Blog

  • প্যাট্রিক ডান।। ধর্ষণ নির্মূল কীভাবে?

    প্যাট্রিক ডান।। ধর্ষণ নির্মূল কীভাবে?

    • অনুবাদ: নিশাত জাহান নিশা ও শুভম ঘোষ

    [“To Abolish Rape, Overthrow Male Desire” শীর্ষক রচনাটি ২০১৩ সালে fith estate ম্যাগাজিনের ৩৮৯তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান অনুবাদটি the anarchist libraryতে সংরক্ষিত সংস্করণ থেকে করা হয়েছে।– সম্পাদক]

    শিল্পী: অ্যান ক্যামেরুন

    অন্তত কিছু ক্ষেত্রে হলেও মানুষের সংস্কৃতিকে যৌন আচারের একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায়, ফ্রয়েড যেভাবে দেখেন ঠিক সেভাবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সামাজিক মানুষ যা যা কার্যক্রম পালন করে তারই একটা অংশ হিসেবে সমাজ যৌনতাকে সংগঠিত ও যৌন আহ্বানকে প্রতীকিকরণ ও সংরক্ষণ করে; আনন্দ, প্রভাব এবং প্রজননের প্রয়োজনে। ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন নিপীড়নগুলো; বিশেষ করে নারী, শিশু এবং যাদের লিঙ্গ পরিচয় প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ পরিচয়ের কাতারে পড়ে না, তাদের উপর হওয়া সহিংসতা সামাজের ওই একই দৃষ্টিভঙ্গির স্বাভাবিক বর্ধিতাংশ।

    সমাজ একটা সংঘটন হিসেবে, তার যুক্তি ও উদ্দেশ্য এমনভাবে সংঘটিত হয়েছে যেন তা ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানিসহ যৌন সহিংসতার যত উপায় আছে সবকিছুকে উৎসাহিত এবং প্রচার করে। এভাবে যৌন সহিংসতা সমাজের কর্তৃত্বপরায়নতার অস্ত্র হিসেবে সেবা করে এবং সমাজ কখনো সরাসরি কখনো গোপনে এটাকে একটা রোজকার প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে পরিচয় করাতে চায়।

    মানব সংস্কৃতিতে যৌন নির্যাতন বিস্তারের মূলকারণ হলো পিতৃতন্ত্র অথবা ব্যাটাছেলেদের শাসন। পুরুষের চেতনাকে কেন্দ্র করে পুরুষালি যৌন–কামুকতার নিরবিচ্ছিন্ন রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুরুষের বাসনা ও চেতনা থেকে আসা সেইসব আজ্ঞা এবং আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ ও সিদ্ধির প্রয়োজনে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

    পুরুষের নিপীড়নমূলক যৌন আকাঙ্ক্ষার মূলে রয়েছে লৈঙ্গিক বিশুদ্ধতার ভ্রান্ত ধারণা, আধিপত্যশীল বিষয়ী দৃষ্টিভঙ্গি, এবং চর্চিত যৌন রীতিনীতির প্রভাব যা বাস্তব ক্রিয়ার উপর পূর্ণ অধিপত্য বিস্তার করার ও নিয়ন্ত্রণ করার সাংস্কৃতিক বৈধতা তৈরি করে দেয়। এই পুরুষত্বের লৌঙ্গিক ও আধিপত্যশীল চৈতন্য মূলত একটা সমাজের সকল লৈঙ্গিক আচার এবং রীতিনীতি চর্চিত হওয়ার পেছনের গোপন প্রভাবক। এটি সংস্কৃতিকে দৃশ্যমান এবং তাকে গড়ে তোলে কাঠামোবদ্ধ সংকেতের মতো; যৌনতাকে আমাদের সামনে হাজির করা থেকে শুরু করে যৌনতার অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি সবই হয় এর কারণে।

    মরদতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এই পূর্বানুমান ধরে নেওয়া হয় যে, পুরুষ ইচ্ছানুযায়ী তার আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দিতে পারে যে কারও উপর। লৈঙ্গিক শ্রেষ্ঠত্বে সে সংস্কৃতিকে এমনভাবে গড়ে যেখানে শুধুমাত্র পুরুষ আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার দাবি রাখে আর অন্যান্য যৌনতার ও এর সম্ভাবনাগুলোর ভূমিকা হয় কেবল তাদের সন্তুষ্টি বিধান করা। এর ফলে কোনো পুরুষ যখন যৌনমিলনের তাড়না অনুভব করে, যে–কোনোভাবেই হোক তার সেই তাড়না নিবৃত্তির বস্তুগত উপকরণাদির যোগানের সুলভ বন্দোবস্ত সমাজ নিশ্চিত করে।

    পুরুষ, নারী, শিশু কিংবা পশুসহ অন্যান্য যাদেরকে এই আকাঙ্ক্ষার অধীন মনে করা হয়, তাদেরকে বিভিন্নভাবে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের শিকার হতে হয়। আর যদি তারা কোনোভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে পুরুষের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ পরিণতি দিতে, সামাজিক বৈষম্যমূলক স্তরায়নের রীতিতে, তাদেরকে নিপীড়ন করা হয়, শোষণ করা হয় এবং খারিজ করা হয়।

    তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ‘অপর’ পুরুষের তৈরি করা আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে প্রথাগত স্বীকৃতি পেয়ে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখে (যেমন: বিয়ে), অন্তত প্রথাগতভাবে, নির্দিষ্ট কিছু যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে। যদিও তাদেরকে এর পরিবর্তে সমর্পিত হতে হয় আরেক ধরনের যৌন সহিংসতার কাছে, সেটা পরিবারের কাছে। এবং যারা তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে সমর্পন করেনি, তারা বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক কাজের শিকার হয় এবং এসব থেকে তাদের নিজেকে আত্মরক্ষার উপায়গুলো আরও ভয়াবহ ও জটিলতর হতে থাকে।

    এই অংশটুকু, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে, প্রমাণ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার অভাব রয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারীরা: বিশেষ করে অবিবাহিত ও কারও অধীনস্থ নয় এমন নারীদের যাদেরকে শুধু যৌন–সর্বস্ব সত্তা হিসেবে জ্ঞান করা হয়, তাদেরকে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের আকাঙ্ক্ষা নিবারণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার রীতি বৈধতা পায়। এদিকে বিবাহিত নারীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যৌন সামগ্রী মনে করা হয়। আসলে এর ফলে ধর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যাটালোকদের সার্বভৌম কামুকতার কাছে নারীদের সহজ, প্রাকৃতিক ও ‘যৌক্তিক’ সহজলভ্য যৌন সামগ্রী হিসেবে বিরাজ করার মামলা।

    পুরুষের প্রশ্নাতীত কামুকতা এই জটিল পরিস্থিতির জন্ম দেয় যেখানে ক্ষমতার অদ্ভুত বিকার এবং অসাম্যতার স্ফূরণ দেখা যায়। মারকুইস ডি সাদের গল্পের চরিত্রগুলোর মতো: বিচারক, রাষ্ট্রপতি, পুরোহিত, স্কুলের শিক্ষকসহ সমস্ত পুরুষ কর্তারা মানুষের উপর তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যৌনতার একটি ধারা স্বাভাবিক করে ফেলছেন।

    আধুনিক আমেরিকান সমাজে পেন স্টেট ফুটবল কোচ জেরি সানডুস্কি এবং ক্যাথলিক পাদ্রিদের ন্যায় অনেক গণ্যমান্য সদস্যদের মতো পুরুষতান্ত্রিক সিরিয়াল ধর্ষকদের দ্বারা আমরা পরিবেষ্টিত থাকি। পুরুষের কামুকতা পূরণের নির্বাহী ক্ষমতার ছায়ায় নিজেদের করা যৌন নিপীড়নকে একরকম লাইসেন্স দেয় এসব ব্যক্তিত্বরা এবং তারা তাদের যৌন বর্বরতাকে সম্পূর্ণ বৈধ ও বিধিসম্মত মনে করে। পারিপার্শিক সংস্কৃতিও একে বিধিসম্মতরূপে হাজির করে। যাই হোক, একজন ধনী বৃদ্ধ আট বছরের একটি গরিব ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ করছে, এটির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কেউ নৈতিক কারণে গোপনে ঐ বৃদ্ধকে খুন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু আমেরিকান সংস্কৃতিতে মর্দামিতে ঠাসা কামুকতার প্রতি বশ্যতা স্বীকার করা হয়, এগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়, এসবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় এবং এ ধরনের ধর্ষকদের জন্ম দেয়া হয়।

    শিল্পী: ডারউইন লিয়ন

    পুরুষালি কামুকতাকে এক অলীক উচ্চতায় প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্বে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়েছে এটাকে একধরনের রহস্যকরণ করেই। আনুষ্ঠানিকভাবে যখন পুরুষের কামুকতার ছাঁচে শরীরকে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন এই কামুকতার পেছনের কলকব্জাগুলোতে গোপনীয়তা থাকে। এমনকি এই ধারণার প্রকৃত বাস্তবতা এড়াতে চাইলে, পুরুষের আকাঙ্ক্ষা তার কাছেও অজানা থাকে। তাদের কর্তৃত্বের অধীনে থাকা নারী, শিশু এবং অন্যান্য সকলের কাছে এর উপায়গুলো সম্পর্কে নিবিড় এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকে। শেতাঙ্গদের নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের যে বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়, এটি অনেকটা সেরকম। এটি এমন একধরনের পরীক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতা শেতাঙ্গরা যেটি কখনো অনুধাবন করতে পারবে না। অ–অনুসারী পুরুষদের পুরুষের আকাঙ্ক্ষার অভ্যন্তরীণ (circuitry) বর্তনী থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যখন প্রেমমূলক নাশকতার সাথে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়, তখন সেটি পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের জ্ঞান পুরুষকে তার সম্পূর্ণ কর্তৃত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে আপেক্ষিকভাবে সহমর্মিতার আচার এবং অনুষ্ঠান পালনের জায়গায় নিয়ে আসে যেখানে পুরুষের প্রশ্নাতীত কামুকতাকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা এবং পরাভূত করা যায়। যেসব রীতিভুক্ত প্রতীক এবং সাইকোম্যাটিক হাতিয়ার দিয়ে পুরুষ তার কামুকতার চরিতার্থকরণে সহিংসতার সংস্থা হিসেবে মূর্তিমান হয়েছে, পুরুষত্বের কিছু বিদ্রোহী সমালোচনা সেগুলোকে খোলসা করছে।

    পিতৃতন্ত্রের অবসান এবং মর্দামির উচ্ছেদ করার এসব আলাপ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান যৌন সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক অসামঞ্জস্যতাকে অস্বীকার করে। এই অসামজ্ঞস্যতার মূলে রয়েছে যৌন অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত বিভিন্ন আচার, মিথস্ক্রিয়া (interaction) এবং শারীরিক কায়দা যা কিনা অটল (persistent) নির্বাহী কর্তৃপক্ষ এবং পুরুষের দ্বারা পরিচালিত। অন্যভাবে বলতে গেলে লিঙ্গ, মর্দামি এবং পুরুষতান্ত্রিকতার অজস্র সমালোচনাতে যেটি অনুপস্থিত সেটিই মূলত লিঙ্গ বৈষম্যের একটি সমাধান। মূলত কী করে এটি করা যায়, ঘটানো সম্ভব করা যায়, সে সম্পর্কিত সমাধান খুব জরুরি। আমাদের প্রজাতি আর যাই হোক অন্তত স্থায়ীভাবে একটি জায়গা আটকে থাকে না।

    শিশুদের ক্ষমতায়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে তারা সহিংসতা, জবরদস্তি এবং নিপীড়নমূলক নিয়ন্ত্রণের মতো জটিলতা এড়িয়ে আনন্দ, আকর্ষণ এবং উত্তেজনা (arousal) উপভোগ করতে পারে।

    নারীদেরকে শারীরিকভাবে অক্ষম এবং পরাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নিজের দেহকে রক্ষা, পরিচালনা করা এবং উপভোগ করার মতো মৌলিক ক্ষমতা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। সহিংসতার (যৌন সহিংসতাসহ) সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতা পুরুষের কাছে সমর্পণ করে নারীদেরকে যৌন সামগ্রীর মতো গুপ্ত এবং সজ্জিতভাবে নিজেদের কমনীয়তা ধরে রাখতে বাধ্য করা হয়। এমনকি স্টুবেনভিল, ওহিওতে যে নারী সংস্থা রয়েছে, পুরুষের ইচ্ছাধীন শাসনের অধীনে তাদের চৈতন্যও অস্তিত্বহীন। পুরুষ এবং নারীর যৌনসম্পর্ক এই ভ্রান্তির দ্বারা ক্রমাগত প্রতারিত হচ্ছে।

    তাছাড়া, আরও বুনিয়াদি পর্যায়ে মরদ–প্রধান সমাজে যৌনমিলনের ক্ষেত্রে পুরুষের কাছে নারীর সমর্পনকে যৌনতার সাধারণ ধর্ম হিসেবে হাজির করা হয়। আন্দ্রেয়া ডওয়ার্কিন (যিনি মনে করেন, নারী–পুরুষের সমস্ত যৌন সম্পর্কই ধর্ষণ) এর মতো তাত্ত্বিকদের তত্ত্বকে বাদ দিলে, সহবাসের হিংস্র পেনিট্রেটিভ ধরন নারী–পুরুষের স্বাভাবিক সহজাত যৌন–সম্পর্কের প্রতিফলন নয়; এটি ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার মতোই মরদ–প্রধান সংস্কৃতিতে যৌনতা সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ধারণা প্রসূত আগ্রাসনের একটি চিহ্ন কেবল।

    যৌনতার উর্দ্ধে গিয়ে লিঙ্গকে (sex) বুঝতে হলে, নারী–পুরুষের মধ্যেকার যৌন–শারীরিক সম্পর্কের ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। অবশ্যই এটি করতে গিয়ে মানুষের সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে অর্থাৎ জৈবিক ভিন্নতার ভিত্তিতে যেসব মরদ–প্রধান সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস (লিঙ্গ বৈষম্য)কাঠামো টিকে আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। ইতিবাচকভাবে বলতে গেলে নারী, শিশুসহ যারা পুরুষতান্ত্রিক যৌন সম্পর্ককে খারিজ করবে, তাদেরকে এমনভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে যাতে তারা যৌনতার পরমানন্দকে খুঁজতে, সন্ধান করতে এবং টিকিয়ে রাখতে যেসব রীতি, কৌশল ও নৈপুণ্য দরকার তাতে উদ্ভাবনী ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিলোপ করা সম্ভব, যা শেষতক মরদতন্ত্রকে এবং পুরুষালি কামুকতার সম্পূর্ণ জিঞ্জিরকেও ধ্বংস করে।

  • হিন্দু বিবাহ ও বিচ্ছেদ: পুরুষতন্ত্র, রাষ্ট্র, নারীমুক্তি

    হিন্দু বিবাহ ও বিচ্ছেদ: পুরুষতন্ত্র, রাষ্ট্র, নারীমুক্তি

    ‘হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া কবিতা (ছদ্মনাম) ভালোবেসে বিয়ে করেন গোপাল কর্মকারকে (ছদ্মনাম)। তারা প্রথমে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিয়ে করেন। বিয়েটি আরও শক্ত হবে ভেবে পরদিন তারা নোটারি পাবলিকের কাছে এফিডেভিট করেন। বিয়ের পর তারা নারায়নগঞ্জে ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন।  গোপাল বিয়ের সময় স্কুলে চাকরি করতেন। বিয়ের পর সরকারি কলেজে চাকরি নিয়ে সন্দ্বীপে চলে যান। তখন কবিতা ঐ বাসাতেই বসবাস করতে থাকেন, গোপাল আসা–যাওয়া করতেন। পরবর্তী সময়ে গোপাল ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন এবং তারা রাজাবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। কবিতা এ সময়ে একটা স্কুলে চাকরি করা শুরু করেন। কবিতার বিবাহিত জীবনের  দীর্ঘসময় পার হয়ে গেলেও সন্তান না হওয়ায় অনেক চাপাচাপির পর গোপাল ডাক্তারের কাছে যেতে সম্মত হন। ডাক্তার তাদের পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে টেস্টটিউব বেবি নেয়ার পরামর্শ দেন। এতে সম্মত হয়ে অনেক খরচের কথা বলে গোপাল কবিতার জমানো সমস্ত টাকা নিয়ে নেন। কিন্তু গোপাল টেস্টটিউব বেবি নেয়ার ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি। কবিতা অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ সময় থেকে ধীরে ধীরে কবিতার প্রতি গোপালের আচরণ বদলাতে থাকে। গোপাল প্রায়ই কবিতার সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করেন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ভাড়া বাসায় কবিতাকে একা রেখে গোপাল চেলে যান এবং ফোন করে জানান, তিনি কবিতার সঙ্গে আর সংসার করবেন না। অথচ কবিতা গোপালের কারণেই তার বাবা–মা ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। পরের মাসেই গোপাল দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এতে কবিতা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি আইনগত সহযোগিতার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রে (আসক) আসেন। আসক থেকে উভয়কে নিয়ে সালিশে বসা হলেও কোনো সমাধানে আসা সম্ভব হয় না। কবিতা আদালতের দ্বারস্থ হন। প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা হারে কবিতাকে আজীবন ভরণপোষণ প্রদান করবেন এবং দুজনে পৃথক বসবাস করবেন এবং কারও সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করবেন না মর্মে আদালতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়।

    গোপাল ঠিকই তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করছেন। কিন্তু কবিতা স্বামীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও বিবাহিতা হিসেবে শাঁখা–সিঁদুর পরে গোপালের স্ত্রী পরিচয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। (সূত্রঃ বাংলাদেশের আইনে নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পৃষ্ঠা ৬৮–৬৯)  

    বাংলাদেশে প্রচলিত সনাতনী হিন্দু আইনে বিয়ে কোনো চুক্তি নয়। সকল ধর্মীয় ও জাগতিক কার্যসাধনের উদ্দেশ্যে বিয়েকে স্বামী–স্ত্রীর অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। সেকারণে হিন্দু নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমোদন নেই। হিন্দু নারী কিংবা পুরুষ কোনো পক্ষই কোনো পরিস্থিতেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম নয়। তবে একজন হিন্দু পুরুষ ইচ্ছে করলেই স্ত্রী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও যতবার ইচ্ছে বিয়ে করার অধিকার রাখেন। সেজন্য বিশেষ কারণ বা আগের স্ত্রীর/স্ত্রীদের বা কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি–অনুমোদনের দরকার পড়ে না। প্রচলিত সনাতন হিন্দু আইনেই বহুবিবাহ অনুমোদিত। এর অর্থ হচ্ছে, বহুবিবাহ ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে অবৈধ বা অগ্রহণযোগ্য নয়, সেইসাথে হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ রাষ্ট্রীয় আইনেও শাস্তিযোগ্য নয়। অন্যদিকে একজন বিবাহিত হিন্দু নারী আদালতের মাধ্যমে বড়জোর স্বামী থেকে পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের অধিকার পেতে পারেন। 

    ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসকদের উদ্যোগে উনিশ শতকে এ অঞ্চলে বিধিবদ্ধ আইনের সূচনা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, দাপ্তরিক কাজের সুবিধার্থে ও আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও কর্তৃত্বে রাখার প্রয়োজনে মূলত আইনগুলো তৈরির উপলক্ষ্য সৃষ্টি হয়। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরি হলেও ব্রিটিশ শাসকগণ বিভিন্ন ধর্ম–জাতিগোষ্ঠী–সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্মীয় আইন তথা প্রচলিত প্রথাসিদ্ধ আইনের ব্যাপারে এবং সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে। অথচ ধর্ম ও প্রথা থেকে উৎসারিত ব্যক্তিগত আইনগুলো বৈষম্যপূর্ণ, পীড়নসহায়ক ও পিতৃতান্ত্রিক চেতনাজাত। বলাবাহুল্য, এইসব আইনের প্রধান শিকার হয়েছে নারী। ব্রিটিশের নীরবতার কারণ বোধগম্য। সাম্রাজ্যবাদী বেনিয়ার অনিবার্য লক্ষ্যই হলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। উপনিবেশের মানুষের সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি কিংবা সার্বিক মঙ্গলকরণ তাদের অভীষ্ট হতে পারে না। তাছাড়া ব্যক্তিগত আইনকে রাষ্ট্রীয় আইনের আকার দিয়ে আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে দেখা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিত করা ঝুকিপূর্ণ ছিল। সেটা করতে গেলে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের পিতৃতান্ত্রিকতার পাহারাদার পুরুষেরা ধর্মের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশের বিপক্ষেই দাঁড়িয়ে যেতেন। ব্যবসা–বাণিজ্য–মুনাফা করতে এসে অহেতুক ঝামেলা বাড়াবেন কেন তারা। সেকারণে ব্যক্তিগত আইনের (personal law) বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে ব্রিটিশ শাসকগণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা বাতিল করে আইন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। এই দুটি আইন ছাড়াও ১৮৭২ সালে বিশেষ বিবাহ আইন প্রণীত হয়। এসব আইন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে  প্রচলিত হিন্দু সনাতন ধর্মশাস্ত্রের বিধিবিধানের সাথে সংঘর্ষ ও সমন্বয় করে মানুষের মাঝে স্থান পায়। তবে মোটাদাগে হিন্দুদের বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পুনর্বিবাহ, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, দত্তক ইত্যাদি ব্যক্তিগত অধিকার সংক্রান্ত আইন, শাস্ত্রের অনুসৃত বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানকাল ও ১৯৭১–এ স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের জন্মের পঞ্চাশ বছর হলেও হিন্দুদের পারিবারিক আইনের সংস্কার সম্ভব হয়নি। হিন্দুদের বিবাহ বিচ্ছেদের আইনও তৈরি হয়নি। অথচ, দেশভাগের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতে সেই ১৯৫৫ সালে হিন্দু বিবাহ আইন পাশ হয়েছে। যার মাধ্যমে হিন্দুদের বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এমনকি একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র নেপালেও বিবাহ বিচ্ছেদের আইন আছে।

    কিন্তু বাংলাদেশে অনুরূপ আইন তৈরির কার্যকর সরকারি উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয়নি। ২০১২ সালে প্রণীত ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন’ রাষ্ট্র কর্তৃক হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য সর্বশেষ আইনি সুরক্ষা। যদিও শুভঙ্করের ফাঁকির মতো করে আইনটিকে ‘ঐচ্ছিক’ করে রাখা হয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, আইন না মানলেও অসুবিধা নেই। আইনের ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘উপধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন হিন্দু বিবাহ এই আইনের অধীনে নিবন্ধিত না হইলেও উহার কারণে কোনো হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী সম্পন্ন বিবাহের বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে না’। একইসাথে আইন মানা ও না মানার বিধান সংযুক্ত রাখা আইনের মোলিক উদ্দশ্যকেই ব্যহত ও  প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখার শামিল। 

    ২০১২ সালে বাংলাদেশ আইন কমিশন সরকারের কাছে ‘হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ পেশ করে। আইন কমিশনের উক্ত গবেষণালব্ধ সুপারিশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশের জোরাল দাবি জানানো হয়। সেইসাথে বিবাহ নিবন্ধন (২০১২ সালে বিবাহ নিবন্ধন আইন পাশ হয়েছে, যদিও আইনটি ঐচ্ছিক), বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুণর্বিবাহ, বহুবিবাহ রোধ, অসবর্ণ বিবাহ, সম্পত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়ে আইন সংস্কারের ব্যাপারে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। আইন কমিশনের রিপোর্টে জনমত জরিপে কমিশনের প্রশ্ন ছিল, ‘হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুণর্বিবাহের সুযোগ থাকতে পারে কি? জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৮০% হ্যাঁ, ১৫% না ও ৫% মন্তব্য প্রদানে বিরত থাকেন। 

    আইন কমিশন সুপারিশে উল্লেখ করেন, ‘যে সমস্ত কারণে হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে তার অধিকাংশ কারণই বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য যুক্তিসংগত কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারণে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিচ্ছেদ কার্যকর করা যেতে পারে। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পর উভয় পক্ষ পুণর্বিবাহ করতে পারবে’। (সূত্রঃ হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ০৭ অগাস্ট, ২০১২)  

    ১৯৪৬ সালে পাশ হয়, ‘The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act’ অর্থাৎ বিবাহিত হিন্দু নারীর পৃথক বাসস্থল ও ভরণপোষণ আইন। এই আইনের ২ ধারায় নিম্নলিখিত এক বা একাধিক কারণে একজন হিন্দু বিবাহিত নারী স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে বসবাস করতে পারবেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেন:  

    (১) যদি স্বামী কোন ‘ঘৃণ্য বা নিকৃষ্ট’ (loathsome) রোগে ভোগেন যা তার স্ত্রীর কাছ থেকে আসেনি;
    (২) যদি সে (স্বামী) তার (নারী) প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন যা কি না তার সাথে থাকাকে অনিরাপদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত করে তোলে;
    (৩) যদি স্বামী, স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে পরিত্যাগ করে;
    (৪) যদি স্বামী পুনরায় বিয়ে করে;
    (৫) যদি স্বামী ধর্মান্তরিত হয়;
    (৬) যদি তিনি  (স্বামী) বাড়ীতে উপ–পত্নী রাখেন বা অভ্যাসগতভাবে উপপত্নীর সাথে বসবাস করেন;
    (৭) অন্যকোন যুক্তিসঙ্গত কারণে । 

    হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসের বিধান আপাত দৃষ্টিতে একটি ভাল সমাধান মনে হলেও এটি আসলে একজন নারীর মৌলিক চাহিদা ও অধিকারের পরিপন্থী। এই আইন আসলে শাঁখা–সিঁদুর পরে বৈধব্যপালনের সমতুল্য। নারী ও পুরুষের স্বামী–স্ত্রী হিসেবে বা সঙ্গী (partner) হিসেবে  একসাথে থাকা আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে যৌনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসের এই আইন নারীর যৌনতাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। 

    আইনের ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শর্ত থাকে যে একজন নারী পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের অধিকারী হবে না যদি সে ‘অসতী’ হয় অথবা সে যদি অন্য ধর্ম গ্রহণ করে অথবা দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পাওয়ার জন্য যুক্তিসঙ্গত কারণ  দর্শাতে ব্যর্থ হয়।   

    সেইসাথে আমরা যদি ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৪৯৪ ধারা পাঠ করি তাহলে নারীর যৌনতা ও পুনরায় নতুন জীবন শুরু করার প্রচেষ্টাকে কীভাবে দমন করা হয়েছে তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। ৪৯৪ ধারায় বলা হয়েছে, 

    ‘যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি ৭ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন’। 

    বহুবিবাহরোধকল্পে ৪৯৪ ধারা তৈরি করা হলেও আইনটির কার্যকারিতা মূলত খ্রিস্টান সম্প্রদায় ও সব ধর্ম সম্প্রদায়ের নারীর জন্য কার্যকরী হয়ে আছে। কারণ, হিন্দু ও মুসলমান পুরুষের একাধিক বিয়ে যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম আইন অনুসারে অবৈধ নয়। কিন্তু একজন হিন্দু নারী আইনসঙ্গতভাবে আলাদা বসবাস করতে পারলেও যেহেতু বিয়েটি বাতিল হচ্ছে না এবং স্বামী জীবিত সেকারণে অন্যকারও সাথে আইনগত বৈধ সম্পর্ক স্থাপনে সে অপারগ। 

    হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদের পক্ষে আইন কমিশনের প্রতিবেদন ছাড়াও এনজিও সংস্থাগুলো হিন্দু বিবাহ  বিচ্ছেদ আইনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এই দাবিতে হাইকোর্টে রিটও দায়ের করেন মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান।    

    ‘হিন্দু আইনে ‘তালাক’ অন্তর্ভুক্ত না করার দাবি’ শিরোনামে জাগো নিউজ ২৪ ডট কম প্রকাশিত ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬’র প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহিলা জোট ’শাশ্বত হিন্দু বিধি বিধান ধ্বংস করে ‘হিন্দু আইনে তালাক’ অন্তর্ভুক্ত না করার দাবিতে ব্যানার সহযোগে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করছেন।  

    হিন্দু বিবাহ আইনে তালাক ব্যবস্থা সংযুক্ত করতে মানবাধিকার কর্মী এলিনা খানের হাইকোর্টে রিট করার প্রতিবাদে এ মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, হাজার বছর ধরে অবিকৃতভাবে চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবার ব্যবস্থায় দুটি মানুষ একত্রিত হয়। হিন্দু পুরুষের জীবনে নারী আসে অর্ধাঙ্গিনী হিসাবে, তাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এমনকি স্বামীর থেকে পৃথক থাকলেও নারীর ভরণ–পোষণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

    সংগঠনটির সভাপতি ড. সেলিনা দত্তের সভাপতিত্বে মানবন্ধনে হিন্দু মহিলা জোটের নির্বাহী সভাপতি প্রীতিলতা বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রতিভা বাগচী, বিথী দত্ত, হিন্দু মহাজোটের সভাপতি দেবাশীষ মন্ডল, মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। 

    ওদিকে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হিন্দু ধর্মীয় নেতাদেরকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে হিন্দু আইন সংস্কারের একটি খসড়া তৈরি করতে বলা  হলেও তাদের ভেতরে কোনও উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

    এ ব্যাপারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত  বলেন, “এখনকার পরিস্থিতি হলো, সংখ্যালঘুদের ওপর সামগ্রিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। তারা অস্তিত্বের সংকটে আছে। ফলে এখন অস্তিত্ব রক্ষা করবে নাকি অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়ে কাজ করবে। এসব প্রশ্নে একটা বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেজন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না।”

    অর্থাৎ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর ‘সামগ্রিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগের’ কথা বলে নারীদের অধিকার প্রশ্নে উদ্যোগের বিষয় এড়িয়ে যান তিনি। তাদের বেশিরভাগে নেতাই এখনো এমন আইনের বিপক্ষে রয়েছেন।  

    এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, বিয়ে বা পরিবার নিয়ে ধর্মের স্বীকৃত বিধান চলে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে। সেজন্য তাতে সংস্কারের ব্যাপারে তাদের সমাজে জড়তা আছে বলে তিনি মনে করেন। একইসাথে তিনি বলেছেন, বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা হলে তখন ঠুনকো বিষয়েই পরিবারগুলোর বন্ধন ভেঙে যেতে পারে। সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমন ভয়ও তাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে। (সূত্রঃ বিবাহ–বিচ্ছেদের অধিকার চান হিন্দু নারীরা, কাদির কল্লোল, বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬) 

    এদিকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ মনে করেন, ‘বিবাহ বিচ্ছেদ এবং সম্পত্তির মালিকানাসহ হিন্দু নারীদের অধিকারের প্রশ্নে আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নিলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ তোলা হতে পারে, এমন ভয় সরকারের মধ্যে কাজ করে বলে তাঁর ধারণা’।(সূত্রঃ বিবাহ–বিচ্ছেদের অধিকার চান হিন্দু নারীরা, কাদির কল্লোল, বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬) 

    আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা নীনা গোস্বামী বলেন, “হিন্দু নারীরা মূলত ঘরে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে স্বামী থেকে আলাদা থাকার আবেদন নিয়ে আসেন।”

    “তখন সালিশ–সমঝোতার মাধ্যমে ভরনপোষণের অর্থ নিয়ে তারা আলাদা হচ্ছেন। বিয়ের কিন্তু সমাপ্তি ঘটছে না। সেখান থেকে তাদের বেরুবার কোনো পথ নেই। হিন্দু নারীরা এখন বিবাহ–বিচ্ছেদরে অধিকার চাইছেন”– বলেছেন নীনা গোস্বামী। (সূত্রঃ ঐ) 

    শিল্পী: সওলারাম হালদঙ্কর (১৮৮২-১৯৬৮)

    এছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদের বিরুদ্ধ পক্ষের যুক্তি হচ্ছে, ‘মুসলিম সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন থাকায় নারীরা নিরাপত্তাহীন জীবন বেছে নিচ্ছে। বিচ্ছেদের শিকার নারীরা পেশা হিসবে যৌনকর্ম বা অপরাধ জগতে যংযুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে তাঁদের শিশুরা পরিত্যাক্ত হয়ে অপরাধজগতে প্রবেশ করছে’। ( সূত্রঃ আইন কমিশনের প্রতিবেদন)

    হিন্দু নেতৃবৃন্দের অনাগ্রহ ও হিন্দু সংগঠনের তৎপরতার কারণে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন না হওয়ার প্রধান অন্তরায়। বৈষম্যমূলক শ্রেণি ব্যবস্থার সুবিধাপ্রাপ্ত সমাজের এইসব উঁচুতলার হিন্দু এলিটদের কারণে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের মতো একটি বাস্তবসম্মত, অতি জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি আইন প্রণয়ন হতে পারছে না। হিন্দু পিতৃতন্ত্রের এইসব মোড়লেরা হিন্দু নারীদেরকে স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে তাঁদেরকে আধুনিক দাস হিসেবে অন্তরীণ করে রেখেছেন। 

    সনাতন ঋষিদের সংজ্ঞায় স্ত্রী স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তিই। মনুর [৯:৩] বিধানে নারী চিরস্বাধিকারহীন অসহায় শিশু:

    ‘নারীকে কুমারিকালে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা করবে। নারী কখনোই স্বাধীন থাকার যোগ্য নয়’।

    হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের অবর্তমানে বিচ্ছেদের ভূয়া, অগ্রহণযোগ্য ও আইনি মূল্যহীন কাগজের কথা শোনা যায়। এইসব  কাগজ আসলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত এফিডেভিট বা হলফনামা।  নন জুডিশিয়াল স্টাম্পে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে গিয়ে এই ধরণের হলফনামা করা হয়। হলফনামা একটি ঘোষণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটি বিবাহ কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের আইনগত দলিল হিসেবেও স্বীকৃত নয়। আদালতে এই জাতীয় কাগজের মূল্য নেই। 

    জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের নারীরা বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সম্পত্তির ক্ষেত্রে সম অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ, সিডও সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নারী–পুরুষের সমানাধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী’। বিবাহ বিচ্ছেদ আইন হলে নারীরা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়বে, বিচ্ছেদের শিকার নারীরা যৌনকর্মী হয়ে অধঃপাতে যাবে, ঠুনকো বিষয় নিয়ে সংসার ভেঙ্গে যাবে, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, ধর্ম ও জাত যাবে— এইসবই  কর্তৃত্বপরায়ন হিন্দু পিতৃতন্ত্রের সুপ্রাচীন অজুহাত, যা হাজার বছর ধরে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠী সেই ১৯৫৫ সাল থেকে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের সুবিধা ভোগ করে আসছে। কই তাদের কাছ থেকে তো আমরা এসব অজুহাত শুনতে পাই না।

    তাই সময় হয়েছে হিন্দু আইন সংস্কারের বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার। বিশেষ করে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণয়ের পক্ষে সামাজিক–নাগরিক আন্দোলন শুরু করা সময়ের দাবি।  

  • এমিল আর্মান্ড।। যৌন স্বাধীনতার প্রশ্নে

    এমিল আর্মান্ড।। যৌন স্বাধীনতার প্রশ্নে

    • অনুবাদ: শ্রবণা শফিক দীপ্তি

    [এমিল আর্মান্ড (১৮৭২-১৯৬২) একজন ফরাসি এনার্কিস্ট মুক্তচিন্তক। ব্যক্তি, প্রেম, যৌনতা, নৈতিকতা নিয়ে লিখেছেন তিনি প্রচুর। তার On sexual liberty লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। বর্তমান অনুবাদটি এনার্কিস্ট লাইব্রেরিতে যেই সংস্করণটি তুলে দেয়া তা অনুসরণ করে করা হয়েছে। – সম্পাদক]

    শিল্পী: এদগার দেগা

    “যৌন স্বাধীনতা” বিষয়ে আমাদের ধারণাকে স্পষ্ট করার আগে, আমি মনে করি খোদ স্বাধীনতার সংজ্ঞায়ন করাটা জরুরি। আমরা জানি স্বাধীনতার কোনো শেষ বলে কিছু নেই, এ কারণে চূড়ান্ত স্বাধীনতা বলেও কিছু নেই, ঠিক যেমন সাধারণ সত্য বলে কিছু নেই। বাস্তবিক অর্থে, নির্দিষ্ট প্রত্যয়গুলোর মধ্যে যার অস্তিত্ব আছে সেই সাধারণ স্বাধীনতারও কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট, ব্যাক্তিক স্বাধীনতা। সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে আসলে এড়ানো সম্ভব হয় না। যেমন কেউ নিঃশ্বাস না নেয়া বা খাবার না খাওয়ার মতো স্বাধীন হতে পারে না। স্বাধীনতা হচ্ছে সত্য, বিশুদ্ধতা, সদ্গুণ, সমতার মতোই বিমূর্তায়ন। এবং এই বিমূর্তায়নের কোনো শেষ নেই।

    এর পরিবর্তে বরং ধরে নেয়া যায়, কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিমূর্তায়নের বদলে একটি পন্থা ও একটি উপায় হিসেবে স্বাধীনতাকে বুঝা হচ্ছে। আর এজন্যই আমরা চিন্তার স্বাধীনতার কথা বলি। অর্থাৎ এর মানে হচ্ছে, কোনো বাহ্যিক বাধা ছাড়াই মনের ভেতর যেভাবে চিন্তা উপস্থিত হয় ঠিক সেভাবেই কথা বা লেখার মাধ্যমে তাদেরকে প্রকাশ করার ক্ষমতা। আর এটাই হচ্ছে চিন্তার পরিপূর্ণ প্রকাশ, যেই লক্ষ্যের পেছনে আমরা ছুটে চলি, কিন্তু তা স্বাধীনতা নয়। আর এর কারণ হচ্ছে এই যে, সুনির্দিষ্ট কিছু স্বাধীনতা রয়েছে যাদেরকে আমরা বিমূর্তায়নের এখতিয়ার থেকে সরিয়ে এনে একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পারি এবং ‘আমাদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে’ নিশ্চিত করতে পারি। এবং একে ‘আমাদের অধিকারগুলো’ থেকে আরও ভালোভাবেই এই শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই ‘আমাদের অধিকারগুলো’ হচ্ছে একটি বিমূর্ত ও যথেচ্ছা অভিব্যক্তি, যাকে কিনা নানা পদের কর্তৃত্বকারীরা শ্বাসরোধ করে মারে, ছিন্নভিন্ন করে বা বিকৃত করে দেয়।

    ব্যক্তি হিসেবে ও ব্যক্তির স্বাধীনতা হিসেবে দেখেই, ধর্ম অথবা নাগরিক ব্যবস্থার আইনি ধারণা ও সংস্কার ছাড়াই বুদ্ধিজীবিতার জীবনের, শিল্পের জীবনের, অর্থনৈতিক জীবনের, যৌনতার জীবনের মুক্তভাবে স্বাধীন উদ্ভাসন চাই আমরা। মোরালিটিজমের আবদ্ধতা কিংবা ট্রেডিশনালিজমের বাঁধ যা কিনা আমাদের এই ছুটে চলাকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে এগুলোকে এড়িয়েই একটা বৃহৎ নদীতে, যেখানে মানবীয় ক্রিয়াকলাপগুলোর বাধাবিপত্তিহীন বিচরণ চাই আমরা। সর্বোপরি, এই কর্তৃত্ববাদিতা, অস্থায়ী মুখোশ, জমাটবদ্ধ গিরিপথ যার পূর্বে আমরা মুশড়িয়ে পড়ি এবং মরে যাই তা থেকে এই দুর্দমনীয় ত্রুটি, বিচলিত ধাক্কা, অচেতন দৃষ্টিভঙ্গির অভাবকে সাথে নিয়েই স্বাধীনতা উত্তম বলে প্রতীয়মান হয় । দরজার বাইরের জীবন এবং ভেতরের জীবনের মধ্যে আমরা তো বাইরের জীবনকেই বেছে নেই।

    ***

    আমরা যখন ‘যৌন স্বাধীনতা’ দাবি জানাচ্ছি তখন আসলে কী বুঝাচ্ছি আমরা? আমরা এটা বলতে কি ‘ধর্ষণের স্বাধীনতা’ কিংবা বেলাল্লাপনাকে বুঝাচ্ছি? আমরা এটা কামনা করছি যে লাভ লাইফের মধ্য থেকে আবেগ উবে যাক; উবে যাক অনুরাগ, আবেগপ্রবণতা, বা প্রেম? আমরা কি যেকোনো স্থানে ও সময়ে অকল্পনীয় উগ্রতা বা পাশবিক যৌন পরিতৃপ্তিকে মহিমান্বিত করছি? কোনোভাবেই নয়। যৌন স্বাধীনতার দাবিতে, আমরা স্রেফ প্রতিটি ব্যক্তির মুক্তির সম্ভাবনার দাবি জানাচ্ছি। যাতে করে করে তারা তাদের ইচ্ছামতো, নিজেদের যৌন জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজ নিজ মেজাজ, আবেগ ও যুক্তি অনুসারে মুক্ত হতে পারে। যেগুলো কিনা তাদের কাছে উদ্ভট বলে মনে হয়। সুতরাং আমরা ‘ধর্ষণ’-এর স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছি না। লক্ষ্যণীয় যে, একজনের যৌন জীবন অন্য আরেকজনের যৌন জীবনের আভাস দেয় না। আমরা যৌন জীবনের এমন স্বাধীনতারও দাবি জানাচ্ছি না, যা কিনা কোনো প্রকার যৌন শিক্ষার উদ্ভব ঘটাতে পারে। আবার অন্যদিকে, আমরা মনে করি যে, বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে মানুষকে যৌন জীবন সংক্রান্ত পর্যায়ক্রমিক কোনো বিষয়েই অজ্ঞ রাখা উচিত নয়। যেমন, অনিবার্য যৌন আকর্ষণ, তা সে যৌন জীবনকে ভাবপ্রবণ, আবেগ বা শারীরিক যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করা হোক না কেন। আমরা বিশ্বাস করি যে, অগ্রসর চিন্তারই উচিত হবে এই শিক্ষার প্রতি সমর্থন দেয়া ও একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ হাতছাড়া না করা। আমরা মনে করি যে, যেই মুহূর্তের কথা আমরা বলছি সেই মুহূর্ত থেকেই মানুষের জানা উচিত পুলক সৃষ্টি হয় কীসে— তা সে ভাবপ্রবণতা, আবেগ এবং শারীরিক কারও যৌন জীবনে যাই মুখ্য হয়ে ওঠুক না কেন। এছাড়াও কী কী দায়বদ্ধতার তার নেয়া উচিত তাও তার জানা দরকার। উভয় লিঙ্গের মানুষদেরই এই বোঝাপড়ার দিকে যাওয়া উচিত। যেমন, গর্ভধারণের সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নারীর উপরই থাকা উচিত। এবং গর্ভনিরোধক এর উপায় সম্পর্কে নারী-পুরুষ কারও অজ্ঞ থাকা উচিত নয়। আমার চিন্তার একটি যৌক্তিক উপসংহারের দিকে গেলে, আমি বলব যে, যে সমাজ তার নারী সদস্যদের হাতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করতে অস্বীকৃতি জানানো অথবা তাকে ঠেকানোর অধিকার দেয়নি, সে সমাজে সেইসব সদস্যরা যদি সমষ্টির জিম্মায় তার সন্তানকে ছেড়ে দেয় তা পুরোপুরি ন্যায্য হবে।

    আমরা “যৌন জীবনের স্বাধীনতা” থেকে “যৌন শিক্ষাকে” আলাদা করি না।

    ***

    ধর্মীয় ও সমাজব্যবস্থার কুসংস্কারগুলোর বিপরীতে আমরা যৌনতার প্রশ্নকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন হিসেবেই দেখি। মনুষ্যকর্ম যে সমস্ত প্রশ্নের আমদানি করেছে সেগুলোর সাথে একে আলাদা করে দেখি না। সামগ্রিক জীবন-অভিজ্ঞতা যতটা প্রয়োজনীয় মনে হয়, যৌন জীবনের অভিজ্ঞতাও ঠিক একই রকম অপরিহার্য। ১৬ বছরের তরুণ ছেলে বা মেয়ের ক্ষেত্রে বিবাহিত জীবনের বাধ্যবাধকতাকে আমরা ‘অর্থহীন’ বলে ঘোষণা করছি আবার একই সাথে একে অপরের সহিত আবেগীয় বা শারীরিক যে প্রকারেই হোক যৌন সম্পর্ক বজায় রাখাকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছি। এছাড়াও, পনেরো থেকে বিশ বছর বয়সের মানুষের যৌন জীবন পয়ত্রিশ বা শেষ বয়সের মানুষের যৌনজীবন থেকে ভিন্ন। যৌন জীবন এতটাই জটিল বিষয় যে একই সাথে যৌন জীবনের একাধিক অভিজ্ঞতার অস্তিত্ব থাকার ব্যাপারটি সহজেই অনুধাবন করা যায়। কেননা, প্রতিটি অভিজ্ঞতায়ই, কখনো কখনো ভাবপ্রবণতা বা আবেগীয় দিকটা প্রধান হয়ে ওঠে, আবার কখনো কখনো আবেগ বা শারীরিক দিকটি প্রধান হয়ে ওঠে, আবার কখনো কখনো স্রেফ ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তির ব্যাপারটি। একটি অভিজ্ঞতা থেকে অন্য অভিজ্ঞতায়, নৈতিক, আবেগীয় বা ইন্দ্রিয়গত অনুভূতি এত অদ্ভূত ভিন্নতা পায় যে, আমরা বলতেই পারি কোনো অভিজ্ঞতাই এর পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।

    আমরা সাধারণত অভিন্ন অভিজ্ঞতার পেছনে ছুটি না।

    শিল্পী: রেনে কাপুনে

    যেহেতু আমরা অভিজ্ঞতা থেকে তীব্র, শারীরিক, ইন্দ্রিয়গত সুখানুভূতিকে বাদ দিচ্ছি না, সেহেতু আমরা একে বুদ্ধিবৃত্তিক (শৈল্পিক, সাহিত্যিক ইত্যাদি), নৈতিক ও অর্থনৈতিক সুখানুভূতির সাথে একই পটভূমিতে স্থাপন করছি। আমরা হীন নৈতিকতাবাদী, নৈতিকভাবে বিধ্বস্ত যারা কিনা একে নিচু স্তরে স্থাপন করে তাদেরও বিবেচনায় রাখছি। জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই ছোট নয়, কেবলমাত্র জীবনভীতি বা ইচ্ছাশক্তির ভারসাম্যহীনতার ফলে জাত অভিজ্ঞতা বাদে। এখন, স্বাভাবিক শরীরবৃত্তিকতা, তা সে চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করাই হোক বা তীব্রভাবে যাপন করা ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই হোক, তা জীবনের প্রতি ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তির অনুশীলনের জন্ম দেয়।

    ***

    ‘লাম্পট্য’ যাকে অন্যভাবে বলা যায় ‘নৈতিক সমবস্থার অবক্ষয়’ তা ‘যৌন জীবনের স্বাধীনতার’ সমার্থক নয়। যৌন স্বাধীনতা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত দিকই নির্দেশ করে।

    এটি এমন এক ইচ্ছার শিক্ষাদানের প্রস্তাব করে, যা কিনা প্রত্যেককে নিজের জন্য এমন একটি মুহূর্তকে নির্ধারণ করার সুযোগ দেয় যখন তরা নিজেদের আসক্তি বা প্রবৃত্তির উপর খবরদারি বন্ধ করবে। হয়তো প্রথমে যেমনটা মনে হয় শিক্ষা এর থেকেও অনেক বেশি প্রবৃত্তিগত। অপরাপর সব স্বাধীনতার মতোই যৌন জীবনের সাথে প্রচেষ্টা জড়িত। এ প্রচেষ্টা সংযমের নয় (সত্যিকার অর্থে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সংযম হচ্ছে নৈতিকতার ঘাটতির লক্ষণ, ঠিক যেমন লাম্পট্য হচ্ছে নৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ।) বরং তা বিচার, বিচক্ষণতা ও বর্গীকরণের প্রচেষ্টা। অন্যভাবে বললে, এটা নিরীক্ষার পরিমাণ বা সংখ্যার প্রশ্ন যতটা না তারচেয়ে বেশি নিরীক্ষকের গুণমানের প্রশ্ন। শেষ কথা হলো, আমাদের মনে যৌন জীবনের স্বাধীনতা শেষপর্যন্ত পূর্বপ্রস্তুতিমূলক যৌন শিক্ষা ও ব্যক্তির সংকল্পের সাথে একীভূত হয়ে থাকে।

    সবরকম পরিস্থিতিতেই যৌন জীবনের স্বাধীনতা, অবশ্যই: সম্মিলনের ভেতরে এবং বাইরে… একের থেকে অন্যের যৌন অভিজ্ঞতায় পার্থক্য আছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে প্রেমের এক অসুস্থ আচরণ অর্থাৎ ঈর্ষা কীভাবে অস্তিত্বশীল? কোনো ব্যক্তি যে কিনা কোনো অভিজ্ঞতার বিষয় বা বিষয়ী হয়ে ওঠছে, সে কি কোনো সংগত কারণে প্রয়োজনীয় গুণাগুণের অভাবে, যার ফলে তার কোনো সঙ্গী অন্য কোনো অভিজ্ঞতার বিষয় বা বিষয়ী হয়ে ওঠছে তা নিয়ে আক্ষেপ করতে পারে? আবেগীয় অভিজ্ঞতা এক বিষয়, ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন বিষয়, আবার জন্মদানকারীর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটা হতেই পারে যে কোনো নারী যাকে তার সন্তানের জন্মদাতা হিসেবে বেছে নিচ্ছে আর যার প্রতি সে সর্বোচ্চ পরিমাণ আকর্ষণ বোধ করে তারা দুজন ভিন্ন কেউ। এবং একজনের মাঝে সে যেই বিশেষ গুণাগুণের অনুসন্ধান করছে অন্যজনের ক্ষেত্রে সে ব্যাপারে সে উদাসীন। যৌক্তিকভাবে এর একজন কি অন্যজনের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে পারে?

    ***

    আলাপ শেষ করা যাক। গতানুগতিক জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে আবেগীয় প্রপঞ্চগুলোকে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যমে আমরা আসলে আমরা কোনোভাবেই মানব অস্তিত্বে ‘প্রেম’ নামক উপাদানটির গুরুত্ব খর্ব করতে চাচ্ছি না। আমরা মনে করি গুরুতর, গভীর ও তীব্রভাবে কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব কিন্তু আমাদের বহু নৈরাশ্য ও কষ্টভোগ থেকে নিষ্কৃতি ঘটবে যদি জীবনের একাধিক উপাদান চূড়ান্ত না হয়ে বরং সাময়িক, রূপান্তরযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য হিসেবে হাজির হয়। এটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও গ্রহণ করে নেয়া হয়েছ, গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ বা সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই— ভাবপ্রবণ, আবেগীয় বা যৌন দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ভিন্ন কিছু কীভাবে হতে পারে, তা আমরা ভেবে পাই না। আর এই ধারণা লুকিয়ে লুকিয়ে সাথে ধারণ করা ও গোপনে গোপনে এর চর্চা করাটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের দাবি হচ্ছে যৌন স্বাধীনতার গবেষণা ও চর্চা হোক লোক চক্ষুর সম্মুখে যেভাবে অন্য সকল স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এর অগ্রগতি ও বির্বতন শুধুমাত্র যে ব্যক্তি ও সমষ্টির সুখের সাথেই জড়িত তাই নয়, বরং বর্তমান ব্যবস্থার একটা বড় অংশের বিলুপ্তির সাথেও জড়িত।

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    তাছাড়া, আমরা নিজেদের প্রেমের ক্ষেত্রে একত্ব বা বহুত্বের পক্ষপাতী বলে ঘোষণা করছি না বিরুদ্ধে বলেও ঘোষণা করছি না, দুক্ষেত্রেই আমাদের অবস্থান সমান। এবং এটাও হতে পারে যে কোনো নির্দিষ্ট দম্পতির মধ্যে একজন একত্বের চর্চা করছে আবার অন্যজন বহুত্বের চর্চা করছে। এবং কোনো একসময় বহুত্বের চেয়ে একত্বই বেশি পছন্দনীয় হয়ে উঠতে পারে বা উল্টোটাও হতে পারে। এগুলো ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। আমরা দাবি জানাচ্ছি যে, কোনো অভিজ্ঞতা কতটা সরল বা মৌলিক তার উপর ভিত্তি করে সে অভিজ্ঞতার গুণমান যাচাই করা বন্ধ করতে হবে। আমরা এটাও দাবি জানাচ্ছি যে, এই বিষয়ে সকল প্রাণিকেই নির্দেশনা দিতে হবে। এবং পিতা, মাতা বা সঙ্গী তাদের সুবিধাজনক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য যারা সেইসব বাধ্যগতদের কাছ থেকে এসমস্ত ব্যাপার লুকিয়ে রেখে কোনো ফায়দা লুটুক। প্রত্যেকের ইচ্ছামতো নিজের যৌন জীবন নির্ধারণ করা, এর অভিজ্ঞতাকে পরিবর্তন করা অথবা নিজেকে কেবলমাত্র একক কোনোকিছুতেই বেঁধে রাখার শিক্ষা পৌঁছে যাক প্রত্যেকের কাছেই। এক কথায় বললে ‘ইচ্ছাস্বাধীন’ হয়ে উঠার দিকে যাত্রা হোক।

  • মানস চৌধুরীর সাক্ষাৎকার: লিঙ্গ-রাজনীতি, যৌনতা, শাসনপ্রণালী, দণ্ডবিধান ও সক্রিয়তা প্রসঙ্গে

    মানস চৌধুরীর সাক্ষাৎকার: লিঙ্গ-রাজনীতি, যৌনতা, শাসনপ্রণালী, দণ্ডবিধান ও সক্রিয়তা প্রসঙ্গে

    [লিঙ্গ প্রশ্নে জ্ঞান/ক্ষমতা ও শাসকতা প্রসঙ্গে এই সাক্ষাৎকার। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আলোচিত হয়েছে যৌন নিপীড়ন ও বিচারের মানদণ্ড। যৌন নিপীড়নকে নিছক একটি ফৌজদারি ঘটনা হিসেবে পাঠ এবং বিচারিক স্বৈরতন্ত্রে যৌন নিপীড়নের প্রতিকার খোঁজা আদৌ সম্ভব কিনা তা আলোচিত হয়েছে এই সাক্ষাৎকারে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে দণ্ডবিধির বিপরীতে একটা সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে যৌন নিপীড়নের জন্য পুনর্গঠনমূলক বিচারব্যবস্থার কথা। অধ্যাপক মানস চৌধুরীকে আমরা একগুচ্ছ প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম। তিনি উত্তর দিয়েছেন। তাকে আর পাল্টা প্রশ্ন করা হয়নি। সাক্ষাৎকারটি চলমান। বর্তমান টেক্সট থেকে প্রশ্ন গঠন করে আবার আমরা তার সাক্ষাৎকার নেব। অরাজের পক্ষে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন, আরিফ রেজা মাহমুদ ও শ্রবণা শফিক দীপ্তি।– সম্পাদক]

    ছবি: মানস চৌধুরী

    যৌন নিপীড়ন: সম্মতি/অসম্মতি ও ধারণায়ন

    ১.আলাপটা একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের সময় এর ধারণায়ন কেমন ছিল? এর সংজ্ঞায়ন এবং শনাক্তকরণ প্রশ্নটি আপনাদের বিবেচনায় ছিল নিশ্চয়…

    মানস: আক্রান্ত মানুষজনের জন্য আসলে ধারণায়ন অজরুরি, বিহিত বা প্রতিবিধান বেশি জরুরি। এটা আমার বিবেচনায় বিদ্যাকর্মীদের একটা আত্মশ্লাঘা যে বেইনসাফের পরিবর্তনের (ইচ্ছার) জন্য ‘জ্ঞানার্জন’ বা ‘তত্ত্বপ্রস্তুতি’ আবশ্যক। আমি বিদ্যাকর্মীদের গড়ে কোনো আঘাত দেবার ইচ্ছা থেকে কথাটা বলছি না। অবশ্যই এ নিয়ে বিশদ তর্কের দরকার পড়তে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদী আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক লড়াই পরিচালনার জন্য ইতিহাসবিদ্যা, তত্ত্বালোচনা সহায়তা দিতে পারে সে বিষয়ে কোনো বিশেষ ওজর–আপত্তিও আমার নাই। আমার বলবার বিষয়টা খুবই সাধারণ: যিনি আক্রমণের শিকার, যাঁর উপর হামলা হচ্ছে, যিনি জবরদস্তিতে যৌনাত্মক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন, তাঁর জন্য বিহিত খুঁজতে চেষ্টা করাটা বিদ্যাকর্মীরা যে অর্থে ‘ধারণায়ন’ বলে থাকেন সেই অর্থে আবশ্যক থাকে না। তিনি ও তাঁরা এর থেকে পরিত্রাণ চেয়েছেন। প্রথমে হয়তো নিশ্চুপভাবে, তারপর কিছু মিত্র পেয়ে গেলে শোরগোল করেই মুক্তি চেয়েছেন। কিন্তু অবশ্যই আপনার এই প্রশ্নের মধ্যে অন্য একটি দিক আছে। তা হলো যাঁরা যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, তাঁরা কীভাবে বিষয়গুলোকে দেখেন, দেখতে আরম্ভ করেন, দেখতে দেখতে বোঝাবুঝি পোক্ত করেন।

    প্রথমেই মেনে নেয়া ভাল, বাংলাদেশ এমন একটা জায়গা, বিশেষত মধ্যবিত্তাঞ্চল যেখানে যৌনতা আর যৌনাক্রমণ প্রায় এক পাল্লায় পড়ে–যাওয়া অপরাধ। যৌনাক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য এই অঞ্চল খুবই অসুবিধাজনক জায়গা, যেহেতু যৌন কাজকর্ম প্রায় গুরুতর পর্যায়ের মুরুব্বিদের একান্ত ঘরের মধ্যকার গোপন তৎপরতা হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। বাস্তবে এই অঞ্চলে যৌনকাজকর্ম এভাবেই সাধিত হয়ে থাকে বলে আমি মনে করি না, তবে সমাজ–প্রপাগান্ডা বা সমাজ–আদর্শের–জয়গান এভাবে চলে। আবারো বলি যদি যৌনকাজ আর যৌনহিংস্রতা কাছাকাছি পাল্লায় প্রজারা রাখতে চেয়ে থাকেন, তাহলে ধারণায়ণের প্রশ্নটা খুবই গুরুতর বটে। যদি আপনার পাঠকেরা অপ্রাসঙ্গিক না মনে করেন, তাহলে আমি উত্তরটাতে কিছু তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত’ মাত্রাও যোগ করব। আমার ছাত্রজীবনের কথা বাদ দিলেও, এই আন্দোলনটির ঠিক প্রাক্কালেই প্রশাসনের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এক সাংবাদিক (তখন ক্যাম্পাসে মাত্র দুই হালি সাংবাদিক থাকতেন) আমার যৌনজীবন নিয়ে ইন্টারভ্যু নিতে এসেছিলেন। নিজের যৌনজীবন ইন্টারভ্যু আকারে বলার ‘নুইস্যান্স’ বাদ দিলেও, এখানে অন্যান্য মানুষের ‘প্রিভেসি’ জড়িত থাকে। তার থেকেও বড় কথা ওই উদ্যোগটাকে আমি আসলে আরেকটা আক্রমণ ভাবছিলাম যাতে আমাকে ‘বিব্রত’ বোধ করানো যায়। আমার বলার জায়গা হলো, যৌন–আক্রান্ত এবং অনাক্রান্ত উভয়ের বেলাতেই কিন্তু বিব্রতি একটা লাগসই অস্ত্র যার প্রয়োগ বিধিব্যবস্থা করে থাকে। আন্দোলনটি শুরু হবার পর থেকেই, নানাবিধ আলাপচক্র, পাঠচক্র, সভাসমিতিতে এই বিষয়গুলোতে বিভিন্ন সংগঠকেরা জোর দিলেন যে শরম কিংবা লোকলজ্জা কিংবা বিব্রতির বাইরে আসা দরকার। যৌন আক্রমণকে প্রতিহত করতে গেলে আক্রমণকে অগ্রগুরুত্ব দিতে হবে। সেই অর্থে কিছু কর্মীর হয়তো স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশযোগ্য বোঝাবুঝি ছিল, বাকি আন্দোলনকর্মীরাও ক্রমাগত সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন।

    ২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধিতে ধর্ষণের সংজ্ঞায়নে সম্মতি/অসম্মতি ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারণার শেকড়টা কোথায়? ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধ বা নৈতিকতার ছাপ এই ধারণায়নে পড়েছিল কি?

    মানস: এসংক্রান্ত আইন নিয়ে আমার জানাশোনা আপনার মতো নয়। কিন্তু আমি সম্পর্কিত একটা জায়গা ধরে আগাতে চাইব। কোনো আইনকেই প্রয়োগকারী ও ভুক্তভোগীর নিয়তের থেকে সার্বভৌম করে আমি দেখি না। এটা বলার সময় চাইব সকল পক্ষ যাতে সতর্ক থাকি যে আমি ‘আধুনিক রাষ্ট্রের লিখিত আইন’সমূহের কথা বলছি। কারণ কথ্য ও তাৎক্ষণিক বিচারিককর্তৃত্বসম্পন্ন যে ‘আইন’, ধরা যাক, শালিসের মতো, সেগুলোকে অপরাধী–ভুক্তোভোগীর ইচ্ছানিরপেক্ষ জ্ঞান করা চলতে পারে। সেখানেও দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের ইচ্ছা বা নিয়তের উপর নির্ভর করে তথাকথিত ইনসাফ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা। কিন্তু পরিস্থিতিটার দশা একদম স্বতন্ত্র। আধুনিক আইন নানাবিধ ব্যাখ্যাসাপেক্ষই থাকে। এটা খোদ আধুনিক সমাজের লিবেরেল দার্শনিক পাটাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক সমস্যা।

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    ফলে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ বা নৈতিকতার ছাপ এখানে থাকতে পারে। কিন্তু আমার জন্য তুল্যবিচারে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এইটা যে ওখানে নির্দিষ্ট বয়সের এক নারীকে যৌনাকাঙ্ক্ষার মালিক বলে গণ্য করা হয়েছে। বয়সটা ছিল ১৪। এবং এখন ১৪ওয়ালারা অযৌন শিশু হিসাবে প্রপাগান্ডিত থাকেন। ‌‘পূর্ণবয়স্ক’/‘পরিণত’ নারী সম্মতি দিলেন কিনা এই প্রশ্নকে বিবেচনায় এনে এই আইন সামন্তসমাজে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে চর্চিত যৌনকাজ করার ক্ষেত্রে পুরুষের ইচ্ছার নিয়ামক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। আমার জন্য তাই ওই আইন ওই পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ছিল। যেমন একটু আগে আইনের অনুধাবনের ক্ষেত্রে বললাম নিয়ত বা অভিপ্রায়ের কথা, ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণের গুরুত্বের কথা, এখন পরিপ্রেক্ষিতকেও আইন অনুধাবনে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রস্তাব করছি। নারী বলছেন তিনি চান না, সেখানে পুরুষের প্রচেষ্টা ধর্ষণ–অপরাধ বলে গণ্য হবে এরকম পাটাতন থাকার মাধ্যমে বিদ্যমান যৌনব্যবস্থাতে পুরুষের দখলদারিত্বের ইতিহাসকে স্বীকার করা হয়; বলপ্রয়োগে এই লিঙ্গের অনেক সদস্যের চর্চাকে আমলে আনা হয়; পরিশেষে নারী অন্তত হ্যাঁ–না’র মালিকানা দিয়ে তাঁর যৌন–কর্তাসত্তাকে জারি রাখার সুযোগ পান।

    ভিক্টোরীয় নৈতিকতা নিয়ে নিন্দা করার জন্য বরং অন্য পরিপ্রেক্ষিত আমার জন্য প্রাসঙ্গিক হবে। বরং, আমরা ভাবার চেষ্টা করি যে ওই আইনপ্রণেতারা যদি জানতেন যে দিকে–দিকে, ইংলন্ডের গ্রামেগঞ্জে, ১৪ বছরের পরিণত নারীরা ১৪ ও অন্যান্য বয়সের নানান পুরুষের সঙ্গে (হেটারোসেক্সুয়াল আন্দাজে) লাগাতার যৌনসম্পর্ক করছেন, সম্মতি জানিয়ে জানিয়ে, তাহলে তাঁরা আনন্দিত হতে পারতেন কিনা। বাংলাদেশের সমাজে যেমন যৌনতা ও যৌনাক্রমণ মিলেমিশে আছে বলে উল্লেখ করেছিলাম; তেমনি, ইংলন্ডীয় তদীয় সমাজেও যৌনাচারের বিষয়ে গুরুতর ওজর–আপত্তি গড়ে উঠেছিল। শিশুদের যৌনজীবন নিয়ে ভাবা তো দূরের কথা, অশিশুদের যৌনজীবনও নানাবিধ রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার বিষয় হয়েছে। ধর্ষণের মতো আক্রমণাত্মক বিষয়কে উপলব্ধি করার জন্য প্রণীত আইনের প্রণেতাগণের অন্যান্য যৌনতা নিয়ে মনোভাব কল্পনা করা চিত্তাকর্ষক হবে বটে; কিন্তু ওই আইনটার পরিপ্রেক্ষিত ও অনুবর্তী বিবেচনা করে হলেও ওটার সঙ্গে যৌনাচার–নিয়ন্ত্রণ–করার আইন বা বিধিগুলোকে গুলিয়ে না ফেলতে চাইব আমি। যৌনাচার নিয়ন্ত্রণে ভিক্টোরীয় সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্রের মরিয়া চেষ্টা নিয়ে অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ আছে দুনিয়ায়। আমি আরো ভাল পড়ুয়া হলে এক্ষুনি হালিখানেক বইয়ের নাম বলে দিতে পারতাম।

    এটা দুনিয়ার একটা আজব পরিহাস যে, লোকে যৌনকাজ করে যত খুশি থাকেন, কিছুতেই অন্যের যৌনকাজে তত খুশি হতে পারেন না। শিশুরা এই বিষয়ে সবচেয়ে বঞ্চিত, বৃদ্ধরাও। জৈবতারুণ্যের সঙ্গে যৌনতার অবধারিত সংযোগ ঘটানোও আইনপ্রণেতা ও বিজ্ঞানচর্চাকারদের আরেকটা উদ্ভট কাজ। মনুষ্য–যৌনতার কাজ যে নিছক বাচ্চা উৎপাদন নয়, সেটা বোঝার জন্য জীববিজ্ঞানের ডিগ্রিই বরং ঝামেলায় ফেলতে পারে, কমনসেন্সই যথেষ্ট হবার কথা। তাহলে জৈবতারুণ্য নিয়ে মাতামাতি যৌনতার ‘পুলক’/প্লেজার, উৎসবমুখরতা/ফেস্টিভিটি কিংবা অধিকল্পনা/ফ্যান্টাসি কিছুই বুঝতে সাহায্য করে না। ওটা তারুণ্যের বৈশ্বিক ডিসকোর্সের আরেকটা অগণতান্ত্রিক মেনিফেস্টো। ঈর্ষার তাত্ত্বিকেরা হয়তো বিশদ কিছু বলতে পারবেন এই বিস্ময়কর প্যারাডক্সটা নিয়ে। শেষের অনুচ্ছেদে আপনার প্রশ্নের কেন্দ্র থেকে সরে গেছি এই অভিযোগ তুলতে পারেন আপনি। কিন্তু আরেক প্রশ্নে এই কথাগুলো বলতে পারব তা নিশ্চিত তো নই এখনো।


    ৩. আপনার/আপনাদের (আন্দোলনকারী অর্থে) ধারণায়নের সঙ্গে দণ্ডবিধির এই বিষয়ক ধারণার সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যটা কোথায়?

    মানস: যদি আপনার আগের প্রশ্নের ভিক্টোরীয় নৈতিকতার ধারণা সমেত এই প্রশ্নে এসে থাকেন, তাহলে সেটা মুলতবি রাখার পক্ষে আমি। কিন্তু সম্মতি অংশের সঙ্গে আগাগোড়াই সম্পর্কিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন। আমি প্রথমেই প্রায় বেয়াড়ার মতো বলে নিতে চাই যে যৌনতার নানাবিধ স্টিগমা একদম বৈশ্বিক; সেটার মাত্রা ও রূপভেদ যেমনই থাকুক না কেন। আপনি হলিউডের বলবান ধারার চলচ্চিত্রেও এই সতর্কতার অভাব দেখেন না যে সেখানকার প্রটাগনিস্টরা ‘এক সম্পর্কে’ থেকে আরেক (যৌন)সম্পর্কে ঢুকে পড়েছেন না কিছুতেই। ঢোকাটি মঙ্গলজনক কিনা, আমার আকাঙ্ক্ষিত কিনা, ঢুকে পড়লে পরে মেলা ভেজাল কিনা সেসব সম্পূর্ণ আরেক বিষয়; এবং এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁরা মেনে চলেন এই বিধান, এমনকি ছায়াছবিতে্‌ও। এই বিধানের লঙ্ঘন হবে কেবল ক্রাইমথ্রিলারে, যেখানে এরকম বিধানবহির্ভূত যৌন/প্রেম/কাম/আবেগাপ্লুত–সম্পর্কই খোদ খুনাখুনির কারণ বয়ে আনছে। ছায়াছবির প্যাটার্ন দেখাতে চাইছি কেন? এটা স্পষ্ট করতে যে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ, কিংবা শুচিতার ভোম্বাকাঠামো আলবৎ বলবৎ। এত বলবৎ যে চলচ্চিত্র কারখানাও বিধানচ্যুতি চায় না, যেমন সহজে চায় না নৈমিত্তিক ছায়াছবিতে সাদা আর কালো মানুষের মধ্যকার এমনকি বিষমলিঙ্গীয় জুটি বানাতেও। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে সম্মতির ধারণার রাজনৈতিক যে তুল্য গুরুত্ব আছে সেটাকে সমুন্নত রাখতে চাই আমি কোথাও কোথাও।

    যৌনসম্পর্কে নারীর সম্মতি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন সেই প্রশ্নের মধ্যেই খোদ সম্মতির গুরুত্ব আছে। এত এত বছর ধরে এত অজস্র ধর্ষণ এবং বহুবিধ যৌন আক্রমণ নারীর উপর হয়েছে যে নারী কীসে অনিচ্ছুক ছিলেন বা আছেন সেই জিজ্ঞাসাটার রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। সেই হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের এবং উনিশ শতকের ব্রিটেনের ধর্ষণ আইনের ধারণায়ন সাদৃশ্যমান ধরে আপনি আগাতে পারেন। তবে আর দুয়েকটি কথা বলতে চাইছি। এসব ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তীয় রাখঢাকে প্রায় কিছুই বলা সম্ভব নয়, আমি জরুরিও মনে করছি না। বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ সূক্ষ্ম, একটা বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাই।

    সম্মতির ধারণাটিকে আমি অন্য একটা শক্তিশালী লিগ্যাসির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছুক। যৌনতা, যৌনভাবনা, যৌনদশা, যৌনপ্রত্যঙ্গ বিষয়ে নিখিলবিশ্বে সব স্ফটিকস্বচ্ছ ‘বৈজ্ঞানিক’ ধারণা আছে বলে আমি মনে করি না। এমনকি খোদ বৈজ্ঞানিক ধারণা বলে যাসব চালু আছে তারও কতকের সঙ্গে আমি (এবং অনেকেই) টেবিলে বসে একটা একটা করে তর্ক করতে পারব। পুলক, সম্ভোগ, সন্তানধারণ, ঋতুচক্রোর্ধ্ব যৌনেচ্ছা এসব বিষয়ে নারীরা তো পারবেন শব্দে শব্দে। এই তর্কে নামতে চাইলে প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক বিজ্ঞানীদের সতর্ক হওয়াই ভাল হবে। তবে তাঁরা জিতবেন ক্ষমতা দিয়ে, যা হয়ে আসছে। যাহোক, বলছিলাম লিগ্যাসির কথা। ‌‘যৌনকাজকর্ম হয় জৈবতাড়নায়’—এই আকাট ধারণা কেবল স্থানিক কোনো চর্চা নয়; এটি বৈশ্বিক। এর সঙ্গে যোগ হয়ে আছে ‘পুরুষের তাড়না, জাগলে আর থামে না’ ধারণা। এটাও বৈশ্বিক। বিদ্যাজগতে, নারীবাদী আলাপে এটার নাম হলো ‘মেইল সেক্সুয়াল ড্রাইভ’। বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে আরো যুৎসই অর্থবোধক ভাষাতে এসব বলা হয়ে থাকে। বলাই বাহুল্য, যদি কারো মনে হয় স্পষ্ট করে বলিনি, এগুলো সব মিথ, প্রপাগান্ডা, পুরুষের বাহানা। ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজে বসে থাকার ইচ্ছা থেকে পর্যন্ত সরানো গেছে, যৌনকাজ করার ইচ্ছা সরবে না কেন! অন্যত্র আবার এই ধারণাও অত্যন্ত শক্তিশালী যে ‘নারীকে জাগাতে হয়’। এই ধারণাটিকেও কেবল দেশজ ভেবে ভুল করবেন না। সমকালীন যৌনতা–অধ্যয়ন শাস্ত্রে সক্রিয়তা–নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিশদ সব আলাপ–চালু আছে। তাহলে এতক্ষণ যেসব প্রবল চলমান ধারণা সামনে হাজির করলাম, সেখানে জৈবযন্ত্র হিসাবে পুরুষ ও নারীর অবধারিত সব কর্মকাণ্ড পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে তা দিব্যি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমি জানি বহু পুরুষ এ যাবৎ কালে জেনে আসছেন যৌনকাজ করার উপায় কেবল মাত্র ‘ছলে–বলে–কৌশলে’ নারীকে ‘বাগানো’। সমাজে যৌনদর্শনের এই বিচিত্র অগণতান্ত্রিক পাটাতনকে বিবেচনা করে ভাবুন। সম্ভবত, এখন যে বিষয়ে কথা বলছি (লিখছি), যেটাকে আমি সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় বললাম, তা নিয়ে বিশদ করা লাগতে পারে আপনার অন্যান্য প্রশ্নগুলোর কোনোটার উত্তরে। আমি একবারেই সব প্রশ্ন পড়ে উত্তর করছি না।

    ৪. ‘সম্মতি‘ বা ‘অসম্মতি‘র জন্য ব্যক্তির কর্তাসত্তা/স্বীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। কর্তাসত্তা বা স্বীয়তার বোধন না হলে সম্মতি বা অসম্মতি দেয়ার প্রশ্ন থাকে না। অনেক সামন্ত সমাজে নারীর বিয়ের প্রশ্নে সম্মতির ধারণা নেই বল্লেই চলে। অভিভাবকই সিদ্ধান্ত নেন। বা এবিষয়ে নিজেট মতামত থাকতে পারে এই উপলব্ধিও নারীর থাকে না অনেক ক্ষেত্রেই। সম্পর্ক গঠনকেই যখন যৌনতার সম্মতি বলে বিবেচনা করা হয় তখন এক্ষেত্রে সম্মত বা অসম্মত হতে তার কোন কর্তাসত্তা/স্বীয়তা থাকে কি?

    মানস: এই বিষয়টা গভীরভাবে ইতিহাস ও শ্রেণীসাপেক্ষ। এমনকি দর্শনসাপেক্ষ। আমি প্রগতির ধারণার বশীভূত হয়ে তা বলছি না। এই অর্থে নয় যে কখনো এসব চেতনার অভাব ছিল, অন্য এক সময়ে মন্ত্রবলে দেখা দেবে; আর তখনই এই কর্তাসত্তা জাগ্রত হবে (ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে)। এমনকি আমি এই সম্মতি–আপত্তি চর্চার প্রসঙ্গটাকে কেবল যৌনতা ও যৌনাক্রমণের মধ্যেই সীমিত রেখেও সাপেক্ষতার বিষয়টা বলিনি। বরং, সম্মতি–আপত্তির চর্চা ঘোরতরভাবে নানান পরিমণ্ডলেই শ্রেণী–ইতিহাস–দর্শনসাপেক্ষ। যৌনতার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ যদি বাদও দিই, কজন ছেলে (নিজ) বাবার অগণতান্ত্রিক কিংবা ক্রুদ্ধ কিংবা হিংস্র কিংবা শোষণকারী আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় বলে ভাবতে পারেন? কেবল সামন্ত পরিসরের বাবাদের কথা হচ্ছে না। শহুরে–শিক্ষিত–মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বেলাতেও কমবেশি বাবা ও ছেলের সম্পর্ক মৌলিক সামাজিক প্রশ্নগুলোতে একপক্ষীয়। সেটা গৃহকর্মীর বেতন হোক, ড্রাইভারের কর্মঘণ্টা হোক, দারোয়ানকে সম্বোধন হোক। আমি খুব স্থূল উদাহরণেই থাকলাম তা সত্য। এখন চুপ–থাকা সকল ছেলেই বাবার স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক তা আমার বক্তব্য নয়। যৌনতার বেলাতেও মানা না–করা আর মেনে নেয়া বা সম্মতি একাকার করার পক্ষে থাকব না আমি। এই অংশে আমার বলবার বিষয় ছিল, নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে, নির্দিষ্ট শ্রেণীতে বিষয়গুলো অভিন্ন থাকে না। আবার তার উপরে দর্শনগত বিষয় থাকতে পারে। যেমন, উদাহরণের ছেলেটি মুরুব্বিদের আচরণের সমালোচনা না–করার মূল্যবোধে বিকশিত হয়ে থাকতে পারেন। আর সেই বিকাশ তাঁর চিন্তাপ্রবাহে বাধা দিতে পারে।

    এই পর্যন্ত এসে আপনি আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে করা আলাপের প্রসঙ্গ টানতে পারেন এবং বলতে পারেন আমি যে ধারণায়নকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না তখন। যখন আক্রান্ত আপত্তি করেন, প্রতিবাদ করেন; কিংবা অন্তত আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ চাইতে থাকেন আর যখন আক্রমণকারী আর আক্রান্তের বাইরে তৃতীয় পক্ষ সেটার সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করেন তখন বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখি আমি। এই দেখাদেখি মাইক্রোমনস্ক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ম্যাক্রো ইতিহাস ও আন্দোলনের চর্চা তো আমরা অনেক বছর অবলোকন করলামই। আমি ছোট ছোট পরিসরের এই কর্তাসত্তামূলক অনুধাবনকে যত্ন করে করতে চেয়েছি। সেজন্য বলতে পারি, আমার প্রথম আলাপ আর এখনকার আলাপ সাংঘর্ষিক নয়। এখন মনোযৌনজ প্রশ্নে নারীর কর্তাসত্তার বিষয়টাও নানাবিধ জটিল সব পরিপ্রেক্ষিতের উপর দাঁড়ানো। যদি আলোচ্য নারীটির মনোগড়ন, বিচারবুদ্ধি এইভাবে গড়ে ওঠে যে স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিতেই হবে তাহলে তাঁর পীড়িত হবার বোধ একই থাকবে না যে নারী যৌনজাগ্রত হবার কারিগরি বিষয়ে ভিন্নভাবে ভাবেন। এই উদাহরণটা সহজ হলো। কিন্তু যেমন আগের প্রশ্নের উত্তরে বললাম যে প্রচুর পুরুষ এই ধারণা নিয়ে বড় হয়েছেন, হয়তো মারাও যাবেন এই ধারণা সমেত যে ‘নারীকে জাগাতে হয়’ সেই মনোভাব (দর্শনই বলছি) যদি কোনো নারীরও থাকে তাহলে ইতোমধ্যেই আমরা খুব সঙ্কটাপন্ন লিঙ্গ–রাজনৈতিক বাস্তবতাতে পড়ে গেলাম। কিন্তু কোনো নারীর মধ্যেই এই ভাবনা কাজ করে না এমনভাবে ভেবে নেবার কোনো কারণ আমি পাই না। শর্তসাপেক্ষে তাই একথা বলা যায় যে অসম্মত হওয়া বা অসম্মতি জ্ঞাপনের কর্তৃত্ব বোধ একটা নির্দিষ্ট মনোযৌনজ বোঝাবুঝি থেকে আসে।

    এই প্রশ্নটাকে আরেকটা সূক্ষ্ম দিকেও নিতে চাই আমি। “সম্পর্ক গঠনকেই যখন যৌনতার সম্মতি বলে বিবেচনা করা হয়” এই বাক্যাংশটিতে মনোযোগ দেয়া দরকার। প্রেমের সম্পর্ক কমবেশি হবুবিয়ের প্রস্তাব হিসাবে প্রচল হয়ে আসছে। হয়তো আমাদের চারপাশে বেশি, হয়তো গ্রামদেশে কিছু কম, হয়তো পাশ্চাত্যে ভিন্ন। এসব ভিন্নতাকে আমলে এনেও বলছি, যেসব সম্পর্কের নাম কমবেশি ‌‘প্রেম’, এবং যেসব সম্পর্ক সাধারণত একজন নারী ও একজন পুরুষকে ঘিরে আবর্তিত হয় সেগুলোর মধ্যে ‌বিয়ে একটা সম্ভাব্য পরিণতি হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মুখে বলে বা খাতাকলমে লিখে কতখানি চর্চিত সেটা আলাদা প্রসঙ্গ। ধারণা করা যায় প্রেমিক–প্রেমিকারা মুখে বলেন অধিক, লিখে হবুবিয়ের চুক্তি করে আগান কম, বা একদমই করেন না। কিন্তু কথ্য বা লেখ্য সেই প্রতিশ্রুতি না থাকলেও এটা আছে সমাজ–পাটাতনে। এই অর্থে এটা ডিসকার্সিভ একটা শক্তি। এর মধ্যে ‘প্রেমে’ যৌনতা আসতেই পারে একটা প্রিমাইজ বা পূর্বধারণা। কিন্তু আমাদের আলোচ্য জুটিটির মধ্যে দুজনেরই এই পূর্বধারণার প্রজা থাকার সম্ভাবনা নাও থাকতে পারে। একজন ভাবতেই পারেন, ‘বিয়ের আগে কক্ষণো না’। এই একজন আমাদের চলতি বিচারে মনে হবে নারীটি হতে পারেন, বা কিছু নারী হতে পারেন। তবে আমার সমাজ–বিচরণ থেকে জানা হয়েছে যে পুরুষটিও এই ভূমিকায় থাকতে পারেন। তাহলে ‘প্রেম’ মাত্রই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ম্যান্ডেট – এরকম ধরে নেয়া পাত্র যদি ধরে না–নেয়া পাত্রের সঙ্গে লিপ্ত হন তাহলে সাংঘর্ষিক বিষয় দেখা দিতে পারে। ফলে কর্তাসত্তার প্রশ্নটা গুরুতর বটে। এই বিষয়ে এত ঘন আলাপ করে আমি কিছুতেই ধর্ষণের গুরুত্ব থেকে পাঠককে সরাতে চাইনি। উল্টো, ধর্ষণের মতো বিষয় যে ‘প্রেমে’র মতো আপাত–নিরীহ হবুবিয়েমণ্ডিত কাজকর্মের মধ্যেও হতে পারে সেটারই প্রেক্ষাপট বিশদ করলাম।

    ৫. বিভিন্ন সময়ে যৌন নিপীড়ন শনাক্ত করণে সম্মতি/অসম্মতির প্রশ্নে কনটেক্সটকে বিবেচনায় নেয়া হয় না। সম্মতি/অসম্মতির ধারণা নিশ্চয় রোবটিক নয়?

    মানস: লিঙ্গীয় বৈষম্য যখন এক গভীর বাস্তবতা তখন এ নিয়ে সংশয়ী ভূমিকা নেয়া খুবই কঠিন, রাজনৈতিকভাবে। কিন্তু সাধারণভাবেই বলতে চাই, বিবেচনা কী করা হয়েছে বা হয়নি তা কেবলই তৃতীয় পক্ষের কাছে গেলেই প্রশ্ন ওঠে। যতক্ষণ যৌনতা দুই পক্ষের মধ্যকার মীমাংসিত বিষয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মতি–অসম্মতির পাটাতন ভাবার দরকার পড়ে না। দুইজন এক পক্ষে আছেন কিন্তু তাঁদের মধ্যে অসম্মত যৌনকাজ সাধিত হয়েছে এরকম একটা প্রসঙ্গ ফ্যালাসি হতে বাধ্য, যদি না আমরা বিয়ের মধ্যকার যৌন নিপীড়ন নিয়ে ভাবতে বসি। সাধারণভাবে, আমি সকল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, লিঙ্গসমেত, গরু এঁকে নিচে গরু লিখে দেবার পক্ষপাতী। অন্তত ইসলামী বিয়েতে কাজী এই কাজটা করে থাকেন ‘কবুল’ শোনার আনুষ্ঠানিকতায়। সেটা প্রতিবার যৌনাত্মক যোগাযোগে করতে–থাকা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরুষের জন্য আরো বেশি সুবিধাজনক। কিন্তু এটাও সত্য যে এতে মনোযৌনজের যে রহস্যময়তা বা মায়াবী বৈশিষ্ট্য আন্দাজ করা হয়ে থাকে, কিংবা কাব্যিক, সেসব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এগুলো সবই কিছু হারিয়ে কিছু পাবার পরিস্থিতি।

    কেন আমি গরু এঁকে গরু লেখার পক্ষপাতী সেটা বরং খোলাসা করি। সেটা এমনকি নিছক যৌনসম্পর্কের বেলাতেই নয়। ধরুন, আপনার আর আমার ভিতর কোনো যৌনসম্পর্ক নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত। আমাদের দেখাসাক্ষাৎও যৎসামান্য হয়েছে জীবনে। কিন্তু সাইবার যোগাযোগে ধরুন আমি একটা উচ্ছ্বাসে, বা অন্য কোনো বজ্জাতিমূলক তৎপরতায় একটা চুমা–ইমো পাঠালাম আপনাকে। যদি দ্বিপাক্ষিক চ্যাট হয় আপনি হয়তো একটা ফোন দিয়ে বসলেন ‘মানসদা, ইমোটা কি ভুলে পাঠাইলেন?’ কিংবা হয়তো চুপ থাকলেন, কিছুই আর লিখলেন না। কিন্তু বহুজনীয় ফোরাম হলে সেসব করাও কঠিন হয়ে যাবে আপনার, যেহেতু আমার চুমা–ইমোর দর্শক তথা তৃতীয় পক্ষ তৈরি হয়ে আছে। তাহলে যদি একটা ইমোচুমাও আপনি না নিতে চান, আপনার বলতে হয় যে ‘এই ইমো আমাকে আর দিবেন না’। যদি আমার বজ্জাতি ভাবনা থাকে, আপনার নিশ্চুপতাকে অস্বস্তি হিসাবে পাঠ করেও কিন্তু আমি ওরকম ইমোবাণ নিক্ষেপ করতে পারি। ফলে আপত্তি বা অসম্মতির একটা প্রকাশ্যরূপ এখানে জরুরি হয়ে পড়ছে। আপনার–আমার এরকম আপাতত অযৌন সমলিঙ্গীয় প্রায়–পেশাগত যোগাযোগেও। যে অর্থে আপনি রোবটিক বললেন, আমি যদি সুবিধার্থে একটা অনুবাদ এরকম করে নিই ‘অটুট নীতিমালা’, তাহলে সেটার জরুরিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। নারীবাদী যে শ্লোগান – ‘নো মিনস নো’ – এটাও একটা কথ্য বা ভার্বাল ‘নো’। এই উচ্চারিত না–টির সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে কিনা সেটা একটা আইনী–প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন; কিন্তু নৈতিক মীমাংসার জন্য ওই না–টি উচ্চারিত হওয়া ধন্বন্তরীর মতো। তাহলে তুল্যবিচারে রোবটিক অসম্মতিকে আমি গুরুত্ব দেব। এতে ছায়াছবির বা আধুনিক গানের বা কবিতারও হয়তো ‘না ছুঁয়ো না’ ধরনের দ্ব্যর্থক ‘না’গুলো মাঠেমারা যেতে বাধ্য। কিন্তু উত্তুঙ্গ বৈষম্যের ভিতর কাব্যের ধ্বজা ধরে পার পাব না বলে আমি মনে করি।

    তবে আপনার প্রশ্নে পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে গিয়ে আসলে উল্টাদৃশ্যের কথাও ভাবা হয়েছে। হতে পারে, সেটাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়েছে। তা হলো, একটা বাস্তবতায় কোনো পক্ষ, নারীপক্ষই প্রাসঙ্গিক, যৌনসম্পর্কে ‘সম্মতি’ দিয়েছেন, সেই সম্মতিটাকে ওই সময়কার চাপের বাস্তবতায় পাঠ করা লাগতে পারে। যেমনটা, আমাদের অঞ্চলে ‘বাসর রাতে নারীর কর্তব্য’ বিষয়ক মর‍্যালগুলোতে জোরেসোরে প্রচারিত হতে থাকে। ঠিক ওরকম ক্ষেত্রগুলোতে রাজনৈতিক তৃতীয়পক্ষীয় এজেন্সি নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু করার আছে বলে আমার মনে হয় না। এক ধরনের বুর্জোয়া–লিবেরেল ন্যায়বিচারও যেখানে সুলভ, সেখানে প্রশ্নগুলোর সূক্ষ্মতার গুরুত্ব আছে। আমাদের পরিমণ্ডলে যৌনাক্রমণ বিষয়ক কোনো অভিযোগ কাঠামোগতভাবেই লঘু হয়ে থাকে – প্রথমত নৈতিক শাসনের দৃষ্টিতে, দ্বিতীয়ত ও মুখ্যত আইনী দীর্ঘসূত্রিতার পদ্ধতিতে, তৃতীয়ত হয়রানির নতুন নতুন আশঙ্কার বাস্তবতায়। সম্মতি–অসম্মতি ধারণা হিসাবে কাজে লাগতে পারে এমন ‘ন্যায়বিচারের’ সম্ভাবনা থেকে ঢের ঢের দূরে আছি আমরা।

    হাইকোর্টের নীতিমালা: যৌন নিপীড়ন ও ভিক্টোরিয়ান ভাবালুতা

    ৬. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন থেকে এবিষয়ে হাইকোর্টের নীতিমালা প্রণয়ন, একটা লম্বা সময়। বিভিন্নখানে আলাপ আলোচনায় হাইকোর্টের নীতিমালার ভিত্তি হিসেবে এই আন্দোলনকেই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু রিট দায়ের করেছিল উন্নয়ন সংস্থা— বিএনডব্লিউএলএ। একটি র‌্যাডিকেল আন্দোলন, মাঝে একটি এনজিও–প্রক্রিয়া। এতে কোন ফিল্টার লক্ষ্য করেন কিনা? দুটো স্বরের পার্থক্য নিশ্চয় ছিল?

    মানস: এখানে কয়েকটা সম্পর্কিত অথচ স্বতন্ত্র বিষয় নিয়ে আলাপ করার দরকার আছে বলে আমার মনে হয়। দীর্ঘ হবে সম্ভবত, কিন্তু আমি নিরুপায়। প্রথম বিষয়টি হলো, লিঙ্গীয় সম্পর্কভিত্তিক আলাপ–আলোচনা ও আন্দোলনের পূর্বসূত্রের অভাব। বাস্তবতা হলো, যেভাবেই হোক ১৯৯৮ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনটির তেমন কোনো পূর্বসূরী তামাম বিশ্বেই অতি বিরল; খোদ দক্ষিণ এশিয়া বলতে যা একাডেমিক–রাজনীতিকরা বুঝিয়ে থাকেন সেখানেও বটে। আবার, কোনো কোনো পাঠকের পড়তে যেমনই গা–চিড়বিড় লাগুক না কেন, গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্মতর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রশ্নে উত্তর–ঔপনিবেশিক পাটাতনে ভারত সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ আলাপসূত্র সরবরাহ করে এসেছে। সেটা ভারত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বৈষম্য–রহিত দশার প্রশ্ন নয়, আইনী লড়াইয়ে ভারতের বিচারালয়ের দীর্ঘকালীন ‘জন–ইনসাফ’কেন্দ্রিক পদক্ষেপ/হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ। বিচারালয়ের প্রসঙ্গ এলে, ইতিহাস সাক্ষী, পাকিস্তানের অবস্থাও বাংলাদেশের থেকে গুরুত্বপূর্ণভাবে উজ্জ্বল। তো, ভারতের বিশাখা রূপরেখাও কিন্তু ১৯৯৮ সালের আন্দোলনের আগের রূপরেখা; সম্ভবত ১৯৯৭’র দিকে এসেছে, পরে যেটা একটা আইন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের আদালতের হস্তক্ষেপের পরে। এটা নিয়ে আমরা ভাবতে পারি যে, কীভাবে পাশের দেশে গুরুতর ক্যাম্পাস–আন্দোলন ব্যতিরেকেই রূপরেখা প্রণীত হয়, আবার আমাদের দেশে গুরুতর ক্যাম্পাস আন্দোলনের পর কমবেশি ১১ বছর লেগে গেল আদালতের একটা স্বর প্রক্ষেপণে। তবে এসব ভাবনা দুর্ভাবনা ও বিলাপ না হয়ে ঘটনাপরম্পরা ও কারকদের তৎপরতার বিশ্লেষণ হলেই ভাল হবে।

    শিল্পী: গিনি নাগি

    এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে বিষয়টা উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে এনজিও নিয়ে মোটের উপর, বিশেষত বামমহলে, একটা গড়গড়া ধ্যাবসা (বা আনক্রিটিক্যাল) অবস্থান। বিএনডব্লিউএলএ–ই যে আদেশপত্র বা রিটের আবেদন করেছিলেন সেটা আমার স্মৃতিতে ছিল না। কিন্তু কোনো একটা ‘এনজিও’ই যে তা আমার স্মরণে ছিল। এটা আলাদা করে বলতে চাই আরেকটা বিষয় হিসাবে ঠিক এর পরের অনুচ্ছেদেই। এনজিও বিষয়ক গড়গড়া বিদ্বেষ গুরুতর ক্ষতি করেছে বাংলাদেশে। প্রথম ও প্রধান যে ক্ষতিটা করেছে তা হলো মহাধিপতি এনজিও–এম্পায়ারের সঙ্গে টিঁকে–থাকা, মামলা–মোকদ্দমা করে রাষ্ট্রের সাথে দেনদরবারে পেরেশান সংস্থাগুলোর ফারাক পুরা উধাও হয়ে গেছে। এতটাই যে, এমনকি ঢাকার ডাকসাইটে বাম মিত্রকে আপনার মনে করিয়ে দিতে হয় যে অমুক থানার তমুক এনজিওটা বরং চিংড়ি ঘেরের নির্যাতিত মজুরের স্বার্থরক্ষার আইনী কাজটুকু করে থাকে। এটা কি আপনার মনে করানোর কথা ছিল? আমার মুখে ‘সিনেমায় কাজ করছি’ শুনলেই যদি আমাকে আপনার ৫২ ইঞ্চি বুকের ছাতির এবং হাজার কয়েক নতুন তারকা বানিয়ে–দিতে–পারা সালমান খান মনে হয়, তাহলে আপনার আক্কেল–আন্দাজ বাদ দিলেও, মাঠ–পর্যায়ের–বিদ্যার হালহকিকতও তো গুরুতর বিপজ্জনক সাব্যস্ত করতেই হবে। ১৯৯৮ সালের আন্দোলনকালীন, এবং পরেও, ‘এনজিও’কে একটা নৈতিকতাশ্রয়ী গালাগালির বিশেষণ হিসাবে সামলাতে হয়েছে আমাদের/আমার খোদ বামমহলের কাছ থেকে। কিছু অভিজ্ঞতা টীকা আকারে না বলে বরং, কখনো প্রয়োজন পড়লে, জীবন ও সংগঠনের ইতিহাস হিসাবে উল্লেখ করতে পছন্দ করব। সারাংশেও যদি বলি, পদ হিসাবে ‘এনজিও’র একটা লেজিসলেটিভ বর্গ হবার কথা ছিল; দীর্ঘদিনের বামদলগুলো এটাকে একটা নৈতিকতাময়/মর‍্যাল বর্গ বানিয়ে সাংগঠনিকতার ক্ষতি করেছেন। কিছু সংগঠন ‘আপনার’ না হতে পারে, কিন্তু নানান সংগঠনের বিচার করার সময় মিত্রপক্ষ নীতিবোধে আক্রান্ত হলে, রাজনীতিবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। রাষ্ট্র–নিবন্ধিত হতে গেলে এনজিও হওয়া এখন অনেকের জন্য ‘চয়েস’ নয়, বিশুদ্ধ ‘হকিকত’। কিছু ‘রাগি’ অগ্রজ কম্যুনিস্টের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমার মাঝেমধ্যে ঈর্ষা জন্মে। তাঁদের কারো মতো হলে এখন ওইসব ২০ বছর আগের শুচিতাক্রান্ত প্রশাসনস্নেহধন্য খারিজপ্রবণ বামবন্ধুদের বলতে পারতাম: “বুঝো না তো কিছু, কাঁঠাল ঝুলায়ে কও লিচু”।

    তৃতীয় যে প্রসঙ্গটি বলতে চাইছিলাম, এখনো বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘ব্যক্তিসমূহ’ সংগঠনের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে হয় চান না, না হয় সুবিধাজনক মনে করেন না। এটা বিশদ না–করতে চেয়ে বলি, গত ৮–১০ বছরেও আমি একাধিকবার বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রশাসনের হিংস্রতায় কিংবা প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় ঘটা হিংস্রতায় যেসব শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগযোগের চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগাযোগই বিশেষ আগায়নি। যেসব ক্ষেত্রে যোগাযোগ কিছুটা আগিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনী পদক্ষেপে সেসব পরিবার উৎসাহী হয়নি, যদিও কাগজে–কলমে বাংলাদেশের আইন স্পষ্টত ভুক্তভোগীর পক্ষে রয়েছে। কেন আইনী পদক্ষেপ ব্যক্তিসমূহের তুলনায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অপেক্ষাকৃত (জ্বি একেবারেই তুলনামূলকভাবে) সুবিধাজনক, সেটা গুরুতর কঠিন প্রসঙ্গ নয় বুঝবার জন্য।

    শেষত এটা বলব, অন্তত আপনার প্রশ্নের ফিল্টার অংশকে বিবেচনায় রেখে, হাইকোর্টের নীতিমালাটি যে সংগঠনের আবেদনেই হোক না কেন, এর বাণী, ধারণায়ন ও রাজনৈতিক উপলব্ধি গুরুতরভাবে ভিন্ন কিছু হয়নি আন্দোলনকারীদের চেতনার দিক থেকে। মাঝে যে এক দশক কেটে গেছে সেটার প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র। কিন্তু আসলে ফিল্টার হয়নি। তথ্য আকারে এগুলো বেশ সংবেদনময় যে, হাইকোর্টের নীতিমালা আর তার দশ বছর আগে আন্দোলনকারীদের দাবিনামার মধ্যে অমিল সামান্যই। আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত পরিণত পর্যায়ে, দাবিনামার আনুষ্ঠানিক বাণী বানানোর সময়কালে, ঝানু কম্যুনিস্ট আর মানবাধিকার আইনজীবী, (ছোটো) এনজিওর ডিরেক্টর আর (এনজিও নিয়ে মর‍্যাল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা) বামদলের সভাপ্রধান, মুখর ছাত্রী আর চৌকষ শব্দধারী লেখক সকলে একত্রে কাজ করেছিলেন। বরং, যেসব সংগঠন লাগাতার সমাজ–পরিসরে দেনদরবার দরকষাকষি জারি রেখে হাইকোর্টের স্পৃহাকে মূর্ত করেছে, ১০ বছর পরে হলেও, সেসব সংগঠনের ‘সংগ্রাম’টাকে লক্ষ্য করা দরকার, বিএনডব্লিউএলএ’র তো বটেই। পরন্তু, এই সংস্থাটি সংগঠনের থেকেও অধিক মোর্চা।

    ৭. হাইকোর্টের নীতিমালাটিতে যৌন নিপীড়নকে সম্মতি/অসম্মতির নিরীখে দেখা হয়নি। এই শব্দবন্ধর উপস্থিতিই নেই! এটিকে কিভাবে ব্যাখা করবেন?

    মানস: সম্মতি–অসম্মতির ধারণায়ন এমনকি আন্দোলনের কালেও যতটা অনুধাবিত ছিল, ততটা উচ্চারিত ছিল না। এর একটা সমাজ–মনোজাগতিক ব্যাখ্যা করা যায়। সেটা হলো সম্মতির ধারণা যত উচ্চারিত হবে, ততই কিন্তু যৌনতাকে একটা চর্চা হিসাবে মূর্ত গণ্য করা হয়, বা ইঙ্গিতময় হয়। এই মূর্তকরণের সামগ্রিক ট্যাবুর দিকে আমি মনোযোগ দিতে চাইব। হাইকোর্টের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটে থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে লাগসই উদাহরণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রক্টরিয়াল নীতিমালা। যদিও এখানে দীর্ঘকাল ১৯২১ সালের প্রক্টরিয়াল নীতিমালাই বলবৎ ছিল, অতি সম্প্রতি সেটার রদবদল হতে শুরু করেছে। মোটের উপর পূর্বানুমান আর বিচারবোধ গুরুতর বদলায়নি তাতে।

    ১৯২১ এর প্রক্টরিয়াল বিধিমালার যেসব বিষয়ে এখন অপেক্ষাকৃত কৌতুকের সঙ্গে তাকানো যাবে তার একটা অন্তত শাস্তির মুদ্রামান। যেমন, যতদূর মনে পড়ে, কোনো শিক্ষকের প্রতি যদি কোনো শিক্ষার্থী ‘প্রেমে’ পড়েন তাহলে উক্ত শিক্ষার্থীর ২৫ পয়সা দণ্ড হবে। লক্ষ্য করবেন, বিধিতে শিক্ষার্থীর উপলব্ধি লিঙ্গনিরপেক্ষ নয়; শিক্ষকের উপলব্ধিও নয়। বরং, আন্দাজ করা হয়েছে, ‘প্রেমে পড়া’ শিক্ষার্থী অবধারিতভাবেই নারী, আর শিক্ষকটি পুরুষ। কিন্তু এহেন ‘পতনে’ শিক্ষার্থী ২৫ পয়সায় যদি পার পেয়ে যানও, এটা অনেক পরিষ্কার নয় যে বারংবার ২৫ পয়সা খরচ করে তাঁর ‘প্রেমনিপতনের’ লাগাতার সুযোগ থাকছে কিনা। আন্দাজ করে নিতে হবে, তা থাকছে না। পক্ষান্তরে, শিক্ষকের এরূপ ‘প্রেমে পড়া’র শাস্তি চাকুরি থেকে বরখাস্ত। এখন আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়বার অধিকার রাখেন যে, যেসব অন্তত পুরুষ শিক্ষক তাঁদের হবুস্ত্রীকে শিক্ষার্থী বর্গ থেকে বাছাই করলেন, এবং পরিশেষে স্ত্রী হিসাবে রাষ্ট্র ও ঈশ্বরের অফিসে নিবন্ধিত করলেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডে ‘প্রেমপতন’ না–ঘটে ছিল কিনা; থাকলে কীভাবে না–ঘটন সম্ভব। কিংবা ঘটে থাকলে কীভাবে (পুরুষ) শিক্ষকটি চাকুরিতে বলবৎ থাকা অবস্থায় সহকর্মীদের মুরগির রোস্ট খাইয়ে তিনি বিয়েতে শামিল হতে পারলেন। ইত্যাদি। বিষয়টা আরো ঘোরতর দুশ্চিন্তার হয়ে পড়ে যেহেতু এই অঞ্চলের প্রেমট্রেম মোটের উপর হবুবিয়ের একটা অলিখিত দলিলই বড়জোর। কিন্তু অধিকাংশ আইনের মত এই প্রক্টরিয়াল বিধানও এরকম রহস্যময়তাসমেতই বিদ্যমান ছিল। এখানে তার থেকে অনেক গুরুতর হলো ‘প্রেম’ পদটার অন্তর্গত অর্থসমেত উপলব্ধি করতে পারা। কোথাও ফুটনোটে বলে দেয়া নেই, কিন্তু আপনারই ক্রিটিক্যাল পাঠক হিসাবে বুঝতে হবে যে শব্দটির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে যাতে বাণীকারদের কোথাও যৌন শব্দটা লিখতে না হয়। ফলে আদি প্রক্টরিয়াল বিধির ‌‘প্রেম’ হলো যৌনতা। এই অনুবাদ ছাড়া কোনো মাথামুণ্ডই উদ্ধার হবে না। এটা ইংরাজি–বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ নয়। ১৯২১ সালে অন্তত ইংরাজিতেই লিখিত ছিল। তারপরও ‘যৌনতা’র মতো গুরুভার শব্দের আমদানি ব্রিটিশরাজও করতে চাননি।

    এইসব বলে আমি আপনার প্রশ্নের অমর্যাদা করিনি, বরং প্রশ্নটার গুরুত্বকে সামাজিক–মনোযৌনজ পাটাতনে স্থাপন করতে চাইলাম। আমি দুটো অন্তত স্পষ্ট কারণ পাই হাইকোর্টের বাণীমালাতে সম্মতি–অসম্মতির ধারণা না থাকার পিছনে। প্রথমত, এখন সাইবারস্পেসের কিছু উত্তুঙ্গতায় যতটা পরিচিত, প্রাসঙ্গিক ও নির্ধারণী সামর্থ্য এই ভাবনা–জোড়ের আছে বলে মনে করা যাচ্ছে, ততটা কিছুতেই হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের কালে ছিল না। পরিপার্শ্বের ভাষা–ভাবনা–পদ–প্রত্যয় নিরন্তর বদলাতে থাকে; তার ওজনের তারতম্য হয়। সেই বাস্তবতাটা আমি স্মরণ করতে চাই। কিন্তু মুখ্য কারণ সম্ভবত এই মনোগড়ন যে, সম্মতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেই একটি প্রতিষ্ঠান হামলাকে হয়তো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু যৌনকাজকর্মকে উৎসাহপ্রদান করেছে বলে প্রতীয়মান হয়ে থাকতে পারে। আমি এমন কিছু নারী অভিভাবককে চিনি যাঁরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে বা আধা–তত্ত্বাবধানে থাকা বালিকাদের, ১৮ ঊর্ধ্ব বা নিম্ন, বাইরে নড়াচড়ার জীবন শুরুর প্রাক্কালেই জন্মশাসন ও যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ক তালিম দিতে পছন্দ করেন। তাঁদের এই তালিম–ইচ্ছাকে আমার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ মনে হয়। কিন্তু প্রায়শই বৃহত্তর পরিবারের অপর সদস্যরা এসকল নারীদের উপর অতিশয় বিরক্ত হন; কখনো সাংঘর্ষিক সম্পর্কও তৈরি হয়। তালিমকারী নারীদের দেখা হয় ওইসকল অল্পবয়স্কা নারী, বা জাতিসংঘীয় নারী শিশুদের, যৌনজীবনে উৎসাহপ্রদান হিসাবে। আমার এই উদাহরণে এটা দেখাতে চাইলাম যে কতিপয় ভাষামালা কিংবা কার্যক্রম নৈতিক বিচারে দুষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে। সম্মতি–অসম্মতি যুগল আলাপ জগতে এখন আপনার যতই প্রাসঙ্গিক লাগুক না কেন, অভিভাবকসুলভ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে এটা যৌনকাজের মতো ‘নিন্দনীয়’ একটা কাজের প্রতি সমর্থনসূচক বিবেচিত হবার পরিস্থিতিতে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সেজন্য এমন ভাষায় আগাতে পারেন যা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, নিশ্চুপ।

    ৮. আমরা একটু আগেই দণ্ডবিধির কথা বলছিলাম। তো ঔপনিবেশিক এবং ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের দ্বারা তাড়িত এই আইনে যৌনতার নানা ফর্মকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। হাইকোর্টের নীতিমালাতেও আমরা কতকগুলো আচরণকে যৌননিপীড়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে দেখি। সম্মতি/অসম্মতির প্রশ্নহীন এবং কতকগুলো আচরণ দ্বারা যৌন নিপীড়নকে চিহ্নিত করার এই পদ্ধতিও কি ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধ তাড়িত? এই আচরণগুলো মিউচুয়াল হতে পারে, কিন্তু তা স্বীকার না করাটা খোদ যৌনতার উপরেই ঔপনিবেশিক ধাঁচের নিষেধাজ্ঞা নয় কি?

    মানস: আমার আশঙ্কা এই প্রশ্নটিতে দুই নম্বর প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি আছে। তাছাড়া আমি এও মনে করি এই প্রশ্নটির আসলে শেষাংশটাই কেবল লিপিবদ্ধ থাকলে প্রশ্ন হিসাবে তীব্র লক্ষ্যমুখ থাকত। মানুষসমূহের পরস্পরের ইচ্ছানুযায়ী সম্মিলনের ক্ষেত্রে আদালতের আইনগুলো যথেষ্ট উন্মুক্ত নয় কেন এই প্রশ্নটা নিজগুণে গভীরভাবে পর্যালোচিত হবার মতো। ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ আইনকানুনকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে সেটাও আমি না–মানার জায়গায় নেই। বরং, আমার আগ্রহ হবে একদম বিদ্যাগত তর্কলড়াইয়ের বাইরে বারংবার ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ না বলারও। কারণ কখনো কখনো আমরা একটা পদপ্রত্যয়ে বন্দি করতে চাইলেও আসলে এই মনোজগতে বিরাজ করে অনেকগুলো সম্পর্কিত অনুভূতি – যৌনশুচিতাবোধ, পাপপুণ্যবোধ, রুচিবোধ, ভালমন্দের বোধ, ন্যায়–অন্যায়ের বোধ, কর্তৃত্ব–নিয়ন্ত্রণের বোধ, ঈর্ষার বোধ। যদি ‘বৈজ্ঞানিক’ প্রমাণ করতে আমাদের অসুবিধাও হয়, আমার তো ধারণা আমার এই রচিত বাক্যটি পঠিত হবার সাথে–সাথেই মূর্ত হয়ে গেল যে কতরকমের জটিল অনুভূতি–পাটাতনের মধ্যে কখনো ব্যক্তি কখনো প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে। ফলে আদালত কিংবা আর কোনো প্রতিষ্ঠান যে মূল্যবোধে ‘তাড়িত’ থাকেন তার নাম ভিক্টোরীয় হবে নাকি ঔপনিবেশিক নাকি আর কিছু এসবের আগ্রহের থেকেও আমার আগ্রহ সেগুলোর বৈশিষ্ট্যকে শনাক্ত করা। আমি বরং একটা ব্যানারে বোঝার চেষ্টাকেই বিপজ্জনক মনে করি।

    এই প্রশ্নটির একটা পূর্বানুমানঘটিত, বা আশাবাদঘটিত, সঙ্কট আছে। নিপীড়নকে প্রতিহত করার আইন বা বিধিমালার কাছে যৌনচর্চার দিকনির্দেশনা আশা করার সঙ্কট সেটা। আমি সেটা করতে চাই না; আমার মাথা ওভাবে কাজ করে না। করে না কেন ভেঙে বলি। বাংলাদেশ এবং নানান দেশে করোনা–কোভিডকালে আইসোলেশন–কোয়ারেন্টাইনের যে বিধিগুলো এসেছে সেগুলো প্রায় আইনেরই শামিল। কোনো কোনো রাষ্ট্রে প্রকৃতই সংসদসিদ্ধ, বা রাষ্ট্রপ্রধানসিদ্ধ আইনও হয়েছে (আইন, বিধি, অধ্যাদেশ, কানুন, হুকুম, পরিপত্র, জনস্বার্থে–ঘোষণা এগুলোর পৃথক সব শক্ত আইনগত/লিগ্যাল সংজ্ঞা আছে; আমার মুখস্ত নয় সেসব; এই আলাপে জরুরিও লাগছে না)। তো সেসব আইন পড়ে যদি আমরা বলতে থাকি যে এই করোনা–আইন এমনকি বৈধ জুটিসমূহের মধ্যকার চুম্বনচর্চার জন্য জায়গা রাখেনি, তাহলে আমাদের সেই দাবি চূড়ান্ত বিচারে মিথ্যা হয়তো নয়, কিন্তু অস্থানে প্রোথিত হতে বাধ্য। করোনা–বিধিগুলোর গুণগত মানই এমন যে দ্বৈত–কোয়ারেন্টাইনে থাকা ছাড়া এমনকি ঈশ্বরকে সাক্ষী–মানা জুটিগুলোও চুম্বন ও অন্যান্য চর্চা করতে পারেন না। কিন্তু আমার আন্দাজ যে ঠিক সেই আশঙ্কার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে গত বছর সারা দুনিয়ার মানুষ চুম্বনরহিত ছিলেন না। আদালত পরিচালকবর্গের মাথায়, রাষ্ট্র পরিচালকবর্গের মাথায়, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকবর্গের মাথায় যৌনশাসন ও যৌনশুচিতার নানান কিছু কিলবিল করছিল কিনা সেটা আরেক জিজ্ঞাসা। যৌন নিপীড়ন বিরোধী বিধিমালা বুঝবার সময় সেই মনোভাব আমি রাজনৈতিক কারণেই না–ভাবতে চাইব। চাইব ঠিক প্রসঙ্গটার বাঁক ঘুরিয়ে। তখন শুচিতার পরাকাষ্ঠার জন্য কেবল আইন–আদালতের দিকেই আঙুল তুলতে চাইব না।

    বরং, আমরা কিছু ‘বৈজ্ঞানিক’ শাস্ত্রের দিকে তাকাই। এমনকি তেমন কখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল না এমন রাষ্ট্র–সমাজের দিকেও তাকাতে পারি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সমরতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে কথা তুললেই মেলা কথা খরচ করা লাগে। কিন্তু আমার ভরসা আছে যে এর সঙ্গে আইন ও বিচারশাস্ত্র, মনোবিদ্যা, মনোচিকিৎসা, অপরাধবিদ্যা ইত্যাদির সম্পর্ক বুঝতে অত সমস্যা লোকজনের হবে না। তো, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত কিতাবগুলোতেই বা ‘যৌনতার নানা ফর্ম’ নিয়ে কী এমন সুবিধাজনক আলাপ পাওয়া যায়? বাংলাদেশের পাঠ্যসূচি হয়তো আপনাকে একটু বেশি চমকে দিতে পারে, হয়তো; কিন্তু ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ্যসূচিও ‘স্বাস্থ্যকর যৌনতার’ যেসব ধারণা বা ব্যাখ্যা হাজির করে তাও রীতিমত ঐশী পর্যায়ের। মনুষ্য নানাবিধ কল্পনা, অধিকল্পনার জায়গা অতিশয় সীমিত। এর উপরে ভিত্তি করেই সেক্সোলজি, সাইক্রিয়াট্রি, সাইকোলজি কাজ করে চলেছে। এমন এমন লোককে ‘চিকিৎসাযোগ্য’ বলে সাব্যস্ত করছেন যাঁরা বড়জোর ‘মিচ্যুয়েল’ কিছু যৌনচর্চা করছেন যা ওইসব চিকিৎসাবিজ্ঞানীর কল্পনাতীত। অথবা তাঁরা কাগজে–কলমে দাবি করেন তা ‘অস্বাভাবিক’। পর্ন কারখানার মাত্রাতিরিক্ত উত্থান সমস্যাটিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। এখানে অনেকগুলো শাস্ত্রের প্রহরীরা ‘স্বাভাবিক’–এর দুনিয়াকে আরো খর্ব করে বিরাট প্রশস্ত ‘অস্বাভাবিক’–এর উপর পর্ন–কারখানার একচ্ছত্র শাসন কায়েম করতে মদদ দিচ্ছেন। সজ্ঞানে তা তাঁরা করছেন কিনা তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এটা ঘটছে। যৌনতার সার্বভৌম গণতান্ত্রিক কল্পনাময় চর্চার ক্ষেত্রে এটা বিরাট এক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপর্যয়। এখানে আদালত একটা অত্যন্ত ছোট অনুষঙ্গ মাত্র।

    ৯. হাইকোর্টের নীতিমালাটিতে বলা হয়েছে তা কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। একটি কর্পোরেট বা কর্পোরেট সংস্কৃতির চর্চাকারী প্রতিষ্ঠানে যৌনতা সংক্রান্ত যে যে নিষেধাজ্ঞা গড়ে ওঠে তাকে যৌন নিপীড়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পুঁজি ও তার ত্রাসের সংস্কৃতি খোদ যৌনতার বিশেষ বিশেষ ধরনকে অপছন্দ ও অপরাধীকরণ করে কেন?

    মানস: এই প্রশ্নটি আমার জন্য অস্পষ্ট। আমি তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করি। কিন্তু আমি দুই তিনটা অংশে ভেঙে উত্তর করি। তাতে আপনার প্রশ্নের আদিগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে অবশ্য। প্রথমেই আমি স্পষ্ট করি যে, হাইকোর্টের নীতিমালাটি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই যারপরই নাই ঢিলেমি দেখিয়েছে এটার প্রতিক্রিয়া হিসাবে একটা কাঠামো দাঁড় করাতে। ঠিক এই মুহূর্তে যে বাক্যটি লিখলাম তাতেই ঝইঝগড়া বাধতে পারে, প্রমাণ হাজির করানোর চাপও কেউ দিতে পারেন। কিন্তু বিষয়টা কেবল খাতাকলমে কী কী করা হয়েছে তার নয়, বরং কী কী গররাজিময় আচরণ আপনি নথিভুক্ত না করতে পারলেও উপলব্ধি করতে পেরেছেন তার প্রশ্ন। সাধারণ বোধবুদ্ধি থেকে ভাবলে, অন্তত ১৯৯৮–এর আন্দোলন এবং একাধিক ক্যাম্পাসে গুণ্ডাবাহিনী ও (পুরুষ) শিক্ষকদের একাংশের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনগুলোর কারণেও, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে হাইকোর্টের নীতিমালা আসার সঙ্গে সঙ্গে চটজলদি তার ‘প্রয়োগ’ ঘটবার কথা। কিন্তু বাস্তবে এভাবে ঘটেনি বিষয়গুলো। একাধিক ক্যাম্পাসেই প্রশাসন এই সেলটি গঠনের সময় গভীর অনুধ্যান দিয়েছেন যাতে ক্যাম্পাসে নারীবাদী বলে পরিচিত কোনো শিক্ষক–শিক্ষিকা এই সেলের দায়িত্ব না পান। কিংবা, অত্যন্ত নৈতিকতার ঘ্যানঘ্যানানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচালন করেন এমন শিক্ষক–শিক্ষিকারা এই পদে ন্যস্ত হন। উপরন্তু, ওইসব সেলে যেসব নারীরা তাঁদের অভিযোগ নিয়ে গেছেন তাঁদের অনেকেরই বিশদ সব হেনস্তা হবার গল্প ক্যাম্পাসগুলোতে কান পাতলেই শুনতে পাবেন। একটা নয়া নীতিমালার সুযোগ নিয়ে দুচারজন পাল্টা চালিয়াতি/ম্যানিপুলেটিভ আচরণ করার উদ্যোগ নেননি এরকম কোনো দাবি প্রতিষ্ঠা আমার লক্ষ্য নয়। কিন্তু সাধারণভাবেই সেলগুলো অনেকাংশে অভিযোগকারিণীর দুঃস্বপ্নের জায়গা হয়ে পড়েছিল।

    শিল্পি: হিথার বুচলার

    ক্যাম্পাসের বাইরে কর্মক্ষেত্রগুলোতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী এই সেলগুলোর কাগুজে অস্তিত্বের বাইরে আর কোনো কিছুর প্রমাণ করা মুস্কিল হবে। এ কথা বলার সময় আমি সতর্ক আছি যে কর্মক্ষেত্রের মতো একটা ঢিলেঢালা বর্গের মধ্যে সকল ধরনের অবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান আমি রাখতে চাইব না। কিছু উন্নয়ন সংস্থাতে কার্যকরী সেল চালু ছিল। আবার যৌন হয়রানির অভিযোগ আসার পর খোদ সংস্থাটিই ‘পরিচালক’ বর্গ ভেঙে দিয়ে আন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করলেন এরকম নজিরও আছে (যদিও গণ সাহায্য সংস্থার এই উদাহরণটা হাইকোর্ট নীতিমালা প্রণীত হবার আগে)। পত্রিকা–টেলিভিশন কোম্পানিগুলোতে বিশেষ সুবিধাজনক কর্মদশা ছিল এরকম নজির আমার নজরে আসেনি। আপনার বা অরাজের মাধ্যমে জানতে পারলে খুশি হব। তবে আমার চোখে আপনার পরের একটা প্রশ্নে মী–টু বিষয়ক আলাপ চোখে পড়ল। ঢাকার অতিসংক্ষিপ্ত কালের সাইবার–মীটু আন্দোলনই প্রমাণ করে খুব কার্যকরী সেল বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ছিল না। কিন্তু আপনার প্রশ্নের যৌন নিষেধাজ্ঞা ও যৌন নিপীড়নের সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে দুয়েকটা কথা বলার আগে ‘কর্পোরেট’ সংজ্ঞায়ন নিয়ে আমার অস্বস্তি জানিয়ে নিতে চাই। আমি আসলে এই মুহূর্তের বাংলাদেশে এই বর্গটার অনায়াস প্রয়োগের আর সুযোগ দেখি না। বাণিজ্য ও শিল্প আইনগত দিক থেকে হাজারে–বিজারে কর্পোরেট। যাকিছু কয় বছর আগেই লিমিটেড কোম্পানি, তাকিছুই কর্পোরেট সংজ্ঞাযোগ্য। আবার যখন (বাম) রাজনৈতিক কর্মীরা এটা উচ্চারণ করেন তখন অন্তত দুইটা, প্রায়শই অমিশ্রিত অর্থে প্রয়োগকৃত হয় বলে আমি অনুভব করি। একটা হয় সরাসরি পুঁজিবাদী বিশেষণটির বিকল্প হিসাবে; আরেকটা হয় কল্পিত একটা বিলাতি/বিদেশী সংস্কৃতির ধারক হিসাবে। শেষোক্ত অর্থে আবার অফিসের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য, কর্মচারিদের উর্দি বা পোশাকও উঁকি মেরে বিরাজ করে। যতক্ষণ না আমি নিশ্চিত হই যে একটা সাংস্কৃতিক–মর‍্যাল জমিনের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে থেকে এই প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে ততক্ষণ এর সঙ্গে সম্পৃক্তি করা অসম্ভব লাগে। অন্তত চাকুরিচুক্তির অনিশ্চয়তা, বৃহৎ মুনাফা, সদাছাঁটাইয়ের সন্ত্রস্ততা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন, বহুরাষ্ট্রীক ‘ব্র্যান্ড’ ভ্যালু এগুলোর কিছু কিছু অনুধাবনে না দেখি ততক্ষণ মুলতবি রাখার পক্ষে।

    যৌন নিষেধাজ্ঞা আর যৌন নিপীড়নের সংযোগস্থাপন করে ভাল করলেন; আপনার আগের প্রশ্নের সঙ্গে বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি আবারো বলব, বিধানপ্রণেতার মাথার মধ্যে কী আছে তা নিয়ে টানাটানি না–করে লিপিবদ্ধ বিধানের কার্যকরী প্রয়োগ লিঙ্গ রাজনীতির জন্য আরো আশু জরুরি। কিন্তু পুঁজি (ও তার ত্রাসের সংস্কৃতি?!) কিছু কিছু যৌনাচরণকে অপছন্দ করে বা অপরাধীকরণ করে এ বিষয়ে আমি একমত হতে চাইব না। আমার ধারণা সঙ্কটটি কর্তার, সাবজেক্টের। ধরুন, আমাদের কল্পিত কর্মক্ষেত্রটির প্রধান একজন পুরুষ; বা প্রধানসমূহ পুরুষেরা। তিনি বা তাঁরা এক বা একাধিক বিশাল অফিসে বসেন। এর বাইরেও নানাবিধ ‘স্পেস’ রয়েছে তাঁর/তাঁদের দখলে। (এই কল্পনাগুলো করতে গেলে কিছু ছায়াছবি আসবেই মাথায়; কিন্তু সেগুলোতে কোলবালিশ আর জরিটরি ঝুলিয়ে এমন পাকিজা–ধরনের ইন্টেরিয়র বানায় যে সিরিয়াসলি নেয়া মুস্কিল; কিন্তু এরকম ‘শিল্পপতি’ ‘ভিলেইন’ সিনেমাতে সুলভ)। সেই দখলকৃত পরিসরে নানান ধরনের পদকনিষ্ঠ নারীদের তিনি আসতে ‘বাধ্য’ করছেন। এইরকম একটা ব্যবস্থাতে সংস্থার প্রধান পুরুষের/পুরুষমণ্ডলীর কোনো ধরনের যৌনাচরণকে পুঁজি বা (তার ত্রাস) কোনোরকম অপছন্দ করে এসেছে বলে আমি মনে করি না। বরং, এই ব্যবস্থায় আপত্তিকারদেরই ওই সংস্থার পুঁজির–পোঁটলা পরের মাসগুলোতে বেতন না দিতে চাইতে পারে।

    আমি বিনীতভাবে মনে করি, এখানে আপনার প্রশ্নটি আসলে অন্যত্র দিকনির্দেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এত সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে আমরা রয়েছি যে আমি দিকনির্দেশনা উদ্ঘাটন করতে চাইনি এই প্রশ্নে। বেঁচে থাকলে, নিশ্চয়ই আবার প্রশ্নগুলো সাজাতে পারব আমরা।

    ১০. যৌন নিপীড়নের সাক্ষ্য প্রমাণ হাজিরে অভিযোগকারীর জন্য কতকগুলো এফারমেটিভ একশনের বেনিফিটের প্রশ্ন আলোচিত হয়। এই বিশেষাধিকারকে প্রযোজ্য করা হলে যৌন নিপীড়নের শনাক্তকরণ কতটা নির্মোহ থাকতে পারে?

    মানস: আশা করি এটা বলা কোনো দপ্তরের অবমাননা হবে না যে, লাগাতার ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে কোনো নিপীড়ন শনাক্তকেই নির্মোহ হিসাবে দেখতে পাওয়া মুস্কিল। তাছাড়া আদালতের, কিংবা বিচারিক কার্যক্রমের নির্মোহতাকে আমি মিথ বা প্রপাগান্ডা হিসাবে মানি। তা নাহলে রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার একাধিক বিচারককে সরানো–বসানোর মতো ঘটনাগুলো বোধগম্য হবে না। বাংলাদেশের নিকট অতীতের কোনো উদাহরণ না দেয়াই মঙ্গলময় মনে হলো। তবে শহিদুল আলমের মুক্তিকালে আদালতে ওঁর ‘গুম’ না–হবার বাস্তবতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকের সরস মন্তব্যটি বাংলাদেশের পাঠকেরা লক্ষ্য করেছেন। নিপীড়নকে নির্মোহ যদি শনাক্ত করা যায়ই ধরে নিই, তাহলে তা জনসমাজে চর্চিত ‘ইনসাফ’–এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে পাই আমি। আর এক্ষেত্রে কোন ইনসাফ–কার ইনসাফ–কে ঠিক করবে ধরনের বিনির্মাণকারী কলাকৌশলকে কূটকৌশলের সন্দেহেও দেখতে চাইব। কিন্তু আইনী প্রক্রিয়ার নির্মোহতা নিয়ে অনেক উৎসাহ নাই আমার। আমি গণতন্ত্রকে যেমন দশার অধিক, পদ্ধতিগত আকাঙ্ক্ষার চর্চা হিসাবে দেখতে চাই, তেমনি বিপ্লবকেও তাই চাই; আবার আদালতের কাছে নির্মোহ–নিপীড়ন–শনাক্তকরণের বেলাতেও এটাকে স্থিরদশা হিসাবে দেখতে চাই না।

    কিন্তু এফারমেটিভ একশন বেনেফিট খোদ একটা গোলমেলে প্রসঙ্গ। যৌনতার ক্ষেত্রে সেটা মহাগোলমেলে, এর নৈতিকতাশ্রয়ী বা মূল্যবোধাশ্রয়ী সমাজ–বিচারিক দশার কারণেই। প্রথমেই আমি পদ্ধতিগত গোলমালটার দিকে নজর দিতে সুপারিশ করব। এফারমেটিভ একশন নিরঙ্কুশভাবে বর্গকে অনুধাবন করে বিকশিত ধারণা। কোর্টকাচারি, পক্ষান্তরে সামলায় ব্যক্তির মামলা। ওদিকে বর্গকে অনুধাবন করে যে গঁৎবাঁধা ধারণাগুলো বা স্টিরিওটাইপগুলো চালু আছে সেগুলোও সক্রিয় থাকে; বিচারকের মাথায় যদি নাও থাকে, আইনজীবীর মাথায় থাকতে পারে, মিডিয়ার মাথায় থাকতে পারে, একটা রায়ের বেনেফিশিয়ারি ও প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রবাসীদের মাথায় থাকতে পারে যেগুলো সব সক্রিয় অবস্থাতেই মোকদ্দমাটি চলতে থাকে। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠীর ‘কোটা’ সুবিধা নিয়ে নিশ্চয়ই কয়েকবার শুনে থেকেছেন যে ‘হ্যাগো এখন আর কোটা দেয়া ঠিক না; হ্যাগো পোলাপাইন তো আইজকাল বিদেশ থাকে’। এই স্টিরিওটাইপটা যতটা একটা নির্দিষ্ট জাতিকে কোটাবঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হয় ততটাই হয়ে থাকে খোদ এই সামান্য কয়টা আসনের (এফারমেটিভ একশন হিসাবে) দাবিদার হিসাবে অনেকগুলো জাতিকেই উৎখাত করার ইচ্ছায়। বাসে নারীদের সংরক্ষিত আসনের বেলাতে এই অভিজ্ঞতা বোধহয় আপনার আরো নিকট অতীতেই হয়ে থাকছে। ফলে এফারমেটিভ একশন চালু থাকে খোদ একটা বিশাল গণ–প্রতিপক্ষতার মধ্য দিয়ে, প্রায়শই।

    অন্য কিছু উদাহরণ দেখাতে চাইব যেখানে বর্গকেন্দ্রিক স্টিরিওটাইপ অতিশয় ক্রিয়াশীল। কোনো মন্ত্রীকে যখন ‘সৎ মন্ত্রী’ হিসাবে পরিচিত করানো হয়ে থাকে, কোনো শিক্ষককে যখন ‘শিক্ষার্থী বান্ধব’ শিক্ষক হিসাবে পরিচিত করানো হয়ে থাকে, তখন ঐ মন্ত্রী বা শিক্ষককে যতটা ‘প্রশংসা’ করা হলো, তার থেকে অনেক স্পষ্ট করে মন্ত্রী বা শিক্ষকবর্গ নিয়ে সামাজিক–ধারণা প্রকাশিত হলো। শ্রোতারা প্রায়শই চিন্তার আলসেমিতে সেটা লক্ষ্য না করে প্রশংসাটা নিয়ে মাতামাতি করেন। ব্যক্তি প্রশংসাগ্রহীতার এই ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো দোষ যদি নাও ধরি, তৃতীয় পক্ষ হিসাবে আমরা অন্যরা গুরুতর সব ক্ষয়ক্ষতির পরোক্ষ কারক থাকছি। উদাহরণটা যদি প্রাসঙ্গিক না মনে হয়ে থাকে, আমি এভাবে আগাতে চাই যে, যৌন হয়রানিমূলক কোনো অভিযোগ উত্থাপনকারীর সচ্চরিত্রতা বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়ে থাকে। সংবাদকর্মী থেকে শিক্ষাকর্মচারী, সাধারণ আলাপকারীরা ‘সমতাবিধানকারী কর্মকাণ্ড’ (এফারমেটিভ একশন) জারি রাখার লক্ষ্যে আক্রান্ত নারী যে ‘কত ভাল’, ‘নিরীহ’, ‘সঠিক পোশাকধারী’, ‘নম্র’ ইত্যাদি আলাপমালায় ঢুকতে থাকেন (বা বিপরীত উদ্দেশ্যে বিপরীত চিত্রণ)। আমি বলবার সাথে–সাথেই এই ধরনের ঘটনাগুলো আপনার মনে পড়ার কথা। তাহলে নির্মোহতা তো দূরের কথা, বিদ্যমান আইনী ব্যবস্থার গ্রাহক হবার জন্যও যৌনাক্রান্ত নারীর অন্য অনেকগুলো সামাজিক সনদপত্রের ছাতার তলে আসতে হয়। ওই নির্দিষ্ট নারী তা চান কিনা তার প্রসঙ্গও থাকে না। নির্মোহতা বিষয়ক আলাপটাই তাই মুলতবি রাখলাম গোড়াতে।

    বরং, যদি প্রশ্ন করার কালে আপনার মাথায় কোথাও অভিযোগকারীর বদনিয়ত বিষয়ক দুর্ভাবনা থেকে থাকে, তাহলে বুঝতে আরো সহজ হয়। সেটা বাস্তবে যে কোনো ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। নিজের মাথা ফাটিয়ে আদালতে গিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু করার উদাহরণ দুয়েকটা মাত্র নয়। এই ধরনের পরিস্থিতি যদি বিবেচনায় থেকে থাকে, তাহলে তা যৌন হয়রানিমূলক পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট করে দেখতে চেষ্টা করা লিঙ্গীয় রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।

    ভিক্টমের বয়ান: ডিজিটাল প্লাটফরম ও নর্মেটিভ
    ১১. সাম্প্রতিক সময়ে ‘মি–টু’ বেশ আলোচিত। অনেকেই মনে করেন মি–টুর মাধ্যমে ভিক্টিম/সার্ভাইভারের স্বর হাজির হয়। কিন্তু ডিজিটাল প্লাটফরমে এই স্বর উপস্থিত হওয়া মাত্রই আমরা পক্ষ–বিপক্ষ দলবদ্ধতা হাজির হতে দেখি। এতে করে কি পক্ষ, কি বিপক্ষ মিলে যে ডিসকোর্স দাঁড় হয় তাতে অভিযোগকারীর স্বরটি তার পরিপ্রেক্ষিত সমেত আর স্বতন্ত্র থাকতে পারে কি? ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ এই স্বরকে কি কোনভাবে ছাঁচীকরণ করে?

    মানস: ডিজিটাল তৎপরতা ও তার ভাষামালা এর বাইরের বস্তুজগতের মতোই একটা অসংবদ্ধ–কোলাহলে পরিণত হয়। যে হারে একাডেমিতে উৎপাদন হচ্ছে তাতে হয়তো যাকে আমি অসংবদ্ধ–কোলাহল বললাম তারও একটা পদমালা দাঁড়িয়ে আছে; তবে আমার জানা নেই। যদিও আমি ডিজিটাল জগত ও বাইরের কোলাহলকে এক কাতারে রাখলাম, বাস্তবে এর গুণাগুণ বা প্রভাব কিছুতেই এক নয়। যে কোনো বিষয়েই অসীম মতামত তৈরি হতে থাকা, সেগুলোর একটা প্রণালীবদ্ধতা, যতই খাপছাড়া ও সাংঘর্ষিক হোক না কেন, তার জন্য ভাষাসংযোগের সুযোগসুবিধাগুলো বস্তুজগতে গুরুত্বপূর্ণ হারে কম থাকে। এটা পরিপূর্ণভাবে, আমার বিবেচনায়, পাটাতন/প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গ, ডিভাইস/যন্ত্রপাতির প্রসঙ্গ। কেবল কথা বলে বলে একটা হৈচৈ বাধানো সহজ কাজ নয়। আরো নির্দিষ্টে উদাহরণ দিলে, গণপিটুনির ঠিক পূর্বকালটাতে, কিংবা দুই দল (তরুণ) পেটোয়াদের মধ্যকার একটা হাতাহাতি বেধে যাবার আগের সময়কালটাতে ভাষা যেভাবে বহুবিধ, নানা–উৎসে, আর শ্রোতাহীনতায় উৎক্ষেপ হতে থাকে সেটা কিছুতেই দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রসঙ্গ নয়। তারপর পেটাই শুরু হয়ে গেলে হয়তো ভাষামালার আপৎকালীন, বা পেটাইকালীন, বিরতি চলে; অল্প কিছু সহগ খিস্তিখেউড় ছাড়া। পক্ষান্তরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই কালটা, যদি এর নাম দিই তাতানো–কাল, একটা স্বাভাবিক দশা। অন্যভাবে বললে, বস্তুজগতে যেটা কিনা একটা বিশেষ সংঘটন, তা ডিজিটাল রাজ্যে দৈনন্দিন। এখানে লোকে লাগাতার ভাষা উৎপাদন করতে পারেন, করতে থাকেন, দিশা–বেদিশা নিরপেক্ষভাবে সেগুলো প্রযুক্ত হতে থাকে; উপরন্তু বস্তুজগতের আর্কাইভহীনতার বাড়তি নিরবতাটা এখানে নেই। এখানে ১৪ ঘণ্টা ঘুম থেকে উঠে আপনি কম্পুটার খুলে ১২ ঘণ্টা আগে মোটামুটি স্থিত মুডে আবার তাতিয়ে দিতে পারেন। সাইবাররাজ্যের এই বিশেষ ভাষাবৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় রাখাটা আমার জন্য জরুরি ছিল এই প্রসঙ্গে।

    ‘মি–টু’র ক্ষেত্রে যা–যা ঘটেছে তাও এই পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই ঘটেছে। হ্যাঁ, হৈচৈয়ের মধ্যে অভিযোগকারীর স্বরটি তার পরিপ্রেক্ষিতসমেত আর স্বতন্ত্র থাকতে পারে না। কিন্তু ‘মি–টু’ প্রসঙ্গে আমি অন্য কিছু প্রসঙ্গের সূত্রপাত করতে চাই যা, আমার আশঙ্কা, আপনার প্রশ্নের পরিসরের বাইরে মনে হতে পারে। কিন্তু আমার জিজ্ঞাসার পরিক্ষেত্রেরই মধ্যে। আমি প্রশ্নের পরিসরের মধ্যে আনতে বরং চেষ্টা করতে পারি। চলুন, আমরা এই জিজ্ঞাসাটির মীমাংসা করি যে বাংলাদেশে ‘মি–টু’ ‘সফল’ হলো না কেন, যদি ধরে নিই যে পাশ্চাত্যের যেসব দেশে, মুখ্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যা হয়েছে তাকে সাফল্য বলা চলে। যদি শর্তসাপেক্ষে পাশ্চাত্যে এর সফলতা আর বাংলাদেশে বিফলতা গ্রাহ্য করে আমরা আলাপটা করি, তাহলে এখানকার বিফলতার কারণ অন্যত্র বলে আমি মনে করি। যেভাবে আপনি প্রশ্নের মধ্যে পক্ষ–বিপক্ষের দলবদ্ধতা রেখেছেন, কিংবা যেভাবে আমি অসংবদ্ধ–কোলাহলকে উত্তরে রেখেছি সেগুলো এই ব্যর্থতার কারণ নয়। বরং, সাইবার ও ভৌত দুনিয়ার হৈচৈ বা দলবদ্ধতা বিভিন্ন রাষ্ট্রে নানান ধরনের আইনি মোকদ্দমাতে সহায়তাও করেছে। নিকটবর্তী দুটো উদাহরণ ভারতেই আছে – যথাক্রমে নির্ভয়া ধর্ষণ ও সুশান্ত’র কথিত আত্মহত্যা বা খুন নিয়ে। বাংলাদেশে কমবেশি পাঁচটি ‘মি–টু’ কেইস/ঘটনার উল্লেখ পাওয়া গেছিল। এর মধ্যে অন্তত তিনজনকে আমি কমবেশি চিনতাম। আর জনা দুয়েকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল এই অভিযোগ উত্থাপনের প্রাক্কালে বা পরপরই। বাস্তবে, এমনকি তিনি না করুন ‘মি–টু’ তা মনে মনে চাইছিলামও একটি ক্ষেত্রে। তাঁকে বিশদ পরে বলেওছি।

    বাংলাদেশে এটির ব্যর্থতা মুখ্যত আইনি (লেজিসলেটিভ অর্থে) ও নৈতিকতা (মর‍্যালিটি অর্থে) রাজ্যের মধ্যে প্রজাদের নির্বিচার আউলে যাবার দশার কারণে। এটা সংক্ষেপে বললাম, বিশদ করতে পারি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষত ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত – তাঁরা বাম হোন, জাতীয়তাবাদী হোন, রাষ্ট্রবাদী হোন বা ‘র‍্যাডিক্যাল‘ হোন – সমালোচনাকে বহুকাল ধরেই দ্রুত নিন্দাতে পর্যবসন করতে অভ্যস্ত, আর নিন্দা মোটের উপর আদর্শবাদী এবং/বা মর‍্যাল। এখন, ‘আদর্শবাদ’ বলতে গিয়েও এত উৎকণ্ঠা হচ্ছে যে মনে না পড়ে থাকছে না এখানকার বহু বামচিন্তক দশকের পর দশক আবেগ ভারাক্রান্ত গলায় ও রচনায় ‘আদর্শবাদ’ বলতে বিপ্লবীর ঈমান বুঝিয়েছেন। ফলে আগামীকাল এই সাক্ষাৎকার পড়েই ‘আদর্শচ্যুত প্রতিবিপ্লবী’ ফরমান জারি করে বসতে পারেন তাঁরা আমার বিরুদ্ধে। আমি আদর্শবাদ বলতে আইডিয়ালিস্ট এবং/বা মর‍্যালিস্ট এবং/বা নরমেটিভই বোঝাচ্ছি। আমার তাই বোঝানোর কথা। ধরুন, কালকে আপনার সমালোচনা করতে গিয়ে আমি নিন্দা করলাম এই বলে যে আরিফ তো ব্যবসা পাতায়া বসছে। তার থেকে শ্রোতা হিসাবে কেউ যদি ভাববার চেষ্টা করেন যে আমি বলতে চাইছি আরিফ একটি মুনাফামূলক প্রকল্পের সূচনা করেছেন তাহলে তাঁর বোঝাবুঝির কপাল পুড়ল। তাঁর বুঝতে হবে যে আমি আসলে এই বলে নিন্দা করলাম যে আরিফের যখন কবিতা–গান–শিল্প–নন্দন–চলচ্চিত্র ও ইত্যাদি ভুজুংভাজুং করার কথা তখন ব্যবসার মতো একটা ‘নিন্দনীয়’ পেশাজগতে তিনি পা রেখেছেন। এই দুয়ের পার্থক্য অসীম, আমার বিবেচনায়। সেটা আরো বিশাল যৌনতার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে। সেখানে ‘মি–টু’ হাজির হয়েছে এমন একটা পাটাতনে যেখানে নেটিজেন পক্ষ বা জ্ঞাতপক্ষের দুনিয়ায় বিষয়টা দাঁড়িয়েছে ‘তোমার ইয়া আমরা জাইনা ফেলছি’।

    শেমিংয়ের এই পাটাতন পাশ্চাত্যেও কার্যকর (ছিল)। কিন্তু লেজিসলেশনের প্রসঙ্গটা এখানে আনছি একারণে যে, যত কম মাত্রাতেই হোক, প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের জন্য এই অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট অপরাধী ব্যক্তিদেরকে শাস্তিপ্রদানের ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। বাংলাদেশে এটা প্রথম অভিযোগের আগেই প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছিল যে তা হতে যাচ্ছে না। অর্থাৎ ‘মি–টু’ অভিযোগ দায়েরের কারণে কোনো পুরুষ অপরাধী কর্মজগতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেসারত দিতে যাচ্ছেন না। ফলে এখানকার অভিযোগকারীরা আইনি সুরক্ষাবলয়বিহীনভাবে কেবল শরমপ্রদানের অস্ত্রপ্রয়োগের চাপে থেকেছেন। পক্ষান্তরে, ‘মি–টু’র সুযোগে নারীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে কিছুমাত্র ভাবিত নন এমন লোকজনও পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘হ জানি জানি’ ধরনের শোরগোল করতে থাকলেন। পাঁচজনের পরে যে আর কোনো নারী অভিযোগ করতে আগালেন না সেটারও একটা মানে এই যে তাঁরা বিশাল ক্ষমতাধর পিতৃতান্ত্রিক বাংলাদেশের অফিস–সংস্কৃতির মধ্যে নিছক শরমপ্রদানের রাজনীতি আর করতে চাননি।

    ১২. একজনের যৌনতার নরমেটিভিটি দিয়ে ডিজিটাল প্লাটফরমে আরেকজননের যৌনতার ধরন ও চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং অতঃপর নিপীড়ক হিসেবে রায় দেয়ার প্রবণতা আমরা দেখি। বিশেষত একগামি/বহুগামি বা ‘পরকীয়া’র মত সম্পর্ক’র ক্ষেত্রে…। মি–টু এই সংকটকে কিভাবে মোকাবেলা করে?

    মানস: একদম পারে না। ‘মি–টু’ এই সঙ্কট মোকাবিলা করতে পারে না। এমনকি যৌনতার প্রবল ভাবনার কোনোকিছুই মোকাবিলা করতে ‘মি–টু’ পারে না। এই অপারগতাতে ‘মি–টু’ আন্দোলনকেই বরং ছাড় দিয়ে দেখতে চাইব আমি। আর কোনো কারণ না থাকলেও, যে আন্দোলন মাত্র ৫জন (নারী) কণ্ঠস্বরকে আত্মপ্রকাশ করতে দিয়েছে (সঠিক সংখ্যা ভুল হতে পারে আমার) সেই আন্দোলনের উপর, অন্তত বাংলাদেশে, এতবড় দুর্ভার চাপ দেবার কোনো কারণ নেই। বরং, সাধারণভাবেই, এমনকি বাংলাদেশের বিপ্লবী এবং/বা র‍্যাডিক্যাল কিংবা অন্তত শিথিল বাম সংগঠনগুলো, প্রকাশ্যে না হলেও সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরে, যৌনতার প্রশ্নে কোনোরকম স্বচ্ছ ও কার্যকরী ধারণায়ন হাজির করতে যে পারেনি সেই বাস্তবতার উপর জোর দিতে চাইব আমি। যৌনতার প্রশ্নে এসব সংগঠন এমনকি সোয়া শ’ বছর আগের এঙ্গেলসের স্ফটিকস্বচ্ছ অবস্থানের প্রতিও কোনোরকম সুবিচার করেনি। যৌনতার প্রশ্নে স্বশ্রেণীর চিহ্নিত ‘রক্ষণশীল’দের সাথে এক কাতারে থেকেছেন এঁরা। কমবেশি রাখঢাক ও ‘চালায়া নেয়া’ পলিসির বাইরে দৃশ্যমান/ট্যানজিবল যে কর্মকাণ্ড করতে এসব সংগঠনকে দেখা গেছে তা হলো মৃদু–বিয়ার ঘটকালি, কিংবা বিয়ার মৃদু–ঘটকালি – অবশ্যই দু’জন সম্ভাব্য কমরেডের মধ্যে।

    এত স্পষ্ট যে আমার মনে পড়ছে তার একটা সাহিত্যপাঠ–আত্মজৈবনিক দিক আছে। আমি কথাসাহিত্য বিষয়ে আপনার দূরত্ববোধ জানা সত্ত্বেও সবিনয়ে দুয়েকটা জিনিস অবতারণা করছি। দাম্পত্যদর্শনের আরামদায়ক মধ্যবিত্তীয় ফয়সালার বাইরে রবীন্দ্রনাথ গেছিলেন ঘরে–বাইরে ও চারুলতার মাধ্যমে; শরৎচন্দ্র গেছিলেন গৃহদাহ কিংবা চরিত্রহীন–এর মাধ্যমে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। বুদ্ধদেব বসু রাত ভ’রে বৃষ্টির মাধ্যমে। এর পরে সমরেশ বসু’র বিবর কিংবা প্রজাপতি’র মতো কাজ থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আরব গেরিলা..ইত্যাদি সময়কাল ও কুলমান (সাহিত্যমান নয়, যৌনতার ধরন) বিচারে স্বতন্ত্রই রাখছি। যতই না কেন এসব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আধুনিক বাংলা সাহিত্যনমুনা থাকুক, রাজনৈতিক চেতনার কারণে প্রথমত আপনি খুঁজতে থাকবেন স্থানীয় প্রবন্ধের জগত এবং স্থানীয় সেসব কথাসাহিত্যের জগত যেখানে প্রটাগনিস্ট বা নায়ক–নায়িকাপ্রমুখ নিজেরা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। আমার পড়ালেখা গুরুতরভাবে কম, অন্তত আমি পড়ুয়া বলে এত বছরে যাঁদের চিনি তাঁদের তুলনায়। তারপরও যখন খোঁজাখুঁজি করতাম, অত্র অঞ্চলের বৃহত্তর বাম বলয়ে যৌনতার প্রশ্নে পারলৌকিক নিস্তব্ধতার খোঁজ পেয়েছি। এমনকি অন্নদাশঙ্কর রায় যা ও যতটুকু প্রকাশ্য ও স্পষ্ট ছিলেন তা এই মহলের কাজে পাইনি। প্রবন্ধের বাইরে থাকে কথ্যজগত আর কথাসাহিত্য জগত। সেখানে কেবল নিস্তব্ধতা দিয়েও বোঝা যাবে না, বরং বুঝতে হবে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। সমরেশ বসু থেকে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন পর্যন্ত সবাই সম্ভবত বিবেচিত হতেন ‘অশ্লীল’ হিসাবে। আমার বিচার–বিশ্লেষণ ভুল হতে পারে, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, অন্যরা দেখালে খুশি হব এসব নিছক কথাসাহিত্য নিয়েই বা সংগঠনসমূহের অবস্থান কী ছিল। আশা করি আমি এটুকু নিশ্চিত করতে পারছি যে প্রশ্নটাকে নিয়ে বিপ্লবী সংগঠনের দিকে আসা আমার তরফে অন্তত এই কারণে ছিল যে অপেক্ষাকৃত বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তাঁরা নিতে পারবেন তা আমি ধরে নিয়েই থাকি। বৃহত্তর মধ্যবিত্ত সমাজ কিংবা রাষ্ট্রসমাজের প্রসঙ্গ তো তাহলে বলাই বাহুল্য।

    এর মধ্যে তাহলে এরকম জিজ্ঞাসু সাহিত্যকর্মের দিকে সপ্রশ্ন তাকানো খুবই সঙ্গত হবার কথা। যৌনতা বা সাধারণভাবে মিত্রকর্মীদের বিষমলিঙ্গীয় সম্পর্ক কী হবে এই প্রশ্নে দুটো উপন্যাসের বিশাল প্রভাব ছিল। আমি অন্তত তাই মনে করি। বিস্ময়ের না যে দুটোই কোনো না কোনো ভাবে একদা–বামের লিখিত, এবং তাঁদের স্বীয় স্বীয় বামকালে লিখিত। যথাক্রমে, গর্ভধারিণী এবং ওদের জানিয়ে দাও। পটভূমি, পাত্রপাত্রী ও গল্পপ্রবাহে দুটো উপন্যাসের বিস্ময়কর মিলের কারণে পাঠকের জন্য চমকপ্রদ দুটো কাজও বটে। তুলনায় আমার অনেক পছন্দের কাজ শাহরিয়ার কবিরের ওদের জানিয়ে দাও। সেটা কথাসূত্রেই বলা, কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। বরং যে প্রসঙ্গে বলা, সেটাও আপনার প্রশ্নের ওই নর্মেটিভিটির পুনঃ পুনঃ শক্তি আহরণের প্রেক্ষিতে। উপন্যাস দুটোতে নানাবিধ ফ্যান্টাসির সমাহার আছে, রাজনৈতিক স্বপ্নদর্শন আছে, সমাজ বদলের বাসনা আছে, সম্পর্ক রূপান্তরের ডাক আছে। তবে হেটারোসেক্সুয়াল–মনোগ্যামাস দাম্পত্যমুখী প্রচলিত সম্পর্কের কিছুমাত্র গুরুতর রদবদল নাই। এই নাইয়ের দায়দায়িত্ব দুজন উপন্যাসকারের মাত্র নয়, সেটা একটা বলার জায়গা আমার। ‘মি–টু’র পাঁচ বংশীবাদকদের তুলনায় অনেক ভারী ভারী জাতীয় (এবং পুরুষ) ‘ফিগার’ এনে সেটা বলার চেষ্টা করলাম। বরং, যদি আমার স্মৃতি প্রতারণা না করে থাকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আগামীকাল ও মহাপৃথিবী গল্পগ্রন্থ দুটোতে লক্ষ্যণীয় ধরনের ভিন্ন ছিলেন। তবে তিনিও কোলকাতায় সমাদৃত হননি, বামরাও অস্বস্তিতে ছিলেন। প্রমাণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব, কিন্তু আমি সুনিশ্চিত জানি। অবশ্যই সুনীল মহাতারকা হবার আগের অধ্যায় এটি।

    শিল্পী: রিথিকা মার্চেন্ট

    উত্তরের দৈর্ঘ্যে পাঠকের বিরক্তি ধরতে পারে কিন্তু এটুকু বলতে চাই যে যৌনতার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সীমানা এখন পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে প্রবল আদর্শমানওয়ালা/নর্মেটিভ বিষমলিঙ্গীয় একগামি যৌনতার বুর্জোয়া স্বাধীনতা অর্জনের ‘আন্দোলন’। এমনকি সেই আদর্শ সম্পর্কটির মধ্যেও দুই পক্ষ (যেহেতু ততোধিক পক্ষ যৌনতায় যুক্ত হবেন এটা ভাবার কারণে আবার আন্দোলন থেকে বের করে দিতে পারেন কেউ) অনেকের কল্পনার বাইরে কোনোরকম (যৌন) কর্মকাণ্ড যদি করে বসেন বা করে বসেছেন বলে জানা যায় কিংবা কখনো বসতে পারেন এমত আশঙ্কা হয় তাহলেও তাঁরা যৌনতার গ্রহণযোগ্য বুর্জোয়া আন্দোলনের মৈত্রী হারাবার ঝুঁকি রাখেন। এই প্রসঙ্গে আরো নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকলেই কেবল আমি আমার ভাবনা বিশদ করতে পারব।

    ১৩. অনেক সময়ই অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রাইভেসি চান। একটি পাবলিক স্টেটমেন্টের বিপক্ষে একটি প্রাইভেট স্টেটমেন্ট। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রদানের কাঠামো অনুপস্থিত। সেক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগহীনতা কি অধিকারের খর্ব হওয়া?

    মানস: বিরাট প্রসঙ্গ তুলেছেন – ‘আত্মপক্ষ সমর্থন’। সকল কিছুতে সাধারণ বুর্জোয়া অধিকারের সীমানাতেও, সীমানাতেই, এইটুকু না–থাকা আর অত্যাচারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই তা যে লিঙ্গের প্রতিই আচরিত হোক না কেন। এখানে আমার মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়লো জায়োনিস্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের কথা। সংখ্যায় অল্প হলেও বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের ফিলিস্তিন বিরোধী হিংস্রতাকে জায়েজ করার জন্য তামাম বিশ্বে কিছু মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইহুদীদের নিপীড়িত হবার অভিজ্ঞতাকে সামনে আনেন। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে এটা একটা দুরূহ ধরনের যুক্তিপ্রস্তাব যেখানে আপনার পক্ষে প্রথমেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন, প্রধানত জার্মানির, আরো বিশেষে হিটলারশাসিত পক্ষের কৃত, নির্যাতনকে নিয়ে মাথা না–ঘামিয়ে আলাপ আগানো যায় না। এমনকি মাথা ঘামানোই যথেষ্ট নয়, গোড়াতেই নিন্দা জানিয়ে কথা শুরু করতে হবে। এমনিতে আপনার বা আমার হিটলারের শাসনব্যবস্থা আর ইহুদীনিধন নিয়ে যে কঠোর অবস্থানই থাকুক না কেন, ওই আলাপে এর শর্তযুক্তি একটা অশান্তিই কেবল নয়, বরং মারাত্মক ফাঁদ। আমার কথা বললে, আমি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লাগাতার আক্রমণকে নিছক ধর্ম–পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা হিসাবে দেখারও চেষ্টা করি না, যেমনটা করি না ভারতে মণিপুরী বা কাশ্মীরী নিয়ন্ত্রণকে, মিজো বা নাগা নিয়ন্ত্রণকে, মুসলিম বা মাওবাদীদের নির্যাতনকে নিছক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক তৎপরতা হিসাবে বুঝতে। যাঁরা বুঝতে চান নিজ দায়িত্বে বুঝবেন, বোঝানোর চেষ্টা করে যে ক্ষতিটা করেন তা ভয়াবহ। অত্যন্ত ভিন্ন পরিসর হলেও এখানে মনে পড়ার কারণ আছে। অভিযুক্ত পুরুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রসঙ্গ এলেই মনে না পড়ার সুযোগ নেই যে নারীদের লাগাতার সিস্টেম্যাটিক শেমিংয়ের মধ্যে থাকতে হয় – বছরের পর বছর, দশকের পর দশক, প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে, ঘরে ও বাইরে; এবং কোনোরকম আত্মপক্ষের সুযোগ ছাড়াই।

    নারী তুলনামূলক কম পোশাক পরলে পুরুষচক্ষু মনোরঞ্জনের জন্য তা করছেন এবং যাবতীয় ‘ছেনালপনা’র অভিযোগে অভিযুক্ত, সকালবিকাল পাবলিকলি বিচারকৃত। অপেক্ষাকৃত বেশি পোশাক পরলে তিনি সেকেলে, রক্ষণশীল এবং ‘আধুনিক’ কর্মজগতে মানিয়ে নেবার মতো আত্মবিশ্বাসী নন! তিনি হাসিমুখে লাঞ্চবিরতিতে কথা বললে অবশ্যই আপনার আমার সঙ্গে শুতে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে আছেন – পুরুষেরা প্রায়শই সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। আর তিনি যদি গম্ভীরভাবে সময়টা কাটান তাহলে তিনি হয় অহেতু একটা ভাবভঙ্গির চেষ্টা করে যাচ্ছেন, ‘হীনম্মন্যতার’ কারণে কিংবা একটা প্র্যাংকমূলক অফিস সংস্কৃতিতে বড়ই বেমানান! তিনি ‘রূপসী’ বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকলে তাঁর বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে পুরুষদের রায় বৈশ্বিকভাবে কাছাকাছি। আর যদি তার উল্টোটা পুরুষদের দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর ঠাট্টাতামাশার শিকার হওয়া নৈমিত্তিক, ও আবারও বৈশ্বিক। হিংস্র পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ও পুরুষাধিপত্যমূলক ‘আধুনিক’ কর্মক্ষেত্রে আসলে এই তালিকাটা কুৎসিত রকমের বড়। আমার মনে পড়ে গেল একটা কবিতা পড়েছিলাম, অনাম্নী কোনো কবির, রেহনুমা আহমেদ পড়তে দিয়েছিলেন। সম্ভবত ১৯৯৭ সালের দিকে। পরে সেটার অনুবাদ আমি করেছিলাম এবং অশুচি’র ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রামাণ্য–বইটার গোড়ার দিকে সংযোজিত আছে। আমি সেটা আপনাদের পড়তে দেব – ‘যে যে কারণে আমরা নারীবাদী আন্দোলনের অংশ’ বা এরকম কাছাকাছি নাম। কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগবঞ্চিত নারীদের একাংশ যখন আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গে অভিযুক্ত পুরুষদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে খুব একটা ইচ্ছুক থাকেন না, তখন সেটাকে পাঠ করতে আমার সমস্যা হয় না। কিন্তু, আবারো, সেটা চর্চা হিসাবে অসম্ভব একটা প্রস্তাব।

    আপনার প্রশ্নের ভরকেন্দ্র বিবেচনা করলে, প্রাইভেট পরিসরের বিষয়টি কেন্দ্রীয়। যৌনতার ক্ষেত্রে পরিসরের দ্বিবিভাজন আরো গভীরভাবে গুরুত্ব দেবার দরকার বলে আমি বিবেচনা করি, এর ইতিহাসের মধ্যেই পরিসর গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে বলে। এটা বলার সময়ে আমার আবার সেসব সহকর্মীদের কথা মনে পড়ছে যাঁরা যৌন আক্রমণকে যৌনতার মুখ্য প্রসঙ্গে রাখতে চান না। গণতান্ত্রিক যৌনতাকে আকাঙ্ক্ষা করতে–থেকে আমি আবার নারীর জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত যৌনতাকে অযৌন–প্রসঙ্গ হিসাবে দেখতে ইচ্ছুক নই। একান্ত পরিসর বা প্রাইভেট স্পেসের প্রসঙ্গটা গণতন্ত্রী–স্বৈরতন্ত্রী সকল ধরনের যৌনসম্পর্কের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বরং প্রাইভেট আর পাবলিকের বিভাজনের মধ্যেই যৌন–রাজনীতির সবচেয়ে বড় উপাদানগুলোর একটা। এটা বুঝবার জন্য যে কোনো সাবেক প্রেমিকের পক্ষ থেকে নাখোশ অবস্থায় প্রেমিকার–সাথে–যৌনদৃশ্য সম্প্রচারের দিকে লক্ষ্য করা যায়। ফলে দায়স্বীকারের জন্য প্রাইভেট পরিসর কোনো পুরুষ চাইলে সেটাকেও পরিসর–রাজনীতির সম্প্রসারিত অংশ হিসাবে আমি দেখব। এক্ষেত্রে এই একান্ত পরিসর প্রদানের পক্ষে না বিপক্ষে থাকছি আমি তাও খুব পূর্বনির্দিষ্ট থাকার সুযোগ নেই। যদি কোনো একটা তৎপরতার লক্ষ্য হয়ে থাকে আক্রমণকারী পুরুষকে শরম–প্রদান বা শেমিং তাহলে অভিযোগকারী পক্ষ বা তাঁর মিত্রপক্ষ প্রাইভেট পরিসরের সুযোগটা না দেবার রাস্তা কৌশলগতভাবেই নিতে থাকবেন। প্রসঙ্গটা রাজনীতির। তবে সকল অভিযোগকারী আক্রান্ত নারীই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অভিযোগ দায়ের করেননি। সেটা বাংলাদেশ হোক বা বহির্বিশ্ব, অভিযোগকারীদের অনেকেই হয়তো কেবল আক্রমণকারীর দুঃখপ্রকাশ আশা করেছেন। কিংবা আশা করেছেন যাতে অন্যান্য অপুরুষ পেশাজীবী পরিস্থিতির আন্দাজ করেন এবং একা বোধ না করেন। রাজনৈতিক লক্ষ্য নানাবিধ হয়ে থাকে, হতে পারে। সঙ্গত কারণেই কোনো কোনো পক্ষ ব্যক্তিগত দায়স্বীকারের, দুঃখপ্রকাশের পথ রুদ্ধ করে আগাতে চেয়েছেন।

    পরিসর ও যৌনতার প্রসঙ্গের প্যাঁচ লেগে থাকা নানানভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ আছে। কর্মক্ষেত্রে হয়রানিগুলো, কিংবা নিছক হয়রানিহীন যৌনাত্মক মেলামেশাগুলোকে এক কাতারে রাখলে দেখা যায় প্রাইভেট পরিসরের জটিল ও ঘোরালো পেঁচালো অর্থ আছে। বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত যে কলেজ–করিডোর পাবলিক পরিসর বলে সাব্যস্ত, সেটাই আধা ঘণ্টা পরে প্রাইভেট বলে সাব্যস্ত হতে পারে। বা অন্তত ‘গোপন’। বাংলায় প্রাইভেটকে গোপন হিসাবেই অনুধাবন করা হয়ে আসছে, যৌন পরিমণ্ডলে তো বটেই। আবার ভৌত এলাকা যেমনই হোক, প্রাইভেট বলে তা অনুধাবিত হলে কোনোভাবেই দুই লিঙ্গের একজন করে থাকার পক্ষে সাধারণ রায় থাকে না। সেটারও বহুবিধ অর্থ। একজন পুরুষ সন্ধ্যা ৭টায় ওইরকম একটা খোলা করিডোরেও একজন নারীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে এসে নিজ লিঙ্গশ্রোতাদের কাছে ঘোষণা দিতে পারেন ‘চুমা খায়া আসলাম’। এটা সর্বৈব মিথ্যা হলেও সত্য বলে গণ্য ও কিছুকাল উদযাপিত হবে। পক্ষান্তরে, নারী যদি এসে ঘোষণা করেন যে তাঁকে জোর করা হয়েছে, তাহলে আদ্যোপান্ত সত্যি হলেও জনজবানে খারিজ হয়ে যাবে ওই পরিসরের প্রাইভেট বৈশিষ্ট্যের কারণে। কারোরই বিশেষ কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই; আবার কাঠামোগতভাবেই নারী উভয় উদাহরণেই ‘ক্ষতিগ্রস্ত’। এই পরিস্থিতিটা জটিল। কিন্তু সকল অভিযোগের উত্তরেই অভিযুক্ত অভিযোগকারীর সঙ্গে মুখোমুখি বসতে চাইলে সেটার ব্যবস্থা করতে পারা সংগঠকদের জন্য দারুণ ব্যাপার বলে আমি মনে করি। শেমিং ছাড়াও অন্য রাজনৈতিক অবস্থান ও পদ্ধতি অভিযোগকারীর থাকতে পারে।

    ১৪. ভিক্টিম বা সার্ভাইভারের সুরক্ষা পাবার অধিকার প্রশ্নে সামাজিক সংবেদনশীলতা দরকারি। বিশেষত ভিক্টিমকে ব্লেম করার প্রবণতা যখন প্রকট। কিন্তু এই সমাজে আমরা অভিযুক্তর অধিকার প্রশ্নে একধরনের নীরবতা দেখি। কখনো কখনো অধিকার খারিজ করতেও দেখি। ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযোগ হওয়া মাত্র একজন অভিযুক্ত যৌন নিপীড়নকারীর লেখা না ছাপানো বা তার আঁকা বা তোলা ছবি নামিয়ে ফেলার চাপ আসে। কোন আদালত যৌন নিপীড়ন প্রমাণিত হলেও আসামির ‘প্রকাশের স্বাধীনতা’ খর্ব করে না। তো,একজন অভিযুক্ত বা প্রমাণিত যৌন নিপীড়কের লেখা বা ছবি প্রকাশ কে আপনি কিভাবে দেখেন? তার এই অধিকার হরণযোগ্য কি না?

    মানস: দেখুন বাংলাদেশ নানান প্রশ্নে গুরুতর জটিল একটা জায়গা। যৌনতার প্রশ্নে ঢাকা মহানগরী আরো এককাঠি উপরে। তবে কমবেশি কোলকাতাও সম্ভবত কাছাকাছিই এই প্রশ্নে। শেমিংয়ের কেন্দ্রীয় গুরুত্বের বিষয়টা বলেছি আগেই। কিন্তু এই প্রশ্নের ক্ষেত্রে বয়কটের শাস্তিবিধান প্রসঙ্গ টানতে হবে। অধিকাংশ লোকেই যেমনটা ভেবে থাকেন যে একঘরে করে দেবার শাস্তিবিধান সাবেক কালের প্রসঙ্গ কিংবা যাকে তাঁরা গ্রাম বলে সাব্যস্ত করে থাকেন সেসব এলাকার চর্চা ইত্যাদি, বাস্তব পরিস্থিতি একেবারেই তা নয়। ‘আধুনিক’ প্রতিষ্ঠানে একঘরে করে দেবার কিংবা বয়কট করবার শাস্তিবিধান বরং আরো নিবিড়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরো তীব্র। একঘরে করা আর বয়কটকে সঙ্গত কারণেই আমি কাছাকাছি জায়গায় রাখতে চাইছি। মার্কিন সমাজে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ইউরোপীয় সমাজে হলোকাস্ট–সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাছাকাছি আচরণগুলো ঘটে থাকে। যদি বৃহত্তর মিডিয়াস্কেপিক দুনিয়ার বাস্তবতা হয়ে থাকে এটা তাহলে রাজনীতির দুনিয়ার একঘরে করার গুরুতর ওজর–উছিলাও আছে। যেমন ‘ওয়ার–ক্রাইম’। যদি একবার ‘ওয়ার–ক্রাইম’ করবার তকমা যদি কারো গায়ে লেগে থাকে, তাহলে তাঁর পক্ষে সাধারণভাবে রাজনীতির খোলা মঞ্চে তাঁর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারার সুবিধা প্রায় নাই বললেই চলে। এসব প্রস্তাব ধরে আগানোও খুব বিপজ্জনক। অনেকগুলো ডিসক্লেইমার দেয়া লাগতে পারে। যেমন ধরুন, এসব কথার মানে যে আমার তরফে যুদ্ধাপরাধ কিংবা হলোকাস্টের প্রতি কোনো সমর্থন নয় সেটাও আবার আগ বাড়িয়ে বলে দেয়া লাগতে পারে; বলার পরও কিছু লোকের সন্দেহ দীর্ঘকালীন বলবৎ থাকতে পারে। আবার হলোকাস্ট বা যুদ্ধাপরাধের তকমা মাথায় লাগলে রাজনৈতিক দুনিয়াতে তৎপর থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে বলার সাথে সাথেই এটাও বলার দরকার পড়ছে যে এসব তকমা লাগার পরও কারো কারো রাজনৈতিক সাফল্যের নজির পাওয়া সম্ভব। এসব ব্যাখ্যা বা কৈফিয়ৎ এক হিসাবে বাহুল্য আমার তরফে। কিন্তু ভুলভাল জায়গায় ওজন পড়ার চেয়ে বাহুল্য কথাও কখনো কখনো পদ্ধতিগত পদক্ষেপ।

    বয়কটের আধুনিক প্রবণতাগুলো কমবেশি নৈতিকাশ্রয়ী বা মর‍্যালিস্ট; আর পরিচালিত হয় কমবেশি ঘৃণার ফ্রেইমওয়ার্ক দিয়ে। এখানে আদর্শ–ফাদর্শের আলাপ লোকে তুলতে পারেন, কিন্তু আদর্শ শব্দের প্রয়োগের কারণেই আমি ঘাবড়ে গিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা খুঁজতে বসব না। আদর্শ মূলগত ও গুণগতভাবেই মর‍্যালিস্ট। ন্যায্যতার ধারণাও লোকে আমদানি করতে পারেন। আমার জন্য সেটাও খুব বেশি মনোগ্রাহী হবে না। আমার এটাও বক্তব্য নয় যে, ‘সাবেকী’ সমাজে একঘরে করে দেয়া আধুনিক অনুশীলনগুলো থেকে মহত্তর ছিল। উল্টো, এরকম বহু নজিরই বরং পাওয়া যেতে পারে যেখানে একঘরে করা হচ্ছিল একদমই সমাজপতিদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য এবং করা হচ্ছিল এমনসব মানুষদের যাঁরা বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিলেন কখনো। বিবরণী বা ঘোষণা তৈরি করার সময়ে অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্তকে দোষী বা অপরাধী বা হিংস্র বা যাকিছু বলা হয়ে থাকতে পারে। আরো বলা হয়ে থাকতে পারে সমাজবিরোধী বা কাছাকাছি কিছু। এই শেষোক্তটি কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্রের মতো। এখানে থাকবেন অবশ্যই তাঁরা যাঁদের কর্মকাণ্ড সমাজপতিদের জন্য হুমকির অথবা মর্যাদানাশের হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যাঁরা বিদ্রোহ করেছিলেন। সারাংশ হচ্ছে, একঘরে শাস্তিপ্রদানের লক্ষ্য হতে পারেন প্রকৃত ‘চোর’ থেকে ‘প্রকৃত’ বিদ্রোহী – একত্রেই, যুগপৎ, অভিন্ন – এমনকি তাঁরা থাকতে পারেন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে, পাশাপাশি। তো, বয়কটের যে আধুনিক সমাজপ্রণালী তা কি গুরুতরভাবে ভিন্ন? এখানে বিপ্লবী ও বিদ্যুৎচোর, রাষ্ট্র–সমালোচক ও ভাড়াটেখুনি, সর্বহারা ও পাকিস্তানপন্থী কাছাকাছি পদ্ধতিতে বিবেচিত হয়ে থাকেন, অন্তত সামাজিক পরিসর ব্যবহার প্রশ্নে; খোদ বিচারিক শাস্তিপ্রাপ্তির ঢের আগে থেকেই। এমনকি মার্জিন অব ইরর, প্রমাণ করা সম্ভব, কখনো কখনো আরো সূক্ষ্ম আরো ক্ষীণকায় আধুনিক ব্যবস্থাদিতে।

    গোলাম আজম যে পাড়ায় থাকতেন সেখানে আমার একজন পরিচিত–বান্ধব থাকতেন। একজন শাস্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী হবার আগেও তিনি আমার প্রতিপক্ষ হিসাবেই ছিলেন বহুবছর, এমনকি সেই সময়কালেও যখন খোদ তখনকার সরকার তাঁর প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আবার শাস্তিপ্রাপ্ত হবার পর তাঁর সামাজিক–মানসিক–পারিবারিক দশা নিয়ে আগ্রহ জন্মাতেও আমার কোনো সমস্যা হয়নি। এটার কারণ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর ছোট ছেলের সঙ্গে আমার নৈকট্য ছিল। তাঁর ছোট ছেলে জাহাঙ্গীরনগরে ইংরাজি সাহিত্য পড়তে ভরতি হয়েছিলেন আমার এক ব্যাচ পরে। যদিও ক্যাম্পাসে রাত কাটানো কম হতো তাঁর, তবুও সম্ভবত তাঁর নানাবিধ আগ্রহ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারণে আমাদের জানাশোনা হয়ে গেছিল, তাঁর বাবার প্রতি আমার ওইসব প্রতিপক্ষতা সমেতই। গোলাম আজমের সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি অবশ্যই, কিন্তু সেটা হয়তো তখনো আমার ঘরকুণো দশার কারণে। নাহলে সালমান, নানান ধরনের দ্বিধাসমেতই, বাসায় যাবার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সালমান বছরখানেকের বেশি জাহাঙ্গীরগরে টিঁকতে পারেননি, এবং সেই সময়টাও যথাসম্ভব নিগৃহীতভাবে ছিলেন। এরশাদের শাসনামল হলেও ক্যাম্পাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভাষামালার মধ্যে ওর পক্ষে নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন ছিল। এই ঘৃণাময়তার আমি অনুগ্রাহী নই। এবং আপনি জানেন এই উচ্চারণের জন্যও, সালমানের মতো তীব্র না হলেও, আমি নিজেই হয়ে পড়তে পারি বয়কটের বা ঘৃণার টার্গেট। শাস্তিপ্রাপ্ত হবার পর বিস্মৃতপ্রায় সালমানের বাবা হিসাবে নয়, নিছকই একজন যেকোনো বৃদ্ধ রাজনীতিবিদের পারিবারিক–মনোজাগতিক দশা নিয়ে আগ্রহ জন্মেছিল। আমার সৌভাগ্য, তাঁর প্রতিবেশী, আমার বান্ধবজন, একটা আন্তরিক উত্তর দিয়েছিলেন। এখন কেউ চাইলে আমার এই মনোভাবকে ‘দয়ালুতা’, ‘ভাবালুতা’, ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ যা কিছু নাম দিতে পারেন। কিন্তু যৌথচর্চার প্রস্তাবিত ঘৃণার পরিকাঠামো যদি আমার গ্রহণযোগ্য না লাগে, তাহলে তো কেবল তিনি বা তাঁরা নন, খোদ আমিও এই ব্যবস্থার শিকার হয়ে পড়বার জায়গায় আছি।

    অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিব্যক্তির সামর্থ্য হরণ করার প্রশ্নটি আপনি তুলেছিলেন যৌনতার পরিপ্রেক্ষিতে। আমি নিছক যৌনতায় পরিসীমিত থাকিনি উত্তর দেবার বেলায়। আশা করি আমার উত্তরকে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছেন না। বয়কট বা ঘৃণার শাসনাধীন বানানো নিয়ে আমার কোনো উৎসাহ নেই, কোনো প্রশ্নেই।

    যৌন নিপীড়নের শাসকতা: দণ্ডনীতি ও ধর্ষণের পুনরুৎপাদন

    ১৫. যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শাসকতা পর্যবেক্ষণ করলে একটা বিষয় পষ্ট যে,পুলিশ–উকিল–চিকিৎসক–সাক্ষ্য–প্রমাণ–বিচারক মিলে গড়ে ওঠা আগাপাছতলা প্রণালীতে ভিক্টিম/সার্ভাইভারের স্বর থাকে না। এই স্বর হারিয়ে যায়। ফিল্টার হয়। অভিযোগের বয়ানকে ‘আইনানুগ’ করে তোলা হয়। সাক্ষীর সাক্ষ্যকে ‘আইনানুগ’ করে গ্রহন/ বর্জনের মুখে পড়তে হয়। ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ‘প্রপঞ্চটিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে এই প্রক্রিয়ায় কনস্ট্রাক্ট হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তো,আমার প্রশ্ন হল: যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শাসকতা এবং একে ‘আইনানুগ’ করে তোলার সিস্টেমেটিক একশন খোদ ধর্ষণ নামের রাজনৈতিক ঘটনাটিকেই অনুপস্থিত করে তোলে কিনা?

    মানস: তোলে, আলবৎ তোলে। রাজনৈতিক ঘটনাটিকে অনুপস্থিত করে তোলে বা ফেলে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে যৌন–লিঙ্গীয় রাজনৈতিক ঘটনা বা হামলার কথা আলাপ করছি আমরা। কিছুটা ঝুঁকিসমেতই বলি সকল বিচারের প্রক্রিয়ায় সকল ক্ষতিগ্রস্তের সকল ধরনের বয়ান (স্বর, আর্তনাদ, ফরিয়াদ, বিবরণী, অনুভব, সংক্ষোভ, সংবেদ ইত্যাদি সকল কিছু সমেত যা যা হতে পারে তার একটা পোঁটলা যদি বলি) অনুপস্থিত হবার সম্ভাবনাসমেত বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। যাকে ইনসেপশন বলে। মামলা হিসাবে অনুধাবিত হবার মধ্যেই ব্যক্তিসমূহ কেইসে, বা বাদীতে (বা বিবাদীতে) , পর্যবসিত হন। তাঁর বাণীমালা আইনানুগ হতে হতে তিনি সেগুলোকে আর না–চিনতে শুরু করতে পারেন। আবার একটা রিয়েলিটি শোয়ের মাঝপথে আপনি যেমন আর বের হয়ে আসতে পারেন না, মামলাকারী বা অভিযোগকারী এই অচেনা পথে, খোদ নিজের অভিজ্ঞতার অচেনা লিপিরূপের অত্যাচার থেকে খুব একটা বের হয়ে আসার সুযোগও পান না।

    রবীন্দ্রনাথ সাহা। মনে হয় এটাই নাম। হয় আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিংবা কোনো এক সাংবাদিকের বিবরণীতে তাঁর অস্তিত্ব এত জাগরুক লেগেছিল আমার যে আমার মাথায় এরকম চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে যে আমি রবীন্দ্রনাথের পাশে দাঁড়িয়েই তাঁর বিহ্বল অন্তর্গত বিলাপ শুনছি। রানা প্লাজার করুণ ও দুর্বৃত্তায়নগত দুর্ঘটনার পর তিনি একাধিক দিন এই ধ্বংসস্তূপের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বিলাপকে যদি সূত্র ধরা যায় তাহলে ওই জমিখানা, যেখানে জনৈক ক্ষমতাবান ও রাজনীতিবিদদের চ্যালাচামুণ্ডা রানা একটা প্লাজা বানিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের মালিকানাধীন ছিল এবং রানা সেটাকে জবরদখল করে। যেহেতু আমি চাকরি করি জাহাঙ্গীরনগরে সেজন্য রবীন্দ্রনাথ সাহার পাশে আমার কোনো একটা দুপুরে দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। রানার কীর্তির জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি এটা যদি আমরা দাবি করি তাহলে নিশ্চয়ই মিথ্যাচার হবে। আবার রানার কীর্তির ‘ন্যায়বিচার’ হয়েছে তা আদৌ সরকারের মধ্যকারও কেউ বলতে রাজি থাকবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। তাঁরা বড়জোর বলবেন ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে..’। এগুলো বারবার শুনতেও আমাদের ভাবগাম্ভীর্যের মৌলিক ক্ষতি হতে পারে। এখন আপনি বা আমি তো দূরের কথা, রবীন্দ্রনাথ নিজেই তো জানেন না যে ওই ধ্বংস্তস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক বছর আগে তাঁর বেহাত হওয়া জমির জন্য কী ধরনের শোক প্রকাশ মানানসই; কিংবা শোকের অধিক সেই কৃত ‌‘অন্যায়’–এর বিপরীতে ঠিক কী ধরনের ‘ন্যায়বিচার’ পেতে তিনি আদালতে যেতে পারেন। আদৌ এই দুই হাজার মৃতদেহের পরিবেশে আদালতে যাবার স্থৈর্য ও সংকল্পই বা তিনি কীভাবে সংগঠন করবেন! কিংবা সেই বিচারিক প্রক্রিয়াটিই বা কী হতে পারে! আবার তিনি নেহায়েৎ রবীন্দ্রনাথ বলে ‘শুধু বিঘে দুই’ লিখেও তাঁর অনুভূতিরাজ্যের একটা আশু নিষ্পত্তি ঘটাতে পারছেন না। ফলে, আমি তাঁর অসীম বিহ্বলতা প্রায় অনুভব করতে পারি। হতে পারে, সাভার বাজারের ওই অজস্র মানুষের ভিড়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সঠিক কী বা কী–কী কারণে তা তিনি নিজেও জানতেন না। যেমন, বাস থেকে আমি বা আপনি নেমে ওইদিকে চেয়ে থাকতাম যে তারও কোনো সঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। কিছু কিছু সময়ে কিছু কিছু জন অবশ্যই ত্রাণকর্মী থেকেছেন। তার থেকে বিশাল বাহিনী ছিলেন দর্শক, আবার তাঁদের নিস্পৃহ বা অকরুণ/এপেথেটিক ভাবার কোনো কারণ নেই। হতে পারে, ওই জমায়েতে, নিহতদের আত্মীয়দের বাইরে রবীন্দ্রনাথই সবচেয়ে বিহ্বল ছিলেন। হতে পারে, তিনি বিড়বিড় স্বগতোক্তির মধ্যে, এই বিশাল মৃত্যুরাজির মধ্যেও চাইছিলেন ওই জমির সঙ্গে তাঁর পুরান সম্পর্কটির একটা জনস্বীকৃতি; এমনকি জনস্বীকৃতিও নয়, নেহায়েৎ সামনে–থাকা লোকটির মুহূর্তের স্বীকৃতি ও সমবেদনা। তিনি মোকদ্দমা একদমই না–চেয়ে থাকতে পারেন।

    আদালতের কাঠগড়া থেকে ঢের ঢের দূরে থাকা এই রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনা আমার তরফে খুবই প্রাসঙ্গিক। আদালতে ‘ন্যায়বিচার’ প্রত্যাশী ধর্ষিতের অভিজ্ঞতা তাঁর নিজেরই কাছে কোনো একটা সময়ে কোনো এক সুদূর অপ্রাসঙ্গিক অন্য মানুষের জীবনের এক নিস্পৃহ–অকরুণ কাহিনি লাগতে পারে। এমন এক কাহিনি যা আর পুনঃ পুনঃ বিবরিত হোক তা তিনি না চাইতে পারেন; পুনঃ পুনঃ বিশ্লেষিত হোক তা তিনি না চাইতে পারেন। শোক কিংবা লজ্জার অধিক তা এমন এক বিবরণী–বিশ্লেষণে পরিণত হয়ে থাকতে পারে যা আর তাঁকে সম্পৃক্ত করছে না। তিনি এই অধ্যায়ের ‘বেকসুর’ খারিজ চাইতে পারেন। রাজনৈতিকতার অনুপস্থিতি তাঁকে খোদ রাজনৈতিক প্লেয়ার/অংশীদার হিসাবে মিউটেড/নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আমি প্রশ্নটির মধ্যকার পাত্রীপাত্রের মনোজাগতিক দিকটাতেও তাকাতে চেষ্টা করলাম।

    ১৬. একটি আদালত কক্ষ, উকিলের জেরা, ভিক্টিমের আইনিভাবে চরিত্র হনন ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন পুণরুৎপাদন হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের দাবি আসলে কোন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে কি? নাকি এটি ভিক্টিমকে একটি বিচারিক স্বৈরতন্ত্রর মুখোমুখি করে?

    মানস: বাহ। বিচারিক স্বৈরতন্ত্র! এটা দুর্দান্ত পদবাচ্য। তবে আমি আশঙ্কা করি যে বিচারিক ও স্বৈরতন্ত্র শব্দদুটো পাশাপাশি বসিয়েই প্রথমে আপনি, ও আপত্তি না করে পরেরবার আমি ‘আদালত অবমাননা’র ফাঁদে পড়ার উপযুক্ত হয়ে আছি। তাই চাইলে এখন থেকে আমরা স্বৈরতন্ত্রকে অন্য কোনো কোডেড একটা নামে ডাকতে পারি। ধরা যাক, স্বরতন্ত্র, অর্থাৎ যেসব প্রত্যঙ্গের ব্যবহারে আমাদের আওয়াজ উৎপন্ন হয়ে থাকে। আদালত কিছু নির্দিষ্ট আওয়াজ তৈরি করে থাকে তা বলাই যায়। বিচারিক স্বরতন্ত্র! আমি চাইব, আগের প্রশ্নেও বলেছি, আদালত ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আমাদের বোঝাবুঝির ইতিহাস ও আকাঙ্ক্ষিত দাবিনামাকে দুই বাক্সে সতর্কভাবে রাখার অভ্যাস করতে। একটার সঙ্গে আরেকটার অন্যমনস্ক, কিংবা সচেতন, গুলিয়ে ফেলার অহরহ নিয়মিত ঘটনা ঘটে। এরপর যে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়টা আমি উচ্চারণ করব তা হচ্ছে ন্যায়বিচারের দাবি মুখ্যত দুইটা অনুপ্রেরণা বা ইনটেন্ট ধারণ করে: প্রতিশোধপরায়ণতা এবং/বা অক্ষম–আক্রোশ। এই ভয়ানক দাবিটা আমি কেবল যৌনতার বিচারিক বিষয় নিয়েই করছি না, বরং করছি সাধারণভাবে রাষ্ট্রানুগ বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সকল আর্তনাদ–ফরিয়াদ নিয়েই। ন্যায়বিচারের আওয়াজটা ক্ষতিগ্রস্তরা তোলেন সাধারণত ওটা রাষ্ট্রের ভাষামালা বা ডিসকোর্সের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে।

    শিল্পী: সায়েদা ইশরাত

    যৌন নিপীড়ন এবং বিশেষভাবে ধর্ষণের বিষয় আদালতে যাবার পর ঘটনাপ্রবাহ বা বিস্তারের একদম সুনির্দিষ্ট কয়েকটা মাত্রা আছে যার মধ্যে দুইটার দিকে, বা আড়াইটাও বলা যায়, আমি আলোকপাত করতে চাই। প্রথম বিষয় হলো, প্রাইভেট পরিসরের মধ্য থেকে যৌনক্রিয়াদি এবং মনুষ্যদেহের বিশদ বিবরণী পাবলিককরণের আবশ্যিক শরমের পাটাতন। আক্রান্তের একান্ত অনুভূতি বাদ দিলেও, যদি আনন্দদায়ক তথাকথিত সম্মতিভিত্তিক যৌনাচারের প্রসঙ্গও হতো তার বিবরণী জনদরবারের চর্চার বিষয়বস্তু হয়ে পড়বার আবশ্যিক অস্বস্তি বা উৎপীড়ন বা হয়রানির প্রসঙ্গ সেটা। কিছু বিরল উদাহরণ বাদ দিলে, এই পরিস্থিতিটা লিঙ্গ নির্বিশেষেই পাত্রপাত্রীদের পরম বিব্রতির বিষয় হবার কথা। যদি আধুনিক বিচারব্যবস্থার বাইরে আমাদের কল্পনার পল্লী অঞ্চলকে, কিংবা ইতিহাসগ্রন্থাদির ‘সাবেক’কালীন সমাজভিত্তিক শালিসব্যবস্থার কথাও আন্দাজ করি, এইসব বিবরণীতে সংশ্লিষ্ট পাত্রপাত্রীদের হর্ষ–আনন্দের কোনো কারণ নাই। তবে মোটের উপর পার্থক্য থাকতে পারে ওটুকুই যতটুকু যৌনতার লজ্জা পুনর্গঠিত হয়েছে আধুনিক কালে। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো, আরো সূক্ষ্ম প্রসঙ্গ, ধর্ষণ বা যৌনাক্রমণকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে কীসব প্রিমাইজ/পূর্বশর্ত বিভিন্ন কারকের মাথায় কাজ করছে। এখানে আমাদের বাহ্যত মনে হতে পারে যে আদালত মানেই তো বিমূর্ত একটা ব্যবস্থা। কোনো বিমূর্ত ব্যবস্থাকেই এর মধ্যকার ও পার্শ্ববর্তী কারকদের বাইরে স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব হিসাবে আমি দেখি না। বহুদিন ধরে দেখি না। প্রায় শিশুকাল থেকে দেখি না। এই বিশেষ ক্ষেত্রে কারকদের প্রায় শতভাগ, অন্তত আমাদের মতো দেশগুলোতে, পুরুষও বটে। আমি অবশ্য যৌনতা অনুধাবনের বেলায় লিঙ্গনির্দিষ্ট ভিন্নতা যে থাকবেই তা মনে করি না। পুরুষের বা পুরুষালি বা অধিপতি যৌন অনুধাবন খোদ নারী বা অন্যান্য লিঙ্গের মানুষজনও ধারণ করতে পারেন। তো সেখানে, ধর্ষণ কীভাবে ‘সাধিত’ হয় এটা অনুধাবন করতে গিয়ে কারকেরা নিজেদের যৌনতাবিষয়ক বোঝাবুঝির দুনিয়ার সঙ্গেও নানাবিধ কুস্তি লড়তে থাকেন। অন্তত যেসব সম্ভাব্য অমীমাংসিত মনোভঙ্গি তাঁরা কুস্তি লড়েন বলে আমি মনে করি তার মধ্যে আছে: উস্কানিমূলক পরিবেশ, ‘সঠিক’ নৈতিক আচরণ বা তার অভাব, ‘যৌনতা সতত অনৈতিক’, ‘নারীর স্বভাব পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে’, পুরুষ নারীটিকে একান্তে পাবার মানে নিশ্চয়ই নারী আগ্রহী ছিল ‘কিছু করতে’, পুরুষটির বদমতলব যদি তাই হয়ে থাকে অবশ্যই নারীটির আগে বুঝতে পারা উচিত ছিল; এমনকি ‘নারীরা আগেভাগেই বিপদের আলামত বুঝে ফেলে উঁইপোকার মতো’। এরকম রাজ্যের সব অনুমান নিয়ে ওইসব কারকেরা দিনের ২৪ ঘণ্টা বসবাস করেন। হঠাৎ আদালতে আলখাল্লা পরে যাবার সময়েই সেসব ভোজভাজির মতো মাথা থেকে উধাও হয়ে যাবার কোনো ন্যায্য কারণ আমি দেখি না।

    ফলে, ধর্ষক বা যৌন–আক্রমককে বাঁচানোর ইচ্ছা ছাড়াও, এইসব নিজের মাথার থিসিসের সঙ্গে কুস্তি লড়তে–লড়তে আদালত–আচারগুলো সারেন তাঁরা। এর মধ্যে আক্রান্ত নারীর যৌন বিষয়ক জগদ্দর্শনও বিপজ্জনক হতে পারে। কিন্তু এখানে তাঁর ভাবনা নতুন করে কোনো বিপদ ঘটাচ্ছে না। ওদিকে আক্রমণকারী এবং বিচারক দীর্ঘকাল চুপচাপ থাকার সুযোগ পান। তাই বলে তাঁদের মাথা সক্রিয় থাকছে না তা তো নয়, নেহায়েৎ একঘেঁয়েমিতে ঘুম পেয়ে যাবার সময়টুকু বাদ দিলে। এই জাগরুক মাথার যৌনবোধকে আমি বিপজ্জনক মোকদ্দমা–পাটাতন গড়ে দেয় বলেও মনে করি। আড়াইতম বিষয়টা হলো, মিডিয়ার ব্যস্ততা বা সম্প্রচারগুণ। অন্তত কিছু কিছু ধর্ষণের বিচারকার্য চলাকালীন ব্যাপক ধরনের মিডিয়া–শোরগোল হয়ে থাকে। এসব শোরগোলের আয়ু যতটুকুই হোক, এর ফ্রেইমওয়ার্ক প্রদান করার সামর্থ্য প্রচুর। আপনার প্রশ্নে যে দৃশ্যরূপ হাজির করা হয়েছে সেখানে নিজগুণেই আক্রান্ত নারীর পরিস্থিতি বিবরিত হয়েছে। আমি এই সুযোগটা নিয়ে তাকে বিশদ করলাম মাত্র। আর আমার বিবরণীতে যৌন–রাজনীতির আরো বিশদ মনোজাগতিক পরিমণ্ডলটাকে আনার তাগিদ আমার ছিল। ‘চরিত্র হনন’ এখানে যতটা অপরাধীকে বাঁচানোর নৈতিক হাতিয়ার, ততটাই যৌনতাকে অনুধাবন করার হাতুড়ে উপায়। ‘ন্যায়বিচার’ এখানে সুদূরপরাহত। বিচারের দাবি, আমি আগেই বলেছি, ‘ন্যায়বিচার’ সংক্রান্ত তাগিদ হিসাবে আমি দেখতেই পাই না। ওটা তীব্র আর্তনাদ হতে পারে, প্রতিশোধ হতে পারে, রিরংসা হতে পারে, অক্ষম–গোঙানি হতে পারে। বেইনসাফকে শনাক্ত করার আওয়াজ বললে আমি মানব।

    দণ্ডমূলক বনাম পুনর্গঠনমূলক ন্যায় বিচারব্যবস্থা

    ১৭. ফৌজদারি বা দণ্ডনীতি কি সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের প্রতিহিংসাকেই অবশেষে নিরুঙ্কুশ করে তোলে না? একটা পিউনিটিভ জাস্টিস সিস্টেম ন্যায়বিচার ধারণাকে যেভাবে শাস্তিমূলক এবং কারাগারকে সামাজিক ভয়ের ক্ষেত্রে পরিণত করে;সমাজের কথিত পঙ্কিলতাকে বন্দী করার নামে খোদ সমাজের গায়ে কারাগার নামক বিমানবিকীকরণ প্রকল্পের জন্ম দেয়,তাতে আদতে দণ্ডনীতি তো সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের ত্রাসই…

    মানস: আমি আপনার বা অরাজের প্রশ্নের তারিফ করতে চাই। আশা করি আমার এই প্রশংসা মোড়লীপনা কিংবা প্যাটার্নালিজম হিসেবে পঠিত হবে না। গড়ে যেভাবে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হই আমি, বা আমরা, তাতে এই পর্যায়ের সূক্ষ্ম ও জটিলভাবে উপলব্ধি করতে থাকা মানুষদের প্রশ্ন কমই মুখোমুখি হয়েছি আমি।
    এই প্রশ্নের মুখোমুখি হবার আগেই আমি প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণতাকে (অক্ষম আর্তনাদসমেত) ‘ন্যায়বিচার’সংক্রান্ত আলাপের কেন্দ্রে এনে কথা তুলেছিলাম। সাক্ষাৎকারে সকল প্রশ্ন একত্রে পড়ে নিয়ে উত্তর শুরু করবার পদ্ধতির পক্ষে অনেকেই থাকেন। তাঁদের পদ্ধতির পক্ষে সঙ্গত সব ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু জটিল ও আগ্রহের বিষয়বস্তুতে অন্তত, আমি পরের প্রশ্ন আগে না পাঠ করে উত্তর করতে পছন্দ করি। আশা করি আমার পদ্ধতির শক্তিটাও স্পষ্ট হলো। নিরঙ্কুশ যদি একটু ঝুঁকিপূর্ণ ভাষাপ্রস্তাব হয়েও থাকে, সংঘবদ্ধ ‘ন্যায়বিচার’ অবশ্যই প্রতিহিংসাকে সংগঠিত করতে সমর্থ, করে থাকে লাগাতার; যতই এর আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য এটি না হয়ে থাকুক না কেন।

    আমি ‘ন্যায়বিচার’ ধারণার গুণগ্রাহী নই, এতে আমার আস্থা নাই। আমি একে বাগাড়ম্বর মনে করি। এর আকাঙ্ক্ষাকে অবাস্তব মনে করি। এর প্রতিষ্ঠাপ্রচেষ্টাকে মিথ্যাচার, বা অন্তত অতিকথন, গণ্য করি। সম্ভবত আমার আগের কিছু আলাপে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পক্ষান্তরে, ন্যায়বিচার বা ইনসাফের অভাবকে লাগাতার উপলব্ধি করতে থাকার অনুশীলনকে আমি রাজনৈতিক ও দার্শনিক উভয় বিচারেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ইনসাফের অভাবের উপলব্ধিকে ন্যায়বিচার আকাঙ্ক্ষা হিসাবে পাঠ করা যেতে পারে নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি এই পর্যায়ে আকাঙ্ক্ষাকে প্রায় কাল্পনিক ঐশী রাজ্যের বাসনা হিসাবে দেখতে পাই; আর অভাবের উপলব্ধি অতি–অবশ্যই দার্শনিক পটভূমি হিসাবে দেখতে পাই। ফলে ‘ন্যায়বিচার নাই’ উপলব্ধির সাধারণ গড়পরতা প্রতিক্রিয়া আর ‘ন্যায়বিচার’–এর জাগতিক অনস্তিত্ববিষয়ক উপলব্ধির উচ্চারণ ঠিক এক কাতারে আমি না–রাখতে চাইব। কিন্তু এত সহজে এই আলাপে পার পেয়ে যাওয়া যাবে না মনে হয়। লোকজন ঠেসে ধরতে পারেন এই বলে যে ‘ন্যায়বিচার তুমি মানো না, মানে তুমি হইলা গিয়া স্বৈরাচারের দোসর’। কিংবা ‘তুমি আসলে জালিম’। আমি কোনোটাই নই। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় অবধারিত ইচ্ছানিরপেক্ষ রাষ্ট্রবাসী হিসাবে আমি বিচারিক প্রক্রিয়ার অত্যাবশ্যকতা গাঢ়ভাবে টের পাই। এমনকি, কিছুক্ষণ আগে যেমন বললাম, খুনি আর বিপ্লবীর সমান্তরালে অবস্থানের বাস্তবতা সত্ত্বেও, বিচারিক প্রক্রিয়া ও তার আশা করতে থাকা সাধারণ নাগরিক নিঃশ্বাস–প্রশ্বাসের মতো একটা বিষয়। আমি বড়জোর ‘ন্যায়ের’ ধারণা প্রত্যাহার করে ভাবতে চাইছি মাত্র।

    সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের দাবিনামা বা চিৎকার যে ত্রাসের ব্যাকরণ তৈরি করে তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। শৃঙ্খলা, শাস্তি ও কারাগার বিষয়ে বিস্তর সব বিদ্যাজগতীয় আলাপ–আলোচনা হয়ে আছে। ফুকো নেতৃস্থানীয় বলে বিবেচিত। আমার সেসব মুখস্ত থাকলে, বা অন্তত গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাঠ করা থাকলে এখানে উদ্ধৃতি দিয়েও আগানো যেতো। কিন্তু সেসব উদ্ধৃতির অভাবে মূল বক্তব্য, ভাব, যুক্তি কিংবা অনুভব হীনবল হয়ে যাবে না। অন্তত এ কারণেও যে এসব তত্ত্বের উদ্ভবেরও বহু আগে আর কেউ না হলেও শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষজন, মরতে মরতে, নিজেরা জানতেন কোন ধরনের শাস্তি ঠিক কার কার স্বার্থে তাঁকে দেয়া হচ্ছে। কিংবা সকলের সম্মিলিত উল্লাস আর চিৎকারের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর শাস্তি কার্যকর করার মুহূর্তগুলো তাঁর জন্য যতখানি ভীতি বয়ে আনতো, ততোই তীব্রভাবে তিনি সকলের উল্লাস শুনতে পেতেন, মৃত্যুকালে। সেগুলো বেঁচে থাকলে তিনি লিখতেন কিনা বা তত্ত্বায়ন হতো কিনা তাতে এই পরিস্থিতির পাঠ বদলায় না। তবে এই আলাপটি শুরু থেকেই যৌন নিপীড়নকে কেন্দ্র করে হবার কারণে আমার আলাপ, এমনকি আপনার প্রশ্নও, পুরুষ–এপলজিস্টের দোষারোপ খেতে পারে। বাস্তবে যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণ প্রসঙ্গেই সীমিত করে আমি ভাবিনি। ন্যায়বিচারের চিৎকারের মধ্যে সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসাকে চিনবার জন্য যেকোনো ‘সন্দেহাতীত’ (ছোট) চোর বা ছিনতাইকারীর উপর উপর্যুপরি সংঘবদ্ধ শক্তিপ্রয়োগের দৃশ্যের দিকে মনোযোগ দেয়াই যথেষ্ট। প্রায়শই এসব হামলা থেকে ‘অপরাধী’ জীবিত আসতে, বা হাসপাতালে যেতে, পারেন কেবল পুলিশের হস্তক্ষেপে। মব–লিঞ্চিংয়ের গড়পরতা যেকোনো পরিস্থিতিরই কাছাকাছি চিত্র।

    তবে যৌনাচার ও যৌনাক্রমণের সীমানার মধ্যে বিবেচনা করলেও বিশেষ ভিন্ন পরিস্থিতি নয়। আমাদের শৈশবে সবচেয়ে বড় ‘জাতীয়’ যৌনবিষয়ক ‘অপরাধ’ ছিল রিমা হত্যাকাণ্ড। কথিত ‘পারকীয়’ প্রেমের মীমাংসা করতে গিয়ে রিমার স্বামী মুনীর রিমাকে খুন করে ফেলেছেন বলে জানা গেছিল। মুনীরের ফাঁসির রায় হয়েছিল পরে। কিন্তু তামাম বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যক নারী আন্দোলনের কর্মীরা মুনীরের যৌনসাথি (বা বান্ধবী বা প্রেমিকা) খুকুরও ফাঁসি চাইছিলেন। কেবল মুনীরের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করার কারণে ফাঁসিযোগ্য বিবেচিত হওয়া বিস্ময়কর কম, কিন্তু বীভৎস তো বটেই। উত্তরকালে এরকম একাধিক ঘটনার নিদর্শন আছে যেখানে নারী সংগঠকদের একাংশ কাছাকাছি আওয়াজ তুলেছিলেন। একবার জাতীয় পর্যায়ের একজন নেত্রীর সঙ্গে আমার প্রকাশ্য মতবিরোধও তীব্র আকার পেয়েছিল। মুখ্য প্রবণতা হিসাবে চিন্তা করলে, খুকু বা এরকম কারো শাস্তিকামনা হতে পারে কেবল নৈতিকাশ্রয়ী তীব্র ঘৃণা থেকে, যাকে মর‍্যালিস্ট বলছিলাম। ন্যূনতম চেতনাটি এরকম যে, যে যৌন–নৈতিকতার শাসনব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছি আমরা, তার বাইরে যাবি যখন তখন দেখ আমরা কী করি! একে প্রতিহিংসা বলার যথাযোগ্য কারণ আছে। এখানে গোপন আর প্রকাশ্য, পাবলিক আর প্রাইভেটের প্রসঙ্গটাও আবার চলে আসে।

    ১৮. ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন কি আদতে ফৌজদারির বিষয় নাকি রাজনৈতিক? মানে পুরুষতান্ত্রিকতা, নারীকে অধঃস্তনীকরণের ধারকবাহক রাষ্ট্র–পুঁজিসহ বলপ্রয়োগের যেকোন প্রথা–প্রতিষ্ঠানের বিলোপ ছাড়া কি এর নিরসন সম্ভব?

    মানস: না সম্ভব নয়। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা একটা বাস্তবতা, অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা রীতিমত। হকিকত, এই মুহূর্তে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপ্রজা হিসাবে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নকে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে না দেখার সুযোগ আমাদের বিশেষ নেই। তাছাড়া এগুলোকে সাপেক্ষিকভাবে দেখতেই হবে। এমনিতেই আদালতের বাইরে জনসমাজে সালিশের নামে যেভাবে যৌনাপরাধগুলোকে সামলানোর চেষ্টা করে সেটা অতিশয় বিপজ্জনক। উপরন্তু, সেখানে ‘বিধিবহির্ভূত’ যৌনতা আর যৌন–আক্রমণ একই কাতারের ‘অপরাধ’। অবশ্যই গোপনে কিছু করে গিলে ফেলতে পারলে আরেক কথা। না পারলে ব্যভিচারও যা, ধর্ষণও তাই। পুরা ব্যবস্থাটা গড়ে অতিশয় ক্রুদ্ধ, যৌননিয়ন্ত্রণকামী, পুরুষালি ঈর্ষাপরায়ণ ও লিঙ্গবিদ্বেষী। আদালত সেখানে ওরকম শাসনব্যবস্থার প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ, যত মৃদু যত কমজোর আর যত অনীহই তা হয়ে থাকুক না কেন। তাছাড়া প্রশ্নটার আরেকটা দিক আছে যা অসতর্ক থাকলে এই মর্মে পর্যবসন ঘটাতে পারে যে আপনি বলতে চাইছেন পুঁজিবাদের বিলোপে এমনকি লিঙ্গীয় সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে; কিংবা লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। আপনাকে চিনি বিধায় আপনার প্রশ্নের এই মানে আমি করব না। তাছাড়া প্রশ্নটিও তার থেকে সূক্ষ্মভাবে বিন্যস্ত। প্রসঙ্গটা আসছে এই কারণে যে দীর্ঘকাল বাংলাদেশের বাম আন্দোলনগুলোতে নারীবাদী চিন্তন নিয়ে একটা কাঠামোগত ডিনায়াল ছিল। ডিনায়ালটা প্রথমত ছিল নারীবাদী চৈতন্য মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলে যে দানা বাঁধছিল সেটার বিষয়ে আনদেখা করা। দ্বিতীয়ত ছিল, মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতন্ত্রভাবে লিঙ্গপ্রশ্নকে বিবেচনা করার প্রয়োজন নাই। দুইটাই যে আত্মঘাতী মাথা–নাড়ানি ছিল তা আশা করি আর নতুন করে প্রমাণ দিতে হবে না। তারপরও যাঁদের সংশয় আছে, জানিয়ে রাখি আমি মনে করি ওগুলো বিপজ্জনক সব ফয়সালা ছিল। এতটাই যে পরে একটা একটা করে নারী শাখা খুলে এই লিঙ্গ–উৎকণ্ঠাগুলোর যথেষ্ট মীমাংসা করবার মতো খুঁটি দেয়া যায়নি, এমনকি কম্যুনিস্ট পার্টির মহিলা পরিষদের মতো জাতীয় পর্যায়ের বৃহদায়তন সংগঠন দিয়েও। সঙ্কটটি বাংলাদেশের মার্ক্সবাদী দলগুলোতেই প্রথম আমদানি হয়নি সবাই জানেন। সোভিয়েত বিপ্লবেরই সমান বয়সী লিঙ্গীয় বিতর্ক। এটা আমার খুবই মনে হয় যে পার্টিগুলোর মধ্যে লিঙ্গচৈতন্য জাগরুক থাকলে রাষ্ট্রের ম্যানিপুলেটিভ আচরণগুলো সতর্ক হতো। আরো সহজ করে বললে, নারীবাদকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করার সময় সকল প্রতিষ্ঠানেরই মনে পড়ে যে এমনকি মার্ক্সবাদী দলগুলোতেও নারীবাদীরা কোণঠাসা। আশা করি আমার বক্তব্যটা স্পষ্ট হলো।

    আবার আরেকদিক থেকেও দেখা দরকার। সমাজতন্ত্রী বিপ্লব কোনো না কোনোভাবে সাধিত হয়েছে এসব রাষ্ট্রে যৌন নিপীড়ন গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় কম ইত্যাদি হিসাব পাওয়া যায়। সেটা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন হোক, কিউবা হোক কিংবা বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি। এমনকি সমাজতন্ত্রী নয় এমন বিপ্লবসম্পন্ন রাষ্ট্রেও যৌন সহিংসতার মাত্রা কম থাকার, নারীর অধিকতর নিরাপদ যৌন জীবনের আলাপ চালু ছিল। এই তালিকায় ইরান থাকবে, সাবেক লিবিয়া থাকতো, কিংবা ইরাকও। কারো কারো মন খারাপ হলেও তালিবানশাসিত আফগানিস্তানও থাকতে পারত। লিঙ্গীয় বৈষম্যের সঙ্গে যৌন নিরাপত্তার প্রশ্ন যে জড়িত তা একদম সাধারণ বোধবুদ্ধির আলাপ। কিন্তু লিঙ্গীয় বৃহত্তর বৈষম্যের মধ্যেও কিছু রাষ্ট্রে নারীর যৌন নিরাপত্তার অধিকতর প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার সঙ্গে নারীবাদের বিবিধ স্পন্দনকে মেলানোর চেষ্টা যারা করে চলেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই করতে থাকবেন। কিন্তু ওই তৎপরতাগুলোর পাশাপাশি এই মুহূর্তের রাষ্ট্রতে এই মুহূর্তের বিচারিক ব্যবস্থায় যৌনহামলা ও হয়রানিগুলোর বিচার চাইতে থাকার দরকার পড়বে। অনেকটা ন্যাশনাল আইডি বা এসএসসির ফর্ম পূরণের মতো নৈমিত্তিক কর্মসূচি হিসাবে।

    ১৯. দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থার বিপরীতে রেস্টোরেটিভ বা পুনর্গঠনমূলক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কথা আমরা শুনতে পাই। এই ধারণাটি সম্পর্কে কিছু বলবেন…। কিভাবে এটি গড়ে উঠতে পারে?

    মানস: খুব অপ্রাসঙ্গিক না শোনালে বলব জনপদীয় সালিশ ব্যবস্থা কিংবা ভারতে যাকে গ্রাম পঞ্চায়েত বলা হয়ে আসছে, সেগুলোর ধারণায়ন কিন্তু এইরকম সমন্বয়মূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক, কিছুটা মোটাদাগে বললে। এটা গড়ে উঠতে পারে যেখানে শক্তিশালী সমাজব্যবস্থা বা ইংরাজিতে বললে কম্যুনিটি আছে। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে এই অনুবাদগুলো একদম নাট আর বল্টুর মতো মাপ করে করে হয়নি। বাংলায় দেশ বা সমাজ প্রায়ই ইংরাজি সনাতনী কম্যুনিটির কাছাকাছি। অন্যদিকে, আমরা লাগাতার সামাজিক অনুশাসনের নিন্দা করছি। অন্তত আমাকে সমাজের একজন অনুগত প্রজা হিসাবে ভাবার বিশেষ কোনো ঐতিহ্য নাই। আমার মনে হয় না, আপনারাও সেই দলে পড়বেন। যেখানে সারাক্ষণ সমাজের কঠোর নৈতিকতাধর্মি বলবানপক্ষীয় বজ্জাতিগুলোর আমরা নিন্দুক, সেখানে ‘শক্তিশালী’ সমাজের প্রস্তাব করার মাথামুণ্ড পাওয়া শ্রোতার জন্য দুরূহ। ফলে এইসব আলাপকে একদম নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতেই কেবল কিছুটা অর্থবহ করে বলা সম্ভব। সমাজ বা কম্যুনিটি বলতে তাহলে সেই অংশের কথা বলা হচ্ছে যেখানে গণতন্ত্র অধিক সুলভ; যেটা গুণগতভাবে ম্যানিপুলেটিভ নয়। আবার অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্রের অনেকগুলোতে কম্যুনিটি পুনর্গঠিত হয়েছে একটা ধারাবাহিক বিন্যস্ত প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। আরো নিশ্চিত করে বললে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, নরম আমলাতন্ত্র দিয়েই জনপদগুলোর কম্যুনিটিরূপ তৈরি করা হচ্ছে; ঠিক ঈশ্বরের ‘প্রাকৃতিক পল্লী’ এগুলো নয়। এসব প্রচেষ্টায় সেসব রাষ্ট্রে বৃহদায়তন শহর কিংবা শিল্পনগরগুলোকে না পারলেও অপেক্ষাকৃত অল্পব্যস্ত লোকালয়গুলোকে ‘কম্যুনিটি’ বানিয়ে ফেলতে পেরেছে; কিংবা সেরকম একটা সন্তোষময়তা আছে।

    শিল্পী: ক্রিস্টিনা কোয়ার্লস

    যদি ভাবতেই হয় যে, পুনর্গঠনমূলক বা সঞ্জীবনী বিচারব্যবস্থা বলে কিছু একটা আমরা ভাবতে পারি, সেটা ন্যায়বিচার হোক বা নাহোক অহিংস বিচারব্যবস্থা হওয়া সম্ভব, বা অন্তত কম–হিংস্র। তবে গোড়াতেই স্পষ্ট করার দরকার যে, অন্তত বুর্জোয়া অর্থেও যাকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বলে সেসবের নিশ্চয়তা হচ্ছে এইরকম শাস্তিব্যবস্থা (বা আপনি বলছিলেন বিচারব্যবস্থা) গড়ে তোলার একদম প্রথম দিকের শর্ত। উপরন্তু, দুর্নীতি বলতে মোটামুটি যাকে চেনা হচ্ছে, এবং যেগুলো দুঃখজনকভাবে দক্ষিণের সমাজে ঐতিহাসিকভাবেই বেশি, সেগুলোও এই ধরনের সৃজনশীল বিচারব্যবস্থাকে দাঁড়াতে দেবে না। তবে এই ধরনের বিচারব্যবস্থার সমর্থকদের একটা অংশ মনুষ্য–মহত্ত্বের উপর অনেক আস্থা রেখে ব্যবস্থাটাকে কল্পনা করেন। আমার মনুষ্য–মহত্ত্ব বা মনুষ্য–ক্রূরতা নিয়ে আলাদা করে কোনো আস্থা বা হতাশা নেই। এসব মিলেমিশে মনুষ্যচরিত্র গঠিত। পাহারাদারিত্বে আমার তীব্র আপত্তি হলেও, আমি মনে করি না যে মনুষ্য–ক্রূরতা কেবল জগাই–মাধাই কোলাকুলিতে পানি হয়ে যাবে। বরং, একটা সামাজিক/কম্যুনিটি পাহারাদারিত্ব থাকবে বলেই আক্রান্ত ও আক্রমণকারী একত্রে একটা পরিসরে গাঠনিক ভূমিকা নিতে পারবেন। এখন ওই কম্যুনিটির ‘শাসনপ্রণালী’ মৃদু বা কোমল হতে পারে, এর প্রজা ও প্রশাসকের সম্পর্ক হাস্যরসের হতে পারে, কিন্তু ব্যবস্থাটির মাজার জোর প্রগাঢ় না হলে কিছুতেই দুই পক্ষের সংমিশ্রণে ‘সম্ভ্রম’ উৎপন্ন করা সম্ভব নয়। এটা একটা গাঢ় ব্যবস্থাপনাগত বিচারব্যবস্থা হিসাবে আমি দেখি। অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের এদিকে এই ধরনের দূরবর্তী কোনো কল্পনার জন্যও সবই অপ্রস্তুত – রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, জনসমাজ।

    সমকালীন নারীর যাপন–অভিজ্ঞতা 

    ২০। একদিকে, নারী আন্দোলনকে ‘রাজনৈতিক‘ না ভাবার চল, অর্থাৎ এমনকি প্রগতিশীল/বৈপ্লবিক রাজনৈতিক পরিসরেও পুরুষাধিপত্য; অন্যদিকে খোদ অধুনা নারীবাদের ক্ষমতাপ্রীতি, সাথে আছে নারী স্বাধীনতার মোড়কে নব্য–উদারনৈতিক “সাফল্যগাথা“। দেখা যাচ্ছে যে, নারীর অধিকারের প্রশ্নকে রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেই ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা না কাটতে কাটতেই, [অনুশাসনমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক] ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জন হয়ে উঠছে নারীবাদের এজেণ্ডা। এই পরিস্থিতিতে আজকের দিনের প্রতিরোধী/ক্রিটিক্যাল নারীবাদকে কী কী জিনিস রপ্ত/রিক্লেইম করতে হবে বলে মনে করেন?

    মানস: বর্গমূলক পরিচয় অত্যন্ত বিপজ্জনক ও পিচ্ছিল, সেটা মানুষের বেলায় যেমন, প্রবণতার বেলাতেও। ‘নারীবাদী’ কে কিংবা ‘রাজনৈতিক’ কী এই ধরনের প্রশ্নগুলোতে হাজার লোকের প্রায় হাজারখানেক উত্তর বা আউটলেট থাকতে পারে। আজকে আমরা আলাপ চালানোর স্বার্থে উভয়পক্ষই কিছু লক্ষণ থেকে নারীবাদী বর্গকে আন্দাজ করে নিয়েছি। তবে যাবতীয় ক্ষমতা–সংঘাতকে রাজনৈতিক না–ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এখানে অবশ্যই নানান ধরনের উত্তরকাঠামোবাদী জিজ্ঞাসার বিপদ যে আছে তা তো আমরা জানিই। ‘সবকিছু রাজনৈতিক, মানে কোনোকিছুরই তাহলে আর বিশেষত্ব নাই’! এরকম একটা বিপদ থাকেই। নারী আন্দোলন তার থেকে ব্যাপকতর প্রসঙ্গ। একে রাজনৈতিক দেখতে না–পারা আসলে অজ্ঞতামূলক নয়, প্রতিপক্ষতামূলক। এখানে আমি এই বিষয়টা স্পষ্ট করতে চাই, আশা করি কোনো আলাপের পুনরাবর্তন হচ্ছে না, আমি সংঘর্ষ বুঝবার ক্ষেত্রে চারপাশের বিদ্বান ও রাজনীতিকর্মীদের লাগাতার জ্ঞানের ঘাড়ে চড়ার ঘোরতর বিরোধী। এমনকি বিরক্ত। ‘মানুষ অজ্ঞ, তাই উহা করিছে’ – এইটা কিছু ব্যতিক্রম বাদে আগাপাছতলা একটা ভুল থিসিস। ‘মানুষ উহা করিছে, কারণ তাই তিনি চান’! ফলে জ্ঞানের ‘আলো’ দিয়ে সংঘর্ষের প্রাথমিক ক্ষেত্রগুলো যাঁরা সারাই করতে চান তাঁদেরকে আমি দূর থেকে সালাম জানাই, এবং দূর থেকেই জানাই। ইন্টেন্ট বা নিয়ত বদলের কার্যক্রম ভিন্ন হবে। আমার না–জানা থাকতে পারে, পরিশেষে আমি একজন মাস্টারির চাকুরিজীবী মাত্র, কিন্তু সেটা ‘জ্ঞানের–আলো’ কার্যক্রম নয় তা বুঝি।

    একটা প্রশ্নে এফারমেটিভ একশনের আলাপ চলছিল। সমাজে বৈষম্য থাকলে সেগুলোকে সামলানোর একটা আধুনিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এটি। কিন্তু আপনি যে বাস্তবতাটার কথা বললেন সেটা সর্বৈব ভিন্ন একটা পরিস্থিতি। অনেকটা কৃষকদের সমবায় সমিতি আর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মধ্যকার তুলনার মতো। বিগত বছরগুলোতে সারা পৃথিবীর নারীবাদীদের মধ্যেই এই সতর্কতাটা তৈরি হয়েছে যে সাম্রাজ্যবাদ, বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ, সমরতন্ত্র ইত্যাদির গুরুতর সমর্থক নারীবাদী স্বর ময়দানে আছে। আরো স্পষ্টভাবে তাকালে, এমনকি তার আগেই কড়া জাতীয়তাবাদ কিংবা পুঁজিবাদের সমর্থক নারীবাদী স্বর বিরাজমান ছিল। এই ধরনের আধিপত্যমূলক নারীবাদকে চাইলে রাগ করে আমরা সিউডো বা ভ্রান্ত নারীবাদ নামে ডাকতেই পারি। কিন্তু তাতে সমস্যা গুরুতরভাবে কমছে না, কারণ সেসব স্বর নিজস্ব দাবিনামা থেকে সরছেন না। বরং, নানাবিধ বৈষম্য নিয়ে চিন্তা করছেন এমন নারীবাদীরা যে সতর্ক হয়েছেন সেটার দিকে আশা নিয়ে তাকানো কাজের বলে আমি মনে করি। ‘সাম্রাজ্যবাদী নারীবাদ’ ঠিক বিদ্যাগত একটা বর্গ হিসাবে না প্রতিষ্ঠা পেলেও পলেমিকের দুনিয়ায় কমবেশি আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্টের হামলার সময় থেকেই গ্রাহ্য হয়ে আসছে। একটা মুখ্য কারণ হলো আমেরিকার হামলা করবার নানান রকমের সাফাই–গাওয়া পক্ষ দেখা দিয়েছিল যাঁরা তালিবান শাসনে নারীদের দুরাবস্থার চিত্র হাজির করেছেন। বাহ্যত, তাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড নারীদের দুরাবস্থা থেকে ‘মুক্ত’ করার ‘স্যালভেশন মিশন’ হিসাবে চিত্রিত হতে পেরেছে। সকলেরই মনে পড়বে যে এই কাজটা নিছক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক নারীদের ছিল না, এমনকি সাধারণভাবে পাশ্চাত্যীয় নারীদেরও নয়, এটা আমাদের চারপাশে বহু নারী–অধিকার বিষয়ে সরবরাও করেছেন। এখন নিজের মনকে আপনি যেভাবেই বুঝ দেন না কেন যে এঁরা ‘প্রকৃত’ নারীবাদী নন, তাতে ওই মতপ্রকাশক বা সংগঠকের আগের বছরগুলোর নারীবাদী পরিচয়ের লিগ্যাসি সরানো সম্ভব নয়। এটা প্রচলিত বামপন্থীদের অনেকের বেলাতেও সত্য। তাঁদের অনেকেই তালিবানবিদ্বেষে আটকা পড়ে মার্কিন সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বরের সঠিক তীব্রতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না; কিংবা ‘যদিও–তথাপি’ দিয়ে সাজাচ্ছিলেন।

    এই মুহূর্তের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক কঠিন, বিপজ্জনক এবং পিচ্ছিল। বৈশ্বিক পুরুষাধিপত্যের কাঠামো নিবিড়ভাবে নিও–লিবেরেল মতাদর্শকে আশ্রয় করেছে যেমন, নারীবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও করেছেন। ব্যক্তিসমূহের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানে সুতীব্র, আর এক্সেলেন্সের ধারণাকে অধিকারের ধারণার উপর চড়াও হতে দেয়া হচ্ছে। সেই লজিকের গ্রাহক ও বেনেফিশিয়ারি দুই ভাবেই নারী আবির্ভূত হচ্ছেন। তবে এগুলো অন্তর্প্রবিষ্ট পরিক্ষেত্র বা ওভারল্যাপিং কন্টেস্টিং জোন। বিদ্যাজগতের ও রাজনীতি জগতে মোটামুটি নিও–লিবেরেল অভিধাটি যেহেতু পরিচিত, বোঝাবুঝিতেও তেমন সমস্যা হবে না। ক্রিটিক্যাল কিংবা সমাজতন্ত্রী কিংবা র‍্যাডিক্যাল কিংবা দক্ষিণের নারীবাদীদের পক্ষে আসলে অগ্রাহ্য/উপেক্ষা করতে থাকাই কাজ। সমতার জন্য লড়াইয়ে আছেন যাঁরা তাঁদের নানান কিছু ডিজওউন করতে থাকার অভ্যাস আছে। কেবল নামটা কম্যুনিস্ট পার্টি বলেই তো আর নিশ্চয়ই নিখিল বিশ্বের শ্রমিকপক্ষীয়রা চীনের পার্টিটাকে নিজপক্ষীয় মনে করতে থাকেন না।

    ২১। অনলাইন স্পেসে যে ধরনের নারীবাদের প্রাধান্য দেখা যায়, তার অনেক চর্চাই সত্যিকারের নারী আন্দোলন/অধিকারের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর বলে আমার অন্তত মনে হয়। প্রসঙ্গত স্মরণ করিয়ে দেই, এক সাক্ষাৎকারে আপনি মন্তব্য করেছিলেন: নেতৃত্বস্থানীয় হয়ে ওঠার প্রবণতা বাংলাদেশের নারীবাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনলাইন জগতে চর্চিত নারীবাদের আর কোন কোন প্রবণতাকে সমস্যায়িত করবেন?

    মানস: সাইবার পরিমণ্ডল প্রসঙ্গে ভাবতে গিয়ে আমি নারীবাদী বা সম্ভাব্য নারীবাদী নড়াচড়াগুলোকে আলাদা করে কোনো দায় দেবার পক্ষে নই। একটা প্রশ্নের উত্তরে আমি বলছিলাম সাইবার পরিমণ্ডলকে দেখতে হবে নিরন্তর ভাষা ও ভঙ্গি উৎপাদনের একটা উৎপাদনক্ষেত্র হিসাবে। প্রাক–সাইবার কালে ভাষা, তাই বার্তা, তাই অভিব্যক্তি, প্রকাশের জন্য সকলেরই যথেষ্ট সাংগঠনিক প্রস্তুতি লাগত। এখানে আমি সংগঠনের প্রচলিত অর্থে বলিনি, বলেছি কোনো একজন ব্যক্তির চিন্তার সংগঠন বা সংবদ্ধতার কথা বলছি। আট জন সখাসখীর একটা দল নিছক ক্যাম্পাসের মাঠে চা–খাবার কালেও যদি একজন কিছু একটা বলতে চান অন্য অন্তত ছয়জনের নৈঃশব্দ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। হাত–পা নাড়িয়ে তাঁদেরকে থামাতে চাইবেন আপনি, আপনার কথাটুকু বলার জন্য। মুদ্রিত মতামত বা অভিব্যক্তির বিষয়ে তো আরো সব পদক্ষেপ নিতে হতো। একটা পোস্টকার্ড কাউকে লিখে পাঠানোর আগেও আপনার কতগুলো ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তার মানে যেকোনো মানুষেরই অভিব্যক্তি প্রকাশের অনেকগুলো পর্যালোকীয় বা সম্পাদকীয় পর্যায় থাকতো। এটা ইচ্ছাসাপেক্ষ কোনো পরিস্থিতি নয়। সাইবার পরিমণ্ডলে রচয়িতা তাঁর সকল অভিব্যক্তিরই তাৎক্ষণিক সম্প্রচারের সুযোগ পান, তার পাঠক যতজনই হোন না কেন। অভিব্যক্তি প্রকাশের সম্পাদকীয় পর্যালোচনাহীন এই তাৎক্ষণিকতার বিষয়ে আমি সতর্ক থাকতে চাইব। ফলে নারীবাদীদের কারো কারো অভিব্যক্তিই কেবল নয় জাতীয়তাবাদী, পুঁজিবাদী, পিতৃতন্ত্রবাদী, নারীবিদ্বেষী, অন্যজাতিবিদ্বেষী কিংবা বামপন্থী সকলেরই উত্তুঙ্গ–উত্তেজিত অভিব্যক্তি প্রকাশিত হতে থাকে।

    আমার সাক্ষাৎকারটি আপনি লক্ষ্য করেছেন বলে ধন্যবাদ জানাই। তবে একটা আলাপের মধ্য থেকে একটা শিরোনাম আলাদা করে পড়তে অত স্বস্তিকর লাগছে না। আমার সামান্য ওই আলাপটার ভিতরে লক্ষ্য করবেন যে আমি ‘নৈতিকতার শাসন’ জারি রাখার প্রবণতা নিয়ে বেশি দুর্ভাবিত ছিলাম। এখনও তাই আছি। অনলাইন জগতের তৎপরতাতে নারীবাদী প্রবণতাগুলো কেবল যে ক্ষতিই করেছে তা আমি মনে করি না অবশ্য, যেটা আগেও বলেছি। নানান রকমের আপত্তির কারণে পুরুষদের একাংশ নানাবিধ অভিব্যক্তি প্রকাশে সতর্ক হয়েছেন, সংযমী হয়েছেন। সেগুলো অবশ্যই লাভ, তাতে পেটের মধ্যে যার যাই থাকুক না কেন। কিন্তু সত্যি সত্যিই আমি অনলাইনের হৈচৈমূলক নানান নড়াচড়াতে অতটা বিচলিত নই। আচরণবিধি একটা নিরন্তর অনুশীলনসাপেক্ষ বিষয়; এমনকি দরকার মতো নির্দেশনারও (যাকে চাইলে বুর্জোয়া সমাজের কারেকটিভ মেজার বলতে পারেন)। ধরুন একটা খেলার ময়দানে আপনি–আমি গেছি একটা দলকে সমর্থন করতে। যতক্ষণ নাচানাচি, পটকা ফোটানো, ঢোলবাজানো ছিল আমাদের হয়তো সমস্যা হয়নি; কিন্তু একটা পর্যায়ে আমাদের সহ–সমর্থকেরা ব্যাপক পিটানি দিতে শুরু করলেন প্রতিপক্ষকে। এই পর্যায়ে আপনি–আমি ব্যথিত হতে পারি তাঁদের আচরণে, কিন্তু ওই দলটিকে সমর্থন করার কারণে আপনার আমার আলাদা করে বিচলিত হবার দরকার পড়ে না। ওই পিটানিওয়ালাদের নিজপক্ষীয় ভেবে পদ্ধতিগত সমস্যাতেও পড়ার দরকার নেই। এখন মনে হতে পারে, যে খেলার উদাহরণ লঘু হয়ে গেল। কিন্তু আমি তা মনে করি না; বিভিন্ন মতের পক্ষাবলম্বনকারীরা ধারাবাহিক ও অটুট সব বৈশিষ্ট্যের মানুষ ধরে নেবার সমস্যা সেটা। চূড়ান্ত বিচারে আদর্শবাদের সমস্যা। আমি বিবিধ রাজনৈতিক পক্ষকে আদর্শমানসিদ্ধ অটুট পক্ষ হিসাবে দেখি না। ফলে এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া যে কোন কোন বিষয়ে আমি–আপনি দূরত্ব বোধ করছি; দরকার মতো ঘোষণা করছি। যদি সংশ্লেষ/সংশ্লেষণ পদ্ধতিগত হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্লেষ/বিযোজনও তাই। এটার ধ্রুব এবং প্রসঙ্গ–নিরপেক্ষ কোনো দশা নেই। স্পষ্ট করি যে, আমার বক্তব্য এই নয় যে সাইবারের অনেক নারীবাদী দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি করছেন না, আমার বক্তব্য হলো নতুন অভিব্যক্তি–পাটাতনে নতুন নতুন ক্ষয়ক্ষতি হবে এবং সেগুলো নেতিকরণের রাস্তা বের করাও একটা কাজ অন্যদের। সাইবারের অভিব্যক্তির ইনফ্লেশনের দুইটা সুবিধা মাথায় রাখা খুবই কাজের হবে। প্রথমত, এখানে বানের পানির মতো চলমান ভাষামালায় কোনো কিছু স্থির–অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ পায় না। দ্বিতীয়ত, একটা বিশেষ সময়ে কত রকমের বিদ্বেষ ও চিন্তাকল্প/প্রিমাইজ ক্রিয়াশীল আছে চারপাশের সমাজে তা আপনি অল্প আয়াসে সাইবার পরিমণ্ডল থেকে জেনে যেতে পারছেন।

    ২২। হালের নারীবাদী এজেণ্ডায় এমনকি মধ্যবিত্ত পরিসরের সকল নারীকে কল্পনা করা হয় বলে আমার মনে হয়নি। কোথাও না কোথাও এই নারীবাদী ডিসকোর্সে “transition” এর ধারণা বিদ্যমান থেকেছে। অর্থাৎ, মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যেও জ্ঞানগম্যি, প্রগতি, আধুনিকতা ইত্যাদিতে যে সকল নারীদের “উত্তরণ” ঘটেছে বলে মনে করা হয়; সেই সকল নারীই যেন বর্তমান নারীবাদের এজেণ্ডায় কল্পিত হচ্ছে। বাকি [মধ্যবিত্ত] নারীরা একটা ‘desired’ জীবন চিনতে শেখেননি বলে কতকটা আহা–চুকচুকের বাইরে তাদের কোন কোন সমস্যা নারীবাদের এজেণ্ডায় আসা উচিত, সেই সম্যক বোঝাপড়ার অভাব দেখতে পাই। আমার এই পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

    মানস: দুর্দান্ত পর্যবেক্ষণ। ট্রানজিশন বা রূপান্তরশীলতার ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটার অপেক্ষাকৃত সহজ উদাহরণ সম্ভবত মধ্যবিত্ত নারীদের পোশাক–বাছাই আর গৃহিণী–জীবন নিয়ে পাওয়া যায়। ডিজায়ার্ড/কাঙ্ক্ষিত জীবন চিনতে ‘শেখেননি’ যে বর্গ, সেই বর্গ বরং তুলনামূলকভাবে সাদরে গৃহীত হন। অন্তত এই কারণেও যে তাঁদের চিনানির দায়িত্বটা তখন আঁভাগাদে বা ‘অগ্রসর’রা নিতে পারেন। সমস্যাটা বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বেশি সেসব মধ্যবিত্ত নারীদের যাঁরা সম্প্রচারিত-‘কাঙ্ক্ষিত’ জীবনযাপনটা চিনেছেন এবং সেটা অবলম্বন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থেকেছেন। মোটের উপর তাঁদের অভিজ্ঞতা ‘এবিউজিভ’ বা জবরদস্তির আচরণ সামলানো। এর মধ্যে একটা বর্গকে না–বিবেচনা করার সুযোগ নেই যে বর্গের মধ্যবিত্ত–শিক্ষিত নারীরা আকাঙ্ক্ষিত জীবনাচরণ চিনেছেন, তা পালন করতে চান, কিন্তু পরিপার্শ্বের পৌরুষময় ব্যবস্থা তা পালন করতে বাধা দেন তাঁদের। এই বর্গের জন্যও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা প্রকাশ্য নারীবাদীরা নিতে পারেন, নিয়ে থাকছেন। আর এটা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেইও। কিন্তু অন্য যাঁদের কথা ভাবলাম তাঁরা আসলেই একটা টানাহেঁচড়ার মধ্যে থাকেন – একপক্ষের জন্য শেখার টানাহেঁচড়া, আরেক পক্ষের জন্য বদলানোর টানাহেঁচড়া।

    অন্যকে তালিম দেয়া বা রূপান্তরের এই আচরণগুলোর বা হৈচৈগুলোর ক্ষমতাদর্পিতা বা বুলিইং দেখতে পাওয়াটা সাধারণ বুদ্ধির বিষয়। আমি বরং আলাপ করি আচরণগুলো তৈরি হবার চিন্তাপাটাতন বা প্রিমাইজ নিয়ে। আমার বিবেচনায় কমবেশি প্রগতিবাদিতার স্থূল মডেলকে আত্মসাৎ করা থেকে এইসব আচরণ আসে। আরো নির্দিষ্টে আসে ধর্মকে পিতৃতন্ত্রের নিরঙ্কুশ কারণ হিসাবে দেখার মাধ্যমে। প্রধান ধর্মগুলোর চর্চিত ফর্মগুলো পিতৃতন্ত্রের আকর। এটা নিয়ে এই মুহূর্তে বিশদ করার কিছু দেখি না। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের মুখ্য বা একমাত্র রূপকার ধর্মকে ভাবা বাস্তবানুগ নয়। এমনকি এভাবে ভাবা পিতৃতন্ত্রকে দীর্ঘকালীন মোকাবিলার রাস্তা বের করতে অন্তরায় করবে মাত্র। মাস্টারি করি বলে প্রগতিবাদিতার স্থূল মডেলের কিছু উদাহরণ একদম সহজেই ক্লাসে পাওয়া যায়। বহুবছর ক্যাম্পাসে ‘স্মার্ট বনাম খ্যাত’ মাপামাপির একটা চল আছে। এখানে স্মার্টবর্গ অবধারিতভাবে আরবান–মিডলক্লাস, প্রায়শই হালের সাহিত্য–ছায়াছবির খোঁজ রাখা, ইংরাজি জানা, এবং অবশ্যই পোশাকে নির্দিষ্ট ফর্ম বা ব্র্যান্ডসচেতন। ‘খ্যাত’বর্গ এর বিপরীতগুলো। হালের সাংস্কৃতিক প্রডাকশন নিয়ে অজ্ঞ, ইংরাজি না–জানা বা কম–জানা ইত্যাদি। মোটের উপর ‘শহুরে–গ্রাম্য’ যে জোড়টা সাহিত্যে–চলচ্চিত্রে সুলভ সেটারই একটা সংস্করণ। এই বিভাজন কিন্তু কমবেশি লিঙ্গনিরপেক্ষ (ছিল)। এখন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (বা তার মধ্যকার বনেদীগুলোর) একটা স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক–পরিচয় তৈরি হবার কারণে, এবং অন্যান্য কারণেও, পাবলিক ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যকার এই বিভাজন অতটা তীক্ষ্ণ নয়। অন্তত আমি দেখি না। বিশেষত পোশাক–প্রবণতা বা ফ্যাশনের একটা অবধারিত বৈশ্বিক রূপান্তর ঘটেছে সাইবার–বিকাশে আর গার্মেন্টশিল্পের কারণে। এখন একজন আর্থিকভাবে টানাপড়েনে থাকা শিক্ষার্থীও একটা টি–শার্ট পরার ‘স্মার্টনেস’ দেখাতে পারেন। কিন্তু, যেসব পোশাক ধর্মীয় কোড বহন করে বলে ভাবা হয়, সেসব পোশাকধারীরা লাগাতার চাপের মধ্যে থাকেন। এবং দশাটা অতটা লিঙ্গনিরপেক্ষও নয়। মোটের উপর নারীদের চাপটা গুরুত্বপূর্ণভাবে বেশি। সহপাঠী বা ক্যাম্পাসবাসীদের চাপ তো আছেই, অধ্যাপকদের একাংশও ঠাট্টাতামাশা যে করেন তার অজস্র ঘটনা আছে, হয়তো প্রামাণ্য নেই। এখন কেউ উল্টাদৃশ্যের কথা বলতে পারেন যেখানে ‘পাশ্চাত্যীয়’ পোশাকধারী নারীর ভোগান্তিও আছে। আমি সেটাকে খাট করার জায়গায় নেই। কিন্তু প্রগতিবাদিতার এই আলাপে ওই ঘটনাগুলো অধিক প্রাসঙ্গিক যেখানে হিজাবী কিংবা সম্পূর্ণ শরীরঢাকা পোশাকধারীকে সাব্যস্ত করা হচ্ছে ‘অনগ্রসর’ (তাই মেরামতসাপেক্ষ) হিসাবে।‘

    শিক্ষিত নারীদের নিজেচ্ছাতে অচাকুরিজীবী গৃহিণী থাকা কিংবা শ্বশুরকুলের শাসনব্যবস্থায় থাকা কিংবা অবগুণ্ঠনে থাকার সুবন্দোবস্ত নাই। মানে এই থাকাথাকি তাঁর পক্ষে ‘বন্ধুবান্ধব’ (পিয়ারগ্রুপ) থেকে ব্যাপক চাপের হবে। বিপজ্জনক হচ্ছে যে নারীবাদীদের কেউ কেউও চাপটা দিয়ে বসতে পারেন। সঙ্কটটা আপনার প্রশ্নেই দিকনির্দেশ করে। এটা জীবনযাপনের আদর্শমান (স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইল কিংবা আপনার ভাষায় কাঙ্ক্ষিত জীবন) বলবৎ রাখার আধিপত্য। এগুলো সূক্ষ্মভাবে অজস্র বিষয়ে ক্রিয়াশীল থাকে, নারীবাদী তৎপরতাতেও আছে মাত্র। আপনার পরিবারের কোনো বিপদের মধ্যে আপনি শান্তভাবে কাজকর্ম করলেও আপনার ‘সংবেদনহীনতা’র অভিযোগ নিতে হতে পারে, আর পাঁচজন বিলাপরতদের সমরূপ আচরণ করার টানাহেঁচড়া চলতে পারে।

    ২৩। “যৌন স্বাধীনতা” বলতে কি বুঝতে হবে তার একটা অনুশাসন আছে খোদ সেক্যুলার–লিবারেল পরিসরেও। আবার ইন্টারেস্টিংলি “যৌন স্বাধীনতা” নিয়ে আলাপও আছে; আমার কাছে এই “স্বাধীনতা“র প্রশ্নটাকে অনুশাসনের প্রশ্ন মনে হয় ইদানীং। মানুষের খুবই জৈবিক অস্তিত্বের সাথে জড়িত এই যৌনতাকেও কেন শাসনের মামলায় পরিণত করতে হয়?

    মানস: ‘যৌন স্বাধীনতা’ আর অনুশাসন যে সম্পর্কিত ধারণা তা একদম গোড়াতেই কবুল করে বলছি। স্বাধীনতার প্রসঙ্গ গুণগতভাবেই শাসনের প্রসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত সেই অর্থে। আমি গোড়াতেই সতর্ক করতে চাইব যে ‘যৌন স্বাধীনতা’ বলতে লোকে অভিন্ন জিনিস বোঝেন না, এবং সম্ভবত সাংঘর্ষিক জিনিসপত্রও বোঝেন। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেব যে পাশাপাশি কয়েকটা ভাষামালা আছে যেগুলোর ভারে বা অর্থময়তার মধ্যে এই ধারণাটাও জুড়ে যায়। যেমন: ‘অবাধ যৌনাচার’, ‘ফ্রি–সেক্স’, ‘যত্রতত্র বা যার তার সাথে’, ‘বাছবিচার নাই’, ‘পশুর সাথে পার্থক্য নাই’, ‘অজাচার’, ‘লুজ’, ‘চরিত্রের ঠিক নাই’ ইত্যাদি। এরকম আরো দীর্ঘ তালিকা বানানো সম্ভব; আর এগুলো, ভাষানির্দিষ্ট অর্থ রাখলেও, মোটামুটি বৈশ্বিক। আপনি যে ভাবনা মাথায় রেখেই ‘যৌন স্বাধীনতা’ শব্দমালা প্রয়োগ করেন না কেন, যেসব ডিসকার্সিভ পরিমণ্ডলে তার অর্থ নির্ধারিত হবে সেগুলো সমূহ ঘোরালো–প্যাঁচালো এবং নৈতিকতার ধ্বজাধারী। এর প্রথম মানেই দাঁড়ায় বহুগামিতা। ফলে খুবই মুস্কিলের প্রসঙ্গ।

    অন্যদিকে, ‘প্রেসের স্বাধীনতা’র মতোই, এটা একটা অতিকথন বা মিথও। যেসব রাষ্ট্রসমাজে যৌন স্বাধীনতা আছে বলে ধরে নেয়া হয় সেখানেও নানান মাত্রার ও প্রকারের অনুশাসনের পদ্ধতি চালু আছে, যদি, অবশ্যই, অনুশাসনকে স্বাধীনতার বিপরীত ধরে নিই। আপনার প্রশ্নেও সেটাই আছে। কাজ চালানোর জন্য অনুশাসনের অর্থ করছি নানাবিধ নৈতিকতাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ। একটা উদাহরণ মনে পড়ল। ২০০৪–এ দিকে জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা ফাতিহ্ আকিন তুর্কী–জার্মান–ইংরাজি ভাষার একটা ছবি বানান, ইংরাজিতে যার নাম হেড–অন। ছবির মুখ্য চরিত্রে নেয়া হয়েছিল সিবেল কেকিলি নামের তুর্কী–জার্মান এক অভিনেত্রীকে। ছবিটি জনপ্রিয় হয়, আবার চিন্তকদের মনোযোগও পেয়েছিল। ছবিটা বেশ কিছু পুরস্কারও পায় গোল্ডেন গ্লোবসমেত। কিন্তু সিবেক কেকিলিকে এই ছবিতে নেবার কারণে জার্মান মধ্যবিত্ত আলাপ–আলোচনায় নির্মাতা অত্যন্ত নিন্দিত হন। কারণ সিবেল পর্নছবিতে কাজ করতেন এই ছবির আগে পর্যন্ত। আমি এই ঘটনা টাটকা জেনেছিলাম জার্মান এক বন্ধুনির কাছ থেকে যিনি এই ছবিতে আলোকচিত্রীদের একজন হিসাবে কাজ করেছেন। ফাতিহ্ আকিন ও নির্মাতাদলের নিন্দিত হবার মাধ্যমে অনুশাসনের বিষয়ে পাশ্চাত্যীয় সমাজের পরিস্থিতি বোঝার বিরাট সুযোগ তৈরি হয় আমাদের। জার্মানিতে পর্ন কারখানা আইনসিদ্ধ, ফলে সেবিলের নিয়োগ আইনগত কোনো সমস্যা ছিল না; ছিল নৈতিকতার আপত্তির বিষয়। বেশ আয়রনিক যে, এর কয়েক বছর পরে, ‘রক্ষণশীল’ বলে পরিচিত ভারতে আরেক পর্নতারকা সানি লিওন অপেক্ষাকৃত সহজে মধ্যবিত্ত মননে ‘গৃহীত’ হয়েছেন। লক্ষ্য রাখতে অনুরোধ করি, পর্ন–কারখানা বিষয়ে পক্ষ–বিপক্ষের আলাপের জন্য এই উদাহরণ আমি আনিনি। আমার বলার জায়গা, যৌন–স্বাধীনতা কিংবা যৌন–অনুশাসনের যে আন্দাজগুলো চালু আছে তা প্রায়শই ত্রুটিপূর্ণ। সম্ভবত আপনার, বা অনেকেরই, দুর্ভাবনার জায়গা হতে পারে কোথায় অনুশাসন নিছক নিন্দামন্দেই সীমিত, কোথায় তা হিংস্রতায় মদদ দিতে পারে।

    আপনার প্রশ্নের শেষাংশটি বরং আমি খানিকটা অভিমানাত্মক মনে করি। হয়তো এটা বিরক্তির মরিয়াপনা থেকে এসেছে। কিন্তু ‘জৈবিক’ বিষয় কেন অনুশাসনে পড়বে এই জিজ্ঞাসা আমার জন্য নিরর্থক। প্রথমত, যৌনতাকে জৈবিক–মাত্র বলার বিপদ নতুন করে বাধানোর কোনো কারণ নেই। নারীবাদীরা বছরের পর বছর লিঙ্গকে সমাজ–সংস্কৃতির প্রসঙ্গ হিসাবে দেখিয়ে এসেছেন। যৌনাচরণও নিছক ‘জৈবিক’ নয়। দ্বিতীয়ত, যদি ‘জৈবিক’ ধরেও আমরা আগাতে চাই, তাহলেও অন্তত কয়েক শ’ বছর ধরে শ্রমিকদের বড় অংশের বিশ্রামহীনতা নিয়ে আগে ‘অভিমান’ করা দরকার। ঠিক আমরা যখন এই আলাপ লিখছি, পৃথিবীর পেটের মধ্যে কোটি কোটি খনিশ্রমিক দিনরাত্র অন্ধকারে ‘সম্পদ আহরণ’ করছেন। অন্য আরো কোটি কোটি শ্রমিক ভূতলে থাকলেও ন্যায্য মজুরি বা বিশ্রাম কোনোটাই পাচ্ছেন না, যেখানে ‘ন্যায্য’কে বড়জোর বুর্জোয়া ব্যবস্থার ন্যায্য বোঝাচ্ছি। খাদ্য বা বিশ্রামকে বরং ‘জৈবিক’ হিসাবে দেখা দরকার; আর সেখানে চলে কঠোর ধরনের শোষণ, অনুশাসনের থেকে যা নিশ্চয়ই তীব্র। যাহোক, অবশ্যই আমি সরল সমাধান জানি না। আর কেবল আমি নই, গাঢ় সব চিন্তকেরা, তীক্ষ্ণ নারীবাদীরাও রাস্তা বা উত্তর খুঁজছেন। কিন্তু যৌনতার বিষয়ে তামাম দুনিয়াতেই মারাত্মক লজ্জাশরমের যে কাঠামোটা আছে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হতে পারে, সেই কাঠামোটার সঙ্গে বোঝাপড়া করা দরকার। অন্তত যেসব এলাকায় শারীরিক আক্রমণমূলক হিংস্রতার মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা কম, কেবল কলঙ্ক হবে, সেসব এলাকায় যৌনশুচিতার চাপ বহন না করার ঘোষণা আসা দরকার। ঝুঁকি সত্ত্বেও, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যৌনশুচিতার চাপ নারীর জন্য স্বতন্ত্র হতে পারে, কিন্তু চাপমুক্তির ঘোষণাটা নারীপুরুষসমেত সকল লিঙ্গের যৌথ পাটাতন হওয়া দরকার। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, এমনকি নারীবাদীদের মধ্যেও যৌনশুচিতার বা পিউরিটির গুরুতর সব প্রবক্তা রয়েছেন, বা তার আলামত আছে। সবই অত্যন্ত ওভারল্যাপিং পরিস্থিতি।

  • ক্যারোলিন।। লৈঙ্গিক পরিচয়ের রাজনীতিকরণ: একটি বৈপ্লবিক লিঙ্গীয় রাজনীতির দিকে যাত্রা

    ক্যারোলিন।। লৈঙ্গিক পরিচয়ের রাজনীতিকরণ: একটি বৈপ্লবিক লিঙ্গীয় রাজনীতির দিকে যাত্রা

    • অনুবাদ: অধরা শ্রেয়সী অথই

    [লিঙ্গ কর্তৃত্ব প্রকৃতি বিষয়ক সংগঠন উপৌলের সৌজন্যে অনুবাদটি অরাজে প্রথম প্রকাশ হলো। ক্যারোলিনের Politicizing Gender Moving toward revolutionary gender politics শীর্ষক রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় 1994 সালে। বর্তমান অনুবাদটি নেয়া হয়েছে Anarchist Library-র ওয়েবসাইট থেকে। – সম্পাদক]

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    নারীবাদী ডিসকোর্সসমূহে সামাজিক নির্মাণবাদী ও জৈবিক নির্ধারণবাদিদের মধ্যকার নিরন্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই তাদেরকে সেইসব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, নারীবাদীরা আসলে যাদের মুক্তির প্রত্যাশা করেন। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো নিয়ে একটি গঠনমূলক বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে যে দ্বন্দ্ব এবং প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে আমার রাজনৈতিক বোধের জন্ম হয়েছে, তার মাঝে নিজেকে শনাক্ত করা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন ২৬ বছর বয়েসি রূপান্তরকামী নারী হিসেবে শুধুমাত্র নৈরাজ্যবাদী এবং নারীবাদী অবস্থান থেকে আমি এসব ঘটনার মুখোমুখি হইনি। ছোটোবেলা থেকেই ব্যক্তিগত মুশকিলগুলোর সাথে বোঝাপড়া করতে করতে আমার লিঙ্গীয় রাজনীতিবোধের বিকাশ ঘটে। বয়সের সাথে সাথে একজন কিশোরী এবং পরবর্তীতে নারী হিসেবে আমার আত্মপরিচয় এবং একজন পুরুষ হিসেবে আমার সামাজিক পরিচয়ের মধ্যকার বেদনাদায়ক বৈষম্য আমি উপলব্ধি করতে থাকি। সে সময় থেকেই আমি প্রথাগত লিঙ্গপরিচয়ের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করি। নিজ পরিচয় প্রকাশ করা আমার জন্য সহজ ছিল না। এই পরিচয়ের সাথে বোঝাপড়া আমাকে লিঙ্গ–পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। আমার অর্থনৈতিক অবস্থাসহ অন্যান্য অনেক বিষয় এই প্রক্রিয়াকে আরও বর্ধিত করেছে। একটি পুরুষ দেহে অদৃশ্য নারীসত্তাকে বয়ে বেড়াবার সেই এলোমেলো কালপর্বেও একজন মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ “পুরুষ” হিসেবে প্রাপ্ত সুবিধাগুলোর ব্যাপারে আমি সচেতন ছিলাম। প্রচলিত লিঙ্গ–পরিচয় একটি আরোপিত ধারণা। জৈবিক ভিত্তি অনুযায়ী লিঙ্গসমূহের শ্রেণিবিভাগ আমাদের স্বাধীনতাকে সংকীর্ণ করে ফেলে। এই ধারণা অনুযায়ী লিঙ্গ–পরিচয় প্রশ্নে আমাদের কারও কোনো মতামত থাকে না।

    অন্য নারীদের সাথে নিজের মিল ও অমিলগুলোর মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অনন্যতাকে অগ্রাহ্য না করা, আবার আমাদের নিপীড়নগুলোর স্তরীকরণ না করে ফেলাটাও আমাদের জন্য জরুরি। রূপান্তরকামী মানুষেরা যে নির্দিষ্ট প্রকার জুলুমের শিকার হন তার স্বরূপ উদঘাটনের মধ্য দিয়ে আমরা এই নিপীড়নগুলোর সাথে বোঝাপড়া শুরু করতে পারবো। আর তা কেবল তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আমরা মোকাবেলায় “ঝাঁপিয়ে পড়বো”— শেরি মোরাগার বর্ণনা অনুযায়ী— “আমাদের নিজস্ব জুলুমের একেবারে গোড়ার সাথে। আমাদের মধ্যকার এবং বাইরের শত্রুদেরকে চিহ্নিত না করা পর্যন্ত নিপীড়িতদের মাঝে প্রকৃত, ক্রমকর্তৃত্বশূন্য যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব নয়।”

    রূপান্তরকামিতা: পরিচয় ও ক্ষমতার সীমারেখা

    নারী–পুরুষ বাইনারির ভেতর যারা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেন না, তারা সকলেই আমাদের দলে। চিকিৎসা শাস্ত্রে একে “রূপান্তরকামিতা” কিংবা “জেন্ডার ডিসফোরিয়া” হিসেবে আখ্যা দেওয়া খুব বেশি আগের ঘটনা নয়। রূপান্তরকামিদের সংজ্ঞায়িত করা হয় মূলত এমন মানুষ হিসেবে, দীর্ঘকালব্যাপী যারা বিবিধ বেমানান লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য নিজেদের ভেতর ধারণ করে আসছেন। যৌনতা বিষয়ে এই লঘু ধারণায়নের ফলে যেসব রূপান্তরকামীরা মানসিক ও শারীরিক সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা নিতেন (এবং তা নেওয়ার সামর্থ্য রাখতেন), তাদের লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারিত হতো আলফ্রেড কিনসের যৌনতা–পরিমাপক মডেল অনুযায়ী। তারপর সেই পরিচয় বাস্তবায়নে কী কী করতে হবে, সেই বিষয়ে তাদের নির্দেশনাও দেওয়া হতো। বলা বাহুল্য, চিকিৎসা “বিশেষজ্ঞদের” প্রণীত এসব বিকল্প পথগুলোও যথেষ্ট রক্ষণশীল ছিল। আরোপিত বিষমকামিতা থেকে শুরু করে পোশাক–আশাক ও আচরণের শক্ত মাপকাঠি বেঁধে দেওয়া সবই এরমধ্যে পড়তো। ১৯৭৩ সাল পর্যন্তও যেখানে সমকামিতাকে মানসিক ব্যাধি হিসেবে দেখা হতো, যেখানে মনরোগ শাস্ত্র এখনও রূপান্তরকামিতাকে এই চোখে দেখে, সেখানে তাঁদের সবচেয়ে ঐকান্তিক সহায়তাগুলোকেও আমরা যথেষ্ট সংশয় নিয়েই বিবেচনা করবো।

    লিঙ্গ পরিচয় কেবল মানুষের মনস্তাত্বিক অবস্থাই নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থানও বটে। রূপান্তরকামিতাকে আমি স্বাধীনতারই ভাষা হিসেবে দেখি, যা আমাকে অন্যান্য সকল দলিত লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের সাথে একাত্ব হয়ে মুক্তির একটি সর্বজনীন ভাষা তৈরির প্রেরণা দেয়। এই পরিচয় বুলড্যাগার, ট্র্যান্সভেসটাইট, ড্র্যাগ কিং, ড্র্যাগ কুইন, ফেম, জেন্ডারফাকস, উভলিঙ্গ কিংবা যারা কোনো নির্দিষ্ট বিভাজনের মধ্যে থাকতে অস্বীকার করেন— তাদের সকলকেই রূপান্তরকামিদের সাথে ঐক্যবদ্ধ করে। যদিও এসব গোষ্ঠীগুলোতে এই অবস্থানের বহুল প্রচলন নেই।

    নারীমুক্তি: কেমনতর বিপ্লব?

    ১৯৬০–এর শেষভাগে নাগরিক অধিকার ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ উঠে আসে। নারীরা তাদের সাথে ঘটা নিপীড়নের স্বরূপ উপলব্ধি করতে শুরু করেন, এবং এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ইচ্ছুক দলগুলোতে কীভাবে এসব নির্যাতন ঘটে, তা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে শুরু করেন। বিবিধ বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া প্রথম দিককার এই আমূল–পরিবর্তনকামী নারীবাদিদের মধ্যে পুঁজিবাদ বিরোধিতার একটি প্রবণতা ছিল। নারীমুক্তি প্রসঙ্গে বিভিন্ন বৈপ্লবিক চিন্তাধারারও চর্চা করতেন তারা। লৈঙ্গিক পরিচয়কে নীপিড়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো। কেননা এটি মেয়েলিপনা ও মর্দামির কৃত্রিম ভূমিকা নির্মাণ করে, যা আখেরে সমাজে পুরুষাধিপত্যকেই বৈধতা দেয়। পুঁজিবাদ এই পুরুষাধিপত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে, কিন্তু শুধুমাত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর নারীরা বিবিধ পথের অন্বেষণ করছিলেন। লৈঙ্গিক সারবাদী (essentialist) রাজনীতি এই আন্দোলনের সাথে শুরু থেকেই ছিল, তবে ১৯৭৩ সালের দিক থেকে সাংস্কৃতিক নারীবাদ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। অ্যালিস ইকোলস যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যেহেতু “মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভবনা দূরবর্তী বলে মনে হয়েছিল” তাই নারীবাদকে “নারী–নীতি” হিসেবে পুনঃব্যাখ্যা করা হয়।

    স্বাধীনতার এই পথে দৃঢ় পায়ে অগ্রসরমান সেই নারীরা কী উন্মাতাল শক্তির আকরের দেখা পেয়েছিলেন তা আমরা আজ কল্পনাও করতে পারি না। “ভগিনীবোধই (sisterhood) শক্তি” শুধুমাত্র শ্লোগান কিংবা বইয়ের শিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং নারীদের প্রতি যুগ যুগ ধরে চলে আসা পদ্ধতিগত জুলুমের যে স্বরূপ হঠাৎ মানুষের সামনে আসে, তারই গণ–স্বীকৃতি এই বাণী। অনেক আন্দোলনকারীর মতে আন্দোলনের মূলসুরটি ছিল এই যে, নারীদের অভিজ্ঞতাগুলো মূলত একই, পার্থক্যটা কেবল বাইরে থেকে চাপানো। এটা একেবারে যুক্তিহীন কথাও নয়। গোড়ার দিককার এই নারীবাদিদের বেশিরভাগই ছিলেন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত শ্বেতাঙ্গ, বামপন্থী, কলেজ পড়ুয়া নারী। আন্দোলনের পরিসর বাড়তে শুরু করলে বিভিন্ন শ্রেণি ও পরিবেশের নারীরা এসে যুক্ত হতে শুরু করেন। তাদের অনেকে শুধুমাত্র আত্ম–সহায়তার জন্যই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন, সমাজের আমূল পরিবর্তন তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

    যদিও ১৯৬৮ সালের দিকে আন্দোলনটিকে ঐক্যবদ্ধ মনে হয়, ১৯৭০’র মধ্যেই এটি নানান প্রতিদ্বন্দ্বী দলে–উপদলে বিস্ফোরিত হতে থাকে। নিক্সনের নির্বাচনের সময়কার তীব্র দলবাজি এবং ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যে সাংস্কৃতিক নারীবাদের এই পাল্টা–সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক উদারতা নিশ্চয়ই মানুষের কাছে বেশ আশাপ্রদ মনে হয়েছিল।

    ক্যাথলিন ব্যারি এবং রবিন মরগ্যানের মতো সাংস্কৃতিক নারীবাদীরা একটি সংঘাতমুক্ত, আপামর ভগিনীবোধের প্রস্তাব করেছিলেন। স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল নারীত্বের এমন এক অবস্থা হিসেবে যা বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যের ঊর্ধ্বে। নারীবাদী পাল্টা–সংস্কৃতিতে, বা এমন কোনো গোষ্ঠী যারা যাপনের হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক সংগ্রামে ছাড় দিয়ে আরোপিত একাত্মতা মেনে নিয়েছেন— এমন জায়গায় বিপ্লবের কথা তোলা মানে “পুরুষ প্রভাবিত” হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    অন্যদিকে, অ্যান স্নিটো, প্যাট পার্কারের মতো আমূল–পরিবর্তনকামী নারীবাদীরা ১৯৬৭–র দিকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, নারী নিপীড়নের শিকড় পুঁজিবাদ এবং পুরুষাধিপত্যে প্রোথিত। যৌনতাবাদকে (sexism) একটি মনস্তাত্বিক অবস্থা হিসেবে দেখা হতো, এবং বর্তমান কিংবা অতীতে যতক্ষণ পর্যন্ত পুরুষেরা নারী নিপীড়নের সাথে জড়িত থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এভাবেই এই র‍্যাডিকাল নারীবাদীরা মার্ক্সবাদী এবং বামপন্থীদের চিন্তা প্রণালীর কিছু অংশ গ্রহণ করেছেন, আবার নারীদের প্রতি বৈষম্যের এই বিষয়টিকে বৃহৎ পরিসরে তুলে না ধরায় তাদের সমালোচনাও করেছেন। সাংস্কৃতিক নারীবাদিদের কাছে আবার বামপন্থী এবং পুরুষ সম্পর্কিত সকল কিছুই ছিল রীতিমতো দূষিত। এর ফলে দেখা গেল নারীরা পরস্পরের উপর একেবারে পুলিশি নজরদারি চালিয়ে সম্মিলিতভাবে “মরদতান্ত্রিক” রাজনীতি ও তাদের আলোচিত সমাধানগুলি প্রত্যাখ্যান করছেন।

    সাংস্কৃতিক নারীবাদীদের মত হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে জন্মগত, অপরিবর্তনীয় পার্থক্য রয়েছে। এবং এর উৎস ঐতিহাসিক, সামাজিক কিংবা জৈবিক যা–ই হোক না কেন— তাদের মতে— এই পার্থক্যের মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। একে সুরক্ষিত এবং সংরক্ষিত রাখা উচিত। সকল পুরুষকেই, বা “মর্দামি”র সকল কিছুকেই নির্বিশেষে নিপীড়ক হিসেবে বিবেচনা করা হতো (এমনকি লিঙ্গবৈষম্য–বিরোধীদেরও রক্ষা ছিল না)। বুচ ও ফেম লেসবিয়ান, স্যাডোম্যাসোচিজম ডাইকস, পর্নোগ্রাফিপন্থী নারীবাদী, যৌনকর্মী, ট্রান্সভেস্টাইট, রূপান্তরকামী, বিপ্লববাদী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নারীরাও এর বাইরে ছিল না। জেন অ্যালপার্টের ঘটনাটাও এরকমই।

    লৈঙ্গিক সারবাদ (essentialism) : প্রতিক্রিয়াশীল নারীবাদ

    ১৯৬৯ সালে অ্যালপার্ট যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িত ছিলেন। তার প্রেমিক স্যাম মেলভিলসহ তিন সহযোদ্ধা সমেত ধরা পড়ে যাবার পর অ্যালপার্ট জামিনে বের হয়ে আসেন এবং পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। এর কিছু পরে তিনি ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড অর্গানাইজেশন (ডাব্লুইউও) নামে মূলত শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবীদের একটি দলে যোগ দেন। তার পরপরই তিনি এই দল থেকে সরেও আসেন। এই সময় তিনি তার বহুল পঠিত ও অত্যন্ত প্রভাবশালী নিবন্ধ “মাদার রাইট: এ নিউ ফেমিনিস্ট থিওরি” রচনা করেন। এই লেখাটি সাংস্কৃতিক নারীবাদের আলোচনায় একটি দুর্দান্ত সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

    এই প্রবন্ধে অ্যালপার্ট সমস্ত বামপন্থী বিপ্লবী দলগুলোকে তাদের অন্তর্জাত মর্দামি প্রবণতার জন্য ধিক্কার জানান। তিনি ডাব্লুইউও সংগঠনের ভেতর লিঙ্গবৈষম্যের বিস্তারিত বিবরণ দেন এবং প্রেমিক স্যাম মেলভির সাথে— যিনি ১৯৭১ সালে অ্যাটিকা কারাগারে একটি বিদ্রোহের সময় খুন হন— নিজের ঘনিষ্ঠতার বিশদ বিবরণ দেন। তিনি লেখাটি শেষ করেন এক চূড়ান্ত আহ্বানের মধ্য দিয়ে, “তাই, ওয়েদারম্যানের বোনেরা আমার, অ্যাটিকার জন্য তোমরা প্রস্তুত হও। নিজেদের সংগঠিত করো। সংবাদপত্রে এই নিয়ে কী লেখা হচ্ছে আমি জানতে চাই না। এই মৃত্যু তোমাদের কতটা ব্যথিত করে, তাও আমাকে বলতে এসো না। এই ৪২ জন আধিপত্যবাদির মৃত্যুতে আমি আর শোকগ্রস্ত হবো না।”

    এর কিছুকাল পরেই অ্যালপার্ট এফবিআইয়ের কাছে আত্মসমর্পন করেন। এফবিআই সগর্বে ঘোষণা করেছিল যে, অ্যালপার্ট তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতা করছেন এবং তার আন্ডারগ্রাউন্ডকালীন অভিজ্ঞতাও সবিস্তারে বর্ণনা করছেন। যদিও তিনি আসলে কী তথ্য এফবিআইকে দিয়েছেন তা তর্কসাপেক্ষ বিষয়। অ্যালপার্টের দাবি ছিল এফবিআইয়ের কাছে তিনি কোনো সত্য খবর ফাঁস করেন নাই। যদিও ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে অ্যালপার্টের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্যাট সুইনটনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে, আত্ম–সংরক্ষণ আইনের আওতায় অ্যালপার্ট আদালতে সুইনটনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ সেসময় জেল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা মিডনাইট স্পেশাল “নারী কয়েদিদের সতর্ক করে দিয়েছিল যে, তাদেরই মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতক রয়েছেন।”

    জেন অ্যালপার্টের সমর্থনে রবিন মরগ্যান একটি নারীবাদী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। তারা ডাব্লুইউও’তে “পুরুষ সহিংসতা” খণ্ডানোর ক্ষেত্রে অ্যালপার্টের ভূমিকা নিয়ে সোচ্চার হন এবং কারাভোগের দুই বছর তাকে সহযোগিতা প্রদান করেন। অথচ ওই একই বছরে ঘোষিত সমকামী এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বিপ্লবী সুসান স্যাক্সকে যখন গ্রেপ্তার করা হলো, তখন সমকামী নারীবাদী গোষ্ঠীর বেশিরভাগ সদস্যই দলের ভেতর এফবিআইয়ের ছোঁকছোঁকানির দায় চাপান তার উপরই। তারা বলতেন, “কারও উপর ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ আসলেই সে সমকামী হয়ে যায় না।” অবশেষে প্রাক্তন ডাব্লুইউও নেতা অ্যালেন ফ্র্যাঙ্কফোর্ট ক্যাথি বুদিন এন্ড দ্য ড্যান্স অব ডেথ বইয়ে এক চাঞ্চল্যকর বিবরণীতে এই নারীদের কথা লেখেন। যৌন সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতার চর্চাকে অবলুপ্ত করতে না পারার অক্ষমতা, এবং সমাজে মাতৃত্বের ভূমিকা ও ক্যাথি বুদিনের মায়ের প্রশান্তিবাদকে প্রত্যাখ্যানের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে এই নারীদের ভূমিকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন ফ্র্যাঙ্কফোর্ট।

    সশস্ত্র সংগ্রাম নিয়ে গবেষণা করার সময় এর ভেতরকার সম্ভাব্য হঠকারী অ্যাডভেঞ্চার, নাস্তিবাদ কিংবা ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়াশীলতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে এগোনোই ভালো। ডাব্লুইউও‘র ইতিহাসে পুরুষালি চালচলনের প্রবণতা তো কিংবদন্তির মতো। যদিও সাংস্কৃতিক নারীবাদীরা মানুষ ও মনুষ্য আচরণকে কেবল পুরুষালি ও মেয়েলি ছাঁচে বিভক্ত করতেই আগ্রহী বলে মনে হয়। সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদেরকে কখনো প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় না।

    পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হওয়া ট্র্যান্সসেক্সচুয়ালদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহানুভূতির জায়গায় পৌঁছাতেও সাংস্কৃতিক নারীবাদিদের এখনো অনেক পথ যেতে হবে। রূপান্তরকামিতার ধারণাটা তাদের কাছে বেশ অস্বস্তির, কেননা এটা স্পষ্ট দেখিয়ে দেয় যৌনতা পরিবর্তনশীল। জেনিস রেমন্ডের বই দ্য ট্র্যান্সসেক্সচুয়াল এমপায়ার–এ তিনি রূপান্তরকামিদের সমালোচনা করেছেন। “নারীদের জীবতত্ত্ব দখল করে বসে আছে,” যদিও তারা কখনোই সম্পূর্ণ নারী হতে পারবে না। রেমন্ডের মতে রূপান্তরকামীরা আসলে “নারীদেরকে ধর্ষণ করে”, বিশেষত সমকামী ট্র্যান্সসেক্সচুয়ালরা, যারা অন্যান্য সমকামী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার মতে এটা “বিপরীতকামিতার উচ্ছিষ্ট।”

    গাইন/ইকোলজি বইতে ম্যারি ডেলি বলেন, রূপান্তরকামীরা আসলে নারী সম্প্রদায়কে নির্মূল করতে চান। তিনি লেখেন, “তাদের উপস্থিতি নারীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, এবং তা আমাদের ভেতরকার বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দেয়।” এসব প্রচ্ছন্ন ষড়যন্ত্র–তত্ত্বগুলো অতটাও বিরক্তিকর লাগতো না, যদি সেগুলো এত বিরাট পরিসরে গ্রহণযোগ্যতা না পেত। “পুরুষ–চিহ্নিত” সবকিছুর প্রতিই রবিন মরগ্যানের প্রাক্তন সম্পাদকের আক্রমণ থেকে শুরু করে মিশিগান উইমেন্স ফেস্টিভ্যালে “শুধুমাত্র জন্মগতভাবে নারীদের জন্য” প্রযোজ্যতার ঢালাও নীতি কিংবা ব্র্যান্ডন টিনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নারীবাদিদের প্রেস কভারেজ— লিঙ্গ–আতঙ্ক আমাদের মাঝে জেঁকে বসে আছে। তীব্রভাবেই আছে।

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    ব্র্যান্ডন টিনা: অস্বীকৃতির নজির

    ব্র্যান্ডন টিনা ছিলেন একজন রূপান্তরকামী পুরুষ। তার আদি নাম ছিল টিনা ব্র্যান্ডন। ছোটোবেলাতেই তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং নেব্রাস্কার বৃহত্তর শহর ফলস সিটিতে আশ্রয় নেন। এখানে তিনি একজন পুরুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন এবং বিষমকামী সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লানা টিসডেল নামক এক নারীর সাথে তার গভীর প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল। এসময় ব্র্যান্ডন খুচরা চুরি–ছিনতাই এবং জাল চেক লেখার কাজে জড়িয়ে পড়েন। জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশের কাছে ধরা পড়বার পর ইচ্ছাকৃতভাবে তার জন্মপরিচয়টি স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশ করে দেয়া হয়। তার পরপরই, ১৯৯৩ সালের ক্রিসমাসের আগেরদিন, লানার প্রাক্তন প্রেমিক ও তার বন্ধু মিলে ব্র্যান্ডনকে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে। পুলিশকে ব্র‍্যান্ডন এই ঘটনার কথা জানালেও তারা কিছুই করেনি। এর এক সপ্তাহ পর নববর্ষের প্রাক্কালে ওই দুই ব্যক্তিই ব্র্যান্ডনকে কুপিয়ে জখম করে এবং গুলি করে হত্যা করে। মূলধারা এবং বিভিন্ন বিপ্লববাদী সংবাদমাধ্যমগুলোতে বারবার ব্র্যান্ডনকে একজন নারী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছিল— একজন প্রতারক, এবং আত্মঘৃণিত সমকামী নারী।

    দ্য ভিলেজ ভয়েজ–এ প্রকাশিত ডোনা মিনকোভিচের “লাভ হার্টস” প্রবন্ধের ঘটনাটাও এই। মিনকোভিচ যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ব্র্যান্ডন ছিলেন একজন আত্মঘৃণিত সমকামী নারী, যিনি কেবল প্রয়োজনের খাতিরেই নিজেকে পুরুষ পরিচয়ে আবৃত রেখেছিলেন। ব্র্যান্ডন যে নিজেকে একজন পুরুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতেন এবং নিজের লিঙ্গ–পরিবর্তন চাইতেন, মিনকোভিচের কাছে তা কেবল “আত্ম প্রবঞ্চনা”। “প্রকৃত নারীদের” অভিজ্ঞতাগুলোকে ধাতবাদী কায়দায় তুলে ধরার যে দর্শন মিনকোভিচ লালন করেন, তার বাইরে এই কথার মধ্যে আর কোনো সার নেই। তিনি যে আদৌ কোনো রূপান্তরকামিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না, কিংবা আমাদের ইতিহাসটাকে জানার পেছনে ন্যূনতম সময়ও ব্যয় করেননি— সেটাও তার এই আচরণের অন্যতম কারণ হতে পারে।

    প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর একজন রূপান্তরকামী নারী দ্য ভয়েজ পত্রিকায় লিখেছিলেন, মিনকোভিচ ব্র্যান্ডনকে সম্বোধনকালে পুরুষবাচক সর্বনাম ব্যবহার করেননি এবং তাকে তার সত্যিকারের পরিচয় থেকে বঞ্চিত করেছেন। ব্র্যান্ডনকে একজন প্রকৃত রূপান্তরকামী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি লেখাটি শেষ করেন। জবাবে মিনকোভিচ বলেছিলেন যে এই জাতীয় কোনো লৈঙ্গিক শ্রেণিবিভাগে তিনি বিশ্বাস করেন না। এবং রূপান্তরকামিদের অভিমতকে মানুষের অবশ্যই সম্মান জানানো উচিত কিন্তু প্রকৃত রূপান্তরকামী বলে আসলে কিছু নেই। মজার ব্যাপার হলো, তার অন্যান্য প্রবন্ধে মিনকোভিচ লিখেছেন, আবশ্যিক কোনো লিঙ্গ–পরিচয় হয় না বলেই তিনি নিজেকে একজন সমকামী নারী হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অথচ, এই একই যুক্তিতেই কি তিনি ব্র্যান্ডনের সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করতে এবং সম্মান জানাতে পারেন না? আমি ব্র্যান্ডনকে একজন রূপান্তরকামী পুরুষ হিসেবে দেখি কোনো এজেন্ডা পূরণের উদ্দেশ্য থেকে নয়, বরং তিনি কীভাবে তার জীবন যাপন করেছেন এবং কীভাবে তিনি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করতেন— তার ভিত্তিতে। দ্য ভিলেজ ভয়েজ এক অতি প্রচলিত নিদর্শনেরই পুনরাবৃত্তি করল কেবল। যেহেতু সাপ্তাহিকটি ঘোষিতভাবেই ক্যুইয়ারপন্থী, তাদের বিবেচনায় ক্যুইয়ার মানে আবার কেবল সমকামী নারী–পুরুষ; উভকামী কিংবা রূপান্তরকামী নয়। তাছাড়া দ্য ভয়েজ গত তিন বছরে এই সম্প্রতি একজন রূপান্তরকামী মানুষের নিবন্ধ প্রকাশ করল।

    মিনেস ইন মিশিগান বইয়ে রিকি অ্যান উইলচিন্স এবছরের আগস্টের মিশিগান উইমেন্স ফেস্টিভাল নিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। এই বছর পর্যন্তও অনুষ্ঠানটিতে “শুধুমাত্র জন্মগতভাবে নারীদের জন্য” প্রযোজ্যতার স্থায়ী নীতি ছিল, যা আনুষ্ঠানিকভাবে রূপান্তরকামী সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে। নীতিটি পুনর্বিবেচনা করার কোনো কথাও এখনো ওঠেনি। উইলচিন্সের বর্ণনায় জানা যায় অনুষ্ঠানটির শুধুমাত্র একটা পর্বে রূপান্তরকামীরা ঢুকতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেসময় তারা হর্ষধ্বনি, কটুক্তি এমনকি হুমকিরও শিকার হন। অনুষ্ঠানটি ভবিষ্যতেও এই রীতি চালিয়ে যাবে কিনা তা অনিশ্চিত। কিন্তু এই ক্ষুদ্র সাফল্যের ফলে রূপান্তরকামিদের আন্দোলন সমাজে বড় পরিসরে লিঙ্গ–পরিচয়ের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার বদলে সমকামী সম্প্রদায়ে নিজেদের অবস্থান জোড়ালো করবার দিকেই মোড় নেয় কিনা, তা নিয়ে মনে সন্দেহ জাগে।

    আর দ্য ভিলেজ ভয়েজ–এর ক্ষেত্রে— এই নিবন্ধটি রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের প্রতি পত্রিকাটির নীরবতা এবং সূক্ষ্ম আক্রমণের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে পারে না। এই পত্রিকার একটি বিশেষ সংস্করণে দু’জন স্বীকৃত নারীবাদী সাইলেন্স অফ দ্য ল্যাম্ব সিনেমায় উপস্থিত সমকামভীতি নিয়ে আলোচনা করেন। সিনেমাটিতে একজন রূপান্তরকামী চরিত্রকে স্রেফ মেরে ফেলার ভেতর তারা আপত্তিকর কিছুই পেলেন না, অথচ এখানে জোডি ফস্টারের এফবিআই এজেন্ট চিত্রায়ণের মতো দৃঢ় নারীবাদী বার্তা আছে। মনিকা টট নামক একজন সমকামী নারীবাদী নির্মিত জার্মান প্রামাণ্যচিত্র “ফিমেল বিহেভিয়ার”–এর উপর এক নারীর একটি পর্যালোচনা ছেপেছিল দ্য ভয়েজ পত্রিকা। লেখক সেই লেখায় প্রামাণ্যচিত্রটির রূপান্তরকামী এক পুরুষকে রীতিমতো আক্রমণ করে বসলেন, তার “নারীত্বকে” অস্বীকার করবার জন্য। আমার বিশ্বাস, এই ছোটো ছোটো উদাহরণগুলোই সমকামী সম্প্রদায়ে রূপান্তরকামভীতির একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে।

    নিউইয়র্কে স্টোনওয়াল ২৫ উপলক্ষে যখন ক্যুইয়ার সম্প্রদায় একত্রিত হলো, তখন আবারও রূপান্তরকামিদেরকে চিয়ারলিডারের আসনে ন্যস্ত করা হলো। মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ হাস্যরসের সঙ্গী হিসেবে আমরা ভালো, তবে ২৬শে জুন ইউনাইটেড নেশনে পেশ করা দাবিদাওয়ার অংশ হওয়ার যোগ্য ঠিক নই আমরা। এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে ক্যুইয়াররা আর মানুষের যৌন–স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করছেন না, বরং অন্য সকলকে বাদ দিয়ে একটি ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠীর মানুষের নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াই করছেন তারা।

    আমরা এককভাবে লড়ে যাই

    রূপান্তরকামী মানুষের চেহারায় এক ধরনের অস্পষ্টতার কারণে আমরা কটুক্তিকারিদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হই। লৈঙ্গিক গোঁড়ামি দ্বারা পরিচালিত একটা সমাজে নিজেকে মানিয়ে নিতে এসব কটুক্তি উপেক্ষা করে যাওয়াটা প্রায়শই দরকারি, ক্ষেত্রবিশেষে বাঞ্ছনীয়। এর মাধ্যমে আমরা এক প্রচ্ছন্ন অদৃষ্টকে স্বীকার করে নেই। এই উপেক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে আমাদের ইতিহাসকেই প্রত্যাখ্যান করি। পরিপাটি, মেরুপ্রবণ লিঙ্গ–ভূমিকার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটা সিস্টেমকে আমরা আরও শক্তিশালী করে তুলতে থাকি। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, দলিত লিঙ্গ পরিচয়ের একজন মানুষের জন্য একটা কাজ পাওয়া অনেক কঠিন। আর চাকরি পেতে হলে যদি প্রচলিত লিঙ্গের মানুষের মতো চলাফেরা করতে হয়, কাপড় পরতে হয়— তবে তা আদতে জান বাঁচানোরই তাগিদ। লিঙ্গ পরিচয়ের স্বাধীনতার কথা বলে এমন যেকোনো তত্ত্বেরই ভিত্তি হতে হবে এসব মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম। এছাড়া, বিপ্লববাদী সংঘগুলো থেকে পর্যাপ্ত আনুকূল্যের অভাবে রূপান্তরকামিদেরকে আসলে একাই লড়াই চালিয়ে যেতে হয়— এমনকি বৃহত্তর সমকামী সম্প্রদায়ের সহায়তাও অতি নগণ্য।

    শিল্পী: বেটিনা সেমার

    লিঙ্গ বিপ্লব: কর্তৃত্ব–বিরোধী ও দলিত লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষেরা যেভাবে পরস্পরকে শক্তি যোগাতে পারে

    যেকোনো নিপীড়নের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো, এটি আমাদেরকে নিজেদেরকে ঘৃণা করতে শেখায়। এই অভ্যন্তরীণ নিপীড়নের সাথে বোঝাপড়া করাটাই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে প্রগতিশীল বন্ধুবর্গে মেশবার সময় যখন লক্ষ্য করি যে আমি অন্যান্য রূপান্তরকামী মানুষদের থেকে নিজেকে একটু দূরে দূরে রাখতে চাচ্ছি, তখন প্রচণ্ড খারাপ লাগে। ড্র্যাগ কুইনদের খেলো রসবোধকে হয়তো আমি অরাজনৈতিক হিসেবে তাচ্ছিল্য করবো। কিংবা কোনো রূপান্তরকামী মানুষের সাজসজ্জার বাড়াবাড়ি নিয়ে হয়তো একটা মন্তব্য করে বসবো, যেন সেই মানুষটার “অধিকতর নারীসুলভ” এই উপস্থিতিতে আমি মনে মনে একটুও ঈর্ষান্বিত নই। অথবা আমি তাদেরকে স্রেফ এড়িয়ে যাবো কারণ মাঝে মাঝে আমার ভান করতে ইচ্ছে হয় যেন আমি তাদের কেউ নই।

    একই সাথে, প্রগতিশীল মানুষেরা লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবাদ কিংবা সমকামভীতির মতো বিষয়গুলোর সাথে তাত্ত্বিক দিক থেকে বোঝাপড়া করেছেন বলেই যে তারা কুসংস্কার মুক্ত বা সর্বদা সহানুভূতিশীল থাকেন, সেটাও তাদের ধরে নেওয়া উচিত নয়। আমি অত্যন্ত বিরক্ত ও ক্লান্ত বোধ করি যখন তারা জানান আমি “সমকামিদের জন্য নিরাপদ” স্থানে আছি, আর তারপর মানুষের লৈঙ্গিক পার্থক্য নিয়ে স্থূল রসিকতা করতে থাকেন অথবা রূপান্তরকামীরা কেন আদৌ নিপীড়িত নয় তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন!

    রূপান্তরকামী আন্দোলন তার প্রারম্ভিক পর্যায়ে আছে মাত্র। একারণেই, কর্তৃত্ব–বিরোধিরা এই দলিত লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের সাথে সম্ভাব্য দোস্তি পাকাতে পারেন। আমরা উভয়ই এই কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর আমূল পরিবর্তন চাই। রূপান্তরকামী আন্দোলনকে খোদ নিপীড়নের ধারণাটা নিয়েই আরও বৃহৎ পরিসরে পর্যালোচনা করতে হবে। একইসাথে, যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের উপর এই নিপীড়ন চালায় তাদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। রূপান্তরকামিদের জন্য একটা “মুক্তাঞ্চল” অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এই মুক্তির কোনো মূল্যই থাকবে না, যদি না আমরা বৃহত্তর সমাজকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

    রূপান্তরকামী সম্প্রদায় প্রকৃতি প্রদত্তভাবে বিপ্লববাদী কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল নয়। অন্যান্য যেকোনো সামাজিক গোষ্ঠীর মতনই আমরাও বিবিধ জাতিসত্তা, লিঙ্গ পরিচয়, শ্রেণি ও রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে এসেছি। একটি লিঙ্গীয় বিপ্লব তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠবে, যখন তা সত্যিকার অর্থে প্রত্যেক মানুষের ক্ষমতায়ন ঘটাবে। যেকোনো বৈপ্লবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলো কোনো পূর্বানুমান ছাড়াই নিপীড়িত সম্প্রদায়ের কথা শোনা। প্রশ্ন এবং সমালোচনাও এর একটি অংশ। যদিও তা যেন কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় আলোচনার পরিসরকে সংকুচিত না করে ফেলে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

    লিঙ্গীয় ক্রমকর্তৃত্বে ভরা এই গোঁড়া, অনড় সমাজের কোন স্তরে আমরা আছি, এবং আমাদের পরিচয়ের শক্তিমত্তারই বা কী স্বরূপ— তার ভিত্তিতেই মূলত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী নির্ধারিত হয়ে থাকে। ১৯৭০–এর দশকে নারীবাদীরা (মধ্যবিত্ত, কলেজ পড়ুয়া, শ্বেতাঙ্গ নারী) তাদের আন্দোলন থেকে বুচ এবং ফেমদেরকে প্রায় দশ বছরের জন্য বহিষ্কৃত করেছিল তাদের “পুরুষ–প্রভাবিত” লিঙ্গ ভূমিকার কারণে। এই জাতীয় ভুল আমরা আর না করি। লিঙ্গীয় স্বাধীনতা সকলেরই কাম্য। কিন্তু, এই স্বাধীনতার অর্থটা কী, তা নির্ধারণে আমাদের সকলের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। কোনো দুর্বোধ্য, পূর্ব–নির্ধারিত তত্ত্ব থেকে নয়, বরং সত্যিকারের মানুষের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে মূর্ত হয়ে ওঠবে এই স্বাধীনতা। আমার বিশ্বাস এর মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাবো, নির্ধারিত লিঙ্গ–ভূমিকার ধারণাকে অনেকেই স্বস্তিদায়ক মনে করেন, আবার এর মাধ্যমেই অনেকে গুরুতরভাবে নিপীড়িত হন। স্বাধীনতা অর্জনে আমরা যে পথই গ্রহণ করি না কেন, আমাদেরকে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার প্রতি সৎ থাকতে হবে। শাস্তি কিংবা সত্যিকার সহিংসতা ব্যতীত কীভাবে এই সম্প্রদায়গুলো পারস্পারিক বৈপরীত্য ও বৈরী চাহিদার সাথে সমঝোতা করতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে৷ এখনো আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দেয়া বাকি। আমাদের সমষ্টিগত শক্তি এবং দুর্বলতাগুলোর মাঝেই আমাদের ক্ষমতার স্বরূপ নিহিত রয়েছে।

    অনুবাদকের নোট: ক্যুইয়ার শব্দটির অর্থ বিচিত্র/অদ্ভুত। নিপীড়িত বিভিন্ন যৌন ও লিঙ্গ পরিচয় বোঝাতে বৃহদার্থে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, সমকামিতা বোঝাতে ‘ক্যুইয়ার’ নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হতো, যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এলজিবিটির(LGBT) বদলে আরও অন্তর্ভূক্তিমূলক শব্দ হিসেবে ‘ক্যুইয়ারের’ নেতিবাচকতাকে পরাভূত করে আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিকভাবে এর ব্যবহার শুরু করে।

    জুডিথ বাটলারের তাত্ত্বিকভাবে বায়োলজিক্যাল সেক্সের ধারণা আর সামাজিক জেন্ডারের ধারণার ফারাক মোচন/সংকোচন, ক্যুইয়ার থিয়োরি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটা তত্ত্ব হিসেবে দাঁড়িয়েছে বাটলারসহ অন্যান্য তাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের কাজের ভিত্তিতে। বাটলারের শরীরের ধারণা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

  • প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার: পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার আলোচনা বা প্রাদেশিকীকরণই আর যথেষ্ট নয়; খোদ তত্ত্বেরই নতুন তত্ত্বায়ন জরুরি.…

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার: পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার আলোচনা বা প্রাদেশিকীকরণই আর যথেষ্ট নয়; খোদ তত্ত্বেরই নতুন তত্ত্বায়ন জরুরি.…

    প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ (CSDS)-এর একজন অধ্যাপক। রাজনৈতিকতার ইতিহাস তার অন্যতম প্রধান গবেষণার বিষয়বস্তু। অনেকেরই মনে থাকার কথা, এ বছরের গত জুন মাসে আমি CSDS-এর আরেকজন তাত্ত্বিক আদিত্য নিগামের এক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারটি অরাজে প্রকাশিত হয়েছিল (আদিত্য ২০২১) । আদিত্য নিগাম ও প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় একত্রে ‘doing theory’ নামক প্রকল্পে যুক্ত। বাংলায় আমরা একে বলছি ‘তত্ত্ব করা’ বা ‘তত্ত্ব নির্মাণ’। কেবলমাত্র পশ্চিমা তত্ত্বের চর্চা কিংবা ‘অ–পশ্চিমা’ সমাজে পশ্চিমের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ক্যাটাগরিসমূহকে সর্বজনীন ও যথাপ্রদত্ত ধরে নিয়ে তার নানাবিধ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা কিংবা পশ্চিমের ‘ক্রিটিক’ করাকেই প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার সহ–তাত্ত্বিকরা নিজেদের কাজ মনে করেন না। তারা মনে করেন বিভিন্ন চিন্তা ঐতিহ্যের মধ্যে গতায়াতের (thinking across the traditions) মাধ্যমে ‘অ–পশ্চিমা’ সমাজই হতে পারে doing theory তথা ‍‘তত্ত্ব করা’র ক্ষেত্র।

    তত্ত্ব নাকি অনুশীলন, আগে তত্ত্ব পরে অনুশীলন, অনেক তত্ত্ব হয়েছে এবার অনুশীলনের পালা; এমন নানাবিধ যান্ত্রিকতাকে ছাপিয়ে ‘তত্ত্ব করা’ প্রকল্পে তারা তত্ত্বকে সমাজে এমনভাবে প্রোথিত করতে চান যেন তত্ত্বকে অনুশীলন থেকে কিংবা অনুশীলনকে তত্ত্ব থেকে আলাদা করে ভাবা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তত্ত্ব নির্মাণের ভিন্ন তাত্ত্বিক পদ্ধতিই তারা প্রতিষ্ঠা করতে চান। এই সাক্ষাৎকারে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

    দর্শন, রাজনীতি, রাজনৈতিকতা, তত্ত্ব, ইতিহাস, রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি বর্গ ও ধারণা প্রশ্নে আমাদের নানা প্রশ্নাতীত অবস্থানকে প্রশ্ন করা এবং নতুন ছকে তত্ত্বায়িত করার ক্ষেত্রে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুনশিয়ানা মনোযোগী পাঠকের নজর এড়াবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

    এছাড়াও উনিশ ও বিশ শতকের ভারতবর্ষে কীভাবে রাজনৈতিক কর্তাসত্তা, রাজনৈতিক কর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মতো আধুনিক ধারণাসমূহের রূপায়ন ও বিস্তার হচ্ছিল তার তদন্ত করাও প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোযোগের ক্ষেত্র।

    ভারতীয় বৌদ্ধিক পরম্পরায় Karma এবং শ্রমের আধুনিক ধারণাসমূহের গাঠনিক টানাপোড়েনে Action তথা কর্ম; স্পিরিচুয়ালিটি ও অর্থনীতির দ্বান্দ্বিকতায় সাম্য (equality); প্রাক–ঔপনিবেশিক ভারতীয় চিন্তা–পরম্পরায় আত্মতা, জন ইত্যাদি ধারণায়নে প্রথমার পরীক্ষা–নিরীক্ষা অত্যন্ত গভীর। উল্লিখিত ক্ষেত্রসমূহে তার তত্ত্বায়ন পশ্চিমা সর্বজনীনতার দাবি, উত্তর–ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক/ঐতিহাসিক পার্থক্য, এমনকি বিউপনিবেশায়নের ফ্রেমওয়ার্ককে ছাপিয়ে এক নতুন প্যারাডাইম হাজির করে।

    মূলত প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘Doing theory’ বিষয়ক আলোচনা এবং পলিটিক্যাল ক্যাটাগরির নানা বুনিয়াদি দিক; ইতিহাস লিখন পদ্ধতির সাথে সময়ের রাজনীতির যোগাযোগ সংক্রান্ত বই দুটি পড়ে আমি অভিভূত হই এবং সিদ্ধান্ত নিই যে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নেব। তিনি সানন্দে আমার প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় আমি তার প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের সাথে বাংলাদেশের ক্রিটিক্যাল চিন্তাজগতকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সূত্রপাত হতে পারে এই সাক্ষাৎকার।

    আমার চিন্তায় ও দৈনন্দিনতায় যারা অন্তস্থিত সুরের মতন বাজতে থাকেন, তাদেরকে এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ উপলক্ষ্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।

    এমনকি নিজে–নিজে খুলে যাও ঝিনুকের মতো,
    ব্যর্থ হও, তবু বালি, ভিতরে প্রবিষ্ট বালিটুকু
    ক্রমে–ক্রমে মুক্তা হয়ে গতির সার্থক কীর্তি হবে।
    শয়নভঙ্গির মতো স্বাভাবিক, সহজ জীবন
    পেতে হলে ঘ্রাণ নাও, হৃদয়ের অন্তর্গত ঘ্রাণ। [বিনয় মজুমদার]

    – সারোয়ার তুষার

    মূল সাক্ষাৎকার:

    সারোয়ার তুষার: আলোচনাটা শুরু করতে চাই আপনার এবং আপনার সহকর্মীদের ‘doing theory’ এবং ‘thinking across traditions’ প্রকল্প দিয়ে। ‘doing theory’-কে আমি বাংলায় পাঠ করছি, ‘তত্ত্ব নির্মাণ/উৎপাদন’ অর্থে (খুব সচেতনভাবেই ‘তত্ত্ব চর্চা’ বলছি না) এবং ‘thinking across the traditions’-কে পাঠ করছি বিভিন্ন চিন্তা ও দর্শন ঐতিহ্যের মধ্যে গতায়াত হিসেবে। আপনার এই প্রকল্প এমনকি উত্তর–ঔপনিবেশিক (Postcolonial) তত্ত্বচর্চাকে ছাপিয়ে নতুন কিছু বলতে চায় বলে আমার মনে হয়েছে। প্রথমত, উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব পশ্চিমা সর্বজনীনতা (universality)-কে কার্যকরভাবে সমালোচনা করলেও, মূলত পশ্চিমা সর্বজনীনতাকেই ‘norm’ তথা মান্যরূপ হিসেবে বিবেচনা করে এবং সেই মান্যরূপ–এর সীমা উন্মোচন করার মাধ্যমে পশ্চিমের ‘critique’ করে থাকে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমের যেসব তত্ত্ব আবার এই সর্বজনীনতাকে প্রশ্ন করে উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব তার সাথেই লিপ্ত হতে চায়। তৃতীয়ত, উত্তর–ঔপনিবেশিক তত্ত্ব মনে করে পশ্চিমা ধারণাই একমাত্র ‘আধুনিক’ ধারণা, কাজ হচ্ছে একে উপনিবেশোত্তর সমাজবাস্তবতায় ‘যথাযথ’ভাবে প্রয়োগ করা।

    সুতরাং, আমি আপনার কাছে জানতে চাইব, উপনিবেশোত্তর সমাজের বাস্তবতায় ‘doing theory’ এবং ‘thinking across the traditions’-এর মাধ্যমে আপনারা আসলে অভিনব কী বলতে চাইছেন? সর্বজনীনতা, উত্তর–ঔপনিবেশিক সমালোচনা এবং উগ্র স্বদেশীয়ানাকে (ultra-nativism) একইসাথে ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের কী কী বিষয় খেয়াল রাখতে হচ্ছে?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: একদম গোড়া থেকে শুরু করি। আমার তত্ত্ব ভাবনার তালিম হয়েছে প্রথমে মার্ক্সবাদ আর পরে উত্তর–উপনিবেশবাদ পরম্পরায়। মার্ক্সবাদ পড়তে শুরু করি রাজনীতি করতে গিয়ে, আর উত্তর–উপনিবেশবাদ ইতিহাস বিভাগের শ্রেণিকক্ষে! দুটোর মধ্যে টানাপোড়েনেই শিক্ষার্থী জীবন কাটল বলা যায়। মার্কসবাদ শেখায় দুনিয়ার মজদুর এক, গরিবের ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ এক এবং সেই কারণেই রাজনৈতিক তত্ত্বও সারা পৃথিবীতে মূলত এক। আর উত্তর–উপনিবেশবাদ শেখায় ইউরোপীয় তত্ত্বচিন্তার সীমা, আমাদের মনের উপর পশ্চিমা দর্শনের অনুচিত আধিপত্য আর প্রাচ্যের অস্বীকৃত ঐতিহাসিক বিশেষত্ব। এই টানাপোড়েন শুধু আমার একার নয়। বোধহয় এই অনুভব মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সব বাঙালিরই, যারা রাজনীতি নিয়ে ভাবনা–চিন্তা করে। অবশ্য মানতে হয় যে এই দুটি অভিমুখিতা এক দিক থেকে সমভাবাপন্ন। মার্ক্সবাদ আর উত্তর–উপনিবেশবাদ দুটিই সমালোচনামূলক বা critical পরম্পরা। দুটিই রাষ্ট্রবাদের১ সীমা আর সমস্যা দর্শায়। আবার দুটিই অভাজনের জন্য ন্যায়ের কামনা করে। তবুও এই দুটি অভিমুখিতাকে মৌলিকভাবে বিপরীতমনস্ক বলা চলে। প্রথমটি সর্বজনীনতায় বিশ্বাস করে, দ্বিতীয়টি সর্বজনীনতার সমালোচনা করে।

    আমাদের Economic & Political Weekly’র লেখাটা (Banerjee, Nigam & Pandey 2016), যাতে আমরা ‘thinking across traditions’-এর কথা বলেছি, সেটার উদ্ভব শ্রেণিকক্ষে। এবার আমরা অধ্যাপক, আর ছাত্রছাত্রী হলেন আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যারা মূলধারার রাজনীতিকে খানিকটা সন্দেহের চোখে দেখে আর অন্য রাজনীতির কল্পনা করার চেষ্টা করে। তাই আমরা চাইনি যে আজকের শ্রেণিকক্ষে আমাদের ছাত্রাবস্থার সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি হোক। পড়াতে গিয়ে বুঝলাম যে আজকের দিনেও সেই একই টানাপোড়েন। তাত্ত্বিক সামগ্রী সেই পশ্চিম— সবার ক্ষেত্রে এখন আর তা মার্ক্সবাদ নয়; এখন ফুকো, আগামবেন, লাতুর অনেকসময় বেশি প্রভাবশালী। কিন্তু যে বাস্তব আমাদের ভাবনার বিষয় আর যে ক্ষেত্র আমাদের কাজের এলাকা সেটা পশ্চিম ইউরোপের বাস্তবের থেকে ভিন্ন। সে কারণে পশ্চিমা তত্ত্ব এই বাস্তবের উপর প্রয়োগ করার ব্যর্থ চেষ্টায় শিক্ষার্থীরা অসন্তুষ্ট। আমদের প্রধান বক্তব্য তাই এই— যে বাস্তব নিয়ে আমরা ভাবছি, আমাদের তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপাদান সেই বাস্তব থেকেই নিতে হবে। এ ছাড়া বৌদ্ধিক আজাদি সম্ভব নয়।

    শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    এ দিক থেকে আমাদের বক্তব্য উত্তর–উপনিবেশবাদের বক্তব্যের থেকে খানিকটা আলাদা। আপনি ঠিকই বলেছেন, উত্তর–উপনিবেশবাদ পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার সীমা দর্শায় বটে, কিন্তু এ–ও বলে যে আধুনিককালে পশ্চিমা দর্শন ব্যতিরেকে উপায় নেই। আমাদের গত কয়েক শতাব্দীর ঔপনিবেশিক ইতিহাস আমাদের সকলকেই খানিকটা পশ্চিমা করে ফেলেছে। কথাটা কিছুটা সত্যি বটে। তবে এই অবস্থানের সঙ্গে আমাদের মূলত তিনটে মতভেদ রয়েছে। এক, আমরা মানছি না যে পশ্চিমা দর্শনের আধিপত্যের সামনে পৃথিবীর অন্য সমস্ত তত্ত্ব–পরম্পরা একেবারে মুছে গেছে, মরে কিংবা শুকিয়ে গেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, ভাষায়, অভ্যাসে, পরিবেশে এমন অনেক কিছু পাওয়া যায় যেগুলোর দীর্ঘ প্রাক–ঔপনিবেশিক ইতিহাস রয়েছে। একটা সাধারণ উদাহরণ নেয়া যাক— আমরা যাকে ধর্ম, দ্বিন, মজহব বা ভক্তি বলি তা কিন্তু religion-এর থেকে আলাদা। তাই ‘religion versus secularism’-এর গল্পটা এখানে ঠিক সরাসরি খাটে না। ধর্ম বা দ্বীনের ইতিহাস আর বর্তমানকে অন্যভাবে ভাবতে হয়। আবার যাকে আমরা নাস্তিকতা বলি তা কিন্তু একেবারেই atheism নয়। নাস্তিকতা ‘না’ বলার— নেতি নেতি২ বলার— একটা তাত্ত্বিক এবং তার্কিক পরম্পরা, যা আমাদের anti-foundationalist তত্ত্বচিন্তার দিকে নিয়ে যায়; নানান ভিত্তিবাদী পরম্পরাকে খণ্ডন করতে সাহায্য করে। ঠিক তেমনি আমরা যাকে রস বলে উপভোগ করি, তা aesthetics-এর থেকে অনেকটাই ভিন্ন।

    দুই, আমরা মনে করি যে তত্ত্বচিন্তার কাজে শুধুমাত্র পশ্চিমকেন্দ্রিকতার সমালোচনা বা critique যথেষ্ট নয়। Critique-এর নেতিবাচক কাজটা প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। আসল মুশকিলের কাজ হলো নতুন আর ভিন্ন তত্ত্ব নির্মাণ করার ইতিবাচক প্রচেষ্টা। ব্যক্তিগতভাবে আমি এও ভাবি যে ‘pure critique’ আমাদের মানসিকভাবে কিছুটা রুঢ়, ক্লিষ্ট, বিদ্রুপী, এমনকি অসূয়ক করে তোলে। তত্ত্ব নির্মাণ কিন্তু শিল্পকর্মের মতো— আমাদের সৃষ্টিশীল আর উদ্দীপ্ত করে তোলে! তত্ত্ব নির্মাণ যদিও কঠিন, তাহলেও একটা আনন্দময় কাজ। আমরা এও বলি যে নানা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে গতায়াতের দ্বারা আমরা শুধু আমাদের ঐতিহাসিক ভিন্নতা বা বিশেষত্ব প্রমাণ করতে উৎসুক নই। তাই ‘difference’— colonial difference, historical difference, cultural difference— আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু নয়। আমরা এমনভাবে তত্ত্ব নির্মাণ করতে চাই যা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সাধারণীকরণের— universalisation না হলেও generalisation-এর— সম্ভাবনা রাখে। মানে আমরা চাই এমন নতুন তত্ত্ব নির্মাণ যা আমাদের কাজে তো লাগেই, পশ্চিমেরও কাজে লাগে। এই কাজটা একা করা যায় না। অনেকে মিলে একটা তাত্ত্বিক আন্দোলন তৈরি করতে হবে বলে আমরা ভাবি। তাই উত্তর–উপনিবেশবাদের critique-সর্বস্বতার থেকে আমরা একটু দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করি।

    তিন, আমাদের মতভেদ কালচিন্তা আর ইতিহাসচিন্তা নিয়েও। আমরা মানি না যে কালের গতি সরলরেখার মতো। পুরনো সব পেছনে ফেলে শুধু সামনের দিকে আমরা এগিয়ে চলি। এটা ঔপনিবেশিক প্রগতিবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার মতে এটা এক ধরনের কুসংস্কার যেটাকে আজ আমরা ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আমরা মানি যে কালের চলার পথ নানান গিঁট, পাক আর ব্যাবর্তে ভরা। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নানা জটিল সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে। পদার্থবিজ্ঞানও কিন্তু আজ একথা মানে। নানা ইতিহাস, নানা পরম্পরা, নানা সম্ভাবনা অনেক সময় এককালীন, আবার অনেক সময় বহুকালীন হয়ে ওঠে। তাই যে–কোনো এক মুহূর্তের ভেতর কাজ করে অনেক মুহূর্ত, অনেক স্মৃতি, অনেক সম্ভাবনা, অনেক প্রকল্প। সেই একই কারণে আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘আধুনিকতা‘ শব্দটিকে খুব বেশি ব্যবহার করি না। আজকাল অনেকে ‘অন্য’ আধুনিকতা, ‘বিভিন্ন’ আধুনিকতা, ‘ভারতীয়’ আধুনিকতা, ‘প্রাক–ঔপনিবেশিক’ আধুনিকতার কথা বলে থাকেন। মানে দাবি করেন যে আমরাও ততটা আধুনিক যতটা ইউরোপ বা আমেরিকা, যদিও আমাদের নিজেদের মতন করে। আমার মনে হয় এ আবার সেই ঔপনিবেশিক প্রগতিবাদের ফাঁদে পড়া। আধুনিক হওয়া যেন একটা নৈতিক উৎকর্ষ, সদ্গুণ, পুণ্য। আমার কাছে আধুনিকতা শুধুমাত্র একটা কাল নির্দেশক শব্দ— এর মানে নতুন বা সাম্প্রতিক, এর প্রতিশব্দ (counter-term/opposite হিসেবে ‘প্রতিশব্দ’–এর ব্যবহার ব্যবহার ‘বিপরীত শব্দের’ সমার্থক) প্রাক্তন, সাবেক, পুরাতন। মনে রাখতে হবে যে প্রাক–ঔপনিবেশিককালে প্রাচ্যে আর প্রতীচ্যে ‘আধুনিক’ শব্দটির ব্যবহার ছিল। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহার হতো শুধুমাত্র কালভিত্তিক তুলনার কাজে— যেকোনো তর্কের বা বিতণ্ডার প্রসঙ্গে পূর্বপক্ষ আর উত্তরপক্ষ নির্দেশ করতে। এর ভেতরে কোনো প্রগতিবাদ বা উন্নয়নবাদ লুকিয়ে থাকত না। উত্তরপক্ষ বা আধুনিক মত ভুল প্রমাণ হতে পারত, আবার পূর্বপক্ষ বা পুরাতন মতও খণ্ডিত হতে পারত। আজ অবশ্য আধুনিক হওয়া মানেই প্রামাণ্য হওয়া। এ আমি মানি না। তাই আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতেও আমার বিশেষ কোনো ইচ্ছে নেই বললেই চলে। অবশ্য সবাই এ কথা মানবেন না। অনেকেই নিজেদের আধুনিক প্রমাণ করতে চান আজকের দিনেও! যেন আধুনিকতাই সব সমস্যার সমাধান।

    অবশ্য আধুনিকতার আদর্শের উপর প্রশ্ন তুললেই একটা কঠিন সমস্যা এসে পড়ে। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই প্রশ্ন করে থাকে আমাদের। আমরা কি একধরনের conservatism বা রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে পড়ছি? ভারতীয় বৌদ্ধিক পরম্পরার নামে কি আমরা কূপমণ্ডূকতার শিকার হয়ে পড়ছি? সারা পৃথিবীজুড়ে আজ যে nativism, nationalism, conservatism, xenophobia’র তাণ্ডব চলেছে, তার মোকাবিলায় আমাদের কি আধুনিকতা, সর্বজনীনতা আর বিশ্বজনীনতাকে আঁকড়ে রাখা উচিত নয়? আবার এও শুনে থাকি যে প্রাক–ঔপনিবেশিক পরম্পরাগুলোতো সবই ব্রাহ্মণ্যবাদী, হিন্দুবাদী, অভিজাত, সাধারণের নাগালের বাইরে, সাধারণের উপর আধিপত্য ফলানোর কৌশল। আজকের দিনে এসব পরম্পরার প্রাসঙ্গিকতাই বা কী, ঔচিত্যই বা কী?

    তাই একটু জোর গলায় কটা কথা বলা দরকার। এক, কাছের বাস্তব থেকে তত্ত্বের উপাদান জোগাড় করা আর জাতীয়তাবাদী হওয়া কোনোমতেই এক নয়। মনে রাখতে হবে যে কাছের বাস্তব শুধু মাত্র দেশি বা সাম্প্রদায়িক বাস্তব নয়। সবাই মানবেন যে দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তব বহু পরম্পরার মিলনে তৈরি— যেখানে আরবি, ফার্সি, চিনি, দেশজ আর ইউরোপীয় নানা পরম্পরা একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আর দ্রবণে লিপ্ত। দুই, খুব কাছের বাস্তব— যেমন আজকের দিনে আমাদের অতিনিকট জলবায়ু সংকট— একই সঙ্গে প্রাদেশিক আর ভূমাণ্ডলিক, এমনকি মহাজাগতিক হয়ে উঠতে পারে। জাতীয়তাবাদ এ ক্ষেত্রে আমাদের দিশা দেখানোর কাজে পুরোপুরি ব্যর্থ। তিন, কাছের বাস্তব থেকে তত্ত্বের উপাদান নেওয়ার মানে কিন্তু দূরস্থ উপাদান বা তত্ত্বকে ভুলে যাওয়া নয়। তত্ত্ব নির্মাণের ক্ষেত্রে বাহ্যিক দৃষ্টিরও উপযোগিতা রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র বাহ্যিক দৃষ্টি যথেষ্ট নয় কোনোমতেই। চার, আমি প্রায়ই বলে থাকি যে প্লেটো, অ্যারিস্টটল দাসব্যবস্থামূলক সমাজের লোক ছিলেন। কান্ট, হেগেলের racism নিয়ে বহু লেখা রয়েছে। এমনকি মার্ক্সও বলেছিলেন যে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ভারতের উন্নতির পক্ষে উপযোগী। তাই বলে আমরা কি প্লেটো, অ্যারিস্টটল, কান্ট, হেগেল, মার্ক্স পড়া ছেড়ে দিয়েছি? একেবারেই নয়। আমাদের পাঠে এখন নতুন সচেতনতা এসেছে। দেশি পরম্পরাকেও সেভাবে তীব্র সচেতনতার সঙ্গে পড়তে হবে। আমরা গত একশ বছরে বড় ভুল করেছি দেশি পরম্পরাগুলোকে রক্ষণশীল মৌলবাদীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে। এই ভুলটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শোধরাতে হবে। আর পাঁচ, নিজস্ব তাত্ত্বিক উপাদান মানে শুধু অতীত পরম্পরা কেন, আমাদের বর্তমান এবং উদ্ভাবনশীল ভবিষ্যৎ–এর থেকেও উপাদান নিতে হবে। এখানে ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনা, সাহিত্য, শিল্পকলা আর ভাবীকথন শাস্ত্রের (predictive sciences) কাজও জুড়ে বসে।

    সারোয়ার তুষার: ‘The Work of Theory’ (Banerjee, Nigam & Pandey 2016) প্রবন্ধটা আমার কাছে নানাকারণে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ মনে হয়েছে। তারমধ্যে আছে theory বনাম practice-এর জোড়–বিপরীত ধারণা থেকে বের হয়ে theory as practice-এর ধারণা, contemporalization তথা সমসমায়িকীকরণ, de-contextualization (বি–পরিপ্রেক্ষিতায়ন) ও re-contextualization (পুনঃপরিপ্রেক্ষিতায়ন) ইত্যাদি ধারণা। তত্ত্ব নাকি অনুশীলন, আগে তত্ত্ব পরে অনুশীলন, অনেক তত্ত্ব হয়েছে এবার অনুশীলনের পালা; এমন নানাবিধ যান্ত্রিকতাকে ছাপিয়ে আপনারা বলছেন The point is to change the way we do theory (Nigam 2020)। আপনারা তত্ত্বকে সমাজে এমনভাবে প্রোথিত করতে চান যেন তত্ত্বকে অনুশীলন থেকে কিংবা অনুশীলনকে তত্ত্ব থেকে আলাদা করে ভাবা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তত্ত্ব নির্মাণের ভিন্ন পদ্ধতিই আপনারা প্রতিষ্ঠা করতে চান। এ সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন। সমসাময়িকীকরণ, বি–পরিপ্রেক্ষিতায়ন, পুনঃপরিপ্রেক্ষিতায়ন এর চিন্তা কেন করলেন? আপনারা কি সর্বজনীনতার দাবিকে সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করতে চান এবং পশ্চিম ভিন্ন বাদবাকি চিন্তা–ঐতিহ্যকে যে ‘অতীতের নিদর্শন’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়, সেইসব চিন্তা–ঐতিহ্যের পুনঃপরিপ্রেক্ষিতায়ন এবং সমসাময়িকীকরণ করতে চান?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনি ভারি সুন্দরভাবে কথাটা ধরেছেন। এই যে theory/practice বা তত্ত্ব/অনুশীলনের তথাকথিত বৈপরীত্য, এটার কিন্তু একটা নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। এটা ইউরোপীয় দর্শনের ইতিহাস। আধুনিক ইউরোপীয় দর্শন নিজেকে প্রাচীন গ্রিক তত্ত্বচিন্তার উত্তরাধিকারী বলে প্রচার করে থাকে। সেই তত্ত্বচিন্তার একটা মূল ধারণা হলো আদর্শ এবং বাস্তবের তফাৎ। এটা সবথেকে বেশি পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে প্লেটোর চিন্তাভাবনায়— বিশেষত যাকে আমরা প্লেটোনিক ‘theory of forms’ বলে জানি তাতে। প্লেটো বলেছেন যে বাস্তবে দেখা সব কিছুই মুষ্টিমেয় অনাদি আদর্শের জৈবিক বা মূর্ত রূপ। বাস্তব যেন আদর্শের বিচ্যুত বা বিকৃত বা বিশেষীকৃত রূপ। তাই তত্ত্বচিন্তার কাজ হলো বাস্তবের মৌলিক রূপ বা essence-কে তুলে ধরা আর জ্ঞানের আয়নায় বাস্তবকে সংশোধন আর পরিশীলিত করা। ইউরোপীয় দর্শনে এবং রাজনীতিতে কালক্রমে এই ধারণাটির নানা প্রকারে পুনরুদ্ভাবন হয়েছে। আমাদের সময়ে আদর্শ আর বাস্তবের বৈপরীত্য ধরা পড়েছে আদর্শবাদ বনাম বাস্তববাদ (idealism/materialism) আর মূর্তি বনাম বিমূর্তির (abstract/concrete) দ্বন্দ্বে, যার সবথেকে জোরদার অভিব্যক্তি আমরা মার্ক্সবাদে পাই। মার্ক্সবাদ বাস্তববাদী হওয়া সত্ত্বেও কিন্তু ভীষণভাবে বিজ্ঞানবাদী। মার্ক্সবাদ শুদ্ধ এবং সার্বভৌমিক বিজ্ঞানের আলোতে বাস্তবের ‘সঠিক’ মূল্যায়ন এবং সংশোধনে বিশ্বাসী। তাই বলা চলে যে তত্ত্ব আর অনুশীলনের বিচ্ছেদের মূলে রয়েছে এক ধরনের উপনিবেশবাদী মানসিকতা যেটা বাস্তবকে, বিশেষ করে ‘তৃতীয় দুনিয়া’র বাস্তবকে উপেক্ষা করে আর জ্ঞানের স্বয়ংক্রিয় প্রামাণ্যতার ভিত্তিতে জীবন আর যথার্থকে পাল্টে ফেলতে চায়— কখনো উন্নতির নামে, কখনো বিকাশের নামে, কখনো আধুনিকীকরণের নামে, আবার কখনো বিপ্লবের নামে। আমি মনে করি যে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা আর পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বিকাশবাদ এই বহু পুরোনো theory/practice বৈপরীত্যের উপর ন্যস্ত।

    এই বৈপরীত্যের ধারণাটি এমনভাবে আমাদের সামান্য বোধের মধ্যে ঢুকে পড়েছে যে আমরা ভুলেই গেছি তত্ত্বচিন্তাও এক ধরনের ক্রিয়া বা অনুশীলন। তাই আমরা ক্লাসে নানা তত্ত্ব পড়াই বটে, কিন্তু হাতে–কলমে তত্ত্ব নির্মাণের কাজটা শেখাই না। তাই আমরা চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের এটা দেখাতে যে কীভাবে নানা দেশে, নানা কালে, নানা চিন্তাবিদ ভিন্ন ভিন্নভাবে তত্ত্ব নির্মাণের কাজ করেছেন। এটা দেখাতে গিয়ে আমরা আরবি, ফারসি, চিনি, আফ্রিকি, লাতিনি, আর অবশ্যই আমাদের দেশীয় ভাষা পরম্পরার থেকে অনেক চিন্তাবিদদের কাজ শিক্ষার্থীদের সামনে পেশ করেছি। বলাই বাহুল্য অনুবাদের মাধ্যমে।

    শ্রেণিকক্ষে এটাও আমরা বারবার বলে থাকি যে প্রাক–আধুনিককালে— শুধু এদেশে নয়, পশ্চিমেও— নতুন তত্ত্ব নির্মাণের সঙ্গে নতুন ধরনের আত্মচেতনা আর আত্ম–অনুশীলনের কাজ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকত। মানে জীবনশৈলী আর তত্ত্বশৈলী যে পরস্পরের উৎপাদক বা সৃজক— এই কথাটা অতি সাধারণ কথা ছিল সে সময়ে। তখন আমরা তত্ত্ব/অনুশীলনের বৈপরীত্যে এভাবে জড়িয়ে পড়িনি। এটা শুধু একটা নৈতিক ব্যাপার নয় কিন্তু। মানে কথাটা শুধু এই নয় যে আমি যা ভাবি বা বলি নিজের জীবনে আমার তাই করা উচিত। কথাটা আরও জটিল। অন্য ভাবনা ভাবতে গেলে নিজেকে— একক এবং সামূহিকভাবে— কিছুটা অন্য করে তুলতে হয়, পাল্টে ফেলতে হয়। তত্ত্ব পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যক্তিসত্তারও একটা ভাঙাগড়া চলে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে, যে— কোনো একটা বিশেষ theory বিশেষ ধরনের ব্যক্তিগত, সামাজিক আর সাংস্থানিক practice-এর দাবি করে যেটা সেই theory’র প্রথম শর্ত বা ‘condition of possibility’। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে তত্ত্ব আর অনুশীলনকে আলাদা করে ভাবা যায় না।

    আরও একটা কথা। Practice শব্দটির আর একটি জাত্যর্থ (connotation) হলো অভ্যাস, প্রথা, সংস্কৃতি, রেওয়াজ— মানে যাকে আমরা সাধারণ মানুষের সাধারণ দিনচর্যার ক্ষেত্র বলে জানি। এ সবের সঙ্গে theory’র সম্পর্কটা কী? অনেকে বেশ জোরগলায় বলেন যে প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ক্ষেত্রে একজন দার্শনিক, তত্ত্বজ্ঞানী! ঠিকও বটে, আবার বেঠিকও। জীবনের সব রকম বাচনক্রিয়া বা কর্মক্রিয়াকে আগের থেকেই তত্ত্বজনিত বলে অনুমান করে নেওয়া মুশকিল। তবে নিঃসন্দেহে মানতে হয় যে ‘pure practice’ বলেও কিছু হয় না। এমনকি যে ক্রিয়া একেবারেই অভ্যাসজনিত, মানে যা করতে বেশিকিছু ভাবাভাবি করতে হয় না, সেই ক্রিয়ার ভেতরেও কিন্তু অনেক অতীত ভাবনা, চিন্তা, সংশয়, সিদ্ধান্ত, এমনকি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা স্তরীভূত হয়ে থাকে, পলির মতো। তবে সেই ক্রিয়া কিন্তু নিজবলে তত্ত্ব নয়। তত্ত্ব নির্মাতার কাজ হলো সেই সমস্ত সাধারণ ক্রিয়াকর্মের ভেতর লুকিয়ে থাকা তাত্ত্বিক উপাদানগুলোকে দৃশ্যমান করা; সেগুলো নিয়ে খেলা করা আর সম্ভবত নতুন তাত্ত্বিক সম্ভাবনার জানালা খুলে দেয়া। আমি বলতে চাইছি যে সব ‘practice in and by itself theory’ নয়। কিন্তু সব practice’র মধ্যে theory’র ছায়া বিদ্যমান। অর্থাৎ তত্ত্বের অনুশীলনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে যেমন আমাদের দার্শনিক পরম্পরার দিকে যেতে হয়, ঠিক তেমনি আমাদের যেতে হয় ক্রিয়াকর্মের আর রীতি–রেয়াজের ইতিহাসের দিকে। তত্ত্বের বাস সবখানে!

    এবার আসি ‘সমসাময়িকীকরণ’–এর ধারণায়। আমাদের আধুনিক ইতিহাসবোধ শেখায় যে নানা সমাজ শুধু নানা দেশের বা নানা সংস্কৃতিরই নয়, নানা সময়েরও বটে। এ ভারি অদ্ভুত কথা। আমার সঙ্গে আর একজনের দেখা হলো রাস্তায়। জিজ্ঞেস করলাম কোথা থেকে আসছেন, সেখানে কী ভাষা বলেন, কী গান শোনেন, কী কী খেতে ভালোবাসেন? উত্তর শুনে মনে মনে হিসাব করে নিলাম এই বিজাতীয় বন্ধুটি আমার থেকে কালক্রমে অগ্রসর না অনগ্রসর, আধুনিক না পুরাতন! মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভেবে নিলাম যে আমরা শুধু দুই দেশের নই, দুই আলাদা কালের বাসিন্দা! একই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একজন হয়ে গেল ভূত, যে বর্তমানের হয়েও বর্তমান নয়, উপস্থিত হয়েও অনুপস্থিত। সমসাময়িকীরণের অবধারণাটা এই প্রগতিবাদী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে উঠার প্রচেষ্টা।

    এর তিনটে দিক আছে। প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে যে যেকোনো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে অনেকগুলো ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে— কিছু অনেক পুরোনো, কিছু আপেক্ষিকভাবে নতুন, কিছু আবার তাৎক্ষণিক। যেমন আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার বয়স হয়তো দুই আড়াইশ বছর, আমাদের সাহিত্যের আর দর্শনের বয়স বহু শতাব্দী, আমাদের অন্তর্জাল মাধ্যমের বয়েস মাত্র দুই দশক, আমাদের শরীরের বয়স কিন্তু সহস্রাব্দেরও বেশি, আবার আমাদের পৃথিবীর বয়স তো আরও আরও অনেক বেশি। কিন্তু এই প্রত্যেক ইতিহাসই একে অপরের সমসাময়িক। কারণ আমাদের মধ্যে এই নানা ইতিহাস একই সঙ্গে কাজ করে চলেছে। এই সচেতনতাটা কিন্তু নতুন ধরনের ইতিহাস লেখনের আর তত্ত্বনির্মাণের দাবি করে। তার ভিত্তি অন্য ধরনের কালচিন্তা।

    শিল্পী: সালভাদোর দালি

    অন্য কথাটা আগেই বলেছি— আধুনিকরা ভাবেন যে অতীত একেবারেই ভূত, যাকে বলে absolute past। আমি বলি যে সমকালে নানা ধরনের অতীতের উপস্থিতি আমরা টের পাই, কিন্তু সবসময় ধরতে পারি না। Eelco Runia বলে এক ঐতিহাসিক একে presence of the past বলেন (Runia 2006)। আমি একে অতীতের সমসাময়িকতা বলি— কেননা প্রশ্নটা শুধু উপস্থিতিরই নয়, সমকালীনতারও বটে যেটার তাৎপর্য আমাদের বুঝতে হবে। তেমনি কিছুকিছু ভবিষ্যৎ আভাসের মতো আমাদের মনে ছায়া ফেলে। অর্থাৎ অতীত আর ভবিষ্যৎ দুটোই বর্তমানের ভেতরে কাজ করে চলেছে। সেটা আরেক ধরনের সমসাময়িকতা যেটা আমাদের ধরতে হবে— কেননা আকাট বর্তমান বলে কিছুই নেই। অর্থাৎ তাৎকালিকতারও (moment অর্থে) একটা কালিক বিস্তার (extension) আর কালিক গঠন (architecture) রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আর বিভিন্ন প্রসঙ্গে বর্তমানের কালিক বিস্তার আর গঠনকে নানাভাবে আন্দাজ করা হয়ে এসেছে। এই কালচিন্তার গল্পটাও আমাদের লেখতে হবে।

    আর সমসাময়িকীকরণের তৃতীয় দিকটি হলো অতীত পরম্পরাকে নতুনভাবে পাঠ করা, নিজের সময় অনুসারে। ইতিহাস আমাদের বলে ‘যে সময়ের যা’— মানে অতীতে যা ভাবা বা বলা হয়েছে তার অর্থ সেই অতীতের পরিপ্রেক্ষিতেই বুঝতে হবে। নয়তো হবে কালবৈষম্যের মহাপাপ! এর পাল্টা তর্ক হলো যে কোনো অতীতকেই পুরোপুরিভাবে ধরা যায় না, কারণ অতীত তো অতীতই! তাই ইতিহাস অনিবার্যভাবেই বর্তমানের গল্প, অতীতটা নিমিত্ত মাত্র। আমি মনে করি এর মাঝামাঝি একটা অবস্থান রয়েছে— যেখানে দাঁড়িয়ে সচেতনভাবে অতীত পরম্পরার সঙ্গে বর্তমানের একটা সাক্ষাৎ বা encounter-কে ধরা যায়। অতীতের প্রতি বিশ্বস্ততা বজায় রেখে, অতীতকে সমকালীন করে তোলা, অতীতের চোখে বর্তমানকে দেখা আবার বর্তমানের চোখে অতীতকে— এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অতীতের সাথে সাথে বর্তমানেরও নবীকরণ সম্ভব হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমসাময়িকীকরণের কাজটা সচেতনভাবে সম্পাদন করতে হয়। এটা কোনো স্বয়ংক্রিয় বা automatic অর্জন নয়। অতীতের আর ভবিষ্যতের নানা কল্পনাকে সম্ভব করে তুলে সাহিত্যও সমসাময়িকীকরণের কাজ করে। অতিকথা, সায়েন্স ফিকশান, utopian লেখন— এ সবই সমসাময়িকীকরণের বিভিন্ন প্রচেষ্টা।

    সমসাময়িকীকরণের প্রসঙ্গেই de-contextualization (বি–পরিপ্রেক্ষিতায়ন) ও re-contextualization (পুনঃপরিপ্রেক্ষিতায়ন)-এর কথাগুলো এসে পড়ে। আমি বলি শুধু অতীত পরম্পরাকে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে তোলাই আমাদের কাজ নয়। বর্তমানকেও অতীত আর ভবিষ্যতের আয়নায় নতুন করে দেখা— জানাকে অজানা করা আবার অজানাকে আপন করে নেওয়া— তত্ত্বনির্মাণের কাজে লাগে। ইতিহাসবিদ্যার যে কাল বিভাজন— প্রাচীন, মধ্য আর আধুনিক— তা এই কালচিন্তার পথের একটা বড় অন্তরায়। এই কালবিভাজন আমি অতিক্রম করতে চাই। আমি বলি যে আলাদা আলাদা বস্তুর আর বিষয়ের নিজস্ব কালগতি আর কালবিভাজন থাকে। সব কিছু একসঙ্গে প্রাচীন, একসঙ্গে আধুনিক হয় না। ফুটবলের ইতিহাসের কালবিভাজন সঙ্গীতের ইতিহাসের কালবিভাজনের থেকে যে আলাদা হবে এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

    আর একটা কথাও বলতে হয় এখানে। পরিপ্রেক্ষিত আর প্রসঙ্গকে কিছুটা অতিক্রম না করলে, ইতিহাস থেকে তত্ত্বের দিকে যাওয়া হয়ে ওঠে না। আমরা তথ্য বিশ্লেষণে আটকে থাকি। সর্বাধিক, বিভিন্ন ইতিহাসের বিশেষত্ব আর ভিন্নতা প্রমাণ করে ক্ষান্ত হই। তাই আমি ভাবি যে পরিপ্রেক্ষিতকে মনে রেখেও প্রেক্ষাকে মুক্ত করা প্রয়োজন। না হলে context বা পরিপ্রেক্ষিত আমাদের কারাগার হয়ে ওঠে। তাই ভারত বা বাংলাদেশ বা তিব্বতের ইতিহাস শুধু মাত্র প্রাদেশিক ইতিহাসই হয়ে থেকে যায়। সে ইতিহাসের আর সে ইতিহাস থেকে উদ্ভূত তত্ত্বসামগ্রীর সাধারণীকরণ এবং বিশ্বায়ন হতে পারে না।

    সারোয়ার তুষার: বাংলাদেশ ও ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলোতে দেখা যায় এমনকি অনেক প্রগতিশীল এবং [আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে] গণমুখী দলও জনবিচ্ছিন্ন থেকে যায়। এর কারণ কি এই যে, যেসব রাজনৈতিক পরিভাষা ও তত্ত্বায়ন নিয়ে এসব দল/সংগঠন কাজ করে, সেসব পরিভাষা ও তত্ত্বায়নকে সমাজের বহিঃস্থ কিংবা উপরিস্থ বলে ধরে নেয়া হয় এবং সমাজে ‘প্রয়োগ’ করতে চাওয়া হয়? নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, বর্গ (category) সম্বলিত গণমুখী রাজনীতি যদি সমাজে প্রোথিত (embedded) হয়, তাহলে কি এই সংকট কাটার কোনো সম্ভাবনা আছে? আবার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের উপর নির্ভর করে গোষ্ঠী–জাতীয়তাবাদের (ethno-nationalism) ফাঁদে না পড়ার উপায় কী?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: এটাই আজকের দিনের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। হ্যাঁ, আমি মানি যে লিবারেলিজম, ফ্যাসিজম, অ্যানার্কিজম, মার্ক্সিজম ইত্যাদি যে রাজনৈতিক আদর্শগুলোর মাধ্যমে আমরা রাজনীতিকে বুঝতে চাই, সেগুলো সবই পশ্চিমজাত, পশ্চিমা দর্শনের মূর্ত আর ব্যবহারিক রূপ। উপনিবেশবাদের মাধ্যমে এগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই মতাদর্শগুলো নিয়ে আমাদের ভাবতেই হয়। কিন্তু শুধু এর ভিত্তিতে রাজনীতি করলে জনবিচ্ছিন্নতা অবশ্যম্ভাবী। দুটো উদাহরণ নিই। এক, ধর্ম। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা আর আধুনিকতার নামে, সাধারণ মানুষের জীবন, জরা, মৃত্যু, সুখ, অসুখ, দুঃখ, ভয়, হতাশা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, ঘৃণা অসূয়া— এরকম নানা জৈবিক (existential), আত্মীয় আর অন্তরঙ্গ (intimate) প্রয়োজনগুলোকে উপেক্ষা করে এসেছি। বলেছি ভাত–কাপড় আর ভোটের অধিকারের দিকে মন দিতে। তাই ধর্মটা চলে গেছে মৌলবাদীদের হাতে, আর আমরা হায় হায় করছি। দুই, জাতপাত। আমরা এই আশাতেই বহুদিন কাটিয়েছি যে শিক্ষা আর আধুনিকতার সাথে সাথে caste— বর্ণ আর জাতি— এক সময় class— বা অর্থনৈতিক শ্রেণিতে— বদলে যাবে আর রাজনীতি পৃথিবীব্যাপী শ্রেণিদ্বন্দ্বের চেহারা নেবে। এই ভ্রান্তির ফল হলো যে মার্ক্সবাদী রাজনীতি বেশিরভাগ জায়গাতেই পিছিয়ে পড়ল আর জাতপাত পরিচয়বাদী রাজনীতির চেহারা নিলো। তাই আমার তো উল্টোটাই মনে হয়। যদি আমরা ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, বর্গ, ইত্যাদির প্রশ্নগুলোকে identity’র কবল থেকে বার করে রাজনৈতিক তত্ত্বচিন্তা আর ভাষা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রোথিত করতে পারি তাহলেই আমাদের পরিত্রাণ। অনেকেই চেষ্টা করেছেন— গান্ধী, আম্বেদকার, ফুলে (Phule), ইকবাল, নজরুল, আবুল হাশিম, রবীন্দ্রনাথ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, যোগেন্দ্রানাথ মণ্ডল, আরও সব নাম–অনামী ব্যক্তি। তবে রাষ্ট্রবাদের (Nationalism) জোয়ারে ভেসে এঁদের আমরা মনে রেখেও মনে রাখিনি।

    সারোয়ার তুষার: বর্তমান সময়ের অনেক ইতিহাসবিদ, দার্শনিকই গ্রহীয় (planetary) পর্যায়ে ইতিহাস ও দর্শনচর্চার উপর জোর দেন। দীপেশ চক্রবর্তীকে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ধরতে হয়। তিনি মনুষ্যকেন্দ্রিক গ্লোবাল যুগকে ছাপিয়ে বর্তমান যুগকে ‘planetary age’ (Chakrabarty 2018, 2021) বলছেন। প্ল্যানেটারি স্কেল বা দৃষ্টিকোণ থেকে তত্ত্বের বিউপনিবেশায়ন (decolonization)-এর সম্ভাবনা কতদূর? অর্থাৎ, বিভিন্ন চিন্তা–ঐতিহ্যের মধ্যে গতায়াত, সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য; একইভাবে বিভিন্ন চিন্তা–ঐতিহ্যকে বর্তমানতার মধ্যে অবস্থিত করলেও এই ঝুঁকি থেকেই যায় যে, এই তত্ত্বানুশীলন মনুষ্যকেন্দ্রিকই থেকে যাবে। যে ধরনের ইতিহাস ও তত্ত্ব চর্চা এই গ্রহের উপর মানুষের সার্বভৌমত্ব/উপনিবেশ নাকচ করবে, প্রকৃতি/সংস্কৃতি মহাবিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে এবং মানুষকে সার্বিক জীববৈচিত্র‍্যের ইতিহাসের সাপেক্ষে স্থাপন করবে, এই মহামারি ও সার্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের বাস্তবতায় তেমন তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখেন কিনা?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: এই বিষয় নিয়ে আজ আমরা সবাই ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। দীপেশ চক্রবর্তী আর অমিতাভ ঘোষের (Ghosh 2016) বই তো বটেই, আরও নানাজনের লেখাপত্র পড়ছি। সব যে জেনে বুঝে নিয়েছি তা নয়। তবু কয়টা কথা মাথায় এসেছে, সেগুলোই বলি। এক, প্রাক–আধুনিক আর প্রাক–ঔপনিবেশিক ইতিহাস আমাদের শেখায় যে পুরাতন কালে নানা জীবজন্তু কীট–পক্ষী, দেব–অসুর, নদী–পাহাড়, দৃশ্য–অদৃশ্য শক্তির সাথে মানুষ জড়িয়ে থাকত। অহিংসা আর অনৃশংসতা নিয়ে যে নানা ধরনের তাত্ত্বিক বিতর্ক আমরা পাই কাব্যে আর দর্শনে, সেগুলো আবার নতুন করে খুঁটিয়ে পড়া দরকার, কারণ তাতে মানুষের সঙ্গে অন্য জীব, অ–জীবের উল্লেখ পাওয়া যায়। আমাদের বাংলায় খনার বচনের স্মৃতি এখনো বেঁচে রয়েছে, যাতে মানুষ দ্বারা প্রকৃতিকে বইয়ের মতো পাঠ করার একটা সক্ষমতার গল্প রয়েছে। লাতিনি ডিকলোনিয়াল লেখকেরা Chiapa দেশের আদিবাসীজনের কল্পনা আর চিন্তার জগতটাকে তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে ধনতান্ত্রিক আধুনিকতার বিকল্প হিসেবে। মানে, গ্রহীয় পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রেও প্রাক–আধুনিক পরম্পরার একটা বিশেষ জায়গা আছে। তাই আমার মনে হয় যে অতীত ইতিহাসকে নতুন প্রেক্ষিতে লেখার একটা প্রয়োজন আমাদের সামনে প্রকট হয়েছে। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে আজ নদীর আর মশার, শীতলা আর দক্ষিণরায়ের গল্প এসে পড়ে। এটা আমাদের শিখতে হবে নতুন করে।

    দুই, শুধু পুরোনো ইতিহাস নতুন করে লিখলে হবে না। এটাও মানতে হবে যে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ইতিহাস লিখতে গেলে কাল বিবেচনা আর দেশ বিবেচনা অন্যভাবে করতে হয়। রাষ্ট্র, সভ্যতা, ইতিহাস আর সংস্কৃতির— এমনকি প্রকৃতির, কারণ প্রকৃতির অবধারণাটা সভ্যতার অবধারণার উল্টাপিঠ মাত্র— দায়রার বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। তবে এ প্রশ্নটাও তুলতে হবে যে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির বিউপনিবেশায়ন আদৌ সম্ভব কিনা। অনেক ঐতিহাসিক দেখিয়েছেন যে আধুনিক প্রযুক্তির নানা দিক— বিশেষ করে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র আর জীবশাস্ত্র, যাকে আমরা bacteriology, virology, biomedicine, forensics আর biometrics দায়রা বলে মানতে পারি— তার উদ্ভব উপনিবেশের প্রয়োগশালায়। মানে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিরও একটা ঔপনিবেশিক অতীত রয়েছে। এটা ভুললে চলবে না। আর সেই ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রভাব আজকের অতিমারি আর পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও কীভাবে কাজ করছে তা তো আমরা দেখছিই। আমরা পশ্চিমা genetic data বা জৈবিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ওষুধ আর টিকা ব্যবহার করছি, পশ্চিমা সামাজিক গঠনের ভিত্তিতে তৈরি তথ্যনির্ধারণ প্রণালী কাজে লাগাচ্ছি, আর তারই ভিত্তিতে ভাবীকথন বা prognosis করছি। এই ভ্রান্তির কথা ঐতিহাসিক Warwick Anderson খুব সুন্দর করে বলেন, তার দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার biomedical ইতিহাসের ভিত্তিতে। Warwick Anderson দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাশাস্ত্র আর জীববিজ্ঞানের বি–উপনিবেশিকরণের কথা বলে চলেছেন। তার আলোচনাগুলো আমাদের মন দিয়ে খেয়াল করা উচিৎ। [ Anderso, W (2006), Anderson and Soto Laveaga (2020), Anderson and Lindee (2020)]

    তিন, disciplines বা জ্ঞানের অনুশাসন নিয়ে আমাদের আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করতে হবে। অতিমারি আর পরিবেশ বিপর্যয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে বিজ্ঞান আর মানবিকির উনিশ–শতকীয় বিচ্ছেদ আজ আমাদের বিষম অসহায় করে তুলেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজ আর রাজনীতি নিয়ে একসাথে ভাবা অতি জরুরি আজকের দিনে। Yuk Hui (2016, 2020) বলে একজন প্রযুক্তিবিদ আছেন যিনি মহাজাগতিক বিভিন্নতা বা cosmic diversity’র কথা বলেন। ওনার বক্তব্য যে প্রযুক্তিশাস্ত্রকে আমরা decolonise তখনই করতে পারব যখন আমরা এটা স্বীকার করতে শিখব যে বিশেষ বিশেষ প্রযুক্তির পেছনে বিশেষ বিশেষ জৈবিক, মহাজাগতিক আর তাত্ত্বিক কল্পনা কাজ করে। সমাজশাস্ত্র আর মানবিকিশাস্ত্রের কাজ হলো বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির পেছনের সেই দার্শনিক আর মহাজাগতিক কল্পনাকে সামনে নিয়ে আসা আর এটা দেখানো যে প্রযুক্তি তখনই বিভিন্ন হতে পারে যখন তত্ত্ব আর cosmology’র বিভিন্নতা আমরা ধরতে পারব। এই কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। উনি একটা উদাহরণ দেন সেটা বলি। যেভাবে social media’র বিবর্তন হয়েছে গত কয়েক দশকে সেটা একটা ব্যক্তিবাদী সমাজবিন্যাসের ফল। Social media— তা Facebook হোক বা Twitter বা Snapchat বা Instagram— এটা ধরে নেয় যে আমরা একক ভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি, সমষ্টিগতভাবে নয়। তাই social media’র তথাকথিত গ্রুপগুলোতেও আমাদের একজন একজন করে আলাদা আলাদাভাবে জুড়তে হয়। Social media sociability বা সামাজিকতাকে একটা বিশেষ ধাঁচে তৈরি করছে। এটা বেশ মজার ভাবার বিষয়, তাই না?

    মানে, আমি বলতে চাইছি যে গ্রহীয় প্রেক্ষিত একক বা অনন্য প্রেক্ষিত নয়। এই প্রেক্ষিতের মধ্যে কিন্তু প্রেক্ষিতের বিভিন্নতার কথাটাও নিহিত রয়েছে— কারণ এই ক্ষেত্রে আমাদের মানুষ, জন্তু, বীজাণু আর জলবায়ুর প্রেক্ষিত বা perspective কল্পনা করে নিতে হয়। সেখানেই planetary’র ধারণাটা universal-এর ধারণাটার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। আমি অনেক সময় planetary’র জায়গায় cosmic শব্দটা ব্যবহার করি। তাতে আরও বেশি বিভিন্নতার— জৈবিক, অজৈবিক, তান্ত্রিক, যান্ত্রিক, ভৌতিক, অভৌতিক, লৌকিক, অলৌকিক, দৃশ্যমান আর অদৃশ্য বিভিন্নতার— জায়গা পাওয়া যায় বলে আমার মনে হয়। এখন আমরা আর শুধু ঐতিহাসিক আর সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার কথা ভাবছি না, প্রকৃতিগত বিভিন্নতার কথাও ভাবার চেষ্টা করছি। এই বিভিন্নতার সাথে অবশ্যই তত্ত্ব আর কল্পনার বিভিন্নতার কথা এসে পড়বে।

    সারোয়ার তুষার: গতবছর প্রকাশিত হয় আপনার Elementary Aspects of the Political (Banerjee 2020) বইটি। এই বইয়ে আপনার একটি কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান হচ্ছে political তথা রাজনৈতিক/রাজনৈতিকতা কী?৩ Political বর্গের গাঠনিক রূপটাই বা কী? গত শতাব্দীর আশির দশকে নিম্নবর্গের অধ্যয়ন গ্রুপ নিম্নবর্গের বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রামকে ‘রাজনৈতিক’ আখ্যা দিয়েছিল। এর ফলে আধিপত্যশীল জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতিবাদ (nationalist culturalism), মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবাদ (Marxist economism) এবং উচ্চবর্গ ও মধ্যবিত্তের রাষ্ট্রবাদ (upper-caste and middle class statism) এর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নিতে হয়েছিল। কিন্তু আপনি বলছেন, এমনকি নিম্নবর্গের অধ্যয়নও ‘political’ ক্যাটাগরিটি খতিয়ে দেখেনি, তারা কেবল আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসবাদিতার (historicism) বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। নানাবিধ দার্শনিক ও মতাদর্শিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই যেন ‘political’ বর্গের ব্যাপারে সুনিশ্চিত। আপনি আপনার বইতে যদিও political বর্গটির ব্যাপক ব্যবচ্ছেদ করেছেন, আমাদের এই সাক্ষাৎকারের পাঠকদের জন্য আপনার প্রশ্নটিই পুনরুক্তি করছি, political কী? নিম্নবর্গের সার্বিক অবস্থানগত কোন বিশেষত্ব একে political স্বীকৃতি দেয়?

    ইলামেন্টারি এস্পেক্ট অফ দ্য পলিটিকেল বইয়ের প্রচ্ছদ

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: আমার এই বইয়ের কাজটা শুরু হয় ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। বহুদিন বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কমরেডদের সঙ্গে নানা আলাপ–আলোচনা, তর্ক–বিতর্ক চলল মার্ক্স, লেনিন, মাও নিয়ে; রাজনৈতিক মতাদর্শ (political ideology) আর কলাকৌশল (political strategy) নিয়ে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলাম কই! অন্য দল জাত, ধর্ম, বা চটজলদি ‘পাইয়ে দেয়ার’ কৌশলে আমাদের হারিয়ে দিলো। আবার কখনো দ্বেষবিদ্বেষ, কখনো বা অন্ধভক্তির জোয়ারে আমাদের মতাদর্শ ভেসে গেল। আমরা সাধারণ মানুষকে নীতি আর যুক্তির পাঠ পড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টায় সময় অপচয় করলাম। ক্রমে বুঝলাম যে কমতিটা শুধু আমাদের মতাদর্শের নয়, আবার শুধু কৌশলেরও নয়, রাজনীতির সংজ্ঞারও।

    তাই নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হলাম— রাজনীতি কাকে বলে? একেবারে গোড়ার কথায় ফিরতে চাইলাম। কাজটা কঠিন। ছোটবেলা থেকে আমি নিজেকে গভীরভাবে রাজনীতিমনস্ক বলে ভেবে এসেছি। মাথায় আসেইনি যে রাজনীতি কাকে বলে এ নিয়ে কোনো বিতর্কও হতে পারে। যা পড়ে এসেছি— তা মার্ক্সবাদ হোক বা নিম্নবর্গের ইতিহাস (Subaltern Studies) হোক বা উত্তর–উপনিবেশবাদ হোক, তা শিখিয়েছে যে রাজনৈতিকতা নিজগুণে প্রতীয়মান, প্রশ্নাতীত, অবশ্যম্ভাবী, দেশকাল নির্বিশেষে এক ও সর্বজনীন। না জানলেও, না বুঝলেও, আমরা সবাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; আর সেই দিক থেকে দেখতে গেলে আমরা সবাই মূলত এক। এই বিশ্বাসটা পেছনে ছেড়ে আশা সহজ নয়। তাই ভাবতে ভাবতে বই হয়ে গেল।

    বুঝলাম প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে দুটো কাজ করতে হয়। এক, আমাদের দেশে আধুনিক রাজনীতির বিবর্তন নতুনভাবে বোঝা। তার জন্য রাজনৈতিক ইতিহাস (political history) নয়, রাজনৈতিকতার ইতিহাস (history of the political) অন্যভাবে লিখতে হয়। আর দুই, আধুনিক রাজনীতি চিন্তার যে মৌলিক তত্ত্ব আর আদর্শগুলো আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, সেগুলোর উপর প্রশ্ন তোলা। তাই বলা চলে যে এই বইটু দুটি স্তরে কাজ করে— একটি ঐতিহাসিক, অন্যটি তাত্ত্বিক।

    তাহলে, রাজনীতির ইতিহাস, রাজনৈতিক তত্ত্ব নির্মাণের কাহিনি আর এ দুটির পারস্পারিক সম্পর্ক— এই নিয়ে বই। সাধারণত, রাজনীতি কাকে বলে তার দুটি বিরোধাভাসী ধারণা নিয়ে আমরা কাজ করে থাকি। এক, পার্টি, সরকার, ভোট, আন্দোলন, রাজা, প্রজা, নেতা বক্তৃতা, আইন পুলিশ— আমরা মনে করি যে এইসব নিয়ে রাজনীতি। দুই, আবার আমরা এ–ও মনে করি যে সব কিছুর ভেতরেই রাজনীতি কাজ করে— তা একান্ত আপন প্রেম ভালোবাসা আত্মীয়তা কুটুম্বিতাই হোক বা ধর্ম–পূজঅর্চনা, সিনেমা–থিয়েটারই হোক আর বাজার খেলার মাঠ বা পাড়ার চায়ের দোকানই হোক। প্রথম সংজ্ঞাটি অতি সঙ্কীর্ণ, দ্বিতীয়টি অতি বিস্তীর্ণ। আমি মনে করি যে আমাদের এই দুটি সংজ্ঞার মাঝামাঝি একটা অবস্থান খুঁজে নিতে হবে, যেখানে রাজনীতি রাষ্ট্র সংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপের দায়রার বাইরে হলেও নির্দিষ্ট এবং বিশিষ্ট রূপে প্রতীয়মান। অর্থাৎ আমি মনে করি যে ‘everything is political’ বললে রাজনীতির আর কোনো অর্থ থাকে না, ফলপ্রসূতা থাকে না।

    আমি তাই বলছি যে power বা ক্ষমতার অবধারণা (discourse, conceptualisation) আর political বা রাজনৈতিকতার অবধারণা এক নয়। ক্ষমতা সর্বব্যাপী। ফুকো দেখিয়েছেন যে একান্ত নিজি আর ব্যক্তিগত ক্ষেত্র এবং সম্পূর্ণ প্রকাশ্য আর লৌকিক ক্ষেত্র, এই দুই জায়গাতেই ক্ষমতা নানা রূপে ক্রিয়াশীল। কিন্তু উনি কখনোই ক্ষমতা আর রাজনীতির তত্ত্বদুটি গুলিয়ে ফেলেননি। আমি মনে করি যে বিশেষ বিশেষ সময়ে আর প্রসঙ্গে ক্ষমতার প্রতি আমাদের approach বা অভিমুখ রাজনৈতিকতার চেহারা নেয়, কিন্তু সর্বদা নয়। অন্য সময়ে এই অভিমুখ বাধ্যতা, বিশ্বাস, সতর্কতা, পলায়ন, অমনোযোগ, এমনকি বিস্মৃতিরও হয়ে উঠতে পারে। মানে রাজনৈতিকতাকে আমি একটি অনন্য আর বিশিষ্ট অভিমুখ হিসেবে দেখছি এখানে। তাই রাজনীতি কাকে বলে এই প্রশ্নের জায়গায় আমি একটু ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করছি। আমি মানছি যে যেকোনো বিষয়— তা রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থ, শিল্প, যৌনতা বা খেলাধুলা যা কিছুই হোক না কেন— কোনো না কোনো সময়ে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে প্রকট হতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিষয় আর অ–রাজনৈতিক (non-political) বিষয় বলে দুটি ভিন্ন স্থায়ীভাব বা আলাদা বর্গ হয় না। কিন্তু যেকোনো বিষয়ের ঠিক কীভাবে রাজনীতিকরণ বা politicisation হচ্ছে, সেটা বোঝা প্রয়োজন। রাজনীতিকরণের প্রক্রিয়ার অধ্যয়নই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে ‘রাজনৈতিকতা’ বস্তুটা আসলে কী? তাই বইটিতে আমি বোঝার চেষ্টা করছি কীভাবে উনিশ–বিশ শতকে ভারতবর্ষে ব্যক্তি, কর্ম, ভাব আর সমষ্টির রাজনীতিকরণ হয়েছে, কীভাবে সেই রাজনীতিকরণের ইতিহাসের অন্তর্নিহিত তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বগুলোর সমস্যায়ন হয়েছে আর কীভাবে সেসব দ্বন্দ্বের সমাধান বা সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টা করা হয়েছে।

    তর্কের প্রথম ধাপটা বিশ্লেষণমূলক। রাজনীতির ধারণাটাকে ভেঙে বোঝার চেষ্টা। সামান্য বোধে বা common sense-এ রাজনীতির চারটি মৌলিক উপাদান (element) আছে বলে আমরা ভাবি— রাজনৈতিক অভিমুখিতা বা স্ব–চেতনা (political subjectivity), রাজনৈতিক কর্ম বা ক্রিয়া (political action), রাজনৈতিক আদর্শ বা মতাদর্শ (political norm or ideology) আর রাজনৈতিক সমষ্টি (political community) যাকে আমরা জন বা গণ বা আওয়ামের (people) নাম দিয়ে থাকি। এই চারটি উপাদানের রাসায়নিক সংমিশ্রণে যেন রাজনীতি নামক বস্তুটির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। যাকে আমরা ‘রাজনীতি’ বলি তা যেন এই নানা উপাদানের মিশ্রণে তৈরি এক যৌগ পদার্থ (compound entity)। এই elements-এর ধারণাটা রসায়নশাস্ত্র থেকে ধার করে সমাজবিদরা কখনো কখনো সমাজ–সংস্কৃতির নানা দিককে ভেঙে বিশ্লেষণ করার কাজে লাগিয়েছেন। আমরা জানি যে রসায়নশাস্ত্রে মৌলিক উপাদান হলো এমন এক বস্তু যার আর কোনো বিভাজন বা বিশ্লেষণ (decomposition) হয় না, যা বাস্তবের সব থেকে সরল, মূল আর আদিম (primordial) রূপ। তাই এমিল ডুর্খেইম ধর্ম কাকে বলে সেটা বোঝাতে গিয়ে ‘Elementary Forms of Religion’; ক্লদ লেভি স্ত্রস নানা সমাজে জ্ঞাতিত্বের ভিন্ন ভিন্ন গঠন বোঝাতে গিয়ে ‘Elementary Structures of Kinship’; আর রণজিৎ গুহ কৃষক বিদ্রোহের নির্মাণ বোঝাতে গিয়ে ‘Elementary Aspects of Peasant Insurgency’র কথা বলেছেন। এঁরা সকলেই মনে করেন যে স্থান–কালের বিভিন্নতা সত্ত্বেও যেকোনো সামাজিক ব্যাপার বা বস্তুর elements বা মৌলিক উপাদানগুলো একক, সাধারণ ও সর্বজনীন। আমি কিন্তু ঠিক উল্টো কথা বলছি। আমি বলছি যে যাকে আমরা রাজনীতির মৌলিক উপাদান বলে জানি, তারই গভীরে দ্বন্দ্ব আর বিরোধাভাস লুকিয়ে আছে। তাই এই উপাদানগুলোকে মৌলিক বা elementary বলা চলে না। এই উপাদানগুলোর আন্তরীণ সংঘর্ষণে আধুনিক রাজনীতি তাই সর্বদাই অস্থির, উদ্বায়ী, অমীমাংসিত, ধরতে গেলে ফসকে যায়।

    উদাহরণ দিয়ে বলি। যাকে আমরা রাজনৈতিক স্ব–চেতনা বলি তার মধ্যে দুটো বিপরীত ঝোঁক কাজ করে— এক দিকে আত্মত্যাগের, অন্য দিকে স্বার্থান্বেষের। তাই রাজনৈতিক ব্যক্তি কখনো সন্ন্যাসী, ফকির বা শহিদের চেহারায় প্রকট হয়, আবার সেই একই ব্যক্তি কখনো চাণক্যরূপী হয়ে ওঠে। এক দিকে বলিদান, স্বার্থত্যাগ; অন্য দিকে ধূর্ততা, নিষ্ঠুরতা, নৈরাজ্যবাদ৪। একদিকে নীতি, সমভাব আর আধ্যাত্মিকতা, অন্য দিকে খলতা, নাটকীয়তা, বিগ্রহ–কৌশল। গান্ধীর মধ্যে এই দুটো ঝোঁকই দেখতে পাওয়া যায়— এক দিকে মহাত্মা, অন্য দিকে চতুরচাণক্য। এই দুই অভিমুখিতা দুজন আলাদা ব্যক্তির বা চেতনার নয়; একই ব্যক্তির, একই চেতনার। দ্বন্দ্বটা সেখানেই। তাই প্রথম দুটি অধ্যায়ে আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি কীভাবে আধুনিক রাজনীতির ক্ষেত্রে আত্মত্যাগ আর কূটনীতির দুটো পরম্পরা একসাথে কাজ করে, যার ফলে political subjectivity’র অর্থকে কখনোই তাত্ত্বিকভাবে স্থির আর সিদ্ধ করা যায় না।

    ঠিক তেমনি আমার পরের দুটি অধ্যায়ে দেখাচ্ছি কীভাবে রাজনৈতিক কর্মের ক্ষেত্রেও দুটি বিপরীত ঝোঁক কাজ করে। এক দিকে নিষ্কাম কর্মের ধারণা, যা ফলের আশা রাখে না, শুধু কাজ করার জন্য কাজ করে যায়। এখানে জোরটা কাজের প্রক্রিয়া, মাধ্যম, নিমিত্ত বা process এর উপর। অন্যদিকে শ্রম, যা উৎপাদন আর সৃজনের আদর্শে বিশ্বাসী, তাই ফলের কথা বলে। এখানে জোরটা পরিণাম, লক্ষ্য বা consequence-এর উপর। আধুনিককালে এই দুই বিরোধী ভাবাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিক কর্মকে কল্পনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুদ্ধ, বিগ্রহ আর সংগ্রামের ধারণা আসে এই দুটি বিপরীত ঝোঁককে সমকক্ষ করার চেষ্টায়— যেখানে স্থির নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অবধারণা থাকলেও প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা অনিবার্য। তাই ‘লড়াই’ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কর্মের উপমা বা নকশা। গান্ধী–আম্বেদকরের মধ্যে কর্ম–মাধ্যম আর কর্ম–লক্ষ্যের সমীকরণ, যাকে কার্যকারণ সম্বন্ধ বা means-end equation বলা হয়ে থাকে, তা নিয়ে যে বিতর্ক হয় তার কেন্দ্রেও রয়েছে সংগ্রাম আর লড়াইয়ের প্রশ্ন। এটাকে শুধুমাত্র হিংসা আর অহিংসার নৈতিক দ্বিধা বলে ধরে নিলে কিন্তু আমরা রাজনৈতিক ক্রিয়া কাকে বলে এই প্রশ্নটার জটিলতা পুরোপুরি ধরতে পারি না। আর এটাও আন্দাজ করতে পারি না যে আধুনিক রাজনীতির ঠিক কেন্দ্রে একটা অসমাধেয় দ্বন্দ্ব কাজ করে। তা হলো এই যে, যদি জীবনযাত্রা মানে অবিরাম কর্মক্রিয়া হয় তবে আমরা শুধু রাজনীতিকেই action বা activism বলি কেন? এ কথা বললে সাধারণ জীবনকে একধরনের নির্জীব নিষ্ক্রিয়তা (passivity) বলে ধরে নেওয়া হয় না কি? পশ্চিমা রাজনীতিশাস্ত্র রাজনীতিকে action বলে সংজ্ঞায়িত করার ফলে দৈনন্দিন জীবনের গতিশীলতাকে আমরা ঠিক চিনে উঠতে পারি না। ফলে event/everyday আর normal/exceptional-এর দ্বৈতবোধ সর্বদাই আধুনিক রাজনীতিশাস্ত্রে হানা দেয়।

    আধুনিক রাজনৈতিক আদর্শের ধারণাটাও ঠিক তেমনি দ্বন্দ্বপ্রসূত। তাই এর পরের দুই অধ্যায়ে আমি দেখাচ্ছি কীভাবে আধুনিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্যের ধারণাটির বিবর্তন হয়েছে আধ্যাত্মিকতা আর অর্থনীতির আভিমুখ্যতার বা encounter এর মাধ্যমে— যেখানে একদিকে বেদান্ত, ইসলাম আর বৌদ্ধ ধর্ম এসে পড়েছে, অন্যদিকে এসেছে নির্ভেজাল অর্থনীতির যুক্তি, বাঙালি মার্ক্সবাদ। অথচ ধর্ম বা অর্থনীতি কোনোটাই নিজবলে যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারছে না রাজনীতিকরণের কাজে। তাই রাজনীতির ক্ষেত্রে কার্যকর হতে গেলে আধ্যাত্মিক চিন্তাকে জীবন আর জীবিকার প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে; আর অর্থনীতিকে সমাজচিন্তা আর সাহিত্যভাবনার থেকে অন্তর্দৃষ্টি ধার নিতে হচ্ছে। অথচ ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা দুটিই দাবি করছে যে তারা রাজনীতির নয়, রাজনীতিকে অতিক্রম করে— রাজনীতির আগে ও পরে— মানুষের আদিম অস্তিত্ব আর প্রাণীত্বের কথা বলে থাকে। যদিও ধর্ম আর অর্থকে বিপরীতধর্মী বলে আমরা জানি, ধর্ম আর অর্থের দায়রার মধ্যে এখানে আমরা একটা সমাপতন বা overlap দেখছি। দুটোই একই সঙ্গে রাজনৈতিকতার সীমা দর্শাচ্ছে আবার রাজনীতির মূল ভিত্তি হয়ে উঠার দাবি করছে। রাজনীতির প্রকৃতিজ অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার প্রশমন করার চেষ্টা করছে।

    ঠিক তেমনি দেখি রাজনৈতিক সমষ্টি বা people-এর কল্পনাটা দুটো বিপরীত অবস্থানের মধ্যে দোদুল্যমান। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে people-এর ধারণাটা তৈরি হচ্ছে সমষ্টির অন্যান্য কল্পনার বিরুদ্ধে। সে সময়কার বিকল্পগুলো ছিল এক, সমাজ বা society; দুই, জন বা population; তিন, ভিড় বা crowd; চার, লোক বা folk আর পাঁচ, প্রজা বা subject— যেগুলোর কোনোটাই ঠিক people-এর সূচক বা প্রতিরূপ হয়ে উঠতে পারছে না। কেন সে কথাটা বইয়ে বিশদ করা আছে। এখানে এটা বলাই যথেষ্ট যে তৎকালীন এই প্রাকদত্ত বর্গগুলো people-এর অপরিহার্য ঐক্যবদ্ধতার নির্দেশ দিতে অক্ষম হচ্ছে। তাই রাজনীতির ক্ষেত্রে এই বর্গগুলো অতিক্রম করে সামনে আসছে people-এর ধারণাটি, দুটি বিপরীত তত্ত্বায়নের আর প্রয়োগের মাধ্যমে। একদিকে পাচ্ছি political party বা রাজনৈতিক দলের একটা নতুন অবধারণা, আর অন্যদিকে পাচ্ছি জন বা গণ নামক একটা নান্দনিক বা aesthetic বর্গের উদ্ভাবন। একদিকে পার্টির শক্ত আর দৃঢ় বাঁধনের মধ্যে বেঁধে এক ঐকিক বা singular জনগণকে হাজির করার চেষ্টা। অন্যদিকে সাহিত্য–কবিতা–নাটকের মাধ্যমে আগামীদিনের নতুন লোক–একতার কল্পনাকে সাকার করার চেষ্টা। একদিকে সংগঠন বা structure, আর এক দিকে স্বপ্ন বা fiction। একদিকে অনুশাসন, অন্যদিকে রস। এর থেকে বড় অসঙ্গতি আর কী–ইবা হতে পারে! বইয়ে এটাকেই আমি people-এর অসম্ভাব্যতা বলছি। মনে রাখতে হবে যে এখানে প্রশ্নটা কিন্তু ‘people কে?’ সেটা নয়। আমরা তো জানিই যে সময় বিশেষে people শ্রমিকজাতি বা কৃষক বা দলিত বা হিন্দু বা মুসলমান হতে পারে। প্রশ্নটা আসলে ‘people কী’ সেটার। প্রশ্নটা people-এর সংরচনা, পরিকাঠামো আর সারতত্ত্বের আর people-এর সাথে সমাজ, ভিড়, জন, দল, লোক আর প্রজার ভেদের।

    শিল্পী: ফিলিপ ফোল্টজ্‌

    তাহলে, রাজনীতির মূল উপাদানগুলো নানাভাবে দ্বন্দ্বগ্রস্ত, এটা আমরা বুঝলাম। তাহলে আধুনিক রাজনীতিতত্ত্বের বুনিয়াদটা কী, যে বুনিয়াদের জোরে পশ্চিমা রাজনীতি দর্শনের সারা বিশ্বে এত রমরমা? এই বুনিয়াদটা হলো রাজনৈতিক (political) আর অ–রাজনৈতিক–এর আনুশাসনিক বিভেদ। এখানে জ্ঞানের রাজনীতির কথাটা এসে পড়ছে। আধুনিক সমাজশাস্ত্র আর মানবিকির ইতিহাস দেখলে এটা আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে প্রত্যেকটি আধুনিক অনুশাসনের কেন্দ্রে এই political/non-political-এর তাত্ত্বিক বিভাজনটা কাজ করে। যেমন, রাজনীতিশাস্ত্র বা political science দাঁড়িয়ে আছে ধর্ম আর রাষ্ট্রের বিভেদের উপর— তাই দুইশ বছর পুরানা secularism-এর বিতর্কটা আজও চলছে। Economics বা অর্থশাস্ত্রের গোড়ায় রয়েছে বাজার আর রাষ্ট্রের বিভাজন। নৃতত্ত্ব আর সমাজতত্ত্বের, অর্থাৎ anthropology আর sociology’র কেন্দ্রে কাজ করছে রাজনীতি আর সংস্কৃতির দ্বৈতভাব— রাজনৈতিক ঘটনা (Event) আর রাজনৈতিক কর্মের (Action) সঙ্গে জীবনপ্রবাহ, আদত–অভ্যাস, দৈনন্দিনতার বৈপরীত্য। যেন রাজনৈতিক বস্তু বা বিষয় নিজবলে নিজগুণে ‘রাজনৈতিক’ বলে সিদ্ধ হয় না, তথাকথিত অ–রাজনৈতিক বিষয় বা বস্তুর আয়নায় ধরা পড়ে। তাই বইটাতে রাজনীতি কাকে বলে এই প্রশ্নটির সাথে বারবার এসে পড়ছে সমাজ কাকে বলে, শিল্প কাকে বলে, সংস্কৃতি কাকে বলে, দর্শন কাকে বলে, অর্থনীতি কাকে বলে, এইসব প্রশ্নগুলোও। মানে রাজনীতির প্রত্যয়ের সঙ্গে সমাজ, সংস্কৃতি, শিল্প, অর্থ, দর্শন আর অর্থের প্রত্যয়েরও বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে।

    আধুনিককালে আমরা মেনে বসেছি যে ‘রাজনৈতিকতা’ এক সর্বব্যাপী, সর্বজনীন, সমভাবী অভিযোজন। কিন্তু ‘রাজনৈতিক’ হওয়ার অর্থ কী? না; স্রেফ সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন, ধর্ম, বা অর্থমনস্ক হওয়া না। অথচ একই সঙ্গে আমরা এও বলি যে সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন, ধর্ম আর অর্থ অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক যুক্তিসাপেক্ষ। কাজেই যা রাজনৈতিক নয় তাও রাজনৈতিক বটে। এ ধরনের ভাবনা কি অনুলাপ বা tautology’র দোষে দোষী নয়? আমার বক্তব্য যে আধুনিক রাজনীতিভাবনার এই ধাঁচটা আমাদের আসলে রাজনীতি নিয়ে ভাবতেই দেয় না। রাজনীতির ধারণাটা একটা স্বতঃসিদ্ধ আর প্রাথমিক সত্যের চেহারা নেয়, যা ঈশ্বরের মতো প্রশ্নাতীত। এতে আমরা রাজনীতিতেই কমজোর হয়ে পড়ি। কারণ আমরা রাজনীতির নির্দিষ্টকরণ করতে ভয় পাই। তাই আমি জিজ্ঞেস করছি— আমাদের জীবনে আর ভাবনায় কি রাজনীতি ছাড়া কিছু থাকতে পারে, যা রাজনীতিকে মেনে নিয়েও রাজনীতির অতিক্রমণ করে, যাকে আমরা extra-political-এর নাম দিতে পারি? যখন জীবনের শেষে আম্বেদকার শূন্যতত্ত্বের কথা বলেন বা যখন নজরুল বিদ্রোহের রাজনীতিকে পাগলামির সীমার পারে খোঁজেন, ইকবাল কবির খুদ’ই–কে আল্লাহর সমকক্ষ করে তোলেন, রবীন্দ্রনাথ কালের সীমা আর অসীমের খোঁজ করেন, বা গান্ধী নিজের যৌনতার সঙ্গে আজীবন লড়াই চালান— তা কি শুধুমাত্র রাজনীতির নাগালে ধরা যায়? নাকি অন্য কোনো অন্বেষণ এখানে কাজ করছে যা রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকলেও রাজনীতির থেকে কিছুটা ভিন্ন? এই অন্বেষণগুলোর সম্পূর্ণ রাজনীতিকরণ কখনোই হয় না, অথচ এগুলো রাজনীতির কাজকে পরিসীমিত আর নির্দিষ্ট করে, আবার একই সঙ্গে রাজনীতির নবায়ন আর পুনরুজ্জীবন সম্ভব করে তোলে। তাই বইটাতে আমি বলছি যে রাজনীতি কাকে বলে সেটা বুঝতে গেলে, political-এর সঙ্গে non-political আর extra-political-কে নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। এ দিক থেকে আমি দীপেশ চক্রবর্তীর সঙ্গে একমত— পরিবেশ সংকটের প্রসঙ্গে ভূমণ্ডল আর মহাজগত নিয়ে ভাবতে হলে, তা শুধুমাত্র বর্তমান রাজনীতিতত্ত্বের কাঠামোর মধ্যে ভাবলে চলবে না। কারণ জলবায়ু, ভাইরাস, জীব, কীটাণু, যন্ত্র আর প্রযুক্তির নানান রাজনৈতিক মাত্রা থাকলেও সেগুলোকে কিন্তু সর্বাঙ্গরূপে রাজনৈতিক পাত্র হিসেবে দেখা যায় না। তাই রাজনীতির বাইরেও আমাদের ভাবতে হবে। তবেই রাজনীতিতত্ত্বের নবীনিকরণ আমরা করতে পারব।

    সারোয়ার তুষার: দর্শন এবং মতাদর্শকে (ideology) রাজনীতির মূল নির্যাস ভাবার বহু প্রচলিত রেওয়াজ আছে। আপনি Elementary Aspects of the Political বইতে দর্শন ও ইতিহাসের সম্পর্ক এবং রাজনীতিতে এর প্রয়োগ সংক্রান্ত ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। দর্শনকে রাজনীতির ‘স্বাভাবিক ভিত্তি’ ভাবার বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান (আপনার ভাষায়: I wish to displace philosophy itself from being the natural ground of the political)। রাজনীতিতে দর্শনের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই বা থাকতে পারে না এমন কোনো দাবি অবশ্য আপনি করছেন না। আপনার মতে, পশ্চিমা রাজনৈতিক দর্শন নিজেকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিকতা থেকে মুক্ত করে দুইভাবে। প্রথমত, ফরাসি বিপ্লব বা শিল্প বিপ্লবের মতো স্থানীয় ঘটনার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে; দ্বিতীয়ত, এসব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন দার্শনিক আদর্শ হিসেবে হাজির করে। স্বাধীনতা, সাম্য, পুঁজি, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদের মতো দার্শনিক ও মতাদর্শিক বর্গের মধ্যে নিহিত ঐতিহাসিকতা মুছে দেয়ার মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়। এর ফলে ইতিহাসের উপরই কেবল দর্শনের আধিপত্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় না, এমনকি এক ইতিহাসের উপর অন্য ইতিহাসের কর্তৃত্বক্রম (hierarchy) প্রতিষ্ঠিত হয়। এক ইতিহাস (অর্থাৎ পশ্চিমের ইতিহাস) নিজেকে দার্শনিক ও আদর্শিকভাবে (normatively) প্রধান/অনুসরণীয় দাবি করতে পারে, কিন্তু অন্য ইতিহাসের (এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ইতিহাস) এমন দাবির কোনো সুযোগ থাকে না।

    এই পরিপ্রেক্ষিতেই দর্শন ও মতাদর্শ হয়ে ওঠে রাজনীতির ভিত্তিভূমি। আপনি এই কর্তৃত্বক্রমকে চিহ্নিত করেছেন। এর পটভূমি বিস্তারিত জানতে চাই। কোন উপলব্ধি থেকে আপনি কেবল সাংস্কৃতিক পার্থক্য (cultural difference), কিংবা ইউরোপের প্রাদেশিকিকরণে (provinicializing) কিংবা পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসবাদিতার সমালোচনার মাধ্যমে আপনার অবস্থানগত হিস্যা (stake) নিশ্চিতকরণে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে খোদ দর্শনকে এর আধিপত্যশীল অবস্থান (hegemonic location) থেকে অপসারণ করতে চেয়েছেন? কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের সাপেক্ষে ‘what is political?’ এই প্রশ্ন না তুলে কেন এমন এক মিলনবিন্দু/মোহনা (crossroad) আপনি বেছে নিলেন, যা কিনা বিভিন্ন দর্শন ও ইতিহাস আদান–প্রদানের মিলনক্ষেত্র? দক্ষিণ গোলার্ধ (global south)-কে আপনি ‘non-place’-ই বা বলছেন কেন?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনি ঠিকই ধরেছেন। আধুনিককালে পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার প্রভাবে আমরা মেনে নিয়েছি যে রাজনীতি (politics) আর রাজনীতিদর্শনের (political philosophy) মধ্যে একটা জৈব বা প্রাকৃতিক সম্বন্ধ রয়েছে। তাই রাজনীতির কথা ভাবলেই মার্ক্স, হেগেল, কান্ট, ফুকো, রঁসিয়ের নাম এসে পড়ে। অথবা লিবারেলিজম, মার্ক্সবাদ, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি ভাবাদর্শের কথা এসে পড়ে; যেগুলো পশ্চিমা ইতিহাসজাত তত্ত্বের উপর নির্ভর অভিব্যক্তি বিশেষ। এই পশ্চিমা চশমা চোখে পরে আমরা আমাদের নিজস্ব রাজনীতি পরম্পরাকে অনেক সময় ভুল বুঝি। তবে পশ্চিমা দর্শনের জায়গায় শুধুমাত্র প্রাচ্য দর্শনকে নিয়ে এলেই সমস্যা কিন্তু সমাধান হয় না। কাজেই মার্ক্স, হেগেল, কান্টের জায়গায় গান্ধী, আম্বেদকার বা নেহরু পড়লেই কাজ খতম, এটা ভাবা কিন্তু একেবারেই ভুল। গান্ধী, আম্বেদকার তো পড়তে হবেই। কিন্তু তার সাথে সাথে আমাদের দর্শন— আর মতাদর্শসর্বস্ব চিন্তাশৈলীকেও পাল্টাতে হবে। ঔপনিবেশিক ও আধুনিককালে রাজনীতিচিন্তার ক্ষেত্রে দর্শনের যে আধিপত্য স্থাপন হয়েছে সেটার উপর প্রশ্ন তুলতে হবে।

    পশ্চিমা রাজনীতিদর্শনের আধিপত্যের ঐতিহাসিক উৎস তিনটি। প্রথম উৎস philosopher-king-এর প্রাচীন গ্রিক আদর্শ। দ্বিতীয় উৎস হলো ঔপনিবেশিক শাসন— যা তথাকথিত অনগ্রসর সমাজের উপর পশ্চিমা দর্শনজাত নীতি আর তত্ত্ব চাপিয়ে দেয়, যা স্থানীয় সমাজ বা প্রথার মধ্যে থেকে জৈবিকভাবে গড়ে ওঠেনি। আর তৃতীয় উৎস হলো সাম্প্রতিক শাসনব্যবস্থা, যাকে অনেকে বিশেষজ্ঞ বর্গের শাসন বা rule of experts (Mitchell 2002) নাম দিয়েছেন।

    দর্শনের (philosophy) সার্বভৌমিক আধিপত্য একটি বড় সঙ্কট খাড়া করে। তত্ত্ব আর অনুশীলনের মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি করে। ফলে আমরা বারবার বাস্তবের সঙ্গে ভাবের, তত্ত্বের সঙ্গে প্রয়োগের অমিলের প্রশ্নে বাঁধা পড়ি। এই সনাতন সঙ্কট থেকে বেরুতে হলে দর্শনের আয়নায় বাস্তবকে চিনতে চেষ্টা না করে আমাদের সাধারণ জীবনে নিহিত তাত্ত্বিক সম্ভাবনাগুলো চিনতে শিখতে হবে। এ কথা আমি আগে বিশদভাবে বলেছি প্রথম প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে। তবে আমি কোনো আকাট বাস্তববাদী চিন্তাশৈলীর কথা বলছি না এখানে। রাজনীতির ক্ষেত্রে ভাবের আর কল্পনার খুব বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই সেসব ভাব আর কল্পনার কীভাবে রাজনীতিকরণ হচ্ছে সেটা আমাদের বোঝা দরকার। কল্পনা আর ভাবের ভূমিকা আর দর্শনের ভূমিকা— এ দুটি কিন্তু আলাদা প্রশ্ন। যাকে আমরা philosophy বলি— যার সঠিক অনুবাদ কিন্তু দর্শন নয় — সেটি চিন্তার একটি বিশেষ শৈলী আর চিন্তার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ককে বোঝার একটি বিশেষ পরিকল্পনা। আমি এখানে political philosophy’র আধিপত্যের সমালোচনা আর বিনির্মাণ করছি। বলছি যে philosophy আর রাজনীতিতে philosophy’র ভূমিকাকে পূর্ব–দত্ত বা pre-given বলে মেনে নেওয়া চলবে না। কিছু কিছু সময়ে দর্শনচিন্তা রাজনীতির কেন্দ্রে এসে পড়ে, আবার অন্য সময়ে দর্শনচিন্তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাই রাজনীতিতত্ত্ব আর রাজনীতিক্রিয়ার সম্বন্ধটা প্রসঙ্গ আর সময় অনুসারে পাল্টায়। Political philosophy’র কোনো একচেটিয়া অধিকার নেই রাজনীতিকে বোঝার ব্যপারে; ঠিক যেমন কোনো বিশেষ শ্রেণি, বর্গ বা জাতির বিশেষাধিকার নেই, তা সে শ্রমিক শ্রেণিই হোক বা শিক্ষিত বর্গ বা ব্রাহ্মণ জাতিই হোক।

    এই প্রসঙ্গে আর একটা কথাও এসে পড়ে। আমি মনে করি যে পশ্চিমা দর্শনের আলোচনা আর প্রাদেশিকীকরণের পরও আর একটা কাজ রয়ে যায়। তা হলো দর্শনের সংজ্ঞার পুনর্চিন্তন। যাকে আমরা ‘theory’ বলে জানি তার একটা বিশেষ ব্যুৎপত্তি আর ব্যাকরণ আছে। Theoria শব্দটি গ্রিক ভাষাজাত— যার মানে contemplation বা মনন, যার সাথে মন দিয়ে আর দূর থেকে দেখার একটা সম্বন্ধ আছে। Peter Sloterdjik (2012) খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে এই দৃষ্টি–নিরপেক্ষ, অনুভূতিহীন, নিষ্ক্রিয় আর অচেষ্ট বলে কল্পনা করা হয়েছে। উনি বলেন ‘theoria’ মননকারিকে যেন প্রায় মৃত আর জড় করে তোলে, মননে তন্নিষ্ঠতার নামে! এই অভিমুখিতার আধুনিকীকরণ হয় ইউরোপীয় দর্শনে, বিশেষ করে phenomenology’র দ্বারা। মনে রাখতে হবে যে ইউরোপীয় দর্শন পরম্পরার কেন্দ্রে কাজ করে mind/body, subject/object আর idea/reality’র দ্বৈতভাব। সব পরম্পরায় কিন্তু তা নয়। যেমন সাংখ্যদর্শনে মানস আর বুদ্ধি প্রকৃতির অন্তর্গত, অর্থাৎ যাকে আমরা mind বলি তা কিন্তু এখানে বস্তুগততা বা materiality আর শারীরিকীকরণ বা embodiment-এর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। কাজেই এখানে philosophy বা theory অপরিহার্যভাবে বাস্তব বা ব্যবহারিক জীবনের বিপরীত নয়।

    এদিকে আঠারো শতকে ইউরোপে বিতর্ক চলে যে ভারতীয় বা চিনি দর্শনকে philosophy বা theory বলা যায় কিনা এই নিয়ে। উপনিবেশবাদের হাত ধরে নানা দেশের তত্ত্ব–পরম্পরা তখন সবে ইউরোপে পৌঁছেছে৫। সিদ্ধান্ত হলো যে যেহেতু ভারতে দর্শনচিন্তা অধ্যাত্ম আর অস্তিত্ব সম্বন্ধীয় প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেহেতু এগুলোকে ঠিক theory বলা চলে না, এগুলোকে ধর্মচিন্তা আর কর্মচিন্তার অঙ্গ বলাই সমীচীন। ফলে নানা ভারতীয় চিন্তাবিদ লেগে পড়লেন এটা প্রমাণ করতে যে ভারতের প্রাক–আধুনিক দর্শন পরম্পরাগুলো pure theory, নির্ভেজাল মনন যার সঙ্গে কর্মক্রিয়া বা আত্মানুশীলনের কোনো যোগ নেই। অন্যদিকে দর্শন কাকে বলে এই প্রশ্নটাই চাপা পড়ে গেল। Theory’র নামে আমরা ক্রমশ পশ্চিমা তত্ত্ব পরম্পরাই বুঝতে লাগলাম।

    এদেশে কিন্তু প্রাক–আধুনিককালে তত্ত্বচিন্তার নানান নাম ছিল— মত, দর্শন আর আগম, যেগুলোর মানে হলো opinion, perspective আর পথ। শব্দগুলো থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে দর্শন theory’র মতো কোনো meta-category বা অধি–বর্গ নয়। দর্শন বিভিন্ন, ভিন্ন ভিন্ন প্রথা আর অবস্থান সাপেক্ষ। ইসলামি পরম্পরায় ‘falsafa’ শব্দটির ব্যবহার দেখতে পাই; যেখানে দর্শন, আইন আর ধর্ম এই তিনটার মধ্যে একটা টানাপোড়েনের গল্প আছে। অতীতে কিন্তু তত্ত্ব কাকে বলে সেটা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে যেগুলো নিয়ে আমরা এখন আর ভাবি না— যেমন, তত্ত্বের সঙ্গে প্রত্যয়, পদার্থ, কাল, কার্যকারণ, ধর্ম আর নিয়মের সম্বন্ধ কীভাবে ভাবা উচিত; তত্ত্বের কোনো নির্ধার্য স্বত্ব আছে না তা প্রচলন মাত্র; বস্তু বা বর্গ একক না সর্বদাই তার প্রতিত্য সমুৎপাদ হয়; অনেকান্তবাদ আর সাপেক্ষবাদ এক কিনা ইত্যাদি।

    আমার মনে হয় আমরা পশ্চিমা তত্ত্বচিন্তার আলোচনা আর প্রাদেশিকীকরণ করেছি বটে, কিন্তু তত্ত্বের তত্ত্বকে নতুন করে ভাবার কাজটা এখনো করতে শুরু করিনি। তেমনি ঐতিহাসিক ঘটনা আর প্রক্রিয়ার সঙ্গে তত্ত্বভাবনার সম্বন্ধ নিয়ে আমরা তেমন ভাবিনি। ফলে আমরা যে শুধু পশ্চিমা তত্ত্বকে নির্দ্বিধায় প্রয়োগ করার চেষ্টা করি তা নয়, তা করতে গিয়ে সেই তত্ত্বগুলোর অন্তর্নিহিত ইতিহাসকেও বিনা প্রশ্নে মান্য বলে গ্রহণ করি। তাই যখন আমরা liberty বা equality’র কথা বলি, তখন আমরা ফরাসি বিপ্লবকেও একটা ‘model event’ বা আদর্শ ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মেনে নিই। স্বপ্ন দেখি একটা ভারতীয় ফরাসি বিপ্লবের, সোনার পাথরবাটির! আর মনে করি যে অন্য ধরনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বা ঘটনার কোনো তত্ত্বগত তাৎপর্য যেন হতেই পারে না। তাই শুধু বিভিন্ন দর্শন পরম্পার মধ্যেই নয়, বিভিন্ন ইতিহাসের মধ্যেও একটা না বলা ক্রমকর্তৃত্ব তৈরি হয়।

    এসব বলার অর্থ কিন্তু আদৌ এই নয় যে আমি ভারতীয়, চিনি বা আফ্রিকি তত্ত্ব পরম্পরার‍ ওকালতি করছি। চিন্তার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ খাটে না। চিন্তার গতি, ভাবনার দিশা কোনো রাষ্ট্রীয় সীমানা মানে না। আবার এ কথাও ভুললে চলবে না যে প্রাক–ঔপনিবেশিককালে বিশ্বের নানা অঞ্চলের মধ্যে নানা ধরনের বৌদ্ধিক আর সাংস্কৃতিক আদান–প্রদান ছিল। যেমন দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, চীন, তিব্বত আর জাপানের মধ্যে বৌদ্ধ দর্শনের একটা চলাচল ছিল। আবার দক্ষিণ এশিয়া, আরব দেশ, পারস্য আর ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বহু শতক ধরে নানা তাত্ত্বিক আদান–প্রদান হয়েছে। এগুলোকে আমি তত্ত্বাঞ্চল (thought region) বা তত্ত্বাবর্তনী (thought circuit) বলি। এই বিভিন্ন তত্ত্বচর্চার ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে কিন্তু আধুনিক জাতীয় মানচিত্রের কোনো সম্বন্ধ নেই। এ–ও জোর দিয়ে বলা দরকার যে ‘ভারত’ বলে একটি রাষ্ট্র থাকলেও, সংস্কৃতি, ভাষা আর চিন্তার ক্ষেত্রে কিন্তু ভারত এক এবং সমভাবী নয়। বহু তাত্ত্বিক পরম্পরা আর বহু চিন্তাশৈলীর এক আলগা সমষ্টি মাত্র। কাজেই ভারতীয় তত্ত্ব পরম্পরা বলে কিছু নেই।

    তাই আমি নানা পরম্পরার মধ্যে গতায়াতের কথা বলি। আবার প্রসঙ্গ বিশেষে global south-এরও উল্লেখ করে থাকি। আগে আমরা তৃতীয় বিশ্বের কথা বলতাম। সোভিয়েত–আমেরিকা ঠান্ডা যুদ্ধের কালে তৃতীয় বিশ্বের একটা ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল। কিন্তু global south-এর তা নেই। এটা একটা বৌদ্ধিক অবস্থান মাত্র, একটা ইউটোপিয়াও বলা চলে। তাই এটিকে আমি ‘non-place’ বলছি। এই কল্পরাজ্যের অনুভূতিটা আমাদের একধরনের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা দেয়। এখানে আমরা নানা পরম্পরার মধ্যে অনায়াসে বিচরণ করতে পারি। আর অধ্যয়নের এক নতুন অনুশীলন গড়তে পারি। এতদিন আমরা হয় ভারতীয় নয় পশ্চিমা ইতিহাস আর দর্শন পড়তাম। অন্য আঞ্চলিক পরম্পরাকে বুঝতে গেলে তার পশ্চিমা অভিযোজন আর তর্জমাই শুধু নজরে আসত। পশ্চিমের মধ্যস্ততা ছাড়া অন্য পরম্পরায় ঢোকার উপায় ছিল না। অবশ্য সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বহুভাষী আর বহুপারম্পরিক চর্চার চেষ্টা বহুদিন আগেই শুরু হয়েছে। Global south-এর ধারণাটা আমাদের অন্য পরম্পরাকে স্বরূপে দেখার কাজে সাহায্য করে বলে আমার মনে হয়। জ্ঞানের রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা বৌদ্ধিক সংহতি তৈরি করতেও মদদ মেলে।

    সারোয়ার তুষার: State (and) Violence (Banerjee 2017) প্রবন্ধে আপনি রাষ্ট্র, সহিংসতা, সার্বভৌমত্ব এবং সমাজ/রাষ্ট্র বাইনারি সংক্রান্ত যে সমস্ত normative চিন্তা প্রচলিত আছে, সেগুলোকে সমস্যায়ন করেছেন এবং হাল আমলের সহিংসতা, সার্বভৌমত্বকে বোঝার প্রচলিত কায়দাগুলো থেকে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। একদিকে সহিংসতাকে রাষ্ট্রের মনোপলি ধরে নেয়া, সার্বভৌমত্বকে একক ও সুসংহত হিসেবে কল্পনা করে আইনের শাসন এবং শাসনের ‘ব্যতিক্রম’ জরুরি অবস্থাকে তত্ত্বায়ন/ব্যাখ্যা করার যে রেওয়াজ আছে, আপনি সেখান থেকে সরে এসেছেন। অন্যদিকে, রণজিৎ গুহ, বীণা দাসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকরা যে ঔপনিবেশিক সার্বভৌমত্বকে dominance without hegemony কিংবা illegibility of the state হিসেবে দেখেছেন, আপনি তার সাথেও নিজেকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করতে পারছেন না বলে আমার মনে হয়েছে। এই উল্লিখিত দুই চিন্তাতেই (পশ্চিমের সার্বভৌমত্ব ও ঔপনিবেশিক সার্বভৌমত্ব) সহিংসতাকে কেবলই রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা হয়েছে। কিন্তু আপনি বলছেন, সহিংসতা, রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের যে নিরেট ও সুসংহত আন্তঃসম্পর্কের কথা ভাবা হয়েছে, বৈশ্বিক ও জাতীয় উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এই প্রচলিত তত্ত্বায়ন আজ আর যথার্থ নয়। এ বিষয়ে আপনাকে কেন ভিন্ন অবস্থান নিতে হয়েছে?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: সহিংসতাকে প্রাক–আধুনিক আর আধুনিককালের মধ্যে ফারাকের একটা সূচক বলে মানা হয়। আগেকার দিনে হিংসার অধিকার আর চলন পুরো সমাজে পরিব্যাপ্ত ছিল। আধুনিক সভ্যতার সাথে সাথে সমাজের বেসামরিকীকরণ হয়, আর সহিংসতা রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার হয়ে দাঁড়ায়। এ কথাটা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে। রাষ্ট্র আইনের দায়রার মধ্যে প্রয়োজন মতো হিংসার প্রয়োগ করবে আর সামাজিক ও ব্যক্তিগত হিংসাকে ন্যায়গতভাবে দণ্ড প্রদান করবে, এটাই আধুনিক লিবারেলিজমের ধারণা। আইন স্থাপিত করার কাজ রাষ্ট্রের, আবার আইন স্থগিত করা আর আইনের ‘ব্যতিক্রম’ নির্দিষ্ট করার কাজও রাষ্ট্রের; আবার প্রসঙ্গ বিশেষে বলপ্রয়োগ আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কাজও একমাত্র রাষ্ট্রের— এটাই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পশ্চিমা সংজ্ঞা।

    বলাই বাহুল্য, এই ধারণাটা বাস্তবে একেবারেই খাটে না। আজকের দিনেও নানা ধরনের সামাজিক হিংসার প্রচলন আমরা দেখি— তা জাতিবাদী, সাম্প্রদায়িক, আঞ্চলিক বা শ্রেণিগত হিংসা হতে পারে। পারিবারিক হিংসা এবং নারী আর অন্য— লৈঙ্গিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হিংসার কথাও মনে রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, আজ আমরা রাষ্ট্রকে সমাজের বিশেষ বিশেষ অংশের প্রতিনিধি আর মুখপাত্র হিসেবে সামাজিক হিংসায় অংশগ্রহণ করতে দেখি। ভারতে হিন্দু সম্প্রদায়ের নামে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর প্রশাখা, এমনকি কোর্ট পুলিশকেও দেখি পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মুসলমান বা দলিতকে দমন করতে। ভারতে কাশ্মিরে আর উত্তরপূর্ব অঞ্চলে সামরিক শাসন একটা স্থায়ী অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা তো জানা কথাই। যদিও প্রকরণগতভাবে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা জনপ্রতিনিধিত্ব এবং আইনসভামূলক, বাস্তবে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নির্বাচন আর রাষ্ট্রপরিচালনার কাজেই নয়, নানা ধরনের সামাজিক নজরদারি আর বলপ্রয়োগের কাজে ব্যস্ত— এমনকি সাধারণ ছেলেমেয়ের প্রেম ভালোবাসা, জামা কাপড় আর হেঁশেলে কী রান্না হবে তার নিয়ন্ত্রণে উৎসুক। এটা অবশ্য আমেরিকার মতো দেশেও দেখা যায়— যেখানে racial বা সাদা–কালোর মধ্যে হিংসা এখনো চলছে আর তাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময় অনিন্দনীয় বলা চলে না।

    রাষ্ট্রের সামাজিকীকরণের সাথে সাথে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘রাষ্ট্রীয়করণ’ আর সার্বভৌমিকতার কথাও ভুললে চলবে না। আনাঘা ইঙ্গলে (Ingole 2021) caste assembly বা জাতি–সভার ইতিহাস ও বর্তমান নিয়ে নতুন বই লিখেছেন। উনি দেখাচ্ছেন কীভাবে নানা আঞ্চলিক জাতি–সভা জাতি–সদস্যদের উপর বলপ্রয়োগ আর বহিষ্কার–দণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা আর রাষ্ট্রীয় দণ্ডের থেকে বেশি জাতি ধর্ম আর জাতি হিংসা এখানে বেশি কার্যকর। তেমনি আধুনিককালে পরিবারের বিবর্তন দেখলে আমরা বুঝতে পারি যে বিবাহ, গার্হস্থ্য আর যৌনতার ক্ষেত্রে এখনো বিষমকামী (heterosexual) পরিবার ব্যবস্থার কর্তৃত্ব আর সার্বভৌমত্ব অনেকটাই বজায় রয়েছে। ভারতে তো ধর্মভিত্তিক personal law বা সাম্প্রদায়িক আইন এখনো প্রচলিত। আবার এ–ও আমরা জানি যে পরিবারের পর্দার মধ্যে হিংসা রাষ্ট্রীয় ন্যায়ব্যবস্থার অপেক্ষা রাখে না। একে আমি বলি ‘dispersed sovereignty’ বা বণ্টিত, পরিব্যাপ্ত বা বিভাজিত সার্বভৌমত্ব। আবার খানিকটা সোনার পাথরবাটির মতন। এ ক্ষেত্রে sovereignty’র পশ্চিমা তত্ত্বটি বর্জন করে আধুনিক রাজনীতিতে বল আর হিংসার ভূমিকার একটা অন্য তত্ত্বায়ন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।

    রণজিৎ গুহর ‘dominance without hegemony’র (Guha 1998) ধারণাটা একটু অন্য। এই বাক্যাংশটি উনি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রায়নে ব্যবহার করেছেন। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার গঠনটা পশ্চিমা আর ঔপনিবেশিক। উনি বলছেন যে সাধারণ মানুষ এ রাষ্ট্রব্যবস্থার তাত্ত্বিক আর প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে কখনোই সেভাবে আত্মভূত করে উঠতে পারেনি। সেটি এখনও অনেকটাই অজানা আর অচেনা থেকে গেছে, স্বাধীনতার পর জনপ্রতিনিধির সরকার আসা সত্ত্বেও। তাই এই রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে জনতার সম্মতি আছে বললে ভুল হয়। মানে পশ্চিমা অনুশাসনের বিশ্বায়ন হয়ে থাকলেও তার সাথে জড়িত মানসিকতা আর অভিমুখিতার বিশ্বায়ন হয়নি। একথাটাই অন্যভাবে বীণা দাস আর অন্য নৃবিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘illegibility of the state’ (Das 2007)-এর প্রণয়নে। এরা বলেন যে আধুনিক আনুশাসনিক গঠন, আমলাতন্ত্র আর আইনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে আজও অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ, alien। তাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হলেও ঠিক সফল নয়। অন্যদিকে কিন্তু পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন যে উত্তর–ঔপনিবেশিককালে আধুনিক অনুশাসনব্যবস্থা দেশের দূর–দূরান্ত আর অভ্যন্তরীণ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তার পেয়েছে (Chatterjee 2011, পার্থ ২০২১)। সাধারণ মানুষ আজ এই অনুশাসনের গতি আর গঠনকে ভালোই বোঝে, তার ব্যবহার করতে জানে। নিম্নবর্গ গণতন্ত্রের খেলায় দক্ষতা অর্জন করেছে। একে উনি politics of the governed বা অনুশাসিতের রাজনীতি বলেছেন (Chatterjee 2004)। দেখিয়েছেন যে আধুনিক রাষ্ট্রের উপর জনতার তলবে, এই রাষ্ট্রের, পূর্ববর্তী পশ্চিমা চরিত্র সত্ত্বেও, একটা স্থানীয়করণ হয়েছে গত কয়েক দশকে। এই দুটি মতই আংশিকভাবে সত্য। কিন্তু এর পরও একটা তত্ত্বায়নের কাজ থেকে যায়— তা হলো এই রাষ্ট্রের আর অনুশাসনের সঠিক চরিত্রায়ন।

    সারোয়ার তুষার: আপনার আরও একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গ টানতে চাই। ‘The Abiding binary: The Social and the Political in Modern India’ (Banerjee 2018); এই প্রবন্ধে আপনি বলছেন, উপনিবেশোত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্থবহ লিপ্ততার ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব–প্রশাসনিকতা (sovereignty-governmentality) বর্গগুলো যথেষ্ট নয়। আপনি developmentality বর্গটি প্রণয়ন করেছেন। বাংলায় আমি একে ভাবছি ‘উন্নয়নতান্ত্রিকতা’ কিংবা কেউ হয়তো একে ‘উন্নয়ন–শাসকতা’ও বলতে পারে। আশিল এমবেম্বে, জৈবরাজনীতি (biopolitics) আদিকল্পের [প্যারাডাইম] সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে মারণরাজনীতি৬ (necro-politics) [Mbembe 2019] ধারণাটি হাজির করেছেন। উন্নয়নতান্ত্রিকতার আদিকল্পে যাওয়ার আগে প্রশাসনিকতা৭ বর্গটি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আপনার সামনে কী ধরনের বাস্তব সমস্যা হাজির হয়েছিল?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: Social and political— এ দুটি বর্গের তাত্ত্বিক বিভাজনের উপর আমি প্রশ্ন করার চেষ্টা করেছি। এই বিভাজনটি আধুনিক পশ্চিমা রাজনীতি দর্শনের একেবারে গোড়ার কথা। এর ভিত্তিতে রয়েছে রাষ্ট্র আর সমাজের বা state and society’র পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য বা বৈপরীত্যের ধারণা। Liberalism আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্র সমাজের প্রতিনিধিত্ব করলেও তা সামাজিক আর সাম্প্রদায়িক প্রভাবের ঊর্ধ্বে। আর সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ মানলেও রাষ্ট্রের অযথা হস্তক্ষেপের বিরোধী আর রাষ্ট্র হতে স্বতন্ত্র। এর মূলে কাজ করে এক রাষ্ট্র আর এক সমাজের বা ‘one state one society’র ভ্রান্ত ধারণা।

    এটা ধরে নেওয়া হয় যে, রাষ্ট্র একক ও সর্বভৌম, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অধিকারের বা এক্তিয়ারের অন্য কোনো প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী হতেই পারে না। এটা ঠিক নয়। আগেই বলেছি যে বাস্তবে এমন অনেক সামাজিক আর সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান আছে যা রাজনৈতিক আর সার্বভৌমিক চরিত্র জাহির করে আর অনেকসময় রাষ্ট্রের counter-polity বা পাল্টা–অনুশাসন হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেক বাহ্য শক্তিও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নির্ধারণ করতে পারে, তা অন্য কোনো রাষ্ট্র হতে পারে, বা বহুরাষ্ট্রিক সংগঠন হতে পারে, আবার বহুজাতীয় কোম্পানি বা কর্পোরেশনও হতে পারে (Bigo 2006)। এদিকে রাষ্ট্র নিজেও অনেকসময় একটি সামাজিক যন্ত্রের স্বরূপে সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অংশী হয়ে পড়ে। তাই সার্বভৌমত্বের অবস্থান একমাত্র রাষ্ট্রই নয়। অন্য দিকে এটাও ধরে নেওয়া হয় যে সমাজ বলে একটি অবিছিন্ন, ঐক্যবদ্ধ আর সীমায়িত ক্ষেত্র আছে। এটাও ঠিক নয়। আম্বেদকার খুব সুন্দর করে বলেছেন যে ভারত এক জাতি এক দেশ হয়েও এক সমাজ নয়— বহু সমাজের একটা আলগা সমষ্টি মাত্র। প্রাক–ঔপনিবেশিককালে সমাজ শব্দটির মানে কিন্তু তাই ছিল— তাই আমরা বলতাম ব্রাহ্মণসমাজ, কায়স্থসমাজ, নাগরিকসমাজ, বৈষ্ণবসমাজ ইত্যাদি। সমাজ মানে ছিল এমন একটি গোষ্ঠী যা এক সঙ্গে ‘গমন’ করে, যার সদস্যরা সামাজিকতার বাঁধনে বাঁধা। তার মানে এক দেশে যে নানা সমাজ হতে পারে এটা খুব সাধারণ কথা ছিল। আম্বেদকার বলেছেন যে যেহেতু ভারতে নানা জাতি, বর্ণ আর সমাজের মধ্যে আত্মীয়তা, কুটুম্বিতা, এমনকি আকস্মিক সংস্পর্শ পর্যন্ত প্রতিষিদ্ধ ছিল, তাই ভারতকে আর যাই বলা হোক ‘society’ বলা চলে না। ঔপনিবেশিককালে আমরা society’র তর্জমায় সমাজ শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করি আর দাবি করি যে ভারতীয় সমাজ ভারতের জাতীয় ঐক্যভাবের প্রতিমূর্তি। ভারতীয় সমাজ সবরকম রাষ্ট্রনৈতিক আর রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, একটি বিশুদ্ধ সামাজিক অবস্থান। তার কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা আলোচনা চলে না। কিন্তু বাস্তবে এ দেশে এক নয়, নানা সমাজের সহাবস্থান আর বিরোধ রয়েছে। আর এই সব সমাজের রাজনৈতিক আর আনুশাসনিক মাত্রাও রয়েছে।

    যদি আমরা মানি যে সমাজ বিচ্ছিন্ন আর বিভক্ত আর রাষ্ট্রভাব সমাজের বিভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে বণ্টিত, তাহলে কিন্তু state/society আর social/political এর সাফ বিভাজন আর খাটে না। অবশ্য এ কথা ঠিকই যে আধুনিককালে রাজনৈতিক অনুশাসন, নীতিপ্রণালী আর মতাদর্শ এই পশ্চিমা state/society বিভেদের মান্যতার ভিত্তিতে কাজ করে। ফুকো বলেন যে আধুনিক governmentality হলো একধরনের ‘rule by the social’। কিন্তু যদি আমরা social বা society বর্গটারই বিনির্মাণ করতে চাই তাহলে আমরা governmentality’র ধারণাটাকে কীভাবে সরাসরি (as it is) প্রয়োগ করব? আবার ফুকো এবং আরও অনেকে biopolitics বা জৈবরাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেন ‘politics of life’ বা জীবনদান আর জীবনোৎপাদনের অনুশাসন হিসেবে, যা প্রাক–আধুনিক দণ্ড, শাস্তি আর মৃত্যুর অনুশাসনের বিরোধাভাসী বলা চলে। কিন্তু যদি আমরা মানি যে আধুনিককালেও যুদ্ধ, মৃত্যু আর হিংস্রতার রাজনীতি চলেছে, শুধু তৃতীয় বিশ্বেই নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে; আর যদি বলি যে আধুনিকতার সঙ্গে ঔপনিবেশিকতার একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল আর আছে, আর উপনিবেশবাদ মূলত জবরদস্তি দখল আর হিংসার রাজনীতি, তাহলে আশিল এমবেম্বের necro-politics বা মারণরাজনীতির তত্ত্বটা আমাদের মানতেই হয়।

    তাই এই প্রবন্ধটিতে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি কেন ফুকোর governmentality’র ধারণাটা আমাদের ক্ষেত্রে সরাসরি খাটে না, এ কথা মানলেও যে উত্তর–ঔপনিবেশিককালে ভারতে জাতীয় রাষ্ট্র governmentality’র যুক্তি খাটাতে চেয়েছে আর তার জন্য রাষ্ট্র আর সমাজের তত্ত্বগত বিভাজনের প্রচেষ্টা করে এসেছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে ‘developmentality’ বা উন্নয়নতন্ত্র বলে একটি আনুশাসনিক ব্যবস্থা যা ইউরোপীয় governmentality’র থেকে অনেকটাই আলাদা। এই তন্ত্রটির মূলে যে ধারণাটি কাজ করে তা হলো এই যে, রাষ্ট্র সমাজের তুলনায় আধুনিক, উন্নত আর অগ্রসর। তাই রাষ্ট্রের কাজ হলো আইন এবং অনুশাসনের মাধ্যমে সমাজকে নিজের প্রতিচ্ছবি অনুযায়ী গড়ে তোলা, সমাজের সংশোধন আর পুনর্গঠন করা। সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটা উপদেশাত্মক বা didactic সম্পর্ক গড়ে তোলা। সমাজের থেকে রাষ্ট্রের দূরত্ব আর পরভাব (alienation) এখানে কিন্তু একটা ইতিবাচক ব্যাপার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ফলে এখানে আধুনিক গণতান্ত্রিক কল্পনার ভেতরে আমরা একটা স্ববিরোধ বা অসঙ্গতি দেখতে পাই— একদিকে সামাজিক প্রতিনিধিত্বের ঝোঁক, অন্যদিকে সমাজকে অস্বীকার করার ঝোঁক। ফলে রাষ্ট্র কখনো বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, কখনো আবার সমাজের সঙ্গে একীকৃত। আমাদের রাজনীতিতে এই ব্যাপারটা কিন্তু পুনরাবর্তের মতো দেখা দেয়।

    তাই আমি বলি যে ঠিক যেমন প্রাক–ঔপনিবেশিক রাজনীতিতত্ত্ব আর সমাজতত্ত্বের ইতিহাস আমাদের নতুন করে লিখতে হবে, ঠিক তেমনি আমাদের আধুনিক আর উত্তর–ঔপনিবেশিক কালের রাজনীতির ইতিহাসকেও নতুন করে ভাবতে হবে। একথা মেনে বসে থাকলে চলবে না যে আধুনিককালে সারা দুনিয়ায় রাজনীতির ধরন আর গঠন এক।

    সারোয়ার তুষার: পার্থ চট্টোপাধ্যায় তার ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধে (পার্থ ২০১৫) ভারতবর্ষের ইতিহাসরচনার পদ্ধতি (historiographical) সংক্রান্ত সংকট উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ এবং বিভিন্নতার মাঝে ঐক্য (unity in diversity) এই তিন আপাত ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাসচেতনাই হয় একদিকে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার প্রশ্নে নিঃসংশয়, অথবা অন্যদিকে ধরে নিচ্ছে ভারতের সমাজজীবনের অন্তনির্হিত সত্য এক এবং অপরিবর্তিত। এই ইতিহাসচেতনাসমূহ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক অথবা আধুনিক ইতিহাসবোধের ঊর্ধ্বে এক অবধারিত ‘অখণ্ডতা’, ‘ঐক্য’ কল্পনা করে নেয়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় চতুর্থ এক ধরনের ইতিহাসচেতনা ও পদ্ধতির সম্ভাবনা দেখেন; যাকে তিনি বলেছেন ‘বিকল্প ইতিহাস’। এই ইতিহাসচেতনা রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতা, অখণ্ডতা ইত্যাদিকে সন্দেহ করে এবং মনে করে ইতিহাসের সামগ্রিকতা যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয়। ভারতের ইতিহাসের অখণ্ডতার ধারণাটাই ভারতের অধিবাসিদের খণ্ডিত ও বিভাজিত করে রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।

    হিস্টোরিওগ্রাফি (Banerjee 2006, 2016) নিয়ে আপনিও লিখেছেন। এই ‘বিকল্প ইতিহাস’–এর ধারণাকে আপনি কীভাবে দেখেন? ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্র বা রাজনীতির লেনদেন/যোগাযোগ কেমন হওয়া উচিত? বিশেষত বিজেপির এই সময়ে জনজীবনে (public life) ইতিহাসের ভূমিকা কী হতে পারে? ইতিহাস কি নিজেই নিজের উদ্দেশ্য? নাকি অধিকতর ন্যায্য, গণতান্ত্রিক সমাজ–রাষ্ট্র চরিতার্থ করার হাতিয়ার হয়ে ওঠবে ইতিহাস? সেক্ষেত্রে দর্শনের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে যে সমস্যা আপনি চিহ্নিত করেছেন, তেমন কোনো আধিপত্য বা হায়ারার্কি ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় কিনা?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: Politics of Time (Banerjee 2006) বইটিতে আমি ভারতে ইতিহাস চেতনা আর ইতিহাস লেখনশৈলীর উদ্ভবের গল্পটা বলার চেষ্টা করেছি। তবে সে কথায় আসার আগে আর একটা কথা বলে নিই। অনেক ঐতিহাসিক বলে থাকেন যে ‘ভারতে প্রাক–আধুনিককালে ইতিহাস লেখনের চল ছিল। ভারতের অতীতে ইতিহাস নেই, কালচেতনা নেই, গতিশীলতা নেই, রাজনীতি নেই— ইংরেজদের এই পরদ্বেষী ধারণাটা ভারতকে জয় করার ছুতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্য সব দেশের মতো, ভারতেও কালক্রমে নানা পরিবর্তন এসেছে আর সেই পরিবর্তনের আখ্যানও যথাযথভাবে হয়ে এসেছে।’ এ কথা নিশ্চিতভাবে ঠিক। কিন্তু অনেকে এও বলেন যে ইংরেজরা আসার আগে ভারতে আশু আধুনিকতা বা ‘early modernity’ দেখা দেয় আর সে সময় আধুনিক ইতিহাস বোধের উদয় হয়। এ কথাটা কিন্তু আমি পুরোপুরি মেনে উঠতে পারি না। আমার মনে হয় যে এ ধরনের তর্কের পেছনে একটা ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি কাজ করে। আমরা এটা প্রমাণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে যা পশ্চিমে ছিল তা ভারতেও ছিল— আধুনিকতা ছিল, ইতিহাস ছিল, আবার অনেকে এমনটাও বলেছেন যে আধুনিক ধনতন্ত্রের উদয়ের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। ইংরেজরা এসে সব গড়বড় করে দেওয়াতে আমাদের আধুনিকতায় বাধা পড়ে। এই মনোভাবটা আমাদের আধুনিকতা, ইতিহাস, ধনতন্ত্র ইত্যাদি পশ্চিমা তত্ত্বের বিনির্মাণ আর সমালোচনার পথে বাধা হয়ে ওঠে। ভিন্ন অতীত, ভিন্ন পরম্পরা আর ভিন্ন তাত্ত্বিক সম্ভাবনা আমরা আর দেখতে পাই না।

    পলিটিক্স অফ টাইম বইটির প্রচ্ছদ

    আমি মনে করি যে আজকের দিনে আমরা যাকে ‘history’ বলি সেটি একটি আধুনিক অনুশাসন, যার বিবর্তনের একটা ঔপনিবেশিক কুলজী বা genealogy রয়েছে। প্রাক–আধুনিককালেও অবশ্যই অতীত চেতনা ছিল আর অতীতকে আখ্যায়িত করার বিভিন্ন রীতিও ছিল, যার মধ্যে ইতিহাস ছিল একটি বিশেষ রীতি। মনে রাখতে হবে যে প্রাক–কালে ইতিহাস ছিল কাব্যের একটি ধারা। এ ছাড়া ছিল শ্রুতি, স্মৃতি, অতিকথা, পুরাণ, আগম, বংশাবলী, কুলজী, চরিত, শব্দ–প্রমাণ ইত্যাদির অবধারণা। রাজকার্যের ক্ষেত্রে ছিল নানা ধরনের কালপঞ্জিকা বা chronology’র চলন, যেগুলোর মধ্যে মধ্যযুগীয় ‘তারিখ’ ছিল একটি প্রধান রূপ। এ ছাড়া ছিল নানা ধরনের নথি আর দলিল— যেমন জমি আর সম্পত্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র— যাতে কালক্রম নির্ধারণ আর আর সাক্ষ্য–প্রমাণের একটা নিখুঁত ধারণা দেখা যায়। মানে আগেকার দিনে অতীতকে নানাভাবে পেশ করার চলন ছিল যা ক্ষেত্র আর প্রসঙ্গ অনুযায়ী আলাদা আলাদা রূপ নিতো। সব অতীত আর সব আখ্যানকে ইতিহাসের নাম দেওয়া হতো না। তফাৎ এখানেই। আধুনিককালে history একটা meta-category বা অতি–বর্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সব ধরনের কালচিন্তার আর অতীতচিন্তার প্রতিরূপ একমাত্র ইতিহাসই, আমরা এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হয়ে পড়েছি।

    আধুনিক ইতিহাসচেতনার উদয় হয় উপনিবেশবাদের কালে, আঠারো–উনিশ শতকে, ইউরোপ আর ইউরোপের উপনিবেশগুলোর মিথস্ক্রিয়ায়। আমরা জানি যে এ সময়ে ইউরোপীয় দর্শনে philosophy of history’র উদয় হয়, যার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রবক্তা ছিলেন হেগেল। উনি বলেন যে ভারত, চীন, আফ্রিকা ইত্যাদি শুধুমাত্র ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সমাজই নয়, কালের পরিমাপ অনুসারে ইতিহাসের ভিন্ন পর্ব বা পর্যায়ের প্রতিরূপ। অর্থাৎ, ইতিহাসের একটা বিশ্বব্যাপী অভিব্যক্তি রয়েছে। পৃথিবীর সব দেশ আর সব সমাজ এই বিশ্ব–ইতিহাসের অন্তর্গত আর সব ধরনের ভিন্নতা সত্ত্বেও ইতিহাসের মানদণ্ডে পরস্পরের সঙ্গে তুলনীয়। এই তুলনা অনুসারে কিছু দেশ আধুনিক ও অগ্রসর; অন্য দেশ আদিম, প্রাচীন বা পিছিয়ে পড়া। এই গল্পটা আমরা জানি। Politics of Time বইটিতে এরই সম্পূরক গল্পটা আমি বলছি। উপনিবেশের আর ইতিহাসবর্জিতের প্রেক্ষা থেকে ইতিহাসের বৈশ্বিকীকরণের গল্পটা। আমি দেখিয়েছি যে ঠিক যেমন ইউরোপে আধুনিক ইতিহাসবোধের উদয় হয় উপবিশগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায়, ঠিক তেমনি ভারতের মতো দেশে ইতিহাসের উদয় হয় পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চজাতি মধ্যবিত্তের সঙ্গে আদিবাসিজনের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। এখানে অ–হিন্দু, জঙ্গল, পর্বত আর সীমান্তবাসী মানুষকে ‘আদিম’ আখ্যা দেওয়া হয়। বলা হয় যে আদিবাসিদের মধ্যে কালচেতনার একান্ত অভাব। তাই এদের ঐতিহাসিক বিবর্তন হয়ে ওঠেনি। তাই ভারতের জাতীয় সমাজ আর সভ্যতা থেকে এরা আলাদা। এরা ভারতের জাতীয় উন্নতিকে বিঘ্ন করে। আমি দেখিয়েছি যে কীভাবে ভারতের কিছু জনজাতি আর কিছু এলাকাকে ভারতের ইতিহাসের ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ার থেকে আলাদা করা হয়েছে। এই আলাদা করার প্রক্রিয়াটি কিন্তু একটা শুদ্ধ বিশ্লেষণাত্মক প্রক্রিয়া নয়, যা শুধুমাত্র তত্ত্বচিন্তার স্তরে কাজ করে। এর একটা বাস্তব আনুশাসনিক দিকও রয়েছে। তাই আমি দেখাচ্ছি কীভাবে শ্রম আর ঋণের বাজারে, জমি বণ্টনের আর প্রাদেশিক সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, অভিপ্রয়ান আর ভ্রমণের নতুন রীতিতে, এমনকি আইনকানুন, প্রশাসন, বিদ্রোহ দমন আর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আর [একদা] উপনিবেশিত দুই পক্ষই একসাথে সীমান্তবাসিদের ইতিহাসবর্জিত জন বা ‘people without history’ করে তুলছে। রাজনৈতিক অধীনতা এখানে ঐতিহাসিক অধস্তনতার রূপ নিচ্ছে। তাই বলছি যে ইতিহাসের যে আধুনিক আনুশাসনিক রূপ আমরা জানি তার পেছনে তথাকথিত ইতিহাসবর্জিতজনের উপস্থিতি আজও ছায়ার মতো দেখা যায়। এই তাত্ত্বিক ও আনুশাসনিক অন্যায়ের পরিণামের সঙ্গে আজও আমরা লড়ে চলেছি।

    যেহেতু আমরা মেনে নিয়েছি যে অতীতকে একমাত্র ইতিহাসই চিত্রায়িত করতে পারে, আর সারা বিশ্বে ইতিহাসের অবয়ব আর পরিকাঠামো মূলত এক, তাই আজও আমরা ইতিহাস নিয়ে লড়াই করছি। রাজনৈতিক অধিকার ইতিহাসের অধিকারের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের দলই হোক আর আদিবাসী, দলিত বা নারীবাদীই হোক— লড়াইয়ের রূপটা কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এক। কার ইতিহাস বেশি প্রামাণ্য, কার ইতিহাস প্রভাবী, কার ইতিহাস প্রগতিশীল, কার ইতিহাস রক্ষণশীল, কার ইতিহাস আদর্শ বা প্রতিনিধিকর, কার ইতিহাস প্রযোজ্য, কার ইতিহাস অপ্রাসঙ্গিক, কার ইতিহাস এ পর্যন্ত দমিত ছিল আর আজ তার পুনরদ্ধার হয়েছে, কার ইতিহাস বর্তমানে ঐতিহাসিক ন্যায়ের দাবি করে ইত্যাদি। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঠিকই বলেছেন যে ভারতবর্ষের ইতিহাস এক আর ঐকিক, এ কথাটা ভুল। ভারতবর্ষের নানা ভাষা, নানা অঞ্চল, নানা জাতির নানা ইতিহাস। তাই এই ইতিহাস মূলত federal বা যুক্তরাষ্ট্রীয়। বহু ইতিহাসের কল্পনা করলে তবেই ইতিহাসের লড়াই প্রশমিত হবে।

    তবে আমি এখানে আর একটা কথা জুড়তে চাই। সমাজের সব স্মৃতি–কাহিনিকে যে ইতিহাসসাপেক্ষই হতে হবে এ কথাটা কিন্তু ঠিক নয়। যে জনজাতির কোনো লিখিত দলিল বা স্থাপত্য নেই, তার অতীতকে গানে, গল্পে, অতিকথায় আর স্মৃতিতে খুঁজতে হবে। আধুনিক ইতিহাস যে ধরনের তথ্য আর প্রমাণ খোঁজে, তা খুঁজতে গেলে কিন্তু এ ধরনের অনেক সমাজই ইতিহাসবর্জিত থেকে যাবে; বা কাল্পনিক গাথাকে ইতিহাস বলে চালাতে চাইবে, যার ফলে বিদ্যায়তনিক ইতিহাস আর জনইতিহাসের মধ্যে একটা বিরোধ তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, এটাও আমাদের মানতে হয় যে মানবজীবনের এমন অনেক মাত্রা আছে যার নাগাল ইতিহাসের মাধ্যমে পাওয়া মুশকিল। আমাদের জীবনে দেব–দৈত্য, জীব–কীটাণু, হাওয়া–বাতাস, নদী–পাহাড় ইত্যাদির যে ভূমিকা তাকে কিন্তু শুধুমাত্র ইতিহাসের বিষয় হিসেবে ভাবা সম্ভব নয়। এগুলোর অন্তর্নিহিত সময়গতি আর সক্রিয়তা ঠিক ঐতিহাসিক কালধারণা দিয়ে ধরা যায় না। তাই আমি বলি যে ইতিহাসের সাম্রাজ্যবাদী এক্তিয়ার থেকে আমাদের নিজেদের মুক্ত করতে হবে। তাহলেই ইতিহাসের রাজনীতির থেকে আমরা বেরুতে পারব আর ইতিহাসকে শুদ্ধ ইতিহাস হিসেবে দেখতে শিখব। তবেই ইতিহাসের আসল রসটা উপভোগ করা সম্ভব হয়ে ওঠবে।

    সারোয়ার তুষার: আপনি বর্তমান ডিজিটাল ও ভাইরাল যুগে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়েও কাজ করছেন বলে জানি। এটা কিন্তু ঠিক যে, আজকের নিওমিডিয়ার যুগে অনেক বেশি মানুষ নিজের কথাটা বলতে পারছে। এইদিক থেকে কথা বলার কিংবা মত প্রকাশের এক ধরনের গণতন্ত্রীকরণ (democratization) ঘটেছে বলা যায়। আবার এটাও ঠিক যে, এর ফলে নানা ধরনের ভার্চুয়াল লিঞ্চিং (অনেক সময় তা বাস্তব লিঞ্চিং পর্যন্ত গড়ায়), ডিজিটাল ভিজিল্যান্টি মবের উত্থান ঘটেছে। প্রযুক্তির বিপুল প্রসারের এই যুগে [contextual judgement অর্থে] ইতিহাসচর্চা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এক রকম মার খাচ্ছে বলা যায়।

    History as Confession (Posel 2008), History as Testimony (Attwood 2008) বিষয়গুলো নিয়ে যারা লিখছেন; তারা বলছেন আজকের দিনের যুগধর্ম হলো এত বিপুল পরিমাণ মানুষের এখন কথা বলার মাধ্যম আছে যেটা আগে অকল্পনীয় ছিল। এখন যত বেশি মানুষ কথা বলবে ততই তো ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু মুশকিল হলো এই মানুষগুলো অতীতে নানা কারণে, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ নানা পরিচয়ের কারণে নিপীড়িত হয়েছে। এখন কথা বলার মাধ্যম ও সুযোগ পেয়ে তারা তাদের গ্রিভেন্স–এর কথা বলা শুরু করেছে। এবং এই সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তিই ‘ইতিহাস’ বনে যাচ্ছে। ইতিহাস মানে যে ব্যক্তিগত খেদটা দূরে রেখে contextual objective জাজমেন্ট করা, সেই জাজমেন্ট মার খাচ্ছে। যার যার ‘সত্য’ই হয়ে ওঠছে চূড়ান্ত ইতিহাস, চূড়ান্ত ফ্যাক্ট। এটা আজকের যুগের এক বড় সংকট বলে অনেকে মনে করেন। স্ক্রুটিনি, অথেনটিসিটি, ফ্যাক্টচেকিং, ভেরিফিকেশনের মারাত্মক ধ্বস লক্ষ করা যাচ্ছে।

    এই ডিজিটাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তের যুগে পপুলিস্ট উত্থানের পেছনেও এই রিভেঞ্জ নির্ভর বঞ্চনার বোধ একটা বড় কারণ। একদিকে লাঞ্চিত–বঞ্চিতদের দুঃখ–দুর্দশাকে পুঁজি করা, অন্যদিকে সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের মধ্যে ‘কল্পিত শত্রু’র জুজু তৈরি করা; দুইক্ষেত্রেই ডিজিটাল মিডিয়ার ভূমিকা ব্যাপক। তথাকথিত পপুলিস্ট সুপারলিডাররাও এত সুনিপুণভাবে মানুষের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাকে এখন কাজে লাগাতে পারে, যা দুই যুগ আগেও কল্পনা করা যেত না। যেমন মিডিয়াশাস্ত্রের পণ্ডিত সিভা ভৈধ্যনাথান (2018) দেখাচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদেরকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করার পরিবর্তে ঘৃণা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে বিচ্ছিন্ন করছে; অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আলাপ–আলোচনা পরিসরের মারাত্মক অবনতি ও সংকোচন ঘটাচ্ছে৮।

    এমন পরিস্থিতিতে, যুক্তি ও ন্যায়–অন্যায়বোধের ক্রম অবনতি এবং প্রযুক্তির অত্যাচারের আজকের জমানায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যত কী?

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়: এ বড় কঠিন প্রশ্ন। আমাদের আরও অনেক ভাবতে হবে। প্রথমেই বলি যে প্রযুক্তির প্রভাব আগেও ছিল। আদিমকালে লোহার যন্ত্রের উদ্ভব কৃষি সম্ভব করে তোলে আর তাতে পুরো পৃথিবীর চেহারা পালটে যায়। আবার লেখনও তো একটা প্রযুক্তি, তাই না? লেখনশিল্প কথা আর ভাবকে লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের আর অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্পর্ক পাল্টে দেয়। বিজলি (ইলেক্ট্রিসিটি) রাত আর দিনের সম্পর্ক পাল্টে ফেলেছে। আর বেনেডিক্ট এন্ডারসন দেখিয়েছেন যে ছাপার প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রবাদকে কল্পনাই করা যায় না (Anderson, B. 1983)। কাজেই প্রযুক্তির গল্পটা অনেক পুরনো, এটা মনে রাখা দরকার। তবেই আমরা বর্তমান প্রযুক্তির নতুনত্ব আর অভিনবত্ব ধরতে পারব।

    যাকে আমরা ‘high-speed information and communication technology’ বা দ্রুতগতি যোগাযোগ আর তথ্যপ্রযুক্তি বলি তার কয়েকটি দিক নিয়ে কথা বলা যাক। প্রথমত, আপনি ঠিকই বলেছেন যে এই প্রযুক্তি লেখা আর ছাপার প্রযুক্তির তুলনায় আরও অনেক বেশি মানুষকে নিজের কথা বলতে দেয়। যারা লিখতে পড়তে জানে না তারাও অডিও আর ভিডিও দ্বারা নিজেকে ব্যক্ত করতে পারে। ফলে গণতন্ত্রীকরণের একটা ঝোঁক এই প্রযুক্তির মধ্যে দেখা যায় বটে।

    দ্বিতীয়ত, এই একই প্রযুক্তি আমাদের প্রতিজনের উপর জাতীয়রাষ্ট্র, পররাষ্ট্র আর বহুজাতিক পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর নজরদারি বা surveillence আরও সহজ করে তোলে। নজরদারির প্রশ্ন আর ডাটার উপর অধিকার কার, সরকারের না ব্যক্তিগত উদ্যোগের, এই প্রশ্ন নিয়ে আজ ভারত সরকার নানা social media company’র সাথে সংগ্রামে লিপ্ত। এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের একান্ত বা privacy’র প্রশ্নটা খানিকটা চাপা পড়ে যাচ্ছে। আবার আমরা এও দেখছি যে digital inclusion বা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বহু সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছাতেই ব্যক্তিগত ডাটা সরকারের হাতে তুলে দিচ্ছে। ফলে অভিব্যক্তির স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল অনিরাপত্তার আর পরাধীনতার সম্ভাবনাও আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে ওঠেছে। এদিক থেকে দেখতে গেলে বলতে হয় যে গণতন্ত্রের প্রতিস্পর্ধায় এক ধরনের সর্বাত্মকবাদ বা totalitarianism মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে।

    তবে সব প্রযুক্তিরই দুটি বিপরীত দিক থাকে। কৃষি প্রযুক্তি যেমন খাদ্য সঙ্কট দূর করেছে তেমনি পরিবেশ দূষণ আর ভূমণ্ডলের উষ্ণায়ন করেছে। প্রশ্নটা কিন্তু শুধু প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রশ্ন নয়। যে–কোনো প্রযুক্তির মধ্যে নিহিত যে সম্ভাবনা আর ঝোঁক (potential) থাকে তার প্রশ্ন। কাজেই নতুন প্রযুক্তির পেছনে যে দর্শন আর কল্পনা কাজ করে সেটা ধরা আমাদের মতো সমাজতাত্ত্বিক আর দার্শনিকদের কাজ। আমাদের অঞ্চলগুলোতে এখনো কিন্তু ‘philosophy of technology’ নিয়ে তেমন কাজ শুরু হয়নি।

    তৃতীয়ত, এই যোগাযোগ প্রযুক্তি আজকে তথ্যের ধারণাটা পাল্টে দিয়েছে। যাকে আগে আমরা ‘fact’ বলতাম তার জায়গায় এসেছে ‘data’। ফ্যাক্টের একটা প্রতীয়মান অর্থ থাকে যার সাথে অভিজ্ঞতা বা প্রয়োগের একটা সংযোগ আমরা খালি চোখে চিনতে পারি। Statistics আর census’র তথ্য যেমন হয়। Digital data’র কিন্তু কোনো নিজস্ব অর্থ নেই। তা হলো তথ্যের একটা টুকরো বা ভগ্নাংশ, একটা digital trace মাত্র। এর কোনো অর্থগত পরিচিতি নেই। আর এর সঙ্গে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সরাসরি যোগাযোগ বোঝা মুশকিল। এর দুটি তাৎপর্য আছে।

    এক, cyberspace-এ আমাদের বিচরণ কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে নয়। আমাদের রুচি, অভ্যাস, কৌতূহল, গতায়াত, প্রয়োজন আর আকাঙ্ক্ষাগুলো সাইবারস্পেসে টুকরো টুকরোভাবে ছড়িয়ে থাকে। এই ট্রেসগুলো একটা নিজস্ব জীবন আর গতি পায়। কাজেই যে ব্যক্তি বা individual-এর অবধারণার উপর ভিত্তি করে আমরা নাগরিকত্ব দাবি করি, সেই ব্যক্তি কিন্তু সবসময় সমভাবে প্রকট হতে পারে না। Citizen বা নাগরিকের জায়গায় এসে পড়ে user বা ব্যবহারকারী। তার রাজনীতি আর রাজনৈতিক অধিকারের চেহারাটা আলাদা। আমাদের ডিজিটাল ব্যক্তিত্বের অধিকার আর সুরক্ষা শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় আইন কানুন দ্বারা সম্ভব হয় না।

    দুই, আমাদের ডিজিটাল গতিবিধি আর জীবনের ব্যাখ্যান করে একটা নতুন ভাষা যাকে আমরা algorithm বা কলনবিধি বলে জানি। নানা দেশের নানা ব্যক্তির নানা ডিজিটাল কর্মক্রিয়াকে একসাথে নিয়ে তার মধ্যে নানা ধাঁচ নির্ধারণ বা pattern recognition-এর কাজ করে এই কলনবিধি। কলনবিধি তৈরি হয় বিশেষ বিশেষ প্রয়োজন অনুসারে, কখনো বাণিজ্যিক চাহিদার আকলন করতে, কখনোবা রোগ সংক্রমণের গতিপথ আন্দাজ করতে, কখনো ভিন্ন ভিন্ন যৌনপ্রবৃত্তির নকশা জানার কাজে। তাই আমাদের data identity কখনো উপভোক্তার কখনোবা রুগীর কখনোবা যৌনতার। অর্থাৎ, সাইবারস্পেসে আমরা নানান পরিচিতিতে হাজির থাকি। আবার আমরা মিথ্যা পরিচয়ও তৈরি করতে পারি, যেমন অনেকে করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আমাদের identity চুরিও যেতে পারে, যেমন হয় ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ একক আর স্বায়ত্ত identity বা আত্মপরিচিতি, যার ভিত্তিতে লিবারেলিজমের rights-এর ধারণাটা দাঁড়িয়ে আছে, তা ঠিক একভাবে কাজ করে না big data’র ক্ষেত্রে। তাই সময় এসেছে সামাজিক আর রাজনৈতিক সমালোচনার সাথে সাথে algorithmic critique-এর বা নানা ধরনের কলনবিধির বিনির্মাণ আর আলোচনা করার। এটা করতে গেলে প্রযুক্তিবিদ আর সমাজবিদদের একসঙ্গে ভাবতে হয়। সেটা সোজা কাজ নয়।

    তৃতীয়ত, সমষ্টির সংজ্ঞাও আজ নানাভাবে পাল্টেছে। আজ আমাদের সামাজিক পরিচিতির সঙ্গে ডিজিটাল পরিচিতির সম্বন্ধের পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যাকে আমরা জাতি, শ্রেণি, লিঙ্গ ইত্যাদি বলে থাকি— যেগুলো সামাজিক পরিসংখ্যান আর জনবিদ্যা (statistics and demographics) নির্ভর আর যার সঙ্গে রাজনৈতিক সমষ্টির কল্পনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত— তার সঙ্গে নানা ধরনের ডিজিটাল সমবায়ের কী সম্পর্ক সেটা নতুন করে বুঝতে হবে। ডিজিটাল সমবায় আবার অনেক সময়েই রাষ্ট্রীয়সীমা লঙ্ঘন করে। কাজেই জাতীয় রাজনীতির স্বাতন্ত্র‍্যের কথাটাও নতুন করে ভাবতে হয়। আবার আমরা অনেকসময় নানা দেশীয় রাজনীতির হিস্যা হই ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে। অনেকে এ–ও বলেছেন যে ডিজিটাল সংযোগের যুগে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যে আবেগের প্রেষণ আর সংক্রমণ অনেক দ্রুত আর তাৎক্ষণিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে আমরা ‘virality of affect’ বলে জানি। তাই যেমন আশা আর বিদ্রোহের আবেগ আর অনুভূতিকে আমরা এক পলকে আরব থেকে ভারত, হংকং থেকে আমেরিকায় ছড়িয়ে যেতে দেখি; ঠিক তেমনি ঘৃণা আর দ্বেষের ভাবকেও মুহূর্তের মধ্যে এক থেকে বহুতে সঞ্চারিত হতে দেখি। তাই আজকের দিনের রাজনৈতিক সমষ্টিকে অনেকে ‘affective public’ বলে থাকেন (Papacharissi 2014)।

    ভাবের প্রসঙ্গে প্রভাবের কথাটাও এসে পড়ে। জনমানসকে এখন অনেক সহজেই দোলা দেওয়া যায় ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রতিজনকে এককভাবে উদ্দেশিত করা যায়। আগে নেতারা যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতেন তা সমষ্টি বা ভিড়কে উদ্দেশ্য করত। আজ সমষ্টির সাথে প্রতিটি ব্যক্তিকে তার নিজস্ব আর ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী প্ররোচিত করা যায়। আর বিরতিহীন তথ্যের আক্রমণে থেমে দাঁড়িয়ে ভাবার সময় পাওয়া যায় না বলে ঠিক–বেঠিক, সত্য–অসত্যের বিচার করা হয়ে ওঠে না। ফলে গণতন্ত্রের আদর্শ deliberative public বা মননশীল জনগণের জায়গায় আমরা পাই এক অমনোযোগী আর অপারদর্শী জনতাকে; যে পলকে মারণোন্মুখী, পলকে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।

    তাই নিঃসন্দেহে আজ সমাজ–সংস্কৃতি–রাজনীতি নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের প্রযুক্তি নিয়েও ভাবতে হবে। কথাটা যতটা সরল মনে হয় তা কিন্তু নয়। আমাদের আলাপ আলোচনায় দুটো প্রবৃত্তি ধরা পড়ে। কখনো আমরা বলি যে প্রযুক্তি নিজগুণে ভালো বা মন্দ হয় না, প্রয়োগে হয়। আবার অন্য সময় আমরা সবকিছুকেই প্রযুক্তি দ্বারা নির্ধারিত মনে করে থাকি, যেটাকে প্রযুক্তি–পরিণামবাদ বা ‘technological determinism’ বলা যায়। এ সমস্যার সমাধান আমার কাছে নেই, যদিও এই দ্বন্দ্বটা আমায় ভারি ভাবায়।

    আর একটা কথা নিয়ে আমি এখন ভালোভাবে ভেবে উঠতে পারিনি। তা হলো প্রযুক্তির সার্বভৌমত্ব। সমাজ সংস্কৃতির নানা রূপ আমরা জানি। কিন্তু প্রযুক্তির কি নানা রূপ হতে পারে? বিভিন্ন সমাজের ক্ষেত্রে কি সেই সমাজ হতে জৈবভাবে বা organically উদ্ভূত প্রযুক্তির কথা বলা চলে? না প্রযুক্তি সর্বদাই universal, সর্বজনীন? চিকিৎসাশাস্ত্র আর জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে খানিকটা ভিন্ন ভিন্ন পরম্পরা আর ইতিহাসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাও নামমাত্র। Communication technology’র ক্ষেত্রে একবারেই নয়। তাই আমার মাথায় এই প্রশ্নটা বারবার চাড়া দিয়ে ওঠে— প্রযুক্তির বিউপনিবেশিকরণ কি সম্ভব? অন্য প্রযুক্তির কল্পনা কি করা যায়? না প্রযুক্তি আমাদের স্ব–প্রদত্ত আর চিরন্তন নিয়তি?

    টীকা:

    ১) প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সাক্ষাৎকারে বেশ কয়েকবার ‘রাষ্ট্রবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আমাদের এখানে সাধারণত statism-এর পরিভাষা হিসেবে ‘রাষ্ট্রবাদ’ পাঠ করার রেওয়াজ আছে। কিন্তু প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সাক্ষাৎকারে nation-state-এর সেন্স ধরতে গিয়ে ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘রাষ্ট্রবাদ’ পরিভাষা দুটি প্রায় অদলবদল করে ব্যবহার করেছেন। কারণ প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের ক্ষেত্র প্রধানত দিল্লি; যেখানে হিন্দি ভাষার ডিসকোর্সে ‘নেশনকে’ রাষ্ট্র এবং ‘স্টেট’কে রাজ্য বলা হয়। হিন্দিতে যাকে রাষ্ট্র বলা হয়, তাতে আবার স্টেট আর পিপল জুড়ে গিয়েছে (পার্থ ২০২১)।

    বাংলায় আমরা কিন্তু ‘স্টেট’ বলতে রাষ্ট্র, আর ‘নেশন’ বলতে জাতি বুঝি। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেশনকে নেশনই বলার পক্ষপাতী ছিলেন, তিনি মনে করতেন বাংলা ভাষার ‘জাতি’ আর ইউরোপীয় ‘নেশন’ ঠিক এক জিনিস নয়, গুরুতর পার্থক্য আছে। [এ নিয়ে চিত্তাকর্ষক আলোচনার জন্য দেখতে পারেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাবীন্দ্রিক নেশন কী?’, ‘রাবীন্দ্রিক নেশন প্রসঙ্গে আরও দু’চার কথা’ (পার্থ ২০০৫) এবং ‘Tagore’s Non-nation’ (Chatterjee 2011)]

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় যুগপৎভাবে ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলা পরিভাষা–ডিসকোর্সের আওতায় বিচরণ করেন বলে তার ক্ষেত্রে নেশন–স্টেট অর্থে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদকে অদলবদল করে ভাবাই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে স্টেট আর নেশনের পার্থক্যটা মনে রাখা জরুরি। সাথে এ–ও মনে রাখা উচিত, এই দুইয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেও, নেশন মাত্রই স্টেট নয়; বরং নেশন ও স্টেট সংক্রান্ত সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে স্টেট তথা রাষ্ট্রই নেশন (জাতি) গঠন করে; এর অন্যথায় নয়: As modern research in nationalism has demonstrated, it was the state that established fixed territories, introduced new cultural practices, and ‘produced’ their nations— contrary to the earlier view that it was pre-existent nations which demanded and eventually obtained their states. (Kaviraj 2010: 54 )

    ২) প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো ড্রাফটে ‘নেতি নেতি’ দ্বিরুক্ত হওয়ায় প্রথমে ভাবলাম ভুলজনিত রিপিটেশন কিনা? তার কাছে এই প্রশ্ন রাখতেই তিনি নিম্নোক্ত ক্ল্যারিফিকেশন পাঠালেন: ‘নেতি নেতি’ হলো not this, not that বলার একটা তাত্ত্বিকশৈলী। যেকোনো বস্তুর বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথমে এটা নির্ধারণ করা যে বস্তুটি কী নয়। এটা বিশেষ করে কাজে লাগে এমন বস্তু বা তত্ত্বের বিশ্লেষণে যার কোনো positive essence নেই, সার নেই— যেমন আত্ম বা self, অর্থ বা referential meaning ইত্যাদি। বৌদ্ধ দার্শনিকেরা আবার অনেক উপনিষদবাদী চিন্তাবিদরা এই তার্কিকশৈলী ব্যবহার করেছেন reality আর appearance, যথার্থ আর বাস্তবের দৃষ্টিগোচর রূপের বিনির্মাণ করতে।

    ৩) ‘Political’-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে রাজনৈতিক/রাজনৈতিকতা দুই–ই ব্যবহার করার কারণ বিভিন্ন তাত্ত্বিকের আলোচনায় বিশেষ্য ও বিশেষণ হিসেবে ‘political’-এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। জার্মান দার্শনিক ও জুরিস্ট কার্ল স্মিট ‘political’-কে স্ব–নির্ধারিত বিশেষ্য হিসেবে দেখতেন। তার চিন্তায় সিদ্ধান্ত/বিধি এবং বিধির ‘ব্যতিক্রম’ সার্বভৌমত্ব ধারণার মূল নির্যাস। তার রাজনৈতিক সম্প্রদায়/জনগোষ্ঠীর ধারণার মূলেও রয়েছে বন্ধু/শত্রুর সুস্পষ্ট পার্থক্যকরণ। স্মিট পলিটিকস তথা রাজনীতির (অর্থাৎ আইন, প্রতিনিধিত্ব ও সরকারের নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ড) বিপরীতে পলিটিক্যাল তথা রাজনৈতিকতাকে ব্যাখ্যা করতেন। সমসাময়িক ফরাসি দর্শনও ‘politics’ বনাম ‘political’-এর ভেদ মেনে চলে।

    প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার আলোচনার মাধ্যমে দেখিয়েছেন ক্লদ লেফোর্ট, জঁ–লুক ন্যান্সি (ফরাসিতে জঁ–লুক নঁসি), ফিলিপ্পে ল্যাকোও–ল্যাবার্থে, আলাঁ বাদিয়্যু ও জ্যাক রঁসিয়ের মতো [ফরাসি উচ্চারণ নিয়ে বেশ একরকমের বিশুদ্ধ–বাতিকতা আছে। সেজন্য আমি কোনো ঝামেলায় না গিয়ে নামগুলোর উচ্চারণ নির্ণয়ে বন্ধুপ্রতীম শাহীন খানের দ্বারস্থ হয়েছি। তিনি নানাভাবেই আমার মতো অভাজনের ভরসাস্থল হয়ে আছেন। –সারোয়ার তুষার] দার্শনিকদের মধ্যে ‘what is political’ প্রশ্নে বিস্তর ভিন্নমত থাকলেও; তাদের প্রত্যেকেই politcal-কে politics, policy, police ইত্যাদি থেকে আলাদা করেই ব্যাখ্যা করেন। উল্লেখ্য, জ্যাক রঁসিয়ে ‘police’ বলতে কেবল দমনমূলক কলকব্জা/প্রতিষ্ঠান কিংবা ফুকোডিয়ান ‘disciplinarization of bodies’ বোঝান না; বরং তার ক্ষেত্রে ‘police’ ক্যাটাগরিটি আরও ব্যাপক বিস্তৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। For me the police designates not an institution of power but a distribution of sensible within which it becomes possible to define strategies and techniques of power. (Ranciere 2010)।

    ফলে সাধারণ মানুষ পলিটিকস–এর ডোমেইনে সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে ‘political’ ধরে নিলেও, উল্লিখিত ডাকসাইটের দার্শনিকেরা মনে করেন politics/political-এর ভিত্তিমূলক পার্থক্য থাকতেই হবে। প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় এই আবশ্যিক বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি ‘political’ বর্গটিকে ‘politics’-এর বিপরীতে স্থান দেন না। তিনি মনে করেন না যে নির্বাচন, দল, গণমাধ্যম, আন্দোলন ইত্যাদি রাজনৈতিকতা (political) বিবর্জিত। এই সাক্ষাৎকারেও তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন দর্শনের আয়নায় বাস্তবকে চিনতে চেষ্টা না করে, সাধারণ জীবনে নিহিত তাত্ত্বিক সম্ভাবনাগুলো চিনতে শেখা জরুরি। তিনি কেবল ‘পলিটিক্যাল’–এ অভিগম্যতার ক্ষেত্রে দর্শনের(philosophy) বিশেষাধিকারকেই প্রশ্ন করেন না; অধিকন্তু, তিনি দর্শনের ‘priority of the political’ ধারণার আগাপাশতলা তদন্ত করতেও ইচ্ছুক।

    সুতরাং, political/politics-এর সুস্পষ্ট পার্থক্যকরণের চেয়ে প্রথমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, “what is political about politics in the first place?” অর্থাৎ, কার্ল স্মিটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রথমা ‘political’-কে বিশেষণে ধরে রাখতে চান। প্রথমার বিবেচনায় ‘everything is political’ বলা মূলত রাজনৈতিকতা আর ক্ষমতাকে গুলিয়ে ফেলার ‘যৌক্তিক’ পরিণতি। ফুকোর বরাতে প্রথমা আমাদের জানাচ্ছেন যে, ফুকো কখনোই ক্ষমতা আর রাজনীতিকে একাকার করে ফেলেননি। স্কুল, কলেজ, কারাগার, হাসপাতাল, পাগলা–গারদ থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত— ক্ষমতা সর্বব্যাপী। তথাপি, “politics does presume power, but power does not necessarily presume politics. Perhaps the only definition, a minimalist one, that we can have of politics is one kind of orientation toward power, though not necessarily the only kind.” (Banerjee 2020)

    এমনকি বাংলাদেশের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ক্রিটিক্যাল তাত্ত্বিক মোহাম্মদ আজমও ‘রাজনীতি’ আর ‘রাজনৈতিকতা’র এক অবধারিত পার্থক্য ধরে নিয়েই আগান। আজমের ভাষ্যে: ‘রাজনীতি’ বলতে বুঝব ক্ষমতার লড়াই, পক্ষ–প্রতিপক্ষের সুস্পষ্ট ধারণা, আর সেই ধারণার অনুকূলে সক্রিয়তা। অপরদিকে, রাজনৈতিকতা এক ধরনের চৈতন্য, যা ব্যাপ্ত থাকতে পারে সর্বত্র। ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক জীবনচর্চার যে কোনো অংশই হয়ে ওঠতে পারে রাজনৈতিক, যদি তা রাষ্ট্রক্ষমতা বা জনগোষ্ঠীর রূপ–রূপান্তরের ব্যাপারে সজাগ থাকে। এই সচেতনতা কেবল সক্রিয়তা আর উচ্চকণ্ঠ ভাষণে প্রকাশ পাবে এমন নয়, বরং শিল্পকলার উচ্চাভিলাষী সব পরীক্ষা–নিরীক্ষাও ব্যাখ্যাসূত্রে গণ্য হতে পারে রাজনৈতিক বলে…। (মোহাম্মদ ২০২০: ৯৫)

    এক্ষেত্রে মোহাম্মদ আজম কার্ল স্মিট কিংবা উল্লিখিত ফরাসি দার্শনিকদের মতোই ‘রাজনীতি’ ও ‘রাজনৈতিকতা’র সুস্পষ্ট বিভাজনের পাটাতনেই অবস্থান করেন বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে কীভাবে আমরা ‘রাজনৈতিকতা’কে সংজ্ঞায়িত করি কিংবা কীভাবে করা উচিত, তার চেয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন, শিল্প–সাহিত্য–সমালোচনার কোন কোন আঙিনা কতটা ‘রাজনৈতিক’ হতে পারছে সেই প্রসঙ্গ। প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, আসলে যেটা মনে রাখা উচিত— রাষ্ট্র, সমাজ, রিলিজিয়ন, অর্থ, শিল্প, যৌনতা বা খেলাধুলা যা কিছুই হোক না কেন— কোনো না কোনো সময়ে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে প্রকট হতে পারে। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিষয় আর অ–রাজনৈতিক (non-political) বিষয় বলে দুটি ভিন্ন স্থায়ীভাব বা আলাদা বর্গ হয় না। কিন্তু যে–কোনো বিষয়ের ঠিক কীভাবে রাজনীতিকরণ হয়, সেটা বোঝা প্রয়োজন। রাজনীতিকরণের প্রক্রিয়ার অধ্যয়নই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে ‘রাজনৈতিকতা’ বস্তুটা আসলে কী? সেজন্য সবার আগে এই উপলব্ধি প্রয়োজন যে, জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রই সবসময় ‘রাজনৈতিক’ নয়।

    দ্বিতীয়ত, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায়শই ‘রাজনৈতিকতা’কে আমরা মূলত ‘ক্ষমতা’র সাথে গুলিয়ে ফেলছি। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি আর প্রসঙ্গে ক্ষমতার প্রতি আমাদের অভিমুখ এবং ক্ষমতার সাথে আমাদের লেনদেন রাজনৈতিকতায় রূপ নেয় বটে; কিন্তু সকলক্ষেত্রে রাজনৈতিকতা আমাদের সকল কর্মলক্ষ্যের একমাত্র উদ্দেশ্য ও ফল নয়। প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকতাকে ‘ontological priority’ হিসেবে মানতে নারাজ। [This is obviously more a historical question than a philosophical one because it does not presume that there is any one thing— a force, an essence, an orientation, a subjectivity, a site— that is priori or ontologically political. The political is not just a self-standing noun but an orientation, a qualifier, that is sometimes assumed or worn by subjects, forces, acts and images, irrespective of their origin. What is political becomes so and does not remain so forever. (Banerjee 2020)]

    ৪) নৈরাজ্যবাদকে সাধারণত আমাদের এখানে অনেকেই Anarchism-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। অনেকে আবার নৈরাজ্যবাদকে এনার্কিজমের বাংলা পরিভাষা হিসেবে ব্যবহারের বিরোধী। সেজন্য আমি প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো ড্রাফটে ‘নৈরাজ্যবাদ’–এর ব্যবহার দেখে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম: “নৈরাজ্যবাদকে অনেকে একটা পলিটিকাল ফিলোসফি/আইডিয়া হিসেবে দেখে; সেই অর্থে এর একটা সদর্থক তাৎপর্য আছে, এখানে আপনি কি ‘বিশৃঙ্খলা’ অর্থে বোঝালেন?” বলা বাহুল্য, নৈরাজ্যবাদকে আমি এনার্কিজম ধরে নিয়েই প্রশ্নটা করেছিলাম।

    এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে লিখে পাঠালেন: “এটা মুশকিল প্রশ্ন। বিশৃঙ্খলা তো বটেই, তার থেকে বড় কথা হলো পলিটিকস–এর কোনো foundation নেই, এই ভয়টা। রাজনীতি ক্ষমতা অর্জনের একটা কৌশল মাত্র, তাই নৈরাজ্য বলছি। অধ্যায়টায় আমি দেখাচ্ছি যে কূটনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কূটনীতি–কৌশলকে রাজনীতিদর্শন বা political philosophy’র আওতায় আনা আর বাঁধার চেষ্টা করা হচ্ছে। নয়তো কূটকৌশল একধরনের নৈরাজ্যবাদের দিকে চলে যাচ্ছে। তাই চাণক্যকে political philosopher বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে বিশ শতকে ভারতবর্ষে, ঠিক যেমন Machiavelli-কে ইউরোপে। এরা নিজেরা কিন্তু নিজেদের দার্শনিক বলে কখনোই পরিচয় দেননি। এরা নিজেদের স্রেফ রাজনীতিজ্ঞ বলে ভেবেছেন। চাণক্য নীতিশাস্ত্র আর অর্থশাস্ত্রের প্রবক্তা— যেটা দর্শন বা philosophy’র থেকে একেবারে আলাদা অনুশাসন।

    সে সময়ে philosophy-কে আন্বীক্ষিকী বলা হতো, যার একটা উল্লেখ আমরা অর্থশাস্ত্রে পাই। Philosophy দিয়ে রাজনীতিকে বাঁধার এই প্রচেষ্টাটা আধুনিকতার অঙ্গ। রাজনীতিকে একটা foundational imperative বা মূল অনুজ্ঞা হিসেবে দেখানো এটার উদ্দেশ্য। এভাবে একটু বিশদ করলে হয়তো কথাটা বোঝা যায়। এটাও বলা যায় যে এখানে ‘নৈরাজ্য’ শব্দটা ভারতের প্রাক–আধুনিক নীতিশাস্ত্রের আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, পশ্চিমা দর্শনের ‘anarchism’ শব্দটির অনুবাদ হিসেবে নয়।”

    ৫) বর্তমানে আমরা ‘আধুনিকতা’ ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন, প্রগতি, সভ্যতা, পুঁজিবাদ (পুঁজির পুঞ্জীভবন যার প্রাণভোমরা), রাইটস (অধিকার) ধারণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যক্তি বলতে যা বুঝি; তা বিশেষভাবে পশ্চিম কর্তৃক নির্মিত প্রভাবশালী ডিসকোর্সের শাসন। লাতিন আমেরিকার বিঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক ওয়াল্টার মিনালুর অনুসরণে একে “পশ্চিমা আধুনিকতা” বলাই যুক্তিযুক্ত; ঔপনিবেশিকতা যার আবশ্যিক অন্যমুখ।

    এশিয়া, আফ্রিকা, আরব, চীন ও লাতিন আমেরিকায় জ্ঞান–বিজ্ঞান–প্রযুক্তি, আধুনিকতা ও র‍্যাশনাল থিংকিং, অতিপ্রাকৃত বর্জিত চিন্তাপদ্ধতি (secularization of thought), ইন্ডাস্ট্রি বাণিজ্যের বিকাশের ইতিহাস বহু বহু পুরাতন। এটা কিন্তু পশ্চিমের ‘আধুনিকতা’কে মান্য ধরে এর সাথে পাঞ্জা কষে বা একে নিজেদের পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করে ‘আমাদের আধুনিকতা’ খোঁজার মামলা নয়। এটা খোদ ‘আধুনিকতা’ ও তৎসংশ্লিষ্ট ধারণার মূলগত আদিকল্প থেকে বের হয়ে, নতুন আদিকল্প নির্মাণের মাধ্যমে জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্গঠনের প্রসঙ্গ।

    পৃথিবী বিভিন্ন জনপদের উপর ঔপনিবেশিক নির্যাতন, লুণ্ঠন ও আধিপত্যবিস্তারকারী ইউরোপের ইতিহাস কেবল এশিয়া, আরব, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ভূমি দখল ও এসব অঞ্চলের মানুষকে জবরদস্ত নির্যাতন, দাসে পরিণত করার ইতিহাসই নয়; আধুনিক ঔপনিবেশিক ইউরোপের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে এর বৌদ্ধিক–জ্ঞানগত–শিল্পের বিকাশে এশিয়া, আফ্রিকা, আরব ও লাতিনের অমোচনীয় ঋণ। [বিস্তারিত দেখুন (Nigam 2020), বিশেষত দ্বিতীয় অধ্যায়। এছাড়াও দেখুন (Abu-Lughod 1989; Mignolo 2002, 2011, 2018; Quijano 2000, 2007)]

    ৬) বোধিচিত্তে গত ২রা মে, ২০২০ তারিখে আশিল এমবেম্বের প্রবন্ধ ‘The Universal right to breathe’-এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ‘শ্বাস নেয়ার চিরন্তন অধিকার’ শিরোনামে এই প্রবন্ধের চমৎকার একটি অনুবাদ করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। এই অনুবাদেই আমরা Necro-Politics-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে ‘মারণরাজনীতি’র ব্যবহার প্রথম লক্ষ করি। Necro-politics-এর বাংলা পরিভাষা হিসেবে ‘মারণরাজনীতি’ শব্দবন্ধনীর প্রবক্তা আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্বক আমরা ‘মারণরাজনীতি’ শব্দবন্ধনী ব্যবহার করছি।

    ৭) Govermentality বর্গটির হালের ব্যবহার ফুকোডিয়ান। অর্থাৎ ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর তত্ত্বায়নের পর আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের একটি অন্যতম প্রধান সিগনেচারে পরিণত হয়েছে গভার্নমেন্টালিটি। আধুনিক ক্ষমতা আর পূর্বেকার রাজা বা সম্রাটদের মতন কেবল বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির মাধ্যমে টিকে থাকে না। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র শাসিতের কাছে ন্যায্যতা আদায় করার দিকেই বেশি মনোযোগী (তাই বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে সার্বভৌম ক্ষমতাবিবর্জিত নখদন্তহীন কোনো সাধু–প্রতিষ্ঠান মনে করার কোনো কারণ নেই)। এজন্য মিশেল ফুকো আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রকে বায়োপলিটিকস তথা জৈবরাজনীতি ও গভার্নমেন্টালিটি এই দুই বর্গে ধরতে চেয়েছেন। বলাই বাহুল্য, একদা উপনিবেশিত [এমনকি আজকাল পশ্চিমের মেট্রোপলিটন রাষ্ট্রেও] উত্তর–ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহকে বায়োপলিটিকস ও গভার্নমেন্টালিটির ছকে ব্যাখ্যা করার বেশকিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বায়োপলিটিকসকে ছাপিয়ে আশিল এমবেম্বে’র নেক্রোপলিটিকস এবং গভার্নমেন্টালিটিকে ছাপিয়ে প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডেভেলপমেন্টালিটি তথা উন্নয়নতান্ত্রিকতা আদিকল্পে মোড় নেয়া এই সীমাবদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

    গভার্নমেন্টালিটির ক্ষেত্রে ‘শাসনপ্রণালী’, ‘প্রশাসনিকতা’, ‘শাসকতা’ ইত্যাদি নানা পরিভাষা ব্যবহার করার চল আছে। তন্মধ্যে ‘প্রশাসনিকতা’ শব্দটি বিপুলভাবে ব্যবহার করেন সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় (পার্থ ২০০৫, ২০২১)। গভার্নমেন্টালিটি বলতে যেহেতু কেবল শাসন করার ধরন কিংবা বৈশিষ্ট্যগত প্রকরণ বোঝায় না; বরং এর সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক দ্যোতনা আছে। সুতরাং, ‘প্রশাসনিকতা’ পরিভাষাটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়।

    ৮) Antisocial Media: How Facebook Disconnects Us and Undermines Democracy শীর্ষক সিভা ভৈদ্যনাথানের গুরুত্বপূর্ণ বইটির হদিস পাই বন্ধু সহুল আহমদের কাছে। এ নিয়ে সহুল আহমদের আলোচনার জন্য দেখুন (সহুল ২০২১)।

    হদিশ:

    আদিত্য নিগাম; “তত্ত্ব করা’র মানে সবার আগে আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে তত্ত্বের দিক থেকে বোঝা”; সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: সারোয়ার তুষার; অরাজ,২০২১।
    https://www.auraj.net/aditya-nigam/5615/

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়; প্রজা ও তন্ত্র; অনুষ্টুপ, কলকাতা, ২০০৫।
    —; ‘
    ইতিহাসের উত্তরাধিকার’, ইতিহাসের উত্তরাধিকার, পঞ্চম মুদ্রণ, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০১৫।
    —
    নাগরিক; অনুষ্টুপ, কলকাতা, ২০২১।

    মোহাম্মদ আজম; কবি ও কবিতার সন্ধানে; কবিতাভবন, চট্টগ্রাম, ২০২০।

    সহুল আহমদ; “নাগরিক আন্দোলন: কিছু সমসাময়িক পর্যালোচনা”; শুদ্ধস্বর, ২০২১।
    https://cutt.ly/cQJ8gQv

    Abu-Lughod, Janet L. Before European Hegemony: The World System A.D. 1250–150. New York and Oxford: Oxford University Press, 1989.

    Anderson, Warwick. Colonial pathologies: American tropical medicine, race, and hygiene in the Philippines (original 1st edition). Durham NC: Duke University Press, 2006.

    Anderson, W, and Soto Laveaga, G. “Decolonizing Histories in Theory and Practice”. History and Theory 59 no. 3 (September 2020): 369-375.
    https://doi.org/10.1111/hith.12164

    Anderson, W and Lindee, S. “Pacific Biologies: How Humans Become Genetic”. Historical Studies in the Natural Sciences 50 no. 5 (November 2020): 483–497.
    https://doi.org/10.1525/hsns.2020.50.5.483

    Anderson, Benedict. Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, London: Verso Books, 1983.

    Attwood, Bain. “In the Age of Testimony: The Stolen Generations Narrative, ‘Distance,’ and Public History”; Public Culture 20 no. 1 (1 January 2008): 75–95. https://doi.org/10.1215/08992363-2007-017

    Banerjee, Prathama. Politics of Time: “Primitives” and History-Writing in a Colonial Society. Delhi: Oxford University Press, 2006.
    —“Writing the Adivasi: Some historiographical notes”.
    The Indian Economic & Social History Review 53 no. 1 (2006): 131-153.
    —“State (and) violence”.
    Seminar 691 (March 2017).
    https://www.india-seminar.com/2017/691/691_prathama_banerjee.htm
    —: “The Abiding Binary: The Social and the Political in Modern India”. In South Asian Governmentalities: Michel Foucault and the Question of Postcolonial Orderings. Edited by S. Legg & D. Heath, 81-105. Cambridge: Cambridge University Press, 2018.
    —Elementary Aspects of the Political: Histories from the Global South, Durham and London: Duke University Press, 2020.

    Banerjee, Prathama; Nigam, Aditya and Pandey, Rakesh. “The Work of Theory: Thinking across Traditions”. Economic & Political Weekly LI no. 37 (2016): 42-50.

    Bigo, Didier. “Globalized-In-Security: The Field and the Ban-opticon”. In Translation, Biopolitics, Colonial Difference. Edited by Noki Sakai and Jon Solomon, 109-56. Hongkong: Hongkong University Press, 2006.

    Chakrabarty, Dipesh. The Crises of Civilization: Exploring Global and Planetary Histories. New Delhi: Oxford University Press, 2018.
    —
    Climate of History in a Planetary Age, Chicago: Chicago University Press, 2021.

    Chatterjee, Partha. Politics of the Governed: Reflections on Popular Politics in Most of the World. New York: Columbia University Press, 2004.
    —Lineages Of Political Society, New York: Columbia University press, 2011.

    Das, Veena. Life and Words: Violence and the Descent into the Ordinary, Berkeley: University of California Press, 2007.

    Ghosh, Amitav. The Great Derangement: Climate Change and the Unthinkable, London: Panguin Books, 2016.

    Guha, Ranajit. Dominance without Hegemony: History and Power in Colonial India; New Delhi: Oxford University Press, 1998.

    Ingole, Anagha. Caste Panchayats and Caste Politics in India. Singapore: Palgrave Macmillan, 2021.

    Kaviraj, Sudipta. The trajectories of the Indian State: Politics and Ideas. Bengalore: Permanent Black, 2010.

    Mbembe, Achille. Necro-politics, Durham and London: Duke University Press, 2019.

    Mignolo, Walter. ‘Geopolitics of Knowledge and the Colonial Difference’. South Atlantic Quarterly 101, No. 1 (Winter 2002): 57–96.
    —
    The Darker Side of Western Modernity: Global Futures, Decolonial Options, Durham and London: Duke University Press, 2011.
    —“Decoloniality and Phenomenology: The Geopolitics of Knowing and Epistemic/Ontological Colonial Differences”.
    The Journal of Speculative Philosophy 32 No. 3 (Special issue with the Society for Phenomenology and Existential Philosophy) (2018): 360– 387.

    Mitchell, Timothy. Rule of Experts: Egypt, Techno–politics, Modernity. Berkeley: University of California Press, 2002.

    Nigam, Aditya. Decolonizing Theory: Thinking Across Traditions, New Delhi: Bloomsbury India, 2020.

    Papacharissi, Zizi. Affective Publics: Sentiment, Technology, and Politics, ed. 1st. New York: Oxford University Press, 2014.

    Posel, Deborah. “History as Confession: The Case of the South African Truth and Reconciliation Commission”. Public Culture 20 no. 1 (2008): 119–141.
    https://doi.org/10.1215/08992363-2007-019

    Quijano, Anibal. “Coloniality and Modernity/Rationality”, Cultural Studies 21, no. 2–3 (2007): 168–178.
    (“ঔপনিবেশিকতা ও আধুনিকতা/যুক্তিবাদিতা” শিরোনামে প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে বোধিচিত্তের ওয়েবসাইটে। লেখাটি পড়ার জন্য লিংক অনুসরণ করুন)
    —“Coloniality of Power, Eurocentrism and Latin America”, Nepantla: Views from the South 1 no. 3 (2000): 533–580.

    Ranciere, Jaques. Dissensus: On Politics and Aesthetics. Trans. Steven Corcoran. New York: Continuum International Publishing Group, 2010.

    Runia, Eelco. “Presence”, History& Theroy, 45 no. 1 (2006): 1-29.

    Sloterdjik, Peter. The Art of Philosophy: Wisdom as Practice. Trans. Karen Margolis. New York: Columbia University Press, 2012.

    Vaidhyanathan, Siva. Antisocial Media: How Facebook Disconnects Us and Undermines Democracy; New York: Oxford University Press, 2018.

    Yuk Hui. The Question Concerning Technology in China. An Essay in Cosmotechnics. Falmouth, UK: Urbanomic, 2016.

    Yuk Hui. “On Technodiversity”. Interview by Anderson Dunker. Los Angeles Review of Books. June 9, 2020.
    https://www.lareviewofbooks.org/article/on-technodiversity-a-conversation-with-yuk-hui/

  • জোয়েল কোভেল, মাইকেল লোয়ি || প্রাণ-প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রের ইশতেহার

    জোয়েল কোভেল, মাইকেল লোয়ি || প্রাণ-প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রের ইশতেহার

    অনুবাদ: রাহুল বিশ্বাস, মোস্তাক আহমেদ

    [২০০১ সালে প্যারিসের অদূরে অবস্থিত ভিনসেনস–এ অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় জোয়েল কোভেল ও মাইকেল লোয়ি যৌথভাবে প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রের ইশতেহার প্রকাশ করেন। অরাজের পাঠকদের জন্য সে ইশতেহারটির একটি অনূদিত সংস্করণ আমরা প্রকাশ করছি।

    জোয়েল স্টিফেন কোভেল (আগস্ট ২৭, ১৯৩৬ – এপ্রিল ৩০, ২০১৮) একজন আমেরিকান পণ্ডিত এবং লেখক, যিনি “ইকো–সোশ্যালিজম বা প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্র” এর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে পরিচিত। কোভেল একজন মনোবিজ্ঞানী ছিলেন। কোভেল ১৯৬০ সালের দিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ফলে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯৮০ সালের পর থেকে তিনি সরাসরি পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮৫ সালের পর মনোবিজ্ঞানী পেশা পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দলের নাম গ্রিন পার্টি অব ইউনাইটেড স্ট্যাটস। হোয়াইট রেসিজম (White Racism), দ্য এনিমি অব নেচার (The Enemy of Nature) সহ অনেকগুলো বই রচনা করেন।

    মাইকেল লোয়ি (জন্ম মে ৬, ১৯৩৮) একজন ফরাসি–জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক। তিনি কার্ল মার্ক্স, চে গুয়েভারা, লিবারেশন থিপলজি‘ প্রভৃতির ওপর বই রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই—ইকোসোশ্যালিজম: অ্যা–র‍্যাডিকেল অলটারনেটিভ টু ক্যাপিটালিস্ট ক্যাটাস্ট্রোফি (Ecosocialism: A Radical Alternative to Capitalist Catastrophe), মার্ক্সিজম ইন ল্যাটিন আমেরিকা ফ্রম ১৯০৯ টু দ্য প্রেজেন্ট: অ্যান অ্যানথলজি (Marxism in Latin America from 1909 to the Present: An Anthology) ইত্যাদি। – সম্পাদক]

    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স

    ইকো–সোশ্যালিস্ট

    প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সকল সমাজতন্ত্রীদের১(Green Left’s) ক্রিয়াকলাপের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এখানেই যে এটি একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও টেকসই বিশ্বের আকাঙ্ক্ষা করে। এবং এটি উপলব্ধি করে যে: পুঁজিবাদের অধীনে এই ধরণের বিশ্বব্যবস্থা কখনোই অর্জন করা যায় না। প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের লক্ষ্য আমাদের প্রতিষ্ঠাতাকালীন বিবৃতিতে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা বিশ্বপরিসরের বৃহত্তর ‘ইকো–সোশ্যালিস্ট‘২ আন্দোলনের প্রতিও সহানুভূতিশীল। সেই বন্ধুত্বের জায়গা থেকে আমরা এখানে ইকো–সোশ্যালিস্ট ইশতেহার প্রস্তাব করছি। তবে মনে রাখবেন, এটি কোনো প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সাম্যবাদী দলিল নয়।

    প্রাক–কথন

    ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে, প্যারিসের নিকটবর্তী ভিন্সেনাসে (Vincennes) অনুষ্ঠিত প্রাণ–প্রকৃতি ও সমাজতন্ত্রে‘র উপর অনুষ্ঠিত একটি কর্মশালায় এই ইকো–সোশ্যালিস্ট ইশতেহারের ধারণাটি দেন জোয়েল কোভেল ও মাইকেল লোয়ি। আমরা সবাই এখন গ্রামসি‘র পারাডক্স৩ নামের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ভুগছি। সংকটটি এই যে: আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে পুরোনো সমাজ–কাঠামোটি (ফলে মানব–সভ্যতাও) মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে পড়েছে, কিন্তু নতুন কিছুর জন্ম হতে পারছে না। তবে জন্মাতে না পারলেও, এটির কথা অন্তত ঘোষিত হতে পারে। আমাদের মাথার উপর যে গভীরতম আঁধার ঝুলছে, তা শুধুমাত্র সন্ত্রাসবাদ, পরিবেশ বিপর্যয়, বা অর্থনৈতিক মন্দা নয়। তা হলো এই নিয়তিবাদী বিধ্বংসী ভাবনা, যে: পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাব্য কোনো বিকল্প নেই। এবং সেই কারণে আমরা এমন এক ধরণের বক্তব্য হাজির করতে চেয়েছি যা এই উৎকণ্ঠাপূর্ণ আপস–মীমাংসা এবং নীরব স্বীকৃতি প্রদানের বর্তমান অবস্থানকে সচেতনভাবে নাকচ করে।

    ১৮৪৮ সালের কমিউনিস্ট ইশতেহারের যে দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতা ছিল, তা হয়তো এখানে সেভাবে পাওয়া যাবে না। কারণ ইকো–সোশ্যালিজম বা প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্র এখন পর্যন্ত বিমূর্ত ধারণামাত্র, কিংবা এটি বাস্তবিক কোনো দল বা আন্দোলনের মাধ্যমেও গড়ে উঠেনি। এটি বর্তমান সংকটের পাঠ এবং এর থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় শর্তবলীর ভিত্তিতে গড়ে উঠা একটি যুক্তিযুক্ত পথরেখা মাত্র। আমরা সর্বজ্ঞ– এমন দাবি কখনো করি না। আমাদের দূরবর্তী লক্ষ্য হল সংলাপ, বিতর্ক, সংশোধনীর আয়োজন করা, সর্বোপরি, এই পথটি কীভাবে আরো বেশি উপলব্ধি করা যায়– সেই চেতনা তৈরি করা। বিশৃঙ্খল পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার দৌরাত্ম্যে প্রতিবন্ধকতার অসংখ্য দিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হয়। অনেকেই আছেন যারা সহজাতভাবেই ইকো–সোশ্যালিস্ট। কীভাবে তারা একত্রিত হতে পারে? আমরা কি একটি “প্রাণ–প্রকৃতিবাদী আন্তর্জাতিক” কল্পনা করতে পারি? এই বিমূর্ত ধারণাকে কি বাস্তবে পরিণত করা যায়?

    ইশতেহার

    একবিংশ শতাব্দী শুরু হয়েছে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। নজিরবিহীন পরিবেশ বিপর্যয় এবং একটি সন্ত্রাস কবলিত বিশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ পৃথিবীর বিশাল অংশ জুড়ে, (যেমন: মধ্য আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলে) ছড়িয়ে পড়ে গ্যাংগ্রিনের মতো এবং তা আলোড়ন তোলে পুরো বিশ্বেই।

    আমাদের মতে, পরিবেশ বিপর্যয় ও সামাজিক বিপর্যয়ের এই বিষয়গুলো পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং একে একই কাঠামোর নানা রূপ হিসেবে দেখা উচিত। পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্য দায়ী বিধিনিষেধহীন ব্যাপক শিল্পায়ন, যেটি পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে এবং পরিবেশগত অস্থিরতা তৈরি করেছে। সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে বিশ্বায়ন নামক সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক ধরন থেকে। এটি সমাজের উপর বিচ্ছিন্ন প্রভাব বজায় রেখে টিকে আছে। অধিকন্তু, এসব অন্তর্নিহিত আইডিয়াগুলো মূলত একই লক্ষ্যে পৌঁছার বিভিন্ন পথ এবং এগুলোকে অবশ্যই বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

    আমরা এই শাসনব্যবস্থার নৃশংসতার পক্ষে মুখরোচক অথবা প্রচারমূলক নমনীয় কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করি। যেমন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে পরিবেশগত ক্ষতি নানাভাবে আড়াল করা ও মানবজীবনের ক্ষয়ক্ষতিকে রহস্যে মুড়ে ফেলার চেষ্টা। অর্থনৈতিক হিসাব–নিকেশের পরিবর্তে, আমরা বরং গুরুত্ব দেই: এটি পরিবেশ ও মানবজীবনের উপর প্রকৃত অর্থে কি প্রভাব ফেলছে, সেদিকে।

    এই শাসনব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত আরো মুনাফা বাড়ানোর তাগিদ নিয়ে চলতে হয়। যা প্রকৃতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। পরিবেশ দূষণ করছে। এমন সব প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস করছে– যা বহু যুগ ধরে, ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে প্রাণপ্রকৃতির সহায়ক হিসেবে। এই শাসনব্যবস্থা এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস ও লুট করছে। ঠাণ্ডা মাথায় এসব প্রাকৃতিক প্রাণশক্তি বিনাশ করছে আরো পুঁজি সঞ্চয়ের তাড়নায়।

    মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মানুষ চায় স্ব–শাসন, কমিউনিটি ও একটি অর্থবহ অস্তিত্ব। কিন্তু পুঁজিবাদ, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষকে নিছক শ্রমভাণ্ডারে এবং অবশিষ্টদেরকে উটকো উপদ্রবে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাপী ভোগবাদ ও বিরাজনীতিকরণ সংস্কৃতির সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এটি সামাজিক নীতি–নৈতিকতা ও ঐক্যে ফাটল ধরায়। বর্তমান সময়ে সম্পদ ও ক্ষমতার যে বিপুল বৈষম্য দেখা যায়, তা মানব ইতিহাসে কখনো দেখা যায় নি। পুঁজিবাদ একটি দুর্নীতিবাজ ও আজ্ঞাবহ গ্রাহক (ক্লায়েন্ট) রাষ্ট্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয় যার স্থানীয় অংশীদারী অভিজাতরা দমন–পীড়ন চালায়। এটি পরিচালিত হচ্ছে পশ্চিমাশক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক তত্ত্বাবধানে, নানাবিধ বহুজাতিক সংস্থার নেটওয়ার্ক দ্বারা। যেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করছে, ঋণের ফাঁদে ফেলছে এবং একই সময়ে পুঁজিবাদী কেন্দ্রের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য বিশাল সামরিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনা তৈরি রাখছে।

    আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যে সংকট সৃষ্টি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠা দূরে থাক, সেটি নিয়ন্ত্রণ করার মতো ব্যবস্থাও এটি গড়ে তুলতে পারবে না। এটি পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। কারণ তা করতে গেলে তাকে সম্পদ আহরণের ওপর সীমা আরোপ করতে হবে। পুঁজিবাদ যেটি কখনোই করতে পারে না। কারণ এটি গড়েই উঠেছে এই নীতিতে: বৃদ্ধি অথবা মৃত্যু! এটি সন্ত্রাস এবং অন্যান্য সহিংস বিদ্রোহের ফলে সৃষ্ট সমস্যাও মিটমাট করতে পারে না, কারণ, তা করতে গেলে তাকে সাম্রাজ্যের ধারণা ত্যাগ করতে হবে। যা পুঁজিবাদী জীবনধারা ও সম্পদের লাগামহীন বৃদ্ধির উপর সীমা আরোপ করবে। যেটি হবে আত্মঘাতী। ফলে তার সামনে একটিই পথ খোলা থাকে। পাল্টা পাশবিক শক্তি প্রয়োগ। যেটি আরো বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে ও আরো সন্ত্রাসবাদের বীজ বপন করে। এভাবে আবার চলে সন্ত্রাসবাদ–বিরোধী সন্ত্রাস। এক পর্যায়ে এগুলো নতুন ও মারাত্নক ফ্যাসিবাদী রূপে বিকশিত হয়।

    এক কথায়, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবেই দেউলিয়া। এটি এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অক্ষম একটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং এই অস্বাভাবিকতা এই অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। প্রাণ–প্রকৃতি বা বাস্তুতন্ত্রের ভাষায় এটি অন্তর্নিহিতভাবে টেকসই নয় এবং এটিকে ভবিষ্যতের বসবাসযোগ্য করতে এর অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন, বস্তুত, পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া প্রয়োজন।

    এই পরিস্থিতিতে রোজা লুক্সেমবার্গের উত্থাপিত দাবিটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে: সমাজতন্ত্র অথবা বর্বরতা! যেখানে এই বর্বরতার চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে মধ্যবর্তী এই শতকটিতে। এবং নানাবিধ পরিবেশ বিপর্যয়, সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা এবং এগুলোর ফ্যাসিবাদী রূপ; এই সবের আশঙ্কাও এখন খুব বাস্তব বলে মনে হচ্ছে।

    কিন্তু, সমাজতন্ত্র কেন? বিংশ শতাব্দীর সমাজতান্ত্রিক প্রবক্তাদের ব্যর্থতার পরও, ইতিহাসের আস্তাকুড় থেকে কেন এটিকে আবার কুড়িয়ে আনা হলো? শুধুমাত্র এই কারণে: অনেক দমনপীড়ন ও অকার্যকারিতার পরেও, সমাজতন্ত্র এখনো টিকে আছে পু্ঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদের রাস্তা হিসেবে। যদি পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করা যায়, তখন সভ্যতার টিকে থাকার প্রয়োজনে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়বে, যেটি পুঁজিবাদ–উত্তর সমাজে একটি বড় সফলতা বলে গণ্য হবে। আমরা যদি পুঁজিবাদকে মূলত অস্থিতিশীলতা এবং বর্বরতায় নিমজ্জিত ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করি, তাহলে আমাদেরকে পুঁজিবাদের রেখে যাওয়া সংকট নিরসনে সক্ষম সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যদি পূর্বতন সমাজতন্ত্র তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের লড়াই করার বাধ্যবাধকতা আছে একটি সফল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য। লুক্সেমবার্গ৫ যে সময় পুঁজির বর্বরতার কথা বর্ণনা করেছিলেন, তখন থেকে এর চেহারা–ধরন অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এটি নতুন রূপে হাজির হয়েছে। একইভাবে “সমাজতন্ত্র”কেও এই সময়ের বাস্তবতা বুঝে হাজির হতে হবে, নতুন নাম নিতে হবে।

    এই কারণে, আমরা আমাদের সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বকে প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্র বা ইকো–সোশ্যালিজম নাম দিয়েছি এবং এটি বাস্তবায়নে নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছি।

    সূত্র: টিন্ডল নিউজ

    কেন ইকো–সোশ্যালিজম?

    বিংশ শতাব্দীর প্রথম যুগের সমাজতন্ত্রকে খারিজ করে নয়, বরং সেখান থেকে উপলব্ধি তৈরি করে আমরা ইকো–সোশ্যালিজমের ধারণা সামনে এনেছি। প্রাণ–প্রকৃতি বা বাস্তুতন্ত্রের সংকটের নিরিখে। সেটির মতো, ইকো সোশ্যালিজমও এই অন্তর্দৃ্ষ্টির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে যে: পুঁজি শ্রমকে নিছকই একটি অবজেক্টে পরিণত করে। এবং উৎপাদকদের মুক্ত বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। অন্যভাবে বললে: এটি উৎপাদকদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে উৎপাদনের উপায় থেকে। আমরা বুঝতে পারি যে: প্রথম যুগের সমাজতন্ত্রে এটির লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করা যায় নি। বিষয়গুলো বেশ জটিল বলে এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানে শুধু এটুকু বলা যায় যে, বিদ্যমান পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর শত্রু মনোভাবাপন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পেক্ষাপটে এই অক্ষমতার বিভিন্ন কারণ ছিল। এই সময়ের সমাজতন্ত্রে বেশ কিছু ক্ষতিকর ‍উপাদান ও প্রভাব ছিল। প্রধানত: অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অস্বীকার করা, এবং পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার অনুকরণে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া। এগুলো শেষপর্যন্ত এই সমাজগুলির পতন ডেকে এনেছে এবং প্রাণ–প্রকৃতি ধ্বংস করেছে।

    ইকো–সোশ্যালিজম প্রথম যুগের সমাজতন্ত্রের মুক্তিমুখীন লক্ষ্যগুলি ধরে রাখে, এবং এটি সামাজিক গণতন্ত্রের অধঃপতিত, সংস্কারবাদী লক্ষ্য এবং সমাজতন্ত্রের আমলাতান্ত্রিক রূপের উত্পাদনশীল কাঠামো উভয়ই প্রত্যাখ্যান করে। এটি বরঞ্চ প্রাণ–প্রকৃতিবাদী কাঠামোয় সমাজতান্ত্রিক উত্পাদনের পথ এবং লক্ষ্য উভয়ই পুনরায় সংজ্ঞায়িত করতে জোর দেয়। এটি সমাজের টেকসইতার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘প্রবৃদ্ধি সীমাবদ্ধকরণের‘ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজ করে। কোনোভাবেই অভাব, কষ্ট এবং দমন চাপিয়ে দেওয়ার অর্থে কোনকিছু গ্রহণ করা হয় না। বরং ইকো–সোশ্যালিজমের লক্ষ্য হল প্রয়োজনের নিরিখে আমূল পরিবর্তন এবং পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে সরে গিয়ে গুনগত পরিবর্তন আনা। পণ্য উৎপাদনের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সমাজের এই রূপান্তর বিনিময় মূল্যের (exchange-values) পরিবর্তে কার্যকরী মূল্যকে (use-values) মূল্যায়ন করে—যা প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে একটি সুদূরপ্রসারী তাত্পর্যপূর্ণ কর্ম–পরিকল্পনা।

    সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে, প্রাণ–প্রকৃতিবান্ধব উত্পাদন, বর্তমান সংকটগুলি কাটিয়ে ওঠার জন্য ভূমি প্রস্তুত করতে পারে। অবাধ সমবায়ভিত্তিক উত্পাদকদের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ তার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রায়নের পথ বন্ধ করে না। ররং, এটি অবশ্যই তার ভিত্তি ও লক্ষ্য হিসেবে সকল মানুষের মুক্তির উপর জোর দেয়। যার ফলে এটি সাম্রাজ্যবাদী প্ররোচনাকে বৈষয়িক ও উদ্দেশ্যমূলকভাবেই প্রত্যাখ্যান করে। এ জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, এটি সমস্ত ধরনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখে। বিশেষত লৈঙ্গিত ও জাতিগত আধিপত্য। এবং এটি অন্ধবিশ্বাসীদের বিকৃতি এবং তাদের সন্ত্রাসবাদী আত্মপ্রকাশের দিকে পরিচালিত শর্তাবলিকে পাশ কাটিয়ে যায়। মোটকথা, এটি এমন একটি বিশ্ব ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে সবাই বাস করবে প্রকৃতির সাথে পরিবেশগত ঐক্যতান বজায় রেখে। এই প্রবণতার একটি বাস্তবিক ফলাফল প্রকাশ করা যেতে পারে, উদাহরণস্বরূপ, শিল্প পুঁজিবাদের অবিচ্ছেদ্য জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার মাধ্যমে। এবং যার পরিবর্তে, এটি তেল সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ জমি মুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ দিশা দিতে পারে। তখন বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে, একইসাথে অন্যান্য পরিবেশগত সংকটের দুর্দশা থেকে রক্ষা করতে পারবে।

    শিল্পী: সেসিল

    এই সুপারিশ/পরামর্শগুলো পড়ার সময় সবাই হয়তো চিন্তা করবেন: এগুলো কত কত বাস্তবিক ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে আনছে। এবং ভগ্ন হৃদয়ে তারা আবিস্কার করবেন যে: এভাবে পৃথিবী গঠনের পথ থেকে তারা এখনো কতটা দূরে আছেন। প্রথা–প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের সচেতনতা; দুই দিক থেকেই। আমাদের সেইসব বিষয়গুলি বিশদভাবে বলার দরকার নেই, যা সকলের কাছে তাত্ক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি পায়। তবে আমরা জোর দিয়ে বলব যে, সেগুলো যেন তারা যথাযোগ্য প্রেক্ষিত–প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে বিবেচনা করেন। আমরা এই কর্ম–পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিটা পদক্ষেপ নির্ধারণ করে দিতে চাই না। বরং বর্তমান পরিস্থিতি বদলানোর জন্য পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় যুক্তি তৈরি করতে চাই। এবং এই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চাই। আমরা এই সম্ভাবনাগুলোকে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি এবং একই সাথে, একই চিন্তা–চেতনার মানুষদের এক জায়গায় হওয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করি। যদি এইসব যুক্তিগুলোর মধ্যে কোনো সদগুণ থাকে, তবে অবশ্যই একই জাতীয় চিন্তাভাবনা এবং এই চিন্তাভাবনাগুলো অনুধাবন করার মতো অনুশীলনগুলো সমন্বিতভাবে সারা বিশ্বে অগণিত দিকে অঙ্কুরিত হবে। ইকো–সোশ্যালিজম আন্তর্জাতিক এবং সর্বজনীন হবে অথবা এটি কিছুই হবে না। আমাদের সময়ের সংকটগুলোকে অবশ্যই বিপ্লবী সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে, এর বাস্তব অস্তিত্ব আনায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।

    জোয়েল কোভেল এবং মাইকেল লোয়ি

    প্যারিস, সেপ্টেম্বর ২০০১

    অনুবাদকের টীকা:

    ১. গ্রিণ লেফট (Green Left) শব্দটাকে আমাদের অনুবাদে ‘প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রী‘ করা হয়েছে। যাকে একইভাবে প্রাণ–প্রকৃতিবাদী রূপান্তরবাদী কিংবা প্রতিবেশবাদী সমাজতন্ত্রী বা প্রতিবেশবাদী রূপান্তরবাদী বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। সুফিবাদকেও এক ধরণের গ্রীণ লেফট বলা চলে।

    ২. ইকো–সোশ্যালিস্টদের চিন্তায় পরিবেশ ও বিশ্বকে বাঁচানোর প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠেছে। প্রাণ–প্রকৃতিমূলক সমাজে যারা বিশ্বাসী। গ্রাম–নদী–পাহাড়–বৃক্ষ–ফসল আর বিস্তৃত জনপদের প্রান্তিক মানুষই যাদের শ্রেণি। যারা শুধু শিল্পসমাজকে বৈপ্লবিক হিসেবে দেখার ঘোর বিরোধী। পুঁজি শিল্পায়নকে যারা প্রাণ–প্রকৃতির দিক থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। লোকজ জ্ঞান–সংস্কৃতি যাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

    ৩. গ্রামসি‘র পারাডক্স বলতে এমনটা বোঝায় যে পুরনো সমাজ পচে গেছে কিন্তু নতুন সমাজ নির্মাণের কাজ সেই তুলনায় দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে না। এই বিলম্বতার কারণ সম্পর্কে গ্রামসি‘র হেজিমনি তত্ত্বে বিশেষ ধারণা পাওয়া যায়। আলতাফ পারভেজ তাঁর ‘গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা‘ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।

    ৪. স্ব–পরিচালনা ও সামাজিক পুনর্গঠনে জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণই শুধু পারে “শত শত বছরের বুর্জোয়া শ্রেণি–শাসনে অধঃপতিত জনগণের পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক রূপান্তর ঘটাতে।“…তিনি আরো বলেছিলেন, “ইতিহাসের দিক থেকে বললে, সবচেয়ে চতুর কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্রান্ততার চেয়েও সত্যিকারের বিপ্লবী একটা আন্দোলনের করা ভুলগুলো অপরিসীম মাত্রায় বেশি ফলপ্রসূ।” [সেলিম রেজা নিউটন (২০২০) চমস্কির ভবিষ্যতের সরকার। ঢাকা: পেন্ডুলাম পাবলিশার্স।]

  • মিখাইল বাকুনিন।। প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রের ধারণা

    মিখাইল বাকুনিন।। প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রের ধারণা

    • ভাষান্তর: সহুল আহমদ

    [অনুবাদকের মন্তব্য: মিখাইল বাকুনিনের ‘প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রর ধারণা’ প্রবন্ধটি ১৮৭১ সালে লেখা হয়েছিল। শিরোনামই বলে দিচ্ছে যে তৎকালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা [এবং আমাদের জন্য ঐতিহাসিক] প্যারি কমিউনই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু। এটি বাকুনিনের প্রধান কাজ The Knouto-Germanic Empire and the Social Revolution এর দ্বিতীয় অংশের মুখবন্ধ। প্রবন্ধটি স্যাম ডলগফ সম্পাদিত ও অনূদিত Bakunin on Anarchy গ্রন্থে ১৯৭১ সালে সংকলিত হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে প্রায় সকল সমাজতান্ত্রিক স্কুলই তর্ক-বিতর্ক করেছে, এবং আজতক সেগুলো চালু আছে। মার্ক্স, লেনিন যেমন নিজ নিজ তত্ত্বের আলোকে একে প্রশংসা করেছেন, ব্লাংকুইস্টরাও তেমনি প্রশংসা করেছেন। এই প্রবন্ধেও বাকুনিনও প্যারি কমিউনের উচ্চকিত প্রশংসা করেন। বাকুনিন প্রশংসা করার পাশাপাশি আন্দোলনের কিছু দুর্বলতাও তুলে ধরেন, এবং এগুলোর ঐতিহাসিক হেতু খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে বাকুনিনের কাছে প্যারি কমিউন ছিল উছিলামাত্র, তিনি আসলে এখানে রাষ্ট্র নিয়েই আলাপ করেছেন, রাষ্ট্র ও গির্জার [বা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের] সম্পর্কের দিকে আলোকপাত করেছেন। বরাবরের মতন, নিজেকে স্বাধীনতাপ্রেমী হিসাবেই উপস্থাপন করেছেন। অনুবাদের জন্য মার্ক্সিস্ট.অর্গ –এ প্রকাশিত সংস্করণটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে। অনুবাদে যে কোনো ধরণের ভুল-ভ্রান্তি নজরে পড়ে অনুবাদকের গোচরে আনার অনুরোধ থাকলো।]

    মিখাইল বাকুনিন — স্কেচ: রে ম্যাক্সওয়েল

    আমার অন্যান্য লেখার মতো এই লেখাও বিভিন্ন ঘটনাবলীর ফসল। এটা আমার লেটার্স টু অ্যা ফ্রেঞ্চম্যান (সেপ্টেম্বর ১৮৭০) লেখার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, যেখানে আমি বর্তমান ফ্রান্সসহ পুরো সভ্য সমাজকে ঘিরে ধরা ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে সহজ কিন্তু কষ্টদায়ক পূর্বাভাস দিয়েছিলাম; যে বিপর্যয়ের একমাত্র নিরাময় হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। 

    আমার এখনকার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ধরণের বিপ্লবের জরুরত প্রমাণ করা। আমি সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ, এবং বর্তমানে আমাদের চোখের সামনে ইউরোপে যা হচ্ছে তাকে পর্যালোচনা করবো। সুতরাং যারা সত্যের জন্য ব্যাকুল তারা এটা গ্রহণ করে এই দার্শনিক নীতি ও ব্যবহারিক লক্ষগুলোকে প্রকাশ্যে এবং দ্ব্যর্থ-হীনভাবে জাহির করতে পারেন। এই নীতি ও লক্ষ্যগুলো আমরা যাকে সামাজিক বিপ্লব বলছি তার একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়।

    আমি জানি আমার এই স্ব-আরোপিত কাজটি সহজ নয়। এটা গ্রহণ আমার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থাকলে আমাকে অহংকারী বলা হতে পারে। আমি আমার পাঠকদের নিশ্চিত করতে চাই যে আমার এমন কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমি কোনো পণ্ডিত নই, বা দার্শনিক নই, এমনকি পেশাদার লেখকও নই। আমি জীবনে খুব বেশি লেখালেখিও করি নাই, এবং আত্মরক্ষার উদ্দেশ্য ব্যতিরেক কিছুই লিখি নি, এবং যখনই নিজের কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য আমার স্বভাবজাত অপছন্দকে কাটিয়ে উঠতে আমার উৎসাহী প্রতীতি বাধ্য করেছে কেবল তখনই কিছু লিখেছি।

    তাহলে আমি কে এবং কোন বিষয়টা আমাকে এই মুহূর্তে বর্তমান কাজটি প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করছে? আমি একজন সত্যানুরাগী, এবং এই দুনিয়াকে বর্বর ও দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা কর্তৃক ব্যবহৃত কুৎসিত অলীক কাহিনীগুলোর একজন নির্মম শত্রু। এই ব্যবস্থা সকল সময়ের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কলঙ্ক থেকে লাভবান হয়েছে। আমি একজন দুর্বার স্বাধীনতাপ্রেমি। আমি স্বাধীনতাকে মানববুদ্ধি, মর্যাদা ও সুখানুভব বিকাশের একমাত্র পরিবেশ হিসাবে বিবেচনা করি। আমি সেই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে বোঝাচ্ছি না যা কিনা রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহ, পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কেননা এই স্বাধীনতা এক অন্তহীন মিথ্যালাপ, এবং এটা মুষ্টিমেয়ের সুবিধার্থে বাকীদের গোলামী ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমি রুশোসহ অন্যান্য বুর্জোয়া লিবারেল স্কুলসমূহ কর্তৃক উত্থাপিত ব্যক্তিস্বাত্যন্ত্রবাদী, অহংবাদী এবং ভুয়া স্বাধীনতার কথাও বলছি না; এই বুর্জোয়া লিবারেলবাদ রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রকাশিত সকলের অধিকারকে ব্যক্তির অধিকারের সীমা/বাধা হিসাবে বিবেচনা করে, ফলে এটি ব্যক্তির অধিকারকে শূন্যতে পর্যবসিত করে। আমি কেবল সেই স্বাধীনতাকেই বোঝাচ্ছি যা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সুপ্ত বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক সক্ষমতাগুলোর পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে। এই স্বাধীনতা কেবল আমাদের প্রকৃতির আইন ব্যতীত অন্য কোনো বিধিনিষেধ জানে না। সঠিকভাবে বলতে গেলে, এর ফলশ্রুতিতে আর কোনো বিধিনিষেধই থাকে না, কেননা এইসব আইন আমাদের বাইরে থেকে, পাশে থেকে বা আমাদের মাথার উপর থেকে আরোপ করা হয় না। এই আইনগুলো বিষয়ীগত, আমাদের মধ্যেই নিহিত। এগুলো খোদ আমাদের সত্তার ভিত্তি গঠন করে। এগুলোকে সঙ্কোচন করার পরিবর্তে এগুলোর মধ্যে আমাদের প্রকৃত অবস্থা এবং আমাদের স্বাধীনতার কার্যকর কারণটি দেখতে পাওয়া উচিৎ; যেখানে এক ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্য আরেক ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা হিসাবে বিবেচিত হবে না, বরঞ্চ তার নিজের স্বাধীনতারই নিশ্চিতকরণ এবং প্রসারণ হিসাবে বিবেচিত হবে। সংহতির মাধ্যমেই স্বাধীনতা, সমতার মধ্যেই স্বাধীনতা। আমি বোঝাচ্ছি নিষ্ঠুর শক্তির ওপর স্বাধীনতার জয়জয়কার, এবং সর্বদাই এ ধরণের শক্তির আসল বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে কর্তৃত্বের নীতি। আমি সেই স্বাধীনতাকে বোঝাচ্ছি যা মর্ত্যে ও স্বর্গের দেবমূর্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিবে এবং সকল গির্জা ও রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের ওপর সংহতির ভিত্তিতে মানবজাতির একটি নতুন দুনিয়া তৈরি করবে।

    আমি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার একজন বিশ্বস্ত সমর্থক, কারণ আমি জানি এটা ছাড়া স্বাধীনতা, ন্যায়, মানব মর্যাদা, নৈতিকতা, ব্যক্তির মঙ্গলসহ জাতিসমূহের সমৃদ্ধি সবকিছুই মিথ্যালাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু যেহেতু আমি স্বাধীনতাকে মানবজাতির প্রাথমিক শর্ত হিসাবে বিবেচনা করি, আমি বিশ্বাস করি যে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠন এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত উৎপাদক সমিতি কর্তৃক সম্পত্তির সামষ্টিক মালিকানার মাধ্যমে পৃথিবীতে সমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এবং এটা করতে হবে কমিউনসমূহের স্বতঃস্ফূর্ত ফেডারেশন দিয়ে কর্তৃত্বপরায়ন পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে।

    এই জায়গাতেই একটা মৌলিক বিভাজন দেখা দেয়, একদিকে থাকেন সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী যৌথবাদী [কালেক্টিভিস্ট] এবং অন্যদিকে থাকেন কর্তৃত্বপরায়ন কমিউনিস্ট যারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে সমর্থন করেন। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিন্ন। উভয়ই সমানভাবে একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা তৈরির আকাঙ্ক্ষা করেন, প্রথমত সামষ্টিক শ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, সকলের জন্য সমান শর্তের অধীনে, ঘটনার সহজাত শক্তির মাধ্যমে সবার ওপর অবধারিতরূপে আরোপ করে, এবং দ্বিতীয়ত উৎপাদনের হাতিয়ারের ওপর সামষ্টিক মালিকানার মাধ্যমে। পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কমিউনিস্টরা মনে করেন তারা শ্রমিক শ্রেণির, প্রধানত শহরের প্রলেতারিয়েতদের রাজনৈতিক ক্ষমতার সংগঠন এবং বিকাশের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করবেন, সহায়তা পাবেন বুর্জোয়া র্যাডিকেলবাদের। অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা বিশ্বাস করেন তারা শহর ও গ্রামের শ্রমিক শ্রেণির অ-রাজনৈতিক বা রাজনীতি-বিরোধী সামাজিক ক্ষমতার সংগঠন ও বিকাশের মাধ্যমে সফলকাম হবেন; উঁচু শ্রেণির বন্ধুসুলভ সকল ব্যক্তি যারা কিনা তাদের অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে খোলামেলাভাবে যুক্ত হতে চাইবেন এবং পুরোপুরি বিপ্লবী কর্মসূচিকে গ্রহণ করবেন তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন।  

    এই মতবিরোধ কৌশলগত পার্থক্যের দিকে নিয়ে যায়। কমিউনিস্টরা বিশ্বাস করেন শ্রমিকদের সংগঠিত করা জরুরি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য। বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা সংগঠিত করেন রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে, আরো নরম সুরে বললে, রাষ্ট্রকে ডুবিয়ে মারার উদ্দেশ্যে। কমিউনিস্টরা কর্তৃত্বের নীতি ও চর্চাকে সমর্থন করেন, বিপ্লবীরা সমাজতান্ত্রিকরা তাদের সকল বিশ্বাস স্বাধীনতার ওপর ন্যস্ত করেন। উভয়ই সমানভাবে বিজ্ঞানের পক্ষে, যা কুসংস্কার ধ্বংস করে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান দখল করে নিবে। কমিউনিস্টরা বিজ্ঞানকে শক্তির মাধ্যমে আরোপ করতে চান; অন্যরা এটাকে এমনভাবে প্রচার করতে চান যেন মানব গোষ্ঠী নিজেরাই সম্মত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হবেন; তলা থেকে উপর পর্যন্ত মুক্তভাবে নিজেদের সঙ্গতি ও চাহিদা অনুযায়ী সংগঠিত হবেন। তারা কখনোই কিছু ‘ঊর্ধ্বতন মনন কর্তৃক ‘অজ্ঞ’ জনতার ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোনো পূর্ব পরিকল্পিত নীলনকশাকে অনুসরণ করেন না। 

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা মনে করেন যে মানবসমাজের সমস্ত ডাক্তার এবং শিক্ষকের গভীর বুদ্ধিমত্তার চেয়ে জনগণের সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং আসল প্রয়োজনগুলির মধ্যে আরও অনেক বেশি ব্যবহারিক ভাল জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা রয়েছে। বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা আরো মনে করেন যে, মানবজাতি দীর্ঘকাল যাবত নিজেকে শাসিত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তার সমস্যার কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপের সরকারব্যবস্থার মধ্যে নয়, বরঞ্চ সরকারব্যবস্থার খোদ অস্তিত্ব ও মৌলিক নীতি সমস্যার কারণ, তা সেই সরকারব্যবস্থা যে রূপেই থাকুক না কেন!  

    পরিশেষে কমিউনিজম ও প্রুধোনিজমের মধ্যে সুপরিচিত দ্বন্দ্ব রয়েছে; কমিউনিজমের বিজ্ঞানভিত্তিক বিকাশ হয়েছে জার্মান স্কুল কর্তৃক এবং আমেরিকা ও ইংরেজের মধ্যে অংশত গৃহীত হয়েছে, অন্যদিকে প্রুধোনিজমের বিকাশ এবং একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে লাতিন দেশগুলোর প্রলেতারিয়েতদের মাধ্যমে। প্যারিস কমিউনে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র সবে প্রথম লক্ষণীয় ও কার্যকর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। 

    আমি প্যারিস কমিউনের সমর্থক, কারণ রাজতান্ত্রিক ও ধর্মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াতে রক্তক্ষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি ইউরোপীয় প্রলেতারিতের অন্তরে আরো শক্তিশালী ও টেকসই হয়ে উঠছে। সবচাইতে বড়ো কথা আমি এর সমর্থক কারণ এটি সাহস করে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রকে নাকচ করে দিয়েছে।   

    এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ফ্রান্সেই সংগঠিত হয়েছে, যা তদ্দিন পর্যন্ত চরম উৎকর্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক কেন্দ্রিকতার জমিন ছিল, এবং যে প্যারিস মহান ফরাসি সভ্যতার নেতা ও উৎসমুখ সেখানেই কমিউনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্যারিস তার মুকুটকে একপাশে সরিয়ে রেখে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে নিজের পরাজয় ঘোষণা করছে ফ্রান্স, ইউরোপ সহ সমগ্র দুনিয়াকে জীবন ও স্বাধীনতা দেয়ার নিমিত্তে। প্যারিস তার নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করছে, গোলামী জীবন যাপনে অভ্যস্ত সকল জনগণকে (এমন কোন জনতা রয়েছে যারা গোলামী করছেন না?)  মুক্তি ও স্বাস্থ্যের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। প্যারিস বুর্জোয়া র্যাডিকেলবাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর মরণঘাতি কামড় বসিয়েছে, এবং ফ্রান্স ও ইউরোপের সকল প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক বাস্তব ভিত তৈরি করে দিচ্ছে। প্যারিস নিজের ধ্বংসাবশেষে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে জয়োল্লাসিত প্রতিক্রিয়াকে ভুল প্রমাণ করার জন্য; নিজের বিপর্যয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ ও মর্যাদাকে  বাঁচিয়ে দিয়েছে; মানবজাতির কাছে এটা প্রমাণ করছে যে যদি জীবন, বুদ্ধিমত্তা, ও নৈতিক জোর উঁচু শ্রেণি থেকে ঝরে পড়ে, তবে সেগুলোকে প্রলেতারিয়েতের ক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতিতে রক্ষা করা করা হয়। প্যারিস জনতার সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণ মুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় সীমান্তজুড়ে তাদের খাঁটি সংহতির নতুন জমানা সূচনা করেছে। প্যারিস জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করে এর ধ্বংসাবশেষের ওপর মানবতার ধর্মকে প্রতিস্থাপন করেছে। প্যারিস নিজেকে মানবতাবাদী ও নাস্তিক বলে ঘোষণা করেছে; ঐশ্বরিক অলীক কাহিনীর স্থলে সামাজিক জীবনের বিরাট বাস্তবতা  ও বিশ্বাসকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে; স্বাধীনতা, ন্যায়, সমতা, ভ্রাতৃত্ব (যেগুলো কিনা সকল মানব নৈতিকতার চিরন্তন ভিত্তি) দিয়ে পুরনো নৈতিকতার মিথ্যা ও বৈষম্যগুলোকে প্রতিস্থাপন করেছে! প্যারিস নায়কোচিত, যৌক্তিক ও আত্মবিশ্বাসী। নিজের ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যু দিয়ে হলেও মানবজাতির ভবিষ্যতের ওপর তার দৃঢ় বিশ্বাসকে নিশ্চিত করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সে তার এই বিশ্বাসকে দিয়ে যাচ্ছে! প্যারিস তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল; খোদ মানবতাই ইউরোপের সংযুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল, খ্রিস্টান গির্জা ও পোপের সরাসরি ইন্ধনে। কিন্তু জনগণের সংহতি প্রকাশ করে আসন্ন আন্তর্জাতিক বিপ্লব হবে প্যারিসের পুনরুত্থান।

    চিরস্মরণীয় প্যারিস কমিউনের জীবন ও মরণের দুই মাসের এই হচ্ছে আসল অর্থ এবং এগুলো হচ্ছে এই দুই মাসের অপরিসীম ও হিতকর ফলাফল।

    প্যারিস কমিউন খুব অল্প সময়ের জন্য টিকে ছিল। সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি প্রয়োগ না হোক, অন্তত পদ্ধতিগতভাবে পরিকল্পনা করার জন্যও ভার্সেলদের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে তাদেরকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। এই প্রাণঘাতী লড়াই দ্বারা এর অভ্যন্তরীণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। আমাদের অবশ্য এও বুঝতে হবে যে, কমিউনের অধিকাংশ সদস্য আদতে সমাজতান্ত্রিক ছিলেন না। যদিও আপাত সেটা মনে হয়েছিল, কারণ তারা সেদিকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ব্যক্তিগত প্রত্যয়ের চাইতে বরঞ্চ ঘটনাসমূহের অপ্রতিরোধ্য প্রবাহ, পরিস্থিতির প্রকৃতি, এবং তাদের অবস্থানের জরুরতের কারণে।  সমাজতান্ত্রিক অংশটা খুবই ছোট ছিল, সর্বোচ্চ চৌদ্দ-পনেরজন। বাকিরা ছিলেন জেকোবিন। কিন্তু স্পষ্ট করে বলা দরকার, সেখানে বিভিন্ন ধরণের জেকোবিনরা ছিলেন। সেখানে লিও গাম্বেত্তার মতো জেকোবিন আইনবিদ ও মতবাদী ছিলেন। তাদের প্রত্যক্ষবাদী দাম্ভিক, স্বৈরচারী ও আইনীয় রিপাবলিকতন্ত্র পুরোন বিপ্লবী বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল, জ্যাকোবিনতন্ত্রের সমস্তটাই গ্রহণ করেছে কেবলমাত্র তার ঐক্যের কাল্ট ও কর্তৃত্বের অংশটুকু বাদে। এবং ফ্রান্সের জনগণকে তুলে দিয়েছিল প্রুশিয়ানদের হাতে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে। এবং সেখানে এমনও জেকোবিন রয়েছেন যারা একেবারে স্পষ্টতই বিপ্লবী। তারা নায়ক। তারা ১৭৯৩ সালের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের সর্বশেষ খাটি প্রতিনিধি। প্রতিক্রিয়ার তোড়ে নিজেদের চেতনা/বিবেককে জমা দেয়ার পরিবর্তে তারা তাদের সুসজ্জিত একতা ও কর্তৃত্বকে আত্মোৎসর্গ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মহাত্মা লুই চার্লস ডেলেসক্লুজের নেতৃত্বে এই মহান জেকোবিনরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিপ্লবের বিজয় কামনা করেছিলেন। যেহেতু জনতা ছাড়া কোনো বিপ্লব নেই, এবং যেহেতু আজকাল জনতা সমাজতন্ত্রের প্রতি একধরণের মনোভাব/প্রবৃত্তি প্রকাশ করছে, এবং যেহেতু এটা একরকম  অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব হতে পারে, সেহেতু বিপ্লবী মুহূর্তের যুক্তি দ্বারা তাড়িত হয়ে সৎবিশ্বাসের জেকোবিনরা দিনশেষে সমাজতান্ত্রিকই হয়ে উঠবেন।  

    যে জেকোবিনরা প্যারিস কমিউনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা একদম এই পরিস্থিতিতেই নিজেদের খুঁজে পেয়েছিলেন। ডেলেসক্লুজসহ অন্যান্যরা এমন সব কর্মসূচী ও ঘোষণা দিচ্ছিলেন যেগুলোর সাধারণ নিহিতার্থ ও ওয়াদা নিশ্চিতভাবেই [পজিটিভলি] সমাজতান্ত্রিক প্রকৃতির ছিল। তদপুরি তাদের সৎবিশ্বাস ও ভালো নিয়ত থাকা সত্ত্বেও তারা অন্তর্নিহিত তাগিদের চাইতে বরঞ্চ বাহ্যিক পরিস্থিতির চাপেই কেবল সমাজতান্ত্রিক ছিলেন। তাদের সময়ের অভাব ছিল। এমনকি তাদের নিজস্ব কিছু বুর্জোয়া কুসংস্কারকে পরাস্ত করা ও ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতারও অভাব ছিল, যে কুসংস্কারগুলো  তাদের নবার্জিত সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিল। যে কেউই বুঝবেন, এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রামে আটকা পড়ে তারা যেমন সাধারণ বিষয়গুলোকে মাড়িয়ে যেতে পারছিল না, তেমনি বুর্জোয়া জগতের সাথে চিরতরে যাবতীয় যোগাযোগ ও সংহতি রদ হয়ে যাবে এমন কোনো সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপও নিতে পারছিল না। 

    এটা ছিল কমিউন এবং খোদ এই লোকগুলোর জন্য বড়োই দুর্ভাগ্যের বিষয়। তারা নিজেরা যেমন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন, তেমনি কমিউনকেও পঙ্গু করে ফেলেছিলেন। তবু আমরা তাদেরকে দোষারোপ করতে পারি না। মানুষ রাতারাতি পাল্টে যায় না। ইচ্ছামাফিক তাদের প্রকৃতি বা অভ্যাস বদলে যায় না। কমিউনের জন্য প্রাণ দিয়ে তারা তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন। তাদের কাছে এর বেশি আর কী চাইতে পারি আমরা? 

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    প্যারিসের জনগণের চাইতে বেশি দোষ তাদেরকে দেয়া যাবে না, যাদের প্রভাবেই তারা চিন্তা ও কাজ করেছেন। জনগণ গভীর চিন্তাভাবনা/বিবেচনার চাইতে বেশি প্রবৃত্তির কারণেই বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক ছিলেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা সর্বোচ্চ মাত্রায় সমাজতান্ত্রিক ছিল, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা বা তাদের গতানুগতিক অভিব্যক্তিগুলো তেমন ছিল না। ফ্রান্সের শহরগুলোর, এমনকি প্যারিসেরও প্রলেতারিয়েতরা এখনো বহু জেকোবিন কুসংস্কারে, বহু স্বৈরাচারী ও সরকারি ধারণার মধ্যে  আটকা পড়ে আছেন। কর্তৃত্বের কাল্ট (সকল অশুভ, বঞ্চনা ও দাসত্বের উৎস ধর্মীয় শিক্ষার ভয়াবহ পরিণাম) এখনো তাদের মধ্যে এখনো নির্মূল হয়নি। এটা এতোই সত্য যে, সবচাইতে বুদ্ধিমান মানুষটা, এমনকি সবচাইতে বিশ্বস্ত বা প্রণোদিত সমাজতান্ত্রিকও এইসব ধারণা থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারেনি। আপনি যদি তাদের মনে একটু অনুসন্ধান চালান তাহলে সেখানে একজন জেকোবিনকে খুঁজে পাবেন যে সরকারব্যবস্থার প্রচারক; এক অন্ধকার কোনে ভয়ে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, অবনমিত কিন্তু একেবারে নিষ্প্রাণ নয়। 

    এবং একেবারে বিশ্বস্ত সমাজতান্ত্রিক যে ছোট দলটি কমিউনে অংশগ্রহণ করেছিল তারা খুব কঠিন পরিস্থিতিতে বা অবস্থানে ছিলেন। একদিকে রয়েছে প্যারিসের জনতার কাছে তাদের সমর্থনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক এ্যাসোসিয়েশনের অসম্পূর্ণতা, অন্যদিকে জেকোবিন সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তাদেরকে প্রাত্যহিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। এমন সংঘর্ষের মধ্যেও তাদেরকে কয়েক হাজার শ্রমিকদের কাজ ও খাদ্য সরবরাহ করতে হচ্ছিল, তাদেরকে সংগঠিত ও সজ্জিত করতে হচ্ছিল, এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের কাজকারবারের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হচ্ছিল। প্যারিসের মতন শহরে ঘেরাও অবস্থায়, অনাহারের হুমকির মুখে এবং ভার্সেইলের অনুমতিতে ও প্রুশিয়ানদের বদৌলতে প্রতিক্রিয়ার ছদ্মবেশী চক্রান্তের সম্ভাব্য শিকার অবস্থাতেই এগুলো করতে হচ্ছিল। তাদেরকে ভার্সেইলের সেনাবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছিল। রাজতন্ত্র ও পুরোহিত তন্ত্রের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে, বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের প্রথম শর্তকে ভুলে বা ত্যাগ করে, তারা বাধ্য হচ্ছিলেন জেকোবিন পদ্ধতিতে সংগঠিত হতে।  

    এরকম বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতিতে, এটা খুব স্বাভাবিকই ছিল যে জেকোবিনরাই সমাজতান্ত্রিকদের ওপরে থাকবেন। জেকোবিনরাই কমিউনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন, তারা একটি বেশ বিকশিত রাজনৈতিক প্রবৃত্তি এবং শাসনতান্ত্রিক সংগঠনের চর্চা ও ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন। এটা অবাক করার মত বিষয় যে, তারা তাদের সুবিধাগুলোকে বেশি চাপায়ে দেন নি। তারা প্যারিস বিদ্রোহকে পুরোপুরি জেকোবিন চরিত্র দেন নি। পরিবর্তে তারা নিজেদেরকে একটি সমাজবিপ্লবের দিকেই চালিত করেছিলেন। 

    আমি জানি বহু সমাজতান্ত্রিক, যারা তাদের তত্ত্বে খুবই যৌক্তিক, তারা আমাদের প্যারিসের বন্ধুদেরকে দোষারোপ করবেন: কেন তারা সমাজতন্ত্রীদের মতো যথার্থভাবে বিপ্লবী চর্চায় সাড়া দিলেন না! অন্যদিকে বুর্জোয়া প্রেস চেঁচামেচি করে খুব বিশ্বাসের সাথে তাদের কর্মসূচি অনুসরণ করার জন্য দোষারোপ করছে। একমুহূর্তে জন্য প্রেসের এই ইতরামি নিন্দাকে ভুলে যাওয়া যাক। আমি প্রলেতারিয়েতের মুক্তির তাত্ত্বিকদের একটা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই: তারা আমাদের প্যারিসের ভাইদের প্রতি অন্যায় করছেন। কারণ সবচেয়ে সঠিক তত্ত্ব ও এর প্রয়োগের মধ্যকার বিরাট দূরত্ব তা মাত্র কয়েকদিনে দূর করা সম্ভব নয়। যেমন, যাদের ইউজেন ভার্লিন সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয়েছে তারা জানেনে যে, ভার্লিন ও তাঁর কমরেডরা অগাধ, প্রগাঢ় ও সুবিবেচিত সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। যারা তাদেরকে জানেন তারা কখনোই তাদের উদ্দীপনা, একনিষ্ঠতা এবং গভীর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। তবু তারা এই গভীর আস্থাসম্পন্ন বা সৎবিশ্বাসের মানুষ হওয়ার কারণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞে নিজেদের মন ও দেহকে উৎসর্গ করেছিলেন সে যজ্ঞের মুখোমুখি হয়ে তারা আত্ম-অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। তারা নিজেদের নিয়ে খুব অল্পই ভাবতে পেরেছিলেন! এবং তারা নিশ্চিত ছিলেন, সামাজিক বিপ্লবে, যা কিনা রাজনৈতিক বিপ্লবের চাইতে বিভিন্ন দিক থেকে একদম ভিন্ন, ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের চাইতে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি যা কিছু করতে পারেন তা হচ্ছে জনতার স্বভাবজাত আকাঙ্ক্ষাগুলি প্রকাশ করে এমন ধারণা তৈরি করা, স্পষ্ট করা ও প্রচার করা; এবং জনতার স্বভাবজাত শক্তির বিপ্লবী সংগঠন নির্মাণে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। এইটাই। এর চাইতে বেশি কিছু না। বাকি সব কাজ কেবল খোদ জনতা দ্বারাই সম্পন্ন করা যেতে পারে। অন্যথায় রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রই পরিণতি হবে, অর্থাৎ, রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, সাথে থাকবে এর সকল বিশেষাধিকার, বৈষম্য ও জুলুম। একটি সর্পিল/প্রতারণাপূর্ণ কিন্তু অনিবার্য পথ অবলম্বন করে আমরা জনসাধারণের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার দিকেই যাবো। 

    ভার্লিন ও তাঁর কমরেডগণ বাকিসকল আন্তরিক সমাজতান্ত্রিকদের মতন এবং সাধারণত জনতার মধ্যে বিকশিত হওয়া সকল শ্রমিকদের মতন এক ও একই গোষ্ঠীর ব্যক্তির ক্রমাগত ক্রিয়াকলাপের প্রতি একধরণের সতর্ক মনোভাব পোষণ করতেন; এবং কয়েকজন উচ্চতর ব্যক্তিত্বের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও সতর্ক ছিলেন। এবং যেহেতু তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচারী ছিলেন, সেহেতু তারা তাদের এই দূরদর্শিতা, এই অবিশ্বাসকে ততটাই নিজের বিরুদ্ধে করেছিলেন যতটা অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করতেন।

    একটি সামাজিক বিপ্লবকে অবশ্যই রাজনৈতিক বিপ্লব থেকে উদ্ভূত স্বৈরশাসন বা নির্বাচনী সংসদের ফরমানে সংগঠিত করতে হবে, স্বৈরচারী কর্তৃত্বপরায়ন কমিউনিস্টদের এই বিশ্বাসের বিপরীতে আমাদের প্যারিস সমাজতন্ত্রী কমরেডেরা বিশ্বাস করতেন যে, একা যেমন তিনি/তারা বিপ্লব করতে পারবেন না, তেমনি জনতা, জনগণের সকল গোষ্ঠী ও সংঘের স্বতঃস্ফূর্ত ও ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড ব্যতীত বিপ্লবের পূর্ণ বিকাশ সাধন সম্ভব নয়। 

    আমাদের প্যারিসের কমরেডরা বহুগুণে সঠিক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কোথায় সেই উজ্জ্বল মনন বা ধীশক্তি যা চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা ও জরুরতের বিচিত্রতা ও অসীম বহুতাকে (এসব মিলেই জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা তৈরি হয়) ধারণ করবে? (এমনকি আমরা যদি সামষ্টিক স্বৈরতন্ত্রের কথাও বলি, এমনকি সেটা যদি উচ্চতর মানসিকতাসম্পন্ন হাজার হাজার ব্যক্তি দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে।) এবং এমন একটি সামাজিক সংগঠন উদ্ভাবন করবে যা সমাজের ওপর রাষ্ট্রের সহিংসতাকে দীর্ঘায়ত করার পদ্ধতি বা পরিকল্পনা হবে না? এটা সর্বদা এমনই ছিল। এবং সামাজিক বিপ্লবকে আদতে এই জোরজবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের পুরাতন ব্যবস্থার ইতি টানতে হবে। এটা করতে হবে ব্যক্তির পাশাপাশি জনতা, সকল গোষ্ঠী, কমিউন ও সংঘের পূর্ণ স্বাধীনতাদানের মাধ্যমে। এটা করতে হবে সকল ধরণের সহিংসতার সকল ঐতিহাসিক কারণকে একেবারে ধূলিসাৎ করার মাধ্যমে। এই সহিংসতাই হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অস্তিত্ব। এর পতন আইনের সকল বৈষম্য এবং বিভিন্ন ধর্মের সকল মিথ্যের অবসান ঘটাবে, কেননা আইন ও ধর্ম উভয়ই রাষ্ট্র দ্বারা প্রকাশিত, প্রতিশ্রুত ও সুরক্ষিত সকল সহিংসতার আবশ্যিক পবিত্রকরণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।  

    এটা নিশ্চিত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মুক্তি আসবে না, সমাজের সকল গোষ্ঠী, স্থানিক সংঘ ও ব্যক্তিবর্গের আসল স্বার্থ পূর্ণ হবে না। এটা সুস্পষ্ট যে সমাজের সমস্ত তথাকথিত সাধারণ স্বার্থ, যা রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে বলে মনে করা হয় এবং যা বাস্তবে রাষ্ট্রের অধীন অঞ্চল, কমিউন, সংঘ এবং ব্যক্তিদের সত্যিকারের স্বার্থকে নাকচ করে দেয়, সেই তথাকথিত সাধারণ স্বার্থ বিমূর্ততা, অলীক ও মিথ্যা। রাষ্ট্র হচ্ছে একটি বিরাট কসাইখানা ও গোরস্থানের মত, যেখানে সকল আকাঙ্ক্ষা, দেশের সকল সজীব শক্তি সেই বিমূর্ততার ছায়ায় খুশিমনে নিজেকে খুন করে এবং সমাধিস্থ করে। এবং যেহেতু কোনো বিমূর্ততাই নিজ থেকে টিকে থাকতে পারে না, দাঁড়ানো জন্য পা নেই, হাত নেই, শিকারিদের হজম করার মতো কোনো পাকস্থলী নেই, এটা সম্ভবত স্পষ্ট যে, এই ধর্মীয় বিমূর্ততা, মানে ঈশ্বর আসলে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, মানে পুরোহিতদের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে ধর্মীয় বিমূর্ততার রাজনৈতিক সম্পূরক, মানে রাষ্ট্র নামক রাজনৈতিক বিমূর্ততা শোষণকারী শ্রেণি, অর্থাৎ বুর্জোয়াদের স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন করে এই পুরোহিততন্ত্র সর্বদা বিভেদ-সৃষ্টিকারী ছিল এবং বর্তমানে মানুষকে শক্তিশালী ও সম্পদশালী সংখ্যালঘু এবং পরাধীন ও হতভাগ্য সংখ্যাগুরুতে বিভক্ত করে ফেলছে, তেমনি বুর্জোয়ারা শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যে তাদের সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রের সকল প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, আইনি, শিক্ষাব্যবস্থা, পুলিশ ও সামরিক কার্যক্রম একদিকে প্রবল আধিপত্যকারী অভিজাতদের কাছে কুক্ষিগত করেছে। এর অন্যদিকে রয়েছে একটা বিরাট সংখ্যক জনতা যারা কমবেশি আশাহত জীব, স্থায়ী মোহের মধ্যে বসবাসকারী প্রতারিত জীব, এবং ধীরে ধীরে ও অনিবার্যরূপে যারা বিদ্যমান অর্থনৈতিক বিকাশের অপ্রতিরোধ্য শক্তির দ্বারা সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে। তারা এই সর্বশক্তিমান অভিজাতদের নিছক আন্ধা-হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। 

    গির্জা ও রাষ্ট্রের বিলুপ্তিই সমাজের প্রকৃত মুক্তিলাভের প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হওয়া উচিত। যে সমাজ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারবে ও করা উচিত, কিন্তু সেটা কয়েকজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বা পণ্ডিতদের আদর্শ পরিকল্পনামাফিক বা কোনো স্বৈরশাসকের বা সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের ফরমান অনুযায়ী উপর-নিচ আদলে হবে না। পূর্বেই বলেছি, এই ধরণের ব্যবস্থা অনিবার্যভাবেই একটি নতুন রাষ্ট্রের দিকেই নিয়ে যাবে, এবং ফলস্বরূপ একটি ক্ষমতাসীন অভিজাত গঠন করবে। অর্থাৎ একটি শ্রেণি তৈরি হয় যাদের সাথে জনতার কোনো মিল নেই। এবং নিঃসন্দেহে এই শ্রেণি সাধারণ মঙ্গল অথবা রাষ্ট্রকে বাঁচানোর অজুহাতে আপামর জনতাকে শোষণ করে।

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    ভবিষ্যৎ সামাজিক সংগঠনকে নিচ-উপর আদলে হতে হবে। সেটা হবে মুক্ত সমিতি বা শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে। সমিতি থেকে শুরু হয়ে, তারপর কমিউন, অঞ্চল, দেশ এবং পরিশেষে একটি আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন ফেডারেশনের সমাপ্তি ঘটবে। কেবল তখনই স্বাধীনতা ও সাধারণ মঙ্গলের জীবনদায়ী সামাজিক ব্যবস্থা [অর্ডার] প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যবস্থা ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থকে সীমিত করার চাইতে বরঞ্চ সমর্থন যোগাবে এবং এগুলোর মিলন সাধন করবে।  

    বলা হয়ে থাকে যে, সমাজের সাথে ব্যক্তির একাত্মতা এবং সর্বজনীন সংহতি বাস্তবে কখনও অর্জন করা যায় না, কারণ তাদের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী হওয়ার কারণে কখনও মিলিত/সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এর প্রত্যুত্তরে আমি বলি যে, যদি এই স্বার্থগুলো এখনো পারষ্পরিক সমঝোতায় না আসে, তাহলে সেটা এই কারণে যে রাষ্ট্র গুটিকয়েক সুবিধাভোগীর জন্য সংখ্যাগুরুর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। এই বিখ্যাত অসামঞ্জস্যতা, অর্থাৎ সমাজের ব্যক্তিগত স্বার্থের এই সংঘাত, ভুয়া ও রাজনৈতিক মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক মিথ্যা থেকে জন্ম নিয়েছে, যা আদিপাপের তত্ত্ব হাজির করে মানুষকে অসম্মান করেছে এবং আত্ম-সম্মানকে ধূলিসাৎ করেছে। শত্রুভাবাপন্ন স্বার্থ সম্পর্কিত এই ভ্রান্ত ধারণা অধিবিদ্যা দ্বারাও জ্বালানি পেয়েছিল এবং সেটা ধর্মতত্ত্বের নিকটাত্মীয়। অধিবিদ্যা মানব প্রকৃতির সামাজিক চরিত্রকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়ে সমাজকে ব্যক্তির যান্ত্রিক এবং একেবারে কৃত্রিম সমষ্টি হিসাবে দেখেছিল, যারা কিছু আনুষ্ঠানিক বা গোপন চুক্তির নামে একত্রিত হয়ে নির্বাধে বা একটি উচ্চতর শক্তির প্রভাবের অধীনে পর্যবসিত হয়েছিল। অধিবিদ্যার পণ্ডিতদের মতে, সমাজে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ব্যক্তি একধরণের অমর আত্মার অধিকারী হয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতো। আমরা নিশ্চিত যে, মানব বুদ্ধির সকল সম্পদ, তার নৈতিক ও বৈষয়িক বিকাশ, এবং তার আপাত স্বাধীনতা সবকিছুই সমাজে তার জিন্দেগীর ফসল। সমাজের বাইরে সে মুক্ত মানুষ হওয়া দূরে থাক, সে এমনকি প্রকৃত মানুষই হতে পারবে না; অর্থাৎ যে সত্তা নিজের বিষয়ে সচেতন, একমাত্র সত্তা যে চিন্তা করতে পারে এবং কথা বলতে পারে। কেবল বুদ্ধিবৃত্তি ও সম্মিলিত শ্রমের সংমিশ্রণই মানুষকে তার আদি বর্বরতা ও বর্বর অবস্থা (যা তার আদি প্রকৃতি গঠন করেছিল অথবা তার বিকাশের সূচনাবিন্দু ছিল) থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিল। আমরা আরও নিশ্চিত যে, মানুষের সমগ্র জীবন – অর্থাৎ, তাদের স্বার্থ, প্রবণতা, জরুরত, মোহ, এমনকি বোকামি, সহিংসতা, অবিচার এবং আপাত স্বেচ্ছাধীন কার্যকলাপ – কেবলমাত্র অনিবার্য সামাজিক শক্তির পরিণামকে তুলে ধরে। মানুষ যেমন পারস্পরিক স্বাধীনতার ধারণাটিকে খারিজ করতে পারে না, তেমনি বাহ্যিক প্রকৃতির প্রকাশকে তুলে ধরে এমন বিপরীতমুখী প্রভাব ও সমরূপতাকেও অস্বীকার করতে পারে না। 

    খোদ প্রকৃতির মাঝে এই বিস্ময়কর পারস্পরিক সম্পর্ক [কোরেলেশন] এবং আন্তঃনির্ভরতা নিশ্চিতভাবেই সংগ্রাম ছাড়া তৈরি হয়নি। বরঞ্চ প্রকৃতির শক্তিগুলোর মাঝে সামঞ্জস্যতা/সংগতি দেখা দেয় কেবল ক্রমাগত সংগ্রামের ফলেই। এটাই জীবন ও পরিবর্তনের প্রকৃত শর্ত। সমাজের মতো করেই প্রকৃতিতেও সংগ্রাম বিনা শৃঙ্খলা[অর্ডার] মানেই মৃত্যু।  

    মহাবিশ্বে যদি শৃঙ্খলা [অর্ডার] প্রাকৃতিক ও সম্ভাব্য হয়েই থাকে, তবে সেটা কেবল এই কারণে যে মহাবিশ্ব কোনো এক সুপ্রিম বা মহত্তম ইচ্ছা দ্বারা আরোপিত কিছু প্রাক-কল্পিত ব্যবস্থা অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে না। ঐশ্বরিক বিধানের ধর্মতাত্ত্বিক হাইপোথিসিস কেবল সকল শৃঙ্খলা/ব্যবস্থাকেই খারিজ করে দেয় না, বরঞ্চ খোদ প্রকৃতিকেই খারিজ করে দেয়। প্রাকৃতিক আইনই [ন্যাচারাল ল’]  কেবল প্রকৃত কেবল এগুলো প্রকৃতিতে অন্তর্নিহিত, এবং এগুলো কোনো কর্তৃত্ব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়। এই আইনগুলো আমরা যাকে ‘প্রকৃতি’ বলি তার সমরূপতার সহজ বহিঃপ্রকাশ, অথবা নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও বিজ্ঞান এগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, একটা পদ্ধতিতে জড়ো করেছে এবং এগুলোকে আইন বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি এমন কোনো আইন জানে না। প্রকৃতি অবচেতনভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। সে তার মধ্যে অসীম ধরণের ঘটনা/প্রপঞ্চকে ধারণ করে, অনিবার্যভাবে পুনরাবৃত্তি করে। কাজের এই অনিবার্যতাই হচ্ছে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার টিকে থাকার কারণ।  

    এমন একটা শৃঙ্খলা/ব্যবস্থা [অর্ডার] মানব সমাজেও দৃশ্যমান। এটি একটি কথিত প্রকৃতি-বিরোধী উপায়ে বিকশিত হয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু এটা সহজাত/প্রাকৃতিক প্রাণির জরুরতের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। তার চিন্তা করার সক্ষমতা তার বিকাশে একটি বিশেষ উপাদান সরবরাহ করেছে; এটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান এই অর্থে যে, মানুষ বিদ্যমান সবকিছুর মতোই প্রাকৃতিক শক্তির মিলন ও কর্মকাণ্ডের বস্তুগত উৎপাদনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বিশেষ উপাদান হচ্ছে যুক্তি [রিজন], মানে সাধারণীকরণ ও বিমূর্তকরণের সক্ষমতা। যার ফলে মানুষ অদ্ভুত বহিরাগত বস্তুসমূহকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মতো করে নিজেকেই নিজের চিন্তায় প্রজেক্ট করতে সক্ষম হয়। নিজেকে চিন্তায় নিজের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং তার চতুঃপার্শ্বের দুনিয়া থেকে নিজেকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সে পৌঁছে যায় নিখুঁত বিমূর্তন ও পরম শূন্যতা উপস্থাপনের দিকে। এবং এই পরম তার বিমূর্তকরণের সক্ষমতা ব্যতীত আর কিছুই নয়, যা বিদ্যমান সবকিছুকে তুচ্ছ করে এবং সবকিছুকে নাকচ করার মধ্য দিয়ে স্থির হয়। এটাই মনের সর্বোচ্চ বিমূর্তকরণের চূড়ান্ত সীমা। এই পরম শূন্যতাই ঈশ্বর।

    এইটাই প্রতিটি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের অর্থ ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। যেহেতু আগের মানুষজন ও তাদের সমাজ  নিজস্ব চিন্তার প্রকৃতি ও বস্তুগত কারণ বুঝতে পারেনি, এমনকি তাদের এমন চিন্তার তলায় লুকিয়ে থাকা শর্তাবলী বা প্রাকৃতিক নিয়মও খুঁজে পান নি, ফলে তারা আন্দাজও করতে পারেন নি যে, তাদের পরম ধারণাগুলি কেবল বিমূর্ত ধারণা প্রণয়নের তাদের নিজস্ব ক্ষমতারই ফলাফল ছিল। ফলে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত তাদের ধারণাগুলোকে তারা আসল বস্তু হিসাবে দেখেছিলেন, এর পরে খোদ প্রকৃতিই সফল হতে নিবৃত্ত করে। তারা তাদের কাহিনীকে, পরমের অসম্ভব ধারণাকে পূজা করা শুরু করে এবং শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করে। কিন্তু যেহেতু তারা শূন্যতার বা ঈশ্বরের বিমূর্ত ধারণাকে একটা দৃঢ় বা কনক্রিট আকার দেয়ার জরুরত অনুভব করলো, তখন ঐশ্বরিক [ডিভাইনিটি] ধারণা তৈয়ার করে নিলো। অধিকন্তু এগুলোকে  শুভ ও অশুভ সকল গুণাবলী ও ক্ষমতা দিয়ে জড়িয়ে দিল। প্রকৃতি ও সমাজে তারা কেবল এই শুভ ও অশুভ-কেই খুঁজে পেল। এমনটাই ছিল সকল ধর্মের গোড়া ও ঐতিহাসিক বিকাশ, একেবারে প্রতিমাপূজা বা বস্তুপূজা থেকে একেবারে খ্রিস্টানধর্ম পর্যন্ত।

    ধর্ম, ধর্মতাত্ত্বিক ও অধিবিদ্যার অর্থহীন/হাস্যকর ইতিহাস আলোচনা করার ইচ্ছা নেই। অথবা শত বছরের বর্বরতার ফলে সৃষ্ট সকল ঐশ্বরিক অবতার ও কল্পনার মিছিল নিয়েও আলোচনা করতে চাই না। আমরা জানি যে, কুসংস্কার বিপর্যয় ডেকে আনে, রক্ত ও অশ্রুর বন্যা বইয়ে দেয়। হতদরিদ্র মানবজাতির এই বিদ্রোহী বিকারগুলো ছিল সামাজিক সংগঠনের স্বাভাবিক বিকাশ ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক ও অনিবার্য পর্যায়। এই বিকারগুলো একটি ভয়াবহ ধারণার জন্ম দিয়েছে: মহাবিশ্ব একটি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও ইচ্ছা দ্বারা চালিত হচ্ছে। এই ধারণাই মানুষের কল্পনায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। শতকের পর শতক পার হয়ে গিয়েছে, সমাজগুলো এই ধারণাতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, এসবের ভেতর থেকে উত্থিত যে কোনো প্রগতি অর্জনের সক্ষমতা বা তাড়নাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। 

    শুরুতে কিছু ব্যক্তির এবং পরবর্তীতে কিছু সামাজিক শ্রেণির ক্ষমতার অভিলাষ দাসত্ব ও দখলকে প্রধান নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, এবং ঐশ্বরিকতার এই ভয়াবহ ধারণাটি সমাজের অন্তরে রোপণ করে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, মূলে গির্জা ও রাষ্ট্র এই দুই প্রতিষ্ঠান ব্যতীত কোনো সমাজকে কার্যকর/সম্ভাব্য বলে দেখাই গেলো না। এই দুই সামাজিক দুর্দশাকে তাদের সকল সমর্থক মতবাদগুলো রক্ষা করে গিয়েছে।   

    পৃথিবীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আবির্ভূত হওয়া মাত্রই দুই শাসক শ্রেণি, অর্থাৎ পুরোহিত ও অভিজাতরা তাত্ক্ষণিকভাবে নিজেদের সংগঠিত করে ফেলে; এবং তারা গির্জা ও রাষ্ট্রের উপযোগিতা, অপরিহার্যতা এবং পবিত্রতার ধারণাগুলো দিয়ে বন্দি জনগণের মগজ ধোলাই করতে খুব বেশি নেয় নি। 

  • লুইস মিশেল || কমিউনের স্মৃতি

    লুইস মিশেল || কমিউনের স্মৃতি

    • অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    সম্পাদকের নোট: প্যারি কমিউনের অন্যতম লড়াকু কমিউনার্ড, লুইস মিশেল ছিলেন শিক্ষিকা। কমিউনের পতনের পর তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল নিউ ক্যালদোনিয়ার পেনাল কলোনিতে। ১৮৮০ সালে আবার ফ্রান্সে ফেরার পর, জীবনের বাকি সময়টা লুইস মিশেল কাটিয়েছেন হয় জেলখানায়, নয়তো বক্তৃতা দিয়ে। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী, Mémoires de Louise Michel écrits par elle-même। এই লেখাটি সেই বইয়ের অংশ।

    লুইস মিশেল (১৮৩০-১৯০৫)

    আমি প্রথমে নিজের সম্পর্কে কিছু না বলেই এই ভলিউমটি লিখেছিলাম। বন্ধুরা যখন এ ব্যাপারটি আমার নজর আনল, কিছু বিষাদ হজম করে হলেও আমি ব্যক্তিগত কিছু পর্ব যুক্ত করলাম।  আমি যা করেছি বরং তার বিপরীত প্রভাবটিই প্রকাশিত হতে শুরু করল: কাহিনিটি এগিয়ে নেয়ার সাথে সাথে আমি আমার প্রকৃত অস্তিত্ব মুক্তি সংগ্রামের সেই সময়টির স্মৃতিময় পুনর্জীবন দেখতে ভালবাসলাম এবং এর স্মৃতিতে নিজেকে হারাতে আমি ভালোবাসি।

    এজন্যই আমি আমার চিন্তাভাবনাগুলিকে এমন এক ধারাবাহিক টুকরো টুকরো দৃশ্যের সমাহার হিশেবে দেখি যেখানে অগুনিত অস্তিত্ব চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

    আমরা Champs de Mars এ অবস্থান করছি: আমাদের অস্ত্রগুলি স্তুপীকৃত এবং অসাধারণ এক রাত। রাত তিনটার দিকে আমরা ভের্সাইতে যাব ভেবে রওয়ানা হলাম। আমি বৃদ্ধ Louis Moreau এর সাথে কথা বলি এবং তিনিও যাত্রা করতে পেরে বেজায় খুশি। আমার পুরানা রাইফেলের জায়গায় তিনি আমাকে একটি রেমিংটন কারবাইন দিয়েছেন। এই প্রথমবারের মতো আমার কাছে একটি ভাল অস্ত্র এসেছে যদিও এটি খুব একটা নির্ভরযোগ্য না বলে বলা হয়েছিল। তবে কথাটি সত্য নয়। আমি আমার মাকে বলা মিথ্যাগুলো পুনর্ব্যক্ত করলাম যেন তার দুশ্চিন্তা না হয়। আমার দিকথেকে সমস্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, আমার পকেট আশ্বাসব্যঞ্জক পত্রে ঠাসা, যেগুলো আগাম তারিখে পোস্ট করা হবে। আমি আমার মা’কে বলি তাদের আমাকে প্রয়োজন ছিল; আমি প্রথম মুহূর্তেই মন্টমার্টে যাবো।

    আমার হতাভাগা মা! আমি কতই না তাকে ভালোবাসতাম! আমার বিবেকের নির্দেশ অনুসারে তিনি আমাকে চলার যে স্বাধীনতা দিয়েছেন তার জন্য আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ এবং আমি প্রায়শই তার দুর্দিনে তাকে রক্ষা করতে কতই না পছন্দ করতাম!

    মন্টমার্টের কমরেডরা আছেন। আমরা একে অপরের বিষয়ে নিশ্চিত এবং যারা আদেশ দিবে তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত।

    এখন আমরা চুপ করে যাই; লড়াই শুরু হয়েছে। একটি পাহাড়ে আমি এগিয়ে যেতেই চিৎকার করছি: ভার্সাই এর দিকে! ভার্সাই! লোকেদের জড়ো করার জন্য রাজাউয়া আমাকে তার তলোয়ারটি ছুঁড়ে দিল। আমরা পাহাড়ের চূড়ায় হাত মিলিয়েছি; আকাশে যেন আগুনের ছটা! কেউ আহত হয়নি।

    আমরা ছোট গাছের স্টাম্পে পূর্ণ জমিকে ট্যারিলেয়ার হিশেবে স্থাপন করি। আপনি ভাববেন যে আমরা এটি আগেও করেছি।

    এবার আমরা মৌলিনাক্সে (Moulineaux) রয়েছি। যেমনটা ভাবা হয়েছিল ঠিক তেমন সৈন্য সন্নিবেশিত নেই। একবার ভাবলাম আমরা আরও অগ্রসর হবো, কিন্তু না, আমরা এখানেই রাত কাটাতে যাচ্ছি, আমাদের একাংশ দূর্গে, বাকিরা জেসুইট কনভেন্টে। আমাদের মধ্যে যারা ভেবেছিল যে আমরা আরও এগিয়ে যাব, মন্টমার্তের কমরেডরা এবং আমি নিজেও, ক্রোধে কন্দনরত। তথাপি আমরা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী। ইউডস, র্যানভিয়ার বা অন্যরা কেউই গুরুতর কারণ ছাড়া যেখানে থাকার কথা সেখানে থাকবেন না। তারা আমাদের কারণগুলি জানায় কিন্তু আমরা শুনি না। আমরা আশা পুনর্জীবিত করি: ইসির দূর্গে এখন কামান প্রস্তুত আছে এবং সেখানে থাকাই ভাল হবে। দখলকৃত অবশিষ্টাংশ, বন্দুকের ক্যালিবারের সাথে খাপ না খাওয়া গুলি সমেত আমাদের যুদ্ধসজ্জা অদ্ভুত।

    আমি দেখলাম আমাকে ছায়ার মতো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে যারা কনভেন্টের নীচের বড় হলে ছিল: ইউডস, মে ভাইয়েরা, ক্যারিয়া ভাইয়েরা, বীরের মতো সাহসী তিন বৃদ্ধ পুরুষ: বৃদ্ধ মোরো, বৃদ্ধ শেভালিট, বুড়ো মানুষ ক্যারিয়া, রাজউয়া, মন্টমার্তের সকল ফেডারেল; বন্য জন্তুর মতো স্পষ্ট সাদা দাঁতযুক্ত এক নিগ্রো কালো: তিনি ভাল, বুদ্ধিমান এবং সাহসী।

    জেসুইটরা চলে গেছে, কেবলমাত্র একজন একজন বৃদ্ধ লোক ছাড়া যিনি বললেন যে তিনি কমিউনে ভীত নন এবং তিনি নিজের ঘরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন এবং যে রাঁধুনি, কেন জানি না, সে আমাকে আমার ভাই জিন ডেস ইউটোমার্সকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেয়ালগুলি সাজাতে যে পেইন্টিংগুলি ব্যবহার করা হয়েছে বিষয়বস্তুর চরিত্র সম্পর্কে ভাল ধারণা দেয় এমন একটি প্রতিকৃতির দিকে আলাদাভাবে নজর গেল আমার, নিশ্চই কোন না কোন জেসুইট পরিভালকের প্রতিকৃতি হবে।

    একটি বেশ জমকালো দূর্গ, আমি আর্টিলারিম্যানদের সাথে বেশ ভাল সময় ব্যয় করি। আমরা সেখানে দীর্ঘকালীন বন্ধু ভিক্টরিন ইডস-এর দেখা পেয়েছি, এখনও তিনি শক্ত-সমর্থ রয়েছেন। তিনিও গুলি চালাতে বেশ পারদর্শী।

    আছেন নারীরা, যারা তাদের বুলেটবিদ্ধ লাল পতাকাসমেত ফেডারেলকে স্যালুট জানাচ্ছিল। তারা দূর্গে মোবাইল হাসপাতাল স্থাপন করেছিল, সেখান থেকে আহতদের প্যারিসে উন্নততর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। আরও কার্যকর হতে আমরা ছড়িয়ে পড়ি। আমি ক্ল্যামার্টে ট্রেন স্টেশনে যাই, প্রতি রাতে ভের্সাই আর্টিলারি দিয়ে গুলি চালাতাম। আমরা ইসির দূর্গে যাওয়ার জন্য একটি হেজ রেখাযুক্ত পথ অনুসরণ করি; রাস্তাগুলো কামানে পিষ্ট পুষ্পাঞ্জলিতে পূর্ণ।

    কাছেই পাথর কল। ক্ল্যামার্ট ট্রেঞ্চে প্রায়শই আমাদের যথেষ্ট লোকবল থাকে না। কেল্লার কামান যদি আমাদের সমর্থন না করে তবে যে-কোন আচমকা আক্রমণের মুখে পড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল: ভের্সাইপন্থীরা কখনওই জানত না সংখ্যায় আমরা ঠিক কত গুটিকয়েক ছিলাম।

    ব্যারিকেড, দ্য প্যারিস কমিউন || শিল্পী: আন্দ্রে দেভাম্বে

    এমনকি এমনও হয়েছিল যে এক রাতে স্টেশনের সামনের পরিখরে আমরা কেবল দু’জন ছিলাম!, যদিও আমি জানি না কেন: প্রাক্তন পন্টিফিকাল জোউভে এবং আমার লোডেড রাইফেলসহ: আমরা নূন্যতম সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম। আমাদের অবিশ্বাস্য ভাগ্য সেই রাতে কোন আক্রমণ হয়নি। আমরা যখন ট্রেঞ্চের সামনে পিছনে টহল দিচ্ছিলাম, তখন মুখোমুখি হতেই তিনি আমাকে বললেন:

    “আমরা যে জীবনযাপন করছি তা নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?”

    “অদূরেই একটা নদীর তীর দেখতে পাওয়ার মতন অনুভূতি, যেখানে আমাদেরকে পৌঁছাতে হবে। ”, আমি বললাম।

    তিনি উত্তর দিলেন, “আমার কাছে একটি ছবিওয়ালা বই পড়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে।”

    আমরা ক্ল্যামার্টের ওপর ভের্সাই এর নীরবতার মধ্যেই পরিখায় হাঁটতে থাকি।

    লিসবন যখন সকালে তাঁর সাথে একদল লোক নিয়ে হাজির হলো এসেছিল তখন তিনি একইসাথে খুশি ও ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, যেন মাছি তাড়াচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে নীচে মাথা নাড়ছিলেন।

    একই জায়গায় বার্সার সাথে আরও একটি রাতের অভিযাত্রা, যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাদের হাজার হাজার বিপদ নিয়ে ভের্সাইয়ের আগুনে যেন আমাদের সাথে যোগ দিতে।

    আমি আবারও এসব দেখতে পাচ্ছি। যেন স্বপ্নের রাজ্যে স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন।

    একজন শিক্ষার্থী যে কিনা আমাদের ধারণাগুলো ধারণ করে না, তবে ভের্সাইপন্থীও নন, তার সম্ভাবনার গণনা যাচাই করার লক্ষ্যে আগুনের বিনিময়ে ক্ল্যামার্টে এসেছিল।

    তার সাথে ছিল বদলেয়ারের একটি ভলিউম, যা আমরা সময় সময় কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছিলাম।

    একদিন যখন বেশ কয়েকটি ফেডেরাল একই জায়গায় খাদের মাঝখানে একটি ছোট প্ল্যাটফর্মে কামানবল দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল, তখন সে তার হিসাবগুলি আবার পরীক্ষা করতে চেয়েছিল এবং আমাকে এক কাপ কফির আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

    আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদেরকে স্থির করেছিলাম এবং “La Charogne” শিরোনামের কবিতাটি পড়ছিলাম। আমাদের কফি যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ন্যাশনাল গার্ডের সৈন্যরা আমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আমাদেরকে টেনেহিঁচড়ে নিতে থাকে আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে, “আচ্ছা, আচ্ছা! বেশ! এখনই এসব থামাতে হবে!”

    ঠিক সেই মুহূর্তেই কামানের গোলাটি আঘাত হানল এবং কাপগুলো প্ল্যাটফর্মে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, বইটিকে অতিসূক্ষ্ম ছেঁড়া টুকরোতে পরিণত করল।

    “আমার হিসাব একদম হুবহু ছিল,” শিক্ষার্থীটি তার শরীরকে আচ্ছাদিত করা ময়লা পরিস্কার করতে করতে বলল।

    এরপর সে আরও কয়েকদিন ছিল, কিন্তু আমি তাকে আর দেখিনি।

    কমিউনের দিনগুলোতে আমি কেবল একটা চ্যাংড়া ছেলের মধ্যেই সাহসের অভাব দেখেছি। সে তার সদ্য বিবাহিত বউ এর চিন্তায় পেরেশান ছিল এবং তার ডরপুক স্বভাবের সমালোচনা করে তাকে প্যারিস ফেরত পাঠাতে ইউডসের কাছে আমি এক পত্র পাঠিয়েছিলাম। চ্যাংড়াটি এতেও খুশি ছিল। আমি লিখেছিলাম:

    “প্রিয় ইউডস,

    আপনি কি অনুগ্রহ করে এই আহাম্মকটিকে প্যারিসে ফেরত পাঠাবেন? এ কেবল ঘাবড়াতেই জানে! আমি তাকে বুঝিয়েছি যে আমাদের দূর্গ থেকে যেসব কামান দাগা হচ্ছে, তা মূলত ভের্সাই থেকে আমাদের দিকে দাগা হচ্ছে। যেন সে দ্রুত পালায়। দয়া করে তাকে দ্রুত প্যারিস পাঠিয়ে দিন।”

    সে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে আমরা আর তাকে দেখিনি। ভার্সাই সেনাবাহিনী প্যারিসে প্রবেশের সময় সে যদি তার ফেডারাল ইউনিফর্ম রাখে, তবে তাকে অবিলম্বে কমিউনপন্থী ধরে নিয়ে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করা হত। এই পরিস্থিতিতে আরও অনেকে ছিলেন।

    একই ধরনের অন্য একটি যুবক ছিল। একদিন রাতে ক্লামার্ট স্টেশনে যখন আমরা হাতেগোণা কয়েকজন ছিলাম এবং ভের্সাই থেকে আমাদের দিকে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছিল, এমন এক অবস্থায় সে হঠাৎ আত্মসমর্পণের কল্পনায় মশগুল হয়ে গেল। কিছুতেই তাকে অন্য কিছু বোঝানো যাচ্ছিল না। আমি তাকে বলেছিলাম: “তুমি চাইলে আত্মসমর্পণ কর, তবে আমি এখানেই থাকব এবং তুমি যদি আত্মসমর্পণ কর তবে আমি স্টেশনটি উড়িয়ে দেব”, আমি একটি ছোট্ট চেম্বারে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছিলাম যেখানে প্রজেক্টিকেলগুলো স্তূপ করে রাখা, সেখানে আমার সাথে করমর্দন করতে এল সেই নিগ্রোটি। সে সেদিন টহলে ছিল। পরেরদিন যুবকটি চলে গেল এবং কখনই ফিরে আসেনি।

    ক্ল্যামার্টে আমি ও ফার্নান্দেজ বিচিত্র কিছু অ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি হলাম। আমরা বেশ কয়েকজন ফেডারালদের সাথে গেম ওয়ার্ডেনের বাড়িতে গিয়েছিলাম, যেখানে ভাল লোকদের ডেকে আনা হয়েছিল।

    আমাদের চারপাশে এত এত  গুলি ছড়ানো-ছিটানো ছিল যে ফার্নান্দেজ আমাকে বলেছিলেন: “যদি আমি মারা যাই তবে আমার ছোট বোনদের খেয়াল রাখবেন।” আমরা আলিঙ্গন করি এবং রাস্তা ধরে এগুতে থাকি। আহত তিন বা চারজন লোক বাড়িতে ছিল, মেঝেতে বা গদিতে পড়ে ছিল। গেম ওয়ার্ডেন অনুপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর একা হয়ে পড়া স্ত্রীকে বেশ ভীত দেখাচ্ছিল।

    শিল্পী: ‍গুস্তাভ বুলাঁজ্যে

    যখন আমরা আহত লোকদের নিতে শুরু করি তখন তিনি আমাকে ও ফার্নান্দেজকে চলে যেতে অনুরোধ করতে শুরু করলেন। বহন করা যায় না এমন আহতদের তিনি আমাদের সাথে থাকা ফেডারেলদের তত্ত্বাবধানে রেখে আমাদের চলে যেতে বললেন।

    ভদ্রমহিলা কেন এইরকম আচরণ করছিলেন তা বুঝতে পারছিলাম না। আমরা দুনিয়ার কোন কিছুর বিনিময়ে আহতদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় রেখে যাব না। আমরা আমাদের সাথে থাকা অ্যাম্বুলেন্স স্ট্রেচারগুলিতে বেশ কষ্টেসৃষ্টে আহতদের উঠাচ্ছিলাম আর ওই মহিলা আমাদের পেছিন পেছন এসে বারংবার আমাদেরকে কেটে পড়তে বলছিলেন।

    তার কথা তেমন একটা আমলে নেয়া হচ্ছে না দেখে তিনি চুপ করে গেলেন এবং গুলিবিদ্ধ আহত রোগীদের নিয়ে তার সদর দরজা থেকে আমরা সামনে অগ্রসর হলাম।

    পরে আমরা জানতে পারলাম যে তার ঘরেই ভের্সাই এর নিয়মিত সৈনিকরা ঘাপটি মেরে ছিল। তিনি অন্য নারীকে খুন হতে দেখতে হবে এই ভয়ে ছিলেন? নাকি তিনি স্রেফ হতভম্ব অবস্থায় ছিলেন?

    আমাদের বয়ে নিয়ে আসা আহতদের মধ্যে আমরা একটি অর্ধ-মৃত ছোট ভের্সাই সৈনিককেও নিয়ে এসেছিলাম যাকে অন্যান্যদের সাথে প্যারিসের ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালে রাখা হয়। ধীর ধীরে সে সেরে উঠছিল। প্যারিস আক্রমণের সময়ে অন্য সৈনিকদের সাথে হয়তো তাকেও মেরে ফেলা হতো।

     ইউডস যখন লিজিওন অফ অনারে গিয়েছিলেন তখন আমি লা সিসিলিয়ার সাথে মন্ট্রোজে এবং তারপরে ডম্ব্রোভস্কির সাথে নিউইলি গিয়েছিলাম। এই দু’জন পুরুষ শারীরিকভাবে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন; অথচ ক্রিয়াকালীন তাদের একই দ্রুত দৃষ্টি, একই সিদ্ধান্ত, একই দুর্গমতা।

    সাধারণভাবে ফেডারেলদের সাহসের কোন তুলনা হয় না। মূলত এই সাহস ছিল একটি বিপ্লবী আন্দোলনের উদ্দীপনা। কমিউনের সেনাবাহিনী সম্পর্কে অপবাদগুলি প্রদেশগুলির চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে; এই সেনাবাহিনীকে দস্যু এবং ন্যায়বিচার থেকে পলাতকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী বলে অভিহিত করা হয়।

    তবুও পাওল মিংক, আমোরোকস এবং অন্যান্য বীর বিপ্লবীরা যে সমস্ত কমিউন ঘোষিত বড় শহরগুলিতে তাদের অনুগামীদের পাঠিয়েছিল। বাকি প্রদেশ এবং গ্রামাঞ্চল ভার্সাই থেকে সামরিক প্রতিবেদন পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে ডুভালের মৃত্যুতে গ্রামগুলি আতংকিত হয়ে পড়েছিল।

    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আমাদের সেনাবাহিনী ৫০০ এরও বেশি বন্দি গ্রহণ করেছে এবং তাদের মধ্যে আমরা শয়তানগুলোর মুখ বন্ধ করতে পারি যারা হালকা মন দিয়ে তাদের পাশবিক আবেগের বশে দেশটিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। বেশিরভাগের বয়স চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ছিল, তবে ঘৃণ্য ব্যক্তিদের এই দীর্ঘ লাইনে বৃদ্ধ পুরুষ এবং শিশুরাও ছিলেন। তাদের মধ্যে কিছু মহিলাও দেখা গেছে। ক্রুদ্ধ জনতার কব্জা থেকে এদেরকে ছাড়িয়ে নিতে এদের প্রহরা দিয়ে নিয়ে আসা অশ্বচালিত অশ্বারোহী প্লাটুনকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও, আমরা তাদের অক্ষত অবস্থায় আস্তাবলের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

    “ব্যক্তি ডুভাল, সেই অন্য নকল জেনারেল, সকালে দুই সাধারণ কর্মচারীর সাথে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।”

    “তিনজনই গর্বের সাথে অস্ত্র তুলে নেয়া সমস্ত বিদ্রোহী নেতাদের ভাগ্যে যা ঘটে  সেই ভাগ্য বরণ করেছিল।”

    (ভের্সাই সেনাবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার রচিত The war of the Communists of Paris)

    আমরা জানতাম যে সাম্রাজ্যের জেনারেলরা যারা নিজেদের পদবি ব্যতীত অন্য কোনও পরিবর্তন না করে ভের্সাই প্রজাতন্ত্রের সেবায় চলে গিয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা যায়।

    প্যারিস হত্যার ভবিষ্যতের অন্যতম প্রতিশোধ হবে সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রচলিত কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ করা।

  • জেমস গিঁয়ুম || ফেডেরালবাদ: প্যারিস কমিউনের গঠনতন্ত্র 

    জেমস গিঁয়ুম || ফেডেরালবাদ: প্যারিস কমিউনের গঠনতন্ত্র 

    • অনুবাদ: অনিক সন্ধি

    সম্পাদকের নোট: ১৮৭১ সালের এপ্রিলে, Solidarité পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশ করেছিলেন জেমস গিঁয়ুম। প্রেক্ষাপট ছিল: কিভাবে ফেডারেটিভ নীতিমালার ভিত্তিতে প্যারিস কমিউন গড়ে উঠতে পারে।

    জেমস গিঁয়ুম (১৮৪৪-১৯১৬)

    প্যারিসে সংঘটিত বিপ্লবের সত্যিকারের চরিত্র এত স্পষ্টভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে অপরিচিত একজন ব্যক্তিও তা সহজে বুঝে ফেলতে পারবে। 

    প্যারিসের বিপ্লব হল ফেডেরালিস্ট। 

    প্যারিসের জনতা নিজ ইচ্ছা মত সংগঠিত হবার স্বাধীনতা চায়। তারা চায় না ফ্রান্সের বাকি অংশ তাদের বিষয়ে নাক গলাক। ঠিক তেমনি তারাও চায় না অন্যের বিষয়ে তারা নাক গলাবে বা মাতব্বরি করবে। তারা একই সাথে সবাইকে তাদের নিজ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন অনুযায়ী সংগঠিত হবার আহবান যানায়। 

    এরূপ বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত সংগঠন মুক্তভাবে যুক্ত হবে, বা অন্য ভাষায় ফেডারেটেড হবে, যাতে তারা একে অপরের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। 

    বলে রাখা ভাল প্যারিসের এই ফেডেরালবাদকে যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ডের কথিত “ফেডেরালবাদের” সাথে মিশিয়ে ফেলা উচিৎ হবে না।  

    সুইজারল্যান্ড সাধারণ এক ফেডেরাল রাষ্ট্র। এই শব্দই আলোচিত দুই সিস্টেমের পার্থক্য বলে দেয়। সুইজারল্যান্ড একটি রাষ্ট্র। সুইজারল্যান্ড রাষ্ট্রের দ্বারা সীমাবদ্ধ কতগুলোর জাতীর একক। তাই তার ফেডেরাল চেহারা থাকা সত্ত্বেও তার আসল সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সেই চূড়ার নিকটই একত্রিত। তার ক্যান্টনগুলো[mfn] সুইজারল্যান্ডের প্রশাসনিক এককগুলোকে ক্যান্টন বলা হয়। সুইজারল্যান্ডের ফরাসি নাগরিকগণ একে কমিউনও বলে। [/mfn] নিজস্ব একক ও সার্বভৌম সত্তা নয়। সেগুলো শুধু সুইস রাষ্ট্রের সম্পূর্ণটার একাংশ। একটা ক্যান্টনের নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই তাই তার সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনও[mfn] নিজেকে শাসন করার অধিকার। ইংরেজিতে এই অধিকারকে বলা হয় Self-determination। [/mfn] নেই। তার বিধাননীতি ফেডেরাল সংবিধানে[mfn] সুইস সংবিধান। পুরো নাম হল সুইস কনফেডারেশনের ফেডেরাল সংবিধান (The Federal Constitution of the Swiss Confederation) [/mfn] সীমাবদ্ধ। সেই ফেডেরাল সংবিধান কিন্তু কোন সত্যিকারের মুক্ত চুক্তি নয়। তার প্রতি সব ক্যান্টন আলাদা ভাবে সম্মতি দেয় নি। সব ক্যান্টনের উপর এই চুক্তি সংখ্যাগরিষ্ট ভোটের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কোন ক্যান্টনের ফেডেরাল চুক্তি নাকচ করার অধিকার নেই। তাদের ফেডারেশন থেকে বের হবার কোন অধিকার নেই। আবার কোন ক্যান্টন বিভাজিত হয়ে নতুন ক্যান্টন তৈরি করারও কোন স্বাধীনতা নেই, সম্প্রতি টেসসিন[mfn] Tessin Canton অপর নাম Ticino canton। সুইজারল্যান্ডের ২৬টি ক্যান্টনের মধ্যে এটি অন্যতম। ১৯ শতকে (এই লেখাটির সময়কালে) টেসসিন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে গরীব ও শোষিত অংশ ছিল এবং নিরক্ষরতার হার ছিল দেশের সর্বাধিক। স্বাভাবিকভাবেই এরূপ অন্যায় অত্যাচার প্রতিবাদের জন্য ও সার্বিক মুক্তির জন্য সেখানে নানা রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম নেয়। ১৮৭০-১৮৯১ পর্যন্ত ফেডেরাল সেনাবাহিনীকে সেখানে ডাকা হয় নানান বিদ্রোহ দমনের জন্য। [/mfn] ক্যান্টনের সাথে যা হচ্ছে। একেবারে মামুলি কোন রাজনৈতিক বা সমাজবাদী আন্দোলন, যেমন কোন স্ট্রাইক, ফেডেরাল সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনের দোর প্রান্তে নিয়ে আসতে পারে। 

    অর্থাৎ সুইজারল্যান্ড শুধু নামেই ফেডারেশন। সুইজারল্যান্ডকে আসলে ফেডারেশন না বলে বিকেন্দ্রিক বললে আরো সঠিক হয়। সুইজারল্যান্ডের মিল পাওয়া যাবে ফ্রান্সে “১৭৮৯ এর নীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত” ১৭৯১ এর ভার্সাই এসেম্বলি-তে লিখিত সংবিধানের সাথে[mfn] ১৭৯১ এর ফরাসী সংবিধান ফরাসী জনতার শত বছরের স্বাধীনতা-সংগ্রামের রক্তে লিখিত সংবিধান। ইউরোপে প্রথমবারের মত এই সংবিধান মানবাধিকার ও সমানাধিকার কায়েম করে। প্রথমবারের মত তারা ঘোষণা করেঃ রাজা বা ঈশ্বর নয়, সার্বভৌমত্ত্বের সত্যিকারের উৎপত্তি হল জনগন। [/mfn] যা ফেডেরালবাদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার চেষ্টা করে কিন্তু পুরোপুরি তা পারে না। 

    শিল্পকর্ম: Olgu Ülkenciler

    প্যারিস কমিউনের দ্বারা ও মহান সমাজবাদী প্রুঁধোর[mfn] পীঁয়ের জোসেফ প্রুঁধো। ১৯ শতকের বিখ্যাত ফরাসী সমাজবাদী ও অনেকের মতে প্রথম এনার্কিস্ট। [/mfn] বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দ্বারা প্রণীত ফেডেরালবাদ সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র ও জাতিতত্ত্ব প্রত্যাখান করে। 

    ফেডেরালবাদের কাছে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের দ্বারা সীমাবদ্ধ জাতীয় ও ভূগৌলিক একক বলে কিছু নেই। সে শুধু চিনে কমিউন[mfn] ফরাসী শব্দ কমিউন দ্বারা প্রশাসনিক একক বুঝালেও সমাজবাদী বা কমিউনিস্ট তত্ত্বানুযায়ী বিপ্লবের পূর্ববর্তী, মধ্যবর্তী ও পরবর্তী সময়ে এর স্বাস্থ্যবান বিকাশ ও স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের গুরুত্ব ব্যাপক। [/mfn] সমষ্টির ফেডারেশনকে। এ এমন এক সমষ্টি যার মূলনীতি শুধুমাত্র চুক্তিবদ্ধ দলগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। আর তাই জাতীয়তাবাদ ও ভূখন্ডের সীমা সে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে। 

    ফেডেরালবাদের সামনে কোন রাষ্ট্র নেই। কোন কেন্দ্রীয় শক্তি নেই, যা অন্য সংগঠনের উপর নিজের মহত্ত্ব কায়েম করে ও নিজের কর্তৃত্ব তাদের উপর চাপিয়ে দেয়। সংগঠনের সমষ্টিগত শক্তিই তার একমাত্র শক্তি। এই সমষ্টিগত শক্তি তাদের ফেডেরাল চুক্তি নিশ্চিত ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। কিন্তু এই চুক্তি সুইস বা যুক্তরাষ্ট্রীয় “ফেডেরাল” চুক্তির মত মামুলি চুক্তি নয়। এটি এমন এক চুক্তি যা নিশ্চিত করে প্রত্যেক চুক্তিকারী অন্য চুক্তিকারীর স্বার্থ রক্ষা করবে।[mfn] সিভিল ল’ তে এরূপ চুক্তিকে synallagmatic চুক্তি বলে। লেখাটির ইংরেজি ভাষান্তরে এই শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছিল। [/mfn] আর এই চুক্তি প্রত্যেক স্বাক্ষরকারী সংগঠনের দ্বারা আলাদা ও এককভাবে নির্ধারিত। এই সমষ্টিগত শক্তি কখনো অন্য ফেডারেট করা সংগঠনের উপর মহত্ত্ব কায়েম করতে পারবে না যেমনটা রাষ্ট্র সমাজ ও কমিউনগুলোর উপর করে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ও জাতীয় রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। কমিউনগুলো নিজের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে ও সত্যিকারের নৈ-রাজ্য[mfn] নেই যার রাজ্য, নেই যার কর্তৃত্ত্ব। শাসন-শোষণ বিহীন এক স্বাধীন ও সাম্যবাদী সমাজ। [/mfn] ফুটে উঠবে। 

    শিল্পকর্ম: Olgu Ülkenciler

    তবে এ ভাবার কারণ নেই যে রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ দমনের পর ফেডেরালবাদ, স্বৈরাচারবাদ, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা অহংকারবাদের[mfn] Egoism। লেখক খারাপ অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করলেও জার্মান লেখক ম্যাক্স স্টার্নার কতৃক এই দর্শন পরবর্তীতে নৈরাজ্যবাদের দর্শন ও সাহিত্যে খুব গুরুপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। [/mfn] জন্ম দিবে। মোটেও না, ফেডেরালবাদ হল সমাজবাদী। তার কাছে সংহতি ও স্বাধীনতা অবিচ্ছিন্ন। কমিউনগুলো সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসিত হলেও নানা কারণে যেমন নিজের স্বাধীনতাকে আরো ভালোভাবে সুরক্ষার জন্য অন্য কমিউনের সাথে সংহতির মাধ্যমে থাকবে। এই সংহতি হবে অন্তরঙ্গ যা নিশ্চিত হবে নানান ফেডেরাল চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তি তাদের সাধারণ স্বার্থগুলো নির্ধারণ করবে। বড় বড় জনসেবা কর্মকান্ড, পণ্য উৎপাদন ও বিনিময়, ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও বহিরাগত আক্রমনের সময় মিউচুয়াল এইড – এসব ফেডেরাল চুক্তি নিশ্চিত করবে।

    ফরাসি জনতা তাদের দুর্দশা ও জুলুমের প্রতি জেগে উঠুক। সত্যের আলোয় তাদের চোখ আলোকিত হোক! ১৮৭১ সাল হোক সেই সাল, যে সালে তারা ফেডেরাল ও সমাজবাদী প্রজাতন্ত্র কায়েম করে। ঠিক যেমন ১৭৯৩ ছিল সেই সাল, যে সালে তারা মানবাধিকার কায়েম করে। ইউরোপ, যে আজ জার্মান সাম্রাজ্যের কালো থাবার তলে[mfn] পুরো ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ তখন জার্মান সাম্রাজ্য ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পদতলে ছিল। সাম্রাজ্যবাদী দখলের জন্য যুদ্ধ লাখ লাখ মানুষের জীবন নাশ করেছিল। জার্মান সাম্রাজ্যের ফ্রান্স দখলের জন্য যুদ্ধের সময় তারা তার রাজধানী প্যারিস ঘেরাও করে। প্যারিসের জনতাকে জার্মান কসাইদের মর্জির উপর ছেড়ে দিয়ে ফরাসী সেনাবাহিনী ও শাসকগণ নির্লজ্জভাবে শহর ছেড়ে পালায়। কিন্তু ফরাসী জনতা কোনঠাসা হয়নি। বীরের মত তারা অস্ত্র তুলে নেয় ও ফরাসী কমিউন কায়েম করে। দুনিয়ার প্রথম সমাজবাদী বিপ্লব ছিল এটি। কিন্তু যে ফরাসী ও জার্মান সেনাবাহিনী ক’দিন আগেও একজন আরেকজনের গলা কাটছিল, তারা বিপ্লবের আভাস পেয়ে হাতে হাত মিলিয়ে প্যারিসে ঢুকে নির্বিচার গণহত্যা চালায়। অন্তত ২০,০০০ নিরীহ মানুষ শহীদ বরণ করে। প্যারিস কমিউন সাক্ষী, শাসক শ্রেণীর কোন জাতি নেই, দেশ নেই। তাদের স্বার্থ একটাই – পূঁজির কর্তৃত্ব বহাল রাখা। সে হোক জার্মান, ফ্রেঞ্চ, আমেরিকান, রাশিয়ান, চীনা, সৌদি, ইরানি, ভারতীয় বা বাঙালি – জনতা যখন সার্বিক মুক্তির জন্য শেষ যুদ্ধ ঘোষণা করবে, শাসক শ্রেণী দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ সব ভুলে সেই যুদ্ধে জনগণকে পরাজিত করার জন্য একত্রিত হবে। [/mfn], সে ইউরোপে আবারো জ্বলে উঠুক সাম্য ও স্বাধীনতার অনির্বাণ আগুন।