Blog

  • অনেক ঐতিহ্য, বহুস্তরায়িত গঠন : চিত্রিত অনুভাষ্য

    অনেক ঐতিহ্য, বহুস্তরায়িত গঠন : চিত্রিত অনুভাষ্য

    • স্বাধীন সেন

    ২০৩২ বঙ্গাব্দের বাংলা নববর্ষ পালন না-করে পশ্চিম বাংলা, ভারতের বিজেপির পক্ষ থেকে হিন্দু নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো হয়। সূত্র: ফেসবুক

    কিন্তু এবারের ১৪৩২ সালের বাংলা নববর্ষ বিজেপি ও বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের উদ্যোগে পালন করা হয়। সেখানে বাংলা নববর্ষকে শশাঙ্ক অব্দ হিসেবে পালন করা হয়। সূত্র: ফেসবুক

    সূত্র: অনলাইন

     

     

    সূত্র: অনলাইন

    এ বছরেই পরিকল্পিতভাবে সাধারণ সপ্তম শতকের তৎকালীন গৌড়ের শাসক শশাঙ্ককে হিন্দুত্ববাদীরা বঙ্গাব্দের প্রণেতা হিসেবে খাড়া করানোর প্রবল তৎপরতা শুরু করেছে। তার নমুনার মধ্যে উপরে বামদিকে শশাঙ্কের কল্পিত প্রতিকৃতি এঁকে ব্যাপকভাবে প্রচারণা যেমন হয়েছে, তেমনই তৎকালীন গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ হিসেবে শনাক্তকৃত বর্তমান পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদের চিরুটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের ওপরে শশাঙ্কের ওই প্রতিকৃতিতে পুজা-অর্চনাও করা হয়েছে উদযাপন করে। প্রধানত পশ্চিম বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে দাপট দেখানোর জন্য বিজেপি এর আগে উত্তর ভারতের অনুকরণে রামনবমী উদযাপন ও হনুমান জয়ন্তী উদযাপনের ‘ঐতিহ্য’ পশ্চিম বাংলায় প্রচলন করে। মহারাষ্ট্রের শাসক শিবাজিকেও বাংলা অঞ্চলে জনপ্রিয় এবং মোগল তথা মুসলমানদের পরাভূত করে হিন্দুত্বকে রক্ষা করার নায়ক হিসেবে পরিচিত করে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে না-পারার কারণে নতুন করে বাংলা অঞ্চলেরই একজন শাসককে হিন্দুত্বের ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিবেশন করার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। শশাঙ্ক সম্পর্কে ঐতিহাসিক উৎসগুলো ভীষণ অস্পষ্ট এবং বিভিন্ন স্থান ও কালে রচিত। অন্যান্য বিভিন্ন শাসকের মতনই শশাঙ্কর জীবন ও কাজকর্ম অতিকথন, পরিচয়বাদী কেচ্ছা, আর পরস্পর-বিরোধী বয়ানে আকীর্ণ। একদিকে তিনি শৈব হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে তিনি উত্তর ভারতের বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বী শাসক হর্ষবর্ধনের আক্রমণ থেকে গৌড় অঞ্চলকে (যে-অঞ্চলের তৎকালীন সীমানা ও আয়তন সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ইতিহাসনির্ভর উপাত্ত পাওয়া যায় না) রক্ষা করেছিলেন বলে বাংলা অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদগণের লেখালেখিতে পরিচিত। আবার, হর্ষবর্ধনের জীবনী হর্ষচরিত-এ আর চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের কথিত ও পরে লিপিবদ্ধ বৃত্তান্তে শশাঙ্ককে একজন বৌদ্ধবিদ্বেষী খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী অন্যান্য সংগঠনগুলো পশ্চিম বাংলায় হিন্দুত্ববাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এই অঞ্চলেরই একজন ঐতিহাসিক চরিত্রকে বেছে নিয়ে, তাকে উল্লেখ করে ইতিহাসের নয়া বয়ান নির্মাণ করছে। সেখানে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়ে বাংলা ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে শশাঙ্কের বিভিন্ন কল্পিত প্রতিকৃতি আর কল্পিত জীবনবৃত্তান্তের ঘটনাবলির দৃশ্যগত পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে। বঙ্গাব্দ ও বাংলা নববর্ষ পালন ও উদযাপন এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক পার্টিগুলোর নির্বাচনী দাপট প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহ্যের বাছাই করা রূপান্তর ও পুনর্গঠন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিচের নিউজটিও বিজেপির প্রতিপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসের নববর্ষ-কেন্দ্রিক তৎপরতার উদাহরণ, যেখানে বঙ্গাব্দের ইতিহাসগত বয়ান বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ঐতিহ্যের বয়ানের পাল্টা বয়ান হিসেবে খাড়া করানো হচ্ছে। অনলাইনে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে পরিকল্পিতভাবে এসব দৃশ্যগত কনটেন্ট প্রচার করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা যেকোনো পরিচয়বাদী বয়ানের মাধ্যমে অপতথ্য প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কেন্দ্রীভূত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং বিশাল অর্থলগ্নির মাধ্যমে কার্যকর করার কেইস স্টাডি বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন নামে সমন্বিতভাবে বট আইডি ব্যবহার করে এবং অনেকক্ষেত্রে অ্যালগোরিদমের ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে অপতথ্য ও হেইট স্পিচ-কনটেন্ট প্রচার করে সফলতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে ইতিহাসের এবং অতীত সম্পর্কিত বিভিন্ন মুসলমান-বিদ্বেষী কনটেন্ট প্রচার, মোগল শাসকদের দানবায়ন, বাছাই-করে কোনো শাসককে হিন্দু-পরিচয় আরোপ করে নায়কে পরিণতকরণ এই তৎপরতার অংশ। শশাঙ্কের পাশাপাশি মোগল আমলে বাংলা অঞ্চলের বারো ভূঁইয়া হিসেবে পরিচিত এবং মোগলদের সঙ্গে সংঘাত ও আপোষের সম্পর্কে লিপ্ত স্থানীয় শাসকদের মধ্যে কেদার রায় ও প্রতাপাদিত্যকেও মহিমান্বিত করে বিভিন্ন দৃশ্যগত কনটেন্ট, মিম ও পোস্ট প্রচারিত হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে পশ্চিম বাংলায় হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য তৈরি করা আর নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করার লক্ষ্য থাকলেও বাংলা অঞ্চলে হঠাৎ করেই শশাঙ্ককে আঞ্চলিক ঐতিহ্যের বয়ান নির্মাণের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন একটি প্রকল্প বলে ভাবার কোনো কারণ নাই। নয়া-হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প বর্তমান ভারতে একটি মনোলিথিক, সমসত্ত্ব, অনৈতিহাসিক উগ্র ও ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদী ও আধিপত্যবাদী বয়ান আর বিভিন্ন তৎপরতা যেমন সামনে নিয়ে আসছে, তেমনই বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ঐতিহ্যের বাছাই করা পুনর্গঠন, পরিমার্জন আর পুনর্নবায়ন করছে। এখানে একইসঙ্গে সর্বভারতীয়করণের সমরূপীকরণ যেমন লক্ষণীয়, আবার আঞ্চলিক ও স্থানিকীকরণের তৎপরতাও লক্ষণীয়। নয়া-উদারনৈতিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিভিন্ন পরিস্থিতি আর প্রক্রিয়াগুলোকে হিন্দুত্ববাদী ঐতিহ্যের পুনর্গঠনে ব্যবহার করার বিভিন্ন কৌশল প্রণালীবদ্ধভাবে প্রয়োগে এই কুশীলবগণ সিদ্ধহস্ত বলেই মনে হবে। প্রচারমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করার বহুবিধ কার্যক্রম স্পষ্টতই নয়া-হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এই কার্যক্রমগুলোকে ঐতিহ্যের বাছাইকৃত পুনর্গঠনের স্থিতিস্থাপক অথচ বুনিয়াদি পরিচয়বাদী আধিপত্য তৈরি করার আর জারি রাখার তৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে।

    সূত্র: অনলাইন

    বিজেপির উদ্যোগে প্রকাশিত বাংলা ক্যালেন্ডারে চিত্রায়িত শশাঙ্কের দুটো প্রতিকৃতি ও জীবনের ঘটনার দৃশ্যগত পরিবেশন। দৃশ্যগত মাধ্যম ঐতিহ্যের বাছাইকরণ আর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ভীষণ কার্যকর ভূমিকা রাখে।

    সূত্র: ডয়েচে ভ্যালে

    বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বঙ্গাব্দের উদযাপন ও বয়ানের পাল্টা বয়ান উপজীব্য করে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের নিউজের স্ক্রিনশট

    দিনাজপুরের বিরামপুরের জম্বুলেশ্বর মণ্ডপের চৈত্র–সংক্রান্তির মেলা এবং শিবমন্দিরের পূজা। গত এক দশকে এই মেলার ব্যাপ্তি ও সময়ের উপরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য অনেক মেলার মতনই। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদিত আতঙ্ক–অপরত্বের প্রতি বিদ্বেষ–নিরাপত্তাহীনতা মেলার উদযাপনের আচার ও আয়োজনে যেমন প্রভাব ফেলেছে তেমনেই প্রভাব ফেলেছে কেবল ‘ধর্মীয়’ হিসেবে মেলার পরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক আর ভদ্রবিত্তীয় বয়ানে ‘লোক’ বা ‘ফোক’ হিসেবে বিভিন্ন মেলার পরিচয় যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে মেলাগুলো ‘হারিয়ে– যেতে–বসা ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। অথবা কোনো বিশুদ্ধ–নির্ভেজাল–অপরিবর্তনীয় আচার–উৎসবের ক্রমাগত আধুনিকতা দ্বারা প্রভাবিত ও দুষিত সমাবেশ হিসেবে পরিবেশিত হয়। এসব বয়ানে মেলাগুলো কেবলই একধরনের জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের হয়ে ওঠা এবং প্রামাণ্যতার অপরিবর্তনশীল এবং নাগরিক জীবন থেকে দুরবর্তী রোমান্টিক ও এক্সোটিক ঐতিহ্য। মেলাগুলোর অন্য কোনো অর্থ নাই এবং এগুলো যাপিত জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিতও না। অথচ বাংলাদেশে মেলাগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় সাধকদের জীবন অথবা বিশেষ কাল অনুসারে আয়োজিত হলেও ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন স্থানিক ব্যবসা, সম্মিলন, নেটওয়ার্কের বিকাশ ঘটানোয় মেলাগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। স্থানীয় কৃষি ও শিল্পের সঙ্গে আর গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এই মেলাগুলোর সম্পর্ক গভীর।

    দিনাজপুরের বিরামপুরের আশুরার বিলের পাশে চুনা পীরের উরস ও মেলা। বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের ঋতু ভিত্তি, আবাদের নানা পর্বের সঙ্গে, কারিগরি উৎপাদনের বাৎসরিক বিভিন্ন ধরনের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মাচার, এবং উপলক্ষ্য সম্পর্কিত করে মেলা ও উৎসবের বিকাশ ঘটেছে। রূপান্তর ঘটেছে। নাগরিক ঐতিহ্য বিষয়ক চিন্তা ও বয়ানে সকল মেলাকে সমরূপীকরণ করা হয় জাতীয়তাবাদী চিন্তার ঐতিহ্যে মেলাগুলোকে ‘শিকড়ের সন্ধানে’র বাসনায় পরিণত করার কারণে। নাগরিক মধ্যবিত্তের চেতনায় মেলা মানেই গ্রামীণ, ফোক, রোমান্টিক উদযাপন, নগরের ব্যস্ত, বিচ্ছিন্ন, যান্ত্রিক জীবনযাপন থেকে সাময়িক মুক্তির পরিসর। আমি এই বাসনা ও কল্পনায় মন্দ কিছু আছে বলে মনে করি না। নাগরিক জনসংস্কৃতির পর্যালোচনা করলে এবং ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে জনসংস্কৃতির বহুবিধ ও জটিল রূপান্তরে হিসাব–নিকাশ করলে নাগরিক পরিসরে ঐতিহ্যের উদযাপন অশুদ্ধ, দূষিত অথবা বিকৃত কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার কোনোই অবকাশ নাই। আবার নগর থেকে দূরে কোনো ‘গ্রাম্য পরিবেশে’, ‘সরল নিসর্গের মধ্যে’, ‘সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারবাহিকতা’র সাক্ষ্য হিসেবে কোনো উৎসব–আয়োজন–উদযাপন–পারফরমেন্সকে পরিবেশন করার বয়ানও সমস্যাজনক। উভয়ক্ষেত্রেই ধরে নেয়া হয় যে, কোথাও না কোথাও দূষণমুক্ত, নির্ভেজাল, আদি ও অকৃত্রিম কোনো ঐতিহ্য টিকে রয়েছে। যুগের পর যুগ ধরে ‘গৌরবময় ঐতিহ্যে’র ধারায় আমরা একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী/জাতি/সম্প্রদায় হিসেবে এসব ঐতিহ্য অর্জন করেছি। এই বয়ানের প্রচ্ছন্ন ও অপ্রকাশ্য একটি অনুভূতি হল হারিয়ে ফেলার, লুপ্ত হয়ে যাওয়ার, দূষিত ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ ও ভীতি। বিশুদ্ধ, পবিত্র, আমাদের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য নানা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলার ট্রমা। এই অনুভব ও ভাবাবেগ আধুনিক অনুভূতির ও সংবেদনের রূপান্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা আমাদের অনুভব–সংবেদন–আবেগের গঠন–রূপান্তর–বদলের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে কাজ করেছে। বিংশ শতকের শুরু থেকে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে এই অঞ্চলের আধুনিক অভিব্যক্তি আর ভাষার দুনিয়ায় শহর/গ্রামের বৈপরীত্য নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই গঠনে ও বয়ানে উৎপাদন–সম্পর্ক ও অর্থনীতির বদলে প্রচলিত জীবনযাপন রূপান্তরিত হওয়া আর মানুষের শহরমুখী অভিবাসনে শিকড়–বিচ্ছিন্ন হওয়াও বিষাদ ও বিপন্নতা, উন্মুলতা চৈতন্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে নগরের বিলাস, ভোগ, উপভোগ, প্রাচুর্য, চাকরির সুযোগ, শিক্ষিত হওয়ার আকুলতা, নতুন মেরিটোক্রেটিক ব্যবস্থায় শ্রেণিবিন্যাসে উপরের দিকে ওঠার বাসনা আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। আধুনিকত্ব আর এই বিহ্বলতার লিপ্তি অনিঃশেষ। পরস্পরবিরোধী অনুভূতি আর আবেগ ঘরে ফেরার, গ্রামের বাড়িতে ফেরার অসম্ভব স্বপ্ন দেখায়। আবার শহরে গ্রাম, কল্পিত গ্রাম, বিশুদ্ধ ও আদি অতীত পুনরাবিষ্কার ও পুনর্নিমাণ করার শর্ত তৈরি করে। নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে পণ্যায়িত করে ফেলতে পারে। মেলা বা ঐতিহ্যের পুনরুৎপাদন ঘটে শপিং মলে, পার্কে, অভিজাত বিনোদন–কেন্দ্রে। একই সঙ্গে যে–মেলা ও উৎসবগুলো গ্রাম বা মফস্বলে বিভিন্ন উপলক্ষে আয়োজিত হতে থাকে তার সাজসজ্জা, পণ্য–বেচাকেনা, আচারের ধরন, স্থানিক পরিসরের বিন্যাস এবং সমবেত হওয়ার নানা প্রকারের মধ্যে বহুবিধ রূপান্তর ও বদল ঘটতে থাকে। আসলে শহুরে মধ্যবিত্তের চৈতন্যে ও কল্পনায় গঠিত হওয়া নিসর্গপ্রধান, সরল–জীবনযাপনময়, রোমান্টিক ও নস্টালজিক সেই গ্রাম কখনও ছিলই না। ঔপনিবেশিক আমলের গভীর রূপান্তর ও বদলের প্রক্রিয়ায় গ্রাম ও শহরের কল্পনা ও ধারণা বিকশিত হয়েছিল। সেই গ্রামে বিশুদ্ধ, আদিমতম, প্রকৃত, উপশম–প্রদানকারী ঐতিহ্য কখনও অস্তিত্বশীল ছিল না। এখনও নাই। ঐতিহ্য–গঠন ও নির্মাণের প্রক্রিয়ায় এই গ্রাম, এই ঐতিহ্য, এই হারিয়ে–যাওয়া উৎসব–মেলা–সম্মিলন–সংবেদন গড়ে উঠেছে মাত্র।

    বগুড়ার মহাস্থানে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার (র.)-এর উরসে বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার আয়োজিত মেলায় গানের পারফরমেন্স।

    বগুড়ার মহাস্থানে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার (র.) এর উরসের সময় তাঁর মাজারে ভক্তদের সমাবেশ ও মিলন।

    বগুড়ার মহাস্থানে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার (র.)-এর উরসের মেলায় সমবেত সাধক, পাগল আর ভক্তদের একাংশ।

    বগুড়ার মহাস্থানে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার (র.)-এর উরসের মেলায় বিভিন্ন স্থানে নানা পারফরমেন্স আয়োজিত হয়। গানের এমনই একটি পারফরমেন্স। এই ধরনের গানের আসর নিম্নবর্গের পরিসরে জমায়েত–সম্মিলন–সংবেদনের জারনে যেভাবে ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করে তার আত্মসাৎকরণ এবং পুনর্গঠন ঘটে নাগরিক ও আনুষ্ঠানিক পরিসরে এই পারফরমেন্সকে প্রদর্শন ও ভোগ করার প্রক্রিয়ায় আর বিশুদ্ধীকরণে।

    বগুড়ার মহাস্থানে শাহ সুলতান মাহীসওয়ার (র.)-এর উরসে মাজার–সংলগ্ন পরিসরে বারোয়ারি গণরান্নার প্রক্রিয়া। এমন গণ ও শরিকি কার্যক্রমও এসব সর্বজনীন মেলা ও উদযাপনের ঐতিহ্যের অংশ।

    দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁয়ের রানীশংকৈলে পীর শাহ নাসিরউদ্দীন (র.)-এর উরসের মেলা। তিনি জনপরিসরে নেকমরদ নামেই পরিচিত।

    দিনাজপুরের ঠাকুরগাঁয়ের রানীশংকৈলে পীর শাহ নাসিরউদ্দীন (র.)-এর উরসের মেলার বিস্তৃতি বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী স্থাপনা, আধুনিক বিনোদন, যাত্রাপাত্রা এবং শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইডের সমন্বয়ে এখন উদযাপিত হয়।

    নেকমরদের মেলার শিশুদের বিনোদনের রাইডসহ বিভিন্ন প্যান্ডেল, যাত্রার প্যান্ডেলসহ রাত্রিকালীন দৃশ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে যে–ঔপনিবেশিক জরিপ প্রকল্পগুলো পরিচালিত হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় ১৮১০–এর দশকে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন পরিচালিত জরিপ। ১৮৩৩ সালে প্রকাশিত তাঁর জরিপ প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের বিভিন্ন বিষয়–আশয় সম্পর্কে বিপুল তথ্য নথিভুক্ত রয়েছে। তাঁর জরিপ প্রতিবেদনে তিনি তৎকালীন নেকমরদের মেলার বিশেষ উল্লেখ করেন। ওই সময়ে এই মেলা একমাসেরও বেশি সময় ধরে চলত। মেলায় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী–বণিকেরা আসতেন বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে। ভুটান থেকে ভুটানি ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়িষ্যা থেকে তোতাপাখি নিয়েও ব্যাপারীরা আসতেন। এই মেলা ছিল সমসাময়িক গ্রামীণ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ও বিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী স্থানীয় পর্যায়ে বেচাকেনার অন্যতম বড় পরিসর। সে–সময়ের নেকমরদের মেলার যে–তাৎপর্য তা যে কেবল বাণিজ্যের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল না তা অনুমান করা যায়; সামাজিক সম্মিলন, যুক্ততা, উদযাপন আর আচারগত অনুশীলনের ধরন এখনকার মেলায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। ঐতিহ্য হিসেবে এই মেলার প্রকৃতি, ধরন ও তাৎপর্য ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়েছে।

    নদী বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলের মানবীয় সকল বোঝাপড়া আর সংবেদনের সঙ্গে লিপ্ত। ১৮৮০ সালের উপরের আলোকচিত্রে তৎকালীন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বাকল্যান্ড বাঁধ ও সংলগ্ন ঢাকার কয়েকটি স্থাপনা আর সে–সময়ের বিভিন্ন ধরনের নৌকা। নদীকে বিভিন্ন বয়ানে এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও নদী অবিরাম বদলের মধ্য দিয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক আমল এবং পরবর্তীকালে নদীর রূপগত বদল আর নদী সংশ্লিষ্ট মানবীয় সংবেদন ও ব্যবহারিক বিন্যাসের পরিবর্তনগুলোর ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা আর পরিবেশন করার ধরনে আধুনিক নদী–ভাবনা, টেকসই ব্যবস্থাপনা আর পরিবেশবাদী স্বীকৃত আখ্যানগুলোর প্র্রভাব যতটা ততটা নদীর সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণ ও অপ্রাণের অবিভাজ্য ও অভেদ লিপ্ততা নিয়ে আলাপচারিতা নাই।

    বুড়িগঙ্গা নদীর জীবন, আর ঢাকার ফ্রেডরিক উইলিয়াম আলেকজান্ডার দ্য ফাবেকের আঁকা ১৮৬১ সালের একটি পেইন্টিং।

    ১৯৬০–এর দশকে ঢাকার পাশের বুড়িগঙ্গা নদীর জীবন।

    স্টিমার বা প্যাডেলচালিত স্টিমার ঔপনিবেশিক আমলে এতদাঞ্চলের জলপথের ওপরে আর নৌ–পরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট বদল ও রূপান্তর নিয়ে এসেছিল। বঙ্গীয় বদ্বীপের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার জলপথের কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বিবেচনা করলে স্টিমার সার্ভিসের প্রবর্তন ছিল এখানকার প্রাক–ঔপনিবেশিক পরিবহন–যোগাযোগ–যুক্ততার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রভাবক। স্টিমার সার্ভিসের প্রবর্তন পরবর্তীকালে বঙ্গীয় বদ্বীপ এবং বদ্বীপ সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যতার স্থানান্তর–মোবিলিটি–অভিবাসনের ক্ষেত্রে যেমন বদল নিয়ে এসেছিল তেমনই বদল নিয়ে এসেছিল নদীপথের ব্যবস্থাপনা ও নৌ–যোগাযোগের উপরে কেন্দ্রীভূত বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ব্যক্তি–মালিকানাধীন স্টিমার কোম্পানীও ব্যবসা করার চেষ্টা করেছে। ২০০০ সালের প্রথমদিক অবধিও স্টিমার সার্ভিস দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি স্থানের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে অল্প হলেও প্রচলিত ছিল। সেসব স্টিমারগুলোর বেশিরভাগই ১৯২০–৩০–এর দশকে নির্মিত ছিল আর বাংলাদেশ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের অধীনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতো। কেবল স্টিমার সার্ভিস আর স্টিমারগুলো বঙ্গীয় বদ্বীপে ঔপনিবেশিক আধিপত্য–নিয়ন্ত্রণ–দখল–রূপান্তর কায়েমের ঐতিহ্য বহন করে না। এই স্টিমার ঔপনিবেশিক আমলে দেশান্তর, উদ্বাস্তুকরণ, দেশভাগের সময় দেশত্যাগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় জনপরিবহন–সমেত মানষজনের স্মৃতি–বিস্মৃতি–যাপনের–পরিবর্তনের বড় সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। অদ্ভুত বিষয় হল, স্টিমার ও স্টিমার–সার্ভিসের ঐতিহ্য কেবল একমাত্রিক ও একরৈখিক ঔপনিবেশিক শাসন ও প্রকৃতির ওপরে আধুনিক যান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্যের স্মারক না। এই অঞ্চলে মানুষ ও প্রকৃতির অধীনস্তকরণ, মানুষের পুরানো পেশা, যাপন, ব্যবসা, পরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তনের বাহকই কেবল না; পাশাপাশি, এই স্টিমারই হয়ে উঠেছে স্থানান্তর–দেশত্যাগ–বিচ্ছিন্নতা–বেদনা অথবা প্রতিরোধ–লড়াইয়ের স্মারক। একটি বস্তুগত ঐতিহ্য হিসেবে স্টিমারগুলো বহুবিধ ও বহুমাত্রিক ইনট্যানজিবল ঐতিহ্যের সঙ্গে লিপ্ত থেকেছে। ঐতিহ্যের কোনো একক, একরৈখিক, স্থানিক–কালিক ভাবে অপরিবর্তনীয় বয়ান হতে পারে না। যখন হয় তখন সেই একক ও নির্দিষ্ট বয়ান নির্মাণ ও বাছাই করণের সঙ্গে বহুবিধ ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ও প্রভাবক কাজ করে।

    বরিশালের এই ভাসমান নৌকার বাজার দীর্ঘদিনের। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, গত ৫–৬ বছরে এই বাজার একটি অনন্য, বিস্ময়কর, রোমান্টিক, এক্সোটিক স্থানে রূপান্তরিত হয়েছে; যেন হঠাৎ করে নদীতে বা জলপথে বা জলাশয়ে এমন বাজার বা হাট বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে। নাগরিক পর্যটকদের কাছেও একটি দর্শনীয় স্থান ও যাপন দর্শন আর উপভোগের গন্তব্য হিসেবেও এই ভাসমান বাজার এখন আকর্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান ও যাপনকে নবায়িত রূপে পরিবেশন, বিপণন আর গঠন করা এখন আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনায় খুবই কার্যকর। বহুক্ষেত্রেই প্রণালীবদ্ধভাবে কোনো স্থানিক পরিসর আর কোনো মানবীয় যাপনকে বাজারজাতকরণ করা হয়। ডিজিটাল দৃশ্য–উৎপাদনের কারখানায় বিভিন্নভাবে পরিমার্জন ও আকর্ষণীয় করে উৎপাদিত এসব পর্যটন পণ্য বিপণনের জন্যই নাগরিক মানুষজনকে জনসংস্কৃতির নবায়িত রূপ পরিবেশন করে। অথচ কেবল এই ভাসমান বাজারই না, বাংলা অঞ্চলের নদী ও জলে বিভিন্ন ধরনের আচার ও বাণিজ্য পরিচালনা করার জন্য হাট–বাজার থাকার পরম্পরা দীর্ঘদিনের। আমাদের প্রচলিত অনুমান হল, জমি বা স্থলভাগেই কেবল হাট–বাজার, আবাদ, বসবাস করা সম্ভব। জল ও নদীপথ এসব কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কেবল যুক্ততা ও পরিবহনের জন্যই ব্যবহৃত হয়। জলভাগ ও স্থলভাগের এই দুইরকমের ধারণায়ন এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনে জল ও জমিনের বিচ্ছেদের ও ভেদাভোদের অনুপস্থিতিতে আমলে নেয় না। বহু পেশাজীবি মাসের পর মাস নদী বা জলে নৌকায় জীবনযাপন করেন। বহু পেশাজীবী বছরের শুকনো মৌসুমে হাওড়/বিল/জলাশয়ে পানি শুকিয়ে গেলে অভিবাসিত হয়ে আবাদ করেন। আবার অন্য ঋতুতে ওই জলাশয়ে জল আসলে অন্যত্র বসতি গড়েন। নদীগুলোর চরে বহু মানুষ বসতি গড়েন সাময়িক সময়ের জন্য। নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। আবার চর সরে গেলে অন্য কোনো চরে স্থানান্তরিত হন। বিভিন্ন ঋতুতেই বিশেষ বিশেষ পণ্য বেচাকেনার জন্য নদীতে বা জলাশয়েই বাজার বসে। এই অঞ্চলের জীবনযাপনে ও বসতির ধরনের এমন বৈচিত্র্যকে নতুন ঐতিহ্যবোধ গঠন করার প্রক্রিয়ায় সমরূপীকরণ করা হয়। এই ঐতিহ্যবোধ স্থলকেন্দ্রীক। জল ও নদী এখানে কেবলই পটভূমি বা মাধ্যম।

    নৌকাবাইচের মতন নদী ও নৌযান কেন্দ্রিক খেলাধুলা ও উদযাপন নতুন না। তবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন উপলক্ষে একই রঙের শাড়ি ও মাথায় বেগুনী রঙের টুপি পড়ে বরিশালের সন্ধ্যা নদীতে আয়োজিত নারীদের এই নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ঐতিহ্যের বাছাই ও পুনর্নবায়নের একটি উদাহরণ।

    ঢাকায় পবিত্র আশুরার তাজিয়া মিছিল আর কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাসের স্মরণ। দেহবিজড়িত সংবেদ আর ধর্মাচারের যৌথতার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের গঠনের ও পুনর্গঠনের উদাহরণ হিসেবে এই মিছিল ও মিছিলের বহুবিধ আচার ও সংবেদের অধ্যয়ন ও অনুভব করা যেতে পারে।

    ঢাকায় পবিত্র আশুরার স্মরণে নিয়মিত আয়োজিত কারবালাকে মনে রেখে নিয়মিত আয়োজিত সমাবেশ ও তাজিয়া মিছিলে এক নারীর বেদনা–বিষাদ–স্মৃতির অভিব্যক্তি। Photos: Nayem Ali/ TBS

    বঙ্গীয় বদ্বীপ অঞ্চলসহ দুনিয়ার বিভিন্নস্থানে পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানগণ আশুরাকে স্মরণ করে তাজিয়া মিছিল করেন। এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়েই জনসংস্কৃতি ও জনপরিসরে কারবালার বিশ্বাসঘাতকতা, মর্মান্তিক অমানবিকতা, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের স্মরণ করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে। বিষাদসিন্ধুর মতন কাব্য কিংবা ঢাকার মঞ্চে বিষাদসিন্ধু–র মতন অসাধারণ নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। জনসাংস্কৃতিক পরিসরেও মোহাররম বা আশুরা উপলক্ষে মিছিল, বিভিন্ন পারফরমেটিভ কর্মকাণ্ড আর শরীর–সংবেদনের বিজড়নে নিজে বেদনার্ত ও রক্তাক্ত হয়ে কারবালার বেদনা ও হত্যার স্মরণ করা হয়েছে। স্মরণের এই প্রকরণ ও ধরন একই রকম থাকে নাই। বরিশালে শৈশবে আমরা প্রতিবছর মোহাররমের এই মিছিল ও বেদনার্ততার পারফরমেন্স দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। সেই মিছিলে নির্দিষ্ট একটা ছন্দে ঢাকের বাজনার সঙ্গে লাঠিখেলা, আগুন নিয়ে খেলা, কৃত্রিম তলোয়ার নিয়ে অভিনয় আমরা ছোটোরা পরে নৈমিত্তিক যাপনে ও নিজেদের মধ্যে অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। আমরা সেই মিছিলে উচ্চারিত বেদনার্ত উচ্চারণ—‘হায় হাসান! হায় হোসেন!’ বলতে বলতে মিছিল করতাম। ওই বয়সে কতটা বেদনাবোধে তাড়িত হতাম জানি না; কিন্তু জনসংস্কৃতিতে বেদনা—স্বজন হারানোর অনুভূতি—অথবা নিজের শরীরকে বেদনার্ত ও রক্তাক্ত করে বেদনার্ততার অনুভবের সঙ্গে লিপ্ত হওয়ার, যুক্ত হওয়ার, কিংবা সমব্যথী হওয়ার যে–আচার আমাদের যাপনের অভ্যাস ও শরীরী সংবেদনের অংশ হয়ে গিয়েছিল সেই অনুভব ও উপলব্ধি আমাকে ভাবায়। সংবেদন–শরীর–বেদনার অনুভূতি কিভাবে ভাষা, শরীর, সংবেদনের ভেদ অতিক্রম করে যেতে পারে ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে! শরীরজ ও বয়ানগত ঐতিহ্যের ধারণা নিয়ে আলাপ করার ক্ষেত্রে আমরা ক্রমাগতভাবে অক্ষরবাদী ও বয়ানকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি। সংবেদন আর স্মৃতির যাপন ও পুনর্যাপন ভাষিক নৈমিত্তিকতার সীমানাকে কিভাবে ভেঙে ফেলে!

    বাংলাদেশে তো বটেই, বিশ্বব্যাপী ঐতিহ্য এবং হেরিটেজ নিয়ে আলাপ–জ্ঞান–সক্রিয়তা–তৎপরতার কেন্দ্রে রয়েছে আদিবাসীগণ অথবা ইনডিজিনাস কমিউনিটি হিসেবে চিহ্নিত জাতি ও জনগোষ্ঠীগুলো। ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রক্রিয়ার এই জাতিগুলোর অনেকেই বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্ত হওয়ার পথে। উদারনৈতিক এবং নয়া–উদারনৈতিক ব্যবস্থায় আর বিশ্বায়নের মহাবয়ানের কালে বিভিন্ন রাষ্ট্রে ও অঞ্চলে কট্টর ও উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থানের কারণে সবচেয়ে বিপদে থাকে প্রান্তিক—নিজস্ব জীবনযাপনে অভ্যস্ত—প্রতিবেশের সঙ্গে পরম্পরাগত বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে বিকশিত সংবেদনে যাপন করা এই জাতিগুলো। একদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রান্তরী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও জীবনযাপনের জ্ঞানকে টেকসই উন্নয়ন আর ইনডিজিনাস জ্ঞানের সংরক্ষণকে একভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। অন্যদিকে নয়া–উদারনৈতিক পুঁজিবাদী শাসনে আর বহুজাতিক সংস্থার অসীম মুনাফাকামী তৎপরতাও একইসঙ্গে চলমান থাকে। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী এই দশাগুলো অনেকসময় বুনিয়াদি কাঠামোর দিক থেকে সদৃশ চিন্তা, ধারণা ও লক্ষ্যের অংশীদার থাকে। এই প্রসঙ্গ ও বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা–প্রকাশনা–অ্যাকটিভিজম–প্রতিরোধ আন্দোলন–আইনী ও নীতিমালাগত বয়ানের পরিমান বিপুল। মজার কথা হল, যে কুশীলবগণ আদিবাসীদের যাপিত জীবনকে রক্ষা করার বিভিন্ন বয়ান জারি রাখে তারাই আবার সেই যাপিত জীবনের জন্য হুমকি ও বিপজ্জনক শর্ত ও প্রভাবকগুলোকে সঠিক বিবেচনা করে এবং তাকে প্রশ্ন করে না। এমন বিপুলবিস্তারী আর বহুবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত চিন্তা ও বয়ান নিয়ে আলাপ করার অবকাশ এখানে নাই। তবে বাংলাদেশে বিকশিত ও বিকাশমান, পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদী ও পরিচয়বাদী বয়ানগুলোতে এমন অদৃশ্যমান, ধারণাগত এবং অংশীদারিত্বমূলক ভাবনাচিন্তা ও জানাবোঝা জনপরিসরে আদিবাসী–সম্পর্কিত প্রবল ও সংঘাতে লিপ্ত বয়ানগুলোক মনোযোগের সঙ্গে পর্যালোচনা করলেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এখানে উদাহরণ হিসেবে যদি কেবল সাঁওতাল জাতির কয়েকটি প্রসঙ্গ বিবেচনায় নিই তাহলেও আন্তর্জাতিক উদারনৈতিক ঐতিহ্যের বয়ান আর রাষ্ট্র ও প্রবল জাতীয়তাবাদগুলো অনুমোদিত ‘আদিবাসী’/‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’/‘উপজাতি’/‘ট্রাইব’/‘ইনডিজিনাস কমিউনিটি’ সম্পর্কিত বয়ানগুলোর নানাবিধ স্ববিরোধীতা, ঐতিহ্যের উৎপাদন–বাছাইকরণ–পুনর্নবায়নের ধরন ও সমস্যাগুলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু আংশিকভাবে আলাপ করা যাবে। ধরা যাক, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকলের কারণে বাস্তুচ্যুত, ধারাবাহিক জাতিবাদী, সাম্প্রদায়িক ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার সাঁওতালদের ঐতিহ্যের রেপ্রিজেনটেশন আর পুনর্গঠনের বয়ানে ও সক্রিয়তাগুলো। একদিকে জাতীয়তাবাদী বয়ান অন্তর্ভুক্তি, সেকুলার চরিত্র, বহুত্ব ও সহনশীলতা আর আন্তর্জাতিক বয়ানের প্রতি আপাত আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য এই স্থানের সাঁওতালদের সহ বিভিন্ন অঞ্চলের সাঁওতালদের পারফরমেটিভ, ধর্মাচরণমূলক, এবং বিভিন্ন ঋতু, পরব, ফসল–কাটা, জলজমির সঙ্গে বিজড়িত বিভিন্ন উৎসব পালন করেন। সিলেকটিভলি রাষ্ট্র এসব উদযাপনকে তার উৎপাদিত বয়ানে অন্তর্ভুক্ত, পুনর্গঠন ও নবায়ন করে, প্রদর্শন করে। অন্যদিকে যেসকল বুনিয়াদি কারণে ও প্রক্রিয়ায় সাঁওতালদের বেঁচে থাকা, নিজেদের জমিতে ও ঘরে থাকা, আর ন্যূনতম মানবিক সত্তা নিয়ে অস্তিত্ব জারি রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে সেগুলোকে প্রশ্নাতীতভাবে এবং জাতিবাদী প্রবল চিন্তার মাধ্যমে অক্ষুণ্ন আর বজায় রাখে। উপরের ছবিটিতে গোবিন্দগঞ্জের সহিংসতার শিকার আর উদ্বাস্তু হয়ে–পড়া সাঁওতাল নারী ও পুরুষদের সোহরাই উৎসবে পারফরমেটিভ ঐতিহ্যের রেপ্রিজেনটেশন।

    উপরের গোছালো, পবিত্রায়নকরা/স্যানিটাইজড, প্রবল প্রদর্শনের শর্তমাফিক, বহুত্ব ও পর্যটনের দেখনদারির জন্য তোলা ছবি আর একই সোহরাই পালনের অন্য ধরনের সমষ্টিগত উদযাপনের চিত্র সাঁওতালদের ঐতিহ্যের দুই ধরনের বয়ানকে পরিবেশন করে। একটি চিত্র অনুমোদিত, কর্তৃত্বপরায়ণ ঐতিহ্যের বয়ানগুলোর স্বীকৃত, রাষ্ট্র ও প্রবল জাতীয়তাবাদের সহিষ্ণুতা, অনুর্ভুক্তি, বহুত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও সেকুলারাইজড। আর অন্যটি তুলনামূলকভাবে কম অনুমোদিত। এখানে একটা কথা মনে রাখা জরুরি। দীর্ঘ আধুনিকীকরণ, সভ্যকরণ, আর পবিত্রায়নের প্রক্রিয়ার কোনো বিশুদ্ধ, আদি ও প্রকৃত ঐতিহ্য নাই। পঞ্চদশ শতক পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সম্প্রসারণ আর সপ্তদশ শতকের পরবর্তীতে সমাজবিজ্ঞানের শাস্ত্রগুলো আর ঔপনিবেশিক জ্ঞানের পারস্পরিক জটিল সম্পর্কের ইতিহাস এখানে প্রাসঙ্গিক। সমাজবিজ্ঞানীরা ও নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন অঞ্চল, ভূখণ্ড খুঁজে বের করতেন এমন পূর্বানুমান থেকে যে, সেই মানুষজন আধুনিকতা, সভ্যতার সংস্পর্শ থেকে দুরে বিচ্ছিন্ন দশায় জীবনযাপন করছেন। এসব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি–সমাজ–জীবনের উপরে জাতিতাত্ত্বিক গবেষণা পরিচালনা করলে বিবর্তনের রূপরেখায় সভ্যতার আগের পর্যায়গুলো (যেমন আদিম, বর্বর ইত্যাদি) সম্পর্কে প্রত্যক্ষণলব্ধ ও নৈর্ব্যক্তিক জ্ঞান অর্জন ও বোঝাপড়া তৈরি হবে। সেসব সমাজ ও সংস্কৃতি কিভাবে ক্রিয়াশীল থাকে, তাদের রীতিনীতি, জ্ঞাতিসম্পর্ক, খাদ্যাভ্যাস, বৈবাহিক–ব্যবস্থা ইত্যাদি কেমন তা সম্পর্কে জানা যাবে। এই জ্ঞান ইউরোপীয় সভ্য ও উন্নত ‘আত্মসত্তা’র বিপরীতে সভ্যতার যাত্রায় অতিক্রম করে আসা পিছিয়ে–পড়া দশাগুলো সম্পর্কে জানতে ও তা নথিভুক্ত করতে ভূমিকা রাখবে। উনবিংশ শতক ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধের একটি বড় সময় ধরে এ–ধরনের এথনোগ্রাফিক গবেষণা আর সম্পর্কিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বিপুল পরিমানের জ্ঞান উৎপাদন করেছে। এসব প্রক্রিয়া নিয়ে পরবর্তীতে প্রচুর সমালোচনা ও আত্মসমালোচনামূলক গবেষণা হয়েছে। নৃবিজ্ঞান–প্রত্নতত্ত্ব–সমাজবিজ্ঞানের বুনিয়াদি এসব পূর্বানুমান, গবেষণালব্ধ জ্ঞান আর সেই জ্ঞানের ভিত্তি অনুকৃত সংস্কারমূলক এবং সভ্যকরণ প্রকল্প, সংশ্লিষ্ট শাসনের তরিকাগুলো নিয়ে পর্যালোচনা অনেক হয়েছে। কিন্তু এই জ্ঞান যেভাবে স্বাভাবিকীকৃতি হয়েছে, জাতিরাষ্ট্রের বুনিয়াদী ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং জনপরিসরে কাণ্ডজ্ঞান হিসেব শিকড় গেড়ে বসেছে, তাতে করে আমাদের দেশেও নৈমিত্তিক যাপনে, ভাষায় আর তৎপরতাগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে সভ্যতার অপর হিসেবে, আধুনিকতা থেকে দুরে–থাকা হিসেবে, এক্সোটিক হিসেবে, পর্যটনের ভোগ্য ভিন্ন ও ‘সরল’ ও ’সহজ’ জীবনের প্রমাণ হিসেবে, নাগরিক–যান্ত্রিক–ভোগবাদী জীবন থেকে মুক্তির গন্তব্য হিসেবে ‘উপজাতি’/‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’/‘ট্রাইব’দের জীবন, সমাজ ও উৎসবগুলো গঠিত হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্র ও প্রবল ক্ষমতাবান সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির মানুষজন এদের পরিচয় নিজেদের শর্ত অনুসারে উপস্থাপন করবে। নিজেদের মানদণ্ড অনুসারে গঠন ও প্রদর্শন করবে অন্তর্ভুক্তি, সেকুলার চরিত্র আর বহুত্বের পরিবেশনের জন্য। অন্যদিকে, এই প্রান্তিক জাতিগুলোকে তাদের নিজস্ব জীবন, জমি, উৎপাদন–ব্যবস্থা, এবং পরিচয় থেকে বঞ্চিত করবে। সাহেবগঞ্জ অথবা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এমন প্রক্রিয়া একটু মনোযোগ দিলেই নজরে পড়বে। আদিবাসী বা ট্রাইবাল বা উপজাতিদের ঐতিহ্য সেক্ষেত্রে প্রবল জাতীয়তাবাদ ও প্রবল নিপীড়ক–রাষ্ট্রের উদযাপনের উপলক্ষ্য যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ঐতিহ্য প্রবলের শর্ত মেনে পরিবেশিত ও গঠিত হয় ততক্ষণ। অন্যদিকে একথা ভাবার অবকাশ নাই নিজস্ব হিসেবে চিহ্নিতকরণে আর সেই ঐতিহ্যগুলোর পরিবেশনে প্রান্তিক ও অধীনস্থ জাতি ও সম্প্রদায়গুলো সার্বভৌম ও স্বয়ংশাসিত সত্তা ধারণ করে। অসম ক্ষমতার সম্পর্ক আর শাসনের প্রক্রিয়া এমনই যে, শাসিত ও অধীনস্থ শাসিতের ও প্রবলের বয়ানকেই গ্রহণ করে, সেই বয়ানমাফিক নিজসত্তাকে গঠন করে, নিজেদের ঐতিহ্যকে পুনর্গঠিত ও পুনর্নবায়িত করে। প্রবল ও প্রান্তিকের সম্পর্ক যেমন প্রবলের বিরুদ্ধে প্রান্তিকের, আধিপত্যবাদী বয়ানের বিরুদ্ধ বয়ান নির্মাণের, শাসন–নিয়ন্ত্রণ–সহিংসতার বিরুদ্ধে সক্রিয়তার তেমনই প্রবলের সঙ্গে আপসরফারও। প্রবলের বয়ান আর আধিপত্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অনেকক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী বয়ান ও ভাষা আত্মসাৎ করে ও স্বীকার করে নিয়েও পরিচালিত হতে পারে। পাশাপাশি, শাসনের ও অনুশাসনের আর জাতিরাষ্ট্রের প্রবল ক্ষমতা যখন মনস্তাত্ত্বিক ও নৈমিত্তিক যাপনে হতক্ষেপ করে, সেই হস্তক্ষেপে দৃশ্যমান সহিংসতা ও নিপীড়নের মাধ্যমেই যে ঘটতে থাকে তা তো না; হোজিমোনিক ক্ষমতা আর ভাষা–সংবেদের প্রণালীবদ্ধ পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক জাতি ও জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করা যায়। প্রবল ও আধিপত্যশীল ঐতিহ্যের বয়ান ও পারফরমেটিভ তৎপরতা গ্রহণ করতে প্রান্তিকগণ চৈতন্যগতভাবে বাধ্য হতে পারেন। আইনি ও বিধি–বিধানগত পরিসরে এই বাধ্যতা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত, দেশপ্রেমী, এবং দায়িত্বশীল নাগরিকের অবশ্যপালনীয় আর অবশ্য অনুকরণীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রান্তিক যখন প্রবল হয়ে ওঠার বাসনা ও হক দাবি করতে থাকে তখন প্রান্তিকদের মধ্যে নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কিত ধারণাগুলো ও অনুশীলনগুলো প্রবলকে অনুকরণ করতে থাকতে পারে। এই গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়া সরল কার্যকারণ সুত্র মেনে চলে না। এমন বহু উদাহরণ দেয়া যাবে যেখানে প্রান্তিক ও নিপীড়িত প্রবল হয়ে উঠলে নিপীড়ক আর আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে। আবার এমন উদাহরণও দেয়া যাবে যে প্রান্তিকের মধ্যকার বহুত্ব আর প্রবলের মধ্যকার বহুত্বের মধ্যে ক্ষমতা, বিধি–বিধান, ভাষা ও অভিব্যক্তির বৈচিত্র্য সমরূপীকৃত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠার বাধ্যতার ফলে একে–অপরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে। ঐতিহ্যের উদযাপন ও পুনর্গঠনকে প্রান্তিকগণ আকাঙ্ক্ষা করেন। তাদের চৈতন্যে প্রবলের ঠিক–করে–দেয়া ঐতিহ্যের বয়ান ও উদযাপন স্বাভাবিক বলে মনে হতে থাকে।

    ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের বিদ্রোহ ও প্রতিরোধের যে–ইতিহাস আছে সেই ইতিহাস পরবর্তীকালে সাঁওতালদের আত্মপরিচয় নির্মাণে ও পরিবেশনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ প্রবল জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে সাঁওতালদের স্থানিক ও কালিকভাবে ভিন্ন অভিলাষ ও ভিন্নধরনের নিপীড়নের ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইকে প্রবল জাতিয়তাবাদী বয়ানে আত্মসাৎ করার উদাহরণও অনেক। এখন প্রতিরোধের এই ঐতিহ্যকে চলমান আধিপত্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বয়ান নির্মাণে যেমন ব্যবহার করা যায় তেমনই জাতীয়তাবাদী বয়ানের বৈধতা নির্মাণের ক্ষেত্রেও আত্মসাৎ করা যায়। আবার প্রবলের ভাষা ও অভিব্যক্তি বাছাই করে গ্রহণ ও বর্জন করে প্রবলে সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করার চিহ্ন ও বয়ান তৈরি করা যায়। উপরের চিত্রটি জাতীয়তাবাদী ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ান ও তৎপরতাকে রেপ্রিজেন্ট করে যেখানে সাঁওতাল বিদ্রোহের উপলক্ষ্যকে বেছে নেয়া হয়েছে। অবার এই মিছিলে ব্যবহৃত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডের ভাষা কিন্তু বাংলা। সাঁওতালি না। সাঁওতাল বিদ্রোহের ঐতিহ্যের স্মরণ ও বর্তমানের প্রতিরোধের সক্রিয়তায় সেই ঐতিহ্যের চিহ্ন (যেমন তীর–ধনুক) বহন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমই রাষ্ট্র–অনুমোদিত বিধিবিধান মেনেই এই ইতিহাস ঐতিহ্য হিসেবে পরিবেশিত হচ্ছে।

    গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাস্তুচ্যুত খ্রিস্ট–ধর্মাবলম্বী সাঁওতালগণ বিষাদ–বাস্তচ্যুতির উন্মুল দশা–নিপীড়নের দশার মধ্যে বড়দিন পালন করছেন শোক–সমাবেশ করে। প্রবল ঐতিহ্যে সাধারণত এই প্রতিবাদ–সমাবেশকে আড়াল করা হবে, যদিও আবার প্রবলের স্বীকৃত ঐতিহ্যের বয়ানে সাঁওতালদের আধিপত্য ও উপনিবেশ–বিরোধী প্রতিরোধের ইতিহাসকে একইসঙ্গে উদযাপনও করা হবে।

    কমিউনিটি–বেসড ট্যুরিজম নামে ব্রাকের একটি প্রকল্পে সাঁওতালদের পর্যটনের উপযুক্তকরণ করা। এই ধরনের উদ্যোগকে সাঁওতালদের ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইনডিজিনাস কমিউনিটির প্রদর্শনে সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাঁওতালদের ক্ষমতায়ন কতটুকু হচ্ছে কি হচ্ছে–না সেটা বাস্তব তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে জানা যেতেই পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানেই আদিবাসী সম্প্রদায়দের পর্যটনের বিষয়বস্তু হিসেবে পন্যায়ন এবং বিপনন করার তৎপরতা নতুন না। পর্যটনের বিষয়বস্তু হওয়ার উপযুক্ত হিসেবে সাঁওতালদের বিভিন্ন ঐতিহ্যের পরিবেশন–পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে একটি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন আচার ও উৎসবকে, জীবনযাপনকে এবং পারফরমেটিভ পরম্পরাকে কমোডিফিকেশন বা পণ্যায়ন করার একটি উদাহরণ হিসেবে এই প্রকল্পকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। বহুত্ববাদী ঐতিহ্যধারী বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকীকৃত আদিবাসীসত্তার উদযাপনের সিলেকটিভ নির্মাণের মাধ্যমে সাঁওতালদের ঐতিহ্যগত বৈচিত্র্য সমরূপীকরণ করা যেমন এই ধরনের তৎপরতায় অনিবার্য হয়ে ওঠে তেমনই নয়া–উদারনৈতিক ব্যবস্থায় পণ্যায়ন ও ক্ষমতায়নকে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে উপস্থাপন করার মহাবয়ানও এখানে শনাক্ত করা সম্ভব। দরিদ্র ও প্রান্তিক একটি জাতির সিলেকটিভ ঐতিহ্য উদযাপন একদিকে বিলুপ্তির হুমকির মুখে থাকা হিসেবে চিহ্নিত ইনডিজিনাস জীবনযাপনের সুরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য দরকারি হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে সাঁওতালদের দারিদ্র্য ও প্রক্রিয়াগতভাবে বাস্তুচ্যুতি ও যাপিত জীবন থেকে ক্রমাগত উদ্বাস্তুকরণের প্রবল তৎপরতার মধ্যে আর্থিকভাবে উপকার করতে পারে। সাঁওতালদের সত্তা ও অস্তিত্বকে বৃহত্তর বৈশ্বিক বাজারে প্রমোট করতে পারে। বাছাই করে সুরক্ষা ও সংরক্ষণও করতে পারে। আমরা অন্য একটা উদাহরণও দিতে পারি। বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদিবাসী জাতিদের প্রণালীবদ্ধভাবে গণহত্যা, জমি দখল, বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়ে মোটামুটিভাবে অস্তিত্বহীন করে তোলা হয়েছে। কিন্তু সেই সহিংসতার ইতিহাস ধামাচাপা পড়ে ওই আদিবাসী জাতিগুলোর বিভিন্ন নিদর্শন ও জীবনযাপনকে বিভিন্ন জাদুঘরে বা প্রদর্শনীতে পরিবেশন করার মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী, বহুসাংস্কৃতিক ও সহিষ্ণুতার ইতিহাসের উদযাপনে জাতীয় পরিচয় নির্মাণে তৎপরতায় নিপীড়িত আদিবাসীদেরই প্রদর্শন, পণ্যায়ন ও জ্ঞান–অর্জনের বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে যারা কলম্বাসের দখল–উত্তর আমেরিকা নামে চিহ্নিত ভূখণ্ডে সাদা ও ইউরোপীয় মানুষজনের নিপীড়নের ইতিহাস আর কালো মানুষদের দাস হিসেবে নির্যাতন ও নিপীড়নের ইতিহাসকে বর্তমানে মার্কিনী আধিপত্যবাদ আর গণহত্যার ইতিহাস স্মরণে রাখতে চান, বিভিন্ন প্রতিরোধ ও বর্ণবাদ–বিরোধী আন্দোলনে সেই ইতিহাসের ধামাচাপা দেয়া বয়ানগুলো প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চান তারাও আদিবাসীদের ঐতিহ্যকে উপস্থাপন ও পরিবেশন করেন ভিন্ন পরিসরে ও ভিন্ন ধরনে। এখানে ঐতিহ্যের পুনর্গঠন ও পুনর্নবায়ন যেমন আধিপত্য ও নিপীড়নের ভাষ্য তৈরি করার, বৈধতা দেয়ার বা ভুলিয়ে দেয়ার তৎপরতায় ব্যবহৃত হয়, তেমনই এই ভুলিয়ে দেয়া, আড়াল করা, আর সমসাময়িক সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়ার বয়ানের প্রতিবয়ান নির্মাণের জন্যও ব্যবহার করা হয়। সাঁওতাল জাতি এবং অন্যান্য আদিবাসী জাতিগুলোর ঐতিহ্য নিয়ে আলাপচারিতায় উপরের প্রসঙ্গটি মনে রাখা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

    শান্তিনিকেতন ও সাঁওতাল জাতির মিথস্ক্রিয়া নিয়ে আলাপ খুবই প্রাসঙ্গিক হতে পারে। বিশদ আলাপের অবকাশ না থাকলেও শান্তিনিকেতনকে বাঙালি জাতিয়তাবাদ ও বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম আকর হিসেবে বিশ্ব–ঐতিহ্যের স্বীকৃতির পরে শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের বয়ানে সাঁওতালগণ কিভাবে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশিত, উদযাপিত হয়েছেন সেই আলাপ খুব একটা চোখে পড়ে না। একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে শান্তিনিকেতনের সাম্প্রতিক বিকাশ এবং শান্তিনিকেতনেরই বিভিন্ন ঐতিহ্যের (যেমন: পৌষমেলা) রূপান্তর, পুনর্নবায়ন আর বাঙালি নাগরিক ভদ্রবিত্ত ও বিদেশি পর্যটকদের উপযোগী করে এসব ঐতিহ্যের বাছাইকৃত পুনর্নবায়ন ও পরিবেশন দারুণ পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে। আধুনিক, সভ্যকরণ প্রকল্পের বয়ানের সঙ্গে শান্তিনিকেতন–অনুরাগী বাঙালি মধ্যবিত্তের ‘শিকড় অনুসন্ধান’ আর বৈচিত্র্যের উদযাপনের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত, আত্মসন্ধানী এবং নাগরিক যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তিকামী বাসনা এই ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যের বয়ানকে শক্তিশালী করেছে। ঔপনিবেশিক আর আধুনিকায়ন প্রকল্পে আদিবাসী ও সভ্যতার স্পর্শ থেকে মুক্ত পিছিয়ে–পড়া জনগোষ্ঠীগুলো নিয়ে আলোকায়ন ও শিল্পবিপ্লব পরবর্তী ইউরোপে যে–রোমান্টিক প্রাচ্যবাদী সংবেদন ও বয়ানের বিকাশ ঘটেছিল তার পুনর্পরিবেশনের একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ সিনেমাটির পাটাতন হিসেবে পরিবেশন করা সভ্যতা/যান্ত্রিকতা/যুক্তিশীলতা/জটিলতাময়/ভোগবাদী জীবন ও সত্তা বনাম সরল/অযান্ত্রিক/মাটির–কাছাকাছি জীবনযাপন করা সমষ্টির বয়ান। প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করা দরকার যে এই বয়ান পশ্চিমা সভ্যকরণ ও আধুনিকীকরণে প্রকল্পের বহুমাত্রিক বয়ানের সঙ্গে সম্পর্কিত। রুশোর ‘নোবেল স্যাভেজের’ ধারণার পুনর্বয়ান। শিল্প–বিপ্লবোত্তর ইউরোপে একদিকে প্রগতি, উন্নয়ন আর বিবর্তনের অনিবার্যতা সেই সময়ের পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রভাবিত করেছিল এবং সেই অনুসারে বিভিন্ন পরিকল্পনা–সংস্কার–পরিবর্তনকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল। অন্যদিকে শিল্পবিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তনগুলো ইউরোপীয় সমাজ–রীতি–অভ্যাস–অর্থনৈতিক পরিসরে যে বিরাট বদল নিয়ে এসেছিল তা বহু চিন্তককেই আধুনিকতা ও উন্নয়নের পরিনতি নিয়ে উভয় সঙ্কটে ফেলেছিল। উন্নয়নকামী আর প্রগতিকামী অনেক দ্বিধান্বিত চিন্তকের মধ্যেই অ–ইউরোপীয় বা বাদবাকি দুনিয়ায় আদিম/সরল/পিছিয়ে পড়া/আবেগ পরিচালিত সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি রোমান্টিক ও মুক্তিদায়ী বাসনা তৈরি করেছিল। সভ্যকরণ ও ঔপনিবেশিক আধুনিকীকরণের সহিংসতা ও বিধ্বংসী বাস্তবতা এই বাসনায় আড়ালে পড়েছে। বরং সহিংসতা ও নিপীড়নের তৎপরতা আর বাদবাকি দুনিয়ার বিধ্বংসী পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন অনুচ্চারিত রেখেছে। বাদবাকি দুনিয়ার সমাজ ও মানুষের জন্য সভ্য ও আধুনিক হয়ে ওঠা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াগুলোকে সমালোচনা না করে এই বাসনা আদিম হিসেবে সংজ্ঞায়িত, সরল হিসেবে নির্মিত সমাজের মধ্যে নিজেদের বা আত্মসত্তার মুক্তির কল্পনা করেছে। শান্তিনিকেতনে ইতিহাস সাঁওতালদের বড় অংশীদারিত্ব আছে। শান্তিনিকেতনের যে প্রবল পরিচয় ও সত্তা বাঙালি রুচিশীল, মধ্যবিত্তের মধ্যে নির্মিত হয়েছে সেই সত্তার নির্মাণে নিসর্গের কাছাকাছি যাপন করা, সরল আনন্দে বিচরণ করা সাঁওতালদের বিজড়ন স্পষ্টতই ছিল। রামকিংকর বেইজের তৈরি করা সাঁওতালদের ভাস্কর্যগুলো শান্তিনিকেতনের যান্ত্রিকতা, শহুরে জটিল ও প্রতিযোগিতামুখী, বাণিজ্যিক আর প্রতারণাময় সত্তার বিপরীতে দাঁড়ায়। কিন্তু রামকিংকরের ভাস্কর্য যে শান্তিনিকেতনকে রেপ্রিজেন্ট করে সেই শান্তিনিকেতন ক্রমান্বয়ে নাগরিক মধ্যবিত্তের পর্যটনকেন্দ্র আর রোমান্টিক মুক্তির বাসনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। ঐতিহ্যের উদযাপন হিসেবে শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা পুনর্গঠিত ও পুনর্ব্যবস্থায়িত করা হয়েছিল। এই পৌষমেলা ক্রমান্বয়ে কলিকাতা ও শহুরে মধ্যবিত্ত বাঙালির পাশাপাশি নাগরিক পরিসরের বাইরের মানুষজনের এবং অবাঙালিদের কাছেও বিনোদনের পরিসরে রূপান্তরিত হয়েছে। অথেনটিক ও নির্ভেজাল বাঙালিত্বের বা ভিন্ন সংস্কৃতির উপভোগের কেন্দ্র হিসেবে গঠিত হয়েছে। এক বিচিত্র মিশ্রণের মধ্য দিয়ে আনন্দ ও বিনোদন বেচাকেনার পরিসরে রূপান্তরিত হয়েছে। হালের আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মরতিবাদী সত্তার গঠনের প্রসঙ্গ মনে রেখেই পৌষমেলার ঐতিহ্য হিসেবে গঠন, পুনর্গঠন ও নবায়নকে পর্যালোচনা করা যায়। সাঁওতালদের ব্যবস্থায়িত নাচগান ছাড়া পৌষমেলার অথেনটিক বাঙালিত্ব ও আন্তর্জাতিকতা একই সঙ্গে ভোগ করা/কনজিউম করা সম্ভব না।

    ‘হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য‘ – এমন বয়ান আমাদের ভীষণ পরিচিত। কিন্তু ধারণাগতভাবেই আধুনিক জ্ঞানে ঐতিহ্যের ধারণা হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর যা যা হারিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তা তা বাঁচিয়ে রাখা, সংরক্ষণ করার বাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত। হারিয়ে যাওয়া বা লুপ্ত হয়ে যাওয়া বা বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার এই উদ্বেগ, ভয়, বেদনা নৈমিত্তিক যাপনের সঙ্গে লিপ্ত অনুভব। প্রাক–আধুনিক কালে বিভিন্ন বস্তু বা স্মৃতি বা বয়ানকে সংরক্ষণ করে রাখার তৎপরতা জারি ছিল। জনপরিসরের বিভিন্ন স্তরে যেমন, তেমনই শাসক ও শাসনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নভাবে সম্পর্কিত কুশীলবদেরও। কোনো লেখা, লিপি, বয়ান অনুকৃতি তৈরির মাধ্যমে টিকিয়ে রাখা, স্থাপত্য তৈরির মাধ্যমে নিজেকে অবিস্মরণীয় করে রাখা, মৃতদের স্মরণের জন্য স্থাপনা ও চিহ্ন নির্মাণ আর সংরক্ষণ করার ঐতিহ্য বিভিন্নভাবেই প্রাগৈতিহাসিক সময়কাল থেকে প্রাক–আধুনিক সময় অবধি লক্ষণীয়; ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোতে স্মরণ–স্মারক–সমাধি–চিহ্নাবলি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এই গুরুত্বে প্রকৃতি, ধরন এবং ব্যাখ্যাও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আধুনিকতা যেভাবে ঐতিহ্যের ধারণাকে মানবীয় সত্তা ও দশার উৎকৃষ্টতা ও নিকৃষ্টতার সঙ্গে, পুঁজি আর ক্ষমতার সঙ্গে, এবং যাপিত জীবনের বিভিন্ন দশার সঙ্গে যুক্ত বা বিযুক্ত করেছে তেমনটা প্রাক–আধুনিক সময়ে ছিল না। প্রাক–আধুনিক কালের বা অতীতের কোনো কিছু ঐতিহ্য হিসেবে নির্বাচন করা (বা খারিজ করা) আর বিভিন্ন বিধি–বিধান ও আইনকানুনের মাধ্যমে কতগুলো বিশ্বজনীন, সমসত্ত্ব আর সর্বজনীন মানদণ্ড তৈরি করার কাজও আধুনিকতার প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত। আধুনিকতা যে মানুষের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি গঠিত করেছে সেখানে মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম শর্তই হল সেসব মানদণ্ড অনুসারে ঐতিহ্য নির্বাচন, সংজ্ঞায়ন ও সংরক্ষণ করা। ইউনেস্কোর মতন রাষ্ট্রান্তরী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কনভেনশন ও নীতির মাধ্যমে বিশ্বজনীন ঐতিহ্যের স্বীকৃতি, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের রূপারেখা তৈরি করে দিয়েছে। সেখানে মৌলিকত্ব/অরিজিনালিটি আর প্রামাণ্যতা/অথেনটিসিটি যেভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, ট্যানজিবল আর ইনট্যানজিবল নামে যে বর্গ–বিভাজন করা হয়েছে তাতে পৃথিবী বিভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিতে বস্তু বা অবস্তুগত অতীত বিষয় ও রীতি, আচার, অভ্যাস, ধর্মাচারে বহুত্ব ও বৈচিত্র্য অনেকক্ষেত্রেই অস্বীকৃত হয়। এসব মানদণ্ড, ঐতিহ্য হিসেবে মনোনয়ন ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বৈষম্য, রাজনীতি আর জটিলতা নিয়ে বহু পর্যালোচনা রয়েছে। এভাবেই কোনো কোনো ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত রীতি, ব্যবহার ও অভ্যাস ঐতিহ্য হিসেবে মূলধারার অফিশিয়াল পরিসরে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রূপান্তরিত হতে থাকে। স্বীকৃত ও আধিপত্যশীল ঐতিহ্যের বয়ানগুলো বিভিন্ন বিধি–বিধান, মানদণ্ড, নীতিমালা অনুসারে গঠিত হয়। অর্থাৎ অন্যভাবে বললে ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ও সংরক্ষণ–পুনরানয়নে বিধিবিধানগুলো তৈরি হয়ে ওঠারও নানান ঐতিহ্য রয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যায়তনিক, প্রাতিষ্ঠানিক, রাষ্ট্রীয়, নৈরাষ্ট্রীয়, মতাদর্শিক বয়ান ও চর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্য পরিমাপের ও স্বীকৃতি দেয়ার রীতি তৈরি হয়েছে। সেখান অসমতা ও বৈষম্য আবশ্যিকভাবেই উপস্থিত থাকে। আবার স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের মানদণ্ডগুলো ও বয়ানগুলোও কোনো না কোনোভাবে বৈশ্বিক পরিসরে সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। ‘লোকঐতিহ্য’ হিসেবে কোনো কিছুকে চিহ্নিত করার আর সেগুলো সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্ত করার প্রক্রিয়া ও বয়ানও বাছাইকরণের মধ্য দিয়ে যায়। লোক বা ফোক হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ হল লোক বা ফোক বর্গ তৈরি করা, বিভিন্ন বিষয়বস্তু ও রীতি, পারফরমেন্স, বয়ানকে ওই বর্গে অন্তর্ভুক্ত করা (অথবা ওই বর্গের বাইরে ফেলা)। এই বর্গীকরণে প্রধানত আধিপত্যশীল শ্রেণি, চিন্তা আর দাপুটে পরিচয়বাদী বয়ান ও চৈতন্য ভূমিকা রাখে। নাগরিক ভদ্রবিত্ত উনবিংশ শতকের জাতীয়তাবাদের উত্থানে প্রক্রিয়ার মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের বস্তুগত ও অবস্তুগত/অপরিমেয় বিষয়কে খুঁজে খুঁজে বের করে সংগ্রহ, সঙ্কলন ও কিতাব হিসেবে প্রকাশ করার প্রকল্প শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ার অবশ্যই গুরুত্ব ছিল এবং আছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মধ্যের অসমতা ও স্বীকৃতি জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে ফোক বা লোক হিসেবে বেছে ও পরিমার্জন করে নেয়া, গ্রহণ ও বর্জনের ইতিহাস রয়েছে। লোক–ঐতিহ্য বিষয়ক আধুনিক শাস্ত্রীয় জ্ঞানচর্চা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিকাশও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। নৈমিত্তিক যাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু কিছুই মধ্যবিত্তের ও রাষ্ট্রীয় ফোক–চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। সেগুলোকে পরিমার্জিত করে ভদ্রবিত্তের রুচি, দাপুটে নৈতিকতা আর প্রদর্শন রীতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হয়। মাটির চুলা ও চুলার রান্না একদিকে পরিত্যক্ত হয়, দূষণের কারণ হিসেবে শনাক্তকৃত হয়। অন্যদিকে বাংলা অঞ্চলের ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পায়। এই ঐতিহ্য যেমন হারিয়ে যায় নাই তেমনই মাটির চুলার রান্নাবান্না ঐতিহ্য স্মরণ করতে গিয়ে আমরা এই রান্নায় নারীদের কষ্ট ও পরিশ্রম, জ্বালানীর নতুন ব্যবস্থাপনা, দৈনন্দিন খাদ্যাভাস আর স্বাদের দুনিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি আমরা আলাপে আনি না। হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দুনিয়ায় মাটির চুলায় রান্না করা বিভিন্ন পদ, সেসব পদের পরিবেশন ও ভোজনের কনটেন্ট ভীষণ জনপ্রিয় ও বিপণনযোগ্য পণ্য হয়ে উঠেছে। নিচে নৈমিত্তিক জীবনের অংশ, যাপিত জীবনের বিজড়িত আরও কিছু বিষয়বস্তুর আলোকচিত্র দিলাম। এগুলো ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত অফিশিয়াল ও আধিপত্যশীল বয়ানে খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

    ‘বাউল গান’ নামে একটি বর্গ তৈরি করার মাধ্যমে নাগরিক ভদ্রবিত্তের পরিসরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন ধরনের গীতরঙ্গকে বিপণন ও পরিবেশনের উপযোগী করা হয়েছে। উপরের ছবিটি শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার। পর্যটক ও নাগরিক সংস্কৃতিপ্রেমী ও ‘শিকড়ের সন্ধানের বাসনাতাড়িত’ মানুষের কাছে পরিবেশনের উপযুক্ত করে পোশাক, পারফরমেন্স এবং শরীরজ অভিব্যক্তি গঠিত হয়েছে।

    টাঙ্গাইলের সখীপুরে একটি আসলে বিভিন্ন গীতরঙ্গের পরিবেশনা। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার বাউলগান আর টাঙ্গাইলের সখীপুরের গ্রামের আসরের গানের মধ্যকার ফারাকগুলো অনুভব করার চেষ্টা করলেই পরিপ্রেক্ষিত, বাণিজ্য, আর ‘ফোকের’ সম্পর্ক বোঝা সম্ভব হবে। ঢাকায় আয়োজিত ফোক ফেস্টের ভিডিও আর বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় এজমালি আয়োজনে গানের আসরের ভিডিও দেখলে ঐতিহ্য হিসেবে নির্দিষ্ট ও সমরূপ গীতরঙ্গ ও পারফরমেন্সের গঠন কোন প্রক্রিয়ায় ঘটে তার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।

    যে চুলার রান্না ও কলা পাতায় খাওয়া নাগরিক পরিসরে এবং গ্রামের বা মফস্বলের পরিসরেও বিভিন্ন কারণে ক্রমশ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেই রান্না ও খাওয়ার প্রক্রিয়া এখন ইউটিউবের জনপ্রিয় ভোগ্য কনটেন্ট হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে এক্সোটিক, রোমান্টিক, নিসর্গঘনিষ্ট, অরগানিক, মাটির কাছাকাছি পৌছানোর বাসনাতাড়িত নেটিজেনদের কাছে। অথচ এগুলো এখনও সাধারণ ও তুচ্ছতার নৈমিত্তিক জীবনযাপনের অংশ। নিচের ছবিগুলোতে এমনই নৈমিত্তিক যাপিত জীবনের কিছু ধরনের উপস্থাপন আছে। এই সাধারণ ও তুচ্ছতার জীবন ঐতিহ্য হিসেবে গৃহিত ও স্বীকৃত হবে কি হবে না সেটা আধিপত্যশীল ঐতিহ্যের বয়ান তৈরির প্রক্রিয়ার উপরে নির্ভর করে।

    খই ভাজা।

    রাস্তার পাশে টং দোকানের আড্ডাবাজি।

    চা বানানোর শিল্পকলা।

    সাধারণ চায়ের দোকান। সমবেত হওয়ার ও আড্ডা দেয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিসর।

    নাগরিক মলের বা প্যাকেটজাত পণ্য হিসেবে মাছ বিপণন না। মাছের বাজার। বাংলা ভাষায় মাছের বাজার শব্দটি বিবিধ অর্থ বহন করে। মাছের বাজার মানেই সম্মিলন, দরদাম, শোরগোল, আড্ডা, গন্ধ, সংলগ্ন চায়ের দোকান, স্পর্শ ও স্বাদের নানাবিধ যুক্ততা।

    চায়ের দোকান, রঙিন টেলিভিশন, সমাবেশ বারোয়ারি দর্শন, আড্ডা ও তর্ক। বন্ধুত্ব, সখাত্ব, আর ভাব–বিনিময়ের সংবেদনের গঠন। ঐতিহ্য হিসেবে ঠিক বনেদি ও অভিজাত ঘরানার সঙ্গে মানানসই না। কিন্তু যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    নদীপথের একটি স্টেশনের ছোট পন্টুন। নদীপথের যোগাযোগ–ব্যবস্থা, লঞ্চ আর মানুষের যাতায়াতের চেহারা ও ধরন ক্রমাগত বদলে যায়। লঞ্চঘাট মানে যাপিত জীবনের চলমানতা, মিলিত হওয়া বা ছেড়ে যাওয়া। জলপ্রবাহ, স্মৃতির প্রবাহ, চলমানতা, অস্থায়ীত্ব, ঘরে ফেরা বা ঘর ছাড়া। বঙ্গীয় বদ্বীপে ঔপনিবেশিক আমল ও পরবর্তীকালে নৌ–যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে রূপান্তর ঘটেছে তা এখানকার নদী–পানি–জীবনের মিথস্ক্রিয়ার ঐতিহ্যকে পুনর্গঠিত করেছে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। লঞ্চ, ইঞ্জিনচালিত নৌযান, পন্টুন থেকে শুরু করে ফেরি ও যুক্ততার ধরনের বদলের ফলে অনুভব–অভিব্যক্তি–ভাষায় যেমন প্রভাব পড়েছে, তেমনই প্রভাব পড়েছে নদীলিপ্ত জীবনযাপনে। আবার ক্রমাগত নদীগুলোর বদল, উন্নয়ন ও অগ্রগতির আধুনিক প্রকল্পের প্রভাবে আর স্থলপথে যোগাযোগের দাপটে নদীগুলো মানবীয় শাসন–নিয়ন্ত্রণ–দখলের পরিসরে পরিণত হয়েছে। বহু পুরানো নদীপাড়ের ঘাট পরিত্যক্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নাগরিক মধ্যবিত্তর বয়ানে এবং জাতীয়–আন্তর্জাতিক হালে জনপ্রিয় পরিবেশবাদী ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বয়ানগুলোতে নদী–জল–যাপনের লিপ্তির ঐতিহ্যের পরিবর্তে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক নদী–জলের প্রসঙ্গ ও ইস্যুগুলোই ঐতিহ্য হিসেবে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে।

    হাট আসলে অফিশিয়াল ঐতিহ্যের কোনো বয়ানেই স্বীকৃত কোনো পরিসর না। অথচ এই বদ্বীপ অঞ্চল এবং উপমহাদেশে কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থানীয় বা আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং নগরের বাইরের পরিসরে জনজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত একটি পরিসর হিসেবে হাটের উল্লেখ বহু আগে থেকেই বিভিন্ন লিখিত উৎসে উল্লিখিত হয়েছে। হট্টিকা বা মান্ডবিক বা হট্ট নামে অথবা কখনও কখনও কসবা নামে উল্লিখিত বসতি ও স্থানীয় বাণিজ্যের পরিসর হিসেবে সাপ্তাহিক বা নির্দিষ্ট দিন ভিত্তিক এই ব্যবসা কেন্দ্রগুলো নদীর ব্যবস্থার শাখা–প্রশাখার মতনই এই অঞ্চলের অর্থনীতি–রাজনীতি–রাজস্বআদায়–ক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঐতিহ্যের গৌরবময় আখ্যানে কিংবা ‘শিকড়ের সন্ধানের বাসনা’র আকুতিতে বহির্বাণিজ্য, সুনির্দিষ্ট বাছাই–করা পণ্য (যেমন: রেশম বস্ত্র, মূল্যবান ধাতু, মূল্যবান পাত্র, অভিনব বিদেশি পণ্যকেন্দ্রিক) বর্হিবাণিজ্য বা সামুদ্রিক বাণিজ্যকে যতটা প্রবলভাবে উদযাপন করা হয়, হাট বা বাজারের মতন নৈমিত্তিক ও বিশেষ বিশেষ সাধারণ (এবং তাই, জাতীয়তাবাদী গৌরবের বয়ানে গুরুত্বহীন ও তুচ্ছ) পণ্য, কারিগরি পণ্য, শস্যসহ বিচিত্র দ্রব্যাদির বিনিময় ও বাণিজ্যে স্থানীয়, অভ্যন্তরীণ এবং সর্বজনীন পরিসর হিসেবে হাট নিয়ে আলাপচারিতা আমাদের ঐতিহ্যের আলাপে অনুপস্থিতও বটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোক বা ফোক বা বাছাই করা কোনো দ্রব্যের বা শিল্প হিসেবে চিহ্নিত পণ্যকে জাতীয়তাবাদী গৌরবের ও অর্জনের উপযুক্ত বিবেচনা করলে হাটের উল্লেখ হতে পারে। কিন্তু ধান, পাট, পান, সুপারি, কাঠ, গুড়, চুন, গোলপাতা বা খড়, মাছ, সবজি, নৌকা, পেয়ারা, আম, পোষা প্রাণী, ধাতুর দৈনন্দিন জিনিসপত্র, মাটির বাসন–কোসন ইত্যাদি বেচাবিক্রির স্থানীয় ও জটিল নেটওয়ার্কে সম্পর্কিত পরিসর হিসেবে হাট যাপিত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নয়া–উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থায় এখনো হাট আমাদের দেশের ব্যবসা–বাণিজ্যের পাটাতন হিসেবে কাজ করছে। নয়া–উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্থানীয় ও এলাকাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পণ্য নির্ভর বানিজ্যিক পরিসর ও নেটওয়ার্কের টিকে থাকা কঠিন হলেও বিভিন্নভাবে হাটগুলোর স্তরভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা কোথাও কোথাও টিকে থেকেছে আবার কোথাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হাটগুলোর সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, ভূমি ও শস্য উৎপাদনের বিন্যাসে পরিবর্তন ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। বহুজাতিক সংস্থার তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃতি, বদ্বীপীয় নদী–খাল–ভূমির যোগাযোগ নেটওয়ার্কের বদল, বিপণন ও ভোগব্যবস্থার ধরনের পরিবর্তন, বিপণনের নয়া কলাকৌশল, মধ্যস্বত্ব ও ইজারাদারদের দৌরাত্ম্য ও দখলদারিত্ব ইত্যাদির প্রভাব হাট ও পাইকারি স্থানীয় ব্যবসায় পড়েছে। নদীগুলোর মৃত্যু, নতুন সড়কপথের নির্মাণ, সেতু নির্মাণ ইত্যাদিও হাটের ধরন ও বিন্যাসে বদল এনেছে। সেক্ষেত্রে হাটভিত্তিক উৎপাদন–বিপণন–ক্রয়–যোগাযোগ এই অঞ্চলে বহুমাত্রিক ও বিচিত্র সম্মিলনের একটি ঐতিহ্যগত পরিসর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিচে কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক আলোকচিত্র দিলাম।

    বরিশালের সন্ধ্যা নদী কেন্দ্রিক নৌকায় ধানের হাট।

    বরিশালের সন্ধ্যা নদীর পাড়ে ধানের হাট। নৌকার উপরেই ধানের পরিবহন, বিপণন, যাচাই–বাছাই চলে। পাইকারি ব্যাপারীরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধান কেনার জন্য এই হাটে জড়ো হন।

    ছোট নৌকায় করে অল্প পরিমাণ ধান আনা–নেয়া হচ্ছে।

    ঝালকাঠিতে সন্ধ্যা নদী সংলগ্ন কাঠ ও গাছের টুকরা বেচাকেনার হাট।

    গাছের গুড়ি এনে রেখে দেয়ার স্থানীয় কৌশল। ঝালকাঠির হাটে।

    নৌকায় করে নৌকার হাটে ছোট নৌকা বহন করে নিয়ে যাওয়া।

    বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদে অনুষ্ঠিত ঈদের নামাজের দৃশ্য। বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে মসজিদের শহর বাগেরহাট ইউনেস্কো–কর্তৃক স্বীকৃত। প্রধানত সুলতানি আমলের কয়েকটি মসজিদকে কেন্দ্র করে এই স্বীকৃতি কতৃত্বশীল হেরিটেজের বয়ানে প্রাধান্য পেয়েছে। পর্যালোচনামূলক হেরিটেজ অধ্যয়নশাস্ত্রের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্বীকৃতি এবং তার পরবর্তী বয়ানের উৎপাদনকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সেই বিশদ আলাপে যাওয়ার সুযোগ এখানে নাই। তবে স্পষ্টতই অফিশিয়াল ও কর্তৃত্বশীল বয়ানে খলিফতাবাদ নামের হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর মাজার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও অনুশীলন বয়ানগুলোতে গুরুত্ব পায় নাই। উলুঘ খান জাহান আলী (র.)-এর উরস উপলক্ষে প্রতিবছর যে মেলা এবং সম্মিলন এখানে হয় সেই ঐতিহ্যকে অপরিমেয় বা ইনট্যানজিবল হেরিটেজ হিসেবে এখানকার স্থানিক পরিসর, স্থাপত্য, দিঘি ও পুকুর এবং এমনকি অন্যান্য না–মানুষী কুশীলব (যেমন: মাজার–সংলগ্ন দিঘির কুমির এবং মানত করে কুমিরকে খেতে দেয়া মুরগি), দিঘি, এবং সম্মিলিত বিভিন্ন তরিকার সাধক ও পাগলগণের বিভিন্ন পারফরমেটিভ ও আচার–অনুষ্ঠান এই অফিশিয়াল ঐতিহ্যের বয়ানে অনুপস্থিত। পাশাপাশি, খলিফতাবাদের অন্যান্য বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও অন্যান্য কয়েকটি নিদর্শনের তুলনায় গুরুত্বহীন থাকে। যখন কেবল জড়, স্থাপনাকে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তখন ওই স্থাপত্যগুলোর বর্তমান জীবনকে গৌণ করে ফেলা হয়। কেবল মাজারের বিভিন্ন ধর্মীয় আচারই না, ষাট গম্বুজ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়। সেই হিসেবে এই স্থাপত্যটি একটি জীবন্ত ও বর্তমান মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত একটি নিদর্শন। স্থানীয় জনপরিসের প্রচলিত কথ্য ইতিহাস, কিংবদন্তী, ধমীয় আচার এখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ারত থাকে। দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের জোয়ার–ভাটা বিশিষ্ট নদী, ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, আর এখানকার নিয়ত পরিবর্তনশীল প্রতিবেশের সঙ্গে এখানকার অতীত বসতি ও স্থাপত্য তৈরি হওয়ার জটিল ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বীকৃত বয়ানগুলোতে পুরোপুরি অনুপস্থিত। সেক্ষেত্রে বিদ্যায়তনিক ও অফিশিয়াল বয়ানগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যগুলোর সঙ্গে সংবেদন ও ধর্মাচার এবং প্রতিবেশের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়ার বহুমাত্রিক সম্পর্কের বয়ান স্বীকৃত হয় না। যদিও হালের ঐতিহ্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও বিদ্যায়তনিক আলাপচারিতা ও বাহাছে ভেদবাদী ঐতিহ্যের ধারণা এবং শরীরজ ও সংবেদন বিচ্ছিন্ন ঐতিহ্যের আধিপত্যশীল বয়ানগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। ইউনেস্কো, আইকমোস, আইইউসিএন, আইকমের মতো আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রান্তরী সংস্থাগুলোর তৈরি করার বিভিন্ন বিধিবিধান ও নীতিমালার সঙ্গে পশ্চিমকেন্দ্রিক, আধুনিক বিশ্বজনীনকৃত মানবায়িত ঐতিহ্যের আধিপত্যবাদী ধারণার যুক্ততাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ঐতিহ্যের এসব প্রবল ধারণার সঙ্গে বহুবিধ প্রান্তিক ও দুর্বল ধারণাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা আর সেগুলোকে মোকাবিলা করতে থাকার মধ্য দিয়েই বিভিন্ন পরিসরে ঐতিহ্যের বহু ধারণা ও অনুশীলন জারি থাকে। আমরা চাই বা না–চাই।

    গতবছর পবিত্র ঈদ–উল–ফিতরে ষাট গম্বুজ মসজিদে ঈদের জামাত।

    অ্যালেন গিনসবার্গের কবিতার কারণে হোক বা সেই কবিতার পৌনঃপুনিক পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে হোক না কেন যশোর রোড আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তির পাশাপাশি বেদনা, দেশান্তর, উদ্বাস্তু হওয়ার কাহিনি, বিচ্ছেদ, ঘর ছাড়ার ও ঘরে ফেরার স্মৃতি, স্বাধীনতা পাওয়ার আনন্দসহ বহু অনুভবের সঙ্গে বিজড়িত একটি স্থানিক পরিসর। যশোর রোডের গাছগুলো এই স্মৃতির সঙ্গে যেমন যুক্ত তেমনই যশোর রোড যেন আমাদের দেশের উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত, অনুভূত এবং ভুলে যাওয়ার, হারানো আর ফিরে পাওয়ার পরস্পরবিরোধী, জটিল এবং ভীষণভাবে সংবেদী এক যাত্রার প্রতীক বা চিহ্ন হয়ে অস্তিত্বশীল আছে। যশোর রোড বাংলাদেশের সত্তার যাত্রার একটি পথকে প্রকাশ করে যেন। যশোর রোডের গাছগুলো কেটে ফেলা নিয়ে আন্দোলন হওয়ার উদাহরণ মনে করলে ঐতিহ্যের গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ার ও তৎপরতার বহুমুখী অভিমুখ বুঝতে আমাদের সুবিধা হতে পারে। এই গাছগুলো মুক্তিযুদ্ধের মানবকেন্দ্রিক স্মৃতিকে প্রশ্ন করে। মানুষ ও না–মানুষী জগতের ঘনিষ্ট যোগসূত্রের সঙ্গে মুক্তির ধারণার ঘনিষ্ঠতার কথা বারংবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

    দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি প্রবল প্রতিষ্ঠিত চিহ্ন। বিভিন্নভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে এই মন্দির ও মন্দিরের পোড়ামাটির চিত্রফলক আমাদের অতীত গৌরব, সম্প্রীতি, শৈল্পিক উৎকর্ষ, স্থাপত্য প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে উদযাপিত হয়। কিন্তু এই উদযাপনে এই মন্দিরের স্থাপত্য–কেন্দ্রিকতা প্রকটভাবেই উপস্থিত থাকে। গৌণ হয়ে পড়ে মন্দিরের জীবনবৃত্তান্ত, মন্দিরের সঙ্গে সম্পর্কিত নদী, ধর্মাচার এবং সংবেদনের সম্পর্ক। এই আলোকচিত্রটি প্রতিবছর কান্তজীর মন্দিরের প্রতীমার মন্দির থেকে দিনাজপুর রাজবাড়ির মন্দিরে সংলগ্ন ঢেপা নদীপথে যাত্রা ও ফেরার একটি পরিবেশন। এই যাত্রা ও সম্পর্কিত বিভিন্ন শরীরজ ও ধর্মাচারকে, নদীর যুক্ততাকে আর দিনাজপুরে রাজবাড়ির যুক্ততাকে বাদ দিয়ে কান্তজীর মন্দিরের ঐতিহ্যর বয়ান একপেশে, একরৈখিক এবং জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। নদীকে যদি আমরা একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে কান্তজী বিগ্রহের এই যাত্রা কেবল মানুষ বা বিগ্রহই না, পাশাপাশি অন্যান্য জীবিত ও সক্রিয় সত্তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার প্রামাণ্য।

    সাধারণত আমাদের প্রবল ঐতিহ্য চর্চায় স্থাপত্য–কেন্দ্রিকতা যেমন প্রবল তেমনই প্রবল বাছাই করা স্থাপত্যকে ঐতিহ্য হিসেবে পরিবেশন করার চর্চা। পুরান ঢাকার নারিন্দার খ্রিস্টান সমাধিস্থল যেমন প্রবল ঐতিহ্যের বয়ানে গৌণ একটি প্রসঙ্গ হিসেবে উল্লেখিত হয়। পুরান ঢাকা কেন্দ্রিক ঢাকা শহরের ঐতিহ্য নিয়ে যেসব আলাপচারিতা জনপরিসরে নাগরিক মধ্যবিত্তের মধ্যে উচ্চকিত ভাব দৃশ্যমান, সেখানে প্রান্তবর্তী উল্লেখ ছাড়া এই সমাধিস্থল প্রসঙ্গে বিশদ কথাবার্তা ও আলাপ নজরে পড়ে না। নগর হিসেবে ঢাকার জীবনে বহুবিধ কুশীলব ও তৎপরতার যে সন্নিবেশ ঘটেছে সেখানে ঢাকার প্রাচীনত্ব নিয়ে যত দাবি, ও ঘোষণা প্রবলভাবে নজরে পড়ে, ততটাই দুর্বল পুরান ঢাকার বহুবিধ বস্তুগত ও অবস্তুগত ঐতিহ্যের উল্লেখ। এখানে নগর হিসেবে ঢাকার জীবনবৃত্তান্ত যখন মধ্যবিত্ত ও বিদ্যায়তনিক পরিসরে গঠিত হতে থাকে তখন স্পষ্টতই পক্ষপাত ও বিশেষ বিশেষ স্থাপত্য ও আচারের প্রতি পক্ষপাত পরিলক্ষিত হয়। এই সমাধি স্থলের সঙ্গে এক সময়কার জীবন্ত ঢাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের স্মৃতির যেমন লীন হয়ে আছে, তেমনই সেসব সম্প্রদায়ের বিলীন হয়ে যাওয়ার, বিস্মৃতি হয়ে যাওয়ার চিহ্নাবলিও রয়েছে।

    প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য বিষয়ক বয়ানে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন বস্তুগত নিদর্শন গুরুত্ব পায়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। বস্তুগত ও অবস্তুগত অথবা পরিমেয় ও অপরিমেয়/ট্যানজিবল ও ইনট্যানজিবল ঐতিহ্যের বর্গীকরণ ও বিচ্ছেদ নিয়ে বিভিন্ন আলাপচারিতা রয়েছে। একইসঙ্গে কোন ধরনের আলামতকে প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে, আর কোন ধরনের আলামতকে বিবেচনা করা হবে না, অথবা গুরুত্ব প্রদান করা হবে না সে প্রসঙ্গেও বাহাছ জারি থাকে। এখানে বিরাজমান প্রবল তাত্ত্বিক ও চর্চাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে এই বাছাইকরণ, গুরুত্বপ্রদানের স্তরবিন্যাস এবং অতীত ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সত্তাশ্রয়ী/সাবজেকটিভ বিভিন্ন শর্ত সম্পর্কিত থাকে। আমাদের দেশে স্থাপত্যগত অবশেষ এবং বিভিন্ন স্থাপনাকে যতটা প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় কেন্দ্রীয় বিবেচনা করা হয় ততটা অস্থাপত্যগত বিভিন্ন বস্তুকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। বস্তুর ক্ষেত্রের ভাস্কর্য, মুদ্রা, লিপি বা বিশেষ ধরনের মৃৎপাত্রকে বাছাই করার প্রবণতা ও ঝোঁক লক্ষণীয় থাকে। সাধারণ ও নৈমিত্তিক ব্যবহারের অন্যান্য বস্তুসামগ্রীকে গৌণ করে বিবেচনা করার যে চর্চা ও প্রবণতা রয়েছে সেখানে প্রবল প্রাতিষ্ঠানিক ও মতাদর্শিক দশা যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনই জাতীয়তাবাদী অতীত গৌরব, সমৃদ্ধি আর শ্রেষ্ঠত্বকে উপস্থাপন করার জন্য উপযোগিতার বিবেচনাও কাজ করে। এমনই একটি প্রান্তিক এবং পরিত্যক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক আলামত হল আমাদের এই অঞ্চলের পুরানো পুকুর ও দিঘিগুলো। অগণিত পুকুর ও দিঘি বদ্বীপের বিভিন্ন স্থানে গত দুই হাজারের বেশি সময় ধরে বৃষ্টির জল সঞ্চয় করে রেখে সেচ দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি নৈমিত্তিক বহুবিধ কাজে এবং ধর্মাচরণের জন্য এই পুকুর/দিঘিগুলো খোঁড়া, ব্যবহার করা, সংস্কার করা, দেখভাল করা হতো। শত শত বছর ধরে এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো এই অঞ্চলের মানুষের বসতির সীমানা হিসেবে, বসতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বহুবিধ মানবীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে বিরাজ করেছে। দক্ষিণাঞ্চলে নোনাপানির প্রভাবযুক্ত এলাকায় সুপেয় পানির উৎস হিসেবেও পুকুর ও দিঘিগুলো অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অতীতের বসতি বিন্যাস ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও এই পুকুর বা জলাধারগুলো প্রাসঙ্গিক। পুকুর ও দিঘি খোঁড়ার পরের মাটি যেমন এগুলোর পাড় উঁচু করে বিভিন্ন বৃক্ষ রোপন করার জন্য ব্যবহৃত হতো, তেমনই বসতিতেও নানা কাজে ব্যবহৃত হতো। আবার পুকুরের ঘাট, পুকুরের পাড়ে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের স্থাপনাও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে অনেক পুরানো পুকুর এখনও মানুষজন ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন পরিবেশ ও বৃষ্টিপাতের বদল আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পরেও। প্রতিটি পুকুর ও দিঘি নিয়ে স্থানীয় জনপরিসরে নানান কথ্য ইতিহাস, কাহিনি, কিংবদন্তী ও গল্প প্রচলিত রয়েছে যেগুলো প্রাক–আধুনিক কালে মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়ার সাক্ষ্য বহন করে। যখনই আমরা এই পুকুরগুলো এবং সংলগ্ন কাহিনিগুলোকে অবজ্ঞা করি, প্রতিষ্ঠিত প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বয়ান থেকে বাদ দিয়ে দিই তখন এতদাঞ্চলের মানুষ–জমি–বৃষ্টি–পানি–আবাদ–আচার–অভ্যাসের ইতিহাসকে ও ঐতিহ্যকে আমরা পুনর্গঠন ও বাছাই করতে থাকি।

    অতীত–শৈশব–সামাজিক যূথবদ্ধতা–বন্ধুত্ব কি ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য হবে? একজন মানুষের স্মৃতি–বিস্মৃতি অথবা একটি কালে একদল মানুষের যৌথতা–সম্পর্ক–তুচ্ছাতিতুচ্ছ খেলাধুলা ও আনন্দের ইতিহাস কি ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হবে? যাপিত জীবনের চারপাশে ফেলে দেয়া, কম দামি বা প্রকৃতি থেকে সহজলভ্য জিনিসপত্র দিয়ে শৈশব বা কৈশোর বা যাপিত জীবনের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক যাত্রার ইতিহাস কি ঐতিহ্য হিসেবে বেছে নেয়া যাবে? হালের সেলুলার ফোন–আইপ্যাড–কম্পিউটার গেইমিং–অনলাইন গেইমের মধ্যে নিমজ্জিত যে শৈশব ও কৈশোর সেখানে এই শৈশবের বিস্মৃতি বহু পরিসরে অনিবার্যভাবেই এসেছে। নতুন প্রজন্মের মানুষজন আগের প্রজন্মের যোগাযোগ ও যৌথতার ধরন যেমন জানেন না, তেমনই আগের প্রজন্মের মানুষ নতুন ভারচুয়াল আর মেশিনের সঙ্গে যাপনকেও বুঝতে পারেন না। যাপিত জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ দিকগুলোতে মনোযোগের সঙ্গে নজর দিলে সেইসব দিকে বহুমাত্রিক ও বহুবিধ রূপান্তর ও বদল আর ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। অফিশিয়াল আর কেতাবি অভিজাত ঐতিহ্য–ভাবনা ও বয়ানে এসব জিনিসপত্র, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, কাহিনি, ও বয়ান কখনও কখনও ‘হারানো সোনালি যুগের’ নস্টালজিয়া হিসেবে উদযাপিত হলেও, পরিশেষে সেই উদযাপন বৃহত্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে স্বীকৃত হওয়ার উদাহরণ খুবই কম। আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বেছে নিলাম শৈশবের খেলাধুলার বিভিন্ন ধরন। এসব খেলা ও আনন্দ এখনও বিলুপ্ত হয়ে যায় নাই। আবার বহুল পরিসরে প্রচলিতও নাই। হয়তো যাপিত জীবনের বদল–প্রক্রিয়ার ক্রান্তিকালে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ আনন্দের ও উচ্ছ্বাসের অনুশীলনগুলো বেঁচে আছে। সাইকেল রিকশার বিয়ারিং আর কাঠ মিলিয়ে বানানো গাড়িতে চড়া ও বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি চড়ার আনন্দ করা এমনই একটি খেলা ছিল বা এখনো কোথাও কোথাও টিকে আছে। তবে খেলনা গাড়ি, রিকশা, সাইকেল এখন মোটামুটি সস্তায় গ্রামগঞ্জেও পাওয়া যায়। একত্রে নিজেরা টুকরা–টাকরা অংশগুলো যোগাড় করে এমন বাহন বানানোর যে অভিজ্ঞতা ও উত্তেজনা সেই উত্তেজনা ও আনন্দ এখন অব্যাহত আছে কি না সেটা ভাবনার বিষয়। আনন্দ–উচ্ছ্বাস–উদযাপনের অনুভবগুলো আছে মানবীয় সংবেদনের সঙ্গে লিপ্তির কারণে। কিন্তু অনুভবের প্রক্রিয়া–ধরন–অভিব্যক্তি বদলে যায়। এই বদলানোটা অনিবার্যও বটে। কিন্তু এমন প্রগাঢ় অনুভূতির ইতিহাস যেমন আমাদের বিদ্যায়তনে ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে নাই, তেমনই প্রবল ঐতিহ্যের বয়ানগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখিত, কথিত এবং প্রদর্শিতও হয় নাই। নিচের কিছু ছবিতে আমি এমনকিছু আপাত তুচ্ছ ও অনভিজাত খেলাধুলার আলোকচিত্রীয় উদাহরণ পেশ করলাম:

    ইচিং বিচিং খেলা।

    ওপেনটি বায়স্কোপ খেলা।

    সাতচাড়া খেলা।

    ডাংগুলি খেলা।

    ডিজিটাল আর ডিভাইসের প্রচলিত ও জনপ্রিয়তার আমলে আশেপাশের নারকেল পাতা, বা তালির কড়ি বা কাঁঠালপাতা বা পাতা দিয়ে শিশুদের বানানো ঘড়ি, চশমা, সাপ, চরকা, নৌকা ইত্যাদি সাধারণ ও নৈমিত্তিক প্রকৃতি ও গাছপালার সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ যাপনের যেমন চিহ্ন তেমনই শৈশবের বিভিন্ন খেলাধুলার বিভিন্ন পণ্য, বিশেষ করে প্লাস্টিক ও সস্তা চায়নার খেলনার বাজার তৈরি হওয়ার আগেকার জনপরিসরে শিশুদের বড় হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা, কিংবা সস্তা ও সহজে প্রাপণীয় উপকরণ দিয়ে খেলার সামগ্রী তৈরি করে নেয়ার বিস্তৃত চর্চার প্রমাণও এই পাতার খেলনাগুলো বহন করে। বাংলাদেশের শহর–মফস্বল–গ্রামের জনপরিসরে ও বাজারের মধ্যকার ফারাক ও বৈচিত্র্যও এই উপকরণগুলো সামনে নিয়ে আসে। সেই ফারাক এখন আরও বেড়েছে আর বিনোদন বা খেলাধুলার উপকরণের ধরনের বদল ঘটেছে, খেলাধুলার চর্চা ও উপলব্ধিতে বদল ঘটেছে।

    প্রযুক্তি আর প্রযুক্তি ব্যবহারের ঐতিহ্য জনপরিসরের বিনোদন–দর্শন–শ্রবণের স্মৃতি ও বয়ানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অঞ্চলে ৮০–৯০ এর দশকের ক্যাসেট প্লেয়ার বা টু–ইন–ওয়ান আর অডিও ক্যাসেটে গান–শোনা সহ বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডিং, শ্রবণ আর বাজারজাতকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ক্যাসেটে গানের বা ব্যান্ডের বা দলের সঙ্গীতের অ্যালবাম রিলিজ হতো। সেই ক্যাসেট কপি ও রেকর্ডিয়ের জন্য শহরে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আলাদা দোকান ছিল। ক্যাসেট বিক্রির জন্য আলাদা দোকান ছিল। সিডি বা ডিভিডিতে বা হালে ইউটিউবে বা অনলাইন প্লাটফরমে গান–নাটক–পডকাস্ট–সাক্ষাৎকার শোনার ঐতিহ্যের ঠিক আগেই। আর ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ও ভিডিও ক্যাসেট ছিল সমসাময়িক সিনেমা, বা বিভিন্ন অনুষ্ঠান রেকডিং করে রাখার অন্যতম দৃশগত মাধ্যম। সিনেমা হল থেকে দেশী–বিদেশী সিনেমা ঘরে ঘরে বা উঠান বা ছাদে আয়োজন করে দেখার জন্য ভিসিপি বা ভিসিআর ভাড়া পাওয়া যেত। সর্বজনীন ইন্টারনেট সংযুক্তির আগেই যেমন পাওয়া যেত ও দেখা/শোনা হতো সিডি বা ভিসিডি। সিডি প্লেয়ারে। জনসংস্কৃতির পরিসরে নৈমিত্তিক বিনোদন, বিভিন্ন বয়ান শ্রবণ, দর্শনসমেত ভোগ বা উপভোগের বড় রূপান্তরের সাক্ষ্য এইসব ডিভাইজ। তখনও স্মার্টফোনের প্রচলন হয় নাই। ঘরে ঘরে ভিসিপি বা ভিসিআর ছিল না। অনেক বাড়িতেই টুইনওয়ান বা অডিও ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল, যা রেডিওর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শ্রুতিগত পারফরমেন্সকে জনসংস্কৃতির ঐতিহ্যের বদলে এবং সামাজিক–রাজনৈতিক–বিনোদনের সঙ্গে জনরুচি ও ভোগের বিন্যাসের ধরনের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিভিন্ন তথ্য বা বয়ান রেকর্ড করা এবং পরে বারংবার শোনা বা দেখার সুযোগ তৈরি হওয়ায় শিল্প উৎপাদনের কারখানায় কপিরাইট, বৈধতা, প্রমাণ্যতা, অরিজিনালিটি, ও শুদ্ধতার প্রসঙ্গগুলো পুনরায় প্রশ্নের মুখে পড়ল। ক্যামেরা বা চলচ্চিত্রের প্রচলনের পরে যেমন পড়েছিল। জনসংস্কৃতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা ও সংবেদন, রাজনৈতিক পরিসরের উপরে রেকর্ড করা ভাষণ–বয়ান–গান–নাটক–আবৃত্তি–ধর্মীয় বয়ান সঞ্চালিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় ও ভোগের/শোনার/দেখার সংবেদী ঐতিহ্যের এই বদল নিয়ে তেমন সিরিয়াস আলাপচারিতা ও বয়ান ঐতিহ্যের বয়ানে যেমন নজরে পড়ে না, তেমনই বিদ্যায়তনিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরেও এইসব প্রযুক্তি আর শিল্প–কারখানার মিথস্ক্রিয়া জনসাংস্কৃতিক পরিসরে কিভাবে প্রভাব ফেলেছিল তা নিয়েও পর্যালোচনা চোখে পড়ে না।

    বেতের তৈরি নির্দিষ্ট আকারের গোলাঘর। উপরে খড়ের ছাউনি। ঔপনিবেশিক ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে যে জটিল প্রক্রিয়ায় এই অঞ্চলের যাপিত জীবনের সকলক্ষেত্র প্রভাবিত ও রূপান্তরিত হয় তার ধারাবাহিকতা উপনিবেশোত্তর কালেও অব্যাহত থেকেছে। রূপান্তর প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয় এই বদ্বীপের জমি–জলের সঙ্গে মানবীয় সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের মধ্যে। এই অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত সকল ক্ষেত্রই রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৬০–এর দশকের সবুজ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হাইব্রিডাইজেশন, শস্য আবাদের প্রক্রিয়ায় বদল, ধান ও অন্যান্য শস্য আবাদ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিপণন, ও ভোগের প্রক্রিয়ার যে বদল ঘটেছে সেই বদলের ইতিহাস নিয়ে আমাদের অঞ্চলের চিন্তক–গবেষণগণ খুব বেশি আগ্রহী ও মনোযোগী নন। নাগরিক ও বিদ্যায়তনিক ঐতিহ্যের আলাপে আর ইদানিংকালের জলবায়ু ও ইকোলজির পরিবর্তনের হুমকির মুখে টেকসই উন্নয়নের বয়ানে স্থানীয় ঐতিহ্যগত ধান ও অন্যান্য শস্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে প্রচলিত উন্নয়ন আর আধুনিকতার বয়ানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ স্থানীয় জ্ঞান/ইনডিজিনাস নলেজ এবং স্থানীয় প্রজাতির বিভিন্ন ধান ও শস্য উৎপাদনের আলাপ উত্থাপিত হয়। সেই আলাপ বৃহত্তর বহুজাতিক সংস্থা, রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষির উপরে নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন পদ্ধতি ও উপকরণের উপরে নিয়ন্ত্রণ আর বাজার–ব্যবস্থার প্রভাবের মধ্যে বিদ্যমান শর্তগুলোর সঙ্গে মানানসই হতে হয়। আমাদের প্রচলিত চিন্তা ও ঐতিহ্যে যেমন শস্য নিয়ে আলাপগুলো অনেকটাই হয় বিজ্ঞান নয়তো সমাজবিজ্ঞানের পরিসরের মধ্যে রেখে হয়। বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা, ইতিহাস, আর রাজনৈতিক বাস্তুবিদ্যার সংশ্লেষে জারিত বিদ্যাচর্চার পরিসরে আমাদের এই অঞ্চলের চাষাবাদকে তার রূপান্তরের বহুমাত্রিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে বয়ান করা হয়। ঔপনিবেশিক আধুনিকতা আর শাসনের অনিবার্য প্রভাবে বদ্বীপীয় পরিসরের আবাদ–শস্যব্যবস্থাপনা–ভূমিব্যবস্থাপনা–প্রতিবেশের বুনিয়াদী রূপান্তর ঘটেছিল। এই রূপান্তরে ফলে এখানকার প্রতিবেশ, অর্থনীতি, সামাজিক ও ধর্মীর আচার ও সংবেদের যে পরস্পরাগত লিপ্তির সম্পর্ক ছিল তা পাল্টে গেছে। এখন বিদ্যায়তনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের চর্চায়, নীতিমালা প্রণয়নে আর বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়নের বয়ানগুলোতে এগুলো পরিস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন প্রসঙ্গ ও বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়। ঐতিহ্য তো কেবল পুরানো ও অতীতের কোনো কিছুর ধারাবাহিকভাবে জারি থাকার সন্ধান করা আর বয়ান জারি করা না। সন্ধানের কারণ ও পদ্ধতি, এছাড়া বয়ান জারির পরিপ্রেক্ষিত, পূর্বানুমান আর পাটাতনগুলোও জ্ঞানচর্চার নির্দিষ্ট ঐতিহ্যের মধ্যেই তৈরি হতে থাকে। এই ঐতিহ্য হিসেবে কোনো কিছুকে বাছাই করা আর নির্মাণ করা আর সেই বাছাই ও নির্মাণের জ্ঞানের ঐতিহ্যের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া আধিপত্যশীল ঐতিহ্য নিয়ে আলাপ ও বাহাছে পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকে। বঙ্গীয় বদ্বীপের চাষাবাদের ঐতিহ্য নিয়ে আলাপে মানবায়িত যে–বয়ান জারি থাকে, তেমন আলাপ নদী–জল–বৃষ্টিপাত–জমির সংশ্লেষের ইতিহাস নিয়ে হয় না আমাদের জ্ঞানচর্চার বা বাহাছের ঐতিহ্যে। কেবল প্রতিনিধিত্বশীল দৃশ্য হিসেবে আমাদের দেশের ধান সংরক্ষণ করার গোলাঘরের বিভিন্ন প্রকারের মধ্য থেকে দুইটির ছবি দিলাম। দুটোর মধ্যে একটি বেত ও খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি বিশেষ গড়নের গোলাঘর আর অন্যটি ইট–মাটির দেয়ালের উপরে টিনের ছাউনির গোলাঘর। দুই ধরনের গোলাঘরই হালে ব্যবহারের দিক থেকে প্রায় বিলুপ্ত। কৃষক ধান ও বীজের উপর থেকে তার সার্বভৌম অধিকার হারানোর পরে এবং বীজ–সেচ–সার–কীটনাশক–জমির ব্যবস্থাপনা–বিপণনের সকল পর্যায় রাষ্ট্র–বহুজাতিক পুঁজি– রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান–ব্যাংক ইত্যাদি কুশীলবদের অধীনস্থ হয়ে যাওয়ার পরে ধান সংরক্ষণের প্রক্রিয়া ও ধরনও পাল্টে গেছে। এই পাল্টানো বা বিলুপ্তি নিয়ে প্রচলিত ঐতিহ্য হারানোর আহাজারি ও আর্তনাদ করাটাই স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। টিকিয়ে রাখার বা ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করার আকুতিতাড়িত হাহাকার ও বিলাপ জারি থাকতে পারে। সেটাই প্রতিষ্ঠিত ও হেজিমোনিক ঐতিহ্য–ভাবনা ও বয়ানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে হয়তো; কিন্তু এই বয়ানে ঐতিহ্য অনন্ত ও অপরিবর্তনীয় এমন একটা পুর্বানুমান যেমন বহাল থাকে, তেমনই খুবই সিলেকটিভলি প্রচলিত ঐতিহ্য–ভাবনার ছাঁচে রেখে আকুতি–বাসনা–আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে থাকে। বেশিরভাগ থেকেই এই বয়ানে ইতিহাস নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড দিয়ে বিচার ও রচনা করা হয়। বিলীন হওয়ার সামগ্রিক পর্যালোচনার বদলে যেভাবে আলাপ করলে আরাম হয় সেভাবেই আলাপ–হাহাকার–আকুতি প্রকাশ করা হতে থাকে। একই কথা প্রযোজ্য পরের দুটো ছবিতে প্রদর্শিত মাটি দিয়ে তৈরি ঘর, হয় খড়ের ছাউনি অথবা গোলপাতার ছাউনি, বাঁশের বেড়া, খুটি দিয়ে বানানো ঘর নিয়ে নাগরিক ভদ্রবিত্তীয় পরিসরে ঐতিহ্য হারানোর বা রক্ষা করার হাহাকার নিয়েও প্রযোজ্য। ঔপনিবেশিক আমলে বদ্বীপ অঞ্চলে গ্রামের কুড়েঘর হিসেবে নথিভুক্ত বা আলোকচিত্রায়িত করে মহাফেজখানার নথিতে রূপান্তরকরণের যে প্রকল্পগুলো তৈরি হয়েছিল সমীক্ষা–জরিপ–নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় বর্তমানের ঐতিহ্য নিয়ে প্রচলিত বয়ানগুলোকে সেই প্রক্রিয়ার ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ঐতিহ্য নিয়ে আলাপচারিতা ও অনুভুতি উপলব্ধ ও অভিব্যক্ত হয় নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত ঐতিহ্যের ছাঁচে ফেলে। আপাত দৃষ্টিতে কথাটা পরস্পরবিরোধী বা কুটাভাসমূলক মনে হলেও চলতি সংবেদ ও অনুভূতির ঐতিহ্য মধ্যে থেকেই রক্ষা করা, বাছাই করার ও নির্মাণ করার ঐতিহ্য গঠিত হয়।

    বাতাস চলাচলের উপযোগী করে এবং ভেতরের তাপ–আর্দ্রতা ও ইঁদুর থেকে নিরাপদ রাখার জন্য ইটের ভিত্তির উপরে মাটির দেয়ালের সিলিন্ডারাকার গোলাঘর। উপরে টিনের ছাউনি।

    মাটির তৈরি ঘর, সামনের উঠোন ঘিরে তৈরি করা মাটির দেয়াল। উপরে শন ও খড়ের ছাউনি।

    দক্ষিণাঞ্চলে বাঁশ, বেত, হোগলার বেড়া আর গোলপাতার ছাউনি দিয়ে তৈরি ঘর। এসব ঘর নাগরিক ভাষায় ‘কুঁড়েঘর’ নামে পরিচিত।

    ১৮৬০ এর দশকে বদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে বাঁশ–বেত, মাটি আর খড়–ছনের দো–চালা ও ধনুকের মতন বাঁকানো ছাউনি–বিশিষ্ট ঘর। এসব ঘর ঔপনিবেশিক ভাষাদুনিয়া ও অভিধানে বাংলা–ঘর (যা থেকে বাংলো শব্দটি এসেছে) পরিচিতি লাভ করে। পরে এই অঞ্চলের প্রাক–আধুনিক স্থাপত্য ও শিল্পকলার ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের আর স্থাপত্যবিদ্যার পরিভাষায় এই শব্দটি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মসজিদের কার্নিশ, মন্দিরের শ্রেণিকরণের পাশাপাশি স্থাপত্যশৈলির বিচার ও বিবরণীতে এই বাংলা এবং দো–চালা, চৌচালা, আট–চালা, বাঁকানো কার্নিশ ইত্যাদি শব্দের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। প্রান্তিক ও নিম্নবর্গীয় গৃহ ও গৃহনির্মাণ শৈলি বনেদি ও অভিজাত শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য ও বিদ্যাচর্চায় আত্মীকৃত হয়ে পরিচয়বাদী অন্যতম চিহ্নে রূপান্তরিত হয়েছে ‘বাংলো’ (> বাংলা স্থাপত্য শিল্প) হিসেবে। অধুনা স্থানিক প্রতিবেশ ও জলবায়ুর উপযোগী এবং ঐতিহ্যগত মানুষ–প্রতিবেশের মিথস্ক্রিয়ার প্রতীক হিসেবে এই ধরনের স্থাপনাকে বিবেচনা করা আর আত্মীকরণ করার তৎপরতা লক্ষণীয়ও বঠে। ঐতিহ্যের বোঝাপড়ার নতুন ধরন আর ধারণায়নের একটি প্রতিফলন হিসেবে এই চিন্তাকে বিবেচনা করা যায়।

    ঢাকার আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একটি গ্যালারি।

    মিউজিয়াম বা জাদুঘরকে ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠিত ও স্বাভাবিকীকৃত আধুনিক চিন্তা ও বয়ানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এবং পরিসর হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। জাদুঘরবিদ্যা বা মিউজিওলজি নামে একটি আলাদা শাস্ত্র যেমন বিকশিত হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদ্যায়তনিক চর্চায়ও তেমনই বহুমুখী গুরুত্ব অর্জন করেছে। হেরিটেজ (যা ট্রাডিশন অর্থে ঐতিহ্য থেকে ভিন্ন অথচ সম্পর্কিত একটি ধারণাকে নির্দেশ করে) ধারণা ও সংশ্লিষ্ট হেরিটেজ অধ্যয়ন ও হেরিটেজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত শাস্ত্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও চর্চার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মিউজিয়ামও একটি কেন্দ্রীয় ধারণা ও ঐতিহ্যের বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় পরিসর ও প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। পাশাপাশি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পুনরানয়ন, প্রদর্শন এবং ব্যবস্থাপনার বহুবিধ শাস্ত্রীয়, বিধিবিধানগত, নীতিমালাগত এবং গবেষণাগত প্রবণতা ও চর্চা তৈরি হয়েছে। এখনকার যেকোনো বয়ানে এসব শব্দ বা পদ বহুল উচ্চারিত হয়। তবে এসব প্রতিষ্ঠান, ধারণা এবং চর্চা স্থানিক ও কালিকভাবে রূপান্তর, পরিবর্তন, পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর পরবর্তীতে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয়দের সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগের সঙ্গে সঙ্গে অতীত ও পূর্বপ্রজন্মের উত্তরাধিকার সুত্রে অর্জিত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, ধারণা, জাতিগত ও নরবর্ণগত ধারবাহিকতা নিয়ে জানা ও সংরক্ষণ করার যে তৎপরতা শুরু হয় তা ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ায় আরো প্রবল ও বহুমাত্রিকতা অর্জন করে। জাদুঘরবিদ্যা বিষয়ক যেকোনো বুনিয়াদি কিতাবে বা অন্তর্জালিক টেক্সটে বা বইয়ে বা মাধ্যমে এই ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলাপ ও পর্যালোচনা পাওয়া যাবে। ঔপনিবেশিক ও পশ্চিমা জ্ঞানের বুনিয়াদ হিসেবে এবং অপশ্চিমা সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষজন সম্পর্কিত প্রাচ্যবাদী বয়ান নির্মাণে বিভিন্ন ধরনের জরিপ ও সমীক্ষা যেমন ভূমিকা রেখেছিল তেমনই ভূমিকা রেখেছিল জাদুঘরীকরণ/মিউজিওলাইজেশন। বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহ করা, নির্দিষ্ট প্রণালীবদ্ধ প্রক্রিয়ায় একটি পরিসরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা এবং সেই প্রদর্শনীকে শিক্ষাপ্রদানের (বা সভ্য ও আধুনিক করে তোলার) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার তৎপরতাকে আধুনিকীকরণের প্রকল্পগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শনাক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে, পরিচয়বাদী ও জাতীয়তাবাদী চেতনা ও বয়ান নির্মাণ, প্রদর্শন, এবং সঞ্চালন করে ‘নিজ জাতিগত বা সম্প্রদায়গত বা জাতি–রাষ্ট্রগত বা নরবর্ণগত গৌরব ও উজ্জ্বল অর্জনের’ প্রামাণ্যগুলো জনপরিসরে ছাড়ানোর জন্য জাদুঘর ভীষণ কার্যকর ছিল। উপনিবেশোত্তর কালে, বিশেষ করে, গত দুই–তিন দশকের বহুমুখী পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে জাদুঘরের ধারণা, প্রদর্শনীর রাজনীতি এবং জাদুঘরের বয়ান নির্মাণের সঙ্গে পরিচয়বাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আলাপচারিতা আর ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ অনেক বেড়েছে। একইসঙ্গে, প্রবল বয়ান ও দৃশ্যমানতার রাজনীতি আর আধিপত্যবাদের প্রতিরোধের নানাবিধ তৎপরতায় জাদুঘরের ভূমিকা সম্পর্কেও বহু নতুন জিজ্ঞাসা ও ধারণার বিকাশ ঘটেছে। যেসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: কে, কেন ও কীভাবে সংগ্রহ করছে? কী কী সংরক্ষণ করছে (কিংবা করছে না)? কীভাবে প্রদর্শন ও পরিবেশন করছে (বা লুকিয়ে রাখছে বা অপর হিসেবে হীনভাবে প্রদর্শন করছে)? কারা দর্শক ও শ্রোতা? কারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে? সচেতনকরণের প্রকল্প কারা ও কেন গ্রহণ করছে? কোন উপাদান, প্রসঙ্গ, বিষয়বস্তু জাদুঘরে কিভাবে দেখানো ও পরিবেশিত হচ্ছে? বাছাইকরণের ও প্রদর্শনের রাজনীতি ও বুনিয়াদি ধারণা কোন জ্ঞানের পাটাতনে তৈরি হচ্ছে? জাদুঘর বলতে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসরকে সংজ্ঞায়িত করা বা না–করা জরুরি কি না? অন্তর্জালিক ও অপরবাস্তব পরিসরের প্রদর্শন, পরিবেশন ও ভোগ/গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আগেকার জাদুঘরের বোঝাপড়া কেমন হবে?—এমন বহু প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। একইসঙ্গে জাদুঘরের বহুমাত্রিক ও বহুপ্রকারের অস্তিত্বের উন্মেষ ঘটছে। ভুলে যাওয়ার বিপরীতে মনে রাখার যে–রাজনীতি সেই রাজনীতি ও ভোলানোর বা মনে রাখানোর ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বয়ান তৈরি করার জন্য বিকল্প জাদুঘর ধারণার বিকাশ ঘটছে। উন্মুক্ত পরিসরে, অস্থায়ীভাবে, স্মৃতির দৃশ্যগত ও শ্রুতিগত পরিবেশনের প্রক্রিয়ায়, অপরবাস্তব পরিসরে আর্কাইভিং, সকলের জন্য উন্মুক্ত, ভোক্তা বা গ্রহীতার সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্ভর সংলাপমুখর জাদুঘরের ধারণা এখন বহু পরিসরে খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্তর্জালের দুনিয়ায় বহু পুরানো, বনেদি, ও বিখ্যাত মিউজিয়াম ও সংগ্রহশালায় প্রবেশ করা, দেখা, ও শোনার সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে। একটি স্থাপত্য, বা একটি সুনির্দিষ্ট পরিসরই জাদুঘর আর কিছু সুনির্দিষ্ট বস্তু বা নিদর্শনই জাদুঘরে থাকবে—এমন ধারণাকে এখন আধিপত্যবাদী হিসেব বিবেচনা করার চলও রয়েছে। আমি এখানে বাংলাদেশের তিনটি জাদুঘরের তিনটি ছবি দিলাম। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের, পটুয়াখালীর পানি জাদুঘরের আর রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের একটি করে তিনটি ছবি। প্রতিটি ছবি জাদুঘরগুলোর ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে প্রদর্শন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ধরন উপস্থাপন করছে। ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত অতীত ও বর্তমানের বিষয় ও প্রসঙ্গগুলোর ভিন্নতাকেও উপস্থাপন করছে।

    পটুয়াখালীতে নির্মিত পানি জাদুঘরে বিভিন্ন নদীর পানির সংরক্ষণ ও প্রদর্শন আর পানি ব্যবহারের বিভিন্ন মৃৎপাত্রের প্রদর্শন।

    রাজশাহীর বরন্দ্রে গবেষণা জাদুঘরে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক পাথরের প্রতীমা প্রদর্শনকক্ষ ও গ্যালারি। অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্ব চর্চা ও জাদুঘরের প্রথম দিককার একটি নিদর্শন হিসেবে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরকে বিবেচনা করা যায়। জাতীয়তাবাদের বিকাশের কালে উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র নামে চিহ্নিত অঞ্চলের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চার যে আঞ্চলিক তৎপরতাগুলো লক্ষ করা যায় তার মধ্যে বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি একটি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঐতিহ্যের সংজ্ঞায়ন, মানদণ্ড নির্ধারণ, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ আর সংরক্ষণের সঙ্গে পরিচয়বাদী বয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আলাপ করার জন্য এই জাদুঘর একটি ভালো কেইস–স্টাডি হতে পারে।

  • এম.এন রায়।। র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি (আমূল গণতন্ত্র বা মানবতন্ত্র )

    এম.এন রায়।। র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি (আমূল গণতন্ত্র বা মানবতন্ত্র )

    • অনুবাদ: স্বদেশ রঞ্জন দাস

    [মানবেন্দ্র নাথ রায় বা এম এন রায়, উপমহাদেশের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক। তার হাত ধরেই ম্যাক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই এম এন রায় প্রথাগত মার্ক্সবাদী চিন্তা থেকে বের হয়ে নতুন রাস্তা অনুসন্ধানের চেষ্টায় ব্রতী হন, যার নাম দেন তিনি নয়া মানবতাবাদ। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয় তার New Humanism: A Manifesto। বর্তমান লেখাটি এ বইয়েরই অনূদিত সংস্করণের একটি অধ্যায় থেকে নেয়া হয়েছে। পুরো বইটির অনুবাদ করেন স্বদেশরঞ্জন দাস, যেখানে Radical Democracy-এর বাংলা তিনি করেন আমূল গণতন্ত্র। বর্তমান লেখাটি বই থেকেই হুবহু তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এ যুগের মানুষকে যে-দর্শন নতুন আশা ও নতুন বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে সেই দর্শনকে অবশ্যই মুক্তির অর্থ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে; মুক্তিলাভ করলে, মানুষের দাবীর কতটা কী পূরণ হবে তা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করতে হবে। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যক্তি মানুষকে, তার ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে তুলতে কতখানি সাহায্য দেবে তার বিচার যদি বর্তমানের নানা পরস্পরবিরোধী মতবাদের গোঁড়ামি ও অন্ধ সংস্কার ও অনুশাসন দিয়ে করতে হয় তা হলে কেবল বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি করবে এবং ইতিহাসের বৃহত্তম এই সংকট থেকে মানুষকে উদ্ধার করে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাও সম্ভব হবে না এবং সংকট ত্রাণের আদর্শ আকাশকুসুমের মতই অলীক থেকে যাবে। সর্বজনকাম্য এক মুক্তির আদর্শের জন্যই এক সার্বজনীন প্রচেষ্টা সম্ভব হতে পারে।

    মানুষের মুক্তি আকাঙ্ক্ষার উদ্ভব হয়েছে তার জীবন সংগ্রাম থেকে। এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষাই তাকে জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটবার পরও প্রকৃতির ওপর নিজের আধিপত্য স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই চলেছে মানুষের নব নব জ্ঞানান্বেষণ প্রচেষ্টা। এর ফলেই সে প্রাকৃতিক ঘটনা, ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের অত্যাচার ও শাসন থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্তি পেতে পেতে এগিয়ে চলেছে। মানুষ তার জীবন সংগ্রাম চালাতে চালাতে যখন বিবর্তনের উন্নত স্তরে উঠেছে তখন সেই সংগ্রাম ক্রমে বুদ্ধি ও সুকুমার আবেগের স্তরে উন্নীত হয়েছে এবং সেটাই তখন উচ্চ মূল্যমানের পর্যায়ে এসে মানুষের এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি মানুষকে যদি মুক্ত জীবনযাপন করতে হয় তবে তার শুধু অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও নিরাপত্তা থাকলেই চলবে না, তার অন্তর্নিহিত সকল বৃত্তি ও শক্তি সমূহের বিকাশ সাধনের অনুকূল এক মানসিক পরিবেশ ও এক মুক্ত আবহাওয়ার প্রয়োজন হবে, যেখানে কোন প্রকার বাঁধাধরা মতবাদের অন্ধ অনুশাসন থাকবে না। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি মানুষ এই প্রকারের ব্যাপক অর্থে স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ কতটা অর্জন করেছে তাই দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে। “মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি” এই প্রাচীন ঋষি বাক্য অনুসরণ করে ভবিষ্যতের দর্শনকে ঘোষণা। করতে হবে, ব্যক্তি মানুষ কতখানি স্বাধীনতা পেল কিংবা পেল না, সেই মাপকাঠি দিয়েই কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে।

    জাতিই হোক আর শ্রেণীই হোক সব রকম সমষ্টি সত্তাই গড়ে ওঠে ব্যষ্টিরূপ ব্যক্তিকে নিয়ে। মানুষ[mfn] এখানে মানবেন্দ্রনাথ আদিম মানবকে “Man” এক বচনে ব্যবহার[/mfn] আরো অধিক মাত্রায় নিজ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও এ সবের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছিল সমাজ গড়েছিল। আদিম যুগে পারিবারিক মানুষ[mfn] যেহেতু মানুষ যুক্তিপরায়ণ জীবও বটে, সেইহেতু সে নিজ নিজ বুক্তি বুদ্ধি দিয়ে নিজের এবং নিজ পরিবার পরিজনের জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছে এবং প্রতিবেশীর ওপর কোন স্বাভাবিক আতের টান না থাকার জন্য সদব্যবহার না করলে সমাজবদ্ধতা থাকবে না সেইজন্য পরস্পরের বাঁধনের সিমেন্ট স্বরূপ সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন প্রবর্তন করেছে, দণ্ডবিধি রচনা ক’রে সমাজে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করেছে। “মানুষ”কে একবচনে ব্যবহার করলে পাছে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকে সেইজন্য আমি Man. এর স্থানে “পারিবারিক মানুষ” লিখেছি (অনুবাদক )।[/mfn] তার পারিবারি জীবন সংগ্রামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য নিয়েই অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সমাজ সম্পর্কের প্রবর্তন করে; এবং আদি মানুষের এই সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা সে ব্যক্তি মানুষ হিসাবেই শুরু করে। এই যে মানুষের জীবন সংগ্রামের বাধাবিপত্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তা কেবল তার জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের ইচ্ছ থেকেই উদ্ভূত। কাজেই দেখা যাচ্ছে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে মানব সমাজের গতি প্রগতির মূল প্রেরণা। মানুষের অন্তর্নিহিত যুক্তিশীলতা, নীতিবোধ ও অন্যান্য সৃজনশীল সম্ভাবনাগুলি বিকাশের পথে যে সব প্রাকৃতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা আছে তার ক্রমঃ করেছেন, কিন্তু তার অর্থ নয় যে আদিম মানব সমাজবদ্ধ হবার পূর্বে একা একাই থাকত। মানুষ কোনদিনই তা থাকত না। মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক। কারণ মানুষের জননীকে জীবিকার্জনের কষ্টকর দায়িত্ব থেকে অবসর দিতে হয় এবং মানব শিশুকে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত মাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, সেইজন্য মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক প্রাণী জগতকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যে-সব জীব একা একাই থাকে, কেবল বংশ রক্ষার সময় স্ত্রী পুরুষ ক্ষণিকের জন্য মিলিত হয়, স্ত্রী-প্রাণ সুবিধামত স্থানে ডিম পেডেই ছুটি নেয়-সন্তান পালনের দায়িত্ব থাকে না, আপনিই ডিম ফোটে – বাচ্ছারা নিজেরাই প্রকৃতি থেকে খাদ্য আহরণ করে বেঁচে থাকে; যেমন কীট পতঙ্গ জাতীয় প্রাণী। যে সব প্রাণী দল বেঁধে থাকে : যেমন পিঁপড়ে, মৌমাছি, উইপোকা।

    যে সব প্রাণী পারিবারিক, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে পরিবার বেঁধে বাস করে যেমন–সিম্পঞ্জি, ওরাং, গিবন ও মানুষ। মানুষ স্বভাবতঃ পারিবারিক জীব সেই হেতু সে পিঁপড়ে মৌমাছির মত সামাজিক মনোবৃত্তি সম্পন্ন জীব নয়। তাই আতের টান নিজ নিজ স্ত্রী ও সন্তানের ওপর প্রতিবেশীর প্রতি নয়। কিন্তু অপসরণই হচ্ছে মুক্তি। সমাজের নানা আইন কানুন ও বিধি নিষেধের দ্বারা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যক্তি মানুষের জন্য সর্বাধিক স্বাধীনতা লাভের ব্যবস্থা করা। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি যে পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করে তার সমষ্টি দিয়েই যে কোন সমাজ ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও প্রগতিমূলক মূল্যের বিচার করতে হবে। নতুবা সামাজিক অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তি ও উন্নতির আদর্শ মিথ্যা হয়েই থাকবে।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    কোন রাজনৈতিক দর্শন বা সামাজিক পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যক্তিব স্বাধীনতার আদর্শ যদি শূন্যগর্ভ অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে পরিত্যক্ত হয় তবে তার বৈপ্লবিক গুরুত্ব খুবই কম না হয়ে পারে না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় (রাষ্ট্রে) ও অর্থ নৈতিক প্রচেষ্টায় রক্ত-মাংসের ব্যক্তি মানুষকে কাল্পনিক সমষ্টি সত্তাব যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়, সম্ভবতঃ ত দিয়ে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি অর্জন করা যায় না। স্বাধীনতা কেড়ে নিলে অর্থাৎ একনায়কত্ব স্থাপন করলে মানুষ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলবে, এ কথা বলা অর্থহীন ৷ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল প্রচেষ্টার যুক্তিসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিক থেকে অধিকত মাত্রায় ব্যক্তির স্বাধীনতা লাভ। একমাত্র ব্যক্তির স্বাধীনতা রূপেই স্বাধীনতা বা মুক্তির আদর্শ বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। 

    কেবলমাত্র অর্থনীতির পুনর্গঠন করলেই কোন সমাজ আপন থেকেই মুক্ত সমাজ হয়ে ওঠে না; অথবা শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দাবীদার কোন রাজনৈতিক পার্টি রাজনৈতিক ক্ষমত দখল করলেই যে সকল ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত সম্পত্তির লোপ, উৎপাদনের উপায় সমূহের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা, অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সাহায্যেই শ্রমিক শোষণের অবসান বা ধনের সমবণ্টন হয় না। যন্ত্র-বিজ্ঞানের পরিপূর্ণ সুযোগ নেওয়ার অজুহাতে কখনও বা কর্ম কুশলতা বাড়াবার জন্য সমষ্টিগত প্রচেষ্টার দোহাই দিয়ে ব্যক্তির ভাল-মন্দকে অস্বীকার করা হয়৷ এর ফলে অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার উদ্দেশ্য যে ব্যক্তির উন্নতি সেটাই ব্যর্থ হয়ে যায়। এই জোর করে ওপর থেকে চাপানে৷. অর্থ নৈতিক পরিকল্পনার দ্বার সামাজিক ন্যায়নীতি ও অর্থ নৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নততর গণতন্ত্রের পরিবর্তে একনায়কশাসিত রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়!  অর্থ নৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও হতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একেবারেই সম্ভব নয়! অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ধারা অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেন, এটা তাঁদের স্মরণ রাখা দরকার।

    সর্বপ্রধান প্রশ্ন হল: কী জন্য পরিকল্পনা? ধরে নেওয়া হয়, পরিকল্পিত অর্থনীতিব দ্বারা সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হবে। অন্য কথায়, এর দ্বারা ধনের সমবণ্টনের সাহায্যে সমাজে ন্যায়-নীতির প্রতিষ্ঠা হবে। তা যদি হয় তা হলে অবশ্য ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে পরিকল্পনার সামঞ্জস্য বিধান হতে পারে। আধুনিক যন্ত্র-বিজ্ঞান যে স্তরে এসে পৌঁছেছে তাতে ব্যক্তি স্বাধীনতার সম্যক স্ফূর্তির পক্ষে যদি তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে মানুষের কল্যাণের জন্য যন্ত্র-বিজ্ঞানের অধিক উন্নতি খর্ব করতে হবে। ডাঃ ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন সৃষ্ট রাক্ষস যেমন তার স্রষ্টাকেই হত্যা করেছিল, তেমন যন্ত্র যেন তার স্বষ্টা বর্তমান সভ্যতাকেই ধ্বংস না করে সেটা দেখতে হবে। যন্ত্র যখন মানুষই সৃষ্টি করেছে তখন সে মানুষেরই সেবা করবে—মানুষের মুক্তি লাভে, মনুষ্যত্বের বিকাশে সাহায্য করবে।[mfn] যন্ত্র ইতিমধ্যে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করতে শুরু করেছে। তারপর যন্ত্রের মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকায় এবং তা লাভ খাওয়ার উদ্দেশ্যে নিযুক্ত হওয়ায় ক্রমেই মানুষকে পুতুল-নাচের পুতুলে পরিণত করা হচ্ছে। আমেরিকার বর্তমান সমাজ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এবং পৃথিবীব্যাপী তারই অনুকরণ চলছে।। মানবেন্দ্রনাথ এখানে সেই বিপদের কথাই স্মরণ করিয়ে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করছেন বর্তমান নগরকে ও যন্ত্রশিল্পকে গ্রাম অঞ্চলেও বিকেন্দ্রিত করে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের পক্ষে যে পর্যন্ত সহায়ক হবে সে পর্যন্ত তা গ্রহণ-যোগ্য হবে, কিন্তু যখনই তা মনুষ্যত্বের পক্ষে হানিকর হয়ে উঠতে থাকবে তখনই সেখানে সীমারেখা টানতে হবে। আমূল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমবায়মূলক অর্থনীতির দ্বারা সেটা সম্ভব হবে। ( অনুবাদক)[/mfn]

    একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাব অজুহাত যেমনই কেন হোক না, সমাজ উন্নয়ণের ব্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্ট পরিকল্পনায় তার স্থান নেই। বাজনীতি থেকে যদি ন্যায়-নীতিকে বিসর্জন দেওয়া হয় তবে রাজনীতির উদ্দেশ্য যে সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষ। সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। এটা অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য যে, নীতিবিরুদ্ধ অসৎ উপায়ের দ্বারা সৎ উদ্দেশ্যে পৌঁছান যায় না, অসৎ উপায়ই সম্প্রসারিত হয়ে চলতে থাকে। এই সত্য অনুসারে সোভিয়েট ইউনিয়ানে মানুষের মুক্তি আনার উপায় স্বরূপ সর্বহারার একাধিপত্যই চিরস্থায়ী ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে। এই সর্বহারার একাধিপত্যই কমিউনিজমের সঙ্গে সমার্থক হয়েছে—উপায়ই লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের (মার্কসবাদ অনুসারে ) বিলুপ্ত হবার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।” সোভিয়েট ইউনিয়ানে যদি বাস্তবিকই সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে তবে এই পরিবর্তনের জন্য যে মধ্যবর্তীকালের প্রয়োজন ছিল তার নিশ্চয় অবসান ঘটেছে। এবং এতদিনে একাধিপত্যের শেষ হওয়া উচিত ছিল। যতদিন না রুশিয়াতে একাধিপত্য শাসনের অবসান হচ্ছে এবং অন্যান্য দল ও মতের অস্তিত্ব স্বীকার করা হচ্ছে, ততদিন সেখানে উচ্চ পর্যায়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলাও অর্থহীন।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের কাজ কর্মও তেমনি নৈরাশ্যজনক। সেই জন্য গতানুগতিক “গণতান্ত্রিক-সমাজতন্ত্রের” সাফল্য সম্পর্কেও ভরসা কর যায় না। গণতন্ত্রকে নব-রূপ গ্রহণ করতে হবে ৷ গণতন্ত্রকে মানবতাবাদী ঐতিহ্যে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানের মত গণতন্ত্রকে কেবল মাথাগুণতির হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠের মধে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বিশেষতঃ মানুষ যখন তাদের সার্বভৌম রাজক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত মর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার কোন সুযোগ পায় না ৷ প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দ্বারা বর্তমানের প্রতিনিধি মারফৎ পরোক্ষ শাসনতন্ত্রকে পরিবর্তিত করতে হবে। রাজনৈতিক পার্টির চরিত্র বিচার করতে হবে তার ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচী দিয়ে ভোট ধরবার ক্ষমতা দিয়ে নয়। শুধু মাত্র মুখের কথা বা প্রতিজ্ঞার দ্বারা জনগণের নিকট ভোট ভিক্ষা করলে চলবে না, সেই পার্টির বাষ্ট্র শাসনের পূর্বতন নজির দেখিয়েই তা করতে হবে ৷ পরিচালন ব্যাপারে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের বা মতামত জানাবার কোন ব্যবস্থা নেই, আছে কেবল ব্যালট বাক্সে মাথা গুণতির ব্যবস্থা। বিচার করে দেখলে দেখা যায় যে, ব্যক্তি সত্তার পরিবর্তে এও সমষ্টিসত্তার নিকট আত্মসমর্পণ। এই ব্যবস্থার ফলে ব্যক্তিব ইচ্ছা-অনিচ্ছা জানাবার বা বুদ্ধি-বিবেচনা প্রকাশের কোন সুযোগই থাকে না।[mfn] ফলে জনসাধারণের করার কিছু থাকে না বলে জনসাধারণের বুদ্ধি বৃত্তি অনুশীলনের অভাবে কোন দিনই বাড়তে পায় না। নেতাদের, পার্টির, ডেমাগগির যারাই চালিত হতে হয়। (অনুবাদক)[/mfn] পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে নীতিবোধ শুন্য বাক্যবীরেরা জনগণকে তাদের বাক্যজাল বিস্তারের দ্বারা অভিভূত করে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে বসতে পারে। প্রজ্ঞা, সততা, জ্ঞান, নীতি ইত্যাদির কোন মূল্যই সেখানে থাকে না ৷ অথচ মানব সভ্যতার এইসব মূল্যবান গুণাবলীর সাহায্যে সমাজের রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত শোধন করার ব্যবস্থা না করলে সমাজে গণতান্ত্রিক জীবন কোন দিনই গড়ে উঠতে পারে না।

    বর্তমান জগতে মানব সভ্যতার ঐ সব মূল্যবান গুণাবলীর ধারক ও বাহক নরনারীর অভাব নেই। কিন্তু যতদিন এই অবাঞ্ছিত বাক্যবীর ডেমাগগরা ক্ষমতায় বসে থাকবে ততদিন এইসব গুণীদের নেতৃত্ব লাভের কোন আশা নেই ৷ এই তো গেল পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের দিক ।

    অন্যদিকে, একাধিপত্যশাসিত রাষ্ট্রও যদি একবার জেঁকে বসে—তা সে যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের ঘোষণা করলেও—তবে সেও এইরূপ গুণ সম্পন্ন নাগরিকের উদ্ভবে বাধা দেবে৷ এইভাবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসিতেই হোক আর একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রেই হোক মানব সমাজ এই সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমোন্নতির পথে মুক্তির উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে পারে না।

    বর্তমানের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার তথাকথিত গণতন্ত্রে যদি এইসকল মূল্যবান গুণ-সমূহের দ্বারা রাজনীতিকে বিশুদ্ধ ও প্রভাবিত করার সুযোগ সুবিধা না থাকে, তাহলে একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্র এইসব মানবিক গুণসমূহ বিকাশে বাধা দেয় বলে তার নিন্দা করা এদের মুখে সাজে না। একাধিপত্যের দ্বারা সকল দুঃখের রাতারাতি সমাধানের আপাতঃ মধুর প্রলোভনের হাত থেকে জনসাধারণকে বাঁচাতে হলে গণতন্ত্রকে আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে যে মানবতাবাদী ঐতিহ্য ছিল তা পুনরাবিষ্কার করতে হবে।

    পুনরায় ব্যক্তি মানুষকেই সকল উন্নতি-অবনতির মাপকাঠি করতে হবে। প্রজ্ঞা, সততা, বুদ্ধি-বিবেচনা ও নীতিপরায়ণতার উৎকর্ষ দিয়েই নেতৃত্বের বিচার করতে হবে। একটা অন্তসারশূন্য আকার সর্বস্ব কাঠামোটা থাকলেই দেশে যে গণতন্ত্র আছে তা ধরে নেওয়া যাবে না। আজ প্রতিটি স্বাধীনতাকামী চিন্তাশীল ব্যক্তি এক কঠিন প্রশ্ন সমাধানের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন: গণতন্ত্র কী সম্ভব? পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় ধার। বিশ্বাসী, তারা একনায়কতন্ত্রকে পরিহার করেছেন বটে কিন্তু তাঁরাও আজ এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। গণতন্ত্রের মূলনীতি যে, সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধন, তা সম্ভব হতে পারে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মুক্তবুদ্ধি, বিবেকবান ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত হবে, কারণ এঁরাই নিজেদের বিবেকের নির্দেশকে সর্বাপেক্ষা বেশী মূল্য দিয়ে থাকেন।

    নৈতিক প্রেরণাই মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে যে সু-শাসন চলবে তার নিশ্চয়তা আইন দেয় না, দেয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নীতিজ্ঞান ও বিবেকবুদ্ধি। ভাল করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, একনায়কতন্ত্রও ঐ নৈতিক প্রেরণা থেকেই অনুপ্রাণিত। সেই জন্যেই তারা বলে, সমগ্র জনসাধারণের মঙ্গল সাধনের মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই একনায়কতন্ত্র উপায় মাত্র। কিন্তু ক্ষমতার লোভ থেকে উর্ধ্বে উঠে সমগ্র দলটাই যে নীতিপরায়ণ থাকবে এ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে। সৎ অসৎ মূল্যমানের প্রকাশ ব্যক্তির মাধ্যমেই ঘটে। সুতরাং একমাত্র মুক্তবুদ্ধি বিবেকবান ব্যক্তি পরিচালিত শাসন ব্যবস্থাতেই সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হতে পারে। কারণ সর্বাগ্রে তারা তাদের নিজ নিজ বিবেকের নিকট দায়ী থাকে। বর্তমান সংকট থেকে ত্রাণ পেতে গেলে ও একনায়কতন্ত্রের প্রবল আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রের এইরূপ দার্শনিক রূপায়ণই একান্ত প্রয়োজন।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    যা বলা হ’ল তার অর্থ এই নয় যে, “জ্ঞাণী-গুণী”দের রাজ প্রতিষ্ঠিত হোক। এখানে মাত্র বলা হল যে, সমাজকে এমন ভাবে পুনর্গঠিত করা হোক যাতে প্রতিটি মানুষ তার অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তিকে বিকশিত করে তোলার অফুরন্ত সুযোগ পায়। এটি সম্ভব হয়ে উঠবে তখনই যখন মানুষ সর্বপ্রকার কায়েমী স্বার্থের প্রভাব মুক্ত হবে, যখন তার| আর লোক ক্ষ্যাপানে৷ ডেমাগগ নেতাদের জাতীয় স্বার্থ বা শ্রেণী স্বার্থের কাল্পনিক সত্তার দোহাই-পাড়া বক্তৃতায় পূর্বের মত সহজে মোহগ্রস্ত হবে না এবং এইসব মোহ-মুক্ত মানুষের হাতে বাষ্ট্রের শাসন পরিচালন ক্ষমতা ন্যস্ত হবে। কয়েক বছর অন্তর একদিন ভোটপত্র প্রদান মাত্রের মধ্যেই গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নির্বাচন যদি সার্বজনীন ভোটের দ্বারাও হয়, কিংবা নির্বাচিত সদস্যের মধ্য থেকেই মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, তথাপি গণতন্ত্র শূন্যগর্ভ আকার সর্বস্বই থেকে যায়। সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্ব ত্যাগ করে তা প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া, তা সে যত কম সময়ের জন্যই হোক, গণতন্ত্র বিরোধী এক বেকুবি ব্যবস্থা। এই হস্তান্তরিত সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্বে স্বত্ববান হয়ে, প্রতিনিধিরা যখন সরকার গঠন ক’রে বলে, ভ্রুন- সাধারণের “জন্য” সরকার গঠন করলাম, তখন যুক্তিসঙ্গত ভাবেই বলা চলে, যে-সরকার জনগণের “জন্য” ( for ) গঠিত হয়, সে-সরকারের “উপাদান” ( of ) জনগণ হতে পারে না৷ এবং তা জনগণের “দ্বারাও” ( by ) পরিচালিত হতে পারে না।

    গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত স্থানীয় গণ-সভা সমূহের ওপর ভিত্তি করে যদি এক পিরামিড আকারের রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয় একমাত্র তখনই রাষ্ট্র পরিচালন ব্যাপারে জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।[mfn] উলটো পিরামিড। কারণ এসব রাষ্ট্রে সব ক্ষমতা ওপরে, আর তলায় একেবারে শূন্য। মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রকে সে তুলনায় সিধা পিরামিড বলা হচ্ছে। কারণ এখানে সকল ক্ষমতা তলায়, মাথায় একেবারে শূন্য। এখানে সার্বভৌম ক্ষমতা লোক- সভায় কেন্দ্রীভূত থাকবে না, তা গ্রামে গ্রামে ও নগরের পাড়াতে পাড়াতে ছড়িয়ে থাকবে। অনধিক ১০০০ মানুষ বাস করেন এমন অঞ্চলকে নিয়ে এক একটি গণ-সভা গঠিত হবে এবং সকল পূর্ণবয়স্ক মানুষ সেই গণ-সভার সদস্য হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা এই সকল গণসভা সমুহের সকল গণ-সভা সমূহের দৈনন্দিন কার্য পরিচালনের (পঞ্চায়েত) থাকবে। তারা গণ-সভার দ্বারা দায়ী থাকবে ৷[/mfn]

    পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বা একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রকে বলা যেতে পারে, এইসব গণ-সভা সমূহের সর্বপ্রধান কাজ হবে জন-সাধারণকে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা এবং সুবিবেচনা ও বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী সে অধিকার ব্যবহার করতে শেখান। সমগ্র সমাজ জুড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই যে ব্যাপক ভিত্তি সেগুলি হবে জনগণকে হাতে-কলমে রাজনীতি শিক্ষা দেবার যেন এক একটি বিদ্যাপীঠ। আইনসভা সমূহের প্রতিনিধিরা অনাস্থা ভাজন হলে তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ও আইন-কানুন সমূহের ওপর মতামত দেবার ক্ষমতা থাকার ফলে এই সব গণ-সভাগুলি সমগ্র রাষ্ট্রের ওপরই প্রত্যক্ষ ও কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন করার অধিকার থাকবে একমাত্র এদেরই। এই ব্যবস্থার দ্বারা রাজনৈতিক পার্টি সমূহের দলাদলির উর্ধে গণতন্ত্রকে স্থাপন করা হবে। গুণী মানুষ তখন নিজ গুণেই জনগণের নিকট স্বীকৃতি লাভের সুযোগ পাবে। পার্টির স্বার্থরক্ষার জন্য বা পার্টির নিকট আনুগত্যের জন্য বা তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভের জন্য বা অন্য কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ পাবার প্রত্যাশায় তখন আর কাকেও চিন্তার স্বাধীনতা, নৈতিক নিষ্ঠা, নিরপেক্ষ জ্ঞানবুদ্ধিকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থা থাকবে না ।

    এই গণসভা সমূহের নিম্নলিখিত ক্ষমতা থাকবে : (১) লোকসভা ও রাজ্য বিধান সভার নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রার্থী মনোনয়ণ। (পল্লী অঞ্চলে নির্বাচনের সময় বা অন্য কোন কারণে মত বিরোধ দেখা দিলে সে মতবিরোধ মনোমালিন্যে দাঁড়ায় এবং বহুদিন ধরে চলতে থাকে। এই বিপদ এড়াবার জন্য বহু প্রার্থীর মধ্য থেকে ক্রমশঃ ছাঁটাই পদ্ধতিতে (process of elimination এই মনোনয়ন কার্য চলতে পারে। যথা, যিনি বা যাঁহারা শতকরা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম ভোট পাবেন এবং যিনি সবচেয়ে কম ভোট পাবেন তিনি বাদ পড়বেন। তার পরে যারা থাকবেন, তাঁদের নিয়ে পুনরায় ভোট হবে। এই ভাবে বাদ পড়তে পড়তে মাত্র দু’জনের মধ্যে যিনি সর্বাধিক ভোট পাবেন তিনিই সেই অঞ্চলের সকল গণ-সভার মনোনীত প্রার্থী হবেন এবং সার্বজনীন ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন।)

    (১) প্রতিনিধিগণ যাতে লোকসভায় ও রাজ্য বিধান সভায় জনগণের প্রক্ক” ইচ্ছা প্রকাশ করতে সক্ষম হয় সেই জন্য তাদের অনুক্ষণ সচেতন ও ওয়াকিবহাল রাখা;

    (৩) লোকসভায় ও রাজ্যবিধান সভায় আলোচ্য আইন-কানুন সম্বন্ধে আলোচনা ও সে সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;

    (৪) নির্বাচক মণ্ডলীর আদেশ অমান্যকারী প্রতিনিধিকে অপসারণ;

    (৫) লোকসভা বা বিধানসভায় আলোচনার জন্য যে কোন আইনে খসড়া রচনা ও প্রেরণ;

    (৬) লোকসভা, বিধানসভা বা শাসন পরিচালন বিভাগ কর্তৃক আ কোন কাজ সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;

    (৭) স্থানীয় জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা (মাধ্যমিক পর্যন্ত), পথ ঘাট, উৎপাদক ক্রেতা সমবায়, নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা, ছোটখাট অপরাধের বিচার প্রভৃতি।

    এই সকল গণ-সভা হবে জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সমন্বয় সাধনের জন্য এ দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ গণ-সভার ওপর থাকবে পিরামিডের চূড়ার মত লোকস বা পার্লামেন্ট ।

    গণতন্ত্রকে সম্ভব করে তোলার জন্য যে অবস্থা সৃষ্টি করা প্রয়োজন সে সম্বন্ধেই উপরি উক্ত কথাগুলি বলা হল। গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতন ও সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারা নিজ নিজ বৃত্তি ও সম্ভাবনা সমূহকে বিকশিত ও সম্ভোগ করার জন্য ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা; এবং সেই ইচ্ছা পূরণের পথে যে সব বাধা-বন্ধন দেখা দেবে সেই সব বাধা-বন্ধন মুক্তির জন্য মানুষকে উদগ্র করে তোলা; এই সকল বাধা-বন্ধন মুক্ত হতে মানুষ যে নিজের চেষ্টাতেই পারে, মানুষ নিজেই যে নিজের জীবন ইচ্ছামত গড়ে তুলতে পারে এই প্রত্যয় জাগিয়ে তোলা; সংস্কার মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তা করার জন্য মানুষের মনে সাহস ও শক্তি সঞ্চারিত করা; এবং নিজেদের স্বাধীনতা পরের হাতে তুলে দিয়ে (পার্টি বা ডিকটেটরের হাতে ) দাসত্বের নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবনের ওপর ঘৃণা জাগিয়ে তোলা। গণতন্ত্রকে যদি মানুষের জীবনে রূপায়িত করে তুলতে হয় এবং তা প্রতিরক্ষার জন্য সামর্থ্য লাভ করতে হয়, তা হলে যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন রেনেসাঁস আন্দোলন জাগিয়ে তুলতে হবে।[mfn] স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দু’দশখানি গ্রাম বা মহকুমা, এমনকি জেলা পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে হয়। সেইজন্য পরোক্ষ নির্বাচনের দ্বারা তিনটি স্তরে (অঞ্চল পঞ্চায়েত, ব্লক পঞ্চায়েত, জেলা পঞ্চায়েত) এই সংগঠনটি থাকবে। এইখানে উল্লেখযোগ্য যে বর্তমান পঞ্চায়েত-রাজ আইন মানবেন্দ্রনাথের গণ-সভার আদর্শেই রচিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা কেবলমাত্র স্বায়ত্ত শাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এর ফলে অতি সহজেই জনগণকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে রাষ্ট্রকে মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। (অনুবাদক) [/mfn]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এই রূপ পরিবেশ গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে যে স্বাধীন যুক্তিসঙ্গত চিন্তার স্ফুরণ হতে থাকবে তার ফলে মানুষের উচ্চতর গুণাবলীসমূহ সার্থকতার পথে পদক্ষেপ করবে। সভ্যতার আদিকাল থেকে মনুষ্য সমাজ যে সকল সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন অনুসরণ করে আসছে সেই সব নৈতিক অনুশাসন মেনে চললেই সমাজের সংহতি ও ভারসাম্য রক্ষিত হবে এবং মানুষও সুখ শান্তি প্রগতির পথে এগিয়ে চলতে পারবে। তখন এর জন্য আর শ্রেণী বা জাতির কল্যাণে ব্যক্তিকে আত্মত্যাগ করতে বাধ্য ক’রে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টার প্রয়োজন হবে না। যে সকল ব্যক্তি এইরূপ নৈতিক জীবন যাপনে উৎকর্ষ লাভ করতে পারবেন তাঁরাই চিন্তাশীল মানুষের নিকট সম্মানিত হতে থাকবেন এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় রূপে গণ্য হবেন। তখন লোক ক্ষ্যাপানো ডেমাগগদের দিন ফুরিয়ে যাবে। তখন কিছুদিন অন্তর নির্বাচনের সময় এক খণ্ড কাগজ ব্যালট বাক্সে ফেলেই গণতন্ত্রের সকল অধিকার ফুরিয়ে যাবে না—রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে অধিকারও থাকবে। তখন জনগণ আর কেবল মাত্র “জনতা” মাত্রই থাকবে না—সংহত হয়ে উঠবে।

    নবরূপায়িত গণতন্ত্র বাস্তবে রূপ নিয়ে গড়ে উঠতে অবশ্যই দেরী হবে। কিন্তু যতদিন না গণতন্ত্রের সে রূপায়ণ হচ্ছে ততদিন সেই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রেই এমন একটি সংবিধান রচনা করতে হবে যাতে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় দেশের সৃজনশীল প্রতিভা, মুক্ত বুদ্ধি এবং নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের স্থান হয়, যার ফলে তাঁরা মন্ত্রী প্রমুখ শাসনকার্য পরিচালকবর্গকে তাদের পরামর্শ ও প্রভাবের সাহায্যে পথ প্রদর্শন করতে পারেন। এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র একদিকে যেমন জনগণের দ্বারা নির্বাচন ভিত্তিক হবে, অন্য দিকে তেমনি উচ্চ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে বেছে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে স্থান দেবার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। যতদিন না সমগ্র সমাজের জ্ঞান-বুদ্ধি ও নৈতিক মান যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত হয়ে উঠছে ততদিন হয়তো কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই সমাজের গুণীজ্ঞানী ব্যক্তিদের আইন সভা সমূহের মধ্যে আনা সম্ভব হবে না। অথচ জনসাধারণের বর্তমান অনগ্রসর অবস্থায় রাষ্ট্রের ওপর এ সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান নীতি-নিষ্ঠ ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের ব্যবস্থা করতে না পারলে গণতন্ত্র সার্থক হয়ে উঠবে না ৷

    এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টে যে রাজ্য সভা (Council of State) থাকবে তা গঠিত হবে বৈজ্ঞানিক, ধীমান, চরিত্রবান, জ্ঞানী ও নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এবং এই রাজ্যসভাই মন্ত্রীবর্গকে জরুরি সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনকার্য পরিচালন ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে চলবে। খাদের নিয়ে এই রাজ্যসভা গঠিত হবে তাঁরা সাধারণত: দলগত রাজনীতির উর্ধে থাকতেই ভালবাসেন। তাই তাঁদের পেশাদার রাজনীতিকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। অতএব রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের মূল্যবান অবদান যদি পেতে হয় তা হলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে: এঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিক, বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ঐতিহাসিক এবং দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতি অন্যান্য সৃজনশীল কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সংঘ তাদের প্রতিনিধি স্বরূপ নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির নাম রাজ্যসভার সদস্যপদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তাঁদের রাজ্যসভায় মনোনয়ন করবেন। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে এই সকল সংঘের সহিত যুক্ত নন অথচ অনুরূপ গুণের অধিকারী এইরূপ কয়েকজনকেও মনোনীত করতে পারবেন। ধনী ও কায়েমী স্বার্থের প্রভাব এড়াবার জন্য বেতনভোগী কর্মচারী ছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদার হিসাবে বা অন্যভাবে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে স্বার্থজড়িত থাকবেন তাঁরা যেন এই রাজ্যসভার সদস্য হতে না পারেন, সেইরূপ ব্যবস্থা থাকবে। এই রাজ্য সভার ওপরই অর্থ নৈতিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনার ভার থাকবে এবং সেই পরিকল্পনা কার্যকরী করে তোলার জন্য কাজকর্ম তদারকী করার অধিকারও এদের থাকবে।

    প্রারম্ভেই সমাজের অর্থ নৈতিক জীবন যেন ধনীদের দুর্নীতিপূর্ণ ও সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্ত হয়ে উঠতে পারে সেই রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তার ফলে আরো বেশী সংখ্যক মানুষ স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়তঃ এই সব স্বাধীন- চিন্তাশীল ব্যক্তিদের তখন জন স্বার্থের বিশ্বস্ত রক্ষক রূপে পাওয়া সম্ভব হবে এবং তাঁরাও এই সব কায়েমী স্বার্থবানদের প্রভাবমুক্ত হয়ে জনকল্যাণকে বাস্তবে রূপায়িত করতে সক্ষম হবেন। গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশের পূর্বে এই মধ্যবর্তী সময়ে যদি মাথা-গুণতির দ্বারাই গণতন্ত্রের প্রতিনিধি নির্বাচন চলতে থাকে তা হলে সমাজ জ্ঞানী-গুণীর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অথচ এই সকল জ্ঞানী-গুণীরাই কেবল সমাজকে সত্যকার গণতান্ত্রিক মুক্তির দিকে পরিচালিত করে নিয়ে যেতে পারে।

    র‍্যাডিক্যাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের অর্থনীতিকে এরূপভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন যাতে মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণের সম্ভাবনা না থাকে। মানুষের মানসিক ও সুকুমার শক্তি ও বৃত্তি সমূহের বিকাশ নির্ভর করে ব্যক্তির জীবনধারণের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব পূরণের ওপর। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান মানের উদ্দেশ্যে রচিত পুনর্গঠিত অর্থনীতিই হবে আমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি (র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি)।

    এই নতুন সমাজের অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষের ব্যবহারের জন্য উৎপাদন ও প্রয়োজন অনুসারে তা বণ্টন৷[mfn]১৮শ সূত্র দ্রষ্টব্য। বর্তমানের মত কেবল বাজারে বিক্রী করে মাত্র লাভের উদ্দেশ্যেই উৎপাদন হবে না; অর্থাৎ প্রত্যেক কর্মক্ষম মানুষের জীবিকার্জনের জন্য কাজ দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটাবার উদ্দেশ্যে উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকবে। (অনুবাদক)[/mfn]

    এই সমাজের রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যক্তির সার্বভৌম ক্ষমতা- হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকবে না। কারণ তাতে জনগণকে সবপ্রকার কার্যকরী ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত কবা হয়। স্থানীয় গণ-সভা সমূহের নাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালন কার্যে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণেব ব্যবস্থাই হবে এই নতুন সমাজেব রাষ্ট্রীয় ভিত্তি।

    জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞান-বিদ্যা চর্চার ব্যাপক ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞান ও অন্যান্য সৃজনমূলক কাজে উৎসাহ দানই হবে এই নতুন সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

    যে হেতু এই নতুন সমাজ যুক্তিবাদ ও জ্ঞানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে সেই হেতু এই সমাজের সব কিছু সুপরিকল্পিতই হবে। কিন্তু এই পূর্ব-পরিকল্পনাতেও মানুষের স্বাধীনতা যাতে সম্পূর্ণরূপে বজায় থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এই নতুন সমাজ রাজনৈতিক, অর্থ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব দিক দিয়েই গণতান্ত্রিক হবে এই গণতন্ত্র প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যক্ষীভূত বাস্তব গণতন্ত্র হবে এবং স্বকীয় শাসনের মধুস্বাদ ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বারাই পেতে থাকবে সেই হেতু আপৎকালে প্রত্যেকটি মানুষই এই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়বে এবং রক্ষা করতেও সমর্থ হবে।[mfn]প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর ইউরোপে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র সমূহের দুর্বলতার জন্যই কমিউনিষ্ট ও ফ্যাসিষ্ট একনায়কতন্ত্রকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয় নি। এখানে সেই দুর্বলতা খণ্ডনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। (অনুবাদক)[/mfn]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এই আমূল গণতন্ত্রের ( র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি ) আদর্শ বাস্তবে রূপায়িত হবে এক নতুন মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মুক্তবুদ্ধি নর-নারীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায়। তারা জনসাধারণের সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়ে নিয়ে তাদের ভাবী শাসক হবার উদ্দেশ্যে কাজ করবে না; তারা হবে তাদের বন্ধু, উপদেষ্টা ও পথ প্রদর্শক মাত্র। যে হেতু তাদের উদ্দেশ্য প্রত্যেকটি মানুষের মুক্তি আনা, সেই হেতু এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে তাদের আচরণ হবে যুক্তি ও নীতিসম্মত জনসাধারণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যতই বাড়বে তাদের প্রচেষ্টাও ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অবশেষে শিক্ষিত ও মার্জিত জনমতের সমর্থনে ও সুবিবেচনার সঙ্গে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের (action of the people) দ্বারা গড়ে উঠবে র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র। ক্ষমতা যদি কতিপয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় তা হলে জনসাধারণের মুক্তিও দূরে সরে যায়; র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্টদের এই বিশ্বাসের জন্য তারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে না।

    তারা স্থানীয় গণসভা সমূহে জনগণকে সংগঠিত করে তুলবে এবং কালক্রমে এইসব গণ-সভাই গণতান্ত্রিক সার্বভৌম ক্ষমতার এক একটি যন্ত্র হয়ে উঠবে। যেহেতু র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র সমাজের সকল মানুষের প্রত্যক্ষ সমবায়ে গড়ে উঠবে তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সমার্থক শব্দ হবে বা উভয়েই একাত্ম হয়ে যাবে, এবং যেহেতু তখন শাসিত জনগণ ও শাসক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন তফাৎ থাকবে না, সেই হেতু তখন বাষ্ট্র আর দমন-পীড়নের যন্ত্র থাকবে না। কেবল তখনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণের উপাদানে (of) গঠিত এবং জনগণের দ্বারাই (by) পরিচালিত হওয়া সম্ভব হবে।

    শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব ও খণ্ডিত না করে সমগ্র সমাজের প্রগতি ও প্রাচুর্যের জন্য সমাজকে পুনর্গঠিত করা একমাত্র গণশিক্ষার দ্বারাই সম্ভব। স্থানীয় গণসভাগুলি হবে জনগণের রাজনীতি ও সমাজনীতি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ। এই র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রের গঠন ও কার্যপ্রণালী এমনই হবে যে যার ফলে স্বার্থশূন্য অনাসক্ত মানুষদের সমাজের পুরোভাগে আনবার সুযোগ করে দেবে। এরূপ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র তখন আর বিশালকায় ভয়ঙ্কর জন্তু লেভিয়াথানের মত সন্দেহ ও ভয়ের বস্তু থাকবে না।[mfn] একনায়কতন্ত্রের দ্বারা জোর করে ওপর থেকে জনসাধারণের ওপর ভাল ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলেই ভাল হয় না, কারণ মূল্য-value জোর করে সৃষ্টি করা যায় না। তা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। (অনুবাদক)[/mfn]

    মানুষ চিন্তাশীল জীব; এই চিন্তাশীলতার জন্যই মানুষ এই পৃথিবীকে নিত্য নতুন ভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে, এবং এই চিন্তা কার্য মানুষ ব্যক্তিগত ভাবেই করতে পারে, সমষ্টিগত ভাবে পারে না। বৈপ্লবিক ও মুক্তিকামী সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের কর্তব্য হল, এই ঐতিহাসিক সত্যটির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া। মানুষের মস্তিষ্ক একটি উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ এবং তাতে উৎপন্ন হয় সব চেয়ে বড় বৈপ্লবিক জিনিষ। সকল বিপ্লবেরই মূলে আছে পুরাতনের পরিবর্তে নতুন গড়ে তোলার জন্য সৃজনাত্মক চিন্তা। নিজেদের সৃজনীশক্তি সম্বন্ধে সচেতন, নতুন সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দুঃসাহসিক ভাব ও ভাবনায় অনুপ্রাণিত এবং মুক্ত মানুষের সহযোগিতায় সৃষ্ট এক মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠবে এই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ। নিষ্কাম মুক্তবুদ্ধি মানুষরা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসন কার্যে ব্রতী হবেন একমাত্র তখনই মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল চূর্ণ হয়ে সকলের জন্য মুক্তি আসবে। 

  • রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিজম বলশেভিজম

    রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিজম বলশেভিজম

    এক। অবতরণের উপলক্ষ

    এখানে যে লেখাটা পেশ করছি সেটার মূল অংশটা বেশ আগের লেখা। বছর তিনেক আগের। রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি ছিল এই স্বল্পদৈর্ঘ্য-রচনার ভরসাবিন্দু। আমাদের দেশের ড. সেলিনা জামানের সম্পাদনা-করা (সম্ভবত ‘কিশোর রবীন্দ্র-সঞ্চয়ন’ নামের) একটা বইয়ে চিঠিটা পেয়েছিলাম। চিঠিটার আদি উৎস জানা এবং এর বয়ানের অবিকলত্ব সম্পর্কে শতভাগ নিঃসংশয় হওয়ার প্রায়-অপ্রয়োজনীয় বাতিক না মেটাতে পারার কারণে এই লেখাটা কোথাও আর ছাপতে দেওয়া হয় নি এত দিন।

    বাতিক এখনও মেটে নি। তবু একটা বিশেষ উপলক্ষে এটা এখন ছাপতে ইচ্ছে করছে। ঠাকুরের চিঠিটা ছিল জুলাই মাসের ৩১ তারিখে লেখা। তার মানে শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝিতে। ঝুম বরষায়। উপরন্তু ২২শে শ্রাবণের খুব কাছাকাছি কোনো একটা দিনে। সম্ভবত ১৬ই শ্রাবণে। বিশেষ কোনো উপলক্ষ-দিবস ধরে কখনো কিছু লিখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু এবারের শ্রাবণে কয়টা দিন ঠাকুরের সাথেই থাকতে হয়েছিল। কারণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর শহীদ ইকবাল তাঁদের ‘চিহ্ন’ পত্রিকায় ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ জাতীয় কিছু-একটা লেখা দিতে বলেছিলেন। বিচিত্র কারণে তাঁর ফরমায়েশ আমার শিরোধার্য-প্রায়। লেখাটা, সুতরাং, আমি দাঁড় করালাম ঠিকই কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। বেরিয়ে গিয়েছে ‘চিহ্ন’। লেখাটা যে আমি করেই ফেলতে পেরেছিলাম, সে কথা তাঁদেরকে জানানো হয় নি দেরি করার লজ্জায়।

     

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    ভেবেছিলাম সেটা এখানে [দৈনিক বণিক বার্তায়] আমার এই [“আত্মঘাতী পরিস্থিতি”] কলামে ছাপার জন্য দেবো। কিন্তু, যেহেতু ইকবালের জন্য লেখা, তাই তাঁর হাতে না দিয়ে অন্য কোথাও “সম্পর্ক: রবীন্দ্রনাথের সাথে” নামে আমার সেই লেখাটা এখানে দিতে সাহস করলাম না— শ্রাবণ পেরিয়ে আশ্বিন এসে গেল যদিও। পরে কোথাও সেটা হয়তো ছাপা হবে কিংবা হবে না, সেটা পরের কথা। আপাতত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগকে উপলক্ষ করে এ শহরের বকুলতলায় “নিনাসা” নামের একটা কেমন-যেন-অন্যরকম বাসায় এসে আশ্বিনের অঝোর বৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের পবিত্র প্রেতাত্মা নতুন করে চেপে বসেছে মাথায়। নামছে না। আর-কিছু ভাবাই যাচ্ছে না। উপায়ন্তর না দেখে প্রেত-পুরাতন এই রচনাটির আশ্রয় নিয়েছি। শ্রাবণের বিলম্বিত শ্রাদ্ধে আশ্বিনের অঞ্জলি এ লেখা।

    দুই। বলশেভিক নিষ্পাপতার প্রতি বঙ্কিম-নায়িকার বিগত কটাক্ষ

    বিগত ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে সত্যিকারের নতুন ধারার প্রকাশনা-সাংবাদিকতা-প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস প্রকাশ করে “সহগামী খুনখারাবি” নামে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি গোপন ভিডিওচিত্র। বিষয় ছিল ইরাকে মার্কিন সেনাদের নির্বিচার খুনের সামরিক খতিয়ান। জুলাই মাসে তারা প্রকাশ করে “আফগানিস্তান যুদ্ধের ডায়েরি” নামে প্রায় ৭৫ হাজার গোপন মার্কিন সামরিক নথিপত্র প্রকাশ করে দেয়। তারপর ডিসেম্বর মাসে “ইরাক যুদ্ধের ডায়েরি” নামে তারা উন্মোচন করে প্রায় চার লক্ষ গোপন মার্কিন সামরিক নথিপত্র। কেঁপে ওঠে পৃথিবী। সারা দুনিয়ার শাসক-মিডিয়া একুশ শতকের সর্বপ্রধান (আমার বিবেচনায়) চিন্তক-দার্শনিক-যোগাযোগতাত্ত্বিক-অ্যাক্টিভিস্ট-সম্পাদক-সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে শুরু করে কুৎসা রটনার এক অবিশ্বাস্য অভিযান।

    পূর্বাপর এই পরিপ্রেক্ষিতে সে বছর ৮ই ডিসেম্বর তারিখের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম-এর আকাশ-বাতায়নে প্রকাশিত হয় আমার “জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কি খ্যাপা বিজ্ঞানী, বিন লাদেন, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী?” নামের একটি লেখা। সেখানে কথাপ্রসঙ্গে আমি “পুরো মার্কিন রাষ্ট্র-প্রণালীর ক্রমাগতভাবে ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক হয়ে ওঠার ভীতিকর ও … আগ্রাসী পরিস্থিতি”র কথা বলাতে ‘প্রতিক্রিয়া’ প্রকাশ করেন অগ্রজ বন্ধুভাজনেষু জনাব ওমর তারেক চৌধুরী।

    লেখার নিচে মন্তব্যের ঘরে তিনি প্রশ্ন তোলেন: “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একাধারে ফ্যাসিস্ট এবং বলশেভিক হয়ে উঠতে পারে?” এবং এরকম নিষ্পাপ একটি প্রশ্নের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে তিনি করেন ভয়ানক একটি লেনিনীয় ভঙ্গির বিদ্রুপ: “এ তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখার মতো প্রশংসনীয় ভাবনা”। এবং পরিশেষে, অদ্ভুত অসঙ্গতিপূর্ণ প্রশংসা-বাক্য পেশ করেন তিনি: “একটি চমৎকার, পরিপূর্ণ লেখা উপহার দেবার জন্য সেলিম রেজা নিউটনকে অভিনন্দন …”।

    তারেক ভাই আরো কথা তুলেছিলেন। সেদিকে আমি এখন যাব না। বিদ্রুপ এবং প্রশংসা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ওসব জিনিস সর্বদাই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। বর্তমান রচনায় আমি বরং ওমর ভাইয়ের মতো পূর্ণবয়স্ক বলশেভিক-বামপন্থীর নিষ্পাপ অন্ধবিশ্বাসকে বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকার চোখ দিয়ে অতি সামান্য কটাক্ষ-ইশারা করব শুধু। এবং বিনিময়ে, যেকোনো ককটেল খেতে আগ্রহী থাকব। তথাপি পাঠক যেন আমার নিজের জীবনের সুদীর্ঘ বলশেভিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিশেষত তারেক ভাইয়ের জন্য আমার নিষ্পাপ ভালোবাসা বিস্মৃত না হন, সেই অনুরোধ জানিয়ে রেখে শুরু করছি চোখের কাজ। বিস্তারিত ‘সরন-প্রতিসরণীয়’ কায়দায় নয়। কটাক্ষ-ইশারায় মাত্র। বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের নায়িকার ভঙ্গিতে। হাজার হোক আমাদের মরমী সাধক জালালের গানে আছে: “প্রেমিক ভঙ্গিতে যায় চেনা”।

    তিন। ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক মানুষখেগোর দল

    ড. সেলিনা জামানের সম্পাদনা-করা যে বইয়ের কথা এ রচনার শুরুতে উল্লেখ করেছি, সেখানে আছে আমাদের এতদিন-অপঠিত একটি চিঠি। “দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি”। ঠাকুরের এটি ১৯৩১ সালের রচনা। চিঠিটা এবার হুবহু পড়ে নেওয়া যাক:

    ওঁ

    [শান্তিনিকেতন]

    কল্যানীয়েষু,

    নীতু, তোর চিঠি পেয়ে খুশি হলুম। জর্মানিতে ব্যাভেরিয়ার ভাবগতিক ভাল লাগছে না। যেখানে দারিদ্রে মানুষ দুর্বল সেইখানেই যেমন মারী মড়ক জোর পায় তেমনি আজকালকার য়ুরোপে দুর্ভিক্ষ যতই ছড়িয়ে পড়ছে ততই ফাসিজ্ম এবং বল্‌শেভিজ্‌ম জোর পেয়ে উঠছে। দুটোই অস্বাস্থ্যের লক্ষণ। মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায় এ-সব কথা সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না। পেটের জ্বালা বাড়লে তখনি যত দুর্বুদ্ধি মানুষকে পেয়ে বসে। বল্‌শেভিজ্‌ম ভারতে ছড়াবে বলে আশঙ্কা হয় — কেননা অন্নকষ্ট অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে — মরণদশা যখন ঘনিয়ে আসে তখন এরা যমের দূত হয়ে দেখা দেয়। মানুষের পক্ষে মানুষ যে কি ভয়ংকর তা দেখলে শরীর শিউরে ওঠে — মারের প্রতিযোগিতায় কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে সেই চেষ্টায় আজ সমস্ত পৃথিবী কোমর বেঁধেছে —মানুষের হাত থেকে বাঁচবার জন্যেই মানুষ কেবলই ভয়ংকর হয়ে উঠছে — এর আর শেষ নেই — খুনোখনির ঘুর্ণিপাক চলল।

    আর যাই করিস এই-সব মানুষখেগো দলের সঙ্গে খবরদার মিশিস নে। য়ুরোপ আজ নিজের মহত্ত্বকে সব দিকেই প্রতিবাদ করতে বসেছে। আমাদের দেশের লোক — বিশেষ বাঙালি — আর কিছু না পারুক, নকল করতে পারে — তাদের অনেকে আজ য়ুরোপের ব্যামোর নকল করতে লেগেছে। এই নকল মড়কের ছোঁয়াচ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলিস। নিশ্চয় তোদের ওখানে এই-সমস্ত দানোয়-পাওয়া ভারতবাসী অনেক আছে, তাদের কাছে ভিঁড়িস নে, আপন মনে কাজ করে যাস।

    …

    ইতি

    দাদামশায়

    ৩১শে জুলাই ১৯৩১

    চার। রাশিয়ার চিঠি: লেনিনীয় জেল-সমাজতন্ত্রের গুরুতর গলদ

    বিশ্বের বৃহত্তম বাধ্যতামূলক, দাসত্বপরায়ন শ্রমশিবির ছিল তথাকথিত কমিউনিস্টদের রাশিয়ায়। সবচেয়ে বেশি মানুষ জেলখানায় ছিলেন লেনিন-ট্রটস্কি-স্তালিনের বহুল-প্রচারিত ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাশিয়ায়। “মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ” বানাতে গিয়ে বলশেভিকরা ‘ভুল করে’ বিশাল একটা জেলখানা বানিয়ে ফেলেছিল পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ এলাকা জুড়ে। এই দুঃখেই সম্ভবত বর্তমান দুনিয়ার সবচাইতে বেশি উদ্ধৃত প্রফেসর নোম চমস্কি বলেন, “লেনিনকে আপনি যদি বামপন্থী মনে করেন, আমি তাহলে বামপন্থী নই।”

    আর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁর কাছে ইস্কুলের দেওয়ালকে পর্যন্ত জেলখানা মনে হতো (ন্যায্যতই), যিনি সারাজীবন বলেছেন যে “মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায় এ-সব কথা সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না”, সেই রবীন্দ্রনাথের “রাশিয়ার চিঠি”কে বলশেভিক-সমাজতন্ত্রের [আদতে কর্তৃত্বপরায়ন রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের] সাফাই হিসেবে প্রচার করা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। অথচ, মস্কোতে নামার পর “যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে” অবস্থা সত্ত্বেও বলশেভিকদের একেবারে গোড়ার “গুরুতর গলদ” দেখতে একচুলও ভুল হয় নি রবীন্দ্রনাথের। রাশিয়ার চিঠির শুরুতেই আমরা তাই দেখি:

    রাশিয়ায় একেবারে গোড়া ঘেঁষে … সমস্যা সমাধান করবার চেষ্টা চলছে। তার শেষ ফলের কথা এখনো বিচার করবার সময় হয় নি, কিন্তু আপাতত যা চোখে পড়ছে তা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। …

    এর মধ্যে গলদ কিছুই নেই তা বলি নে; গুরুতর গলদ আছে। সেজন্যে একদিন এদের বিপদ ঘটবে। সংক্ষেপে সে গলদ হচ্ছে, শিক্ষাবিধি দিয়ে এরা ছাঁচ বানিয়েছে — কিন্তু ছাঁচে-ঢালা মনুষ্যত্ব কখনো টেঁকে না — সজীব মনের তত্ত্বের সঙ্গে বিদ্যার তত্ত্ব যদি না মেলে তা হলে হয় একদিন ছাঁচ হবে ফেটে চুরমার, নয় মানুষের মন যাবে মরে আড়ষ্ট হয়ে, কিম্বা কলের পুতুল হয়ে দাঁড়াবে …

    ১৯৩০ সালে লেখা রাশিয়ার চিঠির সাথে ঠিক পরের বছরই জার্মানি-প্রবাসী নাতিকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ১৯৩১ সালের বহুল-অপ্রচারিত চিঠিটা মিলিয়ে পড়তে বলি, পাঠক। বলশেভিক-রাষ্ট্রপন্থা যে ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর তা বুঝতে ইতিহাসের কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট; তবু আপাতত রবীন্দ্রনাথের চিঠির দোহাই দিচ্ছি তাঁর “রাশিয়ার চিঠি” বাংলাদেশের বলশেভিক-বামপন্থীদের বিশেষ আদরের ধন, তাই।

    আর্টওয়ার্ক: রেডটেরর
    জার্মান এন্টি-বলশেভিক পোস্টার/১৯১৯
    সূত্র: পাবলিক ডোমেন

    “ফাসিজ্ম এবং বল্‌শেভিজ্ম” উভয়ই ঠাকুরের কাছে “অস্বাস্থ্যের লক্ষণ”, “য়ুরোপের ব্যামো”— “মরণদশা যখন ঘনিয়ে আসে তখন এরা যমের দূত হয়ে দেখা দেয়”। তাঁর মতে দুটোই “খুনোখনির ঘুর্ণিপাক” মাত্র, যারা “জোর পেয়ে” ওঠে “দারিদ্র”জনিত “মানুষের দুর্বলতা”, “দুর্ভিক্ষ”, “মারী মড়ক”, “পেটের জ্বালা” তথা “অন্নকষ্ট” ইত্যাদি কারণে। তাই, “ফাসিজ্ম এবং বল্‌শেভিজ্ম” উভয়ই তাঁর কাছে “মানুষখেগো দল”।

    বাকি থাকল “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একাধারে ফ্যাসিস্ট এবং বলশেভিক হয়ে উঠতে পারে” সেই প্রশ্ন। খেয়াল করলে বোঝা যাবে, ফ্যাসিবাদ এবং বলশেভিক-রাষ্ট্রপন্থা উভয়ই আদতে চূড়ান্ত কর্তৃত্বপরায়ন, সর্বাত্মক-স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্রপ্রণালী। উভয়েরই গোড়ার জোরটা গায়ের জোর, বলপ্রয়োগ, সঙ্গে “সমাজতন্ত্রের” বুলি (হিটলারও নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলতেন)। এদের উভয়েরই মূল শত্রু জনসাধারণের স্বাধীনবুদ্ধি। উভয়েরই মূল বিশ্বাস এই যে “মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায়”— যা “সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না।”

    ইউরোপের এই ব্যামো এখন ধরেছে একদা-স্বাধীনতাকেন্দ্র অধুনা-নিওলিবারাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। নতুন ধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস এবং জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ‘গণতান্ত্রিক বামপন্থী’ ওবামা-প্রশাসনের কার্যকলাপে তার সাম্প্রতিকতম প্রমাণ। প্রমাণ ব্র্যাডলি ম্যানিঙের রেডিমেড বিচার-শাস্তির প্রক্রিয়ায়। প্রমাণ এডওয়ার্ড স্নোডেনের সর্বসাম্প্রতিক এনএসএ-উন্মোচনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাস্তবতা হার মানিয়েছে রুশ-বলশেভিকদের ‘চেকা’, তথাকথিত কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির ‘স্ট্যাসি’, এমনকি হিটলারের ফ্যাসিস্ট জার্মানির ‘গেস্টাপো’কে হার মানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই এখন ইউএসএ বলতে বোঝেন: “ইউনাইটেড স্ট্যাসি অফ অ্যামেরিকা”। আর, অ্যাসাঞ্জ তো সেই ২০০৬ সালেই তার ব্যক্তিগত ব্লগ “আইকিউ ডট অর্গ”-এ লিখেছিলেন: “ইউনাইটেড সোভিয়েটস অফ অ্যামেরিকা”।

    পাঁচ। ইউরোপের মহত্ব, ইউরোপের ব্যামো

    বলশেভিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যারা পার্টির হুকুমে চিন্তাপ্যারেড করেছি সেই কৈশোর থেকে, তারা খুবই ভালো জানি: মানুষের স্বাধীনবুদ্ধির কোনো স্থান নাই বলশেভিক পার্টি-রাষ্ট্রগুলোতে। পশ্চিম “য়ুরোপের ব্যামোর নকল” (প্রথমত পূর্ব ইউরোপের এবং ক্রমশ সারা পৃথিবীর) বলশেভিক-বামপন্থীরা অনেক করেছেন।

    চলুন, এবার “য়ুরোপের মহত্ত্বের” দিকে তাকাই: সেটা এক দিকে ব্যক্তিস্বাধীনতাকামী, পুঁজিবাদবিরোধী, রেনেসাঁজনিত ধ্রুপদী উদারনীতিবাদ, এবং অন্য দিকে মার্কসেরও জন্মের আগে জন্মানো সমাজতন্ত্রী শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিবেণীসঙ্গমে বেড়ে ওঠা নৈরাজ্যবাদ, তথা মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র।

    বঙ্কিমের নায়িকার কটাক্ষ-ইশারাটুকুই থাকল আজ। ইট-পাটকেল-ককটেল আসলে (কিংবা না-আসলেও) “বাকি কথা পরে হবে”।

    …………………

    (লেখাটা ছাপা হয়েছিল দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকায় লেখকের “আত্মঘাতী পরিস্থিতি” কলামের ১০ম কিস্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে। বাংলাদেশে তখন যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটতে শুরু করেছে।)

  • ঐতিহ্য : বয়ান ও সংবেদের মিথষ্ক্রিয়ার অনুভব

    ঐতিহ্য : বয়ান ও সংবেদের মিথষ্ক্রিয়ার অনুভব

    • স্বাধীন সেন

    কোনো কিছুই লিখতে মন চাইতেছিল না। বিভিন্ন কারণেই। শারিরীক জরাগ্রস্ততার কারণে। আরও কয়েকটি কাজে মনোযোগ থাকার কারণে। বিষণ্ণতা আর উন্মুলতার কারণে। কোনো কিছু লেখালিখি বা বলাবলিকে ইদানিং বেহুদা মনে হওয়ার কারণে। কোনো কিছু ফেসবুকে লিখলেই নানাভাবে তকমা পাওয়া আর অ্যাবিউজড হওয়ার ভয়ে ও বেদনার্ত হওয়ার আগাম আতঙ্কে। বাচনিক নৃশংসতাকে আমি শরীরী ও মনস্তাত্ত্বিক নৃশংসতা ও সহিংসতার সঙ্গে সঙ্গে গুরুতর নৃশংসতা ও নির্মমতা বিবেচনা করতে শুরু করার কারণে। আদৌ বাক–স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার অনুভব বিভ্রম কীনা সেই বোধে ও জিজ্ঞাসার আক্রান্ত হওয়ার কারণে। আর নিরেট আলস্যজনিত কারণে। লিখতে গেলে সংহতিবোধ তৈরি করার দায়, রেফারেন্স ঘাঁটার খুঁতখুঁতানি, কাউকে আঘাত করলাম কীনা সেই আশংকার কারণেও।

    তবুও নববর্ষের প্রাক্কালে কয়েকটি কথা লিখলাম। সকল কারণ উপেক্ষা করেই। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরের প্রাক্কালে। বিগত বছরে আমরা যেমন ফ্যাসিস্ট একটি সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছি, তেমনই বহু মানুষকে নৃশংসভাবে নিপীড়িত ও নিহত হতেও দেখেছি। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে। সেই হত্যা, অত্যাচার, আর বৃহৎ পরিসরে ক্ষমতার নির্মমতা প্রথমবার ডিজিটাল দুনিয়ার মারফতে দেখেছি। এই দেখার ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আমাকে শারীরিকভাবেও আক্রান্ত করেছে। যেহেতু আমার কয়েকটি ব্যাধি প্রবলভাবেই মনস্তাত্ত্বিক দশার সঙ্গে সম্পর্কিত বা সাইকোসোমাটিক।

    শিল্পী: কামরুল হাসান

    ফ্যাসিজমকে যদি আমরা ক্ষমতার কর্তৃত্ব, দাপট, নৃশংসতা, আধিপত্যশীলতা, প্রাবল্য আর চরম নির্মমতার একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে ক্ষমতার বহুবিধ নড়াচড়া, সক্রিয়তা ও কুশীলবদের যুক্ততা নিয়ে ঐতিহ্য প্রসঙ্গে আলাপচারিতা করা যেতে পারে সম্ভবত। এই ছোট লেখায় আমি সেই চেষ্টাই করবো। ঐতিহ্য নিয়ে নানাবিধ আলাপ ও যুক্তিতক্কো এর আগেও বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করেছি। প্রত্নতত্ত্ব, হেরিটেজ আর ইতিহাস বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে। ঐতিহ্য হিসেবে কোন ভাষা, কোন বয়ান, কোন আচার, কোন অভিব্যক্তি, কোন অনুভব, কোন আবেগ, কোন সংবেদকে আমরা স্বীকৃতি দেবো (বা খারিজ করবো) তা প্রক্রিয়াগতভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখতে পারে। কোন কোন শব্দ বা চিহ্ন বা চর্চাকে আমরা ঐতিহ্য হিসেব স্বীকার করবো, কোন বয়ান ব্যবহার করে, আর খারিজ বা বর্জন করবো কোন বয়ান ব্যবহার করে সেই জিজ্ঞাসা জরুরি হতে পারে। তবে আমার আগ্রহ এই প্রশ্নগুলোরে সঙ্গে মোকাবিলায়: ঐতিহ্য আসলে কী? কীভাবে কোনটা ‘আমাদের ঐতিহ্য’ আর ‘ওদের ঐতিহ্য’ সেই নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলমান থাকে? কোনটা বিশুদ্ধ, আসল, প্রকৃত ও সহী ঐতিহ্য আর কোনটা নয় সেই হিসাবনিকাশ কীভাবে ও কেন ঘটে? প্রথমেই ধরে নেয়া পূর্বানুমানগুলোর ভিত আমাদের নাড়িয়ে দিতে হবে। ঐতিহ্য/ট্রাডিশন হিসেবে কোনো বস্তুগত এবং অবস্তুগত বা অস্পর্শনীয়/ইনট্যানজিবল হিসেবে যে ভাগ করা হয় প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্র ও বয়ানে সেই বিভাজন অসাড় হিসেবে বুঝতে হবে। সকল বস্তুগত ও অবস্তুগত ঐতিহ্যই পরস্পর সম্পর্কিত। একে অপরের সঙ্গে লিপ্ত, যুক্ত—মিথষ্ক্রিয়ারত থাকে। কোনো গান, স্মৃতি, ভাষ্য, পারফরমেন্স, গীতরঙ্গ, রীতি, আচার, অভ্যাস, ভাষা, অভিব্যক্তি আপাত দৃষ্টিতে অস্পর্শনীয় বলে অনুমিত হলেও সেগুলো বস্তুদুনিয়ার সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ারত। একই কথা বলা চলে বস্তুগত ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি বস্তুগত ঐতিহ্যই বয়ান, আখ্যান, স্মৃতি, কিংবদন্তী, কাহিনি, গল্প, লোকশ্রুতির মতন অস্পর্শনীয় অনুশীলন ও তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। পরের পূর্বানুমানটি ধরে নেয়, ঐতিহ্য আমরা যেভাবে দেখছি–শুনছি–উদযাপন করছি সেভাবেই ছিল, আছে। চিরায়ত ও চিরন্তনতা, হাজার হাজার বছরের ধারাবাহিকতা, আদি ও বিশুদ্ধ একটা গঠন কোনো এক কালে কোনো এক স্থানে ছিল বা তার উদ্ভব ঘটেছিল বলে আমরা ধরে নেই। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সেই ঐতিহ্যের বদল বা পরিবর্তন ঘটেছে। কোনো বদলকে আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করি। কোনো বদলকে আমরা অস্বাভাবিক বা বেমানান বলে ঠাহর করি। উদ্ভব, বিকাশ, বদল ঘটলেও কোনো অথেনটিক আর শুদ্ধ ঐতিহ্যের কতগুলো সারসত্তাগত বৈশিষ্ট্য থাকে এবং বিভিন্ন সময়ে বদলের পরেও ওই সারসত্তা ধারবাহিকভাবে অটুট ও অক্ষয় হিসেবে টিকে থাকে। ঐতিহ্য প্রসঙ্গে এই পূর্বানুমানগুলো শাস্ত্রীয় পরিসরে, বিদ্যায়তনিক পরিসরে আর বয়ানগত/বাঙ্ময় পরিসরে প্রবল ও আধিপত্যশীল হিসেবে বিরাজমান রয়েছে কিন্তু উপরের পূর্বানুমানগুলো কেবল ভ্রান্তই না। বরং এই পূর্বানুমানগুলো তৈরি হয়ে উঠেছে, বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিকতার প্রকল্পের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে। আধুনিকতা যেমন একদিকে ঐতিহ্যের বিপ্রতীপ হিসেবে বিবেচিত তেমনই আধুনিকতা ঐতিহ্যকে অব্যবহতভাবে বলবত রাখার সঙ্গেও জড়িত।

    জাতীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য, সম্পদায়গত ঐতিহ্য, আঞ্চলিক ঐতিহ্য, বিশ্ব ঐতিহ্য, লোক বা ফোক ঐতিহ্য, ভাষাগত ঐতিহ্য, রীতি–আচার–আচরণ–খাদ্যাভ্যাস–পোষাক–অভিব্যক্তি–অনুভূতি–আখ্যানভঙ্গিগত ঐতিহ্য প্রভৃতি নানা রূপে আর বর্গে ঐতিহ্যকে ভাগ করে বিদ্যায়তনে, শাস্ত্রীয় চর্চায়, জনপরিসরের বয়ানে তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। এই বিবাদ সংঘাত ও সহিংসতায় পরিণত হওয়ার উদাহরণ ইতিহাসে বহু স্থানে ও কালে রয়েছে। আধুনিক ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতা ও জ্ঞানের পরিসরে কোনো মানুষ বা জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় খোঁজার তৎপরতা যেভাবে অনিবার্য একটি মানবীয় আচার হিসেবে চিহ্নিত হওয়া শুরু করে তার প্রলম্বন আমরা জাতীয়তাবাদ, জাতিবর্ণবাদ, বর্ণবাদসমেত বিভিন্ন পরিচয়বাদী চিন্তা ও চর্চায় লক্ষ্য করি। জাতীয়তাবাদ ও জাতি–রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে জাতীয় ঐতিহ্য থাকা আবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। কারণ অতীতের বিভিন্ন বয়ান ও উল্লেখের উপরে জাতীয়তাবাদী (এবং সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত অন্য যেকোনো পরিচয়বাদী বাসনা) কল্পনা ও বয়ানের, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের তৎপরতার বৈধতা ও প্রামাণ্যতা নির্ভর করতে থাকে। সেভাবে বিবেচনা করলে যে ভাবে যে ঐতিহ্যকে আমরা এখন চিরন্তন, হাজার বছরের পুরানো, বিশুদ্ধ, অনাদি, পবিত্র, আসল, সহী, প্রকৃত হিসেবে ঠাহর করতে থাকি সেই ঐতিহ্য আদতে আধুনিকতার প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কুশীলব, সত্তা, পুঁজি আর ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়, গঠিত হয়, প্রদর্শিত হয়, আলাপিত হয়। বিবাদের বিষয়ে পরিণত হয়। যখন আমরা দাবি করি যে, এইটা আমাদের সহী ঐতিহ্য না, এই রীতি বা পোষাক বা খাবারদাবার, বা ভাষা, বা আবেগ নিতান্তই পরের, আরোপিত, চাপিয়ে দেয়া, দূষিত, ভেজাল, বেঠিত, অবৈধ, অনৈতিহাসিক তখন আসলে আমরা ঐতিহ্যকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হই। বিভিন্ন শর্তাধীনে, বিভিন্ন কুশীলবের অসম ক্ষমতা ও পুঁজির সম্পর্কের, অথবা অনুভব–উপলব্ধির মনস্তাত্ত্বিক স্বাভাবিকীকরণের প্রণালিবদ্ধ প্রক্রিয়াগুলোকে আমরা অবজ্ঞা করি, আড়াল করি।

    শিল্পী: জয়নুল আবেদিন

    যে দল–মত–চিন্তারই হই–না– কেন, বিভিন্ন ঐতিহ্যের সহীত্ব নিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিপক্ষতার পরেও সকল পক্ষের প্রবল ও জনপ্রিয় আলাপচারিতায় তাদের উল্লিখিত–পেশকৃত–আদর্শ হিসেবে জাহির করা ঐতিহ্যকেই সহী আর আসল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন আলাপ ও বাহাসে নিজের দাবি করা ঐতিহ্যকেই বা ঐতিহ্যের প্রণালি, রীতি ও চিহ্নগুলোকেই চিরন্তন, আসল, প্রকৃত, বিশুদ্ধ ও আদিতম হিসেবে ধরে–নেয়ার প্রবণতা ও ঝোঁক জারি থাকে। প্রবল জাতীয়তাবাদী, পরিচয়বাদী আর আধুনিকীকরণ প্রকল্পগুলোর চলমান স্বাভাবিকতার মধ্যে উদ্ভব খোঁজা, দূষণ ও ভেজাল দূর করে বিশুদ্ধ কোনো কিছুকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা আবশ্যকীয় এবং মহান, দেশাত্মবোধক, পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে পেশ করা হয়। সেখানে অথেনটিক ও প্রামাণ্য হিসেবে কোনো কিছু (ভাষা–অনুভূতি–অভিব্যক্তি–বৃত্তি–প্রবৃত্তি–আচার–সংবেদ–চিহ্ন ইত্যাদি ইত্যাদি) জাহির করে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে হাজির করার কার্যক্রম ও বাসনা বলবৎ থাকে। এরিক হবসবম এই প্রক্রিয়াকে ‘ইনভেনশন অব ট্রাডিশন’ বা ‘ঐতিহ্যের আবিষ্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। হবসবমীয় মতানুসারে আধুনিক বিভিন্ন দশা ও শর্তের মধ্যে বিভিন্ন সময়ই ঐতিহ্য আবিষ্কৃত, পুনরাবিষ্কৃত, নবায়িত, পরিগঠিত হতে থাকে। সেখানে পুঁজিবাদ, জাতিরাষ্ট্রের মতন প্রতিষ্ঠান যেমন ভূমিকা রাখে তেমনিই ভূমিকা রাখে জাতীয়তাবাদ ও নানাবিধ সম্মিলনমূলক ও সংঘাতমূলক দশা ও মত। তার পর্যালোচনার কালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অপরবাস্তব পরিসরের সক্রিয়তা, বাস্তবতা ও বহুবিধ যাপন ছিল না। ঐতিহ্যের আবিষ্কার–পুনরাবিষ্কারের বাহাসে ও আখ্যানে আর প্রক্রিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকলাপ, এবং পরিবর্তিত মানবীয় সত্তার গঠন ও বৈশিষ্ট্যাবলি নিয়ে তাই আলাপ করার অবকাশও উনার ছিল না।

    আমি এক্ষেত্রে ‘ঐতিহ্যর আবিষ্কার’—এই হবসবমীয় ধারণার তুলনায় তালাল আসাদের ঐতিহ্য সম্পর্কিত বহুবিধ লিপ্ততা ও পর্যালোচনাগুলো দ্বারা বেশি প্রভাবিত। একদিকে আসাদ ঐতিহ্যের পুনর্গঠনের/রিকনফিগারেশন অব ট্রাডিশনের কথা বলেন। যেখানে তিনি আবিষ্কারের চাইতে বাছাইকরণ/সিলেকশনের উপরে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে তিনি ঐতিহ্যকে আখ্যানগত/ডিসকার্সিভ আর শরীরজ/দেহ বিজড়িত(এমবোডিড) হিসেবে আলাদা করেন। তার আলাপে ডিসকার্সিভ ও এমবোডিড ধারণাগতভাবে আলাদা হলেও পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে জারি থাকে।

    কোন আচার, অনুশীলন, ভাষা, অভিব্যক্তি, বয়ান ঐতিহ্য হিসেবে সহী ও বিশুদ্ধ হিসেবে, দরকারী, ‍মুক্তিদায়ী হিসেবে পরিগণিত হবে, আর কোনগুলো–হবে–না সেটা ক্ষমতা ও পুঁজির, সত্তাশ্রয়ীতা/সাবজেকটিভিটি সমেত আধুনিকীকরণের প্রকল্পের বহুবিধ, বিচিত্র ও জটিল ক্রিয়াকলাপ ও শর্তর উপরে নির্ভর করে। আমাদের সংবেদ (ইন্দ্রিয়জ উপলব্ধি, অভ্যাস, ঝোঁক, শরীরের নানাবিধ আচার ও পারফরমেন্স, আবেগ, ভাবাবেগ, ভাবাবেশ) আখ্যানগত ও টেক্সচুয়াল ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই কর্তৃত্ব তৈরি করে, প্রবল ও স্বাভাবিক হিসেবে জনপ্রিয় ও অধিপতিশীল হয়ে ওঠে। কোনো আবেগ বা অভিব্যক্তি সঠিক, অথেনটিক ও সহী হিসেবে নির্মিত ও গঠিত হয়। কোনো ভাষা ও আচরণ–আচার, শোনা–বলা, গন্ধ নেয়া, স্বাদগ্রহণ, ছোঁয়ার ধরন বিশুদ্ধ, চিরায়ত, অনাদি কাল ধরে বিরাজমান হিসেবে পরিবেশিত হয়। বাদবাকি যেকোনো কিছু আরোপিত, আমদানীকৃত, দূষণ, ভিনদেশী, আধুনিক/পশ্চিমা, ঔপনিবেশিক, ভিন্ন ও প্রতিপক্ষীয় ঐতিহ্য হিসেবে দাগিয়ে দেয়া হয়। চাপিয়ে দেয়া অথবা বিশেষ কর্তৃত্বশীল প্রতিষ্ঠান–জনগোষ্ঠীর কর্তৃক কৃত্রিমভাবে আমদানীকৃত হিসেবে সাব্যস্ত হয়। হালের দুনিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রে ও অঞ্চলে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠা, পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও খারিজীকরণের তৎপরতার বিপজ্জনক আর সহিংস উত্থানে এমন বয়ান বহুল উৎপাদিত ও সঞ্চালিত হয়। বিশেষ করে অপরবাস্তব পরিসরের রাজনীতিতে ও চিন্তা–পছন্দ/অপছন্দ–পণ্যায়নের প্রবল প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে। ব্যক্তি মানুষের অভীষ্ঠ লক্ষ্য হিসেবে এবং মানবীয় অত্যাবশ্যক বৈশিষ্ট হিসেবে যখন প্রতিযোগিতা, মেধাস্তর ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও জীবিকা আর সফলতার বাসনাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে তখনকার এই দুনিয়ায় নিয়ত যুক্ততার মধ্যে মানুষ সহীত্ব আর না–সহীত্বের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহ্য ও পরিচয় একদিকে প্রতিযোগিতা ও সফলতার মানদণ্ড হিসেবে খাড়ায়। যদিও দাবি করা হতে থাকে যে, এই প্রতিযোগিতা অবাধ ও মুক্ত। এই স্বাধীনতা ও বেছে নেয়ার অধিকার থাকার বোধ পরিশেষে বিভ্রমমাত্র। ঐতিহ্যের প্রবল বয়ান বহুবিদ মিথ্যা, অপতথ্য, বাছাই করা উদাহরণ বা টেক্সট বা উদ্ধৃতিকে দৃশ্যমান করে তুলতে থাকে একের পর এক। সার্বক্ষণিকভাবে যখন একটি ডিভাইস মানবায়িত সংবেদকে গঠন করতে থাকে, তখন খারিজকরণ আর সংঘাতে পক্ষাবলম্বন করতে উৎসাহিত করা সহজ হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে বাছাই করার স্বাধীনতা, নিজের পরিচয়ের শুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা বা নিজেকে ঐতিহ্যগত ভাবে দূষণে বাধ্য হওয়া ভিকটিম হিসেবে মনে করতে থাকাও এই দৃশ্যমান অপরবাস্তব পরিসর স্বাভাবিক করে তোলে। অনিবার্যভাবেই এই প্রক্রিয়ায় অপরায়ন ঘটতেই থাকে। অপরের উপরে নিজের ব্যর্থতা, নিজের খুঁজে বের করা দূষণ, গ্লানিবোধ, বা শ্রেষ্ঠত্বর পুনরুদ্ধারের প্রকল্প পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে হতে থাকে। শত্রু গঠিত হয়। নিপীড়ক ও শাসক চিহ্নিত হতে থাকে। দাগানো চলতে থাকে। ঐতিহ্য গঠিত হওয়ার আর পুনর্গঠিত হওয়ার এই সর্বগ্রাসী, নৃশংস আর সহিংস তৎপরতায়।

    শিল্পী: কাইয়ুম চৌধুরী

    যেহেতু ক্ষমতার সম্পর্ক পরিবর্তনশীল, অসমতা ও বৈষম্য দূর করা কঠিন, প্রবল ও প্রান্তিকের সম্পর্ক পাল্টাতে পারে। অবস্থান ও দশা বদলালেও অসমতা বলবত থাকে। যেহেতু আধুনিকতা, আধুনিক জাতি–রাষ্ট্র, ও তার প্রতিষ্ঠানগুলো, রাষ্ট্রান্তরী সংস্থাগুলো পরম্পরের সঙ্গে যুক্ত কুশীলব হিসেবে আমাদের নৈমিত্তিক ও তুচ্ছতর জীবনযাপনকেও বৃহত্তর জাতি–রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহের পাশাপাশি প্রভাবিত করেছে সেহেতু কর্তৃত্ব ও দাপটের বদলের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যের বয়ানও বদলায়, পুনর্নবায়িত হয়, পরিগঠিত হতে থাকে। অর্থাৎ আজ যাকে আমরা সঠিক, বিশুদ্ধ ও চিরায়ত বলে দাবি করছি, প্রামাণ্য ও আদিতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি, গত কাল সেটা সেরকম নাও থাকতে পারে। আগামীকাল আবারও ভিন্ন রূপ নিতে পারে। ভিন্ন দাবি, ভিন্ন প্রতিপক্ষ, ভিন্ন শত্রু তৈরি হতে পারে। ঐতিহ্য গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া তাই বিষচক্রের মতন।

    আগে জারি থাকা বিভিন্ন বয়ান ও সংবেদন–শরীরী আচারগুলো থেকে কোনো কোনোটাকে প্রবল, কর্তৃত্ববাদী ও দাপুটে পরিচয়বাদী, বহুজাতিক সংস্থার মুনাফা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং জাতি–রাষ্ট্রের চলতি মতাদর্শের ও স্বীকৃত বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে বাছাই করা হয়। পরিমার্জন করা হয়, পুনর্গঠন করা হয়। আর ঐতিহ্য হিসেবে খাড়া করা হয়। বাদবাকি সকল কিছু, প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত সকল বয়ান ও সংবেদন–শরীরজ বৈশিষ্ট্য বর্জন করা হয়, অথবা প্রবল ঐতিহ্যের ধারণা ও বয়ানের আর চর্চার মধ্যে বাছাই করে আত্মসাৎ করা হয়। সেখানে দুর্বল ও প্রান্তিক ঐতিহ্যের চিহ্ন ও চিহ্নের ব্যাখ্যা প্রবল ঐতিহ্যের শর্ত দ্বারা নির্ধারিত হয়। ধরেন, আদিবাসীদের কোনো ঐতিহ্য বা পরিফরমেন্স বা রিচুয়ালকে যখন প্রবল জাতি–রাষ্ট্র বহুত্বের ও বৈচিত্র্যের প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শন ও হাজির করে বেশিরভাবে ক্ষেত্রেই সেই হাজিরকরণ প্রবল জাতি–রাষ্ট্রের শর্তানাুসারেই ঘটে। সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী কোনো রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা সংখ্যালঘিষ্ঠের অন্তর্ভুক্তি ও প্রদর্শনও জটিল বাছাইকরণ, পুনর্গঠন আর আত্মসাৎকরণে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটতে থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, হালে পশ্চিমবাংলায় হিন্দুত্ববাদীদের মাধ্যমে বঙ্গাব্দ হিসেবে পালিত বাংলা নববর্ষ (বছর গণনার ধরন ও জ্যোতিষশাস্ত্রগত রীতিকে) অশুদ্ধ ও নাজায়েজ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘সনাতনী হিন্দু নববর্ষ’ প্রচলন করার প্রকল্প নজরে পড়বে। বেশ হইচই করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যকে নানাধরনের তৎপরতার মাধ্যমে এই হিন্দু নববর্ষকে আসল ‘ভারতীয় নববর্ষ’ হিসেবে পালন করার প্রকল্প চালু করেছে। চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের প্রতিপদ তিথিতে এই নববর্ষ শুরু বলে দাবি করে বিজেপি–আরএসএস। ওইদিন শ্রীরামচন্দ্রের জন্মতিথি আর সম্রাট বিক্রমাদীত্য প্রচলিত বিক্রম সম্বতের শুরু বলেও তারা মনে করে। তাদের এই উদ্যোগ ও প্রকল্প নির্বাচনে তেমন প্রভাব ফেলতে না–পারায় এবছর তারা পহেলা বৈশাখকে এতদঅঞ্চলের শাসক শশাঙ্কের প্রবর্তিত কালপঞ্জী হিসেবে দাবি করে পহেলা বৈশাখকে পালন করেছে। এখানে ঐতিহাসিক তথ্য ও উপাত্ত, সত্যি বা মিথ্যা গৌণ। বরং কোনটা হিন্দুত্ববাদীদের মানদণ্ড অনুসারে আর নির্বাচনী রাজনীতির পরিসরে জরুরত, কার্যকর এবং প্রভাববিস্তারী সেটাই ঐতিহ্যর ধরন, সংজ্ঞা ও উদযাপনের রীতি নির্ধারণে বিবেচ্য। বাঙালির নববর্ষ পালনের হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প পশ্চিবঙ্গে হয়ে উঠেছে ক্ষমতা ও নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার অন্যতম একটি পারফরমেটিভ তৎপরতা। প্রবল ও সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী হিন্দুত্ববাদী একরূপ ও সমসত্ত্ব ঐতিহ্য তৈরির ক্ষেত্রে নববর্ষ পালনের তৎপরতার পুনর্গঠন ঘটেছে। কিন্তু রামনবমী ও হনুমান জয়ন্তী পালনের বিপুল তৎপরতা আর দিল্লিতে রামনবমী উপলক্ষ্যে মাছেরবাজার বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও একই সময়ে ঘটছে। সেক্ষেত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সর্বভারতীয় ও চিরন্তন হিন্দুত্ব কায়েম করার প্রকল্প বিভিন্নভাবে চালু আছে। অন্যদিকে নির্বাচনী রাজনীতিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই প্রকল্পে কৌশলগত ছাড় দেয়া হচ্ছে। উপরের উদাহরণটি চলমান ও বহুল আলোচিত ও দৃশ্যমান ঐতিহ্য নির্মাণ ও বাছাইকরণের একটি নমুনা হিসেবে আমি উল্লেখ করলাম।

    একথাও উল্লেখ করা জরুরি যে, খোদ বাংলা নামক স্থানিক বর্গটি এবং বাঙালি ঐতিহ্য নামক বয়ান ও আচারগুলো বিভিন্ন সময়ে ও স্থানে বাছাইকরণ, স্বাভাবিকীকরণ ও প্রবলকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। যেকোনো ঐতিহ্য নির্মাণের ও পরিগঠনের প্রক্রিয়া অসম ক্ষমতা সম্পর্কের পরিসরে সারবাদী ও সমসত্ত্বকরণ করে। কিছু বিষয়, বৈশিষ্ট্য ও আচারকে গ্রহণ করে, বাদবাকিগুলোকে বাদ দিয়ে দেয়। সম্মিলন অথবা সমন্বয়ের যে প্রক্রিয়ার কথা আমরা পড়তে অভ্যস্ত তাতে ক্ষমতা সম্পর্কর এমন প্রভাবগুলো বিবেচনায় নেয়া খুব কমই হয়। রবার্ট রেডফিল্ড আর ম্যাকিম ম্যারিয়ট ‘বড় ঐতিহ্য’/’গ্রেট ট্রাডিশন’ আর ‘ছোট ঐতিহ্য’/’লিটল ট্রাডিশন’ নামের দুটো বর্গ বা ধারণা ব্যবহার করে জটিল ও শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজে ঐতিহ্য কীভাবে বিকশিত হয় ও কাজ করে তা নিয়ে আলাপ করেছিলেন। তাদের এই আলাপ প্রাক–আধুনিক, প্রাক–ঔপনিবেশিক সমাজ ও ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রভাবশালী হলেও এই আলাপেও প্রাক–আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতা, শাসন, কর্তৃত্ব ও শাসকের কর্তৃত্ব বা উচ্চ শ্রেণি/বর্ণ/বর্গ/জাতি/জাতিবর্ণ/সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্যান্যর মিথষ্ক্রিয়াকে বিবেচনায় নেয়া হয় নাই। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় বলেন, আজ যে ঐতিহ্যকে বড় হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে তার বড় হয়ে ওঠার, আর ছোট ঐতিহ্যের ছোট হয়ে ওঠার ইতিহাস রয়েছে।

    শিল্পী: রফিকুন নবী

    আমরা কোন ভাবে কোনো শব্দ বা পদের ব্যাখ্যা করবো, কোনো আচার বা আচরণকে সংজ্ঞায়িত করবো, কোনো চিহ্নকে কীভাবে তকমা দেবো, কোন আচার ও অভ্যাসকে আর ঝোঁক ও সংবেদনকে কোন পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করবো সেটা বিরাজমান দাপুটে, কর্তৃত্ববাদী আর প্রবল বয়ানগত ও শরীরজ ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের উপরে একদিকে নির্ভর করে। আবার অন্যদিকে প্রান্তিক ও এখন দুর্বল হয়ে পড়া বয়ানগত ও শরীরজ ঐতিহ্যের সম্পর্কের উপরে আর প্রবলের সঙ্গে এই দুর্বলের সম্পর্ক, মোকাবিলা, সংলাপ, সংঘাতের প্রক্রিয়া ও দশার উপরেও নির্ভর করে। প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের মাধ্যমে যে ঐতিহ্য গঠিত হয়েছিল, অথবা কর্তৃত্ব, নিপীড়স ও নৃশংসতার বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে যে বয়ানগত ও শরীরী সংবদনের ঐতিহ্য বাছাইকৃত হয়ে সাচ্চা, মুক্তিদায়ী, গণমানুষের হিসেবে গৃহিত হয়েছিল, প্রান্তিকতা সমেত লড়াইয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী হয়ে উঠেছিল সেই সবই পরিবর্তিত ক্ষমতাসম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব আর বয়ানের ও সেই বয়ান স্বীকৃত চিহ্নগুলোর ক্রিয়াকলাপে ভয়াবহভাবে প্রবল, নিপীড়ক আর আধিপত্যবাদী হয়ে উঠতে পারে। প্রবল ও প্রান্তিকের স্থান–চেহারা–সম্পর্ক কেবল বদলে যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতি বা ফোক বলতে যেসব আচার ও অনুষ্ঠানকে আমরা বুঝি ও বাছাই করি তার মাধ্যমে অনেক আচারকে শহুরে বা মধ্যবিত্তের হিসেবে এমনভাবে পরিবেশন করতে থাকি যেন শহর ও মধ্যবিত্ত বা ভদ্রবিত্ত বয়ান ও যাপনের দুনিয়ার বাইরের কোনো পরিসর। কোনটা শহুরে আর কোনটা গ্রামীণ বা ফোক সেই হিসাবনিকাশই উপরের ঐতিহ্য বাছাইকরণ ও পুনর্গঠনের ইতিহাস ও প্রক্রিয়ার বাইরের না। বাংলা নববর্ষে ইতিহাসে তাই ‘আগেরটায় ফিরে যাওয়া’, এটা আরোপ করা, এটা আমাদের সংস্কৃতি না, এই আচার সহী বাঙালির না—এমন সকল দাবি বা বয়ার পরিশেষে ঐতিহ্য পুনর্গঠন, বাছাইকরণ, পুনর্নবায়নের বয়ানগত কর্তৃত্বকে হাজির করে। কে, কেন ও কীভাবে এইসব বয়ান তৈরি করছেন, কীভাবে উৎপাদিত এসব বয়ান বৈধতা ও অবৈধতা নির্ধারণ করছে, বিরাজমান ক্ষমতার কাঠামো ও সম্পর্কের সঙ্গে এই বয়ান প্রদানে সম্পর্ক কী ও কেমন তা বিশদভাবে পর্যালোচনা না করলে আমরা সহী ও গলদ নিয়া বিভ্রমের মধ্যেই যাপন করবো।

    উপরের আলাপচারিতা পড়ে মনে হতে পারে যে, আমি যেহেতু ঐতিহ্য গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়া কীভাবে ও কেন আলাপিত হয় বা হয় না সেই প্রসঙ্গগুলো উল্লেখ করেছি তাই আমি একটি সাপেক্ষিকতাবাদী অবস্থান নিয়েছি। অর্থাৎ সকল ঐতিহ্যই সহী হতে পারে আবার সকল ঐতিহ্যই গলদ হতে পারে এমন কোনো যুক্তি আমি পেশ করছি। সেটা মনে হওয়াটা ভুল হবে। বরং সহীত্ব বা গলদত্বর জনপ্রিয় ও জনতুষ্ঠিবাদী বয়ান ও সংবেদনের ক্ষেত্রে আমি সতর্ক, সন্দেহ ও সংশয়সমেত অবস্থান জারি রাখতে চাই। এই আলাপের চাইতেও জরুরি হচ্ছে গঠিত ও পুনর্গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াগুলো নিষ্ঠা, মনোযোগ আর নিবিড়তার সঙ্গে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা। ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করতে গেলে ধারাবাহিকতার পাশাপাশি ধারাবাহিকার ছেদ ও বদলকেও স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কনটিনজেনসি ও পরিপ্রেক্ষিতের পর্যালোচনা এখানে ভীষণ জরুরি। প্রতিপক্ষতা ও সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রতিপক্ষতা কীভাবে ও কেন তৈরি হলো, এতে কোন প্রসঙ্গ ও বিষয় আড়াল করা হচ্ছে, কীভাবে প্রবলের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব জারি থাকছে, কীভাবে সমসাময়িক ও অতীতের সত্য আলামতগুলোকে আড়াল করে লুকানো হচ্ছে বা অবজ্ঞা করা হচ্ছে সেই দিকে মনোযোগ দিতে আমার আগ্রহ থাকবে। ঐতিহ্যের উদযাপন যদি প্রবলের ক্ষমতার প্রতি প্রতিস্পর্ধী হয়, ধারবাহিতা ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, শর্ত ও পরিপ্রেক্ষিতের নিবিড়ি ও নিষ্ঠ পাঠসমেত বহুবিধ ও অনেকান্তবাদী ঐতিহ্যগুলোর সমধর্মী ও শরিকী তৎপরতা হিসেবে যাপনের অংশ হয় তাহলে মানবীয় আধিপত্য, লোভ, বাসনা আর আধিপত্যকামীতাকে চ্যালেঞ্জ করতে করতে, মিথ্যাকে চিহ্নিত করতে করতে, ভ্রান্ত ঐতিহ্য চেতনা ও পরিচয়বাদী নিপীড়ন আর সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদকে জায়েজ করার ঐতিহ্যকে প্রশ্ন করতে করতে, বেসামাল করে দিতে দিতে ঐতিহ্যের উদযাপন তো আমরা করতেই চাই।

    সূর্যোদয়ের এই ওয়াক্তে সকলকে আনন্দময় ও মঙ্গলময় নববর্ষের প্রীতি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই।

    পহেলা বৈশাখ। ১৪৩২: : ১৪ এপ্রিল ২০২৫।

    অরুনাপল্লি, সাভার, ঢাকা।

  • ডিপ ও শ্যালো স্টেইটের সঙ্গে ইন্টেরিমের বিবাহ ও বিরহ পর্যালোচনা

    ডিপ ও শ্যালো স্টেইটের সঙ্গে ইন্টেরিমের বিবাহ ও বিরহ পর্যালোচনা

    জুলাইয়ের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে কিছু রাজনৈতিক গুরুত্ববহ শব্দ বা বচনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নাগরিক সমাজ অহরহ এগুলো ব্যবহার করছেন, এমনকি রাষ্ট্রের দায়িত্বরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যাদি থেকেও সেসব শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এই যেমন “মব,” “মব করা,” “ডেভিল,” এবং “ডেভিল হান্ট” ইত্যাদি। এমনিতে শব্দ অর্থ প্রকাশের দিক থেকে একটা পিচ্ছিল ব্যাপার, অর্থাৎ এর ব্যবহারে নানান অনির্দিষ্টতা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র এবং বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ যখন এই শব্দগুলো একই প্রেক্ষিতে ব্যবহার করেন সেগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা থিতু হয় এবং শব্দগুলো সরকারি ও নাগরিক সমাজের শব্দভাণ্ডারে নির্দিষ্ট অর্থসহ যুক্ত হয়। এইসব শব্দের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং সরকার নাগরিককে কিছু বার্তা দিতে চায়, নাগরিক সমাজও সরকারকে কিছু বার্তা দিতে চায়। ফলে সর্বজনের স্বার্থে এই শব্দগুলোর সরকারি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবহারকে ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন আছে। সেই তাগিদ থেকে তৈরি করেছি আমার এই লেখাটি। শব্দগুলো ব্যবচ্ছেদের ফলে যা বেরিয়ে এসেছে এই লেখায়, তা হলো গণআন্দোলনের সঙ্গে ডিপ স্টেইট ও শ্যালো স্টেইটের সংহতি এবং সংঘাতের কিছু চিত্র। এই চিত্রগুলোর পর্যালোচনা করতে গিয়ে যথাস্থানে ডিপ স্টেইট ও শ্যালো স্টেইটের উদাহরণসহ সংজ্ঞা হাজির করব। এটা বলে নেয়া দরকার যে, শব্দগুলোর ব্যঞ্জনার উদাহরণ দেখাতে গিয়ে নাগরিক সমাজের যেসকল চিন্তকের বয়ান এখানে ব্যবহার করা হয়েছে তারা সকলেই জুলাই অভ্যুত্থানে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন এবং যুগিয়েছেন। অর্থাৎ শব্দগুলোর ব্যঞ্জনার যে হেরফের আমরা পাব এখানে তা বক্তাদের জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে এবং বিপক্ষে থাকা বাবদে উদ্ভূত নয়, পার্থক্যটা তাদের রাষ্ট্রচিন্তাগত পার্থক্য থেকে আসা।

    প্রথমেই আসি মধ্যে ‘মব‘ প্রসঙ্গে। মব কী, এ নিয়ে সবার মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন ধারণা আছে যা প্রথম আলো প্রস্তাবিত অর্থ “দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা“র সঙ্গে যায়। মবের আদি অর্থ মোবাইল ভারগাস, অর্থাৎ অস্থির জনতা। মোবাইল ভারগাসকে সংক্ষেপে মোবিলিটিও বলা হতো নোবিলিটির বিপরীতে, যেখানে নোবিলিটি হচ্ছে সুস্থির উচ্চবর্গ, আর মোবিলিটি হচ্ছে অস্থির নিম্নবর্গ। অস্থির নিম্নবর্গ যখন সুস্থির উচ্চবর্গের স্থাপিত স্থিতিশীলতা ভাঙে তখন তাদের তাচ্ছিল্যভরে বলা হতো মব। কালে কালে মবের বৈশিষ্ট্যের বিস্তার হয়েছে, আধুনিক ব্যবহারে অর্থ দাঁড়িয়েছে নৈরাজ্যমূলক ও ধ্বংসাত্মক কাণ্ডে লিপ্ত উত্তেজিত জনতা। তবে এই বাংলাদেশে যাদের “মব” বলা হয়েছে এবং হচ্ছে সেই মবের প্রতি নাগরিক সমাজের সবার মনোভঙ্গী এক নয়। এই প্রসঙ্গে অন্তত দুজন স্বনামখ্যাত চিন্তককে দেখেছি, মব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোর উপর ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করছেন, ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন, যা আমদের আহ্বান জানায় মবকে ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখতে। এরমধ্যে একজন হলেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, “জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভকে ‘মব‘ বলা হাসিনার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের ভাষা।” অর্থাৎ –এর সঙ্গে মজহার যুক্ত করে দিচ্ছেন এই যে, রাজ্যের (রাষ্ট্রের) নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই নৈরাজ্য, রাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়ন করার ব্যবস্থা গড়ার প্রতিক্রিয়ায় জনতার এই ভাঙা। অর্থাৎ এই বিশৃঙ্খলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ বাবদে ন্যায়সিদ্ধ। এটা অনেকটা মবের আদি অর্থ নোবিলিটির বিপরীতে মোবিলিটির সমার্থক। পাঠক, এখানে মজহার উল্লেখিত “ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র” প্রসঙ্গে একটা নোক্তা দিয়ে রাখি। এই লেখায় স্টেইট বা রাষ্ট্র বলতে, পরিচালনা বাবদে উদ্ভূত রাষ্ট্রের একটা সংস্করণ বা ভার্শনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের একটি উপস্থিত সংস্করণ তৈরি করেন। যেমন শেখ হাসিনার আমলের শেষ দশ বছর “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” এর যে ভার্শনটি উপস্থিত ছিল তা হলো একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    ফরহাদ মজহারের ব্যাখ্যাটি এমন সময় প্রকাশ পেলো যখন অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে সমর্থন দেয়া বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশটি “তৌহিদী জনতার” নামে দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে মব বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং এসময়ের গুরুত্বপূর্ণ তরুণ চিন্তক মাহফুজ আলম ওই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য করে অনুরোধ করেছেন, “অভ্যুত্থানের পক্ষে হলে মব করা বন্ধ করেন, আর যদি মব করেন, তাইলে আপনাদেরও ডেভিল হিসাবে ট্রিট করা হবে।” অনুরোধটির মধ্যে একটি সতর্কবাণী আছে যা বহু পাঠকের কাছে হুমকি বলে মনে হয়েছে। তার কারণ হলো দেশে যৌথবাহিনীর “অপারেশন ডেভিল হান্ট” চলছে। এধরনের অপারেশনের একটা ইতিহাস আছে যা জনমনে ভীতি তৈরি করে রেখেছে। ফলে মাহফুজ আলমের হুঁশিয়ারিমূলক কথাটি তৎক্ষণাৎ ওই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পঠিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষিত প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক। “অপারেশন ক্লিন হার্ট“-এ বহু লোক প্রাণ হারিয়েছে যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সংস্থাগুলোর মতে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে সন্দেহভাজনদের প্রাণ গেছে, সন্দেহ প্রমাণের জন্য ডিউ প্রসেস অবলম্বন করা হয়নি। এমনিতে “অপারেশন ডেভিল হান্ট” এর ব্যাপারে ওই সকল সংস্থাসহ নাগরিক সমাজের অনেকে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন। আপত্তির কারণ আছে। সংবিধানে “মানবিক মর্যাদা“কে অন্যতম মূলনীতি রেখে, নাগরিককে “ডেভিল” হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না। মানবিক মর্যাদার মূল কথাই হলো মানুষকে তার মানবজন্মের জন্য মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। মানবদেহের মর্যাদাও এর মধ্যে পড়ে। একারণে, চোখের বিনিময়ে চোখ তুলে নেয়া সুবিচার হিসেবে গ্রাহ্য হয় না। কেউ কারও “রগ কেটে” জেলে গেলে, বিচারক অপরাধীর “রগ কেটে” “উচিত বিচার” করেন না। সে বাবদে নাগরিককে আগেই “ডেভিল” নাম দেয়া হচ্ছে “গিভ দেম এ ব্যাড নেইম, অ্যান্ড হ্যাং দেম” পলিসির অংশ। এটা সম্মতি উৎপাদনের কৌশলও বটে। এই অপারেশনে প্রাণ যাদের যাবে তারা কোনো বিচার ছাড়াই “ডেভিল” হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা কোনো কাজ একজন নাগরিককে “ডেভিল” বানায় তার কোনো আইনি ব্যাখ্যা নেই। রাষ্ট্র “মানবিক মর্যাদা“কে অন্যতম মূলনীতি রেখে নাগরিককে মানবেতর “ডেভিল” সাব্যস্তই করতে পারে না, সেখানে রাষ্ট্র উল্টা “ডেভিল” ক্যাটাগরিটাকে উন্মুক্ত রেখেছে, যাতে রাষ্ট্র তার সঙ্গে বনিবনা না হলে নাগরিককে “ডেভিল” হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারে।

    মাহফুজ আলম সতর্কবাণীটা যদিও লঘু পাপে গুরুদণ্ডের মতোই শোনায় আপাত পাঠে কিন্তু অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখলে বিষয়টা মোটেও লঘু নয়। তার ব্যাখ্যাও উপদেষ্টা দিয়েছেন, “বিপ্লবী জনতা আর খণ্ড খণ্ড মব আলাদা জিনিস। লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন এ মবসংস্কৃতির কারণে উপকৃত হচ্ছে আমাদের শত্রুরা। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আমাদের কঠোর হতে হবে।” অর্থাৎ “মব করা” বা দলবদ্ধভাবে লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্যাটাগরিতে পড়ছে। যা কঠোরভাবে দমন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। শুধু ইন্টেরিম নয়, জনগণের একটি বড় অংশও মনে করে মব সংস্কৃতির কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের শত্রুরা অর্থাৎ পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার উপকৃত হচ্ছে। তাদের “টুপ করে” ঢুকে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, জুলাইয়ের অর্জনে যারা অবদান রেখেছেন এবং যারা এই অর্জনে সমর্থন যুগিয়েছেন তাদের কারোরই তা কাম্য নয়। সম্প্রতি আয়নাঘরের আংশিক চিত্র সবাই দেখেছেন, এটা কেবল কয়েক হাজার ভুক্তিভুগির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, খোদ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে জাতিসংঘ। সেবাদে ইন্টেরিম সরকারের ভয়টা কত সর্বগ্রাসী হতে পারে তা ভাবনার বিষয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা বাবদে পাশার দান পাল্টে গেলে তাদের কী অবস্থা হবে সেই ভয়ের মাত্রা নিয়ে বললাম কথাটা। কিন্তু ভয় থেকে রাষ্ট্র অপারেট করলে কী বিপদ হতে পারে সেদিকে এবার নজর দেয়া যাক।

    এক্ষেত্রে উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মন্তব্য প্রাসঙ্গিক, তা হলো, “পতিত ফ্যাসিস্টরা লাখ লাখ কোটি টাকা খরচ করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।” এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রে দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাটা আর লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন থাকে না, কিংবা দেশকে অস্থিতিশীল করার শত্রুপক্ষীয় উদ্দেশ্য থেকে আলাদা করা যায় না। তাই পত্রিকায় পাই, “দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টাকারী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীরা যাতে সহজে জামিন না পান”, সেটা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ ও আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রের মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আইনের আসিফ নজরুল। একই রিপোর্টে পাচ্ছি, আইন উপদেষ্টা “মবতন্ত্র” নিয়েও মন্তব্য করেছেন, বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিকভাবে কাজ করলে মব–তন্ত্র কমে যাবে।” উপরোক্ত ভয়ের মাত্রাগত দিকটা উপদেষ্টাদের ‘জামিন‘ সংক্রান্ত উপদেশের মধ্যেও প্রকাশ পায়। এখন প্রশ্ন হলো, আইন উপদেষ্টা কি আইনত এই উপদেশ দিতে পারেন? না, পারেন না। সেটাই বলেছেন স্বনামখ্যাত আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, তার মতে “জামিন বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যা বলেছেন তা বিচার বিভাগের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার সামিল।” আসিফ নজরুল এবং জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দুজনেই আইনের ছাত্র এবং স্বনামখ্যাত চিন্তক, অভ্যুত্থানে সরাসরি সমর্থন যুগিয়েছেন। তবু আইনের ব্যাখ্যা ছাড়াও যে ভেদটা চোখে পড়ছে তা হলো অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশকে কে কীভাবে দেখতে চান। নাগরিক সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করে ইন্টেরিম পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর ফিরে আসার ভয়ে অন্ধ না হয়ে যাক, কেননা তাতে নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম নিতে পারে।

    “মব সংস্কৃতি” বা “মবতন্ত্র” দমনে “অপারেশন ডেভিল হান্ট“-এর হুঁশিয়ারি দেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশ দেয়া বাবদে উপদেষ্টাদের বক্তব্যগুলো অনেকে শেখ মুজিবের “লাল ঘোড়া দাবড়ে দেয়ার” হুঁশিয়ারি সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসলেই মিলটা কোথায়? মিলটা হচ্ছে রেজিম তার অস্তিত্ব রক্ষায় আক্রমণাত্মক হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন রেজিমের তৈরি করা স্টেইটের ভার্শনটি টিকিয়ে রাখতে পুরনো ভার্শন টিকিয়ে রাখার অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইছে। ভালোমন্দ বিচার মুলতবি রেখে বিষয়টি এভাবে দেখা যেতে পারে, স্টেইট মাত্রই স্থিতি চায়, শব্দের ব্যুৎপত্তিতেও ব্যাপারটি খোদিত আছে, স্টেইট এবং অবস্থা একই শব্দের দুইরূপ, এখানে ‘স্থা-‘ থেকেই স্থিতি। যখন কেউ সেই স্থিতি নষ্ট করতে চায়, রাষ্ট্রকে অ–স্থিতি–শীল করতে চায়, রাষ্ট্র তা প্রতিহত করতে প্রতিক্রিয়া করে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভার্শন অন্তর্বর্তী রাষ্ট্র সেই প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করছে। এখন অভ্যুত্থানকারী ছাত্র–জনতার সমর্থিত রেজিম আমাদের দুধ দিবে বলে তার লাত্থি খেয়ে হজম করার পক্ষে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ দাঁড়িয়েছেন। তাদের অবস্থান হলো, “অপারেশন ডেভিল হান্ট” হান্ট করবে পতিত ফ্যাসিস্টদের। এখানে মানুষকে ডেভিল জ্ঞানে “হান্ট” করা যায় কিনা, তাতে মানবিক মর্যাদার হানি হয় কিনা সেই আলাপকে তারা ত্যানা প্যাঁচানো বলে এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু নাগরিক সমাজের সবাই তা মেনে নিচ্ছেন না। তাদের কথা হলো সংবিধানের প্রস্তাবিত নতুন মূলনীতি মতে সরকারের হাতে যেকোনো অর্থে হান্টার থাকাটা নাগরিকের জন্য অমর্যাদাকর। প্রশ্ন উঠবে আয়নাঘর যে ফ্যাসিস্টদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার সাক্ষ্যবহন করছে তাদের জন্যও কি “অপারেশন ডেভিল হান্ট” পরিচালনা করা যাবে না? নাগরিক সমাজের একটি অংশের উত্তর হচ্ছে যাবে না, কেননা এধরনের অপারেশন দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার রাস্তা তৈরি হয়। তাছাড়া ডিউ প্রসেস ছাড়া কে ফ্যাসিস্ট আর কে মব তা বাছবিচার সমসময় সম্ভব হবে না। ডিউ প্রসেস দিয়েই ফ্যাসিস্টদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া সম্ভব।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    নানাবিধ ব্যবহারিক কারণেও আমি মনে করি “মব” এবং “ডেভিল” ক্যাটাগরি দুটাই বাদ দিতে হবে আমাদের। নাগরিক সমাজের একটি অংশ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনাকে মবের কাজ মনে করেন। নাগরিক সমাজের অন্য একটি অংশ মনে করেন এটা ফ্যাসিবাদ বিরোধী অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা। ফলে তা হান্টযোগ্য মব নয়। কেননা সেটা মজহারের কথা ধার করে বলা যায় “জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ“-এর বহিঃপ্রকাশ। কাছাকাছি একটি ক্রিটিকাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরেক স্বনামখ্যাত চিন্তক সেলিম রেজা নিউটন, বলেছেন “হাজার হাজার মানুষ যখন রাজনৈতিক কারণে জড়ো হয়, তাকে মব বলে না, তাই যদি হয় তাহলে তো ৩৬শে জুলাই বঙ্গভবনে যে জনতা ঢুকেছিল তারাও মব।” সেলিম রেজা নিউটনের কেবল চিন্তক হিসেবে এই বক্তব্যে হাজির করা তাই শুধু নয়, তিনি আন্দোলনেরও ক্ষুব্ধ অংশ: যখন আন্দোলনকারী ছাত্রদের পুলিস ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তিনি পুলিসের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে ছাত্রদের ছিনিয়ে এনেছিলেন। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি আরও বলেন, “মব একটা পুলিশি শব্দ মাত্র।” একই প্রসঙ্গে তার ব্যাখ্যা ও অভিমত ব্যক্ত হয়েছে তার এই মন্তব্যে, “গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তাঁকে আশ্রয়দানকারী ভারতীয় শাসকদের প্রতি প্রচণ্ড আক্রোশও আজকের ধ্বংস–তাড়নার পেছনে কাজ করেছে।…এই তাড়নাকে বিবেচনায় নিয়েই জুলাই–নেতৃত্বকে সামনে যেতে হবে।” এখানে নিউটনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারও একমত। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, “ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনা অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। পলাতক অবস্থায় ভারতে বসে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে জনমনে গভীর ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।”

    উপরোক্ত মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে স্বনামখ্যাত চিন্তক আনু মুহাম্মদসহ ২৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। যেখানে ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনাটিক গণ–উত্তেজক সহিংসতা বা মব ভায়োলেন্স হিসেবে সাব্যস্ত করেন, এবং বিচারযোগ্য অপরাধ মনে করেন। এবং তারা এও মনে করেন “কোনো ধরনের গণ–উত্তেজক সহিংসতা বা মব ভায়োলেন্স কেবলমাত্র ফ্যাসিবাদের কর্মী–সমর্থক এবং তাদের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের নাশকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকেই উৎসাহিত করবে।” এর সঙ্গে আনু মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মতও যোগ যাক, তিনি বলেন, “সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ী, চিহ্ন, প্রতীক ভেঙে রাগ দেখানো যায়, ফ্যাসিবাদ যায় না। ফ্যাসিবাদের পুনরুৎপাদন হয়!” এই প্রসঙ্গে এটা বলা দরকার যে সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ভাঙাকে নেতিবাচক কাজ হিসেবেই দেখেছেন, ফ্যাসিবাদের আইডলস (মূর্তি) ভাঙার চেয়ে উনি ফ্যাসিবাদের আইডিয়ালস (চিন্তা, আদর্শ) ভাঙার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ নিয়ে সেলিম রেজা নিউটনের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছোট্ট একটি সংলাপ হয়। নিউটনের “গণবিক্ষোভের কার্যকারণও বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন আছে” মন্তব্যের জবাবে উপদেষ্টা আলম বলেন “এ সব সাপ্রেশনের (গণবিক্ষোভের কারণ) বহিঃপ্রকাশ ইতিবাচক হলেই আমরা দীর্ঘমেয়াদে জিতব।” এখানে এসে নিউটনও একমত হন। কিন্তু নৈরাষ্ট্রবাদী নিউটন বর্তমান রাষ্ট্রকে জুলাই আন্দোলনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন বাবদে একটু ছাড় দিলেও, “মব” বিষয়ে মজহার তার একই অবস্থানে আছেন, বই মেলাতে তৌহিদী জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন।

    ফরহাদ মজহার তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধের দাবিতে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভের কার্যকারণও বিবেচনায় নিতে চান। তিনি বলেন, তসলিমা নাসরিন স্বঘোষিত জুলাই অভ্যুত্থানের বিরোধী। তিনি শুধু লেখক নন, হিন্দুত্ববাদী দিল্লীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পক্ষে একজন প্রপাগান্ডিস্ট। তার বিরুদ্ধে ‘তৌহিদী জনতার‘ প্রতিরোধ এবং রণধ্বনি সকল প্রকার গোলামির বিরুদ্ধে। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিতকতা। উপদেষ্টা সরকারকে এটা বুঝতে আহ্বান করেছেন যে এই প্রতিরোধের পেছনে জনগণের গণঅভিপ্রায়ের উপাদান আছে। পাঠক খেয়াল করে দেখুন, সেলিম রেজা নিউটন ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনার পেছনে যে কারণটি উপদেষ্টা সরকারকে বিবেচনা করতে বলেছেন, সেই একই কারণ ফরহাদ মজহার বিবেচনা করতে বলছেন বইমেলায় বই নিষিদ্ধের দাবিতে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ প্রসঙ্গে। লেখকের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষুব্ধ সমাজের প্রতি মজহারের পাল্টা জবাব হচ্ছে জাহানারা ইমামের গণআদালত ছিল “মবজাস্টিস” প্রকৃষ্ট উদাহরণ, তখন নাগরিক সমাজ এর সমর্থনই দিয়েছিলেন। এখানেও একটি নোক্তা প্রয়োজন। জাহানারা ইমামের গণআদালতও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন তৎকালীন নাগরিক সমাজ, এর মধ্যে গণঅভিপ্রায় দেখেছেন, এমনকি ফরহাদ মজহার নিজেও দেখেছেন সেই গণঅভিপ্রায় যা তার “রাষ্ট্রদ্রোহী জাহানারা আসছে, হুঁশিয়ার” কবিতায় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এর মধ্যে ব্যক্তি হিসেবে মজহারের অবস্থানের স্ববিরোধিতা আছে কি না সেটা জানা আমাদের উদ্দেশ্য না, আমাদের উদ্দেশ্য হলো, যেসব ঘটনাগুলো বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র থেকে “মব” বলা হয়েছে তা আসলে “গণঅভিপ্রায়ের বিধ্বংসী বহিঃপ্রকাশ” কি না।

    উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে “মব” এবং “অন্যায়ের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ জনতা” কখনো এক হয়ে যাচ্ছে কখনো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এখানে যারা এক করছেন তারা কখনো আলাদা করছেন, আবার যারা আলাদা করছেন তারা কখনো কখনো এক করছেন। এই বিষয়টি আরও জটিল আরও একটি যুক্তিতে। জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের একদল দাবি করছেন তৌহিদী জনতাই যাত্রাবাড়ির যুদ্ধে প্রাণ দিয়ে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনকে তরান্বিত করেছে। এই তৌহিদী জনতা শাহবাগ আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদের সূতিকাগার মনে করে, এবং শাপলাচত্বরের পাল্টা আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুয়াত মনে করে। অর্থাৎ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তৌহিদী জনতার একটা সংহতি ছিল যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই প্রত্যক্ষ ছিল। আজ সেই লড়াইয়ে জিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া অংশ যখন সরকার গঠন করেছে তখন তৌহিদী জনতার লড়াই শেষ হয়নি। তৌহিদী জনতা তাদের মনমত রাষ্ট্র চায়, যা এখনো অর্জিত হয়নি। সেই বাবদে তৌহিদী জনতা একটি রাজনৈতিক কমিউনিটি যাদের ইমাজিনেশনে একটি আদর্শ রাষ্ট্র বর্তমান। বাস্তবে বিদ্যমান রাষ্ট্র যদি সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে নৈরাজ্য (নৈরাষ্ট্র) তৈরি করা তাদের জন্য দায়িত্ব হয়ে পড়ে, আইন নিজের হাতে নেয়া কর্তব্য হয়ে পড়ে। তারা তাই করছে, ফলে তারা মাইন্ডলেস মব না। তুলনার জন্য “ঘাতক–দালাল নির্মূল কমিটি“র কথা তোলা যেতে পারে, কমিটিটি কি মব ছিল? ছিল না। জাহানারা ইমাম কি রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন? ছিলেন না। তাদের ইমাজিনেশনের আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রের আদালত থাকার পরও তারা গণআদালত গঠন করেছিলেন, অভিযুক্তের বিচার করে শাস্তি দিয়েছিলেন। ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। এখানে কোনটা ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ আর কোনটা নেতিবাচক তার কোনো সার্বজনীন ঐক্যমত্য নাই।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    এমতাবস্তায় এদেরকে “মব” বলব না, বলব শ্যালো স্টেইট। শ্যালো স্টেইটের ধারণাটি আলোচিত হয় ডিপ স্টেইটের বিপরীতে। সরকার চালায় স্টেইট, কোনো কোনো রাষ্ট্রে সরকারকে চালায় রাষ্ট্রের অরাজনৈতিক অংশের ক্ষমতাধরদের একটি অংশ। সেই অংশটি রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভেতর থেকে প্রভাবিত করে। মূলত রাষ্ট্র বিষয়ে নিজস্ব মতামতের প্রকাশ দেখতে ইচ্ছুক আর্মি, পুলিস ও আমলারা এই অংশটি তৈরি করেন। এরা তুলনামূলকভাবে স্থায়ী, অর্থাৎ সরকার আসে সরকার যায়, ডিপ স্টেট থেকে যায়। এরা সংগঠিত, অনুচ্চ, রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে অভিজ্ঞ, বাস্তবে রাষ্ট্র কেমন হবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। যদিও ডিপ স্টেট নিয়ে অনেক ফাঁপানো গল্প আছে, যার বেশির ভাগেরই ভিত্তি পাওয়া যায় না। সেসব বাদ দিয়ে এটুকুতো আমরা দেখতে পাই কখনো কখনো শাসন সরকারের হাতে থাকলেও প্রশাসন আমলা, পুলিস এবং আর্মিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই প্রভাবকে সাধারণতো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, কেননা এটার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা নাই। আবার এও দেখেছি রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে ডিপ স্টেইট কখনো কখনো ইতিবাচক ভূমিকাতে জেগে ওঠে। এমনটাও প্রচার হয়েছে যে আর্মির ভেতর থেকে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষে একটি অংশ ভূমিকা রেখেছে। পারিপার্শ্বিক উপাত্তের আলোকে এটা বিশ্বাস করা যায়।

    এবার ডিপ স্টেইটের প্রেক্ষিতে শ্যালো স্টেইটকে দেখা যাক। শ্যালো স্টেইট ডিপ স্টেইটের ঠিক উল্টা, এরা দৃশ্যমান, উগ্র, রাষ্ট্র কিংবা সমাজের আচরণে ক্ষুব্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ। কিন্তু মিলের জায়গাটি হলো তাদেরও রাষ্ট্রচিন্তা আছে, তারা লক্ষ্য উদ্দেশ্যহীন না। যেমন ঘাতক–দালাল নির্মূল কমিটির একটা রাষ্ট্রচিন্তা ছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি। তাই তারা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ভার নিজদের হাতে তুলে নিয়েছিল, সেটা প্রতীকী হলেও রাষ্ট্রের জন্য একটা চাপ। আবার যেমন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রকল্পনার সঙ্গে হেফাজতের বনিবনা না হওয়া। হেফাজত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। এরা শ্যালো স্টেইট, এরা রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু রাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করেই সংগঠিত। আজ যাদের তৌহিদী জনতা বলছি তারাও আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, তখন অবশ্য ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে তার সংহতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটাতো বোধগম্য যে তৌহিদী জনতার যে রাষ্ট্রকল্প তা পুরপুরি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলেই তারা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। আজ ড. ইউনূসের রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলাটা নেতিবাচক হিসেবে দেখছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই নেতিবাচকভাবে দেখার পেছনে যে যুক্তি সেটা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। যে প্রতিক্রিয়া সরকার দেখাচ্ছে সেটারও সমালোচনা হাজির করেছি। তবে এটা স্বীকার্য যে জুলাই অভ্যুত্থান যে প্রতিশ্রুতি আর সুযোগ নিয়ে এসেছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রাষ্ট্রকে, তার সংবিধানকে সংস্কার করার, তা করতে রাষ্ট্রের সুস্থিতি প্রয়োজন। তাই উপদেষ্টা পরিষদকে উপদেশ দিতে চাই, তারা যেন কোনো শ্যালো স্টেইটকে ডিপ স্টেইটের অ্যাপেরাটাস দিয়ে “ট্রিট” না করে, বরং নিজেরাই “ডিল” করে বা মোকাবেলা করে। বিগত সরকার শ্যালো স্টেইটকে ট্রিট করতেই কিন্তু তাদের জঙ্গি সাব্যস্ত করে, আয়নাঘর বানায়, অনন্ত যুদ্ধে ঢুকে পড়ে।

    তৌহিদী জনতার নামে যে ক্ষোভের প্রকাশ হয় তার মধ্যে তাৎক্ষণিকতা থাকলেও একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। যেমন মাজার ভাঙা, বাউল–ফকির–বয়াতিদের উপর আক্রমণ করা গত রেজিমেও বেশ বিদ্যমান ছিল, বর্তমান রেজিমেও বিরাজমান আছে। তৌহিদী জনতার ব্যাখ্যা হলো, এসব শিরকী কাজ কারবার। এটা কোনো নতুন কথা নয়, বাউল ধ্বংসের ফতোয়াগুলো এই ধারণা থেকেই দেয়া। শিরক হলো তৌহিদের বিপরীত, ফলে একে ধ্বংস করতে হবে। শিরকের প্রশ্নে ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে ঘাবড়ে দেয়া সহজ, কেননা একটা ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ এবং এই অপরাধ কেবল মুসলমানদের উপরই প্রযোজ্য। শিরকের পরেই তৌহিদী জনতা আরও একটি বিষয়কে ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন, তাহলো হযরত মুহম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তি করা, যাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা যায় শাতিম করা। শাতিমের অপরাধে যেকোনো ধর্মের ব্যক্তিকে শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে তৌহিদী জনতার কাছে। বহু কেইস আছে যেখানে শাতিম–এ–রসুল, রসুল (সাঃ)-এর অবমাননার অভিযোগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিপীড়ন করা হয়েছে, বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি কবি সোহেল হাসান গালিবকে একটি কবিতায় তৌহিদী জনতার শাতিম–এ–রসুল খোঁজার অতি উৎসাহ নিয়ে ক্রিটিক করে একটি কবিতা লিখেছেন, সেটাকেও শাতিম–এ–রাসুল হিসেবে সাব্যস্ত করে তাকে বিপদে ফেলা হয়েছে, খবরের কাগজে এসেছে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও, বসন্তবরণ, নববর্ষবরণ, নারীদের ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে তৌহিদী জনতার বক্তব্য আছে যা নাগরিক সমাজের সবার জন্য গ্রহণযোগ্য না। ফলে তাদের ক্ষোভ হয়, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সামনে শিয়া, আহমদিয়াদের ব্যাপারেও তাদের অসন্তোষ নিয়ে হাজির হবে অনুমান করা যায়। এখন উপায়? আমার মতে মুসলমান সমাজকে, নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়েই উপায় বের করতে হবে সরকারকে। তার কিছু ইঙ্গিত রেখে লেখাটির উপসংহার টানছি। তবে বলে নেয়া ভালো এ কোনো নতুন উপায় না, বহুল আলোচিত এবং উপেক্ষিত উপায়।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    উপায়টি এক বাক্যে বললে বলা যায়: জান–মান–মাল ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের জবানকে স্বাধীন করে দেয়া। তো, জবান স্বাধীন করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কেননা, জবান সরাসরি চিন্তাভাবনার সঙ্গে জড়িত। জবানের বা প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তাভাবনা আগাতে পারে না। চিন্তাভাবনা না আগালে কোনো ব্যক্তি, বর্গ, জাতি (নেশন) আগাতে পারে না, তা পর্যবেক্ষিত সত্য। রাষ্ট্রকে তাই পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে রাষ্ট্র কী ধরনের জবানকে সুরক্ষা দিবে, কী ধরনের জবানকে দিবে না। যেমন সরকার এবং সরকারের তৈরি করা রাষ্ট্রের ভার্শনের সমালোচনার সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। আবার, যেমন জনগণের জান–মান–মালের ক্ষতিসাধনের হুমকি ও সহিংসতার প্ররোচনা যেহেতু আইনত অপরাধ তার সুরক্ষা রাষ্ট্র দিবে না। এটা পরিষ্কার হতে হবে, যেসব বাচনিক, আঙ্গিক এবং অন্যান্য মাধ্যমগত প্রকাশ আইনত অপরাধ সেই অপরাধের অভিযুক্তের বিচার করা কেবলমাত্র রাষ্ট্রের এখতিয়ার। কোনো ব্যক্তি বা বর্গ অভিযুক্তের ক্ষতিসাধন করতে গেলে তাও অপরাধ বলে বিবেচ্য হবে প্রচলিত আইনে। কোনো স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নয়, ট্রিটমেন্টের কোনো অর্থেই নয়। এটা হলো পূর্বকথিত উপায়ের সূচনার দিকটা, তবে দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য একটি বৃহত্তর সংলাপের প্রয়োজন। সেই সংলাপের বিষয় হলো বাংলাদেশে মুসলমান প্রশ্ন। সামাজিক পরিসরে নাগরিক সমাজ মুসলমান প্রশ্নটির ধারাবাহিক আলাপ হওয়া দরকার।

    প্রসঙ্গত বলে রাখি, ইসলাম প্রশ্নের কথা বলছি না, বাংলাদেশে ইসলাম কোনো প্রশ্ন নয়। যা হাজির আছে, তাহলো মুসলমান প্রশ্ন। মাইনরিটিকেই সবসময় প্রশ্ন আকারে দেখা হয়ে আসছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, হেফাজত, তৌহিদী জনতা, প্রভৃতির শ্যালো স্টেইটের ক্ষুব্ধ উপস্থিতির প্রেক্ষিতে, ম্যাজোরিটির প্রশ্নটি ফয়সালা করা দরকার। কেননা উপরোক্ত শ্যালো স্টেইটগুলো ম্যাজোরিটির দোহাই দিয়েই চাপটা তৈরি করে। উল্টো দিকে যাদের দোহাই দিয়ে এরা তাদের ক্ষোভ দেখায়, সেই বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে তৌহিদী জনতা নামের উপবর্গ বা সাব–ক্যাটাগরিটি হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে। প্রশ্ন জাগে, বাকি মুসলমানরা তাহলে তৌহিদী না? অথচ বিশ্বাসী মুসলমান মানেই তৌহিদী জনতা, কারণ তারা তৌহিদ অথবা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করেন। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, অর্থাৎ এক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই, এ কথা বিশ্বাস করেই একজন মানুষ মুসলমান হয়।

    ফলে, প্রায় নব্বই শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে “তৌহিদী জনতা” বা “আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী জনতা” নামে একটি বিশেষ বর্গ করার কারণ নিয়ে জনপরিসরে তাদের প্রশ্ন করা দরকার। “তৌহিদী জনতা” নামে পরিচিত মুসলমানদের যদি সত্যিই কোনো রাষ্ট্রকল্প থাকে, অর্থাৎ আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা থাকে, যেমন তৌহিদী রাষ্ট্র বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্র, তবে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সেটা শোনা উচিত, তাদের সঙ্গে সংলাপ করা উচিত। বাংলাদেশের ম্যাজোরিটি মুসলমান যে গণতন্ত্র চায়, সেটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। ম্যাজোরিটি মুসলমানের রাষ্ট্রকল্পের সাক্ষী বাংলাদেশের ইতিহাস। তৎকালীন পাকিস্তান পূর্ববঙ্গসহ ইসলামিক রিপাবলিক গড়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে গিয়েছিল, ইসলামের অপমান করে লাখো মুসলমানকে হত্যা করেছিল সেই একনায়কতন্ত্র। শেষপর্যন্ত, পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ মুসলমান পিউপল‘স রিপাবলিক আনার জন্য সত্তরে ভোট দিয়েছিল, একাত্তরে জীবন দিয়েছিল। সেই পিউপল‘স রিপাবলিক যখন বিভিন্ন সময় একনায়কতন্ত্রে বা ফ্যাসিবাদে মোড় নেয়, গণতন্ত্রকামী মুসলমানরা তাদের পিউপল‘স রিপাবলিক ফিরিয়ে আনতে জীবন দিয়েছে। এখন “তৌহিদী জনতা” বাংলাদেশের ম্যাজোরিটি মুসলমানের আদর্শ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় কি না, সেটা পাবলিক পরিসরে পরিষ্কারভাবে বলুক।

  • জর্জিও আগামবেন ।। ইতি ইহুদিবাদ

    জর্জিও আগামবেন ।। ইতি ইহুদিবাদ

    • অনুবাদ: ইমরান কামাল

    [ইজারায়েলি জায়নবাদের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আগামবেন বেশ চমকপ্রদ একটা ধারণা হাজির করছেন। জায়নবাদের আবির্ভাবের পেছনে তিনি নেতির ধারণা নিয়ে আসছেন আমাদের সামনে। লেখাটি প্রকাশিত হয় গত বছরের (২০২৪) এর ৩০ সেপ্টেম্বরে, Quodlibet নামক অনলাইন পত্রিকায়। এখানে আগামবেন দাবি করছেন একদিকে খ্রিস্টীয় জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোতে ইজরায়েলে ইহুদিদের আত্তীকরণ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যেমন ইহুদি পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে আবার আরেকদিকে ইহুদি পরিচয়ের অন্তঃসার যেই নির্বাসনের ধারণা তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এই দুই নেতির মাধ্যমেই ইহুদি পরিচয়ের ইতি ঘটছে, আবির্ভাব হচ্ছে জায়নবাদ নামক এক নতুন বস্তুর। আগামবেনের মতে জায়নবাদ মূলত ইহুদি পরিচয়ের মৌলিক ধারণার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে, এবং সেই পরিচয়কে অস্বীকার করে, ফলে আজকের জায়নবাদকে বুঝতে হলে এই নেতির ধারণা থেকেই বুঝতে হবে বলে দাবি করছেন আগামবেন। লেখাটির বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে মূল ইতালিয়ান প্রবন্ধটির ইংরেজি সংস্করণ থেকে—সম্পাদক]

    জর্জিও আগামবেন
    দেয়ালচিত্র

    হালের হকিকত

    জায়নবাদ ইহুদিবাদের ঐতিহাসিক বাস্তবতার দ্বৈতনেতি, এ কথা না বুঝলে হালের ইসরায়েলে যা ঘটছে তা বোঝাও অসম্ভব। প্রথমত, ইহুদিদের খৃষ্টীয় জাতি-রাষ্ট্রে চালান করার মধ্যদিয়ে এক নেতিকরণ হয়েছে, তাদের পরিচয়কে করা হয়েছে অস্বীকার। এই নেতিকরণের চূড়ান্ত পরিণতিই জায়নবাদ, যা আঠারো শতকের শেষ থেকে ধীরে ধীরে ইহুদি রূপকেই বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

    অ্যামনন রাজ-ক্রাকোৎসকিন (Amnon Raz-Krakotzkin) তাঁর একটি গবেষণায় চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন—জায়নীয় চৈতন্যের গভীরে আছে আরেক নেতি—গালুতের (Galut) নেতি, অর্থাৎ নির্বাসন, যা কিনা দুনিয়াব্যাপী যতরকম ইহুদিবাদ আছে তার সরল বৈশিষ্ট্য। এই নির্বাসন-ধারণার ভিত্তি দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাইবেলীয় সাহিত্যেও এর উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।

    ইহুদি ঐতিহ্যে নির্বাসন–ধারণা

    দুনিয়াতে ইহুদি অস্তিত্বের অপর নাম নির্বাসন। গোটা ইহুদি ঐতিহ্য—মিশনা (Mishnah) থেকে তালমুদ (Talmud), সিনাগগ-স্থাপত্য থেকে বাইবেলীয় নানান ঘটনার স্মৃতি—সবই গড়ে উঠেছে এবং এখনো দাঁড়িয়ে আছে নির্বাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে। একজন অর্থডক্স ইহুদির কাছে, যে ইহুদিরা ইসরায়েল রাষ্ট্রে বাস করছে—তারাও নির্বাসিতই। আর তোরাহে যে রাষ্ট্রের কথা আছে, একজন মসিহা আসবেন এবং সেই রাষ্ট্র গঠন করবেন বলে যে খোয়াব তারা দেখে—তা আর যাই হোক, আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র না। সেই রাষ্ট্রকল্পের মূলবাণী—মন্দির পুনর্প্রতিষ্ঠা আর যা কিছু কোরবানি হয়েছে তার পুনর্স্থাপন। কিন্তু ইসরায়েল রাষ্ট্র এসব কথা শুনতেই চায় না। এও মনে রাখা উচিত যে, ইহুদিবাদে, নির্বাসন কেবল ইহুদিদের বিষয় না, এ দিয়ে বোঝানো হয়—গোটা দুনিয়াই একটা আস্ত ব্যর্থগল্প। ইসহাক লুরিয়ার (Isaac Luria) মতো কাব্বালাবাদীদের মতে, নির্বাসন দিয়েই আরাধ্যের প্রকটদশা ব্যাখ্যা করা যায়। তারা মনে করতেন খোদা দুনিয়া পয়দাই করেছেন আত্মনির্বাসনের মধ্যদিয়ে। আর তার সেই নির্বাসন চলবে টিক্কুন (Tiqqun) পর্যন্ত। ইহুদি কল্পনায়, টিক্কুন হলো—অদ্যশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

    শিল্পী: জেমস তিশত

    উচ্চমনা অবস্থানের ভিত্তি

    নির্বাসনের প্রতি এই নিঃশর্ত সম্মতি, যার জোরে ইহুদিরা হালের সকল প্রকার রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই অস্বীকার করতে পারে। একেই তারা উচ্চমনস্কতা বলে বোঝে, আর এ কারণে, যারা, যেসব ধর্ম ও জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে, আপস করেছে, তাদের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। জিপসিদের মতো জনগোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিরাও রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কখনো যুদ্ধ করেনি এবং অন্য জনগোষ্ঠীকে বধযোগ্য বানিয়ে নিজেদের কলঙ্কিত করেনি।

    জায়নবাদের প্রতারণা

    জাতি-রাষ্ট্রের নামে নির্বাসন আর দেশহীনতার আকর ধারণাকে অস্বীকার করে জায়নবাদ খোদ ইহুদিবাদের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গেই প্রতারণা করেছে। যার ফলে, রাষ্ট্র ইসরায়েল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের চরম নিষ্ঠুর রূপে পরিণত হয়েছে। ফলত, এই অস্বীকার যে—ফিলিস্তিন—নামে আরেক নির্বাসনের স্রষ্টা হয়েছে, আর ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বানিয়েছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ, তা দেখে আমরা আর আচম্বিত না হই। জায়নবাদীদের মতে, দেশান্তর আর দেশহীনতা পৃথিবী থেকে ইহুদিদের মুছেই ফেলতে পারতো। ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস! যারা এককালে এই মত প্রচার করেছিলো, তারাই আজ দুনিয়া থেকে অপর কারো নাম মুছে ফেলতে উদ্ধত। এ কথাকে আমরা অবশ্য অন্যভাবেও পাঠ করতে পারি, আমরা বলতেই পারি, যে ইহুদিবাদকে আউশভিৎস খুন করতে পারেনি, সেই ইহুদিবাদ সম্ভবত আজ জানে—কীভাবে তাকে খতম করা হবে।

    সংযুক্তি
    ১. অ্যামনন রাজ-ক্রাকোৎসকিন: একজন ইসরায়েলি অধ্যাপক, বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি ইতিহাস পড়ান।
    ২. আইজাক লুরিয়া: ষোড়শ শতাব্দীর একজন কাব্বালবাদী রাব্বি।
    ৩. টিক্কুন ওলাম: একটি ইহুদি ধারণা, যা পৃথিবীকে মেরামত ও উন্নত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিকে নির্দেশ করে।

  • জাতির কী রূপ?

    জাতির কী রূপ?

    • সারোয়ার তুষার

    শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’ কিনা, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত সম্প্রতি জমে উঠেছে। এ বিতর্ক করার জন্য উপযুক্ত সময় এখন কিনা– সে প্রশ্নও কেউ কেউ তুলেছেন। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, এ বিতর্ক উঠতই। বিমূর্ত স্তরে ‘জাতির পিতা’ ধারণার পিতৃতান্ত্রিকতা উপেক্ষা করার উপায় নাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রের অবদান অস্বীকার করে বিশেষ একজন ব্যক্তিকে ‘জাতির পিতা’ বানানোর ভাবাদর্শিক তাৎপর্যও উপেক্ষা করা যায় না।

    পূর্ব বাংলা থেকে ক্রমে বাংলাদেশ নামে আবির্ভূত এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁর ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার বা খাটো করার সুযোগ নাই। স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিব শাসনামল সম্পর্কে ঐতিহাসিক মূল্যায়নেরও বিকল্প নাই।

    আসলে কোনো ‘জাতি’র একক ‘পিতা’ থাকতে পারে কি? সাম্প্রতিক বিতর্কে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাউন্ডিং ফাদারস’ ধারণার নজির টেনেছেন। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে যদি স্বীকার করতেই হয়, ফাউন্ডার্স তথা স্থপতি ধারণার শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন নয়, কয়েকজন স্থপতির কথা ভাবতে হবে।

    ‘জাতির পিতা’ ধারণার সমস্যা উপলব্ধির আগে খোদ ‘জাতি’ ধারণার সংকট উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ইংরেজি ‘নেশন’ শব্দের বাংলা হিসেবে আমরা ‘জাতি’ শব্দটি গ্রহণ করেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন ‘নেশন’ শব্দের বাংলা হওয়া উচিত নয়; কারণ আমাদের সামষ্টিক জীবন নেশনকেন্দ্রিক নয়, সমাজভিত্তিক। বাংলায় ভাষায় ‘জাতি’ বা ‘জাত’ শব্দের অর্থও অনেক রকম– ঠিক রাষ্ট্রবাদী নয়; বাঙালি জাতি, নারী জাতি, পশু জাতি ইত্যাদি। তবু নেশন-স্টেটের বাংলা জাতিরাষ্ট্র, আর নেশনের বাংলা হিসেবে জাতি টিকে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নোক্তা পাত্তা পায় নাই। পেলে ভালো হতো। তাঁর অবস্থানটাই সঠিক ছিল।

    নেশন-স্টেট ইউরোপের বিশেষ ইতিহাসের ফসল। নিজেদের মধ্যে অনেক মারামারি-কাটাকাটি করে পাশ্চাত্য উপলব্ধি করে, এবার ‘সভ্য’ হওয়া দরকার। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিটি নেশনের একটা স্টেট থাকতে থাকবে। খ্রিষ্টানদের অন্তঃধর্মীয় বিবাদে ১৭ শতকের ইউরোপ টালমাটাল ছিল। ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টরা পরস্পরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ৩০ বছরের (১৬১৮-৪৮) ধর্মযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাব্যস্ত হয়– ‘রাজার ধর্মই হবে প্রজার ধর্ম’। ক্যাথলিক রাজত্বে প্রজার ধর্ম ক্যাথলিক; আর প্রটেস্টান্ট রাজত্বে প্রজার ধর্মমত প্রটেস্টান্ট। এই দফারফা ইতিহাসে ‘ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধি’ হিসেবে পরিচিত। এর ফলে ধর্মের দিক থেকে রাজত্বগুলো একবাদী হয়ে উঠেছিল। ধর্মযুদ্ধে বিধর্মীনাশের মাধ্যমে ইউরোপে এক অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক ‘শুদ্ধতা’ অর্জিত হয়েছিল। আশ্চর্য নয়; পরবর্তীকালের ইউরোপে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাধিকার চেতনা যত বেড়েছে, এই একবাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বহুত্ববাদী ধ্যান-ধারণার সংঘাত তীব্রতর হয়েছে।

    এক অর্থে, আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ‘এক জাতি এক ধর্ম এক ভাষা এক রক্ত’ কিসিমের বর্ণবাদী ধারণার সঙ্গে বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনার সংগ্রামেরই ইতিহাস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুদীপ্ত কবিরাজ মন্তব্য করেছেন: ‘দেখানো হয় যে ইয়োরোপীয় মানব ক্রমশই একটা থেকে আরেকটা মুক্তির দিকে লম্ফ দিয়ে বাকি পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছে। একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যায় সেই ইতিহাস যে কেবল শ্রেণিবিদ্বেষের এবং শোষণের ওপরে প্রতিষ্ঠিত তাই নয়, নিজের অস্মিতা ছাড়া সে অন্য সব অস্মিতাকেই অবমাননা এবং হিংসা করে এসেছে। এবং তাই পাশ্চাত্যের আধুনিক ইতিহাস মানবিক ভ্রাতৃত্বের ইতিবৃত্ত নয়, প্রত্যেক জাতির অন্য জাতির বিরুদ্ধে হিংসার ও যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস।’[mfn]সুদীপ্ত কবিরাজ, ‘অ-জাতীয়’, রাষ্ট্রচিন্তা জার্নাল, ত্রয়োদশ সংখ্যা, ২০২৪ [/mfn]

    প্রচলিত কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী ‘জাতি’ ধারণা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ইউরোপ তার ধর্ম প্রশ্নের মীমাংসা করেছে বলে মনে করা হয়। আসলে ব্যাপার হচ্ছে, ইউরোপের ‘জাতি ধারণা’র সঙ্গে (খ্রিষ্ট) ধর্মের যোগাযোগ ও আঁতাত গভীর। কারা এক ও অভিন্ন ‘জাতি’– এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে আধুনিক ইউরোপ সাব্যস্ত করেছে যে, যারা ভাষা, ধর্ম ও রক্তের দিক থেকে ‘এক ও অভিন্ন’, তারাই একীভূত জাতি। অর্থাৎ ইউরোপের জাতি ধারণা ‘মধ্যযুগীয়’ ধর্মের প্রতিবিধান তো নয়ই; বরং ধর্ম, ভাষা ও তথাকথিত অমিশ্রিত রক্তই ইউরোপের আধুনিক জাতিবাদী ধ্যান-ধারণার গাঠনিক উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। একই রক্তের অধিকারী অভিন্ন ভাষিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ভূমিতে ‘জাতিরাষ্ট্র’ কায়েম করবে– এমন ধ্যান-ধারণা উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়েও স্বাভাবিক মডেল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এই কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী রাষ্ট্র মানেই জাতিরাষ্ট্র। বলা বাহুল্য, সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী এই (জাতি) রাষ্ট্রতত্ত্ব আধুনিক জমানার সব সংকটের মূলে। আধুনিক জাতিবাদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর।

    ‘জাতি’ ধারণার বলেই ইউরোপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। অভিন্ন ধর্ম-ভাষা-রক্তের বলে বলীয়ান কোনো ‘জাতি’ তথা সংগঠিত ইউরোপীয় লোকশক্তি পরদেশ আক্রমণ ও দখল করেছে। উপনিবেশিত অঞ্চল আকারে ও জনসংখ্যায় অনেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তুলনায় বড় হলেও, তারা শুরুর দিকে উপনিবেশের যৌক্তিক বিরোধিতা করতে পারে নাই জাতি বা জনগণ ধারণার অভাবে।

    উপনিবেশিত অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীরা শুরুর দিকে ঠিক এ কারণেই উপনিবেশের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। এমন নয় যে, তারা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। কিন্তু কেন স্বাধীনতা? কার জন্য স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনতার উপযুক্ত হয়ে উঠেছি?– এই ছিল প্রধান তর্ক। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, কেবল স্বাধীনতা চাইলেই হবে না। চাওয়ার আগে ‘জাতি/জনগণ’ হয়ে উঠতে হবে। আবার ইউরোপীয় জাতিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পদানত অঞ্চলে ক্রমশ জাতীয় মুক্তির চেতনা তৈরি হওয়াতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সূচিত হয়েছে।

    যে যুক্তিতে ইউরোপ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে দখলে নিয়েছে, সেই একই যুক্তিতে উপনিবেশিত অঞ্চলের মানুষ বিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে তথা নিজেদের জাতি/জনগণ ঘোষণা করেছে। একই রক্তের অধিকারী জনগোষ্ঠী একটি ‘নেশন’ এবং তারাই একটি রাষ্ট্র গঠনের অধিকারী– এটাই আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের গোড়ার অনুমান।

    ‘নেশন’ শব্দ এসেছে লাতিন ‘নেশিও’ শব্দ থেকে; অর্থ জন্মসূত্রে একই সম্প্রদায়। অর্থাৎ জাতিরাষ্ট্রের সদস্যরা জন্মের সূত্রে সম্বন্ধিত, এ-ই হচ্ছে অনুমান। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সব বর্ণবাদ ও অপরায়নের শিকড় এর মধ্যে নিহিত।

    ইউরোপের অতীত দেখে আমাদের ভবিষ্যৎ চিনতে হবে– এ কথা আজকাল পাঁড় প্রাচ্যবাদীরাও বলার স্পর্ধা দেখান না। পার্টিশনের কালে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘সর্বজনীন’ ভেবে বহু ধর্ম বহু জাতি বহু ভাষার ভারতবর্ষকে দুই জাতিতে বিভক্ত করেছি আমরা। ধরে নেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্র মানেই জাতিরাষ্ট্র।

    আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ইতিহাসে বিঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রাচ্য থেকেই উঠতে থাকবে। অধুনা দার্শনিক ও রাষ্ট্রতাত্ত্বিকরা বলছেন– তন্মধ্যে ওয়াল্টার মিনালু, মাহমুদ মামদানি, সুদীপ্ত কবিরাজ, ফরহাদ মজহার উল্লেখযোগ্য– রাষ্ট্র মানেই জাতির রাষ্ট্র হতে হবে, এমন কোনো দিব্যি নাই। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে জাতি ও রাষ্ট্রের আবশ্যিক যোগসাজশ অপ্রয়োজনীয়। এ কারণেই ফরহাদ মজহারের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী, মাহমুদ মামদানির বিউপনিবেশিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়, সুদীপ্ত কবিরাজের অ-জাতিবাদী রাষ্ট্র ধারণা ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রস্তাব হিসেবে হাজির আছে। কোনো রক্তবাদী ও জাতিবাদী রাষ্ট্রকল্পকে সমর্থন করার সুযোগ নাই।

    গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য সুসংহত রাষ্ট্র গড়ে তুলবে, এটাই আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকল্প। এ ধরনের রাষ্ট্রে ‘মেজরিটি’ হবে অস্থায়ী ও রাজনৈতিক মেজরিটি তথা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফলাফল; স্থায়ী, অনড় কোনো সূচনাবিন্দু নয়। জাতিরাষ্ট্রে মেজরিটি ও মাইনরিটি উভয়ই স্থায়ী, অনড় এবং ধর্ম বা ভাষার দিক থেকে ধাতবাদী। অ-জাতিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেজরিটি ও মাইনরিটি উভয়ই অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফসল। কাজেই ‘জাতি’ ধারণার বিপরীতে ‘রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’ বর্গটির চর্চা ও প্রয়োগ অধিকতর গণতান্ত্রিক।

    প্রথম প্রকাশ : সমকাল  ২৪ অক্টোবর ২০২৪ 

  • আওয়ামী জমানার ‘ফ্যাসিবাদ’ : কাঠামো ও প্রবণতা

    আওয়ামী জমানার ‘ফ্যাসিবাদ’ : কাঠামো ও প্রবণতা

    • সহুল আহমদ

    Fascism is a set of ideologies and practices that seeks to place the nation, defined in exclusive biological, cultural, and/or historical terms, above all other sources of loyalty, and to create a mobilized national community.- Kevin Passmore[mfn]Kevin Passmore, Fascism: A Very Short Introduction, Oxford University Press, 2014[/mfn]

    আওয়ামীলীগের বিগত পনের বছরের শাসনামলকে স্বৈরতন্ত্র, ইলেক্ট্রোরাল অটোক্রেসি, হাইব্রিড রেজিম ইত্যাদি নানা বর্গে চিহ্নিত করা হলেও, বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক পরিসরে এই রেজিমকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলেই চিহ্নিত করা হয়।

    ৫ আগস্টের আগে ‘ফ্যাসিবাদি’ বলে কেবল আওয়ামী-রেজিমকেই চিহ্নিত করা হলেও, ৫ আগস্টের পরপর সেটা হরেদরে সবার বিরুদ্ধে দাগানো হচ্ছে। আওয়ামীলীগকে তো বলা হচ্ছেই, তেমনি আওয়ামীলীগের ফেসবুক পেজ থেকে উল্টো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমেও একে অপরের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদ’ কায়েমের অভিযোগ তুলছেন হরদম। এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে ছিলেন—এমন ব্যক্তিরাও মতের মিল না হলে একে অপরকে ফ্যাসিবাদী বলে তকমা দিচ্ছেন। যেমন, চিন্তক ফরহাদ মজহারের সমালোচনা করতে গিয়ে সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক সালাহ উদ্দিন শুভ্র যে মন্তব্য করেন সেটাকে এই শব্দের এমন হরেদরে ব্যবহারের উদাহরণ হিসাবে পাঠ করা যায়: ‘ফরহাদ মজহার গঠন, জনগণ ইত্যাদি নানা ধরনের শব্দ দিয়ে চিন্তার একটা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চান। এগুলা ভেঙে দিতে হবে’। (২৬ অক্টোবর, ২০২৪)

    অরওয়েল ১৯৪৪ সালে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক রেটরিক হিসাবে এর অস্পষ্টতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন,  For if you examine the press you will find that there is almost no set of people — certainly no political party or organized body of any kind — which has not been denounced as Fascist during the past ten years.[mfn]George Orwell, ‘What is Fascism?’, Tribune, 1944 (https://www.orwell.ru/library/articles/As_I_Please/english/efasc)[/mfn] বাংলাদেশে বর্তমানে এই পরিস্থিতি হাজির রয়েছে।

    হরেদরে ‘ফ্যাসিবাদী’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দেওয়ার ফলে আওয়ামী-রেজিমের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী হওয়ার যে অভিযোগ, সেটাই লঘু হয়ে যাচ্ছে।

    আবার, আওয়ামীলীগ বা ছাত্রলীগের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত যে আলাপ বা বাহাস চলছে, সেখানেও রেফারেন্স বিন্দু হিসাবে আছে ইউরোপের ফ্যাসিবাদ। ইউরোপে ফ্যাসিবাদকে ন্যাস্যাৎ করা হয়েছে, তাদের সকল চিহ্নকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে এখানেও করতে হবে একই তরিকায় – অনেকটা এই তরিকার যুক্তি।

    ইউরোপের ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ, গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধ ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি আলাপ করেছেন শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসীর মামুন। তারা দুজনেই আওয়ামী লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতনের অন্যতম স্তম্ভ।  ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের সাথে জামায়াতের সম্পৃক্ততার কারণে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে যুক্তি তারা দিতেন, বা জামায়াতকে নিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তারা তৈরি করেছিলেন সেটাও ছিল একই তরিকায় ইউরোপের নাজিবাদ/ফ্যাসিবাদের রেফারেন্স ধরে। বর্তমানে যারা একই ইউরোপের রেফারেন্সে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা করছেন, তারা মারাত্মকভাবে – সচেতন বা অবচেতনভাবে – মুনতাসীর মামুন বা শাহরিয়ার কবিরদের লেখাপত্র দ্বারা প্রভাবিত।

    ইউরোপের ফ্যাসিবাদ বা নাজিবাদকে রেফারেন্স বিন্দু হিসাবে হাজির করে বাংলাদেশের ইতিহাসের সহিংস ঘটনা ব্যাখ্যার যে প্রবণতা এটা আসলে সমস্যাজনক। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির খণ্ডিত চিত্র হাজির হয়। শুধু ইউরোপের সঙ্গে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে এখানকার রাষ্ট্র ও সহিংসতার নানা মাত্রাকে লঘু করে ফেলা হয়। যেমন একাত্তরের জেনোসাইডকে কেবল নাৎসি জমানার জেনোসাইডের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেক স্থানিক বিষয় বাদ পড়ে। ধারণ করে একটা খণ্ডিত চেহারা। এই খণ্ডিত চিত্র আওয়ামী জমানা তাদের মতাদর্শিক অবস্থান তৈরিতে এস্তেমাল করেছিল।

    ফ্যাসিবাদ নিজে কোনো মতাদর্শ না, বরঞ্চ যে কোনো মতাদর্শের কাঁধে সওয়ার হয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে পারে। জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাঁধে সওয়ার হওয়াই সর্বাধিক সহজ-প্রবণতা।

    আওয়ামীলীগের শাসনামলকে আমরা যেভাবে ফ্যাসিবাদী বলে থাকি, তার সাথে এই জমানার একাডেমির বহু লোক আসলে একমত হবেন না। তারা বরঞ্চ এই রেজিমকে ‘স্বৈরতন্ত্র’ বা ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ বা ‘অটোক্রেসি’ বা ‘হাইব্রিড রেজিম’ ইত্যাদি বর্গ দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন।

    ইউরোপের উদাহরণ দিয়ে আওয়ামী শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদ’ বর্গে ঢুকানোর করার কোশেশ আদতে খুব একটা ফলপ্রসু হবে না। হিটলারের নাজিবাদ বা স্ট্যালিনের কমিউনবাদ বা মুসোলিনির ফ্যাসিবাদকে অনেক বেশি ‘টোটালিটারিয়ানিজম’ বর্গের আওতায় ব্যাখ্যা করার চল আছে। হানা আরেন্টের যুগান্তকারী কাজটাকে বিবেচনায় নিতে পারি। ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও সতর্কতামূলক অবস্থান নেওয়া উচিত বোধ হয়। সম্প্রতি চিন্তক ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ আজমকেও ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন :

    ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্তত শেষ এগার বছরের শাসনে ফ্যাসিস্ট শাসনের ও মতাদর্শের নানা উপাদান থাকলেও একে আসলে আধা-ফ্যাসিস্ট, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসন বলাই শ্রেয়। তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটির উল্লেখ করি। প্রথমত, ফ্যাসিস্ট শাসনের ক্লাসিক উদাহরণগুলোতে (যেমন ইতালি ও জার্মানি) ইডিয়লজিকেল স্টেট অ্যাপারেটাসের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের মোটামুটি ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। বাংলাদেশে গত অন্তত বছর দশেকের বাস্তবতা বিশেষভাবে আলাদা। তথ্য-প্রমাণ বলছে, গত বার-তের বছরের মধ্যে যেকোনো সময় সাধারণ নির্বাচন হলেই আওয়ামী-বিরোধী শিবিরই ক্ষমতায় আসত। এ শাসন জনগণের মধ্যে মোটেই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিস্ট শাসনগুলোর, এমনকি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও (যেমন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া), জনসম্মতির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনা, রাষ্ট্রের ও জনগণের উন্নতি, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং নীতি-নৈতিকতার প্রবলতা দেখা গেছে। আওয়ামী-রেজিমে এসব বস্তু বিন্দুমাত্রও লক্ষ করা যায়নি। দুর্নীতি ও লুটপাটই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কাজেই একে ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসন বলে সম্মানিত না করাই ভালো।’[mfn]মোহাম্মদ আজম, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পটভূমিতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪’, রাষ্ট্রচিন্তা, ত্রয়োদশ সংখ্যা, ২০২৪[/mfn]

    ফলে, আওয়ামী-শাসনামলকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’-এর ব্যবহারের কথা বলছি, তাকে বুঝতে হবে আসলে আমাদের কাঠামো ও প্রবণতার আলোকে। ইউরোপের ইতিহাস দিয়ে বুঝতে গেলে এটা মিসপ্লেসড হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মুখের কথা হিসেবে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ ব্যবহার এক কথা। কিন্তু এর বাইরে সরকারি সিদ্ধান্ত বা কোনো দল নিষিদ্ধের যুক্তি হিসেবে ইউরোপীয় অর্থে ‘ফ্যাসিবাদ’ ব্যবহার সরকারকে বিপদে ফেলবে। কেননা, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক কোনো মানবাধিকার সংগঠনই ইউরোপের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আওয়ামী জমানার পরিস্থিতির তুলনামূলক আলাপ ও যুক্তিকে আমলে নেবে না।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ বিষয়ক আলোচনা চালু আছে, আওয়ামী-শাসনামলকে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, তার চরিত্র ও গঠন গত শতকের প্রথম অর্ধেকের ইউরোপীয় অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের আলোকে বোঝা দরকার বলে মনে করি।

    দুইভাবে আওয়ামী রেজিমের ফ্যাসিবাদকে বোঝা যেতে পারে : একটা কাঠামোগত জায়গা থেকে, আরেকটা প্রবণতার জায়গা থেকে।

    বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠে চারটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়াতে : ঔপনিবেশিক আইন, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ (কখনো সেটা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রূপ ধারণ করে) এবং নয়া-উদারনীতিবাদ।

    প্রথমত, বাংলাদেশের সকল আইন-কানুন, পেনাল কোড সবকিছু গভীরভাবে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে চলছে। এখানকার আইন-কানুন যে ধারাবাহিকভাবে নাগরিকের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তাঁর মূল কারণ হচ্ছে এর সাথে লেপ্টে থাকা উপনিবেশের অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশে যে সংবিধান রচনা করা হয়েছিল সেটার ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো। যদিও, গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু চর্চার ক্ষেত্রে সবকিছু নজিরবিহীনভাবে একব্যক্তিকেন্দ্রিক। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা নানাভাবে ক্রিয়াশীল। কখনো ‘হাজার বছরের’ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আবার কখনো ‘নব্বইভাগ মুসলমানের দেশ’ এর বাঙালি+মুসলমান=বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। চতুর্থত, নয়া-উদারনীতিবাদ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশে বর্তমানের ‘উন্নয়ন’কেন্দ্রিক শ্লোগান এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে বিপরীতমুখী হিসেবে হাজির করার মতাদর্শিক হাতিয়ার।

    আওয়ামী-জমানার এই ফ্যাসিবাদকে ‘কাঠামো’র জায়গা থেকে বোঝার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গা থেকেও বোঝা দরকার। অর্থাৎ, কেবল সর্বাত্মক রাষ্ট্রপ্রণালীর জায়গা থেকে ‘ফ্যাসিবাদ’কে বুঝতে চাচ্ছি না, বরঞ্চ একে গণ-হিস্টেরিয়া হিসেবেও চিহ্নিত করছি; এর ব্যপ্তি একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত। এটা এক ধরনের উন্মাদনা। যে মানুষ সারাবছর যুক্তিশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত তিনিও স্রেফ কোনো গুজবের পাল্লায় পড়ে এমন উন্মাদনার জোয়ারে গা ভাসাতে পারেন।

    এ ধরনের উন্মাদনা তথা ফ্যাসিবাদ আসলে সমাবেশ বা গণজোয়ারও বটে। দুটো প্রবণতা থাকে জোয়ারের মধ্যে : একদিকে বিদ্রোহ, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন চালানোর প্রকট বাসনা। এ জায়গা থেকে তেরো সালের দুটো আন্দোলন/সমাবেশ – শাহবাগ ও শাপলা- এর মধ্যে আমরা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখতে পাই।

    সহজ কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দের হরদম এস্তেমাল চলছে, তাকে এই দুটো জায়গা থেকে বুঝতে পারা জরুরি। কেবল তখনই বোঝা যাবে ‘ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ চাই’ বলে কী বোঝানো হচ্ছে? যখন আমরা ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ চাই বলছি, তখন কেবল মতাদর্শিক অবস্থানের ‘স্থানান্তর’ চাই না। বরং পুরো কাঠামোর একধরনের রদবদল, সংস্কার বা বিলোপ চাই।

    তবে, আওয়ামী-রেজিমকে কী নামে চিহ্নিত করবো, তা যেমন জরুরি, তার চেয়েও জরুরি হচ্ছে, এই রেজিমের কালে যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ইনসাফ নিশ্চিত করা। পনের বছরের গুম ও ক্রসফায়ার ও জুলাই মাসের হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকারের মতো ব্যাপক সহিংস ঘটনার বিচার ও ইনসাফ কেবল সাধারণ আইন-আদালত ও বিচকা-প্রক্রিয়া দিয়েই সম্ভব হবে না। আমাদেরকে ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফ বিষয়েও আলাপ শুরু করতে হবে।

    বাংলাদেশে যে ধরনের সহিংসতা জুলাই-আগস্ট মাসে ঘটেছে, যে সামূহিক ট্রমার জন্ম দিয়েছে, তা লাঘব কেবল সাধারণ বিচার দিয়ে হবে না। মাস্টারমাইন্ডদের বিচার যেমন লাগবে, তেমন ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, স্মৃতি সংরক্ষণ, ট্রমা লাঘবকরণ, ট্রুথ-কমিশন তৈরি করা ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারণ, এই ধরনের সহিংসতায় কেবল দুয়েকজন ব্যক্তি জড়িত থাকে না, বরঞ্চ সমাজের এক বিরাট অংশ জড়িয়ে পড়ে। এগুলোকে কেবল ‘শাস্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ’ দিয়ে সমাধা করা যাবে না।

    প্রথম প্রকাশ (খসড়া) : প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর ২০২৪ 

  • গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    • সহুল আহমদ

    সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী-জনতা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও জুলুমবাজ স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। সহিংসতার মাত্রাকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের ইতিহাস, এমনকি তামাম দুনিয়ায় ইতিহাসে এত রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ঘটনা খুব কমই আছে। যেকোনো আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভ্যুত্থানে স্লোগান, পোস্টার, গ্রাফিতি ও গান জনগণের বাসনাকে ব্যক্ত করতে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এগুলোর ভাষিক কথকতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আর আশা-আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ও জোরালো চেহারায় ধরা দেয়।

    বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এর প্রায় প্রতিটি সংগ্রাম ও আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬—১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) গান ও কবিতা বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেটি ১৯৬০–এর দশক হোক, ১৯৯০–এর দশক হোক বা হোক এই ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব সময় নজরুল যেন নিত্যনতুন চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    সব শাসকগোষ্ঠীই কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিবাদী কবিতা ও গানকে নিজেদের মনমর্জিমতো নিস্তেজ করে রাখার নানা কূটকৌশল করেছে। কিন্তু জনতা যখনই তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন এই বিদ্রোহী কবির গান–কবিতাই হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়া জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রে দেখা যায়, স্বৈরশাসকের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দীরা সমস্বরে গেয়ে উঠছেন, ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট/ ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/ রক্ত-জমাট শিকল–পূজার পাষাণ-বেদী’।

    একই গানের লাইনগুলোকে এবারের রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের দেয়াললিখনেও হাজির হতে দেখা গেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে অন্যান্য জেলা শহরের দেয়ালে–দেয়ালে শিক্ষার্থীদের তুলির আঁচড়ে লেখা হয়েছে, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ কিংবা ‘বল বীর—/ বল উন্নত মম শির!’। কেবল দেয়াললিখনেই নয়, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে যোগাযোগের যত নিত্যনতুন তরিকা যুক্ত হয়েছে, সবখানেই ছিল নজরুলের সৃষ্টির সরব উপস্থিতি। যেমন ধরা যাক, ১৯৭১ সালে নজরুলের গানের এস্তেমাল দেখেছি সিনেমার জগতে, ১৯৯০ সালে দেখেছি গানের আসর বা দেয়াললিখনে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে রাজপথের দেয়ালের বাইরে ‘জেন–জি’ প্রজন্মের নতুন মাধ্যমগুলোও ছিল বহুল আলোচিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    টিকটক, ফেসবুক, রিলস, এক্স (সাবেক টুইটার) ইত্যাদির আবির্ভাবের পর গণপরিসরের বৈপ্লবিক গণতন্ত্রায়ন ঘটেছে। সমাজের বিপুল শ্রেণির মানুষের এমন অভাবিত অংশগ্রহণ মতামত উৎপাদনকারী ও ভোক্তা এই দুই বর্গের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে দিন দিন। সংস্কৃতিচর্চার যে গতি এ যাবৎ ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হতো, হালফিল জমানার ঘটনাবলি সেই গতির উল্টো যাত্রারও সাক্ষ্য দিচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে গিয়েছে, সেখানে নতুন এই পরিসর প্রতিবয়ান তৈরিতে মারাত্মক কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। শাসকগোষ্ঠীর চাপে মূলধারায় উপেক্ষিত ঘটনা বা বয়ান নতুন গণপরিসরগুলো তুলনামূলকভাবে ‘অসম্পাদিত’ কায়দায় তুলে এনেছে। এহেন ‘অসম্পাদিত’ জনপরিসরের বিপজ্জনক কিছু দিক নিয়েও আলোচনা চলছে। তবু মেনে নিতেই হবে যে এবারের আন্দোলনে এর বৈপ্লবিক প্রভাব ঠাহর করা গিয়েছে। দেয়াললিখনের মতো সাবেকি কায়দার চেয়ে আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দিতে দশ-বিশ সেকেন্ডের রিলস, ফেসবুক বা এক্সের পোস্টার অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই নতুন ‘সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রসারিত’ সিনেজগতেও নজরুলের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ ছিল সরব। শুধু সরবই নয়, এগুলোর অনেকাংশই ছিল নজরুলের এই গানকে কেন্দ্র করে।

    স্বাধীনতার আগে–পরের গণ–আন্দোলনে—যেখানে জনতা তাদের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, সেখানে সমসাময়িক ও সাবেকি সব কায়দা-কানুনের ভেতরে নজরুল কেন বারবার হাজির হন? এবার আমরা দেখেছি, প্রথাগত গণসংগীতের স্থান দখল করে নিয়েছে র‍্যাপ গান। তারপরেও, আমরা দেখছি, বিভিন্ন ব্যান্ড দলের মাধ্যমে নজরুল দিন দিন আরও বেশি ‘মেটালিক’ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু কেন?

    নজরুলের এই হাজিরানার কারণ নজরুলের সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনই পাওয়া যাবে গণ–আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি থেকেও।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুল–সাহিত্যের বিচারকালে কবি ও সমালোচক হুমায়ূন কবির তাঁর যে কয়টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছিলেন, তার মধ্যে আমাদের জন্য দুটি প্রসঙ্গ খুব জরুরি বলে মনে হয়। প্রথমত, নজরুল ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের কবি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বাংলার কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর কুটুম্বিতা। অসহযোগ আন্দোলনের কালে যে তাঁর ব্রিটিশবিরোধী তথা উপনিবেশবিরোধী চেতনার স্ফূরণ ঘটেছিল, সেটির ভাষিক সাক্ষ্য যেমন দিয়েছিল নজরুলের কবিতা, তেমনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম—যেমন লাঙ্গল—দেখলে কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর সহজাত সম্পর্ক ও রাজনীতি ধরা পড়ে। এমনকি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান বাসিন্দাদের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এবং কৃষকের আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও ধরা পড়ে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা থেকে।

    এই দুটি বৈশিষ্ট্য নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ অনুসন্ধানে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। অসহযোগ আন্দোলনে, যেখানে জনগণ আনুভূমিক কায়দায় রাজপথে অংশগ্রহণ করে, সেটি যদি হয়ে থাকে নজরুলের সাহিত্যের অন্যতম প্রেক্ষাপট, তাহলে যখনই জনতা নিজেদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন অবধারিতভাবে নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।

    অন্যদিকে, কমিউনিজম বা সাম্যবাদের প্রসঙ্গ তাঁর পত্রিকা ও কবিতায় বারবার এলেও সেটি কোনো জমাটবদ্ধ তত্ত্বের আদলে আসেনি, বরং এসেছে কৃষক–শ্রমিকসহ সব অবহেলিত ও নিম্নশ্রেণির মানুষের মুক্তির প্রতি কবির গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এ কারণে নজরুলের কবিতা কেবল শ্রেণি-রাজনীতির স্লোগানে পর্যবসিত না হয়ে বরং হয়ে উঠেছে যেকোনো মুক্তিমুখী রাজনৈতিক সক্রিয়তায় উচ্চারিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুলের সৈনিক জীবন—যাপন বা তাঁর জীবনের ‘সৈনিক’ পর্যায় তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে গভীর প্রভাব রেখেছে বলে সাহিত্য–সমালোচকেরা দেখিয়েছেন। ইনসাফের প্রশ্নে সদা অকুতোভয় এবং পুরোনোকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে বন্দী মানুষকে মুক্ত করে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠার বাসনার যে তীব্র প্রকাশ একের পর এক কবিতায় তিনি করে গিয়েছেন, তাতে তাঁর সৈনিকতার দিকটি স্পষ্ট। তিনি যে নেতা না হয়ে রাজপথের সৈনিক হতে চেয়েছেন, তাতে কোনো রাখঢাক ছিল না। তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সেবার নই, আমি যুদ্ধের। আমি সেবক নই, আমি সৈনিক।’

    নজরুলের এই সৈনিকতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই সৈনিকতা—যাকে আমরা তাঁর সাহিত্যে বিদ্রোহ বা বিপ্লব আকারে দেখি—তার মানে হচ্ছে, জনতার নিত্য সক্রিয়তা। তাঁর কবিতায় উপমার এস্তেমাল এবং একের পর এক যুদ্ধংদেহী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কাহিনি। তবে এই ‘ব্যক্তি’দের উপমা থেকে মনে হতে পারে, নজরুল তেমন কোনো মহান পুরুষ বা উদ্ধারকর্তার অপেক্ষায় আছেন! আদতে নজরুল কোনো ‘উদ্ধারকর্তা’য় আস্থা রাখেন না, বরং তাঁর সৈনিকতা জনতার প্রাত্যহিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয়তাকেই ইঙ্গিত করে।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    অর্থাৎ নজরুল ইসলামের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাহিত্যের ভেতরকার মসলায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা জনতার সক্রিয়তাকে কালের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদা ধারণ করতে সক্ষম। নজরুল যে জনগণের কথা বলেন, তাকে কোনোভাবেই জাতীয়তার পরিচয়ে আবদ্ধ রাখা যায় না। মনে হতে পারে, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। পাকিস্তান আমলে তাঁকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী আকারে হাজির করার কোশেশও করা হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদও তাঁকে নিজের আদলেই গড়ে তোলার চেষ্টাচরিত্র করেছে। কিন্তু মজলুম ও মেহনতি জনতা যখন রাজপথে নেমেছে, তখন নজরুলকে নিয়ে নির্মিত নানাবিধ ‘সুরত’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আন্দোলনের মুহূর্তে নজরুলের ‘জনগণ’–এর পরিচয় ফুটে ওঠে কেবল তাদের সক্রিয়তার ভিত্তিতেই।

    নজরুলের ফিরে আসার কারণ যেমন তাঁর সাহিত্যের মধ্যে তালাশ করতে হয়, তেমনি যে পরিস্থিতিতে তিনি ফিরে আসেন, সেই পরিস্থিতির মধ্যেও তালাশ করতে হয়। পাকিস্তান আমলে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দারা যে পরাধীন জীবন যাপন করেছিলেন, তাতে নজরুলের কবিতা তার মুক্তির ভাষা দিয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও আমরা ভিন্ন বাস্তবতায় পরাধীন পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছিলাম। এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যাবতীয় রাজনৈতিক দল ও কর্মযজ্ঞকে গায়েব করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিকতা নির্দিষ্ট দল ও মতের বাইরেই আশ্রয় নিয়েছিল। এর ফলে জনতা যখন নেমে এল রাস্তায়, নজরুলের সৈনিকতার বেশে দাঁড়িয়ে গেল সশস্ত্র রাষ্ট্রের সামনে, তখন তাকে কোনো নির্দিষ্ট ‘রাজনৈতিক দল’ বা ‘মতবাদ’ দিয়ে চেনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। নিকট ইতিহাসে এমন আনুভূমিক আন্দোলনের নজির আমরা দেখতে পাই না। এই অবস্থার বহিঃপ্রকাশে নজরুল–সাহিত্য যে আমাদের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?

    গ্রাফিতি, খুলনা

    ‘গাজনের বাজনা বাজা!/ কে মালিক? কে সে রাজা?/ কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’ বলার মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতার কথা বলেন, তার বাস্তবায়ন দূরে থাক, রাজনৈতিক কল্পনাও আমরা দেখতে পাইনি। কিন্তু জনতা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের গঠন করতে থাকে, তখন তারা নজরুলের এই ‘কল্পনা’র মধ্যেই নিজেদেরই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। যেমন, হাসিনার পতনের পর প্রশাসন ও পুলিশবিহীন অবস্থায় জনগণ যেভাবে নিজেদের হেফাজত করতে সংগঠিত হয়ে উঠল, তার মধ্যে দিয়ে নজরুলের উপরোক্ত ‘কল্পনা’র এক বাস্তব রূপই যেন আমাদের সামনে ধরা দিল।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    গণ–আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ নজরুল–সাহিত্যে হাজির থাকা ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের সক্রিয়তা ও গণক্ষমতার বৈপ্লবিক সম্ভাবনার মধ্যেই নিহিত। এর প্রেক্ষাপট হিসেবে রয়েছে তৎকালের অসহযোগ আন্দোলন, নজরুলের সৈনিক জীবন এবং সমাজের নানা শ্রেণির সঙ্গে তাঁর বা তাঁর সাহিত্যের সম্পৃক্ততা। নজরুলের জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতা ও পত্রিকা ঘন ঘন শাসকগোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে। ফলে যখনই ক্ষমতাকে ‘ত্যক্ত-বিরক্ত’ করার সুযোগ আসবে, গণক্ষমতার সম্ভাবনা দেখা দেবে এবং যে পরিসর যত বেশি শ্রেণি বা বর্গকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হবে, তখনই এবং সে পরিসরেই নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

  • অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতা : অতীত সংলগ্ন ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর’ বর্তমান

    অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতা : অতীত সংলগ্ন ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর’ বর্তমান

    • স্বাধীন সেন

    ১.

    জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জনপরিসরে (বাস্তব ও অপরবাস্তব/ভারচুয়াল) অসংখ্য আলাপ ও স্বরের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রগড়ার বাসনা উচ্চারিত হচ্ছে প্রবলভাবেই। আমি এই বহুস্বরের উচ্চারণের প্রতি অনুরাগ ও সহমত ব্যক্ত করি। গণঅভূত্থানের একজন অনুসারী ও সমর্থক হিসেবে। জনপরিসরে বহু শব্দ/প্রত্যয় এখন অনেক জোরেশোরে উচ্চারিত ও ব্যক্ত হচ্ছে (আবার বহু শব্দ/প্রত্যয় ব্যক্ত হচ্ছেও না)। যেকোনো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বদলের আকাঙ্খা ব্যক্ত করায় বিভিন্ন পক্ষ যখন তৎপর থাকে, তখন সকল উচ্চারণ-স্বর-অভিব্যক্তি সমান ভাবে ব্যক্ত ও শ্রুত হয় না। বলা ও শোনার মিথষ্ক্রিয়ার সঙ্গে অসমতা (অথবা বৈষম্যের) ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকে। ক্ষমতার সম্পর্ক (যা সকল ক্ষেত্রে ও সকল পরিসরেই অসম) এই মিথষ্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অপরবাস্তব পরিসর আমার অভিব্যক্তি-উচ্চারণ-ভাষা-অনুভূতিকে যেভাবে প্রবলভাবে গঠন করে চলেছে সেখানে এই মিথষ্ক্রিয়ার জটিলতা আরো বেড়েছে।

    ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শব্দদুটোকে যদি আমি ঐতিহাসিক ও জেনেরিকভাবে পাঠ না করি তাহলে স্পষ্টতই এই অভ্যূত্থানের সঙ্গে একটি বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ব নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রব্যবস্থার বাসনা লেপেটে রয়েছে। বৈষম্য যেমন নানাবিধ পরিসরে ক্রিয়াশীল, তেমনিই বহুত্বকেও বহুবিধভাবে উপলব্ধি করার বিষয় থাকে। বিংশ শতকে নাৎসী মতবাদের পাশাপাশি ফ্যাসিজম যেভাবে ইটালিতে বিকশিত হয়েছিল, সেই ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য, প্রয়োগ আর সহিংসতার সঙ্গে অবশ্যই হালে ফ্যাসিবাদ বা ফ্যাসিস্ট শব্দের ব্যঞ্জনার সম্পর্ক থাকলেও ফারাকও রয়েছে। থাকা স্বাভাবিকও। তবে বুনিয়াদীভাবে একটি কতৃত্ববাদী, বলপ্রয়োগবাদী, সহিংস, অলিগার্কিকাল, স্বৈরাচারী, স্বাধীনতাবিদ্বেষী এবং প্রকট অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামজিক, সাংস্কৃতিক অসমতা একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিরাজমান রয়েছে। মানুষ ও না-মানুষের হক্ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধউত্তরকালে তৈরি হওয়া বহু বাহাছ, ও নতুন নীতি ও কনভেনশন তৈরি হওয়া, তারও পরে কোল্ড ওয়ার পরবর্তী পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা, নতুন নতুন সংঘাত ও সহিংসতার দিগন্ত বিস্তৃত হওয়া, ৯/১১ পরবর্তীকালে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের নামে বৈশ্বিক মার্কিন-ইউরোপীয় আগ্রাসনসহ অন্যান্য বহুবিধ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শাসনের প্রকল্প ও তৎপরতার মধ্যে ফ্যাসিজমের প্রকাশ ও বৈশিষ্ট্যাবলি বিস্তৃত হয়েছে। তবে আমার আলাপ ফ্যাসিবাদের নানাবিধ প্রকাশ, বিবিধতা আর রূপান্তর নিয়ে নয়। এই ছোট লেখায় আমি বরং আমাদের জনপরিসরে বহুল উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ ও বাসনাকে বিবেচনা করতে আগ্রহী।

    Avinash Chandra, Early Figures, 1961. Courtesy: Osborne Samuel Ltd. and Leicestershire County Council Artworks Collection

    ২.

    ফ্যাসিবাদী ইতিহাস চিন্তা ও চর্চার প্রসঙ্গ দিয়ে আমি শুরু করতে চাই। আপাত দৃষ্টিতে ফ্যাসিবাদ ও ইতিহাস চর্চার অন্তরঙ্গতা নিয়ে আলাপচারিতা হালের বাংলাদেশের জনপরিসরের উত্তুঙ্গ ও বিস্ফোরিত আলাপচারিতায় অত্যন্ত গৌণ একটি বিষয়। তবে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে অন্যদিকে আমার জিজ্ঞাসার একটি অন্যতম প্রসঙ্গ এই অন্তরঙ্গতা। কেবল আমার আগ্রহের বা মনোযোগের প্রসঙ্গ বলেই না। বাংলাদেশে প্রবল ইতিহাস ও অতীত বোঝাপড়ার ধরন এবং সেসম্পর্কিত পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিভিন্ন বয়ানে যেভাবে ইতিহাস ও অতীতের প্রসঙ্গ অবিচ্ছেদ্য হিসেবে হাজির থাকে, সেখানে এসব বয়ানের ধারণা ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা, ভ্রান্তি ও যার যার প্রয়োজনমাফিক উপাত্ত বাছাই করে, পরিবর্তন করে আর রাষ্ট্র-রাজনৈতিক-ক্ষমতাগত স্বার্থ অনুসারে ব্যাখ্যা করাকে বুঝতে গেলেও এই আলাপ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে, ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় ফ্যাসিবাদী চৈতণ্য, চর্চা ও ধারণার অন্যতম বুনিয়াদ হলো জাতীয়তাবাদ এবং পরিচয়বাদ। উল্টোটাও সত্যি। জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী ধারণা, বাসনা, সংবেদন অতীতের ব্যাখ্যা, উৎপাদন আর পরিবেশনের মাধ্যমে কেবল ডিসকার্সিভ পরিসরেই নয়, পাশাপাশি সংবেদন ও চৈতণ্যের গভীরে ফ্যাসীবাদী অভ্যাস-আকাঙ্খা-আবেগ-অনুভূতি-মনোভঙ্গির ক্রমাগত পরিবর্তনশীল গঠনে তৎপর ভূমিকা রাখতে থাকে। ডিসকার্সিভ পরিসরে আমরা ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের মতন শাস্ত্রগুলোর নিজেদের মতন বাছাই করা, সেন্সর করা, অতিরঞ্জিত করা, বাসনাতাড়িত কল্পনাজারিত আলাপ করতেই আরাম পাই। এই আলাপের বিভ্রান্তি, সঙ্কট, সমস্যাগুলো নিয়ে কথাবার্তা ও বাহাস একদমই লঘু ও অনুচ্চারিত। আর হালের জনপরিসরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব এবং জনসংস্কৃতি সম্পর্কিত জনপ্রিয় বয়ানগুলোতে ডিসকার্সিভ দশার বাইরের অথচ ওই দশার সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদ ও চৈতন্যগত প্রসঙ্গগুলো ‍পুরোপুরিই অগ্রাহ্য করা হয়।

    আমার প্রস্তাব হলো, ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অতীতের আখ্যান উৎপাদন ও সঞ্চালনের প্রবল ঐতিহ্য ও তৎপরতা ( যেমন: ডিসকোর্স খাড়া করা, খারিজ করা, সরল করা, রদ করা, অতিরঞ্জিত করা, আড়াল করা, সহজবোধ্য করার নামে জটিলতা ও একই সময়ে চলমান ভিন্নতা-দ্বিমত-বিতর্ক-সংঘাতকে লুকানো, বিভিন্ন ঘটনা কেন ও কীভাবে একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ও কুশীলবদের সক্রিয়তায় ঘটেছে সেই জিজ্ঞাসা, এবং সর্বোপরি, প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা, সত্তাশ্রয়ীতা, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ঐতিহ্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা) ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে। কেবল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে সরল সওয়াল-জবাবের মাধ্যমে অতীতের বয়ানগুলো কেন ও কীভাবে তৈরি হয়েছে, বা হচ্ছে, কোন বয়ান কেন ও কীভাবে প্রবল হয়ে উঠছে বা দুর্বল ও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে সেই প্রশ্ন একেবারেই অনুচ্চারিত। মোটিভ বা অতীত বিষয়ক জ্ঞান উৎপাদনের কুশীলবদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার একটা তৎপরতা হিসেবে অতীতের জ্ঞান বর্তমানে পরিবেশন ও সঞ্চালনের প্রক্রিয়াকে সংকীর্ন করে তোলারও বহুবিধ বিপদ রয়েছে। এক্ষেত্রে কুশীলবদের ইতিহাস ও পরিপ্রেক্ষিতগত বিবিধ ও পরিবর্তনশীল শর্তগুলোর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হিসেবে ধরে-নেয়া হয়। অনুমান করা হয় যে, যারা অতীত নিয়ে বয়ান নির্মাণের চর্চা করছেন, কোনো বয়ানকে সত্য বা কোনো বয়ানকে বিকৃত বা মিথ্যা হিসেব তকমা দিচ্ছেন, তারা (কুশীলব ও সক্রিয়তা বলতে এখানে আমি কেবল মানুষ ও মানবীয়কে বোঝাচ্ছি না। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্যকেও বোঝাচ্ছি) বিচ্ছিন্নভাবে, স্বয়ংশাসিত হয়ে, সার্বভৌম সত্তা হিসেকে কাজ করার সামর্থ্য ও ক্ষমতা রাখেন।

    পরিচয়বাদী শর্ত, প্রভাব, সক্রিয়তা এবং ঐতিহ্যবোধ নিয়েই আমি যদি আলাপ করি, তাহলেও বোঝা যাবে যে, পরিচয়বাদ আর অতীত বিষয়ক জ্ঞান ও জ্ঞান উৎপাদনের বিচিত্র প্রক্রিয়কা ও কারণ একে অপরকে গঠন করে, প্রভাবিত করে, এবং শর্তাধীন হবে। জাতীয়তাবাদ যেমন ইতিহাসের বা প্রত্নতত্ত্বের চর্চা ও বয়ানকে আর চৈতণ্যকে ফ্যাসিস্ট, একমুখী, সমসত্ত্ব, একমাত্র, বিকল্পহীন, কর্তৃত্ববাদী হিসেবে জাহির করতে ভূমিকা রাখে ঠিক তেমনই ওই চর্চা ও বয়ান এবং বিশেষভাবে গঠনরত চৈতণ্যও বিশেষ, একমুখী ও চিরন্তন একটি বা একাধিক পরিচয়কে বা আত্মসত্তার রূপকে ( এবং জাতির ধারণা, বৈশিষ্ট, মানদণ্ড, ও অভিব্যক্তিকে) তৈরি করতে, সঞ্চলিত হতে, প্রবল হয়ে উঠতে, একমাত্র বৈধ পরিচয় হয়ে উঠতে ভূমিকা রাখতে থাকে। ১৯৬০-৭০ এর দশকে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অধিকারবাদী আন্দোলনে পরিচয়ের রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের স্থানিক ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে। এই সক্রিয়তার মাধ্যমে উপনিবেশ পরবর্তী স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন জাতিগত, অঞ্চলগত, ধর্মীয় পরিচয়গত, নরবর্ণ/রেইস ভিত্তিক, জাতিবর্ণ ভিত্তিক, লিঙ্গীয়, ভাষিকসহ বহুবিধ ও একে অন্যের সঙ্গে লেপ্টে থাকা পরিচয় কেন্দ্রীক আধিপত্যবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নানামুখী চিন্তা- বোঝাপড়া-আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে, বৈপ্লবিক আকাঙখার অবিসংবাদিত অভিব্যক্তিতে পরিনত হয়। কিন্তু সময়ের কালক্রমে এই অবিসংবাদিত দশা প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হয় যখন এই পরিচয়ের রাজনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিভিন্ন বাস্তব লক্ষণা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। উপনিবেশ বিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র বিরোধী চেতনাই নিজেকে টিকিয়ে রাখা ও জায়েজ করার জন্য আবার কর্তৃত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে। উপনিবেশ, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের আতঙ্ক তৈরি করে, মুক্তির যুদ্ধ, বিপ্লবের সক্রিয়তার গৌরব, বীরত্ব, মহত্ত্বর বয়ানের পৌনপুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে। এসময়েই দেখা গেল যে, দুনিয়ায় নানা জায়গায় প্রবল ও প্রান্তিক পরিচয়ের পরস্পর সংঘাতে আগেকার ফয়সালা চূড়ান্ত বা শেষ হিসেবে দাবি করা হতে থাকলেও, সেই ফয়সালার কল্পনা ও বাসনা ভ্রান্তিবিলাস ও ক্ষমতাতাড়িত হিসেবে অচিরেই ব্যক্ত হতে থাকে। দেখা গেল যেভাবে দাবি করা হয়েছিল সেভাবে আসালে ইতিহাসের পরিসমান্তি ঘটে নাই। যে পরিচয়কে মুক্ত করার জন্য লড়াই করা হয়েছিল, সেই পরিচয়ই মুক্তির একটি পর্যায়ে অপরাপর পরিচয়গুলোকে অবৈধ ও ম্লান করে তোলার তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।

    গত এক দশকে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচয়বাদী সংঘাতের প্রকট উত্থান ঘটেছে। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের অন্তরঙ্গ পরিচয়ের গোষ্ঠীগুলোও প্রকৃত অর্থে পরস্পরের সঙ্গে সহিংস ও অহিংস পরিচয়ের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। আরো দেখা যাচ্ছে, প্রবল ও অধিপতিশীল পরিচয়বাদীরাও পরিচয়বাদী ও উত্তর-উপনেবিশক বিভিন্ন চিন্তা-তত্ত্ব-তৎপরতা দিয়ে নিজেদের বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে। উত্তর-উপনিবেশবাদী এবং বিউপনিবেশিকীকরণের যেসব চিন্তা একটা সময় নতুন স্বপ্ন-চেতনা-সম্ভাবনার রাস্তা তৈরি করেছিল সেসব চিন্তাই স্বৈরাচারীরা ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেটগণ আত্মসাৎ করে নিচ্ছে। যে কারণেই পরিচয়ের রাজনীতি একটা সময়ে যেভাবে ইতিবাচক বা সদর্থক হিসেবে পরিগণিত হতো জনপরিসরে ও রাষ্ট্রনৈতিক বিভিন্ন আলাপে বা বিধিবিধানে, এখনকার দুনিয়ায়ে ইতিবাচকতার সেই একক, মঙ্গলময় ও মুক্তিদায়ী রূপটা ভেঙ্গেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। পরিচয়ের সংঘাত ও সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক বিবাদ নতুনতর বিদ্বেষ-বিচ্ছিন্নতা-ঈর্ষা-প্রতিযোগিতা-বাসনার এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করছে।

    আমাদের দেশে চিন্তাশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে প্রভাবশালী একটি চিন্তাধারা যেমন উত্তর-উপনিবেশবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী চিন্তার প্রভাবে, স্থানীক পরিপ্রেক্ষিত আমল করার দাবি করে, ক্রিটিকাল চিন্তাচর্চার তৎপরতায় চিন্তা ও চর্চায় (বা পরিচয়বাদী নানা বয়ানে) বাইনারি বা যুগ্মবৈপরীত্যর ভিত্তিতে গড়ে ওঠার প্রতিষ্ঠিত বয়ানগুলোর সমালোচনা করেন। উপনিবেশিক আধুনিকতা এবং পশ্চিমকেন্দ্রীক জ্ঞানকাণ্ডের বুনিয়াদী বিভিন্ন বাইনারিগুলো ( যেমন : প্রগতিশীল/প্রতিক্রিয়াশীল, সেক্যুলার/নন-সেক্যুলার, যুক্তি/ধর্ম, সভ্য/অসভ্য, প্রগতিশীল/মৌলবাদী ইত্যাদি) ভেঙ্গে বাইনারির বাইরে সীমানাভাঙ্গা চিন্তা করার আহ্বান রাখেন। এই আহ্বান অত্যন্ত জরুরী এবং বাইনারির গণ্ডিগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার জরুরত অস্বীকার করার উপায়ও নাই। তবে, সমস্যা তখনই হয় যখন চিন্তার দুনিয়ার বা আকাঙ্খিত এই বাইনারি ভাঙ্গা বয়ান বাস্তব-যাপিত-নৈমিত্তিক জীবনে সতত উপস্থিত হিসেবে ধরে-নেয়া হয়। অতীতের জ্ঞান ও বয়ানগুলোকে বদলে দেবার বাসনা আমাদের অনেকেরই তৎপরতার অবিচ্ছেদ্য দশা। কিন্তু সেই দশা নৈমিত্তিক যাপিত জীবন ও জগতে, প্রবল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সমঝোতার প্রক্রিয়া ও শর্তগুলোতে এখনও অত্যন্ত দুর্বল, অস্থিতিশীল এবং নড়বড়ে। আমাদের নিত্যকার যাপন, ভাষা ও সংবেদনে এখনো অব্দি বহুবিধ বাইনারি বা যুগ্মবৈপরীত্যকেন্দ্রীকা প্রবলভাবেই জীবন্ত-সক্রিয়-বেগবান। যাপিত নৈমিত্তিক বাস্তবতা যেমন সত্যি, তেমনই বাইনারি ভাঙ্গার তাগিদ-আকাঙ্খা-সক্রিয়তাও সত্যি। ইতিহাসের বয়ান নির্মাণে তাই নৈমিত্তিক এই বাস্তবতা ও জীবন্ত বিরোধাভাস ও বৈপরীত্যগুলোকে খারিজ করে দিলে ফ্যাসিস্ট অতীত চেতনাকে মোকবিলা করা, স্থানচ্যূত করা, আর নড়বড়ে করে দেয়া সম্ভব না। এক্ষেত্রে, প্রবল বাইনারির উপস্থিতিসমেত কোনো অভিব্যক্তি-ভাষাব্যবস্থা-তৎপরতা-চিন্তাভাবনাকেও বাইনারি-অতিক্রমী বলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ও চেতনার অস্তিত্ব ও অভ্যাস, অভিব্যক্তি ও কাঠামোকেও বদলে যাওয়া, নন-বাইনারির প্রকাশ হিসেবে মনে হতে পারে। প্রবল পরিচয়বাদী অতীত বয়ানগুলোকে বা নিপীড়ক ও কর্তৃত্ববাদী অতীত সম্পর্কিত বয়ান গঠিত হওয়ার একই পরিকাঠামোর মধ্য দিয়ে বিকশিত আপাত পাল্টা বা কাউন্টার বয়ানগুলোর অন্তর্নিহিত ও গুঢ় বাইনারিগুলো শনাক্ত করায় আমাদের ভুল হতে পারে। বর্তমানের ফ্যাসিস্ট-উত্তর দশা আবার ভিন্ন পরিসরে, যাপিত জীবনে আর চৈতণ্যের দৈনন্দিন অভিব্যক্তি ও নীতিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও উপাদানগুলোকেই বহালতবিয়তে অস্তিত্বশীল করে রাখতে পারে। ইতিহাসের উৎপাদনে, পর্যালোচনায় ও পুনর্পাঠে তাই বাইনারি বিকাশী ও বাইনারি বিনাশী বয়ান ও নৈমিত্তিকার মধ্যকার জটিল মিথষ্ক্রিয়াকে আমাদের মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। নতুবা সভা, সেমিনার, পাঠচক্র, লিখিত নানা ভাষ্যে বা কোনো বিদ্যায়তনিক পরিসরে যখন আমরা বাইনারির অনুপস্থিতি ঠাহর করতে থাকবো, বাইনারি ভেঙ্গে দেয়ার সাফল্য উচ্চারণ করতে থাকবো, তখন নৈমিত্তিক জীবনে ভিন্নতাকে খারিজকারী, আর বৈচিত্র্যকে নাকচকারী বাইনারিগুলো অন্যরূপে ও উদ্ভাসে প্রবল ও আধিপত্যশীল হয়ে উঠবে। আমরা বাইনারিগুলো নস্যাৎ ও অকার্যকর করে দেয়ার বিভ্রমের মধ্যেই যাপন করতে থাকবো। ইতিহাস ও ফ্যাসিবাদী চৈতন্যের অপর এক প্রকাশ ঘটবে আরো নৃশংসভাবে, আরো সহিংসভাবে, আরো বিপজ্জনকভাবে।

    Affandi, Mexico, Mother and Child, 1962. Courtesy: Collection of Museum Lippo

    ৩.

    জাতীয়তাবাদ যেভাবে একসময় শাসন ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির চিন্তা হিসেবে বিবেচিত হতো, পরবর্তীতে সেই বিবেচনা অবিসংবাদিত ছিল না। জাতীয়তাবাদের বিভিন্নধরনের কর্তৃত্ববাদী ও অধিপতিশীলতা আগে দৃশ্যমান ও আলোচিত হলেও, ভালো জাতীয়তাবাদ ও মন্দ জাতীয়তাবাদের মধ্যে অনেকে ফারাক করতেন। তবে এখন আর নিখুঁত ও বিশুদ্ধ ভালো জাতীয়তাবাদ যে সোনার পাথরবাটি সেবিষয়ে বহু চিন্তকই একমত। একটি জনগোষ্ঠীর জন্য যা ভালো, একই স্থানিক পরিসরে বা ভূখণ্ডে বসবাসকারী আরেকটি জনগোষ্ঠীর জন্য তাই মন্দ হতে পারে। আমাকে যে জিজ্ঞাসাটা ভীষন ভোগায় সেটা হলো: জাতীয়তাবাদী হয়ে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায় কী? কোনো রাষ্ট্রের বা একটি ভূখণ্ডে বসবাসরত বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষজনকে একটা কালে অতীতে কোনো মুহূর্তে কোনো প্রবল ও অধিপতিশীল রাষ্ট্র বা সত্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদ ঐক্যবদ্ধ করতে পারলেও সেই ঐক্য চিরন্তন কী? কোনো পরিচয়বাদ বা পরিচয় কি সার্বক্ষণিক প্রবল ও নিপীড়ক? আর কোনো পরিচয় কি সার্বক্ষণিক প্রান্তিক ও নিপীড়িত?

    ইতিহাসের ধারণা ও পদ্ধতিগত বিবেচনা কিন্তু এই চিরন্তনতা বা সার্বক্ষণিকতাকে ভ্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। ইতিহাস পাঠ ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ছয়টি সি (C) – কে বিবেচনা করাকে জরুরি বিবেচনা করা হয়। এক. সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তন/চেইঞ্জ ওভার টাইম; দুই. পরিপ্রেক্ষিত/কনটেক্সট; তিন. কারণবাচকতা বা কার্যকারণসম্বন্ধ [ কেন বা কোন কোন কারণে ইতিহাসে কোন কোন পরিবর্তন ঘটছে বা ঘটছে না? কারণ কি আকষ্মিক, নাকি পরিকল্পিত? কারণ কি এক নাকি বহু? বহু কারণের প্রভাব ইতিহাসের ঘটনা ঘটায় কি একই মাত্রায় নির্ধারক হয়ে ওঠে? পরিনতি বা ফলাফলের ভিত্তিতে কারণকে মূল্যায়ন করা কি যৌক্তিক? উদ্দীষ্ট কারণ বা কজ কি আকাঙ্খিত ফল নিয়ে এসেছে নাকি অন্য কোনো ফলাফল (যা আবার পরবর্তী ঘটনা/পরিনতি/ফলাফলের কারণ হয়ে ওঠে) তৈরি করেছে? ব্যক্তির বা সমষ্টির সক্রিয়তা নাকি বিভিন্ন শর্ত নাতি উভয়ই কারণ গঠনে ভূমিকা রেখেছিল? – ইত্যাদি অসংখ্য প্রসঙ্গ কজালিটি ও কজেশনের দর্শন চিন্তায় আলোচিত হয়েছে। কজালিটি সেক্ষেত্রে কেবল ইতিহাসের একটি বুনিয়াদি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রসঙ্গ না। বৃহদার্থে চিন্তার প্রণালি ও জ্ঞানে প্রকৃতি সম্পর্কিত, ধর্মতাত্ত্বিক প্রসঙ্গও]। চার. অনিশ্চিত ব্যত্যয় বা পূর্বনির্ধারণ-অযোগ্যতা/কনটিনজেন্সি (অর্থাৎ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার কারণ হিসেবে আগে থেকেই কিছু প্রভাবক বা শর্ত বিবেচনা করার প্রসঙ্গ। এসব প্রভাবক বা শর্ত কোনোটি ওই ঘটনা বা ফলাফলকে প্রভাবিত করতেও পারে, নাও পারে। প্রভাবিত করলেও নানা মাত্রায় করে। দেশ ও কালভেদে। আবার কোনো ঘটনা বা ঘটনাবলির সংঘঠনে বা কোনো ফলাফলের পিছনের প্রভাবকগুলো আবার তারও আগের বিভিন্ন প্রভাবক বা শর্ত বা দশার প্রভাবের ফলাফল হিসেবে কাজ করতে পারে। পরমকারণবাদী/সরলরৈখিক ভাবে ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনা, প্রভাবক ও শর্তকে বোঝাপড়া করার প্রবল প্রবণতার পরিবর্তে কনটিনজেনসিকে আমলে নেয়া বেশ কঠিন কাজ। পাঁচ. জটিলতা/কমপ্লেক্সিটি। ইতিহাসের বিভিন্ন উৎস, উপাদান চিহ্নিত করা, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করা, বর্তমানে বসে অতীত ব্যাখ্যা করার জটিল প্রণালি নিরিখ করে করে লিখন ও কথন, ক্রিয়া হিসেবে ইতিহাসের নিরিখে চিন্তা করার জটিলতা হিসেবে নেয়া। ছয়. ধারাবাহিকতা/কনটিনিউটি [ইতিহাসের ঘটনা, শর্ত আর বিভিন্ন দশার বদল বিবেচনার পাশাপাশি ধারবাহিকতা বিবেচনা করা]।

    উপর্যুক্ত ছয়টি সি- এর বিবেচনায় আমাদের অঞ্চল/ভূখণ্ড/রাষ্ট্র/সমাজ/সংস্কৃতি/রাজনীতির যে ইতিহাস আমরা লিখতে, বলতে ও পড়তে অভ্যস্ত সেই ইতিহাসগুলো কেমন? আমার বিবেচনায় এই ছয়টি সি কে বিবেচনায় নিয়ে যদি ইতিহাস বোঝাপড়ার দিকে আমরা মনোযোগী হই তাহলে সেই ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে ফ্যাসিবাদ-উত্তর ইতিহাস। ফ্যাসিবাদ-উত্তর বা পোস্ট-ফ্যাসিস্ট শব্দটিই একদিকে কালনির্দেশক (ফ্যাসিবাদের সময়ের পরের), একই সঙ্গে সেই শব্দটি বিশেষ একধরনের কর্তৃত্ববাদী ও অধিপতিশীল ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার স্মারকও)।

    কোনো ধরনের পরিচয়বাদী এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বা অন্যভাবে বললে, কোনো পরিচয়কে (জাতিগত, সভ্যতাগত, অঞ্চলগত, রাষ্ট্রগত ইত্যাদি) কেন্দ্র করে বা কোনো পরিচয়ের প্রকট বা প্রচ্ছন্ন প্রভাবে উৎপাদিত ইতিহাস (লিখিত বা কথ্য বয়ান হিসেবে) ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবেই।

    Charles Hossein Zenderoudi, Sun and Lion, 1960. Courtesy: Grey Art Gallery and New York University Art Collection. Gift of Abby Weed Grey

    ৪.

    যদি আমরা বহুল উচ্চারিত অন্তর্ভুক্তির ধারণা বা বয়ানকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বা ইতিহাস চিন্তার উপর্যুক্ত বুনিয়াদি শর্তগুলোর সাপেক্ষে পর্যালোচনা করি তাহলে কয়েকটি নোকতা এখানে উল্লেখ করাই যায়। আমাদের ইতিহাসের বয়ানে সমন্বয়বাদ/সিনক্রেটিজম একটি জনপ্রিয় ধারণা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত, ধর্মমত, ধর্মাচার, চর্চার সংমিশ্রণ, সংশ্লেষ, সম্মিলনকে সিনক্রেটিক বা সমন্বয়বাদী হিসেবে পরিবেশন করতে ভালোবাসেন সেক্যুলার বা নন-সেক্যুলার চিন্তার চিন্তকগণ। জনপরিসরেও এই ধারণাটি বহুল আলাপিত ও জনপ্রিয় উচ্চারণের অনুষঙ্গও বটে।

    সমন্বয় এক ধরনের ঐক্যের দশা যেখানে কমপক্ষে দুই বা ততোধিক সাবজেক্ট বা বিষয়বস্তু থাকবে। সেটা দৈনন্দিন ও নৈমিত্তিক খাবারাদাওয়ার খাওয়ার একাধিক ধরন হতে পারে, দুই বা ততোধিক ধর্মাচারের সংশ্লেষ বা সম্মিলন হতে পারে, দুই বা ততোধিত আচার ও রীতি ও ঐতিহ্যের সম্মিলনও হতে পারে। সমস্যা হলো, সমন্বিত হওয়া, বা সমন্বিত হতে চাওয়া একটি বিষয়বস্তু বা আচার বা চিন্তা বা চর্চার সঙ্গে অন্যটি বা অন্য অনেকগুলো একই পরিপ্রেক্ষিত ও ক্ষমতাগত দশায় অবস্থান করে না। একটি আচার বা চিন্তার সঙ্গে অন্য আরেকটির বা অন্যগুলোর সমন্বয় প্রক্রিয়া হিসেবে সবসময়েই পারস্পরিক সংলাপ-আদানপ্রদান-টানাপড়েনের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়। সমন্বিত হতে চাওয়া না না-চাওয়াও এখানে ক্ষমতাধর বা প্রবল বিষয়বস্তুটির কর্তৃত্বাধীন থাকে। বিবাদমান বা সংঘাতময় বা সংলাপমুখর বিভিন্ন প্রপঞ্চগুলোর মধ্যে যোগাযোগ-যুক্ততা-সমন্বয় যে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিলে পরিচালিত হয় সেই প্রক্রিয়ায় একটি পক্ষ সবসময়ই অন্য পক্ষ, একটি প্রপঞ্চের বর্গ অপর প্রপঞ্চগুলোর চেয়ে প্রবল কিংবা দুর্বল হবে। পরিনতিতে, সমন্বয় বা সম্মিলন অর্জনের পরে নতুন যে বর্গ বা আচার বা পরিচয় তৈরি হয় সেখানে প্রবলটিও প্রকট থাকে। দুটো বা ততোধিক ঐতিহ্য বা চিন্তাধারা বা পরিচয় বা মতামত যখন ঐক্যমত্যে পৌঁছায় তখন কাউকে বেশি ছাড় দিতে হয়, কাউকে কম। যখনই এমন অসমতা একটি প্রক্রিয়া ও তার ফলাফলে ঘটে বা ঘটতে থাকে তখন সেই প্রক্রিয়াটি ফ্যাসিবাদী একটি প্রক্রিয়ায় পর্যবশিত হয়। ফলাফলটিও ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার উৎপাদ হয়ে ওঠে।

    অন্তভুক্তিতা/ইনক্লুসিবনেসের শর্ত ও প্রক্রিয়াকে উপরিল্লিখিত সমন্বয়ের শর্ত ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন বা বহু মত-পথ-চিন্তা-পরিচয়কে ইনক্লুড বা অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রকল্প হিসেবে, বাসনা হিসেবে, অভীষ্ঠ দশা হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। এখানে সাম্যাবস্থা বা বিভিন্ন মত-পথ-পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতগত, পরিস্পরের সঙ্গে নেগোশিয়েট করার, যুক্ত হওয়ার, শুদ্ধ বা খাটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার (বা ভেজাল বা বিকৃত হিসেবে খারিজ হওয়ার) তৎপরতায় বিভিন্ন পক্ষ বা প্রপঞ্চের মধ্যে ক্ষমতাগত সম্পর্ক কেমন? অন্তর্ভুক্তি ও সংহতিকে যদি পরস্পরের পরিপুরক দুটো দশা হিসেবে আমরা বিবেচনা করতে চাই তাহলে অসম ক্ষমতা সম্পর্কের পাটাতনে বিভিন্ন কুশীলব/কারকের তৎপরতা অসম ও বিষম হয়ে উঠবে। সেই সংহতির শর্ত ও প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে প্রবল ও অধিপতিশীল পক্ষ, কুশীলব বা দশার মাধ্যমে। এই পক্ষ বা দশা বা শর্ত বাছাই করবে, নির্বাচন করবে, কোনটা অনুর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য, কোনটা অন্তভুক্ত হওয়ার যোগ্য না সেই নির্ধারণের অধিকার কেবল এই পক্ষের বা চিন্তাধারার বা কুশীলবদেরই থাকবে।

    অন্তর্ভুক্তির আলাপ সুতরাং ক্ষমতা সম্পর্কের আলাপ, পরিপ্রেক্ষিত ও কনটিনজেনসির আলাপ, বহুবিধ দশার আলাপ, পরিচয়বাদকে নাকচ করতে করতে তৎপর থাকা ছাড়া সম্ভব কীনা সে বিষয়ে আমার সংশয় রয়েছে। প্রবল ও প্রান্তিক -সকল পরিচয়বাদী (ও জাতীয়তাবাদী) বয়ান ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে করতে, দুর্বল করতে করতে, নাকচ করতে করতেই কেবল অন্তর্ভুক্তিতামুখী তৎপরতা জারি রাখা সম্ভব। তবে সেই তৎপরতার ফলাফল চিরন্তন ও স্থির না। অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া ধারাবাহিক। কোনো চূড়ান্ত দশা নাই। ফ্যাসিবাদী ইতিহাস ও বোঝাপড়ার সঙ্গে যুযুধান থাকাটাই ফ্যাসিবাদ-উত্তর যাপনের ও নৈমিত্তিক তৎপরতার দশা এবং শর্ত।

    ….

    ০২ অক্টোবর, ২০২৪ অরুণাপল্লী, সাভার।

    প্রথম প্রকাশ : আফটার ফ্যাসিস্ট, ৮ অক্টোবর ২০২৪

  • ইসলাম ও গণতন্ত্র : একটি বাহাসের সন্ধানে

    ইসলাম ও গণতন্ত্র : একটি বাহাসের সন্ধানে

    • সহুল আহমদ

    খালেদ আবু এল ফাদল ইসলামি আইনশাস্ত্রের নামজাদা আলেম। ইসলামি আইন, শরিয়া সহ ইসলামের নানা শাখা নিয়ে অজস্র কিতাবাদি রচনা করেছেন। ২০০৩ সালে তিনি ‘ইসলাম এন্ড চ্যালেঞ্জ অফ ডেমোক্রেসি’ নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে বেশ বড়সড় বাহাস তৈরি হয়, যেখানে নাদের হাশমি, জেরেমি ওয়াল্ড্রন, সাবা মাহমুদ, মোহাম্মদ ফাদেল সহ প্রায় এগারজন স্কলার অংশ নেন। কেউ কেউ ফাদলের অবস্থানের প্রশংসা করেন, কেউ কেউ ক্রিটিক করেন। ফাদল পরে আবার সেগুলোর সম্মিলিত জবাব দেন। এই পুরো বাহাসই পরে কিতাব আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

    যে বাস্তবতার মধ্যে প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল ও সকলে বাহাসে লিপ্ত হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে দুটো নোক্তা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, পুরো বাহাসজুড়ে সেই বাস্তবতা এতো প্রবল কিন্তু উহ্য ছিল যে, তা পাঠকমাত্রই নজরে পড়বে। ২০০১ এর পর দুনিয়াজুড়ে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের হালচাল নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা শুরু হয়। এই কথাবার্তা একেবারে এতদূর পর্যন্ত ঠেকে যে, ইসলাম আদতে কোনোভাবেই গণতন্ত্রকে সমর্থন করে না। বরঞ্চ, ইসলামি ধর্মতত্ত্বেই লুকিয়ে আছে স্বৈরতন্ত্রের ভূত। অন্যদিকে, যে সকল রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলমান, সেখানে কায়েম ছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ফাদল যখন প্রবন্ধ লিখেন এবং তার জবাবে বাকিরা বাহাসে লিপ্ত হন, তখন সবার মধ্যে আসলে কোন না কোনোভাবে এই সঙ্কটকে মোকাবিলা করার কোশেশ ছিল।

    ফাদল গণতন্ত্রের পক্ষেই ওকালিত করেন। কিন্তু ইসলামের মধ্যে (অথবা ইতিহাসে) গণতন্ত্র ছিল, বা গণতন্ত্রের আদিরূপ ইসলামে ছিল – এমন কোনো দাবি থেকে খুব সচেতনভাবে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন। ঐতিহাসিক দুয়েকটা নজির দিয়ে গণতন্ত্রের উপস্থিতি প্রমাণের কোশেশও তিনি করেন না। গণতন্ত্র যে হালজমানার রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল এবং এর উৎস যে ইউরোপে হয়েছে সেটাকে কবুল করে তিনি দাবি করেন, গণতন্ত্রের যে অন্তর্নিহিত বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো রয়েছে সেগুলো কেবল ইউরোপের একার সম্পত্তি নয়। বরঞ্চ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ওই সবের বিকাশে ইসলামি দর্শন ও মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আসলে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের জায়গা থেকে গণতন্ত্রের সাথে ইসলামের সমন্বয়ের কোশেশ করেন। যেমন, গণতন্ত্রে যে জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়, তার সাথে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ঘোষিত আল্লার সার্বভৌমত্ব কী সাংঘর্ষিক? ফাদলের উত্তর হচ্ছে, না।

    তিনি কেন ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন থেকে এর ব্যাখ্যা করতে গেলেন? কেননা, তিনি মানেন, ধর্ম এখনো গভীরভাবে মানুষের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। অনেকেই মুসলমানদের জীবনে ধর্মের ভূমিকাকে খাটো করে দেখেন বলে সিদ্ধান্ত নেন যে, ধর্মতত্ত্বীয় বাহাসের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ফাদলের মতে, অজস্র লোকের জীবনে, এমনকি তার কাছেও, খোদা এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। ধর্ম এখনো তাদের কাছে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যতম নিয়ামক। ফলে, ধর্মের ময়দান থেকে এই বোঝাপড়াকে তিনি জরুরি বলে মান্য করেন। কোরান শরীফ কোনো নির্দিষ্ট ধরনের শাসনব্যবস্থাকে নির্ধারণ করে না দিলেও, ফাদল মনে করেন, কোরান এমন কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের কথা বলে যেগুলো শাসনব্যবস্থার জন্য একেবারে কেন্দ্রীয় বলে বিবেচিত হবে। সামাজিক সহযোগিতা ও পারষ্পরিকতার মাধ্যমে ইনসাফ অনুসন্ধান; অ-স্বৈরাচারী ও পরামর্শমূলক শাসনব্যবস্থা পত্তন; এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতে রহম ও দয়াকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। এই মূল্যবোধগুলোকে প্রমোট করতে সহায়তা করবে এমন যে কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার পক্ষে মুসলমানদের থাকা উচিত বলে মনে করেন ফাদল। এবং, অবশ্যই তার কাছে বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হচ্ছে তেমন উপযোগী শাসনব্যবস্থা।

    ফাদলের কাছে গণতন্ত্রের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং মৌলিক মানবাধিকারসমূহের হেফাজত। বাদবাকি অধিকারগুলো – যেমন, সমাবেশের অধিকার, বিরোধী দলের উপস্থিতি ইত্যাদি – সব আসলে এই কেন্দ্রীয় বিষোয়গুলোর উপজাত। যখন কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর সাথে বোঝাপড়া হয়ে যাবে, তখন বাকিগুলোর প্রায়োগিতা সহজেই সমাধান করা যাবে। তবে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা যে সহজকম্ম নয়, এবং অন্যের অভিজ্ঞতা হুবুহু কপি-কাট করার মামলা নয় সেটাও তিনি বলেন। তিনি বরঞ্চ তার কাজকে কেবল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ বলেই মান্য করেন।

    তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি মৌলিক ধারণার উপরে। এক, মানুষ হচ্ছে দুনিয়ার বুকে খোদাতা’লার খলিফা; দুই, খোদার সাথে এই সম্পর্কটাই ব্যক্তিক দায়িত্বের ভিত্তি; তিন, খলিফা হিসাবে এই দায়িত্ব পালন মানবাধিকার ও সমতার ভিত্তি প্রদান করে; চার, ইনসাফ প্রদান ও খোদার সৃষ্টিকে দেখভাল করার মৌলিক বাধ্যবাধকতা মানবজাতি, বিশেষত মুসলমানদের রয়েছে; পাঁচ, খোদাবি আইন ও মানুষের করা (ভুল হওয়ার সম্ভাবনাসহ) তাফসিরের মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে; ছয়, রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই খোদার সার্বভৌমত্ব ও মহিমাকে মূর্ত করে তোলার করার ভান করা উচিত নয়। গণতন্ত্রের পক্ষে হাজির তাঁর সকল যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে এই পাটাতনের ওপর।

    অনেকেই রাশিদ আল ঘানুচ্চি, ইউসুফ আর কারজাভিদের মতো পণ্ডিতদের সাথে ফাদলের আলাপকে তুলনা করলে ফাদল সচেতনভাবে তাদের অবস্থানের চেয়ে নিজের অবস্থানের ফারাক পষ্ট করেন। তিনি বলেন, বাকিদের মতো তিনি মনে করেন না যে, ইসলামই গণতন্ত্র সবার আগে প্রতিষ্ঠা করেছে, এবং প্রথম যুগের কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের একরৈখিক কোনো আখ্যানে তাঁর আস্থা নেই। গণতন্ত্র ইসলামের ট্র্যাডিশনাল বোঝাপড়ার প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, তাকে মোকাবিলা করার সিরিয়াস কোনো কোশেশও তাদের নেই বলে মনে করেন। বাকিরা যেখানে ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে ওকালতি করেন, খোদার নামে শরিয়া আইন প্রয়োগের কথা বলেন, ফাদল উলটো মনে করেন এমন কোনো ধরনের রাষ্ট্র আদতে মূর্তিপূজার সামিল (form of idolatry)। তারা ব্যক্তির অধিকারের পক্ষে অতোটা সোচ্চারও নয়, যতটা ফাদল গুরুত্ব দেন।

    আগেই বলেছি, ফাদলের প্রবন্ধের ওপর বেশ সিরিয়াস বাৎচিত ও বাহাস শুরু হয়। আমি দুজনের কথা আপাতত বলবো। তাঁর আলাপের ভূয়সী প্রশংসা করেন নাদের হাশমি। নাদের হাশমি কেন প্রশংসা করলেন, এটা তাঁর কাজ থেকেই আন্দাজ করা যায়। তিনি উদার গণতন্ত্রের সাথে ধর্মের বিশেষত ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। ধর্মীয় রাজনীতির সাথে উদার-গণতান্ত্রিক বিকাশের জলঅচল সম্পর্ককেই প্রশ্নবিদ্ধ করার কোশেশ করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রশ্নই ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উদার গণতন্ত্র কীভাবে ফাংশন করবে, যে গণতন্ত্রের জন্য কিনা একরনের সেকুলারিজমের জরুরত রয়েছে। তাঁর তিনটা প্রধান যুক্তি ছিল। প্রথমত, ধর্ম যে সমাজে পরিচয়ের অন্যতম প্রধান নির্ধারক, সেখানে সেকুলারিজমের একধরনের ধর্মভিত্তিক তত্ত্ব গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় রাজনীতির দরজা বাদ দিয়ে উদার গণতন্ত্রের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে, সরকারব্যবস্থার ধর্মের নরম্যাটিভ ভূমিকা নিয়ে দরকষাকষি ও মুলামুলি এই বিকাশের অন্তর্নিহিত অংশ। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রীকরণ ও লিবারেলাইজেশনের জন্য ধর্মকে একেবারে খারিজ না করে ধর্মীয় ধারনাগুলোর নানাবিধ ব্যাখ্যা ও তাফসির করা জরুরি। নাদের হাশমি যে ধরনের বোঝাপড়া তৈরির কথা তাঁর কাজে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফাদলের প্রবন্ধ যেন তারই এক নজির। ফলে তিনি এর প্রশংসা করেন।

    অন্যদিকে, বেশ কড়া সমালোচনা আসে সাবা মাহমুদের কাছ থেকে। সাবা মাহমুদ প্রশ্ন করেন, লিবারেলিজমই কী ইসলামের একমাত্র দিশা/পন্থা? ইউরোপীয় মূল্যবোধের সাথে খাপ খাচ্ছে কিনা – ইসলামকেই কেন নিজেকে সেটা প্রমাণ করার বার্ডেন নিতে হবে? তিনি ইন্ডিভিজুয়ালিজমের বাইরে ইসলামের ইতিহাসে থাকা সামষ্টিক অধিকার নিয়ে কথা বলেন। পাশাপাশি, লিবারেলিজমে ভেতরে থাকা সহনশীলতারও একটি সহিংস ইতিহাস ও যাত্রার দিকে ইঙ্গিত করেন। ফাদলের প্রবন্ধ দার্শনিক চর্চা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মান্য করেই সাবা মাহমুদ আরেকটি সমালোচনা করেন, ফাদল মুসলমান দুনিয়ার আরেকটি বাস্তবতাকে আমলে নেননি। মুসলমান দুনিয়ার যে সকল দেশে প্রবল স্বৈরাচারী শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তারা কোনো না কোনোভাবে লিবারেল মার্কিন সরকারের মদদপ্রাপ্ত।

    পশ্চিমা মূল্যবোধের সার্বজনীনতাকে ক্রিটিক করতে গিয়ে ইসলামী মূল্যবোধকে প্রান্তিক হিসাবে তুলে ধরাকে ফাদল বিপজ্জনক বলে মনে করেন। ইসলামের স্বতন্ত্রকে অতিরিক্ত জোরারোপ করতে গিয়ে খোদ ইসলামের অভিজ্ঞতার যে সার্বজনীনতা রয়েছে সেটা উপেক্ষিত হয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে ইসলামকে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটাকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন না। সেখানে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের বিপদও দেখেন। ফাদল উলটো অভিযোগ করেন, সাবা মাহমুদ ও অন্যান্যদের খেয়াল থাকে না যে, মুসলিম দুনিয়ার শাসকরা সামষ্টিক অধিকারের ধুয়ো তুলেই নাগরিকদের ক্রমাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ব্যক্তিকে হেফাজত করাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

    বইয়ের হদিস :

    Khaled Abou El Fadl, Islam and the Challenge of Democracy, Princeton University Press, 2004

    Nader Hashemi, Islam, Secularism, and Liberal Democracy: Toward a Democratic Theory for Muslim Societies, Oxford University Press, 2009

  • জাতীয়তাবাদ, আইকনপ্রতিষ্ঠা এবং র‍্যাডিক্যালাইজেশনের রাজনীতি : অধ্যাপক ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তির  প্রেক্ষাপটে

    জাতীয়তাবাদ, আইকনপ্রতিষ্ঠা এবং র‍্যাডিক্যালাইজেশনের রাজনীতি : অধ্যাপক ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তির  প্রেক্ষাপটে

    • মানস চৌধুরী

     পূর্বকথা ও প্রেক্ষাপট

    ১৯৯৪ এবং ১৯৯৮ – পশ্চিমবাংলার জন্য এই দুই তাৎপর্যপূর্ণ কালের বা সালের সমকালেই আমার কোলকাতা যাওয়া হয়েছিল। আমার সফর দুটো একেবারেই কাকতালীয়। অন্তত তাৎপর্যসমূহের সঙ্গে মিলিয়ে ছিল না। আবার, কোনোকিছু উপলব্ধি করতে সশরীর হাজির থাকতে হয়, সামাজিক বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তা আমি মনেও করি না। তথাপি, এই সফর দুটো আমাকে এমন কিছু বিষয়ে ওয়াহিবহাল করেছিল যা অন্যসূত্রে জ্ঞাত হওয়া আয়াসসাধ্য হতে পারত। ১৯৯৪-এ সুস্মিতা সেন মিস ইউনিভার্স নির্বাচিত হন। এই নবলব্ধ মর্যাদাসমেত তাঁর সফর করতে হয়েছিল কোলকাতা, এমন এক শহর যার সঙ্গে সুস্মিতা সেনের নিজ-সম্পর্ক-নির্ধারণ প্রায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হয়ে পড়েছিল যদি না খোদ পশ্চিমবাংলার কাণ্ডারীরাই তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ডেকে বসতেন। এই ডাক তামাম কোলকাতা নগরীতে হাঁকডাকে রূপান্তরিত হয়েছিল। কথিত যে, কোলকাতার শোভাযাত্রায় শকটের উপর দাঁড়িয়ে সুস্মিতা সেনকে হাত নাড়তে নাড়তে সম্ভাব্য সকল রাস্তায় ঘুরতে হয়েছে। তা তিনি উপভোগ করে থাকুন আর নাই থাকুন। তুলনায়, ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেনের নোবেলপ্রাপ্তিতে উদ্যাপন, বা তাঁকে অধিগ্রহণ, তাঁর জন্য অনেক অনায়াস অনুষ্ঠানসূচিতে সীমিত ছিল। তা তিনি সমরূপ একটা কর্মসূচির জন্য পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে থাকুন আর নাই থাকুন। আমি নিঃসংশয়ী নই এই উচ্ছ্বাসকে জাতীয়তাবাদের অনুষঙ্গ হিসেবে পাঠ করা সঙ্গত, নাকি রাষ্ট্রবাদের১। এ ব্যাপারেও আমি অনিশ্চিত যে উত্তর-ঔপনিবেশিক স্থাপিত-রাষ্ট্রকাঠামোতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, এবং অন্বেষ, আদতেই রাষ্ট্রবাদী হওয়া ব্যতিরেকে সম্ভব কিনা।২ যাহোক, উভয়ক্ষেত্রেই অর্জনের ঘটনাকে ঘিরে যে উচ্ছ্বাস তার প্রধান অধিকর্তা আমলাতান্ত্রিক কাঠামো হওয়াতে ‘জানগণিক’ উৎসবমুখরতার সঙ্গে এর সম্পর্ক অনায়াস ও সাবলীল ছিল।

    অধ্যাপক ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তি বাংলাদেশে সমরূপ উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, আপাতঃভাবে তা বলা যায়। কিন্তু পশ্চিমবাংলার উদাহরণের প্রেক্ষিতেই, একটা সূক্ষ্ম গুণগত পার্থক্য ঘটনাটিকে আরও স্বাতন্ত্র্য প্রদান করেছে। এই বৈশ্বিক অর্জনের পর চটজলদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো খুব অনায়াসেই একটা উৎসবমুখরতার পরিকাঠামো প্রস্তাব করতে পারেনি।৩ নিবিষ্টপাঠে এর নানাবিধ প্রকরণ ও কারণ হাজির করা সম্ভব। সংক্ষেপে, রাষ্ট্রক্ষমতার সংসদীয় লড়াইয়ে সামিল দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সম্পর্ক নির্বাচনের সময়কালে চরম ও স্থূল আকার ধারণ করেছে এবং অধ্যাপক ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তির কাল এই সময়ের সঙ্গে মিলে যাওয়াতে একটা ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। সেটা, পরিশেষে, ঘটনাচক্রীয়।

    এই উচ্ছ্বাসটি এর গঠনপ্রক্রিয়া বিচারেই প্যারাডক্সিক্যাল বা বিষমসঙ্গতিময়, বিশেষত আলাপপ্রসঙ্গটি যদি হয় খোদ এই উচ্ছ্বাসের প্রকরণগত কারিগরি নিয়েই। ভেঙে বললে, বর্তমান নাতিদীর্ঘ লেখাটি তদন্ত করতে চাইছে এই উচ্ছ্বাসের, উৎসবমুখরতার বুনিয়াদ নিয়ে। এবং অন্যদিকে, এই উচ্ছ্বাস ও আবেগপ্রবণতা এরকম যেকোনো উদ্যোগকে ঝুঁকির মুখোমুখি করে; এরকম একটি রচনাপ্রচেষ্টা গৃহীত হতে পারে ‘জানগণিক’ অনুভূতিকে ও অর্জনকে খাট করবার প্রয়াস হিসেবে। সেসব সমেতই, এই রচনায় বক্তব্য মূলত তিনটি: এক, আইকনপ্রতিষ্ঠা হালের জাতীয়তাবাদী প্রবণতায় কেন্দ্রীয়; দুই, নোবেলপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশ পরিমণ্ডলে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর সমর্থ আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন; তিন, এই প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম দিক হলো তাঁর কর্মকাণ্ডকে, বিশেষভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির কথাই হচ্ছে, র‌্যাডিক্যাল হিসেবে ইঙ্গিত  করা হচ্ছে এবং সেই প্রবণতাটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পঠনপাঠনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

     

    বাংলাদেশে আইকন

    এটা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা দরকার যে বাংলাদেশে আইকন-প্রতিষ্ঠা, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গণের বাইরে এবং ‘অ-রাজনৈতিক’ আকিকায়, স্পষ্টভাবে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। এটা বলবার সময়ে অন্তত কয়েকটা বিষয়ে আমি সতর্ক আছি: এক, রাজনৈতিক অঙ্গণের আইকন ও সেগুলোর নির্মাণপ্রক্রিয়া সমরূপ নয়; দুই, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বিস্তর ফারাক আছে এবং সেটা আইকন সূত্রমালার ক্ষেত্রেও যথার্থ; তিন, সাধারণভাবে পাশ্চাত্যীয় বা অধিকতর ভোগসংস্কৃতির সমাজের সঙ্গে ফারাকটা আরও সুস্পষ্ট এবং অর্থবহ।

    আইকন-সৃষ্টিতে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে বিবরণী খাড়া করবার এখানে আবশ্যকতা নেই। এটা নেহায়েৎ সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে এখন যে মিডিয়ার ভূমিকা দৃশ্য-শ্রুতিগত পুঁজিবাদী জমানায় নিরঙ্কুশ।৪ আইকনের সৃষ্টি, ভোগসম্পাদন, পুনর্সৃজন, রূপান্তর এবং বিনাশ (তাত্ত্বিক অনুকল্পীয়ভাবে) সম্ভব কেবলমাত্র মিডিয়ার একচেটে কর্তৃত্বের মধ্যেই। পাশ্চাত্যীয় সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনায়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ভারতের মতো শক্তিমান মিডিয়ারাজ্যে, যাকে সেলেব্রিটি বলা হয়ে থাকে সেটার সঙ্গে আইকনের সম্পর্ক কী তা নিয়ে সঙ্গত কারণেই চিন্তা করতে হয়েছে এই প্রসঙ্গে আলাপ তুলতে গিয়ে। চিত্তাকর্ষক যে, এই ভাবনার অনুবর্তী হিসেবে একটা প্রস্তাবনা দাঁড় করাতে আমি উৎসাহ বোধ করছি। সেটি হচ্ছে: সেলেব্রিটি উৎপাদন প্রক্রিয়ার পাটাতন আইকন সৃষ্টিতে গুরুতর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে; এবং একই সঙ্গে এই উৎপাদন প্রক্রিয়ার ঘনত্ব আইকন-বিনাশের কারণ হতে পারে- তা সে আনমনেই হোক আর কৃৎকৌশলে সাধিত হোক। এসব কথার গুরুত্ব এখানেই যে বাংলাদেশের মিডিয়া উৎপাদন প্রণালী, এখন অবধি, সেলেব্রিটি তৈরি করতে পারঙ্গম হয় নাই। পাশ্চাত্যের তুলনায় তো বটেই, কিন্তু অন্তত ভারতের তুলনায়ও।

    ভারতের বিষয়টাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার আছে। মুম্বই চলচ্চিত্র কারখানা এবং ভারতীয় ক্রিকেট যুগপৎ মিথোজীবিতার মধ্য দিয়ে সেলেব্রিটি উৎপাদনের মুখ্য চালিকাশক্তি থেকে গেছে কম করেও ৫০ বছর। স্পষ্ট করে বললে, হালের ক্রিকেট বিপণনের উত্তুঙ্গ গ্লোব্যাল প্রচেষ্টার ঢের ঢের আগে থেকেই ক্রিকেট ছিল অন্যতম সেলেব্রিটি পরিক্ষেত্র। অন্যদিকে, লক্ষ্ণৌ , এলাহাবাদ, হায়দরাবাদ, চেন্নাই (তৎকালীন মাদ্রাজ), মুম্বই (তৎকালীন বোম্বে) এবং কোলকাতার নানামাত্রার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিমা রচনার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো সরবরাহ করেছে মুম্বই ওরফে বলিউড চলচ্চিত্র কারখানা। ক্রিকেট ও চলচ্চিত্রের এই মিথোজীবিতা ভারতের সাংস্কৃতিকতায় এক অনন্য রাষ্ট্রোর্ধ্ব মাত্রা দান করেছে যার ভরসায় রাজনৈতিক বৈরিতার আপাত উৎকণ্ঠার মধ্যেও ভারতের মিডিয়া-প্রক্রিয়ার পক্ষে সম্ভব হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের ব্যক্তিত্ব অধিগ্রহণ। পরিমাণে যত কমই হোক, নগণ্য নয় যে, ৫০-এর দশকে নূরজাহান বা সুরাইয়া, ৮০-এর দশকে ইমরান খান, নাহিদ আখতার, মজিদ খান বা রুনা লায়লা এবং ৯০-এর দশকে বা তার পরে নুসরাত ফতে আলি খান কিংবা আদনান সামীর মতো ‘অন্য’ প্রতিমা অন্তর্ভুক্তিকরণ। এর মাঝে ভারতের অজস্র প্রতিমা তো রয়েছেই সেলেব্রিটি হিসেবে। এসব উদাহরণের মধ্য দিয়ে আমি আসলে বড়জোর ভারতের মিডিয়াপ্রক্রিয়ায় সেলেব্রিটি সৃজনের একটা বৈশিষ্ট্যের দিকেই আলোকপাত করছি মাত্র, বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্যকে স্পষ্ট করবার স্বার্থেই। এবং একথাও আমি বিস্মৃত নই যে বিনোদন জগতের প্রতিমামণ্ডলী (সেলেব্রিটি বা আইকন) আর উন্নয়ন বা পরিষেবা (বা যাকে ফিল্যানথ্রপি বলা হয়ে থাকে) জগতের প্রতিমামণ্ডলী সমার্থক নয়।

    কিন্তু, কোনোমতেই বাংলাদেশে কাছাকাছি ধরনেরও সেলেব্রিটি সৃজন প্রক্রিয়া নেই। প্রাথমিকভাবে বিনোদন জগতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখলে, কাছাকাছি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা চলে এমন একটাও প্রতিমা আমাদের মনশ্চক্ষে হাজির হয় না। নিবিড় মনোযোগ দিয়ে ভাবলে, বাংলাদেশের মিডিয়াভোগপ্রণালীর নিকট বা দূর অতীতে সবচেয়ে সন্নিকট যে নামগুলো সম্ভাব্য হিসেবে হাজির হয় তার মধ্যে থাকতে পারে চম্পার নাম (হ্যাঁ, রাজ্জাক বা ববিতা নন), হুমায়ূন আহমেদ-এর নাম, মরহুম সালমান শাহ্-এর নাম, সুবর্ণা মুস্তাফা বা অপি করিম-এর নাম, আফজাল হোসেন বা হুমায়ূন ফরিদীর নাম, এমনকি হয়তো মাহমুদুজ্জামান বাবুর নাম এবং অতি অবশ্যই রুনা লায়লার নাম। নিজ জমানায় এঁদের সকলেই বাংলাদেশের সেলেব্রিটি, তথাপি চূড়ান্তবিচারে, এই নামগুলোর কোনোটাকেই দীর্ঘকালীন কিংবদন্তী রচনাকার হিসেবে দেখা কঠিন; একমাত্র ব্যতিক্রম হয়তো হুমায়ূন আহমেদ। আইসিসি শিরোপা এবং উত্তরকালে টেস্ট-স্ট্যাটাস অর্জনের পর নানাবিধ প্রোমোটারের একনাগাড় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের উছিলায় কোনো ধুন্দুমার সেলেব্রিটি জন্মলাভ করেননি। এখানে হয়তো আমাদের মুদ্রণ-মিডিয়া, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং বিনোদন-সাংবাদিকতার পরিপূরক ভূমিকার ধারাবাহিকতার অভাবকে লক্ষ্য করতে হবে যদি বিষয়গুলো আমরা, তুলনামূলকভাবে, বুঝতে চেষ্টা করি।৫ বিনোদন জগতের বাইরে, পরিষেবা বা ফিল্যানথ্রপিক জগতেও খুব ভিন্ন কোনো চিত্র নয়। মাদার তেরেসা কিংবা অরবিন্দ-এর মতো শক্তিশালী প্রতিমা বাংলাদেশে সৃজিত হয়নি। এই উদাহরণ-তালিকা দীর্ঘ করা সম্ভব।

    চিত্তাকর্ষক যে, উন্নয়ন পরিমণ্ডল নিয়ে ভাবলে বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নয়নকে একটা ডিসকোর্স৬ হিসেবে বিবেচনা করলে এই অঙ্গণে প্রতিমা সৃজন বাংলাদেশে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আশপাশের রাষ্ট্রসমূহে যা আপাত অসম্ভব তা বাংলাদেশে সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন-সেলেব্রিটির তালিকায় আসবেন এনজিও উদ্যোক্তা ফজলে হাসান আবেদ, ফ র মাহমুদ হাসান, এমনকি পর্বতপ্রতিম সম্পাদক মতিউর রহমান কিংবা অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং অবশ্যই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তালিকাটা দীর্ঘ নয় এবং, দৈবাৎ নয় যে, নারী-বিবর্জিত। তথাপি এই তালিকার প্রতিমামণ্ডলীর শক্তিমত্তা নেহায়েৎই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অবশ্যই জরুরি জিজ্ঞাসা যে কী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিমণ্ডলে সেলেব্রিটি, এবং আখেরে আইকন, সৃষ্টি সয়ম্ভূ প্রক্রিয়া হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটা অনুধাবন করবার জন্য আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে খোদ উন্নয়ন ডিসকোর্স বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যেরকম জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বমুক্ত থাকবার, ও কার্যত শেষোক্তের উপর কর্তৃত্ব করতে পারার, ঐতিহাসিক বুনিয়াদ লাভ করেছে সেটার দিকে। উন্নয়ন, একটা ডিসকার্সিভ বা বাক্সময় পরিক্ষেত্র হিসেবেই, জগতের আর কোথাও জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদির সঙ্গে সংমিশ্রণ ব্যতীত ক্রিয়াশীল নয় বলে অনুধাবন করা সম্ভব। এর মানে মোটেই এই নয় যে বাংলাদেশের উন্নয়ন ডিসকোর্স রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোকে লড়াই করে। বরং একেবারেই উল্টো। কিন্তু একটা দরকষাকষির আলাপচারিতা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের উন্নয়ন-স্থাপনাসমূহ তর্কাতীতভাবে স্বাধীন- সেটুকুই আমার বক্তব্য।

    অধ্যাপক ইউনূস নোবেল পাবার ঢের ঢের আগে থেকেই সেলেব্রিটি। এমনকি তাঁর ম্যগসেসে পুরস্কার লাভেরও আগে থেকে। অধ্যাপক ইউনূস হচ্ছেন উন্নয়ন-উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরল একজন যিনি নতুন ধরনের কর্পোরেট সাংবাদিকতার৭ বিকাশলাভকে সম্ভবত মনোযোগ দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এই ধারার সাংবাদিকতা-চর্চার মধ্যে নিরন্তর আত্ম-অবয়ব মুদ্রিত আকারে দেখবার সুযোগ, বা প্রেষণা, লাভ করেছেন। ফলে, নোবেল পুরস্কার অধ্যাপক ইউনূসের দীর্ঘ অভিযাত্রার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাইলফলক হতে পারত কেবল। কমবেশি কয়েকবছর যাবৎ তাঁর নাম মিডিয়াভোক্তাকুলে সম্ভাব্য নোবেলবিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে আসছিল। কার্যত যাকে আমজনতা বলা হয় সেই মিডিয়াভোক্তাকুল আকুল অপেক্ষা করছিলেন এই অর্জনের জন্য। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আইসিসি শিরোপা কিংবা টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনের পর এটাই সর্বোচ্চ মিডিয়া-ইভেন্ট৮,  এবং এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় হচ্ছেন একজন ব্যক্তি, অধিকন্তু উন্নয়ন-বলয়ের। আইকন হিসেবে অনুশীলন করবার এর থেকে বড় কোনো ঘটনা কল্পনাতীত, সমকালীন বাংলাদেশে।

     

    ডিসকোর্স, পাবলিক জবান এবং অপ্রতিরোধ্য অবয়ব

    উন্নয়নের বৈশ্বিক ডিসকোর্সমালাতে ‘মুক্তি’, ‘সংগ্রাম/লড়াই’ কিংবা ‘বিপ্লব’ গত দুই তিন দশক ধরে আত্তীকৃত সব পদ। ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই/সংগ্রাম’; (প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ‘স্বৈরাচার’) থেকে ‘মানুষের মুক্তি’; কিংবা ‘সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তির বিপ্লব’ ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অবনয়ন এবং বৈশ্বিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে এই পদগুলো নবায়িত অর্থ আলাপ প্রসঙ্গ হিসেবে নতুন নয়। ফলে এখানে এগুলো নিয়ে বিস্তর কোনো ব্যাখ্যা আমার লক্ষ্য নয়। যে বিশেষ কারণে এখানে এগুলোর উল্লেখ প্রাসঙ্গিক তা হচ্ছে ডিসকোর্স হিসেবে এগুলোর পরিসর এবং সামর্থ্য রাষ্ট্রসীমাভেদী; এবং বাংলাদেশে পাবলিক জবান সৃষ্টিতে এগুলো কেন্দ্রীয়। পাবলিক জবানের পুনঃপৌণিকতা অটুট থাকে এসবের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া করে। কিন্তু পাবলিক জবানের বিশেষ দেশজ চেহারা আছে। সেই চেহারা গ্লোব্যাল ডিসকোর্সের সঙ্গে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতারত নয়, বরং সম্প্রসারণ ও মিথোজীবিতা। যেমন: ‘মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো’, ‘বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয়া’, ‘আমরাও পিছিয়ে নেই’। লক্ষ্যণীয় যে, জাতীয়তাবাদী স্পৃহার এই পাবলিক জবানগুলোর ডিসকার্সিভ পরিসর রয়েছে যে পরিসর উন্নয়ন-বিশ্বায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত; এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ যে অধ্যাপক ইউনূসের বেলায় এই জবানগুলো কারকপক্ষে শরীকী। তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির বহু আগে থেকেই এটা চলমান।

    অধ্যাপক ইউনূস-এর মডেল কিংবা গ্রামীণ ব্যাংক-এর কার্যপদ্ধতি নিয়ে উন্নয়ন-আলাপমালায় সমালোচনা কিংবা প্রতিরোধ হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণের বিষয়ে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো (যথা বিশ্বব্যাংক) একটা সংশয়ী পর্যবেক্ষক হিসেবে যতদিন ছিল, কিংবা একটা সংস্থাপনযোগ্য প্রকল্প হিসেবে যতদিন এসব প্রতিষ্ঠান রায় দেয়নি তখনকার কথা বাদ দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সমালোচনা এবং প্রতিরোধ হয়েছে। হয়েছে পলিসি অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে কিংবা উন্নয়ন সমীক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে। আমিনুর রহমানের অপেক্ষাকৃত আলোচিত কাজটিই৯ বেশি মনোযোগ পেয়েছে। কিন্তু একেবারে সাম্প্রতিককালেও, তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির আগে কিংবা পরে, আর্থসামাজিক শাস্ত্রীয় বিচারে তাঁর পদ্ধতিকে প্রতিরোধ করবার উদ্যোগ হয়েছে। যে বিষয়টা এখানে উল্লেখযোগ্য, কিংবা যে পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রসঙ্গ এখানে আসছে তা হলো তেমন কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই অধ্যাপক ইউনূস কিংবা গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল নিয়ে কোনো সমালোচনা কমবেশি চাপা পড়ে গেছে – দেশে কিংবা বিদেশে। আমিনুর রহমানের কাজ মোটের উপর উন্নয়ন সমীক্ষার অর্থনৈতিক মডেলগুলোর ব্যাপারে নির্দ্বিধ থেকে এগিয়েছে। বা অন্যভাবে বলা যায়, তাঁর প্রচেষ্টার তাত্ত্বিক পাটাতন উন্নয়নবাদী। অনুবর্তীতে, তিনি জোর দিয়েছেন যেসব গাণিতিক কৃৎকৌশলে গ্রামীণ ব্যাংক মুনাফা নিশ্চিত করে থাকে সেগুলোর তদন্ত করতে এবং এটা করতে গিয়ে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রচারণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যকার প্রভেদকে সামনে নিয়ে আসেন। আমার তরফে এটা স্পষ্ট করা জরুরি যে আমার শাস্ত্রীয় প্রস্তুতি এ ধরনের কিছু হাজির করার মতো নয়। সেটার জন্য যাকে প্রাথমিক উপাত্ত বলা হয়ে থাকে তার উপর কর্তৃত্ব থাকা প্রয়োজন। সর্বোপরি, বর্তমান রচনার মুখ্য তাগিদের জন্য এটা জরুরিও নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এসব সমালোচনার প্রত্যুত্তর কী উপায়ে দেয়া হয়েছে। তেমন কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই, শাস্ত্রীয় ও পদ্ধতিগত প্রত্যুত্তরের বদলে, মিডিয়া-কাভারেজ বরাবর অধ্যাপক ইউনূসের প্রধান জবাবদিহিতা থেকে গেছে। বিষয়টা কেবল জনে জনে তিনি প্রত্যুত্তর দিতে পারেন কিনা এমন সরল আব্দারের নয়। বরং, তাঁর সচেতন ভূমিকা কাঠামোগতভাবে গ্লোবেল ডিসকোর্সের পরিসর ব্যবহার করেছে ধারাবাহিকভাবে- বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তিনি কী কী  দিতে পারেন, কিংবা ‘জাতির জন্য তিনি কী কী  করতে সমর্থ ইত্যাদি। পাবলিক জবানে এই অবস্থান প্রতিবর্তিত হয়েছে শুধু।

    তুলনায়, অন্য কিছু সমালোচনা খোদ রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের পাটাতন থেকেই হয়েছে। সেসব সমালোচনা সাধারণভাবে বাংলাদেশে এনজিও তৎপরতার বিষয়ে সপ্রশ্ন।১০ গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম সেই পরিকাঠামো থেকেই পঠিত হয়েছে। সেই হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের গোড়া থেকেই প্রতিরোধী চিন্তাভাবনা সক্রিয় ছিল। ২০০৫-এর ২৯শে মে দুর্নীতি দমন কমিশনের সেমিনারে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করবার যে ঘোষণা দিয়ে যে প্রবন্ধ পড়েন সেটা সম্ভবত দারিদ্র্য দূরীকরণের থেকেও নগরমানসে (বা মিডিয়াভোক্তাকুলে) বেশি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। বলাইবাহুল্য, এরও পাটাতন হয়ে ছিল পূর্ববর্তী বছরগুলোতে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর দুর্নীতি বিষয়ক আলাপমালা একনাগাড় গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। অধ্যাপক তাজ হাশমী, বাংলাদেশে উন্নয়ন সংস্থাসমূহের কর্মকাণ্ডের একজন নিষ্ঠাবান ও ধারাবাহিক সমালোচক, অধ্যাপক ইউনূসকে ডিজিটাল মাধ্যমে একটা দীর্ঘ পত্র লেখেন।১১ তাঁর চিঠির মূল বক্তব্য ছিল এনজিওগুলোর মধ্যকার দুর্নীতির নানারকম আলামত যেখানে পাওয়া যায় এবং পাবলিককৃত হয় না তখন সেই জগতের মধ্য থেকে সেসংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এরকম খোয়াব দেখানো অতিক্রিয়া।

    এসবের সঙ্গে বাহাসের একটা পদ্ধতিগত উদ্যোগ অধ্যাপক ইউনূস কিংবা গ্রামীণ ব্যাংক নিয়েছেন কখনো তেমন অনেক নজির নেই। আমার বক্তব্য কিন্তু এই নয় যে সম্ভাব্য বাহাস আরও ‘গ্রহণযোগ্য’ করে তুলতে পারত তাঁর/গ্রামীণের অবয়ব। আমার বরং একেবারেই ভিন্ন বক্তব্য। অবয়ব বরং এক্ষেত্রে এমন স্বাভাবিকীকৃত, এমনই গ্রহণযোগ্য যে সেই অবয়ব বা প্রতিমার পুনরুৎপাদন ছাড়া আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়নি। কূটচাল বা দুরভিসন্ধি হিসেবে একে পাঠ করতে যাওয়া নিরর্থক; পাঠ করা জরুরি বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় লোকাল আইকন সৃষ্টির কৃৎকৌশলের আলোকে, পরিবেশনমূলক/রিপ্রেজেন্টেশনাল সূত্রমালার আলোকে, হালের জাতীয়তাবাদ কীভাবে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কল্পমানচিত্রে ডায়াসপোরিক জমিন খোঁজে তার আলোকে, এবং কীভাবে একজন সৃষ্টিরত আইকন তাতে নিরন্তর অংশ নিতে থাকেন তার আলোকে।


    স্বপ্রতিমার র‌্যাডিক্যালাইজেশন

    খুব স্পষ্টভাবেই আমি দুইটা আপাত  বিরোধী ধারণা যুগপৎ প্রয়োগ করেছি বাংলাদেশে উদ্যাপনমুখরতার সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় ঘটনাটিকে বুঝতে- জাতীয়তাবাদ ও র‌্যাডিক্যাল। এটার একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যূৎপত্তিগত দিক আছে। জাতীয়তাবাদ যতটাই অনুধাবনকৃত একটা প্রপঞ্চ, তুলনায়, র‌্যাডিক্যাল ততটাই অস্পষ্ট এবং তরল একটা প্রপঞ্চ । পাশ্চাত্যীয় রাজনৈতিক ডিসকোর্সে র‌্যাডিক্যাল হামেশা নানাবিধ অর্থে প্রয়োগকৃত হয় – প্রায়শই তা নৈরাজ্যের সঙ্গে একাকার করে দেখা হয় এবং পরিশেষে উভয়কেই নেতিবাচক তৎপরতা হিসেবে পরিবেশন করা হয়; অন্যথায় র‌্যাডিক্যাল চিহ্নিত হয় লিবেরেলের অসহিষ্ণু বেয়াড়া প্রতিপক্ষ হিসেবে। এখানে র‌্যাডিক্যালাইজেশন প্রত্যয়টা প্রয়োগ করবার সময়ে পাশ্চাত্যীয় ডিসকোর্সের এই সীমানাগুলো সম্বন্ধে আমি সজাগ আছি। লক্ষ্য করবার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক পুঁজিবাদী বিশ্বে, এর নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোকেই, লিবেরেলবাদ স্বাভাবিকীকৃত হয়নি – অন্তত যতটা পর্যন্ত হলে যাবতীয় লড়াই-প্রচেষ্টা আদর্শমানের (নর্ম) লঙ্ঘন হিসেবে পাবলিক মননে গৃহীত হবে। উল্টো বরং, লড়াই-ই এখানে নর্ম। একটা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ফসিলপ্রায় ভাষা-লক্ষণা; রিপ্রেজেন্টেশন। এটা এমন এক বিষমসঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা যেখানে কোনো সংঘসত্তা বা তৎপরতা প্রশংসিত হয় এর ‘অরাজনৈতিক’ অবয়বের কারণে, এবং একই সঙ্গে তা লড়াই জারি রাখবার প্রত্যাশিত রাজনৈতিক কর্তব্যচাপে থাকে- প্রাসঙ্গিক, অবশ্যই যদি লড়াইকে আমরা ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে অনুধাবন করি। বলাইবাহুল্য, কাঙ্ক্ষিত এই লড়াইয়ের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ/সমূহ ক্ষেত্রবিশেষে এক প্রহেলিকায় পর্যবসিত হয়। পাশ্চাত্যে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ‘সংগ্রাম’ চলে, অধ্যাপক ইউনূসও একে জাদুঘরে পাঠাবার ঘোষণা দিয়ে স্বস্তি পেতে পারেন; কিন্তু বাঙ্গালা-মননে এমন বিমূর্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘লড়াই’ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে না। কোন ‘সংগ্রাম’ বা ‘লড়াইটি অধিকতর খাঁটি বা কার্যকরী সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিজ্ঞাসা এবং পরিশেষে নিরর্থক জিজ্ঞাসা।

    ১০ই ডিসেম্বর অসলো সিটি হলে নোবেল প্রদান অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ইউনূস বাংলায় ও ইংরেজিতে যে বক্তৃতা দেন, প্রত্যাশিতভাবেই, তার একটা মুখ্য লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরা এবং যাঁকে তিনি এবং তাঁর বৈশ্বিক মিত্ররা নারীমুক্তি১২ বলে আসছেন সেটা অর্জনে এর ইতিবাচক প্রভাব বয়ান করা। বহুল চর্চিত একটা পরিসংখ্যান তিনি উল্লেখ করেন১৩: ‘পৃথিবীর সম্পদের মোট শতকরা ৯৪ ভাগ রয়েছে ৪০ ভাগ লোকের হাতে এবং বাকি শতকরা ৬ ভাগ আছে বাকি জনসংখ্যা তথা ৬০ ভাগ লোকের হাতে।’ এ ধরনের পরিসংখ্যানগুলো খুবই মুস্কিলের। এক তো হলো, এর গুণমান সমর্থন বা মোকাবিলার জন্য আমশ্রোতাদের হাতে বিশেষ কিছু থাকে না। রাজ্যের জিজ্ঞাসা নিষ্পত্তিহীনতায় ভোগে- এই ৪০ ভাগের মধ্যেকার বণ্টনচিত্রটা কেমন; কিংবা এদের নিবাস কোথায় এবং কোন ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক বন্ধনে তাঁরা এককাট্টা; কিংবা আদতেই আপাত শিথিল এই ৪০ ভাগের মধ্যে অধ্যাপক ইউনূস কিংবা তাঁর মিত্রদের কেউ কেউ পড়বেন কিনা; যদি পড়েন, সেক্ষেত্রে মৈত্রী, পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের কৃৎকৌশল কী; কিংবা ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’১৪ বলে এমনকি এনজিও সেক্টরেও যে পদটি পরিচিত আছে সেটার বৈশ্বিক গুরুত্ব কীভাবে অনুধাবন করা যাবে; এবংবিধ। কিন্তু মূল সমস্যাটা অন্যত্র। এই পরিসংখ্যানগুলো, আমি মনে করি, ভীষণভাবে শ্রোতার অনুভূতিপ্রবণতায় আবেদন করে- এমন এক অনুভূতিপ্রবণতা একটু আগেই বাংলাদেশের পাবলিক মননের ঐতিহাসিক গঠনের সূত্রে যার উল্লেখ করেছি। বৈশ্বিক বৈষম্যের অর্থনির্দেশে এখানে যা ব্যক্ত হয়, এবং মুখ্যত অব্যক্তভাবে দ্যোতিত হয়, তা পরিবেশনমূলক; এবং আইকনপ্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট অর্থসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টাতেই কেবল সজ্ঞান নিয়োজিত।

    এক্ষেত্রে আরও চিত্তাকর্ষক প্রসঙ্গ সম্ভবত নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলেনর-এর সঙ্গে একেবারে সাম্প্রতিক কালে অধ্যাপক ইউনূস তথা গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকাশ্য মতবিরোধ।১৫ মতবিরোধটা প্রকাশ করবার সময়কালটা নোবেলপ্রাপ্তির কালের সঙ্গে মিলে যাওয়াটা অবশ্যই দৈবাৎ হতে পারে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে আরও বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করবার আছে কী ভাষামণ্ডলী দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস একে চিত্রিত, সুতরাং মিডিয়াকৃত, করছেন। তিনি খুব স্পষ্ট করে যা যা বলেছেন তার মধ্যে নিন্মরেখা দিয়ে পাঠ করা যেতে পারে যেগুলোতে তিনি টেলেনরকে এমন একটা কোম্পানি বলছেন যেটা “রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত” এবং যারা “বাংলাদেশের গরিবদের কাছ থেকে মুনাফা চুষে নিচ্ছে”। পরন্তু, তিনি একটা তুলনা হাজির করেন, অবশ্যই গ্রামীণ টেলেকমের নৈতিক উৎকর্ষ নিশ্চিত করবার জন্য, যে টেলেনরের ঝোঁক “মুনাফা সর্বোচ্চকরণের দিকে আর গ্রামীণ টেলেকমের “সামাজিক লক্ষ্যের দিকে।১৬ তাঁর দাবির যাথার্থ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ। এবং এই বিচারসমেত কেন ও কীভাবে এই অংশীদারিত্ব এ যাবৎ ক্রিয়াশীল আছে সেটা আরও ভিন্ন জিজ্ঞাসা। বাণিজ্যে পাশ্চাত্যীয় পক্ষ যে নানাভাবে অপাশ্চাত্যীয় অংশীদারদের কোণঠাসা করে থাকে সেটাও একটা অত্যন্ত জরুরি রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। কিন্তু এখানে মুখ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে তাঁর প্রতিমার গ্রাহকদের মধ্যে কী কী অনুভূতিতে অধ্যাপক ইউনূস যোগাযোগ স্থাপন করতে চাইছেন। এই পরিবেশনরীতি একটা সজাগ সংস্থাপন হবার সম্ভাবনাই বেশি।

    এই দুটো উদাহরণ কেবল নিছক দৈবচয়ন নয়। যে প্রস্তাবনার সঙ্গে এগুলো সম্পর্কিত সেখানে এই বাছাইগুলোর সুস্পষ্ট প্রেক্ষিত রয়েছে। আমার বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমান বাংলাদেশে অধ্যাপক ইউনূসের আইকন নির্মাণের ক্ষেত্রে মিডিয়াভোক্তাকুল এবং অধ্যাপক ইউনূস স্বয়ং একটা অখণ্ড প্রক্রিয়ার সম্পূরক ভূমিকা নিয়ে চলেছেন। অধিকন্তু, বৈষম্যের প্রসঙ্গে পরিবেশনধর্মী/রিপ্রেজেন্টেশনাল ভঙ্গি খোদ আলোচিত উৎসবমুখরতার সঙ্গেও সম্পূরক। র‌্যাডিক্যালাইজেশন এখানে একটা জাদুকরী সামর্থ্যকে কল্পনা করে তাকে নিরন্তর নির্মাণ করে চলা – এমন এক ঐন্দ্রজালিক সামর্থ্য যা ভোজবাজির মতো ‘অরাজনৈতিক’ তকমাপ্রাপ্ত কিছু লিবেরেল অকাঙ্ক্ষাকে উসকে দিতে থাকবে, এমন এক জাদুকরী সামর্থ্য যা ক্ষমতার ব্যবস্থাতন্ত্রকে উন্মোচন করবার কোনো কারণ দেখবে না। যদি সিভিল অকাঙ্ক্ষার একজন ম্যাজিক্যাল আইকনকে ধন্বন্তরী হিসেবে পাওয়া হয় পলায়নপরতা, তাহলে একটা কল্পরাজ্যে ‘নিজ’কে প্রক্ষেপন করে সেই পলায়নপরতাকে আশ্রয়প্রদান অধ্যাপক ইউনূসের ‘নার্সিসিজম১৭, যা আইকনপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে কাঠামোগতভাবে সম্পর্কিত। ‘দুর্নীতি দমন’ বিষয়ে কিছু কাল আগে তাঁর মিডিয়া তৎপরতাকে আবারও স্মরণে আনা যায়; কিংবা নোবেলপ্রাপ্তির পর বাংলাদেশের ‘উচ্চতা’বিষয়ক তাঁর জবানী।

    বিদ্যমান আইকন-প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে উন্নয়ন ও দারিদ্র্য নিয়ে ক্রিটিক্যাল আলাপ-আলোচনা গড়ে তোলা আগামীতে আরও দুরূহই হবে।


    তথ্যপঞ্জি

    ১।  Ranajit Guha, Dominance without Hegemony: History and Power in Colonial India, Harvard University Press, 1998.

    ২। এখানে আমি সতর্ক থাকার পক্ষে যে ভারতের মতো জটিল ও বহুজাতিক-ভাষিক রাষ্ট্রকাঠামোতে বাঙ্গালি জাতির মতো ঔপনিবেশিককাল থেকে অত্যন্ত সুবিধাভোগী জাতি এবং মিজো বা অহমীয়ার মতো প্রতিরুদ্ধ সত্তার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গকে সমভাবে দেখার সুযোগ নেই। আরও সতর্কভাবে বললে, আমি আসলে নিপীড়িত জাতিবর্গের লড়াই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংমিশ্রিত মতবাদকেও ‘এক ধরনের জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো সময়ের থেকে অনিচ্ছুক আছি। বরং, লড়াইপ্রক্রিয়ার পঠনপাঠন নিদারুণভাবে কাঠামোগত কতগুলো নির্দিষ্ট ধাঁচে বন্দি হয়ে আছে Ñ সেই বন্দিদশা যে কেবল পঠনকে পরিসীমিত করে কেবল তাই নয়, বরং লড়িয়েদের আকাক্সক্ষাকে রূপ দেবার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা ডিসকার্সিভ। আমার এই উপলব্ধি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকাঠামোতে পার্বত্য জাতিসত্তাসমূহের লড়াইয়ের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে ইঙ্গিত দিয়ে এসেছে।

    ৩। এটা ঘনীভূত হয়েছে সম্ভবতঃ বিএনপি’র ভীষণ আত্মবিশ্বাসী, এবং প্রায়শঃই বেফাঁস কথা বলতে পারঙ্গম, একজন অর্থমন্ত্রী রয়েছিল বলে। পেশায় অধ্যাপক ইউনূস অর্থনীতিবিদ হওয়াতেই হয়তো জনাব সাইফুর রহমান ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কটাক্ষ করে বসেন (সূত্র: ডেইলি স্টার, ২০শে ও ২৩শে অক্টোবর, ২০০৬)। তবে উত্তরসপ্তাহগুলোতে, বিএনপি ও অধ্যপক ইউনূস উভয় তরফেই উৎসবমুখরতা ম্লান হতে না-দেবার প্রচেষ্টা ছিল বলে অনুভব করা যায়।

    ৪। অর্জুন আপ্পাদুরাই মিডিয়ার আধিপত্য নিয়ে স্পষ্টভাবে জানান তাঁর মিডিয়াস্কেপ ধারণার আওতায়: “আধুনিক কালসমূহ…অংশত এর মিডিয়াস্কেপ দ্বারা গঠিত, যেহেতু মিডিয়া কেবল তথ্য সরবরাহ করে না অধিকন্তু সত্তার প্রকৃতির জন্যে এর রয়েছে সুগভীর প্রভাব।” আপ্পাদুরাইয়ের চিন্তা-উস্কানিমূলক ভাবনা নিমন্ত্রণ করে তাঁরই প্রয়োগকৃত অপর ধারণা ‘এ্যানথ্রোস্কেপ’-এর সঙ্গে এর সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে। হালের দুনিয়ায় পরিসর বিন্যাসে মিডিয়াস্কেপ ও এ্যানথ্রোস্কেপ কীভাবে পরস্পরপ্রবিষ্ট সেই জিজ্ঞাসা নিয়ে আরও উৎসুক কাজ জরুরি। আপ্পাদুরাই (১৯৯০) উদ্ধৃত হয়েছেন, Hugh Mackey Ges Tim O’Sullivan (eds.), The Media Reader: Continuity and Transformation, SAGE Publications and The Open University, London, 1999.

    আপ্পাদুরাই দেখা যেতে পারে: Arjuna Appadurai, “Disjuncture and Difference in the Global Cultural Economy,” In Featherstone, M. (ed.) Global Culture: Nationalism, Globalization and Modernity, Sage, London, 1990.

    ৫। ভারতের সঙ্গে তুলনাটা গায়ে-পড়ে নয়। মিডিয়াকে বুঝতে গেলে, সংজ্ঞাকৃত দক্ষিণ এশিয়ায় বসে, ভারতের অস্তিত্ব এড়িয়ে সেটা সম্ভব নয়। এখানে আরও একটি প্রস্তাবনা আমি সবিনয়ে দিয়ে রাখতে চাইছি: উপনিবেশকালের ভারতের সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া, ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গঠন এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ডায়াসপোরা অন্যান্য বিষয়ের মতো সেলেব্রিটি নির্মাণ প্রক্রিয়ায়ও মুখ্য অনুঘটক।

    ৬।  Arturo Escobar, Encountering Development: The Making and Unmaking of the Third World, Princeton, Princeton University Press, New Jersey, 1995.

    ৭। কর্পোরেট সাংবাদিকতা বলতে, সংক্ষেপে, আমি বোঝাচ্ছি সাংবাদিকতার সেই অনুশীলনকে যেখানে প্রেস বা পত্রিকাকে আর সম্পাদকীয় পরিক্ষেত্র হিসেবে দেখার সুযোগ থাকছে না, বরং কর্পোরেট-সংঘীয় হিসেবে দেখতে হচ্ছে; যেখানে পত্রিকাসমূহ সমরূপ কণ্ঠস্বরকে আত্মস্থ ও আত্মসাৎ করে এবং, ‘মৌলবাদ’ বনাম সেক্যুলারবাদ ব্যতীত, সকল বিতর্কে সমধর্মী অবস্থান গ্রহণ করে থাকে; যেখানে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকেরা ন্যূনতম কোনো পেশা-নিরাপত্তামূলক বেষ্টনীর মধ্যে থাকেন না এবং নিরন্তর উৎখাত ও মৃত্যুভয়ে থাকতে পারেন। এসংক্রান্ত আমার সামান্য ভাবনা আমি ইঙ্গিত করেছিলাম অন্য একটি রচনায়।

    মানস চৌধুরী, “২১-শে আগস্টের বোমা হামলা: প্রেসকর্তব্যের শেষকৃত্য,” যোগাযোগ, সংখ্যা ৭, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, ২০০৫।

    ৮। আমার তরফে ক্রিকেটকে এখানে উদ্ধৃত করা কোনোরকম অতিকথন নয়। প্রথম আলো’র ভূমিকাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখলে আমার এই প্রতিতুলনা অর্থবহ হবে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে পাকিস্তানকে পরাজিত করার পর এই পত্রিকার বিশেষ বড় হরফে শিরোনাম ছিল ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। এই সংখ্যাটির গুরুত্ব নিশ্চয় মালিক তরফেও সম্যধিক। ফলে, পত্রিকাটির বিজ্ঞাপনী কার্যক্রমে এই সংখ্যাটাকে ব্যবহার করা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। এই শিরোনামের ঔজ্জ্বল্য এবং পরিমাপ কেবল ইরাক যুদ্ধের সময়কালের কিছু শিরোনাম এবং উত্তরকালে অধ্যাপক ইউনূসের নোবেলপ্রাপ্তির সময়কালের পরপর কয়েকদিনের শিরোনামের সঙ্গেই তুলনীয়।

    ৯।  Aminur Rahman, Women and Microcredit in Rural Bangladesh: An Anthropological Study of Grameen Bank Lending, Westview Press, 2001.

    ১০। অন্যান্যদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ খুব নিয়মিত একজন ক্রিটিক। তবে এখানে সাম্প্রতিক অন্য একটা লেখা উল্লেখযোগ্য যেখানে লেখক প্রবল ভঙ্গির বিপরীতে বিশেষভাবে অধ্যাপক ইউনূসের কর্মকাণ্ডকে পাঠ করবার একটা স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ দিতে সচেষ্ট –

    Tarek Chowdhury, “Nobel-Man’s Un-Noble Corporate Nexus”, Meghbarta, 15 December 2006.

    http://www.meghbarta.org/nws/nw_main_p01b.php?issueId=6&sectionId=30&articleId=255

    ১১। আরও ব্লগ ও পোর্টালে এটা সঞ্চালিত হয়ে থাকতে পারে, তবে আমি নাগাল পেয়েছিলাম এটাতে –
    http://groups.yahoo.com/group/mukto-mona/message/24781
    অধ্যাপক হাশমী এই চিঠির সূত্রে অন্যদের সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে তাঁর একটা বইয়ের কথা বলেন। যেটা দেখা আমার কর্তব্যের মধ্যে ছিল, কিন্তু হয়ে ওঠেনি বলে মার্জনা চাই –
    Taj Ul-Islam Hashmi, Women and Islam in Bangladesh: Beyond Subjection and Tyranny, Macmillan-Palgrave and St.Martin’s Press, New York, 2000.

    ১২। নারীমুক্তি এবং নারীর ক্ষমতায়নের মধ্যে তাত্ত্বিক পার্থক্য উন্নয়নসংস্থার কার্যক্রমে ও বুলিচর্চায় ভেদহীন মনে হয় এবং আপাততঃ সেটার সম্ভাব্য কী অর্থ তা বুঝতে গেলে আমাদের জন্য আলামত বলতে থাকে কেবল শ্রমবাজারের পরিবর্ধিত সদস্য হিসেবে মুদ্রাবাজারের ছোটখাট শরীক (স্টেকহোল্ডার!) হওয়া। আরও নিবিষ্টপাঠে, খরিদকার বা কনস্যুমার সত্তার উন্মেষ ঘটানোর সামর্থ্য ছাড়া নারী ক্ষমতায়নের অপর কোনো অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

    ১৩। অসলো সিটি হল থেকে সরাসরি টেলিভিশন প্রচার, এনটিভি ইন্টারনেট সম্প্রচার, ১৩ই ডিসেম্বর ২০০৬।

    ১৪। সসংশয়ে এই পর্যবেক্ষণটি আমার হাজির করে রাখি যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সাহিত্যে নয়া-ওয়েবারীয় ধাঁচে যেভাবে রকমারি ‘পুঁজি’র বিবরণী দেয়া হয়ে থাকে তা ভীতিকরভাবে সরলীকৃত। তা যে কেবল বোর্দ্যু’র তাত্ত্বিক প্রস্তাবনার ব্যাপকতাকে পরিসীমিত করে তাই-ই নয়, বরং প্রায়শঃই প্রান্তিক শ্রেণী/গোষ্ঠীসমূহের সাফল্য ও প্রতিরোধের কাহিনী ফাঁদতে গিয়ে মূল তাত্ত্বিক প্রস্তাবনার যা কিনা বনিয়াদ সেই শ্রেণীনিষ্ঠাকেই ফিকে করে দেয়।

    ১৫। www.bdnews24.com, Dhaka, Dec 6, 2006

    ১৬। বর্তমান রচনাটি মূলগতভাবে পরিবেশনরীতি বিষয়ক। ফলে এই উদাহরণটা এখানে প্রাসঙ্গিক হবার দাবিদার। অধ্যাপক ইউনূস দাবিকৃত ‘সামাজিক লক্ষ্য’টি নিশ্চিতভাবে যাকে দারিদ্র্য দূরীকরণ বলা হয়ে থাকে সেটাই। গ্রামীণ টেলেকম বাণিজ্য শুরু করবার প্রাথমিক কালে এর প্রমোশনাল কর্মকাণ্ডতে এমনসব মুখাবয়ব হাজির করা হয়েছে, মহানগরের পথের ধারে ধারে, যেগুলো কোনো রকম বাড়তি ব্যাখ্যা ছাড়াই ‘দরিদ্র’ মানুষজনের বলে পঠিত হতে সমর্থ ছিল। হাতে তাঁদের মোবাইল ফোন। এই সামাজিক শ্রেণীর মডেলদের অপসারণ করে নিরঙ্কুশ নাগরিক এবং/অথবা মধ্যবিত্ত মুখাবয়ব দিয়ে প্রমোশনাল বানানো হয় কমবেশি পাঁচ-ছয় বছরের মাথায়। ততদিনে নির্দিষ্ট কনস্যুমারবর্গ হিসেবে উচ্চমধ্যবিত্ত ‘ইয়্যুথ’ ‘টার্গেটকৃত’ হয় ডি-জুইস সিরিজের আওতায়। এখানে প্রসঙ্গ এরকম অভিমান প্রকাশের নয় যে গ্রামীণ কাদের কাছে মোবাইল ফোন বিক্রি করতে চায়। বরং এখানে স্মরণ রাখার দরকার আছে গ্রামীণ টেলেকমের আবির্ভাব-কাল থেকে এর উন্নয়ননিষ্ঠা বোঝাতে “‘দরিদ্র শ্রেণী’র প্রযুক্তিতে অধিকার” একটা শক্তিশালী দাবি ছিল; এবং এই দাবিটা একই সঙ্গে গ্রামীণের তরফে টেলেকম্যুনিকেশন বাণিজ্যে অংশগ্রহণের লজিকও বটে। ফলে বিজ্ঞাপনে ‘দরিদ্র’ মুখাবয়বের উপস্থিতি এবং তার প্রতিস্থাপন দুই-ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


    নোট: রচনাকাল: নভেম্বর ২০০৬। প্রকাশ: সমাজ নিরীক্ষণ ৯৮, ২০০৬। পুস্তকে সংযোজন ২০২১, জনসংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত, আদর্শ প্রকাশনী। পুস্তকের নোটে ছিল “বাংলাদেশে এই মুহূর্তের রাষ্ট্র কর্ণধারদের সঙ্গে অধ্যাপক ইউনূসের সম্পর্ক বিবেচনা করলে রচনাটির পুনর্প্রকাশ অস্বস্তিকর, এমনকি আমার জন্যও। তবে আমি পাঠককে পরিপ্রেক্ষিতে রেখে পাঠ করতে সুপারিশ করব।” আমাদের (রাজনৈতিক) জীবন মধুর সহ পরিহাসে ভরা। অন্যথা ওই নোটটির আবার এই অরাজ প্রকাশে দরকার হতো না। – লেখক