Blog

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। দেনা: প্রথম পাঁচ হাজার বছর

    ডেভিড গ্রেইবার ।। দেনা: প্রথম পাঁচ হাজার বছর

    • অনুবাদ: কাজী রবিউল আলম

    আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ও নৈরাজ্যবাদী অ্যাক্টিভিস্ট ডেভিড গ্রেইবারের Debt: The First Five Thousand Years লেখাটি ২০০৯ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় Mute ম্যাগাজিনে এবং তুমুল আলোড়ন তোলা এই লেখাটিকে বর্ধিত করে বছর দুই পরে বই আকারে প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। বর্তমান অনুবাদটি প্রথম বোধিচিত্তে প্রকাশিত হয়। বোধিচিত্তের অনুমতিসাপেক্ষে লেখাটি পুনঃসম্পাদিত অবস্থায় অরাজে ছাপা হচ্ছে। – সম্পাদক

    নিউইয়র্ক টাইমসের স্মরণিকাপত্র

    এই লেখাটি মানব ইতিহাসে দেনা এবং দেনার অর্থ (money) নিয়ে একটি বড় গবেষণা প্রকল্পের অংশ। এই প্রকল্পের প্রথম এবং অভূতপূর্ব (overwhelming) উপসংহার এই যে, অর্থনৈতিক ইতিহাস অধ্যয়ন করতে গিয়ে যাকে এখন আমরা ‘অর্থনীতি’ বলছি তার মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহ তৈরি এবং রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহিংসতা, যুদ্ধ ও দাসত্বের নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে [আমরা] পদ্ধতিগতভাবে উপেক্ষা করেছি। যাই হোক না কেন, যেকোনো বিষয়ের উৎপত্তির ধারণা গুরত্বপূর্ণ। সহিংসতা অদৃশ্য হতে পারে কিন্তু এটি আমাদের অর্থনৈতিক সাধারণ জ্ঞান, প্রতিষ্ঠানসমূহের দৃশ্যত স্বতঃসিদ্ধ প্রকৃতির যুক্তির মধ্যে নিহিত থাকে। আর এগুলো সাধারণভাবে সহিংসতার একচেটিয়া আধিপত্যের বাইরে কখনোই টিকে থাকতে পারে না। উপরন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের মাধ্যমে সহিংসতার এই পদ্ধতিগত হুমকি বজায় রাখা হয়।

    প্রথমেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাসত্বের ভূমিকা দিয়ে আমি শুরু করতে চাচ্ছি। আমার মতে যার ভূমিকা এখানে মুখ্য। বেশিরভাগ সময় এবং স্থানে, দাসত্বকে যুদ্ধের একটি পরিণাম হিসেবে দেখা হয়। কখনো অধিকাংশ যুদ্ধবন্দিরাই দাস হয়ে যান, আবার কখনো তারা সেটি হয় না। কিন্তু প্রায় অবিকৃতভাবে, যুদ্ধকে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি ও ওজর হিসেবে দেখা হয়। আপনি যদি যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন, আপনি আসলে আপনার জীবনকে আত্মসমর্পণ করেন; আপনার উপর বিজয়ীর অধিকার রয়েছে আপনাকে হত্যা করবার এবং প্রায়শই তারা তা–ই করে থাকেন। যদি তিনি সেটা না করেন, আপনি আক্ষরিক অর্থে আপনার জীবনটা তার উপর সমর্পণ করেন; এটি এমন একটা দেনা যাকে নিরঙ্কুশ, অসীম এবং অপরিবর্তনীয় হিসেবে ধারণা করা হয়। নীতিগতভাবে তিনি যা চান তাই আদায় (extract) করতে পারেন। এবং সমস্ত দেনা— বাধ্যবাধকতা— যার জন্য হয়তো আপনি অন্যের (আপনার বন্ধু, পরিবার, প্রাক্তন রাজনৈতিক আনুগত্য) কাছে দেনাগ্রস্ত অথবা অন্যরা আপনার কাছে দেনাগ্রস্ত তা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যায়। যা টিকে থাকে তা হলো মালিকের কাছে আপনার দেনা।

    এই ধরনের যুক্তির কমপক্ষে দুইটি খুবই আগ্রহোদ্দীপক গুরুত্ব রয়েছে। যদিও তা হয়তো দুটি বিপরীত দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। প্রথমত, যেমনটা আমরা সবাই জানি, দাসদের ক্রয় বা বিক্রয় করা যায়। আর এটি দাসত্বের একটি আদর্শস্বরূপ এবং সম্ভবত সংজ্ঞা–নির্ধারক বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে, নিরঙ্কুশ দেনা (অন্য প্রেক্ষিত, যেমন বাজার পরিস্থিতিতে) আর নিরঙ্কুশ থাকে না। বস্তুত, এটাকে সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায়। আর এই ধরনের ক্রিয়াকলাপই যে আমাদের বর্তমান ধরনের মুদ্রার সৃষ্টির শুরু সম্ভব করে তুলেছিল তা বিশ্বাস করবার উপযুক্ত কারণ আছে। কারণ নৃবিজ্ঞানীরা যাকে ‘প্রিমিটিভ মুদ্রা’ বলেন, যা রাষ্ট্রবিহীন সমাজে দেখা যায় (সলোমন দ্বীপের পালকের মুদ্রা, ইরোকুইসদের ওয়্যাম্পাম), তা পণ্য কেনাবেচার জন্য ব্যবহৃত হতো না। বরং তা ব্যবহৃত হতো মূলত বিবাহের ব্যবস্থা করতে, রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি করতে এবং মানুষের অন্যান্য সম্পর্ক বজায় রাখতে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, দাসত্ব যদি দেনা হয়, তাহলে দেনা দাসত্বের দিকে পরিচালিত করতে পারে। ব্যাবিলনের একজন কৃষক বিয়ের অনুমোদনের জন্য মেয়ের বাবাকে একটা ভালো পরিমাণের রৌপ্য দিতে পারে। কিন্তু কোনো অর্থেই সে তার স্ত্রীর মালিক না। এক্ষেত্রে সে কোনোভাবেই তার সন্তানের মাকে বিক্রি বা ক্রয় করতে পারেন না। কিন্তু এর সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে যদি সে ঋণ নেয়। আর যদি সে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে পাওনাদার প্রথমে তার ভেড়া ও আসবাবপত্র, তারপরে তার বাড়ি, ক্ষেত এবং বাগান, এবং অবশেষে তার স্ত্রী, সন্তান, এবং এমনকি তাকে পর্যন্ত দেনা–শ্রমিক হিসেবে নিয়ে যায় যতক্ষণ না বিষয়টির নিস্পত্তি হয় (যা তার সম্পদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কারণে অবশ্যই ক্রমশ আরও কঠিন হয়ে পড়ে)। দেনা ছিল সেই দ্বারসন্ধি (hinge) যা আধুনিক অর্থে মুদ্রা কল্পনা করা সম্ভব করে তুলেছিল। উপরন্তু ঐ কারণে, আমরা যাকে বাজার বলছি তা সৃষ্টি করেছিল। কারণ বাজার হচ্ছে সেই ক্ষেত্র (arena) যেখানে যেকোনো কিছু ক্রয় এবং বিক্রয় করা করা যায়। আর (দাসত্বের মতো) এখানে সব বস্তু তাদের পূর্বের সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিদেহী (disembedded) হয়ে যায় এবং মুদ্রার সাথে সম্পর্কিত হয়েই কেবল টিকে (exist) থাকে।

    কিন্তু একই সময়ে, যেমনটি আমি উল্লেখ করেছিলাম, বিজয় হিসেবে দেনার যুক্তি অন্যদিকে টেনে নিয়ে যায়। সমস্ত ইতিহাসজুড়ে রাজ–রাজরারা দেনার যুক্তিটিকে পুরোপুরি হাতছাড়া করতে ভীষণভাবে দ্বিধান্বিত ছিলেন। তার অর্থ এই নয় যে তারা বাজারের প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন। বরং তারা সাধারণত এগুলোকে (বাজারকে) উৎসাহিত করতেন। বরং এর সাধারণ কারণ ছিল এই যে, প্রয়োজনীয় সবকিছু (রেশম, রথের চাকা, ফ্লেমিংগো জিহ্‌বা, নীলকান্তমণি) সরাসরি অধীনস্ত জনগণের কাছে থেকে আদায় করা সরকারের জন্য ছিল অসুবিধাজনক; এর চেয়ে বরং বাজারকে উৎসাহিত করা এবং তারপর সেখান থেকে ক্রয় করা তাদের জন্য অনেক বেশি সহজ ছিল। প্রারম্ভিক বাজারগুলি সেনাবাহিনী বা রাজকীয় সহচররা যেখানে থাকত সেখানে অথবা প্রাসাদের কাছে কিংবা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের আশেপাশে গঠিত হতো। এটা বরং রাজদরবারের গোলমেলে আচরণকে প্রকৃতপক্ষে ব্যখ্যা করতে সাহায্য করে: সর্বোপরি রাজারাই সাধারণত স্বর্ণ ও রৌপ্যের খনিগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। তাই যদি হয়, তাহলে এর কিছু অংশে নিজের মুখচ্ছবি মুদ্রাঙ্কন করা, তা সাধারণ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এরপর আবার তা কর হিসেবে ফেরত চাওয়ার প্রকৃত কারণটা কী ছিল? এটি কেবল তখনই বোধগম্য হয় যখন বস্তুত কর আদায়ের উদ্দেশ্যেই সবাইকে মুদ্রা অর্জনে বাধ্য করা হয়। যেটিই আবার বাজারগুলোর উত্থানকে সহজ করেছিল। কারণ চারপাশে বাজার থাকাটা এর জন্য সুবিধাজনক ছিল। যাই হোক, এখানে আমাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে: কীভাবে এই করগুলো নায্যতা পেয়েছিল? কেন জনগণ তাদের কাছে দেনাগ্রস্থ থাকত? যখন [কর] প্রদান করতো তখন তারা কোন ধরনের দেনা থেকে মুক্ত হতো? এখানে আবার আমরা বিজয়ীর অধিকারে ফিরে যাই। (প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীন বিশ্বে— সেটা মেসোপটেমিয়া, গ্রিস বা রোম যেখানেই হোক না কেন, মুক্ত নাগরিকদের এই কারণে সরাসরি কর দিতে হতো না। কিন্তু আমি এখানে স্পষ্টতই সরলীকরণ করছি)। রাজারা যদি বিজয়ী হওয়ার অধিকারের ভিত্তিতে তাদের প্রজাদের জীবন এবং মৃত্যুর অধিকার দাবি করে, তাহলে তাদের প্রতি প্রজাদের দেনাও শেষ পর্যন্ত অসীম; এবং উপরন্তু (অন্তত পক্ষে এই প্রেক্ষিতে) তাদের একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক (প্রজাদের নিজেদের মধ্যে) এবং একে অন্যের প্রতি দেনা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। বাস্তবে যেটা টিকে থাকে তা হচ্ছে রাজার সাথে তাদের সম্পর্ক। এটাই ঘুরেফিরে ব্যাখ্যা করে রাজা এবং সম্রাটেরা কেন দাসদের উপর মালিকদের এবং ঋণগ্রহীতাদের উপর পাওনাদের ক্ষমতাকে সর্বদা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন। নিদেনপক্ষে তাদের হাতে যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে যেসব বন্দি তখনো তাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল তারা যেন তাদের মালিকদের দ্বারা হত্যা না হয় সেদিকে তারা (রাজা ও সম্রাটেরা) সর্বদা জোর দিত। বস্তুত কেবল শাসকরাই জীবন ও মৃত্যুর উপর অবাধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারতেন। একজনের চূড়ান্ত দেনাটা ছিল রাষ্ট্রের প্রতি। এটাই ছিল একমাত্র বিষয় যা ছিল সত্যিকারের সীমাহীন, যা নিরঙ্কুশ, মহাজাগতিক হিসেবে দাবি করতে পারত।

    দেনা বইটির প্রচ্ছদ

    আমি যে কারণে এই বিষয়টা গুরুত্ব দিতে চাচ্ছি তা হলো— এই যুক্তিটা এখনো আমাদের সঙ্গে রয়েছে। আমরা যখন একটি সমাজের কথা বলি (ফরাসি সমাজ, জ্যামাইকার সমাজ) তখন আমরা প্রকৃত অর্থে একটি জাতিরাষ্ট্র দ্বারা সংগঠিত জনগণের কথা বলি। যেভাবেই হোক, এটি একটি অকথিত (tacit) মডেল। ‘সমাজগুলোই’ প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র, জয়ী হওয়াটাই রাষ্ট্রের যুক্তি, আর জয়ী হওয়ার যুক্তিটা চূড়ান্তভাবে দাসত্বেরও সমরূপ। রাষ্ট্রের কৈফিয়ত প্রদানকারীদের হাতে সত্যিসত্যই এটি আরও বেশি উদার ‘সামাজিক দেনার’ ধারণায় রূপান্তরিত হয়। এখানে একটি ছোট্ট গল্প বলা হয়েছে যা একধরনের মিথ। আমরা সবাই একধরনের অসীম দেনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এই দেনাটা সেই সমাজের প্রতি যা আমাদের বড় করেছে, লালন–পালন করেছে, খাদ্য দিয়েছে, পোশাক–পরিচ্ছেদ করিয়েছে, সেইসব অনেক আগের মৃতদের প্রতি যারা আমাদের ভাষা এবং ঐতিহ্য আবিষ্কার করেছিলেন, তাদের সকলের প্রতি যারা আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব করে তুলেছিলেন। প্রাচীনকালে আমরা ভেবেছিলাম এর জন্য আমরা ঈশ্বরের কাছে ঋণী (এটা অর্ঘ্য [sacrifice, বলিদান] প্রদানের মাধ্যমে পরিশোধ করা হতো অথবা অর্ঘ্যটা ছিল প্রকৃতঅর্থে সুদ পরিশোধ— চূড়ান্তভাবে এটি মৃত্যুর মধ্যদিয়ে পরিশোধ করা হতো)। পরবর্তীতে এই দেনা রাষ্ট্র কর্তৃক পরিগৃহিত (adopted) হয়েছিল যেখানে রাষ্ট্র নিজেই একটি ঐশ্বরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। এখানে অর্ঘ্যের বিকল্প হিসেবে কর স্থলাভিষিক্ত হয় এবং একজনের জীবনের দেনার বিনিময়ে সামরিক পরিসেবা প্রদান করা হয়। চালিত হওয়ার ধরন অনুযায়ী, মুদ্রা শুধুমাত্র এই সামাজিক দেনারই মূর্ত রূপ। কেইনসীয়রা এই ধরনের যুক্তি পছন্দ করেন। একইরকমভাবে সমাজতান্ত্রিক, সামাজিক গণতন্ত্রীদের বিভিন্ন ধারা, এমনকি অগাস্ট কোঁতের (আমার জানা মতে, যিনি প্রথম ‘সামাজিক দেনা’ শব্দটি ব্যবহার করেন) মতো চোরা–ফ্যাসিস্টরাও এই যুক্তিটি পছন্দ করেন। কিন্তু এই যুক্তিটি আমাদের বেশিরভাগ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মাধ্যমেও সঞ্চালিত হয়: উদাহরণস্বরূপ এই বাক্যগুলো বিবেচনা করুন, ‘সমাজের প্রতি একজনের দেনা পরিশোধ করা’, অথবা, ‘দেশের প্রতি আমার কিছু দেনা আছে’, অথবা, ‘আমি কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই’। এই ধরনের ক্ষেত্রে, সর্বদা পারস্পরিক অধিকার এবং বাধ্যবাধকতা, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি— বস্তুত মুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক— একটি ‘সমাজের’ ধারণায় পরিণত হয়। আর যেখানে আমরা সকলেই কেবল চরম দেনাগ্রস্ত হিসেবেই একজন রাজার সামনে (যে এখন অদৃশ্য) সমান। যে রাজা আমাদের মায়ের পক্ষে, এবং বর্ধিতভাবে, মানবতার পক্ষে দাঁড়ায়

    এর মাধ্যমে আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, নৈর্ব্যক্তিক বাজার এবং ‘সমাজের’ দাবি যখন প্রায় সবসময়ই পাশাপাশি অবস্থান করে— এবং যাদের নিশ্চিতভাবে সকল বাস্তবিক উপায়ে প্রকাশ্যে এবং অগোচরে প্রতারণা করবার প্রবণতা আছে— তখন তারা উভয়েই আসলে চূড়ান্তভাবে সহিংসতার একই যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি নিছক ঐতিহাসিক উৎপত্তির বিষয় নয় যাকে অবান্তর হিসেবে দূরে সরিয়ে রাখা যায়: ক্ষমতার নিরবচ্ছিন্ন হুমকি ব্যতীত রাষ্ট্র এবং বাজার কোনোটিই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না।

    কেউ তখন জিজ্ঞেস করতে পারে, তাহলে বিকল্পটা কী?

    ভার্চুয়াল মুদ্রার ইতিহাসের অভিমুখে

    এখানে আমি আমার মূল বিষয়ে ফিরে আসতে পারি: মুদ্রা শুরুতে এই রকম শীতল, ধাতব এবং নৈর্ব্যক্তিক ধরনে উপস্থিত হয়নি। গোড়াতে এটি মূলত একটি পরিমাপ, বিমূর্ততা হিসেবে হাজির হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক (দেনা এবং বাধ্যবাধকতা) হিসেবেও হাজির হয়। এটি লক্ষ্য করা গুরত্বপূর্ণ যে ঐতিহাসিকভাবে পণ্য–মুদ্রা সবসময়ই সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। একজন ঐতিহাসিক যেমন বলেন, ‘সোনা বা রূপার বাট যুদ্ধের আনুষঙ্গিক বস্তু, শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যের নয়।’[১]

    কারণটা খুবই সাধারণ। পণ্য–মুদ্রা, বিশেষত সোনা বা রুপার আদলে, ঋণ–মুদ্রার থেকে একটি দৃশ্যমান কারণে আলাদা: এটি চুরি করা যায়। যেহেতু সোনার বা রূপার ধাতুপিণ্ড কোনো বংশপরিচয় ছাড়াই একটি বস্তু। সমসাময়িক একজন মাদক ব্যবসায়ী সুটকেস ভর্তি ডলারের বিল নিয়ে যে ভূমিকাটা পালন করেন, ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়ে সোনার বা রুপার বাট একই ভূমিকা পালন করে এসেছে। এ যেন ইতিহাসবিহীন এমন একটা বস্তু যা যেকোনো স্থানে প্রশ্নাতীতভাবে অন্য একটি মূল্যবান বস্তুর সঙ্গে বিনিময় হতে পারে। ফলস্বরূপ, গত ৫০০০ বছরের মানব ইতিহাসকে এক ধরনের পরিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে দেখা যেতে পারে। আপেক্ষিক সামাজিক শান্তির সময়ে, আস্থার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র বা (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে ঋণব্যবস্থা দৃশ্যত উদ্ভব হয় এবং প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। আর বিস্তৃত লুটতরাজের সময়কালে মূল্যবান ধাতু এগুলোকে প্রতিস্থাপিত করে। লুণ্ঠণমূলক ঋণদান ব্যবস্থা প্রত্যেকটি সময়ে উপস্থিত থাকে। কিন্তু এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাব দেখা যায় যখন মুদ্রাকে খুব সহজে নগদ অর্থে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছিল।

    বর্তমান সময়কে চিহ্নিত করে এমন ছন্দকে উপলব্ধি করবার যেকোনো প্রচেষ্টার সূচনা হিসেবে আমি ভার্চুয়াল এবং ধাতব মুদ্রার পর্যায়ানুবৃত্তি অনুযায়ী ইউরেশীয় ইতিহাসের নিম্নলিখিত পর্যায় বিভাজনের প্রস্তাব দিতে পারি:

    ১. প্রথম কৃষি সম্রাজ্যের সময়কাল (৩৫০০–৮০০ খ্রি.পূ.)

    প্রধান মুদ্রার ধরন: ভার্চুয়াল ধার (ক্রেডিট) মুদ্রা

    মুদ্রার উৎপত্তি সম্পর্কে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে আমরা সবচেয়ে ভালো তথ্য পাই। তবে দৃশ্যত এটা বিশ্বাস করবার কোনো কারণ নেই যে ফারাওয়ের মিশর, চীনের ব্রোঞ্জ যুগ বা সিন্ধু উপত্যকাতে বিষয়গুলো খুব আলাদা ছিল। মেসোপটেমিয়ার অর্থনীতি বৃহত্তর সরকারি প্রতিষ্ঠানের (উপাসনালয় এবং রাজপ্রসাদ) অধীনে পরিচালিত হতো। এর আমলান্ত্রিক প্রশাসকরা রুপা এবং প্রধান ফসল বার্লির মধ্যে নির্দিষ্ট সমতুল্য প্রতিষ্ঠা করে কার্যকরভাবে হিসাবী মুদ্রা (money of account) সৃষ্টি করেছিল। দেনাগুলো হিসেব করা হতো রুপাতে কিন্তু বিনিময়ের ক্ষেত্রে রুপা কদাচিৎ ব্যবহৃত হতো। এর পরিবর্তে পাওনা প্রদান করা হতো বার্লি বা অন্য যেকোনো কিছুতে (যা সুবিধাজনক এবং গ্রহণযোগ্য মনে করা হতো)। দেনা লিপিবদ্ধ করা হতো কীলকাকার (cuneiform) ফলকে যা উভয় পক্ষের লেনদেনের জামানত হিসেবে রাখা হতো।

    অবশ্যই, বাজারের অস্তিত্ব ছিল। কিছু পণ্যের মূল্য যা উপাসনালয় এবং প্রসাদের আয়ত্তে উৎপন্ন হতো না। ফলে এগুলো প্রশাসনিক মূল্য তালিকার অধীনে ছিল না। সরবরাহ ও চাহিদার মর্জি অনুযায়ী এগুলোর মূল্য উঠানামা করত। তবে বেশিরভাগ প্রাত্যহিক কেনা–বেচার কাজ (বিশেষত যেগুলো সম্পূর্ণ অপরিচিতদের মধ্যে সম্পাদিত হতো না) দৃশ্যত ঋণের মধ্যে দিয়ে সম্পাদিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, ‘এয়াল নারী’, অথবা পান্থশালার মালিকরা, বিয়ার পরিবেশন করত এবং প্রায়শই ঘর ভাড়া দিতেন; গ্রাহকরা হিসাব লিপিবদ্ধ করে রাখতেন; স্বভাবত পুরো পাওনাটা ফসল উঠার সময় প্রেরণ করা হতো। বাজারের বিক্রেতারা সম্ভবত আজকের আফ্রিকা, মধ্য এশিয়ার ছোট আকারের বাজারের মতো বিশ্বাসযোগ্য গ্রাহকদের একটি তালিকা তৈরি করত যাদেরকে তারা ঋণ দিত।

    সুদে অর্থ আয়ের অভ্যাসটি সুমের (Sumer) থেকেও উৎপত্তি হয়। উদাহরণস্বরূপ, যা মিশরে অজানা ছিল। ২০ শতাংশ হারে নির্ধারিত সুদের হার ২,০০০ বছর ধরে বজায় ছিল (এটা সরকার কর্তৃক বাজার নিয়ন্ত্রণের নিদর্শন ছিল না: এই পর্যায়ে, এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই বাজারকে সম্ভব করে তুলেছিল)। যাইহোক, এটা কিছু গুরুতর সামাজিক সমস্যা তৈরি করেছিল। বিশেষত যে বছর ফসল খারাপ হতো, কৃষকরা আশাহতভাবে ধনীদের নিকট ঋণগ্রস্থ হওয়া শুরু করে। এর ফলে তাদেরকে তাদের খামার দিয়ে দিতে হতো এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের ঋণদাসত্বে আত্মসমর্পণ করতে হতো। ক্রমশ এই পরিস্থিতিটি দৃশ্যত একটি সামাজিক সঙ্কটে পরিণত হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি খুব বড় জনপ্রিয় গণজাগরণে রূপ নেয় না। কিন্তু সাধারণ মানুষ শহর এবং যেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ছিল তা স্থায়ীভাবে পরিত্যাগ করা শুরু করে এবং আধা–যাযাবর ‘দস্যু’ এবং আক্রমণকারী হয়ে ওঠে। প্রতিটি শাসকের পক্ষে স্লেটটি পরিষ্কার করে ফেলা, সব দেনা বাতিল করা এবং সাধারণ ক্ষমা বা ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণা করা ঐতিহ্য হয়ে পড়ে। এর উদ্দেশ্যে ছিল যেন সকল দণ্ডিত শ্রমিকরা তাদের পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে। (এখানে তাৎপর্যপূর্ণ যে, যেকোনো মানবভাষায় ‘স্বাধীনতা’ সম্পর্কিত জ্ঞাত প্রথম শব্দ, সুমেরিয়ায়ান ভাষায় আমর্গা (amarga)। আক্ষরিক অর্থে এটা ‘মায়ের কাছে ফিরে আসা’ বোঝায়।) বাইবেলে উল্লেখিত ধর্মপ্রবক্তারা একটি অনুরূপ প্রথা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এটি ছিল জয়ন্তী, যার দ্বারা সাত বছর পরে সমস্ত দেনা একইভাবে বাতিল করা হতো। এটিই New Testament-এর ‘মুক্তি’ ধারণার প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষ। অর্থনীতিবিদ মাইকেল হডসন যেমন উল্লেখ করেছেন, বিশ্বইতিহাসের দৃশ্যত একটি অন্যতম দুর্ভাগ্য যে সুদের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানটি তার আদি চেক আন্ড ব্যালেন্সের(check and balance) অনুষঙ্গী ছাড়াই মেসোপটেমিয়া বাইরে, অধিকাংশ অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

    ছবি: মারিনো ভ্যান রাইমারসওয়ালা

    ২. অক্ষীয় সময়কাল [Axial Age] (৮০০ খ্রি.পূ. – ৬০০ খ্রি.)

    প্রধান মুদ্রার (money) ধরনঃ ধাতব মুদ্রা (coinage) এবং ধাতব বাট (metal bullion)

    এই সময়ে মুদ্রার আবির্ভাবের পাশাপাশি চীন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যে সব বড় বড় বিশ্বধর্মের জন্মের সূত্রপাত হয়েছিল।[২] চীনের Warring States-এর সময়কাল হতে ভারতের ভাঙন এবং হত্যাকাণ্ড ও গণদাসত্ব সহযোগে রোমান সম্রাজ্যের বিস্তৃতি (এবং পরবর্তীতে, বিলোপ ঘটা) পর্যন্ত, এটি সারা বিশ্বজুড়ে সৃজনশীলতার জমকালো প্রদর্শনী ছিল। কিন্তু প্রায় সমানভাবে এটি সহিংসতারও জমকালো প্রদর্শনীর সময়কাল ছিল।

    ধাতবমুদ্রা (coinage) বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে সত্যিকার অর্থে সোনা এবং রুপার ব্যবহারকে সম্ভব করেছিল। উপরন্তু সেটি এখনকার প্রচলিত, নৈর্ব্যক্তিক অর্থে বাজার সৃষ্টিকে সম্ভব করে তুলেছিল। মূল্যবান ধাতবগুলো চুরি করা সম্ভব ছিল। আর সেই অনস্বীকার্য কারণে এটি সাধারণ যুদ্ধবিগ্রহযুক্ত সময়কালের জন্য অনেক বেশি যথাপযুক্ত ছিল। ধাতবমুদ্রা (coinage) অবশ্যই ব্যবসাকে সহজ করবার জন্য উদ্ভাবিত হয়নি (ফিনিশীয়রা প্রাচীন বিশ্বের নিখুঁত ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এটি গ্রহণে সর্বশেষদের মধ্যে ছিলেন)। দৃশ্যত এটি প্রথমে উদ্ভাবিত হয় সৈনিকদের বেতন দেওয়ার জন্য। সম্ভবত সর্বপ্রথম এশিয়া মাইনরের লিডিয়ার শাসকদের কর্তৃক তাদের গ্রিক সৈন্যদের বেতন দেওয়ার মাধ্যমে। কার্থেজ আরেকটি বিখ্যাত ব্যবসায়ী জাতি এবং এরা অনেক পরে ধাতবমুদ্রা (coin) তৈরি করা শুরু করে। নিশ্চিতভাবেই তারা সেটা করে তাদের বিদেশি সৈন্যদের বেতন দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

    পুরো প্রাচীনকালকে জিওফ্রে ইঙ্গাম–এর মতো করে ‘সামরিক–ধাতব মুদ্রা কমপ্লেক্স’ (‘military-coinage complex’) শিরোনামে অভিহিত করা যায়। যেহেতু নতুন সামরিক প্রযুক্তির বিস্তার (গ্রিক হপলাইটস, রোমান লেজিওনস্‌) দাসদের আটক এবং বিপণনের সাথে ঘনিষ্টভাবে আবদ্ধ ছিল, সেক্ষেত্রে এটাকে তিনি ‘সামরিক–ধাতব মুদ্রা–দাসত্ব কমপ্লেক্স’ (‘military-coinage-slavery complex’) বললে আরও ভালো করতেন। দাসের অন্যান্য প্রধান উৎস ছিল দেনা: এখন রাষ্ট্রগুলো পর্যায়ক্রমে স্লেটগুলো পরিষ্কার করে দেয় না। ফলে এখন এরা বড় সামরিক নগর–রাজ্যের নাগরিক হওয়ার মতো ভাগ্যবান নয়। যারা সাধারভাবে লুণ্ঠনকারী ঋণদাতাদের কাছে থেকে সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাটাই অনেক ভালো ছিল। Near East-এর ঋণব্যবস্থা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার অধীনে এসে ভেঙে পড়েনি; সেগুলো আলেকজেন্ডারের সেনাবাহিনী দ্বারা নির্মূল হয়েছিল। যে সেনাবাহিনীর মজুরি দেওয়ার জন্য প্রতিদিন আধা টন বাট (bullion)-এর প্রয়োজন পড়ত। যে খনিগুলোতে বাট তৈরি হতো সেখানে সাধারণত দাসরা কাজ করত। অন্যদিকে সামরিক অভিযান নতুন দাসদের অন্তহীন প্রবাহকে নিশ্চিত করত। আগেই যেমনটা বলা হয়েছিল, মূলত তাদের প্রজাদের দ্বারা বাজার সৃষ্টি করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজিক কর ব্যবস্থা পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সৈন্যরা (এবং অবশ্যই সরকারি কর্মকর্তারা) যা কিছু চান তা কিনতে যেন এই বাট ব্যবহার করতে পারে। যে নৈর্ব্যক্তিক বাজার একসময় একটি সমাজ থেকে আরেকটি সমাজে অথবা সামরিক অভিযানের প্রান্তে দেখা দেওয়া শুরু করেছিল, এখন তা পুরো সমাজে পরিব্যপ্ত হওয়া শুরু করল।

    তাদের উৎপত্তি যতই চটকদার হোক না কেন, নতুন বিনিময় মাধ্যমের সৃষ্টির দৃশ্যত একটা গভীর বৌদ্ধিক প্রভাব ছিল। উল্লেখ্য গ্রিস, ভারত এবং চীনে একইসাথে ধাতব মুদ্রার সূচনা ঘটে। কেউ কেউ এমন যুক্তি পর্যন্ত দিয়েছেন যে গ্রিক দর্শনের আবির্ভাব সম্ভব হয়েছিল ধাতব মুদ্রা কর্তৃক উপস্থাপিত ধারণাগত উদ্ভাবনের ফলে। তা সত্ত্বেও, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সেই একই সময় এবং স্থানে যেখানে ধাতব মুদ্রার প্রাথমিক প্রসারকে দেখা যায়, সেখানেই আধুনিক ধর্মসমূহের উদ্ভব লক্ষ করা যায়। যেমন প্রফেটিক ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈনধর্ম, কনফুসিয়ানবাদ, তাওবাদ এবং শেষপর্যন্ত, ইসলাম ধর্ম। যদিও যথাযথ সম্পর্ক এখনো বিশ্লেষণ করা যায়নি, তা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু দিক থেকে এই ধর্মসমূহ দৃশ্যত বাজারের যুক্তির প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে উদ্ভব। কিছুটা স্থূলভাবে বললে: কেউ যদি শুধুমাত্র বস্তুগত বিষয়াদির স্বার্থপর অর্জনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্থানকে ন্যস্ত করে, তবে এটি প্রায় অনিবার্য যে খুব শীঘ্রই অন্য কেউ আরেকটি জায়গা আলাদা করবেন। আর যেখান থেকে সে চূড়ান্ত মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বলে উপদেশ দিতে পারে যে, বস্তুগত বিষয়াদি হচ্ছে গুরুত্বহীন। আর এখানে স্বার্থপরতা, এমনকি স্বত্ত্বাও হচ্ছে কল্পনাপ্রসূত বিষয়।

    ৩. মধ্য যুগ (৬০০ খ্রী. – ১৫০০ খ্রী.)[৩]

    ভার্চুয়াল ঋণ মুদ্রার ফিরে আসা

    অক্ষীয় যুগ যদি পণ্যবাজার এবং বিশ্বধর্মের পরিপূরক আদর্শের উত্থান দেখে থাকে, মধ্য যুগ ছিল সেই সময়কাল যেখানে এই দুই প্রতিষ্ঠান একীভূত হওয়া শুরু করে। ধর্মসমূহ বাজার ব্যবস্থার দায়–দায়িত্ব বুঝে নেওয়া শুরু করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে স্থানীয় মেলার সংগঠন পর্যন্ত সমস্ত কিছু ক্রমশ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পাদিত হওয়া শুরু হয়। এটিই পালাক্রমে সমস্ত ইউরোশিয়া জুড়ে ভার্চুয়াল ঋণ মুদ্রার বিভিন্ন ধরণকে সক্ষম করে তোলে।

    ইউরোপে, যেখানে খ্রিস্টীয় সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল, ধাতব মুদ্রা কেবল বিক্ষিপ্তভাবে এবং বিষমভাবে পাওয়া যেত। ৮০০ খ্রিস্টাব্দের পরে দামগুলো মূলত পুরানো ক্যারোলিং–এর মুদ্রা দ্বারা হিসেব করা হতো যার অস্তিত্ব এখন নেই (সেই সময় এটি আসলে ‘কাল্পনিক মুদ্রা’ হিসেবে পরিচিত ছিল)। কিন্তু প্রাত্যহিক কেনা–বেচা অন্যান্য মাধ্যম দ্বারা সম্পাদিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রচলিত পন্থা ছিল গণনা–কাঠি (tally-sticks)-এর ব্যবহার। এটি ছিল খাঁজকাটা কাঠের টুকরা যাকে দুইভাগ করা হতো। অর্ধেক ঋণ প্রদানকারী এবং বাকি অর্ধেক ঋণ গ্রহীতা রাখতেন। এই গণনা–কাঠিগুলো ১৬ শতক পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বেশিরভাগ স্থানেও প্রচলিত ছিল। বড় লেনদেনগুলো হুন্ডির (bills of exchange) মাধ্যমে পরিচালিত হতো। যেখানে বড় বড় বাণিজ্যক মেলাগুলো এগুলোর ক্লিয়ারিং হাউস হিসেবে কাজ করত। ইতোমধ্যে, চার্চ একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে সুদে অর্থ ধার দেওয়া এবং ঋণদাসত্বের নিষেধাজ্ঞার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হয়।

    ছবি: ট্যাক্স কালেক্টর অফিস,
    পিটার ব্রুগেল

    তা সত্ত্বেও, মধ্যযুগীয় বিশ্ব অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্র ছিল ভারত মহাসাগর। এটি ভারত, চীন, এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত সভ্যতাগুলোর সাথে মধ্য এশিয়ার কাফেলা (caravan) [সড়ক পথ] পথসহ যুক্ত ছিল। এখানে, ইসলামের কাঠামোর আলোকে বাণিজ্য পরিচালিত হতো। এটি শুধু ব্যবসায়িক কার্যক্রলাপ সম্পাদনের অত্যন্ত সহায় বা উপযুক্ত একটি আইনি কাঠামো দেয়নি (যেখানে সুদে টাকা ধার দেওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল)। বরং বিভিন্ন ধরনের পরিশীলিত ঋণ–কৌশল তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বড় অংশজুড়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করেছিল। প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য অনেক কিছুর মতোই পশ্চিম ইউরোপ এক্ষেত্রে আপেক্ষিকভাবে অনেক দেরিতে হাজির হয়: ইতালি এবং ফ্রান্সে যেসব আর্থিক উদ্ভাবনগুলো ১১তম এবং ১২শ শতকে দেখা যায়, সেগুলো মিশর বা ইরাকে ৮ম বা ৯ম শতক থেকেই সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। যেমন, ‘চেক’ (‘cheque) শব্দটি আরবি সাক (sakk) শব্দ থেকে উদ্ভূত এবং যা ইংরেজি ভাষায় আবির্ভূত হয় মাত্র ১২২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে।

    চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল: বৌদ্ধধর্মের দ্রুত প্রসারের মধ্য দিয়েই মধ্যযুগের শুরু হয়েছিল। যদিও আইন প্রণয়ন অথবা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের মতো অবস্থানে বৌদ্ধধর্ম সেসময়ে ছিল না। তা সত্ত্বেও, বন্ধকী দোকান উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্ম সেসময় স্থানীয় সুদখোরদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছিল। গরিব কৃষকদের জন্য স্থানীয় সুদখোরদের বিকল্প হিসেবে বৌদ্ধমন্দিরকে ভিত্তি করেই প্রথমদিকের বন্ধকী দোকানগুলো গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও, খুব দ্রুতই রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্বহাল করে, যেমনটি চীনে রাষ্ট্র বরাবরই করে এসেছে। কিন্তু শুধু সুদের হার নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণদাসত্ব চূড়ান্ত বিলোপ করার চেষ্টা করে না। বরং কাগুজে মুদ্রা উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে সোনা বা রুপার বাট (bullion) [নির্ভর বিনিময় মাধ্যম] থেকে পুরোপুরি সরে যায়। আর এর সবকিছুই ঘটেছিল বিভিন্ন ধরনের আরও জটিল আর্থিক উপকরণের বিকাশের মধ্য দিয়ে।

    তার অর্থ এটা বলা না যে, এই সময়কালে (বিশেষত বিখ্যাত যাযাবর আগ্রাসনের সময়কালে) হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠন দেখা যায়নি অথবা ধাতব মুদ্রাকে বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ও স্থানে দেখা যায়নি। তবুও ভিন্ন একটি গতিধারার দিকে অগ্রসর হওয়ায় দৃশ্যত এই সময়কালের মূল বৈশিষ্ট্য। মধ্যযুগের বেশিরভাগ সময়েই দমনমূলক প্রতিষ্ঠান হতে মুদ্রার বিভক্তি দেখা যায়। বলা যেতে পারে, মুদ্রা পরিবর্তনকারীদের (money changers) পুনরায় উপসনালয়ে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যেখানে তাদেরকে নজরদারি করা যায়। অনেক বেশি দৃঢ় সামাজিক আস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিকাশই ছিল এর ফলাফল।

    ৪. ইউরোপীয় সাম্রাজ্যকাল (১৫০০–১৯৭১ খ্রি.)

    মূল্যবান ধাতুর প্রত্যাবর্তন

    বৃহৎ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের (আইবেরিয়ান বা তদানীন্তন উত্তর আটলান্টিক) আবির্ভাবের সাথে সাথে বিশ্ব একই সাথে দুটি বিষয়ের প্রত্যাবর্তন দেখে। ব্যাপকভাবে দাসত্ব, লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যাবর্তন এবং এর ফলাফল হিসেবে মুদ্রার প্রধান ধরন হিসেবে সোনা এবং রুপার বাট (bullion)-এর ফিরে আসা। ঐতিহাসিক অনুসন্ধান সম্ভবত শেষ পর্যন্ত এটা দেখাবে যে, আমাদের সাধারণ অনুমানের চেয়েও এই রূপান্তরগুলো আরও জটিল ছিল। এমনকি এর কিছু কিছু নতুন বিশ্বকে (New World) জয় করবার পূর্বেই ঘটতে শুরু করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৫তম এবং ১৬শ শতাব্দীতে মিং রাজবংশের সময় জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোর উত্থান আবারও সোনা বা রুপার বাটে ফিরে যাওয়ার একটি অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। এটি শেষপর্যন্ত সরকারকে কেবল তাদের কাগুজে মুদ্রা বাতিল করতে বাধ্য করেনি বরং নিজস্ব মুদ্রা চাপিয়ে দেওয়ার যে কোনো চেষ্টাকেও বাতিল করেছিল। এটি বিশাল চীনা বাজারকে একটি অমুদ্রিত রূপার মানদণ্ডে প্রত্যাবর্তন করায়। ক্রমান্বয়ে করও (ট্যাক্স) রুপাতে বিনিময় করা শুরু হয়। ফলে যতটা সম্ভব দেশে রুপা আনার চেষ্টা করাটাই খুব দ্রুত একটা অফিসিয়াল চীনা নীতিতে পরিণত হয়। এটি করা হয় যেন এর মাধ্যমে কর নিম্নগতির রাখা এবং নতুন সামাজিক অস্থিরতার প্রাদুর্ভাব রোধ করা সম্ভব হয়। রূপার জন্য হঠাৎ প্রচুর চাহিদা সারা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছিল। বিজয়ীদের দ্বারা লুট করা এবং পরবর্তীতে মেক্সিকো ও পোটোসির খনি হতে (প্রায় কল্পনাতীত মানুষের জীবনের মূল্য বিনিময়ে) সংগ্রহ করা বেশিরভাগ মূল্যবান ধাতু শেষ পর্যন্ত চীনে গিয়ে পৌঁছেছিল। আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর, এবং প্রশান্ত মহাসাগরের জুড়ে শেষপর্যন্ত গড়ে উঠা এই বিশ্বব্যাপী সংযোগ সম্পর্কে বিস্তর প্রমাণাদি পাওয়া যায়। এখানে গুরত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে অর্থের (money) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হতে বিযুক্তি, দমনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশেষত রাষ্ট্র) সাথে সংযুক্তি এবং সেইসাথে ‘ধাতবতা’র দিকে মতাদর্শিক প্রত্যাবর্তন এগুলোর অনুষঙ্গী হওয়া।[৪]

    এই প্রেক্ষিতে, সার্বিকভাবে ঋণ ছিল রাষ্ট্রের একটি বিষয় যারা নিজেরাই বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল। ক্রমবর্ধমান ব্যয়বহুল যুদ্ধসমূহের অর্থায়ন করতে গিয়েই পালাক্রমে এই ধরনের দেনার সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পুরো ঊনিশ এবং বিশ শতকজুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে সোনাকে মানদণ্ড হিসেব বজায় রাখতে অবিচল ছিল এবং সোনাকে নাকি রুপাকে মানদণ্ড হিসেবে চালু রাখা উচিৎ হবে তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের রাজনৈতিক লড়াই সংগঠিত হয়েছিল।

    উপরন্তু এটি স্পষ্টতই পুঁজিবাদ, শিল্প বিপ্লব, প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ইত্যাদির উত্থানেরও পর্যায়কাল ছিল। আমি এখানে এদের গুরুত্বকে অস্বীকার করিনি। বরং পরিচিত ঘটনাসমূহকে অপরিচিত প্রেক্ষিত থেকে দেখবার একটি কাঠামো প্রদান করবার চেষ্টা করেছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, এটি যুদ্ধ, পুঁজিবাদ এবং দাসত্বের মধ্যকার সম্পর্কগুলোকে সনাক্ত করবার কাজকে সহজ করে তোলে। মজুরি শ্রম প্রতিষ্ঠানের, উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিকভাবে দাসত্বের মধ্য থেকেই উদ্ভুত হয়েছিল (আমরা জানি যে গ্রিস থেকে মলয়ের নগর রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রারম্ভিক মজুরি চুক্তিগুলো প্রকৃতপক্ষে দাসের ভাড়া ছিল)। ঐতিহাসিকভাবেও এটির বিভিন্ন ধরনের ঋণ দাসত্বের সাথে অন্তরঙ্গভাবে জড়িত থাকার প্রবণতা ছিল এবং সে প্রবণতা প্রকৃতপক্ষে আজও বজায় আছে। আর আমরা এই সবধরনের প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ভাবছি। কিন্তু বিষয়টি এরকম নয়। আমরা এখন যাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হিসেবে ভাবছি সেটা প্রকৃতপক্ষে মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়জুড়ে বিদ্যমান দাসত্বের যুক্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত।

    ৫. বর্তমান যুগ (১৯৭১ পরবর্তী)

    দেনার সাম্রাজ্য

    ১৯৭১ সালের ১৫ই আগস্ট বর্তমান যুগের সূচনা হয়েছিল বলা যেতে পারে। এই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আনুষ্ঠানিকভাবে ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের নিয়ম বাতিল করেছিলেন এবং কার্যকরভাবে বর্তমান ভাসমান মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। যেভাবেই হোক, আমরা ভার্চুয়াল মুদ্রার একটি যুগে ফিরে এসেছি। এখানে ধনী দেশগুলোর ভোক্তাদের কেনাকাটায় খুব কমই কাগুজে মুদ্রা প্রয়োজন হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিও মূলত ভোক্তা ঋণ দ্বারা পরিচালিত হয়। এটা সেই প্রেক্ষিত যেখানে আমরা পুঁজির ‘আর্থিকীকরণ’ সম্পর্কে কথা বলতে পারি। এর মাধ্যমে মুদ্রা এবং আর্থিক সরঞ্জামাদি সম্পর্কিত অনুমান নিজেই একটি পরিসর হয়ে ওঠে। এটি উৎপাদন এমনকি বাণিজ্যের সাথে যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সেক্টরটি স্বভাবতই আজ সংকটে পড়েছে।

    ছবি: চতুর্দশ শতাব্দীর একটি ম্যানুস্ক্রিপ্ট

    এই যুগ সম্পর্কে আমরা নিশ্চিতভাবে কি কিছু বলতে পারি? এখনো পর্যন্ত খুবই সামান্য। আমরা যে সময়কাল নিয়ে কাজ করছি তার বিবেচনায় ৩০ বা ৪০ বছর কিছুই না। স্পষ্টতই, এই সময়কাল সবে শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও, পূর্বোক্ত বিশ্লেষণগুলো যতই অপরিপক্ক হোক না কেন তা আমাদের কিছু অভিজ্ঞ (informed) ব্যক্তি পরামর্শ প্রদান শুরু করাকে অনুমোদন করে।

    ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, ভার্চুয়াল, ঋণ–মুদ্রার যুগ একধরনের অতিরিক্ত (overarching) প্রতিষ্ঠানও সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন মেসোপটামিয়ার পবিত্র রাজপদ (Mesopotamian sacred kingship), মোজাইক জুবলি (Mosaic jubilees), শরিয়া বা ক্যানন (canon) আইন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের সম্ভাব্য বিপর্যয়মূলক সামাজিক পরিণতির উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো (সাধারণত রাষ্ট্রের যথাযথ সমস্থানিক নয়, বরং এর চেয়ে বৃহত্তর) ঋণখেলাপিদের রক্ষা করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এখনো পর্যন্ত এগুলোর গতিবিধি ভিন্ন একটি দিকে পরিচালিত হচ্ছে: ৮০’র দশকের পর থেকে আমরা প্রথম একটা বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার সৃষ্টি হতে দেখি। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, কর্পোরেশন এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আর এগুলো মূলত ঋণদাতাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। যাইহোক, এই প্রতিষ্ঠানগুলো খুব দ্রুতই সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। প্রথমত, খুব দ্রুত বেড়ে ওঠা বৈশ্বিক সামাজিক আন্দোলনগুলোর মাধ্যমে (বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলন) যে আন্দোলনগুলো কার্যকরভাবে এইএমএফ–এর মতো প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তৃত্বকে ধ্বংস করে এবং অনেককে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলে। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময়ে এসে সাম্প্রতিক ব্যাংকিং সংকট ও অর্থনৈতিক পতনের মাধ্যমে। ভার্চুয়াল মুদ্রার নতুন যুগটি সবে শুরু হয়েছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো প্রায় পুরোটাই অস্পষ্ট। তা সত্ত্বেও, আমরা ইতিমধ্যে কিছু বিষয় বলতে পারি। প্রথমত, ভার্চুয়াল মুদ্রার দিকে অগ্রসর হওয়া আবশ্যিকভাবে পুঁজিবাদের কোনো কূটকৌশলের প্রভাব নয়। আদতে, এটির ঠিক বিপরীতটা হতে পারে। মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়জুড়ে, ভার্চুয়াল মুদ্রার রূপরেখা প্রণয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে এটা নিশ্চিত করা যায় যে পুঁজিবাদের মতো কোনো কিছুই যেন কখনো আরম্ভ হতে না পারে। অন্তত এটি নিশ্চিত করা যে, পুঁজিবাদ যেন এর বর্তমান রূপে আবির্ভূত না হয়। যে পুঁজিবাদে, বিশ্বের জনসংখ্যার বেশিরভাগই এমন একটি অবস্থার মধ্যে রয়েছে যাকে ইতিহাসের অন্যান্য বহু সময়ে দাসত্বের সমতুল্য বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, যেসব শর্ত দ্বারা আমরা ‘সমাজ’ ও ‘বাজার’ এবং স্বাধীনতা সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রাথমিক ধারণাগুলো কল্পনা করি তা নির্ধারণে সহিংসতার নিশ্চিত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকাকে জোর দেওয়া। একটি বিশ্ব যত বেশি সহিংসতা মুক্ত হবে তত দ্রুত সে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিকাশ শুরু করবে। পরিশেষে, রাষ্ট্র ও বাজারের যমজ বুদ্ধিবৃত্তিক স্ট্রেইট জ্যাকেটের বাইরে গিয়ে দেনা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা এখন জিজ্ঞেস করতে পারি: একটি সমাজ থেকে যখন সহিংসতার ভিত্তিটি শেষ পর্যন্ত দূরে সরে যায়, তখন সেখানে মুক্ত পুরুষ ও মহিলারা একে অন্যের প্রতি ঠিক কিসের ভিত্তিতে দেনাগ্রস্থ থাকে? তারা একে অন্যের প্রতি কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি এবং অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়?

    আশা করি যে একদিন আমরা সকলেই এই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবার মতো অবস্থানে থাকব। কিন্তু আপনি কোনোভাবেই জানেন না যে এরকম সময়টা কখন।

    ১০ই ফ্রেব্রুয়ারি, ২০০৯

    পাদটীকা

    [১] জেফ্রি ডব্লিউ. গার্ডিনার, ‘The Primacy of Trade Debts in the Development of Money’, in Randall Wray (ed.), Credit and State Theories of Money: The Contributions of A. Mitchell Innes, Cheltenham: Elgar, চেলটেনহ্যাম: এলগার, ২০০৪, পৃষ্ঠা .১৩৪।

    [২] মূলত আপেক্ষিকভাবে সংক্ষিপ্ত ৮০০ B.C.E – ২০০ B.C.E সময়কালকে বর্ণনা করবার জন্য [জার্মান অস্তিত্ববাদী দার্শনিক] কার্ল ইয়েসপার্স প্রথম ‘এক্সিয়াল এজ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তার ধারণা মতে আমরা আজ যে সমস্ত প্রধান দার্শনিক ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত সেগুলো সবগুলিই প্রায় একসাথে চীন, ভারত এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এই সময়কালেই উত্থিত হয়েছিল। এখানে, আমি লুইস ম্যামফোর্ডের মতো করে আরও বৃহৎ পরিসরকে বোঝাবার জন্য এই প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছি। জরাথ্রুস্তের সময় থেকে শুরু করে মোহাম্মদ পর্যন্ত বর্তমানে বিদ্যমান সব বিশ্বধর্মের জন্ম এই সময়কালেই দেখা যায়।

    [৩] আমি এখানে প্রারম্ভিক পর্যায়ে যাকে ইউরোপে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো সেটাকে বুঝিয়েছি। এই সময়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লুণ্ঠনকারী সামরিকবাদ এবং ফলশ্রুত সোনা বা রূপার বাটের গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা: ভাইকিং আক্রমণ, এবং অষ্টম শতকের ইংল্যান্ড থেকে ড্যানেজেল্ডের বিখ্যাত নিষ্কাশন। এটাকে সম্ভবত এমন যুগের শেষ হিসেবে দেখা যেতে পারে যেখানে লুণ্ঠনকারী সামরিকবাদ সোনা এবং রুপার বাটের শোভাযাত্রার হাত ধরে এগিয়ে চলেছিল।

    [৪] নিশ্চিতভাবে এই সময়েই মুদ্রার বার্টার ব্যবস্থা এবং এর তত্ত্বসমূহের বিকাশ ঘটেছিল।

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। মিউচুয়াল এইডের ভূমিকা: বিবর্তনের এক উজ্জ্বল অনুঘটক

    ডেভিড গ্রেইবার ।। মিউচুয়াল এইডের ভূমিকা: বিবর্তনের এক উজ্জ্বল অনুঘটক

    • অনুবাদ : অনিক সন্ধি

    গ্রেইবার এই লেখাটি দাঁড় করিয়েছিলেন ক্রপোৎকিনের মিচুয়াল এইড গ্রন্থের উপর আলোচনা হিসেবে। লেখাটি যৌথভাবে গ্রেইবার লিখেছেন তার বন্ধু ও শিষ্য আন্দ্রেই গ্রুবাচিকের সাথে। গ্রুবাচিকের মতে সম্ভবত এটাই গ্রেইবারের সর্বশেষ লেখা। গ্রেইবারের মৃত্যুর দুইদিন পর গ্রুবাচিক এটি ট্রুথআউট-এ প্রকাশ করেন। – সম্পাদক

    ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)

    কখনো কখনো বিরাজমান রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানের বিরুদ্ধে এমন এক অকাট্য যুক্তির আবির্ভাব ঘটে যাকে খণ্ডন করার জন্য সম্পূর্ণ নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করা লাগে। দার্শনিকভাবে বলতে গেলে এরূপ আবির্ভাব এমন এক ঘটনা যা বাস্তবতার অদেখা অংশগুলোকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু যাকে একবার দেখলে আর বারাবার না দেখে পারা যায় না। এরূপ চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ ও মোকাবেলাই ডান–বুদ্ধিজীবিদের প্রধান কাজ।

    তিনটি উদাহরণ দেখা যাক।

    হুরোন–ওয়েন্ডাট এর রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন কনডিয়ারনক, যিনি কিনা ইউরোপে ভ্রমণ করেছেন এবং ফরাসি ও ইংরেজ সেটলার সমাজের সাথেও পরিচিত ছিলেন। ১৬৮০’র দশকে তিনি কিউবেকের ফরাসি গভর্নর ও তার এক সহোযোগী, কোনো এক লাহোনটানের সাথে কয়েক দফা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে তিনি পেশ করেন যে প্রাকৃতিক কোনো কারণে নয়— শাস্তিমূলক আইন ও সম্পূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই বিরাজ করে ঠিক আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার জন্য। আর সেটা হলো অর্থ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা প্রাইভেট প্রপার্টি। এদের অস্তিত্বই মানুষকে এমনভাবে ব্যবহার করতে প্ররোচিত করে যার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দরকার হয়। তিনি দাবি করেন সাম্যই সত্যিকারের স্বাধীনতার প্রধান শর্ত। এই বিতর্কগুলো পরে লাহোনটান বই হিসেবে প্রকাশ করেন, যা ১৮ শতকের প্রথম দিকে ব্যাপক সফলতা পায়। বইটি প্যারিসের থিয়েটারগুলোতে প্রায় ২০ বছর ধরে চলে এবং আলোকায়ন (enlightenment) পর্বের প্রায় প্রত্যেক চিন্তকই এর অনুকরণে লেখেন। এই যুক্তিগুলো এতই শক্তিশালী হয় যে সেগুলো খণ্ডনের জন্য বিরাজমান সামাজিক ব্যবস্থার রক্ষকদের (যেমন টুরগোট ও অ্যাডাম স্মিথ) সামাজিক বিবর্তন তত্ত্বের আবিষ্কার করে আনতে হয়। সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব বলে প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে মানব সমাজকে কতগুলো বিকাশের ধাপে ভাগ করা যায়। “সবাইতো স্বাধীনতা ও সাম্য ভালোবাসে,” টুরগোট বললেন; “কিন্তু প্রশ্নটা হলো একটা অগ্রসর বাণিজ্যিক সমাজ— যার ভিত্তি জটিল শ্রমবিভাজন— দুটোর একটির সাথে তা কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ।” এই তত্ত্ব পুরো ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে রাজত্ব করে এসেছে এবং এখনো কিঞ্চিৎ সংশোধিত অবস্থায় আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে।

    উনিশ শতকের শুরু এবং আঠারো শতকের শেষের দিকে নৈরাজ্যবাদিদের উদারনৈতিক রাষ্ট্রের সমালোচনা ছিল এই যে আইনের শাসনের ভিত্তি হলো নির্বিচার সহিংসতা। তারা আরও বলেন রাষ্ট্র খোদ নিজেই একটি সেকুলার ‘ঈশ্বর’ যেটি তার মতো করে নীতি–নৈতিকতা বানাতে পারে কারণ রাষ্ট্র নিজে এসবের (আইনি বিধিনিষেধ) ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। এই সমালোচনা কার্ল স্মিটদের মতো ডানপন্থী আইন তাত্ত্বিকদের আঁতে এমন ঘা লাগিয়েছিল যে শেষমেষ তিনি ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বর্ম বনে যান। স্মিট তার সবচেয়ে নামকরা লেখা রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব (Political theology) বইটি শেষ করেছেন বাকুনিনকে গালাগাল করে। তিনি বলেছিলেন যে বাকুনিন ‘সিদ্ধান্তবাদ’ (decision-ism) এর বাকুনিন ‘সিদ্ধান্তবাদ‘ তথা আইনি শৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাচারী কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। স্মিটের দাবি ছিল যে একে খারিজ করাও শেষপর্যন্ত বাকুনিন যেই কর্তৃত্বের বিরোধিতা করছেন তার মতোই ঠিক একই রকম স্বেচ্ছাচার। স্মিটের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের ধারণা সমকালীন প্রায় সমস্ত ডানপন্থী চিন্তার বনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করছে, যার উদ্দেশ্য ছিল বাকুনিনের ঈশ্বর ও রাষ্ট্রের একটি জবাব দেয়ার চেষ্টা।

    ক্রপোৎকিনের মিচুয়াল এইড গ্রন্থের ভূমিকা

    ক্রপোৎকিনের “মিউচুয়াল এইড: বিবর্তনের একটি অনুঘটক” বইটি যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তা এখনো বেশ যৌক্তিক গভীরতার দাবি করে। কেননা এটি শুধুমাত্র প্রশাসনের চরিত্রের কথাই বলে না বরং প্রকৃতির চরিত্র বা খোদ বাস্তবতার কথাই বলে।

    সামাজিক বিবর্তনের তত্ত্ব যেখানে টুরগোট প্রথম ‘প্রগতি‘ (progress) এর ব্যবহার করেন, প্রথম প্রথম তা আদিবাসী সমালোচনার চ্যালেঞ্জের উত্তর হিসেবে গৃহিত হলেও পরে তা আরও তিক্ত রূপ নেয়। হার্বার্ট স্পেন্সারের মতো লিবারালরা সামাজিক বিবর্তনকে একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা একই সাথে ক্রমে পার্থক্যকরণ ও অঙ্গীভূতকরণে ব্যস্ত, হিসেবে পেশ না করে একে এক রকমের হবসিয়ান ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকা” হিসেবে ধরে নেন। ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকা‘ বা ‘সার্ভাইভাল অফ দা ফিটেস্ট‘ পরিভাষাটি হার্বার্ট স্পেন্সার প্রথম ১৮৫২ সালে কয়েন করেন। এই ধারণাটি দিয়ে তিনি মানব ইতিহাস বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন এবং ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ ও গণহত্যার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করতে চেয়েছিলেন। দশ বছর পর ‘দি অরিজিন অফ স্পিসিজ’ বইয়ে ডারউইন গ্যালাপাগোস দ্বীপে তার রিসার্চে পাওয়া প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব বর্ণনার সময় উক্ত পরিভাষা ব্যবহার করেন। ১৮৮০ ও ’৯০ এর দশকে, ক্রপোৎকিন যখন সবেমাত্র লেখালেখি করছেন, তখনই ডারউইনের ধারণা মার্কেট লিবারেলদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করল। বিশেষকরে ডারউইনের ‘বুল ডগ’ থমাস হাক্সলি ও ইংরেজ প্রকৃতিবাদী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস। তারা একে উপস্থাপন করেন প্রাকৃতিক ইতিহাসের— প্রায়শই যাকে বলা হয় ‘গ্ল্যাডিয়েটরিয়াল দৃষ্টিকোণ‘, তাকে প্রতিষ্ঠা করতে। ঠিক যেভাবে বক্সিং রিং এ বক্সাররা বা মার্কেট ফ্লোরে যেভাবে বন্ড ট্রেডার্সরা মারামারি করি টিকে থাকে সেভাবেই প্রজাতিসমূহ পরস্পর যুদ্ধ করে টিকে থাকার জন্য, এবং যারা শক্তিশালী তারাই জয়ী হয়।

    প্রাকৃতিক নির্বাচনের অনুঘটক হিসেবে সহযোগিতাও প্রতিযোগিতার মতোই নিশ্চিত একটি ব্যাপার— ক্রপোৎকিনের এই প্রত্যুত্তর একেবারে মৌলিক কিছু ছিল না।

    ক্রপোৎকিন নিজেও তা কখনো সে দাবি করেননি। তিনি তখনকার সবচেয়ে উত্তম জীববিজ্ঞানী, প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান থেকে নিয়ে তার ধারণাগুলোকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাথে সাইবেরিয়ায় তার নিজের গবেষণাতো ছিলই। এরই সাথে নিয়েছেন রুশ বিবর্তন তত্ত্বের বিকল্প একটি ধারা থেকেও তিনি নিজের ধারণাটি গ্রহণ করেছেন, যেটা ইংরেজ অতি–প্রতিযোগীয় ধারণাকে ক্রপোৎকিনের ভাষ্যমতে “অর্থহীনতার পেশি” বলে দাবি করত। “কেসলার, সেভেরস্টভ, মেনজবির, ব্র্যান্ডট— চারজন অসাধারণ রুশ প্রাণীবিজ্ঞানী, আরেকজন কম খ্যাতিমান ব্যক্তি, পোলাইকভ ও আমি, আমরা সবাই ওই পথেরই পথিক।”

    তাও, ক্রপোৎকিনের অবদানের স্বীকৃতি আমাদের দিতেই হবে। উনি সাধারণ একজন ভ্রমণকারী থেকেও অনেক বেশি কিছু ছিলেন। সম্রাজ্যবাদের জয়জয়কার চলছে যে সময়ে তখন ইংরেজ ডারউইনবাদিরা শুধু নয় প্রায় প্রত্যেকেই উনার মতো মানুষদের সফলভাবে অবজ্ঞা করে গেছেন। কিন্তু তার সতর্কবাণী তারা উপেক্ষা করতে পারেননি। এর একটি কারণ হয়তো এই যে ক্রপোৎকিন তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে উপস্থাপন করেছেন অপেক্ষাকৃত বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। আর এর ফলে ডারউনিয়ান সংস্করণটির জয়জয়কার যে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া উদারবাদী ক্যাটাগরির অসচেতন প্রতিচ্ছবিই ছিল যে শুধু ছিল না তা অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। (মার্ক্সের ভাষ্যমতে মানুষের এনাটমি এপের এনাটমির চাবিকাঠি।) এটা ব্যাবসায়ী শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে সর্বজনীন করার এক প্রচেষ্টা ছিল। ডারউইনবাদ তখনো কাণ্ডজ্ঞানকে পুনর্গঠনের জন্য সচেতন ও সামরিক এক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল। একে একপ্রকারের হবু মধ্যপন্থী বিদ্রোহও বলা চলে কেননা তা এক নতুন মধ্যপন্থা তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ তা সফল হতে পারেনি। এর এক বড় কারণ ছিল ক্রপোৎকিনের প্রতিউত্তর।

    ছবি: রিকার্ডো লেভিনস

    লিবেরাল বুদ্ধিজীবিরা কেন এত অস্বস্তি বোধ করছিল তা ভাবা কঠিন কিছু না। ক্রপোৎকিনের মিউচুয়াল এইড বইয়ের বিখ্যাত প্যাসেজটাই ধরুন, যা পূর্ণাঙ্গরূপে উদ্ধৃত হবার যোগ্যতা রাখে: “নেকড়ের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ঘোড়া বা অন্যান্য জাবরকাটা প্রাণীদের যা একসাথে বৃত্ত রচনা করতে প্ররোচিত করে তা ভালোবাসা বা মমত্ব না, বা নেকড়েরা যে কারণে শিকার করবার জন্য দল তৈরি করতে প্ররোচিত হয় তাও ভালোবাসা নয়, যার দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বেড়ালছানা বা ভেড়ারা খেলা করে বেড়ায় তাও ভালোবাসা নয়, অথবা ডজনে ডজনে প্রজাতির পাখিরা যে একসাথে শরৎকালীন আবহাওয়ায় সময় কাটাতে প্ররোচিত হয় তার কারণও ভালোবাসা নয়। এবং নদী পারাপারের উদ্দেশ্যে হাজারে হাজার হরিণ যে ফ্রান্সের সমান বিশাল কোনো ভূমিজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভিন্ন ভিন্ন গোত্র তৈরি করতে প্ররোচিত হয় তার কারণও ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত মমত্ববোধ নয়। এ এমন এক সহজাত প্রকৃতি যা মানুষ ও প্রাণীর অত্যন্ত দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনের ফসল, ভালোবাসা বা ব্যক্তিগত মমত্ববোধ নয়। এটি সবাইকে শিখিয়েছে কীভাবে সহপ্রাণীর থেকে মিউচুয়াল এইডের মাধ্যমে তার শক্তি ধার করে সামাজিক জীবনকে সুখকর বানানো যায়। মানুষের সমাজও ভালোবাসা বা সহমর্মিতার উপর দাঁড় করানো নয়। আসলে তা হলো সংহতি— হোক তা সহজাত প্রকৃতি হিসেবে। আর এ সংহতি হলো প্রত্যেক সহমানবের থেকে মিউচুয়াল এইডের মাধ্যমে ধার করা শক্তি, সবার সুখের মাধ্যমে একের সুখ আর একের মাধ্যমে সবার সুখ— এই নির্ভরশীলতার শক্তি, ন্যায় ও সমতা এই ধারণা প্রবর্তন করে অন্য সব ব্যক্তির অধিকার আদায়ের মাধ্যমেই নিজেরটা আদায় সম্ভব— এই শক্তিসমূহের অচেতন স্বীকৃতি। এইসব বিস্তর ও দরকারি ভিত্তির উপরই উচ্চতর নৈতিক অনুভূতির বিকাশ ঘটে।”

    এর প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা দেখলেই বুঝা যায়। ক্রপোৎকিনের পয়েন্টগুলোর সাথে মীমাংসার জন্য অন্তত দুটি ফিল্ড— সোশিয়োবায়োলজি ও বিবর্তনীয় মনোবিদ্যা গঠন করা হয়েছিল। এসব ফিল্ডের ধারণার চলনশক্তি হলো রিচার্ড ডকিনসের ভাষ্যমতে আমাদের “স্বার্থপর জিন”। ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী জে.বি.এস. হ্যাল্ডেন যখন বলেছিলেন যে তিনি তার জীবন “দুই ভাই, দুই সৎ ভাই অথবা আটজন কাজিন”কে বাঁচানোর জন্য দিতে রাজি আছেন, তিনি সেই ক্যালকুলাসই তোতা পাখির মতো আওড়াচ্ছিলেন যেটা ক্রপোৎকিনের প্রতিউত্তরের জন্য বানানো হয়েছিল; ঠিক যেমন “প্রগতি”র ধারণা তৈরি করা হয়েছিল কন্ড্রিয়ারনককে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর “জরুরি অবস্থা” তথা “স্টেট অফ একসেপশন” বানানো হয়েছিল বাকুনিনকে দেখে নেয়ার জন্য। “স্বার্থপর জিন” পরিভাষাটি এমনি এমনি নির্বাচন করা হয়নি। ক্রপোৎকিন দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে প্রকৃতিতে এমন নিয়মও রয়েছে যা স্বার্থপরতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডারউইনবাদীদের এখন একমাত্র ছল হলো প্রকৃতির সবচেয়ে দরদী, আত্মবিসর্জনী ও সামাজিক চরিত্র আসলে স্বার্থান্বেষী— এটা প্রমাণ করা।

    ডান–বুদ্ধিজীবিদের ক্রপোৎকিনের পেশকৃত চ্যালেঞ্জ টক্কর দেয়ার প্রবণতা না হয় বুঝলাম। আগেই বলেছি যে “প্রতিক্রিয়াশীলদের” কাজই এটা। তারা রাজনৈতিক সৃজনশীলতার মধ্যে কোনো মূল্য খুঁজে তো পানই না বরং একে বিপজ্জনক মনে করেন। যার ফলে ডান–বুদ্ধিজীবিদের কাজই হলো বামেদের দ্বারা প্রদানকৃত ধারণার প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করা। কিন্তু বাম–বুদ্ধিজীবিদের কী অবস্থা?

    এখানে ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। যেখানে ডান–বুদ্ধিজীবিরা ক্রপোৎকিনের বিবর্তনীয়–সম্পূর্ণবাদকে টক্কর দেয়ার জন্য পুরো বৌদ্ধিক সিস্টেমের প্রবর্তন করেছেন, মার্ক্সবাদী–বামেরা এমন ভান ধরেছিল যেন [এ বিষয়ে] ক্রপোৎকিনের হস্তক্ষেপ আদতে ঘটেইনি! এটা বলাই বাহুল্য যে মার্ক্সবাদিরা ক্রপোৎকিনের সহযোগিতামূলক–ফেডারেলবাদের উত্তর দিয়েছিলেন মার্ক্সের নিজের কাজকে বিকশিত করার মাধ্যমে। সে কাজগুলো টানা হয়েছিল একদম বিপরীত দিক থেকে। অর্থাৎ তার সবচেয়ে “প্রগতিশীল” কাজগুলো। মিউচুয়াল এইডের মূল্যবান অর্ন্তদৃষ্টিকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছিল। মার্ক্সবাদী ও বামঘেঁষা পণ্ডিতগণ ক্রপোৎকিনের কাজকে “লাইফবোট সোশালিজম” আর “নাইভ ইউটোপিয়ানিজম” বলে এমনভাবে বিদ্রুপ করা শুরু করেছিল যে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী স্টিফেন জে গোউল্ড তার এক নামকরা প্রবন্ধে বলতে বাধ্য হয়ে হয়েছেন, “ক্রপোৎকিন কোনো পাগল ছিলেন না।”

    এরূপ কৌশলগত খারেজীপনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

    এক হতে পারে খাঁটি উপদলীয়বাদ। আগেই বলা হয়েছে যে ক্রপোৎকিনের বুদ্ধিবৃত্তিক হস্তক্ষেপ বৃহত্তর এক রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ ছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর ভাগজুড়ে কল্যাণ–রাষ্ট্রের ভিত গড়া হচ্ছিল। এর ভিত্তিভূমি মূলত গড়ে দিয়েছিল বিভিন্ন মিউচুয়াল এইড দল যা প্রথমদিকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল এবং পরে আস্তে আস্তে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টিগুলোর দ্বারা দখল হয়ে গিয়েছিল। বিসমার্ক অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি জার্মান কল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিলেন শ্রমিক শ্রেণিকে “ঘুষ” দেয়ার জন্য যাতে তারা সমাজতান্ত্রিক না হয়ে যায়। অপরদিকে [রাষ্ট্রবাদী] সমাজতান্ত্রিকগণ চাচ্ছিলেন সোশাল ইন্সুরেন্স থেকে শুরু করে পাবলিক লাইব্রেরিগুলো তাদের নির্মাতা: মহল্লা ও সিন্ডিকালিস্ট দলগুলো পরিচালনা না করে উপর থেকে নিচ তলার ভ্যানগার্ড পার্টি তা পরিচালনা করুক। এই পরিপ্রেক্ষিতে উভয় দলই ক্রপোৎকিনের নৈতিক সমাজবাদকে সর্বশ্রেষ্ঠ অবশ্য পালনীয়র মতো “ভাঁড়ামি” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। মনে করিয়ে দিতে চাই, অন্তত অংশত ঠিক এই কারণগুলোর জন্যই নৈরাজ্যবাদ ও মুক্তিপরায়ন মার্ক্সবাদী ভাবনাগুলো ১৯০০ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণির মাঝে লেনিন ও কাউটস্কির মার্ক্সবাদের তুলনায় অধিক জনপ্রিয় ছিল। বলশেভিক পার্টির লেনিনীয় অংশের বিজয় (তখন তাদের ডানপন্থী বলশেভিক নামে ডাকা হতো) এবং তাদের দ্বারা সোভিয়েত, প্রলেতকুলত এবং অন্যান্য নিচ থেকে উপরতলার কর্মোদ্যোগকে দমনের মাধ্যমে এই বিতর্কের ইতি ঘটে।

    ছবি: ন্যান্সি ওয়েট

    কিন্তু আরেকটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে। এই ব্যাখ্যা সনাতন মার্কসবাদ ও সমকালীন সমাজ তত্ত্বের “অবস্থানবাদের” সাথে সম্পর্কযুক্ত। একজন র‍্যাডিকাল বুদ্ধিজীবীর কাজ কী? বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবিই নিজেকে কোনো না কোনো রকমের

    র‍্যাডিকাল মনে করেন। তাত্ত্বিকভাবে তারা সবাই মার্ক্সের সাথে একমত যে পৃথিবীকে বুঝতে পারাই যথেষ্ঠ নয়, বুঝতে হবে পৃথিবীটাকে বদলানোর জন্য। কিন্তু বাস্তবে এর মানে কী?

    মিউচুয়াল এইডের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে ক্রপোৎকিন একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন: র‍্যাডিকাল বুদ্ধিজীবির কাজ হলো “দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের সত্যিকার অনুপাত” পুনরুদ্ধার করা। এটি শুনে অস্পষ্ট মনে হবে, কিন্তু তিনি তা আরও পরিষ্কার করেন। র‍্যাডিকাল পণ্ডিতগণ “অতীতের গহবরে সংরক্ষিত রাখা হাজারটা তথ্যকে সমসাময়িক জাতিতত্ত্বের জ্ঞাণ দ্বারা ব্যাখা করবেন। যুগ যুগ ধরে মানুষে–মানুষে কী এত বিভেদ সৃষ্টি করেছে সে জ্ঞান দিয়েই একই সাথে কোন জিনিসটা মানুষকে মানুষের সাথে ঐক্যবদ্ধ করেছে সেরকম প্রতিষ্ঠানাদি তিলে তিলে পুনর্নির্মাণ করবেন।”

    এই ভূমিকার একজন রচয়িতার এখনো মনে পড়ে এই কথাগুলো পড়ে তরুণ বয়সে কতটা উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম! জাতি–কেন্দ্রিক প্রাণহীন একাডেমির ট্রেনিং থেকে কত ভিন্ন এসব! মার্ক্সের সাথে মিলে এই সুপারিশ পড়া উচিত। মার্ক্স নিজের সমগ্র উদ্যম দিয়ে পুঁজিতান্ত্রিক পণ্য উৎপাদনের বিকাশ ও সংগঠন সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। পুঁজি বইটিতে সহযোগিতার প্রতি তখনই মনোযোগ প্রদান করা হয়েছিল যখন কো–অপারেটিভগুলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তার মতে সেখানে শ্রমিকেরা “পুঁজির পদতলেই এক ভিন্ন জীবন–যাপন করে”। মনে হচ্ছিল যে দুই দুই প্রকল্প পরস্পরের ভালোই সম্পূরক হবে। একজন বিচ্ছিন্ন (alienated) শ্রমিক ঠিক কোন জিনিসটা হারায় তা বোঝাই ছিল ক্রপোৎকিনের লক্ষ্য। কিন্তু দুইটিকে একত্র করলে বোঝা যাবে কীভাবে এমনকি পুঁজিবাদ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কমিউনিজমের (মিউচুয়াল এইড) ভিত্তিভূমিতে দাঁড়ানো। যদিও এ এমন এক কমিউনিজম যাকে পুঁজিবাদ স্বীকৃতি দেয় না। এই কমিউনিজম একটা জ্যান্ত, চলমান ও প্রয়োগিক বাস্তবতা। কোনো বিমূর্ত, সুদূর, অসম্ভব ধারণা নয়। এই বাস্তবতার সাথে আমরা প্রতিনিয়ত ও প্রতিদিন বিভিন্ন মাত্রায় জড়িত হই। এ এমন এক জিনিস যাকে ছাড়া ফ্যাক্টরিও চালানো সম্ভব না। যদিও তা গোপনভাবে ফাঁকে ফোকড়ে প্রয়োগকৃত হয়। ইন্টারনেটে আজকাল বলা হয় সম্প্রতি পুঁজিবাদ নাকি সৃজনী–সহযোগিতার উপর পরজীবিতা করছে।

    এটা বাজে প্রলাপ। কারণ সম্প্রতি নয়, বরাবরই তাই ছিল।

    এ এক মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প। কিন্তু কোনো এক কারণে কেউই তা করতে আগ্রহী নয়। হায়ারার্কিকাল ও শোষণমূলক সম্পর্কের কীভাবে পুনরূৎপাদন, প্রত্যখান হয় ও এসব কীভাবে মিউচুয়াল এইডের সাথে পেঁচিয়ে যায়; কীভাবে লালনের সম্পর্ক সহিংসতার সম্পর্কের সাথে বহাল থাকে, কিন্তু তাও সহিংসতার সিস্টেম দিয়েই কীভাবে তাদের ধরে রাখা হয় আঠার মতো যাতে এই সম্পর্কগুলো ভেঙে না পড়ে— এসব সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে ট্র্যাডিশনাল মার্ক্সবাদ ও সমসাময়িক সমাজ তত্ত্ব একগুঁয়েভাবে প্রত্যাখান করেছে কেননা তারা দাক্ষিণ্য, সহোযোগিতা বা পরার্থপরতাকে বুর্জোয়া বিভ্রম মনে করে। “ইউনিয়ন” এর থেকে সংঘর্ষ ও অহংজনিত স্বার্থপরতাকে বেশি আকর্ষণীয় ভাবা হয়। (একইভাবে বহু বাম–একাডেমিকদের কার্ল স্মিট ও টুরগোট নিয়ে লেখালেখি করতে দেখা যায় তবে বাকুনিন ও কন্ড্রিয়ারনক নিয়ে লেখেন এমন একাডেমিক খুঁজে পাওয়া খুবই মুশকিল।) স্বয়ং মার্ক্স যেমনটি বলেছিলেন যে পুঁজিবাদী সমাজে জীবনের কম সংখ্যক কিছু বছর আমাদের (সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বাস্তবিক) পুঁজি বাড়ানোর নৈরাশ্যজনক কৌশল ও সেই কৌশলের উপদেশ শুনে কাটিয়ে দিতে হয়। এসবকে সমালোচনা হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু আপনি যে জিনিসটার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দাবি করেন তার সম্পর্কেই কথা বলে সারাটা জীবন পার করে দেন, সে জিনিসটা ছাড়া আপনি কোনো কিছু কল্পনাই করতে পারেন না, তাহলে আপনি কোন অর্থে সে জিনিসটার বিরুদ্ধে? কখনো কখনো মনে হয় বাম–বুদ্ধিজীবিগণ নয়াউদারবাদী অর্থনীতিবাদের সবচেয়ে বিদ্ঘুটে দিকগুলোকে অন্তরীকরণ করে ফেলেছেন। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে এসব বিশ্লেষণ (কোনো নামকরণ করছি না) পড়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, এসব বিশ্লেষণের সাথে “স্বার্থবাদী জিনের” সামাজিক–জীবতাত্ত্বিক ধারণার পার্থক্যটা কী!

    আসলে শত্রুর এরূপ অন্তরীকরণ তার চূড়ায় পৌঁছেছিল ১৯৮০ ও ‘৯০ এর দশকে যখন আন্তর্জাতিক বাম সম্পূর্ণভাবে পিছু হটছিল। এর মধ্যে বহু জল গড়িয়েছে। ক্রপোৎকিন কি আবারও প্রাসঙ্গিক? বলাই বাহুল্য ক্রপোৎকিন সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিলেন। কিন্তু এই বই প্রকাশিত হচ্ছে এই বিশ্বাসে যে এক নতুন বিপ্লবী প্রজন্ম এসেছে যাদের মধ্যে অনেকে কখনো এরূপ ধারণার সাথে সরাসরি পরিচিত হয়নি। তবুও তারা তাদের বাপ–দাদার থেকে ঠান্ডা মাথায় বৈশ্বিক অবস্থার মূল্যায়ন করতে পারে কারণ তারা জানে যে তারা যদি তা না করে তাহলে অনাগত পৃথিবী তাদের জন্য জাহান্নাম হয়ে দাঁড়াবে।

    আসলে ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। মিউচুয়াল এইডের রাজনৈতিক ভাবনাগুলো নতুন প্রজন্ম দ্বারা গ্রহজুড়ে নানা সামাজিক আন্দোলনে পুনরায় আবিষ্কৃত হচ্ছে। উত্তরপূর্ব সিরিয়ার গণতান্ত্রিক ফেডেরেশন (রোজাভা) ব্যাপকভাবে ক্রপোৎকিনের সামাজিক ইকোলজি ও কোঅপারেটিভ ফেডেরালবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আর তারা তা হয়েছে আংশিক মারে বুকচিনের লেখার দ্বারা আর আংশিক তাদের নিজেদের কুর্দি ঐতিহ্য এবং বিপ্লবী অভিজ্ঞতা দ্বারা।

    পুঁজিবাদী আধুনিকতাবাদের জ্ঞানের কাঠামোর বিপরীতে কুর্দি বিপ্লবিরা নতুন সামজিক বিজ্ঞান গড়ার দায়িত্ব নিয়েছে। সেখানকার যৌথ প্রকল্পগুলোতেঅংশ নেয়া মানুষজন সত্যিই “তিলে তিলে মানুষ ও সংগ্রামকে ঐক্যবদ্ধ রাখার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্নির্মাণ” করা শুরু করেছে। বৈশ্বিক উত্তরে, বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের অকুপাই আন্দোলন থেকে শুরু করে কোভিড–১৯ মোকাবিলার জন্য নানান সংহতি প্রজেক্টে “মিউচুয়াল এইড” একটিভিস্ট ও জার্নালিস্টদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বাক্যাংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে গ্রিসে অভিবাসী সংহতি সমাবেশ ও জাপাতিস্তার সমাজ সংগঠনে মিউচুয়াল এইডের আহবান জানান হচ্ছে। এমনকি পণ্ডিতদের দ্বারা সময় সময় এর ব্যবহারের গুজবও শোনা যাচ্ছে।

    ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

    পুঁজিবাদ ও জাতীয়তাবাদ মানব প্রকৃতির গভীরে গ্রোথিত কিংবা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব অলঙ্ঘনীয়— এই ভাবনা চ্যালেঞ্জ করার সাহস ১৯০২ সালে (মিউচুয়াল এইড বইয়ের প্রকাশ সন) খুব কম সংখ্যক বিজ্ঞানীরই ছিল। যারা সে চ্যালেঞ্জ করেছিল তাদের ‘পাগল’ তকমা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু একেবারেই খারিজ করার মতো না এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব যেমন আইনস্টাইনকে ডাকা হয়েছিল ‘উদ্ভট’ বলে আর এমন ভাব করা হয়েছিল যে তাদের রাজনৈতিক দর্শন তাদের আজব চুলের স্টাইলের মতোই গুরুত্বহীন ছিল। কিন্তু বাকি দুনিয়া এগিয়ে চলছে। বিজ্ঞানীগণ, বিশেষ করে সমাজ বিজ্ঞানীগণ কি অনুসরণ করবে?

    আমরা এমন এক সময়ে এই ভূমিকাটি লিখছি যখন সারা বিশ্বে বর্ণবাদ ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ চলছে। এমন এক সময় যখন সরকার ও রাষ্ট্র নৈরাজ্যবাদিদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়াচ্ছে ঠিক যেমনটি ক্রপোৎকিন সময়ে তারা ছড়াচ্ছিল। শুনে আজব মনে হতে পারে কিন্তু মনে হচ্ছে এখন সেই “আইন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি ঘৃণাকারী” মানুষটির জন্য মদের গ্লাস উঁচু করার একদম উপযুক্ত সময়। তিনি এমনভাবে বিজ্ঞানের চেহারা পরিবর্তন করেছিলেন যার প্রভাব এখনো আমরা পাই। পিওতর ক্রপোৎকিনের বুদ্ধিবৃত্তি ছিল সতর্ক, রঙিন, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও বিপ্লবী। আর আশ্চর্যজনকভাবে তা কিন্তু খুব সুন্দরভাবে যুগোপযোগিও হয়েছে। ক্রপোৎকিন পুঁজিবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক–সমাজতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমলাতান্ত্রিক–সমাজতন্ত্র সম্পর্কে উনার ভবিষ্যৎবাণী বারবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। কে এ সম্পর্কে ঠিক ছিল এ বিষয়ে আজ আর কোনো সন্দেহ নেই।

    অনেকেই আছে যারা এখনো কঠোরভাবে এর সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেন। কেউ আছেন যারা অনেক আগে ছেড়ে দেয়া জাহাজে উঠার স্বপ্ন দেখেন। আবার কেউ কেউ যা ভাবেন তা ভাবার জন্য টাকা পান। আর এই বিনয়ী ভূমিকার লেখকদের ক্ষেত্রে বলব যে আমরা আবারও আশ্চর্যান্বিত যে, বহু দশক পর বইটি পড়ার পরও এর কেন্দ্রীয় যুক্তির সাথে আমরা এখনো কতটা একমত! পুঁজিবাদী বর্বরতার একমাত্র বিকল্প রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্র। এ হলো তার ফল, যা এই মহান ভূগোলবিদ আমাদের কখনো ভুলতে দেননি, “যার প্রবণতা সমাজে এখন আপাত” এবং যা সবসময়ই “কোনো না কোনোভাবে বর্তমানে আসন্ন।”

    নতুন দুনিয়া গড়তে হলে আমাদের চোখের সামনে যা আছে এবং যা সবসময়ই ছিল তা পুনরায় উদ্ঘাটন করতে হবে।

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। ক্ষমতা/জ্ঞান ছাড়িয়ে: ক্ষমতা, অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার একটি অন্বেষণ

    ডেভিড গ্রেইবার ।। ক্ষমতা/জ্ঞান ছাড়িয়ে: ক্ষমতা, অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার একটি অন্বেষণ

    • অনুবাদ: কাজী রবিউল আলম এবং রাদিয়া আউয়াল তৃষা

    ‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস’–এর নৃবিজ্ঞান বিভাগের আয়োজিত“ম্যালিনোস্কি বক্তৃতা” প্রোগ্রামে ২০০৬ সালের ২৫শে মে ডেভিড গ্রেইবার(David Graeber) এই বক্তৃতা প্রদান করেন। গ্রেইবার প্রদত্ত এই বক্তৃতার শিরোনাম ছিল Beyond Power/Knowledge: an exploration of the relation of power, ignorance and stupidity (ক্ষমতা/জ্ঞান ছাড়িয়ে: ক্ষমতা, অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার একটি অন্বেষণ)। বক্তৃতাটিকে পরবর্তীতে পরিমার্জনা করে প্রবন্ধে রূপ দেন গ্রেইবার। Dead zones of the imagination: On violence,bureaucracy and interpretive labor শিরোনামে এর পরিমার্জিত রূপটি প্রকাশিত হয় Journal of Ethnographic Theoryএর ভলিয়ুম ২ এর ২য় সংখ্যায় (২০১২)। গ্রেইবারের এই ম্যালিনোস্কি বক্তৃতা যৌথভাবে অনুবাদ করেছেন কাজী রবিউল আলম এবং রাদিয়া আউয়াল তৃষা। অনুবাদকদ্বয় উভয়েই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। অনুবাদটি প্রথম প্রকাশ করে বোধিচিত্ত। বোধিচিত্তের অনুমতি সাপেক্ষে লেখাটি পুনঃসম্পাদনা করে অরাজে ছাপা হলো। – সম্পাদক

    ডেভিড গ্রেবার বক্তৃতা দিচ্ছেন। ম্যাগডেনহাস অকোপেশান, ইউনিভার্সিটি অফ আমস্টারডাম, ২০১৫। তার পাশে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এনযো রোসি।

    ১.
    আমলাতন্ত্র সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত গল্প দিয়ে শুরু করি।

    আমার মা গত বছর জুড়ে বেশ কয়েকটি স্ট্রোক করেছিলেন। শীঘ্রই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠল যে তিনি কারও সহায়তা ছাড়া বাড়িতে একা বসবাস করতে অক্ষম; যেহেতু বাড়িতে দেখাশুনা করা তার বীমার অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সে কারণে অনেক সমাজকর্মী আমাদের পরামর্শ দিলো তাকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য। একজনের কাছে কেবল ছয় হাজার ডলার থাকলেই সে হাসপাতাল সেবা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। আমরা তার সঞ্চয় স্থানান্তরের ব্যবস্থা করলাম। আমার ধারণা মতে, এটি ছিল একটি প্রযুক্তিগত কেলেঙ্কারি। যদিও সরকার হাজার হাজার কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন যাদের প্রধান কাজ হচ্ছে এটি কীভাবে করা যায় তা জনগণকে বলা, তা সত্ত্বেও এটি ছিল একটি অদ্ভুত ধরনের কেলেঙ্কারি। কিন্তু এর অল্প কিছুদিনের মধ্যে, তিনি আরেকটি গুরুতর স্ট্রোকের শিকার হন এবং তাকে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য একটি নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হয়। তিনি যখন সেখান থেকে ছাড়া পান তখন তার বাড়িতে পরিসেবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেখানে একটি সমস্যা দেখা দেয়: তার সামাজিক সুরক্ষার চেক সরাসরি তার একাউন্টে জমা হয়ে গিয়েছিল। সে অনেক কষ্টে কেবল তার নাম সই করতে সক্ষম হচ্ছিলেন। ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার একাউন্টের অ্যাটর্নি ক্ষমতা পাচ্ছিলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মাসিক বিল পরিশোধ করতে পারছিলাম না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত মাসিক বিল দ্রুত বাড়তে থাকবে এবং তাকে অযোগ্য ঘোষণা করবে। যদিও আমি ইতোমধ্যে হাসপাতাল সংক্রান্ত অনেক নথি পূরণ করেছিলাম তার বিল পরিশোধের যোগ্যতা অর্জনের জন্য।

    আমি তার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে যাই, প্রয়োজনীয় ফর্মগুলো নেই। সেগুলো নার্সিং হোমে নিয়ে আসি। নথিগুলো নোটারি করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট নার্স আমাকে জানান যে তাদের নিজস্ব একজন নোটারি আছেন। কিন্তু তার জন্য আগে থেকে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করতে হবে। সে ফোনটি তুলে আমাকে একটি নীরস কণ্ঠস্বরের ব্যক্তিকে ধরিয়ে দিলেন, যিনি শেষ পর্যন্ত নোটারির সঙ্গে আমাকে সংযোগ করিয়ে দিলেন। নোটারি আমাকে জানাল যে প্রথমে আমাকে সামাজিক সেবার প্রধানের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফোনটি কেটে দিলো। আমি তার নাম ও রুম নম্বর নিলাম এবং যথাযথভাবে লিফট দিয়ে নিচে নেমে এসে তার অফিসে উপস্থিত হলাম। এসে দেখলাম, তিনি আর কেউ নন ফোনের সেই নিরস কণ্ঠস্বরের ব্যক্তি। সামাজিক সেবার প্রধান ফোনটি উঠালেন এবং বললেন “মার্জরি, আপনি এই নির্বোধ লোকটিকে পাগল করে তুলেছেন এবং সাথে সাথে আমাকেও”, এবং পরের সপ্তাহের প্রথম দিকে আমার জন্য একটি সাক্ষাৎকারের তারিখ নির্ধারণ করলেন।

    “ঠিক আছে, আমি করেছি, কিন্তু নোটারি আমাকে যা করতে বলেছে আমি ঠিক তাই করেছি”।

    “তবে এখানে স্পষ্টতই স্বাক্ষর লেখা আছে”।

    “ও, হ্যাঁ, এটা দিয়ে কাজ চলবে তো নাকি? আমার ধারণা সে আমাকে ভুল বলেছে। আবার। ঠিক আছে…সব তথ্য এখানে আছে, তাই না? শুধু একটির জায়গায় অন্যটি দেওয়া হয়েছে। এটা কি আসলেই কোনো সমস্যা? এটা একধরনের চাপ এবং আমার পক্ষে নোটারির সাথে আবার একটা সাক্ষাৎকারের সময় পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সম্ভব নয়”।

    “ঠিক আছে, কিন্তু আমরা স্বাক্ষর প্রদানকারীর স্বশরীরে উপস্থিত ব্যতীত এই ধরনের ফরম গ্রহণই করি না”।

    “আমার মা স্ট্রোক করেছেন। তিনি শয্যাশায়ী। প্রথমত, এই কারণেই আমার অ্যাটর্নি ক্ষমতা দরকার”।

    সে বলল, এ বিষয়ে ম্যানেজারের সাথে কথা বলে তারপরে জানাবে। দশ মিনিট পরে ফিরে এসে সে জানাল যে, ব্যাংকের বর্তমান অবস্থায় তাদের পক্ষে এই ফরমটি গ্রহণ করা সম্ভব নয় এবং এমনকি সেটি যদি সঠিকভাবে পূরণ হয় তারপরও। এ ক্ষেত্রে আমার মায়ের ডাক্তারের কাছে থেকে একটি চিঠি লাগবে যেখানে উনি উল্লেখ করবেন যে আমার মা এই ধরনের নথিতে স্বাক্ষর করতে মানসিকভাবে সক্ষম। আমি তাকে বললাম যে এর আগে কেউ আমাকে এ ধরনের চিঠির বিষয়টি উল্লেখ করেনি।

    ম্যানেজার যে ব্যক্তিটি শুনছিলেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন “কী?” “আপনাকে কে এই ফরমগুলো দিয়েছিল এবং এই চিঠির বিষয়টা আপনাকে বলেনি?”

    যেহেতু আপাত অপরাধী প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের সুন্দর কর্মচারিদের মধ্যে একজন ছিলেন, তাই আমি প্রসঙ্গটি পরিবর্তন করলাম, এবং উল্লেখ করলাম যে ব্যাংকবহিতে স্পষ্টতই লেখা আছে, “ডেভিড গ্রেইবারের বিশ্বস্ততায়”। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দিলেন যে এটি কেবল তিনি মারা গেলে সে ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

    যেমনটি ঘটেছিল, পুরো সমস্যাটি শীঘ্রই একাডেমিক হয়ে উঠল: আমার মা সত্যিই কয়েক সপ্তাহ পর মারা গেলেন।

    এই সময়ে, এই অভিজ্ঞতা আমার মধ্যে একধরনের তীব্র উদ্বেগ তৈরি করে। সাধারণভাবে আমি এই ধরনের বিষয় থেকে সম্পর্কবিহীন একটি জীবন অতিবাহিত করার অভিজ্ঞতা থেকে পরবর্তীতে আমি আমার বন্ধুদের প্রায়শই জিজ্ঞেস করতে থাকি যেঃ বেশিরভাগ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কি এরকমই? বন্ধুদের বেশিরভাগই সন্দেহ করেছিল যে সেটি এরকমই ছিল। নিশ্চিতভাবে, নোটারি অস্বাভাবিকভাবে অযোগ্য ছিলেন। এরই মধ্যে, নিউইয়র্ক–এর মোটরযান বিভাগের একজন অজানা কর্মকর্তার একটি ভুলের কারণে আমাকে ইতোমধ্যে একমাস সময় ব্যয় করতে হয়েছে। কর্মকর্তাটি ভুল করে আমার প্রদত্ত নাম দেয়ঃ

    “Daid, যেখানে ভেরিজোন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ না করাই ভালো, যিনি আমার পদবি উচ্চারণ করেছিলেন “Grueber”।

    যে কোনো ঐতিহাসিক কারণেই— সরকারি এবং বেসরকারি আমলাতন্ত্র এমনভাবে পরিচালিত হয় যার ফলে নিশ্চিতভাবেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশই তাদের দায়িত্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী পালন করতে সক্ষম হয় না। এটি একই সাথে যাকে আমি ঠিক ইউটোপীয় ঘরাণার চর্চার নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্য বলে ভেবেছি তারই একটি নমুনা বহন করে। আর যারা এই ব্যবস্থাটা চালায় তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি ব্যবস্থার সমস্যা নয়, বরং যে ব্যক্তিগুলো এর সাথে যুক্ত তাদের অদক্ষতার ফলাফল।

    এই ফরমগুলো পূরণ করতে গিয়ে আমি যেভাবে বোকামি করেছি তা ছিল একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমার কাছে সম্ভবত সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয়। যে জায়গায় “স্বাক্ষর” লেখা আছে সে জায়গায় আমি আমার নাম মুদ্রিত করেছি, তা কীভাবে আমার চোখ এড়িয়ে গেল? আর এমনটি ঘটেছিল পুরো বিষয়টি নিয়ে আমার যথেষ্ট মানসিক ও আবেগীয় শক্তি ব্যয় করা সত্ত্বেও। আমার উপর আমলাতান্ত্রিক শক্তির যে প্রভাব পড়েছিল তাকে বোঝার নিরন্তর প্রয়াসেই এই শক্তির বেশিরভাগ ব্যয় হয়েছিল বলে আমার মনে হয়। কিন্তু এখানে যা দরকার ছিল তা হলো মূলত দুই একটা ল্যাটিন শব্দের সঠিক ব্যখ্যা এবং একটি যান্ত্রিক কাজের সঠিক সম্পাদন। অদক্ষতার জন্য আমি নোটারির মুখ ঘষছিলাম এমনটা যাতে মনে হয় কিংবা কোন কারণটা আমাকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল করেছিল সে ভাবনায় সময় ব্যয় করার জন্য আমি খেয়ালই করতে পারিনি যে তারা আমাকে বোকার মতো কিছু করতে বলেছিল। এটা নিশ্চিতভাবে ভুল জায়গায় ভুল কৌশল ছিল, কারণ আমি যাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তাদের কারও পক্ষেই নিয়মগুলোকে পরিবর্তনের ক্ষমতা ছিল না। উপরন্তু, আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমি যদি তাদের সাথে মুখোমুখিও হতাম এবং একটি প্রকৃত কাঠামোগত অযৌক্তিতা সম্পর্কে অভিযোগও করতাম তবে সেটার একমাত্র সম্ভাব্য ফলাফল হতো দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু নিম্নপদস্থ ব্যক্তিকে সমস্যার মধ্যে ফেলে দেওয়া।

    একজন নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ছিল এথনোগ্রাফিক লেখালেখিগুলোতে এই বিষয়গুলোর যৎসামান্য উপস্থিতি। সর্বোপরি, নৃবিজ্ঞানিরা জন্ম, বিবাহ, মৃত্যু এবং সমরূপ আচার–অনুষ্ঠানকে নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে একটা বিশেষত্ব তৈরি করেছেন। আমরা বিশেষভাবে আচার–অনুষ্ঠানের সেই ভঙ্গী নিয়ে আগ্রহী যা সামাজিকভাবে কার্যকর: যেখানে নিছক কিছু বলা বা করাও একটি সামাজিক সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে বেশিরভাগ সমাজে সামাজিক আচার–অনুষ্ঠান নয়, বরং কাগজপত্র সামাজিকভাবে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ আমার মায়ের কথা বলা যায়, যিনি কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই সমাধিস্থ হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। আমার কাছে মায়ের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার প্রধান স্মৃতি বলতে যা মনে পড়ে তা হচ্ছে একজন দ্বিধাহীন স্বভাবসুলভ কেরানি কর্তৃক প্রদত্ত ১৪ পৃষ্ঠার একটি নথি, যা তাকে পূরণ করতে হবে মায়ের মৃত্যুর সার্টিফিকেট পাবার জন্য। এখানে কার্বন পেপারে বলপয়েন্টে লিখতে হয়েছিল যেন তিনটি কপি করা যায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম “দিনের কত ঘণ্টা সময় আপনাকে এই ধরনের ফরম পূরণ করবার জন্য ব্যয় করতে হয়?” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার ব্যান্ডেজ করা একটি হাত (ইনসিপিয়েন্ট কার্পাল টানেল সিনড্রোম–এর কারণে) উঠিয়ে সে বলল “আমার কাজই এটা”। এই ফরমগুলো ছাড়া আমার মা আইনগতভাবে–সামাজিকভাবে–মৃত নন।

    ছবি: ইন্টারনেট

    কেন তাহলে আমেরিকান বা ব্রিটিশ আচার–অনুষ্ঠান নিয়ে লিখিত বইয়ে ফরম বা কাগজপত্র নিয়ে দীর্ঘ অধ্যায় নেই? এর সুস্পষ্ট উত্তর হতে পারে কাগজপত্র হচ্ছে বিরক্তিকর। এটার বলার মতো তেমন কোনো আকর্ষণীয় দিক নেই।

    নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত উপাত্তের ঘনত্বের দিকে আকৃষ্ট হন। আমাদের হাতে যে ইন্টারপ্রিটেটিভ কৌশল আছে সেটা অর্থ(meaning) বা মর্মার্থের জটিল বিন্যাসগুলোকে উম্মোচন করবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্তঃ আচার–অনুষ্ঠানের জটিল প্রতীক, সামাজিক নাটক, কাব্যিক রূপ, আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক… এর সবগুলোর মধ্যে যে মিল রয়েছে তা হলো প্রত্যেকটিই সীমাহীনভাবে সমৃদ্ধ এবং উম্মুক্ত; কেউ যদি কেবল একটি নক্বওয়ালা (Ncwala) আচার–অনুষ্ঠান, বালিনিস মোরগ লড়াই, যাদুবিদ্যার অভিযোগ অথবা পারিবারিক কাহিনির প্রতেকটি অর্থ, উদ্দেশ্য, অনুষঙ্গ সম্পর্কে জানতে চায় তবে সেটিও সম্ভাব্য অনন্তকাল ধরে চলতে পারে: উপরন্তু কেউ যদি বৃহত্তর সামাজিক বা প্রতিকী ক্ষেত্রের সাথে এর সম্পর্ককে অনুসন্ধান করতে চায় তবে সেটিও তার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এর বিপরীতে ফরমগুলো সর্বাধিক সহজ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে ডিজাইন করা। সেখানে ব্যাখ্যা করবার মতো তেমন কিছু নেই। সাহিত্যের সাথে আমলাতন্ত্রের সম্পর্কের মধ্যেও একই সমস্যা রয়েছে। সর্বোপরি এটি একধরনের নিরানন্দ কাফকায়েস্ক১ কৌতুকের মতো বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখানেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ যে [ফ্রানৎস] কাফকা একমাত্র লেখক যিনি আমলাতন্ত্রের বাইরে গিয়েও দুর্দান্ত সাহিত্য তৈরি করেছেন: আর একবার আপনি এটি সম্পন্ন করবার পর সেখানে অন্য কারও যোগ করবার মতো তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

    এখনো, সামাজিক তত্ত্ব শূন্যতাকে ঘৃণা সহকারে পরিহার করে। আমলাতন্ত্র নিয়ে সাহিত্য এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। আমলাতন্ত্র নিয়ে যতটুকু এথনোগ্রাফিক লেখালেখি আছে— সেগুলোর প্যারাডাইম হচ্ছে হার্জফিল্ডের “উদাসীনতার সামাজিক উৎপাদন” (হার্জফিল্ড, ১৯৯২)— যেখানে “আমলাতন্ত্র হচ্ছে একটা নির্বুদ্ধিতা” এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সহজাত লোকজ মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হয়। আর এর মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের যে কোনো পরিশীলিত, সাংস্কৃতিক বোঝাপড়াটা ব্যাখ্যা করার কাজ শুরু করা যায়। এর মানে এই নয় যে, আমলাতান্ত্রিক বিধান ও নিয়মকানুনগুলো যে নিয়মিতভাবেই মানুষকে এমনভাবে আচরণ করতে বাধ্য করে যেটা অন্য যে কোনো পরিস্থিতিতে একটি বোকামির কাজ বলে বিবেচিত হবে তা এ জাতীয় কাজগুলো অস্বীকার করে। আর এটি মানুষ তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারে। কিন্তু সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সত্যকে খুব কমই পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্তত একজন একটি “হ্যাঁ, কিন্তু” প্রত্যাশা করে— যেখানে “কিন্তু” এমনকিছু উপস্থাপন করে যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

    আমরা যখন আরও গূঢ় তত্ত্বের দিকে এগিয়ে যাই, তখন এই “হ্যাঁ, কিন্তু”ও সাধারণত অদৃশ্য হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার সামাজিক তত্ত্বে, ’৫০ এবং ’৬০ এর দশকে ম্যাক্স ওয়েবার এবং তার পর থেকে মিশেল ফুকোর কাজে হেজেমোনিক ভূমিকাকে বিবেচনা করা যায়। নিঃসন্দেহে মার্ক্স বিরোধী হিসেবে তাদের খুব সহজে জনপ্রিয়তা পাওয়ার কারণ ছিল। তাদের তত্ত্বগুলো যুক্তি প্রদর্শন করে যে (প্রায়শই অমার্জিত সরলীকৃত রূপে) ক্ষমতা কেবল বা প্রাথমিকভাবে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয় বরং যে কোনো সামাজিক জীবনের এক বিস্তীর্ণ, বহুমুখী এবং অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। আমি আরও মনে করি এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে মানব ইতিহাসে এই দুইজন ব্যক্তি শুধুমাত্র বুদ্ধিমান হিসেবে আবির্ভূত হন যারা সত্যই বিশ্বাস করে আমলাতন্ত্র কাজ করে। ওয়েবার সংগঠনের আমলাতান্ত্রিক রূপগুলোকে যৌক্তিকতারই প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখেছিলেন। আর এটাকে দেখেছিলেন যে কোনো বিকল্পের চেয়ে সর্বোৎকৃষ্টরূপে, যা মানবতাকে চেতনা ও প্রতিভামুক্ত একটি আনন্দহীন “লোহার খাঁচায়” আটকানোর হুমকিস্বরূপ। ফুকো ছিলেন আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী, কিন্তু সেটি এমনভাবে যে তা আমলাতন্ত্রিক শক্তিকে আরও বেশি কার্যকর করে তোলে। শরীর, বিষয়ী, এমনকি খোদ সত্য— সবকিছুই উৎপাদিত হয় প্রশাসনিক ডিসকোর্সের দ্বারা; শাসনতান্ত্রিকতা এবং জৈবক্ষমতার মতো ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র মানব অস্তিত্বের শর্তগুলোকে এমন প্রগাঢ়ভাবে গঠন করে যা সম্ভবত ওয়েবারের কল্পনারও বাইরে ছিল।

    এই উপসংহার এড়ানো কঠিন যে, এদের উভয়ের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে সেই সময়ের আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা একটা ভূমিকা পালন করে। কারণ ঐ সময়ে সেগুলো ক্রমশ এমন প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছিল যা বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যিক প্রশাসনিক কলকব্জাগুলো পরিচালনার জন্য কার্যনির্বাহী উৎপাদনে নিবেদিত ছিল। ফুকোর বর্তমান যে উত্থান তার কারণও আসলে একই। এর উৎস অনুসন্ধান করতে গেলে টালকট পারসন এর ওয়েবার পাঠকে ‘৬০ এর দশকের বিপ্লবীরা‘ যখন খারিজ করা শুরু করে, সে ইতিহাস পর্যন্ত যেতে হয় আমাদের। আর এই বিভাজনে “যৌক্তিক বাছাই তত্ত্বের” নামে আমলাদের আরও যথার্থ প্রশিক্ষণের জন্য ওয়েবারের আশাবাদী দিকটি আরও সরল রূপে পুনঃআবিষ্কৃত হয়েছিল। অন্যদিকে হতাশাবাদী দিকটি ফুকোডিয়ানদের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল। ফুকোর উত্থান সুনির্দিষ্টভাবে জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রচেষ্টার সেই পরিসরে ঘটে যেখানে উভয়েই পক্ষান্তরে প্রাক্তন উগ্রবাদিদের জন্য স্বর্গ হয়ে ওঠে। কিন্তু সেগুলো কোনো ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতা, এমনকি ক্রমান্বয়ে কোনো ধরনের প্রকৃত সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর এটিই ফুকোকে “জ্ঞান/ক্ষমতা”–এর যোগসূত্রকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী করে তোলে। আর এই যোগসূত্রে জ্ঞানের রূপ আর সামাজিক শক্তির রূপ একই। বস্তুত এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তির রূপ একটি বিশেষ আহ্বান মাত্র।

    কোনো সন্দেহ নেই এই ধরনের যুক্তিগুলো কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক ও অনায্য। কিন্তু আমি মনে করি একটি গভীর সত্য রয়েছে। এটি কেবল এই নয় যে আমরা ঘনত্বের ক্ষেত্রগুলোর দিকে আগ্রহী, যেখানে ব্যাখ্যার দক্ষতা সর্বোত্তমভাবে প্রয়োগ করা হয়। কোনটি কৌতূহলোদ্দীপক ও কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তা চিহ্নিত করবার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা রয়েছে আমাদের। ঘনত্বের স্থানগুলোকে অনুমান করার মানে ক্ষমতার স্থানগুলোও অনুমান করা। এটা যে হরহামেশাই ঘটে না আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা আমাদের তা দেখায়।

    এই প্রবন্ধটি আমলাতন্ত্র অথবা নৃবিজ্ঞান এবং নৃবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞানকাণ্ডে আমলাতন্ত্র উপেক্ষিত হওয়ার কারণ নিয়ে নয়। এই প্রবন্ধটি মূলত সহিংসতা নিয়ে। আমি যে যুক্তিটি দিতে চাই তা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো একধরনের স্বেচ্ছাকৃত অন্ধত্ব তৈরি করে। এই পরিস্থিতি তৈরি হয় মূলত সহিংসতার দ্বারা। এখানে সহিংসতা বলতে কাঠামোগত সহিংসতা বোঝানো হচ্ছে। আর কাঠামোগত সহিংসতা বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি একটি ব্যাপ্তিশীল বৈষম্যের ধরন, যা শারীরিক ক্ষতির হুমকির দ্বারা সমর্থনপুষ্ট। স্থূলভাবে বলতে গেলে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সহজাতভাবে এতটা বোকা নয় অথবা, তারা এমন কিছু আচরণ সৃষ্টি করে যেগুলো নিজেদেরকেই বোকা হিসেবে চিহ্নিত করে। বরং সেগুলো সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবার এমন একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া যা ইতোমধ্যে বোকা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, কারণ সেগুলো কাঠামোগত সহিংসতার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি মনে করি এই দৃষ্টিভঙ্গি এমন কিছু সম্ভাব্য অন্তর্দৃষ্টি দেয় যা একই সঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক ও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক তত্ত্বগুলোর সরলীকৃত ধরন ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধরনের মধ্যে বিদ্যমান প্রকৃত সম্পর্ক বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি।

    ২.
    আমরা চূড়ান্ত বিমূর্ত ও রূপক অর্থ ব্যতীত নার্সিং হোম, ব্যাংক বা এমনকি HMO (Health Maintain Organization)-গুলোকে সহিংস প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত নই। কিন্তু আমি এখানে যে সহিংসতার কথা বলছি সেগুলো মহৎ নয়। এগুলো বেশ মূর্ত। এই সব প্রতিষ্ঠানগুলো একটি সম্পত্তির অধিকার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত সম্পদ বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত। আর এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত শক্তি প্রয়োগের হুমকির উপর নির্ভরশীল সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও নিশ্চিত হয়। ‘শক্তি’ প্রকারন্তরে সহিংসতা নির্দেশ করবার একটি শ্রুতিমধুর পথ।

    এই সবগুলোই যথেষ্ট সুস্পষ্ট। এখানে এথনোগ্রাফিক আগ্রহের বিষয়টা হচ্ছে মূলত শিল্প গণতন্ত্রের নাগরিকরা আসলেই এই সত্যটি সম্পর্কে কীভাবে ভাবেন বা কতটা সহজাতভাবে আমরা এর গুরুত্বকে বিবেচনার বাইরে রাখি। উদাহরণস্বরূপ, এর ফলেই আসলে, একজন স্নাতক শিক্ষার্থীর পক্ষে গ্রন্থাগারে গিয়ে আধুনিক জীবনে জবরদস্তির হ্রাসের গুরুত্ব সম্পর্কে, তত্ত্ব সম্পর্কে বইয়ের স্তুপে ডুবে থেকে দিন পার করতে সম্ভবপর হয়ে ওঠে। কিন্তু সে কখনই ভাবে না যে যদি সে এই গ্রন্থাগারে তার সিলমোহরকৃত বৈধ পরিচয়পত্র না দেখিয়ে প্রবেশ করবার অধিকারের উপর জোর দিত তাহলে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী তাকে সেখান থেকে বের করে দিতে উদ্যত হতো। আমরা যত বেশি আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বের দিকগুলো আমলাতান্ত্রিক বিধিবিধানের আওতায় পড়তে দেই, আমরা তত বেশি এর সবকিছু যে শেষ পর্যন্ত সহিংসতার হুমকির উপর নির্ভরশীল সে সত্যটাকে অস্বীকার করবার ঘটনার (এবং বাস্তবে যারা এই ব্যবস্থা পরিচালনা করছে সুস্পষ্টভাবে তাদের সাথে) সাথে গোপন আঁতাত গড়ে তুলি।

    নৃবিজ্ঞানীরা যে গ্রামীণ সমাজগুলোর সাথে সর্বাধিক পরিচিত, যেখানে আধুনিক প্রশাসনিক কৌশলগুলোকে সুস্পষ্টভাবে বিজাতীয় আরোপ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে এই সম্পর্কগুলো আরও ভালোভাবে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামীণ মাদাগাস্কারের যে অংশে আমি আমার মাঠকর্ম সম্পন্ন করেছি, সেখানে সরকারগুলো যে ভীতি তৈরির মাধমে পরিচালিত হয় সেটা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। একই সময়ে দেখা যায় যে, প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতিতে (যেমন বিল্ডিং কোড, মুক্ত ধারক আইন, যানবাহনের বাধ্যতামূলক বীমা ইস্যু করা ইত্যাদি), সরকারি আমলাতান্ত্রের মূল কাজটি ছিল কেবল করযোগ্য সম্পত্তির নিবন্ধিকরণ। এর কৌতূহলোদ্দীপক ফলাফল ছিল এই যে, আমি যে সমাজ নিয়ে গবেষণা করছিলাম যে সম্পর্কে মালাগাসি আর্কাইভ থেকে ঊনিশ শতক ও বিশ শতক সম্পর্কিত যে তথ্য পেয়েছিলাম তা ছিল কেবলমাত্র তাদের পরিবারের আকার, জমির পরিমাণ এবং গবাদিপশু (এবং পূর্ববর্তী সময়ে ক্রীতদাস) সম্পর্কিত। আমি যে সময়টুকু ঐখানে ছিলাম তখন কেবল এই তথ্যগুলোই পাওয়া গিয়েছিল। এটার সাধারণ কারণ হলো বেশিরভাগ লোকজনের এই ধারণা জন্মেছিল যে রাজধানী থেকে আসা বহিরাগতরা এই বিষয়গুলোই জানতে চাইবে এবং তারাও কেবলমাত্র এই বিষয়গুলোই জানাতে প্রবৃত্ত ছিল।

    ছবি: বোর্ড অফ আর্ট ফাউন্ডেশান

    সর্বোপরি, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার একটি ফলাফল বলা যেতে পারে একটি আজ্ঞার সম্পর্ক তৈরি হওয়া। এটি মূলত একটি চলমান সম্পর্ক যেখানে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছার বাইরে অন্যকে কোনো কিছু প্রদান করেন, আর এটিই দাসপ্রথা হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এই দাসপ্রথাই রাষ্ট্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত হয়। আমি যে সমাজে গবেষণা করি, সেখানকার মানুষেরা যখন ঊনিশ শতকের দাসত্বের অধিকারী পরিবারগুলো নিয়ে কথা বলে তখন এই সম্পর্কের বিষয়টা সামনে চলে আসে। এই পরিবারগুলোর সন্তানেরাই ঔপনিবেশিক সময়ের প্রশাসনের অন্তঃসার হয়ে ওঠে। আর এটি সম্ভব হয়েছিল শিক্ষার প্রতি তাদের গভীর অনুরক্তি এবং প্রশাসনিক কাজে তাদের দক্ষতার জন্য। অন্য প্রেক্ষিতে, আজ্ঞার সম্পর্ক (বিশেষত আমলাতান্ত্রিক প্রেক্ষিতে) ভাষাগতভাবে সংকেতাবদ্ধ ছিল: এগুলো দৃঢ়ভাবে ফরাসি ভাষার দ্বারা চিহ্নিত করা হতো; অন্যদিকে, মালাগাছি ভাষাকে বিতর্ক, ব্যাখ্যা এবং ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভাষা হিসেবে উপযুক্ত মনে করা হতো। অপ্রধান কর্মকর্তারা, যখন কোনো স্বেচ্ছাচারি আদেশ চাপিয়ে দিতে চান, তখন প্রায়শই তা ফরাসি ভাষায় করে থাকেন। আমি এরকম একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার কথা মনে করতে পারি, যেখানে আমার সঙ্গে একজন কর্মকর্তার ম্যালাগাসি ভাষায় অনেক কথোপকথন হয় এবং যার কোনো ধারণাই ছিল না যে আমি ফরাসি ভাষা বুঝি। একদিন সবাই যখন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল সেই সময় আমাকে আসতে দেখে সে উত্তেজিত হয়ে যায়। সে ফরাসি ভাষায় বলল, “অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, আপনার যদি কোনো কাজ থাকে তাহলে আগামীকাল সকাল ৮.০০টায় আসতে হবে”। আমি তখন ফরাসি ভাষা বুঝি না এমন ভান করে মালাগাসি ভাষায় আমার বিভ্রান্তি এবং দাবি প্রকাশ করতে থাকলাম। সে তখন আঞ্চলিক ভাষায় তার কথাটি পুনরাবৃত্তি করতে নিতান্তই অক্ষমতা প্রকাশ করলেন এবং বারবার ফরাসি ভাষাতেই তা পুনরাবৃত্তি করতে থাকলেন। অন্যরা পরে আমার সন্দেহের বিষয়টা নিশ্চিত করেন— তিনি যদি মালাগাসি ভাষায় আমার সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলে অফিসটি কেন এরকম অস্বাভাবিক সময়ে বন্ধ হয়ে গেল সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হতো। মালাগাসিতে ফরাসি প্রকৃতপক্ষে “আদেশের ভাষা” হিসেবে পরিচিত; এটা সেই প্রেক্ষিতকে নির্দেশ করে যেখানে ব্যাখ্যা, বিবেচনা, চূড়ান্তভাবে, সম্মতির কোনো প্রয়োজন হতো না। কারণ সেগুলো আদতে সহিংসতার হুমকিকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

    মাদাগাস্কারে, আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা কতকটা শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল। তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখায় যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রয়োগকৃত শক্তির মাত্রা এবং এর থেকে দৃশ্যত উদ্ভুত অযৌক্তিকতার মাত্রার মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কিথ ব্রেকেনরিজ, ঔপনিবেশিক দক্ষিণ আফ্রিকার “জ্ঞানহীন ক্ষমতার” শাসনামলের চিত্র কিছুটা দীর্ঘ পরিসরে তুলে ধরেছেন(২০০৩) যেখানে, আফ্রিকান বিষয়ীকে(subject) বোঝার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে বলপ্রয়োগ এবং প্রশাসনিক কাগজপত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, একটি নতুন ছাড়পত্র ব্যবস্থা চালুর মধ্য দিয়েই মূলত ১৯৫০–এর দশকের দিকে এখানে প্রকৃত বর্ণবৈষম্যের সূচনা হয়েছিল। আগে আফ্রিকান শ্রমিকরা তাদের শ্রমচুক্তির বিস্তৃত প্রমাণাদি বহন করতে বাধ্য ছিল। নতুন ব্যবস্থায় একটিমাত্র পরিচয় পুস্তিকার মাধ্যমে আগের জটিল নিয়মকে প্রতিস্থাপন করে সেটিকে আরও সহজ করেছিল। এই পরিচয় পুস্তিকাতে শুধুমাত্র তাদের “নাম, ঠিকানা, আঙুলের ছাপ, কর স্থিতি এবং শহর ও নগরে বসবাস ও কাজ করবার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন” (২০০৫: ৮৪) ব্যতীত আর কিছুর উল্লেখ ছিল না। সরকারি কর্মকর্তারা প্রশাসনিক কাজকে সহজ করবার জন্য, পুলিশরা আফ্রিকানদের সাথে কথা বলবার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থাকে তারিফ করে; আর সেজন্যই এটি পরবর্তীতে সার্বজনীনভাবে “দমপাস”, বা “বোকা ছাড়পত্র” বলে চিহ্নিত হয়। ইংরেজি ভাষাতেও আমরা যেভাবে কথা বলি তার মধ্যেও জবরদস্তি এবং অযৌক্তিকতার মধ্যে যোগসূত্রের চিহ্ন রয়েছে: উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আমলাতান্ত্রিক বোকামিকে নির্দেশ করে এমন চলতি পরিভাষা যেমন এসএনএফইউ (SNAFU), ক্যাচ–২২ (Catch-22) এবং এরকম আরও অনেক শব্দ সামরিক অপভাষা (Slang) থেকে এসেছে। আরও সাধারণভাবে বললে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানিরা দীর্ঘদিন ধরে একটি “নেতিবাচক অনুবন্ধন” লক্ষ করেছেন, ডেভিড আপটার (১৯৬৫,১৯৭১) যেমন বলপ্রয়োগ এবং তথ্যের মধ্যে এই সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। অর্থাৎ যখন একটি তুলনামূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অনেক বেশি তথ্যের মধ্যে ভাসমান থাকে, সেটি তখন তত বেশি কর্তৃত্ববাদী ও দমনকারী শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়। মানুষের এখানে এ ব্যাপারে খুব বেশি কিছু বলার থাকে না। আর এ কারণেই এই সরকারগুলি গুপ্তচর, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গোপন পুলিশের উপর অনেক বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হয়।

    ৩.
    সহিংসতা স্বেচ্ছাচারি সিদ্ধান্ত নেওয়াকে অনুমোদন দেয়। একইভাবে অধিকতর সাম্যবাদী সামাজিক সম্পর্কের বৈশিষ্ট্যমূলক বিতর্ক, ব্যাখ্যা ও পুনর্বিবেচনাকেও তা এড়িয়ে যায়। আর এটিই ভুক্তভোগীদের সহিংসতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিগুলোকে নিবুর্দ্ধিতা অথবা অযৌক্তিক হিসাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। এটা বলা যেতেই পারে যে, ভয়ের উপর ভর করে যাদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত তারা বেশি ব্যাখ্যা দিতে চায় না এবং সাধারণভাবে বলতে গেলে তারা তা করেও না।

    সহিংসতার এই দিকগুলো নৃবৈজ্ঞানিক কাজে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। বরং কীভাবে সহিংসতা বোধগম্য ও অর্থপূর্ণ হয় নৃবৈজ্ঞানিক কাজগুলো সেদিকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমার মনে হয় এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে বিশেষত ব্যাখ্যামূলক গভীরতা ও সামাজিক তাৎপর্যের মধ্যে আমাদের বিভ্রান্তির শিকার হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের কাছে সহিংসতার সবচেয়ে জনপ্রিয় দিকটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। আবার সহিংসতার ক্রিয়াকলাপগুলো যে আসলে মোটাগাদে বললে যোগাযোগের তৎপরতাও নয়, এটিও বলা যায় না আসলে।স্পষ্টতই সেগুলো যোগাযোগের তৎপরতাই। কিন্তু এটা মানুষের অন্য যে কোনো ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রেও একইভাবে সত্য। কিন্তু সহিংসতার গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি আমাকে নাড়া দিয়েছে তা হলো এটিই একমাত্র মানব কর্ম যা যোগাযোগমূলক না হয়েও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব রাখার সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখে। আরও সুস্পষ্ট করে বললে— সহিংসতা মানব কর্মের একমাত্র ধরন যা একজন ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো কিছু না জেনেও তার উপর একটি অনুমিত প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে। অন্য যেকোনো উপায়ে কোনো ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে কী ভাবছে, অপর ব্যক্তি সম্পর্কে কী ভাবছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যক্তির চাওয়া, ব্যক্তির ঘৃণা, প্রবণতা এবং অন্যান্য নানাবিধ বিষয় সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা প্রয়োজন হয়। সজোরে কারও মাথায় আঘাত করো, তখন এগুলোর সবকিছু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

    এটা সত্যি যে, কোনো ব্যক্তিকে হত্যা বা পঙ্গু করে খুব সীমাবদ্ধ কিছু ফলাফল যাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলো ভীষণ বাস্তব এবং আরও সূক্ষ্মভাবে বলতে গেলে দারুণভাবে অনুমেয়। মর্মার্থ বা বোধগম্যতার অংশীদারিত্ব ব্যতীত অন্য যে কোনো বিকল্প কর্মকাণ্ডের কোনো ধরনের অনুমিত প্রভাব থাকে না। যদিও সহিংসতার হুমকি দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও একটি অংশীদারিত্বমূলক বোধগম্যতার প্রয়োজন হয়, তবে সেটা একেবারেই ন্যূনতম। এটা মনে রাখা জরুরি যে অধিকাংশ মানবিক সম্পর্কই, বিশেষত চলমান সম্পর্কগুলো (তা সে দীর্ঘদিনের বন্ধুই হোক বা দীর্ঘদিনের শত্রুই হোক না কেন) অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির এবং অভিজ্ঞতা ও মর্মার্থ দ্বারা গভীরভাবে সন্নিবেশিত। সেগুলোকে ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক এবং সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অন্তহীন অনুমান প্রয়োজন হয়।

    অন্যকে শারীরিক ক্ষতির হুমকি প্রদান এই সমস্ত কিছুকে ছেটে ফেলার সম্ভবনাকে অনুমোদন দেয়। এই হুমকি অনেক বেশি পরিকল্পিত সম্পর্ক তৈরিকে সম্ভবপর করে (যেমন: যদি এই রেখা পার হও, আমি তোমাকে গুলি করব)। ঠিক এই কারণেই সহিংসতা সবসময়ই বোকাদের একটি পছন্দের অস্ত্রঃ আবার অনেকে এটাকে মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হিসেবে বলতে পারে। কারণ, সহিংসতা এমন এক ধরনের নিবুর্দ্ধিতা, যার কোনো বৃদ্ধিবৃত্তিক প্রত্যুত্তর দেওয়া সবচেয়ে কঠিন।

    আমি এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী নিয়ে আসার প্রয়োজন মনে করছি। ধরুন, এখানে যদি দুটি পক্ষ সহিংসতার প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়। মনে করুন, দুইজন জেনারেল সেনাবাহিনীর দুটি পক্ষকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাহলে, সেক্ষেত্রে উভয়েরই একে অন্যের চিন্তাকে পড়বার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। কিন্তু কোনো পক্ষের যদি অন্যকে শারীরিকভাবে আঘাত করার সামর্থের অপ্রতিরোধ্য সক্ষমতা থাকে তাহলে তাদের আর এটা করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু এর সুগভীর প্রভাব রয়েছে। কারণ এর অর্থ দাড়ায় যে সহিংসতার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যমূলক প্রভাব— ব্যাখ্যা করার শ্রমকে কমাতে পারার সক্ষমতা— তখনই সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে উঠে যখন সহিংসতা সবচেয়ে কম দৃশ্যমান থাকে, মূলত যেখানে দৃষ্টিগ্রাহ্য শারীরিক সহিংসতার ঘটার সম্ভবনা সবথেকে কম থাকে। এই পরিস্থিতিগুলোকেই আমি কাঠমোগত সহিংসতা (structural violence) বলেছি এই অনুমান থেকে যে, বল প্রয়োগের হুমকির দ্বারা সমর্থিত পদ্ধতিগত বৈষম্যই এখানে সহিংসতার ধরন হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এই কারণে কাঠামোগত সহিংসতার পরিস্থিতি অবিচ্ছিন্নভাবে কাল্পনিক পরিচয়ের একটি চূড়ান্ত ভারসাম্যহীন কাঠামো তৈরি করে।

    এই প্রভাবগুলো সর্বাধিক দৃশ্যমান হয় তখনই যখন বৈষম্যের কাঠামো গভীরভাবে অন্তঃস্থীকৃত রূপ পরিগ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৫০ সালে আমেরিকার প্রেক্ষাপটে নিত্যদিনের প্রধান কৌতুক ছিল নারীদের বোঝার অসম্ভাব্যতা সম্পর্কিত রসিকতাগুলো। এই রসিকতাগুলো (যা অবশ্যই পুরুষের দ্বারাই উপস্থাপিত হতো) নারীর যুক্তিকে সবসময় অস্বাভাবিক এবং অবোধগম্য হিসাবে উপস্থাপন করত। কারোরই এই অনুভূতি ছিল না যে, নারীদেরও পুরুষকে বুঝতে সমস্যা হতে পারে। কারণগুলো ছিল খুবই স্পষ্ট, পুরুষকে বুঝা ছাড়া নারীর অন্য কোনো উপায় ছিল না। এটা ছিল পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের একটি সুনির্দিষ্ট চিত্রের পূর্ণ বিকশিত অবস্থা যেখানে নারীর নিজের আয় এবং সম্পদে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকার কারণে তাদের পুরুষ মনের গতি প্রকৃতিকে বুঝতে অধিকাংশ সময় এবং শ্রম ব্যয় করা ব্যতীত আর কোনো বিকল্প ছিল না বললেই চলে।

    ছবি: ম্যাক্সিকান শিল্পী ইয়েস্কা

    যেমনটা দীর্ঘ সময় ধরে নারীবাদিরা বলে আসছেন, এই ধরনের পিতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলো নিশ্চিতভাবেই কাঠামোবদ্ধ সহিংসতার একটি ধরন; এই পরিবারগুলোর নীতি–নৈতিকতাগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবিরাম শারীরিক ক্ষতির হুমকির দ্বারাই অনুমোদিত হতো। নারীজাতির রহস্যময়তা সম্পর্কে এই ধরনের বাগাড়ম্বর তাদের একটি চিরস্থায়ী বৈশিষ্ট্য হিসেবেই মনে করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নারী ঔপন্যাসিকগণ, যাদের মধ্যে প্রথমেই ভার্জিনিয়া উলফের নামই প্রথমে মনে আসছে, এই ধরনের ব্যবস্থার বিপরীত দিকটিও তুলে ধরেছেন: আত্মবিস্মৃত এবং আত্মগর্বী পুরুষের অহংকে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বয় করতেই নারীর ক্রমাগত প্রচেষ্টা নিঃশেষ হয়। আর এটি করতে একটি কাল্পনিক পরিচয় নির্মাণের ক্রমাগত শ্রম বা যাকে আমি ব্যাখ্যামূলক শ্রম (interpretive labor) বলে উল্লেখ করেছি তার প্রয়োজন হয়। এটা প্রতিটি স্তরেই বজায় থাকে। একজন পুরুষের চোখে বিষয়গুলো দেখতে কেমন লাগবে একজন নারী সবসময় সেই অনুযায়ী নিজেকে কল্পনা করবে বলে আশা করা হয়। পুরুষের কাছে থেকে এর বিপরীতটা ঘটবে বলে কখনো আশা করা হয় না। আচরণের এই ধরনটি এত গভীরভাবে অন্তঃস্থীকৃত হয় যে, এর চেয়ে ভিন্ন কিছু করার পরামর্শে অনেক পুরুষ এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান যেন এই ভিন্ন কিছু করাটাই একটা সহিংস কাজ। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে সৃজনশীল লেখা শেখানো শিক্ষকদের একটি জনপ্রিয় অনুশীলনের কথা বলা যেতে পারে। এই অনুশীলনে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের একদিনের জন্য একজন বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছেন বলে কল্পনা করতে বলেন এবং এই একদিনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল তা বর্ণনা করতে বলেন। এর ফলাফল দৃশ্যতই অদ্ভুতভাবে অভিন্ন হয়। মেয়েরা সকলেই দীর্ঘ এবং বিস্তারিত রচনা লেখেন যা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে তারা বিষয়টি সম্পর্কে দীর্ঘ সময় ভেবেছে। ছেলেদের অর্ধেকই সাধারণত রচনাটি লিখতেই অস্বীকার করে। যারা লেখে তাদের লেখা থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে একজন কিশোরী মেয়ে কেমন হয় সে সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই এবং এই বিষয়ে ভাবতেও তাদের তীব্র বিরক্তি রয়েছে। এখানে দুটি জটিল বিষয় সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছে যেগুলোকে আলাদাভাবে আলোচনা করা উচিৎ। প্রথমটি হলো জ্ঞানের একটি রূপ হিসেবে কল্পিত একাত্মতার প্রক্রিয়া। বিষয়টি এরকম যে কতৃর্ত্বের সম্পর্কগুলির ক্ষেত্রে, সামাজিক সম্পর্কগুলো বাস্তবে কীভাবে কাজ করে তা বুঝার দায়িত্ব কার্যকরভাবে অধঃস্তনদের উপরই ন্যাস্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, রেস্টুরেন্টের রান্না ঘরে কাজ করবার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন যে কেউ জানে যে, যদি খুব খারাপ কোনো কিছু ঘটে এবং সেটা ঠিক করতে কোনো রাগী বস হাজির হন তবে তিনি কখনোই বিস্তারিত অনুসন্ধান করেন না কিংবা ঘটনার বিষয়ে নিজ নিজ কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য ভিড় করে থাকা অন্য কর্মচারিদের প্রতিও তেমন মনোযোগ দেন না। তিনি সবাইকে চুপ করতে বলেন এবং ইচ্ছামতো একটা গল্প চাপিয়ে দেন যেখানে সাধারণত একটি তাৎক্ষণিক রায় থাকে: যেমন, “তুমি নতুন লোক, তুমিই ঝামেলাটা বাঁধিয়েছ— আবার যদি কখনো এই ঘটনা ঘটে তাহলে কিন্তু তোমাকে বরখাস্ত করা হবে”। আর যাদের চাকরি দেবার এবং বরখাস্ত করার ক্ষমতা থাকে না তাদের উপরই প্রকৃত ঘটনা খুঁজে বের করার দায়িত্ব পড়ে, এটা নিশ্চিত করার জন্য যে ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমাদের চলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সাধারণত একই ঘটনা ঘটেঃ সবাই জানে যে বাসার গৃহকর্মীরা নিয়োগকর্তার পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত জানলেও তার বিপরীতটা কখনো ঘটে না বললে চলে। দ্বিতীয় উপাদানটি হলো সহানুভূতিশীল একাত্মকরণ। মজার ব্যাপার হলো, অ্যাডাম স্মিথ তার Theory of Moral Sentiment (XXX) গ্রন্থে প্রথম এই প্রপঞ্চ সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণের কথা বলেন যাকে আমরা এখন “সহানুভূতির অবসাদ” হিসেবে আখ্যায়িত করি। তার প্রস্তাবনায়, মানবজাতি তার সঙ্গীদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কেবলমাত্র কাল্পনিক একাত্মকরণেই আগ্রহী নয়, বরং এর ফলাফলস্বরূপ স্বতঃস্ফূর্তভাবে একে অপরের আনন্দ এবং দুঃখকেও অনুভব করে। যাইহোক, দরিদ্রদের দুর্দশা এতটাই অটল যে তাদের প্রতি যেকোনো ভাবে সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদেরও হয় তাদের দুর্দশার প্রতি সম্পূর্ণ মোহাচ্ছন্ন হওয়া বা তাদের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার পথের যে কোনো একটিকে নীরবে বেছে নিতে হয়। এর ফলাফল হচ্ছে যারা সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের নিচের দিকে থাকে তাদের বেশিরভাগ সময়ই ব্যয় হয় উপরের দিকের লোকদের দৃষ্টিভঙ্গিটা কী সেটা বুঝতে এবং সেটার প্রতি সাবধান থাকতে। এর বিপরীতটা কখনো ঘটে না বললেই চলে।

    প্রভু ও ভৃত্য, পুরুষ ও নারী, নিয়োগকর্তা ও কর্মচারী, ধনী এবং দরিদ্র যাদেরকে নিয়েই কাজ করা হোক না কেন কাঠামোবদ্ধ অসমতা— যাকে আমি কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা বলছি— অবশ্যম্ভাবীভাবে চিন্তার ক্ষেত্রেও একটা অসম কাঠামো তৈরি করে। চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে সহানুভূতিও তৈরি হয়— স্মিথের এই পর্যবেক্ষণকে আমি যেহেতু সঠিক মনে করি, [কিন্তু আমার মতে,] এর ফলাফল হচ্ছে যে এখানে কাঠামোবদ্ধ সহিংসতার সুবিধাভোগিরা যতটা এর ভুক্তভোগিদের নিয়ে ভাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ভুক্তভোগিরা এর সুবিধাভোগিদের নিয়ে ভাবেন। যেহেতু আমি মনে করি স্মিথ এই পর্যবেক্ষণে সঠিক ছিল যে, কল্পনা তার সাথে সহানুভূতি নিয়ে আসে। এর ফলাফল হলো কাঠামোবদ্ধ সহিংসতার সুবিধাভোগিদের নিপীড়িতদের পরোয়া করার পরিবর্তে নিপীড়িতরাই সুবিধাভোগিদের অনেক বেশি পরোয়া করে থাকে। সহিংসতাকে বাদ দিলে, এই ধরনের ভাবনাই এই ধরনের সম্পর্ক টিকিয়া রাখার সবচেয়ে ক্ষমতাশীল শক্তি।

    ৪.
    আমার মতে এই সবকিছুর কতিপয় তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে।

    বর্তমানে, সমসাময়িক শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে সহিংসতার বৈধ প্রয়োগের ক্ষমতা তাদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে যাদেরকে শ্রুতিমধুরভাবে “আইন প্রয়োগকারী” বলা হয়— বিশেষত পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে। সমাজবিজ্ঞানিরা যেমনটা বারংবার দেখিয়েছেন, এদের[পুলিশ] বাস্তব ভূমিকা ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতটা দেখা যায় না যতটা প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের সহায়তায় শারীরিক শক্তির বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে দেখা যায়। পুলিশ হচ্ছে মূলত অস্ত্রধারী আমলা। একই সময়ে, গত ৫০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তারা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কাল্পনিক একাত্মতার প্রায় আচ্ছন্নকারী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সমসাময়িক শিল্পোন্নত গণতন্ত্রে একজন নাগরিকের জন্য এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় যে তিনি এমন সব বই পড়ে, সিনেমা দেখে বা টিভি অনুষ্ঠান দেখে দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করছেন যা তাদেরকে পুলিশের চোখে বিশ্বকে দেখার এবং তাদের কীর্তিকলাপে বিকৃতভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। আর কিছু না হলেও, এটি ওয়েবারের লৌহ পিঞ্জর (iron cage) নিয়ে অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যত বাণীকে কুঞ্চিত করে: যেমনটি দেখা যাচ্ছে, নামপরিচয়হীন আমলাতন্ত্র অলীক গোয়েন্দা, গুপ্তচর, পুলিশের অন্তহীন সমষ্টিরূপে তাদের মহিমান্বিত নায়কের রূপটা ছুড়ে ফেলে দিতে প্রবৃত্ত হয়েছে যেন। যাদের প্রত্যেকেই বিশেষভাবে এমন একেকটি চরিত্র, যাদের কাজই হচ্ছে তথ্যের বিন্যাসের উদ্দেশ্যে সংগঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো যেখানে প্রকৃত শারীরিক সহিংসতার মুখোমুখি হয় বা শারীরিক সহিংসতাকে প্ররোচিত করে সেখানে নিপুণভাবে পরিচালনার ভার গ্রহণ করা।

    আমার কাছে আরও বেশি লক্ষণীয় মনে হয়েছে এ সম্পর্কিত তত্ত্বগুলোর প্রায়োগিক অবস্থান।

    আরও বেশি মারাত্মক মনে হয় তত্ত্বের নিজের অবস্থানের জন্যই এর প্রয়োগ।

    প্রণালীসঙ্গত (schematization) করাই হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জ্ঞানের কাজ। কার্যত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলতেই বোঝায় বাস্তব সামাজিক অস্ত্বিত্বের সূক্ষ্মতাগুলোকে উপেক্ষা এবং সমস্তকিছুকে পূর্ব–অনুমিত যান্ত্রিক এবং পরিসংখ্যানগত সূত্রে নিবন্ধ করা। হোক না সেটা কাঠামো, নিয়ম, পরিসংখ্যান বা প্রশ্নপত্র, এটা সর্বদা সরলীকরণের বিষয়।

    সাধারণভাবে এটা ওই বস থেকে তেমন আলাদা না যে রান্নাঘরে প্রবেশ করে সেখানে কী ভুল হয়েছে সে সম্পর্কে নিজের খামখেয়ালিপূর্ণ সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। উভয় ক্ষেত্রেই এটি জটিল এবং দুর্বোধ্য পরিস্থিতিতে সরল এবং পূর্বনির্ধারিত ছক আরোপ করে। এর ফলাফল প্রায়শই আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের সাথে মোকাবিলা করতে বাধ্য লোকদের এমন ধারণা দেয় যে, তারা এমন কিছু লোকের মোকাবিলা করছেন যারা তাদের স্বেচ্ছাপ্রসূত ইচ্ছায় এমনভাবে টেবিলের উপর গ্লাস রাখেন যেন সামনে থেকে এর মাত্র ২% দেখা যায়। সন্দেহাতীতভাবে, সামাজিক তত্ত্বের ক্ষেত্রেও অনুরূপ কিছু ঘটে। এমনকি একটি ভালো এথনোগ্রাফিক বর্ণনাও একটি নুয়্যার(আফ্রিকান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী) দাঙ্গা বা বালিদের মোরগ লড়াইয়ে যা ঘটছে তার মাত্র ২%কে ধারণ করতে পারে। মানব পরিস্থিতির জটিল বিন্যাসের মধ্য থেকে একটি তাত্ত্বিক কাজ একটি বা দুটি সূত্রকে তুলে নিয়ে আসে, একটি ক্ষুদ্র অংশের উপর শুধু মনোনিবেশ করে এবং এটিকেই ভিত্তি করে সাধরণীকরণ করে: উদাহরণস্বরূপ, সেটা হতে পারে সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রকৃতি বা কর্মশৈলির প্রকৃতি নিয়ে। এই ধরনের তাত্ত্বিক হ্রাসকরণের মধ্যে কোনো ভুল আছে তা আমি বলতে চাচ্ছি না। (যৌক্তিকভাবে আমিও এখন এটাই করছি)।

    প্রকৃতপক্ষে, আমি মনে করি যদি কেউ পৃথিবী সম্পর্কে নাটকীয়ভাবে নতুন কোনো ধারণা দিতে চায় তাহলে এই পদ্ধতির প্রয়োজন আছে।

    কাঠামোগত বিশ্লেষণের কথা বিবেচনা করুন, যেটা প্রায় অর্ধশতাব্দী আগেই (১৯৫৯) ১ম ম্যালিনোস্কি স্মরণ বক্তৃতার মাধ্যমে এডমন্ড লিচ ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছিলেন। বর্তমান সময়ে কাঠামোগত বিশ্লেষণ বিগতযৌবনা হিসেবে বিবেচিত হয়; [ক্লদ] লেভি স্ট্রসের তাত্ত্বিক সংকলনগুলো বেদম হাস্যকর। এটা আমার কাছে দুভার্গ্যজনক মনে হয়। একটি ভালো তত্ত্বের মতো কাঠামোগত বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো এটি এমন একটি প্রায় অব্যর্থ কৌশল প্রদান করে যার মাধ্যমে জটিল বিষয়বস্তুকে এমনভাবে সরলীকরণ ও প্রণালীসঙ্গত করা যায় যেন এর মাধ্যমে অভাবনীয় কিছু বলা যায়। ঘটনাচক্রে আমি প্রকৃতপক্ষে এভাবেই ওয়েবার সম্পর্কে উপরোক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি:

    আমি লেভি–স্ট্রসের মতো কাউকেই বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে চাই। উনি পুরোদস্তুর বৌদ্ধিকভাবে সাহসী একজন মানুষ যিনি তার মডেলটি নিয়ে যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায় ততদূর পর্যন্ত গিয়েছেন। এমনকি এর ফলাফলটা অনেক সময় নিশ্চিতভাবে অর্থহীন হলেও— অথবা, আপনি এও বলতে পারেন, এর মাধ্যমে বাস্তবতার কতটা অনিষ্ট সাধন হলো সেটা তার কাছে কোন বিবেচ্য ছিল না।

    আমার যুক্তিতে, তাত্ত্বিক পরিসরের মধ্যে থাকলে সরলীকরণও জ্ঞানের একটা রূপ হতে পারে। সহিংসতা যখন আর রূপক অর্থে থাকে না সমস্যা তখনই তৈরি হয়। এখন কাল্পনিক থেকে বাস্তবের একজন পুলিশে ফিরে আসা যাক। লসঅ্যাঞ্জেলস পুলিশ বিভাগের প্রাক্তন কর্মকর্তা থেকে সমাজবিজ্ঞানী হওয়া (কুপার, ১৯৯১) লক্ষ করলেন যে পুলিশ যে সমস্ত ব্যক্তিকে প্রহার করে তার একটা বড় অংশই কোনো ধরনের অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি লক্ষ করলেন যে “পুলিশ চোরদের মারে না”। তার ব্যাখ্যামতে কারণটা খুব সাধারণ— পুলিশের কাছ থেকে সহিংস প্রতিক্রিয়া পাওয়ার একটা সবচেয়ে নিশ্চিত কারণ হচ্ছে তাদের “পরিস্থিতিকে সংজ্ঞায়িত করার” ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা। আমি যা বলেছি তা যদি সত্য হয় তাহলে আমরা ঠিক এই প্রতিক্রিয়াই পাবো। সাধারণ প্রশাসনিক পরিকল্পনা আরোপের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা এবং এর দমনমূলক শক্তির একচেটিয়া অধিকার যেখানে এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয় তাই হচ্ছে পুলিশের ডাণ্ডা। যারা বিকল্প পরিকল্পনা বা ব্যাখ্যার উপর জোর দেন তাদের উপর আমলাতান্ত্রিক সহিংসতার খড়্গ সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে বেশি কেন পড়ে সেই বিষয়টিও তখন বোধগম্য হয়। একই সময়ে পরিণত বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত পিগেট–এর বিখ্যাত সংজ্ঞাও বিষয়টিকে বুঝতে সাহায্য করে। তার সংজ্ঞা অনুযায়ী বহুবিধ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে (বা সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে) সমন্বয় করার সক্ষমতাই হচ্ছে পরিণত বুদ্ধিমত্তা। আর এই আলোকে দেখলে একজন বুঝতে পারে কীভাবে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা যে মুহূর্তে সহিংসতায় রূপ নেয়, ঠিক তখনই এটা আক্ষরিকভাবে একটি শিশুসুলভ নির্বুদ্ধিতায় পরিণত হয়।

    আরও বেশি সময় থাকলে আমি দেখাতে পারতাম কেন আমি মনে করি এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরাতন সমস্যাগুলো বিবেচনায় নতুন কিছু পথের নির্দেশ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ যদি দেখে তাহলে লক্ষ করবে যে আমার “ব্যাখ্যামূলক শ্রমের(interpretative labor)” ধারণা দেখায় যে সামাজিক উৎপাদন (ব্যক্তি এবং সামাজিক সম্পর্কের উৎপাদন) ও পণ্য উৎপাদনের পরিসরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এখানে “ব্যাখ্যামূলক শ্রম” সামাজিক জীবনের চলমানতাকে সাবলীল রাখে। আর সামাজিক উৎপাদনের পরিসরে সৃষ্টিশীল শ্রমের অবস্থান থাকে নিচের দিকে এবং পণ্য উৎপাদনের পরিসরে শ্রমের সৃষ্টশীল দিকগুলোর অবস্থান থাকে উপরের দিকে।

    যদিও উভয় ক্ষেত্রেই অসমতার কাঠামো চিন্তার ভারসাম্যহীন কাঠামো তৈরি করে। আমি আরও প্রস্তাব করব যে যাকে আমরা “বিচ্ছিন্নতা” বলে থাকি তা আসলে এই ধরনের ভারসাম্যহীন কাঠামোগুলোর মধ্যেকার ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা। যে কোনো ধরনের মুক্তিকামী রাজনীতিতে এর তাৎপর্য রয়েছে। যদিও এই মুহূর্তে আমি নৃবিজ্ঞানে এর কিছু তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

    এর মধ্যে একটি হলো আমরা যেসব ব্যাখ্যামূলক কৌশল ব্যবহার করি তার অনেকগুলোই ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার হাতিয়ার–এর চেয়ে অনেক বেশি দুর্বলের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো। রেনেতো রোজালদো (১৯৮৬) এর একটা সুবিদিত যুক্তি দিয়েছেন। ইভান–প্রিচার্ড যখন মুওত ডিট–এর নুয়্যার ক্যাম্পে কেউ তার সাথে কথা বলবে না এই ভেবে বিরক্ত হয়ে অবশেষে তার “তাবুর দরজা” থেকে বাইরের দিকে নজর দিচ্ছিলেন, তখন পুরো বিষয়টিকে তিনি (রোজাল্ডো) ফুকোর প্যানোপটিকনের(panopticon) সাথে তুলনা করেছেন। যুক্তিটা এরকম যে অসম পরিস্থিতিতে সংগৃহীত যে কোনো জ্ঞান একটি শৃঙ্খলাবদ্ধতার ভূমিকা পালন করে। আমার কাছে এটি অর্থহীন। প্যানোপটিকন ছিল একটা কারাগার। এখানে বন্দিরা নজরদারিতে থাকত এবং এই শাসনকে তারা আত্মস্থ করেছিল কারণ তারা যদি পালানোর চেষ্টা করত অথবা প্রতিবাদ করত তাহলে তদেরকে হত্যাও করা হতে পারত। বল প্রয়োগের ব্যবস্থার অনুপস্থিতে, এই ধরনের পর্যবেক্ষক প্রতিবেশির খোশগল্পের সমতুল্য হয়ে পড়ে। এমনকি, সেটা কোনো ধরনের জনসম্মতি থেকেও বঞ্চিত হয়।

    আমার মতে, এই ধরনের তুলনার অন্তর্নিহিত পূর্বানুমান এই যে, এই ধরনের বিস্তৃত জ্ঞান যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের একটি সহজাত অংশ। এমনকি, ঐতিহাসিক রেকর্ডের একটি সংক্ষিপ্ততম অনুসন্ধানও এটা স্পষ্ট করে দেয় যে জাতিতাত্ত্বিক উপাত্ত নথিভুক্ত করবার ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যগুলোর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। এর পরিবর্তে আইন এবং প্রশাসনের প্রশ্নে বরং তারা অনেক বেশি আগ্রহী ছিল। অন্য সমাজের বিবাহ প্রথা কিংবা মৃতদেহ সৎকারের আচার সম্পর্কে জানতে একজনকে প্রায় অশ্যম্ভাবীভাবে হেরোডোটাস, ইবনে বতুতা কিংবা ঝা কিয়াংয়ের মতো পর্যটকদের বর্ণনার উপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ ঐ ভ্রমণকারী যে রাষ্ট্রের অধিবাসী তার বাইরে যে কোনো স্থান সম্পর্কে তার বর্ণনার উপর নির্ভর করতে হয়।

    ঐতিহাসিক গবেষণা হতে জানা যায় মুওত ডিটের অধিবাসিরা বস্তুত গ্বেক (Gwek) নামক এক ধর্মপ্রচারকের সাবেক অনুসারী ছিলেন যিনি এক বছর আগে আরএএফ–এর বোমা হামলা এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার (জনসন ১৯৭৯, ১৯৮২, ১৯৯৪) হন। পুরো বিষয়টি স্পষ্টভাবে সাধারণ আমলাতান্ত্রিক নির্বুদ্ধিতার কারণেই সংঘটিত হয়েছিল (নুয়্যার সমাজের ক্ষমতার প্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক ভুল বোঝা এবং সেখান থেকে যুগ যুগ ধরে জড়িয়ে থাকা নুয়্যার ও ডিংকা জনগণকে আলাদা করবার প্রচেষ্টা)। ইভান্স–প্রিচার্ড যখন সেখানে ছিলেন তখন পর্যন্তও তারা বৃটিশ কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক হানা বা উপদ্রবের শিকার হচ্ছিলেন। ইভান্স প্রিচার্ডকে মূলত একজন গুপ্তচর হিসেবে সেখানে যাওয়ার জন্য বলা হয়। তিনি প্রাথমিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পরবর্তীতে শেষ পর্যন্ত সম্মত হন। পরবর্তীতে তার যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “তাদের জন্য দুঃখ অনুভব করেছিলাম”। কর্তৃপক্ষ প্রকৃতপক্ষে যে নির্দিষ্ট তথ্যগুলো চাচ্ছিলেন তিনি দৃশ্যত সাবধানতার সাথে সেগুলো সংগ্রহ করা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু একই সাথে তিনি নুয়্যার সমাজের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সাধারণ অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলেন, যাতে করে নুয়্যার সমাজে কর্তৃপক্ষের নির্বোধের মতো করা কিছু অত্যাচারকে নিরুৎসাহিত করা যায়। যেটি তার ভাষায়, কর্তৃপক্ষকে “মানবিক” করতে করেছিলেন (জনসন ১৯৮২:২৪৫)। ফলে একজন এথনোগ্রাফার হিসেবে উনি শেষ পর্যন্ত যা করলেন সেটিকে ঐতিহ্যবাহী মহিলাদের কাজের সাথে তুলনা করা যায়— কিছু কৌশলী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থাকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা। যার অর্থ আদতে দাঁড়ায় অচেতন এবং আত্ম–অহংকারী পুরুষকে তাদের নিজেদের অন্ধত্বের ফলাফলের দায় থেকে মুক্তি দেওয়া।

    কারও হাত পরিষ্কার রাখলে কি ভালো হতো? এটা আমাকে ব্যক্তিগত বিবেকের প্রশ্ন হিসেবে নাড়া দেয়। কিন্তু আমার সন্দেহ বৃহত্তর নৈতিক বিপদগুলো সম্পূর্ণ অন্য স্তরে রয়েছে। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে যে, আমাদের তাত্ত্বিক কাজগুলো কি শেষপর্যন্ত কল্পনার ভারসাম্যহীন কাঠামোর সর্বনাশ ও অবসানের দিকেই ধাবিত হয়? নাকি এমনকি আমাদের সেরা ধারণাগুলোও যেখানে আমলাতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত সহিংসতার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে, আর যা খুব সহজেই ঘটতে পারে, যার ফলে আমরা শেষপর্যন্ত এগুলোকে আরও বেশি শক্তিশালীই করতে থাকব।

    এই প্রকল্পে উপদেশ, পরামর্শ এবং উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমি ডেভিড আপ্টার, কেথ ব্রেকেনরিজ, ক্রিস্টিনা ফেভারভ্যারি, অ্যান্ডরেজ গ্রুব্যাসিস, ম্যাথিউ হল, লরেন লেভি, ক্রিশ্চিয়ান মুন, স্টুয়ার্ট রকফেলার, মেরিনা সিটরিন, স্টিভ কিউপিড থিওডোর এবং হিল্টন হোয়াইটকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিতে চাই। এই রচনাটি আমার মাকে উৎসর্গকৃত, তার নৈতিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অপছন্দ এবং সাধারণ বোধের সম্মানে

    ২৫শে মে, ২০০৬

    টীকা

    [১] কাফকায়েস্ক– চেক লেখক ফ্রানৎস কাফকার নামানুসারে এই টার্মটির উদ্ভব হয়েছে। কাফকা তার গল্পগুলোতে যেই বিভ্রান্তিকর ও পরাবাস্তব পরিস্থিতির মাঝে ফেলে অর্থহীনতা, অসহায়ত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্য দিয়ে তার চরিত্রগুলোকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন, সেই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতেই কাফকায়েস্ক শব্দটির ব্যবহার করা হয়। একে প্রায়শই বিংশ শতাব্দীর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন আধুনিক মানস–এর উপলব্ধির সাথে তুলনা করা হয়। কাফকার সাহিত্যের বিশেষ ধরনটি বুঝাতেও এই টার্মটির ব্যবহার হয়ে থাকে।

    দোহাই:

    [আপ্টার] Apter, David

    1965 The Politics of Modernization. Chicago: University of Chicago Press.

    1971 Choice and the Politics of Allocation: a developmental theory. New Haven: Yale University Press.

    [ব্রেকেনরিজ] Breckenridge, Keith

    2003 “Power Without Knowledge: Three Colonialisms in South Africa.” http://www.history.und.ac.za/Sempapers/Breckenridge2003.pdf.

    2005 “Verwoerd’s Bureau of Proof: Total Information in the Making of Apartheid.” History Workshop Journal 59: 83-108

    [কুপার] Cooper, Marc

    1991 “Dum Da Dum-Dum”. Village Voice April 16, 1991, pp.28-33.

    [গ্রেয়বার] Graeber, David

    2006 On the Nature of Politics: Magic and the Legacy of Slavery in Madagascar. Bloomington: Indiana University Press.

    [হার্জফিল্ড] Herzfeld, Michael

    1994 The Social Production of Indifference: Exploring the Symbolic Roots of Western Bureaucracy. Chicago: University of Chicago Press.

    [জনসন] Johnson, Douglas H.

    1979 “Colonial Policy and Prophecy: the ‘Nuer Settlement’ 1929-20” in Journal of the Anthropological Society of Oxford, X/1.

    1982 “Evans-Pritchard, the Nuer, and the Sudan Political Service.” African Affairs, Vol. 81, No. 323. (Apr., 1982), pp. 231-246

    1994 Nuer Prophets. Oxford: Clarendon Press.

    [লিচ] Leach, Edmund

    1959 “Rethinking Anthropology.” Man:

    [রোজালদো] Rosaldo, Renato

    1986 “From the Door of His Tent: the Fieldworker and the Inquisitor.” In Writing Culture: The Poetics and Politics of Ethnography (James Clifford and George Marcus, eds.), Berkeley: University of California Press, pp. 77-97.

    [স্মিথ] Smith, Adam

    XXX Theory of Moral Sentiments

  • ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ: একজন খুদে মানুষ, একটি অনুবাদ

    ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ: একজন খুদে মানুষ, একটি অনুবাদ

    • বখতিয়ার আহমেদ

    আকস্মিকই তাঁর চলে যাওয়া। মৃত্যুর আগের দিনও টুইটারে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। নৈরাজ্যের নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেইবার আর নেই। গ্রেইবার ছিলেন সেইসব চিন্তকদের একজন যাঁরা ক্ষমতার প্রতিবয়ানে মানুষ, সমাজ, সম্পর্ক ও স্বাধীন-আনুভূমিক সংগঠনপ্রণালীর ইতিহাস ও ন্যায্যতা তুলে ধরেছেন। নৃতত্ত্ব এবং অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই তাঁর কাজকে বৈপ্লবিকই বলা চলে৷

    গবেষক এবং লেখক হিসেবে অবদানের বাইরেও পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও সক্রিয় ছিলেন ডেভিড গ্রেইবার। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট  আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও সংগঠক হিশেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমরাই ৯৯% এই বিখ্যাত শ্লোগানটির প্রণেতা হিসেবে তিনিই সর্বজন বিদিত।  এছাড়া রোজাভার মুক্তিপরায়ণ সমাজ তৈরির লড়াইয়ে সশরীরের উপস্থিত হয়ে সংহতি জানিয়েছেন গ্রেইবার। গ্রেইবার রেখে গেছেন তাঁর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ কাজ: Fragments of an Anarchist Anthropology, Debt: The First 5000 Years,  Direct Action: An Ethnography, Bullshit Jobs: A Theory ।
    প্রবহমান রচনাটি নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদ অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চতর গবেষণা করার সময় তৈরি করেন। প্রত্যক্ষভাবে তিনি সেখানে অংশ নেন অকুপাই আন্দোলনে। ২০১১ সালে নভেম্বরে তিনি ফেসবুকেই এটি প্রকাশ করেন। রচনাটির বর্তমান সংস্করণ সেখান থেকেই নেয়া। ব্যবহৃত ফটোগুলোও লেখকের, অকুপাই সিডনি আন্দোলনের। -সম্পাদক
    ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)
    ভেবেছিলাম শুধু অনুবাদটা করেই এবারের মত ক্ষ্যান্ত দিব। কিন্তু করতে করতে দেখলাম যা ভেবে লেখাটা অনুবাদ করতে নামা সেটা খোলাসা না করলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ অনেক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রিয় এক বন্ধুর ভাষায়, আমার ‘উচ্চশিক্ষার্থে পরলোক গমন’ দশা অনেক বেশি বাংলা লেখার সুযোগ দেয় না, আর সেই সাথে নিজের বৈকল্য তো আছেই। তারপরও মূল লেখাটার সামনে অনুবাদকের এভাবে জুড়ে বসার কারণ বাংলা ভাষা পরিসরে “নৈরাজপন্থা” নিয়ে আলোচনার কিছু বিপদ আছে। শব্দার্থগত সংকট তো আছেই, খোদ “নৈরাজ” নিয়ে আধুনিক নাগরিকের যে ইতিহাস-বিবর্জিত ধারণা সেটাও এই লেখার পাঠ অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে। কিন্তু আমি নাগরিকের ধারণা পাল্টানোর পুরা দায়িত্ব নিতে অক্ষম, এবং এটাকে কোন এক ব্যক্তির একার কাজ বলে মনেও করিনা। ফলে লেখাটার সাথে নিজের সম্পর্ক আর পাঠ অভিজ্ঞতার কিছু এলোমেলো বিবরণ ছাড়া অন্য কোন ভাবে এই দায় মেটানোর উপায় নেই।
    অকুপাই সিডনি

    গত বছর পাঁচেক ধরে আমি একটা অস্ট্রেলিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক-শিক্ষার্থী। ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারী ও মাল্টিকালচারাল’ এই গবেষণা কেন্দ্রের করিডোরে আমার পরিচয় আমি বাংলাদেশি নৃবিজ্ঞানী। তো, এখানে ২০০৭ সালের দিকে সমসাময়িক সামাজিক আন্দোলন বিষয়ে লেখালেখি ঘাঁটতে গিয়ে ভীষণ বদ-মেজাজী এক লেখার মুখোমুখি পড়ে যাই, এক মার্কিন নৃবিজ্ঞানী, ডেভিড গ্রেয়বার তার নাম। The Globalization Movement: Some Points of Clarification শিরোনামের লেখার প্রথম বাক্য, “A great deal of nonsense has been written about the so-called antiglobalisation movement”, লেখাটায় তার ক্ষুরধার বিশ্লেষণের বিষয় ‘বিশ্বায়ন আন্দোলন’, যাকে কর্পোরেট মিডিয়া “বিশ্বায়ন-বিরোধী আন্দোলন” নামে প্রচার করে, সেখানে মিডিয়া ও একাডেমি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা। পিয়েরে বরদিউ’র মত, তিনিও মনে করেন সেই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাজবিদ্যার পন্ডিতদের ভূমিকা, তার সোজা কথায় ‘ন্যাক্কারজনক’। সেই সব এন,জি,ও পুষ্ট অধ্যাপক, যারা বছরের পর বছর অস্তিত্বহীন সব সামাজিক আন্দোলন বিষয়ে বস্তা বস্তা কাগজ পয়দা করেছেন তারা সবাই সিয়াটলের মত বিদ্রোহ নিয়ে কবরের নীরবতা পালন করছেন। তিনি শুধু অভিযোগ তুলে ক্ষ্যান্ত দেন নাই। একজন খাঁটি নৃবিজ্ঞানীর মত এই আন্দোলনগুলোতে নিজের সক্রিয় অংশীদারি অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন কর্পোরেটের বিরুদ্ধে মানুষের স্বতস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ বিদ্রোহের বয়ান। লেখাটা পড়তে পড়তে ২০০৩ সালে, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারির প্রথম বছরে লেখা এক অসহায় জবানবন্দীর স্মৃতি জেগে উঠেছিল। কিন্তু নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি ২০০৭-এ আরেকটু উপরের ক্লাসে পড়ি, ফলে এই মিল আমাকে অবাক করেনি। নৈরাজপন্থী অধ্যাপক ব্রায়ান মার্টিনের ক্লাস করতে গিয়ে আমি তখন ‘হুইসেল ব্লোয়িং’ কথাটার মানে বুঝে গেছি, মানুষের ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে স্বরাজের সুন্দরকে চিহ্নিত করা একটু একটু করে শিখছি। যা হোক, আমি গ্রেয়বারের পিছু ছাড়লাম না। লাইব্রেরী হাতড়াতে গিয়ে পেয়ে গেলাম আরেকটা চটি বই, “Fragments of an Anarchist Anthropology”, পড়তে গিয়ে দেখি এখানে তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন রাষ্ট্রবিহীন সমাজ যে খুবই সম্ভব এবং এটাই যে মানব-প্রকৃতির সাথে একমাত্র সংগতিপূর্ণ ক্ষমতা বিন্যাস, বার বার এই অমূল্য-অপরুপ সত্যের মুখোমুখি হয়েও কেন নৃবিজ্ঞানীরা মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন। মনে পড়ছে সবচেয়ে মজার উদাহারণ ছিল র‍্যাডক্লিফ ব্রাউন। নৈরাজপন্থার প্রতি ঝোঁকের কারণে বন্ধুরা তাকে ডাকতেন ‘এনার্কো ব্রাউন’ নামে। কিন্তু যেই তিনি কেম্ব্রিজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হলেন, ‘স্যার’ হলেন, মুখ দিয়ে নৈরাজ শব্দটি আর কেউ কোনদিন শুনতে পায়নি। যদিও তার আজীবন গবেষণার বিষয় থেকেছে আন্দামান দ্বীপের নৈরাজ্যিক সমাজগুলোর রাজনৈতিক বিন্যাস, The Andaman Islanders, এক অসাধারণ এথনোগ্রাফি।

    যাই হোক, আমার নিজের পি এইচ ডি গবেষণার বিষয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রান্তসীমা পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচয় ও উন্নয়নের রাজনীতি। পিয়েরে ক্লস্ত্রে আর পিয়েরে বরদিউ নামের দুই ফরাসি নৃবিজ্ঞানীকে পড়ার চাপেই আমি তখন জেরবার, তার উপর এসে জুটলেন দুই আমেরিকান, জেমস স্কট আর এই ডেভিড গ্রেয়বার, আমার নিজের থিসিস লেখা প্রায় লাটে উঠল। কিন্তু একই সাথে বদলে যেতে থাকল নৃবিজ্ঞান নিয়ে আমার নিজের চিন্তা। একের পর এক ডেড লাইন মিস করতে থাকলাম, সুপারভাইজারের হাসি শুকনা থেকে শুকনাতর হতে থাকল, আর আমি নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আগের দেড় যুগের বহু শিক্ষা অশিক্ষা করার কাজে লেগে গেলাম। এখনও লেগে আছি, কিন্তু বাস্তব জ্ঞান খানিকটা ফিরেছে, পি এইচ ডি শেষ করতে চাই।

    অকুপাই সিডনি

    এই সেপ্টেম্বরে যখন ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ শুরু হল, অনেকেই হয়তো খেয়াল করেছেন, মিডিয়া প্রথমে পরিস্কার চেপে যাওয়ার চেষ্টা করল। পরে যখন দেখা গেল এটা আসলে চেপে রাখবার মত জিনিসের চেয়ে বহুগুণ বড়, তখন শুরু হল এ নিয়ে আবোল-তাবোল সংবাদ পরিবেশন। সেই বিস্তারে যাওয়ার সুযোগ আমার নেই কিন্তু একটা জিনিস মনে হচ্ছিল যে আন্তরিকতা থাকা স্বত্ত্বেও মিডিয়ার অনেকের কাছে, এবং সাধারণ্যের কাছে আন্দোলনটা ভীষণ অস্পষ্ট এবং ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার, অবাক হওয়ার মত ব্যাপার। মাসের পর মাস আন্দোলন চলছে কিন্তু এখনও কোন হিরোর নাম জানা গেল না, কোন নির্দিষ্ট দাবি নাই, কোন নেতা নাই, এ কেমন আন্দোলন? মিডিয়াও এ নিয়ে গলদঘর্ম হতে থাকল কিন্তু খুব একটা সুবিধা করা গেল না। কিন্তু সামাজিক আন্দোলনের পেশাদার গবেষক হিসাবে আমার অবাক হওয়ার অনুমতি নাই। কাজেই আমি গুগলে সোজা ডেভিড গ্রেয়বার নামে খোঁজ লাগালাম, দেখলাম মামা ঠিকই আছেন ব্রিটিশ পত্রিকা দি গার্ডিয়ানে, নিজের মত নিজের কাজটা ঠিকই করে যাচ্ছেন। এর মধ্য হঠাৎ দেখি বিজনেস উইক ম্যাগাজিন অক্টোবরের ৩১ তারিখের সংখ্যায় অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট নিয়ে তাদের বিশেষ সংখ্যার শিরোনাম দিয়েছে Who is Behind the Mask? খানিকটা চমকে, মনে সন্দেহ নিয়ে সেই মুখোশ উল্টালাম, দেখি ডেভিড গ্রেয়বারের নাম। শংকা আরো বেড়ে গেল কারণ আমি জানি এই বিদ্রোহে তো কারো হিরো হওয়ার কথা নয়। লেখাটা পড়ে ভুল ভাঙল। আমার ধারণা গ্রেয়বারকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি এখানে কি করছেন, উত্তর হবে নৃবিজ্ঞানী হিসেবে নিজের সামাজিক ভূমিকা পালন করছি। আর লেখাটা হচ্ছে এক নৃবিজ্ঞানীকে নিয়ে লেখা, এথনোগ্রাফিক ধারায় অনুপ্রাণিত একটি রচনা। শিবের গীত লম্বা হয়ে যাচ্ছে, কাজেই কিছু জরুরী আলাপ দিয়ে শেষ করি।

    অকুপাই সিডনি

    এনার্কি’র বাংলা কি হবে এ বিষয়ে আমার এখনো কোন চূড়ান্ত ফয়সালা নাই। আমি নৈরাজ/নৈরাজ্য/নৈরাষ্ট্র/স্বরাজ/অরাজ ইত্যাদি শব্দমূলের নানা ধর্মী প্রয়োগ নিয়ে ভাবি, কোন একটাতে থিতু হওয়ার তাড়া যেমন নাই, তেমনি উপায়ও নাই আপাতত। কিন্তু এই শব্দগুলোর, বিশেষত ‘নৈরাজ্যে’র সরকারি মানেটাই এখনও পর্যন্ত মতাদর্শ নির্বিশেষে বাংলা ভাষার সমসাময়িক সব লেখক নির্বিচারে মেনে নিয়েছেন। প্রায়ই অবাক হই এই লেখকদের তালিকায় কষ্ট-কল্পনীয় সব নাম দেখে। নৈরাজপন্থী ধ্যান-ধারণার ঐতিহাসিক সূতিকাগারগুলোর একটি হয়েও বাংলাভাষী অঞ্চলের সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় নৈরাজপন্থা বুদ্ধিবৃত্তির সরকারি পরিভাষার তাবেদারিতে আটকে আছে। কাজেই এই লেখাটি পড়ার গুরুত্বপূর্ণ একটা মানসিক প্রস্তুতি হওয়া উচিত “নৈরাজ” শব্দটার সরকারি মানের চক্কর থেকে বেরুনো।

    নৈরাজপন্থা আসলে কি? নৈরাজপন্থা আসলে কোন রাজনৈতিক মতবাদ নয়। অন্য এক লেখায় গ্রেয়বার বলেছিলেন, “মার্ক্সবাদ হচ্ছে বিপ্লবের কৌশল বিষয়ক তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণ ধর্মী ডিসকোর্স আর নৈরাজপন্থা হচ্ছে বিপ্লবী চর্চার নৈতিকতা বিষয়ক ডিসকোর্স”। নৈরাজ্যের চুড়ান্ত লক্ষ্য নৈরাজ্যই, এনার্কি ইজ অর্ডার। আর সব রাজনৈতিক দর্শন মানুষকে প্রাকৃতিকভাবে হিংস্র, স্বার্থপর মনে করে (হবসের কল্পনা) এবং হানাহানিকেই আদি শাশ্বত সামাজিক দশা মনে করে। ফলে রাষ্ট্রকে বল-প্রয়োগের সার্ব্বভৌম ক্ষমতা দেয়া হয় একজন আরেকজনকে দেখিবামাত্র খুন করবার একটা সম্ভবনাকে সমাজের প্রকৃতি অনুমান করে। খুনোখুনিকেই আদি মানব-দশা বা অর্ডার বোঝানো হয়। মনে করা হয় আইনের শাসন, কারাগার, এবং শাস্তির সার্বক্ষণিক একটা আতংক না থাকলে মানুষ মানুষ থাকবে না। অন্যদিকে নৈরাজপন্থীরা মনে করেন একে অন্যকে সহযোগিতাই হচ্ছে মানব প্রকৃতি। এবং মানুষ এটা রাষ্ট্রের খবরদারি, আইনি ব্যবস্থা এবং কোন ধরনের হুজুরদের উপস্থিতি ছাড়াই করতে সক্ষম। রাষ্ট্রের দাপুটে ইতিহাস আমাদের এই সত্যটা ভুলিয়ে দেয় যে মানবেতিহাসের ৯৯% ভাগ সময় জুড়ে সব মানব সমাজ, এবং গত শতাব্দীর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর বেশির ভাগ জায়গার মানুষেরা সেটা করেছে। নৈরাজপন্থীরা আস্থা রাখেন মানুষের অনাদি মমত্ববোধের উপর, সমাজের মধ্যে অরাজনৈতিক (কর্তৃত্বহীন) ক্ষমতা চর্চার উপর। তারা মনে করেন কর্তৃত্ব ছাড়াও নেতৃত্ব সম্ভব। রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রকে তারা সামরিকতন্ত্রেরই নামান্তর মনে করেন কারণ এখানেও একটি ছোট্ট ‘নির্বাচিত’ দলকে বৃহদাংশের উপরে বল প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়। নৈরাজপন্থীরা মনে করেন একটি সমাজের প্রয়োজনীয় সব সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের মাধ্যমে, সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নেয়া সম্ভব। নৈরাজপন্থীদের লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়, ক্ষমতাতন্ত্রের অবসান।

    এই অনুবাদ, বা মূল লেখার লক্ষ্য ডেভিড গ্রেয়বারকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন নয়। বছর পাঁচেক ধরে তার দুরবর্তী কিন্তু মনযোগী ছাত্র হিসেবে জানি যে আইডিয়াটা উনিও পছন্দ করবেন না। বরং লেখাটি রাজনৈতিক আন্দোলন বা এর নেতৃত্ব যে কর্তৃত্ববিহীনও হতে পারে তার একটা কেস স্টাডি হিসেবে পড়া যেতে পারে। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র যে একটি বাস্তব, এবং প্রয়োগযোগ্য, এবং অর্জনযোগ্য ব্যাপার, ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ যে তার জলজ্যান্ত উদাহারণ, এটা অনুধাবন করা যেতে পারে এই লেখা থেকে। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহকে নৈরাজপন্থী বিদ্রোহ বলার উদ্দেশ্য এটার গায়ে কোন রাজনৈতিক মতবাদের ব্র্যান্ড লাগানো নয়, কারণ আগেই বলেছি, নৈরাজপন্থা কোন রাজনৈতিক মতবাদ নয়, খোদ রাজনীতি প্রশ্নে একটি নৈতিক অবস্থানের নাম।

    অকুপাই সিডনি

    অন্যদিকে নৃবিজ্ঞানকে একতরফাভাবে একটি বিপ্লবী/বেপরোয়া বিজ্ঞান হিসেবে হাজির করাও এর উদ্দেশ্য নয়। রাষ্ট্র-ব্যবস্থা বিবর্জিত সমাজ সম্পর্কে মানববিদ্যাগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে নৃবিজ্ঞানই সবচেয়ে বেশি ভেবেছে কিন্তু সেই ভাবনার বড় অংশই কানার হস্তীদর্শন… যেখানে রাষ্ট্র নেই সেখানে তারা কাল্পনিক আদিম বর্বরতা দেখেছে, আবার যেখানে উপনিবেশিক রাষ্ট্র পুরাদমে হাজির থেকে রাষ্ট্রবিহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করেছে সেখানে আধুনিক রাষ্ট্রের জলজ্যান্ত উপস্থিতিকেও তারা উপেক্ষা করে গেছেন। উদাহারণ হতে পারে ইভান্স প্রিচার্ডের ‘দি নুয়ের’। নুয়েরদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানের এই ধ্রুপদী এথনোগ্রাফিটিতে তিনি সব বলছেন শুধু নুয়েরদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে আসলে রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি বাস্তব, যৌক্তিক এবং নৈরাজ্যিক ব্যবস্থা এটা বাদে। আবার একই সাথে এই গোত্রগুলোর চারপাশ থেকে চেপে আসা আধুনিক রাষ্ট্রের ভৌতিক উপস্থিতিকেও তিনি নিজের লেখায় অনুপস্থিত রেখে দিচ্ছেন। আর সবচেয়ে বড় যে ঝামেলাটা উপনিবেশিক (উপনিবেশ  কিন্তু কোন মৃত অতীত নয়) যুগের নৃবিজ্ঞানীরা বাধিয়েছেন তা হচ্ছে রাষ্ট্রবিহীন সমাজকে আদি, আদিম, এথনিক, ট্রাইবাল, উপজাতি ইত্যাকার নামে ডেকে মানুষের ইতিহাসকে বিবর্তনের অমোঘ সরল রেখায় সাজিয়ে দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্র মানুষের ইতিহাসের অবিকল্প/অনিবার্য নিয়তি, এটাই একমাত্র কাম্য, এটাই স্বাভাবিক, এটাই সভ্যতার তথা মানূষের রাজনৈতিক ইতিহাসের শেষ গন্তব্য। ফলে নৃবিজ্ঞানও জান্তে বা অজান্তে বৃহদাংশে সেই কান্ডজ্ঞানের অংশ হয়ে গেছে যা মানুষকে ডান্ডা ও দন্ড ছাড়া সভ্য ভাবতে পারেনা।

    অহিংস নাগরিক বিদ্রোহ, ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহের যেটা মূল রাজনৈতিক কৌশল, সেটাকেও অদ্বিতীয়, অবিকল্প এবং সার্বজনীন নৈরাজ্যিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ভাবাটাও ঠিক নয়। আসলে নৈরাজের ধারণা মানুষের অচেতনের এমন গভীরে প্রোথিত যে সেটাকে শুধু তার রাজনৈতিক কৌশলের নিরীক্ষে বুঝতে যাওয়াটাও বোকামি। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, বা ঢাকা শহরে অনশন একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে কারণ সেখানে মিডিয়া আছে, জনতা আছে, রাষ্ট্রের আইনি বাধ্য-বাধকতা আছে। কিন্তু ঝাড়খন্ডের জঙ্গলে রাষ্ট্রের হাতে নিষ্পেষিত আদিবাসীরা অনশন করে কোন রাজনৈতিক অর্জনে পৌছাতে পারবে না, কারণ তারা যে না খেয়ে আছেন সেটা দেখবার মতন কেউ নেই, কখনও ছিলও না। আদিবাসীদের মুক্তি আকাঙ্ক্ষা, স্বরাজের আকাঙ্ক্ষা সেখানে তাই মাও সে তুং এর বন্দুক হয়ে গর্জে উঠে।

    অকুপাই সিডনি

    ডেভিড গ্রেয়বারকে নিয়ে আমার প্রধানতম প্রেমানুভূতি হচ্ছে তিনি অতি সাধারণ, স্বাভাবিক, ক্ষুদে একজন মানুষ যিনি নিজের ছোট্ট কোণটিতে নিজের ছোট্ট কাজটা ঠিক-ঠাক মত করবার চেষ্টা করেন। ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহের মত কান্ড ঘটানোর চতুর্থ দিনে বিরহ কাতর প্রেমিক হয়ে ছুটে যান নিউ ইয়র্ক থেকে অস্টিনে, বদ-মেজাজের জন্য চাকরি হারান, পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে ফেল মারেন ড্রাইভিং টেস্টে। ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ থেকে সামাজিক আন্দোলনের ছাত্র হিসেবে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল কিভাবে অরাজপন্থা অতি সাধারণ সব মানুষকেও ইতিহাসে তার ভূমিকা পালনের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়, কিভাবে ব্যক্তির আপাত সাধারণ গুণাবলিকেও ইতিহাস নির্মাণের কাজে লাগায়, কিভাবে ইতিহাসকে হিরোদের হাত থেকে উদ্ধার করে ছোট্ট ছোট্ট সাধারণ মানুষদের হাতে তুলে দেয়। অরাজপন্থা এ কারণেই আজকের সময়ের সবচেয়ে সম্ভবনাময় রাজনৈতিক অবস্থান কারণ তা রাজনীতির নামে ব্যক্তিকে সমাজের বোঝা না বানিয়েও তার সমস্ত সম্ভবনাকে কাজে লাগাতে পারে মুক্তির লড়াইয়ে। ব্যক্তি মানুষও মুক্তি পায় কর্তৃত্বের/নেতৃত্বের অভিশাপ থেকে। গ্রেয়বারের একটা ছবি খুঁজে টানিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল নোটে, পরে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বিবেচনায় বাদ দিলাম। থাক না ছোট্ট মানুষেরা অনিন্দ্য সুন্দর সব মুখোশের আড়ালেই।

    কিছু টেকনিক্যাল টার্ম আছে, আমি ফুটনোট দেয়াসহ নোটটার ঘষামাজা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব। আর বানানের বিষয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আপাতত গত্যান্তর নাই।

    ডেভিড গ্রেয়বার: ওয়াল স্ট্রিট দখল আন্দোলনের অ্যান্টি-লিডার

    পরিচিত হউন এক নৃবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক কর্মী, ও নৈরাজ্যবাদীর সাথে যিনি এক অভাগা মিছিলকে একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ আন্দোলনে রুপান্তরিত হতে সহায়তা করেছেন।

    ড্রেক বেনেত্তে

    স্ট্রিট আর্টওয়ার্ক

    ডেভিড গ্রেয়বার বলতে পছন্দ করেন যে এ বছর আসলে তার লক্ষ্য ছিল তিনটাঃ নিজের বইয়ের বিক্রি-বাট্টা বাড়ানো, গাড়ি চালানো শেখা, এবং, বিশ্বব্যাপী একটা বিপ্লব শুরু করা। প্রথম কাজটা ভালই চলছে, দ্বিতীয়টা কঠিন লাগছে, এবং তৃতীয়টার ক্ষেত্রে, অগ্রগতি ভাল।

    গ্রেয়বার একজন পঞ্চাশ বছর বয়সি নৃবিজ্ঞানী- কেউ কেউ মনে করেন নিজের প্রজন্মের উজ্জ্বলতমদের একজন- খ্যাত হয়েছেন বিনিময় ও মূল্য  ব্যবস্থা নিয়ে উদ্ভাবনী তত্ত্বের জন্য, ‘ইরোকুইজ ওয়ামপুম’ বা ‘কোয়াকিটল পোটলাচ’র মতন নৃবৈজ্ঞানিক প্রপঞ্চ ঘেঁটে। মার্কিন নাগরিক, এখন শিক্ষকতা করেন ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের গোল্ডস্মিথ কলেজে। নৃবিজ্ঞানী ছাড়াও তিনি একজন নৈরাজ্যবাদী এবং আমূলপন্থী সংগঠক, গত কয়েক দশকের অনেকগুলো বড় বামপন্থী প্রতিরোধ আন্দোলনের লড়িয়ে; কুইবেক সিটি এবং জেনোয়া, নিউ ইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়াতে রিপাবলিকান জাতীয় কনভেনশনে বিক্ষোভ, ২০০২ সালে নিউ ইয়র্কে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সভায় বিক্ষোভ এবং সর্বশেষ এ বছরের গোড়ায় লন্ডনের বর্ধিত ছাত্রবেতন বিরোধী বিক্ষোভে সক্রিয় ছিলেন। এই গ্রীষ্মে গ্রেয়বার ছিলেন ছোট্ট একদল রাজনৈতিক কর্মীদের একজন যারা প্রথমে নিঃশব্দে পরিকল্পনা করেছে, তারপর ঢোল পিটিয়ে দখল করেছে লোয়ার ম্যানহাটনের জুকত্তি পার্ক, তারপর অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট নামে এক আদলহীন বৈশ্বিক আন্দোলনের পাদ-প্রদীপ হয়ে উঠেছে।

    গ্রেয়বারকে এই আন্দোলানের একজন নেতা বলা ভুল হবে, কারণ তাদের মধ্যে সার্বক্ষণিক চর্চিত কর্তৃত্বহীনতার দর্শন নেতৃত্বের ধারনাটাকেই বিদ্ঘুটে মনে করে। তিনি আন্দোলনের কোন মুখপাত্রও নন, কারণ এই আন্দোলন এখন পর্যন্ত কোন সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া পেশ করতে অস্বীকার করেছে। এমনকি, জুকত্তি পার্কেও তার নাম খুব বেশি লোকে জানে না। কিন্তু তিনি এই দলটির সবচেয়ে সুসংহত কণ্ঠস্বর গুলোর একজন যিনি আন্দোলনের আশা-নিরাশাকে ফ্রেমে তুলে ধরতে পারেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির গভীরতর বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। “আমরা যা দেখছি তা হচ্ছে এক নতুন আমেরিকান প্রজন্মের বিদ্রোহী আত্ম-সত্ত্বার সুচনা, এমন এক প্রজন্ম যারা দেখতে পাচ্ছে পড়াশুনা শেষ করে তাদের সামনে কোন চাকরি নেই, কোন ভবিষ্যত নেই, আছে শুধু বিশাল অংকের ক্ষমাহীন ঋণের বোঝা”। সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখে গার্ডিয়ানে লেখা এক উপসম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন “এটা কি আসলে অবাক হওয়ার মত ব্যাপার যে তারা তাদের ভবিষ্যত চুরি করা অর্থকড়ির রাঘব-বোয়ালদের সাথে একটা ফয়সালা করতে চাইছে?”

    গ্রেয়বারের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারনা কাঠামো পেয়েছে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, কিন্তু একই সাথে তা ঋদ্ধ হয়েছে তার জীবনের আরেক অংশ, নৃবিজ্ঞানী হিসেবে তার কাজের মধ্য দিয়ে। গ্রেয়বারের সর্বশেষ বই, ঋণঃ প্রথম ৫,০০০ বছর প্রকাশিত হয়েছে ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহের দুই মাস আগে। বইটা টাকা ও বাজারব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের একটি বিকল্প ইতিহাস; বিশাল বিস্তৃতি, গভীর বোঝা-পড়া, এবং চিন্তা নাড়া দেয়ার মত এক কাজ। পশ্চিম আফ্রিকার টিভ জনগোষ্ঠি থেকে শুরু করে প্রাচীন সুমেরীয় থেকে মধ্যযুগের আয়ারল্যান্ড থেকে আধুনিক আমেরিকা পর্যন্ত অজস্র সমাজের বরাত দিয়ে তিনি দেখাচ্ছেন কিভাবে ঋণের প্রতি মানুষের একটা অনিশ্চিত আচরণ কাজ করে, কিভাবে ঋণ একই সাথে বাধ্য-বাধকতা ও পাপ হিসেবে বিরাজ করে, কিভাবে একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শোষণ-নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই ইতিহাসের পথ পাড়ি দিতে দিতেই তিনি এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন কেন ইতিহাসজুড়ে বেশির ভাগ মানুষই ঋণ শোধ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব মনে করে কিন্তু আবার একই সাথে মনে করে যে টাকা ধার দেয়া যাদের পেশা তারা শয়তান।

    গ্রেয়বারের যুক্তিতর্কের ধারা তাকে সরাসরি অর্থশাস্ত্রের মূলসূত্রগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, এবং শাস্ত্রটি তাকে, মোটা দাগে, অবজ্ঞা করেছে। কিন্তু বইটা সাধারণ পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য এর চেয়ে মাহেন্দ্রক্ষণ আর কিছু হতে পারেনা। তার লেখালেখি তিনি যে আন্দোলনটার সূচনার সাথে জড়িত সেটাকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো দিয়েছে, একে একটা ঐতিহাসিক গতিধারার সাথে যুক্ত করেছে। ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহীদের অস্পষ্ট দাবি-দাওয়া দুইটা বিষয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে, এক. রাজনীতিতে টাকার প্রভাব; দুই. ঋণঃ বন্ধক, ক্রেডিট কার্ড, শিক্ষা ঋণ এবং তার সাথে বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো এবং বড় ব্যক্তি ঋণ গ্রহীতাদের ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক ধ্বসের সময় যেভাবে আপ্যায়ন করা হয়েছে তার তুলনা।

    “ও অনেক গভীর করে ভাবতে পারে, ও বরাবরই আন্দোলন আর বিপ্লবের ছাত্র”, বলছিলেন কালে লাসন, ভ্যাঙ্কুভারের কর্পোরেট বিরোধী ম্যাগাজিন অ্যাডবাস্টার্সে’র প্রতিষ্ঠাতা। সে হচ্ছে ওই টাইপের লোক যে বলবে, “আমরা যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেটা কি ১৯৬৮ সালের মত নাকি ফরাসি বিপ্লবের মত?”

    গ্রেয়বার এটা ব্যাখ্যা করেন আরো বড় এক গল্পের অংশ হিসেবেঃ পুরা ইতিহাস জুড়েই ঋণ আসলে নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের সম্পদ হরণের রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার (সাধারণত যুদ্ধে খরচ করবার জন্য) এবং ইতিহাসে যখনি যথেষ্ট পরিমান মানুষ যথেষ্ট পরিমান ঋণে নিমজ্জিত হয়েছে, তখনি সাধারণতঃ কোন না কোন ধরনের বিদ্রোহ হয়েছে।

    গ্রেয়বার ছোট্ট-খাট্ট অস্থির ধরনের মানুষ, নীল চোখ, কিশোরসুলভ ফ্যাকাসে মুখ। স্নাতক শিক্ষার্থীদের মতন পোষাক-আশাক পড়েন, হড়বড় করে কথা বলেন, লম্বা যুক্তিমালার ফাঁকে ফাঁকে রাগে ফেটে পড়েন, ছেড়া-খোঁড়া হাসি দেন, দম নেওয়ার জন্য আবার একটু থামেন। কারো চোখে খুব একটা চোখ রাখেন না। একটা চিন্তা শেষ করার পর হাঁসের মত মাথা ঝাঁকান, ভুরু দিয়ে ধনুক বানান, যেন তিনি এইমাত্র একটা হালকা কিন্তু আশংকাজনক শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

    অকুপাই পোস্টার

    ওয়াল স্ট্রিট বিদ্রোহ শুরু হওয়ার চারদিন পর থেকে কয়েক সপ্তাহ গ্রেয়বার ছিলেন টেক্সাসের অস্টিনে, দীর্ঘ মাঠ-গবেষণা শেষে মেক্সিকো থেকে ফেরা সহ-নৃবিজ্ঞানী বান্ধবীর সাথে সময় দিতে। সেখানেও খানিকটা জড়িয়ে ছিলেন অকুপাই বিদ্রোহের দুনিয়ার বহু জায়গার মত স্থানীয় সংস্করণ ‘অকুপাই অস্টিনে’।

    এই গ্রীষ্মটা গ্রেয়বার শুরু করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাবাটিকেল ছুটি নিয়ে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্কে এসে, যেখানে প্রায়শই আড্ডা দিতে যেতেন ১৬বিভার নামের একটা ‘আঁতেল’দের আখড়ায়। এটা ছিল ওয়াল স্ট্রিটের পাশেই বুদ্ধিবৃত্তিক অ্যাক্টিভিস্টদের একটা আখড়া যেখানে লোকজন শব্দার্থবিজ্ঞান, ইন্টারনেট হ্যাকিং বা আদিবাসী সংগ্রাম নিয়ে কথা বলে। আরো অনেক আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্টদের মতই গ্রেয়বারও গভীর নাড়া খেয়েছিলেন মিশরীয় জনতার তাহরির চত্বর দখল, এবং মাদ্রিদের কেন্দ্র দখল করা ‘ইন্ডিগনাদোস’দের দেখে। মধ্য জুলাইয়ের দিকে তিনি অ্যাডবাস্টার্সে একটা ছোট নিবন্ধ লেখেন এরকম একটা উত্থান পশ্চিমে ঘটানোর জন্য কি কি করা যায় সে নিয়ে। গরমের বেশিরভাগ সময়টা জুড়ে ১৬বিভারের আলোচনা ঠিক এই প্রশ্নকে ঘিরেই ঘুরপাক খায়। যখন ‘অপারেশন এম্পায়ার স্টেট রেবিলিওন’ নামের স্থানীয় একটি সংগঠন জুনের ১৪ তারিখে জুকত্তি পার্কে প্রথম দখল কর্মসূচীর ডাক দেয়, মাত্র চার জন লোক হাজির হয়েছিল সেখানে।

    জুলাই ১৩ তারিখে অ্যাডবাস্টার্স তাদের আহবান জানায় ওয়াল স্ট্রিট দখলের, দিন ঠিক করা হয় দুই মাস পরের, সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ। দিন ঠিক করা আর প্রচার চালানোই ছিল আন্দোলনে ম্যাগাজিনটির মূল সম্পৃক্তি। ‘নিউ ইয়র্কারস এগেইন্সট বাজেট কাট’ নামের একটি দল, কিছু ছাত্রকর্মী, এবং নগরীর গরিব পাড়া-মহল্লার কিছু নেতা এগিয়ে এলেন বাকি কাজকর্ম সামলানোর জন্য। জুন ও জুলাইয়ের তিন সপ্তাহজুড়ে শহরের বাজেট কাট এবং ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে তারা ক্যাম্প গেঁড়ে বসে থাকলেন সিটি হলের সামনের রাস্তার ওপারে, একটা ছোট্ট তাঁবুর শহর বানিয়ে যার নাম দিয়েছিলেন তারা ব্লুম্বার্গভিল। তারপর তাদের মনে হল এই একই কাজ করা যায় ওয়াল স্ট্রিটেও। অ্যাডবাস্টার্সে’র সাথে কথা বলে তারা একটি ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ বা ‘পিপল’স জেনারেল এসেম্বলির ডাক দিলেন “যে কোন ধরণের কাট-ছাঁট ও কৃচ্ছতা সাধনের” বিরদ্ধে, এবং পরিকল্পনা আঁটতে লাগলেন সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখের ‘দখল’ কর্মসূচী নিয়ে।

    সমাবেশটা হওয়ার কথা ছিল শহরতলীর ম্যানহাটন পার্কের বোউলিং মাঠে যেখানে এই আন্দোলনের কারণে ইতিমধ্যে খ্যাতি পাওয়া নুড়ি পাথরে খুড় দাবড়িয়ে তেড়ে আসা ষাঁড়ের ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে। গ্রেয়বার এই সমাবেশটার খবর পেয়েছিলেন এবং আগস্টের ২ তারিখ বিকেলে তিনি বোউলিং মাঠে যান দুই বন্ধুকে নিয়ে, জিওর্জিয়া সাগ্রি নামের এক গ্রিক নৈরাজ্যপন্থী শিল্পী এবং সাবু কোহসো নামের এক জাপানি এক্টিভিস্ট (যিনি গ্রেয়বারের বইয়ের জাপানি অনুবাদকও)।

    ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ বা ‘পিপল’স জেনারেল এসেম্বলি’ কথাটি একজন নৈরাজপন্থীর কাছে বিশেষ অর্থ ও তাৎপর্য বহন করে। একভাবে ধরতে গেলে এটা সমসাময়িক নৈরাজপন্থার একটি কেন্দ্রীয় বিষয় যেটি দাঁড়িয়ে আছে এই ধারণার উপর যে বল-প্রয়োগ নির্ভর যে কোন বিপ্লবী আন্দোলনই নিপীড়নমূলক সমাজেরই জন্ম দেয়। ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ হচ্ছে খুবই সুচিন্তিত সতর্কতায় পরিচালিত একটি যৌথ আলোচনা পদ্ধতি যার মাধ্যমে সব সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় কোন গুটি কতক নেতার মাধ্যমে নয়, সংখ্যাগুরুত্বের জোরে নয়, যৌথ-মিমাংসা বা কনসেন্সাসের মাধ্যমে। অমিমাংশিত বিষয়গুলো তুলে দেয়া হয় জমায়েতের মধ্যেই ছোট ছোট ওয়ার্ক গ্রুপের হাতে, কিন্তু শেষতক সিদ্ধান্ত হতে হবে সর্বসম্মতিক্রমে, এমনকি জমায়েতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেলেও। আপাত দৃষ্টিতে এটা খুব কঠিন সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া মনে হতে পারে, কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলন যে অভিনব ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে সাধারণ্যের সমাবেশকে বিশালকায় জনস্রোতের মধ্যেও কার্যকর একটি পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণ করা, এবং বিদ্রোহের স্বতন্ত্র সব চিহ্ন-ভাষা উদ্ভাবন করা যা ব্যবহার করে যে কোন অংশগ্রহণকারীই সরাসরি প্রশ্ন তুলতে, সমর্থন দিতে বা অসম্মতি জানাতে, এমনকি নির্জলা বিরোধিতা করতে পারেন।

    অকুপাই পেইন্টিং

    কিন্তু গ্রেয়বার ও তার বন্ধুরা যখন আগস্টের দুই তারিখের সমাবেশে হাজির হলেন, তারা আবিস্কার করলেন যে আয়োজনটা যত না ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ তার চেয়ে বেশি একটা প্রথাগত মিছিল যা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে কিছু পূর্ব-নির্ধারিত দাবি-দাওয়া নিয়ে ওয়াল স্ট্রিট অভিমুখে যাত্রা করবে (যার একটি ছিল “প্রাইভেট ও পাবলিক খাতে গণ-কর্মসংস্থান কর্মসূচী”, এবং অন্যটি ছিল “নিপীড়ন ও যুদ্ধের অবসান”)। নৈরাজপন্থার পরিভাষায়, আয়োজনটা পরিচালিত হচ্ছিল ‘উলম্বিক’ ভাবে, ‘আনুপূর্বিক’ সংগঠনের মত, গ্রেয়বার ও তার বন্ধুরা যেমন আশা করেছিলেন সে রকম ‘আনুভূমিক’ ভাবে নয়, এবং এটা দেখে গ্রেয়বার আর সাগ্রি ভীষণ ক্ষেপে গেলেন।

    এরপর যা ঘটল তা যেন নৈরাজপন্থার একটি শিক্ষনীয় গল্প। কোহসোকে সাথে নিয়ে এই দুইজন আরো কিছু লোকজন জুটিয়ে ভিন্নমত আর অসন্তুষ্টি জানিয়ে চলে এলেন পার্কের আরেক কোনে এবং নিজেদের মত করে ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ শুরু করলেন, ১৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচীর পরিকল্পনা শুরু করলেন। শুরুতে ডজন খানেক লোক থাকলেও আস্তে আস্তে এপাশে লোক বাড়তে থাকল, তাদের র‍্যালিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আয়োজকদের অনেক চেষ্টা স্বত্ত্বেও। এই দড়ি টানাটানি চলল সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত, কিন্তু শেষতক বোউলিং মাঠের অবশিষ্ট ৫০ জনের মত জমায়েতের সবাই যোগ দিলেন বিদ্রোহের ভিতরের বিদ্রোহীদের ‘সাধারণ্যের সমাবেশে’।

    “ঐ মিছিলের আয়োজকরাও শেষ পর্যন্ত যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সাথে”, স্মৃতি-চারণ করছিলেন কোহসো। “তারপর সবাই মিলে অনেক অনেক রাত পর্যন্ত আমরা পরিকল্পনা করেছি আমাদের কি কি কমিটি দরকার সে নিয়ে”।

    যদিও পরের কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতি বাকি ছিল, কিন্তু সেদিন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জিত হয়েছিল। ঘটনাটা আনুভূমিকভাবে পরিচালনা, এবং সে অনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন তা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। তার মধ্যে অন্যতম একটা সিদ্ধান্ত ছিল কোন নেতা, এমনকি পুলিশের সাথে দেন-দরবারকারী পর্যন্ত না রাখা, প্রাত্যহিক ‘সাধারণ্যের সমাবেশ’ ও তৎসংশ্লিষ্ট অগুনতি ওয়ার্ক গ্রুপের সভা করা যা এখনও জুকত্তি পার্কের প্রতিরোধ আন্দোলনের হৃৎপিন্ড হিসেবে কাজ করছে, এর থেকে দুনিয়া জুড়ে স্রোতস্বিনী হওয়া অন্য সব আন্দোলনেরও।

    গ্রেয়বারের জন্য পরের দেড় মাস ছিল চরকির মত মিটিং করে বেড়ানোর সময়। তখন সাপ্তাহিক সমাবেশ হতো, প্রথমটি হয়েছিল ব্যাটারি পার্ক সিটির আইরিশ হাঙ্গার মেমোরিয়ালের কাছে, পরেরগুলো ইস্ট ভিলেজের টম্পকিনস স্কয়ার পার্কে। তিনি এর কয়েকটি সমন্বয় করেন নিজে, এবং বাকি সময়ের পুরোটাই দেন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে হওয়া বিভিন্ন কর্ম-দলের সভায়। (আগস্টের ১৪ তারিখে টুইটারে লিখেছিলেন, “আজ আমি ক্লান্তিতে নিঃশেষ। জীবনের প্রথম ড্রাইভিং ক্লাস, তারপর টম্পকিনস স্কয়ার পার্কে সভা পরিচালনা তিন ঘন্টা ধরে”)। তিনি আইনী ও স্বাস্থ্যগত প্রশিক্ষণ সংগঠিত করছিলেন, অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন বিষয়ে ক্লাস নিচ্ছিলেন বিরামহীন। কি কি দাবি-দাওয়া থাকবে বা আদৌ থাকবে কিনা এ নিয়ে সীমাহীন আলোচনা চলল, এমন এক প্রশ্ন যা এই কয়েক মাস পরেও অমিমাংসিতই থেকে গেছে।

    সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখের ‘সাধারণ্যের সমাবেশে’ সিদ্ধান্ত হল দখলের লক্ষ্যবস্তু নিয়েঃ প্রথম পছন্দ চেজ ম্যানহাটন প্লাজা। বেশ কয়েকটি হাতের পাঁচও রাখা হল বিবেচনায়। ফলে দখল শুরু হওয়ার আগের রাত থেকেই পুলিশ যখন ম্যানহাটন প্লাজা ঘিরে রাখল, দখল-আন্দোলনকারীদের বিকল্প প্রস্তুতির কোন ঘাটতি দেখা দিল না। সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে, নির্ধারিত সময় বিকেল তিনটার ঘন্টাখানেক আগেই প্লাজার পরিবর্তে জুকত্তি পার্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মুখে মুখে ছড়িয়ে দেয়া হল, প্রায় ২০০০ লোক জড়ো হয়ে গেল এখন বিখ্যাত হয়ে যাওয়া জুকত্তি পার্কের পাথুরে চত্বর, নীচু বেঞ্চ আর গাছপালার ছায়ায় ছায়ায়। স্থান নির্বাচনটি আসলেই ভাগ্যের আশীর্বাদপুষ্ট কারণ জুকত্তি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন পার্ক, ফলে শহর কর্তৃপক্ষের বিক্ষোভকারীদের উচ্ছেদ করবার কোন আইনী অধিকার নেই। সে রাতের সাধারণ সমাবেশটি সমন্বয় করেন গ্রেয়বার যেখানে সিদ্ধান্ত হয় এখুনি ওয়াল স্ট্রিট অভিমুখে যাত্রা না করে পার্কেই ক্যাম্প করে থাকবার। তিন দিন পরে, গ্রেয়বার যখন অস্টিনের উদ্দেশ্যে উড়াল দেন, বিক্ষোভটি ইতিমধ্যেই নিউ ইয়র্কের স্থানীয় একটি খবরের চেয়ে একটু বেশি কিছুই হয়ে উঠেছে।

    গ্রেয়বার ১৬ বছর বয়স থেকেই নৈরাজপন্থী। তিনি বড় হয়েছেন নিউ ইয়র্কেই, আমূলপন্থী রাজনীতিতে ঠাসা চেলসিয়ার ট্রেড ইউনিয়ন অর্থায়িত একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে। এক ইঁচড়ে পাকা শিশুর মতই, এগারো বছর বয়সেই তার গভীর আগ্রহ জন্মায় মায়ান হায়রোগ্লিফিক্সের নিয়ে। (এই প্রাচীন লিখন পদ্ধতিটির তখনও কেবল আংশিক পাঠোদ্ধার হয়েছে)। তিনি তার নিজের মৌলিক কিছু অনুবাদ পাঠালেন এ বিষয়ে সে সময়কার এক শীর্ষ স্থানীয় বোদ্ধার কাছে যিনি এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে গ্রেয়বারের জন্য একটি বৃত্তি যোগাড় করে দেন আনডোভারের মাস’র ফিলিপস একাডেমিতে।

    গ্রেয়বারের জন্মের সময় তার বাবা-মার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, যার একটা বড় সময় তারা পার করেছেন ১৯৩০ দশকের বাম রাজনীতির স্বশিক্ষিত শ্রমিক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি হিসেবে। গ্রেয়বারের মা ছিলেন একজন গার্মেন্টস কর্মী, এবং, খানিকটা তারকাও, যেহেতু আন্তর্জাতিক নারী পোশাক কর্মী ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষতার একটি মিউজিকেল কমেডির মুখ্য চরিত্রে রুপায়ন করতেন যা একই সাথে ব্রডওয়ে থিয়েটারেও জনপ্রিয় হয়েছিল। বাবা কাজ করতেন একটি অফসেট ছাপাখানার প্লেট কারিগর হিসেবে। তার বাবার আদি নিবাস ছিল কানসাস, স্পেনের গৃহযুদ্ধে তিনি রিপাবলিকানদের হয়ে লড়েছিলেন। নৈরাজপন্থীরা এই রিপাবলিকান মোর্চার অংশীদার ছিলেন এবং অল্প সময়ের জন্য হলেও তারা বার্সেলোনার নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছিলেন।

    “বেশিরভাগ মানুষই নৈরাজপন্থাকে খারাপ ব্যাপার ভাবেনা, ভাবে যে এটা অবাস্তব পাগলামি”, গ্রেয়বার বলেন। “হ্যাঁ, এটা নিশ্চয়ই দারুণ চিন্তা যে কোন কারাগার, পুলিশ, কর্তৃপক্ষীয় ক্রম-নেতৃত্ব কাঠামো থাকবেনা, কিন্তু সবাই তো তখন খুনোখুনি শুরু করে দেবে। কাজেই এটা সম্ভব না তাই না?” কিন্তু গ্রেয়বারের বাবা স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় নিজে দেখেছিলেন যে এটা সম্ভব। “কাজেই এটা কোন পাগলামি ছিলনা। আমি এটাকে কখনও পাগলামি ভেবে বড় হইনি”।

    অনেক বছর পরে, গ্রেয়বার যখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানের স্নাতক ছাত্র, তার মাঠ-গবেষণা তাকে খুব অন্য এক ধরনের নৈরাজ্যিক জনগোষ্ঠির সংস্পর্শে নিয়ে আসে। তার অভিসন্দর্ভ ছিল মাদাগাস্কারের বেটাফো নামের এক গ্রামীণ সমাজ নিয়ে যা ছিল অভিজাত বংশ আর তাদের দাসদের সমষ্টি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই এম এফ) আরোপিত বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় সংকোচনের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয় ঐ এলাকা থেকে সরে আসতে তার বাসিন্দাদের নিজ ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে। পরে যদিও এই ধরনের কাঠামোগত সংস্কার নীতির কঠোর প্রতিবাদ করেছেন তিনি, কিন্তু এটাও লক্ষ্য করতে ভোলেননি যে রাষ্ট্র তাদের পরিত্যাগ করে যাওয়ার পরে এই জনগোষ্ঠি একটি সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলেছে যেখানে প্রায় ১০,০০০ লোক এক সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রায় সর্বসম্মত বোঝাপড়ার মাধ্যমে। যখন দরকার পড়ে, অপরাধের বিচারের দায়িত্ব নেয় জনতারই একটি তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠিত অংশ, কিন্তু তারপরও একটি সর্বসম্মত মিমাংশার দরকার পড়ে এখানেও, এমনকি অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলাতে হলে তার পিতা-মাতারও অনুমোদন লাগে।

    ১৯৯৯ সালে সিয়াটলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বিরোধী বিক্ষোভের আগ পর্যন্ত গ্রেয়বার সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হয়ে উঠেননি। সে সময় ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তিনি অনুধাবন করতে থাকেন সারা জীবন যে ধরনের আন্দোলনে যুক্ত হতে চেয়েছেন তা এমন এক সময় শুরু হয়েছে যখন তিনি নিজের একাডেমিক ক্যারিয়ারের দিকে মনযোগ দেয়া শুরু করেছেন। “আপনি যদি এইসব বিষয়ে খুব নিবেদিত হন, তাহলে ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে”, গ্রেয়বার বলেন। “প্রথম কর্মসূচীতে এসে দেখবেন আপনি পুরা একজন বহিরাগত। আপনি বুঝতেই পারবেন না কি হচ্ছে। দ্বিতীয়বারেই কিন্তু আপনি সবকিছুই বুঝে ফেলবেন। তৃতীয়বারে, আপনি চাইলেই হয়ে উঠতে পারেন নেতৃত্বের কার্যকর অংশ। যে কেউ এখানে নেতৃত্ব দিতে পারেন তার যদি সময় ও শক্তি খরচের ইচ্ছা থাকে”।

    সময়টা গ্রেয়বারের জন্য ছিল বিশেষ সুখের। নিউ হ্যাভেনে তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান, এবং নিউ ইয়র্কে, যেখানে তিনি বেশিরভাগ সময়ই কাটাতেন, তিনি ছিলেন একজন নৈরাজপন্থী যেখানে তিনি নানান ধারার রাজনৈতিক কর্মী, শিল্পী-সাহিত্যিক, এবং বাউন্ডুলের দল, যারা নিজেদের ডাইরেক্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক নামে পরিচয় দেয়, তাদের মাঝে নতুন এক সমাজ খুঁজে পেয়েছিলেন। সেখানে বিক্ষোভ যেমন হতো তেমনি হতো বিশদ ব্যঞ্জণাময় উৎসবাদিও- ‘রিক্লেইম দা স্ট্রিট’ পার্টি অথবা সেই রাতগুলো, যখন সবাই এক সাবওয়ে ট্রেনে উঠে গোটা শহর জুড়ে হৈ হুল্লোড় করে বেড়ানোটাই কাজ।

    যাই হোক, ২০০৫ সালে এই সুখের দিন শেষ হয়ে যায় যখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় তার চাকরি পাকা হওয়ার আগেই তার নিয়োগ চুক্তি বাতিল করে দেয়। গ্রেয়বার এর বিরুদ্ধে আপিল করেন এবং তার মামলাটি ইয়েলসহ অন্যান্য জায়গার পেশাদার নৃবিজ্ঞানীদের দাবি হয়ে দাঁড়ায়। তিনি দাবি করেন যে তার চুক্তি বাতিল করবার পেছনে অন্ততঃ আংশিক কারণ হিসেবে কাজ করেছে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা। যদিও অনেকে মনে করেন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ঠিক সে ধরনের একটি কর্তৃত্বপরায়ণ প্রতিষ্ঠান দার্শনিকভাবে গ্রেয়বার যার ঘোর বিরোধী এবং মেজাজ-মর্জির দিক থেকে একদমই অনুপযুক্ত।

    “তার ব্যক্তিগত স্টাইল নিয়ে কিছু ঝামেলা ছিল, প্রশ্ন ছিল সে ডিপার্টমেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের জৈষ্ঠ সহকর্মীদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল কিনা তা নিয়ে। মচকানোর মত মোলায়েম লোক হিসেবে তার খুব একটা সুনাম ছিলনা”, স্মৃতি চারণ করছিলেন থমাস ব্লম হানসেন, স্টানফোর্ডের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ইয়েলে গ্রেয়বারের সেই সময়ের সহকর্মী। “আমি মনে করিনা সে যে তার নিজের ক্ষেত্রে প্রধানতম একজন নৃবিজ্ঞানী সে বিষয়ে কারো কোন সন্দেহ আছে”, তিনি আরো যোগ করেন। “কিন্তু সে আসলেই আমাদের একাডেমিক জীবনের ক্রমবর্ধিষ্ণু অংশ হয়ে উঠা একঘেঁয়ে প্রশাসনিকতায় কোন আগ্রহ খুঁজে পেত না”।

    অকুপাই সিডনি

    অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনটি সূচনার সাথে যুক্ত সবাই, গ্রেয়বার থেকে শুরু করে অ্যাডবাস্টার্সের সম্পাদকরা বা ‘বাজেট হ্রাস বিরোধী নিউ ইয়র্কবাসী’ পর্যন্ত সবাই হতবাক হয়েছেন এর সাফল্যে। আমেরিকার বামপন্থী সক্রিয়তার জগৎ সাধারণত প্রগতিবাদী ও শান্তিবাদী, নাগরিক মুক্তিবাদী ও মার্ক্সবাদী, আদর্শবাদী বা বাস্তববাদীদের মিলিত জগা-খিচুড়ি এবং প্রায়শই পারস্পরিক দ্বন্ধ্ব আর ভুল-বোঝাবুঝিতে পরিপূর্ণ থাকে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের অভিনব দিক হচ্ছে এই আন্দোলন এই প্রবণতা স্বত্ত্বেও গড়ে উঠা কোন আন্দোলন নয়, বরং এই প্রবণতার কারণে গড়ে উঠা একটি আন্দোলন। নিজের বিবেচনায় গ্রেয়বার এই সাফল্যের কৃতিত্ব পরিকল্পনাকারীদের নয়, বরং দেন খানিকটা ভাগ্যকে, যথোচিত সময় নির্বাচনকে, এবং সর্বোপরি দেশটিতে ফুঁসে উঠা ক্ষোভ আর হতাশাকেঃ “খুব হাতে গোনা কিছু চাকরি আছে বাজারে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিশ্চল হয়ে আছে মাটিতে, আর ব্যক্তি হিসেবে, জাতি হিসেবে আমরা নিমজ্জিত হচ্ছি ঋণে”।

    ঋণ নিয়ে গ্রেয়বারের সমস্যা বা আপত্তি শুধু এই নয় যে মাত্রারিক্ত ঋণ খারাপ। ঋণের আরো মৌলিক সমস্যা হচ্ছে, নিজের বইয়ে তিনি লিখেছেন, একে অপরকে সাহায্য করবার যে সহজাত মানবিক প্রবৃত্তি, ঋণের বিস্তার সেটাকে বিকৃত করে ফেলে। অর্থশাস্ত্রের বইগুলো আমাদের বোঝায় যে টাকা ও বাজারের উদ্ভব হয়েছে মানুষের “পরিবহন ও বিনিময়ের” প্রবণতার কারণে, যেমনটা বলে গেছেন অ্যাডাম স্মিথ। টাকা আসবার আগে, স্মিথ যুক্তি দেন, মানুষেরা সাতটা মুরগির সাথে একটা ছাগল বিনিময় করতো, বা এক জোড়া সেন্ডেলের বিনিময়ে এক বস্তা শস্যদানা। তারপর কিছু কারবারি আর ব্যবসায়ী ভাবলেন যে বিনিময়ের জন্য যদি সাধারণ কোন মাধ্যম থাকে তাহলে সব কিছু খুব সহজ হয়ে যায়, সেটা রুপাই হোক বা ওয়ামপুমই হোক। এই গল্পের ঝামেলা হচ্ছে, যা কয়েক যুগ ধরে নৃবিজ্ঞানীরা বলার চেষ্টা করছেন, এরকম কোন কিছু আদৌ কখনো ঘটেছে বলে বৈজ্ঞানিক কোন প্রমাণ নেই। “বিনিময় অর্থনীতির কোন নিখাদ ও সরল কোন উদাহারণ আজ পর্যন্ত নৃবিজ্ঞানে বর্ণিত হয়নি, সেখান থেকে টাকার উৎপত্তি তো দুরের ব্যাপার”, গ্রেয়বারের দেয়া এক উদ্ধৃতিতে বলছেন নৃবিজ্ঞানী ক্যারোলিন হামফ্রে।

    টাকা বিহীন সমাজের লোকেরা বিনিময় করে না, যদি না তারা একদম অপরিচিত বা শত্রু কারো সাথে কারবার করছে। তার বদলে তারা একজন আরেকজনকে জিনিসপত্র এমনি দিয়ে দেয়, কখনো কখনো অর্ঘ্য হিসেবে, কখনো ভবিষ্যতে কোন কিছু পাওয়ার আশায়, আবার কখনো কখনো একদম সাদামাটা উপহার হিসেবে। সেই অর্থে, বিনিময়কে সহজ করবার জন্য টাকার উদ্ভব ঘটেনি, বরং এর প্রচলন ঘটে প্রাচীন মিশরের মতন রাষ্ট্র বা সুমেরুর মন্দির কেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রের হাতে যাতে করে মানুষের কর পরিশোধের বিষয়টি নির্ঝঞ্জাট হয়, অথবা মালিকানাধীন সম্পদের পরিমান নিরুপণ সহজ হয়। এই প্রক্রিয়াতেই তারা প্রচলন ঘটায় মূল্য ধারণার, ব্যক্তি নিরপেক্ষ বাজার-ব্যবস্থার, যা ক্রমশঃ পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার জৈব-জালটিকে গ্রাস করে ফেলে।

    এই হচ্ছে আক্ষরিক অর্থে প্রাচীন ইতিহাস। তো, এতে কি যায় আসে? অনেক কিছুই যায় আসে, কারণ, টাকা, গ্রেয়বার যুক্তি দিচ্ছেন, পারস্পরিক বন্ধন আর কর্তব্যবোধকে, যা কিনা নিখাদ সামাজিক বিষয়, তাকে ঋণে পরিণত করে, যা কিনা পুরাপুরি অর্থনৈতিক বিষয়। ঋণ পরিশোধের গুরুত্ব বিষয়ক যে ধারণা আমাদের মাথার ভেতর কাজ করে তা আমাদের পরস্পরের প্রতি যে মমত্ববোধ তাকে বিনষ্ট করে। ঋণ পবিত্র কোন ব্যাপার নয়, কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক পবিত্র।

    ডেব্ট

    আমারা যদি ঋণের সামাজিক উৎস বুঝতে পারি, গ্রেয়বার বলেন, আমাদের চিন্তার শর্তাবলি বদলে যাওয়ার সাথে সাথে আমরাও আরো বেশি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠব নিজেদের ঋণ, বন্ধক, ক্রেডিট কার্ড, শিক্ষা ঋণ, বা গোটা জাতির ঋণকেই পুনর্বিবেচনা করবার জন্য। চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নেওয়া মরিয়া পদক্ষেপগুলো যদি কিছু দেখিয়ে থাকে তা হচ্ছে, গ্রেয়বারের মতে, আমরা স্বেচ্ছায় কোন প্রতিষ্ঠানের ঋণ মওকুফ করে দিতে রাজি যদি প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়।

    শেষ বিচারে, অন্ততঃ তাত্ত্বিকভাবে, সার্বভৌমত্বের মালিক হচ্ছে জনগণ। সে বিচারে আমরাই ব্যাংককে টাকা বানানোর অধিকার দেই আমাদেরই সেই টাকা ঋণ দেয়ার জন্য, গ্রেয়বার বলেন। “আমরা এ জিনিস বানিয়েছি একসাথে, কাজেই আমরা চাইলেই সবকিছু ভিন্ন ভাবেও করতে পারি”।

    গ্রেয়বারের বই তার সহ-নৃবিজ্ঞানীদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে, এবং এটা সেই বিদ্যাজগতের বাইরেও যথেষ্ট মনযোগ পেয়েছে। (যদিও মান্ডি হ্যাঙ্কের মতে, ইন্ডিয়ানার এক লাইব্রেরিয়ান যিনি জুকত্তি পার্কে রাতারাতি গড়ে উঠা লাইব্রেরিটি দেখাশুনা করছেন, গ্রেয়বারের বইয়ের কপিগুলো সেখানে খুব একটা ব্যবহৃত হচ্ছে না)। মূলধারার কয়েকজন অর্থনীতিবিদও তার ধারণাগুলোর সাথে পরিচিত। জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টাইলার কোয়েন, যিনি ঘটনাক্রমে একই সাথে একজন বহুল পঠিত ব্লগারও, তাদেরই একজন।“সে মানুষজনের মধ্যে খানিকটা জ্ঞান সেঁধিয়ে দিতে পারে, এবং আমি মনে করি সেই ঠিক আছে, অ্যাডাম স্মিথ ভুল করেছিলেন”, তিনি বলেন। তারপরও কোয়েন, যিনি নিজে একজন মুক্তিপন্থী, গ্রেয়বারের রাজনীতি তাঁকে কমই আকৃষ্ট করেছে। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের কোন বিকল্প কিছু দেখতে পান না। “সোমালিয়ার দিকে তাকান, যদি কোন শুন্যতা থাকে, কিছু না কিছু সেটাকে পূরণ করবেই”।

    তিনি হয়তো জুকত্তি পার্কের ঢোল বাজানো লোকদের প্রতিও আঙ্গুল তুলতে পারেন। ঢোলের বিরামহীন বাড়ি, যা ছিল অকুপাই আন্দোলনের আবহ সংগীত, তাই আবার একগাদা শব্দ দূষণের অভিযোগ নিয়ে এসেছে যা অন্যথায় সমর্থন দেয়া কমিউনিটি বোর্ড এবং এর নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ধৈর্য্য পরীক্ষা নিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে সাধারণ্যের সমাবেশে নানা যুক্তি-তর্ক করেও কিছু ঢোল বাজিয়েকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাজানোর বিষয়ে রাজি করানো যায়নি, কিন্তু সংগঠকরা আশা করছেন অক্টোবরের ২৫ তারিখের একটি মতভেদ নিরসন সভায় এটির ফয়সালা হয়ে যাবে।

    বইয়ের শেষ দিকে, গ্রেয়বার একটি নীতিগত পরামর্শ দেনঃ একটা বাইবেল-স্টাইলের “জুবিলি”, সকল আন্তর্জাতিক ও ভোক্তা ঋণ মওকুফ। এধরনের জুবিলি আজকের আধুনিক যুগে অচল হলেও প্রাচীন ব্যাবিলন, এসিরিয়া, এবং টলেমিজের অধীনের মিশরে এটা ছিল একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। শাসকেরা জানতেন অজন্মার বছরগুলোতে ঋণগ্রস্থ কৃষকদের “জুবিলি” না দেয়ার অর্থ হচ্ছে দাঙ্গা-হাঙ্গামা। “স্বাধীনতা শব্দটা সবচেয়ে প্রাচীন যে রাজনৈতিক দলিলে পাওয়া যায় তা হচ্ছে একজন সুমেরীয়ান রাজার ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেয়ার কাগজ”। “এটা অভিবাদনযোগ্য একটা ব্যাপার হবে”, গ্রেয়বার লিখছেন, “শুধু এই কারণে নয় যে এটা মানুষের অনেক অনেক দুঃখ-দুর্দশা কমাবে, এজন্যও যে এটা আমাদের নিজেদেরকে নিজেরাই মনে করিয়ে দেয়ার উপায় যে টাকা বর্ণনাতীত কোন ব্যাপার না, কারো ঋণ শোধ করার মূলে নীতি-নৈতিকতার ব্যাপার নাই, বরং এই সব কিছুই মানবিক আয়োজনের অংশ এবং গণতন্ত্রের যদি কোন মানে থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই পুরো আয়োজনকে ভিন্নভাবে সাজানোর জন্য আমাদের সকলের একমত হওয়ার সামর্থ্য। (কারেন ওইয়েজ’র রিপোর্টিংসহ)

  • রোজাভার চিঠি।। গ্রেইবার: আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী চিন্তকদের একজন 

    রোজাভার চিঠি।। গ্রেইবার: আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী চিন্তকদের একজন 

    • অনুবাদ: খন্দকার তুর আজাদ

    মানব ইতিহাসের এই জটিল সন্ধিক্ষণে ডেভিডের আরো অনেক কিছুই দেবার বাকি ছিল। আমরা সকলেই তার শুন্যতা অনুভব করবো। কিন্তু সে বেঁচে থাকবে রোজাভায়, বেঁচে থাকবে মানুষের মুক্তির চেতনায়।
    — ফ্রিডম ফর আব্দুল্লাহ ওকালান- পিস ইন কুর্দিস্তান

    কুর্দি জনতার খুব কাছের বন্ধু ডেভিড গ্রেইবারের মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সংগঠন ফ্রিডম ফর আব্দুল্লাহ ওকলান- পিস ইন কুর্দিস্তান একটি বিবৃতি দিয়েছে।  বিবৃতিটিতে নিচের কথাগুলো ছিল:

    নিউইয়র্ক টাইমসের স্মরণিকাপত্র

    আমাদের বন্ধু ডেভিড গ্রেইবারের আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত মৃত্যু আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। তার অকাল মৃত্যু আমাদের সবার জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তার পরিবার, বন্ধু এবং সব কাছের মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

    ডেভিড গ্রেইবারের সম্পর্কে কোন একটি কথা আলাদা করে বলতে হলে তার ভিন্নদৃষ্টিতে দেখার প্রবণতার কথা উল্লেখ করতে হবে। তিনি সবকিছুকে সম্পূর্ণ অভিনব কায়দায় হাজির করতে জানতেন এবং আমরা যেসব ঘটনাকে অবধারিত হিসাবে ধরে নিই সেগুলার উপর ভিন্নভাবে আলোকপাত করতেন। অতুলনীয় সৃজনশীলতার বদৌলতে জ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন শাখায় ও বিভিন্ন কাল জুড়ে তার পদচারণা ছিল।

    ডেভিড ছিলেন একজন দ্বিধাহীন বিপ্লবী ও স্বপ্নদ্রষ্টা। সেটা অকুপাই ওয়ালস্ট্রিটের প্রেক্ষাপটে হোক কিংবা কুর্দিস্তানের বিপ্লব, বিশেষত রোজাভার ক্ষেত্রে। যখনই নিপীড়িতরা নিজেদের হাতে সব তুলে নিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে গিয়েছে তখনই ডেভিড গ্রেইবার সেখানে সাহায্য করতে ছুটে গিয়েছেন। তা হোক তত্ত্ব বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিয়ে।

    আর সেটা করতে গিয়ে তিনি পুরা দুনিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন, দরকার পড়লে পুরা বাম মহলেরও। কুর্দি জনতার কাছাকাছি হবার জন্য তার নেয়া বিভিন্ন পথেও সেটা দেখা যায়। পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে ডেভিড গ্রেইবার রোজাভা বিপ্লব নিয়ে বলেছিলেন : ‘না, এটি একটি সত্যিকারের বিপ্লব!’ এরপর আব্দুল্লাহ ওকালানের রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে তার লেখা প্রবন্ধ দিয়ে ওকালানের সাথে তিনি এক পরোক্ষ সংলাপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন৷ Building Free life: Dialogues with Abdullah Ocalan-এ তিনি লিখেছিলেন:

    অ্যাকাডেমিকদের কাছ থেকে শুধু এমনটা আশা করা যায় না যে তারা রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে চলবেন […] কার্যকরী রাজনৈতিক অ্যাকশন নেয়ার মাধ্যমেও যে কেউ মানব চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এই বিশ্বাসটাকে অস্বীকার করাও এর আরেকটি রূপ। যারা কার্যকর রাজনৈতিক সক্রিয়তায় অংশ নেয় তাদেরকে বড় জোর একটা বিশ্লেষণযোগ্য বস্তু হিসেবে ধরা হয়। চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে তারা সমানতালে এগোচ্ছে এমনভাবে দেখা হয় না। তাই আব্দুল্লাহ ওকালানের ধারণাগুলা নিয়ে নিয়ে কী করা যায় সে ব্যাপারে সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের কোন ধারণা না থাকা তেমন বিস্ময়কর কিছু না।

    ডেভিডকে আমরা ২০১২ সাল থেকে চিনি যখন সে তার অসাধারণ বই Debt: The first 5,000 Years-এর জার্মান অনুবাদ কোলনে প্রকাশ করেছিল। তারপর থেকেই আমাদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। কুর্দি স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক অন্তঃস্বার আন্তর্জাতিক পরিসরে বোধগম্য করার ক্ষেত্রে তিনি বেশ অবদান রেখেছেন। আর  একইসাথে তার নিজের বিশ্লেষণ দিয়ে আমাদের ভাবনাগুলাকেও শাণিত করেছেন।

    রোজাভা’র লড়াকু বিপ্লবী

    ডেভিড ছিলেন সে ধরনের অ্যাক্টিভিস্ট-চিন্তক যাঁদেরকে আমাদের দুনিয়ায় খুবই দরকার। তার যে শুধু একটা সহৃদয় মন এবং বিচক্ষণ বুদ্ধিবৃত্তি ছিল, তা-ই নয়; তিনি অ্যাকাডেমিক দুনিয়ার একমুখিতার বিরুদ্ধে গিয়ে সে সব বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন যেগুলা হয়ত তেমন জনপ্রিয় নয়। পুঁজি ও ক্ষমতার কাঠামো এবং বিদ্যায়তনে এসবের প্রকাশ নিয়ে গভীরভাবে সমালোচনা করা ডেভিড, সমাজকে ন্যায্যতার দিকে পাল্টে দেয়া রেডিকাল মুভমেন্টগুলার অংশ এবং সমর্থক ছিলেন।

    একজন দুর্দান্ত নৃবিজ্ঞানী, অ্যানার্কিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট, কুর্দিস্তানের বিপ্লবের একজন বন্ধু এবং স্বকীয় অর্থময় সৃষ্টিতে সক্ষম একজন বিপ্লবী চিন্তক হিসেবে মানব ইতিহাসের এই জটিল সন্ধিক্ষণে ডেভিডের আরো অনেক কিছুই দেবার বাকি ছিল। আমরা সকলেই তার শুন্যতা বোধ করবো। কিন্তু রোজাভা এবং যেখানেই মানব মুক্তির চেতনা থাকবে, সেখানেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

  • বেহুদা চাকরি: ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাসকদের রাজনৈতিক প্রকল্প

    বেহুদা চাকরি: ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাসকদের রাজনৈতিক প্রকল্প

    • ইরফানুর রহমান রাফিন

    একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা চিকিৎসকের কাজের সোশাল ভ্যালু আছে, কালকে এরা দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে গেলে, শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে এবং মানুষ বিনা চিকিৎসায় মরা শুরু করবে।

    একজন কবি বা শিল্পীর কাজেরও সোশাল ভ্যালু আছে, কালকে এরা দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে গেলে, মানুষের জীবন শুষ্ক বিবর্ণ হয়ে যাবে।

    ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)

    কিন্তু একজন এইচআর কনসালট্যান্ট, ফিন্যান্সিয়াল স্ট্র্যাটেজিস্ট, পিআর রিসার্চার বা কর্পোরেট লইয়ারের কাজের ন্যূনতম কোনো সোশ্যাল ভ্যালু নাই, কালকে এরা দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে গেলে, মানুষের বস্তুগত বা সাংস্কৃতিক কোনো ধরণের ক্ষতি হবে না। ইন ফ্যাক্ট, অনেকের ধারণা, আসলে লাভ হবে। শেষোক্তরা নিজেরাও জানে তাদের কাজ কতোটা পয়েন্টলেস। পাবলিকলি না হলেও অনেকসময় প্রাইভেটলি স্বীকারও করে। আক্ষেপ করতে করতে।

    সদ্যপ্রয়াত নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেইবারের১ ভাষায় এদের চাকরিগুলো Bullshit Job, বাংলা অনুবাদে বেহুদা চাকরি । ২০১৩ সালে গ্রেইবার Srike! ম্যাগাজিনের আগস্ট ইস্যুর জন্য On the Phenomenon of Bullshit Jobs নামে একটা রচনা লেখেন। সেখানে তিনি বেহুদা চাকরির তত্ত্বটা দাঁড় করান। পরে সেটাকে সম্প্রসারিত আর সংহত করে একটা বই লেখেন, যা ২০১৮তে Simon & Schuster থেকে প্রকাশিত হয়।

    বেহুদা চাকরির সংজ্ঞা–

    a bullshit job is a form of paid employment that is so completely pointless, unnecessary, or pernicious that even the employee cannot justify its existence even though, as part of the conditions of employment, the employee feels obliged to pretend that this is not the case.

    গ্রেইবার দেখিয়েছেন, বেহুদা চাকরিগুলা মোটেও productive না। এগুলোর ক্রমসম্প্রসারণের পেছনে নিছকই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নাই। আছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

    ১৯৬০–এর দশকে পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্যাম্পাসগুলোকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী জীবনযাপন পদ্ধতির বিরুদ্ধে তীব্র এক ছাত্র বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে। যা পরবর্তীতে বৃহত্তর সমাজকে নানাভাবে আলোড়িত করে। শাসকরা এতে আতঙ্কিত বোধ করে এবং আর কোনোদিন যেন বিদ্রোহ দেখা না দেয়, সেই ব্যাপারে সচেষ্ট হয়।

    বেহুদা চাকরির বৈশ্বিক বাস্তবতা এরাই তৈরি করেছে। এইসব চাকরির উদ্দেশ্য মোটেও productivity maximization না। এইসব চাকরির উদ্দেশ্য মানুষকে অহেতুক ব্যস্ত রাখা। মানুষকে অহেতুক ব্যস্ত রাখতে পারলে, সে আর বিদ্রোহ করার সময় পাবে না, তাতে শাসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এটাই ১৯৮০র দশক পরবর্তী নিওলিবারেলিজমের আসল দর্শন। নিওলিবারেলিজম মোটেই নিছক অর্থনৈতিক ব্যাপার নয়। এটা একটা পলিটিকাল প্রজেক্ট।

    ডেভিড গ্রেইবারের এসেটা অভাবনীয় রকমের সাড়া ফেলে। পাবলিশ করার সাথে সাথে ভাইরাল হয়ে যায়। Srike!-এর অরিজিনাল পেজ হিটের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়, এতো বেশি ট্র্যাফিকের কারণে পেজটা কয়েকবার ক্রাশ করে।

    হপ্তাখানেকের মধ্যে এসেটা অসংখ্য ভাষায় অনুদিত হয়। পৌঁছে যায় ফরাশি, জর্মন, চেক, পোল, রুশ, রোমানীয়, লাতভীয়, এস্তোনীয়, কাতালান, নরওয়েজীয়, সুইডিশ, গ্রিক, তুর্কি, কোরীয় ইত্যাদি নানান ভাষার পাঠকদের কাছে। বেহুদা চাকরির মতো তত্ত্বটাও বৈশ্বিক হয়ে ওঠে।

    বিপুল পরিমাণ মানুষ গ্রেইবারের সাথে যোগাযোগ করে। গোপনে জানায় তার তত্ত্বটা বাস্তবে কতোটা প্রাসঙ্গিক। বছরখানেক পরে ঘটে যায় এক অদ্ভূত ঘটনা।

    ২০১৫র জানুয়ারিতে লন্ডন আন্ডারগ্রাউণ্ড গেরিলা পোস্টারে ছেয়ে যায় যাতে গ্রেইবারের Srike! এসের বিভিন্ন লাইন কোট করা ছিলো। কোটেশনের জন্য তারা নিচের লাইনগুলো বেছে নেয়:

    • Huge swathes of people spend their days performing tasks they secretly believe do not really need to be performed.
    • It’s as if someone were out there making up pointless jobs for the sake of keeping us all working.
    • The moral and spiritual damage that comes from this situation is profound. It is a scar across our collective soul. Yet virtually no one talks about it.
    • How can one even begin to speak of dignity in labor when one secretly feels one’s job should not exist?

    তত্ত্বটা নিয়ে গণমাধ্যমে রীতিমতো সাড়া পড়ে যায়। যুক্তরাজ্যে YouGov নামে একটা পোলিং এজেন্সি আছে। তারা ব্রিটনদের মধ্যে গ্রেইবারের রচনার ভিত্তিতে তৈরি করা প্রশ্নভিত্তিক একটা পোল চালু করে। পোলে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেক মনে করেন তাদের চাকরিগুলো সমাজে মূল্যবান অবদান রাখছে, আর তাই সেগুলো বেহুদা চাকরি নয়। ১৩ শতাংশ বলেন তাদের চাকরিগুলো অর্থবহ না বেহুদা সেই ব্যাপারে তারা নিশ্চিত না। ৩৭ শতাংশ বলেন তাদের চাকরিগুলো বেহুদা চাকরি।

    কিছুদিন পরে নেদারল্যান্ডসে একই বিষয়ে পোল হলে, সেখানকার পোলে অংশগ্রহণকারীদের ৪০ শতাংশ জানান তাদের চাকরিগুলো বেহুদা চাকরি। গ্রেইবারের তত্ত্বটা তাই স্ট্যাটিসটিকাল রিসার্চ দ্বারাও সমর্থিত। গ্রেইবার মনে করেন, বেহুদা চাকরি শুধু সমাজের জন্যই ক্ষতিকর নয়, শেষ বিচারে এগুলো ব্যক্তির বিকাশের বিরোধীও বটে। যে-সময় মানুষ ব্যয় করতে পারতো সৃষ্টিশীলতার চর্চায়, বা অবসর উপভোগে, এই চাকরিগুলো তা ইঁদুরের মতো খেয়ে ফেলছে। রাজনৈতিকভাবেও এটা একটা ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    গ্রেইবারের ভাষাতেই বলি-

    There is something very wrong with what we have made ourselves. We have become a civilization based on work—not even “productive work” but work as an end and meaning in itself. We have come to believe that men and women who do not work harder than they wish at jobs they do not particularly enjoy are bad people unworthy of love, care, or assistance from their communities. It is as if we have collectively acquiesced to our own enslavement. The main political reaction to our awareness that half the time we are engaged in utterly meaningless or even counterproductive activities— usually under the orders of a person we dislike—is to rankle with resentment over the fact there might be others out there who are not in the same trap. As a result, hatred, resentment, and suspicion have become the glue that holds society together. This is a disastrous state of affairs.

    ডেভিড গ্রেইবার তাঁর বইটিতে পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি এই ভয়ানক পরিস্থিতির অবসান চান। আমরাও, অন্তত আমাদের কেউ কেউ, তাই চাই।

    পাদটীকা

    ১. গ্রেইবার লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসে অধ্যাপনা করতেন। ছিলেন অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্টের মাস্টারমাইন্ডদের একজন, উত্তর সিরিয়ার রোজাভা রেভল্যুশনের আমৃত্যু সমর্থক। ২০২০এর ২ সেপ্টেম্বর ইতালির ভেনিসে তাঁর অকাল প্রস্থানে মানবজাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো।

     

  • ডেভিড গ্রেইবার।। ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলন পুনরাবিষ্কার করছে মৌলিক পরিবর্তনমুখী কল্পনাপ্রতিভাকে

    ডেভিড গ্রেইবার।। ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলন পুনরাবিষ্কার করছে মৌলিক পরিবর্তনমুখী কল্পনাপ্রতিভাকে

    • অনুবাদ: সেলিম রেজা নিউটন

    আকস্মিকই তাঁর চলে যাওয়া। মৃত্যুর আগের দিনও টুইটারে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। নৈরাজ্যের নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেইবার আর নেই। গ্রেইবার ছিলেন সেইসব চিন্তকদের একজন যাঁরা ক্ষমতার প্রতিবয়ানে মানুষ, সমাজ, সম্পর্ক ও স্বাধীন-আনুভূমিক সংগঠনপ্রণালীর ইতিহাস ও ন্যায্যতা তুলে ধরেছেন। নৃতত্ত্ব এবং অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই তাঁর কাজকে বৈপ্লবিকই বলা চলে৷

    গবেষক এবং লেখক হিসেবে অবদানের বাইরেও পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও সক্রিয় ছিলেন ডেভিড গ্রেইবার। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট  আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও সংগঠক হিশেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমরাই ৯৯% এই বিখ্যাত শ্লোগানটির প্রণেতা হিসেবে তিনিই সর্বজন বিদিত।  এছাড়া রোজাভার মুক্তিপরায়ণ সমাজ তৈরির লড়াইয়ে সশরীরের উপস্থিত হয়ে সংহতি জানিয়েছেন গ্রেইবার। গ্রেইবার রেখে গেছেন তাঁর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ কাজ: Fragments of an Anarchist Anthropology, Debt: The First 5000 Years,  Direct Action: An Ethnography, Bullshit Jobs: A Theory।

    রচনাটি প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে। ২০১১ সালে সেলিম রেজা নিউটন এটি অনুবাদ করেন। প্রকাশিত হয় সমকালে। বর্তমান অনুবাদ-সংস্করণটি তাঁর ফেসবুক নোট থেকে নেয়া।
    ডেভিড গ্রেইবার
    (ফেব্রুয়ারি ১২, ১৯৬১- সেপ্টেম্বর ২, ২০২০)

    মূল রচনা

    ওয়াল স্ট্রিটে এবং অন্যত্র প্রতিবাদকারী তরুণ-যুবারা বিদ্যমান অর্থহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের মালিকানাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এসেছেন তাঁরা।

    কেন মানুষজন দখল করছেন ওয়াল স্ট্রিট? সর্বশেষ পুলিশী ক্র্যাকডাউন সত্ত্বেও কেন এই দখল মাত্র কয়েক দিনের সারা আমেরিকা জুড়ে বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে? শত শত মানুষকে কেন তা অনুপ্রাণিত করছে পিৎজা, টাকাপয়সা, যন্ত্রপাতি পাঠাতে? আর এখন, কেন তা মানুষজনকে অনুপ্রাণিত করছে শিকাগো-দখল-করো ফ্লোরিডা-দখল-করো ডেনভার-দখল-করো বা লসঅ্যাঞ্জেলেস-দখল-করো নামে তাঁদের নিজেদের আন্দোলন শুরু করতে?

    স্বতঃস্পষ্ট কারণ আছে এসবের। নতুন প্রজন্মের মার্কিনীদের অবাধ্য আত্মনির্ভরতার শুরুটা দেখছি আমরা। এটা এমন একটা প্রজন্ম যাঁরা তাঁদের লেখাপড়া শেষ করতে চলেছেন কোনো চাকরি, কোনো ভবিষ্যতের আশা ছাড়াই। উপরন্তু, তাঁরা জর্জরিত হয়ে আছেন বিপুল পরিমাণ ঋণে— ক্ষমার অযোগ্য যে ঋণ। এঁদের বেশিরভাগই শ্রমজীবী শ্রেণী থেকে বা অন্যবিধ গরিবি হালের পারিবারিক পটভূমি থেকে আসা। যা যা তাঁদের করা উচিৎ বলে বলা হয়েছিল ঠিক তাই তাই করেছিলেন এ তরুণরা। তাঁরা লেখাপড়া করেছিলেন, কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, আর এখন সেসব করার জন্য তাঁরা স্রেফ শাস্তি তো পাচ্ছেনই, আরো পাচ্ছেন অবজ্ঞা-অপমান। এমন এক জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা, যে জীবনকে মনে করা হয় অলস, হতাশ ঋণখেলাপির জীবন; হাস্যকর নীতিহীনের জীবন।

    এটা কি তবে অবাক করার মতো ব্যাপার যে এবার তাঁরা কথাবার্তা বলতে চাইবেন অর্থকড়ির সেইসব রাঘববোয়ালদের সম্পর্কে, যারা চুরি করে নিয়ে গেছে তাঁদের ভবিষ্যত?

    ঠিক ইউরোপের মতোনই, প্রকাণ্ড সামাজিক ব্যর্থতার পরিণাম দেখছি আমরা। দখল-আন্দোলনকারীরা ঠিক সেই পদের মানুষ যাঁরা ভাবনা-কল্পনায় ভরপুর। যেকোনো সুস্থ সমাজ তার প্রত্যেকটা মানুষের জীবন উন্নত করে তোলার ক্ষেত্রে এঁদের শক্তিসামর্থ্যকে কাজে লাগাতে চাইবে। অথচ, এটাকে তাঁরা ব্যবহার করছেন পুরো সিস্টেমটার পতন ঘটানোর উপায় উদ্ভাবনের কাজে।

    কিন্তু, চূড়ান্ত ব্যর্থতাটা এখানে কল্পনাপ্রতিভার ব্যর্থতা। যা আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি, তাকে একটা দাবি হিসেবেও দেখা যেতে পারে: শেষ পর্যন্ত একটা আলাপ-আলোচনায় বসার দাবি। এই আলাপ-আলোচনায় আমাদের সকলের বসার কথা ছিল সেই ২০০৮ সালে। পৃথিবীর অর্থকড়ি সংক্রান্ত স্থাপত্য-কাঠামো প্রায়-ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরের সেই মুহূর্তটা ছিল এমন একটা মুহূর্ত যখন যেকোনো কিছুই সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।

    বিগত দশক জুড়ে যা যা আমাদেরকে বলা হয়েছে তার সমস্তটাই মিথ্যাকথা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাজার নিজে নিজেকে চালায় নি। অর্থকড়ি বিষয়ক পদ্ধতি-প্রণালীগুলোর স্রষ্টাগণ অভ্রান্ত মহাপণ্ডিত ছিলেন না। এবং ঋণ আসলে পরিশোধ করা লাগে নি। প্রকৃতপক্ষে, টাকাপয়সা নিজেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেখা গেছে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এক রাতে অস্তিত্বমান হয়ে উঠতে পারে বা হাওয়া হয়ে যেতে পারে, যদি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সেরকমটা চায়। এমনকি ইকনোমিস্ট পত্রিকাও এরকম শিরোনাম দিচ্ছিল— “পুঁজিবাদ: এটা কি কোনো ভালো আইডিয়া?”।

    মনে হচ্ছিল যেন সময় এসেছে সব কিছু নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার— বাজার, অর্থকড়ি, ঋণ সব কিছু নিয়ে। মনে হচ্ছিল সময় এসেছে এই প্রশ্ন তোলার যে, একটা ‘অর্থনীতি’ আসলে কীসের জন্য? এই অবস্থাটা টিকে ছিল সম্ভবত দুই সপ্তাহ। তারপর, ইতিহাসের বৃহত্তম স্নায়ু-বিপর্যয়ের মধ্যে সমবেতভাবে আমরা আমাদের হাত দিয়ে ঠেসে ধরলাম আমাদের কান, আর চেষ্টা করলাম যেন আগে যা কিছু যেমন ছিল যতটা সম্ভব সেরকম জায়গায় সেগুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

    সম্ভবত এটা অবাক করার মতো কিছু নয়। ক্রমবর্ধমানভাবে এটা স্বতঃস্পষ্ট হয়ে উঠছে যে গত কয়েক দশক ধরে যাঁরা দুনিয়া চালাচ্ছেন, পুঁজিবাদের একটা টেকসই রূপকাঠামো সৃজন করা তাঁদের আসল অগ্রাধিকার নয়। বরং তাঁদের অগ্রাধিকার হলো আমাদেরকে এ কথা বোঝানো যে পুঁজিবাদের চলতি আদলটাই একমাত্র বোধগম্য ব্যবস্থা; কাজেই এর কী সমস্যা আছে না আছে তা প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে, বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমরা সবাই ঘিরে বসে আছি, আর পুরো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ছে।

    এখন আমরা যা জেনেছি তা হলো ১৯৭০ দশকের অর্থনৈতিক সংকট আসলে কখনোই চলে যায় নি। দেশের ভেতরে সস্তা ধারদেনা (ক্রেডিট) আর দেশের বাইরে ব্যাপক লুটতরাজ দিয়ে সংকটটাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। আর, এই লুটতরাজ চালানো হয়েছিল “তৃতীয় বিশ্বের ঋণ-সংকট” এর নামে। কিন্তু বিশ্বের দক্ষিণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। “বিকল্প-বিশ্বায়ন আন্দোলন” শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে সফল হয়েছে। পূর্ব এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আইএমএফ বিতাড়িত হয়েছে, ঠিক এখন যেমন তা বিতাড়িত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পরিণামে, ঋণ-সংকট এখন তার নিজের ঘরে, মানে ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায়, ফিরে এসেছে। আর, তা পরিপূর্ণ হয়ে আছে ঠিক সেই একই মনোভঙ্গিতে: একটা অর্থকড়ি-সংকট ঘোষণা করো; এটাকে সামলানোর জন্য আপাত-নিরপেক্ষ টেকনোক্র্যাটদেরকে নিয়োগ করো; আর তারপর ‘কৃচ্ছ্রতার’ নামে মেতে ওঠো লুণ্ঠনের লাগামহীন আনন্দোৎসবে।

    অকুপাই ফটো

    প্রতিরোধের যে আদল জেগে উঠেছে তার সাথে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার আন্দোলনেরও উল্লেখযোগ্য রকমের মিল আছে। আমরা দেখছি পুরোনো ধাঁচের পার্টি-রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। আমরা দেখছি মৌলিক পরিবর্তনমুখী বৈচিত্র্যকে সেই একইভাবে আলিঙ্গন করা হচ্ছে। আর, আমরা দেখছি নিচের থেকে গড়ে ওঠা গণতন্ত্রের নতুন নতুন কাঠামো উদ্ভাবনের ওপর সেই একই রকম গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। যেটুকু আলাদা সেটা প্রধানত লক্ষ্যবস্তুতে। ২০০০ সালে এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে গোটা গ্রহজুড়ে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন আমলাতন্ত্রসমূহের বিরুদ্ধে (ডব্লিউটিও, আইএমএফ, নাফটা)। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা ছিল না। স্রেফ ট্রান্সন্যাশনাল পুঁজির দাসত্ব করাই ছিল এগুলোর অস্তিত্বের কারণ। আর, ঠিক সেই একই কারণে এবারের এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে গ্রিস, স্পেন, এবং এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরো রাজনৈতিক শ্রেণীটারই বিরুদ্ধে। এই হলো সেই কারণ যেজন্য বিক্ষোভকারীরা এমনকি আনুষ্ঠানিক দাবিদাওয়া পেশ করতে পর্যন্ত প্রায়শই ইতস্তত করছেন, পাছে তা রাজনীতিবিদদের বৈধতার স্বীকৃতি বলে গণ্য হয়— যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

    শেষ পর্যন্ত যখন ইতিহাস লিখিত হবে, তখন যদিও এমন হবার সম্ভাবনাই বেশি যে এই যাবতীয় হৈ-হট্টগোলকে (আরব বসন্ত থেকে শুরু করে) স্মরণ করা হবে মার্কিন সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা-তরঙ্গমালার প্রথম পর্ব হিসেবে। তিরিশ বছর ধরে লাগাতারভাবে সারবস্তুর তুলনায় প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে চলাটা এবং ভিন্নমতের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে এমন যেকোনো কিছুকেই শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলাটা অবশ্য প্রতিবাদী তরুণদের ভবিষ্যত-প্রত্যাশাকে বিবর্ণ করে তুলতে পারে। আর, এটা পরিষ্কার যে তরুণ-যুবাদের পুরো একটা প্রজন্মকে দরকার হলে নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হলেও উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশের বেশিরভাগটা (যত বেশি সম্ভব) কেড়ে নিতে ধনীরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু ইতিহাস তাঁদের পক্ষে নয়।

    ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকে বিবেচনা করে দেখলে আমাদের ভালো হবে। এই বিলুপ্তির ফলে ধনীদের পক্ষে বিস্কুট-চানাচুরের সমস্তটাই হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে তা নয়, কিন্তু সম্ভব হয়েছে আধুনিক কল্যাণ-রাষ্ট্র সৃষ্টি করাটা। এবারের পালা থেকে কী বেরিয়ে আসবে আমরা তা সুনির্দিষ্টভাবে জানি না। কিন্তু, মানবীয় কল্পনাপ্রতিভার ওপর শ্বাসরোধী যে ফাঁস গত ৩০ বছর ধরে চেপে বসে আসে, দখল-আন্দোলনকারীরা যদি শেষ পর্যন্ত তা ছিঁড়তে পারেন, যেমনটা তাঁরা পেরেছিলেন ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর-পরবর্তী প্রথম সপ্তাহগুলিতে, সবকিছুই তাহলে আবার আলোচনার টেবিলে উঠে আসবে। এবং সেটা হবে ওয়াল স্ট্রিটের এবং সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের দখল-আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে আমাদের প্রতি দেখানো মহত্তম অনুগ্রহ— এতটা অনুগ্রহ আমাদেরকে আর কেউ করতে পারতেন না।

    ১১ই নভেম্বর ২০১১
    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • ডেভিড গ্রেইবার।। অন দ্য ফেনমেনন অফ বুলশিট জব

    ডেভিড গ্রেইবার।। অন দ্য ফেনমেনন অফ বুলশিট জব

    • অনুবাদ: কে এম রাকিব
    জন মেইনার্ড কেইন্স ১৯৩০ সালে প্রযুক্তির এমন উৎকর্ষের ব্যাপারে ভবিষ্যতবাণী করছিলেন যে, শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো দেশগুলোতে শ্রমদান সাপ্তাহিক ১৫ ঘন্টার অবস্থায় উন্নীত হবে। তিনি ঠিক ছিলেন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রযুক্তির বিবেচনায় আমরা সমর্থ।
    আর্টওয়ার্ক: ডেভিড গ্রেইবার
    শিল্পী: নায়া চেইনি
    সূত্র: দিস টাইমস

    তবুও এইটা ঘটে নাই। এই অবস্থায় পৌঁছাইতে এমন চাকরি সৃষ্টির দরকার ছিল যা কার্যকরতার দিকে দিয়া অর্থহীন। জনগণের বিশাল একটা অংশ, বিশেষত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, সম্পূর্ণ চাকরিজীবন ব্যাহত করে এমন কাজকর্ম করে যা তারা নিজেরাই আজাইরা বলে গোপনে বিশ্বাস করে।

    এই পরিস্থিতি উদ্ভুত যে নৈতিক ও আত্মিক ক্ষতিসাধন হয়, সেইটা ভয়াবহ। আমাদের সামষ্টিক প্রাণজুড়ে এ এক বিশাল ক্ষত। অথচ কার্যত এইটা নিয়া কেউ কথা বলতেছে না।

    এমনকি ষাটের দশকেও কেইন্স প্রতিশ্রুত যেই ইউটোপিয়া প্রত্যাশিত ছিল সেইটা আর কখনোই বাস্তবায়িত হইলো না ক্যান?

    প্রচলিত মত হইলো, ভোগবাদের ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি বুঝতে পারেন নাই। প্রদত্ত অল্প কর্মঘন্টা ও বেশি ভোগসামাগ্রীর মধ্যে সামষ্টিকভাবে আমরা দ্বিতীয়টাই বেছে নিছি।

    এইটা বেশ সুন্দর নীতিধর্ম তুলে ধরে, কিন্তু মুহূর্তের বিবেচনাতেই বোঝা যায় এইটা সত্যি হইতে পারে না। হ্যা, প্রচুর বৈচিত্র্যময় চাকরির সৃষ্টি দেখছি বিশ শতক থেকে, কিন্তু তাদের কয়েকটা মাত্র শুশি, আইফোন ও ফ্যান্সি স্নিকারের উৎপাদন ও বন্টনের সাথে জড়িত।
    তাইলে এই চাকরিগুলা কী আসলে? যুক্তরাষ্ট্রের ১৯১০ ও ২০১০ সালের চাকরির তুলনামূলক একটা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেয় ( এবং লক্ষ্য করছি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও যা মোটামুটি প্রযোজ্য)।
    গত শতাব্দীর শেষদিকে, গৃহকর্ম, শিল্পকারখানা ও খামারে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যাটা নাটকীয়ভাবে কমছে। একই সাথে, ‘পেশাদার, ম্যানেজমেন্ট রিলেটেড, ক্লার্ক, বিক্রয় ও সেবাখাতে কর্মীর সংখ্যা বেড়ে তিনগুন হইছে।

    অর্থাৎ উৎপাদনশীল চাকরি, ধারণানুযায়ী, কমে আসছে ( এমনকি আপনি বিশ্বজুড়ে শিল্পকারখানায় শ্রমিকের সংখ্যাটা, যেমন ভারত ও চীনের দুর্বিষহ অবস্থার শ্রমিকদের কথাও বিবেচনায় নেন, শ্রমিকের সংখ্যার হারটা বিশ্বের জনসংখ্যার অত বড় অংশ না যতটা হওয়ার কথা ছিল।)

    কর্মঘন্টা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাইলে বিশ্বের মুক্ত জনগন তাদের নিজের কাজ, আনন্দ ও আইডিয়াগুলো ও ভিশন বাস্তবায়নের সুযোগ পাইতো।

    আমরা দেখছি ‘সেবা’ খাত ও প্রশাসন খাতের ব্যাপক স্ফীতি এবং সম্পূর্ণ নতুন ইন্ডাস্ট্রি যেমন অর্থসেবা ও টেলিমার্কেটিং-এর সৃষ্টি কিংবা কর্পোরেট আইন, একাডেমিক ও হিউম্যান রিসোর্স ও পাবলিক রিলেশান্স – এর মতো সেক্টরের অভূতপূর্ব বিস্তৃতি।

    এই ইন্ডাস্ট্রিগুলায় যেসমস্ত লোক প্রশাসনিক, কারিগরি কিংবা নিরাপত্তা সহায়তার মতো কাজে শ্রম দেয়, সংখ্যাটা তাদেরকেও প্রতিফলিত করে না।

    সহায়ক (এ্যানসিলারি) ইন্ডাস্ট্রির দল (ডগ-ওয়াশার, অলনাইট পিৎজা ডেলিভারিম্যান) টিকেই আছে কেবল হয়তো এই কারণে যে প্রত্যেকে খুব বেশি সময় সময় অন্য কাজে ব্যয় করতেছে। এইগুলারে আমি ‘বুলশিট জব’ বলতে প্রস্তাব করি।
    ব্যাপারটা এমন যেন, কেউ অর্থহীন চাকরি সৃষ্টি করে যাইতেছে খালি আমাদেরকে কাজে ব্যস্ত রাখতেই।

    আসল এইখানেই রহস্য লুকায়ে।

    পুঁজিবাদে ধরাই হয় এইটা কখনো ঘটবে না (চলবে চাহিদা ও যোগানের, প্রতিযোগিতামূলক বাজারের সাপেক্ষে – অনুবাদক)।

    সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলার মতো পুরনো অকার্যকরী রাষ্ট্রে, যেইখানে চাকরিরে বিবেচনা করা হইতো অধিকার ও পবিত্র কর্তব্ হিসেবে- সিস্টেম যত দরকার তত চাকরি/পদ সৃষ্টি করতো। (যেই কারণে সোভিয়েত ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে একটা মাংসের প্যাকেট বেচতে তিনজন কেরানি লাগত।) অথচ, এই একই ধরনের ঝামেলাই বাজার অর্থনীতিকে মেটাতে হইতেছে।

    ইকোনমিক্সের থিয়োরি অনুযায়ী, অন্তত, মুনাফা-লোভী কোনো ফার্ম সর্বশেষ যা করার কথা ভাবতে পারে তা হইলো, অপ্রয়োজনে কর্মীদের নিয়োগ করা। তবু যেভাবেই হোক, এটাই ঘটছে।

    কর্পোরেশনগুলা যেখানে, যারা আসলে সবকিছু বানাইতেছে, পরিবহন, মেরামত ও দেখাশোনা করতেছে, সেই শ্রেণির লোকদেরই ছাঁটাই, কর্মবিরতিতে পাঠাইতেছে নির্বিকারভাবে।

    বেতনভুক্ত নথি-ঠেলাদের সংখ্যাটা আকারে বেড়েই চলতেছে, প্রচুর সংখ্যক চাকরিজীবী, সোভিয়েতের চাকুরিজীবীদের মতো সাপ্তাহিক ৪০-৫০ ঘন্টা কাগুজে কর্ম করে নয় বরং কার্যকরভাবে কেইন্সের প্রেডিকশন মতোই সাপ্তাহিক ১৫ ঘন্টা কাজ করে যাইতেছে, যেহেতু বাকি সময়টা তারা ব্যয় করতেছেন, মোটিভেশনাল (প্রেষণামূলক) সেমিনার আয়োজন আর অংশগ্রহণ করায়, ফেবু প্রোফাইল আপডেইট করা কিংবা টিভি সিরিজ ডাউনলোড করায়।

    উত্তরটা অর্থনৈতিক না, নৈতিক ও রাজনৈতিক।

    শাসক শ্রেণি বুঝে গেছে যে, সুখী ও উৎপাদনশীল কোনো জনগোষ্ঠী, যাদের হাতে অবসর সময় থাকে, খুবই বিপজ্জনক জিনিস (ভাবেন, কী ঘটতে পারে? ষাটের দশকে বিটজেনারেশনের মুভমেন্টের সময় কিছুমাত্রায় এই জিনিস শুরু হইছিল*)।

    অন্যদিকে, কাজ যে একটা নৈতিক ব্যাপার এই বোধ এবং নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে নিজেরে যে শ্রম ও নিষ্ঠার সাথে সমর্পিত করে নাই সে কোনো কিছুর যোগ্য না, এইরকম বোধ খুবই সঙ্গতিপূর্ণ।

    ব্রিটিশ একাডেমিকগুলায়, প্রশাসনিক কাজের আপাত অন্তহীন বৃদ্ধি দেখে আমি দোজখের সম্ভাব্য একটা চেহারা কল্পনা করতে পারছিলাম।

    দোজখ হইলো সেইসব ব্যক্তির একটা সমাবেশ যারা তাদের প্রভূত পরিমাণ সময় ব্যয় করতেছে এমন কাজে যা তারা করতেও চায় না, ভালোমতো পারেও না।

    তারা বলে, তাদেরকে নিয়োগ করা হইছে কারণ আসবাবপত্র নির্মানে তারা অসাধারণ এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করে অধিকাংশ সময় তাদের ব্যয় হইতেছে মাছ ভাজায়।

    তারুপ্রে, এই কাজটাও খুব বেশি দরকার নাই করার, অন্তত, ভাজা মাছের চাহিদাও অল্প। এছাড়া বিরক্তির সাথে তারা এমনটাও ভাবে যে, তাদের কর্মীদের কেউ কেউ আসবাবপত্র বানাইতেই বেশি সময় লাগাইতেছে অথচ তারা মাছ-ভাজার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে না। কর্মশালায় তাদের সামনে রয়েছে আধা-ভাজা ভাঁজা মাছের স্তূপ।

    আমার মতে, আমাদের অর্থনীতির নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এইটা একটা নির্ভুল বর্ণনা। জানি, এইরকম আর্গুমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে কিরকম বিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে: কোন জবটা ‘দরকারী’ সেইটা বলার আপনে কে? দরকারী জিনিসটাই বা কী?

    আপনি একজন নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, এইটার ‘দরকার’ই বা কী? (প্রকৃতপক্ষে, অগণন ট্যাবলয়েড পাঠক, আমার চাকরিকে বেহুদা সামাজিক ব্যয়ের নমুনা হিসেবেই ধরে নেবে)। এক অর্থে এইটা নিশ্চয়ই সত্যি। সামাজিক মুল্যবোধের নিরপেক্ষ (অবজেক্টিভ) কোনো মাপকাঠি নাই।

    আমি তাদেরকে কিছু বলার ধৃষ্টতা দেখাবো না, যারা নিজেদের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাসী যে তারা পৃথিবীতে অর্থপূর্ণ অবদান রাখছেন, কিন্তু বাস্তবে তা নন।

    কিন্তু যাদের জোর বিশ্বাস করে, যে তাদের জব অর্থহীন তাদের ব্যাপারে কী বলবেন? কিছুদিন আগে আমার স্কুলের এক বন্ধুর সংস্পর্শে আসি। ১২ বছর বয়স থেকে এর সাথে আমার সাথে পরিচয় ছিল।
    আমি অবাক হয়া খেয়াল করলাম, অলরেডি সে প্রথমত একজন কবি এবং ইন্ডি রক ব্যান্ডের লিড পার্সন। তার কিছু গান রেডিয়োতে শুনছি যদিও সামান্যতম ধারনা ছিল না যে এরে আমি চিনতাম। অবশ্যই সে অসাধারণ, ইনোভেটিভ এবং তার সৃষ্টিকর্ম নিঃসন্দেহে বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষের জীবনরে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ করছে।
    তবু, কয়েকটা অ্যালবামের ব্যর্থ চেষ্টার পর, সে চুক্তি হারাইলো, সদ্যজাত কন্যাসন্তান ও ঋণের কারণে, শেষপর্যন্ত, তার ভাষায়, ‘অসংখ্য দিশাহীন লোকের মতো, ডিফল্ট চয়েস হিসেবে, ল স্কুল বেছে নিতে বাধ্য হই’।
    এখন সে নিউইয়র্কের নামী এক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। স্বীকার করা ব্যক্তিদের মধ্যে সে প্রথম যারা বিশ্বাস করে, তাদের চাকরি পুরাই অর্থহীন, পৃথিবীতে যার কোনো দরকার নাই। আর তার নিজের মত হইলো, এই চাকরির অস্তিত্বই থাকা উচিৎ না। অনেক প্রশ্ন এখানে তোলা যায়।

    এই যে আমাদের সমাজ মেধাবী কবি-সংগীতশিল্পীদের চাহিদা খুবই অল্প উৎপাদন করে, অথচ কর্পোরেট আইন বিশেষজ্ঞের আপাত অসীম চাহিদা তৈরি করে, এর অর্থ কী?

    (উত্তর: যদি ১% লোক ডিসপোজাবল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে, যারে আমরা ‘বাজার’ বলি, – নিয়ন্ত্রণ কর্তারা যারে দরকারী বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ‘বাজার’-এ তারই প্রতিফলন ঘটে, অন্য কারও নয়।)

    তাছাড়া, এইটা আরও দেখায় যে এই চাকরিগুলোর অধিকাংশ লোক এ বিষয়ে সচেতন।

    সত্যি বলতে, আমি এমন একজন কর্পোরেট আইনজীবীও দেখি নাই যে যারা তাদের চাকরিরে বুলশিট মনে করে না।

    উপরের সমস্ত ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেতনভুক পেশাদারীর এমন বিশাল শ্রেণি আছে, যাদেরকে পার্টিতে দেখা হলে যদি আপনি স্বীকার করে বসেন যে আপনি এমন কিছু করেন যাকে ইন্টারেস্টিং বলে বিবেচনা করা যায় (উদাহরণস্বরূপ, একজন নৃবিজ্ঞানী), তারা এমনকি তাদের কাজকর্মের ধরণ নিয়ে আলাপেও যেতে চাইবে না। তাদেরকে ড্রিংক ধরায়ে দেন, দেখবেন তাদের চাকরির অর্থহীনতা ও অসারতা নিয়ে লম্বা বক্তৃতা আরম্ভ করবে।

    এইটা এক গভীরতর মেন্টাল ভায়োলেন্স।

    ক্যামনে কোনো ব্যক্তির পক্ষে শ্রমের মর্যাদার কথা বলা সম্ভব যেইখানে গোপনে সে বিশ্বাস করে তার চাকরিটার দরকারই নাই?

    ক্ষোভ ও অসন্তষ্টির বোধ না তৈরি কইরা থাকে ক্যামনে?

    তবু আমাদের সমাজের এমনই অদ্ভুত প্রতিভা যে শাসকেরা একটা রাস্তা ঠিকই বের করছে, মাছ-ভাজায় দায়িত্বরত লোকগুলোর মতো, যা নিশ্চিত করে ক্রোধটা তাদের যেন প্রতি লালন করা হয়, যারা প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ করতেছে।

    যেমন, আমাদের সমাজের সাধারণ নিয়ম হইলো, নিশ্চিতভাবে যাদের কাজকর্ম অন্য লোকজনের উপকারে আসে, তাদেরকেই সবচে কম পারিশ্রমিক দেওয়া।

    আবারও, নিরপেক্ষ মানদণ্ড খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সহজ একটা উপায় হইতে পারে এই প্রশ্ন করা যে, এই কম পারিশ্রমিক পাওয়া শ্রেণিটা উধাও হয়ে গেলে কী ঘটবে?

    মনে করেন, নার্স, গার্বেজ কালেক্টর, অথবা মেকানিক, ধরেই নেওয়া হইতেছে তারা ধোয়ায় মিলায়ে গেল। ফলাফল হবে তাৎক্ষণিক বিপর্যয়। শিক্ষক বা খালাসি ছাড়া পৃথিবী বেশ ঝামেলাতেই পড়বে, এমনকি ১জন সাইফাই লেখক বা মিউজিশিয়ান ছাড়াও দুনিয়া কিছুটা হইলেও অস্বস্তির জায়গা হইয়া পড়বে।

    এইটা পুরাপুরি ক্লিয়ার না, সমস্ত লবিস্ট, প্রাইভেট ইকুয়িটি সিইও, পিআর গবেষক, এ্যাকচুয়ারিস, টেলিমার্কেটারস, কিংবা লিগাল উপদেষ্টারা উধাও হয়ে গেলে মানবতার কতটা ক্ষতি হবে।

    (অনেকের সন্দেহ বরং ব্যাপক উন্নতিই হবে)। তবু, হাতে গোনা কয়েকটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে, নিয়মটা আশ্চর্যরকম নির্ভুল।

    আরও পার্ভার্স ব্যাপার হইলো, এইরকম একটা বোধের লালন করা যে, এমনই হওয়া উচিৎ।

    ডানপন্থী পপুলিজমের গোপন শক্তির একটা জায়গা এইটা।

    ব্যাপারটা বোঝা যায় যখন ট্যাবলয়েডগুলা টিউব-ওয়ার্কারদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছড়ায় এই বলে যে, এরা ‘চুক্তি নিয়ে গণ্ডগোলের’ সময় লন্ডনকে অচল করে দিতেছে। টিউব-ওয়ার্কাররা লন্ডনকে অচল করে দিতে পারে ঠিক এই ঘটনাই প্রমাণ করে তাদের কাজ আসলেই দরকারী, অথচ অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এই ব্যাপারটাই মানুষকে বিরক্ত করে।

    যুক্তরাষ্ট্রে এইটা আরও পরিষ্কার যেইখানে, স্বাভাবিকভাবেই মোটা পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধার ধুয়ো তুইলা, স্কুলশিক্ষক বা অটো ড্রাইভারদের দিকে এই ক্রোধকে চালনা করতে রিপাবলিকানরা লক্ষনীয়ভাবে সফল, (আর লক্ষনীয়, স্কুল প্রশাসক কিংবা অটো ইন্ডাসট্রির প্রশাসকদের বিরুদ্ধে কিন্তু নয়, যারা প্রকৃতপক্ষে সমস্যার মূল। ) এ যেন ঠারে ঠারে তাদের বলা হইতেছে, ‘কিন্তু আপনাকে তো বাচ্চাদের পড়াইতে হবে! অথবা গাড়ি নির্মান করতে হবে। চাকরি করা লাগবে আপনার! তার উপর আবার মিডলক্লাস পেনশন আর হেলথকেয়ার প্রত্যাশার করার সাহস আপনে করেন ক্যামনে?’

    আর্টওয়ার্ক: বুলশিট জব
    শিল্পী: জন রিওরডান
    সূত্র: স্ট্রাইক ম্যাগাজিন

    কাউরে কর্মবিশ্বের একটা নক্সা যদি করতে হইতো, ফাইনান্স ক্যাপিটালের ক্ষমতার সাথে যার খাপে খাপ হয়, এইটা বোঝা কঠিন, যে এর চেয়ে ভালো জব তাদের পক্ষে বানানো কীভাবে সম্ভব হইতো?

    আসলে উৎপাদনশীল কর্মীদের প্রতিনিয়ত নিংড়ানো ও শোষন করা হয়।

    বাকিদের দুইভাবে বিভক্ত করা হইছে: একভাগে সন্ত্রস্থ স্তরের – বিশ্বজুড়ে অভিশপ্ত – কর্মহীন আর আরেক ভাগে মূলত কিছু না করেই বেতন পায়, নির্ধারিত বিভিন্ন পদে আসীন যারা নিজেদেরকে শনাক্ত করে শাসকশ্রেণির মতাদর্শ ও কান্ডজ্ঞানের সাথে (ম্যানেজার, প্রশাসক ইত্যাদি) – ও স্পেশালি অর্থনৈতিক অবতারদের সাথে এবং একই সাথে তীব্র ক্ষোভ পোষন করে তাদের প্রতি যাদের কাজের পরিষ্কার ও অবশ্যস্বীকার্য সামাজিক মূল্য আছে।

    ক্লিয়ারলি, এই ব্যবস্থার নকশা কখনোই সচেতনভাবে করা হয় নাই। প্রায় এক শতাব্দীর ট্রায়াল এন্ড এররের ভেতর দিয়া আবির্ভূত হইছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সত্ত্বেও আমরা যে দৈনিক ৩-৪ ঘন্টার কাজ করতেছি না, এইটাই তার একমাত্র ব্যাখ্যা।

    [ লেখাটা ১৭ আগস্ট, ২০১৩ তে ‘স্ট্রাইক!‘ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হয়।]
  • নোম চমস্কি ।। নৈরাজ্য কথন

    নোম চমস্কি ।। নৈরাজ্য কথন

    অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

    লেখাটি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত দানিয়েল গ্যারাঁর (Daniel Guérin ) L’Anarchisme : de la doctrine à l’action বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ Anarchism: From Theory to Practice-এর ভূমিকা হিসেবে লিখেছিলেন চমস্কি। পরবর্তীতে লেখাটি Chomsky On Anarchism গ্রন্থে সংকলিত হয়। লেখাটিতে গ্যারাঁর মুক্তিপরায়ণ সামজতন্ত্রের ধারণা ও নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কিত চমস্কির নিজস্ব ধারণা ফুটে উঠেছে। – সম্পাদক

    সুদানের শিল্পী তালাল নায়ের এর করা চমস্কির গ্রাফিটি

     

    ১৮৯০–এর দশকে, নৈরাজ্যবাদের প্রতি সংবেদনশীল এক ফরাসি লেখক লিখেছিলেন, ‘নৈরাজ্যবাদের কাঁধটা বেশ লম্বা–চওড়া, টিস্যু পেপারের মতো এটা সবকিছু শুষে নিতে পারে’। এমনকি তাদের কর্মকাণ্ডও, যারা নৈরাজ্যবাদের চিরশত্রুদের চেয়ে কিছু কম করেননি। চিন্তা–তৎপরতার অনেক অনেক ধরন আছে, যেগুলোকে “নৈরাজ্যবাদী” বলে ডাকা যায়। একে–অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এসব ঝোঁক–প্রবণতাকে একটা সাধারণ তত্ত্ব বা মতাদর্শের মধ্যে আঁটানোর চেষ্টা করতে গেলে হতাশই হতে হয়। যদি আমরা জীবন্ত এবং ক্রমাগত বিবর্তিত হতে থাকা এই মুক্তিমুখীন চিন্তাধারার ইতিহাস থেকে কিছু অংশও তুলে আনতে যাই, যেমনটা দানিয়েল গ্যারাঁর অ্যানার্কিজম বইতে করেছেন, তখনো এর মতাদর্শগুলোকে সমাজ ও সামাজিক বদলের জন্য একটা নির্দিষ্ট–চূড়ান্ত তত্ত্ব আকারে হাজির করা কঠিন হবে। নৈরাজ্যবাদী ইতিহাসবিদ রুডলফ রকার (যিনি তুলে ধরেছেন, কীভাবে নৈরাজ্যবাদী চিন্তাধারা এগিয়েছে অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিজমের দিকে) বিষয়টা চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন—

    “নৈরাজ্যবাদ অনড়, বদ্ধ কোনো সামাজিক ব্যবস্থা না। এটা বরং মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশের একটা সুস্পষ্ট ধারাকে ইঙ্গিত করে। বুদ্ধিজীবীদের মদদপুষ্ট সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে এটা লড়াই করে সমাজের প্রতিটা শক্তি, প্রতিটা ব্যক্তির মুক্ত–অবাধ বিকাশের জন্য। এমনকি স্বাধীনতাও একটা আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র। এটাও কোনো চূড়ান্ত ধারণা না। স্বাধীনতার ধারণাও ক্রমাগত আরও বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করা হচ্ছে, বহুমুখী পথে। নৈরাজ্যবাদীদের জন্য, স্বাধীনতা কোনো বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা নয়। বরং প্রকৃতি প্রতিটা মানুষকে যে পরিমাণ ক্ষমতা–মেধা–মনন দিয়ে গড়ে তুলেছে তার পূর্ণ বিকাশ ও সেগুলোকে সামাজিক সম্পত্তিতে পরিণত করতে পারার সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনার নামই স্বাধীনতা। মানুষের এই স্বাভাবিক বিকাশ ধর্মতন্ত্র বা রাজনৈতিক তত্ত্বাবধানের প্রভাব থেকে যত দূরে থাকতে পারবে, ততই সে আরও সুদক্ষ ও সুগঠিত হয়ে উঠবে। যে সমাজে সে বেড়ে উঠেছে, হয়ে উঠবে সেই সমাজের চিন্তাশীল সংস্কৃতির অগ্রগতির পরিচায়ক।”

    অনেকের মনেই হয়তো এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ‘মানব বিকাশের ঐতিহাসিক ধারা’ পর্যালোচনা করে কী হবে, যদি সেটা সমাজ বদলের জন্য একটা নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তত্ত্ব হাজির করতে না পারে? শেষপর্যন্ত অনেকেই নৈরাজ্যবাদের ধারণাকে খারিজ করে দেন ইউটোপীয়, বায়বীয়, আদিম অথবা বর্তমান সময়ের জটিল সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না— এই বিবেচনায়। কেউ হয়তো আবার কিছুটা ভিন্নভাবে যুক্তি দিতে পারেন যে, ইতিহাসের প্রতিটা পর্যায়েই আমাদের প্রধান বিবেচ্য থাকে কর্তৃত্ব আর নিপীড়নের কাঠামোগুলোকে উচ্ছেদ করা, যেগুলোর বৈধতা টিকে ছিল অন্য আরেকটা পর্যায়ের সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনধারণ বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু এখন সেগুলো বস্তুগত ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য লাঘব করার চেয়ে বরং সেটা বাড়িয়ে তুলতেই অবদান রাখছে। ঘটনা যদি এরকমই হয়, তাহলে তো বর্তমান বা ভবিষ্যতের সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো তন্ত্রশাস্ত্র নেই। সামাজিক পরিবর্তনের ধারা কেমন হবে সেটা স্থির করে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় কিছু থাকার দরকারও নেই। নিশ্চিতভাবেই, মানুষের স্বভাব–প্রকৃতি বা সম্ভাব্য সামাজিক কাঠামো নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। অনেক সুদূর–বিস্তৃত মতবাদকে তাই সন্দেহ–সংশয়ের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। যেমন, যখন আমরা শুনি যে, ‘মনুষ্য প্রকৃতি’ বা ‘দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা’ বা ‘আধুনিক জীবনের জটিলতা’র জন্য এই ধরনের বা ঐ ধরনের নিপীড়ন কাঠামো আর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দরকার, তখন খুবই সংশয়ের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার এই ধরনের চিন্তাধারাকে।

    আমাদের চিন্তার দৌড় যতদূর আছে তাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে এরকম উপলব্ধিতে পৌঁছানোই যেতে পারে যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত যথোচিত কাজ করার ঝোঁকই মানুষের অগ্রগতির ইতিহাসে দেখা যায়। রকারের জন্য ‘আমাদের সময়ের জন্য যে সমস্যাটা নির্ধারিত হয়েছে তা হলো: মনুষ্য প্রজাতিকে অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক–সামাজিক দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।’ আর সেটা করার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল বা সংসদীয় পন্থা অবলম্বন করাটা কোনো পদ্ধতি হতে পারে না। বরং ‘একেবারে নিচের সারির মানুষদের থেকে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাই সাম্যবাদের চেতনায় গড়তে হবে।’

    কিন্তু সমাজের উৎপাদকরাই (কৃষক–শ্রমিক) কাজটি করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ তারাই সমাজের একমাত্র মূল্য–উৎপাদনকারী (Value-creating) উপাদান, যার মধ্য দিয়ে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে পারে। অর্থনৈতিক শোষণের জন্য তৈরি করা শ্রম–শৃঙ্খল ভাঙার কাজটা তাদেরই করতে হবে। সমাজকে সবধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রথা–প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্ত করা ও নতুন একটা সমাজের পথ খুলে দেওয়ার কাজটা তাদেরই করতে হবে। যে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে মুক্ত নারী–পুরুষের গড়া মুক্ত গোষ্ঠীগুলোর ঐক্যবদ্ধতায়। যে সমাজের ভিত্তি হবে সহযোগিতামূলক শ্রম ও পুরো গোষ্ঠীর কল্যাণ বিবেচনা করার জন্য একটা সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। এই মহান রূপকল্প সামনে রেখে শহর ও গ্রামের কঠোর পরিশ্রমী মানুষগুলোকে প্রস্তুত করা ও তাদেরকে আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ করে তোলাই আধুনিক অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিজমের লক্ষ্য। এটুকুতেই পুরো উদ্দেশ্যটা বলা হয়েছে।

    একজন সাম্যবাদী হিসেবে, রকার এটাই নিশ্চিত বলে ধরে নিচ্ছেন যে, ‘শ্রমিকদের সত্যিকারের, চূড়ান্ত, পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা একটাই মাত্র শর্তের ভিত্তিতে সম্ভব হতে পারে। আর সেটা হলো পুঁজির আত্মীকরণ। সবধরনের কাঁচামাল, ভূমি থেকে শুরু করে সব ধরনের উৎপাদনের উপায় শ্রমিকদের দখলে থাকতে হবে।’ একজন অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিস্ট হিসেবে, তিনি আরও যোগ করেছেন, বিপ্লব পূর্ববর্তী পর্যায়ে শ্রমিকদের সংগঠনগুলো শুধু ধারণাই তৈরি করবে না, ভবিষ্যতের রূপকল্প অনুযায়ী গড়েও উঠবে। ভবিষ্যতের সমাজ কাঠামো কেমন হবে সেই ভাবনার প্রতিমূর্তি তারা নিজেদের মধ্যেই নির্মাণ করবে— তিনি এমন একটা সামাজিক বিপ্লবের আশা করছেন যেটা রাষ্ট্রের সকল কলকব্জা ভেঙে ফেলবে। সেই সঙ্গে দখলচ্যুত করবে দখলদারদের। তিনি বলছেন, ‘আমরা সরকারের জায়গায় বসাবো শিল্পকারখানার সংগঠন।’

    রুডলফ রকারের প্রতিকৃতি
    শিল্পী : ফারমিন রকার (রুডলফ রকারের পুত্র)

    অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিস্টরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, একটা সাম্যবাদী অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা কখনোই সরকারি ডিক্রি বা সংসদীয় আইন–বিধি দিয়ে তৈরি করা যাবে না। এটা করার একমাত্র পথ: উৎপাদনের প্রতিটা পর্যায়ে নিয়োজিত শ্রমিকদের সর্বাত্মক সংহতি ও সহযোগিতা। যেটার জন্য কারখানার সকল ব্যবস্থাপনার উপরে শ্রমিকদের সরাসরি দখল থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ, শাখাগুলো একটা সাধারণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশ নেবে স্বাধীন সদস্য হিসেবে। এবং পুরো সমাজের স্বার্থ বিবেচনা করে উৎপাদন ও বিতরণ করবে সুশৃঙ্খলভাবে। যার ভিত্তি হবে মুক্তভাবে করা পারস্পরিক চুক্তি।

    [Chomsky.info version] রকার এটা এমন একটা সময়ে বসে লিখছিলেন যখন এই ধারণাগুলো নাটকীয়ভাবে অনুশীলন করে দেখা হচ্ছিল স্প্যানিশ বিপ্লবে। [১৯৩৬ সালে] স্পেনের এই বিপ্লবের আগ দিয়েই অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট অর্থনীতিবিদ দিয়েগো আবাদ দে সান্তিয়ান লিখেছেন—

    সামাজিক রূপান্তরের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, বিপ্লব কখনোই রাষ্ট্রকে একটা মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। তাকে বরং উৎপাদকদের সংগঠনের উপরেই নির্ভর করতে হবে। আমরা এই নিয়মটাই অনুসরণ করেছি। আর দেখেছি যে নতুন একটা শৃঙ্খলা গড়ে তোলার জন্য সংগঠিত শ্রমশক্তির উপর আলাদা করে কোনো ক্ষমতার দরকার নেই। ব্যক্তি মালিকানা বিলুপ্ত ও সব ধরনের বিশেষ সুযোগ–সুবিধা প্রাপ্তির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অর্থনৈতিক একটা সংগঠনে রাষ্ট্রের কী প্রয়োজন থাকতে পারে, সেটা কেউ আমাদের দেখিয়ে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। রাষ্ট্রকে নিরুদ্ধ করার কাজটা কখনোই ধীরগতির একটা প্রক্রিয়া হতে পারে না। বিপ্লবের প্রধান কাজই হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। একদিকে হয় বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক সব সম্পত্তি উৎপাদকদের হাতে দিতে হবে এবং তখন তারা নিজেদের সংগঠিত করে পুরো সমাজের জন্য উৎপাদন করবে আর সেখানে রাষ্ট্রের কিছুই করার থাকবে না; নয়তো অন্যদিকে বিপ্লব উৎপাদকদের সামজিক সম্পত্তি দেবে না। সেক্ষেত্রে বিপ্লবটা মিথ্যা হয়ে যাবে আর রাষ্ট্র বলবৎ থাকবে।

    আমাদের অর্থনৈতিক ফেডারেল কাউন্সিল কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়। বরং এটা একটা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। যেটা সে অর্জন করে একেবারে নিচ থেকে। আর পরিচালিত হয় আঞ্চলিক ও জাতীয় সম্মেলনে গ্রহণ করা নীতিমালার মাধ্যমে। এটা একটা সংযোগ সংস্থা মাত্র। আর কিছুই না। [Chomsky.info version]

    এই রকম ধারণার সঙ্গে একমত না হতে পেরে ১৮৮৩ সালে একটা চিঠিতে অ্যাঙ্গেলস লিখেছিলেন:

    নৈরাজ্যবাদীরা ব্যাপারটা তুলে ধরে উল্টাভাবে। তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, সর্বহারার বিপ্লব অবশ্যই শুরু হতে হবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে বিদায় করে দিয়ে। …কিন্তু এইরকম একটা মুহূর্তে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়া মানে বিজয়ী সর্বহারাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাটা ধ্বংস করে দেওয়া যেটার মাধ্যমে তারা নিজেদের সদ্য প্রাপ্ত ক্ষমতাটা প্রয়োগ করতে পারে। পুঁজিবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীদের আটকে রাখতে পারে, এবং সমাজের অর্থনৈতিক বিপ্লবটা সম্পন্ন করতে পারে, যেটা ছাড়া এই পুরো বিজয়টা পরিণত হবে নতুন পরাজয়ে আর যার শেষটা হবে শ্রমিকদের গণহত্যার মধ্য দিয়ে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল প্যারি কমিউনের পর।

    এর বিপরীতে, নৈরাজ্যবাদীরা— বিশেষ করে বাকুনিন— ক্রমাগত সবাইকে সাবধান করছিলেন ‘লাল আমলাতন্ত্রের’ হুমকির ব্যাপারে, যেটা তাঁর ভাষায় প্রমাণিত হতে পারে “আমাদের শতকে সৃষ্ট সবচেয়ে গর্হিত আর ভয়াবহ মিথ্যা হিসেবে।” অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট ফার্নান্দ প্যালাতিয়ারের জিজ্ঞাসা ছিল: “অন্তবর্তীকালীন রাষ্ট্রটাকেও কি একটা কালেকটিভিস্ট কারাগারই হতে হবে? এটা কি মুক্ত সংগঠনগুলো নিয়ে গঠিত হতে পারে না? যার কাজকর্ম নির্দিষ্টভাবে উৎপাদন আর বন্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? উবে যাবে রাষ্ট্র–রাজনীতির সব প্রতিষ্ঠানগুলো?”

    আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানি, এমন ভান করব না। কিন্তু এটা মনে হয় পরিষ্কার যে, কোনো না কোনোভাবে এর একটা ইতিবাচক উত্তর পাওয়া না গেলে, বামপন্থীদের মানবতাবাদী আদর্শগুলো ধারণ করতে পারবে, এমন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আশা খুব বেশি নাই। মার্টিন বুবার খুব অল্প কথায় সমস্যাটা খুব দারুণভাবে শনাক্ত করেন, যখন তিনি লেখেন যে, “One cannot in the nature of things expect a little tree that has been turned into a club to put forth leaves.” রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নাকি ধ্বংস— এই প্রশ্নেই মার্ক্সের সঙ্গে তাঁর মৌলিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল বলে মনে করতেন বাকুনিন। কোনো না কোনোভাবে, এই প্রশ্নটা তখন থেকেই বারবার উঠেছিল। ‘মুক্তিমুখীন’ সমাজতন্ত্রীদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল ‘কর্তৃত্বপরায়ন’ সমাজতন্ত্রীদের।

    [Chomsky.info version] লাল আমলাতন্ত্র সম্পর্কে বাকুনিনের সাবধানবাণী এবং স্টালিনের একনায়কতন্ত্রের অধীনে সেটার চূড়ান্ত পরিণতি দেখার পরও, এক শতাব্দী আগের সেই বিতর্কগুলোকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে একটা বিশাল গলদ নিশ্চিতভাবেই থেকে যাবে যদি আমরা সাম্প্রতিক সময়ের সামাজিক আন্দোলনগুলোকেও তাদের সেই ঐতিহাসিক উদ্ভবের সময়ের ধারণার সঙ্গেই মেলাতে যাই। বিশেষত, বলশেভিকবাদকে ‘মার্ক্সবাদের অনুশীলন’ হিসেবে বিবেচনা করাটাও এক ধরনের বিকৃতি। বরং বলশেভিকবাদের বামপন্থী সমালোচনা, যেটা রাশিয়ান বিপ্লবকে ঘিরে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বিচারের মাধ্যমে করা হয়, সেটা অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট।

    বলশেভিক বিরোধী বামপন্থী শ্রম আন্দোলনগুলো লেনিনপন্থীদের বিরোধিতা করেছিল কারণ তারা রাশিয়ার মানুষের এই অভ্যুত্থানটাকে শুধুমাত্র সর্বহারাদের স্বার্থেই কাজে লাগানোর পথে বেশিদূর যায়নি। তারা বন্দী হয়ে পড়েছিল তাদের নিজেরই গড়া পরিবেশে। আর আন্তর্জাতিক একটা প্রগতিশীল আন্দোলনকে ব্যবহার করেছিল শুধুই রাশিয়ার স্বার্থে। খুব দ্রুতই সেটা বলভেশিক পার্টি–রাষ্ট্রের স্বার্থের সমার্থকে পরিণত হয়। রাশিয়ান বিপ্লবের ‘বুর্জোয়া’ চরিত্রগুলো খুঁজে পাওয়া যেতে থাকল বলভেশিকবাদের মধ্যেই। লেনিনবাদকে ধরা যেতে পারে আন্তর্জাতিক সোশ্যাল–ডেমোক্রেসির অংশ হিসেবে। দুইটার মধ্যে পার্থক্য শুধু ছিল কৌশলগত ইস্যুতে। [Chomsky.info version]

    কেউ যদি নৈরাজ্যবাদী ঐতিহ্যের মধ্যে একটা প্রধান ধারণা সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে আমার মতে সেটা হতে পারে বাকুনিনের এই লেখা থেকে। প্যারি কমিউন নিয়ে লেখার সময় তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন এভাবে:

    আমি স্বাধীনতার এক অন্ধ সমর্থক। এটাকেই আমি বিবেচনা করি একমাত্র শর্ত হিসেবে যার অধীনে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, মর্যাদা, আনন্দ বিকশিত ও বৃদ্ধি পেতে পারে। সেটা রাষ্ট্রের নির্ধারণ করা ও মেপে দেওয়া আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা না। সেই স্বাধীনতা মিথ্যা। বাস্তবে সেটা কিছু মানুষের সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি ও সমাজের বাকি মানুষের দাসত্বের বেশি কিছুই না। আমি যে স্বাধীনতার কথা বলছি সেটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অহংবাদী, জরাজীর্ণ, কল্পিত স্বাধীনতাও নয়, যেটার উচ্চ প্রশংসা করেছেন জঁ জ্যাক রুশো ও অন্যান্য বুর্জোয়া উদারনীতিবাদের সমর্থকেরা। এটাও সব মানুষের সম্ভাব্য অধিকারগুলো প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরই প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্র সবার অধিকার নির্দিষ্ট করে দেয়। এই ধারণাটাও অনিবার্যভাবে অধিকার হরণের দিকে নিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত সেটা শূন্যের কোটায় এসে ঠেকে। না, আমি সেই স্বাধীনতার কথা বলছি যেটা সত্যিই তার নামের সঙ্গে মানায়। যেটার মাধ্যমে প্রতিটা মানুষ তার ভেতরে সুপ্ত বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক ক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। সেই স্বাধীনতার কথা বলছি যেটা মানুষের প্রকৃতি–নির্ধারিত বিধিনিষেধ ছাড়া অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞার স্বীকৃতি দেয় না। এগুলোকে ঠিক বিধিনিষেধ হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না কারণ এই নিয়মনীতিগুলো কারও উপরে বাইরে থেকে আইন জারি করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। এগুলো মানুষের স্বভাবজাত, জন্মগত। এগুলোই আমাদের বস্তুজগত, বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি। এগুলো আমাদের সীমাবদ্ধ করে না। বরং এগুলোই স্বাধীনতার সত্যিকারের ও তাৎক্ষণিক পূর্বশর্ত।

    এই ধ্যানধারণাগুলো গড়ে উঠেছে ইউরোপিয়ান আলোকায়নের যুগ থেকে। এগুলোর মূল খুঁজে পাওয়া যাবে রুশোর ডিসকোর্স অন ইনইকুয়ালিটি, হ্যামবোল্টের লিমিটস অব স্টেট অ্যাকশন, কান্টের নির্বন্ধে, ফরাসী বিপ্লবের পক্ষে তাঁর লেখাপত্রে। তাঁরা বলছিলেন যে, স্বাধীনতার পরিপক্কতা অর্জনের একমাত্র পূর্বশর্ত হতে হবে স্বাধীনতা। পরিপক্কতা অর্জন করার পরে সেটা উপহার দেওয়া হবে— বিষয়টা এমন না। শিল্প পুঁজিবাদ বিকাশের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছিল একটা নতুন ধরণের অন্যায্য ব্যবস্থা, যেমনটা আগে কখনোই দেখা যায়নি। সেই সময়ে মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্রীরাই আলোকায়নের প্রগতিশীল মানবতাবাদী চিন্তাগুলো সংরক্ষণ এবং বিস্তৃত করেছিল। অন্যদিকে ধ্রুপদী উদারনৈতিক আদর্শগুলোকে বিকৃত করে একটা মতাদর্শ দাঁড় করানো হয়েছিল উদীয়মান পুঁজিবাদী সামাজিক ব্যবস্থার বৈধতা দেওয়ার জন্য।

    কিন্তু আদতে, যে অনুমানগুলোর উপর ভিত্তি করে ধ্রুপদী উদারনীতিবাদ সামাজিক জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিল, সেই একই অনুমান থেকে পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কও অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল। [Guerin Book Version] যেমন হ্যামবোল্ট রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছিলেন কারণ রাষ্ট্র “মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করতে চায়, যে যুক্তিহীনভাবে রাষ্ট্রের মর্জিমাফিক চলবে। উপেক্ষা করা হয় ব্যক্তির লক্ষ্য–উদ্দেশ্যকে।” তিনি আরও যুক্তি দেন, “যে জিনিসটা ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা থেকে আসছে না… যেটা তার অস্তিত্বের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে না, বরং নিজের স্বভাব–চরিত্রের সঙ্গে অচেনা হয়ে থাকছে; সেই জিনিসটা সে কখনো ভালোভাবে করতে পারবে না, সত্যিকারের মনুষ্য–শক্তি সেখানে প্রযুক্ত হবে না। সর্বোচ্চ সেখানে কিছু কারিগরী নির্ভুলতা পাওয়া যেতে পারে।” স্বাধীনতা বজায় থাকলে, “সব কৃষক ও কারিগরই শিল্পী হয়ে উঠতে পারেন; মানে যে মানুষ নিজের জন্যই নিজের কাজটাকে ভালোবাসে, তারা ক্রমাগত সেটার বিকাশ ঘটায়, নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা দিয়ে। এভাবেই তারা নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করে, মর্যাদা অর্জন করে এবং আনন্দময় জীবন যাপন করে।” মানুষ যখন শুধু বাহ্যিক চাহিদা আর কর্তৃত্বের সামনে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন “আমরা হয়তো তার কাজটাকে প্রশংসার চোখে দেখতে পারি কিন্তু কিন্তু মনে মনে তাকে অপছন্দই করি।” হ্যামবোল্ট আবার কোনো প্রাচীনপন্থী ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদীও নন। তিনি তার প্রধান চিন্তাধারাকে সারসংক্ষেপ করেছেন এভাবে: “মানুষ যখন সমাজের সব শৃঙ্খল ভেঙে ফেলবে, তখন তারা যত বেশি সম্ভব নতুন সামাজিক বন্ধন তৈরিরও উদ্যোগ নেবে। বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তি নিজেকে বিকশিত করতে পারে না, ঠিক যেমনটা পারে না শৃঙ্খলিত কোনো মানুষ।” [Guerin Book Version] উদারনৈতিক ধ্যানধারণার এই ধ্রুপদী লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৯২ সালে এবং এটি সম্ভবত মিলকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এটির মূল নির্যাস গভীরভাবে পুঁজিবাদবিরোধী ছিল। যদিও তা ছিল অপরিপক্ক। পরে এই ধ্যানধারণাগুলোকে নিশ্চিতভাবেই অনেক কেটেছেঁটে, চেনা যায় না এমন দশা বানিয়ে পরিণত করা হয়েছিল শিল্প পুঁজিবাদের মতাদর্শ হিসেবে।

    সামাজিক নিপীড়নের শেকলগুলো প্রতিস্থাপিত হবে মুক্ত সামাজিক বন্ধন আর মুক্তশ্রমের চুক্তি দিয়ে, এমন একটা সমাজের রূপকল্প আমাদের নিয়ে যায় তরুণ মার্ক্সের কাছে, যিনি এইরকম ধারণার প্রতিচ্ছবি দেখিয়েছেন ‘শ্রমের বিচ্ছিন্নতা’ সংক্রান্ত আলোচনায়। যেখানে তিনি বলছেন যে, যখন মানুষের উপর কোনো কাজ বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, এবং সেটা যদি অনিচ্ছা নিয়ে করতে হয়… তাহলে সে তার কাজের মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতা পায় না, নিজেই নিজেকে প্রত্যাখ্যান করে… আর একসময় হয়ে পড়ে শারিরীকভাবে বিপর্যস্ত আর মানসিকভাবে টালমাটাল। বিচ্ছিন্ন শ্রম কিছু শ্রমিককে বর্বরোচিত পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করে এবং অন্যদের যন্ত্রে পরিণত করে। এইভাবে প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে মানুষ যে ‘মুক্ত সচেতন কর্মকাণ্ড’ আর ‘সৃষ্টিশীল জীবন’–এর আকাঙ্ক্ষা পেয়েছে, সেটা থেকে বঞ্চিত হয়। একইভাবে, মার্ক্স নতুন এক ধরনের মানুষ কল্পনা করেছেন যারা সতীর্থ মানুষদের সহযোগিতা কামনা করে… [শ্রমিকদের অ্যাসোসিয়েশনগুলো হয়ে গেছে] “ভবিষ্যতের মনুষ্য সম্পর্কগুলো কেমন হবে সেটা সামাজিক পটভূমিতে তুলে ধরার একটা সত্যিকারের গঠনমূলক প্রচেষ্টা”। এটা সত্যি যে ধ্রুপদী মুক্তিমুখীন চিন্তাধারা সামাজিক জীবনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। এটা তারা করেছে কারণ স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য, মুক্ত সংগঠন; মানুষের এই স্বভাবজাত আকাক্সক্ষাগুলোর বিষয়েও তাদের একটা গাঢ় অনুমান ছিল। এই একই অনুমান অনুসারে, উৎপাদনের জন্য পুঁজিবাদী সম্পর্ক, মজুরিভিত্তিক শ্রম, প্রতিযোগিতা, ‘আধিপত্যশীল ব্যক্তিসাতন্ত্রবাদের’ মতাদর্শ— সবকিছুই মৌলিকভাবে মানুষ–বিরোধী বলে বিবেচনা করতে হবে। মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্রই যথাযথভাবে আলোকায়নের উদারবাদী আদর্শগুলোর উত্তরাধিকার বহন করে এনেছে।

    লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল
    শিল্পী: ইউজিন দেলাক্রোয়া

    রুডল্ফ রকার আধুনিক নৈরাজ্যবাদকে বর্ণনা করেছেন “দুইটা মহান চিন্তা–তৎপরতার মিলনস্থল হিসেবে যেটা ফরাসী বিপ্লবের সময় ও তারপর থেকে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে একটা বৈশিষ্ট্যগত প্রকাশ খুঁজে পেয়েছে: সাম্যবাদ আর উদারনীতিবাদ।” ধ্রুপদী উদারনৈতিক আদর্শগুলো, তাঁর মতে, ধ্বংসের মুখে পড়েছিল পুঁজিবাদী অর্ধনৈতিক কাঠামোর কঠিন বাস্তবতার কারণে। নৈরাজ্যবাদ খুব জরুরিভাবেই পুঁজিবাদবিরোধী। এটা একজনের দ্বারা আরেকজন মানুষ শোষিত হওয়ার বিরোধিতা করে। সেই সঙ্গে নৈরাজ্যবাদ একজনের ওপর আরেকজনের কর্তৃত্বেরও বিরোধিতা করে। এটা যুক্তি দেয় যে, “সাম্যবাদ হতে হবে মুক্ত অথবা এটা কখনোই সাম্যবাদ হবে না।” এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নৈরাজ্যবাদকে বিবেচনা করা যেতে পারে সাম্যবাদের মুক্তিমুখীন ধারা হিসেবে। এই ধরনের চেতনা থেকেই দানিয়েল গ্যারাঁ নৈরাজ্যবাদের পাঠ শুরু করেছেন। এই বইয়ে, অন্যান্য আরও অনেক লেখায়।

    গ্যারাঁ এখানে অ্যাডল্ফ ফিশারকে উদ্ধৃত করেছেন। ফিশার বলেছেন, “প্রতিটা নৈরাজ্যবাদীই একজন সাম্যবাদী। কিন্তু সব সাম্যবাদীই হয়তো নৈরাজ্যবাদী নন।” একইভাবে বাকুনিন, তাঁর ১৮৬৫ সালের নৈরাজ্যবাদের ইশতেহার-এ, আন্তর্জাতিক বিপ্লবী ভ্রাতৃসঙ্ঘের রূপকল্প উপস্থাপনের সময় একটা নীতি ঠিক করেছিলেন যে, প্রতিটা সদস্যকে অবশ্যই শুরু করতে হবে সাম্যবাদী হয়ে।

    একজন নৈরাজ্যবাদী অবশ্যই উৎপাদনের উপায়সমূহের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা ও মজুরি দাসত্বের বিরোধিতা করবে। ব্যক্তিগত মালিকানা আর মজুরি দাসত্ব— দুই–ই একই সমাজব্যবস্থার উপাদান। এবং এগুলো মুক্ত শ্রম ও সেই শ্রমের উপরে শ্রমিকদেরই অধিকার থাকবে— এমন নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না। মার্ক্স যেমনটা তুলে ধরেছেন যে, সাম্যবাদীরা এমন একটা সমাজের দিকে তাকাবে যেখানে শ্রমটা “শুধু জীবনধারণের উপায়ই না, জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠবে”। কিন্তু সেটা অসম্ভব যখন কোনো কর্মীকে স্বপ্রণোদনা ছাড়া শুধুই বাইরে থেকে কর্তৃত্বের মাধ্যমে চালানো হয়: “একে অপরের থেকে কিছুটা কম শোষণমূলক হলেও, এমন কোনো মজুরি–শ্রমের কাঠামো নেই, যেটা মজুরি দাসত্বের মর্মযন্ত্রণা দূর করতে পারে।” একজন নৈরাজ্যবাদীকে শুধু বিচ্ছিন্ন শ্রমেরই না, বিরোধিতা করতে হবে শ্রমের হতচেতন(alienated) বিশেষায়িতকরণেরও, যেটা তৈরি হয়, যখন উৎপাদনের উপায়সমূহ শ্রমিকদেরকে পুরো মানুষের একটা খণ্ডমাত্রে পরিণত করে। তার মর্যাদাহানি করে বানিয়ে দেয় পুরো ব্যবস্থাটার একটা ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ। কাজ করার পরিবেশটা এমন যন্ত্রণাদায়ক হয়ে যায় যে সেটা করার মৌলিক অর্থটাই হারিয়ে যায়; শ্রমপদ্ধতির সঙ্গে জড়িত বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গাগুলো থেকেও তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। বিজ্ঞানও এখানে মিলেমিশে গেছে স্বাধীন ক্ষমতা হিসেবে…।

    [Chomsky.info version] মার্ক্স এটাকে শিল্পায়নের অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে দেখেননি। বরং বিবেচনা করেছিলেন উৎপাদনের পুঁজিবাদী সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য হিসেবে। ভবিষ্যতের সমাজকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে ‘এখনকার সময়ের শ্রমিকদের, যাদেরকে পুরো একটা মানুষের একটা খণ্ডমাত্রে পরিণত করা হয়েছে, এবং তাদের প্রতিস্থাপন করতে হবে পুরোপুরি বিকশিত একজন ব্যক্তিমানুষ দিয়ে। যে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে পারবে, সমাজে ভিন্ন ভিন্নভাবে ভূমিকা রাখবে। এই সব কিছুরই সুযোগ থাকবে নিজের প্রকৃতিপ্রদত্ত ক্ষমতাগুলো বিকশিত করতে পারার জন্য। আর এটার পূর্বশর্ত হচ্ছে পুঁজি ও মজুরি শ্রমের বিলুপ্তি। (‘শ্রম রাষ্ট্রের’ সেনাবাহিনীর কথা তো না বললেও চলে। পুঁজিবাদের শুরুর পর থেকে চলে আসা সব ধরনের আধুনিক সর্বাত্মকবাদী কাঠামোও ধ্বংস করতে হবে।) মানুষকে শুধুই একটা যন্ত্রের নাটবল্টুতে পর্যবসিত করা, উৎপাদনের একটা বিশেষায়িত হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার এই প্রক্রিয়া আরও বাড়ানোর চেয়ে দমন করে ফেলা যেতে পারে, নীতিগতভাবে। কিন্তু সেটা হতে হবে যথাযথ উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে। উৎপাদন প্রক্রিয়ার উপরে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রকের চাপিয়ে দেওয়া শর্তাবলীর অধীনে নয়। এগুলোর মাধ্যমেই একটা মানুষ (হ্যামবোল্টের ভাষায়) শুধুই একটা যন্ত্রে পরিণত হয়ে শেষদিন পর্যন্ত খেটে যায়। নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্য–উদ্দেশ্যগুলো আড়ালেই পড়ে থাকে।

    অ্যানার্কোসিন্ডিক্যালিস্টরা চেয়েছে, এমনকি পুঁজিবাদের অধীনেও, মুক্ত উৎপাদকদের মুক্ত সমবায় গড়ে তুলতে, যেগুলো যুদ্ধংদেহী আন্দোলনে যুক্ত হবে আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে উৎপাদনের সংগঠনগুলো দখল করার প্রস্তুতি নেবে। এই সমবায়গুলো কাজ করবে নৈরাজ্যবাদের অনুশীলন স্কুল হিসেবে। [Chomsky.info version]

    উৎপাদনের উপায়সমূহের ওপর ব্যক্তিমালিকানা, প্রুধোঁর বহুল ব্যবহৃত উক্তি অনুসারে, এক ধরনের “চুরিই”। এটাতে “শক্তিশালীর দ্বারা দুর্বলের শোষণই” হয়। — [Chomsky.info version] উৎপাদনের উপরে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণটাও, যত মহৎ কারণেই তা থাকুক না কেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে পারে না যেখানে শারিরীক বা মানসিক শ্রম জীবনের সর্বোচ্চ চাওয়া হতে পারে। ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র— দুটোই এজন্য বিলুপ্ত করতে হবে। [Chomsky.info version]

    উৎপাদনের উপায়সমূহের ব্যক্তিগত মালিকানার বিরোধিতা করে এই নৈরাজ্যবাদীরা তাদের কাতারে দাঁড়ান যারা ‘ইতিহাসের তৃতীয় ও শেষ মুক্তিদায়ী পর্যায়ে’ যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে। প্রথম পর্যায়ে মানুষ দাস থেকে ভূমিদাসে পরিণত হয়েছে, দ্বিতীয়বার এই ভূমিদাসরা প্রতিস্থাপিত হয়েছে মজুরি শ্রমিকদের দিয়ে। আর এই তৃতীয়বারে, শ্রমিকদের মুক্তির সর্বশেষ পর্যায়ে উৎপাদকদের মুক্ত–স্বেচ্ছাসেবী সমবায়গুলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে। ১৮৪৮ সালে ‘সভ্যতার’ জন্য সবচেয়ে আসন্ন হুমকির কথা বলতে গিয়ে দে তোকভিল বলেছিলেন—

    ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারটাই অন্যান্য আরও অনেক অধিকারের উৎসভূমি ও ভিত্তি হয়ে থাকার কারণে এটাকে খুব সহজেই রক্ষা করা গেছে— বা বলা যায়, আক্রমণই করা হয়নি। এটাই তারপর হয়ে উঠেছে সমাজের নগরদুর্গ/আশ্রয়স্থল। সেসময় এটার অনুসঙ্গ হিসেবে গড়ে উঠেছে অন্যান্য অধিকারগুলো। এটাকে কখনো আক্রমণের ধকল সইতে হয়নি। গুরুতর কোনো আক্রমণের মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু এখন, ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকারকে বিবেচনা করা হচ্ছে প্রাচীন রাজতান্ত্রিক দুনিয়ার একমাত্র ধ্বংস না হওয়া অবশেষ হিসেবে। বিবেচিত হচ্ছে বৈষম্যের সমাজে সুবিধাপ্রাপ্তির একমাত্র উপাদান হিসেবে। ফলে এখন পরিস্থিতিটা ভিন্ন। শ্রমজীবী শ্রেণির বুকের মধ্যে কী হয়ে যাচ্ছে, তা একবার কল্পনা করে দেখুন, যদিও আমাকে স্বীকার করতে হচ্ছে যে, তারা এখনো চুপচাপই আছে। এটা সত্যি যে আগের তুলনায় তারা তীব্র রাজনৈতিক অনুরাগ থেকে কম উদ্দীপ্ত হচ্ছে। কিন্তু আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, তাদের অনুরাগটা এখন রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ক্রমাগত সামাজিক হয়ে উঠছে? আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে এমন ধ্যান–ধারণা ছড়িয়ে যাচ্ছে যার লক্ষ্য শুধু এই আইন, তমুক মন্ত্রণালয় বা এইরকমের একটা সরকার গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তারা এই সমাজটার খোদ ভিত্তিভূমিই পাল্টে দিতে চাচ্ছে?

    ১৮৭১ সালে প্যারিসের শ্রমিকরা এই নীরবতা ভেঙেছিল আর উদ্যোগ নিয়েছিল সব সভ্যতার ভিত্তি, ব্যক্তিগত মালিকানা বিলোপ করার! হ্যাঁ, মশাইরা, প্যারি কমিউনের উদ্দেশ্য ছিল সব ধরনের শ্রেণি সম্পত্তির বিলোপ ঘটানো, যা অনেকের শ্রমকে পরিণত করে কিছু মানুষের সম্পদে। প্যারি কমিউন দখলদারদেরই দখলচ্যুত করতে চেয়েছিল। যে উৎপাদনের উপায়গুলো (ভূমি, পুঁজি) এখন প্রধানত শ্রম দাসত্ব ও শোষণের উপায়, সেগুলোকে মুক্ত ও সমবায় শ্রমের একটা যন্ত্রমাত্রে পরিণত করে প্যারি কমিউন ব্যক্তি সম্পদকে একটা সত্যে পরিণত করতে চেয়েছিল।

    কমিউন, অবশ্যই ভেসে গিয়েছিল রক্তবন্যায়। প্যারিসের শ্রমিকরা যে “সমাজের খোদ ভিত্তিভূমিতে” আঘাত করে বিজয়ী হবে ভেবেছিল, সেই “সভ্যতা” আরও একবার তার আসল চেহারা দেখিয়েছিল নগ্নভাবে। ভার্সাই সরকার সেনারা যখন আবার প্যারিসের দখল নিয়ে ফেলে, তখন কী পরিস্থিতি হয়েছিল তা খুব নির্মম কিন্তু সঠিকভাবে লিখেছিলেন মার্ক্স:

    দাস ও মজুররা তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেই এই সভ্যতা ও বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার ন্যায়বিচার এসে হাজির হয় তার ভয়ঙ্কর আলো নিয়ে। এরপর সভ্যতা ও ন্যায়বিচার সামনে এগিয়ে আসে চরম বর্বরতা ও বাছবিচারহীন প্রতিশোধস্পৃহার ছদ্মবেশ নিয়ে… সেনাবাহিনীর নারকীয় কর্মকাণ্ডগুলো প্রতিফলিত করে সেই সভ্যতার আজন্ম রূপটি, যেখানে তারা কাজ করে ভাড়াটে ন্যায়প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে… পুরো দুনিয়ার বুর্জোয়ারা সেই যুদ্ধের পর নির্বিচার গণহত্যা দেখে তৃপ্তির সম্মতি দিয়েছিল। তারা ভয়ে কেঁপে উঠেছিল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হতে দেখে।

    ১৮৭১ এর প্যারি কমিউনের উপর আঁকা একটি ছবি

    প্যারি কমিউনের তীব্র ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি সত্ত্বেও, বাকুনিন লিখেছিলেন যে, প্যারিস একটা নতুন যুগের দ্বার খুলে দিয়েছে। “যে যুগটা সাধারণ জনগণের চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণ মুক্তির সূচনা করবে। তাদের সত্যিকারের ভবিষ্যৎ সংহতি ফুটিয়ে তুলবে। রাষ্ট্র নির্ধারিত সীমানা সত্ত্বেও মানুষের পরবর্তী বিপ্লবটা হবে, আর্ন্তজাতিক সংহতিতে। সেটাই হবে প্যারিসের পুনরুত্থান।”— পুরো বিশ্ব এখনো যে বিপ্লবটার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

    একজন যথার্থ নৈরাজ্যবাদীকে এজন্য সাম্যবাদী হতে হবে, বিশেষ ধরনের সাম্যবাদী। একজন নৈরাজ্যবাদী শুধু বিচ্ছিন্ন আর বিশেষায়িত শ্রমের বিরোধিতা এবং সকল শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুঁজির দখল নিয়ে নেওয়ার কথাই চিন্তা করবে না। বরং সে এটাও দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করবে যে, এই দখল নিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা হতে হবে সরাসরি। সর্বহারার নাম দিয়ে কোনো বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে সেটা করা হবে না। ছোট কথায়, সে বিরোধিতা করবে সরকার নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন সংগঠনের। এর মানে রাষ্ট্রীয়–সাম্যবাদ। এই ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপরে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব, ম্যানেজার–বিজ্ঞানীদের কর্তৃত্ব, দোকানে দোকান–কর্মকর্তার কর্তৃত্ব বজায় থাকে…শ্রমিক শ্রেণির লক্ষ্য হচ্ছে সব রকমের শোষণ–নিপীড়ন থেকে মুক্তি। কিন্তু নতুন এক ধরনের পরিচালক আর কর্তৃত্বকারী শ্রেণিকে দিয়ে সেই লক্ষ্যে কখনোই পৌঁছানো যায়নি আর কখনো যাবেও না। লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে শুধুমাত্র তখনই, যখন শ্রমিকরা নিজেই তাদের উৎপাদনের উপর দখল রাখতে পারবে।

    এই মন্তব্যটা নেওয়া হয়েছে বাম–ধারার মার্ক্সবাদী আন্তন প্যানেককের শ্রেণি সংগ্রামের উপর পাঁচটি থিসিস থেকে। তিনি ছিলেন কাউন্সিল কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বামপন্থী তাত্ত্বিক। আসলে প্রগতিশীল মার্ক্সবাদ, নৈরাজ্যবাদী ধারার সঙ্গে মিশে যায়।

    আরও বিস্তারিত চিত্রের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে ‘বিপ্লবী সাম্যবাদের’ এই নিম্নোক্ত রূপায়নকে:

    রাষ্ট্রীয় মালিকানা একটা আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে বলে মনে করে না বিপ্লবী সাম্যবাদীরা। আমরা দেখেছি যে কেন রাষ্ট্র গণতান্ত্রিকভাবে শিল্পকারখানা চালাতে পারে না। কারখানা তখনই কেবল গণতান্ত্রিকভাবে চালানো সম্ভব যখন সব শ্রমিক সরাসরি তাদের নিজেদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করে প্রশাসনিক কমিটি বানাতে পারবে। সাম্যবাদ হবে মৌলিকভাবে একটা শিল্পকারখানাভিত্তিক ব্যবস্থা; এটার প্রতিনিধি ব্যবস্থাও হবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বৈশিষ্ট্যের। এইভাবে যারা বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম ও শিল্পকারখানাগুলো পরিচালনা করছে, তারা সরাসরি সামাজিক প্রশাসনের আঞ্চলিক বা কেন্দ্রিয় কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব করবে। এই পদ্ধতিতে এরকম প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতাটা প্রবাহিত হবে তাদের কাছ থেকে যারা প্রত্যক্ষভাবে কাজগুলো করছে এবং পুরো কমিউনিটির চাহিদা সম্পর্কে অবগত আছে। যখন কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমিটি বৈঠকে বসবে তখন প্রতিনিধিরা সামাজিক কাজগুলোর প্রতিটা ধাপের বর্ণনা দেবে। এইভাবে পুঁজিবাদী রাজনৈতিক বা ভৌগলিক রাষ্ট্র প্রতিস্থাপিত হবে সাম্যবাদের শিল্প প্রশাসন কমিটি দিয়ে। এক সামাজিক ব্যবস্থা থেকে আরেকটাতে রুপান্তরিত হওয়াই তো সামাজিক বিপ্লব। পুরো ইতিহাসজুড়ে রাষ্ট্র–রাজনীতি বলতে বুঝিয়েছে শাসক শ্রেণির সরকারকে। আর সাম্যবাদী রিপাবলিক হবে শিল্পকারাখানার সরকার। পরিচালিত হবে পুরো কমিউনিটির পক্ষে। আগের ধারণাটা অনেক মানুষকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পরাধীন করে রাখত। পরের ধারণাটার অর্থ হবে সব মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি— এটাই, সেজন্য, সত্যিকারের গণতন্ত্র।

    এই পরিকল্পিত বিবৃতিটা এসেছিল উইলিয়াম পলের রাষ্ট্রের উদ্ভব ও কার্যাবলী নামক বইয়ে। এটা লেখা হয়েছিল ১৯১৭ সালের শুরুর দিকে— লেনিনের রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইটির ঠিক আগ দিয়ে। রাষ্ট্র ও বিপ্লবই সম্ভবত লেনিনের সবচেয়ে মুক্তিমুখীন চিন্তাকর্ম। পল মার্ক্সিস্ট–ডি লিওনিস্ট সোশ্যালিস্ট লেবার পার্টির সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁকে দেখা গেছে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁর সমালোচনার জায়গাটা নৈরাজ্যবাদীদের মুক্তিমুখীন মতবাদের সঙ্গে নীতিগতভাবে মিলে যায়। আর তা হলো: রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বজায় থাকলে সেটা যেহেতু আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের দিকেই মোড় নেবে, সেহেতু সামাজিক বিপ্লবকে অবশ্যই এটার জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে হবে সমাজের শিল্পকারখানার সংগঠনগুলোকে। যেগুলোর উপরে থাকবে শ্রমিকদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। এরকম অনেক বিবৃতিই উদ্ধৃত করা যায়।

    এর চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: এই ধারণাগুলো বাস্তবে চর্চা করে দেখা হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। যেমন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ও ইতালিতে, ১৯৩৬ সালে স্পেনে (শুধু কৃষিভিত্তিক জায়গাগুলোতেই নয়, বার্সেলোনার মতো শিল্পায়িত শহরেও।) এমন যুক্তি দেওয়াই যায় যে, কাউন্সিল কমিউনিজমের মতো কোনো কাঠামোই একটা শিল্পায়িত সমাজে বিপ্লবী সাম্যবাদের প্রাকৃতিক কাঠামো। এর মধ্য দিয়ে গভীর বোঝাপড়ার পরিচয় পাওয়া যায় যে, যখন শিল্প ব্যবস্থার উপর কোনো না কোনো ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ থাকে, তখন গণতন্ত্র খুবই খণ্ডবিচ্ছিন্ন ও সীমিত হয়ে পড়ে। সেটা মালিক, ম্যানেজার, নীতিনির্ধারক, ‘ভ্যানগার্ড’ পার্টি বা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র; যাই হোক না কেন। কর্তৃত্বপরায়ন এই আধিপত্যের মধ্যে ধ্রুপদী মুক্তিমুখীন আদর্শগুলো ভালোমতো উপলব্ধিও করা যাবে না, যেগুলো পরবর্তীতে মার্ক্স, বাকুনিন ও অন্যান্য সত্যিকারের বিপ্লবীরা আরও বিকশিত করেছিলেন। মানুষ কখনোই নিজের সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারার মতো স্বাধীন হতে পারবে না। আর উৎপাদকরাও থেকে যাবে ‘মনুষ্য সত্তার একটা ক্ষুদ্র খণ্ডাংশ হয়ে’। মর্যাদাহীনভাবে। উপর থেকে পরিচালিত একটা উৎপাদন ব্যবস্থার যন্ত্র হয়ে।

    [Chomsky.info version] ‘স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবী কর্মকাণ্ড’ কথাটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টরা, বাকুনিনের এই কথাটা খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিল যে, প্রাক বিপ্লব পর্যায়ে শ্রমিক সংগঠনকে “শুধু ধারণা–আদর্শ তৈরিই না, ভবিষ্যত সমাজের প্রতিচ্ছবিটাও নিজেদের মধ্যে তুলে ধরতে হবে”। স্প্যানিশ বিপ্লবের যে অর্জন, তার ভিত্তি ছিল দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার ও লড়াইয়ের ঐতিহ্য ধরে রেখে ধৈর্য্যশীলভাবে সংগঠনমূলক কাজ ও শিক্ষামূলক প্রচার–প্রচারণা। ১৯৩১ সালের জুনে মাদ্রিদ কংগ্রেস ও ১৯৩৬ সালের মে মাসে সারাগোজা কংগ্রেসের গৃহীত প্রস্তাবে আসন্ন বিপ্লবের অনেক পূর্বাভাস দেখা গিয়েছিল। ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল সান্তিয়ানের ক্ষেত্রে। বিপ্লবের মাধ্যমে যে ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠবে, তার সুনির্দিষ্ট অনেক বর্ণনা আগেই দিয়েছিলেন সান্তিয়ান। গ্যারাঁ লিখেছেন, “মুক্তিমুখীন চিন্তকদের চিন্তাভাবনায় স্প্যানিশ বিপ্লবের ধারণাটা তুলনামূলকভাবে অনেক পরিপক্ক ছিল। একই সঙ্গে বিপ্লব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের চেতনাতেও।” শ্রমিকদের সংগঠনগুলোও সমাজকাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সেই অভিজ্ঞতা, সেই বোঝাপড়াই তাদেরকে নিয়ে গিয়েছিল সামাজিক পুনর্গঠনের দিকে। ১৯৩৬ সালের শুরুর দিকের গোলযোগটাই, ফ্রাঙ্কোর অভুত্থানের সময় ফেটে পড়েছিল সামাজিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। স্পেনে কালেক্টিভাইজেশন দলিলপত্র সংগ্রহের সূচনা হিসেবে নৈরাজ্যবাদী অগাস্টিন সোউচে লিখেছেন:

    অনেক বছর ধরে, স্পেনের নৈরাজ্যবাদী আর সিন্ডিক্যালিস্টরা সমাজের সামাজিক রুপান্তরকেই তাদের প্রধান কাজ বলে বিবেচনা করে এসেছে। তাদের সিন্ডিকেট আর গ্রুপগুলোর সমাবেশে, তাদের পত্রপত্রিকা, পুস্তিকা, বইপত্রে, সব জায়গায় সুশৃঙ্খল কায়দায় বিরতিহীনভাবে আলোচনা হতো সামাজিক বিপ্লবের সমস্যাবলী নিয়ে।

    স্বতঃস্ফূর্ত অর্জনগুলোর পেছনে এই সবই অবদান রেখেছে। স্প্যানিশ বিপ্লবের এই গঠনমূলক কাজগুলো। [Chomsky.info version]

    মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্রের এই ধারণাগুলোর সত্যিকার অর্থ গত শতকের অর্ধেকটাজুড়ে চাপা পড়ে ছিল শিল্পায়িত সমাজে। আধিপত্যশীল মতবাদ ছিল হয় রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র নয়তো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ (কেন সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত সামরিক চরিত্র ধারণ করেছে, তার উত্তরটাও অস্পষ্ট কিছু না) কিন্তু বিগত বছরগুলোতে নৈরাজ্যবাদী ধারার চিন্তাভাবনায় আগ্রহের বাতি জ্বলেছে। উপরে আন্তন প্যানেককের যে থিসিস থেকে আমি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছি সেটা পুনরায় ছাপা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে প্রগতিশীল ফরাসি শ্রমিকদের একটি গ্রুপের পুস্তিকায়। বিপ্লবী সাম্যবাদ নিয়ে উইলিয়াম পলের যে লেখাটির কথা উল্লেখ করেছি, সেই লেখাটির উদ্ধৃতি সাম্প্রতিক কালে ব্যবহার করেছেন ওয়াল্টার ক্যানডাল। ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডের শেরফিল্ডে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাতীয় কনফারেন্সে বক্তৃতার সময় তিনি উদ্ধৃত করেছেন উইলিয়াম পলকে। যুক্তরাজ্যে গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে হাজির হচ্ছে। তারা প্রায়ই কনফারেন্স আয়োজন করে, অনেক পুস্তিকা প্রকাশ করে। গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে তাদের অনুসারী অনেক সক্রিয় প্রতিনিধি আছে, যাদের হিসাবে রাখতে হয়। যেমন, The Amalgamated Engineering and Foundryworkers’ Union, তাদের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে ‘সব পর্যায়ে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায়’ প্রধান প্রধান শিল্পকারখানার জাতীয়করণ পরিকল্পনাকে। এই মহাদেশে, একই রকম অগ্রগতি আরও দেখা গেছে। ১৯৬৮ সালের মে–তে অবশ্যই কাউন্সিল কমিউনিজমের উপর আগ্রহ ক্রমাগতভাবে বাড়ছিল ফ্রান্স, জার্মানিতে। ইংল্যান্ডেও।

    মতাদর্শিকভাবে খুব আঁটোসাটো এই সমাজের রক্ষণশীল চরিত্র মাথায় রাখলে, এটা ভেবে খুব অবাক লাগে না যে, কেন যুক্তরাষ্ট্রে এসব ঘটনার প্রভাব প্রায় পড়েইনি। কিন্তু সেটাও বদলে যেতে পারে। ঠান্ডা যুদ্ধের জুজুটা উবে যাওয়ার পর এখন অন্তত বৃহত্তর পরিসরে অনেক প্রশ্ন তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখনকার দমনমূলক পরিবেশটা যদি হটিয়ে দেওয়া যায়, বামপন্থীরা যদি তাদের আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে, বিগত দশকের অর্জনগুলোর ওপর দাঁড়াতে পারেন, সংগঠিত হতে পারেন, তাহলে আগামী দিনের শিল্প সমাজ কীভাবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বোধে পরিচালিত হবে, কিভাবে কর্মক্ষেত্রে ও কমিউনিটিতে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে— এগুলো হয়ে উঠবে প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ইস্যু। যারা সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবে, তারা এগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করবে। আর যখন মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে উঠবে, তখন এই ভাবনাগুলো চর্চায় রূপ নেবে।

    ১৮৬৫ সালের ইশতেহারে, বাকুনিন অনুমান করেছিলেন যে, সামাজিক বিপ্লবের বড় একটা অংশ হবে “মেধাবী ও সত্যিকারের উদারমনা তরুণরা, যারা জন্মগতভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীতেই অবস্থান করে কিন্তু সহৃদয় আর প্রবল আকাক্সক্ষার জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়।” ১৯৬০–এর দশকে বিশ্বব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে হয়তো কেউ এই ভবিষ্যদ্বাণীর স্বার্থকতা খুঁজে পেতে পারেন।

    দানিয়েল গ্যারাঁ সেই কাজটা করতে নিয়েছেন, যা তার ভাষায়, নৈরাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার ‘পুনর্বাসন প্রক্রিয়া’। তিনি দাবি করেন, এবং আমি একমত যে, ‘নৈরাজ্যবাদের গঠনমূলক আদর্শগুলো নিজেদের প্রাণশক্তি টিকিয়ে রেখেছে। তাই তাদেরকে নতুনভাবে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখা, ওলটপালট করে দেখা প্রচলিত সাম্যবাদী চিন্তাভাবনাকেও নতুন দিশা দিতে পারে…এবং মার্ক্সবাদকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। কেউ হয়তো নতুন কোনো পরিবর্তনের কথাও ভাবতে পারেন। আর এটা এইভাবে মার্ক্সবাদকেও সমৃদ্ধ করতে অবদান রাখতে পারে। নৈরাজ্যবাদের ‘লম্বাচওড়া কাঁধ’ থেকে তিনি সেই চিন্তাধারা ও কর্মতৎপরতাগুলোকে বেশি করে পরখ করেছেন, যাকে ডাকা যেতে পারে মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্র নামে। এটাই স্বাভাবিক ও যথার্থ। এই বইয়ে তিনি হাজির করেছেন নৈরাজ্যবাদের প্রধান কিছু মানুষের বক্তব্য এবং নৈরাজ্যবাদী চেতনা ও আদর্শ থেকে উৎসারিত হওয়া জনগণের বিপ্লবী তৎপরতা। গ্যারাঁ শুধু নৈরাজ্যবাদী ভাবনাগুলোকেই বিবেচনায় নেননি, সেই সঙ্গে তিনি খুঁজে দেখেছেন জনগণের বিপ্লবী সংগ্রামের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ডগুলোও। সমাজের পাশাপাশি মনোযোগ দিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতার দিকেও। যারা শুধু দুনিয়াটা বুঝতে না, সেটাকে পাল্টাতেও চায়, তাদের জন্য নৈরাজ্যবাদের ইতিহাস এভাবেই পাঠ করা উচিৎ।

    দানিয়েল গ্যারাঁর এনার্কিজম বইয়ের প্রথম প্রচ্ছদ

    ১৯ শতকের নৈরাজ্যবাদকে গ্যারাঁ বর্ণনা করেছেন মতবাদভিত্তিক অবস্থায়। বিশ শতকটা ছিল নৈরাজ্যবাদীদের জন্য ‘বিপ্লবী অনুশীলনের’ সময়। বইয়ে একথারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। নৈরাজ্যবাদ নিয়ে তাঁর বোঝাপড়া সচেতনভাবে আঙুল তোলে ভবিষ্যতের দিকে। আর্থার রোসনবার্গ একবার উল্লেখ করেছিলেন যে, জনপ্রিয় বিপ্লবগুলোতে চারিত্রিকভাবে একটা বৈশিষ্ট্য দেখা যায়: তারা ‘সামন্ততান্ত্রিক বা কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে বল প্রয়োগ করে প্রতিস্থাপন’ করতে চায়, কোনো ধরনের কমিউনাল ব্যবস্থা দিয়ে। যেটা ‘তখন কাজ করবে পুরোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো ভেঙ্গে উধাও করে দেওয়ার জন্য’। এরকম একটা ব্যবস্থা হবে হয় সাম্যবাদী বা ‘গণতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়… যা সাম্যবাদে যাওয়ার পূর্বশর্ত। কেননা সাম্যবাদকে আসলে এমন একটা জগতে উপলব্ধি করা সম্ভব, যেখানে ব্যক্তি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রার স্বাধীনতা ভোগ করবেন। তিনি লিখেছেন, এই আদর্শটা, মার্ক্সবাদী ও নৈরাজ্যাবাদী, দুই পক্ষই ধারণ করত। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের উপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতার বিরোধিতা করে স্বাভাবিক এই মুক্তি সংগ্রাম। এক শতক আগে মার্ক্স লিখেছিলেন যে, প্যারিসের শ্রমিকরা “অনুভব করেছিল, তাদের সামনে শুধু একটাই বিকল্প আছে। কমিউন অথবা সাম্রাজ্য— সেটা যে নাম নিয়েই আবার হাজির হোক না কেন।”

    সাম্রাজ্য শ্রমিকদের ধ্বংস করে দিয়েছে অর্থনৈতিকভাবে। এটা করা হয়েছে জনগণের সম্পদ ধ্বংস করে, অর্থ আত্মসাৎ করে, পুঁজির কেন্দ্রীভবন কৃত্রিমভাবে তরান্বিত করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়ে, আর সবসময়ের দখলদারি ফলিয়ে। তাদেরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল রাজনৈতিকভাবেও। উদ্ভট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের নাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নৈতিকভাবেও। সাম্রাজ্য Voltairianism কে অপমান করেছিল, শিক্ষার জন্য সন্তানদের frères Ignorantins এ পাঠাতে বাধ্য করে। একজন ফরাসি হিসেবে তারা জাতীয় চেতনার জায়গা থেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল যখন হঠাৎ করে তাদেরকে একটা যুদ্ধে নিক্ষেপ করা হয়। সেই যুদ্ধ যা ধ্বংস এনেছিল, তার একমাত্র সমকক্ষ হতে পারে— পুরো সাম্রাজ্যই নাই হয়ে যাওয়া।

    বিভীষিকাময় দ্বিতীয় সাম্রাজ্যই ‘সেই সময়ের সম্ভাব্য একমাত্র সরকারি কাঠামো হতে পারত, যখন বুর্জোয়ারা ইতিমধ্যেই হেরে গেছে আর শ্রমিকশ্রেণিও পুরো দেশকে শাসন করার মতো সামর্থ্য অর্জন করেনি।’

    এই ভাবনাগুলো, ১৯৭০–এর সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার উপযুক্ত করে পুনরায় বলা খুব কঠিন কিছু না। “মানুষকে অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক–সামাজিক দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার সমস্যা”টি আমাদের সময়েও সমস্যা হিসেবেই থেকে গেছে। আর যতদিন এমনটা থাকবে, ততদিন মুক্তিমুখীন সমাজতন্ত্র, মতবাদ ও বিপ্লবী অনুশীলনের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা ও পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।

  • নোম চমস্কি।। অরাজপন্থা, মার্কসবাদ ও ভবিষ্যতের আশাবাদ প্রসঙ্গে

    নোম চমস্কি।। অরাজপন্থা, মার্কসবাদ ও ভবিষ্যতের আশাবাদ প্রসঙ্গে

    • অনুবাদ: মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

    প্রবহমান সাক্ষাতকারটি রেড অ্যান্ড ব্ল্যাক রেভলিউশন পত্রিকার ১৯৯৫ সালের দ্বিতীয় সংখ্যায় ছাপা হয়। নোম চমস্কি অরাজপন্থা ও মার্কসবাদ নিয়ে তাঁর মতামত তুলে ধরেন এবং বর্তমান  পরিপ্রেক্ষিতে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। কেভিন ডয়েল সাক্ষাৎকার টি ১৯৯৫ সালের মে মাসে গ্রহণ করেছিলেন। মূল প্রবন্ধটি ইংরেজি ভাষায় এখানে পাওয়া যাবে।-সম্পাদক

    নোম চমস্কি

    অনুবাদকের ভূমিকা: ইংরেজি Anarchist এবং Anarchism শব্দ দুটির প্রথাগত বাংলা অর্থ সকল অর্থেই নেতিবাচক। এমন কি ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলেও এই শব্দ দুটির বোঝাপড়া এতোটাই বিপরীত যে কখনও কখনও পুরপুরি উল্টো অর্থটাই চাপিয়ে দেয়া হয় এই শব্দগুলোর উপরে। নোম চমস্কি এই আলোচনার গোড়াতেও অর্থগত বোঝাপড়ার এই সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলায় আমরা Anarchist শব্দটার অর্থ করেছি ‘নৈরাজ্যবাদী’ এবং Anarchism  শব্দটির অর্থ করেছি ‘নৈরাজ্যবাদ’। হয়তো শব্দগত অর্থে এই বোঝাপড়া গুলো ভুল নয়, কিন্তু বোধের জায়গাটিতে এই শব্দগুলোর উপরে এক ধরনের নেতিবাচক বোধ চাপিয়ে  দেয়া হয়েছে, অনেকটা শব্দকে ক্রিমিনালাইজ বা অপরাধী সাব্যস্ত করার মতো। এটা দুঃখজনক। মূলত এই প্রতিষ্ঠিত বোধের জায়গাটিকে এক রকমের চ্যালেঞ্জ করার জন্যেই এই শব্দদুটির প্রথাগত বাংলা অনুবাদ আমি ব্যবহার করিনি এই অনুবাদ কর্মে। বরং আমি এই অনুবাদে Anarchism শব্দটির বাংলা অনুবাদ করেছি ‘অরাজপন্থা’ এবং Anarchist  শব্দটির বাংলা করেছি ‘অরাজপন্থি’। এই শব্দগুলো আমার সৃষ্টি নয়, বাংলা ভাষায় বেশ কিছু লেখালেখিতে আমি এই শব্দগুলো  পেয়েছি। হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘অরাজবাদ’ নাকি ‘অরাজপন্থা’? একই ভাবে ‘অরাজবাদী’ নাকি ‘অরাজপন্থী? আমি উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় পছন্দটিকেই যথাযথ মনে করেছি। এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তবে সেটা অনুবাদের আওতার বাইরে। যদি ভবিষ্যতে দরকার হয়, এ নিয়ে পৃথক ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে, তবে আপাতত এই অনুবাদকর্মটি পাঠ করার সময় Anarchism কে  ‘অরাজপন্থা’ এবং Anarchist শব্দটিকে  ‘অরাজপন্থী’ হিসাবে পাঠ করার অনুরোধ রইলো।

    সাক্ষাৎকার

    প্রশ্ন: নোম, প্রথমত আপনি বেশ অনেকদিন ধরে অরাজপন্থি চিন্তার একজন সমর্থক। দানিয়েল গেঁর‌্যার ১৯৭০ সালে রচিত বইটিতে  আপনার লেখা ভূমিকাটির১ সাথে অনেক পাঠকই পরিচিত, কিন্তু খুব সাম্প্রতিক কালে, ডকুমেন্টারি ছবি ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট২-এ আপনি আবারো অরাজপন্থি চিন্তার সম্ভাবনার কথা ব্যাখ্যা করেছেন। ঠিক কি কারণে অরাজপন্থি চিন্তা আপনাকে আকর্ষিত করলো?

    চমস্কি: আসলে অরাজপন্থি চিন্তার প্রতি আমার আগ্রহ সেই কিশোর বয়স থেকেই। আমি যখন থেকে খুব সংকীর্ণ একটা গণ্ডির বাইরে পৃথিবীকে নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম ঠিক তখন থেকেই। আর আজও সেই আগ্রহের খুব বেশি পরিবর্তন বা সংশোধনের দরকার পড়েনি।

    আমি মনে করি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ব, হায়ারার্কি বা পুরোহিততন্ত্র  এবং আধিপত্যের কাঠামো সন্ধান করা, চিহ্নিত করা এবং তাকে প্রশ্ন করাটাই একমাত্র অর্থবহ কিছু হতে পারে। যতক্ষণ না এই সবের ন্যায্যতা  প্রতিপাদন করার মতো কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এর সবই অবৈধ এবং এদেরকে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। মানুষের স্বাধীনতার দিগন্তকে প্রসারিত করার জন্যেই এসবকে চূর্ণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক শক্তি, মালিকানা ও পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং  নারী ও পুরুষ, পিতা-মাতা ও শিশুদের মধ্যে সম্পর্ক, ভবিষ্যত প্রজন্মের ভাগ্যের উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ (আমার মতে এটাই পরিবেশবাদী আন্দোলনের পেছনে প্রাথমিক নীতিগত উদ্দেশ্য) এবং আরও অনেক কিছু। স্বাভাবিক ভাবেই এটা জবরদস্তি ও নিয়ন্ত্রবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ : রাষ্ট্র, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী জবাবদিহিহীন ক্ষমতাধর মালিক এবং এই রকমের আরও অনেকের কাছেই। কিন্তু শুধু এসবই নয়। অরাজপন্থার মর্মশাঁস বলতে আমি সবসময়ই বুঝেছি যে, নিজেদের ন্যায্যতা প্রমাণের দায়টা সবসময়ই কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃত্ববাদী সংগঠনের উপরেই বর্তায়, যদি এরা তাদের কর্তৃত্বের ন্যায্যতা প্রমাণ  করতে না পারে, তাহলে তা ভেঙ্গে ফেলাই উচিৎ। কখনও কখনও এই ন্যায্যতা প্রমাণ করা যেতে পারে। ধরুন, আমি আমার নাতি-নাতনিদের কাউকে নিয়ে বাইরে হাঁটতে বেরিয়েছি, হঠাৎ করে যদি তাদের কেউ ব্যস্ত সড়কে দৌড়ে চলে যেতে চায় তাহলে আমি শুধু আমার কর্তৃত্বই ব্যবহার করবো না, হয়তো শারীরিক শক্তিও ব্যবহার করবো ওদেরকে থামানোর জন্য। আমার এই সিদ্ধান্তকে, কাজকে হয়তো চ্যালেঞ্জ করা যাবে কিন্তু সাথে সাথেই এর যথার্থতা হাজির করা যাবে। এবং আরও অন্যান্য বিষয়-আশয় আছে,জীবনটা তো একটা জটিল ব্যাপার, মানুষ এবং সমাজ সম্পর্কে তো আসলে খুব কমই বুঝতে পারি আমরা, বিশেষত অভিজাত বয়ানগুলো প্রাপ্তির খাতায় যত না যুক্ত করে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং আমার মনে হয় সেটাই আমাদেরকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে।

    এই সব সাধারণ বিষয়ের বাইরে আমরা বিশেষ ঘটনাগুলো দেখতে শুরু করি যেখানে মানুষের আগ্রহ ও উদ্বেগের প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়।

    প্রশ্ন: এটা তো সত্য যে, আপনার চিন্তা ও বিভিন্ন পর্যালোচনাগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের  চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত। আর এটাও বলা উচিৎ যে, আপনার মতামতগুলো ব্যাপক ভাবে সম্মানিতও হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে  অরাজপন্থা নিয়ে আপনার সমর্থন কিভাবে গৃহীত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন? বিশেষত আমি জানতে আগ্রহী সেইসব মানুষের প্রতিক্রিয়া যারা হয়তো প্রথম বারের মতো রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে এবং হয়তো কোনো ভাবে আপনার মতামতের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ ঘটেছে। এই ধরনের মানুষেরা কি অরাজপন্থার প্রতি আপনার সমর্থনে বিস্মিত হয়? তাঁরা কি আগ্রহী হয়ে ওঠে?

    চমস্কি: আপনি তো জানেন, সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে ‘অ্যানার্কিজম’ বা অরাজপন্থাকে যুক্ত করা হয় বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, বোমাবাজি, কোনো কিছুতে ব্যাঘাত ঘটানো এবং আরও এই ধরনের বিষয়ের সাথে। ফলে মানুষ  প্রায়শই অবাক হয়ে যায় যখন আমি অরাজপন্থা নিয়ে সদর্থক কিছু বলি কিম্বা আমি নিজেকে যখন অরাজপন্থার মূলধারার সাথে যুক্ত বলে পরিচিত করি। কিন্তু আমার ধারণা, বোঝাপড়ার দিক থেকে কিছু অপরিচ্ছন্নতার মেঘ সরিয়ে দিলে সাধারণ জনগণের মাঝে এর মূল চিন্তাগুলো খুবই যৌক্তিক ভাবেই ধরা দেয়। অবশ্যই খুব সুনির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনার বেলায়, যেমন ধরুন, পরিবারের ধরন কিংবা একটা সমাজে গোটা অর্থনীতি কিভাবে আরও মুক্ত ও ন্যায্য ভাবে চলতে পারে, এ ধরনের প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে তখন মতভেদ বা বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সেটাই তো হওয়া উচিৎ। পদার্থবিজ্ঞান আসলেই ব্যাখ্যা করতে পারে না, আপনার পানির কল থেকে কিভাবে পানি গড়িয়ে সিঙ্কে গিয়ে পড়ে। আমরা যখন খুব জটিল ও অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে আগ্রহী হই তখন বোঝাপড়াগুলোও খুব সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে এবং সেখানে নিরীক্ষা ও দ্বিমতের অনেক জায়গা তৈরি হয়। বৌদ্ধিক ও বাস্তব জীবনে আরও বেশি সম্ভাবনার অনুসন্ধান আমাদের আরও বেশি জানতে সাহায্য করে।

    প্রশ্ন: সম্ভবত অন্যান্য আরও অনেক চিন্তার চেয়ে অরাজপন্থাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ভুল বা অযথার্থ উপস্থাপনার। বহু মানুষের কাছে অরাজপন্থার অর্থ নানান রকমের হতে পারে। আপনার কি কখনও সুযোগ হয়েছে আপনি অরাজপন্থা বলতে কি বোঝেন সেটা ব্যাখ্যা করার? অরাজপন্থার এই অযথার্থ উপস্থাপনা কি আপনাকে বিরক্ত করে?

    চমস্কি: অযথার্থ বা ভুল উপস্থাপনা আসলে এক ধরনের উপদ্রব। এর কারণগুলোর বেশিরভাগই খুঁজে পাওয়া যাবে ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যেই, খুব নিশ্চিত ভাবেই, জনগণের বোঝাপড়া গড়ে উঠতে বাধা দেয়ার মাঝে এদের একটা বিশেষ আগ্রহ আছে। এ প্রসঙ্গে ডেভিড হিউমের সরকারের মূলনীতি ৩ বইটির কথা স্মরণ করা যাক। জনগণ তাদের শাসকের কাছে কখনো নতি স্বীকার করে নিয়েছে, এ ব্যাপারটি নিয়ে হিউম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তার শেষকথা ছিল, যখন “সবসময় শাসিতের হাতেই ন্যাস্ত থাকে ক্ষমতা, তখন নিজের সমর্থনে শাসকের হাতে অভিমত ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকে না। যে কারণে শুধুমাত্র অভিমতের উপর ভিত্তি করেই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রবাদ সর্বাধিক স্বৈরতান্ত্রিক ও সামরিক সরকারের ক্ষেত্রে যেমন খাটে, তেমনি সর্বাধিক মুক্ত ও জনপ্রিয় সরকারের ক্ষেত্রেও খাটে।’’ [Hume: 1994:16]  হিউম খুবই বিচক্ষণ লোক ছিলেন, ঘটনাচক্রে আজকালকার মানদণ্ডে তাকে ঠিক মুক্তিপরায়ণও বলা চলে না। কোনো সন্দেহ নেই যে হিউম শক্তিমত্তার কার্যকারিতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ আসলে আমার কাছে ঠিকই মনে হয়েছে, মনে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে অধিকতর স্বাধীন সমাজগুলোতে, যেখানে অভিমত নিয়ন্ত্রণের কৌশল আরও বেশি পরিশীলিত। বিকৃত উপস্থাপনা ও বিভ্রান্তির অপরাপর রূপগুলো স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের সহচর হয়ে থাকে।

    ডেভিড হিউম

    তো, এই ভুল উপস্থাপনা আমাকে বিরক্ত করে কিনা? নিশ্চয়ই করে, ঠিক যেমনটা বাজে আবহাওয়াও আমাকে বিরক্ত করে। এটা টিকে থাকে ততক্ষণ যতক্ষণ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ একে জায়েজ করার জন্য একটি আজ্ঞাবহ রাজনৈতিক অধিকারী গোষ্ঠী তৈরি করতে পারে। যেহেতু এরা খুব একটা মেধাবী হয় না অথবা ঠিক ততটাই মেধাবী হয় যে এরা জানে, যুক্তি ও তথ্যের ধারে কাছে দিয়ে যাওয়া যাবে না। ফলে এদের ভরসা হলো ভুল উপস্থাপনা, গালাগালি  আর এমন কতক হাতিয়ার যা তাদের হাতে আছে এবং দিন শেষে শক্তিমানদের নানা বর্মে এরা সুরক্ষিত। আমাদের বোঝা দরকার কেনো এমন হয় এবং আমাদের উচিত যতটা সম্ভব তার মুখোশ উন্মোচন করে ফেলা। এটাই আমাদের এবং অন্যান্যদের মুক্তির প্রকল্পের অংশ অথবা আরও সঙ্গত ভাবে বলা যায় যে, মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করছে এই মুক্তি অর্জনের জন্যেই।

    খুব সহজ সরল মনে হচ্ছে,তাই না? এটা আসলেই তাই-ই। তবে মানুষ ও সমাজ সম্পর্কে আমার এখনও অনেককিছু জানার বাকি আছে যা খুব সহজ সরল নয়, বিশেষত যখন এর থেকে বিমূর্ততা আর ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার জায়গাগুলোকে সরিয়ে নেয়া হয়।

    প্রশ্ন: ধরুন, প্রতিষ্ঠিত বামপন্থী মহলের অবস্থান কেমন, অন্তত অরাজপন্থা বলতে এই অংশের মানুষের বোঝাপড়াটা যখন অনেকটাই নৈকট্যপূর্ণ? আপনি কি অরাজপন্থার বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন নিয়ে খুব অবাক হওয়ার মত কিছু পেয়েছেন এই মহলের কাছে?

    চমস্কি: আমি যদি সঠিক ভাবে বুঝে থাকি আপনি আসলে ‘প্রতিষ্ঠিত বামপন্থী মহল’ বলতে কি বোঝাচ্ছেন, তাহলে বলবো, না এই মহলে অরাজপন্থা প্রসঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খুব একটা বিস্ময় নেই।  কারণ আসলে যেকোনো বিষয়েই আমার দৃষ্টিভঙ্গি খুব কমই তারা জনেন। আমি এই মহলটির সাথে খুব বেশি ওঠাবসা করি না। আমার লেখায় বা বক্তৃতায় খুব কদাচিৎ এদের সম্পর্কে কোনো  রেফারেন্স পাবেন। অবশ্য এটা একেবারে একশোভাগ সত্যি তা নয়। ফলে আমেরিকায় (ইংল্যান্ডে বা অন্যান্য জায়গাগুলোতে এর চেয়ে অনেক কম) আপনি যাদেরকে বলছেন ‘প্রগতিশীল মহল’ তাদের কোনো কোনো অংশে বিশেষ করে এদের স্বাধীন ও পর্যালোচনামূলক চিন্তাশীল অংশে হয়তো আমার কিছু কিছু কাজ সম্পর্কে খানিকটা বোঝাপড়া আপনি পেতে পারেন। আর আমার কিছু ব্যক্তিগত বন্ধু আছেন এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারাও খানিকটা জানেন। কিন্তু আপনি বিভিন্ন বইপত্র ও সাময়িকীগুলোর দিকে দেখুন, মানে আমি বলতে চাচ্ছি, আমি যা বলি বা লিখি সেসবকে প্রথাগত বিদ্যায়তনিক অনুষদগুলো বা সম্পাদকীয় দপ্তরগুলোর চেয়ে এরা বেশি স্বাগত জানাবেন,এটা আমি আশা করি না। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম তো নিশ্চয়ই আছে।

    আসলে প্রশ্নটা খুব কদাচিৎ উত্থাপিত হয়,তাই এর কোনো সহজ উত্তর নেই।

    প্রশ্ন: অনেকেই খেয়াল করেছেন যে আপনি ঠিক যে অর্থে অরাজপন্থা শব্দটি ব্যবহার করেন একই অর্থে আপনি আরেকটি শব্দবন্ধ ‘মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্রী’৪ ব্যবহার করেন। আপনি কি মনে করেন এই দুটি শব্দ আসলে আবশ্যিক ভাবে একই রকমের? আপনার কাছে কি অরাজপন্থা এক ধরনের সমাজতন্ত্র? এর আগে যে বর্ণনা টুকু ব্যবহার করা হয়েছে সেটা এরকমের যে ‘অরাজপন্থা হচ্ছে সমাজতন্ত্র ও স্বাধীনতা’৫। আপনি এই ধরনের সমীকরণের সাথে একমত?

    চমস্কি:  গেঁর‌্যার বইয়ের ভূমিকাটি,যার কথা আপনি বলছেন এখানে,সেটা শুরু হয়েছিলো  প্রায় শতাব্দী আগের একজন অরাজপন্থার প্রতি সংবেদনশীল মানুষের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি বলেছেন,‘অরাজপন্থার বিস্তৃত পাঠ রয়েছে’ এবং এটা ‘বহু কিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে’[Mirbeau : 1894]। এরই একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক,  প্রথাগত ভাবে যাকে বলা হচ্ছে ‘মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্র’। আমি ওই ভূমিকাতে এবং আরও বেশ কিছু জায়গায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি এই শব্দবন্ধটি দিয়ে আমি আসলে কি বোঝাতে চাই। একই সাথে উল্লেখ করেছি যে, এটা আসলে মৌলিক ভাবেই আমার ধারণা,এমনটা নয়। আমি আসলে অরাজপন্থি আন্দোলনের প্রধান মানুষদের ধারণাগুলোকেই নিয়েছি,তাদেরকে উদ্ধৃত করে।  এবং তারা আসলে প্রতিনিয়তই নিজেদেরকে সমাজতন্ত্রী বলেই পরিচয় দিয়েছেন  এবং একই সাথে খুব তীব্র ভাবেই সমালোচনা করেছেন ‘নতুন শ্রেণীর’ রেডিকেল  বুদ্ধিজীবীদের যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে চায় গাজোয়ারি রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় এক ধরনের ‘লাল আমলাতন্ত্রে’৬ যাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন বাকুনিন।  একেও আবার ‘সমাজতন্ত্র’ বলেই দাবি করা হয়। আমি বরং রুডলফ রকারের অভিমতের সাথে একমত পোষণ করি, এই প্রবণতাগুলো (খুব কেন্দ্রীয় প্রবণতা) নেয়া হয়েছে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্যোতির্ময়কাল আর উদারনৈতিক চিন্তার সবচাইতে সেরা ধারণাগুলো থেকে।  বাস্তবত, আমি যেমনটা দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, এই ধারনাগুলো আসলে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মতবাদ ও  অনুশীলনের সাথে খুব তীক্ষ্ণ ভাবে বিরোধিতামূলক।  যে সকল ‘মুক্তিমুখিন’ মতবাদ খুব বাজার চলতি, ফ্যাশনদুরস্ত, বিশেষত  যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এবং অন্যান্য সমকালীন মতবাদগুলোর প্রায় সবকটিই আমার কাছে মনে হয় এক ধরনের সীমাবদ্ধকরণ, একই বা ভিন্নরকমের অবৈধ কর্তৃত্ববাদকে, কখনও কখনও একেবারে বাস্তব স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করে।

    স্পেনীয় বিপ্লব

    প্রশ্ন: অতীতে আপনি যখনই অরাজপন্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন, প্রায়শই আপনি উদাহরণ হিসাবে খুব গুরুত্ব দিয়ে স্পেনের বিপ্লবের৭ কথা উল্লেখ করেছেন। আপনার মতে এই উদাহরণটির দুইটি দিক রয়েছে, যেমন একদিকে স্পেনের বিপ্লবকে আপনি ‘অরাজপন্থী সক্রিয়তার’ বাস্তব উদাহরণ বলে মনে করেন। অন্যদিকে আপনি এটাও খুব গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, শ্রমিক  শ্রেণী তাদের নিজেদের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে দিয়ে কতটা অর্জন করতে পারে, স্পেনের বিপ্লব তার খুব ভালো একটা উদাহরণ। এই দুইটি দিক অর্থাৎ অরাজপন্থার বাস্তব প্রয়োগ আর অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, এই দুটি ধারণা কি আপনার কাছে সমার্থক? অরাজপন্থা কি তাহলে গণক্ষমতার দর্শন?

    চমস্কি: আসলে আমার কাছে যেটা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ব্যাপার তাকে ব্যাখ্যা করার জন্যে আমি খামোখাই ‘দর্শন’ এর মতো একটা শৌখিন শব্দ ব্যবহার করতে চাই না। আর  বলে রাখা ভালো যে আমি শ্লোগানের বিষয়ে খুব স্বস্তি বোধ করি না। স্পেনের বিপ্লব ব্যর্থ হবার আগে সেখানকার শ্রমিক ও কৃষকদের অর্জনগুলো ছিলো অনেক অর্থেই বিরাট ও মহান অর্জন। ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’৮ এই ধারণাটি গড়ে উঠেছে খুব সাম্প্রতিক সময়ে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই এই ধারণাটির সাথে স্পেনের বিপ্লবের অর্জনের অনেক মিল রয়েছে। আমি দুঃখিত, আমার যুক্তিটা হয়তো একটু ছেঁদো মনে হবে। কিন্তু আমি মনে করি,অরাজপন্থা আর অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র সমর্থক কিনা সেটা বলার জন্যে আমাদের কাছে অরাজপন্থা বা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র এই দুইটি ধারণাই যথেষ্ট পরিষ্কার নয়।

    প্রশ্ন: স্পেনের বিপ্লবের একটা প্রধান অর্জন ছিলো তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারা। শুধু মানুষের হিসাব করলে হয়তো বলা যাবে প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষ এর সাথে যুক্ত ছিলো। শহর এবং গ্রামের উৎপাদন প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনার দিকটি দেখভাল করেছিলো শ্রমিকেরাই । এটা কি আপনার কাছে কাকতালীয় মনে হয় যে ব্যক্তি স্বাধীনতার সমর্থক অরাজপন্থীরা এখানে এক ধরনের সমষ্টিগত প্রশাসন তৈরি করতে সফল হয়ে উঠেছিলেন? 

    চমস্কি: না, একেবারেই কাকতালীয় নয়। বরং অরাজপন্থার প্রবণতা হিসাবে আমি সবসময়ই যা দেখেছি তা হচ্ছে, এরা সবসময়ই খুব সুচারুভাবে গোছানো একটা সমাজ চায়, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কাঠামোকে ( যেমন কর্মক্ষেত্র, সমাজ এবং আরও নানান ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠনসমূহ)  অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণটা থাকে যারা এর সদস্য তাদের হাতেই,যারা উচ্চপদে বসে ক্ষমতার  জোরে আদেশ দিতে পারেন তাদের হাতে নয় (আবারো বলছি, ব্যতিক্রম শুধুমাত্র যেখানে কর্তৃত্ব ন্যায্য হিসেবে প্রমাণিত হয়,যেমন কোনো কোনো বিশেষ দৈব ঘটনার সময়।)

    নো পাসারান
    পোস্টার

    গণতন্ত্র প্রসঙ্গে

    প্রশ্ন: অরাজপন্থীরা প্রায়শই তাদের শক্তির একটা বিরাট অংশ ব্যয় করেন তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের কথা বলে। বাস্তবত কখনও কখনও গণতন্ত্রের আলাপকে একেবারে শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে এদেরকে অভিযুক্তও করা হয়। এর পরেও বহু অরাজপন্থী আছেন যারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হন যে, গণতন্ত্র হচ্ছে অরাজপন্থার একটা কেন্দ্রীয় অঙ্গ। অরাজপন্থীরা প্রায়শই তাদের আন্দোলন সম্পর্কে বলে থাকেন যে, এটা হচ্ছে ‘সমাজতন্ত্র’ সম্পর্কিত কিম্বা ‘ব্যক্তি’ স্বাধীনতা সংক্রান্ত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বলেন না যে, অরাজপন্থা আসলে গণতন্ত্রেরও প্রশ্ন। আপনি কি একমত যে, গণতান্ত্রিক ধারণাগুলোও আসলে অরাজপন্থার কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলোর অন্যতম?

    চমস্কি: ‘গণতন্ত্রে’র যে সকল সমালোচনা রয়েছে অরাজপন্থীদের মাঝে তা মূলত সংসদীয় গণতন্ত্র’র সমালোচনা। কেননা আমাদের সমাজে সংসদীয় গণতন্ত্র আবির্ভূত হয়েছে গভীর শোষণতান্ত্রিক স্বরূপ নিয়ে। ধরুন যুক্তরাষ্ট্রর কথা, শুরু থেকেই অন্য দেশের মতোই দারুণভাবে স্বাধীন ছিলো দেশটি। আমেরিকার গণতন্ত্রের ভিত্তি ছিলো, ১৭৮৭ সালের সংবিধান সংক্রান্ত কনভেনশন৯।  যেখানে জেমস ম্যাডিসন বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন যে,সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হল,‘সংখ্যাগরিষ্ঠের হাত থেকে সংখ্যালঘু ঐশ্বর্যশালী অভিজাত মানুষদের রক্ষা করা’। সেজন্যেই তিনি ইংল্যান্ডের ‘আপাত গণতন্ত্র’ কে সাবধান করে দিয়েছিলেন, যদি সাধারণ জনগণকে নানান ধরনের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বা গণবিষয়াবলীতে মতামত দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে তারা হয়তো এক সময় আমাদের কৃষি ব্যবস্থার সংস্কার চাইবে কিংবা আরও অনেক ধ্বংসাত্মক সংস্কার চাইবে। আর  সেজন্যেই আমেরিকার ব্যবস্থা এমনভাবে সাজাতে হবে যেনো ‘সম্পদের অধিকারের’  বিরুদ্ধে এই ধরনের অপরাধ গুলোকে এড়ানো যায় এবং সম্পদের উপরে এই অধিকারকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে (বাস্তবত,এটাই আছে)। সত্যিকারের মুক্তিপরায়ণ মানুষ এই কাঠামোর সংসদীয় গণতন্ত্র’র তীব্র সমালোচনা করেছেন। এছাড়া আমি এ রকরকম আরও অনেক বিষয় বলিইনি।  যেমন ধরুন দাসত্বের কথা, কেবল একটির কথাই যদি বলি, শ্রমজীবী মানুষ শ্রম-দাসত্বের তীব্র নিন্দা করেছে। অথচ তারা এই উনিশ শতক জুড়ে বা তার পরেও কখনই অরাজপন্থা বা কমিউনিজমের কথা শোনেইনি।

    লেনিনবাদ প্রসঙ্গে

    প্রশ্ন: আমাদের সমাজের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের  প্রশ্নে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের গুরুত্ব প্রমাণিত।  কিন্তু এরপরও, বামপন্থিরা অতীতে এই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন। আমি খুব সাধারণ ভাবেই বলছি সোস্যাল ডেমোক্রাসি১০ এমন কি বামপন্থিদের বলশেভিক ধারার১১ মাঝে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের বদলে অভিজাত চিন্তা ভাবনার দিক থেকে অনেক মিলের জায়গা ছিলো। লেনিন, এক্ষত্রে একটা যুতসই এবং খুব পরিচিত উদাহরণ। তিনি সন্দিহান ছিলেন যে, শ্রমিকেরা ‘ট্রেড ইউনিয়ন সচেতনতার’ চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করতে পারতো।  আমার ধারণা এই মতামত দিয়ে তিনি বোঝাতে চাইতেন যে, শ্রমিকরা আসলে নিজেদের নিকট ভবিতব্যের চেয়ে দূরের কিছু দেখতে পেতেন না। একই ভাবে ব্রিটেনের লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা ফেবিয়ান সমাজতন্ত্রী১২ বিয়েট্রিস ওয়েব মনে করতেন যে, শ্রমিকরা জানে কেবল রেসের ঘোড়ায় টাকা খাটাতে! এই ধরনের আভিজাত্যবোধের উৎস কোথায় এবং এই ধরনের চিন্তা বামপন্থীদের মাঝে কি করছে?

    চমস্কি: আমি দুঃখিত আমার পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। যদি বলশেভিকবাদকেও বামপন্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত ভাবেই বামপন্থিদের খাতা থেকে নিজেকে আলাদা করে নেবো। আমার মতে, সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড়শত্রু ছিলেন লেনিন।  আমি এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। কেউ যদি খুব সাদামাটা ভাবেও শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে একটু তাকান, কিম্বা সাম্প্রতিক সময়ের শ্রমিক আন্দোলনের নানান পত্র পত্রিকার দিকে একটু চোখ বোলান, তাহলে শ্রমিকরা কেবল রেইসের বাজির প্রতিই আগ্রহী, এমন একটা অদ্ভুত দাবি একবারেই ধোপে টেকে না।  এমনকি আমার এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরের শিল্প শহর নিউ ইংল্যান্ডের লাঞ্ছিত নিপীড়িত শ্রমিকদের সেই সব দুর্দান্ত সাহসী সংগ্রামের কথা এখন পর্যন্ত সেটাই বলছে আমাদের। এই গোলার্ধের সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত দেশটির কথাই ধরুন, হাইতি,  একসময় ইউরোপের ঔপনিবেশিক শাসকেরা যাকে স্বর্গ হিসেবে বিবেচনা করতো এবং যাকে ইউরোপের এক কোনা অংশেরও ধন সম্পদের উৎস বলে মনে করতো না, তা এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং সম্ভবত এই ধ্বংস থেকে উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনাই নেই আর। বিগত কয়েক বছরে, এই দেশটির অবস্থা এতোটাই দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছে যে, উন্নত ও ধনী বিশ্বের খুব কম মানুষই ভাবতে পারবে যে, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোর দ্বারা কৃষক এবং বস্তিবাসীরা এমন একটা জনপ্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলেছে যা অন্যান্য অনেক জায়গার উদাহরণকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে আমি জানি। আর আমেরিকান বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা যখন গর্বের সাথে ঘোষণা করেন যে, হাইতিবাসীকে গণতন্ত্র শেখাতে গিয়ে কি পরিশ্রমটাই না করতে হয়েছে তাদের তখন কেবল খুব কট্টর সরকারি আমলা টাইপের কেউ হলেই এই ধরনের কথা শুনে উপহাসে ভেঙ্গে না পড়ে থাকতে পারে। শ্রমজীবী মানুষের এই আন্দোলনের সাফল্য এতোটাই বিরাট ও শক্তিমানদের জন্যে ভীতিকর ছিলো যে,এর পরিণতিতে তাদের উপরে নেমে আসে আরও ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসবাদী নিপীড়ন।এই হামলার পুরোটাই ছিলো আমেরিকার সমর্থনে,সাধারণ জনগণ যার পুরোটা জানে না এবং এই সকল প্রতিবাদকারীরা এখনও আত্মসমর্পণ করেনি। এটাকে কি কেউ শুধু ‘রেইসের বাজি’ খেলার মতো বলবেন?

    আমি প্রায়শই রুশো’র একটা কথা উল্লেখ করি, এখানেও করতে পারি,… ‘আমি যখন দেখি সম্পূর্ণ নগ্ন বর্বর মানুষেরা দলে দলে ইউরোপীয়  আয়েশিপনাকে ঘেন্না করছে আর শুধুমাত্র নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য বরদাশত করে চলেছে ক্ষুধা, দাবানল ও মৃত্যুকে তখন আমার মনে হয়, স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে কোন যুক্তিতর্ক আসলে মোসাহেব-গোলামদের মুখে মানায় না’।  [Rousseau: 1964: 165]

    প্রশ্ন: আবারো খুব সাধারণ ভাবেই বলছি, আপনার নিজের কাজ যেমন ধরুন  Deterring Democracy13, Necessary Illusions14 এই বইগুলোতে ধারাবাহিক ভাবেই আপনি ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে আমাদের সমাজে অভিজাত চিন্তাগুলো অবস্থান করে। আপনি বিতর্ক তুলেছেন কিভাবে ‘পশ্চিমা’ (অথবা সংসদীয়) গণতন্ত্রর সাথে জনগণের সত্যিকারের  ভূমিকা বা জনগণের অংশগ্রহণের গভীর বিরোধ রয়েছে, পাছে জনগণের অংশগ্রহণ যদি সম্পদের অসম বণ্টনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, যা আদতে কেবল ধনীদেরকেই সুবিধা দেয়। আপনার এই ধরনের কাজগুলো বেশ প্রত্যয়দীপ্ত, কিন্তু ভিন্ন আরও কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে  অনেকেই বেশ হতাশ। যেমন ধরুন, আপনি জন এফ কেনেডির রাজনীতির সাথে লেনিনের তুলনা করেছেন, বাস্তবত অনেকটা দুজনকে এক করে দেখিয়েছেন। এই বিষয়টি উভয় শিবিরকেই বেশ হতাশ করেছে, আপনি কি এই ব্যাপারে খানিকটা ব্যাখ্যা করতে পারেন আবারো?

    চমস্কি: আমি জন এফ কেনেডি প্রশাসনের উদারবাদী বুদ্ধিবৃত্তির সাথে লেনিনীয় চিন্তাকে এক করে ফেলিনি, কিন্তু আমি এদের দুজনের চিন্তার মাঝে এক বিস্ময়কর মিল দেখেছি। প্রায় এক শতক আগে বাকুনিন যেভাবে ইঙ্গিত করেছিলেন তাঁর লেখা দারুণ উপলব্ধিমূলক  প্রবন্ধ ‘নয়া শ্রেণী’১৫ তে। যেমন ধরুন,আমি ম্যাকনামারা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়েছি যেখানে বলা হচ্ছে যে,আমাদের আরও বেশি করে ম্যানেজারিয়াল নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো দরকার যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই ‘মুক্ত’ হতে চাই, তিনি ব্যাখ্যা করছেন কিভাবে ‘ব্যবস্থাপনার অভাব’ ‘সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্যে হুমকি’ হয়ে ওঠে এবং এটা নিজের জন্যেই কিভাবে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এই বক্তব্যের শুধু কয়েকটি শব্দ পাল্টে দিলেই আপনি এর মাঝে লেনিনীয় মতবাদের  স্বরূপটি দেখতে পাবেন। আমি বরং প্রশ্ন তুলেছি এই দুই ধরনের চিন্তারই শেকড়টা খুব গভীর। এখন এই বক্তব্যে মানুষ ঠিক কেনো ‘হতাশ’ সেটা খুব বিস্তারিত না জেনে আমি এর চাইতে বেশি বলতে পারছি না। তুলনাটি খুবই নির্দিষ্ট এবং আমি মনে করি উভয়েই নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথার্থ ও উপযুক্ত। যদি তা না হয় তাহলে এটা একটা ত্রুটি এবং আমি এ বিষয়ে নিজে আরও বেশি আলোকিত হতে চাই।

    আর্টওয়ার্ক: লেনিন অন রোস্টাম
    শিল্পী: আলেকজান্ডার গেরাসিমভ
    সূত্র: ইউএসএসআর পেইন্টিংস

    মার্কসবাদ প্রসঙ্গে

    প্রশ্ন: খুব সুনির্দিষ্ট ভাবে বললে বলা যায়, লেনিনবাদ তো আসলে মার্কসবাদেরই একটি ধারা যা লেনিনের হাতে গড়ে ওঠে। আপনি যখন   ‘লেনিনবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে লেনিনের সমালোচনা করেন, তখন কি আপনি পরোক্ষভাবে মার্কসের কাজ থেকে লেনিনবাদকে পার্থক্য করেন? আপনি কি লেনিনের পরবর্তী অনুশীলনকে মার্কসের কাজের ধারাবাহিকতা হিসাবে দেখেন?

    চমস্কি: বাকুনিন সতর্ক করে দিয়েছিলেন ‘লাল আমলাতন্ত্র’ বিষয়ে যা আসলে ‘সকল স্বৈরাচারী সরকারের চাইতেও বাজে’ সরকার গড়ে তুলতে পারে,বাকুনিনের এই সতর্কতাবাণী ছিলো লেনিনের অনেক আগে এবং মূলত এই অভিযোগ করেছিলেন মার্কসের অনুসারীদের দিকেই। বাস্তবত সেই সময় মার্কসের অনুসারীদের মাঝেও নানান ধরন ছিলো। পানেকোয়েক, রোজা লুক্সেমবার্গ, ম্যাটিক এবং অন্যান্যরা ছিলেন লেনিন থেকে বেশ ভিন্ন এবং এদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই ‘অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিজম’র১৬ নানান ভাবনার সাথে মিলে যায়।

    স্পেনের বিপ্লব নিয়ে বেশ সংবেদনশীল ভাবেই লিখেছিলেন [কার্ল] কোর্স এবং অন্যান্য কয়েকজন। মার্কস থেকে লেনিনবাদের মাঝে ধারাবাহিকতা ছিলো। আবার এটাও ঠিক যে অন্যান্য মার্কসবাদী যারা লেনিনের ও বলশেভিকবাদের কট্টর সমালোচনা করেছেন তাদের মাঝেও মার্কসের ধারাবাহিকতা ছিলো। কৃষক বিদ্রোহ প্রসঙ্গে মার্কসের পরের দিকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে  থিওডর শ্যানিনের লেখালেখি এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। আমি মার্কস-বিশারদ নই, তাই আমি এটা বলবো না যে, ঠিক কোন উত্তরাধিকারটি  ‘সত্যিকারের মার্কস’ কে প্রতিনিধিত্ব করে। অবশ্য আদৌ এই প্রশ্নটির যদি কোনো উত্তর থেকে থাকে।

    প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা আপনার লেখা Notes On Anarchism  (গতবছর পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে আমেরিকার Discussion Bulletin১৭ থেকে)। এই বইয়ে আপনি উল্লেখ করেছেন ‘প্রথম দিককার মার্কস’ এর চিন্তাগুলোকে, বিশেষত মার্কসের পুঁজিবাদের অধীনে ‘এলিয়েনিয়েশন’ ধারণা গড়ে ওঠার তত্ত্ব প্রসঙ্গে। আপনি কি সাধারণত মার্কসের জীবন ও কাজকে এই ভাবে বিভিন্ন পর্বে ভাগ করার পক্ষে? যেমন ধরুন তরুণ মার্কস অনেকটাই মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্রী কিন্তু পরিণত মার্কস ক্রমশই হয়ে উঠেছেন একজন শক্ত কর্তৃত্ববাদী?

    চমস্কি: তরুণ মার্কসকে তাঁর সময় ও পরিপার্শ্ব প্রভাবিত করেছে ব্যাপকভাবে,যে সময়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, যে সমাজে তিনি বড় হয়েছেন। সেজন্যেই তাঁর চিন্তায় অনেকেই মিল খুঁজে পাবেন ধ্রুপদী উদারবাদ, ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট বা জ্যোতির্ময়কালের মতো প্রসঙ্গগুলোর সাথে এবং একই সঙ্গে পাবেন ফরাসি ও জার্মান রোমান্টিকতাবাদের ছোঁয়া। আবারো বলে নেয়া ভালো, আমি মার্কস বিষষে পণ্ডিত  নই, তাই এ বিষয়ে কোনো বেত্তার বিচার করতে পারবো না। এ বিষয়ে আমার বোঝাপড়াটা হচ্ছে, তরুণ মার্কস অনেকটাই এনলাইটেনমেন্ট বা জ্যোতির্ময়কালের শেষ দিকের প্রতিভূ। আর পরিণত মার্কস ক্রমশই হয়ে উঠেছেন দারুণ কর্তৃত্বপরায়ণ সক্রিয়তাবাদী এবং পুঁজিবাদের দারুণ সমালোচক, যিনি পুঁজিবাদের চুলচেরা সমালোচনা করেছেন কিন্তু বিকল্প হিসাবে সমাজতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন খুব সামান্যই। তবে এগুলো কেবলই আমার মতামত।

    প্রশ্ন: আমি যতটুকু বুঝি,আপনার সামগ্রিক বোঝাপড়ার মূল অংশটি গড়ে উঠেছে মানবপ্রকৃতি১৮  বিষয়ে আপনার ধারণার উপর ভিত্তি করে। অতীতে যেমন মানব প্রকৃতিকে  ভাবা হতো অনেকটাই প্রতিক্রিয়াশীল,এমনকি  সীমাবদ্ধ হিসাবে। ধরুন, অরাজপন্থার দিকে যেকোনো ধরনের মৌলিক পরিবর্তনের অসম্ভব বিবেচনার কারণ হিসেবে মানব প্রকৃতির  এই অপরিবর্তনীয়তাকে  যুক্তি হিসাবে ধরে নেয়া হয়েছিলো। আপনি কি ভিন্নমত পোষণ করেন? করলে কেনো?

    চমস্কি: আসলে যেকোনো মানুষেরই চিন্তার মর্মস্থল গড়ে ওঠে মানব প্রকৃতি সম্পর্কে তার ধারণার উপরে, অনেকেই হয়তো এ বিষয়ে খুব সচেতন নন কিম্বা হয়তো তাদের ধারণাগুলো সুগ্রন্থিত নয়। তবে এটা তাদের বেলায় সত্য যারা অন্তত নিজেদেরকে নৈতিক মনে করেন,দানব নন।  দানবদের কথা বাদ দিয়ে যদি বলি, তাহলে যেকোনো মানুষই তা সে সংস্কার বা বিপ্লবের সমর্থক হোন কিম্বা বর্তমান অবস্থার স্থায়িত্ব বা পূর্বতন অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সমর্থক হোন অথবা কেবলই নিজের কাজ ঠিকঠাক মতো করার মানুষ হোন সকলেই মানুষের জন্যে ভালো, এমন কিছুরই পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকেন। কিন্তু এই যে বিচারবোধ সেটাতো কোনো না কোনো ভাবে গড়ে ওঠে ‘মানব প্রকৃতি’ প্রসঙ্গে আমাদের ধারণা বা বোঝাপড়ার উপরেই। একজন যুক্তিবান মানুষ চেষ্টা করেন এই বোঝাপড়াটা যতটা সম্ভব স্বচ্ছ করতে যায় এবং তাহলেই কেবল এই মূল্যায়নটি করা যায়। সুতরাং এভাবে দেখলে আমি অন্যদের চেয়ে খুব একটা আলাদা নই।

    হ্যাঁ, আপনি সঠিক, মানব প্রকৃতিকে একরকমের প্রতিক্রিয়াশীল বলেই দেখা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াশীলতা  নিশ্চিত ভাবেই বিপুল বিভ্রান্তির ফলাফল। আমার নাতনি কি একখণ্ড পাথর? কোনো সরীসৃপ উভচর প্রাণী, একটা মুরগি কিম্বা একটা বানর থেকে আলাদা কিছু নয়? এই অর্থহীনতাকে যিনি অর্থহীন হিসাবে নাকোচ করে দিতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই বোঝেন মানবপ্রকৃতি বলতে আলাদা কিছু আছে। এখন শুধু আমাদের জানা বাকি যে, এই স্বতন্ত্র প্রকৃতিটি আসলে কি? বৈজ্ঞানিক ভাবে অসামান্য গুরুত্ব ও মানবিক তাৎপর্যের কারণেই এটা একটা বিপুল আগ্রহ উদ্দীপক প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে আমাদের সামনে। আমরা এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিমধ্যেই জানি, যদিও প্রধান মানবিক অর্থ এখনও অজানা। এর বাইরে, আমাদের জন্যে বাকি থাকে প্রত্যাশা, সংকল্প, অন্তর্দৃষ্টি আর অনুমান।

    আসলে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে তেমন কিছু নেই এ প্রসঙ্গে। কেননা মানুষের ভ্রুণ নানান ভাবেই এতোটাই সীমাবদ্ধ যে, সে পারে না পাখির মতো পাখা নিয়ে বড় হতে, তার দৃষ্টিশক্তি আর তার পদ্ধতি পতঙ্গের মতো নয় কিম্বা তার নেই কবুতরের মতো তীব্র ঘ্রানশক্তি।  যে শর্তগুলো জীবের বিকাশকে সীমাবদ্ধ করে ঠিক একই শর্তই তাকে একটা সমৃদ্ধ, জটিল ও ভীষণ গোছানো কাঠামো অর্জন করতে সাহায্য করে।  অন্যান্য সমপ্রজাতির বেলাতেও ঠিক একই মৌলিক নিয়মে খুব সমৃদ্ধ ও অসাধারণ সক্ষমতার বিকাশ ঘটে। যেকোনো জীবের এই রকমের নির্ধারক অভ্যন্তরীণ কাঠামোর অভাব নিশ্চিত ভাবেই তার বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। এই ধরনের জীব হয়তো বেঁচে থাকে অনেকটা অ্যামিবার মত করে, জগতের করুণা নিয়ে (এমন এরাও বেঁচে থাকে কোনও না কোনো ভাবে)। বিকাশের সুযোগ আর সীমাবদ্ধতা খুব যৌক্তিক ভাবেই সম্পর্কিত।

    ধরুণ ভাষা, খুব সামান্য কয়েকটি মনুষ্য ক্ষমতার একটি যার সম্পর্কে এখন অনেক কিছুই জানা। আমাদের বিশ্বাস করার খুব শক্ত যুক্তি আছে যে, আসলে সব মনুষ্য ভাষাই অনেকটাই একই রকমের।  মানুষকে পর্যবেক্ষণ করছেন এমন একজন মঙ্গলগ্রহের বিজ্ঞানী হয়তো উপসংহারে পৌঁছাবেন যে, আদতে মহাবিশ্বে কেবল একটাই ভাষা আছে, কিছু রকমফের ছাড়া। এর কারণ হচ্ছে মানব প্রকৃতির বিশেষ  বৈশিষ্ট্য যা মানুষের ভাষার ভিত্তি তৈরি করে এবং খুবই নগণ্য সংখ্যক বিকল্পকেই অনুমোদন করে।  এটা কি সীমাবদ্ধ করে ফেলা? নিশ্চয়ই। এটা কি স্বাধীনতা দেয়া? সেটাও ঠিক। এই অত্যন্ত সীমাবদ্ধতার ফলেই খুবই প্রাথমিক, বিক্ষিপ্ত ও বিচিত্র সব অভিজ্ঞতই ভাব প্রকাশের এক সমৃদ্ধ ও জটিল পদ্ধতির বিকাশকে সম্ভব করে তোলে, সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলে।

    ধরুন, মানুষের মাঝে জৈবিক ভাবে নির্ধারিত তফাৎগুলোর বিষয়ে কি বলবেন? মানুষের মাঝে এই তফাৎগুলো নিশ্চিত ভাবেই বিদ্যমান ও সত্য, কিন্তু তা কখনই ভয় বা অনুশোচনার কারণ নয় বরং তা আনন্দের কারণ। ক্লোন প্রাণীদের জীবন আসলে যাপনযোগ্য হয়ে ওঠে না এবং যেকোনো বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষ তার জীবনকে তখনই উপভোগ করতে পারেন  যখন তিনি দেখেতে পান অন্যদের এমন কিছু আছে যা তার সাথে মেলে না। এটাই মানুষের প্রাথমিক বিবেচনা হওয়া উচিৎ। এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব সাধারণ ভাবে যে বিশ্বাসগুলো প্রচলিত, আমার মতে তা খুবই অদ্ভুত।

    এই মানব প্রকৃতি, তা সে যেমনই হোক না কেনো, অরাজপন্থী জীবনবোধ গড়ে তোলার জন্যে সহায়ক নাকি বাধা? এক ভাবে বা অন্য ভাবে, এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর আমাদের জানা নেই। এসব নিরীক্ষা ও আবিস্কারের বিষয়, ফাঁপা বুলিবাগিশি’র বিষয় নয়।

    আগামির ভবিষ্যৎ

    প্রশ্ন: শেষ করার আগে আমি বর্তমান সময়ের বামপন্থী রাজনীতির কিছু বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই। আমি জানি না আমেরিকাতেও ঠিক একই রকমের ঘটেছে কিনা, কিন্তু এখানে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বামপন্থী মহলে একধরনের নৈতিক ভাঙ্গনের শুরু হয়েছে। এটা এমন নয় যে এখানকার মানুষজন সোভিয়েত ইউনিয়নে যা হচ্ছিল তার খুব গুণগ্রাহী সমর্থক ছিলো।  বরং এটা একটা সাধারণ অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন মানে মতবাদ হিসাবে সমাজতন্ত্রেরও পতন ঘটেছে। আপনি কি এই ধরনের নীতিভ্রষ্ট্রতা খেয়াল করেছেন? এ প্রসঙ্গে আপনার উত্তর কি হবে?

    চমস্কি: সোভিয়েত একনায়কতন্ত্রের পতনের প্রসঙ্গে আমার প্রতিক্রিয়া হিটলার এবং মুসলিনির পতনের প্রতিক্রিয়ার মতোই। সব দিক থেকেই এটা মানব চেতনার একটা বিরাট বিজয়। এই ঘটনাটিকে সমাজতন্ত্রীদের স্বাগত জানানোর কথা ছিলো, অন্তত সমাজতন্ত্রের একটা প্রধান শত্রুর পতন হয়েছিলো এর মাধ্যমে। আপনার মতো আমিও দেখার জন্যে আগ্রহী হয়েছিলাম, যারা নিজেকে স্টালিনবাদ বিরোধী এবং লেনিনবাদ বিরোধী বলে গণ্য করেছিলেন,  এই স্বৈরাচারের পতনের ফলে তারাও কিভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়েছিলো। আসলে, এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, এরা যত না  লেনিনবাদে বিশ্বাস করতেন, লেনিনবাদের প্রতি এদের অনুরাগ তার চেয়েও অনেক গভীর ছিলো।

    তবে এই নৃশংস ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার আরও কারণ রয়েছে, কেননা এই ব্যবস্থাটি যতটা না ‘গণতান্ত্রিক’ ছিলো তার চেয়ে বেশি ‘সমাজতান্ত্রিক’ ছিলো ( খেয়াল করে দেখুন,  এরা নিজেদের সমাজতন্ত্রী ও গণতন্ত্রী-এই দুটিই দাবি করতো এবং পরের দাবিটি নিয়ে পশ্চিমে অনেক হাস্যরস তামাশা থাকলেও  প্রথম দাবিটি কিন্তু গভীর আগ্রহসহই মেনে নিয়েছিলো।  সমাজতন্ত্র’র বিরুদ্ধেই একটা অস্ত্র হিসাবে তাকে কাজে লাগিয়েছিলো। এটা ছিলো পশ্চিমের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতাসীন শক্তির সেবাদাসত্বের একটা নমুনা)। স্নায়ু যুদ্ধের১৯ চরিত্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

    আমার মতে,এটা ছিলো ইউরোপের বিশ্বদখলের লালসাকে খানিকটা ভদ্রস্থ করে দেখানোর জন্য ‘উত্তর ও দক্ষিণ সংঘাত’-এর বিশেষ রূপায়ন। পূর্ব ইউরোপ ছিলো প্রকৃত তৃতীয় বিশ্ব এবং ১৯১৭ থেকে শুরু হওয়া স্নায়ু যুদ্ধের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর স্বাধীন পথ নেয়ার প্রতিক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিলো না, যদিও এক্ষেত্রে মাত্রাগত তফাৎ নানান সংঘর্ষে আগুনে ঘি ঢেলেছে। শুধু একারণেই,এটা খুব যৌক্তিক ভাবেই প্রত্যাশিত ছিলো যে, এই অঞ্চলটি আবার ঠিক আগের অবস্থাতেই ফিরে আসবে: পশ্চিমের কিছু অংশ,যেমন চেক রিপাবলিক এবং পশ্চিম পোল্যান্ড হয়তো আবার একসাথে হতে পারে যখন অন্যান্যরা খুব প্রথাগত সেবাদাসের ভূমিকায় থাকবে, এই ‘এক্স-নোমেনক্লাতুরা’ই২০ হয়তো হয়ে উঠবে এই তৃতীয় বিশ্বের অভিজাত শ্রেণী (এটা হবে পশ্চিমা কর্পোরেট শক্তির অনুমোদনক্রমেই যারা এদেরকেই বিকল্প হিসাবে পছন্দ করে)। এটা কোনো সুন্দর ভবিষ্যৎ ছিলো না এবং অনেককে তা দুর্ভোগের দিকেই চালিত করেছিলো।

    উদ্বেগের আরেকটা কারণ হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা ও জোট নিরপেক্ষতা২১ প্রশ্ন। সোভিয়েত সাম্রাজ্য যত কিম্ভূতই হোক না কেন, এর অস্তিত্বই জোট নিরপেক্ষতার জন্য এক ধরনের জায়গা তৈরি করেছিলো এবং পশ্চিমের প্রতি বিদ্বেষ প্রবণতার কারণেই এরা কখনও কখনও পশ্চিমের দ্বারা আক্রান্ত দেশগুলোকে সাহায্য করতো। এখন এসব আর নেই,আর দক্ষিণ এর পরিণতি ভোগ করছে।

    আর তৃতীয় কারণটি হচ্ছে,যাকে পশ্চিমা বেনিয়া মিডিয়া বলে ‘পশ্চিমা আদুরে শ্রমিক শ্রেণী’ আর তাদের ‘বিলাসবহুল জীবনযাত্রা’। পূর্ব ইউরোপের একটা বিরাট অংশ আবারো দখলে আসার পরে, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষ আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেনো হাতে  পেলো মোক্ষম অস্ত্র, নিজেদের দেশের শ্রমিকদের হুমকি-ধামকি দেয়ার জন্য।  জেনারেল মোটরস কিংবা ভক্সওয়াগন তখন হুমকি দিতে শুরু করলো যে তারা কেবল মেক্সিকো বা ব্রাজিলেই নয়, চাইলে পোল্যান্ডে কিম্বা হাঙ্গেরিতেও কারখানা সরিয়ে নিতে পারে। বোঝাই যায় যে, এই পরিস্থিতিতে তারা একরকমের আত্মতুষ্টিতে ভুগছে এই বিষয়ে।

    স্নায়ু যুদ্ধ থেকে বা এই ধরনের যেকোনো সংঘাতময় সময়ের শেষে কে উদযাপন করছে আর কে গোমড়া হচ্ছে তা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। এই হিসাবে, স্নায়ু যুদ্ধের আসল বিজয়ী হচ্ছে পশ্চিমা অভিজাত শ্রেণী আর সেই  ‘এক্স-নোমেনক্লাতুরা’, যারা এখন তাদের কল্পনারও অতীত ধনী। আর বিজিতদের মাঝে রয়েছে পশ্চিমের শ্রমিক শ্রেণী এবং দক্ষিণের সেই সকল দেশ যারা স্বাধীনতার পথে হেঁটেছিলো।

    যদিও বিরল, তবুও এই ধারণাগুলো যখন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পারেন, তখন তাদের মাঝে এক ধরনের উন্মত্ত বিকারগ্রস্ততা  তৈরি হয়। এটা দেখানো খুব সহজ। এটা বোঝাও যায়। এই পর্যবেক্ষণগুলো সঠিক এবং ক্ষমতা ও সুবিধা বঞ্চনার কারণেই এই উন্মত্ত বিকার।

    মোটের উপরে স্নায়ু যুদ্ধের সমাপ্তিতে একজন সৎ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেবল একটা নৃশংস কর্তৃত্ববাদের ধ্বংসে উচ্ছাস প্রকাশ করার চেয়েও বেশ জটিল হবে এবং আমার মতে এই বিষয়ে প্রচলিত মতামতগুলো প্রবল ভন্ডামিতেই বন্দি হয়ে আছে।

    আর্টওয়ার্ক: রোড টু কমিউনিজম
    শিল্পী: ভ্লাদেমির কাজানেভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পুঁজিবাদ প্রসঙ্গে

    প্রশ্ন: অনেক অর্থেই বামপন্থীরা আবারো ফিরে গিয়েছেন গত শতকের মতো তাদের মূল শুরুর বিন্দুতে। তখনকার মতোই এরা একটি বিকাশমান পুঁজিবাদকে প্রত্যক্ষ করছেন। যদিও সম্পদের বৈষম্য ও অসমতা পাহাড়সম হয়েছে, তা সত্ত্বেও পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি ঐকমত্য আছে যে,পুঁজিবাদই সম্ভবত ইতিহাসের একমাত্র সম্ভাব্য সচল অর্থনৈতিক সংগঠন।  যেকেউ বলতে পারেন যে, এই প্রেক্ষাপটের বিপরীতে কিভাবে অগ্রসর হতে হবে সে বিষয়ে বামপন্থীরা অনেকটাই অনিশ্চিত। আপনি এই সময়টিকে কিভাবে দেখছেন? এটা কি এক ধরনের ‘মূলে ফিরে যাওয়ার’ প্রশ্ন? সমাজতন্ত্রের মুক্তিমুখিন ধারাকে সামনে নিয়ে আসা এবং গণতন্ত্রের উপরে জোর দেয়াই কি এখনকার করণীয় হতে পারে?

    চমস্কি: আমার মতে,এটা আসলে অনেকটাই  প্রোপাগান্ডা। আমরা এখন পুঁজিবাদ বলতে যা বলছি তা আসলে এক ধরনের কর্পোরেট মারকেন্টাইলিজম বা বাণিজ্যতন্ত্র,যেখানে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ও আন্তর্জাতিক সমাজে বিপুল প্রভাব খাটানো শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায়  মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ব্যক্তি খাতের বিশাল সব স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নানান ধরনের বিভ্রমের বিপরীতে আমেরিকায় এটা নাটকীয় ভাবে সত্য। ধনিক ও অভিজাত  শ্রেণী এখন আর আগের মতো বাজারের শৃঙ্খলাগুলো মানতে রাজি নয়, যদিও এরা সাধারণ আম জনতার জন্যে এই শৃঙ্খলাগুলোকে এখনো সঠিক মনে করে। কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ধরুন রিগ্যান প্রশাসনের২৩ কথা, যাঁদের আবির্ভাব ঘটেছিলো মুক্ত বাজারের বুলিবাগীশি দিয়ে, যারা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে চাঙ্গা করতে চেয়েছিলো এটা বলে যে তারাই যুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বাণিজ্য সুরক্ষাবাদী প্রশাসন।  বাস্তবত এরা সম্মিলিত ভাবে আগের সকল প্রশাসনের চেয়ে  বেশি সংরংক্ষণবাদী ছিলো।  বর্তমান বাজার ভিত্তিক ক্রুসেডের একজন নেতা নিউট গিংরিচ  যিনি বিপুল ধনী একটা এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন, যদিও এটা কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তার বাইরে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার এলাকা আমেরিকার যেকোনো নিম্ন-মধ্যবিত্ত মফস্বল এলাকার চেয়ে অনেক  বেশি কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি পেয়ে থাকে। আমেরিকার ‘রক্ষণশীলরা’ যারা ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য স্কুলগুলোতে দুপুরের খাবার বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে তারাই আবার পেন্টাগনের জন্য বাজেট বৃদ্ধিরও দাবি জানিয়েছে, যা ১৯৪০ এর দশকের শেষের দিকে তার বর্তমান আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ বাণিজ্যিক মিডিয়াগুলো দয়া করে আমাদেরকে জানিয়েছে  যে, এই ‘বিশুদ্ধ প্রতিযোগিতামূলক, ভর্তুকিবিহীন, মুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি’ এভাবে চলতে পারবে না, সরকারকে অবশ্যই এর ‘ত্রাণকর্তা’ হিসাবে ভূমিকা পালন করতে হবে। এই ‘ত্রাণকর্তা’ ছাড়া নিউট গিংরিচের নির্বাচনি এলাকা হতো একটা হতদরিদ্র শ্রমজীবী এলাকা (অবশ্য সেই সৌভাগ্য তাদের থাকলে)। সেখানে থাকতো না কোনো কম্পিউটার, ইলেক্ট্রনিক্স, হতো না কোনো বিমান শিল্প বা খনিজ বিষয়ক শিল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। জনগণের মাঝে অরাজপন্থিদেরকে এই ধরনের প্রতারকদের সাথে মিলিয়ে ফেলা উচিৎ নয়।

    আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মুক্তিমুখিন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাগুলো এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক এবং জনগণের মাঝে তাদের বেশ গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। বিপুল কর্পোরেট প্রোপাগান্ডা সত্ত্বেও, উচ্চ শিক্ষিত বলয়ের বাইরে  বেশির ভাগ মানুষ এখনও তাদের প্রথাগত মনোভাবই বজায় রাখে। যেমন ধরুন, যদি আমেরিকার উদাহরণ দেই, এখানে জনগণের শতকরা আশি ভাগেরও  বেশি মানুষ মনে করেন আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি ‘মজ্জাগত ভাবেই অন্যায্য’ এবং আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আসলে প্রতারণামূলক, যা কেবল ‘বিশেষ স্বার্থেরই’ সেবা করে ‘জনগণের’ নয়। আমেরিকার জনগণের একটা বিস্ময়কর বড়সড়ো অংশ মনে করে পাবলিক এফেয়ার্স বা গণবিষয়াবলীতে শ্রমজীবী মানুষের মতামত প্রকাশের সুযোগ খুবই সীমিত (একই অবস্থা ইংল্যান্ডেও), ফলে অভাবী মানুষকে সহায়তার জন্যে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সংকোচন কিম্বা কর মওকুফের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ। অথচ বর্তমান রিপাবলিকান প্রস্তাবনা গুলো যা কংগ্রেসের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা শুধু ধনীদেরকেই লাভবান করে আর  আম জনতার জন্য অনিষ্টকর ভূমিকায় আবির্ভূত হয় এবং এই রকমের আরও অনেক অনেক উদাহরণ রয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা হয়তো অন্য গল্প শোনাবে আপনাকে কিন্তু আসল তথ্যটা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন কিছু নয়।

    প্রশ্ন: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে অরাজপন্থি চিন্তাগুলোর সঠিকতাই প্রমাণিত হয়েছে, বাকুনিনের ভবিষ্যৎবাণীই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। আপনার কি মনে হয় এই সাধারণ বিকাশ থেকে এবং বাকুনিনের দারুণ বোধগম্য বিশ্লেষণ থেকে অরাজপন্থীদের প্রেরণা নেয়া উচিৎ? অরাজপন্থী মানুষদের কি তাদের চিন্তা এবং ইতিহাসের উপর আরও বেশি আস্থা রেখে আগত সময়ের দিকে নজর দেয়া উচিৎ?

    চমস্কি: আমি অন্তত আশা করি উপরের আলোচনায় এর উত্তর আছে। আমি মনে করি বর্তমান যুগে অশুভ দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে দুর্দান্ত সব আশার চিহ্ন, এর ফলাফল কি হবে তা নির্ভর করছে আমাদের সামনে থাকা সুযোগগুলোকে আমরা ঠিক কতটা ব্যবহার করতে পারছি তার উপরে।

    প্রশ্ন: সবশেষে, নোম, একটা ভিন্ন প্রশ্ন করছি। আমরা আপনার জন্যে এক পাইন্ট গিনেস বিয়ার অর্ডার করে রেখেছি এখানে। আপনি কবে আসবেন এবং পান করবেন সেটা?

    চমস্কি: গিনেস’টা প্রস্তুত থাক, আমি আশা করি খুব লম্বা সময় লাগবে না আমার আসতে। আমরা যদি পারতাম তাহলে হয়তো কালকেই চলে আসতাম। আয়ারল্যান্ডে আমরা (মানে আমার স্ত্রীও এসেছেন আমার সাথে, যদিও এই ধরনের ধারাবাহিক ভ্রমন তার জন্যে অস্বাভাবিক) দারুণ সময় কাটিয়েছি, আমরা আবার আসতে চাই। আর কেনই বা নয়? কঠিন কঠিন সব আলাপ করে আপনাদেরকে বিরক্ত করবো না, তবে অসাধারণ সব প্রত্যাশা রয়েছে, যে পরিস্থিতিগুলোর কথা আমি বলার চেষ্টা করছি সেসব বিষয়ে।

    পাদ টিকা

    ১.ফরাসি নৈরাজ্য চিন্তাপথিক দানিয়েল গেঁর‌্যা লিখিত বই Anarchism : From Theory To Practise. বইটি মান্থলি রিভিউ প্রেস কর্তৃক প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসে। এতে নোম চমস্কি ভূমিকা লেখেন। ভূমিকাটি পরে বিভিন্নস্থানে Notes On Anarchism শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    ২. নোম চমস্কি ও এস হ্যারম্যান ১৯৮৮ সালে লেখেন তাদের সাড়া জাগানো বই Manufacturing Consent. পরে ১৯৯২ সালে দুই কানাডিয়ান প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা মার্ক আকবার ও পিটার উইনটনিক বিষয়বস্তুকে ধরে চমস্কির ভাবনা বিস্তৃত করতে নির্মাণ করেন ১৬৭ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র Manufacturing Consent: Noam Chomsky and the Media.

    ৩. স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম লিখিত বই Of Priceple OF government .

    ৪. Liberatarian Socialism  এর পরিভাষা মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্র। ১৮৫৮ সাল  থেকে ১৮৬১ সালের ভেতরে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত নৈরাজ্যবাদী জার্নাল খব Le Libertaire– এ প্রথম প্রত্যয়টি ব্যবহৃত হয়। ফরাসি নৈরাজ্যবাদী চিন্তাপথিক ও কবি Joseph Déjacque  প্রথম ব্যবহার করেন। উনিশ শতকের আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী মানুষের সমিতিতে  সমাজতন্ত্র প্রশ্নে মার্কস-বাকুনিন বিভাজন হয়। মার্র্কস সমাজতন্ত্র বলতে মনে করতেন সাম্যবাদে উত্তরণের আগে উৎক্রমনমূলক পর্যায় যাতে শিল্প-প্রলেতারিত রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। অন্যদিকে বাকুনিনের  মতে সমাজতন্ত্র মানেই বিপ্লবকালে  এই রাষ্ট্র তথা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ। নৈরাজ্যবাদীরা রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্রকেই মুক্তিমুখিন সমাজতন্ত্র  এবং রাষ্ট্রবিহিত সমাজতন্ত্রকে কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্র বলে থাকেন।

    ৫. নৈরাজ্যবাদের আদি চিন্তাপথিক মিখাইল বাকুনিন তাঁর Stateless socialism: Anarchism  রচনায় সমাজতন্ত্র ও স্বাধীনতার সম্পর্ক ব্যাখা করেন। বাকুনিনের মতে ‘সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র নির্মমতা’।  দেখুন: বাকুনিন (২০১৯: পৃ) পরে যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী আন্দোলনে anarchism is equivalent to socialism with freedom কথাটি জনপ্রিয় হয়।

    ৬. Red Beurocracy এর পরিভাষা লাল আমলাতন্ত্র। রুশ নৈরাজবাদী চিন্তক মিখাইল বাকুনিন এই প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। বাকুনিন মনে করতেন শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ হল সমাজতন্ত্র। বাকুনিন সমাজতন্ত্র বলতে শুধু উৎপাদনের সামাজিক মালিকানাই বুঝতেন না,  একই সঙ্গে রাষ্ট্র উচ্ছেদকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে সামনে রাখেন। বাকুনিন Statism and Anarchy  তাঁর ধারণা বিস্তৃত করেন এবং মাকর্সীয় রাষ্ট্রবিহিত সমাজতন্ত্রর তীব্র সমালোচনা করেন। রাষ্ট্র ও তার তাবৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা শাসক-শাসিত সম্পর্ক নির্মাণ করে এবং বল প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাধীনতা হরণ করে। রাষ্ট্রকে  ‍চূর্ণ না করে তার ক্ষমতা  দখল কেবল নতুন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীই নির্মাণ করে। বাকুনিন এই নতুন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতাকেই Red Beurocracy নামে অভিহিত করেন।

    ৭. ১৯৩৬  সালের স্পেনীয় বিপ্লব ছিল শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক বিপ্লব। কাতালোনিয়া, আন্দালুসিয়া, আরাগোন এবং ভ্যালেন্সিয়ার অংশবিশেষ  জুড়ে সংগঠিত হয় এই বিপ্লব। স্পেনের অর্থনীতির দুই-তৃতীয়ংশরই নিয়ন্ত্রণ নেয় শ্রমজীবী শ্রেণী। শ্রমজীবী মানুষের নৈরাজ্যবাদী সংগঠন সিএনটি ছিল এই বিপ্লবের সংঘটক। কারখানার দখল নিয়ে শ্রমজীবীদের স্ব-স্বপরিচালনা ব্যবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে  প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, সমন্বয়ের জন্য ফেডারেটিভ পদ্ধতির পরিচালনা ব্যবস্থা এবং প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৩৬-১৯৩৯  পর্যন্ত বিপ্লব স্থায়ী ছিল।

    ৮. অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র: Participatory Democracy’ পরিভাষা াংশগ্রহনমূল গণতন্ত্র। এটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূল গণতন্ত্ররে ধরণ থেকে একবারেই আলাদা। উৎপাদনকাঠামো ও সমাজ- সমিতি ও সম্প্রদায়গুলোতে ব্যক্তি স্বয়ং প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয় এবং প্রত্যেকে ও সকলে মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।

    ৯. ১৭৮৭ সালের সংবিধান সংক্রান্ত কনভেনশন: যুক্তরাষ্ট্রর সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাসে  খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সংবিধান সংক্রান্ত কনভেনশন পেনসিলভেনিয়ার  ফিলাডেলফিয়ায়  ১৭৮৭ সালের ১৪ মে থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে শাসন হবে, তা নির্ধারণই ছিল এই কনভেনশনের মুখ্য উদ্দেশ্য। কনভেনশনে  সভাপতিত্ব করেন জর্জ ওয়াশিংটন।  ৭০ জন ডেলিগেট এতে অংশ নেয়ার কথা থাকলেও ৫৫ জন অংশ নিতে সক্ষম হন। স্টেটগুলোকে বিবেচনার জন্য ৩৯ জনের সাক্ষর সম্বলিত প্রস্তাবনা পাটানো হয়। জেমস মেডিসন, আলেকজান্ডার হ্যামিলটন নতুন ধরনের শাসনপদ্ধতির কথা বলেন। কনভেনশনে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধিত্বও প্রস্তাব হাজির করেন জেমস মেডিসন।

    ১০. সোস্যাল ডেমোক্রাসি: সোসাল ডেমোক্রাসি ১৮৬০’এর দশকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক আন্দোলন। এর সুদূরপ্রসারীর লক্ষ হচ্ছে ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অভীষ্ট সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

    ১১. ফেবিয়ান সমাজতন্ত্রী : ব্রিটেনের একটি সমাজতন্ত্রী ধারা যারা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের বদলে ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের তাত্ত্বিক ধারণায় বিশ্বাসী। এদের মূল সংগঠনের নাম ‘ফ্যাবিয়ান সোসাইটি’।

    ১২. বলশেভিক : রুশ সোসাল ডেমোক্রাটিক লোবার পার্টির লেনিনপন্থী অংশ। বলশেভিক অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৯০৩ সালে পার্টিরি দ্বিতীয় কংগ্রেসে অপর অংশ মেনশিভিক থেকে আদালা হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত হয়।

    ১৩. Deterring Democracy  চমস্কির আলোচিত বই। ১৯৯১ সালে ভার্সো বুকস থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই বইটি আলোচনার ঝড় তোলে। বইটিতে চমস্কি মার্কিন সাম্রাজ্যের ক্ষমতাকাঠামোকে উন্মোচন করেন এবং দেখান কিভাবে নিজ দেশে এবং দেশের বাইওে এই ক্ষমতা গণতন্ত্রর জন্য হুমকি। একদিকে আকাশচুম্বি সামরিক ক্ষমতা অন্যদিকে পড়ন্ত অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রর জন্য একটি নতুন ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি করে এবং এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রর ‘জাতীয় স্বার্থর’ নামে ভয়ানক শোষণ জারি করে।  নিকারাগুয়া থেকে ফিলিপাইন, পানামা থেকে মধ্যপ্রাচ্য- দুনিয়াব্যাপি শোষণের নতুন এক বিন্যাস তৈরি হয়। যাকে ‘নয়া বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব বলেছেন চমস্কি।

    ১৪. Necessary Illusions: Thought Control in Democratic Societies ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত চমস্কির বই। সাউথ ইন্ড প্রেস ও প্লুটো প্রেস বইটি প্রকাশ করে। এতে চমস্কি দেখান ক্ষমতা কিভাবে প্রপাগান্ডার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বিলীন করে এবং ধোঁয়াশার মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করে।  প্রকৃত গণতন্ত্রকে রুদ্ধ করে ফেলা বা অকার্যকর করতে কর্পোরেট মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের  ভ’মিকার সমালোচনা করেন চমস্কি।

    ১৫. ‘নয়া শ্রেণী’: Newclass শিরোনামে বাকুনিনের একটি প্রবন্ধ জি পি ম্যাক্সিমফ সম্পাদিত বাকুনিন রচনামালায়  পত্রস্থ হয়েছে। বাকুনিন নয়া শ্রেনী বলতে মূলত লাল আমলাতন্ত্রে গজিয়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শ্রেণীটিকে বুঝিয়েছেন। ৬ নম্বর পাদটিকা দ্রষ্টব্য।

    ১৬. অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিজম: নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধানধারা। চমস্কির মতে,  অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্টরা নৈরাজ্যবাদকে অত্যন্ত সংগঠিত ও জটিল  শিল্পায়িত সমাজের জন্য সঠিক ধরনের সংগঠনপ্রণালী হিসেবে দেখে। আর এই প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বামপন্থী-মার্ক্সবাদের সঙ্গে, যেমন কাউন্সিল-কমিউনিজম যা লুক্সেমবার্গবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত।

    ১৭. Discussion Bulletin : ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন ফ্রাঙ্ক জিরাল্ড।

    ১৮. মানবপ্রকৃতি: চমস্কির ভাষাতত্ত্বেরও অন্যতম প্রস্তাবনা মানবপ্রকৃতি।  চমস্কি তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় যে লক্ষ্যণীয় সিদ্ধান্তে উপনীত হন তা হলো: মানুষ সহজাত ভাবসম্পন্ন। চমস্কি যুক্তি দেখান যে, ভাষার ব্যাকরণ কাঠামোর অন্তর্নিবিষ্ট রূপগত বিধান বুঝতে পারার ক্ষমতা মানুষের সহজাত। চমস্কি যুক্তি দেখান যে, ভাষার ব্যাকরণ কাঠামোর অন্তর্নিবিষ্ট রূপগত বিধান বুঝতে পারার ক্ষমতা মানুষের সহজাত। খুব অল্প বয়সেই শিশুরা বড়দের কথাবার্তা শুনে ব্যকরণের জটিল বিধানগুলো আয়ত্ত করে ফেলে। একজন শিশু পরবর্তীতে এই বিধানগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করে যাতে খুব নির্দিষ্ট সংখ্যক শব্দ দিয়েই অসংখ্য বাক্য সে প্রণয়ন করতে থাকে। এই বাক্যগুলো অশ্রুত অর্থাৎ নতুন। তাই ব্যকরণের অন্তর্নিহিত বিধান চিনতে পারার সক্ষমতা এবং অসংখ্য বাক্য উৎপাদনের এই সহজাত ক্ষমতাকে সৃজনশীলতা বলে আখ্যায়িত করা যায়।

    ১৯. স্নায়ুযুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রসমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রসমূহের মধ্যকার টানাপোড়েনের নাম। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৮০’র দশকের শেষ পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। প্রায় পাঁচ দশকব্যাপী সময়কালে এই দুই শক্তিশালী দেশের মধ্যকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক মতানৈক্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেহারা নিয়ন্ত্রণ করত।

    ২০. ‘এক্স-নোমেনক্লাতুরা’: এক্স-নোমেনক্লাতুরা : মূলত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট পার্টির অভিজাত নেতাদের এই নামে ডাকা হতো, যারা পার্টির খুব শীর্ষ পদে, নানান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। এরা কমিউনিস্ট সংগঠনের মধ্যেও ‘এলিট’ অংশ। যদিও এই সাক্ষাৎকারে ‘এক্স-নোমেনক্লাতুরা’  বলতে পূর্ব ইউরোপের অভিজাত দেশগুলোর কথা বলা হয়েছে যাঁদের সাথে পশ্চিমের সখ্য গড়ে উঠেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে। -অনুবাদক

    ২১. জোট নিরপেক্ষতা: ১৯৬১ সালের সাবেক যুগাস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে জন্ম হয় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের।

    তথ্যপঞ্জি

    1. Hume, David (1994) Of the First Principles of Government, Political Essay; Ed. Knud Haakonssen; Cambridge University Press; Edinburgh, Uk

    2. Mirbeau, Octave (1894) Le Journal, February 19, 1894; Ed. Fernand Arthur Pierre Xau; Paris

    3. Rousseau, Jean-Jacques (1964); First And Second Discources; Ed. R. D. Masters; St. Martin Press, New York.

     

  • নোম চমস্কি।। ক্ষমতাবোধিনী: নৈরাজ্য ও বিবিধ

    নোম চমস্কি।। ক্ষমতাবোধিনী: নৈরাজ্য ও বিবিধ

    • অনুবাদ: খোইরোম রুধির

    প্রবহমান রচনাটি নোম চমস্কির Understanding Power: The Indispensable Chomsky গ্রন্থ থেকে সংকলিত। ২০০২ সালে নিউপ্রেস থেকে এটি প্রকাশিত হয়। পুরো গ্রন্থটিই মূলত বিভিন্ন কথোপকথন, প্রশ্নোত্তরের একটি গ্রন্থনা। এর নির্বাচিত অংশ ক্ষমতাবোধিনী: নৈরাজ্য ও বিবিধ শিরোনামে প্রকাশিত হল।-সম্পাদক

    নোম চমস্কি

    বিজ্ঞান ও মানব প্রকৃতি

    পুরুষ কণ্ঠ: নোম, মানব প্রকৃতি সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত একটু বিস্তারিত বলবেন? যেমন, আপনি কি মানুষকে গঠনমূলক সত্তার চেয়ে অধিকতর ধ্বংসাত্মক সত্তা হিসেবে দেখেন কিংবা সম্ভবত কাছাকাছি অন্যকিছু? 

    চমস্কি: আচ্ছা। প্রথমত, আমার অভিমত আপনাদের অভিমতের চেয়ে উত্তম কিছু নয়-এটি বিশুদ্ধ স্বজ্ঞা মাত্র। মানব প্রকৃতি সম্পর্কে প্রকৃতপক্ষে কেউই কোনকিছু বুঝতে পারে না। দেখুন, মানুষ বৃহৎ অণুগুলো সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। আপনি যখন তারও বাইরে মানব প্রকৃতির মতো ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে কথা বলেন তখন যে কারো অনুমানই অন্য কারো অনুমানের মতোই ভালো।

    পুরুষ কণ্ঠ: কিন্তু আপনি তো মানব প্রকৃতির প্রচুর সংখ্যক ফলাফল নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন। 

    চমস্কি: হ্যাঁ। কিন্তু আপনি যদি মানব প্রকৃতির ফলাফলগুলোর দিকে তাকান তাহলে তার মধ্যে আপনি সবকিছুই দেখতে পাবেন–আপনি প্রচুর আত্মোৎসর্গ, প্রচণ্ড সাহস, সততা, নাশকতা, যা চান তাই দেখতে পাবেন। এটা আদতে আপনাকে বেশি কিছু জানান দেয় না।

    পুরুষ কণ্ঠ: যদিও আপনার বিপুল সংখ্যাক গবেষণাপত্র মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির দলিল হাজির করেছে বলে মনে হয়।  

    চমস্কি: তা ঠিক। কিন্তু সেগুলোর প্রচুর সংখ্যক গবেষণাপত্র অন্য কিছুর দলিলও হাজির করে। আমার সাধারণ উপলব্ধি হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে পরিমিত পরিমাণে অগ্রগতি হয়েছে—বিপুল পরিমাণে নয় তবে উল্লেখযোগ্য। আর কোনো কোনো সময় এই অগ্রগতি এসেছে খুব নাটকীয়ভাবে। উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার ইতিহাসে “আদি পাপ” এর কথাই ধরুন। এখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে কী ঘটেছিল? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যে ১৯৬০ সাল অব্দি আমেরিকার সংস্কৃতি আদিবাসী জনজাতির সংস্কৃতিকে কোনভাবেই গ্রহণ করতে পারেনি। ১৯৬০ সাল অব্দি বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া বিদ্যায়তিক জ্ঞানচর্চায় ঢালাওভাবে ইতিহাসের মিথ্যা বয়ান হাজির করা হচ্ছিল এবং বাস্তবে যা ঘটেছে সেগুলোকে মাটি চাপা দেয়া হচ্ছিল। এমনকি যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তাদের সংখ্যা সম্পর্কেও ব্যাপক মিথ্যাচার করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগণ্য কূটনৈতিক ইতিহাসের কোনো একটিতে লেখক থমাস বেইলি লিখতে পেরেছিলেন যে, আমেরিকান বিপ্লবের পর পূর্বতন উপনিবেশবাদীরা “গাছ ও ইন্ডিয়ানদের ভূপাতিত করার” কাজে মনোনিবেশ করেছিল।১ ইদানিং কেউ আর এই কথা বলতে পারবে না, এমনকি ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের সম্পাদকীয়তেও আপনি এই কথা বলতে পারবেন না। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এবং এগুলো অপরাপর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির অংশও বটে। দাসত্বকে অল্প কিছুদিন আগেও চমৎকার জিনিস বলে বিবেচনা করা হতো।

    পুরুষ কণ্ঠ: তার মানে আপনি মনে করেন যে মানব প্রকৃতি আলাদাভাবে এক প্রকার ধ্বংসাত্মক ঠেকলেও সামগ্রিকভাবে এটি গঠনমূলক? 

    চমস্কি: আমি জানি না। যেমন, উনিশ শতকে তাদের কাছে গ্যাস চ্যাম্বার ছিল না। সুতরাং আপনি সকল প্রকার বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পাবেন। আর আপনি যদি বিজ্ঞানভিত্তিক উত্তর চান তাহলে উত্তর শূন্য, কেউ কিছু জানে না—এই সংক্রান্ত উত্তরগুলোর অধিকাংশই এসেছে ইতিহাস কিংবা স্বজ্ঞা কিংবা অন্যকিছু থেকে। মানে হচ্ছে, বিজ্ঞান শুধুমাত্র খুব সহজ-সরল প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে। জটিল ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনি শুধু অনুমান করেন মাত্র।

    অপর পুরুষ কণ্ঠ: ভাষাতত্ত্ব সংক্রান্ত আপনার বৈজ্ঞানিক কাজ এবং আপনার রাজনীতির মধ্যেকার যোগসূত্র সম্পর্কে যখন প্রশ্ন করা হয় তখন আপনি এমন মন্তব্য করেন যে, “হ্যাঁ, তাদের মধ্যে অতি সূক্ষ্ম কিছু যোগসূত্র রয়েছে”। আপনি কি এই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন? আমার নিজস্ব ভাবনা হচ্ছে- আমাদের রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর একাংশ সম্ভবত এই যে, মানব মস্তিষ্ক ‘বেশি’ ও ‘কম’ এর মতো প্রতিযোগিতামূলক শব্দবন্ধে ব্যাপারগুলোকে বিবেচনা করতে খুব দক্ষ এবং ‘পর্যাপ্ত’ ধারণাটির ক্ষেত্রে কম দক্ষ।

    চমস্কি: আচ্ছা। এইটা হয়তো সত্য কিন্তু এগুলো এমন সব বিষয় যা সম্পর্কে ভাষা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোনো কিছু বলার নেই। আমার কথার মানে হচ্ছে আপনি এই বিষয়ে ততটুকু জানেন যতটুকু জানেন আমাদের আশেপাশে অবস্থিত সবচেয়ে বিশেষজ্ঞ ভাষাবিজ্ঞানী।

    পুরুষ কণ্ঠ: তাহলে কোথায় সেই অতি সূক্ষ্ম যোগসূত্রগুলো?

    চমস্কি: সেখানে নয়। এই অতি সূক্ষ্ম যোগসূত্রগুলো অন্য কোথাও রয়েছে।

    প্রথমত, আমাদের মনে রাখা উচিত যে বিজ্ঞান যে ধরনের বিষয়বস্তুর উপর আলোকপাত করতে পারে তা খুবই সীমিত। আপনি যখন জটিল সিস্টেমের দিকে এগুতে শুরু করবেন তখন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খুব শীঘ্রই সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম হয়ে উঠবে। আর আপনি যখন মানুষের প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান করতে যান তখন বিজ্ঞানের আর কিছুই বলার থাকে না। কিন্তু এমন কিছু ক্ষেত্রও আছে যেখানে আপনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও বোধশক্তির সন্ধান পেতে পারেন এবং কিছু কারণে ভাষার কোনো কোনো পরিপ্রেক্ষিত সেই ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে। কিন্তু এই অন্তর্দৃষ্টিও মানব সংক্রান্ত প্রকৃত জিজ্ঞাসাগুলোর প্রাসঙ্গিক উত্তর হাজির করতে পারেনি, অন্ততপক্ষে মানবজীবনে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম এমন পর্যায়ের উত্তর হাজির করতে পারেনি।

    এই যোগসূত্রগুলো একেবারেই ভিন্ন ও অতি সূক্ষ্ম। যোগসূত্রগুলোতে জোর দেওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের কালপর্বে এই যোগসুত্রগুলোকে বহুবার চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ক্লাসিকাল লিবারেলিজমের ঠিক কেন্দ্রস্থলেই এই যোগসূত্রগুলো নিহিত। আমার কথার মানে হচ্ছে, ক্লাসিকাল লিবারেলিজম (যা ছিল প্রাক-পুঁজিবাদী প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদ বিরোধী) মানুষের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার নিমিত্তে স্ব-কার্য স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং নিজস্ব তত্ত্বাবধানে স্বাধীন সৃজনশীল কার্য সম্পাদনের প্রয়োজনীয়তার উপর দৃষ্টিপাত করত, যা এটির সাম্প্রতিক সংস্করণের ঠিক উল্টো। সুতরাং একজন ক্লাসিকাল লিবারেলের কাছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রম মজুরির ধারণা হয়তো আগাগোড়া অনৈতিক হিসেবে বিবেচিত হতো। কারণ এটি স্ব-কার্যের উপর স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক জরুরতকে ব্যাহত করে এইটা প্রচার করার মাধ্যমে—তুমি কারো না কারো দাস মাত্র।

    স্বাধীন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অধিকার এবং তার উপর স্ব-নিয়ন্ত্রণের তাগিদে মানব প্রকৃতির অন্তঃসার শনাক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে কতিপয় ক্লাসিকাল লিবারেল দার্শনিক মানব বুদ্ধিবৃত্তির অন্য দিকগুলোতে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। সেগুলোর একটি দিক হচ্ছে ভাষা যা নিয়ে সতের শতক থেকে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে এবং এটির সাথে কার্টেসিয়ান চিন্তাচর্চারও[ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত পরবর্তী] যথেষ্ট লেনাদেনা আছে। কোনো পশু কিংবা স্বয়ংচল যন্ত্রের সাথে মানুষের পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানব অনুভূতির উপর মানব মনের কর্তৃত্ব যাকে প্রায় যথাযথভাবে ভাষার মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছিল। ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহারে স্বাধীন সৃজনশীল পরিপ্রেক্ষিত এমনই এক নির্ণায়ক।

    দেকার্তের যুক্তিতর্কের একটি কেন্দ্রিয় অংশ, এমনকি মানুষ ও জগতের অন্য সত্তাগুলোর মধ্যেকার অন্টোলজিকাল পার্থক্য হচ্ছে—আপনি যদি কোনো মানুষকে কিছু শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে নতুন কোনো বিষয়ে জানতে চান যেটি সম্পর্কে সে আগে কখনো শুনেনি তাহলেও সেই বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক নতুন কোনো উত্তর সে আপনাকে দিতে পারবে। কোনো অভ্যন্তরীণ অবস্থা কিংবা কোনো বাহ্যিক পরিস্থিতির দরুন এমনটা ঘটে না। এটি সম্ভব হয় মানব মনের সৃজনশীল ক্ষমতার জন্য। কিন্তু কোনো স্বয়ংচল যন্ত্র, পশু কিংবা অন্যকিছুর ক্ষেত্রে একই জিনিস ঘটবে না। যেমন, আপনি যদি কোনো যন্ত্রকে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে সেট করে বাটনে চাপ দেন তখন যে ফলাফল পাবেন তা পূর্বনির্ধারিত। কিংবা আপনি যদি কোনো কবুতরকে সুনির্দিষ্ট কিছু তাড়না দেন সেক্ষেত্রেও এটি যে সকল কার্যকলাপ করবে তাও পূর্বনির্ধারিত-ই হবে। কিন্তু একজন মানুষের ক্ষেত্রে আপনি যে ফলাফল পাবেন তা পূর্বনির্ধারিত নয় বরং অনির্ধারিত কিন্তু কোনো না কোনোভাবে সেই পরিস্থিতি সাপেক্ষে যুতসই।

    দেকার্তের জন্য এইটা ছিল মানব মনের চরম দিক। রুশো, হামবল্ডট ও অন্যান্যরা ঠিক ক্লাসিকাল লিবারেল পর্ব থেকে চেষ্টা করে গিয়েছেন এই উপাদানগুলোকে জোড়া দেওয়ার এবং স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা ও অধিকার শনাক্ত করার। এটিকে কখনো কখনো “স্বাধীনতার সহজাত প্রবৃত্তি” নামে ডাকা হয়েছে যা মানব প্রকৃতির জ্ঞানতাত্ত্বিক অন্তঃসার—স্বাধীন সৃজনশীল চিন্তা এবং তার বহিঃপ্রকাশ।

    এইটা অনেকটা রূপক। যেমনটা আমি বলেছি, আসলে কেউই মানব প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু জানে না। সুতরাং আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে স্বাধীনতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি কি না। আমার কথার মানে হচ্ছে, কেউ যদি বলতে চায় যে মানুষের জন্মই হয়েছে দাসত্ব বরণ করার জন্য তাহলে সেইটার পক্ষেও সে সেই পরিমাণ বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ক হাজির করতে পারবে যে পরিমাণ যুক্তিতর্ক রুশো হাজির করেছিলেন মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায় এই মন্তব্যের জন্য। এটি নির্ভর করছে আপনার প্রত্যাশা কোথায় তার উপর, এমন নয় যে এই সংক্রান্ত কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আছে।

    আজকের দিনেও ব্যাপারটা সত্য। যেমন, আপনি সোশিওবায়োলজি সম্পর্কে মর্জিমাফিক যেকোন বই পড়তে পারেন। সেগুলোর অধিকাংশই রূপকথা মাত্র। এটি সেই পর্যায় পর্যন্ত ঠিকঠাক যতক্ষণ পর্যন্ত এটি পিঁপড়েদের নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু এটি যখন স্তন্যপায়ীদের নিয়ে কথা বলে তখন এটি অনুমান নির্ভর হয়ে উঠে। আর এটি যখন মানুষ সম্পর্কে কথা বলতে যায় তখন মাথায় যা আসে তাই বলে ফেলে। তবে আপনি এক প্রকার সম্ভাব্য শক্তিশালী যোগসূত্র দেখতে পাবেন। যোগসূত্রগুলোকে আদৌ বাস্তব রূপ দেওয়া সম্ভব কি না কে জানে? এটি বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার এত বাইরে যে আপনি স্বপ্নেও এটির কূল-কিনারা খুঁজে পাবেন না। আর এইটাই এইসব বিষয়ে খুব বেশি মন্তব্য না করার পেছনকার মূল কারণ। আমি শুধু ভাবি এগুলো আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার-স্যাপার এবং এইসব বিষয়ে আনমনে চিন্তা করা কিংবা সেগুলো নিয়ে কবিতা লেখা কিংবা অন্যকিছু করা হয়তো উত্তম কাজ হবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এগুলো স্বাভাবিকভাবেই কোনো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয় নয়।

    আর্টওয়ার্ক: স্প্যানিশ রেভুলিউশন
    সূত্র: ইউজিটি অ্যান্ড সিএনটি

    “এনার্কিজম” ও “লিবার্টারিয়ানিজম”

    নারী কণ্ঠ: অধ্যাপক চমস্কি, একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ, আপনি সচরাচর “বিশৃঙ্খলা” নামক যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন তার থেকে “এনার্কি” শব্দটার অর্থ আলাদা। 

    চমস্কি: হ্যাঁ। এটি মূলত একটি অর্থহীন প্রলাপ। এটি অনেকটা সোভিয়েত ঢং এর আমলাতন্ত্রকে “সমাজতন্ত্র” নামে ডাকার মতো কিংবা মতাদর্শিক লড়াইয়ের স্বার্থে কোনো ডিসকোর্সের একটি শব্দবন্ধের দ্বিতীয় অর্থ দাঁড় করানোর মতো ব্যাপার। আমি বলতে চাচ্ছি যে এনার্কি শব্দটার একটি অর্থ “বিশৃঙ্খলা” কিন্তু সমাজ বিষয়ক চিন্তাধারায় এই অর্থের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। সামাজিক দর্শন হিসেবে এনার্কি বলতে কখনোই “বিশৃঙ্খলা” বুঝায় না। প্রকৃতপক্ষে, এনার্কিস্টরা অত্যন্ত সংঘবদ্ধ সমাজে বিশ্বাস করে। এমন একটি সমাজ যা নিচ থেকে গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠিত।

    নারী কণ্ঠ: আমার মনে হয় সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে এনার্কিজম এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হাজির করেছিল যে শব্দটিতে কালিমা লেপন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। জনতার সমগ্র শব্দভাণ্ডার ও চিন্তা–ভাবনা থেকে শব্দটিকে গায়েব করার প্রয়োজন পড়েছিল যাতে শব্দটি শোনার সাথে সাথে তাদের চোখে মুখে ভয়ের প্রতিফলন ঘটে। 

    চমস্কি: হ্যাঁ, ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট লোকেরা এনার্কিজমকে সবসময়ই চরম অশুভ বলে বিবেচনা করেছে। তাই উড্রো উইলসনের লাল আতঙ্কের(যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৯ সালে পরিচালিত “নাশকতা” বিরোধী অভিযান) সময় তারা সমাজতন্ত্রীদের ব্যাপারে কঠোর ছিল কিন্তু খুন করেছিল এনার্কিস্টদের। এটি সত্যিই দুঃসংবাদ ছিল।

    দেখেন, মানুষ স্বাধীন জীবনযাপন করবে এই ধারণা ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তির জন্য অতীব ভয়ানক ব্যাপার। এই কারণে ১৯৬০ সালের কুখ্যাতি আছে। ষাটের দশক নিয়ে বিপুল সাহিত্য রয়েছে এবং তার অধিকাংশই লিখিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা কারণ তারাই সেই বর্গের লোক যারা বইপত্র লিখেন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এটির দুর্নাম ছিল কারণ তারা এদের ঘৃণা করত। সেই সময়কার ফ্যাকাল্টি ক্লাবের দিকে নজর দিলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা কেবল অনুকরণ না করে কেন প্রশ্ন করতে শুরু করেছে সেইটা ভেবে ভেবে তারা প্রায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এমনকি অ্যালান ব্লুমের (দ্য ক্লোজিং অব দ্য অ্যামেরিকান মাইন্ড-এর লেখক) মতো লোকেরা এমনভাবে লিখেছে যেন ষাটের দশকে সভ্যতার ভিত্তিগুলো ধ্বসে পড়ছিল। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে তা ঠিক-আসলেই  ধ্বসে পড়ছিল। কারণ তাদের কাছে সভ্যতার ভিত্তি হচ্ছে “আমি একজন বড় মাপের অধ্যাপক এবং আমি বলে দিব তোমরা কী বলবে, কী ভাববে আর সেইটাই তোমরা নোটবইয়ে টুকে নিবে এবং একই কাজ বারংবার করতে থাকবে”। যদি আপনি দাঁড়িয়ে বলে বসেন যে “আমার মাথায় ঢুকে না কেন আমাকে প্ল্যাতো পড়তে হবে, আমার কাছে এটি অর্থহীন বস্তু মনে হয়” তাহলে তা সভ্যতার ভিত্তিকে ধ্বংস করছে। কিন্তু এটি সম্ভবত যথেষ্ট বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রশ্ন- প্রচুর সংখ্যক দার্শনিক এই প্রশ্ন করেছেন সুতরাং কেন এটি একটি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রশ্ন হবে না?

    ষাটের দশকে সংঘটিত প্রত্যেক জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোর সাথে সাথে বিপুল সংখ্যক পাগলাটে কিসিমের ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু পাগলাটে কিসিমের ঐ ঘটনাগুলোই একমাত্র ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে। সেই সময়কার মূল ঘটনাগুলোকে ইতিহাস থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে কারণ সেইগুলোতে লিবার্টারিয়ান বৈশিষ্ট্য ছিল এবং ক্ষমতাবান লোকদের কাছে এর চেয়ে ভীতিকর আর কিছু নেই।

    পুরুষ কণ্ঠ: “লিবার্টারিয়ান” ও “এনার্কিস্ট” ব্যক্তিবর্গের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কী? 

    চমস্কি: আসলে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমি মনে করি তারা একই বস্তু। কিন্তু আপনি যুক্তরাষ্ট্রে “লিবার্টারিয়ান” শব্দটার বিশেষ অর্থ খুঁজে পাবেন। এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র মূল ধারার অনেক বাইরে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রে যেটিকে “লিবার্টারিয়ানিজিম” বলা হয় তা আসলে অবাধ পুঁজিবাদ। ইউরোপীয় লিবার্টারিয়ান ধারা সর্বদাই এটির বিরোধীতা করেছে যেখানে প্রত্যেক নৈরাজ্যবাদী একজন সমাজতন্ত্রী। এই বিরোধীতার কারণ হচ্ছে অবাধ পুঁজিবাদ আপনার আয়ত্তে আসা মানে আপনি সমস্ত কর্তৃত্বের মালিক-আপনি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ।

    পুঁজির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ মানেই হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য আমজনতাকে নিজেদের ভাড়ায় খাটাতে হবে। আপনি হয়তো বলতে পারেন যে, “তারা নিজেদেরকে স্বেচ্ছায় ভাড়া দেয়, এইটা একটা স্বাধীন চুক্তি”। কিন্তু এইটা আসলে তামাশা। “আমি যা বলি তাই করো নাহলে ক্ষুধায় মরবে”- এমন যদি হয় বাছাই করার শর্ত তাহলে এটি আদতে বাছাই করার অধিকার না। আঠারো-উনিশ শতকে শ্রম দাসত্ব/মজুরি দাসত্ব বলে সাধারণত যা পরিচিত ছিল এটি প্রকৃতপক্ষে সেই বস্তুই।

    “লিবার্টারিয়ানিজম” এর আমেরিকান সংস্করণ মূল বিচ্যুত হওয়া সত্ত্বেও কেউ আসলে এটিকে গুরুত্বসহকারে নেয় না। আমার কথার মানে হচ্ছে আমেরিকান লিবার্টারিয়ান নীতিতে চালিত কোনো সমাজ তিন সেকেন্ডে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে এই বিষয়ে সকলে অবগত। লোকে এইটাকে গুরুত্বসহকারে নেয়ার ভান করে কারণ এটিকে আপনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন ধরুন, কেউ যখন করের পক্ষে কথা বলতে আসবে তখন আপনি বলতে পারবেন- “না, আমি একজন লিবার্টারিয়ান এবং আমি করের বিপক্ষে” কিন্তু তবুও আমি সরকারের রাস্তা নির্মাণ, স্কুল বানানো, লিবিয়ানদের হত্যা ইত্যাকার সমস্ত কার্যক্রমকে সমর্থন করি।

    মুরে রোথবার্ড(আমেরিকান একাডেমিক) এর মতো কনসিসটেন্ট লিবার্টারিয়ানরাও আছেন। আপনি যদি তাদের বর্ণিত জগতের কথা পড়েন তাহলে দেখবেন সেই জগত এত ঘৃণায় পূর্ণ যে কোনো মানুষই সেখানে বাস করতে চাইবে না। এ এমন এক জগত যেখানে রাস্তা নেই কারণ আপনি যুক্তি খুঁজে পান না কোনো রাস্তা নির্মাণে কেন সহযোগিতা করবেন যে রাস্তা আপনি ব্যবহার করবেন না। আপনার যদি রাস্তার প্রয়োজন পড়ে তাহলে আপনি আরো একদল লোক যারা ঐ রাস্তা ব্যবহার করবে তাদেরকে নিয়ে রাস্তা বানাবেন। তারপর সেই রাস্তায় যাতায়াতের জন্য অন্য লোকের উপর কর ধার্য করবেন। আপনার যদি কারো মোটরগাড়ির দূষণ পছন্দ না হয় তাহলে আপনি সোজাসুজি আদালতে যান এবং তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেন। এমন জগতে কেইবা থাকতে চাইবে? এটি ঘৃণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা এক জগত।২

    পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ করার কিছু নেই। প্রথমত এটি এক সেকেন্ডের জন্যও ঠিকঠাক কাজ করবে না। আর যদি কাজ করেও তাহলে আপনি যা কিছু করতে চাইতেন তা হচ্ছে সেখান থেকে কেটে পড়া কিংবা আত্মহত্যা করা কিংবা অন্যকিছু। কিন্তু এটি একটি বিশেষ আমেরিকান বিচ্যুতি। এটি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার নয়।

    সচেতনতা ও কর্মতৎপরতা

    পুরুষ কণ্ঠ: প্রচুর সংখ্যক এক্টিভিস্ট যাদের সঙ্গে আমি কাজ করি তারা সকলেই এই ধারণা নিয়ে কাজ করে যে শুধুমাত্র জনগণকে সচেতন করতে পারলেই সবকিছুর সমাধান বের হবে এবং কোনো না কোনো পরিবর্তন আসবে। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিবাদে আমরা যখন নাগরিক অবাধ্যতার মতো কর্মসূচির প্রাক্কালে আমিও এমন ধারণাই পোষণ করতাম যে, এইসব প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা জনগণের কাছে আমাদের বার্তা তুলে ধরতে পারব। কিন্তু মনে হচ্ছে আসলে এইটাই শেষ কথা নয়। শিক্ষার পাশাপাশি আর কী কী কর্মপন্থা দরকার বলে আপনি মনে করেন?

    চমস্কি: শিক্ষা শুরুয়াদ মাত্র। তাছাড়া এমন পরিস্থিতিও আসবে যখন সবাই সচেতন হয়ে আপনার পক্ষে দাঁড়াবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা কিছুই করতে পারছে না। যেমন, হাইতির দিকে তাকান। হাইতির ৯০ শতাংশ লোক কী চায় সেইটা সম্পর্কে কেউ সন্দিহান বলে আমার মনে হয় না। তারা সেইটা সম্পর্কে অবগত। কিন্তু খুন হওয়া ছাড়া তাদের পক্ষে কোনকিছু করা সম্ভব না। সুতরাং আস্ত একটি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে আপনাকে যেতে হবে এবং সেটার শুরু সচেতনতা দিয়ে। সচেতন না হয়ে আপনি কিছুই করবেন না। আপনার করণীয় কী সেইটা সম্পর্কে অবগত না হয়ে অবশ্যই কোনকিছু করতে যাবেন না। সংজ্ঞানুসারে এইটাই শুরুর কথা। কিন্তু প্রকৃত সচেতনতা আসে বিশ্ব সম্পর্কে চর্চা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এমন নয় যে, আপনি প্রথম সচেতন হবেন তারপর কিছু করতে শুরু করবেন। আপনি সচেতন হয়ে উঠবেন আপনার কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

    উদাহরণস্বরূপ, আপনি সংস্কারবাদী রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন সেইটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই। আমার অভিমত হচ্ছে, সকল সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা উচিত কারণ মাঝেমধ্যে জনগণের উপকারে আসে এমন কিছু হিতকর ফলাফলও পেতে পারেন। অনতিবিলম্বে আপনি সীমাবদ্ধতাগুলোকে সনাক্ত করতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন সীমাবদ্ধতার সূত্রগুলো। আপনি এমন সচেতনতা অর্জন করবেন যা বক্তৃতা শুনে অর্জন করতে পারবেন না। আমার কথার মানে হচ্ছে ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে সে সংক্রান্ত সমস্ত পছন্দসই বক্তৃতা আপনি শুনতে পারেন কিন্তু আপনি তখনই খুব দ্রুত শিখতে পারবেন যখন প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার মুখোমুখি হবেন, বক্তৃতা শোনা ছাড়াই। সুতরাং সচেতনতা ও কর্মতৎপরতার মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটে এবং পরিবর্তনের স্বার্থে আপনাকে সহিংস বিপ্লবী সংগ্রামের মতো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন ধরুন, হাইতির জনগণ যদি সেইখানকার মিলিটারিকে উৎখাত করার মতো শক্তিশালী কোনো অবস্থানে থাকত তাহলে তাদের তাই করা উচিত ছিল বলে আমার অভিমত। কখনো-সখনো এমন পরিণতিই ঘটে।

    ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করছি, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিবাদে নাগরিক অবাধ্যতা প্রদর্শনী বিক্ষোভগুলো সম্পর্কে আমার কতিপয় বন্ধুর সাথে আমার অনেক মতানৈক্য ছিল। প্লাউশেয়ারসে (নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এক দল মানুষ) যে মানুষগুলো সম্পৃক্ত ছিল তাদের মতো মানুষদেরকে আমি আসলেই শ্রদ্ধা করি। আমি মনে করি এই সবই হচ্ছে কৌশলগত দিক। যেমন কোনো মিসাইলের সম্মুখশঙ্কু থেঁতলে দিবেন কি না সেইটার সাথে কোনো মূলনীতির প্রশ্ন জড়িত বলে আমি মনে করি না। এটি আপনার ও ঈশ্বর কিংবা অন্যকিছুর মধ্যবর্তী চুক্তির মতো কোনো ব্যাপার নয়। মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, এই কর্মসূচি কী কী প্রভাব ফেলেছে? সেই বিষয়ে আমার ভাবনা হচ্ছে প্রভাবগুলো ছিল নেতিবাচক। আমার মনে হয় তারা যে কর্মসূচি নিয়েছিল তার প্রভাবগুলো হচ্ছে- প্রথমত, রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়া কারণ তারা বিশ বছরের জন্য কারাবরণ করতে যাচ্ছিল এবং একই সাথে আদালতের পেছনে অঢেল অর্থ ও শ্রম নষ্ট করতে যাচ্ছিল যেটি সবচেয়ে জঘন্য স্থান। আমি বলতে চাচ্ছি, যেহেতু আদালতের পেছনে আপনাকে অঢেল সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় করতে হচ্ছে সুতরাং আদালতের বাইরে থাকতে পারলেই আপনার সৌভাগ্য। দ্বিতীয়ত, আমি মনে করি না যে তাদের বার্তা জনগণ অব্দি পৌঁছাতে পেরেছিল কারণ তারা এটির জন্য আগে থেকে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেনি। এমন কোনো শহর কল্পনা করুন যার বাসিন্দাদের মিসাইল তৈরির কারখানায় কাজ করা ব্যতীত জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো রাস্তা নেই এবং কেন আমাদের মিসাইলের দরকার নেই সেই বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নয়। সেই শহরে যদি আপনি মিসাইলের সম্মুখশঙ্কু থেঁতলে দেয়ার মতো কর্মসূচি পালন করেন তাহলে এমন কর্মসূচি শহরের বাসিন্দাদের আদৌ কোনো বার্তা দিবে না বরং তাদেরকে ক্ষিপ্ত করে তুলবে।

    সুতরাং আমার মনে হয় এই কৌশলগত দিকগুলো নিয়ে খুব সতর্কভাবে ভাবতে হবে। অধিক নিশ্চয়তার সহিত আপনি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবেন না। তবে আপনার গৃহীত কৌশলের কী প্রভাব পড়তে পারে তা আপনাকে আন্দাজ করতে হবে। সেই প্রভাব যদি হয় সচেতনতা তৈরি তাহলে ভালো। কিন্তু সচেতনতা শুরুয়াত মাত্র কারণ সচেতন হওয়ার পরও লোকে কোনকিছু নাও করতে পারে। যেমন তারা হয়তো চাকরি হারানোর ভয়ে ভীত। এই দুশ্চিন্তার জন্য আপনি অবশ্যই তাদের সমালোচনা করতে পারেন না। তাদের বাচ্চাকাচ্চা আছে এবং তাদেরকে খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। এই ভাবনা যথেষ্ট যুক্তিসম্মত। আপনার অধিকার অর্জনের জন্য লড়াই করা কঠিন। সেজন্য আপনাকে প্রায়শই ভুগতে হবে।

    পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আন্দোলন

    নারী কণ্ঠ: যে সংগঠনগুলো সঠিক পথে যাচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন সেই সংগঠনগুলোর কাছ থেকে আমরা কী শিখতে পারি বলে আপনার ধারণা?

    চমস্কি: আচ্ছা। আমাদের চারপাশে বিপুল সংখ্যক গোষ্ঠী আছে যাদের কাজকর্ম আমার কাছে খুব গঠনমূলক মনে হয় না। যদিও আমি সেগুলোর কোন কোনটার সদস্য এবং তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করি। উদাহরণস্বরূপ পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি সংক্রান্ত প্রচারাভিযানের কথাই ধরুন। আমার সত্যিই মনে হয়েছিল যে তারা ভুল পথে এগুতে যাচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি সংক্রান্ত প্রচারাভিযান এক অর্থে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও সংগঠিত জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোর একটি। তারা এমন এক সময় পারমাণবিক অস্ত্রবিরতির পক্ষে ৭৫ শতাংশ আমেরিকান জনগণের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল যখন কোনো সংবাদপত্র, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি কেউই প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের সমর্থনে প্রচার চালায়নি।৩ সেই অর্থে এটি একটি বিস্ময়কর অর্জন ছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটি কোনো অর্জন ছিল বলে আমি মনে করি না। আমার মনে হয়েছিল যে অস্ত্রবিরতি আন্দোলন ভেঙে পড়তে যাচ্ছে এবং সত্যিই তা ভেঙে গেল। আর এই আন্দোলন ভেস্তে যাওয়ার কারণ হলো এটির অন্য কোনো ভিত্তি ছিল না শুধুমাত্র পিটিশনে স্বাক্ষর করা ছাড়া।

    আমার কথার মানে হচ্ছে, আপনারা পিটিশনে স্বাক্ষর নিয়েছেন, সে ভালো কথা। কিন্তু ঐটাই আন্দোলনের সমাপ্তি ছিল। আপনারা বাড়ি ফিরে গেলেন এবং আগের মতো প্রাত্যহিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সেটির কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না, কোনো প্রকার প্রকাশ্য বা লিখিত অঙ্গীকার ছিল না। এটি এমন কোনো টেকসই কর্মতৎপরতা ছিল না যা সক্রিয় কোনো কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে আমি যে সকল ভয়ঙ্কর/অপ্রীতিকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখি সেগুলো এই ধরনের।

    তবে আমাদের যদি সুপ্রতিষ্ঠ জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান থাকত তাহলে আমরা কিভাবে ব্যর্থ হয়েছিলাম তা স্মরণ করতে পারতাম। অন্য কাউকে একই কাজ আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হতো না এবং একই ভুল করতে হতো না। আমাদের জানা উচিত যে এটি কোনো কিছু করার আসল তরিকা নয়। পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আন্দোলন মূলত জনতার মতামত গ্রহণ ও দানের সমার্থক হয়ে উঠল। তারা লক্ষ করল যে যত সংখ্যক লোক পারমাণবিক অস্ত্র খাতে সরকারের অর্থায়ন চায় তার চেয়ে তিনগুণ লোক চায় চিকিৎসা ও অন্যন্য খাতে সরকার এই টাকা ব্যয় করুক। তাতে কি? তারা এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিল? কিছুই না। সুতরাং পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আন্দোলনের সাথে যে লোকজন যুক্ত ছিল তারা শুধুমাত্র মতামত প্রদানের মাধ্যমে তাদের কাজ শেষ করল। এটিকে সংগঠিত করা বলে না।

    আমার মনে হয় এমন বহু অপ্রীতিকর কর্মকাণ্ড আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত কোথাও পৌঁছাতে দেয়নি। আসলে এরূপ কর্মকাণ্ড আন্দোলনকে নিঃশেষ করেছে। আমি বলতে চাচ্ছি- আপনারা এত মানুষ পেলেন যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিল এবং তারা প্রচুর খেটেছে। তারা এত পরিমাণ স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিল যে আপনারা চাইলে এটিকে দেশের প্রায় সবাই পারমাণবিক অস্ত্র বিরতি চায় বলে দেখাতে পারতেন। তারপর তারা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কনভেনশনে (১৯৮৪ সালে) গেল এবং তাদের আন্দোলনের ফলাফলগুলো তুলে ধরল। সেখানে উপস্থিত সকলেই বলল, “বিস্ময়কর! এটি আসলেই চমৎকার যে আপনারা এই কাজটি করেছেন। আমরা সব উপায়েই আপনাদেরকে সাহায্য করব।” অতঃপর ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচন লড়তে গেল এবং আর কখনোই অস্ত্র বিরতির কথা উচ্চারণ করেনি। শুধুমাত্র যে কতিপয় শহরে এই প্রসঙ্গ তুললে সহজে কিছু ভোট আদায় করা যাবে সেখানে গিয়ে বক্তৃতাবাজি করেছে—আপনারা জানেন “আমরা এই শহরে এসেছি আবার স্মরণ করিয়ে দিতে যে আপনারা এই কথাগুলো বলতে চান…”। এই প্রকার কর্মকাণ্ড জনগণকে হতাশ করেছে এবং আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করেছে। ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে এবং কিভাবে আপনি পরিবর্তনকে প্রভাবিত করবেন ইত্যাদি সম্পর্কে বিভ্রম নিয়ে শুরু করার কারণেই এই মাশুল দিতে হয়েছে। আমাদের অবশ্যই এই সংক্রান্ত বিভ্রম থাকা উচিত না, যেমনটা থাকা উচিত না সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদেরকে ঠিক তথ্য দিচ্ছে কি না সেই সম্পর্কেও। আপনি যদি ভ্রমে না থাকেন তাহলে আপনাকে ব্যর্থতার আগুনে পুড়ে খাক হতে হবে না। আমরা এই সকল ভ্রম মুক্ত হতে পারি আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতিসাধনের মাধ্যমে যেখান থেকে আমরা এরূপ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে শিক্ষা নিতে পারব।

    বিশাল এক সাংগঠনিক প্রয়াস যেখানে প্রত্যেকেই পিটিশনে স্বাক্ষর করেছে এবং কিছু লোক এই ইস্যুকে ১৯৮৪ সালের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে কিন্তু তাতে আদৌ কোনো প্রভাব পড়েনি; তার ঠিক এক বছর পর মিখাইল গর্বাচেভ (সোভিয়েত নেতা) এক তরফা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করলেন এবং তারপরও কোনো প্রভাব পড়ল না। এইসব দেখার পর আমাদের উচিত ছিল সেখান থেকে কিছু শিক্ষা নেয়া।৪ তারপর পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আন্দোলনের সংগঠকরা এমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। সংগঠকদের প্রতিক্রিয়া এমন ছিল না যে, “আচ্ছা, আমরা সম্ভবত ব্যাপারটা কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে ভুল বুঝেছি” বরং প্রতিক্রিয়া ছিল এমন, “আমরা ঠিক কাজটাই করেছিলাম কিন্তু আমরা আংশিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি—আমরা জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু এলিটদেরকে বুঝাতে সক্ষম হইনি। সুতরাং চলুন এবার এলিটদেরকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি”। আপনারা জানেন, “আমরা বিভ্রান্ত কৌশল বিশ্লেষকদের সাথে কথা বলব—আমরা যা বুঝি তা তারা বুঝতে পারছে না। আমরা তাদেরকে ব্যাখ্যা করে বলব কেন পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে”। প্রকৃতপক্ষে অনেকগুলো অস্ত্রবিরতি আন্দোলনের পরিণতি এমনই হয়েছিল—জনগণ আন্দোলন থেকে সটকে পড়ল এবং তারা ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ ও ইত্যাকার শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে কৌশল বিশ্লেষকদের “বুঝাতে” চারদিকে বেরিয়ে পড়ল।৫

    এটি সে উপায়গুলোর একটি যার মাধ্যমে আপনারা এখনো কিছু করছেন এমনটা বিশ্বাস করার জন্য ধাপ্পাবাজি করতে পারেন যখন নাকি আপনারা আসলে ঘুষ প্রাপ্ত। কারণ এলিটরা এইটা বলতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে- “ওহ, আসুন, আমাকে রাজী করান”। এই ব্যাপারটাই আপনাদেরকে সংগঠিত হওয়া এবং জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে। এটিই আন্দোলনের ভাঙ্গন ঘটাচ্ছে কারণ আপনি এখন কতিপয় এলিট ভদ্রলোকদের সাথে আলাপ পাড়ছেন এবং এই কাজ আপনি সারাজীবন করে যেতে পারবেন। পারমাণবিক অস্ত্রবিরতির পক্ষে আপনাদের দেয়া একটা যুক্তির জবাবে তারা আপনাদেরকে পাল্টা আরেকটা যুক্তি দিবে এবং এটি শুধু চলতেই থাকবে। আপনারা এমন মাননীয়দেরও নাগাল পাবেন যারা আপনাদেরকে হার্ভার্ড ফ্যাকাল্টি ক্লাবে মধ্যাহ্নভোজের জন্য দাওয়াত দিবে। প্রত্যেকেই আপনাদের কথা মন দিয়ে শুনবে এবং আপনাদেরকে সমাদর করবে। সবকিছুই চমৎকার মনে হবে। পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি আন্দোলনটি প্রকৃতপক্ষে এই অভিমুখেই ধাবিত হয়েছিল এবং এটি ছিল একটি ভুল। ইত্যাকার ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকতে হবে এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আপনারা এলিট সার্কেলে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন মানে এই সম্ভাবনা প্রবল যে আপনারা ভুল কিছু করছেন। খুব সাধারণ কারণেই। যারা তাদের ক্ষমতাকেই মাটি চাপা দিতে চাচ্ছে তাদেরকে তারা সমীহ করবে কেন? তার কোনো মানে হয় না।

    নো পাসারান
    পোস্টার

    প্রতিরোধ বিষয়ক শিক্ষা

    নারী কণ্ঠ: সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কাজ করে এবং তারা কিভাবে জনগণকে নিজেদের ভালো-মন্দ স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা করা থেকে বিরত রাখে- ইত্যাকার ধারণাগুলো যাতে জনগণ বুঝে উঠতে পারে সেজন্য কোথা থেকে শুরু করা উত্তম বলে আপনি ভাবেন?

    চমস্কি: আচ্ছা। সত্য হচ্ছে এগুলোর কোনটিই খুব কঠিন কিছু বলে আমার মনে হয় না। বুদ্ধিজীবীরা সহজ কথা কঠিন করে বলার ক্যারিরায় গড়ে তুলেন কারণ তাঁদেরকে যেসব কাজের জন্য মাইনে দেওয়া হয় এই কাজ তার অংশ বিশেষ। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে, সামাজিক পৃথিবীর যদ্দুর আমরা বুঝতে পারি তা অল্পবিস্তর আমাদের সামনে ও পেছনে বিরাজমান। চোখের ঠুলি একটু আলগা করলেই দেখা যায়। আপনার একক প্রয়াসে এই পৃথিবীকে বুঝে উঠা বড়ো কঠিন। তবে যে ধরনের পারস্পারিক আদান-প্রদান ও সংঘবদ্ধ কর্ম তৎপরতার কথা আমরা আলাপ করছি সেগুলোর মাধ্যমে খুব সহজেই বুঝে উঠতে পারবেন।

    সুতরাং জনগণের সাথে মোলাকাত কিংবা আলাপ করার সুযোগ হলে যে কাজটি আপনি করতে পারেন তা হচ্ছে- তাদের নিজেদের ভাল-মন্দ অনুসন্ধান করার তরিকা আত্মস্থ করতে সাহায্য করা। যেমন, প্রচারমাধ্যম ম্যানিপুলেশন ও নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে যে তরিকায় বিভিন্ন ইস্যুকে আকার-আকৃতি দেয় তা যাতে তারা নিজে নিজেই বুঝতে পারে সে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। এটি কিভাবে কাজ করে সে সংক্রান্ত কিছু তত্ত্ব আওড়ানোর মতো বিমূর্ত ধারণা দেয়ার কোনো মানে হয় না। যে কাজটি আপনার করা উচিত তা হচ্ছে সে সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করা।

    সুতরাং যে ঘটনাগুলোর প্রতি জনগণের আগ্রহ আছে সে ঘটনাগুলোকে বেছে নিন এবং কিভাবে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করবেন সে সম্পর্কে তাদেরকে শিক্ষা দিন। গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা খুব সহজ, সেজন্য আপনাকে পিএইচডি করার দরকার নেই। পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করতে গেলে হয়তো প্রয়োজন পড়বে কিন্তু এই সকল বিষয়ে তার কোনো দরকার নেই। শুধুমাত্র আপনার কমনসেন্সের দরকার পড়বে। আপনার কমনসেন্স থাকতে হবে এবং আপনাকে তথ্যগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টিপাত করতে হবে। সেগুলোর ভেতর থেকে সত্য উদঘাটন করতে হয়তো একটু কষ্ট করতে হবে কারণ সচরাচর আপনি পত্রিকার শিরোনাম কিংবা অন্যকিছুতে সেই প্রকৃত তথ্যগুলো খুঁজে পাবেন না। কিন্তু আপনি যদি একটু কষ্ট করেন তাহলে প্রকৃত তথ্যগুলো জানতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই সত্যগুলোকে কিভাবে বিকৃত ও পরিবর্তন করেছে তা বুঝতে পারবেন। তৎক্ষণাৎ সে সকল বিকৃতির উদ্দেশ্য আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

    পুরুষ কণ্ঠ: একজন শিক্ষক কিংবা সংগঠক হিসেবে জনগণের আগ্রহ উদ্দীপিত করার জন্য কোনটি সর্বশ্রেষ্ঠ পথ তা বুঝা কঠিন। কিন্তু কিছু করা থেকে বিরত থাকার জন্য অসংখ্য পথ আছে, এমনকি আপনি যখন কিছু করার জন্য হাজির হচ্ছেন তখনও। নাগরিক অবাধ্যতা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তরে আগে আপনি প্রতিরোধ বিষয়ক বক্তৃতা দেয়া লোকদের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি আমার কাছে কিছু না করেও কিছু করার ভান ধরার মতো ঠেকে।   

    চমস্কি: আচ্ছা। জনগণকে উদ্দীপিত করার জন্য এটি কোনো কাজের কাজ না সে রকমটা ভাবতে আমি আসলে রাজি নই। যেমন, আমি মনে করি যে জনগণকে প্রতিরোধ বিষয়ক শিক্ষা দেয়ার মতো অনেক ব্যাপার স্যাপারও আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সে সকল মানুষের কাছে শুনতে চাই যারা সেই সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তাদের মাথায় হয়তো সেই সংক্রান্ত এমন অনেক চিন্তাধারা আছে যা আমার মাথায় নেই। আপনি যদি একে “বক্তৃতাবাজি” বলতে চান তাতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এটি অবশ্যই ভুল নয় যে দুনিয়াতে বহু জিনিস আছে যা আপনি অন্য লোকের কাছ থেকে শিখতে পারেন, যারা সেই সব ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেন এবং যাদের সেইসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে।

    পুরুষ কণ্ঠ: তাছাড়া জনগণকে প্রতিরোধ ও এক্টিভিজম বিষয়ে শিক্ষা দিতে আমাদেরকে কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

    চমস্কি: প্রথমত, আমি মনে করি আপনার উচিত নয় জনগণকে ভুল পথে পরিচালিত করা। তাদেরকে এইটা বুঝানো উচিত যে তারা যদি স্বাধীন চিন্তক হতে চায় তাহলে তাদেরকে সেজন্য সম্ভবত মাশুল দিতে হবে। মানে হচ্ছে, প্রত্যেককেই পৃথিবীটা কিভাবে চলে সেই সংক্রান্ত বোঝাপড়া দিয়েই শুরু করা উচিত- এই পৃথিবী সততা ও স্বাধীনতাকে আদৌ পুরস্কৃত করে না বরং পুরস্কৃত করে আনুগত্য ও দাসত্বকে। এই পৃথিবী কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার এবং যারা ক্ষমতাবান তারা আদৌ সেই সকল মানুষকে পুরস্কৃত করবে না যারা ঐ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে। সুতরাং শুরুতেই কাউকে এই বিষয়ে ভুল ধারণা দেয়া উচিত না।

    এই বিষয়ে বোঝাপড়া হওয়ার পর আপনি আপনার পছন্দসই পথ বাছাই করুন। আপনাকে কী ধকল পোহাতে হবে তা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও আপনি যদি যে কোনো উপায়ে স্বাধীন হতে চান তাহলে আপনার সেই পথেই পা বাড়ানো উচিত এবং আপনি সেই চেষ্টাই করুন। কিন্তু আপনি যে পথ বেছে নিচ্ছেন কোনো কোনো সময় তা চরম বন্ধুর প্রতিপন্ন হতে পারে। যেমন ধরুন, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ লোক হিসেবে তরুণ-তরুণীরা প্রায়শই আমাকে চেপে ধরেন উপদেশ দেয়ার জন্য। এমন কোনো সিদ্ধান্ত দিতে আমি সর্বদা খুব বিব্রত বোধ করি (যদিও আমি মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতির শিকার হই যে আমাকে বাধ্য হয়ে উপদেশ দিতে হয়) কারণ আমি কে কী সিদ্ধান্ত নিবে সেইটা বলে দেয়ার মতো কোনো অবস্থানে নেই। কিন্তু যে কেউ যে কাজটা করতে পারে বলে আমি মনে করি তা হচ্ছে জনগণকে রূঢ় বাস্তবতাগুলো বুঝতে সাহায্য করা।

    দেখুন, আপনি এক্টিভিজমের মাধ্যমে অনেক কিছুই হয়তো অর্জন করতে পারবেন যেমনটা আপনারা সবাই একটু আগে বলছিলেন। কিন্তু এমন অনেক জিনিসও আছে যা আপনি হারাতে পারেন এবং সেই সব জিনিসের কোন কোনটা আদৌ অগুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন ধরুন, নিরাপত্তা-এটি কোনো তুচ্ছ ব্যাপার নয়। আর কে কী করতে যাচ্ছে সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ই তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনায় নিতে হবে।

    নেতা ও আন্দোলন

    নারী কণ্ঠ: একজন এক্টিভিস্ট হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সবাইকে এই সত্য উপলব্ধি করানো যে আমরা এইসব এক্টিভিজমে আনন্দ পাই এবং আমাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা ঋদ্ধ হয়ে উঠি। আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে সেই ধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে চাই যে ধরনের সংগঠনের কথা আপনি বলছেন তাহলে আমাদেরকে অধিক পরিকল্পিত হতে হবে অনেকটা সদস্য সংগ্রহের মতো। প্রায়শই “এক্টিভিস্ট” বলতে জনগণের চোখে যে প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে তা হচ্ছে সর্বদা পুড় খাওয়া কোনো মানুষ। আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেটি জনগণের কাছে আকর্ষণীয় ও উদ্দীপক ঠেকবে যাতে এমনটি মনে না হয় যে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু র‍্যাডিকাল স্লোগানগুলোই জপে যাচ্ছি। 

    চমস্কি: দেখুন, যে মানুষজন সত্যিকার অর্থে সামাজিক আন্দোলনগুলো সফল করেছিল তারাও এইসব কাজ করেছিল বলে আমার ধারণা। তাদেরকে ইতিহাস থেকে বাদ দেয়া হয়েছে- কোনো বইয়েই তাদের নামোল্লেখ করা হয়নি, সামাজিক আন্দোলনগুলোকে সত্যিকার অর্থে যারা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই দিয়েছিল তাদের নাম কেউই জানে না। কিন্তু সবসময় এমন ঘটনাই ঘটেছে বলে আমার ধারণা।

    এমনকি ১৯৬০ সালের যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলনের মতো সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলগুলোর ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারগুলো সত্য। ইদানিংকালে এমন অসংখ্য বই বের হচ্ছে যা আপনাকে তথ্য দিবে এস. ডি. এস. (স্টুডেন্টস ফর অ্যা ডেমোক্রেটিক সোসাইটি) এর কার্যালয়ে কী ঘটেছিল কিংবা এক ভদ্রলোক অপর ভদ্রলোককে কী বলেছিল। কিন্তু ষাটের দশকে সংঘটিত যুদ্ধ বিরতি আন্দোলন কেন এত ব্যাপক গণ আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল সেইটা সম্পর্কে মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন অনুভব করেনি। আমার ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি কারা সেই আন্দোলনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের কথা আমার মনে আছে। আমার মনে আছে এই শিক্ষার্থীরাই বিক্ষোভ কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করেছিল এবং সেই কারণেই আমি সেখানে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। তারা অন্য লোকদেরও সম্পৃক্ত করার জন্য সেখানে নিয়ে আসছিল। তারা তাদের কাজকর্ম উপভোগ করছিল এবং সেই ব্যাপারে অন্য লোকদের সাথেও কোনো না কোনোভাবে বার্তা আদান-প্রদান করছিল। এইগুলোই জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোকে সফল করেছিল। কিন্তু এইটা নিশ্চিত যে এই সবই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবে-রয়ে যাবে শুধু উপরে ভেসে থাকা ফেনাগুলো।

    পুরুষ কণ্ঠ: মার্টিন লুথার কিং কিংবা মহাত্মা গান্ধীর মতো বিখ্যাত পরিবর্তনকামী নেতাদের নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে আগ্রহী। আপনার বক্তৃতায় কখনো তাঁদের নামোল্লেখ করেছেন বলে মনে হয় না, কেন?

    চমস্কি: আচ্ছা। মার্টিন লুথার কিং এর কথাই ধরা যাক। দেখুন, মার্টিন লুথার কিং একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু তিনি পরিবর্তনের বড় কোনো প্রতিনিধি ছিলেন বলে আমি মনে করি না। বরং মার্টিন লুথার কিং পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছিল কারণ পরিবর্তনের প্রকৃত প্রতিনিধিরা ব্যাপক কর্মযজ্ঞে লিপ্ত ছিলেন। আর তাঁরাই ছিলেন পরিবর্তনের প্রকৃত প্রতিনিধি যারা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছিলেন। উদাহরণ হিসেবে এস. এন. সি. সি. (স্টুডেন্ট ননভায়োলেন্ট কোঅর্ডিনেটিং কমিটি) এর কর্মীদের কথা বলা যায়।

    দেখুন, আমজনতাকে ক্ষমতাহীন করে রাখার পুরো প্রক্রিয়ার অন্তর্গত কৌশল হচ্ছে পরিবর্তনের প্রকৃত প্রতিনিধিদের ইতিহাস থেকে ছুঁড়ে ফেলা এবং তাঁদের কৃতিত্বকে কখনোই সেই সংস্কৃতিতে স্বীকৃতি না দেয়া। তাই ইতিহাস বিকৃত করার প্রয়োজন পড়ে যেন ইতিহাসের সব অর্জনকেই মহামানবদের কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এইটা সেই দীক্ষায়ন প্রক্রিয়ার অংশ যা আমজনতাকে এই শিক্ষা দেয় যে তারা অক্ষম, তারা অসহায় এবং তাদেরকে এমন কোনো মহামানবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে যিনি তাদের হয়ে কার্য সম্পাদন করে দিয়ে যাবে।

    কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত নাগরিক অধিকার আন্দোলনগুলোর দিকে তাকান। উদাহরণস্বরূপ রোজা পার্কসের কথাই ধরুন যিনি ১৯৫৫ সালে জাতিগত/বর্ণ বৈষম্যের প্রতিবাদে মন্টগোমারি বাস বয়কট আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিল। রোজা পার্কসের গল্পটা এমন- এই নির্ভীক কালো নারী হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিল যে, “অনেক সহ্য করেছি, আর নয়। আমি আর বাসের পেছনের সিটে বসব না।” সে ভালো কথা কিন্তু এইটা অর্ধসত্য। রোজা পার্কস এমন এক সুসংগঠিত কমিউনিটি থেকে উঠে এসেছিল যার অতীত খুঁড়লে কমিউনিস্ট পার্টি, হাইল্যান্ডার স্কুল (রাজনৈতিক সংগঠকদের শিক্ষাদান করার জন্য তৈরি একটি টিন্নিস স্কুল) ও ইত্যাকার প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পাওয়া যাবে।৬  কিন্তু এটি এমন এক কমিউনিটি যার বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে কাজ করছিল এবং এই বর্ণ-বৈষম্যমূলক সিস্টেমকে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তে ছিল সংকল্পবদ্ধ। রোজা পার্কস সেই পরিকল্পনার কেবলমাত্র একজন প্রতিনিধি ছিল।

    আর এইসব কাহিনী ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি। ইতিহাসে যা ঠাঁই পেল তা হচ্ছে এক ব্যক্তির সাহসী কীর্তিকলাপ। কিন্তু তা তাঁর একক প্রয়াসে হয়নি। কোনো মানুষই নিজের একক প্রয়াসে কিছু করে ফেলে না। রোজা পার্কস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষের এক সুসংগঠিত কমিউনিটি থেকে উঠে এসেছিল, যারা দীর্ঘদিন যাবৎ এক হয়ে কাজ করে যাচ্ছিল পরিবর্তনের স্বার্থে। আর এইভাবেই সর্বদা আন্দোলনগুলো সফল হয়েছে।

    মার্টিন লুথার কিং এর বেলায়ও এই কথা সত্য- তিনি জনসম্মুখে এসে বক্তৃতা দিতে পেরেছিলেন কারণ এস. এন. সি. সি., ফ্রিডম রাইডার্স ও অপরাপর সংগঠনের কর্মীরা পূর্বেই এই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে রেখেছিল। সেজন্য তাদেরকে নির্মম নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল ঢের সুবিধাপ্রাপ্ত তরুণ-তরুণী। মনে রাখবেন, তারা এই পথ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিল, বাধ্য হয়ে এই পথে আসেনি। তারাই ছিল নাগরিক অধিকার আন্দোলনের চালিকা শক্তি। মার্টিন লুথার কিং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল কারণ উনি সেখানে উঠে দাঁড়াতে পেরেছিল এবং ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। কিন্তু বাকি লোকেরাই ছিল নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মূল স্রোত। আমি নিশ্চিত যে উনিও প্রসঙ্গক্রমে একই কথা বলতেন কিংবা অন্ততপক্ষে এইটুকু বলা উচিত ছিল।

    গান্ধীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর সম্পর্কে আসলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষেরাই গান্ধীর এই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার ভিত্তি প্রস্তুত করতে কাজ করেছিল এবং এক প্রকার তাঁর ভাবনা প্রচারে সহায়তা করেছিল। আপনি যদি অপরাপর জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোর দিকে তাকান তাহলে একই জিনিস দেখতে পাবেন বলেই আমার ধারণা।

    অহিংসা

    পুরুষ কণ্ঠ: চমস্কি সাহেব, আমরা কর্পোরেট পুঁজিবাদকে অহিংস পন্থায় কিন্তু খুবই দৃঢ় ও সুসংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে বিকল করে দিতে পারব এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার দখল নিয়ে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পারব–এই আশা সবসময়ই লালন করেছি। আমি বিস্ময় নিয়ে জানতে চাচ্ছি, অহিংস পন্থায় এমন আশাবাদ ব্যক্ত করাকে আপনি আদৌ বাস্তবসম্মত মনে করেন কি? সহিংসতার সর্বজনীন ব্যবহার সম্পর্কে আপনার ভাবনা কী?

    চমস্কি: আচ্ছা। যেমনটা আমি বলি- কেউই আসলে কৌশল/উপায় সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না। অন্তুতপক্ষে আমি জানি না। কিন্তু আমি মনে করি এই অহিংসা প্রশ্নে আপনাকে সবিস্তারে ভাবতে হবে। আমি বলতে চাচ্ছি যে, যদি সম্ভব হয় প্রত্যেকেই অহিংসভাবে সব কিছু সম্পাদন করার চেষ্টা করে। তাহলে সহিংসতার দরকারটাইবা কি? কিন্তু আপনি যখন ক্ষমতাকে আক্রমণ করা শুরু করবেন তখনই আপনার অধিকারগুলোকে আগলে রাখার প্রয়োজন পড়বে এবং অধিকারগুলোকে রক্ষা করার প্রয়োজনেই আপনার মাঝেমধ্যে সহিংসতার দরকার পড়বে। তারপর আপনি সেটা ব্যবহার করবেন কি করবেন না সেইটা নির্ভর করবে আপনার নৈতিক মূল্যবোধের উপর।

    আমেরিকার শ্রমিক ইতিহাসের দিকে তাকান। এই শতকের প্রথমার্ধে শত শত আমেরিকান শ্রমিকদেরকে খুন করেছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। শুধুমাত্র তাদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য।৭ যুক্তরাষ্ট্রের অস্বাভাবিক সহিংস শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। কার্যত এতই সহিংস ছিল যে আপনি যদি ১৮৯০ সালের ডানপন্থী বৃটিশ সংবাদ মাধ্যমগুলোতে নজর দেন- যেমন লন্ডন টাইমস এর মতো  ডানপন্থী বৃটিশ সংবাদপত্রগুলো কখনোই বুঝতে পারেনি আমেরিকান শ্রমিকদের সাথে কি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছিল। শ্রমিকদেরকে যে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল তাও তারা বুঝতে চায়নি।৮ এইটা এই কারণে নয় যে শ্রমিকরা সহিংস আচরণ করতে শুরু করেছিল বরঞ্চ এই কারণে যে ক্ষমতাবান লোকেরা সহিংস পন্থায় তাদের ক্ষমতা আগলে রাখছিল। আর এই ক্ষমতাই শ্রমিক জনতাকে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল।

    আপনি যদি শান্তিবাদী কিংবা এমন কিছু হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে এই মুহূর্তে এসে নিজেকেই কিছু প্রশ্ন করতে হবে- জনগণকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে আক্রান্ত করা হলে জনগণ কি নিজেদের রক্ষার্থে পাল্টা বল প্রয়োগ করতে পারবে? এইটা ঠিক যে এই ক্ষেত্রে মানুষের মূল্যবোধের তফাৎ থাকতে পারে কিন্তু আপনাকে অন্ততপক্ষে এই প্রশ্নগুলো করতে হবে।

    আমার নিজস্ব অভিমত হচ্ছে যে, জনপ্রিয় আন্দোলনগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কর্মকৌশল পরীক্ষা করে দেখা উচিত। এমনকি আন্দোলনকারীদের চোখে যা অহিংস ঠেকেছে তাও সহিংস হয়ে উঠতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, আমার কাছে যে ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে তা হলো একটি রাজনৈতিক দল গঠন, যা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারত এবং জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারত। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে গড়া কোনো দল নয়। আমার কথার মানে, এইটা নিশ্চয়ই বোধগম্য যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর মতো একটি দল সেখানে থাকতেই পারত। কিন্তু এমন কোনো দল যদি কখনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত হতো তাহলে সমাজের ক্ষমতাবান জনগণ সেইটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত নিজেদেরকে প্রতিরক্ষার তাগিদে। সেই মুহূর্তে প্রত্যেককেই সিদ্ধান্ত নিতে হতো- নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য আপনি কি সহিংসতার ব্যবহার করবেন কি করবেন না? লক্ষ করুন, সহিংসতা সাধারণত ক্ষমতাবানদের দিক থেকে আসে। লোকে হয়তো বিপ্লবীদের দিক থেকে ঘটা সহিংসতার কথা বলবে, কিন্তু এইটা সাধারণত এই কারণে যে তারা আক্রান্ত হয় এবং তারপর নিজেদের রক্ষার্থে তারা পাল্টা সহিংসতায় লিপ্ত হয়।

    একই প্রশ্ন অন্য একটি ব্যাপারেও উঠে যেটি নিয়ে আলাপ হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তা হচ্ছে-বিকল্প প্রচার মাধ্যম গড়ে তোলা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে নেটওয়ার্ক স্থাপন করা, যা বিভিন্ন মতবাদে দীক্ষায়ন প্রকল্পের প্রভাব মোকাবেলা করতে আমজনতাকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করবে। যেমন, আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করছি। আবার কর্পোরেট শক্তির ভিত্তি ধ্বংস করতে গিয়ে ফলাফলগুলো যে মুহূর্তে পেতে শুরু করবেন ঠিক সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আপনি অহিংস থাকতে পারবেন। তার ঠিক পরের মুহূর্তে আপনি আবিষ্কার করবেন যে আর অহিংস থাকা সম্ভব না। কারণ ধনীরা নিজেদের সাম্রাজ্য বাঁচাতে সহিংসতাসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশল খুঁজে বের করবে। সুতরাং অহিংসা নিয়ে আলাপ পাড়া হয়তো সোজা কিন্তু সত্যিকার অর্থে পরম নীতি হিসেবে আমি নিজেই অহিংসাকে গ্রহণ করতে রাজি নই।

    তবে সহিংসতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার উপায়ও অবশ্যই আছে। যেমন ধরুন, যদি পর্যাপ্ত সংখ্যক লোক একত্রিত হয়ে কোনো ফ্যাক্টরির কর্তৃত্ব নিয়ে নিত তাহলে পুলিশ তাদেরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু পুলিশ ও সৈনিকরা যেহেতু তাদের মতোই মানুষ এবং যদি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংহতির ক্ষেত্র যথেষ্ট বিস্তৃত হতো তাহলে শেষপর্যন্ত তারাও বাধা প্রদান করত না। সুতরাং এক অর্থে আপনার প্রশ্নের একটি উত্তর হতে পারে কেবলমাত্র সংহতির পরিসর বাড়ানো, সংহতির ক্ষেত্র বিস্তৃত করা যাতে তারা অন্য কোনো জায়গা থেকে সৈনিক এনে সংঘবদ্ধ জনতাকে গুঁড়িয়ে দিতে না পারে। কিন্তু সেই কাজ কঠিন হবে আর আমাদেরকে সম্পূর্ণভাবে এটির সম্মুখীন হতে হবে। এটি আপনাআপনি হয়ে উঠবে না। সত্য হচ্ছে আমাদের আজকের সমাজ ঘৃণার ভিত্তিতে এত স্তরে স্তরায়িত ও বিভাজিত যে আপনাকে দমন করতে আগ্রহী লোক খুঁজে পেতে এলিটদের বেশি দূর যেতে হবে না।

    কিন্তু ঐ পরিস্থিতিরও পরিবর্তন হতে পারে। আসলে এটিকে পরিবর্তন করতে হবে। কারণ জনপ্রিয় ধাঁচের আন্দোলনগুলো কতদূর পর্যন্ত সহিংসতার মাধ্যমে আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে সক্ষম তার একটি বাস্তব সীমা থাকে। আমি মনে করি, যে মুহূর্তে প্রতিরোধের জন্য বন্দুকবাজি ও যুদ্ধবিগ্রহের প্রয়োজন পড়বে সম্ভবত সেই মুহূর্তে যেকোন বিপ্লবী ক্রমবিকাশের অধঃপতন ঘটবে এবং যেকোন বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হবে। সুতরাং আমি মনে করি এই আশার বাস্তবায়ন চূড়ান্তভাবে অধিকতর আন্তর্জাতিক সংহতির মধ্যে অন্তর্নিহিত। আপনি নিজের দেশের ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষদের সাথে কী আচরণ করছেন তার রাজনৈতিক আবেদনের উপরও নির্ভর করে।

    দ্য আর্ট অব অ্যানার্কি সিরিজ
    শিল্পী: ফ্লাবিও কনস্তানতিনি
    সূত্র: অ্যানার্কিজিমো

    পুঁজিবাদের সীমা ছাড়িয়ে

    পুরুষ কণ্ঠ: পুঁজিবাদের খপ্পর থেকে মুক্তি কিংবা পুঁজিবাদের সাথে যোগসূত্র বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আপনার মন্তব্যের সূত্র ধরেই আমি জানতে চাচ্ছি যে, পুঁজিবাদের জায়গায় আপনি কোন কার্যকর প্রকল্প হাজির করবেন?

    চমস্কি: আমি?

    পুরুষ কণ্ঠ: কিংবা যারা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করার মতো অবস্থানে আছেন তাদেরকে আপনি কী পরামর্শ দিবেন?

    চমস্কি: আচ্ছা। শতবর্ষ আগেও যাকে “মজুরি দাসত্ব/শ্রম দাসত্ব” বলা হতো তাকে আমি দুর্বিষহ মনে করি। আমি মনে করি না যে, বেঁচে থাকার জন্য মানুষের জোর করে নিজেদেরকে ভাড়া খাটানো আবশ্যক। আমি মনে করি যে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা উচিত এবং অবশ্যই সেই প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ ও তারা যেখানে বসবাস করে সেখানকার কমিউনিটিগুলোর তত্ত্বাবধানে। বিভিন্ন প্রকার স্বাধীন সংঘ ও ফেডারিলজমের সাহায্যে এমন একটি কার্যকর সমাজ কল্পনা করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমার কথার মানে হচ্ছে, এমন একটি সমাজ ব্যবস্থার বিস্তারিত সাজ-সজ্জা আপনি হাজির করতে পারবেন না। কেউই এত করিতকর্মা নন যে কোনো সমাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ নকশা এঁকে ফেলতে পারবে। আপনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগুতে হবে। কিন্তু এমন একটি সমাজ কোন যুক্তিসঙ্গত মূলনীতির উপর ভিত্তি করে নির্মিত হবে তা বেশ স্পষ্ট।

    পুরুষ কণ্ঠ: পরিকল্পিত অর্থনীতিতে (Planned economies) গৃহীত অধিকাংশ প্রয়াসই এক প্রকার গণতান্ত্রিক আদর্শ ও তার প্রতিষ্ঠাতাদের বিপক্ষে গিয়েছে।

    চমস্কি: এটি আসলে নির্ভর করে আপনি কোন পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলছেন তার উপর। অসংখ্য পরিকল্পিত অর্থনীতির নজির আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রও পরিকল্পিত অর্থনীতির একটি উদাহরণ। আমাদের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলার সময় আমরা “মুক্ত বাজার” অর্থনীতির কথা বলি কিন্তু ঐটা স্রেফ ধোঁকাবাজি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির যে অংশটি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিযোগিতামূলক তা ঐ পরিকল্পিত অংশটিই। পুঁজি-নির্ভর কৃষি (মাত্রাধিক্য ক্ষতির হাত থেকে বাঁচার গদি হিসেবে যার একটি রাষ্ট্র প্রতিশ্রুত বাজার আছে) কিংবা উচ্চ-প্রযুক্তিসম্পন্ন শিল্প কারখানা (যেটি পেন্টাগন সিস্টেমের উপর নির্ভরশীল) কিংবা ঔষুধ শিল্পের (যেটি ব্যাপকভাবে জন-অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ভর্তুকিপ্রাপ্ত) মতো রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি প্রাপ্ত অর্থনীতির এই অংশটিই ঠিকঠাক কাজ করছে।৯

    আপনি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকান যাদেরকে সফল বড় অর্থনীতি দেশ হিসেবে ধরা হয়। মুক্ত-বাজার গণতন্ত্রের সফল উদাহরণ হিসেবে যাদেরকে নিয়ে সবাই আলোচনা করে, প্রকৃতপক্ষে তাদের সাথে মুক্ত-বাজার গণতন্ত্রের সামান্যতম যোগসূত্রও নেই। আনুষ্ঠানিকভাবেই বলছি, তারা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট; তাদের অর্থনীতি রাষ্ট্র-সংগঠিত অর্থনীতি যা কর্পোরেট শক্তির ছত্রছায়ায় পুঞ্জিভূত বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর সাথে সন্ধি করে চলে। এটি কোনো মুক্ত বাজারের নমুনা নয়, যথাযথভাবে বলতে গেলে এটি ফ্যাসিজম।

    এই ধরনের পরিকল্পিত অর্থনীতি “কার্যকর”, অন্ততপক্ষে এটি কিছু না কিছু উৎপাদন করে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি (Command economies) কার্যকর নয় কিংবা ভিন্নভাবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, সোভিয়েত যুগে পূর্ব ইউরোপের পরিকল্পিত অর্থনীতি ছিল অতিমাত্রায় কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ও আমলাতন্ত্র নির্ভর এবং তা ঠিকঠাক কাজ করেনি যদিও তারা জনগণের জন্য যৎসামান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করেছিল। কিন্তু সেই সমস্ত সিস্টেমগুলো প্রচণ্ড গণতন্ত্র বিরোধী ছিল। যেমন, সোভিয়েত ইউনিয়নে সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যত কোনো কৃষক কিংবা শ্রমিক যুক্ত ছিল না।

    পুরুষ কণ্ঠ: কোনো আদর্শিক কার্যকর মডেল খুঁজে পাওয়া কঠিন। 

    চমস্কি: হ্যাঁ। কিন্তু আঠার শতকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির/রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কোনো কার্যকর মডেল খুঁজে পাওয়াও কঠিন ছিল। তার মানে এটি প্রমাণিত হয় না যে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। উনিশ শতকে এসে এটির অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল। মানব ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে বলে যদি আপনি মনে না করেন তাহলে এইটা বলা খোঁড়া যুক্তি হবে না যে “এটি কাছেপিঠে নয়”। আপনি দু’শ বছর পেছনে যান। সেই সময় এটি কল্পনা করাও দুরূহ ছিল যে দাসত্বের বিলুপ্তি ঘটবে।

     

    পাদটীকা

    ১.   বেইলির মন্তব্যের জন্য দেখুন, Thomas A. Bailey, A Diplomatic History of the American People, New York: Appleton, 1969 (eighth edition). His exact words (p. 163):

    The ending of the Napoleonic nightmare thus left the American people free to work out their own destiny with a minimum of foreign meddling.  Responding to the robust new sense of nationalism engendered by the War of 1812, they turned their backs confidently on the Old World, and concentrated on the task of felling trees and Indians and of rounding out their national boundaries.

    নেটিভ আমেরিকান গণহত্যা বিষয়ক বিদ্যায়তনিক জ্ঞানচর্চা সম্পর্কে জানতে দেখুন, U.P. –এর ৪র্থ অধ্যায় এবং এই অধ্যায়ের ফুটনোট ৭২ ও ৭৬।

    ২।  রোথবার্ডের দৃষ্টিকল্পের নমুনার জন্য দেখতে পারেন Murray Rothbard, For a New Liberty, New York: Macmillan, 1973, especially chs. 10-13. An excerpt (pp. 202, 210, 214-216, 220-221, 229, 269-270):

    Abolition of the public sector means, of course, that all pieces of land, all land areas, including streets and roads, would be owned privately, by individuals, corporations, cooperatives, or any other voluntary groupings of individuals and capital. . ..  Any maverick road owner who insisted on a left-hand drive or green for “stop” instead of “go” would soon find himself with numerous accidents, and the disappearance of customers and users. . ..  [W]hat about driving on congested urban streets?  How could this be priced?  There are numerous possible ways.  In the first place the downtown street owners might require anyone driving on their streets to buy a license. . ..  Modern technology may make feasible the requirement that all cars equip themselves with a meter. . ..  Professor Vickery has also suggested . . . T.V. cameras at the intersections of the most congested streets. . ..

    [I]f police services were supplied on a free, competitive market . . . consumers would pay for whatever degree of protection they wish to purchase.  The consumers who just want to see a policeman once in a while would pay less than those who want continuous patrolling, and far less than those who demand twenty-four-hour bodyguard service. . ..  Any police firm that suffers from gross inefficiency would soon go bankrupt and disappear. . ..  Free-market police would not only be efficient, they would have a strong incentive to be courteous and to refrain from brutality against either their clients or their clients’ friends or customers.  A private Central Park would be guarded efficiently in order to maximize park revenue. . ..  Possibly, each individual would subscribe to a court service, paying a monthly premium. . ..

    If a private firm owned Lake Erie, for example, then anyone dumping garbage in the lake would be promptly sued in the courts.

    ৩।  যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ শতাংশ জনগণ যে পারমাণবিক অস্ত্রবিরতির পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল সে সম্পর্কে জানতে উদাহরণস্বরূপ দেখতে পারেন, Daniel Yankelovich and John Doble, “The Public Mood: Nuclear Weapons and the U.S.S.R.,” Foreign Affairs, Vol. 63, Fall 1984, pp. 33-46 (reporting public opinion poll findings).

    ৪।  এক তরফা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ সংক্রান্ত গর্বাচেভের ঘোষণা সম্পর্কে জানতে উদাহরণস্বরূপ দেখতে পারেন, Serge Schmemann, “Gorbachev Seeks To Talk To Reagan On Atom Test Ban,” New York Times, March 30, 1986, p. 1 (“Moscow announced a halt of its testing program last July, asking Washington to join in”).

    ৫।  ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স এন্ড ডিসআর্মমেন্ট স্টাডিস কর্তৃক পাঠানো তিন পৃষ্ঠার ফান্ডিং লেটারে অস্ত্রবিরতি আন্দোলনের প্রণিধানযোগ্য কতিপয় এক্টিভিস্টদের প্রতিক্রিয়া চিত্রায়িত হয়েছিল। ফান্ডিং লেটারটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক র‍্যানডাল ফোর্সবার্গ কর্তৃক স্বাক্ষরিত ছিল। পারমাণবিক অস্ত্রবিরতি সংক্রান্ত প্রচার অভিযান সফল হওয়ার পেছনে যার কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। সেই লেটার থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দিয়ে চমস্কি নিম্নোক্ত আলাপ করেছেন (Turning the Tide: U.S. Interventionism in Central America and the Struggle for Peace, Boston: South End, 1985, p. 188):

    The Institute, which “launched the nuclear freeze movement in 1980,” accomplished what it set out to do: it educated the public to support a nuclear freeze.  But this popular success did not lead to “a real electoral choice on the issue in 1984.”  Why?  Because of “expert opposition to the freeze,” which prevented Mondale [the Democratic candidate] from taking a supportive position.  The conclusion, then, is that we must devote our efforts to “building expert support”: convincing the experts.  This achieved, we will be able to move to a nuclear freeze.

    ৬।  রোজা পার্কস ১৯৫৫ সালে হাইল্যান্ডার ফোক স্কুলে অনুষ্ঠিত বর্ণবিভেদলোপ বিষয়ক ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঐ একই বছর ডিসেম্বর মাসে মন্টমোগারি বাস বয়কট আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

    সাদা চামড়ার বিচ্ছিন্নদীদের দ্বারা আক্রান্ত হবার পর টিন্নিস কর্মকর্তারা ১৯৬২ সালে হাইল্যান্ডার স্কুল এবং “কমিউনিস্ট ট্রেনিং স্কুল” নামে অপর একটি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিল। তার পর পরই হাইল্যান্ডার রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টার নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। হাইল্যান্ডার ছিল নানা প্রকার সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সমিতির মিলনকেন্দ্র এবং এটির প্রতিষ্ঠাতারা “দক্ষিণের শিল্পশ্রমিক ও কৃষকদের সম্মিলনে সংগঠিত অদম্য ও বহুজাতিক আন্দোলনের সমর্থনে একটি র‍্যাডিকাল জোটের উত্থান ঘটবে বলে স্বপ্ন দেখেছিল”, যদিও “[এটির প্রতিষ্ঠাতা মাইলস] হর্টন কিংবা অন্যান্য ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের কেউই কখনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেনি”। দেখুন- John M. Glen, Highlander: No Ordinary School, Knoxville: University of Tennessee Press, 1996, pp. 162-164, 54-55; Frank Adams, Unearthing Seeds of Fire: The Idea of Highlander, Winston-Salem, NC: John F. Blair, 1975.

    হাইল্যান্ডার ও তার প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে মূল্যবান ও আগ্রহোদ্দীপক বই হিসেবে দেখতে পারেন- Myles Horton, The Long Haul: An Autobiography, New York: Teachers College Press, 1998.

    ৭।  আমেরিকান শ্রমিক ইতিহাসে সহিংসতা প্রসঙ্গে, উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন, Patricia Cayo Sexton, The War on Labor and the Left: Understanding America’s Unique Conservatism, Boulder, CO: Westview, 1991, chs. 4, 6, and 7. উদ্ধৃতাংশ (pp. 55, 58, 65):

    Labor everywhere has “war stories” to tell, but nowhere has the record been as violent as in the United States. . .. One review of some major U.S. strikes puts the figure at 700 dead and untold thousands seriously injured in labor disputes, but these figures, though impressive, include only strike casualties reported in newspapers between 1877 and 1968; and may therefore grossly underestimate the total casualties.  (During the 1877-1968 period, state and federal troops intervened in labor disputes more than 160 times, almost invariably on behalf of employers.)  In the seven years from 1890 to 1897, an estimated 92 people were killed in some major strikes, and from January 1, 1902, to September 1904, an estimated 198 people were killed and 1,966 injured.  These casualties were overwhelmingly strikers killed or injured in some major strikes and lockouts. . ..  After the adoption of some protective legislation, between 1947 and 1962, violence and militia intervention declined, but an estimated 29 people were killed in major strikes during the period, 20 of them in the South.  By contrast, only 1 person in Britain has been killed in a strike since 1911. . ..

    Over the years, labor espionage has been a large and profitable business.  In April 1946, for example, some 230 agencies were in the business, the largest of them being William J. Burns’s International Detective Agency, Inc. (operating in forty-three cities) and [Allan] Pinkerton’s National Detective Agency, Inc. (operating in thirty-four cities).  In just three top agencies, an estimated 135,000 men were employed at one point, operating in over 100 offices and more than 10,000 local branches, and earning some $65 million annually for the agencies. . ..  [D]uring the 1930s the agencies charged employers an estimated $80 million a year.  General Motors testified before the LaFollette [Congressional] committee that it paid about a million dollars to such agencies from January 1934 through July 1936. . .. The use of espionage agencies and professional strikebreakers has been almost unknown in European and other developed democracies.

    John Streuben, Strike Strategy, New York: Gaer, 1950, pp. 300-309 (listing 143 deaths in the United States which were officially attributed to labor-management disputes between 1933 and 1949); David Montgomery, “Afterword,” in David Demarest, ed., “The River Ran Red”: Homestead 1892, Pittsburgh: University of Pittsburgh Press, 1992, pp. 225-228; Jeremy Brecher, Strike!, Cambridge, MA: South End, 1997 (revised and updated edition; original 1972)(a valuable U.S. labor history). আরো দেখতে পারেন Understanding Power বইয়ের ৬ষ্ঠ অধ্যায়ের ফুটনোট ৩২ এবং ১০ম অধ্যায়ের ফুটনোট ৮১।

    ৮।  বিগত উনিশ শতকের যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইতিহাসে শ্রমিকদের সহিংসতা প্রসঙ্গে বৃটিশ সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন, Patricia Cayo Sexton, The War on Labor and the Left: Understanding America’s Unique Conservatism, Boulder, CO: Westview, 1991, pp. 83, 100.

    ৯।  যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ভূমিকা সম্পর্কে জানতে দেখুন U.P.–এর ৩য় অধ্যায় এবং এই অধ্যায়ের ফুটনোট ৩, ৪, ৭, ৮, ৯ ও ১০; U.P.-এর ৭ম অধ্যায় এবং এই অধ্যায়ের ফুটনোট ৩৮-৪৪, ৫১ ও ৫৩; এবং U.P.–এর ১০ম অধ্যায় এবং এই অধ্যায়ের ফুটনোট ২২ ও ২৩। আরো দেখুন U.P.–এর ২য় অধ্যায় এবং এই অধ্যায়ের ফুটনোট ৪ ও ৫।

  • নোম চমস্কি।। অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিজমের প্রাসঙ্গিকতা

    নোম চমস্কি।। অ্যানার্কো সিন্ডিক্যালিজমের প্রাসঙ্গিকতা

    অনুবাদ: অনিক সন্ধি

     

    নোম চমস্কি

    প্রফেসর চমস্কি, প্রথমেই এনার্কিজম কী তা নিয়ে আলোচনা না করে এনার্কিজম কী নয়, তা দিয়ে শুরু করা যাক৷ এনার্কি শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে আহরিত, আক্ষরিক অর্থে যার মানে দাঁড়ায় “রাষ্ট্রহীনতা বা সরকারহীনতা”। এখন, যারা এনার্কি বা এনার্কিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের কথা বলে, তারা তো অবশ্যই শুধু এটা বোঝায় না যে কাল থেকে সব পুলিশ, আইন-কানুন, কর-খাজনা, পোস্ট অফিস – এসব কিছুর বিলীন হয়ে যাক, নাকি? অবশ্যই ব্যাপারটা আরো জটিল কিছু।

    চমস্কি: আচ্ছা। আসলে এখানকার কিছু প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” বলতে হবে আর কিছু ক্ষেত্রে “না” বলতে হবে। পুলিশবাহিনীর অবসান – হ্যাঁ, কিন্তু রাস্তাঘাটে কোন ট্রাফিক নিয়ম-কানুন থাকবে না, মোটেই তা নয়। শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে, বিপুল পরিসরের রাজনৈতিক ধারণা নৈরাজ্যবাদের (Anarchisim) আওতায় পড়ে। তবে আমি এনার্কিজমকে মুক্তিকামী বা লিবার্টারিয়ান-বামের অংশ বলেই ধরি, যাকে অন্যভাষায় স্বেচ্ছাধীন বা ভলান্টারি সমাজতন্ত্রও বলা যায়। আর তার মধ্যেই পড়ে মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্র, এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম, সাম্যবাদী নৈরাজ্যবাদের মতো আদর্শ যা ক্রপোৎকিন, বাকুনিন এবং অন্যান্যদের দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাদের ধারণায় ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি সমাজ কিন্তু সেই সমাজ গঠিত হতে হবে অনেক ধরনের জৈবিক একক কিংবা জৈবিক সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে। আর এই একক কিংবা সম্প্রদায় বলতে তারা বুঝিয়েছেন কর্মক্ষেত্র ও পাড়া-মহল্লাকে। এই এককগুলো সমাবেশিত হয়ে ফেডারেশনের মাধ্যমে অত্যন্ত কর্মক্ষম ও সংবদ্ধ সংগঠন গঠন করবে যার প্রসার হবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সকল সিদ্ধান্ত গৃহিত হবে সারগর্ভ পর্যায়ে যার মর্ম ফেডারেশনগুলোতে বহন করবে প্রতিনিধিগণ (delegates), যারা  ওই সকল জৈবিক একক বা সম্প্রদায়েরই সদস্য এবং যারা সেখানেই ফিরে যাবে।

    তো এর মানে এমন কোন সমাজ নয় যেখানে একেবারেই কোন সরকার থাকবে না৷ বরং এটি এমন এক সমাজ দাবী করে যার মূল কর্তৃত্ব সবসময় আসে নিচ থেকে উপরতলায়, উপর থেকে নিচতলায় নয়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতনন্ত্রে (representative democracy) কর্তৃত্ব আসে উপর থেকে নিচ তলায়, যদিও সেখানে নির্বাচক বা ভোটাররাই সিদ্ধান্ত নেয়।

    চমস্কি: যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের অন্তত দুটি সমালোচনা নৈরাজ্যবাদী ঘরানা থেকে আসবে। প্রথমত,  উল্লেখিত দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের হাতে একচেটিয়া ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সেখানকার গণতন্ত্র শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়। নৈরাজ্যবাদীরা সবসময়ই বলে এসেছে যে একজন ব্যক্তির উৎপাদনশীল জীবনের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সার্বিক মানবিক মুক্তির একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়। অর্থাৎ, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চার অর্থ আসলে তাই। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত মানুষকে বাজারে নিজেকে ভাড়া করতে বাধ্য করানো হবে এমন কারো কাছে যে তাকে ভাড়া করতে চাইবে, যতদিন পর্যন্ত উৎপাদন ক্ষেত্রে তার ভূমিকা হবে সাধারণ হাতিয়ারের, ততদিন সেই বলপ্রয়োগমূলক ও অত্যাচারী ব্যবস্থায় অর্থপূর্ণ  গণতন্ত্র চর্চার কোন প্রশ্নই আসে না।

    ঐতিহাসিকভাবে বলছি, এর আগে কি এমন কোন সমাজের নজির পাওয়া যায় যেটি ব্যাপকভাবে ও সূদুরপ্রসারীভাবে নৈরাজ্যবাদী নীতির কাছাকাছি?

    চমস্কি: ছোট ও বড় দুই ধরনের নৈরাজ্যবাদী সমাজই আমি লক্ষ্য করেছি যা শুধু অতীতেই নয়, বর্তমানেও আছে। দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকা ছোট সমাজগুলোর মধ্যে ইজরায়েলের কিবুৎজিমকে আমি চমৎপ্রদ উদাহরণ হিসেবে বেছে নিব। দীর্ঘ সময় ধরে এটা নৈরাজ্যবাদী নীতির ভিত্তিতেই চলছিল যেমন স্বপরিচালনা বা সেল্ফ-ম্যানেজমেন্ট, প্রত্যক্ষ শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ, কৃষি, শিল্প ও সেবার একীভূতকরণ এবং স্বপরিচালনায় ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ। আর আমি মনে করি এগুলো প্রায় সব ক্ষেত্রেই সফল ছিল।

    কিন্তু এগুলোতো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভ্যন্তরেই ছিল যা তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করত।

    চমস্কি: সবসময় তা ছিল না। আসলে এগুলোর ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। শুধুমাত্র ১৯৪৮ সাল থেকেই তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়। এর আগে তারা ঔপনিবেশিক ছিটমহলের অন্তর্ভুক্ত ছিল যা ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের বাইরেই ছিল। আর এই সমাজটা ছিল অন্তভৌমিক ও সমবায় পদ্ধতি অনুসরণকারী। আমার মতে যখন তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয় তখনই তারা তাদের মুক্তিকামী সমাজবাদী চরিত্র হারিয়ে ফেলে। আরও কিছু ঘটনাবলিও এতে ভূমিকা রাখে যা ওই অঞ্চলের জন্য অনন্য, কিন্তু সেই দিকে আমাদের যাওয়ার দরকার নেই। একটা কার্যকর মুক্তিপরায়ণ সমাজতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এরা খুবই চমৎকার একটা মডেল যা উন্নত শিল্প সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

    আর্টওয়ার্ক: জুলিও ১৯
    শিল্পী: বারদাসানো
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    এখন বড় নৈরাজ্যবাদী সমাজের উদাহরণে আসি। আকারে অত্যন্ত বড় রকমের নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের কথা চিন্তা করলে ১৯৩৬ এর স্প্যানিশ বিপ্লবের কথা মাথায় প্রথমে আসে। এই বিপ্লবটি এতটাই সুদূরপ্রসারী  ছিল যা তখনকার রিপাব্লিকান অংশের অঞ্চলে বিশাল পরিমাণের জায়গা দখল করেছিল এবং সেখানকার কৃষি ও শিল্পকে এমনভাবে জড়িয়েছিল যে বাহিরে থেকে দেখলে মনে হবে বিপ্লবটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু আসলে বিপ্লবটি তিন প্রজন্মের নৈরাজ্যবাদীদের নানাবিধ পরীক্ষা, চিন্তাধারা ও কর্মসূচির ফল যা সেখানকার মানুষদের মন গভীরভাবে জয় করতে পেরেছিল। আর অবশ্যই, মানবিক পাল্লায় ও যে-কোন ধরনের অর্থনৈতিক পাল্লায় এই বিপ্লব অত্যন্ত সফল হয়েছিল। ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা অত্যন্ত সফলভাবে উপরতলার কোন শাসন ও বলপ্রয়োগ ব্যতীতই উৎপাদন কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল, যা তখনকার উদারবাদী ও তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্টদের অবাক করে দিয়ে ছিল। এই নৈরাজ্যবাদী বিপ্লব ক্ষমতাবানদের দ্বারা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছিল, কিন্তু যেটুকু সময় ধরেই তা বেঁচে ছিল, আমি মনে করি সকল ক্ষেত্রেই তা সফল হয়েছিল। আর এই বিপ্লবই প্রমাণ করে যে গরীব মেহনতি শ্রেণির মানুষেরা তাদের নিজেদের জীবন নিজেদের শর্তে কোন প্রকারের বলপ্রয়োগ ও শাসন ছাড়াই সংগঠিত ও পরিচালনা করাতে কতটা সক্ষম। স্প্যানিশ অভিজ্ঞতা অগ্রসর শিল্পায়িত সমাজের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক তা সত্যিই গভীরভাবে পরখ করে দেখা দরকার।

    এটা পরিষ্কার যে নৈরাজ্যবাদের গোড়ার কথার একটি হলো ব্যক্তির অগ্রাধিকার- অবশ্য বিচ্ছিন্নতায় নয়, বরং অন্য ব্যক্তির সাথে যুক্ততা-  এবং তার স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা। শুনে অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভাবনার মতো মনে হয়। আমেরিকান অভিজ্ঞতা কী এমন ছাপ ফেলেছে যা স্বাধীনতার এই ধরণের ঐতিহ্যকে আপনি ও আপনার মত অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী চিন্তাবিদরা সন্দেহ করেন?

    চমস্কি: শুরু করার আগেই বলে নিতে চাই আমি নিজেকে একজন নৈরাজ্যবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে মনে করি না। আমি নিজেকে মনে করি নৈরাজ্যিক পথের একজন পথিক হিসেবে। তবে আমি বলব অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী চিন্তাবিদরা আমেরিকান অভিজ্ঞতা অর্থাৎ জেফারসোনিয়ান গণতন্ত্রকে অনকটাই প্রসন্নচিত্তেই দেখেছেন। ওই যে সেই জেফারসোনিয়ান চিন্তা, যেটা বলে সেই সরকারই মহান সরকার যা শাসন করে সবচেয়ে কম, আবার থোরিউ যাতে যোগ করেছিলেন এউ বলে যে সেই সরকারই মহান সরকার যা শাসনই করে না। এই কথাটাই আধুনিক কালের নৈরাজ্যবাদী চিন্তকগণ বারংবার বলেছেন।

    কিন্তু জেফারসোনিয়ান গণতন্ত্রের আদর্শ বিকশিত হয়েছিল পুঁজিবাদের বিকাশের আগে, এমন এক সময়ে যেখানে নিয়ন্ত্রণের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না এবং ছিল এখনকার মত ব্যক্তিগত ক্ষমতা। আসলে আগেকার পুরনো মুক্তিবাদী লেখাগুলো পড়লে চমকে যেতে হবে। ধরেন ১৭৯২ সালের ভিলহেলম ফন হামবোল্টের রাষ্ট্রের সমালোচনামূলক ধ্রুপদী লেখাগুলো ( The Limits of State Action) যা পরবর্তীতে [জন স্টুয়ার্ট] মিলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল, সেখানে একীভূত ব্যক্তিগত ক্ষমতাকে প্রতিহত করার কথা নেই বললেই চলে। তবে অবশ্যই একীভূত নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তা লেখা আছে। আর প্রায় একই জিনিস দেখবেন পুরনো আমেরিকান ঐতিহ্যতেও। কিন্তু এর কারণ হলো তখন এই একটা ক্ষমতাই ছিল। হামবোল্ট বুঝতে পারেননি যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বাদেও ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিবে ভবিষ্যতে। তিনি শুধু রাষ্ট্র ও চার্চের ক্ষমতার বিরুদ্ধেই লিখেছেন। তো তিনি যখন মানুষের নিজের সৃজনী বা উদ্ভাবনী জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের কথা বললেন, যখন তিনি মানুষের নিজের শ্রম থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করাকে নিন্দা করলেন, তখন তিনি রাষ্ট্রবিরোধী ও পাদ্রীবর্গবিরোধী দিক থেকেই তা বললেন। কিন্তু এই একই নীতি পূঁজিবাদী সমাজেও প্রয়োগ করা যায়। আর আমি মনে করি হামবোল্ট যদি বর্তমানে বেঁচে থাকতেন তবে তিনি অবশ্যই মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রী হতেন।

    পিতর ক্রপোৎকিন

    তাহলে কি বলা যায় না যে মুক্তিবাদ বা নৈরাজ্যবাদের প্রযোজ্যতায় সহজাতভাবেই প্রাক-শিল্পায়িত ধারণার বৈশিষ্ট্য রয়েছে? যে তার বাস্তবায়নের জন্য দরকার গ্রামীণ এক সমাজ যেখানে প্রযুক্তি ও হাতিয়ার সরল প্রকৃতির? আর যেখানকার অর্থনৈতিক সংগঠন স্থানীয় ও ছোট আকারের?

    চমস্কি: আচ্ছা এই প্রশ্নটিকে আমি তাহলে দুই ভাগে ভাগ করি।  প্রথমত, অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী এই সম্পর্কে কী বলেন এবং দ্বিতীয়ত, আমার মতামত। নৈরাজ্যবাদীরা এখানে দুইভাগে বিভক্ত। একটি নৈরাজ্যবাদী ঐতিহ্য-ক্রপোৎকিনকে যে ধারার প্রতিনিধি বিবেচনা করা যায়-যারা আপনার বর্ণিত সমাজই চায়। আবার আরেক ঐতিহ্যের নৈরাজ্যবাদীরা, যাদের বলা হয় এনার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট, তারা নৈরাজ্যবাদকে অত্যন্ত সংগঠিত ও জটিল এক শিল্পায়িত সমাজের জন্য সঠিক ধরনের সংগঠনপ্রণালী হিসেবে দেখে। আর এই প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বামপন্থী-মার্ক্সবাদের সঙ্গে, যেমন কাউন্সিল-কমিউনিজম যা লুক্সেমবার্গবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বলে রাখা ভাল যে, এ্যান্টন পানেকুকের মতো মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক এই বামপন্থী-মার্ক্সবাদের প্রতিনিধিত্ব করেন; যিনি একাধারে ছিলেন বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ, যিনি শিল্পে শ্রমিক কাউন্সিল সম্বন্ধে পূর্ণ এক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন।

    তাহলে এই দুইটি ধারণার ভিতর কোনটি সঠিক? মানে এটা কি সত্য যে নৈরাজ্যবাদী ধারণা শুধু গ্রামীণ সমাজের জন্য উপযুক্ত নাকি নৈরাজ্যবাদ অত্যন্ত উন্নত ও অগ্রসর একটি শিল্পায়িত সমাজের জন্য উপযুক্ত? আমি নিজে মনে করি পরের ধারণাটিই সঠিক। অর্থাৎ আমি মনে করি শিল্পায়ন ও উন্নত প্রযুক্তি বড় জায়গা জুড়ে স্বপরিচালনার সম্ভাব্যতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যা আগের যুগে ভাবাই যেত না। আর ঠিক এই কারণেই এটি উন্নত শিল্প সমাজের জন্য যুক্তিসম্মত একটি ব্যবস্থা, যেখানে শ্রমিকেরা নিজেরা নিজের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার মালিক হতে পারবে, অর্থাৎ নিজের কর্মক্ষেত্রের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায়, আবার অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন-পরিচালনায়, সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বা তারও বড় পরিসরে বড় রকমের সিদ্ধান্ত রাখতে পারবে। বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরকে উল্লেখিত ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ দেয় না এবং দিতে চায় না আর তার জন্য যে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রয়োজন তাও দেয় না এবং দিতে চায় না। আর তাছাড়াও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ প্রযুক্তির বদৌলতে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব যার ফলে মানুষ কাজের বোঝা থেকে মুক্তি পাবে ও মনমতো সৃজনশীল কর্মে লিপ্ত হতে পারবে।

    আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই নৈরাজ্যবাদী সমাজে অর্থনীতি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করব। কিন্তু তার আগে আপনি যেহেতু একটি আধুনিক অবস্থায় নৈরাজ্যবাদী সমাজের কথা বলছেন, এমন সমাজের রাজনৈতিক গঠনতন্ত্রের একটা চিত্র তুলে ধরবেন কি? যেমন ধরুন সেখানে কি রাজনৈতিক দল থাকবে? আর সরকারের কোন কোন অংশ অবশিষ্ট থাকবে?

    চমস্কি: এ সম্বন্ধে যাকে বলা যায় মোটের ওপর সর্বসম্মতি আমি তার একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমি একে আবশ্যিকভাবে সঠিক বিবেচনা করি। শুরু করা যাক প্রধান দুটি সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দিয়ে; যা হল কর্মক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও সম্প্রদায়। ধরুন, শ্রমিক কাউন্সিল সমূহের একটি নেটওয়ার্ক যা উপরের পর্যায়ে সাধারণ সমাবেশ গঠন করে ফ্যাক্টরি সমূহের অথবা শিল্পের শাখা সমূহের প্রতিনিধিত্বের দ্বারা, যার চরিত্র জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হতে পারে। ঠিক আরেকভাবে ভাবা যায় একটি প্রশাসন ব্যবস্থা যা স্থানীয় সমাবেশ বা এসেম্বলি সমূহকে জড়িত করে এবং আবারও যা আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফেডারেটেড হয়ে শিল্প ও ফ্যাক্টরিকে জড়ায়।

    এখন ঠিক কীভাবে এ ধরনের সংগঠনপ্রণালী বিকশিত হবে এবং ঠিক কীভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হবে; আপনার কি দুই ধরনের সংগঠনই লাগবে নাকি এক প্রকারেই চলবে এগুলো নিয়ে খোদ নৈরাজ্যবাদী তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক চলমান এবং নানামাত্রিক প্রস্তাবনা বিরাজ করে। আমি একটা পক্ষ নিয়ে নেয়ার মতো নিশ্চিত এখনো নই। এই প্রশ্নগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

    তাহলে এখনকার মতো জাতীয় পর্যায়ে যে নির্বাচন হয় এবং যাতে রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে তা থাকবে না। কারণ যদি তেমন থাকত তাহলে এখনকার মতো কেন্দ্রীয়ভাবে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বিরাজ করত যা নৈরাজ্যবাদী ভাবনার বিরুদ্ধে।

    চমস্কি: না, নৈরাজ্যবাদী ভাবনা অনুযায়ী প্রতিনিধিত্বমূলক কর্তৃত্ব একেবারে নূন্যতম মাত্রায় থাকবে এবং এই সকল প্রশাসনিক কাঠামোয় যারা অংশগ্রহণ করবে তারা একেবারে সরাসরি তাদের আঙ্গিক সম্প্রদায় সমূহের প্রতি সংবেদনশীল (responsive) থাকবে। আসলে এইসকল প্রশাসনে অংশগ্রহণের সময় অংশগ্রহণকারীর জন্য খুব সীমিত থাকবে আর তারা চাইলেও পেশাদার আমলা হতে পারবে না কারণ অংশগ্রহণ চলাকালীন  অবস্থাতেও তারা যে শ্রমিক অথবা মহল্লা কাউন্সিল প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানকার কাজ একাধারে করে যাবে।

    আর মনে হয় কোন নৈরাজ্যবাদী সমাজ রাজনৈতিক দল গঠনে বাধা দেবে না। আসলে নৈরাজ্যবাদ এই মতে বিশ্বাসী যে কোন ধরণের প্রোকাস্টিয়ান (অর্থাৎ বল প্রয়োগ দ্বারা সমতা সাধক) ব্যবস্থা ও সমাজ জীবনে আরোপ করা যেকোন আদর্শ ও নিয়ম অচিরেই সেই সমাজের জীবনীশক্তি ধ্বংস করে ফেলে। সেই সাথে সেখানকার পার্থিব ও মনোজাগতিক সংস্কৃতির প্রভাবে গড়ে ওঠা সব ঐচ্ছিক সংগঠনের সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে ফেলে। আর যা না বললেই নয়, যদি এমন হয় যে রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে তাহলে বোঝা যাবে যে সেই নৈরাজ্যবাদী সমাজ ব্যর্থ হয়েছে। আসলে যা হওয়া উচিত তা হল, যেখানেই স্ব-ব্যবস্থাপনা বা সেল্ফ-ম্যানেজমেন্টে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে সেখানকার ফেডারেশন সমূহের সব পর্যায়ে সবার ভিন্নমত, দলাদলি, দ্বন্দ-সংঘর্ষ, স্বার্থের ভিন্নতা প্রকাশ করা হবে ও তার মিটমাট করা হবে। একটা স্বাধীন সমাজে এসব জিনিসতো থাকবেই আর তাই এসবকে স্বাগতমও জানানো হবে। তাই বলে কেন তা দুই একটি রাজনৈতিক দলের হাতে করায়ত্ব হতে হবে, তা আমি বুঝি না। আমি মনে করি না মানব জীবন ও স্বার্থের জটিলতা রাজনৈতিক দলভূক্ত একটা সমাজ বুঝতে পারে। রাজনৈতিক দলসমূহ প্রধানত শ্রেণি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, আর নৈরাজ্যবাদী সমাজে শ্রেণীর উৎখাত এবং শ্রেণীকে লঙ্ঘন করার বন্দোবস্ত থাকবে ফলে রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন ফুরাবে।

    আর্টওয়ার্ক: গ্রিড
    সূত্র: উইকিমিডিয়া

    রাজনৈতিক সংগঠন সম্বন্ধে এটা শেষ প্রশ্ন। এই যে নির্বাচনহীন এসব প্রশাসনিক সংগঠন এবং এদের আধা-সরকারী কাঠামো, তাদের কর্তৃত্বক্রমতান্ত্রিক স্তরভুক্ত এসেম্বলিসমূহের মদদে যে পিরামিডের চূড়া গঠন করবে; এমন কি হতে পারে না যে এই চূড়া জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেই কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের মত আচরণ করবে? আর তাছাড়া এই চূড়ার কাছে তো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধীয় ও সামরিক কিছু ক্ষমতা থাকবে। এমন কি হতে পারে না যে সে এই ক্ষমতার মদদে এখনকার রাষ্ট্রসমূহের মতই অগণতান্ত্রিক হয়ে পড়ে?

    চমস্কি: যেকোন মুক্তিবাদী সমাজের জন্যই আপনার বলা দৃশ্যকল্পের দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে নিজেকে রুখতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। আর তা যাতে প্রতিহত হয়, তার জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে সেভাবেই বানাতে হবে। আমি নিজে একেবারেই মনে করি না যে প্রশাসনে অংশগ্রহণ একটা ফুল টাইম কাজ হবে। হ্যাঁ, তা একটা অযৌক্তিক সমাজের জন্য হতে পারে, আর সেখানকার  সমস্ত সংকট আসলে সেই অযৌক্তিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ফল। তবে একটা যৌক্তিক ও চলমান অগ্রসর শিল্পায়িত সমাজ, যা মুক্তিপরায়ণ ধারণার ভিত্তিতে সংগঠিত, সেখানকার প্রশাসনিক কাজ হবে পার্ট-টাইম আর আর সকলের দ্বারাই তা পালাবদলের মাধ্যমে সংগঠিত হবে। আর সকল সময়েই তারা তাদের নিজেদের সৃজনী কর্মের সাথেই যুক্ত থাকবে।

    এমন হতে পারে যে ধরুন, প্রশাসন নিজেই ইস্পাত উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত। তাই যদি হয় তাহলে প্রশাসন ব্যবস্থাও ইস্পাত ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তিতে হবে এবং তা পরিচালিত হবে সেই ইন্ডাস্ট্রির সকল শ্রমিক দ্বারা এবং তারা সংগঠিত হবে তাদের নিজদের শ্রমিক কাউন্সিলের ভিত্তিতে।

    আর তাই কিন্তু হয়েছিল ১৯৫৬ এর হাঙ্গেরিয়ান বিপ্লবের সময়, যেখানে শুধু শ্রমিকরাই নয়, সরকারি কর্মচারীরাও ক্ষমতার সমতাকরণের ভিত্তিতে কাউন্সিল উপায়ে সংগঠিত হয়েছিল ও সরকারী সেবাসমূহ দিয়ে যাচ্ছিল। এমনও হতে পারে এরূপ ব্যবস্থাই নৈরাজ্যবাদী সমাজকে বল প্রয়োগী সমাজে পরিণত হতে বাধা দেবে।

    আপনি যদি মনেই করে থাকেন একটা জটিল পর্যায় পর্যন্ত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাদির প্রয়োজন ফুরাবে না, সেক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য থেকে কিন্তু পরিস্কার হওয়া গেল না এই তল থেকে উপরের দিকে ধাবিত প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে রাখা সম্ভব হবে যা বর্তমানের পেন্টাগনীয় জটিল সংগঠন ও প্রযুক্তি ব্যবস্থা থেকে আলাদা হবে?

    চমস্কি: আচ্ছা। প্রথমেই আমাদের পরিভাষা সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা উচিত। আপনি পেন্টাগনকে প্রতিরক্ষামূলক সংগঠন বলছেন অথছ ১৯৪৭ সাল পর্যন্তও এদের নাম ছিল যুদ্ধ মন্ত্রণালয়। আমি তখন ছাত্র ছিলাম, এবং অতটা জটিল চিন্তার মানুষ ছিলাম না। কিন্তু তখনই আমি এবং অন্য অনেকেই বুঝতে পারে যে অতীতে মার্কিন সেনাবাহিনী যে মাত্রায় প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল, সেই দিন শেষ। যেহেতু এর নতুন নাম হলো প্রতিরক্ষা বিভাগ, তার মানে এটা আদতে হয়ে উঠল আগ্রাসন বিভাগ। অন্য কিছুই না।

    আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যাত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বাস করে যান – এই মর্মের ভিত্তিতে।

    চমস্কি: হ্যাঁ, অরওয়েল আধুনিক রাষ্ট্রের ঠিক যে প্রকৃতিটা তুলে ধরেছিলেন, অনেকটা তাই। ঘটনা ঠিক ঠিক তাই। আমি বলতে চাচ্ছি, পেন্টাগন কোন অর্থেই প্রতিরক্ষা বিভাগ হতে পারে না। এটা কখনোই কারো হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করেনি। এটি সবসময় হানাদারি কায়দায় অন্য দেশ আক্রমণ করেছে। এটি কোন প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং আক্রমণাত্মক সংগঠন। পেন্টাগন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ খুব ভাল ভাবেই চলতে পারবে। পেন্টাগন তার হাতে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী করায়ত্ব করেছে মূলত দুইটি কারণে – উভয়ই ভয়ানক সমাজবিরোধী।

    প্রথমত, এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষায় যাকে তারাই নাম দিয়েছে আমেরিকান স্বার্থ – অর্থাৎ মূলত তার ব্যবসায়ীদের স্বার্থ। দ্বিতীয়টি হল অভ্যন্তরীণ, যাকে শাসকরা কেইনসিয়ান মেকানিজম  বলে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর পর পেন্টাগন বিপুল পরিমাণ সামরিক খাতে সরকার ব্যয় করে, যাকে হাস্যকরভাবে “অর্থনীতির স্বাস্থ্য সুরক্ষা” বলা হয়ে থাকে। আসলে তা স্রেফ অপচয়।

    এই দুটো অবশ্যই নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থ হাসিলের জন্য করা হয়, অর্থাৎ আমেরিকার শাসক শ্রেণী। কিন্তু আর যাই হোক,  জনগণের স্বার্থ হাসিল তারা কখনই করে না। একটা মুক্তিপরায়ণ সমাজতান্ত্রিক বা নৈরাজ্যবাদী সমাজে কখনোই এই বিপুল পরিমাণ আবর্জনা উৎপাদন ও অপচয় করা হবে না। যদি এমন হয় যে কোন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে, তবে এমন কেউই নেই যে তাকে আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। কিউবা ও মেক্সিকোর তো প্রশ্নই আসে না। তাই যুক্তরাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা নিয়ে মাথা ঘামানোর তেমন দরকার নেই। তবে কোন সামাজিক বিপ্লব যদি পশ্চিম ইউরোপের কোথাও সংগঠিত হয়, তবে তাদের হয়তো প্রতিরক্ষা একান্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে।

    আমি বলতে যাচ্ছিলাম, নৈরাজ্যবাদী সমাজে প্রতিরক্ষার কোন প্রয়োজন হবে না এমন কোন সাধারণ নীতি নেই। কারণ এই ধরনের নৈরাজ্যবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ধবং হয়ে গেছে।

    চমস্কি: আসলে এগুলোর কোন সাধারণ উত্তর নেই। এগুলোর উত্তর হতে হবে খুবই সুনির্দিষ্টভাবে, সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং বস্তুনিষ্ঠ শর্তের সাপেক্ষে।

    এ ধরনের সংগঠনপ্রণালীর যে ধরনের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কথা আপনি বলছেন, তা বুঝতে আমার একটু বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ আমি ঠিক বুঝতে পারছি না জেনারেলরা কীভাবে নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে যেটাকে আপনি [গণতান্ত্রিক হিশেবে] অনুমোদন করবেন।

    চমস্কি: এজন্যই আমি এর জটিলতাটার দিকে ইঙ্গিত করতে চাই। এটা পুরোপুরি নির্ভর করে আপনি যে সমাজ বা দেশের কথা বলছেন তার উপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটনা একরকম। কিন্তু যদি ইউরোপে কখনো সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত হয়, তাহলে আপনি যে প্রসঙ্গটি তুললেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ সেক্ষেত্রে প্রতিরক্ষার বিষয়টা আমলে নিতেই হবে। পশ্চিম ইউরোপে যদি কোন না কোন পর্যায়ের মুক্তিপরায়ণ সমাজ-বিপ্লব সংগঠিত হয়ই, সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক অভিযানের হুমকি থেকেই যাবে। এবং তখন সমস্যাটা দেখা দিবে যে কীভাবে একে মোকাবেলা করা হবে। স্পেনিশ বিপ্লবে ঠিক এই সংকটই হাজির হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী, কমিউনিস্ট এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্রীদের [অন্তরাল] সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হয়েছিল এই বিপ্লব। এবং এরকম ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার প্রশ্ন যে গুরুত্বপূর্ণ হয় উঠবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

    যাই হোক, আমি মনে করি আমাদের যে প্রশ্নটা তুলতে হবে, কেন্দ্রীয় নির্দেশে পরিচালিত স্থায়ী সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষার জন্য উপযুক্ত কিনা। তবে আমি মনে করি না পশ্চিমে ইউরোপকে মুক্তিপরায়ণ সামাজিক বিপ্লব রক্ষার ক্ষেত্রে মার্কিন বা সোভিয়েতের আক্রমণের মুখোমুখি হতে হবে। এক্ষেত্রে আক্রমণটা হয়তো সামরিক না হয়ে অর্থনৈতিক হবে। সরাসরি সৈন্যবাহিনী স্থাপন করবে। তারা মূল আঘাত হানবে ইউরোপের অর্থনীতিতে।

    স্প্যানিশ সিভিল ওয়ার পোস্টার

    আপনি আপনার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “একটা সভ্য সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তির তার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকবে, যেখানে প্রত্যেকের সৃজনী কর্মক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনমুখী কাজ করার সুযোগ থাকবে।” তারপর আপনি প্রশ্ন করেন, “তাহলে অর্থ বা ক্ষমতা বা ঠিক কী দিয়ে সেই কাজের প্রতিদান দেয়া যায়? কিন্তু সত্যি কথা হল মননসিদ্ধির সকল কাজই নিজেই তার প্রতিদান।” এখন অনেকের কাছে এই ধরনের যুক্তি অনেক আকর্ষণীয় হতে পারে৷ কিন্তু মননসিদ্ধির সকল কাজই যে সমাজের জন্য মঙ্গলজনক কিংবা আমরা বর্তমানে যে জীবনধারায় অভ্যস্ত তার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবে এর প্রতিশ্রুতি কী?

    চমস্কি: হ্যাঁ, কিছু কিছু কাজ আছে যা আমাদের বর্তমান জীবনধারা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রশ্নটা হল তা কতটুকু কষ্টদায়ক হতে হবে? এটা তো জানা যে বর্তমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জীবনে কাজের পরিশ্রম কমানোর জন্য মোটেও নিয়োজিত নয়। এর কারণ হল ধরেই নেয়া হয় যে এখন এক বিপুল পরিমাণের মজুর-দাস নিয়োজিত আছে যারা নিজেকে ক্ষুধা থেকে বাঁচানোর জন্য যেকোন ধরণের কাঁধ ভাঙ্গা কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু যদি কখনও মানবিক বুদ্ধিমত্তাকে নিয়োজিত করা হয় এই প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্য যে বর্তমানের কাজ-কর্মকে কীভাবে অর্থশীল বানানো যায়, তার উত্তর আমি জানি না। তবে এটা ভাবা উচিত না যে তার কষ্ট লাঘব সম্ভব নয়। যেমন আমি স্টেট কন্সারভেশন কমিশনের জন্য ৩৪টা চারা লাগাই যা অন্তত আমার জন্য খুবই কষ্টকর হওয়ার কথা। কিন্তু আমি এটাকে খুবই উপভোগ করি। তবে যদি এমন হত যে আমার উপর কোন ওভারসীয়ার আরোপ করা হত কিংবা আমাকে জোর করে এটা করার জন্য বাধ্য করা হত তবে আমি তা মোটেও উপোভোগ করতাম না। তাই বলছি বেশিরভাগ মানুষেরই ভারী কাজ করতে তেমন অসুবিধা হয় না, তাই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে সেইসব কাজেরই কষ্ট লাঘব কী করে সম্ভব।

    কিন্তু বেশিরভাগই তো বেশ কিছু মাস অর্থহীন কাজ যেমন অটোমোবাইল এসেম্বলিতে, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে…

    চমস্কি: আমার মনে হয় না মানুষ এসব কাজকে একেবারেই অর্থহীন মনে করে। আমার জানামতে যারা অটোমোবাইল ফ্যাক্টরিতে টেকনিকাল কাজ কর্ম করে তারা তাদের কাজ নিয়ে খুবই গর্ব করে। আর এসবের জন্য তো অনেক বিশেষায়িত স্কীল দরকার যা অনেকের কাছেই অনেক আকর্ষণীয়। আর যদি সত্যিই এমন হয় যে এমন কিছু কাজ রয়েছে যা আসলেই কষ্টদায়ক ও অর্থহীন তবে সমতার খাতিরে কমিউনিটির সবার মাঝে সে কাজ সমান ভাবে ভাগ করে দেয়া যেতে পারে।

    আচ্ছা, আপনি বলছেন কমিউনিটি আপস মীমাংসার অধিকার রাখে। কমিউনিস্ট তত্ত্বও তো তাই প্রদান করে যার ভিত্তি হল জাতীয় পরিকল্পনা, বিনিয়োগের জন্য আদেশ ও বিনিয়োগ পরিচালনা ইত্যাদি কিন্তু একটি নৈরাজ্যবাদী সমাজতো এসবের সুযোগ রাখে না যেহেতু তারা রাষ্ট্রকেই প্রত্যাখান করে।

    চমস্কি: আমি বলব এই ধারণাটা ভুল। নৈরাজ্যবাদী সমাজ অবশ্যই তার শ্রমিক কাউন্সিল ও তাদের ফেডেরাটিভ কাঠামোয় জাতীয় পরিকল্পনার পূর্ণ সুযোগ রাখে। পার্থক্যটা হল এই পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণে কে অংশগ্রহণ করতে পারে। নৈরাজ্যবাদী এবং অবশ্যই মুক্তিকামী বা বাম-মার্কসবাদী ঐতিহ্য চায় সেই পরিকল্পনা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করুক অবগত শ্রমিক কাউন্সিলের এসেম্বলি সমূহ। যেখানে রাষ্ট্রবাদী কমিউনিস্টরা চায় তা করুক একটা জাতীয় আমলা গোষ্ঠী যারা যাবতীয় সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজেদের মধ্যে রাখবে ও কয়েক বছর পর পর নির্বাচন প্রচারণায় বলবে, “যাকেই তোমরা নির্বাচিত কর না কেন, আমাকে বা আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে, দিন শেষে দূরবর্তী আমলা শ্রেণীর এক সদস্যই তোমাদের শাসন করবে।”

    কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও বিশেষায়নের তো ব্যাপার আছে একটা…

    চমস্কি: হ্যাঁ, নৈরাজ্যবাদীরা তো বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাখান করে না। অবশ্যই এরকম বিশেষজ্ঞ থাকবে যারা একটা পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও তার ফল শ্রমিক কাউন্সিলদের সামনে এনে দিবে ও বলবে যে দেখুন এটা এটা করলে উৎপাদন এটা এটা হবে। কিন্তু এই বিশেষজ্ঞরাও শ্রমিকদের মতনই তাদের নিজস্ব কাউন্সিলে সংগঠিত হবে ও তাদের সাথে থেকেই তাদেরই হয়ে কাজ করবে। ঠিক যেমনটা অটোমোবাইল তৈরিকর্তারা আমাদের গাড়ি বানিয়ে দেয় ও আমরা পরে নিজেরা নিজেরদের মত চালাই, ঠিক তেমনি পরিকল্পনাকারীরা পরিকল্পনার নকশা শ্রমিকদের হাতে তুলে দিবে ও শ্রমিকরাই তাদের ইচ্ছানুসারে তা অনুসরণ করবে।

    মানুষের আমূল প্রকৃতি অর্থাৎ তার প্রেরণা, তার পরার্থপরতা, তার জ্ঞান ও তার জটিলতা – এসব কিছুর পরিবর্তনের উপর মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র কতটুকু নির্ভরশীল?

    চমস্কি: আমি মনে করি শুধু পরিবর্তনই না, বরং মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র এসব ক্ষেত্রে অবদানও রাখবে বটে। এটা অবদান রাখবে মানুষের আত্মিক পরিবর্তনে – অর্থাৎ সে কীভাবে নিজেকে নিজে দেখে, তার কর্ম ক্ষমতায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে, উৎপাদনে ও অনুসন্ধানে। একদিকে এটা সেই পরিবর্তনে নির্ভরশীল আবার আরেকদিকে এটা এমন সব প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সচেষ্ট যা মানুষের কর্মের প্রকৃতিতে, সৃজনী কর্ম সম্পাদনে, অন্য মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে পরিবর্তন রাখবে আর সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে এমন সব নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করবে যা নতুন উপায়ে মানব প্রকৃতিকে বিকশিত করতে সাহায্য করবে। আরপর আরো মুক্তিপরায়ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে যেখানে এই মুক্ত মানুষগুলো অবদান রাখতে পারবেঃ আমার মতে এটিই সমাজতন্ত্রের সঠিক বিকাশ।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: হিসাম সাত্তা
    সূত্র: রুয়া

    প্রশ্ন: আর শেষমেশ প্রফেসর চমস্কি, এরূপ আদর্শের সমাজ কী আগামী ২৫ বছর বা এর কাছাকাছি সময়ের মধ্যে এখনকার উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে অস্তিত্বশীল হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে?

    চমস্কি: আমি মনে করি না আমি এতটাই বুদ্ধিমান কিংবা [তথ্যের দ্বারা] এতটাই অবগত যে এরকম অত্যন্ত জটিল একটা প্রশ্নের উত্তরে আমি কোন আগাম ভবিষ্যতবাণী করতে পারব। তবে আমার ধারণা অন্তত এটুকু আমরা বলতেই পারি যে, শিল্পায়িত পুঁজিবাদের মধ্যে সংকীর্ণ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সমস্ত প্রবণতা দৃশ্যমান। এই প্রবণতাসমূহ দীর্ঘকাল যাবৎ বিরাজ করছে এবং এগুলোকে থামানোর মতো কোন নীতি উপায় দেখা যাচ্ছে না।

    কিন্তু আমার মতে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকতার এই বিকাশ – এবং অবশ্যই এরা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত- বিদ্রোহের দিকে এবং অবিরামভাবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে সাংগঠনিক প্রচেষ্টার দিকে ঠেলে দিবে। এসব অনেক ধরনের রূপ নেবে। বর্তমানে ইউরোপে যে আন্দোলন চলছে তার নাম হল সহ-নিরূপণ বা কো-ডিটারমিনেশন। অন্য ভাষায় বলতে গেলে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ। বেশিরভাগ প্রচেষ্টাই নগণ্য এবং আমার মতে ভ্রান্তও বটে যেহেতু এগুলো শ্রমিক শ্রেণির আসল মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত নয়। তবে আর যাই হোক এটি একটি সঠিক প্রতিক্রিয়া অন্তত এই উপলব্ধি ও অনুমানের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিকভাবেই হোক বা বেসরকারী অর্থনৈতিক ক্ষমতার জোরেই হোক, বল প্রয়োগ ও নিপীড়ন কোন ভাবেই মানবজীবনের অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য নয়। যতদিন পর্যন্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের এই কেন্দ্রীকরণ চলবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের উৎখাতের জন্য সংগ্রাম ও বিদ্রোহও চলবে। আর আমি আশা করি অচিরেই সেই সংগ্রাম সফল হবে।

    নোট: এই ইন্টারভিউ  BBC London Weekend 7v এর জন্য ১৯৭৬ সালের ২৫শে জুলাই সংগঠিত হয়েছিল পিটার জেই এর দ্বারা এবং প্রকাশিত হয় Noam Chomsky, Radical Prioritie,  expanded cd., সম্পাদকঃ সি.পি ওটেরো; ওকল্যান্ড: AK Press, ২০০৩), pp. 211-24