অরাজ
শিল্পী: সৈয়দ হায়দার রেজা
প্রচ্ছদ » সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত নোক্তা: ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত নোক্তা: ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

সাভারের যে স্কুলশিক্ষককে হত্যা করা হলো, তিনি ধর্মের দিক থেকে হিন্দু হলেও, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সাম্প্রদায়িক এঙ্গেল নাই। এটা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গুণ্ডা মাস্তান হয়ে উঠা ছাত্রের দ্বারা শিক্ষক হত্যা। এখানে শিক্ষক মুসলমান হলেও একই ঘটনা ঘটত। যারা এ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা হিন্দু শিক্ষক হত্যা এভাবে লেবেলিং করতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ।

নড়াইলের যে অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হলো, এটা বিশেষভাবে সাম্প্রদায়িক ঘটনা। ওই শিক্ষক মুসলমান হলেও তিনি প্রভাবশালীদের তোপের মুখে পড়তেন, কিন্তু ধর্মে হিন্দু হওয়ায় যা যা হলো—অর্থাৎ ঘটনাপ্রবাহ ঠিক একই রকম হতো না। অর্থাৎ, ওই অধ্যক্ষ হিন্দু হওয়াতেই ধর্ম অবমাননার জিকির তোলা গেছে। এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশের উপস্থিতি ইত্যাদি দেখিয়ে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, ‘এই ঘটনা সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক…’। এ ধরনের বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য সুবিধার নয়। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেই একটা ঘটনা আর সাম্প্রদায়িক হতে পারবে না কেন? ‘সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক’ এই ধরনের বক্তব্যেরই বা মানে কী? একটা ঘটনা একই সাথে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক তথা সাম্প্রদায়িকরাজনৈতিক হতে পারবে না কেন? উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস তো আগাগোড়া রাজনৈতিক ঘটনা। বিজেপির মুসলিমনিধনের রাজনীতি কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? সুতরাং, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি মাত্রই তা আর সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক—এমন দাবি নির্বুদ্ধিতা মাত্র। যে পুলিশ হাজার হাজার শ্রমিকের দাবিদাওয়ার মিছিলকে মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারে, সেই একই পুলিশ “উত্তেজিত জনতার” অন্যায্য দাবির মুখে নিষ্ক্রিয় থাকে কী করে? এই সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার অর্থ কী? এ সময়ের পুলিশী ভূমিকাকে বিশেষভাবে ‘মুসলমান পুলিশ’ আকারে না বুঝলে এ ধরনের ঘটনার কোনো অর্থবহ কুলকিনারা করতে পারা যাবে না। দিল্লিতে মুসলমান শিক্ষার্থীর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং তাকে বুঝতে হবে ‘হিন্দু পুলিশ’ আকারে। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং বুঝতে হবে ‘বাঙালি পুলিশ’ আকারে।

ধর্মে হিন্দু/মুসলমান বা জাতে চাকমা কেউ আক্রান্ত হলেই তা সাম্প্রদায়িক হবে এমন কোনো কথা নাই। দেখতে হবে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তাদের হিন্দুত্ব/মুসলমানিত্ব বা চাকমাত্ব কোনো ভূমিকা রাখছে কি না। যেকারণে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে মুসলমান হলেও এ ধরনের ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলার সুযোগ নাই। একইভাবে, ভারতে এনকাউন্টার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে হিন্দু হলেও এ ধরনের ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। কারণ তাদের সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কোনো ভূমিকা এসব ক্ষেত্রে নাই। 

আবার ভারতে মুসলমানরা তাদের মুসলমান পরিচয়ের কারণেই আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সেটা হচ্ছেন সে দেশের একটা রাজনৈতিক দল ও সরকার দ্বারা, এ ধরনের নিগ্রহের ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক নয়; রাজনৈতিক’ বলার কোনো অর্থ হয় না, ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িকরাজনৈতিক। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য নাগরিক নিপীড়নের সাথে একে এক কাতারে এনে বলার কোনো উপায় নাই যে, আলাদা করে এগুলোকে সাম্প্রদায়িক বলছেন কেন, ভারতে কি হিন্দুরা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয় না?

একই কথা খাটবে বাংলাদেশের অনেক হিন্দু নির্যাতনের সময়ে। হৃদয় মণ্ডল ও স্বপন কুমার বিশ্বাস হিন্দু না হলেও, তাদেরকে ফাঁসানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তারা হিন্দু হওয়ায় তাদেরকে ফাঁসানোর, অপমান করার একটা বিশেষ প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বিশেষ প্যাটার্নকে আমলে না নিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করলে তা সত্যের প্রতি অবিচার করা হবে।

প্রথিতযশা মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তো মুসলমানরাও গুমখুনের শিকার হচ্ছে, তাহলে আলাদা করে হিন্দু নির্যাতন বলা হচ্ছে কেন? আমাদের উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, উমরের এই যুক্তি বিভ্রান্তিকর ও গোঁজামিলপূর্ণ। এমন কোনো তথ্য প্রমাণ নাই যে, বাংলাদেশে গুমক্রসফায়ারের শিকার ব্যক্তিরা ‘মুসলমান’ হওয়ার দরুন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে যদি এমন কোনো নজির থাকে যে, মুসলমান বা ইসলামিস্ট হওয়ার দরুন কাউকে গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হতে হয়েছে, তাহলে সেই মর্মান্তিক ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে বুঝতে হবে—এমনকি তা যদি বাংলাদেশেও ঘটে থাকে। কিন্তু মোটাদাগে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিরা ধর্মে মুসলমান হলেই-যে ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। উমরের এ যুক্তি বিজেপিপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবিদের বেশ কাজে আসবে বলে মনে হয়। কারণ তারাও বলবেন, আলাদা করে মুসলমান নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে কেন? ভারতে কি হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হয় না?

উপরের ছবিটি বাংলাদেশের এবং নিচের ছবিটি ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। সূত্র: ইন্টারনেট

দুটি কথা বলে শেষ করা যায়। বাংলাদেশে মুসলমান এবং ভারতে হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হতে পারে। সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক হিসেবেও অভিহিত করার দরকার পড়তে পারে। কখন ও কীভাবে? ধরা যাক, বাংলাদেশে আহমাদিয়া ও কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতি ‘মূলধারা’র মুসলমান সমাজের অনেকেরই মনোভাব সাম্প্রদায়িক তো বটেই। কেবল সাম্প্রদায়িকই নয়, তা বর্ণবাদও বটে। একইভাবে ভারতে তথাকথিত নিচু জাতের হিন্দু ও দলিতদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের মনোভাবআচরণকেও সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ বলতে হবে। তাই বলে বলার কোনো সুযোগ নাই যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ স্বস্ব দেশে নানাবিধ জুলুমের শিকার হলেই তা সাম্প্রদায়িক। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ কথাটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, নৈতিক আবেদন ও জরুরতকে ‘অল লাইভস ম্যাটার’ বলে ঢেকে দেয়া এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

এমনকি আরেক ধরনের অনালোচিত সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গও টানা দরকার—সেক্যুলার সাম্প্রদায়িকতা। বাংলাদেশ ও ভারতের এলিট অ্যাক্টিভিস্টবুদ্ধিজীবীসংস্কৃতিকর্মীদের একটা বড় অংশই এই সাম্প্রদায়িকতায় নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও রোজকার জীবনযাপনকে উল্লিখিত এলিটকুল যে চোখে দেখে থাকেন এবং যে মনোভাব পোষণ করেন, তা সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই সেক্যুলার সাম্প্রদায়িকবর্ণবাদের অস্তিত্বও আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

সুতরাং, সাম্প্রদায়িকতাকে এক ধরনের সিচুয়েটেড এথিকস দ্বারা বোঝা দরকার। কোনো দেশ বা কোনো সম্প্রদায়কে যেমন হরেদরে সাম্প্রদায়িক বলা যায় না, ঠিক একইভাবে অমুক দেশের তমুক ধরনের নির্যাতনসমূহ ‘সাম্প্রদায়িক নয় রাজনৈতিক’ বলারও কোনো মানে হয় না। সাম্প্রদায়িকতা আছে আবার নাই। একেবারেই ‘নাই’ আবার সবই ‘সাম্প্রদায়িক’ কোনোটাই নির্মোহ অবস্থান নয়—বিশেষ ধরনের পজিশনালিটি দ্বারা নির্ধারিত।

[এই লেখাটি মূলত আমাদের দীর্ঘ এক প্রবন্ধের যুক্তিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগ্রহীগণ বিস্তারিত দেখতে পারেন: সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ, সহিংসতা ও সংখ্যাগুরুবাদী চৈতন্য প্রসঙ্গ]

সারোয়ার তুষার