মুক্তিমুখিন নারীবাদী ইশতেহার প্রণীত হয় নরওয়েতে। ১৯৮২ সালের ১ থেকে ৭ জুন নরওয়ে তে অনুষ্ঠিত হয় অ্যানার্কিস্ট ফেডারেশনের তৃতীয় কংগ্রেস। সেই কংগ্রেসে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত নারীবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচির সারসংক্ষেপ এই ইশতেহার।
ইশতেহারটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। নরওয়েজীয় ভাষার সংবাদপত্র Folkebladet এ। এর পরপরই ইশতেহারটি ফরাসি ভাষায় CRIFA এর মার্চ-এপ্রিল বুলেটিনে প্রকাশিত হয়। পরে ফরাসি ভাষা থেকে ইংরেজিতে রূপান্তর করে ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হয়। ইশতেহারটি অন্যান্য ভাষাতেও অনুবাদ করা হয়েছে।
মুক্তিমুখিন নারীবাদী ইশতেহারের সহ-লেখক আনা কুইস্টের পক্ষ থেকে মুক্তিমুখিন নারীবাদী শুভেচ্ছা। CRIFA বুলেটিনে প্রকাশিত ফরাসি ভাষায় লেখা ইশতেহারের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় রূপান্তর করা হয়েছে।
আর্টওয়ার্ক: টর্চ কমপাইল আর্ট ব্লগ
ইশতেহার
সারাবিশ্বে অধিকাংশ নারীরই তাদের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো অধিকার নেই। নারীরা দুই ধরনের নিপীড়নের শিকার হন: ১) মানুষ হিশেবে সাধারণ সামাজিক নিপীড়ন এবং ২) দ্বিতীয়ত, লিঙ্গবাদ (sexism)-তাদের লৈঙ্গিক পরিচয়ের কারণে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হন।
নিপীড়নের রূপ পাঁচটি:
মতাদর্শিক নিপীড়ন: নির্দিষ্ট সাংষ্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্ম, বিজ্ঞাপন এবং অপপ্রচার দ্বারা মগজ ধোলাই। বিভিন্ন ধারণার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃত উপস্থাপন এবং নারীদের অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা নিয়ে খেলা। সর্বব্যাপী পিতৃতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং পুঁজিবাদী মানসিকতার বিস্তৃতি।
রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন: সাংগঠনিক কাঠামোর কর্তৃত্ব-ক্রমতান্ত্রিক বিন্যাস অর্থাৎ উপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হুকুম-আজ্ঞা; এমনকি তথাকথিত ব্যক্তিগত পরিসরের বেশিরভাগ আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।
অর্থনৈতিক শোষণ ও পীড়ন: ঘরে ভোক্তা ও কর্মী হিশেবে এবং বাইরে একই কাজ [পুরুষের সমান মাত্রায়] করেও স্রেফ নারী হওয়ায় কম পারিশ্রমিক পাওয়ার মাধ্যমে।
সংহিসতা: সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সহিংসতা এবং ব্যক্তিগত পরিসরে সাধারণত বিকল্পহীনতার দরুণ পরোক্ষ বলপ্রয়োগ ও শারীরিক অত্যাচারের শিকার হন নারীরা।
সংগঠনের অভাব: কাঠামোহীনতার অত্যাচার যা দায়বোধকে বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৈরি করে দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তা।
এই বিষয়গুলো একইসাথে কাজ করে এবং একে অন্যকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যুগপৎভাবে দুষ্টচক্রের ন্যায় ক্রিয়া করে। এই দুষ্টচক্র ভাঙার এখনো কোনো সর্বরোগহরা দাওয়াই নেই, আবার এটা ভাঙা যায় না এমনও নয়।
মুক্তিমুখিন নারীবাদ চেতনার বিষয়। এমন চেতনা, যা কাজের ক্ষেত্রে মুরুব্বিয়ানার ইতি টানে। ফলে সমাজকে মুক্ত করার নীতি- আমাদের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়।
মুক্তিমুখিন-নারীবাদ মানে, পুরুষের সাথে সমানতালে তাল মিলিয়ে নারীর স্বাধীনতা ও মুক্তি। এমন এক সামাজিক সংগঠন এবং এমন এক সামাজিক জীবন যেখানে কেউ কারোর চেয়ে উৎকৃষ্ট কিংবা নিকৃষ্ট নয়। নারী ও পুরুষ নয় পরস্পরের অধীন। সামাজিক জীবন, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের সকলক্ষেত্র এই নীতি দ্বারা পরিচালিত হবে।
মুক্তিমুখিন নারীবাদ মানে, নারীরা নিজেরাই নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব নেবে। ব্যক্তিগত বিষয়ে নিজেই নিজের সিদ্ধান্তগ্রহীতা হবে এবং নারীর সমষ্টিগত বিষয়ে অন্যান্য নারীদের সাথে মিলে দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। আর উভয় লিঙ্গের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে, নারী ও পুরুষ মিলে সমানভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।
নিজের শরীর বিষয়ে নারীর অবশ্যই নিজের সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। জন্মনিরোধ এবং সন্তান জন্ম দেয়ার মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত নারীর নিজেকেই নিতে হবে।
পুরুষাধিপত্য, নারীর ওপর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের মনোভাব, দমনমূলক প্রতিক্রিয়াশীল আইনের বিরুদ্ধে এবং নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার জন্য- অবশ্যই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উভয় লড়াই জারি রাখতে হবে।
সংকট কেন্দ্র, দিবাযত্ন কেন্দ্র, পাঠ ও পর্যালোচনার দল, নারীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ইত্যাদি অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে এবং নারীদের নিজস্ব ব্যবস্থায় তা পরিচালিত হতে হবে।
সম-অধিকারের ভিত্তিতে পুরুষ ও নারীর সিদ্ধান্তে গঠিত মুক্ত সংঘ দ্বারা প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক একক পরিবার প্রতিস্থাপিত হতে হবে। এই মুক্ত সংগঠন ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন ও পূর্ণতার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাবে।
শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং কর্মক্ষেত্রে যৌনতা সম্পর্কে গতানুগতিক ধারণাসমূহের অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। গড়পড়তা কাজ, গৃহস্থালি জীবন এবং শিক্ষায় উভয় লিঙ্গের মধ্যে বৈপ্লবিক সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব একটা উপায় হতে পারে।
আর্টওয়ার্ক: ফিয়ার সূত্র: জ্যাঁ কুইক
আরও খন্ডকালীন কাজ এবং বাড়িতে ও সমাজে সুসংহত সহযোগিতার মাধ্যমে কর্ম জীবনের কাঠামোয় অবশ্যই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। পুরুষ ও নারীর কাজের পার্থক্যকরণ বিলোপ করতে হবে। নার্সিং ও শিশুর যত্ন নেয়া নারীর মত পুরুষেরও বিষয় হতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী প্রধানমন্ত্রী কখনোই অধিকাংশ নারীর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবে না এবং নারীর ওপর নিপীড়নও বন্ধ হবে না। মার্কসবাদী ও বুর্জোয়া নারীবাদ- নারীমুক্তি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অধিকাংশ নারীর জন্য নৈরাজ্যবাদ ছাড়া নারীবাদ অর্থহীন। অন্যভাবে বলা যায়, মুক্তিমুখিন নারীবাদ- নারীর ক্ষমতায়ন বা নারী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ওকালতি করে না, এটা এমন এক সংগঠনপ্রণালী চায় সেখানে ক্ষমতা থাকবে না, প্রধানমন্ত্রী থাকবে না।
নারীর প্রতি দ্বৈত নিপীড়ন আসলে দ্বৈত লড়াই ও দ্বৈত জোটবদ্ধতা দাবি করে: এক দিকে নারীবাদী ফেডারেশন, অন্য দিকে নৈরাজ্যবাদের নীতিতে সংগঠিত হওয়া। মুক্তিমুখিন নারীবাদ এই দ্বৈত সংগঠনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।
নারীবাদ ছাড়া নৈরাজ্যবাদ আগাগোড়া পিতৃতান্ত্রিক আধা-নৈরাজ্যবাদ এবং সত্যিকারের নৈরাজ্যবাদ নয়। নৈরাজ্যরাদে নারীবাদী বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করাই মুক্তিমুখিন নারীবাদীদের কাজ। নারীবাদ ছাড়া কোনো নৈরাজ্যবাদ নয়।
মুক্তিমুখিন নারীবাদের অপরিহার্য বিষয় হলো, পরিবর্তন আজ থেকেই শুরু হতে হবে, আগামিকাল নয় অথবা বিপ্লবের পর নয়। বিপ্লব হতে হবে স্থায়ী। দৈনন্দিন জীবনে নিপীড়ন চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে আমরা অবশ্যই আজই শুরু করবো এবং এই ছাঁচ ভাঙতে এখানে এবং এখনই কিছু করবো।
আমাদেরকে অবশ্যই স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করতে হবে; আমরা কি চাই এবং আমরা কি করবো সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার কোন নেতার হাতে অর্পন করা ছাড়াই। ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে আমরা অবশ্যই নিজেই সব সিদ্ধান্ত নেবো। একেবারেই নারীর একান্ত নিজস্ব বিষয়গুলো অন্য নারীদের সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নেবো এবং সাধারণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পুরুষ সহযাত্রীর সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নেবো।
‘পঙ্কিলতা’, ‘পাপকে’ কারাগারে বন্দী করে সমাজের পুঁজ আড়াল করা যায় না। বরং সমস্ত কারাগারই পুরো সমাজের বুকে দগদগে ক্ষত হয়ে দেখা দেয়। মনুষ্যত্ব ও স্বাধীনতাকে নির্বাসনের নামান্তর হয়ে ওঠে এই কারাগার-বন্দীশালা-কয়েদখানা। সমস্ত লিবারাল আইডিয়া বলতে থাকে: কারাগার না থাকলে টাকা আর ক্ষমতার জোরে একদল সমাজে যাচ্ছেতাই করবে। তাই সমাজে আইনি নাগরিক সমতার জন্যই কারাগার দরকারি। আদতে কি তাই? বরং উল্টো টাকা আর ক্ষমতার জোরে অন্যকে বন্দী করার ইনস্ট্রুমেন্ট হয়ে ওঠে কারাগার। তার গায়ে সংশোধনের মহতী তিলক যতই লাগানো হউক আদতে নিষ্ঠুর বন্দীত্ব আর নিষেধাজ্ঞা বৈধ হতে পারে না! ন্যায়বিচারের নামে ন্যায় হতে পারে না!!
প্রবহমান রচনাটি লেখা হয় ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে। জরুরি আইন অমান্য করে কারাবন্দী হন লেখক। কারাগারেরই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এই রচনা। প্রথম প্রকাশ: প্রবাসী বাঙালিদের অনলাইন পত্রিকা ইউকেবেঙ্গলি, লন্ডন, ১৯শে এপ্রিল ২০০৮। এরপরে প্ররকাশিত হয়শাশ্বতিকী, প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি ২০০৯। বর্তমাান সংস্করণটি লেখকের অচেনা দাগ গ্রন্থ থেকে সংকলিত। — সম্পাদক
আপনি যদি একুশ শতকের আধুনিক প্রত্যক্ষ দাসপ্রথা না দেখে থাকেন, তাহলে কারাগারে যেতে পারেন। দাসদের গ্রাম এটা, বন্দিদের গ্রাম। আদর্শ দাসত্ব মহাগ্রাম। আস্ত একটা নির্যাতনমূলক শ্রমশিবির বটে জেলখানা, বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির। এখানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষকে দিয়ে সর্বপ্রকার কাজ করানো হয় জুলুম করে এবং জুলুমের ভয় দেখিয়ে। কাজ নিজেও একটা জুলুম এখানে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক কর্মশ্রম জুলুম ছাড়া আর কী?
দাসত্ব মহাগ্রামের যাবতীয় কাজ কয়েদিরা করে। পুরোনো কালের বৃহৎ একটা গ্রামের মতো এখানে আছে আলাদা আলাদা পেশা-জীবিকার আলাদা আলাদা পাড়া। তবে, গ্রাম বা পাড়া বললে যে রকম মানবিক একটা ব্যাপার মনে হয়, এটা সে-রকম নয়। এটা খুবই অমানবিক। তবু পাড়া-পাড়া বা গ্রাম-গ্রাম মনে হয় এখানে থাকা মানুষদের পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য: মোটের ওপর সবাই সবাইকে চেনে, এক সাথে কাজ করে, যাবতীয় দুঃখকষ্টের মধ্যেও সহজভাবে মেলামেশা করে, আড্ডা মারে, কালেভদ্রে ঝগড়াঝাঁটিও করে, আবার মিলেমিশে যায়। হঠাৎ ভুল ভাঙবে, যখন দেখবেন সকলের একই পোশাক, হাসিটা মলিন, উঁকি দিচ্ছে আড়ালের দুঃখ, আর কোথাও কোনো নারী নাই। নারীরা আছেন, আলাদা ঘেরাটোপে, দেখতে পাই নি। শ্রমের দিক দিয়ে দেখলে এটা একটা সুবিশাল কারখানার মতো, বন্দি শ্রমিকরা যেখানে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন, শুষ্ক অনিচ্ছুক প্রাণান্তকর পরিশ্রম। ছোটবেলায় সৈয়দপুরের রেলওয়ে কারাখানায় দেখেছিলাম ওয়াগনশপ, লোকোশেড, আরও সব আলাদা আলাদা শেড। আর এখানে জেলখানায় সব আলাদা আলাদা চালি।
জোঁয়াল-বন্দি কয়েদি, মলবাহী মানুষ
শীত নাই গ্রীষ্ম নাই কোন সকাল থেকে বিশাল বিশাল কম্বল আছড়ে ধুচ্ছেন ধোপা-চালির কয়েদিরা। প্রতিদিন দশ হাজার রুটি বানাচ্ছেন রুটি-চালির লোকেরা। নাপিত-চালির নাপিত-কয়েদিদের কাঁচি কচকচ-কচকচ চলছেই সকাল থেকে সন্ধ্যা। কৃষিকাজ যাঁদের ঘাড়ে পড়েছে তাঁরা নিজের কাঁধে করে জোঁয়াল টানছেন গরুর বদলে: কয়েদি থাকতে আবার গরু কেন। আগে-পিছে দুই কয়েদি বাঁশে ঝুলিয়ে ছোটবড় ড্রামের মতো বালতি টানছেন। কোনো কোনো বালতিতে জল। সারা জেলে যেখানে যেখানে জল লাগে পৌঁছে দিতে হবে। গণ-গোসলের বিরাটকায় চৌবাচ্চা ভরার জল। গণ-কাপড় কাচার জল। গণ-টয়লেটের জল। প্রথম শ্রেণীর বন্দিদের গোসলের জল। কয়েদি থাকতে কর্পোরেশনের পানির লাইনের কী দরকার। কয়েদিদের সশ্রম কারাদণ্ড উশুল করতে হবে না। আবার কোনো কোনো বালতিতে মল-মূত্র-গুয়ের পানি: মলবাহী নালা থেকে ভরে আনা, ফুলবাগানের বা মূলাক্ষেতের আদম-সার। গোটা জেল গুয়ের গন্ধে ম ম করছে। একেবারে বৃদ্ধ লোকেরা ঝাঁট দিচ্ছেন সার বেঁধে। বিস্তৃত আমতলার উঠান লেপছেন। মাথায় করে জং-ধরা পুরাতন টিনের তোরঙ্গে করে ভাত নিয়ে যাচ্ছেন আরেক দল লোক: কয়েদিদের খাদ্য। গিয়ে ঢালছেন ওয়ার্ডের বারান্দায় সিমেন্টের মেঝেতে। অবিকল ফকির লালনের মতো বা কনফুসিয়াসের মতো দেখতে অলৌকিক বৃদ্ধেরা বসে বসে মাছি মারছেন সারা সারা দিন। মেরে মেরে জমা করছেন ছোট ছোট কৌটায় ডিভিশনের স্যারদের ঘরে যেন ভনভন না করে কোনো মাছি। মুচি-চালির লোকেরা জুতা সেলাই করেই চলেছেন। ওদিকে উৎপাদন-বিভাগের (এম.ডি.) দেয়ালের ভেতরে তাঁত-চালির লোকরা মাকু টেনেই চলেছেন। মোড়া-চালির কয়েদিরা বাঁশের-দড়ির মোড়া বানিয়েই যাচ্ছেন। আরও আছে লোহার কাজ, ছাপাখানার কাজ, (ভেতরে গিয়ে রতন মিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, রতন, আরও যেন কী কী কাজ?) ‘রাইটার’ বন্দিরা অফিসের কত রকম কাজ করছেন। মুক্তার মতো তাঁদের হস্তাক্ষর। পাঠাগারের বন্দিরা সাড়ে চার হাজার বই লেনদেনের বন্দোবস্ত সামলাচ্ছেন প্রতিদিন। কারা-হাসপাতালে কয়েদিরাই ড্রেসিং করছেন কয়েদিদের, প্রেশার মাপছেন, ইঞ্জেকশন দিয়ে দিচ্ছেন, স্যালাইনের সিরিঞ্জ-ব্যাগ-স্ট্যান্ড সামাল দিচ্ছেন কলেরার-ডায়রিয়ার রোগীদের। গণটয়লেটের নালাড্রেনের মল-মূত্র পরিষ্কার করছেন ‘বাবু’-চালির কয়েদিরা।
এই রীতিমতো নিবর্তনমূলক এই শ্রমশিবিরের বন্দিদের বাধ্যতামূলক শ্রমের বিনিময়ে রীতিমতো কারখানাভিত্তিক উৎপাদন-যজ্ঞ পরিচালিত হয় ম্যানুফ্যাকচারিং ডিপার্টমেন্ট এম.ডি.-তে। এটা কারাগারের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা, কারাগারের কারখানা। জেলের ভেতরে একটা বড় অংশ চারপাশে উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। জেলের ভেতরে জেল। অন্য অংশের কোনো কয়েদি সেখানে ঢুকতে পারেন না। এম.ডি.-তে সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রম। এম.ডি.-তে কাজ পাশ হওয়াটা কয়েদিদের কাছে ভয়ের। এখানে শত শত গজ উৎপন্ন হয় চাদর, কয়েদিদের পোশাক, লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা ইত্যাদি হিসেবে। প্রচুর মোড়া, বাঁশের চেয়ার তৈরি হয়। মাত্রই বলেছি। জেলের বাইরের বিক্রয়কেন্দ্রে এসব জিনিস দেদারসে বিক্রি হয়, কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে কুল পান না। এখানে মুদ্রণ হয় জেলের জন্য দরকারি যত রকমের খাতা, কাগজপত্র, ফরম, পার্সোনাল টিকেট, মেডিক্যাল কার্ড ইত্যাদি যাবতীয় কিছু। রাজশাহী জেলের চাহিদা মিটিয়ে সেসব যায় আরো সব অন্য অন্য জেলে।
কয়েদিদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, এম.ডি. কারাগারের অত্যন্ত লাভজনক প্রকল্প, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এটাতে লোকসান দেখায়, আর টাকা মেরে খায়। এটা এমন একটা উৎপাদন-কারবার যেখানে শ্রম পাওয়া যায় বিনামূল্যে। শ্রমের জন্য কয়েদিদেরকে কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হয় না। দশ-বিশ-তিরিশ-চল্লিশ বছর জেল খেটে মানুষ যখন কারাগার থেকে মুক্তি পায় তখন তাঁর হাতে ফুটা পয়সাও থাকে না।
আকাশে যত তারা, জেলকোডে তত ধারা
কাজ, কাজ আর কাজ: বিনা পারিশ্রমিকে তো বটেই, প্রায় না খেয়ে এবং নিপীড়ন আর লাগাতার দুর্ব্যবহারের বিনিময়ে। ওদিকে, বাবু-জমাদাররা সারাক্ষণই ছোঁক ছোঁক করছেন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে। জেলের আইনে বিধিবিধানের তো আর শেষ নেই, আলমগীরের বয়ানে: ‘আকাশে যত তারা, জেলকোডে তত ধারা’। রিপোর্ট খাওয়ানোর ভয় দেখিয়ে কীভাবে পাঁচ টাকা দশ টাকা পকেটে ভরা যাবে, কীভাবে কয়েদির সিগারেটটা নিজে খাওয়া যাবে, কয়েদির নামে বাইরে থেকে পাঠানো শুকনা খাবারের ভাগ মারা যাবে, পাঠানো সিগারেটের প্যাকেট সরানো যাবে, ছুঁতানাতার শেষ নাই, অত্যাচারের শেষ নাই। এমনকি ঈদের দিনেও ডিভিশনের ‘কাজের লোক’ বা ‘ফালতু’র কাছ থেকে ২০ টাকা ‘পরবী’ নিয়েছেন এক জমাদার।
এতসব কাজ আর অত্যাচারের সংসারে তিন বেলা ভাত খেতে পর্যন্ত পান না এই বন্দিরা। সকালে একটা রুটি, সাথে গুড়। দুপুরে দুইটা রুটি, সাথে গুড়। রাতের জন্য শুধু ভাত-তরকারী। কিন্তু সে-ভাত তো এসে যায় বিকালের আগেই প্রায়, সন্ধ্যার আগেই দাসদেরকে খাঁচায় ঢুকতে হবে যে। সত্যিকারের রাতে খেতে বসলে দেখা যাবে নষ্ট হয়ে গেছে সে-ভাত, এমনই ভালো তার চাল। ভাত তাই সন্ধ্যার আগে-আগেই খেয়ে ফেলতে হয়। তারপর সারারাত উপাস। নইলে রেখে দিতে হবে পানি দিয়ে, এবং খেয়ে ফেলতে হবে সন্ধ্যা-রাতেই, না হলে নির্ঘাৎ পচতে শুরু করবে। খাবারের মান নিয়ে কিছু না বলাটাই সবচেয়ে ভালো। ডিভিশন পাওয়ার আগে তিন দিন সেলে ছিলাম, নিজমুখে খেয়ে দেখেছি। মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কি সহজ উপায়। তবু এখন যা দেয় সেটাই নাকি ক’বছর আগের তুলনায় অনেক ভালো, কয়েদিরা বারবার মনে করিয়ে দেয় সে-কথা।
আত্মার গভীরে বন্দিত্বের অনুবাদ
সকাল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম, অত্যাচার, আর প্রায়-অনাহারের পরও রাতের চেয়ে দিবসই সুন্দর। দিনে আকাশ দেখা যায়, মাটিতে হাঁটা যায়, গণ্ডির ভেতরে হলেও একটু চলাফেরা হয়। রাতে আরও বেশি বন্দি। আসলে রাত তো অনেক দূর, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই লক-আপ। নিজ নিজ ওয়ার্ডের খাঁচার মধ্যে লোহার গরাদের গেটে তালাচাবি। তখনও সন্ধ্যা হয়নি। তখনও হাঁস-মুরগি খুপরিতে ঢোকেনি। তখনও মাঠে চরছে গরু-ছাগল। কয়েদিদের মুখে তখন গোধূলি-ঘনানো বিষণ্নতা। প্রতিটা সন্ধ্যায় তাঁরা হাঁস-মুরগি-গবাদিপশুর প্রতি ঈর্ষা অনুভব করতে করতে খাঁচায় ঢোকেন। আত্মার একেবারে গভীরে আলাদা করে আরেকবার অনুবাদ করেন বন্দিত্বের অর্থ। বিছানা হয় দেড় হাত চওড়া। বিছানা বলতে ভাঁজ-করা একটা কম্বল, মাথায় ভাঁজ-করা কম্বলেরই একটা বালিশ। দুই বিছানার মাঝখানে এক আঙ্গুলও ফাঁক নাই। শীত হলে গায়ে আর-একটা কম্বল, জানলা-দরজা খোলা, আগেই বলেছি। গরম হলে ভাপ ওঠে, ও-রকম ঘেঁষাঘেঁষি করে বিশাল একটা মেঝেতে কোথাও একশো কোথাও-বা দুইশো তিনশো চারশো মানুষ, রাজশাহীর কুখ্যাত দম-ফাটানো ৪০-৪২ ডিগ্রির গরমে। কি গরমে, কি শীতে সেলগুলোর অবস্থা আরও সঙ্গীন। ঐভাবে শীতে-গ্রীষ্মে শুয়ে শুয়ে সারা রাত অপেক্ষা, কখন সকাল হবে, কখন খুলবে গরাদ। লক-আপ যখন খুলবে লোহার ঘটাং ঘটরং শব্দ শুনতে কত ভালোই না লাগবে: এই কথা ভাবতে ভাবতেই হয়ত ঘুম আসবে অথবা ঘুম আসবে না – দাঁড়িয়ে থাকবে জানালার বাইরে। এইভাবে আয়ু ক্ষয় করতে করতে যাবে একটা দিন। বন্দি জানবেন, তাঁর মুক্তির ক্ষণ আরও একদিন এগিয়ে এসেছে। এ-ও একটা বিরাট অর্জন: আরও একটা দিন তিনি পার করে দিয়েছেন জেলে, এবং তারপরও বেঁচে আছেন।
টাকাতন্ত্র আমলাতন্ত্র কারাতন্ত্র
এত যে দাসের মতো কাজ, সেই কাজেরও নিশ্চয়তা নাই। আজকে আপনার ফুলবাগানে কাজ, কাল যে আবার উৎপাদন-বিভাগের উঁচু দেওয়াল ঘেরা পৃথক জেলের ভেতর বসে বসে আপনাকে মোড়া বানাতে হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। কর্তৃপক্ষের খেয়াল হলেই হলো আপনার কাজ অন্যত্র পাশ করে দিতে পারেন তাঁরা। আইন হচ্ছে, প্রতি মাসে কাজ-পাশ করাতে হয়। একই কাজই যদি বহালও থাকে, তবুও সেটা নতুন করে পাশ করাতে হবে। আর প্রতিবার পাশ করানোর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হবে জেল-কর্তাদেরকে। (আকাশে যত তারা, জেলকোডে তত ধারা; জেলকোডে যত ধারা, তত বেশি ‘মাসোহারা’।) টাকা দিতে না পারলে আপনার কাজ অন্যত্র পাশ হয়ে যাবে। তাতে হয়ত বেশি পরিশ্রম, তাতে হয়ত আপনার বর্তমান কর্ম-এলাকার বন্ধু-হয়ে-যাওয়া কয়েদিদেরকে হারাতে হবে, দেখা হবে না আর প্রতিদিন, কিংবা নতুন কাজটা হয়ত আপনার ভালো লাগে না স্রেফ। সুতরাং প্রতি মাসে টাকা তৈরী রাখতে হবে। টাকা পাবেন কোথায়? বাসার লোকেরা খেয়ে না খেয়ে দিয়ে যাবে। আপনার সে-রকম টাকা পাঠানোর লোক না থাকলে আপনি হয়ত আপনার বরাদ্দ মাছের টুকরাটা বেচে দেবেন দুই টাকা দিয়ে, টাকা জমাবেন।
ঐ যে সামান্য খাদ্য, একটু রুটি আর একটু ভাত, সেটুকু নিয়েও অনেক ব্যবসা হয়। ঠিকাদার কাঁচামাল সাপ্লাই দেবেন। ঠিকাদার নির্বাচনে টাকা লেনদেন হবে। গেট দিয়ে জিনিস ঢুকবে। গেটে নয়-ছয় হবে। রান্না-চালি গোপন ‘নিলামে’ বিক্রি হবে, যিনি ‘কিনে’ নেবেন (তিনি একজন কয়েদি) তিনি সেখান থেকে স্পেশাল হিসেবে চোরা খাবার বেচবেন। এমনকি আপনি যে দেড় হাত জায়গায় শুয়ে থাকেন ঐ জায়গাটা ঐখানেই বহাল রাখার জন্যেও আপনাকে মাসোহারা দিতে হবে। একটু আরামে থাকার জন্য, আলাদা একটু লোহার বেডের বালিশ-তোষক-মশারির বিছানায় ঘুমানোর জন্য, আর একটু ভালো খাওয়ার জন্য আপনাকে থাকতে হবে মেডিক্যালে, যার একটা ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৭০ জন বন্দিকে সরিয়ে আমাদের তিন জনের থাকার ডিভিশন ওয়ার্ড বানানো হয়েছিল। আর সেই মেডিক্যালে থাকতে হলে ডাক্তারকে আপনি প্রতি মাসে এক দেড় দুই বা তিন হাজার টাকা দেবেন। টাকা না থাকলে সত্যিসত্যি অসুখ হলেও মেডিক্যালে আপনার এক-আধ দিনের বেশি সিট জুটবে না। আর টাকা থাকলে দিব্যি সুস্থ মানুষ আপনি মাসের পর মাস মেডিক্যালে থাকবেন।
গরিবের জেলখানা, বড়লোকের আইন-আদালত
এমন একটা কাজ জেলখানায় নাই, যার জন্য টাকা দিতে হয় না। অথচ ঐ দাসদের গ্রামে প্রায় প্রত্যেকেই গরিব মানুষ। গরিবের জেল, আর বড়লোকের আইন-আদালত। অনেকদিন জেল খাটা হয়েছে। যে মামলায় আপনি আছেন তাতে হাইকোর্টে মোটের ওপর একটা উকিল ঠিকমতো দাঁড়ালে আপনার জামিন নিশ্চিত, সেই উকিলটুকু ধরার মতো টাকা বেশিরভাগ কয়েদির নাই বলে তাঁকে পচে মরতে হবে জেলে আরও কত কাল। জামিনটুকু পাওয়ার জন্য আপনার পরিবার হয়ত সহায়-সম্বল সব বেচে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে দালালকে, টাকাটা দালাল নিজেই খেয়ে বসে আছে, আর আপনি সেই জেলেই পচে মরছেন। কারারক্ষীরাও নিতান্ত গরিব। অতি সামান্য বেতন পান। সংসার চলে না, মাস চলে না। কিছুতেই না। ডিউটি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা। বসার হুকুম নাই। জমাদার দেখলে রিপোর্ট করে দেবেন। আর সেই ভয় দেখিয়ে জমাদারও তার কাছ থেকে টাকা খাবেন। জমাদারের কাছ থেকে আবার টাকা খাবেন হয়ত সুবাদার, তারপর জেলার, তারপর সুপার। এরই মধ্যে কত রকম হাজারো মানবিক বৈশিষ্ট্য আর পরিস্থিতির জন্য জেলকর্তাদের কেউ কেউ দয়ালু, কেউ কেউ বদমাইশ। কয়েদিরা সারাক্ষণই বলছেন: এই জেলার ভালো, ঐ সুপার খারাপ, তার আগের জেলার ছিলেন চামার, আর ওমুক সুপার হারামির বাচ্চা, আর তমুক সুবাদার অত্যন্ত সদাশয় লোক। এসব পার্থক্য জেলের ভেতরে বাঁচা-মরার সাথে জরুরিভাবে সংশ্লিষ্ট বটে।
আর আমরা? ডিভিশনের কয়েদিরা? আমরা রাষ্ট্র-কর্তাদের কমবেশি নিজেদের শ্রেণীর লোক বলে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েও প্রথম শ্রেণীর বন্দির মর্যাদা পাব, ‘রাজার হালে’ জেলে থাকব। আর সব গরিব মানুষেরা জেলের বাইরে যেমন মর্যাদাহীন, জেলের ভেতরে তেমনি অধিকতর মর্যাদাহীন বন্দি, পশুর মতো, দাসের মতো। সারাদেশ আমাদের মুক্তির জন্যে চিন্তিত থাকবে, মুক্তি দাবি করে এটা-সেটা করবে, আর এদের মুক্তির কথা কেউ কোনোদিন বলবে না।
জেলখানা থাকলে তাতে গরিব মানুষেরা আর ভিন্নমতের ভিন্নশক্তির লোকেরা তো বন্দি থাকবেই। ৬৪টা জেলা শহর থাকবে, আর ৬৪টা জেলখানা থাকবে না! সাতটা বিভাগ থাকবে, সাতটা কেন্দ্রীয় কারাগার থাকবে না? এই হচ্ছে আমাদের মাথার মধ্যকার ‘স্বাভাবিক’ ‘প্রাকৃতিক’ ধারণাগুচ্ছ। পরিবার রাষ্ট্র ইস্কুল-কলেজ সাহিত্য-শাস্ত্র, ধর্ম-শাস্ত্র, আর সাংবাদিকতা-শাস্ত্রের মাধ্যমে কতদিনের প্রশিক্ষণের ফল এইসব ‘স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক’ ধারণা তা আমাদের ভেবে দেখার সময় কোথায়!
ফলে ডিভিশনের প্রথম শ্রেণীর বন্দিদের কাছে একদিন দুপুরে মর্যাদাহীন এক বন্দি এসে লুকিয়ে লুকিয়ে একটু ভাত খেতে চাইবে বাবু-জমাদার কিম্বা ম্যাট-পাহারারা যেন দেখে না ফেলে, এটাই তো স্বাভাবিক। তারপর একদিন আমরা মুক্তি পেয়ে চলে যাব আর জেলখানা যেমন ছিল তেমনই থেকে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। স্বাভাবিকতার এই স্বর্ণচিন্তার শৃঙ্খলই কারাগার নামক আদর্শ দাসত্ব-মহাগ্রামের আসল নিরাপত্তা।
কান্টের এনলাইটেনমেন্ট রচনাটি প্রকাশিত হওয়ার দুইশত বছর পর মিশেল ফুকো পুনরায় এনলাইটেনমেন্টকী? শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেন। ফুকোর মতে এটি কান্টের তেমন উল্লেখযোগ্য রচনা না হলেও, আধুনিক দর্শনশাস্ত্র এ প্রশ্ন থেকে এখনো মুক্তি পায়নি। হেগেল, নিৎসে, ম্যাক্স ওয়েবার, হরখেইমার এবং হাবারমাস মতো দার্শনিক ও তাত্ত্বিকদের বিভিন্ন সময় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টা হচ্ছে আধুনিক দর্শনশাস্ত্র।১ ফুকো নিজেও কান্টের রচনাটিকে এনলাইটেনমেন্টের যথাযথ বিশ্লেষণ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রস্তাব করছেন না। আঠেরো শতকের শেষের দিকে যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়েছে তার প্রক্ষাপটেও এই বিশ্লেষণ সন্তোষজনক নয়।২
মিশেল ফুকো
তবে ফুকো তার লেখায় কান্টের এনলাইটেনমেন্টকে একেবারে খারিজ না করে বরং সম্প্রসারণ করেছেন। ফুকো কান্টের এনলাইটেনমেন্টের ব্যাখায় এটিকে বর্তমানতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি ভবিষ্যতের কোন পরিকল্পনা নয়। বর্তমানের সাথে সম্পর্কিত হয়ে এটি তার অবস্থানের বিকাশ ঘটায়। ব্যক্তির কাছে এটি এক ধরনের বাস্তবতা, যেহেতু এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কান্টের পূর্বের দার্শনিকদের কাজে বর্তমান গুরুত্ব পেলেও কান্টের বর্তমান বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বর্তমানে বৈশিষ্ট্য নেতিবাচক দৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ নিষ্ক্রমণ বা বহির্গমন। এ বের হয়ে আসার মধ্যেই রয়েছে মুক্তি। ফুকো প্রশ্ন তুলছেন কান্টের ব্যবহৃত মানবজাতি শব্দটি নিয়ে। এই শব্দটিকে কান্ট বিশেষ নাকি সার্বিক অর্থে ব্যবহার করেছেন তার একটি অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ফুকোর মতে এনলাইটেনমেন্ট নিজেই নিজেকে ক্রিটিক করে। এর ফলে এটি স্বেচ্ছাচারী যুক্তির গোঁড়ামি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে ক্রিটিকের জন্ম হয়েছে, এজন্য এটি ক্রিটিকের যুগ। এই ক্রিটিকের যুগ ব্যক্তির যৌক্তিকতাকবোধকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ব্যক্তি যখন কোন কর্তৃত্বের আওতায় যুক্তিকে নিছক যুক্তির খাতিরে ব্যবহার করে তখন তা কোন সম্ভাবনা তৈরি করে না। কর্তৃত্বমূলক পরিবেশ একটি আবদ্ধ ও শৃঙ্খলিত পরিবেশ। তাই যুক্তিকে তাৎপর্য ও গুরুত্বপূর্ণ করে গড়ে তোলতেই কান্ট পাবলিক পরিসরের কথা বলেছেন। এই পরিসরে যুক্তিকে স্বাধীন ও সর্বসাধারণের নিকট পৌঁছানো সম্ভব। সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছানোর এ প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক। কারণ কান্ট এখানে যুক্তিকে ব্যবহারের বিনিময়ে রাজার আনুগত্য নিশ্চয়তা আদায় করে নিচ্ছেন। ফুকো এটিকে বলছেন একধরনের যৌক্তিক স্বৈরতন্ত্র।
এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার রূপরেখার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার মনোভাব তৈরি হয়। আধুনিকতা সময় বা যুগ দ্বারা আবদ্ধ নয় বরং তা একধরনের মনোভাব। এ মনোভাব তার সমসাময়িক বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। বোদলেয়ারের বরাত দিয়ে ফুকো আধুনিকতার মনোভাবের বিশ্লেষণ করেন। আধুনিকতার মনোভাব হচ্ছে সময়ের সাথে ক্ষান্তি, ঐতিহ্যের সাথে বিচ্ছেদ, নতুনত্বের অনুভূতি। আধুনিকতার মনোভাব নিজেকে চিরস্থায়ী করে রাখতে পারে না। বোদলেয়ারের ভাষায় ‘এটি তুচ্ছ,ক্ষণস্থায়ী ও আকস্মিক বিষয়’।৩ এনলাইটেনমেন্টের মতো জটিল ঐতিহাসিক ঘটনা কিভাবে আধুনিক মনোভাব তৈরির রূপরেখা হিসেবে কাজ করেছে তাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন ফুকো। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ফুকো এনলাইটেনমেন্টকে ইতিবাচকভাবে ও নেতিবাচকভাবে তার বৈশিষ্ট্যকে পর্যালোচনা করেছেন। এনলাইটেনমেন্ট যেহেতু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংস্কৃতিক ঘটনাবলির উপর নির্ভরশীল এবং অনেকাংশে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া দ্বারা তা নির্ণীত, তাই এটির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থানের সুযোগ নেই। হয় এটিকে গ্রহণ করে যৌক্তিক ঐতিহ্যের মধ্যে থাকা নতুবা এটিকে বর্জন করে যৌক্তিক ঐতিহ্য থেকে মুক্তি লাভ করা। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে ভালো,মন্দের বিচার করার অর্থই হচ্ছে দ্বান্দ্বিকতা তৈরি করা যার মধ্যে মুক্তির পথ নেই। ফুকোর মতে এটি এনলাইটেনমেন্টের ‘ব্ল্যাকমেইল’যা বর্জনযোগ্য।৪ এটি শুধু এনলাইটেনমেন্টকে ব্ল্যাকমেইল করে না বরং বুদ্ধিমত্তাকেও ব্ল্যাকমেইল করে। ফুকো এজন্য এটি থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকদের লক্ষ্য করেই এনলাইটেনমেন্ট সম্পর্কিত ফুকোর এ অবস্থান। দেখা যাচ্ছে ফুকো খুব জোরালোভাবে এনলাইটেনমেন্টকে পর্যালোচনা করেছেন। এনলাইটেনমেন্টের পক্ষে তার অবস্থানকে দৃঢ় এবং পরিষ্কার করার জন্য এনলাইটেনমেন্ট ও মানবতাবাদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষত ফ্রান্সে এ বিষয়টিকে এক করে দেখা হতো। ফুকোর মতে এই দুইটি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এনলাইটেনমেন্ট জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি বা অনেকগুলো ঘটনার সমষ্টিগত রূপ। মানবতাবাদ বিমূর্ত এবং এনলাইটেনমেন্ট বাস্তব অবস্থান। মানবতাবাদ মূল্যবোধ সংক্রান্ত। ইউরোপে মানবতাবাদ ব্যাপক এবং বহুরূপী অর্থে ব্যবহৃত হয়। অস্তিবাদী দর্শন নিজেকে মানবতাবাদী হিসেবে দাবি করত, এমনকি স্টালিনবাদও একই দাবি করত। যার ফলে মানবতাবাদের মূল্যবোধও পরিবর্তিত হয়েছে। এর বিস্তৃতি ও সংবেদনশীলতার কারণে দার্শনিক গুরুত্ব অপ্রাসঙ্গিক।
ফুকো তার রচনায় একদিকে নিজেকে কান্টিয়ান ক্রিটিকের স্পৃহার সাথে সংযুক্ত করেন অন্যদিকে তিনি নিজেই আধুনিক জ্ঞান এবং ক্ষমতার একজন প্রভাবশালী সমালোচক। ফুকোর তার প্রধান কাজেগুলোর মধ্যে দেখিয়েছেন যুক্তি এবং সত্যের ভিত্তি কখনো নিরপেক্ষ ছিলো না বরং তা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা দ্বারা প্রভাবিত। হাবারমাস কান্টের প্রবন্ধ সম্পর্কে ফুকোর দৃষ্টিভঙ্গির স্ববিরোধীতার প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধন করেছেন। ফুকো কান্টকে এমন একজন দার্শনিক হিসেবে আবিষ্কার করেছেন যিনি দর্শনকে বর্তমানের পর্যালোচনা হিসেবে পর্যবসিত করেছেন। কান্টের দার্শনিক অনুসন্ধান বর্তমানের সাথে সংযুক্ত। অর্থাৎ বর্তমান পরিবেশের মধ্যেই জ্ঞানলাভ সম্ভব। অন্যদিকে ফুকোর কাজগুলোই বর্তমান জ্ঞান ক্ষমতাকে চূড়ান্ত ও সূক্ষ্মভাবে সমালোচনা করেছে। ফুকোর জেলখানা বা যৌনতার কুলুজি সংক্রান্ত (Genealogical) কাজগুলোতে জ্ঞান, ক্ষমতা, সত্য সম্পর্কে গভীর সমালোচনার উপস্থিতি রয়েছে। মানবিক বিজ্ঞান ও আধুনিক ক্ষমতা সম্পর্কিত ফুকোর চিন্তাভাবনা দর্শন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী। ফুকো আধুনিক জ্ঞান/ক্ষমতাকে সর্বাত্মকভাবে সমালোচনা করেছেন। হাবরাম তাই প্রশ্ন করেছেন ‘এনলাইটেনমেন্টের ঐতিহ্যের সাথে ফুকোর আত্ম-বোঝাপড়া কিভাবে সম্পর্কিত হয়, যেহেতু তিনি আধুনিক জ্ঞানকাঠামোর একজন চূড়ান্ত সমালোচক?৫ মানবতাবাদের প্রতি উদাসীন ফুকো শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং এ দুটি বিষয়কে জোরালাভাবে পৃথক করেন। ফুকো এ দুটি প্রত্যয়কে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করলেও এই দুটির মধ্যে সংযোগের জন্য একটি বাদ দিয়ে অন্যটি গ্রহণ করা বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী।
ফুকো যেসব যুক্তির ভিত্তিতে মানবতাবাদকে খারিজ করছেন সেসব যুক্তির ভিত্তিতে এনলাইটেনমেন্টও খারিজ হয়ে যায়। কারণ মানবতাবাদ এবং এনলাইটেনমেন্ট উভয়কেই বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইউরোপীয় মানবতাদ ও এনলাইটেনমেন্ট উভয় বিষয়ই ইউরোপীয় সভ্যকরণ প্রকল্পকে ত্বরান্বিত করে। এই পর্যায়ে এসে এনলাইটেনমেন্ট ও মানবতাবাদের ঐতিহাসিক চেতনার নীতিসমূহ একইরূপ ধারণ করেছে। এনলাইটেনমেন্ট এবং মানবতাবাদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা বিস্তৃত, বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে পর্যালোচনা করা যায়। ফুকো এই দুটি প্রত্যয়কে ভিন্ন দৃষ্টিতে সংজ্ঞায়িত করে এদের সমজাতীয়তাকে অস্বীকার করলেও পুরুষতান্ত্রিক বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় এই দুটি বিষয় নিজেদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করেছে।
ফুকো মানবতাবাদের যেসব বিচিত্র উদাহরণ দিয়েছেন তা এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে বিকাশ ঘটেছে। এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্যেই অস্তিত্ববাদ, স্ট্যালিনবাদের বিকাশ ঘটে। এনলাইটেনমেন্টকে এসব থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তাই মানবতাবাদ নিজেই এনলাইটেনমেন্টের অনুসঙ্গ।
এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়া নিজেই মানবকেন্দ্রিক। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে যেসব প্রভাবশালী দার্শনিকদের জন্ম দিয়েছে তাদের সবার চিন্তাভাবনা মানবকেন্দ্রিক। মার্কস,সার্ত্রে,নিৎসের চিন্তাভাবনার লক্ষ্য ছিলো মানুষকে কর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে কর্তৃত্বমুক্ত করা। যার মাধ্যমে মানুষকে নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। এনলাইটেনমেন্টের এই মানবকেন্দ্রিকতা বিচিত্রভাবে কখনো পরিবেশ, কখনো নারী এবং এর বাইরের অপরাপর মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। এনলাইটেনমেন্ট মানবকেন্দ্রিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং মানবকেন্দ্রিকতা এনলাইটেনমেন্টকে টিকিয়ে রেখেছে। এনলাইটেনমেন্টের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানবকেন্দ্রিকতা বা মানবতাবাদের প্রচার হয়েছে। তাই মানবকেন্দ্রিকতা থেকে এটিকে সহজেই বিচ্ছিন্ন করা যায়না। এনলাইটেনমেন্টের জ্ঞানতত্ত্ব সভ্যকরণ ও উপনিবেশায়ন প্রকল্পের মধ্যে যে যুক্তি পাওয়া যায় তা হচ্ছে মানবকেন্দ্রিক।
ফুকোর লক্ষ্য ছিলো এনলাইটেনমেন্টের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ন্যায্যতা অন্বেষণ। বাস্তবিক এনলাইটেনমেন্ট ইউরোপীয় সমাজের জন্য অনেক প্রগতি ও নতুনত্ব নিয়ে এসেছিল। যার ফলে ইউরোপ নিজেকে আধুনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। কিন্তু এনলাইটেনমেন্টের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যে আধিপত্যশীল অবস্থান ছিলো,তা আমাদের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। এ আধিপত্যশীল প্রক্রিয়া শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে নয় বরং স্বয়ং ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করে এ বিষয়টি ফুকো সজ্ঞানে এড়িয়ে গেছেন। তাই এনলাইটেনমেন্টকে ক্রিটিক করে এর কোন কোন সীমারেখাকে লঙ্ঘন করতে হবে তাদের দিকে ফুকো দৃষ্টিপাত করেননি।
তথ্যসূত্র
১)Edited by Paul Rainbow, The Foucault Reader, Pantheon Books,New York,1984 [Michael Foucault, What is Enlightenment?Translated by Catherine Porter, Page 32 ]
২)Ibid, Page 37
৩)Ibid, Page 39
৪)Ibid, Page 42
৫)David R. Hiley, Foucault and the Question of Enlightenment,Page 64 Derived from Internet https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=http://journals.sagepub.com/doi/abs/10.1177/019145378501100103&ved=2ahUKEwiLht_M8bPsAhWGzTgGHZ0TCv0QFjAAegQIBBAC&usg=AOvVaw3p_xiGO_fuoZF8nTdEOJX7
এ তো রীতিমতো অরাজকতা। খোদ রাজধানী থেকে রাজনীতি-রাজতন্ত্র উঠে গেল নাকি? রাজার অনুমতি ছাড়াই সমাবেশ হচ্ছে দিব্যি। তাও আবার রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। সর্বনাশের কথা। উপরন্তু শাহবাগের সমাবেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনীতিকেরা সেখানে বক্তৃতা করতে পারবেন না। সাহারা খাতুন, মাহবুব-উল-আলম হানিফরা বক্তৃতা করতে গিয়ে অপদস্ত হয়েছেন এরই মধ্যে। এই সমাবেশ তার মানে রাজনীতিবিরোধী। অরাজকতা ছাড়া কী?
‘অরাজকতা’ মানে ‘রাজা’বিহীন বন্দোবস্ত। রাজা-রাজনীতি-হুজুর-হোমরা চোমরা ছাড়াই নিজেরা নিজেদেরকে পরিচালনা করার স্বকৃত বিন্যাস। এরই তো নাম অরাজকতা। এই সমাবেশের রাজনীতিবিরোধিতার ভেতরে সুপ্তভাবে হলেও আছে ‘অরাজ’-এর ধারণা: অরাজনীতি, অরাজতন্ত্র। অন্য ভাষায় একেই বলে নৈরাজ্য। নৈরাজ্য মানে স্বাধীনতা। নৈরাজ্য মানে স্বনিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মকর্তৃত্ব। নৈরাজ্য মানে ‘আমরা সবাই রাজা’। সুপ্ত এই উপাদানগুলো ক্রমশ স্পষ্ট ভাষায় যতো বেশি প্রকাশিত হয়ে উঠবে, শাহবাগ-সমাবেশ ততো বেশি এগিয়ে যাবে তাহরির স্কয়ারের দিকে। আরবিতে ‘তাহরির’ মানে কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ই বটে। শাহবাগ-চত্বর ঠিকই এগিয়ে চলেছে স্বাধীনতা-চত্বরের দিকে।
নব্বুইয়ের শুরুতে আরম্ভ হওয়া আইনের শাসনের অগোছালো বোলচাল ১/১১-তে আইনের সুসংগঠিত বিভীষিকাপন্থার দাঁত-নখ-পেশী দেখিয়েছিল। তারই অনুরাগে (কিছু পরে কিছু আগে) কর্তৃপক্ষীয়, চাপিয়ে-দেয়া, শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচারণা মাধ্যমে এতদিন শুনে আসলাম: ‘আইন তার নিজের গতিতে চলবে’! এখন দেখছি খোদ ‘আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল’-এর আদেশ লোকে মানছে না। আদালতের জন্য লজ্জার কথা। এ তো রীতিমতো আদালত অবমাননা। এই ক’দিন আগেও যে হাইকোর্টের হাইথট-ওয়ালা সব রুলজারির কথা শুনছিলাম, রেডিওতে কীভাবে বাংলা বলা হবে, হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে উপন্যাস লিখবেন ইত্যাদি প্রভৃতি কিছুই বাদ যাচ্ছিল না আইনের সুদীর্ঘ হাতের নাগাল থেকে, সেই হাইকোর্ট এখন চুপচাপ। তাজ্জব বটে।
রাস্তায় সমাবেশ নাকি অবৈধ! রাস্তায় সমাবেশ করলে গাড়ি চলতে অসুবিধা হয়, পণ্য-পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। সেই রাস্তা অধিকার করে সমাবেশ চলছে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা, লাগাতার। আশ্চর্য ব্যাপার। অধিক আশ্চর্যের ব্যাপার: বেয়াদব জনসাধারণ এই রাস্তা-অধিকার-করা আন্দোলন নিয়ে বিরক্ত হচ্ছেন না, মিডিয়ার কাছে নালিশ করছেন না, উল্টো বাড়ি থেকে ভাত এনে ছেলেমেয়েদের খেতে দিচ্ছেন। বাবা এগিয়ে দিচ্ছেন তার মেয়েকে। মা দোয়া করছেন ছেলের জন্য। বান্ধবী বন্ধুকে ফেসবুকে মেসেজ পাঠাচ্ছে: ‘বাড়ি ছেড়ে পালালাম; শাহবাগে যাচ্ছি।’
আইনের শাসন আপাতত উধাও তাহলে! যেকোনো সমাবেশ করার জন্য, মাইক ব্যবহার করার জন্য, মেট্রেপালিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন পেশ করতে হবে। তারপর তারা দয়া করে অনুমতি দেবেন (আদৌ যদি দেন)। কোথায় গেল সেইসব কর্তৃপক্ষীয়, চাপানো আইন-কানুন? আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী না হয় এই আন্দোলনে লাভবান হবেন ভেবে সৌজন্যবশত এর ওপরে মরিচের গুঁড়া ছিটাচ্ছেন না। কিন্তু ‘জনদুর্ভোগ’! কোথায় ‘প্রথম আলো’? কোথায় গেল তাদের এতোদিনকার প্রিয় এজেন্ডা? মানুষ এতো নির্লজ্জ হয়! না, হয় না। আসলে মানুষ এতো নির্লজ্জ হয় না: কিন্তু পুঁজি হয়, ক্ষমতা হয়, সার্কুলেশন হয়। ওগুলো আসলে মানুষ না, মনুষ্যোচিত না, মনুষ্যবান্ধব না। শাহবাগের সমাবেশ যতোদিন এসবের দিকে মন না দেবে ততোদিন আমাদেরকে কর্মময় অপেক্ষার উপাসনা করে যেতে হবে বৈকি। আপাতত পুলিশ-র্যাবের পাহারা আর মিডিয়ার অতি-তেলে তৈলাক্ত হওয়ার বিপদ সম্পর্কে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে কিন্তু।
আইনত এখনও মাঘ মাস, শীতের রাজত্ব। তবু বেআইনত যে ফাল্গুনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে! বোঝা যাচ্ছে, মানুষ রাস্তায় নামলে সব কিছু বদলে যায়। বিচারবিভাগ দুশ্চিন্তায় পড়ে। পুলিশবিভাগ রুটিন দায়িত্বের বাইরে বেরুনোর আগে ভাবে। মিডিয়া একটা অরাজক আন্দোলনকে কাভার করার জন্য রাত জাগে। আর রাজনীতিবিদেরা ভাবতে থাকেন: আমাদের দিন কি ফুরিয়ে যাবে? এইসব বাচ্চা কাচ্চারা সময়মতো দুধভাত খেতে ঘরে ফিরবে তো?
আসলে দশচক্রে ভগবান ভূত। দশ যেখানে, ভগবানও সেখানে। বহুমত আর বৈচিত্র্যই এই আন্দোলনের শক্তি। সেজন্যেই এর মধ্যে রাজনীতিকরা ঢোকার চেষ্টা করছেন। একটু-আধটু ঢুকেও পড়ছেন রাষ্ট্রক্ষমতার জোরে। তারা নিজেরা যদি এরকম সমাবেশ ডাকতেন, দলীয় কর্মীরা ছাড়া কেউই আসতেন না, সে কথা সবারই জানা। সেজন্যই তরুণদের প্রাণবন্ত সমাবেশে সরীসৃপের মতো ঢুকছে রাজনীতি। ঢুকছে ষড়যন্ত্রও। ষড়যন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে হলে শাহবাগ-সমাবেশকে ইতোমধ্যে বিদ্যমান বহুমত-বৈচিত্র্য-রাজনীতিবিরোধিতা ধরে রাখার পাশাপাশি আনুভূমিক ও গণতান্ত্রিক নতুন সাংগঠনিক কাঠামো এবং নতুন ভাষা সৃজন করতে পারতে হবে। এটাই তাদের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।
রাস্তায় এতদিন শুধু জামায়াত ছিল। তাদের পেট্রো-ডলারের দাপট ছিল। কালো টাকায় কেনা, কালো টাকায় ভাড়া করা অস্ত্র এবং অস্ত্রধারী ছিল। কাঁচের শিশির পেট্রোলবোমা ছিল। এখন নিরস্ত্র-কিন্তু-স্বপ্নসশস্ত্র মানুষও রাস্তায় নেমেছেন। আনন্দ সংবাদ।
রিক্লেইম দ্য স্ট্রিট!‘: ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপীয় মুলুকে আমাদের লড়াকু তরুণদের বহুদিনের আদরের শ্লোগান। ষাট-সত্তর দশকের ইউরোপ-জোড়া প্যারিস-বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রমচোষা-রক্তচোষা মালিকদের হাত থেকে শিক্ষার্থী-শ্রমিকদের কলকারখানা পুনর্দখল-আন্দোলন আর প্রশাসক-প্রফেসরদের হাত থেকে ক্যাম্পাস কব্জা করার আন্দোলন; বর্ণবাদ-পুরুষতন্ত্র-শ্রেণিবৈষম্য-বিরোধী আন্দোলন, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন; আশির দশকের যুদ্ধবিরোধী-আগ্রাসনবিরোধী-পরমাণু অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন; নব্বুইয়ে এবং তার পরের দশকে পুঁজির বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সিয়াটল-জেনোয়া-কানকুনের আন্দোলন আর আফগানিস্তান-ইরাক-যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন; এবং তারপর এই একুশ শতকে এসে লন্ডনে ছাত্রবেতনবিরোধী শিক্ষার্থী-আন্দোলন ও ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপ-জোড়া পুঁজিবাদবিরোধী অকুপাই-আন্দোলন: এই সমস্ত আন্দোলনের প্রধানতম আইডিয়া এবং শ্লোগান ছিল ‘রিকেইম দ্য স্ট্রিট!’
না, রাজপথ দখল নয়: রাস্তার জনমালিকানা নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা। রাজপথ তো রাজার। রাজা যায়, রানি যায়, বাঁশি বাজে, পথিক আটকে থাকে, পাজেরো ছোটে প্রাসাদের দিকে। আর রাস্তা মুসাফিরের। রাস্তা পথিকের। রাস্তা অনুসন্ধানের। সেই রাস্তার পুনঃমালিকানা দাবি করেছে শাহবাগের সমাবেশ।
বিগত কুড়ি বছর ধরে আমাদেরকে শেখানো হচ্ছে, মিডিয়া-মুখস্ত করানো হচ্ছে:পার্লামেন্টই সকল সমস্যার সমাধানের উৎস। পার্লামেন্টে যে নাই, আইনত সে নাই। সে অস্তিত্বহীন: নন-এগজিস্টেন্ট। পার্লামেন্টারি-রাজনীতির ঘেরাটোপে গড়া এই আইনের শাসনের যুগে শাহবাগ-মহাসমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা শপথ অনুযায়ী রাস্তায় আন্দোলন হবে ‘গণমানুষের নেতৃত্বে’। হায়, হায়। পার্লামেন্টের কী হবে? বাংলাদেশের নিওলিবারাল পুঁজির উচ্ছিষ্টভোজীদের কী হবে? ‘প্রথম আলো’র সুশীল সমাজের কী হবে?
হ্যাঁ, তারা চাইবেন এই সমাবেশ শুধু আওয়ামী-ক্যাম্পের সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করে সুশীল বালক-বালিকার মতো ঘরে ফিরে যাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ শুধু ফাঁসি ফাঁসি করেই চিল্লাক। তারা চাইবেন: এই সমাবেশ ১৯৭১-এর চেতনায় ‘জনগণের, জনগণের-জন্য, জনগণের-দ্বারা’ পরিচালিতব্য বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে মনোনিবেশ না করুক। কিন্তু সেটুকু করতে না পারলে স্রেফ গুটিকয় রাজাকারের ফাঁসি দিতে পারলেই কি একাত্তরের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পাবো আমরা, একাত্তরেরই ঘোষণা মোতাবেক যে বাংলাদেশের মালিক এদেশের জনসাধারণ?
সুতরাং শাহবাগ-সমাবেশকে ভাবতে হবে নতুন ধারার, সত্যিকারের গণমুখি সংগঠন-সংস্থা-সংঘ-সমিতি-প্রতিষ্ঠান-সমাজ-বিন্যাস-কাঠামো নিয়ে। আজ শুধু এটুকু উচ্চারণ করে রাখি: মুখস্ত শ্লোগান, গতানুগতিক আইডিয়া আর সংকীর্ণ কথাবার্তার মধ্যে নিজেদেরকে পরিসীমিত করে রাখলে আমরা সরকার-স্পন্সরড, মিডিয়া-তেলে-তৈলাক্ত একটা অসার ফাঁসি-আন্দোলনে পর্যবসিত হবো মাত্র। তারপর ফাঁসি টাসি শেষ হয়ে গেলে ঘরে ফিরে দেখব আমাদেরই গলায় সেই চিরপুরাতন রাজনীতির ফাঁসটা লেগে আছে: নেতারা পার্লামেন্টের খোঁয়াড়ে চেঁচাচ্ছেন, পরস্পরকে খুন করছেন, সাগর-রুনির আত্মা হাহাকার করে চলেছে, ক্রসফায়ার-গুম-রিমান্ডের বিধান আরো বিকশিত হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের যে রাজনৈতিক অচলায়তন, সেটিকে ভেঙে দেশকে সত্যিকারের নতুন পথে এগিয়ে নিতে হলে, তরুণদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। কোনো পার্টি, কোনো মতাদর্শ-শাস্ত্র, কোনো সংসদ, কোনো আদালত, কোনো সশস্ত্রবাহিনী, কোনো রাজ-বুদ্ধিজীবীই এই সংকটের সমাধান ঘটাতে পারবে না। কেননা এঁরা সবাই মিলেই তো তিল তিল করে এই মহাসংকট, মহা-অচলাবস্থা তৈরি করেছেন।
পার্টিগুলো নিজেদের পেট-পকেট-প্রভুর দালালি করেছেন। মতাদর্শ-শাস্ত্র-গুলো মানুষকে অন্ধ করেছে, বিভক্ত করেছে, মুক্ত ভাব বিনিময়ের অযোগ্য করে তুলেছে। সংসদ-সদস্যরা কোনোদিন নীতির পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, বিবেকের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি; নমিনেশন কিনেছেন আর সরকারি তহবিল ও আপামর মানুষের কাছ থেকে মেরে-ধরে খাজনা আদায় করে নমিনেশনের টাকা পূরণ করার লুটপাট করেছেন। সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করা আদালত বারবার আমাদের মহাসংকটে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো পাথর হয়ে থেকেছেন। বৈধতা দিয়েছেন একের পর এক স্বৈরতন্ত্রকে বন্দুকের ভয়ে। বিবেকের ভয় তাদের ছিল না। এই সেদিনের ১/১১-তেও তারা একই কাজ করেছেন নির্লজ্জের মতো। আর সশস্ত্রবাহিনী একের পর এক অভ্যুত্থান, রক্তপাত, মারামারি, হানাহানি, মিথ্যাবিচার, গণফায়ারিং স্কোয়াড, উপর্যুপরি সামরিক শাসন জারি করে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করেছেন, মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন স্রেফ ভয় দেখিয়ে, বন্দুকের জোরে। তো, আজকে বিপুলতম আকার ধারণ করা এই সর্পিল, পিচ্ছিল, প্যাঁচানো, কর্দমাক্ত মহাসংকটটা যারা নিজেদের হাতের বানিয়েছেন, আর যাই হোক সেই সব লোক-মত-ধারা এই সর্বগ্রাসী সংকটের সমাধান করতে পারবে না। এটা কমনসেন্স।
সংকট সমাধান করবেন কে তাহলে? করবেন তারাই যাঁরা এই সংকটের শিকার হয়ে খাঁচাবন্দি হয়ে আছেন যুগ যুগ ধরে। এই খাঁচাবন্দি মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এবার, ছোট ছোট জানালা খুলে ফেলেছেন প্রযুক্তির কল্যাণে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগ, নানান ওয়েবসাইট, গান, কবিতা, ছোটকাগজ, হাজারটা মিডিয়া এবং সর্বোপরি প্রেম-ভালোবাসা-ভাববিনিময়ের ভেতর দিয়ে তারা পরস্পরকে চিনছেন-জানছেন কোনো শাস্ত্র-মতাদর্শ ছাড়াই, অন্ধবিশ্বাস ছাড়াই, খোলামনে। তারা তর্ক করছেন, বিতর্ক করছেন, একমত হচ্ছেন, লাখো ধারায় কাজে নেমে পড়ছেন: কিছু না কিছু কাজ। আত্মপ্রকাশের আনন্দে তারা বিভোর হয়ে আছেন। আত্মপ্রকাশের এই আনন্দই স্বাধীনতা। সরকারি আইন-কানুনের বাইরে, সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের বাইরে তারা ক্রমাগতভাবে আত্মকর্তৃত্বের-আত্মমর্যাদার রূপকাঠামো-বিন্যাসের কল্পনা করতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই।
জেগে উঠতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই জাগরণেরই প্রথম, বৃহত্ ঝাপ্টা এসেছে আজ শাহবাগে ফাল্গুনের ঈষদুষ্ণ বাতাসের রঙ মনে মেখে। ফাল্গুন আমাদের চিরকালের দ্রোহ আর প্রেমের পয়গাম। নতুন এই বাংলাদেশের প্রায় সক্কলেই রাজনীতিবিরোধী। রাজনৈতিক দলকে তারা আর বিশ্বাস করেন না। পার্লামেন্টকে তারা বিশ্বাস করেন না। আদালতের স্বচ্ছতা নিয়ে তারা সদাসন্দিহান। পুলিশ-র্যাব-সেনাবাহিনীকে দেখলেই তারা ভয় পান: এই বুঝি কোনো অঘটন ঘটে। মিডিয়াকে তারা সংকীর্ণ স্বার্থের ভাণ্ডারি মনে করেন। মুখস্ত বুলি আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদেরকে মনে করেন বাঁচাল, দালাল। পুরানো বাংলাদেশের দিন শেষ। একাত্তরের রক্তসূর্য যে নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে উদিত হয়েছিল, সেই বাংলাদেশকে আগাগোড়া ঢেলে সাজিয়ে নতুন বাংলাদেশের বিন্যাসের ছবি আঁকার এটাই সময়।
বছরের পর বছর ধরে কবি সাহিত্যিক লেখক শিল্পী চলচ্চিত্রকর্মী ছোটকাগজকর্মী প্রকাশনাকর্মী ব্লগার ইন্টারনেট-অ্যাকটিভিস্ট ওয়েবসাইট-ডিজাইনার স্থপতি ভাস্কর ফটোগ্রাফার সাংবাদিক কম্পিউটার-বিজ্ঞানী সফটওয়ার-প্রোগ্রামার নাট্যকর্মী মুক্ত-সফটওয়ার-অ্যাকটিভিস্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থী ব্যবসা-উদ্যোক্তা ইত্যাদি প্রভৃতি শত ধরনের তরুণ-যুবারা ছবিরহাট চারুকলা জাদুঘর শাহবাগ সোহরাওয়ার্দী-উদ্যান চত্বরকে ঘিরে আড্ডা মেরে চলেছেন। অথচ ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা এই পুরো এলাকাটাকে গাঁজাখোরদের নোংরা একটা জায়গা বলে এতোকাল নাক সিঁট-কিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের ‘বেলেল্লাপনা’র জায়গা বলে বাঁকা চোখে তাকিয়েছেন এর দিকে। আজ সব সমালোচনা উপেক্ষা-উন্নাসিকতাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শাহবাগ জ্বেলেছে আমাদের আশার প্রদীপ । (উল্লেখ্য: ঢাকার বাইরের সমাবেশগুলোর পেছনে এই কমিউনিটি হয়ে ওঠার চর্চা এখনও ভালো করে দাঁড়ায়নি বলেই পরিবর্তনের এই মুহূর্তেও সেগুলো নেতাদের গতানুগতিক বক্তৃতাবাজিতে সরগরম হয়ে আছে।) পৃথিবীর সমস্ত বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-বাহাস-পড়াশোনা-হাসি-তামাশা-আনন্দ-মেলামেশা-প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর শাহবাগের দুর্দান্ত প্রাণবন্ত আড্ডা গত দুই দশকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মে শ্রেষ্ঠতম গণবিশ্ব-বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এটা হয়ে উঠেছে সৃজনবৈচিত্র্যে গমগম করা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিক্ষেত্র। ফান্ড দিয়ে, আমলা দিয়ে, প্রজেক্ট দিয়ে, এনজিও দিয়ে এরকম অবাধ স্বাধীনতাপূর্ণ একটা শিল্প-সৃজন-বিকাশ-অভয়ারণ্য বানানো যায় না। স্বাধীনতাই তো সৃজনশীলতার ধাত্রী। এই ধাত্রীই শত সহস্র তরুণ-যুবককে মানসিকভাবে সাবালক করে তুলেছে, আন্তরিক একটা বিরাট নিবিড় কমিউনিটি গড়ে তুলেছে শাহবাগে।
রাষ্ট্র মাস্তান মন্ত্রী ঠিকাদার এমপি দারোগা র্যাব প্রফেসর ক্যাডার জঙ্গি হুজুর গুরু পুরুৎঠাকুর হোমরা চোমরা এলিট-মহাজনদের সার্বক্ষণিক অত্যাচারে তো খোদ আমাদের সমাজটাই আজ কারাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কোথায় আমাদের সেই ছোটবেলার পাড়া-মহল্লা? সেখানে সবাই সবার বন্ধু ছিল, আত্মীয় ছিল। মারামারি-ঝগড়াঝাটি-কান্নাকাটি শেষে আবার সবাই একসাথে হাসতে হাসতে খেলতে শুরু করার সমাজ-সম্প্রদায়-গ্রাম আজ কোথায়? রাষ্ট্র এবং নির্বাচিত-অনির্বাচিত আমলাতন্ত্র আজ একেবারে তলার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত তার শূঁড় দিয়ে সব কিছু শুষে নিচ্ছে। এখন সব ‘ওয়ার্ড’, ‘ইউনিয়ন’, ‘উপজেলা’, ‘নির্বাচনী এলাকা’। এখন সবাই গলায় কুকুরের বেল্টের মতো পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে নাগরিক হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন সবাই ভোটার মাত্র। এখন সবাই ক্রেতা মাত্র। এখন সবাই যেন ‘কোকাকোলা-দল’ না হয় ‘পেপসি-দল’ হতে বাধ্য। সবাই এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ, কংগ্রেস-বিজেপি, ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান। আর যেন পথ নাই, সমাজ নাই, সম্প্রদায় নাই, মা নাই, বাবা নাই, বয়োজ্যেষ্ঠর সম্মান নাই, ছোটদের আদরযত্ন নাই, বন্ধু-বান্ধব নাই। শুধু মারমার-কাটকাট প্রতিযোগিতার ছ্যাবলামি। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ বিগত দুই-আড়াই দশক ধরে গড়ে ওঠা সমাজ-সম্প্রদায়-পাড়া-কমিউনিটি-বন্ধুত্ব-বোধেরই ফল। জ্ঞাতসারে হোক বা অজ্ঞাতেই হোক: আজকের শাহবাগ-স্বাধীনতা রাষ্ট্রের খপ্পর থেকে খোদ সমাজকে উদ্ধার করার, মুক্ত করার, সমাজের আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার অজস্রমুখি প্রচেষ্টার ফল। তাই তো আজ ফিরে আসছে একাত্তরের নয় মাসের মতো সর্বব্যাপী, বহুবৈচিত্র্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত সমাজ-সম্প্রদায়-আত্মীয়তা-বন্ধুত্ব।
শাহবাগ এখনকার মতো যদি ফুরিয়েও যায় আরো অনেক শাহবাগ আসবে। অকুপাই-আন্দোলনের শ্লোগান উচ্চারণ করে বলি: ‘দ্য বিগিনিং ইজ নিয়ার’ (সন্নিকটেই শুরু)। এই গণজাগরণ কোনো না কোনো ভাবে আবার আত্মপ্রকাশ করবে। শাহবাগের স্মৃতি কখনো হারিয়ে যাবে না। খুন-গুম-ক্রসফায়ার, রাষ্ট্রীয় মাস্তানি, দলীয়করণ, দালালি, চামচামির বাইরে তরুণ-জনসাধারণ এবার সুনির্দিষ্ট-ভাবে ভাবতে শুরু করুক কেমন বাংলাদেশ তারা চান। কেমন পুলিশ চান, কেমন আদালত চান, কেমন জনপ্রতিনিধিত্ব চান। এগুলো নিয়ে সত্যিকার অর্থেই সর্বাত্মক-রূপান্তরধর্মী চিন্তা গড়ে তুলতে পারাই আজকের শাহবাগ-সমাবেশের প্রধান কাজ। কথাটা অল্পবয়েসী তরুণ এবং বৃদ্ধ-বয়স্ক তরুণেরা যদি মনে রাখেন আর নিজেদের মাথা ও আত্মকর্তৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন, বদলে যেতে শুরু করবে বাংলাদেশ। আগামীর সেই বৃহত্তর বাংলা-বসন্ত আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে।
এই ফাল্গুনেও পূর্ণাঙ্গ বসন্ত এখনও আসে নি বটে। এখনও প্রস্তুতি পর্ব চলছে শাহবাগে আর সারাদেশে। প্রস্তুতি এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু হবে। অচিরেই হবে। যখন-তখনই হবে। হয়ত সামনের কোনো শীতকালেই হবে। বসন্ত তো শীতেই আসে, তাই না? ঠিক যে: আর্থ-রাজনৈতিক দল-শক্তিগুলো এবং তাদের মিডিয়া সংকীর্ণ একটা মেডিয়েটেড বসন্ত বানানোর চেষ্টা করছে নানা কারণে। তবু সেটা ঠিক তাদের মতো ইচ্ছানুযায়ী দাঁড়াচ্ছে না কিন্তু। আরব বসন্ত তো আর মিডিয়া দিয়ে বানানো যায় না: বাংলা-বসন্তও না। হ্যাঁ, যেকোনো প্রকৃত গণআন্দোলনকে ঘিরেই সব ধরনের ক্ষমতাশীলমহল প্যাঁচ কষতে থাকেন। তবু যে বালিকারা বালকদের সাথে ক্রোধের আনন্দে নাচছেন তাতে আমি আনন্দিতই বটে। এই সাক্ষাত্, নারীর সাথে পুরুষের, বড়দের সাথে ছোটদের, শিক্ষিতদের সাথে রিকশাওয়ালাদের, এ আমাদের সমাজের যাবতীয় অসামাজিক ব্যাধি-বালা-মুসিবত কমাবে, বাড়াবে সমাজের স্বাধীনতার সীমা: রাষ্ট্র-রাজনীতির একচ্ছত্র রাক্ষস-ক্ষমতার বিপরীতে। সুসমাচার বৈকি। বসন্ত যে এই বঙ্গে আসার জন্য মুখিয়ে আছে সেটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে: শাহবাগে, সারা বাংলাদেশে। আজকের শাহবাগ-সমাবেশ সেই বাংলা-বসন্তের আগাম ফাল্গুনী ইশতেহার।
নোট: রচনাটি ছাপা হয়েছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম-এ ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে এবং দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে। পরে রচনাটি লেখকের অচেনা দাগ গ্রন্থতে সংকলিত হয়।
অপরাধী মাত্রই তাকে আর মানুষ নয়, গণ্য করা হয় আত্মাহীন হিংসাত্মক প্রাণীতে, যাকে বন্দী না করলে সমাজ সহিংসা আক্রান্ত হবে! আর তাই কারাগার-বন্দিশালা-কয়েদখানা হয়ে ওঠে অবিসম্ভাবী। ‘আইন’ ‘বিচার’ ‘দণ্ড’ সমস্তটাই তৈরি হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বর মাধ্যমে। সার্বভৌম ক্ষমতা মাত্রই ত্রাসের মনোপলি। সাধারণ সংকল্পর নামে বিশেষাধিকার প্রাপ্তদের সংকল্প এবং সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসা হলো এই সার্বভৌমত্ব— রাষ্ট্রক্ষমতার আত্মা! তাই যাবতীয় আইন, যাবতীয় বিচার, যাবতীয় দণ্ড বিশেষাধিকারের স্বার্থে।
আদতে বিশেষাধিকার টিকে থাকে ‘ভয়ে’। দণ্ড সেই ভয়। কারাগার সেই ভয়। কারাগার প্রথমেই ছিনিয়ে নেই আপনার আব্রু। আপনার শরীরের একান্তকে। শনাক্ত করা হয় আপনার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সুরাতহালের পরই সমস্ত আপনীয়তা ও তার বোধকে নিশ্চিহ্ন করে আপনার উপরে আরোপ হয় নজরদারি। আপনি হয়ে ওঠেন পাপপরায়ণ একটি বস্তু! এমন বস্তু যাকে পরিণত করতে হবে দণ্ডনীতির অনুসরণকারী যন্ত্রমানবে। আপনাকে হতে হবে সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসার দাস! দাসত্ব একটি নিয়মিত কারা- শৃঙ্খলা।
শৃঙ্খলা মাত্রই তা স্বাধীনতা বন্ধকী। শৃঙ্খলা এই ভয় আর হিংসাকেই পুণরুৎপাদন করে। আপনার খাদ্যগ্রহণ- আপনার পরিধান- আপনার বাস-স্থানকে করে তোলা হয় নিষ্ঠুরতাপূর্ণ। আলোহীন মলমূত্রময় শুঁটে লাগা কক্ষটিই হয়ে ওঠে আপনার সঙ্গ। নিপীড়ন যেন পাপমোচনের অমোঘ পদ্ধতি– মহৌষধ । নিষ্ঠুরতার নিপীড়নই কারা-শাসন প্রণালী।
২০০৭ সালে সেনা-কর্তৃত্বের জরুরি জমানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হওয়ার দায়ে সেলিম রেজা নিউটন কারাবন্দী হন। মুক্তির পর কারাগার নিয়ে তিনি একগুচ্ছ প্রবন্ধ রচনা করেন। বিড়ালের জেলখানা তার মধ্যে অন্যতম। রচনাটি ২০০৮ সালের, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা। প্রথম প্রকাশ হয় প্রবাসী বাঙালিদের লন্ডনভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা ইউকেবেঙ্গলি তে। ৪ঠা মে ২০০৮ সালে। পরে রচনাটি লেখকের অচেনা দাগগ্রন্ত্রে সংকলিত হয়েছে। বর্তমান সংস্করণটি সেখান থেকেই নেয়া। -সম্পাদক
আর্টওয়ার্ক: প্রিজন অব মাইন্ড শিল্পী: ফরহাদ সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
জেলখানার জেনেসিস
মানুষের জন্য প্রথম যখন জেলখানা বানানো হলো, কোনো লোক সেই জেলে যেতে চাইলো না। জেলের কর্তারা তখন পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন, মানুষ আদৌ ঐ জেলের ভেতরে থাকতে পারবে কিনা। কুকুরকে বলা হলো কয়েদখানার ভেতরে যেতে। কুকুর রাজি হয় না। তখন ভেতরে মাংশ, হাড় ইত্যাদি অনেক ভালো ভালো খাবার রেখে আসা হলো। এবার প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলো, আর কুকুরকে আবার অনুরোধ করা হলো। কুকুরেরা ঢুকল। আয়েশ করে খাবার-দাবার খেল, গোটা জেল ঘুরে-ফিরে দেখল, তারপর সোজা গেট দিয়ে বের হয়ে গেল। রাজি হলো না থাকতে তারা জেলের ভেতরে। কিন্তু হাল ছাড়লেন না কারা-কর্তৃপক্ষ। এবার পাঠানো হলো বিড়ালদেরকে, আর ভেতরে রাখা হলো মাছ, দুধ ইত্যাদি প্রভৃতি। বিড়ালেরা ঢুকল, খাওয়াদাওয়া করল, এবং থেকে গেল জেলেরই ভেতরে। উল্লসিত কয়েদ-কর্তারা: বিড়াল যখন থেকে গেল, মানুষও পারবে।
কয়েদির হাসি ও হেঁয়ালি
আশ্বিনের আকাশ-ভর্তি উজ্জ্বল আলোর মতো হাসিভরা মুখ নিয়ে এই গল্প আমাদেরকে বলল আলমগীর। আলমগীর ওরফে জাহাঙ্গীর, পিতা: জাকির হোসেন, কয়েদি নম্বর: ৯৩১৯, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কয়েদির হাসি। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কয়েদির টুপিতে জ্বলজ্বলে লাল-নীল সুতা দিয়ে ফুল-তোলার মতো করে আঁকানো চারটা সংখ্যা ৯৩১৯, আলমগীরের নিজের হাতে করা কারুকাজ, যে হাত দিয়ে এলজি বহন করার দায়ে আজ ১২ বছর হলো সে কারাগারের রাক্ষসপুরীতে ঘানি টানছে, টানতে হবে আরও কয়েক বছর। কৌতূহল আর জিজ্ঞাসার সিরিয়াস একটা দ্রবণে আমার চেহারা ভিজিয়ে আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, বিড়াল পারলে মানুষও পারবে, এর মানে কী আলমগীর? আলমগীর হাসে। হেঁয়ালি-ভরা, আকাশ-ভরা হাসি। ওর কাছে, ওর অভিজ্ঞতার কাছে, ওর গল্প-সত্তার কাছে নিজেকে আমার নিছক একটা খেলনা বলে মনে হলো। পরে অনেক জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু সেই নিরুত্তর হাসি।
নিজে আমি ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি। পোষ-মানা বিড়াল হচ্ছে সেই প্রাণী, যাকে আপনি যতই মারেন যতই ধরেন সে আপনার বাসায় আবার ফিরে আসবে। শারীরিক নিগ্রহ সহ্য করার ক্ষেত্রে বিড়ালের তুলনা মেলা কঠিন। পাঁচ-তলার ছাদ থেকে মাটিতে ফেলে দেন, উঠে একটু গা-ঝাড়া দিয়ে হেঁটে চলে যাবে। অতিশয় শক্ত জান বিড়ালের। আবার, গল্পটা হয়ত এ-কথাও বলতে চাইছে যে জেলখানা নামক ধারণাটার আড়ালে আছে এই মনোভাব যে: মানুষ হচ্ছে কুকুর-বিড়ালের মতোই আরেকটা জন্তু মাত্র। গল্পটার মধ্যে কি এই আভাসও আছে যে জেলের বন্দিত্ব আর নিগ্রহ সহ্য করতে গেলে বিড়ালের মতো ‘অমানবিক’ জীবনের অধিকারী হতে হবে? নাকি ইশারাটা এই যে, জেলে পুরে রাখতে পারলে মানুষ পরিণত হবে বিড়ালে? আমি থৈ পাই না।
বিড়ালের স্বাধীনতা, মানুষের দাসত্ব
কারণ যা-ই হোক, কারাগারে কুকুর দেখি নি। একটাও না। কিন্তু বিড়াল আছে, ছানাপোনা সংসার-সহকারে আছে। বিশাল জানালার লোহার গরাদে গাল রেখে ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি বিড়ালের মা তার সন্তানকে শেখাচ্ছে কেমন করে লাফ দিয়ে আক্রমণ করতে হয়, কেমন করে আত্মরক্ষা করতে হয়, কেমন ক্ষিপ্রতার সাথে থাবা আর দাঁতের ব্যবহার করতে হয়। দেখেছি মধ্যরাতে সন্তানের জন্য খাবার খুঁজতে লক-আপের লোহার ফাঁক গলে আমাদের ওয়ার্ডে ঢুকছে বিড়ালের মা। দেহধারণের জন্য ক্ষুধা-নিবারণ, আর নিজের সিদ্ধান্তে চলার জন্য আত্মরক্ষা-আক্রমণ: বিড়াল তাঁর প্রকৃত প্রজাতি-সত্তা এতটুকু বিসর্জন দেয় নি।
সামান্য বিড়ালকেও তার স্বাধীন স্বভাব থেকে বশীভূত করতে পারে না জেলখানা। অথচ কয়েদ আছে মানুষকে পরাভূত-বশীভূত করার খায়েশে। আল্লাহ – চাইলে আপনি মা-প্রকৃতিও বলতে পারেন – মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জন্মসূত্রে স্বাধীন সত্তা হিসেবে। আর সেই কবে থেকে সমস্ত মানুষকে অল্প কিছু মানুষের দাস বানানোর জন্য শারীরিক ও মানসিক বলপ্রয়োগের একগাদা সশস্ত্র প্রতিষ্ঠান খুলে বসে আছে কতিপয় লোক। নিজেদেরকে এরা বলে কর্তৃপক্ষ, আমি বলি ইবলিস। কর্তৃত্ব-কর্তৃপক্ষ-ইবলিস চায় মানুষ তার গোলামি করবে। আল্লাহ চান মানুষ স্বাধীনভাবে মোমিন মানুষ হয়ে উঠবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাই মোমিনের ঈমানের অঙ্গ। অস্ত্র আর শাস্ত্রের জোরে মানুষকে ইবলিসের দাসে পরিণত করার প্রচেষ্টার ইতিহাস হচ্ছে কারাগারের ইতিহাস।
প্রত্যেক কারাগারই আদিতম কারাগার
বিড়ালের গল্পটার উৎপত্তি চট্টগ্রাম জেলে। চট্টগ্রামের জেলখানাটা বানানোর সময়ই ঐ কুকুর-বিড়াল পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হয়েছিল বলে গল্পে প্রকাশ। গল্পের পেটের মধ্যে এই ইঙ্গিতও আছে বলে আমার বিশ্বাস। সেটা হলো, তুমি যে জেলখানায় বন্দি ঐটাই পৃথিবীর আদিতম এবং একমাত্র জেল। এর আগে অতীতে কোনো জেলখানা ছিল কিনা, কিংবা বর্তমানে আর-কোথাও কোনো জেলখানা আছে কিনা তাতে তোমার কী আসে-যায়? বন্দির বিবেচ্য হচ্ছে বন্দিত্ব। বন্দির বিবেচ্য হচ্ছে স্বাধীনতা। তো, আলমগীর পৃথিবীর ঐ প্রথম জেলখানার লোক – চট্টগ্রামেরই ছেলে। পাহাড়ে সুড়সুড়ি খেয়ে নামতে নামতে, আর সমুদ্রে সুতা-বাঁধা বয়া ধরে দূর নীলে ভাসতে ভাসতে শৈশব পার করেছে সে। তারপর কৈশোর ঠিক মতো পেরিয়েছে কি পেরোয় নি, অভাবের ধাওয়া খেয়ে জেলে ঢুকেছিল নব-তরুণ। সাত সমুদ্র তের জেল ঘুরেফিরে চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই এখন সে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। জেল বিষয়ে তাঁর মতো বিশেষজ্ঞ কমই আছে।
আর্টওয়ার্ক: প্রিজনার শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
নির্যাতনের জাদুঘর
আলমগীরই প্রথম জানালো, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার আদতে বৃটিশের তৈরি করা ‘সাঁওতাল পানিশমেন্ট জেল’। আস্তে-ধীরে বিভিন্ন কয়েদি এবং ‘বাবু’র কাছ থেকে জানা গেল আরও নানা তথ্য। (সবচেয়ে কম বেতনভোগী গরিব কারাকর্মচারী ও কারারক্ষীদেরকে কয়েদিরা বলেন ‘বাবু’।) সাঁওতালদের বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষত তাঁদেরই শায়েস্তা করার জন্য ১৮৪০ সালে এই কারাগারের পত্তন ঘটায় বৃটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুরা।
এই সুসভ্য প্রভুরা বন্দিদেরকে নির্যাতনের জন্য বানায় ভয়ঙ্কর সব সেল আর অন্য-সব ব্যবস্থা। যেমন অন্ধকার নির্জন কবর-সেল: তাতে কোনো মতে শ্বাস নেওয়ার জন্যে সামান্য একটি বাঁকানো পাইপের আউটলেট, যেন বন্দিকে বোঝানো যায় কবরের আজাব বলে কাকে। এখনও আছে এই সেল, প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানে। অব্যবহৃত। ঢোকার দরজা মাটি দিয়ে ভরাট করে বন্ধ করে-দেওয়া। ছিল জোঁক-সেল, তাতে কখনো জোঁক কখনো শিং মাছ রাখা হতো কয়েদিদেরকে বিশেষ শিক্ষা দেওয়ার জন্য। ছিল ঘনকের আকৃতিসম্পন্ন কিউবিক্যাল সেল: এত ছোট, ঘাড় তুলে যেন কেউ দাঁড়াতে না পারে। এখনও আছে কণ্টক-সেল: মাথার ওপরে আর ডানে-বাঁয়ের দেয়ালে শত শত লোহার কাঁটা, পেরেক বা গজালের মতো, তারই মধ্যে এক চিলতে জায়গা, কোনো মতে শোয়া যায়, সামান্য নড়া-চড়া করতে গেলেও গা রক্তাক্ত হবে। এই কাঁটা-সেলগুলো এমডি’র ভেতরে (ম্যানুফ্যাকচারিং ডিপার্টমেন্ট), অব্যবহৃত, দরজাগুলো সিল করে দেওয়া। ছিল যিশু খ্রিষ্টের ক্রসের মতো করে হাত দুই দিকে ছড়িয়ে বেঁধে মনের সুখ মিটিয়ে চাবুক মারার জন্য হুইপ স্ট্যান্ড। সেই স্ট্যান্ড এখনও আছে, এখন আর চাবুক মারা হয় না। দেড়শো বছর আগের সবচাইতে ‘সভ্য’দের এই ছিল বন্দির প্রতি আচরণ। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার এ-রকম ‘ঐতিহ্য’বাহী কারাগার: নির্যাতনের জীবন্ত জাদুঘর।
নির্যাতন এখনও আছে। মাত্রা সংকুচিত হয়েছে, ধারা বদলেছে। কিন্তু নির্যাতন আছে। আছে শীতের কামড়। বাঘ-পালানো মাঘের শীতেও, জেলের দরজা আর দরজার সমান জানালাগুলো থাকে খোলা। সারা সারা রাত ধরে। বিশাল একেকটা ওয়ার্ড। চার দেয়ালের কোনোটাতেই দরজা-জানালার অভাব নাই। হু হু করে হিম ঢুকছে। এদিক দিয়ে ঢুকছে, ওদিক দিয়ে বেরুচ্ছে। জমে যাচ্ছে মানুষের বাচ্চারা। গায়ে শুধু একটা কম্বল: পাতলা, ছেঁড়াখোঁড়া, পুরানা, ধ্যাড়ধ্যাড়া। এসব বন্দির অনেকে শিশু, অনেকে বৃদ্ধ। গরমের দিনে এই অবস্থাটাই বিপরীত আকার ধারণ করে: পদ্মার চর পেরুনো গরম লু হাওয়ার হাহাকার ঢোকে বিরাট উদোম জানলা-দরজা দিয়ে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘুমাতে বাধ্য হওয়া কয়েদিদেরকে নিয়ে একেকটা ওয়ার্ড পরিণত হয় গরম গ্যাসচেম্বারে।
আছে পিঁপড়ার কামড়। প্রায় তিন-তলা দালানের সমান উঁচু এত্তো বড় বকুলগাছের গোড়ার দিককার মূল কাণ্ডে লোহার কড়া পোঁতা আছে। তাতে হাত বেঁধে বিষ পিঁপড়ার কামড় খাওয়ানো হয় এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা তিন ঘণ্টা। গাছের গোড়ায় মাটিতে অনেক পিঁপড়ার বাসা। কয়েদির গায়ে মেখে দেওয়া হয়েছে গুড়। খুঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে বাসা। লাইন ধরে পিঁপড়া বেরুচ্ছে। শত শত পিঁপড়া। উঠে যাচ্ছে কয়েদির গায়ে, কামড়াচ্ছে। প্রসিদ্ধ ঐ বকুলতলার বকুল ছাড়াও গাছ আরও আছে। আছে মাথার ওপর গাছের ডালের সাথে উঁচু করে হাত বেঁধে একদিন দুই দিন তিন দিন দাঁড় করিয়ে রেখে দেওয়া, ঐ অবস্থায় পেটানো। এগুলো খুব বিরল না। (কোর্টে এক নাগাড়ে কয়েক ঘণ্টা করে দাঁড়িয়ে থেকে সামান্য আন্দাজ পেয়েছিলাম দাঁড়িয়ে থাকার সুখ।) আছে দিনের পর দিন লোহার ডাণ্ডাবেড়ি: নানান ভঙ্গিতে, যেন ঠিকমতো হাঁটতে না পারে, যেন দরকারেও নিচু হতে না পারে, সারাক্ষণ পিঠ বাঁকা করে থাকতে হয়, সোজা হতে না পারে, ইয়ত্তা নাই।
আর ‘কেস টেবিলে’ লাঠিপেটা তো আছেই। একজন কয়েদিকে কয়েকজন ‘দাঙ্গা’ মিলে রীতিমতো লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, তবু সে কয়েদি জেল-কর্তাদেরকে চোখে চোখ রেখে ব্যঙ্গ করে হিন্দি গান গেয়ে নেচে চলেছেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে। ‘বি-ক্লাস’ কয়েদি এঁরা, দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদি। প্রকৃতপক্ষে, এঁরাই মানবপ্রজাতির স্বাধীন আত্মা-পরম্পরার সবচাইতে উৎকৃষ্ট প্রতিনিধি। নিরীহ ও ভদ্রভাবে বন্দিত্বকে মেনে নেন না এঁরা। কিছুতেই বশ মানানো যায় না এঁদের। স্বাধীন মানুষকে সকলেই সমীহ করতে বাধ্য হয়। জেল-কর্তৃপক্ষও সমীহ করেন এঁদেরকে, সহজে ঘাঁটান না। আমাদের আলমগীর এঁদেরই এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি।
স্বাধীনতার দিন গণনা, নিরন্তর পাপচক্র
নির্যাতনের এসব ঘটনা প্রত্যেক দিন ঘটে না। ঢালাওভাবে ঘটে না। সেই বৃটিশ আমল আর নাই। তবু এখনও ঘটে নির্যাতন। কম ঘটে, কিন্তু প্রায়শই ঘটে। কোনো কয়েদি বা বাবু-জমাদার অন্য কোনো কয়েদির নামে ‘রিপোর্ট’ দিলে, মানে অভিযোগ দাখিল করলে, কেস টেবিলে তাৎক্ষণিক-বিচারসভা বসে। জেল-কর্তারা সেখানে সাক্ষী-সাবুদ দেখে রায় দেন। অভিযুক্তরা সুবিচারও পান বটে, তবে প্রায়-সমস্ত ক্ষেত্রেই পান শাস্তি। শাস্তি মানে এই সব শারীরিক নির্যাতনমূলক ব্যবস্থাগুলোর কোনো একটা। আবার, শাস্তি বলতে হতে পারে ‘রেমিশন’ বা ‘রেয়াত’ কাটা যাওয়া। প্রায় সকলেরই তো সশ্রম কারাদণ্ড। কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকের শ্রম বা কাজ ঠিক করে দেন, ‘কাজ-পাশ’ করে দেন। সেই কাজের প্রকৃতি অনুসারে কয়েদিরা প্রতি তিন মাস কারাদণ্ড থেকে নির্দিষ্ট হারে – ২০ দিন ২১ দিন ২২ দিন ইত্যাদি – রেয়াত পান, ফলে তার মোট সাজা কমে আসে।
অত্যন্ত বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া এর চেয়ে বড় শাস্তি কয়েদির কাছে আর কিছু নাই। ধরেন, এক বছর জেল খেটে আপনি তিন মাস ‘রেয়াত’ অর্জন করেছেন, এখন শাস্তি হলো তার থেকে এক মাস ‘রেয়াত’ ছেঁটে দেওয়া, এ খুব হৃদয়বিদারক শাস্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক শাস্তির চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকর। তিল তিল করে দেওয়া তাঁর অমানুষিক শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত রেয়াত বাদ গেল। এখন তাঁকে আরও বেশি জেল খাটতে হবে, আরও বেশি শ্রম দিতে হবে।
একটা দিন বেশি জেল খাটা আর একটা দিন কম জেল খাটার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে যে: স্বাধীন মানুষের সাথে বন্দির যে তফাৎ। ‘রেয়াত’ কাটা যাওয়াটাকেই তাই কয়েদিদের ভয় বেশি। সেটা কর্তৃপক্ষও জানেন, ফলে তাঁরা শারীরিক শাস্তির চেয়ে রেয়াত কাটার সিদ্ধান্ত নিতেই পছন্দ করেন বেশি। যে কর্তা ব্যক্তিগতভাবে বদ তিনি শারীরিক নিগ্রহে আনন্দ পান। আর যিনি বিচক্ষণ-দয়ালু তিনি রেয়াত কাটেন। আবার মতান্তরে, যে কর্তা রেয়াত কাটেন তিনিই নিষ্ঠুর বেশি। শাস্তির বৈচিত্র্য আর মাত্রার হেরফেরের আর মানুষের দয়ার আর নিষ্ঠুরতার প্রকারভেদের এ-এক নিরন্তর পাপচক্র।
স্বেচ্ছায় ঢুকেছিল বিড়াল কারাগারের পাপচক্রে, শুধু একটু খাওয়ার তাগিদে, বাঁচার আশায়। অথচ প্রকৃতিতে জেলখানা নাই। বিড়াল অথবা বাঘের জন্য কোনো বন্দিশালা নাই বনানীতে। ক্যাঙ্গারুর জন্য কোনো কারাগার কুঞ্জবনে নাই। পাখিদের জন্য প্রিজন নাই। গরুদের জন্য নাই গরাদের বন্দোবস্ত। কুকুরের জন্য কোনো কয়েদের কারবার নাই। ক্ষুধা লাগলে একটা প্রাণী অন্য প্রাণীকে শিকার করে খায় ঠিকই, কিন্তু বন্দি করে রাখে না। খাঁচায়, খোঁয়াড়ে কিংবা চিড়িয়াখানায় অন্য প্রাণীকে বন্দি করে রাখার ব্যবস্থা প্রাকৃতিক নয়। আদিতে মানুষের জন্যেও কোনো জেলখানা ছিল না। মানুষের জন্য খোদা বানিয়েছেন পাহাড়, নদী আর আকাশ। মানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন জিজ্ঞাসা, কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনতা। সৃজন করেছেন মানুষকে তিনি জন্মসূত্রে স্বাধীন হিসেবে। মানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেন নি কারাগার। মানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেন নি দাসপ্রথা।
বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক হিসেবে এরিক হবসবম গোটা দুনিয়ায় নন্দিত ছিলেন। এমনকী যারা মার্কসবাদের সমর্থক নন, তাঁরাও ইতিহাসে এই ব্রিটিশ মার্ক্সবাদীর অসামান্য অবদানকে স্বীকার করেন। হবসবম জন্মেছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের বছরে,১৯১৭ সালে। আজীবন কমিউনিস্ট এই ঐতিহাসিকের সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলো হলো এইজ অব রেভ্যুলুশন (১৭৮৯-১৮৪৮), এইজ অব ক্যাপিটাল (১৮৪৮-১৮৭৫), এইজ অব এম্পায়ার (১৮৭৫-১৯১৪), এইজ অব এক্সট্রিমস (১৯১৪-১৯৯১) প্রভৃতি।
এরিক হবসবম “বিপ্লব ও সেক্স” প্রবন্ধটি লিখেছেন ষাটের দশকের কাউন্টারকালচারের অস্থির সময়ে। ১৯৬৯ সালে। প্রবন্ধটি পরবর্তিতে সংকলিত হয়েছে লেখকের রেভ্যুলুশোনারিজ বইয়ে।
শিল্পী: পাবলো পিকাসো
মূলরচনা
প্রয়াত চে গুয়েভারা নিঃসন্দেহে আশ্চর্য ও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হতেন, যদি তিনি জানতেন যে তার ছবি আজ এভারগ্রিন রিভিউ এর প্রচ্ছদে, তার ব্যক্তিত্ব ভ্যগ১ এর একটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু এবং তার নাম নিউ ইয়র্কের একটি থিয়েটারে সমকামী প্রদর্শনবাদীতার জন্য ব্যবহৃত লোকদেখানো অজুহাত। আমরা ভ্যগ -কে পাশে সরিয়ে রাখতে পারি। ভ্যগ এর কাজ নারীদের জানানো কোন পোশাক পরিধান করা, কী জানা ও কোন বিষয়ে আলাপ করা হাল ফ্যাশনের সাথে মানানসই; হু ইজ হু২ এর সম্পাদক সম্পর্কে তাদের কৌতুহলের রাজনৈতিক তাৎপর্য যতোটুকু, ঠিক ততোটুকুই চে গুয়েভারা সম্পর্কে তাদের আগ্রহের রাজনৈতিক তাৎপর্য। বাকি দুটি বিষয় অবশ্য বহুবিস্তৃত একটি ধারণাকেই প্রতিফলিত করে: বিপ্লবী সামাজিক আন্দোলনের সাথে জনগণের যৌন স্বাধীনতার কোন না কোন সম্পর্ক আছে। এই বিশ্বাসের পিছনে যে কোন ভালো ভিত্তি নেই, তা বলার জন্য এটাই যথার্থ সময়।
প্রথমত, এখন এটি পরিষ্কার হওয়া উচিত যে প্রকাশ্যে গ্রহণযোগ্য যৌন আচরণ বিষয়ক প্রচলিত রীতির সাথে কোন রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা বা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শোষণ ব্যবস্থার নির্দিষ্ট কোন সম্পর্ক নেই। (এই নিয়মের একটি ব্যতিক্রম হলো সমাজে নারীর উপর পুরুষের অবস্থান এবং পুরুষদের দ্বারা নারীর শোষণ যা সচারচর শোষিত লিঙ্গের প্রকাশ্য ব্যবহারের উপর অল্পবিস্তর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।) যৌন ‘স্বাধীনতা’-র সাথে অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতার শুধু অপ্রত্যক্ষ সম্পর্কই রয়েছে। শ্রেণি শাসন ও শোষণের বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রকাশ্য অথবা গোপন ব্যক্তিগত আচরণে কঠোর রীতিনীতি চাপিয়ে দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। হিন্দু সমাজ মন্দিরকে বিভিন্ন ধরনের আবেদনময়ী যৌন ক্রিয়াকলপের জন্য ব্যবহার করতো এবং ওয়েলশ প্রথাবিরোধী সম্প্রদায় তার সদস্যদের উপর যৌন আচরণ সম্পর্কিত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, এ কারণে আমরা হিন্দু সমাজকে কোনোভাবেই ওয়েলশ প্রথাবিরোধী সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি স্বাধীন বা সমতাবাদী বলতে পারি না। এই বিশেষ সাংস্কৃতিক পার্থক্য থেকে আমরা কেবল যা অনুমান করতে পারি তা হলো: যেসব ধার্মিক হিন্দু তাদের যৌন কর্মে বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছিল, তারা ধার্মিক ওয়েলশবাসীর চেয়ে খুব সহজেই তা শিখে নিতে পারতো।
আদতে, শ্রেণি শাসন এবং যৌন স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে যদি কোন সাধারণীকরণ করা সম্ভব হয়, তবে সেটা হবে- শাসকগোষ্ঠীর অধীন লোকদের প্রকাশ্য যৌন আচরণে স্বাধীনতা, অনুমতি ও বিমিশ্রতা উৎসাহিত করে, যদি তা শাসকগোষ্ঠীকে পরাধীনদের পরাধীনতাকে ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে। দাসদের উপর কখনোই কেউ যৌন অতিনৈতিকতা (Sexual Puritanism) চাঁপিয়ে দেয়নি; বরং উল্টোটা ঘটেছে।. যে সব সমাজ দরিদ্রদের একটি নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, সেইসব সমাজ নিয়মিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মুক্ত যৌনাচারের (Free Sex) গণ স্ফুরণের সাথে যথেষ্ট পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে কার্নিভালের কথা বলা যায়। আসলে, যেহেতু যৌনতা বিনোদনের সবচেয়ে সস্তা এবং সবথেকে প্রবল রূপ, (যেমনটা নেপলসবাসী বলে থাকে, বিছানা হলো গরীব মানুষের ‘গ্রান্ড অপেরা’) সেকারণেই যদি অন্য সব কিছু একই রকম থাকে তবে তাদেরকে (দরিদ্র শ্রেণি) যতো বেশী সম্ভব এই ‘বিনোদন’ এ যুক্ত রাখা শাসকগোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ সুবিধাজনক।
অন্য কথায়, সামাজিক বা রাজনৈতিক সেন্সরশিপ এবং নৈতিক সেন্সরশিপের মধ্যে কোনও অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, যদিও প্রায়ই অনুমান করা হয় যে এমন সম্পর্ক রয়েছে। যেকোনো আচরণের অগ্রহণযোগ্যতা থেকে প্রকাশ্য গ্রহণযোগ্যতায় রূপান্তরিত হওয়া, কেবল তখনই একটি রাজনৈতিক কর্মের রূপ গ্রহণ করবে, যখন এই কাজ কোন রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন সূচিত করবে। জাতিগত আধিপত্যকে আক্রমণ করার কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা ও কালো বর্ণের মানুষের যৌনসহবাস করার অধিকার অর্জন একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে, এ কারণে নয় যে এই কর্ম যৌনতা সম্পর্কে যা অনুমোদনযোগ্য তার পরিধি বাড়িয়েছে। লেডি চ্যাটারলি৩ প্রকাশ করার বৈধতা অর্জনের এমন কোন রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই, যদিও এই ঘটনাকে অন্যান্য কারণে আমরা স্বাগত জানাতে পারি।
আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত। গত ক বছরেই বেশ কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রেই কী বলা যাবে, কী শোনা যাবে, কী করা যাবে এবং কী ধরনের যৌনতা প্রকাশ্যে এমনকি গোপনে প্রদর্শন করা যাবে- এ সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত সকল নিষেধাজ্ঞা বস্তুত বিলুপ্ত হয়েছে। একটি সংকীর্ণ যৌন নৈতিকতা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আত্মরক্ষার অপরিহার্য প্রাচীর এই বিশ্বাস এখন আর সমর্থনযোগ্য নয়। এবং এই সংকীর্ণ নৈতিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যে খুব জরুরি- এই ধারণাও এখন আর সমর্থনযোগ্য নয়। যদিও এখনো কিছু সেকেলে ক্রসেডার রয়েছে যারা ভাবছে তারা যৌন রক্ষণশীলতার এক অতিনৈতিক দুর্গে আঘাত হানছে, কিন্তু আদতে এর দেয়ালগুলি আসলে ভেঙে পড়েছে।
সন্দেহ নেই, এখনো অনেক কিছু আছে যা ছাপানো অথবা দেখানো যায় না, তবে বর্তমানে এই ধরনের বিষয় খুঁজে পাওয়া এবং এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হওয়া ক্রমাগত কঠিন হচ্ছে। নারীদের নেক্লাইন (Neckline) ও স্কার্ট আন্দোলনের৪ মতোই সেন্সোরশিপের অবসান একটি একমাত্রিক ঘটনা এবং যদি এই আন্দোলন দীর্ঘ সময় জুড়ে চলে তবে যৌন রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা ক্রসেডারদের বৈপ্লবিক সন্তুষ্টি অনেকাংশেই কমে যাবে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও, মঞ্চে অভিনেতাদের যৌন সঙ্গমের অধিকার স্পষ্টত ভিক্টোরিয়ান নারীদের বাইসাইকেলে চড়া থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে বিবেচিত হচ্ছে। আজকের দিনে অশ্লীলতার মামলাগুলোও ঠিকমতো চলছে না, যাদের উপর প্রকাশক ও প্রযোজকরা দীর্ঘদিন বিনামূল্য প্রচারণার (Free Publicity) জন্য নির্ভর করেছে।
বাস্তবিক কারণেই প্রকাশ্য যৌন অভিব্যক্তির জন্য লড়াই সফল হয়েছে। এই সফলতা কি সামাজিক বিপ্লবকে কাছাকাছি এনেছে, অথবা বিছানা, ছাপানো পাতা এবং বিনোদন জগতের (তা কাম্য হোক, অথবা না হোক) বাইরে এই সেক্স রেভ্যুলুশন কি কোন প্রকৃত পরিবর্তন এনেছে? কাঠামোগত পরিবর্তনের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই সেক্স রেভ্যুলুশন একটি অপরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোয় শুধুমাত্র প্রচুর প্রকাশ্য যৌনতাই (a lot more public sex) এনেছে।
আমি কিছুটা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি, যৌন আচরণের উদারবাদী অবাধ অভিব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে কোন অন্তর্নিহিত সম্পর্ক না থাকলেও সামজিক বিপ্লবের অতিনৈতিকতাবাদ (Puritanism)- এর প্রতি একটা নিরন্তর ঝোঁক আছে। আমি এমন কোন সুপ্রতিষ্ঠিত সংগঠিত বৈপ্লবিক আন্দোলন বা শাসনের কথা বলতে পারি না, যারা লক্ষ্যনীয় অতিনৈতিকতাবাদী (Puritanical) প্রবণতা বিকশিত করেনি। এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মার্ক্সবাদী আন্দোলন ও শাসন-ব্যবস্থাগুলোও, যে তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতাদের যৌনতা সম্পর্কিত মতবাদ ছিল সম্পূর্ণ অ-রক্ষণশীল, [অথবা এঙ্গেলসের ক্ষেত্রে একেবারেই অতিনৈতিকতাবাদ বিরোধী (Anti-puritanical)]। কিউবার মতো দেশগুলোতেই এই অতিনৈতিকতাবাদী প্রবণতা রয়েছে, যৌনতা সম্পর্কে যাদের স্থানীয় ঐতিহ্য সাধারণত গোঁড়ামিমুক্ত (Opposite of Puritans)। এটা এমনকি সত্য নৈরাজ্যবাদী-মুক্তিপরায়ণ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। যারা বিশ্বাস করে যে পূর্বের নৈরাজ্যবাদী মিলিট্যান্টদের নৈতিকতা ছিল মুক্ত ও সহজ, তারা আসলে জানেই না তারা কি বলছে। “ফ্রি লাভ” (যাতে তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখত) এর অর্থ ছিল নো ড্রিংকস, নো ড্রাগস এবং আনুষ্ঠানিক বিবাহ ছাড়াই একগামিতা।
বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী বা যথাযথভাবে বললে এন্টি নোমিয়ান উপাদান মাঝে মাঝে শক্তিশালী এবং মুক্তির চূড়ান্ত মুহূর্তে সবচেয়ে প্রভাবশালী থাকলেও কখনোই পিউরিটান প্রবণতাকে প্রতিহত করতে পারেনি। দাঁতোনরা সবসময়ই রোবস্পিয়ারদের কাছে পরাজিত হয়।৫ যেসব বিপ্লবীদের কাছে যৌন অথবা সাংস্কৃতিক মুক্তি সত্যিই বিপ্লবের কেন্দ্রীয় ইস্যু, তারা আগে বা পরে বিপ্লবের মূলধারা থেকে এর দ্বারা ছিটকে পড়বেই। যেমনটা নিউ লেফট৬ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অরগ্যাজমের দূত (লেখকের ভাষায় Apostle of Orgasm) উইলহেম রেইখ সত্যিকার অর্থেই একজন বিপ্লবী মার্ক্সবাদী-ফ্রয়েডিয়ান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং তার বই মাসসাইকোলোজি অব ফ্যাসিজম (যার সাবটাইটেল ছিলো দি সেক্সুয়াল ইকোনোমি অব পলিটিক্যাল রিয়েকশন অ্যান্ড প্রলেতারিয়ান সেক্সুয়াল পলিসি) বিচার করে বলা যায়, সে ছিল খুব সক্ষম একজন মার্ক্সবাদী ও ফ্রয়েডিয়ান। কিন্ত আমরা কি সত্যিই অবাক হতে পারি এটা জেনে যে এই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত সংগঠনের বদলে অর্গ্যাজমের উপর নিজের আগ্রহকে কেন্দ্রীভূত করেছে? স্ট্যালিনপন্থী ও ট্রটস্কিপন্থী- উভয়ের মধ্যে কোন পক্ষই বিপ্লবী স্যুররিয়ালিস্টদের প্রতি কোন প্রকার আগ্রহই দেখায়নি, যারা তাদের দলে যোগ দেয়ার জন্য সদা উদগ্রীব ছিল। যারা রাজনীতিতে টিকে থেকেছে, তারা কেউই স্যুররিয়ালিস্টদের মতো ছিলেন না।
কেন এরকম ঘটে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অস্পষ্ট প্রশ্ন, যার উত্তর এখানে দেয়া সম্ভব না। এমন ঘটা অপরিহার্য কিনা তা আরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন- অন্তত সেইসব বিপ্লবীদের জন্য যারা মনে করে বিপ্লবী শাসনব্যবস্থা গুলোর অফিশিয়াল অতিনৈতিকতাবাদ (Puritanism) বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের শতকের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবগুলো যৌনতা সম্পর্কে যা অনুমোদনযোগ্য তারা পরিধি বাড়াতে উৎসাহী ছিলো না। গত শতকের মহান বিপ্লবগুলো যৌন নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটিয়ে যৌন স্বাধীনতার অগ্রগতি ঘটায়নি, বরং তারা যৌন স্বাধীনতাকে বিকশিত করেছিল সামাজিক মুক্তির একটি বড় কাজের মাধ্যমে: অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শৃঙখল থেকে নারীদের মুক্ত করার মাধ্যমে। এবং বিপ্লবী আন্দোলনগুলো যে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যবাদকে সবসময় একটি উপদ্রব মনে করেছে, তা বলাই বাহুল্য। যাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্পিরিট পুরাতন ঘরনার সামাজিক বিপ্লবের সবচেয়ে কাছাকাছি, সেই সব বিদ্রোহী তরুণরাও (মাওবাদী, ট্রটস্কিপন্থী ও কমিউনিস্ট) সাধারণত মাদকগ্রহণ, বাছবিছারহীন সেক্স এবং ব্যক্তিগত প্রথাবিরোধীতার (Personal Dissidence) বিভিন্ন ধরন ও প্রতীকের বিরোধী। এর সপক্ষে যে কারণগুলো দেখানো হয় তা হলো, শ্রমিকরা এই ধরনের আচরণ বুঝতে পারে না এবং এর প্রতি সহানুভূতিশীলও না। এই কারণগুলো সত্য হোক বা না হোক, এই ধরনের আচরণ যে সময় ও শক্তি নষ্ট করে এবং সংগঠন ও কার্যকারিতার সাথে একদম অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তা অস্বীকার করা যাবে না।
এই সমগ্র প্রক্রিয়াটা একটি বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ। সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, যা বর্তমানে ‘নিউ লেফট’ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশে আন্দোলনের প্রধান দিক তা বিপ্লব অথবা যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনে কোন ভূমিকা পালন করে? এমন কোন বড় সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত হয়নি, যারা অন্তত প্রান্তিক পর্যায়ে এই ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহকে একত্রিত করেনি। সম্ভবত আজকের দিনে পশ্চিমা বিশ্বে, যেখানে দারিদ্র্যর বদলে বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টিকে প্রশ্ন না করে কোন আন্দোলনই বৈপ্লবিক হতে পারে না। কিন্তু,আলাদাভাবে বিবেচনা করলে, সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ ও প্রথাবিরোধীতা কেবল বিপ্লবের লক্ষণ,বৈপ্লবিক শক্তি নয়। রাজনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
১৯১৭ এর রুশ বিপ্লব তৎকালীন আভা-গার্দ (avant-garde) ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহীদের তাদের যথার্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নামিয়ে আনে, যাদের মধ্যে অনেকেই রুশ বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৯৬৮ এর মে মাসে ফরাসিরা যখন সাধারণ ধর্মঘটে শুরু করে, তখন অডিওন থিয়েটারের ঘটনাবলি ও ঐ চমকপ্রদ গ্রাফিতিগুলো-কে (‘ইট ইজ ফরবিডেন টু ফরবিড’, ‘হোয়েন আই মেইক রেভ্যুলুশন আই ফিল লাইক মেকিং লাভ’ ইত্যাদি) কোন সাহিত্য বা নাটকের মূল ঘটনাবলীর প্রান্তিক উপাদান হিসেবে ধরা যায়। সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ ও প্রথাবিরোধিতা কোন আন্দোলনে যতো বেশি সামনে চলে আসে,তত বেশি করে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে মৌলিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন (লেখকের ভাষায় big things) ঘটছে না। হায়, বুর্জোয়াদের স্তম্ভিত করা বুর্জোয়াদের উৎখাত করার চেয়ে সহজ।
সূত্র
১. আমেরিকান মাসিক ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন
২. ৩৩০০০ বিখ্যাত মানুষের বায়োগ্রাফিকাল ডাটা সম্ভার, যারা, সম্পাদকদের মতে, ব্রিটিশ জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
৩.ডি. এইচ. লরেন্সের বিতর্কিত উপন্যাস, যা যুক্তরাজ্যে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।
৪.ভিক্টোরিয়ান ড্রেস রিফর্ম
৫. দাঁতোন ও রোবস্পিয়ার উভয়ই ফরাসি বিপ্লবের নেতা
৬.ষাট ও সত্তরের দশকে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণদের একটা বহু-বিস্তৃত রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৬০ সাল থেকে নিউ লেফটরিভিউ নামে একটি দ্বি-মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
হিশাম মাতারের জন্ম ১৯৭০ সালে আমেরিকায়। তিনি এক বৃটিশ-লিবীয় লেখক। নিখোঁজ বাবাকে খোঁজার স্মৃতি নিয়ে লেখা তাঁর বই দ্য রিটার্ন ২০১৭ সালে আত্মজীবনী শাখায় পুলিৎজার পুরষ্কার এবং একই বছরে পেন আমেরিকা জাঁ স্টেইন বুক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। তাঁর সূচনা উপন্যাস ইন দ্য কান্ট্রি অফ মেন ২০০৬ সালে ম্যান বুকার প্রাইজ অর্জনের জন্য মনোনীত হয়। মাতারের নানা প্রবন্ধ আশারক আল-আওসাত, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসেও প্রকাশিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় উপন্য্যাস অ্যানাটমি অফ আ ডিসএ্যাপিয়রেন্স ২০১১ সালের ৩রা মার্চ প্রকাশিত হয়। তিনি লন্ডনে বাস করেন ও সেখানে থেকেই লেখালিখি করেন। বর্তমানে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচারের ফেলো ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্নার্ড কলেজের ইংরেজি এবং তুলনামূলক সাহিত্যের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
হিশাম মাতারের সিয়েনায় এক মাস প্রকাশ করেছে ভাইকিং। সিনেমা, নৃত্য, চিত্রকলা, ইনস্টলেশন, থিয়েটার, কবিতা ও সেমিনার বিষয়ক করোনেট থিয়েটারের ‘ইনসাইড আউট সিরিজ: মুক্ত অনলাইন উপস্থাপনা’য় হিশাম অংশ নিচ্ছেন।
প্লেগ বা মড়কের পর, মৃত্যু হয়ে উঠেছিল রেনেসাঁ যুগের চিত্রকরদের এক নি:শব্দ সঙ্গী। হিশাম মাতার সিয়েনায় একটি মাসের কথা স্মরণ করেছেন প্রেম, ক্ষতি, মরণশীলতা ও শিল্পকলা বিষয়ে জানাচ্ছেন তাঁর নানা ভাবনার কথাও।
হিশাম মাতারের ‘সিয়েনায় এক মাস’
মূল লেখা
২০১৬ সালে আমি যখন ‘দ্য রিটার্ন’ লেখা শেষ করেছি, দীর্ঘ ৩৩ বছর রাজনৈতিক কারণে লিবিয়ায় যেতে না পারা আমার লিবিয়ায় ফেরা ও গাদ্দাফির একনায়কত্বের সময়ে আমার রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী বাবার প্রথমে কারারুদ্ধ ও পরে চিরতরে নিখোঁজ হওয়া সেই বাবাকে খুঁজে ফেরার ব্যর্থ প্রচেষ্টার কাহিনী লেখার পরে আমি সিয়েনা গেলাম। একটা মাস আমি সেই তুস্কানী শহরে সিয়েনিজ স্কুলের যাবতীয় চিত্রকলা দেখে কাটালাম। মূলত: ত্রয়োদশ, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের যত চিত্রকলা। লন্ডনের জাতীয় গ্যালারিতে প্রথম দেখার পর থেকে ইতিহাসের এই বিশেষ সময়ের চিত্রকলা বরাবরই আমার মনোযোগ কেড়েছে। সে আজ থেকে প্রায় বছর পঁচিশেক আগের কথা, আমার বয়স তখন ১৯, যে বছর কিনা আমার বাবা অপহরণ বা গুম হয়েছিলেন। লন্ডনের গ্যালারিতে এই যুগের চিত্রকলার প্রাপ্তিযোগ্যতা ও ছবিগুলোর অন্তর্নিহিত শক্তি আমাকে টেনেছিল। সিয়েনায় কাটানো এক মাসের এই সময়টুকু আমাকে পৃথিবীতে ভালবাসা ও বিচ্ছেদ, মৃত্যু ও শিল্পকলার ভেতরকার সম্পর্ক বুঝতে সহায়তা করেছে।
সিয়েনিজ স্কুল যা কিনা ইউরোপে চার্চের প্রভাব কমে আসা ও রেনেসাঁ বা পুনরুজ্জীবনের মধ্যবর্তী সময়ের সৃষ্টি, ১৩৪৮ সালের মহামারী বা কালো মৃত্যু দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। সেবারের সেই প্লেগ বা মড়ক মানবেতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক বা বিধ্বংসী ঘটনা হিসেবে দেখা দেয়। এটা শুধুই মানব সমাজকে বদলায়নি, বরং বদলেছে খোদ আমাদের কল্পনাশক্তিকেও।
এই যুগের চিহ্নগুলো আজো খুঁজে পাওয়া যায়, এবং সম্ভবত: আজকের এই কঠিন দিনগুলোয় আরো সহজবোধ্যভাবেই আমরা তাদের চিনে নিতে পারব। চতুর্দশ শতকের সিয়েনিজরা হালের আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই অবিশ্বাস্য অনেক কাজ করতে সক্ষম হয়েছিল যা আজকের করোনা ভাইরাস সঙ্কটের শুরুর দিনগুলোয় আমরা পারছি না। কালো মৃত্যুর গতি তখন এত প্রবল ছিল যে এক বছরের ভেতরে গোটা মধ্যযুগের পৃথিবী গ্রাস করে নেয় এই মড়ক। প্রতিটি দেশের জনসংখ্যা গড়ে ৪৫% শতাংশ কমে যায়। সিয়েনিজ শিল্পীদের কাছে (যারা কিনা নিজেদের ভেতরে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক অথচ একে অপরের প্রতি সহায়তা দানে অকুণ্ঠ ও ফলপ্রসূ এক শিক্ষানবিশী অবকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন তরুণ চিত্রশিল্পীদের জন্য) এই কালো মড়ক ছিল বহু দূরের কোন আখ্যান এবং কালো মড়কের প্রতিবেদনগুলো এতই বন্য ও অদ্ভুত ছিল শুনতে যে এগুলো তাঁদের পক্ষে বিশ্বাস করাও ছিল কঠিন। কিন্তু অবশেষে যখন তাঁরা শুনলেন যে খোদ সিসিলি শহরে ঢুকে পড়েছে এই কালো মৃত্যু, তখন তারা বুঝলেন যে সহজে এই মড়ক থেকে রেহাই নেই। ভীতি এবং হিস্টেরিয়া গ্রাস করলো গোটা সিয়েনাকে। কিছু মানুষ পালিয়ে গেল গ্রামে, অন্যরা শহরেই নিজেদের নিরাপদ ভেবে শহরে প্রবেশের দরজাগুলোর কোন কোনটা দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে পড়লো। মিকেলেঞ্জেলো, রেমব্রান্ডন্ট ও ভের্নিয়ের সবাই কালো মৃত্যুর ভয়ে ভীত হলেন। রোগের দুশ্চিন্তাতেই টিটিয়ান মারা গেলেন।
ইতালি একটি জাতি বা রাষ্ট্র হয়ে ওঠার আগে এটি ছিল বেশ কিছু নগর-রাষ্ট্রের সমাহার যাকে শাসন করত একটা ‘অতোরিতা সুপেরিয়র (উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ)।’ সাধারণত: কোন অভিজাত পরিবার বা কোন বিশপই এই উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের রূপ পরিগ্রহ করতেন। সিয়েনা ছিল এক ব্যতিক্রম যেহেতু এই নগরের অধিবাসীরা পৌর শাসন পছন্দ করতেন। আর অংশত: একারণেই এ শহরের চিত্রকলার ছিল এক স্বতন্ত্র চারিত্র্য। আম্ব্রোগিয়ো লোরেঞ্জেত্তির ‘ভাল ও মন্দ সরকারের রূপক (দ্য অ্যালেগরি অফ দ্য গুড অ্যান্ড ব্যাড গভর্নমেন্ট)’ শীর্ষক ফ্রেস্কো সিরিজ অঙ্কিত হয়েছিল নগরীর কেন্দ্রবিন্দু প্যালাজ্জো পাব্লিকো-য়। এটা প্রাচীনতম ও ইহজাগতিক ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী চিত্রকলাসমূহের অন্যতম। পৌর শাসন যদি হয়ে থাকে গির্জার সমতূল্য, তবে এই ফ্রেস্কো সিরিজ যেন ছিল গির্জার পেছনের দেয়ালে আঁকা ছবির মত কিছু। সিয়েনা তার শিল্পীদের আর একটি বিরল ও মানবীয় কৌতূহলেও জারিত করতে পেরেছিল যে এমনকি ধর্মীয় দৃশ্যাবলী আঁকার সময়েও এই শিল্পীরা মানব মনস্তত্ব ও মানবীয় ভাবনার গতি-প্রকৃতি বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতেন।
‘দ্য অ্যালেগরি অফ দ্য গুড অ্যান্ড ব্যাড গভর্নমেন্ট, ফটোগ্রাফ: হেরিটেজ ইমেজ পার্টনারশীপ লিমিটেড
তবে সিয়েনীজ শিল্পীদের এই ইহজাগতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী বদলে যায় কালো মৃৃত্যুর আবির্ভাবের সাথে সাথেই। সিয়েনীজরাও তাদের সমসাময়িক আরো যত মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের মতই দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করত যে সব ব্যধিই ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। কাজেই কালো মৃত্যু বা প্লেগ তাঁদের কাছে নিজেদের কৃত নানা পাপের প্রমাণ হিসেবে দেখা দিল। চোদ্দ শতকের মধ্যযুগীয় ইংরেজ বিবরণধর্মী কবিতা ‘পিয়ের্স প্লাউম্যান’-এ উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ড সংক্ষেপে বলছেন, ‘নিরেট পাপ থেকে দেখা দিয়েছে যত মড়ক ও মহামারী।’ আর এক তুস্কানী কবি পের্ট্রাক মড়কে পরিত্যক্ত যত মৃত দেহ দেখে লিখছেন, ‘হে অনাগত দিনের সুখী মানুষেরা, তোমরা যারা এই দূর্দশা ও দূর্ঘটনা দ্যাখো নি, তাদের কাছে আমাদের এই সাক্ষ্য উপকথার গল্পের মত মনে হবে। আসলে আমাদের হয়তো এই শাস্তি প্রাপ্য অথবা আরো কঠিনতর কিছুও পাওনা থাকতে পারে।’
চার্চ বা গির্জাও এমন অলৌকিক নানা ব্যাখ্যাকে অনুপ্রেরণা যোগাতো। অনেক যাজকই মড়কে সংক্রমিত রোগীদের এই যুক্তিতে আশীর্ব্বাদ জানাতে চাইত না যে হয়তো দ্বারা ঈশ্বরের দণ্ডপ্রাপ্ত। অধিকাংশ ধর্মবিশ্বাসী মানুষই সারাদিন প্রার্থনা ও নানা প্রায়শ্চিত্তমূলক কাজে সময় ব্যয় করতেন, দিন কাটাতেন গির্জা মেরামত করে এবং ধর্মীয় নানা প্রতিষ্ঠান স্থাপনার কাজ করে। পোপের শাসন আরো পোক্ত হয়ে উঠলো। মানুষের ধ্যান-ধারণা এবং মূল্যবোধের খাতে এক বড় পরিবর্তন দেখা দিল।
১৩৪৮ সালের এই কালো মড়ক এবং তার কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক ঘটনা মৃত্যু ও মরে যাওয়া সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দেয়, বদলে দেয় চারপাশের পৃথিবী ও জীবন সম্পর্কে আমাদের ভাবনা-চিন্তাও। তিউনিসীয় ইতিহাসবিদ ও ইতিহাস-রচয়িতা ইবন খালদুন যাকে কিনা হালে সমাজতত্ত্বের পুরোধা বা পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকার করা হচ্ছে, এই কালো মৃত্যু বা মড়কেই তাঁর পিতা-মাতাকে হারান। তাঁর কাছে এই মড়কের যেমন ছিল অসীম বৈশ্বিক গুরুত্ব, তেমন ছিল ব্যক্তিগত ক্ষতির দিক। বাবা-মা’কে হারিয়ে তিনি এই বোধে আসেন যে কালো মৃত্যু আসলে মানব সভ্যতার গভীর দূর্বলতাকেই তুলে ধরছে। তিনি ছিলেন ডারউইনের আগের এক ডারউইনবাদী বা প্রাক-বিবর্তনবাদী সময়ের এক বিবর্তনবাদী। কাজেই বেদনার এই সময়েরও ভাল বা সুযোগের দিকগুলো তিনি দেখতে চাইলেন। তিনি লিখলেন যে কালো মৃত্যু যেন জীবনকে দেখাচ্ছে, ‘তার আদি রূপে এবং পুন:পুন সৃজনের সম্ভাবনায়, অস্তিত্বের প্রবাহে এক নতুন পৃথিবীর উন্মেষ।’ বাস্তবিকই মড়ক এক দিকে যেমন ছিল ধ্বংসাত্মক তেমনি সৃষ্টিমূলক। এই কালো মৃত্যুর ছায়া থেকেই পাঁপড়ি মেললো রেনেসাঁ ও বারোক শিল্পকলা। মিকেলেঞ্জেলো, রেমব্রান্ডন্ট ও ভের্নিয়ের সবাই এই মড়কে পর্যায়ক্রমে আশঙ্কিত হয়েছেন। অনুমান করা হয় যে টিটিয়ান এই মড়কে মারা যান। এবং সেই থেকে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে অন্য শিল্পীদের ভেতরেও। তাঁদের চিন্তায় অমোচনীয় ছাপ রেখে যায় এই কালো মড়ক এবং মৃত্যু তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে এক পরিচিত ও অলঙ্ঘ্যনীয় অতিথি, এক নিঃশব্দ সঙ্গী যে কিনা শেষ কথাটি বলবে। এটাই অপরিহার্য বাস্তবতা। সব কিছুর অন্তিমে এক চিরস্থায়ী বিনাশ ও সংহারের দিকেই শিল্পীদের কল্পনার ডানা পাখা মেললো। ‘আমার ভেতরে এমন কোন চিন্তার কখনোই জন্ম হয় না যেখানে ‘মৃত্যু’ খোদাই করা নেই,’ ভাসারিকে একটি চিঠিতে লিখলেন মিকেলেঞ্জেলো।
‘বোধ হয় আমি সিয়েনায় গেছি শুধুমাত্র এর চিত্রকলার বিপুল সম্ভারকে দেখতে’: হিশাম মাতার, আলোকচিত্র: আনাদোলু এজেন্সি
কালো মৃত্যুর কারণে ধর্মীয় যে উত্তাপের সৃষ্টি হলো সেটা সিয়েনার শিল্পীদের ভেতর চার্চের প্রতি এক গভীর আনুগত্য সৃষ্টি করলো। মাত্র সাত বছর যেতে না যেতে, ১৩৫৫ সাল নাগাদ, সিয়েনায় পৌর শাসনের অবসান হলো এবং যাজকেরা বা চার্চ ক্ষমতায় এলেন। তাঁদের হাতেই জমা হলো বিপুল ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা। তাঁরাই ঠিক করে দিতে থাকলেন যে শিল্পীরা কি আঁকবেন। আম্ব্রিয়োগো লোরেঞ্জোত্তির ‘ভাল ও মন্দ সরকারের রূপক’-এর করিডোরের নিচ থেকেই এক নতুন চ্যাপেল বা খ্রিষ্টীয় ভজনালয়ের কাজ করাবেন বলে মনস্থ করলেন পাদ্রিরা। তাদ্দেও দি বার্তেলো নামের শিল্পীকে এই চ্যাপেলের দেয়ালগুলো অলঙ্করণের কাজ দেয়া হলো। সিয়েনিজ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন পৃষ্ঠপোষক বা শাসকশ্রেণি তথা চার্চের পাদ্রিদের রুচি অনুযায়ী কাজের দায়ও তাঁর কাঁধে চাপলো বৈকি। বার্তেলোর কাজে কুমারীর মৃত্যু এবং চারপাশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে আসা সংক্রান্ত চিত্রাবলী এক নতুন রীতির স্বাক্ষর যা এর আগে সিয়েনিজ চিত্রকলার কেন্দ্রীয় ভাবনা ছিল না। ‘কুমারীর শেষকৃত্য (দ্য ফিউনারেল অফ দ্য ভার্জিন)’-এ দৃষ্টিপাত করলে কালো মড়কের সময়ে সিয়েনার ফুটপাথে স্তুপ হয়ে থাকা শবদেহের কথা মনে না এসে পারবে না। কবর দেবার জায়গাও ছিল না। খ্রিষ্টের প্রত্যেক বার্তাবাহকই কুমারী মা’কে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আর পথের মানুষদের সবাইকেই মনে হচ্ছে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ, যেন তাঁরা প্রত্যেকেই মৃত্যুর চিন্তায় আচ্ছন্ন। গোটা চ্যাপেলটিই যেন অনুশোচনা ও অতিরেকে পূর্ণ স্ববিরোধী আয়োজনের এক অত্যাশ্চর্য উপস্থাপনা। প্রতিটি পরিসর- মেঝের প্রতি সেন্টিমিটার, দেয়াল এবং সিলিংয়ের পরিসর সুসজ্জিত। এ যেন এক উদ্বিগ্ন পরিসর। এর জমকালো নিশ্চয়তা ও স্থির দৃঢ়তার সাথে চ্যাপেলটি সক্ষম হয়েছে একই সাথে পাদ্রিদের খুশি করতে আবার বিশ্বাস নিয়ে মানুষের মনোজগতের দ্বন্দ্বকে উপস্থাপন করতে: বিশ্বাস, যে কোন ধরনের বিশ্বাস, এবং আপাত: দৃষ্টে যত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিশ্বাসই মনে হোক, মূলত: সংশয়ের এক ভূমিও বটে। যেন বা বার্তোলো ফ্লোরেন্সীয় কবি ও পের্ট্রাকের বন্ধু বোক্কাচ্চিওর সেই দুষ্টু বাক্যটিই আওড়াচ্ছে, ‘একটি শোভন বিষয় হলো… আমরা যা কিছু করি, তা’ যেন একইসাথে সেই পবিত্র ও ভয়ানক নামে শুরু হয় যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।’ এই তিক্ত বিদ্রুপাত্মক বিদ্রোহও যেন এই চ্যাপেলে উপস্থিত, যদিও খুব সূক্ষ ভাবে। যেন বা আদৌ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও নয় অথচ বিশ্বাসের ইতিবাচক মহিমার দু’ধার বিশিষ্ট ছুরির মাধ্যমে শিল্পী তাঁর সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।
তাদ্দেও দি বার্তেলো-ওর আঁকা ‘দ্য ফিউনারেল অফ দ্য ভার্জিন’ নামে একটি ছবির দৃশ্য। আলোকচিত্র: দ্য পিকচার আর্ট কালেকশন।
প্রথমে আমি ভেবেছিলাম যে আমি সিয়েনা গেছি শুধু এর চিত্রকলা দেখতে। পরে বুঝলাম যে আমি আসলে গেছিলাম শোক করতে, নতুন ভূখণ্ড দেখতে এবং নিজের কাছে পরিষ্কার হতে যে কিভাবে আমি এখান থেকে আবার আমার কাজ শুরু করব। সিয়েনায় এক মাস লিখতে গিয়ে আমার এসব কিছুই মনে করতে হয়েছে এবং ভেবেছি যে মৃত্যু কিভাবেই না সবকিছু বদলে দেয়। আর এরপরই মড়কে আক্রান্ত আমাদের বর্তমান সময়ের নিজস্ব পৃথিবীকে খুঁজে পাওয়াও কেমন ভুতুড়ে মনে হয়। এবং এসবকিছু নিয়ে ভাবতে গিয়েই আমার বিশ শতকের ইতালীয় কবি ও ঔপন্যাসিক সিজার পাভেসের বক্তব্য ‘শিল্প হলো জীবনের সব আক্রমণের বিরুদ্ধে এক সুরক্ষা’, এই আপ্তবাক্যটি মনে পড়ে গেলো। আমার আরো মনে পড়ে গেল যে যদিও এমন অনুজ্ঞা যথাযথ ভাবে পালন করতে চাওয়াটা খুবই উচ্চাভিলাষী তবু এ ত’ সত্য যে সত্যিকারের শিল্প সবসময়ই একইসাথে একটি লক্ষণ ও প্রতিভাস বা উদ্ঘাটন। দুঃসময়ে আনন্দ ও নিরাময় দানের পাশাপাশি বর্তমানকে বিবেচনা ও সেখানে স্থান খুঁজে পাওয়ার কাজেই এটি এক আশ্চর্য হাতিয়ার।
জনগণই সামাজিক শক্তি, বা অন্তত সেই শক্তির সারসত্তা। কিন্তু সেই জঘন্য শর্তগুলো যা তাদের নিপীড়ন-নিগ্রহ করে তা থেকে মুক্তির জন্য তাদের দুটো জিনিসের কমতি আছে— শিক্ষা ও সংগঠন। এই দুটো জিনিসই বর্তমানে সকল সরকারের ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি।
মিখাইল বাকুনিন
রাষ্ট্রের সামরিক ও শাসন ক্ষমতার বিলুপ্তি ঘটাতে প্রলেতারিয়েতদের অবশ্যই সংগঠিত হতে হবে। কিন্তু যেহেতু জ্ঞান ব্যতীত সংগঠনের অস্তিত্ব থাকে না সেহেতু জনসাধারণের মধ্যে প্রকৃত সামাজিক শিক্ষার বিস্তার জরুরি।
আন্তর্জাতিকের লক্ষ্যই হচ্ছে এই প্রকৃত সামাজিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো। যেদিন আন্তর্জাতিক ইউরোপের শ্রমীজীবী মানুষের অর্ধেক,এক চতুর্থাংশ কিংবা অন্তত এক দশমাংশকে একত্রিত করতে সক্ষম হবে সেদিন থেকেই রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্রসমূহের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠবে। যেহেতু আন্তর্জাতিকের লক্ষ্য নতুন রাষ্ট্র গঠন নয় বরং বিদ্যমান সকল শাসনব্যবস্থার বিলোপ সাধন, সেহেতু আন্তর্জাতিকের সংগঠন সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সংগঠন থেকে ভিন্ন ধাঁচের হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যতই মেকি, বর্বর ও কর্তৃত্বপরায়নণ হবে ততই জনগণের স্বাভাবিক বিকাশ, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উদাসীন ও বিরোধপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিকের সংগঠন হতে হবে আরও বেশি স্বাধীন ও স্বাভাবিক। জনগণের সহজাত প্রবৃত্তি ও আদর্শগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।
কিন্তু জনসাধারণের স্বাভাবিক সংগঠন বলতে আমরা কী বুঝাচ্ছি? এর দ্বারা আমরা জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনযাপন ও পেশাবৈচিত্রের অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে গড়ে উঠা সংগঠনকে বুঝাচ্ছি, যেমন জনগণের শিল্প-কারখানাভিত্তিক সংগঠন। জনসাধারণের সংগঠন তখনই পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে যখন উৎপাদন-শিল্পের সকল শাখার প্রতিনিধিত্ব তৈরি হবে তাদের আন্তর্জাতিকে।
কিন্তু এটা হয়তো বলা চলে যে, যেহেতু আমরা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিরাজমান রয়েছে, এবং জনসাধারণের উপর আমরা সুসংহত প্রভাব বিস্তার করছি: ফলে পুরাতন রাজনীতিবিদদের সমকক্ষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠাই আসলে আমাদের লক্ষ্য। এমন ধারণা আসলে মস্ত বড় ভুল। জনগণের মাঝে ক্রিয়াশীল যেকোনো প্রকার সরকারি ক্ষমতার সাথে জনসাধারণের উপর আন্তর্জাতিকের প্রভাবের পার্থক্য রয়েছে। কোনোপ্রকার কর্তৃত্ব ছাড়াই, সাধারণ চিন্তাগুলোর স্বাভাবিক, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ছাড়া এটি আর কিছুই নয়।
রাষ্ট্র মানেই জনসাধারণের জীবন ও স্বাধীনতার উপর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শ্রেণি ও বিশেষজ্ঞের ভান করা পণ্ডিতদের কর্তৃত্ব, শাসন ও সংগঠিত ক্ষমতার বিস্তার। রাষ্ট্র জনসাধারণের দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই চায় না, আবার একই সঙ্গে তাদের বশ্যতাও দাবি করে।
অন্যদিকে, জনসাধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন ব্যতীত আন্তর্জাতিকের ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই। যার ফলে এটি বিদ্রোহী সত্তাকে আহ্বান জানায়। রাষ্ট্র ও অগ্রাধিকারী শ্রেণির শাসনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বিদ্রোহী সত্তাকে যথেষ্ট শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে হবে এবং আর এজন্যই আন্তর্জাতিককে সংগঠিত হতে হবে।
এই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে আন্তর্জাতিককে দুটো মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে-
১। আন্তর্জাতিকের চিন্তা-ভাবনাগুলোর প্রচার
২। জনগণের মাঝে এর সমর্থকদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এর ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে স্বাভাবিকভাবে সংগঠিত করা।
প্রথম আন্তর্জাতিকে বাকুনিন
সংঘবদ্ধ কর্মপন্থাকে যে ব্যক্তি সর্বসাধারণের স্বাধীনতার উপর আঘাত কিংবা নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বলে দাবি করে, সেই ব্যক্তি হয় কুতার্কিক নয় নির্বোধ। তাদের জন্য করুণা হয় যারা মানব সংহতির কার্যকারণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় এবং মনে করে যে, সমাজবিচ্ছিন্ন পূর্ণ ব্যক্তি-স্বাধীনতা সম্ভব কিংবা সেটাই কাম্য। এমন পরিস্থিতির মানে হলো সকল মানব সমাজের বিলুপ্তি ঘটা, কেননা ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যেকার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উপরই মানুষের সমগ্র সামাজিক অস্তিত্ব নির্ভর করে। প্রতিটি ব্যক্তিই, এমনকি সবচাইতে চালাক ও শক্তিশালীরাও, অথবা বলে চলে সবচেয়ে চালাক ও শক্তিশালীরাই বিশেষ করে একই সাথে এই প্রভাবের সৃষ্টি ও স্রষ্টা। কোনো ব্যক্তি যে সমাজে বাস করে, বিকশিত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে সেই সমাজে তাকে ঘিরে থাকা সকল ব্যক্তির বস্তুগত, মানসিক ও নৈতিক সংস্পর্শের সরাসরি ফল হচ্ছে সেই ব্যক্তির ব্যক্তি-স্বাধীনতা। যে ব্যক্তি অধ্যাত্মিক, অতিমানবীয় ও পুরোপুরি স্বার্থপর “মুক্তি”র দোহাই দিয়ে এই সকল সংস্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চায়, সে মানব সত্তা হিসেবে নিজের অস্তিত্বের বিনাশ নিজেই ডেকে আনে। যারা অন্যের উপর এই প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকে, তারা আসলে সমস্ত সামাজিক জীবন থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এবং নিজের চিন্তা ও অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়া থেকে বিরত থেকে সে বরং নিজের ধ্বংসের পথই সুগম করে। কাজেই, এই তথাকথিত “স্বাধীনতা” যা সচরাচর ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদীর দল প্রচার করে, এই তথাকথিত ব্যক্তি-স্বাধীনতাই অস্তিত্বের বিনাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রকৃতিতে এবং মানব সমাজে যা আসলে এই প্রকৃতিরই অংশ, প্রত্যেক জীবই এই শর্তের উপর বেঁচে থাকে যে— সে ততটুকুই অন্যদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করবে যতটুকু তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তাকে অনুমোদন করে। পরোক্ষ এই প্রভাব বিস্তারের বিনাশ মানেই মৃত্যু। যখন আমরা সর্বসাধারণের মুক্তির কথা বলি তখন আসলে কোনো অর্থেই এটা বলি না যে, ব্যক্তি বা ব্যক্তির সমষ্টি তাদের নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে যেই স্বাভাবিক প্রভাব গড়ে তুলেছে তাকে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
আমরা যা চাই তা হলো এই মেকি, সুবিধাবাদী, আইনানুগ ও দাপ্তরিক প্রভাবের বিলুপ্তি। যদি চার্চ ও রাষ্ট্র ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হতো তখনো আমরা অবশ্যই তাদের প্রতিপক্ষ হতাম বলে আমি মনে করি। তাদের টিকে থাকার অধিকারের বিরুদ্ধে হয়তো প্রতিবাদ করতাম না। এক অর্থে যদিও এটা সত্য যে বর্তমানে এগুলো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানই কারণ এগুলো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির স্বার্থের জন্য একচেটিয়াভাবে কাজ করে। তবুও, আমরা তাদের বিরোধিতা করি কারণ তারা জনগণের সকল শক্তিকে ব্যবহার করে জনগণের উপরই নিজের কর্তৃত্ববাদী, দাপ্তরিক ও বর্বরোচিত কায়দার শাসন কায়েম করে। আন্তর্জাতিক যদি কখনো নিজেকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় সংগঠিত করত তবে আমরা যারা এটির সবচেয়ে উদ্যমী বন্ধু তারাই এটির ঘোর শত্রু হয়ে উঠতাম। কিন্তু সম্ভবত এটি এমন ছাঁচে নিজেকে তৈরি করতে সক্ষম হবে না। আন্তর্জাতিক মানুষের মৈত্রীবন্ধনের কোনো সীমা বেঁধে দেয় না, কিন্তু রাষ্ট্র এই মৈত্রীবন্ধন ও সাম্যেকে ভৌগোলিক ধারণায় সীমাবদ্ধ করা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস আমাদেরকে দেখিয়েছে যে, বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি সংঘ গঠন, সকল স্বৈরশাসকদের যা স্বপ্নের বস্তু তা অসম্ভব। সুতরাং যারাই রাষ্ট্রের কথা প্রচার করে তারা অবধারিতভাবে নানাবিধ রাষ্ট্রে বিভক্ত একটি বিশ্বের কথা চিন্তা করে এবং প্রচার করে। যেই রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণভাবে অত্যাচারী এবং বাহ্যিকভাবে লুণ্ঠনকারী, অর্থাৎ তারা একে অপরের শত্রু। রাষ্ট্র যেহেতু মনুষ্যত্বের বিভাজন, নিপীড়ন ও লুণ্ঠনে জড়িত সুতরাং এটি অবশ্যই মন্যুষত্বের অস্বীকৃতি এবং মানব সমাজের ধ্বংসকেই চিত্রিত করে।
প্রথম আন্তর্জাতিক
শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠনের আদৌ কোনো মানে থাকত না, যদি রাষ্ট্রের উৎখাত তাদের লক্ষ্য না হতো। আন্তর্জাতিক এই লক্ষ্য সামনে রেখেই জনসাধারণকে সংগঠিত করেছে এবং শেষমুহূর্ত পর্যন্তও একে স্মরণ করে যেতে পারে। এবং এটি তাদেরকে কীভাবে সংগঠিত করে?
অবশ্যই উপর থেকে নিচ এই ক্রমে নয়, যেমনটা রাষ্ট্র পেশাভেদে উদ্ভূত আশা-আকাঙ্ক্ষার পার্থক্যের কথা আমলে না নিয়েই কোনো একপ্রকার বাহ্যিক একতা ও শৃঙ্খলা মানবসমাজের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে নিচ থেকে, জনগণের সামাজিক জীবনকে ধারণ করে, তাদের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই প্রারম্ভবিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে, সমাজে তাদের প্রকৃত স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে সংগঠিত হওয়ার জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক তাদের জীবন ও কর্মের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতেই উদ্দেশ্যের ঐক্য গড়ে তুলে, এবং লক্ষ্যবস্তু ও কল্যাণের একটি সত্যিকারের সাম্যাবস্থা নির্মাণ করে।
শুধুমাত্র এই প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হওয়ার কারণেই আন্তর্জাতিক প্রকৃত শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেছে। সুতরাং প্রত্যেক গোষ্ঠীর সকল সদস্যের আন্তর্জাতিকের সকল মূলনীতি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবগত থাকা অত্যাবশ্যক। শুধুমাত্র এই উপায়েই সে শান্তির সময় ভালো প্রচারক এবং যুদ্ধের সময় প্রকৃত বিপ্লবী হয়ে ওঠবে।
আমরা সবাই জানি যে আমাদের কর্মসূচি ন্যায়সঙ্গত। এটি কতিপয় সত্য উচ্চারণে প্রলেতারিয়েতদের ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক দাবিকে ব্যক্ত করে। শুধুমাত্র পুরোপুরিভাবে মানবিক কর্মসূচি হওয়ার কারণেই এটি সামাজিক বিপ্লবের সকল প্রকার লক্ষণ বহন করে। এটি পুরাতনের ধ্বংস এবং নতুন বিশ্ব নির্মাণের ঘোষণা দেয়।
এইটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় যা আমাদেরকে আন্তর্জাতিকের সকল সদস্যদের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। এই কর্মসূচি পুরাতন ধর্মাচরণের প্রতিকল্প হিসেবে একটি নয়া বিজ্ঞান, নয়া দর্শন হাজির করে। এটি পুরাতন কূটনীতির বদৌলতে একটি নয়া আন্তর্জাতিক কর্মপন্থাকে সংজ্ঞায়িত করে। রাষ্ট্রের উৎখাত ব্যতীত এটির ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই।
আন্তর্জাতিকের সদস্যদরা যাতে বিপ্লবী প্রচারক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব বৈজ্ঞানিকভাব পালন করে সে জন্য তাদের প্রত্যেকের এই নয়া বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া আবশ্যক; আন্তর্জাতিকের নতুন সঞ্জীবনী এগুলোই। এটা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয় যে আমরা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চাই; চাই আমাদের শ্রমের পূর্ণ মূল্যায়ন, শ্রেণির বিলুপ্তি, রাজনৈতিক দাসত্বের সমাপ্তি, মানবাধিকারহীনতার উপলব্ধি, সকলের জন্য সমান দায়িত্ব ও ন্যায়বিচার; এক কথায় বললে, অখণ্ড মানবতা। নিঃসন্দেহে, এইসব দাবি বেশ ভালো ও ন্যায্য। কিন্তু আন্তর্জাতিকের কর্মীরা যখন এইসব দাবির যথার্থতা ও তাৎপর্য অনুধাবন না করেই শুধুমাত্র বারংবার এইসব বুলি আওড়াতে থাকে তখন তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া ফাঁপা বুলিতে পর্যবসিত হয়। আর বুঝতে না পারলে এই কথাগুলোর আদতে কোনো মূল্যই থাকে না।
আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন সংগ্রহ: গেটি ইমেজ
হয়তো বলা হবে যে, সকল শ্রমজীমী মানুষকে শিক্ষিত করা সম্ভব না, এমনকি যখন তারা আন্তর্জাতিকের সদস্যও হয়। সংগঠনের মধ্যেই একদল লোক যতদূর সম্ভব সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থা সম্পর্কে পুনর্পাঠ নিচ্ছে, এইটাই কি যথেষ্ট নয়? সঠিক পথ থেকে সরে না আসার জন্য তাদের যে ‘ভ্রাতৃবৎসল উপদেশ’ সেগুলো কি বিশাল জনতা অনুসরণ করতে পারে না, যা অবশেষে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে?
আন্তর্জাতিকের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী কমিউনিস্টরা প্রায়ই এইসব যুক্তি ব্যবহার করত, যদিও প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে বলার মতো সাহস তারা সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। সাধারণ জনতার বুদ্ধিমত্তা ও সর্বময় ক্ষমতার লোকভুলানো প্রশংসা অন্তরালে তাদের আসল অভিমত লুকানোর চেষ্টা করত। আমরা সর্বদা এসকল অভিমতের ঘোর বিরোধী ছিলাম। আমরা বিশ্বাস করি যে, আন্তর্জাতিক যদি বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও দশ, বিশ ও ততোধিক লোক নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী— এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং বৃহৎ অংশ যদি ক্ষুদ্র অংশের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞানকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে থাকে তাহলে এই আন্তর্জাতিক শেষমেশ অভিজাততন্ত্রের মধ্যেই বিনষ্ট হবে, যা আদতে রাষ্ট্রেরই চরম বিকৃত একটি রূপ। শিক্ষিত ও সক্ষম ক্ষুদ্র অংশ তাদের গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি একটি পরিচালনা পর্ষদের দাবি করে বসবে। এবং এই পরিচালনা পর্ষদ স্বীকৃত স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও অধিক স্বৈরাচারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ এর এই স্বৈরাচারী মনোভাব জনগণের ইচ্ছার প্রতি আনুগত্যশীল সম্মানপ্রদর্শনের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে। ক্ষুদ্রাংশটি জনগণের উপর সংকল্পের অস্ত্র চাপিয়ে দিয়ে তাদের শাসন করবে, এবং পরবর্তীতে একে ‘জনগণের ইচ্ছা’ নাম দিয়ে প্রচার করবে। আর এভাবেই শিক্ষিত ক্ষুদ্রাংশটি একটি শাসকবর্গে পরিণত হবে, এবং অপরাপর সকল শাসকবর্গের মতোই দিনে দিনে আরও বেশি স্বৈরাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠবে।
আন্তর্জাতিক তখনই জনসাধারণের মুক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠবে যখন এটি নিজে মুক্ত হয়ে উঠতে পারবে; যখন এটি আর নিজেকে দুটি দলে ভাগ হয়ে থাকতে দেবে না, যার বৃহৎ অংশটি ক্ষুদ্রাংশের অন্ধ অস্ত্রমাত্র। সেইজন্যেই এর প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে সদস্যদের মনে সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থাকে আত্মস্থ করে তোলা।
১৮৪৮ সালের মহাবিদ্রোহের পর শ্রমজীবী মানুষের বৈপ্লবিক সংগঠন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে বিপ্লবীদের পিছে ফেউয়ের মতো লেগে ছিল ইউরোপের সরকারগুলো। বিপ্লব তৎপরতা থেমে থাকেনি। নানাস্থানে গোপনে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন রকমের বিপ্লবী সংগঠন।১৮৪৮ সালের মহাবিদ্রোহের সময় রুশ বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিন মুক্তিবাদী ছিলেন। স্বাধীনতার প্রাণস্পৃহা ছিল তার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মর্মে। বাকুনিন রচনা সংকলনের সম্পাদক ও অনুবাদক স্যাম ডলগফ মনে করেন, ১৮৬৬ থেকে রুশ বিপ্লবী বাকুনিন নৈরাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণার জগতে প্রবেশ করেন। National Catechism বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদ আলিঙ্গনের স্মারক রচনা। বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা আন্দোলনের জন্য মৌলিক সংকল্প’র ধারণায়ন করেন। কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক রাষ্ট্রকে একটা ফেডারেল সংগঠন দ্বারা প্রতিস্থাপনের সংকল্প এতে পষ্ট হয়। ফেডারেল সংগঠনের মৌলিক নীতিই হল: উপর থেকে নিচে নয়, নিচ থেকে উপরে। সংগঠন প্রশ্নে বাকুনিনের ফেডারেল পদ্ধতিই পরবর্তীকালে প্যারী কমিউনেরও সংগঠন প্রণালী ছিল। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন সামাজিক বিপ্লবে। National Catechism লেখা হয় ১৮৬৬ সালে। স্যাম ডলগফ অনূদিত ও সম্পাদিত Bakunin on Anarchy গ্রন্থে রচনাটি সংকলিত হয়েছে। বইটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়।-সম্পা
ভূমিকা
বিভিন্ন দেশের জাতীয় ক্যাটেকিজমে১ কিছু কিছু গৌণ বিষয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু এমন কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক বিষয় রয়েছে যা সকল দেশের জাতীয় সংগঠন বা সংস্থাগুলোকে স্ব-স্ব-ক্যাটেকিজমের ভিত্তি হিসেবে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে:
১) যে কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ জরুরি বিষয় হচ্ছে, জনগণের মুক্ত ফেডারেশনে যোগদানের ইচ্ছা যা কেন্দ্রীভূত, আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক সংস্থাগুলোকে একটা ফেডারেল সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করে। এই ফেডারেল সংগঠনের ভিত্তি হবে অঞ্চল, প্রদেশ, কমিউন, সমিতি এবং ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসন। এই ফেডারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য; এটি এমন কোনো সংগঠন২ হবে না যা উপর থেকে নিচে বা কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত সংগঠিত। আরোপিত বা কঠোরভাবে ছত্রবদ্ধ ঐক্যের নীতি খারিজ করে এটি মুক্ত ফেডারেশনের নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে নিচ থেকে উপরে দিকে বা পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে। এর মুক্ত বা স্বাধীন ব্যক্তিরা বহু স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত সংঘ বা সমিতি গড়ে তুলবেন। এই সংঘ বা সমিতিগুলো গঠন করবে স্বায়ত্বশাসিত কমিউন, এর কমিউনগুলো গঠন করবে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ, এর প্রদেশগুলো গঠন করবে অঞ্চল এবং এই অঞ্চলগুলো স্বাধীনভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে দেশ তৈরি করবে,পালাক্রমে আজ না হোক কাল এগুলোই সৃষ্টি করবে সর্বজনীন বিশ্ব ফেডারেশন।
২) প্রত্যেক ব্যক্তি, কমিউন, সংঘ [বা সমিতি], প্রদেশ এবং দেশের সংশ্লিষ্ট যে কোনো কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্ণ অধিকারের স্বীকৃতি।৩
৩) রাজনৈতিক সমতা ব্যতীত রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা ব্যতীত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সমতা অসম্ভব।
সামাজিক বিপ্লবের জরুরত
প্রত্যেকটি দেশেই নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং বৈপ্লবিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী এই বিপ্লবের বিস্তার ও গভীরতা কমবেশি ভিন্ন হবে। তদপুরি এমন কিছু নির্দিষ্ট নীতি আছে যেগুলো বর্তমানে জাতীয়তা বা পরিস্থিতি নির্বিশেষে জনগণকে বিপ্লবের দিকে আকৃষ্ট ও উৎসাহ করতে পারে। এই নীতিগুলো হলো:
১) ভূমি সমাজের সাধারণ সম্পত্তি, কিন্তু এর সুফল ও ব্যবহার কেবল তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে যারা এই ভূমিতে শ্রমের দ্বারা চাষাবাদ করবে। সে অনুসারে, ভূমি বর্গাও উচ্ছেদ করতে হবে।
২) যেহেতু সমস্ত সামাজিক সম্পত্তি শ্রমের দ্বারা উৎপাদিত, সেহেতু কাজ করতে সক্ষম ব্যক্তি যদি কাজ না করে খায় তবে সে চোর।
৩) কেবল সৎ লোকদেরই রাজনৈতিক অধিকারের অধিকারী হওয়া উচিৎ। এমন অধিকার কেবল শ্রমিকদেরই থাকবে।
৪) রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব একই সময়ে না হলে আজ কোনো দেশেই বিপ্লব সফল হবে না। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক বিপ্লব, তা সেটা জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার্থে বা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের জন্য বা এমনকি একটি রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য হলেও, যদি জনগণের আশু ও বাস্তবিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সাধিত না হয় তাহলে সেটা ঝুটা বিপ্লব হবে। এর উদ্দেশ্যগুলো কায়েম হবে না এবং এর পরিণতি হবে প্রতিক্রিয়াশীল।
৫) বিপ্লব অবশ্যই জনগণের জন্য না করে বরঞ্চ জনগণের দ্বারা করতে হবে। গ্রাম ও শহরের সকল জনগণকে প্রবল উৎসাহের সহিত যদি যুক্ত না করা যায় তাহলে বিপ্লব কখনোই সফল হবে না।
৬) সকল দেশের জন্য একটি সাধারণ কর্মসূচির ধারণা ও পরিচয় দ্বারা সংগঠিত হয়ে, গুটিকয়েকজনকে জড়ো না করে বরঞ্চ সকল দেশকে একটি একক কর্মপরিকল্পনায় জড়ো করবে এমন একটি গোপন সংস্থার সমন্বয়ে, অধিকাংশ গ্রামে ও শহরে একযোগে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, এই বিপ্লব শুরু থেকেই একটা স্থানিক চেহারা ধারণ করবে। আর এর মর্ম হল এই যে,একটা দেশের কোনো একটি একক বিন্দু বা কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া বৈপ্লবিক বাহিনীর সংখ্যাধিক্য এর উদ্ভব ঘটাবে না, অথবা এমনকি রোমান সাম্রাজ্য ধরনের৪ বুর্জোয়া আপাত-বৈপ্লবিক যুদ্ধাভিযানের চরিত্র গ্রহণ করবে না। এর বিপরীতে, দেশের সকল অংশ থেকে বিপ্লব শুরু হবে। এভাবে এটি পুরুষ, নারী ও শিশু সকলের অংশগ্রহণে প্রকৃত অর্থেই গণবিপ্লব হয়ে উঠবে এবং এটিই বিপ্লবকে অপরাজেয় করে তুলবে।
৭) শুরুতে (যুক্তির খাতিরে, যখন জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার নিপীড়কদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে)এই বিপ্লব খুব সম্ভব রক্তাক্ত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে। কিন্তু এই পর্বটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং কখনোই কাঠামোগত সন্ত্রাসবাদে পর্যবসিত হবে না।… এটি একটি যুদ্ধ হবে, বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে নয়, বরঞ্চ যুদ্ধ হবে মূলত সেই সমাজবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যার উপর তাদের ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ভর করে।
৮) সুতরাং এই বিপ্লব শুরু হবে সর্বোপরি সকল প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, চার্চ, পার্লামেন্ট, ট্রাইব্যুনাল, প্রশাসন, ব্যাঙ্ক, বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের মাধ্যমে, যেগুলো কিনা রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি গঠন করে। রাষ্ট্রকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে হবে এবং দেউয়ালিয়া ঘোষণা করতে হবে; সেটা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই নয় বরঞ্চ আরো রাজনৈতিকভাবে, আমলাতান্ত্রিকভাবে ও সামরিকভাবে (এর পুলিশ বাহিনী সহ) দেউলিয়া ঘোষণা করতে হবে। একই সাথে গ্রামীন ও শহুরে জনগণ বিপ্লবের সুবিধার্থে সকল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিবে। তারা প্রতিক্রিয়াশীলদের দখলে থাকা সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে এবং সকল দেওয়ানি, ফৌজদারি, বিচারিক ও সরকারি নথিপত্রকে বাতিল ঘোষণা করে সম্পত্তি ও ঋণের সকল দলিলাদি পুড়িয়ে ফেলবে, দখলি [সম্পত্তির] স্থিতাবস্থা অবস্থা বজায় রাখবে। এই পদ্ধতিতে সামাজিক বিপ্লব সাধিত হবে, এবং একবার যখন বিপ্লবের শত্রুরা তাদের সমস্ত সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে তখন আর তাদের বিরুদ্ধে কোনো রক্তাক্ত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। উপরন্তু, এমনতর দুর্ভাগ্যজনক পদেক্ষেপের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার অবধারিতভাবে ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাবে।
৯) বিপ্লবকে যেহেতু স্থানীয়করণ করা হচ্ছে, সেহেতু এটি অগত্যা ফেডারেলিস্ট চরিত্র ধারণ করবে। ফলে প্রতিষ্ঠিত সরকারব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে কমিউনগুলো অবশ্যই একটি বৈপ্লবিক পদ্ধতিতে নিজেদেরকে স্বীকৃতি দিবে: সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল নির্বাহককে জনগণের কাছে প্রত্যক্ষ ও কার্যকরভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে এমন নীতির উপর দাঁড়িয়ে প্রশাসক ও বৈপ্লবিক ট্রাইব্যুনাল নির্বাচিত করতে হবে।
১০) এই বিপ্লবের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়াসের সমন্বয়ে চক্রান্ত করা ও একটি শক্তিশালী গোপন সংগঠন বা সমিতি গড়ে তোলা জরুরি।
টীকা
১. ক্যাটেকিজমের (Catechism) শাব্দিক অর্থ ‘বিশেষত ধর্ম বিষয়ে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষাদান’। গ্রীক ভাষা থেকে অনূদিত শব্দের অর্থের দ্বারা শিক্ষণ বা নির্দেশনা বা ম্যানুয়াল বোঝানো হয়। তবে শব্দটা খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে বেশি জড়িত। এটি ধর্মের শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহৃত কোনো একটি মতাদর্শের একটি সংক্ষিপ্তরূপ বা ব্যাখ্যান বা বই। খ্রিষ্টান শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ধর্মান্তরিতদের শিক্ষাপ্রদানে এটি ভূমিকা পালন করে। ক্যাটাকিজমকে মতাদর্শিক ম্যানুয়াল হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়; প্রশ্নোত্তরের আকারে সেটা সাজানো হয়ে থাকে। শিক্ষণ বা নির্দেশনার এই ফরম্যাটটি কেবল ধর্মীয় পাঠেই যে ব্যবহৃত হয় তা নয়, সেকুলার পাঠেও এটি ব্যবহৃত হয়।- অনুবাদক
২. প্রবন্ধে নেশন শব্দটি ঠিক জাতি বা জাত অর্থে ব্যবহৃত হয় নি। রাষ্ট্র, জাতি, সংগঠন, সংস্থা ইত্যাদি অর্থে খানিক শিথিলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে- অনুবাদক
৩. বাকুনিন বিশ্বাস করতেন যে, সাধারণ জরুরত দ্বারা তাড়িত স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত সংগঠনগুলো উপর থেকে আরোপিত বাধ্যতামূলক ঐক্যের চেয়ে বেশি টেকসই। বাকুনিনের মতে, স্বতঃস্ফুর্ত একতা ‘আসলেই পোক্ত, ফলপ্রসু এবং দৃঢ় হবে’।- ইংরেজি অনুবাদকের ফুটনোট
৪.‘পার্টি লাইন’ আরোপ করার জন্য স্বৈরশাসকের প্রতিনিধি পাঠানো।- ইংরেজি অনুবাদকের ফুটনোট
মিখাইল বাকুনিন উনিশ শতকের রুশ নৈরাজ্যবাদী। সমাজতন্ত্রকে তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিকশিত রূপ হিসেবে দেখেছেন। বাকুনিন মনে করতেন, সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা বেইনসাফি আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র স্বেচ্ছাচার-নির্মমতা।
বর্তমান রচনাটি বাকুনিনের Stateless Socialism: Anarchism’র বঙ্গানুবাদ। রুশ নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম চিন্তক গ্রেগরি ম্যাক্সিমফ সম্পাদিত The Political Philosophy of Bakunin বইয়ে রচনাটি সংকলিত হয়। নিউইয়র্কের ফ্রিপ্রেস থেকে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় বইটি।
মূলপ্রবন্ধ
মিখাইল বাকুনিন
ফরাসিবিপ্লবেঘোষিতমহাননীতিরপ্রভাব
বিপ্লব অস্পষ্ট নয় বরং যৌক্তিক। স্বর্গীয় নয় বরং পার্থিব। অতিমানবিক কেচ্ছাকাহিনী নয় বরং মানুষের গল্প, মানুষের স্বাধীকারেরই ন্যায্যতা। ফরাসি বিপ্লব যখন এই নিদারুণ সত্য নিয়ে উপস্থিত, তখন দাবি করা হলো সব মানুষই সমান, সব মানুষই স্বাধীনতা-সাম্যের হকদার। এতে করে, এতদিন ধর্মীয় শাসনের ঘোরতর আফিমে বুঁদ হয়ে ছিল যে ইউরোপ এবং বিশ্বের সব সভ্য দেশ, তাদের জনগণের ঘুম ভেঙ্গে গেল। এবার তারা নিজেরাই প্রশ্ন করতে শুরু করল, তাদেরও কি সমতা, স্বাধীনতা এবং মানবতার হক আছে?
সহজাত জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধি দ্বারা যারা চালিত হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবে, সমতার এই প্রশ্ন সামনে আসতে না আসতেই তারা বুঝতে পারল যে, অর্থনৈতিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবতর্নই তাদের সত্যিকারের এবং মানবিক মুক্তির প্রথম শর্ত। রোজকার রুটি-রুজির প্রশ্নই তাদের কাছে প্রথম প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়াল। যেমনটা অ্যারিস্টটল১ বলেছিলেন, মুক্ত চিন্তার জন্য, মুক্তি অনুভবের জন্য এমনকি খোদ মানুষ হওয়ার জন্য অবশ্যই প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রশ্ন থেকে মুক্ত হতে হবে।
এই জন্য বুর্জোয়ারা যারা এতদিন জনমানুষের সহজাত জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির বাইরে অবস্থান করতো, জনতার বস্তুগত অস্তিত্বর বিরুদ্ধে গলা খেকিয়ে সবচেয়ে বেশি হাউকাউ করত, জাত গেল জাত গেল বলে ফাল পাড়ত; সেই কুলীনরাই সাম্য-স্বাধীনতার ব্যাপারটা কোন ধরনের গাইগুই ছাড়াই, বাড়তি প্যাঁচাল ছাড়াই একবাক্যে স্বীকার করে নিল। কিন্তু তারা নিজেরাই জানতো, এই স্বীকারোক্তি শুধু মুখে, বাস্তবে এর কোন উদাহরণ প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য নয়।
এরপর, জনতার সামনে এলো দ্বিতীয় প্রশ্ন- শ্রমের পরে অবসর, যা কিনা মানবতার অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর ছাড়া কখনোই সেই রুটি-রুজি কিম্বা অবসর অধিকার সম্ভব না। আর তাই যেসব মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল, তা থেকেই অনিবার্যরূপে জন্ম নেয় সমাজতন্ত্র।
সমাজতন্ত্রইন্যায়বিচার
সমাজতন্ত্র হলো ন্যায়বিচার। যখন আমরা ন্যায়বিচারের কথা বলি তখন আমরা আসলে রোমান আইনশাস্ত্রের বিচার বুঝি না, যা মূলত প্রতিষ্ঠিত ছিল বলপ্রয়োগ এবং সহিংসতার উপর ভিত্তি করে। কালের ব্যবধানে এবং ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ঝাঁড়ফুঁকে বা কলকাঠিতে এই সহিংসতাকে পবিত্র বলে জপ করতে করতে ঢুকিয়ে দেয়া হয় মানুষের মগজে। করে তোলা হয় সর্বমান্য এবং পরিণতিতে তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় চূড়ান্ত নীতি হিসেবে।
না, আমরা সেই ন্যায়বিচারের কথা বলছি, যা মানুষের বিবেকবোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, সেই ন্যায়বিচার যা সব মানুষের মননে বিকশিত, সেই ন্যায়বিচার যা শিশুদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে। এটা সেই ন্যায়বিচার, এক কথায় যার নাম- সমতা।
এই ন্যায়বিচারই নতুন দুনিয়ার ভিত্তি যা এখন পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক, বিচারিক বা অর্থনৈতিক বিশ্বে দেখা যায়নি। এই ন্যায়বিচার ছাড়া স্বাধীনতা, জনতন্ত্র, সমৃদ্ধি, শান্তি কোনোটাই থাকতে পারে না বা থাকে না। কার্যকর শান্তিপ্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে এই ন্যায়বিচারই আমাদের পথ দেখাবে। ভয়ঙ্করভাবে নিপীড়নের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি জোরালো করতে আমাদের চালিত করে এই ন্যায়বিচার।
সমাজতন্ত্রেরমূলনীতি
সুধীগণ, আমরা এখানে আকাশ থেকে পড়া কোনো সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলছি না। আমরা যা চাই তা হলো, নতুনভাবে ফরাসি বিপ্লবের সেই মহান নীতির ঘোষণা: মনুষ্যত্বর বিকাশের সব ধরনের বস্তুগত ও নৈতিক পন্থা মানুষের হাতেই থাকবে।
এই মৌলিক নীতিকে আমরা প্রকাশ করতে পারি এভাবে :
জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই বিচিত্র সৃজনশীলতার বিকাশ ও প্রয়োগের সমান সুযোগ থাকবে। এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে, যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়বে অন্তহীন শ্রম-শোষণ। প্রত্যেকেই সামাজিক সম্পদ ভোগ করবে যা বাস্তবে উৎপাদিত হবে সমাজেরই যৌথ শ্রমের মাধ্যমে। কিন্তু ততক্ষণই কেবল ওই সম্পদ ভোগ করবে যতক্ষণ সে সম্পদ সৃষ্টিতে সরাসরি অবদান রাখবে।
রাষ্ট্রীয়সমাজতন্ত্রবাদ
সমাজতন্ত্রের জন্য আমাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়াই করতে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস এরই মধ্যে এই গুরুতর প্রশ্নকে আমাদের সামনে হাজির করেছে। আমরা তাকে উপেক্ষা করতে পারি না। যদি করি তবে তা হবে আত্মপ্রতারণা। নিজের কাছে আজীবন ঘৃণ্য হিসেবেই বিবেচিত হব।
আমরা খুব জোরালোভাবে যেকোনো ধরনের সমাজসংস্থাকে প্রত্যাখান করছি যা অস্বীকার করে ব্যক্তি এবং সংগঠনের পূর্ণ স্বাধীনতা। আমরা তীব্রভাবে প্রত্যাখান করছি যে কোন ধরনের ক্ষমতার সংস্থাপণকে যা রেজিমেন্টেড, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক ।
স্বাধীনতাই আমাদের মূলভিত্তি। এমনকি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংগঠনেরও একমাত্র সৃজনশীল নীতি। তাই মুক্তির নামে নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রীয় সাম্যবাদ বা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রর প্রাদুর্ভাব হলে তাকে প্রতিরোধ করা আমাদের কর্তব্য।
উত্তরাধিকারআইনেরবিলোপ
উত্তরাধিকার আইন রাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। কর্তৃত্বপরায়ণ ও ঐশি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ন্যায়ভিত্তিক মুক্ত সমাজে রূপান্তরের জন্য এই রাষ্ট্রের বিলোপ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই বিলোপ না হচ্ছে, রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার আইনের মাত্রা একটু একটু করে কমিয়ে আনতে হবে যাতে তার উচ্ছেদ ঘটে। আর তা সম্ভব কেবল স্বাধীনতার মাধ্যমেই।
আমরা মনে করি, সব ধরনের উত্তারাধিকার বিলোপ ঘটনো দরকার। যতক্ষণ এই অধিকার থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বংশানুক্রমিকভাবে অর্থনৈতিক অসমতা বিরাজ করবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এই অসমতা প্রাকৃতিক নয় বরং শ্রেণীগত এবং কৃত্রিম, মানুষের বানানো। এতে করে পুনপৌনিকভাবে মানবীয় বিকাশ অসম হয়ে হয়ে পড়ে এবং চৈতন্য গঠনকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বেঁধে ফেলে। আদতে যা কিনা অন্যান্য সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসমতার পুতঃপবিত্র উৎস হিসেবে কাজ করে।
ন্যায়বিচার কায়েমে প্রধান কাজ হল সমতা প্রতিষ্ঠা। যা কিনা আদতে নির্ভর করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমাজ-সংগঠনের উপর। এই সমতা এমন ধরনের, যাতে মানুষ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জীবন শুরু করতে পারে এবং প্রত্যেকে হয়ে ওঠে তার নিজস্ব কর্মরেই প্রতিরূপ।
আমাদের মতে, সদ্য মৃতদের সম্পত্তি সামাজিক তহবিলে জমা করতে হবে। জন্মের পর থেকে সাবালক না হওয়া পর্যন্ত জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে তা ব্যয় হবে সবার শিক্ষা-দীক্ষার জন্য।
জনগণের সব সম্পত্তি শুধু তাদের অধিকারেই যাবে, যারা নিজ হাতে এর চাষ করে। আর এই মৌলিক ধারণাটি স্লাভ বা রাশিয়ান হিসেবে আমাদের জনগণের ঐতিহ্যগত সাধারণ প্রবৃত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত।
আমরা মনে করি, এসব মৌলিক নীতি ন্যায্য এবং সব ধরনের গুরুতর সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য শর্ত। কাজেই পশ্চিম ইউরোপ এই নীতি বুঝতে এবং গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে না। দেশে দেশে এই বোঝাপড়ার ভিন্নতা থাকতে পারে। যেমন, ফ্রান্সে অধিকাংশ কৃষক যে ভূমি চাষ করেন তারা সেটার মালিক। কিন্তু শিগগিরই তাদের বেশিরভাগই ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে এবং মালিকানা শুন্য হয়ে পড়বে। এটা ফ্রান্সে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জারি আছে তারই অপরিহার্য ফল। তো, যায় হোক, ভূমির প্রশ্নে যে কোনো ধরনের প্রলোভন থেকে আমরা বিরত থাকব। আমাদের উচিত নিজস্ব ঘোষণার উপর দাঁড়ানো।
সমাজতন্ত্রেরঘোষণা
যতক্ষণ আমজনতা মৌলিক অধিকার বিচ্যুত, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে অচ্ছুত ও দাস হতে বাধ্য হবে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির সুস্পষ্ট বোঝাপড়া অসম্ভব। এই দাসত্ব আইনগত নাও হতে পারে। দরিদ্রতা, রুটিরুজির প্রয়োজনে অবসর-বিশ্রাম ছাড়া বাধ্য-শ্রমের মাধ্যমেও আরোপ হতে পারে। দুনিয়া যে সম্পদের উপর গর্ব করে, শ্রমে-ঘামে তার সবটা উৎপাদন করেও যখন রুটির এতটুকু একটা টুকরো জোটে না, পরদিনের জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না, তখন তা দাসত্বই।
শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ভয়ঙ্করভাবে দমন-পীড়নের শিকার। মানুষের মুক্তির সমস্যা আদতে রুটি-রুজির সমস্যা। রুটি-রুজির সমস্যা মানে মানসিক মুক্তির সমস্যা। রুটি-রুজির সমস্যা মানে স্বাধীনতার সমস্যা। এমনকি মানবতার সমস্যাও বটে।
সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা বিশেষ সুবিধা এবং অন্যায্য। আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র দাসত্ব, হিংস্রতা।
লীগ [দ্য লিগ ফর পিস এন্ড ফ্রিডম২] ঘোষণা করছে যে, পুঁজি ও সম্পত্তির গোলামি থেকে জনগণের শ্রম-মুক্তির লক্ষ্যে বৈপ্লবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। সত্যিকারের ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে এমন পুনর্গঠন, যা কল্যাণমুখি বিজ্ঞান ও সদা বিকাশমান স্বাধীনতার উপর প্রতিষ্ঠিত। মোদ্দা কথায়, দরকার মানুষের ন্যায়বিচার; যা আদতে বিচারসংস্থা-ধর্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মবাদ ভিত্তিক কোন ন্যায়বিচার বা তার ভ্রম নয়।
রাজনৈতিকক্ষমতারবদলেউৎপাদনভিত্তিকসংগঠন
সবধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্ছেদ দরকারি। নীতিতে থাকুক কিম্বা বাস্তবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা মাত্রই তাতে থাকবে শাসক ও শাসিত, মালিক ও দাস এবং শোষক ও শোষিত । একবার এই রাজনৈতিক ক্ষমতার বিলোপ ঘটলে তার স্থলে প্রতিষ্ঠা করতে হবে উৎপাদনী শক্তি ও অর্থনৈতিক সেবার সংগঠন।
আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপক উন্নতি হলেও এর চূড়ান্ত এবং যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে অর্থহীন হয়ে পড়া। ধীরে ধীরে পরিস্কার হচ্ছে যে, যাবতীয় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দিনক্ষণ ফুরিয়ে আসছে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, আম জনতা তাদের মুক্তির চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দিক-দিগন্তে দাবি তুলছে। জেগে উঠছে মানুষ ও তাদের মুক্ত সামাজিক সংগঠন। সরকারি হস্তক্ষেপের বাইরে মুক্ত অর্থনৈতিক সংগঠনের ছায়াতলে একত্রিত হচ্ছে তারা। সাবেকী যত রাষ্ট্রীয় উচ্ছিষ্টভোগী এবং জাতিবাদী নীতিকে একপেশে করে শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী ও মানবীয় শ্রমের ভিত্তিতে এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ।
জনতারআর্দশ
জনতার সামনে এক অভিনব আদর্শ হাজির। যার লক্ষ্য হচ্ছে সব ধরনের অভাব ও দারিদ্রের সমাপ্তি। যৌথ শ্রমের মাধ্যমে বস্তুগত সকল চাহিদার পূর্ণতুষ্টি। যা সবার জন্য সমান এবং সবার জন্যই প্রযোজ্য। এরপর যখনই আধিপত্য বিলুপ্ত হবে জনগণের চাহিদা পুরণে জনতারই মুক্ত সংগঠন কার্যকরী হয়ে উঠবে। এই সংগঠনের কাঠামো রাষ্ট্রের মতো উপর থেকে নিচে নয় বরং তার গঠন হবে গোড়া থেকে উপরের দিকে। যা সরকার-আইনসভার স্থলে কাজ করবে বিভিন্ন সমিতির মুক্ত ইউনিয়ন হিসেবে। কৃষি সমিতি, কারখানা-শ্রমিক সমিতি, সম্প্রদায়-সমিতি, আঞ্চলিক এবং জাতীয় সমিতির মেলবন্ধন এই মুক্ত ইউনিয়ন। আর এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের উপর চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে বৈশ্বিক মানব সংহতি।
মুক্তসমাজেরকর্মসূচি
মাজিনিয়ান সিস্টেম৩ মাত্রই রাষ্ট্ররূপে রিপাবলিক সিস্টেম। এর বাইরে কমিউন রূপে, ফেডারেশন হিসেবে একটি সমাজতান্ত্রিক ও জনগণের সত্যিকারের রিপাবলিক হিসেবে নৈরাজ্যবাদ ছাড়া আর কোন পথ নেই। এটাই হচ্ছে সামাজিক বিপ্লবের রাজনীতি যার লক্ষ্য রাষ্ট্রের বিলোপ। আর তার স্থলে জনতার অর্থনৈতিক মুক্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা। এই মুক্ত সংগঠনগুলো ফেডারেশনের মাধ্যমে নিচ থেকে উপরের দিকে পরিচালিত হবে।
… কোন রাজনৈতিক সরকারের অস্তিত্বের সম্ভাবনা থাকবে না। তার বদলে সরকার রূপান্তরিত হবে সাধারণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সরল কাঠামো।
মোদ্দা কথায় আমাদের কর্মসূচি হল:
– সকল নিপীড়িতের জন্য শান্তি, স্বাধীনতা এবং খুশালি
– সকল নিপীড়ক ও লুটেরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
– শ্রমজীবীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সমস্ত পুঁজি, কারখানা, যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল যাবে শ্রমজীবীদের সমিতিতে। সম্মিলিতভাবে ভূমি থাকবে তাদের হাতে যারা নিজের হাতে ফসল ফলায়।
– পৃথিবীর সকলের জন্য ন্যায়বিচার এবং মৈত্রী
– সকলের জন্য সমতা
– সবার জন্য বৈষম্যহীন সমৃদ্ধি। শিক্ষা, অগ্রগতি এবং কাজের মাধ্যমে জীবন ধারণের সমান সম্ভাবনা।
-মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে সমাজ গঠন। নিচ থেকে উপরে। কারখানা শ্রমিকের সংগঠন, কৃষকের সংগঠন, বিজ্ঞানীদের সংগঠন, সাহিত্যিকদের সংগঠন। প্রথমে একটা কমিউনে, তারপর কমিউনের ফেডারেশন; কমিউনের ফেডারেশন থেকে আঞ্চলিক, আঞ্চলিক থেকে জাতীয়; এরপর আন্তর্জাতিক সর্বজনীন সংগঠনে সংগঠিত হওয়া।
আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন সংগঠন: গ্রাঞ্জার
বৈপ্লবিকসময়েরসঠিককর্মকৌশল
সামাজিক বিপ্লব সবসময়ই রাজনৈতিক বিপ্লবের পুরোপুরি বিপরীত। একক ব্যক্তি-কৃতিত্বর স্থলে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনই তার চালিকাশক্তি। সামাজিক বিপ্লবে ব্যক্তির ভূমিকা হল, আমজনতার সহজাত জ্ঞানকে আরও বিকশিত, আরও স্পষ্ট করার পাশাপাশি সে অনুযায়ী তৎপরতা চালানো। একই সঙ্গে জনগণে স্বাভাবিক ক্ষমতার বৈপ্লবিক সংগঠন-প্রচেষ্টায় লাগাতার অবদান রাখা। এর বাইরে আর কিছু নয়; বাকিটা জনগণ নিজেরাই ঠিক করবে। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় পুনরুজ্জীবনের অন্য যেকোনো তরিকা হবে রাজনৈতিক স্বৈরাচার। সামাজিক আন্দোলন রূপ নেবে রাজনৈতিক স্বৈর-আন্দোলনে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে উত্থান ঘটাবে নিপীড়ন এবং অসমতা তথা বিশেষ অধিকারের। রাষ্ট্রপন্থী তরিকার গতিমুখ গিয়ে ঠেকবে সাতরাস্তার মোহনায়,যেখানে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্বের অবধারিত পথই হয়ে উঠবে যৌক্তিক।
ফরমানদিয়েবিপ্লবহয়না
কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদীদের ধ্যান-ধারণা আমার মতে, একটা চূড়ান্ত প্রতারণা। তারা মনে করে, স্বৈরক্ষমতা বা প্রতিনিধিত্বশীল গণপরিষদের মাধ্যমে ফরমান দিয়ে সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত করা যায়। অন্যদিকে প্যারি-সমাজতন্ত্রীরা৪ মনে করতেন, একমাত্র জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিকাশমান বিভিন্ন গোষ্ঠী ও জনসমিতির বিপুল কর্মযজ্ঞর মাধ্যমেই বিপ্লবকে চূড়ান্ত রূপ দেয়া সম্ভব।
বিপ্লব প্রশ্নে, প্যারি-সমাজতন্ত্রী বন্ধুরাই হাজারগুণ ঠিক ছিলেন। আসলে, এমন কোন চৈতন্য নেই, যা মেধা আর সর্বগুণে গুণান্বিত। আর তাই আমরা যদি কয়েকশ অতিমানবের সম্মিলিত একনায়কত্বের কথা বলি, তাতে মেধার এমন কোন তেলেসমাতি থাকবে না, যা জনগণের সাধারণ সংকল্প তথা এর মধ্যে বিকশিত আশা, আকাঙ্ক্ষা বা সত্যিকারের স্বার্থের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় বহুত্বকে ধারণ করতে পারে। আসলে মেধার এমন কোন সক্ষমতাই নেই যা প্রত্যেকের এবং সকলের পুর্ণাঙ্গ তুষ্টির জন্য একটা সামাজিক সংগঠন নির্মাণ করতে পারে।
তারা শুধু পারে এমন একটা সংগঠন বানাতে যার মাধ্যমে হতভাগ্য সমাজের উপর জোরপুর্বক, সহিংস ও রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের মতলব আঁটা যায়। আর এই সেই সেকেলে সংগঠন পদ্ধতি যা বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। গণমানুষ ও তার বিভিন্ন গোষ্ঠী, সমবায়, সমিতি, এমনকি ব্যক্তির পুর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই উচ্ছেদ করতে হবে সব ধরনের সহিংসতার ঐতিহাসিক ভিত্তিকে; বিনাশ করতে হবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে। এই পতনেই ধ্বংস হবে সব ধরনের বিচারিক অধিকারের অসমতা এবং যাজকতন্ত্রের মিথ্যাচার যা এতদিন একেবারে পূত-পবিত্র, আর্দশিক ও বাস্তবিক বলে বিবেচিত ছিল। বিলোপ ঘটবে সেইসব সহিংসতার যা এতকাল রাষ্ট্র কর্তৃক উপস্থাপিত-অনুমোদিত ও রক্ষিত ছিল।
তবে এটা খুব পরিষ্কার যে, রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব হারাতে শুরু করলে মানুষও স্বাধীনতা অর্জন করতে শুরু করবে। সংগঠিত হবে সত্যিকারের সমাজস্বার্থের ভিত্তিতে। আর এভাবে সংগঠিত ব্যক্তি- গোষ্ঠী-সমিতি খুঁজে পাবে বাস্তবিক মুক্তির পথ।
রাষ্ট্রবিলোপেরপথেযাবেমুক্তসংগঠন
রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় সংগঠনের পতনই হবে সমাজের সত্যিকারের মুক্তির জন্য প্রথম এবং অপরিহার্য শর্ত। আর এরপরই সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে তার নিজস্ব সংগঠন। এই সংগঠন কখনোই ‘উপর থেকে নিচ’ কাঠামোবিশিষ্ট হবে না। এমনকি গুটিকতক মহাজ্ঞানী-মহাপণ্ডিতের তৈরি করা আর্দশও অনুসরণ করবে না। স্বৈরক্ষমতা বা সার্বজনীন ভোটে নির্বাচিত কোন গণপরিষদের ফরমান দিয়েও চলবে না এই সমাজ-সংগঠন।
তবে এর ব্যাত্যয় ঘটলে, আমি আগেই বলেছি, এমন এক ব্যবস্থা কায়েম হবে যা অবধারিতভাবে নিয়ে যাবে সরকারি অভিজাততন্ত্রের পথে। সৃষ্টি করবে এমন একটা নতুন শ্রেণি যার সঙ্গে জনগণের কোন সমস্বার্থ থাকবে না। ফলে জনকল্যাণের অজুহাতে কিংবা রাজকীয় মুক্তির নামে নিশ্চতভাবে এই শ্রেণী শোষণ শুরু করবে এবং ফিরে আসবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার সেই পুরনো রীতি।
সমতারহাতেহাতরেখেইহাঁটবেমুক্তি
আমি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমতার পক্ষপাতী। আমারা জানি, সমতার বাইরে মুক্তি, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, নৈতিকতা, ব্যক্তির কল্যাণ বা জাতির অগ্রগতি আদতে মিথ্যের ফুলঝুরি ছাড়া আর কিছুই নয়। মুক্তির পথে- মানবতার পথে প্রথম শর্ত হল সমতা প্রতিষ্ঠা। দুনিয়াব্যাপী, শ্রম এবং সম্পত্তির যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুক্ত স্বাধীন সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমতা। সমতা আসবে, পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উৎপাদকদের মুক্ত সংগঠনের সমবায় এবং তার মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে। কেন্দ্র-কর্তৃত্বের এক-অদ্বিতীয় ত্রাণকর্তা রাষ্ট্রর পথ ধরে নয়।
কর্তৃত্বপরায়ণওমুক্তিপরায়ণবিপ্লবেরপার্থক্য
বিপ্লব প্রশ্নে দুই ধারা। এর একটা হল- সমাজতন্ত্রী বা বিপ্লবী সংঘ। আর আরেকটা হল- কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদী, যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সবকিছু হাসিল করতে চায়। দুই ধারার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। যদিও উভয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক। যৌথ শ্রম, অর্থনৈতিক সমতা এবং উৎপাদনের উপায়ের উপর সামষ্টিক মালিকানার ভিত্তিতে উভয়েই একটা নতুন সমাজ নির্মাণ করতে চায়।
সাম্যবাদীরা মনে করেন, শ্রমজীবী শ্রেণীর বিকাশ এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে, বিশেষত শহুরে সর্বহারা শ্রেণী ও বুর্জোয়া চরমপন্থার সহযোগিতায় এই লক্ষ্য হাসিল সম্ভব। অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা সবধরনের অস্পষ্ট জোটকে শত্রু মনে করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা নয় বরং সামাজিক সংগঠন (যা আদতে রাজনীতি-বিরোধী) এবং গ্রাম-শহরের শ্রমজীবী জনতার শক্তির মাধ্যমে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা এই সাধারণ লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এমনকি যারা উচ্চকোটিতে জন্মেছে কিন্তু নিজেদের অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং প্রকাশ্যে সর্বহারার সঙ্গে যোগ দিয়ে এর কর্মসূচি মেনে নিয়েছে তারাও এর অর্ন্তভুক্ত হতে পারে।
সাম্যবাদীওনৈরাজ্যবাদীকর্মসূচিরপদ্ধতি
সাম্যবাদী এবং নৈরাজ্যবাদী দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি। সাম্যবাদীরা মনে করেন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন নিতে শ্রমিক-শক্তিকে সংগঠিত করা জরুরি। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রীদের লক্ষ্য খোদ রাষ্ট্রকে বিনাশ করা। একটু পরিশীলিত করে বললে, রাষ্ট্রকেই বিলোপ করে দেয়া। সাম্যবাদীরা কর্তৃত্বের নীতি ও চর্চার দলভুক্ত। অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।
উভয়েই সমানভাবে বিজ্ঞানের পক্ষপাতি, যা কুসংস্কার দূর করবে এবং অন্ধবিশ্বাসকে প্রতিস্থাপন করবে। কিন্তু সাম্যবাদীরা বিজ্ঞানকে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। আর বিপ্লবী সংঘ চেষ্টা করে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে মানুষের মাঝে ব্যপৃত করতে যাতে মানব সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের প্রচারে সহমত হলে নিজেরা সংগঠিত হতে পারে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিতে পারে ফেডারেশনে, বাস্তব স্বার্থ এবং স্বাভাবিক প্রবণতার ভিত্তিতে। এমন কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে নয়, যা মুর্খ মানবগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগের জন্য গুটিকতক ‘উর্বর’ মস্তিস্ক প্রসূত। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রীরা বিশ্বাস করে, আমজনতার সহজাত আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যেই নিহিত থাকে কাণ্ডজ্ঞান এবং সত্যিকারের করণ-কারণ যা কিনা, সমাজের সর্বরোগের বিজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা মনবজাতির ঘাড়ে জুড়ে বসা সবকদাতাদের চৈতন্যে নেই। মানবজাতির উদ্ধারে হতাশাব্যাঞ্জক অসংখ্য ব্যর্থ চেষ্টাই কেবল তাদের উদাহরণ এবং আজও তা একই কায়দায় চলমান। বিপরীতে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা মনে করে, মানবসমাজের আসল রোগটা হল, যোজন যোজন বছর ধরে শাসিত হতে থাকা, যার গোড়া আদতে দুর্ভাগ্য বা বিশেষ ধরনের কোন সরকার ব্যবস্থা নয় বরং খোদ সরকারের অস্তিত্বের মধ্যেই নিহিত। তাতে সরকারের চরিত্র যাই হোক না কেন।
মতামতের এসব পার্থক্য এখন ঐতিহাসিকও বটে। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ আর প্রুঁধোবাদের মধ্যে তা বিদ্যমানও। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ জার্মান ঘরানা থেকে উদ্ভূত এবং আমেরিকান ও ইংরেজ সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে আংশিকভাবে গৃহীত। আর প্রুঁধোবাদের সৃষ্টি সমাজতন্ত্রীদের বিকাশমান ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তর উপর ভিত্তি করে এবং তা বিস্তৃত ল্যাতিন দেশগুলোর শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র প্রথমবারের মতো এর সবচেয়ে উজ্জল ও বাস্তব রূপায়ন ঘটায় প্যারি কমিউনে।
সর্বজার্মান ব্যানারে লেখা: যেকোন মূল্যে রাষ্ট্রকে রক্ষা ও তার শক্তিবৃদ্ধি। বিপরীতে আমাদের সামাজিক-বৈপ্লবিক ব্যানারে আগুন আর রক্তের আখরে লেখা: সব রাষ্ট্রের ধ্বংস; বুর্জোয়া সভ্যতার বিনাশ। নিচ থেকে উপর ভিত্তিতে স্বতস্ফূর্ত মুক্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিকামী জনতার অবাধ-স্বাধীন শ্রম সংগঠনের মাধ্যমে মুক্ত সমতি গঠন।
অতঃপর বিশ্বজুড়ে নয়া মানবিক দুনিয়া সৃষ্টি!
তথ্যপঞ্জি
১. গ্রীক দার্শনিক। তাকে পশ্চিমা দর্শনের জনক হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। রাজনীতি, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্যার পুরোধা তিনি। নির্মোহ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জনকে পথ মনে করতেন। তার বিখ্যাত উক্তি: Man is by nature a political animal . মানবীয় প্রকৃতি যুক্তিশীল এবং এটাই তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে।
২. লুক্সেমবার্গ নিয়ে ফ্রান্স এবং প্রুশিয়ার যুদ্ধের সময় লিগঅবপিসএন্ডফ্রিডম প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৭ সালের সেপ্টম্বরে এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। মিখাইল বাকুনিন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। লিগে জনস্টুয়ার্ট মিল, ভিক্টর হুগো, লুইস ব্লাঙ্ক, গ্যারিবাল্ডির মত প্রভাবশালী চিন্তক ও রাজনীতিবিদরাও ছিলেন। কংগ্রেসে প্রায় ৬ হাজার প্রতিনিধি যোগ দেয়।
৩. ম্যাজিনি ইতালীয় রাজনীতিবিদ। ঐক্যবদ্ধ ইতালি গঠনে তাঁর ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। ম্যাজিনি রিপাবলিকান ছিলেন। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ সম্পর্কে তার ছিল বিরূপ মনোভাব। তিনি শ্রেণী সংগ্রামের বিরোধিতা করেন এবং শ্রেণী-সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে প্রচার করেন। রাষ্ট্র সম্পর্কে তার ধ্যান-ধারণাই ম্যাজিনয়িাম ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। ইউনাইটেড স্টেটস অব ইউরোপ ধারণারও প্রবক্তা তিনি।
৪. ১৮৭১ সালে প্যারিসে শ্রমজীবীরা সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করে। এই বিপ্লব ‘প্যারি কমিউন’ নামে পরিচিত। কমিউন একটি যৌথ সমাজ ব্যবস্থা। মুক্ত শ্রম এবং এবং সামাজিক মালিকানা এবং সমতাই ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ঠ্য। স্ব-প্রতিনিধিত্বমূলক এই ব্যবস্থায় স্থায়ী সেনা বাহিনীর বদলে জনগণকে সশস্ত্র করা হয়। এছাড়া স্থায়ী আমলাতন্ত্র-পুলিশ ও বিচারকের বদলে সর্বস্তরে চালু হয় স্ব-প্রতিনিধিত্ব।
মিখাইল বাকুনিনের জন্ম রাশিয়ায়, ১৮১৪ সালে। বাকুনিন ছিলেন একজন অ্যানার্কিস্ট, একজন দৃঢ়চেতা বিপ্লবী। বিপ্লবে তাঁর ছিল প্রগাঢ় আস্থা, বিশ্বাস করতেন ঘুরানো-পেঁচানো ঠুনকো কোনো নীতি দিয়ে বিদ্যমান শ্রেণি সংঘাতের প্রশ্নের সমাধান হবে না। এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর জীবনের বিপুল কর্মশক্তির সমস্তটাই নিয়োজিত করেছিলেন বিপ্লবের কাজে। রুডলফ রকার এক মন্তব্যে বাকুনিনকে আধুনিক অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনের স্রষ্টা বলে অভিহিত করেছিলেন। সকল অ্যানার্কিস্টের মতো তারও ছিল ‘সকল জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্ত একটা সমাজের আকাঙ্ক্ষা’। সমাজকে তাঁরা দিয়েছেন সর্বোচ্চ প্রাধান্য। নিচের প্রবন্ধটি বাকুনিন লিখেছিলেন ১৮৭১ সালে। সমাজের মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীনতার স্বরূপ কি হবে তা-ই মূল বিষয়। বাকুনিন লিবারেল তাত্ত্বিকদের যুক্তি খণ্ডনের মাধ্যমে এগিয়েছেন। লিবারেল তাত্ত্বিকরা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ব্যক্তিকে সমাজের পূর্ববর্তী ধরে নিয়েছিলেন, আর, বাকুনিন বলছেন যে, ব্যক্তি মূলত সমাজেরই সৃষ্টি। বাকুনিনের মতে, এই চিন্তাধারাই লিবারেল তাত্ত্বিকদের দিনশেষে রাষ্ট্রের রক্ষক বানিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের খবরদারি সীমিত রাখার ব্যাপারে লিবারেলরা খানিকটা অ্যানার্কিস্টদের পাশে অবস্থান নিলেও, বাকুনিনসহ অন্য অ্যানার্কিস্টরা এটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁরা চান সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার সকল প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি। তাই, লিবারেলরা যখন বলেন, সেই সরকারই ভালো যে সরকার শাসন করে কম, বিপরীতে অ্যানার্কিস্টরা বলেন, সেই সরকারই ভালো যে সরকার কোনো শাসনই করে না।
মিখাইল বাকুনিন (১৯১৪-১৮৭৬)
বাকুনিন বলেন, ব্যক্তি যেহেতু সমাজেরই সৃষ্টি, সেহেতু মানুষ ব্যক্তিস্বাধীনতা উপলধ্বি করতে পারে কেবল সমাজের মধ্যে থেকেই। সমাজের তাঁর মতো অন্যান্যদের স্বীকৃতির মাধ্যমেই সে পাবে চূড়ান্ত স্বাধীনতা। সমাজের একটা বিরাট অংশকে পদানত ও দাসত্বের মধ্যে রেখে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব না। সমাজে বসবাস করার মাধ্যমেই মানুষ তাঁর নিজের ও মানবিকতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। সমাজের বাদবাকি সকলের উপস্থিতিতে ও পারষ্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমেই ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়। এই যে স্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে সেটির মধ্যে বাকুনিন দুইটা উপাদানের কথা উল্লেখ করেন। প্রথম উপাদান হচ্ছে, এটি সম্পূর্ণ সামাজিক, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এই স্বাধীনতা নেতিবাচক। নেতিবাচক হচ্ছে এই অর্থে যে, এটি সকল ধরনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সকল রকম কর্তৃত্বকে নাকচ করে দেয়। এই কর্তৃত্ব যেমন ধর্মের, মানে ঈশ্বরের স্বৈরশাসনের , তেমনি মানুষের স্বৈরশাসনের। চার্চকে যেমন বাতিল করে দেয়, তেমনি রাষ্ট্রকেও। অ্যানার্কিস্টদের মতে, রাষ্ট্র তা সে যে তন্ত্রীই হোক না কেনো, স্বৈরতন্ত্রকে আঁকড়ে থাকুক বা সংবিধানকে বুকে রাখুক, তবু তার কার্যাবলী সর্বদা একই থেকে যায়। খারাপ মানুষের স্থলে ভালো মানুষ চলে এলেই রাষ্ট্র বিষয়টা ‘নিপাট ভদ্রলোক’ হয়ে যায় না। রাষ্ট্র সবসময় টিকে থাকে গণশোষণ ও অল্প কিছু মানুষের বিশেষাধিকারের মাধ্যমেই।
আলোচ্য প্রবন্ধে বাকুনিন সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটা ফারাক করেন, একটিকে তিনি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক হিসেবে হাজির করেন, অন্যটিকে রাজনৈতিক ও আরোপিত রূপে। তবে এই প্রবন্ধে তাঁর আলোচনা যতটা না এই ভেদকে কেন্দ্র করে ছিল, তাঁর চেয়ে বেশি ছিল সমাজ কীভাবে ব্যক্তির ওপর তাঁর স্বাভাবিক ও সহজাত প্রভাব বিস্তার করে সে দিকে। একেবারে সহজ-সরল ভাষায় সমাজের গতিপথ নির্ণয় করেছেন। বাকুনিন বলেন, রাষ্ট্র যেখানে কাজ করে জোরজবরদস্তি ও একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে, সমাজ সেখানে কাজ করে মমত্ববোধ ও পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। এমনকি রাষ্ট্র যখন ভালো কিছু করার জন্যে আইনত বাধ্য করে সেটার ফলও খারাপই হয়, কেননা, মানুষ কোনো ধরনের চাপে ভালো কাজ করে না, বরং, সে ভালো কাজ করে কারণ সে তা স্বাধীনভাবেই পছন্দ করে, সে তা চায় বলেই, সে তা ভালোবাসে বলেই। বাকুনিনের মতে, ব্যক্তির বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সকল ধরনের উন্নতির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সমাজের মধ্যে। ব্যক্তির স্বাধীনতার মূল জমিনই হচ্ছে সমাজ।
দুনিয়াজুড়ে যে পরিস্থিতি বর্তমান সেটাই বোধহয় রাষ্ট্র-সমাজ-স্বাধীনতা বিষয়ে অ্যানার্কিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করতে আমাদের উৎসাহ দিচ্ছে। বাকুনিনের এই প্রবন্ধের অনুবাদ খুব সম্ভব সেই তাগিদ থেকেই। প্রবন্ধের হদিস পেয়েছি মার্ক্সিস্ট অনলাইন আর্কাইভ থেকে। অনুবাদ বিষয়ক যে কোনো মতামত কাম্য।
মূল প্রবন্ধ
লিবারেল তাত্ত্বিকরা, যারা ব্যক্তিস্বাধীনতার জমিনে দাঁড়িয়ে যুক্তি দেখিয়ে থাকেন, তারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে জাহির করেন। তাদের মধ্যে যারা মানেন যে সরকার, মানে, রাষ্ট্রের কাজ সম্পাদনের জন্যে মনোনীত এবং সুসংগঠিত একটি কার্যনির্বাহী দেহ হচ্ছে প্রয়োজনীয় মন্দ (necessary evil), এবং মানেন যে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যাবলী ও অধিকারগুলোকে ক্রমাগত কমানোর মধ্যেই সভ্যতার অগ্রগতি নিহিত, তাদের মধ্যে অসংগতি আছে। তত্ত্ব তো এমন, কিন্তু চর্চার ক্ষেত্রে এই একই লিবারেল তাত্ত্বিকরা যখন দেখেন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা স্থিতিশীলতা মারাত্মক হুমকির মুখে, তখন তারা রাজতন্ত্রী এবং জ্যাকোবিনদের মতো রাষ্ট্রের গোঁড়া রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হোন।
রাষ্ট্রের প্রতি তাদের এই যে আনুগত্য, যা তাদের লিবারেল নীতির সাথে সুনির্দিষ্ট-রূপে সাংঘর্ষিক, তা দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বাস্তবে, তাদের শ্রেণি স্বার্থগুলি প্রচুর সংখ্যক লিবারেল তাত্ত্বিককে বুর্জোয়া দলের সদস্যে পরিণত করে। এই শ্রেণি শুধু নিজেদের জন্যেই একচেটিয়া অধিকার এবং পূর্ণ ক্ষমতার বিশেষাধিকার দাবি করে। তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের আর্থসামাজিক ভিত্তি laissez faire এবং laissez aller – এই দুই বিখ্যাত বাক্যাংশে প্রকাশিত অবারিত স্বাধীনতার যে নীতি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু তারা এই নৈরাজ্য শুধু তাদের জন্যেই চায়, জনগণের জন্যে নয়। কেননা, তাদের মতে জনগণকে রাষ্ট্রের কঠোর শৃঙ্খলার অধীনেই রাখা উচিৎ কারণ অপব্যবহার না করে এই নৈরাজ্য উপভোগ করতে জনগণ একেবারেই অজ্ঞ। এটি বলা হয় কারণ, যদি জনসাধারণ অন্যের জন্যে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ করে, তাহলে সমগ্র বুর্জোয়া কাঠামোই ভেঙ্গে পড়বে। সবসময় এবং সবজায়গাতেই, যখন জনসাধারণ অস্থির হয়ে ওঠে, তখন এমনকি সবচেয়ে উৎসাহী লিবারেলও অবিলম্বে বিপরীত দিকে হাটা শুরু করেন এবং সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের সবচেয়ে গোঁড়া রক্ষক বনে যান।
এই বাস্তবিক কারণের পাশাপাশি, এখানে আরেকটা তাত্ত্বিক দিকও আছে যা কিনা সবচেয়ে আন্তরিক লিবারেলকে রাষ্ট্র-পূজার দিকে ঠেলে দেয়। তারা নিজেদেরকে লিবারেল দাবি করেন কারণ সমাজ উদ্ভবের তাদের তত্ত্ব ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ঠিক এই কারণেই তারা অবধারিতভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন।
তাদের মতে ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজের ঐতিহাসিক ফসল নয়। বিপরীতে তারা মনে করেন যে, ব্যক্তিস্বাধীনতা সকল সমাজের পূর্ববর্তী এবং সবাই ঈশ্বর প্রদত্ত এক অমর আত্মা দ্বারা অধিষ্ঠিত। তদনুসারে মানুষ সমাজ থেকে আলাদা এবং সমাজের বাইরের এক সম্পূর্ণ সত্ত্বা, একেবারেই স্বাধীন। একজন মুক্ত প্রতিনিধি (agent) হিসেবে এবং সমাজের পূর্ববর্তী ও সমাজ থেকে আলাদা একজন হিসেবে মানুষ নিজের সমাজ গঠন করে একধরনের চুক্তির মাধ্যমে; তা সেই চুক্তি স্বতঃস্ফূর্ত হোক বা সচেতনই হোক, মৌনসম্মতিতে হোক বা আনুষ্ঠানিকই হোক। সংক্ষেপে, এই তত্ত্বানুসারে, ব্যক্তি সমাজের ফসল নয়, বরং উল্টো ব্যক্তিই বিভিন্ন কাজ বা যুদ্ধের মতো কিছু প্রয়োজনীয়তার খাতিরে এই সমাজ তৈরি করেছে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী এও মেনে নেয়া হয় যে, সমাজের অস্তিত্ব নেই। স্বাভাবিক মানব সমাজ, সকল সভ্যতার সূতিকাগার ও একমাত্র প্রতিবেশ হিসেবে যেখানে ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা গড়ে ওঠে ও বিকশিত হয় তা তাদের জন্যে অস্তিত্ব-মান নয়। একদিকে, এই তত্ত্ব শুধু বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তিকেই স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে এই তত্ত্ব ব্যক্তির ইচ্ছায়, এবং আনুষ্ঠানিক অথবা মৌনসম্মতির ভিত্তিতে সৃষ্ট সমাজকে, অর্থাৎ, রাষ্ট্রকেই স্বীকৃতি দেয়। (তারা খুব ভালো করেই জানে যে ইতিহাসে এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যা চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, এবং তারা এও জানে যে সকল রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দখলবাজি ও সহিংসতার মাধ্যমে।)
যেসব ব্যক্তিদের নিয়ে এই রাষ্ট্র গঠিত তাদেরকে এই তত্ত্ব যেভাবে দেখে তা পুরোপুরি পরষ্পরবিরোধিতায় ভর্তি। একদিকে বিবেচনা করা হয় যে, প্রত্যেকের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছার (free will) একটি অমর আত্মা প্রোথিত আছে। সবাই স্বয়ংসম্পূর্ণ অ-শৃঙ্খলিত সত্ত্বা এবং তাদের কারো দরকার নেই, এমনকি ঈশ্বরেরও দরকার নেই। আত্মার অমরত্বের জন্যে তারা নিজেরাই নিজেদের ঈশ্বর। অন্যদিকে, তারা নিষ্ঠুর, দুর্বল, অসম্পূর্ণ, সীমাবদ্ধ, এবং প্রকৃতির শক্তির সম্পূর্ণ অধীন যা তাদের পরিবেষ্টন করে এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে কবরের দিকে নিয়ে যায় …
জনসাধারণের পার্থিব অস্তিত্ব তাদের এতো হীন ও দুর্দশাগ্রস্থরূপে হাজির করে, উদ্দীপনায়, ইচ্ছায় এবং উদ্যোগে এতো দুর্বলরুপে হাজির করে যে তাদের মধ্যে কোনো অমর আত্মা বা স্বাধীন ইচ্ছার ন্যূনতম কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারা সম্পূর্ণ নির্ধারিত (determined) রূপে হাজির হয়। তারা বহিরাগত শক্তি, নক্ষত্র, এবং তাদের জীবনের সকল বস্তুগত শর্ত দ্বারা নির্ধারিত; তারা আইন দ্বারা এবং বিগত শতাব্দীর যাবতীয় চিন্তা ও কুসংস্কার দ্বারা নির্ধারিত; এসব তার জন্মের পরপরই তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রস্তুত থাকে। এই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি, শুধু অজ্ঞ জনসাধারণই নয় বরং তাদের মধ্যে সবচেয়ে সভ্য ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির ব্যক্তিও ঠিক তাই চিন্তা করে ও চায় যা তাদের চারপাশের সবাই চিন্তা করে ও চায়। তারা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে যে তারা তাদের জন্যে চিন্তা করছে, কিন্তু তারা আসলে অন্যান্য অনুগামীদের যে চিন্তা ও লক্ষ্য যা তারা ক্রমশ গ্রহণ করেছে তা-ই হালকা অদলবদল করে দাসোচিত পুনরাবৃত্তিই করছে। এই গোলামি, এই নিত্যকর্ম, বিদ্রোহ করার ইচ্ছার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং উদ্যোগ ও স্বাধীন চিন্তার অভাবই হচ্ছে মানবতার মন্তর ঐতিহাসিক বিকাশের মূল কারণ। আমরা যারা বস্তুবাদী (materialists) এবং বাস্তববাদী (realists), যারা কোনো আত্মার অমরত্ব বা স্বাধীন ইচ্ছার উপর বিশ্বাস রাখি না, আমাদের জন্যে এই মন্থরতা – তা যতোই ধ্বংসাত্মক হোক – একটা প্রাকৃতিক বাস্তবতা (natural fact)। গরিলা অবস্থা থেকে উত্থানে মানুষ প্রচুর বাধা ডিঙিয়ে তার মানবতার চেতনা এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছে। … তার জন্ম হয় একটি বন্য পশু ও দাসরূপে, এবং ক্রমান্বয়ে সে নিজেকে মানবিক (humanized) এবং মুক্ত (emancipated) করে কেবল সমাজের মধ্যেই যা অপরিহার্যভাবে তার চিন্তা, ভাষা এবং ইচ্ছারও পূর্ববর্তী। সে এই মুক্তি অর্জন করতে পারে কেবল সমাজের বর্তমান ও অতীতের সকল সদস্যের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে। এই সমাজই তার মানব অস্তিত্বের সহজাত সূচনার উৎস।
মানুষ তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে কেবল তার চারপাশের ব্যক্তিদের মাধ্যমে, এবং সেটা শ্রম ও সমাজের যৌথ ক্ষমতার কারণেই। সমাজ না থাকলে সে সকল বন্য পশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকুব ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকতো … সমাজ, তার স্বাধীনতা কমানো দূরে থাক, বরং উল্টো সমস্ত মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা তৈরি করে দেয়। সমাজ হচ্ছে মূল, গাছ। স্বাধীনতা হচ্ছে তার ফল। তাই, প্রত্যেক যুগেই, মানুষকে তার স্বাধীনতা খুঁজতে হয়েছে শুরুতেই নয়, বরং, ইতিহাসের শেষে। এটা বলা যায়, ইতিহাসের প্রকৃত, মহান, সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পূর্ণ মুক্তি …
আদর্শবাদীদের ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার বস্তুবাদী (materialistic), বাস্তববাদী (realistic) এবং যৌথতাবাদী (collectivist) মতটি হচ্ছে এই: মানুষ নিজের ও তার মানবতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে কেবল সমাজের মধ্যেই এবং কেবল সমগ্র সমাজের যৌথ কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে। সে নিজেকে বহিরাগত প্রকৃতির জোয়াল থেকে মুক্ত করে কেবল যৌথ এবং সামাজিক শ্রমের মাধ্যমে, যা একাই পৃথিবীটাকে মানবতা বিকাশের উপযোগী আবাসস্থলে রূপান্তর করতে পারে। এমন বস্তুগত মুক্তি ব্যতীত ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মুক্তি অসম্ভব। সে নিজেকে তার নিজ-স্বভাবের জোয়াল থেকে মুক্ত করতে পারে, যেমন, মনের ইচ্ছানুযায়ী নিজের সহজাতপ্রবৃত্তি ও নিজ শরীরে গতিবিধিকে অধীন করতে পারবে; এই মনের বিকাশ আবার প্রতিপালিত হয় কেবল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই। কিন্তু, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রধানত এবং একচেটিয়াভাবে সামাজিক… তাই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি সম্ভবত তার স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারেনা।
মুক্ত হওয়া… মানে সহকর্মীদের দ্বারা অনুরূপ স্বীকৃতি এবং আচরণ পাওয়া। প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতা কেবল তার নিজস্ব মানবতার প্রতিফলন, অথবা তার ভাই ও তার মতো সমান সকল মুক্ত মানুষের চেতনার মাধ্যমে অর্জিত নিজস্ব মানবিক অধিকারের প্রতিফলন।
আমি স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারব কেবল অন্যান্য মানুষের উপস্থিতি ও তাদের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে। নিকৃষ্ট প্রজাতির কোনো প্রাণীর উপস্থিতিতে আমি না নিজেকে মুক্ত বলতে পারব না মানুষ বলতে পারব, কারণ এই প্রাণী আমার মানবতা চিনতে এবং স্বীকৃতি দিতে অক্ষম। আমি নিজে মুক্ত হতে পারবো না যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার সকল সহকর্মীর স্বাধীনতা ও মানবতাকে স্বীকার করতে পারি।
তাদের মানবিক চরিত্রকে সম্মান জানিয়েই কেবল আমি আমাকে সম্মান জানাই। যে রাক্ষস তার বন্দিকে খেয়ে ফেলে … সে মানুষ নয়, পশু। একজন দাস-মালিক মানুষ নয়, বরং প্রভু। দাসের মানবতাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সে আসলে নিজের মানবিকতাকেই বাতিল করে দেয়, যেমন সকল প্রাচীন সমাজের ইতিহাস তাই প্রমাণ করে। গ্রীক এবং রোমানরা স্বাধীন মানুষের মতো অনুভব করতে পারে নাই। তারা মানবিক অধিকারের দ্বারা নিজেদের এমনভাবে চিন্তা করে নাই। গ্রীক ও রোমানরা যখন অপরাজেয় ছিল এবং অন্যান্য দেশ জয় করছিল তখন তারা বিশ্বাস করতো তাদের এবং তাদের নিজেদের দেশের বিশেষাধিকারে । কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল তারা নিজেদের জাতীয় দেবতার বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আছে। তারা ভাবতেই পারেনি যে তাদের বিদ্রোহ করার অধিকার ছিল … এবং নিজেদেরকে দাসত্বের মধ্যেই ফেলেছিল…
আমি প্রকৃতপক্ষে তখনই মুক্ত হবো যখন সকল মানুষ, পুরুষ ও নারী, সমানভাবে মুক্ত হবে। অন্য মানুষের স্বাধীনতা, আমার স্বাধীনতাকে বাতিল করা বা সীমিত করা দূরে থাক, উল্টো বরং এটাই আমার স্বাধীনতার আবশ্যিক পূর্বানুমান এবং নিশ্চিতকরণ। অন্যের দাসত্ব আমার স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা প্রতিষ্ঠা করে, অথবা সমানভাবে বলা যায়, অন্যের পাশবিকতা আমার মানবিকতাকে বাতিল করে দেয়। আমার মানবিক অধিকার অন্যের গোলামি করাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে এবং দৃঢ়তার সাথে নিজের কাজ নির্ধারণ করার মধ্যে নিহিত। তাই, আমার মানবিক মর্যাদা সকলের অবিশেষ মুক্ত চেতনা ও সকল মানুষের সম্মতিক্রমে নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। সবার স্বাধীনতার দ্বারা স্বীকৃত আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অনন্ত প্রসারিত।
সুতরাং, মুক্তির বস্তুগত ধারণাটি খুবই ইতিবাচক, অনেক বেশি জটিল এবং সবচেয়ে বড় কথা, অতিরিক্ত পরিমাণে সামাজিক, কারণ একে শুধুমাত্র সমাজের মধ্যে থেকেই মানুষের মাঝে বিরাজমান কঠোর সাম্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে বুঝা সম্ভব। মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে মূল উপাদানগুলোকে পৃথক করা সম্ভব। প্রথমটি অতিরিক্ত সামাজিক। আর তা হচ্ছে শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, এবং বস্তুগত উন্নতির মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ। যেই জিনিসগুলো সাধারণত সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব কেবল সমাজের সামষ্টিক, বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও অদৈহিক শ্রমের দ্বারা।
স্বাধীনতার দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে নেতিবাচক। এটি সকল প্রকার ঐশ্বরিক, যৌথ ও একক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ।
প্রথম বিদ্রোহ হচ্ছে ধর্মতত্ত্বের সর্বোচ্চ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের অলীক ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। যতক্ষণ বেহেশতে আমাদের একজন প্রভু থাকবেন, ততক্ষণ আমরা দুনিয়াতে তার দাস থাকবো। আমাদের যুক্তি এবং আমাদের ইচ্ছা সমানভাবে বাতিল হয়ে যাবে। যতক্ষণ আমরা বিশ্বাস করবো যে আমাদের নিঃশর্ত গোলামি করতে হবে – এবং, ঈশ্বরের মতো আর কারো আনুগত্য সম্ভব নয় – ততক্ষণ আমাদের কোনো ন্যূনতম সংরক্ষণ ছাড়াই তার পবিত্র ও অপবিত্র এজেন্ট, মসিহ, পয়গম্বরগণ, ঐশ্বরিক আইন-প্রণেতা, সম্রাট এবং রাজাদের পবিত্র কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে সপে দিতে হবে। নিজেকে সপে দিতে হবে চার্চ ও রাষ্ট্র নামক দুইটা বিশাল প্রতিষ্ঠানের সকল মিনিস্টার, প্রতিনিধি এবং পবিত্র পরিচারকদের কাছে, যা ঈশ্বরকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষকে শাসন করার নামে এবং আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সমস্ত সাময়িক অথবা মানব কর্তৃত্বের ডালপালা সরাসরি আধ্যাত্মিক এবং/অথবা ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব থেকে গজায়। কিন্তু, কর্তৃত্ব মানেই স্বাধীনতার অস্বীকৃতি। ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের কল্পনাই হচ্ছে পৃথিবীর সকল দাসত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক এবং জায়েজীকরণের উৎস। মানবজাতির স্বাধীনতা কখনোই সম্পূর্ণ হবে না যদি না এই ধ্বংসাত্মক ও ছলনাপূর্ণ প্রভুকে বিলুপ্ত করা হয়।
এই বিদ্রোহ স্বাভাবিকভাবে অনুসৃত হয় মানুষের-স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দ্বারা; সেই স্বৈরশাসন যেমন ব্যক্তির হতে পারে, তেমনি হতে পারে সমাজের, হতে পারে রাষ্ট্র কর্তৃক বৈধ প্রতিনিধিত্বকারীর। এই স্থলে, রাষ্ট্র হিসেবে সংগঠিত সমাজের অফিসিয়াল ও স্বৈরাচারী বিশেষ ক্ষমতা এবং নন-অফিসিয়াল, অকৃত্রিম সমাজের সদস্যদের সহজাত প্রভাব ও ক্রিয়া – এই দুয়ের মধ্যে একটা সুনির্দিষ্ট পার্থক্য তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার তুলনায় এই প্রাকৃতিক সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ব্যক্তির পক্ষে অনেক বেশি কঠিন। সামাজিক স্বৈরশাসন প্রায়শই অপ্রতিরোধ্য ও সর্বনাশা হলেও সে আইনসম্মত ও বৈধ স্বৈরতন্ত্রের সহিংস বাধ্যতামূলক চরিত্র গ্রহণ করে না, যা মূলত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের চিহ্ন বহন করে। এটি আইনের রূপে আরোপিত হয় না যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বিচার-বিহিত দণ্ডের যন্ত্রণায় নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। সামাজিক স্বৈরশাসনের কর্মকাণ্ড তুলনামূলক-ভাবে নমনীয়, আরো বেশি কুটিল এবং সূক্ষ্ম হলেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের চেয়ে কোন অংশে কম শক্তিশালী ও ব্যাপক নয়। এটি মানুষকে শাসন করে প্রথা, আচার-আচরণ, জনসাধারণের পূর্বধারণা, প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাস দ্বারা, যাকে একসাথে জনমত (Public Opinion) বলে অভিহিত করা হয়।
এটি ব্যক্তিকে জন্ম থেকেই আচ্ছন্ন করে রাখে, জীবনের প্রতিটি দিকে প্রবেশ করে, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিই প্রায় অজ্ঞাতসারেই নিজের বিরুদ্ধেই একধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এর থেকে এটাই বোঝা যায় যে, সমাজ প্রাকৃতিক-ভাবে যে প্রভাব ব্যক্তির উপর বিস্তার করে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হলে তাকে অন্তত কিছুটা হলেও নিজের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতে হবে। তার সকল সহজাত প্রবণতা এবং বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষার কারণেই সে সমাজের ফসল ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজ যে ব্যক্তির উপর অপরিমেয় ক্ষমতা খাটায় তা এতেই নিহিত থাকে।
পরম নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন মানব মর্যাদা, সমাজের এই ক্ষমতা যেমন হিতকর হতে পারে তেমনি ক্ষতিকরও হতে পারে। এটি তখনই উপকারী যখন তার ঝোঁক বিজ্ঞান, বস্তুগত সমৃদ্ধি, স্বাধীনতা, সাম্য ও সংহতির ক্রমবিকাশের প্রতি থাকে। এটা ক্ষতিকর তখনই যখন তার ঝোঁক বিপরীত দিকে থাকে। যে ব্যক্তি বর্বর জন্তুদের মাঝে জন্মায় তার ঝোঁক থাকে বর্বরতার দিকেই; যে যাজক শাসিত সমাজে জন্মায় সে নির্বোধ ভণ্ড ধর্মধ্বজীই হয়; যে চোরদের দলে জন্মায় সে বোধহয় চোরই হয়ে থাকে; এবং যদি দূর্ভাগ্যবশতভাবে সে রাজা-বাদশাহর মতো উপদেবতার (demigods) সমাজে জন্মে যারা পৃথিবীকে শাসন করে, তাহলে সে সমাজের ঘৃণ্য অত্যাচারী শাসকই হবে। এই সকল ক্ষেত্রেই যে সমাজে তার জন্ম হয়েছে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটা ব্যক্তির মানবীকরণের জন্যে অপরিহার্য।
কিন্তু, আমি আবারো বলছি, সমাজের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়েও কঠিন। রাষ্ট্র তার ভাতৃপ্রতিম সংগঠন চার্চের মতো একটি ক্ষণস্থায়ী, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান যে একটি সংখ্যালঘুর বিশেষাধিকারের নিয়ন্ত্রক এবং অধিকাংশের গোলামীর জন্যে দায়ী।
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অনেক কম কঠিন কারণ রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যেই এমন কিছু আছে যা বিদ্রোহে প্ররোচিত করে। রাষ্ট্র হচ্ছে কর্তৃত্ব, শক্তি। শক্তির সাথে থাকে দম্ভ এবং প্রমত্ততা। এটি নিজেকে ধীরে ধীরে সুকৌশলে প্রবেশ করায় না। এটি পরিবর্তিত হতে চায় না। সময়ে সময়ে এটি যদি নিজের শাসনের উন্নতি ঘটাতে চায় তাহলে সেটা খারাপভাবেই করে। পটানো তার চরিত্রে নেই, বরং, সে নিজেকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই চাপিয়ে দেয়। নিজেকে মুখোশ পরাতে যতই কষ্ট হোক না কেনো, এটি স্বভাবতই মানুষের ইচ্ছার বৈধ লঙ্ঘনকারী. তাদের স্বাধীনতাকে স্থায়ীভাবে নাকচ করে দেয়। এমনকি যখন রাষ্ট্র ভালো কিছু আদেশ দেয়, সে আসলে খারাপকে নিয়ে আসে। এর প্রতিটি আদেশ স্বাধীনতার গালে চপেটাঘাত-স্বরূপ। কারণ যখন ভালোকে আইন জারি করে আদেশ দেয়া হয়, তখন মানবিক নৈতিকতা ও স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে এটি খারাপে পরিণত হয়। ব্যক্তির স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদা এর মধ্যে নিহিত থাকে যে, সে ভালো কাজ করে এই জন্যে না যে সে এটি করতে বাধ্য, বরং এই জন্যে করে যে সে স্বাধীনভাবে এটি ধারণ করে, এটি চায় এবং এটিকে ভালোবাসে।
সমাজের কর্তৃত্ব ইচ্ছামত বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ হয় না, বরং স্বাভাবিকভাবে হয়। এবং এই বাস্তবতার কারণে ব্যক্তির উপর এটির প্রভাব রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এটি তার মধ্যেই সকল ব্যক্তিকে তৈরি করে এবং তার ছাঁচে গড়ে তোলে। ব্যক্তির জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজ তার সকল বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। সুতরাং, একরকমভাবে বলতে গেলে প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে সমাজ তার নিজেকেই স্বতন্ত্র-রূপে প্রকাশ করে।
ব্যক্তি তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থা থেকেই ভৌগলিক, জলবায়ু, জাতিগত, স্বাস্থ্যগত এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের মিলনের ফলে পূর্বনির্ধারিত ও বিশেষায়িত হয়ে যায় যেগুলো তার পরিবার, তার শ্রেণি, তার জাতি, তার বর্ণ গঠন করে। এসব বহিরাগত ও ভৌত প্রভাবের মিলনের ফলে সৃষ্ট তাঁর প্রবণতা অনুসারে সে গঠিত হয়।
তাছাড়া, মানব মস্তিষ্কের তুলনামূলক-ভাবে উচ্চতর গঠনের ফলে, প্রতিটি ব্যক্তি জন্ম থেকেই বিভিন্ন মাত্রায় কিছু বিষয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন। সেটা কোনো চিন্তা ও সহজাত অনুভূতি নয় যেমন আদর্শবাদীরা দাবি করে থাকেন, বরং ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন অনুভব করার শক্তি, ইচ্ছাশক্তি, চিন্তা করার শক্তি এবং কথা বলার শক্তি। কোনো সারবস্তু ছাড়াই অবিকশিত ব্যক্তি থাকে । তাদের সারবস্তু কোথা হতে আসে? সমাজ থেকে … চিন্তার প্যাটার্নে সমবেত হওয়া ধারণাসমূহ, তথ্যাবলি এবং ঘটনাসমূহ, ভালো অথবা মন্দ, এইসব এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির মধ্যে প্রেরিত হয়। সমাজের সকল ব্যক্তি সদস্য ও গোষ্ঠী দ্বারা এইসব সংশোধিত, সম্প্রসারিত, পারষ্পরিকভাবে প্রশংসিত ও সংহত হয়ে এমন একটা অনন্য ব্যবস্থা গড়ে উঠে যা পরিশেষে একটি সমাজের সাধারণ চেতনা ও যৌথ চিন্তাকে গঠন করে। এই সব কিছু চিরায়ত উপায়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রেরিত হয়ে, শত বর্ষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দ্বারা বিকশিত ও বর্ধিত হয়ে একটা জাতির, একটা শ্রেণির এবং একটা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক পরম্পরা গঠিত হয়।
প্রত্যেক প্রজন্মই চিন্তার পরিপক্বতায় পৌঁছানোর পর নিজের ও নিজের সমাজের মধ্যে প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠিত ধারণা ও চিন্তাসমুহ এটির যাত্রাবিন্দু হিসেবে কাজ করে থাকে, যেন এটি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শ্রমের কাঁচামাল … এগুলো হচ্ছে প্রকৃতি সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে, ন্যায্যতা সম্পর্কে, ব্যক্তি ও শ্রেণির দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে, সামাজিক সম্মেলন সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে, সম্পত্তি সম্পর্কে এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা সমূহ এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক প্রভাবিত করে এমন আরো অনেক ফ্যাক্টর সমূহ। এসব ধারণাসমূহ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দ্বারা শর্তায়িত হয়ে ব্যক্তির মনে অঙ্কিত হয়ে যায় যা ব্যক্তি নিজেকে একটা সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করার পূর্বেই গ্রহণ করে ফেলেন । অনেক পরে তিনি এগুলো পুনরাবিষ্কার করেন, প্রতিষ্ঠাপিত করেন, ব্যাখ্যা করেন, এবং তত্ত্ব দ্বারা বিস্তৃত করেন। এগুলোই তিনি যে সমাজে বসবাস করেন সে সমাজের ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সর্বজনীন চেতনা বা সমষ্টিগত পূর্বানুভূতি (Prejudice) প্রকাশ করে। এইসব পূর্বানুভূতিতে (Prejudice) তিনি এতই সিক্ত থাকেন যে তিনি তার সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অভ্যাসের কারণেই, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও, এইসব পাপাচারের সমর্থক হয়ে উঠেন; এমনকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে এগুলো রক্ষা করতে আগ্রহী না হলেও।
এটি মোটেও বিস্ময়কর নয় যে, যে ধারণাসমূহ সমাজ সমষ্টিগতভাবে জারি রাখে জনসাধারণের ওপর সেগুলোর প্রভাব এত দৃঢ়। বরং বিস্ময়কর এটি যে, এই জনসাধারণের মধ্যেও এমন কিছু ব্যক্তি থাকেন যাদের প্রথার স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো চিন্তা, ইচ্ছা এবং সাহস থাকে। ব্যক্তির ওপর সমাজের চাপ এত দৃঢ় যে এর কারণে কেউই, তিনি যতই দৃঢ় চরিত্রের বা যতই প্রগাঢ় বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হোন না কেনো, সমাজের এই স্বৈরচারী ও দুর্নিবার প্রভাব থেকে পুরোপুরি রেহাই পাবেন না।
এই প্রভাবের চাইতে ভালো করে করে আর কিছুই মানুষের সামাজিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে না। বলা যেতে পারে যে, সমাজের সমষ্টিগত চেতনাই, যা কিছুই বড়ো বড়ো পাবলিক প্রতিষ্ঠানসমূহে এবং ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটিতে খোদাই করা আছে, সকল তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক আবহ গড়ে তোলে। এই আবহ খারাপ হতে পারে, তবু তার সকল সদস্যের অস্তিত্বের জন্যে পুরোপুরি আবশ্যক। এই আবহ তাকে শাসন করলেও ধরে রাখে, এবং গতানুগতিকতা ও রুটিনকে জোরদার করে যা বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে একত্রিত করে।
অধিকাংশ মানুষ, শুধু সাধারণ মানুষই না বরং বিশেষাধিকার প্রাপ্ত ও আলোকিত শ্রেণির মানুষরাও আরো বেশি অস্বস্তি-বোধ করেন যদি না তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথা ও রুটিন বিশ্বস্তভাবে মেনে চলেন ও অনুসরণ করেন । তারা যুক্তি দেখান যে, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা এইভাবে চিন্তা ও কাজ করেছেন, তাই আমরাও একইভাবে চিন্তা ও কাজ করবো। প্রত্যেকেই একইভাবে চিন্তা ও কাজ করে। আমরা কেনো আলাদাভাবে চিন্তা ও কাজ করবো?’
বইপত্রের হদিস
১) মিখাইল বাকুনিন, অরাজ রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্র, অনুবাদ: নুরে আলম দুর্জয়, স্বাধীনতা প্রকাশন।
২) রুডলফ রকার, নৈরাজ্যবাদ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, অনুবাদ: সেলিম রেজা নিউটন, স্বাধীনতা প্রকাশন।
সম্পাদকীয় নোট: রচনাটি অরাজের বাকুনিন রচনা সংকলনের জন্য অনুবাদ করা হয়। এরই মধ্যে অনুবাদটি রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
দীপাবলি যত ঘনিয়ে আসছে হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা তত ঘটা করে প্রস্তুত হচ্ছে ভগবান রামের বিজয়ী বেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উদযাপন করতে (এবং তার চমকপ্রদ সেই মন্দিরের জন্য যা নির্মিত হচ্ছে অযোধ্যায়)। আর অবশিষ্ট আমাদের জন্য এই মৌসুমে আছে ভারতীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিক জয় উদযাপনের তুষ্টি। একটি চাঞ্চল্যকর শবদাহের ব্রেকিং নিউজের মধ্যখানে বিরাট এক ষড়যন্ত্রকে ঢেকে দেয়া এবং একেবারে নতুন কাণ্ডের শুরুয়াদে আমরা নিজেদের নিয়ে, আমাদের সংস্কৃতি এবং সভ্যতার আদি ও আধুনিক মূল্যবোধগুলি নিয়ে কি গর্ববোধ না করে পারি?
অরুন্ধতী রায়
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে, উত্তর প্রদেশের হাথরাস গ্রামে ১৯ বছর বয়সী এক দলিত মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়। মেয়েটিকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে রাখা হয় মৃত্যুর উদ্দ্যেশ্যে। আর এতে জড়িত ছিল গ্রামেরই উঁচু জাতের লোকেরা। তার পরিবার ছিলো গ্রামের ১৫টি দলিত পরিবারের মধ্যে একটি, যেখানে ৬০০ পরিবারের বেশিরভাই ব্রাহ্মণ এবং ঠাকুর। সেই গেরুয়া আলখাল্লাধারী উত্তর প্রদেশের মুখ্য মন্ত্রী অজয় সিং বিশতের মতো একই জাত, যিনি নিজেকে যোগী আদিত্যনাথ নামে অভিহিত করেন। (শোনা যায়, অদূর ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদিকে প্রতিস্থাপন করতে তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।)
কয়েকদিনের জন্য মেয়েটিকে তার আক্রমণকারীরা অনুসরণ করে এবং ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। সাহায্য করার মতো কেউ তার পাশে ছিল না। তাকে কেউ রক্ষা করেনি। তাই সে ঘরেই থাকতো এবং বাইরে খুব একটা বের হতো না। সে এবং তার পরিবার জানতো তাদের সাথে কি ঘটবে। কিন্তু সতর্কতা কোনো উপকারে আসেনি। তার মা মেয়ের রক্তাক্ত শরীর খুঁজে পান মাঠে, যেখানে সে গিয়েছিলো গরু চরাতে। তার জিহবা ছেঁড়া, মেরুদণ্ড ভাঙ্গা, চলনশক্তিহীন নিথর শরীর পড়ে আছে।
মেয়েটি দুই সপ্তাহ বেঁচে থাকে, প্রথমে আলীগড়ের একটি হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে, তার অবস্থা আরো সংকাটাপন্ন হলে দিল্লির একটি হাসপাতালে। ২৯শে সেপ্টেম্বরের রাতে সে মারা যায়। উত্তর প্রদেশের পুলিশ যারা হেফাজতে প্রায় ৪শ হত্যাকাণ্ডের (যা সর্বভারতীয় পুলিশি জিম্মায় সংগঠিত ১৭শ হত্যাকাণ্ডের এক চতুর্থাংশ) জন্য কুখ্যাত, রাতারাতি মেয়েটির মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে গ্রামের একদম উপকন্ঠে চলে যায়। মাকে মেয়ের শেষবিদায় এমনকি মুখটিও একটিবারের মতো দেখতে দেয়া হয়নি। এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া প্রিয় মানুষটির জন্য তার স্বজনদের শেষকৃত্য করার মর্যাদাকেও অস্বীকার করা হয়। অতঃপর বন্দী করে রাখা হয় মানসিকভাবে আহত পরিবারটিকে। এমনকি যে মরদেহটি দাহ করা হয়েছে তা আদৌ তাদের সন্তানের কিনা, জানাতে অস্বীকার পর্যন্ত করা হয়।
তাড়াহুড়ো করে তৈরি একটি চিতায় খুন হওয়া মেয়েটির ভাঙ্গাচোরা দেহটাকে এলিয়ে দেয়া হয় এবং পুলিশের খাকি উর্দির একটা দেয়ালের আড়াল হতে ধোঁয়ার কুণ্ডলী রাতের আকাশে মিশে যেতে থাকে। মেয়েটির পুরো পরিবার আড়ষ্ট, স্পষ্টতই মিডিয়ার মনোযোগী শ্যেন দৃষ্টিতে আতঙ্কিত। আতঙ্কিত কারণ তারা খুব ভালো করে জানতেন যখন তাদের উপর থেকে এই আলো ঝাপসা হয়ে যাবে তখন এই দৃষ্টি আকর্ষণের দোষেও তাদের শাস্তি দেয়া হবে।
যদি তারা কোনভাবে বেঁচে যায়, তারা ফিরে যাবে তাদের অভ্যস্ত জীবন যাপনে। সেই মধ্যযুগীয় বর্ণহিংসায় বিধ্বস্ত গ্রামের মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতা ও ক্রোধের আক্রোশে ভরপুর জীবনে, যেখানে তারা অচ্ছুত এবং উপ-মানব হিসাবে বিবেচিত।
শবদাহের একদিন পরে, মৃতদেহটি নিরাপদে হাপিস করা গেছে এই আত্মবিশ্বাসে পুলিশ ঘোষণা করে যে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়নি, কেবল হত্যা করা হয়েছে। কেবল হত্যা। লক্ষ্যণীয় যে, এর মাধ্যমে একটি কার্যকরী পদ্ধতির সূচনা হয় যেখানে খোদ বর্ণপ্রথাকে বর্ণবাদী নৃশংসতা থেকে দ্রুত ছেঁটে ফেলা হয়। এই বিদ্বেষপরায়ণ জাতিবর্ণগত নৃশংসতাকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সাধারণ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং অনুমেয় যে, আদালত, হাসপাতালের নথি এবং মূলধারার মিডিয়া এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে।
অন্য ভাবে বললে, আমাদের সমাজকে মুক্তি দেয়া, আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক অভ্যাসকে দায়মুক্তি দেয়া। সময়ে সময়ে এটা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সবচেয়ে স্পষ্টভাবে, ২০০৬ সালে খাইরলঞ্জিতে সুরেখা ভোটমাঙ্গে এবং তার দুই শিশুর হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতায়।
ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতিশ্রুতি হিসাবে আমাদের দেশকে তার গৌরবময় অতীতে ফিরিয়ে নিতে আমাদের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে আগামী নির্বাচনে যদি পারেন, দয়া করে অজয় সিং বিশত’কে ভোট দিতে ভুলবেন না। যদি তাকে না দেন, যেনো মুসলমানকে কটাক্ষ করেন বা দলিতকে ঘৃণা করেন, এমন যেকোনো এক রাজনীতিবিদকে জয়ী করুন। গণপিটুনীতে হত্যার আপলোডকৃত ভিডিওটিতে “লাইক” দিতে ভুলবেন না এবং আপনার প্রিয়, বিষেদগার করা সংবাদ উপস্থাপককে দেখতে থাকুন, কেননা তিনিই আমাদের সম্মিলিত বিবেকের রক্ষক।
এছাড়াও, দয়া করে কৃতজ্ঞ হতে ভুলবেন না যে আমরা এখনো ভোট দিতে পারি, আমরা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে বাস করি যা কিনা আমাদের প্রতিবেশীদের মতো নয়, যাদেরকে আমরা “ব্যর্থ রাষ্ট্র” বলে অভিহিত করতে পছন্দ করি, আমাদের রয়েছে নিরপেক্ষ আদালত যা আইনের শাসন পরিচালনা করে।
৩০ শে সেপ্টেম্বর সকালে, হাথরাস গ্রামের বাইরে ঘটে যাওয়া এই লজ্জাজনক ও ভয়ঙ্কর শবদাহের মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর একটি আদালত এমন নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রকাণ্ড প্রদর্শনী আমাদের সামনে মেলে ধরে।
২৮ বছর সতর্কতার সাথে বিবেচনার পরে এই আদালত ২০০২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন এমন ৩২ জন অভিযুক্তকে খালাস করে দেয়, এটি এমন একটি ঘটনা যা আধুনিক ভারতের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিলো। খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, একজন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ মন্ত্রী এবং একজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। যার ফলে এই দাঁড়ায় যে বাবরি মসজিদ কেউ ভাঙ্গেনি। অন্ততপক্ষে আইননুযায়ী তো নয়ই। সম্ভবত, মসজিদটি স্বেচ্ছায় ভেঙ্গে পড়ে। এতকিছু ঘটার বহু বছর আগেই, গেরুয়া স্কার্ফ পরিহিত নিজেদেরকে ভক্ত বলে অভিহিত করা গুন্ডাদের সম্মিলিত দুরভিসন্ধির নিচে চূর্ণবিচূর্ণ হতে, নিজেকে ধুলোয় গুড়িয়ে দিতে, মসজিদটি একটি দিন নির্ধারণ করে। আর দিনটি ছিল ৬ই ডিসেম্বর, বাবাসাহেব অম্বেডকরের মৃত্যুবার্ষিকী।
ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় মসজিদের গম্বুজ ভাঙছে লোকদের যেসব ছবি এবং ভিডিও আমরা দেখেছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের যেসব সাক্ষ্য আমরা পড়েছি এবং শুনেছি, ঘটনার পরবর্তী মাসগুলোতে মিডিয়া বুঁদ ছিলো যেসব সংবাদে তা নিতান্তই আমাদের জল্পনা-কল্পনা। এল কে আদভানির রথযাত্রার সময়, যখন তিনি ভারতের এ মোড় থেকে সে মোড়ে ভ্রমণ করছিলেন খোলা ট্রাকে করে, শহরের রাস্তা বন্ধ রেখে বিশাল জনতার উদ্দ্যেশ্যে বক্তৃতা রাখছিলেন, সাচ্চা হিন্দুদের উপদেশ দিচ্ছেলেন, তারা যেনো অযোধ্যায় ঠিক সেখানে মিলিত হয় যেখানে মসজিদটি ছিলো এবং অংশ নেয় রাম-মন্দির নির্মাণে– এসবকিছু বাস্তবে আসলে ঘটেনি।
তার যাত্রা অনুসরণ করে যে মৃত্যু ও ধংসযজ্ঞের শুরু হয়, সেসব কিছুও ঘটেনি। কেউ জপেনি “এক ধাক্কা অউর দো, বাবরি মাসজিদ তোড় দো”। দেশব্যাপী, সম্মিলিতভাবে আমরা একটা হ্যালুসিনেশন অভিজ্ঞতা পেলাম। কি এমন কি খেয়েছিলাম আমরা? মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো থেকে আমাদের তলব করা হচ্ছে না কেন? কেবল বলিউডের লোকজনদের কেন তলব করা হচ্ছে? আমরা সবাই কি আইনের দৃষ্টিতে সমান নই?
কেন মসজিদটি ধ্বংসের কোন পরিকল্পনা ছিলো না সে সম্পর্কে বিশেষ আদালতের বিচারক ২,৩০০ পৃষ্ঠার বিশদ রায় লিখেছেন। আপনাকে স্বীকার করতেই হবে, এটি একটি কৃতিত্ব– পরিকল্পনার অভাব সম্পর্কে ২,৩০০ পৃষ্ঠা। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, কোনো প্রমাণ নেই যা দ্বারা বলা যায় যে অভিযুক্তরা “একটি কক্ষে” মিলিত হয়ে এই ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন। সম্ভবত এর কারণ এই যে, পরিকল্পনাটি হয়েছিলো কোনো এক ঘরের বাইরে, আমাদের রাজপথগুলিতে, জনসভায়, আমাদের টিভির পর্দায় যাতে করে আমরা সবাই দেখতে পারি এবং অংশীদার হতে পারি? অথবা,ঐ মাদকই বোধহয় আমাদের মধ্যে এখন এমন চিন্তার জন্ম দিচ্ছে?
যাই হোক, বাবরি মসজিদের ষড়যন্ত্র আপাতত থাক। তবে আরও একটি আছে যা “চলছে” এবং “ট্রেন্ডিং”। ২০২০ সালের দিল্লি হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র যেখানে উত্তরপূর্ব দিল্লির শ্রমজীবী অধ্যুষিত পাড়াগুলোয় ৫৩ জন মারা যায় (তন্মধ্যে ৪০ জন মুসলিম) এবং ৫৮১ জন আহত হয়। মসজিদ, কবরস্থান এবং মাদ্রাসাগুলিকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছিলো। যেসব ঘরবাড়ি, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিলো তার বেশিরভাগ মুসলমানদের।
এই ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশের চার্জশিট কয়েক হাজার পৃষ্ঠায় চলে যায়, এমনকি কিছু লোকের একটি টেবিল ঘিরে বসে থাকার ছবিও আছে– আজ্ঞে হ্যা! একটি “কক্ষে”, একটি অফিসের নিচতলায়– ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আপনি তাদের অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট করে বলতে পারবেন যে তারা ষড়যন্ত্র করছে। তীর চিহ্ন দিয়ে চিহ্ণিত করে এই অভিযুক্তদের নাম পরিচয় চার্জশীটে তুলে ধরা হয়েছে।ভয়াবহ ব্যাপার।
বাবরি মসজিদের গম্বুজের উপর স্লেজ-হাতুড়িওয়ালা লোকদের থেকেও যেন বেশি উদ্বেগজনক! ঐ টেবিল ঘিরে বসা কয়েকজন ইতিমধ্যে জেলে। বাকিরাও সম্ভবত দ্রুত যাবেন। গ্রেফতার করতে মাত্র কয়েক মাস লেগেছিলো। বেকসুর খালাস পেতে কয়েক বছর লাগতে পারে, বাবরির রায়ের পথ ধরে আগায় যদি, তাহলে হয়তো ২৮ বছর, কে জানে।
বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন– ইউএপিএ’র আওতায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর অধীনে সবই অপরাধ। এমনকি দেশ বিরোধী চিন্তা-ভাবনাও। নিজকে বেকসুর প্রমাণ করার দায় আপনার উপরেই। আমি যতোই এই আইন এবং এর পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পড়ছি ততোই মনে হচ্ছে, একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে পাগলদের একটি কমিটির সামনে তার বিচক্ষণতা প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে।
আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয় যে, দিল্লির ষড়যন্ত্রটি মুসলিম ছাত্র ও অ্যাক্টিভিস্ট, গান্ধীবাদী, আরবান-নকশাল এবং বামপন্থী দ্বারা তৈরি হয়েছিল যারা সবাই এনপিআর, এনআরসি, সিএএ বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তারা বিশ্বাস করতো যে এগুলো সম্মিলিতভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এবং ভারতের দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাদের কিনা “উত্তরাধিকারে কাগজপত্র” নেই তাদের পায়ের নিচের জমি কেড়ে নিবে। আমি নিজেও এটা বিশ্বাস করি। এবং আমি বিশ্বাস করি যে সরকার যদি এই প্রকল্প আগানোর সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে এই প্রতিবাদ আবার শুরু হবে। এটাই হওয়া উচিত।
পুলিশের মতে, দিল্লি ষড়যন্ত্রের পেছনের কারণ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সফরের সময় সহিংসতা প্ররোচিত করে এবং একটি রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তৈরি করে ভারত সরকারকে বিব্রত করা। চার্জশিটে প্রকাশিত যেসব অমুসলিমদের নাম রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনকে “ধর্মনিরপেক্ষতার রঙ” দেয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। যেসব হাজার হাজার মুসলিম নারী নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থায়ীভাবে এবং আন্দোলন করছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, আন্দোলনকারীদের “জেন্ডার কভার” এর জন্য তাদেরকে “আনা” হয়েছে।
ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রকাশ্য পাঠ ও পতাকা উত্তোলন, এবং কবিতা, সঙ্গীত ও প্রেমের প্রসার এ সমস্ত যা এই আন্দোলনের পরিচয় সনাক্ত করে, তা খারিজ করে দেয়া হয় এই বলে যে, এসব কুটিল প্রতারণার জাল ক্ষতিকারক উদ্দ্যেশ্য হাসিলের জন্য। অন্যভাবে বললে, আন্দোলনের মূল অংশটি জিহাদি (এবং পুরুষ) – বাদবাকি সব অলংকরণ ও সাজসজ্জা।
ড. উমর খালিদ, তরুণ শিক্ষানবিশ, যাকে আমি ভালো করে চিনি, যিনি গণমাধ্যমের ভুয়া সংবাদের দ্বারা নিগৃহিত হয়েছিলেন, নির্যাতিত হয়েছিলেন, পুলিশের মতে তিনি একজন মুখ্য ষড়যন্ত্রকারী। পুলিশের মতে তার বিরুদ্ধে জোগাড় করা প্রমাণাদি রয়েছে ১০ লাখ পৃষ্ঠা জুড়ে। (মোদী ঘোষিত বিশ্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর কোভিড-১৯ লকডাউনের পরে, এই সেই একই সরকার যারা জানিয়েছিল, তাদের কাছে ১ কোটি শ্রমিকের কোন তথ্য নেই। কোনো ধারণা নেই নিজ গ্রামের পথে কয়েকশ কিলোমিটার থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার হাঁটতে গিয়ে কতজন মারা গেছে, কতজন ক্ষুধার্ত ছিলো, কতোজন অসুস্থ হয়ে পড়ে।)
উমর খালিদের বিরুদ্ধে এক মিলিয়ন পৃষ্ঠার প্রমাণে অন্তর্ভুক্ত হয়নি জাফরাবাদ মেট্রো স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ। অথচ ঐ জায়টিই ছিল কথিত চক্রান্ত এবং উস্কানির স্থান।২৫ শে ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই সেই ফুটেজ সংরক্ষণ করার জন্য দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলো অ্যাক্টিভিস্টরা। তখনও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছিলো। নির্বিচারে তা মুছে ফেলা হয়েছে।
উমর খালিদ বর্তমানে আরো কয়েক শতাধিক মুসলমানের সাথে জেলে আছেন, যারা ইউএপিএ’র আওয়তার পাশাপাশি হত্যার, হত্যার উদ্দ্যেশ্যে এবং দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত। উকিল এবং আদালতের কতো জন্ম লাগবে এই এক মিলিয়ন পৃষ্ঠার “প্রমাণ” দিয়ে কাজ করতে?
উমর খালিদ
যেভাবে বাবরি মসজিদ নিজেকে ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয় ঠিক সেভাবে ২০২০ সালের দিল্লি হত্যাকাণ্ডের পুলিশি ভাষ্যে মুসলমানরা নিজেকে হত্যা করার, নিজেদের মসজিদ জ্বালিয়ে দেয়ার, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করার, নিজেদের সন্তানদের অনাথ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে কেবলমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখানোর জন্য যে তারা ভারতে এক ভয়াবহ অবস্থা অতিক্রান্ত করছে।
তাদের মামলাটি আরো জোরদার করার জন্য চার্জশীটে কয়েক’শ পৃষ্ঠার হোয়াটস অ্যাপ কনভারসেশন সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এসব কথোপোকথনে শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্ট এবং তাদের সমর্থক গোষ্ঠী দিল্লিতে আন্দোলনের জায়গা এবং শান্তিপূর্ণ গণঅবস্থান নিয়ে সমর্থন ও সমন্বয়ের চেষ্টা করছিলো। এসব কথোপকথন আবার যারা নিজেদের “কট্টর হিন্দু একতা” বা “কট্টর হিন্দু ঐক্য” নামে অভিহিত করেন তাদের হোয়াটস অ্যাপ কথোপকথন থেকে খুব বেশি ভিন্ন কিছু নয়। এসব কথোপকথনে তারা প্রকৃতপক্ষে মুসলমান হত্যায় গর্ববোধ করেন এবং প্রকাশ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতাদের প্রশংসা করেন। এটা একটা ভিন্ন চার্জশীটের অংশ।
ছাত্র-অ্যাক্টিভিস্টদের কথোপকথনের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে তারুণ্যদীপ্ত সেই স্পৃহা ও লক্ষ্য যা উৎসারিত ন্যায়পরায়ণ ক্ষোভ থেকে এবং চলে আপন মর্জিমাফিক। সেগুলো পড়লে প্রবলভাবে শক্তি পাওয়া যায়। এগুলো আপনাকে নিয়ে যায় সেই কোভিড পূর্ব সময়ে যেখানে নতুন প্রজন্মকে নিজে নিজে গড়ে উঠতে দেখার উত্তেজনা কাজ করে। বারবার, অভিজ্ঞ অ্যাক্টিভিস্টরা তাদেরকে শান্ত হতে ও শান্ত থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক করতে উদ্যত হোন। তারাও তুচ্ছ তুচ্ছ প্রশ্নে তর্ক-বিতর্ক জুড়ে দেন, যেমনটা অ্যাক্টিভিস্টরাও করেন। তবে এটা গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠারই অংশ।
কথোপকথনটির বিতর্কের মূল অংশ হচ্ছে, শাহীনবাগের হাজার হাজার নারীর আন্দোলনের সেই অভূতপূর্ব সাফল্য, যারা কিনা সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে একসঙ্গে থেকেছেন, শীতের ভেতরে মোকাবিলা করেছেন কনকনে ঠান্ডা, ট্র্যাফিক ব্লক করে সড়ক অবরোধ করেছেন, হাঙ্গামা বাধিয়েছেন, কিন্তু বিপুল দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নিজেদের দিকে, এই আন্দোলনের দিকে।
শাহীনবাগের দাদি, বিলকিস বানু, ২০২০ সালের টাইম ম্যাগাজিনের সবচেয়ে প্রতাপশালী ব্যক্তিদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। (২০০২ সালে যখন নরেন্দ্র মোদী গুজরাট রাজ্যের মূখ্য মন্ত্রী ছিলেন তখন সেই রাজ্যে মুসলিম বিরোধী সুসংগঠিত হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা ১৯ বছর বয়সী আরেক বিলকিস বানুর সাথে তাকে গুলিয়ে ফেলবেন না। তিনি একটি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী যেখানে উন্মত্ত হিন্দু পাণ্ডারা তার তিন বছর বয়সী মেয়েসহ পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হত্যা করে। তিনি গর্ভবর্তী ছিলেন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হোন। এইতো।)
দিল্লির অ্যাক্টিভিস্টদের হোয়াটস অ্যাপের বকবকানি জনতাকে উত্তর পূর্ব দিল্লিতে “চাক্কা জ্যাম” মানে রাস্তা অবরোধ করবে কিনা- এমন প্রশ্নে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। চাক্কা জ্যামের পরিকল্পনাটি নতুন কিছু নয়- কৃষকেরা এটি আগেও অনেকবার করেছেন। এই মুহুর্তে তারা পাঞ্জাব ও হরিয়ানাতে এটা করছেন। সম্প্রতি পাশ করা কৃষি বিল যা ভারতীয় কৃষিকে কর্পোরেটীকরণ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয় তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন তারা।
দিল্লি আন্দোলনের ক্ষেত্রে, ঐ চ্যাট গ্রুপে কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট বিতর্ক করছিলেন যে রাস্তা বন্ধ করে দেয়াটা হিতে বিপরীত হবে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দিল্লির নির্বাচনে বিজেপি নেতাদের ভরাডুবির পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি ক্ষোভ ঐসব অঞ্চলে প্রকাশ্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, রাস্তা অবরোধ তাদের ক্ষেপিয়ে তুলবে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত করবে সহিংসতা। তারা জানতেন যে কৃষক, গুজ্জার এমনকি দলিতদের এমনটা করা এক জিনিস। আর মুসলমানের ক্ষেত্রে একদম অন্য।এই হলো আজকের ভারতের বাস্তবতা।
আবার কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন, যদি রাস্তা অবরোধ না হয় এবং শহরের সবার মনোযোগ আকর্ষণে বাধ্য করা না হয় তবে প্রতিবাদকারীদের একপেশে করে অবহেলা করা হবে। এই মাফিক, কতক প্রতিবাদ স্থানে রাস্তা আবরোধ করা হয়েছে। ঠিক যেমন অনুমান করা হয়েছিলো, এই অবরোধ উন্মত্ত হিন্দু পাণ্ডাদের অস্ত্র ও হন্তারক মন্ত্র দিয়ে সশস্ত্র হবার সুযোগ করে দেয়, যা তারা এতদিন খুঁজছিলো।
এরপরের কয়েকদিনে তারা যে বর্বরতার প্রকাশ ঘটায় তা আমাদের শ্বাস রুদ্ধ করে দেয়। ভিডিওতে দেখা যায় প্রকাশ্যে তারা পুলিশের পিঠচাপড়ানি ও সমর্থন পাচ্ছে। মুসলিমরাও পাল্টা লড়ে যায়। উভয়পক্ষেই প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু পুরোপুরি অসমভাবে। এখানে সমতার হিসেব নিকেশ হয় না। এই সহিংসতাকে উসকিয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। অবিশ্বাস্যভাবে আমরা দেখতে পাই যে, রাস্তায় পড়ে থাকা গুরুতর আহত মুসলিম যুবকদের পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছে এবং বাধ্য করছে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য। ফাইজান, তাদের মধ্যে একজন, যে কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়।
শত শত নাচার মানুষের কল পুলিশ অবহেলা করে। এক পর্যায়ে অগ্নি-সংযোগ ও হননের পালা শেষ হল। শেষ পর্যন্ত শত শত অভিযোগ গ্রহণও করা হয়। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, আক্রমণকারীর নাম-পরিচয় এবং বন্দুক ও তলোয়ারধারী উন্মত্তদের আওড়ানো সাম্প্রদায়িক স্লোগান অভিযোগ থেকে ছেঁটে ফেলতে পুলিশ বাধ্য করেছে। নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোকে মামুলি পর্যায়ে রূপান্তরিত করা হয় যাতে তা নিষ্পত্তিহীন পড়ে থাকে এবং অপরাধীরা রক্ষা পায়। (ঘৃণ্য অপরাধ থেকে ঘৃণাকে বাদ দেয়া হয়েছিলো।)
ঐ হোয়াটসএপ চ্যাটের একটিতে, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে বসবাসকারী একজন নির্দিষ্ট মুসলিম এক্টিভিস্ট যিনি বারংবার চাক্কা জ্যামের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করছিলেন, চূড়ান্ত তিক্ততায় ভরা একটা পুনরুদ্ধারযোগ্য মেসেজ দিয়ে গ্রুপটি ত্যাগ করেন। এই সেই মেসেজ যেটি পুলিশ এবং মিডিয়া বাজেয়াপ্ত করে এবং ফলাও করে তাদের ওয়েবে প্রচার করে পুরো গোষ্ঠীটাকে নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরতে। এদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের সর্বাধিক সম্মানিত অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা। আর তাদের উপস্থাপন করা হচ্ছে সার্বিক সহিংসতার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে। এমনকি তাদের নাকি হত্যাযজ্ঞের মত অভিপ্রায়ও আছে। এর চেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে?
তবে বেকসুর প্রতিপন্ন হতে তাদের লাগতে পারে বছরের পর বছর। ততোদিন তাদের হয়তো কারাগারের বন্দী রাখা হতে পারে, তাদের জীবন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যেখানে কিনা আসল খুনি ও উস্কানিদাতারা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করবে এবং নির্বাচন জিতবে। শাস্তির উদ্দ্যেশ্যেই প্রক্রিয়াটি করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র মিডিয়া রিপোর্ট, নাগরিক সত্যানুসন্ধান এবং মানবাধিকার সংস্থা দাবি করছে, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সংগঠিত সহিংসতায় দিল্লি পুলিশ জড়িত। ২০২০ সালের আগস্ট মাসের একটি রিপোর্টে এমনেস্টি ইন্টার ন্যাশনাল জানায় যে, আন্দোলনকারীদের উপর নির্যাতন ও নিপীড়ন এবং উন্মত্তদের সহযোগিতার জন্য দিল্লী পুলিশ পুরোপুরি দোষী। আঁতকে ওঠার মত কতক ভিডিও যা অমরা সবাই দেখেছি, তার ময়না করার পর এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। সেই থেকে এমনেস্টির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এবং এর ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তাদেরকে ভারতীয় অফিস বন্ধ করতে বাধ্য করা হয় এবং ভারতে কর্মরত ১৫০ জন কর্মীকে বাদ দিয়ে দিতে হয়।
যখন পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে তখন প্রথমেই চলে যেতে হয় বা চলে যেতে বাধ্য করা হয় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। এই নজির আমরা আগে কোন দেশে লক্ষ্য করেছি? ভাবুন। অথবা গুগল করুন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি স্থায়ী জায়গা চায় ভারত। বৈশ্বিক ব্যবস্থায় হয়ে উঠতে চায় একটি স্বর। বিশ্বের পাঁচ পরাশক্তির সারিতেও থাকতে চায় ভারত, যারা কিনা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চুক্তিকে অনুমোদন দেয় না। আসলে ভারত চায় একটি একদলীয় গণতন্ত্র (অক্সিমোরোন) যেখানে জবাবদিহিতা থাকবে শূন্য কোঠায়।
পুলিশের পাতানো ২০২০ সালের অযৌক্তিক দিল্লি ষড়যন্ত্র এবং একইভাবে ২০১৮ সালের ভিত্তিহীন ভীম-কোরেগাও ষড়যন্ত্রের (হুমকি ও অপমানের অংশ হচ্ছে এই অযৌক্তিকতা) আসল মতলব হচ্ছে অ্যাক্টিভিস্ট, ছাত্র, আইনজীবী, লেখক, কবি, প্রফেসর, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এবং অবাধ্য এনজিওগুলিকে কারারুদ্ধ করা এবং চাপে রাখা। এর আসল উদ্দ্যেশ্য কেবল অতীত ও বর্তমানের ভয়াবহতা মুছে ফেলা নয় বরং আগামীতে যা আসবে তার জন্য মেঝে সাফ করে রাখা।
আমি মনে করি এই ১০ লাখ পাতার প্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের দুই হাজার পৃষ্ঠার রায়ের জন্য আমদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ এটা প্রমাণ করে যে গণতন্ত্রের শব নিয়ে এখনো টানা হেঁচড়া চলছে। উত্তর প্রদেশের হাথরাসে খুন হওয়া মেয়েটির মতো গণতন্ত্রের শব দাহ এখনো হয়নি। দেহাবশেষ হয়েও এটি এখনো নিজের ভার টানছে, আশপাশের সবকিছুকে ধীর করে দিচ্ছে। এই দিন বেশি দূরে নয় যেদিন এটাকে ছুঁড়ে ফেলা হবে এবং সবকিছু তার গতি পাবে। আর তখন আমাদেরকে শাসকদের অব্যক্ত স্লোগান হয়ে উঠতে পারে, “এক ধাক্কা অওর দো, ডেমোক্রেসি গাড় দো”। পুঁতে ফেলো।
যখন অমন দিন আসবে তখন বছরে হেফাজতে ১৭০০ হত্যাকাণ্ডকে আমাদের সাম্প্রতিক, গৌরবময় অতীতের স্মৃতির মতো মনে হবে।
এইসব ছোটখাট ব্যাপারকে প্রশ্রয় দিলে চলবে না। তারচে বরং আসুন, আমারা ভোট দিতে থাকি তাদের যারা আমাদের ঠেলে দিচ্ছে ক্ষুধা আর যুদ্ধের দিকে,যারা ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
তারা অন্তত আমাদেরকে একটি বিরাট মন্দির তো গড়ে দিচ্ছে। এটা তো কম কথা নয়!!