বিরক্তিকর কাজের যান্ত্রিকীকরণ করতে পারি এবং অবশিষ্ট কাজকে সবার মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারি, তাহলে দিনে আমাদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে? দিনে পাঁচ ঘণ্টা? চার? তিন? দুই? কেউ জানে না, কারণ কেউ এই ধরনের প্রশ্ন তুলছে না। কিন্তু নৈরাজ্যবাদিদের মতে, ঠিক এই প্রশ্নগুলোই আমাদের করা উচিত।

    ৪) আপনি আপনার বাচ্চাদের যা বলেন (বা আপনার মা–বাবা আপনাকে যা বলেছিল), আপনি সত্যি তা বিশ্বাস করেন?

    ‘কে প্রথম শুরু করেছে এটি বিবেচ্য না’, ‘দুটি ভুল মিলে একটি সঠিকের জন্ম দেয় না’ ‘নিজের বিশৃঙ্খলা নিজে ঠিক কর’, ‘একজন তোমার মতো না হওয়ার কারণে তাকে ঘৃণা করো না’। সম্ভবত আমাদের ভাবা উচিত যে, আমরা যখন আমাদের সন্তানদের সঠিক ও ভুল সম্পর্কে বলি তখন আমরা মিথ্যা বলছি কিনা অথবা আমরা আমাদের উপদেশকে গুরুত্ব সহকারে নিতে ইচ্ছুক কিনা। কারণ আপনি যদি এই নৈতিক নীতিগুলোকে তাদের যৌক্তিক সিদ্ধান্তে নিয়ে যান তাহলে আপনি নৈরাজ্যবাদে এসে পৌঁছাবেন।

    ছবি: Carlo Carrà (১৯১১)

    উদাহরণ হিসেবে ‘দুটি ভুল মিলে একটি সঠিকের জন্ম দেয় না’– এই নীতির কথা ধরা যাক। আপনি যদি সত্যি এই কথাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে থাকেন তবে কেবলমাত্র এই একটি কথাই যুদ্ধ এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার পুরো ভিতকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে: আমরা সবসময় বাচ্চাদের বলি যে তাদের ভাগ করে নেওয়া শিখতে হবে, একে অপরের প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিতে হবে, একে অপরকে সহায়তা করতে হবে। কিন্তু তারপর আমরা যখন বাস্তব পৃথিবীতে যাই, তখন দেখতে পাই যে, ধরে নেওয়া হচ্ছে এখানে সবাই স্বভাবতই স্বার্থপর ও প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করবে। কিন্তু এই জায়গায় নৈরাজ্যবাদিরা বলবে যে, আমরা আমাদের বাচ্চাদের যা বলেছি, সেটাই ঠিক। মানব ইতিহাসের প্রতিটি অসাধারণ সার্থক অর্জন, প্রতিটি আবিষ্কার বা সাফল্য যা আমাদের জীবনকে উন্নত করেছে তা সম্ভব হয়েছে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তার কারণে। এমনকি এখনো আমরা আমাদের বেশিরভাগ অর্থ নিজেদের তুলনায় বন্ধু ও পরিবারের জন্যই বেশি ব্যয় করি। হ্যাঁ, বিশ্বে সব সময়ই হয়তো কিছু প্রতিযোগিতামূলক মানুষ থাকবে। কিন্তু তার মানে এই না যে, সমাজেও আমাদের এমন আচরণই উৎসাহিত করতে হবে। জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো মিটানোর জন্যও কেন তাকে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে? এ ধরনের পরামর্শ শুধু ক্ষমতাবানদেরই স্বার্থসিদ্ধি করে। এবং তারা চায়: আমরা যেন একে অপরকে ভয় করে বাঁচি। এই কারণে নৈরাজ্যবাদিরা চায় পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে একটি মুক্ত সমাজ গড়ে উঠুক। মূলত, বেশিরভাগ শিশুই শৈশবে নৈরাজ্যবাদী নৈতিকতায় বেড়ে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথিবী আসলে এভাবে চলে না। পরিণামে অনেক মানুষ হয়ে ওঠে বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্ন। এমনকি অনেকে অনেক কম বয়সে আত্মহত্যাও করে বসে। এবং শেষপর্যন্ত, বড় হয়ে তারা হয়ে ওঠে রুক্ষ ও তিরিক্কি মেজাজের। প্রায়ই তাদের একমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য হয়ে ওঠে তাদের নিজের সন্তানদের বড় করার সামর্থ্য। এবং তারা সন্তানদের কাছে ভান করে যেন দুনিয়াটা খুব ন্যায্য। কিন্তু কেমন হতো, যদি আমরা সত্যিই একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে পারতাম এসব ন্যয়বিচারের নীতিতে? সেটিই কি বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতো না?

    ৫) আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, মানুষ মূলগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও খারাপ? অথবা নির্দিষ্ট কিছু মানুষ (নারী, অশ্বেতাঙ্গ মানুষ, সাধারণ মানুষ যারা ধনী বা উচ্চ শিক্ষিত) নিচু প্রজাতির এবং তাদের শাসিতই হওয়া উচিৎ উচ্চ প্রজাতির মানুষদের দ্বারা?

    আপনি যদি ‘হাঁ’ উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে মোটেও নৈরাজ্যবাদী বলা যাবে না। কিন্তু যদি আপনি “না” উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, আপনার চিন্তাভাবনা নৈরাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার সাথে ৯০ ভাগ মিলে যায়। এবং খুব সম্ভবত আপনি সেসব চিন্তাভাবনার ছাপেই আপনার জীবন অতিবাহিত করছেন। যখনই আপনি অন্যের সাথে বিবেচনাপ্রসূত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেন, তখনই আপনি নৈরাজ্যবাদিদের কাতারে নাম লেখান। যখনই আপনি যুক্তিসঙ্গত সমঝোতার মাধ্যমে আপনার মতবিরোধগুলোর সমাধান করেন; সবার হয়ে একজনের সিদ্বান্ত নেওয়ার পরিবর্তে, আলাদা করে প্রত্যেকের বক্তব্য শোনেন ও বিবেচনা করেন; তখনই আপনি নৈরাজ্যবাদী হয়ে উঠেন। কারও উপর কর্তৃত্ব করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও, যদি তা না করে আপনি তাকে যুক্তি বা ন্যায়বোধ দিয়ে সেই কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করেন; তাহলে আপনি নৈরাজ্যবাদির মতোই আচরণ করছেন। একই কথা খাটে যখন আপনি বন্ধুর সাথে কিছু ভাগাভাগি করেন বা কে থালা–বাসন ধোবে তা নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন বা অন্য যে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন ন্যায্যতার দিকে খেয়াল রেখে।

    ছবি: মার্কো মেনাটো

    আপনি হয়তো আপত্তি করে বলবেন, ‘এসমস্ত কিছুই ভালো এবং ছোট গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের মধ্যে এসব চর্চা করতে পারে কিন্তু একটা শহর বা দেশ পরিচালনা করা সম্পূর্ন ভিন্ন বিষয়।’ এমনকি যদি আপনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণও করেন এবং ছোট ছোট কমিউনিটির কাছে ক্ষমতা তুলে দেন, তাহলেও, রেলপথ পরিচালনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা গবেষণার দিকনির্দেশনা; ইত্যাদি নানা কাজের জন্য আপনাকে প্রচুর পরিমাণে সমন্বিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি জটিল মানেই তার অর্থ এই নয় যে, সেটিকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করার কোনো উপায় নাই। এটি হয়তো শুধু একটু জটিলই হবে। আসলে জটিল সমাজ কীভাবে নিজেকে পরিচালনা করতে পারে সে সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদিদের বিভিন্ন ধরনের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সেসবের ব্যাখ্যা এই প্রাবেশিক লেখার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাবে। এখানে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, স্বাস্থ্যকর সমাজ কীভাবে কাজ করতে পারে তার মডেল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষ, অনেক সময় ব্যয় করেছে। এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে: কোনো নৈরাজ্যবাদিই কখনো কোনো পরিকল্পনাকে পুরোপুরি নিখুঁত বলে দাবি করে না। যে জিনিসটা আমরা কোনোভাবেই করতে চাই না, তা হলো: আগে থেকে পরিকল্পিত কোনো সমাজের মডেল জোর করে চাপিয়ে দেয়া। প্রকৃতপক্ষে, একটা গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করার চেষ্টা করতে গিয়ে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে, সম্ভবত তার অর্ধেকও আমরা কল্পনা করতে পারি না; তবুও আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, সব সময়ই এসব সমস্যা মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি আমাদের মৌলিক নীতিগুলোর চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। শেষ বিচারে এটিই মৌলিক মানবীয় শিষ্ঠাচারের মূলনীতি।

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। ‘পশ্চিম’ বলে কখনো কিছু ছিল না: গণতন্ত্রের উত্থান প্রসঙ্গে

    ডেভিড গ্রেইবার ।। ‘পশ্চিম’ বলে কখনো কিছু ছিল না: গণতন্ত্রের উত্থান প্রসঙ্গে

    • অনুবাদ: সহুল আহমদ

    অনুবাদকের মন্তব্য: ডেভিড গ্রেইবার ছিলেন নৃবিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী, এক্টিভিস্ট এবং নৈরাজ্যবাদী। বহুজন তাকে ‘নিপীড়িতদের বন্ধু’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। ‘ছিলেন’ বলছি কারণ মাত্র ৫৯ বছর বয়সে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মারা যান। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন থেকে শুরু কুর্দিদের রোজাভা বিপ্লব সবখানেই তার ছিল সরব বিচরণ। একাধিক বার তিনি কুর্দিস্তান সফর করেছিলেন এবং যেখানেই সম্ভব হয়েছে যোগ দিয়েছিলেন কুর্দি সংহতি বিক্ষোভে। তার Debt: The First 5000 years গ্রন্থটি বেস্ট সেলারের খেতাব অর্জন করেছিল যেখানে। একইভাবে তার Bullshit jobs গ্রন্থটিও সমাদৃত। এছাড়াও নৈরাজ্যবাদ, গণতন্ত্র, আন্দোলন ইত্যাদি প্রশ্নে তিনি বিস্তর লেখালেখি করেছেন। Direct Action: An Ethnography এবং The Democracy Project: A History, a Crisis, a Movement বইগুলো তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। আলোচ্য প্রবন্ধটি মূলত ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘There Never Was a West Or, Democracy Emerges From the Spaces In Between’ শীর্ষক প্রবন্ধের অনুবাদ। এটি প্রকাশিত হয়েছিল ডেভিড গ্রেইবারের Possibilities: Essays on Hierarchy, Rebellion, and Desire গ্রন্থে। প্রবন্ধের হদিস পেয়েছি এনার্কিস্ট লাইব্রেরি থেকে। প্রবন্ধটি অরাজে ছয় কিস্তিতে প্রকাশিত হবে।

    ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)

    বিকল্প বিশ্বায়ন আন্দোলনের আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যা বোঝা গিয়েছে তা হচ্ছে গণতন্ত্রের বিষয়াদি বিতর্কের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার নৈরাজ্যবাদী এবং দক্ষিণ গোলার্ধের (Global South) আদিবাসী সংগঠনগুলো অদ্ভুতভাবে একই ধরনের যুক্তি–তর্কের মধ্যে নিজেদেরকে খুঁজে পেয়েছিল। ‘গণতন্ত্র’ কি অন্তর্নিহিতভাবে পশ্চিমা ধারণা? এটা কি পরিচালনার (গভার্নেন্স, বা সম্প্রদায়ের নিজেকে সংগঠিত করার পদ্ধতি) একটি রূপ, নাকি সরকারের (রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংগঠিত করার বিশেষ উপায়) একটি রূপ? গণতন্ত্র কি আবশ্যিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনকে বোঝায়? প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র কি আদৌ গণতন্ত্র? শব্দের উদ্ভব এথেন্সে হয়েছে বলে কি এটি স্থায়ীভাবে কলুষিত; যে এথেন্স কিনা ছিল নারীর উপর পদ্ধতিগত দমনের ভিত্তিতে গঠিত একটি যুদ্ধবাজ (militaristic), আগ্রাসী ও দাস কেনাবেচার সমাজ? অথবা আমরা যাকে আজ ‘গণতন্ত্র’ বলি তার সাথে অ্যাথেনিয়ান গণতন্ত্রের আদৌ কি কোনো বাস্তব ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে? একটি ঐক্যমত্য–ভিত্তিক প্রত্যক্ষ (ডিরেক্ট) গণতন্ত্রের বিকেন্দ্রীভূত রূপ গড়ে তোলার মাধ্যমে কি শব্দটাকে পুনরূদ্ধার করা (রিক্লেইম) সম্ভব? যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে বোঝাতে পারি যে প্রতিনিধি নির্বাচনের সাথে ‘গণতন্ত্রে’র কোনো যোগসূত্র নেই? যদি তা না হয়ে থাকে, যদি আমরা এর মানসংজ্ঞাটিই গ্রহণ করে ফেলি এবং প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রকে অন্য কোনো নামে ডাকি, তাহলে আমরা কীভাবে বলি যে আমরা গণতন্ত্রের বিরোধী— যে শব্দের সাথে কিনা এমন সর্বজনীন ইতিবাচক বিষয়াদি জড়িত?

    এই যুক্তিতর্কগুলো যতটা না চর্চার বিষয়ে তার চাইতে অনেক বেশি শব্দ বিষয়ে। প্রকৃতপক্ষে চর্চা বা অনুশীলনের প্রশ্নে বিস্ময়কর মাত্রার ঐকমত্য রয়েছে। বিশেষ করে আন্দোলনের বৈপ্লবিক উপাদানসমূহের মধ্যে এটি রয়েছে। কেউ যদি শিয়াপাসের যাপাতিস্তা সম্প্রদায়ের সাথে কথা বলেন, বা আর্জেন্টিনার বেকার পিকেটারদের সাথে কথা বলেন, বা ডাচ স্কোয়াটারের সাথে কথা বলেন, বা দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্ছেদ–বিরোধী আন্দোলনকর্মীদের সাথে কথা বলেন, প্রায় প্রত্যেকেই খাড়াখাড়ি কাঠামোর (vertical structure) পরিবর্তে আড়াআড়ি কাঠামোর (horizontal) জরুরতের বিষয়েই একমত হন। সিদ্ধান্ত চেইন অফ কমান্ডের মাধ্যমে নিম্নাভিমুখী হওয়ার চাইতে তুলনামূলক ছোট, স্ব–সংগঠিত, স্বায়ত্তশাসিত দল থেকে উঠে আসার উদ্যোগের জরুরতের বিষয়েও সবাই একমত হন। স্থায়ী ও নামী নেতৃত্বের কাঠামোকে খারিজ করার বিষয়েও সকলে একমত হন। এবং যে কণ্ঠস্বরগুলো সাধারণত চিরাচরিত প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যায় বা প্রান্তিকে চলে যায় তাদের কণ্ঠস্বর যেন শোনা যায় সে বিষয়ে কোনো একরকম কলকব্জা (মেকানিজম) বজায় রাখার জরুরতের বিষয়েও প্রায় সকলেই একমত হন। অতীতের কিছু তিক্ত দ্বন্দ্ব, যেমন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটদানের পক্ষাবলম্বী বনাম ঐকমত্য [কনসেন্সাস] প্রক্রিয়ার পক্ষাবলম্বীদের দ্বন্দ্ব বহুলাংশেই মীমাংসিত হয়ে গিয়েছে, অথবা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কেননা সামাজিক আন্দোলনগুলোতে ছোট ছোট দলগুলোর ভেতর পূর্ণ ঐকমত্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বৃহত্তর কোয়ালিশনের জন্য ‘মডিফাইড কনসেনসাস’ এর বিভিন্ন রূপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিছু একটার উদ্ভব ঘটছে। সমস্যা হচ্ছে একে আমরা কি নামে ডাকব। এই আন্দোলনগুলোর বহু মূলনীতি (যেমন স্ব–সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবক সমিতি, পারস্পরিকতা বা মিচুয়াল এইড, রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রত্যাখ্যান) নৈরাজ্যবাদী ঐতিহ্য থেকে গ্রহণ করেছে। তবুও যারা এই ধারণাগুলো গ্রহণ করেছেন তাদের অনেকেই নিজেদেরকে ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলতে অনিচ্ছুক বা রাজি নন। সাধারণত আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিটি হচ্ছে অকপটে দুটো শব্দকেই সাগ্রহে গ্রহণ করে নেয়া। প্রকৃতপক্ষে নৈরাজ্যবাদ ও গণতন্ত্র মূলত অভিন্ন বিষয়, অথবা অভিন্ন হওয়া উচিৎ। তদপুরি যেমন আমি বলছিলাম, এই বিষয়ে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, এমনকি কোনো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিও নেই।

    আমার কাছে মনে হয় এগুলো অন্য যে কোনো কিছুর চাইতে বেশি কৌশলগত, রাজনৈতিক প্রশ্ন। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ‘গণতন্ত্র’ দিয়ে বিভিন্ন বিষয়কে বোঝানো হয়েছে। প্রথম যখন শব্দটি চালু করা হয়েছিল তখন এটি এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝাত যেখানে একটা সম্প্রদায়ের নাগরিকগণ একটি সমষ্টিগত পরিষদে (কালেকটিভ এসেম্বলি) সমান ভোটে সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করতেন। ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে এটা দিয়ে বিশৃঙ্খলা, দাঙ্গা, লিঞ্চিং বা গণপিটুনি এবং দলাদলির সহিংসতাকে বোঝানো হয়েছে (বস্তুতঃ বর্তমানে ‘নৈরাজ্যে’র সাথে এই শব্দের প্রচুর সংযোগ রয়েছে)। অতি সম্প্রতি এটা এমন এক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে একটা রাষ্ট্রের নাগরিকগণ কয়েকজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করেন যারা নাগরিকদের নামে রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। স্পষ্টত এখানে কোনো খাঁটি সত্তার সন্ধান করা হচ্ছে না। এমন ভিন্ন ভিন্ন অর্থের ভেতর কেবল একটা সাধারণ বিষয় হচ্ছে যে, যে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো সাধারণত সংকীর্ণ অভিজাতদের হাতে ছিল সেগুলো এখন সকলের কাছে উন্মুক্ত; তা হোক খুব ভালো কিছু বা হোক খুব মন্দ কিছু। শব্দটা নৈতিকভাবে এতই ভারী যে গণতন্ত্রের কোনো নিরাবেগ ও নির্লিপ্ত ইতিহাস লেখাটা স্ববিরোধী কথা হতে পারে। অধিকাংশ পণ্ডিত যারা একধরণের নির্লিপ্ত ভঙ্গি বজায় রাখতে চান তারা এই শব্দটা পরিহার করেন। যারা গণতন্ত্র সম্পর্কে সাধারণীকরণ করেন তাদের অবধারিতভাবেই কিছু না কিছু ব্যক্তিস্বার্থ থাকে।

    ছবি: আভো গারিবিয়ান

    আমারও আছে অবশ্য। এই কারণে শুরু থেকেই আমার স্বার্থ পাঠকের সামনে তুলে ধরাটাকেই আমি ন্যায্য বলে মনে করি। আমার কাছে মনে হয় ‘গণতন্ত্র’ শব্দটাকে শাসক ও নেতারা যতই অপব্যবহার করুক না কেনো এর এখনো অদম্য জনপ্রিয় আকর্ষণ রয়েছে। অধিকাংশই একে চিহ্নিত করেন এমন এক ধারণা [নোশন] হিসেবে যা সাধারণ মানুষের সমষ্টিগতভাবে নিজেদের কাজকারবারগুলোকে পরিচালনা করতে পারার সাথে জড়িত। উনিশ শতকেই শব্দটির এই অর্থ বা অভিব্যক্তি ছিল; এবং এই কারণেই উনিশ শতকের রাজনীতিবিদরা যারা কিনা শব্দটিকেই এড়িয়ে চলতেন, তারাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং নিজেদেরকে ‘ডেমোক্রেটস’ হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের একটা ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে ফেলেন যেখানে তারা নিজেদেরকে প্রাচীন এথেন্সের একটি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসাবে চিত্রিত করতে পারেন। তবু আমি ধরে নেব যে, ‘গণতন্ত্র’ এর ইতিহাসকে ‘গণতন্ত্র’ শব্দের ইতিহাসের চেয়ে জোর দিয়ে গণ্য করা উচিৎ। এটা আমি ধরে নিচ্ছি কোনো বিশেষ কারণ বা বিশেষ কোনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ কারণ ছাড়াই, কেননা এইগুলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রশ্ন নয় বরঞ্চ নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন। গণতন্ত্র যদি কোনো একটা সম্প্রদায়ের সকলের আলাপ–আলোচনার খোলামেলা ও অপেক্ষাকৃত সমতাবাদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজস্ব বিষয়াদি পরিচালনার একটি বিষয় হয়ে থাকে তাহলে আফ্রিকা অথবা ব্রাজিলের গ্রামীণ সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার সমতাবাদীরূপটি হাল–জমানার জাতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থার মতো সমান উপযুক্ত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এবং, বহু ক্ষেত্রে সম্ভবত এটি আরও উপযুক্ত।

    এই আলোকেই আমি এ সম্পর্কিত একসারি যুক্তি হাজির করব। সেগুলো এখনই তুলে ধরাটা আলাপে অগ্রসর হওয়ার সর্বোত্তম উপায় হতে পারে।

    ১) যারা এই বিষয়ে লেখালেখি করেছেন তারা প্রায় সকলেই ‘গণতন্ত্র’কে একটা ‘পশ্চিমা’ ধারণা বলে ধরে নেন যার উদ্ভব কিনা হয়েছে প্রাচীন গ্রিসে। তারা এও ধরে নেন যে, অষ্টাদশ এবং উনিশ শতকের রাজনীতিবিদরা পশ্চিমা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় এর পুনরুত্থান শুরু করেছিলেন। এভাবে গণতন্ত্রকে এমন কিছু একটা হিসেবে দেখা হয় যার স্বাভাবিক বাসস্থান হচ্ছে পশ্চিমা ইউরোপ এবং এর ইংরেজি বা ফরাসি ভাষাভাষীদের বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ। এমন কোনো অনুমানই ন্যায্য নয়। ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ বিশেষভাবে একটি অস্পষ্ট বা আলগা ধারণা। কিন্তু যদি এটা কিছু বুঝিয়েই থাকে তাহলে সেটা একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে বোঝায়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য গণতন্ত্র বলে আমরা যাকে চিনি তার প্রতি ততটাই প্রতিকূল যতটা প্রতিকূল ভারত, চীন বা মেসোআমেরিকার প্রতি।

    ২) গণতান্ত্রিক অনুশীলন, মানে সমতাবাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া যে কোনো স্থানেই দেখা যায়; এটা কোনো একটি ‘সভ্যতা’, সংস্কৃতি অথবা ঐতিহ্যের নিজস্ব নয়। যেখানেই মানবজীবন বলপ্রয়োগ বা জুলুমের পদ্ধতিগত কাঠামোর বাইরে গিয়েছে সেখানেই এসবের বেড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

    ৩) ‘গণতান্ত্রিক আদর্শ’ তখনই হাজির হয় যখন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র এবং জনপ্রিয় আন্দোলন ও চর্চার মধ্যে তাদের চলাচল সুগম করতে অন্যদের সাথে সংলাপের মাধ্যমে নিজেদের ঐতিহ্যকে প্রশ্ন করেন, অতীত বা বর্তমানের গণতান্ত্রিক চর্চার বিভিন্ন ঘটনাকে হাজির করে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, তাদের ঐতিহ্যে গণতন্ত্রের বীজ নিহিত রয়েছে। আমি এই মুহূর্তগুলোকে বলি ‘গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ (ডেমোক্রেটিক রিফাউন্ডেশন)। বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো পুনরুদ্ধারের মুহূর্তও বটে। বিভিন্ন আদর্শ এবং প্রতিষ্ঠান যেগুলো কিনা বিভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মানুষের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়ার অবিশ্বাস্যরকম জটিল রূপের ফসল, সেগুলোকেই তুলে ধরা হয় খোদ নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের যুক্তিবোধ থেকে উদ্ভুত বলে। উনিশ ও বিশ শতকের ইতিহাসজুড়ে এমন মুহূর্ত কেবল ইউরোপেই ঘটেনি, বরঞ্চ প্রায় সর্বত্রই ঘটেছিল।

    ৪) প্রকৃতপক্ষে এই আদর্শ সর্বদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে [অন্তত কিছুটা হলেও] উদ্ভাবিত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে, এ কথা বলার বলার অর্থ এই নয় যে এটি ভেজাল অথবা অবৈধ অথবা অন্তত অন্যকিছুর চাইতে বেশি ভেজাল বা অবৈধ। তবে স্ববিরোধটা হচ্ছে, এই আদর্শের সর্বদা ভিত্তি ছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বা অনুশীলনের সাথে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক প্রক্রিয়ার মিলনের অসম্ভব স্বপ্নের উপর। এর ফল যা হয়েছে তাকে কোনোভাবেই ‘গণতন্ত্র’ বলা চলে না, বরঞ্চ মোটের উপর কয়েকটি সীমিত গণতান্ত্রিক উপাদান নিয়ে ‘রিপাবলিকস’ তথা ‘সাধারণতন্ত্র’ বলা যায়।

    ৫) আমরা বর্তমানে যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তা গণতন্ত্রের সঙ্কট নয়, বরঞ্চ রাষ্ট্রের সঙ্কট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সামাজিক আন্দোলনগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রক্রিয়ার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এটা অগ্রসর হয়েছে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ স্পষ্টত এই জায়গাতেই নিহিত।

    উপরে যেভাবে তুলে ধরেছি মোটামুটি এই ধারাতেই আলাপ শুরু করা যাক। প্রথমেই গণতন্ত্র একটি ‘পশ্চিমা ধারণা’ এটা দিয়েই শুরু করি।

    ছবি: ফিলিপ ফোল্ডজ

    প্রথম পর্ব: ‘পশ্চিমা ঐতিহ্য’ ধারণার অসঙ্গতি সম্বন্ধে

    আমি তুলনামূলক একটা সহজ টার্গেট বেছে নেব: স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশনের বিখ্যাত প্রবন্ধ। হান্টিংটন হার্ভার্ডের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, স্নায়ুযুদ্ধের একজন ধ্রুপদী বুদ্ধিজীবী, ডানপন্থিদের প্রিয় থিংক ট্যাঙ্ক। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি যুক্তি দেন যে, এখন যেহেতু ঠাণ্ডাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব এখন প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যকার সংঘাতকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খাবে। এই যুক্তিটি সাংস্কৃতিক হীনাবস্থার একটা বিশেষ ইশারা প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর্নল্ড টয়েনবির কাজের উপর ভর করে তিনি পশ্চিমাদেরকে বোঝান যে, তাদের সভ্যতা আরও বহু সভ্যতার মধ্যে একটি, এর মূল্যবোধগুলোকে সর্বজনীন ভাবার কোনো উপায় নেই। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বিশেষ করে গণতন্ত্র স্পষ্টতই পশ্চিমা ধারণা এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে এটা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা ইউরোপের পরিহার করা উচিৎ:

    ‘উপরিস্তরে দুনিয়ার বাকি অংশেও পশ্চিমা সংস্কৃতির বেশিরভাগ জিনিস ছড়িয়ে পড়েছে। তবু মৌলিক স্তরে পশ্চিমা ধারণাগুলো মৌলিকভাবেই অন্যান্য সভ্যতায় প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্ন। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, উদারনীতি, সংবিধানবাদ, মানবাধিকার, সাম্য, স্বাধীনতা, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মুক্ত বাজার, রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকীকরণের মতো পশ্চিমা ধারণাগুলোর সাথে ইসলামি, কনফুসিয়ান, জাপানি, হিন্দু, বৌদ্ধ বা অর্থোডক্স সংস্কৃতির মিল খুব অল্পই। এমন ধারণা প্রচারের পশ্চিমা প্রচেষ্টা উল্টো ‘মানবাধিকার সাম্রাজ্যবাদ’ এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে এবং আদি মূল্যবোধগুলোর পুনর্নির্মাণ ঘটাচ্ছে; যেমনটি ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতি অ–পশ্চিমা সংস্কৃতির তরুণ প্রজন্মের সমর্থনে দেখা যাচ্ছে। খোদ ‘সর্বজনীন সভ্যতা’ ধারণাই একটি পশ্চিমা ধারণা, অধিকাংশ এশীয় সমাজের বিশেষত্ববাদ (পারটিকুলারিজম) এর সাথে সরাসরি বিরোধ রয়েছে।’ (১৯৯৩:২০)

    পশ্চিমা ধারণার তালিকাটা যে কোনো অর্থেই কৌতূহলোদ্দীপক। উদাহরস্বরূপ, যদি আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে যে, ‘পশ্চিম’ কেবল উনিশ অথবা বিশ শতকে কোনো ধরনের স্বীকৃত রূপ নিয়েছিল। কেননা, এর পূর্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘পশ্চিমারা’ এই নীতিগুলোকে এক পলকে খারিজ করে দিতেন। কেউ চাইলে গত দুই তিন হাজার বছরের ইউরোপের বিভিন্ন অংশে সন্ধান চালাতে পারেন এবং এসবের সম্ভাব্য অগ্রদূতকেও খুঁজে পেতে পারেন। অনেকে চেষ্টা করেছেন। এই ক্ষেত্রে পঞ্চম শতকের এথেন্স ভালো উপাদান সরবরাহ করে, যদিবা কেউ পঞ্চম শতক এবং ১২১৫ খিষ্টাব্দ বা ১৭৭৬ এর মধ্যকালের প্রায় সকল বিষয় ইচ্ছাকৃত ভাবে খারিজ করতে চান বা ভাসা–ভাসা দেখে যান। অধিকাংশ প্রচলিত গ্রন্থাদি মোটামুটি এই পদ্ধতিটাই গ্রহণ করেন। হান্টিংটন আরো একটু চতুর। তিনি গ্রিক ও রোমকে আলাদাভাবে বিবেচনা করেন, যেগুলো পরবর্তীতে প্রাচ্য (গ্রিক) এবং পশ্চিমা (ল্যাটিন) ক্রিশ্চিয়ানিটিতে বিভক্ত হয়ে যায়, এবং পরবর্তীতে অবশ্য ইসলামে। যখন পশ্চিমা সভ্যতার শুরু হলো তখন সেটা ল্যাটিন খ্রিস্ট্রীয় জগতের সাথে অভিন্ন ছিল। বহু সংস্কার ও পাল্টা–সংস্কারের উত্থান–পতনের মাধ্যমে এই সভ্যতা তার ধর্মীয় নির্দিষ্টিতা হারিয়ে একধরনের বৃহৎ কিছু এবং মূলত সেকুলারে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ফলটা অবশ্য প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকের মতোই, কেননা হান্টিংটন আরও জোর দিয়েছিলেন যে, পশ্চিমা ঐতিহ্য সবসময়ই ধ্রুপদী সভ্যতার ধারণার উত্তরাধিকারী হিসেবে এর গোঁড়া বা ইসলামি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাইতে ‘অনেক বেশি’ কিছু।

    এখন হাজারটা উপায়ে হান্টিংটনের অবস্থানকে আক্রমণ করা যায়। তার ‘পশ্চিমা ধারণা’র তালিকাটা বিশেষভাবে স্বেচ্ছাচারী। পশ্চিমা ইউরোপে বছরের পর বছর অজস্র ধারণা ভেসে ছিল, এবং এর মধ্যে বহু ধারণাকে গ্রহণ করাও হয়েছে। কেন বাকিগুলো না নিয়ে কেবল এগুলোকে বাছাই করা হলো? বাছাই এর মানদণ্ডই–বা কী? স্পষ্টত, হান্টিংটনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, পশ্চিমা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাতে ব্যাপকভাবে গৃহীত ধারণাগুলোকে দুনিয়ার অন্যান্য অংশে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। কিন্তু এমনকি এর উপর ভিত্তি করে কেউ কি একেবারে ভিন্ন একটা তালিকা প্রণয়ন করতে পারে না? যেমন যে কেউ যুক্তি দেখাতে পারেন, ‘পশ্চিমা সংস্কৃতি’র ভিত্তি হচ্ছে বিজ্ঞান, শিল্পবাদ, আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকতা, জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদী তত্ত্বাবলী এবং ভৌগলিক সম্প্রসারণের অন্তহীন অভিযান; এবং এরপরেই যুক্তি দেখানো যেতে পারে পশ্চিমা সংস্কৃতির চূড়ান্তবিন্দু হচ্ছে তৃতীয় রাইখ বা নাৎসি জমানা। (বস্তুত, পশ্চিমের বহু র‍্যাডিক্যাল সমালোচক যথাযথভাবেই এই যুক্তি দেন) তবুও এমনকি এই সমালোচনা হাজির থাকা সত্ত্বেও হান্টিংটন মোটামুটি সেই খামখেয়ালি তালিকাতেই অনড় থাকেন। (যেমন, ১৯৯৬)

    হান্টিংটন কেন এই তালিকা তৈরি করলেন তা বোঝার জন্য একমাত্র তরিকা আমার মনে হয় তার ব্যবহৃত ‘সংস্কৃতি’ ও ‘সভ্যতা’ পদদুটোকে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা। প্রকৃতপক্ষে কেউ যদি সতর্কভাবে তাকে পাঠ করেন তাহলে দেখবেন ‘পশ্চিমা সংস্কৃতি’ ও ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ বাক্যাংশদুটো অনেকটা একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে [অদলবদল করে]। প্রত্যেক সভ্যতার নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। এর পরিবর্তে, সংস্কৃতি মূলত ‘ধারণা’, ‘প্রত্যয়’, এবং ‘মূল্যবোধ’ নিয়ে গঠিত বলে মনে করা হয়েছে। পশ্চিমা ক্ষেত্রে এই ধারণাগুলো একদা খ্রিস্টধর্মের একটি বিশেষ ধরণের সাথে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়; এবং মনে করা হয়, এখন এগুলো [ধারণাগুলো] পশ্চিমা ইউরোপ এবং এর ইংরেজি ও ফরাসি ভাষাভাষী বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশগুলোতে শিকড় গেড়ে একটি ভৌগলিক ও জাতিগত বিন্যাস তৈরি করেছে। অন্যান্য সভ্যতার তালিকাগুলো কোনো ভৌগলিক দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি, কেবল জাপান ছাড়া। তারা এখনো ধর্ম: ইসলাম, কনফুসিয়ান, বৌদ্ধ, হিন্দু এবং গোঁড়া খ্রিস্টান সভ্যতা। এটা ইতোমধ্যেই কিছুটা বিভ্রান্তিকর। কেন পশ্চিমকে ১৫২০ সাল নাগাদ ধর্মীয় দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করা বন্ধ করা হলো, (যদি বেশিরভাগ পশ্চিমারা নিজেদেরকে ‘খ্রিস্টান’ সম্বোধন করা সত্ত্বেও) যেখানে অন্যান্যরা এখনো তাই রয়ে গেল (যদিও অধিকাংশ চীনারা নিশ্চিতভাবেই ‘কনফুসিয়ান’ বলে সম্বোধন না করা সত্ত্বেও)? আমি মনে করি, হান্টিংটনের এই ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য হয় পশ্চিম থেকে কিছু গোষ্ঠীকে বাদ দিতে হবে যেগুলোকে তিনি বাদ দিতে চান না (ক্যাথলিক বা প্রোটেস্ট্যান্ট, ইহুদি, যৌক্তিক একেশ্বরবাদ, সেকুলার দার্শনিক) অথবা তাকে কেন পশ্চিমে বিশ্বাস ও দর্শনের জটিল সংমিশ্রণ রয়েছে এবং অন্যখানে নেই তার কারণ সরবরাহ করতে হবে। যদিও কেউ ভারত বা চীনের ভৌগলিক অঞ্চলকে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করবেন তখন সেখানেও বিশ্বাস ও দর্শনের মধ্যে জটিল সংমিশ্রণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

    ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

    অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে “What Makes the West Western” (1996) প্রবন্ধে হান্টিংটন দাবি করেন যে, ‘বহুত্ববাদ’ই পশ্চিমের অন্যতম অনন্য গুণ:

    ‘পশ্চিমা সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই খুব বহুত্ববাদী। কার্ল ডয়েচ যেমন বলছিলেন, পশ্চিমের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ‘রক্ত বা বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নয় এমন গোষ্ঠী বা দলের উদ্ভব ও ছড়িয়ে পড়া’। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের শুরুতে এই গোষ্ঠীতে বিভিন্ন আশ্রম, গিল্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও বহু ধরনের সমিতি ও সমাজ ছড়িয়ে পড়েছিল।’ (১৯৯৬: ২৩৪)

    তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, এই বৈচিত্রের মধ্যে শ্রেণি বহুত্ববাদ (শক্তিশালী অভিজাততন্ত্র), সামাজিক বহুত্ববাদ (প্রতিনিধিমূলক সংঘ), ভাষাগত বৈচিত্রসহ আরও অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত। তার মতে এই সবকিছু ধীরে ধীরে পশ্চিমা নাগরিক সমাজের অনন্য জটিলতার জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এখন এগুলো যে কতটা হাস্যকর তা সহজেই দেখানো সম্ভব। যেমন, যে কেউই চাইলে পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন যে, প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসজুড়ে চীন ও ভারতে পশ্চিমা ইউরোপের চাইতে অনেক বেশি ধর্মীয় বহুত্ববাদ ছিল। অধিকাংশ এশীয় সমাজ বহু ধরনের আশ্রম, গিল্ড, মঠ, গোপন সমাজ, সংঘ, পেশাজীবী ও নাগরিক গোষ্ঠী দ্বারা চিহ্নিত ছিল। ধর্মদ্রোহিদের নিশ্চিহ্ন করে, বা ডাইনি শিকার করে (উইচ হান্ট) সমরূপতা কায়েমের জন্য পশ্চিমা কায়দায় যুদ্ধ আর কেউই করেনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, হান্টিংটন তার বর্গের অস্পষ্টতাকেই এর নির্ধারিত বা চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। প্রথমত, তিনি এমনভাবে এশিয় সভ্যতাকে বর্ণনা করার চেষ্টা করছেন যেন তারা সংজ্ঞানুসারে বহুত্ববাদী হতেই পারে না। এরপর যদি কেউ অভিযোগ করেন, তিনি যাদেরকে ‘পশ্চিমা’ বলে দলা পাকিয়েছেন তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ভাষা, ধর্ম, দর্শন, বা সরকারপদ্ধতি নেই, তখন হান্টিংটনের উত্তর প্রস্তুতই আছে: এই বহুত্ববাদই পশ্চিমের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এটি এক নিখুঁত চক্রিয় যুক্তিধারা।

    বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হান্টিংটনের যুক্তি সেই পুরান আমলের প্রাচ্যবাদী ধাঁচের: ইউরোপীয় সভ্যতাকে দেখা হয় অন্তর্নিহিতভাবে গতিশীল, ‘প্রাচ্য’কে তুলে ধরা হয় নিশ্চল, কালহীন ও একশিলাভূত (monolithic) হিসাবে। আমি যেদিকে আসলে মনযোগ দিতে চাই সেটা হচ্ছে ‘সভ্যতা’ ও ‘সংস্কৃতি’ নিয়ে হান্টিংটনের ধারণা কতটা অসমাঞ্জস্য বা অস্পষ্ট তা দেখানো! সর্বোপরি ‘সভ্যতা’ শব্দটি দুইভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এটি এমন এক সমাজকে বোঝাতে ব্যবহার করা হতে পারে যেখানে লোকজন শহরে বসবাস করে, প্রত্মতাত্ত্বিকরা যেমন করে সিন্ধু উপত্যকার কথা বলেন। অথবা এর অর্থ হতে পারে পরিমার্জন, অভীষ্টলাভ, সাংস্কৃতিক অর্জন। সংস্কৃতিরও একভাবে দ্বৈত অর্থ রয়েছে। কেউ নৃতাত্ত্বিক অর্থে একে ব্যবহার করতে পারেন, অর্থাৎ কোনো একটি সংস্কৃতির সদস্যদের বেড়ে ওঠার সাথে জড়িত অনুভূতির কাঠামো ও প্রতীকী বিধিকে বোঝাতে ব্যবহার করতে পারেন যা কিনা সদস্যদের প্রত্যাহিক জীবন–যাপনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে অবহিত করবে। মানে কীভাবে লোকেরা কথা বলে, খায়, বিয়ে করে, ভাবের আদান–প্রদান করে, গান শুনে ইত্যাদি। বোওর্দিওর পরিভাষা ব্যবহার করে কেউ এই সংস্কৃতিকে জীবনাচার[হ্যাভিটাস] বলতে পারেন। এর বিপরীতে, কেউ এই শব্দটি দিয়ে ‘উঁচু সংস্কৃতি’ বলে যা চালু আছে সেটাকে বোঝাতে পারেন। মানে, কোনো শৈল্পিক, সাহিত্যিক বা দার্শনিক অভিজাতদের সেরা ও অসামান্য উৎপাদনকেও বোঝাতে পারেন। পশ্চিমাকে কেবল তার সবচেয়ে মূল্যবান ধারণা, যেমন স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার, দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার দিকে হান্টিংটনের জোরারোপ থেকে আন্দাজ করা যায় যে, তার মনে আসলে সংস্কৃতির এই দ্বিতীয় সংজ্ঞাই রয়েছে। যদি নৃতাত্ত্বিক অর্থে ‘সংস্কৃতি’কে সংজ্ঞায়ন করতে হয় তাহলে স্পষ্টত প্রাচীন গ্রিকদের সরাসরি উত্তরাধিকারী আধুনিক ইংরেজ বা ফরাসিরা হতেন না, আধুনিক গ্রিকরাই হতেন। কিন্তু হান্টিংটনের যুক্তি অনুযায়ী, আধুনিক গ্রিকদের সাথে পশ্চিমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল ১৫০০ বছর পূর্বে, যে মুহূর্তে তারা খ্রিস্টধর্মের ভুল রূপে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল।

    ছবি: Jacques Réattu

    সংক্ষেপে হান্টিংটন যে অর্থে ‘সভ্যতা’ ধারণাকে ব্যবহার করছেন তা বুঝতে সভ্যতাগুলোকে মূলত মানুষের একে অপরের বই পড়ার ঐতিহ্য হিসাবে কল্পনা করতে হবে। বলা যেতে পারে প্লাটো বা থুসিডাইডের সময়ের কোনো গ্রিক মেষপালকের চাইতে নেপোলিয়ন বা ডিসরায়েলি ওনাদের কাছের উত্তরাধিকারী, কারণ এই দুইজনেই প্লাটো বা থুসিডাইডের লেখাপত্র বেশি পড়েছেন। পশ্চিমা সংস্কৃতি কেবল চিন্তা বা ধারণা সম্ভার নয়, বরঞ্চ এটি এমন কিছু ধারণার সম্ভার যা পাঠ্যপুস্তকে পঠিত হয়, বক্তৃতা মঞ্চে, ক্যাফে বা সাহিত্যমণ্ডপে আলোচিত হয়। যদি তা না হয় তাহলে এটা কল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে যে কীভাবে একটা সভ্যতা প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু হয়ে প্রাচীন রোম, এরপর মধ্যযুগের ক্যাথলিক দুনিয়াতে প্রায় অর্ধ–জীবন কাটিয়ে ইতালীয় নবজাগরণে আবার জেগে ওঠে, অতঃপর মূলত উত্তর আটলান্টিক সীমান্তবর্তী দেশের বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছে যায়। এও ব্যাখ্যা করা অসম্ভব হয়ে যাবে কীভাবে ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো ‘পশ্চিমা ধারণা’ কেবল সম্ভাবনা হিসাবেই [in potentia] জারি ছিল। আমরা বলতে পারি: এটি একটি সাহিত্যিক ও দার্শনিক ঐতিহ্য; প্রাচীন গ্রিসে কল্পিত ধারণাসমষ্টি বইপুস্তক, বক্তৃতা, সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে হাজার বছরে ধীরে ধীরে পশ্চিমাভিমুখী হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত এসবের [ধারণাসমূহের] উদার ও গণতান্ত্রিক শক্তি গত এক বা দুই শতক পূর্বে আটলান্টিকের সীমান্তবর্তী গুটিকয়েক দেশ উপলদ্ধি করতে পেরেছে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থান পাওয়ার পর তারা ধীরে ধীরে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানে পরিণত হয়। পরিশেষে এই ধারণাগুলোর প্রবক্তারা এগুলোকে সর্বজনীন হিসাবে দেখেছেন এবং বিশ্বের বাকি অংশেও চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু এখানেই ধাক্কা খায়, কারণ এই ধারণাগুলোকে শেষপর্যন্ত এমন অঞ্চলে প্রসারিত করা যাবে না যেখানে সমানভাবে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রন্থীয় ঐতিহ্য রয়েছে যা অন্যান্য ধারণা ও মূল্যবোধ ধারণ করে আছে; যেমন কোরআন বা বুদ্ধের শিক্ষা।

    এই অবস্থান অন্তত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংযত। একে সভ্যতার গ্রেট বুকস তত্ত্ব বলা যেতে পারে। একদিকে এইটা খুবই আগ্রহোদ্দীপক। কেউ বলতে পারেন পশ্চিমা হওয়ার সাথে জীবনাচারের[হ্যাভিটাস] কোনো সম্পর্ক নেই। দুনিয়া সম্পর্কে যে গভীর বোঝাপড়া শৈশবে সহজাতভাবে গ্রহণ করা হয়, অর্থাৎ যে পরিস্থিতি কিছু লোককে উঁচু শ্রেণির ইংরেজ নারী করে তোলে, কাউকে বাভেরিয়ান ক্ষেতের ছেলে বা ব্রুকলিনের ইতালীয় বাচ্চা করে তোলে, তার সাথে এটি সম্পর্কিত নয়। বরঞ্চ পশ্চিম একটি সাহিত্যিক–দার্শনিক ঐতিহ্য যার মধ্যে মূলত কৈশোরে সূচনা ঘটে, যদিও সেই ঐতিহ্যের কিছু কিছু উপাদান ধীরে ধীরে সকলের কাণ্ডজ্ঞানের অংশ হয়ে যায়। সমস্যাটা হচ্ছে, যদি হান্টিংটন এই মডেলটি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করেন তাহলে সেটা খোদ তার যুক্তিকেই ধ্বসিয়ে দেয়। যদি সভ্যতা খুব গভীরভাবে অঙ্গীভূত না হয় তাহলে কেন একজন পেরুর নারী বা বাংলাদেশের কৃষকের ছেলে একই পাঠ্যক্রম গ্রহণ করে অন্যান্যদের মতো পশ্চিমা হয়ে উঠতে পারবে না? কিন্তু হান্টিংটন তো আসলে এটাই খারিজ করার চেষ্টা করছেন।

    ফলে তিনি ‘সভ্যতা’ ও ‘সংস্কৃতি’র দুইটা অর্থের এদিক–ওদিকে ক্রমাগত পিছলাতে বাধ্য হন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পশ্চিম তার বিভিন্ন মহৎ আদর্শ দ্বারাই সংজ্ঞায়িত হয়। কিন্তু কখনো–সখনো এটা চলমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দ্বারাও সংজ্ঞায়িত হয়। যেমন, মধ্যযুগের শুরুর দিককার সকল গিল্ড, সংঘ; এগুলোকে প্ল্যাটো এবং এরিস্টটল পাঠ দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে ধরা হয় না, বরঞ্চ নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী বেড়ে উঠেছিল। কখনো কখনো পশ্চিমা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদকে একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রাচীন পাঠে লুকিয়ে ছিল, হঠাৎ হঠাৎ ম্যাগনা কার্টার মতো দলিলাদিতে মাথা বের করেছে। কখনো কখনো এটাকে ধরে নেয়া হয়েছে আমজনতার মধ্যে গভীরভাবে খচিত ধারণা হিসাবে যা অন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বেড়ে উঠা জনতার মধ্যে কোনো সজ্ঞাত চেতন তৈরি করবে না।

    আমি বলছিলাম, আমি হান্টিংটনকে বেছে নিয়েছিলাম কারণ তিনি সহজ লক্ষ্যবস্তু। ‘ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশ’–এ তার যুক্তিধারা অস্বাভাবিক রকম পিচ্ছিল। সমালোচকরা যথাযথভাবেই অ–পশ্চিমা সভ্যতা বিষয়ক তার মন্তব্যকে আক্রমণ করেছেন। পাঠক হয়তোবা ভাবতে পারেন আমি কেন এতটা সময় তার পিছনে ব্যয় করছি। এর একটা কারণ হচ্ছে যে, প্রায় প্রত্যেকে যে অনুমানগুলো ধারণ করেন সেগুলোর অসঙ্গতি হান্টিংটনের যুক্তিবোধ প্রকাশ করে দিয়েছে। কিন্তু ‘পশ্চিম’ বলে যে একটা সত্তাকে প্রাচীন গ্রিসে উদ্ভূত একটা সাহিত্যিক ঐতিহ্য হিসাবেও সমানতাকে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং আজকের পশ্চিমা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জনগণের সাধারণ সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে— আমার জানামতে তার কোনো সমালোচকই এই ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করেননি। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও গণতন্ত্রের মতো ধারণাগুলোকে পশ্চিমের নিজস্ব জিনিস হিসাবে অনুমান করাটাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রয়ে গিয়েছে। বিতর্কের কারণ হিসেবে এসবকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই ধরে নেয়া হয়েছে। কেউ কেউ পশ্চিমকে স্বাধীনতার জন্মস্থান হিসেবে উদযাপন করেছেন, কেউ কেউ একে খারিজ করেছেন সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতার কারণে। কিন্তু ডান বা বামের এমন কোনো রাজনৈতিক, দার্শনিক বা সামাজিক চিন্তক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব যিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন যে, আদতে ‘পশ্চিমা ঐতিহ্য’ নিয়ে কেউ অর্থবহ জিনিস বলতে পারেন কিনা। প্রকৃতপক্ষে অনেক র‍্যাডিকেলরা মনে করেছেন যে কোনো বিষয় সম্পর্কে কোনো অর্থবহ জিনিস বলা অসম্ভব।

    ছবি: ইন্টারনেট

    সম্পূরক মন্তব্য: পশ্চিমা দৃষ্টির পিচ্ছিলতা প্রসঙ্গে

    আমি বলতে চাচ্ছি যে, পশ্চিমা ধারণাটি পাঠগত ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্যকার একটা ঝাঁপসা দাগের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর একটি অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে: ১৯২০–এর দশকে লুসিয়ান লেভি–ব্রুহ্ল নামক একজন ফরাসি দার্শনিক একসারি বই লিখে প্রস্তাব করেন যে, নৃবিজ্ঞানী দ্বারা নিরীক্ষিত বহু সমাজ এক ধরনের ‘প্রাক–যুক্তি মানসিকতা’ প্রদর্শন করে। তার যুক্তি হচ্ছে, যেখানে আধুনিক পশ্চিমারা যুক্তি–পরীক্ষা–নিরীক্ষামূলক চিন্তার প্রয়োগ ঘটান সেখানে আদিমরা একেবারেই ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করেন। পুরো যুক্তিধারাটা তুলে ধরার দরকার নাই। লেভি–ব্রুহ্ল যা বলেছিলেন তা তৎক্ষণাৎ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং এসব যুক্তি বাতিল হিসাবেই গণ্য করা হয় এখন। সাধারণত তার সমালোচকরা যা বলেননি সেটা হচ্ছে লেভি–ব্রুহ্ল আসলে আপেলের সাথে কমলার তুলনা করেছিলেন। মূলত তিনি যা করেছিলেন তা হলো আফ্রিকা নিউগিনি ও অনুরূপ স্থানের উপনিবেশিক কর্মকর্তা এবং ইউরোপীয় মিশনারিদের পর্যবেক্ষণগুলো থেকে বিভিন্ন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের অদ্ভূত প্রতিক্রিয়া বা গোলমেলে রীতিনীতিকে বাছাই করেন এবং এসব জ্ঞাত তথ্যের ভিত্তিতে অজ্ঞাত কোনো বিষয়ে যুক্তিটা হাজির করেন। এরপর তিনি এই বস্তুগুলোকে ফ্রান্স বা পশ্চিমা কোনো দেশের সমান বস্তুর সাথে তুলনা না করে বরঞ্চ পশ্চিমারা কীভাবে দার্শনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠের ভিত্তিতে আচরণ করে তার একটা পরিপূর্ণ আদর্শ ধারণার সাথে তুলনা করেন। ফলাফল স্পষ্টতই অযৌক্তিক, কারণ আমরা সবাই জানি সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন কাজকারবারে অ্যারিস্টটলিয়ান সিলেজিজম ও পরীক্ষামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করে না, কিন্তু তার রচনাশৈলির জাদুর জন্য কেউই এটাকে মোকাবিলা করেননি।

    এর কারণ হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এমন রচনাশৈলী খুবই সাধারণ [কমন]। তো এই জাদু কীভাবে কাজ করে? এটি মূলত পাঠকের সাথে অর্নিধারিত গুণাবলির এমন এক মানুষের পরিচয় ঘটিয়ে দেয় যিনি কিনা একটি ধাঁধার সমাধানের চেষ্টা করছেন। পশ্চিমা দার্শনিক ঐতিহ্যে, বিশেষত এরিস্টটলের কাজ থেকে শুরু করে এবং অন্যান্য দার্শনিক ঐতিহ্যের সমান ধরনের কাজগুলোর সাথ তুলনা করলে যে কেউ এমন একটা ছাপ খুঁজে পেতে পারেন যে, এই মহাবিশ্ব কেবল গতকাল সৃষ্টি হয়েছে, কোনো প্রাক–জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। এছাড়াও একজন সাধারণ বোধ–বুদ্ধির কথককে কোনো ধরনের উদ্ভট অনুশীলনের মুখোমুখি দেখানোর প্রবণতাও রয়েছে। এটাই আসলে তা সম্ভব করে তোলে। যেমন, একজন সমসাময়িক জার্মানের জন্য টাসিটাসের জার্মানিয়া পড়ে নিজের পূর্বপুরুষের চাইতে বরঞ্চ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইতালীয় কথক বা বর্ণনাকারীর দৃষ্টিকোণকে শনাক্ত করতে পারেন। অথবা একজন ইতালীয় নাস্তিক যখন জিম্বাবুয়ের কিছু প্রথা বিষয়ে ইংরেজি মিশনারির বর্ণনা পড়েন, এবং সেটা করেন সেই পর্যবেক্ষকের [বা মিশনারির] উদ্ভট চা প্রথা বা ট্রানসাবস্টানশিয়েশন মতবাদের প্রতি নিয়োজিত থাকার কথা চিন্তা না করেই। ফলে পশ্চিমের সমগ্র ইতিহাসকে ‘আবিষ্কার’ এবং ‘উদ্ভাবন’ এর একটি গল্প হিসেবে দেখানো যেতে পারে। সবচাইতে বড় কথা, এটাও ঠিক যে যখনই কেউ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কিছু লিখেন, যেমন এখন আমি লিখছি, তিনি আসলে কার্যকরভাবেই এমন এক অনুশাসন ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে যান যাকে কিনা অত্যন্ত অপরিহার্য বলে মনে হয়।

    সবচাইতে বড় কথা, সমসাময়িক নৃবিজ্ঞানীদের কাছেও যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটা হচ্ছে, লেভি ব্রুহ্লতে ‘পশ্চিমা ব্যক্তি’ এমন এক ব্যক্তি যিনি নির্দিষ্ট ঘরানার গদ্য রচনাকালে একধরণের বৈশিষ্ট্যহীন, যুক্তিবাদী পর্যবেক্ষক, বিমূর্ত দৃষ্টিসম্পন্ন হিসেবে ব্যক্তিক বা সামাজিক বিষয়বস্তু থেকে বিচ্যুত করে নিজেকে জাহির করেন বলে মনে করেন। যে মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে, বেড়ে উঠেছে, ভালোবেসেছে, ঘৃণা করেছে, ওয়াদা করেছে তার সাথে এর সম্পর্ক অতি অল্পই রয়েছে। এটি নিখাদ বিমূর্ততা। এইগুলোকে স্বীকার করে নেয়া নৃবিজ্ঞানীদের জন্য একটা মারাত্মক সমস্যা তৈরি করেছে: যদি ‘পশ্চিমা ব্যক্তি’র অস্তিত্ব নাই থাকে, তাহলে আমাদের তুলনা করার জায়গা কী?

    যদিও আমার কাছে মনে হয় যারা এই চেহারাকে ‘গণতন্ত্র’ বাহক হিসাবে দেখতে চান তাদের জন্য এটা আরও বড় মুশকিল তৈরি করে। যদি গণতন্ত্র সম্প্রদায়ের স্ব–শাসনের প্রক্রিয়া হয়ে থাকে তাহলে পশ্চিমা ব্যক্তি এমন এক কর্তা যে কিনা ইতোমধ্যে সম্প্রদায়ের সকল বন্ধন ছিঁড়ে ফিলেছে। যদিও এই অপেক্ষাকৃত বৈশিষ্ট্যহীন, যুক্তিবাদী পর্যবেক্ষককে বাজার অর্থনীতির কিছু নির্দিষ্ট রূপের চরিত্র হিসাবে কল্পনা করা সম্ভব; তাকে গণতন্ত্রবাদী [ডেমোক্রেট] করে তোলা সম্ভব কেবল তখনই যদি কেউ খোদ গণতন্ত্রকে এমন একধরনের বাজার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন যেখানে কর্তারা [এক্টরস] অর্থনৈতিক স্বার্থের চাইতে অল্পকিছু বেশি অন্বেষণে প্রবেশ করেন। অবশ্য এই মনোভাব [এপ্রোচ] র‍্যাশলান–চয়েস থিওরি দ্বারাও প্রচারিত হয়েছিল। একভাবে আপনি বলতে পারেন, রুশোর পর সাহিত্যে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত–প্রণয়নের প্রতি এই আধিপত্যশীল মনোভাবকেই পাওয়া যায়, যা ‘আলাপ–আলোচনা’কে কোনো একটা বিষয়ের গঠন বা আদলের প্রক্রিয়া হিসাবে না দেখে বরঞ্চ নিছক স্বার্থের ভারসাম্য হিসাবে দেখে। (ম্যানিন ১৯৯৪) যাবতীয় সম্প্রদায়গত সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন এমন বিমূর্ত চরিত্রকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সবচাইতে বিমূর্ত রূপের [যেমন কয়েকদিন পর পর নির্বাচনে অংশ নেয়া] চাইতে অন্য কোনো ধরনের আলাপচারিতা ও সমঝোতায় প্রবেশ দেখা খুবই কঠিন।

    (চলবে…)