Blog

  • ক্যাম্পাসে কেন ডেমোক্রেসি দরকার

    ক্যাম্পাসে কেন ডেমোক্রেসি দরকার

    আলতাফ পারভেজ 

    বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় সংকট—সেখানে কথা বলা যাচ্ছে না। ‘রাজনীতি’ সেখানে নিষিদ্ধ। অথচ দুনিয়ায় কেউ রাজনীতির বাইরে নেই। বুয়েটকে বাংলাদেশের অগ্রসর বিদ্যাপীঠ গণ্য করার রেওয়াজ আছে। বুয়েট কিছুকাল আগে সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীদের সংগঠনচর্চা থাকবে না। এর ঢেউ তোলা হয় অন্যত্রও। অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সমাজ-ভাবনা বন্ধের আয়োজন বেগবান হয়। তাতে একের পর এক সব ক্যাম্পাসে রক্তপাতই কেবল ঘটছে।

    ক্যাম্পাস গণতন্ত্রের চর্চা নিষিদ্ধ করতে অজুহাত হিসেবে হাজির করা হয় ‘মারামারি’ ও ‘সন্ত্রাস’-কে। গুটিকয় সন্ত্রাসী কাজকে ‘ছাত্ররাজনীতি’র পোশাক পরিয়ে জবাই দেওয়া হয় মানবিক ভাবনা-চিন্তাচর্চার স্বাভাবিকতাকে। আরও স্পষ্ট করে বললে তরুণ-তরুণীদের প্রশ্ন তোলা ও উত্তর খোঁজার চেষ্টাকে টার্গেট করা হচ্ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) তার নিষ্ঠুর এক পরিণতি দেখলাম আমরা।

    আবরার ফাহাদ হত্যার আগে-পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ও প্রতিবাদের একটা নতুন তরঙ্গ দেখা যাচ্ছিল।

    বিপুল সামাজিক সংহতিও পায় সেটা। ওই সামাজিক সমর্থন দ্রুত অস্ত্র হিসেবে নিপীড়নবিরোধীদের স্তব্ধ করার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তরুণ-তরুণীদের খাঁচায় পোরার জন্য আবরার হত্যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষাঙ্গন বাঁচাতে ‘ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসি’ নিষিদ্ধ রাখতে হবে—এ রকম ফর্মুলা জনসমাজে বেশ সম্মতি পেয়ে যায় তখন। কিন্তু তারপর শাবিপ্রবিতে কী দেখা গেল? এবার হয়তো আবরারের মতো কেউ মরল না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের রক্তে ক্যাম্পাসের মাটি সিক্ত হলো। যে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অব্যবস্থাপনার বিষয়ে বলছিল কেবল।

    মাইন্ড কন্ট্রোল;
    শিল্পী: ব্রায়ান টেয়লর;
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    জ্ঞান-অর্থনীতির প্রকৃত প্রতিপক্ষ কারা
    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় আকারের খাঁচায় পোরার কাঠামোগত ‘কাজ’-টি রাজনৈতিক-অর্থনীতির জন্য খুব জরুরি। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রচর্চা বন্ধের আয়োজন একালে তাই অনেক রাষ্ট্রে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প। তরুণদের কথা বলা বন্ধের কাজটি প্রয়োজন মূলত ক্ষমতাবানের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছোট ছোট অনেক কর্তৃত্বশালী তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের মতো জবাবদিহির বাইরে থাকতে চান।

    কিন্তু তরুণেরা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের জায়গাগুলোর অন্যায্যতা ও অযৌক্তিকতা চিনে ফেলছে। দুর্নীতিকে শনাক্ত করছে। সেগুলো চ্যালেঞ্জ করছে, কথা বলছে, গান করছে, কবিতা লিখছে, গ্রাফিথি আঁকছে, প্রশ্ন তুলছে, উত্তর খুঁজছে এবং গণতন্ত্র চাইছে—যে গণতন্ত্র সবাইকে মতামত প্রকাশের সুযোগ দেয়। কিন্তু অনেকের জন্য এ পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়া কষ্টকর। তাঁরা ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসিতে বাইরের ‘ইন্ধন’ দেখেন। তাঁদের মানসম্মান থাকে না তাতে।

    পাকিস্তান আমলে এ দেশে এ রকম তরুণদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ গালি দেওয়া হতো। পাশের দেশ ভারতে একই ধরনের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ মোহর দেওয়া হয়। এ রকম মনস্তত্ত্বের মাঝেই আমরা আছি এখন।অথচ যেকোনো জ্ঞানপীঠে মেধা ও যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যকে যদি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের মানদণ্ড করা হয়, তখন সেটাই ওই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের জন্য বড় সন্ত্রাস হয়ে ওঠে। এই সন্ত্রাস নির্বিঘ্নেই কি চলছে না? সেই অভিজ্ঞতাগুলো আড়াল করেই কয়েক দশক ধরে ক্যাম্পাসগুলোর সব সহিংসতার দায়ভার চাপানো হচ্ছে ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর এবং ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ঐতিহ্যের ওপর।

    কিন্তু ছাত্র সংসদ বা ইউনিয়ন বন্ধ হওয়ায় মোটেই সন্ত্রাস কমেনি। প্রত্যেক কালেই ক্ষমতাবানেরা সন্ত্রাস করে, এখনো ক্ষমতাবানদের দ্বারাই ছাত্রছাত্রীরা রক্তাক্ত হয়। ইউনিয়ন না থাকলে ক্ষমতাবানদের বাড়তি সুবিধা এটুকু—শিক্ষার্থীদের অনায়াসে পেটানো যায়। পিটিয়ে সাংবাদিক ডেকে বাইরের ইন্ধনের দিকে আঙুল দেখানো যায়। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রচর্চা করতে দেওয়া হবে না বলে বহুকাল দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ইউনিয়নের নিয়মিত নির্বাচন বন্ধ।

    ঔপনিবেশিক আমলেও যা হয়নি, স্বাধীনতার আমলে তা-ই সম্ভব হয়—ক্যাম্পাস, সমাজ ও দেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনাচিন্তাকে ‘অপরাধ’ ও ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। শিক্ষার্থীদের মতামত গঠনের প্রক্রিয়া বন্ধ করা গেছে এতে। সমাজের নিচ থেকে নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশাল বিশাল তহবিলের ওপর প্রশ্নহীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গুটিকয়েকের। জ্ঞান-অর্থনীতির প্রকৃত প্রতিপক্ষরা বেশ আড়ালে থাকতে পারছে এতে।

    আজকে নির্মীয়মাণ পদ্মা সেতুর পিলারে একটা বার্জ ধাক্কা খেলে পুরো দেশ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিন্তু দেশের সম্পদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাচার নিয়ে তরুণদের আকুতিতে প্রতিক্রিয়া অতি সামান্য। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে দেশের প্রতিটি পরিবারের হিস্যা আছে।

    ডেমোক্রেসি
    শিল্পী: ওয়ার্নার হোরভাথ

    শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন না থাকায় লাভ কার
    সামান্য ১-২টি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় ৩০ বছর দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ইউনিয়ন নেই। কিন্তু গুন্ডা বাহিনীগুলো বাধাহীনভাবে কাজ করছে সব জায়গায়। এমন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না—ইউনিয়ন থাকার সময়ের চেয়ে না থাকার সময়ে শিক্ষার পরিবেশ ও মান বেড়েছে, সন্ত্রাস কমেছে কিংবা শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টি বেড়েছে। এই ৩০ বছরে শিক্ষকেরা ঠিক ঠিক জাতীয় রাজনীতি করে গেছে। অফিসার-কর্মচারীরাও করেছে। বহু শিক্ষক বড় ‘নেতা’ হয়েছেন। সেই ‘নেতা’দের সহায়তায় বহু ‘ছাত্র’ কোটিপতি হয়েছে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ-বদলি-পদায়ন যে রাজনৈতিক বিবেচনায় হচ্ছে সেটা সবাই জানে। সবাই অভ্যস্ত এতে। এসব অনায়াসে চলতে পারছে। চলতে পারবে। কেবল চলতে পারছে না এসবের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ। কোনো কিছুতে আপত্তি তোলা, প্রশ্ন উত্থাপন, উত্তর অন্বেষণ বিপজ্জনক। সেসব তাই নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নের জায়গা নয়, একে গড়ে তোলা হচ্ছে আনুগত্যের জায়গা হিসেবে!

    কিন্তু প্রতিনিধি বাছাই, সংগঠিত হওয়ার অধিকার কিংবা ইউনিয়ন না থাকার পরও তরুণ-তরুণীদের সচেতনতাবোধ কমছে না।

    এত নষ্ট একটা সমাজে সেটা সম্ভব নয়। যে ছোট একটা গোষ্ঠী সমাজের প্রায় সবকিছু দখল করে রাখে, শিক্ষাঙ্গনের ক্ষুদ্র চত্বরগুলো তাদের কাছে নতজানু হয় না দেখে স্বাভাবিকভাবেই ক্রোধ হতে পারে তাদের। এটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও বটে। সে জন্য তাঁরা ক্যাম্পাসে সশস্ত্র রক্ষীদের ডাকেন। কেবল এ কারণেই ক্যাম্পাস রক্তাক্ত হয়। তবে এটাকে কখনো ‘সন্ত্রাস’ বলা হয় না।

    শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রতিবাদ (পড়ুন ‘অবাধ্যতা’) চলতি রাজনৈতিক-অর্থনীতির জন্য, একচেটিয়া কারবারিদের জন্য, ভূমিদস্যু, পরিবহন মাফিয়া, নদীখেকো, ক্যাসিনো মালিক, কিছু কিছু মিডিয়া ব্যবসায়ীর জন্যও অসহনীয়। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের খাঁচায় পোরার প্রয়াসে সবার সমর্থন থাকে। খাঁচায় পোরার কাজটি হয় কোথাও ‘সান্ধ্য আইন’-এর নামে। কোথায় ফি বাড়ানোর নামে। কোথাও ফেসবুকে লেখার কারণে। কোথাও বিশেষ বিশেষ পোশাক পরা কিংবা না পরার কারণে। হরেক অছিলায় তরুণ-তরুণীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসছে। কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধূমপানের কারণেও শিক্ষার্থীর ‘সিট বাতিল’-এর ঘটনা ঘটেছে।

    শিক্ষার্থীদের মুখ বন্ধ করা আসলে ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের কথা বলা বন্ধ করা, পরিবার ও সমাজে নারীর কথা বলা নিষিদ্ধ করা, ব্রাহ্মণের সামনে দলিতের কথা বলা কমানো, প্রশাসনের সামনে করদাতার কথা বলার সুযোগ না রাখা, ১ শতাংশের সামনে ৯৯ শতাংশের কথা বলা নিষিদ্ধের থেকে আলাদা কিছু নয়। শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ নিষিদ্ধ করা কার্যত অন্যান্য সামাজিক বিভাজনকেই উদোম করে মাত্র।

    শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, মজলুমসহ সবাইকে কথা বলতে দিয়ে একালে আর ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলো নিজের ন্যায্যতা টিকাতে পারে না। ‘ছাত্র’রা তাই উপলক্ষ, দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য কিন্তু ‘সবাই’। যদিও সবাই সেটা চট করে বোঝে না। একদল বোঝে না রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে; অন্যরা মনোজগতে উপনিবেশের কারণে।

    ‘রাজনীতিমুক্ত’ শিক্ষাঙ্গনগুলোর মান বেড়েছে কি?
    পুরো সমাজ থেকে, বিশ্ব থেকেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আবার সেগুলো, নিজে এক-একটা খুদে ‘রাষ্ট্র’ও বটে। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র নিষিদ্ধের সঙ্গে দেশ গঠনমূলক রাজনীতি নিষিদ্ধের ফারাক ও দূরত্ব তাই সামান্য। এটা মানবসত্তার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত মাত্র। সেই আঘাত নয়াদিল্লিতে যেমন, তেহরানে যেমন, পেশোয়ার এবং সিলেটেও তেমন।

    যে সমাজে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান রাজনীতির খবরদারিতে রয়েছে—যেখানে ব্যক্তির জীবনের সবকিছু, এমনকি তার খাবার, পোশাক, সংস্কৃতিতে লেপটে থাকে রাজনীতি—যেখানে পাঠ্যবইয়ের গল্প-কবিতা নিয়েও গভীর রাজনীতি চলে, বিবাদ হয়; সেখানে কেবল বেছে বেছে তরুণদের ‘রাজনীতিমুক্ত’ জীবন যাপন করতে হবে কেন? কারণ, তার প্রতিবন্ধিতার বিপরীতেই কেবল গুটিকয়েকের কণ্ঠ উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠতে পারে।

    এটা এক বোবাযুদ্ধ। বুয়েট থেকে শাহজালাল পর্যন্ত এই যুদ্ধের পরিসর আসলেই অনেক বড়। খেয়াল করলে আমরা দেখব বুয়েটে আবরার মারা যাওয়ার পর সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল,Ñকিন্তু আজ শাহজালালে শিক্ষার্থীরা মার খাওয়ার সময় বুয়েট পড়াশোনাতেই মন ডুবিয়ে আছে। বুয়েট পরিবার ‘রাজনীতি’ করতে যাচ্ছে না আর। বেখাপ্পা লাগলেও এটা আমাদের দেখাচ্ছে ক্যাম্পাসে বিবেক বন্ধের চেষ্টা পদ্ধতিগতভাবে বেশ কাজে লাগছে। ‘সিস্টেম’-এর জন্য ‘শান্তি’ খুব দরকার!

    তবে ক্যাম্পাসে বিবেকে তালা লাগানোর সময় ‘সিস্টেম’ নয় ‘মান’-এর কথাই শোনা যায়। কিন্তু ‘উন্নত শিক্ষা’র সঙ্গে তথাকথিত ‘রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন’-এর কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। ডাকসু-রাকসু-ইকসু না থাকায় ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক সূচক এগিয়েছে কিংবা সেসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের পেটানো, টেন্ডারবাজি কিংবা হল দখল কমেছে, এমন দেখা যায়নি। অথচ প্রবল রাজনৈতিক কলরব ধারণ করে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) কিংবা যাদবপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে বহু ধাপ এগিয়ে।

    দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে ‘ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গবেষণায়, জ্ঞানচর্চা, আবিষ্কারে সেসব প্রতিষ্ঠান এগিয়েছে এমন শোনা যায় না। হ্যাঁ, কোথাও কোথাও ‘কবরের শান্তি’ বিরাজ করছে। চরম বিপন্নতার মাঝেও সেখানে শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারে না। এ রকম ‘কবরের শান্তি’ এবং ‘শিক্ষার উন্নত পরিবেশ’ নিশ্চিতভাবেই আলাদা কিছু। যেমন আলাদা কিছু কারা প্রাচীরের দুই দিকের পরিসর।

    বাস্তবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্ঞানচর্চার ভয়হীন পরিবেশের জন্য দরকার গণতন্ত্র তাড়ানো নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সত্যিকারের স্বশাসন। আবার ‘স্বশাসন’ ও ‘গুটিকয়েকের শাসন’ মোটেই এক নয়। স্বায়ত্তশাসনের নামে কোনো ‘কর্তৃপক্ষ’ শিক্ষার্থীদের বলা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে ছিনতাই করতে পারে না। বাংলাদেশ সংবিধান সেটা সমর্থন করে না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংবিধানের পরিসরের বাইরে রাখতে চাইছেন অনেকে।

    গণতান্ত্রিক আবহ না থাকা এবং ইউনিয়ন না থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা বসবাস ও অধ্যয়ন-অনুশীলনের জন্য ন্যূনতম জরুরি সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গার সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুবিধা নেই, বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায় না, বিনোদনের কিছু নেই, ভালো পরিবহন নেই, লাইব্রেরি নেই, গবেষণা তহবিল নেই, গুণগতভাবে উন্নত শিক্ষা নেই, কবে পরীক্ষা হবে আর কবে ফল পাওয়া যাবে—সেসব নিয়েও অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়।

    শিক্ষকেরা অন্যায় করলে কথা বলা যায় না। কর্মচারীদের অবহেলায় চুপ থাকতে হয়। অথচ জনগণের করের টাকাতেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সুউচ্চ ভবন উঠছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে। তাঁদের আবাসন সুবিধা বাড়ছে। তাঁদের ভর্তিকালীন আয় বাড়ছে। সরকার তাঁদের প্লট দিচ্ছে, পদক দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দেখিয়েই শিক্ষা খাতের যাবতীয় ব্যয় বৃদ্ধি।

    কিন্তু শিক্ষার্থীরা অসন্তুষ্ট। তারা অসুখী। তারা বঞ্চিত। সন্ধ্যা হলে হলগুলোতে ক্যাডারদের সামনে হাজিরা দিতে হয়। দিনে মিছিলে খাটতে যেতে হয়। অনেক স্থানে যৌন হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার তারা। এত সব অসন্তোষ ও অসুখী জীবনের কথা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার কথা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ রাখা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে এটা ‘রাজনীতি’। এটা নিষিদ্ধ।

    দেশজুড়ে সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমবেশি একই রকম দৃশ্য এখন। এর ফল এত ভয়াবহ যে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করতে দেখা যাচ্ছে। এসব মৃত্যুর কারণ কেউ খোঁজে না। এই মেধাবীদের নিশ্চয়ই কিছু বলার ছিল। তাদের সতীর্থরা কার কাছে এই মৃত্যুর জবাবদিহি চাইবে? এ রকম জবাবদিহি চাওয়াও যে ‘রাজনীতি’! ইউনিয়ন ও গণতন্ত্রহীন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা কীভাবে আছে, আত্মহত্যার ঘটনাবলি তার বড় এক মানদণ্ড। অনুসন্ধান হলে হয়তো দেখা যেত, এসব আত্মহত্যা একধরনের পদ্ধতিগত হত্যা মাত্র।

    যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে চলছে, যেহেতু মেধাবী মানবসম্পদ দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় ভরসার ধন—সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণের সন্তানেরা কীভাবে থাকবে, কেন রক্ষীদের হাতে তারা রক্তাক্ত হচ্ছে, কেন আত্মহত্যা করছে—এই বিষয়গুলো নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনা দরকার।

    বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ভয়মুক্ত পরিবেশে একটা নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের জন্য। শিক্ষার্থীরা যদি দেশের ভবিষ্যৎ হয়, তাহলে তাদের অনিরাপদ পরিবেশ থেকে বাঁচাতে হবে। তাদের কথা বলতে দিতে হবে।

  • বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা

    বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা

    • সৈয়দ নিজার 

    [প্রবন্ধটি ১৪-০৫-২০১৫ তারিখে ইতিহাস অধ্যায়ন কেন্দ্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পঠিত। এই প্রবন্ধ পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়,উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন’ নামে। প্রকাশক: প্রকৃতি-পরিচয়।- সম্পাদক]

    বিশ্ববিদ্যালয় চিরদিনই বিলেতের আমদানি টবের গাছ হয়ে থাকবে; সে টব মূল্যবান, হতে পারে, অলংকৃত হতে পারে, কিন্তু গাছকে সে চিরদিন পৃথক করে রাখবে ভারতবর্ষের মাটি থেকে; বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শখের জিনিস হবে, প্রাণের জিনিস হবে না। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    The University is home to an indivisible inquiry in which the question of being . . . and the question of value . . . are brought together again under one roof. – Martin Heidegger

    বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর একদিকে রয়েছে পুঁজির চাপ অন্যদিকে রয়েছে জ্ঞানচর্চার দায়। অন্যান্য যেকোন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য যেখানে শিক্ষা দেয়া, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান উৎপাদনেরও দায় রয়েছে। সেকারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যতটা সহজে পুঁজির চাপ সুরহা করতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয় ততটা সহজে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রায়শই এ দুয়ের মাঝে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে পারে না বলে আত্মসংকটে ভোগে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা তারই উদাহরণ। এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট এবং সম্ভাবনার (যদি থাকে!) ঐতিহাসিক অনুসন্ধান এবং তার দেশজ ঐতিহ্য নির্ভর সমাধান প্রস্তাব। সেই কারণে শিরোনাম দেওয়া হয়েছে-‘বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা’। কিন্তু, বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা নিয়ে আলাপচারিতার জন্য দুটি ধারণা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন- ১. বিশ্ববিদ্যালয় কী এবং ২. বিউপনিবেশায়ন কী। তাই প্রবন্ধটি শুরু করব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞা খোঁজার মধ্য দিয়ে, তারপর আলোচনার ধারাবাহিকতায় আলোচিত হবে আধুনিক এবং ঔপনিবেশিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক চরিত্র ও সংকট। পরবর্তীতে আলোচিত হবে বিউপনিবেশায়ন কী এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক মহাবিহার যেমন-নালন্দা, সোম, বিক্রমশীলার উপনিবেশোত্তর বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে কেমন ভূমিকা রাখতে পারে।

    আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞায়নে দু’ভাবে অগ্রসর হতে পারি। ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দের ব্যবহার রীতির উপর ভিত্তি করে। যাকে আমরা সাধারণত বর্ণনামূলক সংজ্ঞা বলি। অথবা আমরা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ এর সংজ্ঞা স্থির করে বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজা শুরু করতে পারি। যাকে ‘আদর্শ সংজ্ঞা’ বলা হয়। ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দের ব্যবহার রীতি অত্যন্ত ব্যাপক।

    যেমন ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’ যেখানে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দের তুলনামূলক একটি সামান্য চিত্র পাওয়া গেলেও, ‘উত্তরা উমেন্স ইউনিভার্সিটি কলেজ’, যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’, ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি’ অথবা সাভারে ঢাকা-আরিচা রাস্তার পাশে অবস্থিত ‘কিড ইউনিভার্সিটি স্কুল’ প্রমুখ ক্ষেত্রে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দের সামান্য চিত্র পাওয়া দুষ্কর। তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ একটি বর্গ না নামপদ । ভিটগেনেস্টাইন অবশ্য বলবেন এটাই ‘ভাষার খেলা’।

    অন্যদিকে, অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থেকেও বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া যায় না। অক্সফোর্ডের বিখ্যাত দার্শনিক গিলবার্ট রাইল তার The Concept Of Mind-এ এমনই একটি অভিজ্ঞতার বয়ান দিয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন ভ্রমণে আসে। সেই কারণে পেশাদার ভ্রমণ গাইড রয়েছে। তারা ভ্রমণকারীদের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, দর্শন অনুষদ, গ্রন্থাগার , প্রশাসনিক ভবন, মাঠ পরিদর্শনের পর কেউ কেউ প্রশ্ন করেন- ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কই ?’।

    তারা হয়তো ভাবেন অক্সফোর্ড নামে অন্য কোন ভবন রয়েছে। আমি কোন এক অজানা কারণে ভেবেছি, এই ধরণের প্রশ্ন শুধুমাত্র চীনারা করতে পারে। কিন্তু সদ্য আমার এক সহকর্মীর একই ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্র সমাজবিজ্ঞান অনুষদে দাঁড়িয়ে তাকে কয়েকবার প্রশ্ন করেছিল- ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কই ?’।

    তার মানে, এটি একটি সামান্য চিত্র। প্রত্যেক সমাজেই কিছু লোক থাকে যারা বনে গিয়ে বন আর খুঁজে পায় না; পায় শুধু গাছ, আগাছা এবং লম্বা লম্বা ঘাস। কিন্তু যারা ‘কনসেপ্ট’ বা ‘প্রত্যয়’ বুঝেন তারা কিভাবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের’ সাথে ‘ঢাকা কলেজ’ এর পার্থক্য করেন। ঢাকা কলেজে গ্রন্থাগার আছে, আছে প্রশাসনিক ভবন, আছে ছাত্রদের জন্য হল। তাহলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরটি নয় কেন ? যদিও প্রশ্নটি হালকা মনে হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত গভীর এবং দার্শনিক। কিন্তু আপাতত প্রসঙ্গটি পাশে রেখে আমরা অগ্রসর হই। ‘বিশ্ববিদ্যলয়’ শব্দের বর্তমান ব্যবহাররীতি যেহেতু আমাদের কোন দিক নির্দেশনা দিচ্ছে না তাই আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে ইতিহাসে।

    বাংলা ভাষায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘University’ থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয় শব্দের আমদানি নিয়ে বলেন- ‘ইউরোপীয় ভাষায় যাকে ইউনিভার্সিটি বলে প্রধানত তার উদ্ভব ইউরোপে অর্থাৎ ইউনিভার্সিটির যে চেহারার সঙ্গে আমাদের আধুনিক পরিচয় এবং যার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের ব্যবহার সেটা সমূলে ও শাখা-প্রশাখায় বিলেতি’ [রবীন্দ্রনাথ, ২০১০: ১৭২]। এ থেকে অনুমান করা যায় উনিশ শতকে বাংলায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দের আমদানি করা হয় ইংরেজি থেকে। আবার ইংরেজি ‘University’ শব্দটি আমদানি করা হয় ল্যাটিন শব্দ ‘universitas’ থেকে। যার আভিধানিক অর্থ ‘সমগ্র বা যৌথ বা বিশ্ব (universi)’। কিন্তু এই আভিধানিক অর্থ আমাদের তেমন কোন সহায়ক হয় না।

    ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপীয় চার্চের স্কুলগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রদান করা হত। যাদের অনেকাংশ সীমাবদ্ধ ছিল ধর্মতত্ত্ব এবং ল্যাটিন ভাষা শিক্ষার মধ্যে। কিন্তু মধ্যযুগে ইউরোপে যখন নগররাষ্ট্র সৃষ্টি হতে শুরু করে তখন প্রশাসনিক এবং বিচার ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রয়োজন পড়ে। তখন আইন ও বিচার ব্যবস্থারও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয়। এই আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়। তবে ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল ছাত্ররা, শিক্ষক বা চার্চ নয়।

    রোমান ফৌজদারি এবং দেওয়ানি আইন বিখ্যাত ছিল। বিভিন্ন দেশ-বিশেষ করে ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং ফ্রান্স থেকে শিক্ষার্থী আইন শিক্ষা নিতে আসত ইটালিতে। সে সময় ইউরোপের কিছু কিছু দেশে গোষ্ঠী শাস্তির প্রচলন ছিল। ইটালি তাদের একটি। ইটালির নগর আইনে কেউ ঋণ খেলাপি অথবা অপরাধ করলে তা গোষ্ঠী অপরাধ বলে চিহ্নিত হত। কোন রাজ্য বা গোষ্ঠী কেউ অপরাধ করলে গোষ্ঠীর যে কাউকে গণপিটুনি বা অপদস্ত করা হত। সেকারণে, তারা সংঘবদ্ধ থাকত এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও ছিল। তখন এই ধরনের নৃতাত্ত্বিক সহযোগী সংঘকে বলা হত ‘নেশন’ (nations) [Ridder-Symoens, 1992: 48-51; Pedersen, 1997: 155-188)। রোমান আইন শিক্ষা নিতে অপরাপর নেশনগুলো মিলিত হয়ে পরবর্তীতে ১০৮৮ সালে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ইটালির বলোনিয়াতে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন নেশনগুলো মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করে, তাই তার ল্যাটিন নামকরণ করা হয় ‘Universitas Bononiensis’’ যার অর্থ হচ্ছে বলোনিয়ার নেশনদের যৌথ সংঘ। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম The University of Bononese। বলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক থেকে ছাত্রদের ক্ষমতা বেশি ছিল। প্রতিটি নেশনের দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ এবং চাকুরিচ্যুতির বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা ছিল। এমনকি প্রথম কয়েক শত বছর এ বিশ্ববিদ্যলয়ের রিক্টারও ছিল শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে কয়েক দশকে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত বিস্তৃতি আসে। তা নগরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলে। তাই ১১৫৮ সালে রোমান রাজা প্রথম ফ্রেডরিখ বারবারসা সাংবিধানিক রীতি (Constitution Habit) নামে একটি আইন জারি করেন। যাতে উল্লেখ আছে শিক্ষার্থী নগর আইনের আওতার বাইরে। সমকালীন ইতিহাসবিদগণ মনে করেন, আমাদের জ্ঞানগত (Academic) স্বাধীনতা আইনের ম্যাগনাকার্টা এই আইন। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য, এই আইন জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা প্রদান করে না। তাই বর্তমান জ্ঞানগত-স্বাধীনতা আইনের সাথে এর পার্থক্য আছে। এই আইনে শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র চলাচলের স্বাধীনতা এবং গোষ্ঠী শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এই আইনের সমকালীন রূপ হবে ‘যেকোন দেশে শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণের অধিকার’।

    বলোনিয়া নিয়ন্ত্রিত হত চার্চ দ্বারা। সেকারণে প্রথমদিকে ডিগ্রী প্রদান করার অধিকার ছিল না। পরবর্তীতে ১১৫৮ সালের দিকে সেই অধিকার প্রদান করা হয়। ফলে বলোনিয়ার শিক্ষার্থীগণ পরবর্তীতে কোন পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারত। পরবর্তীকালে যেসকল প্রতিষ্ঠান বলোনিয়ার মত ডিগ্রি প্রদানের অধিকার পায় সেগুলো হল প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় (১১৫০), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা-১০৯৬, স্বীকৃতি-১১৬৭), মদেনা বিশ্ববিদ্যালয় (স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠা- ১১৭৫), প্যেলেনসিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১২০৮) প্রমুখ। সেই সূত্রে এগুলো ইউরোপের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ।

    প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি বলোনিয়া থেকে ভিন্ন। তার উৎপত্তির সাথে দশম শতকের ব্যক্তিগত স্কুলগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। ব্যক্তিগত স্কুলের পাঠ্যসূচির মধ্যে ভিন্নতা ছিল। তাদের মধ্যে কোন কোনটিতে যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, আইন এবং চিকিৎসাবিদ্যা পাঠদান করা হত। কিন্তু ব্যক্তিগত স্কুল খুলতে হলে নটরডেম ক্যাথিড্রাল প্রধানের অনুমতি প্রয়োজন হত। এমনকি বিষয়বস্তু পাঠের ক্ষেত্রেও নজরদারি করা হত। সর্বোপরি কোন বিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেওয়ার অধিকার ছিল না। তাই তাদের শিক্ষার্থীদের চার্চের অধীনে আবার পরীক্ষা দিতে হত।

    দ্বাদশ শতকের দিকে ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং ইটালি থেকে প্রচুর ছাত্র আসতে থাকে প্যারিসে। তখন প্যারিসে ব্যক্তিগতভাবে যারা পাঠদান করছিলেন তাদের অনেকে মিলিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নটরডেমের ক্ষমতা লোপ। যার জন্য প্রয়োজন ছিল ডিগ্রি প্রদানের অধিকার, বিষযবস্তুর উপর নজরদারি কমানো [Frrruolo, 1985]। জ্যাঁক ভার্জার প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন-

    The Birth of the University of Paris can be interpreted as a kind of compromise between the parties involved. It allowed the masters, and the masters of arts in particular, certainly as early as 1208-10, to from themselves into an autonomous guild, to endow themselves statutes, to co-opt their new colleagues and to elude the direct control and exactions of the chancellor of Notre-Dame. [Verger, 1992: 51]

    স্বাধীনভাবে চলাচলের যে রীতি এবং আইন রাজা প্রথম ফ্রেডরিখ প্রবর্তন করেছিলেন বলোনিয়া ছাড়া অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না; অথবা তাদের জন্য এই রকম কোন আইনও ছিল না সংশ্লিষ্ট এলাকায়। এই সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর চার্চের প্রভাব জারি ছিল তা বুঝা যায়-ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারার, গ্যালিলিওকে গৃহবন্দি অথবা ১৮৫২ সাল পর্যন্ত দাঁড়ি রাখলে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব বাতিল করে দেওয়ার আইন থেকে। তারপরও মধ্যযুগের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বন্দ্ব ছিল তা উপলব্ধি করা যায় রেনেসাঁস এবং আধুনিক চিন্তার ইতিহাস পাঠ করলে।

    এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যসূচি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে। প্রথমে আইনশাস্ত্র পাঠ মূখ্য ছিল, পরবর্তীতে তার পরিবর্তন আসে। ধারণা করা হয় ১২২০ সালের আগেই কলা অনুষদের প্রচলন ছিল-যেখানে ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং সামান্য পরিমাণ যুক্তিবিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হত। সে সময় পর্যন্ত দর্শনের পাঠ দেওয়া হত না। পরবর্তীতে আনুমানিক ১২৬০ সালের দিকে চিকিৎসা শাস্ত্রে পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তীতে কয়েক শতকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে দুটি স্তরে বিভক্ত করা হয়। উচ্চতর ধারায় রয়েছে ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসা এবং আইন। যার ব্যবহারিক উপযোগিতা রয়েছে। নিম্ন ধারা দু’ভাগে বিভক্ত-

    [ ট্রিডিয়াম ] ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং যুক্তিবিদ্যা।
    [কোয়াড্রিয়াম ] পাটীগণিত, জ্যামিতি, সঙ্গীত এবং জ্যোতিষশাস্ত্র।

    অনেক গবেষকরা মনে করেন, ট্রিডিয়াম এবং কোয়াড্রিয়াম থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রির রীতি এসেছে।

    প্ল্যাটোর একাডেমি
    মোজাইক ফ্রম পোম্পেই

    আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার রূপকার দুই জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪-১৮০৪) এবং ভাষাতাত্ত্বিক ভিলহ্লেম হামবোল্ডট (১৭৬৭-১৮৩৫)। কান্টের ভাবনায় ‘ইউনিভার্সিটি’- এর অর্থ বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীর উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিণত হয় ‘সার্বিক জ্ঞানের’ (Universal Knowledge) প্রচার কেন্দ্রে। এবং যে স্বাধীনতার সূত্রপাত সাংবিধানিক রীতির মধ্যে দিয়ে তা হামবোল্ডেটের বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবে পরিণত হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জ্ঞানগত স্বাধীনতায়।

    রেনেসাঁস-উত্তর ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোকবাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কান্ট মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা। [বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে কান্টের শেষের দিকের লেখা Perpctual Peace (১৭৯৫) এবং The Conflict of the Faculties (১৭৯৮)]। কান্ট মনে করতেন, সার্বিক জ্ঞান প্রদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়; যা কোন দেশ-কাল সাপেক্ষ নয়। যা যুক্তিনির্ভর মননশীল ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলবে। কী এই সার্বিক জ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় কান্টের The Critique of Pure Reason (১৭৮১) এবং Prolegomena to any Future Metaphysics (১৭৮৩) গ্রন্থে।

    আধুনিকতা এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সার্বিক জ্ঞান। কান্ট জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। প্রাক-সিদ্ধ (a priori) এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান (a posteriori)। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানই হচ্ছে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। যেমন: রাজশাহীর আম মিষ্টি হয়। এই ধরনের জ্ঞান ইন্দ্রিয় নির্ভর এবং ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। প্রাক-সিদ্ধ জ্ঞান যা অভিজ্ঞতা নির্ভর নয় এবং ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে, যেকোন বচন বা বিচারের সত্যমূলের উপর ভিত্তি করে দুই ভাগে ভাগ করেছেন তা হচ্ছে-বিশ্লেষণাত্মক বিচার এবং সংশ্লেষণাত্মক বিচার। বিশ্লেষণাত্মক বিচার সেই সকল বিচার যার সত্যতা নির্ভর করে অর্থের উপর। যেমন: সব কুমার অবিবাহিত। এই বাক্যেও সত্যতা নির্ভর করে কুমার এবং অবিবাহিত শব্দের অর্থের উপর। সংশ্লেষণাত্মক বিচার হচ্ছে সেই বিচার যা অর্থের উপর নির্ভর করে সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না। যেমন: সকল কাক কালো। কান্ট মনে করতেন, প্রাক-সিদ্ধ সংশ্লেষণাত্মক জ্ঞানটি হচ্ছে সার্বিক জ্ঞান। যেমন: গণিত এবং পদার্থ বিজ্ঞানের জ্ঞান। ২+৯= ১১ তা প্রাক-সিদ্ধ কারণ তা অভিজ্ঞতা নির্ভর নয়। অন্যদিকে, ১১ এর অর্থ ২ এবং ৯ নয়। তাই তার সত্যতা অর্থের উপর নির্ভর করে না। ফলে এটি সংশ্লেষণাত্মক জ্ঞান। পদার্থবিদ্যা থেকে অন্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন : ‘প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে’। কান্ট সার্বিক জ্ঞানকে অভিজ্ঞতা নির্ভর মনে করেন না। তার কারণ অভিজ্ঞতায় যা ধরা পড়ে তা অনেক সময় সত্য নাও হতে পারে। যেমন, কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল। আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। কিন্তু কোপার্নিকাসের আবিষ্কার আমাদের অভিজ্ঞতার উর্ধ্বের সত্যকে প্রকাশ করে। তাই তিনি মনে করতেন, সার্বিক জ্ঞান আমাদের অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে যাবে। অভিজ্ঞতার নতুন অর্থ দিবে, কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে কোন কিছু গ্রহণ করবে না। এই জ্ঞানের লাভের মাধ্যম যুক্তিনির্ভর বুদ্ধি। এই সার্বিক জ্ঞানই একমাত্র সত্য জ্ঞান। এই সার্বিক জ্ঞানই আধুনিকতার ভিত্তি। তাই বলা হয়ে থাকে, আধুনিকতা দেশ-কাল নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে একমাত্র সার্বিক জ্ঞান চর্চা এবং প্রসার। যার মাধ্যমে তৈরি হবে আলোকিত মানব এবং প্রতিষ্ঠিত হবে বিশ্বশান্তি। তাই বলোনিয়ায় ‘University’র অর্থ ছিল বিভিন্ন জাতির শিক্ষালয় যা আধুনিক কালে পরিণত হয় সার্বিক জ্ঞানের পাঠকেন্দ্রে।

    কান্টের ভাবনায় যেমন পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক চরিত্র, ঠিক তেমনি হামবোল্ডেটের ভাবনায় পাওয়া যায় জ্ঞানগত স্বাধীনতার রূপ। হামবোল্ডট ভাষাতাত্ত্বিক ছিলেন। তিনি এক বছরের জন্য পার্সিয়ার শিক্ষামন্ত্রী হন। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করেন। সেই প্রস্তাব কার্যকর হয়নি এবং প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর। তিনি মনে করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনবে। তাই তার মতে শিক্ষকের ন্যায় শিক্ষার্থীরও পাঠ্যক্রম বেছে নেবার অধিকার থাকা উচিত। তিনি মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী নেই। এখানে হওয়া উচিত একজন উপদেষ্টা এবং অপর জন গবেষক।

    Just as primary instruction makes the teacher possible, so he renders himself dispensable through schooling at the secondary level. The university teacher is thus no longer a teacher and the student is no longer a pupil. Instead the student conducts research on his own behalf and the professor supervises his research and supports him in it. [উদ্ধৃত হয়েছে Clark, 2008: 333]

    হামবোল্ডটের চিন্তার প্রভাব নিয়ে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিতর্ক রয়েছে [অংয, ২০০৬] কিন্তু ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের। যে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আমেরিকান লিবারাল আর্ট বিশ্ববিদ্যালয় হামাবোল্ডটীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ।

    কিন্তু হামাবোল্ডট যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলেছেন তা আইনি-যার একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়, অপরটি রাষ্ট্র। ইউরোপে শুধু মধ্যযুগে গবেষকগণ বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হননি; আজও তা চলছে। এটা বিশ শতকের বাস্তবতা ছিল। তাই ১৯১৫ সালে আমেরিকার শিক্ষক সমিতি (American Association of University Professors) একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা Declaration of Principles নামে পরিচিত। ১৯৪০ সালে এটি Statement of Principles on Academies Freedom and Tenure আইনে পরিণত হয়। যেখানে তিনটি আইন এবং পাঁচটি অধিকার প্রদান করা হয়েছে [সংযুক্তি-১]। শিক্ষকগণ যেকোন গবেষণালব্ধ ফল প্রকাশ করতে পারবেন এমনকি তা সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রবিরোধী হলেও। সেই বিষয়ে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে পারবেন। তা ব্যবহার করে তাদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না। এই আইন পরবর্তীতে জার্মানি, ফ্রান্স এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে গৃহীত হয়েছে। তাই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার জন্য দুটি শর্ত-

    [জ্ঞানতাত্ত্বিক] বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক জ্ঞান প্রচার ও চর্চা কেন্দ্র।

    [আইনি] বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিক জ্ঞান উৎপাদন করবে। তা রাষ্ট্র, ধর্ম এবং সমাজে রীতির বিরুদ্ধে হলেও তা প্রকাশযোগ্য।

    ইমানুয়েল ক্যান্ট

    ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ইউরোপীয় ধাঁচের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মেকলেসহ অন্যান্য অ্যাংলিসিস্টগণ (Anglicist) মনে করতেন ভারতবর্ষে দীর্ঘমেয়াদী শাসনকার্য পরিচালনার জন্য দাপ্তরিক এবং আদালতের ভাষা হওয়া উচিত ইংরেজি। এ বিষয়ে দীর্ঘ দুই দশক প্রাচ্যতত্ত্ববিদ এবং অ্যাংলিসিস্টদের মধ্যে বিতর্ক জারি ছিল। প্রাচ্যতাত্ত্বিকগণ মনে করতেন, ভারতে দাপ্তরিক এবং আদালতের ভাষা আঞ্চলিক হওয়া উচিত তাতে ভারতীয়দের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন হবে। এই বিতর্কের অবসান ঘটে ১৮৩৫ সালে। তখন দাপ্তরিক এবং উচ্চ আদালতের ভাষা করা হয় ইংরেজি এবং নিম্ন আদালতের ভাষা করা হয় আঞ্চলিক। ইংরেজি দাপ্তরিক করার পেছনে বাঙালিদেরও যুক্ততা ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম রামমোহন রায়। তখন থেকে ইংরেজি জানা সরকারি কর্মচারীর প্রয়োজন পড়ে। তখন বাংলায় ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হত একমাত্র হিন্দু কলেজ (প্রতিষ্ঠা ১৮১৭)। এখানে উল্লেখ্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয় কোম্পানির কর্মচারীদের শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে। তাই হিন্দু কলেজ যথেষ্ট ছিল না। তাই ১৮৫৭ সালে আড়াই লক্ষ রুপি খরচ করে আড়াই একর জায়গার উপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় করার কথা থাকলেও একই অর্থ দিয়ে আরো দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়-মাদ্রাজ ও মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দিকে পাঠদান করা হত না। শুধু ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা নেয়া হত। পাঞ্জাব থেকে রেঙ্গুন; ঐদিকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অধীনস্থ কলেজ হচ্ছে পাঞ্জাব কলেজ। ১৮৯০ সালের মধ্যে এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৬০,০০০ শিক্ষার্থী বের হয়। তাদের এক তৃতীয়াংশ উকিল এবং ১৮৮৭ সালের এক জরিপ থেকে দেখা যায় মধ্য পর্যায়ের ২১,০০০ সরকারি চাকরিতে ৭১% এখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস। তার মধ্যে হিন্দু ৪৫%, মুসলমান ৭% এবং ইউরোপিয়ান ১৯%; বাকি ২৯% ইউরোপ থেকে পড়া। তখন থেকে, সরকারি চাকরির প্রভাব এত গভীর বাঙাালির জীবনে, তার বয়ান পাওয়া যায় তপন রায় চৌধুরীর লেখায়। তিনি বলেন, প্রাক-ঔপনিবেশিক বাঙালি নারীর প্রার্থনার বিষয় ছিল-প্রথম সন্তান যেন সুস্থ ছেলে হয়। সেখানে ঔপনিবেশিক সমাজে তা পরিণত হয়-ছেলে যেন ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে সরকারি চাকরি পায়। উপনিবেশোত্তর কলকাতায় একই প্রবণতা জারি ছিল। তা স্পষ্ট হয় নেহেরু যখন ষাটের দশকে ভারতের শিল্পায়নের কথা বলছেন, তখন বাঙালি পিতা-মাতা তাদের ছেলেদের প্রকৌশলবিদ্যা পড়তে পাঠানোর প্রবণতা থেকে। ঢাকার বাস্তবতার গুণগত ভিন্নতা থাকলেও প্রবণতা এক। চাকরির জন্য প্রয়োজন হয় প্রশংসাপত্রের, বৈষয়িক জ্ঞানের এবং ব্যবহারিক জ্ঞানের। কিন্তু জ্ঞান উৎপাদনের প্রয়োজন নেই ।

    পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করা হয়। শুরুতে তিনটি বিষয় পাঠদান করা হত- ১. ইউরোপীয় ইতিহাস ২. ইউরোপীয় দর্শন এবং ৩. ইংরেজি সাহিত্য। এখানকার পাঠ্যক্রম অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ থেকে নিয়ন্ত্রিত হত কিন্তু তার ন্যায় ছিল না। যেমন ইংরেজি সাহিত্য ইংল্যান্ডে পড়ানোর আগে ভারতে পড়ানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইতিহাস এবং ইউরোপীয় দর্শন পাঠদানের একটি ভিত্তি কান্ট ও আলোকবাদের সার্বিক জ্ঞান শিক্ষা। আলোকবাদী জ্ঞানকা- বিবর্তনবাদ এবং প্রগতির ধারণার সাথে যুক্ত। ইউরোপ যে ধারা এবং পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে তা মানব সমাজের বিকাশের একমাত্র সত্য। সেখানে ইউরোপ উচ্চতর এবং ভারত পশ্চাৎপদ অবস্থায় রয়েছে।

    এই সার্বিক জ্ঞান একমাত্র সত্যরূপে আমাদের কাছে হাজির হয়েছে এবং বর্তমানেও আছে। দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত থেকে শুরু করে সাহিত্য, চিত্রকলার মত সৃজনশীল ধারার ক্ষেত্রেই তা সত্য। ফলে এই সার্বিক সত্যকে যেমন ছেদ করার ক্ষমতা থাকে না তেমনি দেশজ বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট এবং সমস্যা সমাধান করতে আমরা ব্যর্থ হই। ফলে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-

    ইউরোপীয় বিদ্যাও এখানে বদ্ধজলের মতো, তার চলৎ রূপ আমরা দেখতে পাইনে। যে সকল প্রবীণ মত আসন্ন পরিবর্তনের মুখে, আমাদের সম্মুখে তারা স্থির থাকে ধ্রুবসিদ্ধান্তরূপে। সনাতনত্বমুগ্ধ আমাদের মন তাদের ফুলচন্দন দিয়ে পূজা করে থাকে। ইউরোপীয় বিদ্যাকে আমরা স্থাবর ভাবে পাই এবং তার থেকে বাক্যচয়ন করে আবৃতি করাকেই আধুনিক রীতির বৈদগ্ধ্য বলে জানি। এই কারণে তার সম্বন্ধে নতুন চিন্তার সাহস আমাদের থাকে না। দেশের জনসাধারণের সমস্ত দুরূহ প্রশ্ন, গুরুতর প্রয়োজন, কঠোর বেদনা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে দূরের উপলব্ধির দ্বারা নয়। আমরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাক্য মুখস্ত করি এবং সেই টুকরো করা মুখস্থ বিদ্যার পরীক্ষা দিয়ে নিষ্কৃতি পাই। টেক্সটবুক-সংলগ্ন আমাদের মন পরাশ্রিত প্রাণীর মত নিজের খাদ্য নিজে সংগ্রহ করবার নিজের উদ্ভাবন করার শক্তি হরিয়েছে। [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ১৭৯]

    রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণ এবং উপলব্ধি সঠিক; কিন্তু ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যায়ের প্রভাব আরো গভীর। প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ধারাবাহিক জ্ঞানচর্চার ইতিহাস রয়েছে এবং তা সমাজ এবং সময়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজি ভাষা ইউরোপীয় শিক্ষার কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জ্ঞানগত এবং বৈষয়িক কারণে আত্মস্থ করলে সংস্কৃতিতে ও রুচিতে পরিবর্তন আসতে থাকে। ফলে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে লোকজ সংস্কৃতি থেকে। অন্যদিকে, সংস্কৃত ভাষা না জানা থাকার কারণে হাজার হাজার বছরের অর্জিত জ্ঞানকা- থেকে ও সে বিচ্ছিন্ন। ফলে চর্চার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে পড়ে। হয় জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচ্ছেদ। ফলে ইউরোপীয় জ্ঞানকা-ের চর্চার কারণে এই অঞ্চলের মানুষের ও রাষ্ট্রের যেমন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয় ঠিক তেমনি এই অঞ্চলের চর্চার ধারাবাহিক জ্ঞানের উন্নয়নে সক্ষম হয় নাই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ্যায় পরিণত হয়েছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজের মধ্যে আইনি পার্থক্য ছাড়া আর কোন পার্থক্য থাকে না। সর্বোপরি এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে উদ্বাস্তু উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে। মেকলে যাদেরকে বলেছেন

    ….[T]o attempt to educate the body of the people. We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern- a class of persons Indian in blood and colour, but English in tastes, in opinions, in morals and in intellect. [Macauley, 1835]

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    বিউপনিবেশায়ন হচ্ছে আত্মসত্তার বি-বিচ্ছেদায়নের প্রচেষ্টা। এই আত্মসত্তার কোন বিশেষ রূপ নেই। তা বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। ঔপনিবেশিক আমলে আত্মসত্তার বিভিন্ন ধরন এবং মাত্রায় বিচ্ছেদায়ন হয়েছে। তাই বি-বিচ্ছেদায়নই হচ্ছে বিউপনিবেশায়ন। বিউপনিবেশায়ন এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ এক নয়। উত্তর-উপনিবেশবাদ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর শিল্প-সাহিত্য-চিন্তার অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তির মধ্যে বিউপনিবেশায়নের প্রবণতা থাকলেও তা যেমন একমাত্র প্রবণতা নয় তেমনি সার্বিক কোন চরিত্রও বলা যায় না। বিউপনিবেশায়নের শুরু উপনিবেশায়নের জন্ম থেকে। এটি একটি সচেতন বিষয়ী প্রক্রিয়া যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে উপনিবেশায়নের প্রভাবগুলো চিহ্নিত করে তা মাড়িয়ে ওঠা। যেহেতু ঔপনিবেশিক জ্ঞানকা- বিশ্ব জুড়ে সার্বিক না হলেও আমাদের কাছে বৈশ্বিক রূপে আবির্ভূত হয়, তাই বিউপনিবেশায়ন মানে দরজা-জানালা বন্ধ করে প্রাক-ঔপনিবেশিক মননে ফিরে যাওয়া নয়। বাস্তবে তা সম্ভবও নয়। কিন্তু প্রাক-ঔপনিবেশিক চিন্তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বিউপনিবেশায়ন সম্ভব নয়। সে কারণে বিউপনিবেশায়ন প্রাক-ঔপনিবেশিক ভাবনাগুলোর সৃষ্টিশীল বৈশ্বিক রূপান্তর বলা যেতে পারে। উপনিবেশের ছাপ এবং বিকৃতিগুলো চিহ্নায়ন প্রক্রিয়া এবং তা থেকে উত্তরণ প্রাক-উপনিবেশ চিন্তা নির্ভর হলেও বিউপনিবেশায়নের বিশেষ কোন রূপরেখা নেই। তা সক্রিয় ব্যক্তি, সমাজ এবং রাজনীতি সাপেক্ষ। তাই বিউপনিবেশায়ন আত্মসত্তা বি-বিচ্ছেদায়নের একটি সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া।

    ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে প্রাক-ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড থেকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠছে পশ্চিম থেকে আসা সার্বিক নামে উপস্থিত একটি স্থবির জ্ঞানকাণ্ডের শিক্ষা এবং প্রসার কেন্দ্র। ঐ জ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশের সাথে আমাদের কোন মিল নেই। ফলে ঐ জ্ঞানের উদ্ভবের কারণ আমাদের কাছে সব সময় থাকে অপরিচিত; তাই জ্ঞান পরিণত হয় সত্য-তথ্যে। ফলে তাকে ছেদ করে জ্ঞান উৎপাদনের আত্মবিকাশ থাকে না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞান প্রকাশের আইনি অধিকার থাকলেও জ্ঞান উৎপাদনে ব্যর্থ। ফলে এগুলো শুধুমাত্র আচার সর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র।

    এই পরিস্থিতি থেকে উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০০৫ সালে একটি কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে। প্রহসন হল এই যে কৌশলপত্রের জন্য কমিশন দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বা অধ্যাপকের উপর নির্ভর করেনি; করার কথাও না। কিন্তু তার জন্য অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বা হার্ভাডের মত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও দ্বারস্থ হবার কথা। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন দ্বারস্থ হয়েছে অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের উপর!

    কৌশলপত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাবা হয়েছে ‘সেবা’ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রূপে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে সেবা বিক্রেতা এবং শিক্ষার্থী হচ্ছে সেবা ক্রেতা। শিক্ষাকে ‘স্কিল’ ছাড়া কিছু নয়। এটা দুই-একটা অনুষদের জন্য সত্য হলেও সকল বিষয়ের জন্য সত্য নয়। কার্যত বন্ধ্যা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে জাতি গঠনে কাজে আসতে পারে তার চেয়ে বেশি আলোচনা করা হয়েছে কিভাবে মুনাফা লাভ করা যায়। সম্পূর্ণ ‘কৌশলপত্র’ হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ বাগিয়ে নেয়ার ‘কৌশল’ মাত্র। অথচ সমকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান থেকে রাষ্ট্র গঠনে মূখ্য ভূমিকা রাখার কথা। এ প্রসঙ্গে রোনাল্ড বারনেট বলেন-

    ‘[T]he university has abandoned any calling to pursue universal reason and has given itself up to local or national agendas, to the exigencies of the moment, and to the particular.’[ Barnett, R. & Standish. P., 2002: 224]

    শিল্পী: জিওর্জিও দি ছিরিকো

    একবিংশ শতকে পুঁজি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতা চাপ এবং প্রস্তুতির জন্য রাষ্ট্রে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন তার দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে প্রাক-ঔপনিবেশিক মহাবিহারগুলোতে। পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে নালন্দা। আনুমানিক চতুর্থ শতকের দিকে নালন্দা প্রতিষ্ঠা করা হয় মগধে। যা বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে। পরবর্তীতে আনুমানিক অষ্টম শতকের দিকে বিক্রমশীল, সোমপুর এবং ওদন্তপুর প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মপাল। সোমপুর বর্তমানে বাংলাদেশের পাহাড়পুরে অবস্থিত। নালন্দা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ কাহিনীতে এবং তিব্বতীয় সূত্র সাহিত্য থেকে। ধারণা করা হয়ে থাকে আনুমানিক সপ্তম শতকের দিকে নালন্দা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। সে সময়ে নালন্দায় দশ হাজার শিক্ষার্থী এবং দুই হাজার শিক্ষক ছিলেন। যদিও হিউয়েন সাঙের অবস্থানকালে যেখানে ছয় হাজার শিক্ষার্থী ছিল। তাদের অনেকে কোরিয়া, জাপান, চীন, তিব্বত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং তুরস্ক থেকে আগত। সে সময় নালন্দায় ছিল বিশালাকার তিনটি গ্রন্থাগার-রত্মসাগর, রত্মদধি এবং রত্নরজ্ঞক। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় রত্মোদধি নয় তলা ছিল। তাছাড়া প্রায় একশ শ্রেণিকক্ষ ছিল। বিতর্ক এবং সভার জন্য পৃথক কক্ষ ছিল। শিক্ষক এবং ছাত্রদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ছিল। সোমপুর, বিক্রমশীল এবং ওদন্তপুর মহাবিহার তাদের দশম এবং একাদশ শতকের দিকে, নালন্দার মত অবস্থা না হলেও সেখানে ছয়-আট হাজারের মত শিক্ষার্থী ছিল এবং তাদের অনেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছিল। এই সকল মহাবিহারের ইট-পাথর-মাটির রং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন আলেক্সজান্ডার কানিংহাম, জেমস ফার্গসনসহ সমকালীন অনেক প্রত্নতাত্ত্বিকগণ। এই প্রাচীরের মধ্যে থাকা মানুষের ভাবনা এবং তৎপরতা এ প্রবন্ধের আলোচনার বিষয়।

    মহাবিহারগুলো ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় ছিল না। কিন্তু এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়। এই কারণে নয় যে এখানে অনেক দেশ থেকে শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটেছিল; বরং তার ভাবনা, চর্চা এবং উদ্দেশ্যের কারণে। এর মধ্যেই নিহিত আছে কেন ইউরোপের আগে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটেছে, কেন এগুলোর আকার ইউরোপের তুলনায় এত বৃহৎ। সর্বোপরি ব্রাহ্মণদের মাধ্যমে না হয়ে কেন মাধ্যমিক বৌদ্ধদের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

    ব্রাহ্মণদের সাথে জৈন এবং বৌদ্ধদের জ্ঞান ও জ্ঞানলাভের অধিকার প্রসঙ্গে পার্থক্য ছিল। ব্রাহ্মণদের কাছে জ্ঞান, কান্টের মত সব সময় সার্বিক এবং ঐকান্তিক। অর্থাৎ প্রকৃষ্ঠ জ্ঞান যাকে সংস্কৃতে প্রজ্ঞা বলা হয়ে থাকে তা সার্বিক। তা দেশ-কাল নির্ভর নয় এবং যেকোন বিষয়ে একটি মাত্র সত্য রয়েছে। তাই তা ঐকান্তিক। এই জ্ঞানকে বলা হয়েছে কখনো পরমার্থ আবার কখনো ব্রাহ্মজ্ঞান। ধারা ভেদে পার্থক্য থাকলে জ্ঞানের সার্বিক এবং ঐকান্তিক চরিত্র বিষয়ে বৈদিক সকল ধারার অবস্থান অভিন্ন। সেই জ্ঞান আত্মস্থ করাই শিক্ষা এবং জ্ঞানলাভের অধিকার বর্ণ নির্ভর। সে কারণে জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটেনি ব্রাহ্মণদের হাতে। কিন্তু, জৈন এবং বৌদ্ধদের কাছে জ্ঞান এবং জ্ঞানলাভের অধিকার প্রসঙ্গে অবস্থান ভিন্ন। জৈনরা মনে করেন, প্রতিটি তত্ত্বই আংশিক সত্যকে উপস্থাপন করে। অন্ধের হাতি দেখার যে উদাহরণ আমরা ছোট বেলা শুনে থাকি তা আসলে জৈন সাহিত্য থেকে পাওয়া। কিন্তু বৌদ্ধদের অবস্থান, বিশেষত মাধ্যমিকদের অবস্থা আরেকটু বৈপ্লবিক। তারা মনে করেন, জগত এবং জীবন সম্পর্কিত সকল তত্ত্ব আংশিক সত্য নয়, আপাতত সত্য বা ব্যবহারিক সত্য। সংস্কৃত ভাষায় যাকে বলে সংবৃত। এ সম্পর্কে নার্গাজুন বলেন-

    ‘শূন্য’ বলা যাবে না
    “শূন্য নয়” তাও বলা যাবে
    উভয়ই অথবা এটিও নয়, ওটিও নয়; তাও বলা যাবে না।
    তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে সম্বৃতি হিসাবে।।

    (মূলমধ্যামক কারিকা, XXII:11)

    কিন্তু এই ব্যবহারিক জ্ঞানকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রে শিক্ষাকে যে অর্থে স্কিল বলা হয়েছে সে অর্থে নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের র্শিক্ষা যদি কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ হয় তবে নতুন জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে বিশ্ববিদ্যালয়। এ সম্পর্কে ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ ফ্রাসোয়া লিয়োতার বলেন-

    Science does not expand by means of the positivism of efficiency. The opposite is true: working on a proof means searching for and ‘inverting’ counterexample, in other words the unintelligible; supporting an argument means looking for a ‘paradox’ and legitimating it with new rules in the games of reasoning . [ Lyotard, 1979 : 54]

    টমাস কুন ও পল ফায়ারাবেন মনে করেন জ্ঞানের বিকাশ বা বিজ্ঞানের বিকাশ দক্ষতা দিয়ে হয় না। বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের স্ববিরোধিতা বা সমস্যাগুলোকে চিহ্নায়নের মধ্য দিয়ে হয়। এ বিষয়ে মাধ্যমিকদের অবস্থানও একই। এই বিহারগুলোতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রন্থ রচিত হয়েছে যাতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন তত্ত্বের সমস্যাগুলো আলোচিত হয়েছে। তাই এই সকল মহাবিহারগুলোর পাঠ্যক্রম কোন বিশেষ তত্ত্ব এবং ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। তাই হিউয়েন সাঙ এবং তিব্বতীয় সূত্র থেকে জানা যায় নালন্দায় বেদ, যুক্তিশাস্ত্র, ব্যাকরণ, আয়ুর্বেদ, গণিত, সঙ্গীত, নৃত্য, শিল্পকলাসহ ব্যবহারিক অনেক জ্ঞানের পাঠ এবং উৎকর্ষ সাধন করা হত। অনেক তত্ত্বের উন্নয়ন করেছেন সেই সময়কার আচার্যগণ। তাদের অনেকের গবেষণা ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন দেশে আজও পঠিত হয়। তাদের অনেকে বিভিন্ন রাজসভার উপদেষ্টা ছিলেন। জ্ঞানের অধিকার সর্বজনের ছিল। বিশেষ কোন বর্ণ বা লিঙ্গ, এমনকি ইউরোপের মত কোন অর্থনৈতিক শ্রেণির ছিল না। সে কারণে মধ্যযুগের ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংখ্যা হাজার অতিক্রম করত না সেখানে এই সকল বিহারগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা আট-দশ হাজারেও পৌঁছেছে। তবে জ্ঞানের অধিকার সর্বজনের হলেও সকলকে প্রবেশের অধিকার দেওয়া হত না। হিউয়েন সাঙ উল্লেখ করেছে প্রতি দশ জনের মধ্যে দুজনকে প্রবেশের অধিকার দেওয়া হত এবং মেধার ভিত্তিতে প্রবেশানুমতি দেওয়া হত।

    মহাবিহারগুলো কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ছিল না। কারণ তাদের অর্থ সংস্থান হত খাজনা থেকে। রাজা নালন্দার ব্যয় নির্বাহের জন্য শতাধিক গ্রামের খাজনা দান করেছিল। ফলে তার উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনার সাথে মহাবিহারের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল। এই মহাবিহারগুলো হয়ত প্লেটো যে আদর্শ রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন তার উদাহরণ। তাদের তৎপরতা এবং চর্চা লোকসংস্কৃতির এবং জীবনের সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যা আমাদের সমকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা। সদ্য গবেষণায় সোমপুর মহাবিহার সম্পর্কেও একই সত্যতা পাওয়া গেছে। [Furui, 2011, Sen, 2014]

    মহাবিহারগুলো কেন বিশ্ববিদ্যালয়? বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দুটি শর্ত আগে আলোচনা করা হয়েছে তা শুধু বর্তমান ছিল না বরং এই মহাবিহারে মধ্যযুগের ইউরোপী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বাধীনতা বেশি ছিল। তাই ভারতে ইতিহাস সর্বাধিক সংখ্যক সূত্র সাহিত্য রচিত হয়েছে এই মহাবিহারগুলোর শিক্ষার্থী দ্বারা। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়-এই মহাবিহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সোমপুর। তাই, বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা হল-

    ১. সর্বজনের জ্ঞান সর্বজনের জন্য।
    ২. সার্বিক জ্ঞানের নামে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের শিক্ষা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয় সংবৃত জ্ঞানকাণ্ড বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বহুত্ববাদ চর্চা।
    ৩. বিশেষায়নের নামে বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানচর্চা জগত-জীবনবীক্ষা তৈরী করতে ব্যর্থ হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগভিত্তিক বিভাজন না করে হওয়া উচিত পদ্ধতি ভিত্তিক।
    ৪. তা আঞ্চলিক এবং জাতীয় বিষয়ে জ্ঞানকাণ্ড নির্মাণের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক হবে।
    ৫. যেহেতু সার্বিক জ্ঞান বলে কিছু নেই। তা পাঠও আত্মস্থ করার প্রয়োজন নেই। তাই শিক্ষার্থীর মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানের সঙ্কট চিহ্নায়ন এবং তা ছাপিয়ে গিয়ে নতুন জ্ঞান তৈরি।
    ৬. সাধনা মানে নিষ্ঠা, শ্রম এবং অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান তৈরি। তাদের মধ্যে সম্পর্ক শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয়; উত্তর-সাধক এবং পূর্ব সাধকের সম্পর্ক।

    বিউপনিবেশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র গঠনে তা ভূমিকা রাখবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে প্রাণ ফিরে আসবে।

    বিশ্ববিদ্যালয়: উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন (প্রকাশনী: প্রকৃতি-পরিচয়)

    সংযুক্তি-১
    Statement of Principles on Academies Freedom

    1. Teachers are entitled to full freedom in research and in the publication of the results, subject to the adequate per for mance of their other academic duties; but research for pecuniary return should be based upon an understanding with the authorities of the institution.

    2. Teachers are entitled to freedom in the classroom in discussing their subject, but they should be careful not to introduce into their teaching controversial matter which has no relation to their subject. Limitations of academic freedom because of religious or other aims of the institution should be clearly stated in writing at the time of the appointment.

    3. College and university teachers are citizens, members of a learned profession, and officers of an educational institution. When they speak or write as citizens, they should be free from institutional censorship or discipline, but their special position in the community imposes special obligations. As scholars and educational officers, they should remember that the public may judge their profession and their institution by their utterances. Hence they should at all times be accurate, should exercise appropriate restraint, should show respect for the opinions of others, and should make every effort to indicate that they are not speaking for the institution.

     

    সহায়কপঞ্জি

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২০১০), ‘শিক্ষা’, ঢাকা: প্যাপিরাস।

    Ash, Mitchell (2006) ‘Bachelor of What, Maste of Whom? The Humboldt Myth and Historical Transformations of Higher Education In German-Speaking Europe and The US’, in European Journal of Education, Vol. 41(2).

    Barnett, R. & Standish. P., (2002) `Higher Education and the University’ in Blake, Nigel; Smeyers, Paul; Smith, Richard, & Satndish, Paul (eds) (2003) The Blackwell Guide to The Philosophy of Education, Oxford: Blackwell Publishing House.

    Clark Christopher (2007) Iron Kingdom: The Rise and Downfall of Prussia, 1600-1947, London: Penguin.

    Feyerabend, Paul (1987) Against Method, Chicago: The University of Chicago Press.

    Frrruolo, S. C (1985) The Origins of the University: The school of Paris and their citics 1100-1215,  Stamford: Stamford University Press.

    Furui, R.  (2011) Indian  Museum  Copper  Plate  Inscription  of  Dharmapala,  year  26:  Tentative  reading  and  study.  South Asian Studies 27 (2): 145-156.

    Lyotard, Jean-Francois [1979] (1984) The Postmodern Condition: A Report on Knowledge, trans. Geoff Bennington and Brian Massumi, Theory and History of Literature 10, Manchester: Manchester University Press.

    Macauley, Thomas B. (1835) Minute on Education, ColumbiaUniversity.
    http://www.columbia.edu/itc/mealac/pritchett/00generallinks/macaulay/txt_minute_education_1835.html

    Pedersen, Olaf (1997)THE FIRST UNIVERSITIES: Studium generale and the origins of university North, Richard(trns.) Cambridge: Cambridge University Press.

    Ridder-Symoens, (1992) A History of the University in Europe:  Universities in Middle Age, Vol- 1, Hilde de(eds) Cambridge: Cambridge University Press.

    Verger, Jacques (1992) ‘Patterns’ in Ridder-Symoens, Hilde de (eds) (1992) A History of the University in Europe:  Universities in Middle Age, Vol- 1, Cambridge: Cambridge University Press.

    Watters, Thomas (trns.) (1996) On Yuan Chwang’s Travels in India, Davids, Rhys and Bushell, S. W. (eds). New Delhi: Mnushiram Manoharlal Publishers Pvt. Ltd. Sen, Swadhin; Rahman, Syfur & Ahsan, A (2014) ‘Crossing The Boundaries of The Archaeology of Somapura Mahavihara: Alternative Approches and Propositions’ in Pratnatattva: A Journal of The Department of Archeology, Jahangirnagar University, Vol. 20, pp.49-79.

  • বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় ‘নব্য-উদারনীতিবাদ’: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ‘কৌশলপত্র’ কেন গ্রহণযোগ্য নয়?

    বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় ‘নব্য-উদারনীতিবাদ’: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ‘কৌশলপত্র’ কেন গ্রহণযোগ্য নয়?

    • মোহাম্মদ আজম

    [প্রবন্ধটি পঠিত হয়েছিল ‘বাংলার পাঠশালা’ আয়োজিত দক্ষিণ এশীয় সেমিনার ২০১৪-এ। ২২শে আগস্ট, ২০১৪ তারিখে স্বতন্ত্র পুস্তিকা হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধটি পরে রাষ্ট্রচিন্তা ব্লগেও প্রকাশিত হয়েছিল। – সম্পাদক]

    বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০০৫ সালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা পেশ করেছে (ইউজিসি ২০০৫)। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও চলছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলগুলোতে এ বাবদ বিশেষ সচেতনতা বা আলোচনা-পর্যালোচনা দেখা যায়নি। বামপন্থি দলগুলো আলাদাভাবে বা সামষ্টিকভাবে কিছু সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছে; দু-চারবার অন্য প্রতিবাদী কর্মসূচিও দিয়েছে। কিন্তু তাতে বিপুল গরিষ্ঠ শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ এ ব্যাপারে সচেতন হয়েছে বলে মনে হয় না। পরিকল্পনার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব অর্থায়নের খাত তৈরি করা। স্বভাবতই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত কয়েক বছর অব্যাহতভাবে শিক্ষাব্যয় বাড়িয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে অংশ নিয়েছে। তাতে কয়েক বছর ধরে ‘বেতনভাতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে অচলাবস্থা’ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রকল্পের অংশ হিসাবে শিক্ষকদের একাংশ গবেষণা-বৃত্তি ও প্রকল্প-সহায়তা বাবদ অর্থ-বরাদ্দ পেয়েছেন। তাঁরা কেউ কেউ কাজও করেছেন। শিক্ষকদের কারো কারো সঙ্গে আলাপ করে মনে হয়েছে, তাঁরা ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।

    বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যে কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে, তাতে আসলেই ইতিবাচক নানা দিক আছে। উচ্চশিক্ষার প্রসার এবং মান-উন্নয়নের ব্যাপারে এতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষাদানপদ্ধতির পরিবর্তন আর নতুন যুগের চাহিদা অনুযায়ী পড়ানোর বিষয় ও ভঙ্গির বদলের কথা সবিস্তার বলা হয়েছে। আছে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো আর শিক্ষকদের মান-উন্নয়নের কথা। যাঁরা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখেন, তাঁরাই বুঝবেন, এর সব কটিই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে নিত্য আলোচিত চাওয়া। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এসব চাওয়ার একাংশও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার কথা। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণ আর বাস্তবায়ন তো আলাদা ব্যাপার। ওই কৌশলপত্রে বাস্তবায়নের জন্য যেসব উদ্যোগ-আয়োজনের কথা বলা আছে, যে পদ্ধতির পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতেই সন্দেহ হয়, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না। অথচ এর অধীনে কাজ তো চলছেই। ইতিমধ্যেই বেশ কটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, যেগুলো এই পরিকল্পনা মোতাবেক পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুরোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আধ-খেচড়াভাবে কিছু কিছু নতুন জিনিস ঢুকে পড়ছে। উদাহরণ দেয়া যাক।

    বেশ কবছর আগে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিন বছরের অনার্স কোর্সকে চার বছর মেয়াদি করা হয়েছে। পরে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হয়। কোনো পক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বা কোনো গবেষণার বরাতে এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, চাকরির বাজার ইত্যাদি বিবেচনায় চার বছরের প্রফেশনাল স্নাতক ডিগ্রির কোনো তাৎপর্য নেই। তবুও চার বছরের অনার্স চালু করলে আশা করা যায়, মাস্টার্সে থিসিস বা গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রম গৃহীত হবে। তা হয়নি। ফলে ছাত্রছাত্রীরা প্রলম্বিত অনার্সের পর আরো এক বছর একই কায়দার পড়াশোনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটায় মাত্র। এ অবস্থায় পরে আচানক সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হয়। অবকাঠামোগত সুবিধা, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, উপযোগিতা ইত্যাদি সম্পর্কে সামান্যতম জরিপ ছাড়াই নামকাওয়াস্তে এ পদ্ধতি আরোপ করা হয়েছে। শিক্ষকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ থেকে জানি, খুব কম শিক্ষকই এ পদ্ধতি পছন্দ করছেন। কিন্তু সামষ্টিকভাবে নিজেদের ভিন্নমত জানোনোর কোনো উদ্যোগও কেউ নেননি।

    চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স বা সেমিস্টার পদ্ধতি ইউজিসির কৌশলপত্র অনুযায়ী হয়নি। তবে মর্মের দিক থেকে এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতির দিক থেকে কৌশলপত্রের সঙ্গে এর যথেষ্ট মিল আছে। এ ধরনের উদ্যোগ কোনো সুফল আনতে পারে না। বরং বিদ্যমান পদ্ধতির তাৎপর্যও নষ্ট করে। এ কারণেই ইউজিসি-প্রণীত কৌশলপত্র সম্পর্কে সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার।

    এডুকেশন;
    শিল্পী: পাওয়েল কুজনেস্কি

    ২

    আমাদের আসলেই পরিকল্পনা দরকার। কিন্তু প্রথমেই যে প্রশ্ন মনে আসে তা এই, এ পরিকল্পনার জোগানদার বিশ্বব্যাংক কেন? ইউজিসির দাবি, বিশ্বব্যাংকের কাছে পরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এত নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত গবেষণা-প্রতিষ্ঠান থাকতে কোন যোগ্যতার কারণে বিশ্বব্যাংকের কাছে একটি দেশের শিক্ষা-পরিকল্পনা চাওয়া হল, তার কোনো ব্যাখ্যা এই কৌশলপত্রে দেয়া হয়নি। এই অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রচারিত নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব আর পক্ষপাতের কথা উল্লেখ না করেও বলা যায়, গোটা পরিকল্পনাটি সম্ভাব্য মুনাফার লোভ জাগানোর জন্য যতটা লিপ্ত থেকেছে, ‘শিক্ষা’র ব্যাপারে তার পাইর পাই আগ্রহও দেখায়নি। পুরো পরিকল্পনাটি সাজানো হয়েছে বাজারকে কেন্দ্রে রেখে। তাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু দেশীয় বাজার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা নিতান্তই কুয়াশাচ্ছন্ন। কোনো সুদূর ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারে চাহিদা তৈরি হবে – এমন একটা আভাস মাত্র পাওয়া যায়। বারবার বলা হয়েছে প্রতিযোগিতার কথা। কিন্তু বাজার সম্পর্কে যথাসম্ভব সুনির্দিষ্ট ধারণা না থাকায় কৌশলপত্রে ব্যবহৃত ‘প্রতিযোগিতা’ শব্দটিও সুস্পষ্ট ব্যঞ্জনা তৈরি করেনি। আর বলা হয়েছে বিনিয়োগ-অনুপাতে মুনাফার কথা। মানে, শিক্ষাখাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হবে, সে অনুপাতে মুনাফা অর্জিত হবে। কথাগুলো যেমন সত্য তেমনি খাঁটি। কিন্তু বিনিয়োগের ধরন সব ব্যবসায় এক রকম নয়; মুনাফা লোটার হার আর ধরনও ব্যবসাভেদে ভিন্ন হয়। আলোচ্য কৌশলপত্রে শিক্ষা কথাটা সর্বত্র ‘স্কিল’ অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। বাণিজ্যশিক্ষা আর প্রযুক্তিশিক্ষার বড় অংশের সঙ্গে এই সংজ্ঞা সামঞ্জস্যপূর্ণ বটে, কিন্তু খাঁটি বিজ্ঞান, কলা আর সমাজবিজ্ঞানের পড়াশোনাকে ‘স্কিল’ শব্দের আওতায় সামান্যই আঁটানো যায়। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো জাতীয় শিক্ষানীতি এ ভাষা বা পরিভাষায় রচিত হতে পারে না; বড়জোর কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো বিশেষ ‘ডিসিপ্লিন’ এ ধরনের পরিকল্পনা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জন্য বিশ্বব্যাংক-প্রণীত এ পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য – বাংলাদেশ রাষ্ট্র, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বা সামষ্টিক উন্নয়নের ব্যাপারগুলোকে পাশ কাটিয়ে কেবল বাজারকে বিবেচনায় রেখে এ নীতিমালা তৈরি হয়েছে। আগেই বলা হয়েছে, সে বাজার চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিভাজনরেখা মোটেই স্পষ্ট হয়নি।

    এতে বিস্মিত হওয়ার অবশ্য কোনো কারণ নাই। বহুদিন হল আমরা বাস করছি এক ‘নব্য-উদারনীতিবাদী’ বিশ্বে -‘we live in the age of neoliberalism’ (Saad-Filho and Johnston 2005:1)। এ দুনিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার স্বার্থে পুঁজির বিশ্বজয় নিশ্চিত করা। এ অর্থে আজকের দুনিয়া যথার্থই ‘গ্লোবাল’। নব্য-উদারনীতিবাদী এ বিশ্বের মূল বৈশিষ্ট্য: পক্ষপাতদুষ্ট বাজারের স্বরাট কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের মতো জনকল্যাণমূলক ব্যয় কমানো, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণহীনতা, উৎপাদনব্যবস্থাকে ব্যক্তিমালিকানাধীন করা, সমষ্টি বা জনসাধারণের কল্যাণের ধারণা পরিহার করা (Martinez and Garcia 1996) । বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী দেশগুলোর পক্ষে এসব নীতি বাস্তবায়নের এজেন্ট হিসাবে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক বহু বছর ধরে নব্য-উদারতাবাদী বিশ্বব্যবস্থার অনুকূল ‘উচ্চশিক্ষা’র প্রসারের জন্য কাজ করছে। তৃতীয় দুনিয়ায় ’উচ্চশিক্ষা-সংস্কারে’ নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সংস্কারের মূল বিষয় ‘privatization, deregulation and marketization’ (Levidow 2002)। বিশ্বব্যাংক এক রিপোর্টে বলছে:

    The reform agenda… is oriented to the market rather than to public ownership or to governmental planning and regulation. Underlying the market orientation of tertiary education is the ascendance, almost worldwide, of market capitalism and the principles of neo-liberal economics. (Johnstone et al., 1998)

    ফলে বিশ্বব্যাংক যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য এহেন ব্যবস্থাপত্র দেবে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কারণ নাই। ইউজিসি তাদের কাছে পরামর্শ চেয়েছে – বিরোধ কমানোর জন্য তাদের এ প্রচারণাও বোধগম্য। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সরকার, ইউজিসি বা নাগরিকসমাজ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকেই মেনে নিয়েছে – এটা বিস্ময়কর।

    ছবি: ফ্রিডম অফ মিডিয়া
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ৩

    ছড়ানো-ছিটানো কাজের কথা আর সুন্দর কথার ফাঁকে বারবার প্রাধান্য পেয়েছে দুটি বিষয় – বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতিমুক্ত করা আর ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া। এ কথাগুলো এতবার এত বিচিত্র কায়দায় বলা হয়েছে যে, যে কারো মনে হতেই পারে, এই দুই মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্যই অন্যসব কথার ডালি সাজানো হয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক চর্চার নানা কুফল আমরা হামেশাই টের পাই। এ নিয়ে নানা মহলে আলাপ-আলোচনাও চলে। কিন্তু এর সমাধান নিশ্চয়ই ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করা নয়। আসলে সমস্যার প্রকৃতি কেমন, আর তা থেকে পরিত্রাণের উপায়ই বা কী, তা নিয়ে কোনো কার্যকর আলোচনা-পর্যালোচনা বা গবেষণা আজতক হয়ইনি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় ‘অরাজনৈতিক’ সিভিল সমাজ নানা কায়দায় বহুদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরাজনীতিকরণের দাবি জানিয়ে আসছে। নানা লক্ষণ দেখে মনে হয়, এ দাবি জনপ্রিয়ও বটে। আলোচ্য কৌশলপত্রে এই জনপ্রিয় দাবির সুবিধা নেয়া হয়েছে মাত্র। কোনো নতুন বিশ্লেষণে সমস্যার প্রকৃতি নির্ধারণ করে সমাধানের প্রস্তাব করা হয়নি। আর বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যে খুব কম খরচায় পড়াশোনা করে, সে কথাও সত্য। কিন্তু খরচ কতটা বাড়ালে শিক্ষার মোট ব্যয়ের তাৎপর্যপূর্ণ অংশ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা যাবে, আর বাংলাদেশের বিপুল নিম্ন-নিম্নমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর তার প্রভাবই বা কী হবে, তা নিয়ে কোনো কার্যকর গবেষণা ছাড়া বিভিন্ন মহল থেকে যে বেতনভাতা বাড়ানোর আবদার করা হয়, তা কেবল অবৈজ্ঞানিকই নয়, হাস্যকরও বটে। উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্রের এই দুই আরজি তাই সতর্কতার সাথে বিবেচ্য।

    বাজার, বিনিয়োগ, মুনাফা, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি ধারণাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিয়ে যে নীতিমালা তৈরি করেছে বিশ্বব্যাংক, তাতে জীবন-জগত সম্পর্কে এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির চরম প্রকাশ ঘটেছে। এ বিশ্বদৃষ্টি আমাদের অচেনা নয়। বিশ্বপুঁজির বর্তমান হাল এবং তার অধীনে সারা বিশ্বকে ঢেলে সাজানোর নানা কায়কসরতও আমরা নিত্য দেখতে পাই। মুশকিল হল, কেবল অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় এ বিশ্বব্যবস্থা চলতে পারে না। কোনো ব্যবস্থাই আসলে চলে না। দরকার হয় ইডিওলজির প্রসার। ভোক্তাকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে অভ্যস্ত করে তোলা দরকার, যাতে গৃহীত পদক্ষেপ ও জীবনযাপন সম্পর্কে প্রচারিত আদর্শ তার কাছে স্বাভাবিক ও কাঙ্ক্ষিত মনে হতে থাকে। পুঁজিবাজারের গতিবিধি সচল রাখার জন্য প্রান্তের ক্রেতা যেমন দরকার তেমনি দরকার কাঁচামাল। দক্ষ জনশক্তিও এই কাঁচামালেরই অংশ। বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তির জোগান অব্যাহত রাখার জন্য গরিব দেশগুলোর দিকে তাকাতেই হয়। এর নানান জটিল হিসাব-নিকাশ আছে। একটা সরল হিসাব এই যে, গরীব দেশে কাজটা করা যায় অনেক কম খরচায়। সারা দুনিয়া থেকে মেধাবী ও দক্ষ লোক বাছাই করে পুঁজির কেন্দ্রীয় কর্মপ্রবাহে যুক্ত করার জরুরত তো আছেই। বিশ্বব্যাংক তাদের প্রণীত নীতিমালায় যেভাবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়েছে, আর বাজার-বিনিয়োগ-মুনাফার ছকে কথামালা সাজিয়েছে, তাতে হিসাবটা সাদা চোখেই ধরা পড়ে।

    কিন্তু এই হিসাবের বড় মুসিবতটা এই যে, বিরাট জনগোষ্ঠী সবসময়েই এই ছকের বাইরে থেকে যাবে। যারা ইতিমধ্যে আর্থিক সক্ষমতা হাসিল করতে পেরেছে, তারাই ওই বড় বাজারের এলাকায় ঢুকতে পারবে। একটা রাষ্ট্র কখনো তার শিক্ষানীতি এভাবে তৈরি করতে পারে না। তারপরেও মেনে নেয়া যাক, এটাও উন্নয়নের একটা মডেল। তাহলেও কাজটা আসলে সরকারকেই করতে হবে। অর্থাৎ, যদি জনগোষ্ঠীর বড় অংশটাকে হিসাবের বাইরে রেখে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা ও বন্দোবস্ত করতে হয়, বাংলাদেশের বাস্তবতায়, আরো অনেক কাল পর্যন্ত কেবল সরকারি খরচে আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় কাজটা করা সম্ভব। গড় আয়ের বর্তমান দশায় নিজের বা অভিভাবকের পয়সায় খরচ জোগানোর মতো পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একটি উদাহরণ দিলেই আলোচ্য নীতিমালার মুখরোচক কথাবার্তার ফাঁকিটা স্পষ্ট বোঝা যাবে। পুরো পরিকল্পনায় সরকারি বরাদ্দ কমানোর যুক্তি হিসাবে বারবার উন্নত বিশ্বের কথা বলা হয়েছে – পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বের কথা বলা হয়েছে। পশ্চিমে এ পদ্ধতি যে একাট্টা সুফল দিয়েছে তা নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান – সব ক্ষেত্রেই কথিত ‘নিওলিবারেল’ মতাদর্শ ও কর্মসূচির বিস্তর সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে খোদ পুঁজিবাদী বিশ্বেই (Saunders 2010)। কিন্তু ওই দেশগুলোতে কোম্পানিগুলো যে এ বাবদ যথেষ্ট পয়সাকড়ি খরচা করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারা তো অনুদান হিসাবে এ টাকা জোগায় না। তাদের নানান ধান্দা থাকে এবং সেই ধান্দার বাস্তবতা সে সমাজে বিরাজমান। যেমন, প্রযুক্তিখাতে কোম্পানিগুলো বিপুল বরাদ্দ রাখে শিক্ষার্থীদের গবেষণার ফল ব্যবহার করে বড় দাও মারার জন্য। সব ক্ষেত্রে ফল ফলে না। যা ফলে তাতেই সুদে-আসলে টাকা উঠে আসে। অন্য ক্ষেত্রের গবেষণায় এতটা সরাসরি না হলেও ‘প্রাইভেট’ অংশের মুনাফার হিসাবটা অতি স্পষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে উৎপাদনশীলতার জ্ঞানগত দিকটা পুরোপুরি ধার করা, যেখানে প্যাকিং, সেলাই বা মাল বিক্রিই হল প্রধান উৎপাদন-এলাকা, সেখানে নতুন জ্ঞান-উৎপাদনের জন্য প্রাইভেট বিনিয়োগের সুযোগ কোথায়? কোন ভবিষ্যতে সে সুযোগ তৈরি হবে? তাহলে সরকার বরাদ্দ না বাড়ালে বাড়তি টাকাটা কি সম্পূর্ণরূপে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে আসবে? আগেই বলা হয়েছে, তা সম্ভব নয়। এ কারণেই এ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত হয়নি। তা কাজও করবে না।

    নিওলিবারেলিজ
    শিল্পী: মিগুয়েল ভিল্লালবা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ৪

    অথচ বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কিছু অন্যরকম উদ্যোগ নিলে যে উচ্চশিক্ষার অবস্থা ক্রমশ ভালো হওয়ার অবকাশ আছে, তার দিশা এই কৌশলপত্রেই পাওয়া যায়। এখানেই বলা আছে, বাংলাদেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ উন্নত বিশ্ব তো বটেই, আশপাশের দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক কম। বাজেটে শিক্ষাব্যয় ক্রমশ বাড়িয়ে ভারতের সমান করলেই উচ্চশিক্ষাখাতের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থার চিত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার কথা। সরকার গবেষণাখাতে পরিকল্পিতভাবে কিছু অর্থের জোগান দিলে বাংলাদেশের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় কত বড় পরিবর্তন আসতে পারে, তার একটি সরল হিসাব একবার অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল (২০১১) পত্রিকান্তরে দাখিল করেছিলেন। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে লাফ দিয়ে উঁচুতে ওঠার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যা অবাস্তব। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম রোধের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যয় বাড়লে দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেয়া হবে। কিন্তু তার পদ্ধতি ও পরিমাণ কী হবে, তা বিদ্যমান পরিস্থিতিতেই পরীক্ষিত হতে পারত। সেই পরীক্ষার ফলের বরাত দিয়ে দরিদ্র মানুষদের আশ্বস্ত করা যেত যে, শিক্ষাব্যয় বাড়লেও তারা এ ছকের বাইরে পড়ে যাবে না। দরিদ্রদের জন্য ঋণসুবিধা প্রবর্তনের লোভ দেখানো হয়েছে। চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেয়ার আগে এ প্রস্তাবের কার্যকরতা পরীক্ষা করা জরুরি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন যথাসম্ভব কমানোর কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেত। কিছুই না করে পরিকল্পনা ফাঁদা হয়েছে। তাই সন্দেহ হয়, কার্যকর ফললাভ এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা নির্দিষ্ট ছকে আঁটিয়ে ফেলা আর সবার মধ্যে শিক্ষা-দর্শনের ছলে বিশেষ জীবনাদর্শের প্রসার ঘটানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য। এর ফাঁকে শিক্ষাব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন হলে ভালো, না হলেও ক্ষতি নাই।

    উপরে দু একটি উদাহরণ দিলাম পদ্ধতিগত খামতির। নীতির দিক থেকেও এর ফাঁকিঝুঁকি বিস্তর। এ পরিকল্পনায় কেবল উচ্চশিক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কেবল উচ্চশিক্ষা নিয়ে কোনো শিক্ষানীতি হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে, বিদ্যমান সরকারি শিক্ষানীতির প্রতি এই কৌশলপত্রের সমর্থন আছে। কিন্তু কিভাবে মূল শিক্ষানীতির সঙ্গে এই উচ্চশিক্ষানীতির সামঞ্জস্য রক্ষিত হবে, তা কোথাও পষ্ট করা হয়নি। বোঝা যায়, উচ্চশিক্ষা-সম্পর্কিত কোনো ‘জাতীয়’ নীতি প্রণয়ন এই কৌশলপত্রের লক্ষ্য ছিল না। একই কথা খাটে শিক্ষার মাধ্যমের বেলায়ও। কোথাও শিক্ষার মাধ্যম সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। ধরেই নেয়া হয়েছে, শিক্ষার মাধ্যম যে ইংরেজি হবে, তা স্থির হয়ে গেছে। পুরো পরিকল্পনায় যে দেশীয় চাহিদা সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলা হয়নি, কেবল বিশ্ববাজারের দোহাই দেয়া হয়েছে, ভাষা প্রসঙ্গটি বিবেচনায় না আনা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগোষ্ঠী বিবেচনায় আসেনি। সবচেয়ে বড় গোলমাল পাকানো হয়েছে কার্যকারণ-সম্পর্ক নির্ধারণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা রাজনীতিতে যুক্ত – এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে শিক্ষার মান-অবনয়নের প্রধান কারণ হিসাবে। কিন্তু রাজনীতিকে কারণ হিসাবে না দেখে ফল হিসাবে দেখার যথেষ্ট যুক্তি আছে। এ কৌশলপত্র ব্যাপারটাকে এভাবে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। খুব সরল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে যাঁরা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করাকেই সর্বরোগহর দাওয়াই মনে করেন, তাঁদের এ মত পছন্দ করার কথা। কিন্তু কেউ কেউ এই মনে করাটাকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। তাঁদের ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতনভাতা বৃদ্ধিসহ অন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সংগঠিত ছাত্র-আন্দোলন ঠেকানোর জন্যই ছাত্র-রাজনীতি বন্ধের এই তোড়জোড়। রাজনীতি উচ্চশিক্ষার পরিবেশ কিভাবে বিঘ্নিত করছে, আলোচ্য কৌশলপত্রে তার উল্লেখ না থাকায়, এই ধারণা সত্য বলেই মনে হয়। ভালো শিক্ষা পেতে হলে বেশি টাকা খরচা করতে হবে – এই চিন্তাও আপাতদৃষ্টিতে যতটা যৌক্তিক ও সাধু মনে হয়, ততটা যৌক্তিকও নয়, সাধুও নয়। সাধারণত এ ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দেয়া হয়। কিন্তু শিল্পোন্নত বিশ্বে নিজে রোজগার করে উচ্চশিক্ষা নেয়ার যে রেওয়াজ ও বাস্তবতা বিদ্যমান, বাংলাদেশে তা কল্পনাতীত। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মকানুনও এর উপযোগী নয়। আগেই বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী বা প্রাইভেট কোম্পানি উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ করবে – এমন কোনো বাস্তবতা বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্ব-অর্থায়নের প্রস্তাব, যা আদতে ছাত্রবেতন বাড়ানোরই প্রস্তাব, অযৌক্তিক ও জবরদস্তিপূর্ণ।

    কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে সামাজিক সম্মতির দরকার হয়। সামাজিক সম্মতি আসে বাস্তবতা থেকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির যে কোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধেই যে আন্দোলন জমে ওঠে, তার কারণ নিশ্চয়ই নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধের অভাব নয়। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রীর জন্য – যত কমই হোক – বাড়তি ব্যয় মেটানো কঠিন। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ওপর একটা দায়সারা গোছের জরিপ হলেই ধরা পড়বে, এখানকার বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী আসে গ্রাম থেকে; এবং বেশির ভাগেরই আর্থিক স্তর তলানির দিকে। সমাজবিকাশের দিক থেকে এই বাস্তবতার তাৎপর্য অসীম। দরিদ্র বাবা-মায়ের কোনো সন্তান মেধার জোরে, ধারদেনা করে বা অন্যের সহায়তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মাত্রই পুরো পরিবারটি মধ্যবিত্ত কাতারভুক্ত হয়ে যায়। শিল্পায়নের বেহাল দশার কারণে অন্য কোনো পথেই এই সামাজিক বিকাশের পরিকল্পনা করা যায় না। জনগোষ্ঠীর এই ক্রমবিকাশকে ‘বাজার-বিনিয়োগ-মুনাফা-প্রতিযোগিতা’র ছকে আঁটানো যাবে না। অবশ্য, পুঁজিবাজারে যোগ্য স্নাতক সরবরাহ করাই যদি আমাদের উচ্চশিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য হয়, আর তাতে জাতি লাভবান হবে মর্মে যদি সবার সম্মতি তৈরি হয়, তাহলে আলাদা কথা।

    আর্টওয়ার্ক: হায়ার লার্নিং
    শিল্পী: ভ্লাদিমির কাজানভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ৫

    তার মানে এই নয় যে, উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান দশায় আমরা সন্তুষ্ট। আমাদের পরিবর্তন দরকার। আর সেই পরিবর্তনের জন্য পরিকল্পনাও দরকার। তবে পরিকল্পনাটা হবে সামষ্টিক ও সামগ্রিক। উচ্চশিক্ষা হবে সামগ্রিক শিক্ষা-পরিকল্পনার অংশমাত্র। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান করণীয় তিনটি: এক. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, দুই. ইংরেজি-বাংলা-আরবি তিন মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান সাম্য প্রতিষ্ঠা করা এবং তিন. মাধ্যমিক স্তরে বৃত্তিমূলক-তত্ত্বীয় ভাগাভাগি কার্যকর করা। যোগ্য নাগরিকদের পরামর্শে সরকারি অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় এ কাজ করতে হবে। বিদ্যমান অবকাঠামো, সিলেবাস, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অক্ষুণ্ন রেখেই উচ্চশিক্ষার মান-উন্নয়নের জন্য বিস্তর কাজের অবকাশ আছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান যতটা খারাপ, সরকারি এনতেজাম কিন্তু অত খারাপ না। কেবল গবেষণা বলে যে একটা বস্তু উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য অংশ, তা সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহলগুলো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। এই বরাদ্দ বাড়িয়ে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে মান-উন্নয়নের চেষ্টা চালানো দরকার। সরকারের শিক্ষা-বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি ওঠা দরকার। কোনো অযৌক্তিক পরিমাণে নয়, পাশের দেশগুলোর সমান বরাদ্দ নিশ্চিত করা গেলেই অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ-বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। ইউজিসির কৌশলপত্রে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তারা কোন জরিপের ভিত্তিতে সংখ্যাটা নির্ধারণ করল তা স্পষ্ট নয়। অথচ এর বরাতে ছাত্রবেতন বৃদ্ধি আর প্রাইভেট-পাবলিক অংশীদারিত্বের কথা বলা হয়েছে। কার্যত, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের বাস্তবতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের পরিকল্পনা সফল হওয়ার নয়। সরকারি বরাদ্দের ভিত্তিতেই পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। উচ্চশিক্ষার বিস্তারটা হবে সরকারি বরাদ্দের অনুপাতে।

    ‘উচ্চশিক্ষার মান-উন্নয়ন প্রকল্প’ (হেকেপ)-এর অধীনে ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের মধ্যে টাকা বণ্টন করা হয়েছে। নব্য-উদারনীতিবাদী শিক্ষার মূল দর্শনের সাথে এ উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নয়া শিক্ষাদর্শনে শিক্ষকের ভূমিকা মূলত প্রশিক্ষকের। শিক্ষক দক্ষ হবেন; তাঁর জন্য প্রশিক্ষণ দরকার – গবেষণা বা পাণ্ডিত্য নয়। তিনি ভালো ব্যবস্থাপক হবেন যেন শিক্ষার ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করে বাজারে পাঠাতে পারেন। একজন বিশ্লেষক বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টগুলোর পর্যালোচনাসূত্রে লিখেছেন:

    This diagnosis identifies teachers and their traditional protections as the obstacle to market-based efficiencies. In its future scenario, higher education would become less dependent upon teachers’ skills. Students would become customers or clients. As the implicit aim, private investors would have greater opportunities to profit from state expenditure, while influencing the form and content of education. Business and university administrators would become the main partnership, redefining student-teacher relations. (Levidow 2002)

    ইউজিসির কৌশলপত্রের পরিকল্পনা ও ভাষাভঙ্গিতে উপরোল্লিখিত নীতির প্রতিফলনই আছে। সে দিক থেকে গবেষণার নামে টাকা বিতরণ সন্দেহজনক। বিশেষত, কাঠামোগত উন্নয়ন না করে ব্যক্তিগত খাতে বরাদ্দ করায় মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, সম্ভাব্য প্রতিরোধ বা বিরোধিতাকারী হিসাবে শিক্ষকসমাজকে নিষ্ক্রিয় করার জন্যই এ ব্যবস্থা। তবুও ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ ভালো কাজও হয়ত করবেন। কিন্তু গবেষণা কিছুতেই ব্যক্তিগত হতে পারে না। প্রতিষ্ঠান গড়তে হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক প্রতিষ্ঠান মানসম্মতভাবে গবেষণার উপযোগী করে তোলা হয়ত এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় – সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় – বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই গৃহীত হতে পারে গবেষণার বিশেষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে। তাতে কম বিনিয়োগে বেশি সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা।

    এডুকেশন ইজ অ্যা ওয়ে অফ ফ্রিডম
    শিল্পী: নাওয়ার খালিল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ৬

    নব্য-উদারনীতিবাদী বিশ্বব্যবস্থা পৃথিবীর নানা প্রান্তে বহু ধরনের বিরোধের মুখোমুখি হয়েছে। বিরোধিতার প্রধান দিক বণ্টনের অসাম্য। দার্শনিক দিক থেকে মূল অভিযোগ শত শত বছরের মানবিক অর্জন পরিহার করে মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যক্তিবাদী ধ্যানধারণার বিস্তার। অনেকেই লক্ষ করেছেন, নব্য-উদারনীতিবাদীদের যুক্তিগুলো বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন; এবং অনেক সময়েই পরস্পরবিরোধী। পিয়েরে বুর্দো যেমন বলেছেন, , ‘[Neoliberalism is] A programme for destroying collective structures which may impede the pure market logic.’ (Bourdieu 1998) বাংলাদেশের মতো প্রান্তীয় দেশে অবশ্য পশ্চিমা বিশ্বের হিসাব খাপে খাপে মিলবে না। তবে উচ্চশিক্ষানীতির মতো খুব কেজো এলাকায় বিশ্বব্যাংকের খবরদারি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার একটা খুব গভীর তাৎপর্য আছে। আজতক যাঁরা পৃথিবীর দেশে দেশে এই বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানাভাবে সোচ্চার হয়েছেন, তাঁরা মূলত কাজ করেছেন বিরোধিতার আকারে। বিকল্প কর্মপদ্ধতি প্রস্তাব করতে দ্বিধা দেখিয়েছেন। কারণটি খুবই বোধগম্য। সারা দুনিয়াজুড়ে সক্রিয় এই দানবীয় শক্তিকে রোখার জন্য দানবীয় আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় বিশেষ স্থান-কালের প্রেক্ষাপটে গৃহীত নীতির পর্যালোচনা আর সক্রিয় বিরোধিতা একদিকে পুঁজির পাগলা ঘোড়ায় খানিকটা লাগাম পরাতে পারে, অন্যদিকে বিশেষ স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাপ্ত তত্ত্ব ও প্রণালিপদ্ধতি সার্বিক তত্ত্বায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

    করার আছে অনেক কিছুই। কিন্তু ইউজিসির কৌশলপত্রের মতো রাষ্ট্রবিরোধী, জনবিরোধী আর অবাস্তব নথি কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর সচেতনতা ও সক্রিয়তা দরকার।

     

    তথ্যসূত্র

    মুহম্মদ জাফর ইকবাল ২০১১, ‘মাত্র এক হাজার পিএইচ ডি’, প্রথম আলো, ৬ জুন, ঢাকা
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২০০৬, রচনাবলি, তৃতীয় মুদ্রণ, ঐতিহ্য, ঢাকা
    ইউজিসি ২০০৫, Strategic Plan for Higher Education in Bangladesh: 2005-2025, University Grant Commission, Dhaka
    Bourdieu, Pierre 1998, ‘What is neoliberalism? A programme for destroying collective structures which may impede the pure market logic’, Le Monde diplomatique, English Edition, French
    Johnstone, D. Bruce, Arora, A. and Experton, W. 1998, The Financing and Management of Higher Education: A Status Report on Worldwide Reforms, Washington, D.C.: World Bank, Departmental Working Paper, http://www-wds.worldbank.org
    Levidow, Les 2002, ‘Marketizing Higher Education: Neoliberal Strategies and Counter-Strategies’, Published in K.Robins and F.Webster, eds, The Virtual University? Knowledge, Markets and Management, Oxford, UK, Oxford University Press, pp.227-48
    Martinez, Elizabeth and Garcia, Arnoldo 1996, ‘What is Neoliberalism? A Brief Definition for Activists’, Corp Watch, San Francisco
    Saad-Filho, Alfredo and Deborah Johnston 2005, ‘Introduction’, Neoliberalism – A Critical Reader, Pluto Press, London
    Saunders, Daniel B. 2010, ‘Neoliberal Ideology and Public Higher Education in the United States’, Journal for Critical Education Policy Studies, vol.8. no.1
    International Journal of Qualitative Studies in Education, Volume 20, Issue 3, 2007

  • পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার: প্রসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি

    পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার: প্রসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: এই প্রবন্ধ মানুষ নেটওয়ার্ক আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভার অডিও-অনুলিপি। বিষয়: ‘শিক্ষায়তনিক স্বাধীনতা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার এবং শিক্ষক ও ছাত্র-রাজনীতি প্রসঙ্গ’। তারিখ: ২০ মে, ২০০৭, রবিবার, বিকাল সাড়ে ৫টা। স্থান: ১২৩ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রবীন্দ্রভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

    প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল যোগাযোগ, (সম্পাদক: ফাহমিদুল হক, আ-আল মামুন) সংখ্যা ১০, জানুয়ারি ২০১১-তে। যোগাযোগ এর পিডিএফ সংস্করণ যোগাড় করে দেয়ার জন্য ইস্ক্রার প্রতি কৃতজ্ঞতা।   

    বিশেষ পরিস্থিতি: মহা জরুরি অবস্থা

    সমবেত সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর, আমাদের ‘মানুষ অধ্যয়ন ক্লাস’-এর কাজ শুরু করতে যে একটু দেরি হলো, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। অনেক দিন আমাদের অভ্যাস নাই তো, অনভ্যাসের কারণেই মনে হয় আজকে একটু দেরি হয়ে গেল। চাবির জন্য,১ আর কোনো কারণে নয়। আমরা সবাই যথাসময়ে উপস্থিত ছিলাম, এবং আপনারাও অনেকেই যথাসময়ে উপস্থিত ছিলেন, এবং আমরা ঠিক পাঁচটা তিরিশেই শুরু করে দিতাম। সেটা আর বলে কী লাভ? আমাদের তো কিছুক্ষণ দেরিই হলো। দেরি হলেও আমরা শুরু করতে পারলাম, এবং ‘অন্য কোনোরকম বিঘ্ন’২ যে ঘটল না, এখনও পর্যন্ত যে ঘটে নাই, তার জন্য বহুৎ শুকরিয়া।

    আমরা এখন আমাদের দেশে নানান রকম জায়গা থেকে যে কথাটা ঘনঘনই শুনছি এবং নিজেরাও হাড়ে-হাড়ে, অন্তরে-অন্তরে টের পাচ্ছি, সেটা হলো: ‘দেশ এশটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’। আমাদেরকে বারবারই মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে আমরা একটা ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র মধ্যে আছি। তো, এরকম ‘বিশেষ’ পরিস্থিতির মধ্যে অনেক কিছুই আমাদের ‘বিশেষ’ মনোযোগে আসা দরকার এবং সেই জায়গা থেকে আমরা দীর্ঘ দিন ধরেই, গত কয়েক মাস ধরেই, ক্রমাগত তাগিদ বোধ করে যাচ্ছি যে আমাদের কথাবার্তা বলা দরকার।

    শিল্পী: মারকাস জানসেন

    বকেয়া আলোচনা

    আজকে যে বিষয় আমরা ঠিক করেছি, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার: শিক্ষক আর ছাত্র-রাজনীতি প্রসঙ্গ’, এই বিষয়ে কথা বলাটা আমাদের আসলে বকেয়া হয়ে আছে। আমার বিবেচনা তাই। এট দীর্ঘ দিন ধরে ‘ডিউ’ হয়ে আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কারের প্রশ্ন শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার বা সামগ্রিকভাবে সংস্কার-কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের কথা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই জায়গা থেকেই যে আমরা আজকের আলোচ্য বিষয় ঠিক করেছি, তা কিন্তু না। আমাদের দিক থেকে বরঞ্চ এটা দীর্ঘ দিনের বকেয়া আলোচনা। এরকম আরও অনেক বকেয়া আমাদের আছে, যে বকেয়াগুলো সামনে আমাদের ধীরে ধীরে, অন্তত আমার দিকে থেকে, শোধ করতে হবে। প্রচুর বকেয়া আলোচনা, বকেয়া প্রবন্ধ- এগুলো আমাকে খালাস করতে হবে। তারই  অংশ হচ্ছে এইটা।

    অনেক দিন ধরেই ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ভালো না’, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান কিছু নিয়ে ভাবা দরকার’, ‘ছাত্র-রাজনীতি এবং অনেক রকম কর্থাবার্তা আমরা শুনে আসছি। আমাদের নিজেদের দিক থেকেও অনেক রকমের চিন্তা-আমাদের পুরানো অভিজ্ঞতা থেকেও- সেগুলোও ছিল। যে কারণে, আমাদের দিক থেকে আমরা এই নিয়ে কথাবার্তা বলব আবার অনেক বিষয়ের পাশাপাশি-আরও অনেক বিষয়ের মতোই-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, স্বাভাবিক হলেও আমার দিক থেকে বলতে পারি যে আমার নিজের পারিবারিক/ব্যক্তিগত বিভিন্ন রকমের কারণে আমি আলোচনাগুলো তুলে ধরতে পারি নি। বা, আমাদের বন্ধুবান্ধব যাঁরা, আমরা যারা অনেক দিন ধরেই নানান অর্থে এক সঙ্গে চলাফেরা করি, এক সঙ্গে চিন্তা-ভাবনা করি, কাজকর্ম করি, বা চেষ্টা করি করার, তারা নানান কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে পেরে উঠি নি। আমার মনে হচ্ছে যে আমরা হয়তো এই পেরে ওঠা শুরু করলাম। কে জানে? দেখা যাক, সামনের দিনগুলোতে আমরা এটা চালিয়ে যেতে পারি কিনা।

    মানুষ নেটওয়ার্ক

    আমরা যারা আজকে আলোচনা শুরু করছি- ‘মানুষ নেটওয়ার্ক’ – এটা কোনো সংগঠন না। এটা কোনো দল না। এটা কোনো পলিটিক্যাল পার্টি না। এটা কোনো সংস্থা না। এটা কোনো অর্থেই কোনো সংগঠন না। এটা অনেকগুলো লোকের একটা নেটওয়ার্ক মাত্র: যোগাযোগ, স্রেফ যোগাযোগ, আর কিছু না। আমাদের কোনো মেনিফেস্টো নাই, আমাদের কোনো ঘোষণাপত্র নাই। কিন্তু, আমাদের নানান রকম সমঝোতা আছে। বোঝপড়া আছে। এবং সবচাইতে বেশি আছে বৈচিত্র্য। আলাদা আলাদা রকমরে চিন্তুা, মত-পার্থক্য। এবং সেগুলো নিয়েও এক সঙ্গে কাজ করা যে যায়- এইটা চর্চা করাটা আমদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এবং সেখানে আমাদের আলাদা আলাদা মত যত বেশি করে আসবে, তত বেশি করে আমরা সবাই উপকৃত হব। সুতরাং, এইটাকে কোনোভাবেই কোনো পলিটিকাল/নন-পলিটিকাল পার্টি হিসেবে বা অর্গানাইজেশন হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নাই। এরকম কোনো সংগঠন করা যে ভালো বা খারাপ- সে জায়গা থেকে কথাটা বলছি না। আমরা যেটা না, আমরা সেটা বলে রাখলাম। আমরা যদি ভবিষ্যতে অন্য কিছু হই কখনও (‘মানুষ নেটওয়ার্ক’ নামে কিনা বা অন্য নামে কিনা, সেটা অন্য কথা, কাল্পনিক কথা) সেটা তখন দেখা যাবে, সেটা তখন বলা যাবে।

    আলোচনার পদ্ধতি: প্রকাশ্যতা এবং স্বাধীনতা

    তো, বকেয়া আলোচনা আমরা আজকে শোধ করতে নেমেছি, এটা যেমন ঠিক, আবার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটা উসিলা আছে, এটাও ঠিক। অজুহাত হিসেবে এই মুহূর্তে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কথা না বলাটা অন্যায় হবে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি হয়তো আমাদেরকে দ্রুত এ ধরনের একটা আলাপ করতে বাধ্য করল।

    আজকের আলোচনা একটু তাড়াহুড়ো করে আয়োজন করা- আমার দিক থেকেও এবং আয়োজকদের সবার দিক থেকেও। তার কারণ হচ্ছে ২৩ তারিখে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হবে [গরমের ছুটির জন্য]। তো, বন্ধ হওয়ার আগেই আমরা একটা কিছু আলোচনা করি। কোনটা নিয়ে করা যায়, কোনটা নিয়ে এক্ষুণি কথা বলা যায়, কোনটা নিয়ে কথা বলাটা সহজ, অনেক প্রস্তুতি লাগে না- সেই রকম জায়গা থেকে আমরা এই তারিখ, আজকের তারিখ, তাড়াহুড়ো করে ঠিক করেছি, এবং আজকের আলোচ্য বিষয় তাড়াহুড়ো করে ঠিক করেছি। সেটাও হয়তো একটা কারণ, যে কারণে আজকে হয়তো সামান্য বিঘ্ন ঘটল, টেকনিকাল বিঘ্ন ঘটল, শুরু করতে।

    আমার দিক থেকে আলোচনাটা হয়ে যাবার পরে আপনারা যে কেউ, যাঁরা এখানে আছেন, প্রশ্ন করবেন, বা যদি কিছু বলার থাকে, বলবেন। এখানে [মঞ্চে] এসেই বলবেন। প্রশ্নটাও এখানে এসেই করবেন। কারণ, আমাদের সমস্ত আলোচনাই, আমার এবং আপনাদের, প্রশ্ন এবং আলোচনাই রেকর্ডেড থাকবে। এখানে [ডায়াসে] তিনটা রেকর্ডিং মেশিন কাজ করছে। সাংবাদিকরা যদি কেউ থাকেন, কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ৩ যদি থাকেন, তাঁদের কাছেও অনুরোধ যে আমাদের এই আলোচনাকে ‘রেফার’ করার জন্য দরকার যদি পড়ে, যেকোনোরকমভাবে আমাদের আলোচনার বরাত দিয়ে যদি কিছু বলা লাগে, তো দয়া করে আমাদের কাছে চাইবেন। আমরা আমাদের গোটা আলোচনার সিডি দিয়ে দিব। গোটাটাই উন্মুক্ত। এখানে লুকানোর কিছু নাই এবং আড়াল করার কিছু নাই। যে কারও যেকোনো প্রয়োজনে যদি আজকের আলোচনার প্রয়োজন পড়ে, এর বরাত দিয়ে কিছু বলার, কিছু লেখার, কোথাও কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দরকার যদি পড়ে, তাহলে আমাদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সিডিটা নেবেন। দয়া করে আমাদের নাম দিয়ে নিজেদের মতো করে কোনো রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবেন না।

    একই সঙ্গে, একদম শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার আমার দিক থেকে: কি বর্তমান সরকার, কি আমাদের সুশীল সমাজ, কি তাঁদের মিডিয়া-পার্টনারগণ কিংবা রাজনৈতিক মহল (তার মানে, রাজনৈতিক দল এবং শিক্ষার্থী-সংগঠনগুলো এবং শিক্ষক-রাজনীতির নেতৃবৃন্দ বা তাঁদের দলীয় অবস্থান)- এই সব কোনো কিছুর সঙ্গেই আমার এবং আমাদের অবস্থান মিলবে না। কারণ, কোনো দলীয় অবস্থান থেকে বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীগত অবস্থান থেকে আমরা এখানে কথা বলছি না। নিজেদের মতো করে চিন্তা করেই এখানে আমরা কথা তুলছি।

    এই ‘বিশেষ অবস্থায়’, এই বিশেষ সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে, এখানে একটু মনে করিয়ে দিতে চাই যে বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন চিন্তাভাবনা করার জায়গা। [বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই পারেন সত্যিকারের স্বাধীন অবস্থান নিতে: সমাজ এটা আমাকে দিয়েছে।] হাজারটা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমার সমাজ এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষার উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ষোলআনা সুযোগ ও অধিকার দিয়েছে, যে স্বাধীনতার চর্চা আমরা খুব কমই করে থাকি। আজকে আমার অবস্থান ঐ স্বাধীন অবস্থান থেকেই কথা বলার। অর্থাৎ, চিন্তা, মতামত আর প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে, স্বাধীন অবস্থান থেকে, নিজের কথা প্রকাশ করা। [স্বাধীনতা ছাড়া, স্বাধীন চিন্তা ছাড়া আজকে আমার আর কোনো চিন্তা নাই।]

    ঢালাও বিবৃতি এবং ধামাধরার অভ্যাস

    আজকেই প্রথম আলো পত্রিকায় একটি লেখা বেরিয়েছে। তকদির হোসেন মনে হয় তাঁর নাম। পরিচয় দেওয়া আছে : ‘কলাম লেখক’। তকদির সাহেব বলেছেন, যে নির্মম সত্য প্রধান বিচারপতি মহোদয় বিচারবিভাগ সম্পর্কে উচ্চারণ করেছেন, শিক্ষা সম্পর্কে সেই নির্মম সত্য উচ্চারণ করবেন কে? (তকদির হোসেন, ২০০৭) নোয়াখালির আইনজীবী সমিতিতে আমাদের মহাপ্রলয় ঘটেছে সেটা তাঁরাই ভালো জানবেন। সেটা আমি অন্ততপক্ষে খুব ভালো জানি না। কিন্তু আমাদের বিচারবিভাগ কিভাবে চলে সেই খসড়া আন্দাজ বাংলাদেশে প্রত্যেক মানুষেরই আছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, মূর্খ-অমূর্খ সবার দিক থেকেই সেই আন্দাজ ষোলআনাই (আমার ধারণা) কাজ করে। এবং সে আন্দাজ খুব ভুল না। আলাদা করে মাইক দিয়ে বড় একজন কর্তাব্যক্তি যখন বলেছেন মহাপ্রলয় ঘটেছে, তখন সেটার বরাত দিয়ে কথা বলাটা হয়তো অনেকের জন্য সহজ হচ্ছে, কিন্তু এ ছাড়া ঐ কথার গুরুত্ব আমার কাছে কমই আছে বলে মনে হয়।

    তারপর তকদির সাহেব আহাজারি করেছেন, আক্ষেপ করেছেন: আমাদের শিক্ষার অবস্থা এই, শিক্ষার অবস্থা সেই, কে এখানে হাল ধরবে, কে এখানে পরিবর্তন আনবে, কে এখানে সংস্কার করবে, কিভাবে কী হবে? এর মধ্যে যেটা লক্ষণীয় (প্রধান বিচারপতি সাহেবের বেলাতেও বটে, তকদির সাহেবের বেলাতেও বটে, এবং আরও অনেকেরই আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা এই বৈশিষ্ট্যই প্রধানত দেখি), সেটা হলে, ঢালাও একটা বিবৃতি দেওয়া: ‘মহাপ্রলয় ঘটে গেছে’। [পত্রিকার শিরোনামেরও স্বভাবই এইটা, এরকম ঢালও বিবৃতি]। আর তকদির সাহেব চাচ্ছেন, আমরা কেউ একজন মহাকর্তাব্যক্তি শিক্ষপ্রতিষ্ঠান থেকে বলি যে এখানেও মহাপ্রলয় ঘটেছে। এটা আর বলার কী অপেক্ষা রাখে? এখন সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যদি একজন ভিসি থাকতেন (প্রধান বিচারপতির মতো), বা একজন চ্যান্সেলর যদি নিয়মিত কথা বলার অভ্যেস রাখতেন, তাহলে তিনি বললে হয়তো বলতেন। কিন্তু কথা তো বলার কিছু অপেক্ষা রাখে না। আমরা জানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা কী! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই বেকায়দা।

    কিন্তু মহাপ্রলয় ঘটেছে বললে মনে হয়, আচমকা এক দিন কোনো প্রলয় ঘটেছে। তো আচমকা, এক দিন, কোন প্রলয় বিচারবিভাগে ঘটেছে কিনা জানি না। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক দিনে কোন প্রলয় ঘটে নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত চল্লিশ বছর ধরে, আরও অনেক আগে থেকে আসলে, ক্রমাগত প্রলয়াকারে প্রক্রিয়া তিল তিল করে ঘটে চলেছে। সুখের কথা যে অনেক দিন পরে হলেও এখন এসে অনেক মানুষ এ সমস্ত সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন। খুবই ভালো। কথা বলা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার প্রয়োজন। কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু ঢালাও বিবৃতি প্রয়োজন না। ঢালাও বিবৃতি আমাদেরকে সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে না।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাটা কোথায়? ঠিক কোন কোন জায়গায়? সেগুলি যদি আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলা অভ্যাস না করি তাহলে ‘প্রলয় ঘটে গেছে’ বলা, আর ‘হায় হোসেন, হা হোসেন’ করা, হা-হুতাশ করা- এর কোনো মানে নাই। আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে বলা শুরু করতে যে কোন কোন জায়গাতে আমাদের সমস্যা আছে, এবং সেইখানে কী করলে পরে সমস্যাগুলোর সমাধান আশা করা যায়। ফলে, এক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যদি কোনো উদ্যোগ থাকে, আমরা সাধুবাদ জানাই, স্বাগত জানাই। এবং যাঁরাই সংস্কারে ধাবিত, তাঁদেরকেও স্বাগত জানাই। সংস্কার এখানে হোক। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কথা বলাটা আমাদের শুরু করা দরকার।

    আমি চেষ্টা করব আজকে সুনির্দিষ্টভাবে কতকগুলো পয়েন্ট নিয়ে কথা বলতে। এখানে অনেকগুলো পয়েন্ট ছুটে যাবে। আমার আলোচনা থেকে বাদ পড়ে যাবে। তার একটা কারণ হচ্ছে যে আলোচনাটা অতখানি গুছানো সম্ভবত হচ্ছে না। যেগুলো ছুটে যাবে সেগুলো আপনারা বলবেন। যেগুলো ছুটে যাবে সেগুলো সামনের দিনে আমি আরও গুছাবো। আলোচনা তো আর শেষ হয়ে যাচ্ছে না। ফলে, আরও গোছগাছ করে কথা বলা, আমাদের সামনের দিনগুলোতে, যাবে হয়তো। এবং দরকার পড়বে। যতই দিন যাবে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বলা আমাদের দরকার পড়বে।

    পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তকদির সাহেবকে ধন্যবাদ জানাই এই পয়েন্টে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেরাই কথা বলুন বেশি। শুধু যদি বাইরের লোকেরা কথা বেশি করে বলেন সেটা ভালো নয়। আর, বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেরা, শিক্ষকেরা- ধামাধরাটা তাঁদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এখনও বোঝা যাচ্ছে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সরকারের ধামাটা কোথায়। যদি ভালো করে বোঝা যায়, তাহলে অনেকেই ধামাটা ধরে ফেলার জন্য এই মুহূর্তেই রেডি আছেন। তো, তাঁরা যদি ধামাধরার জন্য তক্কে তক্কে থাকে (‘ধামাটা কোন জায়গায়, খুঁজে পেলেই ধরে ফেলব’), তাহলে আমাদেরকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না কেউ।

    ধামাধরার অভ্যাসটা আমাদেরকে, বিশ্ববিদ্যালয়কে, বাদ দিতে হবে। শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের দিক থেকেই কথা বলাটা অনেক বেশি করে দরকার। তাহলে গোটা সংস্কার কার্যক্রম যদি কিছু থাকে, যদি কিছু শুরু হয়, সেখানে আমরা আমাদের অবস্থানটাকে অনেক পরিষ্কার করতে পারব। আমাদের অবস্থান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটির অবস্থান। শিক্ষকদের কমিউনিটি। শিক্ষার্থীদের কমিউনিটি। আমি যেমন শিক্ষকদের মেম্বার গত ১২ বছর ধরে, এটা আমার সত্তার অংশ হয়ে গিয়েছে, সেরকমই তার আগের ১২ বছর আমি শিক্ষার্থী-কমিউনিটির মেম্বার ছিলাম। এবং সেই স্মৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীজীবনের স্মৃতি আমার মনে হয় আমার এই শিক্ষক-সত্তার চাইতে আরও বেশি পাওয়ারফুল। ফলে, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক উভয় সত্তার জায়গা থেকে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রদায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবার, তার স্বার্থ, তার মঙ্গল, তার ভালোমন্দ, সেই জায়গা থেকে আমার সীমিত অভিজ্ঞতায়, সীমিত বুদ্ধি বিবেচনায় যা বুঝি সেই কথাগুলিই বলার চেষ্টা করব। ভুল হলে, বাদ পড়লে আপনারা বলবেন।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    উপাচার্য, আমলাতন্ত্র, রাষ্ট্রের শুঁড়

    একদম প্রথমেই যদি বলতে চাই, বলতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমলাতন্ত্র। এটা হচ্ছে নাটের গুরু। এবং সেই আমলাতন্ত্রেও গুরুদের গুরু হচ্ছেন ভাইস-চ্যান্সেলর। তাঁর সই ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুই হয় না। তাঁর সই ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকাশনা বের হয় না। এবং তাঁর প্রধান অতিথিগিরি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। এবং এই আমলাতন্ত্রের পিঠে হাত না বুলিয়ে ঝটপট কাজ হতে চায় না। অত তলায়, তত তলায় গিয়ে  প্রশাসনিক ভবনের আমলাদের, কেরানিদের পিঠে হাত বুলাতে হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রফেসর- তাঁকে কেরানির পিঠে হাত বুলাতে হয়: ‘ভাই, আমার ফাইলটা’, ‘ভাই, আমার ঐ কাজটা’, ‘ভাই, আমার দরখাস্তটা’, ‘একটু ঠেলেন’, ‘একটু আগান’, ‘একটু পাস করেন’। এবং ঐ আলটিমেটলি ভাইস-চ্যান্সেলরের সই লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো কাজ সম্ভব না (কল্পনীয় এবং অকল্পনীয়) যেটা ভাইস চ্যান্সেলরের, আমি রিপিট করছি, ভাইস চ্যান্সেলরের সিগনেচার ছাড়া হয়।

    এই হলো বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন। এমন ধরনের একটা প্রশাসন, যার হাতে সব ক্ষমতা। সিন্ডিকেট বলেন, সিনেট বলেন, শিক্ষক-সমিতি বলেন, ডিন বলেন, ছাত্র-সংগঠন বলেন, কালচারাল সংগঠন বলেন, সবকিছু গিয়ে কালমিনেট করবে, কেন্দ্রীভূত হবে, ঐ ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে; তাঁর নেতৃত্বে যে আমলাতন্ত্র আছে (কেরানিবাহিনী, অফিসারকুল আছেন), তাঁদের কাছে। আমি কিন্তু ‘ব্যক্তিগতভাবে ভাইস চ্যান্সেলর খারাপ’, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমলারা খারাপ’, ‘ব্যক্তিগতভাবে কেরানিরা খারাপ’, এ রকম কথা বলার মতো মূর্খতা প্রদর্শন করার চেষ্টা করছি  না। আমি বলছি কাঠামোটার কথা। এই কাঠামোটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার প্রাণভোমরা। যে বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যে বিশ্ববিদ্যালয় অচলাবস্থায় আছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থবিরতার প্রাণভোমরা হচ্ছে এইটা।

    তো, ওনারা যা যা করতে পারেন, এই ধরনের কাঠামো হলে যা যা হওয়ার কথা, তাই হচ্ছে। স্বজনপ্রীতি। দুর্নীতি। শিক্ষকদের/শিক্ষার্থীদের ওপরে নানান ধরনের চাপ প্রয়োগ করা। এবং ঐ ভাইস-চ্যান্সেলরের নিজেরই নানানভাবে চাপগ্রস্ত হওয়া। সরকারের দিক থেকে চাপগ্রস্ত হওয়া। ছাত্র-সংগঠনের দিক থেকে চাপগ্রস্ত হওয়া। কর্মচারীদের দিক থেকে চাপগ্রস্ত হওয়া। যত রকম চাপ দেওয়ার বাহিনী আছে, সবাই ভিসিকে চাপ দেবে। আর, ভিসির যত ক্ষমতা আছে, সেই সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে উনি আবার চাপ দিবেন নিচের দিকে। প্রফেসর থেকে আরম্ভ করে পিয়ন সবাই ওনার চাপে অস্থির হয়ে থাকবে- উনি যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন।

    হ্যাঁ, এটাকে ‘ক্ষমতায় থাকা’ বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষকরা এ ভাষাতেই কথা বলেন।৪ পিয়নরাও এই ভাষায় কথা বলেন। ‘অমুক ভিসির আমলে’ (আইয়ুব খানের আমলে), ‘তমুক  ভিসির আমলে’ ইত্যাদি। যত দিন উনি ‘আমলে’ আছেন, তত দিন উনি গাড়িতে আছেন। তত দিন তার চারি পাশ দিয়ে বহুত লোক আছে। উনি যদি মর্নিং ওয়াকে বের হন (আমি নিজের চোখে দেখেছি, আপনারাও দেখবেন), একটা বিরাট বাহিনী সঙ্গে হাঁটবে। কিন্তু, যেদিন উনি ভিসি আর নাই, যেদিন ওনার আমল শেষ, পরের দিন উনি ‘প্যারিস রোড’ দিয়ে একা একা। সঙ্গে একজন পিয়নও থাকবে না। কেউ থাকবে না। তখন তিনি রিকশায় যাবেন। রিকশায় একা। সন্ধ্যারাতের আবছা অন্ধকারে কিংবা মর্নিং ওয়াকে হাঁটবেন, তষনও একা একা। বন্ধুবান্ধবও সঙ্গে নাই। [ভিসিদের মনে হয় ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধব থাকে না]। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি এ রকম অনেক ‘মৃত উপাচার্য’কে দেখেছি এবং জীবিত উপাচার্যকেও দেখেছি। এর কারণ হচ্ছে ঐ যে: সমস্ত ক্ষমতার একটা কেন্দ্র, একটা আমলাতন্ত্র, যার মাথা ভাইস-চ্যান্সেলর। এই কাঠামোর জন্য এরকমটা হয়েছে। ওখানে যদি আপনি আমাকেও ভিসি বানিয়ে দেন, একই অবস্থা হবে। অন্য কিচ্ছু আমার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। বড় জোর আমার পক্ষে চিৎকার করে বলা সম্ভব হবে: ‘বাঁচাও, আমি ভিসি হতে চাই না’। কিছু করা সম্ভব হবে না। যদি কাঠামো এইটা থাকে।

    এই কারণে প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্র-এইটা হচ্ছে সবার আগের কথা। আর, এখানে অন্য কী কী অসুবিধা হয়, এটা আপনারা আমার থেকে ভালো জানেন। সার্টিফিকেট তোলা নিয়ে সমস্যা। শিক্ষার্থীদের হলের সমস্যা। সিট পাওয়া নিয়ে সমস্যা। ভর্তি হওয়ার সমস্যা। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সমস্যা। সেশন জ্যামের সমস্যা। পরীক্ষা না হওয়ার সমস্যা। কত রকম! মাস্টাররা ক্লাস নিবেন না, কিচ্ছু বলা যাবে না। মাস্টাররা পরীক্ষার দিন উপস্থিত থাকবেন না, অন্য শহরে থাকবেন, অন্য দেশে থাকবেন, আন-নোটিশড। এভরিথিং। হোয়াটএভার ইউ ক্যান থিংক, অর আন-থিংক, ইজ পসিবল আন্ডার দ্যা ভাইস-চ্যান্সেলর, আন্ডার দিস অর্গানাইজেশনাল স্ট্রাকচার। দ্যাট ইজ দ্যা পয়েন্ট।

    এটা একটা মহাক্ষমতাশালী আমলাতন্ত্র। মহাকেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র। মহা-হায়ারার্কিকাল। উচ্চ-নিচ ক্রমবিন্যাসওয়ালা। হায়ারার্কি মানে কে না জানে। বাংলায় বলি। বাংলায় কমই জানি আমরা। হায়ারার্কি মানে হচ্ছে: সবাই সবার বস। সবচেয়ে তলায় যিনি আছেন, তিনিও বস। কারণ তাঁর তলেও তো লোকজন আছেন। খুঁজলে পাবেন। আর সবচাইতে উপরে যিনি আছেন, উনি মহা-বস। এটা এক দিকে: বসের উপরে বস, তার উপরে বস, তার উপরে বস। আরেক দিকে: সবাই গোলাম। সবচাইতে উপরে যিনি আছেন, উনিও গোলাম। ওনার উপরেও বস আছে। এবং উনি থেকে আরম্ভ করে নিচের সবাই গোলাম। একদম তলা পর্যন্ত ঠেকবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাস পর্যন্ত ঠেকে যাবে, আমার ধারণা। এই হচ্ছে স্ট্রাকচার। সুপার্ব আমলাতান্ত্রিক স্ট্রাকচার। এই কাঠামোটা অ্যাকচুয়ালি রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর আবশ্যিক অঙ্গ। রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে এই কাঠামো ‘হেব্বি সে’, জুত করে, আটকানো আছে: স্ট্রং নাটবল্টু দিয়ে। কিংবা বলতে পারেন: অভ্যাসের স্কচটেপ দিয়ে কোনোরকমভাবে আটকানো আছে। কিন্তু, স্বার্থের ইন্ধনে এই বন্ধন একেবারে পবিত্র এবং অটুট। অটুট – কিন্তু বেকায়দা হলেই ছুটতে সময় লাগে না ঐটা। লাগবেও না। অতীতে আমারা অনেক বার দেখেছি।

    রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখলে, শিক্ষা-মন্ত্রণালয়, মঞ্জুরি কমিশন এগুলি হচ্ছে রাষ্ট্রের শুঁড়। এইসব শুঁড়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আমলাতন্ত্র আটকানো। মঞ্জুরি কমিশনের আমলাতন্ত্র, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতন্ত্র, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমলাতন্ত্র পরস্পরের সাথে আটাচড। একেবারে জুত-মতো অ্যাটাচড। এই আলমাতন্ত্র ঐ আমলাতন্ত্রের এক্সটেনশন মাত্র।

    রাষ্ট্রের একটা বড় শুঁড় হলো ভিসি-নিয়োগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি-নিয়োগ করবেন আমাদের সরকার বাহাদুর। সুতরাং, ভিসি যেমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সমস্ত কিছুর গুরু, ওস্তাদ, বস; তেমনি তাঁর বস হলেন সরকার; তাঁর চেয়েও বিগ বস। কেননা, তুমি যেই হও, এবং তুমি শিক্ষকদের যত ভোট পেয়েই নির্বাচিত হও না কেন, যে তিনজন নির্বাচিত হবেন সেখান থেকে রাজনৈতিক দল এবং সরকার একজনকে ‘পছন্দমতো’ মনোনয়ন দেবেন। ঐ তিনজন নির্বাচিত হওয়ার আগে আবার তিরিশ জনের মধ্যে জটিল কনুই-চালাচালি চলবে।

    আপনি আমাদের মহান মিছিলগুলো দেখবেন। ছোটবেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলের ছবি দেখতাম পত্রিকায়। দেখতাম সাংঘাতিক গতিময়। সবাই দৌড়াচ্ছে। পত্রিকায় কখনও কখনও লেখা হতো ‘জঙ্গি মিছিল’। পরে যখন জঙ্গি মিছিলে ঢুকলাম, তখন গিয়ে দেখি ওটা আসলে কনুই-চালাচালির মিছিল। প্রথম লাইনে কারা থাকবেন, তা ঠিক করার জন্য কনুই-চালাচালি। তার জন্য নেতারা, সামনের লাইনের ‘নেতা’রা সবাই সবার কনুই ধরে আছেন, যেন কেউ কাউকে কনুই মারতে না পারেন। বছরের পর বছর ধরে আমি এই মিছিল করেছি এবং দেখেছি। এবং ‘নেতা’দের কনুইয়ের এই দেওয়াল ভেদ করে পেছনের কেউ যেন সামনে আসতে না পারে। কেন? আসলে পরে যে ফটো মিস হয়ে যাবে! সাংবাদিকদের ক্যামেরায় আমার ফটো মিস হয়ে যাবে। আর ফটোতে যদি আমি মিস হয়ে যায়, তাহলে আমার সবই শেষ: বিপ্লব শেষ, গণতন্ত্র শেষ, সমাজতন্ত্র শেষ, আমার নেতাগিরি শেষ, ফলে আমার চাঁদাবাজিও শেষ, ক্যারিয়ার শেষ, আমি ডুম।

    তো, এই যে ভিসি হওয়ার জন্য তিন জনের সম্মুখ-সারি, এর পেছনে আছে এই তিনজনকে বাছাই করার জন্য পেছনের তিরিশ জনের ‘অদৃশ্য’ কনুই-চালাচালি। এই তিরিশ জনের প্যানেলে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের উপরও কিন্তু সরকারের আছর থাকবে। পলিটিকাল পার্টির আছর থাকবে: এই পার্টিরও, ঐ পার্টিরও, সেই পার্টিরও। এইসব ক্ষেত্রে ‘লেফট’- ‘রাইট’ সব সমান। রাষ্ট্রের প্রশ্নে, রাজনীতির প্রশ্নে, ক্ষমতার প্রশ্নে, হালুয়ারুটির প্রশ্নে গত ছত্রিশ বছর ধরে বাম-ডান-মধ্য-সব সমান। ভবিষ্যতে যদি আমাকে বলতে বলেন, আমি এ নিয়ে বুঝিয়ে কথা বলতে রাজি আছি। আর একটু যদি ভাবেন, আপনিও বুঝবেন। না বোঝার কোনো কারণ নাই। যাক।

    তো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যিকারের স্বাধীনতার পথে প্রথম সুনির্দিষ্ট সমস্যাটি তাহলে আমলাতন্ত্র। ক্যাম্পাসে এই আমলাতন্ত্রের প্রতীক বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার চিন্তাটি, ‘শাসন’ করার চিন্তার সাথে গিট্টু লেগে আছে। ভিসিগণ এখানে ‘ক্ষমতা’য় থাকেন, তাঁদের কারও ‘আমল’-এ ‘প্রশাসন’ ভালো চলে, কারও আমলে খারাপ চলে। প্রফেসরগণ এখানে ‘প্রশাসক’ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। একেবারে আক্ষরিক অর্থেই বলছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সংক্রান্ত বিষয়-আশয় যিনি দেখেন তাঁকে বলে ‘পরিবহন প্রশাসক’, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বৃহত্তম সমাজের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ব্যাপারগুলো যিনি দেখাশোনা করেন, তিন ‘জনসংযোগ প্রশাসন’ ইত্যাদি। পুলিশ, প্রক্টর, প্রভোস্ট, প্রশাসক, প্রফেসর এখানে প্রায়-সমার্থক শব্দগুচ্ছ। শাসন করার মনোবৃত্তিই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্রেফ একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশাসন রাষ্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে রাজনৈতিক সূত্রে, প্রশাসনিক সূত্রে, আমলাতান্ত্রিক সূত্রে। তিনটা শুঁড় মঞ্জুরি কমিশন, একটা শুঁড় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শুঁড়। অপ্রাতিষ্ঠানিক শুঁড়ের অভাব নাই। চাপের অভাব নাই। আছরের অভাব নাই। সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের দিক থেকেই আছে। সরকার-প্রশাসন চান, ক্যাম্পাস-প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করতে। ক্যাম্পাস-প্রশাসন চান, আমাদের উপর আছর হোক, সারাক্ষণ আছর হোক; এর বাইরে যেন কিচ্ছু ঘটতে না পারে।

    নেক্সট পয়েন্ট: শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া। আমার পয়েন্টগুলো খুব ধারাক্রমিক নাও হতে পারে। মানে যে পয়েন্টের পর যে পয়েন্ট আলোচনা করা উচিত, সেরকমটা নাও হতে পারে। আমি নিশ্চিত না। না হলে অসুবিধা নাই। অদল-বদল করে নিলেও পরিস্থিতি একই। তো, পরের পয়েন্টটা হচ্ছে: শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়া।

    নলেজ ইজ পাওয়ার;
    শিল্পী: আঙ্গু ওয়াল্টার্স

     দ্বৈত খাতা-পরীক্ষণ, দাপ্তরিক গোপনীয়তা ও

     গোলাম-নিয়োগ: সর্বনাশের সরকারি পথ

    এতক্ষণ বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়-কাঠামোর একেবারে মাথার কথা: প্রশাসন। এবার বলছি গোড়ারও নিচের কথা, যা চট করে দেখা যায় না, চোখে পড়ে না। অদৃশ্য। আড়ালের জিনিস। তার নাম শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়া। [প্রক্রিয়াগত বিন্যাস-বন্দোবস্তকে আড়াল করে স্রেফ শিক্ষক-নিয়োগ নিয়ে কথা বললে সেটা বহুল আলোচিত কিন্তু ওপরভাসা গোছের একটা জিনিসই থেকে যায়।] আর আড়ালেও ঘটনা আছে। এবং সেটাই আসল ঘটনা। আমি বলছি শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়ার একেবারে গোড়ার ঘটনাটির কথা। আমি বলছি খাতা দেখা এবং পরীক্ষা-প্রণালির কথা। [আমি যে অর্থে বলছি, সেই অর্থে খাতা দেখা এবং পরীক্ষা-প্রণালির বিদ্যমান ব্যবস্থাটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা তো দূরের কথা,] এটা যে শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়ার আবশ্যিক অঙ্গ, সেই উপলব্ধিটুকু আমি কাউকে কখনও প্রকাশ করতে দেখি নি। শিক্ষকতার ১৩ বছর হতে চললো আমার। এ পর্যন্ত এটা অনালোচিত।

    শিক্ষক-নিয়োগ প্রক্রিয়াটা দেখেন। ব-ছ-রে-র পর ব-ছ-র ধরে চলছে। ভিসি যিনিই হন, দল যাই হোক, ‘ক্ষমতা’য় যিনিই থাকুক, লোক ভালো হোন, লোক খারাপ হোন, দলের আহ্বায়ক যিনিই হোন, শিক্ষকদের দলের কথা বলছি, তাতে কিছু যায় আসে না। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটায় ধীরে ধীরে একটা পচন ধরতে ধরতে ধরতে এখন এসে ছাগল, গরু, গবাদি পশু টিচার হবেন। [এমন দাঁড়িয়েছে যে: মনুষ্যত্বের অবাধ বিকাশের পথে বিদ্যমান হাজারও বাধাকে উড়িয়ে দিয়ে দ্বিপদী প্রজাতির যেকোনো সদস্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষক’ হতে পারেন, এটা আজ সম্ভবত সর্বজনস্বীকৃত, যদি তিনি ‘আমাদের লোক’ হয়ে থাকেন।]

    আমি নিজে ‘মেধাবী’, ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ এইসব ফালতু জায়গা থেকে কথাটা বলছি না। ‘মেধা’ কী, ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ কী জিনিস, ‘বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো’টাই বা কী জিনিস আমি বুঝিও না। পৃথিবীকে নাড়িয়ে দেবার জন্য পৃথিবীর ‘বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো’র মতো একটা জায়গা আইনস্টাইনও নাকি খুঁজেছিলেন, পান নি। তিনিই যদি আউটস্ট্যান্ডিং হতে না পারেন, তাহলে আমি আর কোন কুতুব। (হাসি)। মেধা-টেধা অন্য প্রসঙ্গ। পৃথক মিথ। আইনস্টাইনের ব্রেন কী জিনিস, ঐ ব্রেন ফরমালিন দিয়ে ভিজায়ে রাখতে হয় কেন এবং ওর মধ্যে বিশেষ ‘কিছু একটা’ পাওয়া যাবে কিনা, উনি ‘মঙ্গলগ্রহের মানুষ’ ছিলেন কিনা, এবং সে কারণে ওনার ‘বুদ্ধি’ বেশি ছিল কিনা- এসব আমি বুঝি না। এই ‘মেধা’ আমি বুঝি না। এই ‘মেধা’ সায়েন্সও বোঝে না আসলে। সব মানুষের ঘিলু কমবেশি একই রকমের থাকে। সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

    কিন্তু বাস্তবিকই যাঁরা দ্বিপদী প্রাণী মাত্র, বিবর্তনসূত্রে আনুগত্য ছাড়া এবং দাসত্ব ছাড়া যাঁরা আর তেমন কিছু শেখেন নি, তাঁরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন। দলে দলে। দীর্ঘ কাল ধরে চলছে এই নিয়ম। তো, এই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটা কী? প্রক্রিয়াটা এরকম: আমার পছন্দের লোককে আমি নিয়োগ-বোর্ড থেকে নিয়োগ দেব। নিয়োগ-বোর্ডে থাকব ‘আমরা আর মামুরা’। আর নিয়োগ-বোর্ডে যাঁরা আসবেন পরীক্ষা দিতে, তাঁরাও ঐ ‘আমরা আর মামুরা’ই। কিন্তু, আপনারা এবং আপনাদের মাতুলবংশই যে এসব জায়গায় থাকবেন, সেটা আপনি প্রত্যেকবার কনফার্ম করেন কিভাবে? চিন্তা করে দেখেন; এইটাই হচ্ছে গোড়ার জায়গা।

    আপনি কনফার্ম করেন কিভাবে যে নিয়োগ-বোর্ডে যাঁরা হাজির হচ্ছেন, মানে যাঁরা শিক্ষক পদের জন্য নিয়োগ-অভিলাষী, তাঁরা সবাই প্রায় আমাদের আর মামুদের লোক হবেন, তা কেমন করে হয়? প্রায় সবসময়? ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই। বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, এ্যাকসিডেন্ট ছাড়া এটা আমরা কনফার্ম করি কেমন করে যে সাক্ষাৎকার-সভায় শুধু ‘আমাদের আর মামুদের’ লোকেরাই থাকবেন, আর আমরা শুধু বেছে নেব: কোন ছাগলটা সেরা ছাগল? এটা কেমন করে পারি?

    পারি, তার কারণ হচ্ছে, যাঁরা যাঁরা ফার্স্ট-ক্লাস পেয়েছেন, তাঁরা সবাই ‘আমাদের লোক’। কোনো না কোনোভাবে। এই দলের, না ঐ দলের, না হয় সেই দলের। সবাই প্রায় ছাগল-বংশীয় লোক। দাস-বংশীয় লোক। অন্য বংশের কেউ এখানে থাকবেন না। এঁরা ছাড়া আর কেউ ফার্স্টক্লাস পাবেন না। মোটামুটি গ্যারান্টিড। আমোঘ।

    আমি যা বলব একটু গড়ে ধরে নেবেন। একেবারে হানড্রেডে হাসড্রেড ধরে নেবেন না। সামান্য আসমানী ব্যতিক্রম দু-একটা কল্পনা করে নেবেন যা ঘটতে পারে। ঘটেও। এবং ঐটুকু ব্যতিক্রম যে আছে, সেটা খুবই মহান। সেই ব্যতিক্রমটুকুই মহান। এবং সেটা যে আছে তার কারণ হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয়টা এখনও সবকিছুর পরেও স্বায়ত্তশাসিত। তার জন্য একশতে একশ হওয়া যায় নি। নিরানব্বই, সাড়ে নিরানব্বই, উন নিরানব্বই- এগুলোতে আছে।

    আচ্ছা। তো, তার মানে আপনাকে ফার্স্ট-ক্লাস কনফার্ম করতে হবে।

    সামনের বেঞ্চগুলিতে লোকজন বইসেন কিন্তু। এগুলা রিজার্ভড না। এগুলা ভাইস চ্যান্সেলরদের জন্য রিজার্ভড না (দর্শক-শ্রোতাদের হাসি) বা অন্য কোনো কর্তাব্যক্তিদের জন্যও রিজার্ভড না। পেছনের দিকে ভরে গেলে সামনের দিকে চলে এসেন।

    তো, সবাইকে যে ফার্স্ট-ক্লাস দিব আমরা, ফার্স্ট-ক্লাস দেওয়ার প্রক্রিয়াটা তাহলে এমন হতে হবে যে ‘হিসেবের বাইরে’ কেউ যেন ফার্স্ট-ক্লাস না পায়। এই ‘হিসেবে’ আপনি মেইনটেনন করেন কিভাবে? এটা কিন্তু মহা-হিসাব। একদিনের হিসাব না। এই ‘হিসাব বছরের পর বছর স্মুথলি রান করে। পর পর। উইদআউট এনি এক্সেপশন। কেমন করে এটা এত স্মুথলি রান করতে পারে? এর অপারেশনাল দিকগুলো কী? কার পরে কোনটা হয়? আমাকে এটা নিয়ে দীর্ঘকাল ভাবতে হয়েছে: ঘটনাটা কী? মানে বাস্তবে এটা চলে কেমন করে? প্রক্রিয়া-প্রণালিগুলো কী? কিসের পরে কী হয়? কার পরে কোনটা হয়? আমাকে এটা নিয়ে দীর্ঘকাল ভাবতে হয়েছে: ঘটনাটা কী? এটার জন্য দীর্ঘকাল ভাবা লাগে না আসলে। সামান্য তাকালেই দেখা যায়। আমি যে বহুকাল দেখতে পাই নি, তার কারণ আমি মুখস্থ ধারণা দ্বারা আচ্ছন্ন ছিলাম। আপনাদেরই অনেকের মতন। দীর্ঘকাল ধরে।

    আমাদের সমাজে তো কোনটা কী, সবকিছুই আমরা রেডিমেড জানি। মুখস্থ। [অন্যান্য দেশে/সমাজেও পরিস্থিতি মূলত একই। পরিমাণে কমবেশি। বা মাত্রাগত কমবেশি। মায়ের পেট থেকে পড়ার আগেই জানতে আরম্ভ করি। নিজেরা নিজেদেরকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার আগেই], আমরা শিখতে আরম্ভ করি: কোনটা কী। আসমানের নিচে, সূর্যের নিচে যা কিছু আছে, তার সবকিছু। ঘাস কী? মাটি কী? বটগাছ কী? বন্দুক কী? বিচারবিভাগ কী? গণতন্ত্র কী? পদার্থবিজ্ঞান কী? সাহিত্য কী? প্রেম-ভালোবাসা কী? ডিভোর্স কী? এনিথিং অ্যান্ড এভরিথিং। জানতে-শিখতে আরম্ভ করি। এই কারনেই নিজের মাথা খাটায়ে যেটা সহজে জানা যেত, সহজেই, তাকালে পরেই জানা যেত, সাদা চোখে দেখা যেত, সেটা আর দেখা হয়ে ওঠে না।

    ঘটনা হচ্ছে: আমরা ফার্স্ট-ইয়ারেই টার্গেট করি। সম্ভাব্য এক্স, ওয়াই, জেড- কে ‘আমার লোক’ হতে পারেন। সম্ভাব্য কে কে। এটা অনেক রকম প্রক্রিয়াতেই হবে। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা। আমি খুঁজব ‘আমার লোক’। লক্ষণ দেখব। বেয়াদবির লক্ষণ আছে কিনা। আদবকায়দার লক্ষণ আছে কিনা। (এইগুলার মানে বুঝে নিয়েন কিন্তু। বেয়াদবির লক্ষণ মানে কী? আদব-কায়দার লক্ষণ মানে কী? আপনাদের চেয়ে, শিক্ষার্থীদের চেয়ে, সেটা বেশি আর কে বোঝেন?) আরও অনেক কিছু দেখব। তার সঙ্গে আমার স্বভাবচরিত্র মিলতে হবে। ক্লিক করতে হবে। জ্যাক এবং পিন খাপে-খাপ লাগতে হবে। লাগল কিনা দেখব।

    মোটামুটি এরকমভাবে একটা ‘সেট’ ঠিক করে ফেলব আমরা। আমি হয়তো একজনকে ঠিক করব। আপনি হয়তো আরেকজনকে ঠিক করবেন। আরেকজন অন্য কাউকে ঠিক করবেন। এভাবে একটা ‘সেট’ হয়ে যাবে। এ সেট অফ অল্টারনেটিভস। কিন্তু ‘সেট’ হতে হবে একটা। তিন-চারজনের সেট। বা কখনও কখনও পাঁচ-ছয়জনের সেট। এর বেশি নরম্যালি হয় না।

    এইবার এই শিক্ষার্থীরা, ফার্স্ট-ইয়ার থেকেই, কম বেশি ফার্স্ট-ক্লাস নম্বর পেতে থাকবেন। অথবা পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে ফার্স্ট-ইয়ারেই তিরিশ সারপ্লাস বা বিশ সারপ্লাস। মিস যেন না হয় ফার্স্ট-ক্লাস কোনোভাবেই। কিংবা ফার্স্ট-ইয়ারে এক-দুই নম্বর শর্ট? ঠিক আছে। পরে দেখতেছি। সেকেন্ড-ইয়ারে, থার্ড-ইয়ারে, ফোর্থ-ইয়ারে, মাস্টার্সে পোষায়ে দেব। ব্যবস্থা করে নেব। এইবার ‘টিম’, এই যে ‘সেট’, এরাই ‘আমাদের লোক’। ‘আমাদের’ মানে ‘আমরা’, যাঁরা আছি, বিভিন্ন দলের মাস্টাররা, সেই ‘আমাদের’ লোক। এই ‘সেট’ই ভবিষ্যতের শিক্ষক। সেকেন্ড-ইয়ারে। থার্ড-ইয়ারে। ফোর্থ-ইয়ারে। মাস্টার্সে। এঁরাই। হয় এ ফার্স্ট, নয় ও ফার্স্ট। এঁদের মধ্যেই যত ‘কম্পিটিশন’ হবে। ‘প্রতিযোগিতা’ হবে। প্রতিযোগিতা কিন্তু পড়াশোনার না। ভুল করবেন না। প্রতিযোগিতা হবে পরীক্ষা বেশি নম্বর পাওয়ার।

    পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া, আর ভালো করে পড়াশোনা করা আকাশ-পাতাল আলাদা জিনিস। ভালো রেজল্ট করা, আর ভালোভাবে অধ্যায়ণ করা দুইটা দুই বিপরীত মেরুর জিনিস। এটা একটা বৈজ্ঞানিক সূত্র। অন্তত এখনকার দিনে। এমনিতেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা জিনিসটা এক ধরনের; আর আমলাতান্ত্রিক শিক্ষাকেন্দ্র ও শিক্ষাকাঠামো আরেক পদের জিনিস। অক্সফোর্ড হোক, হার্ভার্ড হোক, যাই হোক, ঐ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সত্যিকারের অধ্যায়নের, বোঝাপড়ার, পড়াশোনার, উপলব্ধির ও কর্তব্য-পালনের মিল কমই ঘটে। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দিয়ে রবীন্দ্রনাথের রচনার উৎকর্ষ কনফার্ম করা যায় না। রচানার সাহিত্যগুণ কখনও পুরস্কার-মানদণ্ড দিয়ে বোঝা যায় না। পৃথিবীর কোনো পুরস্কার দিয়েই জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য, মানবিক মূল্যবোধ, উচ্চতর অনুভূতির চর্চা- এগুলো হয় না। পুরস্কারের সাথে এমনিতেই এগুলোর বিরোধ আছে। তবুও আমরা যেহেতু ইম্প্র্যাক্টিকাল চিন্তা করতে পারি না, আমাদেরকে সমাজের এই মুহূর্তের বাস্তব চাহিদা তো মেটাতে হয়, যার ফলে সমাজে এরকম স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রয়োজন থেকেই যায়। মূল প্রশ্নটা এর কালোপযোগী সংস্কার নিয়ে।

    তো, ঐ যে আমরা একটা সেট ঠিক করেছিলাম ফার্স্ট-ইয়ারে থাকতে, ঐ টিমের মধ্যে চলছে এখন কপাল-কাকতাল, চেষ্টা-চরিত্র, সাধনা-অধ্যবসায়। সেই সাথে শিক্ষকদের রেষারেষি, ঘষাঘষি, সহযোগিতা-শত্রুতা। আর শিক্ষার্থীদের হুজুর হুজুর, ধামাধরা ভাব। সারাক্ষণ একটা ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ভাব, দৌড়াদৌড়ি। সারাক্ষণ জিহ্বা বের হয়ে ঝুলছে। হাঁপাচ্ছে এবং টেনশনে ভুগছে: এই স্যার কী মনে করলেন, ঐ স্যার কী মনে করলেন, এই স্যারের গুড-বুকে আমি আছি কিনা, নম্বরটা পাব কিনা, এই কোর্সের টিচারের কী হবে, ঐ কোর্সের শিক্ষক তো এখনও ম্যানেজ হলো না, তার কী হবে- এইসব দুশ্চিন্তা-সাধনা-অধ্যয়ন করতে করতে এদের মধ্যে থেকে এ, না হয় ও, ফার্স্ট- সেকেণ্ড-থার্ড এগুলো হলেন। কোনো ব্যাচে হয়তো ফার্স্ট-ক্লাসই হলো না কারও। তার মানে সবকিছু মিলিয়ে কম্বিনেশন মেলে নাই। কোনো ব্যাচে হয়তো হলো। এসব করে যাঁরা ফার্স্ট-ক্লাস নিয়ে বের হয়ে আসতে পারলেন, তাঁরাই তো আমাদের শিক্ষক নিয়োগের ইন্টারভিউ-বোর্ডে যাবেন।

    আচ্ছা। এবার আমি আরও একটু গোড়ার দিকে এগোই। ঐ যে আপনি ফার্স্ট-ইয়ার থেকে শুরু করতে পারলেন, একটা সেট যে বাছাই করতে পারলেন, এবং ঐ সেটই যে অনার্স-মাস্টার্স পার হয়ে আসল, এটা আপনি কিভাবে পারলেন? এর ম্যাজিকটা কী? এর প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিটা কী? পদ্ধতিটা হচ্ছে খাতা দেখার বিদ্যমান পদ্ধতি। মানে পরীক্ষা-পদ্ধতি।

    খাতা দেখার পদ্ধতিটা এরকম: খাতা দেখবেন দুইজনে। এই দুজনের মধ্যে যদি মতান্তর হয়, নম্বর যদি আলাদা আলাদা হয়, তাহলে তাঁদের দেওয়া নম্বরের গড়ে বের করতে হবে। আর, দুজনের দেওয়া নম্বরের মধ্যে যদি শতকরা ২০ নম্বর বা তার বেশি তফাত হয়, তাহলে পরে তিন নম্বর আরেকজন খাতা দেখবেন। এভাবে, আমরা যে নিরপেক্ষ, আমরা যে মুখ চিনে নম্বর কমবেশি করি না, সেটা একদম কনফার্ম করা আছে। কাঠামোগতভাবে। পদ্ধতিগতভাবে। ভাবটা এ রকম। ভণিতাটা এ রকম।

    [বাস্তব অবস্থা ঠিক উল্টা ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই নি’ অবস্থা।] এই যে ভণিতাটা, এই ভণিতাটার মধেই তা স্ট্রেইটকাট বলা আছে। এই ভণিতাটা ইটসেল্ফ, পরীক্ষার এই আইন নিজে, স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে-সগর্বে ঘোষণা করছে যে একজন শিক্ষক একাই যদি খাতাটা দেখেন, তাহলে উনি ঠিকমতো খাতাটা দেখবেন না। দ্যাট ইজ দ্যা অ্যাজাম্পশান, দ্য বেসিক অ্যাজাম্পশান। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর, অথচ সেই আমিই আমার ছাত্রের খাতার মূল্যায়ন যদি একা করি, তাহলে স্বাজনপ্রীতি করে ফেলব। নম্বর কম দিব, নম্বর বেশি দিব! এটা হচ্ছে নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-প্রফেসরদের চরিত্র সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা-আইনের মৌলিক অনুমান। তাহলে আমি কিসের প্রফেসর? তাহলে আমি কিসের শিক্ষক? আমার নীতি, মূল্যবোধ, শিক্ষাদীক্ষা এগুলো কোথায়? তাহলে শিক্ষকের নীতিবোধ বলে কিছু নাই?

    অবস্থাটা খেয়াল করুন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করলাম। করে দেখলাম যে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে চোর মনে করে। বিশ্ববিদ্যালয় ধরেই নে, আমি যদি খাতাটা এক একা দেখি, তাহলেই আমি নয়ছয় করে ফেলব। এরই জন্যে, খাতা দেখবেন দুই জন। বিশেষ এদিক সেদিক হলে তিনজন। [যেহেতু অনুমিতভাবে আমি চোর, তাই আমাকে একা খাতা দেখতে না দিয়ে আরও একজন চোরকে পরীক্ষক নিয়োগ করা হবে। দুই চোরের কর্মফলে (খাতা দেখা উপলক্ষে প্রদত্ত নম্বরে) শতকরা ২০ ভাগের বেশি পার্থক্য ঘটলে নিয়োগ দেয়া হবে তৃতীয় চোরটিকে। এক চোরে শান্তি নাই, তিন চোরের জোট! কে না জানেন: “চোরে চোরে মাসতুতো ভাই”।]

    তাতেও শান্তি নাই। গোটা প্রক্রিয়াটা [আইনত] ‘গোপন’। মহা গোপন। [কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে।] এবং মহা প্রকাশ্যও বটে। জায়গামতো। [যেখানে যেরকম দরকার: টু হুম ইট মে কনসার্ন আর কি। যাহার জন্য যাহা প্রযোজ্য। ফলে, বিভাগের ও পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক দপ্তরের পিয়ন-কেরানিগণ প্রকাশ্য কর্মস্থালে বসে স্বহস্তে সংগুপ্ত পত্রাবলি টাইপ করেন। তারপর সমস্ত খামের ওপর ‘গোপন’ সিলমোহর এঁকে কাকপক্ষী ব্যতিরেকে এই মর্মে গ্রামময় রাষ্ট্র করে দেন: ‘এটা কিন্তু গোপন, কেউ দেখে ফেলবেন না, প্লিজ।

    গোপনীয়তার যুক্তি কী? কারণ, গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে গেলেই মাস্টাররা নয়ছয় করে ফেলবে। কে কে খাতা দেখছেন, ফার্স্ট এগজামিনার কে, সেকেন্ড এগজামিনার কে, এগজাম কমিটির কারা কারা মেম্বার, এগজাম কমিটির চেয়ারপারসন কে, এসব যদি শিক্ষার্থীরা জানেন, তাহলেই কী কী জানি হয়ে যাবে, আর মাস্টাররা সব উল্টাপাল্টা নম্বর দেওয়া শুরু করবেন। [ঐ গোপন ব্যাপার শিক্ষকবৃন্দ তো জানবেনই, কারণ সকল শিক্ষকের প্রত্যাশিত উপস্থিতিতে সিন্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, পিয়ন-কেরানি জানলেও কোনো ক্ষতি নেই, যেহেতু তাঁরা কাকপক্ষী নন।] এটা হচ্ছে গোপনীয়তা বজায় রাখার পক্ষে যৌক্তিক আইনসিদ্ধ অনুমান। আবারও, অনুমানটা মাস্টারদের চরিত্র সম্পর্কেও বটে।

    অনুমান একই রকম শিক্ষার্থীদের চরিত্র সম্পর্কেও। [তাঁরা যদি জানতে পারেন পরীক্ষা-প্রণালির গোপন কুশীলব কারা, ওমনি তাঁরা তখন শিক্ষকদের বাসায় ‘নিজেদের বাগানের’ কলাটা মুলাটা কিংবা নিজেদের পার্টির রামদাটা, পিস্তলটা নিয়ে শিক্ষকদের পেছনে পেছনে ঘুরতে শুরু করবেন। শিক্ষকদের সচ্চরিত্র বিনষ্ট না করে তাঁদের শান্তি নেই।] এমনকি শিক্ষার্থীরা খাতার উপর নিজের নামটাও লিখবেন না। সাংকেতিক রোল নম্বর লিখবেন। নামধাম সব ‘গোপন’। অথচ সবাই জানেন। পিয়ন জানেন, কেরানি জানেন। শিক্ষক জানেন। সুতরাং, শিক্ষার্থীও জানেন। প্রশাসন ভবনে গিয়ে ২০ টাকা দিলে আপনিও জানবেন। যে কেউ জানতে পারবেন। অথচ, আইনত ‘গোপন’। মহা গোপন।

    কোনো ছাত্র যদি নাম লেখেন, মানে খাতা যদি বলে, “স্যার, নিউটন স্যার, এই খাতাটা আমার, আমি অমুক ছাত্র”, তাহলেই আমি একদম গলে যাব: “ওরে আমার ছাত্র রে, আয় তোকে নাম্বার বেশি দিই”, কিংবা “পাইছি বেয়াদবটারে, এত বড় বেয়াদব, দেই বেটারে ফেল করায়ে।” এগুলোই হচ্ছে আমাদের অনুমান। ছাত্রদেরকে নিয়ে এবং শিক্ষকদেরকে নিয়ে। অথচ, এই ‘শিক্ষার্থীরাই আগামীতে দেশ চালাবে’, ‘এরা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব’, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’, এইসব বুলিতে কথা-কাগজে ভরপুর।

    এবার দেখেন, খাতা দেখার এই যে ‘দ্বৈত পরীক্ষণ পদ্ধতি’, আর এই যে গোপনীয়তা, এর মজাটা কী। এর মজাটা হচ্ছে, আমি আর আমার বন্ধু দুজনে মিলে ঠিক করব, “দোস্ত, আমাদের ক্যান্ডিডেট কিন্তু অমুক, ‘এক্স’। তুমি সেকেন্ড এগজামিনার আছ, আমি ফাস্ট এগজামিনার আছি, নাম্বার কিন্তু ঠিকমতো দিও।” এইটা আলাপ করে নেব আমরা। দরকার মতো।

    দরকার যদি না পড়ে [অপর পরীক্ষক যদি ‘শত্রু’ দলের কেউ হন], তাহলেও একটা অদৃশ্য ‘আলাপ’ থাকবে: “দেখি তুমি কেমনে ওরে ৬০% নম্বর দিয়া পার করাইতে পার!” অপর পক্ষের মনেও একই কথা: “দেখি, তুমি কেমনে আটকাও!” মানে, তখনও একটা ‘অলিখিত আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ আছে। [তলে তলে একই পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাকেন পরস্পরের ‘শত্রু’।] মানে শত্রুতার আন্ডারস্টান্ডিং। [শত্রুতার সন্ধিপত্র আর কি।] রেষারেষির আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এই মর্মে যে: “তুমি যে ফার্স্ট এগজামিনার আছ, তা তো আমি জানিই। আমিও সেকেন্ড এগজামিনার হয়ে আছি। আমিও ধরায়ে দিব।” যেখানে প্রয়োজন সেখানে একসাথে, যেখানে প্রয়োজন সেখানে আলাদা-আলাদাভাবে। মানে উইথ এ ফুল আন্ডারস্ট্যান্ডিং, অ্যান্ড এ কমপ্লিট নোয়িং অফ দ্যা সিচুয়েশন, আমাদের যা করণীয় সেটা আমরা করব। এইটা হচ্ছে প্রক্রিয়া।

    এইটা হচ্ছে প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থী এসে তো বলতে পারবেন না যে আমি স্যার নম্বরটা বেশি পেলাম কেন, বা কম পেলাম কেন? কোনো শিক্ষার্থী এসে যদি জিজ্ঞেস করেন জনাব কোর্স-শিক্ষককে, কোর্স-শিক্ষক বলবেন, “আমি তো জানি না, বাবা। খাতা যে কে দেখেছেন, সেকেন্ড-এগজামিনার যে কী করেছেন, সেটা তো আমি জানি না। আমার কাছে তো তুমি ভালোই পেয়েছে।” এখন শিক্ষার্থী ‘হাইকোর্ট’ পেয়ে গেলেন [দ্বিতীয়-তৃতীয় পরীক্ষকের নামে এবং গোপনীয়তার যুক্তিতে]। ছাত্রের এখন হাইকোর্টে দৌড়াদৌড়ি করা লাগবে: কে সেকেন্ড-এগজামিনার। আর, তিনি যদি ২০ টাকা দিয়ে হোক, বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে হোক, জানেনও সেকেন্ড-এগজামিনার ব্যক্তিটি কে, তবু তো তাঁকে তিনি ধরতে পারছেন না অফিশিয়ালি। [পরীক্ষার ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার কোনো বিধান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃতপক্ষে নাই।] ফলে, এইটা এমন একটা বিচার-প্রক্রিয়া, যে বিচার-প্রক্রিয়াতে গোপনীয়তার আড়ালে খুব চমৎকার উচ্চ পর্যায়ের ‘নিউট্রালিটি’ কনফার্ম করার ভান করার মাধ্যমে আপনি নিজের ‘ইচ্ছামতো’ নম্বর খাতায় দিতে পারবেন। কোনো সমস্যা হবে না।

    [কে কতটুকু নম্বর দিলে নম্বরের ব্যবধান শতকরা কুড়ির ঘরে পৌছাবে না, সেটা ঠিক করতে প্রথম এবং দ্বিতীয় পরীক্ষককে সুদীর্ঘ বৈঠক করতে হয় না। আর প্রথম পরীক্ষক এবং দ্বিতীয় পরীক্ষক যেন একই লাইনের লোক হন, সেটা কনফার্ম করেন পরীক্ষা-কমিটি। পরীক্ষা-কমিটিতে কারা কারা থাকবে, সেটা ঠিক করবেন অ্যাকাডেমিক কমিটি। স্রেফ ব্রুট মেজরিটির জোরে। অন্য কোনো বিবেচনায় নয়, স্রেফ অন্ধ গরিষ্ঠতার জোরে।  আর, বছরের পর বছর কারা পরীক্ষা-কমিটি হন, কারা প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় পরীক্ষক হন, কার কার দেরির জন্য পরীক্ষার ফলপ্রকাশে বিলম্ব ঘটে, বাইরের লোক হলে এসব তো আপনি কখনই জানতে পারবেন না। পুরো ব্যাপারটাই যে আইনত ‘গোপন’ ঘটনা।

    এসব কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই, শিক্ষকদের পরস্পর এমনকি আলাপও করা লাগে না। আমরা বুঝি। চোখে চোখে তাকালেই বুঝি, আমাদের কী দরকার। পরস্পরকে আমরা বুঝি। কেন বুঝব না? আমরা এখানে এক জায়গাতে এক সাথে ১২ বছর, ১৩ বছর, ৩২ বছর, ৪২ বছর ধরে থাকবো, আছি, আর আমরা পরস্পরকে চিনব না? আমরা কি বুঝব না, আমরা কে কী চাই? কার কোথায় আনন্দ? কার কোথায় দুঃখ? আমরা তো বুঝি। আমরা পরস্পরকে অতিরিক্ত ভালো করে বুঝি। স্বামী-স্ত্রী ৫০ বছর ঘর করলেও সবসময় এত ভালো বোঝেন না। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টাররা পরস্পরকে এত ভালো বুঝি।

    সভ্য দুনিয়াতে বিচার-প্রক্রিয়া মানেই কিন্তু বিচারটা ওপেন হতে হবে। এটা স্বচ্ছ হতে হবে। এখানে আপিল করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। উচ্চ আদালত থাকতে হবে। নিম্ন আদালতে আমি যদি বিচার না পাই, আমি উচ্চ আদালতে যেন যেতে পারি। শুনানি থাকতে হবে। বুঝায়ে দিতে হবে। আপনি যে বিচারক রায় দিলেন, কী বুঝলেন? বুঝায়ে বলতে হবে যে কী বুঝে ‘রায়’ দিছেন। দশ পাতা লিখতে হবে। পঞ্চাশ পাতা রায়ের দলিল লিখতে হবে। আমরা মাস্টাররা ‘রায়’ দিব, ঐ ছাত্রের সারা জীবনের জন্য কপালে দাগ টেনে দিব। এক (I) দাগ, দুই (II) দাগ, তিন (III) দাগ। ফার্স্ট-ক্লাস, সেকেন্ড-ক্লাস, থার্ড-ক্লাস। এবং বাকি সারা জীবন ঐ ছাত্রটা, ঐ ছাত্রীটা ঐ দাগ নিয়ে ঘুরবে। কিন্তু আমাদেরকে কোনো রায়ের দলিল দাখিল করতে হবে না। কোনো শুনানি করতে হবে না। আমাদেরকে ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না, কেন ও নম্বরটা বেশি পেয়েছে। কেন ও নম্বরটা কম পেয়েছে। [আমাদেরকে কেউ প্রশ্ন পর্যন্ত করতে পারবেন না। কেউ জানবেনই না যে নম্বরটা আমিই দিয়েছি। শিক্ষার্থী বেচারা সারা জীবনে জানতেও পারবেন না, কোন ‘বিচারক’ তাঁর রায়টা দিলেন। আমাদেরটা ‘গুপ্ত বিচার-পদ্ধতি’। আমরা সব মুখচোরা, অপ্রকাশ্য, আড়ালের বিচারক। অন্ধকারে অবস্থিত গোপন বিচারক। দিনের আলোয় আমরা সাধারণ শিক্ষকের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াই। রাতের অন্ধকারে খাতা দেখি।

    আমি যে ‘রায়’ দিয়ে দিব, সেই রায়ের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো আপিলও করা যাবে না। শিক্ষর্থী বলতে পারে, আমার খাতাটা ঠিকমতো দেখা হয় নি। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কী করবে? বিশ্ববিদ্যালয় গুনে দেখবে যে সবগুলো প্রশ্নেই নম্বর দেওয়া হয়েছে কিনা, এবং সেইসব নম্বরের যোগফল ঠিক আছে কিনা। ব্যস! নম্বর তার মানে যা আছে তা-ই থাকবে। বদলাবে না। যদি আবার আমার বৌ, বা আমার কন্যা, বা আমার এরকম একেবারে আপনার জন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’, এরকম কোনো জন যদি আবার ক্যান্ডিডেট হয়, তখন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়ে যাবে। তখন প্রয়োজনে এক খাতা পাঁচবার দেখা হবে। এবং পাঁচবার দেখার ফলে রেজাল্ট বদলেও যেতে পারে। উদাহরণ আছে। কিন্তু সেটা ঐ ক্ষেত্রে, ‘আপনার চেয়ে আপন যে জন’, তাঁদের বেলায়। অন্য কোনো বেলায় না।

    তার মানে, আপনি এ-ও দেখলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়-আদালত এমন একটা আদালত, যেখানে আইন কোনো সমস্যা না। চাইলে পরে বিশ্ববিদ্যালয় রেজাল্ট সত্যি সত্যি ‘রিভিউ’ করতে পারে। কিন্তু অন্য কারও বেলায় সেটা করা হবে না। [সুযোগ সীমিত]। ঠিক আছে?

    এই হচ্ছে আমাদের বিচার প্রক্রিয়া। এই বিচার-প্রক্রিয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়েই বছরের পর বছর ধরে আমরা মাস্টাররা আমাদের পছন্দ মতো লোকদেরকে ফার্স্ট-ক্লাস দিয়ে যাচ্ছি। [আর, বাইরে-বাইরে ধোপদুরস্ত সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে জুম্মার নামাজে যাচ্ছি, সরস্বতী পূজায় যাচ্ছি।] হিসাবের বাইরে কাউকে কোনো ফার্স্ট-ক্লাস দেওয়া হবে না। আমরা চাইলে পরে একই ব্যাচে ৫২ জনকেও দিতে পারি ফার্স্ট-ক্লাস। আমরা চাইলে অনার্স পরীক্ষায় পর পর ১৩ বছর উইদআউট এ ফার্স্ট-ক্লাস একটা ডিপার্টমেন্ট চলবে। উদাহরণ আছে। দুই রকমরেই। দুইটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিলাম। একটা গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের। যেখানে ১২ বছর কী ১৩ বছর ফার্স্টক্লাস ছাড়া ডিপার্টমেন্ট চলেছে। পার্টিকুলারলি অনার্স। আর ৫২ জনের যেটা, ঐটাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এটা আপনার জানেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ফলে, আমরা দুই রকমেরই পারি। আমরা সব পারি। আচ্ছা। এর ফলাফলটা কী?

    বিশ্ববিদ্যালয় কী বস্তু: এমনিও সেকেন্ড-ক্লাস, ওমনিও সেকেন্ড-ক্লাস

    যে ছাত্র বা ছাত্রী ফার্স্ট-ইয়ারে ভর্তি হলো অনেক স্বপ্ন নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পড়বে, কত স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে, সে শিক্ষিত হবে, পড়াশোনা শিখবে, পরে ভালো চাকরি পাবে, বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরব, তার মর্যাদার জায়গা এটা, সেই ছেলেটা বা মেয়েটা ফার্স্ট-ইয়ারটা কোনোরকমে পাশ করতে না করতেই তার হাড়ে হাড়ে আক্কেল হয়ে যায় যে ‘বিশ্ববিদ্যালয়টা কী বস্তু’।

    এবং সবার আগে সে যেটা শেখে, সেটা হচ্ছে এই যে ‘পড়াশোনা করার কোনো দরকার নাই’। কারণ, পরীক্ষা আসলে কার? পরীক্ষা তো ঐ ‘সেটের’! ঐ যে আমি ‘সেটের’ কথা বলছিলাম, ঐ ‘সেট’। ওদের মধ্যে কে ফার্স্ট হবে, কে সেকেন্ড হবে, কে কোন ‘দাগ’ পাবে, ঐটা হচ্ছে পরীক্ষা। বাকিরা দুধভাত। বাকিরা ফাউ।

    বাকিদের জন্য পরীক্ষার মানে কী? প্রমোশন! ‘ফার্স্ট-ইয়ার থেকে সেকেণ্ড-ইয়ারে উঠেছে’ [উত্তীর্ণ], যেটা ওরা এমনিতেই উঠবে। ফেল করার নিয়ম নাই। বাস্তবে। থার্ড-ক্লাস পাওয়ার নিয়ম নাই। বি-র-ল ব্যতিক্রম। দুই-একটা বিভাগে আবার ঐটা আরেকটা মর্যাদা। যে ‘আমাদের বিভাগে থার্ডক্লাসও দেই আমরা। আমাদের বিভাগ যেমন-তেমন না।’ নির্দিষ্ট কোনো বিভাগের নাম বলার দরকার নাই এখানে। কোনো বিভাগকে উঁচুতে-নিচুতে নামানোর প্রয়োজন নাই। আপনারা জানেন। আচ্ছা। তো, এই ছাত্রছাত্রীরা ফার্স্ট-ইয়ারেই হাড়ে হাড়ে শেখে যে পড়াশোনাটা করে লাভ নাই। এমনিও সেকেন্ড-ক্লাস, ওমনিও সেকেন্ড-ক্লাস।

    তারপর থার্ড-ইয়ারে উঠতে উঠতে একটু মনে হয়: ‘না, সেকেন্ড-ক্লাসটা একটু ভালো হলেই ভালো। ৫০ এর জায়গায় ৫৫-৫৬ হলে একটু ভালো হয়। চাকরি পাইতে মনে হয় একটু সুবিধা। বিসিএস-টিসিএস দিকে একটু সুবিধা।’ টার্গেটটা হলো কোনো রকমে চাকরিটুকু পাওয়া ভবিষ্যতে। কোনোরকমে বিসিএসটা দেওয়া।

    এই অনুভূতিগুলো তীব্র। এই অনুভূতিগুলো কিন্তু আমারও। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার আজকে, এটা একটা এ্যাকসিডেন্ট, ইন মাই লাইফ। সেটা অন্য কাহিনী। এখানে আজকে বলার দরকার নাই। আমিও ফার্স্ট-ইয়ারে প্রথম টিউটোরিয়াল পরীক্ষা দিয়ে শিখেছিলাম যে পড়াশোনা করার প্রয়োজন নাই। এবং পড়াশোনাটা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। মাস্টার্সে উঠে অন্য কাহিনীর কারণে আবার সেটা করেছি। সেটা অন্য হিসাব। সেই হিসাব আমি না বলি। টেম্পটিং। বলার জন্য খুব প্রলুব্ধকর কাহিনী। হ্যাঁ? কিন্তু না বলি। বলা যাবে। জায়গামতো। পরে।

    তো, এইভাবে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাটা বাদ দিয়ে দেন। কী দরকার? নোট আছে। প্রশ্ন কমন আছে। প্রশ্ন কমনের বাইরে যাবে না। বিরল ব্যতিক্রম না হলে। নোট ফটোকপির দোকানে গেলেও পাওয়া যাবে। এখন আর মানে ক্লাসমেটের কাছেও যাওয়া লাগে না। সুতরাং কোনো অসুবিধা নাই। সেকেন্ড-ক্লাস তো পাব এমনিতেও, ওমনিতেও। এইভাবে ছাত্রদের মনোভাবটা এইরকম পাকাপোক্ত হতে হতে এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে যে টিচার পড়াবে সিনসিয়ারলি, (সিনসিয়ারলি; কতটুকু ইফিসিয়েন্টলি আমি জানি না, কিন্তু উইথ মিনিমাম সিনসিয়ারিটি সে টিচার পড়াবে) ঐ টিচার ছাত্রদের জন্য অসুবিধাজনক। যদি এরকম টিচার দু-একজন থাকে। ঐ টিচার বেশি পড়ায়ে ফেলে। ঐ টিচারের পরীক্ষা দেওয়া কঠিন। প্রশ্ন বুজতে একটু মুশকিল হয়ে যায়। টপিক আটটা হলেই হয়। সে পড়াইছে বিশটা বা পনেরটা। অসুবিধা। [তাঁর কোর্সে পরীক্ষা দেওয়াও ঝামেলা। প্রশ্ন জানা থাকলেও মুখস্থ উল্টর দেওয়া যায় না।] এগুলা অসুবিধা।

    আরও বড় কথা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা এখন পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন করে না আর। তাঁরা পরীক্ষা আগানোর আন্দোলন করে। আক্ষরিক অর্থে। কারণ পড়াশোনা তো লবডঙ্কা! এমনিও ঐ জিনিস, ওমনিও ঐ জিনিস। মাঝখান থেকে দেরি করে কাজটা কী! দেরি করা মানে বিসিএস কম দিতে পারব। দেরি করা মানে বিসিএস ফস্কেও যেতে পারে। মাস্টারদের ও তো বিশ্বাস নাই! ওঁদের যদি কিছু না বলা হয়, তাহলে পরে তো সেশন জট লম্বা হতেই থাকবে। ফলে, ছাত্ররা ঐ সেকেন্ড-ইয়ার থেকেই বলা শুরু করে, ‘তাড়াতাড়ি স্যার’, ‘তাড়াতাড়ি স্যার’, ‘তাড়াতাড়ি স্যার’। এক বছরের কোর্স ছয় মাসে হয়ে গিয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইনগতভাবে। অনেকদিন আগে। ঠিক আছে?

    এইবার আইনের বাইরে আমরা তিন মাসেও কোর্স শেষ করে দিচ্ছি। তিন মাস পড়িয়ে। চতুর্থ মাসে পরীক্ষা। আমরা করেছি। ইয়াজউদ্দিন-ভ্যাকেশনে আমরা এটা করেছি। আমাদের ডিপার্টমেন্টে করেছি। বাধ্য হয়েছি করতে। শিক্ষার্থীদের চাপে। আমাদের মনেও মনে হয় চাপ ছিল। কারণ আমাদেরও তো ঘটনা ঐ একই। আমাদের তো সেট-ই আছে। আর, কোনো কারণে বিশেষ একটা ইয়ারে যদি আমাদের নিজেদের কোনো সেট না থাকে, তাহলে তো আরও মওকা। আমার যদি মিশন-ই না থাকে, তাহলে তো আমি আরও ফ্রি। তখন আর পড়ালেই কী, আর না পড়ালেই কী। তিন মাস হলেই কী আর ছয় মাস হলেই কী। ফলে, আমরা বাধ্য হয়েছি। এবং এটা এখন রেওয়াজ।

    ব্যাপারটা এরকম হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে বাড়ির থেকে পড়ে-টড়ে এসে, কোর্স-টোর্স শেষ করে এসে ভর্তি হবে। ভর্তি হয়ে পরের দিনই বলবে যে “ভাই, আমাকে একটা সার্টিফিকেট দেন। পরীক্ষা নিয়ে নেন। আমি সেকেন্ড-ক্লাস পেতে পারি। আমি জানি সেকেন্ড-ক্লাস পাওয়ার জন্য কী লাগে। আমাকে ছেড়ে দেন। আমি [গিয়ে] বিসিএসটা দিই গা।” ছাত্রের সাথে শিক্ষকের আর কী লেনদেন? এটা হচ্ছে অবস্থা। একদম বাস্তব অবস্থা। আক্ষরিকভাবে এটা হচ্ছে অবস্থা। আপনারা দেখবেন নিজেদের অভিজ্ঞাতার সাথে মিলিয়ে।

    প্রাথমিক সমাধান-সূত্র: সিঙ্গেল এগজামিনারশিপ

    তার মানে বোঝা যাচ্ছে: খাতা দেখার জায়গাটা হচ্ছে আমাদের গোড়ার জায়গা। আমাদের লাগবে সিঙ্গেল এগজামিনারশিপ। যা আছে, তার মধ্যে এটাই মূল সমাধান-সূত্র। এর চাইতেও মহান সমাধান নিশ্চয়ই আছে। সেটা বিপ্লবের পরে হবে। নানান ধরনের বিপ্লব করার পরে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি যেটা পথ দেখি, এই মুহূর্তে যা আছে তার মধ্যে যেটা পথ দেখি, সেটা হলো: সিঙ্গেল এগজামিনারশিপ লাগবে। একক খাতা-পরীক্ষণ পদ্ধতি। কোর্স পড়িয়েছি আমি, আমি একাই প্রশ্ন করব, খাতা আমিই দেখব, আমি একাই নম্বর দেব। ঐটাই চূড়ান্ত।

    এর ফলে কী ঘটবে বুঝে দেখেন। এর ফলে আমার জন্য মুশকিল হবে। আমার জন্য। শিক্ষকসমাজের জন্য। মুশকিল কী হবে? তখন আমি আর বলতে পারব না: “বাবা, সেকেন্ড-এগজামিনার কী নম্বর দিয়েছেন, আমি জানি না।” তখন নম্বর আমি যেটা দিব, শিক্ষার্থীরা জেনে যাবেন। জেনে যাবেন যে নম্বর নিউটন স্যারই দিয়েছেন, আর কেউ কিছু করে নি এখানে। তখন আমার আকাম করে লুকানোর জায়গা থাকবে না। তখন যে যদি সরাসরি আমাকে কিছু না-ও বলে, তবু গোটা ক্লাস জানবে, আমার খাতা দেখা কী চরিত্রের। অফিসিয়ালিই জানবে। ওপেনলি জানবে। সবাই সবকিছু জেনে যাবেন। সবাই তখন বিশাল মিছিল বের না করলেও ‘গুজুর-গুজুর ফুশুর-ফুশুর’ তো করবেন অন্তত। এখন যে যুগ এসেছে, আমি নিশ্চিত, তার পর শিক্ষার্থীরা নির্ঘাৎ বলবেন: ‘আমি নম্বরটা কম পেলাম কেন বলেন’। আমি নিশ্চিত, বলবে। তাহলেই চলবে।

    খাতা দেখার এই ‘একক পরীক্ষণ পদ্ধতি’তে শিক্ষকদর/বিচারকের জবাবদিহিতা এবং রেসপন্সিবিলিটি অনেক বেড়ে যাবে। আমাকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে হবে। একক দায়িত্বে নম্বর দিতে হবে। এবং সেটা সবাই জানবেন। সঙ্গে শুধু এইটুকু আইন নতুন করে যোগ করে দিতে হবে যে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় যে গ্রেড পেলেন, তার ব্যাখ্যা তাঁরা কোর্স শিক্ষকের কাছে দাবি করতে পারবেন, এবং ভরা-ক্লাসে শিক্ষক তাঁর ব্যাখ্যা হাজির করতে বাধ্য থাকবেন। এগুলো কিন্তু কোনো ‘আবিষ্কার’ না। আমাদের বন্ধুরা যাঁরা বাইরে পড়াশোনা করতে যান এবং ফিরে আসেন, তাঁরা জানেন। ওখানে এসব ধারণা ডালভাত। এগুলো সাধারণ নিয়ম। ঠিক কিনা? আমি কাকে কত নম্বর দিলাম আমাকে সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে না? দরকার হলে নম্বর বাড়াতে হবে, যদি সে আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারে যে তার নম্বর বেশি পাওয়ার কথা। দরকার হলে নম্বর কমাতেও হবে। তাহলে আর কোনো ফাঁকিবাজি থাকতে পারবে না। আড়াল থাকবে না। কোনো গোপনীয়তা থাকতে পারবে না। পরীক্ষার সম্পূর্ণ পদ্ধতিটা হতে হবে প্রকাশ্য এবং জবাবদিহিতামূলক। প্রকাশ্য বিচার এবং বিচারের রায়ের প্রকাশ্য মডিফিকেশন।

    আর, অবশ্যই একটা বোর্ড জাতীয় [কিছু একটা] থাকতে হবে। ফ্যাকাল্টি ধরে অথবা যেটা সুইটেবল হয়। সেখানে আপিল করা যাবে। শিক্ষার্থীরা আপিল করতে পারবেন যে আমি নম্বর কম পেয়েছি, আমি ভিক্টিম হয়েছি। টিচারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, নেগোসিয়েশন, যুক্তিতর্ক-দেনদরবার করেও যদি তাঁর মনে শান্তি না হয়, যদি তিনি সন্তুষ্ট না হতে পারেন, তাহলে তিনি আপিল করতে পারবেন। এবং আপিলের রায় যদি টিচারের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তাঁর ব্যাপারে কিছু না কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখতে হেব। ঐ টিচার কিছুদিন খাতাপত্র না দেখেই থাকবেন। বা অন্য রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। নীতিগতভাবে এক্ষেত্রে কঠোরই হওয়া উচিত।

    ফলে সমাধান খুব সিম্পল। আপনি যদি সমাধানটা করেন, তাহলে, [প্রস্তাবিত ‘একক পরীক্ষণ পদ্ধতি’তে] আমি দিনের পর দিন নম্বর নিয়ে নয়ছয় করে যেতে পারব না। একের পর এক ব্যাচ বের হবে, আর গোটা বাংলাদেশে আমার ‘সুনাম’ রটতে থাকবে, নিউটন স্যার খাতায় নম্বর কম দেয়, বেশি দেয়। একের পর এক ব্যাচ বের হবে, আর গোটা বাংলাদেশে আমার ‘সুনাম’ রটতে থাকবে, পছন্দের ছেলেকে, অপছন্দের মেয়েকে নিউটন নম্বর বেশি দেয়, কম দেয়। একের পর এক ব্যাচ বের হবে, আর চল্লিশ-পঞ্চাশটা করে ‘মাইক’ আমার ‘সুনাম’ গাইতে থাকবে সারা বাংলাদেশে। আমি বেশিদিন কন্টিনিউ করতে পারব না। ছাত্ররা এখন আর অত ম্যান্দামারা না। সেগুলো বাদই দিলাম।

    এর আরও সুফল আছে। কী সুফল? [‘একক পরীক্ষণ পদ্ধতি’তে খাতা দেখার এবং পরীক্ষার ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রে সময়ও লাগবে কম।] আর, এই পদ্ধতিতে আমি চাইলেই পছন্দের ছেলেমেয়েকে ফার্স্ট-ক্লাস দিতে পারব না। তার মানে আমি [দ্বৈত পরীক্ষণ পদ্ধতি’র সৃষ্ট] ঐ চেইন, ঐ দুষ্টচক্রের শিকল আমি এখানে কেটে দিলাম। ছেদ করে দিতে পারলাম।

    চেইনটার কথা মনে আছে তো? [এক] ‘হিসেবের বাইরে’ কেউ ফার্স্টক্লাস পাবে না। [দুই] সুতরাং, ভাইভা বোর্ডে সব ‘হিসাবের লোকেরা’ই ভাইভা দিবে। [তিন] সুতরাং, মাস্টারও ঐখান থেকেই হবে, ‘হিসাবের লোকেরা’ই হবে। [চার] ‘হিসাবের লোকেরা’ই আবার হিসেবটাকে নতুন করে করবে। এই দুষ্টচক্র থাকলে, ফার্স্ট-ইয়ার থেকে আমি যে ছাগলটাকে পাতা খাওয়াচ্ছি, ঘাস খাওয়াচ্ছি, সেই ছাগলটা যখন মাস্টার্স পাশ করে মাস্টার হবে, তখন সে তো আমাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝবে না। আমি বলব এটা সকাল। ও বলবে হ্যাঁ, সকাল। আমি বলব এটা বিকাল। সে বলবে বিকাল। আমি যদি অন্যায়ও করি, ও সেটা মানবে। কারণ, ও তো ধামা ধরতে ধরতেই ফার্স্ট-ইয়ার থেকে এ পর্যন্ত এসেছে। ধামাধরা ছাড়া অন্য কোনো বিদ্যা সে ভালো করে আয়ত্ত করে নাই। এইসব ধামাধরা লোকেরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেজরিটি টিচার। এখন। এই মুহূর্তে। এবং সে কারণে ওনারা এই মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধামা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পেলেই ধরে ফেলবেন। এবং নিরাপদে থাকবেন। ফলে, এই ধামাধরার প্রক্রিয়া সম্পর্কে এবং ধামাধরাদের সম্পর্কে যদি যাঁরা সংস্কার চান তাঁরা এ্যালার্ট না থাকেন, তাহলে গোটা সংস্কার-উদ্যোগ একেবারে ভেস্তে যাবে। মাঠে মারা যাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার। এটা খুব ক্লিয়ার।

    তো, একবার আপনি যদি দুষ্টচক্রের ঐ শিকলটা ছিন্ন করে দেন, তাহলে কী হবে? ছাগল রিক্রুটেমেন্ট প্রক্রিয়াটা বন্ধ হয়ে যাবে। যাঁরা অলরেডি আছে, তাঁদেরকে বেছে বেছে আপনি যদি বাদ দিতে নাও পারেন, ধরেন যদি নাও পারেন, প্রক্রিয়াটার নবায়ন তো আর হবে না। প্রক্রিয়াটা তো বন্ধ হয়ে গেল। [এই দুষ্টচক্রই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত সর্বনাশের গোড়ায়। একবার যদি এতে ছেদ ঘটানো যায়, তাহলে ভোটার রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া বন্ধ। সরকার-রাজনৈতিকদল-সুশীলসমাজ-সেনাবাহিনী ক্ষমতাচক্রের বিষাক্ত আঁচ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা-সংহতিকে রক্ষারও এটাই পথ।]

    একবার যখন অনুগত লোকেরা সাবই বুঝবেন, মাস্টারদের হাতে অত ক্ষমতা এখন আর নাই, তখন কিন্তু সবচাইতে বড় দাসেরও স্বাধীনতার সীমা বেড়ে যায়। মানুষের বাচ্চার নিয়মই এরকম। মানুষের বাচ্চার নিয়ম এরকম যে মানবসন্তান যদি কেউ হন, তাঁর ভেতরে স্বাধীনতার ‘বিষ’ থাকে। স্বাধীনতার জার্ম থাকে। স্বাধীনতার বীজানু থাকে। বীজানু। আবহওয়া সামান্য অনুকূল হলেই ঐ বীজানু মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সে স্বাধীনতা চায়। স্বাধীন হতে চায়। ফলে, আপনি যদি একটু পরিবেশটা এনে দিতে পারেন, এই মাস্টারদের অনুগত বাহিনী ডিগবাজি মারবে। কনফার্ম থাকেন। কারণ, কার এত ভালো লাগে বাজার করে দিতে, ব্যাঙ্কের বিল দিয়ে দিতে, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করায়ে দিতে। প্রফেসরদের জন্য যত রকমের কাজ করতে হয় ফেলোদেরকে, শিক্ষক পদের প্রত্যাশী পূর্বকথিত ঐ  ‘সেট’-এর ছাত্রদেরকে, সেগুলো করতে কোনো মানুষের বাচ্চার ভালো লাগে না। আমি জানি। আপনারাও বোঝেন এইটা। ফলে পরিস্থিতি বদলাবেই।

    ওকে, নেক্সট পয়েন্ট। নেক্সট পয়েন্ট হচ্ছে শিক্ষকদের নির্বাচন আর রঙবাজি। মানে দলবাজি। লাল-নীল দল। কে লাল, কে নীল, কে গোলাপি, কে পিংক, কে হলুদ, কে সাদা। এইসব।

    তিয়াত্তরের বিশ্ববিদ্যালয় আইন, নির্বাচন এবং শিক্ষক-রাজনীতির রঙবাজি

    এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে নতুন করে জানতে হবে, আদি ধারণাটা কী ছিল? এই যে কথাবার্তা শুনে যাচ্ছি, ‘শিক্ষক-রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’। এটা কী নিষিদ্ধ করবে! শিক্ষক-রাজনীতি জিনিসটা আদৌ চলছে কোন আইনে? এটা কোনো আইনে আছে নাকি? বাংলাদেশে কোনো আইনে কি আদৌ বলা আছে যে শিক্ষকেরা লাল-নীল দল বানাতে পারবেন? ইসলামি মূল্যবোধের দল বানাতে পারবেন? গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দল বানাতে পারবেন? অথবা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ‘বিশ্বাসীদের’, অর্থাৎ ‘ঈমানদার’ মুক্তিযোদ্ধাদের দল বানাতে পারবেন?

    এমন কোনো আইন বাংলাদেশে নাই। আমার জানামতে নাই। যতি কারও জানা থাকে, তাহলে দয়া করে আমাকে জানাবেন। আমি শিখব। আমি অনেক ভুল কথা বলতে পারি। আমার কোনো দুঃখ নাই। কিন্তু ভুলটা ধরিয়ে দেন। আমি তো প্রকাশ্যেই বলছি। রেকর্ডেড বলছি। ভুলটা ধরায়ে দেন। আমি এক্ষুণি কান ধরে শিখে নেব যে এটা ভুল হয়েছে। কোনো অনুবিধা নাই। ভুল করতে আমার লজ্জা নাই। আমি তো ‘বুদ্ধিজীবী’ না। আমার নাম তো নিয়মিত প্রথম আলোতে দেখেন না। কিন্তু, এখন [বিপদের সময়] এখানে এসে সেই আমাকেই দাঁড়াতে হচ্ছে। যাঁদের নাম পেপারে-টিভিতে দেখেন, তাঁরা এখন কোথায়? শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি। কোথায় তাঁরা? তাঁরা এখন ‘ভুল’ করতে রাজি না। কিন্তু, আমি ভুল করতে আগ্রহী। কেননা, ভুল না করলে শেখা যায় না। জ্ঞানী-গুণী লোকেরা বহুকাল আগেই বলেছেন, যে ভুল করে না সে কিছুই করে না।

    ঘটনাটা কী তাহলে? ‘শিক্ষক-রাজনীতি নিষিদ্ধ করিতে হইবে’ কথাটার মানে কী? এটা তো সিদ্ধ নাই। এটা তো নিষিদ্ধ আছেই। মানে সিদ্ধ অবস্থায় নাই। এটা অসিদ্ধ আছে। এটা চাল আছে, ভাত হয় নি, অসিদ্ধ। এটা তো আইনত সিদ্ধই নাই! কী করে আইন করে নিষিদ্ধ করবেন তাহলে! তাহলে ঘটনাটা কী? ঘটনাটা হচ্ছে, ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ/আইন আমাদের টিচারদেরকে সুযোগ দিয়েছিল যে আমরা ভোট করতে পারব। এটার উদ্দেশ্য খুবই মহান ছিল। পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালগুলোর অবস্থা আরও খারাপ ছিল। আরও খারাপ। ঠিক আছে? এ কারণে, ঐ অভিজ্ঞতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে অত্যন্ত মহৎ এই আইন পাশ হয়। এখনও পর্যন্ত এই আইন তার সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও অতিশয় মহৎ। আমি চিন্তা করতে পারি না এর চেয়ে মহৎ আইন আর কী হতে পারে আমাদের মতো দেশে। যা আছে তার মধ্যে। এত মহৎ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা প্রতিষ্ঠান সব অন্ধকারের মধ্যেও, এখনও, বাংলাদেশে ভরসার এবং আশার জায়গা হতে পারে। সেটা এই আইনের জোরে।

    ঐ আইন কার জোরে হয়েছে? কোনো ভদ্রলোকের বা কোনো মহান ব্যক্তির সদিচ্ছার জন্যে না। মুক্তিযুদ্ধের জন্যে। বাংলাদেশের ৭ কোটি/৮ কোটি মানুষের রক্তক্ষয়ী লড়াই এর পেছনে আছে। সেই লড়াইয়ের কারণে ঐ সরকার বাধ্য হয়েছে এই ধরনের একটা আইন করতে। ঐ সরকারের আরও অনেক এরকম মহান কাজ আছে। বাধ্য হয়ে যেটা করেছেন তাঁরা। তাঁরা কিন্তু কী জিনিস, আপনি এখন বুঝতে পারবেন। আওয়ামী লীগের কথা বলছি। আজকের আওয়ামী লীগ কী আপনি জানেন। বাহাত্তরের আওয়ামী লীগ এই জিনিস ছিল। সব রাজনৈতিক দল এই জিনিসই বটে। আজকে নতুন না।

    জরুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পরে আমাকে এগুলো শিখতে হয় না। আমাদের যাঁদের চোখ আছে, আমরা যাঁরা এসব রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে করেছি, আমার বহু আগে টের পেয়েছি, বহু আগে ছেড়েও এসেছি। আজকে সাত-আট বছর হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ওপেনলি বলছি যে আমি লাল-নীল কোনো দল করি না। ডিজওন করি। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় দুর্দশার জন্য এই লাল-নীল-হলুদ দলই দায়ী। আমি গত কয়েক বছর ধরে, পার্সোনালি, এই কথা বলে যাচ্ছি। সর্বত্র। সম্ভাব্য সর্বত্র। আমার কথা আপনারা সব জায়গায় শুনতে পান না। আমি ‘তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবী’ নই বলে। আমাকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছ থেকে অথবা মতিউর রহমানদের কাছ থেকে এটা শিখতে হয় নাই যে শিক্ষক-রাজনীতির জন্যেই আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবস্থা।

    কিন্তু, আমি ওনাদের মতো করে বুঝি না। আমি বাস্তব জায়গা থেকে দেখতে চাই। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অনেকেই এগুলো জানেন, এগুলো বোঝেন। কথা বলা শুরু হলে তাঁরাও বলবেন। আমার তাই বিশ্বাস। এবং যদি আমরা শুভ কাজকে উৎসাহিত করতে পারি, আমাদের সমাজ যদি পারে, আমাদের রাষ্ট্র যদি পারে, রাষ্ট্রে এবং সমাজে শুভশক্তির অবশিষ্ট যদি এখনও থেকে থাকে তাহলে পরে আরও অনেকেই মুখ খুলবেন আমি জানি। এখন অথবা সামনের দিনগুলোতে। অথচ, এই মুখ খোলার কারণে গত অনেক বছর ধরে আমাকে এই ক্যাম্পাসে, শিক্ষক-সমাজে নচ্ছার হিসেবে এবং অচ্ছুৎ হিসেবে, একটা কলঙ্ক হিসেবে অনেকেই মনে করেন।৫ আমি সেটা আমার জন্যে গৌরবের মনে করি। আর কিছু না পারি, এইটুকু তো পারি যে লেফট-রাইট করি না। মস্তিষ্ক বন্ধক দেই না কারও কাছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগে আমাদের ডিপার্টেমেন্টের একটা সঙ্কলনে লিখেছিলাম, ‘মস্তিষ্ক কারো কাছে বর্গা দিব না’। এইটা হচ্ছে পজিশন। ফলে আমরা এগুলো আগে থেকেই জানি।

    তো, ঘটনাটা কী? ঘটনাটা হচ্ছে, ১৯৭৩-এর আইন শিক্ষকদেরকে সুযোগ দিয়েছিল: আমরা ভোট করতে পারব। বলা ছিল: শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে বিশ্ববিদ্যালয় চালাবেন। স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে চলবেন। স্বাধীন থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে সরকারের কোনো আইন, সরকারের কোনো এজেন্সি বা অন্য কোনো ফোর্স লিগালি, ইলিগালি কোনো চাপ প্রয়োগ করতে পারবে না। এটা ছিল ঐ অধ্যাদেশের স্পিরিট। ফলে কোন শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন সংস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন, সেটা শিক্ষকরা নিজেরাই ঠিক করবেন। কিভাবে ঠিক করবেন? ভোট দিয়ে ঠিক করবেন। ডেমোক্রেটিকালি। উদ্দেশ্য খুব সৎ। খুব মহৎ। আচ্ছা। কারা ভোট দেবেন? সব মাস্টাররা ভোট দেবেন। কাদেরকে ভোট দেবেন? যাঁরা নির্বাচনে দাঁড়াবেন। কারা নির্বাচনে দাঁড়াবেন? যাঁরা নিজেরাই দাড়াবেন, তাঁরা। এবং যাঁদেরকে আপনি-আমি ‘সমমনা’ শুভানুধ্যায়ী কয়েকজনে মিলে দাঁড় করিয়ে দেব, তাঁরা। এইটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের আদি প্রক্রিয়া। নিয়ম হচ্ছে: সমমনের শিক্ষকেরা মিলে কারও নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। যাঁর নাম প্রস্তাব করা হচ্ছে, তাঁর সম্মতিক্রমে অবশ্যই।

    সমমনা শিক্ষকরা মিলে কাউকে দাঁড় করানোর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে নিয়ম দাঁড়িয়ে গেল, সমমনা শিক্ষকরা একটা ‘প্যানেল’ দিতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে কিন্তু ‘প্যানেল’ বলে কিছু নাই। দল তো দূরের কথা। ওখানে আমি ইন্ডিভিজুয়াল, আপনি ইন্ডিভিজুয়াল, তিনি ইন্ডিভিজুয়াল। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা নানা ব্যক্তি একটা নির্দিষ্ট পদে কমপিট করছি- ডেমোক্রেটিকালি, ফ্রেন্ডলি। আমরা-আমরা; নিজেরা-নিজেরা। নো পলিটিকাল পার্টি, নো স্টেট, নো প্রেশার, নো প্রপাগান্ডা। ঠিক আছে?

    এই ‘সমমনা’ লোকদের জিনিসটা অচিরেই সমমনাদের ‘প্যানেল’ হয়ে গেল। তাহলে এবার আপনার প্যানেল আর আমার প্যানেল আলাদা করব কেমন করে? দল তো করা যাচ্ছে না। দল তো করা বেআইনি। দলের কথা তো নাই-ই। ফলে, দলের নাম তো লেখা যাচ্ছে না আইনত। তাহলে, আমরা যে একটা আলাদা ‘বংশ’ আর আপনি যে একটা আলাদা ‘বংশ’- এটা তাহলে বুঝাব কিভাবে? তার জন্যই, আমার প্যানেল-শিট ছাপানোর কাগজটা লাল রঙ করে দিলাম, আপনার প্যানেলের কাগজটা আপনি নীল রঙ করে দিলেন। এরকম গোলাপি রঙও হলো। এভাবে, প্যানেল-শিট দিয়ে বলা আমরা আরম্ভ করলাম, অমুক প্যানেলে ভোট দিন। ‘ইসলামিক মূল্যবোধ’ওয়ালাদের প্যানেল। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ওয়ালাদের প্যানেল। অথচ, যেমনটা মাত্রই বললাম, এরকম প্যানেল-শিট ছাপানোটা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের মধ্যে কোথাও আদৌ উল্লেখ করা নাই। বিদ্যমান আইনের ব্যাখ্যায় বরঞ্চ এই কথাই বলে দেওয়া যেতে পারে যে এরকম প্যানেল-শিট ছাপানো যাবে না। নির্বাচনী সভাও করা যাবে না। দল করার, তথা দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার, তো প্রশ্নই ওঠে না। শিক্ষক-রাজনীতিটা আদৌ তাহলে চলছে কোন আইনে? এই যে লাল-নীল প্যানেল হয়ে গেল, প্যানেলের রঙ দিয়ে এইবার আমি হলাম লাল দল, আপনি হলেন নীল দল। সাদা দল, হলুদ দল- এগুলো হলো।

    তারপারও শান্তি হলো না। তা-ও চেনা যাচ্ছে না, কে কোন দল। আরও ভালো করে চেনা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার টিচার। এক হাজার জনকেই ‘ছাগল’ হতে হবে। এক হাজার জনকেই দলের কমান্ডের অধীনে আসতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু বেয়াদব আছে। তারা পুরা ছাগল হচ্ছে না। তাঁরা এখানে-ওখানে উল্টাপাল্টা ভোট দিয়ে দিচ্ছে মাঝেমধ্যে। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ আবার ভোটই দিতে আসছে না।

    এঁদেরকে তো আরও সাইজ করতে হবে। তখন কী করতে হবে? প্রত্যেকেই কে কোন দল করছেন না করছেন, আমাকে একদম লিখিতভাবে নিশ্চিত হতে হবে। কারণ কী? কারণ, আজকে আপনি লাল দল, পরের দিন গনেশ উল্টায়ে গেল, ঘুমের থেকে উঠে আপনিও চুলটা আঁচড়ায়ে, অন্য একটা জামা গায়ে দিয়ে নীল দলের মিটিঙে চলে গেলেন। [গিয়ে] বললেন, আমি নীল দল। [দর্শকশ্রোতার হাসি] বিশ্বাস করুন। আল্লাহর কসম বলছি। এই জিনিস নিজের চোখে দেখলাম। অনেক বার। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এটা আছে। সুতরাং, দলের নেতারা প্রমাদ গুনতে লাগলেন। এদেরকে সামলানোর জন্য আরও উপায় চাই। ‘ব্যাটা, তুমি যে আমার দল কর, তার প্রমাণ চাই।’ সুতরাং, সদস্যপত্র চাই। হ্যাঁ, তাঁরা সদস্যপত্রও চালু করেছেন। নমুনা আছে। ঘটনা সত্য।

    শিক্ষক-রাজনীতি আমিও করেছি। সরল বিশ্বাসে। মতিউর রহমান নিজামীর মতো; সরল বিশ্বাসে। ১৯৯৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ঢুকি, দেখলাম: শিবির ছাড়া কিছু নাই। হাঁটতে গেলেও শিবিরের অনুমতি লাগে। উঠতে-বসতে অনুমতি লাগে। আমি তো ‘মুক্তিযুদ্ধ’ করে আসছি ছোটবেলা থেকেই, তাই না? আমার কাছে মনে হলো, এত বড় কথা। আমি স্বাধীনতার সৈনিক বেঁচে আছি। একজন থাকলেও আছি। সুতরাং আমি কী করব? শিবিরের বিরুদ্ধে যে দল আছে, ঐ দল আমি মনেপ্রাণে করা শুরু করে দিলাম। সভায় ডাকলেন। সভায় গেলাম। গিয়ে দেখি ১৫ জন। ১৬/১৭ জন। ২০ জনও হয় না। ৩০ জন হলে দলের নেতারা খুব খুশি হন। আজকে বড় মিটিং। তখন থেকে আমি ঐ দল করা শুরু করলাম। অচিরেই দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত ধারণা, এবং এর পরিচালনাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের প্রশ্নে শিবির যা, অতীতে মৈত্রীও তাহাই ছিল, জাসদও তাহাই ছিল।

    বাস্তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে, লাল দল যা, নীল দলও তাই। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে ‘বিশ্বাসী’দের দলও যা, স্বাধীনতাবিরোধীদের দলও তাই। একই জিনিস। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁরা পরিচালনা করেন এবং করতে চান হুবহু একই রকম পদ্ধতিতে। তাঁরা কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তন চান না। তাঁরা কেউ লেখাপড়াটা চান না। তাঁরা কেউ গবেষণা চান না। তাঁরা কেউ নিজেরা পড়াশোনা করেন না। তাঁরা কেউ চান না, শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করুক, পড়াশোনা করুক। তাঁরা এটা চান যে: শিক্ষকরা শুধুমাত্র নিজেদের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকুন; আর-কারও কাছে দায়বদ্ধ না থাকুন। এটা তাঁরা কেউ চান না। ফলে আমি বুঝে ফেললাম: সব দলই এক। সো আই ডিসওন। এই জন্যেই আমি শিক্ষক-রাজনীতির পরম্পরা বহন করতে অস্বীকার করেছি। আমি নাই এর মধ্যে। আমি নাই এর মধ্যে। এইটুকু বুঝতে আমার যে কয়দিন লেগেছে, সে কয়দিনই করেছি শিক্ষক-রাজনীতি।

    তাহলে এই হচ্ছে আমাদেল লাল-নীল দলের ইতিহাস। এবং আইনগত প্রক্রিয়ার জায়গা থেকে ব্যাখ্যা। তার মানে, আরেক বার বলি, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি তো বেআইন-ই আছে। একে আবার নতুন করে কী বেআইনি করতে হবে? তিয়াত্তরের আইনকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। ঠিক আছে? [কেননা, এখানে তার আকাঙ্খা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্ম-পরিচালনা কাঠামোয় যেন কেউ বিশেষ মাতব্বর হয়ে উঠতে না পারেন, এবং বেশির ভাগ শিক্ষকের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে যেন সব কাজকর্ম পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার জন্য এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক শুঁড়বিন্যাস

    বলেন তো, তিয়াত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের যে স্পিরিট, সেই স্পিরিট, এবং তার পেছনে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা মহান ঘটনা, তার পেছনে গোটা ষাটের দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা বড় অংশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা বাঙালি জাতির জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য- এই সব কিছু উড়ে গেল কেমন করে? সব কিছু পাপ হয়ে গেল কেমন করে? ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করে কোনো মহাপ্রলয় তো এখানে ঘটে নি। তাহলে বলেন: কী দিয়ে সব হাওয়া হয়ে গেল?

    এইটা যদি আপনাকে বুঝতে হয়, তাহলে আপনাকে দেখতে হবে ১৯৭২ থেকে এ পর্যন্ত বিদ্যমান আমাদের রাষ্ট্রের কাঠামোটাকে। আমাদের রাষ্ট্র-রাজনীতির কাঠামোটাই মূলত এর জন্য দায়ী। একটু আগে আমি বলেছি: রাষ্ট্র তার শুঁড় ঢুকিয়ে রেখেছে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। শুঁড় মানে পাইপলাইন। ঐ পাইপলাইন দিয়ে প্রেশার আসে। ঐ পাইপলাইন দিয়ে হালুয়ারুটি আসে। দু-একজন খাওয়া শুরু করলেন প্রথম প্রথম। সংখ্যা বাড়তে লাগল। খাওয়া-দাওয়া এবং প্রেশারের কাছে মাথা নত করা মানুষের সংখ্যা।

    রাষ্ট্র এবং তার শুঁড়বিন্যাসই এর জন্য দায়ী। সরকার এবং রাজনৈতিক দল- তাঁরা যত মহানই হোন এবং যে তন্ত্রীই হোন; যায় আসে না। তাঁরাই এই অবস্থার জন্য দায়ী। যে রাজনৈতিক দল সরকারে নাই, ছিলেন না, তাঁদের দায় মোটেও কম নয়। কারণ তাঁরাও রাষ্ট্র। তাঁরা রাষ্ট্রের পাইপলাইনের মেম্বার। তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে রাষ্ট্রের পাইপলাইন যায়। কখনও সমন নিয়ে যায়। কখনও ওয়ারেন্ট নিয়ে, বন্দুক নিয়ে। কখনও আবার হালুয়ারুটি নিয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যেকোনো ব্যাখ্যায় পলিটিকাল পার্টি মাত্রই রাষ্ট্রের প্রধান একটা অঙ্গ। বাস্তবেও তাই। নানাভাবে তাঁরা রাষ্ট্র-পরিচালনার অংশীদার বটেন। যাঁরা ছোট দল, তাঁরা বড় দলের লেজ, বি টিম, সি টিম। ফলে, তাঁরাও হালুয়ারুটির কানাকড়ি, ভগ্নাংশ, অল্পসল্প পান।

    এবং রাজনৈতিক দলের কেউই, তিনি যে তন্ত্রীই হোন, এই প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করেন নি। এক্সপ্লেইনও করেন নি এতটা ডিটেইলে। তাঁদের প্রয়োজন পড়ে নি। কারণ কী? কারণ, রাজনীতি মানেই হালুয়ারুটি। রাজনীতি মানেই ক্ষমতা। রাজনীতি কথাটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অ্যাকাডেমিক জায়গা থেকেই আপনি দেখেন, অথবা আপনার আক্কেল থেকে দেখেন, আপনি দেখবেন, রাজনীতি মানেই হচ্ছে, মোট ক্ষমতা কে কতটা প্রয়োগ করবে, কার ওপরে প্রয়োগ করবে, ক্ষমতার ভাগাভাগিটা কী হবে, আর যাঁরা ক্ষমতার শিকার হবে, যাঁদের ওপরে ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে, তাঁদের ভাগাভাগিটাই বা কী হবে? এই সংক্রান্ত আইনকানুন-অ্যারেঞ্জমেন্ট সমুদয়ের নামই রাজনীতি। আর কিছুই না। শাদা চোখে তাকিয়ে দেখেন।

    তো, যাঁরা রাজনৈতিক দল করেছেন, তাঁরা তো এই কাজই করেছেন। পাকিস্তান আমলেও করেছেন। ব্রিটিশ আমলেও করেছেন। বাংলাদেশে আমলেও করেছেন। আমরা এখন জ্ঞানী। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক জ্ঞানী। ‘এখন কোথাও আর কোনো কিছু গোপনীয় নাই’। বাংলাদেশের মানুষ গত ৩৫ বছর ধরে নিপীড়িত হয়ে, নির্যাতিত হয়ে, একটা লাভ হয়েছে। হাড়ে হাড়ে সবাই এখন সব জানেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়নও জানেন, ঘটনা কী ভিসির? এখন বঙ্গভবনের পিয়নও জানেন, ইয়াজউদ্দিনের ঘটনা কী। এইটা হচ্ছে লাভ। বাংলাদেশের মানুষ এই কারণে রাজনৈতিক দিক থেকে অসম্ভব জ্ঞানী। এবং এইটা হচ্ছে সব সময়, সব যুগে ক্ষমতাবান মানুষদের জন্য একটা অসুবিধা।

    আমি সেই আলোচনায় আরেক দিন যাব। আমাদের ইচ্ছা আছে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আমরা এক দিন আলোচনা করব। আরেকটা এজেন্ডা। এই সরকারের, সুশীল সমাজের, মিডিয়ার। এবং সময়মতো-বুদ্ধিজীবীদের, যাঁরা সময়ে চুপ, অসময়ে নীরব বা সরব। [দর্শকশ্রোতার হাসি] দুই রকমই। এরা মহা কাব্যিক জিনিস। মহা হেঁয়ালিপূর্ণ জিনিস। রহমস্যময় জিনিস। ঐ নিয়ে অন্য দিন না হয় আলোচনা করব?

    ঐ যে ভিসি নিয়োগ দিয়ে, মঞ্জুরি কমিশন দিয়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিয়ে, পলিটিকাল পার্টি দিয়ে, এবং তার পরে রাজনৈতিক ছাত্রদের দল দিয়ে, আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ফেলেছেন, শুঁড় ঢুকিয়ে দিয়েছেন, পাইপলাইনে খাবার আসছে, পাওয়ার আসছে, প্রেশার আসছে, ভয় আসছে, এবং আপনার লাঠিয়াল-বাহিনী ক্যাম্পাসের মধ্যে আছে, ছাত্রসংগঠনের ক্যাডার–বাহিনী, ক্যাডারপুল, যাঁরা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ক্যাম্পাসের মধ্যে মাস্তানি করবে, সবার আগে তাঁরাই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাইজ করা শুরু করেছিল রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে টিচাররা সবাই ‘লাইনে’ আছেন কিনা, ‘দল, সোজা হবে, আরামে দাঁড়াবে’, এটা আছে কিনা, এইটা দেখার দায়িত্ব ছিল প্রাইমারিলি পলিটিকাল পার্টির ক্যাডার-বাহিনীর। তারা এগুলো দেখতেন এবং টিচাররা যদি কেউ বিশেষ অন্য রকম কিছু করতেন, তখন ওনারাই গিয়ে ‘সাইজ’ করতেন। ভয় দেখিয়ে। হুমকি দেখিয়ে। তারপরে ‘অনুরোধ’ করে, “খুব একটা ভালো হচ্ছে না, স্যার!” এ রকম হুমায়ুন আজাদের লেখায় দেখেছি। প্রাচীন কালে, শিক্ষকের বাসায় গুপ্ত বাহিনীর (গুপ্ত পলিটিকাল পার্টির) লোকেরা কাটা রাইফেল-টাইফেল নিয়ে গিয়ে বলেছে, “লাইনে আসেন, বে-লাইনে লেখালেখি করবেন না”, ইত্যাদি প্রভৃতি।

    পরে এদের সঙ্গে আমাদের মাস্টারদের নিজেদের দল, এমপি, লোকাল এ্যাডমিন্সট্রেশন, পুলিশ-প্রশাসন, মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মঞ্জুরি কমিশন, এবং ভিসি-নিয়োগের শুঁড়-সব মিলে আমরা এই জায়গাটাতে দীর্ঘকাল ধরে, তিল তিল করে, এসে পৌঁছেছি। কোনো মহাপ্রলয়ের কারণে না।

    বুয়েটের দেয়ালের দেয়ালচিত্র; আলোকচিত্র: সৈয়দ মাহামুদুর রহমান

    পিএইচডি-প্রমোশন-রাজনীতি: বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণপ্রথা

    নেক্সট পয়েন্ট হচ্ছে শিক্ষকদের প্রমোশন। প্রমোশনের প্রক্রিয়া। পিএইচডি লাগবে। এইটা হলো তাবিজ। মাদুলি। এই মাদুলি আপনি যদি গলায় একবার পড়েন, আপনাকে জিন-ভুত-দৈত-দানব কেউ ধরতে পারবে না। একবার যদি এই মাদুলিটা আপনি গলায় লাগান, তাহলে আপনি লেকচারার থেকে সহকারী অধ্যাপক হবেন তাড়াতাড়ি। সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হবেন চার-পাঁচ বছর আগেই। অন্যদের তুলনায়। যাঁদের মাদুলি নাই, তাঁদের তুলনায়। ঐ একই তাবিজ দিয়ে। কোনো কমনসেন্স এ রকম বলবে না। যে পড়া দিয়ে তুমি একবার পরীক্ষায় পাশ করেছ, ঐ একই পড়া দিয়ে বারবার পাশ! আশ্চর্য নিয়ম! সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এবং কোনো প্রফেসর এই নিয়ে কথা তোলেন নি। কারও আত্মমর্যাদায় লাগে নি। আমি যে একই ডিগ্রি দিয়ে বারবার পাশ দিচ্ছি, এটা কারও ইজ্জতে লাগে নি। তাঁরা এরকম ইজ্জতওয়ালা প্রফেসর। আর, ঐ পিএইচডির মধ্যে কে কী সৃজন করেছেন, কে কী থিসিস লিখেছেন, সে তো এখন সবাই জানেন।

    পিএইচডি এখন হাসাহাসির জিনিস। এক দিন চারুকলার এক টিচার আমাকে বলছেন গল্প করতে করতে, “এখন তো পিএইচডি অন্য রকম। চাল আর ডাল মিশিয়ে দিয়ে বেছে আলাদা করতে হয়!…পাকা চুল থেকে কাঁচা চুল আলাদা করতে হয়।” উনিই এই দুইটা উদাহরণ দিলেন। আমার বানানো না। এইটার নাম পিএইচডি। এর সাথে মেথডোলজি লাগতে হয়, আর তাত্ত্বিক কাঠামো লাগাতে হয়। তারপর থিসিসটা লিখলেই পাশ। কারণ, সবই তো ‘আমরা আর মামুরা’। দল-টল-নাট-বল্টু-কাঠামো তো রেডিই আছে। আর, কাঠামো যদি রেডি না থাকে, এবং আপনি যদি পিএইচডি-থিসিস জমা দেন, ঐ থিসিস পাশ হবে না। আপনি নিশ্চিত থাকেন। তবে এ রকম এগজাম্পল আদৌ থাকলেও খুব কমই থাকার কথা। অত বড় আহাম্মকি কেউ করে না। আমার জানা নাই, কেউ করেছেন কিনা কখনও। ভবিষ্যতে আমি যদি না করি। [দর্শকশ্রোতার হাসি] কিংবা আরও দুই-একজন যদি না করেন।

    পিএইচডি ছাড়া প্রমোশনের জন্য আর কী লাগে? প্রকাশনা লাগে। জার্নালে গবেষণামূলক প্রবন্ধ। আমি যদি আপনার লোক হই, আর আমি যদি বিচিত্রা পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে থাকি, ঐটা গবেষণা-প্রবন্ধ। আর, আমি যদি আপনার লোক না হয়ে থাকি, আর ঐটা যদি কোনো জার্নালেও ছাপা হয়ে থাকে, তাহলে আপনি বলবেন, ঐটা কী জার্নাল? এই জার্নালের ঠিকানা, কুলজি, এগুলো কী? রিভিউ হয়? হ্যান হয়? ত্যান হয়? আইএসএসএন নম্বর আছে? [মাঝখানে রটে গেল, আইএসএসএন নম্বর থাকলে পরে ঐটা হচ্ছে ‘স্বীকৃত জার্নাল’। কারণ, মাঝখানে অনেকখানি প্যাঁচ খেয়ে গেছে যে ‘স্বীকৃত জার্নাল’ কোনটা? বিচিত্রা? দৈনিক পত্রিকা? নাকি অমুক জার্নাল, তমুক জার্নাল? তখন এই আইএসএসএন-নিয়মটা সাম্প্রতিক সময়ে রটে গিয়েছিল। তার মানে, আইএসএসএন কী জিনিস, খায় না মাথায় দেয়, সেটা আমাদের প্রফেসররা জানেন না! ফলে, হয়তো ওনাদের ধারণা হয়েছে, যে জার্নালে আইএসএসএন নম্বর থাকে, সেইটাই মহা জার্নাল। আইএসএসএন হচ্ছে স্রেফ তালিকাভুক্তকরণের একটা প্রক্রিয়া। আর কিছু না। তালিকাটা সকলের জন্য সুলভ রাখা হয়। গবেষকদের খুব কাজে লাগে। প্যারিসে, ওখানে একটা বিবলিওগ্রাফি টাইপের একটা প্রতিষ্ঠান আছে, যাঁরা চায়, সারা পৃথিবীতে যা কিছু জার্নাল বের হয় সবই তাঁদের নলেজে থাক। পারলে একটা করে কপিসহ। হার্ড অথবা সফট। যেন তাঁদের জানা থাকে পৃথিবীতে কোথায় কী হচ্ছে। ভালো হোক, মন্দ হোক, যা-ই হোক। কিছুই যেন মিস না হয়। তাহলে তাঁদের গবেষণা করতে সুবিধা হয়। এইটা হচ্ছে ওনাদের ভিশন। আর, আমরা এখানে ভাবছি নম্বর পাওয়াটা একটা বিরাট ব্যাপার। অথচ এটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাডার্ড সিরিয়াল নাম্বার। একটা সিরিয়াল নম্বর। আর কিছু না।]

    আমার এক বন্ধু, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার, এখন কানাডাতে ডিগ্রি করছেন, উনি একদিন বলেছিলেন, যখন উনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছিলেন প্রথম, তখন ওনার মনে হয়েছিল, ‘ওরেব্বাপ, এত বড় বড় গাছ! বিশ্ববিদ্যালয় তাহলে কত বড় জিনিস।’ তার পর যখন এক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন, এক সময় তার মনে হলো, গাছ যেরকম বড় হয়, লেকচারররা সেরকম প্রফেসর হয়। ন্যাচারালি। কোনো কিছু অর্জন করা লাগে না নতুন করে। ঐ রিক্রুটমেন্ট হওয়া পর্যন্তই। ঐ ধামাধরা পর্যন্তই। তার পর একবার ঢুকে গেলে, আপনি আজকে লেকচারার আছে, কালকে ‘প্রাকৃতিকভাবে’ প্রফেসর হবেন। অলমোস্ট ন্যাচারালি। খুব মহান উক্তি। আমি একটা কোনো দিন ভুলে যাই না।

    প্রমোশনের মধ্যে আরেকটা রাজনীতি আছে। এখানে একটা বর্ণপ্রথা আছে। চতুর্বর্ণ প্রথা। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র। মেইন চারটা ক্যাটেগরি। প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এবং লেকচারার। চুতর্বর্ণ-প্রথা। যাঁরা লেকচারার, তাঁদের লজ্জার শেষ নাই: ‘আমরা লেকচারার’। [দর্শকশ্রোতাঁদের হাসি] যাঁরা প্রফেসর, তাঁদের ডাঁটের শেষ নাই: ‘আমরা প্রফেসর’। সঙ্গে আবার ড.। ইশকুলে থাকতে আমরা শিখেছিলাম গ্রামারের বইয়ে, কারেকশন শেখার সময়: প্রফেসর এবং ডক্টর এক সঙ্গে লিখতে হয় না। ভুল হয়। ব্যাকরণের ভুল হয়। ‘কিসের ব্যাকরণের ভুল। আমি প-ও আছি, ড-ও আছি, আবার লিখব না! লোকে জানবে না!’

    ফলে, প্রফেসর ডক্টর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। খোদ হিমসেল্ফ। প্রফেসরও লেখেন ‘ডক্টর’ও লেখেন। উনি আমাদের রাষ্ট্রপতি। বহাল আছেন। এখনও আছেন। মাঝখানে বহু কিছু করেছেন। কিন্তু এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। ঐটার নাম হচ্ছে: ‘ইয়াজউদ্দিন সিনড্রোম’। এই বিদ্যার নাম। এত কিছু করার পরেও উনি বহাল তবিয়তে রাষ্ট্রপতি আছে।

    আমাদের প্রথম আলো একটা রিপোর্ট করেছিল। ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ছেলে নাকি সরকারের জায়গায় না কার জায়গায় পেট্রল পাম্প না সিএনসি-র পাম্প বানিয়েছেন, না কী, সব নয়ছয় করেছেন। পাম্পের ছবিও দিল প্রথম আলো। প্রথম পাতায়। তারপর চেপে গেল: না, ইয়াজউদ্দিন নিয়ে এখন বেশি কিছু বলার দরকার নাই। এখন অসময়। ঐটা নিয়ে বলার সময় না।

    দুর্নীতি হয় হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদও হবে। এবং ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ছেলের পাম্পও থাকবে। রিপোর্ট একবার অত বড় করে হয়েও সবাই ভুলে যাবে। ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা খুব জরুরি দরকার। এটা সংবাদপত্র পাঠক হওয়ার জন্য একটা আবশ্যিক শর্ত। আপনি যদি আগের দিনের পত্রিকা ভুলে না যান, তাহলে পরের দিন অত বড় পত্রিকা, ২৪ পাতা, আবার কেমন করে পড়বেন? আগের দিনটা ভুলে যেতে হয়। এটা ‘নিয়ম’ আছে। তবু, আলোচ্য প্রাণীটা যেহেতু মানুষ, তাই কিছু কিছু বেয়াড়া লোকের স্মৃতি বেয়াড়াভাবে তাজা থাকবে, এবং বেয়াড়া জায়গায় বেয়াড়া কথা মনে পড়েও যাবে। এবং তারা সেটা বলবেও। চাইলে আপনি-আমি যে কেউই এ রকম অতীব প্রয়োজনীয় বেয়াড়ামি করতে পারি। করাটা দরকার। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদ্য-পদত্যাগী উপদেষ্টা (তার মানে অথেনটিক পার্সন, অ্যান অথরিটি টু বি কোটেড) সুলতানা কামাল সেদিন বলেছেন, যে মেয়েরা, যে নারীরা সমাজে ‘বেয়াদবি’ করেছেন, তাঁরাই কিছু একটা হতে পেরেছেন। তার মানে, ‘বেয়াদব জিন্দাবাদ’। ‘বেয়াদবি’ই রীতি হওয়া উচিত। তো, এভাবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বেয়াদবি এখন ‘অনুমোদিত’ হলো। তাই না? ঘটনা সত্য। তাঁরা সব কথা ঠিক বলেন না, কিছু কিছু কথা ঠিক বলেন। যেগুলো ঠিক বলেন, সেগুলো বাঁধিয়ে রাখা উচিত। [দর্শকশ্রোতার হাসি]

    তারপর, ধরেন, অ্যাজাম্পশন বা অনুমানটা হচ্ছে, বুড়ো হওয়া মানে জ্ঞানী হওয়া। আপনি যা-ই-হন, এবং যা-ই করেন। সারা বছর কী লিখেছেন না লিখেছেন তা দেখার দরকার নাই। কী ধরনের জীবন যাপন করছেন, তাও জানার দরকার নাই। প্রবীণ মানে প্রাজ্ঞ। তারপর ধরেন যে প্রমোশনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বলার কিছুই নাই। আমি কেমন পড়াই, সবচাইতে বেশি কে বোঝে? আমার ক্লাসরুম। হাড়ে হাড়ে বোঝে। এবং মানুষের বাচ্চা তো, এগেইন, অদ্ভুত প্রাণী এইটা। ক্রিয়েটিভ। জন্মসূত্রে ক্রিয়েটিভ। এর পক্ষে নন-ক্রিয়েটিভ হওয়া সম্ভব না। নন-ক্রিয়েটিভ হওয়া সম্ভব, ইফ ওনলি দেয়ার হ্যাজ বিন এ ভেরি লং হার্ড ট্রেনিং।

    লম্বা ট্রেনিং আমরা পাই। ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত এ ট্রেনিং। মাথা কেমন করে না খাটাতে হয়। চিন্তা কেমন করে না করতে হয়। তিন পাতা পড়ে কেমন করে না বুঝতে হয়। বাবা-মা অথবা টিউশনির টিচার দাগিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত কেমন করে অবুঝ থাকতে হয়। তাই না? এ রকম আরও অনেক কিছু। কেমন করে অনুগত হতে হয়। কেমন করে শুধু অনুকরণ করতে হয় (কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এটাকে বলেন ‘হনুকরণ’; হনুমান আর অনুকরণ মিলিয়ে)। এগুলোর লম্বা ট্রেনিং আমাদের আছে। এ প্রসঙ্গে আমি একটু আসব আবার পরে।

    তো, আমার এই মানুষের বাচ্চারা, ক্লাসরুমের মেম্বাররা, পণ্ডিত হোক বা না হোক, টের পায়। কোন মাস্টার পড়ে এসেছে। কোন মাস্টার পড়ে আসে নি। কোন মাস্টার পড়া বুঝে পড়াচ্ছে। কোন মাস্টার পড়া না বুঝে পড়াচ্ছে। টের পায়। কিন্তু, তাঁদের বলার কিছু নাই। ক্লাসরুম পারফর্মেন্স তো প্রধান জিনিস- মাস্টারির। ফলে, শিক্ষকদের প্রমোশনে এর একটা বড় রোল থাকা উচিত।

    বাস্তব কিছু অসুবিধাও আছে। টিচার হওয়ার পরে প্রথম দিকে আমাকে এক সঙ্গে নয়টা কোর্স পড়াতে হতো। প্রতি ব্যাচে নয়খান কোর্স আমি একা পড়াতাম। সর্বোচ্চ-আমার ডিপার্টমেন্টে। সর্বনিম্নরাও পাঁচটার নিচে কেউ নন। তার পরে ধরেন, সারা বছর শুধু ক্লাস ক্লাস ক্লাস ক্লাস। পরীক্ষা পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে চোর-পুলিশ খেলা। তার পর খাতা দেখা খাতা দেখা। ট্যাবুলেশন ট্যাবুলেশন। সাধারণ লেখালেখি করার, বিশেষত প্রবন্ধ লেখার, গবেষণা করার, একটা বই লেখার সুযোগ নাই। একমাত্র সুযোগ আছে আপনি কয়েক বছর ছুটি পাবেন-স্টাডি লিভ। পিএইচডি করবেন- ঐ জন্য ছুটি। একবার পিএইচডি করে ফেলতে পারলে, ব্যস, বাকি জীবন আর পড়াশোনা করার দরকার নাই। সুযোগও নাই বাস্তবে। এইগুলো আমাদের ভাবা উচিত-সংস্কারওয়ালাদের। টিচারদেরকে পড়াশোনা করার জন্য টাইম দিতে হবে। টিচিঙের জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ করতে হবে। রিসার্চের নিয়োগ এবং টিচিঙের নিয়োগ আলাদা করতে হবে। আমি তিন বছর ক্লাসে পড়াব। তার পর চাইলে আমি যেন তিন বছর গবেষণা করতে পারি, তেমন ব্যবস্থা দরকার। ওটাই আমার টিচার হিসেবে কাজ। শুধু পিএইচডি না।

    তো এইভাবে আমাদের শিক্ষক-নিয়োগ, আমাদের প্রমোশন, আমাদের লাল-নীল দল, শিক্ষক-নির্বাচন, এ সমস্ত কিছু মিলে আমরা একবার যখন এই ধরনের লোকেরা প্রমোশন পেতে পেতে, নিযুক্ত হতে হতে, প্রফেসর হয়ে যাই, আমাদের মতো লোকদেরকে দিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভরে যায়, তখন গরুত্বই মানদণ্ড হয়, গুরুত্ব শেষ-শিক্ষার।

    বাজার, নৈরাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়

    তার পর ধরেন, টিচারদের টাকাপয়সা কামানোর ধান্দা। খ্যাপ মারার ধান্দা। কাউন্সেলিং-কনসালটেশান এগুলো করা। নানান জায়গা থেকে টাকা পাওয়ার অবিরাম চেষ্টা করা। এগুলো আছে। সবাই জানে। সবাই বলছে। টিআইবি রিপোর্ট বের করেছে। প্রফেসর ইয়াহিয়া। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। ওনার নাম দেখেছি পত্রিকায় আমি। উনি একটা গবেষণা করেছেন। টিআইবির পক্ষ থেকে গবেষণা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচাররা কিভাবে কিভাবে ক্লাস নেয় না। অন্য অন্য কাজ করে। আরও অনেক এ রকম গবেষণা নিশ্চয়ই আছে। গবেষণা লাগেও না। ঘটনা সত্য।

    টিচারদের তো বেতনভাতা আসলেই কম। টিচাররা অনেক কম বেতন পান। তাঁরা তো বাড়তি টাকার জন্য দৌড়াদৌড়ি করবেনই। শিক্ষকদের বেতন আপনাকে সর্বোচ্চ করতে হবে সমাজে। সর্বোচ্চ মর্যাদা আপনাকে দিতে হবে টিচারদেরকে। প্রাইমারি স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি না এক্ষেত্রে। প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত টিচারদের হায়েস্ট পেইড হতে হবে। তা যদি না হয়, আপনি শিক্ষার মর্যাদা কী দিয়ে দেবেন? মুখে মুখে মর্যাদা দেবেন?

    আপনি সমাজের আদর্শ বানাবেন টাকা কামাই করাকে, সম্মান-মর্যাদা মানে তো তখন টাকা। ক্ষমতা মানেই মর্যাদা। টাকা মানেই ক্ষমতা। গোটা সমাজের আদর্শ হচ্ছে; যেমন তেমন করে যেভাবে পার ড্রইংরুমে দোকান খোলো বেডরুমে ঘুমাও, তা-ও দুইটা পয়সা কামাও। ঘরে ঘরে দোকান বানাও। দোকানদারি ছাড়া কিছু নাই। বাজার ছাড়া কিছু নাই। বেচাকেনা ছাড়া কিছু নাই। টাকা পয়সা কামাই করা ছাড়া কিছু নাই। গোটা সমাজে এটা অ্যাকসেপ্টেড। এটা সেলিব্রেটেড। এটা উদযাপিত, স্বীকৃত। যখন অবস্থা এ রকম, তখন টিচাররা আপনার টাকাপয়সার জন্য কোনো চিন্তা করবে না, এ রকম মনে করা তো ঠিক না। ফলে, তাঁরা করবেন। [না করার যেকোনো উপায়ই নাই, তা তো অবশ্যই নয়। গা ভাসানো ছাড়া পথ আছে বৈকি! কিন্তু কী আর করা।]

    এখন টাকা যদি হয়, ছাত্র সালাম দেয়, পিয়ন সালাম দেয়, কর্মচারী সালাম দেয়, রিকশাওয়ালা সালাম দেয়। টাকা যদি না হয়, কারও কাছে আপনি গুরুত্ব পান না। দোকানদাররাও সালাম দেয় না। আপনি দোকনে [গিয়ে] দাঁড়িয়ে থাকবেন, অনেকক্ষণ পর আপনাকে বলবে, ‘কী চাই?’ বাস্তব। সাহেব বাজারে যান। কাজলায় যান। এই হচ্ছে অবস্থা।

    তো, এর নাম হচ্ছে অবক্ষয়। এর নাম হচ্ছে মাৎসন্যায়। এর নাম কিন্তু নৈরাজ্য না। তকদির সাহেবরা, আর ও অনেকেই, প্রায় সাবই, ‘নৈরাজ্য’ ‘নৈরাজ্য’ করে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছেন। শিক্ষায় নৈরাজ্য। সমাজে নৈরাজ্য। প্রশাসনে নৈরাজ্য। রাজনীতিতে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য আসলে অন্য জিনিস। নৈরাজ্য মানে স্বাধীনতা। যেখানে রাজ্য নাই। যেখানে আপনার ওপরে বস নাই। রাজা নাই। রাজাবিহীন সমাজ- তার নাম হচ্ছে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য করতে অনেক উন্নত সমাজ লাগে। সেখানে সবলোকে রাজা হয়। কোনো একজন লোককে রাজ হতে হয় না।

    তার নাম নৈরাজ্য। থানা-পুলিশ লাগে না যেখানে। যেখানে উঠতে-বসতে আপনার আইনকানুন লাগে না। যেখানে লোকেরা নিজেরা নিজেদেরকে পরিচালনা করে। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। এখনও পর্যন্ত এ রকম সমাজ আমরা পৃথিবীতে দেখি নি কোথাও। আদি গ্রিক ভাষায় ‘অ্যানার্ক’ মানে ‘উইদাউট অ্যান আর্ক’। ‘আর্ক’ বলতে শাসক, রাজা। শাসক ছাড়া, রাজা ছাড়া সমাজ অ্যানার্কি। ফলে, আমাদের সমাজের যে অবস্থার কথা বলছিলাম, তার নাম নৈরাজ্য না। এর নাম আপনি বড়জোর বলতে পারেন বিশৃঙ্খলা। এর নাম মাৎসন্যায়। এর নাম অবক্ষয়। এর নাম ধস।

    এই জিনিসের মধ্যে গোটা সমাজ পড়েছে। টিচাররাও পড়েছেন। টিচারদেরকে আপনি যদি এর থেকে বের করে আনতে চান, টাকা কামানোর ধান্দা থেকে সরিয়ে আনতে চান, তাহলে আপনাকে ঠিক করতে হবে, গোটা সমাজ কিভাবে চলবে। গোটা সমাজের আদর্শ কী হবে। বাজার? নাকি শিক্ষা। শিক্ষাদীক্ষা মূল্যবোধ এ সব আপনার আদর্শ হবে- জীবনের? নাকি, যেন তেন উপায়ে টাকা কামাই করা, বাজারি জীবনযাপন করাটা আদর্শ হবে? এটা আপনাকে ঠিক করতে হবে তো। সমাজটা কি দোকান হবে? গোটা সমাজ কি বাজার হয়ে যাবে? নাকি সমাজটা মানুষের হবে? সমস্ত মানুষ কি স্রেফ ক্রেতা হবে? বিক্রেতা হবে? নাকি সমস্ত মানুষ মানুষ থাকবে? যাঁরা সমাজে ব্যবস্থাপক, যাঁরা রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক, তাঁদেরকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই আলাপটা কেউ তুলছেন না। ঐ আলাপ যাঁরা তুলছেন না, তাঁরা দয়া করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কার নিয়েও আলাপ করবেন না। কোনো কাজে আসবে না।

    নেক্সট পয়েন্ট শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক।

    শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক

    সামনে ‘সালাম’। পেছনে ‘শালা’। এই তো এক কথায়। আমার সময়েও দেখেছি, যখন আমি ছাত্র ছিলাম। টিচারদেরকে সামনে দেখা হলে পরেই ‘স্লামালেকুম স্যার’, পিছনে সিগারেটের ধোঁয়া উঠছে। আর, সামনে চলে গেলে পরেই ‘শালা, বদমাইশ, ক্লাস নেয় না’। আমি বলেছি প্রচুর। আমি। মাইসেল্ফ। প্রচুর বলেছি। কেন বলব না? ছাত্ররা এখনও বলে। কেন বলবে না? অবশ্যই বলবে। সামনে বলতে পারে না বলে পেছনেও বলবে না! এ হলো সম্পর্ক।

    আর, আমি টিচার। আমি কী? গম্ভীর। আমি কী? বস। আমি হচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজা। ছাত্ররা কী? প্রজা। কর্মচারী। সুতরাং, আমি গম্ভীর স্বর ছাড়া কথা বলব না। [দর্শকশ্রোতার হাসি] ঐ স্বর যদি না দেই, তাহলে আমার রাজত্ব থাকে না। আমি যদি ঘন ঘন হাসি, আর ছাত্রদের সাথে যদি অবাধে, বন্ধুর মতো, বাস্তবিকই সাবালক দুজন মানুষের মতো, মিশি [সেটাই উচিত],  তাহলে পরে তো আমার রাজত্ব শেষ। ছাত্ররা বুঝে ফেলবে যে আমার পেট খালি। পেটে বিদ্যা নাই [হাসি]। কলসি ঠনঠন। বুঝে ফেলবে। এ এক আতঙ্ক! যার যেটা যত আতঙ্ক, তারই সেটাতে তত বেশি গর্জন। ক্লাসরুমে। এবং বাইরেও। সে নিজে আতঙ্কিত। সেই কারণে তার কাজ হচ্ছে ছাত্রদেরকেও আতঙ্কিত রাখা যে [গম্ভীর স্বরে] “খবরদার! আমি কিন্তু বাদশাহ নওয়াবজাদা অমুক, এই শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে, সুতরাং….”। এই হচ্ছে আমাদের সম্পর্ক।

    এই যদি সম্পর্ক হয়, পড়াশোনাটা কেমন করে হবে? আর যাই হোক, পড়াশোনাটা কেমন করে হবে? আমাদের দেশে সাধনার ধারা আছে। প্রাচীন কাল থেকে, হ্যাঁ। বুদ্ধ ধারা। গোপন ধারা। যার অনেকাংশ গোপন। আজকে যার একটা বড় অংশ লালনদের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত। বাউলদের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। সুফি সাধনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। আগে তান্ত্রিকরাও ছিলেন। এখনও আছেন বৈকি। তার আগে বৌদ্ধ সহজিয়ারা, সাধকরা ছিলেন। ভিক্ষুরা ছিলেন। তাঁরা হাজার বছর আমাদের সমাজে ‘রাজত্ব’ করেছেন। দাপটের সঙ্গে ছিলেন। সেখান পর্যন্ত, গুপ্ত আচারে পর্যন্ত, বৌদ্ধ গুরু তাঁর যে শিষ্য হতো (যে শিষ্য তখনও এবং এখনও গুরুকে মনে করে লর্ড, গুরুমে মনে করে আল্লাহ) সেই শিষ্যকে নিজের সমান মর্যাদা দিতেন।

    ফরহাদ মাজহারের (তার সঙ্গে আমার বহু মতপার্থক্য আছে; তারপর, তার কারণে আমার বহু সমালোচনা ছিল, হয়তো আছেও; সেগুলো অন্য প্রসঙ্গ; কিন্তু তার বহু ভালো দিকও আমি সবিনয়ে অ্যাক্সেপ্ট করি; শিখেছি অনেক জিনিস, না বলে উপায় নাই। আরও অন্য অনেকের বেলায়ও ঘটনা তাই। আমার গুরুর ঠিক নাই, অজস্র গুরু আমার, যদিও আমি কারও অধস্তন শিষ্য নই), তো ফরহাদ মজহারের একটা কবিতার চরণ আছে: “গুরুকে প্রণাম করি, এই বঙ্গে গুরুই ঈশ্বর”। এইটা হচ্ছে আমাদের সাধনার ধারা, গত এক হাজার বছরে যে গুরু হচ্ছে আল্লাহ হিমসেল্ফ। এইটা আমাদের সুফি-সাধকরা মনে করেন। ভেতরে ঢুকে খবর নিয়ে দেখবেন। তবে, বৌদ্ধ গুরুদের যে কথাটা বলছি, সেখানে পর্যন্ত (ভিক্ষুক-সঙ্ঘে) গুরু এবং শিষ্যের সমান ভোট দেওয়ার অধিকার থাকত। এবং গুরু শিষ্যকে যেমন চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন, শিষ্যও গুরুকে তেমনি চ্যালেঞ্জ করতে পারতেন। যুক্তিতে। তর্কে। [গুরুর মতের এমনকি যুক্তিপূর্ণ বিরুদ্ধাচরণকে পর্যন্ত অনুমোদন করা হতো। শিষ্যের কাছে হার মানতে শিখতে এইসব মহাগুরুদের কোনো অসুবিধা হতো না।] আর এখানে? আমি গুরু আপনি শিষ্য- ঐ যে বললাম, রাজা আর প্রজা।

    তাহলে লেখাপড়া কিভাবে হবে? আমি যুক্তি নির্ণয় কেমন করে করব? আমি বই লিখলাম। বাই ভালো হলো না খারাপ হলো কে বলবে? আপনি যদি না বলেন? আপনি জ্ঞানী লোকদের বই দেখেন। আপনি প্লেটোর অ্যাকাডেমিক খবর নিয়েন। অ্যারিস্টটলের লাইসিয়ামের খবর নিয়েন। ওদের দেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের খবর নিয়েন। এখনও ঐ বাইরের দেশের টিচারদের বই দেখেন। বইয়ের প্রথম ড্রাফট পড়েছে তার ছাত্ররা। তাঁরা মতামত দিয়েছে। সবার আগে।

    পয়লা মে [২০০৭] দেখলাম, ইমামউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। প্রাক্তন আমলা। উনি স্মৃতিকথা লিখেছেন। “আমার অভিজ্ঞতায় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক”। পয়লা মে। প্রথম আলো। পৃষ্ঠা ১১। আমি জাস্ট একটা এগজাম্পল হিসেবে বলছি আর কি। তো, উনি ওখানে লিখেছেন, ওনাদের ছোটবেলায়, ওনাদের স্মৃতিতে, ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্পর্ক কেমন ছিল।

    তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গ

    [সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের একজনের প্রশ্ন: “নামটা কি ইমাম না ইনাম?”] ইনাম না। ইনি হচ্ছেন ইমাম। ইনাম একজন নিয়মিত লেখেন। [কপট গম্ভীর গলায়] উনি লেখেন বড় কলাম। প্রথম আলোতে তিন ক্যাটেগরির কলামিস্ট আছেন। এক ক্যাটেগরির কলামিস্ট হলেন, ‘তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবী’। বড় বুদ্ধিজীবী। ওনাদের কলাম যত বড় ইচ্ছা, ওনারা তত বড় লিখতে পারেন। কোনো অসুবিধা নাই। উপর থেকে তলা পর্যন্ত কলাম দৌড়াবে। সমস্যা নাই। এটা প্রথম ক্যাটেগরি। দ্বিতীয় ক্যাটেগরি: প্রথম আলোর যাঁরা নিজেদের সাংবাদিক, কিন্তু প্রথম আলোর পরিচয়ে লেখেন না। লেখেন ‘সাংবাদিক’। ওনারা মোটামোটি বারোশ, তেরোশ শব্দ লিখবেন। আমি কলামের মাপ দেখে এটা আন্দাজ করে বলছি। এটা কমবেশি হতে পারে। আচ্ছা। নেক্সট হলো: ‘ছয়শ শব্দের বুদ্ধিজীবী’। সিক্স হ্যান্ড্রেড ওয়ার্ডস ইন্টেলেকচুয়াল। এদের মধ্যে পড়েন ইমাম সাহেব। [হাত দিয়ে কলামের দৈর্ঘ্যে মাপ দেখিয়ে] এতটুক। তিন-সাড়ে তিন ইঞ্চি, তিন কলাম। তার বেশি না। ওনারা বলে দেন: “আপনার লেখা ছয়শ শব্দের মধ্যে লিখে দিতে হবে”। কখনও কখনও আমাকেও বলেছেন। “অমুক বিষয়ে একটা লেখা দিতে পারবেন?” আমি বলেছি, “হ্যাঁ, পারব।” তখন বলে দিল: “ছয়শ শব্দের মধ্যে লিখে দিতে হবে”। আমি বললাম, “আমি নাই। আমি অত কম লিখতে পারি না। আমার জ্ঞান আরেকটু বেশি।” [দর্শকশ্রোতার হাসি] এই তিনটি ক্যাটেগরির ইন্টেলেকচুয়ালরা প্রথম আলোতে লেখেন। ইনি [ইমাম] থার্ড ক্যাটেগরির। ইনাম সাহেব ফার্স্ট ক্যাটেগরির। ওনার ছবি থাকে। ওনার কলামের ব্যানার আছে। লক্ষণ আছে: ওনার জাত আলাদা। উচ্চ জাত। ‘তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবী’- আমি নাম দিয়েছি। প্রথম আলোর এবং ‘সুশীল সমাজ’-এর তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবী। এটার নাম হচ্ছে ‘লিস্টেড ইন্টেলেকচুয়াল সিন্ড্রোম’। সুযোগ-সুবিধা পেলে একদিন শুধু এই নামেই, এই নিয়ে আলাপ করা যাবে। বিস্তারিত। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তির একটা প্রধান সিন্ড্রোম। আমাদের মাথার অসুখের রোগলক্ষণ। আচ্ছ।

    তো, ইমাম সাহেব বলছিলেন যে ওনার ছোটবেলায় স্কুলে উনি উচ্চতর গণিত ফোর্থ সাবজেক্ট হিসেবে নেবেন, নাকি পাবলিক এ্যাডমিন্সট্রেশন নেবেন এই নিয়ে দুই টিচারের মধ্যে রেষারেষি। ইতিবাচক রেষারেষি। ইনি বলেন যে তুমি পাবলিক এ্যাডমিন্সট্রেশন নাও। আমি এটা পড়াই। আমি ভালো পড়াই। তোমাকে আরও ভালো করে পড়াব। তুমি এটা পড়লে ভালো করতে পারবা। তোমার তো রেজাল্ট এমিনতে ভালো। আরেক জন ওদিকে উচ্চতর গণিত নিয়ে। উনি অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন। উনি বলছেন, তুমি অঙ্কে নিরানব্বই পেয়েছ। তুমি কেন পাবলিক এ্যাডমিন্সট্রেশন পড়বে? তুমি উচ্চতর গণিত নিও। এই নিয়ে টানাটানি করতে করতে দেখা গেলা যুদ্ধ লেগে গেল। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার। তারপর দেখা গেল স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। উনি গণিত নিয়েছিলেন। পরে দেখলেন যে বিপদ। তখন ঐ টিচার এসে বললেন, দেখ, এখনও সময় আছে। পাবলিক অ্যাড নাও। পড়ার টাইম কিন্তু নাই। তোমার মূল গণিতই কিন্তু এখনও পড়া হয় নি। উচ্চতর গণিত কখন করবা? এই শুনে অঙ্কের টিচার দৌড়ায় আসলেন। এত বড় কথা! আমি তোমাকে বাসায় প্রতি দিন পড়াব। কিন্তু তোমাকে উচ্চতর গণিতই নিতে হবে। তারপর ঐ টিচার বাসায় কয়েক মাস নিয়মিত আসলেন। প্রতিদিন। এবং ঐ ছেলেকে পড়ালেন। বিনা পয়সায়।

    খুব মহৎ। খুব সুন্দর। খুব ভালো একটা স্মৃতি। তাই ছিল অবস্থা। ঠিক না? এ রকম কথা আপনি অনেক পাবেন। অনেক স্মৃতি পাবেন। বাস্তব। এর রকম হওয়া উচিত। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যাল পর্যন্ত। সে রকম এখন নাই। উনি দুঃখ করে বলেছেন। কেন নাই? সেইটা বলা দরকার। সেইটা লোকেট করা দরকার। সাথে এটাও খেয়াল রাখা দরকার যে এ রকম টিচার, ঐ রকম ছাত্র এখনও হয়তো কোথাও কোথাও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও আছে। কিন্তু আমরা ধরে নিয়েছি। কোথাও কিছু নাই।

    নেক্সট পয়েন্ট। শিক্ষার্থীদের অবস্থা। আমি এতক্ষন যে আলোচনাগুলো করেছি। এতক্ষণ যে আলোচনা হলো, সবই কিন্তু শিক্ষকদের জায়গা থেকে। শিক্ষার্থীদের অবস্থাটা কী।

    শিল্পী: মিমো পালাদিনো

    শিক্ষার্থীদের অবস্থা: হাই-কমান্ডের জন্য জীবন যাপন

    শিক্ষার্থীরা হচ্ছেন প্রতিক্রিয়াশীল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এঁরা নিজেরা নিজেদের উদ্যোগে তেমন কিছু করেন না। প্রতিক্রিয়া করেন। ক্রিয়া যা করার মাস্টাররা করেন, কেরানিরা করেন। শিক্ষার্থীরা শুধু পরিস্থিতির শিকার হন। কবীর সুমনের গান কি আপনারা শোনেন? “এইখানে শিকার বোধ হয়, বসে থাকে শিকারীর খোঁজে”। ভিকটিম হতে থাকেন তাঁরা। কোথাও তাঁদের কথা বলার উপায় নাই। কথা বললেই শেষে সেকেন্ড-ক্লাসটাও যদি না থাকে। কথা বললে পরে সেকেন্ড-ক্লাসটা যদি মরা সেকেন্ড-ক্লাস হয়ে যায়! ফর্টি ফাইভ পার্সেন্ট। তার মানে তো প্রায় থার্ডক্লাস! জাত নাই ঐ সেকেন্ড-ক্লাসের। ফলে, শিক্ষার্থীদের, প্রায় কোথাও কিছু করার নাই।

    আর ঐ যে একটু আগে বললাম: ট্রেনিং। লম্বা ট্রেনিং। কঠোর ট্রেনিং। ক্লাস ওয়ান থেকে মাস্টার্স। মাথা না খাটানোর। চিন্তা না করার। অনুগত হওয়ার। পড়ে না বোঝার। নিজে নিজে লিখতে না পারার। ঐ লম্বা এইসব ট্রেনিং শেষ করে আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হন। তার পরে, প্রথম বছরটা পার করতে না করতেই টের পেয়ে যান, পড়াশোনা করার আদৌ কোনো দরকার নাই। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখানে পড়াশোনা করার বিশেষ কোনো ব্যাধি দেখা দেয় না। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনমতো চ্যালেঞ্জ করার কিংবা বেয়াদবি করার  (যে বেয়াদবি এ্যাপ্রুভড বাই সুলতানা কামাল, আমি আবার বলছি) কোনো লক্ষণ দেখি না।

    যে শিক্ষার্থীরা বলেন বিপ্লব করবেন, সমাজতন্ত্র করবেন, ইসলামি সমাজ কায়েম করবেন, জীবন দিয়ে দেবেন; ঐ শিক্ষার্থীদেরকেও তো দেখি শেষমেশ ঐ লেফট-রাইট-ই করতে! লেফট-রাইট, লেফট-রাইট, লেফট। পার্টির হাই-কমান্ড যা বলেন, এঁরা সেটুকুই বোঝেন। তার বাইরে কিছু বোঝেন না। একবার একটা মত শিখে ফেলেন। মতাদর্শ। অমুক বাদ। তমুক তন্ত্র। ব্যস। হয়ে গেল। ঐ তন্ত্রটা আদৌ কী জিনিস, মতবাদটাই বা আসল কোথা থেকে, কী ব্যাপার, এসব নিয়ে তদন্ত করে দেখার কোনো আগ্রহ দেখি না। তলিয়ে দেখার মতো হয়তো কিছুই নাই।

    আল্লাহ-রসুলের নামে স্লোগান দিচ্ছি। মার্ক্সের নামে স্লোগান দিচ্ছি। “সর্বহারার মতবাদ, মার্ক্সবাদ- লেনিনবাদ।” “নো ইস্ট নো ওয়েস্ট, ইসলাম ইস দ্য বেস্ট।” এ রকম ইসলামপন্থী, মার্ক্সপন্থী, নানান পন্থী লোকেরা আছেন। যাঁরা কার্ল মার্ক্সের আশপাশ দিয়ে জীবনে কোনোদিন হাঁটেন নাই। মার্ক্স দু’পাতা উল্টিয়ে দেখেন নাই। যিনি দেখেছেন, দেখে বুঝে ফেলেছেন যে ওটা দেখা যাবে না। ওটা বোঝা যাবে না। কিংবা কোরআন শরিফ নাড়াচাড়া করেন নাই। হাদিসের বইও নিয়ে পড়াশোনা করে দেখেন নাই। বড়জোড় হয়তো মওদুদীর বা আর কারও এ রকম বই থেকে কিছু কোটেশান পড়া আছে। সেই কোটেশানও নিজে মওদুদীর বই নিজে হাতে উল্টায়ে খুঁজে বের করেছেন যে তা-ও না। নেতারা যে কোটেশান দিয়েছেন, ঐ কোটেশান। আর, বামওয়ালাদের পকেটে তো কোটেশানের বই-ই ছিল। রেডবুক। মাও সে তুঙের। চেয়ারম্যান মাওয়ের পকেট-মাপের উদ্ধৃতি-গ্রন্থ। এ বুক অফ কোটেশানস। মাও সে তুঙের হাদিস। চীন সরকারের সরকারি প্রকাশনা। আপনাকে আর মাও সে তুঙের গোটা গোটা বই পড়তে হবে না। মাও সে তুঙের হাসিদ পড়। এতটুক এতটুক কোটেশান। ঐ পড়লেই হবে।

    এ হচ্ছে আনুগত্য। এই হচ্ছে লেফট-রাইট করা। এ হচ্ছে হাই-কমান্ডের জন্য জীবনযাপন করা। এই দিয়ে নাকি সমাজতন্ত্র হবে! সমাজতন্ত্র: ‘মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ’। ওনারাই বলেন। কার্ল মার্ক্স লিখেছেন। তো মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ হবে কি লেফট-রাইট করে? মার্চ-পাস্ট করে? স্রেফ অনুগত হয়ে? কোনো প্রশ্ন না করে? প্রশ্নাতীতভাবে? মানুষ না হয়ে? সৃজনশীলতার যিনি চর্চা করেন না, প্রশ্ন যিনি করেন না, তিনি কিসের মুক্ত মানুষ? নিজে যিনি একেবারে ঝাড়া-হাত-পা ‘চিন্তাভাবনা-মুক্ত মানুষ’, পার্টির থিওরি আর বক্তৃতা যাঁকে মুখস্থ করতে হয়, নকল করতে হয়, তিনি গড়বেন উন্নত সমাজ? বিদ্রোহী নন যিনি, জীবনে কখনও বিদ্রোহ করেন নি যিনি, তিনি হবেন বিপ্লবী? নিতান্তই হাসির কথা।

    তো, শিক্ষার্থীদের মাঝে আমরা দেখি এই রকম। পঙ্গুত্ব। পরনির্ভরশীলতা। আনুগত্য। অনুকরণ। তদবিরের ট্রেনিং। ঝোপ বুঝে দুই রকম কোপ মারা। সময় বুঝে হম্বিতম্বি। আর, ‘সময় বুঝে প্রাজ্ঞ-ভাবুক অনেকে নিশ্চুপ’।

    এগুলো হচ্ছে শিক্ষার্থী-সমাজের বৈশিষ্ট্য। বলতে আমার খারাপ লাগছে। শিক্ষকদের বেলায় এই খারাপটা লাগে নাই। শিক্ষার্থীদের বেলায় লাগছে। এটা দুঃখের বেশি। শিক্ষকরা তো পেকেই গিয়েছে। একেবারে পরিপক্ক হয়ে গেছেন। আর কী? গাছ থেকে ঝরে পড়ার অপেক্ষা। পচে যাওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু, শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু করার আছে। এখনও তাঁরা পচেন নি। পরিবর্তন তাঁদের হাত ধরেই আসতে পারে। এই জন্য দুঃখ। তাঁরাই যদি এমন অন্ধ হন, আর আনুগত্যপরায়ণ হন, তাহলে আর থাকেটা কী একটা জনগোষ্ঠর জীবেন? এবং তার মধ্যে আবার সবচাইতে যাঁরা বিপ্লবী (কি ডান বিপ্লবী কি বাম বিপ্লবী) তাঁদের যদি এই হাল হয়, তাইলে আর কী থাকে, বলেন? হাতে হারিকেন, লাল বাত্তি, ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া?

    সাধারণত শিক্ষার্থীরা সক্রিয় নন, নিষ্ক্রিয়। মাস্টার বলেন, ওঁরা করেন। কেরানি-অফিসারগণ বলে, ওঁরা করেন। ঘুষ চায়, ওরা ঘুষ দেয়। শিক্ষকরা অপকর্ম করেন, ওঁরা শুধু দেখে যান, সহ্য করে যান। [বদরে মুনীরের কবিতার মতন: “আমার কেবল দ্রষ্টার অধিকার, দেখে দেখে ছবি এঁকেছি চাহিদা মতো”।] কিন্তু, এছাড়াও আছে। সক্রিয়তা আছে। হা হুতাশ করা। দুঃখ করা। আর গালাগালি দেওয়া। এগুলাও ইতিবাচক। ওগুলোতে প্রমাণিত হয় যে না, …. কিছু আছে। এত যে অন্ধকার, তার মধ্যে সক্রিয়তাটুকুও আছে। যে সমাজে কিচ্ছু থাকে না, সেখানে যদি হা-হুতাশ থাকে, তাহলেও অনেক শুকরিয়া। অন্তত ফোঁস ফোঁস শোনা যাবে তো! দীর্ঘ নিশ্বাস। ঐটুকু শোনা গেলেও ভালো। আশা থাকে: এ দীর্ঘশ্বাস থেকে পরে কিছু হবে। ঝড় অথবা সুবাতাস। কিছু একটা হবে।

    আর্টওয়ার্ক: প্রিজনার অব ওয়ার
    শিল্পী: বারখাৎকভ
    সূত্র: সিঙ্গুলা আর্ট

    স্বাধীনতাটুকুই বিশ্ববিদ্যালয়

    ছাত্ররা আর কী করে? সারা জীবন ধরে স্মৃতিচারণা করে। ওমুক স্যার ভালো ছিল, তমুক স্যার খারাপ ছিল। সারা জীবন ধরে আমি দেখেছি। বুড়োদের দেখেছি, আমাদের দেখেছি, ছোটদেরকেও দেখছি। স্মৃতিচারণ আর স্মৃতিচারণ। মুগ্ধতার স্মৃতিচারণ। গালাগালির স্মৃতি চারণ। ঐ শালার জন্য আমি সেকেন্ড-ক্লাসটা পাইলাম না! আর অমুক স্যার, আহা, কত সুন্দরভাবে হাসে! এই থেকে শুরু করে অনেক কিছু। ঐ টুকুই ভালো। টিচাররা যদি একদিনও ভালোভাবে কথা বলে থাকে, ঐটা সারা জীবনের স্মৃতি। তার মানেটা কী?

    এটাই তো স্বাভাবিক। ছাত্রদের এই কর্মে তো কোনো দোষ নাই। কারণ টিচাররা, তাঁদের মডেল। টিচাররা তাঁদের আইডিয়াল। রোল মডেল। এটা স্বাভাবিক। ফলে তাঁরা যে খারাপ করেছেন, ঐটাও তাঁদের সারা জীবনের স্মৃতি, ভালো করেছেন, ঐটাও সারা জীবনের স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি বলতে এই স্মৃতিগুলোই। এই স্মৃতিগুলোই। আর কী স্মৃতি?

    দুঃখের বাইরে, আনুগত্যের বাইরে, বঞ্চনার বাইরে আর কী স্মৃতি? ইতিবাচক, ভালো, মঙ্গলের কী স্মৃতি? নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বের স্মৃতি। নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার স্মৃতি। অনেক ছাত্রের সঙ্গে, অনেক ছেলেমেয়ে সঙ্গে, অনেক জেলার অনেক রকমের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার স্মৃতি। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আনন্দ। আনন্দের স্মৃতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দিকটাকে নিয়েই।

    এই স্মৃতিগুলির সাধারণ বৈশিষ্ট্য কী? স্বাধীনতা। এই সমস্ত জায়গা হলো ঐ জায়গা, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীন ছিল। যেখানে যেখানে ছিল সেখানে সেখানেই তাঁরা পরস্পর সহযেগিতা করেছে। যেখানে স্বাধীনতা ছিল সেখানেই তাঁরা সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। একে অন্যকে আবিষ্কার করেছে। আবিষ্কার করেছেন খোদ মানুষ্যত্বকে। কবিতা করেছে। কবিতা পড়েছে। অনুধাবন করেছেন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ককে। আবৃত্তি করেছে। নাটক করেছে। গান গেয়েছে। গাছতলায়। অনুষ্ঠানে। কত রকম। প্রেম করেছে। এগুলো হলো স্বাধীনতার স্মৃতি।

    প্রমাণিত হলো: সমাজে স্বাধীনতা যেখানে আছে, সেখানে মঙ্গল আছে, আনন্দ আছে, সহযোগিতা আছে, সংহতি আছে, সুখ আছে, সুখস্মৃতি আছে। বিশ্ববিদ্যালয় এরকম একটা জায়গা। এবং এইটুকু আছে বলেই, এখনও পর্যন্ত, যুগের পর যুগ করে, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান। কেন? স্বাধীন হওয়া যায়। স্বাধীন থাকা যায়। কার হাত থেকে? পরিবারের কর্মকর্তা-অফিসারদের হাত থেকে। শিশু শ্রেণি থেকে মাস্টার্স শ্রেণি পর্যন্ত যাঁরা আমাদের মহা অফিসার আছেন। পিতা এং মাতা। চিফ কন্ট্রোলার অ্যান্ড চিফ ইন্সট্রাক্টর অফ দ্য চিলড্রেন। এই অফিসারদের হাত থেকে মুক্ত থাকাটাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আসল আনন্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। তাহলে এই চার-পাঁচ বছর বাপ-মা এসে খবরদারি করতে পারবে না।

    স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাটুকুই বিশ্ববিদ্যালয়ে যা কিছু মঙ্গল, সৃজনশীল ও শুভ, তার জন্ম দেয়। এবং এইটুকু হচ্ছে সুখস্মৃতি। আনন্দের স্মৃতি। তার মানে, আপনি যদি এই স্বাধীনতা, এই সহযোগিতা, এই আনন্দটুকু ক্লাসরুমে আনতে পারেন, যদি পড়াশোনার মধ্যে এটাকে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে আপনি দেখবেন, সৃজনশীলতা কাকে বলে। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আবার দেখেবেন সত্যেন বুস, জগদীশ চন্দ্র বসু, কাজী মোতাহার হোসেনরা বের হবেন। আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তো সত্যেন বসু বের হয়েছেন।

    পড়াশোনায় শিক্ষার্থীরা এত উদ্যমহীন কেন? পড়ালেখায় আনন্দ নাই বলে। আনন্দ নাই কেন? স্বাধীনতা নাই বলে। যেখানে যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীন না সেখানে সেখানে তাঁর নিস্তেজ, মরা, পঙ্গু, চিন্তাহীন, প্যাসিভ, অসক্রিয়, নিষ্ক্রিয়। এই জায়গাগুলো কোথায়? ক্লাসরুম। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয়। সক্রিয় কে? শিক্ষক। কারণ, তুলনামূলকভাবে তাঁর স্বাধীনতা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ডিপার্টমেন্ট’ বলতে শিক্ষককে বোঝায়, তাঁদের সিদ্ধান্ত আর কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, শিক্ষার্থীরা যেগুলোতে অংশগ্রহণ করেন মাত্র। রাজনীতি করব, এমনকি সেখানেও আমরা নিস্ক্রিয়। নেতা এবং ক্যাডার। তাঁরা ডিক্টেট করবেন। অন্ধত্ব ডিক্টেট করবে, মতাদর্শ ডিক্টেট করবে। আমরা ক্যারি আউট করব। আর কোথায় কোথায় স্বাধীনতা নাই? হলে আমার স্বাধীনতা নাই। ওখানে মাস্তান বাহিনী আছেন, প্রভোস্ট বাহিনী আছেন। আর কোথায়? ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি করার ক্ষেত্রে আমি নিষ্ক্রিয়। পুলিশ-প্রক্টর বাহিনী আছেন।

    শিল্পী: আসিফ ইমরান রাফসান

    মুখস্থ+মাদক+মিথ্যা=মিডিয়া

    এইসব পরাধীনতা আর নিষ্ক্রিয়তা থেকে আসে আমার হতাশা। আসে নিজের উপরে আস্থার অভাব। আসে নৈরাশ্য। নৈরাশ্য নিজেই একটা ব্যারাম। নৈরাশ্যের পিছে পিছে আসে মাদকাসক্তি। তো, আপনি প্রথম আলো, আপনি মাদকাসক্তি তাড়াবেন, অথচ সমস্যার গোড়ায় দেখবেন না। তা তো হয় না।

    এক মুখে আপনি বলে বেড়াবেন, মাদককে না বলুন, আরেক মুখে বলবেন, পেপসিতে হ্যাঁ বলুন, পেপসির নেশা করুন, শীতে-বর্ষায় পেপসি খান, তা তো হয় না! গোল্ড লিফের জাহাজ কোন দিক দিয়ে কোথায় গেল তা নিয়ে দিনের পর দিন গুরুত্বসহকারে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপবেন, তা তো হয় না! ‘আজকে আপনার বাসায় নানু যাবেন, আপনার ফ্রিজে পেপসি আছে তো!’ পাহাড়-সমান এত বড় বিজ্ঞাপন। এত বড় নানুর ছবিসহ। প্রথম আলোর পেপসি-প্রচারাভিযান। মনে আছে?

    তখনই আমরা বলতাম, প্রথম আলো আসলে কর্পোরেট পুঁজির বিজনেস পার্টনার মাত্র। প্রধান মিডিয়া মাত্রেই কর্পোরেট পার্টনার। এখন ওনারা প্রকাশ্যেই বলেন, আমরা পেপসির মিডিয়া পার্টনার, আমরা ইউনিলিভারের মিডিয়া পার্টনার। ফলে অবস্থাটা দাঁড়ায়: মাদকে ‘না’ বলুন, পেপসিকে ‘হ্যাঁ’। মাদকে ‘না’ বলুন, সিগারাটকে ‘হ্যাঁ’। (মনে আছে প্রথম আলোয় ‘বেনসন খান, সোনা হয়ে যান’? মনে আছে বি গোল্ড বিজ্ঞাপনের কথা?) মাদককে ‘না’ বলুন, কর্পোরেট-ভোগবাদকে ‘হ্যাঁ’। মাদককে ‘না’ বলুন, গ্লামারকে ‘হ্যাঁ’।

    মিডিয়া প্রসঙ্গে পরে আমি আরেকটু আসব। আপাতত বলি, প্রথম আলোর সাম্প্রতিক স্লোগান কী? মাদক-মিথ্যা-মুখস্থ এই তিনকে না বলতে হবে। এই তিন যোগ দিলে কী হয়? যোগ করে দেখেন তো: যোগ দিলে মিডিয়া হয়। [মাদক+মিথ্যা+মুখস্থ=মিডিয়া]

    প্রথমে ‘মাদক’। মিডিয়া নিজেই হচ্ছে মহা-মাদক। রঙিন জগতে হাতছানির নেশা। গ্লামার, যৌনতা, অপরাধ, আর ভোগবাদের নেশা। সকাল বেলা পত্রিকা না পেলে টয়লেট হয় না। সন্ধ্যায় নাটক না দেখলে সারা রাত কেমন উসখুস উসখুস। প্রতিদিন টিভির খবর শো আর টক শো না দেখলে মনে শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। টিভি ছাড়া একটা বাসা কল্পনা করেন তো? পরিষ্কার মাদকাশক্তি।

    তারপর দেখন: ‘মিথ্যা’ মিডিয়া মানেই তো অপ্রিয় সত্য গোপন করে যাওয়া। হাফ ট্রুথ দিতে পাতা ভরিয়ে রাখা। এর নাম হচ্ছে মিডিয়া। মিথ্যা হচ্ছে মিডিয়ার প্রধান কনটেন্ট।

    আর কী? ‘মুখস্থ’। ভদ্র ও শিক্ষিত সমাজের দিকে তাকান। সবই তো মুখস্থ। সুশীল সমাজের বাণী চিরন্তনীও মুখস্থ। গল্প-উপন্যাস-সাহিত্য-রাজনীতি-সমরনীতি সবই তো মুখস্থ। লেখকের জন্যও মুখস্থ, পাঠকের জন্যও মুখস্থ। পাঠক জানেন তাঁর পত্রিকা কী লিখবে। রিপোর্টারও জানেন, হাউসে গিয়ে তিনি কী লিখতে পারবেন, আর কী লিখলে আমার চাকরি থাকবে না, প্রমোশন হবে না। সম্পাদক ডেকে বলবেন, তোমার রিপোর্ট ঠিক অবজেকটিভ হচ্ছে না, ব্যালান্সড হচ্ছে না। সেন্সরশিপ এর নাম। সেন্সরশিপও মুখস্থ, সাংবাদিকতাও মুখস্থ। এবার যোগ করেন: মাদক, মিথ্যা আর মুখস্থ। যোগ দিলে মিডিয়া হয়। শাসকশ্রেণি হয়। তো, প্রথম আলো বলেছেন মাদক-মিথ্যা-মুখস্থকে ‘না’ বলতে। কথাটার মানে হচ্ছে: মিডিয়াকে ‘না’ বলুন, মানুষকে ‘হ্যাঁ’। তিন ‘ম’ এর সাথে আরেক ‘ম’ যোগ করুন, ‘মানুষ’ও হবে।

    আচ্ছা। মিডিয়া নিয়ে এরপরে আরেকটু বলব। দরকার আছে বলার।

    তার মানে ছাত্রদের আপনি যদি ইনভল্ব না করেন, লিবার্টি না দেন, ছাত্রদেরকে যদি আপনি ডিপার্টমেন্ট চালানোর দায়িত্ব না দেন, তাহলে কিভাবে হবে?

    শিল্পী: আসিফ ইমরান রাফসান

    পার্টি মানে পলিটব্যুরো, বিভাগ মানে অ্যাকাডেমিক কমিটি

    আচ্ছ, তখন আমি একটু খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। ঐ যে পার্টির কথা বললাম না। তখন আমরা শুনতাম, ‘কমরেড, পার্টি এই ডিসিশান নিয়েছে, এটা আপনার ক্যারি আউট করতে হবে’। আমি কেন? আমি পার্টি না। আমি ডিসিশান নেই নি। আমার কাজ কী? ডিসিশান ক্যারি আউট করা। আর লিডারের কাজ কী? উনি হচ্ছেন পার্টি। ওনার কাজ ডিসিশান নেওয়া। মন্ত্রীসভার কাজ কী? ডিসিশান নেওয়া। আর সারা দেশের লোকের কাজ কী? ডিসিশান ক্যারি আউট করা। মন্ত্রীসভায় যে ডিসিশন নেওয়া হয় সেই ডিসিশান কার? রার্ষ্ট্রের। আর সারা দেশের জনগণ যেটা মনে করে সেটা কী? সেটা রাষ্ট্রের মত না, কতিপয় ব্যক্তির মত বড় জোর, এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহিতা, মাঝে মাঝে অন্তত।

    তো, ঐ একই জিনিস শুনলাম এখানে এসে। ডিপার্টমেন্টে। যেই শিক্ষার্থীরা গিয়ে বলল স্যার, এই পরীক্ষাটা একটু আগে নিলে ভালো হয়, এটা একটু পরে নিলে ভালো হয়, এটা একটু পড়ালে ভালো হয়, এটা একটু না পড়ালে ভালো হয়, তখন শিক্ষকরা সাফ জানিয়ে দিলেন: এটা বিভাগের সিদ্ধান্ত।

    সিদ্ধান্তটা আসলে কার কার? বিভাগের একাডেমিক কমিটির। আট-দশ জন শিক্ষকের, বা ১৮ জন শিক্ষকের। ঐ আঠারো জনই ডিপার্টমেন্ট। শিক্ষার্থীরা কী? ফক্কা। কিছু না। শিক্ষার্থীরা ডিপার্টমেন্ট না। শিক্ষকরা ডিপার্টমেন্ট।

    বলার কী বাকি থাকে! এই সমস্ত আলাপ প্রতিদিন করছি আমরা। ভাষার মধ্যে আছে। বিভাগ সিন্ধান্ত নিয়েছে। তুমি বিভাগ না, তুমি সিলেবাস না, তুমি পড়াশোনা না, তুমি ভালো রেজাল্ট না, তুমি সেটের মধ্যে নাই, তুমি শিক্ষক হবা না। তুমি তাহলে কী? তুমি নোবডি।

    তার মানে শিক্ষার্থীদেরকে ডিপার্টমেন্ট পরিচালনায় অংশ নিতে হবে। এদেরকে ইনভল্ব করতে হবে। রাকসুতে, ডিপার্টমেন্টে, শিক্ষার্থীদের ফোরামে। তিয়াত্তরের আইন আছে। অধ্যাদেশে আছে: প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে শিক্ষার্থীদের, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ফোরাম থাকবে। সেই ফোরাম নানান ধরনের কাজে অংশ নেবেন। আমি চাই তাঁরা ডিপার্টমেন্ট পরিচলানার কাজেও অংশ নেবেন। তাঁরা সিলেবাসও প্রণয়ন করবেন। তাঁরা শিক্ষকদের প্রমোশনেও মতামত দেবেন। আরও যেভাবে যেভাবে মতামত তাঁরা দিতে পারে সেভাবে সেভাবে তাঁদেরকে ইনভল্ব করতে হবে। যত বেশি পারা যায়। শিক্ষার্থীরা এখনই যদি নিজের দায়িত্ব নিজে না নেন, এখনই যদি নিজেরা নিজেদেরকে পরিচলানা না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁরা কেন করে দেশ পরিচালনা করবেন। ওখানে গিয়ে তাঁরা আমলা হবেন, শুধু বসের হুকুম শুনবেন, আর কিছু করবেন না। তখনই স্বৈরাচার হবে। তখনই হাসিনা-খালেদা হবে। তখনই আবার ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ হবে। জরুরি পরিস্থিতি।

    শিল্পী: আসিফ ইমরান রাফসান

    ছাত্র-রাজনীতি ও ছাত্র-আন্দোলন এক কথা নয়

    এবার আসেন, ছাত্র-রাজনীতির দিকে তাকানো যাক কিছুটা তো বলাই হলো। কিন্তু ‘ভালো ছাত্র-রাজনীতি’ আছে না! আমি নিজে সারা ছাত্রজীবন এই কাজই করেছি: ছাত্র-রাজনীতি। ফলে কটাক্ষ করার জায়গা থেকে বলছি না। ‘ছাত্র-রাজনীতি বাংলাদেশের গৌরব’ না।

    শিক্ষার্থীরা/ছাত্র-রাজনীতি ৫২, ৬২, ৭১, ৬৯, ৯০- এসব সৃষ্টি করে নি? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথা কারা এনেছেন? ছাত্র-রাজনীতি। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান সাহাবুদ্দীন। কারা বানিয়েছে? ছাত্র-রাজনীতি। এসবে গৌরব আছে না! ভালো কিছু আছে না! আছে।

    কিন্তু, নব্বইয়ের পরে আসেন। ১৭ বছর। দু-এক দিন না। ছাত্র-রাজনীতি কী করছে? কোথায় আছে? কেমন আছে? বেঁচে আছে? দেখা যাচ্ছে? আমি তো দেখি না। নাই। নিষ্ক্রিয়। টের পাওয়ার উপায় নাই। কিন্তু আপনি আইন করছেন। শুনছি, ওই জিনিস নিষিদ্ধ করতে হবে। ঐ জিনিস তো এখন আর নাই-ই। ঐ জিনিস শিক্ষার্থীরা কেউ করেন না অলমোস্ট। শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন করেন, শিক্ষার্থীরা যখন ঝুঁকি নেন, পুলিশের মারও খান, তখন তাঁরা ভয়ে থাকে: ছাত্র-সংগঠনগুলো যেন তাঁদের ভেতরে ঢুকে না যায়। ছাত্র-রাজনীতি, ছাত্র-সংগঠন শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্ক।

    সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটা বড় বড় ছাত্র-আন্দোলন আমরা দেখেছি। জাহাঙ্গীরনগরে দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি। আমাদের [রাজশাহী] বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি। তিরিশে অক্টোবর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-অভ্যুত্থানের দিন। ছাত্র-বিদ্রোহের দিন। সেই দিন দেখেছি। সেইদিনকার বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষক-প্রশাসন-শিবির-পুলিশবিরোধী রক্তক্ষয়ী বিস্তৃত প্রতিরোধ ছিল প্রাতঃস্মরণীয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বহু বহু দিন ধরে একটানা অভূতপূর্ব আন্দোলন করেছেন। বিশাল পরিসরে করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে সাধারণ মেয়েদের স্বর প্রতিরুদ্ধ করতে প্রফেসররা যখন রাতের বেলা পুলিশ ঢুকিয়ে মেয়েদেরকে জঘন্যভাবে মার খাইয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা তখন কয়েকদিন ধরে তীব্র, বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। মহা-পালোয়ান এক ভিসিকে চোখের পলকে ‘ক্ষমতা’ থেকে ফেলে দিয়েছেন। আরও অনেক উজ্জ্বল আন্দোলন আমরা বিগত নব্বই দশক জুড়ে দেখেছি। এই সমস্ত ছাত্র আন্দোলন কিন্তু ছাত্র-রাজনীতির যাবতীয় হিসাব-নিকাশের বাইরের ‘অরাজনৈতিক’ ঘটনা। ছাত্র-রাজনীতি কোনো কল্কে পায় নি। ছাত্র-সংগঠনগুলোকে শিক্ষার্থীরা দূরে রেখেছেন। কাছে ঘেঁষতে দেন নি। এবং ছাত্র-রাজনীতিওয়ালাদের, ঐ শক্তিও ছিল না যে জোর করে তাঁরা কাছে ঘেঁষবেন। ভয় দেখানোর জোরও ছিল না। আর, যাঁদের জোর ছিল, জোর থাকেই, তাঁরা তো সরকারি ছাত্র-সংগঠন। প্রতি যুগেই তঁরা এই সরকার ঐ সরকারের অঙ্গ-সংগঠন। এবং পরিস্থিতিমতো তাঁরাও টেকে নি, ছাত্রদের সামনে। অন্তত ফর এ টাইম বিইং টেকে নি। প্রকৃত শিক্ষার্থীদের, প্রকৃত ছাত্র-আন্দোলনের দৃঢ় সংহতি তাঁদের সমস্ত হুমকি-ধামকিকে রুখে দিয়েছে।

    এই তো ছাত্র-রাজনীতি। গত ১৭ বছর। [বিগত এই ১৭ বছরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘অরাজনৈতিক’ ছাত্র আন্দোলনগুলোকে, তথা সামাজিক প্রতিরোধ-আন্দোলনসমূহকে, উপলব্ধি করার কাজ এখনও বাকি আছে। ছাত্র-রাজনীতি করা ছাত্র-সংগঠনগুলোকে দিয়ে সেই কাজ হবে না। তাঁদের রচিত ইতিহাসে তাঁরা ছাড়া আর কেউ কোনো কর্ম করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। বাংলাদেশের ইতিহাস নাকি তাঁদেরই ইতিহাস।] তো এটাকে ব্যানড করার কী আছে? বাস্তবে এটা তো নাই-ই। ছাত্র-রাজনীতি নাই। শিক্ষক-রাজনীতি এমনিতেই বেআইনি।

    এরপরেও শিক্ষক-রাজনীতি নিষিদ্ধ করো, ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করো- এই কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা আসলে কী নিষিদ্ধ করতে চান? এই প্রশ্ন আমাদের মনে আছে। এই প্রশ্ন একটু পরে তুলব। আপাতত ছাত্র-রাজনীতি নিয়ে আরও কিছু কথা বলি।

    তাহলে আপনি দেখছেন, ছাত্র-রাজনীতি জিনিসটা অন্ধত্ব, লেপট-রাইট, হায়ারার্কি আপনি ছাত্র-রাজনীতির মধ্যেও দেখবেন। একই হায়ারার্কি। ক্যারিয়ার: নেতা হওয়ার ক্যারিয়ার, ভবিষ্যতে কিছু করে-কম্মে খাওয়ার ক্যারিয়ার। অসুখ-বিসুখ হলে পার্টির ডাক্তাররা দেখবেন ইত্যাদি প্রভৃতি নানান কিছু। তদবরিও হবে। আপনি যদি সিপিবির মতো একটা নাই-পার্টির নেতাও হন তবুও তো আপনার কিছু পুরানো বন্ধুবান্ধব সচিবালয়ে আছেন। কিছুটা তদবির তো করতেই পারবেন।

    আর্টওয়ার্ক: রুলস অব সোসাইটি
    শিল্পী: স্যামুয়েলস গিলস
    সূত্র: সাৎসি আর্ট

    ছাত্র-রাজনীতির গৌরবের সমাচার

    ‘ভালো ছাত্র-রাজনীতি’ তাহলে কোথায় অবস্থিত? বাস্তবে জিনিসটা পাওয়া না গেলেও ‘গৌরবের ইতিহাসে’র পাতায় পাতায়। ছাত্র ইউনিয়নের ২৫-তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী যখন হয়, ১৯৭৭ সালে মনে হয়, তখন তাঁরা একটা বই বের করলেন। গৌরবের সমাচার। ছাত্র ইউনিয়ন করাটা কত গৌরবের। এই গৌরবের সমাচার বইটা দীর্ঘকাল ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে খুবই প্রশংসিত কেতাব ছিল। গৌরব কিন্তু মিউজিয়ামে থাকে।

    বরেন্দ্র মিউজিয়ামে যান। ঘর ভর্তি, বারান্দা ভর্তি ‘গৌরব’ দেখতে পাবেন। শিব মূর্তি, মা তারার মূর্তি, বোম শঙ্করের মূর্তিতে ভরা। বোম শঙ্কর নাই এখন। মা তারাও এখন নাই। গৌরবের স্মৃতি আছে। উনিশশ বায়ান্নর সত্যিকারের গৌরব যাঁরা বানিয়েছিলেন, সেই শিক্ষার্থীরা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বিদ্রোহ করেছিলেন। প্রশ্ন করেছিলেন। দেশ ও সমাজের প্রতি নিজেদের কর্তব্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। তারপর তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশের জন্য কিছু করার। কাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তাঁরা? রাষ্ট্রকে। পুলিশকে। কর্তৃত্বকে। আর কাকে চ্যালেঞ্জ করেছিরেন তাঁরা? পার্টির হাই-কমান্ডকে। নিজের নিজের পার্টি হাই-কমান্ডকে। এইসব প্রশ্ন, ভাবনাচিন্তা, কর্তব্যবোধ, চ্যালেঞ্জ, এবং বিদ্রোহের জন্যই ‘একুশ’ হয়েছিল। ঐ জন্য গৌরব রচিত হয়েছিল।

    পড়ে দেখেন। উনসত্তুরও তাই। বাষট্টির আন্দোলনও তাই। ছাত্র-সংগঠনগুলো নিজেরা নিজেদের পার্টিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। পার্টি হাই-কমান্ড মানি না। মানলে ছাত্র-রাজনীতিটুকুই হয়, ছাত্র-আন্দোলন আর হয় না। তিরাশিতে আসেন। নব্বইয়ে আসেন। একই ঘটনা। এট ইতিহাস। যতক্ষণ সাধারণ শিক্ষার্থী আন্দোলন, যতক্ষণ ছাত্র-সংগঠন ওপরওয়ালা পার্টির পকেটে-ততক্ষণ ছাত্র-রাজনীতি নাই। যখন ছাত্র-সংগঠন প্রতিরোধ করছে নিজের মূল পার্টিকে, যখন চ্যালেঞ্জ করছে প্রথমত পার্টিকে, তারপরে আরও বড় কর্তৃত্বকে, তখন ছাত্র রাজনীতি গৌরবের।

    এর নাম প্রকৃত গৌরব। গৌরব করার জন্য সৃজনশীল হতে হয়। স্বাধীন হতে হয়। চিন্তা করতে হয়। চ্যালেঞ্জ করতে হয়। তখন গৌরব হয়। বিগত ১৭ বছর ধরে আপনি গৌরবের কাজ করেন নি। কিন্তু আপনি গৌরব বেঁচে খাবেন। মিনিমিন মিনিমিন মিনিমিন মিনিমিন করে আমতলা জামতলায় বসে বসে বলবেন, আমার গৌরব, আমার গৌরব, আমার গৌরব আছে। আমাকে তাই নিষিদ্ধ করা যাবে না। নিজেই বলবেন, নিজেই শুনবেন। অন্য কাউকে শোনানোর মতো ক্ষমতাও আর নাই। এখন যদি গৌরব করতে চান, তাহলে আপনাকে এখন নতুন করে ৫২ বানাতে হবে। দেশে এখন বিশেষ সঙ্কট। দেশ এখন বায়ান্নর সেই গৌরব চায়। দেশ এখন নব্বইয়ের গৌরব চায়। বাষট্টি গৌরব চায়। কই সেই গৌরব? গৌরবআলারা কই? গৌরবআলারা গৌরবের দোহাই দিয়ে কোনোরকমে বলছেন যে আমাকে নিষিদ্ধ করো না। ঐ পর্যন্তই। এখন, এই মুহূর্তে, গৌরব তৈরির সংগ্রাম কই? নাই।

    ফলে ঐ ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন-একটা হাওয়াই প্রশ্ন। ঐ জিনিস এমনি শুকাচ্ছে। মারা গেছে। মুমূর্ষ: ডাক্তার এসে ঘোষণা দিলেই হবে নাড়ি টিপে যে ওটা নাই। মারা গেছে। ওটা মৃত। আর যদি নতুন করে গৌরবের কিছু করার থাকে, তাহলে সেটা যাঁরা করার তাঁরাই করবে। যদি করে, তখন দেখা যাবে। আর যদি সত্যি তেমন দেখা যায়, তাহলে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন কেউ তুলবে না। নব্বইয়ের আগে আগে অনেকদিন ঐ প্রশ্ন অনেকেই তুলতেন। আজকের মতো। নব্বইয়ের পরে বহুদিন তোলেন নি আর। ছাত্র-রাজনীতির ব্যর্থতার কথা ভুলে গিয়েছিলেন অনেকে। অনেক দিন পর্যন্ত। আবার মনে পড়ে গেছে। কারণ গৌরব আর নাই। আবার যদি গৌরব রচিত হয়, নিষিদ্ধ করণেওয়ালারা নিজেরাই নিষিদ্ধ হবেন। সুতরাং, আইন করে ছাত্র -রাজনীতি বাংলাদেশে শুরু হয় নাই, আইন করে নিষিদ্ধ করাটাও হাস্যকর।

    সর্বোপরি, আমার জন্য ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না করা ইস্যু না। আমি চাই শিক্ষার্থীরা স্বাধীন হবে। যাঁরা ছাত্র-রাজনীতি করেন, তাঁরা স্বাধীন হন না। ফলে ঐ জিনিস সিদ্ধ হলেই কী, আর নিষিদ্ধ হলেই কী। আমার কিছু যায় আসে না। আমার এজেন্ডা ঐটা না। লোকে আলাপ করছে। প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছে। কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছে- প্রতিবাদের মতো করে। এজন্য বললাম কিছু কথা। ছাত্র-রাজনীতি করতাম এক সময়, তার জন্যে বললাম কিছু কথা।

    কিন্তু আওমি চাই যে এই ছাত্র-রাজনীতি না থাক। না থাক। কিন্তু সেটা আইন করে ক্যামনে না থাকে- আমি এইটা বুঝি না। যাঁরা বোঝেন, তাঁরা আইন করেন। যাঁরা ঐ আইন ঠেকাতে চান, তাঁরা ঠেকান। আমি দুই গ্রুপের কোথাও নাই। কারণ, দেখতে পাচ্ছি, ঐ জিনিস এমনিতেই নাই। এবং আমি চাইও না যে ঐ জিনিস বাড়ুক। কেন চাই না? কারণ ওই জিনিস অন্ধত্বের জন্ম দেয়। আর যখন সেটা গৌরবের জন্ম দেয়, তখন সেটা আর ‘ছাত্র-রাজনীতি’ থাকে না, ‘ছাত্র-সমাজ’ হয়ে ওঠে। তখন বৃহত্তর ছাত্র-আন্দোলন হয়। ঐটা অন্য জিনিস। ঐটা ছাত্র-রাজনীতি না।

    ফ্রিডম
    শিল্পী: কামিল জারজিক
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার: কী করিতে হইবে।

    পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক দপ্তর রাখার দরকার নাই

    পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক দপ্তর রাখার দরকার নাই। ডিপার্টমেন্ট পরীক্ষা সংক্রান্ত সব কাজই করতে পারে, আর সার্টিফিকেট দিতে পারে না। ওগুলো দেওয়ার জন্য, বলতে গেলে সার্টিফিকেটটুকু বানানোর জন্যই বিশাল এক ডিপার্টমেন্ট। আর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। [ওখানে আসলে তাঁরা করেনটা কী? ডিপার্টমেন্টের ঠিক করা পরীক্ষার তারিখ সরকারিভাবে ঘোষণা করেন। ডিপার্টমেন্টের চূড়ান্ত করা পরীক্ষক-প্রশ্নকর্তাদের তালিকাটাকে তাঁরা উপাচার্যের টেবিলে পাঠান। সর্বশক্তিমান স্বাক্ষরের জন্য। এইসব হাবিজাবি কেরানি-কর্ম করাই এই পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কাজ।] ধরেন, ঐ গোটা ডিপার্টমেন্ট যদি তুলে দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্ষতি নাই।

    হয়তো কেউ বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচাররাই পরীক্ষা নেবেন! কিন্তু, পরীক্ষা তো আমরাই নিই। রেজাল্ট তো আমরাই দিই। ওনারা স্রেফ ঘোষণা করেন। ওনাদের দেওয়ালে সাইক্লোস্টাইলে ছাপানো ফলাফল-তালিকা টাঙিয়ে দেন। পড়াও যায় না সেই তালিকা। এই যুগেও। এই যুগে ধ্যাড়ধ্যাড়া সাইক্লোস্টাইল তো আর পড়া যায় না। আর, টাঙান কখন সেই তালিকা? গভীর রাত্রে। সন্ধ্যাবেলায়। গিয়ে হারকিন দিয়ে দেখা লাগে। দেখা যায় না। আর যে নোটিশ বোর্ড! আহামরি আর কী। খোপ খোপ খোপ খোপ লোহার খাঁচা দিয়ে ঢাকা পুরো নোটিশ বোর্ড। (মমতাজউদ্দীন কলাভবনে যান। শহীদুল্লায় যান। সম্পূর্ণ বিল্ডিংই লোহার খাঁচা লাগানো।) গ্রিলের মধ্যে কী আছে পড়া যায় না। এই সবের জন্য গোটা একটা ডিপার্টমেন্ট। পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রক দপ্তর। আরও আলোচনা করা যাবে এটা নিয়ে। আজকে আর না করি।

    উপাচার্য হবেন কে?

    আমলাতন্ত্র ছোট করে ফেলতে হবে। ভিসি-কেন্দ্রিকতা দূর করে ফেলতে হবে। ভিসি কোনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হতে পারবেন না। আইন করে দিতে হবে। ভিসি নিযুক্ত হবেন ছয় মাসের জন্য। ছয় মাস পর পর ভিসি বদলাবে।

    ভিসি কে হবেন? যিনি সিনিয়র মোস্ট, তিনিই ভিসি হবেন। অথর্ব হন, কথর্ব হন, পারেন, না পারেন, উনিই হবেন। উনি যদি না পারেন, উনি বলবেন ‘পারি না’। উনি যদি না পারেন, আমরা সব শিক্ষকরা মিলে বলব, আপনি পারেন না, আপনি রেস্ট নেন। নেক্সট লোক আসুক। নেক্সট সিনিয়র লোক। তার মানে, জীবনে একবার ভিসি হওয়ার চান্স আসবে কারও কারও। কারও কারও আসবে না। এ্যাকোর্ডিং টু সিনিয়রিটি।

    ভিসি একটা আনুষ্ঠানিক পদ হবে। আর কিছু না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে ডিপার্টমেন্টে। ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কাছে। তাঁরাই বিশ্ববিদ্যালয় চালান। ক্ষমতা থাকবে নিচে। শিক্ষার্থীদের কাছে। ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের কাছে এবং শিক্ষার্থীদের কাছে। তাঁরা যৌথভাবে ডিপার্টমেন্ট চালাবেন, মানে বিশ্ববিদ্যালয় চালাবেন। ডিপার্টমেন্টই বিশ্ববিদ্যালয়। হলই বিশ্ববিদ্যালয়।

    কিন্তু, আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডার খোলেন, নোটবই খোলেন, গাইড বই খোলেন, স্মারক খোলেন, বার্ষিকী খোলেন, যেকোনো বই খোলেন, দেখবেন যে এ্যাডমিন্সট্রেটিভ বিল্ডিংয়ের ছবি দেওয়া আছে। ঐটা হয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক। প্রশাসনিক ভবন। মানে কেরানিকুলের ভবন। মানে আমলাদের ভবন। ঐটা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক। সিনেট ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীক না। অন্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক না।

    তাহলে, ভিসি মানে কী? অফিসার। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ অফ স্টাফ। সেনাবাহিনীর মধ্যে যেমন চিফ অফ স্টাফ থাকে, এখানেও তেমন চিফ অফ স্টাফ। উনি সব চাইতে বড় অফিসার। উনি যে শিক্ষক, এই পরিচয় ওনার মনেই থাকে না। উনি কেরানিকুলের নেতা। কেরানিকুলের প্রধান। উনি বসেন প্রশাসনিক ভবনে। ঐজন্য ওইটা হচ্ছে প্রতীক। তো, এই ধারণা বদলাতে হবে। এই জিনিস তুলে দিতে হবে।

    ভিসির নির্বাচন দরকার নাই। রাষ্ট্র ভিসিকে নিয়োগ দেবে না। সরকার ভিসিকে নিয়োগ দেবে না। ভিসি কে হবেন? আমরা বানাব। আমরা বানাব ভোট না দিয়ে। যিনি সিনিয়র, উনি ভিসি হবেন। উনি হচ্ছে গার্জেন। উনি আমাদের একটা প্রতীক। উনি সমাবর্তনের বক্তৃতা দেবেন। পড়াবেন। নিজের ডিপার্টমেন্টে প্রচুর ক্লাস নেবেন। আর ওনার গৌরবে আমরা গৌরাবান্বিত হব। উনি যত বেশি পড়াশোনা করবেন, ওনাকে বিদেশের লোকেরা ডিগ্রি দেবে, পদক দেবে, আমরা খুশি হব। এই পর্যন্তই।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অ-নে-ক উঁচু পদ হবে। সমাজের সম্ভবত সবাইতে উঁচু পদ। সম্মানের দিক থেকে। মর্যাদার দিক থেকে। ছিলও তাই। অতীশ দীপঙ্করের নাম করে আমরা এখন গলা ফাটাই না? নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নিয়ে গৌরব করি। ঐ আমলে কী ছিল? ঐ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন সমাবর্তন হতো, রাজা আসতেন। রাজা যখন ঢুকতেন, কেউ উঠে দাঁড়াতেন না। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ঢুকতেন, তখন সবাই উঠে দাঁড়াতেন। রাজাও। এটা হচ্ছে মর্যাদা। এই মর্যাদা ক্ষমতাবানরা সহজে কাউকে দেয় না। স্বাধীনতা চর্চার মধ্য দিয়ে অন্যের শ্রদ্ধা আদায় করতে হয়। আর, কখনও কখনও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই করতে হয়। কখনও কখনও কথা বলাটাও লড়াই। আরও অনেক কিছু। লড়াইয়ের রূপ- চেহারা-আদল-অবয়বের শেষ নাই।

    বিশ্ববিদ্যালয় কারা চালাবেন? কিভাবে চালাবেন?

    তাহলে, বিশ্ববিদ্যালয় চালাবে কে? শিক্ষকরা-শিক্ষার্থীরা। ডিপার্টমেন্টে এবং হলে। ব্যস। আর, কোথাও না। কোনো নির্বাচন না। কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ না। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করার আরও যত রকম সুযোগ আছে, সেগুলো কেটে দিতে হবে। মঞ্জুরি কমিশনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিতে হবে; যদি মঞ্জুরি কমিশন আদৌ লাগে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

    আপনি বলবেন যে এক জন শিক্ষক একাই প্রশ্ন করবেন, একাই খাতা দেখবেন, শিক্ষকদেরকে যে এত ক্ষমতা দিয়ে দেব ডিপার্টমেন্টে, পরে এদেরকে ঠিক করবে কে? এদের ঠিক করবে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেন। শিক্ষার্থীরা ঠিক করে রাখবে। শুধু ধিক্কার দিয়েই ঠিক করে রাখবে। ছি ছি বললেই ঠিক হয়ে যাবেন শিক্ষকরা। প্রতিদিন ছি ছি সহ্য করা খুব কঠিন। নির্লজ্জ হওয়া খুব কঠিন। এখন নির্লজ্জ রাষ্ট্রের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ আছে বলে, নির্লজ্জ রাষ্ট্রের নির্লজ্জ মিডিয়া আছে বলে, নির্লজ্জতার নানান কাঠামো আছে বলে নির্লজ্জতা সিদ্ধ। যখন রাষ্ট্রের ঐ হস্তক্ষেপ থাকবে না, যখন অস্ত্র থাকবে না, যখন রাষ্ট্রের প্রধান গোলাম হিসেবে ভাইস চ্যান্সেলার থাকবেন না (ঐ রকম ভাইস চ্যান্সেলার), তখন দেখবেন লজ্জা হবে। তখন দেখবেন, নির্লজ্জ হওয়া কত কঠিন। নিজেরা ট্রাই করে দেখেন, নির্লজ্জ হওয়া খুব কঠিন। ফলে, নিজের নিজের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের সামনে লোকলজ্জার ভয়েই শিক্ষকদেরকে সোজা হয়ে থাকতে হবে।

    ক্ষমতা থাকতে হবে শিক্ষার্থীদের হাতেও। শিক্ষকদের প্রমোশনের জন্য শিক্ষার্থীরা মতামত দেবেন। মতামত দেবেন তাঁরা নিজেদের পাঠ্যসূচি প্রণয়নে, শিক্ষকদের ক্লাস পরিচালনা-পদ্ধতির ব্যাপারে, পরীক্ষার ফলাফল প্রণয়নে, আরও অনেক কিছুতে। পরীক্ষা পদ্ধতির উন্নতি সাধনে। কী কী করলে আরও পরীক্ষা আরও ভালো হয়, কী কী করলে পড়াশোনা আরও ভালে হয়, কী কী করলে গবেষণা আরও ভালো হয়, ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরা তখন এখানে অংশগ্রহণ করবেন আইনগতভাবে। তখন ডিপার্টমেন্ট বলতে শুধু শিক্ষকদেরকে বোঝাবে না। তখন দেখবেন পরিস্থিতি বদলাবে। খুব কঠিন না। এই কাঠামোর মধ্যেই শুরু করা সম্ভব।

    শিল্পী: মরো;
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাষ্ট্রের সমস্ত শুঁড় কেটে দিতে হবে

    আরেকটা দিক আছে। আমি কিন্তু ভেতরের দিক, বাইরের দিক দুই রকমই বলছি। ভেতরের দিক যেটা সেটা আমরা আমরা ঠিক করব। আর, বাইরের দিক যেটা, সে ক্ষেত্রে সমস্ত শুঁড় কেটে দিতে হবে। রাষ্ট্রকে বলে দিতে হবে যে আপনারা ভেতরে আসবেন না। কিন্তু আপনারা আমাদের উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করবেন। সর্বোচ্চ বেতন দেবেন। এর পর থেকে কেউ আর ভিসি হবেন না। শুধু সি [ভাইস-চ্যান্সেলর নন, শুধু চ্যান্সেলর] হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকই হবেন। কিসের প্রসিডেন্ট? কিসের প্রাইম মিনিস্টার? প্রাইম মিনিস্টার, প্রেসিডেন্ট কি প্রফেসরের চাইতে বড়? আচার্য, জ্ঞানী, সক্রেটিস, তার ওপরে কে? কেউ না। ঠিক না? বিবেক ছাড়া আর কারও কাছে তিনি দায়বদ্ধ না। এসব আমরা চাইব বাইরের দিক থেকে। কিন্তু এটা চাওয়ার জন্য তো ভেতরে ভেতরে আমাকে রেডি হতে হবে। তার জন্য আরও কাজ আছে। ভেতরের দিকে।

    ভোটাভুটি বন্ধ করে দিতে হবে

    শিক্ষক-সমিতি নির্বাচন, ডিন নির্বাচন, এসব বন্ধ করে দিতে হবে। আপনি বড় জোর একটা সিনেট এবং একটা সিন্ডিকেট বানাতে পারেন। তাও ছয় মাস মেয়াদের জন্য। ছয় মাসের বেশি কোনো দায়িত্বকাল নাই। চেয়ারম্যান-ছয় মাস। ছয় মাস পর পর চেয়ারম্যান বদলান। ছয় মাস পর পর ভিসি বদলান। বাই রোটেশন।

    সব শিক্ষক মিলে আপনি একটা মাত্র জায়গায় ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে পারেন। সেটা সিনেট বানানোর ক্ষেত্রে। আর, সিনেট নিজেরা নিজেদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে ঠিক করবে, যাঁরা প্রতিদিনের কাজকর্ম দেখবেন। কিন্তু, সিনেট-সিন্ডিকেটের বেলাতেও আমরা যাঁরা ইলেক্টরাল বডি, আমরা যাঁরা ভোট দিয়ে তাঁদেরকে সিনেটর বানাব, আমরা পই পই করে লিখে দেব: এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়; এগুলো আপনাদের কাজ; সিনেটে গিয়ে এগুলো করবেন। এর বাইরে যদি কিছু করতে হয়, এসে আমাদের (সকল শিক্ষকের সাধারণ সভার) কাছ থেকে শুনে যেতে হবে।

    মূলনীতি বানাবে শিক্ষকসভা

    তার মানে, মূলনীতি প্রণয়ন করতে শিক্ষকসভা। দল মত নির্বিশেষে সকল শিক্ষক। সিনেট-সিন্ডিকেট ঐসব মূলনীতি বাস্তবায়ন করবে। যদি ঠিকমতো বাস্তবায়ন না করে তাহলে শিক্ষকসভা [সকল শিক্ষক] যেকোনো সময় অধিবেশনে বসে তাঁদেরকে ‘রিকল’ করবে।

    ‘রিকল’ করার মানে হলো ‘সালাম’ দেওয়া। ঐ যে বলে না, “ভিসি-স্যার আপনাকে সালাম দিয়েছেন?” মানে আপনার নামে সমন জারি হয়েছে। হাজিরা দিতে হবে। সে রকম, শিক্ষকসভা থেকে তখন ‘সালাম’ দিব আমরা। সিনেটরদেরকে। এটাকে ইংরেজিতে বলে রিকল করা- মানে ওমুক সাহেব আপনাকে স্মরণ করেছেন। এটার বাংলা হচ্ছে যে তোমার জারিজুরি শেষ, তোমার এমপিগিরি শেষ। মানে তুমি আর আমার প্রতিনিধি না। তোমার প্রতিনিধিত্ব বাতিল।

    শিক্ষকসভা তার নিজেরই নির্বাচন করা সিনেটকে এবং সিন্ডিকেটকে (এসব সংস্থার কোনো ব্যক্তি-সদস্যকে অথবা গোটা সংস্থাটাকে) বাতিল করে দিতে পারবে। যখন তখন। শুধু যদি শিক্ষকসভা মনে করে, “আমরা যা বলে দিয়েছিলাম তা ওনারা করছেন না।”

    যাই হোক, এইটুকু বড়জোর করা যেতে পারে ভোটাভুটি। আর কোথাও ভোটাভুটি না।

    অনুষদের ডিন প্রসঙ্গে

    ডিন পদের মনে হয় প্রয়োজনই নাই। আমি নিশ্চিত না-সম্ভবত প্রয়োজনই নাই ডিন পদের। কী কাজ ডিনের?

    অনুষদ বলে তো কিছু নাই বাস্তবে। অ্যানথ্রোপলজি-ওয়ালারা অ্যানথ্রোপলি পড়েন। গণযোগাযোগওয়ালারা গণযোগাযোগ পড়েন। কোনো লেনদেন নাই। অথচ একই জিনিস-সমাজ কাঠামো-আমিও পড়ি, সমাজবিজ্ঞানও পড়ে, অ্যানথ্রোপলজিও পড়ে। ইনফরমেশন সায়েন্স আমিও পড়ি, লাইব্রেরি-সায়েন্স বিভাগও পড়ে, ইনফরমেটিক্স-ওয়ালারাও একই জিনিস ফোকলোরও পড়ে, অ্যানথ্রোপলিজিও পড়ে [ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেনোলজি বিভাগ] পড়ে। কোনো লেনদেন নাই।

    তাহলে কাজ কী ডিনের? আর, ডিনের যদি কিছু কাজ থাকেও তবে সেটা শিক্ষাগত লেনদেন ও শিক্ষাগত উৎকর্ষ সংক্রান্ত। প্রশাসনিক কোনো দায়িত্বের কোনো সেটা না। ডিন যদি বানাতেই হয়, সেটা একটা বডি হলেই ভালো। ধরা যাক, গোটা অনুষদের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পনের জন প্রফেসর। তাঁরা হলেন ডিন। অনুষদের অভিভাবক। আর, যদি একজন ব্যক্তিকেই ডিন বানাতে হয়, তবে সেটা জ্যেষ্ঠ্যতা অনুসারে। ইলেকশন দিয়ে না।

    ভোট মানেই ভোটে হারার ভয়। উনি যদি কোনো একটা ভালো কাজ কখনও ভুল করে করতেও চান ভোট হারানোর ভয়ে করতে পারবেন না। এই দিকটাও কিন্তু আছে। ফলে কোন ভোট দরকার নাই।

    শিক্ষক-সমিতি দরকার নাই

    শিক্ষক-সমিতিরও দরকার নাই। শিক্ষক-সমিতি মানে ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিদের’ একটা কমিটি। তো, প্রতিনিধির কী দরকার! আমিই আমার প্রতিনিধি। ৮০০ শিক্ষক আছি। ১২০০ শিক্ষক আছি। আমাদের আবার প্রতিনিধি কী! বিপদ-আপদ ভালো-মন্দ যা হোক আসি সরাসরি গিয়ে বলব যে এটা করা যাবে না; এটা করতে হবে। আমি বলব। আরও পাঁচ জনকে বলব, চলেন সবাই মিলে যাই। কখনও দশ জন যাবে। কখনও পনের জন যাবে। কখনও বিশ জন যাবে। গিয়ে বলবে- ভিসিকে বলবে, ডিনকে বলবে, অন্যদেরকে বলবে, চেয়ারম্যানকে বলবে যে এটা করা যাবে না। এর জন্য তো সমিতির দরকার নাই।

    আর সমিতি মানে তো আমার প্রতিনিধি। প্রতিনিধি মানে তো আমার খলিফা। খেলাফত তো নাই। আরব আমলের খেলাফত নাই। ওমরের খেলাফত নাই। তারপর ছিল তুরস্কের খেলাফত। সাম্রাজ্য। ঐ খেলাফত ছিল সাম্রাজ্য। ঐ খেলাফত দিয়ে আমার কী লাভ এখানে!

    ঐ সমিতি আমার খলিফা হবে। হয়ে আমার উপর ছড়ি ঘুরাবে। ওরা হয়ে যাবেন নেতা। এগারো-বারো জন নেতা হন। বারো জন মিলে জাতির অমুক হয়েছে, জাতির তমুক হয়েছে- এই সব বিবৃতি দেবেন। কখনও এই দলের পক্ষে, কখনও ঐ দলের পক্ষে। এই প্রতিনিধির তো কোনো প্রয়োজন নাই। শিক্ষকদরে স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব সমিতির। ঐ স্বার্থ সমিতির সকল সদস্য মিলেই দেখবেন। আলাদা কমিটির কী দরকার?

    শিক্ষক-সমিতি মানে কিন্তু সকল শিক্ষক। সমস্ত শিক্ষকই শিক্ষক-সমিতির সদস্য। আর, এখন সমিতি বলতে কী বুঝায়? একটি দলের মনোনীত কিছু শিক্ষকের একটা প্যানেল, যা নির্বাচিত হয়েছে, দলের অন্ধ অনুগত ভোটার-সদস্যদের সুনিশ্চিত ভোটে। এই প্যানেল একটি কার্যকর কমিটি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু, বাস্তব অবস্থার কারণে আমাদের প্রতিদিনের ভাষায় পরিস্থিতির ছাপ পড়েছে। ফলে, কার্যকর ঐ কমিটিটার নামই হয়ে গিয়েছে সমিতি। আর, আসল যে গোটা সমিতি, ঐ শিক্ষক-সমিতির কোন খবর নাই। আমরা সকল শিক্ষক শুধু বাৎসরিক ভোটটা দেব। এটুকুই আমাদের কাজ। বাকি সব দেখবে ঐ শিক্ষক-সমিতির কমিটি। আমাদের দরকার মূল সম্পূর্ণ শিক্ষক-সমিতি। আমাদের যা ভালো-মন্দ স্বার্থ রক্ষা করা দরকার, তা ঐ সমিতির সবাই মিলে করবে। আমাদের কোনো নেতা-কমিটির প্রয়োজন নাই।

    আমাদের আর কী দরকার? দরকার- শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষকদের- বিপুলবিস্তৃত ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক। হাই-স্পিডের ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক। সমস্ত হল, সমস্ত স্টুডেন্ট, সমস্ত ডিপার্টমেন্ট, সমস্ত বডি কানেক্টেড থাকবে ইমেইল দিয়ে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে। সবসময় অনলাইন। সমস্ত বিজ্ঞপ্তি-সভা-সিদ্ধান্ত এগুলো সবাই পেয়ে যাবেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইয়াহু গ্রুপের মতো আমার সার্ভারে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসভা’ থাক। সবাই এর সদস্য থাকবেন। ইমেইলে সবার রাবি-ঠিকানা থাকে (যেমন romenroy@ru.ac.bd)। এখানে প্রত্যেক শিক্ষক খোলামেলা আলোচনা করতে পারবেন। কোনো সেন্সরশিপ থাকবে না।

    তাই যদি হয়, যদি অনলাইনে সবসময় আমরা সংযুক্ত থাকি, যদি আমি সমস্ত শিক্ষকদেরকে ডিপার্টমেন্টে এবং বাসায় নেট সংযোগ দিতে পারি, এই মুহূর্তে ডিপার্টমেন্টগুলোতে অন্তত যদি দিতে পারি, পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে ভেবে দেখুন। অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে….. নোটিশ কী আছে, সিদ্ধান্ত কী আছে, নতুন কাজ কী আছে আমি ইন্টারনেটে জানব। পিয়ন আসবে সতের বার, বারো হাত ঘুরে ফাইল আসবে-যাবে, অ্যাত্তো বড় একটা আমলাতন্ত্র আমরা আজীবন ঘাড়ে করে নিয়ে ঘুরব ঐ জমানা নাই।

    অলরেডি ঐ জামানা উঠে যাচ্ছে দিন-দুনিয়া থেকে- আমাকেও তুলে ফেলতে হবে- খুব বেশি টাকা লাগে না। অলরেডি আমার একটা সার্ভার আছে। অলরেডি একটা লাইন আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে। এগুলি আপনি করেন। সবসময় অনলাইনে সংযুক্ত থাকেন। আমার ব্যাপারে যদি আমার চেয়ারপার্সন খারাপ কাজ করে, আমি তখনই এসে আমার ঐ যে আলোচনা গ্রুপ-অল টিচার্স কমিউনিটি- যেটা ইয়াহু গ্রুপের মতো গ্রুপ, ঐ গ্রুপে আমি লিখব যে আজকে আমার ডিপার্টমেন্টের চেয়ারপার্সন এই অপকর্ম করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই কিন্তু জেনে যাবেন। মেইল খুললেই দেখতে পাবেন যে অমুক খাদেমুল, অমুক নিউটন এই ভুল কাজটা করেছেন চেয়ারম্যান হিসাবে। এইটা কী প্রেশার বুঝে দেখেন? চেয়ারম্যানের উপর কী প্রেসার পড়বে এইটা। মারা লাগবে না, ধরা লাগবে না। ছিঃ ছিঃ পর্যন্ত করা লাগবে না এর আগেই খবর হয়ে যাবে। আরে বাপ, উল্টা-পাল্টা করলে খবর হয়ে যাবে!

    আর কী হবে? আমরা কমিউনিটি হতে পারব। শিক্ষকরা। একটা সত্যিকারের সম্প্রদায় হতে পারব। এখন কমিউনিটি নাই। এখন কেউ ‘রংপুর’, কেউ ‘নোয়াখালি’, কেউ ‘চিটাগাং’, কেউ ‘চাপাইনবাবগঞ্জ’। ঘটনা কী? পিছনে দল আছে। লাল-নীল-হলুদ আছে। আমরা খণ্ডিত। আমাদের বড় পরিচয় দলীয় পরিচয়। শিক্ষক পরিচয়টা বড় পরিচয় না। তো, এ রকম বিস্তৃত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, (ল্যান-ইন্টারনেট), ইয়াহু গ্রুপের মতো শিক্ষকসভার উন্মুক্ত সামাজিক বিনিময়ভিত্তিক ওয়েবসাইট ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদেরকে অন্ততপক্ষে একটা ই-কমিউনিটি দাঁড় করাতে হবে।

    বাস্তাব-মানুষের এ রকম জীবন্ত নেটওয়ার্ক যদি থাকে, আমরা স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা, সহযোগিতা, পারস্পরিক দায়িত্বশীলতা, প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা কয়েম করতে পারব। এটা সম্ভব। শিক্ষার্থীরাও যদি এরকম নেটওয়ার্কের মধ্যে আবদ্ধ থাকে, অনলাইনে কানেক্টেড থাকে তাহলে আমাদের গোটা জ্ঞানের, বিজ্ঞানের, পড়াশুনার, বই সম্পর্কে খবরাখবরের একটা জগৎ তৈরি করা যাবে। ভাবেন তো, আমরা সবাই অলওয়েজ কানেক্টেড আছি। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটি, শিক্ষক এবং স্টুডেন্ট। এরকম একটা চমৎকার জিনিস আর কী আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের দিক থেকে দেখলে স্বায়ত্তশাসন-স্বাধীনতার জন্য এগুলো আমাদের দরকার।

    আর বাইরের কথা তো বললামই। রাষ্ট্র যেন নাক না গলায়। রাষ্ট্র যেন না ঢোকে। আর শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করে দেন। বন্ধ তো আছেই। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। মিটিং-ফিটিং কিছু হয় না। অবস্থা এমন, সুযোগ পেলে এখন এ কথাও রাজনীতিওয়ালারা বলে ফেলবেন যে “আমি জীবনে কোনদিনও রাজনীতি করতাম না”। কিংবা বলে বসবেন, “শিক্ষক-রাজনীতি করে ভুল করেছিলাম”। দরকাল হলে কান ধরে দুঃখ প্রকাশও করবেন তাঁরা। সুতরাং, ওটা সমস্যা না। সমস্যা হলো, চিন্তার স্বাধীনতা থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঐখানে কোনো আপস না। চিন্তার স্বাধীনতা। পড়াশুনার স্বাধীনতা। বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা। শিক্ষক তাঁর বিবেক ছাড়া, তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি ছাড়া আর কারও কাছে দায়বদ্ধ হবেন না। শিক্ষার্থীরাও তাই। এইখানে আপস করা যাবে না।

    অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়-বহির্ভূত শক্তিসমূহের হাত থেকে এই স্বাধীনতার নিশ্চয়তাটুকু দেয় তিয়াত্তরের আইন। এই নিশ্চয়তাটুকু রাখতেই হবে। শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করার নামে কেউ যদি এই স্বাধীনতা বন্ধ করার কথা ভাবেন, তাহলে সেটা আমাদের রুখতে হবে।

    শিক্ষার্থীদেরও স্বাধীনতা থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের সভা, সমাবেশ, সংগঠন, চিন্তা, মত-প্রকাশ, সংস্কৃতি-কর্মকাণ্ড ইত্যাদি-প্রভৃতি সবকিছু করার জন্য, করার মতো স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমি আগেই বলেছি যে শিক্ষার্থীরা এখন স্বাধীনভাবে নিজেকেই নিজে চালাতে পারেন না। তাহলে, দুই দিন পরে এমএ পাশ করে তাঁরা কেমন করে দেশ চালাবেন? কেমন করে যোগ্য অফিসার হবেন? কেমন করে সুযোগ্য মন্ত্রী হবেন? ফলে এই প্রশ্ন আপস করা যাবে না।

    শিল্পী: মাতিয়াস তেজেদা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পুনশ্চ: বাজার ও বিশ্ববিদ্যালয়

    এ কথা তুলছি কেন যে এখানে এই স্বাধীনতাটুকু কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না? ভয়ে। আশঙ্কায়। আমরা ঘরপোড়া গরু। সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। কখনও কখনও ভয় পাওয়াটাও খুব জরুরি। ভয় পেয়েছি জানলে সমস্যা চিহ্নিত করা যায়। ভয়টা কিসের, কোত্থেকে আসলো খুঁজে বের করা যায়। এই জন্য ভয় পেয়েছি। ভয় যদি অমূলক হয়, খুব ভালো। ভয় যদি মূলক হয়, তাহলেও খুব ভালো-রুখে দাঁড়াতে হবে।

    ভয়টা কিসের? রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কথা তো আগেই বলেছি। সাথে আছে বাজারের ভয়। স্বায়ত্তশাসন মানে শুধু সরকারের হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচা কিন্তু নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে বাজারের হস্তক্ষেপ থেকেও বাঁচা। শিক্ষা নিয়ে দোকানদারির হাত থেকেও বাঁচা।

    যে জিনিস আইনত অস্তিত্বশূন্য, অনুভবত অদৃশ্য এবং বাস্তবত অগ্রহণযোগ্য, সেই জিনিস আইন করে নিষিদ্ধ করার জন্য এখন যাঁরা উঠে পড়ে লেগেছেন (বলে যাচ্ছেন, বলে যাচ্ছেন, বলে যাচ্ছেন; তাও আবার নির্দিষ্ট করে কিছু বলেন না; বলেন ঢালাওভাবে), তাঁদের কাছে আমার জিজ্ঞাস্য: আপনারা আসলে কী চান? যা নাই, তা চান না- এ সবের মানে কী? আপনারা কী চান আসলে? আসলে কি তাহলে নৈশ কোর্স চান? প্রভাতী কোর্স চান? পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা চান? শিক্ষা নিয়ে শুধু ব্যবসা করতে চান? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে চান? নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, কাজেকামে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হবে, সেই জিনিস চান? তাহলে আপনারা কী চান? বাজার এবং শিক্ষা একটা আরেকটার পরিপূরক হবে- এইটা আপনারা চান? শিক্ষা পণ্য হবে-এইটা চান? যে বড়লোক সে পড়তে পারবে, যে বড়লোক নয় সে পড়তে পারবেনা – এইটা চান?

    এ কথাগুলো বলার অনেক লক্ষণ বাস্তব পরিস্থিতির ইতোমধ্যে আছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মানে কী? যার পয়সা আছে সে গ্র্যাজুয়েট হবে, যার পয়সা নাই সে গ্রাজুয়েট হবে না। পরিষ্কার। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ফি-ভর্তি-বেতন ইত্যাদি পড়ালেখার খরচ বাড়ানোর আলামত শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১২ টাকার ফি ২০০ টাকা দিতে হবে, ২০০ টাকার ফি ২০০০ টাকা দিতে হবে। এই পথে কি ছাত্র-রাজনীতিই মূল বাধা? এই পথে কি শিক্ষকদের রাজনীতিই বাধা? রাজনীতি থাকলে মিছিল-মিটিং-প্রতিবাদ- বিক্ষোভ হয়, এই চিন্তা থেকেই তাহলে আপনারা শিক্ষক-রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চান?

    মাস দুই-তিনেক আগে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। চৌদ্দই ফেব্রুয়ারিতে। পত্রিকায় খবর দেখে। অনাহুতভাবে। বিনা আমন্ত্রণে। এমনকি বিনা পরিচয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিভাগে আমি লেখাপড়া করেছি, সেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন। পত্রিকায় দেখেছিলাম তেরোই ফেব্রুয়ারিতে।

    ওঁরা আন্দোলন করছিলেন ঐ ডিপার্টমেন্টে নৈশ মাস্টার্স কোর্স চালু করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা ঐখানে এ রকম সান্ধ্য কোর্স চালুর চেষ্টা করছিলেন। এর প্রতিবাদে শিশখার্থীরা বলছেন যে আমরা এর আগে আইবিএ দেখেছি। কমার্স ফ্যাকাল্টিকে দেখেছি। আমাদের বন্ধুদেরকে দেখেছি, যারা নৈশ কোর্সের শিক্ষার্থী হন, যারা প্রাইচেট কোর্সের শিক্ষার্থী হন, যারা টাকা বেতন ফি দিয়ে ভর্তি হন, ওরাই হয়ে পড়েন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার্থী। বিভাগের প্রথম শ্রেণির নাগরিক আরকি। আর যারা নিয়মিত শিক্ষার্থী, যারা ১২ টাকা দিয়ে পড়েন, যারা ১২ হাজার ছেলের সাথে প্রতিযোগীতা করে ভর্তি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, তারা হয়ে পড়েন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তারা বই পান না। বই পান ওই ওঁরা (যারা বেশি টাকা দেন)।

     আরও অনেক অসমতা, আরও অনেক বৈষম্য তারা দেখেছেন বাণিজ্য-অনুষদের টাকা-পয়সার নৈশ-সন্ধ্যার কোর্সগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে। তারা আরও দেখেছেন যে ঐ সার্টিফিকেটের দাম বেশি হয়, আর এই সার্টিফিকেটের দাম কমে যায়। তাদের চাকুরি পেতে অসুবিধা হয়।

    তো, আমি চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে গিয়ে দেখলাম তারা স্লোগান দিচ্ছেন। তারা মিছিল করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জরুরি অবস্থার মধ্যে। টাকটা জরুরি অবস্থা। এগারো জানুয়ারি থেকে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি-কয় দিন? তারা শ্লোগান দিচ্ছিলেন, – ‘বাজার এবং শিক্ষা একসাথে চলে না’, ‘ব্যবসা এবং শিক্ষা একসাথে চলে না’, শিক্ষা সুযোগ না- অধিকার, অধিকার’। কোনো দল করেন না তাঁরা – আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম।

    আমি গিয়েছিলাম তাদের সাথে সংহতি জানানোর জন্য। আমার কাছে মনে হচ্ছে একুশ শতকের বাংলাদেশের জন্য এটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। এটাই সবচাইতে মারাত্মক প্রশ্ন: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজার হবে, নাকি হবে না। অভিভাবকদের আয় নির্বিশেষে (ধনী-গরিব নির্বিশেষে) সবার জন্য শিক্ষার অবাধ সুযোগ (পারলে বিনা পয়সার অবাধ সুযোগ) কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাখবে? নাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দোকানদারিতে পরিণত হবে?

    এইটা হচ্ছে একুশ শতকের বাংলাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক প্রশ্ন। কেন? কারণ হচ্ছে, মনে রাখবেন, একটু খেয়াল করবেন যে বিশ্ববিদ্যালয় মানেই বাংলাদেশ ছিল। বাংলাদেশ- আন্দোলনের, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠার ইতিহাস আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এক-ই ইতিহাস। সরদার ফজলুল করিমের বই দেখবেন। আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষাৎকার দেখবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনই বাংলাদেশ-আন্দোলন।

    বাংলাদেশের শ্রমিক, বাংলাদেশের কৃষক, বাংলাদেশের আপামত মানুষ বাংলাদেশ বানিয়েছেন। কোনো সন্দেহ নেই। আব্দুর রাজ্জাক বহুকাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। বাংলাদেশ যে একটা ‘জাতি’, এটা হয়ে উঠলো কেমন করে? একটা ‘নেশন’ কীভাবে ‘নেশন’ হয়? কিভাবে? মানুষ চান বলে। শুধু চান বলে, আর কিছু না। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি লোক চেয়ে যে আমরা বাংলাদেশ- ব্যাস, বাংলাদেশ হয়েছে। আর কিছু না।

    আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছি না। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য গুরুত্ব আছে। এবং সেই গুরুত্ব আজকের জমানায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই বহন করে। আগামী দিনের বাংলাদেশ কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন হবে তার ওপরই নির্ভর করে।

    এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী ‘কলেজ’ হয়ে যাবে? সরকারি কলেজের মত? আপনি মনে মনে ধরেন, সরকারি কলেজগুলো স্বাধীন। অসুবিধা আছে কোনো ভাবতে? [আমরা চাই, কলেজগুলোই বরং স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক।] বাস্তবে স্বাধীন না। শিক্ষকরা সব কেরানি হয়ে আছেন। গিয়ে দেখেন। (ব্যতিক্রম আছে- অন্য হিসাব সেটা।) তাহলে যারা চান নানা কিছু নিষিদ্ধ-টিষিদ্ধ করতে, তাঁরা কি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঐরকম কলেজ বানাতে চান? তাঁরা আসলে কী চান? বাংলায় বলতে হবে। ভেঙ্গে বলতে হবে। ঢালাও করে বললে হবে না।

    বিজ্ঞাপনই সংবাদ: ‘দাগ নেই তো শেখাও নেই’ 

    প্রসেফর ইয়াহিয়া ঢালাও বলে দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কনসালটেন্সি করে। ইচ্ছা হলে এরা ‘গবেষণা’ করে বলতে পারতেন যে সংবাদপত্র সংবাদ তেমন ছাপে না, শুধু বিজ্ঞাপন ছাপে। সেটা তাঁরা বলবেন না। সেটা বলার মতো ‘ফান্ড’ নাই। ওগুলো বলার জন্য কেউ টাকা দেয় না।

    সাংবাদিকের কাজ তো সংবাদ ছাপা, সংবাদ সংগ্রহ করা, যেমন আমার কাজ পড়ানো। আমি যদি না পড়িয়ে কনসাল্টেন্সি করি সেটা যেমন অপরাধ হয়, সংবাদ না ছাপিয়ে হকবর ছাপালে একই অপরাধ হয়। সংবাদপত্র মানে তো বিজ্ঞাপনপত্র। খুলে দেখেন। বিজ্ঞাপনই সংবাদ। টিভি চ্যানেল মানে বিজ্ঞাপনের চ্যানেল। বিজ্ঞাপন যেন লোকে দেখেন, তার জন্যই ‘খবর’ প্রচার করা হয়।

    সুতরাং, আমাদের এই বিজ্ঞাপনী সুশীল সমাজ (সুশীল বণিক সমাজ) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কী চান, সেটা আগে আমাদেরকে ভালো করে বুঝে নিতে হবে।

    প্রফেসর ইয়াহিয়া নিজে ঐ রিপোর্টটা বানানোর জন্য টিআইবি’র কাছে কত টাকা নিয়েছেন এটা আমার জানতে হবে। এবং ঐ রিপোর্টটা লেখার জন্যে, ঐ ফরমায়েশি ‘গবেষণা’টা করার জন্য কতগুলো ক্লাস ওনাকে বাদ দিতে হয়েছে, আদৌ বাদ দিতে হয়েছে কিনা আমাকে জানতে হবে। ধরলে সবই ধরবেন। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরবেন, আর গোটা সমাজ বাজার হয়ে গেলেও, কোনো অসুবিধা বোধ করবেন না, তা তো হয় না।

    আপনি বলবেন, রাজনৈতিক দলের তহবিলের হিসাব-নিকাশ চাই। আমি বলব, প্রথম আলোয় আয়ব্যায়ের হিসাব-নিকাশ চাই। টিআইবির হিসাব-নিকাশ চাই। টিআইবিতে প্রফেসর মোহাফফর আহমেদের বেতন কত জানতে চাই। টিআইবির বাজেট জানতে চাই। কে কে টাকা দেন? কোন দেশ টাকা দেয়? কেন দেয়? কত টাকা দেয়? কত খরচ হয়? টাকাগুলো কে পান? কারা পান? কিভাবে টিআইবি’র কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়? দুর্নীতি হয় কিনা? সব জানতে চাই। সুশীল পত্রিপত্রিকাতে এসব নিয়ে বড় বড় রিপোর্ট চাই। গ্রামীণফোনে কী হয়? কত টাকা লুটপাট হয়েছে? কারা কারা ঘুষ পেয়েছেন? টেলিটককে পঙ্গু করার জন্য গ্রামীণফোনের ভূমিকা কী ছিল জানতে চাই। এগুলো নিয়ে তো কোনো রিপোর্ট হয় না।

    আপনি যদি বলেন যে পলিটিকাল পার্টির মূল নেতা দুই মেয়াদের বেশি সভাপতি-সেক্রেটারি পদে থাকতে পারবেন না, আমি বলব প্রথম আলোর সম্পাদকের সম্পাদকগিরির মেয়াদ কয় বছর? আমাদেরকে জানতেই হবে। কয় বছর তিনি সম্পাদক থাকবেন? এ যাবৎ তো আছেনই, যত দিন বেঁচে আছেন, বদলাবে বলে তো মনে হচ্ছে না। ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম কবে বদলাবেন?

    ওনারা যাবজ্জীবন সম্পাদক থাকবেন- কোনো অসুবিধা নাই। আর হাসিনা যাবজ্জীবন সভাপতি থাকলে পরে অসুবিধা। এটা অন্যায় কথা।

    আমি হাসিনার প্রতি এ ক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল নই মোটেই। খালেদার প্রতিও না। নিশ্চয়ই এতক্ষণে সেটা বোঝা গিয়েছে। যাবতীয় পলিটিকাল পার্টিকে আমি অন্ধত্বের আখড়া মনে করি। সাধারণভাবে। গণবিরোধী মনে করি। একদম গম্ভীরভাবে বলছি। ফলে, আমার কোনো সহানুভূতি তাঁদের প্রতি নাই।

    আমি আরও জিজ্ঞাসা করব, প্রথম আলোতে সাংবাদিকদের গণতন্ত্র আছে? সাংবাদিকরা কি স্বাধীন? স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন? ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন? প্রথম আলোর পলিসি ঠিক করেন কারা? সামগ্রিক অর্থে, মিডিয়ার পলিসি ঠিক করেন কারা? সাংবাদিকরা? না। সম্পাদকবৃন্দ আর মালিকগণ। ঐ সেই আমরা আর মামুরা। আম্মুরা আবার আব্বুরা- মিডিয়ার। আমি জানতে চাই, সাংবাদিককে ডেকে কি জিজ্ঞাসা করা হয় যে আপনারাই তো সবাই পত্রিকা বানাচ্ছেন, আপনাদেরকে নিয়েই তো প্রথম আলো চলে, তো আপনারাই বলেন, প্রথম আলোর পলিসি কেমন হওয়া উচিৎ। কোনো মিডিয়া এটা করে? পৃথিবীর কোনো দেশে এটা করা হয়? আমেরিকার ‘স্বাধীন’ মিডিয়া এটা করে? মনে রাখা দরকার: ওখানেও ডেমোক্রেসি নাই। ওখানেও জবাবদিহিতা নাই। ওখানেও স্বচ্ছতা নাই। ওখানেও সাংবাদিকের কোনো অধিকার নাই। সব সংস্কার করবেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরে আর পলিটিক্যাল পার্টির উপরে- এটা তো হবে না।

    এগুলোই কিন্তু ইস্যু। গোটা দেশের ভালোমন্দের ক্ষেত্রে এগুলো তো মহাগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তো করতেই হবে। আমরা সেটা বহুদিন ধরেই চাচ্ছি। কিন্তু, এবার আমরা সবার আগে মিডিয়ার সংস্কার চাই। আমরা সুশীল সমাজেরও সংস্কার চাই। আমরা গোটা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ারই সংস্কার চাই।

    ইদানিং সিগারেটের বিজ্ঞাপন ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছে। আমরা দাবি করব, সংবাদপত্রে খোদ বিজ্ঞাপনই নিষিদ্ধ করতে হবে। কেন বিজ্ঞাপন সংবাদপত্রে? কোন আইনে? কোন যুক্তিতে? ওটা তো নিউজ-পেপার, তাই না? ‘নিউজ’ এর কাগজ। বিজ্ঞাপনপত্র তো নয়!

    আপনার পয়সা আছে, কড়ি আছে, মেশিন আছে, টেকনোলজি আছে। আপনি বিজ্ঞাওনের জন্য আলাদা পেপার বানান না। এ্যত্তো বড়ো করে বানান। রঙ-চঙ সব দেন ওইখানে অসুবিধা নাই। কয়জন পড়ে দেখি ওই পত্রিকা? বিজ্ঞাপনের যদি সত্যিকারের চাহিদা থাকে তাহলে পড়বেই, তাই না? কিনে পড়বে। আমার যদি প্রয়োজ থাকে খবর জানার যে কোন মাল কোথায় কিনতে পাওয়া যায়, তাহলে তো ওটা কিনে পড়ব আমি।

    সুতরাং, বিজ্ঞাপনের জন্য আলাদা করে বিজ্ঞাপনপত্র বানান। বিজ্ঞাপনের জন্য আলাদা টিভি-চ্যানেল বানান-বিজ্ঞাপন চ্যানেল। কমার্সিয়াল টিভি চ্যানেল আলাদা করে বানান না! নিউজ চ্যানেলের মধ্যে বিজ্ঞাপন দেন কেন? নাটকের মধ্যে বিজ্ঞাপন দেন কেন?

    আসলে কী হয়, জানেন তো? মিডিয়া তার পাঠক-দর্শক-শ্রোতাকে বেচে দেয়। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে গিয়ে বলে, এই দেখেন মার্কেট রিসার্চ, এই দেখেন বাজার জরিপ। অমুখ বিখ্যাত বাজার-গবেষণা-প্রতিষ্ঠান (তৈরিই আছে অলরেডি এগুলো) তারা সার্ভে দেখেছেন যে প্রথম আলো যারা কেনেন, তারা আপনার পণ্য/সেবার সম্ভাব্য খুব ভালো ক্রেতা। তাদের পয়সা আছে। তারা আপার ক্লাস। এবং আপনার পত্রিকার সার্কুলেশন চার লক্ষ। চার লক্ষ লোক আপনার পত্রিকা পড়ে। সুতরাং, এখানে আপনারা যদি বিজ্ঞাপন দেন, তাহলে আপনার বিজ্ঞাপন সার্থক হবে।

    সার্থক হয়ও। তাঁর মানেটা কী? এই চার লক্ষ পাঠককে পত্রিকার মালিকেরা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে গিয়ে বেচে দেন। অর্থাৎ, আপনি এবং আমি হচ্ছি প্রথম আলোর আসল প্রোডাক্ট- সেলস প্রোডাক্ট। তার আসল পণ্য ‘নিউজ’ না। তার আসল প্রোডাক্ট প্রথম আলোও না। আমাদেরকে বেচেই মিডিয়া বড়লোক হয়। [পণ্য হিসেবে আমাদের মালিক, মিডিয়ার মালিক, বিজ্ঞাপনের মালিক, আর বিজ্ঞাপনী পণ্যের মালিক সবাই একই শ্রেণির লোক। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থে শ্রেণিগত দিক দিয়ে।]

    সঙ্গে অন্যান্য সুবিধার দিকও আছে বৈকি। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব অর্জন করা, ব্যবসার জন্য সামগ্রিক একটি ইতিবাচক বাতাবরণ তৈরি করার কাজে মিডিয়াকে লাগাতে পারা, নিজের নিজের কমার্শিয়াল-কর্পোরেট হাউসের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষা করা, শ্রেণিগত স্বার্থ রক্ষা করা এগুলো তো সব আছেই। সংক্ষেপে এই হচ্ছে মিডিয়ার পলিটিকাল ইকোনমি।

    সুতরাং, এক্ষুনি স্বাধীন মিডিয়া কমিশন চাই। এই কমিশনের কাজ হবে মিডিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করছে কিনা পরীক্ষা করে দেখা- প্রতিদিন। সারাবছর ধরে। বিদ্যমান নামকাওয়াস্তে প্রেস কাউন্সিল চাই না। এই মিনমিনে প্রেস কাউন্সিল দিয়ে কিচ্ছু হয় না। আমরা চাই একটা স্বাধীন মিডিয়া মনিটরিং কমিশন। যে কমিশন সারা বছর ধরে প্রতিদিন মিডিয়া পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) করবে। মিডিয়া কী রিপোর্ট করেছে, কী রিপোর্ট করে নি; কী চেপে গিয়েছে, কী সামনে তুলে এনেছে; কেন আনল, কেন আনল না- এইসব তারা দেখবেন, বুঝবেন, সবাইকে জানাবেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য যথাযথ জায়গায় সুপারিশ করবেন। ব্যাপক জানাজানি, আলাপ আলোচনা হলে মিডিয়ার বিদ্যমান অবস্থার ওপর সত্যিকারের চাপ আসবে। পরিবর্তনের চাপ। এই কমিশনের কাছে আমি (পাঠক) নালিশ করতে পারব। এটা হবে রাষ্ট্রীয়-সাংবিধানিক মর্যাদার, স্বাধীন, শক্তিশালী একটা কমিশন। এই কমিশনের কাছে মিডিয়ার জবাবদিহি করতে হবে। ব্যাখ্যা করতে হবে তারা কী করেছেন, কেন করেছেন।

    শুধু তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের লেখাই নয়, পাঠকের লেখাও মিডিয়ায় ছাপতে হবে। যদি না ছাপেন তাহলে লিখিতভাবে জানাতে হবে। কেন ছাপলেন না সেটাও জানাতে হবে বৈকি। কী দোষ ঐ লেখার। আপনার যে লেখা পছন্দ হয় ঐ লেখা ছাপবেন, যে লেখা পছন্দ হয় না ঐ ছাপবেন না। মাঝখান থেকে যে লেখা আপনি ছাপবেন ঐ লোক হয়ে যাবে বুদ্ধিজীবী, আর যে লেখা আপনি ছাপবেন না ঐ লোক হয়ে যাবে মূর্খ- এটা কোন খেলা? এটা কোনো ধরনের সুশীল আচরণ? (এটা শুধু বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে প্রশ্ন না, সারা দুনিয়ার মিডিয়া নিয়ে প্রশ্ন। খুব ন্যায্য প্রশ্ন, গোড়ার প্রশ্ন)

    এগুলো নিয়ে আপনি আলাপ তুলবেন না, অথচ আপনি গোটা সমাজ সংস্কার করবেন, রাজনৈতিক দল বদলে ফেলবে, রাষ্ট্র বদলে ফেলবেন, নির্বাচন কমিশন বদলে ফেলবেন। অন্যদিকে শুধু বাজারটা বদলাবেন না। কর্পোরেট সেক্টরকে বদলাবেন না। আর, ভাব নিবেন আপনি বাংলাদেশের মঙ্গল করছেন।

    বাচ্চাদেরকে ছবি আঁকা শেখাতে হবে। দায়িত্ব কার? সার্ফ এক্সেল – এর। ‘দাগ নেই তো শেখাও নেই’। সার্ফ এক্সেলের ‘পার্টনার’ কে? কখনো প্রথম আলো, কখনও দ্বিতীয় আলো, কখনও অন কোনো মিডিয়া। ঘোষিত অংশীদার। ব্যবসায়িক অংশীদার। সুতরাং কে কার পার্টকার সেটা বেস পরিষ্কার। গোপন করার কিচ্ছু নাই। বাচ্চাদেরকে অংক শেখাতে হবে। স্কুলগুলো শেখাতে পারে না। [অকার্যকর ইস্কুল। ব্যর্থ বিদ্যালয়]। তাহলে শেখাবে কে? প্রথম আলো শেখাবে। অঙ্ক। ভাগ্যিস, বড়দের অঙ্ক শেখানোর প্রকৃত হিসাবটা এখনো বুঝে ফেলেনি অবুঝ বাচ্চারা।

    হাসির একটা গল্প আছে। গৃহশিক্ষক এক দিন সন্ধ্যায় ‘বেয়াড়া’ দুই বাচ্চাকে অঙ্ক করাচ্ছিলেন। তো, এই দুই বাচ্চা আবার অঙ্ক না করার ক্ষেত্রে তুলনারহিত সফলতা অর্জ করেছে ততদিনে। এই শিক্ষক দায়িত্ব নিয়েছেন ‘বিশেষ দায়িত্ব’ হিসেবে। শিখিয়েই ছাড়বেন অঙ্ক। তো , গল্পের ছলে তিনি বাচ্চাদেরকে চাঁদ-তারা-কাশা-গ্রহ-নক্ষত্র দেখাচ্ছেন। বাচ্চারা খুশি। এই স্যার ভালো। শিক্ষক এখন বাচ্চাদের বলছেন, ঐ দেখ কত সুন্দর দুইটা তারা, আর তার পাশেই আরও তিনটা তারা। আচ্ছা বল তো, তাহলে কয়টা তারা হলো? বাচ্চারা বিভ্রান্ত। দুই সেকেন্ড অতিক্রান্ত। তখন ছোট বাচ্চাটা বড় বাচ্চাকে বলছে, ‘বলিস নে ভাই, স্যার কিন্তু অঙ্ক করাতিছে!” ত, গ্রহ-নক্ষত্র-তারকা দেখিয়ে দেখিয়ে প্রথম আলো  জাতিকে অঙ্ক করাচ্ছে। কী অঙ্ক করাচ্ছেন তারা, সেটা অবশ্য আমাদের খতিয়ে দেখাটা উচিৎ হবে।

    অঙ্কের গণিত তো আছেই। ব্যবসারও গণিত আছে। বাণিজ্যেরও তো গণিত আছে। গণিত আছে প্রচারণার। আছে তারকা-বুদ্ধিজীবী-বীজগণিতও। এইচএসবিসি’র মতো সত্যিকারের ব্যাংকিং-গণিতও আছে। ওখানে আবার হাইকোর্টও আছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড। গ্রামীণফোনের গণিতও আছে।

    আপনি গণিত শেখানোর উৎসব করবেন। ওখানে গ্রামীণ ‘ডিজুস’ আপনার পার্টনার হবে। আপনার-আমার বাচ্চারা ডিজুসের প্রথম আলোর পট্টি মেরে, টিশার্ট ইউনিফর্ম পরিধানপূর্বক গণিত উৎসবে হাজির হবে। প্রথম আলোতে ফটো যাবে। আপনি প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদ হবেন। আপনি বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাবেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া প্রতিযোগিতা হবে। সেই প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণী হবে (ঢাবি) চারুকলার বকুলতলায়। ওখানে কী হবে?

    গণিতের ফাঁকে ফাঁকে, বিজ্ঞাপনী ব্রেকের মধ্যে, বাচ্চারা সবাই নেসক্যাফে খাবে। [ব্রিটিশদের চা-খাওয়ানোর কথা আমাদের তবু মনে পড়বে না।] হাতে হাতে নেসক্যাফের মগ যাবে মাগনা মগ। ছোটবেলায়ই ঘুষ। মাগলা নেসক্যাফে। মাগনা মগ। এবং ঐ মগওয়ালা ছবি পরের দিনের পত্রিকায়। বাচ্চা খুশি। আপনিও খুশি। বাচ্চা মানুষ হচ্ছে। ডিজুস হচ্ছে। নেসক্যাফে হচ্ছে। গণিতটা পরিষ্কার। আগামী দিনের কর্পোরেট-ক্রেতা হয়ে উঠছে আজকের গণিতের বাচ্চারা। এটা  হচ্ছে গোটা সমাজকে বাজার বানানোর রাস্তা।

    তো, ওনারা সব সংস্কার করবেন। কিন্তু বাজার সংস্কার করবেন না। মিডিয়া সংস্কার করবেন না। এইটা তো হয় না। এই জন্যেই আমরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিপুল তহবিলে সমৃদ্ধ, উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মিডিয়া পরিবীক্ষণ কমিশন চাই। সেখানে আমরা প্রচুর এক্সপার্টের প্যানেলে বানিয়ে কাজ করব। বিপুল সংখ্যক কর্মীর প্যানেল। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেখানে কাজ করবেন। শিখবেন। এক হাজার দুই হাজার লোকের প্যানেলে সারা বছর কাজ করবে। মিডিয়া কী করছে, কী করছে না।

    আপনারা সারাবছর সবার সবকিছু দেখে বেড়াবেন, মনিটরিং করে বেড়াবেন, আর আমরা আপনাকে মনিটরিং করব না? এ তো বিপজ্জনক কথা। এমনিতেই আপনারা বিশাল ক্ষমতাধর। আপনারা দিনকে রাত, রাতকে দিন বানাতে পারেন। আপনারা বললে কানসাটের রাব্বানী বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে যায়। (হয়ে যায় যায় ভাব। পরে এমপি নির্বাচনে ফেল!) আপনি বললে মনে হয় বাগমারার এমপি আবু হেনা ছাড়া মৌলবাদ থেকে বাঁচার উপায় নাই। আবার, আপনি বললে দুই দিন পর মনে হয়, ঐ একই আবু হেনার নিজেরই জঙ্গি-সংযোগ আছে। তাই না? সুতরাং, মিডিয়াকে একটা স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতেই হবে।

    শিল্পী: শেরিফ আরাফা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সক্রিয়তা ছাড়া কোনো পথ খোলা নাই

    এই তো আলাপ। সবশেষে একটা সতর্কবাণী। বাজার-বিশ্ববিদ্যালয়-রাষ্ট্র-সমাজ ও মিডিয়া সম্পর্কে আজকে আমরা অনেক গড় পর্যবেক্ষণ এখানে হাজির করেছি। এসব পর্যবেক্ষণের পক্ষে বিস্তারিত নথিপত্র হাজির করা দরকার। এসব নিয়ে ভুরিভুরি পত্রপত্রিকা-ছোটকাগর-চটি-পুস্তিকা-প্রবন্ধ উৎপাদন করা দরকার। কেউ একা এসব কাজ করা সম্ভব নয়। অনেক লোক, অনেক শিক্ষার্থী, অনেক পাঠক, অনেক শিক্ষক মিলে যদি কথা বলে শুরু করেন, যদি গুছিয়ে শান্তভাবে কথা বলেন, যদি নিজের কাজের দায়িত্ব নিজে নেন, নিজের কথাটুকু যদি অন্তত নিজে বলেন, তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয় বদলাবে; সমাজ বাদলাবে।

    সমাজ পরিবর্তন হোক, বিশ্ববিদ্যালয় বদলাক, এগুলো আমরা চাই। শুধু অমুক সরকার চায় বলে যদি আমরা আজকে এটা চাই, তাহলে আমাদের জন্য সমূহ বিপদ হবে। এরকম চাপানো সংস্কারের চাপে আমাদের মূলধন যেটুকু আছে অন্তত, সেটুকুও গাপ হয়ে যাবে। সংস্কার আমরা চাই। কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু, মৌলিক একটা প্রশ্নে আমরা কক্ষনো সংস্কার চাই না। সেটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে। আমার অক্ষমতাই আমার স্বাধীনতার সীমা। এর জন্য শিক্ষকদের এবং শিক্ষার্থীদের, শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষকদের সক্রিয়তা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নাই।

    এই তো! সবাইকে ধন্যবাদ এ রকম একটা বিরক্তিকর বকর-বকর অনুগ্রহ করে শোনার জন্য। সবাইকে ধন্যবাদ। আর, ধন্যবাদ দেওয়ার আসলে কী আছে? এটা তো আজকে আমরা সবাই মিলে আয়োজন করেছি। ধন্যবাদ  দেওয়ার কিছু নাই আসলে। যারা শ্রোতা, তারা তো আমরাই। ঠিক না? এবং আমরা আসলে এগুলো নিয়ে কথাবার্তা বলতে চাই বলেই তো এখানে এসেছি। ফলে, আমরাই আয়োজন। আমরাই শ্রোতা। আজকে আমি বক্তা। কালকে আরেক জন বক্তা হবেন। তবু, ধন্যবাদ।

    আপনাদের প্রশ্ন-আলোচনা-মন্তব্য থাকলে মঞ্চে এসে করবেন।

    অন্তঃটীকা

    ১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১২৩ নম্বর ক্লাস রুমের চাবি।

    ২. ‘অন্য কোনো রকম বিঘ্ন’ বলতে এখানে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি তারিখে দেশ জুড়ে জারিকৃত জরুরি অবস্থা-জনিত চরম আতঙ্কের পরিবেশকে বোঝানো হচ্ছে। এখানে উপস্থাপিত আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয় জরুরি অবস্থার মাত্র চার মাসের মাথায়। ভুলে গেলে ভুল হবে, ‘জরুরি’ বিঘোষিত রাষ্ট্রযন্ত্রের তখন রীতিমতো নওজোয়ান তেজ। বাঘ আর হরিণেরা এক ঘাটে নাকানিচুবানি খাচ্ছে। বাচ্চারা গোয়েন্দা সংস্থার নাম মুখস্ত করছে। আতঙ্কে অজগর সাপ গড়াগড়ি রাস্তায়। ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া কুমির আত্মপ্রকাশ করছে ডোবায়। এখনকার খোলামেলা গণতান্ত্রিক পরিবেশ এসে আতঙ্কের সেই দমবন্ধ সময়কে সত্যিকারের অর্থে অনুভব করা সহজ নয়। সেটা ছিল ঘোরতর অন্ধকার কাল।

    ৩. সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হচ্ছে। তাদের অনেকেই সেইদন শ্রোতাদের মধ্যে বসে ছিলেন। আলোচনার পরদিন তো এদের একজন আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত গলায় ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি আমার আলোচনা থেকে উপকৃত হয়েছে। এটা ছিল গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণ, প্রশংসা, জিজ্ঞাসাবাদ, অত্যাচার, কৃতজ্ঞতা জানানো এবং দুঃখপ্রকাশ করার কাল।

    ৪. ‘ক্ষমতা’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম চাবি-শব্দ। ছোট্ট একটু নমুনা-বাক্য দিই: ‘অগণতান্ত্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চললে এমন সন্ত্রাস-চাদাবাজি-টেন্ডারবাজি- অস্ত্রবাজি চলতেই থাকবে। নির্বাচিত ছাত্র-প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিতে পারলেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল হবে’।  (মুহম্মদ আবদুস সোবহান, ২০১০: ১৬; মোটা হরফ সংযোজিত। এরকম নিদারুণ বিবৃতিতে ‘ক্ষমতা’ বলতে কী বোঝায়, তা সহজেই অনুমেয় ‘গণতান্ত্রিকভাবে’ যে ছাত্ররা ‘ক্ষমতা’ আবেন, তাঁরাই হবেন বৈধ ক্ষমতার অধিকারী, ক্ষমতার বাকি সব ‘অবৈধ’ দাবিদারকে তাঁরা আইনসম্মতভাবে নিকাশ করে দেবেন খোদ রাষ্টড়যন্ত্রের ‘বৈধ’ বাতাসে, রাষ্ট্রীয় লু হাওয়ার ঝাপ্টায়। তাতে যে অস্ত্রবাজি বন্ধ হয় না সে কথা ডাকসু, চাকসু, রাকসু, জাকসুর ইতিহাস দেখলেই যথেষ্ট বোঝা যায়। ছাত্র সংসদ মানেই আরও সন্ত্রাস, লাশ।

    ৫. অনেকেই আছেন, যারা স্নেহ করেন, প্রশ্রয় ও উৎসাহ দেন, চমৎকার সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। সংখ্যায় এঁরা ন্যূন নন মোটেও। বিশেষ কোনো দলের লোকও নন। তথাপি, সকলে নির্দলীয়ও নন। এদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নাই। বলাটা নিতান্তই বাহুল্য।

    তথ্যসূত্র

    বাকুনিন, মিখাইল (১৮৭১)। হোয়াট ইজ অথরিটি’। পিঅ্যানার্কি। 

    বাকুনিন, মিখাইল (১৯৫৩)। পাওয়ার এন্ড অথরিটি’। জিপি ম্যাক্সিমফ সম্পাদিত, দি পলিটিক্যাল ফিলসফি অব বাকুনিন। ইলিনয়: ফ্রি প্রেস

    সেন, দীনেশচন্দ্র (২০০৮)। রামায়নী কথা । প্রথম প্রকাশ: ১৯০৪। ঢাকা: পড়ুয়া

    সোবহান, মুহম্মদ আবদুস (২০১০)। ‘শিবিরের হামলা দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনারই অংশ’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ আবদুস সোবহানের বিশেষ সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকার গ্রহণ: বাঁধন অধিকারী। কালের কণ্ঠ, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১০।

  • ভাষার বিরুদ্ধতা আর জিব্রানের মুখোশ

    ভাষার বিরুদ্ধতা আর জিব্রানের মুখোশ

    মানস চৌধুরী

    এক. ব্যক্তির ভাষা

    ব্যক্তিসমুহের মধ্যে যোগাযোগ নির্মাণ ছাড়া ভাষার অপরাপর ভূমিকাগুলো ‘সামাজিকায়ন প্রক্রিয়া’ (socialisation process) তে গুরুত্বপূর্ণ করে দেখা হয় কি? সামাজিকায়ন প্রক্রিয়া যেহেতু সমাজের মধ্যে ব্যক্তির পৌনঃপুনিক  অন্তরায়নের (internalisation) বিষয়মাত্র, তাই ভাষা সেখানে ধারণ করে ‘ব্যক্তি’ কে; সঠিকভাবে বললে ‘ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে, ব্যক্তির মধ্যকার ‘সামাজিক মানুষ’কেও। প্রাক-ভাষা (ভাষার আধুনিক ধ্বনি ও লিপিকে বিবেচনা করলে) যুগের যোগাযোগ ব্যাপারটি নিশ্বয়ই দুরূহ ছিল। যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা ‘ব্যক্তি’র, মূলত ‘সামাজিক মানুষে’র অভিজ্ঞতাকে প্রকাশিত হতে দেখি। তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ পায় তথ্য আর বর্ণনার মধ্য দিয়ে। তথ্য আর বর্ণনাকে আলাদাভাবে দেখবার কিছু অবকাশ বোধহয় হয়েছে। সাধারণত ভাষা ব্যবহারের অভিমুখ রয়েছে এবং যা কিছু বলা হয় তার সবটাই প্রয়োজনীয় ‘তথ্য’ হয়তো নয়, তবে ক্ষেত্রবিচারে গুরুত্বপূর্ণ ‘ভাষা’ কখনও। ‘সামাজিক মানুষ’ এখানে ‘পর্যবেক্ষণকারী’। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতাতো বিভিন্ন, তার-তাদের এমনকি তথ্য আর বর্ণনার ভাষাও কি ছিন্ন হচ্ছেনা তাহলে? ‘আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, কোন দুজন বক্তারই একরকমের ভাষা নয়, কারণ কোন দুজন বক্তার ভাষার অভিজ্ঞতা এক নয়।’১ ভাষার অভিজ্ঞতা প্রাথমিক বিচারে সামাজিক অভিজ্ঞতা; ‘চৈতন্য’ তাহলে এর পরই আসে। এমনকি ‘চৈতন্য সামাজিক অভিজ্ঞতার অভিঘাত হতে উৎসারিত হলেও২ তা ক্ষেত্রজ বিশিষ্ট।

    আবার, ভাষা মূল্যায়নও বটে, ব্যক্তির ‘মূল্যায়ন’, ‘ব্যাখ্যা’ কিংবা ‘বিশ্লেষণ’। ব্যক্তিসমূহের মূলায়ন, ব্যাখ্যা ও বিম্লেষণ সমাজঘটনা প্রবাহের নতুন অর্থ তৈরি করতে থাকে। মানুষের প্রজ্ঞা তখন, বাড়তে থাকে বা ভিন্ন হয় কারণ ‘সত্য’ কিছুতেই আর বিবলিক্যাল কিংবা বেদ-বাক্য থাকেনা, প্রতিনিয়ত ‘বচনে’র অভিঘাতে পড়ে তা। ব্যক্তিকে আর তখন পর্যবেক্ষণকারী নিতান্ত ‘সামাজিক মানুষ’ হিসেবে পাইনা। পাই ‘উপলব্ধ’ এবং ‘অনুভূত’ মানুষ হিসেবে। এখানেই ব্যক্তির চৈতন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং গুরুত্ব পায় গুটিকতক প্রশ্নও। ‘উপলব্ধ’ এবং ‘অনুভূত’ মানুষ কি সামাজিক মানুষ নাকি একক ব্যক্তি? এই মানুষের সকল ভাষারই কি অভিমুখ রয়েছে; এমন ভাষা কি নির্মিত হতে পারে না বা হয় না যার কোন বিশিষ্ট ‘অন্যপক্ষ’  (শ্রোতা) দরকার পড়ে না –  নিতান্ত নিরাসক্ত-নিলিপ্ত কথন (কথোপকথন নয়,  যে ভাষা বলাই হয় নতুবা নির্মিত হয় মস্তিষ্কে) শুধুই নিজের ‘অস্তিত্ব’ কে স্মরণ করবার জন্য? এই ভাষা প্রকাশ পেলে যোগাযোগ বিভ্রাট এমন কি যোগাযোগহীনতা তৈরি হতে পারে না? যদি হয়ই, ‘সামাজিকায়ন প্রক্রিয়া’ তখন কী প্রকৃতির? বলাই বাহুল্য, হাডসনের বর্ণনায় মানুষের ভাষার চতুর্মাত্রিক স্বতন্ত্র্যের (বয়স, উৎসক্ষেত্র, সামাজিক শ্রেণী বা পেশা এবং লিঙ্গ)৩ সাথে চৈতন্য’ কে যুক্ত করেই দেখতে চাওয়া জরুরি।

    দুই. জিব্রানের মুখোশগুলো

    জিব্রানের মুখোশহীন যে পাগল সে কি ব্যক্তি না কি সামাজিক মানুষ? “…For the first time the sun kissed my own naked face and my soul was inflamed with love for the sun, and I wanted my masks no more…”। যদি মুখোশগুলো হয় ব্যক্তিত্বের ধরনসমূহ তাহলে মুখোশ হারিয়ে পাগলটি পরিণত হয় সামাজিক মানুষে এমনকি বিজ্ঞানের বেলায় প্রাকৃতিক মানুষেও হয়তো। কিন্তু, আমাদের দূর-কল্পনাতেও তো এমন সমাজ দেখি না যেখানে এই মুখোশহীনকে সামাজিক মানুষ হিসেবে দেখবার সুযোগ মিলবে। বরং সে পাগলই হয়ে পড়ে, যেহেতু তার চারপাশে ‘সুস্থ’ মুখোশধারী মানুষেরা। সে মানুষেরা সমাজবদ্ধ এবং সামাজিক ক্রিয়াশীলতা তাদেরকেই ঘিরে। আর সেই ক্রিয়াশীলতা নিদারুণ উপদ্রুত হয় এই নগ্নমুখের মানুষটিকে নিয়ে। এভাবে একটি সংকটকে আমরা উম্মোচন করে ফেলি এবং নিশ্চিত হতে বাধ্য হই: যে রাস্তায় ও জনপদে জিব্রানের মুখোশহীন মানুষটি দৌড়ে বেড়ায় সেই রাস্তা ও জনপদ অনিবার্যভাবেই ভিন্ন ‘অভিজ্ঞতা’, সঠিকভাবে বললে ‘উপলব্ধি’ নিয়ে ঐ মানুষটি কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি হয়ে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ান এবং বলেন “… And I have found both freedom and safety in my madness; the freedom of loneliness and the safety from being understood, for those who understand us enslave something in us…”।

    এই ব্যক্তির নিজস্ব একটি ভাষা আছে। সমাজে সেই ভাষা ব্যক্তিত্বের সাথে সাথে নিজেও বিযুক্ত হয়ে পড়ছে। ব্যক্তি-একই সঙ্গে, যেহেতু ভাষাই তার যোগাযোগের মাধ্যম, বিযুক্ত হচ্ছে। বিযুক্তির আদল নানাবিধ। ‘শ্রেণী’ যখন ভাষাকে তৈরি করে, তখন সে ভাষায় ‘রাজনীতি’ থাকে, ‘স্তর’ থাকে যখন, আর থাকে ‘অবদমন’। সে ভাষাও তখন বিযুক্ত হয়ে পড়ে পরস্পর হতে। কারণ, ভাষা তখন নিছক তথ্য আদান প্রদানের যোগাযোগ নয়, সে নির্মাণ করে কতকগুলো বিরুদ্ধ-চেয়ার যেখানে উপবিষ্ট থাকছেন ব্যক্তিসমূহ। এই বিরুদ্ধতা প্রকারান্তরে তৈরি করে অচেনা পরিবেশের পটভূমি। বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব বিরুদ্ধাচারী হতে হতে সংঘাতময় এমনকি যোগাযোগহীন ও তো হতে পরে। ‘রাজনীতি’ই সেখানে নিয়স্তা।

    এভাবে শ্রেণী কিংবা রাজনীতি, চৈতন্য বা বোধ বিবিধ, তাই বিবিধ উপলব্ধিতে তা প্রকাশিত। মুখোশহীনের গল্পটাকে তাহলে অন্যভাবেও দেখা যেতে পারে। যদি অসংখ্য সুদূর বিভাজিত মুখোশ – ভাষার, সৃষ্টি হয় সমাজের অভ্যন্তরে, তাহলে যোগাযোগের অর্থহীনতা তৈরি হয়েই যায়। কারোরই মুখোশহীন হবার দরকার পড়ছে না, সংকট তৈরিতে। ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে ‘ভাষার’ শর্তহীনতায় দেখা যাচ্ছে না। তাই এই টানাপড়েন। এই টানাপড়েনই তৈরি করে কখনও নির্যাতনের ভাষা। সে নির্যাতন শ্রেণীর, বয়সের কিংবা লিঙ্গের।

    শিল্পী: কাহলিল জিব্রান

    তিন. অর্থের ভাষা

    ভাষার যোগাযোগ বিভ্রাটের বিষয়টি ‘অর্থ’ নিয়ে। আপাত অর্থহীন ভাষা-কাঠামো কিংবা ভাষা-কাঠামোর প্রাথমিক অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা যোগাযোগের উপাদান নিয়ে গঠিত হতে পারে। শ্রোতা কিংবা অভিলক্ষ্য মানুষদের সেই প্রাথমিক অর্থের সীমারেখা অতিক্রম করে যেতে হয়। সেখানে ভাষার তাবৎ গাঠনিক প্রক্রিয়া দৃশ্যত কোনো মানেই তৈরি করে না কিংবা বলা যায় গাঠনিক প্রক্রিয়ার বিন্যাস একটা বা বিবিধ ‘অনুভূতি’ নির্মাণ করে। ভাষার জাল বিন্যাস তখন ‘সাবলাইম’ হয়ে যায় ‘অনুভূতি’ প্রকাশে।

    “:      আমাকে সইতে পারবে?

     :      পারব, রাজা, পারব। আমার প্রমোদবনে আমার রাণীর ঘরে তোমাকে দেখতে চেয়েছিলুম বলেই তোমাকে এমন বিরূপ দেখেছিলুম – সেখানে তোমার দাসের অধম দাসকেও তোমার চেয়ে চোখে সুন্দর ঠেকে।         তোমাকে তেমন করে দেখবার তৃষ্ণা আমার একেবারে ঘুচে গেছে-তুমি সুন্দর নও, প্রভু, সুন্দর নও, তুমি      অনুপম।

    :       তোমারই মধ্যে আমার উপমা আছে।

    :       যদি থাকে তো সেও অনুপম। আমার মধ্যে তোমার প্রেম আছে সেই প্রেমেই তোমার ছায়া পড়ে, সেই     খানেই তুমি আপনার রূপ আপনি দেখতে পাও — সে আমার কিছুই নয়, সে তোমার।

    :       আজ এই অন্ধকার ঘরের দ্বার একেবার খুলে দিলুম — এখানকার লীলা শেষ হল। এসো, এবার আমার   সঙ্গে এসো, বাইরে চলে এসো- আলোয়।”

    রবীন্দ্রনাথের রাজার রাজা ও সুদর্শনার ‘কথোপকথনের’৫ মধ্যকার আপাত অর্থ নয় বরং ভেতরকার অর্থই অনুসন্ধিৎসার মুল বিষয়। ‘লা’ ও ‘পারোলে’র মতোই একটা দ্বিবিধ জগৎ তৈরি হয়ে যায় এই ভাষার মধ্যে যাকে প্রতীকী কিংবা রূপক-ভাষা বলা হয়। কিন্তু মনে রাখতেই হচ্ছে যে প্রতীক ক্রিয়াশীল—এমনকি রূপকও, শুধুই অর্থবহতার মধ্যে-অর্থহীনতার মধ্যে নয়; তবে সে ‘অর্থ’ অনুধাবনের জন্য নির্দিষ্ট একটি ‘জনসমাজ’ অর্থে সাংস্কৃতিকভাবে প্রস্তুত থাকে।

    ভাষার ক্ষেত্রে এই প্রতীক বা রূপক এবং ভাষা-বহির্ভূত জগতের প্রতীক বা চিহ্ন সংস্কৃতির সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো মাত্রা। প্রতীকবিদ্যা (semantics) আলোচনা করে সেই বিষয় নিয়েই যা মানুষেরা পরস্পর ব্যবহার করে, এবং সার্বজনীনতা দিয়েছে। বিপরীত দিকে ভাষার ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তি’ কখনো নিজেই স্বপ্রণোদিত। প্রতীকী বা রূপক-ভাষা তখন তার চৈতন্যেরই স্মারক থাকে। যোগাযোগ সেখানে বিভ্রাট তৈরি করতে পারে।

    শিল্পী: কাহলিল জিব্রান

    চার. বেকেটের ব্যক্তিবর্গ

    স্যামূয়েল বেকেটের ‘মানুষদের ভাষা অসংলগ্ন নাকি ‘মানুষেরাই’ পরস্পর অসংলগ্ন কিংবা অসংলগ্ন খোদ সামাজিক প্রক্রিয়াটিই? অসংলগ্নতার বিপরীতে নিশ্চয়ই ‘নিমগ্নতা’ কাজ করে। স্যামুয়েল বেকেটের মানুষেরা সমাজে নিমগ্ন নয়–নিমগ্ন খোদ ‘আত্ম’তেই, আত্মনিমগ্ন তারা। অথবা গাঢ় বিচারে দেখলে, নিমগ্ন হবার মত সামাজিক পরিসরই সেটা নয় বরং নিবিড় অসংলগ্নতাই সেই পরিসর তৈরি করতে পারে যার অন্য নাম ‘বিযুক্ততা’। বস্তুত ‘বিযুক্ত’ মানুষেরা বিচরণ করছে এক সমাজহীনতার মধ্যে — সমাজকে সেখানে শিথিল হতে হতে ক্ষীণকায়, হীনবল, ধোঁয়াটেই দেখি। আর তাই মানুষেরা কিছুতেই ‘সামাজিক মানুষ’ দৃষ্ট হয় না হয়তো বরং ঘোরতর ‘ব্যক্তি’ হিসেবেই তারা দৃষ্ট হয়। ভাষা সেখানে ঐ অসংলগ্ন, বিযুক্ত ‘ব্যক্তি’ ও ‘ব্যক্তি-চৈতন্যে’রই ধারক। বিযুক্ত ‘ব্যক্তি’রা চৈতন্য প্রবাহে কাছাকাছি কি না সে বিচারটি অর্থাৎ ‘মনস্কতা’র প্রসঙ্গ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে কারণ ‘যোগাযোগ’ই সেখানে সচরাচর নয়। তারা বলে:

    “:      কিন্তু যেহেতু আমরা নীরব থাকতে অসমর্থ অতএব ইতিমধ্যে একটু শান্তভাবে আলাপ করার চেষ্টা করা   যাক।

    :       ঠিক বলেছো, আমরা অফুরন্ত।

    :       যেন চিন্তা করতে না হয় সেজন্য।

    :       সে অজুহাত আমাদের আছে।

    :       যেন আমাদের শুনতে না হয় সেজন্য।

    :       যুক্তি আছে আমাদের।

    :       সমস্ত মৃতকন্ঠস্বরগুলো।

    :       পাখার মতো শব্দ করে তারা।

    :       পাতার মতো।

    :       বালির মতো।

    :       লতার মতো।

    কিংবা

    :       আমরা আমাদের ব্যায়ামগুলো করতে পারি।

    :       আমাদের মুভমেন্টগুলো।

    :       আমাদের এলিভেশনগুলো।

    :       আমাদের রিলাক্সেশানগুলো।

    :       আমাদের এলঙ্গেশনগুলো।

    :       আমাদের রিলাক্সেশানগুলো।

    :       গরম করে তোলার জন্যে।

    :       ঠাণ্ডা করে দেবার জন্য।”

    তাছাড়া তারা নিশ্চুপ থাকে অল্পক্ষণ, দীর্ঘক্ষণ; নৈঃশব্দ্যে বসবাস করতে থাকে। এই নৈঃশব্দ্য তাদের স্বতঃস্ফুর্ত কামনা নয়, উল্টো তারা নৈঃশব্দ্য এড়াতেই চায়। কিন্তু বেকেটের ব্যক্তিদের এই-ই পরিণতি। নৈঃশব্দ্য তাদের ভাষারই অংশ, নৈঃশব্দ তাদের ভাষাই। আধুনিক অভিঘাতের সমাজের মানুষদের নৈঃশব্দ্য ভাষা-পরিপূরক হয়ে ওঠে। নৈঃশব্দ্য তখন নিছকই চুপ থাকা নয়। সত্যজিতের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে সিদ্ধার্থ যখন ছোটভাইয়ের গতিবিধি নিয়ে আলোচনা করতে যায়, ছোটভাই তখন ‘চে গুয়েভারা’র জীবনী বের করে দেখায়, জানতে চায় এই বইটি যে একদা সিদ্ধার্থই উপহার দিয়েছে—সেটা সিদ্ধার্থের খেয়াল আছে কি না। এর পর সিদ্ধার্থের চুপ থাকা ভাষাই। এই নির্মাণ আমরা পাই সত্যজিতের আরো সব কাজে, এমনকি চলচ্চিত্রকার অনেকেরই কাজে। ভাষার অভ্যন্তরে নৈঃশব্দ্যের বেড়ে ওঠা এমন এক অনুভবের জন্ম দেয় যা ‘রঙ’ ও ‘সুরে’র প্রকাশভঙ্গির সাথে তুলনীয় হতে চায়। কিন্তু ‘সাধারণ’ বলে সমাজের যে পরিচয়টা আমরা নির্মাণ করি—সেখানে বেকেটের ব্যক্তিদের ভাষা কি স্বতঃস্ফূত অর্থ তৈরি করে? যোগাযোগ কি সেখানে সহজ—যেখানে এই ব্যক্তিরা এতটুকু পরিচিত নয় কিংবা স্বল্প পরিচিত? যোগাযোগহীনতার কোন সঙ্কটই কি তৈরি হয় না?

    দি স্লেভ;
    শিল্পী: কাহলিল জিব্রান

    পাঁচ. Outsider এবং অস্তিত্ত্বের ভাষা

    জিজ্ঞাসা ছিল—নিতান্তই নিজের অস্তিত্বকে স্মরণ করবার জন্য নিস্পৃহ কখন কি সম্ভব নয়, যে কথন সংলাপ-রূপান্তরিত হয় না, অভিমুখ পায় না এ কারণে? কিংবা অভিমুখ প্রয়োজন হয় না বলে? ভাষা তো তৈরি হয় মস্তিস্ক কাঠামোতে। চিন্তার ভাষা কি ধ্বনি-লিপির ভাষা? এ বিয়টিও নিশ্চয়ই ‘চৈতন্যের’ বিষয় অর্থাৎ চৈতন্যের শর্তযুক্ত। যেহেতু চৈতন্য সততই ব্যক্তিক পরিসরে ভিন্ন, তাই চিন্তাও ব্যক্তিক পরিসরে ভিন্ন। চিন্তাকে চৈতন্যের সাথে প্রত্যক্ষভাবেই সম্পর্কিত দেখতে হচ্ছে। চিত্রশিল্পী এবং সুরনির্মাতাদের চিন্তার ভাষা ধ্বনি-লিপির ভাষা নির্ভর হতে হবে কেন?

    বেকেটের ব্যক্তিদের ভাষা অভিজ্ঞতা জারিত এবং ছিন্নভিন্ন; অথচ সেই একই নগর-অভিঘাতে বিচরণশীল নিঃসীম আউটসাইডার ব্যক্তি কাম্যুর ভাষায় এক নিস্পৃহ বিজড়ন ধরা পড়ে। এই ‘নিস্পৃহ-বিজড়ন’ আবার এক বিষমসঙ্গতি (paradox)। কোথাও বিজড়িত নয়, তাই ‘আউটসাইডার’ এবং তাই তার ভাষা নিস্পৃহ। কিন্তু সেই ভাষা আবার পরস্পর ‘বিজড়িত’—‘অসংলগ্ন’ নয়। কাম্যুর ঐ কথন কি কোনো শ্রোতার অভাব বোধ করে? এ কি আমাদের অভিজ্ঞাত, উপলব্ধ, অনুভূত, অভিঘাতে-দীর্ণ মস্তিস্ককাঠামোতেই নির্মিত প্রগলভ ভাষা নয়? “Mother died today, Or Maybe yesterday, I don`t know…After the funeral though, the death will be a classified fact and the whole thing will have assumed a more official aura… … I had to go up to Emmanuel’s place to borrow a black tie and armband. He lost his uncle, a few months ago… কিংবা  And I fired four more times at a difeless body and the buttets sank in without leaving a mark. And it was like giving four sharp knocks at the door of unhappiness..”

    ক্যানভাসে ‘অস্তিত্বে’র চিত্রকলা আঁকবার যে ভাষা—নিঃসীম ব্যক্তির, ব্যক্তির চৈতন্যের; এমনকি কোন অভিমুখ মাত্র বিবেচনায় না এনে—সে ভাষা সাধারণ সামাজিক মানুষের ভাষা কি? ‘আউটসাইডারে’র ভাষাই কি নয়?

    স্যামুয়েল বেকেট

    ছয়. কানামাছির ‘অর্থ’ তার যোগাযোগ

    ‘ব্যক্তি’ আর ‘সামাজিক মানুষ’ প্রতিনিয়তই আলাদা। ‘ব্যক্তি’ সমূহের মধ্যে বিস্তর ফারাক চৈতন্যপ্রবাহে। ব্যক্তির ভাষা তাই জটিল এক সময়। মানুষের ভাষা যোগাযোগ তৈরি করবার মৌলিক তাগিদেই তাড়িত। কিন্তু আধুনিক ব্যক্তির যোগাযোগ-প্রক্রিয়া নতুন পরিসর তৈরি করে। ভাষাহীনতাও যেমন ‘অর্থ’ তৈরি করে—তাই অনিবার্য যোগাযোগ সৃষ্টি হয়; আবার ভাষাই অনিবার্য অর্থহীনতা—তাই যোগাযোগহীনতা তৈরি করে।

    ‘ভাষা মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম’ এই সরল বচনটিকে এমনকি খুব সীমিত শর্তেই কার্যকরী বলা যেতে পারে। ব্যক্তির নানাবিধ ভাষা ‘অর্থে’র নানা ধরণ তৈরি করে, সেই অর্থসমূহ বিভিন্ন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা জারিত হয় না বলে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে তা অর্থ বিভ্রাট, স্তরবিভ্রাট ও চূড়ান্ত বিচারে যোগাযোগহীনতা তৈরি করে। ভাষাই যখন যোগাযোগহীনতার নিয়ামক হয় তখন তার ‘সামাজিকায়ন প্রক্রিয়া’ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। ব্যক্তির বিবিধ চৈতন্যের ফল হিসেবে বিভিন্ন অধিরূপগুলো অংশত বিভিন্ন প্রতীক-রূপক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে, ভাষার ভিন্নতা তাই মুখোশের ভিন্নতা কিংবা মুখোশহীনতা। সামাজিক পরিসরে ‘ব্যক্তি’কে কিংবা ‘ব্যক্তিসমূহের’ সমাজবদ্ধতা (বা বিযুক্ততা) কে দেখতে ভাষাই বিশ্লেষক-মানদন্ড হতে পারে কি? জিব্রানের পাগলেরা সমাজ-সংযুক্ত হবেন কীভাবে?

     

    তথ্যপঞ্জী

        ১. R. A. Hudson, Sociolinguistics, Cambridge, 1980

        ২. Karl Marx, Capital, Moscow, 1965.

        ৩. Hudson, পূর্বোক্ত।

        ৪. Kahlil Gibran, Madman, The Gratest Works of Kahlil Gibran, Delhi, 1991

        ৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, ১৯২০।

        ৬. স্যামুয়েল বেকেট (অনুবাদঃ কবীর চৌধুরী), গডোর প্রতীক্ষায়, ঢাকা, ১৯৮১।

        ৭. Albert Camus, (Trans from the French by Joseph Laredo), Outsider, London, 1982.

     

    • রচনাকাল: ১৯৯৬। প্রকাশ: সমাজ নিরীক্ষণ, সংখ্যা ৬১, ১৯৯৬। পরে লেখকের ‘জনসংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত’ গ্রন্থে সংকলিত, আদর্শ, ২০২১
  • হাওয়ার্ড জিন।। প্রসঙ্গ ‘গণ অনানুগত্য’

    হাওয়ার্ড জিন।। প্রসঙ্গ ‘গণ অনানুগত্য’

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    অনুবাদকের মন্তব্য: আমেরিকান প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, নাট্যকার, রাজনৈতিক দার্শনিক, সংগঠক ও চিন্তক হাওয়ার্ড জিনের এই সাক্ষাৎকারটি (Howard Zinn on Civil Disobedience) ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নেয়া হয়েছিল। সম্প্রতি ২০১৮ সালে State of Nature –এ সাক্ষাৎকারটি পুনরায় প্রকাশিত হয়। সেই সাথে howardzinn.org –তেও প্রকাশিত হয়। হাওয়ার্ড জিন বিভিন্ন লেখাপত্রে Civil Disobedienceনিয়ে প্রবল সরব ছিলেন। তার এই সক্রিয়তা কেবল লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, বাস্তবেও সেটা চর্চা করেছেন, আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, অংশ নিয়েছেন। সিভিল ডিজঅভিডিয়েন্সের বাংলা এখানে গণ অনানুগত্য করা হয়েছে। যদিও এর তর্জমা ‘আইন অমান্যকারী আন্দোলন’, ‘নাগরিক অবাধ্যতা’ও বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আইন-অমান্যকারী আন্দোলন’ পুরো ঘটনাকে কেবল আইন অমান্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে অর্থকে একটু সংকীর্ণও করে ফেলে; আবার ‘নাগরিক অবাধ্যতা’ স্পষ্টত ‘নাগরিক-কেন্দ্রিক’ বা জাতিরাষ্ট্র কেন্দ্রিক, যেখানে কিনা নাগরিক হওয়া বা না-হওয়া আসলে সিলসাপ্পরের মধ্যে আটকে থাকে। ফলে ‘গণ-’ এর মধ্যে সিভিল অর্থে জনসমাজ বেশি মানানসই বলেই মনে করি।

    হাওয়ার্ড জিন

    আপনি একবার লিখেছিলেন যে, ডিরেক্ট একশন বা প্রত্যক্ষ সক্রিয়তা ‘বহু ধরনের পদ্ধতিকে ধারণ করে, আমাদের কল্পনাই কেবল এর সীমানা’। বর্তমানে আপনি কোন কোন পদ্ধতি পেয়েছেন? এবং আপনার কল্পনা এগুলোতে কোন সীমা আরোপ করে দেয়?

    হাওয়ার্ড জিন: প্রত্যক্ষ সক্রিয়তার অর্থ হচ্ছে আপনার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ করার জন্য আবেদন নিবেদন বা তদবির করার পরিবর্তে আপনার প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্যে বা নালিশের মূল উৎসের ওপর সরাসরি এক্ট বা কাজ করা। ঐতিহাসিকভাবে ও বর্তমানে আমরা ধর্মঘটগুলোতে দেখছি: যেমন যে কর্পোরেশনগুলো তাদের কর্মচারীদের শোষণ করে অথবা যুদ্ধের জন্য অস্ত্র তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম হিসাবে ধর্মঘটগুলো। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আরেকটি রূপ হচ্ছে নাশকতার বিভিন্ন রূপসহ অহিংস [নন-ভায়োলেন্ট] কর্মকাণ্ড [অর্থাৎ, মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা এড়ানো]।

    ১৯৮০ সালের দিকে ploughshares গোষ্ঠীগুলো (আমাদের তলোয়ারকে পরিণত কর লাঙলে) অস্ত্র তৈরিকারী সংস্থাগুলোতে আক্রমণ করা শুরু করে, এবং এই কোম্পানিগুলোর কাজকর্মের প্রতিবাদ জানিয়ে ছোট ছোট নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করে। এইতো সম্প্রতি দি সেন্ট প্যট্রিক ফোর নামক একটি ধর্মীয় শান্তিবাদী গোষ্ঠী ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে নৌবাহিনীর একটি প্রতিষ্ঠানে রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। বয়কটও আরেক ধরণের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের রূপ। ১৯৬০ এর দশকে ক্যলিফোর্নিয়ার খামার কৃষকরা ক্ষমতাশালী উৎপাদকদের বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে আঙুর বয়কট শুরু করে। এটি কৃষকদের জন্য ভালো অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। অনৈতিক যুদ্ধ ত্যাগ করা, অথবা যুদ্ধের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানানোও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের একধরণের রূপ।

     

    আপনি বলেন যে, আমাদের সমস্যা গণ-অনানুগত্যে নয়, বরঞ্চ গণ-আনুগত্যে। সক্রেটিস বলেছিলেন যে, ‘যুদ্ধে ও আদালতে, সবখানে আপনাকে তা-ই করতে হবে যা আপনার শহর বা দেশ আদেশ করে’। আপনার দাবি হচ্ছে যে, আমাদের মনে এই কথাগুলোকে খোদাই করে লিখে দেয়া হয়েছে। ইতিহাসে ভয়াবহ অন্যায়ের মুখোমুখি হয়েও কর্তৃপক্ষের কাছে নতি স্বীকারের বহু নজির এবং বিদ্রোহের অতি অল্প নজির পাওয়া যায়। মানুষ কেন এতো সহজে অনাচার মেনে নেয়?

    হা জি: মানুষ দুই কারণে অন্যায় অবিচারের কাছে নতি স্বীকার করে: একটি হলো তারা এটাকে অন্যায়-অবিচার হিসেবে ঠাহর পারে না। একজন যুবক সামরিক বাহিনীকে যোগ দিতে পারে এইটা না জেনেই যে তাকে এমন একটা যুদ্ধে যোগ দিতে হতে পারে যা নৈতিকভাবে ন্যয়সঙ্গত নয়। মিডিয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঐতিহাসিক নজির সম্পর্কে জানাতে নাও পারে। অথবা, জনগণ অন্যায়-অবিচারের কাছে নতি স্বীকার করতে পারে এই বোধ থেকে যে, তাদের আর কোনো বিকল্প বা উপায় নেই। যদি তারা অমান্য করে তাহলে তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে, হয়তোবা চাকরি হারাতে পারে, হয়তোবা জেলে ঢোকানো হতে পারে। তাদেরকে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, এমনকি তাদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখতে শেখানো হয়েছে, বলা হয়েছে যে, তাদেরকে অন্যায়-অবিচারের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে কারণ তাদের সরকার, বা তাদের চার্চ বা তাদের পরিবারের প্রতি অনেক ঋণ রয়েছে। (দি ক্রিটোতে যেমন করে সক্রেটিস বলেন, তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতে পারবেন না, কারণ এই সরকারের প্রতি তার ঋণ রয়েছে।)

    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    আমাদের মতো কেউ কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে যে, বিদ্যমান ব্যবস্থা সামাজিক পরিবর্তন আনার জন্য আইনি ও রাজনৈতিক পদ্ধতি সরবরাহ করে। বিচারপতি আবে ফর্টাস (যিনি Concerning Dissent and Civil Disobedience শীর্ষক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন) এদের মধ্যে একজন। ওনার প্রতি আপনার জবাব খুঁজে পাওয়া যায় Disobedience and Democracy: Nine Fallacies on Law and Order (১৯৬৮) গ্রন্থে। এখানে এবং অন্যান্য লেখালেখিতে আপনি দাবি করেন যে, আইনের শাসন সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বন্টনকে আরো শক্তিশালী করে, এবং অন্যায়-অবিচার রোধে ব্যালট বক্স একটি অকার্যকর হাতিয়ার হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। যারা এখনো বলেন আইন হচ্ছে নিরপেক্ষ এবং গণতন্ত্র এখনো ভালোমতো বেঁচে আছে, তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কি বলবেন?

    হা জি: আপনি যদি ইতিহাসজুড়ে বিচার ব্যবস্থার কাজকারবারগুলো অধ্যয়ন করেন, তাহলে পষ্ট হয় যে, এটি গরিবের চাইতে ধনীকে, কালোর চাইতে সাদাকে, র‍্যাডিকেলের চাইতে গোঁড়াদেরকে বেশি সুবিধা দিয়েছে। উঁচু শ্রেণি থেকে আগত এবং প্রায়শই রাজনৈতিক অভিজাত কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক, ব্যবস্থার পদে পদে টাকার আধিপত্য – এই ব্যবস্থার আসল কাঠামোই এটা নিশ্চিত করে যে, আদালতে দরিদ্ররা আরো বেশি সমস্যার সম্মুখীন হন।

    আপনি যদি ইতিহাসজুড়ে কংগ্রেসে পাস হওয়া আইনগুলো অধ্যয়ন করেন, একেবারে প্রথম কংগ্রেসের হ্যামিল্টনের অর্থনৈতিক কর্মসূচি থেকে শুরু করে বর্তমানকালের করআইন পর্যন্ত, যেগুলো কিনা কর্পোরেশন ও ধনীদের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে, তাহলে আপনি দেখবেন যে আমাদের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা প্রধানত ধনী লোকদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। আপনি যদি যুদ্ধগুলো পর্যবেক্ষণ করেন তবে আপনি দেখবেন যে আমাদের তথাকথিত ‘চেক এন্ড ব্যালেন্স’, মানে যেখানে কিনা সরকারের কোনো শাখাই একক আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না, তা আদতে যুদ্ধের কালে কোনো কাজই করতে পারে না। প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কংগ্রেস আনুগত্যের সাথে তাল মিলিয়ে যায়, এবং সুপ্রিম কোর্ট কখনোই এমন রায় দেয়নি যে, যুদ্ধটি অসাংবিধানিক। যদিও বিচারিক পর্যালোচনা সম্ভবত তাদের কাজেরই অংশ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে সংগঠিত সকল যুদ্ধই সংবিধানের এই বাধ্যবাধকতাকে লঙ্ঘন করেছে যে, কেবল কংগ্রেসই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে।

     

    কামু বলেছিলেন, ‘১৭৮৯ এবং ১৯১৭ তারিখগুলো এখনো ঐতিহাসিক, কিন্তু এগুলো আর ঐতিহাসিক নজির নয়’। তার মতে, রাষ্ট্রের হাতে থাকা শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র এবং একটা দেশের সহিংস অভ্যুত্থানে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধারম্ভের বিপদ এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পুরোনো অর্থে বিপ্লবের কাল অতিক্রান্ত হয়েছে। মনে হয় কামুর ভাবনা আপনার মতোই, যখন আপনিও আপনার লেখাপত্রে বিপ্লবের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন এবং অহিংস প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পক্ষে ওকালতি করেন। কিন্তু একদা ইতিহাসে বিপ্লব যেমন কার্যকর ছিল অহিংস প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কি তেমন কার্যকর হবে?

    হা জি: আমাদের প্রথমেই সহিংস বিপ্লবের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে এটা ব্রিটিশ শাসক শ্রেণিকে সরিয়ে স্থানীয় শাসক শ্রেণিকে বসিয়েছে, ফরাসি বিপ্লব নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্র এবং বোর্বন রাজতন্ত্রের দিকে চলে যায়, রাশিয়ান বিপ্লব স্ট্যালিনবাদের দিকে যায় এবং চীনে মাওবাদের দিকে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমরা মূলত কৃষ্ণাঙ্গদের অহিংস বিপ্লব দেখি, এটাই দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নীতির ইতি টেনেছিল। এটি বহু সমস্যার সমাধান করতে না পারলেও, গৃহযুদ্ধ বা বিপ্লবের ব্যাপক সহিংসতা ছাড়াই এটি একটি মৌলিক সমস্যার সমাধান করেছে। আমরা কোনো ধরণের যুদ্ধ বা ব্যাপক সহিংসতা ছাড়াই একনায়কতন্ত্রকে হটানোর বহু নজির দেখেছি, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়াতে, অথবা ১৯৮৯ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে বা পূর্ব ইউরোপে। কোনো বিপ্লবই, তা সহিংস বা অহিংস যাই হোক না কেন, সমস্যাগুলোকে পুরোপুরি সমাধান করতে পারে না। কিন্তু অহিংস বিপ্লব যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়িয়ে ন্যায়বিচারের পথে একটি পদেক্ষেপ গ্রহণ করে।

    Declarations of Independence-তে আপনি লিখেছিলেন, ‘ভিয়েতনামে যুদ্ধ যতই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এবং যতই স্পষ্ট হচ্ছে যে বিপুল সংখ্যক অ-যোদ্ধা বা সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারাচ্ছেন; সায়গন সরকার দুর্নীতিগ্রস্থ ও অ-জনপ্রিয় এবং সেটা আমাদের সরকারেরই নিয়ন্ত্রণে; এবং আমাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যুদ্ধ সম্পর্কে আমাদেরকে মিথ্যা বলেছেন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন তত আশ্চর্য গতিতে বেগবান হয়েছে।’ এখন ভিয়েতনামের স্থলে ইরাককে প্রতিস্থাপন করা যাক, এবং ঝরে পড়া হাজারো ইরাকি প্রাণের কথা ভাবুন; আমাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ছুড়ে দেয়া আগুনে দেশটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে; আবু ঘারিব ও ফাল্লুজাহের ভয়াবহের কথা ভাবুন; দখলদারবাহিনীর স্বার্থরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত পাপেট ইরাকি সরকারের কথা ভাবুন; এবং আমেরিকার জনগণকে গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র এবং সাদ্দাম হোসেনের সাথে আল-কায়েদার যোগসূত্র সম্পর্কে মিথ্যা গুলিয়ে খাওয়ানো হয়েছে। সত্য যে, নব্য-রক্ষণশীল এজেন্ডা বহুলাংশে নিন্দিত হয়েছে এবং বর্তমানে প্রতি চারজনের একজনেরও কম সংখ্যাক আমেরিকান বুশের ইরাক-পরিকল্পনার বিরোধী, তবু কেন যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন আদতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না? ভিয়েতনামের পর কী পরিবর্তন হলো?

    হা জি: এটা সত্য যে, যুদ্ধ-বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখনো ভিয়েতনামের পর্যায়ের পৌছায়নি যেখানে কিনা সরকারকে যুদ্ধ থেকে সরে আসার কথা ভাবতে হয়েছিল। তবু আন্দোলন ৮০% যুদ্ধ-সমর্থনকে ৬৫% যুদ্ধ-বিরোধী অংশে পরিণত করেছে। সরকার কর্তৃক মিডিয়ার ওপর বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই সময়ে আন্দোলন গড়ে তোলাও কষ্টসাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভাবেন যে আমরা যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন বিকাশের কেবলমাত্র প্রাথমিক পর্যায়ের রয়েছি, এবং সেটা বেশ বড়োসড়ো সময় নিয়েছে, কিন্তু যে দিকে এটা এগিয়েছে তা স্পষ্টত ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আমরা যুদ্ধ অবসানের রাস্তাতেই আছি। আরেকটি কারণ হচ্ছে বুশ প্রশাসনের প্রকৃতি; জনমত গ্রহণে জনসন বা নিক্সন প্রশাসনের চাইতে এই প্রশাসন আর বেশি বধির; আরো নৃশংস ও স্বৈরাচারী। একটা ছোট সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর দল কেবল নিজেদের কথাই শুনছে।

    স্ট্রাগল;
    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স;
    সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

    ১৯৯৮ সালে ডেভিড বার্সামিয়ান যখন আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তখন আপনি তাকে ল্যাঙ্গস্টন হিউজসের A Dream Deferred কবিতা শুনিয়েছিলেন; কবিতাটা আপনার A People’s History of the United States তেও আছে। কবিতায় বলা হচ্ছে যে: ‘What happens to a dream deferred? Does it explode?’ যদি সমস্ত বন্দি স্বপ্ন একদিন বিষ্ফোরিত হয়, সেই বিস্ফোরণটা সংগঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত হবে বলে কি আপনি মনে করেন? মানে, যেমন করে সিভিল রাইট আন্দোলনের বেশিরভাগটাই হয়েছে নাকি নির্বিচারে সহিংস ও উন্মত্ত হবে, যেমন করে আজ মধ্যপ্রাচ্যে হচ্ছে?

    হা জি: আমাদের দেশে অহিংস আন্দোলন ও অর্জনের (যেমন, নাগরিক অধিকার আন্দলন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, নারীদের আন্দোলন) আমাদের ঐতিহ্যের কারণে আমি আশা করি যে এটা বেশিরভাগ অহিংসই হবে। (কোনো অহিংস আন্দোলনই কখনোই একদম নিখুঁত হয়নি)। এতে নাগরিক অবাধ্যতা বা গণ-অবাধ্যতা বা গণ অনানুগত্য (সিভিল ডিসঅভিডিয়েন্স), সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ, ধর্মঘট, বয়কট, মিছিল বা প্রতিবাদী সমাবেশ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আমরা যে ধরণের পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি তা হবে না।

  • দীপেশ চক্রবর্তী।। অতিমারির যুগ? কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক ও গ্রহীয় প্রেক্ষাপট

    দীপেশ চক্রবর্তী।। অতিমারির যুগ? কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক ও গ্রহীয় প্রেক্ষাপট

    • অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর “An Era of Pandemics? What is Global and What is Planetary About COVID-19” শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধ ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে Critical Inquiry ব্লগে প্রকাশিত হয়। বর্তমান রচনাটি সেই প্রবন্ধটিরই বাংলা তর্জমা। দীপেশ চক্রবর্তীর প্রবন্ধটি প্রকাশের এক বছর পর এর বাংলা তর্জমা প্রকাশিত হচ্ছে; ব্যাপারটা একদিক থেকে যেমন কাকতালীয়, অন্যদিক থেকে আশঙ্কারও। কারণ যে বিশেষ পরিস্থিতি— অর্থাৎ অভিনব এক অতিমারির বাস্তবতায় দীপেশ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন— ঠিক এক বছর পরও পরিস্থিতির খুব একটা যে পরিবর্তন হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। অর্থাৎ, এই প্রবন্ধে যে বর্তমান সময়কে ‘অতিমারির যুগ’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সম্ভবত সেই পূর্বাভাসটি যে–কোনো যুক্তিসিদ্ধ অনুমান ও ইতিহাস–নির্ভর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ দ্বারা আজ অনেক বেশি সিদ্ধ।

    প্রবন্ধটি পড়বার সময়ে কেবল খেয়াল রাখা দরকার যে, ‘Global’ আর ‘Planetary’ দুটি পৃথক বর্গ, পরস্পরের প্রতিশব্দ নয়। এই দুইয়ের মধ্যে যে কোনো লেনদেন হয় না, তা নয় মোটেও। কিন্তু বিশ্লেষণী কায়দায় এদের তফাতটা মনে না রাখলে আমরা কেবল মানুষকে এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রেখে আমাদের যাবতীয় আলোচনার পসরা সাজিয়েই ক্ষান্ত হবো। ‘Global’ বর্গের বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে ‘বৈশ্বিক’ যা একটি মনুষ্য–কল্পিত দুনিয়া (কাল্পনিক নয়)। অর্থাৎ, মানুষ যেভাবে এই গ্রহের সার্বিক জীবনের ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্যুত ও আলাদা করে কেবলই তার নিজের এক জগৎ নির্মাণ করেছে ‘Global’ তথা বৈশ্বিক ক্যাটাগরি সেই ‘মানুষী–দুনিয়া’র দ্যোতক।

    ‘মানুষী’ ইতিহাস ও রাজনৈতিক বীক্ষায় মানুষে মানুষে শ্রেণি, লিঙ্গ, ক্ষমতা, জাত–বর্ণ ও অন্যান্য বৈষম্য, বিভেদ, অন্যায় অবিচার ইত্যাদির প্রসঙ্গ থাকে। মানুষই মানুষের প্রতি অত্যাচার, অবিচার করে। সেই অত্যাচার, অবিচারের প্রতিবিধানে সাম্য, ন্যায় ও গণতন্ত্রের অনিবার্য লড়াইও মানুষকে করতে হয়। কিন্তু তা কেবলই মানুষের কথা মাথায় রেখে। মনুষ্যকেন্দ্রিক ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার চিন্তায় ধরেই নেয়া হয় “আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে”র মতো করে এই গ্রহের সমস্ত আয়োজন মানুষের জন্য। মানুষ হাত বাড়ালেই যেন তার মুঠো ভরে যাবে, কারণ ‘শস্যের মাঠ ভরা’। শুধুমাত্র উৎপাদনে প্রাচুর্য আর বণ্টনে সুষমতা নিশ্চিত করাটাই যেন কাজ। রসদ আর পর্যাপ্তি নিয়ে যেন কোনো সংকট নেই।

    অন্যদিকে, প্ল্যানেটারি তথা গ্রহীয় ইতিহাসবীক্ষায় মানুষ আর এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নয়। কেবল মানুষে মানুষে পার্থক্য ও বৈষম্য বোঝা এবং তার প্রতিবিধানে কেবল মানুষেরই জন্য সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ফরমায়েশ করা গ্রহীয় ইতিহাসবীক্ষার অধীত বিষয় নয়। প্ল্যানেটারি তথা গ্রহীয় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ আর সমস্তকিছুর কেন্দ্রে নয়। ‘গ্রহীয়’ এমন এক ঐতিহাসিক–দার্শনিক বর্গ যা মানুষকে কেন্দ্রচ্যুত করে এই গ্রহের সার্বিক স–জীব ও অ–জীব সত্তার প্রসঙ্গকে মুখ্য করে তোলে। সার্বিক জীবনের ইতিহাসের অংশ হিসেবে মানুষ প্রজাতিকে পাঠ ও পুনর্নির্মাণ করে। এই গ্রহের যাবতীয় স–জীব ও অ–জীব সত্তার মতো মানুষও এক প্রজাতিমাত্র; অধীশ্বর বা শাসক নয়। ফলে প্ল্যানেটারি তথা গ্রহীয় বিজ্ঞান ও ইতিহাসে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

    তাহলে এক্ষেত্রে ইতিহাসের কাজ বা ভূমিকা কী? দীপেশ চক্রবর্তী মনে করেন, গ্রহীয় পরিপ্রেক্ষিত থেকে জীববৈচিত্র‍্যের সঙ্গে মনুষ্য–সভ্যতার সম্পর্ক ভাবাই নতুন ইতিহাস–চর্চার কাজ (দীপেশ ২০২১)। প্রথাগত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণে যে সকল বিদ্যার অধ্যয়ন করতে হয়, যেমন— ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, সাহিত্য ইত্যাদি— এসবের সাথে ভূ–তত্ত্ব, জেনেটিকস, জীববিজ্ঞান, জীব ও প্রাণের ইতিহাস সংশ্লিষ্ট নানাবিধ বিদ্যাও অধিগত করতে হয়। অর্থাৎ, পুঁজির ইতিহাসের সঙ্গে পৃথিবী ও প্রাণের ইতিহাস এক বিন্দুতে এসে পৌঁছানোর ফলে গ্লোবাল ও প্ল্যানেটারি তথা মানুষী ও না–মানুষীর (non-human) যুগপৎ বোঝাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। এই অপারগ ও নিরুপায় পরিস্থিতি মানবতাবাদী সমাজ–তাত্ত্বিককে বিজ্ঞানের সাথে এবং ইতিহাসবিদকে সময়ের প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে নতুন সংলাপে লিপ্ত হওয়ার তাগিদ দিচ্ছে। ফলে এই নতুন পরিস্থিতি অনুধাবন ও মোকাবেলায় পুনর্গঠিত বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই বিশ্ব–নাগরিককে স্ব–স্ব নৈতিক ও রাজনৈতিক বর্গসমূহকে বাছাই করতে হবে বলে আমরা মনে করি।

    এ–ও খেয়াল রাখা জরুরি, প্রগতিশীল সামাজিক ইতিহাসে (পড়ুন মানুষী বিশ্ববীক্ষায়) এ যাবৎ ‘এজেন্সি’–কে যে অর্থে পাঠ ও নির্মাণ করা হয়েছে; গ্রহীয় পরিপ্রেক্ষিতে ‘এজেন্সি’ কথাটির অর্থ মৌলিকভাবে আলাদা। এতকাল যা ছিল মানুষের স্বায়ত্তশাসন ও সচেতন কর্তাসত্তা হাসিলের মামলা, তা আবির্ভূত হয়েছে মানুষী কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় এক নৈর্ব্যক্তিক ও অচেতন পুঞ্জিভূত ভূ–তাত্ত্বিক ক্ষমতা হিসেবে। মানুষ না পারছে এই ‘এজেন্সি’–কে অস্বীকার করতে, না পারছে একে হজম করতে: “The use of the word agency in the expression ‘geological agency’ was very different from the concept of ‘agency’ that my historian-heroes of the 1960s— E.P. Thompson, for instance, or our teacher Ranajit Guha —had authored and celebrated. This agency was not autonomous and conscious, as it was in Thompson’s or Guha’s social histories, but that of an impersonal and unconscious geophysical force, the consequence of collective human activity.” (Chakrabarty 2021: 3)

    সুতরাং, এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েই তাহলে আলোকায়ন ও আধুনিকতার সূত্র ধরে ‘মানুষ’ কথাটার যে বিশেষ দ্যোতনা প্রচলিত আছে; তাকে ছাপিয়ে গ্রহীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মানুষ’ ও সার্বিক প্রাণের তাৎপর্য আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। ‘অতিমারির যুগ’ কিংবা আরও সার্বিকভাবে ভূ–ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণী ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তি (sixth great extinction) থেকে স্থায়ী পরিত্রাণের লক্ষ্যে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আবেদন এড়ানো ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে বলে আমরা মনে করি।

    সম্প্রতি ‘লৌকিক প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত দীপেশ চক্রবর্তীর জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্তমান অতিমারি: মানুষের ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ বইটিতে বার কয়েক বর্তমান প্রবন্ধটির প্রসঙ্গ টেনেছেন লেখক। কাজেই স্বতন্ত্র পাঠ ছাড়াও এই অনুবাদটিকে সদ্য প্রকাশিত বইয়ের সাথে মিলিয়ে পড়ার সুযোগ থাকছে।

    ঋণ স্বীকার: দীপেশ চক্রবর্তীর এই প্রবন্ধটির হদিস পাই বোধিচিত্তের মাধ্যমে। তর্জমা বিষয়ক নানা খুঁটিনাটি সলা–পরামর্শের জন্য বরাবরই বন্ধু সহুল আহমদ ও তানভীর আকন্দের প্রতি নির্ভর করি। এই তর্জমার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তর্জমাটির প্রকাশ উপলক্ষ্যে তাদের প্রতি আমার শুকরিয়া জানাই।

    —অনুবাদক

    শিল্পী: এলিসা লোরি

    মূল প্রবন্ধ

    এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে আমি যে বিষয়টির অবতারণা করতে চাই শুরুতেই তা বলে নেয়া যাক।

    কোভিড–১৯ অতিমারির বর্তমান মুহূর্তটি কেবলমাত্র বিশ্বায়িত ধনতন্ত্রের ইতিহাস এবং মানবজীবনের ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি এই গ্রহে জৈবিক জীবনের ইতিহাসের একটি মুহুর্তেরও প্রতিনিধিত্ব করে যখন মানুষ এমন একটি ভাইরাসের পরিবর্ধক হিসেবে কাজ করছে, চীনের কিছু বাদুড় কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে যার পোষক হয়ে আছে। বাদুড় একটি অতি প্রাচীন প্রজাতি, যারা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বছর ধরে বিরাজ করছে— ভাইরাস তার চেয়েও অতি অতি প্রাচীন। ডারউইনবাদী জীবনের ইতিহাস অনুযায়ী, সমস্ত ধরনের জীবনই তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করে। চীনে বিচিত্র/উদ্ভট (exotic) মাংসের বিপুল চাহিদার দরুন, করোনা ভাইরাস অপরাপর প্রজাতিসমূহকে টেক্কা দিয়ে মানবদেহে একটি মোক্ষম এজেন্ট পেয়েছে যা ভাইরাসটিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। কেন? কারণ অত্যন্ত সামাজিক জীব মানুষ জীবনের অপার সম্ভাবনার সন্ধানে নিজেরই তৈরি এক ঘনবসতিপূর্ণ মানুষী–দুনিয়ায় সদা গতিশীল।

    সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আমাদের ইতিহাস বিশ্ব অর্থনীতির মহা–উল্লম্ফন (great acceleration) ও প্রসার প্রত্যক্ষ করছে এই মুক্তির বাসনা নিয়ে যে, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র‍্যমুক্ত করবে। অন্ততপক্ষে এটি এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে নৈতিক বৈধতা হিসেবে ক্রিয়াশীল তো ছিলই। ভাইরাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে এই উল্লম্ফনের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিশৃঙ্খলা এবং মানবিক গতিশীলতা মওকা হিসেবে কাজ করেছে। শেষপর্যন্ত মানুষ হয়তো ভাইরাস মোকাবেলায় সফল হবে— অন্তত আমি সেই প্রত্যাশাই করি— কিন্তু আদতে ভাইরাস ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধ জিতে গেছে। ডারউইনবাদী জীবনের ইতিহাসে এ এক তামাশাই বটে! এবং এর প্রতিঘাতে সৃষ্ট পরিবর্তনসমূহ মানুষী বৈশ্বিক ইতিহাস এবং এই গ্রহের জৈবিক প্রাণের ইতিহাস; উভয়ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

    মানুষী প্রেক্ষাপট: মহা উল্লম্ফন এবং অতিমারির উদীয়মান যুগ

    এই করুণ বৈশ্বিক অতিমারি যে এক দশক বা তারও আগেই আমাদের দুয়ারে হানা দেয়নি সেজন্য আমাদের নিজেদেরকে স্রেফ ভাগ্যবানই মনে করতে হবে। হংকংয়ের বিজ্ঞানীদের একটি দল প্রায় ২০০৭ সালে অর্থাৎ তেরো বছর আগে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল যে, করোনাভাইরাস “জিনগত সমন্বয়/পরিবর্তনে পারদর্শী” যা “নতুন জিনোটাইপ এবং প্রাদুর্ভাবের দিকে ধাবিত করতে পারে”। “ঘোড়াশয় বাদুড়ের দেহে কোভিড–সার্স (SARS) জাতীয় ভাইরাসের উপস্থিতি এবং দক্ষিণ চীনে উদ্ভট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংস খাওয়ার যে বিকট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এই দুইয়ে মিলে এক টাইমবোমা সৃষ্টি হয়েছে। সার্স কিংবা নোভেল ভাইরাস জাতীয় ভাইরাস প্রাণীদেহ কিংবা ল্যাবরেটরি থেকে পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা উপেক্ষা করা উচিত নয়” [১]। এই সতর্কতাবার্তাটি পাত্তা দেয়া হয়নি [২]। স্পিলওভার: অ্যানিমাল ইনফেকশন্স অ্যান্ড দ্য নেক্সট হিউম্যান প্যানডেমিক (২০১২) বইয়ে ডেভিড কোয়ামেন মন্তব্য করেছিলেন যে সার্স করোনাভাইরাস সম্পর্কে “সবচেয়ে গুরুতর বিষয়” এটি মানুষের শরীরকে যেভাবে আক্রান্ত করে: “কোনো ব্যক্তি অত্যন্ত সংক্রামক হয়ে উঠার পরে নয়, বরং আগেই লক্ষণসমূহ দেখা দেয়।” [৩] কোয়ামেনের পর্যবেক্ষণ, “আরও করুণ কাহিনি এখনও বলার অপেক্ষায় আছে”। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছিলেন যে পরের বড় করোনাভাইরাসটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যসহ হাজির হবে, “লক্ষণ প্রকাশের পূর্বেই উচ্চ সংক্রামকতা।” কোয়ামেন তার গবেষণার মূল বার্তা মনে করেছিলেন: “আপনি যদি উচ্চ ঘনত্বে বসবাসরত এবং নিত্যনতুন সংক্রমণের সম্মুখে উন্মোচিত একটি ক্রমবর্ধনশীল জনগোষ্ঠী হন, তাহলে পরের বিরাট অতিমারিটির আগমন সময়ের ব্যাপার মাত্র।” ২০০৭ বা ২০১২–তে এই পয়গম্বর–সুলভ ভবিষ্যদ্বাণী কেউ কানে তোলে নাই।

    সেই কৃষির উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন প্রাণীদের গেরস্থালি পোষ মানানোর সময় থেকেই মারি ও অতিমারি মানুষের সঙ্গী। শিকারী সম্প্রদায়সমূহও কিছু সংক্রামক রোগের শিকার হয়েছিল কিন্তু, “বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে বেঁচে থাকা স্তন্যপায়ী বর্গের জ্ঞাতি–কুটুম্বদের মতোই, তারা এমনসব ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হতো যা তাদেরকে অল্প জনসংখ্যার মধ্যেই নিরাময়ের সুযোগ তৈরি করে দিত; জনাকীর্ণ অবস্থার মারির সাথে এর কোনো মিল নেই।” [৪] প্রাণীকুলের গার্হস্থ্যকরণ ও কৃষির সহগমনে “প্রাণীদেহের রোগজীবাণু মানুষের দেহে বিবর্তনে নানামুখী ভূমিকা রেখেছে।” [৫] কৃষির উদ্ভবের পর থেকেই মানুষ বহু মারি ও অতিমারি দেখে এসেছে। তবে বর্তমানের সাথে সেসবের পার্থক্য হলো: অতীতের এই আজাবগুলোর মধ্যে “একবারে কয়েক শতাব্দী বা কমপক্ষে বহু দশকের দূরত্ব ছিল; কিন্তু এই রোগবালাইসমূহের বর্তমানে ঘনঘন আবির্ভাব ঘটছে,”। কথাগুলো সাম্প্রতিক এক গবেষণাপত্রে সংক্রামক–রোগ বিশেষজ্ঞ ডেভিড মোরেন্স এবং তার সহলেখকবৃন্দ লিখেছেন। তবে এই রোগগুলোগুর উত্থান এখন আরও ঘন ঘন হয়ে উঠছে [৬]।

    মোরেন্স ও তার সহকর্মীরা ২০০৩ থেকে শুরু করে বিগত সতেরো বছরে বিশ্বে কমপক্ষে পাঁচটি অতিমারি বা প্রায় অতিমারির এই প্রাদুর্ভাব লক্ষ করেছেন: মারাত্মক তীব্র শ্বাসযন্ত্রের লক্ষণসহ “প্রায় অতিমারি” সার্স (২০০৩), একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা অতিমারি ( এইচওয়ান-এনওয়ান পিডিএম, ২০০৯), চিকুনগুনিয়া অতিমারি (২০১৪), জিকা অতিমারি (২০১৫) এবং “আফ্রিকার পাঁচটি দেশের ওপরে মহামারি আকারে ইবোলা সংক্রমণ” (২০১৪–২০১৫) (“P”, পৃ:১)। তারা একমত যে, “সম্প্রতি ‘অতিমারি’ শব্দটি ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে” এবং তারপরেও তারা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছান তা যেন আমাদের মুখের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকে: “স্পষ্টতই আমরা সংক্রামক রোগ ও পুরানো ছোঁয়াচে শত্রুদের ফিরে আসার এক নতুন অতিমারির যুগে প্রবেশ করেছি।”

    মোরেন্স এবং অ্যান্টনি ফাউচির আরও সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রের সিদ্ধান্তও একই:

    ১২,০০০ বছর আগেকার নিওলিথিক বিপ্লবের কাল থেকে, যখন শিকারি মানব প্রথম পশুপালন করতে ও ফসল ফলাতে গ্রামে গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিল, সেই তখন থেকেই নতুনভাবে আবির্ভূত (এবং পুনরাবির্ভূত) সংক্রামক রোগবালাই মানুষকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মানুষে আশ্রয় নেয়া মারাত্মক পরিণতিসম্পন্ন প্রাণীদেহের প্রাচীন রোগগুবালাইগুলোর মধ্যে রয়েছে: গুটিবসন্ত, ম্যালেরিয়া, হাম ও বিউবনিক প্লেগ। কিন্তু গত দশক নজিরবিহীন অতিমারি বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছে: এইচওয়ান-এনওয়ান “সোয়াইন” ইনফ্লুয়েঞ্জা (২০০৯), চিকুনগুনিয়া (২০১৪) এবং জিকা (২০১৫)। পাশাপাশি আফ্রিকার বৃহৎ অঞ্চলগুলোতে ইবোলা জ্বরের মহামারি আকারে উত্থান ঘটেছে (২০১৪ থেকে বর্তমান)। এই সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, আমরা একটি অতিমারির যুগে প্রবেশ করেছি। [৭]

    এখানে যে সমস্ত অতিমারির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শ্বাসযন্ত্রের লক্ষণযুক্ত মার্স (MERS) যা ২০১২ সালে কুঁজওয়ালা উট থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছিল; এই সবই মূলত জুনোটিক তথা প্রাণীজ— এগুলো হচ্ছে ভাইরাস এবং ব্যাকটিরিয়াজনিত তেমন সংক্রমণ যা পোষক পরিবর্তন করে বন্য–প্রাণী থেকে মানুষে আশ্রয় নিয়েছে, কখনও কখনও অন্য প্রাণীর মাধ্যমে। ২০০৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৪০৭টি “মানব রোগজীবাণুর ৫৮ শতাংশ উৎসই প্রাণীজ”। মেক্সিকোর কানকুনে ২৪–২৭ ফেব্রুয়ারী ২০১১–তে আঠারোটি দেশ থেকে আসা চুরাশিজন অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি পর্যালোচনা উল্লেখ করেছে,“বিশ্বজুড়ে উদ্ভূত সংক্রামক রোগের পচাত্তর শতাংশ ছিল বন্যপ্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত”।[৮] সেই সম্মেলন থেকে আরও মন্তব্য করা হয়: “প্রতি বছর ১.৫ বিলিয়ন প্রাণী যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা হচ্ছে, পাশাপাশি একটি বিরাট আন্তর্জাতিক অবৈধ প্রাণী রফতানি প্রক্রিয়ার বাস্তবতায় ইকোহেলথ আর মর্জিমাফিক নয়, বরং অপরিহার্য নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।” [৯] আমরা ২০০৯–এর অন্য একটি গবেষণা থেকে জেনেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পশু আমদানির সিংহভাগ (৯২ শতাংশ) ছিল, “বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পোষা জন্তু কেনা–বেচা বাণিজ্যের জন্য মনোনিত করা হয়েছিল।” [১০] প্রায় ৮০ ভাগ চালানে বন্যজন্তু ছিল, যার বেশিরভাগ অংশেরই “চালানের আগে বা পরে কোনো বাধ্যতামূলক রোগজীবাণু পরীক্ষার আওতায় আনা হয় নাই”। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানিকৃত জ্যান্ত প্রাণী প্রাণীজ রোগবালাই এর “উদীয়মান হটস্পট দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া থেকে উদ্ভূত।” [১১]

    কিসে অতিমারি ঘটে? মোরেন্স ও তার সহকর্মীরা এই প্রশ্নের জবাব হয়তো এর চেয়ে বেশি সোজাসাপ্টাভাবে দিতে পারতেন না: “মানুষই অতিমারির চূড়ান্ত কারণ।” তারা চিহ্নিত করেছেন যে এটি হলো, “বনভূমি উজাড়, কৃষির ঘনীভবন, নগরায়ণ এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিনষ্টের” ফলাফল যা “বন্যজীবন এবং তাদের সম্ভাব্য প্রাণীজ রোগবালাই এর সাথে মানুষের সংস্পর্শ অনিবার্য করে তোলে” (“P,” পৃ: ৪)। এই মতামত কোনোভাবেই অভিনব কিছু নয়। অতিমারি সংক্রান্ত বেশিরভাগ অধ্যয়নই শেষপর্যন্ত এই উপসংহারেই উপনীত হয়। কোয়ামেন লিখেছেন: “বিষয়টিকে খুল্লামখুল্লা আকারে রাখতে হলে: মানব–সৃষ্ট পরিবেশগত চাপ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা জন্তু–জানোয়ারের রোগ জীবাণুগুলোকে আরও বেশি মানব জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আনছে; অন্যদিকে মানব প্রযুক্তি ও ব্যবহার সেই রোগজীবাণুগুলোকে আরও ব্যাপকভাবে দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “পরিস্থিতিটির তিনটি দিক রয়েছে,”— মানুষেরা

    ধ্বংসাত্মক হারে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের সংহতি বিনষ্ট করছে। গাছ কাটা, রাস্তা তৈরি, জুম চাষ (slash and burn agriculture), বন্যপ্রাণী শিকার ও খাওয়া… গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরির উদ্দেশ্যে বনজঙ্গল উজার করা, খনিজ উত্তোলন, নগর ব্যবস্থাপনা, শহরতলীর সম্প্রসারণ, রাসায়নিক দূষণ, সাগরে নিয়ট্রিয়েন্ট ভেসে যাওয়া, অ–টেকসইভাবে সামুদ্রিক খাবার আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন… ও প্রাকৃতিক ভূপৃষ্ঠের ওপর অপরাপর সব “সভ্যকরণ” দখলদারিত্ব— এ সকল উপায়েই বাস্তুসংস্থানকে আমরা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি। [S, পৃ ৪০–৪১]

    দ্বিতীয়ত, “ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া, ছত্রাক”সহ এই জাতীয় “লক্ষ লক্ষ অজানা প্রাণী” বাস্তুতন্ত্রে বাস করে— যাকে ভাইরাস বিশারদরা বলছেন “ভাইরাস্ফিয়ার”, জৈবদেহের একটি বিস্তৃত জগত যা সম্ভবত অন্যান্য প্রতিটি দলকে রীতিমতো বামন করে তোলে” (S, পৃ ৪১)। এবং অবশেষে, “প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ব্যাঘাত এ জাতীয় জীবাণুগুলোকে আরও বিস্তৃত বিশ্বে অবমুক্ত করে” (S, পৃ ৪১) বলে মনে হচ্ছে। রোগজীবাণু বিশারদগণ “স্পিলওভার” বলতে সেই মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করেছেন যখন এক জন্তু বা পাখির শরীর থেকে জীবাণু অন্য জন্তুর (বিশেষত মানুষের) শরীরে অতিথি হিসেবে বাসা বাঁধে।

    প্রাণীজ সংক্রামক রোগসমূহের ঘন ঘন উত্থানের এই উপলব্ধিটি আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সমর্থন করে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রোগ্রামের প্রকাশনা “আসন্ন অতিমারির প্রতিরোধ: প্রাণীজ রোগবালাই ও সংক্রমণ শৃঙ্খল ভাঙ্গার উপায় (২০২০)” এবং প্রকৃতির জন্য বিশ্বব্যাপী তহবিল সংস্থার প্রকাশনা “প্রকৃতির ক্ষয় ও অতিমারির উত্থান”। [১২]

    প্রথম প্রকাশনিটিতে “প্রাণীজ রোগের উত্থানের সাতটি বড় মনুষ্য–ক্রিয়াকলাপ সংক্রান্ত প্রভাবক” তুলে ধরা হয়েছে: (১) বিশেষত এশিয়া এবং উপ–সাহারীয় আফ্রিকাতে প্রাণীজ আমিষের চাহিদা বাড়ছে যেখানে “আমিষ ভোগের মাথাপিছু বৃদ্ধির হারের সাথে সাথে বেশ কয়েকটি নিম্ন, নিম্ন–মধ্যবিত্ত আয়ের অঞ্চলে জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটছে।” (২) অ–টেকসই কৃষি, বিশেষত গৃহপালিত পশুপালনের ক্ষেত্রে যা একই মাত্রার সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ “বৃহৎ সংখ্যক অনুরূপ প্রাণী পুনরুৎপাদন করে” (সোয়াইন ফ্লু’র কথা স্মরণ করুন); (৩) বন্যজীবজন্তুর ব্যবহার ও শোষণ বৃদ্ধি; (৪) নগরায়নজনিত কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের লাগামহীন ব্যবহার, ভূমির ব্যবহারে পরিবর্তন ও খনিজসম্পদ, গ্যাস এবং তেল উত্তোলনের মতো নিষ্কাশনমূলক শিল্প এবং এর ফলে মানুষ ও বণ্যপ্রাণীর অভিনব মিথস্ক্রিয়া, (৫) মানুষের চলাফেরা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি, (৬) প্রাণীজ উৎসজাত নিত্যনতুন খাবার এবং নতুন নতুন বাজারে (মাছ–মাংস–সামুদ্রিক খাবারের আর্দ্র বাজারসহ) বন্যপ্রাণীজাত খাবার চাহিদার দরুন খাদ্য সরবরাহ চেইনের পরিবর্তন। কৃষি ঘনীভবনের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ।

    (৭) জলবায়ু পরিবর্তন, যেহেতু “বহু পশু–পক্ষী বাহিত রোগবালাই জলবায়ু স্পর্শকাতর এবং যে উষ্ণতর, আর্দ্রতর ও অধিকতর দুর্যোগ–প্রবণ বিশ্বের পূর্বাভাস পাওয়া যায়, তেমন ভবিষ্যত দুনিয়ায় বেশিরভাগ সংখ্যক ফুলেফেঁপে উঠবে।” [১৩]

    প্রকৃতির জন্য বিশ্বব্যাপী তহবিল সংস্থার (World Wide Fund For Nature-WWF) প্রকাশনা “প্রকৃতির ক্ষয় ও অতিমারির আবির্ভাব”–ও হুবুহু একই প্রস্তাবনা তুলে ধরেছিল:

    মনুষ্য কার্যকলাপই আমাদের গ্রহের প্রলয়ংকারী পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। মানুষের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান ভোগ ভূমি, নদী ও মহাসাগরসমূহ, জলবায়ু ব্যবস্থা, জৈব–ভূরাসায়নিক চক্র এবং বাস্তুসংস্থানের কার্যকারিতায় যেভাবে গভীর পরিবর্তন ঘটিয়েছে— তা আমাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য এবং সার্বিক মঙ্গলামঙ্গলের ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব রেখেছে। জাতিসংঘের দ্য ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স–পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিস (আইপিবিইএস) এর মতে, তিন চতুর্থাংশ ভূমি ও দুই–তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক পরিবেশের একটি অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং প্রায় দশ লক্ষ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। ডব্লিউ ডব্লিউ এফ–এর লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট ২০১৮ মাত্র চল্লিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বিশ্বজুড়ে মেরুদণ্ডী প্রাণীর সহজপ্রাপ্যতার প্রাচুর্যে ৬০% গড় হ্রাস নথিবদ্ধ করেছে। বনভূমি নিধন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অদলবদলসহ ভূমি–ব্যবহারের পরিবর্তন বন্যজীবজন্তু বাহিত উদীয়মান প্রায় অর্ধেক রোগবালাই এর জন্য দায়ী। [১৪]

    শিল্পী: ভ্লাদিমির কুশ

    ২০২০ এর দশকের গোড়ার দিকে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যামেরুনের স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া একটি গবেষণায় ঐতিহ্যবাহী বন্যপ্রাণী শিকারীদের জীবনের ওপর বনভূমি নিধনের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হয়েছিল। গবেষণাটির লেখকেরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, উচ্চমূল্যের বিভিন্ন জাতের কাঠের “বাছাইকৃত কর্তন”— নিষ্কাশন ও যোগাযোগব্যবস্থার ব্যয় নির্বাহে মধ্য আফ্রিকায় নির্বাচিত গাছ কাটার পদ্ধতি— এর সাথে “রাস্তাঘাট নির্মাণ ও অপেক্ষাকৃত আদিম বনাঞ্চলে শ্রমিক পরিবহনের বিষয়টি জড়িত।” [১৫] এর ফলে শিকারের পদ্ধতি এবং রোগজীবাণুর চিরায়ত পোষকদেহ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের প্রাকৃতিকতার বিচ্ছেদ ঘটে। কিছু ক্ষেত্রে, এর ফলে “মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে পোষকদেহের ঐশ্বর্য” হারাতে শুরু করে। (“B,” পৃ ১৮২৩) পোষক প্রজাতির বৈচিত্র্যের এই ক্ষতি “কিছু অত্যন্ত সক্ষম প্রাণীজ এজেন্টের পোষকতার আধিক্য বৃদ্ধি করে এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে” (“B,” পৃ ১৮২৩)।

    এই বিভাজন মানব জনসংখ্যা এবং প্রাণীজ পোষকদেহের মধ্যে যোগাযোগের অঞ্চলকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। সমীক্ষার লেখকেরা লিখেছেন: “ঐতিহাসিকভাবে, শিকার কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে ঘিরে বৃত্তাকারে হতো, যার দরুন শিকারের সীমানা থেকে দূরের প্রান্তে এর তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা মানেই হচ্ছে রাস্তা থেকে সমান দূরত্বে শিকারীরা শিকারের ফাঁদ বিছিয়ে শিকার করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে মানুষ–জন্তুর পরিবর্তিত নিরবিচ্ছিন্ন সংস্পর্শ” একদিকে শিকার–অঞ্চলের বৃদ্ধি ঘটায় এবং অন্যদিকে, অণুজীব আবির্ভাবের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। (“B,” পৃ ১৮২৩)

    এই সবকিছু সম্মিলিতভাবে অতিমারিটিকে বিশ্বায়নের সেই পর্যায়ের একটি অংশে পরিণত করে যাকে আমরা মহা–উল্লম্ফনের সাথে তুলনা করি: ১৯৫০ এর দশক থেকে এই গ্রহে মানুষের উপস্থিতির জ্যামিতিক বৃদ্ধি, অর্থনীতি, গতিশীলতা, জনসংখ্যার জ্যামিতিক বৃদ্ধি, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ, মানুষের ভোগবিলাস, মানব–চলাচল ইত্যাদি। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একটি সাম্প্রতিক (২০১৭) রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছে:

    ইউরোপের শিল্প বিপ্লব শুরুর প্রায় দেড়শ বছর পরে ১৯৮৫ সালের দিকে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা [ভোক্তা সামগ্রী ক্রয়ক্ষমতা সম্পন্ন] ১ বিলিয়নে পৌঁছেছে। এরপরে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী দুই বিলিয়নে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল পরবর্তী ২১ বছর অর্থাৎ ২০০৬ সাল; এর বেশিরভাগ অংশই চীনের অভূতপূর্ব বিকাশের ইঙ্গিতবাহী। পরবর্তী নয় বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০১৫ সাল নাগাদ, বৈশ্বিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির ঘরে তিন বিলিয়ন জনগোষ্ঠী যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সাত বছরে (২০২২ সাল নাগাদ) আরও এক বিলিয়ন এবং তার পরের ছয় বছর, অর্থাৎ ২০২৮ সালের মধ্যে, এই বিশ্ব ভোক্তা জনগোষ্ঠী পাঁচ বিলিয়নে পৌঁছানোর গতিতে আছে। [১৬]

    আসলে বিশ্বায়নের এই তীব্র প্রক্রিয়াটি এই শতাব্দীর শুরুতে চীন বিশ্বের একটি শিল্প–সামরিক পাওয়ার হাউজ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সাথে সাথেই ঘটেছিল। বনভূমি নিধন, বন্যজীবনের আবাস এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসসহ যে কারণগুলো এই “অতিমারির যুগ” উত্থানে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে তা পুঁজির বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার মহা–উল্লম্ফনের গুরুত্বপূর্ণ গল্প।

    তবে অতিমারির আরও একটি দিক রয়েছে যা ব্রুনো লাতুর আর আমি অন্যত্র “দ্য গ্লোবাল রিভিলজ দ্য প্ল্যানেটারি” (Global Reveals the Planetary) [১৭] শিরোনামের অধীনে আলোচনা করেছিলাম। এটা পরিস্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যখন আমরা দেখি ভাইরাস বিশারদ ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞগণ অতিমারির আখ্যানে ভাইরাসের ভূমিকা সংক্রান্ত আলোচনা করেন। অতিমারির এই নতুন যুগের আবির্ভাব বোঝার জন্য আমাদের কেবল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মহান উল্লম্ফন বুঝলেই চলবে না; বরং এই গ্রহের সার্বিক জীবনের বিবর্তনের গভীর ইতিহাসের (deep history) দিকেও তাকাতে হবে এবং বর্তমান অতিমারি কীভাবে সেই ইতিহাসের একটি পর্ব গঠন করে সেটাও উপলব্ধি করতে হবে। যেমন এই নিবন্ধটি শেষ করার আগে পরবর্তী অংশে আমি অতিমারির ইতিহাসের এই গভীর দিকটি এবং সার্বিক জীবনের বিবর্তনের ইতিহাসটি সংক্ষেপে মূল্যায়ন করবো।

    অতিমারির গ্রহীয় প্রেক্ষাপট

    “সংক্রামক রোগের আবির্ভাব ও পুনরাবির্ভাবের চ্যালেঞ্জ” সংক্রান্ত নিরীক্ষা করতে গিয়ে ২০০৪ এ লিখিত একটি নিবন্ধে মোরেন্স, গ্রেগরি ফোকার্স (Folkers) ও ফাউচি আলোচনা শুরু করেছিলেন এভাবে যে, মানুষ তার প্রযুক্তিগত ও বিবর্তনীয় ইতিহাসে একমাত্র যে প্রাকৃতিক “হানাদার”কে বশে আনতে ব্যর্থ হয়েছে তা হলো: জীবাণু গোত্রীয় জীবন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত US National Institute of Allergy and Infectious Diseases এর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা রিচার্ড ক্রাউচ-এর The Persistent Tide (১৯৮১) এ প্রকাশিত সেই সতর্কবাণী তারা স্মরণে রেখেছিলেন, “জীবাণু বৈচিত্র্য এবং বিবর্তনীয় শক্তি এখনও মানবজাতিকে হুমকিতে রেখেছে।” [১৮]

    তারা তাদের নিবন্ধটি শেষ করেন সংক্রামক রোগের ইতিহাসে জীবাণুগুলোর বিবর্তন যে ভূমিকা রেখেছে তা উল্লেখ করে। তারা লিখেছিলেন, “অন্তর্নিহিত রোগবালাই এর আবির্ভাব মূলত দ্রুত বিকশিত ও খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম সংক্রামক এজেন্ট এবং তাদের মন্থরগতিতে বিকশিত পোষকসত্তার মধ্যকার একটি বিবর্তনীয় সংঘাত,” (“C,” পৃ ২৪৮)। তারা আরও যোগ করেন, “পরিবেশগত ও মানুষী আচার–আচরণের অদল–বদলের ত্বরিত পরিপ্রেক্ষিতে এই সংঘাতের ফয়সালা হয় নতুন পারিবেশিক অঞ্চল তৈরি হওয়ার মাধ্যমে যেখানে বিকশিত অণুজীবসমূহ তাৎক্ষণিকভাবে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়।” (“C,” পৃ ২৪৮)

    এ যেন এক অশেষ ও অনন্ত সংঘাত যা মানুষকে তার প্রাযুক্তিক ক্ষমতার হালনাগাদ ও উন্নত করতে নিয়ত বাধ্য করে চলে। অন্যদিকে, খোদ মনুষ্যসৃষ্ট পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় অণুজীব বিকশিত হয় এবং পোষকদেহ বদলানোর বন্দোবস্ত করে নেয়। মোরেন্স ও ফাউচি তাদের প্রবন্ধটির শেষে এই পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন:

    রোগজীবাণু ও মানুষের মধ্যে চলমান এই দ্বন্দ্ব–সংঘাতের মধ্য দিয়ে উত্থাপিত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে নোবেল বিজয়ী সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জশুয়া ল্যাডারবার্গের (Joshua Lederberg) বক্তব্যে বাস্তবতার সারসংক্ষেপ রয়েছে: “জীবাণু ও মানবজাতির ভবিষ্যত সম্ভবত একটি সাসপেন্স থ্রিলার–পর্ব হিসেবে আবির্ভূত হবে যার শিরোনাম হতে পারে ‘আমাদের বুদ্ধি বনাম তাদের জিন’ [“C,” পৃ ২৪৮]।

    মোরেন্স ও ফাউচি বর্তমান অতিমারি সম্পর্কে তাদের সাম্প্রতিক আলোকপাতে এই মূলভাবেই ফিরে আসেন:

    “জীবাণু ও মানুষের মধ্যে চলমান প্রাচীন লড়াইয়ে, আমাদেরকে ধারাবাহিকভাবে অবাক করে দেয়ার জন্য এবং প্রায়শই আমাদের অপ্রস্তুত করে তোলার ক্ষেত্রে জিনগতভাবে অভিযোজিত জীবাণুগুলোর শীর্ষ ভূমিকা রয়েছে”(“E”, পৃ ১০৭৮)। এমনকি মানুষের বিকাশ নিশ্চিত করার স্বার্থে জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমরা যে সকল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করি, সেগুলোও সাধারণত সংক্রমণ ও বিবর্তনের নতুন পথ উন্মুক্ত করে দেয়। নাথান ওল্ফ, ক্লেয়ার ডুনাভান ও জ্যারেড ডায়মন্ডের সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত অন্য একটি গবেষণাপত্রে এই বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে:

    আধুনিক উদ্ভাবন আরও সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া এবং/অথবা মানুষের মধ্যে সংক্রমণকে আগের চেয়ে আরও সুনিপুণ করে তোলার মাধ্যমে রোগজীবাণুগুলোর উত্থান সহজতর করেছে। এই উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে রয়েছে রক্ত ​​সংক্রমণ (হেপাটাইটিস সি), বুনো–জন্তুর গোস্ত বাণিজ্যিক বেচা–কেনা (রেট্রোভাইরাস), শিল্পজাত খাদ্য উৎপাদন (bovine spongiform encephalitis, BSE), আন্তর্জাতিক ভ্রমণ (কলেরা), শিরায় চালিত ড্রাগের ব্যবহার (এইচআইভি), ভ্যাকসিন উৎপাদন (Simian virus 40), এবং দুর্বল রোগ ও জীবাণু–প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বয়োজ্যেষ্ঠ রোগী। [১৯]

    মানুষের সাথে তুলনায় করোনাভাইরাসের একটি বিশেষ বিবর্তনীয় সুবিধা (যা এই মুহুর্তে বিমূর্ত মানবসত্তার কল্পিত মূর্ত দেহের পিছনে একটি পীড়ার কারণ) আছে, আর তা হলো— “অণুজীবের জিনগত অস্থিতিশীলতার দরুন দ্রুত বিবর্তন যা সদা–পরিবর্তনশীল বাস্তুসংলগ্ন কুলুঙ্গিগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।” (“E,” পৃ ১০৮০) মোরেন্স ও ফাউচি বলছেন এটি:

    বিশেষত আরএনএ ভাইরাস যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, ফ্লাভিভাইরাস, এন্টোভাইরাস ও করোনাভাইরাস সম্পর্কে সত্যি, যেগুলোর কিনা সহজাত ঘাটতি বা অনুপস্থিত পলিমারেজ ত্রুটি–সংশোধন প্রক্রিয়া রয়েছে [অন্য কথায়, তাদের নিজের প্রজনন করার সময় কোনো প্রুফরিডিং এর সুযোগ ও ক্ষমতা নেই] এবং এর ফলে এগুলো আধা–প্রজাতি বা শত–শত কিংবা হাজার হাজার জিনগত রূপ হিসেবে সংক্রমিত হয়, যার কারণে মানুষের পক্ষে এগুলোকে মোকাবেলা করা বেশ অসম্ভব ব্যাপার।

    এটি মূলত এমন একটি বিবর্তনবাদী লড়াই যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে হোমো সেপিয়েন্স নামক প্রজাতি মানুষ, তার সমস্ত প্রাযুক্তিক দাদাগিরির পরেও এই গ্রহে ঘটমান ডারউইনীয় জীবন ও বিবর্তনের ইতিহাসের বাইরে নয়। মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগগুলো জীবাণুসুলভ বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তারা আমাদের জেনেটিক, সেল্যুলার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে ক্রমাগত সংক্রমণ নিশ্চিত করে” (“E”, পৃ ১০৭৮)। মোরেন্স ও ফাউচি এই বিষয়টিতে রিচার্ড ডকিন্সের উল্লেখ করেছেন: “জিনের প্রতিযোগিতার স্তরে বিবর্তন ঘটে এবং আমরা, ফিনোটাইপিক মানুষেরা জীবাণু ও মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতায় কেবল জিনগত ‘বেঁচে থাকার মেশিন’ হয়ে থাকি” (“E”, পৃ ১০৭৮)। যেহেতু মনুষ্যকৃত পরিবেশ বিপর্যয় বিভিন্ন ধাঁচের করোনভাইরাসকে তাদের পূর্বতন বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রজাতি থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, তারা অন্যান্য স্তন্যপায়ী দেহের অভ্যন্তরে কাজ করে মানব কোষগুলোতে আগেই থিতু হয়ে যায়। মোরেন্স ও ফাউচি লিখেছেন: “কোষজগতে ভাইরাসের বিবর্তনীয় ভিত্তি অনেক শক্ত। এর নমুনা হচ্ছে বাদুড়ের দ্বারা সার্স ঘরানার বি–করোনাভাইরাস বা সার্বেকোভাইরাস। বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর রিসেপটরগুলোর নমুনা নিয়ে দেখা যাচ্ছে এদের রিসেপটর বাইন্ডিং এলাকাগুলো অত্যধিক–বিকাশক্ষম” (“E,” পৃ ১০৮০)। তারা আরও বলেন, “তথ্য–প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায় যে বাদুড় সংক্রমিত অনেক করোনাভাইরাসই আছে যাদের আবির্ভাব ঘটার মতো প্রাক–অভিযোজন সম্পন্ন হয়েছে এবং সম্ভাবনা রয়েছে অতিমারি আকারে আবির্ভাব ঘটার। ( “E”, পৃ ১০৮১)

    তারা আরও যোগ করেন: “বিভিন্ন আলামত এটাই প্রমাণ করে যে আরও অনেকগুলো বি–করোনভাইরাস আবির্ভাবের জন্য ইতোমধ্যেই প্রাক–অভিযোজিত এবং সম্ভবত এদের আবির্ভাব অতিমারিরূপেই হতে পারে। ( “E”, পৃ ১০৮১)

    শেষ পর্যন্ত, এই সংক্রামক রোগগুলো আমাদের দেহ এবং অন্যান্য শারীরিক জীবনের রূপগুলোর মধ্যে বিদ্যমান গভীর বিবর্তনমূলক সংযোগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় (যে কারণে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে আমরা আগে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করে নিতে পারি)। কোয়ামেন বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এভাবে:

    সংজ্ঞা অনুসারে, প্রাণীজ রোগজীবাণুগুলো (আমাদের সংক্রামক রোগগুলোর প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী) হলো বর্তমানে এবং বারবার মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে প্রবাহিত হয়। অন্য সংক্রমণগুলো (যেগুলো সংক্রামক রোগের ৪০ শতাংশ, গুটিবসন্ত, হাম এবং পোলিওসহ) রোগজীবাণুর কারণে সৃষ্ট যা মানুষের পূর্বপ্রজন্মের কাছে কোনো এক অতীতকালে একবার ভর করেছিল। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সমস্ত রোগগুলোচূড়ান্তভাবে প্রাণীজ। তবে পশু–পক্ষী বাহিত অসুখবিসুখ আমাদের এবং অন্যান্য ধরনের পোষকের মধ্যে আদিম সংযোগের প্রমাণ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। [S, পৃ ১৩৭]

    বর্তমান অতিমারির না–মানুষী গ্রহীয় দিকটি তার মানে এই: এর ফলে যে সমস্ত মানব বিপর্যয় ইতোমধ্যে ঘটেছে এবং ঘটবে (আংশিকভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে), এটি এই গ্রহের জীবনের বিবর্তনীয় ইতিহাসের একটি পর্ব। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মহা–উল্লম্ফনের দ্বারা আরও তীব্র হওয়া মানুষ ও জীবাণুর এই লড়াই প্রসঙ্গে মোরেন্স ও ফাউচির মন্তব্য বরাতযোগ্য— “মানুষ নাকি জীবাণু, কে চালকের আসনে, তা হয়তো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।” (“E”, পৃ ১০৭৮)।

    জীবাণু ধাঁচের জীবনের বিভিন্ন রূপ এই গ্রহে ৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে টিকে আছে। অন্যদিকে হোমো সেপিয়েন্সের টিকে থাকার বয়স আনুমানিক তিনলক্ষ বছর। মোরেন্স ও ফাউচি বলেন, “অনাগত রোগ সংক্রমণের ঝুঁকির ব্যাপারে আমরা কীভাবে ভাববো এবং কীভাবে এই মুসিবতের মোকাবেলা করবো তা এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নিহিত আছে।” (“E”, পৃ ১০৭৮)

    টীকা:

    [1] Vincent C. C. Cheng et al., “Severe Acute Respiratory Syndrome Coronavirus as an Agent of Emerging and Reemerging Infection,” Clinical Microbiology Reviews 20 (Oct. 2007): 683.

    [2] See David M. Morens et al., “Prespective Piece: The Origin of COVID-19 and Why It Matters,” American Journal of Tropical Medicine and Hygiene 103, no. 3 (2020): 955.

    [3] David Quammen, Spillover: Animal Infections and the Next Human Pandemic (New York, 2012), pp. 207–208; hereafter abbreviated “S”.

    [4] Nathan Wolfe, Claire Panosian Dunavan, and Jared Diamond, “Origins of Major Human Infectious Diseases,” Nature, 17 May 2007, p. 281

    [5] Ibid.

    [6] David M. Morens et al., “Pandemic COVID-19 Joins History’s Pandemic Legion,” mBio 11 (May/June 2020): 1; hereafter abbreviated “P”.

    [7] Morens and Anthony S. Fauci, “Emerging Pandemic Diseases: How We Got to COVID-19,” Cell, 3 Sept. 2020, p. 1077; hereafter abbreviated “E”.

    [8] R. E. Kahn et al., “Meeting Review: 6th International Conference on Emerging Zoonoses,” Zoonoses and Public Health 59 (2012), p. 6.

    [9] Ibid., p. 7.

    [10] Katherine F. Smith et al., “Reducing the Risks of the Wildlife Trade,” Science, 1 May 2009, p. 594.

    [11] Ibid.

    [12] See The United Nations Environment Programme and the International Livestock Research Institute, Preventing the Next Pandemic: Zoonotic Diseases and How to Break the Chain of Transmission (Nairobi, 2020); World Wide Fund for Nature, The Loss of Nature and the Rise of Pandemics (Gland, 2020).

    [13] Preventing the Next Pandemic, pp. 15–17.

    [14] The Loss of Nature, p. 14.

    [15] Wolfe et al., “Bushmeat Hunting, Deforestation, and Prediction of Zoonotic Disease Emergence,” Emerging Infectious Diseases 11 (Dec. 2005):1823; hereafter abbreviated “B”.

    [16] Hannes Bergthaller, “Thoughts on Asia and the Anthropocene,” in The Anthropocenic Turn: The Interplay Between Disciplinary and Interdisciplinary Responses to a New Age, ed. Gabriele Dürbeck and Phillip Hüpkes(New York, 2020), pp. 78–79.

    [17] See Bruno Latour and Dipesh Chakrabarty, “The Global Reveals the Planetary,” in Critical Zones: The Science and Politics of Landing on Earth, ed. Latour and Peter Weibel (Cambridge, Mass., 2020), pp. 24­–31.

    [18] Morens, Gregory K. Folkers, and Fauci, “The Challenge of Emerging and Re-emerging Infectious Diseases,” Nature 430, 8 July 2004, p. 242; hereafter abbreviated “C.” The full title of Richard Krause’s book is The Restless Tide: The Persistent Challenge of the Microbial World (Washington, D.C., 1981). For biographical details on Richard Krause (1925–2015), see Morens, “Richard M. Krause: The Avancular Avatar of Microbial Science,” Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America (PNAS) 113 (Feb. 2016): 1681–683.

    [19] Wolfe, Dunavan, and Diamond, “Origins,” p. 282.

    তর্জমাকারীর রেফারেন্স:

    দীপেশ চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার: “জীববৈচিত্র‍্যের সঙ্গে মনুষ্য সভ্যতার সম্পর্ক ভাবাই নতুন ইতিহাস চর্চার কাজ”, সাক্ষাৎগ্রহণকারী: সারোয়ার তুষার, অরাজ, ঢাকা, ২০২১

    https://www.auraj.net/dipesh-interview/5503/

    Chakrabarty, Dipesh. Climate of History in a Planetary Age, Chicago: Chicago University Press, 2021.

  • রেহানা মারিয়াম নুর: আয়নায় এড়িয়ে চলা প্রতিচ্ছবি

    রেহানা মারিয়াম নুর: আয়নায় এড়িয়ে চলা প্রতিচ্ছবি

    নাসরিন খন্দকার 

    রেহানা মারিয়াম নুর, একে যদি এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাহলে বলবো, এটি খুব বেশি বাস্তব। আপস যখন সমাজের স্বাভাবিক নর্ম, তখন রেহানা একজন একরোখা, জেদি আপসহীনতার দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মানুষ। কিন্তু সে সমাজের বাইরের কোন ব্যক্তি না, বরং চারপাশের সমস্ত সহিংসতা ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিয়ে রূক্ষ, ক্ষুব্ধ রেহানা বাঁচে, আবার তা ছড়িয়েও দেয় কাছের জনদের। প্রায় সবগুলো দৃশ্যই দমবন্ধ করা এই চলচ্চিত্রে কোন চরিত্রকেই ভাল-খারাপ, উচিত-অনুচিতের মানদণ্ডে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব না। তাই সংজ্ঞায়িত করতে না পারা, সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে না পারাতেই আমাদের জাজমেন্টাল মন ধাক্কা খায়।

    রেহানা মারিয়াম নুর’র পোস্টার

    বাস্তবে আমাদের আশেপাশের চরিত্রগুলোকে যেমন আসলে ডিফাইন করতে পারি না, কিন্তু তবু একেকটা পকেটে ভরে ফেলেই আমাদের চলতে হয়, রেহানাও তাই। রেহানাকে আমাদের চেনা জানা পরিচিতির বক্সে ফেলা যায় না। আর সেখানেই আমাদের অস্বস্তি তৈরি হয়। আমার কাছে এই ফিল্মের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এইটি। চরিত্রগুলি বহুমুখি, আমাদের ভালোমন্দের মাপকাঠিতে আমরা এদেরকে মাপতে পারি না।

    ফিল্ম বিশ্লেষণের অনেক রকম পদ্ধতি আছে, অনেক বিতর্কও আছে। চলচ্চিত্রের কলাকৌশল, জনরা ইত্যাদিতে ফেলে সিনেমা বোদ্ধারা আলাপ আলোচনা করছেন। সেই দিক থেকে রঙ, ক্যামেরা বা শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে অনেকের লেখায় ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে চলচ্চিত্রসহ যে কোন শিল্পমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর যোগাযোগের দিকটি, অর্থাৎ, দর্শকের সঙ্গে এর কী ধরনের যোগাযোগ বা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। অনুভূতির কী আবহ তৈরি করছে? দর্শকদের মধ্যে কী ধরনের চিন্তা ও অনুভূতির সৃষ্টি করছে? আমি নিজেকে একজন চলচ্চিত্রের গ্রাহক মনে করি, চলচ্চিত্র বিশ্লেষক না। ফলে একটি ফিল্মের খুঁটিনাটি নিয়ে আমি যতটা চিন্তা করি, তার থেকে অনেক বেশি আমাকে ভাবায়, ফিল্মটি আমার মধ্যে কী করছে। নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে সেই দিক থেকে এই ফিল্ম কে দুইভাবে দেখতে চেয়েছি। এই দুই ধরন সম্পূর্ণ আলাদা না, বলা যেতে পারে একই বস্তুকে দুই চশমা দিয়ে দেখা।

    প্রথমটি হোল, দর্শক হিসেবে আমার সাথে এর যোগাযোগ। এই আমি কে? আমি আমার সত্তায় একজন ব্যক্তি মানুষ না, আমি আমার রাজনীতি, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, অনুভূতি, চেতন, অবচেতনের একটা সঙ্কর। তো আমার এই সবগুলো সত্তার মিলে মিশে থাকা যে আমি, যে সমাজের অংশ হিসেবে আমি, যে কাঠামো আর তাঁর পীড়নে লড়াইরত এই আমি, তাঁর সাথে কোন চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতাটা খুব ইন্টিমেট মনে হলেও তা আসলে শুধুমাত্র ব্যক্তিক থাকে না। আমার আনুভূতি আমার ইতিহাস আর রাজনীতি থেকে ভিন্ন না, যাকে সারা আহমেদ (২০০৪) বলছেন ‘অনুভূতির সাংস্কৃতিক রাজনীতি‘। 

    রেহানা মারিয়াম নূরের একটি দৃশ্য

    সংস্কৃতি আর রাজনীতির একটা অংশ হিসেবে, একজন দর্শক হিসেবে আমার সাথে ফিল্মের এই যোগাযোগের অভিজ্ঞতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার মনে হয়েছে রেহানা মারিয়াম নুর, দর্শক হিসেবে আমার উপস্থিতি, আমার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মজার দিকটি হোল, পরিচালক সাদ তাঁর কোন একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি দর্শকের কথা মাথায় রেখে চলচ্চিত্র বানাননি, তিনি একটা গল্প বলতে চেয়েছেন। এইটা শুনলে অনেকের মনে হতে পারে তিনি অহঙ্কারী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আসলে উল্টো। তিনি দর্শকের কাছে তাঁর যা বলার তা শেয়ার করতে চেয়েছেন, এটি বরং দর্শককে সম্মান করে, তাঁর গল্প শোনার কান যে অপরপক্ষের আছে, তাঁর স্বীকৃতি দেয়। আমরা কিন্তু অনেক সময়ই সহজে সবকিছু শেয়ার করতে পারি না, আমাদের গল্পটা বলতে পারি না এই ভেবে যে অপর পক্ষ বুঝবে না। এই যে অপরপক্ষ বুঝবে না বলে পরিচালক দর্শককে একটা ছকে ফেলে সেই ছকে ছবিটা বানাননি, এতেই তিনি সবচেয়ে বেশি সম্মান করেছেন দর্শকদের। দর্শকরা খাবে কি খাবে না, সেই চিন্তাটাই দর্শককে একটি সমরূপী বর্গে সীমিত করে, এবং এটি দর্শককের জন্যে খুবই অসম্মানজনক এবং পেট্রোনাইজিং।  

    এখন আসি দর্শক হিসেবে আমার অস্তিত্ব কে স্বীকৃতি দেবার প্রসঙ্গে। এইটা কেন গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্যে? কারণ আমার বেড়ে উঠার কালে আমি বেশিরভাগ চলচ্চিত্র, নাটক, কবিতা বা যে কোন শিল্প মাধ্যমের সাথে সরাসরিভাবে যোগাযোগ করতে পারিনি। কেন? কারণ আমাকে কবি, পরিচালক বা নাট্যকাররা গণায় ধরেননি। আর এখানেই মেইল গেজ এর সমালোচনাটা আসে । সিনেমার নারীবাদী সমালোচকরা বলেন, নারী যে জীবন যাপন করেন, যে চোখে জীবনকে দেখেন সে চোখের পরিবেশন কালচারাল প্রোডাক্ট গুলোতে পাওয়া যায় না। কারণ, নারীকে দর্শক মনে করা হয় না, মনে করা হয় দর্শনের বস্তু, আর পুরুষ হচ্ছে দর্শক। তো এই বিষয়টা এই নয়া উদারনৈতিক পুঁজিবাদে বদলে যাচ্ছে, এখন নারীরাও ক্রেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ফলে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এমন চলচ্চিত্র বানানো হচ্ছে। 

    রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য

    কিন্তু শিল্পমাধ্যম তো শুধু পণ্যবস্তু না, শিল্প আমাদের সত্তার খোরাক দেয়, আর সেখানেই আমি দেখি যে শুধুমাত্র ক্রেতা না, শিল্পের গ্রাহক হিসেবে এই চলচ্চিত্রটি আমার অস্তিত্বকে সম্মান দিচ্ছে। যে বাস্তবতায় আমি বাস করি, বেড়ে উঠি, যে বাস্তবতাকে আমার শরীর মনে ধারণ করি, যে ক্রোধ, অপমান, প্রতিদিনকার পরাজয় একটু একটু করে আমার সত্তাকে গ্রাস করে, যেভাবে প্রতিদিন নীতির সাথে সংঘর্ষ লাগে এই বাস্তবতার, দুমড়ে মুচড়ে পড়ে যাই আবার আহত হয়েই উঠে দাঁড়াই, এই সবকিছুর সাথে রেহানা মারিয়াম নুর যে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এরকম অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। রেহানা মারিয়াম নুর আমার চলচিত্র ক্ষুধা মিটিয়েছে। আমি যা দেখে আলোড়িত হতে চাই, তার জোগান দিয়েছে। যে ধরনের শিল্প আমাকে নাড়া দেয়, তার জোগান দিয়েছে। এটি দর্শক হিসেবে আমাকে সম্মান করেছে। আমার মতো মানুষকে দর্শক হিসেবে গণ্য করেছে, আমার বুদ্ধিমত্তা আর আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করেনি। আমার মনে হয়নি, আরে পরিচালক কি আমাকে বোকা ভাবে, একটা কিছু বানিয়ে গিলিয়ে দেবার চেষ্টা করলেই হোল? 

    আমার দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হোল, আমাদের সমাজের সাথে এই চলচ্চিত্রের যোগাযোগ। এইখানে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি শুধু সিনেমাটি না, বরং এই সিনেমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। কে কী রিভিউ দিচ্ছে আমি পড়ি, আমি আমাদের সমাজের মানুষের পাঠ বুঝতে চাই। আবার এই সমাজের মানুষগুলো কিন্তু সমরূপী না। ফলে নানা রকমের বিশ্লেষণ চোখে পড়ে। আমি দেখি বেশিরভাগ বিশ্লেষণের সাথেই আমার ঠিক পুরোপুরি মেলে না। মেলার কথাও না। কারণ আমরা একই সমাজে বাস করলেও, একই সমাজের অংশ হলেও আমাদের পাঠ কিছুটা আলাদা হয়। এই মিল আর অমিলের মধ্য দিয়েই আমি এই চলচ্চিত্রটিকে বাংলাদেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে দেখি। 

    এই যোগাযোগে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে, প্রথমত অনেকেই আলোচনা করছেন যে, এইটি নারীবাদী চলচ্চিত্র কিনা। এই প্রসঙ্গে আমি বরং ঘুরে দেখতে চাই, নারীবাদী বলতে উনারা কি বুঝাচ্ছেন? একটা সহজ সংজ্ঞা তো হোল, নারীর বিরুদ্ধে নিপীড়ন বা সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীবাদ অবস্থান নেয়। যেহেতু এই ফিল্মে এই বিষয়টি আছে, ফলে অনেকেই একে নারীবাদী ফিল্ম হিসেবে দেখছেন, কিন্তু আবার দেখতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছেন। কারণ এখানে এমন কিছু বিষয়ও আছে, যা ঠিক নারীবাদ বলতে অনেকেই যা বুঝেন তার সাথে মেলে না। 

    কিন্তু আমার কাছে নারীবাদ আরও অনেক অনেক ব্যাপ্ত এবং জটিল একটি বিষয়। আমি নিজেকে একজন নারীবাদী হিসেবে পরিচিত করতে চাই। যদি আমার নারীবাদী সত্তাকে এই ফিল্ম তৃপ্ত করতে পারে তাহলে একে নারীবাদী ফিল্ম বলাই যায়। কিন্তু আমি আসলে এই চলচ্চিত্রকে নারীবাদের লেবেলে ফেলতে অস্বস্তি বোধ করি, কারণ আমার মনে হয় এতে একে সীমিত করে ফেলার ঝুঁকি থাকে। এই প্রসঙ্গে আমার কাছে একটা দৃশ্য খুব ইন্টেরেস্টিং লাগে, রেহানাকে দেখতে আসা আত্মীয়দের মধ্যে নারীবাদ সম্পর্কিত খুবই ক্লিশে আলাপ। বিষয়টি একটু অপ্রাসঙ্গিক এবং বিরক্তিকর লেগেছে প্রথমে আমার কাছে। পরে আমি ভাবছিলাম, পুরো দৃশ্যটাতে ঐ আলাপে রেহানার কোন অংশগ্রহণ তো থাকেই না, বরং সে তার ভাইয়ের সাথে ইশারায় অন্য আলাপ চালিয়ে যায়, তারই ফাঁকে ফাঁকে ইমু ক্রমাগত জানালার কাছে যায় আবার ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যায়। এই যে একটি দৃশ্যে সমান্তরালে কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটে এটি আমাকে ভাবায়। পরে আমার মনে হয় হয়তো এটি এই সব ক্লিশে এবং অতি সরলীকৃত নারীবাদের বাহাসে ঢাকা পড়ে যাওয়া নারীর বাস্তব জীবন আর তার লড়াইকে দেখানোর একটা দৃশ্য। এইটা আমার পাঠ। এমনটা নাও হতে পারে। তাতে কিছু যায় আসে না। নারীবাদ বলতে অনেকেই যা বুঝে তার সাথে হয়তো এই ফিল্ম পুরোপুরি মেলে না। ফলে এই ফিল্মটিকে সেই লেবেল না দিয়ে বরং আমি বলতে চাই, এই ফিল্মটি কোন কোন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এবং অভ্যস্ত ধারণাগুলোকে ধাক্কা দেয়। 

    রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য

    একটা তো খুব সহজভাবেই বলা যায় যে, এটি ভালো মেয়ে, ভালো মায়ের ইমেজকে ধাক্কা দেয়। মাতৃত্বের কারণে, বিশেষ করে একজন সিঙ্গেল মাকে যে সার্বক্ষণিক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই কাঠগড়াকে ভালভাবেই ধাক্কা দেয় এই ফিল্মটি। কিন্তু তার থেকেও বড় যে, এটি এই একা মায়ের লড়াই, আর প্রতিদিনকার অসহনীয় চাপ আর প্রতিকূলতাকে দারুণভাবে দেখায়। তবে দেখতে পাবার বিষয়টাতো আসলে দর্শকের দেখার উপরে নির্ভর করে।  

    কিন্তু তার থেকেও বেশি যে বিষয়টি ফিল্মটি করে তা হোল আমাদের মনে জাস্টিস বা ন্যায়বিচারের যে ছকবাঁধা ধারণা বিদ্যমান তাকে দারুণভাবে ধাক্কা দেয়। রেহানা বলে, “কেউ দেখেনি বলে তো ঘটনাটি মিথ্যে হয়ে যায়নি।” যৌন সহিংসতার আইনি বিচার প্রক্রিয়ার এই যে একটা অসম্ভব লুপহোল, অপরাধ ‘প্রমাণ‘ করার যে অসম্ভব গোলকধাঁধা, এটি সেই গোলকধাঁধার দেয়ালে ধাক্কা দেয়। বারে বারে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়ার বিষয়টি আমাকে দেয়াল ঘেরা বন্দী মানুষের ক্রমাগত দেয়াল ভাঙ্গার আওয়াজকে মনে করিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, রেহানা এই জাস্টিসের জন্যে একটা ‘আপাত‘ মিথ্যা অভিযোগ দেয়। আপাত বলছি এই কারণে যে, নিপীড়নের ঘটনাটি রেহানার সাথে ঘটেনি, ফলে সাদা চোখে সেটা মিথ্যে। কিন্তু আসলে তো ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু রেহানার মাথায় যিনি অপরাধকারি, শাস্তিটা তাঁর দরকার, নইলে সে আবার এই কাজ অন্য মেয়ের সাথে করবে। ফলে কার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটছে, সেটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। এটা আমাকে জাহাঙ্গীরনগরের ৯৮ এর ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময়কে মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনের সময় যখন প্রশাসন বারে বারে জানতে চাইছিল ধর্ষিতার পরিচয়, আন্দোলনকারী ছাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠেছিল “আমরা সবাই ধর্ষিতা”। একইভাবে বেগমগঞ্জের ধর্ষিতা নারীও বলেছিলেন, তাঁর উপরে নিপীড়নের বিচার না হলে বাংলাদেশের সব নারীর পরাজয় হবে। আরেকজন নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতার পাশে দাঁড়ানো নারী প্রতিমুহূর্তে তাঁর নিজের সাথে নিপীড়িতকে সম্পর্কযুক্ত করেন। তখন ব্যক্তির নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে বড় হয়ে যায় যৌথ নিপীড়নের অভিজ্ঞতা। আরেকজন নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতার পাশে দাঁড়ানো সংহতি থেকে আরেক ধাপ দুরে গিয়ে যখন তাঁর হয়ে লড়াইটি করতে চায় রেহানা, তখন সেটি সত্য থেকে বিচ্যুত হয় ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি কি মিথ্যে হয়ে যায়? নিপীড়িত নারী প্রতিরোধের লড়াই করতে না পারলে, বা না চাইলে, তাঁর হয়ে লড়াইটাকে করতে চাওয়া কি শুধুই সত্য আর মিথ্যের বাইনারি দিয়ে বোঝা সম্ভব? আমার মনে হয়েছে, ন্যায় বিচারের এই পজিটিভিস্ট এবং ব্যক্তিক ধারণাকে রেহানা ধাক্কা দেয়। 

    রেহানা একজন একরোখা চরিত্রের মানুষ, যে দরজা বন্ধ দেখলে ক্রমাগত দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে বের হতে চায়, শক্তি দিয়ে ঐ একটা পথেই হাঁটে, কিন্তু পথ ঘুরিয়ে  অন্য পথে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেন না, জানেন না, বা চান না। আপাতভাবে মনে হতে পারে এইটা তো আসলে খুব দারুণ একটা বিষয়, কিন্তু আমরা দেখি এই একমুখি একরোখা স্বভাবের কারণেই তিনি বুঝতে পারেন না, কিভাবে ইমুর শৈশবের আনন্দকে নষ্ট না করে নিজের নীতির প্রশ্নে অটল থাকবেন। রেহানার এই একরোখা চরিত্র তাঁকে আরও বন্দী করে ফেলে, মেডিকেল কলেজের একটা করিডরের মতো ছোট্ট জায়গায় আটকে ফেলে। এর মধ্যে আর কোন পথ দেখায় না। তিনি বুঝতে পারেন না কিভাবে নিপীড়ন ছাড়াই ইমুকে তার সিদ্ধান্তকে বুঝিয়ে বলবেন। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে ভয়াবহভাবে বন্দী করে। মা হিসেবে আমার তখন অস্থির লেগেছে, মনে হয়েছে তিনি তো মেয়েটাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেই পারতেন, একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত না ফেলে রেখে আরও দক্ষতার সাথে পুরো বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে পারতেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে হয়, রেহানা তো আসলে দর্শকের বিবেচনাবোধ দিয়ে চলা জীবন যাপন করছেন না, তিনি তাঁর নিজের জীবন যাপন করছেন। রেহানা আপনার আমার থেকে একটি ভিন্ন চরিত্র। সেই সাথে রেহানা এটি মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রতিমুহূর্তে কত শত ‘করা উচিত‘ কাজ জেনেও করতে পারি না, অন্য কিছু করি, এবং পরে অনুশোচনায় ভুগি। ফলে দেখা যাচ্ছে তিনি যাকে ঠিক মনে করছেন, সেই ঠিক কাজ করার জন্যে তিনি অন্যকে কষ্ট দিচ্ছেন। তাঁর এই অনমনীয়তা আরেকজনের নিপীড়নের কারণ হচ্ছে। এখানে আমি দেখতে পাই, ব্যক্তির সাথে আমাদের চারপাশের মানুষযে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে, তার ডিলেমা। অর্থাৎ রেহানা তাঁর নিজের নৈতিকতার বিষয়টাকে যত গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার প্রভাবে তাঁর কাছের মানুষগুলো কিভাবে ভুগছে তাকে আমলে নিতে পারছেন না। রেহানার তাঁর ব্যক্তিগত নীতির প্রশ্নে অবিচল থাকা যে অন্যের কাছে তাঁকে অনৈতিক করে তুলতে পারে তা বুঝতে পারছেন না। আমাদের খুবই চেনা ঘটনা এটি, আমরা চারপাশে, এবং নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ এই দ্বন্দ্ব দেখি। 

    রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য

    বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আমাদের দেশি চলচ্চিত্র কান উৎসবে প্রদর্শিত হতে পারা নিশ্চয়ই অনেক বড় খবর। ফলে এর প্রতিক্রিয়াও এরকম। অনেকেই তাঁদের নানারকম প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁদের দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো প্রত্যাশার সাথে মেলেনি। কান-এ প্রদর্শিত হওয়া, আলোচিত হওয়ার ফলে এর পাঠ প্রতিক্রিয়াও প্রভাবিত হচ্ছে। সামাজিক বিজ্ঞানী হিসেবে এগুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ফলে চলচ্চিত্রটি যেমন আমার সত্তাকে ঝাঁকুনি দেয়, তেমনি একে ঘিরে এতো আলোচনাও নৃবিজ্ঞানী হিসেবে সমাজ বিশ্লেষণের অনেক অনেক পথ খুলে দেয়। মনোবিজ্ঞানী রেহানাকে দেখছেন মানসিক রোগী হিসেবে। আইনজ্ঞ দেখছেন মিথ্যা অভিযোগকারী হিসেবে। কেউ কেউ তাঁকে দেখছেন নিপীড়ক মা, অযৌক্তিকভাবে ক্ষুব্ধ শিক্ষক, ইত্যাদি ইত্যাদি। রেহানা হয়তো সবগুলোই। তবে কিভাবে কে রেহানাকে পাঠ করছেন, সেটা যতটা না রেহানাকে দেখায়, তার থেকেও বেশি দেখায় যিনি দেখছেন তাঁকে এবং যে সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ তিনি সেটিকেও।  

    সবশেষে এই ফিল্মটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে, একজন একগুয়ে মানুষকে কিভাবে আপাদমস্তক আপসকামী সমাজ ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে দেয় তার দলিল। সেই সাথে এই ভাংচুর কিভাবে তাঁর আপনজনদের জীবনকেও একে একে চক্রাকারে ভাঙতে থাকে তারও চিত্রায়ন। 

    আমি নিশ্চিত রেহানাকে অনেকেই আয়নায় দেখতে পান, কিন্তু স্বীকার করেন না। বা দেখতে চান না। 

    তথ্যপঞ্জি

    Ahmed, Sara (2004) The cultural politics of emotion; Edinborough University Press.

  • বন্দনা শিবা।। নারীর লোকজ জ্ঞান ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ

    বন্দনা শিবা।। নারীর লোকজ জ্ঞান ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ

    অনুবাদ: তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি

    বন্দনা শিবা একজন বিখ্যাত পরিবেশবাদী নেতা এবং পরিবেশ নারীবাদের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক। পাশাপাশি তিনি Research Foundation on Science, Technology, and Ecology-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বন্দনার বীজ সংরক্ষণ আন্দোলন এগিয়ে নিতে নবদানা (Navadanya) নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি Alternative Nobel Peace Prize এবং Sydney Peace Prize-সহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ হল The Violence of the Green Revolution (1991), Biodiversity (1992), Monocultures of the Mind (1993), Biopolitics (1995) ইত্যাদি। বর্তমান প্রবন্ধটি বন্দনা শিবা এবং মারিয়া মায়েস সম্পাদিত Eco-feminism নামক গ্রন্থের একটি অধ্যায় থেকে অনূদিত। – লেখক

    [মূল প্রবন্ধ]

    জেন্ডার এবং বৈচিত্র্য নানাভাবে একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে নির্মাণ করা ও বিভিন্নতার সাথে খাপখাওয়ানোর অক্ষমতা একই সূত্রে গাঁথা। একইভাবে জৈবিক জগতে বৈচিত্র্যের বিচ্যুতি ও বিলুপ্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় যেই উন্নয়নের নমুনা তাও এর সাথে জড়িত। পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষকেই সকল গুণের মানদণ্ড হিসেবে দেখে, যেখানে বৈচিত্র্যের কোনো স্থান নেই। কেবল আছে কর্তৃত্বক্রমের স্থান। পুরুষের থেকে ভিন্ন হওয়ায় নারী অসম এবং অধস্তন হিসেবে গণ্য হয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্যকেও স্বাভাবিকভাবে এর স্বকীয়তার জন্য মূল্যবান বিবেচনা করা হয় না, শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক শোষণের নিরিখেই এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যিক মূল্যায়ণের এই মানদণ্ড এভাবেই বৈচিত্র্যকে সমস্যা ও ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করে। বৈচিত্র্যকে ধংস করে মনোকালচারই উৎপাদনই পুঁজিতান্ত্রিক পিতৃতন্ত্রের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।

    নারীর প্রান্তিকীকরণ এবং জীববৈচিত্র্যের বিনাশ পরস্পর সহযোগী। পিতৃতান্ত্রিক উন্নয়ন মডেলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অনিবার্য পরিণতিই হলো মনোকালচার, অভিন্নতা এবং একজাতীয়তা। এই ধরনের বিকৃত উন্নয়ন ভাবনায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষির উন্নয়নের নামে একদিকে বৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক স্বার্থ সংরক্ষণের নামে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সেটা সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি উন্নয়নের নামে অভিন্ন উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে উৎপাদন এবং ভোগ— এ দুটোকে আলাদা করা হয়। যা বৈচিত্র্য সংরক্ষণ নয় বরং এর বিরুদ্ধেই কাজ করে। জীববৈচিত্র্য তখনই রক্ষা করা সম্ভব যখন আমরা উৎপাদন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবো।

    বৈচিত্র্যের যৌক্তিকতা জীববৈচিত্র্য ও এর সাথে নারীর যোগসূত্র থেকে উৎসারিত। যা কতৃত্বপূর্ণ কাঠামোকে নিচ থেকে দেখতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মনোকালচারের অনুৎপাদনশীল রূপটিকে উন্মোচিত করে। সেই সাথে এটাও প্রকাশ করে যে এই জ্ঞান বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন নয় বরং সেকেলে।

    বৈচিত্র্য নানাভাবেই নারীর রাজনীতি এবং বাস্তুসংস্থানগত রাজনীতির ভিত্তি। লিঙ্গ–রাজনীতি মূলত ভিন্নতারই রাজনীতি। পরিবেশ–রাজনীতিও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। পক্ষান্তরে শিল্পকারখানার উৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং উৎপাদিত পণ্য অভিন্ন এবং একজাতীয়।

    এই দুই ধরনের রাজনীতি একই বিন্দুতে পৌঁছায় যখন নারী এবং জীববৈচিত্র্যের প্রান্তর ও অরণ্যে এসে মোলাকাত ঘটে। মোলাকাত ঘটে শুষ্ক অঞ্চল ও জলাভূমিতে।

    নারীর দক্ষতা হিসেবে বৈচিত্র্য

    বৈচিত্র্যই নারীর কাজ এবং জ্ঞানের মূলনীতি। এ কারণেই তারা পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোতে অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু এই মূলনীতির সাহায্যেই বিকল্প ‘উৎপাদন পদ্ধতি’ এবং ‘দক্ষতা’ গড়ে তোলা সম্ভব যেটি বিধ্বংসী নয় বরং বৈচিত্র্যকে সম্মান দেয়।

    তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ টিকে থাকার জন্য জৈবিক সম্পদ ব্যবহার করে। এই সমাজগুলোতে জীববৈচিত্র্য যুগপৎভাবে উৎপাদনের উপায় এবং ভোগের বস্তু। তাদের জীবন ও জীবিকা অনেকাংশেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সেগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত। আদিবাসী ও কৃষি সমাজগুলোর জীববৈচিত্র্য–ভিত্তিক প্রযুক্তিকে আদিম এবং অনগ্রসর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সেগুলো ‘উন্নত’ যন্ত্রপাতি দ্বারা স্থানান্তরিত হয়। যা মানুষের জীবিকা নির্বাহের উপায় এবং বৈচিত্র্য দুটোকেই ধ্বংস করে।

    জনমনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে বৈচিত্র্য–ভিত্তিক উৎপাদন পদ্ধতি হলো কম ফলনশীল পদ্ধতি। অথচ একটি অভিন্ন এবং একজাতীয় পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীলতা হলো কন্টেক্সটচুয়াল এবং তত্ত্বীয়ভাবে নির্মিত একটি বিষয়। এটি কেবল একমাত্রিক ফলনকে গুরুত্ব দেয়। তাই কথিত নিম্ন–ফলনশীল এবং উচ্চ ফলনশীল এদুটোকে মুখমুখি দাঁড় করানোকে নিরপেক্ষভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বরং যারা একমাত্রিক ফলনকে অর্থনৈতিকভাবে অনিবার্য মনে করে তাদের সাপেক্ষে এটি বাণিজ্যিক লাভ–ক্ষতির অঙ্ক দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট।

    শস্যের একজাতীয়তা জীবতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যর বিনাশ ঘটায়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন এবং জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যেই মানুষগুলো অরণ্য, কৃষি এবং পশুপালনের একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ,ভারতের কেরালা রাজ্যের নারিকেল চাষ বহু ধাপবিশিষ্ট। সেখানে একইসাথে নারিকেল, পান, গোল মরিচ, কলা, সাগু, সজিনা, পেপে, আম এবং সবজি চাষ করা হয়। শুধু নারিকেল উৎপাদন করলে প্রতি হেক্টর জমিতে বাৎসরিক ১৫৭ জন্য শ্রমিক প্রয়োজন হয়, যেখানে মিশ্র পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে প্রতি হেক্টরে ৯৬০ জন শ্রমিক লাগে। শুষ্ক ডেক্কান অঞ্চলে মিশ্র পদ্ধতিতে ভুট্টা, কলাই এবং তৈলবীজ উৎপাদন ছেড়ে মানুষ যখন শুধু ইউক্যালিপটাস মনোকালচার শুরু করল তখন সেখানে হেক্টর প্রতি ২৫০ জন মানুষ কাজ হারানো শুরু করে।

    যখন শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয় বা শ্রম ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে তখন শ্রমের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহার ফলদায়ক ও কার্যকর হয় কিন্তু যখন শ্রমিকের প্রাচুর্য রয়েছে তখন শ্রমের বিকল্প অর্থহীন কারণ তা দারিদ্র্য, উৎখাত ও জীবিকার ধ্বংসসাধনের কারণ হয়ে ওঠে। তৃতীয় বিশ্বের পরিস্থিতিতে এ কারণে একই সাথে দুটি পর্যায়ে স্থায়িত্ব অর্জন করতে হবে: প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্ব এবং জীবিকার স্থায়িত্ব। ফলস্বরূপ, জীববৈচিত্র্যের থেকে উদ্ভূত জীবিকার সংরক্ষণের সাথে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণকে যুক্ত করে দেখতে হবে।

    জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নারীর কর্ম এবং জ্ঞান কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ, কেননা নারী উভয় সেক্টরে কাজ করে এবং একই সময়ে অনেকগুলো কাজ সম্পাদন করে। কৃষি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। অর্থনীতিবিদরা নারীর কাজকে ‘উৎপাদন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না যেহেতু নারীর কাজ তথাকথিত ‘উৎপাদন–সীমানা’–র অন্তর্গত নয়। কম সংখ্যক নারী কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে বলে এই ভ্রান্তি তৈরি হয়নি, বরং নারীরা একইসাথে অনেকগুলো কাজ করে বিধায় এই ধারণার উৎপত্তি।

    পরিসংখ্যানবিদ এবং গবেষকরা নারীর ঘরের কাজ এবং কৃষি–উৎপাদনমূলক কাজকে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থতারই পরিচয় দিয়ে গেছেন। কোন কাজটি শ্রম এবং কোন কাজটি শ্রম নয় সেটি নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে, যেহেতু নারীরা অধিক পরিমাণ এবং অনেকগুলো কাজ একসাথে করে। এটির আরেকটি বড়সড় কারণ হলো নারীর গৃহস্থলীর কাজ মজুরি দ্বারা পরিমাপ করা হয় না। তাদের কাজ অদৃশ্যই থেকে যায় কারণ তারা বাজার–অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন কাজগুলোতে অধিক সময় দেন এবং একই সাথে একাধিক কাজ করেন।

    সময়–বরাদ্দ (Time allocation) সংক্রান্ত গবেষণাগুলো একই সময়ে অনেকগুলো কাজের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি নারীর দৈনন্দিন গতিবিধি এবং যেই কাজগুলো গতানুগতিক শ্রম–শক্তি হিসেবে চিহ্নিত নয়, কিন্তু বেশিরভাগ গ্রামীণ নারীর জীবিকা যেটার সাথে সম্পর্কিত সেগুলো নিয়ে কাজ করছে । জেন্ডার স্টাডিজের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও নিশ্চিত করেছে, গুণগত মান, পরিমাণ এবং কর্মঘণ্টা এই তিনটি বিষয় বিবেচনা করলে নারীরাই ভারতের খাদ্যশস্যের প্রধান উৎপাদক।

    ফসল উৎপাদন এবং তার প্রস্তুতির জন্য নারীর বিশেষ জ্ঞান এবং দক্ষতার প্রয়োজন। বীজ প্রস্তুত করতে গেলে বীজ অঙ্কুরোদগম, মাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তাদের জানতে হয়। থাকতে হয় দৃশ্যমান বৈষম্য, হাতের আঙুল এবং চোখের সমন্বয়, আর্দ্রতার মাত্রা সম্পর্কিত সংবেদনশীলতা এবং আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান। বীজ বপন করতে ঋতু, জলবায়ু, উদ্ভিদের প্রয়োজনীয়তা, মাইক্রো–জলবায়ুগত অবস্থা এবং মাটি ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় জানতে হয়; এছাড়াও শারিরিক সক্ষমতা এবং নৈপুণ্য দরকার হয়। গাছের যত্ন নিতে হলে উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগ–বালাই, কর্তন, স্টেকিং, সেচ, সাথী রোপণ, ক্ষতিকর প্রাণী, উদ্ভিদের বেড়ে উঠার সময়কাল, মাটি রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য জানা জরুরি। ধৈর্য ও অধ্যবসায়, শারীরিক সক্ষমতা এবং উদ্ভিদের প্রয়োজনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া অপরিহার্য। ফসল উত্তোলনের ক্ষেত্রেও আবহাওয়া, শ্রম ও গ্রেডিং; সংরক্ষণ সম্পর্কিত জ্ঞান ও তৎক্ষণাৎ ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হয়।

    নারীর জ্ঞান দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনেরও প্রধান অবলম্বন। ভারতে দুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়াটি নারী দ্বারা পরিচালিত। তাদের নিজস্ব পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আহরিত ডেইরি সায়েন্সের থেকে আলাদা। নারীরা তাদের চর্চার মধ্য দিয়ে পশু প্রজনন, লালন–পালনে বিশেষ দক্ষ হয়ে ওঠেছে। শুধু গরু কিংবা মহিষ নয়, তারা হাঁস, মুরগি, শুকর, ছাগলও লালন–পালন করে।

    বনায়নে উদ্ভিদের খাদ্য এবং সার হিসেবে ব্যবহৃত জৈববস্তু উৎপাদনেও নারীর জ্ঞান অতি গুরুত্বপূর্ণ। গবাদিপশুর গোবর, জ্বালানি হিসেবে কাঠের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহার, খাদ্য উৎপাদন এ সমস্ত কার্যক্রমে নারী সক্রিয়। এমনকি স্বল্প পরিসর বনায়নেও নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং পশুপাখির ভূমিকা থাকে।

    নারীর কর্ম এবং জ্ঞান স্বতন্ত্রভাবে গৃহস্থালি এবং কৃষি উভয় খাতেই উপস্থিত। সম্পদের ঘাটতি সত্ত্বেও খাতগুলোর মধ্যে নারীর অদৃশ্য বাস্তুসংস্থানগত প্রবাহ এবং সংযোগই পরিবেশের স্থায়িত্ব, টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা সংরক্ষিত হচ্ছে। নারীর কর্ম এবং জ্ঞানের অদৃশ্যমানতা জেন্ডার পক্ষপাত দ্বারাই উৎসারিত। ফলে নারীর অবদানকে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটা উন্নয়ন পরিমাপ করার সেক্টরাল, খণ্ডিত এবং রিডাকশনিস্ট এপ্রোচের সাথে সম্পর্কিত যেখানে বন, পশুপালন, ফসল এগুলোর একেকটাকে স্বাধীন খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

    সবুজ বিপ্লবের উদ্দেশ্য ছিল ডরফিং, মনোকালচার এবং মাল্টিকালচার পদ্ধতি ব্যবহার করে ধান ও গমের উৎপাদন বৃদ্ধি। একজন ভারতীয় নারীর কাছে ধান শুধু খাদ্যশস্য নয় বরং পশু–পাখির খাবারের উৎস, ঘরের ছাউনি। উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহার নারীর কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়, পাশাপাশি নতুন ধরনের প্রযুক্তি, বীজ এবং শস্য উৎপাদন সম্পদগুলোর থেকে নারীর নিয়ন্ত্রন কেড়ে নেয়। স্মরণাতীতকাল থেকে নারীরাই বীজের জিম্মাদারের দায়িত্ব পালন করে এসেছে, তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা ব্যবহার করেই ফসলের উন্নয়ন পরিকল্পনা করা উচিৎ।

    জীববৈচিত্র্যের জিম্মাদার: নারী

    বেশিরভাগ সংস্কৃতিতেই নারী জীববৈচিত্র্যের জিম্মাদারের ভূমিকা পালন করে। তারা কৃষি উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, ভোগ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়াদির মতোই নারীর কর্ম এবং জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এবং উন্নয়নে তার ভূমিকা অস্বীকৃত। নারীর শ্রম এবং দক্ষতাকে প্রাকৃতিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও তার এই কাজগুলো প্রায়োগিক জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক চর্চার দ্বারা অর্জিত। তবে নারীর পরিবেশ সংরক্ষণের পদ্ধতি কর্তৃত্বপরায়ণ পিতৃতান্ত্রিক সংরক্ষণের থেকে ভিন্ন।

    বর্তমানে বৃহৎ পরিসরে মনোকালচার কেন্দ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তৃতি এবং এর সাথে সম্পৃক্ত সংকটগুলো বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মনোকালচার গ্রহণের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থা খণ্ডিত করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পুরো পরক্রিয়াটিকে পরিচালিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কৃষির প্রতিটি উপাদানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয়। ফলে বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফসলের একেকটা জাত সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের গাণিতিক চর্চায় রূপান্তরিত হয়েছে।

    অপরপক্ষে, ভারতীয় ঐতিহ্যে জীববৈচিত্র্য বিচ্ছিন্ন নয় বরং এখানে পরিবেশের একটি উপাদান আরেকটির সাথে সম্বন্ধযুক্ত। এই সম্পর্কের মাধ্যমেই উপাদানগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং মান অর্জন করে। জীববৈচিত্র্য বাস্তুসংস্থান এবং সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকে। সংস্কৃতি সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে বৈচিত্র্য পুনরুৎপাদিত এবং সংরক্ষিত হয়। বিভিন্ন উৎসব এবং লোকাচার পালনের মাধ্যমে শুধু জীবনের পুনরাবৃত্তি নয় বরং এটি নানাবিধ বীজ নির্বাচন এবং এর বিস্তারের পরীক্ষা–নিরীক্ষার সুযোগ করে দেয়। যেহেতু এই ধরনের বীজ কোনো পরীক্ষাগার থেকে উৎপত্তি লাভ করছে না, সেহেতু কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এই সমস্ত পরীক্ষাকে বৈজ্ঞানিক বলে মানতে চায় না। তবে এগুলোই মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সম্পন্ন হচ্ছে, মধ্যবিত্ত পুরুষ নয় বরং গ্রামীণ নারীদের দ্বারা। কৃষির এই সংরক্ষিত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য পদ্ধতিগতভাবেই বিশ্বাসযোগ্য।

    যখন নারী বীজ সংরক্ষণ করে, তারা বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে, যা পরিবেশের ভারসাম্য এবং সঙ্গতি রক্ষা করে। নবদানা (Navdanya) বা নয়া বীজ হলো উদ্ভিদজগৎ এবং সামাজিক জীবন উভয়েরই বৈচিত্র্যের পুনর্জীবন ও ভারসাম্যের প্রতীক।

    পবিত্রতা/ বিশুদ্ধতা (Sacredness): একটি সংরক্ষণ ক্যাটাগরি

    একটি দেশজ পরিবেশে সংরক্ষণের একটি বড় অংশ জুড়ে পবিত্রতার ব্যাপারটি জড়িয়ে থাকে। পবিত্রতা বৈচিত্র্যের সহজাত বৈশিষ্ট্যকে পরিবেষ্টিত করে রাখে; এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থার সাথে তার একটা অংশকে সম্পর্কিত করে। ফলে এটি ব্যবস্থাটির অখণ্ডতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। অপবিত্র বীজ বাস্তুসংস্থান চক্রের অখণ্ডতা বিনষ্ট করে। এমনকি কৃষিজ ইকোসিস্টেম এর সংযোগগুলো ভেঙে ফেলে যেগুলো টেকসই উন্নয়নের সাথেও সম্পর্কিত।

    ১। পবিত্র বীজ হলো নবদানা উদ্যগের ভিত্তি, যা নবগ্রহের প্রতীক। উদ্ভিজ্জ ফসল উৎপাদনে গ্রহ এবং জলবায়ুর ভূমিকা অপরিহার্য। অন্যদিকে উচ্চ ফলনশীল বীজ ঋতুভিত্তিক জলবায়ুর সাথে ফসলের সংযোগ ভেঙে ফেলে। একই সাথে একাধিক ফসলের চাষ এবং আলোক–সংবেদনশীলতা এই দুটি বিষয়কে মাথায় নিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজকে গ্রহ এবং জলবায়ুর প্রভাবমুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ঋতুচক্র থেকে মুক্তি বড় বাধ আর ব্যাপক সেচের উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে।

    ২। বীজের বৈচিত্র্য এবং সুষম পুষ্টি একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত। উচ্চ ফলনশীল জাতের মনোকালচার ব্যবস্থাটি পুষ্টি এবং ভারসাম্য–হীনতা ঘটায়। এক্ষেত্রে কলাই এবং তেলজাতীয় শস্যের উৎপাদন ত্যাগ করে খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বাড়ানো হয়।

    ৩। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্যও শস্য বৈচিত্র্য জরুরি। মনোকালচার রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়িয়ে জমির উর্বরতা নষ্ট করে। খর্বাকৃতি ফসলের জাত খড় তৈরি করে না, ফলে মাটির রিসাইক্লিং ঠিকভাবে হয় না। অন্যদিকে রাসায়নিক সার জমিতে থাকা প্রাণী এবং উদ্ভিদ ধ্বংস করে।

    ৪। জীববৈচিত্র্য স্বনির্ভর খামারগুলোকে টিকিয়ে রাখে, যেখানে উৎপাদনকারীই ভোক্তা। উচ্চ ফলনশীল জাতের এক ফসলী উৎপাদন ব্যবস্থা অধিক কৃষককে অন্যান্য বীজের খদ্দের বানিয়ে ফেলে। ফলে নির্ভরশীলতা বাড়ে, বাড়ে উৎপাদন খরচ, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য সরবরাহ কমে যায়।

    ৫। সর্বশেষ, ক্রয়কৃত বীজ নারীদের সিদ্ধান্তগ্রহণ এবং বীজের জিম্মাদার প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে ফেলে এবং তাদের অদক্ষ শ্রমিক হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কর্ণাটকে প্রধান খাদ্যশস্যগুলো ‘আকাদি’ নামে পরিচিত এবং নারীরা এই শস্য উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। একজন লাম্বানি নারীর ভাষায়, ‘আকাদি সম্পর্কে পুরুষরা কী জানে, তারা তো শুধু হালচাষ করতে জানে’, যেহেতু বংশ পরম্পরায় নারীরাই এসব বীজ সংরক্ষণ করে আসছে। আরেকজন নারী বলেছেন, ‘আমি এবং আমার মা এই বীজগুলোর দেখাশোনা করে এসেছি, এখন আমার মেয়ে করছে।’

    কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায়ের নারীদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নবায়ন সংক্রান্ত প্রাত্যহিক চর্চা থেকে আমরা কী সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি?

    প্রথমত, নবদানা এটাই চিত্রিত করে যে, জীববৈচিত্র্য কোনো বিচ্ছিন্ন (রিডাকশনিস্ট) ক্যাটাগরি নয় বরং সম্পর্কযুক্ত— এটি কোনো অটমাইজড ধারণা নয় বরং কনট্যাক্সটচুয়াল। অতএব, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হলো সেসকল সম্পর্কেরও সংরক্ষণ যাতে করে পরিবেশের ভারসাম্য এবং সঙ্গতি উভয়ই রক্ষিত হয়। জীববৈচিত্র্য বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষণ করতে গেলে এটি কেবল কাঁচামাল যোগান দিতে পারে, বাস্তুসংস্থান এবং সংস্কৃতি রক্ষায় কোনো ভূমিকা পালন করে না।

    দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সম্পর্কের সংরক্ষণ পবিত্রতা এবং অলঙ্ঘনীয়তার সাথে সম্পর্কিত। পবিত্রতা এবং বৈচিত্র্যের ধারণা একেবারে ভিন্ন একটা দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে আনে যেখানে বীজকে শুধু পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা লাভের অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।

    তৃতীয়ত, বেশিরভাগ টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় স্ব–নির্ভরতাজাতীয় উৎপাদন এবং ভোগের চক্রটিকে কাছে থেকে বুঝতে সাহায্য করে। প্রচলিত অর্থনীতি এই ধরনের ব্যবস্থাপনাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ, কারণ এটি কেবল পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়, যেখানে উৎপাদনকারী এবং ভোক্তা ভিন্ন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে স্ব–নির্ভর ব্যবস্থা অনুৎপাদনশীল হিসেবে বিবেচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই নারীর শ্রমসাধ্য কাজকে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। দুঃখজনক হলো, এই দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করেই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালাগুলো প্রণয়ন করা হয়।

    অতপর, জীবতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর সামাজিক, নৈতিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কেবল অর্থনৈতিক গুরুত্বই সরকারি নীতিমালা প্রণেতাদের সামনে প্রদর্শিত হয়। জীবতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য তিন ধরনের—

    • ‘ভোগবাদী মূল্য’— যে পণ্যগুলো বাজারে না গিয়ে সরাসরি ভোগ করা হয়। যেমন– জ্বালানি কাঠ, পশুখাদ্য, শিকার করা মাংস;

    • ‘পণ্য মূল্য’— যে পণ্যগুলো বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো হয়;

    • ‘অভোগ্য ব্যবহারিক মূল্য’— ইকোসিস্টেমের কার্যকারিতার পরোক্ষ মূল্য, যেমন– জলাধার রক্ষা, সালোকসংশ্লেষণ, জলবায়ু ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা।

    একটি চমকপ্রদ মূল্যায়নের কাঠামো নির্মিত হয়েছে, যার বিশ্লেষণ এবং অভিমত পূর্ব নির্ধারিত। এই অভিমত অনুযায়ী, দরিদ্র তৃতীয় বিশ্বের মানুষ সরাসরি প্রকৃতি থেকে জীবিকা নির্বাহ করে এবং শুধু ‘ভোগ’ করে অর্থাৎ এই মানুষগুলো শুধু ভোক্তা। পক্ষান্তরে যারা ব্যবসা–বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত তারাই ‘একমাত্র’ উৎপাদক। তাহলে সহজেই প্রমাণ করা যায় যে তৃতীয় বিশ্ব পরিবেশের সম্পদ ধ্বংস করছে। অপরদিকে বিশ্বের উত্তরের মানুষেরাই এটি রক্ষার সামর্থ্য রাখে। ভোগ, উৎপাদন এবং সংরক্ষণের এই মতাদর্শিক শ্রেণিবিভাগ পুরো প্রক্রিয়াটির রাজনৈতিক অর্থনীতিকে আড়াল করতে সক্ষম হয়।

    সুনির্দিষ্টভাবেই এটি নারী, জীববৈচিত্র্য উৎপাদনকারী এবং সংরক্ষণকারীকে নিছক ভোক্তা হিসেবে পরিচিত করে। সংস্কৃতি, নৈতিকতাবোধ, দক্ষতা, জ্ঞান, বিজ্ঞতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সংরক্ষণ পরিকল্পনা না করে প্রচলিত সংরক্ষণ নীতিমালা এগুলোকে মুছে ফেলে। এরপর এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যেখানে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় টেকসই জীবিকা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিণত হয়।

    প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈচিত্র্যকে বাস্তুসংস্থানগত নয় বরং একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক এবং গাণিতিক বিষয় হিসেবে দেখা যায়। এটি বীজগাণিতিক বৈচিত্র্যের সাথে ঐক্যপোষণ করে পারস্পরিক মিথোজীবিতা ও জটিলতার সাথে নয়। জীববৈচিত্র্যর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে সংখ্যা এবং বাস্তুসংস্থানের ফ্রিকোয়েন্সি, প্রজাতি এবং জিনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণই কেবল ব্যবহৃত হয়। এর বিপরীতে, যেই সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে বৈচিত্র্যের চর্চা করা হয়, সেখানে জীববিচিত্র্যকে জালের মতো বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয় যেটি ভারসাম্য এবং স্থায়িত্ব উভয়ই নিশ্চিত করে। ব্যাপকভাবে এটি গ্রহ এবং উদ্ভিদ, কসমিক সঙ্গতি এবং কৃষি ইত্যাদির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দেশ করে।

    পার্থিব দিক বিবেচনায়, বৈচিত্র্য এবং পরস্পর সম্পর্কই সকল টেকসই কৃষি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য হলো বৃক্ষসমূহ, ফসল এবং গৃহপালিতের পরস্পর নির্ভরশীলতা যা জৈব বস্তুর প্রবাহ দ্বারা জমির উর্বরতা চক্রের ব্যবস্থাপনা করে। নারীর কর্ম এবং জ্ঞান যেখানে কাজে লাগানো হয়। এছাড়াও মিশ্র এবং চক্রাকার চাষ পদ্ধতিতে ফসলের বৈচিত্র্যের সাথে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্যশস্য এবং ডাল বীজের মিশ্রণ নাইট্রোজেন চক্রে পুষ্টির ভারসাম্য তৈরি করে; ফসলের মিশ্রণ ক্ষতিকর প্রাণী থেকেও ফসল বাঁচায়; রাসায়নিক বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবহার ছাড়াই ক্ষতিকর কীট–পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি জলের চক্র ব্যবস্থাপনা এবং মাটির আর্দ্রতা ও উর্বরতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সমৃদ্ধ এই পদ্ধতি বহু বছর থেকে ভারতের ক্ষুদ্র খামারগুলোতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি একইসাথে খাদ্য এবং পুষ্টি সরবরাহ করে আসছে, স্থায়িত্ব এবং ন্যায়বিচার টিকিয়ে রেখে।

    জৈব প্রযুক্তি এবং জীববৈচিত্র্যের বিনাশ

    বিভিন্ন উপায়ে তৃতীয় বিশ্বের নারীর সাথে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্কের থেকে কর্পোরেট পুরুষদের সাথে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক ভিন্ন। নারীরা জীববৈচিত্র্যের মাধ্যমে উৎপাদন করে পক্ষান্তরে কর্পোরেট বিজ্ঞানীরা অভিন্নতার উপর ভিত্তি করে উৎপাদন করে।

    নারী কৃষকদের কাছে জীববৈচিত্র্য মূল্যবান। বৈশ্বিক বীজ এবং কৃষিবাণিজ্যিক কর্পোরেশনগুলোর কাছে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব শুধু কাঁচামাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে। নারী কৃষকদের জন্য বীজের অর্থ হলো জীবনের ধারাবাহিকতা। মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের কাছে বীজ মানে হলো বীজের জীবনের সমাপ্তি। বীজ কোম্পানিগুলো বীজের শংকরায়ন ঘটিয়ে কৃষকদের বীজের জিম্মাদার থেকে ভোক্তায় রূপান্তরিত করে। যেহেতু শঙ্কর বীজের স্বত্ব কোম্পানিগুলো নিয়ে রাখে সেহেতু কৃষককে প্রতি বছর কোম্পানিগুলোর কাছেই ফিরে যেতে হয় বীজ কিনতে। বীজ স্বত্ব আইনের মাধ্যমে কর্পোরেশন বীজগুলোকে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন বলে দাবি করতে পারে। ফলে অন্য কেউ স্বত্বাধিকারী পণ্য উৎপাদন করতে পারে না।

    কর্পোরেট বিজ্ঞানীদের নিজস্ব উদ্ভাবনের দাবি অন্যায্য, বরং এটি উদ্ভাবিত জীবনের প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাদের দাবি অন্যায্য এ কারণে যে, তারা প্রকৃতি এবং তৃতীয় বিশ্বের কৃষকদের উদ্ভাবিত বীজকে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে। বীজের উপর স্বত্বাধিকার দাবি ২১ শতকের এক ধরনের পাইরেসি। যার মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের নারী কৃষকদের সমন্বিত ঐতিহ্য এবং জিম্মা কোম্পানিগুলোর দ্বারা লুণ্ঠিত হচ্ছে। এই কাজে সহায়তা করছে GATT-এর মতো বৈশ্বিক কিছু সংগঠন। স্বত্ব এবং জৈব প্রযুক্তি দুই ধরনের চুরির শিকার। তৃতীয় বিশ্বের উৎপাদনকারিদের থেকে তারা জীববৈচিত্র্য ছিনিয়ে নিয়েছে। সকল ভোক্তার কাছ থেকে তারা নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ‘সবুজ’ প্রযুক্তি হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হচ্ছে। ১৯৯২ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ জেনেটিক ইঙ্গিনিয়ারিং–এর সাহায্যে উৎপাদিত খাদ্যকে ‘প্রাকৃতিক’ এবং নিরাপদ হিসেবে রুল জারি করেন । যাই হোক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোনোভাবেই প্রাকৃতিক কিংবা নিরাপদ নয়।

    সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য এবং ড্রাগ প্রশাসন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং–এর মাধ্যমে উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণের ঝুঁকি সংক্রান্ত একটি তালিকা তৈরি করেছে:

    • জেনেটিক্যালি উৎপাদিত খাদ্যে নতুন বিষাক্ত পদার্থ যোগ করা হতে পারে।

    • খাদ্যের পুষ্টিগুণ হ্রাস পেতে পারে।

    • নতুন পদার্থ খাদ্যের গঠন পরিবর্তন করতে পারে।

    • নতুন প্রোটিনের কারণে এলার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

    • জিনের পরিবর্তন ক্ষতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে ।

    • এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিন মানুষ বা পশুর শরীরের কিছু এন্টিবায়োটিক–এর কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে।

    • জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ‘নকল সজীবতা’ (‘counterfeit freshness’) উৎপাদন করতে পারে।

    • ইঞ্জিনিয়ারিং খাদ্য গৃহপালিত প্রাণীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

    • জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং–এর সাহায্যে উৎপাদিত খাদ্য বণ্য–প্রাণীর ক্ষতিসাধন করতে পারে এবং আবাস পরিবর্তন করতে পারে।

    আমাদের জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ারড খাদ্যের উপর আস্থা আনতে বলা হচ্ছে, আবার একইসাথে সেইসব কোম্পানিকে বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে যারা খাদ্যে কীটনাশক ব্যবহার করে। মনসানটো (আমেরিকান কর্পোরেশন) এখন নিজের পণ্য ‘সবুজ’ হিসেবে বিক্রি করছে, যে আগে আমাদের বলত ‘রাসায়নিক ব্যবহার না করলে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়বে। মনস্যান্টোস, সিবা–গিগিস, ডুপন্টস, আইসিআই এবং ডওস এই কোম্পানিগুলোও ঘোষণা দিচ্ছে তারা আমাদের সবুজ পণ্য দেবে। যাই হোক, জ্যাক ক্লোপেনবারগ সম্প্রতি বলেছেন, ‘নেকড়ে হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এইসব শিল্পপতিরা এখন নিজেদের ভেড়া এবং সবুজ ভেড়া হিসেবে পুনরায় উপস্থাপন করতে চাচ্ছে।’

  • ‘অসুখী বিয়ে’ : বাম ধারা ও নারীবাদ

    ‘অসুখী বিয়ে’ : বাম ধারা ও নারীবাদ

    রেহনুমা আহমেদের ‘অসুখী বিয়ে’: বাম ধারা ও নারীবাদ প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, পাবলিক নৃবিজ্ঞান সিরিজের অংশ হিসেবে। ‘উপল’–এর আয়োজনে ‘লিঙ্গ, কর্তৃত্ব ও মুক্তি’ সিরিজের অংশ হিসেবে অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অরাজের সাইটে হুবহু তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক

    অসুখী বিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ

    ভূমিকা

    এই পুস্তিকা–প্রবন্ধ তিনটি ভিন্ন–ভিন্ন অংশের সমন্বয়ে গঠিত, বলতে পারেন এটা একটা জোড়াতালি লেখা। বাম ধারা ও নারীবাদের সম্পর্ক অনুসন্ধানের প্রয়াস, আবার একইসঙ্গে এই প্রয়াসের পদ্ধতি কী হতে পারে, এ বিষয়গুলোকে ঘিরে এই প্রবন্ধ। পদ্ধতি–সংক্রান্ত আলোচনা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ১।

    প্রবন্ধের একেক অংশ একেক সময় লেখা বা অনুবাদ করা, শেষের অংশটি সর্বপ্রথম লিখেছিলাম (২০০৭), দ্বিতীয় অংশটি তার পরের বছর (২০০৮), আর প্রথম অংশটি, যেটি কিনা অনুবাদ, সেটি ২০১৩–তে।

    প্রথম অংশ হচ্ছে “নিউ লেফ্‌ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”। এটি লিডিয়া সার্জেন্ট সম্পাদিত উইমেন এন্ড রেভোলিউশন (১৯৮১) সংকলনের ভূমিকার অনুবাদ: “New Left Women and Men: The Honeymoon is Over”।২ এই সংকলনের প্রধান প্রবন্ধ লিখেছেন হাইডি হার্টমেন যার শিরোনাম হচ্ছে, “The Unhappy Marriage of Marxism and Feminism: Towards a More Progressive Union”। শিরোনামে উল্লেখিত Unhappy Marriage-এর সূত্র ধরেই উইমেন এন্ড রেভোলিউশন–এর সম্পাদক লিডিয়া সার্জেন্ট তাঁর ভূমিকার উপ–শিরোনামে ঘোষণা করেন: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের মধুচন্দ্রিমার অবসান ঘটেছে (The Honeymoon is Over)। হার্টমেনের শিরোনাম ধার করে এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছি:- ‘অসুখী বিয়ে’। বাম ধারা ও নারীবাদ।

    দ্বিতীয় অংশটিও অনুবাদ— “পুরুষের লেখা স্ক্রিপ্টে নারীমুক্তি: মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতা”। এদেশের বাম নেতৃত্ব প্রসঙ্গে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি ও বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে নিউ এইজ–এর জন্য লেখা আমার একটি কলামের অনুবাদ। মিশুর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলাম আগস্ট ২০০৮–এ; সেটি কলাম–আকারে কিছু দিন পরই ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল।৩

    তৃতীয় অংশটি— “‘পেট’ বনাম ‘যোনি’ তত্ত্ব: একটি ক্রিটিক”— কয়েক বছর আগে হাতে নেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণাকর্মের অংশবিশেষ। আমার এই গবেষণাটি চলমান, তবে তার অর্থ এই নয় যে আমি এই মুহূর্তে এ নিয়ে কাজ করছি। থেকে–থেকে যখনই সময় পাব তখন আবার ধরব, এই হচ্ছে পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। গবেষণাটি হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে উছিলা হিসেবে কাজ করেছিল বুদ্ধিজীবী–বিষয়ে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এমন একটি সংকলন। কিন্তু সংকলনের সম্পাদক পরে আর যোগাযোগ না করাতে প্রবন্ধটি অপ্রকাশিত থেকে যায়।৪ এদেশের বাম/প্রগতিশীল পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা প্রসঙ্গে গবেষণা করতে গিয়ে প্রথমেই হাত দিয়েছিলাম খ্যাতমান মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের লেখায়।৫ তাঁর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের ক্রিটিক করেছি আমি। মজহারের সাক্ষাৎকারটি দৈনিক আজকের কাগজ–এ প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সালে, পুনঃপ্রকাশিত হয় “পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা” নামে সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা (২০০৪) বইয়ে।৬ মজহারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত ছোট্ট এই প্রবন্ধ, “‘পেট’ বনাম ‘যোনি’ তত্ত্ব: একটি ক্রিটিক”— এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শেষ অংশ। এটি লিখেছিলাম ২০০৭ সালে।

    এই তিনটি ভিন্ন–ভিন্ন অংশ একইসূত্রে গাঁথা, যথা, মার্ক্সবাদ এবং নারীবাদ। তবে শুরুতেই একটি টীকা যোগ করছি সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর তাগিদ থেকে। উইমেন এন্ড রেভোলিউশন বইয়ের লেখকদের আত্মপরিচিতি “নারীবাদী” (এবং মার্ক্সবাদী/বাম–ও)। বইটি লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৬০–১৯৭০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ লেফ্ট/নব্য বাম৭ ধারার ভিতরে নারী–পুরুষের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। এই টানাপোড়েনের নিয়মানুবর্তিতা ও ধারাবাহিকতা নারীবাদীদের ভাবিয়ে তোলে; তা প্রশ্ন–আকারে প্রকাশ পায় এভাবে:-

    এক. বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পুরুষদের দৃষ্টিতে নারীবাদী সহযোদ্ধারা কি তাদের সমান? দুই. মার্ক্সবাদী দর্শন ও অনুশীলনের ভিত্তিতে সমাজ গঠিত হলে নারীরা কি সমতা অর্জন করতে পারবে?

    সংকট দেখা দেয় কারণ মার্ক্সবাদ ও নারীবাদকে একীভূত করার প্রচেষ্টার “অপর নাম [হয়ে ওঠে] মার্ক্সবাদ”; হাইডি হার্টমেন একে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, নব্য বাম ধারার আন্দোলনে নারীবাদীদের আন্দোলন পুঁজির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। এতে নারীবাদীরা শঙ্কিত হন; তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, যদি নব্য বামদের মধ্যেও— সনাতনী মার্ক্সবাদীদের মতোই— লিঙ্গীয় ভিন্নতা ও পুরুষ আধিপত্য তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক–অর্থে গুরুত্ব না পায় তাহলে সমস্যাটা কোথায়, এবং নারীবাদীদের কী করা উচিৎ? সমস্যা কি মার্ক্সবাদী তত্ত্বের নাকি আন্দোলনকারী [মার্ক্সবাদী] পুরুষদের? নাকি দুটোই? একই আন্দোলনে নারী ও পুরুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নারী আন্দোলনকারীরা নারীবাদী পরিচয় ও প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেন (তার উত্তরও অনুসন্ধান করেন) কিন্তু— এবং এতক্ষণে আমি ‘সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি’র জায়গাতে পৌঁছাচ্ছি— এই প্রবন্ধ–পুস্তিকার দ্বিতীয় অংশে স্পষ্ট যে, মিশু কিংবা নেপালের মাওবাদী কমরেড পার্বতী৮ নিজেদের একইসঙ্গে “বাম/কম্যুনিস্ট” ও “নারীবাদী” মনে করেন না। তাহলে কি তাঁদেরকে এই পুস্তিকা–প্রবন্ধ, যার উপ–শিরোনাম হচ্ছে “বাম ধারা ও নারীবাদ,” এতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ? কাজটা কি ঠিক করছি?

    বিষয়টা জটিল, এটি ধরা পড়ে মিশুর কথা থেকে যখন তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে— পরিবারে, ব্যক্তিজীবনে, বিয়েতে— সমাজতান্ত্রিক আদর্শ চর্চিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা যখন আমি বলি তখন আমাকে “নব্য–মার্ক্সবাদী ডাকা হয়, নারীবাদী ডাকা হয়”। “নব্য–মার্ক্সবাদী”? তার অর্থ কি এই যে, এদেশের বাম পুরুষরা (পশ্চিমের) নিউ লেফ্ট ধারার পুরুষদের চিন্তাভাবনা ও আচার–আচরণের প্রতি তাদের সহযোদ্ধা নারীদের ক্রিটিকের কোনো খোঁজখবর রাখেন না? তা যদি সত্য হয়ে থাকে, এর থেকে কী বুঝব? এর থেকে আমরা নারীরা— ‘আমরা’ বলতে বোঝাচ্ছি যারা আনুষ্ঠানিকভাবে বাম আন্দোলনে আছেন (যেমন মিশু) এবং আমি/আমার মতো আরো–অনেকে যারা বাম–ঘেঁষা— আমাদের বাম পুরুষ কমরেডদের পড়াশোনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাব?

    অপর দিকে কমরেড পার্বতী৯ বলেন, মার্ক্সবাদ কেবল নারী অধস্তনতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও গভীর বিশ্লেষণ–ই হাজির করে না, একইসঙ্গে তার সমাধানও প্রস্তাব করে, একারণে আমরা আশা করতে পারি যে কম্যুনিস্ট আন্দোলনে থাকবে শত–শত নারী নেতা। কিন্তু “অব্জেক্টিভ কন্ডিশন” এর১০ উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অবস্থায় দেখা যায় তার বিপরীত চিত্র। সেটি কেন ঘটে, তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মনে হয় এর কারণ হচ্ছে নারীবাদী আন্দোলন যেহেতু বুর্জোয়া বিপ্লবের ফলাফল তাই কম্যুনিস্ট দলগুলো নারীমুক্তির ব্যাপারে একমত হলেও তারা পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিকার। এটি নানাভাবে প্রকাশ পায়:- কম্যুনিস্ট আন্দোলনে নারীদের সম–অংশীদারত্ব স্বীকার না করে পার্টি তাদেরকে শুধু “সমর্থক” ভাবে। এর ফলে কম্যুনিস্ট দলগুলো শ্রেণী সংগ্রামের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে, তারা ভুলে যায় যে শ্রেণী সংগ্রাম ও নারী নিপীড়নের মধ্যকার সম্পর্ক হচ্ছে দ্বান্দ্বিক।১১ নারী কমরেডকে পুরুষ কমরেডের সমান না ভাববার কারণেই দেখা যায় যে পার্টি নারী–পুরুষের মধ্যে বিরাজমান সনাতনী শ্রমবিভাজনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। দেখা যায় যে, পার্টির পুরুষরা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেন আর নারীদের ভাগে পড়ে কায়িক শ্রম। কমরেড পার্বতী বলেন, এটি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখি যে নারীর বিশেষ অবস্থার প্রতি (সন্তান ধারণ), তার বিশেষ চাহিদার প্রতি (মাসিক), পার্টি উদাসীন। “নারীর বেলায় নিপীড়ন দ্বৈত হওয়ার কারণে নারীর সংগ্রাম আরো দীর্ঘ।”১২

    আমার কথা হচ্ছে, মোশরেফা মিশু বা কমরেড পার্বতী নিজেকে “নারীবাদী” বলুন আর নাই বলুন, তাঁরা নারীর অভিজ্ঞতার যেই বিশ্লেষণ ও যুক্তি/কাউন্টার–যুক্তি হাজির করেন, তা যে কোনো বিচারে নারীবাদী। আর সে কারণেই এই পুস্তিকা–প্রবন্ধে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

    সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝির পাট চুকিয়ে এখন আগের কথায় ফিরে আসি। নিউ লেফ্ট আন্দোলনের নারীবাদীদের শঙ্কায় ফিরে আসি। তাঁদের মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে: নারী অধস্তনতা বোঝার জন্য অর্থনৈতিক বর্গ (অর্থাৎ, শ্রেণী)- ই কি পর্যাপ্ত? নিউ লেফ্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁদের বলে, না। তাঁদের দৃষ্টিতে, লিঙ্গীয় শ্রমবিভাজন ও যৌনতা— নারী–পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। কেন এবং কীভাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা নিচে পাবেন (লিডিয়া সার্জেন্ট–এর লেখার অনুবাদ, “নিউ লেফ্ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”)। সমস্যা মূলত (১) আন্দোলনরত নারী ও পুরুষের মধ্যকার কাজের ভাগাভাগি নিয়ে— আপিস কে পরিষ্কার করবে, কে মিটিংএর মিনিটস টাইপ করবে, কে কাগজপত্র ফাইল করে গুছিয়ে রাখবে, কে টেলিফোন করে মিটিং ও কর্মসূচীর বার্তা জানান দেবে, কে বিপ্লবীদের খাওয়াবে, সেবা–যত্ন করবে ও ভালোবাসবে, কে তাদের সমর্থন যোগাবে; আর কে বা কারা বিপ্লবী তত্ত্ব নির্মাণ করবে, কর্মসূচী নির্ধারণ করবে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। এবং (২) যৌনতাকে ঘিরে। এ প্রসঙ্গে মাথায় রাখা জরুরি যে ১৯৬০–৭০ দশকে পশ্চিমা (খ্রিস্টান–প্রধান) সমাজে সনাতনী যৌন আচরণের ক্ষেত্রে যে ডবল স্ট্যান্ডার্ড বিরাজ করত— অর্থাৎ, বউয়ের কুমারী হতে হবে— নারীবাদীরা এই অধিপতি ধারণা ও প্র্যাক্টিসকে চ্যালেঞ্জ করেন যার ফলে, অন্তত প্রগতিশীল মহলে, কিছুটা হলেও বদল ঘটা শুরু হয়।

    ডবল স্ট্যান্ডার্ডের কথা মোশরেফা মিশুও বলেন। পুরুষ নেতাদের বান্ধবী থাকলেও এতে তাদের রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। নারী নেতাদের সতী ইমেজ অপরিহার্য; কোনো কোনো বাম দলের ক্ষেত্রে নারী নেতারা পোষাক–পরিচ্ছেদের মাধ্যমে সতী ইমেজকে reinforce করেন। অন্যভাবে বললে, বিপ্লবী দলের মধ্যেও নারী নেতা/কর্মীর “চরিত্র” উৎকণ্ঠার বিষয় (বৃহত্তর সমাজের মতোই); বিপ্লবী নারীরও “সতী” হতে হবে (বৃহত্তর সমাজের অ–বিপ্লবী নারীদের মতোই)। মিশুর মতে বিয়ে, আর কমরেড পার্বতীর দৃষ্টিতে বিয়ে–পরবর্তী সন্তান–ধারণ, নারী কমরেডদের রাজনৈতিক অস্তিত্বে বড়সড় বদল ঘটায়:- তারা “গৃহের অন্তরালে হারিয়ে যান” (মিশু); “গৃহী দাসত্বের শৃঙ্খল আরো বেড়ে যায়, আরো প্রকট হয়” (পার্বতী)।১৩ এক্ষেত্রে পার্বতী এও উল্লেখ করেন যে, নিজের পছন্দের কমরেডকে বিয়ে করলেও এটি ঘটতে পারে। সন্তান লালনপালনের দায়ভার “একপেশে বোঝা” হয়ে দাঁড়ায় বিশেষ করে নেপালের সেই অঞ্চলগুলোতে যেখানে স্থানিক এলিটরা সনাতনী বা “traditional”।১৪ যৌনতার প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বাম মহলে “ট্যাবু”; অবিবাহিত নারী নেতাদের ক্ষেত্রে “স্যাক্রিফাইস” আশা করা হয় (মিশু); নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টিতে নারী–পুরুষ, উভয় কর্মীর ক্ষেত্রেই বিয়ে না করাটা “সন্দেহের চোখে” দেখা হয়;১৫ যৌন নিয়মের লঙ্ঘন রাজনৈতিক নিয়ম লঙ্ঘনের চাইতে আরো বড় অপরাধ বলে বিবেচিত হয় (পার্বতী)।১৬ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: বাম আন্দোলনে ‘বাম সত্তা’ বা ‘বিপ্লবী সত্তা’ বলতে কি অনায়াসেই পুরুষকে বোঝায় (যার মাসিক হয় না, পেটে বাচ্চা আসে না, যিনি ধর্ষণের শিকার হন না, আর ধর্ষণের শিকার হলে তা হয় নারীর–ই দোষে…? অন্য কথায়, ‘বিপ্লবী সত্তা’ বলতে অনায়াসেই নারীকে বোঝায় না— কারণ তার সত্তার সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িত গৃহীপনার মতাদর্শ, নীতি–নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতি অবনত থাকার শর্ত?) পুরুষ চরিত্রই কি মানদণ্ড? ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার পড়ে (যার সমালোচনা এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শেষভাগে পাবেন, ‘পেট’ ও ‘যোনি’ তত্ত্ব), আমার মনে হয়েছে তিনিও বিষয়গুলোকে একই (পিতৃতান্ত্রিক) ফ্রেমওয়ার্কে দেখেন।

    সংক্ষেপে বললে, পিতৃতন্ত্র সর্বব্যাপী ও শক্তিশালী; বাংলাদেশ/দক্ষিণ এশিয়ার বাম মহলে সাচ্চা বা জেনুইন আত্ম–সমালোচনার অভাব, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার ফলে প্রাপ্ত সুযোগ–সুবিধাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়ার ঐতিহ্য— আর পাঠক’মাত্রই জানেন যে ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক বিষয়ের বিরাজনীতিকরণ (de-politicisation )— শ্রেণী শোষণ বাদে অপরাপর অধিপতি ব্যবস্থাকে (লিঙ্গ, জাতি, বর্ণ, নরবর্ণ ইত্যাদি) তাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্য দিয়ে বুঝতে না চাওয়া, মোকাবেলা না করা— বর্তমানের বৈষম্য–ব্যবস্থাকে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে। তাকে জোরদার করে ও জারি রাখে।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব্য বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে যারা সংগ্রামরত তাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা কীভাবে নারী ও পুরুষদের ভিন্ন কাতারে দাঁড় করায়, মুখোমুখি কাতারে দাঁড় করায় তারই বর্ণনা পাবেন এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে ( ১ নং অংশ, নিচের থেকে পৃ. ১১ পর্যন্ত)।

    ১. লিডিয়া সার্জেন্ট, “নিউ লেফ্ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”

    ১.ক অসুখী বিয়ে

    হাইডি হার্টমেন ‘মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ে’ নামক প্রবন্ধের প্রথম প্যারাতে লিখেছেন:

    মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের বিয়ে ইংলিশ কমন ল’তে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কের মতোই: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদ এক ও অভিন্ন, যার অর্থ, এই ঐক্যের অপর নাম মার্ক্সবাদ। মার্ক্সবাদ ও নারীবাদকে একীভূত করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা নারীবাদী হিসেবে আমাদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে কারণ নারীবাদী আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে পুঁজির বিরুদ্ধে “বৃহত্তর” সংগ্রামের অধীনে। উদাহরণটা যদি আরো এগিয়ে নিতে চাই তাহলে বলতে হয়, এই বিয়েকে হয় স্বাস্থ্যকর করে তুলতে হবে নতুবা তালাকের বন্দোবস্ত করতে হবে (হার্টম্যান, পৃ. ২)।

    …বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে, যার প্রধান মতাদর্শ মার্ক্সবাদ,১৭ আমরা যারা র‌্যাডিকাল,১৮ সমাজতান্ত্রিক,১৯ মার্ক্সিস্ট,২০ লেসবিয়ান,২১ এ্যানারকিস্ট,২২ কৃষ্ণাঙ্গ২৩— ভিন্ন–ভিন্ন ধারার নারীবাদী— তারা কি সমতা অর্জন করতে পারব? মার্ক্সবাদী তত্ত্ব ও চর্চাকে ঘিরে ভবিষ্যতে যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে কি আমরা সমতা অর্জন করতে পারব?…

    ১.খ অসুখী বিয়ের কারণ

    মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ে নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়ে ১৯৬০ ও ’৭০ দশকের কৃষ্ণাঙ্গ–অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নিউ লেফ্ট ও নারীবাদী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। নিউ লেফ্ট ঘরানার মধ্যে তর্ক–বিতর্ক, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ চলতে থাকে। তার–ই পরিসমাপ্তিতে মার্কিন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিশ্লেষণ করা হয়, যা স্পষ্ট করে যে নিউ লেফ্ট এ্যাক্টিভিস্টরা মার্ক্সবাদী, লেনিনবাদী চিন্তা ও বৈপ্লবিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত বোধ করেন। নিউ লেফ্ট ধারা ওল্ড লেফ্ট এবং কম্যুনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলোর সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি লক্ষণীয় যে বিশ্বের কোনো না কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে, এবং যে দেশগুলো নয়া–ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে যেমন কিউবা, ভিয়েতনাম, জিম্বাবওয়ে, চিলি… নিউ লেফ্ট একাত্ব বোধ করে। মার্ক্সবাদী ধারার মধ্যে অবস্থিত নিউ লেফ্ট নিঃসন্দেহে একটি নয়া ধরনের মার্ক্সবাদের সূচনা করে যেহেতু এটি স্টুডেন্ট ও তরুণ সংস্কৃতির ধারণাকে— যথা, পুঁজিবাদী/সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শ জীবনের প্রতিটি পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে, কি স্কুল, কি কর্মক্ষেত্র, সঙ্গীত, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, কমিউনিটি, পরিবেশ, এবং বিশেষ করে যৌন/সামাজিক সম্পর্কে— তার বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু রাজনীতিকে “ব্যাপৃত” করার যে উদ্যোগ নিউ লেফ্ট গ্রহণ করে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য সীমিত ছিল কারণ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল: “পুরুষেরা বিপ্লব করবে আর ছেরিগুলোর সঙ্গে শোবে” [“men will make the revolution and make their chicks”]। নিউ লেফ্ট ও কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আদায়ের জন্য লড়াকু সংগঠনগুলোতে যে নারীরা সক্রিয় ছিলেন, তারা প্রধানত দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন: (১) দৈনন্দিন কাজকে ঘিরে উদ্ভূত সমস্যা (আপিস কে পরিষ্কার করবে/কে সেটাকে নোংরা করে, কে লিফলেট লিখবে/কে সেটা টাইপ করবে, কে সভায় কথা বলবে/কে তার মিনিটস লিখবে, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কার মর্যাদা বাড়ে/কারটা কমে) এবং; (২) তত্ত্বের সমস্যা (কে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে, কারা বিপ্লবী, বিপ্লব কাকে মুুক্ত করে, বিপ্লবচলাকালীন কে সংসার সামলে রাখবে)।

    তত্ত্ব ও দৈনন্দিন কাজকে ঘিরে যে সমস্যা তৈরি হয় তার উত্তর খুঁজে পেতে নিউ লেফ্ট আন্দোলনে অংশীদার নারীদের খুব বেশি কসরত করতে হয়নি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর মার্ক্সবাদ–ই বাতলে দেয়, আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর মেলে যৌনবাদী পুরুষদের [sexist men] সাহায্যে। অর্থাৎ, যারা উৎপাদনের কেন্দ্রে (শ্বেতাঙ্গ, শ্রমিক–শ্রেণীর পুরুষেরা) তারা, বিপ্লবী রাজনৈতিক ক্যাডারের সাহায্যে (তার মানে, শ্বেতাঙ্গ–মধ্যবিত্ত–পুরুষ যারা মার্ক্সবাদী তত্ত্বে নিমজ্জিত) বিপ্লব করবেন। নারী (প্রধানত শ্বেতাঙ্গ) বিপ্লব–চলাকালে সংসার সামলে রাখবেন, তাদের কাজ হচ্ছে বিপ্লবকে লালন করা, সেক্রেটারির ভূমিকা পালন করা: টাইপ করা, কাগজপত্র ফাইল করে রাখা, টেলিফোন করা, বিপ্লবীদের খাওয়ানো, তাদের সেবা–যত্ন করা, সমর্থন যোগানো, ভালোবাসতে থাকা, এবং হয়তবা, কখনো–সখনো, আধা–বিপ্লবী উৎসাহদাতা হিসেবে বিপ্লবের সম্মুখসারীতে থাকা।

    এই কল্পিত দৃশ্যের কারণে (যা আমাদের কাছে দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়) নারীদের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে নিজেদের নিপীড়িত দশার ধরন, এবং তা যে কত বিস্তৃত, তাকে চিহ্নিত করা, তার সংজ্ঞা প্রদান করা। কারণ তা নাহলে বিপ্লবী “ভাইদের” কাছে নারীরা যৌন বস্তু ছাড়া ভিন্ন কিছু হতে পারবে না।

    ১.গ আপিস কে পরিষ্কার করে’র সমস্যা: আমাদের নিপীড়নের সমস্যাকে সংজ্ঞায়িত করা

    বেটি ফ্রিইডান তাঁর দ্যা ফেমিনিন মিস্টিক বইয়ে ‘নামহীন সমস্যা’ [“the problem with no name ”] প্রসঙ্গে লেখেন:

    আমেরিকান নারীদের মনের গভীরে একটি সমস্যা লুকিয়ে ছিল। এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতেন না। আচমকা জেগে ওঠা অসন্তোষের একটি তীব্র বোধ, একইসঙ্গে একটি আকাক্সক্ষাও, মিলে–মিশে একাকার হয়ে বিংশ শতকের আমেরিকান নারীদের ভোগায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে সুসজ্জিত এলাকাগুলোতে (suburbia) প্রত্যেক গৃহিণী এই সমস্যায় ভোগেন। সকালবেলা বিছানাপত্তর গুছানোর সময়, বাজার–সদাই করার সময় কিংবা বাচ্চাদের সঙ্গে পিনাট–বাটার স্যান্ডউইচ খাওয়ার সময়, বা হয়ত যখন তাদের কাব স্কাউট বা ব্রাউনি মিটিংয়ে নামিয়ে দিচ্ছেন, হয়তবা রাতে স্বামীর পাশে যখন শুয়ে, তখন বারে–বারে এই ভাবনাটি মাথায় আসে, একটি প্রশ্ন যা উচ্চারণ করতেও ভয় লাগে: ব্যাস, এটাই কি সব? এর জন্যই কি এতকিছু?২৪

    ঠিক যেসময়টাতে সাবারবিয়ার নারীরা ফ্রিইডানের ‘নামহীন সমস্যা’ পড়ছিলেন, তার সঙ্গে একাত্ব বোধ করছিলেন, সেসময়ে নিউ লেফ্ট নারীরা আন্দোলনের আপিস পরিষ্কার করছিলেন, সেটাকে গুছিয়ে রাখছিলেন, আন্দোলেনের কর্মীদের জন্য রান্নাবান্না করছিলেন, বাচ্চাদের দিনের বেলা দেখে–শুনে রাখছিলেন, গাড়ি ড্রাইভ করে প্রতিবাদ সমাবেশে এ্যাক্টিভিস্টদের পৌঁছে দিচ্ছিলেন, চিঠি ও লিফলেট টাইপ করছিলেন, ফোন ধরছিলেন, আর রাতেরবেলা আন্দোলনের প্রেমিক কিংবা স্বামীর পাশে শুয়ে জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছিলেন, এই কি সব?

    যদিও সিমোন দ’ ব্যুভোয়ার নারীর বিচ্ছিন্নতাবোধ, সমাজে জারি থাকা নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন বোধের কোনো নামকরণ করেননি, কিন্তু দ্য সেকেন্ড সেক্স বইয়ে ১৯৪৯ সালে তিনি এটাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন:

    সুতরাং, মানবতা [humanity] হচ্ছে পুরুষ, আর পুরুষ নারীকে নারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে তাকে পুরুষের সাপেক্ষে করে; নারীর কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই… পুরুষ নারীকে যা ভাবে নারী তাই; সুতরাং, নারী হচ্ছে ‘লিঙ্গ’, যার অর্থ, পুরুষের দৃষ্টিতে একমাত্র নারীর–ই আছে যৌন পরিচয়। পুরুষের কাছে নারী হচ্ছে যৌনতা, নিরেট যৌনতা, আর–কিছু নয়। নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে সংজ্ঞায়িত করা হয়, পুরুষের তুলনায় পৃথক ভাবা হয়, পুরুষকে নারীর সাপেক্ষে নয়। নারী হচ্ছে আনুষঙ্গিক এবং অকস্মাৎ। পুরুষ হচ্ছে অপরিহার্য। পুরুষ বিষয় (সাবজেক্ট), পুরুষ সর্বসর্বা। নারী তার ‘অপর’।

    নিউ লেফ্ট রাজনৈতিক ধারায়, পুরুষ কর্তৃক নারীর “অপর” হওয়ার আছর দৈনন্দিন কাজের সবদিকেই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মূল কেন্দ্র হচ্ছে, যা ব্যুভোয়ার বহু আগেই তাঁর বিশ্লেষণে ইঙ্গিত করেছিলেন, যৌনতা। পারসোনাল পলিটিক্স বইয়ে সারা ইভান্স বিবৃত করেন,

    চোদার২৫ মধ্য দিয়ে নারী কর্মীর অস্তিত্বকে স্বীকার করা বহুস্থানেই সাধারণ চর্চা হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও এটা ছিল [নারী কমরেডের প্রতি পুরুষ কমরেডের যৌনবাদী আচরণের] চরম বহিঃপ্রকাশ। একজন পুরুষ নারীর সাথে সঙ্গম করে তাকে সংগঠনের সদস্য করতে পারতেন, আবার তার সঙ্গে শোওয়াশুয়ির সম্পর্ক বন্ধ করে তাকে সংগঠন থেকে বাদ দিতে পারতেন। [সংগঠন থেকে] নারীর বহিষ্কার [নানা কারণে] ঘটতে পারত, পুরুষটির তাকে আর ভাল্ লাগছে না বলে, কিংবা সে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়েছে বলে, বা অন্য কারো প্রতি তার [পুরুষ কমরেডের] আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে। আন্দোলন থেকে নারীকে বহিষ্কার করাটা অবিচলিতভাবে মেনে নেওয়া হতো।

    আর তাই আন্দোলনে–সক্রিয় নারীরা একটি কষ্টকর ও হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির শিকার হন। এক দিকে তারা বুঝতে পারেন যে আন্দোলনের ভিতরে থাকা আর বাইরে থাকার মধ্যে গুণগত পার্থক্য আছে। ভিতরে থাকার কারেণ তারা গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজ করতে পারছেন: যুদ্ধের বিরোধিতা করা, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শামিল হওয়া। তারা ঝুঁকি নিচ্ছেন। শিখছেন। নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। ১৯৫০–এর দশকে নারীর ভূমিকা যেই কঠোরতা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল, তারা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু অপরদিকে নারীদের কাছে এটাও স্পষ্ট ছিল যে আন্দোলনে–সক্রিয় পুরুষদের কাছে (কোনো কোনো নারীর কাছেও) নারীর কার্যকলাপ ও আন্দোলনে থাকার বৈধতার ভিত্তি হচ্ছে প্রথাগত “নারীসুলভ” [feminine] ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অংশগ্রহণ করা, যথা, স্ত্রী, মা, বোন, রক্ষিতা, সেক্রেটারি, পরিচারিকা, পরিবেশিকা, নার্স ও যৌন বস্তু।

    যৌনবাদ [sexism] মোকাবেলা করার প্রথমদিকের প্রচেষ্টার প্রত্যুত্তরে নারীদের যৌন–ইঙ্গিতময় গালাগালি শুনতে হয়েছিল [পুরুষ কমরেডদের কাছে থেকে], “কুত্তি, লেসবিয়ান, পুরুষত্ব–হানি করার চক্রান্তকারী” [bitch, lesbian, castrator]। সভা–সমাবেশে নারীরা সেক্সিজম নিয়ে প্রশ্ন তুললে পুরুষরা হৈচৈ করে হাঙ্গামা বাধাতেন আর চিল্লাচিল্লি শুরু করতেন যাতে তারা [নারীরা] মঞ্চ ছেড়ে দেন, [পুরুষ কমরেডরা] শিষ দিয়ে তাদের “ভালো একটা চোদা” নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। নিজেদের আত্মপরিচয় গোপন করে নারীরা যখন যৌনবাদী আচরণ নিয়ে লেখেন তখন পুরুষরা তাদের উপেক্ষা করেন। পরে, যখন পুরুষদের পক্ষে উগ্র যৌনবাদী আচরণ করে পার পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে কারণ নারীরা বারে–বারে যৌনবাদ প্রসঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য চাপ দিতে থাকেন, এমনকি অসমতাকে ঘিরে কাঠামোগত সমাধানের প্রস্তাব হাজির করেন, তখন পুরুষরা আরো সূক্ষ্ম ধরনের যৌনবাদী আচরণে অবতীর্ণ হ’ন। তার ফলে, যৌনবাদ কী, এবং কী উপায়ে তা প্রতিরোধ করা যায়, এর পিছনে নারীদের অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। আবার একইসঙ্গে, যৌনবাদী আচরণ যে ঘটছে তা প্রমাণ করার পিছনেও তাদের অনেক সময় খরচ করতে হয়। নিচে, নারীরা কীভাবে যৌনবাদী আচরণকে চিহ্ণিত করেন, তার নামকরণ করেন ও তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন, তার বর্ণনা দেওয়া হলো।

    ১.গ.১ নারী সম্মেলনের আয়োজন

    যৌনবাদ, যৌনবাদী রাজনীতি এবং এ ধরনের বিষয়ে নিজেদের অনুভুতি প্রকাশ করার জন্য নারীরা সাধারণত কৌশল হিসেবে কনফারেন্স ও বড় সভা চলাকালীন ‘নারী সম্মেলন’–এর আয়োজন করেন কারণ এ ধরনের ফোরাম ছিল পুরুষের ক্ষমতাগিরি থেকে মুক্ত। নারীদের দৃষ্টিতে তাদের এ ধরনের উদ্যোগ স্বার্থক; পুরুষদের বিবেচনায় তা আলাদা–কিছু, তারা নিজেরা যা করছেন তার সঙ্গে তুলনীয় নয়, গুরুত্বের বিচারে লঘু। পুরুষরা যেহেতু যৌন নিপীড়ক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা আলোচনা করতেন না বরং মনোযোগী হতেন “গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়” এর প্রতি, নারীদের দোটানায় ভুগতে হতো: তারা কি একইসময়ে অনুষ্ঠিত–হওয়া নারী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন নাকি রাজনৈতিক বৈঠক কিংবা সভায় যাবেন।

    ১.গ.২ সভাপতি হিসেবে নারী

    বড় দলের সামনে নারীরা যাতে কথা বলার সুযোগ পান, তার সুবিধার্থে পরিকল্পিত হলেও নারী–সভাপত্বিতে আয়োজিত মিটিং বাস্তবে পুরুষকে সভার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করার সুযোগ তৈরি করে দিত। ক্ষমতাশালী পুরুষরা বিশেষ কোনো নারীকে বাছাই করতেন সভা পরিচালনা করার জন্য (প্রায়শই এমন কেউ যার সঙ্গে সঙ্গমে আগ্রহী কিংবা ইতোমধ্যেই সঙ্গমের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে), মিটিং এ তার পাশে বসতেন। মিটিং চলাকালীন পুরুষরা কি কি করতেন: এজেন্ডার বিষয় তার কানে ফিসফিস করে বলা, কাকে এর পরে ডাকতে হবে তা বলে দেওয়া, সিদ্ধান্ত তার [পুরুষটির] মন মতো পালিত না হলে তাকে [নারীকে] তিরষ্কার করা, মিটিং ঠিক মতো পরিচালিত হচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করা। অনেকসময় উপস্থিত অন্য পুরুষরা নানাধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে নারী সভাপতি যে সভা পরিচালনায় অক্ষম সেই বোধ তৈরিতে সাহায্য করতেন: সভা চলাকালীন কথা বলা, হাসি–ঠাট্টা করা, কথা বলার সিরিয়াল ভঙ্গ করা, সভাপতিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যাতে এটি স্পষ্ট হয় যে “সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ সভা”র জন্য পুরুষ সভাপতি (অর্থাৎ, “শক্তিশালী” সভাপতি) ছাড়া উপায়ন্তর নেই।

    ১.গ.৩ অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে নারী

    বড় ধরনের স্থানিক কিংবা জাতীয় প্রতিবাদ সমাবেশে মঞ্চে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করার দায়িত্ব নারীদের দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে নারীর দায়িত্ব পর্যবসিত হয় পুরুষ–বক্তাদের লম্বা তালিকা ঘোষণা করায়। তার মানে, নারীরা পরিণত হয় আন্দোলনের আপ্যায়নকারীর [hostess] ভূমিকায়। তিরিশ বা তার অধিক পুরুষ বক্তাকে মহিমান্বিত ভাষায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে অনুষ্ঠান–পরিচালনাকারী নারী যাতে তারা একে–একে যুদ্ধ, দারিদ্র, বৈষম্য, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বাধ্য–বাধ্যকতা [draft policy ]-র বিরুদ্ধে, সরকার, প্রতিবেশ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে নারীকণ্ঠ শুধু তখনই শোনা যাচ্ছে যখন পরবর্তী বক্তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পালা।

    ১.গ.৪ বক্তা হিসেবে নারী

    নারী বক্তার ব্যাপারে পুরুষদের আপত্তি ছিল না যতক্ষণ পর্যন্ত বক্তার বক্তব্য সেই বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা নারী–বিষয়ে সীমিত থাকত। তার অর্থ হচ্ছে যে কোনো বড় সভা কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশে ঘোষক হিসেবে নারী উপরোল্লিখিত ভূমিকা পালন করতেন আর (হয়তবা) ২২তম পুরুষ বক্তার পর নারী ইস্যু নিয়ে কথা বলতেন। ততক্ষণে দেখা যেত যে দর্শকদের বেশির ভাগ হয় চলে গেছেন কিংবা দর্শক–পুরুষরা ঘুমিয়ে পড়েছেন বা নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করেছেন।

    ১.গ.৫ কৌশলপ্রণেতা হিসেবে নারী

    এই কৌশল নানাভাবে ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো পুরুষ, নারী–কর্মী বা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যকে এই উদ্দেশ্যে বাছাই করতেন যাতে মিছিল কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশের পলিসি বা কৌশল বিষয়ে তার নিজের সিদ্ধান্ত কার্যকরি করা যায়। সাধারণত তারা বাছাই করতেন নতুন সদস্য কিংবা যারা অনভিজ্ঞ, তাদের। বন্ধুত্ব বা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার নামে (কখনো–কখনো আন্তরিক), পুরুষরা নারীদের সঙ্গে কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন। তারপর তারা যাতে এই কৌশলের পক্ষে মিটিংয়ে কথা বলেন, এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। যার কারণে নারীরা পরিণত হতেন পুরুষের সিদ্ধান্তের ‘বাহক’–এ। কখনো–কখনো দেখা গেছে যে সেই বিশেষ মিটিংএ পুরুষটি হয়ত জড়িতও নয়। তার অর্থ, নারীর ভূমিকা হচ্ছে তার প্রক্সি হওয়া। আবার এও দেখা গেছে যে পুরুষটি উপস্থিত, ‘বাহক’ সম্পর্কের কারণে পুরুষটিই ভোট পাচ্ছেন কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে ডমিনেটিং না মনে হওয়ার কারণে তিনি নারীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন না। কখনো–কখনো বাহক সম্পর্ক যৌনসম্পর্ক স্থাপনের সূত্রপাত হিসেবেও কাজ করত।

    ১.গ.৬ কর্মীবৃন্দের নেতা হিসেবে নারী

    বহু আন্দোলনকারী–সংগঠন গঠিত হয় (ক) কর্মীবৃন্দ [staff] দ্বারা, যারা দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করেন এবং (খ) স্টিয়ারিং কমিটি দ্বারা, যাদের দায়িত্ব হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বহু ক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনকারী স্টাফ–এর বেশির ভাগই ছিল নারী আর স্টিয়ারিং কমিটিতে ছিল পুরুষরা। যার ফলে স্টাফ সদস্য হিসেবে নারীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করলেও পুরুষ–প্রধান স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরাই ঠিক করতেন আন্দোলেনর দিকনির্দেশনা ও পলিসি। কিছু–কিছু ক্ষেত্রে এটি অপ্রাসঙ্গিক ছিল কারণ দেখা যেত যে যারা দৈনন্দিন কাজ করছেন তারা স্টিয়ারিং কমিটির তুলনায় বেশি পলিসি নির্ধারণ করছেন। কিন্তু অনক সময় কাজের গতিপ্রকৃতি বা ডাইন্যামিক সাধারণ আপিসের মতোই ছিল: অর্থাৎ, পুরুষ হচ্ছে বস্, আর নারী হচ্ছে তার সেক্রেটারি।

    ১.গ.৭ ভাগাভাগি করে আপিস পরিষ্কার করা

    মিশ্র সংগঠনে সম্ভবত এটাই ছিল সংঘাতের প্রধান কারণ। পুরুষরা যাতে আপিস পরিষ্কার করা, রান্না–বান্না করা, আন্দোলনের আপিস— যা একইসঙ্গে যূথবদ্ধ রাজনৈতিক সংসার [ঢ়political collective household ]— গুছিয়ে রাখার কাজে অংশগ্রহণ করেন, সে কারণে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণিত রোটেশান সিস্টেম চালু করা হয়। এই ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত স¦ার্থক হয়নি। প্রথমত, পুরুষরা ভাব দেখাতেন যে তারা জানেন না পরিষ্কার করার অর্থ কী। নারীরা পরিষ্কার করার নিয়মনীতি টাইপ করে দিলে’পর, এক সপ্তাহ অনুশীলন করার পর সেটি উপেক্ষিত হতো। পুরুষরা আরেকটা পন্থা অবলম্বন করতেন, “যখন তোমাদের (নারীদের) পরিষ্কার করার পালা, তখন তোমরা (নারীরা) পরিষ্কার করবে; আর যখন আমাদের (পুরুষদের) পরিষ্কার করার পালা আমরা ৫ মিনিটের মধ্যে পরিষ্কার করে ফেলব।” তাদের আরো একটা পন্থাও ছিল, “যখন তোমাদের পরিষ্কার করার পালা, তোমরা পরিষ্কার কোরো, যখন আমাদের পরিষ্কার করার পালা, আমরা করব না।” এরপর পুরুষরা এ নিয়েও অভিযোগ করেন যে পরিষ্কার–করা নিয়ে নারীরা ঘ্যানর–ঘ্যানর করলে তাদের নিজেদের মা’র ঘ্যান–ঘ্যানানির কথা মনে পড়ে যেটা তারা কোনোভাবেই মনে করতে চান না। অর্থাৎ, নারীর কারণে–ই পরুষরা পরিষ্কার করেন না। নারীরা–ই দোষী। তারই আরেক রূপ প্রকাশ পায় যখন দলীয় পরিষ্কার অভিযানে দেখা যায় যে নারীরা আপিসঘর পরিষ্কার করছেন আর পুরুষরা হঠাৎ করে ফোন ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। পুরুষদের চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা বলেন, দলীয় কাজে তাদের যেটুকুন অংশগ্রহণ করার কথা ছিল তা তারা ইতিমধ্যেই সেরে ফেলেছেন। আরো ঘটনাও ঘটত। যেমন, কোনো–এক–মাহেন্দ্রক্ষণে–বড়সড়–পরিষ্কার–অভিযানে–নেমে নারীদের খুশি করার কৌশল। এ সময় দেখা যেত যে পুরুষরা আসলেও পরিষ্কার করার বড় কোনো একটা কাজ হাতে নিয়েছে যেমন ধরেন জানালা পরিষ্কার করা, ঘর রঙ করা (এতে করে কাজ–শেষে ঘরদোর আরো অগুছালো হতো) কিন্তু তারা ময়লা বিনে [bin] ফেলছেন না। চারপাশে খাবারের বাক্স পড়ে থাকা বা সদর দরজার সামনে লিফলেটের বাক্স পড়ে থাকা, এসব তাদের চোখে পড়ছে না। কিন্তু তাতে কি? মাহেন্দ্রক্ষণের অভিযানের পর পুরুষদের মনে হতো তারা নারীদের দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা নারীদের মতোই, বা তাদের চাইতে আরো ভালোভাবে ঘরদোর পরিষ্কার করতে পারে।

    ১.গ.৮ সভায় নারীদের কথা বলা

    সভায় নারীরা যাতে পুরুষদের মতো সমানভাবে কথা বলতে পারে তার জন্য নানান পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল: সভা পরিচালনার দায়িত্বে যিনি তিনি যে নারীরা কোনো বিষয়ে কথা বলেননি তাদের কথা বলার জন্য উৎসাহ দিতেন; স্লিপ ব্যবস্থা; সময় বেধে দেওয়া, পুরুষদের আগে নারীদের কথা বলার জন্য আহ্বান করা ইত্যাদি। এই পন্থাগুলোর ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রতিক্রিয়াকে সবচাইতে ভালোভাবে এই বলে বর্ণনা করা যায়: “যেই বিরতি চাঙা করে তোলে” [“the pause that refreshes”]। অথবা, “মেয়েরা কথা বলতে পারে কিন্তু আমাদের যে শুনতেই হবে এমন তো নয়”। এর বাস্তব অর্থ ছিল যে নারীরা যখন সভায় কথা বলতেন তখন পুরুষরা হয় কাশতেন বা বিড়বিড় করতেন বা বই পড়তেন কিংবা নারীর কথার প্রতি মনোযোগী না হয়ে আগের পুরুষ বক্তার বক্তব্যকে কিভাবে খণ্ডন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেন। সভায় নারীদের কথা বলা ছিল পুরুষদের নিজেদেরকে চাঙা করে তোলার বিরতির সময়।

    ১.গ.৯ সবটুকু কানে না–তোলা

    উপরে যা উল্লেখ করেছি তার–ই আরেক রূপ: পুরুষরা তখন–ই নারীদের কথা শুনতেন যখন তাদের মন চাইত। অর্থাৎ, কোনো নারী ধরেন নকশা নিয়ে কথা বলছেন তখন পুরুষরা শুনছেন কিন্তু তিনি যখন রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলছেন তখন পুরুষরা আর–শুনছেন না। কিংবা দেখা যায় যে পুরুষরা “মনোযোগ দিয়ে শুনছেন” তখনই যখন তারা সেই বিশেষ নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। সেক্ষেত্রে পুরুষদের হাঁ–সূচক ঢঙে মাথা নাড়তেও দেখা যেত। অথবা, নারীটি যদি দেখতে আকর্ষণীয় হয়, তাহলে দেখা যায় যে নারীটি যখন অফিস কিভাবে সাজিয়ে রাখলে ভালো এ নিয়ে কথা বলছেন তখন পুরুষরা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন কিন্তু যখন একই নারী সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে কথা বলছেন তখন পুরুষদের মনোযোগের ঘাটতি ঘটছে। আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের লেসবিয়ান বলে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেওয়া হতো। আর লেসবিয়ান নারীদের কথা কোনোভাবেই কানে তোলা হতো না।

    আন্দোলনকারী–সংগঠনে নারীরা যখন সমতার জন্য লড়াই করতে থাকেন তখন পুরুষরা দমনের অন্তিম পথ বেছে নেন: “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই; পুঁজিবাদী শ্রেণীকে উৎখাত করার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম।” সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই তত্ত্বের সমস্যা দেখা দেয়। তার কারণ, দৈনন্দিন কাজের পরিসরে এতোসব উদ্যমের পরও যদি নারীদের মার্ক্স, লেনিন ও মাও–এর অধ্যায় বা উদ্ধৃতি পড়ে শোনানো হয়, যদি ভাই/বাবা–রা তাদের বলেন, যাও তোমাদের কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো, এইটিন্থ ব্রুমেয়ার, অন কন্ট্রাডিকশান, পুঁজি–র তিন ভলিউম, বা তোমাদের ইমপিরিয়ালিজম: দ্য হাইয়েস্ট স্টেজ অফ ক্যাপটিালিজম এর কপি নামিয়ে পড়ো, যদি বলা হয় পরবর্তীকালের মার্ক্সবাদীদের কাজ, হাবারমাস, মারকিউস, ওয়েবার, আলথুসার, সুইজি, ম্যাগডফ, ব্রেভারমেন–বাহিনীর কাজ পড়ো, তাইলে আপিস কে পরিষ্কার করবে’র প্রশ্নটি তত্ত্ব এবং বাস্তব— উভয় পর্যায়েই নারীর লড়াইয়ের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।

    ১.ঘ তত্ত্বের সমস্যা

    নিউ লেফ্ট আন্দোলনের নারীরা যখন যৌনবাদকে একটি বৈধ তাত্ত্বিক ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন তখন তাদের শুনতে হয় “নারীর জন্য সবচাইতে ভালো পজিশন হচ্ছে সমান্তরাল পজিশন [যৌনসঙ্গী/নিষ্ক্রিয় হিসেবে]” [“the best position for women is horizontal”]। নিউ লেফ্ট পুরুষদের যৌনবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নারীদের সামনে তিনটি পথ খোলা ছিল: (ক) আন্দোলনের ভিতরে থেকেই লড়াই করতে থাকা (খ) আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র নারী সংগঠনে লড়তে থাকা, কিংবা (গ) দুটোই করা: থেকে যাওয়া, চলে যাওয়া। থেকে যাওয়ার অর্থ যেমনটি শিলা রোবথ্যাম উইমেন, রেসিস্ট্যান্স এ্যান্ড রেভোলিউশান–এ বলেন, “যা একান্তভাবে নারী চৈতন্য [feminist consciousness তাকে বর্জন করে বরং ভান করা যে নারীরা সুনির্দিষ্টভাবে [অর্থাৎ, নারী হিসেবে] নিপীড়িত নন”। আর চলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে নারী চৈতন্যকে মুক্তির অপরাপর আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। একইসঙ্গে দুটো করার অর্থ হচ্ছে দ্বিখণ্ডিত ব্যক্তিসত্তা (পার্সোন্যালিটি), দ্বিখণ্ডিত আনুগত্য, সময়কে দুই ভাগে ভাগ করা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে দুই ভাগে ভাগ করা। নারীরা যেই পথ–ই বেছে নেন না কেন, এক পর্যায়ে দেখা যায় যে বেশির ভাগ নারী–ই পুরুষ–প্রধান নিউ লেফ্ট আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তারা নিজেদের রাজনীতি, তত্ত্ব ও সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করা শুরু করেছেন। ১৯৬০–এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০–এর দশকের শুরুর দিকে এই নয়া স্বতন্ত্র নারী আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল তার কর্মপদ্ধতি যার বৈশিষ্ট্য ছিল: ছোট, স্তরবিহীন, সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য দল গঠন [consciousness raising group]; “দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল” (যা ব্যক্তিক তাহা রাজনৈতিক)-এর রাজনীতি; পিতৃতন্ত্রের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। শারলট বাঞ্চ পার্সেনাল পলিটিক্স–এ বলেন, “মানুষের জীবনে এমন কোনো পরিসর নেই যা রাজনৈতিক নয়, এমন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই যা ব্যক্তিগত নয়। পুরোনো প্রাচীরগুলো ভেঙে গেছে।” নারীদের তাত্ত্বিক কার্যক্রমকে এ্যান পপ্‌কিন এভাবে বর্ণনা করেন,

    পুরুষ শ্রেষ্ঠত্ব বলতে আমরা বুঝি প্রাতিষ্ঠানিক, সর্বব্যাপী ক্ষমতা যা পুরুষের আছে নারীর ওপর। [আমরা বুঝি] নারীর সামাজিক ক্ষমতাহীনতা হচ্ছে ব্যবস্থাজনিত কারণে [ব্যক্তিক কারণে নয়; নারীকে নারী বলেই ক্ষমতা কাঠামো থেকে বর্জন করা হয়]। [আমরা বুঝি] নারীর সমাজ–নির্দিষ্ট ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য যা অবমূল্যায়িত হয় ব্যবস্থাজনিত কারণে। ধীরে–ধীরে আমরা এও বুঝি যে পুরুষ শ্রেষ্ঠত্বকে আমাদের মোকাবেলা ও আক্রমণ করতে হবে একটি সর্বাঙ্গীন ব্যবস্থা হিসেবে।

    নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশ ও নারীর রাজনীতি কী সেটিকে সংজ্ঞায়িত করার এই পর্বে নারীদের তৎপরতা বিশাল ও বিস্তৃত ছিল। ক্যাম্পাস, কমিউনিটি ও কর্মপরিসরে সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে হাজারো দল গঠিত হয়। নারী কেন্দ্র স্থাপনের দাবি ওঠে, তার জন্য লড়াই শুরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস দখল করাই ছিল নারীদের জন্য কাজ করার ও পড়াশোনার আলাদা জায়গা আদায়ের একমাত্র উপায়। শিশুদের জন্য ডে–কেয়ার সেন্টার, নারীদের জন্য সেল্ফ–হেল্প ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা ছিল প্রধান দাবি। এ্যাবরশনের পক্ষে ক্যামপেইন শুরু হয় যার লক্ষ্য ছিল নারী যাতে তার নিজের পুনরুৎপাদনমূলক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। চিকিৎসা পেশা যৌনবাদী হওয়ার কারণে চিকিৎসক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নারী দেহের নিয়ন্ত্রণ নারীর নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব বারবারা এহ্রেনরাইক ও ডেইড্রে ইংলিশ এভাবে ব্যাখ্যা করেন:

    আমাদের সংস্কৃতিতে যৌনবাদী মতাদর্শের সবচাইতে শক্তিশালী সূত্রের একটি হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। যৌন পরিচিতির ভিত্তিতে প্রভেদ করা হয় শিক্ষা, চাকুরি ও পাবলিক পরিসরে। অন্তিম অর্থে এটি নির্ভর করে নারীদের পুরুষ থেকে ভিন্ন করে তোলার উপর: শারীরিক ভিন্নতার উপর। চূড়ান্ত অর্থে, পুরুষ উৎকৃষ্টতার সব তত্ত্ব নির্ভর করে জৈবিকতার উপর।

    নারীর প্র্যাক্টিস এবং পুঁজির বিরুদ্ধে “বৃহত্তর” সংগ্রামে যৌনবাদকে বৈধ ইস্যু হিসেবে বোঝার জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে, নারীরা এক্ষেত্রেও সাংঘাতিকভাবে কাজ করেন। নারীদের তাত্ত্বিক কাজকে এই প্রশ্নগুলোর সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়:- নারীর নির্দিষ্ট নিপীড়নকে কীভাবে বুঝলে নিউ লেফ্ট পুরুষের মার্ক্সবাদী পদাবলির [Marxist terminology] সংকীর্ণ বোঝাপড়ার মুখোমুখি হওয়া যাবে যেহেতু তারা শুধু শ্রম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন; কীভাবে নতুন তত্ত্ব তৈরি করা যাবে যা সমকালীন বিশ্লেষণ ও আগামী দিনের কল্পদৃশ্যে পুনরুৎপাদন, পরিবার ও যৌনতাকে তত্ত্বের কেন্দ্রে গুরুত্বসহকারে স্থাপন করতে পারবে?

    এখন আসি এই বইয়ের প্রসঙ্গে, উইমেন এন্ড রেভোলিউশান। মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ের আলোচনা। এই বইতে শুরুর দিকের সেই তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলোকে বর্ণনা ও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। তার কারণ নারীবাদী তত্ত্ব বিকশিত হয় প্রধানত তিনটি ধারায়: (১) র‌্যাডিকাল (২) সমাজতান্ত্রিক (৩) মার্ক্সবাদী নারীবাদ। প্রতিটি ধারায় বিবিধতা ছিল, উপধারা ছিল। লেসবিয়ানবাদ উৎসারিত হয় র‌্যাডিকাল নারীবাদী বিশ্লেষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে, র‌্যাডিকাল নারীবাদী প্র্যাক্টিস থেকেই লেসবিয়ান ধারার নারীবাদ আলাদা ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এ্যানারকিজম প্রক্রিয়া ও কাঠামো, উভয়কেই প্রভাবান্বিত করে। বর্ণবাদ যদিও নারীবাদী আলাপ–আলোচনার অংশ ছিল কিন্তু নারীবাদী তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিস কখনোই বর্ণবাদ (এবং শ্রেণীবাদ)-কে স্বার্থকভাবে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এর ফলে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা শ্বেতাঙ্গ নারীবাদী আন্দোলন— তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিসের— কড়া সমালোচনা করেন। শেষমেষ তারা নারীবাদী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বর্ণবাদ ও যৌনবাদকে একত্রিত করে বিশ্লেষণ করার গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করে নিজেদের পজিশন আলাদাভাবে ব্যক্ত করেন।

    এই তিন ধারার নারীবাদী তত্ত্বায়নের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কখনো–কখনো টানাপোড়েন ছিল, ক্ষেত্রবিশেষে তারা বিরুদ্ধভাবাপন্নও ছিল। বাদবাকি সময় তারা একে অপরকে প্রভাবান্বিত করে, চিন্তার রসদ যোগায়। পরস্পরের ভিতরে মিলও ছিল। মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রভাব প্রতিটি ধারায় সুস্পষ্ট ছিল। পুনরুৎপাদন ও যৌনতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন, এ বিষয়ে আগ্রহ ও মনোযোগ প্রতিটি ধারার ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। তা সত্ত্বেও অনেকাংশেই মনে হয়েছে ধারাগুলোর মধ্যে তত্ত্ব ও কৌশল নিয়ে যে বিরোধ তা অতিক্রম হওয়ার মতো নয়।

    র‌্যাডিকাল নারীবাদীদের চিন্তামতে, পিতৃতান্ত্রিক যৌনভিত্তিক নিপীড়ন–ই [patriarchal sex oppression প্রধান। তাদের দৃষ্টিতে যৌনতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন শ্রেণীগত ও বর্ণভিত্তিক নিপীড়নের জন্ম দেয়। আর এই কারণে, কৌশলগতভাবে যৌনভিত্তিক নিপীড়নের অবসান ঘটালে অপরাপর নিপীড়নের অবসান ঘটবে। তারা মনে করেন, নারীরাই হচ্ছে প্রধান বিপ্লবী দল; অনেকের কাছে তার অর্থ হচ্ছে পুরুষ নিপীড়কদের থেকে আলাদাভাবে সংগঠিত হয়ে লড়াই করা।

    মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা বিশ্বাস করেন যে পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীর গুরুত্ব “শ্রমিক” হিসেবে, “নারী” হিসেবে নয়। পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে (গৃহী শ্রম/domestic labour) মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা নারীর ভূমিকাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন যাতে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণে নারী গুরুত্বলাভ করে, যাতে তার মাধ্যমে মার্ক্সবাদী বর্গের [categories] সম্প্রসারণ ঘটে। কৌশলের দিক থেকে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মিশ্র সংগঠনে কাজ করতে থাকেন, অনেকে আবার অন্য নারীদের সঙ্গে স্বতন্ত্র ইস্যুর লড়াইয়েও যোগ দেন।

    সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা র‌্যাডিকাল নারীবাদীদের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত যে পিতৃতন্ত্র নামে নিপীড়নের একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান; মার্ক্সবাদী নারীবাদীদের সঙ্গে তারা এ বিষয়ে একমত যে শ্রেণীভিত্তিক নিপীড়ন সব শ্রমিকদের অবস্থা নির্ধারণ করে। সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা তাদের সমাজ–বিশ্লেষণে এ দুটো পন্থাকে একীভূত করার চেষ্টা করেন। আর কৌশলের দিক থেকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা পুরুষ–প্রধান নিউ লেফ্ট এবং স্বতন্ত্র নারী সংগঠনে কাজ করতে থাকেন।

    নারীবাদী তর্ক–বিতর্কের অবয়বকে নির্ধারণ করে এই তিনটি প্রধান ধারা। র‌্যাডিকাল ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের ব্যাপারে মার্ক্সবাদী নারীবাদীদের সমালোচনা হচ্ছে তারা যথেষ্ট বস্তুবাদী নন, আর এ কারণে শ্রেণী নিপীড়ন ও নারীবাদী আন্দোলনের শ্রেণী চরিত্রের ব্যাপারে তারা অবহিত নন। অন্যদিকে মার্ক্সবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের নিয়ে র‌্যাডিকাল নারীবাদীদের সমালোচনা হচ্ছে, তারা মানুষের চৈতন্য–গঠনে পিতৃতন্ত্রের গুরুত্বকে উপেক্ষা করেন, যৌনবাদী আচরণ বজায় রাখার মানসিক চাহিদাকে অবজ্ঞা করেন। অপরদিকে, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা মার্ক্সবাদী ও র‌্যাডিকাল নারীবাদীদের এই বলে সমালোচনা করেন যে, প্রথম ঘরানা প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থনীতিবাদী [economistic], দ্বিতীয় ঘরানা খুব–বেশি সাব্জেক্টিভ (ব্যাক্তি–বিষয়ী) আর সে কারণে, অনৈতিহাসিক। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা তিনটি ঘরানাকেই বর্ণবাদী বলে সমালোচনা করেন, তারা এমন তত্ত্ব প্রস্তাব করেন যা নারীবাদী বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করবে নরবর্ণের [race] প্রসঙ্গকে । র‌্যাডিকাল, সমাজতান্ত্রিক ও মার্ক্সবাদী নারীবাদ— তিনটি ঘরানায় লেসবিয়ান নারীবাদীরা ছিলেন, তারা স্ব–স্ব ঘরানায় কনশাসনেস–রেইজিং–এর মাধ্যমে বিষমকামীতাকে [heterosexuality] একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোঝা ও বিশ্লেষণ করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন; অবার একইসঙ্গে সামগ্রিকভাবে নারীবাদী বিশ্লেষণ ও কৌশলের অংশ হিসেবে লেসবিয়ানবাদের গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করেন।

    অধ্যয়ন, পড়াশোনা, আলাপচারিতা, মিছিল–সমাবেশ এবং সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন নারীরা, এর সাহায্যে নারীবাদী তত্ত্বের আলোচনার অবয়ব তাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়। কোন্ কোন্ প্রশ্নের তাত্ত্বিক উত্তর খুঁজতে হবে তা ধীরে–ধীরে আরও স্পষ্ট হয়: নারীরাই কি আসল বিপ্লবী শ্রেণী যাদের মুক্তি আর–সকল নিপীড়নের অবসান ঘটাবে? মার্ক্সবাদী ও নারীবাদী বিশ্লেষণ কি একইসঙ্গে করা যায়, এমনভাবে যাতে দুটোর গুরুত্বই সমান ওজনের হয়? নারী নিপীড়ন বোঝার জন্য অর্থনেতিক বর্গ–ই কি পর্যাপ্ত না–কি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এমনই মজ্জাগত যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পালটে গেলেও যৌনবাদী ধ্যান–ধারণার নড়চড় ঘটে না? চৈতন্য গঠনে যৌন/লিঙ্গ বা জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব কী? প্রায়–পুরো ইতিহাস জুড়ে নারীরা কেনই বা প্রায়–একই ভূমিকা পালন করেছেন তা বোঝার জন্য কোন্ কোন্ বিষয় অধ্যয়ন করা উচিৎ?

    রাজনৈতিক এবং কৌশলগত ভিন্নতা সত্ত্বেও নারীবাদী আন্দোলনের বিবিধ ধারা একটি মিশাল [shared] সূত্রে গাঁথা। নারী চৈতন্য গড়ে ওঠে নারীদের অংশীদারী সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ঘিরে। আগের জমানায় যে নারীরা মিছিল–সমাবেশ করেছিলেন, লিখেছিলেন, সংগঠিত হয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে এই জমানার নারীবাদীরা উদ্দীপনা, চিন্তাভাবনা ও কৌশল ধার করেন। এই জমানার আন্দোলনের বিকাশের ক্ষেত্রে, নারীদের সর্বজন [common] ভাষা, অংশীদারী অতীত এবং অংশীদারী বর্তমান— সবই ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন কাল, ভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থার কথা, অন্য নারীদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা পড়ে নারীরা উপলব্ধি করেন যে বর্তমানে যা ঘটছে তা আগেও ঘটেছিল, বহুবার ঘটেছিল। এলেক্সান্দ্রা কোলনতাই, রুশ কমিউনিস্ট পার্টির অগ্রণী নেতা, ১৯২৬ সালে লিখেছিলেন:

    আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধেও কিছু বলতে চাই। কাজ, পার্টি এসাইনমেন্টের মধ্যেও কতরকম উত্তেজনার মুহূর্ত, এতসবের মধ্যেও যে ঘনিষ্ঠ কিছু অভিজ্ঞতা, ভালোবাসার টানাপোড়েনের সময় মেলে! দুর্ভাগ্যবশত, হ্যাঁ! দুর্ভাগ্যবশত এ কারণে বলছি যে এ ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাধারণত অনেক বেশি মনোযোগ, কষ্ট, নিরাশা জড়িয়ে থাকে, অনেক বেশি এনার্জি অর্থহীনভাবে ব্যয় হয়। কিন্তু কোনো–এক পুরুষ আমার মনের গভীর পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে, আমাকে বুঝবে, পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে চিনবে, এসবের কারণেই এই সিদ্ধান্ত আপনাআপনি হয়ে যায়। আর প্রতিবার এ কারণেই দ্রুত হতাশ হই কারণ বন্ধুটি আমার মধ্যে দেখে শুধু নারী সত্তা যেটিকে সে নিজ অহম [বমড়] প্রচার করার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত করতে চায়। সুতরাং, বারে–বারে সেই অনিবার্য মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে যখন একাত্ববোধের শৃঙ্খল ঝেড়ে ফেলে, হৃদয়বেদনা সত্ত্বেও স্বতন্ত্র, অ– প্রভাবিত সত্তা নিয়ে আমি সরে দাঁড়াই। কিন্তু তখন আমি একা।

    কিন্তু আমরা কোলনতাইয়ের মতো একা নই। আমাদের আন্দোলন আছে। তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিস শুরু হয়েছে। আর–কখনোই “নারী প্রশ্ন”কে “নামহীন সমস্যা” বলে বর্ণনা করা হবে না। আমাদের নাম আছে।

    (অনুবাদ শেষ)

    পরের অংশে আছে এদেশের বাম নেতা মোশরেফা মিশুর সঙ্গে নারীমুক্তি ও বামদলগুলো কিভাবে পুরুষ আধিপত্যকে জারি রাখে সে প্রসঙ্গে আলাপচারিতা; ভাঁজে–ভাঁজে আছে কম্যুনিস্ট পার্টিগুলো কিভাবে ‘পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিকার’ সে প্রসঙ্গে নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড পার্বতীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ।

    ২. পুরুষের লেখা স্ক্রিপ্টে নারীমুক্তি: মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতা

    [নারীমুক্তি ও শ্রেণী সংগ্রামের সম্পর্ক] খুবই ঘনিষ্ঠ। সবচাইতে আগে নিপীড়নের শিকার হয়েছে নারী। [কিন্তু] শ্রেণী শোষণ শেষ হওয়ার পর তাদের–ই মুক্তি সবচাইতে শেষে ঘটবে। আর এ কারণে শ্রেণী নিপীড়ন জারি আছে কি–না তা পরীক্ষা করার পথ হচ্ছে নারী নিপীড়ন টিকে আছে কি–না তা পরখ করে দেখা।২৬

    – কমরেড পার্বতী, সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ও নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের নারী বিভাগের প্রধান

    কম্যুনিস্ট পুরুষদের বোঝা উচিৎ যে বিপ্লব ও বিপ্লবের অর্জনগুলোকে তখনই টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যখন বিপ্লবে আরো এবং আরো নারী যোগ দেবে।২৭

    – কমরেড পার্বতী

    “নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টার দিকে যদি তুমি তাকাও, নারী ও পুরুষের মধ্যে যাতে সমতা গড়ে ওঠে, তাহলে তুমি দেখবে যে পার্টি নেতৃত্বের দৃষ্টিতে এটা হচ্ছে সময়ের অপচয়। তাঁরা মনে করেন যে নারীর কন্ট্রিবিউশান পুরুষের তুলনায় কম। আমি জানি না তাঁরা কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আর আমদেরকে দেখা হয়, আমরা ২–১ জন যারা নেতৃত্বের উঁচুতে পৌঁছেছি, আমাদরকে মনে করা হয় এক্সেপশনাল। কখনো–কখনো আমাদের প্রসংশা করা হয়, আবার অনেক সময়ই আমরা হয়ে উঠি নিন্দার পাত্র।”

    কথা হচ্ছিল মোশরেফা মিশুর সঙ্গে, মিশু গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি, বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ওঁকে চিনি, খুব বেশি দেখা হয় না কিন্তু হলেই আমরা পরস্পরকে জাপটে ধরে অনর্গল কথা বলতে থাকি। দুনিয়া–জাহানের জিনিস নিয়ে আমাদের কথা হয়— গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি, কত নির্মমভাবে তাঁরা শোষণের শিকার, মিশুর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, ওঁর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সরকারের হয়রানি, ওঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ খানেক মামলা— আরো কতকিছু। মিশু সবসময়ই আমার কাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, আমি কী লিখছি, কী পড়ছি, সবসময় আমাকে বলেন আমাদের একত্রে বসে চিন্তাভাবনা শেয়ার করা উচিৎ।

    “বাম দলগুলোতে তুমি অনেক নারীকেই পাবে যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজকর্ম করছেন, যাঁরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পার্টিকে উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু তাঁরা এখনও সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যও হতে পারেননি। কেন সিপিবিকে দেখো না, হেনা দাস সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হলেন ৮০ বছর বয়সে। বা কৃষ্ণা দি’কেই দেখো না, এই ক’দিন আগে উনি সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হলেন, তাঁর বয়স ৬০–এর বেশি। পুরুষরা? ওহ, তাঁরা তো আরো অনেক অল্প বয়সে, হয়তো আমারই বয়সে— আমার বয়স এখন ৪৫— বা আরো অল্প, ধরো তিরিশ পেরিয়ে চল্লিশে পা দেবার আগেই…।” আচ্ছা, নারীরা কী এ নিয়ে প্রশ্ন করেন? “কিছুটা, কখনো–সখনো,” মিশু বলেন। “কয়েক মাস আগে, আমার মনে পড়ে শিরিন আপা [শিরিন আক্তার, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহ–সাধারণ সম্পাদক] জামান ভাইকে [বাসদের কমরেড খালেকুজ্জামান] এ নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। কারণ রুশো আপা, জলি আপা, তাঁরা এখনও পর্যন্ত সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হননি। যদিও তাঁরা সাংঘাতিক নিষ্ঠাবান, যদিও নেতা হিসেবে তাঁদের দুর্দান্ত সামর্থ্য, যদিও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। এমনকি তাঁরা তো সেন্ট্রাল কমিটির বিকল্প সদস্য পর্যন্ত হতে পারেননি। এখনও পর্যন্ত কোনো নারী বাসদের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হতে পারেনি— ভাবো অবস্থা!”২৮

    “আমি কিসের জোরে কথা বলি? আমি যেহেতু গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি, আমি যেহেতু মাঠ পর্যায়ে কাজ করি— এ কারণে তাঁরা আমাকে গ্রহণ করেন [করতে বাধ্য?]। আমার মনে হয় তুমি যদি অন্য বাম দলের নারী কমরেডদের জিজ্ঞেস করো ওরা তোমাকে ২–৪টা কথা নিশ্চয়ই বলবেন কিন্তু তা হবে আড়ালে। তুমি তাদের উদ্ধৃত করতে পারবে না।” আচ্ছা, এটা কী পার্টির প্রতি আনুগত্যের কারণে?— মিশুর কথার মধ্যে আমি ঢুকে পড়ি। “না, তা হবে কেন? আমিও তো পার্টির প্রতি অনুগত। আমি কথা বলি কারণ আমার মনে হয় এ নিয়ে কথা বলা জরুরি। আর তাঁরা বলেন না, কারণ তাহলে তাঁদেরকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হবে। হাজার হোক, কার ঘাঁড়ে কটাই বা মাথা আছে?”

    মোশরেফা মিশু, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি, বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক
    ছবি: শহিদুল আলম

    মিশুর সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ করার এক ফাঁকে ব্রেক নেই, টেবিলে রাখা কমরেড পার্বতীর এই কথাগুলো চোখে পড়ে:- “দেখা গেছে যে বিপ্লবী কম্যুনিস্ট আন্দোলন সবসময়ই নারী দ্রোহের লাগামকে মুক্ত করতে পেরেছে, কিন্তু কখনোই এই শক্তিকে নারী কম্যুনিস্ট নেতা তৈরির কাজে লাগাতে পারেনি। কম্যুনিস্ট পার্টিতে নারী নেতার সংখ্যা এত অল্প কেন এ নিয়ে বারে–বারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কারণ মার্ক্সবাদ নারী নিপীড়নের সাংঘাতিক গভীর বিশ্লেষণ উপস্থিত করতে সক্ষম। আর তার সমাধানও।”২৯

    মিশুরও বলতে গেলে একই প্রশ্ন:- বাংলাদেশের বাম আন্দোলনে নারী নেতার সংখ্যা এত কম কেন? কম্যুনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নারী নেতা তৈরি করার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রেখেছে?

    এর উত্তর কোথায়–ই বা খুঁজব, আমি ভাবি।

    মিশুর কথা শুনতে শুনতে মনে হয় তার মানে কি বাম আন্দোলন ধরে নেয় যে সামাজিক–অর্থে পুরুষদের কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় নেই? যে, যেহেতু তারা পুরুষ, তারা লৈঙ্গিক পরিচয় (gender identity)-এর উর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন? নারীদের বিপরীতে, যারা কিনা পদে–পদে তাদের লৈঙ্গিক পরিচয় দ্বারা বিপর্যস্ত? হতে না চাইলেও, তার উর্ধ্বে উঠতে চাইলেও, অন্তিম বিশ্লেষণে তারা এই পরিচয় দ্বারাই বিপর্যস্ত? বাম আন্দোলন কি ধরে নেয় যে পুরুষরা যখন আন্দোলন–সংগ্রাম করেন তারা সকলের হয়ে করেন কিন্তু যখন নারীরা করেন তখন তারা শুধু নারীজাতির–ই প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? উপরন্ত, এই আন্দোলন কি ধরে নেয় যে, যৌন সত্তা নারী একা–ই বহন করে? পারিবারিক সত্তার বেলায়ও তাই?

    “তোমাকে আরেকটা ঘটনার কথা বলি,” বললেন মিশু। “অনেক আগের ঘটনা, তখন আমার বয়স অনেক কম। আমি তখন ছাত্র ঐক্য ফোরামের সভাপতি, প্রায় চল্লিশখানেক ছাত্র সংগঠনের মধ্যে আমি একমাত্র নারী সভাপতি। আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়, ব্যাংক ডাকাতি চেষ্টা করার অভিযোগ। আসলে হয়েছিল কি, সর্বহারা পার্টির একটি দল গাজীপুরের একটি পেট্রোল পাম্পে ডাকাতি করার সময় ধরা পড়ে, আমি যেহেতু সর্বহারার সমালোচনা করেছিলাম তাই তারা ধরা পড়ার সময় আমার নাম ঢুকিয়ে আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ওরা পুলিশকে বলে, ডাকাতিতে আমি নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, ধরা পড়ার ঠিক আগ– মুহূর্তে অন্য গাড়িতে পালিয়ে গেছি। আমার ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা, আর আমার দুই বোন যারা তখন পার্টিতে নতুন যোগ দিয়েছে, আমার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে একটি বিবৃতি নিয়ে বিভিন্ন বাম দলের নেতাদের কাছে যায়। তাঁদের স্বাক্ষর করতে অনুরোধ জানায়। তাঁরা অস্বীকৃতি জানান। তাঁরা বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক নয়। পরে জেনেছি নির্মল সেন নাকি তখন ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আর কিছু না থাকুক অন্তত একজন নারী ডাকাত তো আছে! আমার প্রশ্ন হলো: আমাকে গ্রেপ্তার করা, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া— এগুলো কিভাবে রাজনৈতিক না হতে পারে? যারা মামলায় আমার নাম ঢুকিয়েছিল তারা তো এ কারণেই করেছিল কারণ আমি রাজনীতি করি? ধরো আমি যদি গৃহবধু হতাম তাহলে তো আর আমার নাম দিত না, তাই না? কোনো কোনো বাম নেতা নাকি এও উচ্চারণ করেছিলেন— আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি কারণ তাঁদেরই একজন নারী নেতা পরে আমাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন— তোমার কি সর্বহারা পার্টির কারো সঙ্গে এফেয়ার ছিল? সেই কারণেই কি প্রতিহিংসা হিসেবে তোমার নাম মামলায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল?”

    মিশুর কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে পাহাড়ি নেতা কল্পনা চাকমার কথা। ১২ বছর আগে,৩০ কল্পনাকে তাঁর মারিষ্যার (খাগড়াছড়ি) বাসা থেকে আর্মি তুলে নিয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ। একই কিসিমের কেচ্ছা ফেঁদেছিল তারা যারা ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। এটা প্রেম–ঘটিত ব্যাপার, কল্পনা নাকি আর্মির লেফেটনেন্ট ফেরদৌসের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। একইধরনের ভাবনা যে বাম মহলের মধ্যেও বিরাজ করে, যাঁরা নিজেদের অপর প্রান্তের বলে দাবি করেন— এই বিষয়টা আমাকে বরাবরই হতবিহ্বল করে।

    ২.ক বিয়ের সম্পর্কে কমরেড

    কমরেড পার্বতী বলেন, যে নারীদের বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য আছে তাঁরা নেতা হতে পারেন না বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের কারণে। নেপালের গণযুদ্ধের কারণে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে ঠিকই কিন্তু গণযুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে নারী নেতৃত্ব গড়ে ওঠার জন্য নারীদের যেভাবে আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন, বিয়ে ও সন্তানধারনের কারণে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটে। বাচ্চা নেওয়াটা একটি “একপেশে বোঝা,” প্রতিটি নতুন শিশু জন্মানোর অর্থই হচ্ছে [নারী কমরেডের] গৃহী দাসত্বের শৃঙ্খল আরো বেড়ে যাওয়া, আরো প্রকট হওয়া। কম্যুনিস্ট নারীদের অভিযোগ হচ্ছে “বাচ্চা হওয়াটা [পার্টির] শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অধীনে থাকা”র মতোই কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পার্টির কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের। সম্ভানাময়ী ও উচ্চাকাক্সক্ষী নারী ক্যাডাররা হারিয়ে যান, নিজেদের পছন্দের কমরেডদের বিয়ে করা সত্ত্বেও। নারীর পুনরুৎপাদকালীন ও সন্তান লালনপালনের বছরগুলোতে সে বাস্তবিক–অর্থে খুব কমই সাহায্য পায়। নারী ক্যাডারদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। যার এখনো বিয়ে হয় নাই, তাকে— কি পুরুষ কি নারী কমরেড, উভয়কেই “সন্দেহের চোখে” দেখা হয়। যৌন নিয়মের লঙ্ঘনকে রাজনৈতিক নিয়মের লঙ্ঘনের চাইতে আরো বেশি বড় অপরাধ মনে করা হয়।৩১

    কমরেড পার্বতী (হিসিলা ইয়ামি)
    নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ও নারী বিভাগের প্রধান
    ছবি: আলোকচিত্রীর নাম জানা যায়নি।

    আমি মিশুকে জিজ্ঞেস করি, এদেশে প্রচলিত বিয়ে ও যৌনতার সামাজিক সম্পর্ক এখানকার বাম ধারার নারীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে? আর তুমি, তুমি তো সিঙ্গেল। আচ্ছা, বলো তো, বাম ধারার নারীরা বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার জন্য নারীমুক্তির আকাক্সক্ষাকে কর্মসূচীর মধ্যে কীভাবে আকার–আকৃতি দিয়েছে?

    “বাম ছাত্র সংগঠন করার সময় থেকে এ পর্যন্ত আমি যা দেখেছি— বাম দলগুলোর কথা বলছি— যেই নারী বুদ্ধিমান আর দেখতে ভালো— বাম পুরুষদের ভাষায়, “সুন্দরী এ্যান্ড শার্প”— তাকে বিয়ের জন্য বাছাই করা হয়। বলা হয়ে থাকে বিয়ে করলে এই নারী কমরেড নিশ্চিতভাবে বাম রাজনীতিতে থাকবে। কিন্তু তা যে অনিবার্যভাবে ঘটে তা–না। অনেকেই গৃহের অন্তরালে হারিয়ে যান। বুদ্ধিমান বাম পুরুষদেরও আমি বলতে শুনেছি— যেসব ক্ষেত্রে দুজন কমরেড–ই সমানভাবে যোগ্য, দুজনা একইভাবে সম্ভাবনাময়ী— যেহেতু দুজনকে একইসঙ্গে গড়ে তোলা যাবে না, একজনের স্যাক্রিফাইস করতে হবে। একজনকে ক্রুশে চড়তে হবে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে পুরুষদের কখনোই ক্রুশে চড়তে দেখি নাই! বাম মহলে সবসময় জেনি মার্ক্সের৩২ অবদানের কথা, ক্রুপস্কায়ার৩৩ কথা স্মরণ করা হয়। লিও জোগিশের৩৪ কথাও বলা হয়। আমি নিজে আমার পুরুষ কমরেডদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি, তাঁরা কোনো অংশে কম স্যাক্রিফাইস করেননি, তাঁরা বহু বাধাবিপত্তি পার করেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো ঘাটতির কথা বলছি না। আমি শুধু বলছি তাঁদের আউটলুকের কথা। তাঁরা ভয়াবহ রকমের chauvinistic (উগ্র পুরুষবাদী)। আর নরবর্ণবাদীও (racist)। তুমি ভাবতে পারবে না “ফর্সা” বউ আর “কালো” বউ নিয়ে কত ধরনের কত কথা যে আমার কানে আসে।

    “এখানকার প্রগতিশীল পুরুষ, কম্যুনিস্ট পুরুষ— আর কথাগুলো আমি একদম সিরিয়াসলি বলছি রেহনুমা, confidently বলছি— তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে সমতা চর্চা করেন না। নিজের স্ত্রীর প্রতি না, কন্যাদের প্রতি না, বোনদের প্রতিও না। তাঁরা হচ্ছেন কর্তা। আমি নামধাম উল্লেখ করতে চাই না কিন্তু এমন বাম নেতাদের আমি চিনি যাঁদের মেয়েদের “ভালো” পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আর “ভালো” পাত্রের মানে হচ্ছে যার বিদেশী ডিগ্রি আছে। এ নিয়ে আমি অন্য নারী কমরেডদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরাও একই কথা বলেছেন।” আর পার্টির যেই নারীরা পুরুষ কমরেডদের বিয়ে করেন, পার্টি নেতাদের বিয়ে করেন, তাঁদের অবস্থা কেমন?— আমি জিজ্ঞেস করি। “অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তাঁরা পার্টিতে নতুন। মার্ক্সবাদী দর্শনে নতুন। এমন পরিস্থিতিতে, অমূকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাওয়াটা বড় ব্যাপার, যেহেতু তার স্ট্যাটাস আরো বেশি, তার প্রেস্টিজ আরো বেশি। তাঁরা নিজেরা একটি এলিট শ্রেণীর মতো।”

    আচ্ছা, আর যৌনতার প্রসঙ্গে আলাপ করতে চাচ্ছি। তুমি তো সিঙ্গেল, বরাবর অবিবাহিতই থেকেছ— এই বলে আগের কথাসূত্রে ফিরে যাই। মিশু বলেন, “এই শব্দটি কখনো উচ্চারণ করা হয় না। এটা ট্যাবু। আমি পুরুষ কমরেডদের বসে আড্ডা দিতে দেখেছি, তাঁরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন, দেখেই বোঝা যায় তাঁরা এসব বিষয়ে কথা বলছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার যদি ২–৪টা পুরুষ বন্ধু থাকত, রাজনীতিতে আমি ঠাঁই পেতাম না। কোনো জায়গাই থাকত না। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আশেপাশে ২–৪ জনকে ‘স্যাক্রিফাইস’ শব্দটা উচ্চারণ করতে শুনেছিলাম। আমি জানি, আমি যদি ভিন্নধরনের জীবন যাপন করতাম তাহলে আমার জন্য বাম রাজনীতিতে কোনো জায়গাই থাকত না। কিন্তু আমার যদি পুরুষ বন্ধু থাকত তাহলে আমার তো ভালোই লাগত।” পুরুষ কমরেডদের কী অবস্থা?— আমি জিজ্ঞেস করি। তাঁদেরও কি একই অবস্থা, নাকি ভিন্ন? “তাতো অবশ্যই। বহু সিঙ্গেল পুরুষ কমরেড ছিলেন কিন্তু মনে হয় তাঁদের নারী বন্ধু ছিল। কিন্তু এ নিয়ে কেউ খোশগল্প করে না।” তার মানে এর কারণে তাঁদের রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না? তাই কি?— আমি জানতে চাই। “ঠিক তাই,” মিশুর উত্তর। তার মানে তোমার বেলায় যদি এটা ঘটত তাহলে তোমাকে “চরিত্রহীন” বলা হতো? “তাতো বটোই। আমাকে ‘প্রস্টিটিউট’ ডাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না।” মিশুর কথা শুনে আমিও আশ্চর্য হইনি।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে, জাহাঙ্গীরনগরের ১৯৯৮ সালের ধর্ষণ–বিরোধী আন্দোলনের সময়, একজন প্রভাবশালী শিক্ষক যিনি আন্দোলনে আমার ভূমিকায় ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন আরেকজন শিক্ষককে বলেছিলেন আমি একজন “বেশ্যা”। যাঁকে তিনি এ কথা বলেছিলেন তিনি শব্দটি উচ্চারণ করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন দেখে আমি–ই মুখ ফুটে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলাম। নারীদের নির্ঘাৎ একটি “বউ–বেশ্যা” বৈপরীত্যে আটকে ফেলা হয়। পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা করলে এই চাবুক দিয়েই তাদের বেত্রাঘাত করা হয়। প্রগতিশীল পুরুষরা এই শব্দকে উড়িয়ে দেন, তাঁদের মতে এটি “রুচির অভাব”কে প্রতিনিধিত্ব করে, এটি “নিম্ন শ্রেণী”র ভাষা। কিন্তু যাঁরা বাম মহলের, তাঁরাও যদি একইধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তাহলে কী বাম আন্দোলনের পোষায়?— আমি ভাবি। এই ডাইকোটোমি শ্রেণীগত ও লৈঙ্গিক, উভয়ই। এটি, এবং মধ্যবিত্তের প্রতিক্রিয়া— দুটোই, বুদ্ধিবৃত্তিক–অর্থে, অ–নিরিক্ষীত থেকে গেছে।

    মিশু বলতে থাকেন, “এদেশের বাম রাজনৈতিক ধারা খুবই পুরুষালি। বাম ঐতিহ্যে নারীরা যে তাত্ত্বিক ও নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে অবদান রাখতে পারে, তা কিন্তু সিরিয়াসলি মনে করা হয় না। সাদামাটাভাবে ধরে নেয়া হয় যে নারীরা পুরুষ বিপ্লবীদের “অনুপ্রাণিত” করতে পারবে। কিন্তু বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। নারী নেতৃত্ব যে বিরাজমান ক্ষমতাসম্পর্কের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধন করতে পারে— এ বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না। ধরে নেয়া হয় যে পুরুষরা তাত্ত্বিকভাবে উৎকৃষ্ট। নারী তার সহযোগী’মাত্র। নারীর অংশগ্রহণ ও নারী নেতৃত্ব পুরুষালি ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন সাধন করতে পারে, এ বিষয়ে বাম পুরুষদের কোনো সিরিয়াস চিন্তাভাবনা নাই।

    “আমরা যদি কমরেড হিসেবে একত্রে কাজ করার পরিসর তৈরি করতে না পারি, নারীর জন্য সমাজতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা যদি ‘ও হ্যাঁ, নারীদের জন্যও আমাদের কিছু করতে হবে’ এতে সীমাবদ্ধ থাকে, যদি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে চর্চিত না হয়, পরিবারে, ব্যক্তি জীবনে, বিয়েতে— তাহলে তো সমতা আপনাআপনি ঘটবে না। আমি যদি এই প্রসঙ্গগুলো তুলি তাহলে আমাকে নব্য–মার্ক্সবাদী ডাকা হয়, নারীবাদী ডাকা হয় কিন্তু আমার মার্ক্সবাদী কমরেডরা বুঝতে ব্যর্থ হন যে মার্ক্সবাদের সৃষ্টিশীল বিকাশের জন্য এসব বিষয়ে আলাপ–আলোচনা গড়ে তোলা, আত্মসমালোচনার প্র্যাক্টিস গড়ে তোলা একান্তভাবে জরুরি।” মিশু হঠাৎ হেসে উঠে আর বলে, “আমাকে অন্তত এখন আর শুনতে হয় না, সাধারণ মানুষ আপনাকে গ্রহণ করবে না। আমি মাঠ পর্যায়ে কাজ করি, অনেকেই তা করে না। আমাকে গ্রহণ করতে ম্যাস পিপেলের কোনো সমস্যা হয় না। ও হ্যাঁ, তোমাকে কি বলেছি যে নারী সদস্যদের সাধারণত সাদা শাড়ি পরার কথা…।” মানে…? বিধবাদের সাজ? কি কাণ্ড! কেন? দুজনেই হো হো করে হেসে উঠি।

    মনে পড়ে, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনালের এ্যানারকিস্ট এমা গোল্ডমেন বলেছিলেন, আমি যদি নাচতেই না পারি তাহলে তোমার বিপ্লবে থাকতে চাই না।

    ২.খ নারীমুক্তি: পুরুষের স্ক্রিপ্ট

    “বাম পুরুষরা একটি পরিকাঠামো তৈরি করেছে। সেই ফ্রেমওয়ার্কের ভিতর থেকে নারী মুক্তিকে ভাবতে হবে। সেই ফ্রেমওয়ার্ক অনুসারে জীবন যাপন করতে হবে। যদি সেটা করো তাহলে তুমি আগামী সভায় সভাপতিত্ব করতে পারবে। আর যদি তা না করো, তোমার যতই নেতৃত্বের গুণাবলী থাকুক না কেন, পারবা না। আমি আবারও বলছি, আমি আমার পুরুষ কমরেডদের খুব শ্রদ্ধা করি, তাঁদের সম্বন্ধে আমার অনেক উঁচু ধারণা, তাঁরা কিন্তু oppressive নন। আমার সমস্যা তাঁদের চিন্তা–কাঠামো নিয়ে। অন্য দলের নেতারা আমার কাজের প্রশংসা করেন, কিন্তু তাঁরা এটাও আশা করেন যে আমি তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইব। যদিও এটা পার্টি ডিসিপ্লিনের পরিপন্থী। কিন্তু আমি যদি তাঁদের কাছ থেকে পরামর্শ চাই তাহলে আমি একজন ভালো মেয়ে, তার মানে আমি আদর্শ নারী নেতা। একজন আদর্শ নারী নেতা তিনি–ই যিনি অধিপতি সামাজিক মূল্যবোধ, নিয়ম–নীতি মেনে চলেন। আমাদের এখনো বিশ্বাস করার কথা যে একবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে নারী মুক্তি ঘটবে। আপনা–আপনিই নারী মুক্তি ঘটে যাবে। এটা অতি সরলীকরণ। এ অবস্থায় বিপ্লব ঘটলে আমরা নারীরা শুধু এক ধাপ এগিয়ে যাব। কিছু অধিকার অর্জন করব। কিন্তু যেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে সেটা পুরুষালি সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কিছু–ই হবে না।”

    আর নারী পার্টি সদস্যদের অবস্থা কী? “আমার মনে হয় না খুব–বেশি ভিন্ন। যাঁরা নতুন সদস্য তাঁদের মধ্যে কেউ–কেউ বিয়ের প্রস্তাব পান। এ ধরনের পরিস্থিতি খুব অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাঁর পছন্দ নাও হতে পারে। তিনি পার্টি ছেড়ে চলে যেতে পারেন। পার্টির তরফ থেকে বলা হতে পারে, এরকম পরিস্থিতি সামাল দিতে পারার কথা, দিতে শিখতে হবে কিন্তু এ ধরনের কথা তো পার্টির দায়িত্বকে এড়িয়ে যায়। পার্টির দায়িত্ব হচ্ছে নারী সদস্যদের জন্য একটি সৃষ্টিশীল কর্মপরিসর তৈরি করা। যারা [পুরুষালি] পার্টির ‘অপর’, তাদেরকে বাস্তবিক–অর্থে অন্তর্ভুক্ত করা। পার্টি ও ‘অপর’র বিভাজনকে ভেঙে ফেলা।”

    আমাদের দীর্ঘ আলাপ শেষ হয়। রুশ বিপ্লবী এলেক্সান্ড্রা কোলোন্তাইয়ের কথা মনে পড়ে । নারী মুক্তির জন্য শুধু পুঁজিবাদের অবসান নয়, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বদল ঘটানো জরুরি।৩৫

    যৌনতা, ভালবাসা ও কমরেডশিপের সম্পর্কের বদল ঘটানো জরুরি।

    পরের অংশে প্রথমত আমি প্রস্তাব করছি যে এদেশের বাম/প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্স হচ্ছে পুরুষদের ডিসকোর্স; এই ডিসকোর্সে পুরুষ হচ্ছে মানদণ্ড, যার কারণে পুরুষের লৈঙ্গিক সত্তা— নারীর সঙ্গে লৈঙ্গিক ভিন্নতা–অর্থে বা পুরুষ হিসেবে পিতৃতন্ত্রের ধারক–বাহক অর্থে, অন্য কথায়, ক্রিটিকাল–অর্থে— বুদ্ধিবৃত্তিক বিচার–বিবেচনা বা নিরীক্ষণের বস্তু অর্থে, অনুপস্থিত। বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা–শেষে আমি এদেশের একজন প্রথিতযশা মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের একটি সাক্ষাৎকারের একাংশ বিশ্লেষণ করে পুরুষালি ডিসকোর্স প্রসঙ্গে আমার এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা তুলে ধরছি।

    ৩. বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা’র প্রসঙ্গ

    বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স বলতে আমি পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্স বোঝাচ্ছি। এদেশের নারী বুদ্ধিজীবীদের স্বতন্ত্র কোনো ডিসকোর্স আছে কি–না, সে প্রসঙ্গে আপাতত ঢুকছি না। ডিসকার্সিভ–অর্থে, এদেশের অন্যান্য জাতিসত্তার বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় বাঙালি পুরুষ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকাই প্রধান।

    বাঙালি পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা কোনো প্রসঙ্গ নয়। প্রসঙ্গ হচ্ছে নারী। ‘পুরুষ’ সত্তাকে প্রসঙ্গ হিসেবে দেখা হয় না। সম্ভবত এ কারণে যে এটি–ই মানদণ্ড (norm)। অর্থাৎ, ধরে নেওয়া হয় যে লিঙ্গীয় পরিচিতি নারী একা–ই বহন করে। পুরুষের লিঙ্গীয় পরিচিতি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। সামাজিক ক্রিটিক অর্থে নয়। আত্ম–ক্রিটিক অর্থে– ও নয়। এটি হচ্ছে এদেশের পুরুষ বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্সের৩৬ কেন্দ্রীয় পূর্বানুমান। এই পূর্বানুমান— পুরুষ সত্তা বুদ্ধিজীবীতার মানদণ্ড— প্রশ্নাতীত। অন্তত আমার তাই মনে হয়।

    এ অঞ্চলের বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স সুবিস্তৃত। সময় ও কাল, উভয় অর্থেই। এর ভিত্তিভূমি ও সীমানা অনেকটা তরল। অনেকটা প্রবাহমান। কোনো কোনো বিষেশ মুহূর্তে ‘বাম’ বা ‘প্রগতিশীল’— হয়ত এই নামপঞ্জি বদলে যায়। হয়ত সংজ্ঞা পালটানো হয়। বদল সত্ত্বেও, তরলতা সত্ত্বেও, কিছু ডিসকুন্টনুইটি সত্ত্বেও বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স বলে কিছু–একটা চিহ্নিত করা যায়। এমন কিছু আছে বলে আমরা ধারণা। তবে এ নিয়ে খুব একটা গবেষণা হয়নি। হাল–আমলের নারীবাদী প্রত্যয়গত যন্ত্রপাতির (conceptual tools) সাহায্যে একদম হয়নি বললেই চলে। পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাম/প্রগতিশীল বাদে আরো ধারা রয়েছে। যেমন, উদারনৈতিক/প্রগতিশীল (লিবারেল) ধারা। ইস্যুর ক্ষেত্রে, বা বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে, ধারার মধ্যকার ভিন্নতা ধরা পড়ে। সবসময় নয়।

    বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা প্রসঙ্গে আলোচনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি এদেশের পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের কাজ টেক্সট হিসেবে বাছাই করেছি। এই প্রবন্ধটি ফরহাদ মজহারের একটি সাক্ষাৎকারকে ঘিরে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে, সেই সাক্ষাৎকারে তাঁকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন, এই প্রবন্ধ সেটিকে ঘিরে। আমার বিবেচনায় ফরহাদ মজহার এদেশের, একালের একজন মহাপুরুষ। মজহার প্রায় ৪০ বছর ধরে লেখালেখি করছেন। এ যাবৎকাল পর্যন্ত তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, সে কথা ভাবলে এ কথাটি কোনো ধরনের অত্যুক্তি বলে আমি মনে করি না। তাঁর আত্মপরিচিতি হচ্ছে তিনি মার্ক্সবাদী৩৭। তিনি বিপ্লবী। প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধুমাত্র একটি টেক্সট বাছাই করে তার ভিত্তিতে আলোচনা দাঁড় করিয়ে আমি তাঁর চিন্তাভাবনার প্রতি— সেটির ব্যাপ্তি, গভীরতার প্রতি সুবিচার করছি কি–না। আমার মনে হয়, মজহার লেখকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন (১৯৯৭), তা আলোচ্য বিষয় প্রসঙ্গে— লিঙ্গীয় ভিন্নতা— খুব ইঙ্গিতবহ।

    আমার মনে হয় বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্সে পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের৩৮ আলাপচারিতা, আর তার ক্রিটিক, এখান থেকেই শুরু হতে পারে।

    ৩.ক ফরহাদ মজহারের শ্রেণীগত বিভাজন, নর–নারীর বিভাজন

    ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আজকের কাগজ–এর৩৯। মজহারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: “লেখালিখি করতে গিয়ে তো আপনাকে কারাবাসও করতে হয়েছে৪০। সেই আলোকে একজন লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে আপনার অভিমত জানাবেন কি?”।৪১

    উত্তরে মজহার বলেন, গরিব আনসারদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদ করেছেন, তাই তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে। আনসাররা শুধু খেয়ে–পরে বাঁচার মতো বেতন চেয়েছে, অন্য কিছু নয়। তিনি আরো বলেন, তাঁর কারাবাসকে লেখকের স্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা করলে তাঁকে এমন কিছু লেখকরে কাতারে ফেলা হবে “যাদের কাজ হচ্ছে নোংরামি, বেলেল্লাগিরি এবং নিজেদের চরম বদমায়েশি”৪২–কে লেখকের স্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা। তিনি বলেন, পেট এবং লিঙ্গের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শরীরে তাদের স্থানও ভিন্ন, “পেট ওপরে, লিঙ্গ নিচে”।৪৩ দুটোর জ্বালা একরকম নয়। সঙ্গম না করে বাঁচা যায়, যেমন করেন ব্রহ্মচারীরা, কিন্তু না খেয়ে বাঁচা সম্ভব নয়। পেটের ব্যবহার ছাড়া মানুষের চলে না। আর এ কারণে লিঙ্গ এবং পেটকে একই কাতারে ফেলা ঠিক নয়। “পেটের ক্ষুধা আর নুনু বা যোনির সুড়সুড়ানি এক জিনিস নয়”।৪৪

    তিনি বলেন, পেট ও লিঙ্গের পার্থক্য করা শিখতে হবে। তার কারণ “সকল ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার এক রকম নয়, সকল অঙ্গের ভূমিকাও এক নয়”।৪৫ লেখকের ভূমিকার কথা তুললে, তাঁর দৃষ্টিতে, মূল প্রশ্ন হচ্ছে, “সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব জনগণ, শ্রমিক, মজুর, উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জন্য”৪৬ লেখক লড়তে, প্রয়োজনে মরতে প্রস্তুত কি–না। সংগ্রামকে দেহের প্রতীক দিয়ে বোঝার প্রস্তাব করে তিনি প্রশ্ন করেন, “পেটের দাবি আগে, নাকি লিঙ্গের দাবি আগে?”৪৭ তিনি যোগ করেন, প্রথমটার কথা বলে দ্বিতীয়টার কথা তিনি অস্বীকার করতে চান না, যেহেতু “শ্রমিক ও কৃষকেরও যৌনজীবন আছে, নারীপুরুষের প্রেম ভালবাসা রতিমিলন আছে”।৪৮ কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, “এইসব খেটে খাওয়া মানুষ শরীর বললেই সবসময়ই পেট এবং সেবাশান্তি করা, পেটে মেহনত করার ক্ষমতা বোঝে”।৪৯ অপর পক্ষে, বুর্জোয়া শ্রেণী দেহ বলতে বোঝে নারীর শরীর উলঙ্গ করা। তাদের দৃষ্টিতে দেহ ও লিঙ্গ সমার্থক। মজহার বলেন, উভয় শ্রেণীর কাছে ঘাম দেহের প্রতীক, দুটোই দেহ থেকে নিসৃত, কিন্তু শ্রমিক, কৃষক শ্রেণীর ঘামের মানে যেখানে “মেহনতের ঘাম,”৫০ অন্য শ্রেণীর কাছে ঘাম মানে “সঙ্গমের স্বেদ”।৫১

    মজহারের কথার দুটো অর্থ হতে পারে। দুটোই গোলমেলে। যদি ধরে নেই যে শ্রমিক বলতে মজহার শুধু পুরুষদেরই বোঝেন (“পেট ওপরে, লিঙ্গ৫২ নিচে”), তাহলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, কেন? কোন যুক্তিতে? শ্রমের কোন্ সংজ্ঞার ভিত্তিতে কেবল পুরুষ শ্রমিক–ই সাচ্চা শ্রমিক? তাহলে কিষাণী, খেটে–খাওয়া নারীর অবস্থান কোথায়? সাধারণ নারীর অবস্থান কোথায়? তাদের শ্রম— তা ঘরের কাজ হতে পারে, যেমন কুটা–কাটা, মশলা বাটা, রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর লেপা, ঝাড় দেয়া, নিড়ানির কাজ, ধান সিদ্ধ, ধান শুকানো, সন্তান লালন–পালন, বয়ষ্কদের দেখাশোনা, পরিবারের রুগ্ন সদস্যদের সেবা–যত্ন, হাঁস–মুর্গি–গরু–ছাগল পালা— কী? নারীর শ্রম শ্রম না কারণ তারা এর বিনিময়ে মজুরি পান না, এই যদি হয় মজহারের সংজ্ঞা, তাহলে এটি সেকেলে।

    কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রথাগত মার্ক্সবাদী ধারণা অনুসারে এ দেশের যে নারীরা পুরোদস্তুর শ্রমিক— অর্থাৎ, মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন (গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক)— মজহারের দৃষ্টিতে, তারাও শ্রমিক নন। কারণ মজহারের

    প্রস্তাবনায় খেটে খাওয়া মানুষরা (“সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব জনগণ, শ্রমিক, মজুর, উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষগুলো..”) শরীর বললে সবসময়ই পেট বোঝেন, আর পেটের অর্থ একটাই: আঁতের জ্বালা মেটানো, ক্ষুধা মেটানো, খেয়ে পরে বাঁচা।

    কিন্তু নারী শ্রমিকের জন্য পেটের অর্থ কী শুধু তাই? এতোই কী একরৈখিক? শুধু নারী শ্রমিক কেন, সকল শ্রেণীর নারীর কাছে পেটের বিশেষ অর্থ রয়েছে: নারী তার পেটে সন্তান ধারণ করে, সন্তান মায়ের পেটের থেকে পুষ্টি পায়, পেটের মধ্যেই বড় হয়, দশ (কি নয়) মাস পর পেটের থেকে বেরোয়। আর এ কারণেই, কার সন্তান, কোন্ মায়ের সন্তান বোঝাতে চাইলে আমরা বলি, অমূকের পেটের সন্তান (পুরুষদের ক্ষেত্রে তা বলি না, বরং বলি, ‘ওর জন্মের সন্তান’)। আরো অনেক–কিছু বলি যা নারীর পেটকে, নারীর জন্মদানের ক্ষমতাকে, তার এই সামর্থ্যকে ঘিরে। যেমন নাড়ির টান, নাড়িছেঁড়া ধন ইত্যাদি, ইত্যাদি।

    শ্রমিক শ্রেণী নিয়ে মজহারের কথাবার্তায় নারী–পুরুষের সম্পর্কের কোনো উল্লেখ নেই, তা না। আছে, তা অতি–সামান্য, “শ্রমিক ও কৃষকেরও যৌন জীবন আছে, নারীপুরুষের প্রেম ভালবাসা রতিমিলন আছে”। যৌন জীবন আছে, রতিমিলন আছে, কিন্তু মজহারের কথা শুনে মনে হয়, যৌন সম্পর্কের কোনো জৈবিক কনসিকোয়েনসেস নেই। কেন? রতিমিলনের খেসারত নারীর পেটেই প্রকাশ পায় বলে? পুরুষের পেট— তা শ্রমিক পুরুষের পেট হোক, কী বুর্জোয়া পুরুষের পেট— যৌনসংগমের কোনো চিহ্ন ধীরে–ধীরে বহন করা শুরু করে না বলে?

    মজহার যদি নারী (বুদ্ধিজীবী) হতেন, তাঁর কাছে কী পেটের এমনই একপেশে অর্থ হতো?

    এখন আসি যোনির কথায়।

    মজহারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে। তিনি এই বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন যে, “আমার কারাবাসকে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন আকারে তুললে আপনি আমাকে এমন কিছু লেখকের কাতারে ফেলে দেবেন যাদের কাজ হচ্ছে নোংরামি, বেল্লোগিরি এবং নিজেদের চরম বদমায়েশিগুলোকে লেখকের স্বাধীনতা আকারে হাজির করা।”৫৩ এর ব্যাখ্যা হিসেবে মজহার বলেন, সঙ্গমের স্বাধীনতা আর লেখকের স্বাধীনতা এক জিনিস নয়। মানুষের শরীর যে সমাজে পুঁজির অধীন, যে সমাজে মানুষের শ্রম হচ্ছে পুঁজির স্ফীতি, অপরের জন্য খেটে মরা, সে সমাজে লেখকরা পেটের মুক্তি, মেহনতের মুক্তি দাবি না করে লিঙ্গের স্বাধীনতা চাইছেন। তারা বলে বেড়াচ্ছেন, “আমাদের আছে স্বাধীন ও সার্বভৌম লিঙ্গ।”৫৪ এটাকেই তারা লেখকের স্বাধীনতা হিসেবে প্রচার করছেন।

    মজহার বলেন, লেখক হিসেবে সঙ্গমের স্বাধীনতা প্রচার করা আর পেটের দাবি প্রচার করা এক জিনিস নয়। তিনি বলেন, কোনো লেখকের হয়ত হস্তমৈথুন ভালো লাগে, সেটা তিনি বাথরুমে গিয়ে করলেই পারেন। এ কারণে যদি কেউ লেখককে গালমন্দ করে, তিনি তার পক্ষে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই লেখক যদি তার ভালো লাগাটা প্রচার করে, অন্যরা যদি রুচির কারণে তাতে বাধা দেয়, তখন যদি লেখক বলে বসেন যে তার স্বাধীনতায় বাধা দেয়া হচ্ছে, সেটা “মহা মুশকিলের ব্যাপার।”৫৫ এ প্রসঙ্গেই মজহার বলেন, “কোন মেয়ে যদি বলে ছেলেরা চারটা বৌ রাখতে পারে, অতএব আমিও চাই চারটা পুরুষ,”৫৬ যদি পরুষতন্ত্রের এই যুগে মেয়েটি “চারটে পুরুষকে এক সঙ্গে”৫৭ বাগিয়ে নিতে পারে, তিনি তাকে “একখানা বাপের বেটি বটে”৫৮ বলবেন। মেয়েটির তারিফ করবেন, তার উদার পুরুষ সঙ্গীদেরও তারিফ করবেন। কিন্তু এই চারটি পুরুষ রাখাই নারী মুক্তি, এটিই লেখকের স্বাধীনতা, যদি লেখক এটা দাবি করে বসেন, সেটা খুবই সমস্যাজনক। এ সকল কারণে মজহার তাঁর নিজ কারাবাসকে “বিমূর্ত কায়দায় লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন আকারে”৫৯ দেখতে রাজি নন।

    এখন, আমার কথা হচ্ছে, লেখকের স্বাধীনতার অর্থ কী, এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মজহার আবারও লিঙ্গীয় ভিন্নতা সৃষ্টি করেন; আর আবারও, তার খেসারত নারীকেই দিতে হয়। তিনি আবারও নারী–সাপেক্ষে পুরুষের ক্ষমতাকে অদৃশ্য করেন। বুর্জোয়া নারী–লেখকের তুলনায় বুর্জোয়া পুরুষ–লেখক যে সাধারণত বেশি ক্ষমতার অধিকারী, তা হাওয়া হয়ে যায়। পুরুষ ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আছে— রাষ্ট্রব্যবস্থায়, আইনে, সমাজ–সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে— তা হাওয়া হয়ে যায়। এর পরিবর্তে আমরা পাই বাস্তবিক সামাজিক সম্পর্কে অ–প্রোথিত নারী (ও পুরুষ) লেখক, যারা স্বেচ্ছাচারী যৌন তাড়না দ্বারা, অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের অনিয়ন্ত্রিত গতি দ্বারা, চালিত (“নুনু বা যোনির সুড়সুড়ানি”)। সমাজ চিন্তক হিসেবে মজহার থেকে আমরা আশা করি যে তিনি দেহের ব্যক্তিবাদী বয়ানকে হিস্টোরিসাইজ করবেন। স্বাধীন–স্বতন্ত্র–সার্বভৌম/autonomous শরীরের ধারণাকে ডিকনস্ট্রাক্ট করবেন। তার লিঙ্গীয় ও বর্ণবাদী রূপ উন্মোচন করবেন। কিন্তু এ ধরনের কোনো কিছু না করে, লেখকের স্বাধীনতার বুর্জোয়া ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে মজহার নিজেই ব্যক্তিবাদী বয়ান উৎপাদন করেন। স্বাধীন–স্বতন্ত্র দেহের বুর্জোয়া আদর্শকে ডিমোনাইজ (দানবীয়) করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেই সেটিকে পুনরুৎপাদন করেন। মজহারের উল্লিখিত নুনু, যোনি ইতিহাস–বিবর্জিত, সমাজ–বিচ্ছিন্ন। তাঁর সাক্ষাৎকারের এই অংশগুলো পড়লে উনবিংশ–বিংশ শতকে ‘ফ্রি সেক্স’ নিয়ে ভিক্টোরীয় উৎকণ্ঠার কথা মনে পড়ে যায়।

    মজহারের ‘শ্রমিক’–এর ধারণা যেমন পুরুষ শ্রমিকের ছাঁচে গড়ে তোলা, মজহারের ‘লেখক’ও তাই। মনে হয়, পুরুষ লেখক ও নারী লেখক একই ক্ষমতা ও সামর্থ্যরে অধিকারী, বুর্জোয়া পুরুষ যা পারেন বুর্জোয়া নারীও তাই পারেন। করেনও। এখানেও যৌন মিলনের কোনো লিঙ্গীয় কনসিকোয়েনসেস নেই: পেটে বাচ্চা আসার দুর্ভাবনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার, এ্যাবরশন, এনেসথিশিয়া নিলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এ্যাবরশনের পরে হঠাৎ ভ্রুণের জন্য মায়া, কুৎসা রটনার ভয়, জারজ বনাম বৈধ সন্তান জন্মদানের সুবিধা–অসুবিধা ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমন কনসিকোয়েনসেস যার চাপ ও মুক্ত পরিসর, দুটোই— বুর্জোয়া নারীর বেলায়ও– বাস্তবিক ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা গঠিত। আমার জানামতে রাইট–টু–ওয়ান্স–বডি’র পশ্চিমা বুর্জোয়া নারীবাদী ধারার প্রবক্তারা মজহারের মত এতো তাচ্ছিল্যের স্বরে কথা বলেন না। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির ক্ষতিকারক দিক নিয়ে, নারী দেহের মেডিকালাইজেশন৬০ নিয়ে, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের নারীকে গিনিপিগে পরিণত করেছে, নানান সময়ে তারা এসব বিষয়ে দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করেছেন।

    সচেতন কথাবার্তায় পুরুষের ক্ষমতাকে অদৃশ্য করলেও, বাস্তব চিত্র যে ভিন্ন, অবচেতন–মনে মজহার তা জানেন, বোঝেন। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। বুর্জোয়া পুরুষ ও নারীর ক্ষমতা যে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সমান্তরাল নয়, তা তাঁর মুখ–ফসকে–বেরিয়ে–যাওয়া কথা থেকে বোঝা যায়। “কোন মেয়ে যদি বলে ছেলেরা চারটা বৌ রাখতে পারে, অতএব আমিও চাই চারটা পুরুষ”— তাঁর এই কথা থেকে বেরিয়ে আসে। মুসলমান পুরুষের একসঙ্গে চারজন স্ত্রী থাকতে পারে, এটি এদেশে আইন–সমর্থিত। কিন্তু মুসলমান নারীর স্বামী সংখ্যা এক–এ সীমিত। লক্ষণীয় যে মজহার চারজন “বর” (বউ–এর জোড় শব্দ)-এর কথা বলেন না। চারজন স্বামীর কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। স্বামী শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ একে তো ঈশ্বর, প্রভু, রাজা, সম্রাট, মালিক ইত্যাদি, ইত্যাদি, আবার বর্তমান বাংলাদেশে, পশ্চিমা রূপান্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে স্বামী/বর/হাসবেন্ড৬১— পুরুষের এই ভূমিকা সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনি, মতাদর্শিক ও নৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। চারজন কর্তার মাধ্যমে নারীমুক্তি সাধিত হতে পারে, এটা বললে তাঁর ব্যঙ্গ ধোপে টিকবে না, কথার পিঠে কথার মধ্যেও মজহার মনে হয় তা টের পেয়েছিলেন। দ্রৌপদির পুরাণ পুরাণই।

    মজহারের লেখকের স্বাধীনতার বয়ান বীরোচিত। এতে নারী ‘অপর’। শুধু তাই নয়, অপরকরণের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী, পুরুষ–লেখকের heroism রচিত। লেখকের স্বাধীনতার বয়ান ‘অনৈতিক বুর্জোয়া’ আর ‘পিউরিটান সর্বহারা,’ শ্রেণীগত বৈপরীত্য বা বাইনারি অপোজিশনের এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে নির্মিত। রুশ বিপ্লবের আগে ও পরে, সে দেশের নারীবাদী বিপ্লবীরা একই–ধরনের অপোজিশনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তর্ক–বিতর্কের মাধ্যমে, ঘাত–প্রতিঘাতের মাধ্যমে তারা আবিষ্কার করেন যে এই বৈপরীত্য নারী–স্বার্থ বিরোধী। তারা আবিষ্কার করেন যে প্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা প্রসঙ্গে ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন আকাক্সক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলে পুরুষ কমরেডরা সর্বহারা শ্রেণীর বাস্তবে যাপিত জীবনের জটিলতার মধ্যে ঢোকেন না। সর্বহারার পিউরিটান চিত্রায়ন অক্ষত রেখে তারা সহজ পথটি বেছে নেন। তারা তাদের নারী কমরেডদের ‘বুর্জোয়া’ ডেকে গালি দেন।

    সামনাসামনি–তে প্রকাশিত “পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা”–র সাক্ষাৎকারের পরের সাক্ষাৎকার “বাংলা, বাংলাদেশ ও পরিচয়ের রাজনীতি” (১৯৯৪)।৬২ সেখানে মজহার বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের ঐতিহ্য নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বলেন, “[আমাদের বর্তমান লড়াইয়ে] শ্রেণীর ব্যাপার আছে, নারীপুরুষ ভেদ আছে।”৬৩ পরের পৃষ্ঠাতেই পাই একটি ভাওয়াইয়া গানের চমৎকার বিশ্লেষণ।৬৪ মজহার বলেন, গানের মর্মকথা হচ্ছে গাহর্স্থ্য শৃঙ্খল থেকে মার মুক্তির অর্থ হচ্ছে কন্যার বন্দীত্ব। মজহারের বক্তব্য হচ্ছে, মায়ের প্রতি মেয়ের সলিডারিটি প্রকাশ পায় গানটিতে, আবার একইসঙ্গে এটি মেয়ে(মানুষের) গাহর্স্থ্য নিয়তির গৌরবগাথা। বিশ্লেষণ চমৎকার, তা সত্ত্বেও, কিংবা সে কারণেই, দ্বিধান্বিত বোধ করি। কীভাবে বুঝব? তার মানে কি টেক্সচুয়াল রেপ্রিজেন্টেশনে মজহার নারী–পুরুষের মধ্যকার ভেদাভেদ বোঝেন, যাপিত জীবনেরটা, with all its complexities of `self’ and ‘other’— বুঝতে পারেন না, ধরতে পারেন না?

    পরিশেষে যেই চিন্তাটি প্রসঙ্গ ও প্রশ্ন–আকারে পাঠকদের মধ্যে দানা বাঁধুক, তা উপস্থাপন করছি: বাম ধারা ও নারীবাদের বিয়ে কি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই অসুখী?

    —————————————————————————–

    ৩’য় অংশের কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সুদৃঢ় ভগিনি বন্ধনে লালিত না হলে বাম/প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী পুরুষ ডিসকোর্স, ও তার ক্রিটিক দাঁড় করানোর কাজ হাতে নেয়া সম্ভব হতো না। ভগিনি তালিকায় সবার আগে একসাথে বেড়ে ওঠা বন্ধু শামীম আক্তার–এর নাম। দিলারা বেগম জলি (চট্টগ্রাম), শিপ্রা বোস (কাবুল), উদিসা ইসলাম (রাজশাহী) ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে উষ্ণ সংহতিবোধের মাধ্যমে, আমাকে, আর ক্রিটিকের জরুরিত্বকে জিইয়ে রেখেছে। প্রাণসই সায়দিয়া গুলরুখ বরাবরের মতো আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাদের সকলকে ধন্যবাদ, তবে ক্রিটিকের অপূর্ণতা, ভুলত্রুটির দায়ভার তাদের নয়। আমারই।

    পূর্ণাঙ্গ লেখার কৃতজ্ঞতা স্বীকার: পাবলিক নৃবিজ্ঞান এর সাথীদের ধন্যবাদ জানাই, এই প্রবন্ধের নানান সংস্করণে তারা সহোৎসাহে পরামর্শ দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করেছেন। সময়–অসময় যদি দিকনির্দেশনা দিয়ে তারা পথ না দেখাতেন, এগোনো কঠিন হতো। বিশেষ ধন্যবাদ সাঈদ ফেরদৌস আর মির্জা তাসলিমা সুলতানার প্রাপ্য, ২০১৫–র পরিবর্তিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে কী ধরনের টীকা সংযোজন করে প্রবন্ধ প্রকাশযোগ্য করে তোলা সম্ভব সেই পরামর্শ দেয়ার জন্য। সাঈদকে বাড়তি ধন্যবাদ মূল্যবান কপি–এডিটিংয়ের জন্য।

    পাদটীকা

    ১এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের প্রথম অংশ, যেটি লিডিয়া সার্জেন্টের লেখার অনুবাদ, এই লেখাতেই নারী–পুরুষের মধ্যকার লিঙ্গীয় অসমতার দৈনন্দিন চর্চা কীভাবে ডক্যুমেন্ট করা সম্ভব, তার একটি পদ্ধতিগত নমুনা (methodological exercise ) পাওয়া যায়।

    ২Lydia Sargent (ed.), Women and Revolution. A Discussion of the Unhappy Marriage of Marxism and Feminism (Boston: South End Press, 1981)। এই সংকলন ‘রাজনৈতিক বিতর্ক’ নামক সিরিজের অংশ। উল্লেখ্য যে লিডিয়া সার্জেন্টের পুরো ভূমিকাটি (“New Left Women and Men: The Honeymoon is Over”) অনুবাদ করিনি। মোট ২০ পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধের (পৃ. xii-xxxii ) ১১ পৃষ্ঠা (xii-xxii)) অনুবাদ করেছি। বাকি ৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে উইমেন এন্ড রেভোলিউশন সংকলনের বিভিন্ন প্রবন্ধ সম্বন্ধে সম্পাদক হিসেবে লিডিয়া সার্জেন্টের পরিচিতিমূলক আলোচনা। এই পুস্তিকাপ্রবন্ধের জন্য পরবর্তী এই অংশটি প্রাসঙ্গিক না হওয়ার কারণে তা বাদ দিয়েছি।

    উইমেন এন্ড রেভোলিউশন সংকলনে ১৩জন নারীবাদীর লেখা রয়েছে, তাঁরা হলেন: Iris Young, Christine Riddiough, Gloria Joseph, Sandra Harding, Azizah al-Hibri, Carol Ehrlich, Lise Vogel, Emily Hicks, Carol Brown, Katie Stewart, Ann Ferguson & Nancy Folbre, Zillah Eisenstein।

    ৩Rahnuma Ahmed, ÒCONVERSATIONS: BEING A WOMAN. Left Leadership in Bangladesh,Ó New Age, Tuesday, August 5, 2008|

    ৪সৈকত হাবিব সম্পাদিত সংকলনটি ২০০৭ সালের বইমেলা’তে বেরুনোর কথা ছিল। সংকলনটি বইমেলা ধরতে পারেনি লেখা দিতে দেরি হওয়ার কারণে, আমার জানামতে পরে সংকলনটি আর বেরোয়নি।

    ৫মানুষের রাজনীতি–দর্শন–আদর্শ বদলায়, ২০০৪ এর ফরহাদ মজহার যেভাবে নিজেকে পরিচিত করিয়েছিলেন একজন ‘মার্ক্সবাদী’ হিসেবে, সেই একই ফরহাদ মজহার ২০১৫ সালে নিজেকে একইভাবে পরিচিত করাবেন কি–না, আর করলেও, তিনি সেভাবেই recognised হবেন কি–না, তা তর্কসাপেক্ষ।

    ৬সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা (সম্পাদকবৃন্দ), সাদ্দাম হোসেন, ইলিয়াস মিলন, মোহাম্মদ আজম, মোহাম্মেদ রোমেল ও এবাদুর রহমান (ঢাকা: সূচীপত্র, ২০০৪)।

    ৭ নিউ লেফ্ট নামটি প্রধানত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত, এটি ১৯৬০–৭০ দশকের শিক্ষক, এ্যাক্টিভিস্ট, প্রতিবাদকারীদের ইঙ্গিত করে যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী ওল্ড লেফ্টের রাজনীতির প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাম সংহতিতে ভাঙন ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরির বিপ্লব যেটি সোভিয়েত সেনাবাহিনী দমন করে। পশ্চিমা কম্যুনিস্ট পার্টি ও বয়োজেষ্ঠ নেতৃত্ব সোভিয়েত হস্তক্ষেপকে মেনে নিয়েছিল যার কারণে নতুন প্রজন্মের বহু পশ্চিমা মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট/বাম দলকে ত্যাগ করেন। তাঁরা পুঁজিবাদের বিরোধিতা’সহ বাম–স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। আর এ কারণেই এই ধারার নাম নিউ লেফ্ট। ব্রিটেনের নিউ লেফ্ট প্রাধান্য দেয় মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক মার্ক্সবাদের উপর; রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির মিশ্রণের উপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ লেফ্ট প্রভাবিত হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ (ও তার বিরোধিতা) এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন দ্বারা। আমেরিকা ও ব্রিটেন, উভয় দেশের নিউ লেফ্টই সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে সমালোচনামনষ্ক ছিলেন (ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দমন–পীড়ন নীতি), কিন্তু ব্রিটেনের নিউ লেফ্ট যেখানে ট্রটস্কিবাদ বা সামাজিক গণতন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, মার্কিন নিউ লেফ্ট নতুন বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে, যেমন, মাও সে তুঙ (চীন), হো চি মিন (ভিয়েতনাম), ফিদেল ক্যাস্ট্রো (কিউবা)।

    ৮এদেশের বাম দলের ঐতিহ্য প্রসঙ্গে মিশু যেই সমালোচনা করেন তা যে একান্তভাবে বাংলাদেশের বামদের সমস্যা নয়, সেটি তুলে ধরার জন্য আমি নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য এবং নারী বিভাগের প্রধান, কমরেড পার্বতীর লেখালেখি ও সাক্ষাৎকারের সাহায্য গ্রহণ করেছি।

    ৯দেখুন, Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” Monthly Review, February 21, 2003 http://monthlyreview.org/commentary/womens-leadership-and-the-revolution-in-nepal

    http://sketchythoughts.blogspot.com/2008/03/interview-with-comrade-parvati-of cpnm.html; “People’s Power in Nepal,” Monthly Review, Volume 57, Issue 06, November 2005 http://monthlyreview.org/2005/11/01/peoples-power-in-nepal; Interview with Comrade Parvati (Hisila Yami) of the Communist Party of Nepal (Maoist), conducted by Jorun Gulbrandsen and Johan Petter Andresen, Blog Sketchy Thoughts, Friday, March 21, 2008|

    ১০বৈজ্ঞানিক মার্ক্সবাদ সমাজ কাঠামোর উপর গুরুত্বারোপ করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে প্রথাগত চিন্তা যেখানে মানুষের ইচ্ছার (will) ওপর জোর দেয়, মার্ক্সের সমাজ কাঠামোর ধারণা’মতে ব্যক্তিগত ইচ্ছা–অনিচ্ছা যাই থাকুক না কেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একজন পুঁজিপতি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরন্তর উৎপাদন বৃদ্ধি করার কাজে নিয়োজিত থাকেন, নিরন্তর শ্রম–শোষণে নিজেকে লগ্নি করেন; সমাজ কাঠামোতে ভিন্ন–ভিন্ন অবস্থানে অবস্থিত হওয়ার কারণে, মার্ক্সের কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি মোতাবেক, বুর্জোয়া ও শ্রমিক নিজস্ব সামাজিক অবস্থান মোতাবেক তাদের যা যা করা উচিৎ— ব্যক্তিগত চিন্তা মন–মানসের ভিত্তিতে নয় বরং বস্তুনিষ্ঠ শর্তের (সামাজিক অবস্থান; উৎপাদন সম্পর্কে তার অবস্থান) পরিপ্রেক্ষিতে— তারা তাই করেন (কাজকর্মে, আচরণে)। মার্ক্সের কাঠামোবাদী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই পয়েন্টগুলো উল্লেখযোগ্য:- (ক) ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে মার্ক্স বস্তুগত শর্তের ধারণার ওপর জোর দেন (খ) দ্বিতীয়টির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন (গ) কাঠামোর ওপর গুরুত্বারোপ করার অর্থ হচ্ছে তিনি “ভালো” বা “মন্দ” ইচ্ছার বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে রাখেন (ঘ) মার্ক্সের যুক্তি হচ্ছে, ব্যক্তিগত ইচ্ছার ধারণা (ও প্রয়োগ) সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী শর্তকে (উৎপাদনের সম্পর্ক: পুঁজিপতি–সর্বহারা; উৎপাদনের মাধ্যম: উৎপাদন করার জন্য যা যা লাগে যেমন কল–কারখানা, জমি, কাঁচা মাল) আড়াল করে (৫) তার অত্যাবশ্যকীয়তাকে উপেক্ষা করে (৬) প্রথাগত চিন্তাা পক্ষান্তরে, মার্ক্সবাদীদের মতে, বৈজ্ঞানিক মার্ক্সবাদের সাহায্যে বিষয়গুলোকে বোঝা ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

    অব্জেক্টিভ কন্ডিশনের আলোচনা প্রসঙ্গে লেনিন বিপ্লবের যে ৪টি শর্তের কথা বলেছিলেন তা সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা যায়:- (ক) বিপ্লব–অনুকূল পরিস্থিতি তখনই সৃষ্ট হয় যখন শাসক শ্রেণী আগের মতো শাসন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে; শাসক শ্রেণীর মধ্যে একাধিক দল, উপদল দেখা দেয়, তার কারণে বিভক্তি ঘটে, প্রতিটি দল ভিন্ন–ভিন্ন সমাধান প্রস্তাব করে (খ) মধ্য(বিত্ত) শ্রেণীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় (গ) শ্রমিক শ্রেণী সমস্যার সমাধান খোঁজে কিন্তু পূর্বতন সমাজব্যবস্থার অধীনে নয়; বদলের জন্য শ্রমিক শ্রেণী যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত (ঘ) আর সর্বোপরি, শ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় সুস্পষ্ট মার্ক্সবাদী ভাবধারার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি বিপ্লবী দল যার কৌশল, লক্ষ্য হাসিলের পন্থা ও সংগঠন— সবই প্রস্তুত।

    ১১দ্বান্দ্বিক চিন্তার মূলে রয়েছে আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হবে সম্পর্ক–বিহীন, তার মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক অর্থাৎ, দৈবাৎ কোনো ঘটনা নয় বরং ব্যবস্থাজনিত কারণে (systematic interconnections) তা অনুসন্ধান করতে পারা, তার মাধ্যমে পূর্বতন অনগ্রসর ধাপ অতিক্রম করে আরো অগ্রসর ধাপে উন্নীত হওয়া। অর্থাৎ, শ্রেণী বৈষম্যের সঙ্গে লিঙ্গীয় বৈষম্যের আন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধান করে উপলব্ধি করতে পারা কেন বিপ্লব সাধন করতে হলে, তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে নারীমুক্তি অপরিহার্য।

    ১২“Women have to wage a longer struggle because of their double oppression.” দেখুন, Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত|

    ১৩“Added to this is the unilateral burden a woman has to carry when she becomes a mother. With the birth of every child she sinks deeper into domestic slavery,” উপরোক্ত। ৩১ নং টীকা–ও দেখুন।

    ১৪“…in white dominated areas [areas still dominated by the local traditional elite-ed.]…women seldom get support system from the mass as well as from the Party to sustain themselves in their reproductive years,” উপরোক্ত।

    ১৫ উপরোক্ত। ৩১ নং টীকা–ও দেখুন।

    ১৬এক্ষেত্রে কমরেড পার্বতীর অভিজ্ঞতা উল্লেখ্য, “But there is also a tendency to treat women differently than men, something I have experienced personally. When my husband Baburam Bhattarai was taken action against in 2005, this was given a political motivation, but when I was taken action against, the reasons given were my negative influence on him,” Interview with Comrade Parvati (Hisila Yami), Blog Sketchy Thoughts, উপরোক্ত। ৩১ নং টীকা–ও দেখুন।

    ১৭পাঠকদের মধ্যে যাঁরা মার্ক্সবাদ–এর সঙ্গে স্বল্প–পরিচিত, তাঁদের সাহায্যার্থে এই টীকা যোগ করছি। অন্যান্য দর্শনের সঙ্গে মার্ক্সবাদের ভিন্নতা কার্ল মার্ক্সের (১৮১৮–১৮৮৩) এই বিখ্যাত উক্তিতে ধরা পড়ে: এ যাবৎকাল পর্যন্ত দার্শনিকরা বিশ্ব–সংসারের নানা ধরনের ব্যাখ্যাই দিয়েছেন শুধু, কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে এই ব্যবস্থার বদল ঘটানো (“The philosophers have only interpreted the world, in various ways; the point is to change it”)। আর একারণেই মার্ক্সবাদ একটি বিপ্লবী দর্শন, যাঁরা মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী তাঁরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বদল ঘটাতে বদ্ধপরিকর, তাঁরা সাম্যবাদী সমাজ বাস্তবে প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেন; মার্ক্সবাদী দর্শনের ভিত্তিতে বিপ্লব সংগঠিত করেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনীতি ব্যক্তির মালিকানাধীন; মালিকরা সমাজের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, সম্পদ তাদেরই নিয়ন্ত্রণে যাতে তারা নিরন্তর মুনাফালাভ করে আরো বিত্তবান, আরো শক্তিশালী হতে পারেন। এই উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাধারণীকৃত পণ্য উৎপাদন (generalised commodity production), অর্থাৎ, ব্যবস্থাটি এমনভাবে গঠিত যাতে সমাজ–জীবনের নানাবিধ দিক প্রতিনিয়ত এবং অবিরামভাবে বেচা–কেনা বা বাজারের চক্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ একটি সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা, এতোটাই যে, পারিবারিক সম্পর্ক পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টাকার সম্পর্কে পরিণত হয়। শিল্পায়নের উত্থান সাধারণ মানুষকে সামন্তবাদী প্রভুর প্রজা থেকে মুক্ত করেছে ঠিকই কিন্তু এই স্বাধীনতা শুধু শ্রম–বিক্রির স্বাধীনতা যাতে শিল্প–শ্রমিক পুঁজিপতি দ্বারা শোষিত হতে পারে; যাতে শিল্পপতি/পুঁজিপতিরা মুনাফা অর্জন করতে পারে। পুঁজিবাদের এই অসম ও অন্যায় ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ভাঙতে হবে, সর্বহারা শ্রেণীর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে হবে যাতে সমাজতান্ত্রিক ধারায় সমাজের রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হয়।

    ১৮সনাতনী মার্ক্সবাদীদের দৃষ্টিতে পুরুষাধিপত্যের মূল কারণ হচ্ছে শ্রেণী বৈষম্য, এর বিপরীতে র‌্যাডিকাল নারীবাদীরা মনে করেন, মানুষের মধ্যে বিরাজমান সবধরনের বৈষম্য ও আধিপত্যের (এমনকি শ্রেণী ও নরবর্ণভিত্তিক আধিপত্যের–ও) মূল কারণ হচ্ছ লিঙ্গীয় বৈষম্য বা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দেখুন, Ann Ferguson and Nancy Folbre, ÒThe Unhappy Marriage of Patriarchy and Capitalism,Ó Women and Revolution, পৃ. ৩১৪। বিষয়গুলো এই অংশের ‘২খ. তত্ত্বের সমস্যা’–য় আরো বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে।

    ১৯সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা র‌্যাডিকাল নারীবাদীদের সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের অস্তিত্বের ব্যাপারে একমত, কিন্তু তারা মনে করেন না যে সমাজে বিরাজমান সকল বৈষম্য একইসূত্রে গাঁথা। তারা নারীবাদকে অপরাপর বৈষম্য–বিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গে— শ্রেণী শোষণ, নরবর্ণভিত্তিক আধিপত্য ইত্যাদি— সম্পৃক্ত করার কথা বলেন।

    ২০মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মনে করেন, পুঁজিবাদের অবসান ঘটলে পিতৃতন্ত্রেরও বিলুপ্তি ঘটবে যেহেতু নারী নিপীড়নের প্রধান কারণ হচ্ছে সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানা। শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব ও কর্মসূচীতে নারী–শ্রমিকের অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মার্ক্সবাদকে তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।

    ২১সাধারণ ধারণা হচ্ছে লেসবিয়ান মানে সমকামী নারী— নারীদের মধ্যে প্রেম–ভালোবাসা–যৌন সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ও বিশ্বাসী। এ ধরনের প্রস্তাবনায় বাদ পড়ে যায় বিষমকামীতা কিভাবে পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে, তার তাত্ত্বিক সমালোচনা।

    ২২এ্যানার্কো–ফেমিনিস্টদের দৃষ্টিতে পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই রাষ্ট্রের বিলুপ্তির লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত। রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে এ্যনার্কিজম যেহেতু সবধরনের ক্ষমতা–সম্পর্কের বিরোধী, তাই স্বাভাবিকভাবে অনেক নারীবাদী এ্যানার্কিজমের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

    ২৩মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী আন্দোলন শুরু হয় ব্ল্যাক লিবারেশন মুভমেন্ট ও উইমেন্স মুভমেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা প্রথমটি থেকে বেরিয়ে আসেন কারণ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের দৃষ্টিতে নরবর্ণবাদী অত্যাচার ও নিপীড়ন সর্বসর্বা, বৈষম্য–ব্যবস্থা হিসেবে পিতৃতন্ত্র সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ না; দ্বিতীয়টি ছাড়ার কারণ শ্বেতাঙ্গ নারীদের কাছে নরবর্ণভিত্তিক বিভাজন, শত শত বছরের বর্ণবাদী ইতিহাস অবজ্ঞার পাত্র, আর এভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা আলাদা ও স্বতন্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী তাত্ত্বিক প্যাট্রিশিয়া হিল কলিন্স’মতে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী হচ্ছেন তিনি যিনি সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা ও চিন্তার তত্ত্বায়ন ঘটান যা ব্যক্তিসত্তা, সম্প্রদায় ও সমাজের অবস্থাকে বিষেøষণ করতে সাহায্য করে।

    ২৪Betty Friedan, The Feminine Mystique (New York: Dell publishing Co., 1963), পৃ. 11|

    ২৫মূল টেক্সটের প্রতি সততার তাগিদ থেকে “fuck”-এর বঙ্গানুবাদে “চোদা” শব্দ ব্যবহার করেছি; ভদ্রসমাজের রীতি–নীতি অনুসারে, বিশেষ করে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত নারীর ওপর ভদ্রতা রক্ষার যেই দায়ভার বর্তায়, এটি হয়তবা একটি অমার্জনীয় অপরাধ।

    ২৬“[class struggle and women’s liberation] are very close. Women were the first to be oppressed, and will be the last to be liberated when class oppression ceases. So the test of whether class oppression still exists is if women’s oppression still exists or not,” Interview with Comrade Parvati (Hisila Yami), Blog Sketchy Thoughts, পূর্বোক্ত।

    ২৭“…communist men should know that the revolution and the gains of revolution can only be preserved and furthered when more and more women join and lead the revolution.” Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত|

    ২৯“…communist men should know that the revolution and the gains of revolution can only be preserved and furthered when more and more women join and lead the revolution.” Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত।

    ৩০নিউ এইজ–এর লেখাটি লিখেছিলাম সাড়ে ছয় বছর আগে; কল্পনাকে ১৯৯৬ সালে অপহরণ করা হয়, অর্থাৎ ১৮ বছর আগে।

    ৩১একদম হুবহু অনুবাদ নয়, যে অংশের ভিত্তিতে লেখা তা তুলে ধরছি, “One of the most apparent reasons is the institution of marriage, which has robbed us of promising women leaders. People’s War seems to be changing that pattern, however, even within PW the question of continuity of women’s leadership keeps coming up, especially when they get married and decide to have children.. Added to this is the unilateral burden a woman has to carry when she becomes a mother. With the birth of every child she sinks deeper into domestic slavery. In fact many women who have been active in People’s War in Nepal are found to complain that having babies is like being under disciplinary action, because they are cut off from the Party activities for a long period. In this way many bright aspiring communist women are at risk of being lost in oblivion, even after getting married to the comrades of their choice… [W]omen seldom get support system from the mass as well as from the Party to sustain themselves in their reproductive years…. There is also the tendency to create pressure on women cadres to get married covertly or overtly as unmarried women draw lots of suspicion from men as well as women for their unmarried status. This results in marriages against their wishes or before they are ready to get married. Also there is a tendency to take sexual offenses more seriously than political offenses.” উপরোক্ত।

    ৩২জেনি মার্ক্স (১৮১৪–১৮৮১) ছিলেন অত্যন্ত সুশিক্ষিত একজন নারী ও কার্ল মার্ক্সের স্ত্রী; ১৮৪৮ সালে ব্রাসেল্স পুলিশ জেনিকে আটক করে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়।

    ৩৩নাদেজদা ক্রুপস্কায়া (১৮৬৯–১৯৩৯), রুশ বিপ্লবী ও রাজনীতিবিদ লেনিনের স্ত্রী।

    ৩৪ লিও জোগিশ (১৮৬৭–১৯১৯), মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, রোজা লুক্সেমবার্গের কমরেড ও প্রেমিক।

    ৩৫Teresa L. Ebert, “Alexandra Kollontai and Red Love,” July-August 1999, www.solidarity-us.org|

    ৩৬পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে আমি পুরুষ বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্স বলছি, পুরুষালি বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্স বলছি না। আমার দৃষ্টিতে সেটি প্রমাণসাপেক্ষ, গবেষণাসাপেক্ষ।

    ৩৭“বলা বাহুল্য আমি মার্ক্সের অনুসারী…,” সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা। সাদ্দাম হোসেন, ইলিয়াস মিলন, মোহাম্মদ আজম, মোহাম্মদ রোমেল, এবাদুর রহমান (সম্পাদনা), ঢাকা: সূচীপত্র, ২০০৪, পৃ. ৬৮।

    ৩৮এটি একটি চলমান কাজ। বদরুদ্দীন উমর (সম্পাদিত) “নারী পশ্ন প্রসঙ্গে” (ঢাকা : শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৩) উমরের প্রবন্ধ (বইয়ের নামেই, “নারী পশ্ন প্রসঙ্গে”) নিয়ে কাজ শেষ হয়নি, তাই সৈকত হাবিব–এর সংকলনে এই প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি।

    ৩৯“পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা,” আজকের কাগজ, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭। সাক্ষাৎকারগ্রহণকারির নাম অনুল্লিখিত । পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে, সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা। উপরোক্ত।

    ৪০‘আনসার বিদ্রোহ’ লেখার জন্য ফরহাদ মজহার ১৯৯৫ সালে, বিশেষ ক্ষমতা অধ্যাদেশ বলে, গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী হন। বিদ্রোহটি দমন করেছিল সেনাবাহিনী। কারাবন্দী আনসারদের যাতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে মুক্ত করা হয়, মজহার এটি লিখেছিলেন। হাই কোর্ট তাঁর বন্দীত্ব বেআইনী ঘোষণা করে। ২৮ দিন পরে তিনি মুক্তি পান।

    ৪১“পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা,” উপরোক্ত, পৃ. ৮০।

    ৪২ পৃ. ৮১।

    ৪৩ পৃ. ৮১।

    ৪৪ পৃ. ৮১।

    ৪৫ পৃ. ৮১।

    ৪৬ পৃ. ৮১।

    ৪৭ পৃ. ৮২।

    ৪৮ পৃ. ৮২।

    ৪৯ পৃ. ৮২।

    ৫০ পৃ. ৮২।

    ৫১ পৃ. ৮২।

    ৫২এখানে “লিঙ্গ” শব্দের ব্যবহার খুবই phallocentric। “লিঙ্গ” বলতে মজহার এখানে পুরুষ লিঙ্গ–ই বোঝাচ্ছেন।

    ৫৩ পৃ. ৮১।

    ৫৪ পৃ. ৮২।

    ৫৫ পৃ. ৮১।

    ৫৬ পৃ. ৮১।

    ৫৭ পৃ. ৮১।

    ৫৮ c„. 81|

    ৫৯ c„. 81|

    ৬০Medicalisation: কোনো দশা বা আচরণকে চিহ্নিত করা, একটি বর্গ তৈরি করে তার মধ্যে সেটিকে ঢুকিয়ে দিয়ে বলা যে এটিকে স্বাভাবিক করতে হলে তার চিকিৎসা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ বা ঔষধপত্র প্রয়োজন।

    ৬১ এর জোড় শব্দ হচ্ছে “মিসেস,” এ দেশের নারীর আধুনিক বশ্যতার প্রতীক, ‘একজন’ স্বামীর প্রতি আনুুগত্যের সামাজিক চিহ্ন।

    ৬২ সাজ্জাদ শরিফ–এর গ্রহণ করা এই সাক্ষাৎকারটি দৈনিক বাংলা বাজার–এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    ৬৩পৃ. ৮৭।

    ৬৪ “আজি বিহানে উঠিয়া বাসি কাম সারিয়া/গোবর ফালায় মোর ময়নামতী মাইয়া…”। দেখুন সামনা সামনি, পৃ. ৮৮–৮৯।

  • হাওয়ার্ড জিন।। মার্কস ইন সোহোর ভূমিকা

    হাওয়ার্ড জিন।। মার্কস ইন সোহোর ভূমিকা

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    [প্রখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও গণ–বুদ্ধিজীবী হাওয়ার্ড জিনের মার্কস ইন সোহো নাটকের ভূমিকার বর্তমান অনুবাদটি করা হয়েছে Beacon Press, Boston কর্তৃক প্রকাশিত হাওয়ার্ড জিনের Three Plays: The Political Theater of Howard Zinn (2010) বই থেকে। – সম্পাদক]

    হাওয়ার্ড জিন

    মূল অনুবাদ:

    আনুমানিক সতেরো বছর বয়সে আমি প্রথমবারের মতো কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়েছিলাম। আমাদের শ্রমজীবী পাড়ায় তরুণ কমিউনিস্টদের অনেকে ছিলেন। খুব সম্ভবত তাদেরই কোনো একজনের কাছ থেকে আমি বইটা পেয়েছিলাম। বইটা পড়ে আমি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলাম। কারণ আমার নিজের জীবন, আমার বাবা–মা’র জীবন এবং ১৯৩৯ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক যে পরিস্থিতি আমি দেখেছি; ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং শক্তিশালী বিশ্লেষণের আলোকে, সেই পরিস্থিতিরই মোক্ষম ব্যাখ্যা যেন বইটাতে পাওয়া যাচ্ছে।

    আমি দেখতে পাচ্ছিলাম মাত্র চতুর্থ শ্রেণি অব্দি পড়াশোনা করা আমার অস্ট্রীয় অভিবাসী বাবা প্রচণ্ড খাটাখাটনি করেও তাঁর স্ত্রী ও চার পুত্রকে খাওয়াতে–পরাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। আমি আরও দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের খাওয়া–পরা ও অসুখ–বিসুখ হলে সেবাযত্ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আমার মা দিনরাত খেটে মরছেন। তাঁদের জীবন যেন টিকে থাকার এক নিরন্তর কুরুক্ষেত্র। ততদিনে আমাদের দেশেরই বিপুল সম্পদের মালিক লোকেদের কথা আমি জেনে গিয়েছিলাম, যারা নিশ্চিতভাবেই আমার বাবা–মার তুলনায় অনেক কম পরিশ্রম করতেন। ব্যবস্থাটা ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না।

    আকালের (depression) সেই কালে আমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছিলাম দারিদ্র‍্যের কষাঘাতে জর্জরিত সব পরিবার। তাদের এই দারিদ্র‍্যের জন্য অবশ্য তারা নিজেরা দায়ী ছিল না। বাড়ি ভাড়া দিতে না পারার দরুন ভূ–স্বামী তাদের মালামাল বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। ভূ–স্বামীরা আইনের মদদপ্রাপ্ত। ততদিনে পত্রিকা পড়ার সুবাদে এও জেনে ফেলেছিলাম তামাম দেশে এই একই অবস্থা। আমি বেশ কড়া পাঠক ছিলাম। তেরো বছর বয়স থেকে শুরু করে ডিকেন্সের ম্যালা উপন্যাস সাবাড় করে ফেলেছিলাম। ডিকেন্স পাঠ আমার মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুতীব্র এক ক্রোধ উস্কে দিয়েছিল এবং মালিকশ্রেণি ও আইনি ব্যবস্থার দ্বারা লাঞ্ছিতদের প্রতি গভীর সহানুভূতির জন্ম দিয়েছিল। তারপর, ১৯৩৯ সালে এসে, জন স্টেইনবেকের The Grapes of Wrath পড়লাম এবং সেই সুতীব্র ক্রোধ আমার মনে ফিরে এলো। তবে এবারকার ক্ষোভ আমার নিজের দেশের ধনী ও ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে।

    মেনিফেস্টোতে মার্কস ও এঙ্গেলস (মার্কসের বয়স ছিল তিরিশ, এঙ্গেলসের আটাশ এবং এঙ্গেলস পরবর্তীতে বলেছিলেন যে মূল রচয়িতা ছিলেন মার্কস) ঠিক সেই বর্ণনাই দিয়েছিলেন যা আমি পড়ছিলাম, আমার চারপাশে প্রত্যক্ষ করছিলাম। অর্থাৎ এটা উনিশ শতকের ইংল্যান্ড কিংবা আকালের যুগের মার্কিন মুল্লুকের বিশেষ কোনো বিপর্যয় ছিল না, এটা ছিল খোদ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তস্থিত অসারতা। এই ব্যবস্থাকে যদিও আধুনিক দুনিয়ায় ব্যাপক সুরক্ষা দিয়ে রাখা হয়, এটা কোনো শাশ্বত ব্যবস্থা নয়। ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট পর্বে এর আবির্ভাব ঘটেছিল এবং এই ব্যবস্থাকে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিয়ে সমাজতন্ত্রকে একদিন না একদিন পাওনা জায়গা দিতেই হবে। পুরো ভাবনাটা বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।

    মার্কস ও এঙ্গেলস মেনিফেস্টো শুরু করেছেন এই ঘোষণার মাধ্যমে: “এখন পর্যন্ত বিদ্যমান তাবৎ সমাজের ইতিহাস আদতে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস।” তার মানে হলো ধনী–গরিব ব্যক্তি হিসেবে না, শ্রেণি হিসেবে পরস্পরকে মোকাবেলা করে। এতে করে তাদের দ্বন্দ্ব বিরাট হয়ে ওঠল। এর ফলে এও পরিষ্কার হলো যে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশা দুনিয়ার শ্রমিক মেহনতি মানুষদের একই পরিচয়ে আবদ্ধ করছে— তারা সকলেই শ্রমজীবী শ্রেণির অন্তর্গত।

    এই শ্রেণি সংগ্রামে সরকার–রাষ্ট্রকে কী ভূমিকায় দেখা যায়? সমস্ত সরকারি ভবনের সম্মুখভাগের দেয়ালে খোদাই করা থাকে, “সকলের জন্য সমান ন্যায়বিচার।” এদিকে মেনিফেস্টোতে মার্কস ও এঙ্গেলস মহাশয় লিখে রেখেছেন, “আধুনিক রাষ্ট্রীয় পুরোহিতগণ গোটা বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ স্বার্থ রক্ষার একটা কমিটি মাত্র।” তারা এখানে একটা পিলে–চমকানো ধারণা সমেত হাজির: সমস্ত ভানটান করার পরেও সরকার–রাষ্ট্র এগুলো আসলে ধনিক শ্রেণির খেদমতগারি করে মাত্র। রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো মোটেও নিরপেক্ষ ধাঁচের কিছু নয়।

    সতেরো বছর বয়সে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম যে, এগুলো বেশ চমকপ্রদ ধারণা। আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরা আমাকে টাইমস স্কয়ারের সমাবেশে নিয়ে গেল। শত শত মানুষ ব্যানার ঝুলিয়ে যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী পদযাত্রায় অংশ নিয়েছে। সাইরেনের ধ্বনি শুনতে পেলাম। অশ্বারোহী পুলিশ বিক্ষোভরত জনতার ওপর হামলে পড়লো। সাদা পোশাকধারী এক পুলিশের ডাণ্ডার আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পরে মাথা পরিস্কার হতেই কেবল একটা চিন্তাই মস্তিষ্ককে কুরে কুরে খাচ্ছিল: পুলিশ, রাষ্ট্র সব সম্পদওয়ালাদের তল্পিবাহক। আপনার কতটুকু জবানের স্বাধীনতা আর কতটুকু জমায়েতের স্বাধীনতা থাকবে তা মূলত নির্ভর করে আপনার শ্রেণি অবস্থানের ওপর।

    আঠারো বছর বয়সে ব্রুকলিনের এক জাহাজ নির্মাণ কারখানায় শিক্ষানবিশ মেরামতকারী হিসাবে কাজ করতে গেলাম। আমার কাজ ছিল যুদ্ধ জাহাজের বহিরাঙ্গে ঢালাই এর মাধ্যমে ইস্পাতের প্লেট লাগানো। ততদিনে আমি বেশ “শ্রেণি–সচেতন”। জাহাজ মেরামতের কাজে গিয়ে আমার মতো আরও তিনজন তরুণ শ্রমিক জুটিয়ে ফেললাম। আমরা চারজনে মিলে এমনসব শিক্ষানবিশ শ্রমিকদের সংগঠিত করতে শুরু করলাম যাদের কিনা জাহাজ–শিল্প ইউনিয়ন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। আমরা আরও ঠিক করলাম যে, সপ্তাহান্তে আমরা জড়ো হবো এবং মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনাদি পড়বো।

    এভাবেই মার্কসবাদী দর্শন সম্পর্কে এঙ্গেলসের ব্যাখ্যার সাথে পরিচিত হলাম তাঁর অ্যান্টি–ড্যুরিং বইয়ের মাধ্যমে। বইটা ছিল ড্যুরিং নাম্নী একজন দার্শনিকের সাথে এঙ্গেলসের যুক্তি–তর্ক। তারপর কায়ক্লেশে Das Kapital-এর প্রথম খণ্ডটুকুও পড়ে শেষ করলাম। চরম উত্তেজনাসহ খেয়াল করলাম ব্যবস্থাটা যেন আমার সামনে নাঙ্গা হয়ে গেছে। সমস্ত ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জটিলতার আড়ালে গোড়ার সত্যটা হলো: সমস্ত মূল্যের উৎস মূলত শ্রম। অল্প মজুরির তুলনায় শ্রম অনেক বেশি মূল্য উৎপাদন করে এবং ধনিক শ্রেণি সেই উদ্বৃত্ত মূল্যটাই পকেটস্থ/আত্মসাৎ করে। পুঁজিবাদের বেকারত্ব দরকার যেন সবসময় মজুরি কমিয়ে রাখা যায়; শ্রমিকদের রিজার্ভ আর্মি। এই ব্যবস্থা পণ্য–সামগ্রীর, বিশেষত টাকার (“পণ্য–পূজা”), যতটা খায়খাতির করে মানুষের ততটা করে না। সুতরাং বিনিময় মূল্য দিয়ে জীবনে কি ভালো আর কি মন্দ তার পরিমাপ চলে।

    মার্কসবাদী তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে যে শোষণ ও শ্রেণি–সংগ্রাম দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল কোনো ঘটনা নয়। তবে পুঁজিবাদ একে তীব্রতম বিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে এবং একটা বৈশ্বিক মাত্রায়। মানব বিকাশের একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ইতিহাসে পুঁজিবাদ একটা প্রগতিশীল শক্তি হিসাবেই অস্তিত্বশীল ছিল। মেনিফেস্টোর ভাষ্য অনুযায়ী: “ঐতিহাসিকভাবে বুর্জোয়ারা বেশ বিপ্লবী ভূমিকাই পালন করেছে।” এরা ব্যাপক মাত্রার প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সাধন করেছে এবং অঢেল সম্পদ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়েছে অতি গুটিকয়েকের হাতে। ক্রমবর্ধমান গতিতে সংগঠিত উৎপাদিকা শক্তি এবং বিশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটা মৌলিক দ্বন্দ্ব ছিল। এক পর্যায়ে এসে শোষিত সর্বহারা শ্রেণি সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ করবে এবং ক্ষমতা দখল করবে। এর ফলে পুঁজিবাদী শ্রেণির রমরমার বদলে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর নিমিত্তে অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে।

    মার্কসের সাথে এই ছিল আমার শুরুর দিককার মোলাকাত। কয়েক বছর বাদে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অষ্টম বিমান বাহিনীতে বোমা–নিক্ষেপকারীর কাজ করলাম। জি. আই. বিলের সহায়তায় স্কুল–কলেজের পর্ব ডিঙিয়ে গ্র‍্যাজুয়েট হলাম। তারপর আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানের সহায়তায় প্রথমে দক্ষিণের স্পেলম্যান কলেজে ইতিহাস ও রাজনীতি শাস্ত্র পড়াতে শুরু করলাম। স্পেলম্যানে সাত বছর কাটানোর পর বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি গ্রহণ করার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে থিতু হলাম। আমার পড়ানো রাজনৈতিক তত্ত্ব কোর্সে আমি মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনাদিতে গভীরভাবে মনোনিবেশ করলাম।

    ১৯৬০-এর শেষের দিকে বেশ কিছু কারণে আমি নৈরাজ্যবাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলাম। তন্মধ্যে একটা কারণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রমবর্ধমান স্ট্যালিনবাদী বিভীষিকার নজির। এর ফলে ধ্রুপদী মার্কসবাদের ‘সর্বহারার একনায়কতন্ত্র’ ধারণাটির পুনর্মূল্যায়নের জরুরত দেখা দিলো। আরেকটা কারণ ছিল দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণবাদ–বিরোধী লড়াই–এ আমার অভিজ্ঞতা। এই লড়াইয়ে সামনে ছিল অহিংস ধারার শিক্ষার্থীদের কো–অর্ডিনেশন কমিটি (এসএনসিসি ওরফে “স্নিক” নামে যেটি পরিচিত ছিল)। কোনো প্রকারের সচেতন তত্ত্বায়ন ছাড়াই এই আন্দোলন নৈরাজ্যবাদী নীতিতে ক্রিয়াশীল ছিল: কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ছিল না, তৃণমূলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি। ১৯৬০-এর দিককার নব্য–বামপন্থীরা এর নাম দিয়েছিল “অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র”।

    স্ত্রী জেনির সাথে কার্ল মার্কস

    নৈরাজ্যবাদ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। শুরুতেই মার্কিন নৈরাজ্যবাদী–নারীবাদী এমা গোল্ডম্যান ও তাঁর বন্ধু আলেক্সান্ডার বার্কম্যান পড়তে থাকলাম। পিওতর ক্রপোৎকিন ও মিখাইল বাকুনিনও পড়লাম। বিপ্লবের তরিকা প্রশ্নে বাকুনিন ছিলেন কট্টর মার্কস–বিরোধী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতা করার কারণে ১৯১৯ সালে এমা গোল্ডম্যান আমেরিকা থেকে বিতাড়িত হয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে তিনি লক্ষ্য করলেন যে সদ্যজাত সোভিয়েত রাষ্ট্র কেবল বুর্জোয়া বিরোধিদেরকেই নয়; বরং ভিন্নমতাবলম্বী বিপ্লবীদেরও কারাবন্দি করছে। সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের সঙ্গে এই চরম গাদ্দারি ঘটতে দেখে এমা ক্ষমতাসীন বলশেভিক দল ও নেতৃবৃন্দের কড়া সমালোচনা করলেন। নৈরাজ্যবাদী চিন্তা–ভাবনার দিকে আমার এই নিমজ্জন আমাকে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে “মার্কসবাদ ও নৈরাজ্যবাদ” বিষয়ে সেনিমার আয়োজনে উদ্বুদ্ধ করলো।

    ১৯৬৫ থেকে (এই বছর ভিয়েতনামে যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছিল) ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত (এ বছর সাইগন সরকার আত্মসমর্পণ করেছিল) সময়টাতে আমি যুদ্ধ–বিরোধী আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম এবং ওই সময়ে আমার যাবতীয় লেখাজোখাও ছিল যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে। যুদ্ধ থামার পরেই কেবল আমি অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারছিলাম। এমা গোল্ডম্যানকে নিয়ে এমা নামে একটা নাটক লিখে ফেললাম এবং নাটকটা প্রথমে বস্টন, নিউইয়র্ক, কয়েক বছর বাদে লন্ডন ও টোকিওতে মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকের একটা দৃশ্য ছিল এমন: নিউইয়র্কের তরুণ বিপ্লবীরা একটা ক্যাফেতে বসে মার্কস বনাম বাকুনিন তুমুল তর্কে মেতে ওঠেছে।

    এই চিন্তকদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী ছিলাম। এমা গোল্ডম্যানের আত্মজীবনী Living My Life বইটি তাঁর ঝটিকাসঙ্কুল বিদ্রোহী রাজনৈতিক ও যৌনজীবনের অকপট বিবরণীতে ঠাসা। মার্কস কখনোই কোনো আত্মজীবনী লেখেননি। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ধারণা পেতে বেশ কিছু জীবনীগ্রন্থ আমাকে পড়তে হয়েছে। মার্কস তনয়া এলিয়েনরকে নিয়ে চমৎকার একটি বই লিখেছেন ইংরেজ লেখক ইভান কাপ। এই বইয়ে লন্ডন নিবাসী মার্কস পরিবারের বিস্তারিত বিবরণ আছে।

    ইউরোপের একের পর এক দেশ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মার্কস ও জেনি লন্ডনে আশ্রয় নেন। ঘিঞ্জি সোহো অঞ্চলে তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল। তামাম ইউরোপের বিপ্লবীরা লন্ডনে এসেই মার্কস–জেনির ডেরায় ঢুঁ মারতো। ঘরোয়া পরিস্থিতিতে জেনি ও এলিয়েনরের সঙ্গে মার্কসের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের কল্পিত দৃশ্য আমাকে অভিভূত করতো। এমা নাটকটা নিয়ে আমার সুখকর অভিজ্ঞতা আমাকে থিয়েটারের দুনিয়ায় ঢুকতে প্রলুব্ধ করেছিল এবং আমি কার্ল মার্কসকে নিয়ে একটা নাটক লিখতে শুরু করলাম। লোকে চেনে না এমন এক মার্কসকে আমি তুলে ধরতে চাইলাম। একজন গৃহী মানুষ যিনি বউ–সংসার–সন্তানাদির ভরণপোষণ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন; যার তিনটা বাচ্চা অকালে মারা গেছে। তিন কন্যা বেঁচে আছে।

    আমি দর্শকদের দেখাতে চাইছিলাম যে, মার্কস তাঁর চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে হওয়া সাঁড়াশি আক্রমণ মোকাবেলা করছেন। আমি জানতাম তাঁর স্ত্রী জেনি নিজে একজন সমীহ–জাগানিয়া চিন্তক ছিলেন এবং কল্পনা করতে চাইলাম যে তিনি আকসার/হরদম মার্কসকে মোকাবেলা করছেন। আমি আরও জানতাম এলিয়েনর একটা অকালপক্ব অসম্ভব প্রতিভাবান বাচ্চা ছিল, যে কিনা প্রায়ই মার্কসের নিগূঢ় তত্ত্বসমূহ চ্যালেঞ্জ করে বসতো। আমি চাইছিলাম মার্কসের প্রধান ধারণাগুলো নৈরাজ্যবাদী পর্যালোচনার অধীনে আসুক এবং এজন্যই মার্কসের বাড়িতে বাকুনিনের আগমনের ঘটনা সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। (আদতে বাস্তবে বাকুনিনের মার্কসের বাড়িতে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনার নজির নেই; তবে বাকুনিন ও মার্কস পরস্পরের বেশ ভালো জানাশোনা ছিলেন। শ্রমজীবিদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনালে তাঁরা একে অপরের চরম বিরোধী ছিলেন।)

    মার্কস বিষয়ক সাধারণ মূল্যায়নে আমি বরাবরই একটা দিকের অভাববোধ করতাম। সবসময় চিন্তক ও তাত্ত্বিক মার্কসকে ঘিরেই বেশি আলোচনা হতো। কিন্তু আমি জানতাম একজন বিপ্লবী হিসেবে মার্কসের সক্রিয়তা ছিল তাক লাগানোর মতো; প্রথমে জার্মানিতে ছিলেন প্রতিবাদী সাংবাদিক, তারপর প্যারিসে শ্রমিক সংঘে ও ব্রাসেলসের কমিউনিস্ট লীগে। ১৮৪৮ সালের ইউরোপীয় বিপ্লবের যুগে তিনি রাইনল্যান্ডে সক্রিয় ছিলেন, যার ফলে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। আদালতে এক নাটকীয় বক্তৃতা দিয়ে সে যাত্রায় তিনি পার পেয়েছিলেন। লন্ডনে হিজরত করার পর তিনি আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘের সাথে জড়িত হলেন আইরিশ মুক্তি আন্দোলনের সমর্থনে। ১৮৭১ সালে মার্কস প্যারি কমিউনের সমর্থনেও সক্রিয় ছিলেন।

    সেই সময়ে মার্কস কেবল Das Kapital-এর মতো রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ক তাত্ত্বিক রচনাই লেখেননি। পাশাপাশি ১৮৪৮ এর বিপ্লব, প্যারি কমিউন, মহাদেশজুড়ে শ্রমিক সংগ্রামের মতো রাজনৈতিক ঘটনাবলির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, সংগঠিত করেছেন। সুতরাং আমি মঞ্চে মার্কসের এই অন্য দিকটা তুলে ধরতে চাইলাম— একজন ত্যাগী ও সংলিপ্ত বিপ্লবী। আমার লেখা নাটকের কুশীলব হিসাবে ছিল মার্কস নিজে, তাঁর স্ত্রী জেনি, মেয়ে এলিয়েনর, বন্ধু এঙ্গেলস ও তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বাকুনিন। বস্টনে নাটকটা সাদরে গৃহীত হয়েছিল, কিন্তু আমার মধ্যে একটা খচখচানি থেকেই গেল। এরপর আমি নাটকটাকে একক চরিত্র নির্ভর নাটক বানিয়ে ফেললাম।

    আমার স্ত্রী রোজলিন বরাবরই আমার লেখাপত্রের একজন আন্তরিক সমালোচক। সে আমাকে ক্রমাগত খোঁচাতে থাকল আমি যেন নাটকটাকে উনিশ শতকের ইউরোপ ও মার্কসের গণ্ডিতে আবদ্ধ না করে একে আমাদের বর্তমান সময়ের সাপেক্ষে আরও প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক করে তুলি। আমার মনে হলো রোজলিন মোক্ষম বুদ্ধিটাই দিয়েছে। অগত্যা আদি পাণ্ডুলিপিটার সাথে বেশ কসরত করে শেষতক এই ফন্দি আঁটলাম যে মার্কস যেখানেই থাকুন না কেন, বর্তমান সময়ে প্রত্যাবর্তন করবেন। শুধু তাই নয়, তিনি ফিরবেন মার্কিন মুল্লুকে। ফলে তিনি উনিশ শতকের ইউরোপে তাঁর জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি ঘটনাবহুল বর্তমান প্রসঙ্গেও কথা বলবেন। সিদ্ধান্ত নিলাম নাটকে কোনো এক কর্তৃপক্ষের প্রসঙ্গ রাখবো যাদের আমলাতান্ত্রিক গলদের কারণে লন্ডনস্থ সোহোর বদলে তারা মার্কসকে পাঠিয়ে দেবেন নিউইয়র্কস্থ সোহোতে।

    মার্কসের দুই কন্যা লরা ও ক্যারোলিন

    একক চরিত্র নির্ভর নাটক হলেও, স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে মার্কস তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকেও জীবিত করে তুলবেন; বিশেষত তাঁর স্ত্রী জেনি, তনয়া এলিয়েনর। নৈরাজ্যবাদী বাকুনিনকেও মার্কস ফিরিয়ে আনবেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নানাভাবে মার্কসের চিন্তাগুলোকে নির্মম সমালোচনার মুখোমুখি করবে। খোদ মার্কসই তাঁর যুক্তি–তর্কগুলোতে পুনরায় আলোকপাত করবেন এবং পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দ্বান্দ্বিকতা সৃষ্টি হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কালে আমি নাটকটা লিখেছিলাম। তখন মূল ধারার সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতাদের উচ্ছ্বাস যেন উপচে পড়ছিল: শুধু ‘শত্রু’ই বিদায় নেয়নি, মার্কসবাদের আবেদনও যেন ফুরালো। পুঁজিবাদ ও ‘মুক্ত বাজার’ জয়লাভ করেছে। মার্কসবাদ ব্যর্থ। মার্কস যেন সত্যি সত্যিই মৃত। ফলে আমি ভাবলাম কয়েকটা জিনিস পরিষ্কার করা দরকার: সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা নিজেদের ‘মার্কসবাদী’ হিসাবে পরিচয় দেয়া অপরাপর রাষ্ট্র যেগুলো কিনা নিজ নিজ দেশে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছে, তারা কেউই মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে না। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে মার্কস তাঁর তত্ত্বের ভয়াবহ বিকৃতি দেখে যারপরনাই ক্ষুব্ধ। সেই বিকৃতি এতটাই যে স্ট্যালিনবাদী বর্বরতাকেও মার্কসবাদের নামে চালানো হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন জুলুমতন্ত্র কায়েম করা ভুয়া–সমাজতন্ত্রীদের খপ্পর থেকে তো বটেই; এমনকি পশ্চিমা যে সকল লেখক ও রাজনীতিবিদ পুঁজিবাদের ‘বিজয়ে’ বেশ গদগদ, এদের হাত থেকেও মার্কসকে হেফাজত করার প্রয়োজন অনুভব করলাম। আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে, মার্কসের পুঁজিবাদ বিষয়ক সমালোচনা আজতক মৌলিকভাবে সঠিক। দৈনিক পত্রিকার শিরোনামসমূহ দৈনিক তাঁর বিশ্লেষণের যথার্থতার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। মার্কস তাঁর সময়ের প্রাযুক্তিক ও সামাজিক পরিবর্তনের যে বিশৃঙ্খলা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা বর্তমান সময়ে যেন আরও প্রকট বাস্তব। মেনিফেস্টোতে মার্কস ও এঙ্গেলস বলছেন:

    উৎপাদনের বিরামহীন বিপ্লবীকরণ, সমস্ত রকমের সামাজিক অবস্থার নির্বিঘ্ন গোলমাল, চিরস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও নিরন্তর ক্ষোভ বুর্জোয়া যুগকে পূর্বের যে–কোনো যুগ থেকে আলাদা করে। জগদ্দল পাথরের ন্যায় জমাট–বাঁধা সম্পর্কপ্রণালী ও তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সনাতনি কুসংস্কার, মতামতকে স্রেফ ধুয়েমুছে সাফ–সুতরো করা হয়। নবগঠিত কোনো কিছু পোক্ত হবার আগেই সেকেলে হয়ে ওঠে। যা কিছু কঠিন, মিলিয়ে যায় বাতাসে।

    আমরা আজ যাকে ‘গ্লোবায়ন’ (globalization) বলি, মার্কস তার পরিষ্কার ইশারা দিয়েছিলেন। আরও একবার মেনিফেস্টোর উদ্ধৃতি:

    নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য সদা–প্রসারিত বাজারের খোঁজে বুর্জোয়াদের বিশ্বের প্রত্যেক প্রান্ত চষে বেড়াতে হয়। সবখানে তাদের বাসা বাঁধতে হয়, থিতু গাড়তে হয় এবং সবখানে সম্পর্ক পাতাতে হয়।… পূর্বের স্থানীয় ও জাতীয় স্বাতন্ত্র‍্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্থলে বিশ্বের জাতিসমূহের অবাধ লেনদেন ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এ এক সর্বজনীন বন্দোবস্ত।

    মার্কিন সরকারের চাওয়া “মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি” মূলত বিশ্বময় পুঁজির নিরবিচ্ছিন্ন বিচরণের ক্ষেত্রে শেষ বাধাটুকু অপসারণ করার খায়েশ ছাড়া আর কিছু নয়। এর ফলে পুঁজিবাদীরা বিশ্বের সর্বত্র জনসাধারণকে চুষে ছিবড়ে বানানোর ‘বৈধ’ অধিকার পাবে।

    নাটকের চরিত্র মার্কস হালের পত্রিকার শিরোনাম পড়ে একেবারেই বিচলিত হন না। অতিকায় কোম্পানিগুলো মার্কসের সময়েও একীভূত হচ্ছিল, হাল আমলে তা আরও বিরাট আকারে হচ্ছে এই যা। তিনি বড়লোক আর গরিবের মধ্যকার ব্যবধান দেখেছিলেন, সেই ব্যবধান বর্তমানে শুধু দেশের অভ্যন্তরে হয় না, তা আজ আরও হতবুদ্ধিকরভাবে ধনী ও গরীব দেশের জনগণের মাঝে বেড়ে চলেছে।

    নাটকে মার্কস সমাজতন্ত্রের পুঁজিবাদী রূপ ধারণ করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ভুয়া–সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রেজিম–বিরোধীদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো দেখে তিনি ১৮৫৩ সালে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউন–এ অপরাধ ও শাস্তি ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর লেখার স্মরণ করছেন:

    অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানো জল্লাদের বন্দনায় মেতে উঠার চেয়ে বরং যে ব্যবস্থা অপরাধ ও অপরাধীর বারংবার জন্ম দেয়, সেই ব্যবস্থাকে পাল্টানোর চেষ্টা করার জরুরতটাই কি বেশি না?

    এমন এক সমাজে আমাদের বসবাস যাকে মার্কসের ‘পণ্য পূজা’ কথাটার মাধ্যমে যুতসইভাবে ধরা যায়। মার্কসের সমসাময়িক রালফ ওয়ালডো এমার্সন মার্কিন শিল্প ব্যবস্থার শুরু দেখে বলেছিলেন, “পণ্য–সামগ্রীই যেন মানুষ নামক ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েছে।” মানুষের জানের সুরক্ষার চেয়ে কর্পোরেট সম্পত্তির সুরক্ষা প্রদানই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিয়মান হয়। উনিশ শতকের শেষ ভাগে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে কর্পোরেশন হচ্ছে “একজন ব্যক্তি” এবং চতুর্দশ সংশোধনী মোতাবেক সুরক্ষার দাবিদার। এই সুরক্ষা কালো মানুষদের চেয়ে বেশি সুরক্ষা, যদিও সংশোধনীটির উদ্দেশ্য ছিল কালোদের রক্ষা করা।

    শিল্পী: ওয়াং-কিং-মিং

    ২৫ বছর বয়সে স্ত্রী জেনিসহ প্যারিস নিবাসী মার্কস দুর্দান্ত এক ডকুমেন্ট লেখেন, যেটা তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পরে ছাপা হয়েছিল। দ্যা ইকনমিক এন্ড ফিলসফিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট। এই লেখায় মার্কস আধুনিক জমানার মানুষের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে লিখেছেন, পুঁজিবাদ যাকে চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছে দিয়েছে। মানুষ তার শ্রম, প্রকৃতি, একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নিজের প্রকৃত সত্তার বিযুক্ত থেকে যায়। আমাদের সময়ে আমাদের চারপাশে আমরা এই তো ঘটতে দেখি এবং এর ফলে মনস্তাত্ত্বিক ও বস্তুগত দুর্দশা কায়েম হতে দেখি।

    মার্কস তার লেখালেখির বড় অংশটাই বরাদ্দ করেছেন পুঁজিবাদের মোক্ষম সমালোচনা খাড়া করার পেছনে। ফলে সমাজতান্ত্রিক সমাজের চেহারা কেমন হতে পারে তিনি তা খুব সামান্যই বলতে পেরেছেন। তবে পুঁজিবাদ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য থেকে আমরা আমাদের মতো করে শোষণহীন সমাজ কল্পনা করতে পারি। যেখানে মানুষ প্রকৃতি, নিজের কাজ ও অন্য মানুষের সাথে একইভাবে অঙ্গীভূত থাকতে পারবে। ১৮৭১ সালে ক্ষণস্থায়ী প্যারি কমিউনে সৃষ্ট সমাজের উজ্জ্বল বর্ণনা দিতে গিয়ে মার্কস যা বলেছেন, তাতে সেই ভবিষ্যতের ইশারা পাওয়া যায়। এই নাটকে আমি সেই রূপকল্পকেই মূর্ত করার চেষ্টা করেছি।

    মার্কস ইন সোহোর পাঠকেরা ভাবতে পারেন এই নাটকটা ঐতিহাসিকভাবে কতটা নির্ভুল? মার্কসের জীবনের মূল ঘটনাসমূহ এবং তাঁর সময়ের যে ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে তা মৌলিকভাবে সত্য: মার্কস ও জেনির বিয়ে, লন্ডনে হিজরত, তিন সন্তানের মৃত্যু। আরও সত্য সেই সময়ের রাজনৈতিক সংঘাতের চিত্র: আইরিশদের ইংল্যান্ড–বিরোধী সংগ্রাম, ইউরোপে ১৮৪৮-এর বিপ্লব, কমিউনিস্ট আন্দোলন, প্যারি কমিউন। মার্কস যে সকল চরিত্রের কথা বলেছেন, তারাও সত্য: তাঁর পরিবারের সদস্যরা, তাঁর বন্ধু এঙ্গেলস, চিরবৈরী বাকুনিন। সংলাপগুলো অবশ্য আমি বানিয়েছি; তবে আমি চরিত্রদের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার মূলানুগ থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে জেনি ও এলিয়েনরের সাথে মার্কসের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব কল্পনা করার ক্ষেত্রে কিছুটা রচয়িতার স্বাধীনতা গ্রহণ করেছি। তৃতীয় নেপোলিয়নের বর্ণনার ক্ষেত্রে আমি হুবুহু মার্কসের কথাই ব্যবহার করেছি।

    আমি প্রত্যাশা করি মার্কস ইন সোহো কেবল মার্কসের সময়ে মার্কসের ভূমিকার দিকেই আলো ফেলবে না; বরং, আমাদের সময়ে আমাদের ভূমিকা বিচারেও কাজে আসবে।

  • আব্দুল্লাহ্‌ ওজালান।। বিপ্লব নারীবাচক

    আব্দুল্লাহ্‌ ওজালান।। বিপ্লব নারীবাচক

    অনুবাদ: ফারজানা লিয়া

    আব্দুল্লাহ্‌ ওজালান একজন চিন্তক, দার্শনিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী । তিনি কুর্দিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সসস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (PKK) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৪ সালে কুর্দি–তুর্কি সংঘাতের সময় এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন তিনি। যার ফলে ১৯৯৯ সালে তুরস্কের সরকার তাকে বন্দি করে ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে তুরস্কে মৃত্যুদণ্ডের প্রথা বাতিল হলে ওজালানকে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত তিনি তুরস্ক সরকারের হাতে বন্দি আছেন। বন্দি অবস্থায়ই তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। ওজালানের রাজনৈতিক চিন্তা মারে বুকচিন, মিশেল ফুকো, হানাহ্‌ আরেন্ডট্‌, কার্ল মার্ক্সের মতো দার্শনিকদের পাশাপাশি নারীবাদী রাজনৈতিক চিন্তা ও মেসোপটেমিয়ার পূরাণ দ্বারাও প্রভাবিত। মূলত মারে বুকচিনের প্রভাবেই তিনি মার্ক্সিস্ট, লেনিনিস্ট ও স্তালিনীয় মতাদর্শ থেকে বের হয়ে এসে মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মারে বুকচিনের চিন্তাধারার প্রভাবেই তিনি কুর্দি প্রশ্নে হাজির করেছেন গণতান্ত্রিক কনফেডারেশনের সূত্র। ওজালানের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এমন একটি নারীবাদী রাজনীতি যেখানে তিনি নারীদের দেখেন গণতান্ত্রিক স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলার কেন্দ্রস্বরূপ। ওজালানের এই দর্শনকে যিনিওলজি (Jineology) বা নারীদের বিজ্ঞান বলা হয়। উত্তর এবং পূর্ব সিরিয়ার স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল রোজাভায় কুর্দিরা যে মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার প্রয়াস সেখানে ওজালানের গণতান্ত্রিক ফেডারেলবাদ, নারীবাদ ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারণার প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে কুর্দিস্তান কমিউনিটিজ ইউনিয়ন (KCK) ওজালানের রাজনৈতিক চিন্তাকে বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে।- সম্পাদক

    আব্দুল্লাহ্‌ ওজালান

    নারী প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবা বা লিখতে যাওয়ার মানে হচ্ছে সমগ্র ইতিহাস ও সমাজকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এর কারণ হচ্ছে নারীর উপর নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়নের নজিরবিহীন এক ব্যাপ্তি।

    এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সভ্যতার ইতিহাসকে নারীর লোকসানের ইতিহাস হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়। আর এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়—যেই ইতিহাস ঈশ্বর ও তার বান্দাদের, প্রভু আর তাদের ভৃত্যদের, কারখানার, বিজ্ঞান ও শিল্পের— সবখানেই পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। সামগ্রিকভাবে এটি পুরো সমাজেরই ক্ষতি; যার ফলস্বরুপ আমরা লিঙ্গবৈষম্যে জর্জরিত একটি সমাজ পেয়েছি।

    লিঙ্গবাদ যেমন ক্ষমতার হাতিয়ার, তেমনি এটি একটি অস্ত্রের মতোও, যা ইতিহাসজুড়ে সভ্যতার সমস্ত ব্যবস্থার মাঝেই পাকাপোক্তভাবে আসন গেড়ে বসে আছে। আদতে কোনো সামাজিক গোষ্ঠীই নারীদের মতো শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে এতটা শোষণের শিকার হয়নি। নারী নিপীড়নের বিভিন্ন রূপের ধরনগুলোও বেশ স্পষ্ট। একজন নারী উত্তরাধিকারীর জন্ম দেয়। নারী বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম বিলায়। সবার অপছন্দের কাজগুলো তারই ঘাড়ে বর্তায়। নারী হচ্ছে একজন বাধ্যগত দাস। যৌনাকাঙ্ক্ষার চিরস্থায়ী এক বস্তু নারী। নারী বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। নারী মূল্যবান ভোগ্যপণ্য, আসলে নারীই হচ্ছে সকল পণ্যের রানি। নারীই সেই ভিত্তি তৈরি করে দেয় যার উপর সহিংসতার অবিচ্ছিন্ন হাতিয়ার হিসেবে পুরুষ তার ক্ষমতা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে পারে। সভ্যতার ৫০০০ বছরের ইতিহাসকে আমরা প্রকৃত অর্থে ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ হিসেবে বর্ণনা করতে পারি।

    পুঁজিবাদের যুগে লিঙ্গবাদকে খুব নিখুঁতভাবে ভাবাদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। লিঙ্গবৈষম্যময় সমাজের উত্তরসূরি হিসেবে পুঁজিবাদ নারীকে কেবল ঘরের ভেতরেই বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ে তৃপ্ত হয়নি, নারীকে সে পরিণত করেছে যৌন বস্তুতে, বাজারে বিকানোর উদ্দেশ্যে নারীকে পরিণত করেছে ভোগ্যপণ্যে। পুরুষ যেখানে শুধু তার শ্রমই বিক্র করতে পারে সেখানে একজন নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোটাই বিক্রির বস্তু। এভাবেই দাসত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। নারীর ওপর আধিপত্য আরোপের জন্য এই ব্যবস্থা একটি কৌশলগত ভূমিকা আরোপ করে, যা শোষণ ও ক্ষমতার বিস্তারের সাথে জড়িত। নারীর উপর প্রথাগত দমনপীড়নের প্রসার ঘটার সাথে সাথে প্রতিটি পুরুষই কর্তৃত্বশীল সঙ্গী হয়ে উঠতে থাকে। এভাবেই একটি সমাজ সামগ্রিক ক্ষমতা বিস্তারের লক্ষণ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান একই সাথে সীমাহীন আধিপত্যের বোধ ও ধারণা প্রদান করে।

    নারীকে জৈবিকভাবে অসম্পূর্ণ লিঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করাটা নিখাঁদ ভাবাদর্শিক ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের ফসল। আর এই অবস্থাকে স্বাভাবিক প্রতিপন্ন করতে এই মতবাদ তাবৎ বৈজ্ঞানিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, নারী নিজেই এই অবস্থাকে স্বীকার করে নেয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই অধস্তন অবস্থানের স্বাভাবিকতা ও পবিত্র অলঙ্ঘনীয়তা, যাকে নানাবিধ মানুষই শত শত বছর ধরে মেনে আসছে, নারীদের মধ্যেও তা সমানভাবে গ্রহণীয়, এবং তা নারীর চিন্তা ও আচরণকেও গড়ে তুলে। এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, কোনো নৃগোষ্ঠী, শ্রেণি বা জাতিই নারীদের মতো এতটা কাঠামোগত দাসত্বের শিকার হয়নি। নারীর দাসত্বের ইতিহাস এখনো লেখা বাকি আর মানব–মুক্তির ইতিহাস এখনো নারীর হাতে রচিত হবার অপেক্ষায়।

    শিল্পী: মারিয়া ব্লানচার্ড

    নারী তার নিজের দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার মাধ্যমে একটি কর্তৃত্বক্রমের (হায়ারার্কি) উদ্ভব হয়, এবং এর ফলে সমাজের অপরাপর অংশকগুলোকেও দাসত্বের অধীনে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়। নারী দাসত্বের পরম্পরা হিসেবেই পুরুষের দাসত্ব এসেছে। জাতি বা শ্রেণিগত দাসত্ব আর লিঙ্গভিত্তিক দাসত্বের পার্থক্য হলো, একে তো তা অনেক সুদূরপ্রসারি এবং সূক্ষ্ম, তার উপর আবেগতাড়িত মিথ্যা বুলি আওড়ে এই নিপীড়ন নিশ্চিত করা হয়। সমাজের সর্বত্র নারীর দাসত্বই অন্য সকল প্রকার কর্তৃত্বক্রম (হায়ারার্কি) ও রাষ্ট্রকাঠামোর পথ সুগম করেছে। কর্তৃত্বক্রমিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ক্ষুদ্র একটি অংশের বাইরে, শুধু নারীর জন্যই নয় বরং সমগ্র সমাজের জন্যই তা সর্বনাশ ডেকে এনেছে।

    এ কারণেই পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ ও এর উপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর যেকোনো প্রকার গভীর সমালোচনার পথই উপেক্ষা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হচ্ছে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠান। পরিবার হচ্ছে পুরুষের মানসজাত একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। সভ্যতার সামগ্রিক ইতিহাসজুড়েই পরিবারের অর্থ এই শক্তিবলেই বিস্তার লাভ করেছে যেই শক্তি শাসকগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রযন্ত্র একে প্রদান করেছে। পুরুষের আধিপত্যের দিকে পরিবার বিন্যাসের ধাবিত হওয়া, এবং এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রবাদী সমাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিবারের নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই নারীর সীমাহীন, মজুরিবিহীন কাজ চালিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সাথে তারা সন্তান লালনপালন করে, পর্যাপ্ত জনগোষ্ঠী তৈরিতে রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করে আবার সমগ্র সমাজজুড়ে দাসত্ব ছড়িয়ে দেয়ার রোল মডেল হিসেবেও কাজ করে।

    রাষ্ট্রের একটি মাইক্রোমডেল হিসেবে যদি পরিবারকে আমরা স্বীকার না করি তবে মধ্যপ্রাচ্যীয় সমাজের উপযুক্ত বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। আদিঅন্ত উপর্যুপরি মার খাওয়া মধ্যপ্রাচ্যীয় পুরুষ নারীর ওপরই তার প্রতিশোধ আরোপ করে। প্রকাশ্যে সে যত বেশি অপমানিত হয়, তত বেশি সে নারীর উপর তার আগ্রাসন আরোপ করে। আপন সমাজ থেকে নিজেকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে, অসহায় ও ক্ষুব্ধ পুরুষ পরিবারে একজন স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে এবং স্ত্রী–সন্তানদের ওপর হিংস্র হয়ে উঠে। যে পুরুষ তার নিজের মূল্যবোধগুলোকে সমাজে পদদলিত হতে দেয়, তথাকথিত ‘অনার কিলিং‘-এর মাধ্যমে সে চেষ্টা করে তার সেই ক্রোধ নারীর উপর প্রয়োগ করতে।

    মধ্যপ্রাচ্যের সমাজের ক্ষেত্রে এটা যোগ করা দরকার যে পুরুষতান্ত্রিক, রাষ্ট্রবাদী সমাজের প্রথাগত প্রভাবের সাথে কোনোভাবেই পশ্চিমা সভ্যতার অধিকতর আধুনিক রূপগুলোর প্রভাবের মেলবন্ধন ঘটেনি। বরং এগুলো এমন একটি সংঘবদ্ধতা তৈরি করে যার সাথে গর্ডিয়ান নটের তুলনা করা চলে।

    দেখা যাচ্ছে, পুরুষের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও আধিপত্যের ধারণাকে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন। নারী যতটা নয় তার চেয়ে পুরুষই যেকোনো প্রকার পরিবর্তনকে অস্বীকার করে। আধিপত্যশীল ভূমিকা ছেড়ে দিলে পুরুষ নিজেকে রাজ্যহারা রাজার মতো অবস্থানে দেখতে পায়। ফলে তাকে চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে যে, আধিপত্যের এই ফাঁপা রূপই তাকে স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলে।

    এ ধরনের বিশ্লেষণ নিছক তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ না, তার থেকেও বেশি কিছু। কারণ এগুলোর মধ্য দিয়ে কুর্দি জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের অস্তিত্বের তাৎপর্য প্রকাশ পায়। কুর্দি জনগণের স্বাধীনতাকে নারী স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই, এ কারণেই আমরা নিজেদের সেভাবেই সংগঠিত করেছি। সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা আর স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর আক্রমণ সত্ত্বরও যে আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দমে যায়নি, তার সবচেয়ে বড় এবং অমূল্য অংশের কৃতিত্ব দিতে হয় নারীমুক্তির আন্দোলন আর এই আন্দোলন যে সচেতনতার সৃষ্টি করেছে তাকে। আমাদের মতে স্বাধীন নারী ব্যতীত কোনো স্বাধীন কুর্দিস্তান হতে পারে না।

    এই দার্শনিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ কোনো অর্থেই নারীদের সংগ্রামে যুক্ত করার কৌশলগত রাজনৈতিক চাল নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুরুষ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, আজ অবধি আমাদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অধপতিত, আধিপত্যশীল, অত্যাচারী, শোষণকারী পুরুষকে বুঝতে সক্ষম হয়েছি। নারীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে যথাযথ যে উত্তর খুঁজে পেয়েছি তা হলো, পুরুষতান্ত্রিক পুরুষকে বুঝো, বিশ্লেষণ করো ও তাকে ‘মেরে’ ফেলো। আমি আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে চাই। আমি পুরুষকে শান্তিকামী এক ব্যক্তিত্বে বিনির্মাণের আহ্বান করব। ধ্রপদী পুরুষকে বিশ্লেষণ ও ‘হত্যা’র মাধ্যমে ভালোবাসা আর শান্তির পথকে সুগম করতে হবে। এদিক থেকে আমি নিজেকে নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন কর্মী বলে মনে করি।

    শিল্পী: গাজবিয়া শিরি

    বিপরীত লিঙ্গসমূহের মধ্যকার বিরোধের দীর্ঘ ৫০০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীর প্রধান সংগ্রাম হয়ে উঠেছে। নারীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এই সমস্যাকে দৃশ্যমান করে তোলার জন্য এই সংগ্রামকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কিছু অসাধারণ নারী তাদের পদচিহ্ন রেখে গেছে তাদের জীবন, তাদের চিন্তা আর কর্মের মাধ্যমে। নারীর এই বিরুদ্ধাচারণ আমাদের সামনে কিছু একটা তুলে ধরে— তা হলো পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধ, সমাজে এই মূল্যবোধগুলোর প্রভাব এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছাড়া আমরা না পারব আমাদের জীবনে স্বাধীনতা অর্জন করতে, না পারব একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে, সে কারণে সমাজতন্ত্রকেও কার্যকর করে তোলা যাবে না। জনগণ শুধুমাত্র গণতন্ত্রেরই কামনা করে না, তারা লিঙ্গবৈষম্যহীন একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রত্যাশা করে। লিঙ্গসমতা ছাড়া, স্বাধীনতা বা সাম্যের যে কোনো ডাক ভিত্তিহীন আর বিভ্রান্তিকর। জনগণের যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও উচিত তার নিজের ভাগ্য নিজেকেই নির্ধারণ করা। পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা ফেলে রাখার মতো কোনো বিষয় এটি নয়। অন্যদিকে, নতুন একটি সভ্যতা নির্মাণের পথে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে নারীর স্বাধীনতা অপরিহার্য হয়ে উঠবে। আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার জন্য প্রকৃত সমাজতন্ত্র এবং জাতীয় সংগ্রামের বিপরীতে, শ্রেণি বা জাতির স্বাধীনতার থেকে নারীর স্বাধীনতা অধিক গুরুত্ব বহন করে।

    নিজেদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, নারীর স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই তা রাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তাকে চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠোর বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে। তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে বিজয় ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদী অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে বিজয় মানে এই নয় যে নারী ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। বরঞ্চ ঠিক উল্টোটা, রাষ্ট্রবাদী আর কর্তৃত্বক্রমিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে এমন একটি কাঠামোর সৃষ্টি করা যেটি রাষ্ট্রঅভিমুখী নয় বরং একটি গণতান্ত্রিক আর পরিবেশবাদী সমাজের দিকে অগ্রসর হওয়া যেখানে সকল ধরনের লিঙ্গই হবে স্বাধীন। আর এর ফলে শুধু নারীই নয় বরং সমগ্র মানবজাতিরই জয় হবে।