Blog

  • নোম চমস্কি।। নৈরাজ্যবাদ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আর রাষ্ট্র

    নোম চমস্কি।। নৈরাজ্যবাদ, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আর রাষ্ট্র

    অনুবাদ: বাধন অধিকারী ও মোকাররম রানা

    নোম চমস্কির এই সাক্ষাতকারটি ব্রাজিলে নেয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে। এই সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন পাবলো ওরটেলাডো এবং আন্দ্রে রায়কি ইনোউ। গণতন্ত্র ও সেলফ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে সাউ পাউলো বিশ্ববিদায়লয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রদের পত্রিকা Temporaes এর বিশেষ সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে  এটি সাউ পাউলো থেকে নৈরাজ্যবাদের উপরে চমস্কির রচনা ও সাক্ষাতকারের সংকলন Anarchism: Notas sobre 0 Annrquismo  তে প্রকাশিত হয়।

    নোম চমস্কি

    আপনাকে ব্রাজিলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ব্রাজিলীয় ভাষাবিজ্ঞানীদের সংগঠন এবিআরএএলআইএন। কেন আপনার সিডিউল থেকে কিছু সময় আপনি স্থানীয় সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার স্বার্থে বরাদ্দ রেখেছেন?  

    চমস্কি: এটা আমি সবসময়ই করি। সম্ভবত বিগত ৪০ বছর ধরে কেবল ভাষাতত্ত্ব নিয়ে কথা বলার জন্য আমি যে কোনও স্থানে গেছি। আর আমি দুই কাজের মধ্যে [ভাষাতত্ত্ব ও সামাজিক আন্দোলন] সমন্বয় করেছি। আসলে তো আমি সাধারণত সামাজিক/রাজনৈতিক আন্দোলনের স্বার্থেই [বিভিন্ন স্থানে] যাই, সঙ্গে ভাষাতত্ত্ব নিয়েও বক্তৃতা করি। সুতরাং আমি যদি যুক্তরাষ্ট্রের কলেরাডো কিংবা অন্য কোথাও কোনও সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের জন্য বক্তৃতা করি, তো সেটা সাধারণত ভাষাতত্ত্ব বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতাতেই হয় আর তারাই ভ্রমণের ব্যবস্থাটা করে দেয়। এ নিয়ে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। আসলে আমন্ত্রণটা আসে বিভিন্ন গ্রুপের পক্ষ থেকে। সুতরাং এটাই স্বাভাবিক।

    নৈরাজ্যবাদ ও রাষ্ট্র

    ‘পাওয়ারস অ্যান্ড প্রোসপেক্টস’ নামে আপনার নতুন বইয়ের একটি রচনায় (গোলস অ্যান্ড ভিসনস) আপনি বলেছেন, একজন নৈরাজ্যবাদী হিসেবে আপনার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের বিলোপ, তবে আপনার আপাত লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, এমনকী কখনও কখনও তাকে শক্তিশালী করা […] যেন গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের সীমা প্রসারিত করার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা প্রতিহত করার চেষ্টা রুখে দেওয়া যায় রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা বলতে আপনি কি বোঝাতে চান? আপনি কি রাষ্ট্রে [জনসাধারণের] কার্যকর অংশগ্রহণের কথা বলেন; এই যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের কিংবা ব্রাজিলে ওয়ার্কার্স পার্টিকে ভোট দেওয়া? যদি তা না হয়, তাহলে আসলে আপনি এর মধ্য দিয়ে কী চান?

    চমস্কি: এটা ছিল একটা অ্যানার্কিস্ট কনফারেন্সের বক্তৃতা; আর আমার মতে মানুষের পরিণতির কথা চিন্তা করার বদলে বাঁধাধরা কোনও মতবাদের পেছনে ছুটে বেড়ানোর মানে মুক্তিপন্থি আন্দোলনগুলোকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। যাইহোক, এটা পুরোপুরি যথাযথ… মানে, আমার এবং আমার মতো অন্য কারও কারও মতে রাষ্ট্র একটা অবৈধ প্রতিষ্ঠান। তবে তার মানে এই নয় যে, কখনও আপনি রাষ্ট্রকে সমর্থন করতে পারবেন না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আপনি যদি রাষ্ট্রকে সমর্থন না করেন, তাহলে  এর চেয়েও [রাষ্ট্রের] অবৈধ কোনও প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং যদি আপনি মানুষের কথা ভাবতে চান, তো বাস্তবসম্মত [চিন্তা করুন], যুক্তরাষ্ট্রের কথায় আসেন। সেখানে একটা রাষ্ট্রীয় খাত রয়েছে যা ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ড করে। আবার তাদের কিছু ভালো কাজ করতেও দেখা যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে সেখানে ব্যাপকতর জন-সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে তার ফলস্বরূপ সেখানে যৎসামান্য একটি কল্যাণমূলক ব্যবস্থা চালু আছে যার কারণে গরীব মা-শিশু উপকৃত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকুচিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা আজ হুমকির মুখে। তো যাই হোক, অ্যানার্কিস্টরা বুঝতে সমর্থ হয়নি যে তাদের ওই ব্যবস্থাকে সমর্থন করা উচিত ছিলো। তাই তারা অতি-দক্ষিণপন্থিদের সঙ্গে জুটলো এবং তাদের সুরে সুর মেলালো যে, ‘হুম, আমাদের রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করা উচিত’; যার মানে হলো স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তিক্ষমতার হাতে আরও বেশি পরিমাণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা যারা সম্পূর্ণভাবে জনগণের কাছে জবাবদিহিতাবিহীন ও পুরোপুরি সর্বাত্মক।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য একলিপস অব দ্য সান
    শির্পী: জর্জ গ্রসজ
    সূত্র: রিপ্রোডাকশন

    এটা ৩০ এর দশকে ফিরে আসে পুরনো সেই কমিউনিস্ট পার্টির শ্লোগানের মতো একটা স্মারক, দ্য ওর্স, দ্য বেটার। একটা সময়কাল ছিল যখন কমিউনিস্ট পার্টি ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করতে অস্বীকৃত ছিল কারণ যদি ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করতে হয়, তাহলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিতে হবে, কিন্তু তারা তো ভালো মানুষ না, সুতরাং ‘খারাপই শ্রেয়তর’। আমার শৈশব স্মৃতি থেকে এই শ্লোগানটি আমি মনে করতে পারি। তো তারা খারাপটাই বেছে নিয়েছিল, তা হলো হিটলার।

    একটা সাত বছরের শিশুর জন্য খাবারের নিশ্চয়তার প্রশ্নকে যদি আপনি আমলে নিতে চান, তখন দূরবর্তী বাস্তবতায় অবৈধ বিবেচনা করেও আপনি রাষ্ট্রীয় খাতকে সমর্থন করবেন। আমি জানি, মৌলিক তাত্ত্বিক পাটাতনের অনুগামী নয়, এমন অনেকের কাছেই বামপন্থিদের মোকাবেলা করাটা কঠিন হয়ে পড়ে; এমনকি আমি নিজেও তাদের অব্যাহত সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে থাকি। তাদের কাছে মৌলিক তাত্ত্বিক পাটাতন হলো রাষ্ট্রীয় খাতের বিরোধিতা করা; এমনকি সেই বিরোধিতার কারণে যদি সর্বাত্মক-স্বেচ্ছাচারী কোনও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় যারা শিশুদের ক্ষুধায় মরতে দেখে খুশি হবে, তখনও। আমরা যদি যথাযথভাবে আমাদের ভবিষ্যত সংকট নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে চাই, তাহলে এই বিষয়গুলো আমাদের মাথায় রাখা উচিত। প্রকৃতপক্ষে, আজকের যুগে রাষ্ট্রীয় খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নের মানে রাষ্ট্র বিলোপের পথে একধাপ অগ্রগতির প্রশ্ন কেননা এটা [রাষ্ট্রীয় খাত] একটা জনক্ষেত্র (পাবলিক অ্যারানা) যেখানে ছোট পরিসরে হলেও জনগণ অংশগ্রহণ করতে পারে, সংগঠিত হতে পারে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে এবং আরও অনেককিছু করতে পারে। যদি আমরা সেই পথে না হাঁটি তাহলে আমরা একটা ব্যক্তিক-স্বৈরতন্ত্রী ব্যবস্থার অধীনে চলে যাব, যা কোনভাবেই স্বাধীনতার পথে অগ্রগতি নয়।

    তার মানে আপনার মতে আমরা এমন একটা অবস্থায় রয়েছি রাষ্ট্র যখন শক্তিশালী হয়, সেখানে কর্পোরেট শক্তি হারায় কিংবা কর্পোরেট শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হ্রাস পায়।

    চমস্কি: অনেকটা সেরকমই।

    আমার মনে হয়, আপনি ক্ষমতার লড়াইয়ে একটি তৃতীয় পক্ষকে শনাক্ত করছেন না, তারা হলো সংগঠিত জনতা। আপনাকে একটা উদাহরণ দিই। গত বছর সাও পাওলোর মেয়র শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গঠনতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেন। সেখানে ডাক্তার ও নার্সসহ অপরাপর স্বাস্থ্যকর্মীরা রাষ্ট্রের কাছে বেতন-ভাতা গ্রহণ করতো, তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিজেদের মতো করে চালায়। তাদের বলা হলো, যদি তারা মনে করে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো তারা ঠিকমতো চালাতে সক্ষম নয়, তাহলে যেন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তা ব্যক্তিখাতের হাতে তুলে দেয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে যারা বামপন্থি, তারা সঙ্গে সঙ্গে বললো, এটা স্বাস্থ্যখাত বেসরকারিকরণের একটা অপচেষ্টা যা সংবিধানসম্মত নয়। একইসময়ে স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত মুক্তিপন্থিরা প্রস্তাব করলো, বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় খাতে রাখার বদলে স্বাস্থ্যখাতকে  স্থানীয় জনসাধারণ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বনিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ভবন ও সরঞ্জাম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হবে, বেতনভাতাও রাষ্ট্র দেবে তবে নীতি-পরিকল্পনা, কার্যক্রম, পরিচালনাবিধির মতো বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে স্থানীয় জনসাধারণ ও কর্মীরা। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের সীমা বাড়া…

    চমস্কি: আর না বললেও চলবে, আমি বুঝেছি আপনার কথা।

    এবং একইসঙ্গে এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে দুর্বল করা যা…

    চমস্কি: না, এটা রাষ্ট্রকে দুর্বল করা না, এটা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, কেননা খেয়াল করে দেখেন যে আপনি নিজেই বলেছেন বেতন-ভাতা দেবে রাষ্ট্র। মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের হাতে, তারমানে রাষ্ট্রীয় খাত শক্তিশালী হবে। আমি খুব করে এটার পক্ষে। আমি মনে করি, সেখানে কর্মীদের স্ব-ব্যবস্থাপনা থাকবে তবে তহবিল বরাদ্দ হবে সামাজিক। যেমন ধরেন, আপনি যদি এখানে একটা ব্যাপার যুক্ত করেন যে, তহবিল আসবে জনসাধারণের কাছে থেকে, তো সেটা ধনীদের জন্য বিরাট একটা উপহার হবে। তারা এতে খুব খুশি হবে। কারণ কর-ব্যবস্থায় কর পরিশোধের মধ্য দিয়ে তাদের যে ভূমিকা পালন করতে হয়, সেটা থেকে তারা মুক্তি পেতে চায়। সেটা [তাদের দেওয়া কর] যতো কমই হোক না কেন, এতে অন্তত সামাজিক কল্যাণে সহযোগিতার কিছু দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়। এটা যদি তাদের না করতে হয়, তাহলে তো তারা খুশি হবে। সুতরাং আপনি যদি স্ব-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার কথা বলেন, তো সেটা দারুণ, আমি মনে করি এটা একটা দুর্দান্ত চিন্তা, এবং আমি যা বলেছি তার সঙ্গে এর মোটেও কোনও বিরোধ নাই। যেমন ধরেন আমি আগে যা বলেছি সেটাও কারখানার স্বনিয়ন্ত্রণ, কারখানাতে কর্মীদের স্বনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এটা একই ব্যাপার। তা হলো, চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে হবে, চলমান বাস্তবতায় গরিবেরা নয়, স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় হবে সামাজিক। আর এটাই হলো ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় খাতকে শক্তিশালী করা। সুতরাং ব্যাপারগুলো একইরকম, আপনি যা বলেন, সেটা কোনও তৃতীয় পন্থা নয়, আমি যে দ্বিতীয় পন্থার কথা বলেছি, সেটাই  [স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তিমালিকানাকে রুখতে রাষ্ট্রীয় খাতের সুরক্ষা।] প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিধিত্বমূলক/সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের যে দায়দায়িত্ব নির্ধারিত, তার  মধ্যে সংরক্ষিত জনক্ষেত্রে লড়াইয়ের নানান ধারার সুযোগ রয়েছে। এর অন্যতম কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণটি হলো, সব ধরনের ব্যক্তিখাতের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানার অবসান ঘটানোর লড়াই।  ধারণাগতভাবে এটি সংসদীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই করা সম্ভব। বাস্তবে এটি হয়তো সম্ভব নয়, তবে সেখানে এ সংক্রান্ত আলোচনার কথা তুলবার সুযোগ রয়েছে ওই ব্যবস্থার মধ্যেই। অধিজাতিক কর্পোরেশনগুলো যে লিবারেলদের ব্যাপারে আগ্রহী, সেটার একটা কারণ হলো লিবারেলরা রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করার পক্ষে। আর রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করার মানে ব্যক্তিমালিকানাকে শক্তিশালী করা। তবে এরমধ্য দিয়ে আসলে জনগণের প্রভাবকে সীমিত করা যায়। আর সেটা কিন্তু নৈরাজ্যবাদী লক্ষ্য হতে পারে না। বলতে চাইছি, ‘রাষ্ট্রের ভূমিকা সংকোচন’ নামের ধারণায় মানুষ বিমোহিত হতে পারে, এর ফাঁদে পা দিতে পারে; তবে ভেবে দেখা দরকার আসলে এর মধ্য দিয়ে কী হচ্ছে। এটা কিন্তু রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করার মধ্য দিয়ে আরও ভয়াবহ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা। এটা নৈরাজ্যবাদী লক্ষ্য হতে পারে না।

    এইযে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নৈরাজ্যবাদী লিবারটেরিয়ান পার্টিকে ভুল করে নৈরাজ্যবাদী ধারার কিংবা তার কাছাকাছি ধারার মনে করে; সেজন্যই কি আপনি জোর দিয়ে এই কথাগুলো বলছেন?

    চমস্কি: খানিকটা সম্পর্কতো আছেই। ইংরেজিভাষী দুনিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটি এক অদ্ভুত অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রপঞ্চ। সেখানে [যুক্তরাষ্ট্রে] নৈরাজ্যবাদের একটিমাত্র স্বপ্ন, একটিমাত্র ধরন টিকে ছিল। সেটি হলো উগ্র ডানপন্থি নৈরাজ্যবাদ, যা আপনি লিবার্টারিয়ান পার্টিতে দেখেন; যা শুধু মাত্র বড় কর্পোরেশন এবং বিনিয়োগ সংস্থাগুলির মতো প্রতিষ্ঠানের হৃদ্যতা পেয়েছে। এমন নয় যে তারা এতে [নৈরাজ্যবাদে] বিশ্বাস করে। তারা ভালভাবে জানে যে, এই রাষ্ট্র থেকে তাদের মুক্তি মিলবে না কারণ নিজেদের স্বার্থেই এটি তাদের দরকার। তবে তারা এটিকে [নৈরাজ্যবাদ] অন্য সবার বিরুদ্ধে একটি মতাদর্শিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পছন্দ করে। তাই, মূলধারার ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে উদারপন্থি দল অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গৃহীত হয়েছে। যেখানে তারা আসলে নৈরাজ্যবাদ নিয়ে গোপনে টিটকারি মারে। কেননা তারা ভালভাবে জানে যে, বিপুল রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারবে না, তাই তারা একটি ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র চায়। তবে তারা উদারপন্থি মতাদর্শ পছন্দ করে যা তারা অন্য সবার বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। যদি আপনি আসলেই উদারপন্থি দলের আদর্শ অনুসরণ করেন তবে আপনি বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সর্বাত্মক জুলুমবাজ তৈরি করতে পারবেন। আসলে, সেখানে [উদারপন্থী দলে] আমার অনেক বন্ধু রয়েছেন। অনেক বছর ধরে, আমি শুধুমাত্র অতি-ডান উদারপন্থি পত্রিকাগুলোতেই লিখতে পারতাম কেননা অনেক বিষয় ছিলো যেগুলো নিয়ে আমরা একমত ছিলাম। উদাহরণ হিশেবে বলা যায়, মার্কিন  সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতার বিষয়ে আমরা একমত। উদাহরণ হিশেবে বলা যায়, পূর্ব তিমুরের উপরে আমি প্রথম যে লেখাটি লিখেছিলাম তা ছাপতে কেউ রাজি   ছিল না। সত্তরের দশকের শেষদিকে, তারা এটি প্রকাশ করেছিল। এটি  সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে  এই বিষয় নিয়ে প্রকাশিত একমাত্র নিবন্ধ। তারা আরো অনেক কিছু ছাপিয়েছে এবং এখনো  ব্যক্তিগত  পর্যায়ে  আমাদের  বন্ধুত্ব  রয়েছে। যদি পার্থক্যের একটি বড় পরিসরও বিদ্যমান।

    যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক শ্রেণির নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন, মানে বাম নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনও ছিল। বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে তাদেরকে প্রায় ধ্বংস করা হয়। ঠিক তখন যখন এমা গোল্ডম্যান এবং আলেকজান্ডার বার্কম্যানের মতো লোকদের জেলে বন্দী করা হয়েছিল এবং দেশ থেকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল। শ্রমিক শ্রেণির বাম উদারপন্থি আন্দোলন ব্যাপক অর্থে থেঁতলে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রশংসিত হয়েছিল ডান উদারপন্থি আন্দোলন। ক্ষমতাশালীরা নিজেদের বিশ্বাস থেকে এমন করেছিল তা নয়, এটা করা হয়েছিল কারণ এটা একটা কার্যকর পন্থা [ব্যাটারিং র‍্যাম]। অনেক  নৈরাজ্যবাদী এ নিয়ে খুব বিভ্রান্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিতান্ত্রিক নৈরাজ্যবাদের ঐতিহ্য রয়েছে। ” আমি বনবাসে  চলে যাব এবং নিজেই কাজ করব, “এই ধারার নৈরাজ্যবাদ। এটি এমন এক ব্যাপার যা ব্যাপক ভাবে ব্যবসা-পরিচালিত সমাজে বিকাশ লাভ করে, যেখানে ব্যাপক শূন্যতা রয়েছে। এটি বহু ধারার। এর একটি ধারা সশস্ত্র পন্থাকে গ্রহণ করে, যারা অত্যন্ত রাষ্ট্রবিরোধী। আমি বোঝাতে চাইছি যে, আমি যদি এমন গোষ্ঠীগুলির সাথে কথা বলি যেখানে অতি-ডান সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি  দৃঢ় সমর্থন রয়েছে, তবে আমরা অনেকগুলি বিষয় নিয়ে  একমত হই। তারা আমার বই বিতরণ করছে। আপনি সেই সশস্ত্রপন্থিদের কনফারেন্সে যান, সেখানে আমার বই আছে। তারা মনে করে আমরা একই দিকে আছি কারণ আমরা দুই পক্ষই রাষ্ট্রকে আক্রমণ করছি।

    ঠিক যেভাবে নৈরাজ্যবাদীরা মনে করে আমরা ভিন্ন পক্ষে রয়েছি, কারণ আমি  রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য কিছু একটা করি। আপনি যদি এই বিষয়গুলি নিয়ে  ধীরে-সুস্থে ভাবেন, আমি যা বোঝাতে চাইছি তা হলো, একটি স্লোগান আপনাকে সবটা বোঝার সুযোগ দেয় না। আপনাকে আরো গভীর বাস্তবতার নিরিখে স্লোগানটিকে বিবেচনা করে দেখতে হবে।

    এটা খুবই হাস্যকর যে আমেরিকানরা অতি-ডান এবং অতি-বামের মধ্যে এত বড় বিভ্রান্তি তৈরি করে…

    চমস্কি: এটি অস্বাভাবিক নয়, ইতিহাস দেখুন, মুসোলিনি কোথা থেকে এসেছে।

    বিশেষায়িতকরণ ও শ্রমের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভাজন

    আপনি [ভাষা ও দায়বদ্ধতা]’র কোথাও একবার উল্লেখ করেছিলেন যে, বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা হলো সামাজিক ভেদাভেদ বজায় রাখা এবং এলিট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা। সামাজিক জ্ঞানের (ইতিহাস, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ইত্যাদি) বিশেষ তত্ত্ব-পদ্ধতি প্রয়োজন যা সাধারণ মানুষের নেই; এমন ধারণার সমালোচনাও করেছিলেন আপনি। একই সময়ে, একার্থে যে সমালোচনা সামাজিক জ্ঞানের বিশেষায়নের নিন্দা করে তা নিজেই বিশেষায়িত, কেননা এটি ব্যাপক পরিশ্রমের  দাবি করে যা কেবলমাত্র  একজন পেশাদার বুদ্ধিজীবী বা কঠোর পরিশ্রমী সমঝদার ব্যক্তিই  করতে পারে। একজন সমালোচক বুদ্ধিজীবী কীভাবে বিশেষায়নের সমালোচনা করা ও নিজেই বিশেষজ্ঞ হওয়ার এই উভয় সংকট এড়াতে পারেন?

    চমস্কি: আমি মনে করি আপনাকে সৎ হতে হবে। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, আমার স্নাতক কোর্সগুলিতে ভাষাবিজ্ঞানের যা পড়াই তা পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারব কি না, আমি “না” বলতাম কেননা এর জন্য অনেক বেশি পূর্বধারণা থাকা প্রয়োজন। এখানে, অনেক  বোঝাপড়া ও প্রায়োগিক জ্ঞানের দরকার। কিন্তু আপনি যদি আমাকে পাঁচ মিনিটে ব্রাজিলের ঋণ  সঙ্কট ব্যাখ্যা করতে বলতেন তাহলে আমি “হ্যাঁ” বলতাম কেননা এটি তুলনামূলকভাবে সোজা। এবং আসলে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সব বিষয়গুলি বাহ্যত একই। বিজ্ঞানের বিষয়গুলো অনেকেই তেমন ভালো বোঝে না, আপনি যখন বড় অণুগুলোর বাইরে চলে যান তখন এটি খুবই বর্ণনামূলক হয়ে যায়। তাই আমি কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে কোন বক্তব্য দিতে যাচ্ছি না যা সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।

    অন্যদিকে, এই প্রশ্নগুলি [সমাজ সংক্রান্ত] আসলেই সবার কাছে বোধগম্য। বুদ্ধিজীবীরা যে কাজগুলি করেন তার মধ্যে একটি হলো এগুলোকে দুর্বোধ্য করে তোলা। অনেক কারণে তারা এটি করেন। এর মধ্যে কর্তৃত্ব রক্ষা ও ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার বিষয়ও রয়েছে। এটি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে, বুদ্ধিজীবীরা সহজ জিনিসকে কঠিন করে দেখান। এটি অনেকটা সেই সময়ের মত যখন মধ্যযুগের চার্চ এর গুরুত্ব ধরে রাখার জন্য রহস্য তৈরি করছিলো। দস্তয়েভস্কির গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর পড়ে দেখুন-সেখানে এটি সুন্দর করে বলা আছে। গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর ব্যাখ্যা করেছেন যে, আপনাকে রহস্য তৈরি করতে হবে তা না হলে সাধারণ মানুষ সবকিছু বুঝে যাবে। তাদের শাসন করার জন্য কোন বিষয়কে রহস্যময় ও জটিল করে তুলতে হবে। এটাই বুদ্ধিজীবীদের পরীক্ষা করার উপায়। এটি তাদের জন্যও ভাল: তখনই আপনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, এমন বড় বড় কথা বলছেন যা কেউ বুঝতে পারে না। কখনো কখনো এটি হাস্যকর হয়ে ওঠে। উত্তরাধুনিক আলাপের কথাই ধরুন। বিশেষ করে, প্যারিসজুড়ে এটি একটি [কমিক স্ট্রিপে] পরিণত হয়েছে। আমি বলতে চাইছি, এগুলো খবই অর্থহীন বকবকানি। তবে এটি খুব ফোলানো ফাঁপানো; টেলিভিশন ক্যামেরা, বিপুল ভান [ঢং] সহকারে। যা আপনি আট বছরের কোন বাচ্চাকেও ব্যাখ্যা করে বলতে পারেন, তারা সেটি অনেক গভীরভাবে উন্মোচন করার এবং এর পিছনে আসল অর্থ কী তা বোঝার চেষ্টা করে। সেখানে আদতে কিছুই নেই। কিন্তু এগুলো হলো বামপন্থিসহ  সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের কিছু পথ; যার মাধ্যমে তারা নিজেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পেশা ও প্রভাব তৈরি করে, জনমানুষকে প্রান্তের দিকে ঠেলে দেয়, ভীত করে তোলে।

    আর্টওয়ার্ক: ওয়ার্কার্স আপরােইজিং
    শিল্পী: জ্যাকোব স্টেইনহাট
    সূত্র: ওয়েমিয়ার

    উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের জন্য এটি আরো বেশি করে প্রযোজ্য যে; তরুণ  র‌্যাডিকাল অ্যাকটিভিস্টদের অনেকেই বাম ঘরানার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন অথবা র‌্যাডিকাল  নারীবাদী আন্দোলন কিংবা এই রকমের কোনও ঘরানা থেকে  আসা  অবোধ্য বকবকানি  দ্বারা ভীত হয়ে পড়েন। এগুলো [বকবকানি] বুঝে ওঠা একেবারেই অসম্ভব। এটি মানুষের মনে এই অনুভূতি তৈরি করে যে, তাদের আসলে কিছু করার নেই। কেননা যতোক্ষণ তাদের পোস্ট-মডার্নিজমের সর্বশেষ চিন্তাধারা সম্পর্কে জানাশোনা নাই, ততোক্ষণ তাদের পক্ষে রাস্তায় নেমে জনগণকে সংগঠিত করা সম্ভব নয়। কেননা, এইসব বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধিশুদ্ধি তাদের নেই।  হয়তোবা এটি উদ্দেশ্যপ্রণিত কিছু নয়।বতবে এর প্রভাব প্রান্তিককরণ, নিয়ন্ত্রণ ও আত্মস্বার্থ হাসিলের কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের মর্যাদাশীল করে তোলেন, এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করেন এবং উচ্চপর্যায়ের জীবন-যাপন করেন এবং এরকম আরো অনেক কিছু। সম্ভবত প্যারিস এটির চরমতম সংস্করণ। সেখানে এটি প্রায় একটি কমিক স্ট্রিপ হয়ে গেছে। তবে আপনি এটি অন্য জায়গাতেও খুঁজে পাবেন।

    অন্যদিকে, এটি বোঝার জন্য আপনার নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে যে, “আসলে কোন সূত্র, কোন নিয়মাবলী বা মতবাদ যদি থেকে থাকে যা বোঝার জন্য কঠিন কিন্তু সত্যিই তা নিয়ে আপনার পড়াশোনা করতে হবে, তাহলে আপনি আমাকে এমন কিছু একটা  দেখান যা সহজ কথায় বলা যায় না।” যদি কেউ আপনাকে তা দেখাতে পারে তাহলে এটি  সিরিয়াসলি নিন।  পদার্থবিজ্ঞানের কাউকে  জিজ্ঞেস করে দেখুন সে এটি পারবে। [কিন্তু] এখানে একটা পার্থক্য আছে। উদাহরণস্বরূপ, কখনো কখনো এরকম ঘটে যে পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে উদ্ভূত এমন কিছু  থাকে যা আমি বুঝি না তখন আমি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে আমার বন্ধুদের যেতে পারি এবং  তাদেরকে বিষয়টি  ব্যাখ্যা করতে বলতে পারি। আমি তাদেরকে বলব আমার লেভেলে এসে এমনভাবে ব্যাপারটি বোঝাতে যাতে আমি বুঝতে পারি এবং তারা এটি পারে। ঠিক একইভাবে আমি যেমন করে স্নাতকোত্তর ভাষাতাত্ত্বিক  সেমিনারের কোন কিছু নিয়ে তার পরিভাষাসহ সবিস্তারে তাদের বোঝাতে পারি।তারা এ ব্যাপারে একটি ধারণা পাবে।  দেরিদার সর্বশেষ রচনা   অথবা অন্য কারো কিছু  নিয়ে কাউকে এমন পরিভাষায় বুঝিয়ে বলতে বলার চেষ্টা করে দেখুন  যা আপনি বুঝবেন।তারা এটি পারে না।  অন্তত আমার ক্ষেত্রে তারা এটি  পারে না: আমি বুঝি না। এবং আমি মনে করি আপনার অবশ্যই নিজেকে খুব যত্ন নিয়ে  জিজ্ঞাসা করতে হবে যে বিবর্তনের ক্ষেত্রে কী এমন দুর্দান্ত উল্লম্ফন ঘটেছে  যাতে কারও কারও মধ্যে এইসব দুর্দান্ত অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়েছে যে তারা সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়গুলি পরিষ্কার করতে পারে না, কেউই এগুলো বোঝে না। এটি সম্পর্কে সবারই খুব সংশয়ী হওয়া উচিত যে, এটি মানুষের মতামতের ওপর বুদ্ধিজীবীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম কৌশল।

    বিবেক এবং ভ্যানগার্ড

    আপনি কেবল দেরিদার প্রসঙ্গই তুললেন। তবে পরবর্তীতে  রিলেটিভিজম (একটি উত্তর আধুনিক ধারণা, যেখানে মনে করা হয়, শাশ্বত কিংবা বস্তুগত সত্য বলে কিছু নেই। এটি নিজ নিজ অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত) নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে। এটি অনেককে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে যেখানে সাংস্কৃতিক  বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার নাম করে নিষ্ক্রিয়তাকে জায়েজ করা  হয়। আমার কাছে মনে হয়  এই আলোচনাটি দ্বিমুখী। এর একটি উদার দিক রয়েছে, যা হলো বহুসংস্কৃতিবাদ, তবে এর একটি বামপন্থি দিকও  রয়েছে, যা গ্রামসি থেকে পাওলো ফ্রেয়ারে পর্যন্ত বিস্মৃত। পরবর্তী (এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়) দিককার (বামপন্থি) আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছিল একটি আলোকিত ভ্যানগার্ড এবং সংকীর্ণ মনের সর্বহারা শ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্বের কর্তৃত্ববাদবাদের দিকে ধাবিত হওয়ার বিষয়টি। সাধারণ নিষ্ক্রিয়তা এবং কর্তৃত্ববাদ দুটোকেই এড়াতে চাইলে কী অবস্থান নেওয়া উচিত?

    চমস্কি: ভ্যানগার্ড ধারণাগুলো সহজেই বোঝা যায়; ডানপন্থি উদারনীতির মতো করেই এটিও মানুষের জন্য নিজেদের  ক্ষমতাকে ন্যায্যতা দেয়ার একটি উপায়। এটি মানুষকে ক্ষমতা অর্জনের এবং অন্যদেরকে মূল্যায়ন না করার মতাদর্শিক বৈধতা দেয়। নিষ্ঠাবান মানুষেরা জনগণের সঙ্গেই কাজ করবে।  আপনি যখন সত্যিই কিছু শেখাতে চান তখন আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতাবাজি করেন না, যা জনগণ নকল  করবে। আপনি তখন সত্যিই জনগণের সাথে কাজ করেন। হোক তা ছয় বছর বয়সী বাচ্চাদের শেখানো অথবা পোস্ট গ্রাজুয়েট স্কুলে শেখানো,সব ক্ষেত্রেই এটি সত্য। আপনি একসাথে কাজ করছেন, নিজেকে আলোকিত করার চেষ্টা করছেন।কখনো কখনো  যে শেখায় সে তার শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি শেখে। তো আপনার যে জ্ঞান, সম্পদ ও সুবিধা আছে অন্যদের সাহায্য করার জন্য এবং তাদের কাছ থেকে শেখার জন্য আপনি তা ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। সম্মানজনক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ এটাই। তার মানে এই নয় যে, কেউ কেউ ভ্যানগার্ড; আসলে বুদ্ধিজীবীরা হলেন সেবক, যারা শ্রেয়তর বোঝাপড়ার স্বার্থে যারা অপরাপর মানুষের সঙ্গে মিলে কাজ করে।

    আসলেই এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই।  বিশেষভাবে হার্ড সায়েন্সের কথা যদি ধরি, তো বিষয়টা ভালোভাবে বোঝা যাবে।  যদি আপনি উচ্চতর গণিত কিংবা উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞান অথবা এমনকি আমাদের ভাষাবিজ্ঞানের স্নাতক কোর্সের মতো প্রচুর পরিমাণ স্বতন্ত্র আধেয় রয়েছে এমন কিছুর কথা বলেন, তো সেখানেও সবকিছু নিয়ে স্পষ্ট বোঝাপড়া অর্জন করা যায়।  ব্যাপারটা এমন নয় যে এখানে অধ্যাপক দাঁড়িয়ে আছেন এবং অন্যেরা নোট নিচ্ছেন কিংবা তার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছেন। এটা একটা বিনিময়ের প্রশ্ন। আপনি যা নিয়ে কাজ করছেন সেটি সম্পর্কে কথা বলবেন। কিছু শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়াবে এবং তারা বলবে যে এটি ভুল। অন্য কোন রাস্তায় আপনার এটি ভাবা উচিত হবে। তখন আপনি সমস্যাটি নিয়ে আবার কাজ করবেন। যখন আপনি শ্রমজীবী মানুষের বস্তিতে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন এবং তারা তাদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করে এটি তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। আমি বোঝাতে চাইছি যে, আমার কিছু জ্ঞান আছে এই ব্যাপারে আর আপনার এবং তাদের আছে অভিজ্ঞতা। এগুলো একসাথে করার চেষ্টা করুন এবং দেখুন এগুলোকে গঠনমূলক পথে ব্যবহার করা যায় কি না। আমি অতি বিনয়ী কিংবা অন্য কিছু হওয়ার চেষ্টা করছি না। আমি যখন শ্রমিকদের সামনে কথা বলি তখন আমি ভালভাবেই জানি যে আমি এমন কিছু জানি যা এই শ্রমিকরা জানে না। এবং এমন অনেক কিছু আছে যা তারা জানে কিন্তু আমি জানি না। আমরা সেগুলোকে একসাথে করি এবং আমাদের পারস্পরিক বিকাশ ঘটে।

    ‘‌নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও বাজার” [ক্ষমতা ও প্রত্যাশা] তে আপনি বলেছিলেন যে শতকরা আশি ভাগেরও বেশি মার্কিন জনগণ মনে করে, শ্রমিকদের প্রভাব খুবই সামান্য, যদিও শ্রমিক ইউনিয়ন সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা পোষণকারীর সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশ। আর শতকরা চল্লিশ ভাগ  তাদেরকে [শ্রমিক ইউনিয়ন]  অতি প্রভাব বিস্তারকারী হিশেবে বিবেচনা করে, এটি প্রোপাগন্ডা কীভাবে বিভ্রান্তিকে উস্কে দেয় তার আরেকটি প্রমাণ।” সেখানে [অবশ্য কেবল সেখানেই নয়] আপনি দু’ভাবে পরিসংখ্যানগত প্রমাণ ব্যবহার করেছেন। একটি হলো, জনগণের ‘প্রকৃত’ আগ্রহ তুলে ধরতে এবং অন্যটি গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যমূলক প্রভাব তুলে ধরতে। জনগণের কথা ও চিন্তা যদি তাদের সত্যিকারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রমাণ না হয় তাহলে আমরা কীভাবে তা বুঝতে পারব?

    চমস্কি: আমরা জানি যে সাধারণ মানুষ খুব সোজাসুজি পথে চিন্তা করে। তারা মনে করে, যা ঘটছে তা নিয়ে শ্রমিকদের আরো বেশি মতামত থাকা উচিত তবে ইউনিয়নের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা কম হওয়া উচিত। তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের দুইটি অনুমানই তাদের কাছে যৌক্তিক। তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন হলো শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি অস্ত্র। আপনি বহু বছর আগের একটি বিখ্যাত সিনেমা On The Waterfront  দেখেছেন? এটা এক ধরনের মডেল, যাকে মিডিয়া পঞ্চাশ বছর ধরে [battering ram] এর মত করে উপস্থাপন করে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, ইউনিয়ন হলো শ্রমিকদের শত্রু এবং একজন শ্রমিককে এই ইউনিয়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং একে ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আপনি বুঝতে পারবেন  কেন বৃহৎ কর্পোরেট সিস্টেম হিসেবে বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি  ইউনিয়নের ধারণাকে প্রতিরোধ করতে চায়। এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়। সুতরাং মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করে যে ইউনিয়নের হাত থেকে শ্রমিকদের নিজেদেরকে মুক্ত করা উচিত এবং যা ঘটছে তা নিয়ে শ্রমিকদের মত প্রকাশের পথ প্রশস্ত করার একটি পথ এটি (ইউনিয়ন বিযুক্তি)।

    এখানে অবশ্যই বাস্তব তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এমন নয় যে, মানুষ কী বিশ্বাস করে তা আমরা জানি না। ইউনিয়ন শ্রমিকদের শত্রু, এমন ভুল ধারণায় বিশ্বাস করে তারা। যেকোন প্রোপাগান্ডার মতই এটি কখনো কখনো সত্য। সবসময়ই সবচেয়ে উন্মত্ত প্রোপাগান্ডা হলো হলো তা যার সাথে কিছুটা সত্য মিশ্রিত থাকে। এবং এখানেও কিছুটা সত্য রয়েছে। ইউনিয়ন শ্রমিকদের শত্রু পরিণত হয়েছে কিন্তু তারা একইসাথে সম্ভবত সবচেয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো যা আমাদের চরম অগণতান্ত্রিক সমাজে টিকে আছে। এমন অনেকগুলি সমিতি থাকতে পারে এবং আছেও যার মধ্য দিয়ে শ্রমিকরা নিজেদের মুক্ত করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে পারে। তবে এই কথা মিডিয়া আপনাকে বলবে না। তাই এই উভয় সংকটের সমাধান  হল, ইউনিয়ন কী বা কী হতে পারে তা বোঝার জন্য শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাস সম্পর্কে জানা।

    আর্টওয়ার্ক: হেড ইন ক্লাউডস
    শিল্পী: ইমানুয়েল দেল রসো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাস সম্পর্কে কেউ জানে না, কেউ পড়েও না। আসলে, সারা বিশ্বের মিডিয়ার দিকে তাকান। দেখবেন, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য নামের বিভাগ রয়েছে। কিন্তু আপনি কি কখনো শ্রমিক বিভাগ দেখেছেন? শ্রমিকদের নিয়ে কোনও বিভাগ রয়েছে, এরকম একটি পত্রিকার কথাও আমার জানা নেই। প্রত্যেকের একটি ব্যবসা বিভাগ রয়েছে। ব্যবসা নিয়ে সংবাদপত্র আছে। কিন্তু শ্রমিকদের নিয়ে কি কোনও সংবাদপত্র আছে? আপনি যদি এখানে দেখেন, আমি জানি না, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন প্রতিবেদককে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন যিনি শ্রমিক আন্দোলন কাভার করার জন্য নিযুক্ত হয়েছেন। সারা দেশে হয়ত মাত্র দুজনএ নিয়ে কাজ করছেন। তার মানে পুরো জনগোষ্ঠী গণমাধ্যমের আওতায় আসে না। যা আসে তা হলো ব্যবসার জগত এবং এটি ক্ষমতারই প্রতিফলন। যতক্ষণ না পর্যন্ত জনগণ প্রোপাগন্ডার কৌশল উন্মোচনে সফল হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের মুক্ত করতে  সক্ষম হবে না। সুতরাং, এই পার্থক্যগুলো অতিক্রম করতে পারাটা কাজের অংশ।

    সরকারের সেবামূলক খাতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জনসাধারণের একটি বড় অংশ মনে করে যে মানুষকে নূন্যতম জীবন যাপনের মান, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। অন্যদিকে, তারা একই ধারার সেবার বিরোধিতাও করে। এর কারণ, সেবার [দৃশ্যমান] চিত্রটি এরকম যে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ধনী নারী একের পর এক বাচ্চা জনম দিচ্ছেন যার জন্য আমাদেরকে [জনগণকে] টাকা দিতে হচ্ছে এবং ক্যাডিলাকে চড়ে তিনি সমাজকল্যাণ অফিসে সেই টাকার চেক ভাঙ্গাতে যাচ্ছেন। সেবা সম্পর্কে জনগণের ধারণাটি এরকমই। এতে আপনি বুঝতে পারবেন তারা কেন কল্যাণমূলক খাতের বিপক্ষে। কেন আমি তাকে [ধনী কৃষ্ণাঙ্গ] টাকা দেয়ার জন্য কাজ করব?  সুতরাং তারা কল্যাণ খাতের বিপক্ষে। আবার ওই মানুষেরাই কিন্তু বলছে, আচ্ছা ঐ গরিব নারীতো তার বাচ্চার দেখাশোনা করতে পারছেন না, তার সাহায্য দরকার। এটি কোন স্ববিরোধ নয়। এটি ব্যাপক মতাদর্শিক দীক্ষায়নের ভিতরে নির্মিত একটি ভুল ধারণা। এবং এর সমাধান হলো, মতাদর্শিক দীক্ষায়ন প্রক্রিয়াকে উন্মোচন করা। ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে, ব্রাজিলকে তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এটি একটি মতাদর্শিক দীক্ষায়ণ। কারা ঋণ পরিশোধ করবে? যারা এই টাকা গ্রহণ করেছে এবং আরো টাকা বানানোর জন্য এটি নিউ ইয়র্কে ফেরত পাঠিয়েছে তারা? কাউকে যদি ঋণ পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেটা ওরা, ব্রাজিলের মানুষ নয়। আপনাকে এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে কথা বলতে হবে। যাতে জনগণ বুঝতে পারে। এগুলো খুব কঠিন নয়। এগুলো নিয়ে আপনাকে উত্তরাধুনিক ভাষ্যে কথা বলতে হবে না। আপনি এগুলো নিয়ে খুব সহজ ভাষাতেই কথা বলতে পারেন। কারণ এগুলো খুব সহজ ব্যাপার। জনগণও এগুলো সহজে বোঝে। একমাত্র তারাই এই সহজ ব্যাপারগুলি বোঝে না যারা বুদ্ধিজীবী। কিন্তু তাদের আগ্রহ না বোঝার দিকেই। কেননা, যদি তারা বোঝেন তাহলে তাদের নিজেদের ক্ষমতা আর থাকবে না। সুতরাং তারা এগুলো বুঝতে যাবেন না, বরং তারা একে আরো রহস্যাবৃত করে আরো  ঘোরপ্যাচে করে ফেলতে চাইবেন।

  • নোম চমস্কি।। সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম সমাজতন্ত্র

    নোম চমস্কি।। সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম সমাজতন্ত্র

    অনুবাদ: তানভীর আকন্দ

    বিশ্বের বৃহৎ দুটি প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থা যখন কোনো মতবাদের ক্ষেত্রে একমত হয়, তখন সেই মতবাদের বেড়াজাল ছিন্ন করে বের হয়ে আসার জন্য কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতারও প্রয়োজন পড়ে। এরকমই একটি মতবাদ হলো— লেনিন ও ট্রটস্কি যে সমাজ নির্মাণ করেছেন, যাকে পরে আরও দূর ঢেলে সাজিয়েছেন স্তালিন ও তার উত্তরসূরিরা, তার সাথে সমাজতন্ত্রের প্রকৃত ধারণার বা বলা যায় ঐতিহাসিকভাবে সমাজতন্ত্রের যে ধারণা আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তার একটা সম্পর্ক রয়েছে।  আদতে সম্পর্ক যদি থেকে থাকেও, তবে সেটা সামঞ্জস্যের নয় বরং বৈপরিত্যের।

    নোম চমস্কি

    দুটি মুখ্য প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থা কেন এই গালগপ্পের উপর এত জোর দেয় তা বেশ স্পষ্ট। শুরু থেকেই সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নিজের জনগোষ্ঠির কর্মশক্তিকে শোষণ করার চেষ্টা করেছে, একই সাথে চেষ্টা করেছে অন্যত্র জনগণকে নিপীড়ন করার। যাতে রাশিয়ার জনপ্রিয় বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ১৯১৭ সালে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে তাদের স্বার্থ হাসিল করা যায়। আর এইক্ষেত্রে একটি প্রধান মতাদর্শিক অস্ত্র হচ্ছে তাদের এই দাবি যে— রাষ্ট্রীয় প্রশাসকেরা তাদের নিজস্ব সমাজের পাশাপাশি সারা বিশ্বকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছ। আর এটা যে অসম্ভব, তা যে কোনো সমাজতান্ত্রিক, এবং অবশ্যই যে কোনো চিন্তাশীল মার্ক্সবাদির পক্ষেও তৎক্ষণাৎ অনুধাবন করা কঠিন কিছু নয়  (অনেকে তা অনুধাবন করেছিলেনও)। বলশেভিক শাসনের শুরু থেকেই ইতিহাস আমাদের এই পর্বতপ্রমাণ মিথ্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আসছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মোহ ও তাদের উপর জনগণের কার্যত যে আস্থা তাকে ব্যবহার করে কর্তাব্যক্তিরা এসব কর্মকাণ্ডের বৈধতা ও এসবের প্রতি জনগণের সমর্থন আদায় করে নেয়ার চেষ্টা করেছে। যাতে করে নিজেদের রীতিনীতিকে তারা আড়াল করতে পারে। যদিও আসলে সমাজতন্ত্রের প্রতিটি নমুনাই তারা নিশ্চিহ্ন করে দিতে থাকে।

    আর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ প্রোপাগান্ডা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে— সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তাদের অনুগতদের সাথে সমাজতন্ত্রের নাম জড়িয়ে একে একটি শক্তিশালী মতাদর্শিক অস্ত্র হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। যে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈধতা প্রদান করা ও [জনগণকে] এসবের অনুগত হতে বাধ্য করার কাজে। এর ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও কর্তাব্যক্তিদের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দেয়াটা যাতে আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক রীতি হিসেবে পরিগণিত হয়, তা নিশ্চিত করা গেছে। আর এটাই ছিল ‘সমাজতান্ত্রিক’ কয়েদখানার একমাত্র বিকল্প।

    আর্টওয়ার্ক: লেনিন অন রোস্টাম
    শিল্পী: আলেকজান্ডার গেরাসিমভ
    সূত্র: ইউএসএসআর পেইন্টিংস

    আর এভাবেই ছড়ি ঘুরানোর অধিকার আদায়ের জন্যই সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ নিজেদের সমাজতান্ত্রিক হিসেবে উপস্থাপন করে। একইসাথে পশ্চিমা ভাববাদিরাও আরও বেশি স্বাধীন ও নৈতিক একটা সমাজের হুমকিকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এই একই ভণ্ডামির পথ অণুসরণ করে। এই যৌথ আক্রমণ আধুনিক সমাজে সমাজতন্ত্রকে বেশ সফলভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পেরেছে।

    আরও একটা অস্ত্রের কথা উল্লেখ করা যায়, যেই অস্ত্র বিদ্যমান ক্ষমতাতন্ত্র ও সুবিধাবাদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ভাবদর্শিকেরা বেশ সাফল্যের সাথেই ব্যবহার করে থাকে। তথাকথিত ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রগুলোর ব্যাপারে প্রথাগত যেসব কুৎসা প্রচার করা হয় সেগুলো নানাভাবেই বিকৃত ও অনেকক্ষেত্রেই ডাহা মিথ্যায় পরিপূর্ণ। প্রকাশ্য শত্রুর নিন্দা ও যেকোনো অপকর্মের দায় তার উপর চাপিয়ে দেয়ার চেয়ে সহজ কাজ আর কিছুই হতে পারে না। স্রোতে গা ভাসানোই যেখানে মানুষের স্বভাব সেখানে কোনো তথ্যপ্রমাণ হাজির বা যুক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে না। পশ্চিমা জুলুম ও নৃশংসতার সমালোচনা যারা করেন তারা মাঝেমাঝেই এটা শুধরে দেয়ার চেষ্টা করেন। পশ্চিমা জুলুমের পক্ষে সাফাই গাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচারিত কাহিনিগুলোর মুখোশ উন্মোচন করে দেবার পাশাপাশি অপরাধমূলক নৃশংসতা ও নিপীড়নকে স্বীকার করে নিয়েই এ কাজটি করেন তারা। বরাবরেই মতোই তাৎক্ষণিক এসকল পদক্ষেপকে ব্যাখ্যা করা হয় দুষ্টের সম্রাজ্য ও তার চামচাদের পক্ষে সাফাই গাইতে। আর এভাবেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থে মিথ্যা বলার চরম অধিকারকে সংরক্ষণ করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় জুলম ও নৃশংসতার সমালোচনাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।

    সংঘাত ও বিপর্যয়ের মুহূর্তে লেনিনবাদী মতবাদের প্রতি আধুনিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রবল আকর্ষণের কথাটাও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এই মতবাদ ‘গোঁড়া বুদ্ধিজীবিদের’ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ও ‘নতুন একটা শ্রেণি’ অর্থাৎ ‘লাল আমলাতন্ত্রের’ কঠোর শাসন চাপিয়ে দেয়ার অধিকার প্রদান করে। এক শতাব্দী আগে বাকুনিন তার দূরদর্শী বিশ্লেষণে এমনটাই বলেছিলেন।  ঠিক যেমনটা মার্ক্সের সমালোচনায় উঠে এসেছে— বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রে তারা “রাষ্ট্রীয় পুরোহিত“ হয়ে ওঠে, এবং সিভিল সোসাইটির উপর আশ্রয় করে বেঁচে থাকা পরজীবী পতঙ্গে“ পরিণত হয়ে সমাজকে শক্তহাতে শাসন করতে থাকে।

    রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যখন খুবই স্বল্প মাত্রায় প্রতিরোধ বিরাজ করে তখন সেই সময়ে এই একই মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো এই “নতুন শ্রেণিকে“ রাষ্ট্রীয় প্রশাসক ও ভাবাদর্শিক হিসেবে কাজ করতে প্রবৃত্ত করে। বাকুনিনের ভাষায় যাকে বলা যায় “জনগণকে তার নিজের লাঠি দিয়েই পিটিয়ে বেড়ানো“। বিগত অর্ধশতকে যা ট্র্যাজেডি থেকে প্রহসনে পরিণত হয়েছে সেই একই নাটকের যখন পুনরাবৃত্তি ঘটে, “বৈপ্লবিক কমিউনিজম“ থেকে সরে এসে “পশ্চিমের গুণকীর্তনে“ প্রলুব্ধ হওয়ার মাধ্যমে, তখন তাকে বুদ্ধিজীবিরা যে অতি সহজভাবেই গ্রহণ করে তা খুব একটা বিস্ময়কর কিছু নয়।  সংক্ষেপে বললে, পরিবর্তন যা ঘটেছে তা কেবল ক্ষমতা কোথায় বিরাজ করবে সে সম্পর্কিত হিসাবনিকাশেই। “আর কিছু না, কেবল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের একাধিপত্যই সমাজতন্ত্র, যা সমগ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নির্মাণ করা হয়“ যেই জনগোষ্ঠীকে অতি অবশ্যই তার নেতাদের বদান্যতায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে— লেনিনের এই উক্তি সমাজতন্ত্রের বিকৃতিকেই প্রকাশ করে মাত্র, আর প্রচার করে রাষ্ট্রীয় পুরোহিতদের প্রয়োজনীয়তাকে। আর তা আমাদের দুটি ভিন্ন অবস্থানের তরিৎ স্থানান্তরকে বুঝার সুযোগ করে দেয়, যে দুটি অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তারা খুবই নিকটবর্তী।

    রাজনৈতিক ও সামাজিক ডিসকোর্সের পরিভাষা বেশ অস্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট, এবং এক বা একাধিক ঘরাণার ভাবাদর্শিকদের অবদানে প্রতিনিয়তই এগুলোর সুনির্দিষ্ট অর্থবোধকতা হ্রাস পাচ্ছে। তবুও এই পরিভাষাগুলোর অন্তত কিছু অর্থ অবশিষ্ট থাকে। শুরু থেকেই, সমাজতন্ত্র বলতে শ্রমজীবী মানুষের শোষণের হাত থেকে মুক্তিকে বুঝায়। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক আন্তন প্যানেকক যেভাবে দেখেছেন, “বুর্জোয়া শ্রেণিকে নতুন একটি  নেতৃস্থানীয় ও শাসকশ্রেণি দ্বারা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, এবং তা হবেও না“, শুধুমাত্র “শ্রমিকদের দ্বারাই এর বাস্তবায়ন সম্ভব, যদি তারা উৎপাদনের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে“। উৎপাদনের উপর উৎপাদকের নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সারকথা। লেনিনবাদ ও পশ্চিমা ব্যবস্থাপনাবাদের (managerialism) সাধারণ নীতির দ্বারা চালিত প্রথাগত শাসকশ্রেণি ও ‘বিপ্লবী বুদ্ধিজীবিদের’ চরম প্রতিপক্ষ যারা, তাদের বিরুদ্ধে এই লক্ষ্য অর্জনের পথ নিয়ে ভাবা হয়েছে বরাবরই। এই ভাবনাচিন্তা হয়েছে বিপ্লবী সংগ্রামের নানা পর্যায়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়েই। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অপরিহার্য উপাদানটি ঠিকই বজায় রয়েছে। আর তা হলো উৎপাদনের যন্ত্রসমূহকে স্বাধীনভাবে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকের সম্পত্তি তথা সেইসব মানুষের সামাজিক সম্পত্তিতে পরিণত করা যারা মালিকশ্রেণির শোষণের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করেছে। আর এটাই হলো মানব-মুক্তির এক বৃহত্তর সিমানার দিকে প্রাথমিক পদক্ষেপ।

    লেনিনবাদী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির উদ্দেশ্য ভিন্ন। মার্ক্স “ষড়যন্ত্রকারিদের“ যে বর্ণনা দিয়েছেন এদের সাথে তা পুরোপুরিভাবে মিলে যায়, যারা কিনা “বিকাশমান বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে কব্জা করে“ নিজেদের কর্তৃত্বের অধীনে নিয়ে আসে। “আর এজন্যই শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে আরও বেশি পরিমাণে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করুক এ ব্যাপারে তাদের গভীর অনাগ্রহ কাজ করে।“ লাল আমলাতন্ত্রের উৎখাত এবং উৎপাদন ও সামাজিক জীবনের উপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাও এই স্বার্থের অন্তর্ভুক্ত।  লেনিনবাদিদের মতে, জনগণকে বাধ্যতামূলকভাবে কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতার অধীনে আনতে হবে। আর সমাতান্ত্রিকরা এর মধ্যেই সংগ্রাম করে যাবে এমন এক সমাজ ব্যবস্থা অর্জনের জন্য, যে সমাজব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিকতা “হয়ে উঠবে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়“। যেহেতু স্বধীনভাবে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকেরা “গতর খাটবে তাদের নিজের গরজেই“ (মার্ক্স)।  কিন্তু মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্র কেবল উৎপাদনের উপর উৎপাদকের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তার লক্ষ্য সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যত রকমের কর্তৃত্ববাদ ও উঁচু-নিচু ভেদ তার সবকিছুকেই ঝেটিয়ে বিদেয় করতে চায়। এ অন্তহীন এক লড়াই, যার কোনো শেষ নেই। কারণ অপেক্ষাকৃত ন্যায়নিষ্ঠ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জুলুম ও নিপীড়নের নানা চেহারা আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে, নতুন নতুন অন্তর্দৃষ্টি ও উপলব্ধির মাধ্যমে। যা হয়তো এতদিন গোপন ছিল আমাদের চিরাচরিত অভ্যাস ও চেতনার গভীরে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য বলশেভিক
    শির্পী: বরিস মিকাইলোভিজ
    সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

    সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে আবশ্যিক বৈশিষ্ট্যের সাথে লেনিনবাদের বৈরিতা একেবারে শুরু থেকেই দৃশ্যমান। বিপ্লবী রাশিয়ায়, সোভিয়েত ও কারখানা সমিতিগুলো গড়ে উঠেছিল সংগ্রাম ও স্বাধীনতার অস্ত্র হিসেবে। নানা ত্রুটি সত্ত্বেও যেগুলোর ছিল অমিত সম্ভাবনা। ক্ষমতা দখলের সাথে সাথেই পার্টির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে লেনিন ও ট্রটস্কি নিজেদের নিয়োজিত করে এই যন্ত্রসমূহের মুক্তিমুখী সম্ভাবনাকে ধ্বংস করার কাজে। বাস্তবিক অর্থে নিয়ন্ত্রণ ছিল কেন্দ্রীয় কমিটি এবং তার সর্বোচ্চ নেতাদের হাতে। ট্রটস্কি এর নিখুঁত পূর্বাভাস দিয়েছিলেন বছর কয়েক আগেই। রোজা লুক্সেমবার্গ ও অন্যান্য বামপন্থী মার্ক্সবাদিরা সে সময়ই সতর্ক করেছিলেন, আর নৈরাজ্যবাদিরাতো বরাবরই এ ব্যাপারে সচেতন ছিল। বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী থেকে রাষ্ট্রীয় পুরোহিতে পরিণত হওয়ার সাথে সাথে ট্রটস্কির ভাবনার মধ্যেও এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠে যে শুধুমাত্র জনগণ নয়, পার্টিকেও ‘উপর থেকে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে’। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আগে বলশেভিক নেতারা তৃণমূল পর্যায়ে বৈপ্লবিক সংগ্রামে যুক্ত মানুষদের রাজনৈতিক ভাস্য রপ্ত করেছিল, যদিও তাদের প্রকৃত অঙ্গীকার ছিল ভিন্ন। আগেও এর প্রমাণ দেখা গেছে, ১৯১৭ এর অক্টোবরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরতো তা একেবারে জলের মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    বলশেভিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ঐতিহাসিক ই. এইচ. কার লিখেছেন, “বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কারখানা কমিটিগুলোকে সংগঠিত করে কারখানা পরিচালনাকার্যে হস্তক্ষেপ করতে শ্রমিকদের স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এই বিশ্বাসের জন্ম নেয় যে দেশের উৎপাদনযন্ত্রের মালিক তারাই এবং নিজেদের স্বার্থে ও নিজেদের বুদ্ধিবিবেচনা অনুযায়ী তারা এগুলো চালাতে পারবে।“ (ইতালিক অংশটুকু আমার যোগ করা- চমস্কি) একজন অরাজপন্থী প্রতিনিধি যেমন বলেছিলেন, শ্রমিকদের কাছে “কারখানা কমিটিগুলো ছিল ভবিষ্যতের ভিত্তিস্বরূপ…রাষ্ট্র নয় বরং তাদেরই এখন প্রশাসক হয়ে উঠা উচিত।

    কিন্তু রাষ্ট্রীয় পুরোহিতরা ছিলেন অতি পণ্ডিত, তারা একেবারে তৎক্ষণাৎই কারখানা কমিটিগুলো ধ্বংস করার কাজে নেমে পড়েন এবং সোভিয়েতগুলোকে তাদের শাসনের যন্ত্রে পরিণত করেন। নভেম্বরের ৩ তারিখ লেনিন “শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের উপর খসড়া বিধি“ প্রণয়নের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে এইরূপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে “যথাযত নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।“ বছর ঘুরার সাথে সাথেই লেনিন ঘোষণা করেন যে, “আমরা শ্রমিক নিয়ন্ত্রণকে পেছনে ফেলে জাতীয় অর্থনীতির সর্বোচ্চ পর্ষদ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে এসেছি“ যা যন্ত্রপাতির উপর শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণকে প্রতিস্থাপিত, বিলীন ও বাতিল করবে (ই. এইচ. কার)। “খোদ সমাজতন্ত্রের ধারণাটিই সঙ্কুচিত হয়ে শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের ধারণায় পর্যবসিত হয়“ মেনশেভিক ট্রেড ইউনিয়নের একজন সদস্য আক্ষেপ করে বলেছিলেন। বলশেভিক নেতৃত্বও তাদের কাজেকর্মে একই আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন সমাজতন্ত্রের প্রকৃত ধারণাকে ধূলিস্যাৎ করে দেবার মাধ্যমে।

    জোসেফ স্টালিন ও ভোরোশিলভ
    সূত্র: সোভিয়েত পোস্টার

    কিছুদিনের মধ্যেই লেনিন আইন জারি করেন যে শ্রমিকদের উপর নেতাদের “স্বৈরাচারী ক্ষমতা“ প্রয়োগ করতে হবে, আর শ্রমিকদের “একক ইচ্ছার অধীন হতে হবে বিনা বাক্যব্যয়ে“, এবং সমাজতন্ত্রের স্বার্থে তাদেরকে অতি অবশ্যই “শ্রম ব্যবস্থাপনার নেতৃবৃন্দের একক ইচ্ছাকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে চলতে হবে“। লেনিন ও ট্রটস্কি যখন শ্রমের সামরিকীকরণের দিকে এগিয়ে চলেছেন, পুরো সামজকেই শ্রমসেনায় রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া তাদের একক ইচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে। লেনিন শ্রমিকদের “একক কর্তৃত্বের“ অধীন হয়ে পড়াকে ব্যাখ্যা করছেন, “এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে যা মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারকে নিশ্চিত করে অন্য যেকোনো ব্যবস্থার চেয়ে আরও ভালোভাবে।“ অথবা রবার্ট ম্যাকনামারা যেভাবে ঠিক একই ধারণাকে প্রকাশ করেছেন, “গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার…অবশ্যই ঊর্ধ্বতনদের হাতে ন্যস্ত থাকবে…গণতন্ত্রের উপর প্রকৃত হুমকি উপর থেকে নিয়ন্ত্রণের কারণে আসে না, বরং তা আসে নিচ থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে“। “মানুষ যদি বুদ্ধির শাসনের অধীন না হয় তাহলে তার পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত হয় না“, আর ব্যবস্থাপনা এই বুদ্ধির শাসন ছাড়া আর কিছুই না, যা কিনা আমাদের স্বাধীন রাখে। এর পাশাপাশি “ফ্যাকশনালিজমকে“, যেমন সামান্য পরিমাণ স্বাধীন মত ও সংগঠন যেগুলো ছিল সেগুলোকেও “সমাজতন্ত্রের স্বার্থে“ ধ্বংস করে দেয়া হয়। লেনিন ও ট্রটস্কি তাদের নিজেদের উদ্দেশ্যে সাধনের উদ্দেশ্যে এই পরিভাষাটার [সমাজতন্ত্র] সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছিলেন। তারা এগিয়ে যান প্রাক-ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বনিয়াদ প্রতিষ্ঠার দিকে, যা স্তালিনের হাতে পড়ে আধুনিক সময়ের অন্যতম একটি বিভীষিকাতে পরিণত হয়।[১]

    সমাজতন্ত্রের প্রতি লেনিনবাদী বুদ্ধিজীবী শ্রেণির (নিসন্দেহে যার ভিত্তি হচ্ছে মার্ক্স) প্রচণ্ড শত্রুতা অনুধাবন করতে না পারা, এবং একই সাথে লেনিনবাদী নকশাটি ভালোমতো বুঝে না উঠার কারণে আরও মানবিক একটি সমাজ নির্মাণ ও পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসযোগ্য একটি দুনিয়া তৈরির পথে আমাদের সংগ্রামকে ভয়াবহভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুধু যে পশ্চিমা বিশ্বই এই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তাও নয়। পৃথিবীর প্রধান দুটি শক্তিকেন্দ্রে বসে থাকা সমাজতন্ত্রের শত্রুদের হাত থেকে— যারা সবসময়ই রাষ্ট্রীয় পুরোহিত আর সমাজের কর্তাব্যক্তি হয়ে উঠতে চায়, যারা স্বাধীনতার নামে মানুষের মুক্তিকে ধ্বংস করতে চায়— তাদের হাত থেকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে রক্ষা করার উপায় খুঁজে বের করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

    পাদটীকা

    [১] লেনিন ও ট্রটস্কির হাতে সমাজতন্ত্রের প্রাথমিক ধ্বংসসাধন প্রসঙ্গে, আরও বিভিন্ন কাজের মধ্যে এই বইটি দেখতে পারেন Maurice Brinton, The Bolsheviks and Workers’ Control. Montréal: Black Rose Books, 1978, and Peter Rachleff, Radical America, Nov. 1974.

    নোট: লেখাটি Our Generation এর ১৯৮৬ সালের ১৭তম খণ্ডের ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত। বর্তমান সংস্করণটি চমস্কির ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট অনুসরণে করা।

  • নোম চমস্কি ।। এনার্কিজম: রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও মুক্তির রাজনীতি

    নোম চমস্কি ।। এনার্কিজম: রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও মুক্তির রাজনীতি

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    নোম চমস্কির রাজনৈতিক চিন্তাকে কেবল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, গণমাধ্যম বা বৈদেশিক নীতির সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হলে তার বৌদ্ধিক প্রকল্পের একটি মৌলিক দিক আড়ালে থেকে যায়। সেই দিকটি হলো এনার্কিজম বা স্বাধীনতাবাদী সমাজতন্ত্রের প্রতি তার দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার। চমস্কির নিজের ভাষায়, এনার্কিজম কোনো বদ্ধ মতবাদ নয়; এটি এমন একটি সমালোচনামূলক ঐতিহ্য, যা প্রতিটি ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও শ্রেণিবিন্যাসকে তার বৈধতার ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করে। যে কর্তৃত্ব নিজেকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তাকে পরিবর্তন বা বিলোপ করাই এনার্কিস্ট রাজনীতির মূল নীতি।

    এই সাক্ষাৎকারে ব্যারি প্যাটম্যান অত্যন্ত সংযত ও অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নের মাধ্যমে চমস্কির রাজনৈতিক দর্শনের সেই ভিত্তিমূলকে উন্মোচন করেছেন। আলোচনায় ফিরে আসে চমস্কির শৈশব, স্প্যানিশ বিপ্লবের স্মৃতি, অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট আন্দোলনের ঐতিহ্য, মার্কসবাদ ও এনার্কিজমের সম্পর্ক, রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের সমালোচনা, গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা, শ্রমিকদের আত্ম-পরিচালনা এবং মুক্ত সমাজের সম্ভাবনা। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ, ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক তত্ত্ব এখানে একে অপরের সঙ্গে মিশে একটি সুসংহত আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

    চমস্কির বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ভবিষ্যৎ সমাজের কোনো চূড়ান্ত নকশা উপস্থাপন করেন না। বরং তিনি মনে করেন, মানুষের স্বাধীনতা, সহযোগিতা এবং আত্মসংগঠনের ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেই সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন ঘটতে পারে। তাই এনার্কিজম তার কাছে কোনো ইউটোপীয় স্বপ্ন নয়; এটি বর্তমান সমাজের ক্ষমতার কাঠামোকে সমালোচনামূলকভাবে বিচার করার একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতি।

    এই সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয় ব্যারি প্যাটম্যান সম্পাদিত Chomsky on Anarchism গ্রন্থে। বইটি প্রকাশের পর থেকেই চমস্কির এনার্কিজম-বিষয়ক চিন্তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যারা চমস্কিকে কেবল একজন ভাষাবিজ্ঞানী বা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচক হিসেবে চেনেন, তাদের জন্য এই সাক্ষাৎকার তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্তর্নিহিত ভিত্তি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বার উন্মোচন করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক মুক্তি সম্পর্কে সমকালীন বিতর্কেও এটি নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগায়।— সম্পাদক

    নোম চমস্কি

    নব্বইয়ের মধ্যভাগে এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যে, নৈরাজ্যবাদের একটি অন্যতম সমস্যা হচ্ছে যে এটি হয়তো খুব বেশি নেতিবাচক, এটি সমালোচনাই করে গেছে কিন্তু ইতিবাচক কিছু প্রস্তাব করেনি… 

    চমস্কি:  আচ্ছা, যদি আমি বলেও থাকি তবু তা বলা উচিৎ হয়নি কারণ এর সাথে আমি একমত নই। এমনকি, আপনি আমার শেলফও দেখতে পারেন (হেসে, ইঙ্গিত করে)। এখানে অনেক নৈরাজ্যবাদী বইপত্র আছে যেগুলো খুবই সুবিবেচনাপ্রসূত সমাজের প্রস্তাবনা দেয়, যা আমার দৃষ্টিতে যথার্থের চেয়েও বেশি কিছু। দিয়েগো আবাদ দে সান্তিয়ান (Diego Abad de Santillan) একজন বিখ্যাত নৈরাজ্যবাদী, যিনি ১৯৩৬ সালে স্পেনের নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের পর্যালোচনা লিখেছিলেন। তিনি একজন আর্জেন্টাইন, তখন স্পেনে ছিলেন। তাঁর রচনার নাম ছিল ‘বিপ্লবের পর’(After the Revolution)। এখানে তিনি স্পেন সমাজের এনার্কো-সিন্ডিকালিস্ট ভিশন কেমন হতে পারে কিংবা বলা যায় যে কোনো সমাজই কেমন হতে পারে তার একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ এঁকেছিলেন, এবং, আরও অনেক প্রস্তাবনা আছে। আমি মনে করি ভবিষ্যতের জন্যে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার বিষয়ে ‘আমরা এটা করতে পারব?’ খুব বড়ো প্রশ্ন নয়। আমরা অবশ্যই করতে পারব। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে আমরা মানুষ, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, মানবজীবনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রভাব সম্পর্কে আদৌ পর্যাপ্ত জানি কি না? একটা সমাজের কেমন হওয়া উচিৎ এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা করার জন্যে উপরোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা কি পর্যাপ্ত জানি? নাকি, স্বাধীনতা, সমতা, কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিষয়ক কিছু নির্দিষ্ট সাধারণ ধ্যানধারণার ভিত্তিতে এগুলোর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া উচিৎ? এবং এই গোলকধাঁধার মধ্যে কাজ করে মানুষ অনুসন্ধান চালিয়ে যাক এবং দেখা যাক সহজাতভাবে তাদের কাছে কী আসে? কত রকম বৈচিত্র্য এখানে আসতে পারে? যারা কাজ করতে চায় না বা যাদের মধ্যে অপরাধ-প্রবণতা আছে বা যারা মিটিং-এ যেতে চায় না তাদের সাথে আপনি কী করতে চান? এমন বহু প্রশ্ন সামনে আসবে। আপনি কোন মাত্রা পর্যন্ত চাকরির অদলবদল করতে চাইবেন বা আগ্রহ ও মেধার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করবেন? যদি কেউ কাঠমিস্ত্রী হতে চায়, বা একজন পারমাণবিক বিজ্ঞানী বা একজন পিয়ানোবাদক হতে চায় এবং আরেকজন প্রশাসক হতে চায়, আপনি কি তখন নীতি মোতাবেক চাকরির অদলবদল চাইবেন, এমনকি তারা যদি সুখী থাকে, বা সুখী না থাকে? আমি মনে করি না আমরা এসব জানি। আপনি এ বিষয়গুলো নিয়ে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক মন্তব্য করতেই পারেন, কিন্তু আমি মনে করি না আমরা এসবের উত্তর জানি।

    আমি স্পেনিশ লিবারটারিয়ান কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক আইজ্যাক পুয়েন্তে১ পড়ছিলাম, তিনি বরঞ্চ যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, ‘যদি কেউ শিক্ষক হয়ে যান, তিনি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করেন, এবং যদি কেউ ডাক্তার হয়ে যান, তিনি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করেন’। এটাতো এমন ছিল না যে কেউ ২২ বছর বয়েসি হয়ে গেলেই ডাক্তার হয়ে যাচ্ছে এবং বোধহয় এভাবেই নৈরাজ্যবাদকে দেখা উচিৎ। 

    চমস্কি: খুব সাধারণ একটা পর্যায় পর্যন্ত আমি মনে করি আমরা সকলেই একমত হতে পারব। যারা নিজেদের নৈরাজ্যবাদী বলে দাবি করেন– খুব বিস্তৃত অর্থেই– তাদের অন্তত একটা সাধারণ ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে যে, সামাজিক কাঠামো ও বন্দোবস্ত যাই নির্মাণ করা হোক না কেন, এগুলো যেন অবশ্যই মানুষের নিজস্ব সৃজনশীলতাকে অনুসরণ করার সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি করে। এবং এই জন্য আপনি কোনো সূত্র বানাতে পারবেন না। মানুষ বৈচিত্র্যময়, এবং বৈচিত্র্যময় হতে বাধ্য। এই বিচিত্রতাকে উৎসাহ দিতে হবে। নিজের বাচ্চাকাচ্চাকে লালন-পালন করা হয় যেন তারা নিজের পথ নিজেরাই খুঁজে নেয়– এই চাওয়ার মতো। আপনি বলতে পারেন না– অনেকেই বলেন, কিন্তু বলা উচিৎ না–  এই দৃঢ় কাঠামো তোমাকে অনুসরণ করতে হবে। আমার নিজস্ব মত হচ্ছে যে– এবং, এই বিষয়ে আমি আমার কাছের অনেক বন্ধুর সাথে দ্বিমত পোষণ করি– ভবিষ্যৎ সমাজের পূর্ণাঙ্গ রূপ আঁকার চেষ্টায় আমাদের সতর্ক থাকা উচিৎ। এমন না যে এটা করা যাবে না। এটা খুব আকর্ষণীয় ও বিচিত্র উপায়ে করা সম্ভব, এবং এবং তা করা হয়েছেও। কিন্তু আমি মনে করি আসল প্রশ্ন হলো, এই কাজ করাটা  আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এবং শুধু চেষ্টা ও পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামোতেই একে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া কতটা জরুরি।

    আসলে, আমি মনে করি আমাদের আরেকটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। মানব ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে মানুষ নিপীড়ন কী তা বুঝে উঠতে পারেনি। এটি এমন কিছু যা আপনাকে শিখতে হয়। যদি আমি অতীতে ফিরে তাকাই আমি দেখি যে, আমার মা বা দাদিরা একটা পুরুষতান্ত্রিক পরিবারের মধ্যে বসবাস করেও এটিকে নিপীড়ন ভাবতেন না। যেখানে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বাপের সামনে মেয়ে চলে আসলে বাপ মেয়েকে না চিনে চলে যেতেন– মেয়েকে চিনতে পারেননি বলে নয়, বরং আপনি মেয়ের দিকে মাথা নাড়ান না। এটিকে ঠিক নিপীড়ন বলে তাদের কাছে মনে হয়নি। মনে হয়েছিল জীবন এভাবেই কাজ করে। আমি বোঝাতে চাচ্ছি, অভ্যন্তরীণভাবে এর কী রকম মানসিক প্রভাব রয়েছে– এটি অবশ্য জটিল প্রশ্ন। কিন্তু, যিনি কোনো এক্টিভিজমের সাথে জড়িত আছেন, যেমন ধরেন যিনি নারী আন্দোলনের সাথে আছেন, তার একেবারে প্রথম কাজ হচ্ছে মানুষকে বোঝানো যে তারা নিপীড়ন ও কর্তৃত্বমূলক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন। এটা মোটেও স্পষ্ট নয় এবং কে জানে আমরা কোন ধরনের নিপীড়ন ও কর্তৃত্বকে কোনো সচেতনতা ছাড়াই গ্রহণ করে যাচ্ছি। সেলফ-এনলাইটেনমেন্ট ও সামাজিক বোঝাপড়ার একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা ঠাহর করতে পারব যে এই এই বিষয়কে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে এবং এগুলো সম্পর্কে আমরা কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব না যদি আমরা এগুলোকে না চিনতে পারি।

    এর সাথে যুক্ত করা যায়, এমা গোল্ডম্যান২ বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই আশঙ্কা করেছিলেন যে আশু বিপ্লব বোধহয় হবে না। তিনি গুস্তাব ল্যান্ডোয়ার৩ দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিলেন যিনি বলতেন যে, রাষ্ট্র এখন আর বাইরে নেই। এটি আমাদের ভিতরেই আছে এবং আমাদের স্বাধীন সত্তা হয়ে হয়ে উঠতে হবে– পুঁজিবাদের মধ্যে যতটা সম্ভব মুক্ত হয়া যায় আরকি। প্রকৃতপক্ষে তিনি সর্বদাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, জনগণ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত না হওয়ারও একটা সম্ভাবনা আছে এবং ব্যক্তিগত রাজনীতি বিকাশেরও একটা উপায় আছে যাতে আরও বেশি মানুষ সেই জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। 

    চমস্কি: আমার মনে হয় এটি খুব সত্যি। প্রকৃতপক্ষে, যারা এটা বুঝতে পেরেছিলেন তারাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যাণ্ডের মতন মুক্ত সমাজের উপর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য কায়েম করতে পেরেছেন, যেখানে আসলে বছরের পর বছর বিভিন্ন জনপ্রিয় আন্দোলন বিবিধ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এবং রাষ্ট্রের দমন করার ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। এটা খুব আশ্চর্যের বিষয়, একেবারে এই সমাজগুলোতেই ব্যবসায়ী দুনিয়া ও রাষ্ট্রপরিচালনাকারীর মতো অভিজাত গোষ্ঠীগুলো শুরুতেই আন্দাজ করতে পেরেছিল যে, মানুষের মনোভাব ও মতামতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শক্তিশালী কিছু পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ, আপনি মানুষকে আর জোরজবরদস্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। তাই আপনাকে মানুষের চেতনাকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যেন তারা বুঝতে না পারে যে তারা বিচ্ছিন্নতা, জুলুম ও পরাধীনতার মধ্যে বসবাস করছে। প্রকৃতপক্ষে, এজন্যই বোধহয় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়ে থাকে। খুব সচেতনভাবেই। একেবারে দুই বছরের বাচ্চার জন্য টিভি বিজ্ঞাপনের পর্দা থেকে শুরু করে গ্র্যাজুয়েট স্কুলের অর্থনীতি বিভাগে আপনাকে কী পড়ানো হবে তা পর্যন্ত। এই পরিকল্পনা করা হয়েছে একটা পরাধীনতার চেতনা সৃষ্টির তাগিদেই এবং বিশেষত একেবারে সাধারণ মানব অনুভূতিগুলোকে দমন করার নিয়তেই।

    গুস্তাভ ল্যান্ডাওয়া

    সাধারণ মানব অনুভূতিগুলো হচ্ছে সহানুভূতি ও সংহতি, তা শুধু অন্য মানুষের জন্যই নয়, বরং অসহায় অবস্থায় পতিত ডলফিনের জন্যও। এটি মানুষের খুব সাধারণ একটি প্রতিক্রিয়া। আপনি যদি এডাম স্মিথের মতো ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদদের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন তারা এটাকে মানব প্রকৃতি ও সমাজের মূল হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপন ও শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অভিনিবেশ হচ্ছে এটাকে আপনার মাথা থেকে বের করে দেয়া। এবং এটা খুব স্পষ্ট। প্রকৃতপক্ষে আজকাল আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত সামাজিক পলিসির মধ্যেই এটি স্পষ্ট। সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security) ধ্বংসের চেষ্টার কথাই ধরুন। আচ্ছা, এর কারণটা কী? অর্থনৈতিক সমস্যা বিষয়ে অনেক কেলেঙ্কারি আছে, এসব অনর্থক কথাবার্তা। এবং অবশ্যই তারা অল্প সময়ে ও স্বল্প প্রচেষ্টায় প্রচুর অর্থোপার্জন করতে ওয়াল স্ট্রিট চায়। এসবের মূলে গভীরতর কিছু একটা আছে। সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি মূলত একটি সহজাত মানব-অনুভূতি। এই যে আপনি অন্যের সম্পর্কে উদ্বিগ্ন থাকেন এটাই সেই মানব-অনুভূতি যা মাথা থেকে বের করে দিতে হবে। আপনি অন্যের প্রতি উদ্বিগ্ন থাকেন। এটি সামাজিক ও সম্প্রদায়গত দায়িত্ব যে শহরের একজন অক্ষম বিধবা খাবার পাচ্ছে কি না তার খোঁজ নেয়া, বা রাস্তার পাশের একটা বাচ্চা স্কুলে যেতে পারছে কি না তার খোঁজ নেয়া। আপনাকে এই বিষয়গুলো মানুষের মাথা থেকে বের করে দিতে হবে। আপনি তাদেরকে বলতে বাধ্য করতে হবে যে, ‘দেখো, তুমি নিজের সম্পদ বাড়াও, এটাই যৌক্তিক। যদি ঐ অক্ষম বিধবা নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে না পারে সেটা তার দোষ, তোমার না। সে পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না তা তো আর তোমার দোষ না, তুমি কেন খামোখা উদ্বিগ্ন হচ্ছ?’

    তখন তাহলে সমাজ বলতে কিছু থাকছে না, আপনি কি এটাই বলতে চাচ্ছেন?

    চমস্কি: হ্যাঁ। এখানে আপনি অন্য কারও কথা না ভেবে কেবল সম্পত্তিটাই বাড়াচ্ছেন এবং নিজেকে ক্ষমতার অধস্তন করছেন। এবং এর একটা প্রভাব আছে। আপনি সেটি মনোভাবের মধ্যেই দেখতে পারবেন। এখন আপনার কথায় ফিরে আসি, এটা তাদের জন্যও সত্য যারা সমাজকে পরিবর্তন করে আরও ভালো রূপে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, আপনাকে জনগণের চৈতন্য ও সচেতনতাকে নিয়েই কারবার করতে হবে এবং, যা আমি বলছিলাম, প্রতিটি সংগঠকই তা জানেন। চমৎকার উদাহরণ হিসেবে নারী আন্দোলনের কথাই ধরুন। এটি সচেতনতা-বৃদ্ধিকারী গোষ্ঠীদের দিয়েই শুরু হয়েছিল। যেখানে লোকেরা একে অপরের সাথে কথা বলেছেন এবং তাদের জীবনের এমন কিছু উপাদান বের করে নিয়ে এসেছেন যেগুলো সম্পর্কে তারা বোধহয় ওয়াকিবহাল না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফ্যাক্টরিসহ সবজায়গার বেলাতে এটি সত্য। এটি কীভাবে বছরের পর বছর কাজ করেছে তা খুবই বিস্ময়কর। শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিনগুলোতে ফিরে যান, এই লোয়েল, লরেন্সে দেখেন, যেখানে টেক্সটাইল মিলগুলো তৈরি করা হয়েছিল। শুরুর দিকে কারখানাগুলোতে যারা এসেছিল, যেমন ক্ষেতখামার থেকে আসা যুবতী, বস্তি থেকে আসা আইরিশ কারিগর ইত্যাদি, তাদের সকলের মধ্য অত্যন্ত রেডিক্যাল চেতনা বিরাজ করছিল, যা খুব স্বাভাবিক ছিল। তারা কখনো মার্ক্স পড়েননি, ইউরোপিয়ান র‍্যাডিকালিজম সম্পর্কে কোনো জ্ঞানও ছিল না, এনার্কিজম বা এমন কিছুর নামও শোনেননি। এটি খুব সহজাত বোঝাপড়া। তাদের খুব স্বাধীন একটি প্রেস ছিল– যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। সেই স্বাধীন প্রেস কিছু বিষয় নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছিল, (taken for granted) যেমন মজুরি প্রায় শ্রম দাসত্বের মতোই, যারা কারখানায় কাজ করে কারখানা তাদেরই হওয়া উচিৎ, ‘আমাদের কী করতে হবে তা বলার জন্য এই হুজুরদের (boss) কী দরকার?’, ‘এই কারখানা ব্যবস্থা, শিল্প ব্যবস্থা আমাদের সাংস্কৃতিক মান ও সৃষ্টিশীল অনুভূতিগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, এবং আমাদেরকে রোবট বানিয়ে দিচ্ছে’, ইত্যাদি। এই সবকিছুই তারা বুঝেছিল, নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছিল। আপনি আজকে আশেপাশের কোনো শ্রমিক শ্রেণির কাছে যান, এটা পাবেন না। কিন্তু এটা এমন কিছু না যে তাদের শেখাতে হবে, বরং এটা তাদের অন্তঃস্থিত স্বভাব থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে যা খুব সচেতনভাবে দমন করা হয়েছে।

    এটা যে কতটা সচেতন প্রয়াস তা অবাক করার মতো। প্রায় শতবর্ষ পূর্বে ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে টেলোরিজম৪ চালু করা হয় – ফ্রেডরিক টেলোরের নামানুযায়ী। মূলত তা শ্রমিকদের রোবটে পরিণত করে যেন তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সুতরাং, তাদের আর কোনো পছন্দ-অপছন্দ রইল না, এবং তারা মূলত রোবটেই পরিণত হয়। বাদবাকি সবকিছুর মতোই এটাও মিলিটারি ব্যবস্থাতেই শুরু করা হয়, কারণ আপনি এখানে জনগণের খরচে ও ঝুঁকিতে ব্যয়-মুক্ত পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে পারেন। তারপর অচিরেই এটি ইন্ডাস্ট্রিতে, মাস-প্রডাকশন সিস্টেমে নিয়ে আসা হয়। লেনিন এই পদ্ধতিতে খুব মোহিত হয়েছিলেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপকের মতো লেনিনও প্রায় একই ধারণা পোষণ করতেন এবং ধারণাটা ছিল কাজের যান্ত্রিকীকরণ (robotize)। কিন্তু ১৯২০ সাল নাগাদ তারা খুব দ্রুতই আন্দাজ করতে পেরেছিল যে, এই ‘অন-জব-কন্ট্রোল’কে বর্ধিত করে ‘অফ-জব-কন্ট্রল’ পর্যন্ত করা যায়। মানে একইভাবে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রও নিয়ন্ত্রণ করা। সুতরাং মানুষ কেন রোবট হবে না? এবং রোবট হয়ে যাওয়া মানে আসলে জীবনের উপরিভাগ বলতে যা বুঝায় সেদিকেই মনযোগকে ধাবিত করা। যেমন মনযোগ হবে ফ্যাশনেবল ভোগের ব্যাপারে। মনযোগটা অন্যের প্রতি দরদের দিকে নয়, একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টিতে নয়, বাচ্চা-কাচ্চাদের জন্য কেমন পৃথিবী হবে সেদিকেও নয়। আপনাকে নিষ্ক্রিয় ভোক্তায় পরিণত করা হবে, যিনি কয়েক বছর পরপর বোতামে চাপ দিয়ে আসবেন এবং বলা হবে যে এটাই গণতন্ত্র। চিন্তা করার দরকার নেই, শুধু আদেশ অনুসরণ করুন। যে পরিমাণ অনর্থক ভোগ আপনি করে যেতে পারেন তার দ্বারাই মানুষ হিসেবে আপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এটাই ‘অফ-জব-কন্ট্রোল’। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে এটি চালু আছে এবং এটি বিশাল একটি ইন্ডাস্ট্রি। এবং এই ‘অফ-জব-কন্ট্রোল’ কাটিয়ে উঠতে চাইলে মানুষকে বোঝাতে হবে যে, আপনি কত বেশি ধার-দেনা করেছেন এবং চাহিদানুযায়ী পণ্য জোগাড় করতে আপনার সর্বোচ্চ কয়টা ক্রেডিট কার্ডের দরকার এসব দিয়ে মানুষ হিসেবে আপনার মূল্য নির্ধারিত হয় না। মানুষ হিসেবে এটি আপনার মূল্য নয়। যেকোনো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আপনি শপিং মলে গেলে দেখবেন অল্প বয়স্ক বাচ্চারা, বিশেষত অল্প বয়েসি মেয়েরা মজা করার  জন্য কোনো কিছু না কিনে দোকানে দোকানে ঘুরাফিরা করে (window-shopping)। আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, তারা যদি এটা করতে চায় আপনি তাদের এটা করতে মানা করতে পারবেন না, কিন্তু এটি আপনাকে দেখাবে যে, এই ‘অফ-জব-কন্ট্রোল’ মানুষের চেতনকে যেভাবে পরিবর্তিত করেছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর।

    এর সাথে যুক্ত করি, আপনি যখন এনার্কিজমের ইতিহাসের দিকে তাকান তখন আমার মনে হয় এর অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়েই এগুলো প্রায় সংগঠিত বা অর্গানিক আন্দোলনই ছিল। সমাজের প্রয়োজনেরই জবাব দিচ্ছিল। যেমন, ১৮৯০ সালে নিউইয়র্কে ইহুদি নৈরাজ্যবাদীদের আন্দোলন, অবশ্যই স্পেনের উদাহরণ আছে, আর্জেন্টিনার কথা আপনিই বলেছেন, আছে ফ্রান্স। এই সমাজ কি এখন প্রযুক্তির মতো জিনিস ধ্বংস করে দিচ্ছে না? আমি বা আপনি যে ধরনের সমাজে বড়ো হয়েছি এখন সাইবারস্পেসে এর চেয়ে বেশি সমাজ আছে। আমি নিজে বেড়ে উঠেছি কয়লা খনির সম্প্রদায়ের মধ্যে, যেখানে সবাই সবাইকে চিনত। হ্যাঁ, এখানেও উত্তেজনা ছিল, কিন্তু সম্পর্কের বোধটাও ছিল। এটা কি খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে না এবং প্রযুক্তি কি এটাকে বিদায় করতে সাহায্য করছে না?

    চমস্কি: আমার দৃষ্টিতে প্রযুক্তি খুব নিরপেক্ষ যন্ত্র। এটি এই দিকে যেতে পারে, বিপরীত দিকেও যেতে পারে। প্রযুক্তিকে কোনো পরিচালক ছাড়াই কোনো কারখানায় কর্মক্ষমদের চালাতে সহায়তা করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রের লোকদের তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করতে পারে যেন তারা অন্যদের সাথে মিলে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। এটাও প্রযুক্তির আরেক ধরনের ব্যবহার। অবশ্য এই প্রযুক্তি বিকাশিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এটা কীভাবে কাজ করবে তা নিয়ে বেশ চমৎকার কিছু গবেষণা রয়েছে। চমকপ্রদ এক গবেষণা করেছিলেন ডেভিড নভেল, তিনি এখানেই (MIT) ছিলেন, কিন্তু তিনি একটু বেশিই রেডিকাল ছিলেন। তিনি একটি দুর্দান্ত কাজ করেছিলেন। তার গবেষণার অন্যতম বিষয় ছিল নিউমেরিকাল কন্ট্রোল– কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক হাতিয়ার উৎপাদন– এই জাতীয় জিনিস। জনগণের খরচেই তা সামরিক ব্যববস্থাতে গড়া হয়েছিল। কিন্তু এটির নকশা করা হয়েছিল এমনভাবে যেন এর ব্যবহার ব্যবস্থাপকের ভূমিকাগুলোকে (managerial roles) দূর করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দক্ষ কারিগরদের হাতে তুলে দিয়েছিল যারা আসলে জানেন তারা কী করছেন। সাধারণত এই মানুষেরা অফিসের উপরের দিকে থাকা লোকদের চেয়ে বেশি জানেন। আমি নিশ্চিত এটা কয়লা খনির কাজের বেলাতেও সত্য। সুতরাং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তাদের হাতে দেয়ার মতো প্রযুক্তি তৈরি করা যেতে পারে। গবেষণা দেখিয়েছে যে এটি লাভ আরও বাড়িয়ে তুলবে। কিন্তু এটি করা হলো একেবারে উল্টোভাবে, যে পদ্ধতি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের (management control)  মাত্রা আরও বৃদ্ধি করেছে। এটি খুবই অকার্যকর এবং কারিগরদের অদক্ষ বানিয়ে এদের রোবটে পরিণত করছে যারা এখন শুধু বোতাম টিপে চলে। আসলে প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করবেন এটা আসলে আপনার ইচ্ছার ব্যাপার এবং এটি একটা শ্রেণিসংগ্রামের মতোই। তবে প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত প্রকৃতির সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই। তবে আপনি যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তা একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়। আমি জানিনা এর থেকে আসলে কী ফল আসবে, কিন্তু এটা সত্য যে এখন অনেক ভার্চুয়াল সমাজ গড়ে উঠেছে যেগুলো খুবই বাস্তব। আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমি আমার কাছের ৯৫ ভাগ বন্ধুদেরকে কখনো দেখিনি, কিন্তু ইন্টারনেটে আমরা সবাই সারাক্ষণ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করি। এবং আমার এই বয়সে আমার কাছে এটি পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়, কিন্তু আমি যখন আমার নাতি-নাতনিদের এটি করতে দেখি তখন আমি তা পছন্দ করি না। আমার মনে হয় মুখোমুখি যোগাযোগের বিষয়ে অনেক কিছু তাদের জানার দরকার আছে।

    আমার ছেলে ইন্সট্যান্ট মেসেজিং করে। এবং সে এমন অনেকের সাথেই মেসেজ আদান-প্রদান করছে স্কুলে থাকাকালীন যাদের সাথে খুব একটা কথাই বলেনি। এটা নিরপেক্ষ কাঠামো প্রদান করছে, কিন্তু প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই কারণ আমি চাই সে কথা বলুক এবং কথোপকথন করুক …

    চমস্কি: আমি আপনার সাথে একমত। ছোট বাচ্চাদের উপর এটা কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা আমি জানি না। মানে তারা একটি কাল্পনিক জগতে বাস করে। এবং এমনকি তারা কথোপকথন করছে এমন কিছু মানুষের সাথে যারা ভুয়া ব্যক্তিত্ব গ্রহণ করেছে। যখন বাচ্চারা ডানজিয়নস এন্ড ড্রাগনস খেলত… মানে, ঠিক আছে, আমি পছন্দ করতাম না, কিন্তু এতে খুব ভুল কিছুও দেখতাম না। অন্যদিকে যখন আপনার জীবনের একটা বড়ো অংশই একটা কাল্পনিক জগতে বসবাস করে এমন কিছু চরিত্রের সাথে যাদের আপনি সৃষ্টি করেছেন এবং যাদেরকে তারা নিজেরাই সৃষ্টি করেছে, এবং তাদের সাথে আপনার কখনো মুখোমুখি যোগাযোগ হয় না, এর তো একটা মানসিক প্রভাব থাকবে, যা আমার মনে হয় না আমরা বুঝতে পারছি। এটি খুব অমঙ্গলকর হতে পারে…

    আরেক ধাপ সামনে যাই, আপনি জানেন যে গত ১০ বছর যাবত নৈরাজ্যবাদে আরেকটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে আমরা বলি আদিমতাবাদ (primitism)। তারা এটিকে বলছে অ্যানার্কো-প্রিমিটিজম। বলছে যে, পুঁজিবাদ এতই পচে গিয়েছে, পুঁজিবাদের প্রযুক্তি এতই ধ্বংসাত্মক যে এই পুরো বিষয়টা থেকেই আমাদের মুক্ত হওয়া উচিৎ। এটি এতই ধ্বংসাত্মক, এতই ক্ষতিকারক, এতই ভয়াবহ যে এটি কেবল মানুষের ক্ষতিই করছে। সুতরাং, এর থেকে মুক্ত হয়ে এবং একধাপ পেছনে গিয়ে, বা তাদের ভাষায় সামনে গিয়ে, আরও বেশি প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া দরকার। এটি কি সম্ভব?

    চমস্কি: আপনি জানেন যারা এইসব বলছেন তাদের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় না তারা বুঝতে পারছেন যে, বর্তমানে সমাজ যেভাবে কাঠামোগত ও সংগঠিত সেখানে তারা আসলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে গণহত্যার কথা বলছেন। আপনি যদি এই কাঠামো নির্মূল করে দেন, সবাই মারা যাবে। যেমন আমি আমার নিজের খাবার ফলাতে পারবো না। এটি ভালো ধারণা কিন্তু তা এই দুনিয়াতে কাজ করবে না। এবং বাস্তবে আমরা কেউ শিকারি-সংগ্রহকারী জীবনযাপন করতে চাইব না। এমন অজস্র জিনিস আছে যেগুলো আধুনিক বিশ্ব আমাদের দিচ্ছে। সহজ সরলভাবে বেঁচে থাকার নামে তারা যা আহ্বান করছে তা আসলে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যা। এবং যদি এই বিষয়গুলো বিবেচনায় না এনে চিন্তা করা হয়ে থাকে, তাহলে এসবকে পাত্তা দেয়ার কিছু নেই।

    দানিয়েল গ্যারাঁ

    হ্যাঁ। আমি একমত। ইউরোপের অনেক লোকই আপনার সাথে পরিচিত হয় দানিয়েল গ্যারাঁর৫ বই Anarchism-এর ভূমিকার মাধ্যমে। একে প্রেস তার ‘নো গডস, নো মাস্টার্স’ বইটা ইংরেজিতে প্রকাশ করেছে… 

    চমস্কি: হ্যাঁ, বইটা শেল্ফেই রাখা রয়েছে।

    এটি একটি দুর্দান্ত বই। স্পষ্টতই, নৈরাজ্যবাদের (anarchism) সর্বোত্তম দিকগুলো ও সমাজতন্ত্রের (socialism) সর্বোত্তম দিকগুলো মিশিয়ে মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্রের (Libertian Socialism) দিকেই গ্যারাঁর বেশি আগ্রহ ছিল। আপনার কি মনে হয় যে, এই দুটো শব্দ– মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র ও নৈরাজ্যবাদ সমার্থক, নাকি এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে?

    চমস্কি: আমি জানি না আমরা আসলেই এটা বলতে পারব কি না, কারণ রাজনৈতিক ডিসকোর্সের শব্দগুলো খুব একটা ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। পুঁজিবাদ, বাণিজ্য, রাষ্ট্র, যে কোনো একটি নেন … এগুলো খুবই আলগা শব্দ। ঠিক আছে, তবে যদি আপনার কাছে এই শব্দসমূহের ব্যাখ্যামূলক তত্ত্ব না থাকে তাহলে এগুলোকে সতর্কভাবে সজ্ঞায়িত করার কোনো মানে হয় না। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, আমরা আসলে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। নৈরাজ্যবাদের ব্যপ্তি অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত, মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্রের ব্যপ্তিও অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত। তবে তিনি যা করার চেষ্টা করেছিলেন তার প্রতি আমি সহানুভূতি প্রকাশ করি। আমার মনে হয় এটাই সঠিক বিষয়। আপনি যদি সতর্কভাবে দেখেন এই দুটো শব্দ খুবই নিকটবর্তী। তাদের যেমন মিল আছে, তেমনি সম্পর্কও আছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বামদের মধ্যে যারা যত বেশি রাষ্ট্রবিরোধী ও ভ্যানগার্ডবিরোধী– মার্ক্সবাদী আন্দোলনের কথাই ধরুন– আন্তন প্যানেককদের৬ মতো যারা আছেন– এদের সাথে এনার্কো-সিন্ডিকালিস্টদের প্রচুর মিল রয়েছে। এনার্কো-সিন্ডিকালিস্টদের সমাজকে সংগঠিত করা সংক্রান্ত ধারণা ও প্যানেককের ওয়ার্কাস কাউন্সিলের মধ্য পার্থক্য খুঁজে বের করা খুব দুরূহ কাজ। কিছু পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু  মানুষ যখন বন্ধুসুলভ সম্পর্কের মধ্যে কাজ করে তখনো একধরনের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সুতরাং হ্যাঁ, আমার মতে এটি বেশ বিচক্ষণ মিশ্রণ। এই ধরনের আন্দোলনের সাথে বলশেভিজম ও কর্পোরেট পুঁজিবাদের মতো সর্বাত্মকবাদ (Totalitarianism) রূপের প্রচুর পার্থক্য বিদ্যমান। এখানে আপনি আলাদা করতে পারেন। সর্বাত্মকবাদী কাঠামো একদিকে, মুক্ত সমাজ অন্যদিকে। প্রকৃতপক্ষে আমি মনে করি মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র ও নৈরাজ্যবাদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ মিল রয়েছে, এবং এই দুটোকে মিশিয়ে ফেলাটা জন ডিউয়ের মতো মূলধারার চিন্তাবিদদের মধ্যেও দেখা যায়।

    আমি জানি তিনি স্টেলটন ও দ্যা মডার্ন স্কুল দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে তিনি অনেক ধারণা ও চিন্তা নিয়েছিলেন…

    চমস্কি: তাঁর মূল অভিমত ছিল যে, আমরা যদি রাজনৈতিক ও শিল্পজাত (industrial) সামন্ততন্ত্রকে উপড়ে ফেলে এটিকে শিল্পজাত গণতন্ত্রে পরিণত করতে না পারি– মানে পুরোপুরি শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারি– তাহলে এই পুরো প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আসলে খুব কাজের কিছু না। এবং তিনি একেবারে মূলধারার আমেরিকান ইতিহাস থেকেই উঠে এসেছেন। তিনি একেবারে খাঁটি আমেরিকান।

    আপনার লেখা পড়ার মারফতেই জানি যে, আপনি বামপন্থী কমিউনিস্ট প্যানেকক ও গোর্টার দ্বারা বেশ প্রভাবিত। আমি ধরে নিচ্ছি, আপনি এসবের বিপদগুলোকে টের পাচ্ছেন না, যেমন ওয়ার্কাস কাউন্সিল বা প্যানেকক বা গোর্টারের কাজও একধরনের সর্বাত্মকবাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। আপনি কি মনে করেন এদের থেকে পার্থক্য …

    চমস্কি: না, আমি মনে করি এতে প্রচুর বিপদ আছে। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতিও (participatory economics) সর্বাত্মকবাদের দিকে পরিচালিত করতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। আমরা সবাই আন্দোলনের সভায় গিয়েছি, আমরা এই চালিকাশক্তিটির (dynamics) ব্যাপারে জানি। আপনি কী কাজ করছেন তা কোনো বিষয় না, সেটা এক কোণে ট্রাফিক লাইট জ্বালানো হতে পারে বা ভিয়েতনামের যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সভা করা হতে পারে বা তা যাই হোক না কেন… সবখানেই সভা হয়ে থাকে এবং বিরক্তিকর ক্রিয়াকলাপ সহ্য করার মাত্রানুযায়ী আমরা একেকজনের চেয়ে আলাদা। কেউ কেউ খুব দ্রুত সরে যায়–  যেমন আমি। আমি  এসবের অনেককিছুই সহ্য করতে পারি না। অন্য ব্যক্তিরা মূলত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে নিজেদের সঁপে দেয়। এখানে একটা সহজাত চালিকাশক্তি(dynamic) থাকে যা সবচেয়ে মুক্ত, সহায়ক ও উদারপন্থী কাঠামোও কর্তৃত্ববাদে পরিণত করতে পারে, কেবল এই কারণে যে, চারদিকে যে ঘুরঘুর করছে যেন যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে ফেলে যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্যান্যরা অন্যকিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। এগুলো সর্বদাই বিপজ্জনক।

    শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা ব্যক্তিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে…

    চমস্কি: এবং আমরা সবাই এর সাথে পরিচিত; বন্ধুদের মহলে, কিংবা অন্য কাজের সমমনা ব্যক্তিদের মহলে। সুতরাং হ্যাঁ, এই সমস্যাগুলো সর্বদাই মোকাবিলা করতে হয়। এটা প্রতিরোধ করার কোনো জাদুকরী কৌশল (ম্যাজিক ফর্মুলা) জানা নেই।

    এর সাথে যুক্ত করি, সামাজিক পরিবর্তন ও নৈরাজ্যবাদে শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে আপনার কী মত?  কোনো সন্দেহ নেই যে, আমেরিকায় নৈরাজ্যবাদের মধ্যে, মানে কিছু নতুন নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে, শ্রেণিকে অতীতের বিষয় হিসেবে দেখার একটি প্রবণতা আছে। এটি আর পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক কেন্দ্রে নেই।

    চমস্কি: এদের মধ্যে কয়জন লোক আপনার কয়লাখনিতে বা কারখানাতে বা ডাটা প্রসেসর হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছে? যদি এগুলো আপনার চাকরি হয়ে থাকে, তবে শ্রেণি নিয়ে আপনার কোনো সমস্যা নেই। আপনি জানেন কে বস, এবং কে আদেশ দেন ও কে আদেশ গ্রহণ করেন। কারা আদেশ দেন এবং কারা আদেশ নেন এসবের বাইরে পুঁজি যে কেন্দ্রীভূত থাকে তা আপনি বুঝতে পারেন। এবং সেগুলোই শ্রেণি পার্থক্য। অন্য কোনো ডোমেইন থেকে আপনি বলতে পারেন, ‘আমি তো দেখছি না’, কিন্তু আপনি যখন সমাজে বসবাসরত ও কর্মরত মানুষের বাস্তব জীবনে প্রবেশ করবেন তখন আমার মনে হয় না তাদের এই শ্রেণি পার্থক্য ও এর গুরুত্ব বুঝতে খুব একটা মুশকিল হয়। আদেশ দেয়া ও আদেশ গ্রহণ করার মধ্যে অনেক  বড়োসড়ো পার্থক্য রয়েছে। এমনকি এও সত্য যে, যারা আদেশ দিচ্ছেন তারা অন্যখান থেকে আদেশ নিচ্ছেন। এটাই সর্বাত্মকবাদী ব্যবস্থার চরিত্র। এমন না যে একেবারে উঁচুতে যিনি বসে আছেন তিনি তলানিতে থাকা লোকদের আদেশ দিচ্ছেন: এই আদেশ আদান প্রদানের সংক্রমণের কয়েকটি স্তর রয়েছে। ব্যবস্থাপনাবাদ তদারকি ও বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তর মৌলিক শ্রেণিভেদের দিকে ধাবিত করে। এমন প্রচুর লোক রয়েছে যাদেরকে আদেশ গ্রহণ করতেই হবে, নাহলে না খেয়ে মরতে হবে। কোনো উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে আমরা শ্রেণি বিষয়টাকেই সবসময় উঠে আসতে দেখছি।

    আন্তন প্যানেকক

    আউটসোর্সিং এর মতো বাস্তবিক ইস্যুর কথাই ধরুন। আউটসোর্সিং সম্পর্কে মানুষের মনোভাব কেমন হওয়া উচিৎ? পরস্পরবিরোধী বোধ আছে। প্রথমত, আউটসোর্সিং খুবই বিভ্রান্তিকর একটি শব্দ। আউটসোর্সিং সর্বাত্মকবাদী ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ। যদি জিএম আউটসোর্স করে, এর অর্থ তারা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এমন কিছু সংস্থায় চাকরি স্থানান্তর করছে যারা শ্রম আইন, পরিবেশগত বাধা ইত্যাদি থেকে বেঁচে যেতে সক্ষম এবং উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য সস্তায় যোগান সরবরাহ করবে। কিন্তু এগুলো কমান্ড অর্থনীতির ভেতরকার বিষয়। আউটোসোর্সিং একটা ভণ্ডামির মতো। মুক্ত বাজারের সাথে এর কিছু সম্পর্ক রয়েছে। কমান্ড অর্থনীতির ভেতরের কাজকারবারের সাথে এটি সম্পর্কযুক্ত। তবে এর প্রতি আমাদের মনোভাব কেমন হওয়া উচিৎ? যেহেতু ভারত বা চীন থেকে আপনি ১০ শতাংশ ব্যায় করে শ্রমিক পাচ্ছেন যার ফলে আপনি চাকরি হারাচ্ছেন, সেহেতু, আমাদের এটার পক্ষে না বিপক্ষে থাকা উচিৎ?

    হ্যাঁ, উভয় দিকেই যুক্তি দেয়া যায়। কিন্তু আমি মনে করি দুটোই বিভ্রান্তিকর, কারণ এরা এমন একটি কাঠামো (framework) গ্রহণ করছে যা আমাদের গ্রহণ করা উচিৎ নয়। আমি বলতে চাইছি, যদি আপনি এই কাঠামো মেনে নেন যে, সর্বাত্মকবাদী কমান্ড অর্থনীতির এইসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে, এবং যদি মজুরির স্তর ও কাজের শর্তগুলো স্থির অবস্থা হয়, তাহলে আমাদের এইসব অনুমানের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তখন আপনি এই যুক্তি দিবেন যে, এখানকার দরিদ্রদের অন্য জায়গার দরিদ্রতর মানুষদের কাছে চাকরি হারনোটাই উচিৎ… কারণ এটা ইকনোমিক পাই এর প্রবৃদ্ধি ঘটায়, এবং এটাই প্রচলিত। কেন এই অনুমান? সঙ্কটটি মোকাবেলার অন্য উপায়ও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ধনী ব্যক্তিদের কথা ধরুন। আমার মতো যারা আয়ের সিঁড়ির শীর্ষ কয়েক শতাংশের মধ্যে আছেন তাদের কথাই ধরুন। আমরা আমাদের বিলাসবহুল জীবনধারা কমাতে পারি, যথাযথ কর পরিশোধ করতে পারি, এমন অনেক কিছুই আছে। আমি এমনকি বিল গেটসদের কথাও বলছি না, বরঞ্চ বলছি যারা যৌক্তিকভাবেই সুবিধাপ্রাপ্ত। দরিদ্র লোকদের উপর বোঝা চাপানোর পরিবর্তে যদি বলি, মানে, ‘আপনি দরিদ্র আপনাকে চাকরি ছাড়তে হবে, কারণ অন্য জায়গায় দরিদ্রতর লোকদের এই চাকরি দরকার’ এটা না বলে যদি বলি, ‘আমরা ধনীরা আমাদের বিলাসবহুল জীবনের ছোট একটা অংশ ছেড়ে দেব এবং অন্য জায়গার মানুষের জীবনমান ও কাজের পরিস্থিতি উন্নয়নে এটার ব্যবহার করব, যেন তারা নিজস্ব উপায়ে নিজেদের অর্থনীতির বিকাশে পর্যাপ্ত পুঁজি পেতে পারে’। তাহলে এই বিষয়টি আর উঠবে না। কিন্তু এটা বলা বেশি সুবিধাজনক যে, কমান্ড অর্থনীতি, সর্বাত্মকবাদী কাঠামোর আওতায় দরিদ্র লোকদেরই এই ভার বহন করা উচিৎ। কিন্তু আপনি যদি তলিয়ে চিন্তা করেন তাহলে এটি বোধগম্য হবে যে প্রায় প্রতিটি সামাজিক ইস্যুরই এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। চিন্তা ও মনোভাবের আধিপত্যের এই যে কাঠামো যা শুধু নির্দিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুমতি দেয় এবং এই সিদ্ধান্তগুলো সবসময়ই দরিদ্রদের উপর বোঝা চাপিয়ে দেয়, সে কাঠামোকে আমরা গ্রহণ করব না, করা উচিতও না। এটাই শ্রেণি সংগ্রাম। এমনকি আমাদের মতো ভালো মানুষ যারা মনে করি দরিদ্র শ্রমিককে সাহায্য করা ভালো, তারাও এই শ্রেণিসংগ্রামের কাঠামোর মধ্যে বিশেষাধিকার বজায় রাখি এবং ভারটা দরিদ্রদের উপর চাপিয়ে দিই। এটি আসলে ভদ্র লোকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়।

    আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন। ১৯০০ এর দশকে লিখিত এক প্রবন্ধে ভোল্টায়রিন ডি ক্লেয়ার৭ আরও ভালো এক দুনিয়ার দিকে শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের আশাবাদ ব্যক্ত করছিলেন। এবং তারপর তিনি এই শাসকদের কথা বললেন যারা এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করছেন যে, তার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। আমরা কি এখনো এমন অবস্থায় আছি যেখান থেকে আরও মুক্ত, আরও ভালো এক দুনিয়ায় শান্তিপূর্ণ স্থানান্তর সম্ভব, নাকি সময়ের সাথে এর সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে?

    চমস্কি: আসলে কেউ জানে না। কিন্তু আমার মনোগত, স্বল্প-বিশ্বাসযোগ্য মত হচ্ছে যে, শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা অতীতের তুলনায় এখন আরও বেশি। এর কারণ হচ্ছে, রাষ্ট্র ও কর্পোরেট শক্তির দমনমূলক হাতিয়ার হ্রাস পেয়েছে। আপনি এখন পিংকারটন দারোয়ানদের দিয়ে ধর্মঘট ভাঙতে পারবেন না। এটা করে আপনি বেশি দূরে যেতে পারবেন না। ন্যাশনাল গার্ড দিয়ে আপনি হোমস্টেডের মতো শ্রমিক শ্রেণির শহরগুলোকে ধ্বংস করতে পারবেন না। এগুলোই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। দমন যাতে কমে তার জন্য যথেষ্ট জয়লাভ করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনে কতজন শ্রমিক মারা যাচ্ছেন, এই সাধারণ প্রশ্নটাই দেখুন। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত এটি খুব বেশি ছিল। বাচ্চাকালে আমার মনে আছে, শ্রমিক আন্দোলনে নিরাপত্তা কর্মী, পিঙ্কারটন ও পুলিশের হাতে শ্রমিকরা নিয়মিত মারা যাচ্ছেন। এবং তা এখন বন্ধ হয়েছে। মাঝেমধ্যে হয়তোবা এটি ঘটে, কিন্তু এটি বেশ ভালো একটি পরিবর্তন।

    নিউ ইয়র্ক টাইমস এর এমা গোল্ডম্যানের পেপারগুলোর দিকে যদি আমরা নজর দিই, বা ১৮৯০’র দিকের পত্রিকাগুলো যদি দেখি তাহলে দেখা যাবে, প্রতি সপ্তাহেই অন্তত একজন করে শ্রমিক মারা যাচ্ছেন।

    চমস্কি: আমি বাচ্চাকালে এসব দেখেছি। আমার শৈশবের স্মৃতি আছে, পুলিশ একটি টেক্সটাইল প্ল্যান্টের নারী আন্দোলনকারীদের উপর প্রবলভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এবং তাদের জখম করছে।  এবং আমি মনে করি না বর্তমানে আপনি এসব করে পার পাবেন। এটি সাধারণ রূপ নিয়েছে। ঠিক যেমনটি ব্রাজিলে সামরিক ক্যু করা আমেরিকার পক্ষে ৪০ বছরের আগের চেয়ে বর্তমানে আরও কঠিন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অনেক কঠিন, অসম্ভবও বলা যায়। কারণ, এমন যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে যে মানুষ আর এটা গ্রহণ করবে না, এবং ক্ষমতার কাঠামো (structures of power) দ্রবীভূত হয়েছে। আসলে ক্ষমতার অনেকগুলো গড়ন এখন খুব ভঙ্গুর। অনেক কিছুই সরাসরি জোরজবরদস্তি থেকে অনুশাসন (indoctrination), চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণের দিকে ধাবিত হয়েছে। এটি যথেষ্ট খারাপ যে আপনার বাচ্চারা ভয়ঙ্কর টেলিভিশন দ্বারা আক্রান্ত, কিন্তু পুলিশের হাতে মার খাওয়া ও চারদিকে নির্যাতন কেন্দ্রের উপস্থিতির চেয়ে এর অনেক পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং এই পরিবর্তনগুলো আমাদের জানাচ্ছে যে, শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য আরও অনেক বিকল্প রয়েছে।

    কিন্তু এটা লড়াইকে আরও জটিল করে তুলছে না? পিঙ্কারটন গার্ডেরা থাকলে তো আপনার শত্রু কে তা অন্তত জানতে পারতেন। 

    চমস্কি: হ্যাঁ, আপনি জানেন আপনার শত্রু কে। যখন এই ভয়াবহ কর্পোরেশনের বন্ধুসুলভ কার্যনিবাহী দাবি করছেন যে, তিনি আপনার পাশেই আছেন, তখন এটা কঠিন। কিন্তু এর মানে এই না যে, এটি অসম্ভব। দুই দিন আগে আমি হার্ভার্ডে যুব লেবার এক্টিভিস্টদের একটি বড়ো দলের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিলাম। ইলাইনে বার্নার্ড নামের এক দুর্দান্ত ব্যক্তি এই দল পরিচালনা করেন। তিনি বাস্তবিকই প্রগতিশীল, উদ্যমী লেবার এক্টিভিস্ট, নারীবাদী, এক কথায় দুর্দান্ত। হার্ভার্ডে তরুণ শ্রমিক নেতাদের নিয়ে আসার এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ১৯৪০ সালের দিকে। রেডিকাল শ্রমিক আন্দোলন (labor action) যা দেশে বিপ্লব ঘটানোর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল সেই বাস্তব হুমকি আমলে নিয়ে কর্পোরেট একাডেমিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। অবস্থান ধর্মঘট (sitdown strike) কারখানা দখল থেকে একটু দূরে ছিল। এটি খুব নিকটবর্তী ছিল। যেহেতু পিঙ্কারটন গার্ড ও পুলিশের পক্ষে এই ধর্মঘট ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ছিল, সেহেতু এটিকে আটকানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই ধরে নেয়া হলো যে, আপনাকে আসলে তরুণ শ্রমিক নেতৃত্বের বেড়ে উঠাকে সামাজিকীকরণ করতে হবে (socialize), এদেরকে সভ্য করে তুলতে হবে, এবং হার্ভার্ডে নিয়ে এসে শিক্ষা দিতে হবে। এবং হার্ভার্ড যে কাজে ওস্তাদ, তাই করুক। প্রকৃতপক্ষে হার্ভার্ড আসলে তার নিজের শিক্ষার্থীদের সাথে কী করে? কীভাবে মার্জিত কথোপকথন করতে হবে, শ্রেণি সংহতি বজায় রাখতে হবে, কোনো ওয়াইনটা পান করতে হবে, সঠিক মনোভাব ও সম্পর্ক বেছে নিতে হবে এই শিক্ষা দেয়। এই তরুণদের (লেবার এক্টিভিস্ট) এখানে নিয়ে আসেন, তারা দেখবে ‘আমরা সকলেই বন্ধু’ এবং আমরা সবাই একই জিনিস করছি। বছরের পর বছর এটি এভাবেই চলছিল। এবং তারপর ইলাইনে বার্নার্ড এসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এরপর থেকেই এটি রেডিকাল আন্তর্জাতিক লেবার এক্টিভিস্টদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এটা হয়েছে কারণ, এইসব ধারণা (idea) আসলে সবসময় ছিল, বড়োজোর উপরিতলের একটু নিচেই, এবং যখনই উপরিতলে খোঁচা লেগেছে তখন সব বেরিয়ে এসেছে। এটি খুবই সহজাত এবং অবশ্যই এটিকে হারাতে বহু প্রচেষ্টার দরকার হয়। বর্তমানে হার্ভার্ড প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দুনিয়াজুড়ে এর ব্যপক প্রভাবও রয়েছে। এবং সব ধরনের জায়গাতেই এটি করা যেতে পারে, তবে এইসব শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের উপায় (mode)। এবং ইলাইনের নিজের জীবদ্দশাতেই তারা খুব বড়ো পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গিয়েছেন।

    পরিবর্তন দুই দিকেই হয়েছে। একদিকে যেমন আপনি ১০০ বছর আগের মতো হোমস্টেডকে দমন করতে পারবেন না, অন্যিদকে তেমনি হোমস্টেডের সেই চেতনাও হারিয়ে গেছে। সুতরাং এটি কেবল অগ্রগতি নয়, তবে সেই চেতনার পুনর্নির্মাণ এমন এক ধরনের শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড যা এখন আমাদের করতে হবে এবং অনেক দিক থেকেই এটি ন্যাশনাল গার্ডের সাথে লড়াইয়ের চেয়ে সহজতর।

    শেষ একটি প্রশ্ন, কারণ আমার মনে হয় আমাদের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি অ্যালেক্সান্ডার বার্কম্যানের বই Now and Then: an ABC of Anarchism বইয়ের উপর কাজ করছিলাম, কারণ, একে প্রেস এটি What is Anarchism নামে পুনঃপ্রকাশ করেছে। ১৯২০ সালের দিকের তার চিঠিপত্র পড়ছিলাম যখন তিনি এই বইয়ের কাজ করছিলেন এবং তার কাছে এটি খুব কঠিন মনে হচ্ছিল, এই বইয়ের মধ্যে তিনি যে বিষয়গুলো ধরার চেষ্টা করছিলেন তার একটি হচ্ছে , ‘কেন মানুষ এই ধারণায় আসে না? এই ধারণা, যা আমার কাছে একেবারে কাণ্ডজ্ঞান (common sense)… সহমর্মিতা ও সহযোগীতার প্রতি এই সহজাত প্রবৃত্তি? আমি রাশিয়া দেখেছি, এবং আমি সর্বাত্মকবাদের কাজকারবার দেখেছি। কেন নৈরাজ্যবাদী ধ্যানধারণা জগতে আরও ব্যপক প্রভাব রাখতে পারছে না?’ এটা বলার প্রায় ৮০ বছর হয়ে গেছে এবং এই প্রশ্নের মুখোমুখি এখনো হতে হচ্ছে, আমরা যারা অন্তত বিশ্বাস করি, যেমন এমা গোল্ডম্যান বলেছেন, ‘নৈরাজ্যবাদ একমাত্র বিশ্বাস যা নর ও নারীকে তাদের প্রকৃত চেহারা (true selves) এবং তারা কী হতে পারবে তা দেখায়’। স্বভাবতই আমরা এটি দেখি ও জানি, তবু এখনো এর প্রভাব একেবারেই সামান্য। এটি কি সত্য?

    চমস্কি: আমি মনে করি না এটা সত্য যে, এর প্রভাব একেবারে সামান্য। গত শতাব্দীর অনেকগুলোর প্রগতিশীল সামাজিক পরিবর্তন নৈরাজ্যবাদী নয়। বৃদ্ধিশীল কর (Progressive taxation), সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security) এগুলো নৈরাজ্যবাদী নয়, কিন্তু এগুলো এমন কিছু মনোভঙ্গি ও বোঝাপড়ার প্রতিচ্ছবি যা, আরও একটু সামনে এগোলেই দেখা যাবে, নৈরাজ্যবাদী প্রতিশ্রুতিই প্রতিফলিত করছে। এগুলো এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য সংহতি, সমাজ(community), পারস্পরিক নির্ভরতা ও পারস্পরিক সহায়তা থাকা উচিৎ। এইসব এগুলোর উপর ভিত্তি করেই হয়েছে। এগুলো বশীভূত, খণ্ডিত ও সংশোধিত আকারে রয়েছে বলে কখনো মুক্তিপরায়ন আকার (libertarian forms) ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু এগুলো আছে, এবং এগুলোই সামাজিক পরিবর্তনের দিকে পরিচালিত করছে।

    কেন এটি আরও এগোয়নি? এর বড়ো একটা অংশ হচ্ছে সহিংসতা। উদাহরণস্বরূপ বার্কম্যানের রাশিয়ার অভিজ্ঞতার কথাই ধরুন। তিনি প্রবেশ করেছিলেন একটি সহিংস সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে। ক্যু, বিপ্লব যে নামেই ডাকুন না কেন, বলশেভিকরা কর্তৃত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত ইউক্রেনের কৃষকদের নৈরাজ্যবাদ (Peasent anarchism) থেকে শুরু করে সোভিয়েতে ওয়ার্কাস কাউন্সিল পর্যন্ত অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় মুক্তিপরায়ন, কখনো কখনো নৈরাজ্যবাদী উদ্যোগও ছিল। এগুলোকে কেবল জোরজবরদস্তি ও প্রবল সহিংসতার মাধ্যমে ধুলিস্যাত করে দেয়া হয়। লেনিন ও ট্রটস্কি সর্বাত্মকবাদী উগ্রপন্থী ছিলেন এবং এসবের পেছনে তাদের একটি তত্ত্ব ছিল। তারা খুব নিবেদিত মার্ক্সবাদী ছিলেন যারা বিশ্বাস করতেন যে, রাশিয়ার মতো পশ্চাৎপদ ও আদিম দেশ সমাজতন্ত্রে পৌঁছাতে পারবে না কারণ গুরুর নীতি তো তাই বলে। অতএব আমাদেরকে জোর করে মূলত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী উন্নয়নের মধ্য দিয়ে দেশকে পরিচালিত করতে হবে এবং তারপর অবশেষে কিছু একটা ঘটবে। তারা নির্ভুলভাবে গুরুকে পুনরাবৃত্তি করছিলেন না, রাশিয়ার কৃষিসমাজ সংক্রান্ত তার অধ্যয়নসহ মার্ক্সের বহু বছরের শেষ দিককার কাজগুলোকে এর জন্য দমনের  প্রয়োজন পড়েছিল– আক্ষরিক অর্থেই দমন করা হয়েছিল।

    বার্কম্যান ও এমা

    আসল কথা হচ্ছে, তাদের হাতে শক্তি ছিল। এটি ধ্বংস করা সহজ ছিল না। মাখনোর আন্দোলন, ক্রোনস্টাড্ট বা সোভিয়েতদের নির্মূলের বিষয়টি বিবেচনা করুন: এটি কোনো মামুলি অভিযান ছিল না। বার্কম্যান তা দেখেছিলেন, এবং তিনি দেখেছিলেন যেভাবে নৈরাজ্যবাদীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সেভাবেই সহিংস সর্বাত্মকবাদী সমাজ উত্থিত হয়েছিল। মানে বাকুনিন তো অনেক আগেই এসব কিছু বলে দিয়েছিলেন। এমনকি ট্রটস্কিও তার শুরুর দিককার কাজে, বলশেভিকে যোগদানের পূর্বে, বলেছিলেন যে এমনই হতে যাচ্ছিল। একই কথা রোজা লুক্সেমবার্গ বা অন্যান্যরাও বলেছিলেন। কিন্তু  এটি ঘটেছিল এবং সেটা ছিল তাদের রূপ। আমাদের রূপটি ছিল ভিন্ন। বার্কম্যান লিখছিলেন উইলসনের লাল ভীতির (Red Scare) পরপরই, যার তুলনায় প্যট্রিয়ট এক্ট কিছুই না। এটি ছিল ‘প্রগতিশীল’ উইড্রো উইলসন ও অন্যান্যদের পরিচালিত হিংস্র দমন নিপীড়ন, এটি কেবল নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধেই ছিল না, কেবল এমা গোল্ডম্যানের বিরুদ্ধেই ছিল না যাকে বের করে দেয়া হয়েছিল, বরঞ্চ ইউজিন দেবসের মতো একেবারে মূলধারার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ছিল। উইলসন পুরোপুরি প্রতিহিংসাপরায়ন ছিলেন, তাকে জেলে প্রেরণ করা হয় কারণ তিনি উইলসনের যুদ্ধের মাহাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। উইলসন যেখানে সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে তাকে সাধারণ ক্ষমা দিতে অস্বীকার করেন। এইসব বাস্তবিক অর্থে সমস্ত স্বাধীন চিন্তা ও লেবারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। এর প্রভাব অনেক বেশিই ছিল।

    এই সহিংসতার পাশাপাশি জনগণের মনোভাব ও বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিরাটকায় প্রোপাগান্ডার উত্থান হলো, উত্থান হলো জনসংযোগ কৌশলের। এর বাইর আরও একটি সহজ বিষয় আছে: জীবন যেভাবে সংগঠিত তার শৃঙ্খলাজনিত প্রভাব। আজকের শিক্ষার্থীদের কথাই ধরুন। কিছু কিছু দিক থেকে তাদের মনোভঙ্গি, প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি বিষয়ে তারা ৬০ বছর আগের তুলনায় বেশ মুক্ত। অন্যদিকে তারা আরও বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ। তারা ঋণ দ্বারা শৃঙ্খলিত। শিক্ষার বন্দোবস্ত করার জন্য যেহেতু আপনাকে ঋণের বোঝা নিয়ে বের হয়ে আসতে হবে, তাই আপনি শৃঙ্খলিত। গত ২০ বছরের নয়া উদারবাদী জমানার কথাই ধরুন, ‘বিশ্বায়নে’র খুব উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে এটি কেবল শৃঙ্খলার দিকেই নজর দিয়েছে। এটি বাছাইয়ের স্বাধীনতা (Freedom of choice) দূর করতে চায় এবং শৃঙ্খলা আরোপ করতে চায়। আপনি এটি কীভাবে করলেন? হ্যাঁ, আপনি যদি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দম্পতি হয়ে থাকেন, টেবিলে খাবার জোগাড় করতে দুজনকেই সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়। কীভাবে মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্রী হবেন সেই চিন্তা করার মতো সময় আপনার থাকবে না। যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন হই যে, ‘আমি কীভাবে খাবার জোগাড় করব’ অথবা ‘আমার বাচ্চাকাচ্চাকে লালন-পালন করতে হবে এবং তারা যখন অসুস্থ হবে তখনো আমাকে কাজে যেতে হবে, তখন তাদের কী হবে’, এগুলো শৃঙ্খলা আরোপ করার খুব সুপরিকল্পিত কৌশল। স্বাধীন হওয়ার চেষ্টার মধ্যেও অনেক খরচা আছে। ধরেন, আপনি একটি শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। যদি আপনি সংগঠক হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে এর মূল্য দিতে হবে। হয়তোবা শ্রমিকদল লাভবান হবে কিন্তু আপনাকে মূল্য দিতেই হবে। আমরা জানি যে, এই মূল্য শুধু শক্তি ও চেষ্টাতেই নয়, বরঞ্চ শাস্তিতেও আছে। নাজুক পরিস্থিতিতে বসবাসকারী লোকেরা যৌক্তিকভাবেই হিসেব করে, ‘আমি যেখানে সহজেই পার পেয়ে যেতে পারি সেখানে কেন এই মূল্য দিতে যাব?’ সুতরাং সহজাত প্রবৃত্তি ও মনোভাব প্রকাশ না করার প্রচুর কারণ রয়েছে। যদিও সময়ে সময়ে তা প্রকাশিত হয়ে থাকে। সর্বোপরি আরও ভালোর জন্য এভাবেই আমাদের সামাজিক পরিবর্তন হয়ে থাকে।

    সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনার সাথে দেখা করে দারুণ লাগল। আপনার চিন্তার জন্য ধন্যবাদ।

    পাদটীকা

    ১. আইজ্যাক পুয়েন্তে স্প্যানিশ নৈরাজ্যবাদী ছিলেন। (৩রা জুন, ১৮৯৬- ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৬)। জন্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি ও এবং যৌনতা নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত El comunismo libertario (Libertarian Communism) নামক পুস্তিকার জন্যই তিনি মূলত পরিচিত। পুয়েন্তে একজন ডাক্তার ছিলেন, তিনি চিকিৎসা-চর্চাকে ন্যাচারালিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতেন, এবং এনার্কো-ন্যাচারিজমের গুরুত্বপূর্ণ প্রচারক ছিলেন। তিনি মনে করতেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্যবিধি উভয় তরফ থেকেই মানবজাতিকে হুমকির সম্মুখীন করে ফেলে। ন্যাচারিজমের পাশাপাশি তিনি এনার্কো-কমিনিউজমকেও এর সমাধান হিসেবে মনে করতেন।

    ২. এমা গোল্ডম্যান (১৮৬৯-১৯৪০), রাশিয়ায় জন্ম নেয়া প্রখ্যাত নৈরাজ্যবাদী, বামপন্থী রাজনীতিবিদ, দার্শনিক এবং নারীবাদী তাত্ত্বিক। তিনি ছিলেন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক কর্মবাদিতার এক বিরল মিশ্রণ। একদিকে রচনা করেছেন তাত্ত্বিক-রচনাবলী, অন্যদিকে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে।

    ৩. গুস্তাব ল্যান্ডোয়ার (৭ই এপ্রিল ১৮৭০-২রা মে ১৯১৯) ছিলেন জার্মানীর একজন অগ্রগণ্য এনার্কিস্ট তাত্ত্বিক। তিনি সামাজিক নৈরাজ্যবাদ বা সোশিয়াল এনার্কিমের সমর্থক ছিলেন এবং একজন স্বীকৃত শান্তিবাদী বা প্যাসিফিস্ট ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কেবল রাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক হাতিয়ারের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করলেই সামাজিক বিপ্লব সাধিত হয় না, বরঞ্চ এর জন্য দরকার আন্তঃব্যক্তিক (ইন্টারপারসোনাল) সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিপ্লব।

    ৪. বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বা সাইন্টিফিক ম্যানেজমেন্টকে কখনো কখনো টেলোরিজম বলা হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার যন্ত্রপাতিতে বিজ্ঞান প্রয়োগের প্রাথমিক প্রচেষ্টা। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মপ্রবাহের বিশ্লেষণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক দক্ষতা (ইকনোমিক এফিসিয়েন্সি), বিশেষত শ্রমের উৎপাদীশলতা বৃদ্ধি করা। এর উদ্ভাবক ফ্রেডরিক টেলোরের নামানুসারেই এই তত্ত্বকে টেলরিজম বলা হয়। ফ্রেডরিক টেলোর (২০শে মার্চ ১৮৫৬- ২১শে মার্চ ১৯১৫) একজন আমেরিকান মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।

    ৫. দানিয়েল গ্যারাঁ (১৯ মে ১৯০৪, ১৪ এপ্রিল ১৯৮৮) একজন ফরাসি এনার্কো-কমিউনিস্ট লেখক। বিখ্যাত দুই গ্রন্থ হচ্ছে: Anarchism: From Theory to Practice, এবং No Gods No Masters: An Anthology of Anarchism

    ৬. আন্তন প্যানেকক (২রা জানুয়ারি ১৮৭৩- ২৮শে এপ্রিল ১৯৬০) একজন ডাচ জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ছিলেন। তিনি কাউন্সিল কমিউনিজমের একজন অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক। কাউন্সিল কমিউনিজম রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ/রাষ্ট্রীয় সমাজন্ত্রের বিরোধী ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের জন্য লেনিনবাদী ভ্যানগার্ড পার্টির উপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। এই ধরনের পার্টি পরবর্তীতে দলীয় একনায়কতন্ত্র কায়েম করে।

    ৭. ভোল্টায়রিন ডি ক্লেয়ার (নভেম্বর ১৭, ১৮৬৬- জুন ২০, ১৯১২) একজন আমেরিকান নৈরাজ্যবাদী। তিনি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ, পুঁজিবাদ, বিবাহ-প্রথা এবং নারী ও যৌনতার উপর ধর্মের খবরদারির বিরোধিতা করতেন। শুরুর দিককার একজন গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়। এমা গোল্ডম্যান  তার সম্পর্কে বলেছিলেন যে, “the most gifted and brilliant anarchist woman America ever produced“।

    নোট: এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বেরি প্যটম্যান এমা গোল্ডম্যান প্রেসের সহযোগী সম্পাদক ।

  • চমস্কি, মার্কস ও মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্র নিয়ে একটি ঝটিকা সফর

    চমস্কি, মার্কস ও মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্র নিয়ে একটি ঝটিকা সফর

    • সেলিম রেজা নিউটন

    এই রচনাটুকু নোম চমস্কির ভবিষ্যতের সরকার  শীর্ষক বাংলা অনুবাদ-গ্রন্থের ভুমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে। এটি ছিল “ভূমিকা”র ১.১৪ অংশ। সেখানে এই অংশটুকুর উপশিরোনাম ছিল “নোম চমস্কির সমাজতন্ত্র: নৈরাজ্য থেকে র‌্যডিক্যাল মার্কস”। বইটির “ভুমিকা, ভাষান্তর ও সম্পাদনা” রচনা করেছেন সেলিম রেজা নিউটন। এটি প্রকাশ করেছিল ঢাকার পেন্ডুলাম পাবলিশার্স। এটি অনলাইনে রকমারি ডট কমে কিনতে পাওয়া যায়।  ইন্টারনেট আর্কাইভ থেকে বর্তমান রচনাটির সুসজ্জিত পিডিএফ ডাউনলোড করা যায়।

    ভবিষ্যতের সরকার
    পেন্ডুলাম পাবলিশার্স

    মূল রচনা

    অনবহিত মহলে বামপন্থা বলতে প্রধানত মস্কোপন্থী ও চীনপন্থী নানা ধরনের ‘সরকারি বামপন্থা’কে বোঝায়। এগুলো ‘স্টেট স্পন্সরড বামপন্থা’। এগুলোকে ‘মার্কসবাদ–লেনিনবাদ’ নামে ডাকা হলেও আসলে তা ‘লেনিনবাদ’ মাত্র। এগুলো হচ্ছে বলশেভিক রুশ–সাম্রাজ্যের লেনিনবাদী মার্কসবাদ। এই দুঃখেই রোজা লুক্সেমবার্গ তাঁর রচনার নাম দিয়েছিলেন “লেনিনবাদ, না মার্কসবাদ?”।১

    ‘বামধারার মার্কসবাদ’ নামক জিনিসটার সাথে বাংলাদেশের বলশেভিকদেরও স্বাভাবিকভাবেই পরিচয় নাই বললেই চলে। মস্কো থেকে, পিকিং থেকে মাঙনায় আসা সরকারি পুথিপত্র ছাড়া আর কোনোদিকে তাকানোর অভ্যাস আমাদের ছিল না। নিজেদের গোঁড়া বিশ্বাসের বাইরে আর–কিছুর যদি আমরা নাম শুনেও থাকি তো সেসবকে স্রেফ প্রতিপক্ষের প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়ে ‘জিন্দাবাদ’ ‘জিন্দাবাদ’ জারি রাখার মধ্য দিয়ে নিজেদের নিষ্ক্রিয় মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রেখেছি আমরা। কিন্তু নোম চমস্কির ‘ভবিষ্যতের সরকার’ অনুধাবন করার জন্য আমাদেরকে চিন্তার এই সরকারি বৃত্তের বাইরে আসতে হবে। তাকাতে হবে বাম–অভিমুখীন মার্কসবাদ, বামধারার মার্কসবাদ, র‌্যাডিক্যাল মার্কসবাদ, বৈপ্লবিক মার্কসবাদ, পশ্চিমা মার্কসবাদ, লেফট কমিউনিজম, লেফট উইং কমিউনিজম ইত্যাদি নামে পরিচিত মার্কসবাদের অ–লেনিনবাদী ধারার দিকে। মার্ক্সিস্টস্‌ ইন্টারনেট আর্কাইভ এই ধারার রচনাদির জন্য বামধারার, বলশেভিকবিরোধী এবং কাউন্সিল কমিউনিজম নামে একটা আলাদা জায়গা বরাদ্দ রেখেছে। কিন্তু তা আমাদের চোখে পড়ে না। মতান্ধতা আমাদের সর্বপ্রকার ‘বলশেভিক’দের প্রাণভোমরা বটে। খোদ বলশেভিক পার্টির মধ্যে, স্বয়ং লেনিনের জীবদ্দশায়, আলেকজান্দ্রা কোলোন্তাই প্রমুখের নেতৃত্বে ১৯২১ সালে গড়ে ওঠা ‘ওয়ার্কার্স অপোজিশন’ তথা পার্টি–রাষ্ট্রীয় বুরোক্রেসির বিরুদ্ধে সাক্ষাৎ শ্রমিকদের বিরোধী ধারা গঠন২ এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণের ঘটনা বিপ্লবের নামে জবরদস্তির বিভীষিকার কথা ভুলতে দেবে না।

    জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লোভাকিয়া এবং খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমজীবীদের আন্দোলন–সংগ্রাম–সৃজনের গুঁড়া গুঁড়া রঙে আঁকা হয়ে ওঠা এই বামধারার মার্কসবাদ কোনো তত্ত্ববিলাস নয়। বৈপ্লবিক সংগঠন, সংগ্রাম, স্বাধীন ব্যক্তিত্ব এবং তাদের অজস্র রচনায় উপচানো এই ধারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ও অর্থ–নৈতিক কেন্দ্রীভবনের হাত থেকে আপামর শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের ইতিহাসের এক বৃহৎ অধ্যায়। ইতিহাস আমাদের সামনে মেলে রেখেছে জার্মানির কার্ল কর্শ৩ ও রোজা লুক্সেমবার্গ৪, হাঙ্গেরির জর্জ লুকাচ৫,  নেদারল্যান্ডসের অ্যান্টন প্যানেকোয়েক৬, হারম্যান গোর্টার৭, জার্মান–মার্কিন পল ম্যাটিকদের কাউন্সিল কমিউনিজম ও বলশেভিকতন্ত্রবিরোধী কমিউনিজম–এর (Mattick, 1978) কথা–কাজের ধারা।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    কার্ল মার্কসের তত্ত্বজগতের চর্চায় বিকশিত এই মুক্তিমুখী মার্কসবাদ–এর ধারা–প্রবণতাকে চমস্কি মেলাতে চান নৈরাজ্যের অনুশীলনের সাথে। তাই, মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্র বলতে চমস্কি বোঝেন এই “বাম–অভিমুখীন মার্কসবাদ থেকে শুরু করে নৈরাজ্যবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত চিন্তাধারা”র পরিসরটিকে। বামধারার মার্কসবাদের সাথে নৈরাজ্যবাদের এই যোগসূত্র খুঁজে পান চমস্কি তিন দিক থেকে।

    [এক] যে আলোকায়ন (বা ধ্রুপদি উদারনীতিবাদকে) তিনি নৈরাজ্য–ধারণার দার্শনিক পূর্বসূরি বলে গণ্য করেন, গোড়ার দিককার মার্কসকে তিনি সেই “আলোকায়নের শেষ ভাগের একজন ব্যক্তিত্ব” হিসেবে দেখেন:

    যে প্রতিবেশ-পরিমণ্ডলে জীবনযাপন করতেন, সেখান থেকে ব্যাপকভাবে নিয়েছেন গোড়ার দিককার মার্কস। এই মার্কসের সাথে ধ্রুপদি উদারনীতিবাদ, আলোকায়নের কিছু দিক, এবং ফরাসি ও জার্মান রোমান্টিকতাবাদের অনেক মিল দেখা যায়। … আমার ধারণা … গোড়ার দিককার মার্কস আলোকায়নের শেষ ভাগের একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন রীতিমতো। (Chomsky, 1996)

    অন্য দিকে, পরের দিককার মার্কসকে তিনি দেখেন “অতিশয় কর্তৃত্বপরায়ণ অ্যাক্টিভিস্ট” হিসেবে:

    পরের দিককার মার্কস ছিলেন অতিশয় কর্তৃত্ববাদী অ্যাক্টিভিস্ট, ছিলেন পুঁজিবাদের বিচারমূলক বিশ্লেষক, যাঁর সমাজতান্ত্রিক বিকল্প নিয়ে তেমন বলার ছিল না। (Chomsky, 1996)

    এই পার্থক্য মনে রাখা চমস্কির জন্য জরুরি, আবার তাঁর কাছে গোড়ার দিককার স্বাধীনতাপ্রিয় মার্কসকে চিনে নেওয়াটাও জরুরি, যাঁর সাথে মানুষের প্রজাতিসত্তাগত স্বাধীনতার প্রশ্নে, এমনকি বিচ্ছিন্ন শ্রমের তত্ত্বের প্রশ্নে, ধ্রুপদি উদারনীতিবাদী হামবোল্টের মিল দেখতে পান।

    [দুই] মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রের ধারণা চমস্কির মানসপ্রসূত নয়। খোদ ইউরোপীয় শ্রমিক–আন্দোলনে বামধারার যে মার্কসবাদ আগাগোড়া প্রবাহিত থেকেছে তার মধ্যে নৈরাজ্যবাদের ছায়া দেখতে পান তিনি। এটা মার্কসবাদের অ–লেনিনবাদী ধারা। র‌্যাডিক্যাল, মুক্তিপরায়ণ, বৈপ্লবিক ধারা। জার্মানির কমিউনিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক রোজা লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডে কাউন্সিল কমিউনিজমের মার্কসীয় তাত্ত্বিক অ্যান্টন প্যানেকোয়েক, বৃটিশ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম পল প্রমুখ এ ধারার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। সমাজতন্ত্র বলতে এই ধারা সবসময়ই স্বাধীনতাশীল সমাজতন্ত্রকে বুঝিয়েছে। নিজেদেরকে মুক্তিপরায়ণ হিসেবে অভিহিত করেছে। কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে শ্রমজীবী উৎপাদকদের নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক মালিকানাকে এরা সমাজতন্ত্র মনে করেছে। নৈরাজ্যবাদের সাথে এদের প্রকৃত কোনো পার্থক্য নাই।

    মিখাইল বাকুনিন
    (১৯১৪-১৮৭৬)
    [তিন] ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে মার্কসবাদী ও নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে যা নিয়ে ছিল বৈরিতা, সেই রাষ্ট্র–বিলুপ্তির প্রশ্নে মার্কস–বাকুনিনের  মতপার্থক্যকে অতিক্রম করে যেতে চান তিনি। এই প্রশ্নে তাঁদের মতপার্থক্যকে মূলনীতিগত পার্থক্য হিসেবে না দেখে কৌশলগত পার্থক্য হিসেবে দেখেন তিনি। তাঁর মতে, “ঊনবিংশ শতকে রাষ্ট্র প্রশ্নে তাঁদের পার্থক্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এক অর্থে সেটা ছিল কৌশলগত।” উভয়েই যে মনেপ্রাণে রাষ্ট্রীয় জবরদস্তির অবসান চান তাতে কোনো সন্দেহ করতে পারেন না চমস্কি। বরং তাঁর ধারণা, জবরদস্তিমূলক পুরাতন রাষ্ট্রযন্ত্র বিলোপের কৌশলপদ্ধতি নিয়েই তাঁদের আসল পার্থক্য। চমস্কি মনে করেন প্যারি কমিউনের বিপ্লবে প্যারিসে শ্রমজীবীদের দুই মাসের যে কমিউন–রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার অভিজ্ঞতা মার্কসকে দিয়ে রাষ্ট্রবিলুপ্তির প্রশ্নে এমন কিছু ‘নতুন’ উপলব্ধি অর্জনে করিয়ে নিয়েছিল যা তাঁকে তত্ত্বধারণার দিক কমিউনিস্ট ইশতেহার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল এবং নৈরাজ্যবাদের নিকটবর্তী করে তুলেছিল। প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পড়ার জন্য ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ নামে যে ভাষণ লিখেছিলেন তিনি, তাতে মার্কসের এই ‘নতুন’ উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছিল। মার্কসের এই ‘নতুন’ উপলব্ধি এত দূর গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে যে, বিপ্লব–পরবর্তী রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তিনি ইশতেহার–এর অবস্থান বদলানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন কেননা তা “সেকেলে” হয়ে পড়েছিল।

    ইশতেহার–এ মার্কস–এঙ্গেলসের ধারণা ছিল শ্রমজীবী সর্বহারার বিপ্লব সম্পন্ন হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে পুরাতন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিতে হবে এবং সেটাকে শ্রমজীবী জনসাধারণের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের কাজে লাগাতে হবে। সর্বহারার এই নতুন রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে হবে উৎপাদনের সকল হাতিয়ারপাতি, পরিবহনের সমস্ত উপায় এবং সকল আর্থিক উপায়–পদ্ধতি। এই রাষ্ট্র এমনসব নীতিপদ্ধতিতে চলবে যে, দীর্ঘদিন যাবত ধীরে ধীরে শ্রেণিবৈষম্য কমে আসতে আসতে এক পর্যায়ে আর থাকবে না। তখন রাষ্ট্রের আর প্রয়োজনও থাকবে না। সেটা তার রাজনৈতিক চরিত্র হারাবে এবং তার বিলুপ্তি ঘটবে। এই দ্বিতীয় ধাপে এসে উৎপাদনের সকল উপায়পদ্ধতি তখন চলে যাবে রাষ্ট্রের বদলে স্বাধীন ব্যক্তিবর্গের মুক্তিপরায়ণ স্বেচ্ছাসমিতিসমূহের হাতে। সূচিত হবে শ্রেণিহীন, রাষ্ট্রহীন মুক্ত–সমাজের চলা।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    কার্ল মার্কসের এই রাষ্ট্রবাদী চিন্তাধারার মুশকিলগুলো নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিকের ভেতরে মুক্তিপরায়ণরা আগাগোড়াই সমালোচনা করে এসেছেন। প্রুঁধো–বাকুনিনরা তো চিরদিনই মনে করেছেন, বিদ্যমান জবরদস্তিমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রই আপামর মেহনতি মানুষের মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়, সুতরাং বিপ্লবের সাথেসাথেই, একদম প্রথম সুযোগেই, এই রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে সমূলে উচ্ছেদ করে ফেলতে হবে, এবং তার জায়গায় শ্রমজীবীদের স্বেচ্ছাসমিতিসমূহের ফেডারেল সংস্থা গঠনের মাধ্যমে সমাজ ও উৎপাদন পরিচালনার কাজে হাত দিতে হবে। প্যারিস কমিউন ছিল ঠিক এইরকম প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তব দৃষ্টান্ত। তো, প্যারিস কমিউনের পর্যালোচনায় এই প্রতিষ্ঠানকেই মার্কস যখন তাঁর ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ রচনায় “শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন ফয়সালা করার রাজনৈতিক কাঠামো” হিসেবে (Marx and Engels, 1978: 634–635), এবং এঙ্গেলস সেই রচনার ভূমিকায় “প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্রের দৃষ্টান্ত”৮ হিসেবে (Marx and Engels, 1978: 629) উপলব্ধি করলেন তখন কিন্তু বিপ্লব–পরবর্তী রাষ্ট্র–বিলুপ্তির প্রশ্নে এবং তার জায়গায় শ্রমজীবী জন–সাধারণের কমিউন গঠনের প্রশ্নে প্রুধোঁ–বাকুনিনদের সঙ্গে মূলগত–ভাবে মার্কস–এঙ্গেলসের আর ফারাক রইল না। ইশতেহার–এর ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় তাঁরা বলেন, “কমিউন বিশেষ করে একটা কথা প্রমাণ করেছে যে, রেডিমেড রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে স্রেফ দখল করে নিয়ে তাকে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাটা শ্রমিকশ্রেণির কাজ নয়” (Marx and Engels, 1978: 470)। কথাটা কিন্তু মার্কসের ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ রচনারই একটা উদ্ধৃতি বটে (Marx and Engels, 1978: 629) যেখানে মার্কস বললেন, “শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্ন ফয়সালা করার যে রাজনৈতিক কাঠামো অবশেষে আবিষ্কৃত হয়েছে” সেটা হলো কমিউন— “শ্রমিকশ্রেণির সরকার” (Marx and Engels, 1978: 634-635)। মার্কসীয় ধারণায় এতদিন যা ছিল রাষ্ট্রের এক–নায়কত্ব, এবার সেটা রূপান্তরিত হলো পুরাতন রাষ্ট্রকাঠামোবর্জিত কমিউনের একনায়কত্বে।

    মার্কসবাদ ও নৈরাজ্যবাদের সাদৃশ্য ও ঐক্যের এই পাটাতনটিকে সামনে তুলে আনা ‘ভবিষ্যতের সরকার’–এ চমস্কির বিশেষ অবদান। তাঁর এই মার্কস–নৈরাজ্য–ব্লেন্ডিং রাষ্ট্রপ্রশ্নে যে ফয়সালা দাঁড় করালো তাতে মার্কসবাদ এখন বিপ্লবের পরে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র গড়ে তোলার বদলে কমিউন গড়ে তুলতে চায়। আর অন্যদিকে, নৈরাজ্যবাদ এখন বিপ্লবের পর রাষ্ট্রকে ‘নাই’ করে দেওয়ার বদলে একটা মুক্তিপরায়ণ আর্থসামাজিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে চায়। ফ্রান্সে ১৮৪৮–এর ফেব্রুয়ারি–বিপ্লব যে ‘সোশাল রিপাবলিক’–এর আওয়াজ তুলেছিল, ১৮৭১ সালের কমিউনের মধ্যে মার্কস যার সফল বাস্তবায়ন দেখেছিলেন, তার সাথে এই মুক্তিপরায়ণ আর্থসামাজিক রাষ্ট্রের প্রকৃত ফারাক নাই। মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের সাথে নৈরাজ্যের বিভেদ ঘুচিয়ে তাহলে আমরা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটা কমিউন–রাষ্ট্র বা পঞ্চায়েত–রাষ্ট্র বা কওমি–রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে পারি যার কাজ হবে “যাবতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করে দিয়ে শুধু … উৎপাদন আর ভোগের চাহিদা বিষয়ক কাজে নিজেকে সীমাবদ্ধ” রাখা। এই ফেডারেল রাষ্ট্র হবে কমিউনসমূহের কমিউন, পঞ্চায়েতসমূহের পঞ্চায়েত। (প্রসঙ্গত, আমার আন্দাজ, একক ‘চেইন অফ কমান্ড’ ভিত্তিক কেন্দ্রীভূত সেনাবাহিনীর বদলে বন্দুকের বিকেন্দ্রায়ন ঘটানোর মধ্য দিয়ে প্রয়োজনে এ রাষ্ট্র কর্তৃত্বক্রম–তন্ত্রহীন, আনুভূমিক, স্বশাসিত পঞ্চায়েত–প্রতিরক্ষা–বাহিনী গঠন করবে বৈকি। এর স্থানীয় পঞ্চায়েত–ইউনিটগুলো জবাবদিহি করবে নিজ নিজ স্থানীয় পঞ্চায়েতের কাছে।)

    নোম চমস্কি

    এ ছাড়া নোম চমস্কির যুক্তিপ্রণালী অনুসরণ করলে বোঝা যায় যে, নৈরাজ্যবাদ ছাড়া রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রী বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ধারার অন্য কোনো রাষ্ট্রচিন্তাই মানুষের স্বাধীনতাশীলতাকে, তথা তার প্রজাতি–ধর্মকে, তথা খোদ মানবিকতাকে রাষ্ট্র–পরিচালনাগত নীতি হিসেবে আদৌ বিবেচনায় নেয় না। এ কারণেই সেসবের হাত ধরে আধুনিক রাষ্ট্রের যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তাতে করে রাষ্ট্র হয়ে পড়েছে গভীরভাবে মানবতাবিরোধী একটা প্রতিষ্ঠান। (মনে পড়ে যায়, এই কারণেই গান্ধী মনে করতেন রাষ্ট্র একটা আত্মাবিহীন মেশিন।) আর সমস্ত কিছুর কথা বাদ দিলেও শুধু এই কারণেই আজকের দিনের রাষ্ট্রচিন্তা যেসব রাজনীতি–তৎপর মানুষকে গভীরভাবে ভাবায়, তাঁদের পক্ষে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধানতম মূলনীতি হিসেবে নৈরাজ্যবাদকে (তথা মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রকে, কিংবা উনিশ শতকীয় রাজনৈতিক পরিভাষার অতীতমুখী ঝামেলাকে এড়িয়ে গিয়ে বলা চলে, মনুষ্য–স্বাধীনতাকে) বিবেচনায় না নিয়ে কোনো উপায় থাকে না।

    এমনিতে ‘নৈরাজ্য’ শব্দটার ঝামেলা প্রচুর। ‘নৈরাজ্যবাদ’ নামটার ঝামেলা আরো বেশি। এর জন্য নৈরাজ্যওয়ালাদের কোনো দায় নাই তা নয় কিন্তু তার চেয়ে বেশি দায় মনুষ্য–স্বাধীনতাবিরোধী মালিক–মাতব্বর–পক্ষের বিপুল মাত্রায় পয়সা–খরচ–করা দীর্ঘমেয়াদী ও সর্বগ্রাসী প্রচারণা। দায় এমনকি আমাদের শিক্ষিত এলিট–মহাজন–দের জিজ্ঞাসাহীন, অনুসন্ধানহীন, চিন্তাদাসসুলভ মূর্খতারও বৈকি! কিন্তু ঝামেলা যতই থাক নৈরাজ্যের বা নৈরাজ্যবাদের, সমাজ–রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় অর্থেই, মনুষ্য–স্বাধীনতাকে প্রধানতম বিবেচনায় না নিয়ে চললে রাষ্ট্র জিনিসটা যে রাক্ষসে পরিণত হয়, সেই মহা জরুরি কথাটা রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান পরিসরে নৈরাজ্যওয়ালারা ছাড়া আর কেউ কোনোদিন এমন লাগাতারভাবে, এমন জোরের সাথে, সামনে আনেন নি। সুতরাং নৈরাজ্যবাদ নামক উনিশ শতকের চিন্তা–পরিভাষাকে অতিক্রম করে যাওয়ার জন্য হলেও আপনাকে নৈরাজ্যবাদ নিয়ে বোঝাপড়া করতে হবে বৈকি।

    মনুষ্য–স্বাধীনতার প্রকৃতিপ্রদত্ত স্পৃহা যার অনুভূতি ও চিন্তনে স্বভাবত ক্রিয়াশীল নয়, তার জন্য ‘নৈরাজ্যবাদ’ ইতিহাস বইয়ের একটা নাম মাত্র। এই ধরনের মানুষদের একটা বিরাট অংশ নৈরাজ্যের নাম শুনলে বিরক্তিতে বমি করার উদ্যোগ নেন, আরেকটা বিরাট অংশ নৈরাজ্যের নাম শুনলেই আনন্দে গদগদ হয়ে ওঠেন যেন সারাক্ষণ ‘নৈরাজ্য’ ‘নৈরাজ্য’ করলেই সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর স্বাধীনতা ও সাম্যের বৃষ্টিধারা নেমে আসবে অঝোরে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম
    শিল্পী: এন্টনিও রডরিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আসলে, স্বাধীনতা নামক প্রজাতিসত্তা যার রক্তে ও মস্তিষ্কে স্বভাবতই কাজ করে, তিনি কিন্তু নৈরাজ্য বা অন্য কোনো একক নামের অধীনে  নিজেকে অনুগত করে তুলতে চান না। নিজের খাসলতের কারণেই তিনি সেটা পারেন না। তার কাছে ‘নৈরাজ্য’ নাম–ধারণাটার চেয়েও অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে যাওয়া— ব্যক্তিগত পরিসরে এবং সমষ্টিগত পরিসরে। তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিসরে পরিচালনাগত মূলনীতি হিসেবে স্বাধীনতাশীলতার চর্চা করতে থাকা। মুখে এবং কাজে। পরিবারে, কর্মস্থলে, আত্মীয়সভায় এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক–সামাজিক পরিসরে বিরতিহীনভাবে তিনি নৈরাজ্যের ধারণাগুলো তুলে ধরতে থাকেন এবং নিজের আচরণ ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে সেই ধারণার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠার সাধনায় নিমগ্ন হয়ে থাকেন— সম্ভব হলে সমমনা বন্ধুদেরকে সাথে নিয়ে, সম্ভব না হলে একা; নিঃসঙ্গভাবে এবং নির্ভীকভাবে। ভয় তার একটাই— দাসত্বের ভয়। তাই বলে নৈরাজ্য শব্দটাকে তিনি ভুলে যান না, অপছন্দও করেন না। মানুষের ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত মুক্তিস্পৃহার সামাজিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের চিরায়ত লড়াইয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর এবং বিংশ শতাব্দীর নৈরাজ্য–ধারণার এবং নৈরাজ্যিক তৎপরতার ইতিহাস তিনি জানেন। সেই ইতিহাসের অসাধারণ সব অর্জন এবং মারাত্মক সব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও তিনি জানেন। কিন্তু তিনি তো আর গত সহস্রাব্দে বাস করেন না। তাই, একবিংশ শতাব্দীতে, অর্থাৎ নতুন এ মিলেনিয়ামে, নৈরাজ্য শব্দটাকে ব্যবহার করার অথবা না করার পক্ষে কোনো ফতোয়া জারি করার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আমার অ্যানার্কি ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীকে পেরিয়ে, এমনকি আমার অন্যতম প্রিয়তম শিক্ষক নোম চমস্কিকেও অতিক্রম করে শতদিকে ধায়। শতনামে, শতফুলে প্রস্ফুটিত হয়।

    পাদটীকা

    ১. দ্রষ্টব্য: Luxemburg, 1904-a; Luxemburg, 1904-b; Luxemburg, 1961।

    ২. ১৯২১ সালের গোড়ায় প্রাভদা-য় শ্লিয়াপ্‌নিকফের লেখা ওয়ার্কার্স অপোজিশনের থিসিস, কোলোন্তাইয়ের লেখা দ্য ওয়ার্কার্স অপোজিশন, ১৯২২ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের কমরেডদের কাছে “২২ জনের আবেদন”, Kollontai, 1978 এবং Clements, 1975 দ্রষ্টব্য।

    ৩. Kellner, 1977

    ৪. Luxemburg, 1925; Luxemburg, 1961; Luxemburg, 1970; Luxemburg, 1981; Luxemburg, 2004; Luxemburg, 2008; Luxemburg, 2013; Gietinger, 2019.

    ৫. Lukacs, 1962; Lukacs, 1970; Lukacs, 1971; Lukacs, 2014

    ৬. Pannekoek, 2003; Smart, 1978

    ৭. Gorter, 1921; Smart, 1978৮. এই কথাটুকু অবশ্য এঙ্গেলসের। ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ রচনারই ভূমিকায় বলা।

    বইপত্রের হদিস

    Chomsky, Noam (1996), “Anarchism, Marxism and Hope for the Future”, An interview with Noam Chomsky conducted in May 1995 by Kevin Doyle, First published in 1996 in Red & Black Revolution, No 2.

    Clements, Barbara Evans (1975), “Kollontai’s Contribution to the Workers’ Opposition”, Russian History, Vol. 2, No. 2, pp. 191-206. Downloaded from Jstor.

    Gietinger, Klaus (2019). The Murder of Rosa Luxemburg. Translated by Loren Balhorn. Kondon: verso.

    Gorter, Herman (1921), “Open Letter to Comrade Lenin”, First published as: Open letter to comrade Lenin, A reply to “‘Left-wing’ communism, an infantile disorder,” in Workers’ Dreadnought, London, 12 March-11 June 1921; Published: Wildcat pamphlet, London, 1989. Available at Marxists Internet Arcive.

    Kellner, Douglas (1977). Karl Korsch: Revolutionary Theories. Austin: University of Texas Press.

    Kollontai, Alexandra (1978). Selected Writings of Alexandra Kollontai. Translated with an introduction and commentaries by Alix Holt. Westport, Conn.: Lawrence Hill.

    Lukacs, Georg (1962). The Destruction of Reason. Atlantic Highlands, N.J.: Humanities Press Inc.

    Lukacs, Georg (1970). Writer and Critic and Other Essays. New York: The Universal Library.

    Lukacs, Georg (1971). History and Class Consciousness. Cambridge, Massachusetts: MIT Press.

    Lukacs, Georg (2014). Tactics and Ethics 1919-1929. London: Verso.

    Luxemburg, Rosa (1904-a). Leninism or Marxism. Glasgow: Anti-Parliamentary Communist Federation. (This edition was published in 1935. Available online as a PDF file at the Internet Archive: archive.org/details/Leninism_or_Marxism_R
    osa_Luxemburg
    ) [The first English translation of the pamphlet appeared in the Council Correspondence, theoretical organ of the United Workers Party of America. Written: 1904. First Published: 1904 in Iskra and Neue Zeit. Online: Marxists Internet Archive.]

    Luxemburg, Rosa (1904-b). Leninism or Marxism. Calicut: Amibooks. (This edition was published in 2017. Available online as a PDF file at the Internet Archive)

    Luxemburg, Rosa (1925). The Mass Strike, the Political Party and the Trade Unions. Written and first published: 1906. Translated: Patrick Lavin. Publisher: Marxist Educational Society of Detroit.

    Luxemburg, Rosa (1961). The Russian Revolution and Leninism or Marxism. Introduction by Bertram D. Wolfe. Ann Arbor Paperback. The University of Michigan. [The Russian Revolution was written in 1918. First published in Le Populaire by Paul Levi in 1922.]

    Luxemburg, Rosa (1970). Rosa Luxemburg Speaks. Edited with an Introduction by Mary-Alice Waters. New York: Pathfinder Press.

    Luxemburg, Rosa (1981). Comrade and Lover: Rosa Luxemburg’s Letters to Leo Jogiches. Edited and translated by Elzbieta Ettinger. London: Pluto Press.

    Luxemburg, Rosa (2004). The Rosa Luxemburg Reader. New York: Monthly Review Press.

    Luxemburg, Rosa (2008). The Essential Rosa Luxemburg: Reform or Revolution & The Mass Strike. Edited by Helen Scott. Chicago: Haymarket Books.

    Luxemburg, Rosa (2013). The Complete Works of Rosa Luxemburg. Volume 1, Economic Writings 1. London: Verso.

    Marx, Karl and Friedrich Engels (1978). The Marx-Engels Reader. Edited by Tucker, Robert C. 2nd edition. New York: W. W. Norton.

    Mattick, Paul (1978). Anti-Bolshevik Communism. Reprinted in 2007. Wales: Merlin Press.

    Paneoek, Anton (2003). Workers’ Councils. First published in 1946. Oakland, CA: AK Press. Available at Marxists Internet Archive.

    Smart, D. A. (1978). Pannekoek and Gorter’s Marxism. London: Pluto Press.

     

     অরাজের প্রচ্ছদ পাতায় প্রথম প্রকাশ : ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২০

  • নোয়াম চমস্কি।। সমাজতন্ত্র: সত্য ও মিথ্যা

    নোয়াম চমস্কি।। সমাজতন্ত্র: সত্য ও মিথ্যা

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    ‘সমাজতন্ত্র’ প্রত্যয়টির অর্থ নিয়ে যে কেউ চাইলেই তর্ক- বিতর্ক করতে পারে। কিন্তু এর সত্যিকারের অর্থ হল– উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ খোদ শ্রমজীবীদের নিজের হাতে থাকা। (more…)

  • নোয়াম চমস্কি।। পারস্পরিকতা বাড়ছে এবং এটাই আমাদের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি

    নোয়াম চমস্কি।। পারস্পরিকতা বাড়ছে এবং এটাই আমাদের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি

    • অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

    ‘নৈরাজ্যবাদ ও নৈরাজ্যবাদীদেরকে ঐতিহাসিকভাবে দুনিয়ার সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নৈরাজ্যবাদীরা অনিয়ন্ত্রিত সংবেদনশীল, নিজ স্বার্থের জন্য ধ্বংসকামী সহিংস ব্যক্তি এবং সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরোধী –  এই ধরনের উপস্থাপন আজ পর্যন্ত বহাল আছে।  এছাড়াও, নৈরাজ্যবাদ মানেই বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি, হত্যা ও ধর্ষণের রাজত্ব … এমন ভ্রান্ত ধারণাও সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে।— লোরেঞ্জ কমবুয়া এর ‘এনার্কিজম এ্যান্ড ব্ল্যাক রেভুলেশন’ বই থেকে।

    কভিড-১৯ এর এই সময়ে পারস্পরিকতা (mutual aid) শব্দটিকে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপক আন্দোলিত হতে দেখা যাচ্ছে। ‘ইন্ডিজেনাস মিউচাল এইড নেটওয়ার্ক’ এর মত অনেক সংগঠন বর্তমানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে; হারিকেন ক্যটরিনার পরপর ‘কমন গ্রাউন্ড রিলিফ কালেক্টিভ’ এর উদ্যোগে এমন পারষ্পরিকতা, সহয়তা প্রদানের নজির দেখা গিয়েছিল।

    ক্রিস স্টীলের সাথে চমস্কির এই  সাক্ষাতকারটি গত ২৮ মে, ২০২০ ‘Truthout’ এর ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে। নৈরাজ্যবাদের অব্যাহত কাজ, জনমনে নৈরাজ্যবাদ নিয়ে ভুল ধারণা ও তৃনমূল পর্যায়ের কাজ গুলোতে কিভাবে নৈরাজ্যবাদ ছড়িয়ে আছে, পারষ্পরিকতা বা মিচুয়াল এইডের কার্যকারিতা ইত্যাদি বিষয়  নিয়ে চমস্কি এই সাক্ষাতকারে আলাপ করেছেন ।

    নোম চমস্কি

    আমার প্রথম প্রশ্ন নৈরাজ্যবাদ নিয়ে । আমরা জানি আপনি অল্প বয়সেই নৈরাজ্যবাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন । আমি জানতে চাচ্ছিলাম, নৈরাজ্যবাদ কিভাবে অগ্রসর হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আপনি এর ভূমিকা কীরকম দেখছেন ?

    প্রথমত, আমাদের মনে রাখা উচিৎ যে ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটি বেশ বিস্তৃত চিন্তাভাবনা ও কার্যকলাপকে ধারণ করে থাকে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দুনিয়ার প্রপাগান্ডা-ব্যবস্থার কারণেই এই শব্দটি নিজেই একটি অবমাননাকর ধারণায় পর্যবসিত হয়েছে। নৈরাজ্যবাদ শব্দটি বলতে মানুষ এখন বুঝে — সহিংসতা ও সন্ত্রাস, ধ্বংস, সমস্ত শৃঙ্খলা ও সংস্থার নির্মূলকরণ ইত্যাদি । কিন্তু নৈরাজ্যবাদের মূল ধারাটি এই রকম ছিল না ।

    নৈরাজ্যবাদ একটি অত্যন্ত সংগঠিত সমাজের কথা বলে যেখানে অন্যায্য শ্রেণিবিন্যাস (heierarchy) এবং আধিপত্য ছাড়াই অংশগ্রহণকারীরা সংগঠিত হতে পারে। এটি সংহতি, পারস্পরিক উদ্বেগ, সহযোগিতা, তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান,  বোঝাপড়া ইত্যাদির ভিত্তিতে উন্নত মাত্রার সংগঠনের কথা বলে। এটি কীভাবে বদলে গেলো? এসব মানবজীবনে সর্বদাই বিদ্যমান ছিল কিন্তু কখনো সমাজের স্বীকৃত উপাদান হিসেবে ছিল না । ষাট এর দশকে এটি পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিল কারণ নৈরাজ্যবাদ শব্দটি ব্যবহৃত না হলেও  রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সক্রিয় কর্মীরা এই রূপগুলো গ্রহণ করা শুরু করেছিল ।

    দক্ষিণের ফ্রিডম রাইডার্সরা (১৯৭১) বলবেন যে, আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যা তৈরি হয়েছিল পারস্পরিকতা, সহযোগিতা,  এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো এই জাতীয় কিছুর মাধ্যমে । প্রথমদিককার নারীবাদী আন্দোলনের একই রকম কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, এবং এই জমানাতেও এটি বিদ্যমান, বিশেষত তরুণদের মধ্যে পরিবেশবাদী আন্দোলনের উত্থানে। তবে এর বাইরেও পুরো বিশ্বে এমন কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ছে যাকে আমরা নৈরাজ্যবাদ না বললেও এতে সম্ভাব্য নৈরাজ্যবাদী সমাজের উপাদান নিহিত রয়েছে।

    ওহাইওর ইয়ংস্টাঊনের বড় ইস্পাত মিলগুলোর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে উদাহরণ হিসাবে দেখতে পারেন। এগুলো কমিউনিটি বা সম্প্রদায় কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল এবং তারা কেবল শ্রমশক্তিই ছিলেন না, বরঞ্চ তাদের অবদানই প্রধান ছিল। প্রকৃতপক্ষে এসব মিল বৃহৎ পরিমাণে সম্প্রদায় দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল বিধায় মিলগুলো বন্ধ হবার দরুন যেমন শ্রমশক্তির ক্ষতি হয়েছিল তেমনিভাবে সম্প্রদায়গুলো ভেঙ্গেও পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।  কিন্তু  পরবর্তীতে তারা বিশৃঙ্খল ও অদৃশ্য হওয়ার পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক আকারে সংগঠিত হতে শুরু করেছিল। আর এটা ঘটাতে সাহায্য করেছিলেন শ্রম কর্মী স্টাফডন ও আইনজীবী গার আল্পেরবভিটাস মত আগ্রহী বুদ্ধিজীবীরা। উনারা দীর্ঘদিন ধরে এসব ধারণাগুলো নিয়ে কাজ করছিলেন এবং সেসবের বিকাশ করছেন এখন ইয়ংস্টাউনে । আসলে,  ক্লিভল্যান্ডসহ প্রাক্তন রুসবেল্ট এলাকাগুলোতে শ্রমিক-মালিকানাধীন ও শ্রমিক-পরিচালিত উদ্যোগগুলোর একটা নেটওয়ার্ক ছিল যা কিনা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। যদিও এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী সমাজে গেঁথে গেছে, কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ স্বভাবে বেশ নৈরাজ্যবাদী ছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডেট্রোয়েট ম্যুরাল

    উনিশ শতকের ব্যক্তিত্ব মিখাইল বাকুনিন (যখন তিনি ‘ভবিষ্যতের জীবাণু’ বা germs of the future প্রসঙ্গে আলাপ করছিলেন) বিদ্যমান সমাজের মধ্যে ভবিষ্যতের উপাদানগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন এবং আমি মনে করি নানা উপায়ে এসব ধারণা এখন এখানে বেশ উঠে আসছে, অতীতের চেয়েও বেশি  (অন্তত সাম্প্রতিকতম অতীতের তুলনায়)।

    অবশ্যই, এখানকার কিছু স্বাধীন বিকাশ বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল, যেমন সাম্প্রতিক কালে, সিরিয়ার কুর্দি ও রোজাভা অঞ্চলে, মুরে বুকচিনের কাজের উপর ভিত্তি করে সেখানকার মানুষজন দৃঢ়ভাবে একটি নারীবাদী ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। যদিও সে সমাজ এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক তাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শত্রুদের নিকট বেইমানির শিকার হয়েছে। আমার ধারণা  সেই সমাজের কিছু হয়ত বেঁচে যাবে ।

    বর্তমানে যে পারস্পরিকতার কার্যক্রম চলছে, সরকারি সংস্থা থেকে নয়, বরং সম্প্রদায়গুলো একে অপরকে যেভাবে সহায়তা করছে তা নিয়ে আপনার কোনো মত আছে? এবং কভিডের যুগে নৈরাজ্যবাদী উপায়ে সংগঠিত করার জরুরত নিয়ে কিছু বলবেন?

    গবেষণামূলক কাজ এখনো করা হয়নি, কিন্তু বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন এসেছে এ ব্যাপারে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে কিভাবে বিশ্বজুড়ে সম্প্রদায়গুলো নিজস্ব আয়জনে এই সংকট মোকাবিলা করছে, যেমন অভাবীদের সহায়তা করছে, সম্প্রদায়গুলোকে সক্রিয় রাখছে, যখন কিনা একই সময়ে সরকারগুলো কিছুই করছে না বা আরো খারাপ করছে।

    উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলে রিও এর বস্তিগুলোর কথা বলা যায়। ভয়াবহ ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকা, পানির মজুত সীমিত। সরকারের অবস্থাও ভয়াবহ। অবশেষে একটা সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠী (ক্রাইম গ্যাং) এলাকায় দখল করে লকডাউন আরোপ করে এবং কিছু প্রাথমিক পরিষেবা দেয়া শুরু করে। স্পষ্টতই তারা ভাল কাজ করছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বহু লোককে মারতে শুরু করে।

    আমি আন্তর্জাতিকতা ও পারস্পরিকতার গুরুত্ব, এবং কীভাবে এগুলো ফিলিস্তিনকে সাহায্য করতে পারে তা নিয়ে কথা বলতে চাই। আমরা প্রায়ই দেখি যে আন্তর্জাতিকতা উল্টো দিকে চলছে । যেমন, দমন কৌশলগুলো শিখানোর জন্য ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। তবে দৃশ্যটা প্রায় সময়ে উল্টে যায় যখন ফিলিস্তিনিদের এর সাথে ফার্গুসন, মিসৌরি, ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংহতি ও কৌশলের একাত্মতা পাওয়া যায় । ফিলিস্থিনের এই ধরনের আন্তর্জাতিকতা নিয়ে আপনার কি মত ?

    আপনার কথা ঠিক আছে। দু ধরনের আন্তর্জাতিকতা রয়েছে। একটা হচ্ছে শক্তিশালীদের ও জুলুমকারীদের আন্তর্জাতিকতা, আরেকটা হচ্ছে স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের জন্য লড়াইরত মজলুমদের আন্তর্জাতিকতা। সব সময়ের জন্য এটি সত্য। যেমন, আমেরিকান বিপ্লবের সময়ের দিকে ফিরে দেখতে পারেন। ব্রিটিশদের পক্ষ হয়ে জার্মান থেকে হেসিয়ান সেনাবাহিনী লড়াই করছিল। অন্যদিকে আমেরিকার পক্ষ নিয়েছিল ফ্রান্স থেকে আসা লাফায়েতরা। এই রকম উদাহরণ আরো দেয়া যাবে। ইতিহাসজুড়েই আমরা উভয় প্রবণতা দেখতে পাই। ধনী ও শক্তিশালীদের মধ্যে সাধারণ স্বার্থ থাকত যেগুলো তারা একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে কায়েম করতে চাইত।

    আর্টওয়ার্ক: রিমেমবার
    শিল্পী: লুকা গ্যারোঞ্জি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যুক্তরাষ্ট্র যখন লাতিন আমেরিকার কিছু দেশে ডানপন্থী সামরিক ষড়যন্ত্রে মদদ দেয় তখন সেটা ছিল ধনী ও শক্তিশালীদের পারস্পরিকতা। ১৯৮০ এর দশকে আমরা একটা দুর্দান্ত আশ্চর্য রকমের উন্নতি দেখেছি । যদিও এটা নিয়ে আলোচনা হয় নাই কেননা এটা ভয়ংকর ছিল। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত মূলধারার সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ এমন একটি দেশে গিয়েছিল যা কিনা ভুল রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল— কেবল কিছু সহায়তা দেয়ার জন্যই না, এমনকি তাদের জীবনযাপনে অংশ নেয়ার চেষ্টা করার জন্য। অথচ যখন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোচিন ধ্বংস করছিল এবং ফ্রান্স আলজেরিয়াকে পিষে ফেলছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র বা ফ্রান্সের প্রায় কেউ ভাবেনি ভিয়েতনাম বা আলজেরিয়ার কোনো গ্রামে যাওয়ার কথা। এসব ধারণা তখন কারও মাথায়ে আসেনি। কিন্তু  ৮০ এর দশকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দশ হাজারের মত মানুষ কর্তৃক এটি ঘটেছিল এবং সারা দেশ জুড়েই এটা ছড়িয়ে পড়েছিল; যেমন, গ্রামীন কন্সাসের ইভাঞ্জেলিকাল চার্চও এতে অংশগ্রহণ করেছিল। স্যান্ডিনিসতাস নামে বিদ্রুপের শিকার হওয়া যুবকদের অংশগ্রহণই কেবল ছিল না; আন্তর্জাতিকতা এবং পারস্পরিকতার এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ছিল সেটি। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বিধায় একে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়ার দরকার পড়েছে। এটা মানুষের ভাবার কথা ছিল না, কিন্তু এটা ছিল এবং চলেও এসেছে। কেউই এটার পূর্বাবাস দিতে পারেনি। হুট করেই চলে এসেছিল। আমার মনে হয় এটা সবসময়ই উপরিতলের নিচেই থাকে।

    আপনি ন্যায়সংগতভাবেই আ্যারিজনার টুসকান অঞ্চলকে ‘দখলকৃত অঞ্চল’ এবং উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকার সমস্ত অঞ্চলকে ‘আদিবাসী ভুমি’ বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে সীমান্ত এলাকাতে শিশুরা মারা যাচ্ছে, অনেকেই বন্দিত্বের শিকার হচ্ছেন। এগুলোকে আপনি কীভাবে উপনিবেশবাদ ও গণহত্যার চলমান উত্তরাধিকারের অংশ বলবেন? এবং দখলকৃত ভূমিতে ন্যায়বিচার স্থাপন এবং উপনিবেশবাদের সংশোধনে কী করা যায় বলে আপনি মনে করছে?

    এটি আরেকটা চমকপ্রদ ঘটনা। মোটের উপর আ্যারিজনা আসলে বামপন্থীদের জন্য স্বর্গ নয়। কিন্তু আপনি যদি অ্যারিজনার অন্তর্গত টুসকান এলাকার দিকে তাকান, যেখানে আমরা থাকি, সেখানে সর্বাধিক নিন্দিত লোকদের প্রতি সংহতিটা বেশ অসাধারণ বলা যায়। আমরা দক্ষিণের যে দেশগুলো ধ্বংস করেছি, সেখান থেকে পালিয়ে আসা শরনার্থীদেরকে আমেরিকার প্রোপাগান্ডা- ব্যবস্থার কাছ থেকে প্রচুর গালি শুনতে দেখা যায়। নতুন করে এই সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলতে হবে না, আপনি জানেন সব। এটি খুবই মর্মান্তিক একটা ব্যাপার। কিন্তু টুসকানে ‘নো মোর ডেথস’ নামে একটা গ্রুপ আছে, যাদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। তাদের মধ্যে অনেকে রুক্ষ ও নিষিদ্ধ মরুভুমি এলাকায়ে গিয়ে শরনার্থীশিবির স্থাপন করে শরনার্থীদের জন্য সামান্য চিকিৎসা সহায়তা, সামান্য খাবার ও বিশ্রামের জন্য সামান্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে থাকেন। তারা মরুভূমিতে পানির বোতল ফেলে আসেন, এবং এটা একটা অপরাধ; এই অপরাধে অনেককে আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা হয়।

    সম্প্রতি বেশ কয়েকটা ফেডারেল ট্রায়াল হয়েছে, একটা এখনও চলছে। আসামীদের পক্ষে বেশ জোরালো সমর্থন রয়েছে। শহরে ঘুরতে বের হলে আপনি দেখবেন অনেকের উঠানে প্ল্যাকার্ড রাখা এবং তাতে লেখা যে মানবিক সহায়তা কোনো  অপরাধ নয়। যেমন, কয়েক মাস পূর্বে স্কট ওয়ারেন নামে একজনের বিরুদ্ধে ফেডারেল কোর্টে একটা অভিযোগ আনা হয়েছিল যার সাজা ছিল  সম্ভাব্য ২০ বছরের জেল। অভিযোগটা ছিল এই রকম যে ওয়ারেন মরুভুমিতে পালিয়ে থাকা লোকজনকে বাঁচতে সহায়তা করেছিল। এটি একটি জুরি ট্রায়াল ছিল এবং ২:১ জুরি ভোটে ওয়ারেন অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সুতরাং আপনার কাছে যেমন এইরকম মামলা – মোকাদ্দমার উদাহরণ রয়েছে, ঠিক তেমনি ভাবে বিপরীত দিকে রয়েছে স্বতস্ফুর্ত, আন্তরিক ও অত্যন্ত সাহসী আন্তর্জাতিক সংহতির উদাহরণ। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী কর্তৃক মরুভুমির শরনার্থী শিবিরগুলো ভেঙ্গে দেয়ার কয়েক মাস আগে আমি ও আমার স্ত্রী সেখানকার শিবিরগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। উদ্যোগগুলো খুবই সাদামাটা, কিন্তু হৃদয়স্পর্শী। হতাশাগ্রস্ত মানুষজনের জন্য সহায়তা ও মুক্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা ছড়িয়ে আছে সেসব উদ্যোগে।

    ইরান নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মানুষ ইরাক যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ এর স্মৃতিচারণ করছে, যা কিনা ইতিহাসের বৃহত্তম বিক্ষোভ ছিল এবং সেটা যুদ্ধকে থামাতে পারে নি। আপনি বলেছিলেন যে পেন্টাগন পেপারসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উপেক্ষিত অংশ শেষের দিকে রয়েছে যেখানে পরামর্শদাতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ বাড়তে থাকলে সেনাবাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের সাথে লড়াই করতে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘শান্তি’ বজায় রাখতে ভিয়েতনাম ছেড়ে আসতে হবে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই জমানাতে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ কী রকম হওয়া উচিৎ?

    হ্যাঁ, আমি মনে করি পেন্টাগন পেপারের এই অংশগুলো আসলে কখনোই উল্লেখ করা হয় নি। পেপারের একেবারে শেষ দিকে, দক্ষিন ভিয়েতনামে টেট আক্রমণের পর লিন্ডন জন্সনের সরকার আরো ১,০০,০০০ সেনা পাঠানোর কথা ভাবছিলেন এবং যুগ্ম প্রধানরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। যুগ্ম প্রধানরা উদ্বিগ্ন ছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেসামরিক বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রনের জন্য তাদেরকে এই সেনাদের প্রয়োজন পড়তে পারে । এই বিষয়ের বেশ কিছু প্রমান ড্যান এলসভার্গ প্রথমে সবার নজরে এনেছিলেন। এখন আরও প্রমাণ সামনে এসেছে যে নিক্সন প্রশাসন সেই সময়ে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছিল কিন্তু তা থেকে বেরিয়ে এসেছিল মূলত টেট আক্রমণের পর ওয়াশিংটনে বিশাল যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভ এর কারণে। ওই বিক্ষোভের পরেই সরকার ইন্দোচিনের অপরাধ থেকে ধীরে ধীরে নিজেদেরকে দূরে সরাতে শুরু করে। কিছু এখনো অব্যাহত রয়েছে তবে তারা ধীরে ধীরে এর প্রকোপ হ্রাস করা শুরু করেছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ভিয়েতনাম-২
    শিল্পী: লিওন গোলুব
    সূত্র: পিবিএস

    ১৯৮০ এর দশকের মধ্যে, [জনপ্রিয়] যে আন্দোলনের কথা আমি বর্ণনা করেছি তা আমি মনে করি [আসলে] ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একটা স্বাভাবিক ফল  ছিল। ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই যুদ্ধ সম্পর্কে জনগনের মতামতকে বহু বছর ধরে অনেক সতর্কতার সাথে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আপনি এটা দেখলে খুবই আশ্চর্য হবেন। দেখা যাচ্ছে, ৭০ শতাংশ জনগন এই যুদ্ধকে বিবেচনা করছেন, আমি উদধৃত করছি ‘ভুল নয়, পুরোপুরি অন্যায় এবং অনৈতিক’ হিসেবে। এই তথ্য আপনি বামপন্থী মহল ব্যতীত অন্য বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় এর কাছ থেকে বা অন্য  একাডেমিক জার্নালগুলোতে খুঁজে পাবেন না। জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে আপনি এটা পাবেন না তবে এটাই জনমত ছিল এবং ৮০ ‘এর দশক ধরে চলছিল; অন্ততপক্ষে জরিপগুলো তাই বলে। এবং আমি মনে করি সেট্রাল আমেরিকায় বিভিন্ন জনপ্রিয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ও সংহতি প্রকাশ এই মনোভাব তৈরিতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। এটি রিগানের প্রোগ্রামগুলোর রাশ টেনে ধরেছিল। তার প্রাথমিক প্রোগ্রামগুলো ছিল ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তা বজায় রাখা কিন্তু তারা দ্রুত পিছু হটে এসেছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে ঐ সময়ের [জনগণের] মেজাজের সাথে তারা পেরে উঠতে পারবে না।

    ইরাক প্রসঙ্গে, আপনি যেমনটা বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভটা হয়েছিল মূলত আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার আগেই। যদিও একে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখা হয়, আমি ঠিক তা বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি, সরকার যা করতে পারত, বিক্ষোভ তাতে একটা বাধা সৃষ্টি করেছিল। যথেষ্ট খারাপ কিছু ঘটলেও প্রতিবাদ তৈরি হওয়ার আগে কেনেডি এবং জনসন ভিয়েতনামে যা করেছিলেন, তার মতোই কিছু ইরাকে ছিল না। তাই আমি মনে করি বিক্ষোভটা আংশিক সফল ছিল এবং এইটাই এখন প্রমাণিত হচ্ছে। দেশে অনেক প্রতিবাদের তরঙ্গ দেখা যাচ্ছে – এর কিছু বিক্ষোভ আকারে দৃশ্যমান। তবে বেশিরভাগই মানুষের সাধারণ মনোভাব আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। মনোভাবগুলো বার্তা দিতে চায় যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ চায় না। সম্ভবত এটির একটি প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা যাবে। এটি মূলত আমাদের মত লোকের, নেতাকর্মীদের ও সংঘটকদের উপর নির্ভর করে যারা বিরোধিতা ও অসন্তুষ্টির সাধারণ মনোভাবকে আরেকটি পরিবর্তনকামী সক্রিয় আন্দোলনে পরিণত করতে পারবে কিনা।

    অরাজ প্রচ্ছদ পাতায় প্রথম প্রকাশ: ২০ শে জুন, ২০২০

  • নোম চমস্কি।। করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বের ভবিষ্যৎ

    নোম চমস্কি।। করোনাভাইরাস পরবর্তী বিশ্বের ভবিষ্যৎ

    • অনুবাদ : তানভীর আকন্দ

    গত ২৩শে মে ইতালির পেত্রো নেন্নি ফাউন্ডেশনের ব্লগে প্রকাশিত হয় চমস্কির এই সাক্ষাতকারটি। বরাবরের মতো এখানেও মহামারির জন্য নয়া উদারবাদী  ব্যবস্থাকেই দায়ী করেন চমস্কি। বর্বর পুঁজিবাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সোসিওপ্যাথ  অতিডান (more…)

  • মিখাইল বাকুনিন।। কর্তৃত্ব কী?

    মিখাইল বাকুনিন।। কর্তৃত্ব কী?

    অনুবাদ: খন্দকার তুর আজাদ

    রুশ বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিনের মুক্তিমুখিন চিন্তার আকর রচনার মধ্যে অন্যতম What is Authority?। ১৮৭১ সালে রচিত God and The State গ্রন্থের অংশ হিসেবেই এই রচনাটি পরিচিত। বইটি ১৮৮২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাকুনিনের The Knouto-Germanic Empire and the Social Revolution নামক অসমাপ্ত গ্রন্থের পাণ্ডলিপি হিসেবে এই রচনাটি পাওয়া যায়। প্রবহমান বাংলা সংস্করণটি শন পি উলবারের ইংরেজি সংস্করণকে অনুসরণ করে ভাষান্তর করা হয়েছে।-সম্পাদক

    মিখাইল বাকুনিন

    কর্তৃত্ব কী? এটি কি কোনো প্রাকৃতিক বিধানের অবিসম্ভাবী ক্ষমতা, যা ভৌত ও সামাজিক দুনিয়ায় পারস্পারিক জরুরি-সংযোগ আর পরম্পরায় নিজেদের সূত্রবদ্ধ করে? প্রকৃতপক্ষে, এসব বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুধু নিষিদ্ধই নয়,এটি  অসম্ভবও বটে। আমরা এগুলো ভালোভাবে না বুঝতে পারি, বা সেগুলো সম্পর্কে একেবারে নাও জানতে পারি। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই আমরা সেগুলো অমান্য করতে পারি না। কেননা এগুলো  আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি ও মৌলিক শর্তাবলী গড়ে তুলে। এগুলো আমাদের ঘিরে রাখে। আমাদের সকল গতিবিধি, চিন্তা, কার্যকলাপে নিয়ন্ত্রণ করে, হস্তক্ষেপ করে। এমনকি যখন আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরা এগুলোকে অমান্য করছি, তখনও আমরা শুধুমাত্র তাদের স্বয়ম্ভর ক্ষমতার প্রতিই আনুগত্য দেখাই।

    হ্যাঁ, আমরা এসকল প্রাকৃতিক বিধানের চূড়ান্ত দাস।কিন্তু এরকম দাসত্বে কোন অপমান নেই, আসলে এটি কোনভাবে দাসত্বই নয়। কারণ দাসত্বের জন্য বাহিরের একজন প্রভু লাগে, নিজের বাহিরে একজন বিধানপ্রণেতা লাগে, যে কিনা আদেশ দেয়। যেখানে এসব প্রাকৃতিক বিধান আমাদের বাহিরের কিছু না;  এগুলো আমাদের ভেতরেই থাকে। এগুলোই গড়ে তোলে আমাদের সত্ত্বা, আমাদের সম্পুর্ন সত্ত্বা। শারিরীক,বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক। আমরা বেঁচে থাকি, নিশ্বাস নিই, কাজ করি, চিন্তা করি, আকাঙ্ক্ষা করি শুধুমাত্র এসব বিধানের মধ্যেই। এগুলো ছাড়া আমাদের অস্তিত্বই থাকে না। তাহলে কিভাবে আমরা এসব বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা অনুভব করলাম?

    প্রাকৃতিক বিধানের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য শুধুমাত্র একটি স্বাধীনতাই সম্ভব। তা হলো: সে যে সামগ্রিক ও ব্যক্তিগত মুক্তি খুঁজছে, তা অর্জনের লক্ষ্যর সাথে সংগতি রেখে এসব বিধানকে সব সময় আরো বেশি করে চেনা ও প্রয়োগ করা। এসব বিধান একবার চেনা হলে, তা এমন কর্তৃত্বের চর্চা করবে যা কখনো গণমানুষ দ্বারা বিতর্কিত হবে না। উদাহরণস্বরুপ, যে বিধান ২ গুণ ২ কে ৪ করে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হলে একজনকে হয় বোকা না হয় ধর্মতাত্ত্বিক অথবা কমপক্ষে অধবিদ্যাবিৎ,আইনবিদ বা বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ হতে হবে। আগুন পুড়াবে না বা পানি ডুবাবে না এরকম কল্পনার জন্য তো একজনকে অবশ্যই বিশ্বাসী হতে হবে যদি না সে অন্য কোন চাতুরীর আশ্রয় নিতে পারে যার ভিত্তিও আসলে অন্য কোন প্রাকৃতিক বিধান। কিন্তু এসব বিদ্রোহ বা আরো যথাযথভাবে বলতে গেলে  অসম্ভব দ্রোহের চেষ্টা বা অলীক কল্পনা শুধু বিরল কিছু ব্যতিক্রম তৈরি করে। কারণ সাধারণভাবে বলা চলে যে, গণমানুষ তার প্রতিদিনের জীবনে নিজেদের সাধারণ বোধশক্তি দিয়েই অর্থাৎ সাধারণভাবে স্বীকৃত প্রাকৃতিক বিধানসমূহ দিয়েই নিজেদের জীবন পরিচিলিত করে। এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই আসলে এমনই ঘটে।

    কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এরই মধ্যে বিজ্ঞান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত- এমন অনেক প্রাকৃতিক বিধান জনসাধারণের কাছে অজানা রয়ে গেছে। এমনটা হয়েছে রক্ষাকারী সব সরকারের বদৌলতে, যারা কিনা আবার আমাদের জানামতে শুধুমাত্র জনতার মঙ্গলের জন্যই টিকে আছে! এখানে আরেকটা যে বাধা আছে, তা হলো: প্রাকৃতিক বিধানের একটি বড় অংশ সে অর্থে বিজ্ঞান দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃতই হয়নি। অথচ এসব বিধান মানব সমাজের বিকাশের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। যেসব প্রাকৃতিক বিধান ভৌত দুনিয়াকে পরিচালিত করে, সেগুলোর মতোই প্রয়োজনীয় , অপরিবর্তনযোগ্য ও গুরুতর।

    একবার এসব প্রাকৃতিক বিধান বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত হলে এবং তারপর সর্বজনের শিক্ষার ও নির্দেশনার বিস্তৃত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সকলের চেতনায় পৌছে গেলে স্বাধীনতা প্রশ্নের নিঁখুত সমাধান আসবে। সবচেয়ে গোঁয়ার কর্তৃত্ববাদীদেরও তখন স্বীকার করতে হবে যে, এরকম হলে আর কোন রাজনৈতিক সংগঠন, পরিচালনা ব্যবস্থা বা আইনের দরকার হবে না। এই তিনটা জিনিস, তা সার্বভৌমের ইচ্ছা থেকেই আসুক বা সার্বজনীন ভোটে নির্বাচিত সংসদ থেকেই আসুক বা প্রাকৃতিক বিধানের অনুগামী (যা কখনোই হয়নি এবং কখনোই হবে না) হিসেবে আসুক; সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার জন্য এসব কিছুই হবে বিরূপ ও ভয়ানক, কেননা এগুলো জনতার উপর বাহ্যিক এবং সে কারণে জবরদস্তির বিধান চাপিয়ে দেয়।

    মানুষ প্রাকৃতিক বিধান মানে। কারণ এগুলোকে সে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে বাহিরের কোন স্বর্গীয় বা মানবিক; সামষ্টিক বা ব্যক্তিগত; কোনো ধরনের বাহ্যিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার থাকে না। শুধুমাত্র এই ব্যাপারটির মধ্যেই মানুষের মুক্তি নিহিত।

    ধরে নিই বিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রতিনিধিদের দিয়ে একটি বিজ্ঞ একাডেমি গড়ে , এটিকে সমাজের আইন প্রণয়ন ও সংগঠিত করার দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবং শুধুমাত্র বিজ্ঞানের প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসা থেকে এটি শুধুমাত্র বিজ্ঞানের সর্বশেষ বিধানের সাথে সর্বোচ্চ সংহতি রেখে আইন প্রণয়ন করে। আচ্ছা, আমি নিজের জন্য বলতে পারি: এমন আইনসভা বা সংগঠন পৈচাশিকতায় পরিণত হবে। দুটি কারণে এমনটা ঘটবে। প্রথমত, মানবিক বিজ্ঞান সবসময় এবং প্রয়োজনবশতই ত্রুটিপূর্ণ, এখন পর্যন্ত যা আবিস্কৃত হয়েছে এবং আগামীতে যা হতে যাচ্ছে, তার বিচারে বলা চলে যে: এটি মাত্র হামাগুড়ি দেয়া শিখছে। তো আমরা বিজ্ঞানের সর্বশেষ তথ্যের সাথে কঠোর ও একচেটিয়া সঙ্গতি রেখে মানুষের ব্যবহারিক জীবন অর্থাৎ ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক জীবন চালাতে গেলে ব্যক্তি ও সমাজ দুটোকেই প্রোক্রাস্টেসের শয্যায় আত্ম বিসর্জনের দণ্ডে দণ্ডিত করবো। এ দশার দ্রুতই সমাপ্তি ঘটবে তাদেরকে বিচ্যুত ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলবার মধ্য দিয়ে। কারণ জীবন, বিজ্ঞানের চেয়ে সীমাহীনভাবে বিশাল।

    *প্রোক্রাস্টেস: গ্রীক পুরাণে প্রোক্রাস্টেস ছিল এমন এক দস্যু যে পথিকদের দাওয়াত দিয়ে এনে তার বিছানার মাপের করে তুলবার জন্য অত্যাচার চালাতো । বেশি ছোট হলে টেনে লম্বা করতো ,বেশি লম্বা হয়ে গেলে পা কেটে ফেলত । উভয় প্রক্রিয়াতেই প্রোক্রাস্টেসের বিছানাই হতো অতিথিদের মৃত্যু শয্যা।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য সান এন্ড গড
    শিল্পী: হিসাম সাত্তা
    সূত্র: রুয়া

    দ্বিতীয় কারণটা হলো: সমাজ এমন একটি বৈজ্ঞানিক একাডেমি থেকে আসা আইন মান্য করবে, এ কারণে নয় যে তারা নিজেদেরকে ঐ আইনের যৌক্তিক চরিত্র বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। ( যে ক্ষেত্রে আসলে একাডেমির অস্তিত্বই অদরকারি হয়ে ওঠে) বরং তারা এসব আইন ভালোমতো বুঝতে না পেরেই সেগুলো ভক্তি করবে বিজ্ঞানের নামে, একাডেমি থেকে আরোপিত হয়েছে বলে। এমন  সমাজ, মানুষের সমাজ হতে পারে না, তা হয়ে উঠে বর্বরদের সমাজ । এধরনের সমাজ দীর্ঘদিন যিশু সমাজ দ্বারা নিজেকে পরিচালিত করা প্যারাগুয়ের হতভাগা প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় সংস্ককরণে পরিণত হবে। এবং তা দ্রুতই নির্বুদ্ধিতার নিম্নতম স্তরে অধঃপতিত হতে বাধ্য।

    তবে এসবের পরেও একটি তৃতীয় কারণ আছে যা এরকম সরকারকে অসম্ভব পরিণত করে। তা হলো:  সবচে কৃতী ব্যক্তিদের দিয়ে তৈরী করা সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্বপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক একাডেমিও দ্রুতই নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে নিজেকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলবে। আজকের দুনিয়ার সব একাডেমিরই ইতিহাস এমন। যদিও তারা অল্প বিশেষাধিকারই পেয়ে থাকে। মহোত্তম বৈজ্ঞানিক প্রতিভা একাডেমিশিয়ানে অর্থাৎ সরকারি সনদপ্রাপ্ত পন্ডিতে পরিণত হওয়া মাত্রই অবশ্যম্ভাবীভাবে অধঃপতিত এবং নিষ্কৃয় হয়ে পড়ে। সে  হারিয়ে ফেলে তার স্বতঃস্ফূর্ততা,বৈপ্লবিক স্পর্ধা। হারিয়ে ফেলে তার শ্রেষ্ঠ প্রতিভার সহজাত প্রলয়ংকারী শক্তি যা সব সময় তাকে জরাজীর্ণ দুনিয়া ভেঙে নতুন পৃথিবী তৈরীর ভিত নির্মানের আহবান জানায়। অবশ্য কোন দ্বিধা ছাড়াই বলা চলে যে,  চিন্তা শক্তিতে যা  হারায় তা সে আদব- কায়দা, উপযোগিতা আর ব্যবহারিক জ্ঞানে লাভ করতে পারে । সোজা কথায় সে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

    বিশেষ সুবিধা এবং প্রতিটি বিশেষ সুবিধার পদের বৈশিষ্ট্যই হল মানুষের শরীর ও  মনকে হত্যা করা।  রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক যে কোন ভাবে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষ হল এমন মানুষ যে কিনা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিকভাবে অধঃপতিত।এ এমন এক সামাজিক বিধান যার কোন ব্যতিক্রম নেই। এটি সব জাতি, শ্রেণী, গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির  ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি সাম্যের বিধান। মুক্তি ও মানবতার চরম শর্ত ।এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো: এটিকে বিস্তৃত করা, যাতে মানব জীবনের সব জায়গায় এর সত্য দেখানো যায়।

    সমাজ পরিচালনার ভার পাওয়ার পর কোন বৈজ্ঞানিক পরিষদ শুধু বিজ্ঞান নিয়েও ব্যস্ত থাকবে না। দ্রুতই আরেকটা ব্যাপার তাদের ধ্যান-জ্ঞান  হয়ে পড়বে। অন্যসব প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার মতই, তাদের কাজ হবে নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য তাদের সেবার উপর, তাদের পরিচালনা ও দিকনির্দেশনার প্রতি সমাজকে আরো বেশি নির্ভরশীল বানানো।

    একটি বৈজ্ঞানিক একাডেমির মতো, এই কথাগুলি সকল প্রকারের সাংবিধানিক ও আইনপ্রণয়নকারী পরিষদের জন্যও সত্য। এমনকি যদি তারা সার্বজনীন ভোটাধিকারের ফলাফল হয় তারপরও সত্য। সার্বজনীন ভোটাধিকার হয়ত পরিষদের চেহারা পাল্টাতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে কয়েক বছরের জন্য গঠিত সুবিধাপ্রাপ্ত  (অধিকার প্রাপ্ত নয়) রাজনীতিবিদদের পরিষদ শুধুমাত্র গণসংশ্লিষ্ট বিষয় পরিচালনার দ্বায়িত্বে নিয়োজিত হওয়ার মাধ্যমেই শেষমেষ একধরনের রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র বা গোষ্ঠীশাসন গড়ে তুলে। যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ডের দিকেই তাকালেই তা বুঝা যায় ।

    তাই বাহিরের আইনপ্রণেতা এবং কর্তৃত্ব একই, কারণ তারা একে অন্যের থেকে অবিচ্ছেদ্য এবং সমাজকে দাসত্বের এবং নিজেদের অধঃপতিত করার দিকেই ধাবিত হয়।

    এটা কী এমন বুঝায় যে আমি সব কর্তৃত্বকে অস্বীকার করি? এমন চিন্তা কখনোই আমার মাথায় আসবে না। জুতোর প্রশ্নে আমি  মুচির কর্তৃত্বের কাছে যাই; বাড়ি, খাল বা সেতুর প্রশ্নে আমি স্থপতি বা প্রকৌশলীর কথা শুনি। জ্ঞানের প্রতিটি বিশেষ ক্ষেত্রর জন্য আমি সেই বিষয়ের জন্য উপযুক্ত দক্ষ লোকের সাথে কথা বলি। কিন্তু আমি মুচি, প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী কাউকেই আমার উপর কিছু চাপিয়ে দেয়ার অনুমতি দিই না। তাদের বুদ্ধিমত্তা ,চরিত্র, জ্ঞানের জন্য প্রাপ্য সম্মান দিয়েই আমার সমালোচনা আর খতিয়ে দেখার প্রশ্নাতীত অধিকার রেখে মুক্তভাবে তাদের কথা শুনি। শুধু একটি নির্দিষ্ট কর্তৃত্বের পরামর্শ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট হই না বরং বহুজনের সাথে আলাপ করি। তাদের মতামতের তুলনা করে আমি সেটিই বেছে নিই যেটি আমার কাছে সবচাইতে ঠিক বলে মনে হয়। কিন্তু আমি কোন অভ্রান্তিযোগ্য কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দিই না, এমনকি খুব ব্যতিক্রমী প্রশ্নের ক্ষেত্রেও। এমন কারো প্রতি-  তার সততা বা আন্তরিকতার প্রতি যতটা শ্রদ্ধাই থাকুক না কেন- পূর্ণ বিশ্বাস নেই। এমন বিশ্বাস আমার যুক্তি ,স্বাধীনতা এমনকি আমার কাজের সাফল্যের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠবে, তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে একজন নির্বোধ দাসে পরিণত করবে, পরিণত করবে আরেকজনের ইচ্ছা আর স্বার্থপূরণের হাতিয়ারে।

    আমি যদি বিশেষজ্ঞদের কোন কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত হই এবং আমার প্রয়োজনমত তাদের দিক নির্দেশনা এবং পরিচালনা মেনে চলি, তবে তা শুধুমাত্র আমার নিজের আরোপিত কর্তৃত্বের কারণেই করব। কোন মানুষ বা ঈশ্বরের আরোপিত কর্তৃত্বের কারণে নয়। সেরকম না হলে আমি ভয়ের সাথে তাদের বিতড়িত করব। আর শয়তানকেই তাদের উপদেশ , দিক –নির্দেশনা , বিজ্ঞান নিতে দিব যা তারা আমার মুক্তি আর মানবিক মর্যাদা কেড়ে নিয়ে অসংখ্য মিথ্যাকে একটু সত্যের মোড়কে সাজিয়ে দিতে চেয়েছিল।

    আমি পারদর্শী মানুষদের কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত হই কারণ তা আমি নিজ যুক্তিতেই আমার উপর আরোপ করি। আমি এটা জানি যে মানবিক বিজ্ঞানের খুটিনাটি বিবরণ আর ইতিবাচক বিকাশের খুব সামান্যই আমি বুঝতে পারি। পুরোপুরি তা বুঝা সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার পক্ষেও সম্ভব হবে না। এই জায়গা থেকেই বিজ্ঞান এবং শিল্পের ক্ষেত্রে শ্রমের বিভাজন আর সংগঠনের ব্যাপারটি আসে। আমি নিই এবং দিই- মানব জীবন তো এমনই। প্রত্যেকেরই কিছু জায়গায় নিজের কর্তৃত্ব আছে এবং অন্য জায়গায় সে অপরের কর্তৃত্বও স্বীকার করে নিচ্ছে। এতে করে কোন বাঁধাধরা কর্তৃত্বের ব্যাপার থাকে না ,বরং থাকে পারস্পরিক,ক্ষণস্থায়ী এবং সর্বোপরি ঐচ্ছিক কর্তৃত্ব আর আনুগত্যের এক চলমান বিনিময়।

    এই কারণে আমি একটি বাঁধাধরা, নির্দিষ্ট ও সার্বজনীন কর্তৃত্ব হিসেবে কাউকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাই। কারণ এমন কোন সার্বজনীন মানব নেই, যিনি কিনা সব কিছু একেবারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রভাবে বুঝতে পারে। অথচ এসব ছাড়া জীবনে বিজ্ঞানের বা সামাজিক বিজ্ঞানের ব্যবহার অসম্ভব। এমনকি যদি কোন মানুষের মধ্যে এরকম সার্বজনীন রূপ আবিষ্কারও করা যায় এবং সে আমাদের উপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার জন্য এর ব্যবহার করতে চায় তাহলেও এরকম মানুষকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করার প্রয়োজন পড়বে। কারণ তা না হলে তার কর্তৃত্ব অবশ্যম্ভাবীভাবে অন্য সবাইকে দাসত্ব আর নির্বুদ্ধিতায় পর্যবাসিত করবে। আমি এমনটা মনে করি না যে সমাজের উচিত প্রতিভাদীপ্ত মানুষদের প্রতি বিরুদ্ধসুলভ আচরণ করা যেমনটি কিছু ক্ষেত্রে ঘটেছে। কিন্তু আমি এমনটিও মনে করি না যে, সমাজের তাদেরকে খুব বেশি কিছু দেয়া দরকার। সবার উপরে তাদের কোন অতিরিক্ত সুবিধা বা বিশেষাধিকার দেয়ার পক্ষে আমি নই। তিনটি কারণে আমি এমনটা মনে করি। প্রথমত, এক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা কোন ভণ্ড লোককে প্রতিভাবান ভেবে ভুল করতে পারি, দ্বিতীয়ত অতিরিক্ত সুযোগ – সুবিধার এমন ব্যবস্থা  সত্যিকারের প্রতিভাবান ব্যক্তিকেও ভন্ডতে পরিণত করতে পারে, তার নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে পারে এবং তাকে  নির্বোধ ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে , এবং শেষ পর্যন্ত এটা একধরনের স্বৈরশাসকে পরিণত করতে পারে।

    সংক্ষেপে বলা চলে আমরা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব মেনে নিই। কারণ বিজ্ঞান ভৌত ও সামাজিক জগত দুটো মিলে গড়া একক প্রাকৃতিক জগতের বস্তুগত , বুদ্ধিবৃত্তিক আর নৈতিক জীবনের অন্তর্নিহিত প্রাকৃতিক বিধানের সুচিন্তিত এবং যতটা সম্ভব নিয়মবদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক পুনঃউৎপাদন ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে মাথা ঘামায় না। এটাই একমাত্র ন্যায্য কর্তৃত্ব কারণ তা যৌক্তিক এবং মানুষের মুক্তির সাথে সংহতিপূর্ণ। এই কর্তৃত্ব ছাড়া অন্য সকল কর্তৃত্বকে আমরা মিথ্যা, যুক্তিহীন, স্বৈরতান্ত্রিক এবং ভয়ানক ঘোষণা করি।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: হিসাম সাত্তা
    সূত্র: রুয়া

    আমরা বিজ্ঞানের পরম কর্তৃত্ব স্বীকার করি কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতিনিধিদের সর্বময়তা এবং অভ্রান্তিযোগ্যতা অস্বীকার করি। যদিও চার্চ আর রাষ্ট্র- এই দুইটিই আমার দুই চোখের বিষ, তারপরও যদি আমাকে বিজ্ঞানকে এগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বলতে হয়, তাহলে বলবো: প্রোটেস্ট্যান্টদের চার্চের মতই আমাদের চার্চে আছে একটি মাথা বা এক অদৃশ্য যিশু; আর তা হলো বিজ্ঞান। এবং প্রোট্যাস্ট্যান্টদের মতই (বা তার চেয়েও বেশি ধারাবাহিকভাবে) আমরা এড়িয়ে চলতে চাই পোপ, কাউন্সিল, যাজক, বা এমনকি পাদ্রীর খপ্পড়। আমাদের যিশুর সাথে খ্রিষ্ঠানদের যিশুর ভিন্নতা এখানে যে, তাদের যিশুর  ব্যক্তি হিসেবে অস্তিত্ব আছে যেখানে আমাদের যিশু স্বাভাবিকভাবেই অব্যক্তিক। তাদের যিশু নিজেকে এক নিখুঁত সত্ত্বা হিসেবে উপস্থাপন করে এবং চিরন্তন অতীতেই তাকে সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায়। অথচ আমাদের যিশু অর্থাৎ বিজ্ঞানের পুর্ণাঙ্গতা এবং খুঁতহীনতা সবসময় ভবিষ্যতে থাকে , অর্থাৎ বলা চলে যেসব কখনোই সম্পূর্নরূপে অনুধাবন করা যাবে না। এই কারণে পরম বিজ্ঞান ছাড়া আর কোন পরম কর্তৃত্ব না মানাতে আমরা কোনভাবেই আমাদের স্বাধীনতার সাথে আপোষ করছি না ।

    ‘পরম বিজ্ঞান’ কথাটি দিয়ে আমি সত্যিকারের সার্বজনীন বিজ্ঞা্নের কথা বুঝাচ্ছি যা কিনা প্রতিনিয়ত বিকাশমান। এবং এটি  পৃথিবীর মধ্যে থাকা সব প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নীতি ও সমন্বয়কে যতটা সম্ভব বিস্তৃত পরিসরে এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণনায় নতুনভাবে তৈরী করবে। বুঝাই যায় যে, এরকম বিজ্ঞান , মানব মনের সব প্রচেষ্টার এই মহিমান্বিত বস্তু, কখনোই নিখুঁত রুপে বুঝা যাবে না। আমাদের খ্রিষ্ট তাহলে চিরকাল অসম্পূর্ণ থাকবে , এ কারণেই আমাদের মধ্যে তার অনুমোদন প্রাপ্ত প্রতিনিধিদের গৌরব সংযত থাকার কথা। পুত্ররূপের যে ঈশ্বরের নামে তারা তাদের উদ্ধত এবং গোঁড়া কর্তৃত্ব খাটাতে চায়, তার বিরুদ্ধে আমরা পিতা রূপ ঈশ্বরের কাছে প্রতিবাদ জানাই। এই পিতা রূপ ঈশ্বর হল  সত্যিকারের দুনিয়া, বাস্তব জীবন । যে দুনিয়ায় আমরাবেঁচে আছি,  সংগ্রাম করছি, ভালবাসছি, স্বপ্ন দেখছি, আনন্দ করছি,  আঘাত পাচ্ছি, কষ্ট করছি।

    বিজ্ঞানের মানুষদের চরম, সর্বময় এবং অভ্রান্তযোগ্য কর্তৃত্বকে আমরা প্রত্যাখান করি কিন্তু আমরা স্বেচ্ছায় বিশেষায়িত বিজ্ঞানের প্রতিনিধিদের সম্মানিত কিন্তু পরিবর্তনশীল, অল্প সময়ের জন্য, সীমিত কর্তৃত্বকে মেনে নিই। আমরা সময়সাপেক্ষে তাদের পরামার্শ নেয়ার চেয়ে বেশি কিছু আশা করি না। তারা যে মূল্যবান তথ্য দিতে চায় তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকি । এবং এর জন্য যদি শর্ত থাকে যে আমরা নিজেরা তাদের চেয়ে যে সকল বিষয়ে শিক্ষিত সে সকল বিষয়ে তাদের  তথ্য দিব , তবে তা সাগ্রহে মেনে নেয়া যায়। সাধারণভাবে মহা জ্ঞান, সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা, মহান চিত্ত এবং সবার উঁপরে বিশাল হৃদয়ের অধিকারী মানুষদেরকে আমাদের উপর প্রকৃতগত এবং বৈধ প্রভাব প্রয়োগ করাই তো আমরা দেখতে চাই , যদি তা মুক্তভাবে গ্রহণ করা যায় এবং কখনোই কোন জাগতিক বা মহাজাগতিক প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের নামে না হয়। কারণ এভাবে প্রয়োগ করা প্রতিটা কর্তৃত্ব বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রদত্ত অধিকারের প্রভাব সরাসরি অত্যাচার এবং মিথ্যাচারে পরিণত হয়। এবং আমার মতে আমি ইতোমধ্যে যথেষ্টভাবে দেখিয়েছে যে তা অবশ্যই আমাদের উপর দাসত্ব এবং নির্বুদ্ধিতা চাপিয়ে দিবে।

    এক কথায় আমরা সব ধরনের আইন , সকল  কর্তৃত্ব এবং প্রতিটি সুবিধাপ্রাপ্ত , প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনগত প্রভাব, এমনকি সার্বজনীন ভোটাধিকার থেকে তৈরী হওয়া কর্তৃত্বও প্রত্যাখান করি। কারণ আমরা বুঝতে পারি যে, এরকম কর্তৃত্ব বাধ্যগত বেশিরভাগ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষমতা খাটানো, অত্যাচারী অল্প মানুষের হাতিয়ারে পরিণত হবে ।

    এবং এ অর্থেই আমরা সত্যিকারের অরাজবাদী।

  • পিতর ক্রপোৎকিন।। আইনকানুন ও কর্তৃপক্ষ

    পিতর ক্রপোৎকিন।। আইনকানুন ও কর্তৃপক্ষ

    অনুবাদ: ইস্ক্রা

    পিতর ক্রপোতকিন
    (১৮৪২-১৯২১)
    সূত্র: রবার্ট গ্রাহামের এনার্কিজম ওয়েবলগ

    প্রথম অধ্যায়

    অজ্ঞতা যখন সমাজে রাজত্ব কায়েম করে এবং মানুষের চিন্তাশক্তিকে বিকল করে ফেলে, তখনই নানান ধরনের আইনের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে। আশা করা হয় আইন প্রণয়ন করলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু, প্রতিটি নয়া আইনই মানুষের মনে একেকটি মিথ্যা আশ্বাস সৃষ্টি করে। এরপর সেগুলো নয়া বিধান প্রয়োগ করে এমনসব দাবী-দাওয়া উত্থাপনের জন্য অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যায় যেগুলো হয়তো মানুষ তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও নৈতিকতার মাধ্যমেই আদায় করতে পারত। কথাগুলো কোন বিপ্লবী বা সংস্কারকের নয়। কথাগুলো বলেছেন Repertoire de la Legislation নামক ফরাসি আইন সংগ্রহপুস্তকের রচয়িতা, আইনবিদ ড্যালয় (Dalloy)। এই কথাগুলো স্বয়ং একজন আইনস্রষ্টা এবং আইন অনুরাগীর লেখা হলেও, এগুলো  আমাদের সমাজের অস্বাভাবিক অবস্থাকেই সঠিকভাবে প্রকাশ করে।

    বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়া আইন প্রণয়নকে সকল অবগতির প্রতিষেধক হিসেবে বিবেচনা করে। খারাপকে সরাসরি পরিবর্তন আবশ্যক। কিন্তু, তার বদলে মানুষ যেন আইনের মাধ্যমেই তার পরিবর্তন করতে চায়। সরু রাস্তা প্রশস্ত করার বদলে লোকে আগে “রাস্তা প্রশস্তকরণ আইন” প্রয়োগ করার কথা ভাবে। কোনো পার্করক্ষীর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচরণ করেও যে কেউ ভাবেন “পার্করক্ষীদের আরও বিনয়ী করার জন্য আইন প্রণয়ন জরুরী।” কৃষি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিলেও চাষী বা ব্যবসায়ীদের বলতে শোনা যায় “আমাদের রক্ষা করার জন্য আইন প্রণয়ন করা দরকার।” পুরানো কাপড় বিক্রেতা থেকে শুরু করে এমন কেউ নাই যে তার ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আইন প্রণয়নের দাবী করেন না।

    কারখানার মালিক মজুরি কমিয়ে কর্মদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করলো। ব্যস, তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতিকেরা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সিঁধা ও কাযর্কর কোন পন্থা বাতলে দেওয়ার বদলে বলে ওঠেম, “সকল অধিকার রক্ষার জন্য চাই আইন।” সংক্ষেপে, সবকিছুর জন্য সবখানেই আছে আইন! আদব-কেতার জন্য আছে আইন, পাগলা কুকুরের জন্যে আছে আইন, মূল্যবোধ ও নীতির জন্য আছে আইন, সকল প্রকার অনৈতিকতা,কর্ম-অনীহাসহ যাবতীয় অশুভের বিরুদ্ধেও আছে আইন। আমাদের এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় যেন বাল্যকাল থেকেই আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করার স্পৃহা মরে যায়। এই শিক্ষা আমাদের কতৃর্পক্ষের প্রতি নমনীয় করে। আইনের এই ছড়ি ঘুরানো চক্র আমাদের বিপথগামী করে। আমাদের জন্ম, শিক্ষা, বিকাশ, ভালবাসা, বন্ধুত্ব সবকিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করে। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে আমরা আমাদের স্বকীয়তা ও স্বপ্রণোদনার অভ্যাসটি হারিয়ে ফেলব। আইনের শাসন মূলত সরকারি প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত এবং একদল শাসকের মাধ্যমে চালিত। এটি সেটি ছাড়াও টিকে থাকা সম্ভব, আমাদের সমাজ বোধহয় এই বিষয়টি বুঝতে অপারগ। এমনকি আমাদের সমাজ যখন এই প্রভাব-বলয় থেকে মুক্তির পথে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল, সবকিছু নতুন করে গড়ার সম্ভাবনা যখন দেখা দিয়েছিলো, “স্বাধীনতার সেই প্রথম বছরটি” একদিনের বেশী টেকানো যায়নি। স্বাধীনতার ঘোষণার পরদিন সকালেই জনগণ তাদেরকে আইন ও কতৃর্পক্ষের হাতে সঁপে দিয়েছিল।

    বস্তুত, হাজার বছর ধরে যারা আমাদের শাসন করে এসেছে তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও শাসকের প্রতি আনুগত্য তৈরির চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই করেনি। এইরকম নৈতিক পরিবেশেই অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করেন এবং বিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র উক্ত আনুগত্যপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলাই নিশ্চিত করে। আইনের অবিচ্ছেদ্যতা নিশ্চিত করতে ছলচাতুরীর মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে বিজ্ঞানের সঙ্গে আনুগত্যের অভ্যাসটি মিশিয়ে বাচ্চাদের শেখানো হয়। ফলে, আইনের প্রতি আনুগত্যই তাদের ধর্মে পরিণত হয়। এভাবেই নৈতিক মূল্যবোধের সাথে শাসকদের আইন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে আইন অমরত্ব লাভ করে। স্কুলঘরে ইতিহাসের নায়ক বলে তারাই বিবেচিত হয় যারা আইন মেনে চলে এবং আইনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের দমন করে।

    এরপর, আমরা আমাদের ব্যক্তি জীবনে প্রবেশ করি। এখানেও চলে অপপ্রচার। জলকণা যেমন করে লোহাকেও ফুটো করে ফেলে, তেমনিভাবে সমাজ ও সাহিত্য আমাদের দিনের পর দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা নানাভাবে প্রভাবিত করতে করতে আনুগত্যের কুসংস্কার রপ্ত করিয়ে ফেলে। ইতিহাস, কূটনীতি, সামাজিক অর্থনীতির বইগুলো আইনের বাধ্যতামুলক আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গিতে ঠাসা। এমনকি পদার্থবিদ্যা, যা কিনা সম্পূর্ণরূপে পযবের্ক্ষণমূলক জ্ঞান, সেখানেও ধর্মতত্ত্ব ও স্বেচ্ছাচারী দর্শন থেকে ধার করে আনা কৃত্রিম ধারণাগুলোর সাহায্যে আইনের প্রতি বাধ্যতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি সন্নিবেশ করা হয়েছে। এভাবেই নিজ বুদ্ধিমত্তার উপর আস্থা রাখার শক্তিকে সফলভাবে দ্বিধান্বিত করা গেছে।  সবর্দা আইনের আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করা গেছে। সংবাদপত্রগুলো দ্বারাও একই কাজ করানো হয়েছে। যেখানে প্রতিটি খবরের মূল বক্তব্য আইনের অসারতা প্রমাণ করে এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, কেমন করে এটি শাসকদের সকল প্রকার পঙ্কিলতা ও দূষণ দ্বারা বিকৃত, সেখানেও জোর করেই আইনের স্তুতি প্রচার করা হয়। আইনের দাসত্ব সবসময় ভালো গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এমন কোন বিপ্লবী পাওয়া দুষ্কর যিনি তাঁর যৌবনকাল হতেই আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন নাই। অবশ্য, অপব্যবহারই আইনের অনিবার্য পরিণতি।

    শিল্পকলাও এই মেকি-বিজ্ঞানের সঙ্গে হাত মেলায়। বিখ্যাত ভাস্কর, পটুয়া, সংগীতজ্ঞগণ আইনকে ঢালরূপে ব্যবহার করেন এবং যারা এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তাদের চোখ-রাঙ্গানি ও উন্নাসিকতা দ্বারা প্রতিহত করেন। আইন বাঁচাতে প্রার্থনালয়গুলো সদা সোচ্চার। বিপ্লবীরাও উচ্চপযার্য়ের যাজকদের গায়ে হাত দিতে সাহস করেন না। এবং, প্রতিটি  বিপ্লবই যখন এইরকম প্রাচীন কিছু প্রতিষ্ঠানকে মুছে ফেলতে উদ্যত হয় তখন আইনই তাদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এবং তাদের সমস্ত কাজকমর্কে স্বীকৃতি দেয়।

    জনগণ যেটিকে আচরণবিধি বা আইন বলে থাকে সেগুলো আসলে দাসত্ব, ভূমিদাসত্ব, সামন্তবাদ এবং রাজতন্ত্রেরই শোষণ। এই শোষণ আমাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। অসহায় মানুষেরা চিরদিন যাদের বলির শিকার হয়েছে, যাদের অদৃশ্য শক্তির শাস্তির ভয়ে স্পর্শ করতেও ভয় পেয়েছে, যারা সারা জীবন অন্যদের ক্রীতদাসতুল্য মনে করেছে, আইন মূলত তাদেরই প্রতিভূ।

    আর্টওয়ার্ক: লিবার্টি লিডিং দ্য পিপিল
    শিল্পী: ইউজিন ডেলাক্রইক্স
    সূত্র: উইকিআর্ট

    ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে, মধ্যবিত্তের হাতে সবোর্চ্চ ক্ষমতা আসা অবধি, আইনের দাসত্ব সফল্যের সহিত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন শাসনব্যবস্থায় জনগণ আইন সম্পর্কে খুব কমই মতামত ব্যক্ত করতে পারত। যদ্যাবধি মন্টেস্কু, রুশো এবং ভলতেয়ার রাজা-রাজড়াদের খামখেয়ালির বিরোধীতা করেছেন, ততদিন রাজা ও তার চাটুকারদের আবদারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করলে ফাঁসি অথবা কারাদণ্ড একপ্রকার নিশ্চিত ছিল শাস্তি। কিন্তু, বিপ্লবের মধ্যবর্তী ও পরবর্তী সময়ে আইনজীবীগণ ক্ষমতা অর্জন করেন। এবং, তারা পূর্ববর্তী নীতিগুলোকেই আবার শক্ত-পোক্ত করে প্রতিষ্ঠা করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। মধ্যবিত্তশ্রেণী শুরুতে এটাকে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। যাজকদের শ্রেণীও বিদ্রোহীদের হাতে ক্ষমতা দখল হওয়ার ভয়ে এটাকে দ্রুত অনুমোদন দিয়েছিল। অতীতের খামখেয়ালি শাসন ও উৎপীড়নের বিপরীতে জনগণ সংস্কার হিসেবেই একে গ্রহণ করেছিল।

    এটা বোঝার জন্য অবশ্যই আঠারো শতকের কথা আমাদের কল্পনায় থাকতে হবে। আমরা সেই সময়ের নারী-পুরষদের উপর ক্ষমতাবান উচ্চবংশীয়দের পাশবিকতার কাহিনী শুনে ব্যথিত হই। কিন্তু, সেসব জানার আগে, “আইনের চোখে সবাই সমান, জন্ম বা ভাগ্য নির্বিশেষে সকলেই আইনের প্রতি আস্থাশীল হতে হবে।”- এই কথাগুলো তৎকালীন জনগণের উপর কেমন প্রভাব ফেলেছিল তা জানা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি পূর্বে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলে বিবেচিত হত, যার কোনদিন কোন অধিকার ছিল না, যে কোনদিন অভিজাতদের চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পেত না, বরং, প্রতিহিংসায় পড়ে তাকেই মেরে ফেলা হত বা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হত – সেও এই আইনব্যবস্থায় নিজ অধিকারের স্বীকৃতি আবিষ্কার করল, অন্ততপক্ষে তত্ত্বীয়ভাবে আবিষ্কার করল – অন্তত প্রভুর সমান ব্যক্তিস্বাধীনতা তারও আছে। এই আইন আর যাই হোক না কেন, অন্তত প্রভু ও ভৃত্যকে সমানচোখে দেখার ওয়াদা করেছিল। এই আইন বিচারপ্রক্রিয়ায় গরিব-ধনীর সমতার কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু, সেই প্রতিশ্রুতি ছিলো মিথ্যা; এবং, আজ তা আমাদের কাছে স্পষ্ট। যেহেতু, স্বীকৃতিই ভণ্ডামির নিদারুণ স্বরূপ, তাই সেই সময়ে এটা ছিল অত্যন্ত অগ্রসরমান, ন্যায়বিচারের প্রতি স্বীকৃতির সনদ স্বরূপ। এই কারণে হুমকির মুখে পড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রক্ষাকর্তারা (The Robespierres and the Dantons) রুশো এবং ভলতেয়ারদের অনুসরণে কলম ধরেন এবং ঘোষণা করেন, “সকলকেই আইনের প্রতি সমান শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।” চালিকাশক্তি ইতিমধ্যেই ক্রমবর্ধমান অপর একদল শত্রুর সাথে মোকাবেলা করতে বাধ্য হওয়ায় উপরোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে তারা আপস করেছিল। পুনরায় প্রভুদের খামখেয়ালি শাসনের হাত থেকে বাঁচতেই আইনের প্রতি তারা মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল।

    মধ্যবিত্ত শ্রেণীও একই পথে হাঁটতে শুরু করে যা ঊনিশ শতকে বুর্জোয়া দর্শন নামের দর্শনের উন্মেষ ঘটায়। তারা তাদের মতবাদকে স্কুলে প্রচার করেছে, তাদের লেখনীতে উপজীব্য করে। এই উদ্দেশ্যে তারা নিজস্ব শিল্পকলা ও বিজ্ঞান সৃষ্টি করে যাতে করে তাদের দর্শনটি বিকশিত হয়ে ওঠে। এই সবকিছুই তারা অত্যন্ত সফলভাবে করতে পেরেছিল বলেই ঘৃণ্য এই বাস্তবতা আজ আমাদের সামনে। প্রভুদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও সমালোচনার বদলে আমরা দেখতে পাই, পূর্বের স্বাধীনতাকামী জনগণও প্রভুদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছে। তারা দয়া কামনা করছে এবং প্রভুদের আইনকেই বিকশিত করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করিয়ে নিচ্ছে!

    কিন্তু, একশ বছরে সময় এবং পরিস্থিতি বদলে গেছে। কোন আইনের উৎপত্তি, প্রয়োগ, ব্যাপ্তি সম্পর্কে না জেনেই সেটি মানতে নারাজ এমন বিদ্রোহীরা এখন সর্বত্রই আছেন। আমাদের যুগের বিদ্রোহীরা সমাজের অত্যন্ত মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে সমালোচনা করছেন, যেগুলো এযাবৎকাল ধরে অলঙ্ঘনীয় বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই সমালোচনায় আইন নামক সেই প্রতীমাটিও আছে। এই কারণে চলমান এই পরিবর্তনগুলোকে আর বিদ্রোহ বলা যায় না, এগুলো হলো বিপ্লব।

    সমালোচকেরা আইনকে বিশ্লেষণ করেছেন। এবং সেখানে স্রষ্টা, সন্ত্রাস, নির্বোধ যাজকদের অলৌকিক সত্তার প্রতি নির্লজ্জ্ব সমর্থন, রক্তপাত, জবরদখল ছাড়া আর কিছুই পাননি। তারা আইনের বৈশিষ্ট্যাবলী বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানেও তারা মানবজাতির চিরস্থায়ী অগ্রগতির বদলে তাদের স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য বিকাশে বাধা এবং সময়ের সাথে সাথে কোন বিশেষ বস্তুটির উন্নয়ন হবে তা নির্ধারণ করার এক গূঢ় ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা প্রশ্ন করেছেন, আইনকে তখন কিভাবে প্রয়োগ করা হতো? এর উত্তরে তারা দেখেছেন বাইজেনটাইনিজমের বর্বরতা, তদন্তের নামে নিষ্ঠুরতা, মধ্যযুগীয় অত্যাচার, জল্লাদদের কষাঘাতে শরীরের মাংস খসে যাওয়া, শেকল, চাবুক, কুঠার, জেলখানার অন্ধকূপ, নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা, অভিশাপ এবং অশ্রু। এখনও আমরা আগের মতোই কুঠার, ধাতব তার, রাইফেল, জেলখানা; অপরদিকে, নির্যাতিত কয়েদী, পশুর মতো খাঁচায় বন্দীর সমস্ত আশা নিংড়ে বের করে আনা জীর্ণ দেহ, মানবপ্রকৃতির সকল বৈশিষ্ট্য বর্জিত বিচারক, আইন নামক গল্পের অবাস্তব জগত, মৃত্যু এবং নির্যাতনের বিকট উল্লাস, বিচারবহিভূর্ত ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞের পাগলামী, সর্বোপরি মানবজাতির অতলস্পর্শী অবনতিই দেখতে পাই। এবং, এইসব দোষে আইনপ্রণেতারা পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন।

    সমালোচকেরা এমন আইন-প্রণেতাদের হদিশ পান যারা নিজেরাও জানেন না তাদের আইনটির বক্তব্য কী। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত বিন্দুমাত্র ধারণা হয়তো তাদের নেই। অথচ, তারাই শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। অস্ত্র সম্পর্কে না জেনেই তারা অস্ত্র আইন তৈরি করেছে। শিক্ষাদান সম্পর্কে না জেনেই তৈরি করেছে শিক্ষা-বিষয়ক আইন। উল্টাপাল্টা আইন তারা প্রণয়ন করেছে ঠিকই, কিন্তু, মজলুম, কয়েদী বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি বিধানের বেলায় কখনো কম যায়নি। অথচ, যাদের তারা শাস্তি দিয়েছে তারাও মানব সমাজেরই অংশ এবং আইন প্রণেতাদের চেয়ে সবসময়েই হাজারগুণে বেশী নীতিবোধসম্পন্ন।

    সবশেষে, সমালোচকেরা দেখতে পান, সেকালের কারারক্ষীরা সকল মানবিক অনুভূতি বিবর্জিত। গুপ্তচরকে রক্তপাতের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এমন নজিরও মেলে হয়তো পুলিশের গুপ্তচরই তার কৃতকর্মের জন্য ঘৃণাবোধ করেছে। নৈতিকতার অধঃপতন, দুর্নীতি, যান্ত্রিকতা, মানবজাতির সকল অসৎ গুণাবলী আইনের বিজয় নিশ্চিত করতে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে।

    এসবই আমরা খুঁজে পেয়েছি। পুরানো সূত্র “আইনকে সম্মান করুন” এর পুনরাবৃত্তি আমরা আর করব না। বরং, আমরা বলব “আইন এবং তার সকল বৈশিষ্ট্যকে ঘৃণা করুন।” দাসত্বের বাক্য “আইনকে মান্য করো” না বলে আমরা বলব, “সকল আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করুন!”

    আইনের নামে যত অপকর্ম ও হিতকর্ম হয়েছে সেসব শুধুমাত্র তুলনা করুন। ভালো ও মন্দকে সাবধানে ওজন করুন, দেখবেন আমরাই সঠিক।

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    কালের হিসাবে, আইন নয়া জামানার একটি পণ্য। যুগ যুগ ধরে মানবজাতি কোন প্রকার লিখিত আইন ছাড়াই জীবনযাপন করেছে। এখনও প্রাচীন মন্দিরের প্রবেশদ্বারে, মন্দিগাত্রের পাথরের গায়েও তার সঙ্কেত রয়ে গেছে। সেই সময়ে মানুষের মধ্যকার সম্পর্কগুলো প্রথা, অভ্যাস এবং প্রচলিত রীতির (Usage) উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো। ক্রমাগত চর্চার মাধ্যমে সেগুলো ক্রমে বিশুদ্ধ হয়ে উঠত। শিকার করা, পশুপালন করা অথবা কৃষিকাজের মতো বিষয়গুলো শেখার মতো করেই মানুষ শৈশবেই সেইসব রীতিনীতি শিখে ফেলত।

    প্রতিটি সমাজই এই প্রাচীন দশার মধ্য দিয়েই গিয়েছে এবং এখনও মানবজাতির একটা বড় অংশের কোনো লিখিত আইন নাই। রাশিয়া, ইতালি, স্পেন এমনকি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বৃহদাংশের বাসিন্দাদের মধ্যে লিখিত আইনের কোনো ধারণাই নাই। আইনবিদেরা বলে থাকেন, প্রতিটি গোষ্ঠীরই তাদের নিজস্ব রীতিনীতি ও প্রথা আছে এবং প্রথালব্ধ আইনও আছে। এসব গোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক আচার-আচরণ আছে, যেগুলোর মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী গ্রাম এবং সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। এমনকি আমাদের “সভ্য” রাষ্ট্রগুলোতেও, বড় বড় শহরে ছেড়ে পল্লী অঞ্চলে গেলে দেখতে পাই যে, সেখানকার বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো কর্তৃপক্ষের লিখিত আইন দ্বারা নয়, বরং প্রাচীন ও সর্বজন স্বীকৃত প্রথাসমূহের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিধিবদ্ধ আইনগুলো কেবলমাত্র তাদের এবং রাষ্ট্রের মাঝে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কাজ করছে। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো কখনো কখনো খুব জটিল হলেও সেগুলো কেবলমাত্র প্রাচীন প্রথা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।

    প্রাচীন মানুষদের আচার-ব্যবহার বিশ্লেষণ করে প্রথার দুটি স্বতন্ত্র ধারার কথা জানতে পারা যায়।

    যেহেতু মানুষ একাকী বাস করে না, তাই অভ্যাস এবং অনুভূতির যে বিকাশ তার ভিতরে ঘটে সেগুলো সমাজ সংরক্ষণ এবং স্বজাতির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সমাজ সম্পর্কিত এইসব অনুভূতি এবং প্রথা না থাকলে জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে যেত। এইসব প্রথা আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এগুলো আইনের চেয়েও পুরোনো। এমনকি ধর্মও এইসব নির্ধারণ করেনি, এগুলো যেকোনো ধর্মের চেয়েও পুরোনো। সমাজে বসবাসরত প্রায় সকল জীবিত প্রাণীদের মাঝেই এগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলো বস্তুর প্রকৃতি হতে স্বতঃস্ফুর্তভাবে উৎসারিত হয়ে থাকে, যেমন, বিভিন্ন প্রাণীর স্বভাব, যেগুলোকে আমরা সহজাত প্রবৃত্তি বলি। এরপর  বিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়। এগুলো শুধু তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণই নয় বরং, নানান প্রতিকূলতার মাঝে সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেও অপরিহার্য।

    বর্বর মানুষ তখনই একে অপরকে ভক্ষণ করা ছেড়েছিলো যখন তারা বুঝলো যে, বছরে একবার নিজ বয়সী স্বজাতির মাংস খেয়ে উৎসব করার চেয়ে কৃষিকাজে নিয়োজিত হওয়াটা অধিকতর লাভজনক। বহু পর্যটক এমন অনেক স্বাধীন গোষ্ঠীর আচার-ব্যবহারের কথা বর্ণনা করেছেন যেখানে আইনকানুন ও কর্তৃপক্ষের ধারণা অজ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে কোনো হানাহানির ইতিহাস নাই। কারণ, সেইসব সমাজে বসবাসের অভ্যাসটি ভ্রাতৃত্ব ও স্বার্থের অখণ্ডতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল এবং তারা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য তৃতীয় ব্যক্তির স্মরণাপন্ন হতেন। আতিথেয়তা, মানবজীবনের মূল্য, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি, সাহস, এমনকি আত্মোৎসর্গের ধারণা – প্রাচীন সামাজিক মানুষদের মাঝে বিকশিত হয়েছিল। এই গুণগুলো মূলত তাদের সন্তানাদি এবং বন্ধুদের স্বার্থেই উদ্ভূত হয়েছিলো এবং এগুলো যেকোনো লিখিত আইনকানুন এবং ধর্মের চেয়েও অনেক পুরোনো। এইসব অনুভূতি এবং আচার-ব্যবহার চর্চার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হলো সামাজিক জীবন। যাজক বা দার্শনিক না হয়েও বলা যায় এইসব গুণাবলী মানুষের সহজাত এবং এগুলো আসলে যূথবদ্ধ জীবনেরই ফল।

    কিন্তু এইসব প্রথার পাশাপাশি সমাজ ও স্বজাতির সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য অন্যান্য প্রবৃত্তিরও বিকাশ ঘটেছিল। সেইসাথে আবেগের বিকাশের মাধ্যমে বিবিধ অভ্যাস ও প্রথার বিকাশও মানব সম্প্রদায়ে ঘটেছিল। অন্যের উপর কর্তৃত্ব এবং স্বেচ্ছাচারিতার ইচ্ছা, প্রতিবেশী গোষ্ঠীর শ্রমার্জিত পণ্য হাতিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা, বিনাশ্রমে ভোগবিলাসিতার ইচ্ছা, দাসদাসীদের দিয়ে সকল প্রকার বাসনা ও বিলাসিতা পূরণের ইচ্ছা – এ ধরণের আত্মকেন্দ্রীক, ব্যক্তিগত ইচ্ছা অপর এক ধারার প্রথার জন্ম দেয়। যাজক এবং যোদ্ধারা ছিলো  বুজরুকের দল। এরা অন্ধবিশ্বাস ছড়িয়ে স্বার্থসিদ্ধি করত এবং অপরের ক্ষতির কথা বিবেচনা না করেই সবার মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ছড়াত। যুদ্ধবাজ, লুটেরা শাসকদের সঙ্গে এই দুই শ্রেণী হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করত। এরা এদের অনুকূলের প্রথাসমূহ প্রাচীন সমাজের উপর চাপিয়ে দিয়ে জনগণের উপর আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল। বিনাশ্রমে লভ্যাংশ অর্জন, ভীতিপ্রদর্শন, মানুষের মূঢ়তার কল্যাণে তারা তাদের প্রথাসমূহকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিল। ফলে, তাদের কর্তৃত্বের শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।

    এই স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রথমত তারা মানবজাতির মূঢ়তাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। শিশু এবং বন্যদের মাঝে এই লক্ষণ অধিক অনুপাতে আছে এবং এই প্রবণতা পশুদের মাঝেও দেখা যায়। মানুষ যখন অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত থাকে তখন সে তার বিদ্যমান পরিস্থি্তির সামান্যতম পরিবর্তনেও ভয় পায় এবং সাধারণত প্রাচীনের পূজারী হয়। নবীনেরা কোনোকিছুর পরিবর্তন ঘটাতে চাইলেই প্রবীণেরা বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এটাই করেছেন; তারা বেশ ভালোভাবেই জীবন অতিবাহিত করেছেন; তারা আমাদের প্রতিপালন করেছেন; তারা অসুখী ছিলেন না; সুতরাং তুমিও একই কাজ করো!” অচেনা যেকোনো কিছুকেই তারা ভয় পায়, এমনকি অতীত যদি দারিদ্রপূর্ণ, উৎপীড়নমূলক এবং দাসত্বপূর্ণও হয়ে থাকে তবুও তারা অতীতের নজিরকেই আঁকড়ে ধরতে চায়। একথা-ও বলা যেতে পারে যে, মানুষ যতোই দুর্দশাগ্রস্ত হয় ততোই সে সব ধরনের পরিবর্তনকে ভয় পায়, পাছে তা তাকে আরো দুর্গত করে তোলে। নতুন কিছু শুরু করার আগে, জীবনযাপনের পুরানো পদ্ধতির সমালোচনা করার আগে সে জীবনে কিছু আরাম-আয়েশ করে নিতে চায়। পরিবর্তনের বিপদজনক পথে পা বাড়াবার আগে সে কিছুটা আশা সঞ্চয় করতে চায়। যতদিন না সে আশায় উজ্জীবিত হতে পারে, নিয়ত অন্ধবিশ্বাস আর জুজুর ভয় দেখানো প্রতিপালকদের হাত থেকে যতদিন না সে মুক্ত হতে পারে,  ততদিন সে তার পুরোনো অবস্থানে থাকাটাই শ্রেয় মনে করে। যদি নবীনেরা কোনো পরিবর্তন করতে চায়, প্রবীনেরা তাদের বিরুদ্ধে মরাকান্না জুড়ে দেন। কিছু গোঁড়া লোকজন নিজ দেশের প্রথাকে ধরে রাখার জন্য জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেন, কারণ তাদেরকে ছোটকাল থেকেই শেখানো হয়েছে যে প্রথার সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেই পুরো সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি আজকের দিনেও বেশীরভাগ রাজনীতিক, অর্থনীতিক এবং নয়া-বিপ্লবীরাও একইরকম মনে করেন। তারাও বিলীয়মান অতীত আঁকড়ে বসে থাকেন। তাদের বেশীরভাগই  কেবল অতীত নজির নিয়ে চিন্তা করেন। বেশীরভাগ তেজস্বী উদ্ভাবকই স্রেফ অতীতের বিপ্লবের অনুসরণকারী।

    কুসংস্কার, শ্রমবিমুখতা এবং ভীরুতা থেকে উৎসারিত হয় নিয়মানুবর্তীতা। আর এটিই নিপীড়নের প্রধান অবলম্বন। প্রাচীন সমাজে যাজক এবং সেনাপ্রধানেরা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে এগুলো নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করত। তারা প্রথাগুলোকে তাদের সুবিধা অনুযায়ী পুরো সম্প্রদায়ের উপর চিরস্থায়ীভাবে চাপিয়ে দিতো। কারণ, যতদিন পর্যন্ত এই ধরনের রক্ষণশীল মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে শোষণ করা যাবে ততদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর অনধিকারচর্চা চালাতে পারবে। যতদিন পর্যন্ত কেবলমাত্র প্রাকৃতিক কারণে মানুষের মধ্যে বৈষম্য ছিলো এবং ক্ষমতা ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বৈষম্যবৃদ্ধি করা যায়নি ততদিন পর্যন্ত কোনো আইনকানুন অথবা ভয়ংকর রূপধারী বিচারালয় এবং বিতর্কিত দণ্ডবিধি প্রয়োগের কোনো প্রয়োজনই ছিলো না।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াল অব স্ট্রাফোর্ড
    শিল্পী: থমাস আলফ্রেড উলনথ
    সূত্র: ইউকে পার্লামেন্ট

    আইনকে যদি কেবলমাত্র শাসকদের কার্যোপযোগী করেই উপস্থাপন করা হতো তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা আর আনুগত্য অর্জনে অসুবিধা হতো। তাই আইন প্রণয়নকারীরা একই আইনে প্রথার দুই ধরনের ধারাই রেখেছিলো। এদের মধ্যে একটি ধারা হলো নৈতিকতা, সামাজিক ঐক্য ইত্যাদি। এগুলো সকলের মধ্যেই সহজাত। আর অপর ধারাটি হলো হুকুম। এগুলো মূলত বৈষম্যকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে প্রণীত হয়। প্রথা অবশ্যই সমাজের টিকে থাকার জন্য জরুরী। কিন্তু শাসকশ্রেণীর মর্জিমতো আইনের ভিতরে সেগুলোকে চাতুর্যের সাথে মেশানো হয়েছে। এরপর নীতি ও হুকুম উভয়ের জন্যই মানুষের কাছ থেকে সমান আনুগত্য দাবী করা হয়েছে। আইন বলে “হত্যা কোরো না” এবং সাথে সাথে জুড়ে দেয় “এবং যাজককে খাজনার অংশ দাও”, আইন বলে “চুরি কোরো না” এবং এরপরেই জুড়ে দেয় “যারা খাজনা দিতে অস্বীকার করবে তাদের হাত কেটে নেওয়া হবে।”

    প্রতিটি আইনের বৈশিষ্ট্যই এমন। এবং, আজও এর দুমুখী চরিত্রকে রক্ষা করা হচ্ছে। স্রেফ শাসকশ্রেণীর স্বার্থোদ্ধারের জন্য সৃষ্ট প্রথাসমূহ প্রয়োগের ইচ্ছা থেকেই এর উৎপত্তি। এর বৈশিষ্ট্যই হলো, বিভিন্ন সামাজিক প্রথা পালনের জন্য অপ্রয়োজনীয় নিয়মের সঙ্গে মানুষের জন্য ক্ষতিকর প্রথাকে মেশানো। শাসকশ্রেণীর স্বার্থোদ্ধারের উপযোগী যেসব প্রথা রয়েছে সেগুলোকে সামাজিক প্রথার সঙ্গে সংমিশ্রণ করাই এর কাজ। কর্তৃত্ব খাটিয়ে, জবরদস্তি করে, জালিয়াতি করে অর্জন করতে হয় পুঁজি। এইরকম পুঁজি যেমন মানুষকে বিন্দুমাত্র দাম দেয় না তেমনি, এইরকম আইনও মানুষকে মূল্যায়ন করতে পারে না। জবরদস্তি আর কুসংস্কার ছড়িয়েই যার জন্ম এবং ভোক্তা, যাজক আর ধনী শোষকশ্রেণীর স্বার্থোদ্ধারই যার ভিত্তি, তাকে আক্ষরিক অর্থেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমেই ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে যখন আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে ধর্ম, কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনের প্রছন্ন মদদ সম্পর্কে জানব।

    তৃতীয় অধ্যায়
    আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি প্রতিষ্ঠিত আচার ও প্রথার মাধ্যমে কেমন করে আইনের উৎপত্তি ঘটেছিল। আমরা আরও দেখেছি, শুরু থেকেই শাসকেরা ছলে-বলে, কৌশলে অপরিহার্য সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে ক্ষতিকর ও স্বার্থান্বেষী প্রথাগুলোকে কেমন করে অন্যান্য প্রথার সঙ্গে সংমিশ্রণ করেছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংগঠনের বিকাশের সাথে সাথে আইনের এই দ্বিমুখী চরিত্র আরও প্রকট হয়ে ওঠে। যতদিন পর্যন্ত না সামাজিক প্রথার একেবারে কেন্দ্রে আইন অনুপ্রবেশ করতে পেরেছে, ততদিন নিপীড়িত শ্রেণীর ক্ষতি করে সময়ের সাথে সাথে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বারবার আইন প্রণীত হয়েছে। প্রভাবশালী শ্রেণীর নির্দেশনায় এসব আইন প্রণীত হয়েছে। বঞ্চিতদের যে যৎসামান্য অধিকার সমাজে নিশ্চিত ছিলো সেগুলোও প্রভাবশালী শ্রেণী সময়ে সময়ে নতুন আইনের মাধ্যমে টেনে টেনে বের করে ফেলে দিয়েছে। এরপর শাসকশ্রেণীর সুবিধার জন্য তৈরি আইনের দ্বারা পুরোনো আইনকে রদ করেছে।বাক্‌লের (Buckle) মতে, “সেগুলোই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ আইন, যেগুলো পূর্ববর্তী আইনকে রদ করেছে।” মানুষকে আইনের এই শেকলে বাঁধতে গিয়ে প্রতিবার কত দুর্দান্ত প্রচেষ্টাই না করতে হয়েছে, এজন্য কত নদী রক্তই না বয়েছে! পৃথিবী থেকে ভূমিদাসত্ব আর সামন্ততন্ত্র নিশ্চিহ্ন করতে, রাজকীয় বিচারালয়ের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ফ্রান্সকে চার বছর ধরে বিপ্লব এবং বিশ বছর ধরে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। অতীতে চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় আইনের সামান্য অংশ রদ করতেও আমাদের কয়েক দশক লেগে গিয়েছিল, এমনকি বিপ্লবের মাধ্যমেও সেগুলোকে রদ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

    পুঁজির উদ্ভবের ইতিহাস সমাজতান্ত্রিকেরা ইতোমধ্যেই বহুবার বলেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন কেমন করে যুদ্ধ, লুণ্ঠন, দাসত্ব, ভূমিদাসত্ব, জালিয়াতি এবং শোষণের মাধ্যমে এর উদ্ভব হয়েছে। তাঁরা আরও দেখিয়েছেন কিভাবে শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে এটি পরিপুষ্ট হয়েছে এবং কেমন করে তিলেতিলে এটা পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। আইনের উদ্ভবের ইতিহাসের একই ধরনের গল্প আছে। এই গল্পটিই বলা এখনো বাকি আছে। যথারীতি, মানুষের মস্তিষ্কেও আইনকে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এই ইতিহাস ইতিমধ্যেই তার দর্শনকে একত্র করেছে ফেলেছে এবং একের পর এক মাইলফলক পুঁতে চলেছে।

    পুঁজির মতো আইনও লুণ্ঠন, দাসত্ব ও শোষণের ক্ষেত্রে একই ধরনের বুলি আওড়িয়েছে; যমজ ভাই-বোনের মত তারা হাতে হাত মিলিয়ে মানবজাতির উপর প্রভাব বিস্তার করেছে।  ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেরই ইতিহাস একইরকম। খুব গভীরে পর্যালোচনা করলে হয়তো কিছু অমিল পাওয়া যাবে কিন্তু মূল কারণগুলো একই। এবং ফ্রান্স এবং জার্মানিতে আইনের বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় জানার মাধ্যমেই ইউরোপের অন্যান্য দেশের আইনের বিকাশ সম্পর্কে জানা সম্ভব।

    প্রথমত, আইন ছিলো একজাতীয় চুক্তি। যদিও পরবর্তীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হস্তক্ষেপে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। তৎসত্ত্বেও এগুলো ছিলো বস্তুত সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে Champs de Mars১ এর লোকেদের চুক্তি। সুইডেনের বিভিন্ন প্রদেশের ফিল্ড অফ মে’তে (Field of May) সেই সময়ের ধ্বংসাবশেষ আজও সংরক্ষিত আছে। এটা সত্য যে, এই চুক্তিগুলো সবসময়ই অবাধে গৃহীত হতো না। এমনকি সেই প্রাচীন সময়েও ধনী এবং শক্তিশালী শ্রেণী তাদের ইচ্ছাকে বাদবাদিকেদের উপর চাপিয়ে দিত। কিন্তু প্রতিবারই আক্রমণ করতে গিয়ে তারা জনগণের বাধার সম্মুখীন হতো এবং জনগণ তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে বুঝিয় দিতো।

    কিন্তু, একদিক থেকে চার্চ এবং অপরদিক থেকে উচ্চপদস্থরা মিলে তাদেরকে কব্জা করতে সমর্থ হয়েছিল। ফলে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেশবাসীর কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত লোকজনের কাছে চলে গিয়েছিল। লুকিয়ে রাখা ধনসম্পদকে কাজে লাগিয়ে চার্চ তার কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করেছিল, মানুষের ব্যক্তিজীবনে আরও বেশী অনুপ্রবেশ করেছিল, এবং স্বর্গে রক্ষা করার প্ররোচনা দিয়ে চার্চ তার ভৃত্যদের দিয়ে খাটিয়ে নিতো। চার্চ প্রতিটা শ্রেণীর কাছ থেকেই কর আদায় করতো। এরা নিজেদের বিচারিক এখতিয়ার বৃদ্ধি করেছিল, দণ্ডকে দ্বিগুণ করেছিল এবং নিজেকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেছিল যাতে প্রতিটা অপরাধের জন্যই তার কাছে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এতে করে আইনের সাথে মানুষের আর কোনো সংযোগ রইলো না। ফরাসি আইনের একজন ইতিহাসবিদ মন্তব্য করেছেন “(তখন) আইন, আইনপ্রণেতাদের দ্বারা প্রণীত না হয়ে বরং ধর্মান্ধ কাউন্সিলের দ্বারা প্রণীত হত।”

    সেই সময় একইভাবে, ব্যারনদেরও (Baron) মাঠের শ্রমিক এবং শহরের আর্টিজেনদের (Artisan) উপর কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারাও আইনপ্রণেতা এবং বিচারক বনে গিয়েছিল। দশ শতকের রাষ্ট্রীয় আইনগুলো নিছকই সেবা, শ্রম এবং রাজস্ব সংক্রান্ত আইনের ধ্বংসাবশেষ। সেই সময়ের আইনপ্রণেতারা ছিলেন ডাকাতের মতো। এদের কাজই ছিল কৃষিজীবীদের কাঠ থেকে লুঠতরাজ চালানো। এই ডাকাতেরা সহজাত ন্যায়বিচারের ধারনাটিকে নিজেদের কাজে লাগিয়েছিল। তারা নিজেদের সেই ন্যায়বিচারক হিসেবে জাহির করত। ন্যায়বিচারের মূলমন্ত্রটাকে এরা নিজেদের কামাইয়ের রাস্তায় পরিণত করেছিল এবং মিথ্যা আইন সাজিয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল।

    পরবর্তীতে এই আইনগুলোকেই আইনজ্ঞরা সংগ্রহ এবং বিন্যস্ত করে আধুনিক বিধানের গোড়াপত্তন করেছিল। ব্যারন এবং যাজকদের থেকে আগত এইসব বিধানকে কি আমরা মান্য করব?

    প্রথম বিপ্লব, নগররাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে এইসব আইনের একাংশ রদ করতে সমর্থ হয়েছিল। মুক্ত শহরের সনদগুলোর বেশীরভাগ অংশই ছিলো নিছক ব্যারন শাসিত এবং বিশপ শাসিত আইনের মধ্যকার আপোষ। যদিও এর ফলে মুক্ত শহরগুলোর মধ্যে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তবুও এই আইনগুলোর সাথে আমাদের বর্তমান আইনগুলোর কী এমন পার্থক্য আছে! ওইসব শহরে তখনও রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার জন্য কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড তুলে নেওয়া হয়নি। যে ব্যক্তিই শত্রু শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করতো তাকেই বিতাড়িত করা হত এবং ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হত। তথাকথিত “অপরাধ এবং অপকর্মের” জন্য জরিমানা আদায়ই ছিলো মুখ্য বিষয়। দ্বাদশ শতকের নগররাষ্ট্রগুলোর বিচারব্যবস্থা হয়তো এখন বিস্মৃত। কিন্তু এগুলো এমন বিচারের নীতিতে চলত, যেখানে যোকোনো সদস্যের ভুলের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে দায়ী করা হতো। তৎকালীন সমাজ অপরাধকে দুর্ঘটনা বা দুর্ভাগ্য বলে বিবেচনা করত। এই ধারণাটি বর্তমানে রুশ শ্রমজীবিদের মধ্যেও বিদ্যমান। কাজেই, বাইবেলে যেমনটা বলা হয়েছে তেমনিভাবেই তারা ব্যক্তিগত সহিংসতার ধারণাটিকে স্বীকার করতো না। বরং, তারা ভাবতো যে, প্রতিটা ভুলের দায় পুরো সমাজের উপরেই বর্তায়। গল (Gauls) এবং জার্মানদের (German)  মৃত্যুদণ্ড ও নির্যাতনের বিভিন্ন উপায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পশ্চিমে প্রাচ্যের স্বেচ্ছাচারীতার আমদানীকারক বাইজেন্টাইন চার্চের (Byzantine Church) সকল উপাদান সন্নিবেশিত করা হয়েছিল। একইভাবে সামাজিক প্রথাগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে জমির উপর চিরস্থায়ী মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে এতে রোমান সাম্রাজ্যের সৃষ্ট রোমান আইনগুলোও (Roman Code) সন্নিবেশিত করা হয়েছিল।

    আমরা জানি, স্বাধীন নগররাষ্ট্রগুলো তাদের স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারেনি। ধনী ও গরীবের, জনগণ ও ভূমিদাসের চিরায়ত বৈষম্যের কারণে তারা রাজপক্ষের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছিল। যেহেতু রাজপক্ষের দরকার নতুন শক্তি, তাই আইনপ্রণয়ের ক্ষমতা তারা অনুগ্রহপুষ্ট সভাসদ গোষ্ঠীর  উপরে ন্যস্ত করেছিলেন। শুধুমাত্র রাজার দাবীকৃত খাজনার বিরুদ্ধেই আপীল করার সুযোগ ছিলো। কোর্ট মর্জি আর খেয়ালখুশীমতো সংসদকে যেন দুই শতাব্দীতে একবার তলব করতো। প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত মন্ত্রীসভা “কাউন্সিলস এক্সট্রাঅর্ডিনারি (Coucils Extraodinary)” কদাচিৎ রাজার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রতি মনোযোগ দিত। এমনই ছিলো ফ্রান্সের আইনপ্রণেতাদের অবস্থা। পরবর্তীতে যখন সকল ক্ষমতা একজন ব্যক্তির উপরে ন্যস্ত হল, তখন তিনিই নিজেকে “রাষ্ট্র” দাবী করে বসলেন। তিনিই তার মন্ত্রীদের মাধ্যমে বা তার হুজুগে “সিক্রেট কাউন্সিল অফ দ্য প্রিন্স” এর নামে মিছেমিছি উদ্ভট ফরমান জারি করতেন। এগুলো অমান্য করার শাস্তি ছিলো যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। জনগণের জন্য সবধরনের বিচার বিভাগীয় নিশ্চয়তা রহিত হয়েছিল। পুরো জাতি রাজা ও তার পারিষদদের ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল। এইসময়ের ভয়ংকরতম দণ্ডবিধিগুলো – দ্য হুইল (The Wheel), দ্য স্টেক (The Stake), জীবন্তাবস্থায় চামড়া উৎপাটন ইত্যাদি আজ চমকে দেওয়ার মতো ভয়ংকর। পাগলা যাজক এবং রাজাদের আবিষ্কৃত নির্যাতনের সকল উপায় প্রয়োগ করে অপরাধীদের নির্মম কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে রাজারা আনন্দ উপভোগ করত।

    মহান বিপ্লব (ফরাসি বিপ্লব) সামন্তবাদ ও রাজা-রাজড়াদের চাপিয়ে দেওয়া আইনের এই কাঠামোকে ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু কিছুদূর ভাঙার পরেই বিপ্লব আইনপ্রণয়ের ক্ষমতা বুর্জোয়াদের হাতে হস্তান্তর করে। এরা তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কর্তৃত্ব সুংসহত করার জন্য নতুন আইন কাঠামো প্রস্তুত করে। তাদের সংসদ অতি দ্রুততার সঙ্গে আইনের এক পাহাড় গড়ে তোলে। কিন্তু এইসব আইনের মূলভিত্তি কী ছিল?

    এর বৃহদাংশের একটিইমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, আর তা হলো ব্যক্তিগত সম্পতি অর্জন। যেমন: শোষণের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি রক্ষা করা। তাদের উদ্দেশ্যই ছিলো শোষণের এক নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করা এবং পুঁজিবাদের মাধ্যমে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ যেমন, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুতিক বাতি, রাসায়নিক শিল্প, সাহিত্যচর্চা এবং বিজ্ঞান ইত্যাদির লোক দেখানো উন্নয়ন ঘটিয়ে শোষণকে সুসংহত করা। এই আইনগুলোর মৌলিক উদ্দেশ্য মোটামুটি একইরকম ছিলো। সেগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে, যা মূলত পুঁজির শোষণ এবং সম্পদের একচেটিয়া অধিকারকে নিশ্চিত করে, টিকিয়ে রাখার জন্যই প্রণীত হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, অর্থনীতি সকলেই এক ঈশ্বরকে পূজা করত, আর তা হলো পুঁজি। সবকিছুর একটাই উদ্দেশ্য ছিলো – পুঁজিপতিদেরকে শ্রমিকদের অধিকার হরণ করার সুযোগ করে দেওয়া। বিগত আশি বছরের আইনগুলোকে বিশ্লেষণ করলে এইসব ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। অদৃশ্য সত্তারূপে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া মূলত আইনের সত্যিকার লক্ষ্য, যাতে সমাজ থেকে ঘৃণা ও বর্বরতার অবসান হয়। বর্তমানে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার তুলনায় রাষ্ট্রীয় অপহরণের স্বীকার হয়ে খুনই বেশী হয়। কিন্তু যদি এই ধরণের অপরাধ ও অপকর্ম ক্রমশ কমে যেতে থাকে আমাদের আইনকানুনকে অবশ্যই আর পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে না। আইনের নির্দেশনায় অপরাধ কমে যাচ্ছে না বরং, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই এমন হচ্ছে। ভবিষ্যতে আক্রমণ বা অন্যান্য কোনো প্রতিহিংসা সংক্রান্ত প্রতিটি আইন উঠিয়ে দিলেও অপরাধ বৃদ্ধির নজির সৃষ্টি হবে না।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলিউশন ১৭৯৫
    শিল্পী: আগস্ত ভিসোঁ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, গত পঞ্চাশ বছরে বেশকিছু উদারনৈতিক আইন প্রণীত হয়েছে। এই আইনগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, এগুলো আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বর্বর আইনগুলোকে রদ করেই প্রণীত হয়েছে। প্রতিটি উদার আইন, প্রতিটি মৌলিক কর্মসূচীই বলা যায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোগের জন্য প্রণীত আইনকে রদ করে এসেছে। মৃত্যুদণ্ড রদকরণ, জুরি পদ্ধতিতে সকল অপরাধের বিচার (দ্বাদশ শতকের জুরিরা অপেক্ষাকৃত উদার ছিল), ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার অধিকার, স্থায়ী সেনাবাহিনী, বিনামূল্য পরামর্শ ইত্যাদি এগুলো সবই আধুনিক উদারনীতিবাদের আবিষ্কার এবং এ হলো চার্চ এবং রাজা-রাজড়াদের হস্তক্ষেপের পূর্বাপর স্বাধীনতার প্রত্যাবর্তন।

    তাই, প্রত্যক্ষভাবে সম্পদের শোষণ এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের শোষণ হতে মুক্তি – এই দুটিই আধুনিক ও ব্যয়বহুল বিধানযন্ত্রের মূলনীতি। কিন্তু এখনই সময় নিছক বুলিতে সন্তুষ্ট না হয়ে এর আসল অর্থ বোঝার। যেসব আইন প্রাথমিকভাবে নিজেদেরকে সমাজের জন্য দরকারি প্রথাসমূহের সমষ্টি হিসেবে প্রমাণ করতে আবির্ভূত হয়েছিল সেগুলোই বর্তমানে ধনীর হাতে গরীবের শোষণের হাতিয়ার ছাড়া আর অন্যকিছু প্রতীয়মান হয় না। এখন সভ্য হওয়ার হার শূন্য, এর একটাই লক্ষ্য – শোষণ বৃদ্ধি।

    আইনের বিকাশের ইতিহাস আমাদের এটাই বলে। এই ইতিহাসের কী এমন কোনো গুণ আছে যার জন্য আমরা মান্য করতে বাধ্য? অবশ্যই এমন কোনো গুণ নাই। সকল লুটতরাজের ফল পুঁজি ছাড়া এতে মান্য করার আর কিছুই নাই। তাই, সকল আইন জ্বালিয়ে দেওয়াই ঊনবিংশ শতকের বিপ্লবীদের প্রথম কর্তব্য, কারণ এগুলোই হলো ব্যক্তিমালিকানার মূলস্তম্ভ।

    চতুর্থ অধ্যায়
    মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য লাখে-লাখে যত আইন রয়েছে, সেগুলোকে খতিয়ে দেখার পর সেগুলোকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায় – সম্পদের সুরক্ষাদান, ব্যক্তিকে সুরক্ষাদান, সরকারকে সুরক্ষাদান। এবং এই তিন শ্রেণীর আইনকে বিশ্লেষণের পর আমরা এসবের অপ্রয়োজনীয়তা এবং ক্ষতিকারক গুণাবলী সম্পর্কিত যৌক্তিক উপসংহারে আসতে পারি।

    সমাজতন্ত্রী মাত্রই জানেন সম্পদের সুরক্ষা বলতে কি বুঝায়। সম্পত্তি-আইন ব্যক্তি বা সমাজের পরিশ্রমের উৎপাদন ভোগ করার নিশ্চয়তা দিতে তৈরি করা হয়নি। বরং, উৎপাদিত বস্তুর একাংশ চুরি করার জন্য এবং সেইসাথে যারা সমাজ বা ব্যক্তির সম্পত্তি চুরি করে তাদের সুরক্ষা প্রদানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।  উদারণস্বরূপ, যখন আইন জনাব ‘ক’ এর বাড়ির উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে তখন এটি তার নিজের বা বন্ধুদের সাহায্যে তৈরি বাড়ির অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। এমন হলে কেউ তার অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ করতো না। অপরদিকে, আইন আসলে সেই বাড়ির উপরে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যা সে আদৌ নিজ শ্রমে তৈরি করেনি।  এর কারণ, প্রথমত, সেটি অন্য কেউ তাকে বানিয়ে দিয়েছে যাদের হয়তো সে শ্রমের সঠিক মূল্যও পরিশোধ করেনি এবং অপর কারণ হলো বাড়িটির একটি সামাজিক মূল্য আছে যা সেই ব্যক্তি নিজে প্রস্তুত করতে পারে না। আইন আসলে সেই বস্তুর প্রতি ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যাতে মূলত সবারই সমান অধিকার আছে,  একইসাথে নির্দিষ্ট কারোই অধিকার নাই। একই বাড়ি সাইবেরিয়াতে তৈরি করা হলে অন্যকোনো বড় শহরের মত তার মূল্য থাকবে না। যেহেতু, আমরা জানি, মূল্য তখনই সৃষ্টি হয় যখন বহুদিন ধরে মানুষ কোন শহরকে গড়ে তোলে, তাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে, গ্যাস এবং পানির ব্যবস্থা করে, বিনোদনের স্থান সৃষ্টি করে, কলেজ, থিয়েটার, দোকানপাট, রেলওয়ে, রাস্তাঘাট নির্মাণ করে। তাই, প্যারিস, লন্ডন বা রৌয়েনে (Rouen) কোনো ব্যক্তির বাড়ির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আইন অসৎ উপায়ে তাকে সাধারণ মানুষের শ্রমে সৃষ্ট কোনো স্থান অধিকার করতে স্বীকৃতি দেয়। এই অধিকার এবং একই ধরনের অন্যান্য অধিকাগুলো এমনই চরম অবিচার যে সকল শুভ ও ন্যায়বোধের বিরুদ্ধে আইনের এক বিশাল অস্ত্রাগার, একপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিচারকদের প্রয়োজন হয়।

    আসলে, দুনিয়ার অর্ধেক আইনই, বিশেষত, প্রতিটি দেশের দেওয়ানি আইনই এই ধরণের স্বীকৃতি প্রদানের কাজটি ছাড়া আর কিছুই করে না। পুরো মানবজাতির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যেই এই মনোপলি চলে। বিচারালয়গুলোর তিন-চতুর্থাংশ মামলাই আসলে মনোপলিস্টদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কিছুই নয় – যেন চুরির মাল নিয়ে দুজন চোর ঝগড়া করছে। এবং বহু ফৌজদারী আইনেরও উদ্দেশ্য একই রকম – শ্রমিকদের মালিকদের অধঃস্তন করে রাখার পাঁয়তারা যেন বৈষম্যের সুযোগ নিশ্চিত হয়।

    এমন কোনো আইন নাই যা শ্রমিককে তার শ্রমলব্ধ উৎপাদন ভোগের অধিকার নিশ্চিত করে। এটা এতোই সহজ এবং প্রাকৃতিক, এটা মানবজাতির প্রথা ও রীতিনীতির এমনই অবিচ্ছেদ্য অংশ যে, আইন একে কোনো ভাবনার বিষয় বলে গণ্যই করেনি। অস্ত্র হাতে প্রকাশ্য রাহাজানি আমাদের বৈশিষ্ট্য নয়। একজনের উৎপাদিত দ্রব্যের উপর ভাগ বসিয়ে কলহ বাঁধানোও আমাদের বৈশিষ্ট্য নয়। যদি তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হত, তখন কোনো ধরনের আইনি আশ্রয় না নিয়ে তারা তৃতীয় একজনের মাধ্যমে সমস্যা মিটমাট করতো। একমাত্র মালিকানা ব্যবস্থাই অন্যের উৎপাদিত দ্রব্যের সিংহভাগ দাবী করে। মনুষ্যত্ব সাধারণভাবে, কোনো ধরনের বিশেষ আইনি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কারোও উৎপাদিত দ্রব্যে তার অধিকারকে মেনে নেয়।

    আর্টওয়ার্ক: ওয়ার্কার্স আপরােইজিং
    শিল্পী: জ্যাকোব স্টেইনহাট
    সূত্র: ওয়েমিয়ার

    পরমানন্দের বস্তু, মোটা মোটা খন্ডের সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনের বই। মানবশ্রমের উপর একচেটিয়াদের অন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ব্যতীত এগুলোর অন্য কোনো উদ্দেশ্য নাই। তাই সেগুলো থাকারও কোনো কারণ নাই। এজন্য বিপ্লবের সময় বিপ্লবীরা সেগুলো বাতিল করতে বদ্ধ পরিকর ছিলেন। বস্তুত, তথাকথিত “সম্পত্তির অধিকার” সংক্রান্ত সকল আইন, সকল স্বত্ব-দলিল (Title deed), নিবন্ধনপত্র, এককথায়, যা কিছু মনুষ্যত্বের ইতিহাসে কালিমা বলে চিহ্নিত, যা কিছু দাসত্ব ও ভূমিদাসত্বের মতো অপমানকর, সবকিছু পুড়িয়ে অগ্নুৎসব করলেই ভালো হতো।

    সম্পত্তি আইন সম্পর্কিত মন্তব্যগুলো দ্বিতীয় প্রকার আইন, শাসন সংক্রান্ত আইন, যেমন: সাংবিধানিক আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এগুলোও আইন, আদেশ, অধ্যাদেশ, ফরমানের এক অস্ত্রাগার যেগুলো মূলত দখলদার কিংবা প্রতিনিধিত্বমূলক শাসকদের রক্ষা করে। এবং এদের হাতেই মানবতা লাঞ্চিত হয়। আমরা ভালোমতোই জানি – এনার্কিস্টরা বহুবার অবিরাম সরকার ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেছেন – রাজতন্ত্রিক, সাংবিধানিক অথবা প্রজাতান্ত্রিক – সকল সরকারেরই লক্ষ্য হলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের, অভিজাতদের, যাজকদের এবং বণিকদের স্বার্থ রক্ষা করা। প্রতিটা দেশেই আয়করের মৌলিক আইন, আবগারি শুল্ক, সেনাবাহিনী, পুলিশ বা চার্চ ইত্যাদির কার্যনির্বাহী পরিষদ ও তাদের পদসমূহের জন্য  তৃতীয় একপ্রকার আইন আছে যেগুলোর কাজই হলো প্রশাসনকে সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ গণ্ডগোল মেটানো। এবং এই ব্যবস্থা সবসময়ই দখলদার শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। এইসব আইন বিশ্লেষণের পর, এদের কার্যকলাপ প্রতিদিন দেখার পর আপনি আবিষ্কার করবেন যে এরা কোনোটাই সংরক্ষণের যোগ্য নয়। এই ধরনের আইন সম্পর্কে আর দ্বিতীয় কোনো মত দেওয়ার সুযোগ নাই। শুধুমাত্র এনার্কিস্টরাই নয়, কমবেশী সকল মৌলিক বিপ্লবীরাই মানবেন, সরকারব্যবস্থা সম্পর্কিত সকল আইনকেই স্রেফ আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই প্রয়োজন।

    তৃতীয় প্রকারের আইন অর্থাৎ, ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং “অপরাধ” চিহ্নিতকরণ ও নিবারণ বিষয়ক আইনগুলো সম্পর্কে বলা এখন বাকি রইলো। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, এগুলো নিয়েই সর্বাধিক অন্ধবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। এই আইনগুলোকে এমনভাবে বিবেচনা করতে বাধ্য করা হয় যার ফলশ্রুতিতে এই বিশ্বাস জন্মে যেন, এগুলো সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য একদম অপরিহার্য। এই আইনগুলো মানব সম্প্রদায়গুলোতে ব্যবহার্য বিভিন্ন প্রথার মূল (Nucleus) থেকে বিকশিত হয়েছে। পরবর্তীতে এগুলোকে কাজে লাগিয়ে শাসকেরা তাদের কর্তৃত্বকে পাকাপোক্ত করেছে। গোত্র প্রধানদের, শহরের ধনী পরিবারগুলোর এবং রাজাদের কর্তৃত্ব নির্ভর করতো তাদের বিচারিক কার্যক্রমের উপর। বর্তমানেও যখনই সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচনা করা হয়, সর্বপ্রথমে এর সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে ভূমিকার কথাই সর্বপ্রথম বলা হয়। যুক্তি দেখানো হয়, “সরকার না থাকলে মানুষ একে অপরকে কচুকাটা করতো।” বার্ক বলেছিলেন, “সরকারের একমাত্র কাজ হলো প্রতিজন অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য বারো জন করে সৎ জুরি নিয়োগ করা।”

    এ ব্যাপারে বিবিধ অন্ধবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও এনার্কিস্টদের এখনই বলা উচিত এই ধরনের আইনগুলো পূর্ববর্তী আইনের মতোই অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর।

    প্রথমত, তথাকথিত “অপরাধ” বা অন্যের উপরে আক্রমণ দুই-তৃতীয়াংশ বা কখনো তিন-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ব্যক্তিগত সম্পদে ভাগ বসাতেই সংঘটিত হয়েছে। যেদিন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা উঠে যাবে সেদিন এই তথাকথিত “অপরাধী” শ্রেণীরও বিলুপ্তি ঘটবে। “কিন্তু”, তখনও বলা হবে, “তবুও যদি কোনো আইনকানুন না থাকে, তাহলে নরপশুরা থেকেই যাবে। তারা কথায় কথায় অস্ত্র হাতে সতীর্থদের জীবননাশ করতে উদ্যত হবে।” যখনই সমাজের দণ্ড প্রদানের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় তখনই এমন ধুয়া বারবার তোলা হয়।

    এই তত্ত্বের চেয়েও সমসাময়িক সময়ে প্রতিষ্ঠিত বড় সত্য হলো, দণ্ডের প্রখরতা অপরাধ কমায় না। ফাঁসির কথাই যদি ধরি, তাহলে একটি ফাঁসির জন্য সিকিভাগ হত্যাও কমবে না। অপরদিকে, মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হলে আরেকটি খুনও বেড়ে যাবে না কিন্তু হত্যাও কমে আসবে। পরিসংখ্যান এই প্রমাণ দেয়। কিন্তু যদি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয় এবং খাদ্য সুলভ হয়, আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে হত্যাকাণ্ড দ্রুত কমে আসে। এটাও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রমাণিত। অপরাধের মাত্রা হ্রাস বা বৃদ্ধি দ্রব্যমূল্য ও আবহাওয়ার উপরে নির্ভর করে। এমন নয় যে সকল খুনীরাই ক্ষুধার জ্বালায় খুন করে। এটা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু যখন ফসল ভালো হয়, দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যেই থাকে এবং  আবহাওয়া থাকে চাঙ্গা, মানুষের মন উৎফুল্ল এবং দুর্দশা যখন নিত্যদিনের তুলনায় কম থাকে, মানুষ তখন হতাশাজনক চর্চা থেকে বিরত থাকে, মামুলি ব্যাপার নিয়ে সতীর্থের উপর ছুরি চালানোর কথা চিন্তা করে না।

    উপরন্তু, আরও একটা অতি পরিচিত সত্য হলো, শাস্তির ভয় কোনোদিন একটিমাত্রও হত্যাকাণ্ডকেও থামাতে পারেনি। যে তার প্রতিবেশীকেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে খুন করে সে এর পরিণতি সম্পর্কে খুব একটা ভাবে না। এবং, এমন কতিপয় খুনী পাওয়া যাবে যারা বিচার ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলো না।

    এমন সমাজের কথা ভাবতে হবে যেখানে মানুষ ভালো শিক্ষার মাধ্যমে তার সকল দক্ষতার বিকাশ করে সেগুলোকে কাজে লাগাতে শেখে এবং এগুলোকে উপভোগ করতে শেখে যাতে করে তার অন্যের ক্ষতি করার কথা চিন্তাও করতে না হয়। এমন ভবিষ্যত সমাজের কথা না ভাবতে গিয়ে, এতো দুঃখ-কষ্ট থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজে কোনোদিন দণ্ডবিধির বিলোপ হলেও খুনের সংখ্যা আর একটিও বৃদ্ধি পাবে না; এমনকি বর্তমানে যাদের স্বভাবসিদ্ধ খুনী বলে বিবেচনা করে জেলে পুরে নির্যাতন করা হয়, তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধবৃত্তি হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও অত্যন্ত প্রবল হবে।

    আইন ও দণ্ডবিধির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও সুবিধা আমাদের অবিরাম বলা হয়। কিন্তু, কখনো কি আইন ও দণ্ডবিধির মানবজাতির উপর প্রযুক্ত সুফল ও কুফলের তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে? নাকি শুধুমাত্র মানবজাতির ভিতরে জাগ্রত মন্দ প্রবৃত্তিগুলোকে বিবেচনা করেই ভয়াবহ দণ্ডবিধি আরোপ করা হয়েছে! মানুষ হলো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম জীব; এমনকি পশুদের মধ্যেও, যারা তার নিষ্ঠুর প্রবৃত্তিকে নীরবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়! যদি তা নাই হতো, তাহলে কেমন করে রাজা, বিচারক বা যাজকেরা স্রেফ কর্তৃত্ব ধরে রাখতে আইন নামক অস্ত্রটি ব্যবহার করে শরীর থেকে মাংস খুলে নেওয়া, ক্ষতস্থানে গরম পিচ ঢেলে দেওয়া, অঙ্গচ্ছেদন করা, হাড্ডি গুঁড়িয়ে দেওয়া, শরীরকে দুইভাগে কেটে ফেলার মতো কাজ করতে পারতো? মানব সমাজ মাত্রই কেবলমাত্র ভ্রষ্টাচারের ধারা অবলম্বী – এই অজুহাতে বিচারকদের মোটা অংকের বেতনে পুষে রাষ্ট্র তথাকথিত “অপরাধকে” সংজ্ঞায়িত করে।

    কারাগারগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলেই জানা যায়, কলঙ্ক ও দুর্নীতি যে দেয়ালে থেকে ঝরে ঝরে পড়ে স্বাধীনতাহীনতায় মানুষের কেমন দশা হয়। শুধু মনে রাখতে হবে যে, এই ধরনের কারাগারগুলোকে যতই সংস্কার করা হয় সেগুলো ততোই ঘৃণ্য হয়ে ওঠে। মধ্যযুগীয় অন্ধকূপের (Dungeons) চেয়ে আমাদের আধুনিক জেলখানা (Penitentiaries) শতগুণে জঘন্য। সবশেষে ভাবা দরকার, আনুগত্যের নামে কেমন দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারের শিক্ষা মানুষের মাঝে ছড়ানো হয়েছে। আইনকানুন ও কর্তৃপক্ষের সারমর্মই হলো ঘাতক, কারারক্ষক ও গুপ্তচরদের মাধ্যমে বিবেক, বন্ধুত্বের মূল্যায়ণ না করেই সকলকে শাস্তিদানের অধিকার রাখা। এককথায়, আইন প্রয়োগ করে অথবা স্রেফ কর্তৃত্বের জোরে শাস্তিপ্রদান করা।

    এইসব কিছু বিবেচনা করলে, আপনি এই মর্মে অবশ্যই আমাদের সাথে একমত হবেন যে, যেসব আইন জঘন্য শাস্তির মাধ্যমে পীড়ন করে সেগুলোকে বিলোপ করা উচিত।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াম্ফ অব ডেথ
    শিল্পী: পিটার ব্রুজেলস
    সূত্র: উইকিমিডিয়া

    রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অসম্পৃক্ত জনগণ স্পষ্টই বুঝতে পেরেছেন যে, যাদের আমরা “অপরাধী” বলে থাকি তারা নিতান্তই অভাগা। কারণ, প্রতিবিধান তাকে বেঁধে রেখে মেরেছে অথবা তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে অথবা বন্দীদশায় হত্যা করেছে, কিন্তু তাকে ভ্রাতৃসুলভ সেবা দিয়ে, সাম্যের ভিত্তিতে সদাচার করে সৎ মানুষদের মাঝে থাকার সুযোগ দেয়নি। আগামী বিপ্লবে আমরা আশা করি আর এই কান্না অব্যাহত থাকবে না।

    “সব গিলোটিন জ্বালিয়ে দাও, সব কারাগার গুঁড়িয়ে দাও, বিচারক, পুলিশ, গুপ্তচরদের মতো অসাধু শ্রেণীকে বিতাড়িত করো, যে লোকটি কুপ্রবৃত্তি থেকে অন্যের ক্ষতি করেছে তাকেও ভ্রাতৃস্নেহ দাও, মোটকথা, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অলস করে রাখা বিভিন্ন অসাধু তৈজসপত্র কেড়ে নাও এবং সজাগ থাকো কোনো অপরাধ যেন সমাজের ক্ষতি করতে না পারে।”

    অপরাধের প্রধান শর্তই হলো আলস্য, আইন এবং কর্তৃপক্ষ। সম্পত্তি আইন, সরকার সম্পর্কিত আইন, দণ্ডবিধি এবং কর্তৃপক্ষ, যারা নিজেরাই আইন প্রণেতার ভূমিকা পালন করে এবং প্রয়োগ করে। আর কোনো আইন নয়! আর কোনো বিচারক নয়! স্বাধীনতা, সাম্য এবং মানবতার বাস্তব প্রয়োগ – এগুলোই হলো সমাজবিরোধী শক্তিগুলোকে প্রতিহত করার মোক্ষম উপায়।

    টিকা
    ১. ফ্রাঙ্কদের (Franks) বার্ষিক সম্মেলন, যা মূলত মার্চে অনুষ্ঠিত হতো। তখন মার্চ মাসই ছিলো বছরের প্রথম মাস।

  • মিখাইল বাকুনিন।। বৈপ্লবিক মূলমন্ত্র

    মিখাইল বাকুনিন।। বৈপ্লবিক মূলমন্ত্র

    • অনুবাদ: সহুল আহমদ

    সম্পাদকীয় মন্তব্য: নিচের রচনাটি রুশ বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিনের Revolutionary Catechism এর অনুবাদ। বাকুনিনের চিন্তাভাবনায় বিভিন্ন মুক্তিমুখীন প্রবণতা সময়ে সময়ে দিক বদল করলেও ১৮৬৪-১৮৬৭ সালের দিকে তার নৈরাজ্যবাদী ভাবনা একটা চূড়ান্ত রূপ নেয়। বাকুনিন রচনা সংকলনের সম্পাদক ও অনুবাদক স্যাম ডলগফ মনে করেন, ১৮৬৬ থেকে বাকুনিন নৈরাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণার জগতে প্রবেশ করেন। এই সময়েই বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ থেকে বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদের দিকে তার রূপান্তর ঘটে। ১৮৬৫-৬৬ সালের দিকে তার তিনটা রচনা প্রকাশিত হয়: The International Family, Revolutionary Catechism, এবং National Catechism; এগুলোতেই তিনি তার মৌলিক ভাবনাগুলো তুলে ধরেন।

    মিখাইল বাকুনিন

    এইচ.ই.কামিন্সকর মতে, এগুলো পুরো নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের স্পিরিচুয়াল ফাউন্ডেশন হিসাবে কাজ করেছে। সময়ের সাথে তার এই ধারণাগুলো আরো বিবর্তিত হয়েছে, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের দিকে গিয়েছে। Revolutionary Catechism লেখা হয় ১৮৬৬ সালে। স্যাম ডলগফ অনূদিত ও সম্পাদিত Bakunin on Anarchy গ্রন্থে রচনাটি সংকলিত হয়েছে। বইটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়। নিচের সংস্করণটি দি এনার্কিস্ট লাইব্রেরি থেকে নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান কোনো সংস্করণে পুরো রচনা পাওয়া যায়নি, কিছু কিছু অংশ হারিয়ে গিয়েছে।

    মূল রচনা

    […]

    ২) মানবতার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা দ্বারা ঈশ্বরের উপাসনাকে প্রতিস্থাপন করে আমরা মানব যুক্তিকে সত্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসাবে ঘোষণা দিচ্ছি; মানুষের বিবেককে ন্যায়বিচারের ভিত্তি হিসাবে ঘোষণা দিচ্ছি; ব্যক্তি ও সমষ্টিগত স্বাধীনতাকে সমাজ ব্যবস্থার একমাত্র উৎস হিসাবে ঘোষণা দিচ্ছি।

    ৩) স্বাধীনতা হলো প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নর ও নারীর পরম অধিকার; নিজ বিবেক ও যুক্তিবোধ ছাড়া নিজের কাজের জন্য আর কোনো সম্মতি আদায়ের দরকার নেই; তারা দায়বদ্ধ থাকবেন প্রথমে খোদ নিজের কাছে এবং তারপর সেই সমাজের কাছে যে সমাজকে তারা স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছেন।

    ৪) এটা সত্য নয় যে, একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্য ব্যক্তির স্বাধীনতা দ্বারা সীমাবদ্ধ। আদতে মানুষ ততটুকু পর্যন্ত স্বাধীন যতটুকু এই স্বাধীনতা তার সহকর্মীর অবাধ সম্মতি দ্বারা পূর্ণ স্বীকৃত ও প্রতিবিম্বিত; তাদের স্বাধীনতার মধ্যেই এর অনুমোদন ও সম্প্রসারণ খুঁজে পাওয়া যায়। মানুষ সত্যিকারের মুক্ত কেবল সমানভাবে মুক্ত মানুষের মধ্যেই। একজন ব্যক্তির দাসত্বও মানবতাকে লঙ্ঘন করে এবং সকলের স্বাধীনতাকেই খারিজ করে দেয়।

    ৫) ফলে প্রত্যেকের স্বাধীনতা কেবল সকলের সমতার মাধ্যমেই বাস্তাবায়িত করা সম্ভব। তত্ত্ব ও চর্চায় সমতার মাধ্যমে স্বাধীনতার বাস্তবায়নই হচ্ছে ন্যায়বিচার।

    ৬) যদি মানব নৈতিকতার কোনো একটি মূলনীতি থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে স্বাধীনতা। আপনার সহকর্মীর স্বাধীনতাকে সম্মান করা আপনার কর্তব্য; তাকে ভালোবাসা, সাহায্য করা এবং সেবা করা সদগুণ।

    ৭) রাষ্ট্রের সুবিধার্থে যে স্বাধীনতাকে উৎসর্গ করার কথা বলা হয় সেটাসহ সকল ধরনের কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আদিম সমাজে স্বাধীনতার কোনো ধারণা ছিল না। সমাজের বিকাশের সাথে সাথে, মানব যুক্তি ও স্বাধীনতার পূর্ণ জাগরণের পূর্বে, এটি এমন একটা পর্ব পার হয়ে এসেছে যা মানুষ ও ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। এখন সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্বাধীনতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে হবে। অতঃপর সমাজের বিন্যাস অবশ্যই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সকল পর্যায়ে সামাজিক সংগঠনের স্বাধীনতার সর্বোচ্চ সম্ভাব্য উপলব্ধি থেকে উঠে আসতে হবে।

    ৮) সমাজ জীবনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগঠন উপর থেকে নিচের দিকে, অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে- এমন কাঠামোতে পরিচালিত করা যাবে না, জোরজবরদস্তিমূলক কেন্দ্রীয়করণের মাধ্যমে ঐক্য চাপিয়ে দেয়া যাবে না। বিপরীতে, স্বাধীন সংগঠন ও ফেডারেশনের নীতি অনুযায়ী, এটাকে নিচ থেকে উপরে, মানে পরিধি থেকে কেন্দ্র এমন কাঠামোতে পুনর্গঠন করতে হবে।

    ৯)  রাজনৈতিক সংগঠন। প্রত্যেকটা দেশের [এখানে নেশন বলা হয়েছে, কিন্তু সেটা দেশ, রাষ্ট্র, সংগঠন অর্থে শিথিলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা পুরো প্রবন্ধের জন্যই প্রযোজ্য- বাংলা অনুবাদক] আভ্যন্তরীণ বিকাশ ও রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো একটি নির্দিষ্ট, সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক মান [নর্ম] নির্ধারণ করা অসম্ভব। প্রতিটি দেশের জীবন বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক, ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক শর্তাধীন হওয়াতে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য কোনো মডেল দাঁড় করানো অসম্ভব। এমন ধরনের যে কোনো প্রচেষ্টা একেবারেই অবাস্তব। এটা জীবনের ঐশ্বর্য ও স্বতঃস্ফুর্ততাকে আড়াল করে ফেলে; কেবল অসীম বৈচিত্র‍্যের মধ্যেই এগুলো সতেজ হয়ে ওঠে। এবং, এই আড়াল করাটা স্বাধীনতার সর্বাধিক মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। তদপুরি কিছু নির্দিষ্ট অপরিহার্য শর্ত ব্যতীত স্বাধীনতার ব্যবহারিক বাস্তবায়ন চিরকালের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    শর্তগুলো হলো:

    ক) সকল ধরনের রাষ্ট্রীয় ধর্ম এবং রাষ্ট্রীয় অনুদানে আংশিকভাবে পালিত বা সমর্থিত চার্চসহ সকল সুবিধাভোগী চার্চের বিলোপসাধন। প্রতিটি ধর্মের তাদের দেবতাদের মন্দির তৈরি এবং তাদের পুরোহিতদের অর্থ প্রদান ও সহায়তা করার সম্পূর্ণ স্বাধীনতাদান।

    খ) ধর্মীয় কর্পোরেশন হিসাবে বিবেচিত চার্চগুলোকে উৎপাদনশীল সংস্থাগুলোর [প্রডাকটিভ এসোসিয়েশন] মতো সমান রাজনৈতিক অধিকার উপভোগ করতে দেয়া যাবে না; শিশুদের শিক্ষার ভার তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে না। কেননা তারা টিকেই থাকে কেবল নৈতিকতা ও স্বাধীনতাকে নাকচ করার জন্য এবং জাদুবিদ্যার লোভনীয় কলাকৌশল দিয়ে ফায়দা লোটার জন্য।

    গ) রাজতন্ত্রের বিলোপ সাধন; একটি কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠা।

    ঘ) শ্রেণি, পদ ও বিশেষাধিকারের বিলোপ সাধন; সকল নর-নারীর জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার; সর্বজনীন ভোটাধিকার।

    ঙ) সর্বব্যাপী, নিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র [চার্চের অল্টার ইগো], যে রাষ্ট্র দারিদ্র্য, নির্মমতা ও জনতার দাসত্বের স্থায়ী কারণ, সেই রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করতে হবে, এবং নৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এটি স্বাভাবিকভাবেই নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে:

    সকল রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলোপসাধন : গণ শিক্ষা কেবলমাত্র কমিউন ও স্বাধীন সংগঠনগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।

    রাষ্ট্রীয় বিচারবিভাগের বিলোপসাধন : সকল বিচারক অবশ্যই জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতে হবে।

    বর্তমান ইউরোপে চালু থাকা সকল ফৌজদারী, সিভিল ও লিগ্যাল বিধানের বিলোপসাধন : কারণ স্বাধীনতার বিধান কেবল খোদ স্বাধীনতাই তৈরি করতে পারে।

    ব্যাঙ্ক ও রাষ্ট্রীয় ক্রেডিটের সকল প্রতিষ্ঠানের বিলোপ করতে হবে। সকল কেন্দ্রীভূত প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, সকল স্থায়ী সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীকে বিলোপ করতে হবে।

    চ) উভয় লিঙ্গের সর্বজনীন ভোটাধিকার দ্বারা সমস্ত বিচারিক ও নাগরিক কর্মীদের পাশাপাশি প্রতিনিধিদের (জাতীয়, প্রাদেশিক, এবং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের) তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি নির্বাচন।

    ছ) ব্যক্তি, উৎপাদনশীল সংস্থাসমূহ এবং কমিউনের চূড়ান্ত স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের আভ্যন্তরীন পুনর্গঠন। বিচ্ছিন্নতার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজনীয়তা: প্রত্যেক ব্যক্তি, সংস্থা, কমিউন, অঞ্চল ও দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের, যুক্ত হওয়া বা না-হওয়ার চূড়ান্ত অধিকার রয়েছে; তাদের ইচ্ছানুযায়ী মিত্রতা তৈরি করার এবং তথাকথিত ঐতিহাসিক অধিকার [পূর্ববর্তী আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অধিকার] আমলে না নিয়ে অথবা প্রতিবেশীদের সুবিধার কথা আমলে না নিয়েই সেই মিত্রতা নাকচ করে দেয়ার অধিকার রয়েছে। যখনই বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় তখন বিচ্ছিন্নকরণের আর প্রয়োজন থাকে না। সহিংসতার মাধ্যমে আরোপিত ‘ঐক্য’কে খারিজ করে সমাজের ইউনিটগুলো একত্রিত হবে তাদের শক্তিশালী পারষ্পরিক আকর্ষণ এবং গভীর জরুরতের ওপর নির্ভর করে। স্বাধীনতা [লিবার্টি] দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে কমিউন, প্রদেশ, অঞ্চল এবং দেশের নতুন ফেডারেশনগুলো হবে আসলেই শক্তিশালী, উৎপাদনশীল এবং দৃঢ়।

    আর্টওয়ার্ক: লং লিভ দ্য কমিউন
    সূত্র: গ্রাহাম ব্লগ

    জ) ব্যক্তিগত অধিকার।

    ▪ জন্ম থেকে সাবালকত্ব পর্যন্ত প্রত্যেক নর-নারীর পরিচর্যা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, নির্দেশনা, শিক্ষা (পাবলিক স্কুল, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, শৈল্পিক, শিল্প ও বিজ্ঞানভিত্তি)সহ সকল অধিকারের ব্যয়ভার সমাজের।

    ▪ মুক্তভাবে জীবিকা নির্বাচনের ব্যাপারে কিশোর-কিশোরীদের সমান অধিকার রয়েছে; এই অধিকার সমাজ দ্বারা সহযোগিতা এবং সর্বাধিক সম্ভাব্য পরিমাণে সমর্থন করতে হবে। এরপরে সমাজ তাদের ওপর কোনো কর্তৃত্ব ফলাবে না বা তদারকি করবে না, কেবল তাদের স্বাধীনতা ও অধিকারকে সম্মান করবে, প্রয়োজনে এগুলোকে রক্ষা করবে।

    ▪ সাবালক নর-নারীর স্বাধীনতা অবশ্যই চরম ও পূর্ণ হতে হবে; তাদের চলাফেরায়, মত প্রকাশে, আলসেমি বা কাজে, নৈতিক বা অনৈতিকতার স্বাধীনতা থাকবে; সংক্ষেপে কারো কাছে কৈফিয়ত না করেও কাউকে বা কোনো সম্পত্তি ত্যাগ করার স্বাধীনতা থাকবে। সৎভাবে নিজের শ্রমের দ্বারা বেঁচে থাকার স্বাধীনতা, এমনকি যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের শোষণ সহ্য করে তাদের ক্ষতি স্বীকার করেও।

    ▪ জনমতের সহজাত উপকারী ক্ষমতা ব্যাতীত অন্য কোনো ধরণের বাধা ছাড়াই প্রপাগান্ডা, বক্তৃতা, সংবাদমাধ্যম, এবং জনপরিসরে বা ব্যক্তিপরিসরে সমাবেশ করার সীমাহীন স্বাধীনতা। সংগঠন বা সমিতি করার পূর্ণ স্বাধীনতা, এমনকি সেটা অনৈতিক উদ্দেশ্যে হলেও; এমনকি যে সংগঠনগুলো ব্যক্তি এবং জনগণের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করাকে সমর্থন করে তাদেরও রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা।

    ▪ স্বাধীনতাকে কেবল স্বাধীনতা দ্বারাই রক্ষা করা যায়: স্বাধীনতাকে রক্ষার অজুহাতে স্বাধীনতায় বাধানিষেধ সমর্থন করা একটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। যেহেতু নৈতিকতার স্বাধীনতা ব্যতীত আর কোনো উৎস নেই, আর কোনো বস্তু নেই, আর কোনো উদ্দীপক নেই সেহেতু নৈতিকতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতার সকল বিধিনিষেধ আসলে নৈতিকতাকেই ক্ষতি করে। মনোবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান এবং সকল ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, ব্যক্তিক ও সামাজিক অনৈতিকতা হচ্ছে একটা মিথ্যা বেসরকারি ও সরকারি শিক্ষার অপরিহার্য পরিণতি, জনসাধারণের নৈতিকতার অবক্ষয় ও জনমত বিকারের পরিণতি, সর্বোপরি সমাজের পঙ্কিল কাঠামোর অপরিহার্য পরিণতি। এক প্রখ্যাত বেলজিয়ান পরিসংখ্যানবিদ দেখিয়েছেন যে, সমাজ অপরাধের যে পথ খুলে দেয় সেই পথেই পরবর্তীতে একজন দুর্বৃত্ত অপরাধ সংঘটিত করে। সে অনুযায়ী, যে আইন ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে তেমন কঠোর আইন দিয়ে সামাজিক নৈতিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এর বিপরীতে অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, একটি দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা অপরাধ প্রতিরোধ না করে উল্টো বাড়িয়ে দেয়। আরও প্রমাণ করে যে, ব্যক্তি-স্বাধীনতা কতটা সীমিত বা প্রসারিত এর ওপর নির্ভর করে জনপরিসরে বা ব্যক্তি পরিসরে নৈতিকতার বৃদ্ধি বা হ্রাস কতটা হবে। এর ফলে, সমাজকে পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে আমাদেরকে এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে হবে; যে ব্যবস্থাটি বৈষম্য, বিশেষাধিকার এবং মানবতার প্রতি ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সবার জন্য সর্বাধিক পূর্ণ স্বাধীনতা, সমতা, ও ন্যায়বিচার, কাজ এবং একটি আলোকিত শিক্ষার [যে শিক্ষা মানুষের প্রতি সম্মান দ্বারা অনুপ্রাণিত] ভিত্তিতে সমাজকে পুনর্গঠন করার পর জনমত একটি নতুন মানবতাকে প্রতিফলিত করবে; এবং জনমত সর্বাধিক চরম স্বাধীনতার একটি সহজাত অভিভাবক হয়ে উঠবে।

    ▪ তদপুরি, সমাজকে দুষ্টু ও ক্ষতিকর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় ছেড়ে দেয়া যাবে না। সকল রাজনৈতিক অধিকারের ভিত্তি হবে কাজ। সমাজের প্রতিটি ইউনিট তার নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে এমন সকল সাবালক সমাজবিরোধীদেরকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে [বৃদ্ধ, অসুস্থ, যারা বিভিন্ন ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল তারা ব্যতীত], এবং যখনই তারা নিজ শ্রমে জীবিকা বাঁচতে শুরু করবেন তখনই তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে সমাজ বাধ্য থাকবে।

    ▪ প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা অবিচ্ছেদ্য; এবং সমাজ কখনোই কোনো ব্যক্তিকে তার স্বাধীনতা সমর্পণ করতে ফরমায়েশ করবে না, অথবা সর্বাধিক পূর্ণ সমতা ও পারস্পরিকতার ভিত্তি ছাড়া এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের দরকার পড়বে না। যে নর বা নারী আত্মসম্মান নষ্ট করে স্বেচ্ছায় অন্যের গোলামিতে নিযুক্ত করে সমাজ তাকেও জোরজবরদস্তি করে আটকাতে পারে না; কিন্তু সমাজ তাকে পরজীবী হিসাবে বিবেচনা করতে পারে, গোলামির কালে সে কোনো রাজনৈতিক অধিকার উপভোগ করতে পারবে না।

    ▪ যে ব্যক্তিরা রাজনৈতিক অধিকার হারাবেন তারা তাদের শিশুদের অভিভাবকত্ব হারাবেন। যারা স্বেচ্ছা-চুক্তি লঙ্ঘন করবেন, চুরি করবেন, শারিরীক ক্ষতি করবেন, অথবা সর্বোপরি দেশী বা বিদেশী কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করবেন তারা সমাজের বিধি-বিধান অনুযায়ী দণ্ডিত হবেন।

    ▪ […]

    ▪ যে কোনো সংস্থার [কমিউন, প্রদেশ, অঞ্চল বা দেশ] আইনানুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি উক্ত সমিতি থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে শাস্তি থেকে বাঁচার অধিকার সংরক্ষণ করেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সংস্থাটিরও তাকে বহিষ্কার করার সমান অধিকার রয়েছে এবং এর নিশ্চয়তা ও সুরক্ষার বাইরে ঘোষণা করার অধিকার রয়েছে।

    ঝ) সংস্থা/সমিতি/সংগঠনের [ফেডারেলিজম] অধিকার

    সমবায় শ্রমিক সংগঠন ইতিহাসের একটি নতুন বাস্তবতা। ভবিষ্যতের নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এর যে বিপুল বিকাশ হাজির হতে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে সে বিষয়ে  আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, নির্ধারণ করতে পারি না। খুব সম্ভব এমনও দিন আসতে পারে যখন এগুলো শহর, প্রদেশ, এমনকি রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে যাবে। এগুলো হয়তোবা পুরো সমাজকে পুনর্গঠিত করে তুলতে পারে; জাতিতে বা দেশে দেশে সমাজকে বিভক্ত না করে বিভিন্ন শিল্প-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করতে পারে, রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুসারে না করে বরঞ্চ উৎপাদনের প্রয়োজন অনুসারে ভাগ করতে পারে। কিন্তু সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। সে যাই হোক না কেন, আমরা ইতোমধ্যে এই মৌলিক নীতি ঘোষণা করতে পারি: ব্যক্তির মতোই সকল সংগঠন/সংস্থা/সমিতি তাদের কাজ বা লক্ষ্য নির্বিশেষে সবাই চরম স্বাধীনতা উপভোগ করবেন। সমাজ বা সমাজের কোনো অংশই (কমিউন, প্রদেশ বা দেশ) কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে যে কোনো উদ্দেশ্যে সংগঠিত/সমবেত হতে বাধা দিতে পারবে না। সে উদ্দেশ্য রাজনৈতিক, ধর্মীয়, বিজ্ঞানভিত্তিক, অথবা শৈল্পিক হতে পারে; অথবা এমনকি নিরীহ বা মদ্যপদের স্বার্থসাধন বা বিকৃতির জন্য হলেও তাকে সমবেত হতে বাধা দেয়া যাবে না যদি সে নাবালক না হয়ে থাকে।  প্রতারক এবং ক্ষতিকর সঙ্ঘের বিরুদ্ধে লড়াই জনমতের একটি বিশেষ কাজ। কিন্তু যে সংগঠন বা সমিতির লক্ষ্য বা বিধি মৌলিক মানবিক ন্যায়বিচারকে লঙ্ঘন করে তার নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা খারিজ করার বাধ্যবাধকতা সমাজের রয়েছে। কেবলমাত্র এমন একটি অ-স্বীকৃত সমিতির সাথে যুক্ত আছেন বলেই কোনো ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা বা তার পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। স্বীকৃত ও অ-স্বীকৃত সংগঠনের পার্থক্য হবে নিম্নরূপ: আইনত স্বীকৃত সমিতিগুলো তাদের স্বেচ্ছাধীন বাধ্যবাধকতা অস্বীকারকারী ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে সম্প্রদায়ের সুরক্ষা অধিকার পাবে। আইনত অ-স্বীকৃত সমিতিগুলো সম্প্রদায় কর্তৃক এমন কোনো ধরণের সুরক্ষার অধিকারী হবেনা এবং তাদের কোনো চুক্তিই বাধ্যবাধকতা হিসাবে বিবেচিত হবে না।

    ঞ) একটি দেশকে বিভিন্ন অঞ্চলে, প্রদেশে, জেলাতে এবং কমিউনে বিভক্ত করা (যেমনটা ফ্রান্সে) স্বাভাবিকভাবেই নির্ভর করবে সেই নির্দিষ্ট দেশের ঐতিহ্য, নির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং বিশেষ প্রকৃতির ওপর। যদি কোনো দেশ গুরুত্ব সহকারেই মুক্ত সমাজ গড়ার চেষ্টা করে তাহলে আমরা কেবল দুটো মৌলিক ও অপরিহার্য নীতিকে নির্দেশ করতে পারি। প্রথমত, সমস্ত সংগঠনকে অবশ্যই তলা থেকে শীর্ষ এমন কাঠামোতে যেতে হবে; কমিউন থেকে দেশের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। দ্বিতীয়ত, কমিউন এবং দেশ বা বিভাগ বা অঞ্চল বা প্রদেশ এর মধ্যে অবশ্যই অন্তত একটি স্বায়ত্তশাসিত মধ্যবর্তী সংস্থা থাকতে হবে। এমন একটি স্বায়ত্তশাসিত মধ্যবর্তী সংস্থা ছাড়া কমিউন রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক কেন্দ্রিক চাপ মোকাবিলায় খুবই বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে যাবে, যা কিনা অনিবার্যভাবে একটি স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে (যেমনটি ফ্রান্সে দুবার হয়েছে)। রাজার স্বৈরাচারী চরিত্রের চাইতে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংগঠনের মধ্যে স্বৈরতন্ত্রের উদ্ভব বেশি হয়।

    ট) প্রতিটি দেশের সমস্ত রাজনৈতিক সংস্থার প্রাথমিক ইউনিটগুলোকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্বশাসিত কমিউন হতে হবে; প্রাপ্তবয়ষ্ক নর-নারীর সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের ভিত্তিতে এটা গঠিত হবে। কমিউনের আভ্যন্তরীণ কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করার কারোরই কোনো ক্ষমতা বা অধিকার থাকবে না। কমিউন নিজেই নির্বাচন করবে সকল কর্মী, আইন-প্রণেতা এবং বিচারকদের। সম্প্রদায়ের সম্পত্তি ও আর্থিক বিষয়াদি কমিউনই পরিচালনা করবে। প্রতিটি কমিউনেরই নিজেদের গঠনতন্ত্র তৈরি ও আইন প্রণয়নের প্রশ্নাতীত অধিকার থাকবে; উচ্চতর কোনো অনুমোদন লাগবে না। কিন্তু প্রাদেশিক ফেডারেশনে যুক্ত হওয়া এবং এর অংশ হওয়ার উদ্দেশ্যে, কমিউনের নিজস্ব নির্দিষ্ট সনদটি অবশ্যই প্রাদেশিক গঠনতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, এবং প্রদেশের সংসদ কর্তৃক তা গৃহীত হতে হবে। কমিউনকে অবশ্যই প্রাদেশিক ট্রাইব্যুনালের রায় এবং প্রদেশ সরকার কর্তৃক আজ্ঞাপিত যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। (প্রাদেশিক সরকারের সকল পদক্ষেপ অবশ্যই প্রাদেশিক সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।) প্রাদেশিক আইন গ্রহণে অস্বীকারকারীরা এর সুবিধা পাবে না।

    ঠ) প্রদেশটিকে অবশ্যই স্বায়ত্বশাসিত কমিউনসমূহের একটি স্বাধীন ফেডারেশন হতে হবে। প্রাদেশিক সংসদ প্রতিটি কমিউনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি একক সভাগৃহ হতে পারে, অথবা দুটো সভাগৃহও হতে পারে, যেখানে অন্যটা কমিউন বাদে প্রদেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব করবে। প্রাদেশিক সংসদ কমিউনের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে কোনোভাবেই নাক না গলিয়ে প্রাদেশিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করবে (এই ক্যাটেকিজমের ওপর নির্ভর করে)। প্রাদেশিক সংসদে যোগদানে ইচ্ছুক সকল কমিউন দ্বারা এটা অবশ্যই গৃহীত হতে হবে। প্রাদেশিক সংসদ ব্যক্তি, কমিউন এবং প্রাদেশিক ফেডারেশন সম্পর্কিত সমিতিগুলির অধিকার এবং বাধ্যবাধকতা সংজ্ঞায়িত করে আইন জারি করবে এবং এই আইন লঙ্ঘনের জন্য দণ্ডবিধি জারি করবে। তদপুরি এটা কমিউনকে গৌণ বিষয়গুলোতে ভিন্নমত দেয়ার অধিকার দিবে যদিও মৌলিক বিষয়গুলোতে দিবে না।

    প্রাদেশিক সংসদ কমিউনের ফেডারেশনের সনদের সাথে কঠোরভাবে সঙ্গতি রেখে কমিউন, সংসদ, বিচারবিভাগ এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের মধ্যকার অধিকার ও বাধ্যবাধকতাকে সংজ্ঞায়িত করবে। এটা কমিউন এবং প্রদেশের স্বায়ত্ত্বশাসন লঙ্ঘন না করে পুরো প্রদেশের জন্য আইন জারি করবে, জাতীয় সংসদের জন্য সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কমিউনের আভ্যন্তরীণ প্রশাসনে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ না করে এটি প্রতিটি কমিউনকে প্রাদেশিক অথবা জাতীয় আয়ের অংশ বণ্টন করে দিবে; এটি কমিউনের নিজ সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবহৃত হবে। সর্বজনীন ভোটাধিকার দ্বারা নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ প্রাদেশিক প্রশাসনের সকল নীতিমালা ও পদক্ষেপ অনুমোদন বা প্রত্যাখান করবে। প্রাদেশিক ট্রাইব্যুনাল (সর্বজনীন ভোটাধিকার দ্বারা নির্বাচিত) কমিউনের সাথে ব্যক্তির, কমিউনের সাথে কমিউনের এবং কমিউনের সাথে সাথে প্রাদেশিক প্রশাসন বা সংসদের বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন, কোনো আপীল ছাড়াই। [এই ব্যবস্থাগুলো] কোনো নিস্তেজ প্রাণহীন অভিন্নতার দিকে নিয়ে যাবে না, বরঞ্চ একটি বাস্তব সজীব একতার দিকে নিয়ে যাবে, সম্প্রদায়গত জীবনের সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে। এমন একটি ঐক্য সৃষ্টি হবে যা কমিউনের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করবে; সংক্ষেপে বললে, আমরা ব্যক্তিগত এবং সম্মিলিত [কালেকটিভ] স্বাধীনতা পাব। এই ঐক্য প্রাদেশিক ক্ষমতার বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা দ্বারা অর্জন করা যায় না। এমনকি সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্যও যদি বলপ্রয়োগ করা হয় তবু সেটা মিথ্যাচার ও দুবৃত্তির দিকে নিয়ে যায়।

    ড) দেশ [নেশন] স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রদেশসমূহের একটি ফেডারেশন।

    ঢ) আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের নীতিমালা। আন্তর্জাতিক ফেডারেশন গঠনে যে দেশগুলো [নেশন] একত্র হবে তা উপরোক্ত নীতিমালার আলোকেই হবে। এটা সম্ভাব্য, এবং আমাদের প্রত্যাশাও যে, যখন গণবিপ্লবের চূড়ান্ত মুহূর্ত হাজির হবে তখন প্রতিটি দেশ একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সংহতিতে ঐক্যবদ্ধ হবে এবং প্রতিক্রিয়াশীল দেশগুলোর বিরুদ্ধে একটি অলঙ্ঘনীয় জোট গঠন করবে। এই জোট হবে ভবিতব্য জনগণের সার্বজনীন ফেডারেশন [অর্থাৎ, ইউনিভার্সেল ফেডারেশন অফ পিপল] এর বীজ হবে, যা ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বকেই আলিঙ্গন করে নিবে। বিপ্লবী জনসাধারণের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন একটি সংসদ, একটি ট্রাইব্যুনাল ও একটি আন্তর্জাতিক নির্বাহী কমিটি সহকারেই সাধারণত বিপ্লবের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক পলিটিতে যে নীতিগুলো প্রয়োগ করা হবে তা হচ্ছে নিম্নরূপ:

    ❖ তথাকথিত ঐতিহাসিক অধিকার, এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, ব্যবসায়ীক অথবা কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নির্বিশেষে প্রতিটি ভূমি, দেশ, জনগণ- তা ছোট বা বড়ো, দুর্বল বা শক্তিশালী যাই হোক না কেন- অঞ্চল, প্রদেশ এবং কমিউনের আত্মনিয়ন্ত্রণের, ইচ্ছামতো মিত্রতা, ঐক্যবদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সত্যিকার টেকসই ও ফলপ্রসু হতে হলে সমাজের উপাদানগুলোর ঐক্যকে অবশ্যই পূর্ণ স্বাধীন হতে হবে: এটি কেবলমাত্র সমাজের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর আভ্যন্তরীন প্রয়োজন ও পারষ্পরিক আকর্ষণ থেকে উদ্ভূত হতে পারে…

    ❖ তথাকথিত ঐতিহাসিক অধিকার এবং বিজয়ীর ভয়াবহ অধিকারকে বাতিল করতে হবে।

    ❖ রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ, ক্ষমতা ও গৌরবের রাজনীতিকে চূড়ান্তরূপে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। কেননা এটি এমন এক রাজনীতি যা প্রতিটি দেশকে একটি স্ব-নির্মিত দুর্গে পরিণত করে, বাকিদেরকে বাইরে রেখে এবং সকল মানব সংহতি থেকে মুক্ত করে একটি বদ্ধ দুনিয়াতে নিজেকে সংগঠিত করে, অন্য দেশের ওপর যত মন্দ কাজকারবার করা যায় তার মধ্যেই গৌরব ও সমৃদ্ধি খুঁজে পায়। দখলদারিত্বে সংকল্পবদ্ধ একটি দেশ আদতে আভ্যন্তরীণভাবে দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ দেশ।

    ❖ একটি দেশ বা জাতির গৌরব ও মহিমা তার মানবতা বিকাশের মধ্যে নিহিত। তার শক্তি ও অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি স্বাধীনতার মাত্রা দিয়ে পরিমাপ করা হয়।

    ❖ ব্যক্তির পাশাপাশি দেশের ভালো থাকা ও স্বাধীনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং ফেডারেশনভুক্ত সমস্ত দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, বিনিময় ও যোগাযোগ মুক্ত থাকবে; এদের মধ্যকার সীমান্ত, পাসপোর্ট ও বহিঃশুল্ক বিলুপ্ত করতে হবে। ফেডারেশনভুক্ত একটি দেশের প্রত্যেক নাগরিকই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং একই ফেডারেশনভুক্ত অন্যান্য দেশের নাগরিকত্ব অর্জন ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করা তার পক্ষে সহজ হবে। যদি স্বাধীনতাই হয়ে থাকে সূচনাবিন্দু, তাহলে এটি আবশ্যিকভাবেই ঐক্যের [ইউনিটি] দিকেই নিয়ে যাবে। কিন্তু ঐক্য থেকে স্বাধীনতার দিকে যাওয়াটা অসম্ভব না হলেও কঠিন। এমনকি যদি সম্ভবও হয়ে থাকে তবু এটা সম্ভব কেবলমাত্র বলপ্রয়োগ দ্বারা আরোপকৃত কৃত্রিম ‘ঐক্য’ ধ্বংসের মাধ্যমে…

    ❖ […]

    ❖ […]

    ❖ ফেডারেশনভুক্ত কোনো দেশই স্থায়ী সেনাবাহিনী রাখতে পারবে না, অথবা বেসামরিক লোকদেরকে সৈন্যদেরকে পৃথক করে রাখে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান রাখতে পারবে না। স্থায়ী সেনাবাহিনী ও পেশাদার সৈন্যরা কেবল আভ্যন্তরীণ ভাঙ্গন, নৃশংসতা ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিই তৈরি করে না, বরঞ্চ তারা অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা ও মঙ্গলকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে সমস্ত সক্ষম ব্যক্তিরাই নিজেদের ঘর ও স্বাধীনতা রক্ষার্থে অস্ত্র হাতে তুলে নিবে। প্রতিটি দেশের সামরিক প্রতিরক্ষা ও সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে কমিউনের মাধ্যমে বা প্রাদেশিকভাবে সংগঠিত করা উচিৎ, অনেকটা সুইজারল্যান্ড বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলিশিয়াদের মতো [circa 1860-7]।

    ❖ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের দেশ ও স্ব-স্ব-প্রদেশের মধ্যকার সমস্ত বিরোধ নিষ্পত্তি, আপিল ব্যতিরেকে, করা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। ফেডারেশনভুক্ত দুটো দেশের পার্থক্য কেবল আন্তর্জাতিক সংসদ কর্তৃক কোনো আপিল ব্যাতিরেক নির্ধারিত হবে, যা কিনা সমগ্র বিপ্লবী ফেডারেশনের নামে একটি সাধারণ নীতিমালাও প্রণয়ন করবে এবং যদি অনিবার্য হয়ে উঠে তখন প্রতিক্রিয়াশীল জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

    ❖ ফেডারেশনভুক্ত এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না। যদি যুদ্ধ হয়ে থাকে এবং আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দিয়ে থাকে তাহলে আক্রমণকারীকে অবশ্যই সমর্পণ করতে হবে। যদি এটা না হয়ে থাকে তাহলে ফেডারেশনভুক্ত অন্যান্য দেশ এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং আক্রমণকারীর আক্রমণকে প্রতিহত করতে ঐক্যবদ্ধ হবে।

    ❖ বিপ্লবী ফেডারেশনের সকল সদস্যকে অবশ্যই ফেডারেশনভুক্ত নয় এমন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনুমোদিত যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। যদি একটি ফেডারেশনভুক্ত দেশ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধাচরণ করে বহিরাগত রাষ্ট্রের সাথে অনায্য যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে সেটা আগেই জানিয়ে দেয়া হবে যে, এই যুদ্ধ তাকে একাই করতে হবে।

    ❖ আশা করা যায় ফেডারেশনভুক্ত রাষ্ট্র ধীরে ধীরে বিদেশী রাষ্ট্রগুলোতে পৃথক পৃথক কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্যয়বহুল বিলাসিতা ত্যাগ করবে এবং সমস্ত ফেডারেশনভুক্ত রাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধিদের কথা বলার ব্যবস্থা করবে।

    ❖ যে দেশ বা ব্যক্তি এই ক্যটকিজমে বর্ণিত নীতিগুলো গ্রহণ করবেন তারাই কেবল ফেডারেশনে যুক্ত হতে পারবেন।

    […]
    আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন
    সংগ্রহ: গেটি ইমেজ

    ১০) সামাজিক সংগঠন। রাজনৈতিক সমতা ব্যতীত কোনো সত্যিকারের রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকতে পারেনা, কিন্তু রাজনৈতিক সমতা কেবল তখনই সম্ভব যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা থাকবে।

    o সমতা মানে এই নয় যে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ঘুচে যাবে, বা ব্যক্তি শারিরীকভাবে, মানসিকভাবে অথবা নৈতিকভাবে অভিন্ন হয়ে যাবে। জাত, দেশ, লিঙ্গ, বয়স ও ব্যক্তিদের মধ্যকার সক্ষমতা ও ক্ষমতার বিচিত্রতা সামাজিক অমঙ্গল তৈরির বিপরীতে মানবতার প্রাচুর্যতাকেই গঠন করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার অর্থ হলো ব্যক্তি সম্পত্তির সমতাবিধান, কিন্তু নিজ দক্ষতা, উৎপাদনশীল কর্মশক্তি ও মিতব্যায়ীতার মাধ্যমে ব্যক্তি যা অর্জন করবেন সেটাকে সীমাবদ্ধ করে নয়।

    o সমতা ও ন্যায়বিচার কেবল সেই সংগঠিত সমাজে দাবি করা যায় যেখানে প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকে শুরু করে কৈশোর ও সাবালকত্বসহ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সমান সুযোগ পাবে: প্রথমত রক্ষণাবেক্ষন ও শিক্ষার, এবং পরবর্তীতে তার সহজাত সক্ষমতা ও তৎপরতাগুলো অনুশীলনের। যে ন্যায়বিচারের ভিত্তি জন্মের পর থেকে সবার জন্য সমতা, তা ততক্ষণ পর্যন্ত অর্জন করা অসম্ভব যতক্ষণ পর্যন্ত উত্তরাধিকার সম্পত্তি বজায় থাকবে।

    o […]

    o উত্তরাধিকারের [right of inheritance] বিলুপ্তি। উত্তরাধিকারের বিলুপ্তি না ঘটা পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্য, অর্থাৎ শ্রেণি, সুবিধা ও সম্পদের বৈষম্য বজায় থাকবে। এটি এমন এক সামাজিক আইন, যার মধ্যে কার্যত বৈষম্য মজ্জাগত রয়েছে, তা অনিবার্যভাবে অধিকারের বৈষম্য তৈরি করে। সামাজিক বৈষম্য রাজনৈতিক বৈষ্যমের দিকে নিয়ে যায়। এবং রাজনৈতিক সমতা ব্যতীত (সত্য, সার্বজনীন ও লিবার্টিয়ান অর্থে রাজনৈতিক সমতা বলতে যা বোঝায়) সমাজ সর্বদাই দুটো অসম অংশে বিভক্ত থাকবে। প্রথম অংশ, যা মানবজাতির বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিয়ে গঠিত, যাদেরকে জনসাধারণ বলা হয়, তারা সুবিধাভোগী ও শোষণকারী সংখ্যালঘু দ্বারা নির্যাতিত হবেন। উত্তরাধিকারের অধিকার স্বাধীনতার নীতি লঙ্ঘন করে এবং তা অবশ্যই বাতিল করতে হবে।

    o […]

    o […]

    o যখন উত্তরাধিকারের ফলে প্রাপ্ত বৈষম্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে তখনও ব্যক্তিদের মধ্যকার বিচিত্র পরিমাণের কর্মশক্তি ও দক্ষতার কারণে [সম্পদের] বৈষম্য অব্যাহত থাকবে। এই বৈষম্যগুলো কখনো পুরোপুরি উবে যাবে না, কিন্তু শিক্ষা ও সমতাবাদী সামাজিক সংগঠনের প্রভাবে এগুলো কমতে থাকবে। সর্বোপরি উত্তরাধিকার অনাগত প্রজন্মের ওপর আর কোনো বোঝা চাপিয়ে দিবে না।

    o শ্রমই সম্পদের একমাত্র উৎস হওয়াতে সবাই ক্ষুধার্ত অবস্থায় মরতে বা মরুভূমিতে বাঁচতে বা জঙ্গলে পশুদের মধ্যে বাঁচতে স্বাধীন, কিন্তু যিনি সমাজে বসবাস করতে চাইবেন তাকে অবশ্যই শ্রমের মাধ্যমে জীবনধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাকে পরজীবী হিসাবে বিবেচনা করা হবে, যিনি অন্যের শ্রমের ওপর জীবন ধারণ করেন।

    o শ্রমই হচ্ছে মানব মর্যাদা ও নৈতিকতার ভিত্তি। কারণ কেবলমাত্র মুক্ত ও বোধশক্তিসম্পন্ন শ্রমের মাধ্যমেই মানুষ তার পশুত্বকে অতিক্রম করে মানবতা ও ন্যায়বিচার বোধ অর্জন করেছে, তার পরিবেশকে পরিবর্তন করেছে এবং এই সভ্য দুনিয়া তৈরি করেছে। প্রাচীন আমলে ও সামন্তযুগেও শ্রমের সাথে যে কলঙ্ক যুক্ত করা হয়েছিল, এবং ‘শ্রমের মর্যাদা’ নিয়ে মোনাফেকি ধরণের কথাবার্তা চালু থাকা সত্ত্বেও বর্তমানেও সেই কলঙ্ক বিদ্যমান, শ্রমের বিরুদ্ধে সেই বেকুবি কুসংস্কারের দুটো উৎস রয়েছে: প্রথমটা হচ্ছে এই বিশ্বাস (ফলে সেটা প্রাচীন দুনিয়ার বৈশিষ্ট্যও ছিল) যে, সমাজের একটা অংশকে জ্ঞান বিজ্ঞান শিল্প দর্শন এবং অন্যান্য মানবিক অধিকারের সুযোগ করে দিতে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের সবচাইতে বড়ো অংশটাকেই দাস হিসাবে কাজ করতে হবে। প্রাচীন সভ্যতার এই মৌলিক বিধানটি এর পতনের কারণ ছিল।

    যে নগর একদিকে সুবিধাভোগী নাগরিকদের অলসতার দ্বারা দুর্নীতিগ্রস্থ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে অধিকার থেকে বঞ্চিত দাস দুনিয়ার অদৃশ্য কিন্তু নিরলস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধ্বংসসাধণের চেষ্টা করা হচ্ছিল; এবং দাসরা তাদের দাসত্ব সত্ত্বেও সাধারণ শ্রমের মাধ্যমে নিপীড়নের বিরুদ্ধে পারষ্পরিক সহায়তা [মিচুয়াল এইড] ও সংহতির বোধ গড়ে তুলেছিল; সে নগর বর্বর লোকদের ধাক্কায় ভেঙ্গে পড়ে।

    খ্রিষ্টধর্ম, দাসদের ধর্ম হিসাবে, অনেক পরে প্রাচীন দাসপ্রথাকে ধ্বংস করে নতুন দাসপ্রথা গড়ে তোলে। বৈষম্য এবং বিজয়ীর অধিকার এবং ঐশ্বরিক অনুগ্রহের ভিত্তিতে সুবিধাভোগ সমাজকে আবারো দুটো শিবিরে বিভক্ত করে ফেল: ‘জনতা’ এবং অভিজাত, ভূমিদাস এবং মালিক। দ্বিতীয় শিবিরের কাছে সেনাবাহিনী ও সরকারের মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল; ভূমিদাসের জুটেছিল জোরপূর্বক শ্রমের অভিশাপ। একই কারণ একই প্রভাব উৎপাদন করার কথা; অধোগামী অলসতার কারণে দুর্বল ও হতাশ অভিজাতরা ১৭৮৯ সালে বিপ্লবী ভূমিদাস ও শ্রমিকদের ধাক্কায় পতিত হন। ফরাসী বিপ্লব শ্রমের মর্যাদা ঘোষণা করেছিল এবং শ্রমের অধিকারকে আইনে পরিণত করেছিল। তবে সেটা কেবল আইনেই ঘটেছিল, কারণ বাস্তবে শ্রম দাসত্বেই আটকে থাকে। শ্রমের অবক্ষয়ের প্রথম উৎস, মানে মানুষের [ম্যান] রাজনৈতিক অসমতার ডগমা বা মতাদর্শ মহান বিপ্লবের ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে পড়ে। ফলে অবক্ষয়ের দ্বিতীয় উৎসকে দায়ী করতে হবে; এবং সেটা হচ্ছে কায়িক ও মানসিক শ্রমের মধ্যে বিদ্যমান বিচ্ছিন্নতা [সেপারেশন], যা কিনা প্রাচীন বৈষম্যকে নতুন রূপে পুনরুৎপাদন করে এবং দুনিয়াকে দুটো শিবিরে বিভক্ত করে: একদিকে সুবিধাভোগী সংখ্যালঘু, তবে সেটা আইনগত দিক দিয়ে সুবিধাভোগী নয় বরঞ্চ পুজির দিক দিয়ে সুবিধাভোগী; অন্যদিকে সুবিধাবঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠরা, যারা আইনের কাছে আর বন্দী নয় বরঞ্চ ক্ষুধার কাছে বন্দী।

    বর্তমানে শ্রমের মর্যাদা তাত্ত্বিকভাবে স্বীকৃত, এবং জনমত কর্মহীন জীবনধারণকে অসম্মানজনক বলে মনে করে। কিন্তু এটা প্রশ্নের কেন্দ্রে যায় না। সাধারণত মানব শ্রম এখনো দুটো এক্সক্লুসিভ বর্গে বিভক্ত: প্রথমটিতে আছেন কেবল বুদ্ধিজীবী ও ব্যবস্থাপকরা, সেখানে বিজ্ঞানী, শিল্পী, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, হিসাবরক্ষক, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং তাদের অধীনস্থ অভিজাত যারা শ্রম শৃঙ্খলা প্রয়োগ করেন। দ্বিতীয় বর্গ প্রচুর পরিমাণে শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত, যারা কিনা সৃজনশীল ধারণা বা বুদ্ধি প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত এবং যারা উপরোক্ত বুদ্ধিজীবী-ব্যবস্থাপক অভিজাতদের আদেশগুলো অন্ধভাবে ও যান্ত্রিকভাবে পালন করেন। শ্রমের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন সুবিধাভোগী শ্রেণি, জনসাধারণ এবং সর্বোপরি সমগ্র সমাজের সমৃদ্ধি এবং নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে এসেছে।

    সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্য বিলাসবহুল আলসেমির জীবনযাপন ধীরে ধীরে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের দিকে পরিচালিত করে। এটা পুরোপুরি সত্য যে, শিল্পী, বিজ্ঞানী অর্থাৎ মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অবসর একান্তই প্রয়োজনীয়। সৃজনশীল অবসরের পথ ধরেই আসে দৈনন্দিন শ্রমের স্বাস্থ্যকর অনুশীলন, যা কিনা ব্যক্তির সক্ষমতা ও পছন্দ অনুসারে উপার্জিত ও সামাজিকভাবে সরবরাহকৃত। মানবপ্রকৃতি এমনভাবে গঠিত যে মন্দের প্রতি প্রবণতা সর্বদাই বহিরাগত পরিস্থিতির দ্বারা তীব্র হয়, এবং ব্যক্তির নৈতিকতা ব্যক্তির নিজের ইচ্ছার চাইতে বেশি সে যে পরিবেশের ওপর বসবাস করে তার ওপর নির্ভর করে। এই ক্ষেত্রে অন্য সবকিছুর মতো সামাজিক সংহতির আইন অপরিহার্য: পূর্ণ সমতা ভিত্তিক স্বাধীনতা ব্যতীত ব্যক্তি বা সমাজের অন্য কোনো নৈতিকতা থাকতে পারে না। সবচেয়ে আন্তরিক গণতান্ত্রিক ব্যক্তিকে সিংহাসনে বসিয়ে দিন; তিনি যদি শীঘ্রই সরে না দাড়ান তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিনি একজন বজ্জাতে পরিণত হবেন। একজন জন্মগত অভিজাত (যদি তিনি কোনোভাবে তার আভিজাত্যপূর্ণ সিলসিলার জন্য লজ্জাবোধ করেন এবং জন্মগত সুবিধাগুলো ত্যাগ করেন) অতীতের গৌরবের জন্য আকুল হয়ে থাকেন, বর্তমানে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকেন এবং ভবিষ্যতের অগ্রগতির চরম বিরোধীতা করেন। একই জিনিস বুর্জোয়াদের বেলাতেও ঘটে: পুজি ও অলসতার এই প্রিয় সন্তানটি অসততা, দুর্নীতি ও ধোঁকাবাজিতে তার অবসরকে নষ্ট করে, অথবা সেই শ্রমিক শ্রেণিকে দাস বানিয়ে রাখার নৃশংস হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে যে শ্রেণি কিনা একসময় তার বিরুদ্ধে ১৭৯৩ চাইতে ভয়াবহভাবে রুখে দাঁড়াবে।

    শ্রমবিভাজনের ফলে শ্রমিকরা যে অনিষ্টের শিকার হন তা নির্ধারণ করা আরও সহজ: অন্যের জন্য কাজ করতে বাধ্য করা হয় কারণ তারা দারিদ্রতা ও দুর্দশদার মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেছেন, সমস্ত যৌক্তিক পরিচর্চা ও শিক্ষাদীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং ধর্মীয় প্রভাব দ্বারা নৈতিকভাবে আবদ্ধ হয়েছেন। তারা প্রতিরক্ষা, কোনো ধরণের উদ্যোগ এবং নিজের নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছা ছাড়াই জীবন পরিচালিত করেন। দুঃখ-দুর্দশার কারণে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে কখনো কখনো তারা বিদ্রোহ করেন, কিন্তু তাদের সহকর্মী বা অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে ঐক্যের অভাবে এবং যে আলোকিত চিন্তাভাবনার ওপর ক্ষমতা নির্ভর করে সেটার অভাবে, তারা প্রায়শই নেতাদের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন এবং বিক্রি হয়ে যান। অধিকাংশ সময় তারা বুঝতে পারেন না যে কে বা কী তাদের দুর্দশার জন্য দায়ী। নিরর্থক বা ব্যর্থ লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে তারা আবারো সেই পুরনো দাসত্বের বন্ধনে আটকা পড়ে যান।

    এই দাসত্ব ততদিনই অব্যাহত থাকবে যতদিন না পর্যন্ত শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রয়াসে পুঁজিবাদকে উৎখাত করা যাবে। তারা ততদিন পর্যন্ত শোষিত হবেন যতদিন পর্যন্ত শিক্ষা (যা কিনা একটি মুক্ত বা স্বাধীন সমাজে সবার জন্য সমানভাবে থাকবে) কেবলমাত্র সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্মগত অধিকার হিসাব থাকবে; যতদিন পর্যন্ত এই সংখ্যালঘুরা একচেটিয়া ভাবে দখল করে রাখবে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ব্যবস্থাপনামূলক কাজকারবার এবং জনগণ কেবল তাদের ওপর অর্পিত শোষকদের কাজগুলো মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। মানব শ্রমের এই অবক্ষয় ভয়াবহ অনিষ্টকর, এটি সমাজের নৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দুষিত করে তোলে। ইতিহাস দেখায় যে, একটি অশিক্ষিত জনতা যার সহজাত বুদ্ধিমত্তাকে দমন করা হয় এবং প্রাত্যাহিক কঠোর পরিশ্রমের যান্ত্রিক গতানুগতিকতা যাদেরকে বর্বর করে তোলে, যারা কোনো একটা জ্ঞানার্জনের [এনলাইটেনমেন্ট] জন্য উদ্দেশ্যহীনভাবে হাতড়ে বেড়ান, সেই জনতা একটি নির্বোধ মব তৈরি করে, যারা অন্ধ হাঙ্গামা খোদ সমাজের অস্তিত্বকেই হুমকিতে ফেলে দেয়।

    কায়িক ও মানসিক [বা বুদ্ধিবৃত্তিক] শ্রমের এই কৃত্রিম বিভাজনকে অবশ্যই একটি নতুন সামাজিক সংশ্লেষণের দিকে নিতে যেতে হবে। যখন বিজ্ঞানের লোক কায়িক শ্রম করবেন এবং কায়িক শ্রমের লোক বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দিবেন, তখন মুক্ত বৌদ্ধিক কাজ হয়ে উঠবে মানবজাতির গৌরবের বিষয়, হয়ে উঠবে এর মর্যাদা ও অধিকারের উৎস।

    o […]

    o বৌদ্ধিক ও স্বাধীন শ্রম অত্যাবশকীয়ভাবে সম্মিলিত বা যৌথ শ্রম হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি একা বা যৌথভাবে কাজ করতে স্বাধীন থাকবেন। কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই যে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কাজে, এমনকি বিজ্ঞানভিত্তিক বা শৈল্পিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও সকলের কাছে যৌথ শ্রমই অগ্রাধিকার পাবে [ব্যক্তিগতভাবে সর্বোত্তমভাবে সম্পাদিত কাজগুলোর বাইরে]। কেননা সমিতি বা যৌথতা দুর্দান্তভাবে প্রত্যেক শ্রমিকের কর্মদক্ষতাকে বাড়িয়ে দেয়; ফলে একটি উৎপাদনশীল সমিতির সহযোগী সদস্য কম সময়ে বেশি আয় করতে পারবেন। যখন স্বাধীন উৎপাদনশীল সমিতিগুলো (যা সমবায় ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করবে) তাদের প্রয়োজন ও বিশেষ দক্ষতা অনুযায়ী স্বেচ্ছায় সংগঠিত হবে, তখন তারা জাতীয় সীমানাকে অতিক্রম করে একটি বৃহৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ফেডারেশন গঠন করবেন। এতে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল সংসদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, সমিতি বা সংগঠনগুলো নিখুঁত ও বিস্তারিত বৈশ্বিক পরিসংখ্যান হাজির সরবরাহ করবে। যোগান ও চাহিদার সাথে মিল রেখে এই সংসদ বৈশ্বিক শিল্প-উৎপাদনকে বিভিন্ন দেশে বণ্টন ও বরাদ্দ দিবে। বাণিজ্যিক ও শিল্প সঙ্কট, বেকারত্ব, পুজির অপচয় ইত্যাদি আর মানবাজাতিকে যন্ত্রণা দিবে না; মানব শ্রমের মুক্তি বিশ্বের পুনরুত্থান ঘটাবে।

    o জমি এবং সকল প্রাকৃতিক সম্পদ সবার সাধারণ সম্পত্তি। কিন্তু সেটা তারাই ব্যবহার করবেন যারা সেখানে নিজের শ্রম দ্বারা চাষ করবেন। বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া; শ্রমিক সংগঠন বা সমিতিগুলোর শক্তিশালী চাপের মাধ্যমে পুঁজি ও উৎপাদনের হাতিয়ার কেবল তাদের হাতেই পড়বে যারা নিজের শ্রমের দ্বারা সম্পদ উৎপাদন করেন।

    o সমান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি নারীদের জন্য সমান বাধ্যবাধকতা।

    o প্রাকৃতিক পরিবারের বিলুপ্তি নয়, বরঞ্চ আইন ও সম্পত্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আইনি পরিবারের বিলুপ্তি। ধর্মীয় ও সিভিল বিবাহের পরিবর্তে থাকবে মুক্ত বিবাহ। সাবালক নর ও নারী নিজের ইচ্ছেমতো একত্রিত হওয়ার বা আলাদা হওয়ার অধিকার রাখেন। সমাজ তাতে বাধা দেয়ার বা জোরজবরদস্তি করার অধিকার রাখে না। উত্তরাধিকার প্রথার বিলুপ্তি ও সমাজ কর্তৃক শিশুদের শিক্ষার দায়ভার গ্রহণের মাধ্যমে বিবাহ বাতিলের অসাম্ভ্যবতার আইনি যুক্তিগুলো হাওয়াতে মিলিয়ে যাবে। একজন নারী ও পুরুষের মিলন অবশ্যই স্বাধীনভাবে হতে হবে, কেননা নৈতিক জোরের অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে বাছাইয়ের স্বাধীনতা [ফ্রি চয়েস]। বিবাহের মধ্যে নারী ও পুরুষ পরম স্বাধীনতা উপভোগ করবেন। সহিংসতা বা আবেগ বা অতীতের অধিকার কোনো কিছুই একজন কর্তৃক অন্যজনের স্বাধীনতায় আক্রমণকে ন্যায্যতা দেয় না, এবং এমন প্রতিটি আক্রমণই অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।

    o গর্ভকালীন মুহূর্ত থেকে বাচ্চা জন্মদানের আগ পর্যন্ত সেই নারী ও শিশুকে দেখভালের জন্য সম্প্রদায়ের সংগঠন ভর্তুকি দিবে। যে নারী বাচ্চার পরিচর্যা করতে চান ও মায়ের দুধ ব্যতীত অন্য খাবারে অভ্যস্ত করতে চান তাকেও ভর্তুকি দেয়া হবে।

    o সন্তানদের যত্ন এবং শিক্ষার নির্দেশনা দেয়ার অধিকার পিতা-মাতাদের থাকবে, এই অধিকার থাকবে কমিউনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের অধীনে যা কিনা পিতামাতার কাছ থেকে সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেয়ার অধিকার ও বাধ্যবাধকতা বজায় রাখে; উদাহরণস্বরূপ, যারা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করবেন, মনোবল ভেঙে দিবেন বা শিশুদের শারিরীক ও মানসিক বিকাশকে বাঁধা দিবেন তাদের থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হবে।

    o শিশুরা যেমন তাদের পিতামাতার না, তেমনি সমাজেরও না। তারা তাদের নিজেদের ও খোদ নিজের ভবিষ্যতের মধ্যে নিহিত। নিজেদের যত্ন নেয়ার মতো বয়স না হওয়া পর্যন্ত শিশুদের অবশ্যই তাদের বড়োদের নির্দেশেই লালিত করা উচিত। এটা সত্য যে, পিতামাতারা হচ্ছেন প্রাকৃতিক শিক্ষক, কিন্তু যেহেতু খোদ কমিউনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শিশুদের কি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে তার ওপর, সেহেতু কমিউনকেও শিক্ষক হয়ে উঠতে হবে। সাবালকদের স্বাধীনতা সম্ভব কেবল তখনই যখন মুক্ত সমাজ নাবালকদের শিক্ষার দেখভাল করবে।

    o সেক্যুলার স্কুল চার্চকে প্রতিস্থাপন করতে হবে। কেননা যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা কুসংস্কার ও ঐশ্বরিক কর্তৃত্বকে বিলোপ হতে রক্ষা করে, সেখানে সেক্যুলার গণশিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও ইচ্ছাশক্তি এই ত্রয়ীর বিকাশের মাধ্যমে  তাদেরকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যাওয়া। যুক্তি, সত্য, ন্যায়বিচার, সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা, ব্যক্তিগত মর্যাদার অনুভূতি যা কিনা অপরের মর্যাদার সাথে অবিচ্ছেদ্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সবার স্বাধীনতার প্রতি ভালবাসা, কর্মই যে অধিকারের ভিত্তি ও শর্ত তাতে বিশ্বাস – এগুলোই গণশিক্ষার মৌলিক নীতি হওয়া উচিৎ। সর্বোপরি শিক্ষা মানুষের ভেতর প্রথমেই মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করবে, এবং পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিবে। শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতার দিকে আরো বেশি করে পথ দেখাবেন, ফলে কৈশোরে তিনি পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে উঠবেন এবং ভুলে যাবেন কীভাবে শৈশবে তাকে কর্তৃত্বের কাছে অনিবার্যভাবে নিজেকে সমর্পন করতে হয়েছিল। মানব মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা, যা কিনা স্বাধীনতার বীজ, তা প্রতি মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে হবে, এমনকি যখন শিশুদেরকে কঠোরভাবে নিয়মনিষ্ঠ করে তোলা হবে তখনও। সকল নৈতিক শিক্ষার সারমর্মটি হলো এই যে: মানবতার প্রতি সম্মান শিশুদের হৃদয়ে গেঁথে দিলে আপনি তাকে ভালো মানুষ বানাতে পারবেন…

    o সাবালকত্বে পৌঁছানো মাত্র তরুণ/তরুণীদেরকে স্বায়ত্বশাসিত ও স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হবে এবং নিজে যা ভালো মনে করবেন তাই করার জন্য তারা স্বাধীন থাকবেন। এর বিনিময়ে সমাজ তাদের কাছ থেকে তিনটা বাধ্যবাধকতা পূরণ করার প্রত্যাশা রাখবে: তিনি স্বাধীন বা মুক্ত থাকবেন, নিজের শ্রমের মাধ্যমে জীবনধারণ করবেন এবং অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান দেখাবেন। যেহেতু বর্তমান সমাজকে যেসকল অপরাধ ও দুষ্কর্ম দুষিত করে তুলছে সেগুলো সমাজের মন্দ সংগঠনের কারণেই, সেহেতু এটা নিশ্চিত যে, যুক্তি, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, মানবতার প্রতি সম্মান এবং পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ মঙ্গলদায়ক হবে। এবং সেখানে অশুভ বা মন্দ হবে একটি ব্যতিক্রম, যেগুলো একটি আলোকিত ও মানবিক জনমতের বিস্তৃত প্রভাবের ফলে ধীরে ধীরে আরো কমে যাবে।

    o প্রবীণ, অসুস্থ ও দুর্বলরা সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার উপভোগ করবেন এবং সমাজই তাদের ভার গ্রহণ করবেন।

    আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন
    সংগঠন: গ্রাঞ্জার

    ১১) বিপ্লবী নীতি। এটা আমাদের গভীর বিশ্বাস যে, যেহেতু সকল দেশের স্বাধীনতা অবিভাজ্য সেহেতু জাতীয় বিপ্লবগুলো আন্তর্জাতিক রূপ ঘটবে। যেহেতু ইউরোপ ও বিশ্ব প্রতিক্রিয়া একীভূত থাকবে, সেহেতু আর কোনো বিচ্ছিন্ন বিপ্লব হবে না, বরঞ্চ একটি সর্বজনীন বিশ্বব্যাপী বিপ্লব সংঘটিত হবে। সুতরাং দেশগুলোর ভেতর যে বিশেষ স্বার্থ, অহংকার, আত্মাভিমান, হিংসা এবং শত্রুতা রয়েছে তা বিপ্লবের একীভূত, সাধারণ ও সর্বজনীন স্বার্থে রূপান্তরিত হবে। কেবল এটাই পারবে সকল দেশের সংহতির মাধ্যমে প্রতিটি দেশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করতে। আমরা এও বিশ্বাস করি যে, বিশ্বের প্রতিবিপ্লবী এবং রাজা, পাদ্রী, অভিজাত ও বুর্জোয়াদের জোট আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের সকল ভয়ঙ্কর হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে বিশাল বাজেট, স্থায়ী সেনাবাহিনী, দুরূহ আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তি গঠন করবে। প্রকৃতপক্ষে, এই বৃহৎ প্রতিবিপ্লবী জোটকে পরাস্ত করা যাবে কেবলমাত্র যুগপৎ বিপ্লবী জোট ও সভ্য দুনিয়ার সকলের অংশগ্রহণে তৈরি এক বিরাট শক্তির মাধ্যমে; এই বৃহৎ প্রতিবিপ্লবী জোটের বিরুদ্ধে একক জনতার বিচ্ছিন্ন বিপ্লব দিয়ে সফলকাম হওয়া যাবে না। এ ধরণের বিপ্লব হবে নির্বুদ্ধিতা, বিচ্ছিন্ন দেশের জন্য হবে একটি বিপর্যয় এবং এরফলে বাকি দেশগুলোর বিরুদ্ধে এটি একটি অপরাধ হবে। এখান থেকে বলা যায়, একক জনগোষ্ঠীর অভ্যুত্থান কেবল নিজের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে হবে না, বরঞ্চ পুরো বিশ্বের দিকে তাকাতে হবে। এটি একটি বিশ্বব্যাপী কর্মসূচী দাবি করে যেন তা পুরো বিশ্বের স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত করে। জাতীয়তা নির্বিশেষে ইউরোপের জনগণের আবেগকে আরও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচীটি কেবল হতে পারে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচী।

    সংক্ষেপে বলা যায়, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে:

    রাজনৈতিকভাবে: রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অধিকার, বিজয়ের অধিকার এবং কূটনৈতিক অধিকারের বিলুপ্তি। এর লক্ষ্য হচ্ছে ঐশ্বরিক ও দুনিয়াবি বন্ধন থেকে ব্যক্তি ও সংগঠনের মুক্তি; এটা সমস্ত বাধ্যতামূলক ইউনিয়ন, এবং কমিউন জড়ো করা প্রদেশ এবং দখলকৃত দেশ জড়া করা রাষ্ট্রের পূর্ণ ধ্বংস কামনা করে। পরিশেষে এর জন্য প্রয়োজন সামরিক, আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক, বিচারবিভাগীয় ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সহ কেন্দ্রীভূত, আগ্রাসী ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের আমূল অবসান। সংক্ষেপে বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে: সকলের জন্য স্বাধীনতা, যেমন ব্যক্তির জন্য তেমনি যৌথ বা সম্মিলিত সংস্থা, সমিতি, কমিউন, প্রদেশ, অঞ্চল ও রাষ্ট্রের জন্য; এবং ফেডারেশনের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতার পারষ্পরিক নিশ্চয়তা প্রদান।

    সামাজিকভাবে: এটা অর্থনৈতিক সমতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমতার নিশ্চয়তা কামনা করে। এটা ব্যক্তির সহজাত পার্থক্যের অপসারণ নয়, বরঞ্চ এটি জন্ম থেকে প্রত্যেক ব্যক্তির সামাজিক অধিকারের সমতা। বিশেষত সাবালক হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকল শিশুর জীবনধারণ, অবলম্বন শিক্ষা ও সুযোগের সমান উপায় নিশ্চিত করা; এবং সাবালকত্বের পর যেন নিজের শ্রমের মাধ্যমে নিজের মঙ্গল তৈরি করা যায় সেই উদ্দেশ্যে সমান সম্পদ ও সুবিধা প্রদান।

  • মিখাইল বাকুনিন।। জার নিকোলাসের কাছে স্বীকারোক্তি

    মিখাইল বাকুনিন।। জার নিকোলাসের কাছে স্বীকারোক্তি

    অনুবাদ: অনিক সন্ধি

    অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যে ১৮৪৮ সালেরর মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হবার পর শ্রমজীবী মানুষকে উজ্জীবিত করা শুরু করেন বাকুনিন। পরিকল্পনা করেন ফেডারেশন অব ফ্রি স্লাভ রিপাবলিকস গঠনের। বাকুনিনের এই তৎপরতার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করে অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে তাঁকে হস্তান্তর করা হয় রাশিয়ায়। রাশিয়ায় তখন জার প্রথম নিকোলাস ক্ষমতায়। তারই নির্দেশে রাশিয়ার কারাগারে আদায় করা হয় এক স্বীকারোক্তি। মহাবিদ্রোহের পর শ্রমজীবীদের সকল সংগঠনই তখন গুপ্ত তৎপরতায়। আর বাকুনিনের ব্লাঙ্কিবাদী প্রবণতাও তখন তুঙ্গে।  ঠিক এমন সময়ই ১৯৫১ সালে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। তবে কোন সময়ই স্বৈরক্ষমতার পক্ষে ছিলেন না বাকুনিন। বাকুনিনের পরবর্তী সংগ্রাম ব্লাঙ্কিবাদকে পরিহার করে। তিনি হয়ে ওঠেন মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রর লড়াকু যোদ্ধা। স্যাম ডলগফের ১৯৭১ সালে প্রকাশিত Bakunin And Anarchy গ্রন্থে এটি পত্রস্থ হয়েছে। বাংলা অনুবাদটি এর অনুসরণেই করা।- সম্পাদক

    মিখাইল বাকুনিন

    বোহেমিয়াতে আমি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের আপাদমস্তক সব উল্টে দিতে চেয়েছিলাম। এমনভাবে সব বদলে দিতে চেয়েছিলাম যাতে আমাদের বিজয়ের পর অস্ট্রিয়ান সরকার পুরান কিছুর অস্তিত্বই খুঁজে না পায়। অভিজাত ও যাজক শ্রেণীর সব সম্পদ-সম্পত্তি দখল করার পর তাদের সকলকে পুরোপুরি বিতাড়িত করতে চেয়েছিলাম। এর এক অংশ ভূমিহীন কৃষকদের দিতে চেয়েছিলাম আর বাকিটা বিপ্লবের অর্থায়নের জন্য রাখতে চেয়েছিলাম। আমি সব দূর্গ ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম, সব প্রশাসনিক, আইনি, সরকারি নথি-পত্র পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। সব বন্ধক ও ঋণ মউকুফ ঘোষণা করতে চেয়েছিলাম। সংক্ষেপে, আমি বিধ্বংসী এক বিপ্লব সংগঠন করতে চেয়েছিলাম। যদিও সে ধ্বংস মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না করে ব্যবস্থার উপর ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম।

    কিন্তু আমি সেখানেই থামতে চাইনি। আমি পুরা বোহেমিয়াকে এক বিপ্লবী ক্যম্পে পরিণত করতে চেয়েছিলাম। আমি এমন এক বাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলাম যা বিপ্লবের প্রতিরক্ষাসহ দেশের বাইরেও বিপ্লব সম্প্রসারিত করতে পারবে।

    আর্টওয়ার্ক: রেভ্যুলিউশন ১৮৮৪
    শিল্পী: মিথালি জিকি
    সূত্র: ইউকি মিডিয়া

    কাজ ছাড়া কথা বলা নৈরাজ্যবাদী সব ক্লাব, পত্র-পত্রিকা বিলুপ্ত করে দেয়া হত। সব শুধু এক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পদতলে থাকত। সব সাবালকদের তাদের চরিত্র, ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে ভাগ করে সারা দেশে পাঠিয়ে দিয়ে অস্থায়ী এক বিপ্লবী ও সামরিক সংগঠন তৈরি করা হত। বিপ্লবকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য গুপ্তসমাজকে তিনটি সংগঠনে ভাগ করা হত। প্রত্যেক সংগঠন একে অপরের থেকে স্বাধীন ও অপরিচিত থাকত। সমাজগুলোর একটি থাকত শহরবাসীদের, আরেকটি যুবক-যুবতীদের ও শেষটি কৃষকদের।

    প্রত্যেকটি সমাজ তার নিয়োগকৃত এলাকার সামাজিক চরিত্রের উপর ভিত্তি করে তার কর্ম সম্পাদন করত। প্রত্যেকে কঠিন ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক ও চরম শৃঙ্খলার দ্বারা সংগঠিত হত। এই তিনটি সমাজ একটি গোপন কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বারা দিকনির্দেশিত হত। এই কমিটির সদস্য সংখ্যা হত অন্তত তিন কিন্তু সর্বোচ্চ পাঁচ। যদি বিপ্লব সফল হত তবে এই সমাজগুলোর বিলুপ্তকরণ করা হত না, উলটো আরো শক্তিশালী করা হত। তাদেরকে আরো প্রসারিত করা হত ও বিপ্লবী ক্রমকর্তৃত্বে যোগ করা হত।

    এরকম বিপ্লব শুধু একটা জাতির জন্য সীমিত থাকত না। বিপ্লবের উদাহরণ ও প্রচার-প্রচারণা দ্বারা শুধু মোরাভিয়াই নয়, জার্মানির সকল ভূখন্ড আকর্ষিত হত।

    মিখাইল বাকুনিন
    সূত্র: আর্ট ইন এক্সাইল

    রাশিয়াতে আমি জনতন্ত্র চেয়েছিলাম। কিন্তু কিরকম জনতন্ত্র? অবশ্যই সংসদীয় কোন জনতন্ত্র নয়! আমি বিশ্বাস করি যে অন্তত রাশিয়ায় একটা শক্তিশালী স্বৈরশক্তি আবশ্যক। এ এমন এক শক্তি যা শুধুমাত্র জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ও তাদের শিক্ষা-দীক্ষায় মনোযোগী হবে। এমন এক শক্তি যা নিদের্শনায় স্বাধীন ও উদ্দীপনায় ভরপুর হবে কিন্তু বিশেষ কোন সংসদীয় সুবিধার অধিকারী হবে না। যার বই-পুস্তক প্রকাশ করে জনগণের কাছে তার আদর্শ পৌঁছে দেয়ার স্বাধীনতা থাকবে। যা তার সোভিয়েতগুলো দ্বারা মহিমান্বিত থাকবে। যা তার স্বাধীন কাজ-কর্মের দ্বারা শক্তিশালী হবে এবং যা কোনকিছুর বা কারোর দ্বারা শেকলবদ্ধ থাকবে না।

  • মিখাইল বাকুনিন।। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘের নীতিমালা প্রসঙ্গে

    মিখাইল বাকুনিন।। আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘের নীতিমালা প্রসঙ্গে

    অনুবাদ : খোইরোম রুধির

    মিখাইল বাকুনিন
    (১৯১৪-১৮৭৬)

    ১
    L’Égalité
    , ৭ই আগস্ট, ১৮৬৯

    নতুন সদস্য গ্রহণের বেলায় আন্তর্জাতিক এটি কখনোই জিজ্ঞেস করে না যে সে একজন নাস্তিক না আস্তিক, সে কি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না কি না। আন্তর্জাতিক শুধু এইটাই জিজ্ঞেস করে– আপনি কি একজন শ্রমজীবী মানুষ? আর যদি শ্রমজীবী না হয়ে থাকেন তবে আপনি কি আন্তরিকভাবে শুধুমাত্র শ্রমজীবীদের স্বার্থকেই সমর্থন করতে চান, এর মূলনীতিগুলোর সাথে সংঘর্ষিক সকল স্বার্থ পরিত্যাগ করে?

    আপনি কি মনে করেন এই শ্রমজীবী মানুষেরা যারা সারা বিশ্বের সকল সম্পদের প্রধান উৎপাদক; যারা এই সভ্যতার নির্মাতা এবং বুর্জোয়াদের ভোগ করা যাবতীয় স্বাধীনতাই আসলে যাদের অর্জন; সেই তারাই দারিদ্র্য, তাচ্ছিল্য আর দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকুক? শ্রমজীবী মানুষ যে সকল দুর্দশার কবলে পড়ছে তার মূল উৎস যে তাদের দারিদ্র্য সেটা কি আপনি বুঝতে পারেন? আপনি কি বুঝতে পারেন যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিশেষ করে পুঁজিবাদের জোয়ালের তলে অর্থাৎ বুর্জোয়াদের কাছে নিজের শ্রমকে সমর্পণ করার বাধ্যতামূলক পরিণতি হিসেবেই সমগ্র দুনিয়াব্যাপী এই শ্রমজীবী মানুষদের আবির্ভাব ঘটেছে?

    প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়াদের নিজ নিজ অর্থনৈতিক অবস্থানের অনিবার্য পরিণতিই হচ্ছে তাদের মধ্যে অমোচনীয় এক বৈরিতার সম্পর্ক, তা কি আপনি বুঝতে পারেন? শ্রমিকের কল্যাণ ও স্বাধীনতার সাথে যে বুর্জোয়া শ্রেণির সম্পদের একটি বৈপরিত্যের সম্পর্ক রয়েছে তা কি আপনি বুঝেন? কেননা, এই বিপুল ধন-সম্পদ শুধুমাত্র শ্রমের শোষণ ও অধিগ্রহণের মধ্য দিয়েই গড়ে তোলা যায়। আর এই কারণেই শ্রমজীবী জনতার অগ্রগতি ও মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যেই একটি বিশেষ শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়াদের বিলোপ করতে হবে…. আপনি কি এটা বুঝেন যে কোনো শ্রমিক সে যতই বুদ্ধিমান অথবা উদ্যমী হোক না কেন একা তার পক্ষে বুর্জোয়া শ্রেণির এই সুসংগঠিত শক্তির বিপক্ষে লড়াই করা সম্ভব নয় যেই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখে রাষ্ট্রগুলো।

    অগ্রসর সকল শ্রেণি, সমস্ত পুঁজিবাদী ও সবগুলো রাষ্ট্র মিলিয়ে যেই ভয়ঙ্কর জোট গড়ে উঠেছে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্ন একটি শ্রমিক সংঘের পেরে উঠা সম্ভব নয়, তা সেই শ্রমিক সংঘ স্থানীয়ই হোক বা জাতীয় পর্যায়েই, এমনকি যদি বৃহত্তম ইউরোপীয় দেশগুলোর একটিতেও এই সংঘ গড়ে ওঠে— এ ব্যাপারটি কি আপনি বুঝতে পারেন? আপনি কি এটা বুঝেন যে, এই জোটের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র তখনই বিজয় সম্ভব যখন সমস্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংঘগুলো বিশ্বব্যাপী একটি একক সংঘরূপে একত্রিত হবে, আর তাই হচ্ছে এই মহান আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘ।

    আপনি যদি সর্বাঙ্গে উপলব্ধি করেন ও মন থেকেই এই সবকিছু চেয়ে থাকেন তাহলে আপনার জাতিগত আনুগত্য ও ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে এসে আমাদের সাথে যোগ দিন, আপনাকে সাদরে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু আপনাকে প্রথমে অঙ্গীকার করতে হবে যে—

    ক) পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমের এই লড়াইয়ে অর্থাৎ বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের এই অর্থনৈতিক সংগ্রামের জন্য নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থের পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে আমাদের সংঘের চূড়ান্ত স্বার্থকেই উপরে রাখা।

    খ) ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য কখনোই বুর্জোয়াদের সাথে আপোষ না করা।

    গ) সাধারণ সদস্যের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজের অহমিকাকে তুষ্ট করা থেকে বিরত থাকা। এমনটি যদি করে থাকেন তাহলে তাহলে আপনাকে প্রলেতারিয়েতের শত্রু, একজন বুর্জোয়া হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বুর্জোয়ারা সমবেত জনতা এড়িয়ে চলে আর প্রলেতারিয়েতরা চায় যারা শ্রম দেয় ও পুঁজিবাদের হাতে শোষণের শিকার হয় তাদের সংহতি।

    ঘ) শ্রম-সংহতির প্রতি সর্বদা আস্থাবান থাকা। এই সংহতির সাথে ন্যূনতম বিশ্বাসঘাতকতাকেও একজন শ্রমিক যতটুকু অপরাধ করতে সক্ষম তার মধ্যে সর্বোচ্চ অপরাধ বলে বিবেচনা করবে আন্তর্জাতিক। সংক্ষেপে বললে, কোনো বাছবিচার ছাড়াই আপনাকে আমাদের সাধারণ বিধি-বিধানগুলো পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগুলোকে মেনে চলার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে।

    আমরা মনে করি যে আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠাতারা তাদের কর্মসূচি থেকে সকল ধর্মীয় ও জাতীয় প্রশ্নকে পরিহার করতে যথেষ্ট ধীশক্তির প্রমাণ দিয়েছেন। তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের দ্ব্যর্থহীন ধর্মবিরোধী ও জাতীয় বিশ্বাসগুলো আন্তর্জাতিকের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা থেকে বিরত ছিলেন। কারণ তাদের প্রধান চিন্তার বিষয় ছিল সভ্য জগতের সকল নিপীড়িত ও শোষিত শ্রমিকদেরকে একটি একক প্রয়াসের মধ্য দিয়ে একত্রিত করা। তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবেই এমন একটি সাধারণ বনিয়াদ প্রতিষ্ঠা করতে হতো এবং প্রণয়ন করতে হতো এমন একগুচ্ছ মৌলিক নীতিমালা  যা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে সকল শ্রমিকের কাছে। এমনকি অসংখ্য শ্রমিকের মনকে এখনো আক্রান্ত করে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যেকোনো প্রকার বিকারে তারা সংক্রমিত হওয়ার পরও।

    কোনো গোষ্ঠী বা দলের ধর্মবিরোধী ও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে আন্তর্জাতিকের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত  করা আর ইউরোপীয় শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ করার মধ্যে ফারাক বিস্তর। এতে বরং বর্তমানে শ্রমিকরা যতটা না বিভক্ত হয়ে আছে তারচেয়েও অনেক বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ত। শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ধর্মযাজকেরা, সরকার, বুর্জোয়া দলগুলো— এমনকি এদের মধ্যে সবচেয়ে বামঘেঁষা দলগুলোও যতপ্রকার কুমন্ত্রণা আছে শ্রমিকদের কানে বেশ সফলভাবেই সেগুলো প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রমিকদের মগজ-ধোলাই যাতে তারা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে অগ্রসর শ্রেণিগুলোর জন্য স্বেচ্ছায় মজুর খাটে।

    এছাড়াও বিভিন্ন দেশের শ্রমজীবী জনতার উৎপাদন-শিল্প, রাজনৈতিক ও নৈতিক ক্রমবিকাশের এখনো এত বেশি মাত্রাপার্থক্য রয়েছে যে একটি একক রাজনৈতিক ও ধর্মবিরোধী কর্মসূচির ভিত্তিতে তাদের একত্রিত করা দুরূহ ব্যাপার। এমন একটি কর্মসূচিকে সদস্যপদ গ্রহণের চূড়ান্ত শর্ত করা মানে হচ্ছে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী তৈরি করা, একটি সর্বজনীন সংঘ প্রতিষ্ঠা করা নয়। এটি গোড়াতেই আন্তর্জাতিককে ধ্বংস করে দিতে পারত।

    সকল প্রকার রাজনৈতিক প্রবণতাকে অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে এবং শুধু আনুষ্ঠানিকভাবেই পরিহার করার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত জনগণের পক্ষে কোনো প্রকৃত  রাজনীতির অস্তিত্ব ছিল না। এই “জনগণ” বলতে আমরা বুঝাচ্ছি নিম্ন শ্রেণির মানুষকে, “ইতর জনতা”, দরিদ্রতম শ্রমিকদের যাদের শ্রমের উপর বিশ্ব টিকে আছে। শুধুমাত্র সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির রাজনীতিই বিদ্যমান ছিল। যারা আধিপত্য অর্জনের এক অশেষ লড়াইয়ে জনগণের শারীরিক পরাক্রমকে ব্যবহার করেছে একে অপরকে উৎখাত ও প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে। জনগণ শুধু এক পক্ষ ছেড়ে আরেক পক্ষকে সমর্থন করে গেছে এই নিষ্ফল আশায় যে, অন্তত এগুলোর মধ্যে কোনো এক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়তো তাদেরকে শতবর্ষ পুরাতন এই দারিদ্র্য ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করবে। এমনকি মহান ফরাসি বিপ্লবও তাদের অবস্থার কোনো বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি। এর অভিজাতদের হঠিয়ে দিয়েছে স্রেফ বুর্জোয়াদের স্থান করে দেয়ার জন্য। জনগণকে আর ভূমিদাস বলে ডাকা হয় না। তাদেরকে মুক্ত মানুষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং আইনত স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করা নাগরিকে সকল অধিকার তাদের দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা দারিদ্র্য-পীড়িত ভূমিদাসই থেকে গেছে।

    শ্রমজীবী জনতা ততদিন ক্রীতদাসই রয়ে যাবে যতদিন পর্যন্ত তারা বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক ঘুটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকবে। তা সে সংরক্ষণশীল রাজনীতিই হোক কি প্রগতিশীল, অথবা বিপ্লবী ভেক ধরে থাকা রাজনীতিই হোক। যে মাত্রা বা রঙেরই হোক না কেন সকল বুর্জোয়া রাজনীতির একটাই উদ্দেশ্য, আর তা হচ্ছে— আজীবনের জন্য বুর্জোয়াদের আধিপত্য বজায় রাখা। আর বুর্জোয়াদের আধিপত্য মানেই প্রলেতারিয়েতের দাসত্ব।

    প্রথম আন্তর্জাতিকের গঠন, ১৮৬৪

    আন্তর্জাতিকের কী করা উচিত ছিল? শ্রমজীবী জনতাকে সকল বুর্জোয়া রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতেই হতো তাকে, এবং সকল প্রকার বুর্জোয়া রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই এর কর্মসূচি থেকে বাদ দিতে হতো। আন্তর্জাতিক যখন প্রথম সংগঠিত হচ্ছিল তখন চার্চ, রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও বুর্জোয়া— এই প্রতিষ্ঠানগুলোই মূল চাপ প্রয়োগ করেছিল। এরপরই রয়েছে বিশেষত উদারনৈতিক বুর্জোয়ারা। এরা নিঃসন্দেহে অন্যদের তুলনায় মানবিক ছিলেন। কিন্তু তারাও জনগণের শোষণের উপরই নির্ভরশীল এবং তাদের আসল উদ্দেশ্যই ছিল তাদের প্রতিপক্ষকে পরাহত করা, যাতে শ্রমশোষণের উপর নিজেদের একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিককে প্রথমেই তার পথ পরিষ্কার করে নিতেই হতো। যেহেতু মুক্তির লক্ষ্যে এগিয়ে চলা সকল রাজনীতিই প্রতিক্রিয়াশীল উপাদানগুলো দ্বারা আক্রান্ত, আন্তর্জাতিককে প্রথমেই তার নিজেকে সকল রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে আনতে হতো, আর তারপর বুর্জোয়া সামাজিক ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের উপর আন্তর্জাতিকের নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হতো।

     

    ২
    L’Égalité
    , ১৪ই আগস্ট, ১৮৬৯

    এই কারণগুলোর জন্যেই আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠাতারা এই সংঘকে দাঁড় করিয়েছিল পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে। তাদের যুক্তি ছিল যে, যখন এই শ্রমিকেরা তাদের উদ্দেশ্যের ন্যায্যতা ও একই সাথে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে  আত্মবিশ্বাস অর্জন করে মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে তাদের সর্বজনীন লড়াইয়ে সহ-শ্রমিকদের সাথে যুক্ত হয় তখন ঘটনা প্রবাহ ও লড়াইয়ের তীব্রতা খুব দ্রুতই তাদেরকে আন্তর্জাতিকের সকল রাজনৈতিক, সমাজতান্ত্রিক ও দার্শনিক মূলনীতিগুলো উপলব্ধি করতে প্রবুদ্ধ করবে। যে মূলনীতিগুলো আসলে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন মাত্র।

    রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই মূলনীতিগুলোর অনিবার্য ফলাফল হচ্ছে সকল প্রকার প্রাদেশিক রাষ্ট্রের বিলোপ সাধন এবং তাদের ধ্বংসাবশেষের উপর সকল জাতীয় ও উৎপাদনশীল গোষ্ঠীর মহান আন্তর্জাতিক মৈত্রীর গোড়াপত্তন। দার্শনিকভাবে এর গুরুত্ব মানব সমাজের সুখ, সমতা, স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার উপলব্ধি থেকে কোনো অংশে কম নয়। সমস্ত ধর্মীয় ফ্যান্টাসি ও স্বর্গলোকে উন্নত জীবনের ফাঁপা স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবে এই আদর্শগুলো।

    কিন্তু রাষ্ট্র ও পৌরোহিত্যের নীতিভ্রষ্ট্র মতবাদ ও প্রপাগান্ডার প্রভাবে যাদের যাদের মন কলুসিত হয়ে আছে সেইসকল অজ্ঞ শ্রমিকদের কাছে এই দুই চূড়ান্ত লক্ষ্যকে সময়ের আগেই তুলে ধরলে নিশ্চিতভাবেই তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, এবং এর প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাবে তাদের মনে। এমনকি তারা টেরও পাবে না যে এই লক্ষ্যগুলো সত্যিকার অর্থে তাদের স্বার্থের প্রকৃত অভিব্যক্তি। এই লক্ষ্যগুলোর পশ্চাদ্ধাবন যে তাদের অন্তরে লালিত চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব পরিণতি দিতে প্ররোচিত করবে সেইটাও তারা বুঝতে চাইবে না। সুনির্দিষ্টভাবে বললে যে সকল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোঁড়ামির জন্যে তারা এই সকল ধারণাগুলোকে পদদলিত করে সে সকল গোঁড়ামিই যে তাদের দীর্ঘায়িত দারিদ্র্য ও দাসত্বের মূল কারণ সেইটাও তারা বিশ্বাস করতে চাইবে না।

    প্রথম আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস, ১৮৬৬

    সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির সংস্কারগুলোকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। জনসাধারণের সংস্কার তাদের নিজেদেরই স্বার্থবিরোধী হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু বুর্জোয়াদের সংস্কারগুলো পুরোপুরিভাবে তাদের শ্রেণিস্বার্থের উপরই প্রতিষ্ঠিত। জনগণ চায়, কিন্তু জানে না। বুর্জোয়ারা জানে, কিন্তু চায় না। এই দুইয়ের মধ্যে কে দুরারোগ্য? অবশ্যই বুর্জোয়ারা।

    সাধারণ নিয়ম হচ্ছে আপনি শুধুমাত্র তাদেরকেই উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবেন যারা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি ও করুণ পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যেই অনুভব করে যে তাদের অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। কিন্তু যারা আদৌ সেই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না তাদেরকে কখনোই উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবেন না। যারা এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চায় কিন্তু  সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক স্বভাবের কারণে যারা আপনার আদর্শের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অন্য এক আদর্শ দ্বারা আকৃষ্ট, তাদেরকেও আপনি উপলব্ধি করাতে সক্ষম হবেন না।

    টাকার পাগল কোনো অভিজাত লোক কিংবা কোনো বুর্জোয়া যার একমাত্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা হচ্ছে আভিজাত্যের স্বর্ণশিখরে উঠা কিংবা কোনো শ্রমিক যে মনেপ্রাণে একজন বুর্জোয়া হতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তাদের কাছ থেকে আপনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে সমর্থন আদায় করতে পারবেন না। কোনো বুদ্ধিমান উন্নাসিক লোক কিংবা স্বঘোষিত কোনো ‘মহাপণ্ডিত’ যে কিনা গুটি কয়েক বই অর্ধেক হজম করে তার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বহর দেখিয়ে বেড়াচ্ছে তাকে আপনি দলে টানতে পারবেন না। এই লোকগুলো নিরক্ষর জনতার দিকে অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্য নিয়ে আস্ফালন প্রদর্শন করে এবং নিজেদেরকে নতুন এক আধিপত্যবাদী শ্রেণি গঠনে ব্রত বলে কল্পনা করে।

    কোনো প্রকার যুক্তি কিংবা বিতর্কই এই নৈতিকভাবে অধঃপতিতদের পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে না। তাদের প্রতিরোধ পার হয়ে যাবার একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে কর্ম তৎপরতা— বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের অবস্থান, শোষণ ও আধিপত্য কায়েমের পথ বন্ধ করে দেওয়া। শুধুমাত্র সামাজিক বিপ্লবই সকল অসমতা দূর করতে পারবে এবং তাদেরকে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষে রূপান্তরিত করে সমতা ও সংহতির মধ্যে সুখ খোঁজায় নিবৃত্ত করতে পারবে।

    কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক বলতে আমি তাদেরকে বুঝাচ্ছি যারা শ্রমের ভারে ভারাক্রান্ত। সেই সকল শ্রমিক যাদের অবস্থান এতটাই অন্যের অধীনস্ত যে তারা জীবনে ভালো কোনো পদমর্যাদা প্রাপ্তির প্রত্যাশাও করতে পারে না(অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ব্যতীত)। এই ক্যাটাগরিতে আরও আছে সেসকল বিরল ও মহৎ  শ্রমিকরা যারা শ্রমিক শ্রেণির বাইরে উন্নীত হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শ্রমিক ভাইদের সাথে কষ্টভোগ ও বুর্জোয়াদের বিপক্ষে সংগ্রাম করাকেই বেছে নিয়েছে। এমন শ্রমিকদের রূপান্তরের প্রয়োজন নেই। তারা ইতোমধ্যেই প্রকৃত সমাজতান্ত্রিকে পরিণত হয়েছেন।

    প্রাত্যহিক কঠোর পরিশ্রমে ক্লান্ত, অবসন্ন বিপুল শ্রমিক জনতা তাদের শোচনীয় অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ। নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অপপ্রচার সত্ত্বেও এই শ্রমিক জনতারা সমাজতান্ত্রিক, যদিও তাদের সেই সম্পর্কে পূর্ব কোনো ধারণা নেই। তাদের সামাজিক অবস্থানের জন্যই তারা সকল বৈজ্ঞানিক ও বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকদের চেয়েও অধিক সমাজতান্ত্রিক। বস্তুগত শর্ত ও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই তারা সমাজতান্ত্রিক হয়ে উঠে যেখানে দ্বিতীয় ক্যাটাহরির লোবেরা শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই সমাজতন্ত্রিক। বাস্তব জীবনে বুদ্ধিবৃত্তির চেয়ে বস্তুগত প্রয়োজন অধিক শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে যা সর্বদা ও সবখানেই সত্তার অভিব্যক্তি, জীবনের ধারাবাহিক বিকাশের প্রতিবিম্ব। কিন্তু এটি কখনোই প্রধান মূলনীতি নয়…।

    শ্রমিকদের শুধুমাত্র যে জিনিসটির কমতি আছে তা হলো সমাজতান্ত্রিক ভাবনা, বাস্তবতা কিংবা সমাজতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কিত জ্ঞান নয়। প্রত্যেক শ্রমিকই মনের গহীনে বস্তুগত ধন-সম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুপ্ত বাসনা লালন করে। তারা জীবনভর এমন এক মুক্ত পরিবেশে জীবনযাপন ও কাজ করতে চায় যা প্রত্যেক মানুষের জন্য ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে অর্জিত। শ্রমজীবী জনতার কঠোর শোষণকে ভিত্তি করে যে সমাজ কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে সেই সমাজ কাঠামোর ভেতরে থেকে সম্ভবত এই চিন্তা প্রক্রিয়াকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। যেহেতু বিরাজমান এই সমাজ বিন্যাসের উৎখাতের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি অর্জিত হবে সেহেতু প্রত্যেক উদ্যমী শ্রমিক মাত্রই একজন সম্ভাব্য বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক।

    প্রত্যেক পরিশ্রমী শ্রমিকের মনে সমাজতান্ত্রিক ভাবনার বীজ অবচেতনে রোপিত হয়ে থাকে। সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যই হচ্ছে প্রত্যেক শ্রমিককে তার চাহিদা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সচেতন করে তোলা, তার মধ্যে এক বোধের উন্মেষ ঘটানো যা তার অন্তর্নিহিত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করবে। শ্রমজীবী মানুষের এই বোধ তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুভবের স্তরে উন্নীত হওয়া মাত্রই তাদের ইচ্ছা শক্তি একাগ্রতা পেতে বাধ্য হবে এবং তাদের ক্ষমতা হয়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য। এটি সর্বজনবিদিত যে অজ্ঞতা এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোঁড়ামি শ্রমজীবী জনতার মধ্যে বোধশক্তির বিকাশকে স্লথ করে। এই অজ্ঞতাকে কীভাবে দূর করা যায়? কীভাবে মূল উপড়ে ফেলা যায় এই গোঁড়ামির? শিক্ষার মাধ্যমে? প্রচারণার মাধ্যমে?

    প্রচারণা ও শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে চমৎকার কিন্তু অপর্যাপ্ত। যে শ্রমিকরা একাকী জীবন-যাপন করে এবং শ্রম ও নিত্যনৈমিত্তিক কার্যাবলী দ্বারা ভারাক্রান্ত তারা আলাদা করে নিজের শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে পারে না। আর কারাইবা এই প্রচার কার্য সম্পাদন করবে? সেই গুটি কয়েক সমাজতান্ত্রিক যারা সম্প্রতি বুর্জোয়া পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে? তারা নিঃসন্দেহে নিবেদিত প্রাণ এবং মহৎ অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত জনতাকে যথেষ্ট পরিমাণে বোঝানোর ক্ষেত্রে সংখ্যায় তারা খুবই অপ্রতুল ।

    তাছাড়া শ্রমিকদের সতর্কভাবে বড়জোর সেইসব বুদ্ধিজীবীদের প্রচারণাকেই আমলে নিতে হবে যারা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও প্রতিকূল এক সামাজিক পরিবেশ থেকে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিকের সংবিধানের প্রস্তাবনা এটা বলে যে, “শ্রমিকদের বন্ধনমুক্তির ভার শ্রমিকদেরই হাতে”। এটি পরম সত্য। আমাদের মহান আন্তর্জাতিকের মূলনীতিও এটি। কিন্তু শ্রমিকরা এইসব তত্ত্ব সম্পর্কে কমই জানে এবং তারা এই সকল মূলনীতির তাৎপর্য বুঝতে অপারগ। এইসব তত্ত্ব তারা শুধুমাত্র বাস্তব জীবনে চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করতে পারে– কার্যকর কর্ম-তৎপরতার মাধ্যমে বন্ধন-মুক্তি। এর জন্য প্রয়োজন মনিবদের বিপক্ষে শ্রমিকদের সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির পূর্ণ সংহতি। তা হতে পারে ট্রেড ইউনিয়ন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে [স্ট্রাইক ফান্ড[i]]।

    ৩
    L’Égalité
    , ২১শে আগস্ট, ১৮৬৯

    প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই যদি আন্তর্জাতিক যোগদানকৃত শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ধারণাগুলোকে বরদাস্ত করে থাকে তাহলে এর মানে এই নয় যে এই ধারণাগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক কোনোভাবে উদাসীন। আমি ইতোমধ্যেই দেখিয়েছি যে, আন্তর্জাতিক এইক্ষেত্রে উদাসীন নয়। সদস্যগণ কর্তৃক এইসব প্রতিক্রিয়াশীল ধারণার চর্চা করার ফলে আন্তর্জাতিকের মূলনীতিসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর সাথে সাথে খোদ আন্তর্জাতিকের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

    আমি আবারও বলছি, আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠাতারা এই সহনশীল পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তারা যুক্তি দেখান যে, লড়াইয়ে যুক্ত হওয়া কোনো শ্রমিক বাধ্যতামূলকভাবেই উপলব্ধি করবে যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও তার লালন করা সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটা অসংযত বৈরিতার সম্পর্ক রয়েছে। আর এটা উপলব্ধি করার পর প্রাকশ্যে সে নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বলে ঘোষণা করবে।

    বুর্জোয়াদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আবার ভিন্ন। তাদের সমস্ত স্বার্থ সমাজের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিরুদ্ধে। তাদের চিন্তাধারাও যদি এটির বিরুদ্ধে হয় তাহলে তারা প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা আজকাল বহুল প্রচলতি শব্দবন্ধ ব্যবহার করে বলা যায় ‘মধ্যপন্থী’। তারা সর্বদাই প্রতিক্রিয়াশীল থেকে যাবে এবং তাদেরকে আন্তর্জাতিক থেকে দূরে রাখা জরুরি। কোনো বুর্জোয়া, যে আন্তরিকভাবে আন্তর্জাতিকের সদস্যপদ পেতে চায় তাকে দেখলেই যেকোনো শ্রমিক চিনতে পারবে বুর্জোয়া বিশ্বের সাথে তার সম্পর্কের কারণে। বুর্জোয়া পুঁজিপতি ও ভূ-স্বামীরা, যারা প্রকাশ্যে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে ঘৃণা প্রচার করার সাহস দেখায় তারা আন্তর্জাতিকের শত্রু হিসেবে অন্তত অটল ও অকপট এবং ভণ্ডদের থেকে তারা কম বিপজ্জনক।

    কিন্তু বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যে অন্য একটি ধরাও রয়েছে যারা এতটা স্পষ্টভাষী কিংবা নির্ভীক নয়। সামাজিক তরলীকরণের (কর্তৃত্ববাদী শোষণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলুপ্তি) বিরোধীরা প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের মতোই সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করে চলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রলেতারিয়েতদের দাসত্বের জন্য দায়ী এবং তারপরও নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণির বন্ধনমুক্তির দূত দাবি করে।

    র‍্যাডিকাল ও লিবারেল বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকরা, যারা লিগ ফর পিস এন্ড ফ্রিডম প্রতিষ্ঠা করেছিল তারা এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরেই এই লিগ ঘৃণার সহিত সমাজতন্ত্রকে প্রত্যাখান করেছিল। গত বছর, ১৮৬৮ সালে বার্ন কংগ্রেসে তারা আবার বিস্ময়করভাবে অর্থনৈতিক সাম্যকে প্রত্যাখান করল। এখন ১৯৬৯ সালে যখন লিগ বিলুপ্ত হতে চলেছে তখন তাদের বিলুপ্তি আরও কিছুদিন পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে। সেই নিমিত্তে তারা অনুধাবন করতে পারছে যে তাদের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। তারা নিজেদেরকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে দাবি করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিক। কারণ তারা সমাজে বিদ্যমান সকল সমস্যাকে সামাজিক সমতার ভিত্তিতে সমাধান করবে। তারা পুঁজি ও ভূমি করের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চায়। তবুও তারা শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির কথা বলে।

    এমন আশাহীন ও হাস্যকর কাজ সম্পাদনে কী প্ররোচিত করেছিল তাদের? বেশিরভাগ বুর্জোয়াই সিজারিজম ও সামরিকতন্ত্রের উপর ত্যাক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছিল। অথচ প্রলেতারিয়তদের ভয়ে ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যার সূত্রপাত ঘটাতে তারা নিজেরাই সাহায্য করেছিল।

    ডিসেম্বরের আগে জুনের দিনগুলির কথা স্মরণ করতে হবে আপনাকে, যখন এই ন্যাশনাল এসেম্বলি একজোট হয়ে কীর্তিমান ও বীর সমাজতান্ত্রিক প্রুধোঁকে গালমন্দ করেছিল। প্রুধোঁই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা এই বুর্জোয়া সংরক্ষণশীল, লিবারেল ও র‍্যাডিকালদের ভেড়ার পালকে প্রতিরোধ করা ও এদের মুখোশ উন্মোচনের সাহস রাখত। ভুলে গেলে চলবে না যে, তার দুর্নাম রটনাকারীদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন এবং আজকাল তারা পূর্বের চেয়ে আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। তারা বিপ্লবী ব্যাপ্টিজমে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল ডিসেম্বরের দিনগুলিতে সংগঠিত নির্যাতন-নিপীড়নের প্রাক্কালে এবং অনেকেই স্বাধীনতার জন্য শহীদ হয়েছেন। কিন্তু এই প্রণিধানযোগ্য ব্যতিক্রমী ঘটনাগুলোকে আমলে না নিয়ে সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণি (র‍্যাডিকাল বুর্জোয়ারাও যার অন্তর্ভুক্ত) নিজেরাই একনায়কতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র কায়েমের পথ করে দিয়েছিল, যার কর্মফল বুর্জোয়ারা এখন ভোগ করছে এবং এর জন্য আক্ষেপ করছে। প্রলেতারিয়েতদের বিরুদ্ধে এইসব উপাদান প্রয়োগ করার পর তারা এখন তাদের কাছ থেকে মুক্তি চায়। কেন? কারণ তারা মনে করে এই রেজিম তাদেরকে অপদস্থ করেছে এবং তাদের স্বার্থের উপর অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু তারা কীভাবে নিজেদেরকে মুক্ত করবে? তখন তাদের যথেষ্ট সাহস ও ক্ষমতা ছিল এই রেজিমকে চ্যালেঞ্জ করার। আর এখন তারা ভীরু, জরাগ্রস্ত ও অক্ষম।

    শুধুমাত্র প্রলেতারিয়েতদের কাছ থেকে তারা সাহায্য পেতে পারে। কিন্তু তারা কীভাবে তা অর্জন করবে? স্বাধীনতা ও সমতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে? এই প্রতিশ্রুতিগুলো শ্রমিকদের মনোজগতে এখন আর নাড়া দিতে পারবে না। তারা তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে পেরেছে যে এই শ্রুতিমধুর শব্দগুলোর মানে কেবল অর্থনৈতিক দাসত্বের চিরস্থায়িত্ব। এই দাসত্ব পূর্বের চেয়ে কম জঘন্য কিছু নয়। এই লক্ষ লক্ষ শ্রমদাসদের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলতে হবে। অর্থনৈতিক মুক্তি যে অন্য সকল মুক্তির ভিত্তি সেই মোদ্দা কথা বুঝেন না এমন শ্রমিক আজকাল আর খুঁজে পাবেন না। এই কারণেই বুর্জোয়াদের অবশ্যই শ্রমিকদের কাছে সমাজের অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস সম্পর্কে আলাপ তুলতে হবে।

    লিগ ফর পিস এন্ড ফ্রিডম-এর বুর্জোয়া সদস্যরা নিজেদের প্রবোধ দেয় যা বলে—

    আন্তর্জাতিকে বাকুনিন

    সে ভালো কথা, আমাদের নিজেদেরকে সমাজতান্ত্রিক বলেও ডাকতে হবে। আমাদেরকে শ্রমিকদের কাছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অঙ্গীকার করতে হবে এই শর্তে যে— তারা সর্বদা সভ্যতা ও বুর্জোয়াদের সর্বশক্তিমানতা, ব্যক্তিগত ও বংশগত সম্পত্তি, পুঁজি ও বিষয়ী সম্পত্তির উপর কর এবং বুর্জোয়াদের অপরাপর স্বার্থগুলোর কদর করবে। শুধুমাত্র এসকল শর্তগুলোর ভিত্তিতে তাদের উপর আমাদের কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে এবং (আশ্চর্য ঠেকতে পারে যে) এইভাবেই শ্রমিক শ্রেণির বন্ধনমুক্তি ঘটবে। আর তা উপলব্ধি করানোর জন্য আমাদের অন্য কোনো উপায় অবশ্যই খুঁজতে হবে। আমাদের তাদেরকে এই কথাও উপলব্ধি করাতে হবে যে এসমস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বাস্তবায়নের জন্য প্রধানত একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বিপ্লব সাধন করা জরুরি। যেই বিপ্লব শুধুমাত্র রাজনৈতিকই এবং যতটা লাল হতে পারে ঠিক ততটাই লাল। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে এমনকি কল্লা ফেলে দিতে হবে যতগুলো প্রয়োজন এবং অবশ্যই সম্পত্তির পবিত্রতার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে, যা কিনা পুরোদস্তুর একটি জেকোবিন বিপ্লব। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা আমাদেরকে এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে হাজির করব এবং তারপর শ্রমিকরা যা কিছুর হকদার বলে আমরা মনে করি তাই তাদেরকে প্রদান করব।

    একজন ভণ্ড বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিক শনাক্ত করার কিছু অভ্রান্ত লক্ষণ হচ্ছে— সে যদি বলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পূর্বে রাজনৈতিক রূপান্তর দরকার; সে যদি প্রত্যাখান করে যে উভয় রূপান্তরই একই সময় হওয়া উচিত; অথবা সে যদি অবজ্ঞাভরে কাঁধ ঝাকি দেয় এ কথা বলবার সময় যে, রাজনৈতিক বিপ্লব কেবলমাত্র তখনই অর্থপূর্ণ হবে যখন এটি অবিলম্বে সরাসরি সমগ্র সামাজিক তরলীকরণের সূচনা করবে।

    ৪
    L’Égalité
    , ২৮শে আগস্ট, ১৮৬৯

     আন্তর্জাতিককে যদি এটির মূলনীতিতে অবিচল থাকতে হয় তাহলে এটি অবশ্যই সেই পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারবে না যেই পথ এটিকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাবে। সর্বপ্রথম এটিকে দুই প্রকার বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকদের প্রভাবকে নাকচ করে দিতে হবে। এক, যারা বুর্জোয়া রাজনীতির সমর্থক(বিপ্লবী বুর্জোয়ারাও এর অন্তর্ভুক্ত) আর দুই, ‘বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ’ যারা বুর্জোয়াদের মদত দেয়। আমাদের প্রস্তাবনা থেকে আন্তর্জাতিকের রাজনীতির সারসংক্ষেপ নিচে অল্প কথায় তুলে ধরা হলো—

    … পুঁজির নিকট শ্রমের সমর্পণই রাজনৈতিক নীতিগত ও বস্তুগত দাসত্বের উৎস এবং এই কারণেই আন্তর্জাতিকের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, প্রত্যেক রাজনৈতিক আন্দোলনই আবশ্যিকভাবে যার অধীন…

    এটি স্পষ্ট যে, শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক, প্রত্যক্ষ, নিশ্চিত ও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বন্ধনমুক্তি যেই রাজনৈতিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়, এবং যা স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে অর্থনৈতিক সাম্যের মূলনীতিগুলোকে অর্থাৎ শ্রম বা সামাজিক তরলীকরণের কাছে পুঁজিকে ফিরিয়ে দেয়ার কথা প্রচার করে না, সেরকম সকল রাজনৈতিক আন্দোলনই বুর্জোয়া আন্দোলন এবং এজন্যই এগুলোকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক থেকে বাদ দিতে হবে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকদের রাজনীতির পাটাতন এই আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতাই অর্থনৈতিক মুক্তির পূর্বশর্ত। এই সমস্ত কথার শুধু একটাই মানে দাঁড়ায়। শ্রমিকদের অবশ্যই র‍্যাডিকেল বুর্জোয়াদের সাথে জোট বাঁধতে হবে প্রথমত রাজনৈতিক বিপ্লব সাধনের জন্য। তারপর তাদের পূর্বতন প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্য।

    আমরা এই ভয়ংকর তত্ত্বকে জোরালোভাবে প্রত্যাখান করছি। যার মারফত আবারও শ্রমিকদের স্বদাসত্বের ঘুটিতে পরিণত করা হবে এবং নতুনভাবে বুর্জোয়া কর্তৃক তাদেরকে শোষণের বন্দোবস্ত করা হবে। প্রথমত রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের এই মানে হতে পারে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো অন্তত অস্থায়ীভাবে অক্ষতই থাকবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পুঁজিপতিরা আগলে রাখবে তাদের ধন-সম্পদ আর শ্রমিকরা তাদের দারিদ্র্য।

    আমাদেরকে বলা হবে যে, একবার যদি রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায় তবে তা পরবর্তীতে শ্রমিকদের সমতা ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা অর্জনের জন্য প্ররোচিত করবে। অবশ্যই স্বাধীনতা একটি মহৎ ও ক্ষমতাবান শক্তি যদি শ্রমিকরা এটির সদ্ব্যবহার করার সুযোগ পায় এবং কার্যকরভাবে এটি তাদের অধিকারে থাকে। তবে তা না হলে, এই রাজনৈতিক স্বাধীনতা একটি স্পষ্ট ছলনা ও কল্পনা হিসেবেই থেকে যাবে। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করে কোনো শ্রমিক প্রকৃতপক্ষে ও কার্যকরভাবে তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা চর্চা করছে এমন ভাবনার জন্য সেই ব্যক্তিকে কাল্পনিক পৃথিবীর বাসিন্দা হতে হবে। এমন কাজের জন্য তার সময় ও বস্তুগত ভিত্তির অভাব রয়েছে।

    ফ্রান্সে ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের পরের দিন আমরা কী দেখতে পাই? রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল সবার কাম্য সবচেয়ে র‍্যাডিকাল বিপ্লব। ফরাসি শ্রমিকরা উদাসীন কিংবা নির্বোধ কোনোটাই ছিল না। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সমস্ত কিছু বুর্জোয়াদের হস্তগত হয়েছিল কেন? কারণ রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে বাস্তব রূপ দান করার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত ভিত্তি সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল ছিল না। র‍্যাডিকাল ও লিবারেল বুর্জোয়ারা সংরক্ষণশীল বুর্জোয়াদের সাথে নিয়ে গত পরশুদিন গঠিত নয়া রিপাবলিকের রিপাবলিকানরা ও অপরাপর রূপান্তরিত ব্যক্তিরা সকলে মিলে তখন শ্রমিকদেরকে উপেক্ষা করল এবং চক্রান্তে লিপ্ত হলো। একদল সাধুবাদ জানাল ভূসম্পত্তি থেকে আসা আয় কিংবা তাদের অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক অবস্থানকে, অপর দল সাধুবাদ জানাল তাদের রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে যে অবস্থানে তারা স্বাভাবিকভাবে থেকে গেল। যার দরুন তারা পূর্বের চেয়ে আরও দৃঢ়ভাবে তাদের আসন সুরক্ষিত করল।

    ধরে নেয়া যাক যে, অভিজ্ঞতার দরুন প্রাজ্ঞ হয়ে জাতীয় সংসদে কিংবা আইনসভায় বুর্জোয়াদের নির্বাচিত করার বদলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হলো। তখন কী ঘটতে পারে? নতুন শ্রমিক প্রতিনিধিরা যারা বুর্জোয়া আদর্শ ও জীবনাভ্যাস আয়ত্ত ও চর্চা করার মাধ্যমে বুর্জোয়া পরিবেশে বেড়ে উঠেছে তারা আর শ্রমিক থাকতে চাইবে না, হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা। এই শ্রমিক প্রতিনিধিরা বুর্জোয়ায় রূপান্তরিত হবে। এমনকি তারা বুর্জোয়াদের চেয়েও আরও সাচ্চা বুর্জোয়া হয়ে উঠবে। কারণ মানুষ তার অবস্থান তৈরি করে না, অপরপক্ষে তার অবস্থানই সেই শ্রেণির মানুষ তৈরি করে। আর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, বুর্জোয়া শ্রমিকরা বুর্জোয়া শাসক-শোষকদের থেকে কম অহংকারী নয়; বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকদের চেয়ে তারা আন্তর্জাতিকের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ নয় এবং তারা মহান সাজা বুর্জোয়াদের চেয়ে কম ভণ্ড ও উদ্ভট নয়।

    প্রথমে সমাজতন্ত্রের আলোচিত বিষয়গুলোর সুরাহা না করে এবং বুর্জোয়ারা যা শুনে কেঁপে উঠে সেই সামাজিক পুনর্বিন্যাসের কথা আদৌ উচ্চারণ না করে শ্রমিকদেরকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ঠেলে দেয়ার মানে, এটাই বলা যে, ‘আমাদের জন্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনো যাতে পরবর্তীতে তোমাদের বিপক্ষে এটি ব্যবহার করতে পারি’।

    বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিকরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে শ্রমিকদের মধ্যে জোর প্রচার চালিয়েছিল এবং শ্রমিকদেরকে বাগে আনতে সমাজতন্ত্রকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। শ্রমিক জনতার উচিত নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ও বিশদ ধারণা নিয়ে এবং আন্তর্জাতিকের মূলনীতি দ্বারা চালিত হয়ে নিজেদেরকে কার্যকরভাবে সংগঠিত করতে শুরু করা। তাদের উচিত বুর্জোয়াদের কর্মপন্থাকে নিজেদের কর্মপন্থা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার নিমিত্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি প্রকৃত শ্রমিক শক্তি গড়ে তোলা। রিপাবলিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর ছত্রছায়ায় পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত আদর্শগুলো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুর্জোয়াদের প্রয়োজন একটি বিপ্লব। আর কোনো বিপ্লবই জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সংগঠিত হওয়া সম্ভব নয়। বুর্জোয়া ভদ্রলোকদের স্বার্থে কঠিন অগ্নি পরীক্ষা দেওয়া থেকে শ্রমিক আন্দোলনকে বিরত রাখা জরুরি। বিপ্লবকে শুধুমাত্র জনগণের বিজয়ের জন্য পরিচালিত করতে হবে, সেই সকল মানুষের জন্য যারা শ্রম-শোষকদের থাবা থেকে মুক্তির জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে।

    আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘ এটির মূলনীতিতে স্থির থাকতে কখনোই এমন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুমোদন কিংবা সমর্থন করবে না যেটি অবিলম্বে, সরাসরি ও সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জনসাধারণের থেকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন বুর্জোয়া শ্রেণির বিলোপ সাধনের কথা বলে না। বিপ্লবের প্রচার-প্রচারণায় শুরু থেকেই সামাজিক পুনর্বিন্যাসের কথা অনুপস্থিত এমন কোনো বিপ্লবের সমর্থন আন্তর্জাতিক করবে না।

    কিন্তু বিপ্লব কোনো ব্যক্তি কিংবা সর্বশক্তিমান সংঘের ছকানুসারে ও ইচ্ছামতো উদ্ভাবিত কোনো বস্তু নয়। সকল অভিলাষ ও চক্রান্তের অধীন না থেকে ঘটনার স্বাভাবিক প্রবাহের দরুন বিপ্লব সংগঠিত হয়। আসন্ন বিপ্লব সম্পর্কে হয়তো পূর্বানুমান করা যায় কিন্তু বিপ্লবের বিস্ফোরণকে কৃত্রিমভাবে ত্বরিত করা যায় না। এই সত্য উপলব্ধি করতে পেরেই আমরা প্রশ্ন করি, ‘সর্ব-প্রত্যাশিত ও অপ্রতিরোধ্য সামাজিক বিপ্লবপূর্ব এই কম-বেশি প্রলম্বিত মধ্যবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিকের কোন কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত?’

    আন্তর্জাতিক সকল স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিকে উপেক্ষা করে এবং শুধুমাত্র অর্থনৈতিক চরিত্রকে আমলে নিয়ে সকল স্থানের শ্রমিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করার প্রচেষ্টা চালায়। এটির তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমঘণ্টা হ্রাস ও অধিক মজুরি নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমিক ধর্মঘটের প্রস্তুতি নেয়, ধর্মঘটের জ্বালানি সরবরাহ করে এবং শ্রমিকদেরেকে একটি সংগঠনের আওতায় একত্রিত করার চেষ্টা করে।

    [চলুন আমরা আমাদের সংগঠনকে সম্প্রসারিত করি। কিন্তু একই সাথে এটিকে দৃঢ় ও শক্তিশালী করতেও যেন ভুলে না যাই আমরা, যাতে আমাদের মধ্যেকার সংহতি যা কিনা আমদের সামগ্রিক শক্তি তা যেন দিনকে দিন বৃদ্ধি পায়। চলুন আমাদের শিক্ষায়, আমাদের কাজকর্মে, নাগরিক কর্ম তৎপরতায় ও খোদ ব্যক্তি জীবনে এই সংহতি জ্ঞাপনের ব্যাপক চর্চা করি। চলুন আমাদের জীবনকে আরেকটু বেশি সমর্থনযোগ্য ও কম মুশকিলের করে তুলতে যৌথ কর্ম প্রচেষ্টায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। যখনই সম্ভব চলুন উৎপাদক-গ্রাহক সমবায় ও পারস্পরিক বিনিময়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি। যদিও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে এই ব্যবস্থাগুলো আমাদেরকে প্রকৃত কিংবা উপযুক্ত অর্থে মুক্তি দিতে পারবে না কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা যতদূর সম্ভব শ্রমিকদেরকে অর্থনীতি পরিচালনার কর্মপন্থা সম্পর্কে হাতে কলমে শিক্ষা দেয়। একই সাথে ভবিষ্যতের সংগঠনের জন্য মূল্যবান বীজ রোপণ করে।]

    আন্তর্জাতিক এটির মূলনীতিগুলো প্রচার করতে থাকবে কারণ এই মূলনীতিগুলো সারা বিশ্বের সকল শ্রমিকদের সামষ্টিক স্বার্থের নিখাদ অভিব্যক্তি। এই মূলনীতিগুলো আমাদের সংগঠনের সারসত্তা এবং জীবন্ত চালিকা শক্তি। আন্তর্জাতিক বুর্জোয়া সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় না নিয়ে এটির প্রচার চালাবে যাতে প্রত্যেক শ্রমিক তাকে যেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অসাড়তার মধ্যে রাখা হয়েছিল তার থেকে জেগে উঠে তার অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে পারে। একই সাথে জানতে পারে যে সে কী চায় ও কী করতে হবে এবং কোন শর্তের সাপেক্ষে একজন মানুষ হিসেবে তার অধিকারগুলো অর্জন করতে পারবে। আন্তর্জাতিককে আরও প্রবলভাবে এটির প্রচার চালাতে হবে কারণ খোদ আন্তর্জাতিকের অভ্যন্তরেই আমরা এমন প্রভাবের সম্মুখীন হই যা এই মূলনীতিগুলোর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে। মূলনীতিগুলোকে ফাঁপা, বেহুদা তত্ত্ব হিসেবে প্রচার করে এবং শ্রমিকদেরকে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় পঠন-পাঠনের দিকে পরিচালিত করার চেষ্টা চালায়।

    আন্তর্জাতিকের পোস্টার

    আন্তর্জাতিক নিজেকে সম্প্রসারিত করবে এবং দৃঢ়ভাবে সংগঠিত হবে। ঘটনার প্রবাহে পরিপুষ্ট হয়ে বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার মুহূর্তে উপস্থিত হবে এক প্রকৃত শ্রমিকশক্তি যারা তাদের করণীয় সম্পর্কে অবগত এবং সেই বিপ্লবকে জনগণের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত অভিমুখে প্রবাহিত করতে সক্ষম। সকল ভূখণ্ডের শ্রমজীবী সংঘের সম্মিলনে গড়ে উঠা একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক সংগঠন এটি, যা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভাজিত এই মৃত বিশ্বকে প্রতিস্থাপিত করতে সক্ষম হবে।

    আমাদের সর্বজন গৃহীত সংবিধানের প্রস্তাবনা অংশের সমাপ্তিসূচক অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিকের কর্মপন্থা সম্পর্কে যথাযথ ব্যাখ্যা দেয়া যায়—

    ইউরোপের শিল্পায়িত দেশগুলোতে যে আন্দোলনগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তা আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। একই সাথে পুরনো ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করার গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিচ্ছে।

    টীকা

    [i]    শ্রমিক ধর্মঘটের সময় যেহেতু কারখানা থেকে শ্রমিকেরা মজুরি পাচ্ছে না, সে সময়টা ধর্মঘট চালিয়ে যাবার জন্য শ্রমিকদের অর্থসাহায্য দেয়ার উদ্দেশ্যে ইউনিয়ন যে ফান্ড গড়ে তুলে।