Blog

  • পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

    পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

    • অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

    সম্পাদকের নোট: রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদী পিতর ক্রপোৎকিনের এই লেখাটি লা রিভোল্ট পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮০ সালে, ফরাসি ভাষায়। প্যারি কমিউনের প্রায় ১০ বছর পর। ১৮৯৫ সালে লেখাটির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ফ্রিডম প্যামফ্লেটে। অনুবাদটি সেই ইংরেজি সংস্করণ অবলম্বনে করা হয়েছে। মূল লেখাটি পাবেন এখানে। 

    পিতর ক্রপোৎকিন (১৮৪২-১৯২১)

    ১. সাম্যবাদী বিবর্তনে কমিউনের স্থান

    ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ। প্যারিসের জনসাধারণ বিদ্রোহ করে ঘৃণিত ও নিন্দিত সরকারের বিরুদ্ধে। শহরটিকে ঘোষণা দেয় মুক্ত ও নিজেদের বলে।

    বিপ্লবের সময় সাধারণত যেসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেগুলো ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে। এজন্য কোনো বন্দুকের গুলির প্রয়োজন হয়নি, ব্যারিকেডের সামনে রক্ত ঝরাতে হয়নি। মানুষ যখন নিজেদের সশস্ত্র করে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, তখন [ভয়েই] শাসকরা পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের সৈন্য-সামন্তরা শহর ছেড়েছিল, বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মানুষজন হাতের কাছে যা কিছু পেয়েছে, তাই নিয়েই রওনা দিয়েছে ভার্সাইয়ের দিকে। সরকার ঠিক যেন উবে গিয়েছিল, যেভাবে গ্রীষ্মে বাষ্প হয়ে উবে যায় পুকুরের পানি। ১৯ মে, প্যারিস শহর নিজেকে আবিস্কার করে সেসব অপবিত্রতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত অবস্থায়, যেগুলো দিনের পর দিন তাকে কলুষিত করেছে। আর এজন্য তার সন্তানদের এক ফোঁটা রক্তও ঝরাতে হয়নি।

    এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বিপ্লবের দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। যেখানে মানুষ দাসত্বের শেকল ভেঙে হাঁটতে শুরু করেছিল মুক্তির পথে। “প্যারিস কমিউন”-এর নামে জন্ম হয়েছিল নতুন একটি ভাবনার। যেটি ভবিষ্যতের আরো অনেক বিপ্লবের জন্য কাজ করছে সূচনাবিন্দু হিসেবে। 

    সব সময়ের মতো, এই ভাবনাটিও কোনো একক ব্যক্তির মাথা থেকে বা কোনো দার্শনিকের চিন্তা থেকে আসেনি; এটির জন্ম হয়েছিল একটি সম্মিলিত চেতনা থেকে, পুরো কমিউনিটির হৃদয় ও মস্তিস্ক থেকে। প্রথম দিকে অনেক কিছুই অবশ্য অস্পষ্ট ছিল। বিপ্লব-বিদ্রোহে অংশ নেওয়া অনেকেই হয়তো তাদের জীবনও দিয়েছেন, কিন্তু ঘটনাবলীর তাৎপর্য বুঝতে উঠতে পারেননি; যেভাবে এখন আমরা বুঝছি। তাদের অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেননি যে, কী ধরনের নতুন নীতি-নৈতিকতা তারা সামনে আনার চেষ্টা করছেন। সত্যিই বিষয়গুলো বাস্তবে চর্চা শুরুর পর তারা ধীরে ধীরে এগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। নতুন সেসব নীতি যখন সতর্কতার সাথে ও পর্যাপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে শুরু করা হয়, তখন এগুলো আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে থাকে। এগুলোকে তাদের পূর্ণ সৌন্দর্য্য ও স্বচ্ছতায় দেখতে পাওয়া যায়। বুঝতে পারা যায় এর ন্যায়-নীতি ও তার ফলাফলের গুরুত্ব। 

    কমিউনের আগের পাঁচ-ছয় বছরে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পেয়েছিল ইন্টারন্যাশন্যাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তৃতিতে। স্থানীয় শাখা পর্যায়ের বৈঠক ও সাধারণ সম্মেলনগুলোতে ইউরোপের শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং নানাবিধ সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ করতেন। এমনটা তারা আগে কখনো করেননি। তাদের মধ্যে যারা সামাজিক বিপ্লবকে প্রায় আসন্ন মনে করতেন এবং সেই পাটাতন তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তারা সব কিছুর ওপরে একটি বিষয়ে সমাধানের ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। “শিল্পকারখানার বর্তমান এই অগ্রগতি, আমাদের সমাজকে একটি মহান অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করবে; এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত হবে; আগের প্রজন্মগুলোর মাধ্যমে যেসব পুঁজি সঞ্চিত হয়েছে, তাতে সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে; কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এসব পরিবর্তন আনার জন্য কোন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন/জোট সবচে যথার্থ হবে?” 

    ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের উত্তর ছিল, “এই জোট কোনোভাবেই ক্ষুদ্র জাতীয়তার মধ্যে বন্দী থাকা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কৃত্রিম সব সীমান্ত ও সীমারেখার বাধা পেরিয়ে যেতে হবে।” দ্রুতই এই মহান ধারণাটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তাদের মস্তিস্কে স্থায়ী বসতি গড়ে। যদিও তারপর থেকে পৃথিবীর সব প্রজাতির প্রতিক্রিয়াশীলদের যৌথ উদ্যোগ এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টায় নিয়োজিত আছে, কিন্তু তবুও এটিকে মেরে ফেলা যায় নি। এটি জীবিত আছে, এবং যখনই বিদ্রোহ-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর সামনে থাকা বাধাগুলো সরে যায়, তখনই আবার এটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে সামনে আসে। 

    কিন্তু এই ধরনের বিস্তৃত একটি অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠার উপাদানগুলো কী ধরনের হবে, তা এখনো খুঁজে দেখা বাকি। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    এখন পর্যন্ত, দুইভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। দুই ধরনের উত্তর থেকে তৈরি হয়েছে দুটি আলাদা চিন্তাধারা। যার একদিকে আছে জনপ্রিয় রাষ্ট্র; এবং অন্যদিকে নৈরাজ্য।

    জার্মান সমাজতন্ত্রীরা বলেছেন যে, রাষ্ট্রই এসব পুঞ্জিভূত সম্পদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং সেগুলো শ্রমিকদের অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে বিতরণ করবে। এছাড়াও রাষ্ট্রই উৎপাদন ও বিনিময়ের ব্যবস্থাগুলো পরিচালনা করবে, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখবে। 

    এর জবাবে, অনেক বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, ল্যাটিন জাতির সমাজতন্ত্রীরা বললেন, সত্যিই যদি এমন কোনো রাষ্ট্র কখনো থেকে থাকে, তাহলে তা হবে একটি অলৌকিক ঘটনা। আর সত্যিই যদি এমন কিছু দেখা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা হবে সবচে বাজে ধরনের স্বৈরশাসন। এই সমাজতন্ত্রীরা বলেছিলেন: সর্বক্ষমতাময় ও কল্যানমূলক একটি রাষ্ট্রের ধারণা শুধুই অতীত থেকে ধার করে আনা হচ্ছে। এবং এটি মোকাবিলার জন্য তারা সামনে এনেছেন একটি নতুন আদর্শ: নৈরাজ্য। যেখানে রাষ্ট্রের পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে হবে এবং সহজ-সাধারণ থেকে শুরু করে জটিল; সব ধরনের সামাজিক সংগঠনই গড়ে তুলতে হবে উৎপাদক ও ভোক্তার জনপ্রিয় সব গ্রুপগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে।

    দ্রুতই এটি মেনে নেওয়া হয় যে, জনপ্রিয় রাষ্ট্রের বদলে নৈরাজ্যের মাধ্যমেই সমাজকে আরো ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব। এমনকি উদার মানসিকতার রাষ্ট্রপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও এটি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কথা হলো: নৈরাজ্যবাদী আদর্শ এতোই ‍দূরের ব্যাপার যে আমরা এখনই এ নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। 

    একই সঙ্গে, এটিও সত্য যে, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বগুলোর কিছু মাত্রায় স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। এমন কিছু সূত্রের প্রয়োজন ছিল যা একই সঙ্গে সহজ-সাধারণ এবং বাস্তবসম্মত। কোন সময় থেকে এটি পুরোনো সমাজের সঙ্গ ছেড়ে নতুন পথে যাত্রা করবে, এবং কিভাবে মানুষের সত্যিকারের ঝোঁক-প্রবণতাগুলো থেকে এটি সমর্থন পাবে; ইত্যাদি বিষয় আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। জাতি-সীমানা নির্বিশেষে শ্রমিক ইউনিয়ন ও ভোক্তাদের গ্রুপগুলোর ফেডারেশন, যেটি কিনা স্বাধীনভাবে কাজ করবে– ধারণাটিকে খুব অস্পষ্ট বলে মনে হয়েছিল। এবং, তারচেয়েও বড় কথা, খুব সহজেই দেখা যাচ্ছিল যে, এটি মানুষের অসীম চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি মেটাতে পারবে না। ফলে একটি স্পষ্ট ও পরিস্কার সূত্র প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, যা থেকে বিষয়গুলো সহজেই বোঝা যাবে। এবং যেটি সত্যিকারের জীবন-বাস্তবতার ভিত্তিতে শক্তভাবে গড়ে উঠবে।

    একটি তত্ত্বকে কোন উপায়ে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়- প্রশ্নটি যদি শুধু এটিই হতো, তাহলে আমরা হয়তো বলতাম, শুধু তত্ত্বের কোনো বিশেষ গুরুত্ব নেই। কিন্তু নতুন কোনো ধ্যানধারণার যদি একটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না থাকে; সেটি যদি স্বাভাবিক সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে থেকে গড়ে না ওঠে, তাহলে সেটি কখনোই মানুষের মস্তিস্কে জায়গা করে নিতে পারে না। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে না একটি প্রাণপন লড়াইয়ে যোগ দিতে। সামনে কোনো ইতিবাচক ও স্পষ্ট চিন্তা না থাকলে মানুষ নিজেকে অজানা-অচেনা পরিস্থিতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে না। পরিবর্তনের শুরুর জায়গাটিতে পৌঁছানোর পর এটি কাজ করে একটি স্প্রিংবোটের মতো।  

    শুরুর জায়গাটির ক্ষেত্রে বলতে হয়, বাস্তব জীবনের নানা ঘটনাবলী-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এটিকে এই অবস্থায় আসতে হবে। 

    পুরো পাঁচ মাস প্যারিসকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল জার্মান অবরোধকারীরা। এই পাঁচ মাসে প্যারিসকে নিজেই নিজের গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্সগুলো সরবরাহ করতে হয়েছে। এবং সে জেনেছে কী বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শক্তি তার আছে। সে তার নিজের নতুন নতুন সব উদ্যোগের দিকে এক নজর তাকিয়েই সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করেছে। একই সময়ে, সে এটিও দেখছিল যে, ক্ষমতা দখল করা নির্বোধ মানুষদের কোনো ধারণা নেই কিভাবে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় বা এর অভ্যন্তরীন বিষয়াবলী পরিচালনা করা যায়। সে দেখছিল যে, শহরের প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায় বা দ্বিধা-সংশয় তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার। এবং শেষপর্যন্ত, সে বুঝতে পেরেছিল যে, বড় কোনো বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার জন্য বা দ্রুত বিবর্তনের পথ নির্বিঘ্ন করার জন্য যে কোনো ধরনের সরকারকে অবশ্যই নিস্ক্রিয় করে রাখতে হবে। প্যারিসের সেই অবরোধের মধ্যে, তার রক্ষাকারী, তার শ্রমিকরাই সবচে দুর্দশার মধ্যে পড়েছিল। অন্যদিকে, তার নিস্ক্রিয় নাগরিকরা উপভোগ করছিল উদ্ধত আভিজাত্য। এবং প্যারিস দেখেছে: কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে এসব কেলেঙ্কারির অবসান টানা যায় নি। প্রতিটা সময়, যখনই প্যারিসের সাধারণ মানুষ নতুন কোনো মুক্ত আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেছে, তখনই সরকার সেগুলোর ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণার জন্ম নেয় যে, প্যারিসকে অবশ্যই একটি স্বাধীন কমিউন হতে হবে। এবং এর দেয়ালের মধ্যে থাকা নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে হবে। 

    ১৮৭১ সালের কমিউন একটি প্রথম পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই না। এটি শুরু হয়েছিল একটি যুদ্ধের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী জনতার এই বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিল। এসব পরিস্থিতির মুখে তারা নিঃসংশয়ভাবে অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথে হাঁটতে পারেনি; এটি নিজেকে সাম্যবাদী বলেও দৃঢ় ঘোষণা দিতে পারেনি; পুঁজি বিলুপ্ত বা শ্রম সংগঠনের দিকেও এটি যেতে পারেনি; এটি এমনকি শহরের সাধারণ সব মালসামানকেও বিবেচনায় নেয়নি। 

    রাষ্ট্র, বা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অতীত ঐতিহ্যও এটি ছিন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতা ও কমিউনগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের ঘোষণা না দিয়েই কমিউন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরের সহজ থেকে জটিল- সব ধরনের সংগঠনের ক্ষেত্রেই তারা এই নীতির প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। 

    তারপরও, এটি নিশ্চিত যে, প্যারিস কমিউন আর কয়েক মাস স্থায়ী হলে, এটি নিশ্চিতভাবে এসব অন্যান্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দিকেও ধাবিত হতো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সীমিত রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে চার বছর (১৭৮৯-১৭৯৩) নানাবিধ বিপ্লবী তৎপরতার মধ্যে পার করেছিল ফরাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তাহলে, প্যারিসের মানুষজন যে এতো অল্প সময়ের মধ্যে বিধ্বংসী সরকারের ধারণা থেকে নৈরাজ্যবাদী কমিউনের ধারনায় আসতে পারবে না; তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? আবার আমরা এটিও মাথায় রাখতে চাই যে, পরবর্তী বিপ্লবে (অন্তত ফ্রান্স ও স্পেনে যেটি কমিউনাল ধরনের হওয়ার কথা) মানুষ এই প্যারিস কমিউনের অসমাপ্ত কাজ আবার নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। ভার্সেই সৈন্যদের নির্বিচার হত্যার মুখে যে কাজটি বাধাগ্রস্থ হয়েছিল। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    কমিউনের পতন হয়েছিল। আর আমরা খুব ভালো করেই জানি, শাসকদের ভীত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিভাবে প্রতিশোধ নিয়েছিল প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের আধুনিক সমাজে সত্যিই মাত্র দুইটি শ্রেণী আছে। একদিকে, সেসব মানুষেরা, যারা উৎপাদন করে ও সেই উৎপাদনের অর্ধেকই তুলে দেয় সম্পদের একচেটিয়া মালিকদের হাতে। এবং তারপরও হালকাভাবে এড়িয়ে যায় শাসকদের করা অন্যায়গুলো। অন্যদিকে আছে নিস্ক্রিয় পরজীবীরা। সব কিছু নষ্টকারী এই মানুষগুলো তাদের দাসদের ঘৃণা করে; খেলার মতো করে তাদের হত্যা করতে প্রস্তুত থাকে, নিজের সম্পদ-সম্পত্তির দখল হুমকির মুখে দেখলে সে চূড়ান্ত বর্বর আচরণও করতে পারে। 

    প্যারিসের মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলার পর এবং বেরোনোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর, ভার্সেই সরকার তাদের ওপর সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেয়। মদ ও সেনাজীবনের বর্বরতায় প্ররোচিত হওয়া সৈন্যদের বলা হয়েছিল “নেকড়ে ও তার শাবকদের” মতো কাজ করে দেখাতে। প্যারিসের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল: 

    তুমি যে-ই হও, তোমার মৃত্যু অবধারিত! যদি তুমি হাতে অস্ত্র তুলে নাও, মৃত্যু! যদি সেগুলোর ব্যবহার করো, মৃত্যু! যদি ক্ষমা ভিক্ষা করো, মৃত্যু! যেদিকেই যাও, ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পিছে, উপরে, নিচে; মৃত্যু! তোমরা শুধু আইনেরই বাইরে নয়, মানবতারই বাইরে। বয়স বা লিঙ্গ; কোনো কিছুই তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। তোমরা মরবে। তবে তার আগে দেখবে তোমাদের স্ত্রী, বোন, মা, ছেলে-মেয়ে, এমনকি দোলনায় থাকা শিশুদেরও আর্তচিৎকার! তোমার চোখের সামনে আহত মানুষকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে তার বুকে বেয়োনেট চালিয়ে দেওয়া হবে বা রাইফেলের বাঁট দিয়ে মাথায় মারা হবে। জীবন্ত অবস্থাতেই তার ভাঙা পা বা রক্ত ঝরতে থাকা হাত ছিঁড়ে ফেলা হবে, ছুঁড়ে ফেলা হবে নর্দমায়। মৃত্যু! মৃত্যু! মৃত্যু!১

    এই উন্মক্ত-বর্বর আহ্বানের পর, প্যারিসে রাস্তায় জমে লাশের সারি। এবং এই নিধনযজ্ঞ চালানোর পর আসে পেটি প্রতিশোধ। জেলারদের চাবুক-লাঠির ঘা, অপমান, অনাহার ইত্যাদি যত ধরনের নিষ্ঠুরতা আছে; সব কিছু দিয়ে নেওয়া হতে থাকে প্রতিশোধ। মানুষ কী এসব ভুলে যেতে পারে? 

    প্যারিস কমিউনকে উচ্ছেদ করা গেছে, কিন্তু পরাজিত করা যায়নি। আমাদের সময়ে কমিউন আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছে। এটি শুধু একটি লুপ্ত হয়ে যাওয়া স্বপ্ন নয়, শুধুই একটি সুন্দর আশা-আলেয়ার কল্পনা নয়। না! আজকের “কমিউন” হয়ে উঠছে আরো দৃশ্যমান। বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আমাদের পায়ের নিচে গর্জে উঠছে। সাধারণ মানুষের এই স্রোতধারার গভীরে যাওয়া এবং তাদেরকে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করাই এখন কাজ। আমরা বর্তমান এই প্রজন্মের ওপরই ভরসা রাখছি যে, তারা কমিউনের মধ্যে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে; মধ্যবিত্তের শোষণ-শাসনের এই হীন ব্যবস্থাটির অবসান ঘটাবে; রাষ্ট্রের রক্ষায় নিযুক্ত থাকা মানুষদের থেকে মুক্তি দেবে; এবং মনুষ্যজাতির বিবর্তনে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    ২. কিভাবে প্যারি কমিউন নিজের সত্যিকারের লক্ষ্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তবে তারপরও সেই লক্ষ্যটি তুলে ধরেছিল বিশ্বের সামনে

    ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উচ্ছেদ করেছিল প্যারিসের মানুষ। সেই ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনো সভ্য সমাজের নিপীড়িত জনতা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয় ১৮৭১ সালের সেই আন্দোলনের দিকে। কেন প্যারিস কমিউনের ধারনাটি বিশ্বের প্রতিটি জায়গার, প্রতিটি জাতির শ্রমিকের কাছে এতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে? 

    উত্তরটা সহজ। ১৮৭১ সালের বিপ্লব, সব কিছুর ওপরে ছিল খুবই জনপ্রিয় একটি তৎপরতা। সাধারণ মানুষ নিজেরাই এটি তৈরি করেছিল। জনসমুদ্রের ভেতর থেকে এটি গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এবং এই মহান জনসমুদ্রের ভেতর থেকেই প্যারিস কমিউন খুঁজে পেয়েছিল তার রক্ষক, নায়ক ও শহীদদের। এটি এতোটাই “নিচু” শ্রেণীর মানুষদের বিষয় ছিল যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী কখনোই এটিকে ক্ষমা করতে পারে না। এবং একই সময়ে, এটি পরিচালিত হচ্ছিল একটি সামাজিক বিপ্লবের ধারণা নিয়ে। সেটি নিশ্চিতভাবেই অনেক অস্পষ্ট ছিল। হয়তো অবচেতনে ছিল। কিন্তু, তারপরও এটি সব মানুষের জন্য সত্যিকারের মুক্তি, সত্যিকারের সাম্য অর্জনের কথা বলেছিল। এটি ছিল এমন এক বিপ্লব, যেখানে সমাজের নিচের স্তরের মানুষেরা তাদের অধিকার আদায়ের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। 

    বিপ্লবের এই অর্থ ও তাৎপর্য বদলে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে এটিকে দেখানো হয় শুধুই প্যারিসের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয় হিসেবে। যেন এটি ফ্রান্সের মধ্যেই আরেকটি ছোট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কিন্তু এর চেয়ে অসত্য আর কিছুই হতে পারে না। প্যারিস কখনোই পুরো ফ্রান্স থেকে নিজেকে আলাদা করতে চায়নি। অস্ত্রের জোরে এটি দখলও করতে চায়নি; প্যারিস নিজেকে নিজের দেয়ালের মধ্যে বন্দীও করে ফেলতে চায়নি, যেমনটি একজন নান করেন নিজেকে কনভেন্টের মধ্যে বন্দী করে ফেলার মাধ্যমে; প্যারিস নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেনি দেয়ালঘেরা সুন্দর এলাকা তৈরির মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। প্যারিস যদি নিজের স্বাধীনতা দাবি করে থাকে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তক্ষেপ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সে এটি করেছে কারণ এই ধরনের স্বাধীনতার মধ্যেই প্যারিস দেখেছিল ভবিষ্যতের নানাবিধ সংগঠনের ভীত এবং এগুলো ঘিরে সে পরিচালনার চেষ্টা করেছিল একটি সামাজিক বিপ্লব। যে বিপ্লবটি হয়তো পুরোপুরি বদলে দিত উৎপাদন ও বণ্টনের পুরো ব্যবস্থাটিকে। সেটিকে প্রতিষ্ঠা করত ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে। যেগুলো পুরোপুরি বদলে দিত নানাবিধ মনুষ্য সম্পর্ককেও। তাদের চালিত করত সাম্যের পথে। যেটি শেষপর্যন্ত তৈরি করত নতুন ধরনের সামাজিক নীতি-নৈতিকতা। যার ভিত্তি হতো সাম্য ও সংহতি। প্যারিসের মানুষের জন্য তখন কমিউনের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল একটি উপায় মাত্র। তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছিল: সামাজিক বিপ্লব। 

    এই লক্ষ্য হয়তো অর্জন করাও সম্ভব হতো যদি ১৮ মার্চের সেই বিপ্লবকে তার স্বাভাবিক পথে পরিচালিত হতে দেওয়া হতো। যদি ভার্সেইয়ের আততায়ীরা প্যারিসের মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে না ফেলত। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কী করতে চাওয়া হচ্ছে, তা কিভাবে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে, সহজ কথায় ব্যাখ্যা করা যায়, যা পুরো বিশ্বের মানুষের জন্যেই বোধগম্য হবে- তা ছিল বিপ্লবের শুরুর সময় থেকে প্যারিসের মানুষের একটি অন্যতম প্রধান ভাবনা। কিন্তু এ ধরনের মহান কোনো ধারণা একদিনে তৈরি হয়ে যায় না। বিপ্লবের সময় সেগুলো যত দ্রুতই ছড়ানো বা ব্যাখ্যা-বিস্তার করা হোক না কেন। সব সময়ই এগুলো গড়ে উঠতে, জনসাধারণের মধ্যে সেসব ধ্যানধারণা ছড়াতে ও সেগুলোর ভিত্তিতে কর্মতৎপরতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এবং এই জায়গাতেই প্যারিস কমিউন ব্যর্থ হয়েছিল। এটির ব্যর্থতার একটি অন্যতম কারণ, যেমনটি আমরা আগে দেখেছি: ১০ বছর আগে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পার করছিল একটি রূপান্তরের পর্যায়। ১৮৪৮ সালের কর্তৃত্বপরায়ন, আধা-ধর্মীয় সমাজতন্ত্র; আমাদের সময়ের বাস্তববাদী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের কাছে আর আবেদন জাগাতে পারছে না। মজুরি ব্যবস্থা ও যৌথ সম্পত্তিকে এক জোয়ালে জুড়ে দিতে চাওয়া কালেক্টিভিজম ছিল দুর্বোধ্য, অনাকর্ষণীয়, এবং এটি বাস্তব প্রয়োগের পথে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। মুক্ত সমাজতন্ত্র বা নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের ধ্যানধারণা তখন কেবল শ্রমিকদের মাথায় আসতে শুরু করেছে। এবং তারা তখনও এমন সব কর্মকাণ্ড শুরু করেনি, যা থেকে সরকার-পূজারীরা তাদের আক্রমণ করা শুরু করবে। তখনও মানুষ কোনো স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপকল্প না থাকায়, সমাজতন্ত্রীরা নিজেরাও ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদের দিকে হাত দিতে পারেনি। তারাও এমন সব যুক্তি দিয়ে নিজেদের বিভ্রান্ত করেছেন যা অনেক বছর ধরে হয়ে আসছে। তা হলো: “আমাদের প্রথমে বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তারপর আমরা দেখব কী করা যায়।”

    বিজয় নিশ্চিত করা! যেন ব্যক্তি মালিকানার ওপর হাত না দিয়ে মুক্ত কমিউন গঠনের অন্য কোনো উপায় আছে! বিপ্লবের বিজয়ে সাধারণ জনগণ সরাসরি আগ্রহী না হলে, অংশগ্রহণ না করলে শত্রুদের পরাজিত করার অন্য কোনো রাস্তা নেই। এবং এটি তারা করবে না যদি তারা সেখানে সবার বস্তুগত, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ দেখতে না পায়। 

    সরকারের প্রশ্নে, নীতি-নির্ধারনের প্রসঙ্গেও একই জিনিস দেখা যায়। মুক্ত কমিউনের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে, প্যারিসের মানুষ একটি মৌলিক নৈরাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেছিল। তা হলো: রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।  

    যদি আমরা মেনে নিই যে, কমিউনগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন নেই; তাহলে আমরা কেন মানব যে, প্রতিটি কমিউনের ভেতরে সবার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এমন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন আছে? আমরা আগামী দিনের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডকে যদি এমনভাবে কল্পনা করি, যেখানে বেশ কয়েকটি শহরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে মুক্তভাবে কোনো উদ্যোগ নেবে তাদের নিজ নিজ কমিউনিটির জন্য। তাহলে কেন আমরা একটি কমিউনের ক্ষেত্রেও কল্পনা করছি না যে, এখানেও এই একই ধরনের মুক্ত উদ্যোগের মাধ্যমেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে? কমিউনের বাইরে যদি কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা না থাকে, তাহলে কমিউনের ভেতরেও তা থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। 

    প্যারিসের মানুষ আগেও অনেক সরকারকে উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু ১৮৭১ সালে, তারা এই সরকারতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করার প্রথম নজির দেখিয়েছিল। শেষপর্যন্ত অবশ্য তারা সরকারের অলৌকিক ক্ষমতার পূজায় ভেসে যায় এবং নিজেদেরও একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে বসে। তার পরিণাম কী হয়েছিল- সেই সাক্ষ্য ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। প্যারিস, তার সবচে নিবেদিতপ্রাণ সন্তানদের এই সরকার পরিচালনার জন্য পাঠিয়েছিল টাউন হলে। সেখানে, তারা ডুবে গিয়েছিল গাদা গাদা পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে। সহজাত বোধ-বুদ্ধি, তাদেরকে মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করতে বললেও, তারা বাধ্য হয়েছিল শাসন করতে। তারা আলোচনা করতে বাধ্য হয়েছিল যে, কখন কী পদক্ষেপ নিতে হবে; কখন সমঝোতা করতে হবে, যেখানে কোনো ধরনের সমঝোতাই ভালো কোনো নীতি হতে পারে না। এবং শেষপর্যন্ত, সব সময় জনসাধারণের মধ্যে থাকলে যে ধরনের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, সেগুলো তারা হারিয়ে ফেলছিল। এভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের করে তুলেছিল অক্ষম। জনমানুষের কাছ থেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সরকার পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। এবং বিপ্লবী শক্তির কেন্দ্র হওয়ায়, এটি জনপ্রিয় সব মুক্ত উদ্যোগকেও করে তুলছিল পক্ষাঘাতগ্রস্থ। ফলে, এসব কারণে প্রুশিয়ার বন্দুকের নিচ থেকে জন্ম নেওয়া, প্যারিস কমিউনের পতন নিশ্চিত ছিল। তবে, খুবই জনপ্রিয় রূপ ধারণ করায় এটি আরো অনেক বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করেছে। চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটি ছিল সামাজিক বিপ্লবের অগ্রদূত। প্যারিস কমিউনের শিক্ষা অবশ্য পাওয়া গেছে। এবং ফ্রান্স আবার যখন এ ধরনের বিদ্রোহী সব কমিউন দিয়ে গর্জে উঠবে, তখন মানুষ হয়তো আর সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে না, এবং আশা করবে না যে, সরকারই সব বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেবে। বরং, তারা যখন সত্যিই এসব পরজীবীদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করবে; সব সামাজিক সম্পত্তির দখল নেবে এবং সেগুলো নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের নীতিতে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সরকার, ও রাষ্ট্র থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলার পর, মানুষ নিজেদের মতো করে মুক্তভাবে সমাজ গঠন করবে, জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে। বিগত দিনের শৃঙ্খল ছিন্ন করে, মূর্তি-বিগ্রহ গুঁড়িয়ে দিয়ে, মানুষ যাত্রা করবে সুন্দর এক ভবিষ্যতের পথে। তারা জানবে যে, সেখানে কেউ কারো প্রভু বা দাস হবে না। সেখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে সেসব মহান শহীদদের, যারা মুক্তির পথে প্রথম পা বাড়িয়ে তাদের রক্ত ঝরিয়েছেন। এবং আমাদের উদ্বুদ্ধ ও আলোকিত করেছেন স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরুর জন্য। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    ৩. আধুনিক সমাজতন্ত্রে প্যারি কমিউনের শিক্ষা

    সোশ্যালিস্ট কিছু গ্রুপ আছে, এমন প্রায় প্রতিটি শহরে ১৮ মার্চ, প্যারি কমিউনের স্মরণে সমবেত হয়েছিল সাধারণ মানুষ। ১৮ মার্চের এই সমাবেশগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শুধু এ কারণে না যে, এগুলো থেকে শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায়। বরং এজন্য যে, এগুলো দুই ধারার সমাজতন্ত্রীদেরই মনোভাব প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে। যে কোনো ধরনের ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে “ভোট নেওয়ার” চেয়ে এই সমাবেশগুলো অনেক ভালো সুযোগ নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো উপস্থাপন করার। এখানে নির্বাচন-কেন্দ্রিক পার্টি কৌশলের কোনো প্রভাব থাকে না। শ্রমিকরা শুধু প্যারিসের প্রলেতারিয়েতদের সাহসীকতাকে প্রশংসা করা বা মে গণহত্যার প্রতিশোধ চাওয়ার জন্যই সমবেত হয়নি। হ্যাঁ, প্যারিসের সেই সাহসী সংগ্রামের স্মৃতি অবশ্যই তাদের উজ্জীবিত করে। কিন্তু তারা শুধু এটুকুতেই আটকে না থেকে, আরো অনেক আলাপ তুলেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে যে, ১৮৭১ সালের কমিউন থেকে আমরা আগামী দিনের বিপ্লব সম্পর্কে কী শিক্ষা পেতে পারি। তারা জানতে চেয়েছে: কমিউনের ভুলভ্রান্তিগুলো কী ছিল। তারা শুধু এর জন্য দায়ী মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের সমালোচনা করতে চায়নি। বরং খুবই স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে যে, কিভাবে সম্পত্তি ও কর্তৃত্ব নিয়ে বাঁধাধরা সব ধারণা তাদের পিছু টেনে ধরেছে। বিপ্লবী চিন্তাধারার বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করেছে, এবং পরিণামে এটি বিশ্বের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেনি।  

    ১৮৭১ সালের এসব শিক্ষা পুরো বিশ্বের শ্রমিকদের কাজে লেগেছে। তারা পুরোনো সব ধ্যানধারণা ও চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলেছে। সহজ ও স্পষ্টভাবে বোঝাপড়া তৈরি করেছে যে, তাদের আগামী বিপ্লবটা কেমন হতে যাচ্ছে। 

    আগামী দিনে কমিউনের উত্থান শুধুই একটি “কমিউনাল” আন্দোলন হবে না। যারা এখনো মনে করেন যে বিপ্লবের শুরুতেই স্বাধীন, স্থানীয় স্বশাসিত সংগঠন/সংস্থা গড়ে তুলতে হবে, তারা শুধু নিজেদের এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার ঘটিয়েই থেমে যাবেন না। জনপ্রিয় চেতনাকে ধারন করে আরো অনেক কিছুর বিকাশ ঘটাবেন। অন্তত ফ্রান্সে এমনটিই দেখা যাবে। আগামী বিপ্লবের কমিউনগুলো তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠা করবে সরাসরি সব সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তারা বিলুপ্ত করবেন ব্যক্তিগত মালিকানা। যখন এমন বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করবে, এবং জনতার বিপ্লবী স্রোতে সরকার ভেসে যাবে; রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর নির্ভর করা মধ্যবিত্ত শ্রেণী যখন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে; তখন এই বিপ্লবী জনতা নতুন কোনো সরকারি ডিক্রি জারির অপেক্ষা করবে না। যেটি কিনা তার দুর্দান্ত জ্ঞান দিয়ে অল্প কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আসবে মাত্র!

    তারা এমন কোনো ডিক্রির জন্য অপেক্ষা করবে না যেটির পর সামাজিক পুঁজির দখল রাখা মানুষদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে। আসলে এমন একটি ডিক্রি কার্যত অকার্যকরই থাকবে যদি শ্রমিক-জনতা নিজে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়। বিপ্লবের পর তাই কোনো দেরি না করে, সাধারণ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় সব সম্পদের দখল নেবেন এবং সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। তারা কলকারখানায় নিজেদের এমনভাবে সংগঠিত করবেন যেন সব কর্মকাণ্ড চালু থাকে। কিন্তু এখন থেকে তারা উৎপাদন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন সাধারণ মানুষের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী। তারা নিজেদের বস্তি-কলোনি ছেড়ে বিত্তবানদের মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন; শহরে জমা হয়ে থাকা সম্পদ কিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেভাবে নিজেদের সংগঠিত করবেন। তারা এই সঞ্চিত সম্পদকে নিজেদের বলেই বিবেচনা করবেন এবং দাবি করবেন যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এগুলো তাদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। 

    যে শিল্পকারখানার মালিকরা এতোদিন শ্রমিকদের ব্ল্যাকমেইল করে ফায়দা লুটেছে, সেই মালিকদের উচ্ছেদ করা মাত্র আবার উৎপাদন শুরু হবে। সেসব বাধা-নিষেধাজ্ঞা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, যেগুলো উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। সেই ধরনের সব সংশয়-সন্দেহের অবসান ঘটাতে হবে, যেগুলো উৎপাদন থামিয়ে দিতে পারে বা এটিকে বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটির রূপান্তর ঘটাতে হবে বিপ্লবী পরিস্থিতি-তৎপরতার আকাঙ্ক্ষা অনুসারে, এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে। “ফ্রান্সের মানুষ কখনোই এতোটা উৎসাহ নিয়ে কাজ করেনি, যতটা করেছিল ১৭৯৩ সালে, অভিজাতদের হাত থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে সেটিতে কাজ করার সময়,” বলেছেন ইতিহাসবিদ মিশলে২। মানুষ তখনও এমন উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে, যেদিন থেকে শ্রম মুক্ত হয়ে যাবে এবং শ্রমিকের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পুরো সমাজের কল্যানের স্বার্থে কাজ করবে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পদের মধ্যে পার্থক্য টানার একটি চেষ্টা পরবর্তীতে হয়েছে। এবং সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলো এই প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে আছে। বর্তমানের কালেক্টিভিস্ট স্কুল, পুরোনো আন্তর্জাতিকের কালেক্টিভিজমকে (যেটি নিছকই একটি কর্তৃত্ববিরোধী কমিউনিজমের ধারনা) প্রতিস্থাপন করেছে নতুন এক ধরনের কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব দিয়ে। যেখানে দুই ধরনের পুঁজির মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করা হয়েছে। এক দিকে থাকবে এমন পুঁজি যেটি উৎপাদন ও সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে কাজে লাগানো হবে। এগুলোর মধ্যে থাকবে যন্ত্রপাতি, কল-কারখানা, কাঁচামাল, যোগাযোগের উপায় ও ভূমি। এবং অন্য ধরনের পুঁজিতে থাকবে আবাসন, বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য, জামাকাপড়, ইত্যদি। প্রথম ধরনের পুঁজিতে থাকবে কালেক্টিভ মালিকানা। এবং দ্বিতীয় ধরনের পুঁজি থাকবে ব্যক্তিমালিকানায়। এভাবেই ভেবেছেন এই সমাজতান্ত্রিক স্কুলের অধ্যাপকরা!

    এরকম একটি পার্থক্য টানার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বোধশক্তি সেটি হতে দেয়নি। তাদের কাছে এটিকে মনে হয়েছে অবাস্তব এবং এটি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এটি তাত্ত্বিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। শ্রমিকরা বুঝতে পেরেছিল: যে বাড়িতে তারা থাকেন, যে কয়লা-গ্যাস জ্বালান, মানবশরীর চালাতে যে জ্বালানি খরচ হয়, জীবনধারনের জন্য যে জামাকাপড় প্রয়োজন হয়, যে বই আমরা পড়ি জানার জন্য, এমনকি যে আনন্দ-উৎসবের ব্যবস্থা থাকে; সব কিছুই আমাদের অস্তিত্বের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সব কিছুই কার্যকরীভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ও সামগ্রিকভাবে মনুষ্য সভ্যতার প্রগতিশীল বিকাশের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কলকারখানা, কাঁচামাল ও উৎপাদন সংক্রান্ত অন্যান্য উপাদান। শ্রমিকরা ক্রমেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন যে, যদি কিছু কিছু ধনসম্পদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার চল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি বৈষম্য, নিপীড়ন, শোষণ জারি রাখবে। কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব তাদের চিন্তার সামনে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, সেটিকে শ্রমিকরা পেরিয়ে যাচ্ছেন। তারা হাঁটছেন সবচে সহজ-সাধারণ এবং সবচে বাস্তবসম্মত কাঠামোর কর্তৃত্ববিরোধী সমাজতন্ত্রের দিকে। 

    এখনকার সমাবেশগুলোতে বিপ্লবী শ্রমিকরা খুব স্পষ্টভাবে বলছে সব ধরনের সামাজিক সম্পদের ওপর তাদের অধিকারের কথা, এবং ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্তির কথা। সেটি সব ক্ষেত্রেই: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে বিলাসী পণ্য পর্যন্ত। তারা বলছেন, “বিপ্লবের দিন, শহরে জমা হয়ে থাকা সব সম্পদ আমরা বাজেয়াপ্ত করব এবং সেগুলো সর্বসাধারণের ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজে লাগাব।” সমাবেশগুলোতে তাদের এই ঘোষণাকে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে সম্মিলিতভাবে হাততালি দিয়ে। বিপ্লবী এই শ্রমিকরা আরো বলছেন, “নতুন করে মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন শুরুর আগে সবাই যেন তার প্রয়োজনীয়তা অনুসারে পর্যাপ্ত রসদ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত পোশাক আছে সবাইকে দেওয়ার মতো। সেগুলো দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর বাইরে মানুষ দারিদ্রতার মধ্যে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি সেখানে এতো পোশাক আছে যে সবাই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী অভিজাত সব পোষাকও বেছে নিতে পারবে।”

    ফ্রান্স ও অন্যান্য আরো অনেক জায়গায় প্যারি কমিউনের স্মরণে যেসব সভা-সমাবেশগুলো হচ্ছে, এবং সেসব জায়গায় যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, তাতে করে এটি স্পষ্টই বোঝা যায়: শ্রমিকরা আগামী দিনের বিপ্লবের ব্যাপারে তাদের মনস্থির করে ফেলেছেন। তারা আগামী বিপ্লবে হাঁটবেন নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন পুনর্গঠনের দিকে। এই দুইটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত হয়েছেন এবং এই দিক থেকে চিন্তা করলে, আগামী দিনের বিপ্লবগুলোতে আর পূর্বসূরীদের সেই একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না। যে পূর্বসূরীরা ভবিষ্যত অগ্রগতির জন্য নিঃশঙ্ক চিত্তে রক্ত ঝরিয়েছেন। 

    ল্যঁ সিয়েজ দে প্যারি || জঁ লুই আরনেস্ত মিসোনিয়ে

    তবে, তৃতীয় আরেকটি বিষয় আছে, যা নিয়ে এখনো কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানো যায় নি। এটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেই ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর সময়টিও হয়তো খুব বেশি দূরে নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে সরকার গঠন নিয়ে। 

    খুব ভালোমতোই জানা আছে যে, সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলো এই প্রশ্নে দুটি অংশে পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে যায়। একপক্ষ থেকে বলা হয়, “বিপ্লবের দিনই, আমাদের এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে যা সব ক্ষমতার দখল নিয়ে নেবে। শক্তিশালী, ক্ষমতাবান, ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সরকার এরপর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এটা-সেটা ডিক্রি জারি করে এবং সবাইকে বাধ্য করবে সেসব নির্দেশ মানতে।”

    “কী করুণ ভ্রান্তি!” বলে আরেক পক্ষ, “যে কোনো ধরনের কেন্দ্রীয় সরকার যদি কোনো দেশের ওপর নিজের শাসন চালাতে আসে, তাহলে এটি অবশ্যই বিপ্লবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটি সব সময়ই গড়ে উঠবে এর অন্যতম প্রধান নির্যাস, সংরক্ষণবাদ এবং সবচে বিসদৃশ সব উপাদন দিয়ে। কমিউনগুলোতে গর্জে উঠতে থাকা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডগুলোর রাশ টেনে ধরা ছাড়া এটি আর কিছুই করবে না। ফলে পিছিয়ে পড়ে থাকা কমিউনগুলোকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার কাজটিও তারা করতে পারবে না। একই ঘটনা ঘটে বিক্ষুব্ধ, বিপ্লবী হয়ে ওঠা কোনো কমিউনের মধ্যেও। হয় কমিউনাল এই সরকার এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়া কিছু জিনিসের অনুমোদন দেবে, এবং তারপর এটি একটি অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক একটি যন্ত্র হয়ে থেকে যাবে; অথবা এটি বিপ্লবের নেতৃত্ব নিজের হাতে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখাবে এবং সেসব বিষয়ে নিয়মনীতি তৈরি করার চেষ্টা করবে যেগুলো তখনও শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারেনি। টিকে থাকার জন্য এগুলো করা ছাড়া তার আর কোনো পথ থাকে না। এটি তখন বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করবে, যেখানে পুরো সমাজ চেষ্টা করছে নতুন ধরনের সামাজিক জীবন গড়ে তুলতে। সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার পর মানুষের সামনে নতুন ও বিস্তৃত দিগন্ত খুলে যাবে এবং এগুলোর মধ্যে থেকে গড়ে ওঠা সম্মিলিত সৃজনশীল শক্তি দিয়েই সামাজিক কর্মকাণ্ডের নতুন সব সংগঠন তারা গড়ে তুলবে। ক্ষমতায় থাকা মানুষরা এই বিপ্লবী স্ফূরণকে শুধু বাধাগ্রস্থ করবে। সেসব কিছুই তারা করবে না, যেগুলো তারা করত; যদি তারা সাধারণ মানুষের ভেতরে থাকত। তা না করে তারা নিজেদের বন্দী করে ফেলেছে প্রশাসনিক সব দপ্তরের মধ্যে এবং নিজেদের ছুঁড়ে দিচ্ছে অলস সব তর্ক-বিতর্কের মধ্যে। ফলে বিপ্লবী সরকার সব সময়ই থাকবে একটি বিঘ্ন ও বিপদের প্রতীক হয়ে। ভালো অবস্থায় সেটি থাকবে ক্ষমতাহীন হয়ে, আর খারাপ অবস্থায় এটি হয়ে উঠবে দুর্দমনীয়। ফলে এরকম একটি জিনিস থাকার ফায়দা কী?”

    ন্যায্য ও স্বাভাবিক মনে হলেও, এই যুক্তিগুলোকে লড়তে হচ্ছে আগেকার অনেক গোঁড়া চিন্তাধারার বিরুদ্ধে। এবং এমন মানুষদের বিরুদ্ধে, যারা সরকারের পূজনীয় ভাব বজায় রাখার স্বার্থে কাজ করে। একই সাথে সম্পত্তি ও ধর্মের যৌক্তিকতা ও বিশ্বাস তুলে ধরা ভাবধারার সঙ্গেও তাদের লড়তে হচ্ছে। 

    তিনটি গোঁড়া পূর্ব সংস্কারের মধ্যে এই শেষটিই এখনো টিকে আছে এবং এটি আগামী বিপ্লবগুলোতে একটি বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। যদিও এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ারও অনেক লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকরা বলতে শুরু করেছে, “সরকারের কোনো নির্দেশ ছাড়াই আমরা নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিজেরাই ব্যবস্থাপনা করা শুরু করব। কেউ যদি নিজেদের যাজক, ভূস্বামী বা শাসক বলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আসে, তাহলে তাদেরকে আমরা পদদলিত করব।” আমাদের এখন এমন আশা করতে হবে যে, নৈরাজ্যবাদী শক্তি যেন কঠোরভাবে এই সরকার-পূজারীদের মোকাবিলা করতে থাকেন; এবং কখনো নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত না করেন। আমাদের আশা করতে হবে যে, বিপ্লবের আগের সময়গুলোতে সরকারপন্থী এসব ভাবধারাকে এমনভাবে নাড়া দিতে হবে যেন বিপ্লবের সময় এটি মানুষকে অন্য কোনো ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিই অর্জন করতে না পারে।  

    পরবর্তী বিপ্লবের সময় কমিউনগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং সংসদীয় শাসনের পরিবর্তে মুক্ত ফেডারেশন গড়ে তুলবে। তারা নিজ নিজ কমিউনিটির মধ্যেও সংসদীয় শাসনের প্রথা বিলুপ্ত করে ফেলবে। খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য তারা ভরসা করবে শ্রমিকদের মুক্তভাবে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর সংগঠনের ওপর। যেগুলো অন্য শহর ও গ্রামের সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে ফেডারেশনের মাধ্যমে। তারা কোনো কমিউনাল সংসদের মাধ্যমে এই যোগাযোগ করবে না। বরং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে সরাসরি।   

    তারা কমিউনের ভেতরেও যেমন নৈরাজ্যবাদী হবে, তেমনি কমিউনের বাইরেও নৈরাজ্যবাদী হবে। এভাবেই তারা বাঁচতে পারে পরাজয়ের দুঃস্বপ্ন থেকে, প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিশোধ থেকে।

    ———————-

    ১. Arthur Arnould, Historie populaire et parlementaire de la Commune de Paris, Bruxelles: H. Kistemaeckers, 1878, 2 tomes en 1 vol.

    ২. জুলস মিশলে (১৭৯৮-১৮৭৪) একজন ফরাসী ইতিহাসবিদ। তিনিই ফ্রান্সের ইতিহাস বিষয়ক বইয়ে ইউরোপের পুনর্জাগরনের বিষয়টিকে রেঁনেসা নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলেন।

  • ভলটারিন ডি ক্লেয়ার || প্যারিস কমিউন 

    ভলটারিন ডি ক্লেয়ার || প্যারিস কমিউন 

    • অনুবাদ: খন্দকার তুর আজাদ

    সম্পাদকের নোট: ভলটারিন ডি ক্লেয়ার ছিলেন একজন আমেরিকান অরাজবাদী লেখক, বক্তা, শিক্ষক ও কবি। রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ও  শক্তিশালী লেখনী ও বাগ্মীতা দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই নারীকে তার সময় থেকে অগ্রসর একজন নারীবাদী হিসেবেও গণ্য করা হয়। ১৯১১ সালে, প্যারি কমিউনের ৪০ বর্ষ পূর্তিতে এটি একটি চিঠি আকারে লিখেছিলেন ভলটারিন ডি ক্লেয়ার। এটি প্রকাশিত হয়েছিল এই বইয়ে: “The Selected Works of Voltairine de Cleyre: Poems, Essays, Sketches and Stories, 1885-1911”। 

    ভলটারিন ডি ক্লেয়ার (১৮৬৬-১৯১২)

    মানব ইতিহাসের অন্যসব চমকপ্রদ ঘটনার মতো প্যারিস কমিউনও একইভাবে এর শত্রু ও বন্ধু; উভয়ের জন্যই অসংখ্য কিংবদন্তীর সাথে জড়িত। প্রকৃতপক্ষে মাঝেমধ্যে এই প্রশ্ন করতে হয় যে: কোনটা আসল কমিউন ছিল, গড়ে ওঠা কিংবদন্তী নাকি বাস্তবতা? কোনটাকে আমরা প্রকৃত কমিউন বলব, যা  সে সময় ঘটেছিল নাকি  ১৮ মে ১৮৭১ এর পরবর্তী প্রায় ৪০ বছরে যে ধারণাগুলো বিশ্ব মানসে জন্ম নিয়েছে?  

    মতবাদ, ব্যক্তিত্ব, ঘটনা প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই ব্যাপার ঘটে থাকে। 

    প্রকৃত ক্রিশ্চিয়ানিটি কী, যেই সরল মতবাদ খ্রিষ্টের দ্বারা প্রবর্তিত নাকি সংঘবদ্ধ ক্রিশ্চিয়ানিটি বাস্তবে যে প্রচারণা চালায়? আসল আব্রাহাম লিংকন কে,– চতুর রাজনীতিবিদ, যিনি একটি নীতি হিসেবে ভূমি দাসদের মুক্ত করেছিলেন নাকি মানব মুক্তির একজন কিংবদন্তী সংস্কারক, যিনি প্রথাবিরোধী অধিকারের পক্ষের এক বিশাল আকৃতি হিসেবে পুরাতন সব ভুলকে ধূলিস্মাৎ করেছেন, এবং সে কারণে শহীদের মর্যাদা লাভ করেছেন?

    আসল কমিউন কোনটা, — যেই ব্যাপারটা অস্তিত্বশীল ছিল, নাকি যেটা আমাদের বক্তরা চিত্রিত করেছেন? কোনটা আগামী দিনগুলোতে প্রভাববিস্তারকারী ক্ষমতা হয়ে উঠবে? আমাদের কমিউন বিষয়ক বক্তারা এটা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে এবং বলায় অভ্যস্ত যে, কমিউনের ঘোষণা ছিলে প্যারিসিয়ান জনতার স্বাধীনতার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ, যারা এ ব্যাপারের প্রতি সচেতন ছিল যে, ফ্রান্সের জাতীয় সরকার প্রুসিয়ান আর্মির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সাথে  জঘন্য ভূমিকা নিয়েছে। আমাদের বক্তারা বিশ্বাস করে শহরটা পরিস্থিতির যে প্রহসনের মুখোমুখি হয়েছে তা সাধারণ জনতার চোখ খুলে দিয়েছিল। সাধারণ জনতার কাছে এ ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছিল যে, জাতীয় সরকার যে কোন  সরকারের  কথিত মূখ্য ভূমিকা পালন করা (যেমন, বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষার নিয়ামক হওয়া) থেকে বহুদূরে ছিল। আসলে জাতীয় সরকার প্যারিসিয়ান জনতা এবং তাদের স্বার্থের থেকে এত বিচ্ছিন্ন ছিল যে  তারা জনতাকে প্রতিরক্ষায় সহায়তা করা বা জনতাকে নিজেদের রক্ষা করতে দিয়ে নিজেদের আধিপত্যকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়ার চেয়ে জনতাকে প্রুশিয়ানদের হাতে ছেড়ে দেয়াকেই বেছে নিয়েছিল। 

    এটা আক্ষেপের বিষয় যে প্যারিসের জাগরণের এই কিংবদন্তী চিত্রটা আসলে সত্য নয়। কমিউনটা বাস্তবে প্যারিসের সমগ্র জনতার তৈরী করা ছিল না, এমনকি এটা প্যারিসের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতারও কাজ নয়। কমিউন প্রকৃতপক্ষে তৈরী হয়েছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প সংখ্যক যোগ্য বা যথার্থভাবে বললে মেধাবী এবং প্রচন্ডভাবে নিবেদিত পুরুষ ও নারীদের দ্বারা। তাদের মধ্যে জীবনের প্রতি স্তর থেকে আসা মানুষ ছিল, তবে তুলনামূলক তাদের বড় অংশ এসেছিল সামরিক ব্যক্তি, প্রকৌশলী এবং রাজনৈতিক সাংবাদিকদের থেকে যাদের কেউ কেউ কিনা এরা আগে বারবার রাষ্ট্রদ্রোহী লেখা বা বিদ্রোহী আচরণের দায়ে জেলখানা ঘুরে এসেছেন। তারা নির্বাসন ভেঙে প্রতিবেশী দেশগুলা থেকে থেকে এসে জড়ো হয়েছিলেন এমনটা ভেবে যে: পূর্বের ভুলগুলা শুধরানোর সুযোগ তাদের সামনে হাজির হয়েছে । তাঁরা মানুষকে জাগ্রত করেছিল ১৮৪৮-এর সংগ্রামকে নতুন করে নির্মান করে তা ছড়িয়ে দিতে। এটা সত্য যে সেখানে তাদের সাথে শিক্ষক, শিল্পী, ডিজাইনার, প্রকৌশলী, নির্মানশ্রমিক, প্রতিটা ধরনের দক্ষ কারিগর ছিল। এবং সম্ভবত এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় হল শ্রমিকদের একত্রিত হয়ে সাক্ষাতের বর্ণনাটুকু। শ্রমিকরা ১৮ মার্চের আগে এবং পরে রাতের পর রাত এই শক্রদের দ্বারা ঘেরাও করা শহরের প্রতিটা কোয়ার্টারে একত্রিত হতো। এরকম সাক্ষাতে সেসব মানুষেরা যেত যারা কিনা মানুষ কী অর্জন করতে পারবে এবং পারে সে ব্যাপারে প্রবল বিশ্বাসে দীপ্ত ছিল।  নতুন সামাজিক ভবিষ্যতের উজ্জ্বল দৃষ্টিকল্প চোখে নিয়ে তারা  শ্রোতাদের কী অর্জন করা সম্ভব সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে বুঝানোর চেষ্টা করতেন। তাদের এই প্রবল বিশ্বাসের স্ফুরণ, আকাঙ্ক্ষা, সাহসিকতা এবং নির্ভিকতার প্রাণশক্তির উচ্ছাস বসন্তের সুবাসের মতো করেই যে কেউ অনুভব করতে পারে এবং যে কারো মনে হয় যেন সে নিজেই সেখানে উপস্থিত। সে যেন তাদের সাথেই এই কাজ, বিপত্তি, এই গৌরব, ভ্রান্তিময় নিশ্চয়তার অংশীদার। 

    এবং তারপরও নিশ্চয় এটাই সত্য যে, কমিউনের এই প্রচারকরা তাদের নিজেদের উৎসাহ এবং  অন্যদের মধ্যে জাগ্রত করা উদ্দীপনার ঘোরে এই ব্যাপারে অন্ধ-বধির ছিলেন যে জনতার নিশ্চুপ বড় অংশ যারা এই সব পাব্লিক মিটিং এ অংশ নেয়নি , যারা তাদের বাসায় বা দোকানে নীরবতা বজায় রেখেছিল, তারা কমিউনের প্রচারকারীদের এইসব শিক্ষায় পালটে যায়নি বা প্রভাবিত হয়নি। 

    কমিউনার্ডডের মধ্যে যারা জীবিত তাদের কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি যে যারা এই মহা জাগরণের সক্রিয় এবং আগ্রাসী সত্তা ছিলেন তাদের সংখ্যাটা ২০০০ এর খুব বেশি ছিল না। জনতার বেশীরভাগই তাদের মাথার উপর দিয়ে কী চলছে সে ব্যাপারে নির্লিপ্ত ছিল যাতে করে কিনা তাদের ব্যক্তিগত জীবনের শান্তি এবং নীরবতা ফিরতে আসে, যাতে করে প্রুসিয়ানদের অবরোধ ভাঙে এবং তারা নিজেদের কাজকর্মে ফেরত যেতে পারে। যদি কমিউন সে নিশ্চয়তা দিতে পারে, তবে সেটার জন্য শুভকামনা! তারা এই অবরোধে ক্লান্ত ছিল এবং তাদের পুরাতন দুর্দশায় ফিরে যেতে চেয়েছিল, যেখানে তারা কিছু অর্থে অভ্যস্ত ছিল, তারা আসলে এর চেয়ে ভাল কিছুর স্বপ্ন সেভাবে দেখেনি। 

    তবে কৌশলী মুহুর্ত আসলে সচরাচর যেটা হয়, এই সব সাদামাটা,নির্বিকার, উদাসীন মানুষেরা যারা রাজনৈতিক অধিকার, পৌর সার্বভৌমত্ব এবং এরকম আরো সব ব্যাপারে জানে না এবং জানার আগ্রহ রাখে না তারা বরং অনেক বেশী তাত্ত্বিকতায় নিজেদের বিভ্রান্ত করা লোকদের চেয়ে সরাসরি পরিস্থিতির যৌক্তিক অবস্থা দেখতে পারে। সেভাবেই, কমিউন একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হয়ে যাবার পর প্যারিসের জনগণ সাধারণভাবে এটা বুঝেছিল যে, পরের একমাত্র পদক্ষেপ হওয়া উচিত একইসাথে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক যুদ্ধ চালানো। জাতীয় সেনাবাহিনী যা কিনা শহরের মধ্যে অবস্থান করছিল তাতে সরবরাহ যোগানোর যেকোন উৎসই বন্ধ করে দেয়া। সেটা করার বদলে কমিউনের সরকার যা কিনা আগের শাসনের চেয়েও নিজেদের আইন অনুরাগী দেখাতে চেয়েছিল,তা নির্বোধের মতো তার শত্রুদের সম্পত্তির অধিকারকে সমর্থন করে গেছে। এবং তারা ব্যাংক অব ফ্রান্সকে সেসব ব্যক্তিদের অর্থ যোগান দিতে দিয়েছে যারা কিনা ভার্সেই এর সেনাবাহিনীকে অর্থ সরবরাহ করেছে, যেই সেনাবাহিনী কিনা ছিলই তাদের গলা কাটার জন্য। 

    স্বাভাবিকভাবে, সাধারণ মানুষেরা এমন একটি নির্বোধ কর্মসূচির প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। এবং ভার্সাইয়ের সৈনিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামে মোটের উপর তারা কোন অংশই নেয়নি, এমনকি তাদের শহরে প্রবেশ করার চিন্তার ব্যাপারেও কোন বিরোধিতা করেনি। সম্ভবত একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, দুই দানবের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দানবের ফিরে আসার ধারণায় স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলেছে। তারা অল্পই ভাবতে পেরছিল যে এদের ফিরে আসার পথটুকু তাদের নিজেদের  রক্তেই রঞ্জিত হবে এবং যারা কিনা কমিউনের পক্ষে কিছু বলেনি বা করেনি তারাও এর শহীদে পরিণত হবে। বিদ্রোহের উপর আইন-শৃঙ্খলার উন্মত্ত প্রতিশোধ, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার *স্যাটারনালিয়া সম্পর্কে তারা সামান্যই ধারণা করতে পেরেছিল। 

    আমি চিন্তা করি, তারা কি ২০ মে র রাতের আগে ঘুমাতে পেরছিল, যখন প্রতিহিংসার ঘন মেঘ আছড়ে পড়ার জন্য জড়ো হচ্ছিল? অনেকেই পরের রাতেও ভালমতো ঘুমিয়েছিল এবং এখনও ঘুমন্ত কেননা “এরপর শুরু হয় এক নৃশংস এবং ভয়নক হত্যাকান্ড”– এমন এক হত্যাকান্ড যেটাকে নিয়ে আঁকা ছবি এই ৪০ বছর পরেও রক্ত হিম করে দেয় এবং প্রবল আতংক ও ঘৃণা জাগায়। ম্যাকমাহন প্যারিসের রাস্তায় শান্তি ঘোষণা করল এবং তার সৈনিকদের সেই শান্তি কায়েম করতে পাঠাল। এবং সেই শান্তির নামে গালিফে যে কিনা জাহান্নামের মানব রুপ সে প্যারিসের রাস্তায় নেমে শিশুদের খুলি ছিন্ন করে তার সৈনিকদের জন্য উদাহরণ তৈরী করল। কোন হাত শাটারের কাছে আসলেই জানালা বুলেটে জর্জরিত করে ফেলা হতো। যদি প্রতিবাদের কোন একটা ধ্বনিও কোন গলা থেকে বেরিয়ে আসতো, তবে সেই  ঘরে আক্রমণ করা হতো, তার বাসিন্দাদের তাড়িয়ে বের করে দেয়াল বরাবর লাইন করে গুলি করা হতো। আহতদের বিছানাদের পাশে থাকা ডাক্তার এবং নার্স, হাসপাতালের রোগীরা সবাইকে হত্যা করা হয়েছিল, তারা যেই অবস্থায় ছিল সেভাবেই। এমনই ছিল ম্যাকমাহনের শান্তি।

    রাস্তায় হত্যাযজ্ঞের পর দূর্গ প্রাচীর গুলোতে সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ, স্যাটোরির অগ্নিকুন্ড, গাদাগাদি করে সমবেত করা জেলখানার কয়েদীরা, লন্ঠন হাতের নিষ্ঠুর আগন্তুক, উঠে আসা এবং অনুসরণের নির্দেশের বীভৎস ডাক, পিচ্ছিল রক্তভেজা মাটিতে দন্ডপ্রাপ্তদের নিজেদের জন্য খুঁড়া সব গর্ত যেগুলাকে তাদের নিজেদের মৃতদেহ দিয়েই বোঝাই করা হবে। ৩০ হাজার মানুষ খুন! কর্তৃত্বের অতৃপ্ত প্রতিহিংসা এবং তাদের উন্মত্ত রক্ত পিপাসু পেশাদার সৈনিকের হাতে জবাই ৩০ হাজার মানুষ ! সামান্যতম কারণের ছুতো ছাড়া, অনুসন্ধানের ন্যুনতম ছায়াটুকু ছাড়া , শুধুমাত্র  নির্মম ক্ষোভের বলি হল ৩০ হাজার মানুষ!

    ক্রোধের মচ্ছবের পরে দমনের মচ্ছব। কয়েদীদের জড়ো করা হতো মাটির নিচের কক্ষে যেখান তাদের স্যাতস্যাতে মাটিতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে বা শুয়ে থাকতে হতো। তারা আলোর দেখা পেত মাত্র একবার যখন কিনা সূর্যের আলো কোন এক বন্ধ না হওয়া ফাটল দিয়ে তাদের কাছে পৌছাত। দিনে এবং রাতে উভয় সময়ই তাদের দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করা হতো। মাঝেমধ্যে সে কাজে ব্যবহার করা হতো প্রানীদের বহন করার গাড়ি। সেখানে তাদেরকে  ঠেসে বোঝাই করা হতো, গাদাগাদি করা অবস্থায় এমনভাবে তাদের ফেলে রাখা হতো যেমনটা কিনা আমাদের  কসাই সমাজও জবাই করার জন্য জড়ো করা শুয়োরদের সাথে করতেও লজ্জিত হবে। মাঝেমধ্যে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হতো ভীতিকর পদযাত্রার মাধ্যমে। মূলত রাত্রেই সে পদযাত্রা চলত, প্রায়শই বৃষ্টির মধ্যেই পথ চলতে হতো তাদের, এরইমধ্যে সৈন্যরা গাদা বন্দুকের বাট দিয়ে তাদের শরীরে আঘাত চালাতো যেহেতু দুর্বলতা অথবা পঙ্গুত্বের কারণে তারা পিছিয়ে পড়ত। 

    এর পরে বন্দিত্বের জেলখনাগুলা। সেসবে ছিল  ক্ষুধা, ঠান্ডা, কীট , ব্যাধি, বন্দিত্বের সুদীর্ঘ যন্ত্রনা এবং অপেক্ষামান মৃত্যুর অন্ধকারের ছায়া। তারপর কমিউনার্ড বা সন্দেহভাজন কমিউনার্ডদের উপর নির্যাতন, যা চালানো হতো যাতে তারা তাদের বন্ধুদের খোঁজ জানিয়ে দিতে বাধ্য হয়। 

    যারা এসবে দেখেছে তাদের পক্ষে কি  “ভুলে যাওয়া এবং ক্ষমা করে দেয়া” সম্ভব ? বাবা কোথায় তা বলতে বাধ্য করার জন্য দশ বছরের শিশুরের চাবুক মারতে দেখেছে যারা। লড়াই করা ছেলেদের নাকি লড়াই না করা মেয়েদের, কাদের সৈন্যদের নিষ্ঠুরতার হাতে তুলে দিব, এমন ভয়ানক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে উন্মাদে পরিণত হয়েছে যেই মহিলারা। তাদের পক্ষে কি সম্ভব?

    শিকার ধরার নির্যাতনের পর বিচারের নির্যাতন, ভাব গাম্ভীর্য্যপূর্ণসব প্রহসন, চাতুর্যপূর্ণ নিষ্ঠুরতা। সেসবের পর জেলখানা থেকে বন্দরে আশাহীন সারিবদ্ধ নির্বাসিতদের যাত্রা। পণ্য পরিবহনের জাহাজে বোঝাই করা হতো তাদের, খাঁচাবন্দি প্রাণির মতো নজরদারিতে রাখা হতো, নিজেদের মধ্যে কথা বলাও নিষিদ্ধ ছিল, মাথার উপর হুমকিস্বরূপ কামানগুলা থাকত সবসময়। এরপর তাদের দূরে বিতারিত করা হতো, বিতারিত করা হতো নির্বাসনের জমিতে। বিরান দ্বীপ থেকে উপকূলে পাঠানো হতো তাদের, সেখানে নিঃসঙ্গতায়, অকার্যকারিতায় ক্ষয় হবার জন্য। তাদের সঙ্গী হতো স্বাধীনতার নিষ্ফল স্বপ্ন যার সমাপ্তি ঘটত গোড়ালিতে বাঁধা শেকলে, অথবা প্রবাল প্রাচীরে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এসবই ছিল বিদ্রোহী নগর, যার কাজ কিনা ফ্রান্সের গৌরব এবং যার সৌন্দর্য দুনিয়ার সৌন্দর্য , তার প্রতি জাতীয় সরকারের দেখানো ক্ষমা এবং প্রজ্ঞার নমুনা। আমাদের আর যা যা শিখতে হবে সেসব বাদে এটা খুবই নিশ্চিত একটা শিক্ষা; তা হল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের অতৃপ্ত প্রতিশোধ। যদি কেউ আর কখনো বিদ্রোহ করে, তবে তাকে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ করতে দেয়া হোক; যেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হয় তার বিচার বা ক্ষমার প্রতি আশা রাখার চেয়ে নিস্ফল আর কিছুই হয় না। পুনরায় দখলদারিত্ব কায়েম করা সরকারের  বৈষম্য, বিচার বা প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস রাখার চেয়ে সরল আর নির্বোধ কোন বিশ্বাসই হতে পারে না। 

    ইউনিভার্সাল হিস্টরি আর্কাইভ

    সেসময় ফ্রান্সের অন্যসব শহরে একই ধরনের কার্যক্রমের সাধারণ প্রতিক্রিয়া দ্বারা (যদি প্যারিস তার সংগ্রাম আরো কয়েকমাস চালিয়ে যেত) স্বাধীন কমিউনের দরকারি নীতিগুলা বাস্তবায়িত হতো নাকি হতো না, সেটা বলার মতো যথেষ্ঠ ঐতিহাসিক বা ঐতিহাসিক ভবিষ্যতবক্তা আমি নই। আমি তা সম্ভব হতো না মনে করার দিকেই ঝুঁকবো। তবে নিশ্চিতভাবেই সংগ্রামটা আরো ভিন্ন ধরনের হতো, এটা তখন এবং পরের হিসাবেও অনেক বেশী ফলপ্রসূ হতো (এমনকি যদি শেষমেষ এটাকে উৎখাত করা হতো), যদি এটা আসলেই সে সকল মানুষের একটি সংগ্রাম হতো যাদেরকে এটার জন্য বাছ-বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে, ভয়ানকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, ক্ষমাহীনভাবে নির্বাসিত করা করা হয়েছে। এটা যদি আসলেই লাখো মানুষের মুক্ত হবার সচেতন অভিব্যক্তি হতো, তবে তারা তাদের নিজেদের দরজা হতে শত্রুদের জন্য যা কিছুর যোগান দেয়া হচ্ছিল তা কেঁড়ে নিত, তারা যেই ক্ষমতাকে উচ্ছেদ করার জন্য লড়াই করছিল সেই ক্ষমতার বানানো ‘সম্পত্তির অধিকার’ এর ধারণাকে অস্বীকার করত। তার বুঝতে পারতো কী করা জরুরি ছিল এবং তাই করত । 

    যদি আসল কমিউনার্ডরা তাদের নিজেদের প্রচেষ্টার কার্যকরণ বুঝতো, এবং তারা যদি বুঝতো যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনতা যা কমিউনগুলাকে দাসত্বের মুখোমুখি করেছে তা উচ্ছেদ করতে হলে তাদেরকে অবশ্যই সেসব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করতে হবে যেগুলা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে অস্তিত্বশীল করে। যদি তারা নগরীর সব সম্পদকে সাধারণভাবে কমিউনের সম্পদে পরিণত করতে পারত, তাহলে তারা হয়ত এই সংগ্রামে মানুষের সম্পূর্ণ আস্থা অর্জন করত এবং এই সংগ্রাম বিজয়ের  জন্য বহুগুণ প্রচেষ্টা জাগ্রত করত। যদি তাদেরকে সংক্রামক রোগের মতো ফ্রান্সের অন্যসব শহরেও পিছু নেয়া হতো তবে এই বিদ্রোহের অগ্নিশিখা *লাতিন ইউরোপেও ছড়িয়ে যেত। এবং সেই সব দেশ হয়ত এখন একটি নিজস্ব ধাঁচের সমাজতন্ত্রের পরিবর্ধিত রূপ এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব উদাহরণ হতো। সামনের কোনো একই রকমের বিস্ফোরণে এমনটা হবার কথা; যদি রাজনৈতিকরা আবার এমন উস্কানি তৈরি করার মতো অবিবেচক হন। সামাজিক বিজ্ঞানের সেরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত যে, প্রগতির ধারা এমনটাই হবে। 

    আমি সোজাসাপ্টাভাবে বলি যে, আমি ভবিষ্যতের প্রগতির পথ দেখতে পারিনা,–আমার দৃষ্টিকল্প এতটা বিশাল নয়, আমার দৃষ্টিভঙ্গি এতটা উঁচু নয়। যেখানে অন্যরা সকালের সূর্যের আলোকে আঁকড়ে ধরে সেখানে আমি শুধুই কুয়াশা খুঁজে পাই– উড়তে থাকা ধূলি কণা আর চলমান অন্ধকার যা ভবিষ্যতকে অস্পষ্ট করে। আমি জানি না এই পথ কোনদিকে যায় বা আমাদের কোন গন্তব্যে নেয়। শুধুমাত্র পিছে ফিরে দেখলে, মানব জাতি যে দীর্ঘ, ভয়ানক এবং পরিশ্রমসাধ্য পথে সামনে এগিয়েছে তার কিছু আভা পাই, এমনকি সেটাও আমি স্পষ্ট দেখতে পারিনা– শুধু তার কিছু নমুনা এখানে সেখানে ছড়ানো দেখতে পাই। তবে এটা কখনোই সরল, অবিচ্যুত কোন পথ যে ছিল না- তা জানবার মতো যথেষ্ঠ দেখতে পারি। এই পথ সবসময় বাঁক বদলায় ও ফিরে আসে। এবং এমনকি কিছু অর্জনের সময়ও আমরা কিছু হারাই।  

    প্রকৃতির আক্রমণের মুখে মানুষ তার সামাজিক শক্তিকে জড়ো করে এবং এর দ্বারা তার  বিচ্ছিন্ন অবস্থার স্বাধীনতা হারায়। আদিম সমাজের বিরুপ পরিস্থিতির মুখে সে তার উদ্ভাবনী প্রতিভা প্রয়োগ করে,– ভূমি, সমুদ্র এবং আকাশ প্রদক্ষিণ করে,–এবং নিজের সীমাবদ্ধতাগুলাকে জয় করাটাই তাকে নতুনভাবে শৃঙ্খল বন্দি করে। সে এমন এক সম্পদ তৈরী করে যা উৎপাদন করতে গিয়ে সে নিজেকে দাসে পরিণত করে। 

    এবং এটাই প্রগতির পথ, যা কিনা কোন পূর্বাভাসে ছিল না!

    তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? কী আশা রয়েছে সেখানে? রয়েছে কী সাহায্য?

    কী অপেক্ষা করে? অপেক্ষ করে অজানা, যেমনটি সবসময় করেছে,– অন্ধকার, অস্পষ্ট, গভীর, অভেদযোগ্য– যেই রহস্য নবীন এবং শক্তিশালীদের এই বলে প্রলুব্ধ করে, “আসো এবং আমার সাথে মানিয়ে নাও”, যেই রহস্য থেকে বৃদ্ধ এবং জ্ঞানীরা এই বলে পিছু হটে “আমরা যা জানিনা তার অভিমুখে উড়বার চেয়ে আমাদের যা সব মন্দ আছে তাদের সহ্য করা শ্রেয়”, বৃদ্ধ এবং জ্ঞানী, কিন্ত হায়! হিমশীতল রক্তের অধিকারী! পৃথিবী, সূর্য এবং ভূগর্ভে এখনও অবাধ্য শক্তির রহস্য রয়েছে।  এসবের কোন একটা মুক্ত হলে হয়ত সব এমনভাবে বদলে যাবে যে  আমরা এতদিনের জন্য যেটাকে মুক্তির নিশ্চয়তা ভেবেছি তাই দাসত্বের শৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে। যেমনটা এর আগে পরিশ্রম দ্বারা অর্জিত স্বাধীনতা পরের সময়ের মানুষের জন্য মানতেই হবে এমন বিধিবদ্ধ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এবং তারপরও– অজানা অপেক্ষমান।

    কমিউনের স্মরণে || শিল্পী: ওয়াল্টার ক্রেন

    তুমি কি সাহসী এবং শক্তিশালী? অজানা তোমাকে সংগ্রামের জন্য আহবান জানায়, তাকে বিজয় করার দুঃসাহসিকতার হাতছানি দেয়। হয়তো এটা তোমার ভবিষ্যতের ভালবাসা, যা কিনা তোমার দুঃসাহসী তাড়নাকে নব সৃষ্টির উদ্দীপনায় পুরষ্কৃত করবার জন্য অপেক্ষা করে। তুমি কি দুর্বল এবং চিত্তে ভীরু? তোমার মাথা মাটিতে নত কর। তবু তোমাকে ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হবে। তবুও তোমাকে অন্যদের পথে যেতে হবে। তুমি তাদের বাধাগ্রস্ত করতে পারো, তাদের যাত্রাকে বিলম্বিত করতে পার; কিন্ত তুমি পারবে না থামাতে, না তাদের, না নিজেকে।

    সংগ্রামের অপেক্ষমান– নিষ্ফল সংগ্রাম, বিধ্বস্ত সংগ্রাম, ভুল সংগ্রাম, দীর্ঘ এবং বারবার। এবং এসবের চেয়েও বাজে হল , অপেক্ষা অপেক্ষমান ,– নিষ্কৃয়তার দীর্ঘ মৃত ধাপ, যখন কেউ কিছু  করে না, যখন কিনা দুঃসাহসীরাও শুধুমাত্র একই জায়গায় ফিরে আসার বৃত্তে ঘুরপাক খায়; যখন কেউ জানে না কী করতে হবে, শুধুমাত্র অসহ্য পরিস্থিতির ক্রমেই বাড়তে থাকা চাপ সহ্য করতে হয়, কীভাবে সে পরিস্থিতি ভাল করতে হয় তা সে জানে না;  যখন কিনা বেঁচে থাকা একটা নিরাকার তেপান্তরে একঘেয়ে যাত্রার মতো মনে হয়, যখন কিনা কেউ বের হবার আশায় প্রতিটা লক্ষ্যহীন পথ হাতড়ে মরে তখন সেসব পথ থেকে একই  নিষ্করুণ শব্দ “অদরকারি” তার দিকে দৃষ্টি হানে। যে ব্যক্তি উত্তপ্ত  এবং বিক্ষত আত্মার অধিকারী  হলেও স্পষ্ট বিচারশক্তি দিয়ে দেখতে পায় যে সে অনির্দিষ্টকাল ধরে যে সব অন্যায় রয়েছে  তা মেনে চলতে বাধ্য, সে ব্যক্তির তুলনায় ভুল সংগ্রামে প্রাণ হারানো ব্যক্তি বেশি সুখী। কী আশা রয়েছে তাতে? এটা যে, পরিস্থিতির ক্রমাগত বাড়তে থাকা চাপ হয়ত দ্রত বুদ্ধিমত্তা আনবে; যে ভ্রান্ত সংগ্রাম, হতাশাগ্রস্ত সংগ্রাম থেকেও  আগে দেখা যায়নি এমন ভাল পরিণতি আসে। যেমন করে আমদের বস্তুগত জীবনের অনস্বীকার্য উন্নতি থেকে অদৃষ্টপূর্ব খারাপ ফলাফলও  অনুগামী হয়।  

    কমিউন চেয়েছিল প্যারিসকে মুক্ত করতে এবং সেটার মাধ্যমে অন্য অনেক শহরের জন্য উদাহরণ তৈরী করতে। সম্পূর্ণ পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এর পতন ঘটে, এবং সে কারণে কোন শহরই মুক্ত হয় না। কিন্ত এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এর মানুষদের কারিগরি  জ্ঞান এবং দক্ষতা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে, একইসাথে সভ্য কেন্দ্রস্থল এবং বন্য পরিত্যক্ত জায়গায় পৌছে যায়। এবং যেখানেই এর শিল্প পৌছায়, সেখানেই এর ধারণাগুলিও পৌছায়। সুতরাং ‘কমিউন’,  আদর্শায়িত কমিউন, দুনিয়াজুড়ে কারখানাগুলায় যেখানেই কিছু শ্রমিক তাদের সাথের শ্রমিকদের জাগ্রত করতে চায় সেখানেই এগুলো অনুপ্রেরণার শব্দে পরিণত হয়েছে। 

    অনেকেই সুনির্দিষ্ট আশা আছে; যারা মনে করে তারা সঠিকভাবে জানে কীভাবে বাড়তি কাজ, কাজের অভাব, দারিদ্র এবং এসবের ফলে সৃষ্ট সব আত্মিক দাসত্বকে উচ্ছেদ করতে হবে। তারা ভাবে যে ব্যালট বাক্সের ফাঁক দিয়ে তারা  খুব স্পষ্ট এবং বিশদভাবে প্রগতি দেখতে পায়।আমি ভয় পাই যে,  যদি তারা কখন এসব বাস্তবায়ন করতে পারে তবে তাদের কর্মকান্ডের এমন কিছু ফলাফলও থাকবে যেগুলা তারা হিসাবে আনেনি।আমি ভয় পাই যে, তাদের সংকীর্ণ দৃষ্টীভঙ্গি তাদের সাথে ভালই প্রতারণার খেলা খেলে। পাহাড় চূড়ায় ওঠা আর কাউকে ভোট দিয়ে উপরে উঠানো সম্পূর্ন ভিন্ন ব্যাপার।

    তবে যাই ঘটুক: মানুষ সবসময় ই আশা দেখে; জীবন সবসময় আশার পক্ষে। যখন কিনা সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য চিহ্নিত করা যায় না, তখনও হার না মানা আশার চেতনা বেঁচে থাকা গণমানুষকে কিছুর দিকে তাড়িত করে, যেই কিছু কোন না কোনভাবে আগের চেয়ে ভাল হবে।  

    কী সাহায্য আছে? বাইরের কোন শক্তির থেকে কোন সাহায্য নেই; মাথার উপর থেকে কোন সাহায্য আসবে না; আসমান থেকেও কোন সাহায্য আসবে না, যতই প্রার্থনা করা হোক না কেন; বিজ্ঞ মানুষদের শক্তিশালী হাত থেকেও কোন সাহায্য নেই,  ভাল মানুষদের থেকেও নেই , তা যত জ্ঞানী বা ভালই হোক না কেন। এমন সাহায্যের শেষ পরিণতি সব সময় স্বৈরতন্ত্রই হয়। যেসব মহৎ অন্ধবিশ্বাসীদের চেষ্টা শোচনীয় ব্যর্থতায় শেষ হয়, তাদের আত্মদানেও সাহায্য নেই , যেমনট ঘটেছিল কমিউনের ক্ষেত্রে । সাহায্য তাদের থেকেই আসবে যারা তাদের সাধারণ ইচ্ছার দ্বারা কীভাবে, কখন, কোথায় কাজটি করবে তা বলে।

    কমিউনের শিক্ষার শক্তি এই যে, যেসব মানুষ এখনও স্বাধীনতাকে ধারণায় আনেনি, তাদেরকে মুক্ত করা যাবে না। কিন্ত এই ধরনের উদাহরণ থেকে তারা স্বাধীনতাকে ধারণ করবার শিক্ষা পেতে পারে। এটা উপহারের মতো করে অপর্ণ করা যাবে না, যারা এটা চায় তাদেরকে এটা অর্জন করে নিতে হবে। আমরা আশা করি যে যারা এই শিক্ষা দিয়ে গেছে এতটা ত্যাগের বিনিময়ে, তারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাঁটতে থাকা সর্বহারাদের বন্ধ চোখকে এমন আলো দিয়ে স্পর্শ করেছে যেটা তাদেরকে অন্তত জেগে উঠবার স্বপ্ন দেখায়।  

    * স্যাটারনালিয়া: প্রাচীন রোমে কৃষির দেবতা স্যাটার্ন দেবতার সম্মানে হওয়া উৎসব ।  এই উৎসবে অন্য সময়ের জন্য নিষিদ্ধ এবং অনৈতিক ভাবে গৃহীত আচরণ অনুমোদিত বলে গৃহীত হয়। এখানে কমিউন দমন করে পুনঃপ্রতিপ্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের ( ফ্রান্সের জাতীয় সরকার ) ও তাদের সেনাবাহিনীর  নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠা এবং পরবর্তীতেও নির্বিচারে নির্যাতন চালানো বুঝিয়েছে। 

    * লাতিন ইউরোপ: লাতিন ইউরোপ বলতে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল এবং রোমানিয়াকে বুঝানো হয় । এসব জাতির সংস্কৃতি রোমান জাতক।

  •  ক্রাইমথিঙ্ক. || মার্চ ১৮, ১৮৭১: প্যারিস কমিউনের অভ্যুদয়

     ক্রাইমথিঙ্ক. || মার্চ ১৮, ১৮৭১: প্যারিস কমিউনের অভ্যুদয়

    • অনুবাদ: ইশাদী হুসাইন

    সম্পাদকের নোট: কিভাবে, কোন পরিস্থিতিতে প্যারিসের জনসাধারণ পুরো শহরের দখল নিয়ে নিয়েছিল- তার একটি ভাষ্য উঠে এসেছে কমিউনার্ড লুইস মিশেলের সঙ্গে ঘটা ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে। লেখাটি নেওয়া হয়েছে ক্রাইমথিঙ্ক. থেকে।

    লুইস মিশেল

    সালটা ১৮৭১। জার্মানির সাথে যুদ্ধে সম্রাট নেপোলিয়নের পরাজয়ের পরপরই ফ্রান্সের বিপ্লব একটি গণতান্ত্রিক সরকারের গোড়াপত্তন করেছে ঠিক। কিন্তু এই নতুন প্রজাতন্ত্র কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। নতুন গঠিত ভারপ্রাপ্ত সরকারটি পুরানা মহারাজের চাকুরিজীবী আমলাদের দ্বারা সংগঠিত; বিপ্লবীদের সমাজ বদলানোর দাবিদাওয়া পূরণে তারা না কোন কাজ করেছে, না তারা করতে চায়। প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থীরা মহারাজকে পুনরায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রদানের কিংবা তাতে ব্যর্থ হলে নতুন কোন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছে। ফ্রান্স এবং প্রতিবিপ্লবের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে একা বিদ্রোহী প্যারিস। 

    নিয়মের দাসদের কাজকর্ম ঠিকঠাক বেঁটে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে, ফরাসী জনতাকে বাধ্য করতে হবে অক্ষরে অক্ষরে জার্মানির জনবিরোধী সমর্পণ শর্ত মান্য করতে। নাগরিকদের উপর যুদ্ধবিরতি চাপানোর জন্য নতুন প্রজাতন্ত্রটি দু’টি জাতীয় সেনাবাহিনীর জোরে র‍্যাডিকাল ক্লাবগুলিকে নিষিদ্ধ করেছে এবং সংবাদপত্রগুলি বন্ধ করে দিয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে কেবল যখন সম্রাটকে উৎখাত যারা করেছে তাদের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরেই।

    র‍্যাডিকালরা জেলে কিংবা অজ্ঞাতবাসে থাকায় নির্বাচনে জেতে সংরক্ষণশীলেরা। প্রধান জয়ী হয় প্রুধোঁ’র আদি শত্রু ব্যাংকার অ্যাডল্ফ থিয়ের যে ১৮৪৮ এর বিপ্লব বেঁচতে সহযোগিতা করেছিল। তার জন্যে না হলে হয়তো সম্রাট ক্ষমতা অধিগ্রহণও করতে পারতেন না। প্রাদেশিক গ্রামাঞ্চলের ভোটে সরকারের অফিসে যেতে পেরেই থিয়েরের প্রথম কাজ হ’লো ৫০ কোটি ফ্রাংক খরচ করে জার্মানির সাথে শান্তির জন্য আপোস করা। থিয়েরের কাছে এটা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের সস্তা উপায় মাত্র – বিশেষ করে যেখানে পুরোটাই দিচ্ছে ফরাসি জনতা, সে নিজে না। আর যদি জনগণ তা না দিতে চায়? তাহলেও সে জার্মানি নয় বরং ফ্রান্সের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।

    থিয়েরের সমর্পণচুক্তির মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো জার্মান সৈন্যদের রাজধানীর মধ্য দিয়ে বিজয় মিছিল করতে দেয়া। মাসের পর মাস ঘেরাওয়ের ফলে ক্ষুধায় ক্লীষ্ট প্যারিসবাসী এটা কোনভাবেই হতে দিতে চায় না। গুজব ছড়িয়ে পড়ছে যে জার্মানিরা শহর লুটতে আসছে। বিপ্লবের পরে গড়ে ওঠা প্রহরী সমিতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষাৎ চালিয়ে যাচ্ছে।

    ফেব্রুয়ারি ২৬ এর রাতে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর দশ হাজারের বেশি বিদ্রোহী সদস্য চ্যাম্পস-ইলিসিসের মফঃস্বল শহরে জড়ো হয়। তাদের সাথে আছেন নগরপ্রান্ত মন্তমার্ত্রের স্কুলশিক্ষিকা চল্লিশ বছর বয়স্ক লুইস মিশেলের মতোন কঠোর-মূর্তি বিপ্লবীরা। একসাথে তারা সদ্য আটক হওয়া রাজবন্দীদের জেল ভেঙে মুক্ত করে। তারপর তারা প্যারিসের জন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে নিকষ আঁধারে অপেক্ষা করতে থাকে জার্মানদের আগমনের।

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক

    ভোর নাগাদ আক্রমণের কোন লক্ষণই দেখা না যাওয়ায় বিদ্রোহীরা প্যারিসে থাকা যুদ্ধের অবশিষ্ট কামানগুলি করায়ত্ত করে নেয়। বিদ্রোহীরা বিশ্বাস করে গরিবের দাতব্য চাঁদায় কেনা এই কামানগুলির যোগ্য অধিকার তাদেরই আছে যারা শহরটিকে রক্ষা করতে চায়; শহরের সাথে প্রবঞ্চনা করা রাজনীতিবিদ কিংবা যেই জার্মান বাহিনী নিরস্ত্র করে তাদের গ্লানি জর্জরিত করতে চায় তাদের কক্ষণো নয়। বিলাসী এলাকা থেকে সরিয়ে ভারী অস্ত্রগুলি তারা বস্তি আর ভাগাড়ের ফাঁকে নিজেদের এলাকায় নিয়ে মন্তমার্ত্রের টিলায় স্থাপন করেন।

    অবশেষে, ১৮৭১ সালের পয়লা মার্চে, জার্মান বাহিনী প্যারিসে প্রবেশ করে। অস্থির বস্তিগুলো এড়িয়ে তারা পুরান শহরে চেপে চেপে আগায়। দোকানপাট সব বন্ধ; মিছিলের যাত্রাপথে সমস্ত ভাস্কর্য কালোবসনে আবৃত আর কালো পতাকা উড়তে থাকে দালানে দালানে। দুস্থ জনতা দূর থেকে কড়া চোখে তাকিয়ে দেখে; তাদের বুভুক্ষু নজর হৃষ্টপুষ্ট জার্মানদের মজ্জা কাঁপিয়ে দেয়। হানাদার বাহিনী লেজ গুটিয়ে শিবির স্থাপন করে শহরের বাইরে পূর্বপাশে।

    এর কিছুদিন পরেই থিয়েরের সরকার ঘোষণা করে ঘেরাওয়ের সময় স্থগিত রাখা ভাড়াগুলি বাড়িওয়ালারা আদেশমাত্র দাবি করতে পারবে। চারমাসের বকেয়া সুদসমেত বাকী, এবং বন্ধক রাখা মাল বিক্রির স্থগিতাদেশও বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিশেষ প্রয়োজন দেখাতে না পারলে, জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর বেতনও দেয়া হয় বন্ধ করে। এইসব এবং আরও অনেক কিছুই থিয়ের যেই শর্তে শান্তি লিখে দিচ্ছে সেই চুক্তিতে অবধার্য।

    মার্চ ১৮ এর সকালে মন্তমার্ত্রেবাসী ঘুম ভেঙে দেখে দেয়ালে দেয়ালে এলান। পৈতৃক প্রতাপে অ্যাডল্ফ থিয়ের ব্যাখ্যা করে দিচ্ছে কীভাবে জনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, অর্থনীতি, এবং তাদের নিজেদের পিঠ বাঁচানোর স্বার্থে প্যারিসের সুনাগরিকদের কামানগুলো ফেরত দিয়ে বিপথে চালিত করা অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে হবে:

    ন্যায়বিচার ও সুবুদ্ধির খাতিরে এই কর্ম সম্পাদনে সরকার আপনাদের সহায়তা কামনা করছে। জনমতের সাথে বিরোধিতা না করে সমর্থন করে সুনাগরিকেরা কুনাগরিকের সঙ্গ ত্যাগ করবে এই বিশ্বাস করে। এই প্রজ্ঞাপন জারি মাত্রই, বলপ্রয়োগে আপনাদের সম্মতি গৃহীত হবে, কেননা আর একদিনও দেরি না করে শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক.

    ঠিক এর আগের দিন রাতে, লুইস মিশেল মন্তমার্ত্রের চূড়ায় উঠে কামানের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিরক্ষীদের একটি বার্তা পৌঁছে দেন। দেরি হয়ে যাওয়ায়, তাদের হেডকোয়ার্টারে তিনি রাতটা থেকে যান। সারারাত একের পর এক সন্দেহজনক চরিত্র টিলার উপরে উঁকি দিতে হাজির হয় মাতালের ভান করে আউলফাউল গপ্পো সাজিয়ে।

    বন্দুকের গর্জনে তার ঘুম ভাঙে। তখনও আঁধার কাটে নাই। বিছানা ছেড়ে দাঁড়ানোর আগেই বাড়িটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে থিয়েরের অনুগত ফরাসি সৈন্যরা। ঘরদোর তছনছ করে ছেলেদের গ্রেফতার করেছে বটে কিন্তু তাকে খেয়াল করে কদাচিৎ – তিনি একজন মেয়েলোক ছাড়া কী। এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সৈন্যরা প্রতিরক্ষীদের একজনকে নিয়ে আসে যাকে গুলি করা হয়েছে। তার রক্তের স্রোত আর মিশেলের অশ্রু প্রবাহ এক হয়ে মিশে যায়।

    মন্তমার্ত্রের উদারপন্থী মেয়র আসলেন। তার নগরবাসীরা ভাঙচুর শুরু করার আগে তাড়াতাড়ি সৈন্যদের কামানগুলি সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তিনি আহত প্রতিরক্ষীর ব্যাপারেও চিন্তিত। মাথা নাড়ানো ছাড়া মিশেলের করার কিছু নেই। তাই মিশেল ক্ষত বেঁধে দিয়েছেন না জেনেও তিনি পরিষ্কার ব্যান্ডেজের খোঁজ করায় মিশেল নিজেই তা নিয়ে আসার আগ্রহ জানালেন।

    “আপনি নিশ্চিত আপনি ফিরে আসবেন?” তিনি কটাক্ষে তাকালেন।

    “আমি কথা দিচ্ছি,” জবাবে মিশেল, অবিচল।

    দৃষ্টির সীমানা পেরোতেই, পাহাড়ের তল থেকে এক দৌড়ে, দেয়ালে সাঁটানো থিয়েরের প্রজ্ঞাপন পড়তে থাকা জটলাগুলো পেরিয়ে স্থানীয় প্রহরা সমিতির মূলভবনের সড়কে পৌঁছাতেই পুরা দমে চিৎকার করতে থাকলেন, “বেইমান! বিশ্বাসঘাতক!” তার বন্ধুরা সেখানেই ছিলো। নিজেদের বন্দুক নিয়ে সবাই ছুটলেন পাহাড়ের উপরে আবার তার সাথে। দূরে তখন শোনা যাচ্ছে রণধ্বনি প্রতিরক্ষী বাহিনীর দামামায়।

    এখন রাস্তায় জমেছে ভীড়: দাঁড়িওয়ালা প্রতিরক্ষী জোয়ান বিড়বিড় করছে রাইফেল হাতে দুই বা তিনজন নারীর সাথে এখানে-ওখানে। জমতে জমতে মানব জোয়ার হয়ে উর্দ্ধগামী ছুটছে সকলে। তাদের সবার আগে, মিশেল দেখতে পায় পাহাড়টা, দিনের মৃদু আলোয় উজ্জ্বল চূড়াটা। চূড়ান্তে দাঁড়িয়ে, রণব্যুহে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি সৈন্যদল। তিনি এবং তার বন্ধুরা মারা যাবেন। এই নিদারুণ সত্যের উত্তেজনাটা প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর। হঠাৎ, মিশেলের মা এসে দাঁড়ায় সেই ভীড়ে তার পাশে। “লুইস, কত দিন ধরে তোমারে দেখি না! কই ছিলা তুমি? এই ঝামেলার মধ্যে তো পড়তে যাচ্ছো না তুমি, না?”

    যখন তিনি পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছেছেন, জনতা ততক্ষণে সৈন্যদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভিতরে চলে গিয়েছে। তাদেরকে ঘিরে ধরা হয়েছে। মহিলারা থিয়েরের সৈন্যদের জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে:

    “এই কামানগুলি কই নিচ্ছো, গা? বার্লিনে?”

    “না– ওরা এইগুলা নবাব নেপোলিয়নের কাছে ফিরায়ে নিচ্ছে গো!”

    “তোমরা আমাদের উপর গুলি করতে পারো, কিন্তু জার্মানদের উপর করতে পারো না, এহ?”

    ঘোড়ায় টানা কামানের ঘোড়া আর কামানের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়া এক রণচণ্ডীর সামনে লজ্জায় নতমুখে এক অফিসার অনুনয় করতে থাকে। “সরে দাঁড়ান, মা জননী, এদিকে আসেন।”

    “যা সর, কুলাঙ্গার,” তিনি পালটা চিৎকার করে বলেন, “গুলি কর আমারে আমার বাচ্চাগুলার সামনে!”

    “দড়িগুলা কেটে ফেলেন!” কেউ চিৎকার করে ভীড়ের পিছন থেকে। একটা ছুড়ি হাত থেকে হাতে পৌঁছে যায় কামান আটকে রাখা নারীটির হাতে। তিনি ঘোড়ার সাথে জুড়ে বাঁধা দড়িটা কেটে আলাদা করেন। জনতা গর্জে উঠে। 

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক.

    জেনারেল লেকোন্তে স্বয়ং স্বীয় উচ্চাসনে চড়ে হাজির হোন। উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত কর্তৃবাচ্যে তিনি হুঙ্কার করেন: “সৈন্যদল! অস্ত্র সাজো!”

    থমকে যায় সব। সৈন্যরা অস্ত্র সাজায়। তাদের মুখ রক্তশূণ্য। কেউ চিল্লায় উঠে, “গুলি কোরো না!” কিন্তু জনতা পিছু হটে না।

    “তাক করো!”

    এক সারি রাইফেল তুলে ধরা হয়। একজন নারী কাঁপছে; আরেকজন তার হাত শক্ত করে ধরে রাখে, উর্দিধারী জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কেটে। তাদের পিছনে, মিশেল আর তার বন্ধুরাও রাইফেল তুলে ধরে। তারা দেখতে পায় কিছু সৈন্যরাও কাঁপছে। 

    “চালাও গুলি!” এক মুহুর্তের জন্য সব স্তব্ধ।

    একজন অফিসার তার অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। বের হয়ে গেলেন সারি থেকে। “চুদি তোরে!”

    “সবাই রাইফেল ঘুরায় নাও!” আরেকজন চিৎকার করলো। এবং এই মুহুর্তটা মিশেলের সারাজীবন মনে থাকবে।

    এরপর দিন, নগর ভবনে উড়িয়ে দেয়া হয় লাল পতাকা – জনতার পতাকা, ১৮৪৮ সালেই যেটা ওড়ানো উচিৎ ছিলো। প্রহরা সমিতি এলাকার যাবতীয় প্রশাসনিক ভবনগুলিতে অবস্থান নিয়েছে। লেকোন্তেকে গুলি করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর অবশিষ্টাংশ সাথে নিয়ে থিয়ের আর তার শাগরেদরা উড়াল দিয়েছে নিকটবর্তী শহর ভার্সাইয়ে। তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে গেছে তাদের গ্রামের তালুকে। ভিক্টর হুগো পালিয়েছে বেলজিয়ামে। পূর্বদিক থেকে অপেক্ষমান জার্মান সেনারা দেখছে ফরাসি সরকার এই বিপ্লব ঠেকাতে পারে কিনা। তাদের ভয়, যা ছড়িয়ে পড়তে পারে সমগ্র ইউরোপে।

    প্যারিস কেবলমাত্র সেই সাধারণের হাতে যারা পরিচিত কেবলই একে অপরের কাছে। রহস্যজনক হলো, এইদিনের মতো এতো শান্তি এই শহরে আগে কখনো ছিল না। 

  • স্প্যানিশ বিপ্লবের মুক্ত নারীরা

    স্প্যানিশ বিপ্লবের মুক্ত নারীরা

    “আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা যেন ছিল ভাই-বোনের মতো। এদেশের পুরুষরা নারীদের কখনোই পূর্ণ মানবাধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসাবে গণ্য করেনি। আর এই ব্যাপারটাতে আমি সব সময়ই বিরক্ত হতাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একটা বিশাল পরিবর্তন। আমার মনে হয়, এই পরিবর্তন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাবে।”
    —রোনাল্ড ফ্রেজারের লেখা ‘দ্য ব্লাড অব স্পেইন’ বইয়ে মার্গোরিতা বালাগারের উক্তি

    ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে স্পেনের কৃষক-শ্রমিকদের অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। আর নারীদের জন্য তা ছিল  রীতিমতো ভয়াবহ! স্প্যানিশ নারীর প্রতি সেই সমাজ ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের দমনীয় ও অত্যাচারী। ১৯৩০-এর দশকের স্পেনের নারীদের পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার বেশিরভাগ মুসলিম মৌলবাদী দেশের নারীদের পরিস্থিতির মিল পাওয়া যেতে পারে। সেসময় নারীদের কোনো প্রকার স্বাধীনতা ছিল না। “বিয়ে ঠিক করার” মাধ্যমে তাদেরকে আরেকজনের কাছে সঁপে দেওয়া হতো। অবিবাহিত নারী কখনই কোনো পুরুষ সঙ্গী ছাড়া একা বের হতে পারতেন না।

    একজন সাধারণ পুরুষ কৃষকের এক দিনের গড় মজুরি ছিল ৩ পেসেটা। অথচ ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, সারাদিন কাজ করেও একজন নারীর জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১.৫ পেসেটা! বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের নামে যা করা হয়েছিল, সেগুলো নারীদের তেমন উপকারে আসেনি। যেমন, ১৯৩১ সালে রিপাবলিকান সরকার যখন ‘আটঘন্টা কর্মদিবসের’ আইন পাশ করে, তখন তার অর্থ ছিল: বিকেল ৫টার সময় বাসায় ফিরে নারীরা যেন সংসারের সব কাজকর্মও দেখতে পারেন!

    ১৯৩১-এর সরকার লিমিটেড ডিভোর্সের প্রথা চালু করে। নারীদের ভোটাধিকার এবং অল্প সময়ের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া শুরু করে। সেসময় স্পেনে যেসব ছোট ছোট নারীবাদী আন্দোলন দেখা যেত, তার বেশিরভাগই ছিল সংস্কারমূলক এবং মধ্যবিত্ত ও চাকুরীজীবি নারীদের উপর ভিত্তি করে। নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনগুলোর মধ্যে নারীদের ইস্যুটি আলোচনায় আসত খুব কম। তবে বড় একটি ঘটনা ঘটে ১৯৩৬ সালের মে মাসে, সামরিক অভ্যুত্থানের ঠিক আগ দিয়ে। মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার নৈরাজ্যবাদী নারীদের দু’টি ছোট গ্রুপ একীভূত হয়ে গঠন করে মুখেরেস লিবরেস (ফ্রি উইমেন) নামের একটি সংগঠন।

    সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়া হিসাবেই স্পেনে বিপ্লব শুরু হয়েছিল। প্রধানত অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিস্ট ইউনিয়ন, সিএনটি-র শ্রমিকরা এবং কিছু জায়গায় সোশ্যালিস্ট ইউনিয়ন ফেডারেশন, ইউজিটি-র শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানোর এই প্রতিক্রিয়া ছিল খুব স্বতঃস্ফূর্ত ও সাহসী। এর ওপর প্রবলভাবে ছিল নৈরাজ্যবাদী চিন্তাধারার প্রভাব, যেটি স্প্যানিশ শ্রমিক ও কৃষকদের মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

    সামরিক ক্যু-এর বিরুদ্ধে প্রাথমিক এই প্রতিরোধ ও যুুদ্ধের সব জায়গাতেই সমানভাবে ছিলেন নারীরা। অ্যান্টি ফ্যাসিস্ট মিলিশিয়ার অংশ হিসেবে তারা সামনের সারিতে লড়াই করেছেন পুরুষদের সঙ্গে। কিন্তু ১৯৩৬ সালের নভেম্বরে নারীদের ফ্রন্টলাইন থেকে সরে আসার নির্দেশ দেয় রিপাবলিকান সরকার। মাদ্রিদের যুদ্ধে অনেকে মারা যান। সেসময় নারীর কাজ, অবসর এবং নারীদের প্রতি মনোভাবে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আসে।

    শিল্প ও জমি কালেক্টিভাইজেশনের ক্ষেত্রে নারীরা সর্বস্তরে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তারা ঘরের কাজ ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন কলকারখানায় কাজের জন্য। তখন সময়টা ছিল বিপুল উত্তেজনা আর উৎসাহে ভরপুর। এবং এই বিপ্লবী উদ্যম ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো রিপাবলিকান অঞ্চলে। মুখেরেস লিবরেসের কাতালান আঞ্চলিক কমিটির সদস্য পেপেশিয়া কার্পেনা বলেছিলেন, “এমনকি আমি মরে গেলেও এমন অভিজ্ঞতা হাতছাড়া করতে চাইতাম না।”

    বিপ্লব পরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনগুলো বরাবরই বেশ নাটকীয় হয়! হাজার বছর ধরে পালিত নিয়ম কানুন, পুরানো প্রত্যাশা, স্বীকৃতি এবং আচরণের পদ্ধতিগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে, তবে রাতারাতি পরিবর্তন আসে না কখনোই। পরিবর্তন শুরু হয় আলাপ-আলোচনা থেকে। প্রায়ই দেখা যায়: কিছু জিনিস আমূল পরিবর্তনের জন্য পাড়ি দিতে হয় অনেক দীর্ঘ ও বিশৃঙ্খল পদ্ধতির তর্ক-বিতর্ক, মতবিরোধের পথ। ফলে, স্পেনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বিপ্লবের জন্য সব কিছু প্রস্তুত করা ছিল না।

    তেরেসার মত অঞ্চলে নৈরাজ্যবাদীরা সুসংগঠিত ছিল। সেখানকার টেক্সটাইল শিল্পে ১৯৩১ সাল থেকে নৈরাজ্যবাদী নারীদের একটি গ্রুপ ছিল। তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সমান বেতনের অধিকার অর্জন করেছিল। যদিও অনেক ক্ষেত্রে সিএনটি সম্পূর্ণ সমতার লক্ষ্য অর্জন করতে অক্ষম বা অনাগ্রহী ছিল। টেক্সটাইল শিল্পে, সাধারণত যেখানে কিনা নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মশক্তি ছিলেন, সেখানেও তারা সবচে কম মজুরি পেতেন।

    জমির ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি মনোভাব ছিল আরো অনগ্রসর। ফলে জমির কালেক্টিভাইজেশনের সময় নারীরা প্রথমবারের মতো আবিস্কার করে যে, তাদেরও সত্যিকার অর্থেই একটি কণ্ঠ আছে। যদিও তা সব সময় পুরুষদের তুলনায় সমান ছিল না। আরাগনের ম্যাজন ও মিরামেলের মত অনেক কালেক্টিভে নারীরা পুরুষদের সমান বেতন পেত। যদিও, সব জায়গায় চিত্রটি এমন ছিল না।

    কিছু কালেক্টিভে এটা মানা হতো যে, নারীরা নিজের আয়ে চলার অধিকার রাখে। যেটি সেসময়ের জন্য একটি অগ্রগতি ছিল। যদিও অধিকাংশ কালেক্টিভে চালু ছিল ‘ফ্যামিলি ওয়েজ’ ব্যবস্থা। আর এটি অবশ্যই বেশিরভাগ সময় পরিবারের প্রধান হিসেবে পুরুষের হাতেই দেওয়া হতো। শ্রমের সামাজিক বিভাজন তখনও চালুই থাকে। নারীদের কাজগুলো ছিল ‘নারীদের কাজ’। আর নারীরা যখন ‘পুরুষদের কাজ’গুলোও করতেন, তখনও তারা পারিশ্রমিক পেতেন নারী হিসেবে!

    অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও, নারী-পুরুষের সম্পূর্ণ সাম্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সিএনটি। ১৯৩৬ সালে সারাগোসা সম্মেলনে তারা ঘোষণা করেছিল যে, বিপ্লবের পর “অধিকার ও দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে উভয় লিঙ্গই সমান গুরুত্ব পাবে”। তবে বাস্তব চর্চার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৩৬ সাল পর্যন্তও সিএনটি তাদের নারী কমরেডদের সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে নিত না। লিঙ্গ বৈষম্য ছিল সাধারণ ব্যাপার। এটি মোকাবিলার জন্যই ১৯৩৬ সালের মে মাসে গঠন করা হয় মুখেরেস লিবরেস।

    মুখেরেস লিবরেসের লক্ষ্য ছিলো নারীর ক্ষমতায়ন ও নৈরাজ্যবাদী রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণের আত্মবিশ্বাস গড়তে ভূমিকা রাখা। নিজস্ব মুক্তির সংগ্রামে প্রত্যেক নারীকে সরাসরি যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেছিল। তারা নিজেদের ‘নারীবাদী’ বলে আখ্যায়িত করেনি কখনো; এমনকি এই সংগঠনের একজন সদস্য, সোলেদাদ এস্তোরাকের মতে, অনেকেই কখনো ‘নারীবাদ’ শব্দটিই শোনেননি! তাদের মতে, পুরুষ দ্বারা নারীর আধিপত্যের অবসান ঘটানো সকল প্রকার আধিপত্য বিলোপেরই একটা বিশেষ অংশ। তাদের বিশ্বাস ছিল: নারীর ওপর পুরুষের আধিপধ্যের অবসান ঘটানোর মাধ্যমে তারা অন্য ধরনের আধিপত্যেরও অবসান ঘটাতে পারবেন।

    ব্যক্তি নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো সংকীর্ণ নারীবাদীতার বদলে, তাদের বিশ্বাস ছিল সামগ্রিকভাবে মুক্তি অর্জন। একই একই সঙ্গে ছিল নৈরাজ্য ও মুক্তি অর্জনের বৃহত্তর সংগ্রাম। তবে তাদের সংগ্রামের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের মধ্যে নারীর অবমূল্যায়ন রোধে কাজ করা।

    মুখেরেস লিবরেসের কৃতিত্ব ও অর্জন:

    মাত্র দুই বছরের মধ্যেই মুখেরেস লিবরেস-এর সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩০ হাজারে। পুরো রিপাবলিকান স্পেন জুড়েই এই সংগঠনের অর্জন বিস্তর রূপ ধারণ করে। তাদের কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল: নারীশিক্ষা। ১৯৩৭ সালে বার্সেলোনায় তারা প্রতিষ্ঠা করেন নারীদের কলেজ, ‘কাসা দে লা দোনা’। ১৯৩৮-এর ডিসেম্বরের মধ্যেই এই কলেজে প্রতিদিনে ৬০০-৮০০ জন নারী যুক্ত হতে থাকে। বার্সেলোনা এবং মাদ্রিদের শিল্পক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তারা অসংখ্য স্কুল এবং কোর্স পরিচালনা করে। একই সাথে তারা কর্মক্ষেত্রেও নারী-পুুরুষের সমতার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

    তারা মাদ্রিদে একটি শ্যুটিং রেঞ্জ স্থাপনের মাধ্যমে সামরিক প্রশিক্ষণেও যুক্ত হয়েছিলেন। তেরেসা ও বার্সেলোনায় ম্যাটার্নিটি হাসপাতাল তৈরি ও নারী শিশুদের জন্য অসংখ্য স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাদের বিশাল অর্জন। এই বিদ্যালয়গুলো নৈরাজ্যবাদী শিক্ষাব্যবস্থার ধারণার উপর ভিত্তি করে উন্নয়ন ও অন্বেষণে বিশ্বাস করতো।

    মুখেরেস লিবরেস গর্ভপাত, গর্ভনিরোধ এবং বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছে, জয়লাভও করেছে। স্থানীয়ভাবে, কিছু সংখ্যক চাকুরীজীবি নারীর জন্য চাইল্ড কেয়ারের ব্যবস্থাও করেছিল তারা। যুদ্ধের বিস্তার বাড়ার সাথে সাথে অনেক সদস্য শরনার্থীদের আবাসন ও শিক্ষার জন্যও কাজ করেন।

    সর্বোপরি, মুখেরেস লিবরেস তাদের নিজেদের সংগ্রামের মাধ্যমে নারী মুক্তির লক্ষ্যেই এগিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং পিওইউএম (অ্যান্টি-স্টালিনিস্ট-লেনিনিস্ট) সবাই মিলিত হয়ে “নারী বিভাগ” স্থাপন করেছিল। সকলেই নারীদেরকে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে এবং তাদের নিজস্ব সংস্থায় নিযুক্ত করতে চাইছিল, তবে কেউই প্রকৃতপক্ষে নারী মুক্তিকে নিজেদের সংগ্রামেরই একটি লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত করেনি, যা একমাত্র মুখেরেস লিবরেসই করেছিল।

    স্পেনের নারীদের ভাগ্য সমগ্র বিপ্লবের সাথেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। তৎকালীন সরকার ও কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা সংগ্রাম স্থগিত হওয়ার কারণে নারীরাও পিছিয়ে পড়ে। সব মিলিশিয়া ও কালেক্টিভ ধ্বংসের সাথে সাথে তাদের ক্ষণস্থায়ী স্বাধীনতাও হনন করা হয়। ফ্রাঙ্কোর বিজয় এই হননের-প্রক্রিয়াকে কেবল পাকাপোক্ত করেছিল।

    বিপ্লব যে নারীদের জন্য সত্যিকার অর্থে কিছু লাভ এনেছিল, তা নিশ্চিত। স্প্যানিশ বিপ্লবের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে, বিপ্লবীরা নারী স্বাধীনতাকে উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করতে পারে নি। এই স্বাধীনতাকে বিপ্লব শেষ হওয়া পর্যন্ত কিংবা কেবল বিপ্লবের ‘নারী বিভাগ’ পর্যন্ত রেখে আসা যায়নি।

    যেই লড়াই শুরু থেকেই সকলের জন্য স্বাধীনতা এবং সাম্য অর্জনের লক্ষ্য রাখে না, সেই লড়াই আর যাই হোক, বিপ্লব নয়।

    ________

    মুখেরেস লিবরেস নিয়ে কনর ম্যাকলখলিন-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক এই আর্টিকেলের অনুবাদ করেছেন রিদাকা জান্নাহ। লেখাটি দ্য ঢাকা এপোলগ-এও প্রকাশিত হয়েছে।

  • কিউবার সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে ব্ল্যাক রোজ মায়ামির সদস্যদের বক্তব্য

    কিউবার সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে ব্ল্যাক রোজ মায়ামির সদস্যদের বক্তব্য

    অনুবাদ: অনিক সন্ধি

    [কিউবার ঘটনাপ্রবহ কিছুদিন ধরেই সারাদুনিয়ায় আলোচিত৷ বর্তমান পরিস্থিতিতে আ্যনার্কিস্টরা একই সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আরোপ করা অর্থনৈতিক অবরোধ, কিউবায় সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যাবতীয় কৌশলের বিরোধিতা করছে এবং কিউবার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন প্রণালীর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে৷ কিউবান শ্রমজীবী জনগণ নিজেরাই তাদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক হোক, বিভিন্ন আ্যনার্কিস্ট গ্রুপের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে এই অবস্থান ই সাধারণভাবে লক্ষণীয়।

    বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ‘ব্ল্যাক রোজ মায়ামি’র আ্যানার্কিস্টদের একটি বিবৃতির অনুবাদ আমরা বাংলায় প্রকাশ করছি।

    মায়ামির আ্যানার্কিস্টরা জানাচ্ছে, খোদ মায়ামিতেই যুক্তরাষ্ট্রের কিউবা অভিযানের পক্ষে ডানপন্থী ডায়াসপোরা কমিউনিটি অবস্থান নিয়েছে। এর বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার আহ্বান জানিয়েছে তারা। এছাড়াও কিউবার বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপট ও বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়ে পর্যালোচনা করেছে তারা। – সম্পাদক]

    মূল বক্তব্য

    গত ১০ই জুলাই রাতে সান্তিয়াগো দে কিউবার পালমা সোরাইনো শহরে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের খবর দিয়ে কিউবার বর্তমান অবস্থার শুরু ঘটে। দীর্ঘদিনের খাদ্য ঘাটতি, ব্ল্যাকআউট ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে দিয়েই লোকজন পাত্র–কড়াই হাতে নিয়ে রাস্তায় পদযাত্রা শুরু করে।

    বছরের শুরুতে কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকা অবস্থার মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপাতির অভাবে সাহায্যহীন মানুষ ঘরে ও হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করার মতো খবর ইন্টারনেটে ছড়াতে থাকে। কিউবার জনগণ একে অপরকে ও সারা বিশ্বের মানুষকে জানাতে শুরু করে তাদের ওষুধপত্রের অভাবের কথা, দিনের পর দিন নূন্যতম পরিমাণের এবং অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারিত পণ্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কথা; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কোভিড সংকট মোকাবিলার অক্ষমতার কথা। ১১ই জুলাইয়ের প্রথম প্রহরে বিদ্রোহের দাবানল সম্পূর্ণ দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে যায়। এটি নিঃসন্দেহে দ্বীপটির কয়েক দশকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি।

    কিউবান জনতা আজকে যে সংকটের মুখে পড়েছে তা শুধুমাত্র জাতি–রাষ্ট্রের আধিপত্যই নয়। সাথে আছে সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিদ্বন্দ্বী বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সংকটও। সম্প্রতি মার্কিন অবরোধ, রেমিটেন্সের উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা ও “মানবীয় হস্তক্ষেপ” এই ব্যাপারটাকে আরও পরিষ্কার করে। জনতার উপর অত্যাচার সব রাষ্ট্ররই লিগ্যাসি, কিউবা আর বিশেষ কী?

    আমরা নৈরাজ্যবাদী হিসেবে চাই সব গণবিদ্রোহই শ্রেণিশোষণ ও রাষ্ট্রীয় আধিপত্য থেকে শেষ মুক্তির বিপ্লবী সংগ্রামে পরিণত হোক। যাইহোক, কিউবার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কর্তৃত্ববাদী শিকড় এবং মার্কিন সরকার কর্তৃক প্রায় সমস্ত রকমের বিরোধিতার পদ্ধতিগত আত্মসাৎ এর দরুণ শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন কিউবায় বাস্তবিক অর্থে নেই বললেই চলে। এটি স্বায়ত্বশাসিত আন্দোলন তৈরিকরণের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    সূত্র: ইন্টারনেট

    আর বর্তমানের সামাজিক ও মানবিক সংকটের বিকাশের ভবিষ্যদ্বাণী করার পরিপক্ক সময় এখনো আসেনি। তবুও যদি এমন হয় যে গণআন্দোলনটি একটি সাধারণ বিদ্রোহে পরিণত হতে থাকে তাহলে কিউবান রাষ্ট্র ও কমিউনিস্ট পার্টি তার শেষ ধাপে যেতে বসেছে। আমরা বিশ্বাস করি যে জনগণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও তারা তাদের স্বায়ত্বশাসন রক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু কিউবান রাষ্ট্রীয় দমন–নিপীড়ন এবং ডানপন্থীদের দ্বারা আন্দোলন হাতিয়ে নেয়ার কথা চিন্তা করেও আমরা শঙ্কিত; এর উভয়ই শুরু হয়েও গিয়েছে।

    যেমন, ১৩ই জুলাইতে মায়ামির প্রধান এক মহাসড়ক কয়েক ঘণ্টা অবরোধের মাধ্যমে কিউবান–মার্কিন ডায়াস্পোরা মার্কিন সেনাবাহিনীর কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য দাবি করছিল। এসব আমাদের প্রশ্ন করায় যে রেজিম পরিবর্তনের দ্বারা কিউবার জনতার কী লাভ হবে। কোনো স্ব–সংগঠিত জনসংগঠনই যেখানে কিউবায় নেই সেখানে অনুমান করা যায় যে জনগণের এই সংগ্রাম পুঁজিবাদী ও ডান–পক্ষের স্বার্থের জন্য ব্যবহৃত হবে।

    কিন্তু রেজিমটি পরাজিত হলে যা আশা করা যায়:

    ১। কিউবান জনশ্রেণি নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক শক্তিতে সক্ষম এক সামাজিক এক্টর হিসেবে আত্মস্বীকৃতি দিবে— যা ৬০ বছর ধরে কয়েক প্রজন্ম প্রত্যাশা করেনি।

    ২। তবে সম্ভবত বর্তমান রেজিমের বদলে এক নিও–লিবারাল ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক প্রশাসন পাব যারা শুধুমাত্র গণতন্ত্রের ছদ্মবেশ ধরবে। উল্টোভাবে এরকম পরিস্থিতে শোষিতশ্রেণি হয়তো সংগঠিত হবার জায়গা পাবে। এর মাধ্যমে তারা বহুল প্রয়োজনীয় শ্রেণিচেতনা, সত্যিকারের বিপ্লবী প্রবণতা ও চর্চার বিকাশ সুযোগ পেতে পারে। তবে আমরা এ সম্পর্কেও সচেতন যে তখন এমন এক অবস্থা বিরাজ করবে যে কিউবান বিপ্লবের দ্বারা আনিত নানা ভালো সামাজিক পরিবর্তন ধ্বংস করে বা ক্ষয়ে দেয়া হবে। এই অত্যাচারী রেজিমের বিরুদ্ধে যে বীর জনশ্রেণি লড়ছে তাদেরকেই সে ব্যবস্থার সবচেয়ে খারাপ অংশের ভার বইতে হবে।

    এসব কিছু চিন্তা মাথায় নিয়েই বলতে হবে যে সামনের পথ খুবই কণ্টকময়। আমাদের ভালোবাসা ও সংহতি রইল কিউবান জনতার জন্য। আমরা আন্দোলনকালীন সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবি করছি। সকল খুন ও শারীরিক নিপীড়নের ঘটনার স্বচ্ছতা দাবি করছি। ইন্টারনেট সেবা ফিরিয়ে দেবার দাবি করছি এবং গণহত্যা সামিল অবরোধ উঠিয়ে নেবার দাবি করছি। আমাদের আশা তোমাদের উপর রইল। জনগণের সামাজিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক মুক্তির জন্য প্রত্যেক প্রচেষ্টা, প্রত্যেক বিদ্রোহ, প্রত্যেক বিপ্লব, প্রত্যেক আন্দোলনকে আমরা স্যালুট জানাই।

    আরিব্বা লেস কে লুচান!

    (সংগ্রামকারী জিন্দাবাদ!)

  • স্প্যানিশ বিপ্লব ১৯৩৬: মুক্তি, অধিকার ও সাম্যের লড়াই

    স্প্যানিশ বিপ্লব ১৯৩৬: মুক্তি, অধিকার ও সাম্যের লড়াই

    ১৯৩৬ সালে, গৃহযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে, স্পেনের শ্রমজীবী জনতা যে বিপ্লবটি সংগঠিত করেছিলেন, তাকে যদি বিগত ১০০ বছরের শ্রম-মুক্তি আন্দোলনের সবচে প্রানবন্ত ফসল বলা হয়; তাহলে মোটেও বাড়িয়ে বলা হয় না। স্পেনের, বিশেষ করে কাতালোনিয়া ও অ্যারাগন অঞ্চলের কৃষক-শ্রমিকরা নৈরাজ্যবাদী মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে এমন সব সামাজিক প্রকল্প পরিচালনা করেছিল; যা সে আমলের সবচে আশাবাদী বিপ্লবীও কল্পনা করতে পারেনি। এই বিপ্লবী সময়টাতে অ্যানার্কো সিন্ডিকালিস্ট ও শ্রমিকরা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রর মাধ্যমে কয়েকশ কালেক্টিভ গড়ে তোলেন এবং স্ব-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেগুলো পরিচালনা করেন। শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও কালেক্টিভগুলো স্প্যানিশ বিপ্লবকে এমনভাবে চিহ্নিত করে যা তাকে পূর্বের সকল সামাজিক নীরীক্ষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা স্থান দেয়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও কালেক্টিভগুলো গড়ে তোলার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে স্পেনের তখনকার সর্ববৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন, সি.এন.টি এবং স্পেন-পর্তুগালের অ্যানার্কিস্ট সংগঠন, এফ.এ.আই-এর অ্যাক্টিভিস্টরা। কয়েক হাজার বছরের রাজতন্ত্রী, সামন্তবাদী ও পরবর্তী পুঁজিবাদী অত্যাচার, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পেনের প্রলেতারীয় জনতার ন্যায়, সম্মান, মুক্তি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সি.এন.টি তার কর্মনীতি হিসেবে ধারণ করে।

    এই আকাঙ্ক্ষা ও কর্মনীতি বাস্তব রূপ পায় তাদের অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিস্ট ও মুক্তিকামী কমিউনিস্ট প্রোগ্রামে। কয়েক দশক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর তাদের সে প্রোগ্রাম বাস্তব রূপ পায় ১৯৩৬ সালের বিপ্লবে। সে সময়ের কালেক্টিভগুলোর মধ্য দিয়ে। এসব কর্মকাণ্ডের মূল চিন্তাধারা অ্যানার্কিস্টদের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা পেলেও, বাস্তবে এগুলো পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তুলেছিল শ্রমজীবী মানুষেরা। তাঁরাই নিজেদের মধ্যে গণতান্ত্রিক উপায়ে চর্চা করেছেন স্ব-ব্যবস্থাপনার নানা উপায়-কৌশল। শুধু তাই নয়, তত্ত্ব থেকে বাস্তব চর্চায় যাওয়ার সময় যেসব নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়েছে; সেগুলোর অবাক করা সৃজনশীল সমাধানও এসেছে এই শ্রমজীবী মানুষদের থেকেই। সেখানে আলাদা করে কোনো তাত্ত্বিক বা বুদ্ধিজীবীর প্রয়োজন হয় নি। 

    শ্রমের জাতীয় কনফেডারেশন[mfn]স্প্যানিশ ভাষায়ঃ Cofederecion Nacional del Trabajo – CNT। ইংরেজিতেঃ National Confederation of Labour. [/mfn] – সি.এন.টি-র বিপ্লব পূর্ববর্তী সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ লাখের মতো। স্পেনের সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন তো বটেই, এটি তখনকার দুনিয়ার সবচে বড় ইউনিয়নগুলোরও একটি ছিল। সি.এন.টি-র গঠনতন্ত্রে তাদের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট অক্ষরে লেখাঃ “সামাজিক বিপ্লব ও মুক্তিকামী কমিউনিজম।”[mfn]CNT – The Founding Congress of The Spanish Confederation of Labor.[/mfn] তাদের পন্থা ছিল: অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিজম অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেনীর ইউনিয়ন দ্বারা বিপ্লবী কর্মকান্ডের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীকে সামাজিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করা এবং শ্রমিক শ্রেণীর নিজ তত্ত্বাবধানে বিপ্লব সম্পন্ন করা।

    সি.এন.টি-র এক্টিভিস্টরা নিজেদের এই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন বিগত বেশ কয়েক বছরের বিরামহীন আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: ১৯১৯ সালের ৮ ঘন্টা শ্রমের আন্দোলন। এ আন্দোলনের সফলতা হিসেবে বিশ্বের প্রথম ৮ ঘন্টার কর্মদিবস আইন পাশ করা হয়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহের ঘটনা ছিল ১৯৩৪ সালের আস্তুরিয়ার খনি শ্রমিকদের বিদ্রোহ। সেখানে শ্রমিকরা নিজেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাধীন বলে। পরে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে সেই বিদ্রোহ দমন করা হয়। সি.এন.টি-র ইতিহাসে রক্তক্ষয়ী এই অধ্যায়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল হাজার হাজার নৈরাজ্যবাদীকে। 

    তবে এসব আন্দোলন ও আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ১৯৩৬ সালের জুলাইয়ে এসে যায় সেই পরমক্ষণ, যার জন্য এই মুক্তিকামী জনতা অপেক্ষা করেছেন এবং রক্ত ঝরিয়েছেন শত শত বছর ধরে। 

    ১৯৩৬ সালের জুলাইয়ে, স্পেনের নির্বাচিত রিপাবলিকান সরকারের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান শুরু হলে প্রথম প্রতিরোধটি এসেছিল সিএনটি-র এই বিপ্লবী জনতার কাছ থেকে। তাৎক্ষণিকভাবে সেনা অভ্যুত্থান রুখে দিয়ে তারা নিজেদের স্বপ্নের সমাজ গঠন ও পরিচালনার উদ্যোগ নেন। ১৯৩৬ সালের এই বিপ্লবের পর, বার্সেলোনা-সহ স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শত শত ফ্যাক্টরি, গ্রাম, আবাদ-জমির নিয়ন্ত্রন নেয় শ্রমিক নিজেরাই।

    বিপ্লবী পরিস্থিতি এসে যাওয়া মাত্রই অ্যানার্কিস্ট সংগঠনগুলো কলকারখানা ও ক্ষেত-খামারের দখল নিয়ে নিয়েছিলেন। এবং সেগুলো পরিচালনা করতে শুরু করেছিলেন স্ব-ব্যবস্থাপনার নীতিতে। ওপর তলার কারো আদেশের অপেক্ষায় না থেকে তাঁরা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের মাধ্যমে কারখানা পরিচালনা ও উৎপাদন শুরু করেন। বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল সেসময়ের বার্সেলোনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: “আমার জীবনে দেখা প্রথম এই এক শহর, যেখানে শ্রমিকেরাই তার কর্তা। প্রত্যেক বিল্ডিং ছিল শ্রমিকদের দখলে এবং তার  বাইরে ঝোলানো এনার্কিস্টদের লাল-কালো পতাকা।”[mfn]George Orwell – Homage to Catalonia (p.2)[/mfn]

    অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র

    স্প্যানিশ বিপ্লবের সেই সময়টিতে বার্সেলোনাসহ কাতালোনিয়ার অনেক জায়গায় চলেছে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের চর্চা। যেটি এখনকার প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের থেকে একেবারেই আলাদা। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ভোটাররা নির্দিষ্ট সময় পর পর কোন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে ভোটের মাধ্যমে তাদেরকে শাসন করার অনুমতি দেন। পরবর্তী ভোটের আগ পর্যন্ত সে ব্যক্তি নিজ ইচ্ছা মত শাসনকার্য চালাতে পারে। এর মধ্যে তিনি দুর্নীতি, অবিচার, অন্যায় ইত্যাদির মধ্যে জড়িয়ে পড়লেও ভোটারদের তাকিয়ে দেখা ছাড়া করার কিছুই থাকে না। তাত্ত্বিকভাবে পরবর্তী ইলেকশন চক্রে সে ব্যক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ থাকলেও আমরা সবাই জানি তা কতটুকু বাস্তবসম্মত। ক্ষমতাসীন ব্যক্তি আইন পাশের মাধ্যমে, কারচুপি করে বা ক্ষেত্রবিশেষে শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই নিজের ক্ষমতার মেয়াদ অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাড়িয়ে ফেলতে পারে। এতেও নাগরিকদের তাকিয়ে থাকা ছাড়া করার কিছু থাকে না কেননা তার ক্ষমতা সুরক্ষিত করার জন্য আছে পুলিশ ও সেনাদল।

    অন্যদিকে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা, যা ক্ষমতাকে জনগণ থেকে এরকম আলাদা করে ফেলতে পারে না। ক্ষমতার চর্চা ও পরিচলনা জনগণের মাধ্যমেই হয়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রে গ্রাম-নগর, ও কর্মস্থানের নিয়ন্ত্রন জনগণের হাতে থাকে। নগর, গ্রাম, ও কর্মস্থল কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য জনগনই নানা এসেম্বলি নির্মান করে, যার সদস্য সে গ্রামের বা শহরের বাসিন্দা বা কর্মস্থলের সদস্যরাই হয়। তারা সে এসেম্বলিতেই তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার মাধ্যমে নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ও পলিসি বানান। সে সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত নানা কমিটি বা কাউন্সিল থাকে। এ কাউন্সিল বা কমিটির সদস্য হয় নির্বাচিত ডেলিগেট।

     ডেলিগেট ও প্রথাগত প্রতিনিধির পার্থক্য হল, প্রথাগত প্রতিনিধি অন্যের নামে নিজের ইচ্ছা মত শাসন-পরিচালনা করেন আর একজন ডেলিগেটের কাজ তাকে দেয়া নির্দিষ্ট দায়িত্ব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এই কাজের বিবরণ আসে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট থেকে। এভাবে জনগণের তাদের পারিপার্শ্বিকের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসে। দেশের সত্যিকারের মালিক  জনগণ হয়। জনসংখ্যাবহুল শহরগুলো সাধারণত অনেক মহল্লা ও পাড়া পড়শির ভিত্তিতে অ্যাসেম্বলি তৈরি হয়। অনেকগুলো অ্যাসেম্বলি ফেডেরেটেড হয়ে শহরের একটি সেকশন গঠন করে ও অনেকগুলো সেকশন ফেডেরেটেড হয়ে শহর ফেডেরেশন গঠন করে। 

    শহর ও গ্রামের ফেডেরেশন মিলে গঠিত হয় জাতীয় ফেডেরেশন। এভাবে একটি দেশের মানুষ ঘনিষ্টভাবে যোগাযোগ রাখতে পারে ও যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে কোনো কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়াই। জনবিচ্ছিন্ন কোনো সরকারের কাছে স্বাধীনতা আত্নসমর্পণ এবং তাদের জীবন ও পারিপার্শিকের উপর নিয়ন্ত্রন হারানো ছাড়াই। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হল ক্রমে স্বাধীনতা হরণ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র হল ক্রমে স্বাধীনতা নির্মাণ প্রক্রিয়া।

    স্প্যানিশ শ্রমিকদের স্ব-ব্যবস্থাপনা

    ১৯৩৬ সালের জুলাইয়ে, বিপ্লবের পর বার্সেলোনার মতো বড় শিল্পায়িত শহর সংগঠিত হয়েছিল এই অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও নৈরাজ্যের নীতিতে। যেখানে বিশাল সংখ্যক শ্রমিক জনতা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও স্ব-ব্যবস্থাপনার নীতিতে নিজেদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। 

    স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শ্রমিকেরা এমন অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কয়েক দশক ধরে। তারা এসব চিন্তা বাস্তবে প্রয়োগ ঘটানোর নানা কৌশলও নানা সময়ে ভেবেছেন, প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে, ১৯৩৬ সালের বিপ্লব সংগঠনের সাথে সাথেই শহর ও গ্রামের কলকারখানা, যন্ত্রপাতি, পরিবহন-যাতায়তের, এমনকি রিটেইল ও হোলসেল এন্টপ্রাইজগুলোও সেলফ-ম্যানেজমেন্ট বা স্ব-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের শ্রমিক কাউন্সিল, কমিটি বা ইউনিয়নের আওতায় নিয়ে আসে। এ বিপ্লবী পরিবর্তন শুধু স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই সীমিত ছিল না। স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া থেকে শুরু করে আল্কয় পর্যন্ত সি.এন.টি নিয়ন্ত্রিত ফ্যাক্টরি ছিল। আর এ সব কিছুই চলছিল একটি ঘোরতর গৃহযুদ্ধের মধ্যে। 

    শহরের প্রলেতারিয়দের পাশাপাশি কৃষক ও ভূমি-শ্রমিকেরাও (যাদেরকে গ্রামাঞ্চলের প্রলেতারিয় বলা যায়) তাদের ভূমি ও বাসস্থানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। শিল্প বিপ্লবের আগে, স্পেনের কৃষি সম্পূর্ণভাবে ছিল বড় বড় জমিদারদের হাতে। সেসব জমি ছিনিয়ে নিয়ে সিএনটির কৃষকরা গড়ে তোলেন বিশ্বের অন্যতম সফল যৌথ কৃষি প্রকল্প। গ্রামীন শ্রমিকদের এমন সব বিপ্লবী উদ্যোগ কখনো কখনো শহরের শ্রমিকদের থেকেও সুদূরপ্রসারী হয়েছে। কোনো কোনো গ্রামে মুদ্রার বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে।[mfn] Gaston Leval – Collectives in the Spanish Revolution (1975) (p.44) [/mfn] স্পেনের এই কৃষক-শ্রমিকরা প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন সেই কমিউনিস্ট স্লোগানের: “প্রত্যেকের সামর্থ্য ও প্রত্যেকের চাহিদা অনুযায়ী”। যেখানে সবার শারিরীক ও মানসিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ নেয়া হত ও সবাই ঐকতানে প্রয়োজনীয় উৎপাদন করে সবার শারিরীক ও মানসিক চাহিদা অনুসারে পণ্য সরবরাহ করা হতো। কোন কোন কালেক্টিভ, পয়েন্ট ভিত্তিক উৎপাদন ও বিপনন ব্যবস্থা চালু করে[mfn] Gaston Leval – Collectives in the Spanish Revolution (1975) (p.58)[/mfn] যা এত সমৃদ্ধ ও চিন্তনশীল ছিল যার দৃশ্য গ্রামবাসীদের পশ্চাৎপদ মনে করা বুদ্ধিজীবীদের মুখ বন্ধ করে দেয়। কৃষি কালেক্টিভগুলো এত সুষ্ঠুভাবে শ্রমিকেরা পরিচালনা করেন যে কৃষি পণ্য উৎপাদন ৫ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায় যুদ্ধবিদ্ধস্ত অবস্থার মাঝেও[mfn]Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939 (p.525)[/mfn]। পরে তা এমন এক পর্যায়ে চলে আসে যে এই কালেক্টিভগুলোই পুরো রিপাবলিকান স্পেনের খাদ্যের জোগান এবং যুদ্ধের জন্য রশদের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিল। 

    এসব কিছুর কোনটিই একদিনে হয় নি। শত শত বছর ধরে বিরাজমান বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার প্রপাগান্ডা ও শিক্ষায় দীক্ষিত কোন দেশের জনগণ একদিনে অ্যানার্কিস্ট বা কমিউনিস্ট হতে পারে না। সি.এন.টি-র কয়েক দশকব্যাপি নিরলস সংগ্রাম ও এক্টিভিজম জনগণের মনে নৈরাজ্যবাদ ও সমাজবাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি নিয়ে আসে। বিপ্লবের টান টান উত্তেজনার আগে মানুষ এটি জিজ্ঞেস করত না যে নৈরাজ্য বা সমাজবাদ সম্ভব কিনা, বরং জিজ্ঞেস করত “কবে?” সি.এন.টি এবং সম্পৃক্ত সকল নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করত কাজ ছাড়া কথা মূল্যহীন ও কথা ছাড়া কাজ বিভ্রান্তিকর। তারা কাগজ-কলমের পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। ধর্মঘটের মাধ্যমে শ্রমজীবী জনতার নিজেদের উৎপাদনী ক্ষমতার উপর জোর বিশ্বাস আনা, শ্রমিক কাউন্সিল ও ফেডেরালবাদের মাধ্যমে কোন সরকার বা কর্তৃত্ব ছাড়া নিজের জীবন ও ভাগ্য নিজের হাতে নিয়ন্ত্রনে আনার অভিজ্ঞতা ও অভ্যাস তৈরির মাধ্যমে সি.এন.টি জনগণের কাছে নৈরাজ্যবাদের প্রতি আস্থা যোগায়। 

    শাসকশ্রেণীর শোষণমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে শ্রমিকদের সচেতন করে তোলার কাজটি অনেক আগে থেকেই করছিল সিএনটি। শ্রমিকদের মধ্যেও গড়ে উঠেছিল নিজেদের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা। এগুলোর মাধ্যমে ১৯৩৬ সালের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের ভিত্তি তারা তৈরি করে রেখেছিল অনেক আগেই। সি.এন.টি ও এফ.এ.আই নিজেরা ১০৩টি পত্রিকা প্রকাশ ও বিতরণ করত। সেই সাথে ছিল অসংখ্য সাময়িকী ও পরিস্থিতি ভিত্তিক ইশতেহার-ঘোষণা।[mfn] Juan Gomez Casas – Anarchist Organisation, The History of The F.A.I (p. 15)[/mfn] সি.এন.টি অন্যসব নৈরাজ্যবাদীদের মতই শ্রমজীবী জনগণের নিজেদের বিপ্লবের উপর বিশ্বাস করত। তারা প্রথম আন্তর্জাতিকের “শ্রমজীবী জনতার মুক্তির সংগ্রাম শ্রমজীবী জনতার দ্বারাই করতে হবে” স্লোগানের বিশ্বাসী ছিলেন। যে বিপ্লব জনগণের হবে না সে বিপ্লবে আগের বুর্জোয়া শাসনের সব অন্যায়, অবিচার, শাসন ও শোষণ পুনরায় ফিরে আসবে – এ নীতিতে বিশ্বাস করত।

    বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ 

    স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে ফ্যাসিস্ট ও ন্যাশনালিস্ট শত্রুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধও গড়ে তুলেছিল সি.এন.টি, এফ.এ.আই ও লিবারটেরিয়ান ইয়ুথের মিলিশিয়া বাহিনী। ফ্যাসিস্ট বাহিনী ও ফ্যাসিস্টদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী থাকলেও ফ্যাসিস্ট প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভাবে শহরের বুর্জোয়া, গ্রামের লুপ্তপ্রায় সামন্ত সর্দার ও স্পেনের তখনকার বিশাল ভূমি-মালিক চার্চের স্বার্থ রক্ষার প্রচেষ্টা ছিল। স্পেনের জনগণকে কয়েক হাজার বছর ধরে গুড়িয়ে-মুচড়িয়ে খাবার যাঁতাকল ভেঙে যাবার শেষ মুহূর্তেই শাসক-শোষক শ্রেণী তাকে বাঁচাবার জন্য এক শেষ প্রচেষ্টা স্বরূপ ফ্যাসিস্ট হায়নাদের স্পেনের জনগণের উপর লেলিয়ে দেয়। ‘স্পেনের বীর’ খেতাব প্রাপ্ত এনার্কিস্ট বুয়েনাভেন্তুরা দুররুতি এর মতেঃ “বুর্জোয়া শ্রেনী যখন দেখে তার হাত থেকে ক্ষমতা ছুটে যাচ্ছে তখন সে তার বিশেষাধিকার ধরে রাখার জন্য ফ্যাসিবাদকে টেনে আনে।”[mfn] Felix Morrow – Revolution and Counter-Revolution in Spain (1963) [/mfn] শহরের ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, গ্রামের সামন্ত সর্দারগণ ও চার্চের নেতারা ছিল এই ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার ভিত। তারাই ছিল এই ফ্যাসিস্ট বাহিনীর তহবিলের প্রথম উৎস। তিন দশকের বুর্জোয়া অব্যবস্থাপনা, চার্চ কেন্দ্রিক দুর্নীতি, গ্রামীন জনতাকে লুট করার নীতির ঘোর প্রতিরোধ করে যায় সংগঠিত শ্রমজীবী জনতা। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল সি.এন.টি। এসব প্রতিবাদ-প্রতিরোধের রূপ দেখা পর্যায়ক্রমিক বিদ্রোহ ও গণঅভ্যুত্থানে। শাসক-শোষক শ্রেণী ক্রমেই বুঝে উঠছিল যে তাদের ক্ষমতার আয়ু আর বেশি দিন নেই। এই জন্য তারাও সেটি আঁকড়ে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে যাচ্ছিল।

    স্পেনের উদারবাদী রাজনীতীবিদরা মনে করেছিল জার্মানি-ইতালির মত ফ্যাসিস্ট উত্থান প্রতিহত করা সম্ভব সংশোধনবাদী রাজনীতির মাধ্যমে। তারা তখনও জার্মানি ও ইতালির উদারবাদী রাজনীতির পতনের কারণ বুঝে উঠতে পারেনি। কিন্তু সেটা এনার্কিস্টরা ঠিকই জানত এবং অনেক আগের থেকেই জানত। ফ্যাসিজমের উত্থান সম্পূর্ণভাবে  উৎপাদন যন্ত্র ও এর সাথের সামাজিক সম্পর্কের সাথে জড়িত। আদতে বাইরে ফ্যাসিবাদ জাতি, বর্ণ, শ্রেনী বিভাজন রক্ষার নাম দিয়ে রাজনীতি করলেও তার মূল কার্যক্রম শাসক শ্রেণীর বিশেষাধিকার ও তাদের উৎপাদন যন্ত্রর  মালিকানার অধিকার রক্ষা। এই বিশেষাধিকার ও মালিকানার অধিকারের প্রশ্নই স্পেনের শ্রমজীবী মানুষ তুলেছিল।

     ১৯৩৬ এর ফ্যাসিস্ট উত্থানের আগেই স্প্যানিশ অ্যানার্কিস্টরা বুঝে গিয়েছিল যে গৃহযুদ্ধ আসন্ন। “হয় ডানপন্থি পার্টিগুলো ইলেকশনে জিতবে ও শ্রমজীবী জনতা বিপ্লব ডাকবে, না হয় বাম-রিপাবলিকানরা জিতবে ও গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।”[mfn]Juan Gomez Casas – Anarchist Organisation, The History of The F.A.I (p. 154)[/mfn] – এ ছিল এফ.এ.আই এর ভবিষ্যদ্বাণী। যুদ্ধ একটা হবেই, হয় সেটা গৃহযুদ্ধ না হয় বিপ্লবী যুদ্ধ। তাদের দাবী ছিল: ফ্যাসিবাদকে রুখতে হলে উৎপাদন যন্ত্রের মালিকানা পালটানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই। হয় দেশের কল-করখানা, খনি, বাঁধ, আবাদী জমি স্পেনের জনতা নিয়ন্ত্রনে নিবে তাদের নিজেদের কাউন্সিল ও ইউনিউনের মাধ্যমে সরকারের কোন রকম হস্তক্ষেপ ছাড়া ও এর দ্বারা ফ্যাসিজম এর পতন ঘনিয়ে আসবে; নয়তো বুর্জোয়া শ্রেণীর নিয়ন্ত্রন বহাল থাকবে এবং সেটি ফ্যাসিস্ট আগাছাকে পানি দিয়ে বড় করবে। কার্যত স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় এটিই ঘটেছিল।

    যেসব অঞ্চলে শ্রমজীবী জনতা শহর নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছিল সেখানে ফ্যাসিবাদ ফ্র্যাঙ্কোর আক্রমণের শুরুতে মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগই পায় নি। তবে বাস্তবতা হল বাম-রিপাবলিকান সরকারই শ্রমিকদের আত্নরক্ষা ও শহর নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা দিয়েছিল। ফ্র্যাঙ্কোর আক্রমণের খবর যখন ছড়াতে শুরু করে তখন বিভিন্ন শহরের শ্রমিকেরা সরকারের কাছে আত্নরক্ষার জন্য অস্ত্রের জন্য অনুরোধ করে। বিপ্লবের ভয়ে সরকার তাদের অস্ত্র দেয়নি ও সাথে ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থানের সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্তে দুর্বলতার পরিচয় দেয়। এছাড়াও অনেক অঞ্চলের গভর্নররা নিজেরাই ফ্যাসিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় সাথে সাথেই তাদের অঞ্চল ফ্যাসিস্টদের হাতে তুলে দেয়। এভাবে স্পেনের দক্ষিণ ও পশ্চিমের অনেক শহর ফ্যাসিস্ট হানাদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কিন্তু সি.এন.টি ও এফ.এ.আই  যুদ্ধের আসন্নতা জেনে গোপনভাবে স্পেনের উত্তরে ও পূর্বের অঞ্চলগুলোতে অস্ত্র ভান্ডার লুকিয়ে রাখে। ফ্যাসিস্ট আক্রমণের খবর পাওয়ার পর পরই শ্রমিকদের নিকট তারা অস্ত্র বণ্টন করে স্পেনের সামরিক ও অর্থনৈতিক অর্থে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো রক্ষা করে সেসব অঞ্চলে ফ্যাসিস্ট অভ্যুত্থান প্রতিহত করে। 

    স্পেনের সর্ববৃহৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল শহর বার্সেলোনা অ্যানার্কিস্ট শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে ফ্যাসিস্টদের দ্রুত অভ্যুত্থানের স্বপ্ন সম্পূর্ণরূপে বানচাল হয়ে যায় ও একইসাথে স্প্যানিশ বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধের প্রারম্ভ হয়। স্পেনের লিবারেল-বাম-রিপাবলিকান সরকারের ইতিহাস আমাদের দেখিয়ে দেয় যে ফ্যাসিস্ট বিপদ মোকাবেলা কখনোই ক্ষমতায় থাকা লোকদের পাল্টানোর দ্বারা সমাধান হবে না। আদতে ফ্যাসিবাদের প্রশ্ন মৌলিকভাবে উৎপাদনের যন্ত্রের মালিকানা ও এর সাথের সামাজিক সম্পর্কের প্রশ্ন। 

    স্পেনের গৃহযুদ্ধে ডান ক্যাম্পে ছিল সেনাবাহিনী, কার্লিস্ট[mfn] কাউন্ট ডন কার্লোসের বংশ স্পেনের রাজ ক্ষমতার অধিকারী – এ মতবাদে বিশ্বাস করা দল। [/mfn], ফ্যালাঞ্জিস্ট[mfn] JONS ফ্যাসিস্ট পার্টির সদস্য। [/mfn], রাজতন্ত্রী[mfn] আলফোন্সিন বংশ স্পেনের রাজ ক্ষমতার অধিকারী – এ মতবাদে বিশ্বাস করা দল। [/mfn], সামন্ত সর্দার, বুর্জোয়াজি, ক্যাথলিক চার্চের পাদ্রী ও নেতাগণ। তাদের সম্মিলিতভাবে ন্যাশনালিস্ট বলা হলেও ফ্র্যাঙ্কো হিটলার ও মুসোলিনির সামনে নিজেকে ফ্যাসিস্ট বলত ,আবার  ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সামনে নিজেকে বলত কন্সার্ভেটিভ। ফ্যাসিস্টবিরোধী ক্যাম্পে ছিল রিপাবলিকান, অ্যানার্কিস্ট, অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট, বলশেভিক পি.সি.ই, মার্ক্সিস্ট পি.ও.ইউ.এম সমাজতান্ত্রিক পি.এস.ও.ই, বাস্কের  জাতীয়তাবাদী ইত্যাদি। অনেকে এ যুদ্ধকে “বাম বনাম ডান” যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করলেও ইতিহাসবিদগণ ব্যাপারটিকে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। ইতিহাসবিদ অ্যান্টনি বিভরের মতেঃ “স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধকে আজপর্যন্ত বাম-ডানের কোন্দল হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে খুবই ভুলভাবে সরলীকরণ করা হয়েছে। আরো দুইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ অক্ষের সংঘর্ষের উৎপত্তি ঘটেঃ রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীকরণ বনাম আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসন এবং কর্তৃত্ববাদ বনাম ব্যক্তির স্বাধীনতা।”[mfn] Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939 (p.48)[/mfn] 

    বলশেভিক কমিউনিস্টদের বিশ্বাসঘাতকতা

    বিভর জাতীয়বাদী পক্ষের শ্রেণী স্বার্থে একত্রিত হওয়া ও সেই ক্যাম্পের সব দলেরই কেন্দ্রীয়-রাষ্ট্রবাদী, কর্তৃত্ত্ববাদী ও ডানপন্থী হওয়া লক্ষ করেন ও বলেন যে “জাতীয়বাদী পক্ষ এ জন্য তার প্রতিপক্ষের থেকে বেশি সুসঙ্গত ছিল।” রিপাবলিকান পক্ষের দিকে লক্ষ করে তিনি বলেন যে তারা ছিল “অসঙ্গতির মহামিশ্রণ” ও তারা “একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখত।” ফ্যাসিস্টরা যেখানে সবাই কর্তৃত্ববাদী ও কেন্দ্রবাদী ছিল সেখানে বামের মধ্যে “কমিউনিস্টরাও” (পি.সি.ও.ই; এনার্কিস্টরাও কিন্তু লিবার্টেরিয়ান কমিউনিস্ট ছিল তাই পি.সি.ও.ইকে এজন্য তারা কমিউনিস্ট না ডেকে বলশেভিক ডাকত।) ছিল ফ্যাসিস্টদের মত “কর্তৃত্ববাদী ও কেন্দ্রবাদী, যাদের বিরোধিতা করত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের অধিকারবাদী ও লিবার্টেরিয়ানরা (মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রী) ।”[mfn]Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939 (p.49)[/mfn]

    এই অসঙ্গতি দেখা যায় গৃহযুদ্ধের একদম প্রথম থেকে। স্পেনে বলশেভিকরা কোন মজবুত ভিত্তি কখনো গড়ে তুলতে পারেনি। স্পেনের বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক মুভমেন্টের নেতৃত্ব প্রায় সম্পূর্ণরূপে অ্যানার্কিস্টরাই দিয়েছিল। তবে যুদ্ধের সময় রিপাব্লিকানদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, যেহেতু  রিপাবলিকানদের কাছে অস্ত্র ও রসদের সবচেয়ে বড় বিক্রিকর্তা ছিল তারা। তবে স্তালিন আন্তর্যাতিক সংহতি স্বরূপ এরূপ কিছু করেনি। ফ্যাসিস্টদের সরবরাহ দিচ্ছিল নাৎসি জার্মানি ও ফ্যাসিস্ট ইতালি। স্পেনে জার্মানি যাতে ঘাটি না গড়ে পারে ও স্ট্রেট অব জিব্রালটার যাতে হিটলারের নিয়ন্ত্রণে না এসে ইউরোপীয় জল-যাতায়তের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এটাই ছিল স্তালিনের সবচেয়ে বড় চিন্তা। সমাজতন্ত্রী ভাতৃত্ববোধের জন্য না করেও নিজের স্বার্থের জন্যও যদি স্তালিন স্পেনে ফ্যাসিস্ট বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের জন্য কাজ করে যেত তাহলে তাকে সাধুবাদ জানান হত। কিন্তু স্তালিন একইসাথে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সাথে মিত্রচুক্তির জন্য কুটনীতি করছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স নন-ইন্টারভেনশন  নামের নীতি রেখে ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে পরোক্ষভাবে সহোযোগিতা করছিল কারণ সেসময় হিটলার ও মুসোলিনি ফ্র্যাংকোর পক্ষে প্রত্যক্ষ অবস্থান নিয়েছে। ফ্রান্সের শাসক শ্রেণীর ভয় ছিল স্পেনে সমাজবাদীদের বিজয় হলে তার দেশেও বিপ্লবের আগুন জ্বলবে। স্তালিন তাই তাদের কথায় সায় দিয়ে অস্ত্র বিক্রি খুবই সীমীত আকারে রেখেছিল। তবে এ পলিসির ভয়াবহ ফলাফল দেখা যায় স্পেনের অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ক্যাম্পে। স্পেনের বিপ্লবের প্রথম মূহুর্তেই সি.এন.টি এর কয়লা খনি শ্রমিকেরা ইংরেজ পূঁজিবাদীদের মালিকানাধীন কয়লা খনি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেয়। এ নিয়ে ইংরেজ পূঁজিবাদীগণ খুবই বিচলিত ছিল ও সাথে বিচলিত ছিল তাদের প্রতিনিধি ব্রিটিশ সরকার। স্পেনের বিপ্লবী শ্রমিকেরা ভূমি ও কল-কারখানা নিয়ন্ত্রনে নেয়ার ফলে বহির্বিশ্বে শাসক শ্রেণী যে উদ্বেগে পড়েছিল তা স্তালিন শান্ত্ব করাতে চেয়েছিল। স্পেনে বিপ্লব নেই ও স্পেনের শ্রমিকদের দ্বারা দখলকৃত সব সম্পত্তি বিদেশি মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে এরূপ আশা পি.সি.ই বিদেশি বুর্জোয়াদের দিচ্ছিল। এর জন্য শুরুর থেকে স্তালিনবাদীরা লিবারেল-বুর্জোয়া রিপাবলিকানদের বাদে অন্য সব দলের সাথে কোন্দল শুরু করেছিল। 

    বিভর বলেনঃ “আশ্চর্যজনকভাবে ব্যক্তিগত মালিকানার সবচেয়ে স্পষ্টভাষী রক্ষাকর্তা লিবারেল রিপাবলিকানরা ছিল না – ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও তার কাতালান সহায়ক পি.এস.ইউ.সি। দুই দলই কমিন্টার্নের লাইন বরাবর বিপ্লবকে ঢাকার চেষ্টা করছিল।”[mfn] Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939[/mfn] বিপ্লব হবে কিন্তু যুদ্ধের পর! তারা এরূপ স্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছিল যা বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দলগুলোর জন্য খুবই অসম্মানজনক ছিল। দুররুতি এ সম্পর্কে বলেনঃ “আমরা একই সাথে যুদ্ধ ও বিপ্লব করছি। মিলিশিয়ারা ভূমি, ফ্যাক্টরি, রুটি ও সংস্কৃতির জন্য লড়ছে। কোদাল ও রাইফেল দুইটাই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”[mfn] Abel Paz – Durruti In the Spanish Revolution (1996)[/mfn] তিনি অন্য এক জায়গায় বলেনঃ “হিটলার ও মুসোলিনি রাশিয়ার লাল সেনার থেকে আমাদের বিপ্লব নিয়ে বেশি চিন্তিত। আমরা জার্মানি ও ইতালির শ্রমিকগণকে আমাদের ফ্যাসিবিরোধী প্রতিরোধ দিয়ে উজ্জীবিত করছি।”[mfn] The Toronto Daily Star এর Pierre van Passen এর কাছে দেয়া ইন্টারভিউ থেকে। (5 August 1936) [/mfn] 

    সুতরাং স্তালিনবাদীদের সাথে অন্য সব বাম দলের সংঘর্ষের সূত্রপাত এখান থেকেই। অ্যানার্কিস্ট ও পি.ও.ইউ.এম ছিল বিপ্লবের জন্য ও বলশেভিকরা ছিল স্তালিনের জন্য। স্তালিনের স্বার্থ যখন স্পেনের জনতার স্বার্থের বিপরীতে যাচ্ছিল তখনও তারা স্তালিনের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল। যুদ্ধ শেষ দিকে তারা অসংখ্য এনার্কিস্ট, মার্কিস্ট ও সোশালিস্ট এক্টিভিস্টদের হত্যা করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা শহীদ ছিলেন আন্দ্রে নিন – পি.ও.ইউ.এমের নেতা। তাঁকে স্তালিনীয় পুলিশ তাদের বানানো গোপন টর্চার চেম্বারে টর্চার করে মেরে ফেলে। তিনি এককালে ট্রটস্কির সেক্রেটারি ছিলেন বলে ও নানা মিথ্যা অজুহাতে তাঁকে ও পুরো পি.ও.ইউ.এমকে ট্রটস্কিবাদী অ্যাখা দেয়া হয়। কিন্তু আসলে পি.ও.ইউ.এমকে ট্রটস্কি নিজে সমালোচনা করে।[mfn] Pierre Broué – Trotsky and The Spanish Revolution (1967) [/mfn] এছাড়াও তাদের ট্রটস্কিবাদী হবার কোন প্রমাণ আজ পর্যন্ত মিলেনি। “১৯৩৩ এর আগেই ট্রটস্কির সাথে আন্দ্রে নিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়”[mfn] Keith Hassel – Trotsky and The POUM। লেখাটি ব্রিটিশ মার্ক্সিস্ট জার্নাল Revolutionary History এর Summer 1988 এডিশনে প্রকাশিত হয়। [/mfn]- লিখেন কিথ হ্যাসেল। বিভর এ সম্পর্কে বলেনঃ “স্তালিনিস্টরা দাবী করত যে পার্টিটি ‘ট্রটস্কিবাদী’ ছিল। কিন্তু আসলে তা সত্য নয়। সোভিয়েত ইউনিওনের লেফট-অপোজিশনের সাথে তাদের বেশি মিল ছিল।”[mfn] Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939 (p.70)[/mfn] তবে স্তালিনিস্টদের কাছ থেকে সবচেয়ে ভয়ংকর ও যুদ্ধকালীন-একতা বিধ্বংসী অভিযোগ আসে যখন ওরা পি.ও.ইউ.এম-কে ফ্যাসিস্টদের সাহায্যকারী ডাকা শুরু করে। জোর্জেস সোরিয়া ছিলেন একজন ব্রিটিশ স্তালিনিস্ট প্রতিনিধি যিনি পি.ও.ইউ.এম-কে ট্রটস্কিবাদী ও ফ্যাসিস্টদের সাহায্যকারী হিসেবে দেখানোর জন্য “ফ্র্যাঙ্কোর সেবায় ট্রটস্কিবাদীরা” নামে একটি মনগড়া রিপোর্ট বানান। ১৯৩৮ সালে বার্সেলোনাতে পি.ও.ইউ.এম-কে ট্রাইবুলনালে তদন্ত করার পর যখন প্রমাণ মেলে যে তাদের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ বানোয়াট, সোরিয়া নিজের ভুল স্বীকার করে বলেনঃ “পি.ও.ইউ.এম নেতৃবৃন্দের গেসটাপো ও ফ্র্যাঙ্কোর প্রতিনিধি হবার যে অভিযোগ ছিল তা মনগড়া বললেও কম বলা হবে। এ অভিযোগের পক্ষে বিন্দুমাত্র প্রমাণ বের করা সম্ভব হয়নি।”[mfn] Lawrence and Wishart সংকলনকৃত Georges Soria এর Trotskyism in The Service of Franco. (p.1)[/mfn]

    পি.ও.ইউ.এম স্পেনের সবচেয়ে বড় মার্ক্সবাদী দলগুলোর মধ্যে একটি ছিল। তারা শেষ অবধি শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবকে রক্ষার জন্য লড়ে যান। কিন্তু স্তালিনিস্টদের এত খুন, হত্যা, গুম, টর্চার ও বিপ্লব-বিরোধীতা কোন কাজেই আসল না কেননা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রিত ইন্ডাস্ট্রি সরকার জোরপূর্বক ছিনিয়ে যাওয়ার পর শ্রমিকেরা সম্পূর্ণ মনোবলহীন হয়ে যায় ও যুদ্ধের ন্যাযতাকেই প্রশ্ন করা শুরু করে। তবুও অ্যানার্কিস্টরা ফ্যাসিস্ট গণহত্যা আশু জেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার আহবান জানায় ও স্তালিনীয় কমান্ডের আওতায়ই যুদ্ধ চালিয়ে যায়। কিন্তু মনোবলহীনতা, রিপাব্লিকান সরকারের বাজে রণ-স্ট্র্যাটেজি,সামরিক নেতৃবৃন্দ অজ্ঞতা ও অক্ষমতা, সরকারের দ্বারা অর্থনীতির অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ফ্যাসিস্টদের বিজয় ত্বরান্বিত করে। যেই শ্রমিক নিয়ন্ত্রিত ক্যাটালোনিয়া দেখে জর্জ অরওয়েল আবেগে আপ্লুত হয়েছিল, সে ক্যাটালোনিয়া স্তালিনবাদীদের বুটের নিচে চলে গিয়েছিল। সে ক্যাটালোনিয়ায় ফ্র্যাঙ্কো বাহিনী ঢুকে ১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে। সরকারের স্পেনের জনগণের প্রতি শেষ অপমান স্বরূপ ফ্র্যাঙ্কোর কাছে গোপনে আত্নসম্পর্ণের জন্য যায়। কিন্তু ফ্র্যাঙ্কোও তাদের অপমান করে তা নাকোচ করে। মাদ্রিদের শেষ রক্ষায় নামে স্পেনের শ্রমিকরা। “নো পাসারান!” – তারা প্রবেশ করতে পারবে না! “ভিভা মাদ্রিদ সিন গোবিরেনো!” – সরকারহীন মাদ্রিদ জিন্দাবাদ! স্লোগান মুখে নিয়ে মাদ্রিদের জনতা মাদ্রিদের শেষ রক্ষার জন্য শেষ ব্যারিকেড গড়ে। কিন্তু তাদের না ছিল অস্ত্র-গোলাবারুদ, না ছিল রসদ। সরকার অ্যানার্কিস্টদের খাদ্য কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার পর ও খাদ্য বিপনন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রনে নেয়ার পর দুর্নীতির জন্য প্রথমবারের মত মাদ্রিদ ভুখা যায়।[mfn] Anthony Beevor – The Battle For Spain – The Spanish Civil war 1936 – 1939 [/mfn] অবশেষে ২৮ মার্চ ১৯৩৯ ফ্যাসিস্ট বাহিনী মাদ্রিদে প্রবেশ করলে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ ও স্প্যানিশ বিপ্লবের ইতি ঘটে।  

    স্প্যানিশ বিপ্লব একইসাথে যেমন আজকের প্রজন্মের বিপ্লবী ও অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য এক দৃষ্টান্ত- ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মালিকানা ও শ্রমিক শ্রেণীর আত্ন-নিয়ন্ত্রন স্থাপনার এক উজ্জ্বল ও  দুর্দান্ত উদাহরণ, তেমনি তা এক সতর্কবার্তা – আমরা মিত্র হিসেবে কাদের নিব? বিপ্লব আগে, না গৃহযুদ্ধ আগে? স্প্যানিশ বিপ্লবের ইতিহাস এসব প্রশ্নের উত্তর চিন্তা করতে আমাদের গভীরভাবে প্রণোদনা দেয়। স্প্যানিশ বিপ্লব প্রমান করে যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধ যুদ্ধ ও উৎপাদনের মালিকানার প্রশ্ন একই সূত্রে গাঁথা, প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র সবসময় জনগণের বিপ্লবের বিরূদ্ধে থাকবে ও সরকারের ক্ষমতা বদলানোর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা সম্ভব না। আশা করছি আজকের মুক্তিকামী যোদ্ধাগণ স্প্যানিশ বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও অ্যাক্টিভিস্ট জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাবে।

  • ‘তত্ত্ব করা’র মানে সবার আগে আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে তত্ত্বের দিক থেকে বোঝা

    ‘তত্ত্ব করা’র মানে সবার আগে আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে তত্ত্বের দিক থেকে বোঝা

    দিল্লির প্রথিতযশা বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ (CSDS)-এর ফেলো এবং ভারতীয় বাঙালি চিন্তক আদিত্য নিগামের কাজ সম্পর্কে জানতে পারি গত বছর, বোধিচিত্তের সুবাদে। নিগামের লেখাপত্র বোধিচিত্তের নজরে আনেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ স্বাধীন সেন। বোধিচিত্ত এবং শ্রদ্ধেয় স্বাধীন সেনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

    গত বছর করোনা মহামারির প্রথম ঢেউ আঘাত হানার একেবারে শুরুর দিকেই Kaflia.online–এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে নিগামের চার–পর্বের প্রবন্ধের কিস্তি। এই চার–পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের প্রথম দুই কিস্তি, আমার অনুবাদে প্রকাশিত হয় বোধিচিত্তে (নিগাম ২০২০ক) এবং পরবর্তীতে অরাজে (নিগাম ২০২০খ)। শেষ দুই পর্ব আর গত বছর অনুবাদ করা হয়ে ওঠেনি। ইন্ডিয়াসহ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে নিগামের কাজ বহুল সমাদৃত এবং পর্যালোচিত হলেও, আমার বা আমাদের জন্য গত বছরও তিনি ছিলেন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত তাত্ত্বিক। তা সত্ত্বেও, তার প্রবন্ধ অনুবাদ করতে গিয়ে তার কাজ সম্পর্কে আমি আগ্রহী হয়ে ওঠি। বিশেষত পুঁজি ও পুঁজিবাদ, তত্ত্ব, সেক্যুলারিজম, মডার্নিটি, সাবলটার্নিটি, উন্নয়ন নিয়ে নিগামের কাজের গভীরতায় বেশ চমৎকৃত হই। গতবছরই প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ বই Declonizing Theory: Thinking across the Traditions; এই বইটি পড়ে এবং প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে যৌথভাবে নিগামের প্রকল্প “Doing Theory” সম্পর্কে অবগত হয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই আদিত্য নিগামের একটি সাক্ষাৎকার নেব। আদিত্য নিগামের কাছে সেই প্রস্তাব রাখতেই তিনি সানন্দে রাজি হন। এ বছরের এপ্রিলে এই সাক্ষাতকারের জন্য তাকে যখন প্রশ্নগুলো পাঠিয়েছিলাম, দিল্লিতে তখন করোনা মহামারির কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর মধ্যেও নিগাম এই সাক্ষাৎকারের জন্য প্রেরিত আমার প্রশ্নগুলোর সাথে লিপ্ত হয়েছেন। এজন্য তার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

    সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের বিউপনিবেশায়ন নিয়ে নিগাম বর্তমানে কাজ করছেন। কেবলমাত্র পশ্চিমা তত্ত্বের চর্চা কিংবা ‘অ–পশ্চিমা’ সমাজে পশ্চিমের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ক্যাটাগরিসমূহকে সর্বজনীন ধরে নিয়ে তার নানাবিধ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা কিংবা পশ্চিমের ‘ক্রিটিক’ করাকেই নিগাম ও তার সহ–তাত্ত্বিকরা নিজেদের কাজ মনে করেন না। তারা মনে করেন বিভিন্ন চিন্তা ঐতিহ্যের মধ্যে গতায়াতের মাধ্যমে ‘অ–পশ্চিমা‘ সমাজই হতে পারে doing theory তথা “তত্ত্ব করা”র ক্ষেত্র।

    তত্ত্ব নাকি অনুশীলন, আগে তত্ত্ব পরে অনুশীলন, অনেক তত্ত্ব হয়েছে এবার অনুশীলনের পালা; এমন নানাবিধ যান্ত্রিকতাকে ছাপিয়ে তারা বলছেন: The point is to change the way we do theory (Nigam 2020e)। “তত্ত্ব করা” প্রকল্পে তারা তত্ত্বকে সমাজে এমনভাবে গ্রোথিত করতে চান যেন তত্ত্বকে অনুশীলন থেকে কিংবা অনুশীলনকে তত্ত্ব থেকে আলাদা করে ভাবা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তত্ত্ব নির্মাণের ভিন্ন পদ্ধতিই তারা প্রতিষ্ঠা করতে চান। (Banerjee, Nigam & Pandey 2016)

    এছাড়াও নিগাম পুঁজির সর্বজনীনতা , গ্লোবায়নের সিলসিলা, ‘অ–পশ্চিমা’ অভিজ্ঞতায় পুঁজির দার্শনিকতার স্বরূপ উদঘাটন প্রকল্পেও লিপ্ত।

    শ্রিলংকা, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন তাত্ত্বিকদের সাথে ‘post-national condition’ সংক্রান্ত কাজেও নিগামের সক্রিয়তা লক্ষণীয়। আদিত্য নিগামের কাজের সাথে বাংলাদেশের ক্রিটিক্যাল চিন্তাজগতকে পরিচয় করিয়ের দেয়ার সূত্রপাত হতে পারে এই সাক্ষাৎকার।

    আরিফ রেজা মাহমুদ, তানভীর আকন্দ, সহুল আহমদের সাথে বিচিত্র রকমের চিন্তার আদান–প্রদান ও ধারাবাহিক কথোপকথনের প্রভাব আমার পক্ষে অস্বীকার করা অসম্ভব। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন ফর দ্যা আর্টস–এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর কবি অরুন্ধতী ঘোষের প্রতি। বেশ কিছু দিনের জন্য আদিত্য নিগামের সাথে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, এই সময়ে নিগামের সাথে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারে অরুন্ধতী ঘোষ সহায়তা করেছেন অকাতরে। এছাড়াও হাসিবউদ্দিন হুসাইন, শ্রবণা শফিক দীপ্তি, শাহীন খান, কাজী তাফসিন, ডালিয়া চাকমা, ফরিদুল হক, নাঈমুল ইসলাম নয়ন, ইমরান ইমন, লোপা ভৌমিক, ইফতেখার রুমি, রিবাতুল ইসলাম, মোস্তাকিম বিল্লাহ মাসুমসহ যারা আমার দৈনন্দিনতার অংশ হয়ে আছেন, তাদের সবার প্রতি আমার ঋণ ক্রম–বর্ধমান:

    “আমি অকৃতি অধম ব’লেও তো কিছু

    কম করে মোরে দাওনি…”  

    ধন্যবাদান্তে,
    সারোয়ার তুষার

     

    আদিত্য নিগাম

    মূল সাক্ষাৎকার

    সারোয়ার তুষার: গত বছর মহামারি শুরু হওয়ার পর Kaflia.online–এ মহামারি, জৈব–রাজনীতি এবং ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ (Life after capitalism) সংক্রান্ত চার কিস্তির ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখেছেন আপনি (Nigam 2020a,b,cd)। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’কে আমরা কী করে আমাদের বর্তমানতার মধ্যে ধর‍তে পারি? আপনি যেহেতু মনে করেন না যে, ‘ইতিহাসের অনিবার্য যুক্তি’ (inevitable logic of history) অনুযায়ী পুঁজিবাদের পতন ঘটবে এবং সমাজতন্ত্র অবধারিতভাবে ধরা দেবেই। সেক্ষেত্রে ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ কথাটার মাধ্যমে সেই ইতিহাসের ক্রম–বিবর্তনের নিয়তিবাদী যুক্তি বা বিশ্বাসের ফাঁদেই আমরা পড়ছি কিনা?

    আদিত্য নিগাম: এই প্রশ্নটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ বলতেই আমাদের মাথায় সমাজতন্ত্রের কথা চলে আসে। আর আমাদের কল্পনায় সমাজতন্ত্র কতকগুলো চলতি মার্ক্সবাদী ধারণার সঙ্গে যুক্ত, কারণ এই আদর্শের একমাত্র মূর্ত রূপ আমরা তারই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে দেখতে পেরেছি। মার্ক্সবাদী তত্ত্ব আমাদের শিখিয়েছে যে সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের পরের অবস্থা, এবং পুঁজিবাদকে অতিক্রম করেই মানব–সমাজ সমাজতন্ত্রের দিকে এগোতে পারে। মার্ক্সবাদের এই বক্তব্য ইতিহাস সম্বন্ধে তার দর্শনের সাথে গভীরভাবে জড়িত। এই ইতিহাস–দর্শনে সমাজের ক্রম–বিকাশের একটা নির্দিষ্ট পথ আছে যেটা তাকে সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদের পর সমাজতন্ত্রের দিকে নিয়ে যায়।

    মার্ক্স ও এঙ্গেলসের সময়ে, ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়ে, উনিশ শতকের নানান শ্রমিক অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে বোধ হয় এই ধারণাটি পুষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। ১৮৪৫ থেকে শুরু করে, বিশেষ করে ১৮৫০ ও ১৮৬০–এর দশকে লেখা মার্ক্সের রচনাগুলোর মধ্যে এই অভিজ্ঞতাকেই একটা তত্ত্বগত ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। উৎপাদন–পদ্ধতি ও অর্থনীতিকে সমাজের ভিত হিসেবে ধরে নেওয়া হয় এবং এই তত্ত্বের মধ্যে উৎপাদনের শক্তির ক্রম–বিকাশের ভূমিকা এক অর্থে প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণেই মার্ক্স ও এঙ্গেলস আশা করেছিলেন যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইউরোপের বিকশিত দেশগুলোতেই আগে ঘটবে। অথচ বিপ্লবটা ঘটে গেল রাশিয়াতে ও তার পরবর্তীকালে অন্যান্য ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে, যেখানে উৎপাদন শক্তির ও অর্থ–ব্যবস্থার তেমন বিকাশ ঘটেনি। লেনিন এর ব্যাখ্যা করলেন অন্যভাবে— যেখানে বিপ্লবের কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক বিকাশ বা পুঁজিবাদের বিকাশের আর তত গুরুত্ব রইল না। তার বক্ত্যব্য ছিল যে সাম্রাজ্যবাদের উদয়ের পর গোটা পৃথিবী একই সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলে বাঁধা এবং এই chain টি ভাঙবে সেখানে যেখানে সেটা সবচেয়ে দুর্বল— অর্থাৎ যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলো সব চেয়ে বেশি তীব্র। এটা লক্ষণীয় যে এই ব্যাখ্যাটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন, বা পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক বিকাশের প্রশ্নটার পরিবর্তে এক অন্য তত্ত্ব উত্থাপন করল যেটা সরাসরি রাজনৈতিক। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রয়োজন এখন আর উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বের কারণে দেখা না দিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক কারণে সামনে উঠে আসছে। ফলে আধুনিক শ্রমিকশ্রেণি আর তার চালিকা শক্তি থাকল না, কারণ যে সমাজগুলোতে বিপ্লব হলো সেখানে শ্রমিকশ্রেণি নগণ্যই ছিল। তখন উঠে এলো শ্রমিক–কৃষক মৈত্রী বা ঐক্যের প্রশ্ন, যার সম্বন্ধে আমি পরে আরও বলব।

    মার্ক্সবাদ ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা–ভাবনাতে এই হস্তক্ষেপ এক বিশাল বড় পরিবর্তনের সূত্রপাত করতে পারত, কিন্তু সেটা হলো না। লেনিনসহ সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে চীন ও অন্যান্য সব দেশের চিন্তাবিদরা সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের বিপ্লব করতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমাজ বিকাশের স্তর ডিঙিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়— অতএব তাদেরকেও পুঁজিবাদের মতনই দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটাতে হবে। কৃষির জায়গা ক্রমশঃ শিল্পকে নিতে হবে, এটা যেন অবধারিত এবং পুঁজিবাদের মধ্য দিয়ে যদি সেটা বাস্তবায়িত না হয়ে থাকে, তাহলে ক্ষমতায় আসার পর কমিউনিস্টদেরই সেই কাজটা করতে হবে। এই ধারণার ফল কী হয়েছে তা তো আমরা সর্বত্র দেখেছি এবং দেখছি।

    এসব কারণে আমি ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ এর কথা বলেছি— সমাজতন্ত্রের নয়। বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্রের ও মার্ক্সবাদের এই ইতিহাস থেকে অনেক কিছু শেখার ও বোঝার আছে ঠিকই কিন্তু আজ আমাদের ‘উত্তর–পুঁজিবাদী জীবনের’ কথা যে পরিস্থিতির মধ্যে ভাবতে হচ্ছে এবং যে কারণে ভাবতে হচ্ছে তা একদম আলাদা। এখানে প্রয়োজন নতুন তত্ত্বের, নতুন চিন্তা–ভাবনার ও নতুন ইতিহাস–দর্শনের। ইতিহাসের ক্রম–বিবর্তনের নিয়তিবাদী যুক্তি বর্জন করতে গেলে মার্ক্সবাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা অবশ্যই নিতে হবে কিন্তু তার মধ্যে আবদ্ধ থাকলে চলবে না।

    এবার প্রশ্ন হলো ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ এর অর্থ কী এবং সেটা আমরা কীভাবে ভাবব? আমার মতে আজকের দিনে, বিশেষ করে আমাদের মতো এশিয়া বা আফ্রিকার সমাজগুলোর অবস্থান থেকে পুঁজিবাদের পরের জীবনের কথা ভাবতে গেলে সর্বপ্রথম এটা বুঝতে হবে যে আজকে পুঁজি গোটা পৃথিবীর জন্য— মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, প্রকৃতি, এমনকি জড়বস্তুর ক্ষেত্রেও একটা বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে দুটি কথা স্পষ্ট করতে চাই। প্রথমত, আমি যখন ‘পুঁজিবাদের পর’ কথাটা ব্যবহার করছি তার মানে এই নয় যে গোটা পৃথিবীতে, সমস্ত দেশের সমস্ত ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমার যে লেখাগুলির উল্লেখ আপনি করেছেন তাতে এই বিষয়টা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা করেছি যে এখনো পৃথিবীর বৃহৎ অংশে অ–পুঁজিবাদী সম্পর্কই বর্তমান। কিন্তু এটা আসলে উৎপাদন পদ্ধতির প্রশ্নই নয়, কারণ আজ প্রত্যেকটা জীবন (ও উৎপাদন) পদ্ধতিই পুঁজির কবলে পড়েছে। কোনোটাই বাদ পড়ে না। দ্বিতীয়ত, এই কারণেই পুঁজির দ্বন্দ্ব আজ শুধু ‘আধুনিক শ্রমিকশ্রেণির’ সঙ্গে নয়, বরঞ্চ ‘খোদ জীবন’ (life itself)-এর সঙ্গে। আদিবাসী বা indigenous people সহ মানব সমাজের সমস্ত অংশের সঙ্গে তো বটেই; তার সংঘাত আজ পশুপাখি, জন্তু জানোয়ার, গাছপালা, প্রকৃতি— সবার সাথে। এইভাবে দেখতে গেলে ‘পুঁজিবাদের পর’–এর অবস্থা কোনো বিশেষ সামাজিক স্তরের সাথে যুক্ত নয়, হতে পারেও না। এখানে পুঁজিবাদের পরের জীবনের সঙ্গে ইতিহাসের কোনো ‘অনিবার্য যুক্তি’র সম্পর্ক নেই। বড়জোর এটাকে আমাদের বর্তমানের রাজনৈতিক তাগিদ বা দাবি বলা যেতে পারে।

    প্রসঙ্গত বলে রাখি, এভাবে দেখলে ‘জৈব–রাজনীতির’ বা biopolitics-এর অর্থও আজ অনেক বেশি ব্যাপক। ফুকো জৈব–রাজনীতি বলতে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন তার সম্পর্ক মূলত ‘সরকার’–এর কার্যকলাপের সঙ্গে ছিল। আজকে কিন্তু পুঁজির কার্যকলাপের প্রসঙ্গে ‘biopolitics’কে অন্যভাবে বুঝতে হবে।

    সারোয়ার তুষার: আপনি আপনার চার–পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে ‘নয়া–বিপ্লব’–এর রূপরেখা আলোচনা করেছেন (নিগাম ২০২০খ)। একে আপনি বলছেন, ‘নয়া শাতিরীয়–কোপার্নিকাসীয় বিপ্লব’। সিরিয়ান জ্যোতির্বিদ ইবনে আল শাতিরের মডেল ধরে পরবর্তীতে পোলিশ জ্যোতির্বিদ কোপার্নিকাস পৃথিবী যে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে এবং সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে এই ধারণাকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং নতুন প্যারাডাইম তথা আদিকল্প প্রস্তাব করেছিলেন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটা ছিল এক যুগান্তকারী বিপ্লব। একইভাবে, এই মডেলের মর্মবাণীকে সামাজিকবিদ্যা এবং দার্শনিক ক্ষেত্রে অনুসরণ করে আমরা বলতে পারি, মানুষ পৃথিবীর কেন্দ্রে নয়। এই বিবৃতি প্রকৃতির উপর মানুষের ‘সার্বভৌমত্ব’, আধুনিক পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব এবং সাংস্কৃতির উত্থান ও আধিপত্য, অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রচলিত বোধ–বুদ্ধিকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

    আমাদের এই সাক্ষাতকারের পাঠকদের জন্য বিষয়টা আরেকটু বিস্তারিত করতে চাই। এই গ্রহের সার্বিক জীব ও জড় সত্তাকে মানুষের যজ্ঞ ও প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ ভাবা, প্রকৃতিকে মানুষের উপনিবেশে পরিণত করা কিংবা পোষ মানানোর জ্ঞানকাণ্ড আঠারো শতক থেকে মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের জগতের প্রাণ–ভোমরায় পরিণত হয়ে আছে। এই প্রবল মনুষ্যকেন্দ্রীক চিন্তাবিশ্বে অর্থনীতি হচ্ছে বৃহত্তর সেট এবং প্রকৃতি যেন তার উপসেট। ফলে মানুষের ‘সমাজ’কে প্রকৃতি থেকে এবং মানুষকে আলাদা ভাবা হলো ‘না–মানুষ’ (non-human) সত্তা থেকে। বলা যায়, ব্রুনো লাতুর কথিত এই ‘মহা–বিভাজন’ (great divide)-ই মানুষকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে এবং অর্থনীতিকে মানব অস্তিত্বের প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত করল। বিপুল এবং সীমাহীন সম্পদ পুঞ্জিভবনের দর্শন ‘প্রগতি’র চিহ্ন হয়ে ওঠল।

    এখন অতিমারি বা সার্বিকভাবে পরিবেশগত সংকটের ফলে মানুষী–যজ্ঞ সংকোচনের কথা উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে ধরনের ইতিহাস ও তত্ত্ব চর্চা পৃথিবীর উপর মানুষের সার্বভৌমত্ব/উপনিবেশ নাকচ করে দিয়ে মানুষকে আর দশটা প্রজাতির মতো এক প্রজাতি; অর্থাৎ মানুষের ‘ভূ–তাত্ত্বিক কর্তাসত্তা’ (geological agency)-কে ‘জীবতাত্ত্বিক কর্তাসত্তা’ (biological agency)-তে সংকুচিত করবে; ইতিহাসের ‘নায়ক’ হিসেবে মানুষকে বিবৃত না করে সার্বিক জীবনের ইতিহাসে মানুষকে অবস্থিত করবে (চক্রবর্তী ২০১৬); তেমন ইতিহাস–চর্চার গুরুত্ব কতখানি? তত্ত্বের বিউপনিবেশায়নকে সেই পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন মনে করেন কিনা?

    আদিত্য নিগাম: শেষ থেকে শুরু করে বলি যে অবশ্যই তত্ত্বের বিউপনিবেশায়নের (ডিকোলনাইজেশান) প্রয়োজন আজ মূলত এই কারণেই দেখা দিয়েছে এবং মানুষের জায়গা যে সামগ্রিক জীবনের মাঝখানে, এই কথাটা আজ জোর গলায় বলা দরকার। মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু তো মানুষ নয়ই, ‘ইতিহাসের নায়ক’ও সে নয়— এই স্বীকৃতি আজ এক জ্বলন্ত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর সবকিছু যে তার ভোগের উপকরণ নয়, এটা স্পষ্টভাবে বোঝা ও বলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ এই ধারণার ফলে মানুষ নিজের সাথে সাথে পৃথিবীর অন্য সমস্ত জীবদের সর্বনাশও ডেকে এনেছে।

    বিউপনিবেশায়নের দ্বিতীয় প্রয়োজন এই প্রশ্নটার সাথে যুক্ত আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে। সে বিষয়টা হলো প্রতিটি সমাজের তার নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত করার অধিকার। আমরা এশিয়া কিংবা আফ্রিকার বর্তমানে দাঁড়িয়ে কি নতুন করে আমাদের ভবিষ্যতের সম্বন্ধে ভাবতে পারি? তার অধিকার বা ক্ষমতা কি আমাদের আছে? নাকি যেটা আমরা এতদিন জেনে ও মেনে এসেছি— যা মূলত আমাদের জন্য আগেই পশ্চিমের তাত্ত্বিক ও দার্শনিকেরা ভেবে রেখেছেন— সেটাকেই পরম সত্য মনে করে আঁকড়ে ধরে থাকব? আমাদের কাজ কি কেবল তাদের চিন্তার অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়া? কার্যত এই দুটি প্রশ্ন আজ এক জায়গায় এসে গেঁথে গেছে, কারণ ওই পথ ধরে যাওয়া মানে হচ্ছে তাদের ভুল ও ভ্রান্ত ধারণাগুলোর পুনরাবৃত্তি করা। একথা ঠিক যে আজকে পশ্চিমের চিন্তাবিদরাও এসব প্রশ্ন নিয়ে নতুন করে ভাবছেন কিন্তু তাতে আমাদের ভাববার দায়িত্বটা শেষ হয়ে যায় না। যে কথাটি ভালো করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে এই যে গোটা সমাজ–বিজ্ঞান যা আমরা পড়ে এসেছি এবং যা এখনো আমাদের স্কুলে–কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়ানো হয়— সবই কিন্তু মানব সমাজের এক পঞ্চমাংশেরও কম লোকের অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে। তাদের অভিজ্ঞতা ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে আছে এক বিশেষ ইতিহাস ও এক বিশেষ সময়— যেটাকে আমরা আধুনিকতার ঊষাকাল বলতে পারি— আবির্ভূত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। চার্চের আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার পর রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ নিয়ে অনেক কিছু নতুন করে, বিজ্ঞান–সম্মতভাবে ভাবা হলো। তারই পাশে ভগবানের অবর্তমানে (Nietzsche’র কথায় ‘Death of God’), মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে যে দার্শনিক চিন্তা–ভাবনা আমরা দেখতে পাই তার অনেকটাই এই পটভূমিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যাই হোক, এই বিষয়ের বিশদ আলোচনা এখানে সম্ভব নয়।

    সূত্র: টিন্ডল নিউজ

    এক অর্থে দুটি প্রয়োজনের কেন্দ্রে আছে একই প্রশ্ন— যেটাকে আমরা বলতে পারি ‘ইউরোপীয় এপিস্টেমের’ (European episteme) প্রশ্ন। এই এপিস্টেমের মূলে যে ধারণাটি কাজ করছে সেটা—আপনি ঠিকই বলেছেন—মানুষের নায়কত্বের ধারণা। কেবল ইতিহাসের নায়কই সে নয়, সে মহাবিশ্বের নায়ক, সৃষ্টির নায়ক। এবং তার উন্নতি–প্রগতির জন্যই সবকিছু বর্তমান। এবং এই প্রগতির ধারণা সর্বপ্রথম অর্থনৈতিক— মানুষের উন্নত হওয়া বা সভ্য হওয়ার মাপকাঠি নিছক এটাই। এবং এটা যে শুধু মার্ক্সবাদের ভ্রান্ত ধারণা, এমনটা ভাবা ভুল হবে। অর্থনৈতিক বিকাশই যে সভ্য সমাজের চিহ্ন এ বিষয়ে মোটামুটি আধুনিক ইউরোপের বেশিরভাগ দার্শনিক বা চিন্তাবিদ একমত। শুধু তাই নয়, এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সমাজ বিকাশের যে ইতিহাস–দর্শন আমরা ইউরোপ থেকে পেয়েছি তাতে সমাজের ক্রমবর্ধমান বিকাশের মূলই হচ্ছে অর্থনৈতিক বিকাশ। গোটা মানব সমাজের বিকাশকে এক ধরনের ছকে ফেলা হয়ে থাকে যেটা আমরা এই সমাজ–বিজ্ঞানের দৌলতে ‘সার্বভৌম/ সর্বজনীন’ (universal) বলে মেনে নিয়েছি। অর্থাৎ আমরা আমাদের একদম পৃথক ইতিহাসগুলোকেও ওই একই ছকে রেখে তার ব্যাখ্যা করতে শিখেছি।

    বিগত কয়েক দশকে ইতিহাস–ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায় ঠিকই। বিভিন্ন সমাজের আলাদা ইতিহাসকে এখন আমরা কিছুটা স্বতন্ত্রভাবে দেখতে শুরু করেছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা মনে করি যে পুঁজিবাদের আবির্ভাবের পরে গোটা পৃথিবী, তার নানান পৃথক সমাজ, এখন একই জায়গায় এসে পৌঁছেছে কারণ তারা এখন একই ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এর পর থেকে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যত একই হবে।

    আধুনিকতা ও পুঁজিবাদ যেহেতু ইউরোপে জন্মেছে এবং ওখানে যেহেতু এর সঙ্গে জড়িত প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা ভাবনা আগে হয়েছে, সে কারণে আমরা তাদের অনুকরণ করতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। সমস্যাটি এখানেই। তারা এই পথে আগে অগ্রসর হয়েছে বলেই তারা ও তাদের পথ আমাদের আদর্শ হতে হবে এমন ভাববার কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিগত আড়াই–তিন শত বছরের ইউরোপের ও পশ্চিমের আশ্চর্য প্রগতিই বলতে গেলে ওদের পক্ষে একটা তর্ক হয়ে দাঁড়াল, যেটা সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়ে গেল। এর ফলে আমরা আসলে এই বিবেচনার মধ্যে যাই–ইনি যে ওদের এই প্রগতিই কি আমাদের কাম্য? কীসের উপর, কোন ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে সে প্রগতি? আজকে তো এই কথাটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে উপনিবেশবাদের ফলেই, অর্থাৎ গোটা পৃথিবীকে গোলাম বানিয়েই পশ্চিমের এই আশ্চর্যজনক বিকাশ ঘটেছে। আফ্রিকা থেকে আনা লক্ষ লক্ষ গোলামদের ছাড়া, এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ পৃথিবীর অন্যত্র স্থানীয় অধিবাসীদের গণসংহার, ওই মহাদ্বীপগুলোকে বসবাসকারী উপনিবেশে (settler colony) পরিণত করা ছাড়া এই আশ্চর্য বিকাশ সম্ভব ছিল না। পৃথিবীজুড়ে অ–শ্বেত মানুষের দাসত্ব যেমন এই উন্নতি–প্রগতির মূলে ছিল, তেমনি ছিল বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার মাধ্যমে শোষণ–দোহন। আমরা ধরে নিয়েছিলাম যে এটা ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম— মানব সমাজের প্রগতির এটাই একমাত্র পথ। তাই আমাদের মতো দেশের রাষ্ট্রনেতারা আজও ওই বিকাশের স্বপ্ন দেখে চলেছেন।

    দর্শনের দিক থেকে দেখতে গেলে, পরিবেশগত সংকট ও ‘মানুষ বনাম না–মানুষ’ এর যে ‘মহা বিভাজন’, যার কথা ব্রুনো লাতুর বলেন, সেটি হচ্ছে এই বিপর্যয়ের মূলে। মানুষের এক অংশকে পশু বলে গণ্য করা অথবা তাদের কে কোনো অতীতের ‘অবশিষ্ট’ হিসেবে দেখা, (যার ফলে তাদের বিলোপ ঘটানোর যুক্তি যোগান হয়ে থাকে), এবং উন্নতি–প্রগতির সেই ধারণা এই মহা–বিভাজনের মধ্যে থেকেই জন্মাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত, আপনি সঠিকভাবেই যেটাকে ‘এই গ্রহের জীব ও জড় সত্তাকে মানুষের যজ্ঞ ও প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ’ ভাবার মানসিকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সেই মানসিকতা মানুষের এক অংশকেও তার উপকরণে পরিণত করে ফেলে।

    এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে গেলে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে কয়েকশ বছর আগে আল–শাতির ও কোপার্নিকাস বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী বিপ্লবের সূত্রপাত করেছিলেন, আজ সমাজ–চিন্তার ক্ষেত্রে সে–জাতীয় একটা বিপ্লব ঘটছে। এখনো বহু দেশে রাষ্ট্র–নেতাদের ও নীতি নির্ধারকদের চিন্তা–ভাবনায় তার কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না ঠিকই, কিন্তু একথাও ঠিক যে এক অসম্ভব পরিবেশগত সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে নানা মহলে, নানাভাবে পশ্চিম প্রদত্ত অর্থনৈতিক বিকাশ–কেন্দ্রিক মডেল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বরং বলা উচিত যে প্রশ্ন তো অনেক দিন ধরেই উঠছিল— আজ আমরা তার উত্তর খোঁজার দিকে অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছি এই আল–শাতির–কোপার্নিকাস বিপ্লবের ফলে। অন্তত আজ আর এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে সূর্য পৃথিবীকে (অর্থাৎ মহাবিশ্ব মানুষকে) প্রদক্ষিণ করে না বরং মানুষই একটা বৃহত্তর মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ যে তার ধৃষ্টতার দরুন নিজেরই সর্বনাশ ডেকে আনছে। এই চিন্তা–ভাবনা আজ পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করছে।

    সারোয়ার তুষার: সর্বজনীন নূন্যতম আয় (Universal Basic Income-UBI) বিশ্বজুড়েই এক প্রগতিশীল দাবি হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু আপনি আপনার চার–পর্বের প্রবন্ধ সিরিজের প্রথম দুই পর্বে UBI-কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আপনার মতে UBI নির্মম ধারণা, কারণ এর ফলে ভারতসহ দক্ষিণ গোলার্ধে (Global South) পুঁজি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের বাইরে যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিকানা আছে, UBI তাদেরকে রাষ্ট্রের জৈব–রাজনৈতিক (biopolitical) কলকব্জায় পরিণত করবে; নিজেদের জীবনের উপর তাদের যে নূন্যতম স্বায়ত্ত্বশাসন ও নিয়ন্ত্রণ আছে, সেটাকে ধবংস করবে। বরং আপনি পুঁজি–বহির্ভূত (non-capital) স্পেস তৈরির স্বার্থে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে (informal economy) বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে ‘সংহতি অর্থনীতি’ (solidarity economy), ‘প্রয়োজনের অর্থনীতি’–এর (need economy)পক্ষে বেশ জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন।

    অন্যদিকে, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় আপনাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে (Nigam 2014) কল্যাণ স্যানালের এই need economy’র ধারণাকে ‘unpersuasive’ বলেছেন। তিনি ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার রাষ্ট্রে–যেখানে শত কোটি মানুষের জন্য উৎপাদন ও বিতরণের প্রশ্ন হাজির হয় সেখানে–এই need economy’র ধারণা টেকসই (viable) হবে বলে মনে করেন না। UBI-কে জৈবরাজনীতির লেন্সে দেখাসহ পুঁজি ও রাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প স্পেস তৈরির বিষয়ে আমাদের পাঠকদের কি বলবেন?

    আদিত্য নিগাম: সর্বজনীন ন্যূনতম আয় বা Universal Basic Income নিয়ে সমস্যা, আমার মতে, দুটি স্তরে। আমি এটা কে ‘নির্মম’ মনে করি না। বরং অতিমারির পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ লোকেরা তাদের রোজগার হারিয়েছেন সেখানে এ–জাতীয় একটা ন্যূনতম আয় সত্যিই তাদের বেঁচে থাকার জন্য বেশ জরুরি একটা পদক্ষেপ বলেই মনে হয়। আমার সমালোচনা অন্য জায়গায়। এক অর্থে এটাও আমাদের পশ্চিমের মুখাপেক্ষী হওয়ার লক্ষণ। আমরা যদি পশ্চিমের, বিশেষত— ইউরোপের পরিস্থিতির দিকে তাকাই তাহলে বুঝতে অসুবিধে হবে না যে ১৯৮০’র দশক থেকে এ জাতীয় একটা দাবি কেন উঠতে শুরু করে— বিশেষ করে ইউরোপের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মহল থেকে। ধরুন ১৯৮০’র কাছাকাছি সময়ে আন্দ্রে গর্জ (Andre Gorz) তার বই Farewell to the Working Class-এ সোশ্যাল ইনকাম বা সোশ্যাল ওয়েজের কথা তোলেন। এই বইটার উনি ‘An Essay in Post-Industrial Socialism’ বলে পরিচয় দেন এবং ইউরোপের পুঁজিবাদের মধ্যে আসা নতুন পরিবর্তনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে চাকরি আর কাজের দাবির আর এখন কোনো মানে হয় না, কারণ ইউরোপের পুঁজিবাদ যেদিকে এগোচ্ছে সেখানে কাজের অবসানই হবে আগামীকালে। পশ্চিম ইউরোপের তিনটি প্রধান শিল্পায়িত দেশের সম্বন্ধে যা অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎবাণী তখন পাওয়া যাচ্ছিল তার ভিত্তিতে তিনি বলেন যে আগামী দশ বছরে এ দেশগুলো অটোমেশনের ফলে ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ চাকরি হারাতে বসেছে। একমাত্র যদি কাজের ঘণ্টা বেশ কিছুটা কমানো যায় তাহলেই এই চাকরিগুলো বাঁচানো যেতে পারে। সুতরাং শ্রমিকশ্রেণির উচিত কাজের দাবি না তুলে একটা ন্যূনতম আয়ের দাবি তোলা। কাজ থেকে মুক্তির কথাও তিনি বলেন (Gorz 2001)।

    এবার তার ৩৫ বছর পরে জেমস ফার্গুসন তার Give a Man a Fish ছাপান। তিনি এমন এক অবস্থায় এই বইটি লেখেন যেখানে আনুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার মধ্যে চাকরি প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে— মনে রাখতে হবে তার পটভূমিকায় আছে জবলেস গ্রোথের অনেক বছর। তিনি এটাও বুঝতে পারছিলেন যে বর্তমান যুগে পুঁজিবাদ আসলে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যেখানে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের তার কোনো প্রয়োজনই নেই। আমাদের যুগের পুঁজিবাদের জন্য পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সারপ্লাস, এবং অপ্রয়োজনীয় অর্থাৎ redundant; ফলে তিনি বুঝলেন যে উৎপাদনের গণ্ডির মধ্যে আর লড়াইটা আবদ্ধ রাখার কোনো মানে হয় না। এবার লড়াইটা ‘বিতরণের’ (distribution) স্তরে লড়তে হবে (Ferguson 2015)। কে কতটা পাবে তার একটা ন্যূনতম সংজ্ঞা স্বতন্ত্রভাবে ঠিক করতে হবে— সে কাজ পাক আর নাই পাক। এই অবস্থাটি তৈরি হলো কী করে? প্রধানত এর মূলে হচ্ছে পুঁজিবাদের তৈরি করা সেই জায়গা যেখানে পুঁজি তার আধিপত্য কায়েম করে সমস্ত কৃষি/কৃষক, ছোট কারিগর–শিল্পী, ছোট কারখানাদার ও দোকানদারদের বিলোপ সাধন করতে পেরেছে। পুঁজির রাজত্বে সবাই সর্বহারা। এমতবস্থায় UBI-এর মতো দাবি ওঠাটা স্বাভাবিক।

    শিল্পী: লুইস জে রেইনার

    এবার আমরা যদি আমাদের দেশগুলোর— এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর অবস্থা দেখি তাহলে সহজে বোঝা যাবে যে এখানে পুঁজির রাজত্ব সেই অর্থে কায়েম হয়নি। সেই কারণে আমাদের সমাজে কৃষক, কারিগর–শিল্পী, ছোট দোকানদার বা কারখানাদার— এক কথায় অনানুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার একটা ব্যাপক জায়গা আজও আছে। ভারতে সরকারি তথ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক রোজগার প্রতিশতে ১০–এর চেয়েও কম। ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের মধ্যে একটা ভালো রকম অংশ আছে যারা অত্যন্ত গরিব। তাদের সংখ্যার অনুপাত হবে ১৮–২০ শতাংশ যাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার হয়। ভারতে আগের United Progressive Alliance-এর সরকার (২০০৪–২০১৪) National Rural Employment Guarantee Act (NREGA)-এর মাধ্যমে এদের জন্য কাজের এবং আয়ের ব্যবস্থা করেছিল, যার ফলে অনেকে অত্যন্ত গরিব অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। এদের জন্য প্রথম দিকে নিশ্চয়ই UBI গোছের একটা ব্যবস্থা হলে সুবিধে হয়। এদের অধিকাংশের অবশ্য কোনো ব্যাংকে খাতা ছিল না— ফলে বিশেষ চেষ্টা করে তাদের একাউন্ট খোলানো হলো, যাতে তাদেরকে direct benefit transfer (DBT)-এর মাধ্যমে পাওনা টাকাটি সোজা ব্যাংকে পৌঁছে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও আজও ধরুন ১৯ কোটির মতো লোকের ব্যাংকের খাতা নেই। মাঝে মাঝেই ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তির’ (financial inclusion) কথা তোলা হয়— যার অর্থ হলো এদের সবাইকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং–এর মধ্যে টেনে আনা। এটা তো স্পষ্টই যে UBIও ততদিন সফল হতে পারে না যতদিন না সবাই ব্যাংকিং–এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে — সরকারের তরফ থেকে তাদের খাতে প্রতি মাসে আয় নয় তো জমা পড়বে কী করে?

    এবার প্রশ্ন উঠতে পারে আমি কেন বলছি যে শুধু সাময়িকভাবে, প্রথম দিকে এদের UBI’র আবর্তে আনা যেতে পারে— কেন আমি এটার পুরোপুরি সমর্থন করি না? দুটো কারণে। প্রথমত, আজ আমরা যদি বিশ্বজুড়ে মধ্যবিত্ত লোকেদের অভিজ্ঞতা দেখি— সেটা এশিয়ার ১৯৯৭’র সংকট হোক বা আমেরিকা ও ইউরোপের ২০০৮–এর সংকটই হোক (আর এর মধ্যে আর্জেন্টিনা ও গ্রিসের মতো দেশের কথা ভুলে যাবেন না), সেই জায়গাগুলোতে সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় মিনিটে উধাও হয়ে যেতে দেখা গেছে। অসংখ্য লোক রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলি হচ্ছে পুঁজিবাদের সেই হাতিয়ার যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আজীবন সঞ্চয়ের টাকা বাজারি বড় খেলোয়াড়দের হস্তগত হয়ে থাকে। ভারতে জাতীয়কৃত ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুট করে এমন অনেকে এখন বিদেশে বাস করছেন যাদের সরকারই মদদ জুগিয়েছে। আসলে হের্নান্দো ডি সোটো (Hernando de Soto) যেটা অনেক গবেষণা করে বুঝলেন সেটা হলো এই যে আমাদের মতো দেশগুলিতে স্টক এক্সচেঞ্জে বা পুঁজির বাজারে যত পুঁজি আছে তার চেয়ে অনেক বেশি পুঁজি এই আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। এটাকে উনি ‘মৃত পুঁজি’ (Hernando 2000) আখ্যা দিয়েছেন, কারণ সেটা স্টক মার্কেটে টেনে এনে বিনিয়োগ করা যায় না। সাধারণ মানুষ যা সেভিং করেন তা ‘মৃত’ কারণ তার থেকে পুঁজিপতিরা মুনাফা অর্জন করতে পারছে না। এই কারণে আমি মনে করি গরিব মানুষের নিজেদের জীবনের উপর যতটুকু এক্তিয়ার আছে সেটুকুও তাদের থাকবে না যদি তারা এইভাবে পুঁজির কবলে পড়ে যায়।

    UBI-এর কল্পনা— এবং এটা হলো আমার দ্বিতীয় আপত্তি— পুরোপুরি রাষ্ট্র–কেন্দ্রিক। কে নূন্যতম আয়টা দেবে? অবশ্যই রাষ্ট্র— রাষ্ট্র ছাড়া আর কারই বা এই অধিকার থাকতে পারে? পৃথিবীজুড়ে আমাদের যে অভিজ্ঞতা তাতে পুঁজিকে যতটা ঘৃণা করার আমাদের কারণ আছে, ঠিক ততটা নাহলেও রাষ্ট্রের উপরে ভরসা করার কি কারণ আছে? বিশেষ করে গরিব মানুষের বা ক্ষুদ্র সম্পত্তির মালিক যারা, তাদের অভিজ্ঞতা কী? শেষ পর্যন্ত এই কল্পনার মূলে যে বিশাল আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে সেটা কি অস্বীকার করা যায়? মজার ব্যাপার এই যে আসলে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র জিনিসটা কী তার কোনো ধারণা আমাদের, এশিয়া–আফ্রিকার বাসিন্দাদের নেই। সেটা দেখতে ও বুঝতে হলে দেখতে হয় ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে যেখানে মানুষের জীবনের কোনো দিক, কোনো লেনদেন— কিছুই সরকারের নজরের বাহিরে থাকে না। ফুকোর চিন্তার কেন্দ্রে যে আধুনিক রাষ্ট্র ছিল, যাকে নিয়ে তার ‘জৈব–রাজনীতি’ ও ‘গভর্মেন্টালিটি’ ধারণার সূত্রপাত, সেই রাষ্ট্র আজকের আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকার রাষ্ট্র। এখানে তাই এটা বলে রাখা দরকার যে পার্থ চট্টোপাধ্যায় যেভাবে গভর্মেন্টালিটিকে শুধুমাত্র কল্যাণ বা welfare-এর অর্থে বোঝেন আমি তা মনে করি না। ফুকোর এই জৈব–রাজনৈতিক রাষ্ট্রটি আসলে বেশ ভয়াবহ একটা জিনিসও বটে। আর আমাদের যুগে তো সেটা আরও ভয়ঙ্কর একটা চেহারা গ্রহণ করেছে।

    সেই কারণে আমি মনে করি ‘উত্তর–পুঁজিবাদী জীবন’–এর সন্ধান আসলে সাধারণ মানুষের তার জীবনের উপর এক্তিয়ারের প্রশ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে তার সমাধান পুঁজি বা রাষ্ট্র কোনোটাই দিতে পারে না। এবং এই কারণেই আমি ‘পুঁজি–বহিৰ্ভূত’ জায়গাগুলো খুঁজি এবং সেগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিই। সুতরাং ‘সংহতি অর্থনীতি’, ‘সমবায় অর্থনীতি’ ও ‘প্রয়োজনের অর্থনীতি’র কল্যাণ সান্যালের (Sanyal 2007) ধারণা আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। পার্থ–দা যেটাকে ‘unpersuasive’ মনে করেন, আমি কিন্তু তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পাই। আসলে কল্যাণ সান্যাল প্রয়োজনের অর্থনীতির কথা বলতে কোনো মুক্তির পথ দেখাচ্ছিলেন না। তিনি কেবল মাত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন যে এ জাতীয় এক বিশাল এলাকা আমাদের মতো দেশগুলিতে আছে যেখানে লোকে সঞ্চয়ের (accumulation) জন্য উৎপাদন করেন না, বরং তাদের প্রয়োজন মেটাবার জন্য করেন। আমার নিজের ট্রেড ইউনিয়নে কাজের অভিজ্ঞতা এবং পরে অধ্যয়ন থেকে বলতে পারি যে যারা সাধারণ গরিব মানুষ, যারা বিশেষভাবে ‘বুর্জোয়া এথিক’ এ দীক্ষা নেননি, তাতে শিক্ষিত হননি, তারা ‘সঞ্চয়’ (accumulation)-এর কথা সচরাচর ভাবেন না।

    পার্থ–দা’র সঙ্গে আমার দ্বিতীয় বড় মত–পার্থক্য আসলে অন্য জায়গাতে। উনি একজন ভালো সমাজ–বিজ্ঞানীর মতো যা ঘটে যায় তার ব্যাখ্যা করেন এবং আমাদের সেটা বুঝতে সাহায্য করেন কিন্তু আমার কাছে সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটা একদিকে আমার অতীতের রাজনৈতিক কর্মী মনোভাব থেকে আসে হয়তো, কিন্তু পরবর্তীকালে আমি এটাও বুঝেছি যে দর্শন ব্যাখ্যা করে ভবিষ্যৎটা মাথায় রেখে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দর্শনের একটা দিক অবশ্যই ভবিষ্যৎমুখী। সুতরাং পার্থ–দা’র কথাটার সঙ্গে কিছুটা একমত হয়েও, বর্তমান অবস্থায় পুঁজির রাজত্বে প্রয়োজনের অর্থনীতি টেকসই নয়, এটাতে আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। এই অর্থব্যবস্থা শুধু যে টিকে আছে তাই নয়, বরং বেড়েই চলেছে। ১৯৭১–এ আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের এক মিশন আফ্রিকাতে এই অনানুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার অধ্যয়ন করতে গিয়ে পেয়েছিলেন, শুধু যে সেটা টিকে ছিল তাই নয়, বিগত দশকগুলিতে আরও বিস্তার লাভ করেছে। এটা অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে নানান সরকারি নীতি–নির্ধারকদের আশার অনুরূপ ছিল না। তারা আশা করে ছিলেন এই ‘অতীতের অবশেষ’গুলো আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তাদের সমস্ত চেষ্টা সেই দিকেই থাকত। তাদের সকল চেষ্টা সত্ত্বেও এই সেক্টরটা বেড়ে চলেছিল এবং বেশ কিছু ধন সৃষ্টিও করছিল। তারও তিন দশক পরে হের্নান্দো ডি সোটোর কাজে এটা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এই অনানুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থা আমাদের মতো দেশগুলিতে বেশ ভালো পরিমাণে ধন সৃষ্টি করে। মনে রাখা দরকার যে ডি সোটো কিন্তু এই অনানুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার ঘোরতর বিরোধী— সমর্থক একেবারেই নন।

    বুঝতেই পারছেন পার্থ–দা’র সঙ্গে আমার দ্বিমত ‘যা আছে’ তার ব্যাখ্যা নিয়ে তো আছেই, কিন্তু মত–পার্থক্যটা এর চেয়ে আরও বেশি এই কারণে যে, আমি ভাবছি পুঁজিবাদের পরের কথা— সেখানে পৌঁছতে হলে আমাদের ভবিষ্যৎ–এর অর্থব্যবস্থার কল্পনাটি কী রকম হওয়া উচিত? পার্থ–দা এখনো পুঁজিবাদ সম্বন্ধে অনেকটা মার্ক্সবাদের গণ্ডির মধ্যে থেকে ভাবেন বলে স্বাভাবিকভাবেই ওনার সাথে আমার মতের একটা অমিল থেকে যায়। আমি যে ভাবে পুঁজিবাদ এবং বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্রের সম্বন্ধে ভাবি তাতে আমার মনে হয় ওই ভবিষ্যৎটা কোনো এক ধরনের সম্পত্তির মালিকানার (যথা রাষ্ট্রের মালিকানা) উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সে রকম একটা নতুন সমাজে অনেকভাবে এই প্রয়োজনের অর্থনীতিকে সমর্থন দিয়ে আরও মজবুত করা যেতে পারে।

    সারোয়ার তুষার: আপনার চার–পর্বের প্রবন্ধ সিরিজ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রশ্ন। এরপর আমরা আপনার অন্যান্য কাজের প্রসঙ্গে ঢুকব। Fascism, the Revolt of the ‘Little Man’ and Life After Capitalism (Nigam 2020c) প্রবন্ধে আপনি বৈশ্বিক ডানপন্থার উত্থানের (global rise of the right) কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এই ডানপন্থার উত্থানকে আপনি দেখছেন বিরাজমান বামপন্থা, বাম–মধ্যপন্থা ও উদারপন্থার ক্ষয়, সংকট এবং ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। বহু জায়গাতেই দেখা গেছে, পুঁজিবাদের সংকট ও বিপর্যয়ের উল্টো ফল হয়েছে। পুঁজিবাদের বিপর্যয়ে অবধারিতভাবে সমাজতন্ত্র হাজির না হয়ে [যেমনটা ভাবা হয়েছিল] ট্রাম্প, মোদী, বলসোনারোদের উত্থান ঘটেছে। এই ডানপন্থী বাতাবরণে বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ‘ক্ষুদে মানব’ (little man)-এর উত্থানও লক্ষ করা যাচ্ছে। এই ‘ক্ষুদে মানব’ freedom–কে বন্দিত্ব হিশেবে বিবেচনা করে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শকেই ‘মুক্তি’ ভাবে। প্রচলিত প্রগতিশীল রাজনীতিতে ‘সর্বহারা’ কিংবা ‘নিম্নবর্গ’–কে ঘিরে যে আশা ও বৈপ্লবিক রূপকল্প (revolutionary vision) বিরাজ করে, ‘ক্ষুদে মানব’ সেই ছক সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেয়। আবার অধিকতর ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যে–কোনো ঘরানার রাজনীতি তো গণ–মানুষ ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। সবমিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় ডানপন্থার মোকাবেলায় গণমুখী রাজনীতির কী কী কৌশল ও নীতির প্রশ্ন ভাবা উচিত?

    আদিত্য নিগাম: আসলে আমি বলব এই ‘ক্ষুদে মানব’ মুক্তি বা স্বাতন্ত্র‍্যকেই ভয় পায়। এমন নয় যে সে ফ্যাসিবাদ কিংবা ফ্যাসিবাদী মতাদর্শকে মুক্তি ভাবে। বরং মুক্তি তার কাম্যই নয়— তাতে তার নিজেকে অসহায় ও দিশেহারা মনে হয়। যেমনটি হয় অল্পবয়সে বাবার ছত্রছায়া হারিয়ে ফেলা বাচ্চার— হঠাৎ মনে হয় আমার দেখাশোনা করার, খেয়াল রাখার এবং আমার জন্য ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নেই। সাধারণত ছোট শহরের বাসিন্দা, এই ক্ষুদে মানব এই বিশাল জগতে নিজেকে একা ও শক্তিহীন মনে করে— যেন সে অথৈ জলে পড়েছে। নতুন দুনিয়ার সাম্যের ও স্বাতন্ত্র‍্যের ভাষা সে বোঝে না— বিশেষ করে নারী সমতাকেও ভয় পায়, কারণ তাতে সে চিরাচরিত পারিবারিক ও সম্প্রদায়গত কাঠামোর বিপদ দেখতে পায়। আমরা যে আধুনিক মূল্যবোধগুলোতে মুক্তির পথ দেখতে পাই— সেই একই ধারণাগুলোতে সে দেখে এমন এক বিপদ যে তার পরম্পরাগত জীবনকেই তছনছ করে দিচ্ছে। ফলে সে খোঁজে এক পিতৃসুলভ অধিনায়ক বা নেতা যে তার ভাষায় কথা বলে, ‘political correctness’-এর ধার ধারে না, নারী মুক্তি ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র‍্য’র খোলাখুলি বিরোধিতা করে এবং পারম্পরিক জীবন পদ্ধতিকে রক্ষার ভরসা দেয়। নরেন্দ্র মোদী, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বলসোনারোর মতো নেতাদের মধ্যে সে তার অধিনায়ক খুঁজে পায়ে। এই কথা বলার মানে এই নয় যে ফ্যাসিবাদ নিছকই কোনো অতীতমুখী বা অতীতগামী প্রকল্প। ফ্যাসিবাদ বহু অর্থে আধুনিক যুগের প্রজেক্ট এবং জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র উভয়ের খোরাক নিয়েই তার জন্ম। অথচ এ কথা ভুললে চলবে না যে আধুনিকতা ও শিল্পায়ন যেভাবে দ্রুত সমস্ত পুরোনো কাঠামো ও সম্পর্কগুলোকে তছনছ করে দিয়ে যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, তাতে অনেকের মধ্যে নতুন যুগের ‘মুক্তির’ প্রতি ভয় ও সংশয় দেখা দেয়— সেটাও কিন্তু ফ্যাসিবাদের মতো আন্দোলনের রসদ যোগায়।

    শিল্পী: হোসে ক্লেমেন্তে ওরোযকো (১৮৮৩ – ১৯৪৯)

    এইবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। সাধারণভাবে বিপ্লবের প্রচলিত রূপকল্পে ‘সর্বহারা’ কিংবা ‘নিম্নবর্গ’কে ঘিরে পরিবর্তনের যে চিন্তা–ভাবনা তার দুটি দিক নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই। প্রথমত, মার্ক্সবাদের প্রভাবে সর্বহারাকে কেন্দ্র করে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, এবং পরে গ্রামশি যেটাকে ‘নিম্নবর্গীয় সামাজিক সমূহ’ বলেছেন— এই দুটোর মধ্যে তফাৎ আছে। মার্কস যে সর্বহারার কথা উনিশ শতকের ইউরোপের অভিজ্ঞতায়, তার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলেছিলেন, সেটা মূলত একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হস্তক্ষেপ করলেও তার চেহারা অর্থনৈতিকই ছিল এবং মার্কস বিপ্লবে তার যে ভূমিকা নির্ধারণ করেছিলেন তার কিন্তু তথ্যে কোনো ভিত্তি নেই। কোনো তথ্য থেকেই এটা প্রমাণ হয় না এবং করা যায় না যে সর্বহারার ঐতিহাসিক দায়িত্ব হচ্ছে সাম্যবাদের মাধ্যমে গোটা মানব–সমাজের মুক্তি সাধন করা। সে যাই হোক, মার্কস এই সর্বহারার ‘চেতনা’কে সরাসরি তার অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেন। অন্য দিকে, গ্রামশি কিন্তু লিখছিলেন ফ্যাসিজমের যুগে, অনেকটাই কারাগারের মধ্যে বসে। তার লেখায় যখন আমরা সাবলটার্ন বা নিম্নবর্গীয় সমূহের কথা পড়ি তখন কিন্তু আমরা একেবারে অন্য একটা জিনিস লক্ষ করি। গ্রামশি চেতনার প্রশ্নকে কোনো অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না করে এবার দুটি কথা বলেন— এক, নিম্নবর্গের ইতিহাস সর্বদা শক্তিশালী শ্রেণিগুলোর কার্যকলাপের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং সে কারণে সহজে ঐক্যবদ্ধ হয় না। দুই, এই সমূহগুলোর চেতনার প্রশ্ন সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সঙ্গে জড়িত। গ্রামশির শ্রমিকশ্রেণির ও নিম্নবর্গের পরিভাষার মধ্যেই কিন্তু সংস্কৃতির বিষয় উপস্থিত আছে যার ফলে তাদের চেতনা সমাজে আধিপত্যের সুদীর্ঘ সংগ্রামের সাথে গাঁথা বলে তিনি মনে করেন। যদিও গ্রামশি সরাসরি ওই সব প্রশ্নের সম্মুখীন হননি যেগুলো ‘ক্ষুদে মানব’ ও তার বিদ্রোহ সম্বন্ধে তোলা হয়েছে, তাহলেও এটা পরিষ্কার যে তার ফ্রেমেওয়ার্কের মধ্যে আমরা এগুলোকে একটু আলাদাভাবে ভাববার সম্ভাবনা পাই। আমরা দেখতে পাই যে শ্রেণি চেতনার কী রূপ হবে সেটা আগাম বলা যায় না— সবই সংগ্রামের মধ্যে, বিশেষ করে cultural hegemony’র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ঠিক হয়। সাধারণ মানুষের ‘ক্ষুদে মানবের’ দিকটা প্রধান হয়ে উঠবে নাকি শেষ পর্যন্ত বৈপ্লবিক হেজেমনির লড়াই এর মধ্য দিয়ে তার পরিবর্তনকামী দিকটা এগিয়ে আসবে— সবটাই নির্ভর করছে রাজনীতির উপর।

    সারোয়ার তুষার: উপনিবেশোত্তর সমাজ (Postcolonial Society) কি আবশ্যিকভাবে ‘non-normative’ সমাজ? প্রাচ্যবাদী (orientalist) এবং ইউরোপ–কেন্দ্রীক (Eurocentric) চিন্তায় ধরেই নেয়া হয় পশ্চিম ‘তত্ত্ব’ উৎপাদন করবে এবং অ–পশ্চিম (non-west) হবে সেই তত্ত্ব প্রয়োগ ও চর্চার ক্ষেত্র (field)। একজন উত্তর–ঔপনিবেশিক চিন্তক হিশেবে আপনার ক্ষেত্রে ‘doing theory’ কথাটার তাৎপর্য কী?

    আদিত্য নিগাম: ‘Non-normative’ কথাটার অর্থ যদি এই হয় যে উপনিবেশোত্তর সমাজগুলো সমাজ বিজ্ঞান বা থিওরি দ্বারা তৈরি কোনো ছকের মধ্যে পড়ে না তাহলে নিশ্চয়ই আমার উত্তর হবে ‘হ্যাঁ, তারা আবশ্যিকভাবে নন–নর্মেটিভ’। মিশেল ফুকো যে অর্থে ‘নর্ম’–এর কথা বলেন— অর্থাৎ আদর্শ ঠিক নয় বরং যেটা থেকে normal কথার আভাস পাওয়া যায়— সে অর্থে নর্মেটিভ হতে গেলে আমাদের হয় male হতে হয়, নয় female হতে হয়। এই অর্থে আমাদের ‘অদ্ভুত’ মনে হতেই পারে কারণ আমাদের কোনো কিছুই তো মেলে না তাদের তত্ত্বের দিক থেকে দেখতে গেলে। পুঁজি ও শ্রমের বাহিরে যে আমাদের সমাজগুলোতে এক বিশাল জগৎ আছে সেটাও তারই একটা উদাহরণ। আমি যেটা অনেক সময় ছাত্রদের বলে থাকি, ওই তত্ত্বের কাছে উত্তর খুঁজতে গেলে ভাবতে হবে আমরা নাকি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝি না, আর কিছুই ঠিক মতো করি না। মনে হবে এই পৃথিবীর পাঁচ ভাগের চার ভাগ লোক, যারা এই সমাজগুলোতে বাস করেন, তারা না পেরেছেন আধুনিক হতে, না বোঝেন সেক্যুলারিজম, আর না পেরেছেন গণতন্ত্র গড়ে তুলতে। এমনকি তাদের পুঁজিবাদ ও বিকাশও ‘অবরুদ্ধ’ ও প্রতিবন্ধিত। এর কারণ কিছুটা আগের একটা প্রশ্নের উত্তরে আলোচনা করেছি — ইউরোপের ইতিহাস যে পথে অগ্রসর হয়েছে এবং সেটাকে ইউরোপের চিন্তাবিদ ও দার্শনিকরা যেভাবে বিধিবদ্ধ করেছেন, সেভাবে যদি আমরা না এগোই তাহলেই আমাদের ‘উদ্ভট’ মনে হবে। আর আমরা যেভাবে ওই জ্ঞান বা তত্ত্বকে রপ্ত করেছি তাতে আমাদের তত্ত্ব নিয়ে ‘গল্প করা’ ছাড়া কিছু করার থাকে না।

    ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী ভূদেব মুখোপাধ্যায় একদা বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার সম্বন্ধে বলেছিলেন যে আমাদের এখানে বিজ্ঞান করা হয় না, কেবল বিজ্ঞানের গল্প করা হয়। সমাজ বিজ্ঞান ও দর্শনের ক্ষেত্রে আজ সেই একই কথা বলা যায়। আমরা ওদের তাত্ত্বিকরা কী বললেন তার গল্প করতে বেশি ভালোবাসি। ‘থিওরি করা’টা (‘doing theory’) কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। থিওরি করা মানে হলো নিজের সময়ের, নিজের বর্তমানের সঙ্গে কুস্তি করা, তার চ্যালেঞ্জটা বোঝা এবং তার মধ্যে থেকে পথ বার করা। পশ্চিমে তৈরি জ্ঞান ও তত্ত্ব আওড়াতে থাকলে এই কাজটা করা সম্ভব নয়। আমাদের জ্ঞান উৎপাদনের পদ্ধতি এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমরা ভাবি তত্ত্বের কারবারটা পশ্চিমের— আর আমাদের কাজ হচ্ছে শুধু সেটাকে আমাদের সমাজগুলোতে প্রয়োগ করা। বড়জোর ‘আমাদের তথ্য’ দিয়ে ওদের তত্ত্বকে ‘টেস্ট’ করা। এমন না যে টেস্ট এ ফেল করলে থিওরিটা বর্জন করা হবে, বরং ফেল করে যায় আমাদের সমাজগুলো। এখানে তাদের তত্ত্ব কার্যকরী না হওয়ার কারণ আমরা আমাদের নানান ‘অভাব’ এর মধ্যে খুঁজি। কেন সেকুলার হতে পারছি না, কেন গণতন্ত্র গড়তে পারলাম না ইত্যাদি সব মনোভাব সেই অভাববোধ থেকেই আসে। আসলে আদৌ কি সেক্যুলার হওয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল বা হতে পারে, এই প্রশ্ন উঠতেই দেওয়া হয় না।

    আমি এটা অন্য জায়গায় উল্লেখ করেছি যে চার্চ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার যে ধরনের একীকরণ ইউরোপে ছিল সেটা পৃথিবীর অন্যত্রে খুব কমই দেখা যায়। ইসলামে তো চার্চের মতো কোনো সংস্থা ছিলই না, আর হিন্দুদের তো সে অর্থে কোনো কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রও ছিল না। চীন বা জাপানে ‘রিলিজন’ বলতে (ইংরিজিতে) যা বোঝায় সে রকম কোনো ব্যাপার ছিল না। এই সমস্ত দেশে ও সমাজে রাষ্ট্র মূলত ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল না। ভারতবর্ষে প্রাচীন কাল থেকে কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের বই নয়। গোটা ইউরোপ যখন চার্চের পায়ে লুটোচ্ছে, যাকে পরে ‘dark middle ages’ বলা হলো, সেই সময়ে ভারতে সালতানাত বা মুঘল সাম্রাজ্য শরিয়ার ভিত্তিতে দেশ শাসন করছিল না। বরং আকবার–এর সময় হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয় এবং ‘দিন–এ–ইলাহী’র মতো একটা নতুন ধর্ম প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়। আরব দুনিয়ায় বিজ্ঞান ও দর্শনের বিশাল অগ্রগতি ৮ম এবং ৯ম শতাব্দী থেকে দেখা যায়। এই বৃহৎ ইতিহাসের কোনো চর্চাই হবে না, তার থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে হবে না, এবং তত্ত্বের দিক থেকে এটা অবহেলিত থাকবে— এরকম অবস্থায় আমাদের কাছে সেকুলারিজম–এর মন্ত্র উচ্চারণ করা ছাড়া আর উপায় কী থাকে? আমার মতে আমাদের থিওরি করার মানে সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে তত্ত্বের দিক থেকে বোঝা।

    সারোয়ার তুষার: গণমুখী রাজনীতিতে প্রায়ই “সাধারণ মানুষ”–এর একটা সুনির্দিষ্ট ইমেজ কল্পনা করে নেয়া হয় যা অনেকসময়ই বিভ্রান্তি তৈরি করে। অথচ আজকাল অনেক চিন্তকই বলছেন যে বিশেষত আমাদের মতো একদা উপনিবেশিত (colonized) অঞ্চলে আদতে একক ও অবিভক্ত (singular and unitary) কোনো “জনতা” নেই।

    এই যে “জনতা”র একটা সুনির্দিষ্ট ইমেজ কল্পনা করে নেয়া, তাদেরকে বিপ্লবের/পরিবর্তনের উপাদান ভাবা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদিকে লিনিয়ার একটা টাইম ফ্রেমের ভবিষ্যত কোনো বিন্দুতে কল্পনা করে নেয়া অনেকসময় ফ্যাটিশ তৈরি করে বলে আমার ধারণা। ফলে রাজনীতিটা হয়ে দাঁড়ায় ইউটোপিয়ান। ইউটোপিয়া খারাপ তা বলছি না। যারা অ্যান্টি–ইউটোপিয়ান আমি তাদের বিরুদ্ধে। মানুষের ইউটোপিয়া থাকতেই হয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ইউটোপিয়ান রাজনীতি “যা কিছু ভালো” তাকে ভবিষ্যতে স্থাপন বা কল্পনা করে নেয়। “ভালো সবকিছু” ভবিষ্যতে ঘটবে, সেই ভবিষ্যতের পানে অপার হয়ে তাকিয়ে থাকার তাড়না সৃষ্টি করে। ফলে বর্তমানকে দেখা হয় একটা কন্সপিরেসির চোখ দিয়ে। কারও কাঁধে দোষ চাপানো বা আহাজারি তখন রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। পরিবর্তন–প্রত্যাশীরা আর বর্তমানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না অনেক সময়। ছিটকে পড়ে।

    “জনতা”র একটা সুনির্দিষ্ট ইমেজ ধরে নেয়া এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন বা রূপান্তরকে ভবিষ্যতের কোনো বিন্দুতে কল্পনা করার এই লিনিয়ার টাইম ফ্রেমকে আপনি কীভাবে দেখেন?

    আদিত্য নিগাম: আপনার প্রশ্নটা ঠিকই কিন্তু এটার উত্তর হিসেবে খুব বেশি বলতে চাই না। কারণ এখনো এই বিষয় নিয়ে আমি অনেক কিছু নতুন করে ভাবছি। তবে আমার মনে হয় যে ইউরোপের ইতিহাসে Death of God, অর্থাৎ Christianity’র একেশ্বরবাদী ভগবানের বিদায় নেওয়ার পরে এবং রাষ্ট্রের একটা স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার মুহূর্তে অনেক প্রশ্ন এই বিশেষ প্রসঙ্গে ওঠে। এর আগে তো রাজা ভগবানের প্রতিনিধি ছিল। এবার প্রশ্ন দেখা দিলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অন্য একটা জমিতে দাঁড় করাবার— এই ক্ষমতার উৎস কোথায় হবে? জনগণ বা ‘জনতা’ ছাড়া আর কার থেকে সেই ক্ষমতা তার বৈধতা পেতে পারে? আর কিছুটা ভগবানের মতো জনতারও একক ও অবিভক্ত will বা ‘ইচ্ছাশক্তি’ কল্পনা করার প্রয়োজন দেখা দিলো। আসলে শুধু একদা উপনিবেশিত দেশগুলোতেই নয় এই জাতীয় একক ও অবিভক্ত will কোথাওই দেখা যায়নি। ফ্যাসিজম তার চেষ্টা করেছে ঠিকই কিন্তু এটা কল্পনার বেশি কোনো কালেই কিছু ছিল না।

    সময়ের ব্যাপারটা আমার মনে হয় একটু আলাদা— যদিও তার সম্পর্কও খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে আছে। মার্ক্সবাদে এবং সাধারণভাবে ইউরোপীয় ইউটোপিয়ান চিন্তা–ভাবনা যে মুক্তি ও ‘ভালো সব কিছু’ সুদূর ভবিষ্যতে দেখে তার শিকড় ওখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে। জান্নাত থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরে মানুষ ‘ঐতিহাসিক সময়’–এর মধ্যে এসে পড়ে যেখান থেকে মুক্তি পেয়ে সে আবার সেই অবস্থায় ফেরত যাবে যেখানে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। শ্রেণিবিহীন সমাজের কল্পনা অনেকটা এই তত্ত্বকেই অবলম্বন করে।

    সারোয়ার তুষার: আপনার Democracy, State and Capital: The ‘Unthouht’ of 20th Century Marxism (Nigam 2009) প্রবন্ধটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। আমার ধারণা মার্ক্সবাদী–মাওবাদী এবং সংসদীয় উদারনৈতিক গণতন্ত্রী; এই দুই শিবিরই এই প্রবন্ধের প্রচণ্ড বিরোধিতা করবে (হয়তো করেছেও)। একদিকে আপনি ‘mass democracy’-কে liberal parliamentarianism/ constitutionalism থেকে পৃথক করছেন এবং বলছেন যে, mass democracy আসলে উদারনৈতিক সাংবিধানিক রাজনীতির ‘anti-thesis’; আবার অন্যদিকে আপনি বলছেন, প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র (dictatorship of the proletariat), গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা (democratic centralism) ইত্যাদি রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘entry of masses’-এর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। এখানে আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ তর্ক মনে হয়েছে, আপনি কথিত ‘আইনের শাসন’–এর রূপকথা, তথাকথিত বৈপ্লবিক ভ্যানগার্ড তত্ত্ব এবং ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ; এই প্রত্যেকটির চূড়ান্ত অভিমুখ হিসেবে সার্বভৌম ক্ষমতাকে (sovereign power) উন্মোচন করেছেন এবং গণতন্ত্রকে এর বিপরীতে তুলে ধরেছেন। এজন্যই জনগণের প্রকৃত উত্থানকে ম্যানেজ করতে হয় কোনো না কোনো বর্ণের রাখাল–বালক তত্ত্ব (vanguardism) টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।

    কিন্তু বিশ শতকের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, যে–কোনো বৈপ্লবিক/রূপান্তরকামী/পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক প্রকল্প যদি রাষ্ট্র–ক্ষমতা দখলে মনোযোগী হয়, তাহলে চূড়ান্ত বিচারে তা পুঁজির পুঞ্জিভবনে (accumulation of capital) গিয়ে থামে। তথাকথিত অনেক ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুঁজিবাদকে আরও নির্মম চেহারায় দেখা গেছে [চীনের ক্ষেত্রে তো অনেকসময় কৌতুক করে বলাই হয়, socialism is the quickest way to capitalism]। আপনি দেখাচ্ছেন যে, [সমাজতন্ত্রের সাইনবোর্ড সম্বলিত রাষ্ট্রসমূহের] এই পুঁজিবাদের দিকে অগ্রসর হওয়াটা কোনো ‘সংশোধনবাদ’ (revisionism)-এর ফল নয়; বরং খোদ রাষ্ট্র, আধুনিকতা এবং পুঁজির আন্তঃসম্পর্কের অনিবার্য পরিণতি (আপনার ভাষায়, the logic of the modern state itself is bourgeois..)।

    উপরের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আপনার কাছে আমার জিজ্ঞাসা দুটি। প্রথমত, আপনি যাকে বলছেন mass democracy, সেই mass democracy’র পথ ধরে কী করে পুঁজি ও রাষ্ট্র–কর্তৃত্বকে ছাপিয়ে যাওয়া (beyond state and capital) সমাজ–সম্পর্ক ভাবা সম্ভব? দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রবাদী (statist) রাজনৈতিক চিন্তার আধিপত্যের বিপরীতে যারা অবস্থান করেন, তাদের নীতি–কৌশল কেমন হতে পারে?

    আদিত্য নিগাম: ‘Socialism is the quickest way to capitalism’ কথাটা বেশ মজার— আমি এটা আগে শুনিনি। বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে যে আলোচনা এই লেখাটিতে আমি করেছি তার প্রস্থান বিন্দুও এটাই— কেন বারে বারে কমিউনিস্টরা বিপ্লব করেও শুধু পুঁজিবাদই গড়েন। আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এই বিষয়টা নিয়ে কিছু বলেছি কিন্তু এই বিষয়টির বিশদ আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। আপনার যে বিশেষ প্রশ্ন দুটি, সেগুলোর উত্তর দেওয়ার আগে এটা বলে দিই যে ওই লেখাটার মধ্যে অনেক কিছু নিয়ে আমি এখনো ভাবছি। যখন লিখেছিলাম, প্রায় ১২ বছর আগে, তখন একটা বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে ওই প্রশ্নগুলো উঠছিল। ভারতীয় মাওবাদ নিয়ে নতুন করে একটা বিতর্ক তো উঠছিলই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা নিও–লিবারেলিজম নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। ২০০৮–এর বিশ্ব পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক সংকটের অনেক আগেই কৃষকদের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলি তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেখানে একটি বাম ফ্রন্ট সরকার তিন দশক ধরে রাজত্ব করছিল, সেখানে ওরাও শেষ পর্যন্ত কৃষিকে উৎখাত করে তার জায়গায় পুঁজিবাদ গড়তে চেয়েছিল। ‘চীনের পথ’ অবলম্বনে ‘Special Economic Zone’ই গড়তে চেয়েছিল, কিন্তু চীনের মতো সুবিধে এখানে হয়নি। যেহেতু আমরা একটা গণতন্ত্র, সেই গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামে কৃষকরা আন্দোলনে নামলেন। এর ফলে শেষে পশ্চিমবঙ্গে মার্ক্সবাদীদের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটল।

    শিল্পী: মিমো পালাদিনো

    যাই হোক, এর পর ১২ বছরে এই সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে আরও অনেক ভাববার সুযোগ হয়েছে, নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে। পরবর্তীকালে সারা বিশ্বে যেভাবে দক্ষিণপন্থার অভ্যুদয় হয়েছে তার আলোকে এই বিষয়গুলির আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এটাও বলে রাখা দরকার যে ‘mass democracy’ কথাটা আমার নয় বরং ওটা নাজি সমর্থক আইনবিদ কার্ল স্মিট ব্যবহার করেন। তার মতে উদারতাবাদ ও সংসদীয় প্রতিনিধি ব্যবস্থা আসলে গণতন্ত্র নয়। মনে রাখা দরকার যে এই মতামত স্মিটের একার নয়। তখনো ছিল না এবং আজও জাক রান্সিয়েরের (Jacques Ranciere) মতো বামপন্থী দার্শনিকেরা এই ব্যাপারে অন্তত স্মিটের সাথে একমত। স্মিটের উদ্দেশ্য অবশ্য নাজি রাজনীতির পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো ছিল, যেটা অন্যরা সমর্থন করতে পারেন না। যাই হোক, একথা অস্বীকার করা যায় না যে উনিশ শতকজুড়ে সারা ইউরোপে ভোটের অধিকারের যে লড়াই চলে তার সঙ্গে তখনকার প্রতিনিধি ব্যবস্থার একটা দ্বন্দ্বও দেখা দেয়। রান্সিয়ের মনে করিয়ে দেন যে লিবারেল প্রতিনিধি ব্যবস্থার সূত্রপাত গণতন্ত্রের বিস্তারের জন্য নয়, তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য দেখা গেল যে কার্ল স্মিটের অর্থে মাস ডেমোক্রেসির বহিঃপ্রকাশ ফ্যাসিজমের মাধ্যমে হলো।

    যে প্রশ্ন স্মিটের পরেও থেকে গেছে সেটা হলো এই যে: ‘জনতার একক ও অবিভক্ত ইচ্ছা’কেই যদি আমরা গণতন্ত্রের সমার্থক মনে করে নিই, তাহলে এটাও বুঝতে হবে যে এই ‘ইচ্ছা’ আগে আসে না, বরং অধিনায়ক শাসক প্রয়োজন মতো সেটা গড়ে নেয়। বিস্তর আলোচনার সম্ভাবনা এখানে নেই কিন্তু এটুকু তো বলা যেতে পারে আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে যে mass demcracy’র ভিত্তিতে নতুন কিছু— পুঁজি ও রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাওয়া কিছু— ভাবা সম্ভব নয়। আজ পৃথিবীজুড়ে গণতন্ত্রের থিওরি ও ব্যবহার এক অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন। নতুন ভাবনা চিন্তার জরুরি প্রয়োজন আছে।

    আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন— যারা রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক চিন্তার বাহিরে গিয়ে ভাবেন তাদের নীতি ও কৌশলের প্রশ্ন কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখানে অনেক কিছুই বলা যেতে পারে কিন্তু আমার মনে হয় আসল যে বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে সেটি হলো এই যে আজকে বসে বিংশ শতাব্দীর সেই ‘ব্যক্তিগত’ বনাম ‘রাষ্ট্রীয়’ সম্পত্তির মালিকানা এই বাইনারির মধ্যে ভাবলে আর চলবে না। আমি আগেই বলেছি যে আমাদের সামনে প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে পুঁজি ও রাষ্ট্র এই দুই–এর হাত থেকেই সাধারণ মানুষের স্বাতন্ত্র‍্যকে রক্ষা করা। এবার এখানে আরও যোগ করতে চাই যে ব্যক্তিগত মালিকানা বা উদ্যোগ মানেই পুঁজিবাদ নয়। কল্যাণ সান্যালের ‘প্রয়োজনের অর্থব্যবস্থার’ আলোচনা থেকে যেটা স্পষ্ট বোঝা যায় সেটা হলো এই যে ব্যক্তি–মালিকানা সত্ত্বেও একটা বিশাল ক্ষেত্রজুড়ে লোকে পুঞ্জীভবনের/পুঁজিকরণের তর্কের বাহিরে থাকতেই পছন্দ করেন। আমার লেখাগুলোতে আমি ল্যাটিন আমেরিকায় ‘সংহতি অর্থনীতি’ নামে যে প্রয়োগগুলো চলছে, তার উল্লেখও করেছি। এদের মালিকানার স্বরূপ ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়গত — দুইয়ের সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করে। এখানে ভাগ করে নেওয়ার অর্থাৎ sharing-এর ব্যাপারটা প্রধান। ইউরোপে বিভিন্ন জায়গায় এনার্কিস্টরা সমবায় নিয়েও কাজ করেছেন।

    এই সকল উদাহরণ থেকে আমরা দেখতে পাই যে অন্য এক উত্তর–পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপাদান আমাদের এসব অভিজ্ঞতার মধ্যেই আছে। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে যে এইগুলোর ভিত্তিতে কি কোনো রাজনীতি দাঁড় করানো যায়? আমি মনে করি এটা সম্ভব, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার মতে প্রশ্নটা এর চেয়ে অনেক বড়: আমার দিন দিন এই ধারণা দৃঢ় হচ্ছে যে রাজনীতি কোনো সমস্যার সমাধান নয় বরং সকল সমস্যার উৎস। ‘রাজনীতি’ বলতে এখানে আমি বোঝাতে চাইছি পার্টিগত, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতি— যার মাধ্যমে গোটা সমাজ এক বিশাল মেশিনে পরিণত হয়ে যায়, মানুষ তার কলকব্জা মাত্র হয়ে থেকে যায়। গণতন্ত্রের বর্তমান সংকটের সঙ্গে এটার একটা গভীর সম্পর্ক আছে। আপাতত, এটাকে প্রশ্ন হিসাবেই ছেড়ে দিতে চাই। এর মানে অবশ্য এই নয় যে এর মধ্যে আমাদের হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকতে হবে— বরং আমাদের এক নতুন ধরনের বামপন্থা গড়ে তোলার দিকে সচেষ্ট হতে হবে।

    সারোয়ার তুষার: ভারত ও বাংলাদেশসহ প্রায় সমস্ত উত্তর–ঔপনিবেশিক সমাজে একটা খুব শক্তিশালী মতামত চালু আছে: ইউরোপের উপনিবেশ হওয়াটা ছিল প্রাচ্যের ‘অনিবার্য’ নিয়তি (fate)। এরকম অনড় সমাজব্যবস্থাকে গতিশীল করা এবং বিকশিত করা ছিল উপনিবেশবাদের ‘ঐতিহাসিক কর্তব্য’ (historical responsibility)। ভারতীয় সমাজব্যবস্থার নিজস্ব কোনো গতি নেই–ইউরোপীয় এই দাবির বিরোধিতা যে হয়নি তা না, বিরোধিতা হয়েছে। কিন্তু সেই ইউরোপীয় ছকেই রেনেসাঁস, রিফর্মেশন, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদের ইতিহাস আমরা খুঁজেছি। খুঁজতে গিয়ে যে প্রক্রিয়ার যা প্রত্যাশা করেছি তা তো হয়নি। সব উল্টে গিয়েছে। (চট্টোপাধ্যায় ২০১৫)

    এর ফলাফল অন্তত দুই–দিক থেকে ভয়াবহ হয়েছে বলে আমার ধারণা। একদিকে, ‘যা কিছু পশ্চিমের’ তাকে ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে একদল ‘অতীত–ঐতিহ্য’ অনুসন্ধান এবং এক ধরনের অতীতবাদী (pastist) ও গোষ্ঠী–জাতীয়তবাদী (ethno-nationalist) হয়ে ওঠেছে। অন্যদিকে, আরেকদল ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব ও অনিবার্যতায় এতটাই মজেছে যে, ‘যা কিছু পশ্চিমের’ তাকে প্রায় ‘অলঙ্ঘনীয়’ জ্ঞান করতে শুরু করেছে এবং নিজেদের সমাজকে ইউরোপের ‘বিকৃতি’ ভেবেছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, দোষটা কি আমাদের সমাজ–ব্যবস্থার? নাকি আমাদের বিশ্লেষণের উপকরণের? যে তত্ত্বের ভেতর দিয়ে দেখছি, সেটাই হয়তো উপযুক্ত নয়। (চট্টোপাধ্যায় ২০১৫)

    সোহিনী চট্টোপাধ্যায়কে (Nigam 2018) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আপনিও বলেছেন, পুঁজিবাদ কেন ‘যেভাবে বিকশিত হওয়ার কথা’ সেভাবে বিকশিত হচ্ছে না এই নিয়ে অ–পশ্চিমা (non-west) অঞ্চলগুলোতে বিস্তর তর্ক–বিতর্ক হয়ে গেলেও, পুঁজির সর্বজনীনতার দাবির (claim of universality) ব্যাপারে মোটাদাগে নিঃসংশয় অবস্থান দেখা গেছে। (আপনার ভাষায়: We could look at the Marxist debate in much of the non-West from the 1960s onwards— dependency, unequal exchange and accumulation in peripheral capitalism— as an instance. For decades, we debated why capitalism was not developing in the non-West as it ‘should have’— but instead of asking if something was wrong with the theory (the universal history of capital, for instance), we debated what was wrong with these societies!)

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রশ্নটাই একটু ভিন্নভাবে করতে চাই— কেন আমরা আমাদের বিশ্লেষণের উপকরণগুলোকে ‘অবধারিত’ ধরে নিয়েছি? দ্বিতীয়ত, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘সর্বজনীনতা’কে প্রশ্ন করার পাশাপাশি সংকীর্ণ অতীতমুখিতা কিংবা উগ্র স্বদেশিয়ানার (ultra-nativism) বিরুদ্ধে আমরা কী করে অর্থবহ কায়দায় আলাপ তুলতে পারি?

    আদিত্য নিগাম: আসলে যারা এটা ভাবেন যে প্রাচ্যের সমাজগুলির সম্বন্ধে মার্কস ১৮৫০’র দশকে যা লিখে গেছেন সেটাই তাদের আওড়ে যেতে হবে তাদেরকে আমার কিছু বলার নেই। মার্ক্স তার ভারত সম্বন্ধে সেই সময়ে যা লিখেছেন তার থেকে ওনার নিজেরও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পাল্টে গেছিল ১৮৬০’র পরে এবং বিশেষ করে ১৮৭০’র পরে যখন তিনি রাশিয়া এবং ভারতসহ প্রাচ্যের দেশগুলো নিয়ে গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। আগের লেখাগুলোতে তিনি যে মনে করতেন উপনিবেশবাদ ‘ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ার’ হয়ে এই দেশগুলোতে এসেছে সেই ধারণা পরে অনেক পাল্টে গিয়েছিল। তাছাড়া ভারতে অনেক বছর পর ইরফান হাবিব, ডি ডি কোসাম্বি, রামশরণ শর্মা ও রোমিলা থাপারের মতো মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদরা তাদের গবেষণার মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে ‘ভারতীয় সমাজ ‘অনড়’ ও পরিবর্তনহীন’— এ ধারণা একদম ভুল। আপনার এই কথা ঠিক যে অনেক সময় যখন এই ধারণাগুলোর সমালোচনা হয়েছে তখনো সেই ইউরোপীয় ছকের মধ্যে ফেলে দেখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ওই সব কথা বাদ দিলেও আজকের দিনে গোটা পৃথিবী থেকে এত নতুন গবেষণা সামনে আসার পরে উপনিবেশবাদ সম্বন্ধে মার্ক্সের ১৮৫০’র দশকের উক্তিগুলোকে ধরে বসে থাকার কোনো মানে হয় না।

    দ্বিতীয়ত, আমি মনে করি না যে কেবল মাত্র পশ্চিমের গুণকীর্তনে মগ্ন থাকলে উগ্র–জাতীয়তাবাদ বা উগ্র–স্বদেশিয়ানার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। বরঞ্চ, যত বেশি আমরা তা করব তত বেশি আমরা ওই শক্তিগুলোর রসদ জোগাব। আজ এই বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ আছে যে আমাদের মতো দেশগুলোতে যারা নিজেদের আধুনিক ও সেক্যুলার বলেন তারা যেভাবে তাদের নিজেদের অতীতকে খারিজ করে পশ্চিম–ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন তাতে তারা সাধারণ মানুষ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন? আজ তার ফলে উগ্র–জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর সুবিধা হয়েছে এবং তারা তাদের উদ্ভট ‘ইতিহাস ব্যাখ্যা’ লোকেদের মধ্যে প্রচার করতে পেরেছে। এই ব্যাপারে আমি পার্থ–দা’র সঙ্গে একেবারে একমত যে দোষটা আমাদের সমাজগুলোর নয়, বরং আমাদের বিশ্লেষণ–উপকরণের। তার ফলে আমরা আমাদের সমাজে যা আছে বা যা ছিল তার কোনো মূল্য দেখতে পাই না আর কেবল কখনো feudalism, কখনো secularism, কখনো renaissance খুঁজে বেড়াই। আর না পেলে হতাশ হই।

    শিল্পী: দিয়েগো রিভেরা

    সর্বজনীনতার প্রশ্নটা বেশ জটিল। কিন্তু আমার মনে হয় সেটা অন্য দিক থেকে ধরলে ভালো হয়। আপনার প্রশ্নে মোটামুটি ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে তার সঙ্গে ‘সংকীর্ণ অতীতমুখিতা বা উগ্র–স্বদেশিয়ানার বিরুদ্ধে অর্থবহ আলাপ’ তুলতে পারার সোজা সম্পর্ক আছে। আমার প্রশ্ন হলো, বিগত দুয়েক শতকের অভিজ্ঞতা, সর্বজনীনতার একচেটিয়া আধিপত্যের অভিজ্ঞতা, এ বিষয়ে কি আমাদের আশ্বস্ত করে যে তার ভিত্তিতে কোনো ‘অর্থবহ আলাপ’ সম্ভব হয়েছে? আজকে বিশ্বজুড়ে সর্বজনীনতা প্রশ্নবিদ্ধ কেন? এবং প্রশ্ন তুলছে কারা? দুনিয়ার আদিবাসী (indigenous population) যাদের গণ–সংহার তো হয়েইছে; আবার তাদের অতীতের বস্তায় ফেলে আমরা–আধুনিকরা–সর্বজনীনতার বুলি কপচাই। আর প্রশ্ন ওঠে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা একদা উপনিবেশিত, নানান সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর দিক থেকে। তার কারণ হচ্ছে সর্বজনীনের বিষয়বস্তু (content) তো আগের থেকে ঠিক করা আছে। এটা তার প্রকৃতি— কতগুলো principle ধরেই তো আমরা দাবি করতে পারি যে এগুলোর ভিত্তিতে ‘অর্থবহ আলাপ’ করতে হবে। সে কারণে আজ দর্শনের ও দার্শনিকদের কাছে এটা এক বিশাল বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনে হয় সর্বজনীনের কোনো বিষয়বস্তু আগের থেকে নির্ধারিত করলে চলবে না— তার মানে এই যে, সর্বজনীন ওই ‘অর্থবহ আলাপের’ শেষে হয়তো আবির্ভূত হতে পারে। ততদিন এই আলাপ আধুনিক অর্থে আলাপ হবে না— যেখানে আমরা পরস্পরকে যুক্তির ভিত্তিতে নিজের মতের দিকে টানবার, convince করার চেষ্টা করি। ততদিন এই আলাপের ধরন আলাদা হতে বাধ্য— আমরা একে অপরকে গল্প শোনাতে পারি, তাদের গল্প শুনতে পারি, কিন্তু কেউ কাউকে দলে টানবার চেষ্টা করবে না। চেষ্টা করব সাক্ষাৎটা শেষ হওয়ার পরেও বুঝবার। এর জন্য সম্পূর্ণ একটা আলাদা মনোভাব দরকার।

    সারোয়ার তুষার: আপনার কাজে মার্ক্স ও মার্ক্সবাদ ফিরে–ফিরে আসে। আবার আপনি উত্তর–ঔপনিবেশিক (Post-colonial) চিন্তক হিসেবেও সমাদৃত। তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ বাস্তবতায় এটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ আপনার লেখালেখিত মার্ক্সবাদ ও উত্তর–উপনিবেশিকতাবাদ দুই–ই প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু আমাদের অঞ্চলের মার্ক্সবাদের অনুসারিরা (পার্টিজান এবং নন–পার্টিজান উভয় ঘরাণাই) উত্তর–উপনিবেশিকতাবাদ, নিম্নবর্গের অধ্যয়ন (subaltern studies), উত্তর–কাঠামোবাদের (post-structuralism) ঘোরতর বিরোধী। এর কারণ কী? অনেকের প্রতিক্রিয়ায় এমনও মনে হয় যে, মার্ক্সবাদী ছকে বিপ্লবটা যেন প্রায় হয়েই যাচ্ছিল; উত্তর–ঔপনিবেশিকতাবাদ, নিম্নবর্গের অধ্যয়ন কিংবা উত্তর–আধুনিক তত্ত্ব চর্চাই যত গণ্ডগোল পাকিয়েছে। পোস্ট–কলোনিয়াল চিন্তক হিসেবে একদিকে মার্ক্সবাদিদের গোঁড়ামি (Orthodoxy) মোকাবেলা, অন্যদিকে মার্ক্সকে নিজের কাজে বিপুলভাবে প্রাসঙ্গিক রাখা দুই–ই আপনাকে করতে হয়। এ বিষয়ে কিছু বলুন….

    আদিত্য নিগাম: আসলে নিজেদের ব্যর্থতার দায়িত্ব অন্য কারও ঘাড়ে চাপাতে পারলে এই ধরনের মার্ক্সবাদিরা বেঁচে যান। তাদের মনে হয় তাদের আর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এমন মার্ক্সবাদিদের (যে দুই ঘরাণার কথা আপনি বলেছেন, উভয়েরই) আসল সমস্যা হলো এই যে তারা মার্ক্সবাদকেও একটা ধর্মের মতো করে বুঝেছেন। ঠিক যেমন ধর্মের কাছে সব কিছুর উত্তর আগাম থাকে, কোনো প্রশ্নই তাদের বিচলিত করে না আর প্রশ্ন উঠলেই সেটা শত্রু শিবিরের কাজ হতে হয়— ঠিক তেমনই হচ্ছে এদের মার্ক্সবাদে আস্থা। তারা বিজ্ঞানের কথা বলেন। কিন্তু বিজ্ঞানের কারবারই হচ্ছে অজানার সন্ধান করা। বৈজ্ঞানিক যদি এই ভেবে বসে যায় যে তার কাছে সব কিছুর উত্তর আগের থেকেই আছে তাহলে বিজ্ঞানের কোনোদিন এক বিন্দু উন্নতি হতো না। এ–জাতীয় মার্ক্সবাদিরা আর সব কিছুতে ইতিহাসের দোহাই দেন কিন্তু নিজেদের ইতিহাসকে ভয় পান। এ এক অদ্ভুত সম্প্রদায়। আমরা নিম্ন–বর্গ অধ্যয়নের কথা নিশ্চয়ই আলোচনা করব, উত্তর–ঔপনিবেশিকতাবাদ ও উত্তর–কাঠামোবাদেরও আলোচনা করব অথচ তাদের মার্ক্সবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন তো ব্যাপক গণ আন্দোলনের মাধ্যমে হলো— ওখানে কোন দেরিদা বা ফুকো গিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? সোভিয়েত জনগণ কি নামও শুনেছিলেন এদের কিংবা এদের তত্ত্ব বা দর্শনের? সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের নামে তাদের যা গেলানো হচ্ছিল তাতে তাদের আপত্তি ছিল, গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে তাদের ঘোরতর রাগও ছিল। তাছাড়াও আরও অনেক সমস্যা ছিল যার উত্তর–আধুনিকতা বা উত্তর–কাঠামোবাদের সঙ্গে আদৌ কোনো সম্পর্ক ছিল না।

    দ্বিতীয় যে বিষয়টা উঠে আসে, সোভিয়েত পতনের পর, সেটা হচ্ছে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়বাদী রাজনীতি। এখানেও আইডেন্টিটি পলিটিক্স নিয়ে বিগত তিন–চার দশকের যে কাজ হয়েছে তাতে কোনে সন্দেহের অবকাশ নেই যে গায়ের জোরে ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদির বিলোপ সাধনের চেষ্টার প্রতিকার হিসেবেই এই ধরনের রাজনীতির আবির্ভাব। এখানে বোধ হয় এটাও বলে রাখা দরকার: অনেকে ভাবেন উত্তর–কাঠামোবাদের পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে কোনো তত্ত্বগত সম্পর্ক আছে যেটা আদৌ ঠিক নয়। উত্তর–কাঠামোবাদের পুরো কারবারই এর বিপরীত— এটা বোঝানো যে আইডেন্টিটি মাত্রই হচ্ছে অস্থায়ী ও অ–স্থির একটা ব্যাপার।

    এবার আমার কথা বলি। আমার মনে হয় মার্ক্স ও মার্ক্সবাদকে যারা মার্ক্সের জীবনের একটা পর্যায়ের কার্যকলাপ ও চিন্তার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেন তারা মার্ক্সের সঙ্গে তো অন্যায় করছেনই, সমাজের প্রতিও তাদের দায়িত্ব বর্জন করে ফেলছেন। মার্ক্স থেকে যে ধারা শুরু হয় সে বিগত দেড়শ বছরের যাত্রায় অনেক আঁকা–বাঁকা পথ হয়ে এগিয়েছে। বহু এমন অভিজ্ঞতা মার্ক্সবাদিদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হয়েছে যার কল্পনাও মার্ক্সের সময় করা যেত না। নানান উপধারাও এই সফরে বেরিয়েছে। এগুলোর অনেককেই আন্দোলন থেকে বার করে দেওয়া হয়েছে, শত্রু শিবিরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আজ যদি আমরা বিগত শতাব্দীর গোটা অভিজ্ঞতার হিসাব–নিকাশ করতে চাই এবং সমাজতন্ত্রকে নতুনভাবে কল্পনা করতে চাই তাহলে আমাদের মার্ক্সবাদের ‘মূল পাঠ’–এর বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে ও খুঁজতে হবে। উত্তর–ঔপনিবেশিক দুনিয়াতেই মার্ক্সবাদের অধিকাংশ জীবন কাটল— অথচ সেটার কিন্তু আজ অবধি কোনো তাত্ত্বিক বিবেচনা হয়নি। হয়নি কারণ সে ইতিহাসই আমরা বর্জন করেছি। আমি যেহেতু এই কাজটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তাই আমার জন্য মার্ক্সবাদের ইতিহাসের এক অন্য উত্তর–উপনিবেশিক পাঠও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

    সারোয়ার তুষার: আপনার প্রথম বই The Insurrection of Little Selves: The Crisis of Secular Nationalism in India বের হয় ২০০৬ সালে। এই বইতে আপনি নেহরুভিয়ান/মার্ক্সবাদী সেক্যুলার–জাতীয়তাবাদের সংকটকে উন্মোচন করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার (Communalism) মোকাবেলায় সেক্যুলারবাদের (secularism) ব্যর্থতার প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন। সেক্যুলার–জাতীয়তাবাদকে আপনি সাম্প্রদায়িকতার একমাত্র প্রতিষেধক (antidote) হিসেবে মনে করেন না, বরং সেক্যুলার–জাতীয়তাবাদ যে অনড় (rigid) পরিচয়বাদী রাজনীতি (identity politics) গড়ে তোলে তার বিপদের দিকটাও আপনি আমলে নিতে চান। এরপর নিবেদিতা মেননের সাথে যৌথভাবে লিখলেন Power and Contestation: India Since 1989, যেটা ২০০৭–এ বের হলো। ২০১০–এ লিখলেন After Utopia: Modernity, Socialism and the Postcolony নামক বই। Desire Named Development বইটি বের হয় ২০১১ সালে। এই বইয়ে আপনি পুঁজিবাদের অমোঘ অনিবার্যতাকে (inevitability) চ্যালেঞ্জ করছেন এবং উন্নয়নের নামে কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও বাস্তুহীনতাকে চিহ্নিত করছেন। আপনার সাম্প্রতিকতম বই বেরিয়েছে গত বছর— Decolonizing Theory: Thinking across Traditions। এই বইয়ে এসে আপনার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রথম পর্যায় শেষ হলো বলে কি ধরে নেয়া যায়? আপনার এই জার্নি সম্পর্কে আমাদের পাঠকদের কিছু বলুন। আপনার অনুসন্ধান কোথা থেকে শুরু হয়েছিল? এখন এসে নিজেকে কোথায় আবিষ্কার করছেন?

    ডিকলোনাইজিং থিউরি বইয়ের প্রচ্ছদ

    আদিত্য নিগাম: আপনি একদম ঠিক ধরেছেন। আসলে ১৯৯০–৯২–এ সক্রিয় রাজনীতি ছাড়ার পর থেকে মার্ক্সবাদের সম্বন্ধে যে প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম তার একটা পর্যায়ের অবসান ঘটল Decolonizing Theory: Thinking Across Traditions (2020e) এর সাথে। আঠারো বছর সিপিআই(এম)-এ কাজ করার পর যখন ১৯৯২তে পার্টি ছাড়লাম তখন যে প্রশ্নগুলো উদ্বেলিত করছিল তাতে এক দিকে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উঠে আসা জাতির প্রশ্ন প্রধান ছিল— যার সম্বন্ধে মার্ক্সবাদিদের কোনো ধারণাই ছিল না বললে চলে। আর ঠিক সেই সময়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটিও আমাদের অনেককেই ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল। অন্য দিকে সেই বছরগুলোই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সময়। সব মিলিয়ে ব্যর্থতার এমন এক অবস্থা যার ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট কোনো ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের কথা বলে করা যায় না। ভারতে আমরা এটাও তখন দেখতে পাচ্ছিলাম যে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনগুলো ঠান্ডা হয়ে গেলেও বিভিন্ন প্রদেশে আদিবাসী ও কৃষকদের জমি থেকে বেদখল করার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল। মার্ক্সবাদী ধ্যান–ধারণার মধ্যে এটা বোঝা মুশকিল ছিল। কৃষক ও আদিবাসীদের তো মার্ক্সবাদিরা ভাবতেন অতীতের ‘অবশেষ’ যাদের নিয়তিই হচ্ছে শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। তারাই তো নিঃস্ব হয়ে আধুনিক সর্বহারা হয়ে পুনর্জন্ম লাভ করবে! অন্যদিকে, শ্রমিকশ্রেণি বা সর্বহারা হলো পুঁজিবাদের সবচেয়ে মজবুত ও দৃঢ় বিরোধী। কিছুই ঠিক মিলছিল না আমার পুঁথি পড়া জ্ঞানের সঙ্গে।

    এখানে আরেকটা কথা বলা দরকার। ব্যবহারের দিক থেকে প্রথমে রাশিয়ার বিপ্লবের সময়ে এবং পরে আরও জোরালোভাবে চীন বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে, শ্রমিক–কৃষক ঐক্যর কথা উঠেছিল ঠিকই কিন্তু তার তাৎপর্য আমরা বুঝতাম না। এটা যে একটা সাময়িক, কৌশলগত ব্যাপার ছিল এবং ক্ষমতায় এলে কমিউনিস্টরাও ঠিক সেইভাবেই শিল্পায়নের মাধ্যমে কৃষকের বিলোপ সাধনের চেষ্টা করবে— এই বিষয়টি বুঝতে অনেক সময় লাগল। সমাজতন্ত্রের পতন না হলে হয়তো তার তাৎপর্য বুঝতাম না।

    সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর শুনতে লাগলাম যে তার পরাজয়ের আসল কারণ হলো কৃষি ও কৃষক–প্রধান সমাজগুলোতে বিপ্লব হওয়া যেখানে পুঁজিবাদের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেনি। চীনের প্রসঙ্গে মাও বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু মার্ক্সবাদের ইতিহাস দর্শন ও তত্ত্বের মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি।

    বলতে গেলে, যে দিক থেকেই দেখি, একই প্রশ্ন উঠে আসে। যেমন জাতির প্রশ্ন পুনরায় উঠে আসে, তেমনই আদিবাসী–কৃষকদের সংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে আসে— যাকে আমরা ‘অতীত’ ভেবে নিয়েছিলাম তার প্রত্যাগমন হয়! এখান থেকে জন্ম নিতে শুরু করল পুঁজিবাদের সঙ্গে আধুনিকতার সম্বন্ধের প্রশ্ন। সব মিলিয়ে যেটাকে ইতিহাস দর্শন বলা যায়, সেটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে যেগুলি এই সমস্ত বইয়ে নানানভাবে বিবেচনা করা হয়েছে

    Decolonizing Theoryতে এই চিন্তাগুলো একটা জায়গায় এসেছে। আমার মনে হয় এই সব ব্যাপার নিয়ে ভাবতে গেলে বারবার যে ‘লিনিয়ার টাইম’ এর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তার থেকে বেরোবার কিছুটা পথ এখানে খুঁজে পেয়েছি। বিভিন্ন দেশের স্কলাররা যে কাজ করেছেন এবং করছেন তার সঙ্গে একটা কথোপকথনের মাধ্যমেই এটা কিছুটা করা গেছে। কিন্তু এখনো তত্ত্বের দিক থেকে, philosophy’র দিক থেকে একটা তর্ক দাঁড় করানোর কাজ বাকি আছে। যতদিন না সেটা হচ্ছে ততদিন ইউরোপীয় জ্ঞানতত্ত্বের আধিপত্যকে ঠিক মতো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।

    রেফারেন্স:

    চক্রবর্তী, দীপেশ (২০১৬): ‘আরেক টোয়েন্টি টোয়েন্টি: পৃথিবীর উষ্ণতা–বৃদ্ধি ও মানুষের ইতিহাস’, ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ, তৃতীয় মুদ্রণ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা

    চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০১৫): ‘জাত–জাতি–জাতীয়তা’, ইতিহাসের উত্তরাধিকার, পঞ্চম মুদ্রণ, প্রথম সংস্করণ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা

    নিগাম, আদিত্য,

    -(২০২০ক): “করোনা জৈব–রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার”, অনু. সারোয়ার তুষার, বোধিচিত্ত, ৫ই এপ্রিল, ২০২০, https://sites.google.com/view/bodhichitta/%E0%A6%85%E0%A6%A4%E0%A6%AE%E0%A6%B0/%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%AF%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%9F%E0%A6%95%E0%A6%B8-%E0%A6%93-%E0%A6%AA%E0%A6%9C%E0%A6%AC%E0%A6%A6%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%AC%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%A4%E0%A6%AF-%E0%A6%A8%E0%A6%97%E0%A6%AE?authuser=0

    –২০২০খ, “পুঁজিবাদের পরের জীবন এবং নয়া শাতিরীয়–কোপার্নিসীয় বিপ্লব: আশার ইশতেহার–২”, অনু. সারোয়ার তুষার, অরাজ, ২রা মে, ২০২০, https://www.auraj.net/%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a5%a4%e0%a5%a4-%e0%a6%aa%e0%a7%81%e0%a6%81%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87/3976/

    Banerjee, Prathama; Nigam, Aditya and Pandey, Rakesh (2016): The Work of Theory: Thinking across Traditions, Economic & Political Weekly, Vol LI, NO 37, pp 42-50

    Ferguson, James (2015): Give a man a fish: Reflections on the New Politics of Distribution, Duke University Press, North Carolina

    Gorz, Andre (2001): Farewell to the Working Class: An Essay on Post-Industrial Socialism, Pluto Press, London

    De Soto, Hernando (2000): The Mystery of Capital: Why Capitalism Triumphs in the West and Fails Everywhere Else, Basic Books, New York

    Nigam, Aditya (2009): Democracy, State and Capital: The ‘Unthought’ of 20th Century Marxism, Economic & Political Weekly, Vol XLIV, NO 51, pp 35-39

    -(2014): Partha Chatterjee Interviewed by Aditya Nigam, Development and Change, Volume 45, Issue 5 p. 1059-1073

    – (2018): Theories from the South II: Interview with Aditya Nigam, Interviewed by Sohini Chattopadhyay, 10 November, Borderlines CSSAAME

    -(2020 a) : CORONA BIOPOLITICS AND LIFE AFTER CAPITALISM – A MANIFESTO OF HOPE I, 26 March, Kaflia.online

    -(2020b): LIFE AFTER CAPITALISM AND THE NEW ‘AL SHATIR-COPERNICUS’ REVOLUTION – MANIFESTO OF HOPE II, 09 April, Kaflia.online

    -(2020c): FASCISM, THE REVOLT OF THE ‘LITTLE MAN’ AND LIFE AFTER CAPITALISM – MANIFESTO OF HOPE III, 23 April, Kaflia.online

    -(2020d): BEYOND THE ‘EMPLOYMENT’ PARADIGM AND LIFE AFTER CAPITALISM – MANIFESTO OF HOPE IV, 07 May, Kaflia.online

    -(2020e): Decolonizing Theory: Thinking Across Traditions, Bloomsbury India, New Delhi

    Sanyal, Kalyan (2007): Rethinking Capitalist Development: Primitive Accumulation, Governmentality and Post-Colonial Capitalism, Routledge, New Delhi

     

  • বন্ধ রাখার পলিসি প্রসঙ্গে ।। মানস চৌধুরী

    বন্ধ রাখার পলিসি প্রসঙ্গে ।। মানস চৌধুরী

    গত কয়েকদিন ধরে ইউট্যাবের শিক্ষকদের মধ্যে ক্রমাগত বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেবার, ও সাধারণভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেবার তাগিদ ও দাবিনামা জোরদার হচ্ছে। ইউট্যাবের সূচনাকাল থেকে এর প্রবণতাগুলো লক্ষ্য করলে এই তাগিদবোধ গুরুতর হিসাবে দেখার আছে। এখানে গড়ে যা কিছু ‘সরকারের সমালোচনা’ বলে বিবেচিত হতো, তা কিছুকেই দলবেঁধে হামলা করার চল খুব বেশি কাল আগের কথা নয়। সেরকম একটা পরিস্থিতির বদল গণতন্ত্রমনা শিক্ষকদের জন্য দুর্দান্ত অগ্রগতি হিসাবে দেখা চলে।

    বিভিন্ন জনের কণ্ঠস্বর আমি লক্ষ্য করলেও দুজনের দুটো স্বরকে বিশেষ বিবেচনায় আনছি। একজন হলেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্প্যুটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তাহজীব উল ইসলাম। অন্যজন হলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ মাহবুব উল আলম। শেষোক্তজন মাওলানা আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ’র বরাতে মনোযোগ দিতে বলেছেন গত প্রায় বছর দুয়েক ধরে বেতনহীন জীবন কাটানো বেসরকারী ও নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের দিকে। আমার মনে পড়ে গেল, বছর কয়েক আগে নতুন স্প্রে-মরিচ অস্ত্র যোগাড়কারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সময়কাল। যখন এসব শিক্ষকেরা ন্যূনতম জীবনধারণের দাবিতে ঢাকা শহরে এসেছিলেন, পুলিশ তাঁদের সদ্যপ্রাপ্ত অস্ত্র ও পানিকামান দিয়ে ঘায়েল করে দিলেন। দুজন অন্তত বৃদ্ধ শিক্ষক এই শোকে বাড়ি ফিরে মারা গেছিলেন। তখন এঁদের আন্দোলনে সমর্থন করে একটা রচনা লিখেছিলাম আমি। ইত্তেফাক বা বণিকবার্তায়। ওসব পত্রিকা তখনো আমার কাছে রচনা চাইতেন। যাহোক, রচনাটি পড়ে বেশ কিছু শিক্ষক আর্দ্র হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা আমার ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ফোন দেন। আর যে বার্তাটা বলেন তা স্তম্ভিত হয়ে যাবার মতো: “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা আমাদের নিয়ে ভাবেন?” মাহবুব সাহেবের বার্তাটি আমাকে আবার সেই অচেনা সহকর্মীদের কথা মনে করিয়ে দিল আমাকে।

    তারপরও আজকের এই রচনাপ্রচেষ্টাটি আমার মুখ্যত তাহজীব সাহেবের রচনার উপলক্ষে। ‘রেড এলার্ট’ নামে তিনি চলমান অবস্থার প্রতি আমাদের দৃকপাত ঘটিয়েছেন। তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও মুখ্যত বেসরকারী ওসব স্কুলকলেজকে নিয়েই। রচনাটির শেষদিকে এসে তিনি এভাবে প্রশ্ন হাজির করেছেন:

    ….অন্য পেশার জন্য যেটা করা খুব সহজ একজন শিক্ষক… সরকারের কাছে আর সবার মত রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে পারেন না তাঁদের ক্ষুধার্ত পেটের ক্ষুধা মেটানোর দাবি নিয়ে। প্যান্ডেমিকের দোহাই দিয়ে সবাইকে আয়ের ব্যবস্থা রেখে একটি বিশেষ শ্রেণীকে বাইরে রাখবেন আবার তাঁদের জন্য বিকল্প কোন ব্যবস্থা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা করবেন না এটা কি ন্যায়সংগত?স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁরা কি তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেনা?নাকি দেশ শুধু ব্যবসায়ী আর সরকারী কর্মকর্তা দিয়েই চালাবেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব উঠিয়ে দিয়ে? প্রশ্নের উত্তর কারো জানা থাকলে দয়া করে জানাবেন।

    আমি লিখতে বসেছি আমার অশান্তির জন্য। আমি প্রায় নিশ্চিত যে জনাব তাহজীবের প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। আমি নিজে একে উত্তর হিসাবে দেখছিও না। তবে এই উছিলায় সাধারণভাবেই বন্ধ শিক্ষায়তন পলিসির একটা পাঠপ্রস্তাব আমি হাজির করছি। এটুকু লিখে আমার মনে হলো, এটাও বলা দরকার যে, আমার দেখার পদ্ধতিতে যাঁরা আপত্তি করবেন তাঁরা সরাসরি করলে আমি খুশি হব। উপরন্তু ‘পরে বিশদ লিখব’ বলে বসে থাকতে চাইছি না বলে কিছু বিষয় সংক্ষেপিত হয়ে থাকতে পারে। আপনাদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে সেসব ভাবনা বিশদ করার সময়ও আমি বের করব।

    ফ্যামিলি লাইফ ডিউরিং এ প্যান্ডেমিক
    শিল্পী: লেইফ লারসন

    চলুন প্রথমেই আমরা কমবেশি সকলের জ্ঞাত জিনিসগুলো একবার ঝালিয়ে নিই। এটা আমি স্কিমেটিক্যালি/অনুচ্ছেদীয় পদ্ধতিতে করতে চাই। এখানেও যদিওবা আমি সকলের জ্ঞাত বললাম, কোনো পর্যবেক্ষণে যে কারো আপত্তি পেশাগত রাস্তাতেই জানতে পারব ধরে নিচ্ছি।

    এক।। ২০১৯ এর ডিসেম্বর মাস থেকে করোনার বৈশ্বিক হৈচৈয়ের সময় থেকেই বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা নিয়েছিলেন সেই রাস্তা যা বহুকাল ধরেই তাঁরা নিয়ে থাকেন। ডিনায়াল। “আমাদের এইখানে কিস্যু হবে না।” কিংবা “আমাদের অমুক তমুক লিডার থাকার কারণে ভাইরাস ডরায়ে পালায়ে যাবে।” প্রপাগান্ডিস্ট মন্ত্রী-সাংসদ-কর্মী ও প্রেস মোটামুটি এই ভূমিকায় রইলেন।

    দুই।। লকডাউন যখন বৈশ্বিক আওয়াজ তখন ২০২০-র মার্চ মাসে আকস্মিক লকডাউন বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করলেন। আর লকডাউন ঘোষণার জন্য দেশের আর্থ-সামাজিক খতিয়ান যতটা আন্তরিকভাবে নেবার কথা তার ধারেকাছেও বাংলাদেশে নেয়া হয়নি। কোনো গরিবের জন্য কোনো ধরনের গৃহাভ্যন্তরীণ জীবনযাপনের রসদ দেয়া হয়নি। যদি ভারতে গরিব মানুষের ঢল রাস্তায় না নামত তাহলে হয়তো বাংলাদেশী প্রশাসনের করোনায় অসংবেদনশীল আসনের প্রথমস্থান লাভ করতে বিশেষ কোনো কম্পিটিশনেরও প্রশ্ন আসত  না।

    তিন।। লকডাউনে গরিবেরা নানাবিধ পেশায় মরিয়া জীবনযাপন শুরু করার চেষ্টার শুরু থেকেই লাগাতার গালমন্দ খেয়ে আসছেন ভদ্রলোকদের। তাঁরা স্বাস্থ্য-অসচেতন, লকডাউন মানেন না ইত্যাদি। এই ‘অচেতন’ ফেরিওয়ালা ও মজুরকুলিগণের প্রতি ভদ্রলোকদের গালির বয়সও প্রায় করোনারই বয়সী। এখন পর্যন্ত ঘরের দরজা থেকে পটল কেনার পর বাসায় পটল খেতে খেতে ওই গরিবের “অসচেতন” সত্তাকে গালি দেয়ার অভ্যাস বলবৎ আছে ভদ্রলোক শ্রেণীর।

    চার।। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কুল-কলেজ, বেসরকারী স্কুল-কলেজ, এমপিও-ননএমপিও সকলেই ‘লকডাউনে’ কাটা পড়েছে এক কোপে। অর্থাৎ কোনো দূরদর্শী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতাধীন হয়ে তাঁর বন্ধ বা বন্দি নন। দশাটা প্রায় প্রতি সপ্তাহে নবায়নযোগ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোঁতাকুঁতিমূলক ঘোষণাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে আছে।

    পাঁচ।। বেসরকারী কথাটা ঘোর এক বে-ইনসাফ বাংলাদেশে। এখানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ও বেসরকারী। ম্যাপল লিফ বিদ্যালয়ও বেসরকারী। আবার কোনো এক রসুলপুরের দীননাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ও বেসরকারী।

    ছয়।। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোটের উপর স্বায়ত্বশাসনের দুর্ভার বহনের লজ্জা নিয়ে চলতে চলতে প্রায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পৃষ্ঠার নোটিসের শাসনের অধীন বানিয়েছে নিজেদের।

    সাত।। উপাচার্য নিয়োগ ছাড়া আর যে কাজটাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টগবগে উত্তেজনা দেখা যায় তা হলো বিসিএস নিয়োগ। বস্তুত করোনার মধ্যে যা ও যতটুকু পরীক্ষা হয়েছে তা বিসিএসের লক্ষ্যেই হয়েছে। বিসিএসটা যে পেছালো সেটাই বরং বেরসিকের মতো এন্টিক্ল্যাইম্যাক্স ঘটেছে।

    আট।। ইউজিসি একটা রহস্যোপন্যাসের নায়কের মতো সংস্থা যাঁদের কর্মকাণ্ড টের পাওয়া যায়, কিন্তু ঠিক কোনোকালেই বোঝা যায় না যে কী করছেন।

    নয়।। করোনা নির্বিশেষেই বাংলাদেশের হেভিওয়েট অধ্যাপকেরা উপাচার্য হওয়াহওয়িকেও থোড়াই কেয়ার করে প্রথমে জাতিসংঘ অন্যান্য বেরাদরিতে “উচ্চমূল্য গবেষক” (কমিশন্ড রিসার্চার বা ভাড়াইট্যা প্রতিবেদক) হলেন; আরো পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের “গবেষণা ফান্ড” পেতে থাকতেন। এসব ফান্ডের পরিমাণ আপনাদের মধ্যে যাঁদের হৃদপিণ্ড দুর্বল তাঁদের না-জানাই ভাল। আর কীভাবে পাওয়া যায় তা আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার জানমালের নিরাপত্তাহীনতা ঘটাবেন না প্লিজ। (এই অংশটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু নয়; একটু ভাবলেই বুঝবেন। সহজ ক্লু দিই … দেশের উন্নতির জন্য ওসব গবেষণা কি বসে আছে?)

    দশ।। সরকার, তার অংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একপৃষ্ঠা নোটিসে শাসিত থাকতে পেরে খুশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাস্তবে কোনো কিছু জানে না। সকলে সকলের জন্য অপেক্ষা করে আছে। এবং সম্ভবত পাশের দেশের দিকেও তাকিয়ে থাকতে পারে – কখন কী খুলল বা বন্ধ হলো।

    এই তালিকাটি আসলে সর্বাত্মক হলো না। আরো কিছু বিষয় অনায়াসেই আসতে পারে। ডিজিটাল কাল। পরেও সংযোজন করা যাবে। আমি আসলে দেরি করতে চাইছি না। যদি এগুলোতে আপনাদের সম্মতি থাকে তাহলে আপনারা নিজেরাও হালিখানেক যোগ দিয়ে নিতে পারবেন। বরং, কী কী পরিস্থিতিতে এই ‘বন্ধ পলিসি’টাই আমাদের অধিনায়কদের সব থেকে পছন্দের হচ্ছে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা করি।

    শিল্পী: লিওন জারনিটস্কি

    ক. আতঙ্ক ও অজনপ্রিয়তার পরিস্থিতি      

    এটা সবচেয়ে সহজ বিষয়। আমি না লিখলেও চলত। অন্তত যে তিনটা পরিস্থিতি আমি লিখব তার মধ্যে এটাই ধ্যাবসা কিসিমের। বাচ্চারা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে সংক্রমিত হতে পারেন। আর তাতে বিশ্বদরবারে ভারী বদনাম হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কা প্রতিপালকদের মনে দেখা দেয়া সঙ্গত। এটাই দীর্ঘসূত্রিতার কারণ। তবে কোনো পরিকল্পনা বা দূরদর্শিতা না থাকার পক্ষে এই আতঙ্ক যথেষ্ট নয়। কিন্তু কী করা! বলা হয়ে থাকে রাজা তাঁর প্রজাদের আত্মার অনুরূপ। হয়তো আমরাই ভ্যাদভ্যাদা। তবে এটা ঠিকই যে বাংলাদেশের করোনার মৃত্যুমিটার বেশ স্লো। আমাদের কম ভয় পাওয়া অন্যায্য হতো না। বিশেষত, লকডাউনের সময় গরিব মানুষের জন্য ঠেলাঠেলির পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে যে রাষ্ট্র তার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এত ভয় মানায় না। 

    খ. বেতনভুক ও অবেতনভুক ভেদাভেদ পরিস্থিতি/পলিসি    

    জনাব তাহজীব ও জনাব মাহবুবের কনসার্নের সঙ্গে খুব যায় এগুলো। বিভিন্ন আপৎকালীন সময়ে সমাজের শ্রেণীগত পাটাতনকে দোমড়ানো-মোচড়ানো কিংবা পুনর্গঠন করা শাসকদের (এটা কেবল একটা সরকারী দল বোঝাচ্ছি না, বৃহত্তর সিস্টেমের দণ্ডমুণ্ড কর্তারা) অত্যন্ত প্রিয় ও পুরাতন কাজ। যাঁরা মার্ক্সবাদকে তীব্র ঘৃণা করেন তাঁরাও এই শ্রেণীভেদ পুনর্গঠনের বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেন। বস্তুত ইনসাফ-বেইনসাফের প্রসঙ্গ, কিংবা সুবিধা দেয়া ও হরণ করার প্রসঙ্গ একজন বেচারা মার্ক্সের সঙ্গে অত সম্পর্কিতই নয়। এই যে আমরা বেতন পাচ্ছি ও বগল বাজাচ্ছি, রাতের বেলা চিচিঙ্গার হালুয়া রান্না করে ফেসবুকে পোস্ট করছি আর তাহজীব-মাহবুব যাঁদের কথা বললেন তাঁরা চোখের পানিতে নিশাবসান চাইছেন এইখানে একটা কেরামতি সব সময়েই থাকে। সেজন্যই আমাদের নাকের ডগাতেই্ যখন ম. খা. পুলিশ ওই গরিব মাস্টারদের পেটাই দিল আমরা ঠিকই পাশে ঢাবি কলাভবনে বা কার্জন হলে ঢুকে ফুকো বা মার্ক্স, রবীন্দ্রনাথ বা পার্টিকেল ফিজিক্স পড়তে পারলাম। অন্য সময়ে “ওহে সহকর্মী বৃন্দ, আ গলে লাগ যা” বলে সেসব স্কুলের মরিচের গুঁড়াচোখের শিক্ষককে কোলাকুলি করলেও, আমরা উভয়পক্ষই জানি শিক্ষক হয়েও আমরা একজাতের শিক্ষক না। বাস্তবে, শ্রেণী পুনর্গঠনে অত্যন্ত পাকা হলো জাতিসংঘ। দেশে যখন চার হাজারের চাকরি মাস্টার্স পাশেরা (ধরুন পুরুষই) পাননি, তাঁরা বিশ হাজারের চাকরিতে ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ’ শুরু করে দিলেন। আপাতত বন্ধ শিক্ষায়তন মানেই মিনিমাম দুই রকমের মাস্টার – খেতে পাওয়া মাস্টার, আর না-খেতে পাওয়া মাস্টার। মেলা বুদ্ধি এঁদের।

    গ. আন্দোলনহীন দন্তনখরহীন ক্যাম্পাস পলিসি    

    এটাকে অতিশয় গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আপনারা যদি ভেবে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ কেবল ভিসি নিয়োগ দেয়া, আর ভিসিদের কাজ কেবল ফিতা কেটে বিভিন্ন জিনিস উদ্বোধন করা তাহলে তা ঠিক নয়। এগুলো অতিশয় মস্ত কাজ। তবে একাংশ মাত্র। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এলে কিছু উত্তেজনার সম্ভাবনা আছে। এটা ঠিকই বাংলাদেশ এখন প্রায় শতভাগ মিঁউবিলাইয়ের দেশ। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে কিছু মানুষের ঈমান জাগ্রহ হতে পারে এবং ইনসাফ-ন্যায্যতার লড়াই দেখা দিতে পারে। সেটার বিষয়ে চুলচেরা খতিয়ান ছাড়া কর্তৃপক্ষ নড়বেন না বলেই মনে হয়।

    আপনারা বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। ঘটনাচক্রে আমি জাহাঙ্গীরনগরে চাকরি করি। আমার চাকরিপ্রাপ্তির ইতিহাস সহজ ছিল না। যদি ২৫ বছর আগে দেশে এতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকত, তাহলে আমারও যে কোনো একটাতেই হয়তো কাজ করতে থাকার বাস্তবতা তৈরি হতো। আমি শুধু চাইছি আপনারা ভাবুন যে কেন তিনটা তিন তলা ভবন দাঁড় করিয়েই একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত “বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি” বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হলো! এমনকি কোনো কোনো ক্যাম্পাস একটা স্ট্যান্ডার্ড জেলা শহরের সরকারী স্কুলের তুলনায় ক্ষীণকায়া, কোনো কোনো ক্যাম্পাসে যে কোনো পুরান কলেজের সমান একটা (প্রধানত পুরুষের) খেলার মাঠ নেই। আপনারা একটু ভাবুন যে কেন ঢাকা বা রাজশাহী বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা কলেজগুলোকে টেনেটুনে একটা ম্যালফাংশনিং কর্তৃপক্ষের হাতে দেয়া হলো! কীভাবেই বা সময়কালটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশকালের সঙ্গে মিলেমিশে গেল! এগুলো ভাবলেই উচ্চশিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটা নকশা (নীলনকশা মেলাদিন ধরে বলে বলে কেমন জানি হয়ে গেছে) বুঝতে পারবেন। এই নকশার মধ্যে খাপছাড়া যেটা ঘটে গেছে তা হলো ভ্যাট ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যা কিনা কর্তৃপক্ষের হিসাবের বাইরে থেকে গেছিল। তবে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে কী চলছে, কীভাবে ‘শিক্ষার্থী-বান্ধব’ শিক্ষকদের আলাদা করে টার্গেট করা হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে দেখতে পারেন।

    ঘ. গুদামপোড়া ও আলুপোড়া পরিস্থিতি     

    এটা গ্রামীণ গল্প, আপনারা সবাই জানেন। কারো গুদাম পোড়ে আর কেউ আলুপোড়া খাবার শখ করে তখন। যে কোনো আপদকালীন পরিস্থিতিতেই কেউ কেউ বাণিজ্য সম্ভাবনা দেখতে পান। ১৯৭১ সালেও জমির দালালি করেছেন অনেকে যাঁরা নামমাত্র বা বিনি পয়সায় কারো না কারো, সাধারণত হিন্দুদের, জমি বিক্রির দালালি করেছেন। করোনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে কী কী ঘটেছে তা বলে আমি আমার কপাল পোড়াতে চাইব না। কিন্তু আমি না বললেই যে আপনারা জানেন না তা তো নয়। তাছাড়া বাংলাদেশ কেন শুধু, পৃথিবীর মহাশাসক আমেরিকাতে পর্যন্ত জনসন আর ফাইজার কাইজার কথা আপনারা জানেন। সারা বিশ্বে ওষুধ কোম্পানিগুলোর মাস্তানি বিষয়ে আমার মতো রোগাপটকা শিক্ষক না বললেও চলবে। আর বাংলাদেশের কথা তো বলবই না। কিন্তু করোনা বা যে কোনো মহামারীতে স্বাস্থ্যখাতের বাণিজ্যগুলো যত সহজে বোঝা যায় শিক্ষাখাতের বাণিজ্যগুলো তো অত সরল নয়।

    শিল্পী: আরশিল গোর্কি

    আপনারা পাশের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতেই যদি লক্ষ্য করেন, যদিও এসব চ্যানেলের আদিমালিক বা আসল মালিক খুব জটিল বিষয়, কিন্তু টার্গেট অডিয়েন্স হিসাবে ভারতীয় চ্যানেল ধরেই আগাই, দেখবেন এই করোনাকালে (ভদ্রলোকী) শিশুদের জন্য কতগুলো ডিজিটাল-শিক্ষালয় চালু হয়েছে। এসব কাজে প্রায়শই সামাজিক দায়দায়িত্বের গালগল্প থাকে; কিংবা নন-প্রফিট ট্যাগ। দয়া করে আদ্যোপন্ত অবিশ্বাস করবেন গোড়াতেই। এগুলো বিশাল সব বাণিজ্যিক প্রকল্প। কেবল বৈশ্বিক মধ্যবিত্ত বাসায় বসে বসে খরচ করেছেন বলেই এমাজন বা নেটফ্লিক্সের মতো কোম্পানি সব লালে লাল হয়ে আছে (ফাইজার টাইজার তো আছেই)। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে নয়া বাণিজ্য সম্ভাবনাগুলো আমাদের মতো দেশে এখনো পুরোটা খতিয়ে দেখা হয়নি। কে খতিয়ে দেখেনি? মানে হলো, যাঁরা “সামাজিক দায়দায়িত্ব” নিয়ে নিছক “ননপ্রফিট’ কর্মকাণ্ড চালান তাঁরা পুরোটা এখনো বুঝে সারতে পারেননি যে এখানে কী কী বাণিজ্য লুকায়ে রয়েছে। কথায় বলে “যেখানে দেখিবে ছাই”। আর আমরা যাঁরা এখানকার কর্মচারি আমাদের তো কল্পনাশক্তিতেই পুরা নাই যে কী কী বাণিজ্য হতে পারে। এখানে আপনাদের হোমওয়ার্ক হিসাবে যে কোনো নতুন প্রকল্প লিখে গুগলসার্চ করলেই যে পেয়ে যাবেন অংকের খতিয়ান ততটা সহজ নয়। তারপরও কোঁতাকুঁতি করলে কিছু জিনিস বুঝবেন।

    যেমন আমি এই রচনা লিখতে গিয়েই রিসেন্ট প্রকল্পের তালিকায় যৎসামান্য ১০ হাজার কোটি টাকার কিছু হিসাব পেলাম যা কিনা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮০০ কোটি টাকার একটা প্রকল্প হচ্ছে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যকার শিশুদের এনআইডি বা এইরকম কিছু। আমি আরো মনোযোগ দিয়ে খুঁজতে পারতাম। খুঁজিনি তাড়াহুড়ার কারণে নয়। দুটো কারণে। এক, খুঁজলেও স্ফটিকস্বচ্ছ কিছু পাব না। দুই, না খুঁজলেও আমার বুঝতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু আপনাদের যাঁদের হাতেনাতে প্রমাণ না পেলে কোনো কিছুই বোঝা হয়ে ওঠে না, তাঁরা অবশ্যই নানান কায়দা করে খোঁজা চালিয়ে যান। নেটে ভূত থাকে। নানান কিছু খেয়ে ফেলে। সাংবাদিকতার জগতে ভূত থাকে, নানান কিছু খেয়ে ফেলে। তারপরও নানান আলামত পাবেন, যার সঙ্গে আপনার কল্পনাশক্তি মিশিয়ে ভালমতো কিছু “ডেটা” বুঝে যাবেন আপনি। ধরুন বিডিরেন। এটা তো আজ আপনাদের সকলেরই চেনা। কী লেখা আছে তাঁদের কোম্পানি বিষয়ে? কয়েকটা বাক্য এরকম: “BdREN is being operated as a Non-profit Trust organization with a board of trustees consisting of representatives from the universities/user communities, UGC, MoE and other members co-opted for their expertise and position in relevant industries.” এই যে শেষে কয়েকটা শব্দ পেলেন – এক্সপার্টিজ, ইন্ডাস্ট্রিজ – এগুলো কিন্তু বোমার মতো। আপনি কনুই কামড়িয়ে মরে গেলেও সঠিক জানতে পারবেন না যে কার কী ভূমিকা, কী কর্তৃত্ব, কী পরিকল্পনা, আর কী আয়। ঠিক সেভাবে পাসপোর্ট ছাপানোর কন্ট্রাক্ট কে পান, ওই অভূতপূর্ব সাবেক এনআইডি’র ঠিকাদারি কার ছিল ইত্যাদিরও পুরা হদিশ হয়তো করতে পারবেন না। কিন্তু এটুকু যদি বিশ্বাস করেন যে এগুলো বস্তা বস্তা টাকার প্রজেক্ট, তাহলে আমার উপর বিশ্বাসের কারণে আপনার কোনো পাপ হবে না। পরের যেটা স্মার্ট আইডি সেখানে অবশ্যই গণেশ মুখার্জির নাম গণি মণ্ডল হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে ওটা কম টাকার প্রকল্প তা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং ওটা আগের ওই দুর্দান্ত মানের বস্তুটার তুলনায় দশগুণ বেশি হয়ে থাকবার কথা। এটুকু বুঝে গেলে আপনারা বুঝতে পারবেন যে আগামীতে কিছু লোক ঘাপটি মেরে নানান এ্যাপ, ঠ্যাপ ইত্যাদির ভূয়সী “ননপ্রফিট” সব প্রকল্পের অপেক্ষাতেও আছেন।

    আমার এই রচনাটি সম্পূর্ণ হলো না। কিন্তু অসম্পূর্ণ রচনা এটি নয়। নন-এমপিও ওই শিক্ষকেরা যদি এখনো বেঁচে থেকে থাকেন তাহলে তা অবশ্যই তাঁদের জানের শক্তি। কিন্তু আমরা যাঁরা প্রতিমাসে বেতন ব্যাংকে পেয়ে যাচ্ছি, তাঁরাও যে এই ব্যবস্থায় বেঁচে আছি তা প্রমাণ করা খুব কঠিন। আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ গায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ চিমটি কেটে দেখা দরকার।

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

    আদাবর।। ২৭ মে ২০২১।। বিকাল ৫:৩২

  • আহমেদ কামাল ।। জন-ইতিহাস কী এবং কেন?

    আহমেদ কামাল ।। জন-ইতিহাস কী এবং কেন?

    [আহমেদ কামালের এ প্রবন্ধটি তার কালের কল্লোল : ইতিহাস, উন্নয়ন ও রাজনীতি  গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে লেখাটি অরাজের পাঠকদের জন্য অনলাইন মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দেয়া হলো। – সম্পাদক]

    আহমেদ কামাল

    দুটো বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে এ বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথমটি হচ্ছে দ্যা প্র্যাকটিস অব হিস্ট্রি গ্রন্থে ঐতিহাসিক জি. আর. এলটনের একটি উক্তি, যার বাংলা করলে অনেকটা এরকম অর্থ দাঁড়ায়—‘মানুষ এ যাবৎকাল যা করেছে, বলেছে, ভেবেছে এবং সর্বোপরি যত দুঃখ কষ্ট ভোগ করেছে তার সবটাই ইতিহাস চর্চার অন্তর্গত।’ তারপরও কথা থাকে। পুরা অতীতটা কিন্তু কোনভাবে পুনরুদ্ধার হয় না। কারণ যেটুকু সাক্ষ্যপ্রমাণ টিকে আছে অথবা যুক্তি খাটিয়ে যতটুকু সাক্ষ্যপ্রমাণ জড়ো করা যায়, তার ভিত্তিতে ঐটুকু অতীতই কেবল উদ্ধার করা সম্ভব। আসলে ইতিহাস–চর্চা হচ্ছে বর্তমানের গায়ে অতীতের যে ছাপ তাকে বোধগম্য করা। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে প্রেজেন্ট এভিডেন্স। অর্থাৎ আজ এই মুহূর্তে যেই এভিডেন্সগুলি হাতের কাছে আছে তাই দিয়ে অতীতের পুনর্গঠন চলছে। মনে রাখতে হবে এভিডেন্স শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পাশে রাজনীতিও নিরন্তর কাজ করে চলছে। দ্বিতীয়ত, মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারিত হয় ক্ষমতার সম্পর্ক দ্বারা। হেরোডোটাস থেকে শুরু করে দ্যা এন্ড অব হিস্ট্রি এন্ড দ্যা লাস্ট ম্যান–এর লেখক ফুকুয়ামার সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ এখন পর্যন্ত, মানব সমাজ প্রভুত্ব এবং অধীনতার সম্পর্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । যদিও এর চেহারা এবং বৈশিষ্ট্য নানারকম হতে পারে। ফোকাসটা আরো কাছে নিয়ে আসলে দেখা যাবে যে, ফরাসী বিপ্লবের পর থেকেই ইতিহাস জাতিরাষ্ট্রের চাহিদা অনুযায়ী  তৈরী হচ্ছে।  ইতিহাস চর্চা অনেকখানি আটকে পড়েছে জাতিরাষ্ট্রের স্রষ্টা শ্রেণীটির জীবনী রচনার মধ্যে। এই শ্রেণীটি উপনিবেশগুলার ভাগ্য নিয়ন্তাও বটে। এই ইতিহাসের রাজনীতি তো খুবই স্পষ্ট। জন–ইতিহাসকে এই দুই বেড়া ভেঙে বের হবার আশ্বাস দিতে হয়। কাজটি মূলত রাজনৈতিক।

    এবার জন–ইতিহাসের ইতিহাসটা একটু  খোঁজ করা যাক। ঐতিহাসিক কারণেই এই ইতিহাস চর্চার আদিভূমি ইউরোপ।

    পিটার বার্ক জন–ইতিহাস চর্চার সূচনাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘ডিসকভারি অব দ্যা পিপল’ নামে। সুইডেনের ঐতিহাসিক এরিক গিজারের (১৭৮৩–১৮৪৭) হিস্ট্রি অব দ্যা সুইডিশ পিপল, চেক ঐতিহাসিক ফ্র্যানটিসেক পালাকির (১৭৮৩–১৮৭৬) হিস্ট্রি অব চেক পিপল , ম্যাকলির ১৮৪৮ সালের হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড এসবই ইতিহাসে জনগণ আবিষ্কারের পথিকৃৎ। জনগণ আবিষ্কারের এই কাজটিতে পর্যটকরা অনেকখানি সাহায্য করেছে। ১৭৭০ সালে ইতালির পাদ্রী আলবার্তো ফরতিস ডালমাশিয়া ভ্রমণে যেয়ে মোরলাচিদের জীবনপদ্ধতি,সংস্কৃতি, ধর্ম আচার ইত্যাদি দর্শন করেন। 

    প্রথম পর্যায়ে জন–ইতিহাসের একটি প্রধান* উপাদান কিন্তু লোকসঙ্গীত। জার্মান কবি ও ফোকলরিস্ট আসিম ভন অরনিমের (১৭৮১–১৮৩১) মতে, লোকসঙ্গীত ইউরোপের অনেক দেশের বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিল। জাতির  কল্পনাটা যদিও বুদ্ধিজীবীদের কাছে থেকেই এসেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিহাস  চর্চা এক নতুন বাঁক নেয়। ইতিহাস এবার ‘পলিটিক্স এন্ড প্রোডাকশন অব আইডেন্টিটি’তে জড়িয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে উঠতি দেশীয় ক্ষমতাধরদের নির্ভরযোগ্য মিত্র হয় ইতিহাস। জাতিয়তাবাদী  আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হয় জাতিরাষ্ট্রের। ৬০ এর দশকে এসে  পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশেই জাতীয় ইতিহাস যেসব গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে লেখা হচ্ছিল সেইসব অবহেলিত গোষ্ঠীগুলাকে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু হয়। ১৯৬০– এর দশকের দশকের এই তালিকায় প্রাক্তন ক্রীতদাস, শ্রমিক শ্রেণী, দাগী আসামী , নারী, শিশু, বৃদ্ধ এরা স্থান পেতে থাকে। ‘৭০ এর দশকে  এই ইতিহাসকেই বলা হতো হিস্ট্রি ফ্রম বিলো। 

    ‘৭০ ও ‘৮০ এর দশকে সদ্য উল্লিখিত তালিকাটি আরো একটু বড় হয়। এবার ছোটখাটো জাতিসত্ত্বা, নারী ও পুরুষ সমকামী এরাও স্থান পেতে শুরু করে। এদের ইতিহাস ‘মাইনরিটি হিস্ট্রি’ নামে পরিচিত হয়। অর্থাৎ গণতন্ত্রমনা ঐতিহাসিকেরা জাতির ইতিহাসের মূলধারা থেকে বাদ যাওয়া এইসব জনগোষ্ঠীকে ইতিহাসের ধারায় ফিরিয়ে আনতে শুরু করেন। যে মাইনরিটির কথা উল্লেখ করা হলো, তালিকাটি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে তারা শুধু সংখ্যায় না, গুরুত্বেও মাইনরিটি। গত দশকের শুরু থেকে মাইনরিটি হিস্ট্রির কাছ থেকে সরকারি অথবা সরকার সমর্থনপুষ্ট  জাতীয় ইতিহাস দেশে দেশে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। দীনেশ চক্রবর্তীর মতে,  উত্তর আধুনিকদের ‘মহা আখ্যান’ বা ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ এর সমালোচনা ব্যবহার করে জাতির একটি মাত্র সত্যায়িত ইতিহাসের ধারণাকে পরিত্যাগ করছে। প্রমাণ করা হচ্ছে জাতি আসলেই অনেকগুলি প্রতিযোগী আখ্যানের সৃষ্টি। মাইনরিটি হিস্ট্রির লড়াই আসলে এই এই জাতির কাহিনীতে জায়গা করে নেবার লক্ষ্যে পরিচালিত । আমরা যে জন–ইতিহাসে কথা বলছি তা আসলে ঐ মাইনরিটি হিস্ট্রি। প্রথমে তা প্রতিবাদী ইতিহাস হিসেবে মাথা তোলে, তারপর তা ধীরে ধীরে মহা–আখ্যানের মিছিলে শরিক হয়। প্রতিবাদী চরিত্রটা তখন বাড়তি একটা খোলসে রূপান্তরিত হয়।

    শিল্পী: হরেণ দাস

    ইতিহাস যেহেতু একটি সাক্ষ্য–প্রমাণভিত্তিক যুক্তিনির্ভর আখ্যান তৈরীর কৌশল, সেহেতু জন–ইতিহাসের চর্চা একটু আয়াসসাধ্যও বটে। আমি প্রথমে স্মরণ করেছি সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া ইতিহাস তৈরী হয় না। সমাজে আমরা যাদের জনগণ, ছোটলোক বা নিম্নবর্গ বলি তারা কিন্তু কর্মকান্ডের দলিলের রেখে যায় না, তাদের কীর্তির বেশিরভাগ ধরা থাকে স্মৃতিতে। এই স্মৃতিকে ইতিহাস করার প্রক্রিয়াকে সম্প্রতি ‘মুখের কথার ইতিহাস’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। এখানেই জন–ইতিহাসের উপাদান নিয়ে দু’ একটা কথা সেরে নেয়া ভালো। জন–ইতিহাসের উপাদান কী? লিখিত সূত্রের অভাবে মৌখিক সূত্র নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান উপাদান। তাছাড়া গুজব, গান, কৌতুক, লৌকিক উৎসব, অল্পশিক্ষিত গ্রাম্য কবিদের রচিত পথুয়া সাহিত্য যাতে ৮ থেকে ১৬ পাতার কবিতা, তবে এর কোনটাই নির্ভেজাল লৌকিক সূত্র নয়। একে দক্ষতার সাথে ও সঠিক তাত্ত্বিক শক্তিতে বলীয়ান হতে হয় ধীরে ধীরে–ইংরেজিতে যাকে বলা হয় আনপ্যাক করা, সেই কাজটিই করতে হয়। জনস্মৃতির সমস্যা নিয়ে বর্তমানকালের ফরাসি দার্শনিক ফুকো কিছু প্রশ্ন  তুলেছেন। তার মতে জনস্মৃতি মিশেলহীন নয়। জনস্মৃতি ‘unified, fully achieved and therefore capable of sustaining  a memory wholly apart from the dominant construction of the past’ এ কথাটি ফুকো স্বীকার করেননি। আসলে প্রায়শই জনস্মৃতিতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে আবদ্ধ মানুষের মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। এই বিষয়ে সচেতন না হলে জন–ইতিহাসের সত্যিকার অবস্থানটা শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। জন–ইতিহাসের পক্ষের রাজনীতি ও গভীর সৃজনশীলতা দ্বারাই জন–ইতিহাস তৈরি  সম্ভব। 

    আমি এরকম তিনটি রচনার উদাহরণ দিতে চাই। 

    বার্কলের অধ্যাপক দিলীপ বসু ও তার সহযোগীর লেখা মল্লবীর। এ বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। মল্লবীর কলকাতার অপরাধ জগতের এক উড়িয়া গুন্ডা। দেশ বিভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে সে অংশগ্রহণ করেছিল। দাঙ্গার রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের সঙ্গে এই সাধারণ গুন্ডার সম্পর্ক, তার চৈতন্যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অবয়ব এই সকল জটিল দিকগুলি তার জবানীতেই বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। মল্লবীরের স্মৃতিকে ইতিহাস করার এই পদ্ধতি আয়ত্তের মধ্যেই জন–ইতিহাস তৈরীর ক্ষেত্রটি বড় হতে পারে।

    দ্বিতীয় নিবন্ধটি ইউরোপের ইতিহাস থেকে পাওয়া। নিবন্ধটির শিরোনাম ‘ওয়ার্কার্স রিভোল্ট: দ্যা গ্রেট ক্যাট ম্যাসাকার অব দ্যা রু সেইন্ট–সেভেরিন’ ১৭৩০– এর দশকের শেষ দিকে প্যারিসের একটি ছাপখানার শ্রমিকেরা মালিকের অনেকগুলি বেড়াল নির্মমভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের বিশ বছর পর এই ঘটনার একটি বিবরণ হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী একজন শ্রমিকের জবানীতে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সেই বিবরণকে ভিত্তি করে রবার্ট ডার্নটন বিপ্লবপূর্ব ফ্রান্সের প্যারি নগরীর এক অসাধারণ সামাজিক আখ্যান তৈরী করেন। প্যারির অন্ধকার ছোট ছাপাখানার জগতটাকে তিনি উদ্ভাসিত করেন তাঁর সৃষ্টিশীল ইতিহাস চর্চার আলোকচ্ছটায়। আমাদের সামনে তুলে ধরেন তৎকালীন প্যারির শ্রমিক–মালিক সম্পর্ক, ছাপখানার শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সংস্কার ও চেতনার জগৎ—সর্বোপরি শ্রমিক–মালিক দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ কাহিনী। এই ইতিহাসের নায়ক বিপ্লবপূর্ব প্যারি নগরীর ছাপখানার শ্রমিকেরা। এখানেও ইতিহাস তৈরির প্রাথমিক উপাদান ঐ একটি ছোট্ট বিবরণ।

    তৃতীয় নিবন্ধটির রচয়িতা ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাস চর্চায় নিম্নবর্গের অবস্থানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার স্থপতি রণজিৎ গুহ। নিবন্ধটির নাম ‘চন্দ্রা’স ডেথ’।  রণজিৎ  গুহ চন্দ্রার মৃত্যু সম্পর্কিত মামলার একটি ছেঁড়া অসম্পূর্ণ বিবরণকে অপূর্ব দক্ষতায় এক অসাধারণ ইতিহাস তৈরী করেন। ১৯ শতকের ভারতবর্ষের ভারতবর্ষের অন্তজ সমাজের লাঞ্চিত নারীদের এক অসাধারণ উপাখ্যান এই নিবন্ধটি। নারীবাদী ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও এই নিবন্ধটি একটি অমূল্য দলিল। অথচ অন্তজ সমাজের নারীদের এই ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে একটি অসম্পূর্ন ছেঁড়া দলিলের ওপর। রণজিৎ গুহ জন–ইতিহাসকে, যে ইতিহাসের নামকরণ তিনি নিম্নবর্গের ইতিহাস করেছেন, উদ্ধার করার আরো সৃজনশীল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। আপনারা যাঁরা তাঁর আপ্রোজ অব কাউন্টার ইন্টার্জেন্সি পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন উচ্চবর্গের দলিলের ভিতরেই কীভাবে নিম্নবর্গের ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। অর্থাৎ যারা তাদের কীর্তির দলিল তৈরী করছে—অর্থাৎ উচ্চবর্গের সদস্যরা—তারা ক্ষমতার বিস্তার আর রক্ষার স্বার্থেই নিম্নবর্গকে তাদের দলিলে জায়গা করে দিচ্ছে। উচ্চবর্গের দলিল পাঠের এই পদ্ধতি শুধু অভিনবই নয়, জন–ইতিহাস উদ্ধারের এক সৃজনশীল পথও বটে। উপরে শুধুমাত্র তিনটি নিবন্ধের উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের নিবন্ধ আরো অনেক লেখা হচ্ছে। জন–ইতিহাসের উৎসাহী ছাত্ররা সেগুলার সাথে পরিচিত হলে জন–ইতিহাসের চর্চা  বিকশিত হবে।

    শিল্পী: রাধাচরণ বাগচী

    রণজিৎ গুহর একটা বক্তব্য জন–ইতিহাস চর্চার লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। নিম্নবর্গের অন্তর্ভুক্ত সকল শ্রেণীগোষ্ঠি, ব্যক্তি ও সমষ্টিকে ঐতিহাসিক গবেষণা ও বক্তব্যের বিষয় বলে স্বীকার করতে হবে সচেতনভাবে। এই সচেতনতার জন্য জনগণের পক্ষের রাজনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ–উত্তর সমাজের প্রভু ও অধীনের সম্পর্কটা যাদের জীবনে খুবই প্রকট, অথচ যারা আমাদের ইতিহাস চর্চায় এখনো প্রায় অনুপস্থিত সেই আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, গ্রাম–শহরের গরীব জনতা ও স্ত্রীলোকের ভূমিকা নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে ও লিখতে হবে। এইদিকে এগুতে গেলেই বোঝা যাবে উচ্চবর্গের দৃষ্টিভঙ্গি তার বাহন প্রচলিত ইতিহাস বিদ্যা আমাদের জুড়ে আছে। ১৯১৮ সালে আমেদাবাদের সূতাকল ধর্মঘটের ইতিহাস যখন লিখতে হবে, তখন যেন মনে রাখা হয় যে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা গান্ধী, শংকরলাল ব্যাংকার ও অনুসূয়া সারাভাইইয়ের জীবনীর অধ্যায় মাত্র নয়। তার মধ্যে ধর্মঘটীদের চৈতন্যের শ্রেণী চেতনা যার অন্যতম উপাদান , একটি মূল্যবান ইতিহাস আছে। যে ইতিহাস মহাদেব দেশাই ও তেন্ডুলকারের পক্ষে লেখা সম্ভব হয়নি, তা আমাদেরই লিখতে  হবে। যখন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে হবে তখন যেন মনে রাখা হয় যে এ আন্দোলন ছাত্র–বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনই শুধু নয়; যখন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের ইতিহাস লিখতে হবে তখন যেন মনে রাখা হয়, এ আন্দোলন শুধুমাত্র জাতীয় নেতাদের আর ছাত্র সংগ্রাম কমিটির আন্দোলনই নয়। এই ইতিহাস লিখতে হবে একদম একেবারে আরেক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। আমরা এমন ইতিহাস চাই যার মধ্যে মেয়েরা  বা সাধারণ লোকেরা অতীত সমাজের তথ্যকণিকা মাত্র নয়, যার মধ্যে তারা ঐতিহাসিক সত্য বলে স্বীকৃত।

    রণজিৎ গুহ আরো বলেন, ‘উচ্চবর্গের পক্ষপাতি ইতিহাসবিদ্যাকে সমালোচনা দিয়েই শুরু করতে হবে। সমালোচনাই নতুন পথ খোঁজার উপায়, তিনি খোঁজার কথা বলেছেন, পৌছানোর কথা নয়। কারণ পৌছানো যাবে তখনই যখন একেবারে নতুন কোন আদিকল্পকে বসানো যাবে পুরনোটির জায়গায়। এ ধরনের পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ শুধু নয়; অনেক এগানো–পেছানো, হারিয়ে যাওয়া, হোঁচট খাওয়া তার স্বভাবসিদ্ধ। ইতিহাসবিদ্যাকে ঢেলে সাজাতে হলে সাধারণ মানুষের দিকে চোখ ফিরাতে হবে। ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশিকোত্তর বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সবকিছুর ওপর রাজনীতিতে তাদের বিশিষ্ট ভূমিকা কী ছিল তা নির্ণয় করতে হবে।’ সেই উদ্দ্যেশ্যেই নতুন তথ্য খুঁজতে পুরনো তথ্যকে নতুনভাবে পড়তে হবে, দরকার হলে বিশ্লেষণের পুরনো কায়দা ছেড়ে নতুন কায়দা তৈরী করে নিতে হবে। আর এই সবকিছুকে সম্ভব করার জন্যই তথ্যাশ্রিত অভ্যাসের সঙ্গে মেলাতে হবে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির। এই ইচ্ছার প্রকাশ যতটা সহজ, কাজতা ততখানি সহজ নয়।

    এখানে জন–ইতিহাস চর্চার কিছু তাত্ত্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, যদিও এ পর্যায়ে আলোচনা কিছুটা জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেটা এড়াবার কোন উপায় নেই। তবে ক্রমাগত মতবিনিময়ের মধ্যে দিয়েই ভাবনার জটিলতা অনেকখানি সহজ হয়ে আসবে।

    জন–ইতিহাস কি উচ্চবর্গের আখ্যানে ধস নামাতে পারে? এক সাম্প্রতিক লেখায় দীপেশ চক্রবর্তী এই প্রশ্নটি তুলেছেন। ইতিহাস চর্চায় যে মৌলিক শর্ত অর্থাৎ মানুষের কোন বিশেষ কর্মকান্ডে একটা আখ্যানের সম্ভাবনা এবং সেই আখ্যানটি যদি জনজীবনের যুক্তিগ্রাহ্যতার অবস্থান থেকে তৈরি হয় , তখনই তা ইতিহাস হয়ে ওঠে। এই যুক্তি গ্রাহ্যতা আদর্শিক, নৈতিক , রাজনৈতিক, দর্শনভিত্তিক হতে পারে। সেই কারণেই কোন  উন্মাদের কাহিনী ইতিহাস হয় না, অথবা নেহাত ব্যক্তিগত কোন বিবরণ ইতিহাস হয় না; ওগুলি ইতিহাসের উপাদান হতে পারে যদিও। উপযুক্ত দুটি শর্ত মেনে যে ইতিহাস লেখা হয় তা একসময় ইতিহাসের মূলধারায় মিশে যায় অথবা নিজে একসময় প্রান্তিক অবস্থান থেকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে চলে আসতে পারে। গত দুই দশকে রণজিৎ গুহর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নিম্নবর্গের ইতিহাস তেমনই ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের ইতিহাস চর্চার কেন্দ্রে হাজির হয়েছে।  ইতিহাস চর্চা এ ধরনের সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে পথ কেটে এগিয়ে চলে। জন–ইতিহাসের এই গ্রাহ্যতা জনজীবনে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা সৃষ্ট। জন–ইতিহাসের প্রয়োজন ঐতিহাসিকদের গণতান্ত্রিক চেতনাপুষ্ট প্রশ্ন থেকে উদ্ভূত। সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চেতনা, যা কিনা ইউরোপের উদার রাজনীতি ও মার্ক্সবাদ থেকে আমরা শিক্ষ পেয়েছি, আমাদের প্রেরণা যোগায় সমাজের অবহেলিত মানুষের কাহিনীকে মূলধারার পাশে স্থান দিতে। জন–ইতিহাস চর্চা আসলে সামাজিক স্মৃতি গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে একটি নিরন্তর সংগ্রাম। এটাই জন–ইতিহাস চর্চার রাজনীতি। জন  ইতিহাস চর্চার কি কোন লক্ষ্য আছে? বিষয়টা নিয়ে ভাবা দরকার । তবে ঐতিহাসিক জে.এইচ.প্লাম্বের ক্রাইসিস ইন হিউম্যানিটিজ –এর একটি উক্তি ইতিহাস চর্চায় মানবিক লক্ষ্য নির্ধারণের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেছেন, ‘Historian’s explanations of the past should lead to an explanation of it for their time and generation, so that by explaining man’s control over his future may be increased.

    এই উদ্বেগ অনেক বড় মাপের। মানবজাতির ভবিষ্যৎ ঘিরে জন–ইতিহাস চর্চাও এই উদ্বেগের অংশীদার।

  • জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে মনুষ্য সভ্যতার সম্পর্ক ভাবাই নতুন ইতিহাস চর্চার কাজ

    জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে মনুষ্য সভ্যতার সম্পর্ক ভাবাই নতুন ইতিহাস চর্চার কাজ

    নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ হিশেবে খ্যাত দীপেশ চক্রবর্তী আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এক নাম। বিশেষত তার প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ দুনিয়াজুড়ে বহুল পঠিত ও আলোচিত গ্রন্থ। বর্তমান সময়ে তিনি কাজ করছেন জলবায়ু সংকট ও মহামারির কার্যকারণ উন্মোচনে ইতিহাসের ভূমিকা বিষয়ে। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও পরিবর্তনকামী ক্রিটিকাল রাজনৈতিক পরিসরে দীপেশ চক্রবর্তীর নানাবিধ তত্ত্ব ও আইডিয়া সংক্রান্ত আলাপ–পর্যালোচনা ক্রমবর্ধমান।

    দীপেশ চক্রবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে লরেন্স এ কিম্পটন ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর। প্ল্যানেটারি তথা গ্রহীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু সংকট ও মহামারি ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ সংক্রান্ত তার লেখালেখিকে সমগ্র বিশ্বেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার The Climate of History in a Planetary Age গ্রন্থ। মানুষী ও না–মানুষী (non-human) ইতিহাসকে একই মোহনায় সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে দীপেশ চক্রবর্তীর মুনশিয়ানা সর্বমহলে স্বীকৃত। পুঁজির ইতিহাসের সঙ্গে পৃথিবী আর প্রাণের ইতিহাস মিলিয়ে পাঠ করার পদ্ধতি বিদ্যায়তনিক ও ক্রিটিক্যাল জ্ঞান–চর্চার জগতে প্রতিষ্ঠিত অনুশাসনে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া বর্তমানে দৃশ্যমান।

    অরাজের আমন্ত্রণে দীপেশ চক্রবর্তী নিম্নোক্ত সাক্ষাৎকারটি দেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সারোয়ার তুষার।

    দীপেশ চক্রবর্তী

    জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে মনুষ্য সভ্যতার সম্পর্ক ভাবাই নতুন ইতিহাস চর্চার কাজ–দীপেশ চক্রবর্তী

    প্রশ্ন: আপনি আপনার বিভিন্ন লেখাপত্র ও সাক্ষাৎকারে ‘ইতিহাসের ইতিহাস’, ‘ইতিহাসের বিবর্তন’ ইত্যাদি বিষয়ে নানা পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন। আপনার মতে, বর্তমান যুগে ইতিহাসের সংকট ও সম্ভাবনার দিক কোনগুলো?

    দীপেশ চক্রবর্তী: ইতিহাসবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো চালু আছে। সেখানে বিচার হয় সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে, ঘটনা ও মানুষকে তার নিজস্ব সময়ের প্রসঙ্গে দেখে। কিন্তু জনজীবনে ঐতিহাসিক সাক্ষ্য–প্রমাণের ভিত্তিতে সামাজিক দ্বন্দ্বের নিরসন করা বা সেই প্রমাণকে মূল্য দেবার প্রবণতা সর্বত্রই হ্রাসমান। সেই জায়গায় মানুষের “অভিজ্ঞতা”, “স্মৃতি”, গোষ্ঠীগত পরিচিতি, তাৎক্ষণিক অনুভূতির ভূমিকা ক্রমবর্ধমান। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতি আধুনিক প্রযুক্তি যা এক অতি–তাৎক্ষনিক “বর্তমান”–এর সৃষ্টি করে স্থান–কাল–পাত্র নির্ভর বিচারের বুদ্ধিটাই দেয় গুলিয়ে। নানাদিক থেকে ইতিহাস–ভিত্তিক বিচারের বোধ আজ গভীর সংকটে।

    প্রশ্ন: একদিকে উৎকট পশ্চিম–কেন্দ্রিকতা, অন্যদিকে উৎকট পশ্চিম–বিরোধিতা; এই দুইয়ের বাইরে গিয়ে আপনি প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ বইয়ে লিখেছেন, ইউনিভার্সাল নর্মস ‘indispensable and inadequate’; ‘অপরিহার্য এবং অপর্যাপ্ত’। আমাদের এই সাক্ষাতকারের পাঠকদের জন্য এ বিষয়টা ব্যাখ্যা করবেন কি? অর্থাৎ উত্তর–ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে ইউনিভার্সাল নর্মস ও লোকাল কন্টেক্সট একইসাথে কেন জরুরি? একচেটিয়াভাবে ইউনিভার্সাল কিংবা একচেটিয়াভাবে লোকাল হওয়ার সংকট কী?

    দীপেশ চক্রবর্তী: এই প্রশ্নের বিশদ উত্তর দিতে গেলে একটা বই লেখা লাগবে। আমার Provincializing Europe দেখে নেবেন। কিন্তু খুব সংক্ষেপে বললে এই: মানুষের ক্ষেত্রে যা সত্যই সর্বজনীন— যেমন আমরা Homo sapiens প্রজাতি— তা আমাদের শরীরে–মনে নিজের অজান্তেই বহমানা এক ইতিহাস। এই সর্বজনীনতা থেকে কোনো রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের উদ্ভব হয় না। কারণ Homo sapiens হিসাবেই— অর্থাৎ আমাদের প্রজাতিগত চরিত্রের প্রভাবেই আমরা মানুষে–মানুষে নানান কোন্দলে লিপ্ত হই। আপনিও মানুষ, আমিও মানুষ, এই জ্ঞান সর্বজনীন হলেও এই জ্ঞান আমাদেরকে অত্যাচার বা নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি দেয় না। বরং বলতে পারেন মানুষ মানুষকেই যে অত্যাচার করে, তা সে পশু–পাখিকেও সচরাচর করে না। ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রে সর্ব মানুষের প্রতি প্রযোজ্য এমন কতগুলো ধারণা নিয়ে কাজ করতে গেলে— যেমন সাম্যের বা নাগরিক অধিকারের ধারণা— বুঝতে হয় যে এইগুলি সত্যকার সর্বজনীন কথা না। যুক্তির দরবারে এই সব ধারণার আপীল থাকলেও বাস্তবে ধারণাগুলিকে মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক প্রভেদের কথা মনে রেখে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। যুক্তির কাছে যা indispensable লাগে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাকেই একটু বদলে নিতে হয়, তাই তা inadequateও বটে।

    প্রশ্ন: ইউরোপিয়ান ক্যাটাগরিগুলো বাদ দিয়ে কি পোস্ট–কলোনিয়াল চিন্তার বুনিয়াদ গড়ে তোলা সম্ভব? ইউরোপিয়ান ক্যাটাগরির ঋণ স্বীকার করেও কি করে ইউরোসেন্ট্রিক হওয়া এড়ানো যায়?

    দীপেশ চক্রবর্তী: প্রথম প্রশ্নটার সহজ উত্তর, না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ কিন্তু উত্তরটা জটিল। উনিশ শতক বা বিশ শতকে ইউরোপীয় চিন্তার প্রাধান্য এড়ানো শক্ত ছিল। অনেক সময় ইউরোপীয় চিন্তাকে অস্বীকার করার মধ্যেও সেই চিন্তাকে পূর্বপক্ষ ধরে নিয়ে কথা হতো। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে উনিশ শতকের শেষে একটা কথা খুব চালু হয়েছিল যে, ইউরোপীয় বিজ্ঞানের সব তথ্যই নাকি “ব্যাদেও আছে”। এখন এইটা একটা ইউরোপীয় দাবির উত্তর, অর্থাৎ সেই অর্থে কথাটা একটি “অনু–বাদ”, যে কথা আরেকটি কথা ওঠার পরে বলা হয়। একটা অন্য উদাহরণ দিলে কথাটা সহজ হবে। বঙ্কিম–রবীন্দ্রনাথ–শরৎচন্দ্রের কাছে বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক অবশ্যই ঋণী, কিন্তু তাই বলে কি হিন্দু–কেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে সরে যাওয়া অসম্ভব হয়েছে? তা তো না।

    প্রশ্ন: ‘History and the Politics of recognition’ প্রবন্ধে চার্লস টেইলরের বরাত দিয়ে আপনি historical wound তথা ঐতিহাসিক ক্ষত ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছেন। ঐতিহাসিক ক্ষত সত্তা বা পরিচয়ের রাজনীতিতে খুবই কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকে। বিশেষত অতীত অপমান বা নির্যাতনের স্মৃতি বর্তমান সময়ে জাগরুক রাখার ক্ষেত্রে। আবার ‘ঐতিহাসিক ক্ষত’–তে সত্যের বীজ থাকলেও, এই ক্ষত কেবল ইতিহাসকে নির্ভর করে নিজেকে জিইয়ে রাখে না; ‘ইতিহাস–নির্ভর–মিথ’ জাতীয় বয়ানে পরিণত হয় যা স্রেফ ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে বিচার করা যায় না। আপনি এও লিখেছেন যে, এই ক্ষত কিংবা ক্ষতের নামে কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের কথা বলতে পারার মানে হচ্ছে ইতোমধ্যেই সেই ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি ‘ঐতিহাসিক ক্ষত’ পরিচয়বাদী রাজনীতির পুঁজি হয়ে উঠছে না? বস্তুনিষ্ঠ কিংবা ঐতিহাসিক সত্যের উপর বিকশিত সমাজ গঠনে ‘ঐতিহাসিক ক্ষত’ অন্তরায় হতে পারে কিনা?

    দীপেশ চক্রবর্তী: হ্যাঁ, এই শেষ প্রশ্ন দুটির মধ্যে “ঐতিহাসিক ক্ষত” সম্বন্ধে যে রাজনৈতিক সমালোচনা প্রচ্ছন্নভাবে বর্তমান, তার সঙ্গে আমি একমত।

    প্রশ্ন: ‘আমাদের যা ইচ্ছা সমাজ সেদিকেই যেতে চায়’— অর্থে ইতিহাসের ধারণায় আপনি বিশ্বাস করেন না। ইতিহাসে এমন কোনো সাক্ষ্য নেই যে সমাজ ভালোর দিকে যাবেই। কিন্ত ভালো কিংবা উন্নত সমাজ নির্মাণের বাসনাও মানুষের আছে। এই বাসনা ইতিহাসের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তাই বলে আধুনিক মানুষ এই বাসনা ত্যাগও করতে পারে না। অর্থাৎ ‘আধুনিক’ হওয়ার অর্থ এক অর্থে anti-historical হওয়া।

    আবার, প্রযুক্তির বিপুল প্রসারের এই যুগে [contextual judgement অর্থে] ইতিহাস চর্চা এক রকম মারও খাচ্ছে। এমতাবস্থায়, একটা factual সমাজ গঠন ও anti-historical হওয়া কি একইসাথে সম্ভব? এমন সমাজ কি ভাবা সম্ভব যেখানে ঐতিহাসিক সত্যের কদর আছে, কিন্ত ইতিহাসবাদিতার অত্যাচার নেই? যুক্তির ক্রম অবনতি এবং প্রযুক্তির অত্যাচারের আজকের জমানায় ইতিহাস চর্চার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত?

    দীপেশ চক্রবর্তী: আপনার পর্যবেক্ষণগুলি আমারও ঠিক মনে হয়। গণতন্ত্রের ভোটের দিকটা সবাই চায়, কিন্তু গণতান্ত্রিক চেতনার যেইখানে প্রাণভোমরা বাস করে— সেই deliberative দিক, অর্থাৎ বিরোধী ও বিরোধী–চিন্তাকে শুধু স্থান দেয়া নয়, তাকে গণতন্ত্রের স্বার্থেই সম্মান করা ও মূল্য দেয়া— সেই জায়গাটার আলো–বাতাস আজ প্রায় সব দেশেই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ইতিহাস চর্চার মূল উদ্দেশ্য এখন প্রধানত একটাই: মানুষ পৃথিবী জুড়ে গণতন্ত্রের নাম করে এমন একটা গণতন্ত্র–বিরোধী অবস্থায় পৌঁছাল কী করে, তার হদিশ দেয়া।

    শিল্পী: সেসিল

    প্রশ্ন: আধুনিকতার সমালোচনা মাত্রই anti-modern সাব্যস্ত করার চল আছে আমাদের সমাজে। আবার এটাও সত্য যে, অনেকে প্রাক–আধুনিক অবস্থান থেকে আধুনিকতাকে খারিজ করতে চান। কিন্ত আপনি কিংবা ব্রুনো লাতুর, এমনকি হেবারমাস প্রমুখ দার্শনিকেরা তো আধুনিক যুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে কখনো reject করেন না। হেবারমাস যেমন আধুনিক হওয়া অর্থেই আধুনিকতার পর্যালোচনা করতে আগ্রহী। কিন্ত আধুনিকতাকে সমালোচনার উর্ধ্বে sacred মনে করেন অনেকে। এর কারণ কি এই যে, মডার্নিটির দার্শনিক মোকাবেলার প্রতি অনীহা অথচ মডার্নিটিকে একটা রাজনৈতিক এজেণ্ডা বিবেচনা করা?

    দীপেশ চক্রবর্তী: ইন্ডিয়াতেও এইটা এক সময় চালু ছিল। আশিস নন্দীকে আধুনিকতা–বিরোধী ভাবা হতো। আমরা আধুনিকতার যেই সমালোচনার কথা বলি, তা আধুনিক মানুষ হিসাবেই বলি। অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়ে বিশ্বাস করে, যুক্তিতে বিশ্বাস করে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, বিশেষত আধুনিকীকরণ করতে গিয়ে যে নিপীড়ন হয়— শুধু মানুষের উপরই না, প্রাণীজগতের ও প্রাকৃতিকজগতের উপরও— তারও বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে।

    প্রশ্ন: এবারে আপনার সাম্প্রতিক কাজ প্রসঙ্গে আসি। এই মার্চেই আপনার নতুন একটা বই বেরিয়েছে। The Climate of History in a Planetary age জলবায়ু সংকট ও অতিমারি সংক্রান্ত আপনার সমস্ত লেখাতেই planetary ক্যাটাগরিটি অবধারিতভাবে হাজির হয়; এই ক্যাটাগরিকে আপনি global [মনুষ্য–নির্মিত পরিকাঠামোর দুনিয়া অর্থে] ক্যাটাগরি থেকে আলাদা হিশেবেই হাজির করছেন। planetary ক্যাটাগরিতে মানুষ কেন্দ্রচ্যুত হয়ে যায় এবং এই গ্রহের সার্বিক স–জীব ও অ–জীব সত্তার প্রসঙ্গ মুখ্য হয়ে ওঠে। আমাদের পাঠকদের জন্য planetary ক্যাটাগরিটি ব্যাখ্যা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। কেন কেবল global ক্যাটাগরি দিয়ে আর জলবায়ু সংকট কিংবা অতিমারিকে বোঝা যথেষ্ট নয়? কোন অর্থে জলবায়ু ও অতিমারির সংকট পুঁজির যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়?

    দীপেশ চক্রবর্তী: এই প্রশ্নের একটা খুব ছোট্ট জবাব দিই— বাকিটার জন্য আমার বইটা পড়া দরকার (আগে যেমন সিনেমার বিজ্ঞাপনে বলা হতো “বাকিটা রূপালি পর্দায় দেখুন”!) জলবায়ু বা অতিমারির সংকট সার্বিকভাবে বুঝতে গেলে ভূতত্ত্ব, জীবনের ইতিহাস, প্রাণের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশুনা করতে হয়। অর্থাৎ পুঁজির ইতিহাসের সঙ্গে এখন পৃথিবীর আর প্রাণের ইতিহাস মিলে মিশে গেছে, এই অর্থেই প্রথাগত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণে যে সকল বিদ্যা কাজে দিত (যেমন ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, সাহিত্য ইত্যাদি), এখন তার বেশি বিদ্যা অধিগত করতে হয়। এই অর্থে। বিশদ ব্যাখ্যার জন্য আমার বইটা দেখেন।

    ইনিভার্সিটি অফ সিকাগো প্রেস থেকে প্রকাশিত দীপেশের সর্বশেষ বই

    প্রশ্ন: জলবায়ু সংকটকে সাধারণত পলিসিগত কিংবা/এবং বৈজ্ঞানিক সংকট মনে করা হয়; যার সমাধানও পলিসিগত এবং বৈজ্ঞানিক হবে বলে ধরে নেয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিমারি প্রশ্নে ইতিহাসের অভিঘাত কেন জরুরি? সেই ‘ইতিহাস’–এ মানুষের অবস্থান কোথায় হবে?

    দীপেশ চক্রবর্তী: কিন্তু পলিসিগত বা বৈজ্ঞানিক সমধানও তো মানুষের জন্যই। কাজেই সংকটের চরিত্র ও সমাধান দুটো নিয়েই মানুষকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে ভাবতে হবে প্রাণের ইতিহাসের ও প্রাণের আয়োজনের সঙ্গে— অর্থাৎ জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে— মানুষের সভ্যতার সম্পর্ক কী। সেইটাই নতুন ইতিহাসচর্চার কাজ।

    প্রশ্ন: যে ইতিহাসের নায়ক মানুষ; সেই ধরনের ইতিহাস–চর্চার সহসাই অবসান ঘটবে এমন কোন সম্ভাবনা আছে কি? আবার মানুষ তার সচেতন সিদ্ধান্তে যেভাবে এক অবিসংবাদিত ভূ–তাত্ত্বিক ক্ষমতা (geological agent) হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে এই গ্রহের যে নাভিশ্বাস উঠেছে, সেই দিক বিবেচনায় multi-species ইতিহাস–চেতনাও অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই দুই ধরনের ইতিহাসের সংশ্লেষে নতুন কোনো ইতিহাস–চেতনার সম্ভাবনা দেখেন কি?

    দীপেশ চক্রবর্তী: এই প্রশ্নের উত্তর আমার আগের প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে নিহিত আছে। আবার বলি, অনুগ্রহ করে বইটা পড়ে দেখেন।

    প্রশ্ন: অতিমারির সাথে মানুষের সম্পর্ক বেশ পুরোনো; অন্তত কৃষির উদ্ভবের কাল থেকে। তাহলে ‘অতিমারির যুগ’ কথাটার তাৎপর্য কী?

    দীপেশ চক্রবর্তী: “অতিমারির যুগ” বলতে বিশেষজ্ঞরা এমন একটা সময় বোঝান যেখানে অতিমারির আক্রমণ পূর্বের চেয়ে অনেক ঘন–ঘন হয়ে ওঠে। গত পনেরো বৎসরে অনেকগুলি অতিমারি হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, একটি তো হলোই। মানুষের দশ হাজার সভ্যতার ইতিহাসে এত ঘন ঘন অতিমারির সম্ভাবনা দেখা দেয়নি আগে। কিন্তু এখন সেই অবস্থা হয়েছে। সেই কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ বর্তমানকে একটি “অতিমারির যুগ” বলে চিহ্নিত করেন।

    প্রশ্ন: আপনি আপনার এক সাক্ষাৎকারে (The Planet does not return our gaze) বলেছেন, অতিমারি আমাদের পুনরায় মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, অণুজীব তথা বিভিন্ন ধরনের জীবাণুই এই গ্রহের ‘dominant form of life’; মানুষই বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী চৈতন্যে আচ্ছন্ন মাইনরিটি ফর্ম অব লাইফ। অন্যান্য অনেক দার্শনিক (যেমন হানা আরেন্ট) মাইনরিটি ফর্ম অব থিংকিং প্রসঙ্গে আলাপও তুলেছেন, যদিও সেটা মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই। আপনি সম্ভবত প্ল্যানেটারি স্কেলে minority form of thinkingকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে চাইছেন। আমাদের পাঠকদের জন্য ব্যাখ্যা করবেন কি জলবায়ু সংকট ও অতিমারির বাস্তবতায় মানুষী যজ্ঞ সংকোচনের স্বার্থে সংখ্যালঘুত্বের চৈতন্য কীভাবে কাজে আসতে পারে?

    দীপেশ চক্রবর্তী: ঠিকই বলেছেন। এই কথা আমি বলেছি। কিন্তু এইটা নিয়ে আমার ভাবনাচিন্তা এখনো সম্পূর্ণ দানা বাঁধেনি। তাই এই আলোচনাটি ভবিষ্যতের কোনো সুযোগের জন্য মুলতুবি রাখলাম। শুধু এইটুকু বলি, আধুনিক মানুষকে নিজের প্রয়োজনেই এমনভাবে বাঁচতে শিখতে হবে যাতে পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা domination-এর না হয়। এই ভাবনার প্রসঙ্গেই এই সব কথা তোলা।

    আপনাদের প্রশ্ন ও আমার কাজে আপনাদের আগ্রহের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  • পার্থ চট্টোপাধ্যায় ।। গণতন্ত্র ও জনবাদ

    পার্থ চট্টোপাধ্যায় ।। গণতন্ত্র ও জনবাদ

    গত ৫ই মার্চ ২০২১ সালে রাষ্ট্রচিন্তার আমন্ত্রণে ‘গণতন্ত্র ও জনবাদ’ বিষয়ে অনলাইন বক্তৃতা দেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে দুনিয়াব্যাপী অন্যতম প্রধান একজন ইতিহাসবিদ ও তাত্ত্বিক হিশেবে বিবেচিত। বাংলাদেশেও লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, ইতিহাসবিদদের কাছে পার্থ চট্টোপাধ্যায় অতি পরিচিত নাম।

    পার্থ চট্টোপাধ্যায় আশির দশকে শুরু হওয়া সাড়া জাগানো নিম্নবর্গের ইতিহাস অধ্যয়ন গ্রুপের একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে অবস্থিত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান এবং মিডল ইস্টার্ন, সাউথ এশিয়ান ও আফ্রিকান স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার হিশেবে কর্মরত আছেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় অবস্থিত সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স–এর ডিরেক্টর এর দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন।

    পলিটিকাল সোসাইটি, সিভিল সোসাইটি, সেক্যুলারিজম, গণতন্ত্র, আধুনিকতা, জাতীয়তাবাদ, উত্তর–ঔপনিবেশিক সমাজ সম্পর্কে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সর্বমহলে বিবেচিত। সাম্প্রতিককালে তিনি বিশ শতকে অবিভক্ত বাংলার জন–ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন।

    দুনিয়াব্যাপী গণতন্ত্রের ক্রম অবনতি ও নতুন ধরনের স্বৈরতান্ত্রিকতার উত্থানের কালে ‘পপুলিজম’ তথা ‘জনবাদ’ বহুল চর্চিত রাজনৈতিক পরিভাষা। আমরা মনে করি, অধিকতর ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ–সম্পর্কের জন্য যারা লড়াইরত, তাদের এ বিষয়ে সম্যক বোঝাপড়া থাকা জরুরি।

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তৃতার শ্রুতিলিখন তৈরি করেছেন রেজওয়ানুর রহমান পান্থ ও সারোয়ার তুষার। অরাজ নেটওয়ার্কের অনুরোধে পরবর্তী পরিমার্জন–এর মাধ্যমে শ্রুতিলিখনটিকে বর্তমান ভার্সনে উপনীত করে দিয়েছেন খোদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়। রাষ্ট্রচিন্তা, পার্থ চট্টোপাধ্যায়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি অরাজ কৃতজ্ঞ।–সম্পাদক]

    ছবি: টিএনআই

    রাষ্ট্রচিন্তার পক্ষ থেকে যে আপনারা আমায় বলার সুযোগ দিয়েছেন তার জন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। সকলকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। আমি যতদূর জানি আপনারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাজনীতি সংক্রান্ত নানারকম তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা করে থাকেন আপনাদের এই ফেসবুক সিরিজটাতে। আপনাদের সারোয়ার তুষার যখন আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন, ভাবলাম সাম্প্রতিক যে বিষয় নিয়ে শুধু আমাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেই নয়, সারা পৃথিবীতেই যা নিয়ে যথেষ্ট চর্চা শুরু হয়েছে এবং সেটা শুধু পণ্ডিত মহলেই নয়, সাধারণ সংবাদপত্র, টেলিভিশনের আলোচনায় এবং সাধারণ রাজনীতির আলোচনাতেও যাকে বলা হচ্ছে পপুলিজম বা জনবাদ, তাই নিয়ে বলব। জনবাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কী, এই বিষয়টা নিয়ে আমি সাম্প্রতিককালে কিছু চিন্তাভাবনা করেছিলাম, তাই নিয়ে কিছু লেখালেখিও করেছি। আমার মনে হলো যে সেই বিষয়ে হয়তো আপনাদের কাছে যদি আমি আমার ভাবনা খানিকটা ব্যক্ত করি তাহলে হয়তো আপনাদের তার থেকে খানিকটা আলোচনার খোরাক জুটতে পারে। সেই হিসেবে আমি আপনাদের এই বিষয়টা নিয়ে কিছু বলছি। তারপরে আমি নিশ্চয়ই আশা করবো আপনারা আপনাদের প্রশ্ন তুলবেন এবং তাই নিয়ে খানিকটা আলোচনা হবে।

    গণতন্ত্র ও জনবাদ। আমি ‘গণতন্ত্র’ দিয়েই শুরু করি। গণতন্ত্র ব্যাপারটা কী, আমার ধারণা আমরা মোটামুটি সকলেই তার সঙ্গে খানিকটা পরিচিত! কারণ এটা এখন সম্প্রতিকালে, অন্তত আমাদের যুগে এই ধারণাটা ব্যাপকভাবে সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে গেছে। সব দেশে গণতন্ত্র নেই। কিন্তু যে দেশে নেই, সেখানেও গণতন্ত্র হওয়া উচিত— এইরকম বক্তব্য শোনা যায়। আপনারা জানেন, এই যে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার। বার্মাতে যে ঘটনা ঘটে চলেছে এখন–সাংঘাতিক। সেখানেও আমরা দৈনিক দেখতে পাচ্ছি সেখানকার মানুষ কীভাবে সেনাবাহিনীর একটা জঘন্য অত্যাচারের সামনে দাঁড়িয়েও তারা গণতন্ত্রের জন্য লড়ছে, বলছে গণতন্ত্রের জন্য আমরা প্রাণ দিতে রাজি আছি। এইরকম একটা ঘটনা যেখানে আমাদের চোখের সামনে ঘটতে পারে, সেখানে এই প্রশ্নটা নিশ্চয়ই উঠবে যে, এই ধারণাটা এত শক্তিশালী হলো কী করে? এবং এই ধারণাটার পিছনে এমন কী ব্যাপার আছে যাতে এত মানুষকে এরকমভাবে সেটা নাড়া দিতে পারে। আমি প্রথমে সেখান থেকেই শুরু করি।

    আপনারা যারা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা পলিটিকাল সায়েন্স খানিকটা চর্চা করেছেন, তারা সকলেই জানবেন যে এই গণতন্ত্রের বিষয়ে যখন পশ্চিমের যারা তাত্ত্বিক, তারা যখন লিখতে শুরু করেন বা এই বিষয়ে বলতে শুরু করেন, প্রথমেই তারা চলে যান প্রাচীন গ্রিসে। প্রাচীন গ্রিস। সেখানেই এই ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের ধারণার জন্ম হয়েছিলো। এটাই হচ্ছে প্রচলিত ইতিহাস। সে ইতিহাসে এমনিতে ভুল কিছু নেই, কিন্তু কতগুলো বিষয় নিয়ে আমাদের একটু খেয়াল রাখা উচিত। যদিও প্রাচীন গ্রিসে এবং তার পরবর্তীকালে রোমের সাম্রাজ্যে গণতন্ত্র বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দেখা দিয়েছিলো বটে, কিন্তু সাধারণভাবে তখনকার পণ্ডিত সমাজে এবং যারা শাসন করতেন, সেই শাসকগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে কিন্তু গণতন্ত্র সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা ছিলো না।

    গ্রিক পণ্ডিতদের মধ্যে অনেকেই, যেমন প্লেটো, মোটেই গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না। সাধারণভাবে গণতন্ত্র সম্বন্ধে তাদের মত ছিলো, এটা হচ্ছে সাধারণ মানুষের রাজত্ব, যেসব মানুষরা স্বভাবতই কোনো উচ্চ সংস্কৃতির বিষয়ে অবহিত নন, তারা হয়তো কৃষক কিংবা কারিগর এই জাতীয় লোক। তারা যখন রাজত্ব করার মতো অবস্থায় চলে আসে, সেই রাজত্ব মোটেই কোনো ভালো রাজত্ব হতে পারে না। এটাই সাধারণভাবে মত ছিলো। এদের মধ্যে একমাত্র যিনি বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল, তাঁর যে ‘পলিটিকস’ নামের বই, তাতে তিনি বিভিন্ন রকমের রাজ্য শাসনব্যবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, সেসব বর্ণনার মধ্যে উনি গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির কথা বলছেন। একটা মোটামুটি মন্দের ভালো হিসেবে ডেমোক্রেসিকে উনি সম্পূর্ণ বাদ দেননি। মন্দের ভালো এই ডেমোক্রেসির মধ্যে বেশ কিছু ভালো দিক উনি বলেছেন।

    শিল্পী: ফিলিপ ফোল্টজ্‌

    একটা বিষয় কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার যে, এই প্রাচীন গ্রিসই বলুন অথবা রোমই বলুন, সেখানে যখন ‘সাধারণ মানুষ’ বলা হচ্ছে তার মানে কিন্তু এই নয় যে এখনকার গণতন্ত্র বলতে আমরা যেভাবে বুঝি অবাধ ভোটাধিকার, অর্থাৎ আপামর জনসাধারণ স্ত্রী–পুরুষ নির্বিশেষে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই রাজ্যশাসনের বিষয়ে একটা মতামত দেবে এবং সেই মতামত অনুসারে রাজ্য শাসিত হবে— এই যে ধারণা এখন আমরা গণতন্ত্র বলতে যেটা বুঝি, সেটা কিন্তু গ্রিস বা রোমে ছিলো না৷ কারণ আমরা অনেকসময় ভুলে যাই যে গ্রিস বা রোমের সমাজে কিন্তু একটা বড় অংশ ছিলো যারা আসলে কৃতদাস, স্লেইভ। স্বভাবতই কোনোরকম রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করার প্রশ্নই উঠতো না। তারা তাদের মালিকের অধীনে কাজ করতো। তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের কোনো প্রশ্নই আসতে পারতো না। দ্বিতীয়ত, ‘সাধারণ মানুষ’ বলতে এখানে পুরুষ মানুষই বোঝানো হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কিন্তু প্রাচীন এই সমাজে মহিলাদের রাজনীতি বা রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত প্রকাশ করার কোনো অবকাশ ছিলো না। সুতরাং এই অর্থে প্রাচীন গ্রিসে ডেমোক্রেসি বলতে গেলে, হ্যাঁ, ধারণার দিক থেকে আধুনিক যুগের পাশ্চাত্যের তাত্ত্বিকেরা এই ধারণাটাকেই মান্য করেন। এর যে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত, সেই পরিপ্রেক্ষিত যে এখনকার অবস্থার সঙ্গে মেলে না সেটা অবশ্যই তারা স্বীকার করবেন। ফলে এইটা মনে রাখা উচিত যে, ডেমোক্রেসির ধারণা, অথবা একটু পরেই আমি যে বিষয়টা তুলবো republicanism বা রিপাবলিকের ধারণা, যাকে আমরা বাংলায় বলি প্রজাতন্ত্র, সেই ধারণাও রোমে ছিলো। সেটাও কিন্তু ওইরকম আপামর জনসাধারণের রাজ্যশাসন নয়। গণতন্ত্র সম্বন্ধে পরবর্তীকালে অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগে যে ধারণাটা গুরুত্বপূর্ণ, যেটা বিশেষ করে আমাদের এই এশিয়ার যে অংশটা আমরা যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলাম, সেই ব্রিটিশ গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আমরা অনেকটাই গ্রহণ করেছি, এখনো আমরা অনেকটাই ব্রিটিশ ধরনের রাজ্যশাসন ব্যবস্থার মধ্যে আছি।

    এই ব্রিটিশ গণতন্ত্র ব্যবস্থার যেটা মূল ধারণা, সেটা বোঝাতে কিন্তু এই বিংশ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত ডেমোক্রেসি কথাটা অত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো না। তখন বলা হতো representative government অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যাদের প্রতিনিধি বলে বেছে দেবেন ভোট দিয়ে, সেই প্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের হয়ে রাজ্য শাসন করবেন। এটা হচ্ছে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা, যেটা বিলেতের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা হিসেবে আমরা জানি। কিছুদিন বাদে বাদে, অর্থাৎ সাধারণভাবে বিলেতের হিসাব অনুযায়ী পাঁচ বছর বাদে বাদে, একটি করে সাধারণ নির্বাচন হবে এবং সেই সাধারণ নির্বাচনে পার্লামেন্টের যারা সদস্য নির্বাচিত হবেন, সেই পার্লামেন্ট সদস্যরা একটা মন্ত্রীসভা তৈরি করবেন। প্রধানমন্ত্রী ঠিক হবে এবং সেই মন্ত্রীসভা দেশ শাসন করবে। এইটাই হচ্ছে গিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা। এটাকে representative government বলা হচ্ছে। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কিন্তু ডেমোক্রেসির সঙ্গে এটাকে স্পষ্টভাবে মেলানো হতো না। তার কারণ আছে। লিবারেল বা উদারনৈতিক তাত্ত্বিকদের মতে এই প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থাই শ্রেষ্ঠ গভর্নমেন্ট। অনেকেই আপনারা পড়েছেন হয়তো জন স্টুয়ার্ট মিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তার একটা বই–ই আছে রেপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট সম্বন্ধে। তাতে উনি স্পষ্ট ব্যাখা করে বুঝাচ্ছেন কেন প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থাই অন্য সব ব্যবস্থার তুলনায় শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। জনগণের নির্বাচিত সরকারের ধারণাটা কিন্তু এই প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনপদ্ধতির একেবারে কেন্দ্রস্থলে আছে।

    ‘জনগণ’ বলতে কিন্তু এটা মনে রাখা উচিত যে ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কথা আমরা এত শুনে থাকি, সেখানে কিন্তু অবাধ ভোটাধিকার ছিলো না। বহুদিন পর্যন্ত, ধরুন যাদের শ্রমিক শ্রেণি বলা হয়, বিলেতে তাদের ভোট এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে। ব্রিটেনে মেয়েদের ভোট, অবাধ ভোটাধিকার হয়েছে বোধ হয় ১৯২৩ বা ১৯২৪ সালে। তার আগে পর্যন্ত মহিলাদের ভোট ছিলো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটা জিনিস আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, আমরা ভুলি না নিশ্চয়ই। সেখানে যদিও সম্পত্তি বা শিক্ষা বা ট্যাক্স দেওয়া অনুযায়ী ভোটাধিকারের যে নিয়মগুলো ছিলো, সেগুলো অনেকদিন আগেই উঠে যায়, কিন্তু মেয়েদের ভোট ১৯২০’র দশকে এসেছে। এবং যারা প্রাক্তন কৃতদাস আফ্রিকান অর্থাৎ আফ্রিকান–আমেরিকান জনগোষ্ঠী তাদের ভোটাধিকার হয়েছে ১৯৬০’র দশকে, সিভিল রাইটস যখন স্বীকৃত হলো তারপরেই তাদের সাধারণভাবে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। তার আগে পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্টেটে কিন্তু অধিকাংশ আফ্রিকান–আমেরিকানদের ভোট ছিলো না। সুতরাং এগুলো সবই গণতন্ত্রের প্রাক–ইতিহাস বলতে পারা যায়।

    শিল্পী: জ্যাকব লরেন্স

    এইজন্য বলছি যে, আমাদের একটা জিনিস প্রথমেই ভালোভাবে বুঝে রাখা প্রয়োজন যে আমরা এখন গণতন্ত্র বলতে যা বুঝি, অর্থাৎ আপামর জনসাধারণ তথা স্ত্রী–পুরুষ নির্বিশেষে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যে ভোটাধিকার এবং সেই ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকারের যে শাসন, সেই ধারণাটা কিন্তু অত্যন্ত আধুনিক ধারণা। এর প্রাক–ইতিহাস থাকতেই পারে কিন্তু এই ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিংশ শতাব্দীতে। এখানে গণতন্ত্র সম্বন্ধে আরেকটা সাধারণ কথা, এটা আপনারা অনেকেই শুনে থাকবেন, অনেকসময়ই এটা বলা হয়। আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত কথা, ডেমোক্রেসি হচ্ছে ‘গভর্নমেন্ট অফ দ্যা পিপল, বাই দ্যা পিপল, ফর দ্যা পিপল’। এই যে তিনটা ধারণা, এই তিনটা ধারণা আমি একটু বিশদভাবে বলি।

    ‘গভর্নমেন্ট অফ দ্যা পিপল’ বলতে বোঝায় এমন শাসনব্যবস্থা যা জনগণই প্রতিষ্ঠা করেছে। জনগণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলতে কী বোঝায়? এই ধারণাটা বুঝতে হলে কিন্তু ইউরোপ এবং আমেরিকায় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যেগুলোকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলা হয়ে থাকে, ডেমোক্রেটিক রেভ্যুলিউশন, সেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ইতিহাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরমধ্যে স্বভাবতই ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের কথা আসে। ফরাসি বিপ্লব নিশ্চিতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তার কারণ আপনারা জানেন যে ফরাসি বিপ্লবে একটা রাজতন্ত্র, একটা অত্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রের অবসান হলো একটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। এবং সেই বিপ্লবের পর যেটা প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই প্রথম কন্সটিটিউশন হলো রাইটস অফ মেন এন্ড সিটিজেন। অর্থাৎ নাগরিক অধিকার এবং মানবাধিকার; এই দুটো ধারণা। নাগরিক অধিকার, সিটিজেনস রাইটস আর মানবাধিকার, রাইটস অফ মেন। সেটা অবশ্য তখনো শুধু মেনই বলা হয়েছে। এই দুটো ধারণার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিলো রাজতন্ত্রের অবসান এবং প্রজাতন্ত্র অর্থাৎ রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা। এই গোটাটা মিলিয়ে যে ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেটা হল জনগণের সার্বভৌমত্ব। sovereignty অর্থাৎ people’s sovereignty; এই People’s sovereignty বা জনগণের সার্বভৌমত্ব ধারণাটা যে গণতন্ত্রের সঙ্গে জুড়ে গেলো, এটা আধুনিক গণতন্ত্রের একেবারে কেন্দ্রস্থলে এখনো রয়েছে। আপনি ফ্রান্সের কথাই ভাবুন, বিপ্লবের পর যেটা প্রতিষ্ঠিত হলো, অথবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র যুদ্ধ, যেটা আমেরিকান ওয়ার অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স বলা হয়। তার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যারা ইউরোপীয় সেটলার, সেখানে যারা কলোনি স্থাপন করেছে, তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল। এখানেও আবার মনে রাখতে হবে, এই যে সেটলার যারা, যারা জনগণ, তার মধ্যে কিন্তু আমেরিকার যারা আদি–অধিবাসী অর্থাৎ নেটিভ আমেরিকান, তারা কিন্তু এর অংশীদার নন। তারা এই রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বাইরে। বহুদিন পর্যন্ত, অতি সম্প্রতিকাল পর্যন্ত নেটিভ আমেরিকানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার সম্পূর্ণ বাইরে ছিলো। তাদের রিজার্ভেশন বলে আলাদা জায়গা দেওয়া হয়েছিলো। সেখানে তাদের থাকতে হতো একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে। এখন সম্প্রতিকালে খুব সামান্য অল্প অল্প করে তাদের কিছুকিছু প্রতিনিধি মার্কিন রাজনীতিতে দেখতে পাওয়া যায়। বহুদিন পর্যন্ত এদের কোনো স্থানই ছিলো না। সুতরাং আমেরিকার ‘জনগণ’ বলতে কিন্তু ইউরোপ থেকে আসা যে সেটলার, যারা উপনিবেশ স্থাপন করেছে, সেই সেটলারদের কথাই বলা হচ্ছে। তারাই আমেরিকান ‘পিপল’। কিন্তু তারা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের যে ঔপনিবেশিক শাসন তার অবসান ঘটিয়ে নিজেদের রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করলো।

    ফ্রান্স আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়াতে দক্ষিণ আমেরিকায় বেশ কয়টা নতুন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হয় যাদের বলিভারের বিপ্লব বলা হয়, সায়মন বলিভারের বিপ্লব। এরা সবই স্পেনের যে সাম্রাজ্য ছিলো তার বিরুদ্ধে ঠিক একই রকম ইউরোপীয় সেটলারদের বিদ্রোহ। স্পেনের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করে নিজেদের আলাদা আলাদা রিপাবলিক তৈরি করল, যেমন পেরু, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা। এইগুলা সবই কিন্তু রিপাবলিক, সবগুলোই তথাকথিত জনগণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এরা যে জনগণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, তার প্রমাণ হলো এরা প্রত্যেকেই একটি করে সংবিধান, কনস্টিটিউশন তৈরি করল। সেই কনস্টিটিউশনই হচ্ছে নতুন শাসনব্যবস্থার ভিত্তি, তার সাংবিধানিক দলিল। সেই প্রত্যেকটি সংবিধানের গোড়াতেই একটি কথা লেখা থাকে— আমরা এদেশের জনগণ, আমরা এই সংবিধান রচনা করে এক নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলাম। এটাই হচ্ছে প্রতিটা সংবিধানের প্রতিজ্ঞাপত্র। এটাই হলো গভর্নমেন্ট অব দ্যা পিপল অর্থাৎ জনগণই যে শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করলো, তার ঘোষণা। এটাই হলো জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রমাণ, তার দলিল।

    শিল্পী: আভো গারিবিয়ান

    এই দলিলগুলোতে সাধারণভাবে যে দুটো কথা বলা হয়— সাধারণ ভোটাধিকার এবং প্রজাতন্ত্র— ইউরোপের অনেকগুলো দেশে কিন্তু, এই যেরকম ব্রিটেনের কথা বললাম, এইভাবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি, রাজতন্ত্র রেখেই এক ধরনের representative government আনা হয়েছে। এই কারণে আমি বলছিলাম যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটেনে ডেমোক্রেসি কথাটা সরাসরি ব্যবহার করা হতো না, কারণ ডেমক্রেসি কথাটার মধ্যে ওই ফরাসি বিপ্লবের একটা গন্ধ রয়ে গেছে এবং অনেকদিন পর্যন্ত ব্রিটেনে ওই ফরাসি বিপ্লবের ছোঁয়াটা যাতে না লাগে সেইজন্যে রিপাবলিকান কথাটাও সেইভাবে ব্যবহার করা হতো না। যদিও তার আগের যুগে ব্রিটেনেও প্রচুর রিপাবলিকান ধারণার কথা উঠেছে কিন্তু ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে ওই পুরো ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ উদারনীতি, উদারনৈতিক মত তথা লিবারেলিজম, তাতে ডেমোক্রেসি কথাটা খুব শুনতে পাওয়া যায় না, রিপাবলিক কথাটাও খুব শুনতে পাওয়া যায় না। প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা, অর্থাৎ মানুষের ভোটাধিকার দিয়ে যে পার্লামেন্ট তৈরি হবে সেই পার্লামেন্ট কিন্তু রাজা বা রানির পদটা রেখেই পার্লামেন্টের শাসন। এইভাবেই রাজতন্ত্র সত্ত্বেও এক ধরনের গণতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে এই গণতন্ত্র আরও অনেক ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশেই এই অবস্থা হয়েছে। সুতরাং এটা হচ্ছে গভর্নমেন্ট অফ দ্যা পিপল–এর দ্বিতীয় পথ যা প্রজাতন্ত্র নয়।

    ‘ফর দ্যা পিপল’— এইটা আরেকটু বিশদভাবে বলতে হবে এখন। আগেই বলে নিই, ‘বাই দ্যা পিপল’ অর্থাৎ জনগণ নিজেই নিজেকে শাসন করছে, এটা কিন্তু আমার মতে পৃথিবীর কোথাও হয়নি, আজ অব্দি হয়নি। অর্থাৎ যে অর্থে বলা যেতে পারতো ‘গভর্নমেন্ট বাই দ্যা পিপল’, এটা কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্রে বা আধুনিক কোনো রাষ্ট্রে, অর্থাৎ যেখানে কোটি কোটি লোকের বাস, সেই রকম জনবহুল কোনো রাষ্ট্রে কিন্তু এটা বলতে পারা যাবে না যে ‘গভর্নমেন্ট বাই দ্যা পিপল’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সবসময়ই ‘পিপল’ এবং তার শাসক যারা তাদের মধ্যবর্তী অনেকগুলো স্তর থাকবে। সেখানেই প্রতিনিধির ধারণাটা আসছে। জনপ্রতিনিধি কে এবং প্রতিনিধি কীভাবে বাছা হবে? সেই প্রতিনিধির ক্ষমতা কতদূর? সেই প্রতিনিধিকে কখন সরানো যাবে? তার বদলে আর কাকে বসানো যাবে? এই প্রশ্নগুলো স্বভাবতই গণতন্ত্রের আলোচনাতে সবসময়ই আসছে। কিন্তু জনগণ নিজেই নিজেকে শাসন করছে এই ধারণাটার কিন্তু কোথাও প্রাতিষ্ঠানিক নিদর্শন পাওয়া যাবে না। গণতন্ত্রের এই বিষয়ে অত্যন্ত ভালো আলোচনা পাওয়া যায় ফরাসি বিপ্লবের ঠিক আগের যুগে এবং ফরাসি বিপ্লবের সমসাময়িক সময়ে।

    যেমন রুশোর মত ছিলো যে, একটি আইন যখন পাশ হবে, সেটা সব মানুষ একসঙ্গে আলোচনা করে তারপরে ভোট দিয়ে সেই আইন পাশ করবে না কেন? অর্থাৎ শুধু পার্লামেন্টের যারা সদস্য তারাই শুধু আলোচনা করে একটা আইন তৈরি করবে কেন? তাতে সমস্ত মানুষ, ব্যাপক জনসাধারণ অংশ নেবে না কেন? এখন এখানে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটা সবসময় ওঠে যে, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষকে একটা আলোচনায় কী করে আনা যাবে এবং তাতে কী করে একটা আইনের যে খুঁটিনাটি জটিলতা সবসময় থাকবে, সেটা কী করে ওইরকম একটা সর্বসাধারণের মধ্যে আলোচনার পর স্থির হতে পারে? রুশোর প্রশ্নের উত্তরে সবাই এখন বলেন, এটা হতে পারে না। সর্বসাধারণ বড়জোর একটা মোটাদাগের নীতি বলে দিতে পারে। কিন্তু সেই নীতি একটা আইন ব্যবস্থার মধ্যে রূপায়ণ করা, এটা স্পেশালিস্টদের কাজ অর্থাৎ যারা এই বিষয়ে বিজ্ঞ লোক, অভিজ্ঞ লোক এরকম মানুষই এ কাজটা করতে পারে। সুতরাং জনগণের এটাই কর্তব্য যে সেই ধরনের মানুষ যেন তারা প্রতিনিধি হিসেবে বাছতে পারে, নির্বাচন করতে পারে। তাহলেই গণতন্ত্রের কাজটা ঠিকমতো হতে পারে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের একটা বক্তব্য সেখানে থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষ সবসময় সক্রিয়ভাবে প্রশাসন চালাচ্ছে বা আইন প্রণয়ন করছে, এটা হওয়া সম্ভব নয়। যদিও এই ধরনের প্রচেষ্টা কিন্তু বিভিন্ন সময়ে হয়ে এসেছে এবং এখনো হয়ে থাকে। আপনাদের মধ্যে অনেকে হয়তো জানবেন যে, চীনে যখন কালচারাল রেভ্যুলিউশন তথা সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়েছিলো, তখনো এই ধরনের চেষ্টা হয়েছিলো যে, সমস্ত সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সাধারণ জনসভা ডেকে সেইখানে নেওয়া হবে। কিন্তু এটা আমরা জানি যে এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা অন্তত সাম্প্রতিককালে, এবং ভবিষ্যতেও যেটুকু দেখতে পাওয়া যায়, কোনো বড় রাষ্ট্রে এইরকম ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কোথাও নেওয়া যায়নি। নেওয়া সম্ভব বলেও অনেকে মনে করেন না। অর্থাৎ ‘গভর্নমেন্ট বাই দ্যা পিপল’ ধারণাটা কিন্তু বাস্তবে কার্যকর হয়নি বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আমার মতে সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।

    ‘গভর্নমেন্ট ফর দ্যা পিপল’ এটাই আরেকটু বিশদভাবে বলতে হয়। ‘গভমেন্ট ফর দ্যা পিপল’ অর্থে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য, তাদের সুবিধার জন্য, তাদের দাবি মেটানোর জন্য নিয়োজিত যে সরকার বা শাসনব্যবস্থা সেটাই হলো গভর্নমেন্ট ফর দ্যা পিপল। এইখানেই পপুলিজমের ধারণাটা সম্প্রতিকালে বিশেষ করে উঠেছে। কারণ পপুলিজম তথা জনবাদ বলতে যে সমস্ত নেতা বা দলের কথা বলা হয়, তারা সকলেই জোর গলায় বলেন যে, এখন যারা শাসন করছেন তারা একটা এলিট সম্প্রদায়। তারা সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করেন না। সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়ার প্রতি তারা মোটেই সেদিকে নজর দেন না। বরং ক্ষুদ্রগোষ্ঠী যারা ইতোমধ্যেই ধনী, বিত্তশালী, সম্পত্তিবান, তাদের কথাই তারা ভাবে। যারা পপুলিস্ট বা জনবাদী নেতা/নেত্রী বা জনবাদী দল, তারা সকলেই বলে যে, যে প্রশাসন বা সরকার বা শাসনব্যবস্থা আছে তা আরও বেশি করে জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের অভাব–অনটন মেটানোর কথা তাদের ভাবা উচিত। এটাই হবে যথার্থ গণতন্ত্র। অর্থাৎ তারা অনেক বেশি করে ‘গভর্নমেন্ট ফর দ্যা পিপল’, এই দিকটাতেই জোর দিয়ে থাকেন।

    শিল্পী: হোসে ক্লেমেন্তে ওরোযকো (১৮৮৩ – ১৯৪৯)

    এখন এই বিষয়টাও খানিকটা প্রাক–ইতিহাস আছে। আমি দুদিক থেকে এই আলোচনাটা করতে চাই। এক হচ্ছে পশ্চিমের দেশ, যেহেতু এখন পশ্চিমেই এই পপুলিজমের কথাটা খুব বেশি করে শোনা যাচ্ছে এবং এই নিয়ে অনেক বেশি করে লেখালেখি কথাবার্তা হচ্ছে। সুতরাং সে কথাটা খানিকটা আলোচনা করতে হবে। আর অন্যদিকে আমাদের মতো দেশে, এশিয়া আফ্রিকা অঞ্চলে যে পপুলিজম, সেই কথাটাও আমি আলাদা করে আলোচনা করবো কারণ আমার মতে এই দুই অঞ্চলের জনবাদের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটা আমাদের খেয়াল রাখা উচিত।

    পশ্চিমের জনবাদের কথাটাই প্রথমে বলি। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন জায়গায় এই পপুলিস্ট কথাটা উঠেছিলো। আপনারা যারা একটু ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন তারা হয়তো জানবেন যে রাশিয়ান পপুলিজম সম্বন্ধে একসময় অনেকরকম কথা হয়েছিলো। তাদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন। নারোদনিক বলা হতো তাদের। যেরকম তলস্তয় যিনি বিখ্যাত লেখক, তাঁর মতকে অনেকে মনে করেন অনেকটাই নারোদনিক ধারণার কাছাকাছি। কিন্তু নারোদনিকদের সঙ্গে তৎকালীন পশ্চিম ইউরোপের যারা মার্কসবাদী তাদের অনেক রকম যোগাযোগ ছিলো, বিরোধিতাও ছিলো। নারোদনিকদের রাশিয়ান পপুলিস্ট বলা হতো। এদের মূল ধারণা ছিলো যে, রাশিয়াতে সেইসময় যারা অভিজাত শ্রেণি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তারা তখন ভয়ানকভাবে পশ্চিম ইউরোপের দিকে অনেক বেশি মনোযোগ দিতো, পশ্চিমের শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি অনুকরণ করার চেষ্টা করতো। তাদের ওয়েস্টার্নাইজার বলা হয়। তার বিরুদ্ধে একটা মত, এবং এই মতটা অনেকটাই কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে ওই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির অল্পবয়েসী ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে খুব বেশি করে দেখা গিয়েছিলো যে ‘গ্রামে চলো’। প্যারিসে বা জার্মানিতে গিয়ে লেখাপড়া শেখা–এটা রাশিয়ার পক্ষে উপযুক্ত নয়। কারণ আসল রাশিয়া আছে গ্রামে, রাশিয়ার কৃষকদের মধ্যে চলে যাও। কৃষক সমাজের কীভাবে উন্নতি হবে সেই দিকটা ভাবো। এক ধরনের স্যোসালিজমের কথাও তারা বলতেন যে স্যোসালিজমটা কিন্তু ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণির যে স্যোসালিজম, তার মতো নয়। অর্থাৎ কলকারখানায় কাজ করে যে শহরের মজুর, তাদের শ্রেণি–সংগঠন, তাদের ট্রেড ইউনিয়ন, তার মাধ্যমে একটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে, এই যে ধারণাটা তখন পশ্চিম ইউরোপে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, নারোদনিকদের বক্তব্য ছিলো যে রাশিয়ার পক্ষে সে পথটা মোটেই উপযুক্ত নয়। কারণ রাশিয়াতে সেইরকমভাবে শিল্প তৈরি হয়নি, শিল্পশ্রমিক বলতে কিছু নেই। সুতরাং গ্রামে কী হবে সেইটাই তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। স্বতন্ত্র গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের সমাজতন্ত্র হতে পারে, এই বিশ্বাসটাই তাদের পপুলিজম। অনেকে মনে করেন যে আমাদের ভারতবর্ষে গান্ধীবাদ এক ধরনের পপুলিজম, বিশেষ করে খানিকটা হয়তো এই কারণে যে গান্ধী খুব মন দিয়ে তলস্তয় পড়েছিলেন এবং খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন তলস্তয়ের লেখা থেকে। এই যে গান্ধীর সময়ে কংগ্রেসের মধ্যে যে কথাটা চালু হলো, বিশেষ করে শহরের শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে, যে শহরে থেকে রাজনীতি করা একটা শৌখিন রাজনীতি, আসল রাজনীতি করতে হলে গ্রামে যেতে হবে, কৃষকদের মধ্যে গিয়ে কাজ করতে হবে। এটাও এক ধরনের পপুলিজম বলে অনেকে বলেছেন। অনেকের হয়তো বাংলাদেশের মওলানা ভাসানীর কথা মনে হতে পারে। যাই হোক, এগুলো সবই কিন্তু আধুনিক বা সমসাময়িক যে পপুলিজম তার খানিকটা প্রাক–ইতিহাস বলা যায়।

    সম্প্রতি ইউরোপে যে পপুলিজমের কথাটা আসছে সেটার পরিপ্রেক্ষিতট কিন্তু এই: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপে যে সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছিলো তার মধ্যে থেকে এই পপুলিজমের জন্ম। সেই ইতিহাসটা একটু দেখতে হয়। সেই ইতিহাসটা এরকম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপে ওয়েলফেয়ার স্টেট অর্থাৎ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। এই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মূল কথা হচ্ছে যে কেবলমাত্র ভোটের অধিকার নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যে প্রয়োজন তার একটা বড় অংশ মেটানোর দায় সরকারকে নিতে হবে। এই দায় যে সরকার নিলো ওয়েলফেয়ার স্টেটের মাধ্যমে, তার ফলে প্রত্যেক মানুষের জীবিকার দায়িত্ব, সেই জীবিকা কোনো কারণে যদি তার না থাকে, তার যদি কোনো কাজ না থাকে, বেকার হয়ে যায়, তাহলে তার ন্যূনতম ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকার নেবে। অর্থাৎ ইউরোপের সব দেশে প্রবর্তিত হলো বেকার ভাতা৷ এই বেকার ভাতা প্রত্যেক বেকার মানুষের প্রাপ্য। তারপর স্বাস্থ্য। বৃটেনসহ পশ্চিম ইউরোপের সব দেশে এক ধরনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস চালু হলো, অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালে সমস্ত রকম চিকিৎসা বিনা খরচায় প্রত্যেক নাগরিকের প্রাপ্য। এরপর ধরুন শিক্ষা। সমস্ত স্কুল শিক্ষা বিনা বেতনে হবে। অনেক দেশে কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষাও মোটামুটি বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে পাওয়া যেত। বাসস্থান একটা বড় জিনিস। সরকারি খরচে বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হল। খুব সামান্য ভাড়ায়, অনেকক্ষেত্রে এক ধরনের লিজের মারফত, কিছুদিন বাদে সেই বাড়ির মালিকানা সাধারণ মানুষ পাবে। এই যে ব্যবস্থাগুলো, অর্থাৎ ওয়েলফেয়ার স্টেটের মূলকথা ছিলো, এই সুবিধাগুলো দেওয়া হচ্ছে সমস্ত জনগণের নাগরিক অধিকার হিসেবে। এখানে কিন্তু কারোর বিশেষ প্রয়োজন আছে কি নেই— এ প্রশ্ন উঠছে না। যে কেউ, যে কোনো নাগরিক চাইলেই এই সুবিধাগুলো পেতে পারে। এই জনকল্যাণমূলক ওয়েলফেয়ার স্টেট পশ্চিম ইউরোপের সবগুলো দেশেই ১৯৫০’র দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।

    ১৯৭০ থেকে শুরু করে ওয়েলফেয়ার স্টেটের ব্যবস্থা সম্পর্কে নানারকম সমালোচনা উঠতে লাগলো। সমালোচনার মূলকথা হচ্ছে যে এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, এরজন্য সরকারকে ভয়ঙ্কর বেশি ট্যাক্স (কর) আদায় করতে হচ্ছে এবং তার ফলে বিশেষ করে যাদের উপার্জন বেশি তাদেরকে প্রচণ্ড বেশি হারে কর দিতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ওঠে যে, এতে প্রচুর অপচয় হয়। যাদের সামর্থ্য আছে, যাদের ব্যক্তিগত উপার্জন বেশি, যাদের ধনসম্পত্তি আছে, যারা ব্যক্তিগতভাবে এই খরচটা মেটাতে পারেন, যেমন ধরুন প্রাইভেট হাসপাতালের খরচ বহন করতে পারেন, অথবা ধরুন ইউনিভার্সিটির পড়াশোনার খরচ মেটাতে পারেন। তারাও কিন্তু সরকারি সুযোগ নিয়ে বিনা খরচে হাসপাতালে চিকিৎসা করাচ্ছেন, বিনা খরচে তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা কলেজ–ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। এটা কেন হবে?

    এই যে সমালোচনাগুলো শুরু হলো তার থেকেই সত্তরের দশক থেকে ব্রিটেনে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে অর্থনীতিবিদ এবং বিভিন্ন পলিসি বিষয়ে যারা আলোচনা করেন, তাদের প্রচারে এই কথাটা বেশি করে শুরু হলো যে ওয়েলফেয়ার স্টেট ব্যবস্থাটা আর চালানো উচিত নয়। ওয়েলফেয়ার স্টেটকে সংকোচন করে নিয়ে আসা হোক। রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। সেই সব পরিসেবা বাজারের হাতে তুলে দিতে হবে। বাজারের মাধ্যমে সত্যি সত্যি যাদের প্রয়োজন তাদের আলাদা করে সনাক্ত করা সম্ভব। যাদের পক্ষে বাজার থেকে নিজের সামর্থ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় অথবা যারা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবেন না অথবা যাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারবে না তাদের সেই সামর্থ্য নেই বলে, শুধু তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করে সুযোগ–সুবিধার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। সেটা রাষ্ট্র করবে। কিন্তু সাধারণভাবে সমস্ত নাগরিকের জন্য এই সমস্ত সুবিধাগুলো খুলে দেওয়া আর চলতে পারে না। এই যে রাষ্ট্র বা সরকারকে এইসব জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম থেকে সরে আসার ব্যবস্থা করা হলো, তাকে বলা হয় নিও–লিবারেলিজম বা নিও–লিবারেল মতবাদ। এই মতবাদ কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে ১৯৮০’র দশকের মধ্যে প্রায় সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো। এবং ওয়েলফেয়ার স্টেট মোটামুটিভাবে সব জায়গাতেই অনেকটা করে কমে এলো, অনেক জায়গায় প্রায় উঠেই গেলো বলতে পারা যায়।

    নিও–লিবেরাল ব্যবস্থার বিরূদ্ধে আবার নব্বইয়ের দশক থেকে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নানারকম ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই বিক্ষোভ সবচেয়ে বেশি করে প্রকাশ পেল ২০০৮–’০৯–এর ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিস থেকে। ফিনান্সিয়াল বাজারে হঠাৎ করে প্রায় সমস্ত কিছু হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার মতো যে অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিলো, সেই অবস্থার পরে, ২০১০–’১১–’১২ এই সময়ে অনেক বেশি করে এইসব দেশে ব্যাপকভাবে যে ধনী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তফাৎটা, ইনইকুয়ালিটি, অসাম্য— এই অসাম্য যে প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গেছে, এটা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে সকলকে দেখিয়ে দেওয়া হলো। এইখান থেকেই জনগণের প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। এই বিক্ষোভ দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী— দু’রকমই দেখতে পাওয়া যায়। আমি পশ্চিমের কথাটাই বলছিলাম এতক্ষণ, সেখানে এই ধরনের বিক্ষোভ দেখ দিলো। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা যদি বলেন, “অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট”, একরকম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তৈরি হয়েছিলো। মূল বক্তব্য ছিলো, আমরা হচ্ছি দেশের ৯৯ ভাগ, আমাদের কিছুই নেই, আর দেশের এক ভাগ, শতকরা এক ভাগ মানুষ, তারা সমস্ত সম্পত্তি দখল করে বসে আছে। এই অসাম্য কেন চলবে? এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

    অন্যদিকে যাকে আবার দক্ষিণপন্থী বলা যায়, তার একটা বড় উদাহরণ সে সময় ছিলো, “টি পার্টি মুভমেন্ট”। এই টি পার্টি মুভমেন্ট— এরা দক্ষিণপন্থী, কিন্তু এরাও সাধারণ মানুষ। এরা ওই অর্থে ধনী মানুষদের সংগঠন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এরা অপেক্ষাকৃত গ্রামাঞ্চলের মানুষ। কিন্তু এরা দক্ষিণপন্থী এই অর্থে যে, এদের প্রধান রাগ হচ্ছে, বড়–বড় শহরের ফিনান্সিয়াল হাউজ, বড়–বড় শহরের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, বৈভব এবং বিদেশিদের আনাগোনার বিরুদ্ধে। বিদেশি বলতে সেখানে ধনী বিদেশিও প্রচুর, আবার সাধারণ যারা কাজ করে কিন্তু বিদেশি, বিদেশ থেকে আসা মানুষ তারা। টি পার্টির বক্তব্য ছিলো, বিদেশ থেকে আসা লোকেরা আমাদের কাজকর্মগুলো দখল করে নিচ্ছে। এই ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী মনোভাব, এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শেষ অব্দি ট্রাম্পের মতো একজন জনবাদী বা পপুলিস্ট নেতার পুরো রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম। পশ্চিম ইউরোপে এরকম একাধিক দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী— দু’রকম পপুলিস্ট আন্দোলন আমরা দেখতে পাই। দক্ষিণপন্থী বলতে প্রধানত ইমিগ্র্যান্ট বিরোধী মত, ইসলাম বিরোধী মত— এটাই প্রধানভাবে দেখতে পাওয়া যায়। তাদেরকেই তারা প্রথম শত্রু বলে চিহ্নিত করে। আবার বামপন্থীও আছে, বামপন্থী পপুলিস্ট। তারা পপুলিস্ট এই অর্থে যে, পুরোনো যে সমাজবাদী দলগুলো, কমিউনিস্ট দলের যেরকম সংগঠন, সেরকম সংগঠন তাদের থাকে না। কিন্তু তারা সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষ, অপেক্ষাকৃত সাধারণ মধ্যবিত্ত, তাদের জন্য সরকার আরও কিছু কল্যাণমূলক কাজ করুক— এই দিকে তাদের ঝোঁক বেশি। এটা হচ্ছে পাশ্চাত্যে যে পপুলিজম, তার ছক।

    শিল্পী: নাটালিয়া মামোনোভা (২০১৭)

    এইখানে আমি ছোট করে একটা তত্ত্বের কথাই বলি। পপুলিজম বিশ্লেষণ করতে গেলে, জনবাদের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক কোথায়, এখানে একজন বিশেষ তাত্ত্বিকের কথা আমি বলবো। আর্নেস্তো লাকলাউ। ইনি ছিলেন আর্জেন্টিনার মানুষ, কিন্তু আর্জেন্টিনা থেকে বিতাড়িত। ইংল্যান্ডে অধ্যাপনা করতেন। উনি On Populist Reason বলে একটি বই লিখেছিলেন ২০০৫ সালে। তাতে তিনি পপুলিজমের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক— তার একটা বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণটা মূলত এইরকম। উনি বলছেন যে, দু’ধরনের রাজনৈতিক পন্থা হতে পারে। একটিকে উনি বলছেন ডেমোক্র্যাটিক অর্থাৎ যেটা একটা ডিফারেন্সিয়াল লজিকে চলে। ডিফারেন্সিয়াল লজিক বলতে ঠিক আগে আমি যেটা বলছিলাম, অর্থাৎ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের দাবি থাকতে পারে। সমস্ত দাবি সরকারের পক্ষে মেটানো সম্ভব হয় না। সুতরাং যেই যেই দাবিগুলো রাজনৈতিকভাবে মেটানো সম্ভব ও মেটানো প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে, তার একটা কস্ট–বেনিফিট হিসেব থাকে। এই দাবিটা মেটাতে কত খরচ পড়বে, এবং তা থেকে আমাদের রাজনৈতিকভাবে কতটা সুবিধা হবে, এইরকম একটা হিসেব থাকে। তার ভিত্তিতে কিছু কিছু জনগোষ্ঠীর দাবি মেটানো হয়, সকলের দাবি মেটানো যায় না। এইটা হলো লজিক অফ ডিফারেন্স বা ডিফারেন্সিয়াল লজিক অর্থাৎ পৃথকীকরণের নীতি। কিন্তু এর ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকবে, যাদের দাবি মেটানো হলো না। এই যে মেটানো হলো না, তার ফলে কিন্তু তাদের মধ্যে এইরকম একটা ধারণার জন্ম হতে পারে যে, যদিও আমাদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দাবি স্বতন্ত্র, কিন্তু আমরা সকলেই একই অবস্থায় আছি, তার কারণ আমাদের একজন শত্রু আছে যে আমাদের দাবি অস্বীকার করছে। অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠী বা এলিট। আমরা সকলেই সমানভাবে সেই শাসক এলিটদের দ্বারা অত্যাচারিত। এই যে এক ধরনের সমীকরণের নীতি, এটাকে লাকলাউ বলছেন, লজিক অফ ইকুইভ্যালেন্স। এই সমীকরণের নীতি থেকে পপুলিজমের জন্ম হয়। অর্থাৎ জন্মলগ্নে কিন্তু পপুলিজম একটা বিরোধী রাজনীতি থেকে আসে। একটা কোনো প্রতিষ্ঠিত শাসকগোষ্ঠী আছে আর বিভিন্ন জনগোষ্ঠী আছে যারা নানা রকম দাবি করছে। যাদের দাবিগুলো মিটলো না, সেইসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি এই ধারণা সৃষ্টি করা যায় যে তারা সকলেই আসলে এক অবস্থায় কারণ তারা সকলেই একই শত্রু দ্বারা অত্যাচারিত, তাহলেই জনবাদী রাজনীতির জন্ম হয়। এইটা হলো লাকলাউ–এর বিশ্লেষণ। এর পরে উনি বিশ্লেষণ করে বলছেন যে, ধারণাটা সৃষ্টি করা যায় কী করে। সব সময় সব ক্ষেত্রে চেষ্টা করলেও এই ধারণা তৈরি করা যায় না। ধারণাটা সৃষ্টি হয় রেটরিকের মাধ্যমে। অর্থাৎ একটা বয়ানের মধ্যে, এক ধরনের অলঙ্কার প্রয়োগের মধ্যে, কিছু কল্পকাহিনীর সৃষ্টি করার মধ্যে, কিছু পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নাটক সৃষ্টি করতে হয়। এর মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবাবেগকে স্পর্শ করতে হয়। তাহলেই এই জনবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অর্থাৎ জনবাদী রাজনীতির মধ্যে কিন্তু উনি বারে বারে যদিও রিজন কথাটা বলছেন, কিন্তু এর যে ইমোশনের দিকটা, সেটা কিন্তু প্রধান। কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অ্যাকশন যখন হবে, বিশেষ করে যদি আমরা একটা ব্যাপক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কথা বলি, তাহলে সেখানে এই যে ইমোশনের দিকটা, এইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বারেবারে তিনি এই দিকটাতে, এই রেটরিকাল তথা আলঙ্কারিক দিকটাতে জোর দিয়ে বলছেন যে, জনবাদী রাজনীতির আসল চরিত্র এখানেই লুকিয়ে আছে।

    এইবারে আমি প্রাচ্যের তথা এশিয়া–আফ্রিকার পপুলিজম প্রসঙ্গে আসি। বিভিন্ন দেশে এই পপুলিস্ট রাজনীতি, পপুলিস্ট নেতা, পপুলিস্ট দল আমরা দেখেছি। এখানে কতগুলো সাধারণ কথা আমি বলি। ভারতবর্ষের অনেক উদাহরণ আমি দিতে পারি। কিন্তু তার মধ্যে আমি এক্ষুণি যাচ্ছি না। আমি সাধারণভাবে এই জনবাদী রাজনীতির কতগুলো চরিত্র এবং বিশেষ করে জনবাদী নেতার ভূমিকা নিয়ে বলব। জনগণ একদিকে এবং কোনো এক শোষক গোষ্ঠী যারা জনগণের শত্রু অন্যদিকে— এই ধারণাটা সৃষ্টি করার মধ্যে একজন নেতার ভূমিকা অনেকক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। জনগণের যে তথাকথিত ঐক্য, এই ঐক্যটা প্রতিষ্ঠিত হয় একজন নেতার ব্যক্তির মধ্যে। তার ব্যক্তির মধ্যে জনগণের ঐক্য প্রতিফলিত হয়। আবার বলছি, যে কেউ জনবাদী নেতা হওয়ার চেষ্টা করলেই যে তিনি তা হতে পারবেন, তা নয়। কোন অবস্থায় কী কারণে তা সম্ভব হয়, বিশেষ বিশেষ অবস্থায় তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন। দু’নম্বর যেটা বড় কথা, যা প্রাচ্যে বহু জায়গায় দেখা গেছে যে, একটা বিরোধী জায়গা থেকে এই জনবাদী নেতা বা দল, তারা শাসকদল হয়ে গেল। তারা নির্বাচনে জিতে সরকার প্রতিষ্ঠা করল। লাকলাউ–এর আলোচনাতে কিন্তু এই দিকটাতে উনি খুব জোর দেননি। তার কারণ, ওনার মত ছিলো যে, সরকারে আসার পরে জনবাদী রাজনীতি বেশিদিন টিকতে পারে না। কেননা জনবাদী রাজনীতির ভিত্তিটা একমাত্র বিরোধিতার মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পেতে পারে। একবার সরকারে চলে এলে অবধারিতভাবে সেই ডিফারেন্স বা পৃথকীকরণের নীতি অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ কিছু কিছু গোষ্ঠীকে সুযোগ–সুবিধা দেওয়া যাবে, বাকিদের দেওয়া যাবে না। তাতে আবার একটা নতুন বিরোধিতা তৈরি হয়ে যাবে। একটা পপুলিস্ট দল, সে যদি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকে, সে আর পপুলিস্ট থাকতে পারবে না বরঞ্চ তার বিরুদ্ধে একটা অন্য কোনো পপুলিস্ট রাজনীতি, বিরোধী রাজনীতি তৈরি হয়ে যাবে। সুতরাং লাকলাউ–এর ধারণায়, পপুলিস্ট রাজনীতি শাসন ক্ষমতায় এসে বেশিদিন টিকতে পারে না।

    কিন্তু ভারতবর্ষ থেকে, আফ্রিকা–এশিয়ার অন্য দেশ থেকেও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে যে, এই জনবাদী রাজনীতি শুধু যে একজন নেতার নেতৃত্বেই দীর্ঘ দিন শাসন করেছে শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে এক নেতা চলে গিয়েছেন কিন্তু দল সেই নেতার বদলে আরেকজন নেতা নির্বাচন করেছে। অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু ওই জনবাদী দল তার জনবাদী চরিত্র বজায় রেখেছে, এরকম উদাহরণ অনেক জায়গায় পাওয়া যাবে। এখানে সবচেয়ে যেটা ভেবে দেখার এবং অনেকে বলবেন দুশ্চিন্তার জায়গা, সেটা হলো একদিকে যেরকম এই জনবাদী রাজনীতির ফলে খানিকটা জনকল্যাণমূলক কাজের প্রয়োজন স্বীকৃত হয়েছে এবং অনেকক্ষেত্রে নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জনবাদী নেতৃত্বের মধ্যে স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সম্ভাবনাও প্রবল। একটা জিনিস যেরকম আমি ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে বলতে পারি। এই জনবাদী রাজনীতির সম্পূর্ণ প্রশাসনিক একটা দিক আছে, অর্থাৎ সরকার খরচ করবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য নানা প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ করা হবে। এটা কিন্তু কখনোই ইউরোপের ওয়েলফেয়ার স্টেটের মতো ব্যবস্থা নয়। কারণ ওয়েলফেয়ার স্টেটের মতো সকলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা, সকলের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, আমাদের দেশে কোনো সরকারের সেরকম রাজস্ব নেই যে তারা সেটা করতে পারে। সুতরাং কিছু লোককে দেওয়া হবে, কিছু লোককে দেওয়া হবে না। এইখানে যাদের প্রয়োজন বেশি, তাদের জন্য যাতে দেওয়া হয়, এই ধারণাটা কিন্তু এখন ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়ে গেছে। সবরকম দল, তাদের অন্যান্য রাজনৈতিক মত যাই থাকুক না কেন, সকলেই এখন মোটামুটিভাবে প্রশাসনিক পপুলিজম, অর্থাৎ সরকারি খরচের দিক থেকে এই ধরনের এক্সপেন্ডিচার, মেনে নিয়েছে। নানা রকম প্রকল্প, সেটা দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যেই হোক, মহিলাদের জন্যেই হোক, শিশুদের জন্যেই হোক, বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য প্রকল্প, বিভিন্ন ধরনের স্কুল শিক্ষা প্রকল্প, খাদ্য বা বাসস্থান ইত্যাদির জন্য নানারকম সাবসিডি দেওয়ার ব্যবস্থা, এগুলো এখন ব্যাপকভাবে সব দলের সরকার করে থাকে।

    Artist: Boy Dominiguez

    অর্থাৎ, জনবাদের এই দিকটা এখন প্রায় সর্বজনস্বীকৃত হয়ে গেছে। অন্তত পৃথিবীর এই অংশটাতে যেখানে আমরা বাস করি। কিন্তু এর অন্য যে রাজনৈতিক মতবাদের দিক, অর্থাৎ নেতার অবস্থান, নেতার সঙ্গে তার সমর্থকদের সম্পর্ক, এই দিকটার কিন্তু একটা অত্যন্ত বিশিষ্ট চরিত্র আছে জনবাদী রাজনীতিতে। এই নেতা কিন্তু এক অর্থে সার্বভৌম নেতা। অর্থাৎ জনগণের সার্বভৌমত্ব যেন তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এইরকম একটা ধারণা। তিনি সার্বভৌম নেতা, জনগণের কল্যাণের জন্য বা জনগণের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য তিনি জনগণের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। নানারকম আইনকানুনের বেড়াজাল, যার মাধ্যমে এতদিন অব্দি এলিট শাসকশ্রেণি তারা সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে রেখেছে, সেই আইনকানুনের পাশ কাটিয়ে, সেই বেড়াজাল ভেঙে, দরকার হলে আইন ভেঙে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করে দেবেন। এই ধারণাটা কিন্তু জনবাদী রাজনীতির মূলে রয়েছে। উদারনৈতিক রাজনীতি বা সাংবিধানিক রাজনীতির যেটা মূল কথা, যে শেষ অব্দি আউটকাম বা ফলটা ভালো হলো কি হলো না সেটা অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু আইনের যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়াটা বজায় রাখতে হবে। তার কারণ তুমি প্রক্রিয়া ভেঙে যদি শেষ অব্দি একটা ভালো ফলও পাও, ভবিষ্যতে কিন্তু তোমাকে তার জন্য খেসারত দিতে হবে। কারণ আইনের নিরপেক্ষ প্রক্রিয়াটা তুমি নষ্ট করে ফেললে। এর পরে তুমি চাইলেও বিচার পাবে না। এই যে সাংবিধানিক ধারণাটা, জনবাদের রাজনীতি কিন্তু এটা স্বীকার করে না। স্বীকার না করার একটা বড় কারণ এই যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাই হচ্ছে যে ওসব আইন–কানুন আসলে বড়লোকদের ব্যাপার। ওটা তাদের সুবিধার জন্য তৈরি করা, ওখানে আমরা সাধারণ মানুষ গিয়ে তো কিছুই করতে পারবো না। যদি কোনো কারণে আমরা আইন–কানুন করতে যাই, থানা–পুলিশ করতে যাই, কোর্ট–কাচারি করতে যাই, শেষ অব্দি দেখা যাবে যে বড়লোকেরা বড় বড় উকিল নিয়ে আসবে, তারাই জানে কী করে কী করতে হয়, আমরা তো জানি না, শেষ অব্দি আমরাই ভুগি, আমাদের ভাগ্যে কিছু জোটে না। তার বদলে আমরা এমন একজন নেতা যদি বাছতে পারি এবং তাকে যদি শাসন ক্ষমতায় বসাতে পারি, যিনি প্রয়োজন হলে সমস্ত আইন–কানুন ভেঙেও আমাদের জন্য কিছু করে দেবেন, একমাত্র তাহলেই আমরা কিছু পাবো।

    এই ধারণাটা জনবাদী রাজনীতির মধ্যে একটা বিপজ্জনক সম্ভাবনা। এই বিপদটার জন্য জনবাদী রাজনীতির সমালোচনা করা হয়। তাতে দুটো সমালোচনা বড়। একটা হচ্ছে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতার আরবিট্রারি অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ, অর্থাৎ আইন–কানুনের তোয়াক্কা না করে, নিজের পছন্দ মতো কোনো কাজ করতে পারা। এই ক্ষমতাটা সংবিধান কখনো কোনো শাসককে দেয় না। সংবিধান সবসময় বলবে যে শাসক, তিনি যতই মানুষের ভালো করতে চান, সেটা আইন মেনে করতে হবে। কিন্তু জনবাদী নেতারা মনে করেন, আমার আইন মানার দরকার নেই, কারণ আমি যেটা করতে চাইছি, সেটা মানুষের ভালো করার জন্য। এই ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সাংবিধানিক ব্যবস্থাটা কিন্তু ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা হয়।

    জনবাদী নেতৃত্বের আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। এই জনবাদী নেতা কিন্তু শেষ অব্দি ডিক্টেটর হন না কখনো। এটা একটা লক্ষ্য করার মতো বিষয়। সম্প্রতিকালে নানা দেশে অনেক অথরিটেরিয়ান একনায়কও দেখা গেছে। কিন্তু তারা সকলেই কিছু দিন পরপর একটা করে নির্বাচন করান। এবং নির্বাচনে বিরোধীও থাকতে হয়। এবং সেই বিরোধীদের উনি পরাস্ত করে জনগণের সমর্থন নিয়ে যে আবার ক্ষমতায় এলেন, এটা একজন জনবাদী নেতাকে বারেবারে প্রমাণ করতে হয়। অর্থাৎ তিনি দেখাতে চান যে তার ক্ষমতার উৎস হলো যে তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপে বহু জায়গায় এমন ঘটনা হয়েছে, এমনকি উনিশশত পঞ্চাশ–ষাটের দশকেও লাতিন আমেরিকার বহু জায়গায় হয়েছে, আফ্রিকার বহু জায়গায় হয়েছে যে একজন নেতা ক্ষমতায় এলেন, তারপর নির্বাচন–টির্বাচন সব তুলে দিলেন। দরকার নেই। তিনি যেন চিরস্থায়ী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। এমন ঘটনা কিন্তু সাম্প্রতিককালে বেশি দেখা যাবে না। দেখা যাবে না, তার কারণ এই পপুলিজমের ছকটা, যেখানে বারেবারেই তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, আমার ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি হচ্ছে জনগণের সমর্থন। সেই সমর্থনটা তাকে প্রদর্শন করতে হবে কিছুদিন পরপর। এখানেই জনবাদী রাজনীতির দ্বিতীয় সমালোচনা চলে আসে। সেটা হলো যে, এই জনবাদের কোনো বৃহত্তর সমাজ পরিবর্তনের প্রকল্প থাকে না। এর সবটাই হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচন জেতার জন্য কোন কোন গোষ্ঠীকে কোন কোন সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন, সেই প্রশ্ন। সেটা সবসময়ই যে সাধারণ জনস্বার্থের বিরোধী হবে, এমন হয়তো নয়। কিন্তু ব্যাপকভাবে একটা সমাজ পরিবর্তনের কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প জনবাদী রাজনীতির থাকে না। এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই জনবাদী রাজনীতি দক্ষিণপন্থী না বামপন্থী, এটা অনেকক্ষেত্রেই বোঝা মুশকিল হয়ে যায়, কারণ তাদের মতবাদের দিক থেকে অনেক জনবাদী দল বা নেতাকে মনে হবে খুব দক্ষিণপন্থী কিন্তু তারাই হয়তো অনেক রকম নীতি গ্রহণ করবে যেগুলো আসলে বামপন্থীদের নীতি। কিন্তু সেইসব নীতি তাদের নিতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ তারা ওইভাবে কোনো একটা দীর্ঘস্থায়ী সমাজ পরিবর্তনের প্রকল্পের দিক থেকে এটা ভেবে দেখছে না। তাদের কাছে হিসেবটা হচ্ছে, এর থেকে নির্বাচন বা জনসমর্থনের দিক থেকে কতটুকু সুবিধা। এই হিসেব করে জনবাদের রাজনীতি চলে।এতগুলো কথা আমি মোটামুটি বললাম। প্রথম কথা, জনবাদী রাজনীতির সূত্র হচ্ছে একটা নির্বাচনী গণতন্ত্র। সেই নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যে থেকে একটা বিশেষ ধরনের জনবাদী রাজনীতির কী করে উদ্ভব হয়, সেটা আমি বললাম। আমি আরও বেশি করে বলছি যে, এই জনবাদী রাজনীতির যে বিভিন্ন রকমের প্রকাশ, এটা কিন্তু পাশ্চাত্যের তুলনায় এশিয়া–আফ্রিকার দেশগুলোতে অনেক বেশি দেখা গেছে। অনেক সময় আমার মনে হয় যে, এই ট্রাম্পের আমলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনবাদী রাজনীতির যে প্রকাশ, পশ্চিম ইউরোপের অনেক জায়গায় যা এখন দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে এই অভিজ্ঞতাটা আমরা অনেকদিন ধরে ভালোভাবে সঞ্চয় করেছি। সুতরাং এই ঘটনাগুলো পাশ্চাত্যের কাছে যতটা অত্যাশ্চর্য মনে হয়, আমাদের কাছে মোটেই অত আশ্চর্যের লাগে না। এরকম তো আমরা কত দেখেছি। কিন্তু কেন গণতন্ত্রের মধ্যে থেকে এই ধরনের জনবাদী রাজনীতির উদ্ভব হতে পারে সেটাই আমি খানিকটা বলার চেষ্টা করলাম। এবারে আপনারা যদি প্রশ্ন করেন আমি অতি অবশ্যই উত্তর দেবো।

    প্রশ্নোত্তর পর্ব

    প্রশ্ন ১: সান্তাল মউফ, আর্নেস্তো লাকলাউ, আকিল বিলগ্রামী প্রমুখ চিন্তকরা পপুলিজমকে এক্সক্লুসিভলি নেগেটিভ কনোটেশন হিসেবে মানতে চান না। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হাজির হয়, গণমুখী রাজনীতির জন্য পপুলিজম কি আবশ্যিকভাবে খারাপ? নাকি পপুলিজম গণমুখী ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতিরও কৌশল হতে পারে?

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: আমি তো বললাম যে কৌশল হতে পারে। পপুলিজম গণমুখী রাজনীতির কৌশল হতে পারে এবং বহু জায়গাতেই তা হয়েছে। বিশেষ করে যে কথাটা আমি আরও বেশি করে বললাম, জনবাদী রাজনীতির মধ্যে থেকে যেসব ধারণার জন্ম হয়েছিলো, অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের জন্য বিশেষ প্রকল্প, বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকির ব্যবস্থা, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য প্রকল্প, শিশুদের জন্য প্রকল্প, তাদের স্বাস্থ্যের জন্য প্রকল্প— এই ধরনের প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু জনবাদী রাজনীতির চাপে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক পরিকল্পনার কথাই শুধু বলছি না। রাজনীতির মাধ্যমে যখন এগুলোকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা হয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাবে কোনো জনবাদী দল বা জনবাদী নেতা বা কোনো জনবাদী সরকারের চাপে এই জিনিসগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। এবং বহু জায়গায় এগুলো এখন সাধারণভাবেই গৃহীত। সুতরাং জনবাদ নিশ্চয়ই গণমুখী রাজনীতির কৌশল হতে পারে। কিন্তু আবার বলছি এটা কৌশল। আমার মতে জনবাদী রাজনীতির পরিসরের মধ্যে থেকে কোনো ব্যাপক দীর্ঘস্থায়ী সমাজ পরিবর্তনের প্রকল্প হতে পারে না। তাহলে জনবাদী রাজনীতির বাইরে যেতে হবে। সেই প্রকল্প প্রগতিশীল হোক বা অন্যরকম কিছু হোক, ব্যাপক সমাজ পরিবর্তনের প্রকল্প যদি হয় তাহলে কিন্তু জনবাদী রাজনীতির থেকে আরও বেশি কিছু করতে হবে। সেই রাজনীতি শুধুমাত্র পরবর্তী নির্বাচনে জিতবো, এই হিসেবের মধ্যে, এই কৌশলের মধ্যে থাকলে হবে না।

    প্রশ্ন ২: বর্তমান দুনিয়ায় আমরা দেখতে পাচ্ছি; যে রাষ্ট্রকাঠামোগুলা ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক স্টেট’ হিশেবে পরিচিত ছিলো, সেই সবগুলো রাষ্ট্রেই ‘পপুলিস্ট সুপার লিডার’ খ্যাত স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান দেখা যাচ্ছে। এখন আমার প্রশ্নটা হলো, প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে ব্যবহার করে এত সহজে কী করে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি নিজের পরিসর তৈরি করতে পারছে?

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: পাশ্চাত্যের কথা যখন বলছি, একটা নিওলিবারেল প্রশাসনের সময় গিয়েছিলো, বিশেষ করে ১৯৮০–৯০, ২০০০–এর সময় – এই বছর তিরিশের মতো। সেই সময়টাতে আমরা দেখেছি যে সাধারণভাবে এই দেশগুলোতে একটা ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময়। পুরোনো শিল্প, যন্ত্র শিল্প, ম্যানুফ্যাকচারিং – সেইগুলো সমস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বা ব্রিটেন থেকে সরে গেল। বড় বড় পুরোনো ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেল। এইসব শিল্পোৎপাদন অন্য দেশে চলে গেল। মানে আমেরিকান কোম্পানি, কিন্তু তারা আর আমেরিকাতে মোটর তৈরি করে না। তারা কেউ মেক্সিকোতে গিয়ে করে, কেউ অন্য কোনো দেশে গিয়ে করে, বিদেশী কোম্পানির উৎপাদনের একটা বড় জায়গা হয়ে গেল চীন। বহুজাতিক কোম্পানিরা, তারা চীনে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে চলে গেল। অন্যান্য বহু দেশে এই ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ পুরোনো যে শিল্প–শ্রমিক ভিত্তিক অর্থনীতি ছিলো, সেগুলো আস্তে–আস্তে ওই দেশ থেকে চলে গেল। তার ফলে একটা বড় অসাম্য তৈরি হলো। এই অসাম্য মেটানোর একমাত্র উপায় ছিলো, ফিনান্সিয়াল দিক থেকে, অর্থাৎ ব্যাংকিং, ইনসিওরেন্স, স্টক মার্কেট, আন্তর্জাতিক লেনদেন – এইখান থেকে ফিনান্সিয়াল যে মুনাফা, তার খানিকটা অংশ, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করল। বিশেষ করে, সস্তায় চীন থেকে বা ভিয়েতনাম থেকে, বাংলাদেশ থেকে জিনিস তৈরি করে আমেরিকান কোম্পানিরা আমেরিকার সাধারণ মানুষদের সস্তায় বিক্রি করতে লাগলো। ধরুন বাংলাদেশে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের জামাকাপড় তৈরি হচ্ছে। আমি কিছু দিন আগে একটা টেলিভিশন প্রোগ্রামে দেখছিলাম, যে আমেরিকায় যেখানে লিভাইস জিন্স তৈরি হতো, সেই শহরের লোকেদের জিজ্ঞেস করছে যে এখানে যদি তৈরি হয়, একটা জিন্সের কত দাম হবে? আর এখন তোমরা ওয়ালমার্টে জিন্স কততে পাও? সবাই বললো, হ্যাঁ, এখন অনেক তফাৎ হয়ে গেছে, কারণ বিদেশ থেকে তৈরি করা লিভাইস ব্র্যান্ডের জিন্স এখন অনেক সস্তায় পাওয়া যায়। তার ফলে একজন সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের স্তর, শিল্পোৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেটা ধরে রাখতে পারা গিয়েছিলো, যদিও আগেকার যুগে তার চাকরির যে রোজগার ছিলো, সেই রোজগার তার নেই। এই অসাম্যটা হঠাৎ ভীষণভাবে প্রকট হয়ে গেল, ওই ফিনান্সিয়াল জগতটা যখন ক্র্যাশ করল। ওই ক্র্যাশের পরে, ২০০৯–১০ সাল থেকে এই যে ধারণাটা ছড়িয়ে পরল যে, একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, তারা সমস্ত মুনাফা খেয়ে ফেলছে আর আমাদের ভাগে কিছু থাকছে না। আমরা আমেরিকাতে দেখেছি, দক্ষিণপন্থী ট্রাম্প এই ধারণাটার সুযোগ নিয়ে একটা দক্ষিণপন্থী জনবাদী রাজনীতি তৈরি করতে পারলো। ইউরোপের অনেক দেশে কিন্তু এই অসাম্যের প্রতিবাদে বামপন্থী রাজনীতিও হয়েছে। গ্রিসে যেরকম সিরিৎসা বলে একটা দল আছে, স্পেইনে পডেমস বলে একটা দল আছে – তারা এখন ক্ষমতায় এসেছে। ইতালিতে ফাইভস্টার বলে একটা দল আছে, তারাও এখন সরকারে এসেছে। এরা জনবাদী কিন্তু ওই অর্থে দক্ষিণপন্থী নয়। এরা ওরকম বিদেশি বিরোধী, সমস্ত ইমিগ্র্যান্ট চলে যাও – এইসব কথা বলে না। সুতরাং বামপন্থী পপুলিজমও আছে অনেক দেশে। আবার দক্ষিণপন্থীও আছে। দু’রকমই থাকতে পারে। কিন্তু এর ভিত্তিটা হচ্ছে, যে ধরনের স্থিতাবস্থার মধ্য দিয়ে নিওলিবারেল রাজনীতি চলছিলো, সেই স্থিতাবস্থাটা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এবং তার একটা বড় বহিঃপ্রকাশ, যেটা অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পাবেন, যে পুরোনো যে রাজনৈতিক দলগুলো ছিলো, সেগুলোর ভেতর প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রায় ভেঙে দু–তিন টুকরো হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেটা আপনি আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে দেখবেন, ইংল্যান্ডের কনজারভেটিভ বা লেবার পার্টির মধ্যেও দেখবেন, ফ্রান্সে যে সোশ্যালিস্ট দল, সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। এই যে পুরোনো বড় বড় দলগুলো যারা এতদিন ধরে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলো, রেপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্টের কাজ করছিলো, সেই সংগঠনগুলো সমস্ত ভেঙে গেছে। এইখানেই হয় দক্ষিণপন্থী না হয় বামপন্থী জনবাদ, জনবাদী রাজনীতির জায়গা তৈরি হয়েছে।

    শিল্পী: জর্জ পিনওয়েল (১৮৪২–১৮৭৫)

    প্রশ্ন ৩: উন্নয়ন প্রপঞ্চের নিরিখে পশ্চিমকে এতকাল অন্যসব দেশগুলো মডেল মেনে এসেছে, পশ্চিম হতে চেয়েছে। এরপর সেই পশ্চিমা দেশগুলোতে পপুলিজমের বিস্তারণে ট্রাম্প ও জনসনের মতো মানুষেরা ক্ষমতায় আসছে। প্রতিফলে গনতান্ত্রিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে পপুলিজম ও স্বৈরতান্ত্রিকতার মিশেলে নতুন এক ধরনের শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। পপুলিজমের বৈশিষ্ট্য মেনে একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানাদির ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে ব্যক্তিবিশেষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, পপুলিজমের আরেকটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে জনগণের ইচ্ছের গুরুত্ব থাকার যে শর্ত আছে– সেটাকে বেমালুম অস্বীকার করা হচ্ছে– বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে। এতে করে গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকারের নানান প্রশ্নে উন্নত সব দেশ ও তাঁদের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যারা আগে এ ধরনের বাস্তবতায় আপাত দৃষ্টিতে জনগণের স্বার্থে নানাবিধ প্রয়াস পেত– সেগুলোর কার্যকারিতা ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে। তো, এমত বাস্তবতায় সম্মিলিত মানুষের অগ্রগতির প্রশ্নে অর্থাৎ আরাধ্য মুক্তির প্রশ্নে কোন ধরনের পথ পাথেয় বিবেচিত হতে পারে?

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করলেন। এখানেই আমার ওই প্রশ্নটা উঠছে যে, যেহেতু জনবাদী রাজনীতির কোন বৃহত্তর সমাজ পরিবর্তনের দায় নেই, সেই জন্যে বহু ক্ষেত্রেই মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা, সমস্তটাই সুবিধাবাদের ওপর চলে। অর্থাৎ আমি সাংঘাতিক রকমের অপকর্ম করতে রাজি আছি যদি শেষ অব্দি কোথাও আমার একটা রাজনৈতিক সুবিধা হয়। আমি সেক্ষেত্রে মানবাধিকারের কোন তোয়াক্কাই করব না যদি নির্বাচনের দিক থেকে আমার সুবিধা হয়। আপনি একটা জিনিস বহু জায়গায় লক্ষ্য করবেন, আমি ভারতবর্ষের কথাই বলি। যেমন, আমি একটা ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা সংখ্যালঘু, তাদের আমি চিহ্নিত করলাম যে, এদের জন্যই আমাদের সমস্ত অসুবিধা, সুতরাং এদের খানিকটা শায়েস্তা করো। এটাতে নির্বাচনী রাজনীতিতে যদি আমার সুবিধা হয়, অর্থাৎ আমি একটা মেজরিটি মতকে সংগঠিত করতে পারি, আমার তাতে সুবিধা। সুতরাং এই বিভাজনের রাজনীতি সে করবে। তার জন্য মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলো কি হলো না, সেটা সে খুব একটা তোয়াক্কা করবে না। এইবারে অসুবিধাটার কথাটা আপনি যেটা বললেন, এটা খুবই ঠিক কথা। যে ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক মত, যেটা কোন এক সময় হয়তো অনেকটা প্রভাবশালী ছিলো, এই প্রভাব অনেক কমে এসেছে। দু’দিক থেকে কমে এসেছে। প্রথম কথা, আপনি এই ট্রাম্পের যুগে তো দেখতেই পেলেন যে, একজন প্রতিষ্ঠিত নেতা যে সরকারী ক্ষমতার শীর্ষে – সে নিজেই এই ধরনের মানবাধিকার ইত্যাদির কোনো গুরুত্ব দেয় না। সুতরাং তার নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মানবাধিকার রক্ষা করো, এই কথা বলা সম্ভবই ছিলো না, সে চাইতোও না করতে। আর একবার যখন ঘটনাটা ঘটে যায়, তারপরে কিন্তু এই আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর পেছনে যে রাজনৈতিক শক্তি থাকে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধেও একটা বড় রকমের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড়িয়ে যায়। আর যারা এই ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, সেই শাসকেরা তখন সেই সুযোগটা নিয়ে বলবে ওই আন্তর্জাতিক মতের বিশ্বাসযোগ্যতা কী? ওদের কথা আমাদের শুনতে হবে কেন? না শুনলে তাদের যে কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা, তাও হয়তো নেই। এখানে আবার মায়ানমার বা বার্মার প্রসঙ্গটায় আসে। সেখানকার ঘটনা তো এখন রোজই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, সারা পৃথিবী চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে এরকম একটা কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, অথচ কিছু করার উপায় নেই। কেউ কিছু করতে চাইছে না। সুতরাং, এই অসুবিধাটা তো আছেই। তবে এটা যে শুধুমাত্র জনবাদী রাজনীতির সমস্যা, এটা আমি বলবো না। কথাটা একটু অন্যভাবে বলি। জনবাদী রাজনীতির মধ্যে এই যে স্বল্পমেয়াদী ভাবনা, এটা সম্পূর্ণ কৌশলগত ভাবনা। নীতিগত ভাবনা এই ধরনের রাজনীতিতে খুব কম। সেখানে কৌশলগত ভাবনাই অনেক বেশি প্রবল। সেই কৌশলগত চিন্তা এখন পশ্চিমের সরকারগুলোর মধ্যেও ঢুকে গেছে। সুতরাং আপনি যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলছেন তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়া কিছুই আশ্চর্যের নয়। নীতিগত দিক দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, সেটা আবার নতুন করে শুরু করতে হবে, এরকম একটা অবস্থায় আমরা পৌঁছে গেছি। এতদিনে যা হয়েছিলো, তার থেকে অনেকটাই হয়তো আমরা পিছিয়ে গেলাম। নতুন করে ফের শুরু করার জায়গায় চলে এসেছি।

    প্রশ্ন ৪: প্রচলিত গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রাবল্য ঘটে, তা নিরসনে কি কি প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ দেখছেন? ক্রমাগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক (সমগ্র জনগোষ্ঠীর) প্রতিনিধিত্বের জনসাধারণের জন্য সেবা কাঠামো (বিচার বিভাগসহ সরকার ও প্রশাসনের) কীভাবে গড়ে উঠতে পারে বলে আপনার ধারণা? এটা কি আদৌ প্রচলিত গণতন্ত্রে করা সম্ভব হচ্ছে, আপনার মত কী?

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: এটা তো খুব বড় প্রশ্ন করলেন। এতটা বড় প্রশ্নের উত্তর যে আমি চট করে বলে দিতে পারবো, মোটেই আমি সেই দাবি করবো না। আমি যেটা বারেবারে বলার চেষ্টা করছি যে, প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের বাইরে অন্য কোনো জায়গায় তো বললেই রাতারাতি চলে যেতে পারি না। সুতরাং এখন যেটুকু গণতন্ত্র আছে তার মধ্যে থেকেই একটা কোন নতুন দিকে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বার করতে এবং সেইদিকে যাবার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টাটা কোন কোন দিকে জোর দিলে আরও সহজে পাওয়া যাবে, এটাই আসলে ভেবে দেখা এবং খানিকটা কাজ করে দেখার ব্যাপার আছে। সুতরাং আমি যে কথাটা বলার চেষ্টা করছি যে, রাজনীতিকে শুধুমাত্র কৌশলগত দিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এর মধ্যে যে নীতিগত দিক আছে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে আর কাজ করতে হবে। তাতে কিন্তু আজ করলাম, কালকেই তার ফল পেয়ে যাবো, এই ঘটনাটা ঘটবে না। এখানে এমন প্রচেষ্টার প্রয়োজন, যেটা হয়তো শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, যেটা আরও ব্যাপকভাবে সামাজিক বিষয়। সেটা সাংস্কৃতিক উৎসব হতে পারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে হতে পারে, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সংগঠনের মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে সমবেত একটা জনগোষ্ঠীর ধারণা, সমবেতভাবে কাজ করার ধারণা, এবং সমবেতভাবে সহাবস্থানের ধারণা— এই ধারণাগুলো আরও গভীরভাবে কী করে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন, কর্মী এবং কাজকর্মের কী ধারণা হতে পারে, এগুলো অনেক বেশি করে ভাবার প্রয়োজন। সরাসরিভাবে রাজনৈতিক দিকটার যে অসুবিধা, যেটা আপনি প্রচলিত গণতন্ত্রের প্রসঙ্গে বলছেন, সেটা হলো যে তাতে নির্বাচনে কী হবে, এই প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দিতে বাধ্য। আমার কাজটা হচ্ছে কি হচ্ছে না, সফল হলাম কি হলাম না, প্রচলিত গণতন্ত্রে তার একমাত্র মানদণ্ড হচ্ছে আমি নির্বাচনে কি ফল পাবো। তাই এর বাইরে যেটা সরাসরিভাবে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কাজ নয়, কিন্তু রাজনীতি বা রাজনৈতিক মানুষের চেতনার দিক, তার চিন্তাভাবনার দিক এবং তার কাজ করার প্রক্রিয়ার দিক— এই ভিত্তিগুলো যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সেই ভিতগুলো তৈরি হচ্ছে, সেইখানে গিয়ে কাজ করার কথাটাতে আমি আরও বেশি করে জোর দিতে চাই। সেইখানে না গেলে কিন্তু এই নীতিগত প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

    প্রশ্ন ৫: স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী শাসক মাত্রই কি বর্তমান বিবেচনায় পপুলিস্ট হিশেবে গণ্য হবে? এই প্রশ্ন উঠছে কারণ বাংলাদেশসহ এমন বেশ কয়েকটি গণতান্ত্রিক রীতি–নীতি, প্রতিষ্ঠান সম্বলিত রাষ্ট্রে এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে নির্বাচন হয়ে উঠেছে আজকের দুনিয়ায় পপুলিস্ট লিডারদের উত্থানের প্রধান হাতিয়ার; সেখানে বাংলাদেশের মতো বেশ কিছু রাষ্ট্রে নির্বাচনী ব্যবস্থাই প্রায় তিরোহিত হওয়ার পর্যায়ে। অথচ এসব রাষ্ট্রের শাসনপ্রণালীতে পপুলিজম বলে কথিত সমস্ত প্রবণতাই হাজির। এই ফেনোমেননকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: একটা কথা আমি আগে বলেছিলাম। পপুলিজমের জন্য একটা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। কারণ পপুলিস্ট নেতা বা নেত্রী যিনিই থাকুন, বা পপুলিস্ট দল, তাকে সবসময় এইটা প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় যে, আমি বৈধভাবে ক্ষমতায় আছি তার কারণ আমি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। এইটা তাকে ক্রমাগত কিছু দিন পরপরই প্রমাণ করতে হয়৷ কিন্তু এই নির্বাচন ব্যবস্থা প্রায় সময়ই অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা হয় না যদিও একটা বা একাধিক বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এটাই একটা অদ্ভুত ঘটনা। আমাদের ভারতবর্ষেও অনেক সময় শুনি যে, বিরোধী শূন্য রাজনীতি হবে। এখন বিরোধী শূন্য নির্বাচনী গণতন্ত্র তো হতে পারে না। এটা কিন্তু সেই অর্থে ডিক্টেটরশিপও থাকছে না। কারণ কোথাও এই প্রয়োজনটা স্বীকার করা হচ্ছে যে, একটা সংবিধান থাকবে, সেই সংবিধানে একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকবে৷ অথচ সেই নির্বাচনে আমি সকলকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেব না। এমন কিছু লোককেই দাঁড়াতে দেবো যাদের আমি খুব সহজেই পরাস্ত করতে পারি। ফলে আমি যে নির্বাচন করলাম, এবং আমি যে কিছু বিরোধীকে হারিয়ে জনগণের সমর্থন নিয়ে জিতে ক্ষমতায় রইলাম, এই মতটা প্রতিষ্ঠা পায়। এইখানে আপনি যেটা বলছেন যে, এক অর্থে এটা গণতন্ত্রের পারভারশন হয়ে যাচ্ছে। একটা অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের খোলসটা ছাড়া প্রায় আর কিছুই থাকছে না। আমি এইটুকুই বলবো যে, এটা জনবাদের প্রায় শেষ অবস্থা, যেখানে শুধু খোলসটা থাকছে। কিন্তু খোলসটা রাখার প্রয়োজনটাও থাকছে। একটা গণতন্ত্রের মধ্যে থেকে উঠে এসেছি, এই ধারণাটা তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে খোলসটা রেখে। একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করলাম, বার্মায় যে সেনারা ক্ষমতা নিয়েছে, তারাও কিন্তু বলছে যে, আমরা কদিন বাদেই আবার একটা নির্বাচন করব। এবং জানি না, বলা যায় না, হয়তো তারা সেটা করবেও। সেটা তাদের পরিচালনায় অত্যন্ত কুৎসিত কিছু একটা হবে। কিন্তু জনবাদী রাজনীতি নিয়ে আপনি অন্য যে প্রশ্নটা করলেন, জনবাদী রাজনীতি কি কোথাও গিয়ে জনবাদের মূলশর্ত ছাড়িয়ে অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছে কিনা? এটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ যেখানে বিরোধী দলকে, বিশেষ করে যারা প্রধান বিরোধী দল হতে পারে, তাদের নির্বাচনে অংশই নিতে দেওয়া হচ্ছে না, অথচ একটা নির্বাচন করা হচ্ছে, সেটা কি আদৌ নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যে থাকছে? আমার মনে হয়, তা সত্ত্বেও যে প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে যে, তা হলো যে নির্বাচনটা করতে হচ্ছে কেন? আমি যে নির্বাচিত নেতা বা নেত্রী, সেটা প্রমাণ করা এত জরুরি কেন?

    I AM THE PEOPLE বইয়ের প্রচ্ছদ

    প্রশ্ন ৬: আপনার I Am The People: Reflections On Popular Sovereignty Today বইতে আপনি উল্লেখ করেছেন যে, পশ্চিমে পপুলিজমের উত্থান ঘটেছে tactical contraction-এর মাধ্যমে। আর ইন্ডিয়ায় পপুলিজমের উত্থান ঘটেছে tactical extension-এর মাধ্যমে। এই বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করার অনুরোধ করছি।

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়: পশ্চিম প্রসঙ্গে আমি ট্যাক্টিকাল সংকোচনের কথা খানিকটা বলেছিলাম। ব্যাপারটা হচ্ছে এই: ওয়েলফেয়ার স্টেট থেকে যখন নিও–লিবারাল প্রশাসনের দিকে চলে গেল, তখন সমগ্র জনগণের জন্য কল্যাণমূলক যেসব প্রকল্প ওয়েলফেয়ার স্টেটে নেওয়া হয়েছিলো, সেখান থেকে ক্রমশ সরকারের কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়াটা কমে আসতে লাগলো। এটা ‘ট্যাক্টিকাল কন্ট্রাকশন’। এই সংকোচন থেকেই কিন্তু পরবর্তী কালের বাজারনির্ভর আর্থিক অসাম্যের দিকটা, ইনইকুয়ালিটি, প্রকট হয়ে উঠল, যার থেকে পাশ্চাত্যের পপুলিজম, সেটা দক্ষিণপন্থীই বলুন, আর বামপন্থীই বলুন, দুই–ই কিন্তু ওই অসাম্যের ধারণা থেকে আসছে। এই অসাম্য তৈরি হয়েছে ওই কন্ট্রাকশনের পরবর্তীকালে।

    অন্যদিকে এশিয়া–আফ্রিকার দেশে কিন্তু জনকল্যাণমূলক ওয়েলফেয়ার স্টেট কোথাওই ছিলো না। তার প্রধান কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্র এখানে পশ্চিমের মতো করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি৷ এইখানে আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলোনিয়াল অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রয়োজনে। কলোনিয়াল রাষ্ট্র আসলে খুব অল্প কিছু মানুষের অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছিলো। আপনি ব্রিটিশ ভারতবর্ষের কথা যদি ভাবেন, সেখানে ব্রিটিশ শাসক ছিলো, ব্রিটিশ শাসকদের আশেপাশে কিছু ভারতীয় ছিলো, সেই ভারতীয়রা বিভিন্ন রকমের প্রশাসনিক এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই শাসনব্যবস্থায় অংশ নিতে শুরু করে। তারপরে যখন ব্রিটিশ চলে যায়, তখন ভারতবর্ষ আজকের ইন্ডিয়া, পাকিস্তান হলো, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ হলো। সেখানে যে শাসন ব্যবস্থা, সেটা ওই কলোনিয়াল শাসন ব্যবস্থাকেই অবলম্বন করে একেকটা জাতীয় রাষ্ট্রের চেহারা নিয়েছে। কিন্তু কোনো সময়েই এখানে আপামর মানুষের মধ্যে প্রায় নাগরিক অধিকারের মতো করে জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া, এটা এইসব দেশে কোনো সময়েই ছিলো না।

    সুতরাং এসব অঞ্চলে পপুলিজমটা এসছে আসলে একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর যে রাষ্ট্র, তার থেকে আস্তে–আস্তে প্রশাসনের কাজকর্ম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে। প্রশাসন আসলে ট্যাক্টিকালি এক–একটি জনগোষ্ঠীর দিকে আস্তে–আস্তে এগোবার চেষ্টা করেছে। আপনি যদি ভাবেন, একসময় সরকারি ব্যবস্থা বলতে শুধু একেকটা জেলার সদরে সরকারের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যেত। গ্রামাঞ্চলে গেলে সরকার বলে কিছু দেখতেই পাওয়া যেতো না। গ্রামাঞ্চলে সরকার বলতে ছিলো একটা থানা, একটা বড় জেলার মধ্যে হয়তো ৫টা, ৬টা থানা। এর বাইরে ব্যাপক গ্রামাঞ্চল, সেখানে সরকারি কোনো কর্মচারির কোনো উপস্থিতিই ছিলো না। ধীরে ধীরে এটা বাড়তে শুরু করে। এই যে বাড়া, আস্তে আস্তে একটা করে হেলথ সেন্টার তৈরি হলো, একটা করে সরকারি স্কুল তৈরি হলো, পরবর্তীকালে নানা রকম স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন রকমের সরকারি অফিস। এখন যেমন ধরুন, একটা বাচ্চা জন্মালেই তার একটা সার্টিফিকেট নেওয়া যায়। এটা এখন গ্রামাঞ্চলেও চালু হয়েছে। একসময় তো শহরেও এর ব্যবস্থা ছিলো না। আমার তো কোনো বার্থ সার্টিফিকেট নেই। আমি যখন জন্মেছিলাম, তখন এর কোনো প্রচলনই ছিলো না। আস্তে–আস্তে ধীরে–ধীরে দৈনিক জীবনযাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রবেশ ঘটেছে। ধরুন, একটা রেশন ব্যবস্থা তৈরি হলো। সরকারি রেশনের দোকান থেকে খানিকটা অল্প মূল্যে খাদ্য পাওয়া যায়। বা অন্যান্য সরকারি যে প্রকল্প, এগুলো ধীরে ধীরে এক্সটেন্ডেড হয়েছে। এই এক্সটেনশনের মাধ্যমে একটা ব্যাপক জনবাদী রাজনীতির জন্ম হয়েছে। সুতরাং এই তফাৎটা আমি করার চেষ্টা করেছি যে পাশ্চাত্যে যে পরিস্থিতির মধ্যে জনবাদী রাজনীতি আজকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, ভারতবর্ষ বা বাংলাদেশ বা এশিয়া আফ্রিকার অন্যান্য দেশে জনবাদী রাজনীতির সামাজিক ভিত্তিটা কিন্তু অন্যরকম।

  • বদরুদ্দীন উমর ।। বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা 

    বদরুদ্দীন উমর ।। বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা 

    [বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক আয়ােজিত ‘হাবিবুল্লাহ স্মারক বক্তৃতা ২০০৩’-এ পেশকৃত বক্তৃতাটি পরবর্তীতে বদরুদ্দীন উমর-এর বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা নামক গ্রন্থটিতে লিপিবদ্ধ হয়। অনলাইন পাঠকদের উদ্দেশ্যে এ লেখাটি ইতিহাস রাজনীতি পুনর্পাঠ সিরিজের অংশ হিসেবে অরাজে পুনঃপ্রকাশিত হলো। এখানে বইয়ে থাকা বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।- সম্পাদক]

    বদরুদ্দীন উমর

    আজ ডক্টর আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ স্মারক বক্তৃতায় বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা সম্পর্কে আমি ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের ইতিহাস চর্চার ওপর আলােচনা করতে চাই না, যদিও প্রসঙ্গত এ বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়ােজন হবে। আমি এখানে ইতিহাস চর্চা বলতে সাধারণভাবে সংস্কৃতি চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ইতিহাসের সাথে জনগণের শিক্ষিত অংশের ও ছাত্রদের পরিচিতি ও ইতিহাস বিষয়ে তাদের ধ্যান ধারণা, চিন্তাভাবনা ও সচেতনতা প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু কথা বলব।

    ইতিহাসে রাজা বাদশার একটা ভূমিকা অবশ্যই আছে, কারণ আধুনিক গণতন্ত্রের উদ্ভবের আগে তারাই সমাজে শােষক-শ্রেণীর পক্ষে শাসন নীতি নির্ধারণ করতেন, শাসন কাজ পরিচালনা করতেন, এবং বিপুল অধিকাংশের ওপর অল্প সংখ্যকের শােষণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতাে ভারতবর্ষেও এরকমই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানব সমাজে যে প্রক্রিয়ায় মৌলিক জীবন ধারা প্রবাহিত হয় সে প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রাজা বাদশাদের শাসন কাজ ও সে কাজের সাথে সম্পর্কিত হাজার রকম জৌলুসের থেকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রবহমান জনজীবনের এই প্রক্রিয়াই হলাে ইতিহাসের আসল রূপ।

    এ বিষয়টিকে নিজের চিন্তাধারা অনুযায়ী উপস্থিত করতে গিয়ে ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নামক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আমাদের লিখিত ইতিহাসে রাজা বাদশা ও জনগণের স্থান সম্পর্কে বলেন, “তখনকার দুর্দিনেও এই কাটাকাটি-খুনাখুনিই যে ভারতবর্ষের প্রধানতম ব্যাপার তাহা নহে। ঝড়ের দিনে যে ঝড়ই সর্বপ্রধান ঘটনা, তাহা তাহার গর্জন সত্ত্বেও স্বীকার করা যায় না—সেদিনও সেই ধূলিসমাচ্ছন্ন আকাশের মধ্যে পল্লীর গৃহে গৃহে যে জন্মমৃত্যু-সুখ দুঃখের প্রবাহ চলিতে থাকে, তাহা ঢাকা পড়িলেও, মানুষের পক্ষে তাহাই প্রধান। কিন্তু বিদেশী পথিকের কাছে এই ঝড়টাই প্রধান, এই ধূলিজালই তাহার পক্ষে আর সমস্তই গ্রাস করে; কারণ সে ঘরের ভিতরে নাই, সে ঘরের বাহিরে। সেইজন্য বিদেশীর ইতিহাসে এই ধূলির কথা ঝড়ের কথাই পাই, ঘরের কথা কিছুমাত্র পাই না।” 

    ভারতবর্ষের লিখিত ইতিহাস চর্চা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যখন একথা বলেছিলেন তখন জনগণের কথা ইতিহাসে কোন উল্লেখযােগ্য স্থান না পেলেও ইতিহাসের অনেক কিছুর সাথেই ছাত্র ও জনগণের শিক্ষিত অংশের পরিচয় হতাে। শত সহস্র বছর ধরে মানুষের জীবনযাত্রা বিভিন্ন পর্যায়ে কেমন ছিল সে বিষয়ে জানার একটা আগ্রহ ঐতিহাসিকদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ, শিলালিপি, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, সাহিত্য ইত্যাদি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে মানুষের প্রবহমান জীবনের প্রক্রিয়া ও তার নানা দিক উঘাটনে একটা চেষ্টার সূত্রপাত হয়েছিল। সামাজিক ইতিহাস নামে ইতিহাসের এক বিশেষ ধরনের চর্চার মাধ্যমে উৎপাদন সম্পর্ক, সমাজের বিন্যাস, বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক বিষয়ে এমন অনেক তথ্যের সাথে পরিচয় ঘটতে শুরু করে, যা সাধারণ মানুষের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের ওপর আলােকসম্পাত করে।

    এই আলােকের দেখা আমাদের স্কুলপাঠ্য ইতিহাসের বইয়ে তেমন না মিললেও তখনকার দিনে ক্লাসরুমের ইতিহাস চর্চা যে একেবারে মূল্যহীন ছিল এমন বলার উপায় নেই। রাজা মহারাজা, নবাব বাদশা ও ব্রিটিশ শাসকদের কথা এই ইতিহাসে লিখিত থাকলেও তাতে দেশের পরিস্থিতি, জনগণের অবস্থা, মানব সমাজের। বিকাশ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক কিছুর সাথেই পরিচয় ঘটত। একজন ছাত্র প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগের ভারতবর্ষের ইতিহাস, ইংল্যান্ড ও ইউরােপের ইতিহাসের নানা ঘটনাবলীর সাথে, অনেক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের সাথে কিছুটা পরিচিত হতাে। কাজেই লিখিত ইতিহাস, বিশেষত স্কুল ও কলেজ পাঠ্য ইতিহাসের বই পড়ে, একজন ছাত্র যখন ম্যাট্রিকুলেশন এবং ইন্টারমিডিয়েট (এখনকার এসএসসি ও এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতাে তখন শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইতিহাসের সাথে তাদের এক প্রকার পরিচয় ঘটত। এই পরিচয় খুব সন্তোষজনক না হলেও একে উপেক্ষণীয় বলা যেত না।

    ইতিহাস যেমন শুধু রাজা বাদশাদের কীর্তিকলাপ নয়, তেমনি তা কতকগুলি প্রতিভাধর ব্যক্তির কীর্তিও নয়, যদিও তাদের কার্যকলাপের একটা ভূমিকা ইতিহাসে অবশ্যই থাকে। ইতিহাসে দেখা যায় এক পর্যায়ে এক ধরনের সমাজ, শ্রেণী, উৎপাদন ব্যবস্থা, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, আইন কানুন, এমনকি এক এক ধরনের চরিত্রসম্পন্ন মানুষ। এ সব কোন আকস্মিক অথবা বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। মানব সমাজের ইতিহাসে যে পরিবর্তন লােকচক্ষুর সামনে ও লােকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে চলেছে তারই অভিব্যক্তি ও প্রতিফলন ঘটে এক এক পর্যায়ে এক এক দেশে। ও সমাজে নানা পরিবর্তনের মধ্যে, নানা শক্তি ও ব্যক্তির উদ্ভব ও আবির্ভাবের মধ্যে। বাস্তব পরিস্থিতির এই সব পরিবর্তনের ধারা অনুধাবন, ব্যাখ্যা ও বর্ণনাই হলাে ইতিহাসের প্রকৃত উপজীব্য। 

    উৎপাদন পদ্ধতি অর্থাৎ উৎপাদনের শক্তি এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সম্পর্কই মূলত সমাজে কতকগুলি বাস্তব শর্ত সৃষ্টি করে যার অধীনেই সমাজের জনজীবন, আইন ও শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা সংস্কৃতি, রাজনীতি নির্ধারিত হয়। কাজেই যে কোন সমাজে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে যে সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে তাঁরাও এই একই শর্তের অধীন। এই শর্তই নির্ধারণ করে তাদের আবির্ভাবের সময়, তাদের চরিত্র, তাঁদের কাজের ধারা ও পরিধি, তাঁদের সাফল্য ও ব্যর্থতা, আগমন, এমনকি পলায়ন।

    এ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ এবং উপলব্ধি করা ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চার নামে যা ঘটছে সেই পরিপ্রেক্ষিতে এদিকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়ােজন এখন অপরিহার্য হয়েছে।

    বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যে অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায় তা হলাে, প্রকৃত ইতিহাস চর্চা বলতে যা বােঝায় তার পরিবর্তে ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে মাতামাতি। শাসকশ্রেণীর দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল এখন বাঙলাদেশের ইতিহাস রচনার নামে ক্ষমতায় থাকাকালে পর্যায়ক্রমে ইতিহাসের দলীয়করণ ঘটায়, পাঠ্যপুস্তকে দলীয় স্বার্থে নানা ভুল তথ্য ঢুকিয়ে এই সব বিকৃত তথ্যের মাধ্যমে ইতিহাস বলতে আসলে কি বােঝায় তার ধারণা থেকেও ছাত্রদের বঞ্চিত করে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর একাজ করা হলেও বাঙলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে এই কাজ খুব বেশী করেই শুরু হয়েছে। ১৯৮০ ও ‘৯০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত বাঙলাদেশের ইতিহাসের দলীয়করণ যত নির্লজ্জ ও বেপরােয়াভাবে এবং মূর্খতার সাথে চলছে এর কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। এক্ষেত্রে সব থেকে লক্ষণীয় ব্যাপার, ইতিহাস চর্চার থেকে ইতিহাস বিকৃতকরণ নিয়ে দুই দলের এই মাতামাতিতে বুদ্ধিজীবীদের সব থেকে সোচ্চার অংশ, এমনকি এঁদের মধ্য যারা ঐতিহাসিক এবং ইতিহাসের শিক্ষক তাঁরাও, এমনভাবে একাজে অংশগ্রহণ করছেন যার সাথে শাসকশ্রেণীর দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের লােকজন কর্তৃক মূল ইতিহাস বিকৃতকরণ বিতর্কের কোন পার্থক্য নেই। শুধু স্কুল কলেজ ছাত্র নয়, সাধারণ শিক্ষিত মানুষদের ওপরও এর প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী ক্ষতির কারণ হচ্ছে এ নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা ও বিবেচনা দলীয় লোকদের মতাে দলীয় আনুগত্যপরায়ণ এই সব বুদ্ধিজীবী এবং ঐতিহাসিকদেরও নেই।

    বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা বইয়ের প্রচ্ছদ

     

    ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা ও বর্ণনার সব থেকে স্কুল ও সহজ পথ হলাে সংবাদপত্রে এ নিয়ে লেখালেখি এবং স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনা ঢুকিয়ে দেয়া। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই দুই দলের স্বার্থে তাদের অনুগত বুদ্ধিজীবী এবং ঐতিহাসিকরা একাজই প্রথম থেকে করে এসেছেন এবং এখনাে করছেন, এবং অন্য পক্ষের এই একই কাজের সমালােচনা করতেও এঁদের অসুবিধে হচ্ছে না। এসবই সম্ভব হচ্ছে এ কারণে যে, ইতিহাস বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বােঝায়, ইতিহাসের চালিকাশক্তি কি, ইতিহাসের নায়ক বলতে কি বােঝায়, বিশেষত ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকার তাৎপর্য কি এসব বিষয়ে কোন আলােচনার ধারে-কাছেও এঁরা যান না। এরা নিজেদের দলীয় নেতাদের বাহাদুরীকেই বস্তুতপক্ষে ইতিহাস হিসেবে উপস্থিত করেন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে পাঠ্যপুস্তকে ও প্রচার মাধ্যমে এক দলের নেতার বাহাদুরী কীর্তনের পরিবর্তে শুরু হয় অন্য দলের নেতার বাহাদুরী কীর্তন। এই দলীয় বাহাদুরদেরকে ইতিহাসের স্রষ্টা হিসেবে উপস্থিত করবার খেলায় শাসকশ্রেণীর নীতি নির্ধারকেরা মত্ত থাকায় বাঙলাদেশে সাধারণভাবে ইতিহাস চর্চা বলতে কার্যত কিছু দেখা যায় না। সামান্য ইতিহাস চর্চা, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে থাকলেও এই চর্চার সাথে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক নেই, তাদের চেতনায় ইতিহাসের নায়ক নিয়ে টানাটানি এবং ইতিহাস বিকৃতকরণের কতকগুলি দলীয় কথাবার্তা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ইতিহাস সম্পর্কে সেখানে বিরাজ করে এক বিরাট শূন্যতা। বাঙলাদেশের ইতিহাস চর্চায় যে সংকট দেখা দিয়েছে এই পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে কিছু আলােচনার প্রয়ােজন। তত্ত্ব নির্মাণ থেকে নিয়ে বাস্তব রাজনীতিতে নেতৃত্ব পর্যন্ত যে কোন ক্ষেত্রে ব্যক্তির ভূমিকা বলতে যথার্থ অর্থে কী বােঝায় সেটা দেখা দরকার। তত্ত্ব নির্মাণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়ে ফরাসী ভাববাদী দার্শনিক প্রধোর মতের সমালােচনা প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস আনেনকভের কাছে লেখা এক চিঠিতে যা বলেন সেটা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযােগ্য :

    “মানুষের দ্বারা ইতিমধ্যে অর্জিত উৎপাদনের শক্তিসমূহ এবং এই শক্তিসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন সব সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেকার সংঘাত থেকে উদ্ভূত বিশাল ঐতিহাসিক আন্দোলনের পরিবর্তে প্রতিটি জাতির অভ্যন্তরে বিভিন্ন শ্ৰেণীর মধ্যে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে যে সব ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে সেগুলির পরিবর্তে; জনগণের বাস্তব ও প্রচণ্ড সক্রিয়তা, একমাত্র যার দ্বারা এই সব সংঘাতের মীমাংসা হতে পারে, তাদের পরিবর্তে-এই বিশাল দীর্ঘকালীন ও জটিল। আন্দোলনের পরিবর্তে, সঁসিয়ে ধো সরবরাহ করেন নিজের মস্তিষ্কের খামখেয়ালী গতিবেগ। সুতরাং ইতিহাস সৃষ্টি করেন পাণ্ডিত্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা, সেই ব্যক্তিরা, যাঁরা জানেন ঈশ্বরের গােপন চিন্তাভাবনা কিভাবে চুরি করতে হয়। সাধারণ মানুষের কাজ হচ্ছে শুধু তাদের দ্বারা অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে লব্ধ জ্ঞানের বাস্তব প্রয়ােগ। আপনারা এখন বুঝতে পারবেন, কেন ঘঁসিয়ে প্ৰধে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘােষিত শত্রু। তাঁর কাছে বর্তমান সমস্যাবলীর সমাধান নিহিত আছে। তার নিজের মনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে; জনগণের কার্যপ্রক্রিয়ার মধ্যে নয়। যেহেতু তার কাছে বর্গগুলিই (category) হলাে চালিকাশক্তি সেজন্য বর্গগুলি পরিবর্তনের জন্য বাস্তব জীবনকে পরিবর্তনের কোন প্রয়ােজন নেই। ঠিক এর উল্টো। বর্গগুলিকেই পরিবর্তন করতে হবে এবং তার ফলেই বিদ্যমান সমাজের মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটবে। (Marx to P.V Annenkov, Poverty of Philosophy, Progress Publishers, Moscow 1966, P. 165)

    রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন না এবং সম্ভবত করেন না, ইতিহাস যে সামাজিক বিকাশের কতকগুলি অমােঘ নিয়মের অধীনেই সৃষ্টি হয়-এই কথাটিই মার্কস এখানে বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, যারা মনে করেন পণ্ডিত ব্যক্তিরাই ইতিহাসের স্রষ্টা এবং সাধারণ লােকদের কাজ হলাে তাঁদের লেজুড়বৃত্তি করা-তারা সকল প্রকার রাজনৈতিক সংগ্রামের ঘােষিত শত্রু।

    মার্কস এখানে রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে যা বলেছেন সেটা মূলত যে কোন উচ্চমার্গের রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতার ক্ষেত্রেও প্রযােজ্য। এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রত্যেকেই বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বা বিকাশমান কতকগুলি শর্তের সৃষ্টি। এই শর্তগুলির মধ্যেই। তাঁদের উৎপত্তি এবং উদ্ভব। কাজেই এগুলি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কোন পণ্ডিত অথবা রাজনীতিক ব্যক্তির ভূমিকাই বােঝা ও নির্ধারণ সম্ভব নয়। কিন্তু তার অর্থ আবার এই নয় যে, ইতিহাসে ব্যক্তির কোন গুরুত্ব ও প্রভাব নেই অর্থাৎ ব্যক্তি ঘটনাসমূহের বিশেষ বিশেষ দিকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে না। তা নিশ্চয়ই পারে। এ প্রসঙ্গে রুশ দার্শনিক ও মার্কসবাদী রাজনৈতিক নেতা প্লেখানভের বিখ্যাত বক্তব্য উল্লেখযােগ্য, “এটা দেখা গেছে যে, মহান প্রতিভাধর ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটেছে সেখানেই যখন তাদের বিকাশের পক্ষে সহায়ক সামাজিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে প্রত্যেক প্রতিভাধর ব্যক্তি যারই যথার্থ আবির্ভাব ঘটেছে, প্রত্যেক প্রতিভাধর ব্যক্তি যিনিই একটি সামাজিক শক্তি হয়ে উঠেছেন, তিনি হলেন সমাজ সম্পর্কের মূর্ত প্রকাশ। এই যখন হলাে ঘটনাটা, এটা তাহলে পরিষ্কার, প্রতিভাধর ব্যক্তিরা, আমরা যেমনটি বলছি, শুধু ঘটনাসমূহের বিশেষ কিছু দিককেই বদলাতে পারেন কিন্তু তাদের সাধারণ ধারাকে বদলে দিতে পারেন না; তারা নিজেরাই হলেন এই ধারার মূর্ত প্রকাশ; এই ধারাটি না থাকলে এঁরা নিজেরাই সম্ভাবনা থেকে বাস্তবের আঙ্গিনায় উপনীত হতে পারতেন না।” (উদ্ধৃতিতে গুরুত্ব চিহ্ন প্লেখানভের নিজের; প্লেখানভ : ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা, প্রগতি প্রকাশনী, কলকাতা। পৃ. ৫)।

    প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সম্পর্কে এখানে যা বলা হয়েছে সেটা ক্রমওয়েল, ডানটন, রােবেসপীয়র, নেপােলিয়ন, বিসমার্ক, আব্রাহাম লিঙ্কন, গান্ধী, জিন্নাহ, মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও-এর সম্পর্কেও প্রযােজ্য। তাদের ভূমিকার অর্থ এই নয় যে, তারা ইতিহাসের ধারা নির্ধারণ অথবা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এর অর্থ হলাে, তাঁরা যে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে জন্মলাভ করেছিলেন এবং সক্রিয় ছিলেন সেই পরিস্থিতির বিকাশ ধারার তাঁরা ছিলেন মূর্ত প্রকাশ। অর্থাৎ ইতিহাস কিভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবর্তিত হবে সেটা তারা নির্ধারণ করেননি। ইতিহাসই তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট প্রভাবশালী ভূমিকাকে নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

    ইতিহাসে এক একজন প্রতিভাধর ব্যক্তির ভূমিকা দেখে এক ধরনের বিভ্রান্তি অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এ বিভ্রান্তিটি হলাে এই যে, এই বিশেষ ব্যক্তির জন্য হলে তিনি যে ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করেছেন সেটা অসম্পন্নই থেকে যেত। এ বিভ্রান্তির বিষয়ে প্লেখানভ বলেন, ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে আলােচনা করলে, আমরা প্রায় সব সময়েই এক ধরনের যে দৃষ্টিবিভ্রমে পড়ে থাকি তার প্রতি পাঠকদের মনােযােগ আকর্ষণ করা মঙ্গলজনক হবে মনে করি।

    “জনজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য ‘জবরদস্ত তরবারি’ধারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নেপােলিয়ন অন্যান্য জেনারেলদের এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে প্রতিহত করলেন-অথচ এদের মধ্যে কেউ কেউ ঐ একইভাবে বা তাঁর মতাে প্রায় একইভাবে তা সম্পাদন করতে পারতেন। একবার যখন জনসাধারণের দিক থেকে উদ্যমশীল সামরিক শাসনের প্রয়ােজন মিটে গেল, তখন সামাজিক সংগঠনগুলাে অন্যান্য প্রতিভাবান সৈন্যদের পক্ষে সামরিক শাসনের অবস্থান গ্রহণের পথ রােধ। করেছিল। এই শক্তিটি এমন একটি শক্তি হয়ে দাঁড়ালাে যে ঐ একই ধরনের অন্যান্য। প্রতিভাবানদের আবির্ভূত হওয়ার পক্ষে তা প্রতিকূল হয়ে উঠল। আমরা যার কথা বলেছি সেই দৃষ্টিবিভ্রমের এই হলাে কারণ। নেপােলিয়নের ব্যক্তিগত ক্ষমতা আমাদের কাছে হয়েছে চূড়ান্ত রকমের বিপুল আকারের কারণ আমরা তার দিকে ধরে নিয়েছি সেই সামাজিক শক্তির যা তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল, মদদ দিয়েছিল। নেপােলিয়নের শক্তি আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে বেশ একটা অভাবনীয়তা নিয়ে কারণ তাঁর মতাে অন্যান্য সমান শক্তিমানেরা সম্ভাব্যতার স্তর থেকে বাস্তবতায় রূপ পরিগ্রহ করতেই পারেননি। আর তাই যখন আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘যদি নেপােলিয়ন বলে কেউ না থাকতেন তাহলে কী হতাে?’ আমাদের কল্পনাশক্তি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের মনে হয় তিনি না থাকলে যে সামাজিক আন্দোলনের ওপর তার শক্তি ও প্রভাব গড়ে উঠেছে তা সম্ভব হতাে না।

    “মানুষের মননশীলতার বিকাশের ইতিহাসে কতিপয় ব্যক্তির সাফল্য অন্য একজনের সাফল্যকে প্রতিহত করার ঘটনা অনেক বিরল। কিন্তু এখানেও আমরা উপরের উল্লিখিত দৃষ্টিবিভ্রমের হাত থেকে মুক্ত নই। যখন কোন একটা সামাজিক অবস্থান ঐ সমাজের মননশীলতার মুখপাত্রদের শাসনে কিছু কিছু সমস্যা এনে হাজির করে তখন মুখ্য চিন্তাবিদদের দৃষ্টি ওইগুলির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাতেই নিবন্ধ থাকে। যখনই তারা তার সমাধান করে ফেলেন-তখন অন্যতম বিষয়ের প্রতি তাদের মনােযােগ আকৃষ্ট হয়। কিন্তু একটা সমস্যা সমাধানের মধ্যে দিয়ে একজন বিশেষ প্রতিভাধর ক. অন্যতম প্রতিভাধর খ. এর মনােযােগকে সমাধান হয়ে যাওয়া সমস্যা থেকে অন্য সমস্যার দিকে ঘুরিয়ে দেন। আর যখন আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়-‘সমস্যার স-এর সমাধান করার আগেই যদি ক মারা যেতেন তাহলে কী হতাে?’—আমরা ভাবি তাহলে মানবজাতির মননশীলতার বিকাশের সূত্রটিই ছিন্ন হয়ে যেত। আমরা ভুলে যাই ক মরে গেলেও খ অথবা গ অথবা ঘ ঐ সমস্যার মােকাবেলা করতে পারতেন এবং ক এর অকাল মৃত্যু সত্ত্বেও মননশীলতার বিকাশের সূত্রটি অব্যাহত থাকত।” (ঐ, পৃ. ৪৭-৪৮)।

    জগৎ যে সকল প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে বিজ্ঞানীরা সেগুলি আবিষ্কার করে থাকেন। তাদের এক একজনের ক্ষেত্র থাকে ভিন্ন ভিন্ন। কেউ পদার্থবিদ্যা, কেউ রসায়ন, কেউ ভূগােল, কেউ মৃত্তিকাবিজ্ঞান, কেউ অর্থনীতি ক্ষেত্রে নােতুন নােতুন সূত্র আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার সমাজকে এগিয়ে নেয়, মানুষের জ্ঞানের রাজ্য বিস্তার করে এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে। অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আর্কিমিডিস, নিউটন, ডালটন, ডারউইন, আইনস্টাইন প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীরা ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে নােতুন নােতুন আবিষ্কার করে সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। সমাজের ওপর তাঁদের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বলতে পারি তাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভূমিকা সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে নির্ধারক? মােটেই তা নয়।

    উপরােক্ত বিজ্ঞানীরা যদি ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত নাও হতেন তাহলে অন্য ব্যক্তিরা সমাজ বিকাশের এক নির্দিষ্ট পর্যায়ে আবির্ভূত হতেন এবং সমাজের অগ্রগতি সাধন করতেন। অর্থাৎ বিশেষ কোন ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়া না হওয়ার ওপর সমাজ বিকাশ অথবা ইতিহাসের সাধারণ ধারা মােটেই নির্ভরশীল নয়। বরং সমাজ বিকাশের এক একটি পর্যায়ের সাধারণ ধারার ওপর বিশেষ ধরনের প্রতিভাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আবির্ভাব সর্বতােভাবে নির্ভরশীল। যারা বিদ্যুৎ, বাষ্পীয় যান, রেডিও, টেলিফোন অথবা অন্য যা কিছু আবিষ্কার করেছেন সেটা তাঁদের জন্ম না হলে, অন্য কেউ এগুলির আবিষ্কার করতেন। তাঁদের অবর্তমানে সমাজের অগ্রগতির ধারায় এগুলি অনাবিষ্কৃত থাকত এটা মনে করার থেকে অবাস্তব ইতিহাস বিষয়ক চিন্তা আর কী হতে পারে?

    বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যা সত্য, সাধারণভাবে সামাজিক অগ্রগতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সেটা একই রকম সত্য। প্লেখানভ নেপােলিয়ন সম্পর্কে ওপরে উদ্ধৃত অংশে যা বলেছেন সেটা অন্য দেশে, অন্য সময়ে অন্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযােজ্য। 

    কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস সমাজ বিকাশের যে যুগান্তকারী করেছিলেন সেটা ইউরােপের তৎকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতি হয়েছিল। লক্ষ করার বিষয় যে, প্রায় সমান প্রতিভার অধিকারী এই দুই ব্যক্তির সামগ্রিক কাজ পরস্পরের সাথে এমনভাবে সম্পর্কিত যাকে বিচ্ছিন্ন করার উপায় নেই এবং তারা উভয়েই জন্মেছিলেন একই সময়ে, ইউরােপে পুঁজিবাদের বিকাশের এক বিশেষ পর্যায়ে।

    বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা প্রসঙ্গে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে এসব কথা সুনির্দিষ্ট কারণেই আলােচনার প্রয়ােজন হলাে। এই কারণটি হলাে, তৎকালীন পর্ব পাকিস্তানে ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত্রে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সেই যুদ্ধের ঘােষণা, নেতৃত্ব ইত্যাদি নিয়ে তিরিশ বছরের ওপর যে বিতর্ক চলছে তাতে সেই যুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও পরে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করা হয়েছে সেটা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের চিন্তাকে বিরাটভাবে প্রভাবিত ও বিভ্রান্ত করছে এবং এই বিভ্রান্তি স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে সমাজের গভীরদেশেও বিস্তৃত হচ্ছে। এই দুই ব্যক্তির গৌরব কীর্তন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে ইতিহাসের প্রকৃত নায়ক জনগণের ভূমিকা এই যুদ্ধে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অনুপস্থিত। যে মৌলিক সম্পর্কসমূহের ভিত্তিতে সমাজে পরিবর্তন ঘটে, সমাজে দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ ও যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সে বিষয়গুলিও ব্যক্তির গৌরব কীর্তনের মহিমায় ধামাচাপা থাকে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির নামে কারণে-অকারণে অহরহ নানা ধরনের বাগাড়ম্বর চলা সত্ত্বেও এ যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনাবলীর সাথে জনগণের ও ছাত্র সমাজের পরিচয়ের কোন সুযােগ নেই। শুধু তাই নয়, ব্যক্তির মহিমা কীর্তনের প্রয়ােজন বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা আজ যেভাবে উচ্ছেদ হয়ে গেছে একটি জাতির জীবনে তার থেকে ভয়াবহ ব্যাপার আর কী হতে পারে?

    বস্তুতপক্ষে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে চর্চার একটি বিষয় হিসেবে ইতিহাসই হয়ে দাঁড়ালাে। তৎকালীন শাসক দলের আক্রমণের ওপর লক্ষ্যবস্তু (target)। এর মূল কারণ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, তার মধ্যে কোন ব্যক্তিকে নায়ক হিসেবে খাড়া করে তার মহিমা কীর্তন সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সে ধরনের কোন নায়কই ছিল না। যাদ নায়কের স্থানে কাউকে অধিষ্ঠিত করতেই হয় তাহলে সে গৌরব একমাত্র আমাদের দেশের জনগণের, অগণিত শ্রমজীবী মানুষের।

    কিন্তু ২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে সব সরকারী ও সাধারণভাবে শাসকশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা আয়ােজিত অনষ্ঠান হয় তাতে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের গৌরব কীর্তন করা ছাড়া আর কিছুই হয় না। এবং এই গৌরব কীর্তনের ক্ষেত্রে চলে কুৎসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই ন্যক্কারজনক মহােৎসবই এখন বাঙলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের প্রধানতম ধরন।

    শিল্পী: কামরুল হাসান

    ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রের শােষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার যে প্রয়ােজন দেখা দিয়েছিল এবং আকাঙক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল সেটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপার ছিল না। জনগণের ওপর ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান সরকারের শােষণ ও নানা প্রকার নির্যাতন জনগণের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তনের সূচনা করেছিল এবং তাঁদের মধ্যে প্রতিরােধের জন্ম দিয়েছিল। সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সংগ্রামকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছিল। এই ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও। সাংস্কৃতিক জগতের অনেক ব্যক্তিরই অল্পবিস্তর অবদান ছিল। অনেক সংগঠন ও দলের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে দলগতভাবে যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ইত্যাদি দলের ভূমিকা ছিল, অনেক দল ও শ্রেণী সংগঠনের ভূমিকা ছিল, তেমনি ব্যক্তিরও ভূমিকা ছিল। এই ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবই ছিল সব থেকে বেশী। তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ভাসানীর জনপ্রিয়তাকেও উত্তীর্ণ করেছিল। এককথায় বলা চলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জনগণের ওপর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবই দাঁড়িয়েছিল সব থেকে বেশী। এই সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ হলাে, ইতিহাসের তৎকালীন বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা।

    শেখ মুজিবুর রহমানের এই অবস্থানের মূল কারণ ছিল অনেক রকম সুবিধাবাদ ও দোদুল্যমানতা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে পাকিস্তানী রাষ্ট্রের শােষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সব থেকে সােচ্চার। এই শােষণ নির্যাতনের প্রকৃত চরিত্র তিনি কখনােই বিশ্লেষণ করতে যাননি, জনগণকে তার ভিত্তিতে শিক্ষা দেয়ার কোন চেষ্টাও তিনি করেননি। সে রকম চেষ্টা তাঁর দলের ও তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিপন্থী ছিল।। এ কারণে সতর্কতার সাথে তিনি সেটা আড়ালও করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মােটা দাগে তিনি পাকিস্তানী শােষণ শাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে বলতেন ও তার প্রতিকার হিসেবে স্বায়ত্তশাসনের দাবী করতেন সেটা জনগণের চিন্তার তন্ত্রীতে অনুরণন সৃষ্টি করত। তিনি যেভাবে এটা করতেন সেভাবে অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হতাে না। বিশেষত কমিউনিস্টরা জাতীয় নির্যাতনের প্রশ্নটি আড়ালে রেখে শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে যেসব অবাস্তব কথাবার্তা বলতেন ও কর্মসূচী নির্ধারণ করতেন সেটাও শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে খুব সহায়ক হয়েছিল। কারণ তিনি তাঁর স্বায়ত্তশাসন দাবীর মাধ্যমে যেভাবে জনগণের পাকিস্তান সরকারবিরােধী চিন্তা চেতনাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। এটাই ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সব থেকে বড় কৃতিত্ব, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পরিস্থিতি সষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর এক অনস্বীকার্য ব্যক্তিগত অবদান।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সীমাবদ্ধতা ছিল। শেখ মুজিব ছিলেন সংসদীয় পথে আন্দোলনের পথিক এবং তাঁর। সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ ছিল কারাগৃহে প্রবেশ। এর থেকে কঠোরতর সংগ্রাম তিনি কোন সময়েই করেননি এবং অন্য ধরনের সংগ্রাম, বিশেষত সশস্ত্র গণযুদ্ধ, তাঁর রাজনীতি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কাজেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তাঁর অবস্থা শােচনীয় হয়েছিল।

    ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতায় ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বললেও এবং দেশবাসীকে যার হাতে যা আছে সেটা নিয়ে তৈরী থাকতে বললেও তিনি আসলে স্বাধীনতা বলতে পাকিস্তানীদের রাষ্ট্রীয় কাঠামাের মধ্যে সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণই বুঝতেন। এজন্য ৭ই মার্চের বক্তৃতায় শেখ মুজিব জয় বাংলার পর বলেছিলেন জয় পাকিস্তান। এ কথাটি তৎকালীন রেডিওর আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্তাব্যক্তিরা মুছে ফেলায় অনেকেই, বিশেষত আওয়ামী লীগাররা এটা অস্বীকার করে থাকেন। কোথাও এটা লিখিতভাবেও এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের তারিখ’ নামে সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত একটি বইয়ে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের বক্তৃতা উদ্ধৃত করে। লিখেছেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা! জিয়ে পাকিস্তান!!” (মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারী ২০০৩, পৃ. ৩৭)। জয় বাংলার পর সেই বক্তৃতায় তখন বলা দরকার ছিল পাকিস্তান ধ্বংস হােক। কিন্তু মুজিব বলেছিলেন জিয়ে পাকিস্তান বা পাকিস্তান জিন্দাবাদ! একথা এখন হাবিবুর রহমান। সাহেব লিখলেও তখন তার বক্তৃতার শ্রোতারাও এটা শুনেছিলেন। পাকিস্তানী রাষ্ট্র। উৎখাতের জন্য সেই বক্তৃতায় শেখ মুজিব প্রকৃত অর্থে কোন গণযুদ্ধের ডাক দেননি। সেটা ভালভাবে প্রমাণিত হয়েছিল তার দুটি কাজের মাধ্যমে। প্রথমত, ৮ই। মার্চ থেকে গান্ধীবাদী অহিংস অসহযােগ আন্দোলন শুরু করা এবং দ্বিতীয়ত, ২৫শে মার্চ রাত্রে সকলে যখন আত্মগােপনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে ও প্রতিরােধ যুদ্ধের জন্য চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তখন সেই যুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে অবতীর্ণ না হয়ে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করা।

    এই আত্মসমর্পণের মূল কারণ ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে পরিস্থিতি সশস্ত্রভাবে মােকাবেলার কোন লাইন, কর্মসূচী ও সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের ছিল না। সশস্ত্র গণযুদ্ধ কিভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে তার বিন্দুমাত্র ধারণাও শেখ মুজিবের থাকেনি। সেই পরিস্থিতিতে তার নেতত্ব collapse করেছিল বা ধসে পড়েছিল। তার নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা নিঃশেষিত হয়েছিল। আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোন পথ তিনি দেখতে পাননি। কিন্তু তিনি এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, ঠিক সেই মুহূর্তে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল তাতে জনগণ এগিয়ে আসবেন এবং প্রতিরােধ যুদ্ধ শুরু হবে। কাজেই তিনি সকলকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন সরে গিয়ে শত্রুর চোখের আড়াল হতে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত অজয় রায়-এর ‘বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলন’ নামে একটি বইয়ে তিনি বলেছেন, “২৫শে মার্চ মধ্যরাতে যখন সেনা অভিযান শুরু হয় তার আগে পার্টির (মস্কোপন্থী নামে পরিচিত কমিউনিস্ট পার্টি-ব:উ:) পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার বাড়ীতে যােগাযােগ করা হয়। ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মােজাফফর আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। তিনি অধ্যাপককে বলেন তােমরা আত্মগােপনে চলে গিয়ে সংগ্রামের প্রস্তুতি নাও। এখন একমাত্র স্বাধীনতার দাবীতেই সংগ্রাম হবে। তিনি আরাে বলেন- আমি সবাইকে বলে দিয়েছি আত্মগােপনে চলে যেতে। তিনি জানান, তিনি নিজে ধরা দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। (অজয় রায় : বাংলাদেশে বামপন্থী আন্দোলন, ১৯৪৭-১৯৭১, সাহিত্যিকা, পৃ. ১০১)

    আমি এ ব্যাপারে অধ্যাপক মােজাফফর আহমেদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করায় তিনি আমাকে বলেন যে, কথাগুলাের বিষয়বস্তু ঠিকই আছে তবে শেখ মুজিব তাঁর নিজের ভাষাতেই এটা বলেছিলেন।

    তাজউদ্দীন আহমদ, কামাল হােসেন, আমীর-উল ইসলামসহ অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা ও সহকর্মী তাঁকে বাড়ী থেকে সরে আত্মগােপন করার কথা বলা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের বাড়ীতে বসে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সামরিক বাহিনী তাকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায়। এভাবে ধরা দেয়া যদি আত্মসমর্পণ না হয় তাহলে আত্মসমর্পণ আর কাকে বলে?

    যাই হােক, শেখ মুজিবের এই আত্মসমর্পণ সত্ত্বেও দাবী করা হয় যে, তিনি ২৬শে মার্চ রাত্রে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেছিলেন। এসব কথা কোন বিদ্যেবুদ্ধিওয়ালা সৎলােক, সামান্য ঐতিহাসিক চেতনাসম্পন্ন লােকের পক্ষে বলা ও বিশ্বাস করার কথা নয়। যুদ্ধে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া এক কথা, কিন্তু যিনি নিজে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন তিনি আত্মসমর্পণের মুহূর্তে কিভাবে অন্যদের প্রতি স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিতে পারেন? এ নিয়ে অনেক অথর্ব গালগল্প আওয়ামী লীগের লােকজন এবং তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের মুখে ও লেখালেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা ও সিপাহসালার শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করার মুহূর্তে জাতিকে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বানের কথাটি শুধু বড়মাপের মিথ্যেই নয়, মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তিকে বুড়াে আঙুল দেখানােরই এক কুৎসিত দৃষ্টান্ত।

    এ বিষয়ে অনেক বিস্তারিত আলােচনা সম্ভব এবং আমি নিজে অন্যত্র এ আলােচনা খুব বিশদভাবে করেছি। এখানে আমাদের বর্তমান আলােচনা প্রসঙ্গে যা বলা দরকার তা হলাে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শেখ মুজিবের পলায়ন সত্ত্বেও জনগণের সংগ্রামের যে ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিব নেততের পর্যায়ে এসেছিলেন সে ধারাবাহিকতার সূত্র ছিন্ন হয়নি। আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণের সাথে সাথে প্রতিরােধ যুদ্ধ পরিণত হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে।

    লক্ষ করার বিষয় যে, আত্মসমর্পণ ও পলায়ন সত্ত্বেও শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিলেন। এর কারণ প্রথমত এদেশের কমিউনিস্টদের তাত্ত্বিক চরিত্র ও দেশীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ব্যর্থতা। তথাকথিত বামপন্থী নামে পরিচিত কমিউনিস্টদের পাকিস্তানী শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরােধের চরিত্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট ধারণা না থাকা এবং জাতীয় প্রতিরােধের পরিবর্তে শ্রেণী সগ্রামের ধুয়াে তুলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ততা। মস্কোপন্থী নামে পরিচিত কমিউনিস্টদের অপর এক অংশে শ্রেণী প্রশ্ন একেবারেই শিকেয় তুলে আওয়ামী লীগের লাইনে ও বাস্তবত তাঁদের নেতৃত্বে যুদ্ধে শরীক হওয়া।

    এর ফলে রাজনীতি ক্ষেত্রে যে শূন্যতা ও সংকট তখন তৈরী হয়েছিল তাতে সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করেই জনগণের প্রতিরােধ গড়ে উঠেছিল এবং নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের ভারতীয় এবং সােভিয়েত পৃষ্ঠপােষকদের সামনে শেখ মুজিবের কোন বিকল্প ছিল না। ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের পর শেখ মুজিব নােতুন রাষ্ট্র বাঙলাদেশে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আবার। অধিষ্ঠিত হওয়ার সেটাই ছিল মূল কারণ।

    কিন্তু এভাবে নেতৃত্বে আবার অধিষ্ঠিত হয়ে ক্ষমতাসীন হলেও শেখ মজিব দই ধরনের দংশনে ক্ষতবিক্ষত হতেন। প্রথমত, জাতির নিদারুণ দুঃসময়ে জনগণকে পরিত্যাগ ও তাদের শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর মধ্যে ছিল এক গভীর ‘অপরাধবােধ। দ্বিতীয়ত, তাঁর ব্যক্তিগত অনুপস্থিতি ও নেতৃত্ব ছাড়াই যুদ্ধ বিজয় ও বাঙলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তাঁর পর্বতপ্রমাণ। অহমিকার ওপর ছিল এক প্রচণ্ড আঘাত।

    এ দুটি কারণে তিনি তিরিশ লক্ষ বাঙালীর মৃত্যু ইত্যাদি নিয়ে অনেক সময় আবেগপ্রবণ কথা বললেও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে তাঁর কোন উৎসাহ ছিল না। সে কথা জানতে তার কোন আগ্রহ না থাকার কারণ। এত বড়াে রকম পরিবর্তনে তাঁর নিজের কোন ভূমিকা না থাকা। 

    বাঙলাদেশে ইতিহাস চর্চা বিষয়ে আলােচনা প্রসঙ্গে এই বিন্দুতে আসার জন্যই ১৯৭১ সালের যুদ্ধ, শেখ মুজিবের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে কিছুটা আলােচনার প্রয়ােজন হলাে। কারণ ১৯৭১-এর যুদ্ধে শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণ, শারীরিক অনুপস্থিতি ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়গুলিকে ইতিবাচক ব্যাপার হিসেবে দাঁড় করানাের জন্য ১৯৭২ সাল থেকেই শুরু হলাে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক তথ্যের চরম বিকৃতকরণ।

    এই বিকৃতকরণ সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকল না। তার থেকেও অনেক মারাত্মকভাবে তথ্য বিকৃতকরণ শুরু হলাে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে। শুরু হলাে তথ্য বিকৃত করে দালাল বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা গ্রন্থ প্রণয়ন। শেখ মুজিবই যে বাঙলাদেশের জনক, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তিনি যে বাঙলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেছিলেন এবং তার ফলেই যে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ এসব মিথ্যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে অবাধে প্রচারিত হতে থাকল। শুধু তাই নয়, কেউ এর প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে বিষােদগার তাে হতােই, এমনকি তার নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হতাে।

    ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর কিছু অফিসার, কিছু সংখ্যক আওয়ামী নেতা ও মার্কিন গােয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র যৌথ চক্রান্তের মাধ্যমে শেখ মুজিব নিহত ও তাঁর বাকশালী সরকার উৎখাত হয়। এর পর দ্রুত ঘটতে থাকা নানা চক্রান্তমূলক পরিবর্তনের পরিণতিতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি নিজের এই অবস্থানকে যুক্তিসঙ্গত ও পাকাপােক্ত করার জন্য আওয়ামী লীগের লাইন অনুসরণ করেই স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের ভূমিকা নিয়ে শুরু করেন এক আত্মগৌরব কীর্তন। স্বাধীনতার ঘােষক হিসেবে তিনি নিজেকে এমনভাবে প্রচার প্রচারণায় উপস্থিত করতে থাকেন যাতে মনে হয়, তার সংগ্রামী ও জাতীয়তাবাদী চেতনার কাছে শেখ মুজিবের ভূমিকা কিছুই নয়! তিনি ১৯৭১ সালের সংকটজনক পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার ঘােষণা দেয়ার ফলেই শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ!

    একথা ঠিক যে ঐ বিশেষ সময়ে যেভাবেই হােক জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘােষণায়, যা শেখ মুজিবের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া হয়েছিল, একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, জিয়াউর রহমানের ঘােষণা ছাড়া যুদ্ধ শুরু হতাে না অথবা জিয়াউর রহমান কোন অর্থে সেই যুদ্ধ শুরুর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। উর্দিপরা একজন সামরিক অফিসার হিসেবে এক্ষেত্রে তাঁর কোন ভূমিকাই ছিল না। শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ আত্মসমর্পণ করলেও যে পরিস্থিতিতে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সে পরিস্থিতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির, মওলানা ভাসানীর ও শেখ মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে সামরিক বাহিনীর একজন মেজর উঠে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘােষণা দিলেই তাতে মানুষ উজ্জীবিত হতাে এটা মনে করার মতাে বড় আহাম্মুকী আর কি হতে পারে?

    কিন্তু জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শুরু করে একাধিক বিএনপি সরকার আমলে এ আহাম্মুকী ও মিথ্যা প্রচারিত হচ্ছে এবং বিপজ্জনকভাবে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারাও নােতুন উদ্যমে আবার ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতকরণ নিজেদের মতাে। করে ঘটিয়েছিল। সেই বিকৃতকরণের পর বিএনপির নােতুন সরকার ২০০১ সাল থেকে তাদের বিকৃতকরণ কর্মসূচী শুরু করে পাঠ্যপুস্তকে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।

    ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র বিপজ্জনক ব্যাপার নয়। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সম্পর্কিত তথ্য বিকৃতকরণের প্রতিযােগিতায় ইতিহাস বলতে সাধারণ মানুষের মাথায় এখন ১৯৭১-এর স্বাধীনতা ঘােষণা এবং ঘােষক ছাড়া অন্য কিছুই নেই। ইতিহাস বলতে কী বােঝায় এ নিয়ে আমরা যে আলােচনা শুরু করেছিলাম। তার কোন ধারণা যাতে সাধারণ মানুষের, এমনকি স্কুল-কলেজের ছাত্রদের মাথাতেও আর না থাকে সেজন্য বাঙলাদেশের স্কুলগুলির পাঠ্যতালিকা থেকে ইতিহাসকে একটি পাঠ্য বিষয় হিসেবে একেবারে বাতিল ও বর্জ করা হয়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলে শত সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি সত্ত্বেও একজন সাধারণ স্কুলছাত্র তার শিক্ষাজীবনে ইতিহাস সম্পর্কে যা জানত তার তিলার্ধও এখনকার ছাত্ররা জানে না। তারা ভারতবর্ষের প্রাচীন, মধ্য এবং আধুনিক যুগের ইতিহাস তাে দূরের কথা পাকিস্তান আমলের ইতিহাস, তখনকার দিনে জনগণের সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কেও কিছুই জানে না।

    আওয়ামী লীগ আমল থেকে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃতকরণের যে মাস্তানী ইতিহাস চর্চার নামে চলছে তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কাজ হিসেবেই স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে ইতিহাসকে বাদ দেয়া হয়েছে। কারণ ইতিহাসের সাথে সামান্য পরিচয় থাকলেও যেভাবে ইতিহাসের বিকৃতিকরণ ঘটছে সেটা চিহ্নিত করা সহজ হয়। ইতিহাসে যে শুধু ১৯৭১ সালের যুদ্ধই নয়, আরও অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, অনেক বড় মাপের সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে যুগে যুগে আমাদের দেশে ও বিশ্বের অন্যত্র, এটা আড়াল করার প্রয়ােজন দেখা দিয়েছে এদের নিজেদের কীর্তিকে বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয় এবং অদৃষ্টপূর্ব এক ব্যাপার হিসেবে উপস্থিত করার উদ্দেশ্যে। নিজেদের ছােট মাপকে অনেক বড়াে আকারে দাঁড় করানাের জন্য।

    শিল্পী: শাহাবুদ্দীন আহমেদ

    স্কুল পাঠ্যক্রম থেকে ইতিহাস উচ্ছেদ করার এটা এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও এর আর একটা কারণ হলাে, ইতিহাস চর্চাকে বিসর্জন দিয়ে শুধু দেশের সাধারণ মানুষকে নয়, শিক্ষিত সমাজকেও কূপমণ্ডুকে পরিণত করা। কূপমণ্ডুক হিসেবে তাদের চিত্তের ও চিন্তাভাবনার বিকাশকে রােধ করে পঙ্গু করে রাখা। এই প্রচেষ্টা পাকিস্তানী আমলের গােড়াতেও ছিল। এই অঞ্চলের বাঙালীদেরকে তাদের ইতিহাস, সাহিত্য সংস্কৃতির ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার একটা অংশ হিসেবেই ছিল বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ। সেই আক্রমণ সরকারী পর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী মুসলমানদের একাংশের মধ্যে একটা চেষ্টা ছিল বাংলা ভাষার মুসলমানীকরণ মেনে নিয়ে বাঙালী হিসেবে হিন্দু মুসলমানের যৌথ, এমনকি মুসলমানদেরও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঐতিহ্য থেকে এখানকার মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন। করা। বাঙলাদেশ আমলে বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, হাজার বছরের বাঙালী সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে অনেক বাগাড়ম্বর করলেও পাকিস্তানী আমলের উপরােক্ত বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়া বাঙলাদেশে আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে এবং জোরেশােরে চলে আসছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ইতিহাসকে স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে বাতিল করে জনগণের শিক্ষিত অংশের মধ্যেও বিস্তার করা হয়েছে এক ধরনের কূপমণ্ডুকতা। এই কূপমণ্ডুকতা যদি না থাকত তাহলে বাঙলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিরিশ বছরেরও বেশী সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও, স্বাধীনতার ঘােষক কে এই অকিঞ্চিৎকর বিষয় নিয়ে পুরােদস্তুর মাতামাতি এবং বাক ও কলমযুদ্ধ এখনাে পর্যন্ত যেভাবে জারী আছে সেটা থাকত না, থাকা সম্ভব ছিল না।

    ইতিহাসকে স্কুল পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেয়ার অর্থই হলাে কয়েক বছরের মধ্যেই সমস্ত দেশের লােককে নিজেদের ইতিহাস বিষয়ে অন্ধকারের জগতে ঠেলে দেয়া। ঠিক এটাই এখন ঘটছে। ইতিহাস বলতে বাঙলাদেশের শিক্ষিত সমাজের, বলা চলে, নব্বই ভাগেরও বেশী এখন অন্ধকারের বাসিন্দা।

    অল্প বয়সে, স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায়, ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ শীর্ষক পূর্বোল্লিখিত প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “যে সকল দেশ ভাগ্যবান তাহারা চিরন্তন স্বদেশের ইতিহাসের মধ্যেই খুঁজিয়া পায়, বালককালে ইতিহাসই দেশের সহিত তাহাদের পরিচয় সাধন করাইয়া দেয়। আমাদের ঠিক তাহার উল্টা। দেশের ইতিহাসই আমাদের স্বদেশকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে।”

    রবীন্দ্রনাথ এখানে দেশের ইতিহাস বলতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে লিখিত ইতিহাসকে বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি যে, সেকালের সেই ইতিহাসের মধ্যে জ্ঞানের অনেক বিষয় ছিল, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার মাধ্যমে দেশের ও বিশ্বের অন্য দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা ও ধারার সাথে স্কুল পর্যায়েই ছাত্রদের একটা পরিচয় হতাে। সেই পরিচয়কে অসম্পূর্ণ, অসন্তোষজনক ও বিভ্রান্তিকর মনে করেই তকালে স্কুল পাঠ্য ইতিহাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উপরােক্ত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি যদি বাঙলাদেশের এই অবস্থা দেখতেন তা হলে তখনকার দিনের স্কুল পাঠ্য যে ইতিহাসের তিনি এত বড় সমালােচনা করেছেন তাকেই বারবার তাঁর প্রণাম নিবেদন করতেন।

    যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, যে জাতির সন্তানদের সাথে নিজেদের ইতিহাসের কোন পরিচয় নেই তার থেকে হতভাগ্য আর কে আছে? বাঙলাদেশের স্বাধীন বাঙালীদের এই হতভাগ্য অবস্থা এক বিরাট চক্রান্তের পরিণতি। ইতিহাস জ্ঞানের শক্তি অনেক প্রবল। এই শক্তিকে যেমন প্রতিক্রিয়ার কাজে ব্যবহার করা যায়, তেমনি একে ব্যবহার করা যায় প্রগতির কাজে, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী সমাজ পরিবর্তনের কাজে। প্রতিক্রিয়ার কাজে ইতিহাসকে ব্যবহার করার উপায় হলাে ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থিত করা এবং সম্ভব হলে ইতিহাস বিষয়ে জনগণকে ঘাের অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখা। বাঙলাদেশের শাসকশ্রেণী এই দুই ভাবেই ইতিহাসকে প্রতিক্রিয়ার খেদমতে ব্যবহার করছে। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এ নিয়ে বাঙলাদেশের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে, এমনকি ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন সমিতি, সংস্থা ইত্যাদির মধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক তাঁদের মধ্যে কোন আলােড়ন তাে নেই-ই, এমনকি কোন প্রতিবাদেরও লেশমাত্র নেই। এই পরিস্থিতি যে এক বড় জাতীয় দুর্যোগ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্যান্য দুর্যোগের সাথে এর পার্থক্য এই যে, অন্য ক্ষেত্রে দুর্যোগ যেখানে মানুষকে নাড়া দেয় এই দুর্যোগ সেখানে দেশের মানুষকে, এমনকি দেশের শিক্ষিত সমাজকে অসাড়তায় আচ্ছন্ন রেখেছে।

    এই অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া বর্তমান বাঙলাদেশে বিদ্যমান শােষণ শাসন নির্যাতন এবং অরাজকতার বিরুদ্ধে কোন বড় ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরােধ সম্ভব নয়। শাসকশ্রেণীর লােকেরা, প্রতিক্রিয়াশীলেরা যেখানে ইতিহাসকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে তেমনি তার বিপরীতে দেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিরও প্রয়ােজন হয়েছে ইতিহাসকে জনগণের সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের।

    এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসকে স্কুল পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা, ইতিহাসের ঘটনাবলীর বিকৃতি ছাড়াই ছাত্রদের সামনে উপস্থিত করা এবং সাধারণভাবে জনগণের মধ্যে ইতিহাস চেতনা সৃষ্টি এবং ইতিহাসের পাঠ বৃদ্ধির জন্য যা কিছু করণীয় সেটা করা ছাড়া গণতান্ত্রিক শিক্ষা আন্দোলন থেকে নিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোন বিকল্প নেই।