রুশ চিন্তক ও বিপ্লবী পিতর ক্রপোৎকিনের বহুল আলোচিত রচনা রাষ্ট্র ও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা । ১৮৯৬ সালে Les Temps Nouveaux পত্রিকার সম্পাদকের আমন্ত্রণে প্যারিসে ধারাবাহিক বক্তৃতার জন্য ক্রপোৎকিন দুটো বিষয় নির্বাচন করেন। এর মধ্যে প্রথমটি হল, রাষ্ট্র: এর ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং অপরটি হল নৈরাজ্যবাদ: এর দর্শন ও আদর্শ। কিন্তু এই বক্তৃতা আর কখনোই দেয়া হয়নি। রুশ-ফ্রান্স সামরিক মৈত্রীর প্রেক্ষাপটে প্যারিসে বড় ধরনের কোন বিরোধী-সমাবেশের বিষয়ে ভীত ছিল প্রান্স সরকার। ফলে ক্রপোৎকিনকে আর প্যারিসে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
পরবর্তীতে জেমস গিয়মকে লেখা চিঠিতে এবিষয়ে বিস্তারিত জানান ক্রপোৎকিন।১৯০৮ সালে ফ্রিডম প্রেস, লন্ডন থেকে The State: Its Historic Roal এর প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ভ্যারন রিচার্ডস এর অনুবাদ করেন। বর্তমান সংস্করণটি ভ্যারন রিচার্ডের ১৯৮৬ সালের সংস্করণ থেকে গৃহীত। আজ প্রকাশিত হল প্রথম অধ্যায়। -সম্পাদক
পিতর ক্রপোৎকিন
প্রথম অধ্যায়
আমার মনে হয়, এসময় খুব বেশি করে কথা হওয়া উচিৎ এমন একটা বিষয়ই আমি তুলে ধরতে যাচ্ছি। তা হলো: রাষ্ট্র ও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা। এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা রাষ্ট্রের ধারণার গভীরে যাব। এর নির্যাস, অতীত ভূমিকা আর ভবিষ্যতে এটিকে কেমন চেহারায় দেখা যেতে পারে ইত্যাদি পর্যালোচনা করব।
অন্য সব কিছুর ওপরে, এই রাষ্ট্রের প্রশ্নেই বিভক্ত হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। এই বিভক্তিতে দুইটি প্রধান ধারা চিহ্নিত করা যায়, যার ওপর ভিত্তি করে চিন্তাপদ্ধতি ও মেজাজে পার্থক্য গড়ে ওঠে। আসন্ন বিপ্লবের ওপর বিশ্বাস গড়ে উঠবে কিনা, তাও নির্ভর করে এই বিভক্তির ওপর।
এই বিভাজনের একদিকে থাকেন তারা, যারা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করার আশা করেন এবং বিপ্লবের জন্য এটির সার্বিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এমনকি ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়িয়ে নিয়ে। অন্যদিকে আছে আমাদের মতো মানুষেরা, যারা বর্তমান কাঠামো, মূলগত অবস্থান ইত্যাদির বিবেচনায় রাষ্ট্রকে দেখে সামাজিক বিপ্লবের পথে বাধা হিসেবে। যে ছদ্মবেশ নিয়েই হাজির হোক না কেন, রাষ্ট্র সব সময়ই সাম্য ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ার পথে একটি বড় বাধা। ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রকে গড়েই তোলা হয়েছে এই স্বাধীন সমাজের অঙ্কুরোদগম ঠেকানোর জন্য। ফলে এই ধারার কর্মীরা কাজ করেন রাষ্ট্রের বিলুপ্তির জন্য। এটিকে সংস্কারের জন্য নয়।
স্পষ্টই বোঝা যায়, এই বিভাজন খুবই গভীর। এর ফলে দুইটি ভিন্নমুখী ধারা তৈরি হয়েছে, যা আমাদের সময়ের সব দার্শনিক ভাবনা, সাহিত্য ও কর্মতৎপরতায় প্রতিফলিত হয়েছে। এবং রাষ্ট্র নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি যদি এখনকার মতোই অস্পষ্ট থেকে যায় তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে, যখন (আশা করি দ্রুতই) কমিউনিস্ট ধারণাগুলো কমিউনিটির প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবিক প্রয়োগের দিকে যাবে, তখন এই রাষ্ট্র প্রশ্নেই সবচে একগুঁয়ে লড়াইটি শুরু হবে।
আজকাল যেভাবে রাষ্ট্রের সমালোচনা করা হয় তাতে কেউ এর উদ্ভবতত্ত্বের খোঁজ করতেই পারেন। গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে পারেন রাষ্ট্রের অতীত ভূমিকা নিয়ে আর সেইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করতে পারেন যেগুলোকে রাষ্ট্র প্রতিস্থাপন করেছে।
প্রথমেই আমাদের একমত হওয়া যাক: ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটি দিয়ে আমরা কী বোঝাতে চাচ্ছি।
জার্মান স্কুলের চিন্তাধারায় রাষ্ট্রকে সমাজের সাথে গুলিয়ে ফেলে তৃপ্তি নেওয়া হয়। এই বিভ্রান্তিটা শ্রেষ্ঠ জার্মান চিন্তকদের মধ্যেও দেখা যায়। অনেক ফরাসির মধ্যেও দেখা যায়, যারা রাষ্ট্র ছাড়া সমাজ কল্পনাই করতে পারেন না। যার ফলে তাদের দৃষ্টিতে, নৈরাজ্যবাদীরা সমাজকে ধ্বংস করতে চায় এবং এমন অবস্থায় যাওয়ার কথা বলে যেখানে “সবাই সবার বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধে” লিপ্ত আছে।
যদিও এই ধরণের যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে, গত ৩০ বছরের মতো সময়ে ইতিহাসে যে অগ্রগতি হয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে সমাজবদ্ধভাবে বাস করছে, যখন রাষ্ট্র নামক জিনিসটার কথা কেউ শোনেও নি। এটা এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, ইউরোপের বিচারে রাষ্ট্র-ধারণার ইতিহাস খুবই কম সময়ের— টেনেটুনে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত যাবে। আর শেষ পর্যন্ত, এটাও এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, সেগুলোই মানুষের ইতিহাসের সবচে গৌরবজ্জ্বল সময়, যেখানে মানুষের সামাজিক জীবন ও স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে ধ্বংস হয়নি। যেখানে অনেক মানুষ কমিউনের ভিত্তিতে, স্বাধীন ফেডারেশনের ভিত্তিতে বাস করত।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে নানাবিধ কাঠামো গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র সেরকম একটি কাঠামো মাত্র। তাহলে যেটা স্থায়ী আর যেটা ঘটনাবশত— এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হবে না কেন?
আরেক দিকে, রাষ্ট্রকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয় সরকারের সাথে। যেহেতু কোনো রাষ্ট্রই সরকার ছাড়া থাকতে পারে না, ফলে কখনো কখনো এমনটা বলা হয় যে, লক্ষ্য স্থির করতে হবে সরকারের অনুপস্থিতির জন্য, রাষ্ট্রের বিলুপ্তির জন্য নয়।
যদিও, আমার মনে হয় রাষ্ট্র ও সরকার দুইটি ভিন্ন প্রকৃতির ধারনা। রাষ্ট্রের ধারনা দিয়ে যা বোঝানো হয়, তা সরকারের ধারনার চাইতে বেশ খানিকটা আলাদা। রাষ্ট্রের ধারনার সঙ্গে জুড়ে আছে ক্ষমতার অস্তিত্ব, যেটার অবস্থান সমাজের ওপরে। একই সঙ্গে এখানে যুক্ত আছে ভূখণ্ডগত কেন্দ্রীভবন। সেই সঙ্গে যুক্ত আছে সামাজিক জীবনের অনেক অনেক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার মতো ব্যাপার। সমাজের সদস্যদের ওপর নতুন কিছু সম্পর্ক চাপিয়ে দেয় রাষ্ট্র, যেগুলোর অস্তিত্ব রাষ্ট্রগঠনের আগে ছিল না। কিছু শ্রেণীর মানুষকে বাধ্য করে অন্য শ্রেণীর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে। আইনকানুন-পুলিশিংয়ের পুরো একটা ব্যবস্থা তৈরি হয় রাষ্ট্রপদ্ধতিতে।
এই পার্থক্যটি প্রথম দৃষ্টিতে স্পষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হয় রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত অধ্যয়ন শুরু করলে।
বস্তুত, সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রকে বোঝার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে এর ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে অধ্যয়ন করা। এখানে আমরা সেটাই করার চেষ্টা করব।
রাষ্ট্র শব্দটির সত্যিকার নির্যাস অনুযায়ী রোমান সাম্রাজ্য একটি রাষ্ট্র ছিল। আজকের দিন পর্যন্ত, রোমান সাম্রাজ্য যে কোনো আইনজ্ঞের আদর্শ। এই রাষ্ট্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিল একটি বিস্তৃত জায়গা জুড়ে, খুবই শক্ত নেটওয়ার্ক নিয়ে। সব কিছুরই কেন্দ্র ছিল রোম। অর্থনৈতিক ও সামরিক জীবন, ধনসম্পদ, শিক্ষা, এমনকি ধর্মও নিয়ন্ত্রিত হতো রোম থেকে। সেখান থেকে আসত আইন, ম্যাজিস্ট্রেট, সৈন্য, পুলিশ এবং ঈশ্বর। এই পুরো সাম্রাজ্যের মানুষের জীবনসুতো বাঁধা ছিল প্রথমে সিনেটে, তারপর সিজারের হাতে। সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সাম্রাজ্যের ঈশ্বর। প্রতিটা প্রদেশ, প্রতিটা জেলার ছিল একটি ছোট আকারের নিজস্ব ক্যাপিটল। রোমান সার্বভৌমত্বের অংশ, যা দিয়ে তারা প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটা বিষয় শাসন করত। রোম থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি একক আইন পুরো সাম্রাজ্যে আধিপত্য করত। যে আইন সেখানকার নাগরিকদের কোনো কনফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করত না। নাগরিকদের বিবেচনা করা হতো শুধুই প্রজার দল হিসেবে।
এমনকি এখনও, আইনজ্ঞ আর কর্তৃত্ববাদীরা শ্রদ্ধা করেন এই সাম্রাজ্যের একতাকে। এর আইনকানুনের একতাবাদী চেতনাকে। তাঁদের ভাষায়, এই সংগঠনের সৌন্দর্য্য ও ঐক্যতানকে।
আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াম্ফ অব ডেথ শিল্পী: পিটার ব্রুজেলস সূত্র: উইকিমিডিয়া
কিন্তু রোমান সাম্রাজ্য ভিতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এবং বাইরে থেকে বারবারিয়ানদের আগ্রাসী আক্রমণ সেটিকে ত্বরান্বিত করে। আঞ্চলিক সব সামাজিক জীবনের বিলুপ্তি ঘটেছিল। ফলে বাইরে থেকে আসা আক্রমণও তারা ঠেকাতে পারছিল না, আবার কেন্দ্র থেকে যে কুপ্রভাব ছড়ানো হচ্ছিল সেগুলোও মোকাবিলা করতে পারছিল না। জমি দখলে রাখা ধনীদের আধিপত্য, আর সেসব জমি চাষ করা কৃষকদের দুর্দশা— এই সব কিছু মিলিয়ে রোমান সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যায়। আর সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা। আমাদের সভ্যতা।
এখন, যদি আমরা প্রাচীনযুগের সভ্যতাগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু আমাদের এই তরুণ, বারবারিয়ান সভ্যতার জন্ম ও বিকাশের দিকে দৃষ্টি দেই এবং ঠিক সেই সময়টা পর্যন্ত খেয়াল করি যখন এটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, তাহলে আমরা এই আধুনিক রাষ্ট্রের স্বরূপ অনেক ভালোমতো বুঝতে পারব। রোমান সাম্রাজ্য বা মেসোডোনিয়ার আলেকজান্ডার বা প্রাচ্যের কোনো রাজ্যের দিকে মনোযোগ দিলে যা অত ভালোভাবে নাও বোঝা যেতে পারে।
শক্তিশালী বারবারিয়ান গোষ্ঠীগুলো রোমান সাম্রাজ্যকে উৎখাত করছে— ইতিহাসের এই জায়গাটিকে আমরা আমাদের যাত্রার উৎসবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করছি। যার ফলে আমরা আমাদের পুরো সভ্যতার বিবর্তন অনুসন্ধান করতে পারব। এর শুরু থেকে এখনকার রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত।
ইউরোপে ১৮৪৮ সালের তুমুল মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতায় নেমে এসছিল এক অমানিশা। একিদিকে বুর্জোয়া বিশ্বাসঘাতকতা অন্যদিকে আতঙ্ক আর হতাশায় নিমজ্জিত শ্রমজীবী মানুষ! বিপ্লবী শ্রমজীবীদের উজ্জীবনে তরুণ বাকুনিনের কালজয়ী ভাষণ স্লাভদের প্রতি আহ্বান । এতে বাকুনিন পরিস্কার করেন যে, বুর্জোয়ারা নিজেরাই নিজেদের বিপ্লব-বিরোধী শক্তি হিসেবে উন্মোচিত করেছে এবং বিপ্লবের ভবিষ্যত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। দ্বিতীয়ত, বিপ্লবের জন্য অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যর ভাঙ্গন এবং মধ্য ও পুর্ব ইউরোপে মুক্ত স্লাভ রিপাবলিক মহাসংঘ (Federation of free Slav republics) প্রতিষ্ঠা একটি অনিবার্য শর্ত। তৃতীয়ত: অত্যাসন্ন বিপ্লবে কৃষক বিশেষত রুশ কৃষকরা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে এবং বিপ্লবকে পুর্ণাঙ্গ রূপ দিতে সক্ষমত হবে।
মিখাইল বাকুনিন
ইউরোপের ইতিহাসে বাকুনিনের এই সম্ভাষণকে মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন ই এইচ কার। ১৮৪৮ সালের অস্ট্রীয় মার্চ বিদ্রোহে অংশগ্রহণের জন্য বাকুনিনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে রাশিয়ায় রাজবন্দী হিসেবে হস্তান্তর করা হয়। তরুণ বাকুনিনের মধ্যে বিদ্রোহের পাশাপাশি ব্লাঙ্কিবাদী ঝোঁক ছিল। স্লাভদের প্রতি আহ্বান -এ তা বেশ পষ্ট। তাঁর এই ঝোঁক কাটতে সময় লেগেছিল আরও দেড় দশক।
১৯৭১ সালে স্যাম ডলগফ স্লাভদের প্রতি আহ্বান অনুবাদ করেন। Bakunin on Anarchy গ্রন্থে এটি প্রকাশিত হয়। বর্তমান বাংলা অনুবাদ সংস্করণটি সেখান থেকেই অনুসৃত।-সম্পাদক
মূল রচনা
ভাইয়েরা, সিদ্ধান্ত নেয়ার এটাই সময়। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাদেরই, পুরনো পৃথিবীর এই ধ্বসংস্তূপকে ঠিকা দিয়ে আরও কিছুকাল চালিয়ে নিবেন আপনারা নাকি নতুন এক পৃথিবী— যার প্রতিভাস আপনাদের স্পর্শ করেছে, যেই পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ও অনাগত শতাব্দীর জন্য— তার পক্ষে দাঁড়াবেন। ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ আপনাদের হাতে রাখতে চান নাকি আবারও নিমজ্জিত হতে চান অক্ষমতায়, আশাহীন অন্ধকারে, দাসত্বের নরকে— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারও আপনাদেরই হাতে। মুক্তিকামী অপরাপর মানুষদের ভাগ্য ঝুলে আছে আপনাদের সিদ্ধান্তের ওপরই। আপনাদের সিদ্ধান্তই তাদেরকে লক্ষ্যের দিকে দ্রুতপায়ে, কোনো বিচ্যুতি ছাড়াই এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগাবে, নয়তো এই লক্ষ্য, যা কখনোই হারিয়ে যেতে পারে না, অপসৃত হবে কোনো দূর অন্ধকরাচ্ছন্নতায়।
এক রুদ্ধশ্বাস উদ্বেগ নিয়ে সকলেই চেয়ে আছে আপনাদের দিকে। আপনাদের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দিবে এই পৃথিবীর আশা ও ভাগ্যের প্রতীতি কী হবে— তার ত্বরিৎ আগমন ঘটবে নাকি তা সরে যাবে সুদূর ও অনিশ্চিত কোনো ভবিষ্যতের দিকে। তা হবে আপনারই কল্যাণ অথবা লোকসান। জনতার আশীর্বাদ থাকবে আপনার ওপর নাকি তার ভর্ৎসনা, আপনিই বেছে নেন।
সারা বিশ্ব ভাগ হয়ে গেছে দুটি শিবিরে; এক অংশে বিপ্লব আর অন্য অংশে প্রতিবিপ্লব। এবং স্পষ্ট বিকল্প আপনাদের সামনে। আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ শিবির বেছে নিতে হবে, এটা আপনাদের ক্ষেত্রে যেমন আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও সত্য। মধ্যপন্থা বলে কিছু নেই। যারা মধ্যপন্থার দিকে ইঙ্গিত করে, হয় তারা নিজেরা ধাঁধায় পড়ে আছে অথবা আপনাকে ধাঁধায় ফেলতে চাচ্ছে।
আমরা যদি এই সংগ্রামে উভয় প্রতিপক্ষকেই জায়গা করে দিই, যাতে করে দুজনকেই খুশি রাখা যায় এবং অনিবার্য এবং আবশ্যক সংঘর্ষের বিস্ফোরণ এড়ানো যায়, তাহলে সুনিশ্চিতভাবেই আমরা লক্ষ্যের দিকে অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারব— এই মিথ্যায় যারা বিশ্বাস রাখে তারা আত্মপ্রবঞ্চণার শিকার।
তারা প্রতারক যদি তারা আপনাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে, কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে আপনাকে একটা সময় পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে, এবং অবশেষে ক্ষমতাশালী অংশটাকেই বেছে নিতে হবে, এবং নিজের ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা আদায় করে নিতে হবে যাদের আপনি সাহায্য করেছেন তাদের হাত ধরে।
ভাইয়েরা, কূটনৈতিককৌশলেআপনারাবিশ্বাসস্থাপনকরবেননা। পোল্যান্ডের ধ্বংস ডেকে এনেছে এটা। এবং একই পরিণতি আপনাদেরও হবে। এইসব কূটনৈতিক চাতুরি আপনাদের কী বলে? আপনারা এটাকে ব্যবহার করতে পারবেন শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য। কিন্তু আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, এটাকে ব্যবহার করতে পারার বদলে বরং আপনিই এইসব কূটনীতিকদের হাতের অস্ত্রে পরিণত হচ্ছেন? যেই অস্ত্র ব্যবহার করে তারা নিজেদের শত্রুকে পরাস্ত করে। আর তাদের পরাস্ত করবার পর এরা আপনার দিকে ঝুঁকবে সেই সময়ে আপনি যখন একা ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন, আর তখন আপনি নিজেই আপনার মাথা নুইয়ে নিবেন জোয়ালের তলে। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না, এই লজ্জাজনক কৌশল, এই ফন্দিফিকিরকে কাজে লাগাচ্ছে প্রতিবিপ্লবীরা? আপনারা কি জানেন না নিপীড়কদের সেই পুরাতন প্রবাদবাক্য: বিভক্তিঘটাওআরশাসনকরো।
কূটনীতির কাছ থেকে কীইবা আশা করা যায়? নিজের উৎসকে অস্বীকার করতে পারবে এটা? যেই কিনা স্বৈরতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই না? এর উৎপত্তির জন্য যাদের কাছে সে ঋণী তাদের ছাড়া অন্যদের স্বার্থে কি সে লড়তে পারে? এটা কি কাজ করতে পারে নতুন এক বিশ্ব গড়ার জন্য? যেই বিশ্বে একে নিন্দা জানানো হবে এবং এর মৃত্যু ঘটবে সেখানে? কখনোই না। এর চেহারার দিকে সোজা তাকিয়ে দেখেন, এর মুখের ওপরই সেঁটে দেয়া আছে শয়তানের আদিরূপ, ছলনা ও বিশ্বাসঘাতকতা, যা আপনাদের মধ্যে তীব্র ঘৃণার উদ্রেগ করবে।
প্রাচীন জার্মান রাজনীতিকে গালাগালি করার যথেষ্ট কারণ আছে আপনাদের, আপনাদের ন্যায়সঙ্গত ঘৃণা এর প্রাপ্য, কেননা এটা আপনাদের ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই চায় না। আপনাদের বন্দি করে রেখেছে কয়েক শতাব্দী ধরে, এমনকি ফ্রাঙ্কফুটের আগেও আপনাদের ন্যায্য আশা এবং আহ্বানকে কটাক্ষ করে এসেছে… এবং প্রাগ কনগ্রেস ভেঙে যাওয়াতে ভিয়েনাতে তারা উল্লাস করেছে। কিন্তু বিভ্রান্ত হবেন না এবং মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এইপুরাতনরাজনীতি, যাকেআমরাআপনাদেরইমতোতিরস্কারকরি, গালাগালিকরি, যারবিরুদ্ধেশোধনেওয়ারজন্যআমরাপ্রতিজ্ঞাবদ্ধ, এইরাজনীতিভবিষ্যৎজার্মানিরমানুষেরকাছেস্থানকরেনিতেপারবেনাকখনোই।জার্মানবিপ্লবএটিনয়, এটিজার্মানগণতন্ত্রেরওঅংশনয়। নিছক প্রাচীন রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্র, রাজতন্ত্রের অধিকার, অভিজাত ও অগ্রসর সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদের রাজনীতি এটি। এটা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও সেনানায়কদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি, যেনবা তারা কোনো যুদ্ধযন্ত্র। এটা সেই রাজনীতি যার পতনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা— আমরা সকলেই যারা তারুণ্য ও ভবিষ্যতের উদ্যম নিয়ে এগিয়ে চলেছি, যারা সকল দেশের সব গণতন্ত্রকামী মানুষের হাতে হাত রাখবে আনন্দের সাথে, যাতে করে আমরা একসাথে, একতাবদ্ধ হয়ে, লড়াই করতে পারি সকলের মঙ্গলের জন্য, সব মানুষের ভবিষ্যতের জন্য।
সকল প্রতিশ্রিয়াশীল কর্ম একত্র হয়েছে মদ মতলব নিয়ে। আমাদেরও কি তাই করা উচিত নয়, আমাদের সুমতলবের বাস্তাবায়নের জন্য? প্রতিক্রিয়াশীলতা যখন সমগ্র ইউরোপজুড়ে চক্রান্ত করে বেড়াচ্ছে, কোনো মাত্রা ছাড়াই কাজ করে চলেছে, ধীরে ধীরে সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করা সংগঠনের সাহায্য নিয়ে, সবখানেই যা বিস্তৃত হচ্ছে, বিপ্লবেরও এর সাথে লড়াই করার মতো শক্তি দাঁড় করানো উচিত।
আপনারাতো জানেনই যে, বিপ্লবের প্রাণের অস্তিত্বে নীপিড়কদের প্রাচীন রাজনীতির বিরুদ্ধে ঘৃণার সুদীর্ঘ এক বিস্ফোরণ রয়েছে, আছে দীর্ঘ সহানুভূতিশীল কান্না এবং সকল নীপিড়িত জাতিসমূহের প্রতি ভালোবাসা।
এইভিয়েনাতেই, মানেআছেআপনাদের? আপনারাশুনতেপেয়েছিলেনএবংউপলব্ধিকরতেপেরেছিলেনএটাসেইদিন, যখনআপনারালড়েযাচ্ছিলেনঅন্যদেরসাথেসকলেরমঙ্গলেরজন্য, আপনারাজেগেউঠেছিলেনজার্মানপ্রতিরোধেরবিরুদ্ধে, সেইমহানস্লাভপ্রতিরোধযারওপরআপনাদেরজাতীয়পতাকাউড়েছিল, এইস্লোগানসহ: আমাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার প্রতি!
কী মহান, কী চমৎকার ছিল এই আন্দোলন, সমগ্র ইউরোপজুড়েই যা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা ইউরোপ। বিপ্লবী প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে, ইতালীয়, পোলিশ, স্লাভ, জার্মান, ম্যাগিয়ার, অস্ট্রিয়া ও তুর্কির ওয়ালেকিয়ানরা— যারাই বিদেশি শক্তির অধীনে নিপীড়িত হয়েছে, তারাও জেগে উঠেছিল, আশা ও আনন্দে শিহরিত হয়েছিল। সবচাইতে দুঃসাহসী স্বপ্নগুলোরই বাস্তবায়ন ঘটতে চলেছিল। জনগণ দেখতে পেলো বহু শতাব্দী ধরে যেই পাথর তাদের স্বাধীনতাকে চাপা দিয়ে রেখেছে তা দূরে সরে যাচ্ছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত তাকে ঠেলে নিয়ে গেছে। মন্ত্রপুত তালা গিয়েছিল ভেঙে, আর এতগুলো জ্যান্ত-মরা মানুষের বিমর্ষ অসাড়তাকে পাহাড়া দিয়ে রেখেছিল যেই ড্রাগন, আহত হয়ে পড়ে ছিল সে, আর মরণযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল। রাজ-রাজরাদের পুরনো রাজনীতি বিদায় নিলো আর এক নতুন জনতার রাজনীতি জীবন লাভ করল।
তারপর আমাদের মোলাকাত হলো প্রাগে, যারা দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আবারও ভ্রাতৃরূপে একত্র হয়েছে একে অপরকে এটাই জানাতে যে তাদের পথ আর কখনোই বিভক্ত হবে না। ইতিহাস ও রক্তের অভিন্ন বন্ধনে প্রবলভাবে উজ্জীবিত হয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি যে আমরা আর কখনোই নিয়তিকে আমাদের বিভক্ত করে ফেলতে দেবো না। স্বৈরাচারের রাজনীতিকে আমরা পরিত্যাগ করেছি, দীর্ঘকাল ধরে যেই স্বৈরাচারের শিকারে পরিণত হয়ে ছিলাম আমরা। এবং আমরা নিজেদের চূড়ান্ত স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি যে সকল স্লাভ জনগণই এই স্বাধীনতার অংশীদার হবে। বোহেমিয়াও মোরাভিয়াকে আমরা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছি। ফ্রাঙ্কফুট (সংসদ) এর অযৌক্তিক দাবিকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, ইউরোপজুড়ে যা আজ এক হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছে। তারা আমাদের সবাইকে জার্মান বানিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, যেখানে আমরা আমাদের ভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি জার্মান জনগণের দিকে, গণতান্ত্রিক জার্মানির দিকে। হাঙ্গেরিতে বসবাসরত স্লাভদের অছিলায় আমরা ম্যাগিয়ারদের প্রতি আমাদের ভ্রাতৃপ্রতীম মৈত্রীর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। যার কিনা আমাদের জাতির অগ্নিতুল্য শত্রু। সবেমাত্র ৪০ লক্ষ মানুষ নিয়ে যারা ৮০ লক্ষ স্লাভদের দাসে পরিণত করতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য আমাদের যে চুক্তি তাতে আমরা ভুলে যাইনি তুর্কী আধিপত্যের অধীনে কেঁদে মরা আমাদের ভাইদের কথাও।
পোল্যান্ডকে তিন তিনবার দ্বিধাবিভক্ত করে দেয়া অপরাধমূলক রাজনীতি যা এখন আবারও অবশিষ্ট যাকিছু আছে তাকেও টুকরো টুকরো করে দেয়ার তালে আছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের আকুল আকাঙ্ক্ষা এই যে, সেই মহান ও পবিত্র শহীদ জনগোষ্ঠীকে আমরা আমাদের সকলের মুক্তির নিশানা হয়ে পুনরুজ্জীবিত হতে দেখব খুব শ্রীঘ্রই। অবশেষে, মহান রাশিয়ান জনগণের প্রতি আমরা দৃঢ় আহ্বান জানিয়েছি। সকল স্লাভদের মধ্যে একমাত্র তারাই জাতিগত অস্তিত্ব জিইয়ে অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। রাশিয়ানদের কাছে আমাদের আবেদন ছিল যে তারা যা খুব ভালোভাবে জানে সে ব্যাপারে গভীরভাবে ভেবে দেখতে। আর তা হচ্ছে যতক্ষণ না তারা নিজেরাই স্বাধীন হতে পারছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের ক্ষমতাকে দুর্দশাগ্রস্থ পোল্যান্ডের উপর চাবুক চালানোর কাজে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা ইউরোপীয় সভ্যতার জন্য চিরস্থায়ী হুমকি হয়ে রয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের জাতীয়তা এবং মাহাত্মের কোনো অর্থই থাকছে না আর।
সকল দেশের গণতান্ত্রিকদের সাথে মিলে আমরা যা করেছি, আমাদের দাবি জানিয়েছি যে: জাতিসমূহের স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। আর যার মধ্য দিয়ে স্লাভ জনগোষ্ঠী খুব দ্রুতই হয়তো একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে, যেখানে তারা এই জাতিরাষ্ট্রসমূহের মতোই স্বাধীন এবং সকলের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে আবদ্ধ, কিন্তু নিজেদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ মৈত্রীর বন্ধনে একতাবদ্ধ থাকবে।
1848 Revolutions
বসন্তের একেবারে শুরুর দিন থেকেই দুটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে, যেনবা স্বতস্ফূর্তভাবেই উঠে আসছে প্রশ্ন দুটি। এক দিকে সামাজিক প্রশ্ন আবার অপরদিকে সকল জাতিসমূহের স্বাধীনতা, জনগণের বন্ধনমুক্তির প্রশ্ন। আর এদুটি প্রশ্নই ভিতরে ও বাহিরের বন্ধনমুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। না স্রেফ কতিপয় ব্যক্তি বা কোনো দল নয়, বরং জনগণের অপূর্ব সেই প্রবৃত্তিই এ দুটি প্রশ্নকে সামনে তুলে ধরেছে, এবর এর ত্বরিৎ সমাধানের দাবিও জানিয়েছে। প্রত্যেকেই এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছে যে যেখানে জনগণের সিংহভাগকেই এক দুর্বিষহ অস্তিত্বে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষা, অবসর এবং খাবার বঞ্চিত হয়ে এই জনগণের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাবান ও ধনীদের ভারবাহী হয়ে থাকা, সেখানে স্বাধীনতা নিছক একটি মিথ্যাচার মাত্র। ফলে রাজনৈতিক বিপ্লবের স্বাভাবিক, জরুরি অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। অনুরূপভাবে এটাও উপলব্ধি হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইউরোপে একটি মাত্র নিগৃহীত জাতিও বিরাজ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোথাওই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিজয় সম্ভব নয়। একের উপর নিপীড়ন মানে সকলের উপরই নিপীড়ন। সকলের স্বাধীনতা লঙ্ঘন না করে একের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হতে পারে না। বিপদের দ্বারা কণ্টকাকীর্ণ ও ঝড়ের পূর্বলক্ষণে দুর্বহ এক জটিল প্রশ্ন হচ্ছে এই সামাজিক প্রশ্ন। এবং পূর্বানুমিত তত্ত্ব বা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবস্থার দ্বারা এর সমাধান সম্ভব নয়। এর সমাধান দাবি করে সদিচ্ছা ও সর্বসম্মত সহযোগিতার। সকলের সমান স্বাধীনতার অধিকারে সমস্ত জনগণের বিশ্বাস স্থাপনের দাবি করে এটি। বর্তমানকালে আমাদের অস্তিত্বের বস্তুগত ও নৈতিক যে অবস্থাগুলো রয়েছে সেগুলোকে রূপান্তরিত করতে হবে যদি আমরা উপর থেকে নিচে আমূল পাল্টে দিতে চাই জরাজীর্ণ এই সামাজিক বিশ্বকে। যেই বিশ্ব হয়ে উঠেছে নির্বীর্য ও নিষ্ফলা। এই বিশাল জনতার স্বাধীনতাকে ধারণ করতে বা সমর্থন করতেও যা হয়ে পড়েছে অক্ষম। আমাদের প্রথমে অবশ্যই পারিপাশ্বিক আবহকে দূষণমুক্ত করতে হবে, পুরোদস্তুর রূপান্তরিত করতে হবে আমাদের পরিবেশকে, কেননা এটি আমাদের হৃদয় ও মনকে সঙ্কীর্ণ করে দিয়ে আমাদের প্রবৃত্তি ও ইচ্ছাশক্তিকে কলুসিত করে। আর এভাবেই সামাজিক প্রশ্নটি সর্বাগ্রে সমাজকে আমূল পাল্টে দেয়ার প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়।
প্রবহমান রচনাটি মিখাইল বাকুনিনের Federalism, Socialism, Anti-Theologim রচনার কয়েকটি অনুচ্ছেদ মাত্র। ১৮৬৭ সালে লিগ অব পিস অ্যান্ড ফ্রিডমের জেনাভা কংগ্রেসে বাকুনিন এই শিরোনামে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। তাঁর বক্তৃতার টেক্সটটির অনেকখানি হয়তো ধ্বংসপ্রাপ্ত, নয়তো হারিয়ে গেছে। বাকুনিন এটি বক্তৃতার ঢঙেই রচনা করেন। এর তিনটি অংশ ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয়াংশ Federalism ও Socialism বিষয়ে। কিন্তু তৃতাংশ Anti-Theologim অংশটি ধ্বংসপ্রাপ্ত। এই অংশটি থেকে শুধু Rousseau’s Theory Of The State অংশটি অক্ষত ছিল। স্যাম ডলগফ ১৯৭১ সালে বাকুনিনের এই রচনাটি ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং তা তাঁর Bakunin And Anarchy গ্রন্থে স্থান পায়। Rousseau’s Theory Of The State অংশেরই কয়েকটি অনুচ্ছেদ Power Corrupts The best শিরোনামে ১৯৮০ দশকে লিফলেট আকারে প্রকাশিত হয়। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড এক্টনের Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely এই উক্তি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই শিরোনামটির আর্বিভাব। বাকুনিন রচনা সম্পাদনাকারী স্বনামধন্য গাই এ অলড্রিন, জি পি ম্যাক্সিমফ বা স্যাম ডলগফ কেউই তাদের গ্রন্থে Power Corrupts The best উপশিরোনাম যুক্ত করেননি। Rousseau’s Theory Of The State এর অংশ হিসেবে মূল রচনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অরাজ সংস্করণে ক্ষমতা ও পচন শিরোনামে এটি প্রকাশ করা হল।–সম্পাদক
মিখাইল বাকুনিন
রাষ্ট্র আদতে শাসন ও শোষণের নিয়মতান্ত্রিকতা ও নিয়মিতকরণ ছাড়া আর কিছু না। আমরা যাচাই করে দেখানোর চেষ্টা করবো যে, গুটিকতক লোক দ্বারা শাসিত জনগণের সরকারের পরিনাম আসলে কি! এক্ষেত্রে প্রথমেই আমরা বিবেচনা করব, স্বাধীন চুক্তির ভিত্তিতে গঠিত কোন আদর্শ রাষ্ট্রের বুদ্ধিদীপ্ত ও নিষ্ঠাবান সরকারকে, যেমনটি আপনি চান ।
ধরা যাক, সর্বোৎকৃষ্ট নাগরিকদের নিয়েই সরকার গঠিত হলো। প্রথমে এই নাগরিকগণ অধিকারের দিক থেকে নয় বরং বাস্তবতার বিবেচনায় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন। জনগণের দ্বারাই তারা নির্বাচিত হবেন; কারণ তারা বুদ্ধিমান, চতুর, জ্ঞানী, সাহসী এবং নিষ্ঠাবান। সম-অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিকগণের মাঝ থেকে বেছে নেয়া এই মানুষগুলো আলাদা কোনো শ্রেণি প্রতিষ্ঠা করবে না প্রথমে বরং তারা হবে কিছু মানুষের সমষ্টি যারা চারিত্রিক গুণাবলীর কারণে অগ্রাধিকারী বলে গণ্য হবেন, এবং এই কারণে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার জন্য বেছে নেয়া হবে এদের। তাদের সংখ্যাটাও অবশ্যই সীমিত থাকবে। কারণ, অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, সবসময়ই সবদেশে অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন যে সমস্ত মানুষ দেখা যায়, যারা স্বভাবতই কোনো জাতির সর্বসম্মত শ্রদ্ধা অর্জন করেন, তাদের সংখ্যাটা অতি ক্ষুদ্র হয়। অতএব, ভুল সিদ্ধান্তগ্রহণের যন্ত্রণা মেনে নিয়েই, জনগণ সবসময়ই বাধ্য হবে এদের মধ্য থেকেই শাসক নির্বাচিত করতে।
তখনো একে পৃথক দুটি শ্রেণি যদি নাও বলি, তবুও সমাজ এখানে দুইভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, যার একটি ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপুল সংখ্যক নাগরিক নিয়ে তৈরি, অকুণ্ঠচিত্তে যারা তাদের নির্বাচিত নেতাদের নিয়ে গঠিত সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আর অপরপক্ষ, যারা কিনা জনগণের স্বীকৃতি ও রায় পেয়ে ক্ষুদ্র সংখ্যাক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মানুষদের দ্বারা গঠিত, জনগণকে শাসন করার জন্য তারা নিয়োজিত হয়। গণনির্বাচনের ওপর নির্ভর করে প্রথমে এদেরকে জনগণের থেকে আলাদা করা হয় তাদের বিশেষ গুণাবলী দেখে, যেই গুণাবলীর কারণে জনগণের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হয়ে ওঠেন তারা, এবং তারা স্বাভাবিকভাবেই যে কারও চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠাবান ও প্রয়োজনীয় হিশেবে বিবেচিত হন। তখনো তারা নিজেদের কোনো অগ্রাধিকার আদায় করে নেন না, কোনো বিশেষ অধিকারও আদায় করেন না, কেবল জনগণের ইচ্ছা আনুসারে যেই বিশেষ কর্তব্য তাদের প্রদান করা হয়েছে সেটার চর্চা ছাড়া। আর বাকিদের ক্ষেত্রে, তাদের জীবনাচরণের জন্যই এবং তাদের অস্তিত্বরক্ষার শর্ত ও উপায়ের কারণেই নিজেদেরকে তারা অন্যদের থেকে পৃথক করে নেন না কোনোভাবেই, যাতে করে একটা নিপুণ সাম্য সবার মধ্যে বজায় থাকে। এই সাম্য কি বেশিদিন রক্ষা করা সম্ভব? আমরা বলব যে সম্ভব নয়, এবং এটা প্রমাণ করে দেখানোর চেয়ে সহজ বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।
মানুষের ‘ব্যক্তিগত নৈতিকতাবোধ’ ও ‘হুকুমপ্রদানের অভ্যাসের’ মতো ভয়াবহ কিছু আর নেই। সবচাইতে সেরা মানুষটাও— সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, নির্লিপ্ত, উদার এবং শুদ্ধ মানুষটাও এই ক্ষেত্রে এসে যে কোনো সময়েই অধপতিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষমতার মাঝে দুটি স্বভাবসিদ্ধ প্রবণতা থাকে যার কারণে এই নৈতিকস্খলন অবধারিত। আর এই দুটি প্রবণতা হচ্ছে, সাধারণ জনগণের প্রতি অবজ্ঞা ও নিজের যোগ্যতার অতিমূল্যায়ণ করা। তার মনে হতে থাকে, “জনতা তার নিজের শাসনের ভার নিজে নিতে পারে না বলেই আমাকে নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর এর মাধ্যমে তারা প্রকাশ্যে নিজেদের হীনতা ও আমার উৎকৃষ্টতা ঘোষণা করেছে। এই জনতার ভিড়ে আমার সমকক্ষ কোনো লোক খুঁজে পাওয়া দুস্কর, সুতরাং আমি একাই এই জনসাধারণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখি। এই জনগণের আমাকে দরকার, আমার সেবা ছাড়া এরা কিছুই করতে পারবে না, কিন্তু আমার একার পক্ষেই বেশ ভালোভাবেই সফলকাম হওয়া সম্ভব। সুতরাং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই আমাকে মেনে চলতে হবে তাদের, এবং তাদের কথা শুনে চলার ক্ষেত্রে তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বরং তাদের উপকারই করছি আমি।”
এর মধ্যেই কি মানুষের মাথা এবং তার অন্তর খারাপ হয়ে যাওয়ার কারণ নিহত থাকে না? এবং এই আত্মঅহঙ্কার তাকে পাগল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? আর এইভাবে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও নিষ্পাপ মানুষটার ক্ষেত্রেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক স্খলনের উৎস হয়ে ওঠে ক্ষমতা এবং হুকুম করার অভ্যাস।
বিপ্লব দাবি করে সর্বব্যাপি বিদ্রোহ। কিন্তু বিদ্রোহের স্পৃহা আসে কোথা থেকে? স্বাধীনতার বোধ থেকে। কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন-শোষণের জাঁতাকলে মানুষ যখন পিষ্ট, কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্র সামাজিক সংহতিই তখন তাকে বিদ্রোহের পথ দেখায়। রাষ্ট্রের কল-কব্জাগুলো অসাড় হয়ে পড়ে, হারাতে থাকে তার ছন্দ। হাজির হয় অনিবার্য বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। কেমন করে এই বৈপ্লবিক পরিস্থিতিতে সমাজ লড়াকু হয়ে ওঠে তারই এক চিত্রায়ন বিদ্রোহের প্রাণস্পৃহা।
পিতর ক্রপোৎকিন
রুশ নৈরাজ্যবাদী চিন্তক পিতর ক্রপোৎকিনের The Spirit Of Revolt প্রথম ছাপা হয় Le Révolté নামে, ১৮৮০ সালে। ১৮৯২ সালে Commonweal-এ ছাপা হয় ইংরেজি অনুবাদ। বর্তমান অনুবাদটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত The Essential Kropotkin অনুসারে করা হয়েছে।
সামাজিক বিকাশের ধারা-প্রবণতাকে আধুনিক প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানামুখি অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন ক্রপোৎকিন। সামাজিক ডারুইনবাদের Survival for the fittest মতবাদের বিপরীতে তিনি তাঁর Mutual Aid: A Factor of Evaluation বইয়ে দেখান যে, প্রকৃতিতে পারস্পারিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই প্রজাতিগুলো বিকশিত হয়। শরীরবৃত্তীয়ভাবে দুর্বল প্রাণসত্তার প্রবৃত্তি হলো তা সংহতিপরায়ণ। আদতে সামাজিক সংহতিই ক্রমাগত জীবনের উচ্চতর গঠন নিশ্চিত করে।
ক্রপোৎকিন বিদ্রোহকে মানবীয় প্রবৃত্তি মনে করেন। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত চিত্রকর্মটি আলবেনীয় ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৬৯ সালে স্লাভ চিত্রকর সালি শিজাকু তিরিশের দশকের প্রখ্যাত আলবেনীয় বিপ্লবী ভোজো কুশির এই প্রতিকৃতি অঙ্কন করেন। দ্রোহ ও সাহসিকতার ভঙ্গি চিত্রকর্মটিকে করে তোলে বিদ্রোহের স্মারক।
মূল রচনা
মানুষের সমাজে এমন কিছু কিছু পর্যায় আসে যখন বৈপ্লবিক তৎপরতা হয়ে ওঠে ভীষণ প্রয়োজনীয়। একেবারে অনিবার্য। নতুন নতুন চিন্তাধারা আলো-বাতাসের খোঁজে মাথা চাড়া দেয় অঙ্কুরের মতো। কিভাবে সেই চিন্তাগুলো জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়- সেই সন্ধান চলতে থাকে অনবরত।
কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেগুলো বাধার সম্মুখীন হয়। পুরনো সমাজের শৃঙ্খল যারা রক্ষা করতে চায়, তারা সেই বিপ্লবী চিন্তা-তৎপরতাগুলো স্তব্ধ করে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়। তবে এতে করে তারা নিজেরাই অন্ধবিশ্বাস ও নানা রকম প্রথা দিয়ে মোড়ানো দমবন্ধ-পরিস্থিতির মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রের সংবিধান, সামাজিক ভারসাম্যের আইন, নাগরিকদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলো টিকে থাকতে পারে না নির্মম সমালোচনার সামনে। ড্রইংরুম, অফিস-রেস্তোঁরা, প্রাত্যহিক আলাপচারিতা, দার্শনিকদের লেখনি; সর্বত্রই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে থাকে পুরনো সমাজে প্রচলিত বিষয়-আশয়গুলো। এমন অবস্থায় নড়বড়ে হতে থাকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভীত। জীর্ণ হয়ে পড়ে সামাজিক কাঠামো। অনেক বিরোধিতা সত্ত্বেও পুরনো সমাজ-রাষ্ট্রের ভাঙ্গতে থাকা দেয়ালে বপিত হতে থাকে নতুন চিন্তার বীজ। সেগুলো বেড়ে উঠতে থাকে আশেপাশে, চারদিকে।
নতুন সমাজ-জীবনের প্রয়োজনীয়তা হয়ে ওঠে অনিবার্য। প্রতিষ্ঠিত যেসব নীতি-নৈতিকতা দিয়ে মানুষকে শাসনের কাজটা চালানো হয়, তা অপর্যাপ্ত মনে হতে থাকে। পুরনো সমাজ-রাষ্ট্রে যা ন্যায্য মনে হতো, তার অন্যায্যতা ফুটে উঠতে থাকে। অতীতের সাবেকী যত নীতিনৈতিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হয়ে ওঠে নৈতিক।
নতুন চিন্তাধারা ও পুরনো প্রথাগুলোর মধ্যে এই দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সমাজের প্রতিটা স্তরে। সম্ভাব্য প্রতিটি ক্ষেত্রে। এমনকি পরিবারেও। ছেলে বাবার বিরুদ্ধাচরণ করে। বাবা যে ব্যাপারগুলো সারা জীবন ধরে স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করে এসেছে, ছেলে সেগুলোর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে শুরু করে। মা তাঁর সারাজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যে নীতি-নৈতিকতা আঁকড়ে চলেছেন, মেয়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
প্রাত্যহিকভাবে, পুরনো সমাজের সুবিধাপ্রাপ্তদের আকাম-কুকাম আর কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে জেগে ওঠে জনগণের বিবেক। আওয়াজ উঠতে থাকে শক্তিমানের আইন আর উপরি সুবিধার নামে সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে।
আর্টওয়ার্ক: দ্য ইনসারেকশন শিল্পী: অনারে দ্যুমিয়ে সূত্র: ফেসবুক
যারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের উত্থানের অপেক্ষা করছেন, যারা নতুন চিন্তাভাবনাগুলো বাস্তবে চর্চা করতে চান, তারা শিগগিরই টের পেতে শুরু করেন যে, তাদের উদার, মানবিক ও উজ্জীবিত চিন্তাভাবনাগুলো প্রচলিত সমাজে ঠাঁই পাবে না। ফলে তারা একটা আমূল বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেন। যার মাধ্যমে ধুয়ে যাবে পুরনো সমাজের সব পচন। অলস প্রাণে আবার শোনা যাবে নতুন শ্বাস-প্রশ্বাসের স্পন্দন। মানবজাতির কাছে বয়ে আনবে ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের চেতনা; যা ছাড়া সমাজ ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
সংকটের কালপর্বে ঘনীভূত হতে থাকে জরাজীর্ণতার আশঙ্কা। বড় শিল্পের আকস্মিক পতন, উৎপাদনের অন্যান্য ক্ষেত্রে স্থবিরতায় রাতারাতি হৃষ্টপুষ্টরা হয়ে পড়ে শীর্ণ। আর তাতে দেখা দেয় সম্পদ দখলের মচ্ছব। ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, উৎপাদন ও বিনিময় নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজকে আর উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারবে না। বরং হতে থাকবে ঠিক এর উল্টোটা। শৃঙ্খলার পরিবর্তে তারা নিয়ে আসবে বিশৃঙ্খলা। উন্নয়নের পরিবর্তে তারা দেবে দারিদ্র ও অনিরাপত্তা। সমাজের সমন্বিত স্বার্থে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে তারা দেবে যুদ্ধ; শাসক-শোষকদের যে চিরস্থায়ী যুদ্ধটা পরিচালিত হবে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে।
মনুষ্য সমাজ ক্রমশ আরও বেশি মাত্রায় বিভক্ত হয়ে যাবে দুইটি শত্রুভাবাপন্ন শিবিরে। আর একই সময়ে অনেক ছোট ছোট গ্রুপেও বিভক্তি দেখা যাবে, যারা একে অপরের বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ শুরু করবে। এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর এগুলো যে দুর্দশা বয়ে আনে, তা দেখতে দেখতে সমাজে তৈরি হয় নতুন সংগঠন তৈরির তাড়না। সমাজে তীব্র আওয়াজ ওঠে উৎপাদন, সম্পদের মালিকানা, বিলি-বণ্টন ও অন্যান্য সকল অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণের সম্পূর্ণ নতুন একটা ব্যবস্থা কায়েমের।
শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়ভার কাঁধে নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র চালানোর দায়িত্বে নিয়োজিত সরকার তখনও নানাবিধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু পদে পদে বিকল হতে থাকে সেই যন্ত্রের কলকব্জা, থেমে যায় গতি। ক্রমাগত কঠিন হতে থাকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা। আর এর ফলে ক্রমেই বাড়তে থাকে অসন্তোষ। প্রতিদিনই উঠতে থাকে নতুন নতুন দাবি দফা। ‘এটা সংস্কার করো’, ‘ওটা সংস্কার করো’- এই রব ওঠে সব দিক থেকে। সংস্কারবাদীরা বলতে শুরু করে, ‘যুদ্ধ, অর্থনীতি, কর, আদালত, পুলিশ, সবকিছুরই পুনর্বিন্যাস, পুনর্গঠন করতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে নতুন ভিত্তিমূল।’ কিন্তু এটাও সবারই জানা যে, মেরামত করে এভাবে কোন কিছুর পুনর্বিন্যাস অসম্ভব। কারণ ডালপালার মতো সব কিছুই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পুরোটা নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে এবং তা একই সঙ্গে। আর সেটা কিভাবে সম্ভব হবে যখন সমাজ প্রকাশ্যে দুটি শত্রুভাবাপন্ন শিবিরে বিভক্ত? অসন্তুষ্ট একটি পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গেলে তৈরি হবে নতুন নতুন অসন্তোষ।
ফলে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয় রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনাকারীরা। কারণ এটা করতে গেলে পথ তৈরি হবে বিপ্লব-বিদ্রোহের। একই সঙ্গে সরকার খুল্লামখুল্লা প্রতিক্রিয়াশীলও হতে পারে না। তারা এমন একটা অবস্থানে গিয়ে পড়ে যেখান থেকে কোনো পক্ষকেই তুষ্ট করা সম্ভব নয়। বরং জন্ম দেয় নতুন নতুন অসন্তোষের।
এইরকম একটা রূপান্তরের কালে মধ্যমপন্থীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের চালকের আসনে বসলে শুধু একটা বিষয়ই চিন্তা করে: আসন্ন ‘বিপর্যয়’১ থেকে নিজেদের রক্ষা করা। সব দিক থেকে আক্রমণে জবুথবু হয়ে তারা শুধু চেষ্টা করে নিজেদের রক্ষার বা পালানোর। একের পর এক ভুল করে রুদ্ধ করে ফেলে বাঁচার সর্বশেষ পথটাও। তাদের কূপমুণ্ডকতায় সরকারের সব প্রতিপত্তি হাস্যকরভাবে ধূলোয় মিশিয়ে যায়।
এমন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের দাবিই হল বিপ্লব। এটা রূপ নেয় সামাজিক প্রয়োজনে। পুরো পরিস্থিতিটা নিজেই হয়ে ওঠে বৈপ্লবিক।
বড় আকারের বিপ্লবী আন্দোলনগুলো কিভাবে দানা বাঁধে আর গড়ে ওঠে, তা জানতে গিয়ে আমরা যখন মহান ইতিহাসবিদদের কাজগুলো দেখি তখন তার কিছু চিত্র পাওয়া যায়। মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা, সাধারণভাবে একটা অনিরাপত্তাবোধ, সরকারের নেওয়া হয়রানিমূলক সব পদক্ষেপ আর ন্যাক্কারজনক সব কেলেঙ্কারির ফলে সমাজে জমতে থাকা ক্লেদ একেবারে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। নতুন নতুন চিন্তাভাবনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সেগুলো সাবেক শাসক ও তার সমর্থকদের বিরোধিতার মুখে পড়ে। এমন ঐতিহাসিক চিত্র পর্যালোচনা করলে মনে হয় যে, বিপ্লবটা তখন সত্যিই ছিল অনিবার্য। আর তার জন্য বিদ্রোহ-অভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না।
উদাহরণ হিসেবে, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের আগমুহূর্তের পরিস্থিতি ইতিহাসবিদরা কিভাবে বর্ণনা করেছেন, তা লক্ষণীয়। আপনি দেখতে পাবেন, কৃষকরা লবণ করের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে। আপত্তি তুলছে অন্যায্য খাজনা, সামন্ত-দেনা ইত্যাদির বিরুদ্ধে। আর বুকের মধ্যে সামন্তপ্রভু২, যাজক, অধিপতি, অধিকারীদের৩ বিরুদ্ধে বয়ে বেড়াচ্ছে অনমনীয় ক্ষোভ-ঘৃণা। নগরের মানুষ বিলাপ করছে তাদের নাগরিক স্বাধীনতা হারানো নিয়ে আর অভিশাপ বর্ষণ করছে রাজার ওপর। নিন্দা-তিরস্কার করছে রানিকে।
মন্ত্রিবর্গের ফরমানের প্রতিবাদে তারা বিদ্রোহ করে। আর তারা উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকে, এত বেশি খাজনা-কর দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে, আর এগুলো গলাকাটার সামিল। ক্ষেতে ফসল ভালো হয়নি, শীত পড়েছে ভয়াবহ। জীবন ধারণের রসদ পাওয়া দুরূহ অথচ অধিপতিদের লালসা এত বেড়েছে যে, গ্রামের আইন-ব্যাপারিরা কৃষকের সমস্ত ফসল গলাধঃকরণ করছে আর গ্রামের শান্ত্রী নিজেই যেন ক্ষুদে রাজা। এমনকি ডাকসেবাও অকার্যকর, কর্মচারিরা একবারেই অকর্মা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোনো কিছুই ছন্দে নেই। সবাই কিছু না কিছু নিয়ে অভিযোগ করছে। ‘এভাবে আর চলতে পারে না, এর একটা বাজে পরিসমাপ্তি ঘটবে’- এমন কথাই সর্বত্র শোনা যায়।
কিন্তু শান্তভাবে এসব কথাবার্তা বলা আর বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের মাঝখানে একটা বিশাল ফারাক বিদ্যমান। মানব ইতিহাসের একটা বড় অংশজুড়ে আদতে যুক্তি ও কর্মের, চিন্তা ও সংকল্পের এই ফারাকটাই হাজির করে কিছু করতে চাওয়ার তাড়না। কিন্তু ফারাক ঘুচিয়ে কিভাবে সংযোগের সেই সেতু নির্মিত হয়? যে মানুষটা গতকালও শান্তশিষ্টভাবে পাইপ খেতে খেতে তার দুর্ভোগ নিয়ে অভিযোগ করছিল আর পরমুহূর্তেই কোনো স্থানীয় বরকন্দাজ বা নিরাপত্তা রক্ষী৪ দেখে অভিবাদন জানাচ্ছিল; সেই মানুষটাই কিভাবে কয়েক দিন পর কাস্তে আর লোহার পাইক নিয়ে রাজার দুর্গ আক্রমণ করতে চলে যায়- যে রাজা কদিন আগেও ছিল দুর্দমনীয়? কোন অলৌকিক শক্তির বলে এই মানুষগুলো রাতারাতি বীরে পরিণত হয়ে গেল? নিজেদের বৌয়ের কাছ থেকে হরহামেশা যারা কাপুরুষ গালি শুনেছেন, রাতারাতি তারা কিভাবে দল বেঁধে বুলেট-কামানের সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে গেলেন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য? কিভাবে তাদের অস্ফূট উচ্চারণ যা এতদিন গীর্জার ঘন্টাধ্বনির মতো মিলিয়ে যেত, এমন বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে গেল?
উত্তরটা সহজ। বহুবিচিত্র সক্রিয়তা। নিরবিচ্ছিন্ন চলতে থাকা কর্মতৎপরতা। একটা ছোট গোষ্ঠীর নিরন্তর কর্মতৎপরতা এই রূপান্তরটা ঘটিয়ে দেয়। শুধু কাপুরুষতা, নতি স্বীকার করা আর ভীতিই ছোঁয়াচে নয়। সাহস, ভালোবাসা, আত্মত্যাগও ছোঁয়াচে।
তো, এই কর্মতৎপরতা কী রূপ নেবে? যেকোন রূপ নিতে পারে। আদতে এটা নির্ধারিত হবে সেই সময়ের পরিস্থিতি, তার উত্তাপ ও উত্তরণের পন্থা ইত্যাদি দ্বারা। কখনো তা ট্র্যাজিক, কখনো রসাত্মক; কিন্তু সবসময়ই অকুতোভয়। আবার কখনো এই তৎপরতাগুলো সামষ্টিক, কখনোবা তা সংঘটিত হয় পুরোপুরি ব্যক্তি প্রচেষ্টায়। কর্ম-তৎপরতার নীতি প্রযুক্ত হয় সম্ভাব্য সব উপায়ে; বাদ পড়ে না জনপরিসরের কোনো অংশ। আর বিদ্রোহকে জীবন্ত-সজীব রাখতে অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ ও প্রচার, শোষকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-ঘৃণা জাগিয়ে তোলা, সরকারের সমালোচনা ও এর দুর্বলতা ফাঁস করে দিতে চলতে থাকে বিপুল কর্মযজ্ঞ। সবচেয়ে বড় কথা, সত্যিকারের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয় সাহস। উজ্জীবিত হয় বিদ্রোহের প্রাণস্পৃহা।
কোনো দেশে যখন একটা বৈপ্লবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন জনসাধারণের মধ্যে বিদ্রোহের চেতনা পুরোপুরি জাগ্রত হওয়ার আগে চোখে পড়ে অল্প-সংখ্যকের নানাবিধ কর্মকাণ্ড-তৎপরতা। আর এর মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয় স্বাধীনতার বোধ। জেগে ওঠে ইস্পাতসম দৃঢ় স্পর্ধা। এছাড়া কোনো বিপ্লবই পরিণতি পায় না। ফলস্বরূপ, জনসাধারণ রাস্তায় নেমে আসে, মিছিল-প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সর্বোপরি বিদ্রোহের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটায়।
সাহসী মানুষেরা শুধু মুখের কথায় তুষ্ট হতে পারেন না। তাই সব সময় নিজেদের সংকল্পকে বৈপ্লবিক কর্মে রূপান্তরের পথ খুঁজতে থাকেন। দৃঢ়চেতা মানুষ, যাঁরা নিজেদের নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ করার চেয়ে কারাদণ্ড, নির্বাসন বা মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেন তারা নির্ভয়। তারা জানেন যে, সফল হতে গেলে সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আর এই মানুষগুলোই অন্য সবার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে দাবি আদায়ের প্রেরণা, বিক্ষোভ-বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের স্পৃহা জেগে ওঠার অনেক আগেই লিপ্ত হন বৈপ্লবিক কর্মে।
নানাবিধ আলাপ-সংলাপ, মতপার্থক্য, তত্ত্ব আলোচনা ইত্যাদির মধ্যেই, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড হাজির হয়ে পড়ে। মূর্ত হয়ে ওঠে প্রবলতম আকাঙ্ক্ষা। তবে শুরুতে এমনও হতে পারে যে, জনসাধারণ কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না। আবার কখনো বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডের সূচনাকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাহসী উদ্যোগকে মনে মনে প্রশংসা করলেও, জনসাধারণ অনুসরণ করবে তাদের, যারা সমাজে পরিচিত বিচক্ষণ ও সতর্ক হিসেবে। আর সেই বিচক্ষণের দলই হয়তো বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডকে আখ্যা দেবে ‘পাগলামো’ হিসেবে। আর বলবে যে, ‘এরা উন্মাদ। এদের উন্মত্ততা সব কিছুকে হুমকির মুখে ফেলছে।’
সেই বিচক্ষণ আর সতর্ক মানুষগুলো বা তাদের দল-পার্টি সব কিছু খুব ভালোমতো হিসেব করবে। তারা সবাইকে বলবে যে, তাদের ধীরগতির কর্মকাণ্ড দিয়ে একশ বছর, দুইশ বছর, অথবা হয়তো তিনশ বছরের মধ্যে তারা পুরো বিশ্বজয় করবে। আর এখন এর মধ্যে এসে পড়েছে কিছু উটকো আগন্তুক! বিচক্ষণ আর সতর্ক গোষ্ঠী যা কখনো চিন্তা করেনি, এমন সব কিছুই তাদের কাছে উটকো, অপ্রত্যাশিত। ইতিহাস সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জ্ঞান আছে আর খোলা মাথায় চিন্তা করতে পারে, এমন যেকোন মানুষ শুরু থেকেই খুব ভালোমতো জানেন যে, বিপ্লবের তত্ত্বগত প্রচার স্বাভাবিকভাবেই নানামুখি তৎপরতায় রূপ নেয়। বিপ্লবের ‘মোক্ষম সময় এসে গেছে’ তাত্ত্বিকদের এমন সিদ্ধান্ত জানানোর অনেক আগে থেকেই সেটা শুরু হয়। তারপরও, সেই সতর্ক তাত্ত্বিকরা এই পাগলাটেদের প্রতি ক্ষুব্ধ হবেন। তাদের সমাজচ্যুত করবেন, তাদের মুণ্ডুপাত করবেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই পাগলাটে মানুষগুলোই সাধারণ মানুষের সহানভূতি পাবেন। জনসাধারণের বড় একটা অংশ গোপনে তাদের সাহসের প্রশংসা করবেন। অনেকেই হয়ে উঠবেন তাদের অনুসরণকারী। পাগলাটে এই মানুষদের অনেকেই জেলখানায় যাবেন, নানা দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অন্যদিকে আরও অনেকে তখন তৈরি হয়ে যাবেন। এভাবেই বেআইনি প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, প্রতিরোধ দিনদিন বাড়তে থাকবে।
এই পর্যায়ে এসে নিরপেক্ষ একটা অবস্থানে দাঁড়ানো হয়ে পড়বে অসম্ভব। শুরুতে যারা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেননি যে, এই ‘পাগলাটে মানুষগুলো’ কী চান, তারাও এদের ব্যাপারে চিন্তা করতে বাধ্য হবেন। তাদের ভাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন। এ থেকে হয় তারা সেই পাগলাটেদের পক্ষে দাঁড়াবেন বা বিপক্ষে। তাদের এই কর্মকাণ্ডগুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তাদের নতুন চিন্তাভাবনাগুলো সাধারণ মানুষের মাথায় ঢুকে পড়তে শুরু করবে। আর অনেকেই তাদের অনুসারী হয়ে উঠবে। এরকম একটা তৎপরতা কয়েকদিনের মধ্যে এমন প্রচার তৈরি করবে, যা হয়তো হাজারটা প্রকাশনা দিয়েও সম্ভব হতো না।
সবচেয়ে বড় কথা, এই কর্মকাণ্ড-তৎপরতাগুলো একটা বিদ্রোহী চেতনার জন্ম দেবে: সাহস উৎপাদন করবে। পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট-নিরাপত্তারক্ষী-সৈনিকদের সমর্থনে থাকা পুরোনো শাসকদের শুরুতে মনে হবে অদম্য। ঠিক যেমনটা মনে হয়েছিল বাস্তিল দুর্গকে। কামানের গোলা দিয়ে ঠাঁসা উঁচু দেয়ালগুলোর বাইরে দাঁড়ানো নিরস্ত্র মানুষের চোখেও শুরুতে এটা ছিল দুর্ভেদ্য। কিন্তু দ্রুতই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাকে যতটা দৃঢ় মনে হয়েছিল, ততটা আসলে নয়। একটা সাহসী কর্মকাণ্ড অল্প কদিনে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ভীত কাঁপিয়ে দেয়, অতিকায় মূর্তি নড়বড়ে করে দেয়; তো আরেকটি বিদ্রোহ পুরো প্রদেশ টালমাটাল করে তোলে। আর সবসময়ই খুব জরবদস্ত মনে হওয়া সেনাবাহিনী পিছু হটে অল্প কিছু কৃষকের হাতে লাঠি আর পাথর দেখে। মানুষ অবাক হয়ে দেখে যে, রাষ্ট্র-সরকারের দৈত্যটা আসলে ততটা ভয়ঙ্কর কিছু নয়, যেমনটা তারা মনে করেছিল। তারা অসচেতনভাবেই এটা মানতে শুরু করে যে, অল্প কিছু তেজী কর্মকাণ্ডই দানবটাকে মাটিতে নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। তাদের মনে আশার জন্ম নেয়। আমাদের স্মরণ করা উচিত যে, ক্রোধ মানুষকে বিদ্রোহের দিকে তাড়িত করে। আশা থেকেই আসে জয়ের আকাঙ্ক্ষা, যা জন্ম দেয় বিপ্লবের।
সরকার তীব্রভাবে এই বিপ্লবের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করে। বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বর্বর আচরণ করতে থাকে। অন্য সময় দমন-পীড়নের মাধ্যমে এসব ঠাণ্ডা করে দিতে পারলেও, বিপ্লবের উত্তাপ-উত্তেজনায় এখন তৈরি হয় ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। এসব নিপীড়ন উল্টো তৈরি করে নতুন নতুন বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড। সেটা হতে পারে ব্যক্তিক বা সামষ্টিক। এসব তৎপরতা বিদ্রোহীদের নিয়ে যায় নায়কোচিত সব কর্মকাণ্ডের দিকে। আর খুব দ্রুততার সঙ্গে এসব তৎপরতা প্রচারিত হতে থাকে। আলোচনা তৈরি করে জনপরিসরে। বিপ্লবী রাজনৈতিক দলগুলোও এসব তৎপরতায় আরও সংহত হতে থাকে। যদিও তারা শুরুতে ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করেনি বা কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বিরোধিতাও করেছে।
সাধারণ বিভেদ তৈরি হতে থাকে সরকার, শাসক শ্রেণী ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর মধ্যেও। কেউ কেউ বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেয়। কেউ কেউ আবার কিছুটা ছাড় দেওয়ার পক্ষে। কেউ কেউ আবার এগিয়ে যায় আরও বেশ খানিকটা। বিদ্রোহের চেতনাকে তুষ্ট করতে গিয়ে অনেকেই ঘোষণা দেয় সুযোগ-সুবিধা পরিত্যাগের যাতে ভবিষ্যতে আবার শাসন করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভেঙে যায় সরকার ও সুবিধাভোগী শ্রেণীর চিরায়ত ঐক্য।
কোনো ক্ষেত্রে বর্বর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শাসক শ্রেণী আবারও সুরক্ষিত হতে চায়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। লড়াইটা হয়ে ওঠে আরও তীব্র, আরও নির্মম। আর আসন্ন বিপ্লবটা হয়ে ওঠে আরও রক্তক্ষয়ী। অন্যদিকে, শাসক শ্রেণী যে কিছু পরিমাণ ছাড় দেয়, তাতে বিদ্রোহের স্পৃহা আরো বেশি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বিপ্লবের আগুন আরও বেশি করে জ্বলে ওঠে। সাধারণ মানুষ কিছুদিন আগেও হয়তো এসব ছিটেফোটা দক্ষিণা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু বিপ্লবের মুহূর্তে তারা লক্ষ্য করে যে, তাদের শত্রু শাসক শ্রেণীর অবস্থা টালমাটাল। বিজয় আসন্ন। তাদের সাহস বাড়তে থাকে। যে মানুষটা কিছুদিন আগেও নিজের দৈন্যদশার কথা ভেবে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলত, সেই মানুষটিই এখন মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে মিছিলে সামিল হয়। জয় করতে যায় নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ।
শেষপর্যন্ত বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। পূর্ববর্তী সংগ্রামটা যত তিক্ত হয়, বিপ্লবের চেহারাও ততটা ভয়ানক রূপ ধারণ করে।
বিপ্লব-বিদ্রোহ কোন পথে হাঁটবে, তা নির্ভর করে বেশ কিছু পরিস্থিতির ওপর। নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দেয় বিপ্লবের প্লাবনটা কেমন রূপ ধারণ করবে। তবে প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রগতিশীল শক্তি কী ধরনের তেজদীপ্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, তা বিচার করে আগে থেকেই কিছু অনুমান দাঁড় করানো যায়।
কোনো পার্টি হয়তো সমাজবদলের তত্ত্ব খুব ভালোভাবে তৈয়ার করেছে। যা অর্জন করতে চায়, সে সংক্রান্ত বিস্তারিত পরিকল্পনাও হাজির করেছে। ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে নিজেদের কথাবার্তা। বক্তৃতার মাধ্যমে, বই-প্রকাশনার মাধ্যমে। কিন্তু এই পার্টি হয়তো রাস্তায়, জনপরিসরে নিজেদের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটাতে পারেনি পর্যাপ্তভাবে। যে কর্মকাণ্ডগুলোর মধ্য দিয়ে তাদের চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটার কথা, সেরকম কর্মকাণ্ড তারা পরিচালনা করতে পারেনি। তাহলে বলতে হয়, সেই পার্টি খুবই অল্প কাজই করেছে। অথবা মূল শত্রুর বিরুদ্ধে তারা হয়তো কিছুই করেনি। যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা ধ্বংস করতে চায়, সেগুলোকে তারা আক্রমণ করেনি। তাহলে বুঝতে হবে, এই পার্টির শক্তি শুধু তত্ত্বে, কাজে না। বিদ্রোহের চেতনা জাগ্রত করার জন্য তাদের অবদান খুব সামান্যই। অথবা বিপ্লবের সময় নিপীড়ক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রয়োজনীয়তাকে তারা অগ্রাহ্য করেছে। ফলস্বরূপ, দেখা যায়, এই পার্টি থেকে গেছে অনেকটাই অপরিচিত শক্তি হিসেবে। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়নি প্রাত্যহিক নানা তৎপরতা-কর্মকাণ্ডের মধ্যে। তারা সক্রিয় হলে তাদের তৎপরতার খবর পৌঁছে যেত দূরদূরান্তে। তারা গণমানুষের চেতনায় জায়গা করে নিতে পারেনি বা পারলেও সেটার পরিমাণ খুবই নগণ্য। বৈপ্লবিক পরিস্থিতিতে রাজপথে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে তাই সেই পার্টি নিজেদের মেলাতে পারে না। জনপ্রিয় শ্লোগানগুলোতে তারা নিজেদের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে না।
এমন পার্টির সবচেয়ে সক্রিয় লেখককে তাঁর পাঠকরা চিনতে পারেন উচ্চ মেধাসম্পন্ন চিন্তাবিদ হিসেবে। কিন্তু সক্রিয় কর্মতৎপরতার সঙ্গে জড়িত হওয়ার মতো পরিচিতি বা সক্ষমতা তাঁর নেই। আর যেদিন রাস্তায় বিক্ষুব্ধ মানুষের ঢল নামবে, সেদিন জনতা তাদের কথা-পরামর্শই অনুসরণ করবে, যাদের তারা দেখেছে নানাবিধ তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে। যারা হয়তো তাত্ত্বিকভাবে অতো পোক্ত বা নির্ভুল না। কিন্তু গণমানুষ তাদের চেনে অনেক ভালোভাবে। কারণ বিভিন্ন সময়ে জনসাধারণ তাদের দেখেছে নানাবিধ কর্মকাণ্ড-তৎপরতায় সামিল হতে।
বিপ্লবের আগে যে পার্টি সবচেয়ে বেশি বিপ্লবী প্রচার চালিয়েছে আর বিদ্রোহের স্পৃহা ও সাহস দেখিয়েছে, বিপ্লবের উত্তাল সময়ে গণমানুষ তাদের দিকেই বেশি ঝুঁকবে। বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে তাদের পাশেই রাজপথে হাঁটবে। কিন্তু যে পার্টি বিপ্লবের আগে নানাবিধ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের সাহসী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না, ব্যক্তিমানুষ বা গোষ্ঠীকে বিপ্লবী চেতনায় অনুপ্রাণিত করার মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, নিজেদের চিন্তাভাবনাকে কর্মে রূপান্তরিত করার অদম্য ইচ্ছা যাদের মধ্যে দেখা যায় না (এই ইচ্ছাটা যদি তাদের থাকত, তাহলে নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ দেখা যেত। সাধারণ মানুষ বিদ্রোহে সামিল হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেগুলো দেখা যেত), যারা জানে না কিভাবে নিজেদের প্রতীক-পতাকা জনপ্রিয় করে তুলতে হয়, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব বিস্তৃতি ঘটাতে হয়, সেই পার্টি নিজের কর্মসূচির ক্ষুদ্র একটা অংশও বাস্তবায়ন করতে পারে না। বিপ্লবী পরিস্থিতিতে তাদেরকে একপাশে সরে যেতে হয়। আর প্রধান জায়গা দখল করে ক্রমাগত নানাবিধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া সক্রিয় পার্টিগুলো।
বিগত সময়ের সব বড় বড় বিপ্লবের ইতিহাস থেকে আমরা এই জিনিসগুলোই শিখতে পারি। [ফরাসি বিপ্লবে] বিপ্লবী বুর্জোয়ারা এটা খুব ভালোভাবে বুঝেছিল। তারা যখন রাজতন্ত্রের কর্তৃত্ব ধুলিসাৎ করার লক্ষ্যে জনসাধারণের মধ্যে বিদ্রোহী চেতনা জাগিয়ে তুলতে চেয়েছে, তখন বিক্ষোভ-বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার কোনো উপায়ই অগ্রাহ্য করেনি। অষ্টাদশ শতকের ফরাসি কৃষকরা এটা নিজেদের প্রবৃত্তি দিয়েই বুঝতে পেরেছিল যে, সামন্ততান্ত্রিক অধিকারের বিলুপ্তি ঘটানো কতটা জরুরি। আর অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল একই রকম নীতি-আদর্শ নিয়ে কাজ করেছিল শহরের শ্রমিকদের মাঝে। চেষ্টা করেছিল তাদের বিদ্রোহী চেতনা জাগিয়ে তুলতে। আর তাদের তাড়িত করেছিল মজুরি-শ্রমিকদের সহজাত শত্রু, উৎপাদনের উপায় ও কাঁচামাল কুক্ষিগত করে রাখা মালিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে।
তথ্যপঞ্জি
১. ফরাসি শব্দ Debacle অর্থ collapse, crash, break-up। বাংলায় ভেঙ্গে পড়া।
২. Feudal baron এর সহজ বাংলা করা হয়েছে সামন্ত প্রভু। মধ্যযুগে ইউরোপে রাজা কর্তৃক দেয়া উপাধি এবং ভূমি-বন্দোবস্তপ্রাপ্ত। ব্যারনরা বংশানুক্রমিকভাবে জমির মালিকানা পেতেন। এর চল শুরু হয় ইংল্যান্ডে। তবে ফ্রান্স, জার্মানি, প্রুশিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডসহ নানা জায়গায় তা পরবর্তীতে ব্যপ্ত হয়। ব্যারনরা রাজার প্রতিনিধি হিসেবে শাসন করতেন এবং কর আরোপ ও সংগ্রহ করতেন।
৩. Bailiff– এর সহজ বাংলা করা হয়েছে অধিকারী। মধ্যযুগে ইউরোপে প্রশাসনিক ও বিচারিক ফরমান তামিলকারী কর্তৃপক্ষ।
৪. Gendarme– এর সহজ বাংলা করা হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষী। মধ্যযুগে ইউরোপে দৈনন্দিন আইন-শৃঙ্খলা দেখভালে সামরিক বাহিনী থেকে লোক এনে তৈরি করা এলিট ফোর্স।
মূলত সিস্টেম ও সিস্টেমের ডিজাইনারদের দায়িত্ব মানুষকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা। এটা মানুষের দায়িত্ব না যে, সিস্টেমের ইচ্ছেমতন এর স্বেচ্ছাচারী, অর্থহীন নির্দেশনা মানুষ মেনে চলবে।
—ডন নরম্যান, দ্যা ডিজাইন অব এভরিডে থিংস
ভিক্টিম ব্লেইমিং— বহুল প্রচলিত একটি টার্ম। কোনো অপরাধ বা নিপীড়নমূলক ঘটনায় সেটির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত তথা ভিক্টিমকেই দোষ ও দায় দেওয়াকে ভিক্টিম ব্লেইমিং বলে। ভিক্টিম ব্লেইমিং এর একটি অন্যতম প্রচলিত উদাহরণ হলো: কোনো নারীর প্রতি সেক্সুয়াল, ডামেস্টিক বা অন্য কোনো ধরনের ভায়োলেন্স ঘটলে সেই ভিকটিম নারীটিকেই দোষ দেওয়া হয়। বলা হয়, নারীটিই দায়ী এবং ভিক্টিম নিজে তার দুর্দশাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমরা সাধারণত এই টার্মটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের নানা ঘটনায় ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়কে ছাড়িয়ে এটির খুবই শক্ত প্রয়োগ দেখা যায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। রাষ্ট্র ও সরকারের নানা প্রকার দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার জন্য দোষারোপ করা হয় জনতাকে। যাকে ‘স্টেট স্পনসর্ড ভিক্টিম ব্লেইমিং’ বলা যায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে এটির সর্বোচ্চ চর্চা করে যাচ্ছে। এই করোনা মহামারীর সময়েও আলাদা কিছু হচ্ছে না। এই লেখাটিতে করোনার সময়কার কয়েকটি ঘটনা ও সাধারণ সময়ের কয়েকটি ভিক্টিম ব্লেইমিং সম্পর্কিত ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
কোনো ভুল কিছু ঘটলেই তাতে ব্যক্তির দোষ মনে করার ধারণাটা সমাজে বেশ গভীরে গেঁথে আছে। এই কারণেই আমরা অন্যদেরকে এমনকি নিজেদেরকেও দোষারোপ করি। দূর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষকে দোষারোপ করার এই ধারণা আমাদের আইনি ব্যবস্থাতেই বিদ্যমান। যখনই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তখন কোট-কাচারি করে এই দোষারপের আইনিযজ্ঞ শুরু হয়। আর সবসময়ই আরও নানা উপায়ে এই দোষারোপের বলি করা হয় ‘হিউম্যান এরর’কে। জড়িত ব্যক্তিকে জরিমানা, শাস্তি, বরখাস্ত ইত্যাদির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিংবা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে রিভাইজ করা হয়। আইন যেমন ছিলো, তেমনই তার মতন থাকে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতায় বলে, হিউম্যান এরর আসলে খারাপ ডিজাইনের একটা ফল। একে আসলে ‘সিস্টেম এরর’ বলে ডাকা উচিত। মানুষ অবিরাম ভুল করে যাবে– এটাই আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। সিস্টেম ডিজাইনের এই ব্যাপারটা আমলে নেওয়া উচিত। ব্যক্তিকে দোষারোপ করা হয়তো একটা আরামদায়ক প্রক্রিয়া, কিন্তু সিস্টেমটা কেন এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে একজন ব্যক্তির একটা সিঙ্গেল কাজের ফলে পুরো সিস্টেমে বিপর্যয় ঘটবে? মূল অন্তর্নিহিত সমস্যা সমাধান না করে ব্যক্তিকে দোষারোপ করা আরও খারাপ একটা কাজ, এতে সমস্যার সমাধান হয় না। সেই একই ভুল, একই ত্রুটি আরেকজন ব্যক্তির মাধ্যমেই রিপিট হতে থাকে।
—ডন নরম্যান, দ্যা ডিজাইন অব এভরিডে থিংস
বিভিন্ন সমস্যায় জনতাকে দোষারোপ করার ব্যাপারটিকে স্টেট স্পন্সর্ড ভিক্টিম ব্লেইমিং বলার কারণ এটি সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। যার সাথে বিভিন্ন কর্পোরেট ও এনজিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম জড়িত থাকে। এতে এমনকি সরকারের সাথে সম্পর্কিত কিংবা এই চিন্তা-ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত বুদ্ধিজীবী, এক্টিভিস্ট কিংবা অন্য পরিচয়ের মানুষও জড়িত থাকে। নয়া-উদারবাদ, বিজ্ঞানবাদ, সংস্কৃতিবাদ, দেশপ্রেম, মানবতাবাদ, পলিটিক্যাল কারেক্টনেস, মেধাতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে আস্থা এনে এই গোষ্ঠী জনতার বাকিদেরকে হেয় গণ্য করে ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক (hierarchical) নিপীড়নের বয়ান প্রচার করে। অদ্ভুতভাবে, তারা এই গোষ্ঠীগুলো নিজেদেরকে জনতার থেকে আলাদা বা বাইরের মনে করে। বাকি জনতার মঙ্গল তারা নিজেরাই ঠিক করতে চায়। কেবলমাত্র নিজেদের আর্থ-সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং নয়া-উদারতাবাদী কিছু বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তারা অযৌক্তিকভাবে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা ছাড়াই বাকি জনতার কী করা উচিত, কী করতে হবে এই জাতীয় আলাপ দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় নানা প্রচারণা ও এস্টাবলিশমেন্টের ফলে প্রিভিলেজড এই গোষ্ঠীর মধ্যে বিভ্রান্তির জন্ম নেয়, আবার অনেকে কার্যতই সরকারের হয়ে কাজ করে। এছাড়া কোনো ঘটনায় শাসকের সিস্টেমের দিকে আঙুল তোলার চেয়ে জনতাকে দোষ দেওয়া নিরাপদ ও নিজের মোরাল হায়ারার্কি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনতার একটা অংশ নিজেরাও নিজেদেরকে দোষারোপ করে। আবার, দীর্ঘ নিপীড়নের ফলে হতাশ জনতা একসময় মনে করে এসব দুর্দশা নিপীড়িতের নিজের কারণেই হয়েছে।
প্রথমত, সচেতনতা, দেশপ্রেম, উদারতা, সুশিক্ষা, নাগরিক দায়িত্ব ইত্যাদি শব্দের আবরণে এক মিথ্যে নৈতিকতার আবরণ তৈরি হয়। আর দ্বিতীয়ত, শাসনব্যবস্থায় প্রশ্ন তুললে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে নানাপ্রকার আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্ত, একই ক্ষেত্রে জনতার, নাগরিকদের দোষারোপ করে কোনো আলাপ আলোচনা দাঁড় করালে বরঞ্চ সরকারি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে প্রশংসাও পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় এই ভিক্টিম ব্লেইমিং এর অন্যতম প্রধান ভয়ঙ্কর দিক মূলত এটিই যে, এতে করে খোদ রাষ্ট্রের নাগরিকই তার সহ-নাগরিকের বিরুদ্ধে ও তার নিজের বিরুদ্ধে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো শুরু করে। নিজের অধিকারকে নিজেই বিভিন্ন কর্পোরেট গোষ্ঠী, সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে বন্ধক দিয়ে রাখে। এভাবে জনতাকে দোষারোপের ফলে রাষ্ট্র সমগ্র জনতাকেই আরও বেশি নিপীড়নের আওতায় আনার সম্মতি লাভ করে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যত স্বৈরতন্ত্র বিদ্যমান। আওয়ামীলীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদি এই স্বৈরতন্ত্রে উন্নয়ন, জিডিপি ইত্যাদি নানা সমৃদ্ধির গপ্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র তার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেহারাটিও হারিয়ে ফেলেছে এই সরকারের আমলে। যেহেতু রাষ্ট্র ও সরকার দুটোই অগণতান্ত্রিক, তাই জনতাকেই সবসময় নিপীড়িত হতে হয়। জনতার প্রতি সবসময়ই চলতে থাকে নানাবিধ নির্যাতন। আর সেই নির্যাতনের বৈধতা দিতেও ন্যারেটিভের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাষ্ট্র বাকিদের মুখ বন্ধ করার ও মগজ ধোলাইয়ের পাঁয়তারায় থাকে সবসময়। এই জুলুমের সম্মতি উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলো পাবলিক ভিক্টিম ব্লেইমিং। বিগত কয়েকটি জাতীয় দুর্যোগ, নাগরিক দুর্যোগ, নিরাপত্তা সংকট ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকার ও বিভিন্ন কর্পোরেট এজেন্সির নানাপ্রকার প্রচার-প্রচারণা ও ন্যারেটিভের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হবে।
২০১৮ সালের অন্যতম আলোচিত আন্দোলনের নাম নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে সারা দেশের স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথ দখল করে নেয়। তাদের অনেকেই রাস্তার দখল নিয়ে দেখিয়ে দেয় যে চাইলেই অনেক কিছু জনতা ঠিক করতে পারে। এমনকি তারা রাষ্ট্র মেরামতের দাবিও তোলেন। ক্ষমতাসীনদের বেকায়দায় ফেলে দেয়া এই আন্দোলনকে অবশেষে পুলিশ ও নিজ দলের গুণ্ডাদের হামলার মাধ্যমে দমন করা হয়। এই সরকারি হামলাকে বৈধতা দিতে ও আড়াল করতে পরবর্তীতে শুরু হয় রাষ্ট্র প্রণোদিত ভিক্টিম ব্লেইমিং প্রকল্প। বলা হতে থাকে, নাগরিকরা নিজেরাই রাস্তা ঠিক করে পার হয় না, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে না, তাই তাদের নিরাপদ সড়ক চাইবার অধিকার নাই। সড়কের অব্যবস্থাপনা ঠিক না করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তারা। ‘সচেতনতা’ সৃষ্টির নামে এই ভিক্টিম ব্লেইমিং-এ দেশের বিভিন্ন সেলেব্রেটি ও কর্পোরেট এজেন্সিও যোগ দেয়। সবচেয়ে বেশি দোষ দেওয়া হয় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করাকে। একইসাথে যেখানে সেখানে ফুট ওভার ব্রিজ তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ফুটওভারব্রিজ প্রীতির অন্যতম কারণ এতে অনেক টাকার বাজেট থাকায়, দুর্নীতিরও অনেক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আদতে দেশের নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটওভার ব্রিজ একটি অপ্রয়োজনীয় কাঠামো। যা যেকোনো শহরের জন্য ক্ষতিকর। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রচণ্ড অমানবিক। সিগন্যাল ব্যবস্থা ঠিক না করে, জেব্রা ক্রসিং ঠিক না করে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুস্থ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত না করে, রাস্তাঘাট সংস্কার না করে তারা কেবল দোষারোপ আর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। যার সবই অকার্যকর আর নিপীড়নমূলক।
এরপর ধরা যাক, জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় জলাবদ্ধতা প্রচণ্ড আকার নেয়। আর এই সময়ে সরকার নিজেদের বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা সংস্কার করার বদলে জনগণকে প্রশ্ন করে যে তারা কেন ড্রেনে ময়লা ফেলে। অথচ তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান বা ব্যবস্থাও সরকার তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি আড়াল করে এই সত্য যে, একটি কার্যকর ড্রেনেজ সিস্টেম থাকলে, কোন ময়লাই জমার কথা না। সবই অতিরিক্ত জলে ধুয়ে-ভেসে যাবার কথা। কিন্ত ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ যে বিভিন্ন জলাশয়ের অবৈধ দখলদারিত্ব এই সত্য আড়াল করা হয়। সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাও আলোচনায় আসে না।
একইরকমভাবে নগরের অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করার বদলে দোষারোপের মাধ্যমে জনতার প্রতি আরও নিপীড়ন নিশ্চিত করার কাজটি সরকার প্রত্যেক ঘটনাতেই করে যাচ্ছে। এমনকি ডেংগু মশার উৎপাতের সময়ও। আর টেলিভিশন, পত্রিকায় প্রতিনিয়ত সুনাগরিক হতে, আইন মেনে চলতে বলা হচ্ছে ‘সচেতনতা’ তৈরির নামে। টিভি নিউজ রিপোর্টে রাস্তায় র্যান্ডম মানুষজনকে ধরে হেনস্তা করা হয়। কিন্তু, মূল সিস্টেমের দিকে নজর নেই। সিস্টেমই যে মানুষকে ভুল কাজ করতে বাধ্য করে, মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে সেই প্রশ্ন তোলার খবর নেই। বরঞ্চ, ভিক্টিম নাগরিককেই বারবার বলা হয় তারা নিজেরাই দোষী। এই প্রক্রিয়াটি এতই ক্রিয়াশীল যে, খোদ নিপীড়িত নাগরিকের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়ে পড়ে। আর তারা তাদের সহ-নাগরিকদের প্রতি নানা প্রকার বিদ্বেষ চর্চা করতে থাকে।
আমরা যদি খেয়াল করি, তবে লক্ষ্য করবো যে, করোনা মহামারির শুরু থেকেই সরকার ব্যর্থতা ঢাকতে ও অন্যায়ের ন্যায্যতা পেতে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। গণমানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার বরাবরই আঙুল তোলে গণমানুষের দিকে। করোনা সংকটেও তার আলাদা কিছু ঘটেনি, একেবারে শুরু থেকে লক্ষ্য করা যাক।
প্রথম টার্গেট: ইতালি ফেরত শ্রমজীবী প্রবাসীগণ
করোনা সংকটের অব্যবস্থাপনা লুকাতে সর্বপ্রথম যাদের উপর দোষারোপ করে যাদেরকে ‘জাতীয় শত্রু’ হিশেবে উপস্থাপন করা হয় তারা হলেন গত বছরের ১৪ই মার্চ ইতালি থেকে আসা ১৪২ জন প্রবাসী। বিদেশ থেকে আসা লোকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে না পারার ব্যর্থতাকে রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা মেকানিজম এই প্রবাসী মানুষদেরকে দোষারোপের মাধ্যমে লুকাতে অনেকটাই সক্ষম হয়। মার্চের মধ্যখানে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের ভাইরাল স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সবাই জানতে পারে দেশে একসাথে বিপুল পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশী প্রবেশ করছে। ইতালিতে ততদিনে করোনার অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তাই স্বভাবতই বাংলাদেশে থাকা নাগরিকদের মনে আশঙ্কার জন্ম হয়েছিলো। সরকারের উচিত ছিলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সকলের স্বাস্থ্য বিষয়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেখা গেলো তাড়াহুড়া করে ইতালি থেকে আসা প্রবাসীদেরকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদেরকে ঠিকমতন খেতে দেওয়া হয়নি, স্বাস্থ্যসেবার মান অতি নিম্ন ছিলো, বাচ্চাদের জন্যও অসুবিধার পরিবেশ ছিলো, কোয়ারেন্টিন সেন্টারের মান অত্যন্ত বাজে। তারপরই সেখানে এসব নানা প্রকার বাজে ব্যবস্থাপনার ফলে প্রবাসীরা বিক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই বিক্ষোভকে আমলে নেওয়ার বদলে সরকার তাদেরকেই দোষ দেওয়া শুরু করে। তাদের বিক্ষোভের একটি ভিডিওকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। প্রথমেই শুরু হয়, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলা। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারপন্থী একটিভিস্টরা প্রশ্ন তোলে, এই ইতালি প্রবাসী নাগরিকরা যথেষ্ট দেশপ্রেমিক নন। কেননা তারা এই জাতীয় দুর্যোগের সময় দেশে এসে বাকিদের বিপদে ফেলতেন না, যদি তারা যথেষ্ট দেশপ্রেমিক হতেন। এই ধরনের বক্তব্য পরবর্তীতে পুরো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসীদের নিয়ে প্রচুর ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক ন্যারেটিভ দেখা যায়। কিন্তু, এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা যে, দূর্যোগের সময় নিজ ভূমিতে, নিজ পরিবারের সাথে থাকতে চাওয়া। ইতালিতে যেখানে মহামারি অবস্থা বাংলাদেশের থেকেও বাজে ছিলো, সেখানে প্রবাসীরা কী করে টিকে থাকবে? সকলের কি একই ধরনের প্রিভিলেজ ও আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে? এছাড়াও রাষ্ট্রের কি দায়িত্ব না তার নাগরিককে রক্ষা করা? যেই রাষ্ট্রকে তারা ট্যাক্স, ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে রেখেছে নিজেদের কল্যাণের জন্য, সেই রাষ্ট্র যদি দুর্যোগের সময় পাশে না দাঁড়ায় তাহলে কি ক্ষোভ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক নয়? একটা লোক বেকার, তার দেশে স্বজনদের কাছে ফিরবে। এটাই তো বড় কারণ। কেউ বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠাবে আর বিপদগ্রস্ত হলে দেশে ফিরতে পারবে না, ঐ দেশে বেকার হয়ে মরবে– এটা তো তাকে বেনাগরিক করে মারার মতো। সরকারের যেখানে উচিত ছিলো তাদের জন্য উপযুক্ত কোয়ারেন্টিন সেন্টারের ব্যবস্থা করা, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “প্রবাসীরা দেশে এলেই নবাবজাদা হয়ে যান। তারা কোয়ারেনটাইনে যাওয়ার বিষয়ে খুব অসন্তুষ্ট হন। ফাইভ স্টার হোটেল না হলে তারা অপছন্দ করেন।” যা অত্যন্ত আপত্তিকর। রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রতি নূন্যতম দায়িত্ববোধ নেই, সম্মান নেই এরকম একজন লোককে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীরা কোনো ফাইভ স্টার হোটেল চাননি, তারা একটি সুব্যবস্থাপনার সম্মানজনক কোয়ারেন্টিন সেন্টার চেয়েছিলেন। কিন্তু পুরো ঘটনায় খোদ ভিক্টিমকেই যাবতীয় অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
এই ইতালি প্রবাসীদের ভিক্টিম ব্লেইমিং এর পরের ধাপ, ইতালি থেকে আসা বাংলাদেশি নাগরিকদের শ্রেণি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্বভাব ইত্যাদি নিয়ে শ্রেণি-বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, সরকারপন্থি অনেকেই ইতালি থেকে আসা প্রবাসীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাদের শ্রমিক পরিচয় ইত্যাদির কারণে তাদের সবার স্বভাব-চরিত্র খারাপ বলে পোস্ট দিয়েছেন। সাধারণত সবসময়ই এই ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার জন্য কিছু মিথ্যা তথ্যের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য হিসেবে দেখা যায় এর আগে উহান থেকে আসা প্রবাসীদের কথা। বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয় যে, উহানের লোকজন অধিকাংশই শিক্ষাকাজে উহানে যাওয়ায়, শিক্ষিত হওয়ায় উহান থেকে এসে তারা নাকি কোনো অভিযোগ করেননি। তারা সরকারের সব আদেশ মেনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ঐ একই হ্বজ ক্যাম্পে ১৪দিন কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। এই তুলনা দেখিয়ে দাবি করা হয়, ইতালির শ্রমজীবী প্রবাসীরা অশিক্ষিত ও মূর্খ, তাই তারা কোয়ারেন্টিন মানেনি। এভাবে তাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের ন্যায্যতা আদায় করা হয়, আর এর দোষ তাদেরকেই দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র আসলে কী? উহানের লোকজন কি সত্যিই বিনা অভিযোগে সরকারের সব বিধি মেনে চলেছিলেন? গতবছর ২ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হওয়া বিবিসি বাংলার নিউজে দেখা যায় উল্টো চিত্র। “একই রুমের মধ্যে আমরা গ্যাদারিং করে পড়ে আছি। আমাদের রুমেই ৪০ থেকে ৫০ জন হব। এই রুমেই আছে ৮টা পরিবার। এদের মধ্যে বাচ্চারাও আছে। আবার ব্যাচেলরও আছে”, চীন থেকে এসে হজ ক্যাম্পে থাকা দুই সন্তানের মা ফারজানা ইসলাম জানান। পিএইচডি করতে চিনে যাওয়া শামীমা সুলতানা জানান, “কোয়ারেন্টাইন বলতে যা বোঝায় সেটা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন রাখা। তো সেটাতো এখানে দেখছি না। কালকে থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখলাম তাতে আমার মনে হচ্ছে যে অব্যবস্থাপনার একটা বিষয় আছে। কাল থেকে যে খাবারগুলো আসছে সে খাবারগুলোর প্যাকেটও এখনো পড়ে আছে। রুম থেকে বের করে মশা মারার জন্য ধোঁয়া দিয়েছিল। এটাও আমরা আসার আগে করলে ভাল হতো।” এছাড়া ২০২০-এ ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে দ্য বাংলাদেশ টুডে পত্রিকায় “আশকোনা ক্যাম্পে নানান অব্যবস্থাপনার অভিযোগ চীন ফেরত শিক্ষার্থীদের!” শিরোনামে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, উহান থেকে আসা অনেকেই দাবি করেছেন তাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়নি। এমনকি তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীরাও যায়নি। এই একই হজক্যাম্পেই ইতালি থেকে আসা প্রবাসীদের রাখা হয়েছে। যা অত্যন্ত বাজে অবস্থার একটি কোয়ারেন্টিন সেন্টার। সেখানে বরঞ্চ সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেশি ছিলো। অথচ একটি ভুল ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইতালি থেকে আসা প্রবাসীদের উপর শ্রেণিবিদ্বেষী আক্রমণ করা হয়।
ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন
করোনাভাইরাস একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক দুর্যোগ। তাই এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সবার সামনে থেকে কাজ করতে হচ্ছে ডাক্তার, নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদেরকে। কিন্ত, এরকম একটি জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় কেবল ব্যক্তিগতভাবে খেটে গেলেই হয় না। একটি উন্নত, জনবান্ধব নীতি নির্ধারণী ও নির্বাহী কাঠামো প্রয়োজন। কিন্ত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দুর্নীতি, লুটপাট, নিপীড়ন, উন্নয়নের মিথ্যা প্রপাগান্ডা, কর্তৃত্বের প্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তাই এই জাতীয় সংকটকালে একটি একেবারেই ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বরূপ চূড়ান্ত রকমে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এটি আড়াল করতেও নিজেদের ক্ষমতাকে বাঁচাতে নতুন বলি হিসেবে খোদ চিকিৎসা কর্মীদেরকেই বেছে নেওয়া হয়।
করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে, ২০২০ সালের ১৪ই মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) নাজমা আমিন নামের এক তরুণীর মৃত্যু হয়। কারণ হিসেবে দেখা যায়, করোনা সন্দেহে চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দিতে অবহেলা করে। এরকম আরও বেশ কিছু ঘটনার পর ডাক্তারদের প্রতি আক্রমণ শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে অনলাইন ও অফলাইনে বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তারবিরোধী ন্যারেটিভ প্রচার হয়। চিকিৎসায় অবহেলা মোটেই কাম্য নয়। কিন্ত একজন ডাক্তারের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলে তিনি কী করে চিকিৎসা করবেন সেটাও জরুরী সমস্যা। ডাক্তারদের অভিযোগ ছিলো তাদের কাছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যেমন পিপিই, মাস্ক বা অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। এমন অবস্থায় করোনার চিকিৎসা করতে গেলে ডাক্তাররাও বিপদে পড়বে। পরবর্তীতে আরও বড় জনগোষ্ঠী ডাক্তারের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে পারে। এমনকি করোনা মহামারীর এক বছরে প্রচুর সংখ্যক ডাক্তার মারাও গিয়েছেন। ঢামেকে সেসময়ই চারজন ডাক্তারকে করোনায় আক্রান্ত হবার ফলে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয়েছিলো। করোনার সময়ে অন্য রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ায় সমস্যাযুক্ত। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণের তুলনায় টেস্টিং অনেক কম হওয়ায় কে করোনা রোগী, কে করোনামুক্ত তা জানা যায় না। ফলে ডাক্তারদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করা স্বাভাবিক। করোনার মতন একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক মহামারিতে পিপিই, মাস্ক, টেস্টিং কিট সরবরাহ করার বিশেষ দায়িত্ব সরকারের ও বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তা না করার ফলেই করোনার সময় ডাক্তাররা সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে পারছেন না। সেবার মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রায় ২০০জন ইন্টার্ন চিকিৎসক নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে কর্মবিরতি ঘোষণা করে। সেসময় তারা দাবি করে এর আগে হওয়া ডেংগু মৌসুমের সংকটে তারা কর্তৃপক্ষকে অব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে জানালেও তাদের নিরাপত্তার নূন্যতম ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। ডেংগুর সময় তারা নৈতিক অবস্থান থেকেই চিকিৎসা কাজ চালিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন মহামারিতে তা সম্ভব না। তাদের এই ক্ষোভ অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্ত সামগ্রিকভাবে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য চিকিৎসা কর্মীদেরকে ‘ভিলেইন’ বানিয়ে উপস্থাপন করা হলো। কেউ কেউ আবার ডাক্তারদেরকে ব্যক্তিগতভাবে পিপিই কিনে সংকট নিরসনের কথা বলেন। কেউ কেউ আমেরিকার গার্বেজ ব্যাগ পরে চিকিৎসা করা নার্সদের উদাহরণ দেখান। কিন্তু, সেই গার্বেজ পরে চিকিৎসা দেওয়া নার্সদের সকলেই পরবর্তীতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এমনকি, কুয়েত মৈত্রি হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা ইউনিটের চিকিৎসাকর্মীরা ঠিক করে খাবার সুবিধাও পাননি।
সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নতিকরণে কোনো প্রকার ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের দায়ী করা হলো। পিপিই সংকট নিয়ে এত আলোচনা হবার পরও স্বাস্থ্য মন্ত্রী দাবি করেন, দেশে পিপিই সংকট নেই। অথচ এই কারণেই অনেক ডাক্তারকে করোনায় আক্রান্ত হতে হয়েছে। এমনকি সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ডাক্তারদের হুশিয়ারি দিলেন। ৭ই এপ্রিল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রয়োজনে আমরা বাইরে থেকে ডাক্তার নিয়ে আসব, বাইরে থেকে নার্স নিয়ে আসব। কিন্তু এই ধরনের দুর্বল মানসিকতা দিয়ে আমাদের কাজ হবে না, এটা হল বাস্তবতা।” স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার পরিবেশ জারি রেখে একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান চিকিৎসকদের বাস্তবতা ও দুর্বল মানসিকতার কথা বলেন— এর থেকে হাস্যকর আর নির্মম কথা আর কী হতে পারে!
ডাক্তার বনাম রোগী/জনতা
জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবনতির কারণে স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে জনগণও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যেহেতু ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা রোগী ও রোগীর আত্মীয়সজনের সাথে যোগাযোগ করে, আর কর্তৃপক্ষ ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে তাই জনতা ও ডাক্তার পারস্পরিক সংঘর্ষের মধ্যে দাঁড়ান। এটিকেও সরকার সমর্থক অনলাইন এক্টিভিস্টরা নিজেদের ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করে থাকেন। জনতাকে মূর্খ, বর্বর প্রতিপন্ন করে, জনতা ডাক্তারদের পেটায়, ডাক্তারদের ত্যাগ স্বীকার করে না ইত্যাদি বয়ানের মাধ্যমে এই দুরবস্থার জন্য জনতাকেই দায়ী করা হয়। অথচ ডাক্তার ও জনগণ— উভয়ই এই বাজে ব্যবস্থার ভিক্টিম।
জনতা লকডাউন মানে না
গত বছরের ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশে করোনা মহামারির কারণে প্রথমবারের মতন সাধারণ ছুটি ও লকডাউন ঘোষণা করা হয়। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে এমনিতেই যথেষ্ঠ বাজে, সেখানে এমন মহামারি আরও বড় সমস্যা নিয়ে হাজির হয়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় জনতাকে ‘করোনায় মরবো নাকি না খেয়ে মরবো’ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। লকডাউনের ফলে এদেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ, দরিদ্র দিনমজুর থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তরাও প্রচণ্ড আর্থিক, মানসিক নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন। কেননা, লকডাউনে শান্তিমতন জীবনযাপন করতে যেরকম রিসোর্স প্রয়োজন হয়, তার কোনোটাই তাদের নেই। এর কারণও বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সরকার ও এসবের সাথে সম্পর্কিত প্রভাবশালী মহলের সীমাহীন দুর্নীতি। বাংলাদেশে লকডাউনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা দ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রিসোর্স রেশনের মতন করে ব্যবস্থা করা ছাড়া লকডাউনকে মানবিক করা যায় না। দেশের এত এত মানুষের যখন লকডাউনের ফলে কাজে বের হতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হয়, তখন লকডাউনে রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের প্রধান মৌলিক অধিকার খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ, রাষ্ট্র আর সরকার এই কল্যাণের কথা বলেই জনতাকে শাসনের ক্ষমতা নেয়। কিন্তু বাস্তবে সরকার কী করে? বাস্তবে সরকার এইসব জীবনের প্রশ্ন আড়াল করে রাখে। বাস্তবে সরকার খোদ নাগরিক জনতাকেই দোষারোপ করে। বর্বর ধরনের শাস্তি দেয়। মানুষের মানবাধিকারকে ন্যূনতম সম্মান দেয় না। লকডাউনের শুরু থেকেই জনতার বিরুদ্ধে নানাপ্রকার দোষারোপের প্রচারণা চালায়। এই দোষারোপের চালানোর মূল উদ্দেশ্য জাতীয় দুর্যোগের সময়েও জনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও জনতার উপর নিপীড়ন চালানোর ন্যায্যতা অর্জন।
গত বছরের ২৬শে মার্চ, লকডাউনের প্রথমদিনে ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখা যায়। যেখানে পিপিই পরা একজন পুলিশ রাস্তায় এক রিকশাওয়ালাকে মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়াচ্ছেন। যা কিনা অত্যন্ত অমানবিক ও মানবাধিকারবিরোধী কাজ। ঘটনাটি জামালপুরের কথাকলি মার্কেট এলাকায় ঘটে। রিকশাওয়ালার দোষ লকডাউনের মধ্যে রিকশা নিয়ে বের হওয়া। আবার তার পরদিনই আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, যশোরের মনিরামপুরে এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসান তিন বৃদ্ধকে কানে ধরিয়ে উঠবস করান এবং এর ভিডিও করেন, ছবি তোলেন। পরে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সহযোগীরাই আপলোড করে এই কাজকে সমর্থন করেন। একই দিনে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিদা আক্তার তার পরিচালনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে জনসাধারণের ওপর লাঠিচার্জ ও ধাওয়া করেন। এরকম বেশ কিছু ঘটনা সেসময় সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই সামনে আসছিলো। আবার, নারায়ণগঞ্জ থেকে করোনা সারাদেশে ছড়ানোর বিভিন্ন নিউজ দেখা যায় গণমাধ্যমগুলোতে। নারায়ণগঞ্জ থেকে সরকারের অব্যবস্থাপনা, তথ্য লুকোচুরির কারণেই নারায়ণগঞ্জে কর্মরত দেশের নানা প্রান্তের মানুষ লকডাউন অমান্য করে নানা প্রক্রিয়ায় নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে নিজ নিজ আবাসস্থলে যান। এই অবস্থাকে উপলব্ধি না করে, উপযুক্ত ব্যবস্থা পরিকল্পনা না নিয়ে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে এই লোকগুলোকে দোষারোপ করা হতে থাকে। আবারও আগের প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের শ্রেণি-বিদ্বেষমূলক আক্রমণ চলে। এছাড়াও ঈদসহ নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ধরনের আলাপ তো চালুই ছিলো। এবং, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সরকারপন্থি এক্টিভিস্টরা এসব কাজে জড়িত ছিলো। যখন রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব ছিলো প্রত্যেক নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা, তখন রাষ্ট্র কেবল লুটপাট আর নির্যাতন করে গেছে। আর দিনশেষে তার দোষ দেওয়া হয়েছে খোদ ভিক্টিম জনতাকেই।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা
বাংলাদেশে করোনা মহামারি শুরু হবার এক বছর পর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ সময়টুকুতে সরকারি হিসাবমতে করোনার আবার নতুন প্রকোপ দেখা যায়। যা অনেকের মতেই আগের থেকে ভয়াবহ। এই অবস্থায় ৩ এপ্রিলে ৭ দিনের জন্য ৫ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বারের মতো লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তার দু’দিন আগে, ১ এপ্রিল মেডিকেল সায়েন্স পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই ভর্তি পরীক্ষায় স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর মানুষ হয়, প্রচুর ভিড় হয়। এমন একটা পরিস্থিতিতে এই পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কী ছিলো? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরীক্ষার হলগুলোতেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। পরীক্ষার্থীদের স্যানিটাইজ করা, শরীরের তাপমাত্রা চেক করা ইত্যাদি কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু, এই সব অব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলামূলক পলিসির বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আলাপ তোলা হয় অভিভাবকদের সংখ্যা নিয়ে। পরীক্ষার্থীদের সাথে কেন অভিভাবক যায়, কেন তারা ভিড় করে, কেন তারা একের অধিক সংখ্যক যান – ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তুলে সরকারের দায়িত্বহীনতাকে আড়াল করার চেষ্টা চলে। অথচ এই সব প্রশ্নই হাস্যকর। এত বড়, এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কেন কোনো অভিভাবক যাবে না? আর ভিড় যে হবে, তা কি প্রশাসন জানতো না? এটা মাথায় রেখেই কি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত না? যাতায়াতের ঝামেলা, অভিভাবকদের উদ্বেগ, করোনা পরিস্থিতির ভয়, পরীক্ষা কেন্দ্রের অধিক দূরত্ব – এতসব প্র্যাকটিক্যাল ও যৌক্তিক কারণ বাদ দিলেও স্রেফ মানসিক ভরসার জন্যও অভিভাবকরা সন্তানের সাথে পরীক্ষা কেন্দ্রে যায়। এই পরীক্ষা কেবল ছেলেমেয়েদের পরীক্ষাই নয়, বরঞ্চ অনেক পরিবারের স্বপ্ন, পরিশ্রমের ব্যাপারও এতে জড়িত। অথচ, এই সময়ে সরকারের অবহেলা, দুর্নীতি, অক্ষমতা আড়াল করতে খুবই অযৌক্তিকভাবে অভিভাবককে দোষ দেওয়া হচ্ছে।
এই লেখাটিতে কেবল কয়েকটি ঘটনার কথা আছে। কিন্ত সারাবছর প্রায় সব প্রাসঙ্গিক ইস্যুতেই এই স্টেট স্পন্সর্ড ভিক্টিম ব্লেইমিং চালানো হয়। সরকারের যাবতীয় উন্নয়নের ফাঁকিবাজি বুলি, যাবতীয় ডিজিটাল বাংলাদেশের গলাবাজি যখন কাজ করে না, তখন বলির পাঁঠা হিসেবে বেছে নেয়া হয় স্বয়ং নাগরিককে। এই সময়ে এসে আমাদের ভাবা উচিত, আমরা কি আসলেই সরকারের দোষারোপ মেকানিজমে মগজ বন্ধক দিবো? আমরা কি সরকারের এইসব সীমাহীন বেসাতি মেনে নিয়ে নিজেরা মরতে থাকবো? নাকি নিজেদের অধিকার আদায়ে সরকারের গণবিরোধিতা জোরদার প্রশ্নের সম্মুখীন করবো? যারা আমাদেরকে নিয়মিত সচেতন হতে বলে, তাদের ব্যাপারেই সচেতন হলেই চিন্তা আরও মুক্ত হয়, দৃষ্টি আরও ভিতরে প্রবেশ করতে পারে, প্রকৃত অবস্থা দেখা যায়। তাই, সচেতনতার নামে অচেতনতা আর দোষারোপের এই রাষ্ট্রীয় জারিজুরি উন্মোচন করতে হবে।
মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশের প্রধান শর্ত স্বাধীনতা। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন পরিবেশ প্রায় প্রতি পদে বাধাগ্রস্থ হয় অনায্য কর্তৃত্বের দ্বারা। কর্তৃত্ব কী এবং মানবপ্রকৃতি ধারণার সঙ্গে কর্তৃত্বের বিরোধ কোথায়- এসব প্রশ্নই আলোচিত হয়েছে প্রবন্ধটিতে। চিহ্নিত করা হয়েছে কর্তৃত্বের রূপগুলোকেও। একই সঙ্গে রাষ্ট্র-জনপ্রতিনিধিত্ব এবং মার্কসীয় রাষ্ট্রমুখীন সমাজতন্ত্রকেও সমালোচনা করেছেন লেখক।
কর্তৃত্ব বিরোধী ইশতেহার রচিত হয় আগস্ট বিদ্রোহের সময়। ২০০৭-০৮ সালে সেনা-কর্তৃত্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি-শাসনামলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংগঠিত আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ আছে লেখাটির। কারাবন্দী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠে কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে একটি ইশতেহার রচনার প্রচেষ্টা এই লেখা। ২০০৮ সালে কর্তৃত্ব-বিরোধী আন্দোলন পর্যালোচনা করে ওঙ্কার নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। তাতেই আন্দোলনের কর্তৃত্ব বিরোধী ধারা: মূল প্রস্তাবনা শিরোনামে লেখাটি ছাপা হয়। পরবর্তীতে কর্তৃত্ব বিরোধী ইশতেহার হিসেবে লেখাটি বিভিন্ন স্থানে প্রকাশিত হয়েছে।
ফরাসি বিপ্লবের দার্শিনিক রুশো বলেছিলেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলে আবদ্ধ। ফরাসি বিপ্লবই স্বাধীনতাকে ইতিহাসে প্রথম মানবীয় সহজাত প্রবণতা হিসেবেই দেখেছিল।একই সঙ্গে হাজির করেছিল, স্বাধীনতা মানে প্রত্যেকের ও সকলের স্বাধীনতার শর্ত।
ঐতিহাসিকভাবে ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক প্রশ্ন হিসেবেই আসে সমাজতন্ত্রের ধারণা। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত চিত্রকর্মটি যুগে যুগে স্বাধীনতার লড়াইয়ের স্মারক। ফরাসি চিত্রকর ইউজিন দেলাক্রোয়া ১৮৩০ সালে আঁকেন কালজয়ী শিল্পকর্ম লিবার্টি লিডিং দ্য পিপল। মানবীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ের
স্মারক হিসেবে প্রচ্ছদে চিত্রকর্মটি ব্যবহার করা হয়েছে।
আধুনিক নৈরাজ্যবাদ হচ্ছে উদারনীতিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মহামিলন। ঐতিহাসিকভাবে ফরাসি বিপ্লবের গর্ভেই সামাজিক-অর্থনৈতিক একচেটিয়া ও শ্রেণী-ক্ষমতার উচ্ছেদের প্রশ্ন হিসেবে আসে সমাজতন্ত্রের ধারণা। কোন গৎবাঁধা বা মহান দার্শনিক প্রণীত তত্ত্ব নয়, একেবারে ‘স্বাধীনতা-সাম্য-মৈত্রী’র পুর্ণাঙ্গ ও ফলপ্রসু চর্চার এক দৃষ্টিকল্প হিসেবে এর আবির্ভাব। যুগে যুগে নৈরাজ্য-পথিকগণ কাঙ্ক্ষিত সমাজের জন্য লড়াই করেছেন, নির্মাণ করেছেন মুক্ত সমাজের পথ।
জার্মান নৈরাজ্যবাদী রুডলফ রকার ছিলেন অ্যানার্কো-সিন্ডিক্যালিস্ট। ১৯৩৮ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত তাঁর Anarcho-syndicalism: Theory and Practice বইয়ের প্রথম অধ্যায় Anarchysm: Its Aim And Purposes– এর বাংলা অনুবাদ এই রচনাটি। রকার মুক্তির প্রশ্নে নৈরাজ্য-পথিক ও চিন্তকদের দৃষ্টিকল্পর সারমর্ম করেছেন এই রচনায়। দেখিয়েছেন, নৈরাজ্যবাদী চিন্তকদের সাধারণ অবস্থান হল, সকল জবরদস্তিমূলক সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষমতার উচ্ছেদ এবং সরাসরি গণ-অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্ব-শাসন বা আত্মকর্তৃত্ব গড়ে তোলা। ২০০৭ সালে সেনা-কর্তৃত্বের জরুরি শাসনের সময় মুক্তিমুখিন প্রতিরোধের একজন চিন্তক ও সক্রিয়ক হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ এই অনুবাদ কর্মটি সম্পন্ন করেন সেলিম রেজা নিউটন। আগস্টের শিক্ষার্থী বিক্ষোভের আগে আগে, মে মাসে। রাষ্ট্র, বলপ্রয়োগ এবং শ্রেণী-ক্ষমতা উচ্ছেদের প্রশ্নে নবতর পথ উন্মোচন করে রচনাটি। অনুবাদ কর্মটি পত্রিকায় প্রকাশের আগেই অনেকের কাছে বিলি করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আগস্ট বিক্ষোভ এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলনের কর্মী-সংগঠকদের মাঝে এর প্রভাব ছিল বিপুল। অনুবাদটি প্রথম ছাপা হয় ২০১১ সালে, খুলনা থেকে প্রকাশিত বাউন্ডুলে পত্রিকায়।
রকারের এই রচনার পটভূমি ছিল স্পেনের গৃহযুদ্ধ। একদিকে জেনারেল ফ্র্যাঙ্কোর ফ্যাসিবাদ, অন্যদিকে বলশেভিক কর্তৃত্বতন্ত্র। দুইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেই স্পেনে ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে নবতর রাষ্ট্রবিহীন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সেখানকার শ্রমজীবীদের সংঘ- সিএনটি। প্রচ্ছদে জুলাই বিপ্লবের স্মারক হিসেবে এনার্কিস্ট চিত্রকর জোসেপ বারদাসানোর মাদ্রিদ ফ্রন্ট পপুলার নামক চিত্রকর্মটি ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৩৬ সালে এটি সিএনটির একটি পোস্টার হিসেবে প্রকাশিত হয়।
মিখাইল বাকুনিন উনিশ শতকের রুশ নৈরাজ্যবাদী। সমাজতন্ত্রকে তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিকশিত রূপ হিসেবে দেখেছেন। বাকুনিন মনে করতেন, সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা বেইনসাফি। আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র স্বেচ্ছাচার-নির্মমতা।
বর্তমান রচনাটি বাকুনিনের Stateless Socialism: Anarchism-এর বঙ্গানুবাদ। রুশ নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম চিন্তক গ্রেগরি ম্যাক্সিমফ সম্পাদিত The Political Philosophy of Bakunin বইয়ে রচনাটি সংকলিত হয়। নিউইয়র্কের ফ্রি প্রেস থেকে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় বইটি।
বাকুনিনের এই রচনাটি ১৮৭১ সালে সংগঠিত প্যারি কমিউনের পরে লেখা। বাকুনিনের কাছে প্যারি বিপ্লব ছিল নৈরাজ্যবাদী সমাজ তথা রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্রর চাক্ষুষ উদাহরণ। প্যারি বিপ্লবের পতনের পর মার্কস সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর ধারণাকে প্রলেতারিয়েত একনায়কত্ব হিসেবে নিবদ্ধ করেন। অন্যদিকে বাকুনিন মার্কসীয় সমাজতন্ত্রকে কর্তৃত্বপরায়ণ মনে করতেন। তিনি কমিউনের অটুঁট যৌথতার প্রতি জোর দেন। বাকুনিন মনে করতেন, বিপ্লবের সময় এক ঝটকায় রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করা দরকার। প্রলেতারিয়েতের রাষ্ট্রক্ষমতা তাঁর মতে, কেবলমাত্র নতুন রাষ্ট্রজীবী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের শ্রেণী-ক্ষমতা। তিনি বলতেন, রেড বুরোক্রাসি। বলশেভিকদের পরিণতি বাকুনিনকেই অভ্রান্ত প্রমাণ করে।
প্রচ্ছদে ব্যবহৃত প্যারিস এন্ড দ্য কমিউন চিত্রকর্মটি ১৮৯১ সালে মার্কিন স্যাকেট এন্ড ওয়েলহেলম লিথোগ্রাফিং কোম্পানি প্রকাশ করে। শিল্পী অজ্ঞাত।
বিপ্লব দাবি করে সর্বব্যাপি বিদ্রোহ। কিন্তু বিদ্রোহের স্পৃহা আসে কোথা থেকে? স্বাধীনতার বোধ থেকে। কর্তৃত্বপরায়ন শাসন-শোষণের যাঁতাকলে মানুষ যখন পিষ্ট, কেবলমাত্র এবং কেবলমাত্র সামাজিক সংহতিই তাকে বিদ্রোহের পথ দেখায়। রাষ্ট্রর কল-কব্জাগুলো অসাড় হয়ে পড়ে, হারাতে থাকে তার ছন্দ। হাজির হয় অনিবার্য বৈপ্লবিক পরিস্থিতি। কেমন করে এই বৈপ্লবিক পরিস্থিতিতে সমাজ লড়াকু হয়ে ওঠে তারই এক চিত্রায়ন বিপ্লবের প্রাণস্পৃহা।
রুশ নৈরাজ্যবাদী চিন্তক পিতর ক্রপোৎকিনের The Spirit of Revolt প্রথম ছাপা হয় Le Révolté নামে, ১৮৮০ সালে। ১৮৯২ সালে Commonweal-এ ছাপা হয় এর ইংরেজি অনুবাদ। বর্তমান অনুবাদটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত The Essential Kropotkin অনুসারে করা হয়েছে।
নৈরাজ্যবাদী চিন্তক ক্রপোৎকিন সামাজিক বিকাশের ধারা-প্রবণতাকে আধুনিক প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানামুখি অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। সামাজিক ডারুইনবাদের Survival for the fittest মতবাদের বিপরীতে তিনি তাঁর Mutual Aid: Factor of Evaluation বইয়ে দেখান যে, প্রকৃতিতে পারস্পারিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই প্রজাতিগুলো বিকশিত হয়। শরীরবৃত্তীয় ভাবে দুর্বল প্রাণসত্তার প্রবৃত্তি হল তা সংহতিপরায়ন। আদতে সামাজিক সংহতিই ক্রমাগত জীবনের উচ্চতর গঠন নিশ্চিত করে।
ক্রপোৎকিন বিদ্রোহকে মানবীয় প্রবৃত্তি মনে করেন। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত চিত্রকর্মটি আলবেনীয় ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৬৯ সালে স্লাভ চিত্রকর সালি শিজাকু তিরিশের দশকের প্রখ্যাত আলবেনীয় বিপ্লবী ভোজো কুশির এই প্রতিকৃতি অঙ্কন করেন। দ্রোহ ও সাহসিকতা ভঙ্গি চিত্রকর্মটিকে করে তোলে বিদ্রোহের স্মারক।
কার্ল মার্কস আর মিশেল ফুকোর সম্পর্ক নিয়ে দুইটি বিশেষ বই বেরিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে: একটি হচ্ছে ফরাসী দার্শনিক জাঁক বিদে-এর বই ফুকো উইথ মার্কস (২০১৫/ ইংরেজি তর্জমা: ২০১৬); অপরটি ইতালীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও অ্যাকটিভিস্ট আন্তনিও নেগ্রি-এর বই মার্কস অ্যান্ড ফুকো (২০১৭)। বেশ কৌতূহল নিয়ে পড়তে গিয়ে দেখলাম বই দুইটি একদিকে যেমন মার্কস আর ফুকোর তাত্ত্বিক সংশ্লেষণ ঘটাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে আবার তারা ফুকোর নিজস্ব বই—তাঁর সাক্ষাৎকারের বই— রিমার্কস অন মার্কস কে সম্পূর্ণ এড়িয়েও গেছে। মনে হল, ফুকোর ওই বইটা আবারও পড়া দরকার।
আর্টওয়ার্ক: ফুকো’জ মার্কস সূত্র: আর্ট-ইফেক্ট
তবে ফুকোর রিমার্কস অন মার্কস বইটা আবারও পড়ার আরেকটা কারণ আছে অবশ্য। প্রায় দেড় দশক আগে মার্কসবাদীদের এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে মার্কস, ফুকো এবং দেরিদা নিয়ে আমি নিজেই একটা পেপার পেশ করেছিলাম। সেখানে মার্কসকে নিয়ে ফুকো ও দেরিদার ভাবনার তুলনামূলক আলোচনা করেছিলাম। ফুকোর বই রিমার্কস অন মার্কস আর দেরিদার বই স্পেক্টার্স অফ মার্কস কে এক সমতলে এনে তাদের তুলনা করে রূপকার্থে এও বলেছিলাম: যেখানে দেহতাত্ত্বিক মিশেল ফুকো ব্যস্ত থাকেন মার্কসের দেহ নিয়ে, সেখানে ভূতকাব্যতাত্ত্বিক জাঁক দেরিদা ব্যস্ত থাকেন মার্কসের “ভূত” নিয়ে, যদিও সেটা আমার পেপারের একমাত্র আর্গুমেন্ট ছিল না। ওই পেপারের একটা পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ শিঘ্রি প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। সেই জন্যও ফুকোর ওই তুলনামূলকভাবে অবহেলিত বই রিমার্কস অন মার্কস -এর কাছে ফিরতে হল।
আর্টওয়ার্ক: মার্কস সূত্র: দ্য প্রিন্ট
বলা দরকার, ইতালীয় মার্কসবাদী সাংবাদিক দুচ্চো ত্রোম্বাদরি বেশ কিছু সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মিশেল ফুকোর, সত্তরের দশকের শেষভাগে। ওই সাক্ষাৎকারগুলোকে একসঙ্গে করেই সেই ১৯৮১ সালে ইতালীয় ভাষায় প্রথম বেরোয় রিমার্কস অন মার্কস। ফুকো মারা যান ১৯৮৪ সালে। তারপর ১৯৯১ সালে বইটির ইংরেজি তর্জমা প্রকাশিত হয় আমেরিকায়। আর আমি বইটার প্রথম সন্ধান পাই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ওয়াইডনার লাইব্রেরিতে, সেই ১৯৯৫ সালে।
এবারে বইটা নিয়ে কয়েকটা কথা বলে নেই। যদিও বইটির শিরোনামে মার্কসের নাম জাহিরী ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত, সেখানে ফুকো সরাসরি মার্কস নিয়ে কথা বলেছেন খুবই কম। বরঞ্চ ফুকোর বয়ান আবর্তিত হয়েছে ফরাসি মুলুকের মার্কসবাদী ঐতিহ্যকে ঘিরে; সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও টানাপড়েনকে ঘিরে এবং সে-সব কিছুর প্রেক্ষিতে তাঁর কাজের রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক তাৎপর্যকে ঘিরেও। বইটাতে ফুকো এই ইঙ্গিতটা দিতেও বাধ্য হন যে, মার্কস ও মার্কসবাদকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নাই; বরঞ্চ বিশ শতকের প্রায় সব প্রধান ও প্রভাবশালী তাত্ত্বিক বা দার্শনিক কোনো না কোনোভাবে মার্কসের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু এই বইয়ে ফুকো যে মার্কসের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়ায় এসেছেন তাও বলা যাবে না, যদিও মার্কসের সঙ্গে ফুকোর কাজের সম্পর্কের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে, যে-সম্পর্কটা কিছুটা জটিলও বটে।
আর্টওয়ার্ক: মিশেল ফুকো সূত্র: আর্ট সেন্টার
শুরুর দিককার ফুকো, যে-ফুকোর কাজে কেউ কেউ “কাঠামোবাদী” বা “স্ট্রাকচারালিস্ট” পর্ব চিহ্নিত করে থাকেন (যদিও “কাঠামোবাদী” বর্গটা ফুকোর পছন্দের না), সেই ফুকো তাঁর বিখ্যাত বই দ্য অর্ডার অফ থিংস -এ মার্কসকে কোনো বিপ্লবী চিন্তাবিদ হিসাবে গণ্য করেন নাই (এই বইয়ে ফুকোর নায়ক নীৎশে, মার্কস নন।)। ওই বইয়ে তিনি মার্কসের কাজ আর মার্কসবাদকে সমার্থক করে খুব দ্রুত এই কথাগুলো বলেন,
পশ্চিমা জ্ঞানের গভীরতম স্তরে মার্কসবাদ কোনো ছেদ ঘটাতে পারে নাই; কোনো সমস্যা ছাড়াই মার্কসবাদ পশ্চিমা জ্ঞানের পরিসরে জায়গা করে নিতে পেরেছে… এমন এক জ্ঞানতাত্ত্বিক আয়োজনের ভেতর দিয়ে, যে আয়োজন মার্কসবাদকে আনন্দে আহ্বান করেছে আর মার্কসবাদ সেই আয়োজনকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে সামান্যতম আগ্রহ দেখায় নাই (পৃ. ২৬১)।
দেখা যাচ্ছে, ধ্রুপদী রাজনৈতিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব তুমুল ক্রিটিক হাজির করার ভেতর দিয়ে মার্কস যে রাজনৈতিক অর্থনীতির পাঠে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন তা ফুকোর মনোযোগ কাড়তে পারে নাই। না পারারই কথা। মার্কস যে কেবল ইউরোপীয় আলোকায়ন প্রকল্পের সন্তান ছিলেন তা তো নয়; বরঞ্চ তিনি ওই প্রকল্পের বুর্জোয়া রাজনীতির বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন সবকিছুর খোলনলচে পাল্টে দেয়ার জন্য। এই বিষয়টা শুরুর দিককার বা ‘কাঠামোবাদী’ ফুকো আমলে যে আনেন নি, তা তো আগেই লক্ষ করলাম। ফুকোর এই ফাঁক ও ফাঁকি এর মধ্যে অবশ্য ধরিয়ে দিয়েছেন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক— বিশেষভাবে বলা যাবে ভারতীয় মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এজাজ আহমদ ও ফিলিপাইনি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ই স্যান উয়ানের কথা। তৃতীয় বিশ্বে ফুকোসহ অনেক “উত্তরবাদী”র সমালোচনা আরেক এলাকায় আমাদের মনোযোগ দাবি করে, কিন্তু আমি এখন সেদিকে যাচ্ছি না।
তবে জোর দিয়েই বলা যাবে যে, থেকে থেকে মার্কসকে নিয়ে ফুকোর ধারণা বদলে গেছে। ফুকোর দ্য অর্ডার অফ থিংস পরবর্তী কাজগুলোতে মার্কস তুমুলভাবে না হলেও কোনো না কোনোভাবে হাজির হয়েছেন। বোঝা যায়, এড়াতে চাইলেও মার্কসকে এড়াতে পারছেন না ফুকো। তাইতো তাঁর পরবর্তী কাজ দ্য আর্কেওলজি অফ নলেজ -এ ফুকো নির্দ্বিধায় বলে উঠেন: ”রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তিতে মার্কস সম্পূর্ণ নতুন বয়ানের চর্চাকে সামনে এনেছেন” (পৃ. ১৮৮)। কিন্তু ফুকো এখানেই থামেন নাই; তাঁর বেশ পরের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী কাজ পাওয়ার / নলেজ -এ ফুকো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন,
মার্কসের চিন্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত ধ্যানধারণার বিভিন্ন ব্যবহার ছাড়া এবং মার্কস-নির্দেশিত চিন্তার দিগন্তে নিজেকে কোনো না কোনোভাবে স্থাপন না করে বর্তমান সময়ে ইতিহাস লেখা অসম্ভব। (পৃ. ৫৩)
এখানে ফুকো যে মার্কসের কথা বললেন তাকে ফুকোবাদীরা যে সবসময় চিনতে পেরেছেন তা বলা যাবে না, যদিও এই মার্কসকে চিনে রাখা দরকার।