Blog

  • জামরাত মেসন।। আমি পুরুষ কিম্বা নারী নই, একজন রূপান্তরকামী

    জামরাত মেসন।। আমি পুরুষ কিম্বা নারী নই, একজন রূপান্তরকামী

    আমার নাম জামরাত মেসন এবং আমার একটি যোনি রয়েছে। আমি পূর্ব লন্ডন অ্যাক্টিভিজম কমিউনিটির একজন সক্রিয় সদস্য, কিন্তু আজ আমি কথা বলবো একজন ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামীর জায়গা থেকে। ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি দ্বারা আদতে একটি বিস্তৃত পরিসরের জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা কোনো না কোনোভাবে তাদের জন্মসনদে লিপিবদ্ধ লিঙ্গপরিচয় হতে ব্যতিক্রমরূপে আত্মপ্রকাশ করে। কাজেই আমি কোনোভাবেই ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের প্রতিনিধি নই। আমি কেবল বলতে পারি একজন ট্রান্সেক্সুয়াল বা রূপান্তরকামী হিসেবে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান জগতটাকে কীভাবে দেখি। আজ সেটাই বলবো আপনাদের।

    আমি বেশ সৌভাগ্যবান একজন রূপা। প্রথমত, কারণ আমি এখনও বেঁচে আছি। এবং দ্বিতীয়ত, কারণ আমার একটি পরিবার আছে যারা আমাকে ভালোবাসে। এগুলো এমন আহামরি সৌভাগ্যের ব্যাপার হবার কথা নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে এগুলোই অনেক বড় বিষয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বেশ চমকপ্রদ। সংক্ষেপে বলছি। ৩ বছর বয়সে আমার উচ্চারিত প্রথম বাক্য ছিলো, ‘আমি একজন ছেলে’। ৭ বছর বয়সেও যখন আমি আমার বিশ্বাসে অনড় রইলাম, তখন বাবা-মা আমাকে একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে গেলেন। সেই মনোবিজ্ঞানী রায় দিলেন, আমি খুব সম্ভবত ‘লিঙ্গ-অস্থিরতায়’ ভুগছি। বাবা-মা তখন আমার স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমাকে চুল ছোট রাখার এবং ছেলেদের ইউনিফর্ম পরার অনুমতি আদায় করে দেন। ৮ বছর বয়সে আমাকে লন্ডনের এনএইএসে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয় এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমি তার তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসা নিই। ১২ বছর বয়সে আমি আমার দাদি/নানির আর্থিক সহযোগিতায় আইনতভাবে আমার নাম পরিবর্তন করে একজন ছেলের নাম রাখি। তো মোটামুটিভাবে বলা যায়, আমি ৭-৮ বছর বয়স থেকেই একজন ছেলে বা পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন করে আসছি। তবে আমি দৈহিকভাবে পুরোপুরি একজন নারীর মতই কৈশোরে পদার্পণ এবং বয়ঃসন্ধি যাপন করি, এবং ২১ বছর বয়সে টেস্টোস্টেরন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হই। ২২ বছর বয়সে আমি একটি অস্ত্রোপচার করাই। আমার বয়স এখন ২৪,কাজেই আমি বিগত প্রায় ২ বছর ধরে আমার বর্তমান রূপে আছি। 

    কিন্তু আমার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র রূপান্তরকামীদের জন্য নিরঙ্কুশ গ্রহণযোগ্যতা প্রার্থনা নয়, অথবা আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিদ্বেষ দূর করাও নয়। আজ আমি সরাসরি ট্রান্সফোবিয়া বা রূপান্তরকামভীতি নিয়ে কথা বলতে চাই, কারণ এটি আমাদের সবাইকেই নানাভাবে প্রভাবিত করছে, এবং আমরা সকলেই এটা দূর করতে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে পারি। একটি সংঘবদ্ধ সমাজ হিসেবে লিঙ্গ প্রশ্নে আমাদের আরও সংবেদনশীল হওয়া আবশ্যক।

    গর্ভে আমরা সবাই নারীই থাকি। যারা পুরুষ হিসেবে জন্ম নেয় তারা গর্ভকালীন সময়ে টেস্টোস্টেরোনের প্রভাবে পুরুষে পরিণত হয়। আমাদের ভগাঙ্কুর তখন বিবর্ধিত হয়ে পুংদণ্ডে পরিণত হয়, এবং ভগোষ্ঠ তখন পরিণত হয় অণ্ডকোষে। ইংরেজিতে women শব্দটার উৎপত্তিও men with womb বা womb-man থেকে, যার অর্থাৎ গর্ভ সম্বলিত পুরুষ। সেভাবে দেখতে গেলে, পুরুষেরা হলো বৃহদাকৃতির ভগাঙ্কুর সম্বলিত নারী,কিংবা বৃহদাঙ্গুর। অধিকাংশই একটি যোনি কিংবা পুংদণ্ড নিয়ে মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়, কিন্তু কেউ কেউ এই দুইয়ের মাঝে আটকে থাকে। তাদেরকে ‘আন্ত:লিঙ্গ’ বলা হয়। ছেলে কিংবা মেয়ে হিসেবে জন্ম নেয়ামাত্র আমাদের সাথে বেশ লক্ষণীয় রকমের আলাদা আচরণ করা হয়। যেমন ছেলেদেরকে খেলনা হিসেবে দেওয়া হয় লেগো, আর মেয়েদেরকে পুতুল। (এবং তারপর আবার সমাজে নারী প্রকৌশলীর অভাব নিয়ে হা-হুতাশও করা হয়!) মেয়েদেরকে কোমল হতে এবং নিজেদের অনুভূতির ব্যাপারে কথা বলতে উৎসাহিত করা হয়, অপরদিকে ছেলেদেরকে দেওয়া হয় কঠোরতার পাঠ। বড় হতে গিয়ে প্রতিটি ছেলেমেয়েকে তার নিজের পরিচয় কী, এবং আসল পুরুষ বা আসল নারী কাকে বলে তা নিয়ে অনেক বক্তৃতা শুনতে হয়। আমাদের প্রত্যেককেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব নিয়ে অনেক ভুগতে হয় বা হয়েছে। আমি নিজেকে এই দ্বন্দ্বের একজন চরম পর্যায়ের ভুক্তভোগী মনে করি। আমি নিজেকে পুরুষ মনে করি না, কিন্তু সেইসাথে আমি এটাও জানি যে আমি কোনোভাবেই সম্পূর্ণরূপে একজন নারীও নই। আমার মনে হয় সকল রূপান্তরকামীই এই দ্বন্দ্বের শিকার। 

    আমাদের সমাজটা নারী ও পুরুষ এই দুই ভাগে বিভক্ত এবং আমি এই দুই দলের কোনোটিতেই পড়ি না। এর ফলে আমি শুধু সভ্য সমাজে নয়, প্রতি পদে পদে, এমনকি কারাগারেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হবো। আমাকে যদি কোনো কারণে জেলে পাঠানো হয়, তাহলে হয় আমাকে একজন পুরুষ হিসেবে নারী সেলে রাখা হবে, কিংবা একজন যোনি সম্বলিত পুরুষ হিসেবে পুরুষ সেলে রাখা হবে, যেখানে আড়ালের কোনো বালাই নেই। আমাকে যদি কোনো কারণে গ্রেপ্তার করে আমার শরীরে তল্লাশি চালানো হয়, তাহলে হয় একজন নারী অথবা একজন পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তা কাজটি সম্পন্ন করবেন। কিন্তু আমি তো নারী-পুরুষ কোনোটিই নই। আমি একজন রূপান্তরকামী। রাষ্ট্রীয় কোনো লিঙ্গ নির্ধারক সনদপত্র নেই যার দ্বারা আমাকে সরকারিভাবে একজন নারী বা পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হবে। কেননা আমি নারী কিংবা পুরুষ কোনোটিই নই, আমি একজন ট্রান্সসেক্সুয়াল। হ্যাঁ, আমাকে একজন পুরুষ হিসেবে পুরুষ সেলে পাঠানো যায়, পুরুষ কর্মকর্তা দ্বারা আমার শরীরে তল্লাশি চালানো যায়, একজন নারীর সাথে আমাকে বিয়েও দেওয়া যায়। কিন্তু আমি তো বিয়ে করতে চাই না। আমি এমন কোনো সমাজে বাস করতে চাই না যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের শরীরে তল্লাশি চালিয়ে একে অপরকে জেলে পুরে দেয়। আমি এমন কোনো লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে চাই না যেখানে আমরা সরকারের কাছে আর্জি জানাবো আমাদের আরও সাবলীলভাবে,আরও কার্যকরভাবে শোষণ করার জন্য। আমি একটা পঁচে যাওয়া সমাজব্যবস্থায় কিঞ্চিৎ সুবিধা পেতে চাই না। আমি পুরো ব্যাপারটাতেই আমূল পরিবর্তন চাই। আমি একটি উন্নততর পৃথিবী বিনির্মাণে সক্রিয় অবদান রাখতে চাই।

    শিল্পী: কালকি সুব্রামানিয়াম

    ট্রান্স পুরুষ কিংবা রূপান্তরকামী পুরুষদের (মানে আমাদের) বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার, কুসংস্কার, কিংবা ভ্রান্ত ধারণার একটি হলো যে, আমরা নাকি নিজেদেরকে পুরুষদের মত শক্ত-সমর্থ প্রমাণ করে সমাজে পুরুষের সেসকল সুযোগ-সুবিধা পেতে চাই,যা ভোগ করার অধিকার আমাদের নেই। আমরা নাকি অপর্যাপ্ত, অসম্পূর্ণ। কারণ আমাদের কোনো লিঙ্গ নেই, কিংবা থাকলেও তা কুৎসিত,ক্ষুদ্রাকার কিংবা অকেজো। আমরা বিশাল নিতম্ব এবং অকেজো লিঙ্গ সম্বলিত অপরিপূর্ণ পুরুষ। 

    অপরদিকে ট্রান্স নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত অপবিশ্বাস হলো,তারা নিজেদের আত্মসম্মান হারাচ্ছে। তারা হাস্যকর,কৌতুকের খোরাক। যেচে পড়ে নারী হতে কে-ই বা চাইবে বলুন? শুধু শুধু তারা সমাজে নিজেদের সম্মান একধাপ নিচে নামিয়ে ফেলছে। 

    মোদ্দাকথা, ট্রান্সফোবিয়া বা রূপান্তরকামভীতির মূলে রয়েছে লিঙ্গবৈষম্য। অনেকে মনে করেন ট্রান্স নারীরা এই পুরুষশাসিত সমাজে নারী হবার যন্ত্রণা জানেন না, কারণ তাদের কখনো লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয় না। কিন্তু তারা এটা বোঝেন না যে, ট্রান্সফোবিয়াও লিঙ্গবৈষম্যেরই একটা রূপ। আরও শতগুণ বিভৎস্য একটা রূপ!

    অনেকে বলেন, আমরা ট্রান্স পুরুষেরা এই লিঙ্গবৈষম্য থেকে বাঁচতেই পুরুষে রূপান্তরিত হই। কিন্তু সত্যিটা হলো, যে ট্রান্সেক্সুয়াল সে লিঙ্গবৈষম্য থেকে বেঁচে যাওয়া তো দূরে থাক বরং লিঙ্গবৈষম্যের এক অতল কূপে নিক্ষিপ্ত হয়। মূদ্রার দুই পিঠ, এবং এর কিনারটাকেও ভালোমত দেখে ফেললে, লিঙ্গবৈষম্যের আসল রূপটা দেখা যায়। তখন এই ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি এতটাই সজাগ হয়ে যাবে, যে আপনি সেখানেও লিঙ্গবৈষম্যকে খুঁজে পাবেন যেখানে আর কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। লিঙ্গ বিষয়ে আপনি যত জানবেন,ক্ষমতার প্রবাহকে আপনি তত পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।

    লিঙ্গবৈষম্য কিংবা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, মানুষের ব্যতিক্রমী লৈঙ্গিক আচরণের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লিঙ্গবৈষম্য, অর্থাৎ আসল পুরুষ বা আসল নারী না হতে পারার-এই ব্যাপারটা আলোচনায় প্রায় আসেই না বলতে গেলে। কিন্তু এই ব্যাপারটা সমকামভীতির পেছনেও একটি বড় কার্যকারণের ভূমিকা পালন করে। একটি সমকামী ছেলে যার আচার-আচরণ আর দশটা ছেলের মতই পুরুষালি,সে কিন্তু স্কুলে অন্য ছেলেদের দ্বারা বুলিয়িংয়ের শিকার হয় না। কারণ স্কুলের বাচ্চারা তাদের সহপাঠী কার প্রতি আকৃষ্ট তা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। বরং তারা তার আচরণ দেখে বিচার করে। অপরদিকে একটি বিষমকামী ছেলের আচরণ যদি কিছুটা মেয়েলি হয়, সে কিন্তু ঠিকই বন্ধুদের বিদ্রূপের বস্তুতে পরিণত হয়। এবং সেক্ষেত্রে তার সহপাঠীরা তাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য ছক্কা, সমকামী, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে থাকে। আদতে তারা কেবলমাত্র তাদের মেয়েলি আচরণের জন্যই বুলিংয়ের শিকার হয়,কারণ তারা ‘আসল পুরুষ’ এর মত নয়। এটাও কিন্তু লিঙ্গবৈষম্য, কিন্তু আমরা একে সমকামভীতি বা হোমোফোবিয়া বলে থাকি। কিন্তু এতে মুশকিলটা হয় কি, হোমোফোবিয়া হিসেবে ব্যাপারটার মোকাবেলা করতে গেলে এ বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন ভুরি ভুরি সংগঠন পেয়ে যাবেন,যারা আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু সেই ‘মেয়েলি’ আচরণের বিষমকামী ছেলেটাকে সাহায্য করার মত কোনো সংস্থা আছে কি? নেই। তাকে হয়তো বলা হচ্ছে যে সমকামী হওয়াটা দোষের কিছু নয়, যেটা সত্যি কথা। কিন্তু কেউ তাকে এটা বলছে না যে সমকামী না হয়েও একটা ছেলে মেয়েলি হতে পারে, এবং সেটাও দোষের কিছু নয়। আমরা ট্রান্সেক্সুয়ালরা হরদম এধরনের বুলিয়িংয়ের শিকার হই,এবং সেটা হয় আরও বিশ্রী। কিন্তু আমরা একা নই। সেই মেয়েলি স্বভাবের ছেলেটি কিংবা কিঞ্চিৎ পুরুষালি স্বভাবের মেয়েরাও কিন্তু আমাদের মতই এর ভুক্তভোগী।

    ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের এই অভিজ্ঞতাগুলো লিঙ্গবৈষম্যের সবচেয়ে মারাত্মক নিদর্শনগুলোর মাঝে অন্যতম। ‘মারাত্মক’ শব্দটা এক্ষেত্রে মোটেও অত্যূক্তি নয়, কারণ ট্রান্সজেন্ডার ডে অফ রিমেম্বারেন্স এর ওয়েবসাইটের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০৯ সালে ১৩০ জন ট্রান্সজেন্ডার মানুষকে কেবলমাত্র ট্রান্সজেন্ডার হবার কারণে হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা যা আমাদের সকলকেই প্রভাবিত করছে এবং আমরা সকলেই এটা মোকাবেলায় অংশ নিতে পারি। 

    এই ‘আসল পুরুষ’ এবং ‘আসল নারী’র সমগ্র ধারণাটারই উৎপত্তি হয়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে। আরও সহজ করে বললে, একটা পরিবারের একজনকে সারা সপ্তাহ কাজ করে মাইনে পেতে হয়, আরেকজনকে সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয়, যা করতে গিয়ে তাকে ঘরের কাজ করতে হয় এবং বিনা মাইনেতে বাচ্চাদেরকে মানুষ করতে হয়, এই সমগ্র ব্যবস্থাটার কারণে। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ পরিবারে পুরুষটি সারাদিন অর্থোপার্জনের জন্য কাজ করে, অপরদিকে নারীটি বিনা মাইনেতে বাড়ির কাজ করে। অর্থাৎ, নারীটির এই বিনা মাইনের পরিশ্রমটাই কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রেখেছে। এটা না থাকলে সমস্ত ব্যবস্থাটাই ভেঙ্গে পড়তো। কিন্তু এটাকে লিঙ্গ পরিবর্তন করে, কিংবা পুরুষ এবং নারীর কাজ অদলবদল করে, কিংবা পালা করে করলেও পাল্টানো সম্ভব না। এমনকি আরেকজন নারীকে সামান্য কিছু পয়সা দিয়ে এই কাজগুলো করিয়ে নিলেও এই ব্যবস্থাটায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ এই ব্যবস্থাটা যতদিন চলমান থাকবে, কাউকে না কাউকে বিনা মাইনেতে কাজ করতে হবে। এবং এই অসমতাই আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আমরা ট্রান্সজেন্ডাররা যতই নারী-পুরুষের কাজ ভাগ করে নেয়ার এই অসমতার নগ্ন স্বরূপটাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিই না কেন, কেবলমাত্র কাজের সমতার জন্য দাবী জানানোই এই সমস্যার সমাধান নয়।

    শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু

    এর সমাধান হিসেবে আমি আবারও আমার আগের কথাটারই পুনরাবৃত্তি করতে চাই। আমাদের একটি সমাজ হিসেবে, একটি সম্প্রদায় হিসেবে লিঙ্গ প্রশ্নে সংবেদনশীল হতে হবে। এক লিঙ্গপরিচয় থেকে আরেকটাতে রূপান্তর বিষয়টা কেবলমাত্র অস্ত্রোপচারেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই পুরো প্রক্রিয়ায় খুব ক্ষুদ্র একটা ভূমিকা পালন করে অস্ত্রোপচার। রূপান্তর ব্যাপারটা মূলত ঘটে থাকে সামাজিকভাবে, কারণ লিঙ্গপরিচয়ের সমগ্র ধারণাটাই সামাজিক একটা ধারণা। আগেই বলেছি,আমি প্রায় ১২ বছর কোনোরকম অস্ত্রোপচার কিংবা হরমোন থেরাপি ছাড়াই একজন পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন করেছি। আমি এখন একজন পুরুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারি কারণ লোকে আমাকে পুরুষ হিসেবে জানে এবং সম্বোধন করে। ‘রূপান্তর একটি সামাজিক বিষয়’- এই কথাটা বেশিরভাগ মানুষই বোঝে না। কেউ ট্রান্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে লোকে সেই ব্যক্তির জন্মসূত্রে পাওয়া লিঙ্গপরিচয় অনুযায়ী তার মত পরিবর্তনের চেষ্টা করে। অর্থাৎ, সে পুরুষের শরীরে জন্মে নারী হতে চাইলে তাকে জোর করে পুরুষ বানানোর চেষ্টা করা হয়, আবার সে নারীর শরীরে জন্মে পুরুষ হতে চাইলে তাকে জোর করে নারী বানানো হয়। এক্ষেত্রে তার আচরণ কতটা নারীসুলভ কিংবা পুরুষসুলভ- এই বিষয়টা অনেক বড় ভূমিকা পালন কর। এর ফলে একজন ট্রান্স ব্যক্তিকে ‘মেয়েলি’ কিংবা ‘পুরুষালি’ আচরণ করে তবেই সমাজে সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার অর্জন করতে হয়। এর মানে হলো আমাদের মত ট্রান্স পুরুষেরা কঠোর, পুরুষালি বেকুবের মত আচরণ করি বলেই সবার কাছে সম্মানিত হই। কিন্তু আসলে তো আমাদের সকলেরই উচিৎ প্রত্যেককে তার নিজ নিজ পরিচয়ের জন্য নির্বিশেষে সম্মান করা, যাতে সকলে তাদের নিজের পরিচয়েই স্বাছন্দ্য বোধ করে। 

    আমরা আমাদের এই প্রাইড মার্চ এবং অ্যক্টিভিজমের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চাই?

    কেবলই কি ক্ল্যাপ্টন, স্ট্র্যাটফোর্ড, কিংবা ইস্টহ্যামের মত পূর্ব লন্ডনের অভিজাত এলাকাগুলোয় ‘যেমন খুশি তেমন’ সাজে হেঁটে যাওয়ার, যাকে খুশি তাকে চুমু খাওয়ার স্বাধীনতা? কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষদের মাঝে, যেখানে আমরা আসলে বাস করি, সেখানে আমাদের স্বাধীনতার কী হবে? কবে আমরা আমাদের পরিচয়, প্রেম, লিঙ্গ, এবং শরীর নিয়ে সকলের সামনে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবো, একদল বখাটে কিশোরের হাতে গণপিটুনির শিকার হবার ভয় ছাড়াই? আর আমাদেরকে গণপিটুনি দিতে চাওয়া সেই ‘গণ’- দের কী হবে? তারাও তো আমাদেরই বন্ধু, পরিজন, প্রতিবেশী। সেই কিশোরদের মধ্যে কেউ কি চাইলেই তার প্রিয়তমকে চুমু খেতে পারবে? পারবে তার পছন্দমত ‘মেয়েলি’ পোশাকে সাজতে, সকলের কাছ থেকে বিতাড়িত হবার কিংবা নিজের স্বকীয়তা হারানোর ভয় ছাড়াই?

    এগুলো শুনতে সেসকল মধ্যবিত্ত সমকামীদের কাছে লোভনীয় মনে হতেই পারে, যারা ইতমধ্যেই তাদের স্বাধীনতা অর্জন করে ফেলেছে। হ্যাম্পস্টেডের অভিজাত এলাকায় প্রেমিকের হাত ধরে হেঁটে বেড়ানো সেসকল সমকামীদের মনে হতেই পারে, “আমরা তো দিব্যি আছি। কী দরকার ওসব ঝামেলায় জড়ানোর?” তারা চাইতেই পারে হ্যাকনি’র মত হোমফোবিয়া, ট্রান্সফোবিয়া, লিঙ্গবৈষম্যে জর্জরিত স্বল্পশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত এলাকায় থাকা আমাদের মত রূপান্তরকামীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সহযোদ্ধা না হতে। বর্তমানে লন্ডনের প্রাইড আন্দোলনের চেহারা দেখে মনে হয় আমাদের সতীর্থদের মাঝে এই না চাওয়াদের সংখ্যাই বেশি। আর সেকারণেই, ঠিক এই কারণেই, এরকম তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলনটাকে জিইয়ে রাখতে এধরণের কর্মসূচীর আরও বেশি বেশি প্রয়োজন। এবং সর্বক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনটাকে সচল রাখা প্রয়োজন।

    • মূল লেখার লিংক: https://theanarchistlibrary.org/library/jamrat-mason-i-am-not-a-man-or-a-woman-i-am-a-transexual
  • ব্যাটস অ্যান্ড জোকারস

    ব্যাটস অ্যান্ড জোকারস

    • ইমরান কামাল 

    I Name you three metamorphoses of the spirit: how the spirit shall become a camel, and the camel a lion, and the lion at last a child. (Thus Spoke Zarathustra, Friedrich Nietzsche১

    উট, সিংহ, শিশুজ্জফ্রেডরিখ নীৎশের (১৮৪৪-১৯০০) জরদ-উষ্ট্রের২ (Zarathustra) মানব চৈতন্যের৩ রূপান্তরের (metamorphoses) তিন প্রতীকী আধার। নীৎশের জরদ-উষ্ট্রের কাছে যা spirit তাকে ডাকছি ‘চেতনা’ বলে। কেনো চেতনা, কেনো অন্য কথা নয়? অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে যা ক্রমে পরিবর্তিত হচ্ছেজ্জক্রমে উপরে উঠে যাচ্ছে বা নেমে যাচ্ছেজ্জতাকে চেতনা ছাড়া অন্য কি নাম দেয়া যেতে পারে, জানা নেই। এই spirit সত্তা নয়, being নয়, psycheও নয়- গুস্তাভ ইয়ুঙের (Carl Gustav Jung) (১৮৭৫-১৯৬১) spirit যেমন। নীৎশের জরদ-উষ্ট্র যে চেতনার কথা বলছে তার রূপের, আধারের তিন পরিবর্তন আছে। চেতনার বিকাশ যেনো এক আধার থেকে আরেক আধারে যাওয়া। ইংরেজিতে যা ghost তাতো চেতনা শূন্য নয় – তা আধারহীন। আধার বা host হারিয়েছে বা খুইয়েছে বিধায় সে ghost। কিন্তু আশ্চর্য, যে ghost কিনা আধার হারালো, হারানোর মধ্য দিয়ে তার দৃশ্যমান রূপ থেকে host বিলুপ্ত হলো না, উল্টো ধাতুর পূর্বভাগে একটা ধ্বনি যুক্ত হয়ে শব্দটা আরো স্ফীত হলো যেনো। এখানেই মজা, ভাবখানা বর্ণচোরা হলো। তার মধ্যে যে এক host আছে তাকে যেনো আর চেনা যায় না। এতে কি দাঁড়ালো? ghost এরও আধার আছে। ধরাছোঁয়ার বাইরে বিধায় তাকে কেবলই ছায়া,  বিশুদ্ধ চেতনার হাজেরান বলে মনে হয়।

    নীৎশের জরদ-উষ্ট্র চেতনার প্রথম যে host বা আধারের কথা বলে তার দেহখানা কর্তব্য আর দায়িত্ববোধের বাঁধনে গড়া। তপ্ত বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে নির্লিপ্ত সে জীবনের বোঝা টেনে যায় অবলীলায়। তার উদর ভরা জল। জীবন সে সংরক্ষণ করতে জানে। সেই আধার থেকে চেতনার ঊর্ধ্ব যাত্রার শুরু। এই থেকে চেতনা উন্মোচিত হয় সিংহাধারে। হিংস্র, প্রবল প্রতাপশালী, উদ্ধত সিংহ মিথিক গিলগামেশ (Gilgamesh), কিংবা ওজিমানদিয়াস (Ozymandias) যেনোজ্জআধার সে উদ্ধত কেনো? কারণ তাকে যে লড়াই করতে হয় মহাপরাক্রমশালী অতিকায় তিমিঙ্গিলের (নীৎশের ভাষায় Dragon) সঙ্গে। নতুন সৃষ্টির পথ তাকে প্রশ^স্ত করতে হয় একা। নিজের পৃথিবী তার হয়ে উঠতে হয় নিঃসঙ্গ কর্তা। তারপর চূড়ান্ত পর্ব আসে। চেতনাকে খুঁজে নিতে হয় শিশুর রূপ। নিষ্পাপ, সরল, ভুলতে পারার আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু হয় সে। একটা নতুন শুরু, কর্তাসত্তার ইচ্ছার অধীন নতুন চক্রের শুরু। চেতনা এই পরিক্রমণে মানবিক থেকে অতিমানবিক (Übermensch) হয়। নীৎশের অতিমানব সেই যে তার নিজের জীবনের নিয়ন্তা, হর্তা, কর্তা, বিধাতাজ্জ তার নিজস্ব মরাল (moral) আছে। অপরের বেধে দেয়া মরালিটির ঊর্ধ্বে সে নিজেকে তুলতে পারে। ঈঙ্গ-মার্কিন পপ সংস্কৃতিতে আমরা যে ঝঁঢ়বৎ যবৎড় বা অতিমানবদের গপ্পোগাথা পাই তার মরালিটি এমনই ঊর্ধ্ব স্তরে থাকে না কি?

    অতিনায়ক পপ্ সংস্কৃতির স্বভাবজাত সৃষ্টি। পপ্ সংস্কৃতির আইকনিক চরিত্র লাগে। তার জনতার নায়কদের নানা জাতীয় অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হয়। এদের কেউ ভিনগ্রহ থেকে আসা, কেউ আমেরিকার বা অন্যকোনো রাষ্ট্রের নর্দমা থেকে উঠে আসা, কেউ চাকরির ধরাবাধা সময়ের মধ্যে বড় হওয়া, কেউ আবার বিলিওনেয়ার কোনো পরিবারের সন্তান। মোটা দাগে অতিনায়ক শব্দটার মধ্যে সাম্য আছে। এই সাম্য অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। পাঠকের বৈচিত্র্য যতো বেড়েছে অতিনায়ক প্রতীকেও তত নতুন নতুন অভিব্যক্তি যুক্ত হয়েছে। তারা ছড়িয়েছে কমিক্সের পাতা থেকে ভার্চুয়াল নভেলে। তাদের নিয়ে সিনেমাতে বিশেষ বিশেষ কাল্ট তৈরি হয়েছে, ভার্চুয়াল গেমে তাদের রাজত্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এই আইকনিক চরিত্রদের মধ্যে ভিন্নতাই প্রবল, মিল এক জায়গাতেই – তাদের ঊর্ধ্বমুখী মরাল। যে ব্যবস্থা, আইন ও শৃঙ্খলাকে রক্ষা করতে এই সব অতিনায়কের জন্ম তার ওপর তারা কেউই আস্থা রাখে না। আস্থা রাখলে তাদের অতিনায়কগিরির কোনো অর্থ থাকে না। কি বলবো একেজ্জঅতিনায়কের প্যারাডক্স। যে ব্যবস্থাকে তারা রক্ষা করতে চায় তা যে সংরক্ষণের মতো অবস্থায় নেই তা তারা জানে, তারপরও তারা একে রক্ষা করতে চায়। খ্রিস্টোফার নোলানের (১৯৭০) বিখ্যাত ট্রিলজি ‘ব্যাটম্যান সাগা’ যা উদ্দেশ্য করে এই আলাপ তার মুখ্য চরিত্রও এই প্যারাডক্সের বাইরে নয়। কিন্তু নোলানের ব্যাটম্যানে ভিন্নতর কাণ্ড আছে। ব্যাটম্যান বিগেনস্ থেকে ডার্ক নাইট, ডার্ক নাইট থেকে ডার্ক নাইট রাইজেস্ – নোলানের অতিনায়কের যাত্রাটি হয় উল্টোমুখে। অনপরাধী শিশু থেকে নিঃসঙ্গ কর্তা সিংহ, নিঃসঙ্গ কর্তা সিংহ থেকে কর্তব্যপরায়ণ উটে। তাঁর ব্যাটম্যান অতিনায়কের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

    আর জোকার, সে কে? নোলানের জোকারও এক রকম রূপান্তর। নীৎশের নয় কাফকার মতো করে রূপান্তর। ফ্রান্স কাফকার (১৮৮৩-১৯২৪) দ্য মেটামরফোসিসের (১৯১৫) শুরুতেই দেখা যাচ্ছে প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসা একটা কিছুতে পরিণত হয়েছে। একটা কিছু বলছি কেনো? তাকে তো আমরা অতিকায় পোকা হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত। এই অতিকায় পোকার কল্পনার সূত্র মূলত কাফকার অনুবাদকেরা। অধিকাংশ ইংরেজি অনুবাদে সামসার হয়ে ওঠা রূপকে gigantic insect বা bug হিসেবে দেখাই চল হয়ে এসেছে। কিন্তু কাফকা এই হয়ে ওঠা বা পরিণত হওয়ার নাম দিয়েছিলেন – ungeziefer। জর্মন ভাষায় geziefer শব্দের ইংরেজি প্রতিরূপ vermin। অর্থাৎ এমন প্রাণ যা মারি ছড়ায়, মানুষের ক্ষতির কারণ হয়। কিন্তু শব্দটির আগে ‘un’ যুক্ত হয়ে মুশকিল বাঁধিয়েছে। কীট বা পোকা হিসেবে তাকে আর ধরা যাচ্ছে না।৪ অনেকটাই ghostএর hostএর মতো – ungezieferএ geziefer আছে বটে, কিন্তু আছে বর্ণচোরা হয়ে। তাকে আর কীট বলেও চেনা যাচ্ছে না। নীৎশের রূপান্তরে আধারেরা স্পষ্ট। তাদের নিজ নিজ রূপে চেনা যায়। রূপগুলোই চেতনাকে আকার দেয়। কিন্তু কাফকায় ঘটছে উল্টো ঘটনা। আধার খোদ আকার হারিয়েছে। চেতনা কি হবে, তা যেনো আর বুঝে উঠতে পারছে না। গ্রেগর যে জীবনযাপন করে, যে নিয়মানুবর্তিতা আর কর্তব্যপরায়ণতার রুটিনে সে বাস করে তা তাকে ‘উষ্ট্র’ না বানিয়ে এমন কিছু বানিয়ে ফেলেছে যার প্রতিবন্ধকতা ছাড়া অন্যকোনো অর্থ হয় না। তার ওপর রূপকের যে দূরত্ব, তাও গিয়েছে খসে। নিরেট বাস্তবে এ যেনো সত্যি সত্যি হয়ে ওঠা। ইউটোপিয়া (utopia) উল্টে গেলে বাস্তবতা হয়, ডিসটোপিয়া (dystopia) নয়। নোলানের জোকার অবশ্য আরো এক কাঠি সরেস। গ্রেগরের মতো তার আধারও রূপক নয়, নিরেট বাস্তব। কিন্তু নীৎশে কিংবা কাফকায় আধার আর আইডেনটিটির যে ভেদ তা জোকারে নেই। ungezieferকে ভেঙে দিলে গ্রেগর বেরিয়ে আসে। জোকারের পার্সনা (persona) বা মুখোশের পেছনে জোকারই থাকে।

    ডার্ক নাইটের প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায়জ্জজোকার ব্যাংক ডাকাতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। ডাকাত দলের প্রত্যেক সদস্যই জোকারের মুখোশ পড়ে ডাকাতিতে অংশ নিয়েছে। দৃশ্যের শেষে জোকার যখন তার মুখোশটা খুলে ফেলে তখন দেখা যায় মুশোশের অন্তরাল থেকে জোকারই বেরিয়ে আসে। আমেরিকার পপ্ সংস্কৃতিতে জন্ম নেওয়া জোকারে বয়সে ব্যাটম্যানেরই সমান। দুটো চরিত্রেরই জন্ম হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম লগ্নে – ১৯৪০ সালে। জন্মলগ্ন থেকেই জোকার এমন এক চরিত্র যার মরাল বলে কিছু নেই, সে বদ্ধ উন্মাদ এবং কার্যকারণ সূত্রে তাকে বোঝা যায় না। ফিকশনাল নির্মিতি বিচারে এই জোকারের অন্তত দুইটি পূর্বসূত্র পাওয়া যাবে। একটি আছে উনিশ শতকে ভিক্টর হুগোর (১৮০২-১৮৮৫) কিশোর উপন্যাস দ্য ম্যান হু লাফস্এ (The Man Who Laughs) (১৮৬৯)। অন্যটি পাওয়া যাবে, ভিক্টোরীয় লন্ডনের প্রখ্যাত ‘জ্যাক দ্য রিপার’ (Jack the Ripper) মামলায়। সঙ্গে যদি বিশ্বযুদ্ধ মাথায় রাখা যায় – মানে যখন ব্যাটম্যান ও জোকারের আবির্ভাব ঘটছে কমিক্সে, তখন নাৎসীদের যেমন শীতল খুনি রূপ জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলো আমেরিকান মিডিয়া তার দিকে খেয়াল রাখলে জন্ম থেকেই জোকারের ইনস্যানিটির (insanity) একটা কার্যকারণ সূত্র মেলানো যায়।

    খ্রিস্টোফার নোলানের জোকার অবশ্য এমন নয়, সে আর সমস্ত জোকার থেকে ভিন্ন। সে যেনো ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় থিয়েটার থেকে উঠে আসা ফুল (fool)। যে কিনা, ‘Playful, irreverent and frequently irrational, folly at its most serious detonates confrontation with both society and the self. It constantly seeks out a persona or mask through which it can disclaim what it articulates’।৫ সে Super নয় Un, এমন যে বোধের অগমে থেকে যায়।

    The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

    I believe… whatever doesn’t kill you simply makes you …stranger. Joker

    খ্রিস্টোফার নোলানের জোকারের প্রথম পূর্ণ সংলাপ – যা তোমাকে খুন করে না, তোমাকে তা অপর/আগন্তুক বানায়। অনেকটাই রনে দেকার্তের (১৫৯৬-১৬৫০) দর্শনের প্রথম মন্ত্র Cogitoর উল্টো বাক্য। নিজের প্রথম সংলাপেই জোকার তার দর্শনের মূল মন্ত্রটা আমাদের জানিয়ে দেয়। দুদিক থেকে কথাটা কেটে আলাদা করে ভাবা যেতে পারে। প্রথমত কথাটা দেকার্তের কগিটোর মতো আত্মকেন্দ্রিক নয়- পরমুখী। পর এবং আত্মের সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয় সহিংসার (violence) মধ্য দিয়ে।

    যদি তাই হয়, এই কথা কি একই সাথে ইউরোপের ইতিহাস আর তার চিন্তার ঐতিহাসিক বিকাশের যে সূত্র তার অন্তরের কথাও নয়।

    গোটা সিনেমায় এই কথাটার নানান রকম প্রতিধ্বনি আছে। যেমন গথম (Gothom) শহরের মাফিয়াদের মিটিঙে আগন্তুকের মতো ঢুকে পড়ে জোকার একটি চরিত্রকে খুন করে। খুনের ঠিক আগ মুহূর্তে টেবিলে একটা পেনসিল উলম্ব ভাবে দাঁড় করিয়ে সে বলে, ÔHow about a magic trick. I’m gonna make this pencil disappearÕ৬। পেন্সিলটা গায়েব হয় সেই মুহূর্তে জোকারকে পাকড়াও করতে আসা ব্যক্তির চোখের কোটরে। এই খুনটির পরপরই দেখা যায়, উন্মাদ অনুপ্রবেশকারী বলে ভাবতে থাকা মাফিয়া চরিত্রেরা তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করেছে। আরেকটা চমৎকার প্রতিধ্বনি আছে ইন্টারোগেশন সেলে বন্দি জোকারের একটি সংলাপে, যেখানে জোকার জানাচ্ছে কেনো সে খুনের সময় অস্ত্র হিসেবে পিস্তল ব্যবহার না করে ছুরি ব্যবহার করে। এটা সে করে কারণ, বন্দুক/পিস্তলের গুলিতে মানুষ খুব দ্রুত মরে যায়। মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার আগে তারা কেমন ছিলো তা বোঝার আগেই – তারা মরে যায়। জোকারের কাছে এই মৃত্যু এক রকমের পলায়ন। তাই ধারালো দিয়ে ধীরে ধীরে খুন করার মধ্য দিয়ে সে মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তিকে তার সত্যিকার চেহারাটা দেখাতে চায়। তাদের প্রকৃত ট্রমাগুলো চেনাতে চায়। জোকার যেনো ছুরি দিয়ে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ায়। অল্প অল্প করে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সে পেঁয়াজকেই বোঝাতে চায় – পেঁয়াজের অন্তর বলে কিছু নেই।

    জোকার এবং তার শিকারের চেহারা একই রকম হয়। ফ্রান্সিস বেকনের (১৯০৯-১৯৯২) ছবির মতো। বেকনের ছবির প্রধান বিষয় যন্ত্রণা ও আর্তি। ব্যাটম্যানের মসৃণ কালো মুখোশের বিপরীতে তার মুখ অসঙ্গতিতে ভরা। জোকারের এই অসঙ্গতি পূর্ণ মুখাবয়ব আইন ও শৃঙ্খলার বৈপরীত্যের প্রতীক।

    The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

    Francis Becon (1979-80), Three studies for a self potrait

    It’s not about money …it’s about sending a massage. Joker

    কী চায় নোলানের জোকার? পুরো সিনেমায় এই প্রশ্নটি প্রেতের মতো গল্পকে তাড়া করে ফেরে। প্রশ্নটির দু রকম ফয়সালা হতে পারে। প্রথম ফয়সালা – ভোগবাদী সংস্কৃতিতে যে নির্বাচন বা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আপাতে দৃশ্যমান হয় – জোকার তার মুখোশ উন্মোচন করতে চায়। মানুষকে সে নির্বাচনের প্রকৃত চেহারার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চায়। এমন নির্বাচন যা অস্তিময়তার সঙ্গে যুক্ত। দ্বিতীয় ফয়সালা – জোকার গণতান্ত্রিকতার গোপন কথা ফাস করতে চায়। জোকারের দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিকতা গণকে শৃঙ্খলার (order) মধ্যে রাখা উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত। গণমুক্তি এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নয়। মুক্তি এই ব্যবস্থায় একটা মিথ যা মানুষের বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে।

    Why so serious? Joker

    আগেই বলেছি, নোলানের জোকার এর পূর্বসূরিদের মতো সাইকোপ্যাথ নয়। তার অস্তিবিদ্যা (ontology) যতোটা বোধগম্য হয়, মনবিদ্যা (psychology) ততটা নয়। নোলানের জোকারের অতীতানুসন্ধান – বৃথা প্রচেষ্টা মাত্র। গোটা সিনেমায় জোকার তিনবার তার অতীতের গল্প বলে – তিনটি গল্পের মধ্যে মিল যতো তার চাইতে অমিলই বেশী। গল্পগুলো বলার উদ্দেশ্য অপরের কাছে তার অতীত উন্মোচন করা নয়। মূল উদ্দেশ্য শিকারের মস্তিষ্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটা তার পন্থা যা সে অপরের ওপর বার বার প্রয়োগ করে। এটা প্রমাণ করার জন্য যে মানুষ তার নিজের বিভৎস চেহারাটা কখনো দেখতে চায় না। একটা চমৎকার উদাহরণ হলো রেচেলকে বলা জোকারের অতীতের গল্প। জোকার রেচেলকে বলে তার সহধর্মিনী এক সময় নিগ্রহের শিকার হয়েছিলো। অপর দ্বারা নিষ্পেষিত হয়ে তার মুখ বিকৃত হয়ে যায়। জোকার তার স্ত্রীর প্রতি সমবেদনাবসত নিজেই নিজের মুখ বিকৃত করে ফেলে। এবং সেই বিকৃত মুখ নিয়ে যখন সে তার সহধর্মিনীর সামনে দাঁড়ায় তখন তার সহধর্মিনী আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে, আর তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। জোকারের বিভৎস মুখ তার সহধর্মিনীকে নিজের বিকৃত মুখের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সেই সত্য যা সে দেখতে চায় না তাই যখন তার সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তাকে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই গল্পের মধ্য দিয়ে জোকার প্রমাণ করতে চায়, মানুষ এমন ব্যবস্থা চায় না যেখানে সে তার মুখদর্শন করতে পারবে বরঞ্চ এমন ব্যবস্থা চায় যেখানে সে নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে।

    স্লাভয় জিজাক (১৯৪৯) যেমন বলেন – জ্জোকার সত্যের শুদ্ধ বর্তমানতা৭। অপসারিতের (dispossessed) বিশুদ্ধ আকৃতি। সিনেমায় পুলিশী হেফাজতে আনার পর তার ক্রিমিনালিটির অতীতানুসন্ধান করতে গিয়ে ব্যর্থ পুলিশের অধিকর্তা গর্ডনের বক্তব্য হয় এমনজ্জ ‘Nothing. No matches on prints, DNA, dental. Nothing in his pockets but knives and lint’৮। ইতিহাসের পুরুষ/ মানুষ/কর্তা হয়ে ওঠার যে বক্ররেখা বা Curve নোলানের জোকার তা ছেদ করে যায়। সে পোস্ট হিউম্যান। তার ইতিহাস নাই। একারণেই গথমের প্রচলিত আইন ও শৃঙ্খলায় তাকে সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে রোগের ইতিহাস নেই তাকে চেনার উপায় কি? – আধুনিক মানুষের জানা নেই।

    And that’s the point. You’ll have to choose. Joker

    নোলানের জোকার মনে করে, গথম শহরে জনতা চেতনাশূন্য হয়ে আছে। তারা কেউই আর নিজের শরীরের কর্তা নয়। ফলে জোকারের কাছে তারা গিনিপিগ। আর গথম তার বিরাট পরীক্ষাগার। এই পরীক্ষাগারে জোকার তার সামাজিক নিরীক্ষা চালিয়ে যায়। তার সকল কর্মকাণ্ডই বস্তুত সামাজিক নিরীক্ষা। জোকার দেখতে চায়, ভোগবাদী সংস্কৃতির মধ্যে নির্বাচনের মেকি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষকে যদি বেছে নেওয়ার বা নির্বাচনের আস্তিত্বিক সমস্যার মুখে ফেলে দেয়া হয় – তখন কী ঘটে? ডার্ক নাইটে তিনটি চমৎকার উদাহরণ আছে এমন নিরীক্ষার।

    The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

    Choose between one life or the other. Joker

    ভোগবাদে দুটি খাদ্যের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া কিংবা দুটি কসমেটিক্সের মধ্যে একটি নির্বাচন করা আর মৃত্যুমুখে পতিত দুই জীবনের মধ্যে এককে বেছে নেওয়ার মধ্যে যে দূরত্ব জোকার যেনো তার স্পষ্ট সীমান্তরেখা। সিনেমায় তার সবগুলো সমাজতাত্ত্বিক নিরীক্ষাই এই প্রকারের আস্তিত্বিক নির্বাচনের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। অন্যভাবে বললে জোকার তার নিরীক্ষায় নির্বাচনের বিলাসিতাকে নির্বাচনের বাস্তবতায় বদলে দেয়। ডার্ক নাইটে এমন নিরীক্ষার প্রথম উদাহরণ, মি. রিসের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। মি. রিস ব্যাটম্যানের পরিচয় জানতে পারে। মিডিয়ার সামনে যখন সে সেই পরিচয় উন্মোচন করতে যায় তখনই জোকার ঘোষণা করে যে – গথমের জনতা যদি ষাট মিনিটের মধ্যে রিসকে খুন না করে তাহলে সে গথমের যেকোনো একটি হাসপাতাল উড়িয়ে দেবে। এই ঘোষণার পরপরই দেখা যায় জনতা থেকে পুলিশের সাধারণ কর্মী সবাই রিসকে হত্যা করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়। দেখা যাচ্ছে, জোকার গথমের জনতাকে একটা আস্তিত্বিক সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি মানুষদের (যাদের মধ্যে তাদের আত্মীয়-স্বজন আছে) বাঁচাতে গেলে কাউকে হত্যা করতে হবে। অর্থাৎ কোনো জীবন বাঁচাতে হলে কোনো জীবনকে খুন করতে হবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জোকার মানুষের নৈতিকতাকে মানুষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। বোঝা যায় নৈতিকতা বিষয়টা আপেক্ষিক। জোকারের পৃথিবীতে বিশুদ্ধ নৈতিকতা বলে কিছু নাই। একই সঙ্গে দেখা যায়, যে আইন ও শৃঙ্খলাকে জনতা তাদের রক্ষা-কবচ বলে বিশ্বাস করে – তাদের সেই বিশ্বাস টলিয়ে দেওয়ার জন্য সামান্য নৈরাজ্যই যথেষ্ট এবং যে নৈতিকতার ওপর শৃঙ্খলা নামক রক্ষা-কবচ প্রকিষ্ঠিত তাই নৈতিকতার শিকারে পরিণত। দ্বিতীয় উদাহরণ, জোকারের পাতা ফাঁদ। জোকারের পরিকল্পনা অনুসারে গথম শহরের সাদা নাইট এবং আইন ও নীতির প্রতীক হার্ভি ডেন্ট আর আইনজীবী রেচেলকে অপহরণ করে দুই ভিন্ন স্থানে বন্দি করা হয়। তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে টাইম বোমা আর তেলের ড্রাম সাজিয়ে রাখা হয়। ইন্টারোগেশন সেলে বন্দি জোকার ব্যাটম্যানকে হাসতে হাসতে সবই জানায়। কোথায়, কি অবস্থায় তাদের রাখা হয়েছে সবকিছু। তারপর ব্যাটম্যান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে সে নির্বাচনের স্বাধীনতাকে হাজির করে। দুটো বোমাই একই সময়ে বিস্ফোরিত হবে। তারা কেবল একজনকেই বাঁচাতে পারবে। তাদের বেছে নিতে হবে কাকে তারা বাঁচাবে। ঘটনা শেষ হয় রেচেলের মৃত্যু এবং আগুনে মুখের একপাশ পুড়ে যাওয়া হার্ভির বেঁচে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ব্যাটম্যান এবং নিরাপত্তা বাহিনী হার্ভিকেই বাঁচানো চেষ্টা করে, রেচেলকে (যে কিনা ব্যাটম্যানের সাবেক প্রেমিকাও) নয়। আইনের প্রতীক উদ্ধার হয়, সাধারণ নাগনিককে কোরবানি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। তৃতীয় উদাহরণ, সিনেমার শেষ পর্বে আছেজ্জযখন জোকারের হাত থেকে বাঁচাতে গথমের নাগরিকদের শহর থেকে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। নাগনিকদের নৈরাজ্য থেকে উদ্ধার করতে দুটো যাত্রীবাহী স্টিমার ভাড়া করা হয়। একটি স্টিমারে তোলা হয় গথমের নাগরিকদের। অন্য স্টিমারে স্থান পায় শহরটির নাম কাটা আসামীরা। আসামীদের এই সুবিধা দেওয়ার কারণ কমিশনার গর্ডন (জোকারকে বন্দি করার পুরষ্কার হিসেবে গর্ডন ততদিনে কমিশনার বনে গিয়েছে) চাইছিলো না জোকারের অপরাধী চক্র আর বড় হোক। দুটো স্টিমার যখন যাত্রা শুরু করে তখনই যাত্রী ও মাল্লাদের কাছে আশ্চর্য এক উপহারের প্যাকেট আসে। দুটো প্যাকেটেই দুটো ডেটোনেটর (detonator) পাওয়া যায়। দুটো স্টিমারেই জোকারের কণ্ঠ ভেসে ওঠে। জোকার তাদের উদ্দেশ্যে জানায়, দুটো স্টিমারেই পেট্রোল আর বোমা বসানো আছে। দুই স্টিমারের যাত্রীদের কাছে বোমার চাবি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যদি এক স্টিমারের যাত্রীরা বাঁচতে চায় তাহলে, নিজেদের বাঁচাতে তাদের অপর স্টিমারটি উড়িয়ে দিতে হবে। এখানেও নির্বাচনের একই তরিকা জোকার মানুষের ওপর প্রয়োগ করে। দুই স্টিমারেই হল্লা শুরু হয়, স্ব স্ব স্টিমারে থাকা স্বাধীন নাগরিক ও কয়েদিরা কেউই সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। অবশেষে দেখা যায় দুই স্টিমারেই ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। তারা কি করবে তা নির্ধারিত হবে সমষ্টির রায়ে। দুই স্টিমারেই অপর স্টিমারটি উড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বেশি ভোট পড়ে। কিন্তু কেউ সেই নির্বাচনের প্রথা বা ritual কার্যে পরিণত করতে পারে না। সমস্যাটা যে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা কে বাঁধবে এমন সংকট। এক পর্যায়ে দুই স্টিমারে দুইজন সাহসী ব্যক্তি এগিয়ে আসে। কয়েদিদের স্টিমারে যে কয়েদি এগিয়ে আসে সে ডেটোনেটরটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আর নাগরিকদের মধ্যে এগিয়ে আসা ব্যক্তি ডেটনেটর তুলে নিয়ে আবার বাক্সেই রেখে দেয়। তারপর তারা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এখানেও মজার বিষয় – জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অসারতা। সমষ্টি ভোটের মধ্য দিয়ে যে রায় দিলো, বাস্তবে ঘটলো তার উল্টো ঘটনা। সমষ্টির সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলো। এবং সেই ভুল পর্যবসিত হলো ভুল স্বীকার -নীরবে মেনে নেওয়াও মধ্য দিয়ে।

    Do I really look like a guy with a plan? You know what I am? I’m a dog chasing cars. I wouldn’t know what to do with one if I caught it. You know? I just do things. Joker

    গণতান্ত্রিকতা, ভোগবাদের সংস্কৃতি, নীতিনির্ভর আইন ও শৃঙ্খলাজ্জজোকার এই সবকিছুর এক প্রবল নাহং। তার দৃষ্টিতে গথমের শহরের নাগরিকদের দশা কারাগারে বন্দি কয়েদিদের মতোই। পার্থক্য কেবল অনুশাসনের ধরনে এবং স্বীকৃতিতে। এখানেই ব্যাটম্যান এবং জোকারের মিল। তারা একে অপরের নেমেসিস (Nemesis) -এই কারণেই। সিনেমায় জোকারের প্রথম সংলাপটি যদি পুনরায় স্মরণ করা যায়, যেখানে জোকার বলছে – যা তোমাকে খুন করে না তা তোমাকে অপর/আগন্তুক বানায়। জোকার ব্যাটম্যানকে খুন করে না। ইন্টারোগেশন সেলে সে এটা স্পষ্ট করেই জানায় যে ব্যাটম্যানকে খুন করার কোনো ইচ্ছাই তার নেই। কারণ ব্যাটম্যান তাকে পূর্ণ করে। তার অপূর্ণতাকে অর্থ দেয়। অর্থাৎ ব্যাটম্যান ও জোকার পরস্পরের আস্তিত্বিক অপরত্বের সম্বন্ধে প্রতিষ্ঠিত। জোকারের চৈতন্য এবং চৈতন্য তাড়িত সমস্ত কর্মকাণ্ড ব্যাটম্যানের অস্তিত্বের কারণে অর্থপূর্ণ হয়। একই ঘটনাকে উল্টোভাবেও দেখা যায়।

    When there enemies were at the gates …the Romans would suspend democracy and appoint one man to protect the city. It wasn’t considered an honor, it was a public service. Harvey Dent

    ব্যাটম্যান এবং জোকার হার্ভি ডেন্টের হাতে থাকা মুদ্রাটির মতো। তারা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গণতান্ত্রিকতা, আধুনিক সভ্যতার আইন ও শৃঙ্খলার ওপর দু’জনেরই ঘোর অবিশ্বাস। কিন্তু দু’জনের হয়ে ওঠা দুই পথে। গথম শহরের ধনীতম পরিবারের অনাথ সন্তান ব্রুস ওয়েইন যে কিনা চোখের সামনে পিতা-মাতাকে খুন হতে দেখে। সেই ঘটনা থেকে সৃষ্ট ক্ষতজাত মর্মপীড়া তাকে তাড়া করে ফেরে। ব্রুস এটা বিশ্বাস করে যে, গথম শহরের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলা, আমলাতন্ত্র শহরটিকে ধ্বংস থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। বরঞ্চ এইসব ব্যবস্থা ধ্বংসকে আরো তরান্বিত করছে। সে মনে করে শহরটার এমন একটা প্রতীক প্রয়োজন যে কিনা হবে শহরের বিচার ব্যবস্থা আর নীতি-দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। এটা অতিনৈতিক দশা। এখানেই ব্যাটম্যানের প্যারাডক্স। যা সে রক্ষা করতে চাচ্ছে তার শক্তির ওপর তার নিজের ভরসা নেই। তার অস্তিত্ব তার নিজের কাছেই এক অর্থে অগুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটম্যানের কাছে গণতান্ত্রিকতা, আইন ও শৃঙ্খলায় আবদ্ধ ব্যবস্থা যেমন অকার্যকর একইভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিক থেকে দেখা যাচ্ছে ব্যাটম্যানের অস্তিত্ব অপরিহার্য। এই সূত্র সিনেমাতেই আছে। হার্ভি ডেন্ট ব্যাটম্যানকে একেবারেই পছন্দ করে না। কিস্তু সে বিশ্বাস করে ব্যাটম্যান এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় শয়তান। সিনেমায় এক ভোজ সভায় তার মুখে যে সংলাপ বসানো হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, হার্ভি বলছে – রোমের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হলে রোমানরা গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠাতো এবং সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিতো একজনের হাতে। রোমকে সমূহ বিনাশ থেকে রক্ষা করা নির্বাচিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আলাদা কোনো সম্মানের বিষয় হতো না, এটা তার নাগরিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়তো। হার্ভির সংলাপে সরলীকরণ আছে। সংকটকালে রোমের ডিকটেটর নির্বাচনের ক্ষমতা থাকতো সিনেটের হাতে। অন্তত অগাস্টাস সিজার রোমের মসনদে পুরোপুরি জেঁকে বসার আগে এটা ছিলো সিনেটের অসাধারণ নিয়ম। সংকটকালে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে – নির্বাসনই একমাত্র পথ। এটাই গণতন্ত্রের প্যারাডক্স এবং ব্যাটম্যানদের মতো সমস্ত পপ্ অতিনায়ক আর আধুনিক যুগের স্বৈরাচারের উত্থানের মূল পথও এই সূত্রে প্রশ্বস্ত হয়। গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে হলে, জনগণের রাষ্ট্র ও ব্যবস্থাকে উদ্ধার করতে হলে তাকে আপাতত কবরে পাঠাও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্বে উইনস্টন চার্চিলের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে এভাবে গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলো ব্রিটেনের জনগণ। আরো ধ্রুপদী উদাহরণ এডলফ হিটলারের উত্থান।

    The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

    যদি ব্যাটম্যান হয় super order তাহলে জোকার ‘un’order । ব্যাটম্যান super plan হলে জোকার ‘un’plan । গথম শহরের ব্যাধি জোকার নয়। তার ব্যাধি সেই super order’র মধ্যে যা সে তার গড়ে তোলা আধুনিক গণতান্ত্রিকতার প্যারডক্সিকাল পরিস্থিতির ঔষধ বলে মনে করে। প্যারাডক্সিকালিটি আছে বলে তা ঢাকতে গণতান্ত্রিকতার সংস্কৃতির super moral (ফিকশনাল এবং ঐতিহাসিক) একনায়কের প্রয়োজন হয়। তাকে super moralityর মিথ গড়ে তুলতে হয়। আর যে অপসারিত, dispossessed যে – সে যেহেতু সেই super moralityর মিথের নাহং – সেহেতু নিরেট সত্য বা ব্যত্যয় রূপে তার উত্থানের সম্ভবনাও একই আস্তিত্বিক সূত্রে আবর্তিত হতে থাকে।

     

    তথ্যসূত্র :

    ১. Friedrich Nietzsche (1961), Thus Spoke Zarathustra, translated by R. J. Hollingdale, Penhuin Classics, UK, Pg. 54

    ২. মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ Zarathustra নামটার বাংলা করেছিলেন জরদ-উষ্ট্র। জরদ অর্থ পীত বর্ণ। আকরম খাঁর ভাষ্যে,‘আরব ও এশিয়ার বহু দেশে জরদ বা পীতবর্ণের উট অতিশয় মূল্যবান বলিয়া বিবেচিত হয়।’ [সূত্র. মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (২০০২), মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঢাকা, পৃ. ২১] সংস্কৃত সাহিত্যে হরিৎ উষ্ট্র নামটাও পাওয়া যায়। অনুমিত হয় জরদ-উষ্ট্রকেই হরিৎ উষ্ট্র নামে অভিহিত করা হতো প্রাচীন ভারতে।

    ৩. হলিংডেলের অনুবাদে স্থান পাওয়া spirit শব্দটার বাংলা তরজমা চেতনা করা গেলো।

    ৪. Susan Bernofsky, On Translating Kafka’s “The Metamorphosis”, https://www.newyorker.com/books/page-turner/on-translating-kafkas-the-metamorphosis

    ৫. Tim Prentky (2012), The Fool In European Theatre: Stages of Folly, Palgrave macmillan, London, P.1

    ৬. The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

    ৭. http://myheartwillgoonandsoonandsoon.blogspot.com/2019/11/slavoj-zizek-more-on-joker.html

    ৮. The Dark Knight (2008), directed by Christopher Nolan, Warner Bros. Entertainment, USA

     

     

  • বাংলা ভাষার জন্য টুসু সত্যাগ্রহের কথা

    বাংলা ভাষার জন্য টুসু সত্যাগ্রহের কথা

    আলতাফ পারভেজ

    একুশে নিয়ে বাংলাদেশে বিস্তর আলোচনা হয়। কিন্তু তাতে বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত বাংলা ভাষা নিয়ে বাংলাদেশের বাইরের জনপদের সক্রিয়তার কথা।

    বহু নজির দেয়া যায় এরকম উদাসীনতার। যেমন, বায়ান্নর ভাষার লড়াইয়ে তখনকার পূর্ববাংলার অনেক কবিতা ও গানের কথা আসে। কিন্তু তারও আগের আরেক ভাষা-সংগ্রামে রাঢ় অঞ্চলের টুসু গান কীভাবে ব্যবহার হয়েছে—ভজহরি মাহাতো, ভাবিনী মাহাতো, লাবণ্যপ্রভা ঘোষের মতো নেতারা কী করেছিলেন—সেসব নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে আজও তেমন বিশদ আলোচনা দেখি না।

    মানভূমি ভাষা সংগ্রামীদের দীর্ঘ পদযাত্রা

    কৃষি ও বনজীবী রাঢ় বাংলার আদি এক কবিতাসম্পদ ‘টুসু’। শব্দটি এসেছে বোধহয় ধানের তুষ থেকে। পৌষে ঝাড়খন্ড ও বিহার এলাকার  টুসু উৎসবের রেওয়াজ আছে। টুসু পরবের আদিতে রয়েছে গ্রামীণ বাংলার শস্যের প্রতি ভালোবাসা। এটা অ-পৌরাণিক, অ-ব্রাহ্মণ্যবাদী উৎসব এবং তার সঙ্গে লেপটে আছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অসামান্য এক পরম্পরা।

    পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ড সীমান্তের দুই দিকে আজকের যে রাঢ় বাংলা—তার অনেকখানি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘মানভূম’ হিসেবে পরিচিত। এই মানভূমেই বাংলাভাষা নিয়ে ইতিহাসের দীর্ঘতম সংগ্রাম হয়েছিল। মানভূমের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও সেই সংগ্রাম বিভিন্ন আদলে চলছে। অথচ ঢাকায় ভাষা-সংগ্রাম নিয়ে সকল আলোচনা তৃপ্তির সুরে শেষ হয় কেবল উর্দুর আধিপত্য প্রতিরোধের বিবরণ দিয়ে। সেই আলোচনায় হিন্দির আধিপত্যের বিপরীতে রাঢ় মানভূমের বাঙালিদের লড়ে যাওয়ার ইতিহাস অজ্ঞাত কারণে বেমালুম গরহাজির। ফলে ১৯৫২-এর বাংলাদেশ এবং ১৯৬১-এর বরাকের বাইরে বাংলা নিয়ে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক যন্ত্রণা ও দ্রোহের বিবরণ নিরন্তর আড়ালেই পড়ে থাকছে বাংলাদেশের পাঠক-শ্রোতার কাছে। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের অনেকে এও শুনে আশ্চর্য হন— মানভূম এলাকায় বাংলা নিয়ে সংগ্রামের শুরু ১৯৫২-এর চার দশক আগে, ১৯১২ সালে। মানুভূমকে তখন প্রশাসনিকভাবে বিহার-ওড়িষ্যার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তারই প্রতিবাদ। বিহারের সঙ্গে মানভূমের ওই সংযুক্তি থেকেই বৃহত্তর বাংলাভাষী সমাজের খন্ড-বিখন্ডের শুরু। সেই মানভূমি অঞ্চলেরই একাংশ আজকের পুরুলিয়া—আরেকাংশ আজকের ধানবাদ। দুঃখজনকভাবে তাদের দুই প্রদেশে ভাগ হয়ে থাকতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সর্ব পশ্চিমের জেলা পুরুলিয়া যে হিন্দির আধিপত্য থেকে মুক্তি পেয়েছিল সেটাও ১৯৫৬ সালে ১৬ দিনের মহাকাব্যিক এক গণমিছিল কলকাতা কাঁপানোর পর। দশ নারীসহ এক হাজার সংগঠকের সেই পদযাত্রা শুরু হয়েছিল পুরুলিয়ার পুঞ্চা থেকে। পুঞ্চার জৈন তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত পাকবিড়রা গ্রাম থেকে বেরিয়ে এই মিছিল কলকাতা পৌঁছে ৬ মে। ৩০-৪০ জন বাদে মিছিলকারীদের সবাইকে আটক করা হয়েছিল কলকাতায়। সপ্তাহ দুয়েক পরে এরা মুক্তি পান এবং মাস ছয় পর দাবির একাংশ মানা হয়। মানভূমের কিছু অংশ পুরুলিয়া নামে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়।

    ১৯৫৬ সালের ঐতিহাসিক ঐ গণমিছিলের পাটাতন তৈরি করতে মানভূমের সংগঠকদের এক নাগাড়ে ১০টি বছর লেগেছিল। বহু ধরপাকড় সইতে হয়েছে তাদের। কিন্তু সেসব মেঠো সংগ্রামের কথা ঢাকার একুশে-সাহিত্যে পাওয়া যায় না। আবার বাংলাভাষী ধানবাদ যে আজও ঢাকা-কলকাতা-আগরতলা থেকে সাংস্কৃতিকভাবে বিছিন্ন হয়ে ঝাড়খন্ডে পড়ে আছে তারও রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিপুল। সমৃদ্ধ এক খনি এলাকা এটা—যা ‘বাংলা’ চিরতরে হারালো। ধানবাদ ছাড়াও ঝাড়খন্ডের অন্তত ১১ জেলায় বাংলাভাষীরা আছে। ঢাকার পাঠক সেই বাঙালিদের সাহিত্য সম্পর্কে জানেন সামান্যই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেখানকার ভজহরি মাহাতোদের কথাও শুনেছে কদাচিৎ।

    ভজহরি (১৯১১-২০০৩) ছিলেন একই সঙ্গে কবি এবং রাজনীতিবিদ। পুরুলিয়ার বান্দোয়ানের মানুষ। ভাষার লড়াইয়ে এসেছিলেন তিনি অতুল চন্দ্র ঘোষেরর হাত ধরে। অতুল চন্দ্রের স্ত্রী ছিলেন লাবণ্যপ্রভা ঘোষ। এরা সবাই মানভূমি বাংলা ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা। শুরুতে এরা ছিলেন রাঢ় বাংলায় কংগ্রেসের ভিত্তি। কিন্তু মানভূমে বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোতে হিন্দির প্রশ্ন ওঠা মাত্র মাতৃভাষার পক্ষ নিয়ে অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে রাঢ়ের রাজনীতিবিদরা ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস ভেঙ্গে বেরিয়ে চলে আসেন। এসময় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠে ‘লোকসেবক সংঘ’ নামে একটি সংগঠন। দফায় দফায় মার খেয়ে, কারা জীবন কাটিয়ে  ভজহরি মাহাতোরা পরে এই আন্দোলনকে চূড়ান্ত এক উচ্চতায় নেন। টুসু গান ছিল এসময় তাঁদের সাংগঠনিক হাতিয়ার। এই গান দিয়ে খুব সহজে মানভূমের কৃষিজীবী জনপদকে এক কাতারে আনা যেত। ওনাদের ভাষার লড়াইয়ে প্রধান সাংস্কৃতিক অস্ত্র ছিল ভূমিজ এই গান।

    টুসুতে সুর বা যন্ত্রপাতির বাড়তি কারিগরী থাকে না। মুখে মুখে ছোট ছোট এসব কবিতা আওড়ায় মানুষ– অনেকটা সমবেত আরাধনার মতো। রাঢ় জনপদের পরিবারগুলো টুসুতে দ্রুত এক সঙ্গে সাড়া দেয়। টুসুর আরেক বৈশিষ্ট্য এটার আবৃত্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ থাকে বেশি। মানভূমের ভাষার লড়াইয়েও নারীদের অংশগ্রহণ ছিল বিপুল। ইতিহাসে যা ‘টুসু সত্যাগ্রহ’ হিসেবে পরিচিত। বাংলা নিয়ে তখনকার এই সত্যাগ্রহ পুরো ভারতে অন্যান্য ভাষা-ভাষীর মানুষকে হিন্দির আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস যুগিয়েছিল। এরপরই ভারতজুড়ে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গড়ার প্রবণতা জোরদার হয়। 

    মানভূম ভাষা আন্দোলনের পদযাত্রা ১৯৫৬ সালে কলকাতায় পৌছালো

    মানভূম বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রধান এক সংগঠক ভজহরি মাহাতো টুসু কবিতার বড় এক শরিকও বটে। আন্দোলন চলার সময় তাঁর বিখ্যাত একটা গানের কয়েক চরণ খুব গাওয়া হতো:

    শুন বিহারি ভাই
    তোরা রাখতে লারবি ডাঙ্গ দেখাই
    তোরা আপন তবে ভেদ বাড়ালি
    বাংলা ভাষায় দিলি ছাই…
    শুন বিহারি ভাই…
    বাঙালিকে মারলি তবু
    বিষ ছড়ালি হিন্দি চাই।
    বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই
    কোন ভেদের কথা নাই… ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষার রাজ্য চাই।

    আরেকটি টুসু গানে জগবন্ধু লিখছেন:

    প্রাণে আর সহে না
    হিন্দি কংগ্রেসীদের ছলনা
    ইংরেজ আমলে যারা গো
    করতো মোসাবিয়ানা
    এখন তারা হিন্দি-কংগ্রেসি
    মানভূমে দেয় যাতনা।।

    মধুসূদন মাহাতো লিখেছিলেন:

    মন মানে না রে হিন্দি সইতে
    ভাষা মোদের হরে নিল হিন্দিতে।
    মাতৃভাষা হরে যদি
    আর কি মোদের থাকে রে
    মধু বলে মাতৃভাষার
    ধ্বজা হবে বহিতে।

    ভজহরি মাহাতো

    রাঢ়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক এই আন্দোলন চলাকালেই ‘টুসু গানে মানভূম’ নামে এক ফর্মার একটা সংকলন তৈরি হয়। যা সেকালে এক লাখ কপি ছাপা হয় বলে কথিত আছে। শিগগির তা পুলিশি বাজেয়াপ্তির শিকার হয়েছিল।

    এসময়কার টুসু কবিদের অন্যতম মধ্যমনি ভজহরি মাহাতো ছিলেন একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠকও। নিত্যনতুন টুসু গান লিখে মানুষকে সংঘবদ্ধ রাখতে সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল ঘুরে বেড়াতেন তিনি। ভজহরি ছাড়াও মানভূমের ‘লোকসেবক সংঘ’ এসময় প্রভাবশালী সংগঠক ছিলেন অরুণচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা, ভীমচন্দ্র মাহাতো প্রমুখ। এদের কাজের কৌশল ছিল গান্ধীর ধারার— দাবির সমর্থনে অহিংস সমাবেশ শক্তি প্রদর্শন।

    হিন্দির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঝাড়খন্ডে আজও বাংলাভাষার মর্যাদা ও বিকাশের আন্দোলন চলছে

    পুরুলিয়া থেকে ভজহরি মাহাতো দু’বার লোকসভায় জিতেছিলেন। ভজহরিদের সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতাতেই আজও ঝাড়খন্ডের বহু এলাকায় হিন্দির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষীরা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় লড়ছে। যদিও ঢাকা তার সামান্যই খবর রাখে। এরকম সীমাবদ্ধতার কারণেই বাংলাদেশের একুশের বিবরণ আজও বাঙালি জনজাতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হয়ে উঠছে না। রাঢ় মানভূমে টুসুর হদিস তদন্ত করতে গেলে আমরা বাংলা ভাষা আন্দোলনের একান্তই নতুন এক সাংস্কৃতিক ইতিহাস খুঁজে পেতাম। যার স্রষ্ট্রা নাগরিক মধ্যবিত্ত নয়, কৃষিজীবী নিম্নবর্গ। সেজন্যই কি ঐ ইতিহাসে আমাদের আগ্রহ কম?

  • রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    × অনুবাদ: সহুল আহমদ

    [অনুবাদকের মন্তব্য: বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের জন্ম ১৮৭১ সালের ৫ মার্চে, পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারে। কৈশোরেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন রোজা। ১৮৮৬ সালে পোলিশ প্রলেতারিয়েত পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, কিন্তু তৎপরতার কারণে তৎকালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে রোজা দেশ ছাড়েন ১৮৮৯ সালে। পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৭ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, ‘দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অফ পোল্যান্ড’ শীর্ষক ডক্টোরাল থিসিস জমা দেন। কিন্তু ততদিনে তার তৎপরতা তাকে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিল। ১৮৯৩ সালে জুরিখে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।

    ১৯০৪ সালের দিকে, যখন বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন রোজা লুক্সেমবার্গ মোটাদাগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের জন্য পোলিশ ও রুশ বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে মেনশেভিক ও বলশেভিকদের যে বিভাজন হয়েছিল সেটা বিশ্লেষণ করতে ইস্ক্রার সম্পাদকরা তাকে অনুরোধ করেন। জার্মান ভাষায় ১৯০৪ সালে তিনি Neue Zeit পত্রিকায় ‘রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক প্রশ্নসমূহ’ শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধ হচ্ছে সংগঠন বিষয়ে লেনিনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের ভেতর পার্টি সংগঠন ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিষয়ে যে তর্ক চলছিল তাতে এই প্রবন্ধ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। রোজা এখানে বৈপ্লবিক পার্টির গঠন ও কেন্দ্রিকতা বিষয়ে লেনিনের অবস্থানের কড়া সমালোচনা হাজির করেন।

    রোজা এই প্রবন্ধে সংগঠন সংক্রান্ত তার ভাবনা তুলে ধরেন। আলাপ শুরু করেন লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদ দিয়ে, এবং এটাকে সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন। তৎকালে এক ধরনের নতুন সংগঠন, যা কিনা বিপ্লব সফল করবে, সে বিষয়ে প্রচুর আলাপ চলছিল। লেনিনের মতে, বিপ্লবী পার্টিকে আসলে শ্রমিকশ্রেণির ভ্যানগার্ড হতে হবে। তারাই নেতৃত্ব দিবে বিপ্লবে, শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালনে উদ্বুদ্ধ করবে। এই যে সংগঠন বা পার্টি হবে সেটাকে খুব কেন্দ্রীভূত হতে হবে, সামরিক বাহিনীর মতো এবং আমলাতান্ত্রিক। সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিই সবকিছুর পরিকল্পনা করবে, বাদবাকি সবাই, সংগঠনের শাখা–প্রশাখা সকলেই কেবল সেই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করবে। বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠন, বিলুপ্তকরণ, নেতা নির্বাচন বা অপসারণ ইত্যাদি সকল কাজের দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে। কেন্দ্রে যা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বাকিরা সেটাই বাস্তবায়িত করবেন, কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে আলাপ–আলোচনা করবেন। শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের এইসব নিয়া ভাবনার সময় নেই। বরঞ্চ সংগঠনের আমলাতান্ত্রিকতা ও কেন্দ্রিকতাবাদ আদতে বৈপ্লবিক। রোজা এই প্রবন্ধে প্রধানত এই প্রস্তাবনা ও এর সাথে জড়িত মনোভঙ্গির সমালোচনা করেন। রোজা বৈপ্লবিক পার্টির জরুরতকে অস্বীকার করেন না, বরঞ্চ তিনি মানেন সেটা লাগবেই। কিন্তু লেনিন যে কেন্দ্রিকতার কথা বলেন, রোজা সেটা মানতে পারেন না। কারণ, রোজার মতে, লেনিন জনগণের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে যান্ত্রিক বানিয়ে তুলতে চান। লেনিন যে ‘সুবিধাবাদে’র ব্যাপক নিন্দামন্দ করেন, রোজার মতে, সেটা কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে বরঞ্চ আরও ত্বরান্বিত হবে। রোজা তার দুই অধ্যায়ে এই অবস্থানকেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। তিনি বরঞ্চ সংগঠনে ব্যাপক অংশগ্রহণ চান। তাতে ভুল হতে পারে, সুবিধাবাদও প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেটাকে কোনো গঠনতন্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ভুল ঠেকানোর জন্য যদি কঠিন কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তোলা হয় তাহলে সেটা ভুল ঠেকানো দূরে থাক, উল্টো বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণির যে সজীবতা ও লড়াই করার যে স্পৃহা তাকেই গলা টিপে মেরে ফেলবে।

    রোজার এমন ভাবনা মোটেই অকস্মাৎ নয়। লেনিনের সাথে তার এই দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্য একেবারেই মৌলিক এবং সেটা আজীবন ছিল। এই প্রবন্ধে যেমন ছিল, তেমনি ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। রোজা বলশেভিক বিপ্লবের প্রশংসা করলেও সেখানেও তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটা বিষয়ে রোজার অগাধ বিশ্বাস ছিল, এগুলোই লেনিনের সাথে তার অবস্থানের ফারাক ঘটিয়েছে, এবং সারাজীবন সকল লেখাতেই বিষ্যগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিষয়গুলো হচ্ছে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা ও গণতন্ত্র। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর রোজা জোর দিতেন। সেখানে শ্রমিকশ্রেণির বা প্রলেতারিয়েতের বা আমজনতার সৃজনশীল সত্তা এই আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদের সমালোচনা করেন সেখানেও এই দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া। অর্থাৎ, কেন্দ্রিকতাবাদ জনগণের আন্দোলনের স্পৃহা, তাদের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা সবকিছুকে দমিয়ে দিয়ে, কাগজ ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কমিটির খপ্পরে তুলে দেয়। ফলে রোজার চোখে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র অবিচ্ছেদ্য। তিনি অবশ্যই সমাজতন্ত্র চাইতেন কিন্তু, তার মতে, যতদূর পর্যন্ত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে বিস্তৃত করা যায় ততদূর ছাড়া তার সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। সকল ধরনের স্বাধীনতা, অর্থাৎ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ব্যতীত সেই সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। তার চিন্তার এই কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো লেনিনের সাথে তার ফারাকটা গড়ে দিয়েছিল, এবং সেটা এই প্রবন্ধ থেকে শুরু করে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তৎকালে তর্কে জিত বোধহয় লেনিনেরই হয়েছিল, (যেহেতু লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়ে গিয়েছিল), কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী অভিজ্ঞতা, স্ট্যালিনবাদের আবির্ভাব, সোভিয়েতের পতন ইত্যাদিসহ আজ প্রায় ১০০ বছর পর আমাদের কাছে মনে হচ্ছে রোজাই বোধহয় সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, বিপদ টের পেয়েছিলেন।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগঠন বিষয়ক আলাপ–আলোচনা একদম অনুপস্থিত। থাকলেও সেটা অল্প। সংগঠন বিষয়ে যে সকল ধারণা প্রবলভাবে রাজনৈতিক মানসজগতে বিরাজ করছে সেখানে লেনিনের সংগঠন বিষয়ক ভাবনার একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু এই ধরনের সাংগঠনিক মডেল আজ আর কাজ করছে না। এই মুহূর্তে সংগঠন বিষয়ে আমাদের নতুন নতুন আলাপ তোলা জরুরি। এই কথা মাথায় রেখেই রোজা লুক্সেমবার্গের প্রবন্ধটির অনুবাদ করা হয়েছে।

    তৎকালে এই তর্কের আরও হদিস পাওয়া যেতে পারে লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান? এবং ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড, টু স্টেপস ব্যাক শীর্ষক রচনাতে। পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ট্রটস্কির আওয়ার পলিটিক্যাল টাস্ক।

    ১৯০৪ সালে এটি প্রকাশিত হয় “Organizational Questions of the Russian Social Democracy” শিরোনামে। প্রকাশিত হয় Iskra এবং Neue Zeit–এ। পরবর্তীতে Marxism vs. Leninism নামে একটি পুস্তিকা আকারেও প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে ইন্টেজারে প্রকাশিত হয় Revolutionary Socialist Organization শিরোনামে। ১৯৩৫ সালে Leninism or Marxism? শিরোনামে আরেকটি ফেডারেশন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে বার্ত্রাম উলফের ভূমিকাসহ The Russian Revolution and Leninism or Marxism? শিরোনামে প্রকাশিত হয়; ১৯৭০ সালে পাথফাইন্ডার প্রেস থেকে প্রকাশিত রোজা লুক্সেমবার্গের আরেকটা সংকলনে “Organizational Questions of Social Democracy” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    এখানে যে সংস্করণটি অনুবাদ করা হয়েছে তার মূল সূত্র হচ্ছে মার্ক্সিস্ট আর্কাইভ। তবে ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিটার হুদিস এবং কেভিন বি এন্ডারসন সম্পাদিত দি রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার–এর সংস্করণটিকেও অনুসরণ করা হয়েছে। কখনো কখনো ফুটনোটে বা বন্ধনীর ভেতর পার্থক্যসূচক মন্তব্যও জুড়ে দেয়া হয়েছে। তবে, এই দুটো সংস্করণকে পাশাপাশির রেখে আরও সম্পাদনার জরুরত রয়েছে।

    রোজা লুক্সেমবার্গের এই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল দুই অধ্যায়ে। রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের জন্য রোজার প্রথম অধ্যায়ের একটি খসড়া অনুবাদ করেছিলেন অনুবাদক মাজহার জীবন; কিন্তু তিনি আর কাজটা শেষ করেননি। এই অনুবাদে বিভিন্ন সময়ে তার খসড়া থেকে আমি সাহায্য নিয়েছি। তার প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা। অনুবাদ করার সময় আরিফ রেজা মাহমুদ, সারোয়ার তুষার ও তানভীর আকন্দের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা নিয়েছি। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।]

    মূল অনুবাদ

    প্রথম অধ্যায়

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ওপর এক নজিরবিহীন দায়িত্ব বর্তেছে। যে দেশে এখনো চরম ক্ষমতাধর রাজতন্ত্র প্রভাবশালী, সেখানে সর্বোত্তম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশলগত নীতি [পলিসি] নির্ধারণ করাই হলো এর দায়িত্ব। [১৮৭৯–৯০ সালের দিকে জার্মানিতে যখন বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইন কার্যকর ছিল] জার্মানির তৎকালীন পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার পরিস্থিতিকে একই সমান্তরালে তুলনা করাটা ভুল হবে। দুই দেশেরই সাধারণ মিল হলো—পুলিশি শাসন। আর কোনো দিক থেকেই দু’দেশের তুলনা চলে না [বিশেষত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে]।

    গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতাগুলো গুরুত্বের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে গৌণ। এমনকি রাশিয়ায় জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত বাধাগুলো অতিক্রম করে সাফল্য লাভ করেছে। রাস্তায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে জনগণ তাদের ‘গঠনতন্ত্র’ (কনস্টিটিউশন) খুঁজে পেয়েছে (যদিও তা অনিশ্চিত)। এই অবস্থা বজায় রেখে একদিন রাশিয়ার জনগণ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করবে।

    রাশিয়াতে বুর্জোয়া আধিপত্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির আড়ালে কার্যকর; এই বাস্তবতাই রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপ পরিচালনার প্রধান সমস্যা। এই স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য শ্রেণিসংগ্রামের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের একটি বিমূর্ত প্রোপাগান্ডামূলক চেহারা প্রদান করে, এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অসন্তোষ বা বিক্ষোভকে একধরনের গণতান্ত্রিক–বৈপ্লবিক চেহারা প্রদান করে।

    বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইনগুলো১ শ্রমিক আন্দোলনকে অতি উন্নত বুর্জোয়া সমাজে সাংবিধানিক চৌহদ্দির বাইরে নিয়ে এসেছে; যে বুর্জোয়া সমাজে শ্রেণিদ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বোচ্চ বিরোধাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। [এখানেই বিসমার্কের পরিকল্পনার অর্থহীনতা নিহিত]। রাশিয়ার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ওখানকার সমস্যা হলো কীভাবে একটা সোস্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় যেখানে রাষ্ট্র এখনো বুর্জোয়াদের কব্জায় নেই।

    এই পরিস্থিতির সাথে কেবল বিক্ষোভ এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে রুশ মাটিতে রোপনের পদ্ধতিই জড়িত নয়; বরঞ্চ এর সাথে পার্টি সংগঠনের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে এবং সরাসরি সামনে চলে আসে।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনে এমনকি সংগঠনকেও [সমাজতন্ত্রের পূর্বেকার ইউটোপিয়ান পরীক্ষা–নিরীক্ষা থেকে স্বতন্ত্র] প্রোপাগান্ডা/প্রচারণার একটি কৃত্রিম ফসল হিসাবে না দেখে বরঞ্চ শ্রেণিসংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক ফসল হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে, যেখানে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব [ডমিনেশন] সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে অগ্রগামী থাকে, সেখানে খোদ বুর্জোয়ারাই শ্রমজীবী শ্রেণির মাঝে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংহতির সূত্রপাত ঘটান। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর মতে, ‘এই পর্যায়ে শ্রমজীবীদের সংহতি তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ফসল নয়, বরঞ্চ এটা বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ।’ […যা কিনা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রলিতারিয়েতদের বাধ্য করে…’]

    তদপুরি, রাশিয়াতে সোশ্যাল ডেমক্রেসিকে নিজের প্রচেষ্টাতেই একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক কালপর্ব মেরামত করতে হবে। রুশ প্রলেতারিয়েতদের বর্তমান যে ‘বিক্ষিপ্ত’ [atomized] অবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক জমানাকে দীর্ঘায়িত করছে সে অবস্থা থেকে তাদেরকে শ্রেণি সংগঠনে রূপান্তরিত করতে হবে। এটা তাদেরকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে এবং সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।

    একটি বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে ধরনের সুযোগ–সুবিধার নিশ্চিয়তা থাকে সেগুলো ছাড়াই রুশ সমাজতন্ত্রীদের এমন একটি সংগঠন নির্মাণের ভার গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যান্য দেশের বুর্জোয়া সমাজ যে রাজনৈতিক রসদ যোগায় তা সেখানে থাকবে না। এভাবে বলা যায় যে, সর্বশক্তিমান ইশ্বরের মতো তাদেরকেও শূন্য থেকে এধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে সংগঠনগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠী/দল ও ক্লাব, এবং এদের প্রধান কর্মসূচি হচ্ছে প্রচারণা/প্রপাগান্ডা। প্রস্তুতি পর্যায়ের এই ধরনের সংগঠনগুলোকে কীভাবে এমন একটি বৃহৎ অখণ্ড জাতীয় কাঠামোতে রূপান্তর করা যায় যেগুলো কিনা রাশিয়া রাষ্ট্র শাসিত বিশাল অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত? এটাই হলো রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রোসির সুনির্দিষ্ট সমস্যা যা বেশ কিছুকাল ধরে আলোচিত হচ্ছে।

    পুরনো সংগঠন সক্রান্ত ধারণার সর্বাধিক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন [অটোনমি] এবং বিচ্ছিন্নতা [আইসোলেশন]। সুতরাং এটা বোধগম্য যে, যিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংগঠন দেখতে চান তাঁর শ্লোগান কেন হয়ে যাচ্ছে ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ [সেন্ট্রালিজম’]। গত পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্য ইস্ক্রা২ যে দারুণ প্রচারাভিযান চালিয়েছে সেখানে কেন্দ্রিকতা ধারণার প্রতি সম্মতি বারংবার প্রকাশিত হয়েছে; এই ধারণা রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটের পুরো তরুণ প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পার্টি কংগ্রেসে৩ এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ প্রত্যয়টি রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সংগঠন প্রশ্নকে পুরোপুরি আলাপে আনতে পারেনি। আমরা আবারও বুঝতে পারলাম যে, সামাজিক আন্দোলনে কোনো বাঁধাধরা নকশা [ফর্মূলা] যে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

    ইস্ক্রা গ্রুপের অন্যতম সদস্য কমরেড লেনিন রচিত এক কদম আগে, দুই কদম পিছে৪ শীর্ষক গ্রন্থটি রাশিয়ার আন্দোলনের “অতি–কেন্দ্রীকতাবাদীদের” ধারণাগুলোর পদ্ধতিগত বর্ণনা। এই গ্রন্থে অতুলনীয় বলিষ্ঠ ও যুক্তি সহকারে নির্মম কেন্দ্রিকতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূলনীতিগুলো হলো: ১) সকল সক্রিয় বিপ্লবীদের নিয়ে একটি আলাদা বাহিনী বাছাই ও গঠন করার জরুরত; এই অভিজাতদের [এলিট] চারপাশে থাকা অসংগঠিত কিন্তু বৈপ্লবিক সাধারণ জনগণ থেকে তারা আলাদা হবেন। ২) পার্টির সকল স্থানীয় কমিটিকে মনোনিত করার সুযোগ–সুবিধা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; সকল স্থানীয় কমিটির কার্যকর পদে নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটির থাকবে; পার্টি পরিচালনার তৈয়ারি নিয়মকানুন সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ারও কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; এমনকি, স্থানীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তকরণ ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে কোনো ধরনের আর্জির সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব থাকতে হবে। এভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রয়োজন অনুসারে পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্তর বিন্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে। পার্টির মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিই হবে একমাত্র চিন্তাশীল অংশ। বাকি সকল গ্রুপ হবে এর কার্যনিবাহী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

    লেনিনের যুক্তি হচ্ছে যে, এমন কেন্দ্রীভূত ধরনের সংগঠনের সাথে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গণআন্দোলনের সংমিশ্রণই বিপ্লবী মার্ক্সবাদের একটি নির্দিষ্ট নীতি। এই থিসিসের সমর্থনে তিনি একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এই ব্যাপারটা আরও একটু গভীরভাবে দেখা যাক।

    কোনো সন্দেহ নেই যে, সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রিকতাবাদের দিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একটি জোরালো ঝোঁক বা প্রবণতা রয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি যেহেতু তার এই ঝোঁকগুলো [কেন্দ্রিকতাবাদের ঝোঁক] সহ পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক জমিনে বেড়ে ওঠে এবং বৃহৎ কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর [ফ্রেমওয়ার্ক] ওপর তার সংগ্রাম ভর করে, সেহেতু সোশ্যাল ডেমোক্রেসি অন্তর্নিহিতভাবে সকল ধরনের স্থানিকতা বা জাতীয় ফেডারেলিজমের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সকল স্থানীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের সাধারণ স্বার্থগুলোর বিরোধিতা করা। এটি সকল শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনকে একটি একক দলে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে, তা তাদের মধ্যে যতই জাতিগত, ধর্মগত বা পেশাগত ভিন্নতা থাকুক। অস্ট্রিয়ার মতো কিছু বিশেষ ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটেছে।৫

    এটা পরিষ্কার যে, রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি নিজেকে অনেকগুলো জাতীয় গ্রুপ/দলের একত্রীভূত ফেডারেটিভ হিসাবে সংগঠিত করা উচিৎ নয়। বরঞ্চ তাকে পুরো সাম্রাজ্যের জন্য একটি একক পার্টি হয়ে উঠতে হবে। তদপুরি, এখানে বিবেচনাধীন প্রশ্ন এটি নয়। আমরা এখানে যা জিজ্ঞেস করছি তা হচ্ছে, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে একীভূত ও একক রুশ পার্টির অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয়করণের মাত্রা কদ্দূর পর্যন্ত জরুরি।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির যথাযথ কার্যক্রমের আঙ্গিক থেকে শ্রেণি সংগ্রামের একটি দল হিসাবে এর সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রতীয়মান হয় যে, পার্টির ক্ষমতা ও শক্তি সরাসরি পার্টির কেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিসমূহের প্রভাবের তুলনায় এগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি সমাজের ইতিহাসে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনই প্রথম যা প্রত্যেক পর্যায়ে এবং সকল ক্ষেত্রে জনগণের সংগঠন এবং প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন কার্যকলাপকে বিবেচনায় নেয়।

    এই কারণেই সোশাল ডেমোক্রেসি এমন এক ধরনের সংগঠন তৈরি করে যা পূর্বতন বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাধারণ সংগঠনের (যেমন জেকোবিন ও ব্লাঙ্কুইদের অনুসারী) চেয়ে পৃথক।

    লেনিন বোধহয় এই বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন যখন তিনি তার বইয়ে মন্তব্য করেন যে, বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট ‘শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের সাথে যুক্ত একজন জেকোবিন’–এর চাইতে বেশি কিছু নয়। লেনিনের কাছে সোশাল ডেমোক্রেসি এবং ব্লাঙ্কুইজিমের৬ পার্থক্য এই জায়গায় নেমে এসেছে যে, মুষ্টিমেয় ষড়যন্ত্রকারীর পরিবর্তে আমরা শ্রেণি–সচেতন প্রলেতেরিয়াত পেয়েছি। তিনি ভুলে যান যে, এই পার্থক্য সংগঠন প্রশ্নে আমাদের ধারণাগুলোর সম্যক পুনঃপাঠের ইশারা দিচ্ছে; কেন্দ্রিকতাবাদ নিয়ে একেবারে নতুন ধরনের ধারণার ইশারা দিচ্ছে; এবং পার্টি ও সংগ্রামের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক বিষয়ে একেবারে ভিন্ন ধারণার ইশারা দিচ্ছে।

    ব্লাঙ্কুইজম শ্রমিক শ্রেণির প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা অংশগ্রহণকে আমলে নেয় না। ফলে বিপ্লবের জন্য তাকে জনগণকে সংগঠিত করতে হয় না। বিপ্লবের মূহূর্তেই কেবল জনগণ তাদের ভূমিকা পালন করবে বলে ধরে নেয়া হয়। বিপ্লবের প্রস্তুতির ভার কেবল ছোট একটি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের, যারা ক্যু করবে। বস্তুত বৈপ্লবিক ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য ধরে নেয়া হয়েছিল যে ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে জনগণকে দূরে রাখাই শ্রেয়। এমন সম্পর্ক কেবল ব্লাংকুইবাদীরাই গ্রহণ করতে পারতেন, কেননা তাদের সংগঠনের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার সাথে জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রামের কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ নেই।

    ব্লাংকুইস্ট বিপ্লবীদের কৌশল ও তৎপরতার সাথে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রামের সংযোগ খুব কমই ছিল। তারা মুক্তভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কাজ করতে পারতেন। ফলে তারা আগ থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি রেডিমেড পরিকল্পনার রূপ নিতে পারেন। এর ফলে, সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা কেবল সাধারণ কার্যনিবাহী অঙ্গে পরিণত হন; তাদের কর্মকাণ্ডের পরিসরের বাইরে পূর্ব নির্ধারিত ইচ্ছা/সিদ্ধান্তের আদেশ পালন করাই হয়ে উঠে তাদের কাজ। তারা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতিয়ারে পরিণত হন। এখানে আমরা ষড়যন্ত্রমূলক কেন্দ্রিকতাবাদের দ্বিতীয় বিশেষত্ব খুঁজে পাই: কেন্দ্রের ইচ্ছার কাছে পার্টির বিভিন্ন অংশের চরম ও অন্ধ সমর্পণ, এবং সংগঠনের সকল অংশে এই কর্তৃত্বের সম্প্রসারণ।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে [র‍্যাডিক্যালি] আলাদা পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এর উত্থান ঘটে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রাম থেকে। এর বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত দ্বান্দ্বিক বিরোধের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে। অর্থাৎ, খোদ এই সংগ্রামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বাহিনী নিজেকে নিযুক্ত করেছে [রিক্রুট], এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। পার্টি গঠনের কার্যক্রম, সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রলেতারিয়েতদের সচেতনতা এবং খোদ সংগ্রাম, কোনোটাই কালানুক্রমিক ও যান্ত্রিকভাবে আলাদা আলাদা বিষয় নয়। এগুলো হলো একই সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন দিক। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির এমন কোনো একগুচ্ছ কৌশল নেই যা কিনা প্রশিক্ষণ শিবিরের সৈনিকদের শেখানোর মতো করে কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির সদস্যদের শেখাবে। বরঞ্চ, যে সংগ্রামের প্রক্রিয়া সংগঠন তৈয়ার করেছে সেটাই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির প্রভাবের পরিসরে একটি ক্রমাগত ওঠানামার প্রয়োজনীয় শর্ত তুলে ধরে।

    এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতা পার্টির কেন্দ্রের প্রতি সদস্যদের যান্ত্রিক অধীনতা ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর ভর করে হতে পারে না। এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন ইতোমধ্যে পার্টিতে থাকা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি সচেতন নিউক্লিয়াস এবং প্রলেতারিয়েতের পার্টিবিহীন অংশের মধ্যে কোনো বদ্ধ দেয়াল তৈরি অনুমোদন করে না।

    এখন লেনিনের কেন্দ্রিকতা যে দুটো নীতির ওপর নির্ভর করে আছে তা হলো:

    ১) পার্টির কেন্দ্রের কাছে পার্টির সকল অংশের অন্ধ আনুগত্য; কেবল কেন্দ্রই সকলের জন্য চিন্তা করবে, নির্দেশনা দিবে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

    ২) সামাজিক–বৈপ্লবিক প্রতিবেশ থেকে বিপ্লবীদের সংগঠিত নিউক্লিয়াসের কঠোর পৃথকীকরণ।

    এ ধরনের কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক শ্রেণির গণআন্দোলনের ওপর ব্লাঙ্কুইজমের সাংগঠনিক নীতিমালার একটি যান্ত্রিক প্রয়োগ।

    এই মতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেনিন তার ‘বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট’কে সজ্ঞায়ন করেছেন ‘শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের যুক্ত একজন জেকোবিন’ হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি প্রলেতারিয়েতের সংগঠনে সাথে যুক্ত নয়। এটা নিজেই প্রলেতারিয়েত; এটা শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের আন্দোলন। এই কারণেই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাবাদ মূলত ব্লাংকুইস্ট কেন্দ্রিকতাবাদ থেকে আলাদা। এটা কেবল মাত্র শ্রমিক শ্রেণির ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রতিনিধিদের পুঞ্জীভূত বা সম্মিলিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। বলা যেতে পারে, এটা প্রলেতারিয়েতের অগ্রসর অংশের [বা নেতৃত্বস্থানীয় স্তরের] ‘স্ব–কেন্দ্রিকতাবাদ’। এটা হলো নিজ পার্টির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাকে বাস্তবে পরিণত করার অপরিহার্য শর্তগুলো হচ্ছে:

    ১) শ্রেণি সংগ্রামে শিক্ষিত এক বিরাট বা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের শ্রমিকের উপস্থিতি

    ২) জনজীবন, পার্টি প্রেস, জনসমাবেশ ইত্যাদিতে প্রত্যক্ষ প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা বিকাশে শ্রমিকদের সম্ভাবনা।

    এই শর্তগুলো রাশিয়াতে এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। প্রথমটি, অর্থাৎ শ্রেণিস্বার্থ সচেতন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনায় সক্ষম একটি প্রলেতারিয়েত ভ্যানগার্ড, এখনো রাশিয়াতে কেবলমাত্র হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের সকল প্রচেষ্ঠা এমন ভ্যানগার্ড গঠনকে ত্বরান্বিত করা উচিৎ। দ্বিতীয় শর্তটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিস্থিতিতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    এই সিদ্ধান্তগুলোর সাথে লেনিন চরমভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিশ্চিত যে, একটি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রিভূত পার্টি গঠনের সকল প্রয়োজনীয় শর্তাবলী ইতোমধ্যে রাশিয়াতে বিদ্যমান। তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘প্রলেতারিয়েতদের নয়, বরঞ্চ সংগঠন ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আমাদের পার্টির কিছু বুদ্ধিজীবীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে’। তিনি কারখানার শিক্ষামূলক প্রভাবকে মহিমান্বিত করেন, যা তার ভাষায়, প্রলেতারিয়েতদেরকে ‘শৃঙ্খলা ও সংগঠনে’ অভ্যস্ত করে তুলবে। এতকিছু বলার পর লেনিন আবারও প্রমাণ করেন যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠন সম্পর্কে তার ধারণা যথেষ্ট যান্ত্রিক। লেনিনের চিন্তায় যে ‘শৃঙ্খলা’ [ডিসিপ্লিন] রয়েছে তা কেবল কারখানার মাধ্যমেই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে রোপণ করেন না, বরঞ্চ সামরিক ও বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বা [আধুনিক] আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেও সেটা করেন। অর্থাৎ, কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সকল কলকব্জা [মেকানিজম] দিয়ে এটা করা হয়।

    আমরা শব্দের অপব্যবহার করি এবং আত্ম–প্রবঞ্চনা চর্চা করি যখন একই শব্দ—যেমন শৃঙ্খলা [ডিসিপ্লিন]—নিম্নোক্ত বিপরীতমুখী ধারণাতে প্রয়োগ করি: ১) সয়ংক্রিয়ভাবে চলমান হাজারো হাত পা যুক্ত শরীরে চিন্তা ও ইচ্ছার অনুপস্থিতি, এবং ২) একদল মানুষের সচেতন রাজনৈতিক তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়। একটি নিপীড়িত শ্রেণির অন্ধ আনুগত্য এবং নিজের মুক্তির জন্য সংগ্রামরত একটি শ্রেণির সংগঠিত বিদ্রোহের মধ্যে কোন সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়?

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলা মানে বুর্জোয়া শাসকদের কর্তৃত্বকে একটি সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব দ্বারা নিছক প্রতিস্থাপন করা নয়। শ্রমিক শ্রেণি নতুন শৃঙ্খলার ধারণা অর্জন করবে, মুক্তভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলাকে গ্রহণ করবে; পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত শৃঙ্খলার ফসল হিসেবে নয়, বরঞ্চ আনুগত্য ও দাসত্বের পুরোনো অভ্যাসের শেষ শেকড় পর্যন্ত উৎপাটন করার মাধ্যমে এটা করবে।

    সমাজতান্ত্রিক [সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক–রিডার] ধারণায় কেন্দ্রিকতাবাদ শ্রমিক আন্দোলনের যে কোনো পর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য এমন কোনো চূড়ান্ত বিষয় নয়। বরঞ্চ এটা একটা প্রবণতা, যা শ্রমজীবীদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অর্জিত বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষার আলোকে মূর্ত হয়ে ওঠে। সন্দেহ নেই, রুশ আন্দোলনে এই ধরনের কেন্দ্রিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মূর্ত করে তুলতে প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর অনুপস্থিতিই একটি দুরূহ বাধা হাজির করেছে।

    এটা ভাবা ভুল হবে যে, যেখানে এখনো পার্টিতে সচেতন শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে সে শাসনকে একটা কেন্দ্রীয় কমিটির চূড়ান্ত ক্ষমতা দিয়ে ‘সাময়িকভাবে’ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে এবং এভাবেই পার্টি বা সংগঠনের ওপর শ্রমজীবী জনগণের উন্মুক্ত নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে বৈপ্লবিক প্রলেতারিয়েতের ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

    রুশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এমন ধরনের কেন্দ্রিকতার মূল্য সম্পর্কে বিবিধ সন্দেহের জন্ম দেয়। নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের সীমাহীন অধিকারসহ সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্র (অল–পাওয়ারফুল সেন্টার), যেমনটা লেনিন হয়তোবা চাইবেন, তা অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে যদি এই কর্তৃত্ব কেবল প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়, যেমন তহবিল পরিচালনা, প্রচারকারী [প্রপাগান্ডিস্ট] ও বিক্ষোভকারীদের কাজের দায়িত্ব বণ্টন, পার্টি পুস্তিকা বহন ও প্রচার। কেবলমাত্র যদি এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সংগ্রামের কৌশল অবলম্বন এবং রাশিয়াতে একটি বিরাট বৈপ্লবিক পদক্ষেপ শুরু করা হয় তবেই এর একটি বোধগম্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

    কিন্তু এখন পর্যন্ত রুশ আন্দোলন যে পরিবর্তনগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছে তার অভিজ্ঞতা কী? গত দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসূ পরিবর্তনগুলো আন্দোলনকারী কোনো নেতার ‘আবিষ্কার’ নয়, এমনকি নেতৃত্বস্থানীয় সংগঠনগুলোরও ফসল নয়, বরঞ্চ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা ছিল আন্দোলনের সক্রিয়তার স্বতঃস্ফূর্ত ফসল। এটা সত্য ছিল রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের জন্য; এটা শুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি ছিল রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রামের নবযুগের সূচনা। পরবর্তী সময়েও এটা কম সত্য ছিল না, ১৯০১ সালের মার্চে সেন্ট পিটার্সবার্গের শিক্ষার্থীরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তার আন্দোলনে নেমে আসে। ১৯০৩ সালের রোস্তভ অন ডনের সাধারণ ধর্মঘট ছিল রুশ প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের পরবর্তী বিশাল কৌশলগত মোড়, এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা। ‘অল বাই ইটসেলফ’, মানে নিজে নিজেই ধর্মঘট পরিণত হয় রাজনৈতিক সমাবেশে, রাস্তার বিক্ষোভে, বিশাল বিশাল সভা, যা কিনা কয়েকবছর পূর্বেই সবচেয়ে আশাবাদী বিপ্লবীও কল্পনা করতে পারেননি।

    প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘পহেলা ছিল কর্ম’; অর্থাৎ এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের কাজের যৌক্তিকতা আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ ও সচেতন নেতৃত্ব এই বিকাশে খুবই নগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এটা সত্য যে এই সংগঠনগুলোকে এমন ঘটনা প্রবাহের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না। তবু বিপ্লবীদের এই অগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে এই ফ্যাক্ট দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। লেনিন যে সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্রীয় পার্টির হাতিয়ারের কথা বলেছিলেন তার অনুপস্থিতি দিয়েও এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। এমন একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অস্তিত্ব সম্ভবত স্থানীয় কমিটিগুলোতে বিশৃঙ্খলা বা সিদ্ধান্তহীনতা বৃদ্ধি করতো; উত্তেজিত জনগণ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বিচক্ষণ অবস্থানের মধ্যে ফাটল ধরানোর মাধ্যমে এটা করা হতো। একই প্রপঞ্চ, মানে কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সচেতন উদ্যোগের গৌণ ভূমিকা, বর্তমানে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। সাধারণত, সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কৌশলগত নীতি এমন কিছু নয় যা আসলে ‘উদ্ভাবিত’ [ইনভেন্টেড] হতে পারে। বরঞ্চ বিভিন্ন পরীক্ষামূলক, এবং প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত, শ্রেণি সংগ্রামের দুর্দান্ত সব সৃজনশীল কর্মতৎপরতার ধাবাহিকতার ফসল।

    এখানেও চেতনের পূর্বে আসে অচেতন। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী মানবজাতির [বা, প্রক্রিয়ার এজেন্টদের] বিষয়ীগত যুক্তির পূর্বে আসে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার [অবজেক্টিভ বা বিষয়গত] যুক্তি। এইসমস্ত ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের ভূমিকা রক্ষণশীল চরিত্রের হয়ে থাকে, কারণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, যখন তারা লড়াইয়ের জন্য নতুন জমিন জিতে নেয় তখন তারা এটার ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা–নিরীক্ষা শুরু করে, এবং আরও বেশি মাত্রার অধিকতর উদ্ভাবনের বিপরীতে এটাকে শীঘ্রই কেল্লা বা দুর্গে পরিণত করে।

    জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বর্তমান কৌশল তাদের অসাধারণ বৈচিত্র্য, নমনীয়তা [ফ্লেক্সিবিলিটি], এবং একইসাথে দৃঢ়তার কারণে সবার কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার [রেজিম] আওতায় প্রতিদিনের ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিয়ে পার্টির খাপ খাওয়ানোর [এডাপটেশন] একটি চমৎকার আলামত। পার্টি তার আয়ত্বে থাকা সকল জিনিসপত্রের একটি পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করেছে; সে জানে তার নীতিগুলো পরিবর্তন না করেও কীভাবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হয়।

    তদপুরি, এই বিশেষ কৌশল, মানে এই এই নিখুঁত অভিযোজন, আমাদের পার্টির বিস্তীর্ণ দিগন্তকে এতই কার্যকরভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে যে, পার্লামেন্টারি কৌশলকে চিরস্থায়ী করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এটাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি জার্মানিতে সাধারণ ভোটাধিকার বিলুপ্ত হয় তখন কৌশলগত নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা (পারভাস৭ দ্বারা উত্থাপিত) বিবেচনা করতে লোকেরা অস্বীকার করেছিল; যদিও এমন একটি সম্ভাব্য ঘটনাকে [মানে ভোটাধিকারের বিলুপ্তি] জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসি একেবারে অবাস্তব মনে করেনি।

    মোটাদাগে এই ধরনের জড়তার কারণ হচ্ছে যে, বিমূর্ত হাইপোথিসিস সমূহের শূন্যতার মধ্যে, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির লাইন ও রূপগুলোকে সংজ্ঞায়ন করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ। স্পষ্টত ভবিষ্যত কৌশলের জন্য রেডি–মেড পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং আন্দাজ করাটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে: ১) প্রদত্ত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সংগ্রামের রুপগুলোর সঠিক ঐতিহাসিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা, এবং ২) বর্তমান পর্যায়ের আপেক্ষিকতা এবং শ্রেণি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্যের অবস্থান থেকে বৈপ্লবিক উত্তেজনার অনিবার্য বৃদ্ধি সম্পর্কে বোঝাপড়া অব্যাহত রাখা।

    লেনিনের চাওয়া মতে পার্টির শীর্ষে নেতিবাচক চরিত্রের এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হলে আমরা এমন অঙ্গের অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতাকে একটা বিপজ্জনক পরিমাণে শক্তিশালী করে তুলবো। সমাজতান্ত্রিক পার্টির কৌশল যদি একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন না হয়ে উল্টো পুরো পার্টি গঠন বা আরও ভালো হবে যদি পুরো শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে পার্টির বিভিন্ন অংশ [সেকশন] ও ফেডারেশনের কর্মের স্বাধীনতার জরুরত রয়েছে। এই স্বাধীনতা তাদেরকে বৈপ্লবিক উদ্যোগ গড়ে তোলার এবং পরিস্থিতি সকল উপাদানকে ব্যবহার করার অনুমতি দিবে। লেনিন কর্তৃক প্রস্তাবিত অতি–কেন্দ্রিকতা একজন প্রহরীর নিষ্ফলা চেতনায় ভরপুর। এটা কোনো ইতিবাচক এবং সৃজনশীল চেতনা নয়। পার্টির কর্মকাণ্ডকে আরও ফলপ্রসূ করার চাইতে লেনিনের তাগিদ হচ্ছে পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা—আন্দোলনকে বিকশিত করার পরিবর্তে আরও সঙ্কুচিত করা ফেলা, সমন্বয় করার পরিবর্তে বেঁধে ফেলা।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বিগুণ বিপজ্জনক হবে। জারের শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রান্তে এটি দাঁড়িয়ে আছে। এখন এটি তীব্র সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কালে প্রবেশের সময় এসেছে, অথবা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেই ফেলেছে; যখন কিনা এটি তার প্রভাবের পরিধিকে বিস্তৃত করে তুলবে [বৈপ্লবিক সময়ে যেমন সাধারণত হয়ে থাকে] এবং জোরেশোরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে পার্টির উদ্যোগকে বেঁধে রাখার চেষ্টা, কাঁটাতার দিয়ে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখার মানেই হচ্ছে এই মুহূর্তের যে অভাবনীয় দায়িত্ব বর্তেছে সেটা পালনে অক্ষম হয়ে পড়া।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আমরা যে সাধারণ ধারণা হাজির করেছি সেগুলো রুশ পার্টির জন্য মানানসই গঠনতান্ত্রিক [কনস্টিটিউশনাল] পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। চূড়ান্ত মুহূর্তে, এই ধরণের বিধিবিধান নির্ধারণ করা যেতে পারে কেবল সেই বাস্তবতায়, যার অধীনে একটি প্রদত্ত যুগে সংগঠনের কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। রাশিয়ায় এই মুহূর্তের প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে একটি বৃহৎ প্রলেতারিয়েত সংগঠন চালু করা যায়। কোনো গঠনতান্ত্রিক প্রকল্পই অভ্রান্ততা দাবি করতে পারে না। অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা থেকে আমরা মনে করি, এর স্পিরিটের জন্য প্রয়োজন, বিশেষ করে গণপার্টির শুরুতেই, আন্দোলনের সমন্বয় ও একত্রীকরণ; একগুচ্ছ নিয়মকানুনের কাছে অন্ধ আনুগত্য নয়। যদি পার্টি রাজনৈতিক গতিশীলতার গুণ ধারণ করতে পারে, পাশাপাশি নীতির প্রতি অটল থাকে এবং ঐক্য নিয়ে ভাবনা থাকে তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, পার্টির গঠনতন্ত্রে যে কোনো ধরনের ত্রুটি চর্চার মাধ্যমে সংশোধিত হয়ে যাবে। আমাদের জন্য এক টুকরো দলিল নয়, বরঞ্চ সদস্যরা সংগঠনের ভেতর যে জীবন্ত চেতনা নিয়ে আসেন সেটাই সাংগঠনিক বিভিন্ন রূপের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    এতক্ষণ আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাধারণ দৃষ্টিকোণ এবং কিছুটা হলেও রাশিয়ার অভিনব পরিস্থিতির আলোকে কেন্দ্রিকতাবাদের সমস্যাকে পর্যালোচনা করলাম। তদপুরি, লেনিন ও তার কমরেডদের বহুল প্রচারিত সামরিক অতি–কেন্দ্রিকতাবাদ মতের আকস্মিক ভিন্নতার ফসল নয়। বলা হয় যে এটা সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযানের সাথে জড়িত যা লেনিন ক্ষুদ্রতর সাংগঠনিক বিবরণের মধ্যে ধারণ করেছেন।

    লেনিন বলছেন যে, ‘সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি কার্যকরী অস্ত্র দাগা জরুরি’। তিনি বিশ্বাস করেন যে, সুবিধাবাদ বিশেষত বিকেন্দ্রীকরণ ও বিশৃঙ্খলার প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ঝোঁক থেকে আসে, কঠোর শৃঙ্খলা ও ‘আমলাতন্ত্র’ এর প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা থেকে আসে; যদিওবা এগুলো পার্টির কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন।

    লেনিন বলছেন যে, বুদ্ধিজীবীরা সোশ্যালিস্ট/সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ার পরও ব্যক্তিবাদী রয়ে যান এবং নৈরাজ্যবাদের প্রতি ঝুঁকে থাকেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল বিরোধিতা কেবল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই দেখা যায়। তিনি বলেন, খাঁটি প্রলেতারিয়েত তার শ্রেণি–প্রবৃত্তির কারণে দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর/নির্দয় শৃঙ্খলার খপ্পরে নিজেকে সঁপে দিয়ে একধরনের ইন্দ্রিয়পরায়ণ সুখানুভূতি খুঁজে পায়। তিনি লেখেন, ‘আমলাতন্ত্রবাদ বনাম গণততন্ত্রবাদ হচ্ছে বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক নীতি বনাম সুবিধাবাদীর সাংগঠনিক নীতি’। তিনি ঘোষণা করেন যে, যেসব দেশে সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্র মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয়বাদী ও স্বায়ত্তশাসনবাদী প্রবণতার মধ্যে একধরনের সংঘাত বিরাজ করছে। আইনভায় সমাজতান্ত্রিক প্রতিনিধির কতটুকু স্বাধীনতা পার্টি অনুমোদন করবে—এই প্রশ্নে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে যে সাম্প্রতিক বিতর্ক চালু আছে সে দিকে লেনিন বিশেষভাবে ইঙ্গিত দেন।৮

    লেনিন উত্থাপিত সাদৃশ্যগুলোকে পরীক্ষা করা যাক।

    প্রথমত, এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের ব্যাপারে প্রলেতারিয়েতের অনুমিত প্রতিভার গুণকীর্তন এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সাধারণ অবিশ্বাস এগুলো ‘বিপ্লবী মার্ক্সবাদী’ মানসিকতার আবশ্যক লক্ষণ নয়। এটা খুব সহজেই দেখানো সম্ভব যে, এই ধরনের যুক্তি নিজেই আসলে সুবিধাবাদের বহিঃপ্রকাশ।

    শ্রমিক আন্দোলনে খাঁটি প্রলেতারিয়েত উপাদান ও অ–প্রলেতারিয়েত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যকার বিরোধকে মতাদর্শিক বিষয় হিসাবে উত্থাপিত করা হয় নিম্নোক্ত উপায়ে: ফরাসি সিন্ডিকালিস্টদের আধা–নৈরাজ্যবাদ, যার জিগির হচ্ছে, ‘রাজনীতিবিদ থেকে সাবধান!’; ইংরেজ ট্রেডইউনিয়বাদী, ‘সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্ট্রা’দের ব্যাপারে অবিশ্বাসী; এবং আমাদের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এরপরেই রয়েছে ‘খাঁটি অর্থনীতিবাদী’, রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে রাবচায়া মিসলে৯ কিছুদিন আগে এর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, সেন্ট পিটাসবার্গ–এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির মধ্যে সুবিধাবাদ ও ‘বুদ্ধিজীবী’দের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি যোগসূত্র রয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ ও বিকেন্দ্রীকরণ প্রবণতার মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক জমিন থেকে সামাজিক প্রপঞ্চগুলোকে আলাদা করা এবং প্রপঞ্চগুলোকে বিমূর্ত নীতি হিসাবে উপস্থাপন (যেন এগুলোর একটি চূড়ান্ত ও সর্বজনীন প্রয়োগ রয়েছে) করার চাইতে মার্ক্সবাদী চিন্তার ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিপরীত আর কিছুই হতে পারে না।

    ধরে নেয়া যাক, যে কেউ বলতে পারেন, বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে উঠে আসা একটি সামাজিক উপাদান হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ আদতে প্রলেতারিয়েত থেকে দূরবর্তী থাকেন; তিনি তাঁর শ্রেণি–পরিচয়ের বোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাজতন্ত্রে যোগ দেন না, বরঞ্চ মতাদর্শিক পথকে গ্রহণের মাধ্যমে সেই বোধকে মাড়িয়ে তিনি যোগ দেন। এই কারণে তার শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতের তুলনায় বেশি সুবিধাবাদী বিভ্রান্তে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। যেহেতু শ্রেণি–সচেতন প্রলেতারিয়েতের নিজস্ব সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জনতার সাথে যোগসূত্র হারিয়ে যায়নি, সেহেতু তার তাৎক্ষণিক শ্রেণি–প্রবৃত্তি তাকে বিপ্লবী মেরুদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু সুবিধাবাদের দিকে বুদ্ধিজীবীর ঝুঁকে থাকার এই পূর্বানুমানের দৃঢ় রূপ এবং সর্বোপরি সাংগঠনিক প্রশ্নে এই প্রবণতা যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করে তা সবসময়ই প্রদত্ত সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

    জার্মান, ফরাসি ও ইতালির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে লেনিন যে প্রপঞ্চ চিহ্নিত করেছেন সেখানে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজম বা সংসদীয় রীতি হচ্ছে সেই প্রপঞ্চের নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি। পশ্চিমা সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে বিদ্যমান সকল সুবিধাবাদী প্রবণতার উর্বর জমিন হচ্ছে এই পার্লামেন্টারিজম।

    ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিতে আমরা বর্তমান সুবিধাবাদের যেসকল বিভ্রান্তির বিষয় দেখতে পাচ্ছি, যেমন: সামাজিক সংস্কার, শ্রেণি ও পার্টির সহযোগিতা, সমাজতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ বিকাশের আশা ইত্যাদির অতি–মূল্যায়ন, পার্লামেন্টারিজম কেবল এগুলোকে সমর্থনই যোগাচ্ছে না, বরঞ্চ এটা সেই জমিন তৈরি করে দিচ্ছে যেখানে এই বিভ্রান্তিগুলোকে অনুশীলন করা যায়। কারণ, এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ভেতরেই, পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে বুদ্ধিজীবীদেরকে এটি প্রলেতারিয়েত থেকে আলাদা করে ফেলে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতদের ওপরে স্থান দিয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্লামেন্টারিজম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারবাদীদের উর্বর জমিন। এই কারণেই বুর্জোয়াদের এত বেশি উচ্চাভিলাষী ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক পার্টির ব্যানারে ভিড় জমিয়েছে।

    এইসকল কারণ পশ্চিম ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অরাজকতা ও শৃঙ্খলতার অভাবের দিকে একটি নির্দিষ্ট ঝোঁকের উত্থান ঘটিয়েছে। বর্তমান সুবিধাবাদী ঢেউয়ের দ্বিতীয় নির্দিষ্ট শর্ত হচ্ছে উচ্চ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এর ফলে একটি প্রভাবশালী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংগঠনের উপস্থিতি। বুর্জোয়া–পার্লামেন্টারি প্রবণতার বিরুদ্ধে এই পার্টি বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামের দুর্গ হিসাবে কাজ করবে। যদি প্রলেতারিয়েতদের সুদৃঢ় ও সক্রিয় প্রাণভোমরাকে ভেঙে একটি নিরাকার গণ ‘ভোটারে’ পরিণত করতে হয় তাহলে এই দুর্গকে ভেঙে ফেলতে হবে এবং অকার্যকর করে তুলতে হবে। এভাবেই আধুনিক সুবিধাবাদের ‘স্বায়ত্তশানবাদী’ ও বিকেন্দ্রীয়করণের প্রবণতাগুলোর জন্ম হয়। তারা ঐতিহাসিকভাবে সু–প্রতিষ্ঠিত এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এগুলোকে ‘বুদ্ধিজীবী’র অন্তর্নিহিত অস্থিরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যেমন করে লেনিন বলছেন; বরঞ্চ এগুলোকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বুদ্ধিজীবীদের ‘মনস্তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরঞ্চ সুবিধাবাদী ‘রাজনীতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

    তদপুরি জারের রাশিয়ার পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। সাধারণত রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ কোনোভাবেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির শক্তিশালী বিকাশ অথবা বুর্জোয়া সমাজের বিভাজনের ফসল নয়, বরঞ্চ এটি রুশ সমাজের পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল।

    এটা বোধগম্য যে, রাশিয়ার যে বিদ্বৎসমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা উঠে এসেছেন সেই সমাজের এখনো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিচরিত্র গড়ে ওঠেনি, এবং পশ্চিম ইউরোপের বিদ্বৎসমাজের চাইতে কিছুদূর অব্দি এখনো শ্রেণিচ্যুত বলা যায়; অর্থাৎ, তারা সে তুলনায় এখনো কম বুর্জোয়া। এটি রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের অপরিপক্বতার সাথে যুক্ত হয়ে তত্ত্বীয় অস্থিরতা ও সুবিধাবাদী দোদুল্যমানতার বিস্তর সুযোগ তৈরি করে দেয়; যা কখনো শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়, কখনো এর একদম বিপরীতে গিয়ে সন্ত্রাসকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসাবে বিশ্বাস করে, এবং পরিশেষে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে লিবারেলিজমের পঙ্কিলতায় অথবা দার্শনিক পরিমণ্ডলে কান্টের আদর্শবাদীতার খপ্পরে পড়ে।১০

    আমাদের মতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠনহীনতার দিকে একটি নির্দিষ্ট সক্রিয় প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্য বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজমের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কেবল অভাবই নয়, বরঞ্চ এটা সংশ্লিষ্ট সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে জড়িত। আধুনিক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের যারা এই সময়ে ‘ইগোর কাল্টে’ নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং এমনকি ‘প্রভু জাতের নৈতিকতা’কে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও সংগ্রামের জগতে টেনে নিয়ে আসছেন, তারা সাধারণত বুর্জোয়া বিদ্বৎসমাজের আদর্শ প্রতিনিধি নন, বরঞ্চ তারা তাদের সামাজিক বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্য ভাবে বলা যায়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু ও বিকৃত বুর্জোয়া সমাজের ফসল, যা কিনা ইতোমধ্যে তার নিজের শ্রেণি আধিপত্যের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে এবং সঙ্গত কারণেই, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির ইউটোপিয়ান ও সুবিধাবাদী কল্পনাগুলো বরঞ্চ আত্ম–অস্বীকৃতি ও আত্ম–অননুমোদনের বিপ্রতীপ তাত্ত্বিক রূপের গ্রহণ করার দিকে ঝোঁকে। নিশ্চিতভাবে পুরনো নারদনিকদের ‘জনতার কাছে যাওয়া’১১ নামক আন্দোলন, মানে বুদ্ধিজীবীকে বাধ্যতামূলকভাবে কৃষকের ছদ্মবেশ ধারণ ছিল একটি হতাশাজনক আবিষ্কার। একইভাবে সাম্প্রতিক খাঁটি ‘অর্থনীতিবাদে’র শীষ্যরা শ্রমিকের ‘মসৃণ হাত’–এর সামনে আমাদেরকে মাথা নত করাতে চায়।

    আমরা যদি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রশ্নটিকে সরাসির ইউরোপ থেকে রাশিয়াতে আমদানি না করে খোদ রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করতে চাই তাহলে আমরা একদম ভিন্ন ফলাফল পাবো। সংগঠনের কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো, যেমন বিকেন্দ্রীকরণ, এর প্রতি প্রবল উৎসাহের জন্য সুবিধাবাদকে দায়ী করার (যেমনটি লেনিন করেছেন) মানে হলো সুবিধাবাধের অন্তর্নিহিত নির্যাসকে ভুল বোঝা। সাংগঠনিক প্রশ্নে সুবিধাবাদের কেবল একটাই নীতি থাকে: নীতির অনুপস্থিতি। এটা সবসময়ই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে পদ্ধতি নির্বাচন করে, যতক্ষণ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু যদি লেনিনের মতো করে আমরা সুবিধাবাদকে একটি প্রবণতা বা আকাঙ্ক্ষা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করি যা কিনা প্রলেতারিয়েতদের স্বাধীন বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামকে অসাড় করে ফেলে এবং এটাকে উচ্চাভিলাষী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের একটি হাতিয়ারে পরিণত করে, তাহলে আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে, শ্রমিক আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফলাফল বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নয়, বরঞ্চ দৃঢ় কেন্দ্রিকতাবাদের মাধ্যমেই কায়েম হয়ে যায়। কঠোর কেন্দ্রিকরণের মাধ্যমেই একটি নব–বিকশিত ও অপরিষ্ফুটিত প্রলেতারিয়েত আন্দোলন একটি কেন্দ্রীয় কমিটির বুদ্ধিজীবী নেতাদের হাতের মুঠোয় চলে যায়।

    জার্মানিতেও আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, সচেতন প্রলেতারিয়েতদের একটি শক্তিশালী নিউক্লিয়াস এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশল হাজির হওয়ার পূর্বেই বিপরীতমুখী দুই সাংগঠনিক প্রবণতাই বিবাদে মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে রয়েছে লাসালের জেনারেল জার্মান ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কর্তৃক প্রচারিত উগ্র কেন্দ্রিকতাবাদ, এবং অন্যদিকে রয়েছে আইজেনাখার কর্তৃক প্রচারিত ‘স্বায়ত্বশাসনবাদ’। আইজেনাুখারদের কৌশলগত নীতি কিছুটা দিশেহারা হওয়া সত্ত্বেও এটি জার্মানের জনগণের মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা বৃদ্ধিতে লাসালিয়ানদের তুলনায় বেশি অবদান রেখেছিল। অতি শীঘ্রই শ্রমিকরা এই পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা শুরু করেছিল এবং আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটেছিল। একইসময়ে লাসালিয়ানরা তাদের ‘স্বৈরশাসক’দের নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা উল্টো বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করেছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডিজএপেয়ার্ড
    শিল্পী: স্যাগাল
    সূত্র: ফ্রিপিক্স

    সাধারণভাবে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী উপাদান এখনো অসংগঠিত এবং খোদ আন্দোলনই দোদুল্যমান, (সংক্ষেপে, এই পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার মিল রয়েছে) এমন পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা একটি কঠোর স্বৈরাচারী কেন্দ্রিকতাবাদী সাংগঠনিক প্রবণতাকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, একটি সংসদীয় শাসনামলে এবং একটি শক্তিশালী শ্রমিক দলের মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদী প্রবণতা তখন ‘বিকেন্দ্রীকরণে’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।

    শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে বিদ্বৎসমাজের বিপজ্জনক প্রভাব সম্পর্কে লেনিনের যে ভয় সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, সংগঠন প্রশ্নে তার নিজের ধারণা রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হাজির করছে। প্রকৃতপক্ষে, বিকাশমান প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে একটি আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের পকেটে ঢুকাতে পারলে এই আন্দোলন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী একদল বুদ্ধিজীবীদের কব্জায় খুব সহজে, এবং নিশ্চিতভাবেই চলে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সংগ্রামী শ্রমিকদের একটি ‘কমিটি’র অনুগত হাতিয়ারে পরিণত করে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অর্জন করেন, তা তাদেরকে উচ্চাভিলাষী বিদ্বৎসমাজ পরিচালিত কমিটির সুবিধাবাদী ব্যবহার থেকে রক্ষা করবে।

    লেনিন আজ যাকে অলীক ছায়া বা ভূত হিসাবে দেখছেন কাল তা সহজেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে রাশিয়ার আশু বিপ্লব একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হতে যাচ্ছে, কোনো সর্বহারা বিপ্লব নয়। এটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের সকল পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন রুশ বুদ্ধিজীবীরা দ্রুতই বুর্জোয়া মতাদর্শে ডুব দিবে। যদি বর্তমানে রুশ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্রেসিই প্রধান ধারা হয়ে থাকে, তাহলে বুর্জোয়া বিপ্লবের পরপরই, সর্বোপরি এর বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে সংসদীয় হেজেমনির জন্য স্তম্ভমূল বানাতে চাইবে। স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড, স্বাধীন উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাধারী অংশ যত কম হবে, তত বেশি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক জবরদস্তির শিকার হবে, নতুন রাশিয়ার বুর্জোয়া বক্তৃতাবাজ নেতাদের খেলা তত সহজ হবে, এবং আজকের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক শ্রমিকদের ফসল তত বেশি বুর্জোয়াদের মাচায় উঠবে।

    সর্বোপরি, অতি–কেন্দ্রিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মূল অভিমুখ, অর্থাৎ সাংগঠনিক অবস্থা বা পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা–উপধারা দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদের হাত থেকে রক্ষা করার ধারণাটি, আসলে মিথ্যা। ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মাঝেও সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এলিয়েন বা বিজাতীয় উপাদান হিসাবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেন এটা কেবল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উপাদানের সাথে বাইরে থেকে এসেছে। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ধারা–উপাধারা এই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না। অর্থাৎ, সুবিধাবাদী উপাদানের চাপে এটা অকার্যকর হিসাবে প্রমাণিত হবে। প্রলেতারিয়েত সংগঠনে বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে নন–প্রলেতারিয়েত উপাদানের এই অন্তঃপ্রবাহ আসলে বিভিন ধরনের সামাজিক কারণের ফলাফল, যেমন পাতি–বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক পতন, বুর্জোয়া উদারবাদের দেউলিয়াপনা এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অবক্ষয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে লিখিত ফর্মুলা দিয়ে এই প্রবাহকে আটকানোর আশা করা বোকামিই। কয়েকটি অনুচ্ছেদ, বা বিধিবিধানের ম্যানুয়াল কেবল একটি ছোট উপদল বা গোপন (প্রাইভেট) চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ইতিহাসের প্রবাহ সবসময় এই অনুচ্ছেদকে মাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, বুর্জোয়া সমাজের ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া উপাদানগুলোকে ঠেকানোর মানে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করা—এও সত্য নয়। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি সর্বদাই দাবি করে এসেছে যে, এটি কেবল প্রলেতারিয়েতদের শ্রেণি স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে না, বরঞ্চ সমগ্র সমসাময়িক সমাজের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। বুর্জোয়া আধিপত্যের জুলুমের শিকার সবার স্বার্থকে এটা তুলে ধরে। এটাকে নিছক এই অর্থে বোঝা যাবে না যে, এইসমস্ত স্বার্থ আদর্শস্বরূপ সোশ্যালিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়াতেই এই ধারণাটি বাস্তবে হাজির হবে, যেখানে কিনা রাজনৈতিক পার্টি হিসাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের সকল অসন্তুষ্ট উপাদানগুলোর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। যার ফলে এটি গুটিকয়েক আধিপত্যকামী বুর্জোয়াদের পার্টি হওয়ার বিপরীতে জনতার পার্টি হয়ে উঠবে। এ জন্য জানতে হবে কীভাবে এই বিচিত্র সমষ্টির যন্ত্রণা, ক্রোধ ও আশাকে শ্রমিক শ্রেণির চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা যাবে। বিদ্যমান সমাজের বিরুদ্ধে অ–প্রলেতারিয়েতের বিক্ষোভকে প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সাথে একত্রে আবদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ, আগত উপাদানগুলোকে একীভূত করতে হবে। এটা কেবল তখনই সম্ভব যদি সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েত নিউক্লিয়াসের উপস্থিতি থাকে (যেমন এখন পর্যন্ত জার্মানি) যারা কিনা শ্রেণিচ্যুত ও পাতি–বুর্জোয়া উপাদানগুলোকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণের নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং দলীয় বিধি অনুসারে গঠিত কঠিন শৃঙ্খলা সুবিধাবাদের বিপদের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর সুরক্ষা হতে পারে। এভাবেই ফ্রান্সের বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন জ্যোরাসি১২ বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করেছিল। সেদিকে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির গঠনতন্ত্রের সংশোধন একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হবে। কিন্তু এমনকি এক্ষেত্রে কেবল দলীয় গঠনতন্ত্র বা বিধিকে সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার ভাবা উচিৎ নয়, বরঞ্চ এটাকে পার্টির মধ্যে বিদ্যমান বৈপ্লবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রলেতারিয়েত কর্তৃত্বমূলক প্রভাব প্রয়োগের একটি বাহ্যিক বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তিমূলক হাতিয়ার হিসাবে দেখা উচিৎ। যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব থাকে তাহলে সবচেয়ে ভয়ানক কাগুজে অনুমোদনও বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

    তদপুরি আমরা উল্লেখ করেছি যে, কেবল বুর্জোয়া উপাদানের অনুপ্রবেশই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবাহের একমাত্র উৎস নয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে খোদ সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের চরিত্র ও এর মধ্যে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য। সর্বমুক্তির দিকে প্রলেতারিয়েতদের আন্তর্জাতিক লড়াই বা বিজয়ের দিকে প্রলেতারিয়েতদের ঐতিহাসিক অগ্রগতি একটি অভূতপূর্ব প্রক্রিয়া। কারণ ইতিহাসের প্রথমবারের মতো জনগণ [পিপল] সচেতনভাবে নিজেদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, এবং সমস্ত শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু এই ইচ্ছা কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থা বা সমাজের উর্ধ্বে উঠে বা ছাড়িয়ে গিয়ে সিদ্ধ হতে পারে। তদপুরি অন্যদিকে, এই জনতা তাদের এই ইচ্ছাকে গঠিত বা বিকশিত করতে পারে কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে, অর্থাৎ কেবল বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই (অর্থাৎ, পুঁজিবাদী সমাজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে)। একদিকে রয়েছে জনতা [মাস] অন্যদিকে রয়েছে এর ঐতিহাসিক লক্ষ্য যা কিনা বিদ্যমান সমাজের বাইরে অবস্থিত। একদিকে রয়েছে দৈনন্দিন সংগ্রাম, অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বিপ্লব। এই দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের [সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক আন্দোলন] বিকাশ ঘটছে বা ঘটে। এই পথচলায় দুটো বিপদকে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করেই যেতে হয়, একদিকে রয়েছে গণচরিত্রের ক্ষতি, অন্যদিকে রয়েছে এর লক্ষ্যে পরিত্যাগ। একদিকে রয়েছে একটি উপদল বা সম্প্রদায়ের দশায় পুনঃপতিত হওয়ার বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে একটি বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হওয়ার বিপদ।

    এই কারণেই এটা চিন্তা করা অনৈতিহাসিক ভ্রান্তি যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক কৌশল পূর্ণরূপে সবার জন্য নির্ধারণ করা যাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তি থেকে একেবারেই মুক্ত করা সম্ভব। অবশ্যই, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব আমাদেরকে সুবিধাবাদী সাধারণ প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার সরবরাহ করে। কিন্তু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি গণ–আন্দোলন এবং এর বিপদগুলো ব্যক্তির মনন থেকে উদ্ভূত না হয়ে বরঞ্চ সামাজিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত হয়, ফলে আগ থেকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না। যখন এগুলো বাস্তবে মূর্ত আকার ধারণ কবে কেবল তখনই, খোদ আন্দোলনের মাধ্যমেই এটাকে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে; এবং অতি অবশ্যই মার্ক্সবাদ প্রদত্ত হাতিয়ার দিয়ে, মানে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সহায়তায়। এদিক থেকে দেখলে সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিকাশের অনিবার্য পর্যায় ও ফসল বলে মনে হবে। রাশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি এখনো অবিকশিত, এবং যেখানে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক, সেখানে সুবিধাবাদ মোটাদাগে এই উৎস থেকে উৎসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের কৌশলের ক্রমাগত পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান থেকে উৎসারিত হতে পারে, সমাজতান্ত্রিক মৌলিক নীতিগুলোর ব্যতিক্রমী ও অতুলনীয় পরিস্থিতিতে বর্তমান সংগ্রামকে নিয়ে আসার প্রয়োজন থেকে উৎসারিত হতে পারে।

    যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে কোনো একটা নির্দিষ্ট সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র দিয়ে রাশিয়ার আন্দোলনে সুবিধাবাদের উত্থান এড়ানোর ধারণাটা অদ্ভুত খেয়ালিপনায় পূর্ণ। এক টুকরা কাগজ দিয়ে সুবিধাবাদকে নিবৃত্ত করার প্রয়াস প্রচণ্ড ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে, সুবিধাবাদের জন্য নয় বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যই। কারণ একটি সুস্থ জীবনের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বন্ধ করার মাধ্যমে আপনি তার লড়াই করার স্পৃহাকেই দুর্বল ও দমন করে ফেলেন। যা কিনা কেবল সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরঞ্চ বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তার লড়াইর স্পৃহাকে দুর্বল করে দেয়। উপায় উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধেই চলে যায়।

    শিল্পী: পল স্নোডেন

    রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের একটা অংশের (বা লেনিনের) এই যে অতি–উদ্বিগ্নতা, অর্থাৎ একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন শ্রমিক আন্দোলনকে কোনো ধরনের ভুল–ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য একটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আমরা সেই একই সাবজেক্টিভিজমের আলামত দেখতে পাচ্ছি, যা কিনা রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার জগতে ইতোমধ্যে একের অধিক প্রতারণা করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক রাশিয়ার ইতিহাসে শ্রদ্ধেয় মানব ‘অহং’কে যে অদ্ভুত ডিগবাজিগুলো করতে হয়েছে তা আগ্রহোদ্দীপক। রুশ স্বৈরাচার কর্তৃক একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়ে এই ‘অহং’ নিজেকে, নিজস্ব চিন্তার পদ্ধতিতে, সিংহাসনে বসিয়ে এবং অস্তিত্বহীন ‘নারোদনায়া ভোলিয়া’র১৩ নামে ষড়যন্ত্রকারীদের একটি কমিটি হিসাবে নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসাবে ঘোষণা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ‘বিষয়’ [অবজেক্ট] শক্তিশালী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। এই কষাঘাত (knout/knot একেক স্থানে এককটা দেয়া আছে) বিজয়ী হয়েছিল, কারণ এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ‘বৈধ’ অভিব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করেছিল।

    সময়ে সময়ে আমরা দৃশ্যপটে ইতিহাসের আরও বেশি ‘বৈধসম্মত’ সন্তানকে দেখতে পেলাম, মানে রুশ শ্রমিক আন্দোলনকে। প্রথমবারের মতো একটি খাঁটি ‘পিপলস উইল’ বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ গঠনের ভিত্তি রাশিয়ার জমিনে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে আবারও রুশ বিপ্লবী ‘অহং’! মাথার উপর দাঁড়িয়ে এটা আরেকবার নিজেকে ইতিহাসের সর্বশক্তিমান পরিচালক হিসাবে ঘোষণা করছে; এইবার রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহামান্য কেন্দ্রীয় কমিটির নামে। এই তুখোড় কসরতবাজ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, আজ যে কর্তা বা সাবজেক্ট পরিচালকের ভূমিকা পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সমষ্টিগত ‘অহং’। শ্রমিক শ্রেণি তাদের ভূল করার এবং ইতিহাসের দ্বন্দ্ব শেখার অধিকার দাবি করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারি। ঐতিহাসিকভাবে, সবচেয়ে চতুর কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্রান্ততার চাইতে কোনো একটি সত্যিকারের বৈপ্লবিক আন্দোলনের ভুল বা ত্রুটিগুলো বহুগুণ উপকারী।

    টীকা:

    ১. জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৮৭৮ সালে জার্মানির রাইখস্ট্যাগে বিসমার্ক কর্তৃক উত্থাপিত সমাজতন্ত্র–বিরোধী আইনটি গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে এই আইন প্রত্যাহার করা হয়।

    ২. ইস্ক্রা হচ্ছে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি [RSDLP] কর্তৃক প্রকাশিত রুশ সংবাদপত্র। ভি আই লেনিনের তত্ত্বাবধানে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দমন পীড়নের জন্য এটি রাশিয়ার বাইরে প্রকাশ করতে হতো, এবং বিদেশে প্রকাশিত হয়ে গোপনে রাশিয়াতে প্রচার করা হতো। ১৯০৩ সালে RSDLP এর বিভাজনের পর পত্রিকাটি মেনশেভিকদের দখলে যায়।

    ৩. এখানে ১৯০৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত RSDLP এর দ্বিতীয় কংগ্রেসের কথা বলা হচ্ছে। এই কংগ্রেসেই মেনশেভিক ও বলশেভিকরা আলাদা হয়েছিল।

    ৪. লেনিনের এই গ্রন্থটি ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ৫. এখানে অস্ট্রীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রীয়–হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বহুজাতিক চরিত্রের প্রতিক্রিয়ায় তারা যেভাবে একটি ফেডারেল পার্টি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে কিনা তাদের বিভিন্ন জাতির স্বায়ত্তশাসনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

    ৬. লুই অগাস্ট ব্লাঙ্কুই (১৮০৫–১৮৮১) কর্তৃক প্রচারিত বিপ্লবের ধারণাকে ব্লাংকুইজম বলা যায়। এর মতে, তুলনামূলক একটি ছোট ও খুব সঙ্ঘবদ্ধ গ্রুপ এবং গোপন ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালিত হওয়া উচিত। ক্ষমতা দখলের পর বিপ্লবীরা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্র চালু করবে। এটা মনে করে যে, রাজনৈতিক বিপ্লব আসলে একধরনের ক্যু’র মাধ্যমেই হতে হবে।

    ৭. পারভাস আলেক্সান্ডার হেলফান্ড (১৮৬৭–১৯২৪) এর ছদ্মনাম ছিল। তিনি ছিলেন রুশ বিপ্লবী; ১৮৯১ এর SPD এর সাথে সক্রিয় ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আগ পর্যন্ত তিনি লুক্সেমবার্গের সাথে কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালের পর তিনি যখন জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেন তখন রোজা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

    ৮. এস্পিডি এর সংস্কারপন্থীরা এসপিডির অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতাবাদের বিরুদ্ধে স্থানিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে যুক্তি দিতেন, তাদের সংস্কারপন্থী নীতিকে তুলে ধরার একটা উপায় হিসাবে।

    ৯. রবচায়া মিসলে (শ্রমিকদের চিন্তাধার) অর্থনীতিবাদীদের সংবাদপত্র। ১৮৯৭ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ১৬টি সংখ্যা বের হয়েছিল, ৩ থেকে ১১ সংখ্যা এবং ১৬তম সংখ্যা বের হয়েছিল বার্লিন থেকে, অন্যান্য সংখ্যা বেরিয়েছিল সেন্ট পিটাসবার্গ থেকে। – তথ্যসূত্র: ভি আই লেনিন, কী করিতে হইবে, পৃষ্ঠা. ১৮৭ [ফুটনোট]

    ১০. ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক্যাল ফিলোসফির উল্লেখ; রোজা তাঁর লেখাপত্রে ধ্রুপদী দার্শনিকদের কথা যে অল্প কয়বার উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে এটা অন্যতম। এসপিডির কয়েকজন সংস্কারপন্থী নেতা কান্টবাদী ছিলেন। – সম্পাদক, রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার

    ১১. ‘জনতার কাছে যাওয়া’ ছিল ১৮৭০–১৮৮০ সালের দিককার রুশ পপুলিস্ট বিদ্বৎসমাজের একটি শ্লোগান।

    ১২. জ্যা জ্যোরাসি (১৮৫৪–১৯১৪) একজন সংস্কারপন্থী ফরাসি সমাজতন্ত্রী নেতা, তিনি L Humanite নামক পত্রিকা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। লুক্সেমবার্গ অনেকবার তার সাথে বিতর্ক করেন। কিন্তু তার উচ্চকিত প্রশংসা করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের বিরোধীতা করার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন।

    ১৩. নারোদনায়া ভোলিয়া ১৮৭৯ এর আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল রুশ পপুলিস্ট সংগঠন, বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের চর্চা করতো। ১৮৮১ সালের মার্চে এই দলের সদস্যরা জার আলেক্সান্ডার দ্বিতীয়কে হত্যা করে। এরপরে রুশ সরকার এই গোষ্ঠীকে মারাত্মক দমন পীড়নের মাধ্যমে নিধন করেছিল।

  • জর্জি ডিমিট্রভ

    জর্জি ডিমিট্রভ

    • অনুবাদ: দীপিকা বসু ও পত্রলেখা বন্দ্যোপাধ্যায়

    [জর্জি ডিমিট্রভের এই লেখাটি অনুবাদ করেছিলেন দীপিকা বসু ও পত্রলেখা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচয় পত্রিকার নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, কলকাতা থেকে ২০২১ সালে প্রকাশিত, ফ্যাসিস্টবিরোধী সংকলন এ অনূদিত লেখাটি ছাপা হয়। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছিলেন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সন্যাল। অরাজের পাঠকদের সুবিধার্থে গ্রন্থের সম্পাদকদ্বয়ের দেয়া ভূমিকাসহ লেখাটি  পুনঃপ্রকাশ করা হলো। বানান সমরূপতা রক্ষায় মুদ্রণ প্রমাদ সংশোধন করা হয়েছে।—সম্পাদক]

    সম্পাদকীয় ভূমিকা: জার্মানির রাষ্ট্রপতি ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলারকে রাইখ চান্সেলরের পদে নিয়োগ করেন। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি ছিল শক্তিশালী ও সংগঠিত, ১৯৩২ সালের নভেম্বরে রাইখস্টাকের নির্বাচনে কমিউনিস্টরা ৬০ লক্ষ ভোট পেয়েছিল। ফ্যাসিস্টদের প্রধান শত্রু ছিল তারাই। ফলে হিটলার-গোয়েরিং-গোয়েবলস চক্রের প্রথম কাজ হল ছলে বলে কৌশলে কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করা। প্রথমে প্রচার করা হল যে ‘কার্ল লীব কনেথট’ ভবনে অবস্থিত কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে তল্লাশি করে “অতি ভয়ানক ধরনের অনেক কিছু” পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রায় প্রতি সপ্তাহে পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি সত্ত্বেও ঐ ভবনে মাটির নিচে ভাড়ার তৈরি করা, যাতায়াতের গোপন পথ নির্মাণ ও আস্ত একটি বিদ্রোহ-পরিকল্পনা লুকিয়ে রাখা সম্ভব—এই আষাঢ়ে গল্প প্রায় কেউই বিশ্বাস করেনি। তারপর ঘটল অভূতপূর্ব ঘটনা। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাইখস্টাকে আগুন লাগার সংবাদ দাবানলের মতোই ছড়িয়ে পড়ে। হিটলার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সমবেত বিদেশী সাংবাদিকদের বলে “এটা ঈশ্বরের নির্দেশ— কমিউনিস্টদের ওপর আমরা আঘাত হানব।” অচিরে সরকারী ঘোষণা জারী করে স্পষ্ট বলা হয় রাইখস্টাকে এ-আগুন কমিউনিস্টরাই লাগিয়েছে ৷

    বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জঙ্গি ডিমিট্রভ তখন জার্মানিতে ছিলেন। ঐ রাতে ট্রেনে মিউনিখ থেকে বার্লিন যাচ্ছিলেন। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতী সংবাদপত্রে তিনি রাইখস্টাকে আগুন লাগাবার সংবাদ পান। ডিমিট্রভ বোঝেন সংসদীয় নির্বাচনের আগে কমিউনিস্টদের জনপ্রিয়তা খর্ব ও জয়লাভের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করার জন্য হিটলারই রাইখস্টাকে আগুন দিয়েছে ।

    গোটা জার্মানি জুড়ে হিটলার-পুলিশ ও ফ্যাসিস্ট ‘ঝঞ্ঝা বাহিনী’র ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস শুরু হয় ।

    ছবি: তরুণ বয়সে জর্জি ডিমিট্রিভ

    বলা যায় রাইখস্টাকে অগ্নিকাণ্ড ‘মহাভারত’-এর ‘জতুগৃহদাহ’ পর্ব। তারপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে ১৯৪৫ সালের ৩রা মে তারিখে রাইখস্টাকে রক্তপতাকা উত্তোলনের মধ্যে কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান এবং পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক যুগের অভ্যুদয়। ডিমিট্রভ দুই যুগের অমোঘ সেতু ৷

    ১৯৩৩ সালের ১লা মার্চ জার্মান ফ্যাসিস্টরা বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির দুই সহকর্মী ব্লাগোই পপোভ ও ভাসিল তানেভসহ জর্জি ডিমিট্রভকে গ্রেপ্তার করে। কিছুদিন আটক রাখার পর লাইপৎসিকে শুরু হয় বিশ্ববিখ্যাত ‘রাইখস্টাক বিচার’।

    ‘সমাজতান্ত্রিক জার্মানি’ পত্রিকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৩ সংখ্যায় এ-প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে :

    “লাইপৎসিক আদালতে জঙ্গি ডিমিট্রভ প্রথম কথা বলেছিলেন ১৯৩৩ সালের ২৩শে সেপটেম্বর তারিখে। সেটি ছিল বিচারের তৃতীয় দিন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন ৮২ জন বিদেশী সাংবাদিক ও জার্মান পত্রপত্রিকার ৬২ জন সাংবাদিক। কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট ও বামপন্থী বুর্জোয়া পত্রপত্রিকার সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গোড়ার দিকে কোনো সোভিয়েত সাংবাদিক ছিলেন না। পরে, সোভিয়েত গভর্নমেন্ট যখন অনুরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মান সাংবাদিকদের তৎপরতার ওপরে বিধি-নিষেধ আরোপ করলেন, একমাত্র তখনই জার্মান ফ্যাসিস্ট কর্তারা সোভিয়েত সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দিয়েছিল। পুরোপুরি সাজিয়ে ও পাকিয়ে তোলা উত্তেজনা-সৃষ্টির এই মামলার জয়লাভ সম্পর্কে ফ্যাসিস্টরা এতই নিশ্চিত ছিল যে গোড়ার দিকে আদালতের সওয়াল তারা বেতারে প্রচার করতে থাকে। তারপরেই ২৩শে সেপটেম্বর তারিখে ডিমিট্রভের প্রথম ভাষণের পরে বেতারে প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও এই বিচার সম্পর্কে বিশ্বজোড়া যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তা বন্ধ হয় নি। লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে জর্জি ডিমিট্রভের নাম। …লাইপৎসিক আদালতে ডিমিট্রিভ গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শের নীতি। আদালতে ঘোষণা করেছিলেন :

    একথা সত্য যে, আমি একজন বলশেভিক, একজন প্রোলেতারীয় বিপ্লবী। একথাও সত্য যে, বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য হিসেবে আমি একজন দায়িত্বশীল কর্মী ও নেতা। কিন্তু তাই বলে আমি সন্ত্রাসবাদী বা মতান্ধ ন‍ই, হঠাৎ আক্রমণে লিপ্ত চক্রী নই, নই আগুনবাজ । …

    একথাও সত্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির আমি উৎসাহী সমর্থক ও গুণগ্রাহী, কেননা এই পার্টি ভূ-গোলকের এক-ষষ্ঠাংশ জুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো দেশটি শাসন করছে এবং সাফল্যের সঙ্গে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করছে।

    রোমাঁ রোলাঁ তাঁর ‘শিল্পীর নবজন্ম’ গ্রন্থে ১৯৯৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর এ-বিষয়ে লিখেছেন: “আমাদের সময়কার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মামলা শেষ হইয়া আসিতেছে।…কিন্তু যে উত্তেজনার সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহার ফলে বিচারশালার আবহাওয়া বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে…। যে মন্ত্রীর হাতে বিচার-বিভাগের ভার ন্যস্ত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথা যাহার সবচেয়ে বেশি এবং ধৃত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য যিনি নিজে দ্বায়ী তিনিই যখন বিচারশালার মধ্যেই দাঁড়াইয়া প্রকাশে আসামীদের ভয় দেখান, রায় যদি তাহার নির্দেশানুযায়ী না হয়, তবে আসামীদের নিহত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে।

    …এ মহাকাব্যের উপসংহার যাহাই হউক না কেন ডিমিট্রভের বীরমূর্তি ভবিষ্যতের পটভূমিকায় চিরদিন অনন্ত মহিমায় উজ্জ্বল রহিবে।” 

    তারপর তথাকথিত লাইপৎসিক মামলা শেষ হল। ‘সমাজতান্ত্রিক জার্মানি’র ঐ সংখ্যায় ঠিকই বলা হয়েছে:

    “আদালতের কাঠগড়াকে জর্জি ডিমিট্রভ ব্যবহার করেছিলেন সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের ধ্যানধারণা প্রচার করার জন্য। ফ্যাসিস্ট আদালতের সমস্ত রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টির ওপরে রাইখস্টাক অগ্নিকাণ্ডের দোষ চাপানো যায়নি এবং জর্জি ডিমিট্রভকে মুক্তি দিতে হয়েছিল।”

    সম্প্রতি ডিমিট্রভের ওপর একটি সোভিয়েত তথ্যচিত্র দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। রোলাঁ, বারব্যুস প্রমুখ বিশ্ববিশ্রুত লেখক ও কাশ্যাঁ, ইবারুরি, তোগলিয়াত্তি প্রমুখ অগ্রগণ্য রাজনৈতিক নেতার যৌথ উদ্যোগে জর্জি ডিমিট্রভের মুক্তির দাবিতে যে যুক্তফ্রন্ট গড়ে ওঠে—তা শুধু ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের এক দিকচিহ্নই ছিল না, ছিল যুক্তফ্রন্ট তত্ত্বের ভবিষৎ প্রবক্তার জন্য বিশ্ববিবেকের আগমনী গীত, যথাযোগ্য অর্ঘ্য।

    সোভিয়েত ইউনিয়ন জর্জি ডিমিট্রভকে নাগরিকত্ব দান করে এবং মুক্তির পর তাঁকে হত্যার ফ্যাসিস্ট চক্রান্ত ব্যর্থ করে সোভিয়েত বিমানে বিজয়ী বীরকে “বিশ্বশ্রমিক-প্রিয়” সোভিয়েত ভূমিতে নিয়ে আসে ।

    কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অবিসংবাদী নেতা হিসেবে ডিমিট্রভের বিপ্লবী জীবন অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি হন মুক্ত সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে মগ্ন অবস্থারই ১৯৪৯ সালে এই সৃজনশীল কমিউনিস্টের জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।

    ২রা ও ৩রা আগস্ট ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ঐতিহাসিক সপ্তম কংগ্রেসে আস্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক জর্জি ডিমিট্রভ যে বিশ্ববিখ্যাত রিপোর্ট পেশ করেন এবং আলোচনার যে-উত্তর দেন, ‘মনীষা গ্ৰন্থালয়’ সম্প্রতি ‘যুক্ত ফ্রন্ট/ ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম’ নামে সেই মহান আন্তর্জাতিক দলিলের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছে। সেই বইয়েরই একটি অধ্যায়—‘ফ্যাসিবাদের শ্রেণী চরিত্র’ আমরা পুনর্মুদ্রণ করলাম । অধ্যায়ের শুরুতে ছিল ”কমরেডগণ” এই সম্বোধন। রচনাটির কয়েক জায়গায় মোটা হরফ ব্যবহৃত হয়েছিল। আমরা বাদ দিয়েছি। বানান ও যতিচিহ্নে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।

     

    বার্থ অফ ফ্যাসিজম (১৯৩৬)
    শিল্পী: ডেভিড আলফারো সিকেরোস

    মূল লেখা

    কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটির ত্রয়োদশ প্লেনাম সঠিকভাবেই শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদকে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদাম্ভিক এবং লগ্নী পুঁজির সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিভূর প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়ত্ব বলে বর্ণনা করেছিল।

    সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধরনের ফ্যাসিবাদ হল জার্মান ফ্যাসিবাদ। এর নিজেকে জাতীয় সমাজতন্ত্র বলে অভিহিত করায় ধৃষ্টতা রয়েছে, যদিও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এর কোনই মিল নেই। হিটলারের ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়, এ হল পাশবিক জাতিদম্ভ। এ হল রাজনৈতিক দস্যুতার এক শাসনব্যবস্থা, শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক, পেটি-বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও নির্যাতনের ব্যবস্থা। এ হল মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও পাশবিকতা, অন্যান্য জাতিদের সম্পর্কে বল্গাহীন আক্রমণ ।

    জার্মান ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিক প্রতিবিপ্লবের উদ্যত খড়গ হিসাবে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রধান প্ররোচক হিসাবে এবং সমগ্র বিশ্বের মেহনতী মানুষের মহান পিতৃভূমি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জেহাদের প্রবর্তক হিসাবে কাজ করে চলেছে।

    ফ্যাসিবাদ অটো বাওয়ারের মত অনুযায়ী “প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়া—এই দুই শ্রেণীর ঊর্ধ্বে অবস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতার কোনো একটা রূপ নয়।” অথবা ব্রিটিশ সোশ্যালিস্ট ব্রেলস ফোর্ডের ঘোষণামতো “রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র-দখলকারী পেটি বুর্জোয়াদের বিদ্রোহ”ও নয়। না, ফ্যাশিবাদ শ্রেণীর উর্ধ্বে কোনো সরকার নয় অথবা লগ্নী পুঁজির উপর পেটি বুর্জোয়া বা ভবঘুরে সর্বহারার কোনো সরকার নয়। ফ্যাশিবাদ হল লগ্নী পুঁজিরই শক্তি। এ হল শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী প্রতিহিংসার সংগঠন। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ হল জাতিদম্ভের নগ্নতম রূপ যা অপরাপর জাতির বিরুদ্ধে পাশবিক ঘৃণার প্ররোচনা যোগায় ।

    ফ্যাসিবাদের এই সঠিক চরিত্রের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ অবশ্যই করতে হবে; কারণ অনেকগুলি দেশে ফ্যাসিবাদ সমাজবাদী বুলির আড়ালে সেই অগণিত পেটিবুর্জোয়া জনগণের, যারা সংকটের আবর্তে নিজ নিজ গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের এবং এমনকি সর্বহারাশ্রেণীর সবচেয়ে পশ্চাদপদ স্তরের কোনো কোনো অংশেরও সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফ্যাসিবাদের প্রকৃত শ্রেণীচরিত্র ও এর সঠিক প্রকৃতি অনুধাবন করলে, তারা কখনই একে সমর্থন জানাত না ৷

    এক-একটি নির্দিষ্ট দেশের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী এবং জাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আন্তর্জাতিক অবস্থান অনুযায়ী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের বিকাশ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। কোনো কোনো দেশে, বিশেষ করে যেখানে ফ্যাসিবাদের কোনো ব্যাপক গণভিত্তি নেই এবং যেখানে ফ্যাসিবাদী বুর্জোয়াদের নিজেদের শিবিরে নানা উপদলের সংঘর্ষ খুব তীব্র, সেখানে ফ্যাসিবাদ সরাসরিভাবে সংসদকে অবলোপ করার সাহস রাখে না আর তাই অন্যান্য বুর্জোয়া দল এবং এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিকেও কিছু পরিমাণ বৈধতা রাখবার অনুমতি দেয়। অন্য সকল দেশে, যেখানে শাসক বুর্জোরাশ্রেণী এক আসন্ন বিপ্লবের আবির্ভাব সম্পর্কে শঙ্কিত, সেখানে তারা হয় তৎক্ষণাৎ অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও উপদশের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও সন্ত্রাসের শাসনকে তীব্রতর করে তার সীমাহীন একচেটিয়া রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এর দ্বারা ফ্যাসিবাদের অবস্থা যখন বিশেষভাবে সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে, তখন এর দরুন কিন্তু ফ্যাসিবাদের পক্ষে নিজের শ্রেণীচরিত্রকে পরিবর্তিত না করেও প্রকাশ সন্ত্ৰাসবাদী একনায়কত্বের সঙ্গে স্থূল ভুয়ো সংসদীয় পন্থার সংযুক্তিসাধন ও নিজের ভিত্তিপ্রসারের প্রচেষ্টায় বাধা হয় না ।

    ছবি: রাইখস্টাইক অগ্নিকাণ্ডের বিচারে বক্তৃতা দিচ্ছেন ডিমিট্রিভ

    ফ্যাসিবাদের ক্ষমতালাভ এক বুর্জোয়া সরকার থেকে অপর এক সরকারে মামুলি উত্তরণ নয়, এ হল বুর্জোয়াদের শ্রেণীকর্তৃত্বের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জায়গায় অন্য এক রাষ্ট্রীয় রূপের প্রকাশ, সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের প্রতিষ্ঠা। এই পার্থক্যটি উপেক্ষা করা গুরুতর ভুল হবে; এই ভুল বিপ্লবী সর্বহারাদের আদতে, ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য শহর ও গ্রামের মেহনতী মানুষের ব্যাপক সমাবেশ ব্যাহত করবে এবং তাদের বুর্জোয়া শিবিরের মধ্যেকার স্ব-বিরোধিতার সুযোগ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করবে। কিন্তু আবার ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারা অনুসৃত ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ, যা মেহনতী জনগণের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে দমন করে, সংসদের অধিকারকে খর্ব করে ও তা নিয়ে জোচ্চুরি করে এবং বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে দমননীতিকে তীব্র করে, সেগুলির গুরুত্বকে ছোট করে দেখা কিছু কম বিপজ্জনক ও কম গুরুতর ভ্রাস্তি নয় ।

    কমরেডগণ, ফ্যাসিবাদের ক্ষমতালাতকে এই রকম সরলীকৃত ও স্বচ্ছরূপে কল্পনা করা ভুল হবে যে, এ যেন লগ্নী পুঁজির কোনো একটি কমিটি কোনো এক নির্দিষ্ট তারিখে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। বাস্তবক্ষেত্রে, ফ্যাসিবাদ সাধারণত ক্ষমতায় আসে পুরনো বুর্জোয়া পার্টিগুলির অথবা ঐ পার্টিগুলির কোনো নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে পারস্পরিক লড়াইয়ের গতিপথে, অথবা কখনও কখনও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াইয়ের গতিপথে, এমনকি ফ্যাসিস্ট শিবিরের মধ্যেই লড়াইয়ের গতিপথে—কখনও কখনও এ লড়াই সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত হয় যেমন হয়েছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও অপরাপর দেশে। এই সবকিছু কিন্তু এই সত্যটিকে চাপা দেয় না যে, ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগে বুর্জোয়া সরকারগুলি সাধারণত কতকগুলি প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে এবং কতকগুলি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা অবলম্বন করে যা ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের পথকে প্রত্যক্ষভাবে সুগম করে। বুর্জোয়াদের এই প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং প্রস্তুতিপর্বে ফ্যাসিবাদের শক্তিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম না করে, সে ফ্যাসিবাদের বিষয়কে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে না, বরঞ্চ সেই বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে ।

    সোশ্যাল ডেমোক্রাট নেতারা ফ্যাসিবাদের প্রকৃত শ্রেণীচরিত্রকে চাপা দিয়ে জনতার কাছ থেকে তাকে গোপন রেখেছিল, এবং বুর্জোয়াত্বের ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাবলীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তাদের আহ্বান জানায় নি। তারা এক ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব বহন করছে এই কারণে যে, ফ্যাসিবাদী দেশে মেহনতী জনগণের এক বিশাল অংশ ফ্যাসিবাদের মধ্যে তাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু, রক্তলোলুপ, লুণ্ঠনকারী লগ্নী পুঁজিকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ঐ জনগণ তাকে প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিল না।

    জনগণের উপর ফ্যাসিবাদের প্রভাবের উৎস কি? ফ্যাসিবাদ জনগণকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই কারণে যে, জনগণের সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন ও দাবিগুলির কাছে সে মহাবাগাড়ম্বরে আবেদন করে। ফ্যাসিবাদ শুধু জনগণের মধ্যে গভীরভাবে বদ্ধমূল সংস্কারগুলিকেই উসকিয়ে দেয় না, উপরন্তু তাদের অপেক্ষাকৃত উন্নততর অনুভূতিগুলি, যথা- তাদের ন্যায় বিচারের চেতনাকে, এমনকি কখনও কখনও তাদের বিপ্লবী ঐতিহ্যকেও কাজে লাগায়৷ কেন জার্মান ফ্যাসিবাদীরা, যারা বড় বড় বুর্জোয়াদের সেবাদাস ও সমাজতন্ত্রের মারাত্মক শত্রু, ভারা জনগণের কাছে নিজেদের “সমাজতন্ত্রী” বলে পরিচয় দেয় এবং তাদের ক্ষমতাদখলকে বিপ্লব বলে বর্ণনা করে? তার কারণ জার্মানির অগণিত মেহনতী জনগণের সমাজতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা এবং বিপ্লবের প্রতি যে বিশ্বাস রয়েছে তাকেই কাজে লাগাবার চেষ্টা করে।

    শিল্পী: মারিও সিরোনি

    ফ্যাসিবাদ চরম সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থেই কাজ করে, কিন্তু জনগণের কাছে নিজেকে নির্ধাতিত জাতিগুলির রক্ষকের ছদ্মবেশে উপস্থিত করে এবং অপমানিত জাতীয় অনুভূতিগুলিকে নাড়া দেয়, যেমন জার্মান ফ্যাসিবাদীরা করেছিল যখন তারা “ভার্সাই চুক্তির বিরোধিতা”র স্লোগান তুলে পেটি বুর্জোয়া জনগণের সমর্থন অর্জন করেছিল।

    ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য হল জনগণের উপর বল্গাহীন শোষণ কায়েম করা, কিন্তু লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়া, ব্যাঙ্ক, ট্রাস্ট ও ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে মেহনতী জনগণের তীব্র ঘৃণা নিয়ে ফ্যাসিবাদ অতি সুকৌশলে, পুঁজিবাদবিরোধী বুলি কপচিয়ে ও রাজনৈতিকভাবে অপরিণত জনগণের কাছে এক-একটি নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে লোভনীয় স্লোগান নিয়ে হাজির হয়ে তাদের চিত্ত জয় করে। তাদের এই রকমের স্নোগান হল: জার্মানিতে “ব্যক্তিগত মঙ্গলের চেয়ে সাধারণ মহা অনেক ঊর্ধ্বে”; ইতালিতে “আমাদের রাষ্ট্র ধনতান্ত্রিক নয়, বরং এক যৌথ রাষ্ট্র”; জাপানে “শোষণহীন জাপানের জন্ম”, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “সম্পদের ভাগ নাও” ইত্যাদি ।

    ফ্যাসিবাদ জনগণকে সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ ও ঘুষখোর লোকেদের হাতে শিকার হবার জন্য তুলে দেয়, কিন্তু জনগণের সামনে হাজির হয় এক “সং ও নিষ্কলুষ সরকার”-এর ছবি নিয়ে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার সম্পর্কে জনসাধারণের মোহভঙ্গের উপর বেসাতি করে ফ্যাসিবাদ দুর্নীতির কপট নিন্দা করে [উদাহরণস্বরূপ জার্মানিতে বারমাত এবং স্কলারেকের কাণ্ড, ফ্রান্সে স্ট্রাভিস্কির কাণ্ড এবং অনুরূপ অন্যান্য অসংখ্য ঘটনা ]।

    পুরনো বুর্জোয়া পার্টিগুলিতে আস্থা হারিয়ে যে জনসাধারণ তাদের পরিত্যাগ করেছে সেই জনসাধারণকে ফ্যাসিবাদ বুর্জোয়াদের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের স্বার্থেই পাকড়ায়। কিন্তু বুর্জোয়া সরকারগুলির বিরুদ্ধে তার আক্রমণের কঠোরতার দ্বারা ও পুরনো বুর্জোয়া দলগুলির প্রতি তার আপসহীন ভাবভঙ্গির দ্বারাই ফ্যাসিবাদ এই জনগণকে প্রভাবিত করে। মানববিদ্বেষ ও ছলনায় বুর্জোয়া-প্রতিক্রিয়াধারাকে ছাপিয়ে ফ্যাসিবাদ তার প্রতিটি দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের এমনকি একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। অভাব, বেকারত্ব এবং জীবনের অনিশ্চয়তার দরুন হতাশ পেটি বুর্জোয়া জনগণ, এমনকি শ্রমিকদেরও একটি অংশ ফ্যাসিবাদের এই সামাজিক ও জাতিদাম্ভিক বাগাড়ম্বরের শিকার হয় ।

    সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং বিক্ষুব্ধ জনগণের বিরুদ্ধে আক্রমণের পার্টি হিসাবেই ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় আসে, কিন্তু তবুও সে তার ক্ষমতালাভকে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে “সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে” এক “বিপ্লবী” আন্দোলন হিসাবে এবং সমগ্র জাতির “পরিত্রাণ”-এর প্রতীক হিসাবে প্রতিপক্ষ করে [ এখানে আমরা মুসোলিনির রোম “অভিযান”, পিলসুদস্কির ওয়ারশ “অভিযান”, জার্মানিতে হিটলারের ন্যাশনাল নোশ্যালিস্ট “বিপ্লব” এবং অনুরূপ ঘটনা স্মরণ করতে পারি ] ৷

    কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে কোনো মুখোশই ধারণ করুক, যে কোনো রূপেই নিজেকে উপস্থাপিত করুক এবং যে কোনো পথেই ক্ষমতায় আসুক, তবুও ফ্যাশিবাদ হল মেহনতী জনগণের উপর পুঁজির সবচেয়ে হিংস্র আক্রমণ;—ফ্যাসিবাদ হল বল্গাহীন জাতিদম্ভ ও আগ্রাসী যুদ্ধ,— ফ্যাসিবাদ হল প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লব : ফ্যাসিবাদ হল শ্রমিকশ্রেণীর এবং সমস্ত মেহনতী মানুষের সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু ।

  • সৈয়দ নিজারের সুলতান পাঠ: প্রসঙ্গ বিউপনিবেশায়ন

    সৈয়দ নিজারের সুলতান পাঠ: প্রসঙ্গ বিউপনিবেশায়ন

    • মনিরুল ইসলাম

    The transcendence of self-estrangement follows the same course as self-estrangement.

    Karl Marx

    যে জীবনকে আমরা যাপন করি খুব সহজেই তার খামতি নির্দেশ করা চলে। কিন্তু সেই খামতিকে নির্ণয় ও বর্ণনায় হাজির করাটা প্রায়শই দুরূহ। এবং হামেশাই এতে ভুল হয়। কেননা জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা যেমন প্রকাশ্যে থাকে না, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা থাকে পর্দা ও মুখোশের আড়ালে। অর্থাৎ শাসন ও শোষণের আচমকা যে রূপটাকে আমরা সনাক্ত করি তারও থাকে ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত দৃঢ় শেকড়। ‘আধুনিকতার বীজ বপনকারী’ ইংরেজদের শুরুতে স্বাগতমই জানিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। ক্রমেই না গোল বাঁধলো। জীবনে ঘনীভূত হলো স্বাধীনতার শর্ত। স্বরাজ ছাড়া এগোলোই না ভারতবর্ষের একেকটি দিন। তারপর স্বাধীনতা। তারপর এক অচেনা স্বাধীনতা। জনজীবনের সঙ্গে যার যোগের অংক অমীমাংসিতই রয়ে গেলো। যেই স্বাধীনতার মানে নির্ণয় করা এখনো তাই সমান দুর্বোধ্য। ইতিহাস তাই আমাদের সম্মুখে সময়ের কোনো সরলরৈখিক প্রবাহমাত্র রইলো না। হয়ে উঠলো অন্ধকার গুহাক্ষেত্র। যেখানে ধ্বনির গায়ে জড়িয়ে থাকলো অপরাপর প্রতিধ্বনি। বিম্বের গায়ে গা ঘেঁষে রইলো বিবিধ প্রতিবিম্ব। এখানে ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিকে, বিম্ব থেকে প্রতিবিম্বকে আলাদা করাটাও তাই বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ। এই পরিসরেই চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতানকে নিয়ে কথা তোলেন সৈয়দ নিজার। লিখে ফেলেন গোটা একটা গ্রন্থ। ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা (২০১৭)। নিজারের আলোচনার ক্ষেত্র ছিলো ভারতশিল্পের ইতিহাস ও তার পরম্পরা; সেই পরম্পরায় নড়াইলের শিল্পী সুলতানের অবস্থান ও অবদান চিহ্নিত করেছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে ভারতশিল্পে সুলতানের অনন্য ভূমিকার তিনি তত্ত্বায়ন করেছেন।

    খালি চোখে দেখলে নিজার লিখেছেন শিল্প-সমালোচনার বই। খুবই পদ্ধতিগতভাবে যেখানে তিনি আলোচনা করেছেন ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পদৃষ্টির ফারাক; দুইয়ের প্রবণতাগত তারতম্য ও অনন্যতা। উপনিবেশায়নের ফসল রূপে সনাক্ত করেছেন, ভারতশিল্পের অবমূল্যায়ণ ও তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত ছেদ। পর্যালোচনা করেছেন ভারতশিল্পের বিউপনিবেশায়ন ও তার সংকট। ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা – নামেই অনেক কিছু আসে যায়। ‘ভারতশিল্প’, ‘উপনিবেশায়ন’, ‘সুলতান’, ‘বিউপনিবেশায়ন’ – বাংলাদেশের জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে শব্দসমূহ মোটেই নিরীহ নয়। এদের রয়েছে সমূহ রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা। শিরোনামে যেন অনেক কথাই বলে ফেলেছেন নিজার। সেই অল্প পরিসরেই প্রকাশ লাভ করেছে তার প্রতিজ্ঞা। অর্থাৎ তিনি রূপায়ণ করতে যাচ্ছেন, ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া ও উপনিবেশ-পরবর্তী সময়েও তার অটুট প্রভাব এবং সেই প্রভাব বলয়ে সৃষ্ট সংকটের স্বরূপ। এই ধারাবাহিকতাতেই আলোচিত হয়েছে সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা। এই সুযোগে বলে ফেলা যায়, নিজারের গন্তব্য কিন্তু সুলতান নয়। এই কথা মনে রাখার দরকার আছে। সুলতান তার উপায়। সুলতানকে আশ্রয় করে তিনি মূলত গড়ে তুলতে চেয়েছেন অনবদ্য তত্ত্বদৃষ্টি। যেই দৃষ্টিতে সম্ভব হবে গোটা বাংলা-অঞ্চলটাকেই বুঝে নেওয়া; যেই চোখে বাংলা-অঞ্চলের প্রেক্ষিতে একইসঙ্গে বিশ্বকেও নির্ণয় করা যাবে। এই কারণেই সুলতানের শিল্পে প্রকটিত বিউপনিবেশায়ন প্রবণতা নিজারের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিউপনিবেশায়ন তার কাছে রোগনির্ণয়ের তত্ত্ব মাত্র থাকেনি, একইসঙ্গে হয়ে উঠেছে, বিদ্যমান অস্তিত্বের রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল নির্দেশনা।

    বাংলা-অঞ্চলের বিউপনিবেশায়ন-তৎপরতা নিজারের তত্ত্বালোচনার ভরকেন্দ্র। বর্তমান আলোচনাটির লক্ষ্যও তাই, সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে প্রস্ফূটিত, তার বিউপনিবেশায়ন চিন্তার রূপরেখা প্রণয়ন। সেই সুবাদে তার চিন্তার স্বাতন্ত্র্যও যথারীতি উন্মোচিত হবে। নিজারের প্রস্তাবনা বোঝার ক্ষেত্রে কতোগুলো ধারণা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাটা জরুরি। এই যেমন আত্মসত্তা ও অভিমুখিতার প্রত্যয়। তিনি প্রয়োগ করেছেন বিচ্ছেদায়ন, দ্বি-বিচ্ছেদায়ন ও দ্বৈতচিত্তের ধারণা। প্রত্যয়গুলোর মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক যোগটা ধরতে না পারলে উপনিবেশায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অভিমুখিতা থেকে কীভাবে আত্মসত্তার বিচ্ছেদায়ন ও দ্বি-বিচ্ছেদায়ন ঘটেছে; কীভাবে এর দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে দ্বৈতচিত্তের ও সেই প্রেক্ষিতে জন্ম নিয়েছে নানাবিধ সংকট, তা বোধগম্য হওয়া কঠিন। এই রূপরেখাটি না বুঝলে নিজারের বিউপনিবেশায়ন চিন্তাকে অপরাপর ডিকলোনাইজেশন সম্পর্কিত প্রস্তাবনা থেকে আলাদা করাও মুশকিল। তাই উপর্যুক্ত ধারণাসমূহকে বর্তমান আলোচনায় স্বতন্ত্র পরিসরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন আলাপ নয়। সারা পৃথিবীতেই ডিকলোনাইজেশন এখন আলোচিত বিষয়। বিভিন্ন ভূখণ্ডে বিভিন্ন রূপ ও স্বরে সংঘটিত হচ্ছে এই আলোচনা। এইসব আলোচনার মধ্যেকার সম্পর্কের পারস্পরিক ছকটিও সোজাসাপ্টা নয়। বৈশ্বিক পরিসরে সংঘটিত ডিকলোনাইজেশন সংশ্লিষ্ট আলাপালোচনার নজির এখানে টানা হয়েছে; চেষ্টা করা হয়েছে সেই প্রেক্ষাপটেই নিজারকে বোঝার।

    ডিকলোনাইজেশন

    আলজেরিয়ায় কলোনাইজেশনের সঙ্গে ‘decolonisation’ টার্মটি নানাভাবেই জড়িত। আমরা তো জানিই, আলজেরিয়ার বিপ্লব-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার সুবাদে ফানো (Frantz Fanon) কেমন দারুণভাবে গড়ে তুলেছেন নিজেকে। তার The Wretched of the Earth– গ্রন্থেই ডিকলোনাইজেশন নিয়ে তাকে সোচ্চার হতে দেখি। মজার ব্যাপার হলো, ফরাসি ভাষায় লেখা এক নিবন্ধে, ১৮৩৬ সালে, ‘decolonisation’ শব্দটিকে প্রথমবারের মতো পাওয়া যায়; এবং নিবন্ধটির নাম ছিলো ‘Decolonization of Algiers’; সাংবাদিক হেনরি ফনফ্রেড (Henri Fonfrède) এর রচয়িতা। এতে উত্তর আফ্রিকায় জারি থাকা ছয় বছরের ফরাসি দখলদারিত্বের অবসান কামনা করেছিলেন তিনি। ১৮৩৮ সালে ফরাসি দখলদার রাষ্ট্র এই ভূখণ্ডটিরই নাম রাখে আলজেরিয়া। আর আমরা তো দেখেছিই, আলজেরিয়ানদের মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে ‘ডিকলোনাইজেশন’ বর্গটিকে সংহতকরণে ভূমিকা রেখেছে। টড শেপার্ড (Todd Shepard) মনে করিয়ে দেন, ‘What has gone unremarked is that French efforts to end the Algerian Revolution gave birth to the notion that the historical category of “decolonization” was a casual force with an all but irresistible momentum.’ (Shepard, 2006: 5)।

    ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের ও ইউরোপের লিবারেল এন্টিকলোনিয়ালিস্টদের লেখাপত্রে ‘ডিকলোনাইজেশন’ টার্মটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু নয়া সাম্রাজ্যবাদ বিকশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বদলে যায় পরিস্থিতি। রদ হয়ে যায় এর ব্যবহার। এক-রকম গায়েবই হয়ে যায় শব্দটি। তারপর সেই ১৯২০ সালের শেষ দিকে, কতিপয় সমাজতাত্ত্বিক ও কমিউনিস্ট, শব্দটিকে পুনরায় ব্যবহার করতে শুরু করেন। দুই অর্থেই তারা টার্মটিকে ব্যবহার করেছেন। এক, এর দ্বারা বিশ্লেষণ করেছেন, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার কী উপায়ে আন্তর্জাতিক প্রলেতারিয়েত বিপ্লবকেই আরও ত্বরান্বিত করছে। দুই, সংশ্লিষ্ট পুঁজিবাদী রূপান্তরকে তারা চিহ্নিত করেছিলেন পশ্চিমা শক্তির আসন্ন পতন হিসেবে (Shepard, 2021)। শেপার্ড মানবেন্দ্র নাথ রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এম এন রায় নাকি বিশের দশকে ‘decolonisation’ শব্দটি ব্যবহার করা সেই কমিউনিস্টদের একজন। শেপার্ডের কথাসূত্রে, মানবেন্দ্র নাথ রায় ১৯২৬ সালে ভারতীয় জাতীয় বুর্জোয়াদের ব্যাপারে ব্রিটিশদের ছাড় দেওয়ার নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, তার The Future of Indian Politics গ্রন্থে, ‘decolonisation’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন (Shepard, 2006: 5)। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট গ্রন্থে ‘decolonisation’ শব্দটির ব্যবহার আবিষ্কার করা গেলো না। পাওয়া গেলে, আমাদের নিজেদেরই একজন ঠিক কী অর্থে ও কোন পরিপ্রেক্ষিতে টার্মটি প্রয়োগ করেছিলেন, অন্তত এটুকু জানার সরাসরি সুযোগটা হতো।

    শেপার্ড জানাচ্ছেন, ১৯২৭ সালের ১৪ জুন, বেলজিয়ান স্কলার হেনরি রলিনের (Henri Rolin) বক্তৃতার উপরে লেখা এক প্রতিবেদনে, প্রথমবারের মতো, লন্ডনের Times -পত্রিকায় ‘decolonisation’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। রলিনের বক্তৃতার টাইটেল ছিলো ‘Development of Colonies: Native Advance to Self-Government’ । শেপার্ড গুরুত্ব দিয়ে বলছেন, এই দুই ক্ষেত্রেই ‘ইনডিপেনডেন্স’ অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি (Shepard, 2021)। যদিও পরবর্তীতে আমরা এই অর্থেও শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করবো। এটা ঘটে ১৯৫০ সালের দিকে। যেই সময়ে ইউরো-আমেরিকান স্কলাররা, পলিটিশিয়ানরাও, কোনো ভূখণ্ডের সার্বভৌম ক্ষমতার পরিবর্তন বোঝাতে – দ্বিধার সঙ্গে হলেও – ‘ডিকলোনাইজেশন’ টার্মটিকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ইউরোপীয় স্কলারদের মধ্যে ডিকলোনাইজেশনের এই পুরোনো তর্ককে পুনরায় চালু করেন মরিৎজ জুলিয়াস বন (Moritz Julias Bonn)। এই কারণে, ভুল করে অনেকেই মরিৎজ বনকেই টার্মটির প্রবর্তক বলে মনে করেন (Shepard, 2021)।

    বন একজন জার্মান-ইহুদি সমাজবিজ্ঞানী। অর্থনীতিবিদও। নাৎসিদের খপ্পর থেকে বাঁচতে যিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে। সেখানে তিনি পড়াতেন। ১৯৩২ সালে ‘Imperialism’ সম্পর্কিত তার একটি লেখা Encyclopedia of the Social Sciences -এ স্থান পায়। সেখানেই তিনি ‘decolonisation’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা তিনি মূলত কী বোঝাতে চেয়েছিলেন – তা পরিষ্কার হতে আরও একটু সময় লাগে। ১৯৩৮ সালে তার The Crumbling of Empire. The Disintegration of World Economy গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। যেখানে ‘ডিকলোনাইজেশন’ টার্মটিকে তিনি বিস্তারিত অর্থে ব্যবহার করেন। বন প্রায়ই সেখানে ‘counter-colonialism’ -এর সমার্থক হিসেবে শব্দটির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। নতুন এই পরিভাষাটি দিয়ে তিনি মূলত এক-ধরনের তৎপরতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন; যা দ্বারা প্রকাশ লাভ করেছিলো উপনিবেশিত জনগণের সংগ্রাম; যেই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিলো ঔপনিবেশিক শক্তিকে রুখে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই। এর দ্বারা বন একইসঙ্গে এক-ধরনের বৈশ্বিক অগ্রগতিকেও নির্দেশ করেছিলেন যা ঔপনিবেশিক সামাজ্যের আসন্ন পতনকেই বরং সূচিত করেছে। তার গ্রন্থের সাব-টাইটেলটিই অবশ্য এই ইঙ্গিত দেয় (Rothermund, 2006: 1)। বন কর্তৃক ব্যবহৃত হওয়ার পরও – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত – শব্দটি এক-রকম অচেনাই রয়ে যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ফরাসি এথনোলজিস্ট হেনরি ল্যাবারের (Henri Labouret) Colonisation, colonialism, decolonization গ্রন্থটি। এটিই সেই প্রথম বইটি যার শিরোনামেই ছিলো ‘ডিকলোনাইজেশন’। তবুও ইংরেজিতে এটি একটি টেকনিকেল শব্দ হিসেবে রয়ে যায়। খুব বেশি ব্যবহৃতও হতো না। লন্ডনের Times পত্রিকায় ‘decolonisation’-কে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা যায় ১৯৫৮ সালে। ১৯৫৯ সালে একইসঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয়বারের মতো একে পাওয়া যায় New York Times পত্রিকায় (Shepard, 2021)। ১৯৬০ সালের পর থেকেই মূলত ‘ডিকলোনাইজেশন’ শব্দটির স্বাভাবিক প্রয়োগ শুরু হয়েছে (Kennedy, 2016: 2)।

    ডিকলোনাইজেশনের বিভিন্ন স্বর

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে, সার্বভৌম ক্ষমতার পরিবর্তন বোঝাতে ইউরোপ-আমেরিকাতে ‘ডিকলোনাইজেশন’ শব্দটির চল হয়। অক্সফোর্ড অভিধানে এই অর্থটিই ঠাঁই করে নেয়। ফলে ইউরোপীয় অভিধানে ডিকলোনাইজেশনের অর্থ দাঁড়িয়েছে: অধীনস্ত কলোনি থেকে শাসন-ক্ষমতার অপসারণ; সাবেক কলোনির রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক স্বাধীনতাপ্রাপ্তি। সেই অর্থেই, একে ক্ষমতা-হস্তান্তর বললেও অর্থের কোনো বিকৃতি ঘটে না (Kennedy, 2016: 1-2)। ছবিতে আমরা যেমন দেখি: ঔপনিবেশিক আমলারা উপনিবেশিত জাতীয় নেতাদের হাতে ক্ষমতার বিলি-বন্টন করছেন। দু’জনের মুখেই টসটসা হাসি। যেই সুবাদে, ডিকলোনাইজেশন হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী-সময়ে সাবেক উপনিবেশিত রাষ্ট্রসমূহের, ঔপনিবেশিক শাসনাপসারণের দ্বারা, নতুন-নতুন জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশ করার ঘটনা। এই প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় শক্তিসমূহের অধীনতা থেকে এক-রকম শান্তিপূর্ণ উপায়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্বাধীন হয়েছে প্রায় শ’খানেক জাতি-রাষ্ট্র। এইসব রাষ্ট্রেরই পরিচয় জ্ঞাপিত হয়েছে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে। এখন কথা হলো, অক্সফোর্ডের অভিধানে ‘ডিকলোনাইজেশন’ শব্দটিকে যেরকম শান্তিপূর্ণ অর্থে পাওয়া যায়, বনের মাথায়ও কিন্তু অনুরূপ অর্থ এটি বহন করতো না। এটি স্মরণে রাখা চাই। এটি মনে রাখলে ডিকলোনাইজেশনের বিভিন্ন স্বর বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে।

    প্রথম বৃক্ষরোপন
    শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    উপর্যুক্ত আভিধানিক অর্থ ধরে এগোলে ডিকলোনাইজেশনকে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান বলেই বর্ণনা করতে হয়। যে প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটান দেশসমূহ, দখলে থাকা, উপনিবেশগুলো থেকে তাদের কর্তৃত্ব সরিয়ে নিয়েছে। এই কর্তৃত্ব সরানোর ঘটনাই কারো কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা-হস্তান্তর; কারো কাছে বা নাম নিয়েছে রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা-সংগ্রাম। এই সূত্রে আমেরিকা ও আলজেরিয়া এই দুইয়ের স্বাধীনতা-প্রাপ্তিই ডিকলোনাইজেশন। কিন্তু আমেরিকার স্বাধীন হওয়া আর আলজেরিয়ার স্বাধীন হওয়া তো এক-রকম বিষয় নয়। একই ছাঁটে ভারতবর্ষের স্বাধীন হওয়াকে বুঝতে গেলেও বড়ো বিপদ আছে। ডেইন কেনেডি ((Dane Kennedy), উপর্যুক্ত অর্থ মোতাবেক, গোটা বিশ্বে সংঘটিত ডিকলোনাইজেশনকে কয়েকটি প্রবাহে ভাগ করেছেন। এই সুবাদেই তার বর্ণনায় স্থান করে নিয়েছে নতুন বিশ্ব, পুরোনো বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের ধারণা; এবং এভাবেই তিনি নির্দেশ করেছেন, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বাহিত, ডিকলোনাইজেশনের একাধিক স্রোতধারা; যেই স্রোতসমূহ একে একে গড়ে তুলেছে বিশ্বের বর্তমান মানচিত্র। তাকে উদ্ধৃত করছি:

    Global clashes between empires had generated several prior waves of decolonization. The first occurred in the New World between 1776 and the 1820s, the second in the Old World between 1917 and 1920s. The collapse of the Soviet Union after 1989 constituted, in turn, a fourth wave. Like the decolonization of the Third World, these other waves resulted in the fragmentation of some empires, the expansion and reconstitution of others, and the rise of new states… (Kennedy, 2016: 5)

    ডিকলোনাইজেশনের এই গেলো একটি ব্যাখ্যা – সার্বভৌম ক্ষমতার পরিবর্তন। এই ব্যাখ্যারই আমরা দুইটি পিঠের সন্ধান পাবো। ইউরোপ যাকে বর্ণনা করবে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা-পরিবর্তন বলে; এশিয়া ও আফ্রিকার ইতিহাসবিদদের কাছে তা-ই হবে তাদের মুক্তিসংগ্রাম। অর্থাৎ রাজনীতিক মানদণ্ডে ডিকলোনাইজেশন বুঝতে গেলে দুইটি পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা মিলবে। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেখানেই হোক, ডিকলোনাইজেশনের এই বিশেষ চরিত্রটি রয়েছে, যা জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত (আমীনুর, ২০১১: ৩৯, ৪৩)। অবশ্য ডিকলোনাইজেশন না ঘটলে উপনিবেশিত ভূখণ্ডসমূহের জাতীয়তাবাদী আত্মপ্রকাশের প্রসঙ্গই-বা আসছে কোথা থেকে! ফলে তা একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটান দেশ কর্তৃক ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর ও সাবেক উপনিবেশিত ভূখণ্ডসমূহের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম; এদের একটি ব্যাখ্যা অপরটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এভাবেই ডিকলোনাইজেশন শব্দের প্রয়োগে এক-ধরনের দ্ব্যর্থবোধকতা তৈরি হয়। একই শিরোনামে অঙ্গীভূত হয়ে পড়ে দুইটি পরস্পরবিরোধী স্বর।

    ডিকলোনাইজেশনের সংগ্রামী পক্ষের একজন গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক হলেন ফানো। আলজেরিয়ায় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন উপনিবেশায়নের ভয়াল রূপ। দেহগত পীড়ন ছাড়াও যেখানে কার্যকর ছিলো ভয়াবহ মানসিক সন্ত্রাস। পেশাগত পরিচয়ে ফানো ছিলেন একজন মনোচিকিৎসক। স্বাভাবিকভাবেই উপনিবেশায়নের কারণে সৃষ্ট মানসিক ক্ষয়সমূহ তার নজর এড়ায়নি। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, উপনিবেশায়নের বর্ণবাদী ও সহিংস চরিত্র; একজন উপনিবেশিতের হীনমন্য হয়ে বেড়ে ওঠার হেতু; এবং তার পরিচয়গত সংকটের উৎস। একজন কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ফানো নিজেই বেড়ে উঠেছেন ফরাসি বর্ণবাদী আধিপত্যের বিপরীতে। হিংস্রতা ও সন্ত্রাসই তার কাছে ঔপনিবেশিকতার স্বরূপ। ফলে ডিকলোনাইজেশনও তার কাছে নির্ঝঞ্ঝাট কোনো প্রক্রিয়া ছিলো না। তার মতে, কলোনাইজেশন যেমন সহিংসতাকে বেছে নিয়েছিলো হাতিয়ার হিসেবে, তেমনি ডিকলোনাইজেশনেও অনিবার্য এই সহিংসতার ভূমিকা। তাই ডিকলোনাইজেশন, ফানোর চোখে, দুই বিরুদ্ধ পক্ষের সম্মুখ সমর; যে দুই পক্ষ প্রকৃতিগতভাবেই একে অন্যের প্রতিপক্ষ। খুবই বলিষ্ঠ স্বরে তিনি লিখেছেন:

    National liberation, national renaissance, the restoration of nationhood to the people, commonwealth: whatever may be the headings used or the new formulas introduced, decolonization is always a violent phenomenon. … Decolonization is the meeting of two forces, opposed to each other by their very nature… The naked truth of decolonization evokes for us the searing bullets and bloodstained knives which emanate from it. For if the last shall be first, this will only come to pass after a murderous and decisive struggle between the two protagonists. (Fanon, 2001: 27-28)

    উপনিবেশায়নকে ফানো সনাক্ত করেছেন ‘সিস্টেম অব নেগেশন’ হিসেবে। তিনি দেখান, কীভাবে ‘অপর’-এর সম্ভাবনাকে সেখানে পদ্ধতিগতভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। কীভাবে ‘অপর’-এর মানবিকতার প্রতি সেই প্রক্রিয়ায় বিরাজ করেছে কেন্দ্রীভূত তাচ্ছিল্য। সতর্ক করেছেন তিনি, উপনিবেশিতদের কেবল ডমিনেটেড হিসেবে বুঝলেই চলবে না। হিসাব থেকে তাহলে মেলা কিছু বাদ পড়ে যাবে। ভুল হবে হিসাব। উদাহরণ দিয়ে তিনি পরিষ্কার করেছেন বিষয়টা। জার্মানদের দ্বারা ডমিনেটেড অবস্থায় ফরাসিরা মানুষই ছিলো। ফরাসিদের দ্বারা ডমিনেটেড অবস্থায়ও মানুষ গণ্য হয়েছিলো জার্মানরা। কিন্তু ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় একজন আলজেরিয়াবাসীর মানুষ হিসেবে কানা কড়ি মূল্য ছিলো না। উপনিবেশকেরা তাদের মানুষই মনে করেনি (Fanon, 2001: 201-2)। ফানোর এই নির্ণয় উপনিবেশিত অন্যান্য ভূ-খণ্ডসমূহের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

    মুক্তির লড়াই অথবা ক্ষমতার হাসিখুশি পালাবদলের চিহ্ন দিয়ে ডিকলোনাইজেশনের সীমানা আঁকলেও কিছু বাকি থাকবে। কেননা, এর অপরাপর খুঁটিও তো রয়েছে, যার সাপেক্ষে এমনকি গড়ে ওঠেছে স্বতন্ত্র অ্যাকাডেমিক পরিসর। কলোনাইজড মানসিকতাকে ডিকলোনাইজ করার কাজে অনেক তাত্তি¡কই এখন ব্যস্ত সময় পার করেন। এটি হয়ে ওঠেছে তাদের মনোযোগের কেন্দ্র। সংস্কৃতির হাইব্রিডিটি নিয়ে এখন বিদ্যায়তনিক পরিসরে চলে জোরদার তর্ক। জ্ঞানকাণ্ডের সঙ্গে ক্ষমতা-চর্চার ওতপ্রোত সম্পর্ক এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার। মূলত এই সকল আবহেই ‘পোস্ট-কলোনিয়ালিজম’ ক্যাটেগরিটি জমাট বেঁধেছে (Rothermund, 2006: 2)। অ্যাশক্রফট (Bill Ashcroft), গ্রিফিথস (Gareth Griffiths) ও টিফিন (Helen Tiffin) ডিকলোনাইজেশনকে ভিন্নভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তাদের নির্দেশিত পরিচয়ে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার রূপ ও শর্ত নির্ণয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঠিক কীভাবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা বাস্তবায়িত হয়, আরও বাড়িয়ে বললে, যতো উপায়ে এটি কাজ করে তাকে চিহ্নিত করাই যেন ডিকলোনাইজেশন। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কোন ছদ্মবেশে, কোন দলের কাঁধে সওয়ার হয়ে, ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব জারি থাকে তা সনাক্ত করাও এর কাজ। তারা লিখেছেন:

    Decolonisation is the process of revealing and dismantling colonialist power in all its forms. This includes dismantling the hidden aspects of those institutional and cultural forces that had maintained the colonialist power and that remain even after political independence is achieved. (Ashcroft, Griffiths & Tiffin , 2001: 63)

    অর্থাৎ ডিকলোনাইজেশন প্রক্রিয়ায় নির্ণীত হবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা-কাঠামোর সূত্র; এবং তাত্তি¡কেরা এই পরিসরেই ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের অচেতনকে প্রকাশ করবেন; তারা বর্ণনা করবেন, ঔপনিবেশিক ক্ষমতাজালের জটিল সব নকশা; ফাঁস করে দেবেন, ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্তে¡র সঙ্গে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সব গোপন সম্পর্ক। ডিকলোনাইজেশন এভাবে পদ্ধতিগত রূপ নেয় যা দ্বারা অনাবৃত হয় ঔপনিবেশিক চিন্তার উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়া; উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের পারস্পরিক জটিল সম্পর্ক; খোলাসা হয় একের কর্তৃক অপরের গ্রহণ-বর্জন ও উপস্থাপনের জটিল রাজনীতি। এটি ডিকলোনাইজেশনের আরেকটি স্বর। এটি স্বতন্ত্র আরেকটি পরিসর গড়ে তোলে। যেই পরিসরে ঔপনিবেশিকতাকে বিভিন্ন উপায়ে নির্ণয় করা হয়ে থাকে। এই সূত্রেই আলবেয়ার মেমি (Albert Memi) ও এডওয়ার্ড সায়িদের (Edward Said) পর্যালোচনাসমূহকে ডিকলোনাইজেশন তৎপরতা হিসেবে পাঠ করা চলে।

    মেমি যেমন নির্ণয় করেছেন, উপনিবেশক কর্তৃক উপনিবেশিতের বৈষম্যপূর্ণ নির্মাণ-প্রক্রিয়া। ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের একজন উপনিবেশক তার যে ছবিটা টাঙিয়ে রাখেন তা দেখে ভুরু কুঁচকিয়ে তিনি বলে উঠেন, ‘আমাদের মজাই লাগে।’ ‘উঁচা-লম্বা এক পুরুষ। সূর্যের তাপে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী চেহারা। শক্ত চোয়াল। পায়ে ওয়েলিংটন বুট। বেলচায় ভর দিয়ে চেয়ে আছে দিগন্তের পানে।’ বাহ্! মেমি লিখছেন : ‘যখন সে সমরে নিয়োজিত নয়, আমাদের মনে হয়, নিশ্চয়ই সে নিঃস্বার্থে সেবা করে চলেছে মানবজাতির। ছুটে যাচ্ছে পীড়িতের পানে। অন্ধজনে দিচ্ছে আলো। বিলিয়ে বেড়াচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানসমগ্র। অথবা সাহসী এক পর্যটকের চেহারা তার। সে একজন পাঞ্জেরী’ (Memi, 2003: 47)। অন্যদিকে, উপনিবেশকদের দৃষ্টিতে ‘উপনিবেশিতেরা মারাত্মক অলস!’ একজন, কোনো একটি দল, নাকি একসঙ্গে সবাই অলস! উত্তর- ‘গোষ্ঠীসুদ্ধা অলস। গতরখাটা কামলা থেকে শুরু করে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সবাই অলস। অলসতা উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মৌলিক স্বভাব। সারাদিন তারা যা-ই করুক না কেন, দিনশেষে সবাই অলস তারা। এটি তাদের মজ্জাগত স্বভাব’ (Memi, 2003: 124-25)। আর উপনিবেশকেরা! তা তো আগেই ব্যক্ত হয়েছে। ‘তারা সাহসী। তারা উদ্যমী। তাদের দমের অভাব নেই।’ আসলে বাস্তবের সঙ্গে উপনিবেশকদের এই সকল বানানো ছবির মিল অন্বেষণ করাটা একদম নিরর্থক। মেমি ঠিকই এই ধরনের পরিচয় নির্মাণের গুমর ফাঁস করেছেন। তিনি লিখেছেন:

    Whenever the colonizer states, in his language, that the colonized is a weakling, he suggests thereby that this deficiency requires protection. From this comes the concept of a protectorate. It is in the colonized’s own interest that he be excluded from management functions, and that those heavy responsibilities be reserved for the colonizer. Whenever the colonizer adds, in order not to fall prey to anxiety, that the colonized is a wicked, backward person with evil, thievish, somewhat sadistic instincts, he thus justifies his police and his legitimate severity. (Memi, 2003: 125-26)

    উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর জীবনে-আচরণে-কর্মতৎপরতায়, উপনিবেশকেরা কেবল খুঁজে পেয়েছে ঘাটতি আর ঘাটতি। ‘উপনিবেশিতেরা দুর্বল; তারা ম্যানেজমেন্ট জানে না; তাদের রুচিবোধ নেই; তারা নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা নিতে জানে না। তাই তাদের রক্ষাকর্তা আবশ্যক; এবং ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই রক্ষাকর্তার ভূমিকাই পালন করে চলেছেন। আখেরে এতে উপনিবেশিত জনগণেরই লাভ।’ উপনিবেশক তার নিজেকে যে কায়দায় হাজির করেছে, পাশাপাশি যে পুত্তলিকা দাঁড় করিয়েছে উপনিবেশিতের, তা মূলত একই ঔপনিবেশিক ধাতুতে গড়া। মেমি দেখলেন, উপনিবেশক কর্তৃক উপনিবেশিতদের এই ধরনের আজগুবি-বানোয়াট পরিচয় নির্মাণের পেছনে মেলা গোপন সুবিধা রয়েছে। শুধু তাই নয়, উপনিবেশিতদের বর্ণনা করার জন্য উপনিবেশকেরা এ-পর্যন্ত যতো যতো ক্যাটেগরি উদ্ভাবন করেছে সবগুলোর ক্ষেত্রেই এই একই বিশ্লেষণ খাটে (Memi, 2003: 125)। অর্থাৎ, যে কোনো প্রকারে ঔপনিবেশিক শাসনকেই তা বৈধ প্রতিপন্ন করেছে।

    এডওয়ার্ড সায়িদ তেমনি তার বিখ্যাত Orientalism গ্রন্থে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডকে নির্মিত প্রাচ্য সম্পর্কিত ডিসকোর্সসমূহ বিশ্লেষণ করেছেন। সায়িদের পর্যালোচনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে প্রাচ্য সম্পর্কিত যাবতীয় পশ্চিমা জ্ঞান। তিনি দেখান, জ্ঞানচর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রাচ্যকে বর্ণনা করার সময়, কীভাবে পশ্চিমারা তাদের বাসনা দ্বারা তাড়িত হয়েছেন। তার মতে, আঠারো শতকের শেষ থেকে পশ্চিমা কর্তৃত্বে সংঘটিত এই প্রাচ্যবাদী তৎপরতায় কৌশলগত কারণেই সংরক্ষিত হয়েছে ইউরোপীয় কর্তৃত্ব। সায়িদ দেখান, প্রাচ্যবাদী ডিসকোর্সসমূহে প্রতীচ্য ও প্রাচ্যের যে সম্পর্ক নির্মিত হয়েছে, কীভাবে প্রতীচ্য সেখানে বরাবর ছিলো কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। যার দরুন, কেন্দ্রের সুবিধাজনক অবস্থান তার জন্য ছিলো এক-রকম পূর্বনির্ধারিত (Said, 1979: 7)। সায়িদকে উদ্ধৃত করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়:

    Under the general heading of knowledge of the Orient, and within the umbrella of western hegemony over the Orient during the period from the end of the eighteenth century, there emerged a complex Orient suitable for in the academy, for display in the museam, for reconstruction in the colonial office, for theoretical illustration in anthropological, biological, linguistic, racial and historical theses about mankind and the universe, for instances of economic and sociological theories of development, revolution, cultural personality, national or religious character. Additionally, the imaginative examination of things Oriental was based more or less exclusively upon a sovereign Western consciousness out of whose unchallenged centrality an Oriental world emerged, first according to general ideas about who or what was an Oriental, then according to a detailed logic governed not simply by empirical reality but by a battery of desires, repressions, investments, and projections. (Said, 1979: 7-8)

    সায়িদকে বড়ো করে উদ্ধৃত করার কারণ আছে। বিশেষ করে Orientalism, ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার এই গ্রন্থটি ব্যাপক জ্ঞান-জাগতিক সাড়া জাগায়। এর প্রভাবে বিদ্যায়তনিক পরিসরে কলোনিয়াল ডিসকোর্স ও পোস্টকলোনিয়াল স্টাডিজের কদর বেড়ে যায়। সায়িদ আসলে জোরের সঙ্গে- তার এই গ্রন্থে- যে জিনিসটা দেখাতে পেরেছিলেন তা হলো, ‘প্রাচ্য’ আসলে পশ্চিমেরই প্রোডাকশন। এতেই উদাম হয়ে পড়ে পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের অচেতন, একইসঙ্গে যা অনাবৃত করে দেয় উপনিবেশায়নেরও জ্ঞানতাত্ত্বিক নকশা।

    ডিকলোনাইজেশনের আরেকটি স্বর আমরা খুঁজে পাবো নগুগির (Ngugi Wa Thion’o) চিন্তায়। ফানোর মতো নগুগিও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কথা বলেন। তিনি বেছে নিয়েছেন, ভাষা ও সাহিত্যের পরিসর। তার বিশ্লেষণে ধরা পড়ে, জীবন-যাপনে ও চিন্তায়, ঔপনিবেশিক ভাষার প্রভাব। ঔপনিবেশিক ভাষা ও সাহিত্য উপনিবেশ-পরবর্তী সময়েও কীভাবে মনোজাগতিক উপনিবেশায়ন জারি রাখে, তা-ই সনাক্ত করেন নগুগি। তার মতে, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রভাবে উপনিবেশিত জনগণ তাদের – ভাষা, নাম-ধাম-পরিচয় ও পরিবেশ, সংগ্রামী ঐতিহ্য – সবকিছুকেই অপছন্দ করতে শেখে। নিজেদের তারা আবিষ্কার করে এক-ধরনের ঘাটতির মধ্যে। পরিত্যক্ত, অনুর্বর এক নিজস্ব জমিনে; এবং এই হীনমন্যতা সারিয়ে তোলার অদ্বিতীয় দাওয়াই হিসেবেও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিকেই তারা খুঁজে পায়। নগুগি বলেন, এভাবেই জন্ম নেয় এক-ধরনের নয়া-উপনিবেশবাদ (Ngugi, 2007: 3)। খানিকটা তাকে উদ্ধৃত করা যাক:

    The effect of a cultural bomb is to annihilate a people’s belief in their names, in their languages, in their environment, in their heritage of struggle, in their unity, in their capacities and ultimately in themselves. …It even plants serious doubts about the moral rightness of struggle. Possibilities of triumph or victory are seen as remote, ridiculous dreams. The intended results are despair, despondency and a collective death-wish. Amidst this wasteland which it has created, imperialism presents itself as the cure and demands… (Ngugi, 2007: 3)

    কোনো অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্যে সেই ভূখণ্ডের সংগ্রামী চেতনা নিহিত থাকে। সাম্রাজ্যবাদী ভাষা সেই বৈপ্লবিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনা ধারণে সম্পূর্ণ অপারগ; বরং দেশি ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে যে পারস্পরিক নিবিড় যোগ ও প্রতিরোধী স্পৃহা গড়ে ওঠে ঔপনিবেশিক ভাষা তা ধ্বংস করে দেয়। ঔপনিবেশিক ভাষা ও সাহিত্য গড়ে তোলে উপনিবেশিত মন। নগুগি তার বইটার নাম রেখেছেন, Decolonising the Mind। সাব-টাইটেলে লিখেছেন, ‘the politics of language in African literature’। অর্থাৎ, সচেতনভাবেই তিনি বেছে নিয়েছেন ভাষা ও সাহিত্যের পরিসর।

    হত্যাযজ্ঞ
    শিল্পী: এস এম সুলতান

    এভাবেই সময়ের পরিক্রমায় ডিকলোনাইজেশনের বহুবিধ স্বর সৃষ্টি হতে থাকে। তাছাড়া, একটি স্বর থেকে অপরাপর স্বরসমূহ এতোটাই পৃথক হয়ে যায় যে এদেরকে আর ঢালাওভাবে বর্ণনা করা চলে না। স্থানভেদেও এর তারতম্য পরিলক্ষিত হয়েছে। এমনকি কোনো একটি দেশের গণ্ডির ভেতরেই আলাদা হয়েছে এর স্বরসমূহ। প্রসেনজিৎ দুয়ারা (Prasenjit Duara) চিনের উদাহরণ দিয়ে প্রসঙ্গটি আলোচনা করেছেন। তার মতে, চিনকে যেমন পশ্চিমা সংস্কৃতিকে মোকাবিলাই করতে হয়নি। কেননা, পশ্চিমা শক্তি ও জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের শামিল হতে হয়েছিলো কঠোর লড়াইয়ে। যার ফলে আলাদাভাবে মন ও মগজকে ডিকলোনাইজ করার প্রয়োজন তারা অনুভব করেনি। আর চিন যদি কমবেশি কলোনাইজড হয়েই থাকে, প্রসেনজিৎ লিখছেন, তবে তা এশীয় শক্তি জাপানের দ্বারাই হয়েছিলো। যে কারণে, চিনের ডিকলোনাইজেশন তৎপরতায় ভিন্নতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ডিকলোনাইজেশনের বিভিন্নতা নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছেন, এমনকি প্রক্রিয়া হিসেবেও একে সর্বদা এক-রকমভাবে বোঝা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ডিকলোনাইজেশন মূল্যায়িত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে (Prasenjit, 2004: 2)।

    জ্ঞানতাত্তি¡ক পরিসরে কোনো ধারণাই স্থির নয়। ডিকলোনাইজেশনের বেলায়-ই বা সেই নিয়ম খাটবে না কেন! মিগনোলো (Walter D. Mignolo) ও ওয়ালশ (Catherine E. Walsh) বলেছেন ডিকলোনিয়ালিটির কথা। তাদের চিন্তায় প্রস্ফূটিত হয়েছে ডিকলোনাইজেশনের দার্শনিক স্বর। ডিকলোনিয়ালিটি বলতে গভীরার্থে তারা চিন্তা করার ধরন-ধারন ও জানাবোঝার সমগ্র প্রক্রিয়াটিকেই নির্দেশ করেছেন। তাদের কাছে এটি অস্তিত্বশীল হওয়ার উপায়। এক-ধরনের কর্মযোগ। ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমের যা এক যুগপৎ প্রক্রিয়া। তাদের মতে, ডিকলোনিয়ালিটি বৈশ্বিক পুঁজি ও পশ্চিমা আধুনিকতার সঙ্গে পরস্পর বিজড়িত ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ও শ্রেণিগত সম্পর্ক নির্ণয় করে। এর দ্বারা নির্ণীত ও প্রতিহত হয় বিষম ঔপনিবেশিক সম্পর্ক। এই অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক কীভাবে সমগ্র জীবনকেই নিয়ন্ত্রণে নেয় ডিকলোনিয়ালিটি ভেদ করে তারই রহস্য। ওয়ালশ লিখেছেন:

    Decoloniality denotes ways of thinking, knowing, being, and doing that began with, but also precede, the colonial enterprise and invasion. It implies the recognition and undoing of the hierarchical structures of race, gender, heteropatriarchy, and class that continue to control life, knowledge, spirituality, and thought, structures that are clearly intertwined with and constitutive of global capitalism and western modernity. Moreover, it is indicative of the ongoing nature of struggles, constructions, and creations that continue to work within coloniality’s margins and fissures to affirm that which coloniality has attempted to negate. (Mignolo & Walsh, 2018: 17)

    ডিকলোনিয়ালিটি ঔপনিবেশিক পরিধির ভেতরেই ক্রিয়াশীল হয়। এটি গজিয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার ফাটল বরাবর। এটি যেমন কোনো স্থিতাবস্থা নয়, তেমনি প্রগতির সোজা পথ ধরেও এটি অগ্রসর হয় না; বরং ডিকলোনিয়ালিটি জীবনকে যাপন করার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। চিন্তা ও তৎপরতার বহুবিধ পাটাতন। জীবন-ধারণের অদ্বিতীয় পশ্চিমা শর্তের যা স্থানচ্যুতি ঘটায় (Mignolo & Walsh, 2018: 17)। মিগনোলো আর ওয়ালশের আলোচনায় ডিকলোনাইজেশন আর টেরিটরি দখল, বা তার স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, কলোনাইজেশনের মনোজাগতিক ক্ষয়, বা ক্ষয়জনিত প্রভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর আওতাধীন হয়ে পড়ছে জীবনযাপনের প্রতিটি অনুষঙ্গ। ঠিক এভাবেই, ডিকলোনাইজেশনের আলাপ বরাবর একইরকম থাকছে না। একে ঘিরে জন্ম নিচ্ছে বিবিধ দার্শনিক সম্ভাবনা। শুধু তাই নয়, পায়ুকাম থেকে শুরু করে প্রাণ-প্রকৃতি-স্বাস্থ্য ও ভগবান ইত্যাদি জ্ঞান-জাগতিক বিভিন্ন ক্যাটেগরি সাপেক্ষে ডিকলোনাইজেশন নিয়ে ইতোমধ্যেই রচিত হয়েছে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

    বি–উপনিবেশায়ন

    বাংলাদেশে ডিকলোনাইজেশনের আলাপ বেশিদিনের পুরোনো নয়। এখনও এটি ভিনদেশি চিন্তার তর্জমাকারেই বাজারে চাওড় আছে। একে ঘিরে প্রস্তুত হয়নি তর্ক-বিতর্কের স্বতন্ত্র পরিসর। গড়ে উঠছে, এটা হয়তো বলা যায়। এই ধরনের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ, একইসঙ্গে জনপ্রিয়, সংকলন হলো উপনিবেশবাদ ও উত্তর–ঔপনিবেশিক পাঠ। ২০০৭ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। এটি সম্পাদনা করেছেন ফকরুল চৌধুরী। দেশি-বিদেশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের রচনাই এতে ঠাঁই পেয়েছে। সন-তারিখসহ সংকলনটির বরাত দেওয়ার উদ্দেশ্য এই নয় যে, বাংলাদেশে উপনিবেশবাদ-টাদ নিয়ে আলাপালোচনার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া। তবে গ্রন্থটিকে একটি বিন্দুতে বসিয়ে আগে-পিছে ভেবে নেওয়ার সুবিধা আছে। এতে আরেকটা বিষয় খোলাসা হয়ে যায় যে, ডিকলোনাইজেশনের আলাপ বাংলাদেশে মূলত শুরু হয়েছে উত্তর-ঔপনিবেশিক পঠন-পাঠনের পরিসরে। স্বতন্ত্র পরিসর গড়ার দাবি নিয়ে এই আলাপ শুরু হয়নি।

    ‘ডিকলোনাইজেশন’ শব্দটি বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রথম কোথায় ব্যবহৃত হয়েছিলো – তা বলা মুশকিল। খুঁজে বের করতে পারলে ভালোই হতো। ফানোর The Wretched of the Earth গ্রন্থটি জগতের লাঞ্ছিত নামে অনুবাদ করেছেন আমিনুল ইসলাম ভুইয়া। এই গ্রন্থে ডিকলোনাইজেশনের তিনি বাংলা করেছিলেন ‘ব্যুপনিবেশন’। বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। জানি না, এটিই প্রথম ব্যবহার কিনা! ২০০৬/৭ সালের দিকেই ‘বি-উপনিবেশায়ন’ শব্দটির চালু ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে উপর্যুক্ত সংকলনটির কয়েকটি প্রবন্ধে বি-উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে। ১৯৮৬ থেকে ২০০৭ সাল, খাটো সময় নয়। এই শব্দের প্রয়োগ-সংক্রান্ত আরও তথ্য থাকারই কথা। ভবিষ্যতে এর একটি পরিষ্কার নকশা দাঁড় করানো যেতে পারে।

    উপর্যুক্ত সংকলন-গ্রন্থে ফকরুল চৌধুরী ‘উপনিবেশবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতি’ শিরোনামে সম্পাদকীয়ের বদলে একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে ফানো সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি লিখছেন: বি-উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে ফানোর প্রত্যাশা হলো সহিংস তৎপরতার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক-উত্তরাধিকার চিহ্নাদির বিনাশ (ফকরুল, ২০১১: ১৬)। অর্থাৎ গ্রন্থের শুরুতেই বি-উপনিবেশায়নের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়; এবং তা ফানোর বরাতে। তেমনি আমীনুর রহমান তার প্রবন্ধে ডিকলোনাইজেশন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেখানে তিনি এর পরিচয় নির্দেশ করতে গিয়ে লিখেছেন:

    সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শোষণ-বঞ্চনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের আলোয়, নিজের সামর্থ্যে নিজেকে চিনে নেবার প্রক্রিয়ার নামই ডিকলোনাইজেশন। নিজেকে চিনতে পারা নিজেদের উপযোগী শাসন ব্যবস্থা সৃষ্টি ও রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে মুক্তির আস্বাদ লাভের প্রক্রিয়াই Decolonization। তবে এই মুক্তি কেবল রাজনীতিক প্রশাসনিক দিক দিয়েই নয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিদায় নেবার পরও সমাজ, অর্থনীতি ও মানসিকতায় উপনিবেশের যে অশরীরী উপস্থিতি তা থেকে মুক্তি লাভের আকাক্সক্ষাও এ ধারণার অংশ। (আমীনুর, ২০১১: ৩৯)

    একইভাবে ফয়েজ আলম বি-উপনিবেশায়নের তৎপরতাকে ডিকলোনাইজেশন অর্থেই মেপে নিয়েছেন। ২০০৬ সালে তার উত্তর উপনিবেশী মন গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিকদের আলোচনার সূত্র ধরে তিনিও উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার মনোজাগতিক ক্ষতকে সারিয়ে তোলার দিকেই বেশি মনোযোগী। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পরও, উপনিবেশিত মগজে-মননে, ঠায় হাজির ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রভাবকেই তিনি উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি বলে নির্দেশ করেন। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকেই তিনি বলেছেন বি-উপনিবেশায়ন। যার শুরু হবে সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে। এডওয়ার্ড সায়িদকে উদ্ধৃত করে তিনি তার প্রস্তাব পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। সায়িদ যেখানে সাম্রাজ্যবাদী দমনের শিকার, চাপা পড়া, জাতীয় অতীতকে আবিষ্কার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন; যার মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে বি-উপনিবেশায়নের ভিত, যেখানে দাঁড়িয়ে নেওয়া যাবে পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ (ফয়েজ, ২০১১: ৬২-৬৩)। ফয়েজ আলম অবশ্য তার আলোচনায় কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি। বি-উপনিবেশায়ন বলতে আমরা কী বুঝব! এই প্রশ্নের তিনি সাফ জবাব দিয়েছেন। তাকে উদ্ধৃত করছি:

    বি-উপনিবেশায়ন বলতে আমরা বুঝব উপনিবেশের সেইসব প্রভাব নিষ্ক্রিয় করা, যেগুলো আমাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাদান ও অভিজ্ঞতাসমূহ বিকৃত করেছে, গোটা জাতির মধ্যে হীনমন্যতার বোধ পুঁতে দিয়েছে। আবার যেসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে কিংবা নব্য উপনিবেশের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। (ফয়েজ, ২০১১: ৬৩)

    ফয়েজ আলম, আমীনুর রহমান প্রমুখের লেখায় ডিকলোনাইজেশনকে বেশ স্বচ্ছভাবেই পাওয়া যায়। তারা এর বাংলা করেছেন বি-উপনিবেশায়ন। ডিকলোনাইজেশনকে তারা প্রয়োগ করেছেন বাংলাদেশের জ্ঞানজাগতিক পরিসরে। বাংলাদেশের বি-উপনিবেশায়ন তৎপরতায় তাদের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ডিকলোনাইজেশনের পদ্ধতিসমূহ বা উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকদের প্রস্তাবনাগুলোকে প্রয়োগ করার কিছু সংকট আছে। এর ফলে, ভিনদেশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যার সাপেক্ষে বাংলাদেশকে বুঝে নেওয়ার তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। গতরের মাপেই পোষাক হওয়া চাই। পোষাকের মাপে গতরকে গড়ে নেওয়াটা মুশকিল। ফানো, সায়িদ, নগুগি যার নামই আমরা নিই না কেন, তারা সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের নিজস্ব সমস্যার সাপেক্ষেই তাদের প্রস্তাবগুলো গড়ে তুলেছেন। হ্যাঁ, তাদের পর্যালোচনা, আমাদের বিবেচনাকে যেমন সমৃদ্ধ করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়নে তারা হতে পারেন অপ্রাসঙ্গিক। কথা হলো, বাংলাদেশে বি-উপনিবেশায়ন সম্পর্কে যারা প্রথম থেকেই আলাপ করছেন তাদের চিন্তায় মৌলিকত্ব নেই, এই দাবি করা অনায্য হবে। যেহেতু, এখনও তারা তত্ত্বচিন্তায় সমান সক্রিয় আছেন। বরং এখন সময় এসেছে, বাংলাদেশের সমস্যা সাপেক্ষে, যার যার ভাবনাকে সংহত রূপে হাজির করার।

    মজিদ মাহমুদের উত্তর–উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য গ্রন্থে ডিকলোনাইজেশন সম্পর্কিত আলোচনা পরিলক্ষিত হয়। বইটি বিচ্ছিন্ন কিছু প্রবন্ধের সংকলন। এটি প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। লেখক যদিও মুখবন্ধে উল্লেখ করে দিয়েছেন, ‘প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশ বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য সাময়িকী কিংবা লিটলম্যাগে ছাপা’ হয়েছে; কিন্তু প্রবন্ধগুলোর শেষে আলাদা করে সন-তারিখ বা পত্রিকার নামের উল্লেখ না-থাকায় সেগুলোর প্রকাশকাল নির্ধারণ করা কঠিন। ‘উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্যের রূপরেখা’ প্রবন্ধে তিনি ডিকলোনাইজেশন সম্পর্কে আলাপ তোলেন; এর তর্জমা হিসেবে বেছে নেন ‘ব্যুপনিবেশ’ শব্দটিকে। লিখেছেন:

    ব্যুপনিবেশ (Decolonization) ধারণার সঙ্গে অনেকেই উত্তর-উপনিবেশ (Post-colonization) ধারণাটি গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এ দুটি ধারণার মধ্যে রয়েছে বিস্তর প্রার্থক্য [পার্থক্য]। এবং একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক নেই বলা চলে। ব্যুপনিবেশের শুরু হয়েছে সেই তখন থেকে, যখন পরদেশী ইউরোপীয়রা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছিল। ব্যুপনিবেশ একটি বিদ্রোহার্থক চেতনা। যা মূলত ভূমিপুত্রদের নিজের মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকার লড়াই। বিদ্রোহ ও রক্তপাত, এমনকি নির্মূল হয়ে যাবার আশঙ্কাও এই চেতনার মধ্যে নিহিত। ব্যুপনিবেশকালে স্বদেশীদের শুভবুদ্ধির কাছে আবেদন জানানো হয়। তাদের সামনে তুলে ধরা হয় বিশেষ মূল্যবোধ। তাদের বারবার বলা হয় ব্যুপনিবেশ বলতে পশ্চাৎপদতা বোঝায় না। বলা হয় আমাদের যা, তা খাঁটি ও শ্রদ্ধেয়; আমাদের যা নিজেদের তার ওপর আস্থা রাখতে হবে। উপনিবেশ প্রথমেই একটি মুৎসুদ্দি শ্রেণী তৈরি করে। স্থানীয়দের সংস্কৃতির মধ্যে হট্টগোল বাধিয়ে দেয়। সর্বত্র ভাষা শিক্ষার প্রকল্প গ্রহণ করে। আর মুৎসুদ্দির কাজ শে^তাঙ্গ মূল্যবোধের মাহাত্ম্য প্রচার করা। যা কিছু দেশী তার সবই খারাপ। কিন্তু ব্যুপনিবেশকালে মানুষজন ঔপনিবেশিক প্রভুদের সবকিছু খারাপ বলতে শুরু করে। তাদের মূল্যবোধ পরিহাস করে, অপমান করে এবং বমি করে উগরে দেয়। বিলাতি পণ্য বর্জন করে, চরকার গান গায়। (মজিদ, ২০০৯: ১২)

    পুরো অনুচ্ছেদটিকেই উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেলো না। লেখকের বক্তব্যকে জুত মতো উপস্থাপনের স্বার্থেই এটি করা। প্রবন্ধটিতে মজিদ মাহমুদ বেশ কিছু সাহসী বিবৃতিও দিয়েছেন। যেমন, কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি বলেছেন ব্যুপনিবেশিক সাহিত্যের প্রতীক ও মনুমেন্ট (মজিদ, ২০০৯: ১৩)। বলেছেন, ‘বাংলা সাহিত্য মূলত ব্যুপনিবেশের সাহিত্য’ (মজিদ, ২০০৯: ১২)।

    ২০১৩ সালে পারভেজ হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মহাত্মা গান্ধীর কিছু লেখাপত্রের সংগ্রহ। সম্পাদক সংগ্রহটির নাম রেখেছেন প্রতিরোধ ও বিউপনিবেশীকরণ। বিউপনিবেশীকরণ সম্পর্কে, তার এক পৃষ্ঠার সম্পাদকীয়তে, তেমন কিছুই তিনি খোলাসা করেননি। মুখ খোলেননি গান্ধীর বিউপনিবেশীকরণ সম্পর্কেও; বরং পাঠকদের ঠেলে দিয়েছেন গান্ধীর রচনায়। লিখেছেন:

    গান্ধী কেন? এই প্রশ্নের হাজারো জবাব আছে। বড় জবাব অবশ্যই এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত গান্ধীর লেখাগুলোর ভিতরই রয়েছে।… গান্ধী কেবলমাত্র উপনিবেশবাদের অপসারণই চাননি, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের রূপরেখা নিয়েও ভেবেছেন।… আমরা মনে করি উপনিবেশবাদের ছায়া উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে এখনো বিরাজ করছে। উত্তরণের উপায় হিসেবে গান্ধী অনিবার্য। এই লক্ষ্যেই গান্ধীর লেখাসমূহ থেকে বাছাই সংকলন ‘প্রতিরোধ ও বিউপনিবেশীকরণ’। (পারভেজ, ২০১৩: ৯)

    উপর্যুক্ত নজিরগুলো দেওয়ার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে। একদম নড়বড়ে হলেও, বাংলাদেশে বি-উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত ভাবনার, একটা কাঠামো অন্তত দাঁড় করানো। গঠনটাকে ভবিষ্যতে আরও পোক্ত করার আশা থাকলো। উল্লেখ করা উচিৎ, নাম ধরে বি-উপনিবেশায়ন সংক্রান্ত আলাপ না করলেও, বাংলাদেশের অনেকেই কিন্তু উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার প্রভাব ও ফল সম্পর্কিত আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই শামিল আছেন। উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারার চিন্তা ও বইপত্র নিয়েও লিখছেন অনেকেই। সা¤্রাজ্যবাদী তৎপরতা, নয়া-উপনিবেশবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইত্যাদি বিষয়াষয় সেই সকল রচনায় নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে ও হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এই ধরনের তৎপরতা বিউপনিবেশায়ন ভাবনার শর্ত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার ছয় বছরের মাথায়ই যেমন জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী লিখেছিলেন:

    It will be an uphill road, overcoming this favourable bias toward the wisdom of the West. For a long time to come we will continue to credit foreign expertise unquestioningly with any knowledge it may lay claim to. (Zafrullah: 1981)

    তিনি আলোচনা করেছিলেন উপনিবেশীকরণের সংকট নিয়ে। তার তদন্তে গ্রেফতার হয়েছে, গবেষণা-তৎপরতা কীভাবে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার। কীভাবে এর দ্বারা, ছলে-বলে-কৌশলে, কায়েম হয়েছে নয়া-উপনিবেশবাদ। তার আলোচনার ক্ষেত্র ছিলো চিকিৎসাখাত; সেই খাতে পরিচালিত গবেষণা। সেই সকল গবেষণায় নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও তার নেপথ্যে ক্রিয়াশীল পুঁজির ভূমিকা তিনি সনাক্ত করেছিলেন। তিনি নির্দেশ করেছিলেন, সেই সকল গবেষণায় নিহিত সাম্রাজ্যবাদী নানান ছলাকলা। নিবন্ধটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। ১৩-১৪ জানুয়ারি। Bangladesh Times পত্রিকায়। নাম ‘Research: A Method of Colonization’। লেখাটাতে ঔষধ সংক্রান্ত রাজনীতিই কেবল অনাবৃত হয়নি, কীভাবে আমরা পশ্চিমা জ্ঞানের মুখোমুখি হই, নির্ণীত হয়েছে সেই সংকটও।

    বিউপনিবেশায়ন ডিকলোনাইজেশনের তর্জমা নয়

    বাংলাদেশে বি-উপনিবেশায়ন সম্পর্কিত যে-ধরনের আলাপগুলো ইতোমধ্যে হয়েছে প্রত্যয়টি সেখানে ‘decolonisation’-কেই প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রয়োগের সুবাদে বা অন্যান্য যে-কারণেই হোক, ভিনদেশি তাত্ত্বিকদের চিন্তা থেকে, কিছুক্ষেত্রে ভাবগত সামান্য বিচ্যুতি থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু, ভিনদেশি চিন্তাকে আশ্রয় করেই মূলত সংহত হয়েছে সেই সকল আলোচনা। এক্ষেত্রে আলোচকদের পদ্ধতিগত নিজস্বতা একদম গরহাজির ছিলো। বিশেষ করে এডওয়ার্ড সায়িদ, ফ্রাঞ্জ ফানো ও নগুগি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন অনেকেই। তবে নিজার এক্ষেত্রে বেশ সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাকে ঠেস দিয়ে বর্তমান আলোচনাটি দাঁড় করানোর এটিই অন্যতম কারণ। ডিকলোনাইজেশনকে তিনি পরিচয় করিয়ে দেওয়া বা দেশীয় জমিনে প্রয়োগ করার শর্তে বিউপনিবেশায়ন অভিধাটি প্রয়োগ করেননি। তবে হ্যাঁ, তার বিউপনিবেশায়ন আলোচনা বিশ্বজুড়ে চলমান ডিকলোনাইজেশন তৎপরতার বাংলাদেশি স্বর। এই দুইয়ের মধ্যে সন্দেহহীন ফারাক আছে। এই স্বর স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে নিজারের অবদান অসামান্য। বিউপনিবেশায়নকে তিনি পৃথিবীর অপরাপর ভূখণ্ডগত স্বর থেকে সচেতনভাবে আলাদা করে নিয়েছেন। এই কারণেই স্পষ্ট হয়েছে তার চিন্তার স্বতন্ত্র রূপরেখা।

    মজার ছলে বলা যায়, বিউপনিবেশায়ন বানানে ‘হাইফেন’-এর ব্যবহার, এক্ষেত্রে তাৎপর্যহীন নয়। নিজার ‘হাইফেন’ ব্যবহার করেন না। সচেতনভাবেই করেন না। হয়তো তার চিন্তাকে দেশীয় অপরাপর ভাবনা থেকে ফারাক করার জন্যই করেন না। অন্যরা ঠিকই ‘হাইফেন’ ব্যবহার করেন। আবার করেনও না। এজন্যই শুরুতে বলা, এখানে ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনিকে, বিম্ব থেকে প্রতিবিম্বকে আলাদা করাটাও জ্ঞানতাত্তি¡ক বিপ্লবের মতোই কিছু একটা। যাইহোক, নিয়ম-কানুন মানলে ‘বিউপনিবেশায়ন’ লেখার বদলে নিজারকে অবশ্য ‘ব্যুপনিবেশায়ন’ লিখতে হতো। কেননা, ব্যাকরণের পরিসরে ‘ই’-এর সঙ্গে ‘উ’ যদি সন্ধি করে তবে তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘য্ + উ’ হিসেবে। আমিনুল ইসলাম ভুইয়া যেমন ‘decolonisation’-এর অনুবাদ করেছিলেন ‘ব্যুপনিবেশন’ (ফানো, ২০০৬: ৩০)। তার অনুবাদ যথার্থ। সম্ভবত বাংলাদেশি কানে ‘ব্যুপনিবেশন’ আরামদায়ক ঠেকেনি। দেখতেও হয়তো খটমট লেগেছে। ফলে, হাইফেনঅলা ‘বি-উপনিবেশায়ন’ শব্দটিই মার্কেট পায়। তত্ত্বচিন্তার পরিসরে হাইফেন সহযোগে বিভিন্ন উপসর্গের ব্যবহার ইদানিং জনপ্রিয়। অনেকক্ষেত্রেই তা সংশ্লিষ্ট সেই চিন্তার সঙ্গে ধারাবাহিকতা অথবা বিরোধিতার লক্ষণ প্রকাশে সহায়ক হয়। অবশ্য, হাইফেনের আঠা দিয়ে শব্দের আগে কোন উপসর্গ বা পদ জুড়ে দেওয়া হচ্ছে এটাও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘বি-উপনিবেশায়ন’ বানানটি এক্ষেত্রে, এক-ধরনের বিরোধী তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়। নিজারের হাইফেন ব্যবহার না-করার সম্ভবত এটাও একটা কারণ। যেহেতু, বিউপনিবেশায়নকে তিনি উপনিবেশায়নের বিরোধী তৎপরতা হিসেবে বুঝতে নারাজ। কেন ও কীভাবে নারাজ, এই বিষয়ে, সামনে আরও পরিষ্কার কথা লেখা আছে।

    ছবি: চর দখল (১৯৭৬) শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    বিউপনিবেশায়নের আলোচনায় ডিকলোনাইজেশনের সংকটময় দিকগুলো পর্যালোচনারও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কেননা, তত্ত্বজগতে ডিকলোনাইজেশনের আলাপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; একইসঙ্গে, চিহ্নিত হয়েছে এর কিছু সংকটময় চরিত্রও। এই বিষয়ে বিউপনিবেশায়ন তাত্ত্বিকদের সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। যেমন, উপনিবেশ-পরবর্তী সদ্য স্বাধীন হওয়া জাতি-রাষ্ট্রগুলোর ডিকলোনাইজেশন তৎপরতায় তাত্ত্বিকেরা এক-ধরনের স্মৃতি লোপাটের প্রবণতা (পলিটিকাল অ্যামনেশিয়া) লক্ষ্য করেছেন। উপনিবেশিতেরা যেন ভুলে যেতে চেয়েছে, স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে, উপনিবেশের বিগত স্মৃতিসমূহ। ইতিহাসের স্পেস থেকে জাতি-রাষ্ট্রগুলো যেন ঘঁষে ঘঁষে তুলে ফেলতে চেয়েছে কলঙ্কিত ঔপনিবেশিক চিহ্নাদি; এবং এই মুছে ফেলাকে তারা জ্ঞান করেছে তাদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার শর্ত। হয়তোবা এই মুছে ফেলা, এই চিহ্নলোপসাধন, এই বিস্মৃতি তাদের প্রয়োজন ছিলো, আকাক্সিক্ষত ছিলো; প্রয়োজন ছিলো সবকিছু নতুনভাবে শুরু করার জন্য। কিন্তু নিছক আকাক্সক্ষা দ্বারা কি ইতিহাসের হিসাব মেলে! মেলে না। যে কারণে জাতি-রাষ্ট্রসমূহ তাদের ঔপনিবেশিক অতীত মুছে ফেলতে যথারীতি ব্যর্থ হয়েছে (Leela, 1998: 4)।

    এই মুছে ফেলার কাজটিই নানাভাবে সংঘটিত হয়েছে। উপনিবেশবাহিত লক্ষণসমূহকে কেউ হয়তো চেষ্টা করেছেন জাতীয় প্রতীকে বদলে নিতে। আবার ফানো যেমন বলতেন: আগের কাতারকে ঠেলে দিতে হবে একদম শেষ কাতারে, আর শেষ কাতারকে প্রথম কাতারে জায়গা দিতে হবে। অর্থাৎ সরাসরি প্রতিস্থাপন চেয়েছিলেন তিনি। ‘The last shall be first and the first last.’। এই বাক্যের মধ্য দিয়ে ফানো কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা অস্পষ্ট নয়। ঔপনিবেশিক সমগ্র কাঠামোটাকেই তিনি কাঠগড়ায় তুলেছিলেন (Fanon, 2001: 28); তবে তাকে গিয়ে পৌঁছতে হয়েছিলো সেই জাতীয় চেতনার ধারণাতেই। অবশ্য তার সামনে এ-ছাড়া আর উপায়ই বা কী ছিলো! ফানো লিখেছেন:

    National consciousness, which is not nationalism, is the only thing that will give us an international dimension. … It is at the heart of national consciousness that international consciousness lives and grows. And this two-fold emerging is ultimately the source of all culture. (Fanon, 2001: 199)

    ফানো যে জাতীয়তাবাদের কথা বলছেন না – এটা পরিষ্কার। কিন্তু জাতীয় মুক্তি বা জাতীয় চেতনার ধারণাও মর্মগত প্রপঞ্চ মাত্র। এক-ধরনের কল্পিত বয়ান। এই বয়ানেও নিজ-এর বিপরীতে থাকে পর। পরকে পরিধিতে পাঠিয়ে চিন্তার কেন্দ্র দখল করে থাকে নিজ। ঘুরে ফিরে যেকোনোভাবেই জাতীয় চেতনায় নিহিত থাকে স্বাজাত্যবোধ; থাকে ফ্যান্টাসি; থাকে এক-ধরনের কাল্পনিক-উদার শুভবোধ; থাকে আধিপত্যবাদ। মর্মগত কোনো প্রপঞ্চ বর্তমান জমানায় নানাভাবেই সমালোচিত। ফলে, হাল আমলের তাত্ত্বিকেরা এখন আর কোনো ধরনের জাতীয় চেতনায় ভর দিয়ে দাঁড়াতে সাহস করেন না। তার যৌক্তিক উপায়ও সীমিত। ফলে ডিকলোনাইজেশনের আলোচনায় জাতীয় চেতনায় ভর দিয়ে সুযোগ নেই দাঁড়াবার।

    ডিকলোনাইজেশনে যারা উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের চরিত্রগত মেরুকরণ করেছেন, তাদেরকে আরেক প্রকার সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। যেহেতু সেখানে নিজ ও পরের পরিচয়গত স্থিরীকরণ ঘটে যায়; উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের পরিচয় রয়ে যায় ফিক্সড। মেমি, ফানো ও সায়িদের রচনায় যেমনটা দেখা গেছে। প্রত্যেকেই তারা উপনিবেশকদের স্থির চরিত্র গড়েছেন; তেমনি স্থির চেহারাতেই চিনে নিয়েছেন উপনিবেশিতদের। হোমি ভাবা (Homi K. Bhaba) এই চারিত্রিক স্থিরীকরণের বিপক্ষে কথা বলেন। তার কাছে উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের পরিচয়টি এতো সরল নয়। ঔপনিবেশিক ‘সেল্ফ’ আর উপনিবেশিত ‘আদার’ ফিক্সড নয় তার কাছে; যেমনটা সচরাচর ধারণা করা হয়ে থাকে। দুইয়ের চারিত্রিক পিছলামির (ফ্লেক্সিবিলিটি) দোহাই দিয়ে ভাবা হাইব্রিডিটির কথা তোলেন (Bhaba, 2006: 3-6)। উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া, ভাবার মতে, পুরোপুরি ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বে সংঘটিত হয়নি। অর্থাৎ স্থানীয়রা এক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় পুতুল মাত্র ছিলো না; ঠিকই তারা সক্রিয় ছিলো আপনাপন চাহিদাসমেত; যাকে পুরোটা শাসন করা ঔপনিবেশিক কর্তাদের পক্ষেও বলতে গেলে অসম্ভবই ছিলো। ভাবা লিখেছেন:

    In the case of the colonial discourse, these syntagmatic appropriations of presence confront it with those contradictory and threatening differences of its enunciative function that had been disavowed. In their repetition, these disavowed knowledges return to make the presence of authority uncertain. They may be take the form of multiple or contradictory belief, as in some forms of knowledges: ‘We are willing to be baptized, but we will never take the Sacrament.’ Or they may be forms of mythic explanation that refuse to acknowledge the agency of the Evangelicals: ‘An Angel from heaven gave it [the Bible] us, at Hurdwar fair.’ (Bhaba, 2006: 171)

    ফলে ঔপনিবেশিক শাসনের মর্মগত চেহারা দাঁড় করানো ও তাকে নেতিবাচকভাবে স্থির করাটাও নির্ভুল নয়। তাছাড়া জাতি-রাষ্ট্রের সংকটসমূহের হেতু বিগত ঔপনিবেশিক পর্বে ঢালাওভাবে অন্বেষণ করাটাও এক-ধরনের পলায়নবাদী বিশ্লেষণ। এই প্রক্রিয়ায় বর্তমানের সমস্যা বরাবরই আত্মগোপন করবে এক কল্পিত অতীতে; যা নিজেই জন্ম দেবে আরেক প্রকার সংকট।

    উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাধারার বিকাশে ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থটিকে অনেকেই কার্যকরী প্রভাবক বলে মনে করেছেন। কিন্তু খুব একটা গুরত্ব দিয়ে এই বিষয়টা খেয়াল করা হয় না যে, সায়িদের ভাবনা মূলত বেড়ে উঠেছে পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট পরিমণ্ডলে; যে সময়ে অফ গ্রামাটোলজি (১৯৭৭) অনুবাদ করে তত্ত্বজগতে প্রবেশ করেন স্পিভাক; পরিবেশটা ছিলো অনেকটাই ফুকোডিয়ান ও দেরিদিয়ান ভাবধারা কর্তৃক শাসিত; বিশেষ করে ফুকোর ডিসকোর্স অ্যানালাইসিসের ধারণা সায়িদকে প্রভাবিত করে। এই সুবাদেই ওরিয়েন্টালিজম সম্পর্কিত আলাপকে তিনি আলাদা করে নিতে পেরেছিলেন (Leela, 1998: 25)। সায়িদ অবশ্য তার গ্রন্থের ভূমিকাতেই ফুকোর প্রতি এই ঋণ-স্বীকারটা করেছেন (Said, 1979: 23)। এখন কথা হলো, ফুকোডিয়ান-দেরিদিয়ান কায়দায় সায়িদ যখন পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন, তাকে এক-প্রকার নাকানিচুবানি খাওয়ান, এক-অর্থে তা কি পশ্চিমা জ্ঞানকেই বিকশিত করে না! তিনি তো প্রাচ্য সম্পর্কিত পশ্চিমা-জ্ঞানকেই ডিসেন্ট্রালাইজ করেছেন! ফলে তার ওরিয়েন্টালিজমকে পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট তৎপরতার অংশ হিসেবেই কি পাঠ করা সংগত নয়! এই প্রেক্ষিত স্মরণে রেখে সায়িদের পাঠ দাঁড় করানো কি অসংগত হবে! তাকে কি পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের বাইরে রেখে হিসেব মেলানো যায়!

    ডিকলোনাইজেশনের এই সংকটগুলো সম্পর্কে নিজার ওয়াকিবহাল। উপর্যুক্ত সংকটময় দিকগুলো তিনি পরিহার করেছেন। এখানে আরেকটা কথা খোলাসা করা দরকার। পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের অন্তর্ভুক্তি মানেই দোষাবহ, বর্তমান আলোচনায় কিন্তু, এমনটা বিবেচিত হচ্ছে না। এটা শুধু করা হচ্ছে তৎপরতার ফারাকটুকু বোঝানোর জন্য; যা গুরুত্বহীন নয়; যেহেতু চলমান আলোচনায় এটা নির্দেশ করারও প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, বিউপনিবেশায়ন কীভাবে পশ্চিমা জ্ঞান-পরম্পরা থেকে পৃথক; কীভাবে এটি বাংলা-অঞ্চলের বিউপনিবেশায়ন। যদিও এই স্বাতন্ত্রের মূল্যও কম নয়। কেননা ভিনদেশি জ্ঞানতত্ত্বে বাংলা-অঞ্চলকে, বাংলাদেশকে আসলে পাওয়া যায়নি; অবশ্য না-পাওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক; তাই ভিনদেশি জ্ঞানজাগতিক নকশাও বাংলাদেশের জন্য বরাবর অপ্রাসঙ্গিক প্রতিপন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের দরকার প্রাসঙ্গিক জ্ঞানতত্ত¡; যা ব্যাখ্যা করবে বাংলাদেশের সমস্যা; প্রস্তাব করবে তার সমাধানের পথ। এভাবে কথা বলার মানে অবশ্য এই নয় যে, বাংলা-অঞ্চলের লোকেরা যদি বিউপনিবেশায়ন নামে পর্যালোচনার ভূখণ্ডগত পৃথক স্বর গড়ে তোলে, ডিকলোনাইজেশন বা পোস্ট-কলোনিয়ালিজমের কাছে তার কোনো ঋণ থাকবে না। জ্ঞানগত যোগ বা ঋণ যা-ই বলি না কেন – তা থাকতেই পারে। সে আলাদা কথা। নিজার লিখছেন: ‘বিউপনিবেশায়ন এবং উত্তর-উপনিবেশবাদ এক নয়। উত্তর-উপনিবেশবাদ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর শিল্প-সাহিত্য-চিন্তার অভিব্যক্তি। এই অভিব্যক্তির মধ্যে বিউপনিবেশায়নের প্রবণতা থাকলেও তা যেমন একমাত্র নয়, তেমনি একে সার্বিক কোন চরিত্রও বলা যায় না’ (নিজার, ২০১৮: ৫৭)। এই কথাগুলো বলার মাধ্যমেই নিজার মূলত বিউপনিবেশায়নের স্বতন্ত্র পরিসর গড়ার পায়তারা খুঁজেছেন; এবং তার প্রস্তাবসমূহ যে আলাদা ছাঁচে ঢালাই করা- দিয়েছেন সেই ইঙ্গিত।

    আকারে-ইঙ্গিতে যদিও আগেই বলা হয়েছে, আবারও তবু বলা যেতে পারে, বিউপনিবেশায়ন ডিকলোনাইজেশনের বাংলা অনুবাদ নয়। বিশ্ব জুড়ে আলোচিত ডিকলোনাইজেশনের অপরাপর স্বরসমূহ থেকে এটি আলাদা। এটি আলাদা এই কারণেও যে, ডিকলোনাইজেশনের কোনো সর্বজনীন স্বর নেই। ভূখণ্ডগত অভিমুখিতার কারণেই বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের ডিকলোনাইজেশনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন ভাবনার বৈশিষ্ট্যগত ফারাক থাকাটা স্বাভাবিক; এবং তা আছেও। নিজারের আলোচনায় বিউপনিবেশায়ন কেবলই বাংলা-অঞ্চলের জ্ঞানতাত্ত্বিক তৎপরতার দ্যোতক। যেখানে একে এন্টি-কলোনিয়ালিজম হিসেবে বুঝলেও চলে না। কারণ বিউপনিবেশায়ন এন্টি-কলোনিয়ালিজম নয়। যেহেতু ঔপনিবেশিক নিপীড়নের অনেক প্রসঙ্গই স্বাধীনতা-প্রাপ্তির পর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে; অনেক ক্ষেত্রেই তাই সেই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা অর্থহীন; তাছাড়া ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ড মাত্রই নেতিবাচক, এটি কোনো নির্ভুল অনুসিদ্ধান্ত হতে পারে না। ফলে ঔপনিবেশিক পর্বে সংঘটিত যেকোনো কর্মকাণ্ডেরই বিরোধিতা বিউপনিবেশায়ন তৎপরতার অংশ নয়; এর লক্ষ্য নয় কলোনিয়াল কর্মসূচির ঢালাও বিষোদগার। এই দৃষ্টিতে জগৎ বাইনারি (binary) স্বরূপে হাজির নয়। হয় এটা, নয় ওটা- সদাই এখানে পরিতাজ্য। এমনভাবেই নিজার গড়ে নিয়েছেন বিউপনিবেশায়নের পদ্ধতি। এমনকি হাইব্রিডিটির ধারণা দিয়েও তিনি মাপেননি উপনিবেশক ও উপনিবেশিতের পরিচয়।

    তেমনি বিউপনিবেশায়ন কোনো নির্মাণকে ডিসেন্ট্রালাইজ করেনি। এটি কোনো ডিকনস্ট্রাকশনের পদ্ধতি নয়। যেহেতু গোটা জগৎ এতে দুই ফোঁড়ের (binary) গাঁথনিতে গাঁথা নয়। বিভাজিত নয় কেন্দ্র ও পরিধির জ্যামিতিতে। ফলে কেন্দ্র ও প্রান্তের সমতা এর আলোচনার বিষয় হয়নি। তেমনি এতে নিহিত নেই জ্ঞানজাগতিক কোনো সমতলীয় ক্ষেত্রের প্রস্তাবনা (মনিরুল: ২০২১); বরং এখানে অবলম্বিত হয়েছে প্রসজ্য প্রতিষেধ; কোনো বিকল্পকে খÐন করে যেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় না তার বিরুদ্ধ বিকল্পকে। ফলে কোনো কিছু সাদা না হলেই এখানে তার অ-সাদা হওয়া বোঝায়নি। একইসঙ্গে তা সাদা ও অ-সাদা কোনোটিই না হতে পারে। হতে পারে সাদা বা অ-সাদা উভয়ই। এমনকি তা হতে পারে সাদা ও অ-সাদা কোনোটিই নয়, আবার উভয়ও নয়। পশ্চিমা জ্ঞানের ক্যাটেগরি সাপেক্ষে একে তাই বোঝাটা মুশকিল। বিভিন্ন আলাপচারিতায় নিজার বলেন, বিউপনিবেশায়ন ঔষধের মতো। রোগ থাকলেই কেবল ঔষধ প্রয়োজনীয় হয়। রোগের সাপেক্ষেই কেবল কোনো উপাদান ঔষধ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ঔষধের ঔষধত্ব এককভাবে তার উপাদানে নিহিত নেই। একারণেই বিউপনিবেশায়ন একটি সমস্যা সাপেক্ষ তত্ত্ব। এর নেই দাঁড়াবার কোনো একক ও সুনির্দিষ্ট জমিন। ফলে কোনো অঞ্চলের জন্য কার্যকরী বিউপনিবেশায়ন প্রস্তাব অন্য অঞ্চলের জন্য হতে পারে অপ্রাসঙ্গিক। এমনকি অনুরূপ ঘটনা ঘটতে পারে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিধির ভেতরেই, যদি না উপনিবেশায়নকে স্বরূপে চিহ্নিত করা যায়। যেহেতু, রোগনির্ণয় যথার্থ না হলে তার ঔষধও অযথার্থ হতে বাধ্য।

    বিউপনিবেশায়ন আবার ঔপনিবেশিক প্রভাবকে মোকাবিলা করার মঞ্চও নয়; যেহেতু মোকাবিলার কথা এখানে আসে না। ‘মোকাবিলা’ শব্দটিতেই মূলত আপত্তি। কেননা এতে পক্ষ-বিপক্ষ গড়ে ওঠে। পক্ষ-বিপক্ষ গড়ে উঠলে আবারও পড়তে হয় সেই নিজ ও পরের ফাঁদে; লকলকে জিভ বের করে এগোতে থাকে স্বাজাত্যবোধ; বরং বিউপনিবেশায়ন দার্শনিক তৎপরতা; হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া; বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া; একইসঙ্গে যা তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক দুইটাই; যার কোনো পূর্বানুমান নেই; যার কোনো বিশেষ রূপরেখা নেই; তা সক্রিয় ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনীতি সাপেক্ষ (নিজার, ২০১৭: ৫৭)। এখন কথা হলো, কেউ যদি উপনিবেশায়নকে রোগ হিসেবে চিহ্নিতই না করেন! হ্যাঁ, বিউপনিবেশায়নের আলাপই তবে উঠবে না। নিজার তাই বিউপনিবেশায়নকে সমস্যা-সাপেক্ষ বলেন। এটি তাই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা নয়; নয় এটি অতীতের পরম্পরা অথবা অতীত-ঘটনার কোনো প্রতিশোধাত্মক বয়ান। বর্তমানের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই অতীত এখানে হয়ে ওঠে তদন্তের জরুরি অনুষঙ্গ।

    কেন বিউপনিবেশায়ন?

    বিউপনিবেশায়ন তৎপরতায় যদি কোনো পূর্বানুমান না থাকে, তার যদি পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত কোনো গন্তব্যও না থাকে, তাহলে তার প্রাসঙ্গিকতা কোথায়! তার কথাই বা উঠছে কোন প্রেক্ষিতে! এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে কথা যেহেতু উঠেছে, তার মানে সমস্যা কোথাও আছে। কোথায় সমস্যা! নিজার তার গ্রন্থ শুরু করেছেন এই বলে :

    শেখ মুহাম্মদ সুলতান বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পীদের একজন। তিনি শুধু চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, তার স্বতন্ত্র দর্শন, রাজনীতি, সমাজ ও নন্দনভাবনা ছিল, যা একই সাথে দেশজ ও সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এবং জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে ‘সহজিয়া’দের ‘সহজ’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টার স্মারক। তার চিন্তার ছাপ পড়তে পারত আমাদের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও দর্শনচর্চাসহ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। কিন্তু তার চিন্তা জ্ঞানের অন্যান্য শাখা তো দূরের কথা, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় কোনো ধারাক্রমই সৃষ্টি করতে পারেনি বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীকে প্রভাবিতও করতে পারেনি। কখনও কখনও সুলতানের কাজ অনেক শিল্প-সমালোচকদের কাছে অবোধগম্য ছিল বলে তা অবমূল্যায়িত হয়েছে। (নিজার, ২০১৭: ১৭)

    বাংলাদেশের একজন চিত্রশিল্পী যার ছিলো শক্তিশালী অন্তর্দৃষ্টি। গ্রামের এক কোণায় যে পড়ে ছিলেন তা-ও নয়। আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত তার ছিলো অনায়াস গতায়াত। এমনকি তিনি বিখ্যাতও ছিলেন। অথচ দেশে তার সিলসিলা বহন করার কেউ নেই। উল্টা অনেক ক্ষেত্রেই তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অনাধুনিক’ হিসেবে। এই হলো সমস্যার লক্ষণ। তদন্ত শুরু করলেন নিজার। গলদ খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছলেন গিয়ে ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায়। সমস্যা হলো- ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন। সুনির্দিষ্ট এই সমস্যার সাপেক্ষেই এখানে গড়ে উঠল বিউপনিবেশায়নের প্রাসঙ্গিকতা। অবশ্য বিউপনিবেশায়ন কোনো সরল প্রক্রিয়া নয়। এর অত্যাবশ্যকীয় শর্তসমূহের একটি হলো, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে, উপনিবেশায়ন ও তার প্রভাবকে স্বরূপে সনাক্ত করা।

    নিজার ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের আদ্যোপান্ত খোঁজ করতে শুরু করলেন। ভারতীয় শিল্পকলাবিষয়ক গবেষণা শুরু হয় আঠারো শতকের শেষ ও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। ঔপনিবেশিক তত্ত্বাবধানে। বিশেষ করে প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন অধ্যয়ন করতে গিয়ে। যার কারণ ছিলো দুইটি – এক, শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বাঙালিসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ; দুই, আঠারো এবং উনিশ শতক থেকে প্রত্মনিদর্শনের বাজারমূল্য বৃদ্ধি। তাছাড়া শাসনকার্যের সুবিধার্থে এই অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্ব অধ্যয়নেরও প্রয়োজন ছিলো। ফলে শুরু হয় এই অঞ্চলের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, দর্শন ও ধর্মের অধ্যয়ন; যা ‘ভারতবিদ্যা’ বা ‘প্রাচ্যবিদ্যা’ নামে পরিচিত। মূলত এই প্রাচ্যবিদ্যার সুবাদেই ভারতীয় শিল্পকলা প্রাচ্যবাদী অপব্যাখ্যার কবলে পড়ে। ঐদিকে ভারতবর্ষে শিল্পচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও সেই ইতিহাসের উপর কোনো গ্রন্থ ছিলো না; যার ফলে প্রত্মনিদর্শন অধ্যয়নের দ্বারাই গড়ে উঠেছে ভারতীয় শিল্পকলার প্রথম ইতিহাস। নিজার দেখলেন, সেই ইতিহাস প্রাচ্যবাদ, উপনিবেশের রাজনীতি এবং পুঁজির প্রভাবের বাইরে ছিলো না। তিনি উইলিয়াম জোন্সকৃত (William Jones) ভারতশিল্প মূল্যায়ণের বরাত দেন। জোন্স যেমন মনে করতেন, ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্প নয়; বরং প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন মাত্র; চিত্রকলা ও ভাস্কর্য নাকি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হিসেবে। তাই তার কাছে এসবের কোনো শিল্পমূল্য নেই (নিজার, ২০১৭: ৪৭-৪৯)।

    শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    ভারতীয় শিল্পচর্চার ইতিহাসে আরও দুইটি নাম খুবই উল্লেখযোগ্য। এদের একজন হলেন জেমস ফার্গুসন (James Fergusson) ও অপরজন আলেকজান্ডার কানিংহাম (Alexander Cunningham)। নিজার জানাচ্ছেন, ফার্গুসন ও কানিংহামের ভারতশিল্পকলার ইতিহাস পাঠ একদম অপরিপক্ব; স্থানীয় তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই; বরং ধারাবাহিক শিল্পচর্চার যে ঐতিহ্য ভারতে ছিলো সেই পরম্পরায় বিযুক্তি সৃষ্টিতে তাদের পাঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, তাদের কাজের মধ্য দিয়েই ভারতশিল্প প্রথম পর্যায়ের উপনিবেশায়নের শিকার হয়েছে। একদিকে, কানিংহাম হাজির করেছিলেন ভারতীয় শিল্পের ধর্মনির্ভর ব্যাখ্যা; ফলে তারও সুর ছিলো অনেকটা জোন্সের মতোই। আরেকদিকে, জোন্স ও কানিংহামের থেকে স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা দিলেও, ফার্গুসন বললেন, ভারতশিল্পে রিয়ালিজমের ঘাটতি আছে; এই কারণে তা অনুন্নত; তার বাস্তবতাকে উপস্থাপনের ক্ষমতা নেই; আর উন্নত শিল্পকর্ম তাই, ফার্গুসনের মতে, যার বাস্তবতাকে উপস্থাপনের ক্ষমতা আছে। তার দাবি- আধুনিক ইউরোপীয় শিল্পকলা রেনেসাঁ-উত্তরকালে অনুকরণ প্রবণতাকে ছাড়িয়ে গেছে; আর সে কারণেই তা ভারতসহ অন্যান্য প্রাচীন শিল্পকলা থেকে উন্নত। ফার্গুসনের ব্যাখ্যায় প্রাধান্য পায় আর্যতত্ত¡ ও শিল্পকলার বিবর্তন তত্ত¡ (নিজার, ২০১৭: ৫০-৫১)। নিজার তার গ্রন্থে এই দুই তত্ত্ব সম্পর্কেই বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তিনি দেখান যে, পরিপ্রেক্ষিত-নির্ভরতাই হচ্ছে ইউরোপীয় শিল্পকলার বিবর্তন তত্তে¡র ভিত্তি; এবং এই পরিপ্রেক্ষিতনির্ভর শিল্পচর্চার ব্যাকরণই গড়েছে ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত; এই ভিত্তিতেই সুলতানের চিত্র ‘অনাধুনিক’; ‘ব্যাকরণসিদ্ধ নয়’ (নিজার, ২০১৭: ৫৪)।

    ভারতশিল্প সম্পর্কে উপনিবেশকদের এই পর্যালোচনা মোটেই নিরীহ ছিলো না। ফানোর বরাত দিয়ে আমরা আগেই বলেছি, এ ছিলো তাদের ‘সিস্টেমেটিক নেগেশন’। আমরা তো জানিই, পাশ্চাত্য জ্ঞানকাÐ তার উপনিবেশিত অপরকে চিহ্নিত করেছে বর্বর ও অসভ্য রূপে; আর নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে সভ্য চেহারায়। ইউরোপীয় গবেষকদের দৃষ্টিতে তাই ভারতশিল্পও ছিলো ‘আদিম-অশ্লীল-বর্বর’। ইউরোপীয়রা ‘যুক্তিবাদী’; আর ভারতীয়রা ‘অযুক্তিবাদী’। ভারতের ক্ষেত্রে এই ‘অযুক্তি’র জায়গা নিয়েছিলো ‘অধ্যাত্মবাদ’। ভারত তাই চিহ্নিত হয়েছে ‘অধ্যাত্মবাদী’ হিসেবে (নিজার, ২০১৭: ২৪)। নিজার বলেন, এই ধরনের নির্মাণ উপনিবেশিতের ইতিহাস ও বাস্তবতা সম্পর্কে সত্যভ্রম প্রতিষ্ঠা করেছে; যার দ্বারা উপনিবেশায়নের শিকার হয়েছে উপনিবেশিতের মনোজগৎ। ফানো, নগুগিসহ অন্যান্য তাত্তি¡কগণ এই মনোজাগতিক উপনিবেশায়নের কথাই বলেছেন। তাদের সঙ্গে একমত হয়ে নিজার যোগ করলেন, ভারতের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তার ভাষায়:

    ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের শুরু হয়েছিল ফার্গুসন ও কানিংহামের ভারতশিল্পের সত্যভ্রম তৈরির মধ্য দিয়ে। তা নতুন মাত্রা পায় আর্ট কলেজের পাশ্চাত্য অঙ্কনরীতি প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু, ভারতশিল্পের উপনিবেশায়নের প্রভাব শুধুমাত্র ভারতশিল্পকে ‘ART’-এর মর্যাদা না দেওয়ার এবং ভারতে পাশ্চাত্য শিল্পরীতি প্রশিক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক জীবনে। তা সৃষ্টি করে নতুন এক সৌন্দর্য-ভাবনা। সৃষ্টি করে নতুন জীবন-কামনা। সৃষ্টি করে ঐতিহ্যকে ছেদ করে নতুন, ভিন্ন কোনো ব্যক্তি-হয়ে-ওঠার প্রবণতা, যা পরিবর্তন করেছিল রুচিবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির। (নিজার, ২০১৭: ৭৩)

    শ্যামচরণ ছিলেন কলকাতা আর্ট কলেজের প্রথম ভারতীয় শিক্ষক। বাংলা ভাষায় লেখা শিল্পবিষয়ক পয়লা রচনাটি তারই। সূক্ষ্ম শিল্পের উৎপত্তি ও আর্যজাতির শিল্প (১৮৭৪) নামে তিনি একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা রচনা করেন। সেখানে তিনি আর্যতত্ত্ব ও শিল্পকলার বিবর্তনবাদকে গ্রহণ করেছিলেন স্বতঃসিদ্ধ বলে। শ্যামচরণ মনে করতেন, আর্যদের হাত ধরেই ভারতে শিল্পচর্চা এসেছে; মনে করতেন, পাশ্চাত্যের শিল্পধারা বিকাশমান; আর ভারতেরটা নিম্নগামী। তাহলে এই দুর্দশা থেকে উত্তরণের উপায়! উপায় আছে। শ্যামচরণের বিশ্বাস, পশ্চিমা অঙ্কনরীতির অনুকরণের দ্বারা ভারতীয় শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব (নিজার, ২০১৭: ৭৮)। নগুগির কথাগুলো মনে পড়ে যায়; উপনিবেশিতেরা তাদের হীনমন্যতা সারিয়ে তোলার দাওয়াই হিসেবেও ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিকেই একমাত্র হাজির-নাজির দেখে। এভাবেই জ্ঞানকাণ্ডের নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে স্থানীয়দের বিচ্ছেদটা ঘটেছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রভাবে গড়ে উঠেছে আলাদা একটি শ্রেণি; শিক্ষিত শ্রেণি। যাদের অর্জিত জ্ঞানের শেকড় পোঁতা নয় এই দেশের মাটিতে। তারা গতরে ছিলো ভারতীয়, মাগার মননে ইংরেজ। মেকলে (Thomas Babington Macaulay) তো এর বেশি কিছু চাননি। বিচ্ছেদায়ন নির্দেশ করতে নিজার বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আর্য্যজাতির সূক্ষ্ম শিল্প’ রচনাটির বরাত দিলেন। যেখানে বঙ্কিম বাঙালির জীবনে কাব্য, সঙ্গীত, নৃত্য, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ও চিত্র এইসব নেই বলে ‘হায় হায় করছিলেন’ (নিজার, ২০১৭: ৭৩-৭৪)। আসলে তার এই ‘হায় হায় করার’ কারণ বাঙালির জীবনে এইসবের অনুপস্থিতি নয়। কারণটা হলো, যা আছে তা থেকে বঙ্কিমের বিচ্ছেদায়ন।

    বিচ্ছেদায়ন, দ্বি–বিচ্ছেদায়ন, দ্বৈতচিত্ত

    বিচ্ছেদায়ন কী! প্রশ্নটির উত্তর আস্তে আস্তে খোলাসা হওয়াই ভালো। ইংরেজিতে এইরকম যে প্রত্যয়টি আছে তার নাম ‘এলিয়েনেশন’ (alienation)। এলিয়েনেশনের ধারণাটা পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে নানান মাত্রা অর্জন করেছে এই সম্পর্কিত আলাপ। লিখিত হয়েছে পুস্তকের পর পুস্তক। এক্ষেত্রে কয়েকজন তাত্ত্বিকের নাম বেশি বেশি নেওয়া হয়। এই দলে আছেন: হেগেল, ফয়েরবাখ ও মার্কস। মূলত এদেরই আলোচনা মারফত এলিয়েনেশনের আলাপটা গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর এই সম্পর্কিত ভাবনা আরও বহুদূর অগ্রসর হয়। তাই এলিয়েনেশন বুঝতে গেলে এখন হাজির হয় পরস্পর প্যাঁচ খাওয়া এক বান্ডিল বিষয়াষয়। তাই একইসঙ্গে এটি অনেককিছু বোঝায়। এটি নির্দেশ করে অনাসক্তি, অক্ষমতা, সত্তার অন্তর্গত খণ্ডায়ন, এক-ধরনের সম্পর্কহীনতা; যে জীবনকে কেউ যাপন করে তার প্রতি উদাসীনতা; তাকে আপন করে না-পাওয়া; তার প্রতি এলিয়েন (alien) থাকা ইত্যাদি (Jaeggi, 2014: 3)। এই ‘এলিয়েন’ থেকেই শব্দটা হয়েছে ‘এলিয়েনেশন’। রাহেল জায়েগি (Rahel Jaeggi) এই সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে লিখছেন:

    Alienation is the inability to establish a relation to other human beings, to things, to social institutions and thereby also – so the fundamental intuition of the theory of alienation – to oneself. An alienated world presents itself to individuals as insignificant and meaningless, as rigidified or impoverished, as a world that is not one’s own, which is to say, a world in which one is not “at home” and over which one can have no influence. The alienated subject becomes a stranger to itself; it no longer experiences itself as an “actively effective subject” but a “passive object” at the mercy of unknown forces. (Jaeggi, 2014: 3)

    হেগেলের (Friedrich Hegel) দর্শনে এলিয়েনেশন একটি বেসিক আইডিয়া রূপে কাজ করেছে। সহজভাবে হেগেলকে বুঝতে গেলে, দেখা যায়, তার চিন্তা গিয়ে শেষ হয় পরম এক ভাবগত সত্তায়। তিনি বলেন, অ্যাবসল্যুট মাইন্ডের কথা। অ্যাবসল্যুট স্পিরিটের কথা। জনপ্রিয় ধারণায় একেই ঈশ্বর বলে অভিহিত করা হয়; এবং এই অ্যাবসল্যুট আইডিয়া, হেগেলের ধ্যানে, এক সেট ফিক্সড জিনিসপত্র নয়; এমনকি তা গোটা এই ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে সেই সকল কিছুর নির্জীব সমষ্টিও নয়; বরং তা এক ‘dynamic Self, engaged in a circular process of alienation and dealienation’। জগৎসংসার, হেগেলের কাছে, পরম ভাবের আত্ম-বিচ্ছিন্নতার ফল। পরম ভাবের আত্ম-অচেতন রূপ। এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে, আত্ম-সচেতনতার মধ্য দিয়ে, জগৎ আবার পরম ভাবে বিলীন হবে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ হলো সেই পরম ভাবে রূপান্তরশীল ফিরতি সত্তা। একারণেই ইতিহাসব্যাপী মানুষ ক্রমশ আত্ম-সচেতন সত্তায় রূপান্তরিত হয়। মানুষের এই আত্ম-সচেতনতা ও প্রজ্ঞা একইসঙ্গে পরম ভাবেরও নিজ সম্পর্কে আত্ম-সচেতন হয়ে উঠার প্রক্রিয়া। অনেকেই মনে করেন, হেগেল এই ধারণা পেয়েছেন, খ্রিস্টীয় আদি পাপ ও তা থেকে পরিত্রাণের গল্পে। কেউ কেউ দাবি করেন, পশ্চিমা চিন্তায় এলিয়েনেশনের বীজ ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর উপাসনা (concept of idolatry) রীতিতেই নিহিত ছিলো। তেমনি অনেকের বিবেচনায়, ‘Absolute Mind’-এর ‘self-alienated’ রূপ হিসেবে জগৎকে দেখায়, হেগেলের ঋণ মূলত প্লেটোর কাছে। প্লেটোই প্রথম জগৎকে দেখেছিলেন পরম ভাবজগতের নকল হিসেবে (Petrovic, 2021)।

    মানুষ যে তার নিজ-সত্তা থেকে এলিয়েনেটেড হতে পারে হেগেলের এই প্রস্তাবনাটি ফয়েরবাখ (Ludwig Feuerbach) মেনে নেন। কিন্তু জগৎ হলো ‘Absolute Mind’-এর ‘self-alienated’ রূপ; আর মানুষ হলো ডি-এলিয়েনেশন প্রক্রিয়ায় শামিল সেই অ্যাবসল্যুট মাইন্ড; এইসব অ্যাবসল্যুট মাইন্ড-টাইন্ড ফয়েরবাখ উড়িয়ে দেন। তার মতে, মানুষ আত্ম-বিচ্ছিন্ন ঈশ্বর নয়। উল্টা ঈশ্বরই আত্ম-বিচ্ছিন্ন মানুষ। মানুষের কর্মই, মানুষের সাধনাই পরম-টরম বানিয়ে ঈশ্বরের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়। তার কথা হলো, মানুষ যখন প্রকৃতিকে আত্ম-বিচ্ছিন্ন ভগবান হিসেবে স্বীকার না করে তখন সে এলিয়েনেটেড হয় না; বরং সে যখন নিজের শ্রমে কিছু সৃষ্টি করে কল্পিত এক পরম সত্তার নামে তা প্রচার করে, তার কাছে মাথা নোয়ায়, তখনই সে এলিয়েনেটেড হয়। সেই ঈশ্বরকে খারিজ করার মাধ্যমেই মূলত, ফয়েরবাখ মনে করেন, মানুষের ডি-এলিয়েনেশনটা ঘটবে। ধর্মীয় পরিসরে সংঘটিত ফয়েরবাখের এই সমালোচনাকে মার্কস (Karl Marx) স্বাগত জানান। হেগেলেরও প্রশংসা করেন তিনি। হেগেল যেহেতু বিষয়টা ধরতে পেরেছিলেন যে, মানুষের তৎপরতা এলিয়েনেশন ও ডি-এলিয়েনেশন প্রক্রিয়া দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু হেগেলের প্রস্তাবের অপরাপর দিকগুলোর কট্টর সমালোচনা করেন মার্কস। বিশেষ করে, অবজেক্টিফিকেশনকে (objectification) এলিয়েনেশনের কারণ মনে করা; এবং তা বিলোপের মধ্য দিয়ে ডি-এলিয়েনেশন প্রস্তাব করা। এছাড়াও মানুষকে হেগেল বিবেচনা করেছেন আত্ম-সচেতনতা হিসেবে। ফলে মানুষের এলিয়েনেশন মূলত গিয়ে দাঁড়িয়েছে আত্ম-অচেতনতায়। যে কারণে হেগেলকে পৌঁছতে হয়েছে বিশুদ্ধ চিন্তায় যা এই আত্ম-অচেতনতা দূর করে ডি-এলিয়েনেশন ঘটাবে। কিন্তু মানুষ তো কেবল ধার্মিক পরিচয়ই বহন করে না; কেবল ধর্মীয় পরিসরেই তার এলিয়েনেশন ঘটে না; তার অপরাপর মাত্রাও রয়েছে; রয়েছে তার আর্থনীতিক-রাজনীতিক ও দার্শনিক দিক (Petrovic, 2021)। মার্কস তাই হাজির করলেন এলিয়েনেশনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা।

    ফয়েরবাখ ও মার্কসে এসে এলিয়েনেশন মর্ত্যরে বিষয় হয়ে উঠলো। মার্কসের চিন্তায় কেন্দ্রীয় জায়গা নিয়েছে এই এলিয়েনেশন। খুবই পদ্ধতিগতভাবে এই সম্পর্কে আলোচনা দাঁড় করালেন মার্কস। তার বিশ্লেষণে ধরা পড়লো সমাজে মজুরি-প্রথার বিকাশের সঙ্গে কীভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ। লিখলেন, মজুরির উদ্ভবই সংশ্লিষ্ট সমাজে শ্রমের বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ। মার্কসের বিশ্লেষণে মজুরি প্রথা, শ্রমের বিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তির বিকাশ, মানুষের এলিয়েনেশন একই সূত্রে গাঁথা। বিচ্ছিন্ন শ্রম সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম দেয় (Marx, 2007: 68)। আর এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিমূর্ত রূপ হিসেবেই সমাজে হাজির থাকে ব্যক্তি। ব্যক্তি মানেই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি। অর্থাৎ ইতোমধ্যেই যার এলিয়েনেশন ঘটে গেছে। তাই ব্যক্তির ব্যক্তি হয়ে ওঠা মূলত প্রজাতি সত্তা থেকে তার বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ। গুছিয়ে লিখলে মার্কসের বিশ্লেষণে চার ধরনের এলিয়য়েনেশন ধরা পড়ে। এক, উৎপাদিত পণ্য থেকে বিচ্ছিন্নতা; দুই, উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতা; তিন, আত্মসত্তা থেকে বিচ্ছিন্নতা; চার, প্রজাতি সত্তা থেকে বিচ্ছিন্নতা। বলে রাখা ভালো, মার্কস বর্ণিত উৎপাদনকে কিন্তু চাল-ডাল উৎপাদন হিসেবে বুঝলে চলবে না। বস্তুগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এই উৎপাদনের চরিত্রে নিহিত থাকে তার দার্শনিক দিকও। এতে নিহিত থাকে, প্রতিনিয়ত নিজেরই জীবন উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের মতো বিষয়। মার্কস তার ১৮৪৪ সালের অর্থশাস্ত্র ও দর্শনসম্বন্ধীয় পাণ্ডুলিপিতে এই সম্পর্কে দুর্দান্ত আলোচনা করেছেন।

    এলিয়েনেশনের মার্কসীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে নিজার তার বিশ্লেষণের সাযুজ্য নির্দেশ করেছেন। বিশেষ করে তিনিও আত্মসত্তার বিচ্ছিন্নতার উপরই জোর দিয়েছেন। নিজার একে ‘বিচ্ছেদায়ন’ লেখেন। ‘বিচ্ছেদ’ শব্দের সঙ্গে বাংলা-অঞ্চলের মানুষের পূর্বপরিচয় আছে। ‘শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনল’কে যার যার মতো করে বুঝে নেওয়ার অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। পরমাত্মা থেকে জীবাত্মার বিচ্ছেদ; প্রেমাস্পদ থেকে প্রেমিকের বিচ্ছেদ ইত্যাদি নানা অর্থে। সম্ভবত বাংলা-অঞ্চলের বিচ্ছেদ-ভাবনাকে দার্শনিক পরিপুষ্টি প্রদানের জন্যই এই শব্দটি নিজার বেছে নিয়েছেন; যাতে এসে যোগ হবে এলিয়েনেশন সম্পর্কিত হাল আমলের পর্যালোচনাসমূহও। বিচ্ছেদায়ন ধারণাগতভাবে এলিয়েনেশন থেকে দূরবর্তী নয়; এটি এলিয়েনেশনের দার্শনিক মাত্রাটিকেই প্রকাশ করে; যার দ্বারা মানুষ উৎখাত হয়ে পড়ে তার আত্মসত্তা থেকে। মানুষের চিন্তা তখন আর তার নিজের চিন্তা থাকে না; সে যাপন করে না তার নিজের জীবন। অবশ্য ফয়েরবাখ ও মার্কসের মতো মানুষের প্রজাতি সত্তার ধারণায় আস্থা রাখেন না নিজার। এমনকি মানুষের কোনো সারসত্তায়। তাহলে তার আলোচনায় বিচ্ছেদায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে! এটি একটি জরুরি জিজ্ঞাসা। প্রকৃতির প্রভাবশালী জীব মানুষ। তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোটা অঞ্চলেরই স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তর এতে বাধাগ্রস্থ হয়। দীর্ঘ সময়ের ছকে যা নির্ণয় করাও সম্ভব। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এই স্বতঃফূর্ত প্রাণ-প্রবাহকে নিজার অভিমুখিতা বলে চিহ্নিত করেন। বিচ্ছেদায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে এই অভিমুখিতারই পরিবর্তন ঘটে। এতে সেই অঞ্চলের সক্রিয় উপাদানগুলোতে এক-ধরনের উলট-পালট ঘটে যায়; এই পরিবর্তন জোর প্রয়োগে ঘটে; মোটেই তা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। বিচ্ছেদায়নের কারণে সত্তা হারায় তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ। অঞ্চলটি চ্যুত হয় তার স্বতস্ফূর্ত পরিবর্তন থেকে। ‘স্বতস্ফূর্ত’ ধারণাটি এখানে ‘যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; এর কোনো মর্মগত (essential) রূপ নেই। এই বিষয়ে সাবধানতা জরুরি।

    নিজার মার্কসের পথ ধরেননি। সেই পথ ধরলে তাকে সমাধান খুঁজতে হতো ব্যক্তি-সম্পত্তির বিলোপসাধনে। আর্থনীতিক নির্দিষ্টতা তার গন্তব্য নয়। উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় বিচ্ছেদায়নের জটিল রূপটিকে তিনি লক্ষ্য করেছেন। যেখানে উপনিবেশিত মন তার বিচ্ছিন্ন সত্তাকেই বাস্তবতা বলে গ্রহণ করেছে। হার্বার্ট মার্কিউজের (Herbert Marcuse) বিশ্লেষণটি এক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। মার্কিউজ লিখেছিলেন:

    …the concept of alienation seems to become questionable when the individuals identify themselves with the existence which is imposed upon them and have in it their own development and satisfaction. This identification is not illusion but reality. However, the reality constitutes a more progressive stage of alienation. (Marcuse, 2007: 13)

    মার্কিউজ বিষয়গত এলিয়েনেশনের কথা বলেছেন। বিচ্ছিন্ন বিষয়ী যেখানে তার বিচ্ছিন্নতাসমেত হয়ে উঠেছে বিষয়গত। তার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলো, বিকশিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল কালচার ও টেকনোলজিক্যাল সোসাইটিতে বিরাজমান নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণকৌশল। যেই সমাজে পুঁজিবাদী ভাবাদর্শই হাজির হয় অদ্বিতীয় বাস্তবতা রূপে। মার্কিউজ মনে করিয়ে দেন: This absorption of ideology into reality does not, however, signify the “end of ideology”। তিনি বলছেন, সেই সমাজ বরং আরও বেশি ভাবাদর্শ নির্ভর; কেননা ভাবাদর্শও সেখানে সমানতালে উৎপাদিত হয়ে থাকে। সেই সমাজকে তার প্রোডাকশন দিয়ে নির্ণয় করা যায়। উৎপাদিত পণ্যই ঘোষণা করে সেই সমাজের পরিচয়। যে ধরনের পণ্য ও সেবা কোনো সমাজে উৎপাদিত হয়ে থাকে মূলত সেই ধরনের সমাজই সেখানে কায়েম হয়েছে। মার্কিউজ লিখছেন, ‘Thus emerges a pattern of one-dimensional thought and behavior…’ (Marcuse, 2007: 13-14)।

    বিকশিত-পুঁজিবাদী-সমাজে ব্যক্তির হ্রাসমান অস্তিত্ব মার্কিউজের নজর এড়ায়নি। বুর্জোয়া বিপ্লবের পর থেকে প্রযুক্তিগত আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত ব্যক্তিসত্তার কেবলি তিনি অবনমন দেখেছেন; দেখেছেন, সংশ্লিষ্ট সমাজের শ্রম ও অবসরকে প্রযুক্তি কীভাবে নতুন বিন্যাসে সাজায়; কীভাবে সমগ্র জীবনকেই তা প্রভাবিত করে; কব্জা করে নেয় ব্যক্তিক চিন্তার ধরন। ব্যক্তির বিকাশ এতে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মার্কিউজ ব্যক্তির এই নিয়ন্ত্রিত দশাকে ‘একমাত্রিক জীবন’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, শিল্পপ্রধান সমাজের প্রাযুক্তিক শর্তসমূহ ব্যক্তিস্বাধীনতাকে দারুণভাবে খর্ব করে (Kellner, 2007: xviii -xix)। অ্যাডর্নো (Theodor Adorno) ও মার্কিউজ দুজনেই এই ধরনের সমাজ সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ফ্রয়েডের দার্শনিক ব্যাখ্যাসূত্রে যৌন স্বাধীনতা ও প্লেজার প্রিন্সিপালের প্রাধান্যের মধ্যেই ‘emancipation’-এর শর্ত দেখেছিলেন মার্কিউজ। অন্যদিকে, আধিপত্য থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করার উপায় হিসেবে যৌনতাকে নয়, অ্যাডর্নো বেছে নিয়েছিলেন ‘বিশুদ্ধ’ শিল্প। তার মতে, শিল্পই বিদ্যমান বাস্তবতার মুখোমুখি হয় এবং তা-ই বলে দিতে পারে বাস্তবতা আদতে কতো কতো রকম হতে পারতো (Bottomore, 2002: 41)। ব্যক্তিসত্তার এই বিচ্ছিন্নতা ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্তি¡কদের ‘emancipation’-এর ধারণাকে নিজারের আত্মসত্তার বিচ্ছেদায়ন ও বি-বিচ্ছেদায়নের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায়। কিন্তু কেবল মিলিয়েই পড়া যায় Ñ তা এক নয়। কারণ ‘আত্মসত্তা’ বলতে নিজার ব্যক্তি বোঝাচ্ছেন না। ‘ব্যক্তি’ ইউরোপীয় ধারণা। আলাদা তার জিনিয়ালোজি। তিনি ব্যক্তিসত্তার ফাঁদে পড়তে নারাজ। লিখেছেন:

    আত্মসত্তার কোনো বিশেষ রূপ নেই। তা বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। বিশেষ কালে তার কোনো সামান্য চিত্র নেই। সময়ের সাথে সাথে তা পরিবর্তনশীল এবং প্রয়োজনের সাপেক্ষে তা নির্মানাধীন, যে প্রয়োজন আবার ভৌগোলিক ও কালিক। (নিজার, ২০১৭: ২৩)

    নিজার এক্ষেত্রে সূক্ষ্ম সংজ্ঞায়নের দিকে ঝুঁকেছেন। কোনো সুগঠিত ব্যক্তির ধারণায় তিনি আস্থা পোষণ করেননি। আদতে স্থান-কাল নিরপেক্ষ ও স্থির কোনো ব্যক্তিসত্তা যে অবাস্তব, এই ধারণাকেই তিনি সামনে ঠেলে দিয়েছেন। তার আত্মসত্তার ধারণা পরিগঠিত হয়েছে বৌদ্ধ সাহিত্য ও দর্শনে ব্যবহৃত চিত্তের ধারণা থেকে। ‘চিত্ত’ পালি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে – সচেতন চিন্তার প্রবাহ। কিন্তু সতর্ক করছেন লেখক, চিত্ত সর্বদা বিষয়কেন্দ্রিক হলেও, এটি কোনো মনস্তাত্তি¡ক অবস্থা নয়; বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো বিষয় সম্পর্কিত এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সচেতন যে চিন্তা চলতে থাকে তা-ই চিত্ত। ফলে, প্রবাহিত ভাবনাজগতের পূর্বাপর সম্পর্ক থাকলেও তা সামান্য সম্পর্ক নয় (নিজার, ২০১৭: ১০০)। ব্যক্তির ধারণা নির্মাণে মূলত এই ধরনের একটা কল্পিত সামান্য সম্পর্ক ধরে নেওয়া হয়। যা ভ্রম মাত্র। ঘূর্ণায়মান ফ্যানের উদাহরণ দিয়ে একে বোঝা সম্ভব। চালু অবস্থায় ফ্যানের ব্লেডগুলোকে পরস্পর সংযুক্ত ও বৃত্তাকার মনে হয়। ব্লেডগুলো কিন্তু সেই রকম নয়। সেটি একটি ভ্রমাত্মক রূপ। তেমনি ব্যক্তির যে টোটাল চরিত্রটি দর্শনে দাঁড় করানো হয় তা মূলত এই বৃত্তাকার ফ্যানের মতোই এক-ধরনের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ।

    ফলে আত্মসত্তার বিচ্ছেদায়ন বলতে নিজার বোঝাচ্ছেন, বলপ্রয়োগের দ্বারা আত্মসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তরে ব্যাঘাত সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে; যা আত্মসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তরকে প্রতিহত করে। উদাহরণস্বরূপ তিনি কৃষিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার বদলে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক কারখানা, চা-বাগান, রাবার-বাগানে প্রলোভন ও জোর খাটিয়ে নিয়োজিত শ্রমিকের কথা বলেছেন। নিজস্ব ভূমি থেকে যাদের বিচ্ছেদ ঘটেছে; যাদের বিচ্ছেদ ঘটেছে জীবনের নিজস্ব খাত থেকেই; যার দরুন, গড়ে উঠেছে তাদের আলাদা আত্মপরিচয়; আগের পরিচয় থেকে যা ভিন্ন। এটিই আত্মসত্তার বিচ্ছেদায়ন প্রক্রিয়া (নিজার, ২০১৭: ৯৮)। আত্মপরিচয়ের এই রূপান্তর স্বতঃস্ফূর্ত ছিলো। নিজার প্রচলিত উদাহরণগুলোই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তার ছিলো লক্ষ্য ঘটনার দার্শনিক মাত্রাটিকেই বরং প্রকাশ করা। পরিষ্কার করা দরকার, বিচ্ছেদায়নের নেপথ্যে সক্রিয় জোর সকল ক্ষেত্রেই পেশিশক্তি সংশ্লিষ্ট হতে হবে, তা নয়; তা হতে পারে কোনো ভাবাদর্শ অথবা খোদ কোনো জ্ঞানোৎপাদন প্রক্রিয়া; যা ব্যাহত করবে আত্মসত্তার স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তর। বিচ্ছেদায়নের প্রসঙ্গ এইসব কারণেই বিউপনিবেশায়ন আলোচনায় জরুরি হয়ে ওঠে। আলোচনার পরবর্তী অংশে আমরা দেখবো, বি-বিচ্ছেদায়ন কীভাবে বিউপনিবেশায়নের মৌলিক শর্ত।

    শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    বিচ্ছেদায়নের পাশাপাশি নিজার নির্মাণ করেছেন দ্বি-বিচ্ছেদায়নের ধারণা। আত্মসত্তার স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে বিচ্ছিন্নতাই যদি বিচ্ছেদায়ন হয়, তাহলে দ্বি-বিচ্ছেদায়ন কী! বিচ্ছেদায়নের পর পুনরায় সেই আত্মসত্তায় ফিরে যাওয়ার যে চেষ্টা অথবা সে উদ্দেশ্যে কোনো কল্পিত আত্মসত্তা নির্মাণ করা অথবা আরোপিত কোনো আত্মসত্তায় ফিরে যাওয়ার তাগাদাকেই নিজার বলেছেন দ্বি-বিচ্ছেদায়ন। আসলে আত্মসত্তায় ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আত্মসত্তা তো অপরিবর্তনশীল কংক্রিট কিছু নয়। ফলে ফিরে যাওয়ার প্রসঙ্গই আসে না। এইসব কারণেই দ্বি-বিচ্ছেদায়নের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; এবং বিউপনিবেশায়নে সর্বদাই নিহিত থাকে এর ঝুঁকি। বিউপনিবেশায়নে শামিল হয়ে এমনকি অনেকেই এই দ্বি-বিচ্ছেদায়নের কবলে পড়েছেন। ই. বি. হ্যাবেল (E. B. Havell), আনন্দ কুমারস্বামী ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদাহরণ দিয়েছেন নিজার। তিনজনই ভারতশিল্পচর্চায় অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। নিজার মনে করেন, ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন সম্পর্কে, যদিও তাত্ত্বিকভাবে নয়, তারা ওয়াকিবহাল ছিলেন। বিশেষত ভারতশিল্প যখন ঔপনিবেশিক ছকে অনুন্নত ঘোষিত হলো, তারা চেয়েছিলেন এর পাল্টা বয়ান হাজির করতে। এই সুবাদে ভারতশিল্পের মৌল বৈশিষ্ট্য হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছেন ‘আধ্যাত্মিকতা’কে; এবং চেয়েছেন সেখানেই ফিরে যেতে। নিজারের মতে, তাদের এই প্রচেষ্টাও নিঃসন্দেহে, এক-ধরনের বিউপনিবেশায়ন প্রস্তাবই ছিলো; কিন্তু ‘আধ্যাত্মিকতা’য় ফিরতে গিয়ে বিউপনিবেশায়নের পরিবর্তে উল্টা তারা দ্বি-বিচ্ছেদায়নের শিকার হয়েছেন; যেহেতু ‘আধ্যাত্মিকতা’ ভারতশিল্পের মৌল বৈশিষ্ট্য নয়; অনেক বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র। নিজার ব্যাখ্যা করেছেন, ভারতশিল্প পাঠের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের ভিত্তি আর্যতত্ত্ব ও শিল্পকলার বিবর্তন তত্ত্ব দ্বারা তারা প্রথম পর্যায়ের বিচ্ছেদায়নের শিকার হয়েছেন। তারপর সেই জ্ঞানকাণ্ডের ভিত্তিতেই আবার যখন ভারতশিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ‘আধ্যাত্মিকতা’ ভেবে তাতে ফিরে যেতে চান, তখন তাদের দ্বি-বিচ্ছেদায়ন ঘটে (নিজার, ২০১৭: ৯৮)। নিজারের ভাষায়:

    এই বিচ্ছেদায়ন পুনরায় সংগঠিত হয়, যখন বিউপনিবেশায়নের প্রত্যয় নিয়ে আমরা পাশ্চাত্য উপনিবেশায়ন প্রতিরোধের ভাষা খুঁজি ‘প্রাচ্যবাদী’ জ্ঞানকাণ্ডে। প্রাচ্যতত্ত্ব প্রাক-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশের উপর ভিত্তি করে আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। এই নির্মিত আত্মপরিচয় যখন ‘আধ্যাত্মিকতা’, তখন তা পুনরায় আত্মসত্তার বিচ্ছেদ ঘটায় অর্থাৎ আত্মসত্তার দ্বি-বিচ্ছেদায়ন হয়। (নিজার, ২০১৭: ৯৮)

    দ্বি-বিচ্ছেদায়নের প্রসঙ্গটিতে নিজার কেন জোর দিয়েছেন, এখন আর তা নিশ্চয়ই অপরিষ্কার নয়। দ্বি-বিচ্ছেদায়ন বিউপনিবেশায়নে নিহিত চোরাফাঁদ। এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন না করলে বিউপনিবেশায়ন নাম নিয়েই গলায় বিঁধবে কাঁটাটা। নেগ্রিচ্যুড আন্দোলনের ক্ষেত্রে অনুরূপ সংকট লক্ষ করা যায়। ঔপনিবেশিক ফ্রান্সের আত্তীকরণ নীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো। এর অগ্রভাগে ছিলেন লিওপোল্ড সেডার সেঙ্গর এইমে সেজায়ার, বিরাগো দিয়োপ প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। ঔপনিবেশিক শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য ‘নেগ্রিচ্যুড’ শিরোনামে তারা গড়ে তুলেছিলেন একটি কমন প্লাটফর্ম; যেখানে ‘নিগ্রো’ পরিচয়টাকে তারা করে তোলেন গর্বের বিষয়; পরস্পরের মধ্যে ঐক্যের ভিত (Kohn & Mcbride, 2011: 24-25)। সেজায়ার (Aimé Césaire) ‘নিগ্রো’ পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্নতাকে মানতে পারেননি। একে তিনি দেখেছেন এলিয়েনেশন হিসেবে। এক সাক্ষাৎকারে বলেন:

    Our struggle was a struggle against alienation. That struggle gave birth to Negritude. Because Antilleans were ashamed of being Negros, they searched for all sorts of euphemisms for Negro: they would say a man of color, a dark-complexioned man, and other idiocies like that. (Césaire, 1972: 28)

    ‘নিগ্রো’ আসলে ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডে নির্মিত এক-ধরনের মর্মগত পরিচয়। এক্ষেত্রে ক্যাটেগরি ছিলো গাত্রবর্ণ। এই নির্মাণ ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডের অপরাপর ক্যাটেগরিক্যাল নির্মাণের মতোই বর্ণবাদী ও ত্রুটিপূর্ণ। ‘নিগ্রো’ কারো প্রকৃত পরিচয় হতে পারে না। ঔপনিবেশিক প্রভুদের তাচ্ছিল্য ও ঘৃণায় গড়া এই পরিচয়। যদিও নেগ্রিচ্যুড আন্দোলনে একেই সারসত্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে; আঁকড়ে ধরা হয়েছে এই পরিচয়টাকেই; এর ভিত্তিকেই মনে করা হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের ঐক্যবেদি; অভিজ্ঞতার সামান্য পাটাতন; সুতরাং, ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডে ‘নিগ্রো’ পরিচয় নির্মাণের মধ্য দিয়ে উপনিবেশিত কৃষ্ণাঙ্গরা প্রথম পর্যায়ের বিচ্ছেদায়নের শিকার হয়েছে। আবার, ‘নিগ্রো’ পরিচয়টিকেই সারসত্তা ভেবে তারা যখন সেখানে ফিরতে চেয়েছে, তখন তারা কবলে পড়েছে দ্বি-বিচ্ছেদায়নের। ফানো যদিও ভিন্নভাবে বলেছিলেন, তবু তার কথাটা এখানে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক: ‘It is the white man who creates the Negro. But it is the Negro who creates negritude.’ (Fano, 1965: 47)। এই কারণেই, প্রাক-ঔপনিবেশিক চৈতন্যে ফিরে যাওয়ার তাগাদা বোধ করা, অথবা কোনো সার পরিচয়ে আস্থা রাখা, অথবা কোনো সার পরিচয় নির্মাণপূর্বক তা কায়েমের চেষ্টা করাটা বরাবর ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের জ্ঞানজাগতিক পরিসরে লক্ষণসমূহ একেবারে গরহাজির, তা কিন্তু দাবি করা যায় না। বিউপনিবেশায়নে তাই দ্বি-বিচ্ছেদায়ন সম্পর্কে সতর্কতা খুবই জরুরি। এছাড়া, প্রাক-ঔপনিবেশিক চৈতন্য বলতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, যে জিনিসগুলো আমরা বুঝে থাকি, একটু খোঁজ করে দেখলেই দেখা যায়, আদতে তা ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডেরই নির্মাণ। অথবা তা জাল স্বপ্ন মাত্র।

    উপনিবেশ-পরবর্তী সময়ে উপনিবেশিত মনে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়। নিজার একে ‘দ্বৈতচিত্ত’ বলেছেন। এটি বোঝা কঠিন নয়। চিন্তায় নিহিত পরস্পরবিরোধী প্রবণতা নির্দেশ করতে শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছেন। উপনিবেশিত সমাজে ঔপনিবেশিক বলয় থেকে মুক্ত হওয়ার প্রচেষ্টা ও সেই জ্ঞানকাণ্ডে প্রতিষ্ঠা লাভের আকাঙ্ক্ষা কখনো দুই-ই আমাদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। এটি দ্বৈতচিত্তের কারণেই ঘটে। ঔপনিবেশিক হেজেমনির প্রভাবেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে। সমাজে হাজির ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানসমূহই মূলত এই হেজেমনি গড়ে তোলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। উপনিবেশিত রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নেতাদের মধ্যে দ্বৈতচিত্তের প্রবণতা তাই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। নিজার জানিয়েছেন – কবি, ঔপন্যাসিক ও চিত্রশিল্পীদের মধ্যেও দেখা যায় এই প্রবণতা। শামসুর রাহমানের উদাহরণ দিয়েছেন তিনি। তার ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ ও ‘ফিরে আয় উত্তরাধিকারী’ এই দুই কবিতায় প্রকটিত ভাবগত দ্বন্দের বরাত দিয়ে কবির চিন্তায় দ্বৈতচিত্তের উপস্থিতি নির্দেশ করেছেন নিজার। দ্বৈতচিত্ত তার কাছে উত্তর-ঔপনিবেশিক মননের গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশিষ্ট্য। তার মতে, উপনিবেশের কালে জনমনে যেমন একদিকে থাকে ঔপনিবেশিক প্রভাব প্রতিহত করার চেষ্টা, তেমনি অন্যদিকে থাকে ঔপনিবেশিক চিন্তার প্রভাব (নিজার, ২০১৭: ১০০)। বিউপনিবেশায়নে দ্বৈতচিত্তের সংকট সম্পর্কেও সমান ওয়াকিবহাল থাকা চাই।

    ভারতশিল্পের অভিমুখিতা

    অভিমুখিতার প্রসঙ্গ বিচ্ছেদায়নের আলোচনায় যদিও আগেই চলে এসেছে। তবু একে আরও পরিষ্কার করা জরুরি। নিজারের বিউপনিবেশায়ন আলোচনায় অভিমুখিতা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়। যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বহুলোকের চিত্তের কোনো সাধারণ চরিত্র থাকা সম্ভব নয়। ফলে সামষ্টিক চিত্তেরও কোনো নির্দিষ্ট রূপ থাকতে পারে না। নিজার তাই বড়ো পরিসরে কোনো অঞ্চলের অভিমুখিতা লক্ষ্য করেছেন। সেই সাপেক্ষে পর্যালোচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্বতঃস্ফূর্ত জীবন-প্রবাহকে। বর্তমানে বিভিন্ন ঘরানার চিন্তা-কাঠামোতেই এই ধরনের সামষ্টিক চিত্তের একটি সামান্য চিত্র পূর্বানুমান করা হয় – যা ত্রুটিযুক্ত। দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে; অথবা বিশেষ আইডিওলজির ঝাণ্ডাবাহী হয়; গড়ে তোলে হেজেমনি। নিজার এই দার্শনিক সংকট পরিহারের উদ্দেশ্যে অভিমুখিতার ধারণা গড়ে তোলেন। তার ভাষায়:

    বিশেষ সময়ে অনেক লোকের চিত্ত-এর মধ্যে সামান্য চিত্র পাওয়া কঠিন। তাই বিশেষ সময়ে সামষ্টিক চিত্ত-এর কোনো সামান্য চিত্র থাকে না। কিন্তু ঐতিহাসিক সামষ্টিক চিত্ত-এর একটি সামান্য চিত্র এবং অভিমুখিতা পাওয়া যায়। কারণ দীর্ঘকালিক ব্যবধান বিবেচনার কারণে অভিব্যক্তি এবং অভিমুখিতার সামান্য চিত্র পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা অপরিবর্তনীয় এবং শাশ্বত নয়; ভবিষ্যতে তার পরিবর্তন নিশ্চিত। (নিজার, ২০১৭: ১০০)

    তেমনি বিশেষ সময়ে কোনো অঞ্চলের শিল্পচর্চার সামান্যচিত্রও পাওয়া যায় না। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তার অভিমুখিতা ঠিকই পরিলক্ষিত হয়। নিজার জানাচ্ছেন, রেনেসাঁ থেকে উনিশ শতকের শেষ অব্দি ইউরোপীয় শিল্পচর্চার সঙ্গে প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতশিল্পের অভিমুখিতার পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপীয় ও ভারতশিল্প বিকশিত হয়েছে যার যার নিয়মে। দুইয়ের পার্থক্যটা তাহলে কোথায়! পার্থক্য ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’র ধারণায়নে। নিজার বলেছেন, পাশ্চাত্য শিল্পকলায় উপস্থাপিত হয় ব্যক্তিসাপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিকতা; যা রেনেসাঁ ও রেনেসাঁ-উত্তর মূলধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য; এক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় কোনো বস্তুর ব্যক্তিসাপেক্ষ যথাযথ উপস্থাপনা; অর্থাৎ বিশেষ আলোতে ও দুরত্বে বস্তুকে কেমন দেখাবে তার নিখুঁত চিত্রায়ন। এজন্য প্রয়োজন ছিলো পরিপ্রেক্ষিত কৌশলের আবিষ্কার; যেহেতু পরিপ্রেক্ষিত কৌশল ব্যবহার করেই দ্বিমাত্রিক তলে এভাবে অঙ্কন করা যায় ত্রিমাত্রিক চিত্র। ইউরোপে তাই পরিপ্রেক্ষিত কৌশল আবিষ্কৃতও হয়; এবং এই কৌশলে আঁকা ছবি এতোটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, পাশ্চাত্যে পরিপ্রেক্ষিতের উপর ভিত্তি করে শুরু হয় শিল্প-অশিল্প বিবেচনা; এটি হয়ে ওঠে শিল্প বিচারের স্বীকৃত মানদণ্ড। কিন্তু ভারতশিল্পেই এই পরিপ্রেক্ষিত কৌশল অপরিহার্য ছিলো না; এর কারণ, ভারতশিল্পে উপস্থাপিত হতো ব্যক্তিনিরপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিকতা; এক্ষেত্রে উপস্থাপিত হতো বস্তুর সামান্য লক্ষণ; যা মোটেই ব্যক্তিসাপেক্ষ নয়। যোগ করা উচিৎ, এই সামান্য লক্ষণের মধ্যেই ভারতীয় শিল্পীরা সীমাবদ্ধ ছিলেন না; একইসঙ্গে বস্তুর জ্ঞানলক্ষণ উপস্থাপনেও তারা ছিলেন সবিশেষ মনোযোগী (নিজার, ২০১৭: ২৭-৩৩)।

    সুতরাং, নৈর্ব্যক্তিকতার ধারণা সাপেক্ষেই পাশ্চাত্য ও ভারতীয় শিল্পদর্শনের স্পষ্ট পার্থক্য সূচিত হয়েছে; এবং ঔপনিবেশিকতার সুবাদে ভারতীয় শিল্পের এই স্বাতন্ত্র্যই ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ডে পেয়েছে নেতিবাচক নির্মিতি। শিল্প-বিচারে পাশ্চাত্য হাজির হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিত কৌশল নিয়ে; যে জোরের বশে ভারতশিল্পকে তারা ‘অশিল্প’ প্রতিপন্ন করেছে; সাব্যস্ত করেছে ‘অনাধুনিক’। নিজার লিখেছেন, সেই পরিপ্রেক্ষিত কৌশলেরই বরং নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে; বস্তুকে তা যথাযথ রূপে উপস্থাপন করতে পারে ঠিক আছে; কিন্তু তা প্রতিবেশের সঙ্গে বস্তুর সম্পর্ক নির্দেশ করতে অপারগ; অথচ ভারতশিল্পে সেই সম্পর্কও উপস্থাপিত হয়। নিজার তার গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ভারতশিল্প ও ভারতীয় দর্শনের গভীর যোগ; ক্রমশই তার আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন ভারতীয় শিল্পদর্শনের অভিমুখিতা। যশোধরকৃত কামসূত্র-এর টীকা জয়মঙ্গলায় উপস্থাপিত শিল্পের ষড়ঙ্গ ধারণার বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি; তিনি শুরু করেছেন এভাবে – ভারতীয় দর্শনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ‘প্রমা’; প্রমা হলো যথার্থ বা অভ্রান্ত জ্ঞান; প্রমাণ হচ্ছে এই ‘প্রমা’ লাভের মাধ্যম। অক্ষপদ গৌতম তার ন্যায়সূত্র-এ বলেছেন চারটি প্রমাণের কথা – প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ। ন্যায়সূত্র-এ বলা হয়েছে দুই ধরনের প্রত্যক্ষের কথা – নির্বিকল্পক ও সবিকল্পক। বস্তু যখন ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শে আসে তখন স্পর্শ, গন্ধ ও শব্দের মাধ্যমে যে তথ্য পাওয়া যায় তাকে বলে নির্বিকল্পক প্রত্যক্ষ। নৈয়ায়িকগণ নির্বিকল্পক প্রত্যক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে ‘প্রমা’ মনে করেন না। আবার সবিকল্পক প্রত্যক্ষে তৈরি হয় বস্তুর ‘রূপভেদ’। ষড়ঙ্গের এটি প্রথম অঙ্গ। সবিকল্পক স্তরেই দৃশ্যপটে উপস্থিত বস্তুর স্থান, কাল, অবস্থা, গুণ, কর্ম আকার সম্পর্কে জানা যায়। সবিকল্পকের পরবর্তী স্তরকে গৌতম বলেছেন, ‘অলৌকিক প্রত্যক্ষ’; অলৌকিক প্রত্যক্ষ জটিল ও বুদ্ধিজাত। ফলে এটি ব্যক্তিসাপেক্ষ নয়। এই অবস্থায় মানুষ লাভ করে বস্তু সম্পর্কে সামান্যলক্ষণ, জ্ঞানলক্ষণ ও যোগজ বিষয়ক জ্ঞান (নিজার, ২০১৭: ৩২-৩৩)।

    একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি নিজার পরিষ্কার করেছেন। একটি পদ্মফুল। নির্বিকল্পক অবস্থায় ফুলটিকে আমরা দেখি, স্পর্শ করি ও গন্ধ নিই। সবিকল্পক অবস্থায় ফুলটির রং, গন্ধ, আকার-আকৃতি ইত্যাদি গুণ চিহ্নায়নের মাধ্যমে তার রূপভেদ করি। পরে বিভিন্ন পদ্মের মধ্যে সাদৃশ্য লক্ষ করে আমরা নির্ণয় করি তার সামান্য লক্ষণ। পাশ্চাত্যের শিল্পকলা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ ব্যক্তির দেখা পদ্মকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে চায়। ভারতশিল্প চায় পদ্মফুলের ব্যক্তিনিরপেক্ষ সামান্য চিত্র উপস্থাপন করতে। শুধু তাই নয়, পদ্মফুলের সঙ্গে মাটি-পানি, অপরাপর প্রাণি-ফুল-গাছ, তার সঙ্গে শিল্প-শিল্পী ও সংস্কৃতির সম্পর্কও উপস্থাপন করতে চায়। এই সবকিছু মিলে হয় ‘ভাব’ – যা ষড়ঙ্গের তৃতীয় অঙ্গ। নিজার যোগ করছেন, এই অঞ্চলের শিল্প ভাবনির্ভর হওয়ার কারণে অপ্রয়োজনীয় ও অসম্পর্কিত বস্তু ক্যানভাসে স্থান পায় না। এই ‘ভাব’ বাস্তব জগৎ থেকে আসা বুদ্ধির মাধ্যমে উপলব্ধ ব্যক্তিনিরপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা (নিজার, ২০১৭: ৩৩)। সুতরাং, পাশ্চাত্যের শিল্পকলার লক্ষ্য যেমন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করা, ভারতশিল্পেরও সেই একই লক্ষ্য। কিন্তু দুইয়ের অভিমুখিতা আলাদা। উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় এই পার্থক্যই নেতিবাদী নির্মাণের শিকার হয়েছে।

    কেন সুলতান?

    শুধুমাত্র সুলতানের শিল্পচর্চায়ই যে বিউপনিবেশায়নের প্রবণতা রয়েছে তা কিন্তু নয়। সুলতান না হয়ে এখানে হতে পারতো জসীম উদ্দীন বা সেলিম আলদীন বা অন্য কেউ। তাহলে নিজার কেন সুলতানকে বেছে নিলেন – একইসঙ্গে এটি একটি ভালো ও বাজে প্রশ্ন। বাজে প্রশ্ন এই কারণে যে, যাকে নিয়েই গ্রন্থটি লিখিত হতো না কেন, তাকে ঘিরেই উপর্যুক্ত প্রশ্নটি উত্থাপিত হওয়া সম্ভব। আর এটিকে ভালো প্রশ্ন বলতে হবে, কারণ, এর দ্বারা সুলতানের বিউপনিবেশায়ন প্রস্তাবের শক্তিমত্তা বোঝা সহজ হবে। নিজার সম্ভবত সুলতানকে বেছে নিয়েছেন স্ক্রুটিনিতে দারুণভাবে উৎরে যাওয়ার কারণে; অথবা কথাটাকে উল্টাভাবে বলা যায়, সুলতানের মতো অনন্য একজন শিল্পী নিজারের তত্ত্বচিন্তাকে ঘনীভূত করতে সর্বাধিক সহায়তা দিয়েছে; অথবা এই দুইয়ের কোনোটিই হয়তো উত্তর হিসেবে যথার্থ নয়; যেহেতু, একটি উত্তর আগেই দেওয়া আছে, বাংলাদেশে সুলতানকে পাঠের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হাজির ছিলো, সেই সমস্যার সমাধানকল্পেই হয়তো তাকে সম্যকভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন নিজার; এবং সেই পর্যালোচনারই তত্ত্বায়ন করেছেন তিনি।

    ১৯৪০ সালের দিকে সুলতান কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সতীশ সিনহা, বলাই কর্মকার ও জয়নুল আবেদীনের মতো নামকাড়া মানুষদের। আর্ট কলেজে তখন অনুসরণ করা হতো ব্রিটিশ সিলেবাস। বইপত্রের সুবাদে তরুণ বয়সেই ‘ওয়ার্ল্ড মাস্টার পেইন্টারদের’ কাজের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আলাপচারিতায় জানিয়েছেন, শাহেদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের লাইব্রেরি ব্যবহার করতেন তিনি; এবং এটা তার জীবনে ছিলো একটা ভালো সুযোগ। সুলতান মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অ্যাকাডেমিক রেজাল্টও ছিলো ভালো। বেশ ভালো। পরে আর পড়লেন না। ছেড়ে দিলেন পড়াশুনা। ভারত দেখবেন বলে। মানুষ দেখবেন বলে (শাহাদুজ্জামান, ১৯৯৭: ১১-১৩)। বড়ই বিচিত্র জীবন ছিলো তার। প্রশংসা করে বললে বলতে হয়, তার মধ্যে পরমহংস টাইপ বৈশিষ্ট্য ছিলো। গরিবির মধ্যে মানুষ হয়েও মননে অভাবী মানুষ ছিলেন না। তেমনি সোহরাওয়ার্দী ফ্যামিলিতে রাজার হালে থেকেও বিষয়ের প্রতি কোনো প্রকার মোহ জন্মায়নি তার। এই এক দারুণ জীবন। সহজ জীবন। এই সহজ, মোটেও সহজ নয়। সুলতানের জীবনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের একটি হলো বাঁক; আর দ্বিতীয়টি প্রসার। তার জীবন যেমন বাঁকবহুল ছিলো, তেমনি বৈশ্বিক পরিসর অবধি ছিলো তার বিস্তৃতি।

    এক বিদেশি মহিলার উদ্যোগে ১৯৪৬ সালে সুলতানের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। সিমলাতে। ঐ পর্বে তিনি মূলত ল্যান্ডস্কেপ এঁকেছেন। ‘মানুষ কাজ করছে উইথ ল্যান্ডস্কেপ।’ শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানান, তখন তিনি কাজ করতেন ওয়াটার কালারে। প্রদর্শনীর অধিকাংশ ছবিই ছিলো ইউরোপীয় ধাঁচে আঁকা। কাশ্মীর বাসকালীন সুলতান আঁকতেন সেখানকার নিসর্গ। সেই পর্বের ছবিগুলো হারিয়ে যায়। যে কারণে সুলতানের ধারাবাহিক বিকাশ চিহ্নিত করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। করাচিতে তার ছবির একাধিক একক প্রদর্শনী হয়। তখন ১৯৪৭ সাল। তারপর ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণ করেন সুলতান। লন্ডনে এক প্রদর্শনীতে তার ছবি প্রদর্শিত হয় পিকাসো, কর্নেট, মাতিস, ডুফি, দালি এবং ক্লের মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে (নিজার, ২০১৭: ১৮-১৯)। ‘সেগুলো ছিলো ল্যান্ডস্কেপ, শীতের ছবি।’ ছবিগুলো সুলতান এঁকেছিলেন আমেরিকাতে থাকার সময়। ‘ইম্প্রেশনিস্ট ধারার ছবি, একেবারে রিয়েলিস্ট ভাবে ফিনিশিং না ক’রে অল্প বোল্ড লাইনে, ব্রাশে আঁকা ছবি।’ ১৯৫৩ সালে সুলতান নড়াইল ফেরেন। এক দশক প্রায় তেমন কিছুই আঁকেন না। ‘বাচ্চাদের এবং গ্রামের সাধারণ মানুষদের এসথেটিক সেন্স ডেভলপ করবে এরকম একটা ভিন্ন ধরনের ইন্সটিটিউশন করার প্ল্যান’ নিয়ে মগ্ন হয়ে উঠেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তার ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয় ১৯৭৬ সালে (শাহাদুজ্জামান, ১৯৯৭: ১৫-১৮)।

    শাহাদুজ্জামানের সঙ্গে সুলতানের আলাপচারিতাটি নানা দিক দিয়েই গুরুত্ববহ। তার কথায় উঠে আসে বাংলাদেশি নন্দনভাবনা থেকে শুরু করে নন্দনতত্ত্বে নিহিত রাজনীতি; তার স্থানিক ও বৈশ্বিক বহুবিধ টানাপোড়েন। সুলতান যে কী গভীর অন্তর্দৃষ্টি ধারণ করতেন সেই আলাপে তার ভুরিভুরি প্রমাণ মেলে। তার প্রতিটি কথাই উদ্ধৃত করার লোভ জাগে। কী দারুণভাবেই না সুলতান বলেন :

    বাঙালী জাতি তার অভিব্যক্তির জন্য উন্নত ভাষা খুঁজে পেয়েছে। তাই যদি হয় বাঙালী তবে তার রেখা খুঁজে পাবে না কেন? বাঙালীর মনে স্বতঃস্ফূর্ত যে রেখা রয়েছে তাকে উদ্ধার করতে হবে। সেটাকে ধারাবাহিকভাবে ডেভেলপ করতে হবে। তাছাড়া পেইন্টিং ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে, ড্রয়িংরুম ডেকোরেট করছে, এ থেকে পেন্টিংকে [পেইন্টিং] মুক্ত করা দরকার। সাধারণ মানুষ তাঁদের প্রয়োজনে তাদের মতো করে ছবি আঁকবে। এইসব ভাবনা নিয়ে আমি নড়াইল চলে আসি। আমি নিজের গ্রাম থেকে কাজ শুরু করার চিন্তা করি। (শাহাদুজ্জামান, ১৯৯৭: ১৭)

    সুলতান বাঙালি জাতির সেই কাঙ্ক্ষিত রেখাটিই খুঁজে পাবার চেষ্টা করেছেন। তার ছবিতে প্রস্ফূটিত হয়েছে কৃষিনির্ভর বাংলা-অঞ্চলের কর্মমুখর জীবন। জীবনের নানা জরুরি অনুষঙ্গ – লড়াই ও অবসর। সেই পরিশ্রমী জীবনেরই শৈল্পিক ভাষ্য হাজির করেছেন সুলতান। ব্যক্তি কৃষক তার উপজীব্য ছিলো না। তিনি এঁকেছেন হাজার বছরের কৃষকের প্রাণস্পৃহা। এঁকেছেন শোষণকে প্রতিহত করার, নিপীড়ন সয়ে টিকে থাকার, কৃষকের অপরিসীম প্রাণশক্তি।

    নিজার মনে করেন, ‘আত্মসত্তার দ্বি-বিচ্ছেদায়ন’ ধারণার সঙ্গে সুলতান পরিচিত ছিলেন না; কিন্তু তিনি তা উপলব্ধি করতে পারতেন; এবং এ-থেকে তিনি বের হতে চেয়েছেন। সুলতানের এই বের হতে চাওয়ার প্রবণতাকে নিজার বি-বিচ্ছেদায়ন বলে চিহ্নিত করেছেন; শুধু তাই নয়, নিজারের দাবি, সুলতানের এই বি-বিচ্ছেদায়ন প্রস্তাব বঙ্গীয় পুনর্জাগরণবাদ থেকেও স্বতন্ত্র ছিলো; যদিও প্রাক-ঔপনিবেশিক অঙ্কনরীতি থেকে সুলতানও অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। নিজার স্পষ্ট করেছেন, কিন্তু প্রাক-ঔপনিবেশিক চৈতন্যে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব সুলতান করেননি; সুলতান প্রাক-ঔপনিবেশিক চিত্ররীতির সৃষ্টিশীল বৈশ্বিক রূপান্তর ঘটিয়েছেন (নিজার, ২০১৭: ৯৪)। বিচ্ছিন্নতা অতিক্রমণের মার্কসীয় প্রস্তাবের সঙ্গে সুলতানের বি-বিচ্ছেদায়ন প্রস্তাবের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন নিজার। তার মতে, মার্কসের প্রস্তাব সেক্ষেত্রে বেশ পদ্ধতিগত; সুলতানের প্রস্তাবকেই বরং অপরিপক্ব বলতে হয়। কিন্তু অপরিপক্ব হলেও, নিজার মনে করেন, ‘ঔপনিবেশিক কালে এবং তার উত্তরপর্বে আমাদের সংস্কৃতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থা যে বিচ্ছেদায়নের মধ্য দিয়ে গেছে’ সুলতানের ছবি তা থেকে বি-বিচ্ছেদায়নের প্রস্তাব দেয় (নিজার, ২০১৭: ৯৮)। সুলতানের এই বি-বিচ্ছেদায়ন প্রস্তাবকেই সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনারূপে নিজার চিহ্নিত করেছেন। যেন এভাবেই সুলতানের আঁকা ছবিতে বাংলাদেশি রংকালিতে লেপ্টে আছে তার বিউপনিবেশায়ন ভাবনা।

    শেষ কথা, বিউপনিবেশায়ন

    উপনিবেশায়নের ফলে বাংলা-অঞ্চলের উৎপাদন-পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়; এর প্রভাব পড়ে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে; মানুষে মানুষে সম্পর্ক চর্চার স্বতঃস্ফূর্তায়; এতে ব্যাহত হয়েছে প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা; বদল এসেছে বাংলা-অঞ্চলের তৎপরতার সামগ্রিক ধরনে। নিজার বলবেন, বদল ঘটেছে বাংলা-অঞ্চলের অভিমুখিতার। এই বদল স্বতঃস্ফূর্ত নয়। বহিরাগত স্বার্থে জোরপূর্বক ঘটানো হয়েছে এই পরিবর্তন। এতে বাংলা-অঞ্চলের লোকেদের বিচ্ছেদ ঘটেছে তাদের আত্মসত্তা থেকে। এতে ব্যাহত হয়েছে তাদের জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জীবনকে যা রুদ্ধ করে রেখেছে। জীবনের প্রকাশকে ক্রমাগত যা সংকুচিত করে তুলছে। সংক্রমিত করে চলেছে জীবনের অন্যান্য সম্ভাবনা। তাই বাংলাদেশের স্বতঃস্ফূর্ত রূপান্তর নিশ্চিৎ করতে বিউপনিবেশায়ন এখন প্রাসঙ্গিক তৎপরতা। প্রশাসন, আইন-আদালত, সামাজিক শৃঙ্খলা-রক্ষা, ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন, শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক-চর্চা, গণযোগাযোগ মাধ্যম, নদী খনন, সড়ক-সেতু নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এইসব সকল ক্ষেত্রেই বিউপনিবেশায়ন জরুরি। আত্মসত্তা থেকে বাংলার মানুষের যে বিচ্ছেদায়ন ঘটেছে তার বি-বিচ্ছেদায়ন ঘটাতে হবে। উপনিবেশায়ন যে প্রক্রিয়ায় বিচ্ছেদায়ন ঘটিয়েছে তা চিহ্নিত করে তাকে মাড়িয়ে যেতে হবে। এই মাড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই বিউপনিবেশায়ন। এই বি-বিচ্ছেদায়ন প্রক্রিয়াই বিউপনিবেশায়ন। বিচ্ছেদায়নের মূর্ত রূপগুলো সনাক্ত করে তা ইতিবাচকভাবে মাড়িয়ে যাওয়াই স্বতঃস্ফূর্ততা। স্বতঃস্ফূর্ত জীবনই বিউপনিবেশিত জীবন। স্বতঃস্ফূর্ত সমাজই বিউপনিবেশিত সমাজ। আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে, স্বতঃস্ফূর্তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপ নেই। তেমনি বিউপনিবেশায়নেরও কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। নেই কোনো একক ইশতেহার।

    শিল্পী: এস. এম. সুলতান

    নিজারের গ্রন্থটি ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বইটির সবচেয়ে দুর্দান্ত বৈশিষ্ট্য হলো- এতে ব্যবহৃত পদ্ধতি। এটি লেখকের নিজস্ব। বাংলা-অঞ্চলকে গভীরভাবে বিশ্লেষণের স্বার্থে, সচেতন কায়দায়, নিপুণভাবে তিনি পুরো কাঠামোটি গড়ে নিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোকে গেঁথেছেন এক সূত্রে। অনুমান করা যায়, বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ড পর্যালোচনার তিনি একটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশি পরিসর নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। আলোচ্য গ্রন্থে তা হয়তো বীজাকারেই ছিলো। নিজার যে বাংলা-অঞ্চলের জ্ঞানজাগতিক অভিমুখিতার সাপেক্ষেই বাংলাদেশের বর্তমান তৎপরতা বুঝতে আগ্রহী – এ ব্যাপারে সন্দেহহীন হওয়া চলে। কেননা, জ্ঞানচর্চার প্রাক-ঔপনিবেশিক ধারার সঙ্গে বর্তমান যাপনের যোগ সৃষ্টির প্রয়াস তার চিন্তায় স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। তিনি ওয়াকিবহাল আছেন, বিউপনিবেশায়ন প্রাক-ঔপনিবেশিক চিন্তায় ফিরে যাওয়া নয়; কিন্তু তার সঙ্গে বিচ্ছেদ বহাল রেখেও তা সম্ভব নয়। যে কারণে, বিউপনিবেশায়নকে তিনি প্রাক-ঔপনিবেশিক চিন্তার সৃষ্টিশীল বৈশ্বিক রূপান্তর বলেন। একে পরিচয় করিয়ে দেন একটি সচেতন বিষয়ী প্রক্রিয়া বলে (নিজার, ২০১৭: ২৩)।

    নিজারের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা চাই। খেয়ালের একটু অভাবেই জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেলা সম্ভব। না। বিউপনিবেশায়ন কোনো জাতীয়তাবাদী প্রকল্প নয়। যদিও বাংলাদেশ, বাংলা-অঞ্চল ইত্যাদি শব্দ বারবার এখানে উচ্চারিত হয়েছে; তা করা হয়েছে শুধুমাত্র অঞ্চলগত অভিমুখিতার ইঙ্গিত দিতে। তার বিউপনিবেশায়ন চিন্তায় জাতীয়তাবাদী কোনো স্বর প্রচ্ছন্নভাবেও নিহিত নেই। কারণ জাতীয় ভাবের ছদ্মবেশে গড়ে ওঠা আধিপত্যবাদ সম্পর্কে তিনি সতর্ক। এই কারণে বিশ্লেষণের গোটা কৌশলটাকেই তিনি পৃথক উপায়ে গড়ে নিয়েছেন; যাতে জাতীয় ভাবের অথবা কোনো ধরনের কমিউনাল পরিচয়ের খপ্পরে তাকে পড়তে না হয়। তার এই কৌশলই ডিকলোনাইজেশনের অপরাপর তাত্ত্বিকদের সঙ্গে তার পার্থক্য গড়ে দেয়; যদিও আলাদা হওয়াটাই এখানে বড়ো কথা নয়; তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান ভাবনায় বিরাজমান সংকটগুলোকে উপেক্ষা না করা; নিজার তা উপেক্ষা করেননি। যে কারণে, পশ্চিমা ক্যাটেগরিগুলোকে তিনি সচেতনভাবে পরিহার করেছেন। এটা তাকে করতেই হতো। কেননা, পশ্চিমা ক্যাটেগরি সাপেক্ষে উৎপাদিত জ্ঞান কোনো-না-কোনোভাবে পশ্চিমা লিগ্যাসির ধারক; ফলে বাংলা-অঞ্চলকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যার অপারগতা স্বাভাবিক। এজন্যই তাকে নির্মাণ করতে হয়েছে স্বতন্ত্র কিছু পরিভাষা; যা পেশ করেছে স্বতন্ত্র কিছু প্রস্তাব; অথবা স্বতন্ত্র ভাবনা পেশ করার ক্ষেত্রে যা তার সহায়ক হয়েছে। ব্যক্তির ধারণা পরিহার করে এজন্যই তিনি গ্রহণ করেছেন আত্মসত্তার ধারণাটিকে। সারগত কোনো পরিচয়কে আঁকড়ে না ধরে প্রবর্তন করেছেন অভিমুখিতার ধারণা। বিচ্ছেদায়ন ও দ্বি-বিচ্ছেদায়নের ধারণা দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করেছেন উপনিবেশায়নের সক্রিয়তা। এক্ষেত্রে দ্বি-বিচ্ছেদায়ন ধারণাটির তিনি জুতসই প্রয়োগ করেছেন। হ্যাঁ, নিজারের চিন্তায় ফাঁক থাকতেই পারে; সেই ফাঁক নির্দেশ করা, তার চিন্তায় নিহিত সীমাবদ্ধতা আবিষ্কার করা ও সেই সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনাকে তিনি স্বাগতমই জানাবেন; যেহেতু এই ধরনের তর্ক-বিতর্কই কেবল জ্ঞানজাগতিক তৎপরতাকে জারি রাখে।

    বিউপনিবেশায়ন সম্পর্কিত আলাপালোচনা বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই গুরুত্ব লাভ করেছে। ২০১৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ দর্শন সংঘ কর্তৃক দীর্ঘ ছয় মাসব্যাপী ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব’ শিরোনামে বক্তৃতামালার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিকেরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেখানে তাদের ভাবনা পেশ করেছেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এই সম্পর্কিত আলাপ কমবেশি জারি আছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের নানা সংগঠন ও ব্যক্তিগত আগ্রহে অনেক লেখক-গবেষকই এখন শামিল আছেন বিউপনিবেশায়ন তৎপরতায়। এমনকি বিদ্যায়তনিক গবেষণাগুলোতেও ইদানিং বি-উপনিবেশায়ন নামটা কেউ কেউ জুড়ে দিচ্ছেন তাদের রচনায়। তবে যেভাবেই আলাপ করা হোক না কেন বিউপনিবেশায়ন চিন্তার গভীরে ঢুকছেন না অনেকেই। ফলে বাংলা-অঞ্চলের বিউপনিবেশায়ন চিন্তার আলাদা স্বর তাদের কাজের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে না। তবে এই তৎপরতা চলমান রয়েছে। এটাই খুশির কথা। শহীদ ইকবালের সম্পাদনায় প্রকাশিত চিহ্ন-পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যাটির (ফেব্রুয়ারি ২০২১) লিড হলো বিউপনিবেশায়ন। অতি সম্প্রতি বিউপনিবেশায়ন শিরোনামে ফকরুল চৌধুরীর আস্ত একটি গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে। এভাবেই বিভিন্ন সংকটাপন্ন সেক্টরে বিরাজমান সমস্যা (যদি থাকে) চিহ্নিত করে তার বিউপনিবেশায়ন প্রস্তাব দাখিল করা জরুরি। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়নে সম্ভাব্য নানা দার্শনিক সংকট নিয়েও সতর্ক পর্যালোচনা আবশ্যক। এই ধরনের দার্শনিক অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে বিউপনিবেশায়নের তাত্ত্বিক ভিত। ‘বাংলাদেশের বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব’ এখনো বিকাশমান জ্ঞানজাগতিক তৎপরতা। সম্মিলিত শ্রমের দ্বারাই কেবল, বাংলাদেশি সংকট সমাধানের লক্ষ্যে, এই চিন্তা প্রয়োগযোগ্য হতে পারে।

     

    • প্রবন্ধটি রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের সপ্তম সংখ্যায় (অক্টোবর, ২০২১) প্রথম প্রকাশিত হয়। অরাজের পাঠকদের জন্য অনলাইনে তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক

     

    সহায়কপঞ্জি:

    আমীনুর, ২০১১ আমীনুর রহমান, ‘ইম্পিরিয়ালিজম থেকে পোস্টকলোনিয়ালিজম’, উপনিবেশবাদ ও উত্তর–ঔপনিবেশিক পাঠ, সম্পা. ফকরুল চৌধুরী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

    পারভেজ, ২০১৩ পারভেজ হোসেন, ‘সম্পাদকীয়’, প্রতিরোধ ও বিউপনিবেশীকরণ, মহাত্মা গান্ধী, সম্পা. পারভেজ হোসেন, সংবেদ, ঢাকা।

    ফয়েজ, ২০১১ ফয়েজ আলম, ‘উত্তর-উপনিবেশী মন’, উপনিবেশবাদ ও উত্তর–ঔপনিবেশিক পাঠ, সম্পা. ফকরুল চৌধুরী, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

    ফানো, ২০০৬ ফ্রাঞ্জ ফানো, জগতের লাঞ্ছিত, অনু. আমিনুল ইসলাম ভুইয়াৃ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।

    মজিদ, ২০০৯ মজিদ মাহমুদ, উত্তর–উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য, কথাপ্রকাশ, ঢাকা।

    মনিরুল, ২০২১ মনিরুল ইসলাম, ‘(ডি)কনস্ট্রাকশন’, সহজিয়া, সম্পা. সুমন সাজ্জাদ, ২৭ জানু. ২০২১, https://shahojia.com/

    শাহাদুজ্জামান, ১৯৯৭ শাহাদুজ্জামান, কথা পরম্পরা, পাঠক সমাবেশ, ১৯৯৭, ঢাকা।

    নিজার, ২০১৭ সৈয়দ নিজার, ভারতশিল্পের উপনিবেশায়ন ও সুলতানের বিউপনিবেশায়ন ভাবনা, চৈতন্য, সিলেট।

    নিজার, ২০১৮ সৈয়দ নিজার, বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভব, বিকাশ ও বিউপনিবেশায়ন, প্রকৃতি-পরিচয়, ঢাকা।

    Ashcroft, Griffiths

    & Tiffin, 2001 Bill Ashcroft, Gareth Griffiths & Helen Tiffin, Key Concepts in Post-Colonial Studies, Routledge, London & New York.

    Bhabha, 2006 Homi K. Bhabha, The Location of Culture, Routledge, London & New York.

    Bottomore, 2002 Tom Bottomore, The Frankfurt School and its Critics, Ed. Peter Hamilton, Routledge, London & New York.

    Cesaire, 1972 Aime Cesaire, Discourse on Colonialism, Trans. Joan Pinkham, Monthly Review Press, New York.

    Fano, 1965 Frantz Fanon, A Dying Colonialism, Trans. Haakon Chevalier, Grove Press, New York.

    2001 Frantz Fanon, The Wretched Of the Earth, Trans. Constance Farrington, Penguin Books, New York.

    Jaeggi, 2014 Rahel Jaeggi, Alienation, Trans. Frederick Neuhouser and Alan E. Smith, Columbia University Press, New York.

    Kellner, 2007 Douglas Kellner, ‘Introduction to The Second Edition’, One-Dimensional Man, Herbert Marcuse, Routledge, London & New York.

    Kennedy, 2016 Dane Kennedy, Decolonization A Very Short Introduction, Oxford University Press, New York.

    Kohn & Mcbride, 2011 Margaret Kohn & Keally Mcbride, Political Theories of Decolonization, Oxford University Press, New York.

    Leela, 1998 Leela Gandhi, Postcolonial Theory A Critical Introduction, Allen & Unwin, Australia.

    Marcuse, 2007 Herbert Marcuse, One-Dimensional Man, Routledge, London & New York.

    Marx, 2007 Karl Marx, Economic and Philosophic Manuscript of 1844, Trans. Martin Milligan, Dover Publications, New York.

    Memi, 2003 Albert Memi, The Colonizer and the Colonized, Trans. Howard Greenfeld, earthscan, New York.

    Mignolo &

    Walsh, 2018 Walter D. Mignolo & Catherine E. Walsh, On Decoloniality, Duke University Press, Durham and London.

    Ngugi, 2007 Ngugi Wa Thion’o, Decolonising the Mind, Worldview Publications, India.

    Petrovic, 2021 G. Petrovic, ‘Alienation’, Encyclopedia of Philosophy, Encyclopedia.com. 10 Mar. 2021, https://www.encyclopedia.com.

    Prasenjit, 2004 Prasenjit Duara, ‘Introduction: the decolonization of Asia and Africa in the twentieth century’, Decolonization, Ed. Prasenjit Duara, Routledge, London & New York.

    Rothermund, 2006 Dietmar Rothermund, The Routledge Companion to Decolonization, Routledge, London & New York.

    Said, 1979 Edward W. Said, Orientalism, Vintage Books, New York.

    Shepard, 2006 Todd Shepard, The Invention of Decolonization, Cornell University Press, Ithaka and London.

    2021 Todd Shepard, ‘Decolonization’, Encyclopedia of Modern Europe: Europe Since 1914: Encyclopedia of the Age of War and Rconstruction. Encyclopedia.com. 16 Apr. 2021, https://www.encyclopedia.com.

    Zafrullah: 1981 Zafrullah Chowdhury, ‘Research: A Method of Colonization’, Medico Friend Circle Bulletin, Feb. 1981.

  • সোশ্যাল ইকোলজি কো-অপারেটিভ ।। একুশ শতকের জনস্বার্থে প্রাণ-প্রকৃতির জন্য একুশটি থিসিস

    সোশ্যাল ইকোলজি কো-অপারেটিভ ।। একুশ শতকের জনস্বার্থে প্রাণ-প্রকৃতির জন্য একুশটি থিসিস

    * অনুবাদ: রাহুল বিশ্বাস

    জ্যানেট বিহলের ভূমিকা

    “২১ থিসিস” লেখা হয় ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আর ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে সেটি প্রকাশিত হয়। এ লেখাটি প্যারিসে সামাজিক বাস্তুবিদ্যা সমবায় (সোশ্যাল ইকোলজি কো–অপারেটিভ)-এর জন্মকে সূচিত করেছে৷ ২০১৬ সালের মে মাসে এটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক ফারবিয়াজকে (Patrick Farbiaz) আমি জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেয়েছিলাম, সামাজিক ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র দ্বারা সমবায় (কো–অপারেটিভ) বলতে কী বোঝায়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি গ্লোবাল সাউথের দরিদ্রদের দৃষ্টি দিয়ে ইকোলজি তথা বাস্তুতন্ত্রকে দেখে। এটি ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি “মুক্তির বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দরিদ্রদের চোখ দিয়ে দেখা খ্রিস্টীয় মতবাদের একটি প্রণয়ন। পলিটিকাল ইকোলজির এই রূপটি পরিবেশগত ন্যায্যতা আন্দোলনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। যেটি ১৯৭০–এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যা পরিবেশগত বিপর্যয়ে—দরিদ্র, আদিবাসী সংখ্যালঘু, নারী এবং অতিসম্প্রতি জলবায়ু ন্যায্যতা আন্দোলনের সাথে যারা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের সংগঠিত করতে চেয়েছিল। এই “২১টি গবেষণা প্রবন্ধ” মানুষের ইকোলজি তথা প্রাণ–প্রকৃতির (écologie populaire) ধারণাকে অগ্রসর করে, যা “লোকায়ত শ্রেণির” আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্ট, যারা বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী আধুনিকতা দ্বারা ছিটকে পড়েছে।

    বুকচিনের সামাজিক বাস্ততন্ত্রের সাথে কুটুম্বিতা এখানে স্পষ্ট। এই কুটুম্বিতা বিশেষ করে বাস্তুতন্ত্রের সংকটের সামাজিক উৎসের সাথে; পরিবেশবাদ (স্বভাবগতভাবে সংস্কারপন্থী) এবং ইকোলজির (যা রাজনৈতিক পরিভাষায় সামাজিকভাবে বিপ্লবী) মধ্যে যে তফাৎ তার সাথে; দরিদ্রদের দিকে যে অভিযোজন তার সাথে; স্থাণীয়করণ নিয়ে সচেতনতার সাথে; এবং সবুজ পুঁজিবাদের তিক্ত বিরোধিতার সাথে।

    কোঅপারেটিভ ইকোলজি সোস্যালের (Cooperative Ecologie Sociale) তিনজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ১৯৯০–এর গোড়ার দিক থেকে বিকশিত বিভিন্ন ফরাসি বাস্তুতান্ত্রিক দলগুলোর (লেস ভার্টস, ইকোলজি ইউরোপ, ইকোলজি ইউরোপ–লেস ভার্টস, বা ইইএলভি) সাথে সম্পৃক্ত। ২০০৪ সালে ফ্রানসাইন বেভয় (Francine Bavay) ইলে–ডি–ফ্রান্স–এর আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচিত হয়ে দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন এবং সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক অর্থনীতি, সংহতি, স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের দায়িত্ব স্বাদরে গ্রহন করেন। তিনি তখন থেকে নির্বাচনী অফিস ত্যাগ করেছেন এবং এখন স্থানীয় পন্থায় সংগঠিত হচ্ছেন। প্যাট্রিক ফারবিয়াজ ফরাসি জাতীয় পরিষদের ডেপুটি নোয়েল মামেরের অফিসে কাজ করেন। ইইএলভি অফিসকর্তা সার্জ করোনাডো ফরাসিদের কাছে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ানদের প্রতিনিধিত্ব করেন।

    একবিংশ শতাব্দীতে সামাজিক ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার জন্য এবং পরিবেশগত ন্যায্যতার উপর জোর দেওয়ার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমি এর ইংরেজি অনুবাদ এখানে প্রকাশ করছি। সহযোগিতা–সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য, এর অন্যান্য নথি দেখতে এবং এটির জন্য আসল ফরাসি তথ্যের জন্য, Ecolgiesociale.org-এর ওয়েবসাইট দেখুন৷

    একুশ শতকের পিপলস ইকোলজি বা জনস্বার্থে বাস্তুতন্ত্রের জন্য একুশটি থিসিস

    শিল্পী: লিয়াহ্ লারিসা বানশেফট

    এই ইশতেহারটি এই সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু হয় যে দুই ধরনের ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র রয়েছে, একটি উপরের দিক থেকে এবং একটি নিচের দিক থেকে। উপর হতে উৎসারিত বাস্তৃতন্ত্র সবুজ প্রবৃদ্ধির (গ্রিন গ্রোথ) উপর ভিত্তি করে অর্থনীতির বিকাশের পক্ষে। এটি বাস্তবে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হটানোর চালিকাশক্তি হতে চায়। অন্যদিকে নিম্ন হতে উৎসারিত ইকোলজি হলো লোকায়ত শ্রেণিগুলোর টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম এবং তাদের প্রয়োজনগুলো মেটানোর স্বার্থে পরিবেশগত সম্পদে প্রবেশাধিকার। এই দুই স্তরের ইকোলজির মধ্যে, ব্যবধান প্রতিদিন ক্রমশ বাড়ছে, এবং এটিকে স্থির করা প্রয়োজন। আর যে অভিঘাত আসছে তা বিবেচনা করে বিকল্প হতে হবে পলিটিক্যাল ইকোলজি।

    ১) আমরা যে বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন তা বহুমাত্রিক: এটি অর্থসংস্থানগত (ফিন্যান্সিয়াল), অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিচয়বাদী (আইডেন্টিটারিয়ান) এবং প্রাণ–প্রকৃতিমূলক। এই শেষ বৈশিষ্ট্যটি হলো মৌলিক নতুন উপাদান যা পৃথিবীকে টিকে থাকার দিকে পরিচালিত করছে: বর্বরতা যা বাজারব্যবস্থায় কতিপয় লোকের আধিপত্য ও ‘ভালোভাবে বেঁচে থাকা’ নামক রাষ্ট্রের সভ্যতাকরণের রাজনীতি থেকে উদ্ভূত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধ্বংসের মন্ত্রণায় নিযুক্ত, যার সংস্কার করা যাবে না, এমনকি সবুজ অর্থনীতি তার সংকট সমাধানের জন্য চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালালেও। ‘পুঁজিবাদের সভ্যকরণের মিশন’, উৎপাদনবাদী শক্তির সম্প্রসারণের উপর ভিত্তি করে এবং যা উদার চিন্তাবিদদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রীদের দ্বারাও সুরক্ষিত। এটি পৃথিবীর শৃঙ্খলাজনিত গঠনতন্ত্রের আবশ্যক ভারসাম্য বিঘ্নিত করেছে যা মানুষের জীবনকে অসম্ভব করে তুলছে।

    পুঁজিবাদ প্রাকৃতির সীমাবদ্ধতার সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম নয়। যার প্রধান লক্ষণ ইকোসিস্টেমগুলোর নিত্যকার অতিদ্রুত বিনাশ, জলবায়ু অবস্থার অবনতি, রাসায়নিক দূষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট রোগ, জীববৈচিত্র্যের দ্রুত হ্রাস, মাটির অবক্ষয়, চিরহরিৎ বা অতিবৃষ্টির বন (রেইনফরেস্ট) ধ্বংস, নিষ্ঠুরতার ফলে বিকশিত বৈশ্বিক সামাজিক বর্ণবৈষম্য এবং পরিচয়বাদী এবং ধর্মীয় সহিংসতার উত্থান। এই সঙ্কটগুলি উত্পাদনব্যবস্থার পদ্ধতি থেকে উদ্ভূত হয়েছে যা দুই শতাব্দী ধরে চরমে পৌঁছেছে—পুঁজিবাদ—এবং এর ফলে ভোগ ও তত্পরতার কারণে। এই পরিবেশগত এবং সামাজিকভাবে অস্থিতিশীল উন্নয়নের পদ্ধতি জীবজগৎকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

    ২) পলিটিকেল ইকোলজিই হলো একমাত্র শক্তি যা কিনা এই সংকটকে দেখতে পেয়েছে। পলিটিক্যাল ইকোলজির বিভিন্ন ধারা রয়েছে, কিন্তু সব পলিটিক্যাল পরিজনবর্গের মধ্যে একমাত্র, ইকোলজি আমাদের বাস্তুতান্ত্রিক পদাঙ্ক/পদচিহ্ন (ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট) কমানোর মাধ্যমে উন্নয়নের মডেল পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করে, প্রাণ–প্রকৃতিখেকোদের প্রতিহত করে গ্রহের ইকোসিস্টেম তথা বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করে, এবং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা রক্ষা করে যেহেতু তা মৌলিক সামাজিক প্রয়োজনগুলি মেটায়। স্বশাসনের অধিকার, দায়িত্ব এবং ভারসাম্যের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ইকোলজি মাটি এবং মানুষ ও জীবসম্প্রদায় রক্ষার সার্বজনীন মূল্যবোধকে গ্রহণ করার আহ্বান জানায়। ইউরোপে এবং অন্যান্য ধনী দেশে ১৯৮০–এর দশকে প্রাণ–প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে যখন প্রতিদিনকার প্রতিরোধ মানব সম্প্রদায়ের টিকে থাকার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্র বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তির সাথে একীভূত হয়। এটি প্রাণ–প্রকৃতিবাদী দলগুলো (Green parties) দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল, যাদের সামাজিক ভিত্তি ১৯৬৮–উত্তর ছাত্র প্রজন্মের সাথে মিলে যায় যেটি যুদ্ধ পরবর্তী দশকগুলিতে সমৃদ্ধ হয়েছিল। এই সামাজিক ভিত্তিকে মধ্যবিত্ত হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, যার আয়ত্তে উচ্চ সাংস্কৃতিক পুঁজি রয়েছে এবং যারা বড় শহরগুলির শহুরে কেন্দ্রগুলিতে বাস করে; এটি তার নিজস্ব ধারণায় পলিটিক্যাল ইকোলজিকে রূপ দিয়েছে এবং যা তার স্ব–অধিকারে কাজ করে। এটি প্রাণ–প্রকৃতিবাদী রাজনীতির সমর্থন করে যা উপরে থেকে (ঊর্ধ্বস্থিত) মান নির্ধারণ করে এবং যেটি পলিটিক্যাল ইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে সবুজ অর্থনীতির উপায়ে পুঁজিবাদের অভিযোজনকে বিবেচনা করে।

    ৩) আরেকটি ইকোলজি, দরিদ্রদের ঐতিহাসিক শক্তি থেকে প্রবর্তিত, নিচে থেকে উৎসারিত ইকোলজি, যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় উদ্ভূত হয়েছিল। এই লোকায়ত ইকোলজি, গ্রহের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থেকে উদ্ভূত, যারা সর্বত্র মনুষ্যপ্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। সামাজিক পরিধির প্রকৃতিগত, এটি আর্থিক ও শিল্প অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নারী ও পুরুষকে একত্রিত করে যা গ্রহকে ধ্বংস করছে এবং হুমকি দিচ্ছে মনুষ্যপ্রকৃতির টিকে থাকার এবং সারা বিশ্বে ছিন্নমূলদের জীবনের পরিস্থিতি: বন উজাড়ের বিরুদ্ধে, বড়সব বাঁধের বিরুদ্ধে, তেল ও খনিজ সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে, এবং তাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের টিকে থাকার জন্য, শিল্পকারখানাজাত ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে, পরিবেশগত বিভক্তির বিরুদ্ধে।… নিম্নস্থিত ইকোলজিকে বর্তমানে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে স্থানান্তরণ করা হয়নি। যখন এটি প্রাণ–প্রকৃতিপন্থী দলগুলোর (green parties) মধ্যে উপস্থিত হয়, এটি প্রায়শই সংখ্যাল্প হয়।

    এটি সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনে (ব্রাজিলের ভূমিহীন মজুর আন্দোলন, ভিয়া ক্যাম্পেসিনা১, আদিবাসী আন্দোলন) এবং জনপ্রিয় বিদ্রোহে (বলিভিয়ায় জলযুদ্ধ, চীনে আইন বিরোধীতা, ভারতে বাঁধ বিরোধী আন্দোলন) প্রকাশিত হয়। এটি এখনও তার তথ্যসূত্র খুঁজছে, তবে ইতিমধ্যে এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, বিশেষত রিও+ ২০–এর মতো পলিটিক্যাল ইকোলজির এই ধরনের বড় বৈঠকের সময় কিংবা যখন হাজার হাজার পরিবেশবিদ সবুজ অর্থনীতি এবং এর পরিণতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং ক্লাইমেট জাস্টিস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামাজিক প্রাণ–প্রকৃতিমূলক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করে… ধীরে ধীরে, পশ্চিমা দেশগুলিতে পিপলস ইকোলজি ছড়িয়ে পড়ছে, শিল্প কৃষি এবং রাসায়নিক শিল্পের বিরুদ্ধে লড়াইকারী গ্রামীণ সম্প্রদায়গুলিতে, জনবহুল পাড়াগুলোতে যেখানে দূষণ প্রচ্ছন্নভাবে কেন্দ্রীভূত, এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাজনিত রোগ, জাঙ্ক ফুড খাওয়া এবং তার ফলস্বরূপ স্থূলতা দেখা দিচ্ছে। সমবেত সামাজিক এবং পরিবেশগত অবিচারের মুখোমুখি হয়ে, একটি নতুন পলিটিক্যাল ইকোলজি একইসাথে প্রয়োজনীয় এবং সম্ভবপর।

    ৪) পলিটিক্যাল ইকোলজির এই দুই মেরুর কারণ পূর্বের বিবরণে রয়েছে যা শুরু থেকেই বিভক্ত। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে, ঊর্ধ্বভাগের বৈজ্ঞানিক ইকোলজির মধ্যে একটি ব্যবধান বিস্তৃত হয়েছে, যা ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সংরক্ষণবাদ এবং সামাজিক ডারউইনবাদ দ্বারা বৃহৎ অংশে গঠিত হয়েছে। ইতিবাচক মতাদর্শ এবং অনন্ত অগ্রগতির ধর্মচারণ দ্বারা চালিত, ঊর্ধ্বভাগের এই ইকোলজি বিংশ শতাব্দীতে প্রথমে প্রাণ–প্রকৃতিবাদীদের, পুনঃপুন প্রকৃতিবাদী এবং পরিবেশবাদীদের প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে, নীচের দিক থেকে (নিম্নস্থিত) ইকোলজি হলো পিপলস ইকোলজি তথা জনস্বার্থে প্রাণ–প্রকৃতি। শ্রমিক, কৃষক এবং ঔপনিবেশিক বিরোধী জনগণের বেঁচে থাকার সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত মুক্তিপরায়ণ প্রাণ–প্রকৃতিবাদ। বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম পিপলস ইকোলজির ভিত্তি। পুঁজিবাদী আধুনিকতা তাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করার কারণে লোকায়ত শ্রেণীগুলি কেবল তাদের জীবনের বস্তুগত অবস্থা–ই নয়, তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকেও রক্ষা করবে।

    শিল্পী: ওলাফ হাজেক

    পুঁজি অগ্রগতি, বিজ্ঞান ও যুক্তির নামে কৃষক ও কারিগর সম্প্রদায়ের জীবন ও কর্মের অবস্থাকে ধ্বংস করেছে। এই অর্থে ডানপন্থী এবং একইসাথে বামরাও উদার ব্যক্তিবাদের দোহায় দিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা অর্জন করেছে। আমরা যদি এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করতে চাই, তবে পিপলস ইকোলজির প্রথম কাজটি হলো প্রগতি ও বিজ্ঞানবাদের এই ধর্মচারণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বামপন্থী এবং বাস্তুবিদ্যার সম্মিলিত বোধকে বিউপনিবেশায়ন করা, যা লোকায়ত শ্রেণীর উপর মধ্যবিত্ত আধিপত্যের ফলাফল। টেরা নোভা ফাউন্ডেশন বামপন্থীদের ভবিষ্যত “দৃঢ়তা” নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে অভিহিত করেছে, যেহেতু তারা কার্যত লোকায়ত শ্রেণীগুলিকে বর্জন করেছে বা জাতীয় ফ্রন্টের পক্ষে; এইভাবে তারা তাদের উদ্ভব বা মূলবিন্দু শ্রমিক, আদিবাসী এবং কৃষক আন্দোলনের সমাজতন্ত্রকে তুচ্ছ করে সমাজতন্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তুশাস্ত্রের যুক্তি অনুসরণ করছে, এবং দাবি করছে যে তারা এখনো আগের মতোই। বিউপনিবেশায়ন তথা উপনিবেশায়ন থেকে সামগ্রিক মুক্তির ভাবনা এইভাবে মূল্যবোধ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ইতিহাসের পুনঃআবিষ্কারে অবদান রাখে, যা মুনাফা এবং ব্যক্তিবাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতিযোগিতার উপর ভিত্তি করে বাজার সমাজের ঠিক বিপরীত: তারা সংঘবদ্ধতা, অন্যদের জন্য উদ্বেগ, জমির সমষ্টিগত মালিকানা, সহজাত, পারস্পরিক সাহায্য, সহযোগিতা এবং সৌজন্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে।

    (কোঅপারেটিভ ইকোলজি–সোশ্যালে ইন প্যারিস–এর প্যাট্রিক ফারবিয়াজ এবং ফ্রানসাইন বেভয়)

    ৫) ঊনবিংশ শতাব্দীতে পিপলস ইকোলজি উদ্ভূত হয়েছিল শ্রমিকদের সঙ্ঘবদ্ধতা, কৃষিজীবীদের সংখ্যাধিক্যতা, যান্ত্রিকীকরণ বিরুদ্ধতা (লুড্ডিজম), নাগরিক অবাধ্যতা, এবং মুক্তিমুখীন ভূ–বিদ্যায়। শ্রমিক সঙ্ঘবদ্ধতা সামাজিক ও সংহতিমূলক অর্থনীতির মূল ভিত্তি; লুড্ডিজম শিল্পায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের সমালোচনার মূল ভিত্তি; গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম ও যুদ্ধ থেকে কৃষিভিত্তিক জনসংখ্যার উদ্ভব হয়েছিল তাদের জীবনযাত্রা এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পৃথিবীর সাথে অন্য কোনো সম্পর্ক এবং পণ্যায়নের বিকাশের বিরুদ্ধে; থোরো থেকে গান্ধী পর্যন্ত এবং ব্রাজিলের ভূমিহীনদের মধ্য দিয়ে যাওয়া সংগ্রামে অসহযোগের পদ্ধতিতে নাগরিক অবাধ্যতার উদ্ভব হয়েছিল; এলিসি রেক্লাস এবং পিটার ক্রোপোটকিনের মুক্তিপরায়ণ ভূ–বিদ্যা সমাজবিজ্ঞানকে কাউন্টারিং করে, যা পারস্পরিক সাহায্য এবং সহযোগিতার ধারণার বিকাশ ঘটায়।

    ইকোলজির পদপরিচায়ক বা দাপ্তরিক ইতিহাস প্রকৃতির প্রতি বুর্জোয়া সংবেদনশীলতার সাথে বৈজ্ঞানিক বাস্তব্যবিদ্যা বিশেষজ্ঞ থেকে পরিবেশবাদী এবং প্রকৃতিবাদী আন্দোলনে পুলিশি লাঠিসোঁটা এড়িয়ে এর উত্থানকে বর্ণনা করে। ১৯৬৮ সালের পরে, বিভিন্ন প্রভাব (নারীবাদ, তৃতীয় বিশ্ব, শান্তিবাদ এবং অহিংসাবাদ, স্বাধীনতাবাদী, সমাজতান্ত্রিক স্ব–ব্যবস্থাপনা) দ্বারা পুষ্ট একটি সাংস্কৃতিক এবং প্রজন্মগত আন্দোলন থেকে ১৯৭০–এর দশকে জন্ম নেওয়া স্রোতের একটি পথধারা একত্রিত হয় এবং পলিটিক্যাল ইকোলজি ও প্রাণ–প্রকৃতিবাদী দলগুলোর জন্ম দেয়। এই গল্পটি মিথ্যা। কারণ এটি ইচ্ছাকৃতভাবে দরিদ্রদের ইকোলজিকে বাদ দেয়। যা উনিশ এবং বিশ শতকে পুঁজিবাদী আধুনিকতা এবং উন্নয়নের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই করা বন্ধ করেনি।

    ৬) পিপলস ইকোলজি তার সূচনা থেকেই সম্পদের সীমাহীন শোষণ, বিশ্বায়ন বাণিজ্য এবং পুঁজি সঞ্চয়সহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিরোধী। প্রধানতম চার রকমের বিশ্বায়ন প্রাণ–প্রকৃতিমূলক সঙ্কটের জন্য দায়ী।

    প্রথম বিশ্বায়ন ছিল বহুমাত্রিক আটলান্টিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, যা মানব দাসত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যার ফলে আদিবাসীদের নিধন করা হয় এবং সম্পদ আহরণের কাজে লাগানো হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কাঁচামাল দখল করা হয়।

    দ্বিতীয় বিশ্বায়ন কয়লা এবং বাষ্প শক্তির উপর ভিত্তি করে, মজুরি শ্রম, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং উত্পাদনবাদ উদ্ভূত। অর্থাৎ যে উৎপাদনের ধর্ম ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলোর প্রাপ্ত লাভের বনিয়াদ করে। ইতোমধ্যে সে বেড়াজাল জমির সাধারণ মালিকানার অবসান ঘটিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ কৃষককে যন্ত্রের সম্প্রসারণে ভিন্ন অবস্থায় পর্যবসিত করেছে। শিল্প শ্রমজীবী শ্রেণীর জন্মের সাথে সাথে কৃষক সম্প্রদায়ের ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

    তৃতীয় বিশ্বায়ন তেল শোষণের দ্বারা সৃষ্ট, তা ছিল ফোর্ডিজম২ এবং বিদ্যুৎ, ভোগবাদ এবং বিচ্ছিন্নতা।

    চতুর্থ বিশ্বায়ন পারমাণবিক শক্তি, তেল আহরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে সৃষ্ট বস্তু এবং মনুষ্যপ্রকৃতি বা মানবিকতার পরিকল্পিত বিলোপপ্রবণতার সাথে সমসাময়িক। এই যুগ হয় বর্বরতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাবে নয়তো বিশ্ব নাগরিকতা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে একটি মানবিক রেনেসাঁর জন্ম দিবে। বর্তমান বিশ্বায়ন মানবিকতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

    একটি প্রাণ–প্রকৃতিমূলক বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এই চার ধরণের বিশ্বায়ন পাঠ করলে দেখা যায় যে পুঁজিবাদী আধুনিকতা সর্বদা শ্রমিকশ্রেণীর শোষণ এবং তাদের বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের উপর ভিত্তি করে। যারা আধিপত্যশীল তারা মানুষ ও প্রকৃতির অভিমুখে আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করেনি। ভারতের প্রতিরোধ, পলায়নপর ক্রীতদাস, দাস বিদ্রোহ, আইনভঙ্গ ও কৃষক বিদ্রোহ, অধিকার ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যরক্ষার সংগ্রাম, এবং আজকাল সম্পদ আহরণ, বিশাল বাঁধ, বন উজাড় এবং বড়সব অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের প্রতিরোধ দ্বারা তা প্রমাণিত।

    পিপলস ইকোলজি কী?

    ৭) পিপলস ইকোলজি মূলধারার কিছু নয়, নিরপেক্ষ কিছুও নয়। ইকোলজি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক সামাজিক সম্পর্ক ও আনুকূল্যতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আন্তঃসম্পর্কিত। এটি তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে লোকায়ত শ্রেণী এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাততন্ত্রের মধ্যে মতবিরোধ রাখে এই সাধারণ কারণে যে মনুষ্যপ্রকৃতির সমস্ত অংশ একইভাবে পরিবেশগত সংকট অনুভব করে না। আয়, অধিকার, এবং সাংস্কৃতিক সাবলীলতার অসমতা, যা পরিবেশগত সংকটের মূলে রয়েছে, তা নিশ্চিত করে যে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এর প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সামর্থ্যের অভাব বোধ করে। পিপলস ইকোলজির লক্ষ্য পানি, বাতাস, মাটি এবং সর্বসাকুল্যে সমস্ত ব্যক্তিমালিকানা (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি) নস্যাৎ করার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করা।

    বিশ্বের ফিন্যান্সিয়ালাইজেশন পণ্যের আসক্তিবাদের (ফেটিসিজম) সর্বোচ্চ পর্যায়, যেখানে একমাত্র মানদণ্ড ধনাঢ্যদের মূলধন (কিং মানি) এবং বস্তুগত সম্পদের স্তর হলো সুখ গণনার সূচক। পিপলস ইকোলজি, অর্থনৈতিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, এবং দরিদ্রদের জন্য এর অগ্রাধিকার তাদের জীবনের শোচনীয় অবস্থা প্রতিরোধের শক্তি খুঁজে পায়, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, বর্জিত, অচ্ছুত এবং ভাগ্যহতদের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সাথে আরও ভালভাবে লড়াই করার জন্য। জলবায়ু, শক্তি (Energy) এবং প্রাণ–প্রকৃতির সঙ্কট মূলধারার মধ্যে সমাধান করা হবে না কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি এবং সঙ্কটের দ্বারা সরাসরি হুমকির সম্মুখীন জনগণের মধ্যাকার সংঘর্ষের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

    ৮) পিপলস ইকোলজি হলো প্রাণ–প্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রাণ–প্রকৃতিবাদী আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্রোত। এটি মৌলিকভাবে অন্যান্য প্রবণতা থেকে নিজেকে আলাদা করে:

    পরিবেশবাদ– এই প্রবণতা পলিটিক্যাল ইকোলজিকে সঙ্কুচিত করে পরিবেশ রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু পলিটিক্যাল ইকোলজি হলো মানুষ, সমাজ এবং প্রকৃতির মধ্যকার সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগত পন্থা। একটি পরিবেশবাদ যা শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করে, প্রাণ–প্রকৃতির গোটা দিক থেকে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করার সময় NIMBY-টাইপ৩ কর্পোরেটবাদে পরিণত হয়।

    গভীর বাস্তুশাস্ত্র বা ডিপ ইকোলজি – মনুষ্যপ্রকৃতি বা মানবিকতা বিবর্জিত এই রূপটি সংরক্ষণবাদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা সর্বদা বাস্তুতন্ত্রের থেকে মানুষকে বাদ দিয়েছে। নরওয়ের দার্শনিক আর্নে নেস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই চিন্তাধারাটি প্রাণকেন্দ্রিকতার (biocentrism) উপর ভিত্তি করে, যা মনুষ্যপ্রকৃতি বিবর্জিত রূপে সঙ্কুচিত হয়। যদিও পিপলস ইকোলজি নৃ–কেন্দ্রিকতার (মানুষের কেন্দ্রীভূত জীবনব্যবস্থা) সমালোচনা করে, তবে এটিকে এমন একটি ইকোলজির সাথে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয় যা মানুষকে প্রকৃতির বাইরে রাখে।

    উদারনৈতিক বাস্তুশাস্ত্র, টেকসই উন্নয়ন, সবুজ অর্থনীতি এবং সর্বসাকুল্যে যারা ইকোলজিকে পুঁজিবাদকে সবুজ করার কর্তব্যপালনে রাখতে চান। উদারনৈতিক বাস্তুশাস্ত্র, যা দক্ষতাকে সম্মান করে ও প্রাণ–প্রকৃতির পণ্যায়নের উপর ভিত্তি করে। এটি বিশ্বাস করে যে প্রকৃতির একটি মূল্য (price) রয়েছে এবং এর অর্থনীতি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতাকে সমর্থন করা, যা এটিকে দুর্দমণীয় বলে মনে করে এবং কার্বন বাজারের মতো জুতসই প্রক্রিয়া গড়ে তোলে….

    পিপলস ইকোলজি– অবস্থা বদলের ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রের অনুসরণকারী, এই মৌলিক বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে সাম্যবস্থার উৎপাদন (de-growth), সামাজিক বাস্তুতন্ত্র, এবং প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের সমর্থকরা। অবস্থা বদলের এই ইকোলজি বিশ্বাস করে যে পুঁজিবাদকে সংস্কার করা যায় না। এটি সামাজিক অনুশীলন, মূর্ত সংগ্রাম এবং কোন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিস্তারের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে কাবু করার শর্ত তৈরি করে, যা বাজারের আইন বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাবর্গের আশ্রয় নেয় না।

    ৯) পিপলস ইকোলজি মানে ইকো–সোশ্যালিজম তথা প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্র নয়। এটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এবং ইকোলজির থিসিসের কপি–পেস্ট নয়। এটি উৎপাদনবাদী সমাজতন্ত্রের উত্তরসূরি নয় বরং এর বিকল্প হিসেবে বিদ্যমান। তথাকথিত “বৈজ্ঞানিক” সমাজতন্ত্র এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যে বুর্জোয়াদের দ্বারা কাঙ্খিত এবং সমর্থিত উত্পাদনশীল শক্তির বিকাশ আধুনিক শিল্প প্রলেতারিয়েত গঠনে সাহায্য করেছিল সেই শ্রেণী দ্বারা তার নিজস্ব উৎখাতের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    এই ধারণাটি অগ্রগতির মতাদর্শ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দেবত্ববাদ, পরিণতি নির্বিশেষে প্রযুক্তির বিকাশ, জাতি–রাষ্ট্রের ভূমিকাকে দেওয়া অসম গুরুত্ব এবং সমাজ পরিচয়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়েছিল। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদ কৃষক সম্প্রদায়, কারিগর এবং সাধারণ দোকানদারদের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং এটি শিল্প ও উৎপাদনবাদী বিপ্লবের বাইরে অন্য কোন উল্লেখ ছাড়াই লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে একটি শিল্পবাহিনীতে তালিকাভুক্ত করেছিল। উপনিবেশগুলিতে, এটি মানুষের জমির উপর ঘাঁটি গেড়ে পূর্বপুরুষের সভ্যতাগুলিকে আক্রমন করেছিল যেগুলি এটি আত্মীকরণ এবং সভ্যকরণের দাবি করেছিল….

    প্রযুক্তির সমালোচনা ইকো–সোশ্যালিজম এবং পিপলস ইকোলজির মধ্যে আরেকটি পার্থক্য। মার্কসবাদ মনে করে যে প্রযুক্তি হলো একটি পক্ষপাতশূন্য (নিরপেক্ষ) যন্ত্র যা শ্রমিক শ্রেণীর কাজে লাগানো যেতে পারে এবং সেই প্রযুক্তি সামাজিক রূপান্তর ও অগ্রগতির জন্য একটি নির্ণায়ক উপাদান।৪ এর বিপরীতে, পিপলস ইকোলজি বিবেচনা করে যে প্রযুক্তি আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে এবং পৃথিবী এবং মানবজাতিকে বিপন্ন করছে। তবুও, প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রের বুদ্ধিভিত্তিক ঝোঁক পিপলস ইকোলজির কাছাকাছি। মিলগুলি অসংখ্য, এবং তারা একই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসাবে একসাথে কাজ করতে পারে।

    ১০) পিপলস ইকোলজি উৎপাদনের স্থিতিবস্থা (ডি–গ্রোথ) সদৃশ নয়। এমনকি যদি সাম্যবস্থার উৎপাদনের নীতিগুলো সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়, তবুও পিপলস ইকোলজি এখনও লোকায়ত শ্রেণীর জন্য খাদ্য, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। এই অঞ্চলগুলিতে প্রয়োজনগুলি মেটানোর জন্য সামাজিক এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে প্রাণ–প্রকৃতির উন্নীতকরণের বিকাশসাধনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দক্ষিণে ও দরিদ্রতম দেশগুলিতে, এছাড়াও উদীয়মান এবং পশ্চিমা দেশগুলিতে, এটি খেসারতের নীতিতে পর্যবসিত হতে পারে (যেমন আর্থিক বা পরিবেশগত দায়ের জন্য ক্ষতিপূরণ)। লোকায়ত শ্রেণী যাদেরকে সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তারা কিছু এলাকার ব্যবহার এবং উৎপাদন বিকাশের মাধ্যমে একটি মদত পেতে পারে। যদি বাস্তুতান্ত্রিক পদাঙ্ক/পদচিহ্নের (ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট) পতন একটি নিরঙ্কুশ নিয়ম হতে হয়, তবে এটি লোকায়ত শ্রেণীর কাজে আসবে না। উৎপাদনের স্থিতিবস্থা মানে পিছু হটা নয়। বিপরীতে, এটিকে অবশ্যই পুঁজিবাদের পরিমাণগত বৃদ্ধি এবং এর সঞ্চয়ের যুক্তিকে গুণগত বৃদ্ধির যুক্তির সাথে প্রতিস্থাপন করতে হবে, যা প্রধানত প্রভাবশালী পুঁজিবাদী দেশগুলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণগত উৎপাদনের স্থিতিবস্থাকে বোঝায়।

    ১১) পিপলস ইকোলজি হলো মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র। এটি ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার দরিদ্রদের একটি ইকোলজি বা বাস্তুশাস্ত্র। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব হলেন চিকো মেন্ডেস, বন্দনা শিবা এবং কেন সারো–উইওয়া। এটি পানি, বায়ু ও মাটির পণ্যায়ণ নিষিদ্ধ করে মাতৃস্থানীয় ধরিত্রী (মাদার আর্থ) এবং দরিদ্রদের সংযোগ অটল রাখে। নিজেদের মুক্ত করে, দরিদ্ররা সমস্ত মনুষ্যপ্রকৃতিকে মুক্ত করে এবং গ্রহ এবং এর সমস্ত উপাদান সংরক্ষণ করে। মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র তথা প্রাণ–প্রকৃতির একটি মৌলিক নীতি রয়েছে যে পৃথিবীর মালিকানা নেই।

    মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র বেঁচে থাকার বাস্তুশাস্ত্র। এটি বসতি, স্বাস্থ্য এবং খাদ্যের অধিকারসহ ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় (Universal Declaration of Human Rights) নির্ধারিত অধিকারগুলিতে প্রবেশের দাবি করে।

    মুক্তির প্রাণ–প্রকৃতির একটি অন্তর্মুখ মাত্রা রয়েছে, যা খ্রিস্টীয় মুক্তির ধর্মতত্ত্ব এবং মাতৃস্থানীয় ধরিত্রীর ধারণার মধ্যে একটি পুনর্মিলনের মাধ্যমে বৈশিষ্ট্যযুক্ত, যা আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে এবং অন্যত্র কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে পাওয়া যায়।

    শিল্পী: আলেক্সিস রকম্যান

    ১২) পিপলস ইকোলজি হলো পরিবেশগত ন্যায়পরতার একটি ইকোলজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮০–এর দশকে স্পষ্ট হওয়া এই আন্দোলনটি পরিবেশগত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। পরিবেশগত সংকট ধনী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যতটা প্রভাব ফেলে, দরিদ্র এলাকাগুলিতে একইরূপ প্রভাব ফেলে না। একটি আঞ্চলিক এবং জাতিগত–সামাজিক বৈষম্য গঠনের জন্য পরিবেশগত বৈষম্য সামাজিক ও জাতিগত অসাম্যের সাথে একাকার হয়ে যায়। পিপলস ইকোলজি বৈষম্য বিরোধী। এই অর্থে মুক্তিপরায়ণ প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সক্রিয় কর্মী ও সংগঠক মারে বুকচিনের তাত্ত্বিক সামাজিক ইকোলজির সাথে এটির একটি গভীর সুসম্পর্ক রয়েছে।

    ১৩) পিপলস ইকোলজি হলো যৌথ বা সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনার ইকোলজি। কৃষক সম্প্রদায়ের একটি অর্জন হিসাবে যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থাপনার উদ্ভব, বিশেষত “দখলদারদের” বিরুদ্ধে লড়াই করে, এবং এটি আজ সামাজিক এবং পরিবেশগত সংগ্রামের ঝুঁকিতে রয়েছে। যখন কিনা এটি জীবনের পেটেন্টিং, জমির মালিকানা, সাইবারস্পেস আত্মসাৎ, সংস্কৃতির কর্পোরেট মালিকানা, কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামালের উপর নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে, তখনি সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনার জন্য সংগ্রাম জনগণের নতুন প্রাণ–প্রকৃতিগত সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ করে। সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা যৌথ পণ্য, সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তা এবং পূর্বপুরুষের দক্ষতা যেমন ফলিত বা প্রায়োগিক জানাশোনা তা পুনরুদ্ধার করছে, যা কর্পোরেট মালিকানাকে প্রতিহত করে।

    ১৪) পিপলস ইকোলজি হলো একটি আন্তর্জাতিক এবং পরিবর্তিত–বিশ্বায়ন ইকোলজি। এটি সংগঠিত সামাজিক শক্তির উপর নির্ভর করে যেমন কৃষক আন্দোলন (লা ভায়া ক্যাম্পেসিনা), বন উজাড় এবং বড়সব বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলন, অকেজো বড় প্রকল্প আরোপের বিরুদ্ধে আন্দোলন, টিকে থাকার জন্য আদিবাসীদের আন্দোলন, বিনামূল্যের সফ্টওয়্যার, এবং প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের (ইকো–ইউনিয়নিজম) জন্য আন্দোলন। এটি সামাজিক ফোরামে পরিবর্তিত–বিশ্বায়ন (অলটার গ্লোবালাইজিং) আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

    ১৫) প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের সাথে পিপলস ইকোলজির সাদৃশ্য রয়েছে। সামাজিক ও পরিবেশগত অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম পিপলস ইকোলজির অংশ। অ্যাসবেস্টস (সিলিকেট খনিজ), সীসা বিষক্রিয়া এবং বিষাক্ত পণ্যগুলির বিরুদ্ধে পেশাগত স্বাস্থ্যের জন্য সংগ্রাম একটি অপরিহার্য বিষয়। প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের মতো পিপলস ইকোলজি স্ব–ব্যবস্থাপনার পক্ষে। এটি একটি সংঘবদ্ধ এবং বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলির প্রত্যক্ষ পরিচালনার পক্ষে সমর্থন করে, এছাড়া ব্যবহারকারী–নাগরিক (user-citizen) উত্পাদন এবং পরিবেশের উপর নিয়ন্ত্রণও করে।

    ১৬) পিপলস ইকোলজি ইকো–ফেমিনিস্ট। পুরুষশাসিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নারীকে নিপীড়ন ও শোষণ করছে, যেমন তার জমি আছে। ইকো–ফেমিনিজম মনে করে যে পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জীবনের অখণ্ডতা রক্ষা করা একটি ঐক্যবদ্ধ লড়াই। শিল্পায়ন শুধু প্রকৃতিকে নয়, নারীদেহকেও পণ্যে পরিণত করেছে। মানুষকর্তৃক প্রকৃতির শাসন পুরুষকর্তৃক নারীর শাসনের সাথে অন্তর্নিহিতভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। নারী ও পুরুষের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করে মানুষ প্রকৃতির সাথে নতুন সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। ইকো–ফেমিনিজম এই নীতিগুলি সমর্থন করে যেমন: পারস্পরিকতা, পারস্পরিক সহায়তা, সংহতি, ভাগ করে নেওয়া, বিশ্বাস, অন্যদের জন্য যত্ন, ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমস্ত প্রাণ–প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

    ১৭) পিপলস ইকোলজি বিশ্বজনীন। মনুষ্যোচিত বহুত্ববাদের সংরক্ষণ গ্রহের প্রতিরক্ষার সংগ্রামে একটি অপরিহার্য উপাদান। ছয় হাজার মানুষ এই গ্রহটি রচনা করে, এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয় সংরক্ষণ করা প্রাণ–প্রকৃতিমূলক সংগ্রামের একটি অপরিহার্য উপাদান। ১৯৯০–এর দশকে আমেরিকান নব্য রক্ষণশীলদের দ্বারা সমর্থিত সভ্যতার যুদ্ধ নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যানকারী লোকদের বিরুদ্ধে বিশ্বায়িত বর্ণবাদের জন্ম দেয়। পিপলস ইকোলজি রাষ্ট্রীয় সীমাহীন (বর্ডারলেস) এবং বিশ্ব নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করে। বিশ্বজনীনতা একুশ শতকের জীবন দর্শন।

    পিপলস ইকোলজির পরিচালনাকৌশল

    ১৮) পিপলস ইকোলজি একটি নতুন হিস্টোরিক ব্লক বা ঐতিহাসিক জোট তৈরির জন্য লড়াই করে: সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার জন্য জোট। সংগ্রামটি শহুরে সংস্কৃতিবান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর নির্ভর করতে পারে না, তবে নয়া প্রলেতারিয়েত তথা সর্বহারা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারীদেরকে অবশ্যই একত্রিত করতে হবে: বুদ্ধিজীবী শ্রমিক, প্রিকারিয়েট (অনিশ্চিত অস্তিত্বধারী), শিল্প শ্রমিক শ্রেণীর অংশ, ক্ষুদ্র কর্মকর্তা এবং কৃষক–শ্রমিক। এই নতুন ঐতিহাসিক জোটে পিপলস ইকোলজির সহযোগী হলো সেই সমস্ত আন্দোলন যা সকলের অধিকার এবং প্রাণ–প্রকৃতিগত সাম্যের জন্য লড়াই করে। এই জোটটি যৌথ বা সমষ্টিগত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি জোট, যারা প্রাকৃতিক সাধারণ উপাদান (জল, মাটি, বায়ু) এবং মনুষ্যপ্রকৃতির টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে এবং যারা নতুন দখলদারদের বিরুদ্ধে অস্পৃশ্য সাধারণ বিষয়গুলোর (তথ্য, সংস্কৃতি, সাইবারস্পেস) জন্য লড়াই করছে। এই জোটটি সংখ্যাগরিষ্ঠ। শ্রমজীবী ​​মানুষের সুবিশাল অংশ সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাতে অভিগমনের জন্য একটি বিপ্লবের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়।

    ১৯) পিপলস ইকোলজি উন্নয়নের একটি বিকল্প ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে একটি প্রাণ–প্রকৃতিমূলক পরিবর্তন চায় যা মানুষের চাহিদা এবং গ্রহের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে। এটি উৎপাদনের সামাজিক উপযোগিতা, ভোগের উপায়, আমাদের পণ্যের উদ্দেশ্য এবং সেগুলি কীভাবে উত্পাদিত হয় তা পুনর্বিবেচনা করে। এটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পুনঃস্থানীয়করণ এবং অকেজো বা লুণ্ঠনমূলক কার্যকলাপের পরিবর্তন এবং সম্পদ ও কাজের পুনর্বন্টনের সমার্থক। উৎপাদনবাদী কৃষির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, এটি কৃষি–বাস্তুবিদ্যাকে তুলে ধরে এবং কৃষকদের পূর্বপুরুষের জ্ঞানকে সম্মান করে। অন্তর্বর্তীকালীন কার্যক্রম হলো:

    একটি জ্বালানি ও শিল্প নীতি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শক্তি সংরক্ষণ, পারমাণবিক শক্তির সমাপ্তি, জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রচলিত বা অপ্রয়োগসিদ্ধ উত্সের অশোষণ, এবং স্থানীয় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার

    জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এড়াতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য সম্পদ ভাগাভাগি করতে অর্থনীতির পুনঃস্থাপন। এটি একটি অনানুষ্ঠানিক স্থানীয় অর্থনীতি এবং একটি নতুন পুঁজিবাদ–উত্তর পারস্পরিক নির্ভরতার অর্থনীতিকে সমর্থন করে….

    পরিবেশগত সংকট কাটিয়ে সমাজের সহনশীল বিকাশের জন্য, আমাদের অবশ্যই সামর্থ্যের উপর তেল উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পূর্বজ্ঞান করার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে….[আমাদের অবশ্যই অগ্রগামী হতে হবে] বৈশ্বিক, মহাদেশীয়, জাতীয় এবং আঞ্চলিক জননীতিগুলি গণতান্ত্রিক পরিবেশগত পরিকল্পনা গ্রহণে সক্ষম করে; প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ পণ্য, এবং খাদ্যে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রামকে সমর্থন করে; এবং বেসরকারী খাত, একটি সামাজিক এবং পারস্পরিক নির্ভরতার অর্থনীতি এবং সরকারী পরিষেবাগুলিকে একত্রিত করে বহুমাত্রিক অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য স্থান তৈরি করে….

    ২০) পিপলস ইকোলজি রাজনীতির পেশাদারিকরণ এবং সামাজিক ও প্রাণ–প্রকৃতিমূলক মুক্তির সংগ্রাম থেকে এর বিচ্ছিন্নতাকে প্রত্যাখ্যান করে। লোকায়ত শ্রেণীর রাজনীতিতে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক সকলক্ষেত্রে তারা তাদের জীবন, তাদের কর্ম এবং তাদের পরিবেশের অবস্থার উপর সিদ্ধান্ত নিতে চায়। রাজনীতি প্রত্যেকের ক্ষেত্রে পেশা (business)। এটি শক্তিশালী যেখানে সামাজিক এবং পরিবেশগত আন্দোলন দেখা যায় এবং রুপান্তরের জন্য তাদের শক্তি প্রকাশ করে। তারা যেখানে নেই সেখানে এটি দুর্বল। পিপলস ইকোলজি একটি পার্টিতে বুঁদ হতে পারে না, যদিও এটি বিভিন্ন আন্দোলন, দল বা ফ্রন্টের একটি উপাদান হয়ে উঠতে পারে। পিপলস ইকোলজি লোকায়ত উদ্যোগ, স্ব–পরিচালিত সংগ্রাম, নিচ থেকে গণতন্ত্রের নির্মাণ এবং সামাজিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। সুতরাং এটি আদর্শবাদ–নির্ভর (ইউটোপিয়ান) এবং মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রের উৎসের দিকে ফিরে আসে, যা প্রাথমিকভাবে মুক্তিমুখীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, কারিগরি শিল্প এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ধ্বংস, শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে লোকায়ত শ্রেণীগুলোকে অপসারণ বা ক্ষমতাচ্যুতকরণ এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে তাদের দাসত্ব এসবের বিপরীতে একটি যৌথ, গতিশীল এবং সংহতিমূলক প্রতিক্রিয়া চেয়েছিল।

    পিপলস ইকোলজি অ্যামিয়েন্সের সনদ৫ [১৯০৬ সালের] সেকেলে বলে মনে করে। শ্রমিক ইউনিয়ন, সমিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ শিল্প বিপ্লব দ্বারা আরোপিত হয়েছিল। একইভাবে, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীভূত সংগঠন সেই সময়কার। আজ সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনগুলিকে অবশ্যই একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ–বিকশিত করতে হবে এবং সেটিকে গতিশীল করতে হবে। ভিন্নভাবে রাজনীতি করা মানে গণতন্ত্রকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুশীলন করা, সহযোগিতার তাগিদে বেতনভুক্ত পদের জন্য অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ত্যাগ করা। যাইহোক, এই ঐতিহাসিক করণীয়–এর মুখোমুখি হয়ে, পিপলস ইকোলজি বা জনস্বার্থে প্রাণ–প্রকৃতি আন্দোলন রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিস্তারের একটি ফোরাম, সংগ্রামে নিয়োজিত সামাজিক শক্তিকে একত্রিত করার ক্ষমতা এবং সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ এবং জননীতি হিসাবে তাদের প্রস্তাব রাখার ক্ষমতা ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। যে আন্দোলন এই ভূমিকা গ্রহণ করে তাকে অবশ্যই ভ্যানগার্ডের সেকেলে সাংগঠনিক প্যাটার্নকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, একটি পূর্ব–নির্ধারিত ব্যবস্থা হিসাবে আলাদা আলাদাভাবে বিকশিত একটি কর্মসূচিসহ। তাই এটিকে প্রাণ–প্রকৃতিমূলক আন্দোলনের মধ্যে একটি স্বাধীন প্রবণতা হিসাবে নিজেকে সংগঠিত করতে হবে।

    শিল্পী: আরতুরো এসেনশিয়ো

    একটি পলিটিক্যাল কোঅপারেটিভ (রাজনৈতিক সমবায়) গঠনের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা…পার্টি গঠনের বিষয়ে বায়না ছিল, যা ২১ শতকে অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে। যাদেরকে যোগ্য বলা হয় এবং যারা নয় তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক অভিনেতা/থিয়েটারকর্মী এবং ইউনিয়ন সংগ্রামীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, যা শিল্প বিপ্লবের রাজনীতির অন্তর্গত, যেখানে লোকায়ত শ্রেণীগুলি কাজ সম্পাদনে সংকুচিত হয়েছে। বস্তুত, সমগ্র দল এবং সমাজের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার জন্য, এটি একটি ছোট গোষ্ঠীর আধিপত্যকে খারিজ করেছিল, যা অন্যদের উপর আরোপিত হয়েছিল। এই ধরনের সংগঠনের প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হয়েছে। সোজাসুজিভাবে নেটওয়ার্কের সাবালকত্বের অভিমুখে উপযুক্ত একটি পার্টি ফর্ম উদ্ভাবন করা পিপলস ইকোলজির কাজ।

    ২১) পিপলস ইকোলজি গোষ্ঠীকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের বিন্যাসকে সমর্থন করে। শুধু স্বাধীন মত প্রকাশের ভিত্তিতে পিপলস ইকোলজি বিকল্প গড়ে তুলতে পারে না। সকল স্তরের মানুষের গভীর সম্পৃক্ততা ছাড়া গণতন্ত্র আজ অস্তিমান থাকতে পারে না; অন্যথায় এটি একটি প্রকৃত আদমশুমারি হয়ে যায়। মিডিয়া, বিজ্ঞাপনের অপপ্রচার এবং ভোটদানকে পুঁজি করে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কণ্ঠনিষ্পেষণ করা হয়েছে এবং এটি তার নিজস্ব শর্তে গণতান্ত্রিক বিতর্কের আয়োজন করে। যে নাগরিকরা রাজনীতি পুনরুদ্ধার করতে চান তাদের অবশ্যই নীচ থেকে তা করতে হবে, সামাজিক রূপান্তরে নিযুক্ত স্থানীয় সম্প্রদায়গুলির দ্বারা তৈরি ক্রান্তিকালীন উদ্যোগগুলিকে ফেডারেশনের মাধ্যমে শুরু করে এবং পিপলস ইকোলজির মূল্যবোধগুলি গ্রহণ করে, যেমন: স্বশাসন, সমতা, মর্যাদা এবং পারস্পরিক সহায়তা।

    পিপলস ইকোলজি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের তালাস করতে চায় না কিন্তু সমাজকে নীচে থেকে পরিবর্তন করতে চায় যখন একই সাথে প্রবর্তন, প্রতিরোধ এবং সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার পথ ব্যবহার করে। এই কৌশলটি দ্বারা নিচ থেকে স্বশাসনের অনুশীলন বোঝায়, যা ফেডারেল এবং স্ব–ব্যবস্থাপনা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি আজও সামাজিক আন্দোলনে অব্যাহত রয়েছে যা রাষ্ট্রীয় শক্তিকে সম্মুখভাবে আক্রমণ না করে স্থানগুলিকে মুক্ত করতে চায়। এটি রাষ্ট্রের প্রশ্নটিকে তার চিন্তাভাবনা থেকে বাদ দেয় না, তবে এটি বিবেচনা করে যে উত্তরণঅবস্থাটি স্ব–শাসনের একটি ব্যবস্থার জন্ম দেবে যেখানে নাগরিকরা পৌরসভা, অঞ্চল এবং কোম্পানিগুলিতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবে। রাজনৈতিক সংগঠনকে অবশ্যই এই স্ব–শাসনের অনুশীলনগুলি বাস্তবায়নে এবং তাদেরকে আগের অবস্থায় রাখা ছাড়াই সাহায্য করতে হবে।

    গোষ্ঠীকেন্দ্রিক গণতন্ত্র সর্বস্তরে একটি ফেডারেশনমূলক (ফেডারেটিভ) প্রজাতন্ত্র গঠনের পূর্ব–ধারনা করে। ফেডারেলিস্ট নীতি ইউরোপীয় মহাদেশ বা বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রযোজ্য হবে না যদি না এটি জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রযোজ্য হয়।

    রাজনৈতিক জোটের বিষয়ে, পিপলস ইকোলজি মনে করে যে সামাজিক রূপান্তরের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জোটের অংশগ্রহণ হলো পরিবেশবিদদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার উপায়। পরন্ত যে দেশে সামাজিক উদারতাবাদ সামাজিক গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করেছে, তা সমাজ বিরোধীতা এবং পরিবেশ বিরোধীতার দলভুক্ত হয়। সামাজিক উদারনৈতিক সরকারের অংশগ্রহণ পিপলস ইকোলজিকে কোনঠাসা করে এবং এটিকে সবুজ পুঁজিবাদের এজেন্ট করে তোলে। আমাদের অবশ্যই একটি সামাজিক এবং পরিবেশগত বিরোধী দল গঠনে অংশগ্রহণ করতে হবে, সমস্ত স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং ইউরোপীয় নির্বাচনে পরিবেশবিদদের উপস্থিতি জোরদার করতে হবে যেখানে স্বায়ত্তশাসন তৈরি করা যেতে পারে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে, কিন্তু সামাজিক–উদারনৈতিক সরকারগুলোতে অংশগ্রহণ প্রত্যাখান করতে হবে যেটি পুঁজিবাদী আধুনিকতার সবথেকে কার্যকর উপকরণ।

    অনুবাদকের টীকা:

    ১) ভিয়া ক্যাম্পেসিনা: লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা হলো একটি আন্তর্জাতিক কৃষক সংগঠন যা ১৯৯৩ সালে বেলজিয়ামের মন্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা ৮১ টি দেশে ১৮২টি সংস্থা দ্বারা গঠিত। যা এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং ইউরোপের ক্ষুদ্র ও মধ্যম মানের উৎপাদক, কৃষি শ্রমিক, গ্রামীণ নারী এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের কৃষক সংগঠনগুলির সমন্বয় সাধন করে। ভায়া ক্যাম্পেসিনা পরিবার–খামার–ভিত্তিক টেকসই কৃষির পক্ষে কাজ করে, এবং সেই দলটি “খাদ্য সার্বভৌমত্ব” শব্দটি সামনে এনেছিল। লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা কৃষকদের বীজের অধিকার রক্ষায়, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে, কৃষি সংস্কারের জন্য এবং সাধারণত কৃষকদের অধিকারের জন্য প্রচারণা চালায়।

    ২) ফোর্ডিজম: ফোর্ডিজম হলো বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হেনরি ফোর্ড দ্বারা পরিচালিত বৃহৎ আকারের উৎপাদন পদ্ধতি। এটি ব্যাপক উৎপাদন ও ভোগের আধুনিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার বর্ণনা দেয়।

    ৩) NIMBY- NIMBY, “not in my back yard” শব্দগুচ্ছের সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রচলিত অর্থে নিম্বি হলো বাসিন্দাদের কর্তৃক তাদের স্থানীয় এলাকায় প্রস্তাবিত উন্নয়নের বিরোধিতার বৈশিষ্ট্য, সেইসাথে কঠোর ভূমি ব্যবহার বিধিগুলির সমর্থনকারী। সেঅর্থে এটি এই অর্থ বহন করে যে এই ধরনের বাসিন্দারা শুধুমাত্র উন্নয়নের বিরোধিতা করছে কারণ এটি তাদের কাছাকাছি এবং যদি এটি দূরে নির্মিত হয় তবে তারা এটি সহ্য করবে বা সমর্থন করবে। বাসিন্দাদের প্রায়ই নিম্বি বলা হয়, এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় নিম্বিজম।

    ৪) কার্ল মার্কস তার কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার (রচনাকাল: নভেম্বর, ১৮৪৭–জানুয়ারি ১৮৪৮)–এর ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বলছেন, “গত ২৫ বছরে আধুনিক যন্ত্রপাতি যে বিপুল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে, তাতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার ফলে….কিছু ব্যাপার সেকেলে হয়ে পড়েছে।” দ্য ক্যাপিটাল –এর তৃতীয় খণ্ড (রচনাকাল: ১৮৬৩–১৮৮৩) লিখতে গিয়ে মার্কস বলছেন, “বিশ্ব পরিবেশের ক্ষতিসাধন–সমস্যার একমাত্র প্রকৃত অর্থাৎ টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে “যৌথ উৎপাদকের” সেই সমাজব্যবস্থায় যেখানে উৎপাদকেরা মানুষের বিপাক ক্রিয়াকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্তিশীল পন্থায় পরিচালিত করতে পারবে; প্রাকৃতিক শক্তিকে কেবল এক অন্ধ শক্তি রূপে কর্তৃত্ব করতে না দিয়ে, এক যৌথ বা সমষ্টিগত নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসবে। এর ফলে ন্যুনতম পরিমাণ শক্তি ব্যয়িত হবে এবং এমনভাবে ব্যবহৃত হবে যা মানবপ্রকৃতির যোগ্য ও উপযুক্ত।”

    ৫) অ্যামিয়েন্স সনদ: অ্যামিয়েন্সের সনদ (ফরাসি: Charte d’Amiens) ফরাসি ট্রেড–ইউনিয়নের নবম কংগ্রেসে গৃহীত হয়েছিল, যা ১৯০৬ সালের অক্টোবরে অ্যামিয়েন্সে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রধান প্রস্তাব ছিল ইউনিয়ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিচ্ছেদ। কনফেডারেশনে তখন অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিস্টদের (অরাজক শ্রমিকতন্ত্রী) আধিপত্য ছিল যারা নির্বাচনী পথের মধ্য দিয়ে মধ্যপন্থী সংস্কারের পরিবর্তে শ্রমিক ইউনিয়নগুলির বিস্তৃতির মাধ্যমে একটি বিকল্প ব্যবস্থার সংবিধানকে পছন্দ করেছিল।

  • বাকস্বাধীনতার ফজিলত ও বাংলাদেশের হালচাল

    বাকস্বাধীনতার ফজিলত ও বাংলাদেশের হালচাল

    • সহুল আহমদ

    বাকস্বাধীনতা মানে যে কোন বাক্যের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একটি ব্যবস্থাই নেয়া যেতে পারে: আরেকটা বাক্য, লাগলে আরো একশ-হাজার বাক্য। বাকস্বাধীনতা মানে মানুষের লিখিত বা উচ্চারিত কোন বাক্যের বিরুদ্ধেই বাক্য ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাক্যের বিরুদ্ধে বাক্য ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম ফ্যাসিবাদ।

    – বখতিয়ার আহমেদ, ফেসবুক, ১৬ জুন ২০২০

     

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বেহাল দশার খবর বহু আগেই দুনিয়াজুড়ে রটে গিয়েছে, করোনাকালে এর এক তীব্র রূপ আমরা প্রত্যক্ষ্য করেছি এবং কার্যত এখনো করছি। তবুও এখানে বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কে নানাবিধ সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। যেমন, বাক স্বাধীনতা পেলে মানুষ গালাগালি করবে, অশালীন বক্তব্য দিবে। বাকস্বাধীনতা থাকলে ইতিহাস বিকৃতি করবে। ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’দের জন্য দরকার ‘সীমিত ও শর্তায়িত’ বাক ও মতের স্বাধীনতা। ফলে অনেকেই ‘শালীন’ ও ‘সংযত’ ভাষা ব্যবহারের নীতিমালাও দেখিয়ে থাকেন। এই প্রবণতা এতই প্রবল যে, রাষ্ট্রের সবচাইতে ‘মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ স্থান হওয়ার কথা যে বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলের তাতেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। এই স্বাধীনতাকে খর্ব করার যত আইন করা হয় তার কারণ হিসেবে জনপ্রিয় চালু-মত হচ্ছে, মানুষ মূলত খারাপ, অফুরন্ত স্বাধীনতা পেলে সে যা ইচ্ছা তাই করবে। কিন্তু বাস্তবে ইতিহাস আমাদেরকে দেখায় যে, এমন আইন কেবল তাদের উপর প্রয়োগ করা হয় যারা মূলত বিভিন্নভাবে (লেখা-গান-কবিতা-ছবি-ব্যঙ্গোক্তি-কৌতুক ইত্যাদি) ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

    এমন পরিস্থিতিতে আলোচ্য প্রবন্ধে বাকস্বাধীনতার দুয়েকটা ফজিলত তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। তবে শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আলোচ্য ‘ফজিলত’গুলো মোটেও নতুন কোনো বিষয় নয়, বহুদিন-বহুবছর যাবত চিন্তার বাজারে চালু থাকা মত। সম্ভবত জনপ্রিয়ও বটে। বাংলাদেশের বিদ্যমান নাজুক আবহাওয়াই এমন চালু মতকে হাজির করতে প্রণোদনা দিচ্ছে।

    অন লিবার্টি: একটি ধ্রুপদী পাঠ

    বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কিত আলাপে সবচেয়ে ধ্রুপদী রচনা হচ্ছে স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’।১ কথা বলা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে লিখিত এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে।  ধ্রুপসী পাঠ হিসেবে তা এখনো কেবল স্মরণীয়ই নয়, কার্যত বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার যে কোনো আলাপে-তর্কে মিলের সেই পাঠ এখনো হাজিরা দেয়। মিল উপযোগবাদী, ফলে তিনি যখন কথা বলার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তখনও মূল জিজ্ঞাসা ছিল এর উপযোগিতা কি? কেন কথা বলার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার দরকার? মত প্রকাশে বাধা দিলে, তা রাষ্ট্র কর্তৃক হোক বা সমাজ কর্তৃকই হোক, এতে ক্ষতি কি?

    বাকস্বাধীনতা প্রশ্নে মিলের চিন্তার একেবারে দুটো গোড়ার জায়গা আছে। প্রথমত, সত্য জানা লাগবে, এবং দ্বিতীয়ত, সত্য সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত না। শতভাগ অভ্রান্ততা কেউ দিতে পারবেন না, এমনকি যিনি শতভাগ নিশ্চয়তার দাবি করেন তিনি সেটা নাও হতে পারেন। মিল স্থান কালের বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিগত কালের অনেক ‘অভ্রান্ত’ সত্য বলে প্রতীয়মান কথা এইকালে এসে স্রেফ উড়ে গিয়েছে। এর ভ্রান্ততা নিয়ে এখন আর কেউ কোনো কথাই বলেন না। স্থানের বেলাতেও একই; কপালের ফেরে আরবদেশে জন্ম নেয়া ব্যক্তি আল্লা নিয়ে যে ‘অভ্রান্ত’ ধারণা, চীন দেশে জন্ম নেয়া কনফুসিয়াসবাদী ব্যক্তির সেটা আলাদা। ফলে, শতভাগ সত্যবচন বলে কিছু নেই, আজ যিনি দাবি করছেন তার বচন অভ্রান্ত, কয়েকযুগ পর সেটা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে। এটাই ইতিহাসপ্রাপ্ত শিক্ষা।

    মিলের কাছে ‘সত্য’ জানা জরুরি, এই জরুরতের কারণে তিনি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। স্বাধীনতা পেয়ে সত্য-মিথ্যা দুটোই মানুষ বলতে পারে। সত্য বা মিথ্যে দুটো বলার স্বাধীনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বাধীনতা যদি না থাকে তাহলে দুটো ঘটনা ঘটতে পারে। এক, যে আলাপটাকে রুদ্ধ করা হচ্ছে সেই আলাপ যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমরা খোদ সত্য থেকেই বঞ্চিত হবো। দুই, আলাপটা যদি মিথ্যে হয়ে থাকে তাহলে এই মিথ্যের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সত্যের আরো স্পষ্ট ও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হবে। ফলে দুটোই মিলের কাছে সমান জরুরি। সত্য হোক মিথ্যে হোক কোনো অবস্থাকেই বাকস্বাধীনতাকে বাধা দেয়া চলবে না। বাধা দিলে দিনশেষে ‘সত্য’প্রাপ্তি থেকেই আমরা বঞ্চিত হবো। ফলে মিল বলেন, যদি একজন ব্যতীত দুনিয়ার সকল মানুষও একটা মতের দিকে যান, তাহলে এই একজনের যেমন অন্যদের মতকে দমন করার এখতিয়ার নেই, তেমনি বাকিসকলের এখতিয়ার নেই সেই একজনের মতকে দমন করার।

    অন লিবার্টি গ্রন্থের ১৮৫৯ সালের প্রথম সংস্করণ

    মিলের যুক্তি হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা চিন্তার আদান-প্রদানের বাজার যদি মুক্ত-স্বাধীন হয়ে থাকে তাহলে এটি যে কোনো বিষয়ে সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ ফল এনে দিতে পারে। ভুল-ত্রুটিকে কমিয়ে ‘সঠিক’ পথ বাতলাতে সাহায্য করবে। এমন জীবন্ত আলাপ-আলোচনার পরিসর বজায় রাখার পক্ষে এবং যে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করার পিছনে মিলের চারটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, নিষিদ্ধ মতটি সত্য হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এমনকি যদি সেই মতটি মিথ্যেও হয়ে থাকে, এতে কিছুটা সত্য থাকতেও পারে। তৃতীয়ত, যদি একেবারেই মিথ্যে হয়ে থাকে, তবুও এই নিষিদ্ধ মতটি সত্যকে ‘ডগমা’ হয়ে উঠা থেকে বিরত রাখতে পারবে। এবং চতুর্থত, ডগমা হিসেবে যে কোনো ‘আনচ্যলেঞ্জড’ মত তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। মিল বলেন, এমনকি আমি যদি আমার মতের সত্যতা বা সঠিকতা নিয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসীও থাকি এবং পুরদোমে বিশ্বাস করি যে এটাই ঠিক, তবু এটা স্বাধীনভাবে খোলা ময়দানে আলোচিত না হলে দিনশেষে একটা মৃত মতবাদ বা ডগমাতেই পর্যবসিত হবে। যে কোনো মত যদি নিয়মিত প্রশ্ন ও তর্কের সম্মুখীন না হয় তাহলে মিলের কথা অনুযায়ী সেটা তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ মতেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাবে, যা কিনা মানবজাতির জন্যই হুমকিস্বরূপ।

    স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের বহু সমালোচনাও আছে, বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদের সমর্থক হিসেবে। আমরা সেদিকে যাবো না। আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনার খাতিরে ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলাপেই সীমাবদ্ধ থাকবো। মিলের উপরোক্ত আলোচনা সংক্রান্ত একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৯৪ সালে হলোকাস্ট গবেষক ও ইতিহাসবিদ দেবোরা লিপস্টাড তাঁর বইতে আরেক ইতিহাসবিদ ডেভিড আরভিংকে ‘হলোকাস্ট অস্বীকারকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আরভিং মানহানির মামলা করলে লিপস্টাডকে প্রমাণ করতে হয় যে তাঁর বক্তব্য সঠিক। মানে, আরভিং হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের বহু সাক্ষ্য-প্রমাণাদি দিয়ে লিপস্টাড প্রমাণ করেন যে, আরভিং ইতিহাস বিকৃতি করেছেন। এখানে, আরভিং একাডেমিক পদ্ধতিতে লিপস্টাডের সাথে তর্ক-বিতর্ক না করে সরাসরি আইনের আশ্রয় নেন তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য। এই মামলার একটা বড় পার্শ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলা হয়, হলোকাস্ট গবেষকরা তাদের গবেষণা আরো বিস্তৃত করেছিলেন, যেটা অনেকক্ষেত্রে পূর্বে হয়নি। আবার, উল্টো আরেকটি ঘটনা ঘটে। অস্ট্রিয়াতে হলোকাস্ট ডিনায়েল আইন আছে। ফলে ২০০৬ সালে যখন আরভিং ভিয়েনা যান তখন সেই আইনের অধীনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় আরভিং নিজেকে একধরনের ‘বাকস্বাধীনতার শহিদ’ হিসেবে হাজির করেন। এই দুটো ঘটনাই মিলের উপরোক্ত যুক্তির একটা বাস্তবতা হাজির করে। আরভিং এর বক্তব্য নির্জলা মিথ্যে হওয়া সত্ত্বেও লন্ডনের খোলামেলা তর্কবিতর্ক ‘সত্য’ উদঘাটন করতে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার আইন তাকে এক ধরনের নায়করূপ দেয়।২

    বাকস্বাধীনতা, নাকি রাষ্ট্রের হাতে ‘সত্য-মিথ্যা’ নির্ধারণের ভার 

    ১৯৭৮-১৯৭৯ এর দিকে রবার্ট ফুরিসন নামক এক ফরাসী অধ্যাপক তাঁর লেখায় এবং টিভি সাক্ষাতকারে হলোকাস্ট অস্বীকার করেন, বিশেষ করে নাৎসী বাহিনীর গ্যাস চেম্বারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তিনি কয়েক স্থানে আক্রমণেরও শিকার হোন। তখন নোয়াম চমস্কি সহ প্রায় ৬০০ জন বুদ্ধিজীবী একটি খোলা চিঠিতে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তারা ফুরিসনের বাকস্বাধীনতার এবং মত প্রকাশের অধিকার পক্ষে দাড়ান, এবং তাকে নিরব করিয়ে দেয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ জানান। এই খোলা চিঠি ফ্রান্সে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করে। তখন অনেকের অনুরোধে চমস্কি আরেকটি নিবন্ধ লিখেন, যেখানে বাকস্বাধীনতা নিয়ে একেবারে ‘এলিমেন্টারি’ কিছু কথাবার্তা বলেন। যে কেউ চাইলে তাঁর এই নিবন্ধ ব্যবহার করতে পারবেন, এই অনুমতি চমস্কি দেন।

    ১৯৮০ সালের দিকে যখন ফুরিসনের এই সংক্রান্ত বই প্রকাশিত হয় তখন চমস্কি লিখিত এই নিবন্ধ ‘মুখবন্ধ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু চমস্কি এটা জানতেন না। পরে জানার পর তিনি এটা সরানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কেননা এতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে যায়, বই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চমস্কি বলেছিলেন, লেখা সরানোর অনুরোধ করাটা তার ঠিক হয় নি।

    এই ঘটনার পর চমস্কিকে ঘিরে আরো বেশি বিতর্কের ঢেউ উঠে। চমস্কির বিভিন্ন সেমিনার-বক্তৃতায় ঘুরেফিরে এই প্রসঙ্গ হাজির হতো, দর্শক-শ্রোতার কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। আগ্রহী পাঠক চমস্কি ও ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন। চমস্কিও বিভিন্ন সময়ে এই ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, মন্তব্য করেছেন।

    চমস্কির অবস্থান কি ছিল? চমস্কির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, হলোকাস্ট অস্বীকারকারীকে সমর্থন করার মাধ্যমে তিনিও হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। চমস্কি তার বিভিন্ন লেখা বা বক্তৃতায় দুটো বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। প্রথমত, কারো বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো মানে তার মতের পক্ষে দাঁড়ানো না, বা তার মতকে সমর্থন করাও না। আমি কারো মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিলাম, তার মানে এই নয় যে, আমি তার মতকে সমর্থন করি। তার প্রকাশিত মতকে সমর্থন না করেও আমি তার মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ জারি রাখতে পারি। রোজা লুক্সেমবার্গ যেমন করে বলেছিলেন, বাকস্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে আসলে ভিন্নমতাবলম্বীর বাকস্বাধীনতা।

    চমস্কি যে কেবল এই প্রথম এমন ‘বিতর্কিত’ অবস্থান নিয়েছেন, তা না। তিনি এর পূর্বে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধীদের একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণা করার স্বাধীনতা, সেই গবেষনার ফল প্রকাশ করার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থানকে অনেকেই ‘absolutist’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু, চমস্কি তার এই অবস্থান থেকে কখনোই সরে দাড়ান নি। হাল আমলে ক্যান্সেল কালচার নিয়ে চমস্কির অবস্থানও সমান বিতর্কের মধ্যে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে, বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থান মোটেও নতুন কিছু নয়। চমস্কির বারবার ভলতেয়ারকে উদ্ধৃত করেছেন, আমি তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জান দিতে পারি।

    দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, চমস্কি ফুরিসনের ঘটনাকে দেখছেন ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হিসেবে। তার মতে, বোধহয় এই প্রথম পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্ট্যালিনবাদী ও নাৎসীবাদী মতাদর্শ মেনে নিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রই ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করে দিবে এবং এর থেকে বিচ্যুতি ঘটলে শাস্তি দিবে, এই আদর্শ মেনে নিল। তিনি বলেন, হলোকাস্টের শহিদদের আত্মার প্রতি সবচেয়ে বড়ো বেইমানি হচ্ছে এটাই যে, তাদের খুনীদের মতাদর্শকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।৩

    উন্নয়নেও বাকস্বাধীনতা

    উন্নয়ন প্রশ্নটা আমাদের রাষ্ট্রে খুবই জরুরি ‘প্রসঙ্গ’; এতই জরুরি যে, যে রাষ্ট্র ক্রমাগত গণআন্দোলন ও জনযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে, যে রাষ্ট্রের জন্ম প্রক্রিয়াতে ‘গণতন্ত্র’ সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ও স্পষ্ট ছিল, সেই রাষ্ট্রে হঠাৎ করে খোদ ‘গণতন্ত্র’ই উন্নয়নের জন্য ‘উটকো ঝামেলা’ হিসেবে হাজির হয়েছে। তাই, ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ এমন ডিসকোর্স শক্তিশালী হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু, যুক্তির খাতিরে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও এই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যাবশ্যকীয়; এটা আমার কথা নয়, অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের কথা।৪ উল্লেখ্য, অর্মত্য সেন যে জরুরি কাজটা করেছেন সেটা হচ্ছে, ‘উন্নয়ন’ নামক ধারণার সঙ্গে নীতি/ন্যায়ের একটা সম্পর্ক, তথা উন্নয়ের একটি ‘নৈতিক’ আবেদন তৈরি করেছিলেন।   

    উনিশ শতকে দুনিয়াজুড়ে খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল কোন কোন দেশ ‘গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত’ আর কোন কোন দেশ অনপযুক্ত তা নিয়ে আলাপ করা। এই বিশ শতকে এসে দেখা গেলো, খোদ এই প্রশ্নটাই সমস্যা-জর্জরিত, এবং ভুল। জনগণ গণতন্ত্রের জন্য ‘ফিট’ কি না এটা কোনো প্রশ্নই হতে পারে না, বরঞ্চ গণতন্ত্রের মাধ্যমেই জনগণকে ‘ফিট’ করে তুলতে হয়। ফলে, অর্মত্য সেনের কাছে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বোধের সার্বজনীনতা সাম্প্রতিক প্রপঞ্চ। তার মূল জিজ্ঞাসা হচ্ছে এই গণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতার বোধ কীভাবে উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে?

    ২০০১ সালে অর্মত্য সেন এক বক্তৃতায় মিডিয়া কেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন। নির্দিষ্টভাবে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করলেও আমরা এটাকে সার্বিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে পাঠ করতে পারি।

    অর্মত্য সেন শুরুতে বলে নেন যে, বাক-স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে মানব স্বাধীনতারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই যে অপরের সাথে কথা বলতে পারা, অপরের কথা শুনতে পারার সক্ষমতা, এটি হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের মূল্যবান হওয়ার কেন্দ্রীয় কারণ। যেমন করে মনিষী এরিস্টটল বলে গিয়েছিলেন, আমরা সামাজিকভাবে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল বা ইন্টারেক্টিভ প্রাণী; জীবনের পূর্ণতার জন্যই ঘর ও বাইরের মানুষদের সাথে পারষ্পরিক সহযোগীতা, আলাপ-আলোচনা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কথা বলা তাই মানব জীবনেরই একটা অংশ, এবং বাক-স্বাধীনতা তাই মানব স্বাধীনতারই একটি মৌলিক অঙ্গ।

    অর্মত্য সেনের মতে, উন্নয়নের জন্য চারটি কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কারণ হচ্ছে কথা বলা এবং যোগাযোগের সহজাত গুণের সাথে এই স্বাধীনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উন্নয়নকে কেবল জিডপি বা জিএনপি ইত্যাদি দিয়ে মাপা যাবে না, বরং দেখতে হবে দায়িত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সেটা করার স্বাধীনতা তার আছে কি না। উন্নয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটার উপকারিতা নির্ভর করে উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার হালচালের উপর। তার কাছে স্বাধীনতা উন্নয়নের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত বা বাকস্বাধীনতার দমন সরাসরি মানব স্বাধীনতাকেই হ্রাস করে, এবং উন্নয়নকেই দুর্বল করে দেয়।

    দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম তথ্যের যোগান দেয়, যা সমাজে বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা ছড়িয়ে দিতে এবং পর্যালোচনামূলক কাজকারবারে উৎসাহ দেয়। তার মতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষাকবচ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তাতেও ভূমিকা রাখে। অর্মত্য সেন ব্যাখ্যা দিয়ে দেখান যে, ১৯৫৮-৬১ সালের চীনের দূর্ভিক্ষের একটা বড়ো কারণ ছিল সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকা। সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীন ভাবে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে হয়তোবা এই দুর্ভিক্ষ এড়ানো যেতো। তিনি বলেন, কর্তৃত্বমূলক সরকারব্যবস্থা সেন্সরশিপের কারণে যে বিরাটসংখ্যক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তা আসলে খোদ সেই সরকারকেই দিনশেষে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না থাকলে কেবল জনগণই অন্ধকারে থাকে না, খোদ সরকারও অন্ধকারে থাকে।

    ছবি: মিডিয়া কনট্রোল
    শিল্পী: আলফ্রেডো গারজন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তৃতীয় কারণটা হচ্ছে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের ‘প্রটেক্টিভ’ ভূমিকা’; সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জনগোষ্ঠীর অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং সুবিধাবঞ্চিত অংশের জবান উঠে আসতে পারে, যা সামাজিক নিরাপত্তাকেই মজবুত করে। বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের ইতিহাস থেকে অর্মত্য সেন দেখিয়েছেন, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে দুর্ভিক্ষের আশংকা বেড়ে যায়। কারণ, সেন্সরশিপ একদিকে সঠিক তথ্য তুলে আনতে বাধা প্রদান করে, অন্যদিকে সরকারি সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে আলাপ-আলোচনাও রুদ্ধ করে দেয়।

    অর্মত্য সেনের কাছে চতুর্থ কারণ হচ্ছে এর ‘গঠনমূলক’ ভূমিকা; মুক্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক সমাজে বিভিন ধ্যান-ধারণার উদ্ভব ঘটাতে, মূল্যবোধ গঠনে এবং জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার সহজলভ্য হয়। কোথায় কোথায় আমাদের অভাব রয়েছে, আমাদের অসুবিধে রয়েছে, এর থেকে উত্তরণের উপায় কি, এসব নিয়ে বোঝাপড়া তৈরির জন্য আলাপ-আলোচনার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা জরুরি।

    বাকস্বাধীনতা: এশীয় মূল্যবোধ?

    মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ‘এশীয় মূল্যবোধ’ বা Asian Values এর দোহাই দিয়ে অনেকেই মানবাধিকারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ করেন; বিভিন্নভাবে বলা হয় মানবাধিকার, বিশেষত মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার প্রতি এশীয়মূল্যবোধ সমর্থন জোগায় না।

    এশীয় মূল্যবোধগুলো কি? সামষ্টিকতা বা কালেক্টিভিজম, আদর্শ মেনে চলা, আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক স্বীকৃতির জন্য অর্জন, নম্রতা, পিতারমাতার প্রতি ভক্তি, কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি। যেমন, ‘ব্যক্তির মঙ্গলের চেয়ে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে’, ‘কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো’, ‘যাই ঘটুক না কেন, একজন পুত্র বা কন্যা হিসেবে পিতা-মাতার কথা অবশ্যই মানতে হবে’ ইত্যাদি বহু বিবৃতি এশীয়মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

    মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ব্যাপারে এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে দুইভাবে সমালোচনা হতে থাকে। একপক্ষ দাবি করেন যে, এগুলো এশীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় অথবা এর সঙ্গে মাননসই নয়। এশীয় সংস্কৃতিতে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হলো পরিবার, ব্যক্তি নয়। দ্বিতীয় পক্ষের সমালোচনা অন্যরকম, তারা দাবি করেন, এশীয়সংস্কৃতি মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের জন্য এখনো ‘প্রস্তুত’ নয়। এখানে উন্নয়ন আগে ঘটাতে হবে; অর্থনৈতিক উন্নয়নের অধিকার মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও প্রায় সমান গুরুত্বই বহন করে।

    এসবের বিপরীতেও প্রচুর যুক্তি দেয়া হয়েছে। এশিয়া কোনো সমগোত্রীয় ভৌগলিক সত্তা নয়। ফলে পুরো অঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধের সুতোয় বাঁধা যাবে না। ‘এশীয় মূল্যবোধ’ তত্ত্ব বহনকারীদের বিপক্ষে আরেকটা ‘রাজনৈতিক’ যুক্তিও হাজির করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণেই এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দেয়া হচ্ছে; মূলত স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা দেয়ার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, এশীয় মূল্যবোধ গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক তো নয়ই, বরঞ্চ পরিপূরক।

    সময় পাল্টেছে, এখন মত প্রকাশের একটা বড়ো ময়দান হচ্ছে ইন্টারনেট। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন আরও বৃদ্ধি করে। ইন্টারনেটের ব্যবহার গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে। তো, এই সময়ে (মানে ইন্টারনেটের জমানায়) এসে প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ পর্যায়ে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে এশীয় মূল্যবোধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ফেই শেন ও লুকমান সুই তাদের গবেষণা চালান।৫ এগারোটা দেশে (উল্লেখ্য এখানে বাংলাদেশ নেই, ভারত-পাকিস্তান আছে) ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়। তিনটা দিক থেকে তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পরিমাপ করেছেন: ব্যক্তিগত বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা।

    ফেই শেন ও লোকমান সুই যে তথ্য-উপাত্ত পান তাতে দেখা যায়, বেশির ভাগ এশীয় দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাক ও ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা চেয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমের প্রশ্নে বৈচিত্রপূর্ণ মতামত পাওয়া গিয়েছে। তবে, সব বিষয়ে পাকিস্তান সম্পূর্ণ চিত্র থেকে আলাদা থেকেছে। গবেষকদ্বয় তাদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন, সামাজিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রায় এশীয় মূল্যবোধ থাকার সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি কম সমর্থনের কোনো প্রমাণ নেই। ব্যক্তি পর্যায়েও দেখা যায়, এশীয় মূল্যবোধের সাথে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কোনো নেতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

    তার মানে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌছাচ্ছেন, এশীয় মূল্যবোধ থাকা মানেই এই নয় যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কম থাকবে। তাদের ভাষায়, ‘এশীয় মূল্যবোধ থিসিসকে বাতিল করে দেয়ার মতো যত প্রমাণ পাই, তার সমর্থনে তত প্রমাণ পাইনি।’ যদিও তারা যে কয়টা এশীয়মূল্যবোধের মাত্রা ব্যবহার করেছেন তার দুইটার সাথে (আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য) মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও বাকিগুলোর সাথে এই সম্পর্ক ইতিবাচক। বলছেন, ‘কিছু এশীয় মূল্যবোধ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থনকে দমন করে; কিন্তু অন্যান্য এশীয় মূল্যবোধ বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনের সমতুল্য’।

    তাদের ফলাফলে আরো দেখা যায় যে, ইন্টারনেটের ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়াটা একটি মুক্তিকামী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করে। যেসব মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তারা মুক্তবাকের প্রতি বেশি ঝোঁকে; যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশি, সেখানে বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনও বেশি।

    গবেষকদ্বয়ের মূল কথা হচ্ছে, কেউ ‘এশীয় মূল্যবোধ’ ধারণ করলেই যে সে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতি সমর্থন কম দিবে বিষয়টা এমন নয়। বরঞ্চ ‘ব্যক্তি অধিকারের ধারণার সঙ্গে প্রথাগত এশীয় মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই।’

    বাংলাদেশ: দৌড় শুরু করতে হবে অনেক পিছন থেকে 

    যে ডিসক্লেইমার শুরুতেই দেয়া দরকার ছিল, সেটা এখন দেই। বাকস্বাধীনতাকে মানবীয় কর্তাসত্তার সাথে মিলিয়ে পাঠ করার রেওয়াজ আছে; ফরহাদ মজহার৬, বখতিয়ার আহমেদ৭ এ নিয়ে লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। কথা বলার স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অধিকারই নয়, আমাদের মানবীয়তারও অংশ। বন্ধু সারোয়ার তুষারও সম্প্রতি কয়েকটা লেখাতে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মানুষের মানবীয়তার সাথে সম্পর্কিত করে বোঝার কমনসেন্স তৈরি উপর জোরারোপ করেছেন।৮ সঙ্গত কারণেই আলোচ্য প্রবন্ধে এই বিষয়টি উল্লেখিত হয় নি, বরঞ্চ কেবল বাকস্বাধীনতার উপকারিতা বা উপযোগীতার দিকেই নজর দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিখ্যাতজনের বরাত দিয়ে।

    বাংলাদেশে তাহলে আমাদের হালচাল কেমন? বাংলাদেশে আসলে আমাদের এই দৌড়টা অনেক পিছন থেকে শুরু করতে হবে। কারণ, উপরে যে বাকস্বাধীনতার ফজিলত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেই ‘বাকস্বাধীনতা’ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক বিভিন্ন সমাজে আছে। প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী নতুন নতুন তর্ক-বিতর্ক হাজির করছে। সময়ের সাথে সাথেও এর নানান মাত্রা দিয়ে আলাপ হয়েছে, হচ্ছে। যেমন, সত্তরের দশকে ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ নামে একটা আন্দোলন হয়েছিল। মানে ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী মত প্রকাশকারীদের জন্য প্লাটফর্ম দেয়া হবে না। কেউ কেউ একে বাকস্বাধীনতা হরণ বলে অভিহিত করলেও অনেকে বলেছেন, কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে কথা বলার সুযোগ না দেয়া মানেই যে কারো কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া তা কিন্তু না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এই যে মঞ্চ না দেয়া বা ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ একধরনের নিরব ও পরোক্ষ সেন্সরশীপ চালু করতে পারে। সমাজে এই ধরনের তর্ক-বিতর্ক জারি থাকা সজীবতার লক্ষণ। নাগরিকগণ ক্রমাগত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রায়োগিক বিষয়াদি ঠিক করে নিবেন।

    এখানেই বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া। বাংলাদেশের রাষ্ট্রের নাগরিকদের সবচেয়ে বড়ো সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞাকে উপড়ে ফেলার সংগ্রাম।  আমাদের সংবিধান চিন্তা করার স্বাধীনতা দিলেও নাগরিকদের সেই চিন্তাকে হাজির করার স্বা্ধীনতা দেয় নি। বিস্তারিত আলাপ করার পূর্বে বাকস্বাধীনতা নিয়ে এই দেশের মানুষের একটা দীর্ঘ আন্দোলনের কিছু নমুনা পেশ করি।

    বাক-স্বাধীনতার জন্য আমরা পাকিস্তান আমলেও লড়েছি

    খুব বেশি ঘাটাঘাটি করার দরকার পড়েনি; হাতের কাছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বিতীয় খণ্ড’ ছিল।  আইয়ুব আমলের শুরু থেকে একাত্তরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন দলিলপত্র সেখানে সংকলিত হয়েছে। যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও যদি কেবল চোখ বুলিয়ে যান তাহলে খেয়ালে আসবে যে, পাকিস্তান আমলে সংগঠিত বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের দাবি-দাওয়াতে বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। এই স্বাধীনতাসমূহের কথা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ছিল না, প্রায় সকলেরই লিফলেট-প্রচারপত্রে পাওয়া যায়। অবশ্য, কখনো স্বাধীনতা এসেছে শর্তহীনভাবে, কখনো শর্তায়িতভাবে স্বাধীনতা। কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন
    শিল্পী: মোহাম্মেদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সরকার একটা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর বিরুদ্ধে পুরো পাকিস্তানের সাংবাদিকমহল ফুঁসে উঠেছিল। প্রেস অধ্যাদেশ বাতিল, সকল প্রেস আইনের সংস্কার, ঢাকার তিনটা দৈনিক পত্রিকার কালো-তালিকাভুক্তি বাতিল এবং গ্রেফতারকৃত সাংবাদিকদের মুক্তি এমন দাবিদাওয়াসহ সারাদেশে [মানে, পুরো পাকিস্তানে] তখন সাংবাদিকরা হরতাল পালন করেন। ১৯ সেপ্টেম্বরের পাকিস্তান অবজারভার লিখেছিল, খাইবার পাস থেকে চট্টগ্রাম সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই ‘কালাকানুনের’ বিরুদ্ধে আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছে। ঢাকাতেও, পত্রিকার ভাষ্যমতে, বিরাট সমাবেশ হয়েছে। সেখানে আজাদ পত্রিকার মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম খান বলেন, আমার এই বয়স ও শারীরিক অবস্থাতে বিছানায় শুয়ে থাকার কথা, কিন্তু দেশে যা হচ্ছে তা আমাকে উঠে দাঁড়াতে ও আওয়াজ তুলতে বাধ্য করছে। তিনি এই বয়সে, দরকার পড়লে, জেলে যেতেও রাজি আছেন বলে সমাবেশে ঘোষণা দেন। তার মতে এই আইন কেবল সংবাদমাধ্যমকে শেকলে বাঁধেনি, বরঞ্চ পুরো জাতিকেই শেকল পরিয়েছে। অন্যান্য সম্পাদকরাও এই সমাবেশে বক্তৃতা করেন।

    সেদিন সমাবেশ থেকে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তার মধ্যে শুরুতেই ছিল:

    ‘A gagged press is a national disgrace and is essentially anti-national in character. Press freedom is the basis of all freedoms. Press curbs are a clear denial of the fundamental rights of the people. There can be no free people without a free Press..’

    ১৯৬৪ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায়ের জন্য জনগণের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান কয়েকজন নেতা আবেদন জানিয়েছিলেন। ‘সর্বদলীয় সার্বজনীন ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন কর্মপরিষদ’ নামক সেই প্ল্যাটফর্মে মওলানা ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবর রহমান, মওলানা সৈয়দ মোসলেনউদ্দীন সহ আরো কয়েকজন ছিলেন। ভোটাধিকারের দাবীতে প্রদেশব্যাপী সভা, শোভাযাত্রা ও হরতালের আহ্বান সম্বলিত তাদের প্রচারপত্রের শুরুতে ‘জাতীয় জীবনের এক সংকটজনক সন্ধিক্ষণে’র কথা বলা হয়। যেসকল সঙ্কটের কথা ছোট আকারে বলা হয়েছে তাতে এও ছিল, ‘অর্ডিন্যান্স এর যাঁতাকলে বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রায় লুপ্ত’। এই প্রচারপত্রের আরেকটা বক্তব্য বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ: ‘ভাইসব, পাকিস্তান অর্জিত হয় জনগণের ভোটে। আর আজ সেই পাকিস্তানের জনগণ কে ভোটাধিকার হইতে চিরতরে বঞ্চিত করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্র চলিয়াছে। উহার নজীর কোন স্বাধীন ও সভ্য দেশে নাই – এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ছিল না।’ কেন সামঞ্জস্যপূর্ণ, আশা করি খোলাসা করে বলার দরকার নেই।

    ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি থেকে একটি পুস্তিকা প্রচারিত হয়। আইয়ুব খান তৎকালীন নির্বাচনীয় প্রচারণায় ‘গণতন্ত্রে’র কথা বলে বেড়াচ্ছিলেন, এর জবাবে এই পুস্তিকায় ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ শীর্ষক এক অনুচ্ছেদে লেখা হয়, ‘… কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে যে ‘বিপ্লব’ তিনি করিয়াছিলেন সেই ‘বিপ্লবের’ প্রথম কাজই ছিল গণতন্ত্রকে জবেহ করা। সামরিক শাসন জারির প্রথম ঘোষণাতেই আইনের শাসন উচ্ছেদ করিয়া সামরিক আইনে দেশ শাসন করার কথা ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণাতে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করিয়া, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করিয়া, বাক-স্বাধীনতা হরণ করিয়া, জনগণের সভা-মিছিল করিবার  অধিকার পদদলিত করিয়া এক নিমিষে সারা দেশে সামরিক সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়।’

    পুস্তিকাটিতে গণতন্ত্রকে ‘হত্যা’ করার কথা বারংবার দেখা যায়। এই ‘অসহ্য অবস্থার প্রতিকারের জন্য’ একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিসহ আরো কিছু দাবি তোলা হয়; এর মধ্যে ছিল: ‘জনগণের পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা স্বীকৃত হোক’।

    ন্যাপের ১৪ দফা ‘জাতীয় মুক্তির কর্মসূচি’ প্রচারিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালের জুন মাসে। সেখানে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকগণের ‘স্বাধীন ও অবাধ বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথ’ রুদ্ধ করার নানান আইনি সরঞ্জামের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বর্তমানে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক আরোপিত শাসনতন্ত্র ও সরকারী নীতিসমূহ শুধু যে একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী এক ব্যক্তির হাতে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করিয়া দিয়াছে তাহাই নয় ইহা জনসাধারণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করিয়েছে’। সেখানে দ্বিতীয় দফাতে বলা হয় ‘পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ঘোষিত জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করিতে হইবে। সকল দমনমূলক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে’।

    ১৯৬৬ সালের ৮ জুনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক প্রচারিত একটি লিফলেটেও বলা হয় ‘সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী এই জালিম সরকার সাম্রাজ্যবাদেরই সহযোগিতায় ১৯৫৮ সনে সামরিক শাসন জারির মারফত দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি কব্জা করিয়া নিয়াছে। আপামর জনসাধারণের সুখী-সুন্দর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা মাটিচাপা দিয়াছে। বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ মানুষের সকল মৌলিক অধিকার ছিনাইয়া লইয়াছে।’ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয় সেখানে।

    ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে একটা পুস্তিকা প্রচারিত হয়। ৮ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ৫টি বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের আহ্বান জানায়। সেই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘প্রত্যেক সভ্য দেশে গণ-অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা মৌলিক বলিয়া স্বীকৃত এবং স্বাধীন ও সভ্য সমাজের অস্তিত্বটুকু প্রয়োজনেই তাহা অলঙ্ঘ্য ও পবিত্র বলিয়া বিবেচিত।’ ৮ দফা কর্মসূচীর প্রথম দফাতেই ‘সংবাদপত্রের অবাধ আযাদী’র কথা উল্লেখ করা হয়। পুস্তিকায় দেশবাসীর নিকট আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘আজ ব্যক্তিস্বাধীনতার অবস্থা অত্যন্ত করুণ। জরুরি অবস্থা অপ্রয়োজনীয়ভাবে চালু রাখা, কথায় কথায় ১৪৪ ধারা জারি করা, সভা-সমিতি ও মিছিলের সুযোগ না দেওয়া, বিনা বিচারে আটক রাখা, প্রতিরক্ষা আইনের অপপ্রয়োগ করা, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা ইত্যাদির ফলে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে।’ রাজনৈতিক দাবিতে বলা হয়: ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা -স্বীকার কর।’

    সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালে সাংবাদিকরা মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। সংবাদ মারফত জানা যায় যে, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবীতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের আহবানে গতকল্য (রবিবার) প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে সংবাদপত্রে নিয়োজিত ঢাকায় কার্যরত সাংবাদিক, কর্মচারী ও প্রেস কর্মচারী এবং হকারদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং সমাবেশ শেষে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সেবীদের একটি দীর্ঘ মিছিল রাজপথে নামিয়া আসে। মিছিলকারীগণ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, পূর্ণ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার, দেশ রক্ষা বিধি, প্রেস অর্ডিন্যান্স সহ সকল কালা কানুন বাতিল, সংগ্রামের মাঝে পূর্ব-পশ্চিম এক হও, নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশ প্রত্যাহার, ইত্তেফাক ছাপাখানার বাজেয়াপ্তি প্রত্যাহার, রাজ বন্দীদের মুক্তির দাবীতে গভর্নর হাউজের সম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।’

    ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি একটি প্রচারপত্র প্রচারিত হয়, লেখক স্বাধিকার সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং আন্দোলনে সমর্থনে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় একটি সভা ও মিছিলের আয়োজন করেন। প্রতিবাদ সভাটি ১৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে হওয়ার কথা ছিল, সভাপতি ড. এনামুল হক। বক্তার তালিকায় জয়নুল আবেদিন, আহমদ শরীফ, সুফিয়া কামাল, সিকানদার আবু জাফর, কে জি মোস্তফা, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সা, অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের নাম ছিল। সেই প্রচারপত্র যা বলা হয়েছিল সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; আমাদের বর্তমানের সময়ের বিচারে আরো গুরুত্বপূর্ণ:

    ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। সকল উন্নত জাতির বিকাশের মূলেই রয়েছে এই অধিকারের নিশ্চয়তা। সে কারণেই প্রতিটি উন্নতিকামী স্বাধীন জাতিই চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাণেরও অধিক মূল্যবান বলে মনে করেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য কোন ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধাগ্রস্ত হন না। পক্ষান্তরে এও লক্ষণীয় যে কোন জাতিকে দাবিয়ে রাখতে চাইলে তাঁদের শাসকবর্গ চান প্রথমেই সে জাতির চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দিতে। এ উদ্দেশ্যে শাসকবর্গ জাতির চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে এমন ষড়যন্ত্র নেই যার জাল বিস্তার করতে ইতস্তত বোধ করেন, এমন কোন সরকারি মাধ্যম নেই যার সাহায্য সক্রিয় হয়ে উঠতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেন।

    আমাদের বেলাতেও বিগত বাইশ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, সরকার স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশেষ করে এই প্রদেশের জনসাধারণের কণ্ঠ রোধ করা এক প্রধান নীতি হিসাবে অনুসরণ করে চলেছেন। কুখ্যাত প্রেস ও পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারী করে  সংবাদপত্রের  প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়ার যে স্বেচ্ছাচারী নজির স্থাপন করা হয়েছে, তা শুধু ব্রিটিশ শাসন নীতির সঙ্গেই  তুলনীয় হতে পারে। এই অর্ডিন্যান্স জারী করার পূর্বেই স্বাধীনতা লাভের পরপরেই পূর্ব বাংলার সংবাদপত্রের প্রকাশ বন্ধ করা হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত প্রকাশনা ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধের খাঁড়া সমানভাবে ঝুলে রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরের যে কোন কর্মচারীর মাধ্যমে লিখিত, অলিখিত যে কোন উপায়ে ‘প্রেস উপদেশ’ ও সংবাদ বিশেষের উপর ‘এমবার্গো’ জাতীয় ব্যবস্থার সাহায্যে জনমতের স্বাধীনতার উপর হামলা।

    অন্যদিকে জনসাধারণের অর্থে পরিচালিত রেডিও এবং টেলিভিশন সরকার সম্পূর্ণরূপে নিজস্ব প্রচারযন্ত্ররূপে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। সকলের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ রেডিও, টেলিভিশনে তো নেই-ই, এমনকি এইসব প্রচারযন্ত্রে স্বাধীনভাবে শব্দও ব্যবহার করা যায় না। …

    এরই পাশাপাশি রয়েছে গ্রন্থ প্রকাশের ওপর সরকারের ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত দমননীতি। স্বাধীনতার পর এ প্রদেশে সরকার যে একে একে কত বই বাজেয়াপ্ত করেছেন, তার হিসাব নেই। বিশেষ করে সম্প্রতি সেই কুখ্যাত প্রেস ও পাবলিকেশন্স-এর কালাকানুনের সাহায্যেগ্রন্থ বিশেষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে, কারণ দর্শানোর নোটিশ জারী এবং কোন বই আটক ও বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে সরকার নতুনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের কণ্ঠরোধে তৎপর হয়ে উঠেছেন। …

    বস্তুত: স্বৈরাচারী শাসকবর্গের নিকটও একটি জাতিকে অবদমিত রাখার জন্যে এটাই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা। … তাই এ মুহূর্তে লেখকদের স্বাধিকার সংরক্ষণ এবং চিন্তা ও মত প্রকাশের ওপর যে কোন প্রকারের হামলার প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিককে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। শেষবারের মতো এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যে, আমরা স্বাধীন জাতি  এবং আমাদের চিন্তা ও মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ আমরা যে কোন মূল্যে প্রতিরোধ করবো এবং এই অনাচারকে আমরা কিছুতেই কায়েম থাকতে দেবো না।’

    ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ‘সংগ্রামী ছাত্রসমাজ’ পক্ষ থেকে এগার দফার দাবী জানানো হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফাতে বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উল্লেখ পাওয়া যায়: ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হইবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিতে হইবে।’

    সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রামের কমিটির আহবানে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র ও গণহত্যা, সহকারী নির্যাতন ও ব্যাপক হারে গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ‘…দেশরক্ষা আইন ও নিরাপত্তা আইন বাতিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান, ইত্তেফাক ও অন্যান্য সংবাদ পত্রের উপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদান…’ এর দাবি জানানো হয়।

    ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারিতে পল্টনে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় কিছু প্রস্তাবলী গৃহীত হয়। সেখানে ‘শপথ প্রস্তাব’-এ বলা হয়: ‘এই সমাবেশ ঘোষণা করিতেছে যে, স্বৈরাচারী একনায়কত্ববাদী আইয়ুব সরকারের অবসান ঘটাইয়া অবিলম্বে সারা পাকিস্তানের সকল জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার কায়েম ….সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা কায়েম, সকল দমনমূলক আইন প্রত্যাহার করিয়া ছাত্র ….কায়েম না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকিবে।’

    ১৯৬৯ সালের এপ্রিলে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি কর্তৃক ‘স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি পেশ করা হয়। এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন। কর্মসূচির রূপরেখাতে বলা হয়, ‘জনগণের বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও প্রকাশনার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা প্রদান করা হইবে।’ কিন্তু পুরো কর্মসূচিতে এই স্বাধীনতার সাথে কিছু শর্তও যুক্ত ছিল। যেমন, ‘কোন অবস্থাতেই সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি বৃহৎ  পুঁজির পক্ষেও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশ ও সংগঠিত করিবার অধিকার দেওয়া হইবে না’, ‘নোংরা মার্কিনী সিনেমা,  অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও গণবিরোধী সকল প্রকার সাংস্কৃতিক কার্যকে উৎখাত করাহইবে ও নিষ্ঠুর হস্তে দমন করা হইবে’, এবং ‘…রাষ্ট্র মার্কসবাদকে বিৃকতকারী সংশোধনবাদী নয়াসংশোধনবাদ ভাবাদর্শে পূর্ণশিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করিবে।’

    ১৯৬৯ সালের আগস্টে প্রচারিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’ অনুচ্ছেদে বলা হয়: ‘…মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, বই-পুস্তক, সংবাদপত্র ও প্রচারপত্র মুদ্রণ ও প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা, সমবেত হইবার ও সংগঠন করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা থাকিতে হইবে। …একমাত্র যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত অন্য কোন সময়ে এই সকল অধিকার খর্ব করা হইবে না। ‘জরুরী অবস্থার’ অজুহাতে অন্যায়ভাবে কোন নাগরিকের অধিকার খর্ব করা চলিবে না।…’

    ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ১১-দফা কর্মসূচি সম্পর্কিত একটি প্রচারপত্রের ৩ নং দফাতে ছিল: ‘জনগণের সকল প্রকার মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতাদর্শের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে’। ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শাসনতন্ত্র সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৪ দফা দাবি জানায়। সেখানেও ৪র্থ দফাতে ছিল: ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজ বিবেক অনুযায়ী দল, সংঘ-সংগঠন গঠনের অধিকার, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকারের পূর্ণ গ্যারান্টি থাকিতে হইবে…’

    ১৯৭১ সালের ৩ মার্চে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে যে ইশতেহার পাঠ করা হয় সেখানে তিনটা লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়। তৃতীয় লক্ষ্যে স্পষ্টত বলা হয়েছে: ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে’।

    অতি অল্প কিছু নমুনা হাজির করলাম কেবল; সেগুলোতে স্পষ্টতই  দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন দল সংগঠনের দাবিদাওয়াতে বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা একেবারে মৌলিক প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয়েছিল। তারা যখন জনগণের সামনে দেশের তৎকালীন দুরবস্থার কথা বলছিলেন তখন সেগুলোর ‘অনুপস্থিতি’র দিকে বিশেষভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। ফলস্বরূপ আন্দোলনের দাবি-দাওয়াতেও এই স্বাধীনতাগুলো ‘নিশ্চিত’ করার ওয়াদাও বারেবারে দিয়েছেন, বা তাদেরকে দিতে হয়েছে। দুয়েকটা দল বা সংগঠন বাদে অধিকাংশ সময়ই এই স্বাধীনতাকে প্রায় ‘নিঃশর্ত’ আকারেই হাজির করা হয়েছিল। এমনকি বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকারের বর্গেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই আন্দোলনে কেবল রাজনৈতিক সংগঠনই জড়িত ছিল না, আমরা দেখেছি সাংবাদিক মহল ও লেখক-বুদ্ধিজীবী মহলও বিভিন্ন সময়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য রাস্তায় নেমেছেন। আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

    সংবিধানে চিন্তার স্বাধীনতা থাকলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নানাভাবে শৃঙ্খলিত  

    দীর্ঘ পঁচিশ বছরের নানামুখী সৃজনশীল অহিংস সংগ্রাম, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, পঁচিশ মার্চের রাতের পর সশস্ত্র লড়াই, জেনোসাইডে তিরিশ লাখ লোকের প্রাণহানি- এতো এতো ত্যাগ তিতিক্ষার পর আমরা যে সংবিধান তৈয়ার করলাম বাহাত্তর সালেই, সেখানে বাক-স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা শব্দগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকাররক্ষণ’ সংক্রান্ত ৩২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ এই বাক্যকে উল্টো করে পড়লে দেখা যাবে, জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে যদি সেটা আইনানুযায়ী হয়ে থাকে। এর সবচাইতে ‘কার্যকর’ ব্যবহার আমরা দেখতে পাই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে লড়াইয়ের কালে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার সাথে কোনো শর্তারোপ না করলেও লড়াই সফল হওয়ার পর বলা হচ্ছে, সেই স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে যদি সেটা আইন অনুযায়ী হয়ে থাকে। ঔপনিবেশিক আইনকাঠামো দিয়ে নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার নজির আমাদের দেশে প্রচুর। আবার, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা’ শীর্ষক ৩৯ নং অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা’ দেয়া হলেও বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে করা হয়েছে শর্তাধীন। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাক।

    ৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে বাউল শরিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করা হয়; ১১ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মির্জাপুর থানা পুলিশ; এবং ১৪ জানুয়ারি তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়। বেশ কিছুদিন জেল খাটার পর অতঃপর শরিয়ত সরকারের জামিন হয়। বাউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে; বলা হয়েছে যে, বাউল বলেছিলেন, গান-বাজনা হারাম বলে ইসলাম ধর্মে কোনো উল্লেখ নেই। কেউ প্রমাণ দিলে তিনি গান ছেড়ে দেবেন। এমন বক্তব্য শুনেই বাদী মামলা করেছিলেন।

    বাউল কী বলেছেন? বা বাউল কি আদৌ ধর্মকে অবমাননা করেছিলেন? বা, বাউলের কথায় যৌক্তিকতা ছিল কি না বা তার জামিন সংক্রান্ত কোনো ধরনের আলাপে আমরা প্রবেশ না করে বরং বাউলের ঘটনাকে একটা বিশেষ বিষয়ের কেসস্টাডি হিসেবে পাঠ করতে চাই: বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সাংবিধানিক বাকস্বাধীনতার অস্তিত্বের স্বরূপ চিহ্নিত করতে এবং সংবিধানের এই স্বাধীনতা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে (৩৯ নং) যে প্যারাডক্স হাজির আছে তা তুলে ধরতে।

    বাউল শরিয়তকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন মূল প্রশ্নটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ঘিরে তৈরি না হয়ে বরং শিল্পী-বাউল-গান-বাজনার উপর আঘাতই মূল প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সরকার সমালোচকদের গণ-গ্রেফতার বা গণ-মামলার অভিজ্ঞতা এই আইন এবং বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মূল প্রশ্ন হিসেবে হাজির করেছে। আন্দোলনে তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলই মূখ্য দাবি।

    যারা এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এমন মতও পোষণ করেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। অভিজ্ঞতা বলে যে, প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চায় জড়িতদের সিংহভাগই সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতায় গভীর আস্থা প্রকাশ করেন। ফলে, অনেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সংবিধানের পরিপন্থী বা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করছেন। কিন্তু, এই আমরা বলতে চাচ্ছি যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে মামলাগুলো করা হচ্ছে সেগুলোকে সাংবিধানিকভাবেও ‘বৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। মানে, আদতে এগুলো যে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না সেটা প্রমাণ করা সম্ভব। উল্টো সাংবিধানিক এখতিয়ারের আওতায় এ ধরনের মামলা-জুলুম করা সম্ভব।

    উল্লেখ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যে বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথকে রুদ্ধ করে দেয় তার প্রমাণ দেয়াটা এই মুহূর্তে বাহুল্যই হবে; বিস্তর লেখাপত্র অনলাইন-অফলাইনে রয়েছে।

    বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে মূলত বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত আলাপ রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের নামকে দুইভাবে ভাগ করা যায়: ১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, ২) বাক স্বাধীনতা। ‘ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতা’ এবং ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’ দুটোকে বাক-স্বাধীনতার মধ্যেই ফেলে দেয়া যায়।

    সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের প্রথমেই কোনো বিধিনিষেধ বা ‘সাপেক্ষে’ ছাড়াই ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান’ করা হয়েছে। কিন্তু বাকস্বাধীনতা, ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে এভাবে নির্বিঘ্নে ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরং একটা বিরাট বাক্যের অধীনে এই স্বাধীনতাগুলোকে শর্তায়িত করে রাখা হয়েছে। শর্তগুলো হলো,

    ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে…’

    এই অনুচ্ছেদ খেয়াল করে পড়লে বোঝা যাচ্ছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়া হলেও বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, বাক স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা আদৌ কি কোনো অর্থ বহন করে? ধরুন, আমি একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছি, কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই চিন্তাকে ভাষার মাধ্যমে হাজির করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেই চিন্তা কি আদৌ ‘চিন্তা’ হয়ে উঠতে পারবে? বা পেরেছে বলে কি আমি নিশ্চিত হতে পারি? উদাহরণস্বরূপ এই লেখাটার কথাই ধরা যাক। আমি সংবিধানের একটা ধারার প্যারাডক্স নিয়ে চিন্তা করছি, কিন্তু আমি যদি সেটা মৌখিক বা লিখিত রূপে ভাষার মধ্যে দিয়ে হাজির করতে না পারি তাহলে সেই চিন্তার অস্তিত্ব তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই চিন্তার থাকা বা না থাকাটা কি তখন তাৎপর্য বহন করে? চিন্তা বা চিন্তার বিষয়বস্তু পরীক্ষিত বা পরিশীলিত বা যুক্তির কঠিন ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বা এমনকি ভুল প্রমাণিত হওয়ার জন্যও সেই চিন্তাকে প্রকাশ ঘটাতে হবে। সংবিধানের যে বিষয়টা আমার কাছে প্যারাডক্স মনে হচ্ছে, সেটা আমার বুঝতে ভুলও হতে পারে, সেটা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু সেই তর্ক-বিতর্ক তো হবে চিন্তার প্রকাশ ঘটার পর। মানে, মত প্রকাশের পর।

    জে. বি. বিউরি যখন ‘চিন্তার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস’ লিখা শুরু করেন, তখন একেবারে গোড়াতেই ঘোষণা দেন, চিন্তার স্বাধীনতার ইতিহাস আসলে বাক স্বাধীনতারও ইতিহাসও বটে। ‘কথা বলার স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা কোনো অর্থ বহন করে না’।

    বিষয়টা তাহলে দাঁড়ালো এই, আমাদের সংবিধান বলছে আপনি চিন্তা করতে পারবেন স্বাধীনভাবে, কিন্তু সেই চিন্তার প্রকাশ করার বেলায় আপনি পরাধীন, শর্তায়িত। যে শর্তগুলোর কথা সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, মানে যেসব ব্যাপারে আপনার বাকস্বাধীনতা সীমিত সেগুলো হচ্ছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, ‘বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ , ‘জনশৃঙ্খলা’, ‘শালীনতা’ বা ‘নৈতিকতা’ ইত্যাদি।

    উপরে উল্লিখিত বাউল শরিয়তের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘জনশৃঙ্খলা’ ও ‘নৈতিকতা’ এই দুটোর সাপেক্ষে বিবেচনা করতে পারি। ‘নৈতিকতা’ সবসময়ই নির্ধারিত হয় মূলধারার বয়ান অনুযায়ী। প্রমিন্যান্ট ডিসকোর্সই মূলত ঠিক করে দেয় কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক। এটা একেবারেই স্থান-কাল-ধর্ম-আচার-ক্ষমতা সাপেক্ষ। বাউল শরিয়ত বলেছেন ইসলামে গান বাজনা হারাম নয়; দাবি করা যেতেই পারে, বাউলের এই উক্তি এখনকার বিদ্যমান ইসলামের আধিপত্যশীল বয়ানের সাথে খাপ খায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ ধর্মীয় পণ্ডিতরা মনে করেন, গান বাজনা হারাম। ইসলামি জগত ও দর্শনে এ নিয়ে বিস্তর জ্ঞানতাত্ত্বিক তর্ক-বিতর্ক থাকলেও সেটা এখানে একেবারে ‘গৌণ’ হয়ে পড়ে, কারণ ‘নৈতিকতা’ সর্বত্রই নির্ধারিত হয় মূলধারা ও ক্ষমতার ইচ্ছাধীন। একইভাবে যখনই কেউ কোনো সামাজিক ট্যাবু ভাঙ্গতে চান বা যান বা সেই ট্যাবু নিয়ে কথা বলতে যান তখনও একইভাবে মূলধারার ‘নৈতিকতা’র মানদণ্ডে আটকা পড়তে পারেন। সাম্প্রতিক সমকামিতা সংক্রান্ত আলাপও এখানে ‘নৈতিকতা’ বা ‘শালীনতা’র বেড়াজালে বন্দী হতে পারে। সেটা খুব সহজেই ধর্মীয় অবমাননা বা বিভিন্নধরনের অনুভূতিসংক্রান্ত ফ্যাসাদের দিকে ধাবিত হতে পারে। মানে, নৈতিকতা ও শালীনতার ‘স্বাপেক্ষে’ কখনোই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না। দেখা যাচ্ছে, বাউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে আনীত অভিযোগ যে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেটা প্রমাণ করা সম্ভব।

    ‘নৈতিকতা’র সাথে কীভাবে ‘জনশৃঙ্খলা’ মিশে যেতে পারে তার একটা ধ্রুপদী উদাহরণও হচ্ছে শরিয়ত বাউলের ঘটনা। বাউলকে রিমান্ড শেষে জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানোর আবেদন জানিয়েছিল পুলিশ; বলা হয় যে, ‘আসামী জামিনে মুক্তি পাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে এবং … সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে’। এই লেখার প্রাথমিক খসড়া তৈরি পর্যন্ত তার জামিন ঝুলে ছিল, বারেবারে আবেদন করা হচ্ছিল, কিন্তু ‘জামিন পেলে আবারও এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে…’ এই কারণে তাকে জামিন দেয়া হচ্ছিল না। (প্রথম আলো, বাউল শরিয়তের জামিন আবেদন নাকচ, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। সমাজে চালু থাকা কোনো মতের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতানুসারী কর্তৃক ‘জনশৃঙ্খলা’ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভবনা থাকায় আপনার মতকে কাটছাঁট করেই প্রকাশ করতে হবে, আর নাহলে মত প্রকাশকে দমন করতেই হবে। আর এই ক্ষেত্রে, বাউল যে অপরাধ করেছেন তার সার্টিফিকেট দিয়েছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাতন্ত্রের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিটি। ২২ জানুয়ারিতে (২০২১) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, ‘অপরাধে জড়িত বলেই বাউল শরিয়তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ [প্রবন্ধের খসড়া তৈরির মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্ধৃতি ডেইলি স্টারের বরাত উল্লেখ করা হয়েছিল। পাণ্ডুলিপি রেডি করার সময় যখন লিঙ্কে প্রবেশ করতে গেলাম, আবিষ্কার করলাম, লিঙ্ক আর কাজ করছে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তব্য অন্যান্য অনলাইন মিডিয়াতেও প্রকাশিত হয়েছে।]

    সহজ কথা হচ্ছে, ‘শালীনতা’ বা ‘নৈতিকতা’ ধারণাগুলোর ব্যাখ্যা এত বিস্তৃত এবং ক্ষমতা ও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনযোগ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছয়মাস পূর্বের বাউল শরিয়ত বা এই সময়ের সিরাজাম মুনিরা, তারা যে সংবিধানের বরখেলাপ করেছেন, তা শালীনতা বা নৈতিকতার বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ দেয়া সম্ভব।

    পাশপাশি, এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, বা ‘বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এর মতো বাক্য বাকস্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। যেমন, একজন গবেষক চিন্তা করলেন তিনি ভারতের সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটা গবেষণা করবেন। তিনি সেই গবেষণার চিন্তা করতেই পারেন, কেননা তিনি চিন্তায় স্বাধীন। কিন্তু, এখন ভারত যেহেতু আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র গবেষকের সেই চিন্তার বহিঃপ্রকাশ বা গবেষণা প্রকাশিত হলে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। বা, কোনো সংবাদপত্রে এমন কোনো রিপোর্টের বেলায় আমাদের রাষ্ট্র মনে করতেই পারে যে, এই রিপোর্ট প্রকাশিত হলে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। তখন আপনি সংবিধানের বেড়াজালে আটকা পড়ে গেলেন, আপনার গবেষণা তখন অ-সংবিধানিক।

    ফলে এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশের সংবিধান আসলে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করলেও সেই চিন্তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা (মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা) নিশ্চিত করে নি। তাই বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হিসাবে দেখার যে জনপ্রিয় মত চালু আছে সেটা আসলে কোনো অর্থ বহন করে না।

    ‘চিন্তা’র সাথে ‘চিন্তাকে হাজির করা’র মধ্যে যে দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে সেটা আসলে একটা জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত চিন্তাকে, চিন্তার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়। চিন্তা আসলে কোনো ‘ব্যক্তি’র বিষয় নয়, এটা আসলে ‘কালেক্টিভ’ বিষয়। তাই জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চাও আসলে ‘কালক্টিভ’ বিষয়। আমার চিন্তা বহু জনের চিন্তার সাথে মিলবে, বহুজনের চিন্তা আমার চিন্তার সাথে মিলবে, মোলাকাত করবে, পরীক্ষা দিবে, খারিজ হবে, গৃহীত হবে – এমন বহু যৌথ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই আসলে চিন্তাচর্চা এগিয়ে যায়। কিন্তু এই সব ‘কর্মকাণ্ড’ কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন সেই চিন্তাকে হাজির করার স্বাধীনতা বজায় থাকবে। এটাই আসলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এটাই আসলে বাক স্বাধীনতা। এটাই এর ফজিলত।

    ফলে, বাকস্বাধীনতাকে কীভাবে কাজে লাগাবে এই জিজ্ঞাসার পূর্বে তাকে স্বাধীনতার সেই অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। মরার ওপর খাড়ার ঘা স্বরূপ যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছিল ৭৩২টি, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৬০৭। এবং ২০২০ সালে প্রথম ৫ মাসেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৪০৩টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫৩ জন। অর্থাৎ, করোনাকালে কথা বলার দায়ে দমন-পীড়নের হার বেড়ে গিয়েছে। মামলার প্রধান প্রধান ‘খাত’ হচ্ছে: মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ পরিবেশন, ফেসবুকে লেখা, বঙ্গবন্ধু, তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি’, করোনাভাইরাস ও এর চিকিৎসা নিয়ে ‘গুজব ছড়ানো’, ত্রাণ চুরির ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানো ও সংবাদ পরিবেশন, সরকারবিরোধী প্রচারণা, পুলিশের সমালোচনা করে সংবাদ পরিবেশন ও ফেসবুক লেখা, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি।৯

    অর্মত্য সেন স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, উপনিবেশকালে কেবল যে সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেফতার করা হয়েছে, তা কিন্ত না; সুযোগ পেলে সরকারের সমালোচনা করতে পারে এই ‘আন্দাজ’ থেকে ‘সম্ভাব্য দুষ্কৃতিকারী’কে গ্রেফতার করা হতো। আমাদের গর্দানের উপর জারি থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এমন ঔপনিবেশিক আমলের ইশারা আছে। এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আপনার না করলেও চলবে, কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি মনে করে অপরাধ ‘হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে’ তাহলেও আপনাকে গারদে ভরতে পারবে। অর্থাৎ যদি উর্দিওয়ালাদের মনে হয় আপনার অপ্রকাশিত ‘মত’ খতরনাক হতে পারে তাহলে আপনি আইনের জালে বন্দী হতে পারেন।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকদের মূল দ্বন্দ্ব তাই রাষ্ট্রের সাথেই। এই রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবেই মত প্রকাশকে বিবিধ শর্তের অধীন করে করেছে, উপরন্তু দিনকে দিন মানুষের বাকস্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়ার জন্য আরো বেশি আইনি হাতিয়ার তৈরি করছে। আবার, ইতিহাস-বিকৃতি রোধের জন্য বিভিন্ন আইন তৈরির খায়েশ রয়েছে জাতীয়তাবাদী মহলেরও; ইতিহাসের সত্য- মিথ্যা নির্ধারনের ভার আমরা তুলে দিতে চাই রাষ্ট্রের হাতে। [উল্লেখ্য, একসময় আমিও ইতিহাস-বিকৃতি রোধের আইনের পক্ষে ওকালতি করেছি। ইতিহাসের সত্যমিথ্য নির্ধারণের ভার আদালত বা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে চেয়েছি। নিঃসন্দেহে এই লেখা আমার পূর্বের অবস্থান থেকে একটি ‘উত্তরণ’; এবং কেন- সেটাও এই লেখাতে হাজির করতে পেরেছি বলে মনে করি।] ফলে, একদিকে এমনিতেই এই রাষ্ট্র বাকস্বাধীনতার অনুমোদন দেয় না, অন্যদিকে যেটুকু স্বাধীনতা আছে সেটুকুও কেড়ে নেয়ার বাস্তবতা শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগত তৈরি করছে। ফলে, আমাদের লড়াই একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আমার কথা বলার উপর রাষ্ট্রীয় খবরদারিকে ন্যাস্যাৎ করতে হবে। এর ফজিলত কি- তার কিছুটা আভাসমাত্র উপরে দেয়া হয়েছে।

    বর্তমানে যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের জন্য জোরেশোরে আওয়াজ উঠছে, তখন আমাদের এও মনে রাখা উচিৎ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের মাধ্যমেই আমাদের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হয়ে যাবে না। খোদ আমাদের সংবিধানেই এই স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নেই। তাই, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি দাবি তুলতে হবে সাংবিধানিকভাবে আমরা বাকস্বাধীনতা চাই। নিঃশর্ত কথা বলার অধিকার চাই। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে, কোনো আইনের বিরুদ্ধে জনমত ফুঁসে উঠলে এটাকে সংশোধন করে আরো বেশি নিপীড়নমূলক আইন বানানো হয়। ফলে, এমন গণবিরোধী আইন তৈরির যে কাঠামো চালু আছে খোদ সেটাকেও আমাদের বদলাতে হবে। অন্যথায়, গণ-আন্দোলনের মুখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হলেও সেটা আরো নয়া নয়া রূপে ফিরে আসবে।

    শেষ কথা

    দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে যে দাবি-দাওয়া সবচাইতে স্পষ্ট ছিল একাত্তরের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সেগুলোই বরঞ্চ বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেলো। খাঁচার ভেতর পাখির উড়াউড়ি। উল্টো, এই স্বাধীনতাগুলো সবচাইতে ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েছে বর্তমান কালে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আক্ষরিক অর্থেই কারাগারে পুরে দিয়েছে। এই আইনের ব্যবহার যে ‘আপেক্ষিক’ খোদ সেটা বাংলাদেশের ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রধানমন্ত্রীও মেন নেন।১০ অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, যে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ সংগ্রামে ‘বাক-স্বাধীনতা’, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা’ ইত্যাদির উপস্থিতি সবচাইতে স্পষ্ট ছিল, বর্তমানে সেই স্বাধীনতাগুলোকে বন্দী করা হচ্ছে খোদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে।[ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য]১১ বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের দীর্ঘ লড়াই জানান দিচ্ছে, গণমানুষের যে মুক্তিযুদ্ধ ও তার সংগ্রামের চেতনা, তার সাথে বিদ্যমান রেজিমের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক মতাদর্শিক বয়ানের কোনো মিল নাই। বরঞ্চ দুটোর গতি-প্রকৃতি ভিন্ন ও উল্টো।

    বহুদিন যাবত বলা হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে একধরনের অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে। মাত্রাগত রকমফের হচ্ছে কখনো সখনো। ফলে এখানে রাষ্ট্রের কাছে মহামারি মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা। অন্য অর্থে, খোদ নাগরিকের বিরুদ্ধেই এক অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। ডিজিটাল নিরাপত্ত আইন বাতিল এবং সংবিধানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার আমাদের এই লড়াইয়ে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর।

    দোহাই:

    ১) John Stuart Mill, On Liberty, 1859

    ২) Nigel Warburton, Free Speech: A Very Short Introduction, OUP Oxford, 2009

    ৩) চমস্কিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্কের হদিস পাবেন: Noam Chomsky, Some Elementary Comments on The Rights of Freedom of Expression, [Appeared as a Preface to Robert Faurisson, Mémoire en défense, October 11, 1980], chomsky.info; The Faurisson Affair, Noam Chomsky writes to Lawrence K. Kolodney, Circa 1989-1991, chomsky.info; Faurisson affair, Wikipedia; Film: Manufacturing Consent: Noam Chomsky and the Media, 1992

    ৪) উন্নয়নের সাথে স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে অর্মত্য সেনের বহু আলাপ আছে। এই প্রবন্ধের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে: Amartya Sen, ‘Speaking of Freedom: Why Media Is Important for Economic Development’, The Country of First Boys, 2015

    ৫) ফেই শেন ও লোকমান সুই, ‘এশীয়মূল্যবোধ ফিরে দেখা: ইন্টারনেটের ব্যবহার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, প্রতিচিন্তা, ২০১৮। [অনুবাদ: খলিলুল্লাহ]

    ৬) ফরহাদ মজহার, প্রস্তাব, আগামী প্রকাশনী, ১৯৭৭

    ৭) বখতিয়ার আহমেদ, ‘ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবসত্তা: একটি নৃবৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা’, রাষ্ট্রচিন্তা, ২০২০

    ৮) সারোয়ার তুষার, ‘বাকস্বাধীনতা রাজনৈতিক শর্তের অধীন নয়, মানবীয়তার অংশ’, সময়ের ব্যবচ্ছেদ, গ্রন্থিক, ২০১৯

    ৯) প্রথম আলো, করোনাকালে সমালোচনা-কটূক্তির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা-গ্রেপ্তার বেড়েই চলেছে, ৭ জুলাই ২০২০

    ১০) ‘আইন তার আপন গতিতে চলে। আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা, এটা হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। কোনটা আপনার কাছে অপপ্রয়োগ আর কোনটা অপপ্রয়োগ না, এটাও একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমি মনে করি, আইন তার নিজ গতিতে চলছে এবং চলবে। যদি কেউ অপরাধ না করে, তার বিচারে শাস্তি হবে না।’- প্রধানমন্ত্রী; ডেইলি স্টার, “আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা, এটা হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার: প্রধানমন্ত্রী”, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

    ১১) মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড:

    ২১। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১(এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    (৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা ৩(তিন) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

  • ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

    ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

    সাভারের যে স্কুলশিক্ষককে হত্যা করা হলো, তিনি ধর্মের দিক থেকে হিন্দু হলেও, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সাম্প্রদায়িক এঙ্গেল নাই। এটা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গুণ্ডা মাস্তান হয়ে উঠা ছাত্রের দ্বারা শিক্ষক হত্যা। এখানে শিক্ষক মুসলমান হলেও একই ঘটনা ঘটত। যারা এ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা হিন্দু শিক্ষক হত্যা এভাবে লেবেলিং করতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ।

    নড়াইলের যে অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হলো, এটা বিশেষভাবে সাম্প্রদায়িক ঘটনা। ওই শিক্ষক মুসলমান হলেও তিনি প্রভাবশালীদের তোপের মুখে পড়তেন, কিন্তু ধর্মে হিন্দু হওয়ায় যা যা হলো—অর্থাৎ ঘটনাপ্রবাহ ঠিক একই রকম হতো না। অর্থাৎ, ওই অধ্যক্ষ হিন্দু হওয়াতেই ধর্ম অবমাননার জিকির তোলা গেছে। এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশের উপস্থিতি ইত্যাদি দেখিয়ে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, ‘এই ঘটনা সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক…’। এ ধরনের বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য সুবিধার নয়। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেই একটা ঘটনা আর সাম্প্রদায়িক হতে পারবে না কেন? ‘সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক’ এই ধরনের বক্তব্যেরই বা মানে কী? একটা ঘটনা একই সাথে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক তথা সাম্প্রদায়িক–রাজনৈতিক হতে পারবে না কেন? উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস তো আগাগোড়া রাজনৈতিক ঘটনা। বিজেপির মুসলিম–নিধনের রাজনীতি কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? সুতরাং, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি মাত্রই তা আর সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক—এমন দাবি নির্বুদ্ধিতা মাত্র। যে পুলিশ হাজার হাজার শ্রমিকের দাবিদাওয়ার মিছিলকে মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারে, সেই একই পুলিশ “উত্তেজিত জনতার” অন্যায্য দাবির মুখে নিষ্ক্রিয় থাকে কী করে? এই সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার অর্থ কী? এ সময়ের পুলিশী ভূমিকাকে বিশেষভাবে ‘মুসলমান পুলিশ’ আকারে না বুঝলে এ ধরনের ঘটনার কোনো অর্থবহ কুলকিনারা করতে পারা যাবে না। দিল্লিতে মুসলমান শিক্ষার্থীর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং তাকে বুঝতে হবে ‘হিন্দু পুলিশ’ আকারে। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং বুঝতে হবে ‘বাঙালি পুলিশ’ আকারে।

    ধর্মে হিন্দু/মুসলমান বা জাতে চাকমা কেউ আক্রান্ত হলেই তা সাম্প্রদায়িক হবে এমন কোনো কথা নাই। দেখতে হবে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তাদের হিন্দুত্ব/মুসলমানিত্ব বা চাকমাত্ব কোনো ভূমিকা রাখছে কি না। যে–কারণে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে মুসলমান হলেও এ ধরনের ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলার সুযোগ নাই। একইভাবে, ভারতে এনকাউন্টার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে হিন্দু হলেও এ ধরনের ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। কারণ তাদের সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কোনো ভূমিকা এসব ক্ষেত্রে নাই। 

    আবার ভারতে মুসলমানরা তাদের মুসলমান পরিচয়ের কারণেই আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সেটা হচ্ছেন সে দেশের একটা রাজনৈতিক দল ও সরকার দ্বারা, এ ধরনের নিগ্রহের ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক নয়; রাজনৈতিক’ বলার কোনো অর্থ হয় না, ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক–রাজনৈতিক। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য নাগরিক নিপীড়নের সাথে একে এক কাতারে এনে বলার কোনো উপায় নাই যে, আলাদা করে এগুলোকে সাম্প্রদায়িক বলছেন কেন, ভারতে কি হিন্দুরা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয় না?

    একই কথা খাটবে বাংলাদেশের অনেক হিন্দু নির্যাতনের সময়ে। হৃদয় মণ্ডল ও স্বপন কুমার বিশ্বাস হিন্দু না হলেও, তাদেরকে ফাঁসানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তারা হিন্দু হওয়ায় তাদেরকে ফাঁসানোর, অপমান করার একটা বিশেষ প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বিশেষ প্যাটার্নকে আমলে না নিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করলে তা সত্যের প্রতি অবিচার করা হবে।

    প্রথিতযশা মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তো মুসলমানরাও গুম–খুনের শিকার হচ্ছে, তাহলে আলাদা করে হিন্দু নির্যাতন বলা হচ্ছে কেন? আমাদের উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, উমরের এই যুক্তি বিভ্রান্তিকর ও গোঁজামিলপূর্ণ। এমন কোনো তথ্য প্রমাণ নাই যে, বাংলাদেশে গুম–ক্রসফায়ারের শিকার ব্যক্তিরা ‘মুসলমান’ হওয়ার দরুন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে যদি এমন কোনো নজির থাকে যে, মুসলমান বা ইসলামিস্ট হওয়ার দরুন কাউকে গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হতে হয়েছে, তাহলে সেই মর্মান্তিক ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে বুঝতে হবে—এমনকি তা যদি বাংলাদেশেও ঘটে থাকে। কিন্তু মোটাদাগে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিরা ধর্মে মুসলমান হলেই-যে ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। উমরের এ যুক্তি বিজেপিপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবিদের বেশ কাজে আসবে বলে মনে হয়। কারণ তারাও বলবেন, আলাদা করে মুসলমান নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে কেন? ভারতে কি হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হয় না?

    উপরের ছবিটি বাংলাদেশের এবং নিচের ছবিটি ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। সূত্র: ইন্টারনেট

    দুটি কথা বলে শেষ করা যায়। বাংলাদেশে মুসলমান এবং ভারতে হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হতে পারে। সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক হিসেবেও অভিহিত করার দরকার পড়তে পারে। কখন ও কীভাবে? ধরা যাক, বাংলাদেশে আহমাদিয়া ও কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতি ‘মূলধারা’র মুসলমান সমাজের অনেকেরই মনোভাব সাম্প্রদায়িক তো বটেই। কেবল সাম্প্রদায়িকই নয়, তা বর্ণবাদও বটে। একইভাবে ভারতে তথাকথিত নিচু জাতের হিন্দু ও দলিতদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের মনোভাব–আচরণকেও সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ বলতে হবে। তাই বলে বলার কোনো সুযোগ নাই যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ স্ব–স্ব দেশে নানাবিধ জুলুমের শিকার হলেই তা সাম্প্রদায়িক। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ কথাটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, নৈতিক আবেদন ও জরুরতকে ‘অল লাইভস ম্যাটার’ বলে ঢেকে দেয়া এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

    এমনকি আরেক ধরনের অনালোচিত সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গও টানা দরকার—সেক্যুলার সাম্প্রদায়িকতা। বাংলাদেশ ও ভারতের এলিট অ্যাক্টিভিস্ট–বুদ্ধিজীবী–সংস্কৃতিকর্মীদের একটা বড় অংশই এই সাম্প্রদায়িকতায় নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও রোজকার জীবনযাপনকে উল্লিখিত এলিটকুল যে চোখে দেখে থাকেন এবং যে মনোভাব পোষণ করেন, তা সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই সেক্যুলার সাম্প্রদায়িক–বর্ণবাদের অস্তিত্বও আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

    সুতরাং, সাম্প্রদায়িকতাকে এক ধরনের সিচুয়েটেড এথিকস দ্বারা বোঝা দরকার। কোনো দেশ বা কোনো সম্প্রদায়কে যেমন হরেদরে সাম্প্রদায়িক বলা যায় না, ঠিক একইভাবে অমুক দেশের তমুক ধরনের নির্যাতনসমূহ ‘সাম্প্রদায়িক নয় রাজনৈতিক’ বলারও কোনো মানে হয় না। সাম্প্রদায়িকতা আছে আবার নাই। একেবারেই ‘নাই’ আবার সবই ‘সাম্প্রদায়িক’ কোনোটাই নির্মোহ অবস্থান নয়—বিশেষ ধরনের পজিশনালিটি দ্বারা নির্ধারিত।

    [এই লেখাটি মূলত আমাদের দীর্ঘ এক প্রবন্ধের যুক্তিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগ্রহীগণ বিস্তারিত দেখতে পারেন: সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ, সহিংসতা ও সংখ্যাগুরুবাদী চৈতন্য প্রসঙ্গ]

  • বাংলাদেশ জেনোসাইড ১৯৭১: নির্ধারিত গোষ্ঠী এবং নিয়ত [ইনটেনশন]-এর পুনর্পাঠ

    বাংলাদেশ জেনোসাইড ১৯৭১: নির্ধারিত গোষ্ঠী এবং নিয়ত [ইনটেনশন]-এর পুনর্পাঠ

    • সহুল আহমদ

    ভূমিকা

    ১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক জেনোসাইড১ কনভেনশন জেনোসাইডের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। সে সংজ্ঞার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জেনোসাইডমূলক কর্ম [জেনোসাইডাল একশন], নির্ধারিত গোষ্ঠী [ন্যাশনাল, এথনিক্যাল, রিলিজিয়াস ও রেসিয়াল], জেনোসাইডের নিয়ত [ইনটেনশন], এবং শাস্তিযোগ্য কর্ম। অর্থাৎ, কোন কোন গোষ্ঠীর ওপর ‘নিয়ত’ সহকারে জেনোসাইডমূলক কর্ম সম্পাদন হচ্ছে সেটার ওপর নির্ভর করে কোনো ঘটনাকে জেনোসাইড বলা হবে কিনা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডকে যারা স্বীকার করেন তাদের মধ্যে নির্ধারিত গোষ্ঠী, অর্থাৎ হিন্দু জেনোসাইড নাকি বাঙালি জেনোসাইড, নিয়ে একধরণের নীরব বিতর্ক চালু আছে। আবার যারা অস্বীকার করেন তারাও কনভেনশনের সংজ্ঞাকে ব্যবহার করেন। এই প্রবন্ধে প্রধানত কনভেনশন প্রদত্ত সংজ্ঞায় নির্ধারিত গোষ্ঠীর ধারণাকে সমস্যায়িত [প্রবলেমেটাইজ] করা হয়েছে। বাংলাদেশের জেনোসাইডের ক্ষেত্রে যারা আলোচনা করেন তারা নির্ধারিত গোষ্ঠীকে রিজিড বা একাট্টা কোনো একটি গোষ্ঠী হিসাবে বিবেচনা করেন। কিন্তু এই প্রবন্ধ মনযোগ দিয়েছে, কীভাবে আক্রমণকারী তার নির্ধারিত গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে সেদিকে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের জেনোসাইডের নির্ধারিত গোষ্ঠী ও নিয়ত বিষয়ক আলাপকে বিস্তার করে মূলত কনভেনশনের নির্ধারিত গোষ্ঠীর ধারণাকে সমস্যায়িত করা হয়েছে।

    শিল্পী: জয়নুল আবেদীন

    ইভেন্টস অফ ইস্ট পাকিস্তান

    জেনেভাস্থ আন্তর্জাতিক আইনবিদ পরিষদ [ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্ট] থেকে ১৯৭২ সালে The Events of East Pakistan, ১৯৭১ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।২ প্রকাশনার নাম ও সংগঠনের পরিচিতি আমাদের জানান দিচ্ছে যে, প্রকাশনাটি একাত্তর সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ঘটনাবলীর আইনি অধ্যয়ন। এই ধরণের অধ্যয়ন সম্ভবত এটাই যে প্রথম ছিল তা প্রকাশের তারিখ থেকে আন্দাজ করা যায়। মোট সাতটা অধ্যায়ে বিভক্ত এই প্রতিবেদনে পুরো ঘটনার পটভূমি, মার্চ–ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘটনার রূপরেখা, পাকিস্তানি অভ্যন্তরীণ আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনাসমূহের আইনি দিক, আত্ম–নিয়ন্ত্রণের অধিকার, এবং জাতিসংঘ ও ভারতের ভূমিকাকে বিশদ ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, প্রতিটা আলাপে আইনি–দিকটাই প্রাধান্য পেয়েছে। ঘটনার রূপরেখা প্রণয়নে মার্চ–ডিসেম্বরকে দুটো কালপর্বে ভাগ করা হয়েছিল: ১–২৫ মার্চ এবং ২৬ মার্চ–১৮ ডিসেম্বর। সেখানে বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের সাক্ষ্যকেই প্রধান অনুষঙ্গ হিসাবে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের মুখবন্ধে জানানো হচ্ছে যে, ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান করা হয়। নভেম্বরে তিনজন প্রখ্যাত আইনবিদকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল মোটাদাগে মার্চের ১ তারিখ থেকে মানবাধিকার লংঘনের ‘প্রকৃতি, মাত্রা ও কারণ’ অনুসন্ধান করা। ভারতীয় সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার পুরোদমে সাহায্য করলেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কোনো ধরনের সাহায্য করতে অপারগ ছিল। উল্লেখ করা দরকার যে, পাকিস্তানের বিশেষ আদালত গঠনের বিরোধীতা করে আন্তর্জাতিক আইনবিদ পরিষদ এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। সেখানে স্পষ্টত উল্লেখ ছিল:

    The International Commission of Jurists has always disapproved of the establishment of special tribunals to try political opponents for alleged political offence…If Sheikh Mujibur Rahman or other Awami League Leaders have committed any offence under the law of Pakistan there is no reason why they should not be brought before the internationally respected civilian courts of the country.৩

    মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসকে বোঝার জন্য এই প্রতিবেদন খুব গুরুত্বপূর্ণ, এর নানাবিধ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করাও জরুরি। তবে আমার প্রবন্ধের জন্য আমি কেবল জেনোসাইড প্রসঙ্গটাকেই (পৃষ্ঠা ৫৫–৫৭) বিবেচনায় নেব। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের কনভেনশনে পাশ হওয়া জেনোসাইডের সংজ্ঞা এবং এর অধীনে কোন কোন কাজ শাস্তিযোগ্য অপরাধ সেগুলো শুরুতে বলা হয়। সতর্কবাণী দেয়া হয় যে, জেনোসাইড শব্দকে যত্রতত্র ব্যবহার করা হলেও, এমনকি এই ক্ষেত্রে দুই তরফ থেকেই একে–অপরের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগ তুললেও, আইনজীবীদের কাছে এই শব্দের একটি নিখুঁত গূঢ়ার্থ রয়েছে। এবং সেই অর্থটা জাতিসংঘ প্রদত্ত সংজ্ঞা ও সীমানাতেই আবদ্ধ।

    সংজ্ঞানুযায়ী বাংলাদেশের ঘটনাবলীকে জেনোসাইড বলা যাবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে যাওয়ার পূর্বে সংজ্ঞার কিছু অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়। কনভেনশনের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে বলা হয় যে, এই অপরাধের সারসত্তা [এসেন্স] আসলে একটি বিশেষ নিয়তের মধ্যে নিহিত, অর্থাৎ নির্দিষ্ট চারটি গোষ্ঠীকে [ন্যাশনাল, এথনিক্যাল, রিলিজিয়াস বা রেসিয়াল] সামগ্রিক বা আংশিক ধ্বংস করার নিয়ত। জেনোসাইড হওয়ার জন্য উপরোক্ত এই চার গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত হতে হবে, এবং সামগ্রিক বা আংশিক ধ্বংস নিয়ত থাকতে হবে। কোনো একটা গোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এটা জেনোসাইড প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়, বরঞ্চ প্রমাণ করতে হবে যে, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে কেবল এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত সদস্য ছিলেন বলেই। এবং সেটা উপরোক্ত চারটা গোষ্ঠীর কেউ না কেউ হতে হবে। রাজনৈতিক গোষ্ঠী আক্রান্ত হলে তাকে জেনোসাইড বলা যাবে না, সংজ্ঞা মতো। এই হচ্ছে প্রতিবেদনের আলাপের একেবারে গোড়ার যুক্তি। বাংলাদেশে ঘটনাবলীকে জেনোসাইড বলা যাবে কিনা সেটা নির্ভর করবে এই কাঠামোর নিরিখে।

    যদিও বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সকল সামরিক কর্মকাণ্ড ও আগ্রাসনকে জেনোসাইড হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু প্রতিবেদনের যুক্তি হচ্ছে, কোনো একটা জাতিকে রাজনৈতিক স্বায়ত্ত্বশাসন না দেয়ার পদক্ষেপ জেনোসাইড বলে গণ্য করা যায় না। জেনোসাইডের জন্য নির্মূল বা ধ্বংসের নিয়তটাকে প্রমাণ করতে হবে। প্রতিবেদন স্বীকার করছে যে, প্রচুর বাঙালি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তৎসত্ত্বেও তাদের যোগাড়কৃত আলামত ও সাক্ষ্য থেকে এটা প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য যে, কেবল ‘বাঙালি’ ছিলেন বলেই তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। ঢাকার অপারেশন সার্চলাইটে তিনটা গোষ্ঠীকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল: আওয়ামীলীগ, ছাত্র এবং হিন্দু। আওয়ামীলীগ ও ছাত্র এই দুই গোষ্ঠী নির্ধারিত গোষ্ঠীতে অন্তর্ভূক্ত নয়, কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসাবে উপরোক্ত সংজ্ঞার কাঠামোতে পড়ে যায়। প্রতিবেদন বলছে যে, প্রদত্ত তথ্য–উপাত্ত– আলামত সবকিছুই পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইডের প্রমাণ দিচ্ছে। অর্থাৎ, হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কেবল হিন্দু হওয়ার কারণেই মারা হয়েছে, বাড়ি পোড়ানো হয়েছে এমন ঘটনা বিস্তর ঘটেছে। হিন্দুদেরকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রতিবেদনের মতে, যা কিনা জেনোসাইডের নিয়তের উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে। তবে তাই বলে বাঙালিদের ওপর একেবারেই জেনোসাইড হয়নি এমন কোনো সিদ্ধান্তে প্রতিবেদন পৌছায়নি, বরঞ্চ তাদের কথা হচ্ছে, যদি এটা প্রমাণ করা যায় যে একটা নির্দিষ্ট ঘটনায় বহুজনকে হত্যা করা হয়েছে কেবল তারা বাঙালি ছিলেন বলেই তবে জেনোসাইডের অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হবে।

    শান্তির প্রতিধ্বনি; (১৯৭১);
    শিল্পী: স্বপন চৌধুরী
    সূত্র: স্বপন চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

    নিয়ত ও নির্ধারিত গোষ্ঠী

    বলা হয়েছে, কোনো ঘটনা জেনোসাইডাল কিনা সেটার জন্য দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সাধারণত আমলে নেয়া হয়: নিয়তের [ইনটেনশন] উপস্থিতি এবং নির্ধারিত আক্রান্ত গোষ্ঠী। অর্থাৎ, যারা জেনোসাইডের শিকার তারা সংজ্ঞা প্রদত্ত গোষ্ঠীর মধ্যে পড়েন কিনা এবং এই গোষ্ঠীর মধ্যে থাকার কারণেই কেবল তারা হত্যা বা সংজ্ঞা প্রদত্ত কার্যকলাপের শিকার হচ্ছেন কিনা—এই দুটো বিচার্য। নিয়ত প্রমাণ করা জেনোসাইডে সবসময়ই একটা তর্ক–বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেনোসাইড অস্বীকার করা বা নামকরণ নিয়ে যে রাজনীতি তার অধিকাংশ আসলে এই দুটো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। হাল আমলে রোহিঙ্গা জেনোসাইড অস্বীকার করার বেলাতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই যুক্তি দিয়েছিল যে, নিয়ত প্রমাণ করা যায়নি।৪ অন্যদিকে যে চারটি গোষ্ঠী সংজ্ঞায় নির্ধারণ করা হয়েছে এগুলোর মধ্যকার বিরাজমান অস্পষ্টতাও নামকরণ নিয়ে রাজনীতির জন্ম দিয়ে থাকে। যেমন দারফুরের ঘটনার বেলাতে আরব বনাম কালো আফ্রিকান গোষ্ঠীর বিভাজন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।৫

    জেনোসাইড সংক্রান্ত এই দুই আলাপ কেবল কনভেনশন নির্ধারিত সীমানায় আটকে নেই। গবেষকগণ এই আলাপকে আরো বিস্তৃত করেছেন। স্কট স্ট্রাউস বিভিন্ন জেনোসাইড গবেষক প্রদত্ত ও কনভেনশনে নির্ধারিত সংজ্ঞাসমূহের মধ্যে একটা তুলনামূলক চিত্র এঁকেছিলেন।৬ যেমন বিভিন্নজনের আলাপে আরো কিছু বিষয় হাজির হয় যা কনভেনশনের সংজ্ঞাতে অনির্দিষ্ট রয়েছিল। কনভেনশন নির্ধারিত গোষ্ঠী থেকে বাদপড়া ‘রাজনৈতিক’ বর্গটাকে পরবর্তীতে অনেকেই আমলে নিয়েছেন। কেউ কেউ জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মগত, নৃ–গত ইত্যাদি বর্গের কথা উল্লেখ না করে বরঞ্চ ‘ডিফেন্সলেস, হেল্পলেস হিউম্যান বিয়িং’, বা ‘হিউম্যান কালেক্টিভিটি’ ধরণের বিস্তৃত ধারণা পেশ করেছেন। কিন্তু এই গোষ্ঠী সংক্রান্ত আলাপে অবধারিত ভাবে চলে আসে আক্রমণকারী কর্তা [এজেন্ট অফ এনিহিলেশন]। কনভেনশন সহ কেউ কেউ আক্রমণকারী কর্তাকে নির্দিষ্ট করেনি, তবে যারা নির্দিষ্ট করেছেন তারা কর্তা হিসাবে ‘রাষ্ট্র’, ‘কর্তৃত্বপরায়ন রাষ্ট্র’ ধরণের বর্গকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রই প্রধানত জেনোসাইডের জন্য দায়ী থাকে। বিশ বা একুশ শতকের অধিকাংশ জেনোসাইডের ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রই আসলে কোনো একটা জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড চালিয়েছে। আক্রমণকারী কর্তা ও নির্ধারিত গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে যে, আক্রমণকারীই ‘টার্গেট’ গোষ্ঠীকে চিহ্নিত ও নির্ধারিত করে দেয়। ভিক্টিম নিজে তার গোষ্ঠীকে কীভাবে চিহ্নিত করে, এটার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে আক্রমণকারী কর্তা, তা সে রাষ্ট্র বা অ–রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিই হোক, কীভাবে ও কোন নামে চিহ্নিত ও নির্ধারিত করে। এই গোষ্ঠীর মধ্যে আদতে ‘এসেনশিয়াল’ বৈশিষ্ট্য আছে কিনা, সেই গোষ্ঠী কাল্পনিক নাকি বাস্তব, এগুলো প্রাসঙ্গিক থাকে না, বরঞ্চ আক্রমণকারী যদি মনে করে তার মধ্যে ‘এসেনশিয়াল’ বৈশিষ্ট্য আছে, তাহলে সেটা সেভাবেই চিহ্নিত হয়। জেনোসাইড সংক্রান্ত আলাপের জন্য এটা তাই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে গোষ্ঠীর মধ্যকার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য আছে কিনা খোঁজার চাইতে আক্রমণকারীর যুক্তিকাঠামোতে কীভাবে সেই কাল্পনিক বা বাস্তবিক ‘গোষ্ঠী’ ধরা দিচ্ছে, চিহ্নিত হচ্ছে ও নির্ধারিত হচ্ছে সেটা খোঁজা জরুরি।

    টার্গেট গোষ্ঠীর সাথে আক্রমণকারী কর্তার এই সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে জেনোসাইডের নিয়ত খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। আধুনিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি জেনোসাইড সংঘটন করে তাহলে সরাসরি নিয়ত প্রমাণ করা কঠিন, এবং সাধারণত এটাই হয়ে থাকে। আক্রমণের প্রকৃতি যেমন নিয়তের প্রমাণ হাজির করতে পারে, পাশাপাশি জেনোসাইডাল পলিসির উপস্থিতি নিয়তের প্রমাণ হাজির করে। গবেষকরা নিয়তকে কখনো নিয়তই বলেছেন, আবার কখনো কখনো ‘পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ’, ‘কো–অর্ডিনেটেড প্ল্যান’, ‘ডেলিবারেট ডেস্ট্রাকশন’ ও ‘প্রিমেডিয়েটেড’ ইত্যাদি শব্দবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এগুলো থেকে বোঝা যায় কেন্দ্রীয় নির্দেশনা, পদ্ধতিগত পরিকল্পনা ইত্যাদি আসলে নিয়তের প্রমাণস্বরূপ। হত্যাযজ্ঞের প্রকৃতির পাশাপাশি আক্রমণকারী কর্তার পলিসি, নির্দেশনা, পরিকল্পনা এগুলো জেনোসাইডের নিয়তকে প্রমাণ করে।

    উপরোক্ত প্রতিবেদনে আমরা দেখেছি, আক্রমণের প্রকৃতি হিন্দু জেনোসাইডের সাক্ষী দিচ্ছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে। এমতের সাথে আরো অনেক গবেষকই একমত হয়েছেন। সম্প্রতি চৌধুরী শহীদ কাদের ১৯৭১ সালে সংঘটিত ১০০টি ঘটনার প্রকৃতি বিশ্লেষণ৭ করে দেখিয়েছেন যে, এই ১০০ টি ঘটনার মধ্যে প্রায় ২৩ টি ঘটনা এমন ছিল যে সেখানে কেবল হিন্দুদেরকেই লক্ষ্য করা হয়েছে। ১০০টি ঘটনা থেকে প্রায় ৫০১৩ জন শহিদের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে, সেখানে প্রায় ৪৩%-ই হিন্দু ছিলেন। আবার, একাত্তর সালে ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মধ্যে সিংহভাগই হিন্দু ছিলেন। ফলে এই ঘটনাগুলো থেকে একাত্তরের ঘটনাবলীকে হিন্দু–জেনোসাইড বলার দিকেই শহীদ কাদেরের ঝোঁক। কেউ কেউ একাত্তরের সহিংসতাকে নানা বর্গে ভাগ করেন, জেনোসাইড, পলিটিসাইড ইত্যাদি।৮ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা জেনোসাইড। আবার, যেহেতু পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে আওয়ামীলীগ তথা সম্ভাব্য মুক্তিবাহিনীর লোক অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন ফলে সে অংশ পলিটিসাইড।

    ওয়ারদাতুল আকমাম জাতিসংঘের কনভেনশনের বিপরীতে পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ জেনোসাইড গবেষকের সংজ্ঞার ‘রিজিডিটি’ ও ‘লিবারেলিবিটি’ এর তুলনামূলক বিচার করে দেখান যে, প্রতিটি সংজ্ঞার সবচাইতে ‘লিবারেল’ অংশকে বিবেচনা নিলে বাঙালি ও হিন্দু দুই জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই জেনোসাইড হয়েছে দেখানো সম্ভব। বুদ্ধিজীবী ও অভিজাতদের হত্যা করলে পুরো ‘জাতি’ নির্জীব হয়ে যায়, এমন একটা পূর্বানুমানও তার যুক্তি কাঠামোতে ছিল। ‘বাঙালি’ জেনোসাইড বলার ক্ষেত্রে এই ধারণা ক্রিয়াশীল ছিল।৯

    এসব ক্ষেত্রে ঘটনাকে আসলে পূর্ব প্রদত্ত সংজ্ঞার ধাঁচেই বর্ণনা করা হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই। এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, কনভেনশনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল হলোকাস্টের পরপরই, ফলে এই সংজ্ঞাতে হলোকাস্ট যতটা নিখুঁতভাবে এটে যায়, পরবর্তী অনেকগুলো ঘটনা ততটা আটে না। এখান থেকেই আসলে পরবর্তীতে জেনোসাইড ছাড়াও আরো নানান ধরণের বর্গের আবির্ভাব হয়েছে, এবং সংজ্ঞার সাথে কতটুকু মিলে বা না–মিলে সেটা ঘটনা পরবর্তী বিচার–প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। জিওফ্রে রবিনসন এশিয়ার জেনোসাইডমূলক ঘটনাবলীকে একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেন।১০ কেনো সেই ঘটনাগুলোকে পরবর্তীতে ‘জেনোসাইড’ হিসাবে নামকরণ করা হয় নাই, বা গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে নাই, সে প্রশ্নের উত্তর তার ভিন্নভাবে দেখার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তিনি পূর্ব পাকিস্তান, মিয়ানমার, পাপুয়া ও ইস্ট তিমুরের ঘটনাগুলোকে বিশ্লেষণ করে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখান। এগুলো ছিল রাষ্ট্র–প্রণোদিত সহিংসতা। উপনিবেশত্তোর রাষ্ট্রগুলোর ঔপনিবেশিক সীমানার মধ্যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা, স্বায়ত্ত্বশাসন ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন নতুন সঙ্কট জন্ম দিচ্ছিল। ‘এথনিসিটি’ রাজনৈতিক বর্গ হিসাবে হাজির হচ্ছিল। নিপীড়নের শিকার হয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়াবাদী আকাক্সক্ষা বা পরিচয় হাজির হয়েছিল। রাষ্ট্রগুলো ছিল সামরিক ও স্বৈরাচারী। ফলে স্বাধীনতাকামী, বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের নামে রাষ্ট্রগুলো সহিংসতা চালিয়েছে। আবার ঘটনাগুলো ঘটেছিল স্নায়ুযুদ্ধের আমলে, যখন কিনা বিভিন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্র এদের সমর্থন ও সহায়তা দান করেছিল। তার মতে, উক্ত বাস্তবতার মধ্যে আসলে এই ঘটনাগুলো সম্পর্কে পরবর্তী নিরবতার কারণও খুঁজে পাওয়া যাবে। তিনি বেচলারের বরাত দিয়ে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণগুলো উত্থাপন করেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, সাধারণত হলোকাস্টের প্রকৃতি থেকে খুব বেশি আলাদা ঘটনাগুলোকে জেনোসাইড হিসাবে হাজির করতে গবেষকরা ইতস্ততবোধ করেন। এবং যে সকল ঘটনায় আক্রমণকারী ও নিরীহ–নিরস্ত্র [বা ডিফেন্সলেস] আক্রান্তের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন পাওয়া যায় না, সেগুলোকে জেনোসাইড হিসাবে খুব একটা আলোচিত বা পাঠ হয়নি। পূর্বপাকিস্তানসহ যে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী, স্বায়ত্ত্বশাসন বা স্বাধীনতাবাদী আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে সহিংসতা কেবল এক পাক্ষিক হয় না, বরঞ্চ একধরণের যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে। কমবেশি দুপক্ষই সহিংসতায় লিপ্ত হয়। ফলে এক্ষেত্রে শতভাগ নিরস্ত্র জনগোষ্ঠী পাওয়া যায় না। জেনোসাইডের সংজ্ঞার যে সরল ছবি সেটা এশিয়ার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে জটিল হয়ে পড়ার কারণে জেনোসাইড গবেষকদের থেকে এটা খুব একটা দৃষ্টি পায় না। তার মতে, ‘সহিংসতা যদি পশ্চিমা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, এবং ভালো বনাম মন্দের সরল ন্যারেটিভ অনুপস্থিত থাকে, তাহলে এটা খুব কম মনযোগ আকর্ষণ করে।’১১

    জিওফ্রের আলাপ এই জেনোসাইডগুলোর ক্ষেত্রে আক্রমণকারী হিসাবে রাষ্ট্রকেই চিহ্নিত করে এবং আক্রান্ত গোষ্ঠী আসলে বিভিন্নধরণের রাজনৈতিক [স্পষ্টভাবে বললে বিচ্ছিন্নতাবাদী] দাবি সম্বলিত জনগোষ্ঠী। এতে উপরোক্ত কনভেনশন নির্ধারিত নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়, রাষ্ট্রই বিভিন্নভাবে এদেরকে চিহ্নিত ও নির্ধারিত করে দেয়। যেমন, এথনিক গোষ্ঠী রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হতে পারে। রাষ্ট্র এগুলোকে রাজনৈতিক গ্রুপ বলে চিহ্নিত করে, ‘সন্ত্রাসী’, ‘ষড়যন্ত্রকারী’,‘রাষ্ট্র–বিরোধী’ ইত্যাদি আখ্যায়িত করে নির্মূল বা দমন পীড়ন করতে পারে। ফলে কনভেনশন প্রদত্ত সংজ্ঞায় রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুপস্থিতি রাষ্ট্রকে ‘জেনোসাইডে’ অভিযুক্ত থেকে রেহাই দিয়ে দেয়।

    বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডকে হিন্দু জেনোসাইড বলা হলে জেনোসাইডকালীন ও প্রাক–জেনোসাইড ঘটনাপ্রবাহ এবং পুরো ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। হিন্দু জেনোসাইড বললে হিন্দু বনাম পাকিস্তান রাষ্ট্র দ্বন্দ্বই মূল দ্বন্দ্ব হিসাবে প্রতিভাত হয়। কিন্তু, সেটা খুবই খণ্ডিত ছবি। জেনোসাইডের পূর্ববর্তীত বছরগুলোতে যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কথা বলা হতো সেটা ছিল পাকিস্তান–রাষ্ট্র বনাম বাঙালি বা তৎকালীন পূর্ব–পাকিস্তানবাসী। সেখানে ‘রেস’ হিসাবে বাংলাদেশের বাঙালির কথা আইনবিদ পরিষদের ‘রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশনে’ও উল্লেখ ছিল: ‘… discrimination against the Bengalis as a group, with their historical, linguistic, cultural, social and physical differences from the people of West Pakistan, would seem to fall within the term racial discrimination.’১২ এবং পুরো পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় যে কেবল বাঙালি বা পূর্ব পাকিস্তানবাসী বলেই পূর্ব–পাকিস্তান নামক ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী নানাবিধ বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলেন।

    আর্তনাদ; (১৯৭১)
    শিল্পী: স্বপন চৌধুরী;
    সূত্র: স্বপন চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

    ‘হিন্দু’ ও ‘বাঙালি’

    বাঙলা ভাষা ও [পূর্ব পাকিস্তানের] বাঙালিরা ‘হিন্দুধর্ম’ দ্বারা প্রভাবিত এমন এক ধারণা পুরো পাকিস্তান আমল জুড়েই শাসকগোষ্ঠীর কথাবার্তা, বক্তৃতা, বিবৃতিতে ফুটে উঠতো। দেশভাগের হিন্দু–মুসলমান বিভাজন এই জনগোষ্ঠীকে দুইটা রাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে দিয়েছিল, যদিও কখনো কখনো কর্তাব্যক্তিরা সকলের জন্য সমান অধিকারের কথাও বলতেন, পাকিস্তান সবার জন্য এমন কথা বলতেন। কিন্তু সময়ে সময়ে এই বিভাজন বিভিন্ন তরিকায় কাজ করতো। রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে নাকি বাঙলাও হবে, সেই তর্কে বাঙলা ভাষা যে ‘হিন্দুয়ানি’ বা হিন্দু ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত সেদিকে আকারে–প্রকারে নানা ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এটা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আত্মজীবনী ও ডায়রিতে এমন একটা বয়ান স্পষ্ট বা অ–স্পষ্টভাবে থাকতো। বাঙালি ও বাঙলা ভাষা হিন্দু ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত, ‘সহি/পুরো’ মুসলমান নয়।

    মুনতাসীর মামুন পাকিস্তানি জেনারেলদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের আত্মজীবনীগুলো নিয়ে আলাপ–আলোচনা করেছিলেন। সেখানে দেখা যায়, পাকিস্তানি সামরিক ও অভিজাতদের কাছে ‘হিন্দু’, ‘হিন্দুয়ানি বাঙালি’, ‘বাঙালি মুসলমান’ ইত্যাদি বর্গগুলো ‘সন্দেহপ্রবণ’ হিসাবে চিহ্নিত হতো এবং এই বর্গগুলোর সাথে ‘ভারতমুখীন’ হওয়াটাকে জড়িয়ে উপস্থাপন করা হতো। সে সময়ে অধিকাংশ বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদদের ‘ভারতের দালাল’ আখ্যায়িত করার জনপ্রিয় চল ছিল, অন্তত ক্ষমতাসীনদের মনে।১৩

    পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘ঘৃণা ও ভয়’ মেশানো দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে আইয়ুব খানের ডায়রি এবং তার আত্মজীবনী। পাকিস্তানি শাসকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন। বর্ণবাদের ছাপ স্পষ্ট ছিল তার চিন্তাভাবনায়। বিভিন্ন মানুষের সাথে তার যে কথোপকথন হত তা ডায়রিতে লিখে রাখতেন। এবং সেই কথোপকথনের রেশ টেনে বাঙালিদের সম্পর্কে প্রচুর বর্ণবাদী মন্তব্যও তিনি ডায়রিতে উল্লেখ করতেন । যেমন, বাঙালিরা খুবই ‘সংকীর্ণ ও অনুদার’, ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা ‘খুবই কম’, এরা ‘বেইমান ও অবিশ্বস্থ’’, এরা ‘সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা দোষে দুষ্ট’ এবং এদের ‘নিজেদের কোন ভাষা ও সংস্কৃতি নেই’। বাঙালিদের কথা মনে হলেই তিনি ভাবেন, ‘এরা কেন পশ্চিম পাকিস্তানকে দূরে সরিয়ে হিন্দুদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে চায়’। হিন্দুদের ভাষা বলতে তিনি এখানে বাংলাকেই বোঝাচ্ছেন এবং তার মতে মুসলমান তমুদ্দনের ‘ভিত্তি হলো উর্দু’। দুটো বিষয় নিয়ে তিনি সর্বদাই চিন্তা করতেন, এক, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হিন্দু ভারতের ষড়যন্ত্র’ এবং দুই, ‘পূর্ব পাকিস্তানিদের নৈরাশ্যজনক চালচলন’। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিরা যদি বিচ্ছিন্নবাদী আন্দোলন করে তাহলে এর বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন এবং ‘যদি প্রয়োজন পড়ে, রক্তের নদী বয়ে যাবে’। তিনি আক্ষেপ করে এও বলেন যে, ‘হিন্দু ও বাঙালি, এর চেয়ে খারাপ সংমিশ্রণ আর কী হতে পারে’।১৪

    আইয়ুব খানের আত্মজীবনী, Friends Not Masters, প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। সেখানে তার বর্ণবাদী মানসিকতা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে এক তুলনামূলক আলোচনায় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের ‘উত্তম’ ও পূর্ব পাকিস্তানিদের ‘অধম’ বলে চিহ্নিত করেন। সেখানেও তিনি উল্লেখ করেন, বাঙালিরা ‘…have been and still are under considerable Hindu cultural and linguistic influence.’১৫

    অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্ত রাও ফরমান আলীর আত্মজীবনীতে পূর্ব–বাংলার বাঙ্গালীরা হিন্দু হয়ে গিয়েছে ধরণের প্রচারণার একটি চূড়ান্ত নমুনা পাওয়া যায়। তার বিবরণীর একস্থানে তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কিত মন্তব্যে এই প্রচারণার আলামত পাওয়া যায়। তিনি লিখেন, তাজউদ্দীন আহমদ ‘পশ্চিম পাকিস্তানকে এবং সম্ভবত পাকিস্তানকেও ঘৃণা করতেন। তিনি আট বছর বয়স পর্যন্ত হিন্দু ছিলেন বলে একটা প্রচারণা ছিল। আমি গল্পটিকে সত্য মনে করি না। কিন্তু তাঁর মানসিক গঠনে এর যথেষ্ট প্রকাশ ঘটত’।১৬ এমন প্রচারণার কিছু বাস্তবতাও একাত্তরে দেখা গিয়েছিল। ১৯৭১ এ একজন পাকিস্তানি অফিসার তাজউদ্দীন আহমদের শ্বশুরকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সৈয়দ সাহেব, আপনি ছিলেন আরবি প্রফেসর এবং ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধেও আপনার অগাধ জ্ঞান রয়েছে। অথচ আপনার মেয়ের কি না বিয়ে দিলেন এক হিন্দুর সঙ্গে’।১৭ পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানরা যে হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন সেটা বোধহয় বহুকাল পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন। ঘটনার প্রায় ২৮ বছর পরও তার বিশ্বাস যে এমনই ছিল তা তার সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠে: ‘আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝি ও বিশ্বাস করি যে, হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তানের মন মানসিকতাকে প্রভাবিত করেছে’।১৮

    মুনতাসীর মামুন তার বইতে যে কয়টা আত্মজীবনীর বিবরণ দিয়েছেন তার সবগুলোতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষাভাবে এমন বয়ান পাওয়া যায়। এই প্রচারণা যে খুব প্রবল ছিল সেটা ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত গফুর আহমদের মন্তব্যেও পরিষ্কার: ‘আমি যখন পূর্ব পাকিস্তানে যাই তখন আমাকে বলা হয় যে, ওখানকার গোটা জনসমষ্টির একটা বড় অংশ পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারতে চলে গেছে। তবে স্কুলের শিক্ষকরা যায় নি। ওরা এখনো রয়ে গেছে। আমাকে ঐ সময় আরও জানানো হয় যে, ঐসব হিন্দু শিক্ষক দেশের অখণ্ডতার ধারণার বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রী ছেলেমেয়েদের মন বিষিয়ে তুলেছে।’১৯ এয়ার মার্শাল (অবঃ) আসগর খান এই প্রচারণার সারকথা বলেছিলেন এভাবে, ‘…এই যে প্রচারণার কথা বললেন, ওরা পূর্ব পাকিস্তানে যা করেছে তাঁর যৌক্তিকতা খাড়া করার জন্যই এটা করা হয়েছে। আমাদের এখানকার সমাজে হিন্দুর তেমন অস্তিত্ব নেই। কাজেই এ ধরনের প্রচারণা এখানে পাত্তা পেতে সক্ষম হয়। যে ব্যবস্থা ওখানে নিয়া হচ্ছিল তাকে যৌক্তিকতা দেবার জন্যই এ প্রচারণার অবতারণা।’২০

    সাংবাদিক এন্থনী মাসকারেনহাস হিন্দুদেরকে চিহ্নিত করে হত্যার কথা তার প্রতিবেদনে বলেছেন। আবার তার বিবরণেও ‘হিন্দু’ ‘বাঙালি’ এই বর্গগুলোর ওভারল্যাপিং পাওয়া যায়। তার সামনেই একজন লোককে হত্যা করা হয়েছিল, তিনি তখন এক পাকিস্তানি মেজরকে হত্যা করার কারণ জিজ্ঞেস করেছিলেন; প্রত্যুত্তরে মেজর বলেছিলেন, ‘কারণ সে একজন হিন্দু হতে পারে, হতে পারে একজন বিদ্রোহী, নিদেনপক্ষে একজন ছাত্র বা আওয়ামী লীগার।’ এখানে স্পষ্ট দুই ধরণের বর্গের উপস্থিতি পাওয়া যায়, ‘ধর্মীয়’ ও ‘রাজনৈতিক’। আবার আরেকজন মেজরের কথা মাসকারেনহাস উল্লেখ করেন যিনি বলছিলেন, ‘এটা পবিত্র এবং অপবিত্রের মধ্যেকার একটা যুদ্ধ। এখানকার লোকজন নামে হয়তো মুসলমান এবং নিজেদেরকে তারা মুসলমান বলেও থাকে। কিন্তু মনেপ্রাণে তারা হিন্দু। আপনার হয়তো বিশ্বাস হবে না যে, এই সেনানিবাসের মৌলভী কিনা শুক্রবার জুম্মার নামাজে এক ফতোয়া দিয়েছে যে, যারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের হত্যা করবে তারা জান্নাতে যাবে। আমরা ঐ বেজন্মাকে ধরে এনে খতম করে দিয়েছি এবং অন্যদেরকেও খতম করে করছি। যারা বেঁচে যাবে তারাই হবে সত্যিকারের মুসলমান। আমরা তাদেরকে উর্দুও শেখাবো’।২১

    অর্থাৎ, আমি বলার চেষ্টা করছি যে এখানে জেনোসাইডের লক্ষ্য–বর্গ চিহ্নিত করার জন্য স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট ‘হিন্দু’ বর্গটার ব্যবহার আরো বিস্তৃত ছিল। মানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, যারা জেনোসাইডের পলিসি নির্ধারক ছিলেন তাদের কাছে ‘হিন্দু’ বর্গটা কেবল ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বী’দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরঞ্চ ‘হিন্দু’ প্রভাবিত ‘বাঙালি’ বা ‘বাঙালি মুসলমান’ এগুলোও কার্যত কম–বেশি সমানভাবেই ব্যবহৃত হতো। ‘হিন্দুধর্মাবলম্বী’দের প্রতি যেমন ঘৃণা ছিল একইভাবে ‘হিন্দু প্রভাবিত বাঙালি বা মুসলমান’দের প্রতিও ঘৃণা ছিল। কিছুদিন পূর্বে আনাম জাকারিয়া তার বইতেও এক পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ারের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, বাঙালিদের ‘সেকেন্ড রেট পাকিস্তানি’ হিসাবে ব্যবহার করা হতো।২২ কোনো সন্দেহ নেই, এই প্রচারণাতে ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বী’দেরকে তুলনামূলক বেশি ঝুকিতে ফেলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে বিমানবিকীকরণ চলছিল সেটা আসলে পুরো এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই চলছিল, যারাই শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।

    এটা উল্লেখ করা জরুরি, পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধ–গোষ্ঠীকে ‘দুষ্কৃতিকারী’, ‘ভারতের দালাল’, ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’, ‘অ্যন্টি–স্টেট এলিমেন্ট’, ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করতো। আবার দুষ্কৃতিকারীদের পরিচয় সেটাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল, ক) তথাকথিত মুক্তিবাহিনীর নিয়মিত সদস্য, তথাকথিত মুক্তিবাহিনী ভর্তিতে সাহায্যকারীরা; খ) স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের খাদ্য, যানবাহন ও অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহকারী; গ) স্বেচ্ছায় বিদ্রোহীদের আশ্রয়দানকারী; ঘ) বিদ্রোহীদের ‘ইনফরমার’ বা বার্তাবাহকরূপে যারা কাজ করে; ঙ) তথাকথিত মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত নাশকতামূলক লিফলেট, প্যাম্পলেট, প্রভৃতির লেখক বা প্রকাশক।২৩ এই চিহ্নিত ‘দুষ্কৃতিকারী’কে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরষ্কারও ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এই তালিকাতে উপরোক্ত কোনো বর্গকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

    পাশবিক অত্যাচার; (১৯৭১) শিল্পী: স্বপন চৌধুরী; সূত্র: স্বপন চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

    জেনোসাইড ও ধর্ষণ

    যুদ্ধ–বিগ্রহ–সহিংসতা–দাঙ্গার সাথে ধর্ষণের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক বিশ্বের এমন কোনো সহিংস ঘটনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যেখানে ভয়, সন্ত্রাস ও জাতিগত নৃশংসতা উৎপাদনে, এমনকি শত্রুকে নিয়ন্ত্রণে নারীর শরীরের ওপর সহিংসতা চালানো হয় নি বা নারীর শরীরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়নি। যুদ্ধকালীন ধর্ষণের সাথে কেবল জোরপূর্বক ‘যৌনতুষ্টি’ জড়িত থাকেনা, কখনো কখনো বিজিতের সমাজ ও মননের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমের মনোবাসনাও থাকে। ধর্ষণ একটা কৌশলও বটে। ধর্ষণের মাধ্যমে হত্যা করা হয়, ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। ধর্ষণকে ব্যবহার করে বাস্তুচ্যুত ও দেশছাড়া করা হয়, দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে সমাজ–পরিবারকে তছনছ করতেও ধর্ষণ কার্যকরী কৌশল। অর্থাৎ, ধর্ষণকে যুদ্ধ বা দাঙ্গার একটা কৌশল/পদ্ধতি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।

    জেনোসাইড কনভেনশন অনুযায়ী যেসব কাজ জেনোসাইডের অন্তর্ভূক্ত তাতে ধর্ষণের কথা নেই, যদিও অনেক পরে এসে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বসনিয়া ও রুয়ান্ডা জেনোসাইডের পর জেনোসাইডাল রেপ ধারণাও জনপ্রিয় হয়েছে। কনভেনশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘causing serious bodily or mental harm to members of the group’ এবং ‘deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in whole or in part’ দুটো জেনোসাইডমূলক কর্মের অন্তর্ভুক্ত। লিসা শারলাখ এই দুই ধারার বরাত দিয়ে ধর্ষণকেও জেনোসাইডমূলক কাজ হিসাবে চিহ্নিত করেন। ধর্ষণ আক্রান্তের গুরুতর শারীরিক এবং/অথবা মানসিক ক্ষতি করতে পারে, আক্রান্তের পরিবার ও এথনিক সম্প্রদায়ের মনোবল ধ্বংস করে দিতে পারে। ধর্ষণ যে কেবল শারিরীকভাবে ক্ষতি করে তাও নয়, সমাজ ও পরিস্থিতি ভেদে ধর্ষণ কোনো একটা সমাজের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রেখে যেতে পারে। তিনি বলেন, হত্যার চেয়ে ধর্ষণ আরো চতুর কৌশল হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে, কারণ এটা প্রমাণ করা কঠিন। অনেকসময় সামাজিক ও পরস্থিতিজনিত কারণে খোদ ভিকটিমই ঘটনা চেপে যান। সাধারণত ধর্ষণের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আছে কিনা, উপর মহল থেকে এমন কোনো নির্দেশনা ছিল কিনা সেটা প্রমাণ করাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠে। সেনাবাহিনী ও সরকার কখনোই ধর্ষণে উদ্বুদ্ব করার কথা স্বীকার করেন না। ফলে এটাকে যুদ্ধাবস্থার ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা হিসাবে দেখানো সহজ হয়ে উঠে। আবার, সহিংসতা–উত্তর পরিবেশে তাদেরক ভিকটিমহুড যেমন নীরবতার চাদরে ঢেকে ফেলা যায়, তেমনি তাদের ‘ট্রমা’র রাজনীতিকরণও ঘটে থাকে। সকল ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারী যে পরিস্থিতিতে পড়েন সেটাকেও ‘দ্বিতীয় ধর্ষণ’ বলে অভিহিত করা হয়। তার মতে যদি জেনোসাইডের বিশ্লেষণ নারীর ওপর চালিত সহিংসতাকে আমলে না নেয় তাহলে নারীকে ধর্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন এথনিক গোষ্ঠীকে যে হিউমিয়েলিয়েশন বা অপমান করা হয় সেটা পুরোপুরি বোঝা যাবে না। সেখানে নারী কমিউনিটির ‘ইজ্জত’/‘সম্মান’ সংক্রান্ত ধারণার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবার ধর্ষণের মাধ্যমে ‘গর্ভবতী’ করা, অর্থাৎ নারীর গর্ভকে ‘দখল’ করার বাসনাও পূরণ করা হয়। লিসা তার বিশ্লেষণে তিনটা কেসস্টাডি উল্লেখ করেন: পূর্ব পাকিস্তান, যুগোশ্লোভিয়া এবং রুয়ান্ডা। তিনটা ক্ষেত্রেই ধর্ষণ ছিল জেনোসাইডের একটি অন্যতম উপাদান।২৪

    একাত্তর সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী যে ধর্ষণ চালিয়েছিল (প্রায় চার লক্ষাধিক নারী) তা যে খুব পদ্ধতিগত ও পরিকল্পিত ছিল তা নিয়ে ইতোমধ্যে বহুল আলোচনা হয়েছে। ধর্ষণের তীব্রতা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশ, ধর্ষণের প্যাটার্ন ইত্যাদি অবলোকন করে অনেক গবেষকই এটাকে ‘পরিকল্পিত’ বলে রায় দিয়েছেন।২৫ ধর্ষণের শিকার নারীরা যে ধরণের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন তার একটা পরিসংখ্যানও ডঃ এম এ হাসান দিয়েছেন। ধর্ষণের শিকার নারীরা শ্বেতস্রাব, তলপেটে ব্যাথা, রক্তস্রাব, মেনোরেজিয়া, ডিসমেনোরিয়াসহ বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে বিষাদগ্রস্থতা, নৈরাশ্যসহ প্রায় ৮০–৯০ ভাগ নারী দীর্ঘকাল ব্যাপী মানসিক সমস্যাতে আক্রান্ত ছিলেন।২৬ একাত্তরে ধর্ষণের শিকার নারীদের পরবর্তী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনা ও লাঞ্চনা নিয়েও প্রভাবশালী কিছু গবেষণাও হয়েছে।২৭ অর্থাৎ, এই নারীরা কেবল যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তা–ই নয় বরঞ্চ সামাজিকভাবেও প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। উপরন্তু রাজনৈতিক ময়দানে তাদের ‘ভিকটিমহুড’ এর ব্যবহার তাদেরকে আরো প্রান্তিকে ঠেলে দিয়েছিল।

    ড. জিওফ্রে ডেভিস যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ধর্ষণের শিকার গর্ভবতী নারীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন। বীনা ডি কস্তার সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা তাদের ধর্ষণকে জায়েজিকরণ করে:

    They had orders of a kind or instruction from Tikka Khan to the effect that a good Muslim will fight anybody except his father. So what they had to do was to impregnate as many Bengali women as they could. That was the theory behind it.২৮

    বাংলাদেশে যারা একাত্তরে নারী ধর্ষণ নিয়ে কাজ করেছেন তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এমন মনোভঙ্গির কথা উল্লেখ করেছেন। একটা ‘জাতির চেহারা বদলে দেয়া’র বাসনা তাতে স্পষ্ট।

    এখানে ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনাবলীকে যদি জেনোসাইডমূলক কাজ বা জেনোসাইডের উপাদান হিসাবে চিহ্নিত করা হয় তাহলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আবারো বিবেচ্য ‘গোষ্ঠী’ বা বর্গ অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কেননা পাকিস্তানি বাহিনীর ধর্ষণের শিকার নারীদেরকে ‘বাঙালি’ ‘হিন্দু’ বা ‘হিন্দুবাঙালি’ ইত্যাদি বর্গে আটা যায় না। বরঞ্চ এই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা একালের বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের ‘বাঙালি’ তা যে কোনো ধর্মেরই হোক, এমনকি আদিবাসী নারীরাও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। এই ক্ষেত্রেও কোনো সন্দেহ নেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সর্বাধিক ঝুঁকিতে ছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন চিঠিপত্র, মন্তব্যতে ‘বাঙালি’ বর্গের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।

    বীরাঙ্গনা
    আলোকচিত্র: নাইব উদ্দিন আহমেদ

    দি রেমেডি

    ‘দি রেমেডি’ শিরোনামযুক্ত দলিলটি খুলনাস্থ গণহত্যা জাদুঘরের আর্কাইভে রয়েছে, জাদুঘরে প্রদর্শিতও হচ্ছে।২৯ এই দলিল সম্পর্কে মুনতাসীর মামুনের লেখা৩০ এবং অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের সাথে সরাসরি কথা বলে জানা যায় যে, এটি নিয়াজী কর্তৃক লিখিত চিঠি। চিঠিটি কত পৃষ্ঠার ছিল নিশ্চিত নয়, তবে আর্কাইভে রয়েছে তিন পৃষ্ঠা। চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল ব্যবসায়ী এহিয়া আহমদ বাওয়ানীর একটা ফাইলে। সেখানে থেকে সংগ্রহ করেছিলেন লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের তৎকালীন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান। পরে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসের সচিব এস এম গোলাম নবীর সংগ্রহে আসে। জাদুঘরে সংগৃহীত এই দলিলের নিচে নীল রঙের কালি দিয়ে হাতে লেখা আছে যে, ‘ইহা রাও ফরমান আলীর নিকট লিখিত’।

    দলিলটির শুরু হয়েছে একাত্তরের মার্চে সংঘটিত অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে; দাবি করা হচ্ছে যে, মার্চ/এপ্রিল মাসে বিহারিদের ওপর ‘সু–পরিকল্পিত’ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। যাদেরকে মারা হয়েছে তারা ‘অ–বাঙালি মুসলমান’, এবং তাদেরকে ‘পশ্চিমা’ বলে সম্বোধন করা হতো। যারা মেরেছে তাদের অধিকাংশই ‘বাঙালি’। তারা বহিরাগত এই কারণে মারা হয়নি, বরঞ্চ তারা পাকিস্তানি, কেন্দ্রীয় সরকারের কট্টর সমর্থক এবং সামরিক বাহিনীর শুভাকাঙ্ক্ষী—এ কারণে মারা হয়েছে। এই প্রদেশে প্রচুর ‘অবাঙালি হিন্দু’ ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা ‘জয়বংলা শ্লোগানওয়ালা’দের ভাই হিসাবে বিবেচিত হন।

    দলিল মতে, বাঙলা দেশ আন্দোলন কেবল আওয়ামী লীগ দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে না, বরঞ্চ এটা আসলে পুরো বাঙালি সম্প্রদায়েরই অভ্যুত্থান। মসজিদের ইমাম–মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, পুলিশ, ইআরপি, আদালতের বিচারক প্রায় সবাই জড়িত ছিলেন এই ‘বিদ্রোহে’ [রিভোল্ট]। তার প্রমাণ হিসাবে মার্চের ১ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন ‘সেকশন’ থেকে একের পর এক ‘রেজুলেশন’ গ্রহণ করা হয়েছে।

    এমনকি সেখানে মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম, পিডিপির বাঙালি নেতারাও যুক্ত ছিলেন। ‘বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষ’ গভীরে প্রবেশ করেছে। আগা খানের স্মৃতিচারণের বরাত দিয়ে বলা হয়, বিগত বিশ্বযুদ্ধ কেবল ‘হিটলারের যুদ্ধ’ ছিল না, বরঞ্চ সেটা পুরো জার্মানির যুদ্ধ ছিল। একইভাবে এই আন্দোলন আওয়ামী লীগ বা মুক্তিবাহিনীর বিদ্রোহ নয়, বরঞ্চ পুরো বাঙালির বিদ্রোহ। শান্তিকমিটিগুলো আসলে উপরে উপরে সামরিক বাহিনীকে সাহায্যের ভান করলেও আদতে তারা মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করছে, আশ্রয় দিচ্ছে। ফলে মার্শাল ল’ কর্তৃপক্ষকে এইসব পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর ‘বাঙালি নেতাদের’ পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। তারা ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান’ এর সাথে বেইমানি করেছে। যারা ইসলামিক রিপাবলিকের সাথে বেইমানি করেছে তারা ইসলামের সাথেও বেইমানি করেছে। তাদের একমাত্র সাজা হওয়া উচিত মৃত্যুদণ্ড।

    ছবি: দি রেমেডি; কৃতজ্ঞতা- ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর

    এরপরেই ‘বাঙালি’দের চরিত্র উন্মোচনের দিকে নজর দেয়া হয়। লর্ড ম্যাকলের বরাত দিয়ে বলা হয়, এই ‘কমিউনিটি’ কাপুরুষ, প্রতারক। অবাঙালি মুসলমান হত্যায় বাঙালি যে নৃশংসতা দেখিয়েছে তার নজির ইতিহাসে নেই। ‘…what is paw to a tiger, what is sting to a bee, what horn to a buffalo, deceit is to a Bengali’. এমনকি কোরান শরিফে হাত রেখে যে শান্তিকমিটির বাঙালিরা শপথ গ্রহণ করেছে তারাও বিহারীদের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৯৪৪/৪৫ সালে জার্মান দখলের পর রাশিয়ানরা জার্মানদের সাথে যে আচরণ করেছে, [প্রায় ২–৩ মিলিয়ন জার্মানকে হত্যার কথা দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে] বাঙালিদের সাথেও একই আচরণ করা উচিত: ‘unless they are fully terrorize the Bengalis can not be set at right.’

    বাঙালিদের ‘বেস্টফ্রেন্ড’ এখনো ভারত। যে কোনো ‘বাঙালি’কে খোঁজা হোক, সে আসলে বিচ্ছিন্নতাবাদী। কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তাদেরকে আসলে ব্রেইনওয়াশ করা দরকার, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদেরকে মানসিকভাবে [সেন্টিমেন্টালি] আলাদা করতে হবে। কীভাবে? উত্তর হচ্ছে: ভাষা। ‘They need a total brainwashing at least ten years. They can be separated sentimentally West Bengal only by change of their language.’ ফলে যদি কর্তৃপক্ষ ভেবে থাকেন, যে ‘শাস্তি’ দেয়া হয়েছে পর্যাপ্ত তাহলে ভুল হবে। পৃথিবীকে স্বাভাবিক দেখানোর জন্য যদি সব খুলে দেয়া হয়, তাহলে পাকিস্তানের ভবিষ্যত খুব ‘doubtful’ হয়ে উঠবে। বরঞ্চ এই অভিযান আরো চালাতে হবে: ‘There must be more killing, more mopping up and more witch hunting.’

    এই অভিযানের সাফাই গাওয়ার জন্য রুশ উদাহরণ দেয়া হয়েছে। রুশরা যদি কমিউনিজমের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য কয়েক মিলিয়ন ভূমিমালিকদের খতম করতে পারে, তাহলে পাকিস্তানের শত্রুদের খতম করতে অসুবিধা কোথায়? ফলে ভারত ও ইহুদি প্রোপাগান্ডাকে পাত্তা না দেয়ার জন্য বলা হয়। যাদের পাকিস্তান ও পাকিস্তানের সংহতির ওপর বিশ্বাস আছে কেবল তাদেরই অধিকার রয়েছে পাকিস্তানকে শাসন করার। যদি লাল (মানে, কমিউনিস্ট) দেশগুলোকে কেবল কমিউনিস্টদেরই শাসন করার অধিকার থাকে, তাহলে কীভাবে পাকিস্তানের প্রতি অবিশ্বাসী লোকদের কেন নির্বাচনে দাড়াতে দেয়া হলো? বরঞ্চ এই বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করা ও তাদের থেকে রেহাই পাওয়ার দারুণ মওকা এসেছে। কেবল ‘হিন্দু’দের নিধন করলেই হবে না, তাদের সশস্ত্র ভাইব্রাদার, ইসলামের শত্রু, মুরতাদদেরও খতম করতে হবে।

    শেষের দিকে আবারো বিহারীদের বিষয়ে বলা হয়। তারাই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো ভিকটিম। তারা নিরাপত্তাহীনতায় আছে। সামরিক সরকারকে তাদের দেখভালের দিকে নজর দেয়া দরকার। এরপর নয়টি সম্ভাব্য পদক্ষেপের পরামর্শ দেয়া হয়। এই পদক্ষেপগুলোতে দুটো বিপরীতমুখী গোষ্ঠী পাওয়া যায়: বাঙালি ও বিহারী। একদিকে বলা হয় ‘বাঙালি’ সিভিল অফিসারদের বাদ দিতে হবে (প্রায় ৭৫%); সেনাবাহিনী, গোয়েন্দাসংস্থাকে ‘বাঙালি’দের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে, কারণ তারা তলে তলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পক্ষে কাজ করে। অন্যদিকে বিহারীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

    আমার আলোচনার বিষয়বস্তু এই দলিলের ঠিকুজি খোঁজা নয়, বরঞ্চ শাসকের অবস্থান থেকে কিছু নির্দিষ্ট মনোভাবনার সন্ধান করা। এই চিঠি নিয়াজী বা কার লেখা তার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, অন্তত আমাদের এই আলোচনার জন্য, এই চিঠি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও জেনোসাইডের পলিসি–নির্ধারক কারো লেখা। এখানে ‘বাঙালি’ বর্গ বিশেষভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। এবং, সেই ‘বর্গ’ তৈরি হচ্ছে আধুনিক জাতি–রাষ্ট্রের যুক্তি–কাঠামোর ভেতর থেকে। এক জাতির জন্য এক রাষ্ট্র—এই নীতির সাথে দ্বিমত বা ভিন্নমত পোষণকারীর রাষ্ট্রে থাকার অধিকার নেই। এর সাফাইয়ের যুক্তি আবার বিশ শতকের দুটো বৃহৎ রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ঘটনা থেকে উদাহণ নেয়া হচ্ছে: রুশ বিপ্লব বা কমিউনিস্তদের বিপ্লব এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়ার কাছে জার্মানির পরাজয়। জিওফ্রে যে ফ্রেমওয়ার্কে আলোচনা করে দেখিয়েছিলেন যে, এশিয়ার জেনোসাইডগুলোতে রাষ্ট্র ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ লেবেল দাগিয়ে যেভাবে সহিংসতা চালিয়ে থাকে সেটারই প্রমাণ এই চিঠির যুক্তি ও ভাষাতে দেখা যায়।

    উপসংহার

    এই প্রবন্ধে মূলত বাংলাদেশের জেনোসাইডের একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে মনযোগ দেয়া হয়েছে। সাধারণত ১৯৭১ সালে সংঘটিত সহিংসতাকে নানাজনে নানা নামে চিহ্নিত করলেও এখানকার হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড হয়েছে সেটা প্রায় সবাই মেনে নেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটাকে বাঙালি জেনোসাইড হিসাবে চিহ্নিত করলেও অনেক গবেষকই এটাকে হিন্দু জেনোসাইড বলেন। এটা বলার মধ্যে যে প্রধান যুক্তি সেটা বাহাত্তরের প্রতিবেদনেই স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে যে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সর্বাধিক ঝুঁকিতে ছিলেন সেটা যে কোনো হিসাব/ পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। তদপুরি, হিন্দু–জেনোসাইড বলার ক্ষেত্রে সংজ্ঞা প্রদত্ত ‘গোষ্ঠী’কে সমস্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। প্রথমত, কে কোন গোষ্ঠীতে অন্তর্ভূক্ত, সেটা আসলে আক্রমণকারী নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ, আপনি আসলেই এই গোষ্ঠীর সদস্য কিনা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আক্রমণকারী আপনাকে কোন গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত বলে মনে করে। দ্বিতীয়ত, উপনিবেশত্তোর রাষ্ট্রগুলো ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা নির্ধারিত সীমানার মধ্যে এমন বহু জাতিসত্তাকে খুঁজে পায় যারা কিনা ‘এক জাতি এক রাষ্ট্র’ নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে। আধিপত্যশীল জাতিগোষ্ঠীর কাছে বিভিন্ন ধরণের বৈষম্যের শিকার হয়ে স্বাধীকার, স্বায়ত্ত্বশাসন, স্বাধীনতা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন জোরদার হলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা এই উপনিবেশত্তোর রাষ্ট্রগুলোর একটি বিশেষ সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এখানে ‘বর্গ’ অধিকাংশ সময় আক্রমণকারী রাষ্ট্রই ঠিক করে দেয়; জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক এই বর্গগুলো অনেকক্ষেত্রে ওভারল্যাপিং করে। অর্থাৎ, বর্গগুলোর মধ্যে একাট্টা বা খাড়াখাড়ি বিভাজন পাওয়া যায়না। তৃতীয়ত, ফলে এখানে যখন ‘বাঙালি’ ও ‘হিন্দু’ বর্গ বলা হচ্ছে তখন আসলে শাসকরা বা পাকিস্তানি রাষ্ট্র কীভাবে সে বর্গগুলোকে চিহ্নিত করছে সেটা দেখা জরুরি। এবং এখানে দেখা যাচ্ছে যে, পাকিস্তানি সামরিক শাসক বা অভিজাতদের কাছে ‘বাঙালি’ ও ‘হিন্দু’ দুটো বর্গের মধ্যে কোনো একাট্টা বিভাজন নেই, বরঞ্চ গতায়াত রয়েছে; কখনো কখনো সমার্থক হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়। যার ফলে বাঙালি মুসলমান মাত্রই হিন্দুয়ানি বা হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত এমন সব ধারণার ছড়াছড়ি দেখা যায়। চতুর্থত, ধর্ষণকে যদি জেনোসাইডের একটি উপাদান হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয় তাহলে বাংলাদেশের ঘটনায় হিন্দু ও বাঙালি বর্গের সীমানা আরো অস্পষ্ট হয়ে উঠে। পাকিস্তান বাহিনীর কাছে বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলমান, অন্যান্য অ–অবাঙালি জনগোষ্ঠী যেমন চাকমা, মারমারাও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। পঞ্চমত, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী [অথবা শাসকগোষ্ঠী] লিখিত একটি চিঠি আবার স্পষ্ট ‘বাঙালি’কে জেনোসাইডের বিশেষ লক্ষ্য হিসাবে চিহ্নিত করছে। সেখানে অজুহাত হিসাবে ইসলাম ধর্ম যেমন রয়েছে, তেমনি আসলে রাষ্ট্রের সংহতি রয়েছে। অর্থাৎ, এই প্রবন্ধে জেনোসাইডকে কেন্দ্রিয় নির্দেশনা রয়েছে এমন একটা সু–পরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে; এতে আক্রমণকারী স্পষ্টাভাবে নির্ধারিত; এবং আক্রমণকারীই আক্রান্তগোষ্ঠীকে চিহ্নায়ন করছে। জেনোসাইডের নিয়তের প্রমাণের জন্য আক্রমণের ধরণ/প্রকৃতি যেমন একটা উপায়, তেমনি কেন্দ্রীয় নির্দেশনার উপস্থিতিও আরেকটি উপায়। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সাথে জড়িয়ে থাকে আক্রান্তগোষ্ঠীকে চিহ্নিতকরণের পদ্ধতি বা শর্ত। উল্লেখ্য ১৯৭১ সালে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আরেকটি বড়ো প্রমাণ অপারেশন সার্চলাইট প্রণয়ন।

    সর্বশেষ এটা উল্লেখ করা দরকার, বাহাত্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিহারিদের নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। বিহারী হত্যাকাণ্ড জেনোসাইড হবে কিনা সেটা নিয়ে প্রতিবেদনে আইনি মতামত দেয়া হয়েছে। এই প্রবন্ধে বিহারী হত্যাকাণ্ডকে আলাপের বাইরে রাখা হয়েছে, কেননা এটা নিয়ে স্বতন্ত্র দীর্ঘ আলাপের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রেও একইভাবে আক্রমণকারী, আক্রান্তগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার খোঁজ নিতে হবে।

    সূত্র নির্দেশ: 

    ১ পুরো প্রবন্ধ জুড়ে ‘গণহত্যা’ ব্যবহার না করে ‘জেনোসাইড’ ব্যবহার করা হয়েছে, বিশেষ উদ্দেশ্যেই। বাংলা একাডেমি অভিধানে genocide এর পরিভাষা হিসেবে ‘গণহত্যা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ‘গণহত্যা’ না বলে ‘জেনোসাইড’ বলার দুটো প্রধান কারণ আছে। প্রথমত ‘জেনোসাইড’ শব্দ দিয়ে যে একটা প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে, অর্থাৎ নির্ধারিত একটা গোষ্ঠীকে আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস করার নিয়তে পরিকল্পিতভাবে কিছু নির্দিষ্ট অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা, আন্তর্জাতিক আইনের যেটাকে ‘অপরাধ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই গোটা প্রক্রিয়াটা ‘গণহত্যা’ শব্দের মধ্যে আটে না। ‘গণহত্যা’র অর্থ সেদিক থেকে ইংরেজি শব্দ ‘ম্যাসাকারে’র নিকটবর্তী। কেননা, ‘জেনোসাইড’ প্রক্রিয়াতে কেবল ‘হত্যা’ই জড়িত না, হত্যা বা নিধনের বাইরেও আরো বহু বিষয় রয়েছে। জেনোসাইড ও গণহত্যা দুই শব্দের ব্যবহারগত ফারাক নিয়ে আরো অনেকেই লিখেছেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে এই শব্দের বহুল ব্যবহার শব্দকে তার মূল অর্থ থেকে একধরণের বিচ্ছেদও ঘটিয়েছে। যেমন, ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ইত্তেফাক–এর হেডলাইন ছিল ‘বাংলার বুকে এ গণহত্যা বন্ধ কর!’ একাত্তরের পূর্বেও বিভিন্ন বিবৃতিতে এটার ব্যবহার পাওয়া যায়। আবার সাম্প্রতিক সময়ে যে কোনো রাষ্ট্রীয় ভায়োলেন্স যা প্রাণহানি ঘটিয়ে থাকে তাকে ‘গণহত্যা’ বলার প্রবণতাও এখানে রয়েছে। এই অবস্থান থেকে স্পষ্টত দূরত্ব তৈরি করার জন্য ‘জেনোসাইড’ শব্দটা ব্যবহারই যৌক্তিক ও যথার্থ বলে মনে করি।

    ২ The Events in East Pakistan, 1971, A legal study by the Secretariat of the International Commission of Jurists. Geneva: 1972.

    ৩  হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পা.),বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র : ত্রয়োদশ খণ্ড, গণপ্রপজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তথ্য মন্ত্রণালয় (মুদ্রন ২০১১), পৃ. ৭২১ 

    ৪ সহুল আহমদ, ‘রোহিঙ্গা জেনোসাইড: আর্তনাদ শোনার কেউ নেই’, শুদ্ধস্বর, ২৬ আগস্ট ২০২০

    ৫ Mahmood Mamdani, ‘The Politics of Naming: Genocide, Civil War, Insurgency’, London Review of Books, Vol. 29 No. 5 · 8 March 2007

    ৬ Scott Straus, ‘Contested meanings and conflicting imperatives: A conceptual analysis of genocide’, Journal of Genocide Research, 3:3, 349-375, 2001, DOI: 10.1080/14623520120097189

    ৭ চৌধুরী শহীদ কাদেরের ‘বাংলাদেশ গণহত্যায় ধর্ম, লিঙ্গ ও বয়সের প্রভাব: একটি কেস স্টাডি’ প্রবন্ধটি গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ ২, (জুলাই ২০২২) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যখন কাজ করছিলেন তখন এই বিষয়ে তার সাথে আলাপ–আলোচনা হয়েছে। তিনি তার প্রকাশিতব্য গবেষণা ও এর ফলাফল আমাকে দেখতে দেয়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। অন্যান্যদের কাজের চেয়ে তার এই কাজের আলাদা বিশেষত্ব হচ্ছে বাকি সবাই যেখানে বাহাত্তরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক আইনবিদ পরিষদ এর প্রতিবেদনের যুক্তিই ব্যবহার করেছেন, চৌধুরী শহীদ কাদের মাঠ পর্যায়ের কেস–স্টাডিকে আমলে নিয়েছেন।

    ৮ Sarmila Bose, ‘Anatomy of Violence: Analysis of Civil War in East Pakistan in 1971.’ Economic and Political Weekly, vol. 40, no. 41, pp. 4463–4471, 2005. JSTOR, www.jstor.org/stable/4417267. Accessed 23 Aug. 2021.

    ৯ Wardatul Akmam, ‘Atrocities against humanity during the liberation war in Bangladesh: A case of genocide’, Journal of Genocide Research, 4:4, 543-559, 2002. DOI: 10.1080/146235022000000463

    ১০ Geoffrey Robinson, ‘State-Sponsored Violence and Secessionist Rebellions in Asia.’ In Donald Bloxham and A. Dirk Moses eds. The Oxford Handbook of Genocide Studies. New York and Oxford: Oxford University Press, 2010, pp. 466-88.

    ১১ Ibid.

    ১২ The Events in East Pakistan, 1971, P. 52

    ১৩ মুনতাসীর মামুন, পাকিস্তানি জেনারেলদের মন: বাঙালি, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, সময় প্রকাশন, ২০১০; মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দীন আহমেদ, পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে একাত্তর, ইউপিএল, ২০০৫।

    ১৪ মহিউদ্দিন আহমদ, আওয়ামীলীগের উত্থানপর্ব: ১৯৪৮–১৯৭০, প্রথমা, ২০১৬, পৃ. ১৫৮–১৬৪

    ১৫ Mohammad Ayub Khan, Friends Not Masters: A Political Autobiography, The University Press Limited (UPL), 2008, P.187

    ১৬ রাও ফরমান আলী খান, বাংলাদেশের জন্ম, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), ২০১৭

    ১৭ শারমিন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা, ঐতিহ্য, ২০১৫

    ১৮ মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দীন আহমেদ, প্রাগুক্ত, ২০০৫, পৃ. ৩১৫

    ১৯ প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৬

    ২০ প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬

    ২১ ফজলুল কাদের, বাংলাদেশ জেনোসাইড এন্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, সংঘ প্রকাশন, ২০০৩

    ২২ Anam Zakaria, 1971: A People’s History from Bangladesh, Pakistan and India, Penguin, 2019, P. 19

    ২৩ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র

    ২৪ Lisa Sharlach, ‘Rape as Genocide: Bangladesh, the Former Yugoslavia, and Rwanda.’ New Political Science. 22. 89-102, 2000.

    ২৫হামিদা হোসেন, আমেনা মহসিন, সেলিনা হোসেন, একটি জাতির জন্ম: যৌন সহিংসতা ও দায়মুক্তি, ইউপিএল, ২০১৮; Susan Brownmiller, Against Our Will: Men, Women, and Rape, Simon & Schuster, 1975; মুনতাসীর মামুন, বীরাঙ্গনা ১৯৭১, সুবর্ণ, ২০১৩; এম এ হাসান, যুদ্ধ ও নারী, তাম্রলিপি, ২০০৮; নারীর–৭১ ও যুদ্ধ পরবর্তী কথ্য কাহিনী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রকাশনা

    ২৬এম এ হাসান, যুদ্ধ ও নারী, তাম্রলিপি, ২০০৮, পৃ. ৫০–৫৩

    ২৭ Nayanika Mookherjee, The Spectral Wound: Sexual Violence, Public Memories, and the Bangladesh War of 1971, Duke University Press, 2015; Angela Debnath, “The Bangladesh Genocide: The Plight of Women”, In Totten, S. (Ed.). (2009). Plight and Fate of Women During and Following Genocide: Genocide: A Critical Bibliographic Review (2nd ed.). Routledge; সায়েমা খাতুন, মুক্তিযুদ্ধের His-Story ইজ্জত ও লজ্জা, পাবলিক নৃবিজ্ঞান, ২০১৫, নিলীমা ইব্রাহিম, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, ২০১৩, (ষষ্ট সংস্করণ)

    ২৮ Bina D’Costa, “1971: Rape and its consequences”, Bdnews24.com, 15th Dec 2010

    ২৯‘দি রেমেডি’ শিরোনামের তিন পৃষ্ঠার এই দলিলটি খুলনাস্থ গণহত্যা–নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই দলিলটি আমাকে ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য জাদুঘরের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

    ৩০মুনতাসীর মামুন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস: অন্যভাবে দেখা, সময় প্রকাশন, ২০১৮, পৃ. ১১৬–১২১

     

    • প্রথম প্রকাশ: গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ, সংখ্যা ২, জুলাই ২০২১, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা 
  • নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    • অনুবাদ: ইমন রায় 

    অনুবাদকের নোট: নোম চমস্কি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী ও আধুনিক ভাষাতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বর্তমানে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লরিয়েট অধ্যাপক এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভাষাতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের নাম কনসিক্যুয়েন্সেস অফ ক্যাপিটালিজম: ম্যানুফ্যাকচারিং ডিসকন্টেন্টস এন্ড রেজিস্ট্যান্স। নোম চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সি.জে. পলিক্রনিউ। তিনি একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও সাংবাদিক যিনি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করেছেন ও পড়িয়েছেন। বর্তমানে তাঁর গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে মার্কিন রাজনীতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক একীভবন, বিশ্বায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অর্থনীতি, এবং নব্য–উদারনৈতিকতার আর্থ–রাজনৈতিক প্রকল্পের বিনির্মাণ। তিনি ট্রুথ আউট এর একজন নিয়মিত প্রদায়কের পাশাপাশি ট্রুথ আউট এর পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রকল্পের একজন সদস্য। মূল লেখাটি ট্রুথআউটে Noam Chomsky: Russia’s War Against Ukraine Has Accelerated the Doomsday Clock শিরোনামে ৩০শে মার্চ ২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

    নোম চমস্কি; শিল্পী: সার্জ মেজেট; সূত্র: আর্টমেজেউর

    মূল সাক্ষাৎকার  

    ইউক্রেইন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার সামরিক কৌশল ও ভ্লাদিমির পুতিনের ভূ–কৌশলগত লক্ষ্যসমূহ নিয়ে অনেক জল্পনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, পুতিন কী চান সেটা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, এবং ইউক্রেইনীয় প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনেস্কির বারংবার মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো, যদিও এটি শীঘ্রই পরিবর্তিত হতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সম্ভাব্য স্পষ্টতম ইঙ্গিত দিয়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে তখন ইউক্রেইনের ধ্বংস অদ্যবধি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) তার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং ওয়াশিংটন থেকে এমন কোনো লক্ষণ নেই যে ইউক্রেইনে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাইডেন প্রশাসন গঠনমূলক কূটনীতিতে লিপ্ত হতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কার্যত রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহার করে আগুনে ঘি ঢালছেন।

    নিচের সাক্ষাৎকারে বিশ্বখ্যাত স্কলার ও নেতৃস্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী নোম চমস্কি ইউক্রেইন যুদ্ধের সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনীয়তাকে আমাদের নিকট সুচারুভাবে উন্মোচন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্পর্কে তাঁর কিছু অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টির মতাদর্শিক জগতের পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক উত্তাপ ও বই নিষিদ্ধকরণ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: নোম, ইউক্রেইনের যুদ্ধের সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কতিপয় ইউক্রেইনীয় কর্মকর্তার মতে, দেশটিকে “উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া”র মত ভাগ করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া তার কৌশল পরিবর্তন করছে। এর মধ্যে ন্যাটো তার পূর্ব ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেন রাশিয়ার বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও স্লোভেনিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেইনে শান্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন কেবল নীরবই থাকছে না, বরং আমরা শুনেছি বাইডেন তাঁর সাম্প্রতিক পোল্যান্ড সফরে পুতিনের বিরুদ্ধে অনেকটা বিষাক্ত তেজোদ্দীপ্ত কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছেন। এর ফলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছেন কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি আমেরিকান অভিজ্ঞ কূটনৈতিক রিচার্ড হাস বলেছেন যে বাইডেনের কথাগুলো একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। সমস্ত একাগ্রতার সাথে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবতে পারে যে ভীতিপ্রদর্শন ও নিরন্তর শক্তির ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে?

    নোম চমস্কি: কয়েকটি প্রশ্ন আছে, সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ, আমি এখানে যা বলার চেষ্টা করতে পারি তার চেয়েও বেশি আলোচনার যোগ্য। আমি মোটামুটি ক্রমানুসারে বলবো।

    চলমান সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দুটো গল্প আছে। পরিচিত গল্পটি দিয়েছেন ইউক্রেইনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল কিরিলো বুদানভ : ইউক্রেইনীয় সরকার উৎখাতের জন্য রাশিয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই রাশিয়া এখন একটি “কোরিয়ান দৃশ্যপট” পরিকল্পনা করার মাধ্যমে দেশটির দক্ষিণে ও পূর্বে, ডনবাস অঞ্চলে ও পূর্বাঞ্চলীয় আজভ সমুদ্র উপকূলের দিকে পিছু হটছে।

    রাশিয়ান ফেডারেশনের জেনারেল স্টাফ অফ দ্য আর্মড ফোর্সেস–এর প্রধান পরিচালন অধিদপ্তরের প্রধান কর্নেল জেনারেল সের্গেই রুদস্কয় একদম ভিন্ন একটি গল্প বলেছেন (২৫ মার্চ পর্যন্ত): ইরাকে জর্জ ডব্লিউ বুশের “মিশন সম্পন্ন” হওয়ার অনুরূপ, যদিও নাটকীয় কৃত্রিমতা নেই:

    বিগত আট বছর ধরে ইউক্রেইনীয় নাৎসিদের গণহত্যামূলক আক্রমণ থেকে ডনবাস পিপলস রিপাবলিককে রক্ষা করাই হচ্ছে “বিশেষ সামরিক অভিযান” এর মূল লক্ষ্য। ইউক্রেইন যেহেতু কূটনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই অসামরিকদের রেহাই দিয়ে খুব সতর্কতার সহিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ইউক্রেইনের “বিসামরিকীকরণ ও বিনাৎসিকরণ” এর জন্য অভিযানটি বিস্তৃত করা প্রয়োজনীয় ছিলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাযথভাবে দক্ষতার সহিত প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে। যা অবশিষ্ট আছে তা হলো “ডনবাসের পূর্ণ মুক্তি।”

    দুটো গল্প, একই সমাপ্তি, যা আমি মনে করি নিখুঁত।

    পশ্চিম, বেশ স্বাভাবিকভাবে, প্রথম গল্পটি গ্রহণ করেছে। এটি সেই গল্পটি গ্রহণ করেছে যা আমাদের বলে যে রাশিয়ানরা তাদের সীমান্ত থেকে কয়েক মাইলের মধ্যে শহরগুলো দখল করতে সক্ষম নয়, যেগুলো বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসারে একটি নাগরিক সৈন্যবাহিনী সমর্থিত সীমিত সামরিক শক্তি দ্বারা রক্ষিত।

    অথবা পশ্চিম কি এই গল্পটি গ্রহণ করে? এর কার্যকলাপ ইঙ্গিত দেয় যে এটি জেনারেল রুদস্কয়ের সংস্করণটি বেশি পছন্দ করে—একটি অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষমতাধর ও সুদক্ষ রাশিয়ান সামরিক যন্ত্র ইউক্রেইনে তার লক্ষ্যসমূহ তাড়াতাড়ি অর্জন করার মাধ্যমে হয়ত দক্ষতার সহিত ন্যাটোকে গ্রাস করে এখন ইউরোপকে আক্রান্ত করার জন্য এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। যদি তাই হয়, তাহলে এই দানবীয় শক্তির আসন্ন আক্রমণকে ঠেকানোর করার জন্য ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তিবৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

    আরেকটি ভাবনা নিজেই প্রকাশিত হয়—এটা কি হতে পারে যে ইউরোপকে ওয়াশিংটনের খপ্পরে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে পুতিন তাকে যে দারুণ উপহার দিয়েছেন সেটাকে ওয়াশিংটন আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, এবং সেজন্য পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তার জানামতে আক্রমণের হুমকি না থাকার পরেও সেখানে শক্তিবৃদ্ধি করতে ইচ্ছুক?

    আমরা পূর্বে যে যৌথ বিবৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি সে অবস্থান থেকে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন সরে আসেনি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার বিবৃতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে ইউক্রেইনকে স্বাগত জানিয়েছে এবং “ন্যাটোর বর্ধিত সুবিধাদির একটি অংশীদার হিসেবে ইউক্রেইনের পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখার জন্য বলিষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন কর্মসূচি”র পাশাপাশি ইউক্রেইনকে উন্নত এন্টি–ট্যাংক ও অন্যান্য অস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে “মার্কিন–ইউক্রেইন কৌশলগত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি ভিত্তি রচনা করে এমন একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত করেছে।”

    পুতিন কেন ইউক্রেইন আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুঁজে বের করার জন্য তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত মনের গভীর নিভৃতে পৌঁছানোর ব্যাপারে অনেক বিদগ্ধ আলোচনা রয়েছে। অপরাধমূলক আগ্রাসনের দিকে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি ইউক্রেইনের সীমান্তে বাৎসরিক সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করার জন্য তাঁর নিরুত্তর আহ্বানের বিষয়ে কিছুটা মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি অনেক উচ্চপদস্থ মার্কিন কূটনৈতিক, সিআইএ পরিচালক, এবং আরও অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত যারা এসমস্ত উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করার বোকামি সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন।

    শিল্পী: এলেক্স উইলিয়ামসন; সূত্র: নিউস্টেটসম্যান

    ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের সিদ্ধান্তকে বোঝার সঠিক পন্থা হচ্ছে সম্ভবত পুতিনের মনের অনুসন্ধান করা। হয়ত আরেকটি সম্ভাবনা আছে। হয়ত ২৫ বছর আগে বরিস ইয়েলেৎসিন থেকে শুরু করে তিনি ও অন্যান্য রাশিয়ান নেতৃবৃন্দ ইউক্রেইনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে যা বলে আসছিলেন সেটাই বুঝিয়েছেন; এবং সম্ভবত, অত্যন্ত উস্কানিমূলক যৌথ বিবৃতিটি যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাবিয়ে রাখা হয়েছে, পুতিন হয়ত এ বিষয়ে ভেবে থাকবেন এবং তাই সরাসরি সংঘর্ষের যে প্রচেষ্টাকে প্রতি বছর উপেক্ষিত রাখা হয় সেটিকে ত্বরান্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    হয়ত, এটি একটি সম্ভাবনা।

    সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, “যদি রাশিয়া সেনা প্রত্যাহার করে নেয় এবং কিয়েভ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পায় তাহলে ইউক্রেইন নিরপেক্ষতা ঘোষণা করতে, ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা ত্যাগ করতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিকশিত না করার জন্য প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত।”

    এটি একটি প্রশ্নকে তুলে ধরে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে ও গত সেপ্টেম্বরের নীতিমালা বিবৃতির অবস্থানকে বজায় রাখার মাধ্যমে এসব প্রচেষ্টায় বাগড়া দেওয়ার পরিবর্তে নমনীয় হবে, এবং ইউক্রেইনকে অধিকতর দুর্দশা থেকে রক্ষা করার চেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে যাবে?

    পুতিনকে পালাবার কোনো পথ না দিয়ে, তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বাইডেনের অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্যের দিকে এই প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে যায়। বাইডেনের বক্তব্য কার্যত একটি যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে স্বীকৃত যার পরিণতি হতে পারতো ভয়াবহ, বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই আতঙ্ক তাঁর কর্মকর্তাদের মধ্যেও কম নয়, যারা ত্বরিত হয়ে বিশ্বকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি যা বলেছেন তাঁর কথায় সেটা বুঝায় না। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের অবস্থানকে বিচার করলে এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া মুশকিল।

    বাইডেন তখন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে তাঁর বক্তব্য “নৈতিক ক্ষোভের” একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, রাশিয়াকে যে “কসাই” শাসন করে তাঁর অপরাধের প্রতি বিতৃষ্ণা। অন্য কোনো চলমান পরিস্থিতি আছে যা নৈতিক ক্ষোভকে অনুপ্রাণিত করতে পারে?

    ঘটনাগুলো ভেবে দেখা কঠিন কিছু নয়। সবচেয়ে ভয়াবহগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান। আক্ষরিকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারের সম্মুখীন, একটি সুবিশাল ট্র্যাজেডি। বাজারে খাবার আছে, কিন্তু ব্যাংকে যাওয়ার সুযোগ না থাকার কারণে যাদের অল্প টাকা আছে তাদের সন্তানদের অনাহারে দেখতে হয়।

    কেন? একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ওয়াশিংটনের ২০ বছরের যুদ্ধকে প্রতিরোধ করার সাহস দেখানোর কারণে দরিদ্র আফগানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নিউ ইয়র্কের ব্যাংকগুলোতে রক্ষিত আফগানিস্তানের তহবিলগুলো মুক্ত করতে ওয়াশিংটন অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সরকারি অজুহাত আরও বেশি লজ্জাজনকঃ আমেরিকানরা ৯/১১ এর অপরাধের ক্ষতিপূরণ চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই অনাহারী আফগানদের থেকে তহবিলগুলো আটকে রাখতে হবে, যার জন্য আফগানরা দায়ী নয়। মনে রাখুন তালেবানরা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলো, যার অর্থ দাঁড়ায় আল–কায়েদা সন্দেহভাজনদের ফিরিয়ে দেওয়া। (মার্কিন আক্রমণের সময়, আদতে তার অনেক পরে, যেটা এফবিআই নিশ্চিত করেছিলো, তারা কেবল সন্দেহভাজন ছিলো) তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘোষণার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছে যে, “যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণের বিষয়ে দরকষাকষি করতে ইচ্ছুক নয়।” ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামসফেল্ডের কথাটি জর্জ ডব্লিউ বুশের দ্বারা প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো।

    এই চলমান অপরাধের ব্যাপারে যদি কোনো নৈতিক ক্ষোভ থাকে, সেটা শনাক্ত করা কঠিন। এটি একমাত্র ঘটনা নয়। কোনো শিক্ষণীয় কিছু আছে? হয়ত আছে, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট সাধারণ মনে হলেও এ বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার।

    ইউক্রেইনে রাশিয়ার অপরাধের ব্যাপারে নৈতিক ক্ষোভটি বোধগম্য এবং ন্যায়সঙ্গত। নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনও বোধগম্য কিন্তু ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি অনেক দেখা যায় বলে বোধগম্য।

    শ্রেষ্ঠ নিয়মের চেয়ে আরও বেশি প্রাথমিক মৌলিক নীতির কথা চিন্তা করা দুষ্কর—ইহুদী ঐতিহ্যে নিয়মটি হচ্ছে, “তোমার কাছে যা ঘৃণিত তা অন্যদের সাথে করো না।”

    এমন কোনো নিয়ম নেই যা এর চেয়ে বেশি মৌলিক, কিংবা নিয়মিতভাবে এর চেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়। একটি অনুসিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তা সত্য : উদ্যম ও মনোযোগ সেখানেই কেন্দ্রীভূত করা উচিত যেখানে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালো করতে পারি। আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে সাধারণত এর অর্থ হচ্ছে নিজ রাষ্ট্রের কাজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা, বিশেষত কম–বেশি গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে যেখানে ফলাফল নির্ণয়ে নাগরিকদের কিছু ভূমিকা থাকে। আমরা মিয়ানমারের [বার্মা নামেও পরিচিত] অপরাধকে ঘৃণা করতে পারি, কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরে কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করার জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পারি না। যেসকল দুর্দশাগ্রস্ত ভুক্তভোগী পালিয়ে এসেছেন কিংবা উৎখাত হয়েছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা, তাদেরকে সাহায্য করার জন্য অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু আমরা করবো না।

    পর্যবেক্ষণটিকে সর্বজনীন করা হয়। নীতিটি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক। প্রকৃত চর্চাটি নীতির সাথে সঙ্গতি রাখতে ব্যর্থ হয়, এটা বললে খুবই অবমূল্যায়ন হবে। 

    ওয়ার; কার্টুনিস্ট: ফ্রাগিস্কস; সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন নয় যে আমরা নীতিটি বুঝি না এবং সেটাকে সম্মান করি না। আমরা সত্যিকারের অনুরাগের সহিত তা করি যখন আনুষ্ঠানিক প্রতিপক্ষদের সমাজে এই নীতিটি পরিলক্ষিত হয়ঃ যেসকল রাশিয়ান সাহসিকতার সাথে কঠোর রাশিয়ান স্বৈরতন্ত্রকে অস্বীকার করছেন ও রাশিয়ান আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন তাঁদের প্রতি আমরা কুর্নিশ জানাই। এর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা সবসময়ই সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বীদের গভীরভাবে সম্মানিত করেছি যারা তাঁদের নিজ রাষ্ট্রের অপরাধগুলোর নিন্দা জানিয়েছেন এবং এমনকি অন্যরা যখন প্রধান মার্কিন অপরাধগুলোকে প্রশংসিত করতেন, তাদের নিয়েও কথা বলতে একদমই কুণ্ঠিত হতেন না। চীনা ও ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তা–ই। যখনই কেবল আমাদের ওপর নীতিটি প্রযোজ্য হয় তখন এটি একদমই অনুশীলন করা হয় না।

    ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ হচ্ছে আমাদের অনেক নাটকীয় নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। একে একটি “কৌশলগত সাংঘাতিক ভুল” (বারাক ওবামার মতে) হিসেবে সমালোচনা করা যেতে পারে এবং এটি যা ছিলো সে হিসেবে নয়ঃ অপ্ররোচিত ও খুনে আগ্রাসন, ন্যুরেমবার্গের দণ্ডাদেশ অনুসারে “সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ।”

    সে অনুযায়ী নৈতিক ক্ষোভের নাটকীয় নির্বাচনটি বোধগম্য এবং সেটি আরেকটি ক্ষোভ। অপরাধকে লঘু করার দুর্বল প্রয়াস হিসেবে আমরা আরও বলতে পারি যে এটি মার্কিন আবিষ্কার নয়। আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা, ব্রিটেন সহকারে, ভিন্ন কিছু ছিলেন না; তর্কসাপেক্ষে আরও খারাপ ছিলেন, যদিও শতাব্দীব্যাপী জঘন্য আচরণের পর এখন দায়স্বীকারের সূচনা হয়েছে।

    পরবর্তী প্রশ্নের দিকে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবে যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে? কোনো সন্দেহ নেই। দৃষ্টান্ত রয়েছে যেগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার। আমরা চাইলে আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ব্যাপারে সেগুলো থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।

    ঠিক এই মূহুর্তে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তকে উদযাপন করার জন্য আমাদের সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে—ইসরায়েল ও চার আরব স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে চলমান “নেগেভ সম্মেলন।” এই ঐতিহাসিক সভাতে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্থনি ব্লিংকেনের মতে, এটি “এই অঞ্চলে শান্তি ও সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনাকে বর্ধিত করবে।”

    সম্মেলনটি আব্রাহাম চুক্তির ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথের মধ্যে থাকা সর্বাধিক নিষ্ঠুর ও সহিংস রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করেছে। চুক্তিটি ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও মরক্কোর মধ্যকার মৌন সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকতা দিয়েছে, যেখানে সৌদি আরব তার মুখাপেক্ষী বাহরাইন একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে অন্তর্নিহিতভাবে উপস্থিত ছিলো। সম্মেলনে মিশর তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো, যেটি এখন প্রায় ৬০,০০০ রাজনৈতিক বন্দী ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তার কুৎসিত ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য একনায়কতন্ত্রের অধীনে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সবচেয়ে বড় গ্রাহক হচ্ছে মিশর। সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বর্ণবাদী রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া শীর্ষস্থানীয় গ্রাহকের জঘন্য রেকর্ড পর্যালোচনা করার দরকার নেই।

    বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানবিক সংকট হিসেবে জাতিসংঘ যাকে আখ্যা দিয়েছে, সেই ইয়েমেনের জন্য প্রাথমিক দায়ের ভাগীদার হচ্ছে ইউএই ও সৌদি আরব। গত বছর সরকারি হিসেবে মৃত্যু সংখ্যা তিন লাখ সত্তর হাজারে পৌঁছেছে। আসল সংখ্যা কেউ জানে না। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত একমাত্র বন্দরটির ওপর সৌদি আরব তার অবরোধ জোরদার করেছে। জাতিসংঘ চরম সতর্কবার্তা প্রচার করছে, লক্ষ লক্ষ শিশুর আসন্ন অনাহারের ঝুঁকির কথা বলছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা সাধারণ সতর্কবার্তার সাথে গলা মিলিয়েছেন। ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ব্রুস রিডেলের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য, যিনি চার জন প্রেসিডেন্টের আমলে মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএ–এর সাবেক শীর্ষ বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, সৌদির “আক্রমণাত্মক কাজকে” একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, খুচরা যন্ত্রাংশ ছাড়া সৌদি ও আমিরাতি বিমান বাহিনী কাজ চালাতে পারে না। অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সাথে ব্রিটেন এই অপরাধে অংশ নিচ্ছে, তবে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগে মরক্কোর একনায়কতন্ত্রকেও স্বাগত জানানো হয়েছিলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি তাঁর ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিরুদ্ধে গিয়ে মরক্কো কর্তৃক পশ্চিম সাহারার অন্তর্ভুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন—যা ঘটনাক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপূরণীয় সম্পদ পটাশিয়ামের ওপর মরক্কোর কার্যত একাধিপত্যকে জোরদার করেছে, যা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন।

    মরক্কোর অপরাধমূলক অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দেওয়াকে আশ্চর্যজনক হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি ইসরায়েল কর্তৃক গোলান উপত্যকা এবং বিশালাকারে বিস্তৃত বৃহৎ জেরুজালেমের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে অনুসরণ করেছে, উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিষদের আদেশগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই চমৎকার বিচ্ছিন্নতা, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই উপভোগ করে, তার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থনটি গৃহীত হয়েছিলো, যেমনটা ৬০ বছর ধরে কিউবাকে তার অত্যাচারের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

    এগুলো কেবল “আইনের শাসন” ও সার্বভৌমত্বের অলঙ্ঘনীয়তার প্রতি অঙ্গীকারের আরও কিছু দৃষ্টান্ত, যা ওয়াশিংটন ৭০ বছর যাবত ইরান, গুয়াতেমালা, ব্রাজিল, চিলি, ইরান ও আরও অনেক দেশে দেখিয়েছে—ইউক্রেইনকে ন্যাটোতে যোগ দিতে স্বাগত জানানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।

    আমরা এখন যে সম্মেলটিকে উদযাপন করছি সেটি আব্রাহাম চুক্তির একটি সরাসরি বিকাশ। এগুলো প্রণয়ন করার জন্য জেয়ারড কুশনারকে (হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক অ্যালান দারশোভিচ কর্তৃক) নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

    সংঘাতের শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় ওয়াশিংটন যে তার নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছে সেটা আব্রাহাম চুক্তি ও আজকের নেগেভ সম্মেলনেই প্রথম নয়। সর্বোপরি, হেনরি কিসিঞ্জার কূটনৈতিক ইতিহাসে গণহত্যার অন্যতম অসাধারণ আহ্বানটি প্রচার করার পরপরই ভিয়েতনামে শান্তি আনয়নে তাঁর অর্জনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেনঃ “কম্বোডিয়াতে এক ব্যাপক বোমা হামলা অভিযান। যা কিছু চলনশীল তার ওপর দিয়ে উড়তে হয়।” পরিণাম ছিলো ভয়াবহ, কিন্তু কোনো ব্যাপার নয়।

    কিসিঞ্জারের পুরস্কার মনে করিয়ে দিয়েছে যে [ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী] মেনাশিম বেগিনকে পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার প্রদানের জন্য একজন ইসরায়েলি পদার্থবিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন, তাঁকে শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের পুরস্কার কেন নয়?”

    এই ঠাট্টা অনেক সময় অন্যায্য। জিমি কার্টার নিশ্চিতভাবে শান্তি পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন যা তিনি প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তাঁর প্রচেষ্টার জন্য লাভ করেছিলেন। পুরস্কার কমিটি অবশ্য জোর দিয়ে বলেছিলো যে ক্ষমতায় থাকার সময় প্রেসিডেন্ট কার্টারের “ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যকার ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি নোবেল পুরস্কারের জন্য যোগ্য হওয়ার একটি অতিশয় যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিলো।”

    কার্টারের ১৯৭৮ সালের প্রচেষ্টাগুলো নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম নিয়তের সহিত গৃহীত হয়েছিলো। এটি পুরোপুরি সেরকম ফল লাভ করেনি। মেনাশিম বেগিন মিশরীয় সিনাইয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রকল্পকে পরিত্যাগ করতে রাজি হয়েছিলেন কিন্তু চুক্তিগুলো থেকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারসমূহকে বাদ দেওয়ার জন্য জোর করেছিলেন, এবং অ্যারিয়েল শ্যারনের পরিচালনায় সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সহায়তার সহিত ও নিরাপত্তা পরিষদের নিদের্শনাকে লঙ্ঘন করে অবৈধ স্থাপনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। আর ইসরায়েলি কৌশলগত বিশ্লেষকরা দ্রুতই বের করেছিলেন যে, মিশরীয় প্রতিবন্ধকতাকে সরিয়ে ফেলার কারণে ইসরায়েল লেবাননে তার আক্রমণ বৃদ্ধি করতে পেরেছিলো, যার ফলে অবশেষে ১৯৮২ সালের মার্কিন সমর্থিত আক্রমণে প্রায় ২০,০০০ লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং কোনো বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত ছাড়াই লেবাননের অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো।

    রাজধানী শহর বৈরুতের ওপর বোমাবর্ষণ যখন ওয়াশিংটনের জন্য আন্তর্জাতিক গ্লানি তৈরি করছিলো তখন রোনাল্ড রিগ্যান অবশেষে ইসরায়েলকে আক্রমণ বন্ধ করতে আদেশ দেন। ইসরায়েল অবশ্যই সম্মত হয়েছিলো কিন্তু তাদের ভাষায় যে “সন্ত্রাসবাদী গ্রামবাসীরা” নিষ্ঠুর দখলদারিত্বের প্রতিরোধ করেছে তাদের প্রতি ক্রমাগত অত্যাচারের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলো। এটি খিয়ামে–ও একটি জঘন্য নির্যাতন কক্ষ স্থাপন করেছিলো। হিজবুল্লাহ গেরিলা যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে শেষমেশ ইসরায়েলকে চলে যেতে বাধ্য করার পর একে একটি স্মৃতিস্থাপনা হিসেবে রাখা হয়েছিলো। ইসরায়েলি বোমা হামলার মাধ্যমে অপরাধের স্মৃতিকে ধ্বংস করার আগে আমাকে সেটা ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিলো।

    অতএব, হ্যাঁ, কিছু ঘটনা আছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার পূর্বেকার অন্যান্য আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মত, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেছে।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: দেশে রিপাবলিকানরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির জন্য মদদ দিচ্ছে, যদিও তাদের “মহান নেতা” চলমান ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাল মেলানোর জন্য পুতিনের ব্যাপারে তাঁর সুর পরিবর্তন করে চলেছেন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছেঃ এখনও জিওপি (রিপাবলিকান পার্টি) সদস্যদের মধ্যে, বিশেষত রাজনৈতিক বলয়ের অতি ডানপন্থীদের মধ্যে, রাশিয়া ও পুতিনের জন্য সমর্থন থাকার কারণ কী? দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত যখন ইউক্রেইনের পক্ষে তখন কোন জিনিসটি রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে রাশিয়ার বিষয়ে মতদ্বৈধতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অতি ডানপন্থীদের অনুপ্রাণিত করছে?

    নোম চমস্কি: এটি শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেইন নয়। ইউরোপ যখন হাংগেরিতে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের “সংকীর্ণ গণতন্ত্র”কে নিন্দা জানিয়েছে তখন এটি আমেরিকান ডানপন্থার অনেকাংশের প্রিয়ভাজন হয়েছে। ফক্স নিউজ ও তার প্রধান সম্প্রচারক টাকার কার্লসন এর নেতৃত্বে আছেন, কিন্তু অন্যান্য প্রখ্যাত “রক্ষণশীলরা” হাঙ্গেরির স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে ওরবান কর্তৃক আরোপিত আদি–ফ্যাসিস্ট খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রশংসায় গা ভাসাচ্ছে।

    এসব কিছুই রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে একটি সংঘাতকে প্রতিফলিত করে—অথবা আরও সঠিকভাবে বললে, এক সময়কার একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের যা অবশিষ্ট আছে তা এখন নব্য–ফ্যাসিবাদী উৎসের ইউরোপীয় দলগুলোর কাতারে অবস্থান করছে। ট্রাম্প যে প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছেন তার মূলে আছে ৩০ বছর আগে নিউট গ্যাংরিচ কর্তৃক পার্টির কর্তৃত্ব গ্রহণ। ট্রাম্প এখন ডানপন্থীদের কাছে পরাস্ত হচ্ছেন, খুব বেশি দিন আগেও এটা কল্পনা করা কঠিন ছিলো না। অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ তাদের সাথে ভক্তিপূর্ণ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ওরবান মডেলের দিকে ঝুঁকছেন অথবা তার চেয়েও বেশি কিছু। আমি মনে করি রাশিয়া ও ইউক্রেইনের বিষয়ে দলটির ভেতরের বিতর্ককে এই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: জিওপি আইনপ্রণেতারা বর্ণ বিষয়ক বইগুলোকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টাকে জোরদার করছেন, যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব ও বর্ণগত অত্যাচার ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে কারোর কল্পনাপ্রসূত উদ্ভাবন। বই নিষিদ্ধ করা ও ভোট দমন করার চেষ্টা কি সম্পর্কযুক্ত? এসব ঘটনাপ্রবাহ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ঘনীভূত হওয়ার ইঙ্গিতকে প্রতীয়মান করে?

    নোম চমস্কি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধকরণ নতুন কিছু নয় এবং গতানুগতিকভাবে বলা যায়, “ভুল” লোকদের ভোট দমন করা আপেল পাইয়ের মতই আমেরিকান। শীঘ্রই ক্ষমতা পুনঃদখল করতে উদ্যত রিপাবলিকান প্রতিষ্ঠান যখন এক ধরনের আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে তখন এগুলো শক্তি নিয়ে ফিরে আসছে। কতিপয় সাবধানী বিশ্লেষক গৃহযুদ্ধকে আঁচ করেন। অন্ততপক্ষে একটি গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকট রূপধারণ করছে। আমেরিকার অবক্ষয় নিয়ে অনেক দিন যাবত অনেক আলোচনা হচ্ছে। এর যতটুকু বাস্তব, তার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ। গভীরে তাকালে দেখা যাবে অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবক্ষয়ের বেশিরভাগই বিগত ৪০ বছরের নব্য–উদারনৈতিক কার্যক্রমের নিষ্ঠুর প্রভাব থেকে উদ্ভূত। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। হাঙ্গেরি যখন খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে যায় তখন এটি যথেষ্ট খারাপ। বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে যখন এটি ঘটে তখন এর পরিণাম হয় অশুভ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: যেসব দেশ ওয়াশিংটনের আদেশ মোতাবেক চলতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশল। এমনকি নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা দেশগুলোতে বসবাসরত বিদগ্ধজনদের অবাঞ্ছিত হিসেবে গণ্য করা হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণপরিসরে ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠস্বরদের ব্যাপকভাবে শুনতে দেওয়ার অনুমোদন দিতে একদমই আগ্রহী নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু বলতে চান?

    নোম চমস্কি: এটি এত বড় বিষয় যে এখানে বলা যাবে না। আর এটি নৈমিত্তিক বক্তব্যের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি স্মরণ করা উচিত যে আবারও এটি নতুন কিছু নয়। আমরা সবাই স্মরণ করতে পারি যে ইরাকে ওয়াশিংটনের অপরাধমূলক হামলায় যোগ দিতে ফ্রান্সের দুর্বিনীত অস্বীকৃতির ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহান সিনেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে পরিবর্তিত করে “ফ্রিডম ফ্রাইজ” করেছিলো। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন, যিনি পাশ্চাত্য মহলের মুষ্টিমেয় কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কণ্ঠস্বরদের মধ্যে একজন, যদি কথায় ও কাজে পরিমিতির এবং কূটনৈতিক বিকল্পসমূহের খোঁজ করতে আহ্বান জানান তাহলে আমরা একই রকম কিছু দেখতে পারি। ভীতি প্রদর্শনের এই সহজ প্রবণতার ঝোঁক অনেক আগে থেকে চলে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো তখন এটি হাস্যকর গভীরতায় পৌঁছেছিলো এবং জার্মান সবকিছুই তৎক্ষণাৎ গর্হিত হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলো।

    যে রোগের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন তা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দেই, আমি সম্প্রতি এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম যে ব্রিটেনের একটি অত্যন্ত সম্মানিত দর্শনের জার্নাল তাঁর একটি নিবন্ধ না পড়েই ফেরত দিয়েছে। তাঁকে নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছে নিবন্ধটি বিবেচনা করা যাবে না কারণ তিনি ইরানের নাগরিক, যা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা একটি দেশ।

    নিষেধাজ্ঞাকে ইউরোপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেছে, কিন্তু বরাবরই প্রভুর কাছে নতি স্বীকার করেছে, এমনকি একজন ইরানি দার্শনিকের নিবন্ধটিও নিষিদ্ধ করেছে। ক্ষমতার প্রতি এই নতি স্বীকারকে জোরদার করাই হচ্ছে ওয়াশিংটনকে দেওয়া পুতিনের সেরা উপহার।

    আমার কিছু নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি এখানে অনেক উদাহরণ যোগ করতে পারি, কিন্তু বিদ্বেষ যে এর চেয়েও বেশি দূর যেতে পারে সেটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

    আমরা বিপজ্জনক সময়ে বাস করি। আমরা হয়ত স্মরণ করতে পারি মহাপ্রলয়ের ঘড়িটি ট্রাম্পের আমলে মিনিট ত্যাগ করে সেকেন্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং বর্তমানে মধ্যরাত—সমাপ্তি—থেকে ১০০ সেকেন্ড আগে স্থির করা হয়েছে। যেসকল বিশ্লেষক ঘড়িটিকে স্থির করেছেন তারা তিনটি কারণ দেখিয়েছেন—পারমাণবিক যুদ্ধ, পরিবেশগত ধ্বংস, এবং গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসরের পতন। এগুলো এই আশাকে ক্ষুণ্ণ করে যে অবগত ও জাগ্রত নাগরিকরা তাঁদের সরকারকে দুর্যোগের এই দ্বৈত প্রতিযোগিতাকে অতিক্রম করতে বাধ্য করবে।

    ইউক্রেইনের যুদ্ধ এই তিনটি দুর্যোগময় প্রবণতার সবগুলোকে খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। পারমাণবিক হুমকি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার হাত থেকে সভ্যতাকে রক্ষার জন্য পৃথিবীতে জীবনের ধ্বংসকারীদের প্রশংসিত করার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমশ কম ব্যবহারের গুরুতর প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করা হয়েছিলো। আর গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসর ভয়ানক পতনের দিকে রয়েছে।

    এসব কিছু আমাদেরকে ৯০ বছর পেছনে নিয়ে যায়। অবশ্য ঝুঁকিগুলো আজ অনেক বেশি। তারপর, ব্যাপকভাবে পুনরুজ্জীবিত শ্রম আন্দোলনের প্রেরণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোশ্যাল ডেমোক্রেসির পথে অগ্রসর হয়ে এই সংকটের মোকাবেলা করেছিলো। ইউরোপ ফ্যাসিবাদী অন্ধকারের নিমজ্জিত হয়েছিলো।

    এখন কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। এটি যে আমাদের ওপর নির্ভর করছে সেটাই একমাত্র নিশ্চয়তা।

  • ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ এবং বাংলায় ইসলাম প্রসারের তরবারিতত্ত্ব

    ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ এবং বাংলায় ইসলাম প্রসারের তরবারিতত্ত্ব

    • আলতাফ পারভেজ

    আল-মাহমুদ আমার প্রিয় কবিদের একজন। তাঁর অনেক কবিতা বারবার পড়ি। নতুন করে মুগ্ধ হই। কেবল বহুল আলোচিত ‘সোনালী কাবিন’ নয়- তাঁর অনেক কবিতাই অমরত্ব পাবে বলে অনুমান করা যায়। তাঁর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ও অনেক জনপ্রিয়। বহুল পঠিত।

    ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’য় বঙ্গে ইসলামের ইতিহাসের কিছু চুম্বক ইঙ্গিত আছে। কাব্যিক ব্যবহারে তা অনন্য। কিন্তু ইতিহাস-চৈতন্যের দিক থেকে তা কোন ভুল বার্তা দেয় কি না- সে প্রশ্ন তোলা যায়। ইতিহাস-স্পর্শী কবিতা সে প্রশ্ন এড়াতে পারে না। কবিতার তাফসীরে সবাই একমত হন না। সেটা মেনেই ওইরকম প্রশ্ন তোলা হচ্ছে এখানে।১

    কবিতা বহুকাল ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের অন্যতম এক উৎস। ‘হিস্ট্রিক্যাল পোয়েট্রি’ বলে কবিতার একটা সুপরিচিত ধারাই রয়েছে। যা ইতিহাস ও সমাজ গবেষণায় বহু আলোচিত উৎস। যে কারণে ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার ওপর  দাঁড়িয়ে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস লিখিত হয়। যেভাবে উর্দুতে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতায় ১৯৪৭-এর দেশভাগ কিংবা বাংলা ভাষায় শামসুর রাহমানের কবিতায় ১৯৭১-এর বাংলাদেশযুদ্ধকে পাই আমরা। অর্থাৎ কাব্য সুষমার বাইরেও কবিতা নিয়ে আলাপ উঠতে পারে। কবিতায় প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণে লুুকিয়ে থাকা আকার-ইঙ্গিতে বাড়তি অনুসন্ধান হতে পারে। যা আবার কবিতা-সাহিত্যের শক্তির জায়গাই প্রকাশ করে। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’কে আমরা সেভাবেও পাঠ করতে পারি। ব্যক্তি ও কবি আল-মাহমুদকে একদম মিলিয়ে না ফেলেও সে পাঠ চলতে পারে।২

    এ কবিতায় ‘ঘোড়া’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- ধরে নেয়া যায়, বখতিয়ার খলজির বীরত্ব, সাহস এবং স্থানীয় সমাজের সমর্থনের প্রতীক ও প্রমাণ হিসেবে। কবি স্পষ্টত বখতিয়ারকে মহিমান্বিত করেন। সেই মহিমার সঙ্গে পরোক্ষে যুক্ত করতে চান বঙ্গে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ায় ঐ যোদ্ধার ‘অবদান’-এর গৌরব। বখতিয়ারের ঘোড়া’য় কবি পাঠককে ধর্মীয় আবেগে উদ্দীপ্ত করতেও আকুল- যে পাঠক স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠই হয়তো ধর্মে মুসলমান। এমনকি পাঠকের ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিয়েও বলা যায়- বখতিয়ায়ের ঘোড়া বাংলায় ইসলামের প্রসার সম্পর্কে ধারণা দিতে চায়। কিন্তু সেই ধারণার যথার্থতা মোটা দাগে খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে। কারণ, এই কবিতার সরল পাঠ নবীন পাঠকের এই বোধ তৈরি করে- ‘ঘোড়ার ক্ষুর’ আর মধ্য এশিয়ার ‘যোদ্ধাদের তরবারি’র ডগায় ইসলামের বীজ রোপিত হয়েছে এখানে। বাংলার ইসলাম যেন শুধুই একটা যুদ্ধ-প্রসঙ্গ।

    এরকম বিবরণ কেবল আল-মাহমুদের ৩৩ লাইনের ১৮৬ শব্দের এই কবিতায় রয়েছে তা নয়। বাংলাদেশে ‘ইসলামের ইতিহাস’ নামে যা কিছু প্রচলিত ও প্রচারিত তাতে এটা এক প্রবল বয়ান।৩ এই ধর্মীয়-সমরবাদ গৌরবের সঙ্গেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লিখিত-পঠিত-প্রচারিত হচ্ছে। যেমন, বাংলাদেশে কলেজ পর্যায়ে ইতিহাসের বহুল প্রচলিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আব্দুল করিমের ‘ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসন’। খুবই প্রভাবশালী গ্রন্থ এটা। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এরকম বই পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ইসলামের আবির্ভাব সম্পর্কে জানছে, পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক ও  স্নাতক ডিগ্রি নিচ্ছে। অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে এই গ্রন্থের। এই বইয়ে ‘বিচক্ষণ সমরনায়ক’ বখতিয়ারকে ‘বাংলা জয়’ এবং ‘ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম’-এর কৃর্তৃত্ব দেয়া আছে।৪ এরকম গ্রন্থের বাইরে সরাসরি শুধু বখতিয়ার খলজির উপরও অনেক বই লেখা হচ্ছে। যেমন সরদার আব্দুর রহমান লিখেছেন (তাঁর উল্লেখ মতে), ‘বখতিয়ার খলজির পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ’। সেখানে বখতিয়ারকে নিয়ে বলা হয়েছে, ‘পুরাতন ধর্মের নিগড় থেকে নির্যাতিত মানুষকে মুক্ত করার এবং একটা নতুন জীবন ব্যবস্থায় উত্তীর্ণ করার জন্য তিনি প্রথম বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের উদ্যোগ নেন।…বাংলাদেশের প্রথম দীক্ষিত মুসলমান দেবকোটের কোচদলপতি… আলীমেচ তাঁরই আদর্শে মুগ্ধ হয়ে সদলবলে মুসলমান হয়।…বিজয়ী ধর্ম হিসেবে তাঁর (বখতিয়ারের) দ্বারাই এতদাঞ্চলে প্রথম ইসলাম প্রচার শুরু হয়।’৫

    ইতিহাস হিসেবে এইসব ভাষ্য কতটা সঠিক তা বাড়তি বিবেচনা দাবি করে। এসব বিবরণের সত্যাসত্য এবং তার পক্ষে নিভর্রযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে কি না এবং বঙ্গে প্রকৃতপক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলামের আহ্বান কীভাবে প্রচারিত হয়েছে সেসব নিয়ে আমরা ধাপে ধাপে পর্যালোচনা করবো। বাংলায় বিশ্বাস হিসেবে ইসলামের প্রসার কি শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ঘটেছে- নাকি এর অর্থনৈতিক সামাজিক আধ্যাত্মিক অনেক কারণ ছিল সেসবও খতিয়ে দেখা দরকার। ইসলাম আবির্ভাবের তরবারি ও ঘোড়াতত্ত্ব বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই ধর্ম প্রসারের যে ধারণা প্রচার করে- তার মাধ্যমে আসলে অপর কোন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য আড়াল হচ্ছে কি না সেটাও আমাদের পর্যালোচনায় থাকবে।

    বাংলায় ইসলামের আবির্ভাবের প্রাথমিক দিনগুলো নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু মৌলিক গবেষণা হয়েছে। আরও হবে নিশ্চয়ই। তবে এ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ গবেষণার সারকথা হচ্ছে, এখানে ইসলামের প্রসার ও বিকাশে ভৌগলিক পরিবেশ, মানুষের মনোজগত এবং প্রত্যক্ষ কিছু সমাজ-ঘটনা বিপুল ভূমিকা রেখেছে। তবে ‘বখতিয়ারে ঘোড়া’ আমাদের সামনে তার বিপরীত প্রতিচ্ছবি নিয়ে হাজির হয় এবং লোকপ্রিয়তা পায়। এটা কবিতাশিল্পের জন্য ভালো খবর। কিন্তু ইসলাম ও ইতিহাসের দিক থেকে একে যাচাই করে নেয়া জরুরি।

    সূত্র: : Emily Shovelton (2021) Revisiting a Royal Sultanate Manuscript from Bengal: The Sharafnama of Nasir al-Din Nusrat Shah of 938/1531–2, Iran, 59:2, 225-244

    কারণ, এরকম বিবরণ ইসলাম সম্পর্কে ভীতিকর ধারণার দিকেও নিয়ে যায় পাঠককে। পাশাপাশি ইসলামের কাঁধে সওয়ার হয় ভারতবর্ষে মধ্য এশিয়ার যোদ্ধাদের নানান নির্মমতার কান্ডকৃর্তি। সেসব নির্মমতার কলঙ্ক বাড়ানো-কমানোর একটা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতাও আছে। তাতে করে বিভিন্ন তরফে আবার অস্পষ্ট ও অযৌক্তিক নতুন নতুন বিবরণ হাজির হয়ে চলেছে। যা তৎকালীন বঙ্গসমাজ সম্পর্কে পাঠককে ঐতিহাসিক সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে ব্যর্থ করে দেয়। এরকম এক পরিসরে দাঁড়িয়ে আমরা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ পুনর্পাঠ করছি। তবে এও বলা দরকার, আল-মাহমুদের কবিতা ও তার ইতিহাস চেতনা এই আলোচনায় একরূপ উপলক্ষ মাত্র। এই আলোচনা কেবল বাংলার ইতিহাসে ইসলাম আবির্ভাবের তরবারিতত্ত্বকে পর্যালোচনা করতে ইচ্ছুক। তবে পাশাপাশি এ প্রশ্নও তোলা হচ্ছে, বাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে বাইরে থেকে আসা আক্রমণের মাধ্যমে রাজত্ব করা শাসকদের আমরা কীভাবে দেখবো। বাংলার ইতিহাস বলতে আমরা আসলে কার বিবরণকে বুঝবো? আগ্রাসী শাসকদের ইতিহাস- নাকি স্থানীয় প্রাকৃতজনের জীবন-জীবিকা-নির্মাণ-ধ্বংস-দুঃখ-সুখের বিবরণ?

    আবেগ, বর্ণ, ধর্ম ও জাতিগত পক্ষপাতের বাইরে এসে অতীত বাংলা নিয়ে যেসব নির্ভরযোগ্য গবেষণা রয়েছে সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই আলোচনা। তবে মূল বিতর্কে প্রবেশের আগে আলোচিত কবিতাটি আমরা আরেকবার পড়ে নিতে পারি-

    বখতিয়ারের ঘোড়া

    মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে

    মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;

    আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।

    জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।

    যেযন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,

    যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি,

    মাতৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;

    বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।

    আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।

    না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে ভোলানো ছড়া শোনায়।

    বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো

    বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।

    আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি

    হাতে নাংগা তলোয়ার।

    মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কানপাতে বালিশে

    নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।

    সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?

    আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।

    মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,

    আল্লার সেপাই তিনি, দুঃখীদের রাজা।

    যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,

    আর মানুষ করে মানুষের পূজা,

    সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।

    দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে

    দ্যাখো, দ্যাখো।

    মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক

    তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার

    নিশেন ওড়ায়।

    কোথায় সে বালক?

     

    আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা

    মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।

    বারুদই বিচারক। আর

    স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।

     

    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    বখতিয়ার খলজির বাংলায় আসা

    বখতিয়ার খলজি বাংলায় অভিযান চালান ১২০৪-এ (হিজরি ৫৯৮-৯৯; কোন কোন ভাষ্যকারের মতে ১২০৫ খ্রি.) এবং সেটা বাংলার ক্ষুদ্র একাংশে মাত্র।৬ বিহার-নদিয়া-গৌড় ছিল তার অভিযানের পথরেখা। যা ইতিহাসের বইগুলোতে ‘লক্ষণাবতী’ নামেও পরিচিত। রাজা লক্ষণের নামে গৌড়ের ঐ নামকরণ। ইসলাম ধর্মের অনুসারী শাসকদের আমলে লক্ষণাবতীকে ‘লাখনৌতি’ নামে উল্লেখ শুরু হয়।

    গৌড় অভিযানের দু’বছর পরই আসাম-তিব্বত অভিযানে খলজি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তখন নিজ পক্ষীয় আরেক সেনাপাতি কর্তৃক ছুরিকাহত হয়ে মারা যান তিনি। তাঁর জন্ম-মৃত্যু-সামরিক কৃর্তির দিন-তারিখে সামান্য হেরফের আছে পুরানো বিবরণে। সেই বিতর্ক এড়িয়ে আমরা মূল প্রসঙ্গের দিকে এগোবো।

    বখতিয়ার খলজির অধিকাংশ বিবরণের উৎস কাযী মীনহাজ-ই সিরাজ জোয্জানীর ‘তবকাত-ই-নাসিরী’। বাংলায় মুসলমান শাসনের অনেক তথ্যের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাঙলায় মুসলমানদের অভিযান সম্পর্কে এটাকে প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়।  কিন্তু এও মনে রাখা দরকার, এটি বখতিয়ারের মৃত্যুর প্রায় ছয় দশক পর প্রকাশিত এবং চার দশক পরের শোনাকথার ওপর লিখিত। লেখকের জন্ম বখতিয়ারের বাংলা অভিযানের এক দশক আগে। আর, তিনি হিন্দুস্তানে এসেছেন বখতিয়ারের মৃত্যুর অন্তত দুই দশক পর- তাও বাংলা থেকে বহু দূরের সিন্ধুতে। বখতিয়ারের অভিযান সম্পর্কে তাঁর কোন সরাসরি অভিজ্ঞতা ছিল না। দিল্লীতে কাযী থাকা অবস্থায় ঐ গ্রন্থ লিখিত এবং এর ভিত্তি হলো ১২৪২-এর পর দু’বছর বাংলায় অবস্থান। ১২৬০ সালের অক্টোবরে মীনহাজ-ই-সিরাজ এটা লেখা শেষ করেন। মেজর রেভার্টি পরে সেটা অনুবাদ করেন। যা প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে।

    মীনহাজ-ই-সিরাজ নিজে দিল্লীর মুসলমান শাসকদের ঘনিষ্ট ছিলেন। তাদের সঙ্গে অনেক সামরিক অভিযানেও অংশ নেন।৭ গ্রন্থটি লেখা হয়েছে দিল্লীর ১২৪৬-এর শাসক সুলতান নাসির উদ্দীন মাহমুদ শাহ’র জন্য পুরস্কার হিসেবে। ‘তবকত’ মানে কাহিনী। ‘তবকাত’ হলো তার বহুবচন। ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ মানে ‘সুলতান নাসিরের কাহিনী’। বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে এখানে তিনটি তবকতে (২০, ২১, ২২) উল্লেখ আছে।

    এ গ্রন্থ স্বাভাবিকভাবেই শাসকদের বিষয়ে প্রশংসামূলক ছিল। কারণ সরাসরি তাদের ছত্রছায়ায়, তাদের গুণগান হিসেবে এটা লিখিত। এরকম একমাত্র উৎসকে ব্যবহার করে বখতিয়ার খলজির যেসব বীরত্বের বিবরণ প্রচারিত হয় তা সঙ্গতকারণেই প্রশ্নসাপেক্ষ। বীরত্বের পাশাপাশি মীনহাজও বখতিয়ারকে ‘অধিকৃত অঞ্চলসমূহে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও উপাসনালয় নির্মাণ’ করার কৃতিত্ব দিয়েছেন। আজ পর্যন্ত বখতিয়ারের আমলের সেরকম কোন স্থাপত্য কোথাও না পাওয়ার পরও এসব বিবরণ সদম্ভে জারি আছে। এসব নিয়ে বাড়তি অনুসন্ধান বেশি হয়নি। বরং পরবর্তী ‘ইতিহাসবিদ’রা সিরাজের বিবরণকেই নানানভাবে পুনর্লিখন করে চলেছেন। আবার তবকাত-ই-নাসিরী থেকে বখতিয়ারের বিষয়ে যত তথ্য-উপাত্ত নেয়া হয় তার ‘প্রতিপক্ষ’ লক্ষণ সেন সম্পর্কে তেমনটি করা হয় না। বাংলায় তখনকার জনসাধারণ সম্পর্কেও সেখানে বিস্তারিত কিছু পাওয়া যায় না।

    তবকাত-ই-নাসিরী বা অনুরূপ কোন উৎস আমাদের এমন কোন তথ্য দেয় না যা থেকে বখতিয়ারের জীবনের প্রথমাংশে এমন সাক্ষ্য মেলে যে, ধর্মপ্রচার তার কোন লক্ষ্য ছিল। আধ্যাত্মিকতার দিকে এই যোদ্ধার আগ্রহ ছিল বলে বিস্তারিত প্রমাণ মেলে না। বরং প্রাথমিক সমর অভিযানগুলোতে সম্পদ-সংগ্রহ এবং সৈন্যদল বাড়াতেই তাঁকে আগ্রহী দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে জায়গীর পাওয়া (বর্তমানের উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলার) ভিউলী (Bhuili) ও ভগওয়াত (Bhagwat) থেকে তিনি আশে-পাশের হিন্দু শাসকদের রাজ্যগুলোতে মাঝে মাঝে প্রায় বছরাধিক কালজুড়ে যেসব অভিযান চালিয়েছেন সেসব মূলত সম্পদ সংগ্রহের লক্ষ্যে। বিহারের (মগধ) ওদন্তপুরী বিহার আক্রমণের পর বখতিয়ার খলজি সেখানকার ধনসম্পদ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। ধর্মের প্রসার যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হবে- তিনি কোথাও অভিযান শেষে ধনসম্পদ সংগ্রহ শেষে সেখান থেকে চলে যাবেন- এমনটি হওয়ার কথা নয়। তবকাত-ই-নাসিরীতে লেখা রয়েছে: ‘বিজয় লাভের পর (ওদন্তপুরী বিহার দখলের পর) লুন্ঠিত দ্রব্য নিয়ে মোহাম্মদ বখতিয়ার প্রত্যাবর্তন করেন ও সুলতান কুতুব-উদ-দীন এর নিকট উপস্থিত হন। তিনি সেখানে প্রভূত সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেন।’৮ ওদন্তপুরী থেকে সংগৃহীত সম্পদ যে তখনকার দিল্লীর ‘সুলতান’ কুতুব-উদ-দীন আইবককে উপহার দেয়া হয় সে বিষয়ে গবেষক মোহাম্মদ মোহার আলীও উল্লেখ করেন- যদিও তিনি এটা মানেননি যে, ঐ অভিযানে বখতিয়ার কাউকে খুন করেন।৯

    আল বেরুণীর কিতাবুল হিন্দ সাক্ষ্য দেয় ঐ সময়ের ভারতীয় হিন্দুরাজ্যগুলোতে মন্দিরে প্রচুর ধন-সম্পদ গচ্ছিত থাকতো। যা ঐসব রাজ্যে বহিরাক্রমণের বড় কারণ ছিল। বখতিয়ার খলজির সৈন্যদলও গড়ে উঠেছিল ভাগ্যান্বেষী যোদ্ধাদের দ্বারা। ধর্ম প্রচারক বা আধ্যাত্মিকতার তাড়নাদীপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারা নয়। এরা কেউ শাহ সুলতান রুমি, আমানত শাহ, মিসকিন শাহ বা বায়েজিদ বোস্তামির মতো ছিলেন না। এরা জিহাদে লিপ্ত হয়েছিলেন বলেও প্রমাণ নেই। আমাদের প্রিয় কবি আল-মাহমুদ তাঁর কবিতায় জিহাদ ও বখতিয়ার খলজি প্রায় সমার্থক করেছেন এবং এই তুর্কি এই যোদ্ধাকে ‘আল্লার সেপাই’ বলেছেন। ফলে ইসলামের একরূপ কট্টর ও সমরবাদি যে ইমেজ দাঁড়ায় তা বঙ্গে ইসলামের আবির্ভাবের সময়ের সঙ্গে মেলে কিনা সেটা একটু পর আমরা মিলিয়ে দেখবো। আমরা এও দেখবো যে, ‘জিহাদ’ অর্থ যদি হয় ‘ধর্মযুদ্ধ’ হয়- তাহলে তখনকার বাংলার সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির১০ মাঝে সেটার প্রয়োজন বা অবকাশ ঘটেনি। শাসকদের সঙ্গে শাসকদের ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং জিহাদ মোটেই সমার্থক নয়। ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক- কোন বিবেচনা থেকেই নয়। বিশেষ করে যেখানে উভয় শাসকই বহিরাগত।

    ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতাটির অনন্য কাব্যিক সৌন্দর্য রয়েছে। কিন্তু তাতে এমন এক ব্যক্তিকে বাংলায় ইসলাম প্রচারের গৌরবের ভাগ দেয়া হচ্ছে বা প্রধান এক ইসলাম-পসন্দ ব্যক্তির তকমা দেয়া হয়েছে- যা বাস্তবতার সঙ্গে সামান্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআনে জিহাদ সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরই জন্য- যারা নির্যাতিত হওয়ার পর হিজরত করে, পরে জিহাদ করে ও ধৈর্য ধারণ করে’ (১৬ সুরা নাহল: ১১০)। অর্থাৎ জিহাদ বা অমানবিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হলো নির্যাতনের একরূপ প্রতিউত্তর। কিন্তু বখতিয়ার খলজি কোথাও নির্যাতিত নন। বরং পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি দিল্লীসহ বিভিন্ন স্থানের মুসলমান শাসকদের দ্বারাই কয়েকবার প্রত্যাখাত। তিনি মগধ বা নদীয়া বা গৌড়ে কোন পূর্ব-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে আসেননি। তাঁর সর্বশেষ তিব্বত অভিযানকেও জিহাদ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো সা¤্রাজ্য বিস্তার, সম্পদ সংগ্রহ এবং রাজত্ব কায়েম ছাড়া আর কিছু ছিল  না।

    বাস্তবে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দ্বারা ইতোমধ্যে এ সত্য সমর্থিত হয়- বখতিয়ার খলজির বহু আগেই বঙ্গে ইসলামের প্রচার ঘটে গিয়েছিল। তবে এর প্রসার তখনো বাকি ছিল। তুর্কি যোদ্ধাদের যদি এখানে ধর্মপ্রচারের কৃর্তৃত্ব দিতে হয় তাহলে বখতিয়ারের আগে প্রায় ৫০০ বছর জুড়ে উপমহাদেশে আগত ইসলাম প্রচারকারীদের সেটা কেন দেয়া হবে না- এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তারাই বরং ধর্ম-প্রচারে প্রাথমিক প্রতিকূলতা অতিক্রমের কৃতিত্বের অধিকারী।

    অন্যদিকে, যদি রাজা-বাদশাদের দ্বারা বা তাদের তরবারি শক্তিতে ধর্মান্তকরণ গতি পেতো তাহলে উপমহাদেশে মুসলমানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকতো দিল্লীতে। কয়েক শতাব্দি ওখানে মুসলমান শাসকদের কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও তেমনটি ঘটেনি। বরং দিল্লীর নগর পরিমন্ডলে মুসলমান জনসংখ্যার বড় অংশ ছিল বাইরে থেকে আগতরা বা তাদের বংশধররা। বাংলাতেও মুসলমান শাসকদের অবস্থানের মূল জায়গাগুলোতে নয়- ইসলামের বেশি বিকাশ ঘটেছে প্রান্তিক অঞ্চলে।

    ১৮৭১ সালে ভারতে প্রথম জনশুমারি হয় বলে আমরা জানি। তবে তার আগেও কিছু কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে শুমারি হয়েছে।১১ সেই সূত্রে পাওয়া নদীয়ার ১৮০১-এর জনসংখ্যার হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সেখানে তখনও মুসলমানদের হিস্যা ৩৭ দশমিক ৫ ভাগ। দারিদ্র্যের কারণে মুসলমানদের জন্মহার বেশি হওয়া সত্ত্বেও ১৮০১ সালেও নদীয়ায় মুসলমানরা ছিল অমুসলমানদের (৫৪ শতাংশ) চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ কম। অথচ এই নদীয়া ‘জয় করে’ই বখতিয়ার বাংলায় ইসলাম প্রসারের খ্যাতি উপভোগ করে যাচ্ছেন। এবং তার পরও বহুকাল সেখানে মুসলমানদের ‘শাসন’ ছিল। পরিসংখ্যান এখানে ‘তরবারির শক্তি’ ও ব্যবহার সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা দেয় না। বরং ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে আমরা যা পাই, দিল্লীতে মুসলমান শাসকদের প্রতিষ্ঠার বহু আগে বাংলায় আরবদের আগমন ঘটে গিয়েছিল। বখতিয়ারের আগমনের কয়েক শ’ বছর আগের মসজিদের প্রমাণ রয়েছে বাংলায়। ৮০০ খ্রিস্টাব্দের আগের আরবি মুদ্রা পাওয়ার নজির আছে রাজশাহীর পাহাড়পুর১২ ও কুমিল্লার ময়নামতিতে। বখতিয়ারের আগমনের আগে বা সমকালে মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে এসেছেন বাবা শহীদ আদম, নেত্রকোনার মদনপুরে এসেছেন শাহ সুলতান রুমি, বগুড়ার মহাস্থানে এসেছেন সুলতান মাহিসওয়ার (‘মাছের পীঠে আরোহনকারী’ বলে কথিত), সিরাজগঞ্জে এসেছেন ইয়েমেনের মখদুহ শাহ দৌলাপ্রমুখ। এরকম তালিকা আসলে আরও অনেক দীর্ঘ। মুন্সিগঞ্জের রামপালের মতো একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেন আমলে বাবা আদমের উপস্থিতির কাহিনী নিশ্চিতভাবে আমাদের বঙ্গে ইসলাম প্রচার সম্পর্কে সুস্পষ্ট বার্তা দেয়।

    এটা হতে পারে, বখতিয়ার অভিযানের পর বাংলার কিছু অংশে ইসলামের অবকাঠামোগত বিকাশ গতি পেয়েছিল। পুরানো সমাজের গর্ভে নতুনের জন্মের যে তাড়না ছিল- পুরানো শাসকের অপসারণে তা-ই স্বচ্ছন্দ হয়েছে। এটা নতুন চলমানতার সঞ্চার করতে বাধ্য। পাশাপাশি এও সত্য, বাংলায় বাইরে থেকে অভিযানে আসা মুসলমান ধর্মাবলম্বী প্রথম সেনানায়ক বখতিয়ার। কিন্তু যে ধর্মাবলম্বীই হোন- তিনি কিন্তু যোদ্ধা এবং পররাজ্য আক্রমণকারীই। লস্কর-ই-তুরকান (তুর্কীদের সেনাবাহিনী) আর লস্কর-ই-ইসলাম (ইসলামের সেনাবাহিনী) এক বিষয় হতে পারে না।১৩ উপরন্তু রক্ত ও ভাষাগত দিক থেকে স্থানীয় জনপদের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্ক ছিল না এই যোদ্ধাদের। বখতিয়ারের মুসলমানিত্বকে ইসলামের প্রচার-প্রসারের সঙ্গে একাকার করে ভাবা কিংবা একজন মুসলমানের ‘শাসন’কে ‘ইসলাম কায়েম’ হিসেবে দেখার আগে বাংলাভাষীদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

    ক] বখতিয়ারের আগমনের বহু আগেই ইয়েমেন, মক্কা, বাগদাদ ইত্যাদি স্থান থেকে দরবেশ ও আউলিয়ারা এখানে এসেছেন;

    খ] বখতিয়ার নিজে বাংলার সামান্য অংশেই অভিযান পরিচালনা করেন; সুতরাং পুরো বাংলায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে তাঁর ভূমিকা রাখার সুযোগ খুবই সীমিত; এটা কেবল ভৌগলিক কারণেই নয়। সময়গত কারণেও। বাংলা অভিযানের দু’বছর পরই তিনি মারা যান। ফলে এত অল্প সময়ে ব্যাপক কোন ধর্মীয় জাগরণের অবকাশ প্রশ্নসাপেক্ষ। পরের আলোচনায় বিভিন্ন গবেষকের বিবরণ থেকে আমরা দেখবো, বাংলায় কখনোই মুসলমানদের সংখ্যা হঠাৎ একসঙ্গে বাড়েনি। বরং বহু বছর ধরে দরবেশদের ধীরলয়ের ভূমিকায় এখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের রূপান্তর ঘটেছে।

    গ] প্রাথমিক জীবনের বিবরণ থেকে বখতিয়ারের মাঝে ধর্ম প্রচারকের কোন বৈশিষ্ট্য বা লক্ষ্য পাওয়া যায় না; তিনি যদি সেই কাজই করতেন তাহলে বাংলায় আসার আগে তাঁর জায়গীর পাওয়া বিউলি ও ভাগওয়াতে তার স্পষ্ট নজির থাকতো।

    ঘ] বখতিয়ারের বীরত্ব সম্পর্কে ব্যাপক অতিকথন দেখা যায়; অথচ তাঁর যোদ্ধা জীবনের বড় অভিযানে (১২০৫ পরবর্তী কামরূপ-আসাম-তিব্বত অভিমুখীন) তাঁর বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিতই হয়েছিল। এমনকি বিহার অভিযান শেষেও মিথিলা (উত্তর বিহার) তাঁর দখলে আসেনি।১৪ কামরূপে এমন এক রাজার কাছে তিনি পরাজিত হন- যুদ্ধবিদ্যায় যাঁর বিশেষ কোন খ্যাতি ছিল না। এই যুদ্ধে কামরূপে বন্দি হয়ে থাকা বখতিয়ারের যোদ্ধাদের বংশধররাই আসামের ইতিহাসে ‘গোরিয়া মুসলমান’ হিসেবে কথিত। মীনহাজ-ই-সিরাজের বিবরণ থেকেই জানা যায় তিব্বত অভিযানে যেসব সৈন্যরা নিহত হয়েছিল তাদের বিধাব স্ত্রী ও এতিম শিশুরা বখতিয়ারকে পেলেই অভিশম্পাত বর্ষণ করতো। মীনহাজ-ই-সিরাজের সেই বিবরণ এরকম:

    বখতিয়ার দেওকোটে পৌঁছে অত্যধিক মানসিক যন্ত্রণায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। যেসমস্ত খলজি মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার লজ্জায় তিনি অশ্বারোহন করতেন না। যখনই তিনি অশ্বারোহণ করে বের হতেন গৃহচূড়া ও রাস্তা থেকে সমুদয় লোক অভিযোগ করতেন এবং অভিশাপ দিতেন। গালিগালাজ করতেন।১৫

    এই হলো বাস্তবে বীর বখতিয়ারের অবস্থা। মীনহাজের বিবরণ থেকে এও লক্ষ্যণীয় যে, এসব অভিযান ছিল ‘খলজি’ উপজাতিদের একটা ব্যাপার। তিব্বত অভিযানের এই পরিণতির আগে নদীয়া দখলেও কোন যুদ্ধ হয়নি লক্ষণ সেনের পালিয়ে যাওয়ার বিবরণ সঠিক হলে। লক্ষণাবতী বা গৌড়েও বখতিয়ার যুদ্ধ করার মতো কোন প্রতিপক্ষ পেয়েছেন বলে জানা যায় না। অথচ বাংলার ইতিহাসগ্রন্থসমূহ তাঁর বীরত্বে ভারাক্রান্ত।

    ঙ] বাংলার যে অংশ বখতিয়ারের দখলকৃত ছিল সেখানে তাঁর পরের শাসক শিরান খলজিও দ্রুতই উৎখাত হয়েছিলেন। মাত্র আট মাস তিনি রাজত্ব করেন। ১২০৮-এ তিনিও পলাতক অবস্থায় মারা যান। এই দুই খলজি যদি স্থানীয় সমাজে জনপ্রিয় হতেন তাহলে শিরানের এত দ্রুত অপসারণ নিশ্চয়ই সম্ভব হতো না।

    চ] খলজিরা বাংলার নদীয়া বা গৌড়কেন্দ্রীক যে অংশ দখল করেছিলেন তার বাইরে- বিশেষ করে পূর্ববাংলায় সেন বংশের শাসন আরও দীর্ঘকাল অব্যাহত ছিল। লক্ষণ সেন বঙ্গে সেনবংশের ‘শেষ রাজা’ নন মোটেই- আমাদের ইতিহাস বইগুলোতে যেভাবে লেখা হয়। তাঁর দুই পুত্র (বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন) বহু বছর বাংলার বড় এক অংশ শাসন করেছে। বিভিন্ন তাম্রশাসনে ইতোমধ্যে প্রমাণিত, লক্ষণ সেনের এই দুই পুত্র ১২২৩ পর্যন্ত বিক্রমপুরে শাসক ছিল। অর্থাৎ বখতিয়ারের আক্রমণে ‘বাংলায় মুসলমান শাসন কায়েমে’র দাবি ঐতিহাসিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বখতিয়ারের নদীয়া ও গৌড় (বর্তমানের মালদাহ) বিজয়কে ‘বাংলা বিজয়’ হিসেবে ইতিহাস বইগুলো যেভাবে উল্লেখ করে তা খুবই বিভ্রান্তিকর।১৬ এমনকি এরপরের সুলতানি শাসন শুরু হতেও অনেক দশক লেগেছে। আবার সুলতানি শাসনের মাঝেও বাংলায় কংশনারায়ন নামে অ-মুসলমান স্বাধীন রাজা ক্ষমতায় এসেছেন (১৪১৭ খ্রি.)। ইতিহাসকে নির্মোহভাবে পাঠ করতে হলে এসব তথ্য অবজ্ঞার নয়।

    ছ] বাংলায় ইসলামের বিকাশকে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই খলজিদের মতো যোদ্ধাদলের কর্মকান্ডের সঙ্গে মিলিয়ে পর্যবেক্ষণের আরেকটা বিপদের দিক হলো- এতে ধরে নেয়া, এই ধর্ম তার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সামর্থের ওপর দাঁড়িয়ে তলোয়ার বা রাষ্ট্রীয় মদদ ছাড়া প্রচারিত ও বিকশিত হতে সক্ষম নয়। এটা এক অর্থে ইসলামকে ‘রিলিজিয়ন অব সোর্ড’ বলে যেভাবে খন্ডিত প্রচার রয়েছে তাকে মেনে নেয়া। বাংলায় ইসলামের ইতিহাস নিয়ে খ্যাতনামা গবেষকদের ভাষ্যগুলোর সঙ্গে এরকম পর্যবেক্ষণ একদম মেলে না। এমনকি জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তকরণ মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন সম্মতও নয় (২:২৫৬)।

    জ] মিনহাজ-ই-সিরাজ যদিও বলেছেন নদীয়া ও গৌড়ে অভিযান শেষে ‘বখতিয়ার খলজি অনেক মসজিদ, খানকা ইত্যাদি নির্মাণ করেছেন’ কিন্তু তার ন্যূনতম কোন অবশেষ চিহ্নের কথা প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে পাওয়া যায় না। গৌড় ও পা-ুয়ায় ১২৩১-এর আগের কোন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ বা শিলালিপির কথা এখনও জানা যায় না- যা থেকে এ স্থানকে সে কালের কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র বলে মনে হতে পারে। গৌড়ে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন শিলালিপিটি ১২৩১ খ্রিস্টাব্দের। যা একটা কূপ খননের ফলক।১৭ তাছাড়া যদি মীনহাজ-ই-সিরাজের এই বিবরণকে সত্য মানতে হয় তাহলে এও মানতে হয়, ‘অনেক মসজিদ’ স্থাপনের মতো বড় সংখ্যায় মুসলমান জনগোষ্ঠী বখতিয়ারের আগে থেকে নদীয়া ও সন্নিহিত অঞ্চলে আগে থেকেই ছিল।

    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে বখতিয়ার খলজি সম্পর্কে প্রচার ও অপপ্রচার

    বখতিয়ার খলজি সম্পর্কে উপরোক্ত বিবরণ পাঠের সময় এটা মনে রাখা জরুরি, বঙ্গের ইসলাম প্রসারের মতো তিনিও নানানভাবে ভুল প্রচারণার শিকার। বিশেষ করে মগধের অনেক ধ্বংসলীলার সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয় পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই। ফলে ইতিহাসের ওই সময়টা পাঠ করতে যেয়ে আমরা আসলে দুটি সমস্যায় পড়ছি। একদিকে ইসলাম বিস্তৃতির আলোচনা চলে যায় তরবারিবাদের বিবরণের দিকে। আবার বখতিয়ারকে অযথা কালিমালিপ্ত করতে যেয়ে সত্য-মিথ্যার মিশেলে অনেক ধ্বংসলীলার কাহিনী হাজির করা হয় তাঁর নামে। এই দুই বিপরীতমুখী প্রবণতা সামলিয়ে বিহার ও বাংলার ইতিহাসে বখতিয়ারের ভূমিকার একটা নির্মোহ ভাষ্য দাঁড় করানো জরুরি। তবে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের জন্য এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের প্রশ্নে তৎকালীন সমাজের একটা সম্ভাব্য সঠিক ছবি খুঁজে পাওয়া। কাজটি সহজ নয়। কারণ ইতোমধ্যে আমরা এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে আছি যেখানে একদিকে তরবারিতত্ত্ব১৮ কেবল কবিতায় নয়- গদ্যেও বিপুলভাবে স্তুপ হয়ে আছে, আবার বখতিয়ারঘৃণারও আধিক্য সীমাহীন। যারা বখতিয়ারকে বিশিষ্ট জিহাদি হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন তাদের বিবরণে যেমন সত্য, অর্ধসত্য এবং অসত্যের ব্যাপক মিশ্রণ ঘটেছে- তেমনি আরেক দল তাঁকে শুধু নিষ্ঠুর দস্যু হিসেবে দেখাতে যেয়েও তখনকার সামগ্রিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে অবহেলা করেছেন।

    দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চর্চায় বখতিয়ারকে আফগানিস্তান থেকে আগত দেখানো হলেও খলজি ট্রাইব মূলত তার্কি অঞ্চলের। তবকাত-ই-নাসিরীর ইংরেজি অনুবাদক রেভার্টির স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এ বিষয়ে। তুরস্ক থেকেই এদের একাংশ আফগানিস্তানে আসে। তারপর বিভিন্ন আক্রমণকারী সৈন্যদলের হয়ে ভারতে এদের আগমন। আফগানিস্তানে এরা মূলত যাযাবর পশুচারণা পেশাজীবী হিসেবে পরিচিত। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এরা আফগানিস্তানে আসে। আফগানিস্তানে এরা গিলজি বা গিলজাই নামেও উচ্চারিত ছিল। ঐ ‘গিলজাই’ ভারতবর্ষে এসে ‘খলজি’ রূপে উচ্চারিত।১৯ প্রাথমিকভাবে অন্য শাসকদের সৈনিক হিসেবে এবং সমর কৌশলে দক্ষ হওয়ায় পরে নিজেরাই ‘শাসক’ হয়ে ওঠার আকাঙ্খার বাইরে তাদের চরিত্রে ‘জিহাদি’ গৌরব আরোহ ইতিহাসসম্মত নয়।

    বখতিয়ারের মতোই তথ্য-বিকৃতি দেখা যায় বাংলায় তিনি যাকে ‘পরাজিত’ করেন বলে প্রচারিত হয় সেই লক্ষণ সেন সম্পর্কেও। বলা হয় লক্ষণ সেন ‘হিন্দু রাজা’ ছিলেন। কার্যত তিনি বৈঞ্চব ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তথ্য হিসেবে এটা হয়তো সামান্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তবকাত-ই-নাসিরী কিন্তু এও জানাচ্ছে, লক্ষণ সেন রাজা হিসেবে ‘দানশীল’ ও ‘ঔদার্য’-এর প্রতীক ছিলেন। আল-মাহমুদ লক্ষণকে ‘জালিম’ হিসেবে উল্লেখ করলেও মিনহাজ-ই সিরাজ তাঁকে ‘মহান ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। লক্ষণ সেন সম্পর্কে তিনি এরকম লিখেছেন:

    কোন কোন বিশ্বস্ত লোকের বর্ণনায় এমন পাওয়া যায় যেনো, ছোট বা বড় কোন অত্যাচার তিনি কোনদিন করেননি। এ কালের হাতেম দয়াশীল সুলতান কুতুব-উদ্দ-দীন (তাবসারাহ)-র মতো তিনি দাতা ছিলেন এবং কোন তাঁর নিকট প্রার্থনা করলে তিনি তাঁকে এক লক্ষ মুদ্রা দান করতেন। এ বর্ণনা আছে যে, ঐ দেশে চিতল বা জিতল এর পরিবর্তে কড়ির প্রচলন ছিল। কমপক্ষে এক লক্ষ কড়ি তিনি দান করতেন।২০

    বখতিয়ারের জন্য আমরা যদি মিনহাজ-ই সিরাজকে সত্য মানি- তাহলে লক্ষণ সেন সম্পর্কে না-মানা স্ববিরোধিতা। তবে এ প্রশ্নও ওঠে, এত ভালো রাজা হলে লক্ষণ সেন নদীয়ায় হেরে গেলেন কেন? এর কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত. বখতিয়ারের নদীয়া আগমনকালে লক্ষণ সেন ছিলেন অতিবৃদ্ধ। তাঁর পক্ষে এসময় বিশাল সাম্রাজ্য ঐক্য ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বখতিয়ার আসার আগেই অন্তত তিনজন স্থানীয় শাসক লক্ষণ সেনের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকার করছিলেন। অর্থাৎ লক্ষণ সেনের সাম্রাজ্য বখতিয়ার আসার কালে পর্যুদস্ত হওয়ার অপেক্ষাতেই ছিল।২১

    দ্বিতীয়ত, নদীয়া (নওদীহ বা নবদ্বীপ) সেনদের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রও ছিল না। যদিও মীনহাজ-ই-সিরাজ একে ‘রাজধানী’ বলেছেন- কিন্তু ‘সমগ্র নবদ্বীপে এমন কোন প্রত্নকীর্তির চিহ্ন নেই যাতে করে ধারণা করা যেতে পারে যে লক্ষণ সেনের মতো প্রবল প্রতাপশালী নৃপতির শাসনকেন্দ্র বা কয়েক বছরের অবস্থান সেখানে ছিল।’২২ গঙ্গাতীরে অবস্থিত নবদ্বীপ বা নদীয়া ছিল তখন হিন্দুদের একটা ‘পুন্যস্থান’।২৩ গঙ্গার মূলস্রোতে তখন ভাগীরথী দিয়ে প্রবাহিত হতো। ‘বৃদ্ধ রাজা সেখানে ধর্মকর্মে নিয়োজিত ছিলেন।’২৪ শাসক হিসেবে সেনদের ক্ষমতার বড় ভরকেন্দ্র ছিল বিক্রমপুর বা সোনারগাঁও। সেটা বখতিয়ার খলজির নদীয়া অভিযানের পরও যে অব্যাহত ছিল সেটা আগেই বলা হয়েছে। বঙ্গ ছাড়াও লক্ষণ সেনের রাজ্য মিথিলা (উত্তর বিহার), রাঢ়, বরেন্দ্রেসহ আরও বহু স্থানে বিস্তৃত ছিল।২৫

    বখতিয়ার ও লক্ষণ সেন সম্পর্কে উপরোক্ত চিত্র আমাদের এটাই জানায়- ঘোড়া ও তরবারিতত্ত্ব একদিকে যেমন এই উভয় ঐতিহাসিক চরিত্র সম্পর্কে আবেগনির্ভর অনেক বাড়তি তথ্য ছড়িয়েছে, তেমনি অনেক বাস্তব তথ্য আড়াল করেছে।

    এরকম আবেগনির্ভর একপেশে ইতিহাসচর্চার সূত্রেই এটাও ছড়ানো হয়, বখতিয়ার খলজি বিহার অভিযানকালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেন। বাস্তবে নালন্দা ধ্বংস হয় ১১৯৩ সালে, আর বখতিয়ারের বিহার অভিযান ছিল আরও দু বছর পর। বখতিয়ার খলজি ভারতবর্ষেই ঢোকেন ১১৯৫-এ। তবে নালন্দা ধ্বংসে যুক্ত না থাকলেও তিনি বিহার বা মগদের উদন্ডপুরে একটা শিক্ষালয় (বিহার) ১১৯৯-এ ধ্বংস করেছিলেন। যারা নালন্দা ধ্বংসে বখতিয়ারকে নির্দোষ দেখান (এবং সেটাই সঠিক) তারা অজ্ঞাত কারণে উদন্তপুরীর ঘটনা নিয়ে নিশ্চুপ থাকেন বা একে শুধুই একটা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

    উদন্তপুরী স্থানটি নালন্দা থেকে দূরে অবস্থিত ভিন্ন জায়গা। ওখানকার অভিযানগুলো থেকে পাওয়া ধন-সম্পদ দিতেই বখতিয়ার খলজি ১২০৩-এ কুতবদ্দীন আইবেকের কাছে গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে ধন-সম্পদ সংগ্রহ ও তা উর্ধ্বতন শাসকদের নজরাণা হিসেবে দেয়ার সঙ্গে ধর্মপ্রচার বা জিহাদের যে সামান্যই সম্পর্ক সেটা বলাই বাহুল্য।২৬ বখতিয়ারের মতোই কুতব-উদ্-দীন আইবেকও ছিলেন তুর্কি। উপমহাদেশে তুর্কিদের এরূপ সমরবাদিতাকে ‘ইসলামের জয়-পরাজয়-বিজয়’ হিসেবে দেখার যে রেওয়াজ আমরা ইতিহাসসূত্রে পাই সেটা প্রকৃতপক্ষে উপমহাদেশের ইসলামের ইতিহাসের বড় এক ভ্রান্তিপূর্ণ অধ্যায়। তুরস্ক বা আফগানিস্তানের যোদ্ধাদের বাংলার অভিযান ও দখলকে আমরা যদি ‘ইসলামের প্রতিষ্ঠা’ বা ‘মুসলমানদের শাসনের শুরু’ হিসেবে দেখি তা হলে এর ৫৫৫ বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা বাংলায় সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ও বিতাড়নকে দেখতে হয় ‘বাংলায় খ্রীস্টানদের শাসন’-এর প্রতিষ্ঠা হিসেবে! সাড়ে পাঁচ দশকের ব্যবধানে ‘ক্ষমতা দখল-বেদখলের’ এই উভয় অধ্যায় অনেক সমরূপতা নির্দেশ করে২৭-কিন্তু তাকে ধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা দুরূহ।

    সূত্র: : Emily Shovelton (2021) Revisiting a Royal Sultanate Manuscript from Bengal: The Sharafnama of Nasir al-Din Nusrat Shah of 938/1531–2, Iran, 59:2, 225-244

    বাংলায় ইসলামের প্রচার-প্রসার: কিছু সাধারণ বিবেচনা

    নির্মোহভাবে ও সম্প্রদায়গত পক্ষপাতের বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলায় ইসলামের প্রসার সম্পর্কে অনুসন্ধানের চেষ্টা খুবই অল্প। কারণ হিসেবে তথ্য, উপাত্ত এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের অপ্রতুলতার কথা বলা হয়। সেটা অসত্য নয়। ফলে ধর্ম প্রসারের ইতিহাসের জায়গা দখল করে রেখেছে রাজা-বাদশাদের শাসনের কাহিনী। এখানে ইসলামের বিস্তৃতিতে বিশেষ ধরনের এক সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবেশের সহিঞ্চুতা, ভাতৃত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য আকুলতা যে বড় ভূমিকা রেখেছে সেটা বাংলার ভেতরকার স্বল্প কয়েকজন অনুসন্ধনকারী কেবল গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন এ পর্যন্ত। ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের মনীষীরা এবং বিদেশের অনেক গবেষক বরং অধিক হারে সেরকম পরিশ্রমসাধ্য কাজগুলো করেছেন এবং করছেন। এরকমই এক লেখায়২৮ মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মন্তব্য ছিল-ইসলামের একেশ্বরবাদের মাঝে একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনের সদূরপ্রসারী সম্ভাবনা দেখেছিল স্থানীয় সমাজ। ভবিষ্যত সমৃদ্ধির স্বার্থে তাঁদের দরকার ছিল আধ্যাত্মিক ঐক্য। ইসলাম এখানে পুরানো সমাজের সেই অসমাপ্ত কাজের সমাধা করেছে। নতুন ‘বিশ্বাস’কে স্থানীয়রা দেখেছিল নতুন সমাজ বিপ্লবের বীজ হিসেবে। এর পরিবর্তে ইসলামকে কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহের ফল হিসেবে দেখলে বাংলার সমাজ-ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল অবিচার করা হয়। ইসলাম আবির্ভাবের রাজনৈতিক তাৎপর্য তাতে বাদ পড়ে। ঘোড়া ও তরবারিবাদ ইসলামের স্থানীয় ধরনের তাৎপর্যের সামান্যই বুঝতে সক্ষম।

    এ লেখায় ইতোপূর্বে বাংলায় ইসলাম প্রচারের কয়েকজন আরব বুজর্গের নাম করেছি আমরা। উপমহাদেশে ইসলামের প্রচারের প্রাথমিক উদ্যোগগুলো যে এক পর্যায়ে এরকম আরবদের থেকে যুদ্ধ ও লুন্ঠনপ্রিয় কোন কোন তুর্কি ও আফগান আগ্রাসীর হাতে মলিন হয়েছে সেটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। এটাও সত্য, আরবদের তরফ থেকেও ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধের প্রবল ইতিহাস আছে। আশেপাশের অঞ্চলে আরবদের সেই যুদ্ধগুলো ছিল আসলে জরাগ্রস্ত নানান রাষ্ট্র কাঠামো ধ্বংস করে বহুকালের গোত্রযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সেখানে বাণিজ্য বিকাশের উপযোগী নতুন শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার প্রকল্প। সেই ইসলামের মাঝে আছে আব্বাসীয় খলিফাদের হাতে বাগদাদে থেকে, ফাতেমীয়দের সময় উত্তর আফ্রিকা জুড়ে এবং উমাইয়াদের মাধ্যমে স্পেনে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার বিস্ময়কর সব আয়োজনের কথা।

    অন্যদিকে উপমহাদেশে তুর্কি-আফগানদের অভিযানগুলো ছিল স্পষ্টত সাম্রাজ্য দখল ও নিজস্ব ক্ষমতা কায়েম। এটা নেহায়েতই ভিন্ন চরিত্রের অভিযান। যদিও এতে ধর্মীয় আবরণ দিয়েছেন কিছু লেখক-গবেষক। বাংলায় ইসলামের বিস্তৃতির প্রধান কারণ সেটা নয়। প্রধান পদ্ধতিও সেটা ছিল না। ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে ধর্মান্তকরণের ধারণা অবশ্যই গৌরবেরও নয়। লুটপাট ও ধর্মপ্রচার ইসলামের প্রাথমিক নির্দেশনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ‘ফৌজে এলাহি’দের (খোদার সৈনিক) জন্য খলিফা আবু বকরের নসিহত ছিল: ‘ফলের গাছও নষ্ট করা যাবে না- খাদ্যশস্য এমনকি পশুও নয়।’ আশ্রমবাসীদের প্রতিও কদাচ কঠোর হবে।’২৯

    অথচ বখতিয়ার খলজি কী করলেন? তবকাত-ই-নাসিরী থেকে বিহারের ওদন্তপুরী অভিযানের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হলো সংক্ষেপে (মিনহাজ-ই-সিরাজের মূল বিবরণের ইংরেজি তর্জমাও নীচে রেফারেন্স হিসেবে থাকলো পাঠকের বিবেচনার জন্য)।৩০

    বিহারের শহর ছিল দূর্গ দ্বারা সুরক্ষিত। সেখানে গুছিয়ে আক্রমণের আগে লুটপাটের অংশ হিসেবে বখতিয়ার বিভিন্ন স্থানে হানা দিতেন। বিশ্বাসী সহযোগিরা তাঁর সঙ্গে থাকতো। এরকম এক সময়েই দূর্গসদৃশ একটা স্থানে দু’শ ঘোড়া সওয়ারীসহ হঠাৎ আক্রমণের ঘটনা ঘটে। সেসময় ফারগানার বেশ শিক্ষিত দুই ভাইও এই অভিযানে ছিল। এদের একজন নিজাম উদ দীন, আরেকজন শামশাম উদ দীন। এদের একজনের সঙ্গে ৬৪১ হিজরীতে কথা বলেই এই বিবরণ লিখছি। দুর্গসদৃশ জায়গাটিতে আক্রমণকালে বখতিয়ার একটা গুপ্ত দরজা দিয়ে সেখানে ঢুকে গেলেন। প্রচুর সম্পদ পাওয়া গেল। এখানে অধিবাসীদের বড় অংশ ছিল ব্রাহ্মণ। তাদের মস্তক মুন্ডিত ছিল। সবাইকে হত্যা করা হয়। প্রচুর কিতাব দেখা গেল। এসব বইয়ের অর্থ উদ্ধারের জন্য কিছু হিন্দুকে ডাকা হলো। সেই হিন্দুদেরও মেরে ফেলা হলো। বইগুলোর বিবরণ থেকে বোঝা গেল এই দুর্গ ও শহরটি আসলে একটা বিদ্যাপীঠ।

    অনেক ভারতীয় গবেষক এই ঘটনাকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। ওদন্তপুরী নালন্দার কাছাকাছি বিহার শরীফ নামে একটা জায়গা। মূল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় নয় মোটেই। অর্থাৎ বখতিয়ার ও তার বাহিনী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেননি। সেটা বৌদ্ধ ও হিন্দুদের দ্বন্দ্বে ভিন্ন সময় ভিন্ন কারণে পোড়ে। আপাতত সেই আলোচনা থাক। তবে এটা আড়াল করার সুযোগ নেই, ওদন্তপুরীতে বখতিয়ারের মাধ্যমেও অন্যায়ভাবে বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে এটা কি ‘জিহাদ’ হতে পারে? ‘বখতিয়ারে ঘোড়া’য় আমরা জিহাদেরই উল্লেখ পাই।

    উপরে সমর অভিযানে ইসলামের প্রথম খলিফার ধ্বংসবিরোধী যে নির্দেশনার উল্লেখ করা হয়েছে সেটা প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামের মূল অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে ধারণ করে আছে। এর একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দেন এম এন রায় এভাবে:

    ‘‘মূল মতবাদই ইসলামকে সহিঞ্চু করেছে। ইসলাম একথা বিশ্বাস করে- সমস্ত জগত তার দোষত্রুটি নিয়ে এক খোদারই সৃষ্টি।…এই ধর্মমত কোনদিনই অনুসারীদের একথা শেখায় না যে, কোন ভ্রান্তগোষ্ঠী কোন দুর্বৃত্ত ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। যারা পূজার্চনা করে থাকে মুসলমানদের দৃষ্টিতে তারা ভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু এক খোদারই সন্তান। সেজন্য তারা ভ্রাতৃস্থানীয়। তাদের ‘সৎপথে আনা’ ইসলামেরই কর্তব্য বটে- কিন্তু যতদিন তারা স্বেচ্ছায় মুক্তিপর পথ বেছে না নেয় ততদিন সহজভাবেই তাকে ছেড়ে দিতে হবে।’’

    বলা বাহুল্য, বখতিয়ার খলজির বহুল আলোচিত মগধ অভিযানে আমরা এরকমটি দেখি না।

    আর, বাংলায় কী ঘটেছিল? এখানে কী ইসলাম তার মূলশিক্ষা ছেড়ে তরবারির মাধ্যমে এগিয়েছে? প্রশ্নটি এভাবেও তোলা যায়, এখানে ইসলামের বিস্তৃতি কীভাবে ঘটেছিল? ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান তাঁর ২০১৮ সালের এক বর্ক্তৃতায় এই প্রশ্নের চারটি সম্ভাব্য উত্তর চিহ্নিত করে সবগুলোর একরূপ ময়নাতদন্ত করেন। বাংলায় ইসলাম প্রসারের সম্ভাব্য সেই চারটি উত্তর হতে পারে:

    ক. ইসলাম ধর্ম প্রসারে মুসলমান শাসকরা ভূমিকা রেখেছেন;

    খ. ব্রাহ্মণ্যবাদের কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণের প্রতিবাদ হিসেবে আগের ধর্মত্যাগ ঘটেছে;

    গ. হিন্দু শাসকদের উৎপীড়ন থেকে বাঁচতে বৌদ্ধরা ব্যাপক হারে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছে; এবং

    ঘ. পীর-দরবেশদের মাধ্যমে নতুন ধর্মের প্রসার ঘটেছে।

    উপরের চারটি সম্ভাব্য উত্তরের মধ্যে ইসলামের প্রসারে সবচেয়ে কম ভূমিকা শনাক্ত হয় প্রথম পদ্ধতিতে। ভীতি প্রদর্শন বা নিপীড়নের মাধ্যমে নতুন ধর্মে দীক্ষার নজির বিরল না হলেও তার উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা দেখা যায় না বাংলায়। এমনকি অন্যত্রও। দিল্লী ও উত্তর ভারতের উদাহরণ দিয়েছিলাম আমরা উপরে। ক্ষমতার উত্তাপে গণহারে কোন নতুন ধর্মের প্রসার ঘটলে উত্তর ভারতে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকতো। ইসলাম-প্রসারে যোদ্ধাদের ভূমিকা-তত্ত্ব এমনকি এমন প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারে না যে, মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদীয়া ও ঢাকার মতো মুসলমান শাসকদের অবস্থানের প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলো থেকে নোয়াখালী-চট্টগ্রামের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে কেন মুসলমানদের সংখ্যাগত প্রসার অধিক। ১৮৮১-এর শুমারিতেও দেখা গেছে, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় যখন মুসলমানদের হিস্যা যথাক্রমে ৪৮ ও ৫৬ শতাংশ- নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে তখন সেটা ৭৪ ও ৭১ শতাংশ। শেষোক্ত অঞ্চলগুলো নতুন ধর্মের প্রসারে এগিয়ে গেল কেন?৩১ এমনকি সুদূর ভেনিস থেকে আসা পর্যটক সিজার ফেডেরিসি সন্দ্বীপের মতো স্থানে কেন ‘প্রায় পুরো জনসংখ্যা মুসলমান’ পেলেন?৩২ তরবারি কাজ করলে অন্তত ১৮৮১ পর্যন্ত বাংলায় ‘শাসক শ্রেণী’র সংখ্যালঘু হয়ে থাকার কোন কারণ থাকতে পারে না।

    আকবর আলী খানের মতে, ব্রাহ্মণ্যবাদের উৎপীড়নে নিম্নবর্ণের মানুষের দলে দলে সাম্যবাদের খোঁজে ইসলাম গ্রহণের ধারণাও এই কারণে বিশেষ সমর্থন করা যায় না যে, এরকম সমস্যা ভারতের অন্যত্রও ছিল। কিন্তু সেসব অঞ্চলে ব্যাপক ধর্মান্তরের নজির নেই। ১৮৭২ সালের প্রথম শুমারিতে যে চারটি এলাকায় মুসলমানদের ঘনত্ব বেশি দেখা গেছে সেগুলো ছিল পূর্ববাংলা, পশ্চিম পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্তান।৩৩ তাছাড়া বাংলায় মুসলমান সমাজেও বর্ণপ্রথার প্রবল প্রভাব ঢুকে পড়েছিল আশরাফ, আতরাফ, আরজল ইত্যাদি শ্রেণীভেদের মাধ্যমে।৩৪ একই রকমভাবে সেনবংশসহ অন্যান্য হিন্দুদের দ্বারা বাংলার বৌদ্ধদের উৎপীড়িত হওয়ারও ব্যাপক কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ফলে ইসলামের পতাকাতলে গণহারে বৌদ্ধরাও শামিল হয়েছে- এমন সাক্ষ্য মেলে না।৩৫ বরং বাংলায় ইসলামের প্রসারে চতুর্থ ধারণা- তথা পীর-আওলিয়াদের ধীরলয়ের ভূমিকাই প্রবল দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও খাজা মইনুদ্দীন চিশতী, আলী কলন্দর, কুতুবুদ্দিন, নিজামুদ্দিন প্রমুখ প্রভাবশালী পীর থাকার পরও বাংলায় কী কারণে পীরদের সফলতা অধিক বলে ধরতে হবে? এর উত্তর হিসেবে আকবর আলী খান বাংলার গ্রামের গড়নকে চিহ্নিত করেন। গবেষক অসীম রায় এ বিষয়ে যেটা বলেন৩৬, পীর ও দরবেশরা বাংলায় প্রকৃতির রুদ্ররোষের শিকার মানুষকে সংঘবদ্ধকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন। একটা বন্ধন সৃষ্টিকারীর চরিত্র ছিলেন তাঁরা। স্থানীয় সমাজের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাতে পেরেছিলেন তাঁরা- অস্থিতিশীল ভৌগলিক পরিবেশে অসহায় মানুষের যা দরকার হয়। রিচার্ড এম ইটনও বাংলায় পীরদের অনুরূপ ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের তিনটি প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী বৈশিষ্ট্যের কথা জানান। সেগুলো হলো সম্মোহনী শক্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা ও চাষবাস সম্পর্কে পরামর্শ। এতে তারা স্থানীয়দের আধ্যাত্মিক শান্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও পথ দেখান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রাক্তন অধ্যাপক সুশীল চৌধুরী এই প্রক্রিয়াকে এভাবে শনাক্ত করেছেন:

    বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব এবং উত্থানে কৃষির বিকাশ ও নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে জনবসতি স্থানান্তরের একটা ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে পূর্ববাংলায় ঐতিহাসিক এই প্রক্রিয়াকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। এখানে গণধর্ম আকারে ইসলামের বিকাশে যেসব ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে তার মধ্যে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা। এর ফলে বাংলায় কৃষির ভরকেন্দ্র পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রান্তিক দিকে সরে গিয়েছিল। এরই চূড়ান্তরূপ দেখি আমরা যখন পদ্মার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় গঙ্গা। এতে করে গঙ্গার মূল স্রােত পূর্ববাংলার ভেতর দিয়ে বইতে শুরু করে। অঞ্চলটি তখন তুমুল উর্বর হয়ে ওঠে। এর নিম্নাঞ্চলে ব্যাপক বিস্তার ঘটে বন ও ঝোঁপঝাড়ের। এসময় ক্রমে বাংলার অন্য জায়গা থেকে দরিদ্ররা বিস্তৃর্ণ বনাঞ্চলের দিকে সরে যেতে থাকে। ইতোমধ্যে সেখানে ঝোঁপঝাড় বন সরিয়ে আবাদে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন পীর, গাজী, সুফিদের দল। যাঁরা সেখানে ‘সাংস্কৃতিক মধ্যস্থকারী’র ভূমিকা পালন করছিলেন। এই প্রক্রিয়াতেই পূর্ববাংলার নতুন বসতিস্থাপনকারীরা ইসলামের পরিসরে প্রবেশ করে- তাদের পুরানো সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারসহ। ফলে আমরা দেখবো, যেটা অন্যত্র ঘটেনি- পূর্ববাংলার ইসলামে স্থানীয় অতীত সংস্কৃতির প্রবল জের ছিল এবং এখানকার কৃষিজীবীদের কাছে ইসলামকে কখনো বিদেশী কিছু মনে হয়নি। অন্তত ইসলাম বিস্তৃতির প্রাথমিক দিনগুলোতে।৩৭

    এই ধরনের বিবরণের অন্যতম উৎস আসলে রিচার্ড ইটনের বিখ্যাত গবেষণা। ইটন অনেকটা জেলা ধরে ধরে এরকম বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে বাগেরহাটের খান জাহান আলীর বিবরণ দিতে যেয়ে তিনি লিখেন৩৮:

    দরবেশ খান জাহান ছিলেন বাগেরহাটের একজন পৃষ্ঠপোষক।…তাঁর স্মরণীয় কৃর্তিসমূহের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জঙ্গল পরিষ্কার করা, সেটা আবাদের জন্য প্রস্তুত করা, ইসলামের প্রসার ঘটানো এবং এলাকায় অনেক রাস্তাঘাট ও মসজিদ নির্মাণ।…তিনি অবশ্যই একজন কার্যকর নেতা ছিলেন। অঞ্চলটির পূর্বেকার ঘনবনকে ধানক্ষেতে রূপান্তরিত করতে শ্রেয়তর সাংগঠনিক দক্ষতা ও প্রচুর জনশক্তির প্রয়োজন ছিল। একদিকে লোনা পানি সরিয়ে রাখার জন্য পানি প্রবাহ বরাবর জমিতে বাঁধ দেয়া, পানি মজুদের জন্য পুকুর খনন, শ্রমিকদের জন্য কুঠির তৈরি ইত্যাদি বহু কাজ ছিল। এসব সম্পন্ন করেই ধান চাষ শুরু হতো। না হলে নল-খাগড়া ফিরে আসতো। এসব ছিল কষ্টকর তৎপরতা। এসব কাজ কঠিন করে তুলতো বাঘ ও জ্বরের উপস্থিতি। খান জাহান লোকদের স্থাপত্যের বিশাল কর্মকান্ডের দিকেও ধাবিত করেন। বিভিন্ন জরিপ তাঁকে অর্ধশতাধিক স্থাপনা তৈরির কৃতিত্ব দিয়েছে। আর লোক-ঐতিহ্য দাবি করে তিনি ৩৬০টি মসজিদ এবং সমসংখ্যক দীঘি বানিয়েছেন।…তাঁকে অঞ্চলের অসংখ্য সড়ক নির্মাণের কৃতিত্বও দেয়া হয়।…সংক্ষেপে খান জাহানকে স্মরণ করা হয় শুধু বনের একজন অগ্রপতিক হিসেবেই নয়- একজন সভ্যতা নির্মাণকারী হিসেবে।

    কেবল কৃষি ও অবকাঠামোগত নতুন ‘সভ্যতা’ নির্মাণই নয়- জেমস ওয়াইজ প্রান্তিক বাংলায় (রাষ্ট্রীয় সেবার অনুপস্থিতির মাঝে) পীরদের বিভিন্ন সেবাধর্মী কর্মসূচির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যারা মধ্যে ছিল রোগ নিরাময় ও বিচারমূলক কাজ। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এরকম পীরদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি আস্থাশীল ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে তাদের ‘মাজার’-এ নানান ধর্মের মানুষের আগমন তা নির্দেশ করতো।

    তবে শুধু এসব কারণেই বাংলার পীররা উত্তর ভারতীয় পীরদের চেয়ে বেশি সফল নন। তাঁদের সফলতা এনে দিয়েছিল (আকবর আলী খানের মতে) বাংলার গ্রামের উন্মুক্ত চরিত্র। এর প্রমাণ হিসেবেই দেখা যায় বঙ্গীয় ব-দ্বীপে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে ইসলামের প্রসার ঘটেছে বেশি। ঐসব গ্রামের চরিত্র ছিল কেন্দ্রের চেয়ে অনেক উদার ও স্বাধীন। যেখানে ব্রাহ্মণ ছিল কম। ‘বিশ্বাস’ বদলের কারণে ত্যাজ্য হলে সেখানে পৃথক গ্রাম গড়বার মতো যথেষ্ট পরিসর ছিল। উত্তর ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের আঁটোসাটো গ্রামগুলোতে যা সম্ভব হতো না। মুসলিম শাসনের কেন্দ্রগুলো থেকে বহু দূরের অঞ্চলগুলোতে অধিক মুসলমানের দৃশ্যমান হবার এই চমকপ্রদ বিষয়টি খেয়াল করেই হেনরি বেভারলিও সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, বাঙলায় মুসলমানদের অস্তিত্ব বেড়েছে শাসকদের কারণে নয় বরং কিছুটা বর্ণ শৃঙ্খল প্রভাবিত পরিবেশের কারণ।৩৯ এসব উন্মুক্ত ও দুর্বল গঠনের গ্রাম থেকে ধর্মান্তর যতটা সহজ উত্তর ভারতের কেন্দ্রীভূত গ্রামগুলোতে সেটা সম্ভব ছিল না। এ কারণেই বাংলায় পীর দরবেশদের সফলতার হার বেশি।

    উল্লেখ্য, বেভারলি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম শুমারির পরিচালক তথা ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন। বাংলার সকল প্রান্ত থেকে আসা তথ্য-উপাত্তগুলোর তাৎপর্য প্রকৃতই এমন এক বাস্তবতা যা আজো তখনকার সমাজ বুঝতে অগ্রাহ্য করার মতো নয়। বেভারলি সেটাই কেবল সকলকে জানিয়ে গেছেন দীর্ঘ এক বিবরণে ‘রিপোর্ট অন দ্য সেনসাস অব বেঙ্গল’ শীর্ষক ১৮৭২ সালের প্রকাশনায়।৪০ উদ্বৃতি দীর্ঘ হলেও ঐ রিপোর্ট থেকে কিছু চুম্বক কথা তুলে ধরা হলো এখানে:

    “৩৪৯…. কৌতূহল বেড়ে গেল, যখন দেখা যাচ্ছে- মোগলদের সান্নিধ্য পাওয়া রাজধানীসুলভ এলাকাগুলো নয়, মুসলমানরা সংখ্যায় বেশি বাংলার অন্যত্র। এরকম কিছু কিছু জেলায় তারা সংখ্যায় চার ভাগের তিন ভাগ। বগুড়ায় দেখা গেল পাঁচ ভাগের চার ভাগ। …অথচ গৌড়ের মালদায় ৪৬ শতাংশ। মুর্শিদাবাদে ৪৫।..অথচ বাকেরগঞ্জ-ত্রিপুরা-রংপুর-ময়মনসিংহে তারা দুই তৃতীয়াংশ।…এসবই ইংগিত করে বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যায় বেড়েছে মোগলদের মতো শাসকদের আবির্ভাবের কারণে নয়। বরং প্রাক্তন অধিবাসীদের মাঝে থাকা বর্ণপ্রথার কঠোর অসহিঞ্চুতার কারণে।…

    ৩৫০. বিশ্বাস করার কারণ ঘটেছে, নিম্নবর্গ এবং বিভিন্ন ট্রাইব ইসলামে আকর্ষিত হয়েছে। ফরিদপুরে ও বাকেরগঞ্জে অনেক বড় সংখ্যায় চন্ডাল, রংপুরে অনেক কোচ ইসলাম গ্রহণ করেছে। যাদের মর্যাদা রাজবংশীদের মতো ছিল না।… যেখানেই মুসলমানদের সংখ্যায় বেশি পাওয়া গেছে সেখানেই এও দেখা গেছে কৃষিজীবী ও শ্রমজীবীরা বেশি।৪১ এটা একটা নিয়ম হিসেবে পাওয়া গেছে…

    ৩৫২. …ইসলাম যখন বঙ্গের নিম্নাঞ্চলে আসে…তখন হিন্দুধর্ম একটা অনিশ্চিত ভিত্তির উপর অবস্থান করছিল। তখন এটা কেবল ধর্ম হিসেবে নয়, এমন এক ব্যবস্থা হিসেবেও আসে- যার মাধ্যমে নিম্নবর্গীয়রা আগের অবজ্ঞার জীবনের পরিবর্তে পুরানো প্রভুদের সমান না হলেও- একরকম প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে শিখে।…ধর্মান্তরে এখানে শাস্তি বা ভয় দেখানোর ঘটনা বিরল।…পূর্বতন অবজ্ঞাসূচক অবস্থান থেকে রক্ষা পেতেই তারা ইসলামে আকর্ষিত হয়।

    ৩৫৩. বিদেশী রক্তের জোরে নয়- মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি অন্য কারণে- এর জন্য যদি যদি আরও প্রমাণ চাওয়া হয়- তাহলে বলতে হবে, এখানে যারা মুসলমান হলো এবং সম পাটাতনের যারা হয়নি উভয়ের প্রথাসমূহ, গড়ন এক, চুল আঁচড়ানোর মতো বিষয়ও এক। তারা একই আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধাস্থলে যায়। তারা প্রায় একই ধাঁচে প্রার্থনা করে। যদিও প্রভুর নাম ভিন্ন। এক দলের কাছে যা ‘সত্য নারায়ন’- অন্যদলের কাছে তা ‘সত্য পীর;। কেবল ‘শেখ’ পরিচয়টি এই মুসলমানদের আলাদা করেছে। এটা দিয়ে বোঝা যেত সে ধর্মান্তরিত।

    লক্ষ্যণীয়, বেভারলির বিবরণে তৎকালীন বাংলার ইসলাম সামাজিক মুক্তির একটা ছবি হাজির করে। পাশাপাশি বহুত্ববাদী একটা বাংলাকে দেখি আমরা সেখানে। এই দুটি ছবিরই ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর সঙ্গে, ইতিহাসবিদ আব্দুল মমিন চৌধুরী বাংলার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে প্রাথমিক ইসলামের অগ্রযাত্রার পেছনে সেখানকার মানুষের চারিত্রিক নমনীয়তার বৈশিষ্ট্যকেও বিবেচনায় নেয়ার কথা বলেছেন।৪২ তাঁর মতে এ কারণেই বাংলার পশ্চিমবাঞ্চলের পরিবর্তে অন্যান্য দিকে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ছিল দ্রুতলয়ে। অথচ সেসব এলাকা ছিল শাসকদের অবস্থান থেকে দূরের এলাকা। তাঁর এই বক্তব্য এমন সামাজিক ধারণাকেও সমথর্ন করে যে, কৃষিজীবী সমাজ বহির্জগতের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয় কম।

    উপরোক্ত মতামতসমূহের সমর্থনসূচক বিবরণ আমরা পাবো জেমস ওয়াইজের বিবরণ থেকেও। একদা (১৮৬৬-৬৮তে) ঢাকায় সিভিল  সার্জন হিসেবে কাজ করে যাওয়া ওয়াইজ ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত (মাত্র ১২ কপি মুদ্রিত!) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটিতে লিখেছেন৪৩:

    বঙ্গদেশে ১৮৭২ সালের লোক গণনা শেষে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। এতে দেখা যায় মুসলমানরা দক্ষিণবঙ্গে বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাচীন বঙ্গের রাজধানীগুলোর সন্নিহিত এলাকা নয়। সমগ্র বদ্বীপের প্লাবনভূমিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ঢাকা, মালদা, মুর্শিদাবাদ ও পাটনায় মুসলমান সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫৬, ৪৫, ৪৫ এবং ১২ শতাংশ। অন্যদিকে বাকেরগঞ্জ ও ময়মনসিংহের নদীবিধৌত অঞ্চলে তারা ছিল স্পষ্টভাবে অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ। লোক গণনার এরকম তথ্য ছিল কল্পনাতীত।.. .. প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাস আমরা যত জেনেছি অষ্টাদশ শতাব্দির পূর্বে মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুরাই ছিল সংখ্যায় অধিক।

    ওয়াইজ, ইটন, বেভারলি প্রমুখের এসব বিবরণ বাংলায় ইসলাম প্রচারে মধ্যযুগের মুসলমান শাসকদের অতি সীমিত ভূমিকার কথাই জানায়। সেক্ষেত্রে আমরা কী সরাসরি এই উপসংহারেই পৌঁছাবো- অসীম রায়, ইটন, আকবর আলী খান প্রমুখ যেমনটি বলেছে- পীর-দরবেশদের মাধ্যমে এখানকার উন্মুক্ত গ্রামে সহজে ইসলাম প্রচার হয়েছে? তখন আবার প্রশ্ন ওঠে, আউলিয়া-দরবেশদের দ্বারা কারা আকর্ষিত হলো? নতুন ধর্মে কারা দীক্ষিত হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ইসলাম প্রসারের (উপরে উল্লিখিত চারটি বিকল্পে) দ্বিতীয় বিকল্পটিকে প্রথম বিকল্পের সঙ্গে মিলিয়ে উপসংহারে পৌঁছা যৌক্তিক হবে। অর্থাৎ পীররা এখানে সফল হয়েছেন একদিকে যেমন এখানকার প্লাবনভূমির উন্মুক্ত চরিত্রের গ্রামীণ ভূগোলের কারণে- তেমনি নিম্নবর্ণ এবং বর্ণচ্যুত সনাতম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর নীতির কারণেও। এ বিষয়ে ওয়াইজের বিবরণ৪৪ এরকম:

    হিন্দুধর্ম উচ্চবর্ণ প্রভাবিত গ্রাম থেকে নিম্নবর্ণের অচ্ছুতদের নির্বাসিত করেছে। তাদের কঠিন কায়িক পরিশ্রম ও হেয় বৃত্তি গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে। বৃহত্তর নিম্নবর্ণের জনসাধারণ মানবেতন জীবনযাপন করতে ছিল বাধ্য। দীনতা হীনতা ছাড়া কিছুই তারা পায়নি। পুর্নজন্মবাদী ব্রাহ্মণরা দলিতদের জন্য পরকালেও ভালো কিছু পাবার আশ্বাস দিতে পারেনি। অথচ মৌলানারা ইহলোকে ফললাভের আশ্বাসবাণী তো শোনাতেনই- পরলোকেও ন্যায়বিচারের কথা শোনাতেন।

    ওয়াইজের এ বিবরণ পরবর্তীকালের বিভিন্ন শরীরতাত্ত্বিক জরিপদ্বারাও সমর্থিত হয়। নৃতত্ত্ব ও পরিসংখ্যানবিদ্যার সমন্বয়ে এসব শ্রমসাধ্য গবেষণায় শরীরের গঠন, মাথার আকৃতি, ওজন, রক্তের গ্রুপ ইত্যাদির মাধ্যমে দেখা গেছে, বাংলার মুসলমানদের শরীরী মিল রয়েছে একই অঞ্চলের বর্ণ-বহির্ভূত হিন্দুদের (এর কিছু ব্যতিক্রম ছিল কেবল চট্টগ্রাম)।৪৫ একই রকম সাক্ষ্য দেয় এ বিষয়ক নৃতাত্ত্বিক জরিপগুলোও। অর্থাৎ আমরা যদি মধ্যযুগের বাংলার বর্ণ-সম্পর্ক এবং পীর-দরবেশদের ভূমিকাকে সমন্বয় করি তাহলে এখানে ইসলামের প্রসারের একটা বিশ্বাসযোগ্য পথনির্দেশ খুঁজে পেতে পারি বলেই মনে হয়। এর সঙ্গে মিলাতে পারি আমরা মমতাজুর রহমান তরফদারের সেই বিবরণকেও যেখানে তিনি প্রাক-মধ্যযুগীয় বাংলায় নৌ-বন্দর এবং ময়নামতি-লালমাইয়ে পাওয়া আরবীয় মুদ্রার মধ্যদিয়ে বহির্বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেন।৪৬ অর্থাৎ বখতিয়ার খলজির মতো যোদ্ধারা আসার আগেই কৃষিজীবী বাংলার সঙ্গে আরবের একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে পাওয়া এসব মুদ্রা বাংলার প্রাথমিক মুসলমান শাসকদের চালু করা মুদ্রা থেকে ভিন্নতর। শেষোক্ত মুদ্রাগুলো কেবল সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে তৈরি হতো। বাণিজ্যিক লেনদেনের অংশ হিসেবে নয়। মুসলমান শাসকরা দ্বিতীয় ধরনের মুদ্রার প্রচলন করে চৌদ্দ শতকের দিকে অনেকগুলো টাকশাল বানিয়ে।৪৭

    শিল্প: বাফেলোস ইন কমব্যাট
    সূত্র: দি মিট

    ইসলামের ইতিহাস-সন্ধান ও বাংলার ইতিহাসের মুক্তি

    বহিরাগত একজন শাসক হয়েও বাংলার ইতিহাসে বখতিয়ারের নায়ক হিসেবে চিহ্নিত হওয়া যে বাস্তবসম্মত নয়- সেটা দেখেছি আমরা উপরে। প্রশ্ন হলো, এর পরও কেন তার জন্য এমন উম্মত্ত গর্ববোধ ছড়িয়ে পড়তে পারলো। এর কিছু কারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক, বড় কারণ অবশ্যই রাজনৈতিক। বাংলার ইতিহাস চর্চার এখনও বাঙলায়ন হয়নি বলেই এমনটি ঘটতে পারে। স্থানীয় অতীতের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক আকাঙ্খার বিবরণের চেয়ে এখানে ‘ইতিহাসচর্চা’য় বিদেশী শাসকদের শৌর্য-বীর্যকে মহিমান্বিত করার চল। সেটা একারণেও যে, এ অঞ্চলের শাসন সংস্কৃতি এখনও সংখ্যালঘু অভিজাত এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতেই রয়ে গেছে। তাদের জন্য বখতিয়ার বা লক্ষণ সেনদের মতাদর্শ ও রাষ্ট্রদর্শন যতটা উপযোগী ও আরামদায়ক- নিম্নবর্গের রাজনৈতিক আকাঙ্খার বিবরণ ততটাই অস্বস্তিকর। খেয়াল করলে আমরা এও দেখবো, লক্ষণ সেনকে হটিয়ে বখতিয়ারের আগমনে সন্তোষ থাকলেও- ঐরকম কোন রচনায় এরকম কোন অসন্তোষ দেখা যায় না যে, বখতিয়ার বা মুসলমান রাজশক্তি বাংলার সমাজ কাঠামোতে শোষণমূলক সামাজিক সম্পর্কের সামান্যই কোন পরিবর্তন সাধন করেছে। নিজেদের প্রভাবের সুরক্ষায় শাসনতান্ত্রিক নতুন কিছু পদ্ধতির বিস্তারেই বিশেষ মনোযোগী ছিল তাঁরা।

    বাস্তবে সমরবাদ ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার জায়গা থেকে সেন বা খলজিদের নীতি-কৌশলে একালের শাসকরা নিজেদের সম্ভাবনা, স্বস্তি ও স্থায়িত্ব দেখেন। ‘রাষ্ট্রীয়’ সীমার বাইরে দাঁড়িয়ে অতীত বাংলায় পীর-দরবেশ-বুজর্গ-সন্ন্যাসী-বাউলদেও নতুন সমাজ-নির্মাণ চেষ্টার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল বোঝার মতো বাংলার ইতিহাস হয়তো আজও সাবালক হয়নি। এই ইতিহাসে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার স্থানীয় জীবন্ত মানুষদের খুঁজে পাই না আমরা। তারই ছাপ পড়ে আমাদের সাহিত্যচিন্তায়, গতানুগতিক ভাবুকতায় এবং চর্চায়। কিন্তু এর মাঝে প্রবল এক বিপদের দিক আছে। হয়তো আছে হীনমন্যতা বোধও।

    উত্তর ভারতের সেনরা বা আরও দূরের আফগান-তুর্কি থেকে আসা খলজিরাই যদি আমাদের ‘ইতিহাস’ এবং সেই ইতিহাসের প্রধান চরিত্র হয়ে থাকে তাহলে বাংলার জাতীয় পরিচয় কীভাবে নির্মিত হবে? নতুন প্রজন্ম ‘বাংলার ইতিহাস’ হিসেবে কী জানবে বা জানছে? আমরা বাঙলার বহিরাগত আক্রমণকারীদের কীভাবে দেখবে? বহিরাগতের শাসনই কী বিশাল বাংলার শত শত বছরের ইতিহাস? আমাদের পাঠ্য-পুস্তকগুলো কবে প্রকৃতপক্ষে আমাদের হবে? কবে সেগুলো হীনমন্যতা থেকে এই জাতিসত্তাকে মুক্তি দিবে? সেগুলোতে যদি বহিরাগত সেন ও খলজিরাই মহিমান্বিত থাকে তাহলে বাংলার স্বকিয়তা থাকলো কোথায়? আগ্রাসী শক্তিসমূহের জন্য গৌরব অন্যভাবে আবার বাংলায় ঐতিহাসিক সামাজিক-সন্ত্রাসকে গৌরবদানও বটে। অথচ গৌরবান্বিত হওয়া উচিত স্থানীয় ‘সমাজ’ কীভাবে ঐ বাইরের শাসকদের বিরুদ্ধে তাদের মতো করে প্রতিরোধ রচনা করেছিল- সেসব পদ্ধতিসমূহ। যেকোন জনপদের যে নিজস্ব চৈতন্য থাকে তার সঙ্গে আগ্রাসনকারীকে মহিমান্বিত করা মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এটা এমন এক বিপজ্জনক তাবেদারি- যা এখানকার সমাজের রাজনৈতিক অভিমুখকেও অস্পষ্ট করে রাখে।

    ছবি: গাজী পীর ও তার বাঘ
    সূত্র: দি হেরিটেজ ল্যাব

    শেষকথা

    প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে কিংবা আমাদের বহুল আলোচিত ইতিহাস বিষয়ক কিতাবসমূহে মধ্যযুগের বাংলা নানানভাবেই উপস্থিত। সেখানে যে বাংলাকে আমরা পাই তার একরূপ কাব্যিক প্রকাশ আল-মাহমুদের ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’। তিনি আমাদের মূলধারার ইতিহাসকে নিজের আবেগ, বিশ্বাস ও দর্শন দিয়ে একটি বিশেষ ভঙ্গীতে তুলে ধরেছেন ১৮৬ শব্দে। সেই দেখা কাব্যের বিবেচনায় সফল। কিন্তু ইতিহাস চৈতন্যের দিক থেকে কীভাবে সমস্যা তৈরি করে সেটা দেখেছি আমরা উপরে। এটা একই সঙ্গে  বাংলার ইতিহাসবিদ্যার গভীর সংকটেরও একাংশ। বাংলার ইতিহাসের এই অসুস্থতা ইসলামের ইতিহাসকেও সংক্রমিত করতে উদ্ধত সেটাও আমরা কিছুটা আলোচনা করেছি। বাংলায় ইসলামের ইতিহাসের প্রকৃত অনুসন্ধান আসলে স্থানীয় সকল জাতিসত্তার ইতিহাস সারাইয়ের কাজের অপরিহার্য অংশ। এটা রাজনৈতিক কাজও বটে। সেই ‘কাজ’ আত্ম পরিচয়ের রাজনীতি নির্মাণের জন্য নয়। বরং আত্ম পরিচয়ের সত্য খুঁজতে। যে ‘সত্য’ বর্তমান ‘বাংলা’কে ভবিষ্যতের পথ দেখাবে এবং ছদ্ম-আত্মপরিচয়ের টানাপোড়েনকে অতিক্রম করে যাবে।

    এটা বাংলায় জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা যুদ্ধের মতোও। ইতিহাসের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতেই হবে আমাদের। ভৌগলিক স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির লগ্নে আমাদের ‘ইতিহাস’-এরও ‘মুক্তি’ দরকার। পাশাপাশি তার পুরাণধর্মী চরিত্রও বদলাতে হবে। ভৌগলিক স্বাধীনতার পরও আমরা যখন অতীতের দখলদারদের শৌর্যবীর্যে মুগ্ধ তখন অবশ্যই আমাদের চিন্তার ইতিহাসের দৈন্যতা নিয়ে পুনর্ভাবনা দরকার আছে। এই পুনর্ভাবনা এমনকি ‘ইসলামী উম্মাহ’র সঠিক ইতিহাস পুননির্মাণের স্বার্থেও।

    আজকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ মিলে বাংলাভাষীরা ইসলামী ‘উম্মাহ’র বড় এক মুসলিম জনগোষ্ঠী। বৌদ্ধ ও হিন্দু প্রধান একটা অঞ্চলে কীভাবে ইসলামের এত বিস্তৃতি ঘটলো- তার কোন আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বিশেষত্ব ছিল কি না- সে বিষয়ে সঠিক একটা বিবরণ তৈরি অবশ্যই ইসলামের বৈশ্বিক ইতিহাসের দিক থেকে জরুরি। উপরন্তু আমরা ইতিহাসকে ঘটনা হিসেবে বা বীরপূজা বা জাতিঘৃণার অংশ হিসেবে পাঠ করবো- নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে পাঠ করতে চাই- সেটাও আজ দরকারি প্রশ্ন হিসেবে সামনে চলে এসেছে।

    বখতিয়ারের ঘোড়ায় এমন এক ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদ’-এর কাব্যরূপ পাওয়া যায়- যা ধর্মের আবরণে আমাদের কোন অসত্য জাতিবাদের দিকে নিয়ে যায় কিনা সেটা বিবেচনায় রাখতে হবে। এরকম জাতিবাদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে ‘অপর’ ‘অশ্রেষ্ঠ’কে ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দখলের চেতনা। এ কবিতার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের ইতিহাসের মহিয়ান সব সাংস্কৃতিক অবদান এবং তার দার্শনিক শক্তির ছাপ দুর্বল হয়ে পড়ে স্থানীয় পাঠকের মননে।

     

    তথ্যনির্দেশ:

    ১. লেখাটি এক বছর আগে ‘প্রতিচিন্তা’ (জানুয়ারি-জুন ২০২১) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। অন-লাইন পাঠকদের অনুরোধে এখানে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

    ২. আল-মাহমুদ যেমন বখতিয়ারকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন তেমনি তাঁর কবিতাতেই আমরা ‘সাম্যের দাওয়াত’ দেখি ‘ফসলের সুষম বন্টন’ ও ‘শ্রেণী উচ্ছেদ’-এর জন্য (সোনালী কাবিন, ১০ নং সনেট)। তিনি যেমন একটি বিশেষ রাজনৈতিক ধারার সংবাদপত্র হিসেবে ঢাকায় দৈনিক সংগ্রাম ও চট্টগ্রামে দৈনিক কর্ণফুলীতে যুক্ত ছিলেন তেমনি আবার অনেকখানি বিপরীত ধারার দৈনিক গণকন্ঠেও তার আগে যুক্ত ছিলেন। কতটুকু আদর্শিক কারণে এবং কতটুকু আর্থিক কারণে এসব যুক্ততা সেটা শনাক্ত করা সহজ নয় আজ আর। সুতরাং একটি কবিতায় ব্যক্ত কোন বিশেষ ঐতিহাসিক চৈতন্য নিয়ে ব্যক্তি আল-মাহমুদ বা তাঁর সমগ্র কাব্যসত্তাকে বিবেচনা করা অসঙ্গত। আমরা এখানে কেবল তাঁর কবিতা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’য় ব্যক্ত ঐতিহাসিক উপাখ্যানকে পর্যালোচনা করবো।

    ৩. এ ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাসের একজন সুপরিচিত গবেষক মোহাম্মদ মোহার আলীর লেখা থেকে একটা উদাহরণ তুলে ধরছি এখানে: ‘It was one such goup of Turkish chieftains and military adventurers under the leadership of Ikhtiyar al-din Muhammad bin Bakhtiyar Khalji who planted the victorious banner of Islam on the soil on Bengal.’ (History of The Muslims of Bengal, V. IA, 1985, p. 47)|

    এখানে একই বাক্যে একদিকে খলজিকে military adventurers বলা হচ্ছে এবং অন্যদিকে তাকে দেয়া হচ্ছে ‘ইসলামের পতাকা ওড়ানোর বিজয়ের গৌরব’। কয়েক খন্ডে প্রকাশিত বিপুল কলেবরের এই গবেষণাটি হয়েছে আবার সৌদি আরবের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধের পর গবেষক মোহাম্মদ মোহার আলী সৌদি আরবে চলে গিয়েছিলেন।

    ৪. আবদুল করিম, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান শাসন, বড়াল প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭, পৃ. ৩২-৩৪।

    ৫. সরদার আবদুর রহমান, ইখতিয়ারউদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০১৯, পৃ. ১৯৫-১৯৬।

    ৬. আজকের বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মালদা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ইত্যাদি এলাকাকে সেই অভিযানের ভরকেন্দ্র বলা যায়।

    ৭. যেমন, তোঘরীল তোঘান খানের সঙ্গে ওড়িষ্যা সহযোগী হন তিনি। গোওয়ালিয়ার আক্রমণে তিনি সুলতান ইলতুৎমীশের সহযাত্রী ছিলেন।

    ৮. অনুবাদ: আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, দিব্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ২৪।

    ৯. History of  The Muslims of Bengal, V. IA, 1985, p. 51.

    ১০. বাংলার ‘সমাজ’ থেকে সেই সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির সংগঠিত উৎখাতের সূচনা মাত্র গত কয়েক শতাব্দির ঘটনা। মধ্যযুগের বাংলার স্বাধীন মুসলমান সুলতানদের আমলে বরং উল্টোচিত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুলতান রুকুন-উদ-দীন, আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, নাসির উদ্দীন নুসরাত শাহ প্রমুখের সময়ে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা হতে দেখা গেছে, শ্রী কৃষ্ণ বিজয় (মালাধর বসু), মনসা বিজয় (বিপ্রদাস পিপলাই), পদ্মপুরাণ (বিজয় গুপ্ত), কৃষ্ণ মঙ্গল (যশোরাজ খান) ইত্যাদি বাংলাকাব্য। মালাধর বসু ছিলেন বর্ধমানের, বিপ্রদাস উত্তর চব্বিশ পরগণার, বিজয় গুপ্ত বরিশালের মানুষ। একই সময়ে আলাউদ্দিন হুসেন শাহের লস্কর চট্টগ্রামের শাসক পরগাল খাঁর অনুরোধে মহাভারতের একাংশ অনুবাদ করছেন কবিন্দ্র পরমেশ্বরণ। এরকমই ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় সপ্তদশ শতকেও দৌলত কাজী এবং আলাওলে লেখনির বিষয়বস্তুতে। এই উভয় খ্যাতনামা মুসলমান লেখকের রচনায় অনেকভাবে শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রকে উপস্থিত দেখা যায়। বলাবাহুল্য, এটা মুসলমান শাসকদের দিক থেকে শুধুই ঔদার্যের বিষয় ছিল না। বহিরাগত শাসক হিসেবে অপরিচিত জমিনে নিজেদের রাজত্বের দীর্ঘস্থায়ীত্বের কৌশল হিসেবেই হিন্দু-মুসলমানের সুসম্পর্ক তাদের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক ছিল। আবার একই সঙ্গে এটা স্থানীয় সমাজের সংস্কৃতির সঙ্গেও মানানসই ছিল। এ আিরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখা যেতে পারে: Sushil Chaudhury, Identity and Composite Culture: The Bengal Case, Journal of the Asiatic Society of Bangladesh, Hum., Vol. 58 (1), 2013.

     ১১. আকবর আলী খান, বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার, জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০১৮, পৃ. ২৭।

    ১২. এটা ছিল ৭৮৮ সালের আব্বাসীয় খলিফা হারুণ আল-রশীদের মুদ্রা। Md. Shah Noorur Rahman, Islam and its early introduction in Bengal, Indian History Congress, Vol. 56 (1995), pp. 425-434 (10 pages).

    ১৩. রিচার্ড এম. ইটন, ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: হাসান শহীদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৮, পৃ. ১৪৯।

    ১৪. Dr. Sangeeta B. Sahay, Re-assessing the military career of Bakhtiyar Khilji in Bihar, www.iosrjournals.org, Feb 2019.

    ১৫. তবকাত-ই-নাসিরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩০।

    ১৬. মূল ফারসি থেকে তবকাত-ই-নাসিরীর অনুবাদক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া লিখেছেন, ‘সেনদের দলিলপত্রে কোথাও দেখা যায় না গৌড়ে তাদের কোন রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। অথচ সেই নগরীর নামের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রায় সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলকে লখনৌতি রাজ্য বলে অভিহিত করে গেছেন মীনহাজসহ অনেক মুসলমান ঐতিহাসিক।’ পূর্বোক্ত, উপক্রমনিকা, পৃ. চৌত্রিশ।

    ১৭. আবিদ আলী খান, গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্মৃতি, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: চৌধুরী শামসুর রহমান, দিব্য প্রকাশ, ২০০৭, পৃ. ১৬৯ । ১৯০২ সালে মালদহে লর্ড কার্জনের হাতে গৌড় ও পাণ্ডুয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনগুলোর এই তালিকা দেয়া হয়েছিল। গৌড়ের প্রত্ন-ইতিহাস সম্পর্কে এটা একটা নির্ভরযোগ্য দলিল। একই বিষয়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-এর গৌড় কাহিনীতে (বঙ্গদর্শন, কার্তিক, ১৩১৪) বলা হয়েছে: ‘লক্ষণাবতীর ধ্বংসাবশেষের মাঝে বখতিয়ার নির্মিত কোন পুরাতন মসজিদের পরিচয় পাওয়া যায় না। সেরকম কোন জনশ্রুতিও বর্তমান নাই।’

    ১৮. দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের ইতিহাসে জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তকরণের ধারণা তথা ‘তরবারিতত্ত্ব’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা হলে উইল ডুরান্ট (The Story of Civilization: Our Oriental Heritage, 1935)। পরে এই তত্ত্ব এখানে প্রচার করেছে ব্রিটিশ শাসক-বুদ্ধিজীবীরা। মূলত ভারতবাসীকে বিভক্ত করে শাসন করার জন্যই এই তত্ত্বের প্রসার ঘটায় তারা। এরপর সেটা হস্তান্তরিত হয় হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের কাছে। এভাবেই এর অনুপ্রবেশ ঘটে বাঙ্গালি মুসলমান বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশের মাঝেও। তারই একরূপ পার্শ্বফল হতে পারে বখতিয়ারের মতো চরিত্রদের ক্রমাগত ‘মুসলমান শাসনের প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে তুলে ধরা। বখতিয়ারকে ‘মুসলমান শাসক’ হিসেবে চিহ্নিত করা স্পষ্ট ইঙ্গিতবহ। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে দশকের পর দশক তার প্রচার- ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার কোন সচেতন প্রয়াস কি না- সেটাও গভীরভাবে পুনর্ভাবনার অবকাশ রয়েছে। এরকম তুর্কি যোদ্ধাদরে ‘কাজ’কে ভারতবর্ষে ‘মুসলমানদের অবদান’ হিসেবে দেখানো আজকের ভারত বিজেপির তরফ থেকেও বিরাট এক বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি হিসেবে হাজির আছে।

    ১৯. Sayiedmomin Sayied, Khilji Dynesty, www.taand.com,https://bit.ly/3890RaU

    ২০. তবকাত-ই-নাসীরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫।

    ২১. এ পর্যায়ে এও মনে রাখা দরকার যে, সেনরাও খলজিদের মতোই বাংলায় বহিরাগত শাসক। মূলত কানাড়িভাষী তারা। সেনরা এসেছিল কনার্টকের মহীশূর থেকে। প্রাথমিকভাবে এরা ছিল ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়। অর্থাৎ একই সঙ্গে স্বঘোষিত শাসক ও যোদ্ধা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা যখন দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের বাংলার ইতিহাস পড়ি তখন কেবল এসব বহিরাগত যোদ্ধাদের ইতিহাস পড়তে বাধ্য হই। এসব শাসকদের আমরা মহিমান্বিতও করি। কার্যত এসব বাংলার সমাজের ইতিহাস নয়। তখনকার আগ্রাসী ‘শাসকদের ইতিহাস’ মাত্র। যদিও তাকেই ‘বাংলার ইতিহাস’ হিসেবে দেখানো চলছে। আরও বিস্ময়ের দিক হলো, সেন বংশ এবং খলজিদের সঙ্গে তুলনা করলে শাসক হিসেবে পালবংশই অনেক লোকজ এবং বাঙ্গালি চরিত্রের। এই শাসক বংশের গোড়াপত্তনের ধরনও ছিল তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক ধাঁচের। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সুযোগে তাদের উৎখাত করেই সেনরা এসেছিল। আর সেই সেনদের পর এলো তুর্কি-আফগান খলজিরা। কিন্তু পূর্বতন স্থানীয় শাসকদের পরিবর্তে বাংলার ইতিহাসচর্চায় বহিরাগত শাসকরাই প্রশংসিত- যাঁরা মূলত আক্রমণকারী এবং ক্ষমতা দখলকারী।

    ২২. সরদার আবদুর রহমান, ইখতিয়ারউদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি, দিব্যপ্রকাশ, ২০১৯, পৃ. ৯৩।

    ২৩. তবে এমনকি সেখানে কোন বড় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষও মিলেনি। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর অনুবাদের উপক্রমনিকায় লিখেছেন, ‘মীনহাজের বর্ণনায় দেখা যায়, বখতিয়ার বিহার অধিকারের সংবাদ পাওয়ার পর মহারাজা লক্ষণ সেন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেটা হলে এই মহারাজা যে নগরীতে কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করবেন না তা কল্পনাতীত। আর কিছু না হোক, নগরীর চারদিকে একটা পরিখা অন্তত থাকতো। অথচ সারা নবদ্বীপে কোন পরিখার চিহ্ন পাওয়া যায় না। পূর্বোক্ত, পৃ. একচল্লিশ।

    ২৪. সরদার আবদুর রহমান, পূর্বোক্ত, পৃ. ৯১।

    ২৫. হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেনের রাজধানী ছিল বিজয়পুর। সেটা রাজশাহী থেকে আট মাইল দূরের বিজয়নগর।

    ২৬. কোরআনের বিধান অনুযায়ী অন্যের সম্পদ অন্যায়ভবে সংগ্রহ অনুমোদিত নয়। সুরা বাকারাহ’য় এর বিরুদ্ধে নির্দেশ রয়েছে (২:১৮৮)। এরকম ধন সম্পদ গ্রাস করার লক্ষ্যে উর্ধ্বতনকে উৎকোচ প্রদানেও নিষেধ করা হয়েছে সেখানে (২:১৮৯)।

    ২৭.  H. Bolchmann, Journal of Asiatic Society of Bengal, 1873, No. 3, p.211.

    ২৮. মানবেন্দ্রনাথ রায়, ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা, রেনেসাঁস, ২০১৫, কলকাতা, পৃ.৩১।

    ২৯. মানবেন্দ্রনাথ রায়, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭। এ বিষয়ে ইসলামের বিধান সম্পর্কে সাইয়েদ আবুল আ’ল মওদূদী লিখেছেন,

    ‘যারা ইসলামের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তারা কোথাও বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলে সেখানকার লোকেরা গণহত্যা, জনপদে ধ্বংসলীলা, জুলুম নির্যাতন, গুন্ডামী এবং ব্যভিচারের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হবে না। বরং বিজিত জনপদের অধিবাসীরা এদের প্রতিটি সিপাহিকে পাবে জানমাল, ইজ্জত, আব্রু ও নারীদের সতীত্বের পূর্ণ হেফাজতকারী হিসেবে।’ (ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান, মওদূদী রিসার্চ একাডেমি, ১৯৯৭, ঢাকা, পৃ. ৪৬৯)।

    আর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’য় যাকে ‘আল্লার সেপাই’ বলা হয়েছে এবং শত শত গবেষক যাকে ‘বাংলায় মুসলমান শাসনে’র কর্তৃত্ব দিচ্ছেন তার নদীয়া অভিযান শেষে কী ঘটছে? তবকাত-ই-নাসিরী থেকে উদ্বৃতি:

    রায় (লক্ষণ সেন) নগ্নপদে পশ্চাৎদ্বার দিয়ে নিজ প্রাসাদ থেকে পলায়ন করেন। তাঁর সমুদয় ধনাগার, হারেমের নারী, দাসদাসী, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পুর নারী বখতিয়ারের করতলগত হয়। তিনি অসংখ্য হস্তীও অধিকার করেন। মুসলিম সৈন্যদের হস্তে এত লুন্ঠিত দ্রব্য পতিত হয় যে, তা বর্ণনা করা যায় না।…

    (তবকাতের বখতিয়ার অধ্যায়, সরদার আবদুর রহমানের ‘ইখতিয়ারউদ্দীন মোহাম্মদম বখতিয়ার খলজি’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট হিসেবে সংযুক্ত, দিব্যপ্রকাশ, ২০১৯, পৃ. ২২৬)

    ৩০. He (Bakhtiyar Khilji) used to carry his depredations into those parts and that country until he organized an attack upon the fortified city of Bihar. Trustworthy persons have related on this wise, that he advanced to the gateway of the fortress of Bihar with two hundred horsemen in defensive armour, and suddenly attacked the place. There were two brothers of Farghanah, men of learning, one Nizamu-ud-Din, the other Samsam-ud-Din (by name) in the service of Muhammad-i-Bakhtiyar; and the author of this book [Minhaj] met with at Lakhnawati in the year 641 H, and this account is from him. These two wise brothers were soldiers among that band of holy warriors when they reached the gateway of the fortress and began the attack, at which time Muhammad-i-Bakhtiyar, by the force of his intrepidity, threw himself into the postern of the gateway of the place, and they captured the fortress and acquired great booty. The greater number of inhabitants of that place were Brahmans, and the whole of those Brahmans had their heads shaven; and they were all slain. There were a great number of books there; and, when all these books came under the observation of the Musalmans, they summoned a number of Hindus that they might give them information respecting the import of those books; but the whole of the Hindus were killed. On becoming acquainted (with the contents of the books), it was found that the whole of that fortress and city was a college, and in the Hindu tongue, they call a college Bihar.” (Tabaqat-i-Nasiri, English translation by H.G. Raverty, pages 551-52).

    ৩১. ১৯০১-এর শুমারিতে এও দেখা যায়, বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর পেশা মূলত কৃষি এবং তারা গ্রামনিবাসী। (Abdul Momin Chowdhury, Reflections on Islamisation in Bengal, Bangladesh e-Journal of Sociology, 2011)। যদি যোদ্ধা-শাসকদের সূত্রেই প্রধানত ধর্মান্তর ঘটতো তাহলে মুসলমানদের মাঝে শহুরে পেশাজীবীদের সংখ্যাও থাকতো উল্লেখযোগ্য এবং তাদের অবস্থান হতো নগরগুলোতে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের দীর্ঘসময় পরের শুমারিও সেরকম আভাস দেয় না।

    ৩২. তাঁর গ্রন্থ ‘The voyage and travaile into the East India’, London 1588. এখানে সন্দ্বীপের তথ্য উদ্বৃত হয়েছে ইটনের গ্রন্থ থেকে। পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৮।

    ৩৩. রিচার্ড এম. ইটন, ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫২।

    ৩৪. বেভারলিও ব্রিটিশদের তৈরি ১৮৭১-এর প্রথম শুমারি দলিলে বাংলার মুসলমানদের মাঝে বর্ণপ্রথার অস্তিত্বের কথা বলেছেন। পৃ. ১৯০।

    ৩৫. মুসলমান শাসকরা আসা মাত্র যে ‘গণহারে ইসলাম কায়েম’ হয়নি তার আরেক প্রমাণ ইবনে বতুতার পূববাংলা ভ্রমণের কাহিনী। এসময় ১৫ দিন মেঘনা নদীতে ভ্রমণ শেষে নদীর দু’পাড়ে কেবল ‘মুসলমান রাজত্বের অধীনে কাফের’দের দেখেছিলেন তিনি। এ বিবরণ সাক্ষ্য দেয়, অন্তত ১৪ শ’ শতাব্দিতেও এ বাংলায় অ-মুসলমানদের ব্যাপক আধিক্য ছিল।

    ‘গণহারে’-এর বদলে যে ‘ধীরলয়ে’ বিশ্বাস বদলের ঘটনা ঘটেছে সেটা এমনকি নদীয়ার পরের সময়ের শুমারি প্রতিবেদনগুলোতেও লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ১৮৭২-এ নদীয়ায় মুসলমান জনসংখ্যার হিস্যা ছিল ৫৪ ভাগ, ১৮৯১-এ ৫৭ ভাগ এবং ১৯০১-এ ৫৯ ভাগ। লক্ষ্য করার বিষয়, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে জন্মহার বেশির বিষয় বিবেচনা করলে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েছে খুব ধীরলয়ে। [জেলা গেজেট নদীয়া ১৯২৭]

    নদীয়ার মতোই তখনকার আরেক ‘মুসলমান শাসক প্রভাবিত অঞ্চল’ ঢাকার ১৮৩০ সালের শুমারি থেকে হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যা পাওয়া যায় যথাক্রমে ৩১ হাজার ও ৩৫ হাজার। অর্থাৎ তখনও এখানে প্রায় অর্ধেক জনগণ ছিল অ-মুসলমান। এইচ ওয়াল্টনের উদ্যোগে শুধু ঢাকায় এই শুমারি হয়েছিল বলে জেমস ওয়াইজ জানিয়েছেন। (পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ, ১ম ভাগ, অনুবাদ: ফওজুল করিম, আইসিবিএস, ২০০০, পৃ. ২৬)

    ৩৬. Asim Roy, Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, Princetion University Press, 1983, p. 42.

    ৩৭. Sushil Chaudhury, Identity and Composite Culture: The Bengal Case, Journal of the Asiatic Society of Bangladesh, Hum., Vol. 58 (1), 2013, P.3.

    ৩৮ রিচার্ড এম. ইটন, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৫৩-৫৪।

    ৩৯. H. Beverley, Census of Bengal 1871, Bengal Secretariat Press, 1872, P, 133.

    ৪০. Bengal Secretariat Press, Calcutta, 1872, p. 132-134.অনুবাদ: বর্তমান লেখকের।

    ৪১. বেভারলি মুসলমানদের মাঝে কৃষিজীবীর পাশাপাশি তাঁতি ও জোলাদের বড় সংখ্যায় পাওয়ার তথ্য দিয়েছেন। পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯০।

    ৪২. একই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাংলার এসব এলাকায় একদা বৌদ্ধ বিশ্বাসেরও বিস্তৃতি ঘটেছিল বলে আব্দুল মমিন চৌধুরী দাবি করেন। সেনদের আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদী কঠোরতা এসব এলাকায় ইসলাম প্রসারের জমিন তৈরি করে রেখেছিল বলেই তিনি ইঙ্গিত দেন। পূর্বোক্ত, পৃ. ৫০।

    ৪৩. জেমস ওয়াইজ, পূর্বোক্ত, ২৩

    ৪৪. জেমস ওয়াইজ, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭।

    ৪৫. এরকমই এক গবেষণা Dhirendra Nath Majumdar and Radhakrishna Rao, Race elements in Bengal: A quantitative analysis, Asia Pub. House, 1960. এর মাঝে প্রথমজন ছিলেন নৃবিজ্ঞানী। দ্বিতীয়জন পরিসংখ্যানবিদ। ১৯৪৫ সালে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয় বাংলার ২৯টি জেলার ১৪টিতে ৪১টি সামাজিক গ্রুপের মাঝে। ৩৬৮১ জন পুরুষকে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছিল। এরকম বিষয়ে এত বৃহৎ পরিসরের ব্যবহারিক গবেষণা খুবই বিরল।

    ৪৬. ইটন তাঁর বিবরণে অন্যান্য পশ্চিমী গবেষকদের সূত্রে দাবি করেছেন সুলায়মান তাহির (মৃ. ৮৫১), ইবনে খুদাদাদবিহ (মৃ. ৮৫০), মাসুদি (মৃ. ৯৫৬) ও ইদ্রিসির (মৃ. ১১৫০) মতো আরবের ভূগোলবিদদের কাছে বাংলা পরিচিত ছিল এবং তাদের মধ্যে অন্তত একজন (মাসুদি) সেখানে মুসলমানদের বসবাসের উল্লেখ করেছেন। পূর্বোক্ত, পৃ. ১৬৫।

    ৪৭. মমতাজুর রহমান তরফদার, ইতিহাস ও ঐতিহাসিক, বাংলা একাডেমি, ১৯৮১, পৃ. ৪ ও ১৩।

    প্রথম প্রকাশ: প্রতিচিন্তা, জানুয়ারি-জুন ২০২১