Blog

  • আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

    আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

    • আরিফ রেজা মাহমুদ
      পার্থ প্রতীম দাস

    ভূমিকা: আগস্ট বিদ্রোহ। আদতে শরতে অসুর বধ। অন্যায্য অগণতান্ত্রিক ‘জরুরী আইনের’ বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধের নতুন পর্ব। এই আন্দোলনের খুবই নতুন এবং ভিন্ন স্বর শোনা গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মতিহারের আঙ্গিনায় ‘অহিংস অসহযোগ’ নামে রচিত হয়েছিল কর্তৃত্ব অমান্য করার দৃষ্টান্ত। এ রিয়েল সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স । রাষ্ট্রের কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাকে পঙ্গু করে বিশ্বিবদ্যালয়ে মুক্তাঞ্চল কায়েমের দৃষ্টিকল্পই ছিল আন্দোলনের মূলমন্ত্র। কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন জরুরি অবস্থায় সংগঠিত হলেও, আদতে এটা শিক্ষার্থী সমাজের জন্য সবসময়ই একটি দিশা। আগস্ট বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭/০৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন, তার দৃষ্টিকল্প, সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক আরিফ রেজা মাহমুদ ও পার্থ প্রতীম দাসের এই আলাপচারিতাটি ছাপা হয়, ওঙ্কারের  মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব সংখ্যায়।

    আর্টওয়ার্ক: পোরিশ স্টেট
    শিল্পী: আলেন ব্রেটম্যান
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    প্রশ্ন: সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সংগঠিত হলো, তাকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব  নামে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

    উত্তর: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন বলতে আমি বুঝি, বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করার আন্দোলন, মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের আন্দোলন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা মাফিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, তা প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনও মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, বিশ্বজনীন জ্ঞান সৃজন ও চর্চার ক্ষেত্র। মনুষ্য জীবনের উৎকর্ষ সাধন কিংবা মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য জ্ঞান উৎপাদন ও তার চর্চা সমাজে প্রবাহমান রাখার উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার অংশ। কিন্তু সৃজনের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সৃজন হতে পারে না। স্বাধীনতাহীনতায় চর্চিত জ্ঞান বড়জোর ‘দক্ষ’ উৎপাদন করতে পারে, জ্ঞানী নয়। যে সমাজে সৃজন রুদ্ধ, সে সমাজে জ্ঞানও রুদ্ধ। ফলে স্বাধীনতাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত নিশ্চল বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণ, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণারই অংশ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করতে একে রাষ্ট্র-কর্পোরেট-সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত রাখা এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলনই মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন।

    মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অবারিত। কোনো সীমারেখা দ্বারা একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। কাজেই মুক্তি মানেই তা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তির ক্ষেত্রেও একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব না। সুতরাং মুক্তির জন্য আন্দোলন একটি চলমার প্রক্রিয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি-কাল-পর্বকে চিহ্নিত করা সম্ভব। কখনো কখনো প্রয়োজনীয়ও হয়ে পড়ে।

    বাংলাদেশে বর্তমানে একটি বিশেষ পরিস্থিতি জারি আছে। সরকারি ভাষায় একে ‘জরুরী অবস্থা’ নামে ডাকা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই ‘জরুরী অবস্থা’ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শাসন-যন্ত্রকে কর্পোরেট বিকাশের অনুকূল করে তোলার প্রচেষ্টা। কর্পোরেট বিকাশের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি প্রয়োজন, তা নির্মাণ করা। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটা গণজনতন্ত্র [People’s Republic] প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছিলাম। এই গণজনতন্ত্রের মাধ্যমে আমরা একটা নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন রাষ্ট্রের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রটা ছিলো উপনিবেশের গর্ভে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রযন্ত্ররই তদ্ভব রূপ মাত্র। ফলে তার পক্ষে ঐ সামাজিক চুক্তিকে ধারণ করা সম্ভব ছিল না। আবার পরবর্তীতে পনের বছরের সামরিকায়নে রাষ্ট্রযন্ত্র আরো কর্তৃত্বশীল, আরো গণবিচ্ছিন্ন হয়েছে। ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরেও এর কতৃত্বশীলচেহারা খুব একটা পাল্টায়নি। সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র রূপে তা বহাল থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক কায়দায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পারিক কর্তৃত্ব পরম্পরার যে ছেদ সৃষ্টি হয় তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘কর্তৃত্বের লড়াই’ হিসেবে মূর্ত হয়ে ওঠে। এই ‘জরুরী অবস্থা’ মূলত উপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় খোল-নলচেগুলোকে পাল্টে কর্পোরেট স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ঢেলে সাজানো’র জন্যই হাজির হয়েছে। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসে সুবিধাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল-গোষ্ঠী-পক্ষগুলোকে সাইজ করতে এবং কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র-বিরোধী গণমুখী আন্দোলনকে দমন করতে  রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সংস্থাগুলোর বিশেষভাবে তৎপর হয়ে পড়া এই ‘জরুরী অবস্থা’র অবধারিত অনুসঙ্গ। আবার কপোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের মতাদর্শিক হাতল হিসেবে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিক ‘জরুরী অবস্থা’র পক্ষে প্রচার-প্রচারণা উৎপাদন জারি রেখেছে। ফলে সামগ্রিক সমাজটাই চিন্তাভাবনার দিক থেকে অনুর্বর ও কর্পোরেট কর্তৃত্ব-অনুগামী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের সামনে দৃশ্যমান।

    এই পরিস্থিতিতে সমাজের অন্যান্য অংশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়কেও নিপাট ভাষাহীন, প্রতিবাদরুদ্ধ করে ফেলার প্রয়োজন পড়েছে। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বাগে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাক্যাম্প পর্যন্ত স্থাপন করেছে, যা অতীতে কখনোই সংঘটিত হয়নি। ফলে ‘জরুরী অবস্থা’য় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিস্থিতি কায়েম হয় তার মাত্রাগুলো স্পষ্টভাবে চেনা সম্ভব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে এই ‘জরুরী অবস্থা’য় অত্যন্ত জরুরিভাবে প্রতিবাদের-প্রতিরোধের কর্তব্য এসে হাজির হয়। এই কর্তব্য আন্দোলনের রূপ নেয় এবং এই আন্দোলনই জরুরি পর্বের আন্দোলন বলে আমি মনে করি।

    প্রশ্ন: ৭৩’এর অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করে কেমন করে?

    উত্তর: আচ্ছা। ৭৩’এর অধ্যাদেশে স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ এমনি এমনি হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমাজে গণমুখী বিনির্মাণের যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এদেশের মানুষ লালন করেছিল তারই জোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনেও লেগেছিল। আর এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৃঢ় জনমতের সামনে স্বায়ত্তশাসন কথাটা উচ্চারণ না করে ৭৩’এর অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। আর এই স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কয়েকটা জায়গায় স্বাধীনতাও এনে দিয়েছিল বটে। ৭৩’এর যে স্বায়ত্তশাসন, তা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার জন্য অধস্তন আইন  [বিধিবিধান] প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। আবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা আলোচনা-সমালোচনারও সুযোগ দিয়েছে। এসনকি রাষ্ট্র সম্পর্কেও অনুরূপ একটা অবস্থান নেবার স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আছে। কিন্তু গত চৌত্রিশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-স্বীকৃত এই স্বায়ত্তশাসনটুকুও রক্ষিত হয়নি। রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। স্বায়ত্তশাসন পরিণত হয়েছে আয়ত্তশাসনে। কিন্তু আপনার প্রশ্নের আগে, রাষ্ট্র-রাজনীতির শুঁড় কিংবা রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে কায়েম হয় কেন—এই জবাব দেয়া জরুরি।

    প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র হচ্ছে ক্ষমতা সংস্থাপনের যন্ত্র। এই সংস্থাপিত ক্ষমতা কীভাবে এবং কতোটা প্রয়োগ করা যাবে—তা লেখা থাকে সংবিধানে। কিন্তু বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির সংবিধান কোনো গ্রাম-সমবায় তথা পিপলস ফেডারেশনের সমন্বয়ের মাধ্যমে, তাদের জনমতের ভিত্তিতে রচিত হয়নি। এই সংবিধান রচিত হয়েছে উকিলদের দ্বারা। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংসদের হাতে। কিন্তু সংসদ মানেই তো সংবিধান মোতাবেক পার্টিজান ‘জনপ্রতিনিধি’। ফলে সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রটাই পার্টি-কর্তৃত্বের অধীন। রাষ্ট্রের চরিত্র পার্টিক্র্যাটিক। ফলে এটাকে পার্টিস্টেট বলাটা ভুল হবে না। পার্টিমাত্রই তার ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণি-গোষ্ঠী-দল থাকে। ফলে তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতাই জেতার জন্য-ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করবার জন্য দরকার হয় সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্টি-কর্তৃত্বের আওতায় আনা। চলতি ভাষায় একেই বলে দলীয়করণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ থেকে রেহায় পায় না। আবার ক্ষমতা মতাদর্শিক স্তম্ভ রচনার জন্যও প্রয়োজন হয় বিশ্ববিদ্যালকে ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত করা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় যতোই স্বাধীনতা শব্দটা থাক না কেন, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর তাই ৭৩’এর অধ্যাদেশেও ফাঁকফোকর থাকে। আর তা দিয়ে ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের শুঁড়। এ থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে, রাষ্ট্রের কাঠামোতে পার্টি-কর্তৃত্ব ছাড়া কোন অংশীদারিত্বমূলক পদ্ধতি নাই। আর এটাই হলো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত হওয়ার বর্তমানের বাস্তবিক কারণ।

    এখন আপনার প্রশ্নে আসি। কীভাবে রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন কায়েম হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের যেতে হবে ৭৩’এর অধ্যাদেশে। এই অধ্যাদেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যমূলক দিক উল্লেখ করা যাক।

    এক. বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ হয় রাষ্ট্রপতি দ্বারা।
    দুই. বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে  ক্রমকর্তৃতন্ত্র।
    তিন. সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকা। এখন এই বিষয়গুলোকে সূত্রবদ্ধ করলেই উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। বলাই বাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এই নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই তো একজন পার্টিজান। আর তাই উপাচার্য হতে গেলে পার্টিজান হতে হবে। এ কারণেই দেখা যায় যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বদলে যায়। আবার উপাচার্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কী দৃশ্যমান, কী অদৃশ্যমান, কী চিন্তনীয়, কী অচিন্তনীয় তাবৎ কিছুর মালিক তিনি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট-একাডেমিক কাউন্সিল সকল কিছুতেই তার আধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবৎ নিয়োগ কমিটি, পদোন্নতি-কমিটির মালিক তিনি। এমনকি নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরর তিনিই নির্ধারণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোষাধ‌্যক্ষ-রেজিস্ট্রার-প্রক্টর-প্রভোস্ট- ছাত্র উপদেষ্টা ইত্যাদি প্রশাসনিক পদে তিনিই শিক্ষকদের নিয়োগ দেন। ফলে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা-বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক। সুতরাং উপাচার্য ‘কট’ হলেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ‘কট’। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের শুঁড় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করে না, শুঁড়ের পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্ষমতার হালুয়া-রুটিও পাস হয়’ অর্থাৎ বরাদ্দ, ফান্ড, মালপানির মামলা আর কি। ফলে প্রশাসনের যে কোনো গদিতে বসতে পারলে ঐ মালপানির হিস্যা পাওয়া যায়। আর এ কারণেই গদিতে বসার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। উপাচার্যের নেক নজরে পড়লেই যেহেতু তা নিশ্চিত হবে সুতরাং উপাচার্যের মতোই অন্য শিক্ষকরাও শুরু করে দলবাজি। ‘বেনীআসহকলা’ নামের দলগুলি আসলে এক একটা পার্টির লেজমাত্র এবং এই দলগুলোর নামে চলতে থাকে শিক্ষক সমিতির ভোটাভুটি। কার কত শক্তি, কার কত ভোট, কে কত ইমপর্টেন্ট ইত্যাদির হিসাব নিকাশ। উপাচার্য এখান থেকেই তার অনুগত ভৃত্যদের বাছাই করেন। নিয়োগ, পদোন্নতি প্রভৃতির জন্যও শিক্ষকরা তার মুখাপেক্ষী। শিক্ষক সমিতি মানে শিক্ষকদের অধিকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিন্তার কোনো সংগঠন নয়। এটা পরিণত হয়েছে দলবাজির কারখানায়। এখানকার কর্মকর্তারা হচ্ছেন আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদের ক্যান্ডিডেট। শিক্ষক সমিতির কর্মকর্তারা নিজেরাই এর মাধ্যমে নিজেদেরক পদপার্থী তথা পদলেহী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করেন। এ তো গেলো শিক্ষক রাজনীতির কথা। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি? ছাত্রদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সবই কোনো না কোনো পার্টির লেজ। লেজুড়বৃত্তির সূত্রে তারা কোনো না কোনো পার্টির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বড়জোর নিজ নিজ পার্টি এজেন্ডা বা মতাদর্শ বাস্তবায়ন করতে চাইতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত বা ইচ্ছার সাথে এগুলোর সম্পর্ক নাই। উপরন্তু দাপুটে ক্ষমতার মাৎসন্যায় নীতির ধারকবাহক ছাত্র সংগঠনগুলো হল দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই ইত্যাদিতেই ব্যস্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ত্তশাসন কায়েমের ক্ষেত্রে তারা হচ্ছে প্রধান ক্ষত্রশক্তি। উপাচার্য যে দলের, ক্যাম্পাসে সেই দলের ছাত্র সংগঠনেরই কর্তৃত্ব। কেননা প্রশাসন হচ্ছে সেই ছাত্র সংগঠনের পাহারাদার। আর এই ছাত্র সংগঠনগুলো হচ্ছে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের লাঠি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্ব বলবৎ হয় মূলত উপাচার্যের চরম ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার অনুসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি দ্বারা।

    প্রশ্ন: রাষ্ট্রের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্পোরেট ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথাও বলেছেন আপনি। এটা কিভাবে কায়েম হয়?

    উত্তর: মুক্তবাজার অর্থনীতি বলে যে প্রত্যয়টি চালু আছে তার প্রকৃত মানে হচ্ছে বাজারের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। জগতের সবকিছুকেই বাজারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বাজার কর্তৃত্বের  বর্তমান রূপটি হচ্ছে কর্পোরেট একচেটিয়া। কর্পোরটের স্বার্থে সমাজকে একটি উন্নতমানের ভোক্তা শ্রেণীতে রূপান্তর করা এই বাজার যুগের প্রধান সাংস্কৃতিক প্রবণতা। ফলে বাজারের চিন্তা-বাজারের মতাদর্শ-বাজারের সংস্কৃতি উৎপাদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে হাতল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সিলেবাসের মধ্যে ক্লাসিক্যাল যুগের জ্ঞানকাণ্ড চর্চার যে আবহ তৈরি হয়ে আছে তা প্রতিস্থাপন করে একেবারে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে উন্নতমানের এক্সিকিউটিভ উৎপাদনের জন্য যে ধরনের জ্ঞানকাণ্ডের প্রয়োজন সেই ধরনের জ্ঞান চর্চার প্রবাহ তৈরির তৎপরতা চলছে। আবার মুনাফামুখিন কর্পোরেট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ছাঁচে গড়া সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রচার-প্রচারণা নেহাত কম নয়। ফলে পুঁজিবাদ যা শিল্পমূল্যকে বাজারমূল্যে রূপান্তর করতে চায়- মানবিক রুচিশীলতাকে বাজার রুচিশীলতায় রূপান্তর করতে চায়, তার বিশেষ তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সমাজ ‘খাদক সমাজে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন ধরে চর্চিত মুক্তিমুখিন সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক একুশ-পহেলা বৈশাখ-স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয়ের চেতনা- এ সবকিছু ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কর্পোরেট বিজ্ঞাপন-স্পন্সরশিপ আর তার লোভ দেখানো সুযোগ-সুবিধার তোড়ে এসব সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার খুবই ভিন্ন মানে উৎপাদন করা হচ্ছে। যেমন স্বাধীনতা বলতে আপনি কত কম খরচে এবং কত বেশি দিনের ব্যবধানে বাংলালিংক কর্পোরেট মোবাইল কোম্পানির সিমটি রিচার্জ করতে পারবেন, তা বোঝানো হচ্ছে। ভাষার স্বাধীনতা বলতে সিটিসেল ফোনে পারস্পরিক, আগের থেকে বেশি এসএমএসপাঠানোর সুবিধাকে বোঝানো হচ্ছে। ফলে স্বাধীনতা সংজ্ঞায়িত হচ্ছে কর্পোরেট দ্বারা, কর্পোরেট স্বার্থানুসারে। কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র একচেটিয়া অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠান-জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রি ও বাজার সম্পর্ক কায়েম ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য-আগ্রাসন চালাচ্ছে।

    রশ্ন: রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কেও জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাঠামো দাঁড়িয়েছে তার সাথে আগস্ট বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক আছে কী?

    উত্তর: হ্যাঁ, তা তো আছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক । এটা আমি আগেই বলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটাও সেই আদলেই তৈরি হয়েছে। গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে কাঠামোগতভাবে যুক্ত থাকতে পারেন। কিন্তু তারাও রাষ্ট্র-রাজনীতি কর্তৃক নিযুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত উপাচার্যের তল্পিবাহক। আবার সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান যেমন সিনেট, সিন্ডিকেট,  কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ছাত্র সংসদ), বিভাগীয় সমিতি ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু কিছু পরিমাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে এর একটিতেও শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নেই, এগুলো নিস্ক্রিয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই স্থগিত। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোনো প্রকার সুযোগ অনুপস্থিত, প্রশাসনের গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক তাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, যে সিদ্ধান্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৈরি করেন সেটাই যেন সকলের ভাগ্য। আরও লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এত কেন্দ্রীভূত হওয়া সত্ত্বেও এর জবাবদিহিতার জন্য কোনো কাঠামো নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র নিরঙ্কুশভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল। এই পরিস্থিতিতে যদি রাষ্ট্রীয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর আন্দোলন মানেই সংগঠিত হওয়া। কিন্তু ‘জরুরী অবস্থা’য় অধ্যাদেশ জারি করে এই সংগঠিত হওয়া, সংগঠন করা তথা মিছিল-সমাবেশ-প্রতিবাদ ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত একদিকে রাষ্ট্রের অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় আরো তীব্র মাত্রা যোগ করে। সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় যেন নিপাট ভাষাহীন-প্রতিবাদহীন, রাষ্ট্রের অনুগত-গৃহপালিত একটা জিনিস হিসেবে হাজির থাকে তার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। দু-একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ‘জরুরী অবস্থার’ সুযোগ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন সেশন চার্জ ৫৬১ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৩৪০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। ‘জরুরী অবস্থার’ দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য সভা, সংস্কৃতি সভা, গান-নাটক, এমনকি দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা সভা, সেমিনার বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৭-এর ভয়াবহ বন্যার সময় প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাণ সংগ্রহ তৎপরতা বন্ধ করে দেয়। এসব নিয়ে শিক্ষার্থীরা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে, উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের অবহিত করেও কোনো প্রতিকার পায়নি। অথচ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রশাসনের পাহারায় হলে হলে ‘শিবিরের আইন’ মানতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেছে। এই চিত্র কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। আবার অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি ও তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের অবাধ মেলামেশা, পোশাক পরিচ্ছেদ ইত্যাদি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ, কটূক্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন দাপুটে ক্ষমতার নগ্ন রূপকেই প্রতিপন্ন করে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুমোটের মধ্যে গুমরে মরছিল। ফলে তাদের মনে ক্রমাগত ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সমাজের অন্যান্য অংশ, যারা আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার চরম নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার, তাদের মনেও দানা বেঁধেছিল। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, বস্তি উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদ এগুলো হচ্ছে এই নির্যাতন-নিপীড়নের নমুনা। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে যখন সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং সেনাসদস্য কর্তৃক বিশ্ববিদ্যায়ের মধ্যে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তখন শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা থাকে না। স্ফূলিঙ্গ থেকে নিমিশেই তখন দাবানল তৈরি হয়। এই বিক্ষোভ যেহেতু আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, কাজেই সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত অংশও এতে যোগ দেয়। ফলে মোট কথা হচ্ছে যে: ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে, সর্বাত্মক-স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলে মানুষ তার অস্তিত্ব তথা স্বাধীনতা রক্ষার্থেই প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে প্রতিরোধের আকর হিসেবে প্রথমত কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

    প্রশ্ন : আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভের পরে প্রতিবাদ কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরে আবার এত বড় একটি ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়ে গেল। এর শুরুটা কেমন ছিল?

    উত্তর: আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফুর্ত এবং এর কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। ফলে ২২ শে আগস্ট বিক্ষোভ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত কেঁপে যায়। ফলে রাষ্ট্র আরও সহিংস ও নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেট্রোপলিটন শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। কারফিউ জারি করে দেশটাকে একটা জেলখানা বানিয়ে ফেলা হয়। সেই সময় বিশেষভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে পেলে তাদের উপর নির্বিচারে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআর-র‌্যাব প্রভৃতি ‘আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী’র অমানুষিক-বিভৎস নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসে। এমনকি রাষ্ট্র তার অনুগামী বন্ধুত্বপরায়ণ মিডিয়াকেও চরম কর্তৃত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। টিভি চ্যানেলগুলোর সকল প্রকার টক্-শো বন্ধ করে দেয়া হয়। সেল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে সামগ্রিক নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাস্তায় সেনাবাহিনীর যুদ্ধংদেহী তৎপরতা দেখা যায়। পরিস্থিতিটা একেবারেই রুদ্ধশ্বাসের। আর এরকম একটি পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কাঠামোহীন স্বতঃস্ফুর্ত বিক্ষোভ চলতে পারা প্রায় অসম্ভব। আবার দু-তিন দিন পর এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি অল্পবিস্তর শিথিল হলেও শুধুমাত্র সাংগঠনিক কাঠামোর অভাবে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই তীব্রমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যায়নি। আপনার বক্তব্য সঠিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়সহ অপরাপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা শুরু হলে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। পরিস্থিতি বদলে কেমন করে পরবর্তী সময়ে এত বড় একটা ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হলো তা আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা বলতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর পর শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের ভয়, আশঙ্কা এবং ক্ষোভ মিশ্রিত একটা অবস্থা দেখা যাচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে অন্যায়ভাবে আটককৃত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষমতাতাড়িত মিডিয়ার নিরন্তর প্রচারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ…ই মুক্তি পাচ্ছেন- শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হওয়াকে অনেকটাই বিলম্বিত করে ফেলে। কিন্তু এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিম্ন আদালতের রায়ে দণ্ড দেয়া হয়। রায়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর কিংবা সহিংসতায় মদদ প্রদানের অভিযোগ মিথ্যা বলে স্বীকার করা হয়। শুধুমাত্র মৌন মিছিল করে ‘জরুরী বিধিমালা’ ভঙ্গ করার ‘অপরাধে’ তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের এমন অবস্থায় দেখে আবেগী হয়ে ওঠে। তাদের মূল্যবোধ, বিবেক তাদেরকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। যে শিক্ষকদের শাস্তি দেয়া হয় তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পূর্ব থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ফলে ঐ শিক্ষকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মুক্তির জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। বিপুল পরিমানে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি চাপের মধ্যেও তারা স্বাক্ষর সংগ্রহ, স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন প্রভৃতি তৎপরতা চালাতে থাকে। এসব তৎপরতার  সময় তারা কৌশলগত কারণে এমন ধরনের কর্মসূচিগুলোই হাতে নেয় যা ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের তৎপরতার মাত্রাটাও বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মুক্ত চিন্তা ও চর্চার একটা প্রবাহের সাথে আগে থেকেই যুক্ত। ক্ষমতা-রাষ্ট্র-রাজনীতি-মতাদর্শ-কর্পোরেট মিডিয়া প্রভৃতি বিষয়ে চিন্তা ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এই বিভাগে গড়ে উঠেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের তৎপরতার মাত্রাটা ছিল বেশি। শিক্ষকদের মুক্তি দাবি করে একসাথে ৮০/৯০ জন শিক্ষার্থী উপাচার্যের কাছে বিভাগের প্রায় সকল শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সস্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই একসাথে হেঁটে উপাচার্যের কাছে যাওয়া প্রকৃতপক্ষে একটি প্রতিকী মৌন মিছিল রচনা করে। যা ঐ সময়ে ছিল খুবই সাহসী পদক্ষেপ। আবার এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা অঘোষিতভাবে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে ক্লাস বর্জন করে। এভাবে ক্লাস বর্জন সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এই আশঙ্কায় রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্বিগ্ন হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ক্লাস বর্জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযাগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তারা আল্টিমেটাম দিয়ে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট শিক্ষার্থীদের মাঝে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেগ অনুভূতি ও তৎপরতা এবং শিক্ষকদের উচ্চ নৈতিকতার প্রতি সারাদেশের মানুষের সমর্থন ও মানসিক লিপ্ততা তীব্রভাবে যুক্ত ছিল। ফলে এই পরিস্থিতিতে সরকার বেশ চাপের মুখে পড়ে এবং গণদাবির মুখে ২০০৭ এর ১০ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তি দেয়। গণদাবির সামনে নতজানু হয়ে রাষ্ট্র শিক্ষকদের মুক্তি দিলেও তাদের মুক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ‘সাধারণ ক্ষমা’র আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রের এই ‘সাধারণ ক্ষমা’ অনেকটা ‘রেললাইনে বডি দেব, মাথা দেব না’ নীতির পরিচায়ক। রাষ্ট্রের এই নীতি স্পষ্টভাবে তাকে উলঙ্গ করেছে, রাষ্ট্র যে ঘায়েল হয়েছে, তার শরীরেই ঘা খেয়েছে, তা প্রমাণিত। শিক্ষকদের মুক্তি পর্যন্ত এই আন্দোলনই পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বৃহৎ আন্দোলনের পাটাতন হিসেবে কাজ করে।

    প্রশ্ন: আপনি আন্দোলনের এই পর্যায়ে শুধু বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের কথাই বললেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র সংগঠনগুলো আছে তাদের কি কোনো তৎপরতা ছিল না?

    উত্তর: না, তাদের কোনো তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান হয়নি। আর আমার মনে হয় ‘জরুরী অবস্থা’ জারি হওয়ার পর মাৎস্যন্যায় নীতিতে বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর মতো নৈতিকশক্তি ছিল না। অপরদিকে এই ‘জরুরী অবস্থাতেই’ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো সাংগঠনিক দিক থেকে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। এছাড়া চিন্তা ও চর্চার অর্থাৎ পরিস্থিতি বোঝার স্বকীয় কোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখানকার বর্তমান বাম নেতৃত্বের নেই বললেই চলে। কিন্তু একেবারে ভেতরে ভেতরে কিংবা খুবই ঘরোয়াভাবে কোনো তৎপরতা ছিল কিনা তা ঐ ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন। আমার জানা নেই।

    প্রশ্ন: শিক্ষকদের মুক্তির এই আন্দোলনের পরে ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আহ্বানে অনেক বেশি সংগঠিত ও তীব্র একটা আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখলাম আমরা। এই মঞ্চটা গড়ে উঠল কেমন করে?

    উত্তর: আচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কিছুদিনের মধ্যেই মামলার শিকার শিক্ষার্থীরা আদালতে ‘আত্মসমর্পণ’ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তির পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির প্রশ্নটি মুখ্য হয়ে ওঠে। এই সময়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট, একাউন্টিং ইত্যাদি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে একমত হয়। এইসব বিভাগের সচেতন শিক্ষার্থীরা এক বৈঠকে এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে। বৈঠকে প্ল্যাটফর্মের নামের বিষয়ে কথা উঠলে বিভিন্ন নাম প্রস্তাবিত হয়। নামগুলো কোনোটি বিমূর্ত, কোনোটি রাজনৈতিক দলীয় লেজুড়বৃত্তির অসচেতন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বাতিল হয়ে যায়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছোট কাগজ কর্মী বাধন অধিকারীর প্রস্তাবনা ঈষৎ সংশোধন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ নামটি গৃহীত হয়। অতঃপর সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলা পার করে এর একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করা হয়। সমন্বয় পরিষদ ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ১৯ সদস্য বিশিষ্ট। পরে তা বর্ধিত হয়ে ২৬ সদস্য বিশিষ্ট হয়। এই সমন্বয় পরিষদ গঠনের পরে সংবাদ সম্মেলন করে ১০ই জানুয়ারী সংগঠনের আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করা হয়। বলে রাখা ভালো, সমন্বয় পরিষদ গঠনের একটা অন্যতম কারণ ছিল নিজেদের দ্বারা সংগঠিত কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করা। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ২০০৭ এর ২১ শে আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কিছু মুক্তিমুখীন সক্রিয়ক-মত সংগঠক-বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী-সাংস্কৃতিক কর্মী স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রতিবাদে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের উপর হামলা রুখে দাঁড়াও/ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না” উচ্চারণকে ব্যানারে লিখে মৌন মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে। এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চিন্তাসমৃদ্ধ এবং লক্ষ্য অভিমুখী। কিন্তু ২২ শে আগস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরোষের কারণে বিপুল পরিমাণ সহিংসতা ঘটে। এটা চিন্তা সমৃদ্ধ ও লক্ষ্য অভিমুখী সংগঠিত প্রতিবাদ ছিল না। কিন্তু ২২ তারিখে সহিংসতায় অংশ না নিলেও ২১ তারিখের প্রতিবাদে অংশ নেয়া ৪ শিক্ষক ও বেশ কিছু শিক্ষার্থীর ঘাড়ে এই সহিংসতার দায়ভার চাপানো হয়। তাই এখান থেকে আমাদের এটাই শিক্ষা হয় যে, আমরা যা করব তা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব নিয়েই করব। অন্যদের কার্যক্রমের দায়দায়িত্ব আমরা নেব না। ফলে এরকম পরিস্থিতিতে সেই দায়দায়িত্ব গ্রহণের অবস্থান থেকেই সমন্বয় পরিষদ তৈরি হয়।

    প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদ গঠনে সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলার কথা বললেন। সেটা কী?

    উত্তর: প্রশ্নটি খুব স্পর্শকাতর। কেননা এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলব তা সংকীর্ণ মনোভাবাপন্নদের খোঁচা মারামারির মতো কোনো ঘটনা হয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। উত্তরটিকে আমি যথা সম্ভব এ থেকে দূরবর্তী কোনো অবস্থানে নিয়ে দিতে চাই। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো কিছু একটা করতে চায়- আমাদের এমনটা মনে হয়েছিল। আবার সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানের জোট সভাপতি নোবেল ভাই এ বিষয়ে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন। ফলে আমাদের মঞ্চ গঠনের সভায় আমরা তাকে আমন্ত্রণ জানাই। সভায় তিনি এবং উদিচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্র ইউনিয়ন রাবি শাখার সদ্য বিদায়ী কার্যকরী সভাপতি প্রশান্ত কুমার মন্ডল আসছেন বলে আমরা জানতে পারি। সভা শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যে তারা সভায় যোগ দেন। ছাত্র ইউনিয়নের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক প্রমথেশ শীল সভাস্থলের পাশে থাকায় তাকেও আমরা সভায় যোগ দেবার কথা বলি। তার কাজ আছে বলে তিনি সভায় বসেননি। এরপরে সভায় মঞ্চের নাম ঠিক করা হয় এবং বন্দী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা, যে সংবাদ সম্মেলন করবেন তা তদারকির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার দায়িত্ব প্রশান্ত গ্রহণ করেন। আর অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র অসীম। সংবাদ সম্মেলনের জন্য মনোনীত স্থান হিসেবে রাজশাহী প্রেস ক্লাবকে নির্ধারণ করার কারণে আমি প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সভায় সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার সময় শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাগুলো উচ্চারণ  যেন কোনোমতেই না করা হয় সে বিষয়ে প্রশান্তকে সভা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। কেননা সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাটার স্বেচ্ছা উচ্চারণ সামগ্রিক ছাত্র আন্দোলনের বুকে ছুরি মারার শামিল। কিন্তু প্রশান্ত এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেননি। সংবাদ সম্মেলনে কারাবন্দী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। অভিভাবকরা সন্তানের মুক্তির জন্য খুবই আবেগী ছিলেন। এই আবেগঘন অবস্থায় তাদের সামনে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা তারা ঐ সময়ে নিঃশঙ্কচে পাঠ করে ফেলেন। দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন, ছাত্র আন্দোলনের ন্যায্যতার পরিপন্থী। আবার মঞ্চের সিদ্ধান্তকে সবগুলো পক্ষের সাথে আলোচনা না করে ‘এডভোকেট বলেছেন’ উছিলায় পাল্টে ফেলা স্বেচ্ছাচারের শামিল এবং তা মঞ্চের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে যায়। অঙ্কুরেই যে মঞ্চের কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়েছে তা কি আদৌ কোনোভাবে আগামীতে কার্যকর হতে পারবে?-এমন একটা শঙ্কা আমাদের অনেকের মনেই জেগেছিল। এমন সময় প্রমথেশ শীল আমাদের মঞ্চের দু-এক জন কর্মীর সামনেই বেশ দাম্ভিকভাবেই ঘোষণা করেন “আমি ঢাকা থেকে যে মিশন নিয়ে এসেছি, তাতে সফল হয়েছি।” মিশনের অর্থ বুঝতে আমাদেরও বাকি থাকে না। ফলে আমরা আরো দৃঢ় ও সতর্ক হয়ে উঠি এবং একেবারেই কাছাকাছি থাকা আন্তরিক কর্মীদের সমন্বয়ে একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেই। ঘোষণায় মঞ্চের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অবস্থান খুবই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়।

    প্রশ্ন: তাহলে এটা কী একটা ষড়যন্ত্র?

    উত্তর: না, বিষয়টিকে আমি একজন ব্যক্তির কিংবা ব্যক্তি যে সংগঠনের সাথে যুক্ত তাদের সংগঠিত একটা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে পছন্দ করব না। বরং এটা হচ্ছে পার্টি ঘরানায় চর্চিত সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। সেখানে যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে এটা মূলত তারই সংকট। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের দোষ না। এ ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চায় আন্দোলনকে ‘নিয়ন্ত্রণের’ একটা ইচ্ছা ও আচরণ গড়ে ওঠে। এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিজ হাতে রাখার জন্য অন্যান্য পক্ষগুলোর সাথে কখনও কখনও বিবাদে জড়িয়ে পড়া, নির্বিচার প্রচারণা চালান পার্টি ঘরানায় সাধারণ একটা ব্যাপার। ফলে এটাকে ষড়যন্ত্র নয় বরং পার্টি সংস্কৃতি বলেই চিহ্নিত করা যায়।

    প্রশ্ন: আপনাদের এই মঞ্চটার নাম কর্তৃত্ব -বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  দিলেন কেন? কর্তৃত্ব বিরোধিতা বলতে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন?

    উত্তর: সমাজ একটা শব্দের বিভিন্ন অর্থ চর্চা করে থাকে। ফলে কখনো কখনো শুধুমাত্র অর্থ চর্চার ভিন্নতার কারণেই শব্দ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আবার একই ধারণা বা অর্থকে ভিন্ন নামে বা প্রতীকে চিহ্নিত করার কারণে বিতর্ক থাকে। কর্তৃত্ব শব্দটিকে নিয়ে এমন ধরনের বিতর্ক অনেকের মধ্যেই আছে। তাই যে ধারণাটিকে আমরা কর্তৃত্ব শব্দ দ্বারা মূর্ত করতে  চেয়েছি সেই ধারণাটিকে প্রকাশ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কর্তৃত্ব মানে কর্তাগিরি। কর্তৃত্ব হচ্ছে সহজ কথায় শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সাধিত হওয়া। অর্থাৎ যখন কর্তার খেয়াল খুশি মোতাবেক কাজ করা হয়- যাতে অন্য কারো কিছু বলার বা করার থাকে না তখন তাকে কর্তৃত্ব বলা হয়। সুতরাং কর্তা হওয়া এবং অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর বা সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা দেয়াই হচ্ছে কর্তৃত্ব। কিন্তু এই মাফিক কর্তা কে? কোনো ব্যক্তির বাইরের শক্তি যা ঐ ব্যক্তির ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই ব্যক্তির উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। সুতরাং কর্তৃত্ব হচ্ছে একটা সম্পর্ক যেখানে কর্তা ও উদ্দিষ্ট থাকে এবং কর্তা উদ্দিষ্টের উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। কর্তৃত্ব বলতে আমি শক্তিমানের বলপ্রয়োগ কেই বুঝি। আবার কর্তৃত্বের সাথে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক আছে। কর্তৃত্ব যদি ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ সাপেক্ষ হয় অর্থাৎ চুক্তির বাঁধনে বাঁধা পড়ে এবং চুক্তির উপর ছদ্ম-সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই আমরা তাকে ক্ষমতা বলতে পারি। সুতরাং ক্ষমতা নিজেও হচ্ছে এক ধরনের সম্পর্ক। ক্ষমতা সম্পর্ক হচ্ছে ‘বল প্রয়োগের স্বীকৃত’ ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ যা ছদ্ম-সম্মতির দ্বারা ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হয় এবং সামাজিক সম্পর্কের যুথবদ্ধতার সূত্রকে ভেঙ্গে কর্তৃত্ব কায়েম করে। এই কর্তৃত্ব আরোপন যখন একমুখী হয়ে পড়ে তখন তাকে বলা হয় অসম ক্ষমতা সম্পর্ক। এই অসম ক্ষমতা সম্পর্ক মূর্ত হয়ে ওঠে প্রধানত চারটি বিষয়ের মাধ্যমে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে

    ১. ভূমির অসম মালিকানা,
    ২. শ্রমের উদ্বৃত্ত শোষণ,
    ৩.  দেহগত বা লেঙ্গিক আধিপত্য,
    ৪. ভাষা-সংস্কৃতি-জ্ঞানগত আধিপত্য।

    কর্তৃত্বের এই প্রধন চতুর্মূর্তিই সকল প্রকার শোষণশাসন ও আধিপত্যের জড়। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতা বলতে আমি এই  শোষণশাসন ও আধিপত্যের বিরোধিতা এবং এগুলোকে সমাজ থেকে চিরতরে উচ্ছেদের জন্য তৎপরতা চালানকেই বুঝি। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়। এই চিন্তা ও ধারণাকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মঞ্চের নাম দিই কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ।

    প্রশ্ন: আপনি অসম ক্ষমতা সম্পর্কের যে চারটি দিকের কথা বললেন, তা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র তো একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তাহলে আপনি কি রাষ্ট্রেরও বিরোধী?

    উত্তর: এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে ভুল বোঝার অবকাশ থাকবে। তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য আমাকে আগে দেশ ও রাষ্ট্র এ দুটো ধারণাকে আলাদা করে নিতে হবে। কেননা আমাদের এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও দেশ ও রাষ্ট্র বলতে একই জিনিস বোঝেন। প্রকৃতপক্ষে দেশ ও রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। দেশ বলতে আমি চিরচেনা প্রতিবেশের মধ্যে স্বাধীনতা ও সংহতি চর্চার  যে বৃহত্তর ক্ষেত্র গড়ে ওঠে, তাকে বুঝি। লোপামুদ্রার গানে “আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক” কিংবা “মন যতদূর চাইছে যেতে ঠিক ততদূর আমার দেশ”-এই উচ্চারণ আমার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন যোগায়। অপরদিকে রাষ্ট্র হচ্ছে শাসনের তথা ক্ষমতা-কর্তৃত্ব-আধিপত্যের একটা সংস্থা-কেন্দ্রীয় সংস্থা। সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া, সিদ্ধান্ত দেয়া অর্থাৎ সকল বিষয়ে নাক গলানোর এবং মাতবরির ক্ষমতাধারী একটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রকে একটা ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতার অস্তিত্বের শর্ত হচ্ছে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ। ফলে অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কী পরিমান ক্ষমতা, কখন, কেন এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে তা চুক্তি তথা সংবিধানে লিখিত থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোটি চরমভাবে ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক এবং এটি বিশাল আমলাতান্ত্রিক বপুসমৃদ্ধে জিনিস। ফলে এটি খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক সুরতালছন্দে নড়াচড়া করে। এ কারণে সংবিধান বা চুক্তিপত্রের সৃজনশীল প্রয়োগ তার পক্ষে সম্ভব হয় না। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। কোনো এক আইনে লেখা ছিল: ঘোড়া চুরি করলে শাস্তি  ভোগ করতে হবে। কিন্তু কোনো চোর ঘোড়া নয়, ঘোড়ার বাচ্চা চুরি করলে তাকে বেকসুরখালাস দেয়া হয়। কেননা আইন ও তার ভাষার পাঠ উদ্ধার এবং সেই মাফিক তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা সৃজনশীল থাকতে পারেন না। আবার রাষ্ট্র যখন নিজকে পিপলস রিপাবলিক  বলে পরিচয় দেয় তখন রাষ্ট্রক্ষমতা চালনার জন্য জনগণের প্রতিনিধি দরকার হয়ে পড়ে। এই প্রতিনিধিদের ঐক্যের জন্য মতাদর্শও দরকারি হয়ে পড়ে। আর মতাদর্শের চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় পার্টির। এই পার্টি হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে হাইফেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কেন্দ্র-কর্তৃত্ব এবং তার কাঠামোগত সেটিং এর কারণেই জনপ্রতিনিধিরা হয়ে পড়েন ‘ব্লাঙ্ক চেক প্রাপ্ত’। সিদ্ধান্ত গ্রহণ  প্রক্রিয়ায় জনগণের সম্মতি বলতে স্রেফ ঐ মতাদর্শ। ফলে প্রকৃত অর্থে তার কাজ ঘলো সিদ্ধান্তকে ‘ইয়েস’ অথবা ‘নো’ বলা। কখনও কখনও সেটার সুযোগও থাকে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রকে আমি কোনোভাবেই জনগণের প্রতিষ্ঠান বলতে পারি না। তার ক্ষমতাকেও আমার জন্য বৈধতা দেয়ার কোনো কারণ নাই। আমার কোনো একটা লেখায় আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সেলিমঃরেজা নিউটনকে আমি উদ্ধৃত করেছিলাম। রাষ্ট্র সম্পর্কে আমার বিচার ঐ উদ্ধৃতিরই অনুগামী। সেই মাফিক রাষ্ট্রের যে ধারণা আমার কাছে দাঁড়িয়েছে: আধুনিক কালে রাষ্ট্র হচ্ছে এলিটদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ম্যানেজারিয়াল সিস্টেম। এলিটদের স্বার্থরক্ষাকারী সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার কমিটি হচ্ছে এই রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নামক এই কমিটির কাজ এলিটদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা, ছোটলোকদের শোষণ করে বড়লোকদের ধনসম্পদ পাহারা দেয়া, মৌলিক অর্থে ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণী-গোষ্ঠী-দল-শক্তিকে ধ্বংস করা ইত্যাদি। এলিটদের-শাসকশোষকদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ‘সমন্বয়’ সাধন করা এই কমিটির আরেকটা কাজ।‌‌‌‌‌‌ এই সব ফরজ কর্ম সম্পাদনের জন্য এই কমিটির হাতে থাকে আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিচার বিভাগ বা আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহ, উর্দি বিভাগ বা পুলিশ-সেনা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ মিডিয়া বা মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। সুতরাং সমাজ পরিচালনার জন্য এইরকম গণবিরোধী একটা প্রতিষ্ঠানের স্থলে রুডলফ রকারের মত আমি চাই ‘স্বাধীন সম্প্রদায়সমূহের একটি ফেডারেশন’। রকারের মতে, এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো পরস্পরের সাথে সাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের সূত্রে সম্পর্কিত থাকবে। নিজেদের কর্মকাণ্ডের বন্দোবস্ত করবে পারস্পরিক সম্মতি আর স্বাধীন চুক্তির মাধ্যমে। এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো প্রত্যেকেই স্ব-ব্যবস্থাপনা ও অংশীদারিত্বমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার নীতিতে বিশ্বাসী হবে। আর যার চিন্তাভাবনা বিচার-আচার এমন, আকাঙ্ক্ষা এমন, সে রাষ্ট্রবিরোধী না হয়ে পারে না। আমি কর্তৃত্ব-বিরোধিতার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্র বিরোধী।

    প্রশ্ন: এই আন্দোলনে যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে, কাছাকাছি একইরকম কর্মসূচি দিয়ে আগেও অনেক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। তাহলে এই আন্দোলনকে বিশেষভাবে ‘অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

    উত্তর: হ্যাঁ, কাছাকাছি কিন্তু হুবহু একই রকম কর্মসূচি এই আন্দোলনে পালিত হয়নি। মূলত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের যে সেন্টিমেন্ট সেই মাফিকই কর্মসূচিগুলা এক্ষেত্রে ঘোষিত ও পালিত হয়েছে। এখন প্রশ্নটা দাঁড়ায় কেন এটাকে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন বলা হল। রাষ্ট্র-রাজনীতির দমনপীড়ণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। যেমন, ২০০৪ সালের ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ এর ২২ শে আগস্ট’র মতো আরো কিছু ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়,যেখানে খুব বিশেষ মাত্রায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ দেখা যায়। এই ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে অংশ নিতে দেখা যায়। প্রতিরোধের এই ভাষা সংগঠিত নয় এবং স্রেফ বিশুদ্ধ গণরোষে ভরা। আবার অসংগঠিত বলেই পরবর্তী সময়ে তা প্রয়োজনমত প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণেই গণরোষের আসল কারণটা চাপা পড়ে যায়। ফলে তা সমর্থনও হারায়। আমরা এই সবকিছু থেকে সতর্ক থাকতে চেয়েছিলাম। সাধারণ শিক্ষার্থীপদর স্বতঃস্ফুর্ত ও বিপুল অংশগ্রহণ হলে সেখানে কোনো ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী যেন হঠাৎ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা ইত্যাকার সহিংসতার হুজুগ তুলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে এইজন্যই আমরা এই আন্দোলনকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন হিসবে সবার সামনে হাজির করি। যেন আন্দোলনের সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে পারে। এই আন্দোলনের এরকম নামকরণের আরো একটি কারণ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী যেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নিতে পারে, দ্বিধাগ্রস্থ না হয়। কেননা বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এধরনের কর্মসূচিতে আপামর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দেখিনি। আর যে প্রক্রিয়ায় এগুলো হয়ে থাকে তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত হবার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তাই আমরা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের  সময় এমন কর্মসূচিই ঠিক করেছিলাম যেন সবাই অংশ নিতে পারে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, জন-সম্পৃক্ততা। এজন্যই আমরা মানববন্ধন, গণর‌্যালি, দুই ঘন্টা স্বতঃস্ফুর্ত ক্লাস বর্জন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গণসংযোগে প্রচারপত্র ব্যবহার, আন্দোলনের চিন্তাধারা বোঝার জন্য মুক্ত আলোচনা ও গণসংলাপ  ইত্যাদি ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। এমনকি এবারের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক দিকটিও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। র‌্যালি, মানববন্ধন, সমাবেশ প্রভৃতি কর্মসূচিতে নতুন ধারার গণসঙ্গীত ছাড়াও প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার, ব্যঙ্গচিত্রসহ নানান ধরনের ডেমোনেস্রট্রশনে সৃজনশীলতার ছাপ দেখা যায়। পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোতে আমি এমনটা দেখিনি। ফলে এবারের এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন  সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন রূপ ধারণ করেছিল।

    প্রশ্ন: আন্দোলনে সাংগঠনিক কাঠামোটা কেমন ছিল, সিদ্ধন্তগ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল, কোনো সমস্যার জায়গা ছিল কিনা, থাকলে  সেটা কেমন?

    উত্তর: সংগঠন বলতে আমি বুঝি, একটি বিশেষ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তা বাস্তবায়নের জন্য কিছু মানুষের মধ্যে চিন্তা, সৃজন ও তৎপরতার সংহতি। পারস্পারিক যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতাই এই সংহতির প্রধান ভিত্তি। ফলে আমার ধারণায় এবং আমার মতো অনেকেরই ধারণামতে সংগঠন মানে তা ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্রমুক্ত একটা জিনিস। এই ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। সাধারণত পলিটিক্যাল পার্টি কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজের দায়িত্ব ভাগ করার নামে নানান ধরনের পদ তৈরি করা হয়। এই পদগুলোকে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাও দেয়া হয়। ফলে ক্ষমতার নির্দিষ্টতা অনুসারে উপরতলা-নিচতলা তৈরি হয়। সাধারণত উপরতলার প্রধান ব্যক্তিটি হন সভাপতি আর তারপর ক্রমঅনুসারে সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক প্রভৃতি পদ বিন্যস্ত থাকে। এখানকার সাধারণ সংস্কৃতি হচ্ছে: উপরতলার লোক নিচতলার লোককে হুকুম বা নির্দেশ দেবেন এবং নিচতলার লোক বিনা বাক্যব্যায়ে তা পালন করবেন। আর এটা করতে পারলেই নিচতলার লোক একদিন উপরতলায় যেতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে মূলত ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠানের গুটিকয়েক লোকের হাতে ন্যাস্ত হয়ে পড়ে। এবং এই গুটিকয়েক লোক সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন। ফলে ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র ক্ষমতার কেন্দ্রানুগতাকেই ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্র-কর্তৃত্বকে জায়েজ করার জন্য নানান ধরনের পলিটিক্যাল পার্টি ঘরানা থেকে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র আওয়াজ শোনা যায়। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ জিনিসটি একটি মিথ। গণতন্ত্র বলতে প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতি’র নিশ্চয়তাকে বোঝায়। কিন্তু কেন্দ্র মানেই অসম ক্ষমতা- অপরের উপর কর্তৃত্ব। আর সম্পর্ক যখন কর্তৃত্বমূলক তখন সেখানে সংহতি থাকতে পারে না। সংহতির নামে খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক একটা সম্পর্ক টিকে থাকে। ফলে গণতন্ত্র ও কেন্দ্র সমার্থক হতে পারে না। আর এসব চিন্তাকে মাথায় রেখেই আমরা কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ এই মঞ্চটিকে সম্পূর্ণরূপে ক্রমকর্তৃকতন্ত্রমুক্ত রাখতে চেয়েছি। এই জন্যই সমন্বয় পরিষদে কোনো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক- আহ্বায়ক ছিল না, প্রত্যেকেই সমান অধিকারসম্পন্ন সদস্য ছিলেন।

    প্রশ্ন: এই সমন্বয় পরিষদেরও তো তাহলে একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল…

    উত্তর: এই বিশেষ মন্তব্যটি করার আগে মঞ্চের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি বিবেচনায় রাখার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাব। সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের নানান ধরনের মতামত ও প্রস্তাব সংগ্রহ করা। অতঃপর সেই মতামত ও প্রস্তাবগুলোকে পর্যালোচনা করা, সাথে সাথে নিজেদের চিন্তা-মতামত প্রভৃতি উপস্থাপন করে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। এই কর্মপরিকল্পনা কোনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়- প্রস্তাব মাত্র। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সক্রিয়-আন্তরিক ও মত-সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের নিয়ে একটি সাধারণ বৈঠকে বসে প্রস্তাব আকারে এগুলো হাজির করা হত। সেখানে বিষয়টি সমর্থিত হলেই কেবল কর্মসূচি হিসেবে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের উদ্দেশ্যে সেটা হাজির করা হত। সকল কর্মসূচির ভিত্তিই ছিল স্বতঃস্ফুর্ততা। বলপ্রয়োগমূলকভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করা হত না। যেমন আন্দোলনের সময় দুই ঘন্টা ক্লাস বর্জন। আমরা এই কর্মসূচি পালনের জন্য শুধু প্রচার চালিয়েছি। কোনো ক্লাসরুমে উপস্থিত হয়ে ক্লাস বন্ধ করতে বলিনি। তবে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চাইছেন না কিন্তু শিক্ষক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ক্লাস করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন, শুধু এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে আমরা প্রতিরোধ গড়ব- এমন পরিকল্পনা আমাদের ছিল। কিন্তু তা প্রয়োগের প্রয়োজনই পড়েনি। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধন্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কোনো কেন্দ্রের হাতে বন্দী ছিল না। এটা একটা প্রবাহের মতো বিষয় হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সমন্বয় পরিষদ আলাদা কোনো বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করার মতো কাঠামোই ছিল না।

    প্রশ্ন: কিছু কিছু সময়ে দেখা যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবেও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়ে। সেক্ষেত্রে কী হতো?

    উত্তর: তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কী হবে সেইটা নিয়ে আমি নিজেই শঙ্কিত ছিলাম। কেননা হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা তো খুবই কঠিন। যদি সমন্বয় পরিষদ ছোট ছোট কিছু একটিভিস্ট গ্রুপের কিংবা ক্যাটালিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হতো এবং এদের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সমন্বয় পরিষদ গড়ে উঠত তাহলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কঠিন হত না। আর যেহেতু সাধারণ সভায় বেঁধে দেয়া গাইডলাইনের বাইরে সমন্বয় পরিষদের প্রতিনিধিরা কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না সেহেতু প্রতিনিধিরা ‘ব্ল্যাংক চেক প্রাপ্ত’ বা স্বৈচ্ছাচারী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো না। কিন্তু মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে এরকম একটিভিস্ট গ্রুপ না থাকলেও কতকগুলো পক্ষ ছিল। এই পক্ষগুলোর মধ্যে যারা সমন্বয় পরিষদে ছিলেন তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ দু-একজন করে মত-সংগঠকরা কোনো তাৎক্ষণিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে অন্য পক্ষের মত-সংগঠকদের সাথে আলোচনা করে নিজ নিজ পক্ষগুলোর সাথে কথা বলে নিতেন। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন হবে- এ বিষয়ে কোনো জমাট ধারণা আমার কিংবা মঞ্চের অন্য অনেক সদস্যেরই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এটা নির্ধারিত হবে এমন একটা ভাবনাই আমার ছিল এবং বর্তমানে আমার উপলব্ধি হচ্ছে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন (সমন্বয় পরিষদকে কতকগুলো একটিভিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তোলা) আনলেই এই ধরনের সমস্যাগুলো আমরা উত্তরণ করতে পারি।

    প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে তখন কী ভোটাভুটি হত?

    উত্তর: আমাদের আশপাশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হ্যাঁ অথবা না মতকে বোঝার সংস্কৃতি দাঁড় হয়েছে। আপনি যেটাকে ভোটাভুটি বললেন। এ ধরনের পদ্ধতির একটা বড় দুর্বলতা হলো, এটা বিতর্ককে এড়িয়ে যেতে চায়। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের সাথে একমত না হলেও সংখ্যালঘিষ্ঠকে অনুগত’র মতো তা বাস্তবায়ন করতে হয়। ঐ মতামত নিয়ে জনসংযোগের সময়ে যদি কোনো ব্যক্তি সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামতটির সাথে ঐক্যমত্য হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আর জনসংযোগকারী যদি হন সংখ্যালঘিষ্ঠ তবে তিনি খুব বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। এছাড়া যে মতের সাথে একজন একমত নয়, সেই মত বাস্তবায়ন করা তার জন্য মানসিক চাপ। এটা প্রায় একটা স্বাধীনতা হরণকারী প্রক্রিয়া। এজন্য মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে কোনো বিষয়ে একাধিক মত থাকলে তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে তা ফয়সালা করার চেষ্টা হতো। একটা বিষয়ের উপর ঘন্টা দুই-তিনেক আলাপ-আলোচনার নজির এই সমন্বয় পরিষদের ছিল। তীব্র তর্ক-বিতর্ক এখানে সংঘটিত হয়েছে। এর পরেও একমত না হতে পারলে উদ্ভুত সকল মতামত আন্দোলনকারীদের সাধারণ বৈঠকে উপস্থাপন করা হত। সাধারণ বৈঠকের মধ্যেও তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এর পরেও কোন কারণে ঐক্যমত্য না হলে ঐ বিশেষ ইস্যু বা কর্মসূচি পর্যন্ত যে কোনো সদস্য নিজের নাম প্রত্যাহার করতে পারতেন। এমনকি জনসম্মুখে ইস্যু বা কর্মসূচির ক্ষেত্রে ভিন্নমত প্রচারের ও সেই মাফিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ ছিল। এ প্রক্রিয়ায় এখানে সংগঠক-সক্রিয়কের স্বাধীনতা সংরক্ষিত ছিল। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে, যেমন, ক্লাস আওয়ারে মাইক ব্যবহার কিংবা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট (এই কর্মসূচি পালনের প্রয়োজন পড়ে নি, তার আগেই শিক্ষার্থীরা মুক্তি পেয়ে যায়।) এইসব সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি বিষয়ে দ্বিমত ছিল। কিন্তু ক্লাস বর্জন কর্মসূচি শুরু হলে এবং বৃহৎ সমাবেশে বক্তব্য পৌঁছোনোর জন্য মাইক ব্যবহার বিষয়ে দ্বিমতটি আর ছিল না। আর স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট কর্মসূচিটিতে দুই-তিন জন সমন্বয় পরিষদ সদস্য দ্বিমত  পোষণ করেছিলেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। সমন্বয় পরিষদের অন্য সদস্যরা তাদের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

    প্রশ্ন: কিন্তু কোনো ইস্যু বা কর্মসূচি নিয়ে দুই তিনটা মত প্রচার ও সেই মাফিক তৎপরতা চালালে মঞ্চের ভেতরে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না? আবার যখন মানুষ দেখবে যে একই ব্যানার নিয়ে দুই-তিন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে তখন কী বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে না?

    উত্তর: না, বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না। কেননা বৃহত্তর মূলনীতিতে লড়াইটা অনায্য কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ফলে একাধিক ধরনের কর্মসূচি শেষ বিচারে সমান্তরাল চাপই তৈরি করে। ফলে  সেখানেও একটি ঐক্য তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে একই নামের কিন্তু আলাদা মতের একাধিক ব্যানার থাকলে জনগণ যে মতটি সমর্থন করে সে তাতেই অংশ নেয়।

    ফলে নামের অন্ধ অনুসরণ নয় বরং মতামত ও বক্তব্যের ভিত্তিতে সমর্থন ও অংশগ্রহণ- এই বিষয়টিই এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু একটা নামকে-একটা ব্যানারকে অন্ধ অনুসরণ- মূলত এরকম কোনো অবস্থান থেকে বিভ্রান্তির সমস্যাটা দেখা দিতে পারে। একজন যদি এটা ঠিক করে ফেলে যে, তিনি সবসময়ই এই নামটাকে-এই ব্যানারটাকেই সমর্থন করবেন, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রথমত নাম-ব্যানারের অন্ধ প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং যাচাই বাছাই ছাড়াই নির্বিচারে ব্যানারের সিদ্ধান্ত মানতে থাকেন। ফলে তিনি বিভ্রান্ত হন। কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চ এরকম সমস্যার মধ্যে পড়েনি। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি অভিজ্ঞতার অবস্থান থেকে দিতে পারছি না। সাধারণ যুক্তি চর্চার অবস্থান থেকেই আমি এরকমভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করছি।

    প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর কয়েক দিন পরেই আমরা দেখলাম যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘোষণাকারী নির্যাতন বিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ নামে আরেকটি ব্যানার থেকে আন্দোলন শুরু করা হয়। আন্দোলনের সময় এই দুই মঞ্চের সম্পর্ক কেমন ছিল?

    উত্তর: প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো ২০০২ সালে শিবির-বিরোধী আন্দোলনের সময় নির্যাতনবিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করে। ঐ একই সময়ে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রী নির্যাতন, বুয়েটে সনি হত্যাকান্ড এসব কিছু মিলিয়ে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মঞ্চটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই আত্মপ্রকাশ করে। এই মঞ্চটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংগঠিত কোনো মঞ্চ নয়। মূলত বাম ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বারা সংগঠিত এবং কিছু সচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় ঐ সময়ে এ মঞ্চটি গড়ে উঠেছিল। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আন্দোলন সংগঠিত হলেও কখনোই এ মঞ্চের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় নি। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময়ে এই মঞ্চটি আবার দেখা যায়। এবার এই মঞ্চটি গঠন প্রক্রিয়ায় প্রধানত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন যুক্ত ছিল। তাদের দিক থেকে এরকম একটা মঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আমি কিছুটা অনুমান করতে পারি। ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করতে করতে শিক্ষার্থীদের থেকে অনেকখানি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবার রাজনৈতিক দলের অংশ হিসেবে দলের মতাদর্শকে তারা ধারণ করে। এই মতাদর্শ একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নাও ধারণ করতে পারে। তখন ঐ সাধারণ শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত হলেও স্রেফ ঐ মতাদর্শের কারণেই ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে একাত্মতা বোধ করে না। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে কলস পাল্টাতে হয়। ছাত্র সংগঠনগুলো কলস পাল্টে এরকম মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে। এসব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পেছনে সত্যিকারই আন্দোলনের স্পিরিটের চেয়ে, কিংবা কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ, পরবর্তীতে সংগঠন করান ইত্যাদি বিষয়ই মুখ্য হয়ে পড়ে। ফলে একটা সত্যিকারের আন্দোলন গড়ে ওঠা এবং তা থেকে প্রগতিশীল অর্জনগুলো সংঘটিত হয় না। আবার ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন বলেই এই মঞ্চগুলোরও কাজের ধাঁচ অনেকটা ছাত্র সংগঠনগুলোর মতোই কেন্দ্রমুখাপেক্ষী। সেজন্যই এখানকার বাস্তব অবস্থা বিচারের চোখ কিংবা বলতে পারি, যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার মধ্যে থাকলে বাস্তব অবস্থা বিচার করা যায় তা তাদের ছিল না। এখানে এই মঞ্চটি সংগঠিত করার পেছনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামানোর একটা প্রচেষ্টা ছিল। আর অপরদিকে আমাদের মূলনীতির জায়গাটি ছিল: নিয়ন্ত্রণ নয়, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। ফলে দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান এবং সাংগঠনিক সেটিং-এর কারণেই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এই মঞ্চটি গঠন করে। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের প্রধান ধারা হিসেবে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই আন্দোলনের প্রধান ধারার কর্মসূচির সাথে তারা একাত্মতা ঘোষণা করে এবং নিজেরা ছোটখাট দু-তিনটি কর্মসূচি পালন করে। তাদের এই কর্মসূচিগুলোতে আমরা সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে পারেনি। বরং সামগ্রিক আন্দোলনে কিছু অবদান রেখেছে। আবার ঐ মঞ্চটি দাঁড় হওয়ায় আন্দোলনের কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারার আলাদা পরিচয় স্পষ্ট হয়েছ।

    প্রশ্ন: আন্দোলনের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনাকে দেখা গেছে সমাবেশে, র‌্যালিতে বক্তব্য রাখতে, কর্মসূচি ঘোষণা করতে। এ থেকে অনেক শিক্ষার্থীরই হয়তো এমন ধারণা জন্মেছে যে, আপনি এই আন্দোলনের নেতা। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী? আন্দোলনের নেতৃত্বে বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আপনি?

    উত্তর: হ্যাঁ, এটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি সমাবেশে, র‌্যালিতে কিংবা মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতাম। এবং পরবর্তী দিনের কর্মসূচীও ঘোষণা করতাম। প্রচলিত সংস্কৃতিতে এরকম একটা ধারণা আছে যে, যিনি সমাবেশে বক্তৃতা করেন তিনিই নেতা এবং নেতাই সামগ্রিক আন্দোলনের ভাগ্য বিধাতা। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থীরই মনে হয়েছে যে, আমি এই আন্দোলনের নেতা। এই বিষয়টি আমাকেই সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত করে তোলে। আমি আন্দোলনের সময়ই এ বিষয়ে সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এবং অন্যদেরকে ক্রমানুসারে এই কাজটির দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাবও রাখি। সেই মাফিক অন্যদের অনুরোধে দু-একজন সেই চেষ্টাটা করেন। কিন্তু মঞ্চের সামগ্রিক বক্তব্য ও ধারণা স্পষ্ট করে বলতে পারার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে-এ কথা বলে তারা পরবর্তীতে সেই দায়িত্ব নিতে চাননি এবং তারপরে কেউই স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই কাজটির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার বিশেষ দু-একজনের ক্ষেত্রে অন্যদের তীব্রতর আপত্তি ছিল এবং তাদের আপত্তির যুক্তি সমন্বয় পরিষদে সমর্থিত হয়। তখন আমার প্রস্তাব ছিল যে, যেমনই হোক না কেন মঞ্চের অনান্য সদস্যরা বক্তব্য রাখবেন, কোনো সংশোধন বা সংযোজন থাকলে আমি তা পরে যুক্ত করব। কিন্তু এই কাজের জন্যও লোক পাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মঞ্চের সিদ্ধান্তে কর্মসূচিগুলোত আমি বক্তব্য রাখি। তবে নিজের মনগড়া এবং সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দ্বিমত আছে এমন কোনো বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার আমার ছিল না। মঞ্চের লিফলেট, সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য, বিভিন্ন সভায় সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের দ্বারা সমর্থিত চিন্তা-ধ্যানধারণা অনুযায়ী বা একই ধ্যানধারণাই কিন্তু ভিন্ন ভাষায় আমি বক্তব্য উপস্থপন করতাম। ফলে আমার কাজটা ছিল অনেকটা মুখপাত্রের মতো। দুতিনবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমি মঞ্চের গাইডলাইনের বাইরে চলে যাই। মঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা এ বিষয়ে আমাকে সতর্ক করে দেন। আমি আমার ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। সুতরাং আমি খুবই স্পষ্টভাবে বলতেই যে, আমি কোনোভাবেই এই আন্দোলনের ভাগ্যবিধাতা- নেতা নই। আন্দোলন চলাকালে মিডিয়ার সামনেও আমি এই বক্তব্যই দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বিবেকই ছিল এই আন্দোলনের নের্তৃত্ব। একটি আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে থাকে বহুদিনের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন। বহুদিন ধরে এই চিন্তাভাবনা ও অনুশীলনগুলোর সারাংশ করা, ব্যাখ্যা প্রদান করা, প্রচার করা এবং জনগণের মধ্যে আন্দোলনের নায্যতার পক্ষে হরহামেশা বক্তব্য উপস্থাপন করার কাজগুলো কোনো না চিন্তাধারায় মত-সংগঠকরাই করে থাকে। এই মত-সংগঠকরা কখনো খুবই সুসংগঠিত, কখনো আবার স্রেফ একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে বিস্তৃত থাকে। আর তাদের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন যদি জনগণের কাছে ন্যায্য বলে মনে হয়, তখনই কেবল তাতে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়। ফলে কোনো আন্দোলন শুধু এই মত-সংগঠকদের উপর নির্ভরশীল বিষয় নয়। এর প্রধান বিষয়টিই হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা। কোনো একটি গোষ্ঠীর কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলা, আন্দোলন সৃষ্টি করে না। আন্দোলন তখনই সৃষ্টি হয় যখন তাতে জনসম্পৃক্ততা ঘটে। ফলে নেতৃত্ব বিষয়টিকে আমি ব্যাখ্যা করি মত-সংগঠক ও জনসম্পৃক্ততা- এই দুইটি বিষয়ের একটি যুগপৎ সম্পর্ক হিসেবে। কিন্তু মিডিয়া এবং ইতিহাস লেখার যে ছক আছে তাতে প্রায়ই নেতৃত্ব বলতে মত-সংগঠকদের মধ্য থেকে হাতে গোনা এবং জনস্রোতের মধ্যে ভেসে থাকা দু-চার জন লোককে বোঝানো হয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় নের্তৃত্বের যে ধারণা নির্মাণ করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে গণমুখী অর্থ ধারণ করে না।

    প্রশ্ন: যে কোনো কাজ সম্পন্ন করার পরেই তো সেটা নিয়ে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়। আমরা সেখান থেকে কিছু শিখতে পারি। এবারের আন্দোলনের পর আপনার অভিজ্ঞতা কী? কী শিখলেন আপনি?

    উত্তর: আন্দোলন হচ্ছে জীবন শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠশালা। ফলে এবারের আন্দোলনেরও কিছু শিক্ষা আছে। আমি এই আন্দেলন থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় শিখেছি। আমি প্রথমত শিখেছি জনসম্পৃক্ততাই একটি আন্দোলনের প্রধান বিষয়। ফলে তাই ঘটে যা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ চায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই চলে না, তা পাহারা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। তৃতীয়ত, বিবেক যখন আন্দোলনের নের্তৃত্ব তখন রাষ্ট্র ও অনান্য ক্ষমতাশক্তির প্রচার-প্রচারণা ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়ে।

    প্রশ্ন: শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তি ছাড়া এই আন্দোলনে এমন কী অর্জিত হয়েছিল যার কারণে এই আন্দোলনকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরী পর্ব নামে আখ্যায়িত করলেন?

    উত্তর: সাম্প্রতিক আন্দোলন শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির আন্দোলন না। এই আন্দোলন রাষ্ট্র ও অনান্য দাপুটে আধিপত্যশীল ক্ষমতার বিরুদ্ধে তথা বৃহত্তর অর্থে অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন। তাই রাষ্ট্রের ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে জরুরি প্রতিবাদ, জরুরি প্রতিরোধ এই আন্দোলনের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়েছে।

    ‘জরুরী আইনের’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকেছিল, তা থেঁতলে দেয়া রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জরুরী অবস্থা’ শিথিল হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ধরনের তৎপরতা প্রকাশ্যে সংগঠিত হতে পারছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রক্টরিয়াল আইনের বিধিনিষেধগুলো দূর্বল হয়ে গেছে, যার কারণে আন্দোলনের এই মঞ্চ থেকে যখন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার উপর, যে নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল তা অমান্য করার ঘোষণা দেয়া হয়, তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ আলোচনা সভা, সেমিনার, পাঠচক্র, প্রদর্শনী, উৎসব প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের অনুমোদন দেয়া শুরু করে। ‘জরুরী অবস্থার’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রধান ক্ষেত্র কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালাতে পারছিল না, তৎপরতাহীনতার কারণে ক্রমেই সদস্যহীন হয়ে পড়ছিল। আন্দোলনের পরে সেই সংগঠনগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ঐক্যের শক্তি, রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সবসময় চাপের মুখে রাখছে। এতে ‘জরুরী অবস্থার’ মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার সীমা প্রসারিত হয়েছে। এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই আন্দোলন আত্মপরিচয় নির্মাণের আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয় নির্মিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মানেই মৌলবাদী, প্রতিবাদহীন, সহিংস কিংবা অনাধুনিক-খ্যাত ইত্যাদি। এখানকার তাবৎ প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড মানেই তার স্থান সংবাদপত্রের ‘১৭ নম্বর পাতা’। কিন্তু যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নিয়েছে সে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাহীন নয়। এখানে  যেমন শিবির আছে তেমনি মুক্তিকামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীরাও আছেন। ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উত্তরাধিকার এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয়ের বিরুদ্ধে সত্যিকারের আত্মপরিচয় পুনঃনির্মাণের সূচনা ছিল এই আন্দোলন। এই আন্দোলন যে, শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির আন্দোলন ছিল না, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বানও এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল তা আন্দোলনের সময়ের প্রচারপত্র-প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-ব্যানার কিংবা আন্দোলনকারীদের লেখাপত্রের মধ্যে খুবই স্পষ্ট। অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাশক্তি, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা-অধিকারকে সংকুচিত করে ফেলে। আর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে যখন এই ঘটনা ঘটে তখন সামগ্রিক চিন্তা ও সৃজন রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার শ্লোগান,  এই অর্থে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার আকাংক্ষাকেও ব্যক্ত করে। আবার এই শ্লোগানের মাধ্যমে ‘জরুরী আইনে’র বিরুদ্ধে জরুরি প্রতিরোধের ন্যায্যতাকেও তুলে ধরা হয়। এই আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যম বিশেষত গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। খুব বিচ্ছিন্নভাবে এবং ব্যক্তিগত বা বন্ধু পরিমণ্ডলে নতুন ধারার গণসঙ্গীত বা জীবন ঘনিষ্ঠ গানের চর্চা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তা প্রকাশিত ছিল না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের সময়ে র‌্যালি, সমাবেশ, মানববন্ধন প্রভৃতিতে যে গণসঙ্গীতগুলো উচ্চারিত হয়েছে তা ধ্রুপদী গণসঙ্গীতের ধারা যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো চর্চা করে তার থেকে আলাদা। তারুণ্য-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ কিন্তু তার মাঝেও ঘুড়ে দাঁড়ানোর কথা এই গানগুলোতে ছিল। সংগ্রাম-সংহতি-ভালেবাসা মিলেমিশে একাকার হয়েছে এই গানগুলোতে। এটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বাঁক।

    আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
    শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের পক্ষ থেকে “একুশ আমার বর্ণমালা” শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসূচি কতোটা সফল ছিল? মঞ্চের ভবিষ্যৎ কতোটুকু সম্ভবনাময়?

    উত্তর: হ্যাঁ, আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর মঞ্চের ব্যানারে একুশ আমার বর্ণমালা  শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষিত হয়। বৃহত্তর একটি আন্দোলনের পর সেই আন্দোলনের পর্যালোচনা আগে জরুরি ছিল। কোথায় দুর্বলতা ছিল, কীভাবে আগামী দিনে মঞ্চের সাংগঠনিক কর্মকান্ডর পরিধি বিস্তৃততে করা যায়, মঞ্চ পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও  ভালো কি কি পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, সেসব বিষয়ে আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর একুশের কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে মঞ্চের কিছু সদস্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে আগে মঞ্চর সাংগঠনিক বিষয়টি ফয়সালা করার অনুরোধ জানাই। কিন্তু তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। ফলে একুশের কর্মসূচির একটা প্রস্তাবনা তৈরি করে তারা বৈঠক ডাকে। কয়েকবার বৈঠক ডাকার পরেও সাড়া পাওয়া যায় নি। পরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে বৈঠকে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতি আশানুরূপ ছিল না। আমি নিজেও বৈঠকে উপস্থিত হতে পারিনি। হতে যে পারব না তা আগে থেকেই জানিয়েছিলাম। সেই বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সামনে একটি প্যাকেজ প্রস্তাব আকারে একুশের কর্মসূচি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবনার প্রতিটি বিষয়ের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বৈঠকে বিশদভাবে আলোচিত হয়নি বলে উপস্থিত অনেক সদস্যই আমাকে জানিয়েছেন। আবার দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে মঞ্চের সংগঠকদের ক্লাস-পরীক্ষা বা একাডেমিক কার্যক্রমে যতটুকু ফাঁক তৈরি হয়েছিল তা পুষিয়ে নেবার জন্য আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তাদের একটি বিশেষ ব্যস্ততাও তৈরি হয়। সেই ব্যস্ততার মাঝে কে কতখানি সময় দিতে পারবে তা বৈঠকে পূর্ণাঙ্গরূপে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার বিষয়টি সুচারু ছিল না। সামগ্রিকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ প্রক্রিয়াটাতেই অংশিদারিত্বের অভাব ছিল। ফলে মঞ্চের খুবই হাতে গোনা, বলতে গেলে ৫/৭ জন সদস্য এতে সময় দেয়। কিন্তু এই ৫/৭ জনের মধ্যেও সমন্বয় ও সহনশীলতার অভাব ছিল। এতে করে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একুশের কর্মসূচির প্রস্তাবনা হাজির হয়েছিল তাতে সফলতার পরিমাণ খুব বেশি বলে দাবি করা যাবে না। মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হলেও পরের দিকের কিছু কর্মসূচি পালিত হয় নি। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আলোচনা সভাগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। আবার অংশগ্রহণ কম হওয়ায় প্রশাসনের চাপও বাড়তে থাকে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে মঞ্চের জন্য সময়টা খুব খারাপ ছিল। তবে প্রশাসনকে স্রেফ অবহিত করে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করায় প্রশাসন অন্য অনেক সংগঠনকে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়। মঞ্চের একুশের কর্মসূচির প্রচারপত্র এবং তার আবেদন অন্য অনেক সংগঠনকেই কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে উজ্জ্বীবিত করে। একারণেই সারা দেশের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এদিক থেকে এটা একটা বড় অর্জন। মঞ্চের ভবিষ্যত কতটুকু সম্ভবনাময় এবং কতটুকু নয় তা নির্ভর করছে প্রধানত মঞ্চের কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের উপর। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তখনই সম্ভব হবে, যখন মঞ্চের মত-সংগঠকরা মঞ্চের মৌলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জনমত গঠনে সফল হতে পারবেন এবং মঞ্চের চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষা ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে। বর্তমানে মঞ্চের মত-সংগঠকদের মধ্যেই কাজের একটা সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। আবার তা কাটিয়ে ওঠার কিছু প্রচেষ্টাও আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে আশার কথা হলো এই যে, কর্তৃত্ব-বিরোধী তৎপরতা থেমে নেই। মঞ্চের মত সংগঠকদের মধ্যে অনেকেই কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় ছোট ছোট একটিভিস্ট গ্রুপ,ক্যাটালিস্ট গ্রুপ কিংবা কনসেটে অরগানাইজিং গ্রুপ গড়ে তুলছেন। এদের মধ্যে কেউ ক্ষমতা-মিডিয়া-সক্রিয়তা বিষয়ে, কেউ কর্পোরেট একচেটিয়া ও অসম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, কেউ ভাষা-সংস্কৃতি-আধিপত্য বিষয়ে, কেউ কর্তৃত্ব-আইন-মানবাধিকার বিষয়ে আবার কেউ প্রকৃতি-বিজ্ঞান ও বিবর্তন বিষয়ে কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় চিন্তা ও চর্চার জন্য নানান ধরণের তৎপরতার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলে এই সংগঠন-প্রচেষ্টাগুলো মোটামুটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় হতে পারলেই কর্তৃত্ব-বিরোধী মঞ্চ’র ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি সংশয় প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়বে না।

    প্রশ্ন: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্বে, ঠিক এই সময়ের করনীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

    উত্তর: ইতিমধ্যে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে তার একটি বিশেষ উচ্চারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক কী হওয়া দরকার সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ফলে এই সময়ে আন্দোলনের প্রধান এলাকাটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয়-কর্তৃত্বকে খর্ব করে বিভাগগুলোতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। সেই সাথে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একটা সংস্কারের প্রস্তাব মঞ্জুরি কমিশন তৈরি করেছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃতপক্ষে কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের উপযোগী মতাদর্শিক এবং একই সাথে ঐ কর্পোরেটের উৎপাদন কাঠামোতে উন্নতমানের আমলা- কামলা সরবরাহের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাওয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়র ধারণা বিরোধী এই কর্পোরেট কর্তৃত্ব তাড়িত সংস্কারকে প্রতিরোধ করা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে  জরুরি কর্তব্য বলে আমি মনে করি।

    ০৭ মার্চ-২৮ মার্চ, ০৮
    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • ‘সুপার কপ’ কিংবা ‘ডার্ক জাস্টিস’: রাষ্ট্রীয় খুন ও জনমনের রাজনৈতিক বাসনা

    ‘সুপার কপ’ কিংবা ‘ডার্ক জাস্টিস’: রাষ্ট্রীয় খুন ও জনমনের রাজনৈতিক বাসনা

    • বখতিয়ার আহমেদ

    নানা পাটেকারের ‘আব তাক ছাপ্পান’ (২০০৪) আমার দেখা প্রথম বলিউডি ‘সুপার কপ’ মুভি। বেশ কয়েকবার দেখছি। প্রায়ই কানে ভাসে ৫৬ এনকাউন্টার করা পুলিশ অফিসার সাধু আগাশের অমোঘ ডায়লগ: ‘সোসাইটিকে জামাদার হ্যায় হাম’। গ্লোবাল সাউথের এই ‘সুপার কপ’ সমাজের সুইপার, খুনে-অপরাধীদের সাফ করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেও খুন করেন। কিন্তু তার খুন আইনেরই স্বার্থে, সমাজেরই বৃহত্তর স্বার্থে। ফলে চাকরিসূত্রে তিনি ঠিক মানুষ নন, কিলিং মেশিন। বড়কর্তার গোপন অলিখিত নির্দেশে সকালের ফ্লাইটে শাদা পোশাকে ভারতের আরেক শহরে গিয়ে অচেনা কোন লোককে অবলীলায় গুলি করেন। বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে বাজার থেকে সব্জী কিনে নিয়ে মমতাময়ী স্ত্রী আর আদরের সন্তানের সাথে আটপৌরে জীবন কাটান। মানুষ আর মিডিয়া তাকে নিয়ে ভাবে কিন্তু ঠিক বোঝে না। তিনি নিজের কাজ নিয়ে খুব বিচলিত নন, কারণ ‘যো কারনা হ্যায়, ও কারনা হ্যায়, ঠোক না হ্যায় তো ঠোকনা হ্যায়… সোচনে কা এলাউ নেহি হ্যায়’। খুনাখুনি করা ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না, এবং খুনাখুনি নিয়ে ভাবার অনুমতি নাই, এই হচ্ছে ‘আব তাক ছাপ্পান’ খুনের মোরাল অব দি স্টোরি।

    আবতক ছাপ্পান পোস্টার

    বলিউড ছবি আমি পারতপক্ষে মিস করি না। ‘কোম্পানি’ বা ‘দাবাং’ থেকে শুরু করে ‘সিংঘম’ পর্যন্ত সব ‘সুপার কপ’ বা গ্যাংস্টার মুভিই মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। কোন চ্যানেলে ‘সিংঘম’ দেখালে আমার ‘বলিউড প্রীতি’তে বিরক্ত ছেলে পর্যন্ত টিটকারি দেয় ‘তোমার ফেভারিট মুভি’ হচ্ছে বলে। শুধু বলিউড না, আমি শার্লক হোমস থেকে শুরু করে জেমস বন্ড টাইপ সব মুভিই দেখার চেষ্টা করি, ‘ডার্ক-জাস্টিস’ বোঝার জন্য ‘সুপার হিরো’ মুভিও। ঢালিউড মৃভিও দেখি যথাসম্ভব। এসব প্রায় পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কারণ অ্যাকশন বা থ্রিলার মুভি আমার জন্য মিথ বা ভাষার মতই মানুষের মন বোঝার উপাত্ত। রাষ্ট্র ব্যবস্থার দৈনন্দিন চেহারা ও চর্চা বিশ্লেষণ যেমন নৃবিজ্ঞানের ধ্রুপদী কাজ, প্রতীকি ব্যবস্থায় সামাজিক সত্য আবিষ্কার তেমনি তার ধ্রুপদী বিশ্লেষণ পদ্ধতিগুলোর মূল একটি।

    নৃবিজ্ঞানের চোখ দিয়ে বুঝতে গেলে, বাংলাদেশসহ বহু আধুনিক রাষ্ট্রে চলমান খুনাখুনি শাসিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের সম্মতি, ‘সহমত’ অথবা সংশয়ী অবস্থান ছাড়া ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সিস্টেমিক ম্যানেজমেন্ট প্রাকটিসে’ পরিণত হতে পারে না। কেন? সেটা আমি ২০১৪ সালের এক আলাপে যতদূর সম্ভব বলার চেষ্টা করছি (আহমেদ ২০১৪-ক)। কিন্তু এই সম্মতি আর সংশয় কিভাবে তৈয়ার হয় সেটা ব্যাখ্যা করতে গেলে ‘হাইপার রিয়েল’ সমাজ বাস্তবতায় ‘ফ্যাক্ট’ আর ‘ফিকশন’ দুটাকেই বিশ্লেষণের আওতায় আনতে হয়। ফলে ‘আইনী’ বাহিনীর ‘বেআইনী’ হত্যা প্রবৃত্তির ‘স্বাভাবিকায়ন’ বোঝার জন্য গণমানসে ‘সুপার কপ’ আর ‘ডার্ক-জাস্টিস’ ধারণার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রডাকশন আর রিপ্রোডাকশন প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ খুব জরুরী হয়ে পড়ে।

    লিবারেল রাষ্ট্র-কল্পনায় বিভোর আধুনিক নাগরিক মনের কল্পনায় ‘পুলিশ’ আসলে দুইটা জোড়-বিপ্রতীপ বা বা্ইনারি চরিত্রের সংমিশ্রণ; আধুনিক অ্যাংলো-স্যাক্সন সাংস্কৃতিক বলয়ে যার মোক্ষম উদাহারণ হবেন শার্লক হোমস আর জেমস বন্ড, বলছেন নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেয়বার (২০১৫)। এই দুই চরিত্রই আসলে অভিন্ন সত্তা এই অর্থে যে দুজনের মধ্য দিয়েই ‘অপরাধ’, ‘পুলিশ’ বা আইন-প্রয়োগ নিয়ে পাবলিকের রাজনৈতিক চেতনা বা বাসনার স্ববিরোধিতাই প্রতীকায়িত হয়। বেশি জটিল শোনালে বিশ্লেষণ পদ্ধতিটাই একটু খুলে বলি।

    লেভি-স্ত্রস প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাকচারাল নৃবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ পদ্ধতি মোতাবেক, কোন প্রতীকের অর্থই স্বতঃসিদ্ধ নয়, অন্য প্রতীকের সাথে সম্পর্কসূত্রেই তার অর্থ নির্ধারিত হতে থাকে। নৃবিজ্ঞানী মাত্রই সংস্কৃতির জটিল জালে ক্রিয়াশীল প্রতীকগুলোর অর্থময়তার আন্তঃসম্পর্কের কাঠামো বা বিন্যাস চিহ্নিত করেই মানুষের মনকে বোঝার চেষ্টা করেন। নৃবিজ্ঞানের এই ‘কাঠামো-প্রত্যাশী’ (মজহার ১৯৭৭) পদ্ধতির প্রথম ধাপ হচ্ছে ভাষায়, কাব্যে, প্রতীকে, মিথে, টোটেমে, বিশ্বাসে, বয়ানে বা জনমানুষের মনের আর সব অলি-গলি-সন্ধিতে থাকা প্রতীকগুলোর জোড়-বিপরীত সম্পর্কগুলো আবিষ্কার করা।

    এই বিশ্লেষণ খুব কঠিন কোন কাজ না, কোন থিওরি তো না-ই। এই সম্পর্কের প্রথম সূত্রই হচ্ছে জোড়-বৈপরীত্য বা বাইনারি। সহজ অর্থে এর মূল সূত্র হচ্ছে কোন প্রতীকি ব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে, কোন প্রতীককে তার জন্য সাংস্কৃতিক অভিধানে নির্দিষ্ট করা অর্থ দিয়ে না বুঝে আর সব প্রতীকের সাথে সম্পর্কসূত্রে বুঝতে হবে। একটা বাক্যে যেমন কোন পদের অর্থ অন্য পদের সাথে তার সম্পর্কের নিরীক্ষে নির্ধারিত হয়। এজন্য প্রথমে একটা নির্দিষ্ট পরিসর লাগবে, সেখানে ক্রিয়াশীল উপাদানগুলো চিহ্নিত করতে হবে, তারপর একটার সাথে অন্যটার বিপ্রতীপ আন্তঃসম্পর্ক আবিষ্কার করতে হবে। যেমন জনমানসের ভয় যদি পরিসর হয়, হরর মুভির ক্ষেত্রে ড্রাকুলা বা কোন ভ্যাম্পায়ার চরিত্রকে বুঝতে হবে তার প্রতি-চরিত্র ওয়্যার-উলফ দিয়ে। কারণ একজনকে ছাড়া অন্যজনের কল্পকথা পূর্ণ হয় না।

    লেভিস্ত্রস

    ফেভারিট কোন ‘সুপার কপ’ বা ‘সুপার হিরো’ থাকার বয়স পেরিয়ে গেলেও লেভি-স্ত্রস এখনো আমার ইন্টেলেকচুয়াল হিরোদের একজন। কারণ উনার আগের সমাজবিদ্যার কাছে ব্যাখ্যাতীত বিমূর্ত বাস্তবতাকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসবার, উপাত্তে পরিণত করবার, এবং তার অন্তর্লীন আদল ‘আবিষ্কার’ (খান ২০১১) করবার একটা সহজ ও সাহসী পদ্ধতি তিনি আধুনিক নৃবিদ্যাকে দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ পরিস্থিতির সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের জন্যও আমি তাঁর এই ‘অন্তর্লীন-কাঠামো-সন্ধানী’ পদ্ধতি (আহমেদ ২০১৪-খ) অকাতরে ব্যবহার করি।

    যা হোক, গ্লোবাল নর্থের লিবারেল ও পপুলার রাষ্ট্র কল্পনায় হোমস আর বন্ড এমনই জোড়-বিপরীত সম্পর্কে আবদ্ধ দুই প্রতীক। ইনাদের একজনকে ছাড়া আরেকজনকে বোঝা যাবে না। কারণ উনারা জনমনে মিশে থাকা দুই বিপরীত বাসনার প্রতীক যা দিয়ে তারা বাস্তবের ‘পুলিশ’ নিয়ে ভাবে। এই বৈপরীত্যেরই হাজারো প্রকাশ আছে আমাদের রাজনৈতিক জীবন আর কথকতার দৈনন্দিন চর্চায়, ‘সুপার কপে’র বিপরীতে ‘মনস্টার কপে’র মত বাইনারি আছে আরো অসংখ্য। আমার ধারণা বাংলাভাষী সাংস্কৃতিক বলয়ে ‘হোমস-বন্ড’ জুটির লোকাল বা পোস্টকলোনিয়াল উত্তরাধিকার হচ্ছেন ফেলুদা (বা মিসির আলী) আর ‘অবসরপ্রাপ্ত মেজর’ মাসুদ রানা। যাই হোক, আপাতত ‘হোমস-বন্ড’ বাইনারি দিয়েই আরেকটু বোঝা যাক ‘পুলিশ’ নিয়ে লিবারেল নাগরিক কল্পনার কায়-কারবার।

    জেমস বন্ড পোস্টার

    হোমস আর বন্ড, দু’জনেই লন্ডননিবাসী ‘অপরাধ-নিরোধকারী’ হলেও স্বভাব ও কাজেকর্মে পুরাই বিপরীত। প্রথম জন অ্যামেচার, পরের জন পেশাদার। প্রথম জন একটু নেশা-ভাঙ করলেও যৌনতা উদযাপনে তেমন আগ্রহী নন, দ্বিতীয় জনের মদিরা ও যৌনতা, দুইয়েই আগ্রহ আছে। অ্যামেচার আর খেয়ালি হলেও হোমস নিজের কাজে সাংঘাতিক দক্ষ ও দায়িত্বশীল। ওদিকে পেশাদার হলেও বন্ড মৌজ করতে গিয়ে প্রায়ই নিয়ম, দায়িত্ব বা ছদ্মবেশ ভুলে বিপদে পড়েন। হোমস পুলিশের লোক না হলেও অপরাধ তদন্তে পুলিশের চেয়ে দক্ষ, প্রধানত আইনের সীমার মধ্যেই কাজ করেন। বন্ড রাষ্ট্রীয় সিক্রেট এজেন্ট হলেও শুধু ‘লাইসেন্সড টু চিল’ই না, ‘লাইসেন্সড টু কিল’ও বটেন। তিনি প্রায় সব কাজই করেন আইনের সীমার বাইরে। এমনকি প্রায়শই নিজ দেশের ‘পুলিশ’ই তাকে ধাওয়া করে, নিজের বসই তাকে গ্রেপ্তার বা গুলির নির্দেশ দেয়। প্রায়শই ‘হি ইজ আউট অন হিজ ওউন’।  একটু খেয়াল করলে দেখবেন স্পাই থ্রিলার ‘মিশন ইম্পসিবলে’র ইথান চরিত্রটিও তাই।

    কিন্তু এতসব বিপরীত-বৈশিষ্ট্য ছাপিয়েও দুইজনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হচ্ছে হোমস অতীতে ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে ‘সত্য’ উদঘাটন করে আইনের হাতে তুলে দেন, অন্যদিকে বন্ড গোপন গোয়েন্দা ‘তথ্যে’র ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন ‘অপরাধ’ আগেই দমন করে ফেলেন। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুনিয়ার সর্বত্রই পুলিশের মূল দুইটা কাজ, অতীত ‘অপরাধ তদন্ত’ এবং ভবিষ্যত ‘অপরাধ দমন’, এই দুই ‘সুপার কপ’ আখ্যানেই চিত্রিত আছে। জনমানস এই কল্পনা দিয়েই বাস্তবের পুলিশ নিয়ে ভাবে বা বাসনা সাজায়।

    ওয়ার ওলফ

    ‘সুপার কপ’কে জনমানসের বাসনার অন্তর্গত করে তোলার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞানী গ্রেয়বার দেখান যে ইউরোপের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে জন-মানসে এই চিন্তনভঙ্গীর একটা সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা আছে। কল্পিত ড্রাকুলা চরিত্র যেমন আছে, তেমনি বাস্তবের চরিত্র এলিয়ট নেস বা ফিলিপ মারলোকে নিয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি আছে। ভ্যাম্পায়ার আর ওয়্যার-উলফ, গ্রেয়বার দেখাচ্ছেন, আজকের জন-মানসে ‘সুপার কপ’ বা ‘ডার্ক জাস্টিস’ ধারণারই প্রত্নতাত্ত্বিক রূপ। দুই চরিত্রই দানব, ভ্যাম্পায়াররা ছিলেন ধনী আর অভিজাত, থাকতেন ক্যাসল বা ম্যানশনে। ওয়্যার-উলফরা ছিলেন গরিব ও ভবঘুরে, প্রায়শই জেমস বন্ডের মত ফেরারী, লড়তেন ভ্যাম্পয়ারদের সাথে, দানব হয়ে। শুভ আর অশুভ, দুই শক্তিই তখন দানব, একে অপরের সাথে লড়াই করে প্রতীকি সম্পর্কে আবদ্ধ থাকার কারণেই তারা আবির্ভূত হন জনমানসের কল্পনায়।

    মেরিন ড্রাইভের সর্বশেষ খুনে উদ্বেলিত পাঠকের মনে হয়তো ইতিমধ্যেই ‘সুপার কপ=মেজর সিনহা’ এবং ‘মনস্টার-কপ=ওসি প্রদীপ’ ধরনের একটা স্ট্রাকচারাল বিশ্লেষণ পাওয়ার আশা জেঁকে বসেছে। কিন্তু সেই পথ আমি মাড়াবো না। কারণ আমার কারেন্ট হিরো নৃবিজ্ঞানী গ্রেয়বার আরো শিখিয়েছেন, খুনি রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু ‘জেমস বন্ড’ বা ‘নয়ন বন্ডে’র ফিকশনই বানায় না, শাসিত বুদ্ধিজীবিতার জন্য দুইটা সিরিয়াস ওয়ার্নিংও ইস্যু করে। প্রথমটা হচ্ছে, অতীত ঘটনা নিয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করতে গেলে বাটে পড়তে হয় (এই গণপ্রজ্ঞা অর্জনের জন্য ‘দি মামি’ দেখতে পারেন)। দ্বিতীয়টা হচ্ছে ভবিষ্যত নিয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলেও বিপদ হয় (উদাহারণ: ফ্রাংকেনস্টাইন চরিত্র)। কাজেই প্রতীকে পরিণত হতে থাকা বাস্তব চরিত্র দিয়ে চলমান খুনাখুনির ভূত-ভবিষ্যত বিশ্লেষণের ঝুঁকি আপাতত এড়িয়েই যাব। তাছাড়া, স্ট্রাকচারাল পদ্ধতিরও একটা পরিসীমা আছে। এটা পরাবাস্তবিক দৃশ্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক আনন্দে যতদূর আগায় তারচে বেশি ঠেলতে গেলে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ না হয়ে বৈজ্ঞানিক কুসংস্কারে পর্যবসিত হতে পারে।

    যা হোক, নৃজ্ঞৈানিক বিচার বিশ্লেষণের জন্য ‘জনমানস’ খুব অদ্ভূত একটা পরিসর কারণ তা সর্বদা এরকম অদ্ভূত সব বৈপরীত্যে ঠাসা থাকে। সমাজের মূলধারার চিন্তা-স্রোত, ক্লিফোর্ড গিয়ার্টয (১৯৭৩) দেখিয়েছেন, মতাদর্শ বা আইনের মত এক-রৈখিক বা একমাত্রিক না। এখানে বহুমাত্রিক ও বিরোধাত্মক বহু ধারণাই একই সাথে একই মনে ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন এই পরিসরে ব্যক্তি মানুষ একই সাথে ধার্মিক এবং সেকুলার বা লিবারেল হতে পারেন এবং তাতে তার সমাজ জীবনে বিশেষ কোন বিড়ম্বনা পোহাতে হয় না। কিন্তু মতাদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কল্পনায় বৈপরীত্য বা বহুমাত্রিক সম্ভবনা বা সত্যের জায়গা নেই। এজন্যই ক্ষমতা, খুন, মতাদর্শ, বা ধর্মের মত সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা বোঝার জন্য জনজীবন ও মানসের বহুমাত্রিক বৈপরীত্যকে প্রতীকি ব্যবস্থার ‘থিক ডেসক্রিপশন’ তৈরি করে ব্যাখ্যা করবার প্রেস্ক্রিপশন দেন আমার আরেক একাডেমিক হিরো, ‘ব্যাখ্যানমূলক নৃবিদ্যা’র অগ্রদূত ক্লিফোর্ড গিয়ার্টয। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপবাসীদের মোরগ লড়াইয়ে প্রতীকাবদ্ধ রাজনৈতিক মনের গড়ন ব্যাখ্যা করে নিজের পদ্ধতি তিনি হাতে কলমে দেখিয়েছেন।

    ডেভিড গ্রেয়বর

    এসব প্রেসক্রিপশন বা পদ্ধতি দিয়ে পাবলিক ডিসকোর্সে ক্রিয়াশীল অযুত-নিযুত সব প্রতীকের মাঝে এরকম শত-সহস্র জোড়-বিপ্রতীপ সম্পর্ক আবিষ্কার করে, তাদের সম্পর্ক সূত্র বিশ্লেষণ করে জনমানসে ‘সুপারকপ’ বা ‘ডার্ক-জাস্টিসে’র বাসনাকে যেমন ব্যাখ্যা করা যায়, তেমনি ব্যাখ্যা করা যায় রাষ্ট্রীয় প্রযোজনায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ এর মত একক-উর্ধ্ব-কমা-বন্দী শব্দের প্রতীকে প্রতিভাত চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে। ব্যাখ্যা করা যায় মেট্রোপলিটান হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ক্রমশ নেক্রোপলিটান হতে থাকা রাষ্ট্রের গুপ্ত ও প্রকাশ্য খুনাখুনির প্রবৃত্তিকে। শাসন-প্রণালীর অঙ্গীভূত চর্চা হিসেবে খুনাখুনিকে বুঝতে হলে, রাজনৈতিক ক্ষমতার এই খুনে প্রবৃত্তির কায়-কারবার ব্যাখ্যা করতে গেলে, নৃবিজ্ঞানের কাছে এই পদ্ধতির বিকল্প নাই।

    রাষ্ট্রের হাতে একেকটা খুনের পরে কি কি দেখা গেল, কি কি জানা গেল, কি কি বলা/লেখা/ভাবা গেল, সেটা খুনের ঘটনার মতই তীব্র বাস্তবতা কারণ এসবের মধ্য দিয়েই পরের খুনের প্লট তৈরী হয়। এই ছিল আমার ২০১১ সালে লেখা নৃবৈজ্ঞানিক উপলব্ধি। এখন আরো স্পষ্ট হচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় খুন প্রশ্নে জনমানসে বিরাজমান যে সম্মতি বা স্ববিরোধ, তার মূলে আছে সরল ও ‘নির্বোধ’ এক রাষ্ট্র-কল্পনা, যার ম্যানুফ্যাকচার আর ডিসট্রিবিউশন আধুনিক রাষ্ট্র নিজেই তদারকি করে, খুনাখুনিকেই ‘স্বাভাবিক’ শাসন দশা হিসেবে চালানোর মতলবে।

    আর্টওয়ার্ক: ওরেগন লাইভ
    শিল্পী: আলেন ব্রেটম্যান
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এই পুরো প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসা গেলে ‘ভাল ক্রসফায়ার বনাম খারাপ ক্রসফায়ার’ ধরনের নির্বুদ্ধিতা কেন ও কীভাবে জনমানসে দানা বেঁধে অবস্থান করে, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিগঠনে নির্বুদ্ধিতার ভূমিকা, এমনকি এই নির্বুদ্ধিতা উৎপাদন প্রণালীকেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব এই পদ্ধতি অবলম্বনে। ‘ডার্ক’ বা ‘ডাইরেক্ট’ জাস্টিসের বাসনা, কিংবা সুপার বা মনস্টার কপের আখ্যান কীভাবে ন্যায়হীন বন্দোবস্ত আর খুনাখুনির রাজনৈতিক বাস্তবে বোকামিকে সম্বল করে বাঁচতে শেখায় নাগরিককে, তার রাজনৈতিক বাসনার বিন্যাসকে কীভাবে বদলে দেয়, আর এসবের মধ্য দিয়ে তার মুক্তির স্পৃহা, তার সামাজিক সত্তা, কীভাবে প্রতিদিন খুন হয় সেই বিবরণ ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। হাইপার রিয়াল সময়ে ফ্যাক্ট আর ফিকশনের প্যারালাল ইউনিভার্সে আটকা পড়া বিহব্বল নাগরিক মন, কিম্বা ‘ফরেস্ট গাম্পে’র মত হুদাই দৌড়াইতে থাকা নাগরিক মনের অন্তর্লীন আদল আরো স্পষ্ট হতে থাকে।

    খুব বোরিং না আসলে নৃবিজ্ঞান।

    উল্লেখিত পূর্বসূত্র

    আহমেদ, বখতিয়ার ২০১৪ (ক), ‘গুম-খুন-আতঙ্ক : শাসন প্রণালী ও হত্যার কথকতা’, বাধন অধিকারী সম্পাদিত বাংলাদেশ পরিস্থিতি: নয়া উদারবাদী যুগে শাসনপ্রণালী ও কথকতা।

    আহমেদ, বখতিয়ার ২০১৪ (খ), ‘ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবসত্তা: একটা নৃবৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা’, আলী আফজাল খান (সম্পাদিত), ভিন্নচোখ, ভাষা সংখ্যা ২০১৪, ঢাকা।

    খান, সলিমুল্লাহ ২০১১, ‘লেবিস্ত্রোসের আবিষ্কার’, তাঁর স্বাধীনতা ব্যবসায়, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ১৪৫-১৫৭।

    মজহার, ফরহাদ ১৯৭৭, প্রস্তাব, বুক সোসাইটি, ঢাকা।

    Geertz, Clifford 1973, The Interpretation of Cultures, Basic Books Inc., New York.

    Graeber, David 2015, ‘Dead Zones of the Imagination: An Essay on Structural Stupidity’ in his The Utopia of Rules: On Technology, Stupidity, and the Secret Joys of Bureaucracy, Melville House, London.

  • সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    • জাহিদুল ইসলাম

    প্রখ্যাত তাত্ত্বিক তালাল আসাদের মতে সেক্যুলারিজম শব্দটি উনিশ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিমা মুক্তচিন্তরকরা ব্যবহার করেন। এ শব্দটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিলো তাদের যেন নাস্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা না হয় এবং সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সমাজের সাথে একধরনের স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় থাকে। এ কৌশলটি তাঁরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে নয় বরং তাদের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেন।১ সেক্যুলার সমাজ বিভিন্ন সময় তার নিজস্ব ধর্ম থেকে বিভিন্ন উপাদান নিয়েছে। লকের প্রাকৃতিক আইনের ধারণাও ধর্মতত্ত্ব থেকে এসেছে। লক মনে করতেন জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি এই তিনটি প্রাকৃতিক অধিকার নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। যে অধিকার আদম পেয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছ থেকে। আমেরিকার সংবিধানে লকের এ ধারণাটি গ্রহণ করা হয়। দার্শনিক জার্গেন হেবারমাসের মতে ‘মানবাধিকার’ ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ ‘গণতন্ত্রের’ মতো বিষয়গুলো সরাসরি ইহুদি ও খ্রিস্টান মূল্যবোধ থেকে নেওয়া হয়েছে।২ এক্ষেত্রে ধর্মের সাথে সেক্যুলারিজমের একদম বিপরীতধর্মী (বাইনারি অপজিশন) সম্পর্ক নেই। সেক্যুলারিজম যৌক্তিক, ধর্ম অযৌক্তক, সেক্যুলারিজম উদার, ধর্ম অনুদার এভাবে দুটি বাইনারিতে ভাগ করাই হচ্ছে বিপজ্জনক কাজ। যে কাজটি পশ্চিমা আলোকায়নের সময় হেগেল বা কান্টের মতো দার্শনিকরা করে গিয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে। এবং এ নির্মাণের মাধ্যমে প্রাচ্যের উপর তাদের আধিপত্য যৌক্তিক করে তোলেন। পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ড ধর্মকে যেভাবে নির্মাণ করে তা হচ্ছে ধর্ম একটি প্রাচীন ধারণা। ধর্মের তুলনায় সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি অত্যন্ত প্রগতিশীল। ধর্মের সাথে সেক্যুলার সমাজের বাইনারি সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা আধিপত্যের বিস্তার ঘটে।

    লেভিয়ান্থ

    আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব চর্চার মধ্য থেকে এসেছে। কার্ল স্মিট রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে দুই ধরনের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের কথা বলেছেন: প্রাচীন ও আধুনিক ধর্মতত্ত্ব। প্রাচীন রাষ্ট্রতত্ত্বে ঈশ্বরের হাতে যে সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ধারণায় সেটি রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বকে ‘সেক্যুলারাইজড থিওলজিকাল কনসেপ্ট’ অভিহিত করেন।৩ পূর্বে যেখানে ঈশ্বর ছিলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বর্তমানে রাষ্ট্র সে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ সার্বভৌম ক্ষমতার বলে রাষ্ট্র তার নিজের জনগণের উপর ক্ষমতার চর্চার করে,আবার অন্য রাষ্ট্রর সার্বভৌমত্বও বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

    সেক্যুলার সমাজ ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় ভৌগলিকভাবে অপরের নির্মাণ করেছে। মধ্যযুগে আরব স্পেনকে ইউরোপের বাহিরে হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আধুনিক স্পেনকে ইউরোপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেহেতু এটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্র।৪ আধুনিক যুগে বসনিয়া এবং চেচনিয়া নামক দুটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা পশ্চিমা মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত। তারা আবার বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণহত্যার শিকার হয়েছেন। আজফার হোসেন তাঁর দর্শনাখ্যান বইতে গ্রিসকে প্রাচ্যের অংশ হিসেবে দাবি করেন। এটি পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের অংশ হিসেবেই তাদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

    সেক্যুলার সমাজ মিথকে বাতিল করতে চেয়েছিলো। বিপরীতে মিথকে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে যে জ্ঞান, বিশ্বাস ও চেতনার জন্ম দিয়েছে তালাল আসাদের মতে তাই হচ্ছে সেক্যুলার। সেক্যুলার যুগে মিথকে আধুনিক ফিকশনে টি এস ইলিয়ট, জেমস জয়েস, কোলরিজের মতো সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে পার্সি বিশি শেলি একজন নাস্তিক হয়েও গ্রীক মিথের উপর ভিত্তি করে নাটক লিখেছেন। আধুনিক যুগে সেক্যুলার মানসিকতার সাথে মিথ মিশে আছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক এডর্নো এবং হরখেইমার আধুনিকতার প্রকল্প হিসেবে এনলাইটেনমেন্টকে মিথ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

    ইউরোপীয় সমাজে সেক্যুলারিজম ধারণা বিকাশের পাশাপাশি এন্টি-সেমেটিজমের উপাদানসমূহকে লালন করে। যার ফলে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইহুদিদের উপর ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদিরা ইউরোপে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। এনলাইটেনমেন্টের বিকাশও তাদের সেই অবস্থান থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারেনি। বরং এনলাইটেনমেন্ট নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কিছু কল্পিত ধারণার নির্মাণ করে। এই নির্মাণই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপক গণহত্যা ঘটায়। এনলাইটেনমেন্ট তার যে যৌক্তিক বা সার্বভৌম চিন্তা চর্চা করত সেই যৌক্তিক চিন্তাই ইউরোপের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও এন্টি-সেমেটিজমের জন্ম দেয়। এনলাইটেনমেন্ট তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে চাপা দেওয়ার জন্যেই গণহত্যায় মেতে উঠে। হিটলারের জার্মানি ইহুদিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনে তার মধ্যে ছিলো,ইহুদিরা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্ররোচক। যারা একটি সমসত্ত্ব সমাজ ব্যবস্থায় চায়। এছাড়া হিটলার তাঁর বর্ণের ভিত্তিতে ইউরোপে আর্যদের অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান করতেন। ইহুদিদের তিনি ইউরোপীয়দের জন্য অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ মনে করতেন। এটি আত্নরক্ষার ধারণাকে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত করে।

    এডর্নো ও হরখেইমারের মতে ইউরোপীয় বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় এন্টি-সেমেটিজমির অর্থনৈতিক কারণ ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার উপর তাদের আধিপত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।৫ ধামাচাপা দেওয়ার স্বার্থেই তারা ইহুদিদেরকে নিজেদের প্রধান শক্র হিসেবে উপস্থাপন করে। ইহুদিদের ভাবা হতো পুঁজিবাদের বিকাশ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রগতির অন্তরায় হিসেবে।

    সেক্যুলার রাষ্ট্রে সহিষ্ণুতার তত্ত্বটির ভিত গড়ে উঠেছে পরস্পর বিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে। উদারবাদী এলিটরা ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংখ্যালগিষ্ঠদের উপর আধিপত্যের বৈধতা দেয়। সেক্যুলারিজমের প্যারাডক্স হচ্ছে এটি ব্যক্তির ধর্মীয় আচরণকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আসে, আবার রাষ্ট্র নিজেই সেই ব্যক্তিগত আচরণকে হস্তক্ষেপ করে। সুইজারল্যান্ডের কাছে হিজাব হচ্ছে বহিরাগত সংস্কৃতি ও লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতীক।৬ এ প্রতীকগুলোকে দমিয়ে রাখার জন্য ফ্রান্সে আইন করে পাবলিক স্কুলগুলোতে হিজাব বা অন্যান্য ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। সেক্যুলার সমাজে সংখ্যালঘুদের অবস্থান অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে বিবেচনা করা থেকেই তাদের উপর নির্যাতন বা প্রান্তিকীকরণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি কখনোই বহুত্ববাদী সমাজ তৈরিতে সহায়ক নয়। পশ্চিমা সেক্যুলার সমাজের নিকট একসময় ইহুদিদের হুমকিস্বরূপ মনে করা হতো, যার ফলে এন্টি সেমেটিজমের বিকাশ ঘটে। এখন ইহুদিদের ইউরোপীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের তাদের সাংস্কৃতিক হুমকিস্বরূপ মনে করা হয়।

    ইসলামি ধর্মতত্ত্বের মধ্যে মৌলবাদের বীজ নিহিত এ মতটিই বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত। পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীনতা ব্যবসার নামে এ মতটি ভালোভাবেই প্রচার করেছে। তালাল আসাদের মতে খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে যেমন গণতন্ত্র, উদারতাবাদ ইত্যাদি ধারণা বিকাশ ঘটেছে ইসলাম বা  অ-ইউরোপীয় অন্যান্য ধর্মতত্ত্বেও এসব উপাদান রয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ বা নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শিক আধিপত্যের কারণে তার বিস্তার ঘটেনি।৭

    কোন রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী যখন মানসিক, সাংস্কৃতিক বা আর্থ-রাজনৈতিকভাবে পরাধীন তখন সেসব লোকদের আত্মগ্লানি কাজ করে। তারা তখন তাদের অতীতে ফিরে যেতে যায়। অতীতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদের সৃষ্টি হয়। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী,ইজরাইলি জায়নবাদী,বিন লাদেন বা ওমর আল-বাগদাদীর উদ্দেশ্য ও একইরকম ছিল। লাদেনের উগ্রতার বিকাশ ঘটে সৌদি আরবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকায়নের প্রেক্ষিতে। বাগগাদী প্রেরণা ছিলো নিজেকে মাসিহা হিসেবে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থাপন করা এবং দুনিয়ার অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া। এজন্য তিনি সিরিয়া এবং ইরাকের কিছু অংশ দখল করে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করলেন। একইসাথে ধর্মকে ব্যবহার করে সহিংসতার জন্ম দেন। তারা যে সত্তাকে নির্মাণ করে সেটি আত্মকেন্দ্রিক। এর বাইরে যারা আছে সবাইকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অধীনতার গ্লানি ও সার্বভৌম ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি তার নির্মিত ‘অপরের’বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে সহিংসতা ঘটায়। অন্যদিকে সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় সহিংসতার রুখতে ধর্মকেই ব্যবহার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেকে মনে করতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ঈশ্বরের নির্দেশেই তিনি আফগানিস্তান এবং ইরাকে হামলা চালান।৮

    অলিভার রয় সেক্যুলারিজম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পশ্চিমা সেক্যুলারিজম নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদারপন্থী সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মকে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত ফ্রান্সে অভিবাসী মুসলমান সম্প্রদায়ের সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রান্তিকীকরণ করা হচ্ছে। অলিভার রয়ের মতে যখন কোন সম্প্রদায়কে তাঁর ধর্ম এবং সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং তার মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে তখনই উগ্রবাদের জন্ম দেয়।৯ সেক্যুলার সমাজের সম্যাটি হচ্ছে এটি নিরপেক্ষতার কথা বলে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করে। একটি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে নিরপেক্ষতার মাত্রায় ফেলে এমনভাবে নির্মাণ করে যেন অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটিকে সচেতন বা অবচেতনভাবে গ্রহণ করে। এর ফলে ধর্মীয় চর্চার সমতা বা স্বাধীনতা সার্বজনীনভাবে কাজ করতে পারেনা।২

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রিসারেকশন অব ক্রাইস্ট
    শিল্পী: জিওভান্নি এন্টনিও
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    পাশ্চাত্য সমাজে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তারা তাদের ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার চালায়। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনামলে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের পর উইলিয়াম কেরি এবং টমাস নামে দুজন ব্যক্তি ধর্মপ্রচারের জন্য কলকাতায় আসেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বিরোধের ফলে তারা ১৮০০ সালে কলকাতা থেকে অদূরে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা। ভারতবর্ষে বা আফ্রিকার উপনিবেশিত দেশগুলোর প্রতিটি অঞ্চলের ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করা হয়। ভারতবর্ষে শ্রীরামপুর মিশন থেকে উইলিয়াম কেরি,জন মার্শম্যান এদের নেতৃত্বে বাইবেল বাংলাসহ বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৮০৯ সালে শ্রীরামপুর মিশনের নেতৃত্বে সমগ্র বাইবেল ‘ধর্মপুস্তক’ নামে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়।

    ১৯৩০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের ব্যাপক জনসংখ্যার দুই শতাংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এসব ধর্মপ্রচারকরা ভারতীয় সমাজে ‘পশ্চিমায়ন’ ও ‘আধুনিকায়নে’ ভূমিকা রাখেন। প্রাচ্যতাত্ত্বিকরা ভারতবর্ষের হিন্দুদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন। হেগেল মনে করতেন হিন্দুদের কোন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই,এবং তাঁদের ইতিহাস রচনার সামর্থ্য নেই। এক্ষেত্রে তাদের নিয়তি হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনকে মেনে নেওয়া।১০
    উপনিবেশিত কলকাতায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রাহ্মধর্মের প্রসার ঘটে। এ ধর্ম ছিল ভারতীয় ধর্মের সাথে খ্রিস্টান ধর্মের একপ্রকার সেতুবন্ধন।

    তখনকার সময়ে বাঙালি রেনেসাঁসের বিকাশ যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তা হচ্ছে সতীদাহ প্রথা নিবারণ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলন। রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন এসব সংস্কারের জন্য তর্ক বির্তকে লিপ্ত হন, তখন তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যের ভিতর থেকেই এ কাজটি করেন। এ সংস্কারের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য তারা ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকেই যুক্তি প্রদর্শন করেন। সতীদাহ নিয়ে কাজ করা লতা মনি তাঁর Contentious traditions বইতে দেখান যে সতীদাহ প্রথাটি যে হিন্দুদের ধর্মীয় প্রথা এটি ব্রিটিশ শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এ প্রথাটির সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের স্বার্থ জড়িত ছিল।

    স্বপন বসু তাঁর ‘বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস’ বইতে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। কোন স্বামী মারা গেলে তার সাথে তার স্ত্রীকে যখন দাহ করা হতো তখন ধনীদের পরিবার থেকে দুইশত টাকা পর্যন্ত বখশিশ পাওয়া যেত। এই অর্থের লোভে ব্রাহ্মণরা মেয়েদেরকে সতী হতে উৎসাহ দিত। আর সতীদাহপ্রথা ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকার তুলনায় কলকাতায় বেশি প্রচলিত ছিলো। ব্রিটিশ শাসকরা যেহেতু ভারতবর্ষ সম্পর্কে পূর্বানুমান ছিলো যে তারা ধর্মান্ধ, তাই তারা এটিকে প্রথম দিকে ধর্মীয় প্রথা হিসেবে মেনে নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের নারীমুক্তির চেয়ে স্থানীয় হিন্দুদের বিরাগভাজন হওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিলো। এর সাথে তাদের ভারতবর্ষকে পাকাপোক্তভাবে শাসন করার বিষয়টি জড়িত ছিলো। এজন্য তারা ধর্মগুরুদের কাছ থেকে সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে মতামত নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে সতী বা নারীর বিষয়টি গুরুত্ব ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসনের বৈধতার জন্য সভ্যকরণ,মানবমুক্তি বিষয়টি উপস্থাপন করে, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এটি আধুনিকতা নামক ডিসকোর্সের সাথে সম্পর্কিত নয়।

    উপনিবেশ স্থাপনের পরবর্তীতে ভারতবর্ষ শাসনের সুবিধার্তে ব্রিটিশরা বিভিন্ন আইন চালু করে। ভারববর্ষে ধর্মীয় আইনের বিধিবদ্ধকরণের কাজটি ব্রিটিশরাই প্রথমে করে। ১৭৭২ সালে হেস্টিংসের নেতৃত্বে কোরআন থেকে মোহামেডান আইন এবং ব্রাহ্মণ শাস্ত্র থেকে হিন্দু আইনের বিধিবদ্ধকরণ করা হয়।১১ ব্রিটিশ শাসকরা তাদের পূর্বানুমান থেকে এই কাজটি করে। তাদের ধারণা ছিলো ভারতবর্ষের লোকেরা অন্ধবিশ্বাসী,তাদের কাজকর্ম,চিন্তাভাবনা শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্রিটিশদের নিকট ধর্ম বলতেই ছিলো ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এন্ডারসনের মতে মুঘল শাসনামলে বিচারব্যবস্থা ও আইনের ক্ষেত্রে কাজীর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা ছিলো। কাজী তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় কার্যক্রম চালিয়ে যেতেন।১২

    ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্বে মুসলমানদের জন্য ছিল মাদ্রাসা এবং হিন্দুদের জন্য ছিল টোল ও পাঠশালাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব ধর্ম এবং সেক্যুলার উভয় বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিলো। মাদ্রাসায় যেসব প্রধান বিষয় পড়াশোনার অন্তর্ভুক্ত ছিলো এগুলো হলো ১.ব্যাকরণ ২. সাহিত্য, ৩. যুক্তিবিদ্যা, ৪.ইসলামিক আইন এবং এর মূলনীতিসমূহ ৫. কোরআনের ব্যাখ্যা ৬. হাদিস ৭. অতীন্দ্রিয়বাদ, ৮. স্কলাস্টিসিজম (ধর্মীয় দর্শন) ইত্যাদি । হিন্দুদের টোলে ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আর পাঠশালাতে ছিলো সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। পাঠশালাতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ছিলো ভাষা, মৌলিক গণিত, কৃষি ও নৌকা নির্মাণ দক্ষতা ইত্যাদি। মোঘল শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্রাট শাহজাহান তাঁর শাসনামলে দিল্লিতে ইম্পেরিয়াল কলেজ স্থাপন করেন।১৩ কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে এসে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার স্থলে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে তা একদম স্থবির হয়ে যায়নি।

    ঔপনিবেশিক শাসনামলের শুরুতে ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেনি। এসময় খ্রিস্টান মিশনারীরা বিভিন্ন মিশনারি বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতেন। ১৮১৩ সাল চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে শাসকদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দুটিভাগে করেন। সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার ফলে মাদ্রাসা এবং টোল ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রান্তিকীকরণ ঘটে। অন্যদিকে মিশনারি বিদ্যালয়গুলো তখনও ব্রিটিশদের নিকট থেকে অনুদান পেত।১৪

    বাংলায় যখন উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন বাংলার মুসলমানরা বিভিন্ন কারণে এ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। মুসলমানদের প্রশাসনিক কাজের সংযুক্তের জন্য ব্রিটিশরা সরকার নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৮০ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে তখন সেখানে কোন বাঙ্গালী মুসলমান শিক্ষক ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন বাংলার বাইরে থেকে আসা উর্দুভাষী।১৫

    ব্রিটিশরা মুসলমানদের নিকট থেকে ভারতবর্ষে ক্ষমতা দখলের পর তাদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি চালু করে। মুসলমানদের নিকট থেকে ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকে তারা একটি সাম্প্রদায়িক মাত্রায় রূপ দেয়। দার্শনিক জেমস মিল তাঁর ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকতার সূচনা করেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাসকে তিনটি যুগ বা সভ্যতায় ভাগ করেন। এ তিনটি যুগ হচ্ছে যথাক্রমে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ যুগ৷ মিলের এ লেখাটি তৎকালীন সময়ে অসাধারণ স্বীকৃতি লাভ করে ও প্রভাব বিস্তার করে৷ মিলে পরবর্তী অনেক ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে ইতিহাস রচনায় তার যুগ বিভাজন দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হন।

    ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে অধ্যায়কে মিল হিন্দু যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে তখন উপমহাদেশের সব শাসক-বংশগুলি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলো এমন নয়। রাজবংশের হিন্দু ধর্মের প্রাধান্যের ভিত্তিতে এ যুগকে হিন্দুযুগ মনে করা ভ্রান্ত,কারণ মৌর্য,ইন্দো-গ্রীক,শক,কুষাণ প্রভৃতি বহু প্রধান রাজবংশই অহিন্দু ছিলো। অনেক প্রভাবশালী বৌদ্ধ রাজারাও তখন শাসন করেন। লানন্দা, তক্ষশীলার মত বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বৌদ্ধ শাসনামলে সর্বাধিক প্রচার ঘটে। মিল তার যুগ বিভাজনের দ্বিতীয় পর্বে আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই একসঙ্গে “মুসলমান” বলে অভিহিত করেন। মিল পূর্ব ঐতিহাসিকরা এদের ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতেন। এককভাবে মুসলমান শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে এদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হয় যা তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলে। তুর্কী, পার্সী এবং আরবরা ধর্মের দিক থেকে এক হলেও রাজনৈতিক ও জাতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে তৎকালীন সময় তারা ছিল ভিন্ন। এ ভিন্ন ভিন্ন জাতি দ্বারা ভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান হয়।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    মিল তার তৃতীয় যুগবিভাজনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভিত্তিক যুগবিভাজন থেকে সরে আসেন। তিনি একে খ্রিস্টান যুগ না বলে ব্রিটিশ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যেন এযুগের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ সুশৃঙ্খল,সভ্য,ধর্মনিরপেক্ষ যুগে প্রবেশ করে। এ তিনটি যুগের দ্বারা মিল বুঝিয়েছেন প্রথম যুগ ছিলো হিন্দুদের জন্য গৌরবময় যুগ,দ্বিতীয় যুগ ছিল ‘মুসলিম স্বৈরশাসনের’, তৃতীয় যুগ হচ্ছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার যুগ। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধুনিকায়নের পাশাপাশি মুসলমানদের অপর হিসেবে নির্মাণের কাজটিও একসাথে চলে। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতবর্ষের ধর্ম ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিলো। এটি শুধু হিন্দু মুসলিম বাইনারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুসলমান ধর্মের মধ্যে তখন বিভিন্ন বৈচিত্র্য ধারা (শিয়া, সুন্নি, হমেদিয়া)ছিলো। হিন্দুদের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ এবং এ বর্ণের বাইরেরও ছিলো প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠী। বৌদ্ধ, জৈনসহ ভারতবর্ষে তখন বহুবিধ ধর্ম ও বর্ণের লোক বাস করত। ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষে মধ্যযুগ সম্পর্কে যে ইতিহাস নির্মাণ করে রোমেলা থাপার একে মিথ বলে অভিহিত করেন।১৬ আরসি মজুমদার থেকে যদুনাথ সরকার পর্যন্ত সকলেই এই মিথকে অনুসরণ করেছেন।

    ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে যে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের নির্মাণ করে সে নির্মাণের ভিত্তিতেই ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্য হারায়। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে তখন দুটি সম্প্রদায় জন্য দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।

    ব্রিটিশ ভারতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে গুরুতর ছিলো সেটি হচ্ছে হরিজন বা দলিত সমস্যা৷ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতারা এবং শাসক গোষ্ঠীরা নিজেদের স্বার্থে সম্যাটিকে ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করেছেন। যার ফলে এ সমস্যাটি এখনও ভারতে রয়ে গেছে। তাদেরকে এমনভাবে বিমানবীকরণ করা হয় যে তাঁরা ভারতবর্ষকে নিজেদের জন্মভূমি হিসেবে মনে করতেন না। ১৯৩১ সালে আম্বেদকরের সাথে মহাত্মা গান্ধীর যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি বলেছিলেন ‘গান্ধীজি, আমার কোন মাতৃভূমি নেই। আপনি এমন কোন অস্পৃশ্যকে পাবেন না যে এই ভূখণ্ডের জন্য কোনরকম গর্ববোধ করে।’১৭ ১৯১৯ সালে আম্বেদকর ব্রিটিশদের নিকট দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি দলিত সম্প্রদায়কে পৃথক সামাজিক বর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্রিটিশ শাসকরা কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে এ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যায়।

    ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের ডাকা লন্ডন সম্মেলনে আম্বেদকর অংশগ্রহণ করেন। তিনি দলিতদের প্রধান হিসেবে এ সম্মেলন কমিটির নিকট তাঁর প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিলো দলিতদের অন্যায়ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তাদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ব্রিটিশরা তাঁর এ দাবি মেনে নেয়। কিন্তু গান্ধী নিজেকে অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবী করেন এবং এর বিরোধিতা করেন। গান্ধীর আমরণ অনশনের প্রতিজ্ঞা ও জাতিয়তাবাদী নেতাদের চাপের ফলে আম্বেদকর তাঁর দাবী প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। দলিতদের সমস্যাকে প্রান্তে রেখে ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করল। কিন্তু আম্বেদকর বা যোগেন মন্ডলের মতো দলিতদের প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ হলো না। হতাশার একপর্যায়ে স্বাধীন ভারতে আম্বেদকর তার অনুসারীদের নিয়ে স্বধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষও পরবর্তী সময় সেক্যুলার ভারতে সংখ্যালঘু প্রশ্নে দলিত সমস্যার মীমাংসা না করে বরং এটিকে আরো সমস্যা সংকুল করা হয়েছে।৩

    বাঙালিরা একসময় ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছে আবার বাঙালি জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করেছে। এ দুটি রাষ্ট্র গঠনের মূলে যে প্রেরণাটি কাজ করে তা হল, দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যবোধ। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরির পিছনে যে কারণটির কথা বলতেন সেটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের উপস্থাপনের বিষয়টির কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে তখন মুসলমান চরিত্র অর্থাৎ মুসলমানদের উপস্থানের অবস্থান ছিলো সীমিত। তাদের প্রান্তিকীকরণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। এ সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ যোগেল মন্ডলের মতো দলিতদেরও ছিলো। তাই তিনি দলিতদের নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে এ বৈষম্যব্যবস্থা আরো জেঁকে বসে। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের তুলনায় তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন অধ্যাপক রেহমান সোবহান,অধ্যাপক আনিসুল হক,অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকরা দুই অর্থনীতি তত্ত্বকে তোলে ধরেন। যার উপর ভিত্তি করে ছয় দফা দাবি পেশ করেন।

    পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আন্দোলনের সাথে বৈষম্যের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ বৈষম্যের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না করে অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ আন্দোলনকে প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করেন৷ তাদের বক্তব্য হচ্ছে মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্য বাঙালি নামক জাতি প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে প্রগতিশীল হয়ে উঠে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলে। শোষণ,বৈষম্যবোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়টি আড়াল রেখে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিশীলতার বাইনারি হাজির করার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সে প্রক্রিয়া বহাল রাখা।

    আর্টোয়ার্ক: স্বাধীনতা তুমি
    সূত্র: অন্য আলো

    ১৯৭১ হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর সেই রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এ রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়বিচারের অভাব। দীপন হত্যার পর তার পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি। কারণ তিনি নিশ্চিত আমাদের রা্ষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই। আরেকটি কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের জনগণ ফলস কনসাসনেসের মধ্যে বাস করছে। অপরের মুক্তির মধ্যেই যে তার নিজের মুক্তির এটি সে কল্পনাই করতে পারে না। যার ফলে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় সহিংসতার জন্ম দেয়।

    প্রাচ্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ সবসময়ই তার সমাজ কাঠামোর উপর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ধর্ম অথবা সেক্যুলারিজম দু’টির একটিকেই চূড়ান্ত ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ধর্ম এবং সেক্যুলারিজমের মধ্যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান নির্মাণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে এধরনের কৌশল স্পষ্টভাবে কাজ করে। আমাদের দেশে ‘আস্তিক’ ‘নাস্তিক’ ‘প্রগতিশীল’ ‘প্রক্রিয়াশীল’ ‘হেফাজতি’ ‘শাহবাগী’ এরকম বর্গ রয়েছে। এ বর্গকরণের মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। তারা এসব দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কৌশলে নিজেদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

    আমাদের দেশে প্রগতিশীল চিন্তকরা প্রগতিশীলতা চর্চার বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতা নামক ডিসকোর্সটি তৈরি করেছেন তা অত্যন্ত কৌশলী। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামক ডিসকোর্সটি মূলত ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড থেকে পাওয়া। আমাদের দেশে সম্প্রদায়িকতা শব্দটি দ্বারা শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিম বিদ্বেষকেই বোঝায়। আমাদের দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এটিকে শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। এর ফলে আমাদের দেশের আদিবাসীদের সমস্যা ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করা হয়;বিশেষত আদিবাসীদের ভাষা এবং জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা দিকটি।

    বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, যাদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের অধিকাংশই সমাজে বিশেষ সুযোগ গ্রহণকারী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন শ্রেণির লোকেদেকে তাদের সৃজনীশলতা বা জ্ঞানচর্চা দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে থাকে। বিভিন্ন ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলেও রাজনৈতিকীকরণের স্বার্থে তারা তাকে চেপে রাখেন। প্রগতিশীলতা চর্চার বিষয়টি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আধিপত্য বিস্তারের কৌশলে। রাষ্ট্র তার জনগণের উপর ক্ষমতা চর্চার সম্মতি উৎপাদানের কাজটিই তারা বিশেষভাবে করে থাকেন। এখানকার প্রগতিশীলরা চিন্তকরা সমাজ বিকাশের খাতিরে পশ্চিমা আলোকায়িত জ্ঞানের চর্বিতচর্বন দ্বারা আমাদেরকে আলোকিত করতে চান। কিন্তু একটি সমাজ প্রগতির জন্য শুধু ধার করা জ্ঞান দিয়ে চলে না। সমাজের ভিতর থেকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয়। যে সমাজ সৃষ্টিহীন সে সমাজ বন্ধ্যা এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়।

    এদেশে হিন্দু মুসলমানরা নৃ-তাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হলে আদিবাসীরা তা নয়। তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন। এ অর্থে তারাই প্রকৃত সংখ্যালঘু। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমরা হচ্ছি বাঙালি জাতি। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতরে অন্যান্য জাতিও রয়েছে। ধর্মীয় রাষ্ট্র যদি সাম্প্রদায়িক হয় তাহলে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র কতটুকু অসাম্প্রদায়িক তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

    বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি হয়ে যায়। তখন থেকেই সমস্যার সূচনা। মানবেন্দ্র লারমা সংবিধান প্রণয়নের সময় তীব্রভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন। ১৯৭২ সালের ২৫ ও ৩১ অক্টোবর গণপরিষদের খসড়া সংবিধানের উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে তর্ক বিতর্কের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত দেওয়া হলো-

    মানবেন্দ্র লারমা: আমরা করুণার পাত্র হিসেবে আসিনি। আমরা এসেছি মানুষ হিসেবে। তাই মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।
    মিসেস সাজেদা চৌধুরী: বৈধতার প্রশ্ন, জনাব স্পিকার, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলতে চেয়েছেন যে এই সংবিধানে তাঁদের উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমি বলব, তাঁরাও আজকে স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে তাঁদেরও একটা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
    একটি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেয়ে একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিক মর্যাদাজনক নয়?

    মানবেন্দ্র লারমা: আমি একজন মানুষ, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছি, যে জন্মভূমিতে আজন্ম লালিত-পালিত হয়েছি, সেই জন্মভূমির জন্য আমার যে কথা বলার রয়েছে, সে কথা যদি প্রকাশ করতে না পারি, যদি এই সংবিধানে তার কোনো ব্যবস্থাই দেখতে না পাই, তাহলে আমাকে বলতে হবে যে বঞ্চিত মানুষের জন্য সংবিধানে কিছুই রাখা হয়নি।

    আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া: মাননীয় স্পিকার, আমি প্রস্তাব করছি যে সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক।
    ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’

    মানবেন্দ্র লারমা: আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা চৌদ্দ পুরুষ—কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি। আমি জানি না, এই সংবিধানে আমাদের কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়।

    স্পিকার: আপনি কি বাঙালি হতে চান না?

    মানবেন্দ্র লারমা: মাননীয় স্পিকার, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় না। আমরা কোনো দিনই নিজেদের বাঙালি মনে করি না। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।

    আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সদস্য আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তির প্রতি, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবৈধ ভাষায় বক্তৃতা করেন।… ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বদলে যে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তারই প্রতি ষড়যন্ত্রমূলক এ বক্তব্য।”১৮

    পাকিস্তান শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা বাঙ্গালীদের উপর সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদি বিষয় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো। বাঙ্গালী জাতি তার জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য তা মেনে নেয়নি। তাঁরা নিজেদের বাঙ্গালী পরিচয়কে রক্ষার খাতিরেই দেশকে স্বাধীন করে।সেই বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার করে অন্যের উপর তা চাপিয়ে দেওয়ায় বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা বিরোধী।

    অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন ‘পাহাড়িরা তাদের দাবীগুলোকে গৃহীত ও বাঙলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ক’রে নিতে চান,যা সংবিধানের মূল চেতনার বিরোধী।’১৯ অধ্যাপক আজাদ হয়ত এ বিষয়টি লক্ষ করেননি যে স্বয়ং বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার উপর গুরুত্বারোপ দেওয়া হয়নি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রে সংবিধানে প্রণয়নে গণপরিষদকে কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। বাংলাদেশের গণপরিষদ একত্রে নিষ্ক্রিয় ছিল,তাঁর হাতে কোন নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। নির্বাহী ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রেপতি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিকট। গণপরিষদ তার কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। এজন্য দেখা যায় গণপরিষদে সংবিধান বিল আকারে উত্তাপিত হওয়ার পর যেসব সংশোধনী প্রস্তাব আছে তার অধিকাংশই বাতিল হয়ে যায়। আর এই বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা বিরোধী।

    আর্টওয়ার্ক: ইনডিজিনার পিপল

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত আদিবাসীদের উপর কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে কিভাবে আদিবাসীদের উপর বৈষম্যমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদেরকে বিমানবিকীকরণ করা হয়। আদিবাসীদের ক্রমাগতভাবে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। গারো, হাজং, ওরাও, রাখাইন, খাসিয়া ও সাঁওতালদের মধ্যে গড়ে ৬৮.৮ ভাগ লোকের নিজস্ব জমি নেই।২০

    অধ্যাপক আবুল বারাকাতের ভাষায় ‘আদিবাসী মানুষের ভূমির অধিকার স্বীকৃত নয় অথবা যতটুকু আছে তাও সহজে হরণযোগ্য।…. সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ এখন ভূমিহীন।….পঞ্চাশ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষের আনুপাতিক হার ছিলো ৭৫ শতাংশ,আর এখন তা ৪৭ শতাংশ’।২১ আদিবাসীদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যা নিয়ে ভাবতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, সমাধান আরো বহুদূরের বিষয়।

    বাংলাদেশে আদিবাসীদের উপর বিভিন্ন সময় যে শারিরীক বা সাংস্কৃতিক সহিংসতা ঘটানো হয় এসব বিষয়কে মুছে ফেলার জন্য তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

    আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্যে তাদের সমস্যা খুব একটা ফুটে উঠে না। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ‘The Ugly Asian’ উপন্যাসে যেভাবে আদিবাসীদের জীবনের রাজনৈতিক জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন আমাদের দেশে তা খুবই বিরল। আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত ফরাসি উপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামু তাঁর সাহিত্যিক নীরবতার জন্য বিশেষভাবে সমালোচিত। তাঁর উপন্যাসের অধিকাংশ ঘটনা ঘটে আলেজেরিয়াকে কেন্দ্র করে। আর আলজেরিয়া তখন ফ্রান্সের উপনিবেশ। কিন্তু তাঁর গল্পে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলিত স্থানীয়দের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা অনুপস্থিত। অথচ ক্যামু একই সময়ে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা,লেখক ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরব। ক্যামুর লেখায় স্থানীয়দের সমস্যার বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। আমাদের দেশে শিল্প, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও আদিবাসীদের উপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একই কাজ করে থাকেন।

    সত্যিকার অর্থকে বাংলাদেশেকে অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বাইনারি ডিসকোর্স থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সহনশীলতার ভিত্তিতে একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলতে। যে সমাজে মুক্তি ঘটবে আপামর জনসাধারণের ।

    তথ্যসূত্র
    ১)Talal Asad, Formation of The Secularism: Christianity Islam Modernity, California 2003, page 23
    ২) Saba Mahmood,Religious Difference in a Secular Age: A Minority Report,Princeton University Press, page 8
    ৩)Carl Schmitt, Political Theology, Four Chapter on The Sovereignty, Chicago 2005, page 36
    ৪)Talal Asad, Ibd, page 168
    ৫) Max Horkheimer and Theodor W. Adorno,Dialectic of Enlightenment,Philosophical Fragment, California, 2002 page 142
    ৬)Saba Mahmood, Ibd, page 170
    ৭)Talal Asad, Modern power and the reconfiguration of religious tradition interview with Saba Mahmood (1996)
    ৮) Ewen MacAskill,
    George Bush: ‘God told me to end the tyranny in Iraq,The gurdian
    ৯)Olivier Roy, Secularism Confronts Islam,Colombia University Press, 2007
    page 74-75
    ১০)Theshale Tibebu,Hegel and the Third World : The Making of Eurocentrism in World History, Syracuse University Press page 256-57
    ১১)Michael R Anderson,Islamic Law and the Colonial Encounter in British India WLUML occasional paper no.7 – June 1996 page 5
    ১২) Ibd page 11
    ১৩)আলী রিয়াজ, দক্ষিণ এশিয়ায় মাদ্রাসাশিক্ষা: প্রাক-ঔপনিবেশিক এবং ঔপনিবেশিক আমল,প্রতিচিন্তা, প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৭(ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)
    ১৪)প্রাগুক্ত
    ১৫)আহমদ শরীফ,বাঙলা বাঙালী ও বাঙালীত্ব,১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৭৪
    ১৬)Romila Thapar,What Secularism is and Where It Needs to Be Headed,The Wire,
    Oct 18, 2015
    ১৭) Arundhati Roy,The Doctor and the Saint,2014 page 43
    ১৮)মহিউদ্দিন আহমদ, বাঙালি-আদিবাসী জাতীয়তাবাদ বিতর্ক,প্রথম আলো, ১৯-০৮-২০১১
    ১৯) উদ্ধৃতিটি হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা’ বইয়ের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।
    ২০) Abul Barakat, Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh, page 27
    https://bea-bd.org › site › pdfPDF
    Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh/Abul Barkat
    ২১)আবুল বারাকাত, বাংলাদেশ কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭।

  • মাধব চক্রবর্ত্তী।। প্রাচীন ভারতে গো মাংস ভক্ষণ

    মাধব চক্রবর্ত্তী।। প্রাচীন ভারতে গো মাংস ভক্ষণ

    • অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    শুধু পশ্চিমের দেশগুলোয় নয়, বৈদিক যুগের ভারতীয়দের ভেতরেও গো মাংস ভক্ষণ প্রচলিত ছিল। বৈদিক ভারতীয়রা যজ্ঞে কি কি বলি দিত সেটা থেকেই বোঝা যায় তারা কি খেত। কারণ মানুষ তার দেবতা বা ঈশ্বরের কাছে সেটাই তর্পণ করে যা সে নিজে খায়। সত্যি কথা বলতে বৈদিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠান এবং যজ্ঞেই ষাঁঢ় ও গরু বলি হতো। গোমেধ এবং অশ্বমেধ নামে প্রচলিত দুই পশু বলির কথা এপ্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সুলগাভা বলিতে ষাঁড় বলি দেয়া হতো। এই বলিতে ষাঁড়টিকে একটি বর্শা বা গজাল দিয়ে বিদ্ধ করা হতো। দেবতা রুদ্রকে খুশি করতে এই বলি দেয়া হতো। গ্রহসূত্রতে তেমনটাই বলা হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: চেয়ারিং বুল
    শিল্পী: ধীঙ্কর যাদব
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    বৈদিক সাহিত্যে গোমাংস বিষয়ক উদ্ধৃতি 

    ঋগ্বেদের একটি স্তবে বলা হয়েছে,‘‘ইন্দ্র তোমার ষাঁড় আহার করবেন।” ঋগ্বেদের আর একটি স্তবে অগ্নিকে ‘উকসন্ন’ এবং ‘বসন্ন’ বলা হয়েছে  যার অর্থ ‘ষাঁড় ও বন্ধ্যা গাভীর খাদক।’ শুধু যজ্ঞের জন্যই নয়, খাবারের জন্যও গবাদি পশুসমূহ নিয়মিত কসাইখানায় নেয়া হতো যা ঋগ্বেদের আরও একটি স্তবে স্পষ্ট। আবার, ঋগ্বেদে এটিও সুপারিশ করা হয়েছে যে গরু যেন তরবারি বা কুঠারে কাটা হয়। এটা লক্ষ্যনীয় যে বর্তমানের হিন্দু বলি প্রথায় যে ‘ঝটকা বলি’ বা এক কোপে প্রাণির মস্তক বিচ্ছিন্ন করার কথা আছে, সেটা তখনো চালু হয়নি। সত্যি বলতে ঋগ্বেদের যুগে প্রচুর মানুষ যে বরং গোমাংসের ভক্ত ছিল তার প্রচুর সাক্ষ্য-প্রমাণ আজো ছড়িয়ে আছে। এমনকি শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানেও গোমাংস ভক্ষণ ছিল অনুষ্ঠানের একটি আবশ্যিক অংশ।

    তবে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো যে এই একই ঋগ্বেদে মাঝে মাঝে গরুকে আবার ‘অঘ্ন (যাকে বলি দেয়া যায় না)’ হিসেবে ‘অলঙ্ঘ্যনীয়’ মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং গোটা ঋগ্বেদের এমনটি ষোল বার বলা হয়েছে, তবে তিন ক্ষেত্রে ‘অঘ্ন’ (যদি পুং বা ষাঁড় হয়) বলি দেয়া যেতে পারে। তবে এটা থেকে এমনটি ভাবা যাবে না যে সেই সময়ে গো ভক্ষণ কোন নিন্দিত কাজ ছিল। এই প্রসঙ্গে এটা বরং বলা যেতে পারে যে সংস্কৃতে বলির গরু বোঝাতে ‘বস (যার অর্থ বন্ধ্যা গাভী)’ শব্দটি ব্যবহার করা হত তবে দুধেল গরু কালে-ভদ্রে বলি দেয়া হতো। একমাত্র এবিষয়গুলো খেয়াল রাখলেই বোঝা বা ব্যখ্যা করা সম্ভব যে কিভাবে বেদে গাভীকে নানা প্রশংসা বাক্যে ভূষিত করা হয়েছে এবং অসংখ্য বৈদিক স্তোত্রে তাকে ‘রুদ্রগণের মাতা, বসুদের কন্যা, আদিত্যগণের ভগিনী এবং অমৃতের কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

    যদিও ঋগ্বেদের ‘অঘ্ন’ কথাটি তিনবার বলা হয়েছে,তবুও দুধেল গাভীকে হত্যা করা যেমন পুরো নিষিদ্ধ, তেমন কোন নিষেধাজ্ঞা ষাঁড় হত্যার ক্ষেত্রে নেই। তবে এমনটা হতে পারে যে বেদের কিছু স্তোত্রের রচয়িতারা যদি প্রাগার্য (অনার্য) ভারতীয়দের কেউ হয়ে থাকেন (যারা কিনা গোমাংস ভক্ষণ অপছন্দ করতেন)তারাই কালক্রমে অসুর এবং ব্রাত্যদের মত আর্যায়িত হয়ে গেলে বা আর্য সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত হয়ে গেলে তারাই গোটা গোপ্রজাতিকে অলঙ্ঘ্যনীয় হিসেবে তকমাভুক্ত করতে পারেন। যেহেতু ভারতের বাইরে গরুর এই অলঙ্ঘ্যনীয়তা কারোর জানা ছিল না বা জানা থাকার কথাও নয়।

    অথর্ব বেদের সময় আসা পর্যন্ত ভারতে গোমাংস ভক্ষণের রীতি অপরিবর্তিত ছিল। তবু ঋগ্বেদের নানা জায়গায় কালক্রমে গোমাংস ভক্ষণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হতে শুরু করে।

    আর্টওয়ার্ক: টয় ‍সেলর
    শিল্পী: সিদ্ধার্থ সিংগাড়ে
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    ব্রাহ্মণ যুগে গোমাংস ভক্ষণের অভ্যাস আরো বেড়ে যায়। ‘তৈতিরীয় ব্রাহ্মণ’ ‘কাম ইস্টি’ বা ছোটখাট যজ্ঞগুলোয় নানা দেবতার কাছে গোপ্রজাতির কাকে কাকে বলি দেয়া যেতে পারে তা বলা হয়েছে। যেমন,দেবতা বিষ্ণর কাছে দেয়া যেতে পারে একটি বামুন ষাঁড়।ঝুঁকে পড়া দুই শিঙ বিশিষ্ট আর কপালে একটি দাগবিশিষ্ট ষাঁড়কে রুদ্রের কাছে আর একটি সাদা ও বন্ধ্যা গাভীকে দিতে হবে সূর্য দেবতার কাছে। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’-এ ষাঁড়কে অন্যতম যজ্ঞ বা বলির পশু হিসেবে বলা হয়েছে। তৈত্তিরীয় এবং পঞ্চবিশ্ব ব্রাহ্মণ থেকে আমরা জানতে পারি যে  অগস্ত্য মুনী একটি যজ্ঞে একসাথে একশোটি ষাঁড় বলি দিয়েছেন। ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের অত্যাধিক গোমাংস প্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন ‘আমি এটা খাই তবে মাংস নরম (আঁশলা)’ হতে হবে। তবে বেশ অবাক করা বিষয় হলো যে, এই একই ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ই গোমাংস খাবার বিরুদ্ধে দু’টো উপদেশ বা অনুরোধ রয়েছে।

    সূত্রসমূহের ভেতরে,কল্পসূত্র এবং গ্রহসূত্র-এ অল্পকথার ভেতরেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে জীবনের নানা ক্ষেত্রেই গোমাংস ছিল খাদ্যতালিকার একটি অংশ। সাংখ্যায়ণ সূত্রে বলা হচ্ছে যে, বিয়ের দিনে কনের বাবার বাড়িতে একটি ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দেয়া হবে এবং বিয়ের পর কনে যখন বরের বাড়িতে বর সমেত আসে,তখন বরের বাড়িতেও আর একটি ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দেয়া উচিত। এমনকি শ্রাদ্ধ বা পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে নানা তর্পণের ক্ষেত্রেও একটি ষাঁড় বা গরু বলি দেয়ার উপদেশ অপস্তম্ব এবং পরষ্কর গৃহসূত্র-এ বলা হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য এমনকি এমনও বলছেন যে গোমাংসের সুঘ্রাণে আত্মাসূহের আরোগ্য হয়। বশিষ্ঠ সূত্রে বলা হচ্ছে ‘যজ্ঞে নিমন্ত্রিত কোন সন্ন্যাসী যদি মাংস খেতে অস্বীকৃতি জানান…তবে তিনি নরকে তত বছর থাকবেন যতটা চুল সেই বলিকৃত পশুর ছিল বা আছে।’ খাদিরা এবং গভীলা-সূত্রে নতুন ঘর তোলার সময় বসতবাড়ির অধিষ্ঠাতা দেবতা বা অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উদ্দেশ্যে একটি কাল গরু বলি দেবার কথা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

    ঘরে সম্মানিত অতিথিবর্গ যেমন শিক্ষক, পুরোহিত, রাজণ্যবর্গ, বর বা গুরুগৃহে শিক্ষা শেষে ফিরে আসা বৈদিক ছাত্রের আগমন উপলক্ষ্যে ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দিয়ে সম্মান জানানোর প্রথা চালু ছিল এবং একারণেই বৈদিক সাহিত্যে ঘরে আগত কোন অতিথিকে বলা হতো ‘গোঘ্ন’ বা ‘গোহত্যাকারী’ বা যার জন্য গরু হত্যা করতে হয়। ‘মধুপর্কে’র অনুষ্ঠান এপ্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মধুপর্ক অনুষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে খুব প্রাচীন হয়ে থাকবে যেহেতু কোন সম্মানিত অতিথিকে গোমাংস সহযোগে আপ্যায়ন করার বিষয়টি ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ এবং ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’ উভয় গ্রন্থেই আছে। আর এসবকিছুই মোটামুটি ঋগ্বেদের যুগে ঘটে থাকবে।

    নৈতিক বিধিবিধান এবং গো–ভক্ষণ

    আমরা এখন স্মৃতি সাহিত্যের দিকে ফিরব। মনু, বশিষ্ঠের মতই, মাত্র এক পাটি দাঁত উঠেছে এমন যাবতীয় গবাদি পশুর মাংস ভক্ষণকে অনুমোদন দিয়েছেন। সেই হিসেবে তাহলে অবশ্যই গরুও এসব ভক্ষ্য প্রাণির তালিকায় আসবে এবং সেটা মেধাতিথি এবং রাঘবানন্দের মত পণ্ডিতদের মন্তব্য থেকেও পরিষ্কার। মনু রাজাদের আপ্যায়নেও মধুপর্ক সহযোগে গোমাংস দেবার সুপারিশ করেছেন। যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি সুনির্দিষ্ট ভাবে বলে যে ‘মাহ-ওক্ষ’ বা ‘বড় ষাঁড়’ এমন সব আয়োজনে (যেমন, রাজন্যবর্গের আপ্যায়নে) বলি দিতে হবে। সত্যি বলতে মনু এবং যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি উভয়েই বিশেষ বিশেষ আয়োজন যেমন যজ্ঞ বা পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণে গবাদি পশুর বলি দেবার সুপারিশ  করেছেন। বিশেষ দিনগুলো ছাড়া গোহত্যা ‘উপপাতক’ বা ‘ছোট পাপ/অন্যায়’ হলেও ‘মহাপাতক’ বা ‘বড় পাপ/অন্যায়’ ছিল না।  যদিও মনু-স্মৃতির লেখক ব্যক্তিগত ভাবে ‘অহিংসা’ নীতির নিশ্ছিদ্র সমর্থক ছিলেন এবং যিনি কিনা এমনটাও বলেছিলেন যেহেতু কোন জীবন্ত প্রাণিকে হত্যা না করে কোন মাংস পাওয়া সম্ভব নয়,আর জীব হত্যা করে স্বর্গে যাওয়া সম্ভব নয়, সুতরাং মাংস খাওয়া বাদ দেওয়া উচিত, তবে সেই যুগে তখনো মাংস খাওয়ার চল ছিল আর তাই মনুর এই মতামত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে আরো কয়েকশ বছর লেগে গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: বুল আন্ডার মুনলাইট
    শিল্পী: ধীঙ্কর যাদব
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    প্রাচীন বিজ্ঞান এবং সাহিত্য থেকে 

    ভারতের প্রাচীন ব্যাধি ও আরোগ্য সংক্রান্ত কাজগুলোর ভেতর ‘চরক সংহিতা’য় গর্ভবতী মেয়েদের গোমাংস খেতে বলা হলেও প্রতিদিন সবাইকে খেতে মানা করা হয়েছে। আর. এল. মিত্র আমাদের আরো জানান যে মধ্যযুগের ভারতীয় কিছু ব্যাধি ও আরোগ্য শাস্ত্রে মূর্চ্ছা যাওয়া রোগীদের জন্য গোমাংসের স্যূপ পথ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছিল।

    মহাকাব্যগুলোয় ‘গোমেধ’ যজ্ঞের কথা সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মহাভারত’-এর ‘বনপর্বে’ একথাও বলা হয়েছে যে বৈদিক মন্ত্রের উচ্চারণের সাথে সাথে বলিকৃত পশুরা স্বর্গ পাবে এবং বনপর্বে রাজা রন্তিদেবের কথাও বলা হয়েছে যার যজ্ঞ আয়োজনে প্রতিদিন গরুসহ দু’হাজার প্রাণি বলি হতো। আবার ‘মহাভারত’-এর ‘উদ্যোগপর্বে’ রাজা নহুষ মহামুনী অগস্ত্যের অভিশাপে স্বর্গ খেকে নিচে নিক্ষিপ্ত হন যেহেতু তিনি গরু হত্যা বিষয়ে বেদের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং একজন ব্রাহ্মণকে অপমান করেন।

    ভবভূতি তাঁর ‘উত্তর রাম-চরিত’-এ (৪র্থ দৃশ্য) বর্ণনা করেছেন যে কিভাবে মহাকবি বাল্মীকি মহামুনী বশিষ্ঠকে আমন্ত্রণ জানাবেন বলে বেশ কিছু বাছুর বলি দেন। একই লেখকের ‘মহাবীরচরিত্র’ গ্রন্থ থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে কিভাবে বশিষ্ঠ নিজে বিশ্বামিত্র, জনক, সতানন্দ এবং অন্যান্য মুনীদের ‘হৃষ্টপুষ্ট বাছুর’ দিয়ে আপ্যায়ণ করেছেন ও জমদগ্নকে এই বলে প্রলুব্ধ করেছেন,‘বকনা-বাছুর বলির জন্য প্রস্তুত এবং ঘৃতে পলান্ন প্রস্তুত করা হয়েছে।’

    কৌটিল্যর ‘অর্থশাস্ত্রে’ গবাদিপশুরা শ্রেণিবদ্ধ, যেখানে ষাঁড়সমূহকে কসাইখানায় পাঠানোর অভিপ্রায় মনোগত তবে দুধেল গাভি এবং বাছুর যজ্ঞের জন্য মনোনীত হলেও কসাইয়ের তাঁবুতে নিষিদ্ধ। অশোক তাঁর শিলালিপি ১-এ এবং স্তম্ভ লিপি–১-এ উল্লেখ করেছেন যে শুরুতে হাজার হাজার পশু রাজকীয় রান্নাঘরে বলি দেয়া হতো। প্রজাদের ভেতর গোমাংসের বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ‘অহিংসা’র প্রবল প্রচারক অশোক বছরের মাত্র কয়েকটি দিন প্রাণি হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। যেমন, প্রজননক্ষম ষাঁড় বধ্য তালিকায় থাকলেও গাভী হত্যা করা যাবে না।

  • ব্লেড রানার ২০৪৯: যে তুচ্ছ নায়কের গল্প ইতিহাসে থাকে না

    ব্লেড রানার ২০৪৯: যে তুচ্ছ নায়কের গল্প ইতিহাসে থাকে না

    • নিসর্গ নিলয়

    মাঝে মাঝে মনে হয় না, ‘কোন দুনিয়ায় আছি?’ বক্রোক্তি অর্থে নয়, সত্যি সত্যিই। এই যেমন ধরি করোনাভাইরাসের সময়টা। বুঝে উঠছি না যে কী হল, দুনিয়ার এ কী হল, কিংবা পরিবার-পরিজনদের কেউ আক্রান্ত হয়ে মারা গেল হুটহাট কীভাবে হল? হঠাৎ করে আমাদের সবকিছু খুব অদ্ভুত মনে হয়, মনে হয় আসলে কী হচ্ছে? কিছু মেলাতে পারি না, তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর মনে হয় নিজেকে, নিজের কিছু করার নেই, কোন জায়গা নেই। সবসময়ই কী এরকম ছিল? কী করব এরকম হলে?

    ব্লেড রানার ২০৪৯ এর গল্প শুরু এরকম একটা দিন থেকে। তার আগে ব্লেড রানারের কিছু ট্রিভিয়া বলি।

    ব্লেড রানার ২০৪৯

    Blade Runner 2049 হলিউডি সিনেমা। রিলিজ হয় ২০১৭ সালে। ব্লেড রানার ২০৪৯ একটা সিকুয়েল, এর প্রথম সিনেমা Blade Runner বের হয় মান্ধাতা আমলে, ১৯৮২ সালে। পরিচালক ছিলেন রিডলি স্কট (আমি ব্যক্তিগতভাবে রিডলি স্কটের অধিকাংশ সিনেমা খুবই অপছন্দ করি, কেন জানি না। সম্ভবত রিডলি স্কটের নাম থাকার কারণেই অসংখ্যবার নাম শোনার পরেও প্রথমটা দেখি নাই, এজন্য এখন খুব দুঃখ হচ্ছে। তবে প্রথমটা শিগগিরই দেখে ফেলব আশা করি)। সিনেমাটা বানানো হয় সায়েন্স ফিকশন লেখক ফিলিপ কে. ডিকের একটা উপন্যাস অবলম্বনে, নাম Do Androids Dream of Electric Sheep? সাই-ফাই মুভি দেখতে পছন্দ করলে ডিকের গল্প অবলম্বনে করা আরও অনেক কিছু আপনি দেখেছেন অবশ্যই, যেমন মাইনরিটি রিপোর্ট, টোটাল রিকল, এডজাস্টমেণ্ট ব্যুরো। এবং দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসল। যাই হোক, ব্লেড রানার যখন ১৯৮২ সালে মুক্তি পায় তখন সিনেমাটা কেউ খুব একটা দেখতে চায় নাই। খুবই ধীরে ধীরে, পরের বিশ বছরে সিনেমাটি কাল্ট ফিল্মে পরিণত হয়। এই সিনেমার মোটমাট সাতটা ভার্সন রিলিজ হয়! সর্বশেষ ২০০৭ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্স এর ‘ফাইনাল কাট’ ভার্সন রিলিজ করে।

    ব্লেড রানার একটা ডিস্টোপিয়ান ফিকশন, এমন একটা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ে ঘটনা চলতে থাকে যেখানে কিছুই ঠিক নেই। ১৯৮২ সালের সিনেমাটার ফিকশনাল সময়কাল ২০১৯ সাল। মানুষ এত ‘উন্নত’ যে এখন পাড়ি জমাচ্ছে অন্যান্য গ্রহে উপনিবেশ তৈরি করতে। বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বরাতে আরও শক্তিশালী, শারীরিকভাবে সক্ষম নতুন ধরনের রোবটিক মানুষ ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায়, যাদেরকে বলা হয় রেপ্লিক্যান্ট। এই রেপ্লিক্যাণ্ট তৈরিতে একচেটিয়া ব্যবসা করছে টাইরেল কর্পোরেশন, পৃথিবী ও পৃথিবীর বাইরে বিভিন্ন জায়গায় এই কারখানায় উৎপাদিত রেপ্লিক্যাণ্টদের কাজে লাগানো হচ্ছে গতর খাটানোর জন্য। যে সব জায়গায় মানুষের পক্ষে কাজ করা সম্ভব না, যেমন তীব্র তেজস্ক্রিয় পরিবেশ, সেসব জায়গায় রেপ্লিক্যাণ্টদের দিয়ে কাজ করানো হয়। আর ‘মানুষ’ না হওয়ায় তাদের নিয়ে বিশেষ চিন্তাও নেই, তাদের দিয়ে দাসের মত কাজ করানো হয়। রেপ্লিক্যাণ্টরা মানুষের মত হলেও মানুষের মত না, তারপরেও কিছু সন্দেহের কারণে তাদেরকে প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে বা সদর দপ্তরে হাজিরা দিতে হয় ভয়েট-ক্যাম্পফ টেস্ট বা বেসলাইন টেস্টের জন্য। এই টেস্টের হিসাব হল, একটা নির্দিষ্ট স্কোরের কম-বেশি দিয়ে হিসাব করা যায় টেস্ট সাবজেক্টের কি মানুষের মত অনুভূতি আছে কি নাই। অর্থাৎ স্কোর বেসলাইনের উপরে হলে সে রেপ্লিক্যাণ্ট, নিচে হলে মানুষ। প্রথম সিনেমার ঘটনা শুরুও হয় এই বেসলাইন টেস্ট দিয়ে। রেপ্লিক্যান্টরা বায়োইঞ্জিনিয়ার্ড কৃত্রিম মানুষ হলেও তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষেরই তৈরি, সেখানে মানুষের অনেক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এসে পড়ে। উপরন্তু, টাইরেল কর্পোরেশন এআই টেকনোলজি আরও এক ধাপ উপরে নিয়ে গেছে, তাদের এডভান্সড এআই প্রযুক্তির নাম নেক্সাস মডেল। এই নেক্সাস মডেলের রেপ্লিক্যাণ্টদের মধ্যে যাতে অস্তিত্বগত সংকট তৈরি না হয় সেজন্য কিছু কৃত্রিম স্মৃতি ইমপ্ল্যান্টও করা থাকে। ব্লেড রানারের ঘটনা যখন চলছে, তখন নেক্সাস-সিক্স মডেলের কিছু রেপ্লিক্যাণ্ট বিদ্রোহ করে বসে। ফলে পৃথিবীতে নেক্সাস-সিক্স মডেলের সব রেপ্লিক্যাণ্টকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন পুলিশ ডিপার্টমেণ্টে আলাদা একটা সেকশনই থাকে, যাদের কাজ হল এসব ‘ভ্রষ্ট রেপ্লিক্যাণ্টদের’ খুঁজে খুঁজে মেরে ফেলা। তাদেরকে বলা হয় ব্লেড রানার।

    প্রথম সিনেমার ঘটনা শুরু হয় এরকম এক ব্লেড রানারকে নিয়ে। তার নাম রিক ডেকার্ড (হ্যারিসন ফোর্ড)। ডেকার্ড তার এই কাজ নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট না, কিন্তু তাকে জোর করে পাঠানো হয় নেক্সাস-সিক্স মডেলের কিছু বিদ্রোহী রেপ্লিক্যাণ্টকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলার জন্য। যেহেতু রেপ্লিক্যাণ্টরা মানুষ না, তাই তাদেরকে ‘মেরে ফেলার’ প্রশ্ন আসে না, তাদেরকে ‘রিটায়ার’ করা হয়। রিক ডেকার্ডের ঘটনা শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ বছর পরে শুরু হয় ব্লেড রানার ২০৪৯ এর ঘটনা। এবারের চরিত্র অফিসার KD6–3.7 (রায়ান গসলিং)। নেক্সাস-সিক্স থেকে নেক্সাস-এইট মডেলের কতগুলো সিরিজ বিদ্রোহের পরে টাইরেল কর্পোরেশনের রেপ্লিক্যাণ্ট উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা দেউলিয়া হয়ে পড়ে। বলতে গেলে টাইরেল মোটামুটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাদের যাবতীয় ডাটাবেস সব ধ্বংস হয়ে যায়। একই সাথে পৃথিবীতে শুরু হয় পরিবেশ বিপর্যয়, দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। বিজনেস টাইকুন নিয়ান্ডার ওয়ালেস টাইরেলের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা সংগ্রহ করেন এবং পৃথিবীর দুর্যোগে এগিয়ে আসেন বড় আকারে সিন্থেটিক ফার্মিং ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে। তাঁর কারণে পৃথিবী দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পায়।

    ওয়ালেসের চরিত্রে জ্যারেড লেটো

    ওয়ালেস নতুন নেক্সাস-নাইন মডেলের উৎপাদন শুরু করেন। নেক্সাস-্নাইন মডেল আবার শ্রমনির্ভর কাজে ব্যবহার শুরু হয়। এই মডেল আরও উন্নত, আরও অনুগত। নেক্সাস-সিক্স ও সেভেন মডেল আরও আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে, নেক্সাস-এইট মডেলের অনেক রেপ্লিক্যাণ্ট এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে আছে। নতুন ব্লেড রানারদের কাজ হল এই নেক্সাস-এইট মডেল বা আরও পুরানো মডেলের রেপ্লিক্যাণ্টদের ‘রিটায়ার’ করা। ব্লেড রানার ২০৪৯ এর ঘটনায় আমরা এখন প্রবেশ করব, তবে তার সাথে সাথে বলতে থাকব এর ভিতরে আমি আসলে কী কী দেখেছি।

    মুদ্রার উল্টোপিঠ: সাইবারপাঙ্ক ডিস্টোপিয়া

    বিশ্বায়নের কারণে পুরো পৃথিবীই এখন প্রযুক্তিগত ‘উন্নয়নের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, না চাইলেও হাতে হাতে প্রযুক্তি আসছে। প্রযুক্তির আবার ক্লাস ডিভিশনও আছে। সে যাই হোক, এই প্রযুক্তির জোয়ার আমাদেরকে নতুন একটা সামাজিক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে তা আমরা বুঝতেই পারি। প্রযুক্তির ব্যবসায় আসছে নতুন এলিট। আসছে ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস, মার্ক জাকারবার্গ-রা, কিংবা আমাদের উঠতি সফল টেকনোলজিক্যাল উদ্যোক্তারা, যাদের আলিশান জীবনের(তারা যদি প্রচার করে যে তারা খুবই সাধারণ জীবনযাপন করে সেটাও আলিশানত্বের লক্ষণই!) কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না, আবার আমাদের ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত কিংবা নোয়াখালীর অপু ভাই, নীলফামারীর জামাল-কামাল-জরিনাও টেকনোলজির দুনিয়ার বাইরে না, সে মোবাইল ফোন-কম্পিউটার চালায়, সে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, দুনিয়ার বড় বড় খবর পায়। তাকে হয়ত গ্রীন রেভলিউশনের কৃষিকাজের টেকনোলজি ব্যবহার করতে হয়, বড় বড় কলকারখানায় অদ্ভুত যন্ত্রপাতি চালাতে হয়। কিন্তু তাকে একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস বা টিকটক ভিডিও দেওয়ার সাথে সাথে আবার দুদণ্ড ভাবতে হয়, তার কথা-কাজকর্ম আবার এলিটদের ক্ষেপিয়ে দিচ্ছে কিনা!

    টেকনোলজির প্রসার বাড়তে বাড়তে যখন দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে গেল, তখন আধুনিক সাহিত্যেও ঢুকে পড়ল টেকনোলজি। শুধু গল্পের চরিত্র মোবাইল ফোন ইন্টারনেট বা যন্ত্রপাতি চালাচ্ছে এমন নয়, গল্পের বিষয়বস্তুই হয়ে ওঠে টেকনোলজি। সায়েন্স ফিকশনের একটা বড় অংশই হল বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রভাবে ভবিষ্যতে কী হবে বা হতে পারে, তার সম্ভাবনা কল্পনা করা। আপাতত সিনেমাতে সায়েন্স ফিকশনের প্রভাব নিয়ে কথা বলি। এভেঞ্জার্স বা আয়রনম্যান — এসব সিনেমা আমরা শহুরেরা অনেকেই হয়ত দেখেছি। সেখানেও এডভান্সড টেকনোলজির সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছে, সবকিছুতে টেকনোলজির প্রভাব একদিন আমাদেরকে এনে দেবে আয়রনম্যান বা ক্যাপ্টেন আমেরিকা, যারা আমাদেরকে বাঁচাবে বড় বিপদ থেকে। তাদের জীবনে আছে অসংখ্য নতুন নতুন যন্ত্রপাতি যেগুলো তাদের জীবনকে করেছে সহজ, তাঁদের পৃথিবী বাঁচাবার প্রচেষ্টাকে করেছে আরও আকর্ষণীয়, মোহনীয়, মন্ত্রমুগ্ধকর। আমরা তাদের টেকনোলজি দেখে হাঁ হয়ে যাই, বিস্ময়ে ভাবতে থাকি, “আহা, আমারও যদি এরকম হত!” এই আয়রনম্যানদের সিনেমার একটা থিমই হল টেকনোক্রেসি, অর্থাৎ টেকনোলজির একচেটিয়া প্রসার এবং তার ফলে উঠে আসা ‘হিরো’রা, যারা আসলে হাই-ফাই উঁচুতলার ‘মহান’ মানুষ।

    কিন্তু সবাই তো আর এরকম ‘মহান হিরো’ হয়ে ওঠে না, টেকনোলজিও সবসময় ত্রাতা হয় না। একে-ফর্টিসেভেন বা নিউক্লিয়ার বোম — সেও প্রযুক্তিই। যে কম্পিউটার-মোবাইলফোন আমরা চালাই তার কাজ যতটা না আমাদের জীবন সহজ করা তার থেকেও বেশি নজরদারি করা। এই যে উল্টোপিঠে পড়ে থাকে সেসব মানুষ যারা আয়রনম্যানের ‘সাইড-ক্যারেক্টার’ও থাকে না, যারা রাস্তায় হেঁটে চলে এবং যাদের জীবন আয়রনম্যানদের মত এত রোমাঞ্চকর না, তাদের কথা কই? কিংবা তাদের কী কোন গল্প নাই? আছে। এগুলো উঠে আসে সাইবারপাঙ্ক ডিস্টোপিয়াতে। ডিস্টোপিয়া ব্যাপারটা কী আসলে? কাগজে কলমে ডিস্টোপিয়া হল এমন এক কল্পিত অবস্থা যেখানে পুরো সমাজ ধ্বসে পড়েছে, সিস্টেম এত খারাপ ও ভয়ংকর যে বেঁচে থাকাই কষ্ট, অর্থাৎ ‘ইউটোপিয়া’ ধারণার উল্টোটা। তবে একটু চিন্তা করলে দেখব, আসলে ইউটোপিয়া-ডিস্টোপিয়ার ব্যাপারটা খুবই আপেক্ষিক। ইউটোপিয়ায় শুধু একপাশের ছবি দেখা যায়, আরেকপাশের যায় না। সজীব ওয়াজেদ জয় বা ডিজিটাল বাংলাদেশের হোতাদের জন্য যে সিস্টেমটা ইউটোপিয়া, সেটাই আমাদের মত সাধারণ মানুষ, ফটোগ্রাফার শহীদুল ইসলাম, সাংবাদিক কাজলদের জন্য ডিস্টোপিয়া। এরা একই সাথে পাশাপাশি থাকতে পারে! আয়রনম্যানের গল্প পুরো ইউটোপিয়া না হলেও সেখানে টেকনোক্রেসির ইউটোপিয়ারই একটা ছায়া দেবার চেষ্টা করা হয়। ডিস্টোপিয়ান ফিকশনে আসলে দেখানো হয় উল্টোপাশের ছবিটা। ব্লেড রানার ২০৪৯ ডিস্টোপিয়ান ফিকশন হলেও নিয়াণ্ডার ওয়ালেসের জন্য সেটা হয়ত ইউটোপিয়ার কাছাকাছিই। কিন্তু নিচুতলার মানুষেরা, যাদের জীবনে প্রযুক্তির বাহার প্রবেশ করলেও তাদের রুক্ষ, জর্জরিত, দরিদ্র জীবনধারার তেমন কোন পরিবর্তন আসে নি, যাদের এই ‘হাই-টেক লো-লাইফ’ জীবনধারা সাইবারপাঙ্ক নামে সায়েন্স ফিকশনে পরিচিত, তারা তো আসলে ডিস্টোপিয়াতেই থাকে!

    বাস্তবতার হেঁয়ালি

    ব্লেড রানার ২০৪৯ এর মূল চরিত্র কোন ‘মানুষ’ না, একজন ‘কৃত্রিম মানুষ’ যার নিজস্ব কোন ইচ্ছা নাই, ইচ্ছার অধিকার নাই। অফিসার KD6–3.7 (রায়ান গসলিং) ‘নামের’ একজন রেপ্লিক্যাণ্ট কাজ করে পুলিশ ডিপার্টমেণ্টে, ব্লেড রানার হিসেবে। তার মডেল নেক্সাস-নাইন। তার এক মিশন থাকে নেক্সাস-এইট মডেলের এক রেপ্লিক্যাণ্টকে রিটায়ার করানোর। তাকে রিটায়ার করতে গিয়ে সে একটা বাক্স খুঁজে পায়, বাক্সের ভিতরে কিছু হাড়গোড়। কোন এক রেপ্লিক্যাণ্টের দেহাবশেষ। সেগুলো টেস্ট করানোর সময় দেখা যায়, এই রেপ্লিক্যাণ্ট মারা গেছে বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে। রেপ্লিক্যাণ্টদের সাধারণত বাচ্চা হয় না, তাদেরকে প্রজনন সক্ষমতা দিয়ে তৈরি করা হয় নাই। খুবই কম সংখ্যক রেপ্লিক্যাণ্টকে এই সক্ষমতা দেওয়া হলেও এরকম কোন রেকর্ড ছিল না। রেপ্লিক্যাণ্টের বাচ্চা হওয়া ভয়ংকর জিনিস, মানুষের ধারণা তাহলে তারা নিজে নিজে জনসংখ্যা বাড়াতে পারবে এবং আবারও বিদ্রোহ করবে। অতি দ্রুত অফিসার K-কে পাঠানো হয় সেই বাচ্চাকে খুঁজে বের করে ‘রিটায়ার’ করানোর জন্য। খুঁজতে গিয়ে অফিসার K দেখে যেখানে দেহাবশেষ কবর দেওয়া ছিল সেই মরা গাছের গোড়ায় একটা তারিখ খোদাই করা, ৬-১০-২১।

    ব্লেড রানার ২০৪৯

    ঝলক দিয়ে অফিসার K-র মনে একটা স্মৃতি মনে পড়ে। সে ছোটবেলায় একটা বিল্ডিঙের ভিতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে, তাকে ধাওয়া করছে আরও কয়েকটা বাচ্চা, তার হাতের একটা কাঠের খেলনা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। খেলনাটার গায়েও তারিখ খোদাই করা, ৬-১০-২১।

    অফিসার K খুব চিন্তায় পড়ে যায়। এই স্মৃতিটা কি তার কিনা সে জানে না, কারণ সে বরাবরই জানে সে একজন রেপ্লিক্যাণ্ট, তার কোন মানবীয় স্মৃতি নেই। যেগুলো আছে সেগুলো কৃত্রিমভাবে ইমপ্ল্যান্ট করা, যাতে রুক্ষ, মানবেতর কাজ করতে করতে রেপ্লিক্যাণ্টরা অপ্রকৃতিস্থ না হয়ে যায়। কিন্তু তাহলে এই বিষয়টা মিলে গেল কীভাবে?

    অফিসার K নিজের বাসায় ফিরে আসে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে তার হলোগ্রাফিক প্রেমিকা। প্রেমিকা কিনতে পাওয়া যায়, সে আচরণ করে ঠিক যেমনটা তার ক্রেতা চায়, তেমনি করেই। সেই পণ্য-প্রেমিকা, একখণ্ড হলোগ্রাফিক এআই চালিত ডাটাসেট, অফিসার K-কে বলে যে সে তাকে ভালবাসে। অফিসার K-ও জানে যে এই এআই ঠিক তেমনই আচরণ করবে যেমনটা সে চায়। কিন্তু সে তার অনুভূতিকে আলাদা করতে পারে না, সে বুঝতে পারে সে এই এআইকেই ভালোবাসে। এই রক্তমাংসহীন ফাঁপা হলোগ্রাফিক ইমেজের সাথেই সে মিলিত হতে চায়। হলোগ্রাফিক প্রেমিকাই তার জীবনে বাস্তব হয়ে ওঠে, কোন রক্তমাংসের মেয়ের প্রতি সে আকৃষ্টও হয় না। সেই প্রেমিকা তাকে আদর্শ কোমল প্রেমিকার মত গিফটও দেয়, একটা পোর্টেবল হলোগ্রাফিক কন্টেইনার, যেটাতে করে অফিসার K তার প্রেমিকাকে যে কোন জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে।

    — “I want to be real for you.” — “You are real to me.”

    মুভির কাহিনীর প্রায় পুরোটাই চলে অফিসার K-র এই স্মৃতিটুকুর খোঁজ নিয়ে। সে খুঁজতে খুঁজতে সেই এতিমখানায়ও চলে যায় যেখানে তার সেই স্মৃতিটুকু ঘটেছিল। সে কাঠের খেলনাটাও খুঁজে বের করে, খোদাই করা তারিখটা মিলিয়ে দেখে। কিন্তু সে একটা দোটানায় বারবারই পড়তে থাকে। জেনেটিক কোড খুঁজতে গিয়ে দেখে ঐ দিন একইসাথে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে জন্মেছিল, যাদের জেনেটিক কোডে অসম্ভব রকমের মিল। তাহলে তার স্মৃতিটা কি সত্য? নাকি ইমপ্লাণ্টেড? সে জানতে পারে না। কিন্তু আমরা দেখি সে প্রবল আশা নিয়ে বেঁচে থাকে, মেমরি-মেকার স্টেলিনের সাথে দেখা করে সে জানতে পারে এই স্মৃতি সত্য। সে প্রবল ধাক্কা খায়। সে দেখা করতে যায় ডেকার্ডের সাথে, যে সম্ভবত তার বাবা।

    সেখানেও আমরা দেখতে পাই অফিসার K-র জীবনে বাস্তব আর কৃত্রিমতার কোন পার্থক্য নেই। ডেকার্ডের কাছে সে নিজের পরিচয় দেয়, তার নাম জো। তার KD6–3.7 রেপ্লিক্যাণ্ট পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তার ‘কৃত্রিম’ প্রেমিকার দেওয়া নাম, জো। তার নাম জো।

    জোয়ের প্রথম মৃত্যু

    এই সিনেমার শেষ দিকে দুইটা মোড়-ঘুরানো মুহূর্ত আছে। একটা হল, যখন জো জানতে পারে সে আসলে ডেকার্ডের সেই সন্তান না। জো বুঝতে পারে, মেমরি-মেকার স্টেলিনই ডেকার্ডের মেয়ে। স্টেলিন লুকিয়ে তার সবচেয়ে বিষাদগ্রস্ত স্মৃতির একটা ইমপ্ল্যাণ্ট করে দিয়েছে অনেক রেপ্লিক্যাণ্টের মধ্যেই। তাদেরই একজন জো। জো যেমন সামান্য একজন রেপ্লিক্যাণ্ট ছিল, সে তাই-ই রয়ে গেল। সে এক কৃত্রিম মানুষ, যার কোন ‘বাস্তব স্মৃতি’ নেই। কিন্তু আসলেই কি সব কৃত্রিম? জো-এর ‘কৃত্রিম’ জীবনের যে টানাপোড়েন, তা কি আর কৃত্রিম থাকে দর্শকের মাঝে?

    জো-কে রেজিস্ট্যান্স গ্রুপের সদস্যরা (যারা সবাই রেপ্লিক্যাণ্ট) উদ্ধার করে, এবং বলে, “Dying for the right cause is the most human thing we can do.” আমরা দেখতে পাই কৃত্রিম মানুষেরা হয়ে উঠছে মানুষের থেকেও মানবিক। তারা মানুষের মতই মুক্তির স্বপ্ন দেখছে। দর্শক হিসেবে আমিই তখন আর পার্থক্য করতে পারি না, কে আসল মানুষ আর কে কৃত্রিম?

    ব্লেড রানারের পুরো প্লটের একটা প্রধান থিম হল এই বিষয়টা — যেখানে বাস্তব আর কৃত্রিমের পার্থক্য ধোঁয়াটে হয়ে যায়। যেখানে বাস্তবের থেকেও বেশি বাস্তব হিসেবে এসে হাজির হয় বাস্তবতার প্রতিলিপি।ফরাসি দার্শনিক জাঁ বদ্রিয়া যাকে বলেছেন হাইপাররিয়ালিটি।

    ব্লেড রানারের এনার্কিজম ও নায়কের তুচ্ছতা

    সিনেমার দ্বিতীয় মোড়-ঘুরানো মুহূর্ত হল যখন জো-কে পাঠানো হয় ডেকার্ডকে খুন করতে। রেজিস্ট্যান্স গ্রুপের রেপ্লিক্যাণ্টরা জো-কে বলে, যে করেই হোক আমাদের মুক্তির লড়াইয়ে নামতে হবে। সঠিক লক্ষ্যের জন্য মারা যাওয়াই সবচেয়ে মানবীয় কাজ যেটা এখন তাদের পক্ষে করা সম্ভব। জো-কে পাঠানো হয় ডেকার্ডকে খুন করতে, যাতে ডেকার্ডকে দিয়ে নিয়ান্ডার ওয়ালেস তার মেয়েকে খুঁজে বের করতে না পারে। ডেকার্ডের মেয়ে একটা মিরাকল, কারণ এর আগে কখনো কোন রেপ্লিক্যাণ্টের সন্তান জন্মে নি। তাই সেই মেয়ে রেপ্লিক্যাণ্টদের কাছে মুক্তির সিম্বল। সেই মেয়েকে ছাড়িয়ে আনতে হবে।

    কিন্তু যে জো ঝুলে আছে অতিবাস্তবতার মাঝামাঝি কোথাও, সে কী হতে চেয়েছিল আর সে কী হয়ে উঠল, এর মাঝামাঝি শূন্যতায় যে টানাপোড়েন চলছে, সে কী করে বুঝবে কোনটা সঠিক লক্ষ্য আর কোনটা না? সে কি ফিরে যাবে পুরনো কাজে? সেটা সম্ভব না আর। সে কি ডেকার্ডকে খুন করবে? যোগ দেবে রেজিস্ট্যান্সে?

    আমরা শুরু থেকেই দেখতে পাই জো এমন একটা অস্তিত্ব যার কোন ‘ফ্রি উইল’ নেই। ‘জন্মসূত্রে’ তার ফ্রি উইল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি আমরা এমন একটা জগতে বাস করি, যেখানে আমাদেরকে নির্মাণ করে সিস্টেম, সিম্বল ইত্যাদি এবং যেখানে আমাদের কোন ফ্রি উইল থাকে না?

    জো এইখানে বিদ্রোহ করে, এই কারাগার ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে ডেকার্ডকে বাঁচাবে। ওয়ালেসের লোকজন ডেকার্ডকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় সে ডেকার্ডকে উদ্ধার করে। উদ্ধার করে তাকে নিয়ে যায় তার মেয়ের সাথে দেখা করাতে, যে স্বপ্ন, যে আশা কিছু একটা ‘হয়ে ওঠার’ স্বপ্ন দেখিয়েছিল জো-কে, সেটা অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ হবে। কিন্তু সেটা তৈরি করার সিদ্ধান্তটা নেয় জো — যেই জো একজন তুচ্ছ রেপ্লিক্যাণ্ট মাত্র, সামনের বিশাল ইতিহাসে, সংগ্রামের কিংবা বিজয়ীর ইতিহাসে হয়ত তার জায়গা সামান্যই, অথবা কোন জায়গাই নেই।

    শেষ দৃশ্যে জো ডেকার্ডকে নিয়ে আসে তার মেয়ে স্টেলিনের কাছে। ডেকার্ডের হাতে খেলনা কাঠের ঘোড়াটা তুলে দেয়। এই ঘোড়াটা তার সবচেয়ে মূল্যবান ভেবে আসা স্মৃতির আধার, যেই স্মৃতি সবচেয়ে বিষাদগ্রস্ত, সেটাই তার জীবনের সেরা স্মৃতি, হয়ে উঠত। কিন্তু সে এখন জানে, এটা তার স্মৃতি না, সে সামান্য এক রেপ্লিক্যাণ্ট মাত্র। সে ঘোড়াটা ডেকার্ডকে দিয়ে বলে, “All the best memories are hers.” শেষ মুহূর্তে তার মুখে দেখা যায় সেই বুক ভেঙে যাওয়া হাসি।ডেকার্ড তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি এত কিছু কেন করছ? আমি কে হই তোমার?” জো কিছু বলতে পারে না, হাসে। “যাও, তোমার মেয়ের সাথে দেখা করে আসো।”

    “All the best memories are hers.”

    জো শুয়ে পড়ে বরফের মধ্যে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। যে শূন্যতায় সে ঝুলে আছে, ঝুলে থাকবে — আমরা জানতেও পারি না আহত, ক্ষতবিক্ষত জো আর বেঁচে আছে কি নেই। শুধু জানতে পারি, অনুভব করতে পারি তার শূন্যতাটুকু। তার তুচ্ছতা। সে এমন এক গল্পের নায়ক যার কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই বিশাল ইতিহাসে। সে রীতিমত এক অপ্রাসঙ্গিক, তুচ্ছ নায়ক। সে কাঁদে কিনা আমরা জানি না, কারণ তার কান্না অনবরত তুষারপাতে মিশে যায় হয়ত। কিংবা তার কান্না করার মত পূর্ণতাও আর নেই। ডেকার্ড যখন তার মেয়ের সাথে দেখা করে, সেই শেষ সেকেণ্ডেই আমরা বুঝতে পারি, জোয়ের গল্প ফুরিয়ে গেছে। জোয়ের আর কোথাও জায়গা নেই।

    এই অপ্রাসঙ্গিকতাই জো-কে করে তুলেছে মানুষের চেয়েও বেশি মানুষ। ব্লেড রানার দেখবার সময় দর্শক হিসেবে আমরাই হাইপাররিয়ালিটিতে ঘুরপাক খেতে থাকি। আমাদের জীবন কি এমনই তুচ্ছ না? বিশাল এক মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র একটা গ্রহের প্রজাতি আমরা, তার থেকেও ক্ষুদ্র আমাদের সত্ত্বা, সেই সত্ত্বার প্রাসঙ্গিকতা আর কতটুকু? এত অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমরা কীভাবে মেতেছি ইতিহাস নির্মাণের যজ্ঞে, হিরো বানানোর খেলায়?

    জো আমাদেরকে একটা আশা দেখায়। এই তুচ্ছ জীবন নিয়েও আমাদের নিজেদের তৈরি কারাগারের বিরুদ্ধেই আমরা দাঁড়াতে পারি, এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমাদের ফ্রি উইলের সম্ভাবনা সে দেখায়। হতে পারে সেই ফ্রি উইল তেমন কিছু এদিক সেদিক করবে না, নিয়ে আসবে না চিরন্তন কিছু। কিন্তু সেই ফ্রি উইল থাকার সম্ভাবনা দেখানোটাই অনেক বিশাল ব্যাপার। হয়ত অনেক মানবীয় কিছুর জন্যই সে ফ্রি উইল দাঁড়াতে পারবে। যে মানবীয়তাকে আমরা মনে করে এসেছি আমাদের একান্ত শ্রেষ্ঠত্ব, আমরা এখন জানি সেই শ্রেষ্ঠত্বের শ্লাঘাই আমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। হয়ত যাকে আমরা মানবিক ভাবি, সেইসব বৈশিষ্ট্য আমাদের আশেপাশে সবসময় ছিল, আছে, থাকবে। হয়ত মানুষের মধ্যে নয়, অন্য কোন প্রজাতির মধ্যে। অন্য কোন ইতিহাসে। এই সহজ বিষয়টা মেনে নিতে আমরা ভুলে গেছি। জো আমাদের সেগুলো মনে করিয়ে দেয়। এরপর জো, আমাদের মতই, তুচ্ছ, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। জো কেবল বেঁচে থাকে শূন্যতা, নিরর্থকতার ট্র্যাজেডিতে।

    “All those things become tears in rain.”

    মেল ফ্যাণ্টাসি? সেক্সিজম?

    খুব সংক্ষেপে এবার ব্লেড রানারের কিছু ঝামেলার কথা বলি। ব্লেড রানার দেখে সবারই ভাল লাগবে এমন না, তবে যারা দেখবেন তাদের কাছে এটা কেমন লাগতে পারে? যেমন, একটা শহরবাসী মেয়েই ধরলাম ব্লেড রানার দেখল। তার কাছে ব্লেড রানার কেমন লাগবে? আমি একটা ছেলে, আমার কাছে দেখে কেমন লাগল?

    আমার কাছে মনে হয়েছে ব্লেড রানারের ঘটনাপ্রবাহ প্রচণ্ডভাবেই মেল-ফ্যান্টাসি। ছেলে হয়ে ব্লেড রানার দেখতে আমার খুবই ভাল লাগবে এটাই স্বাভাবিক। এমন না যে ব্লেড রানারে কোন মেয়ে চরিত্র নেই। মেয়ে চরিত্রের সংখ্যা অনেকঃ জো-র বস লেফটেন্যান্ট জোশি, জো-র প্রেমিকা জোয়ি,নিয়ান্ডার ওয়ালেসের এসিস্টেন্ট রেপ্লিক্যাণ্ট লাভ, রেজিস্টেন্সের সদস্য মারিয়েত, ডেকার্ডের মেয়ে স্টেলিন। কিন্তু একটা মেয়ে যদি ব্লেড রানার দেখে, তার কী বোধ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা সম্ভব না, কারণ আমি পুরো সিনেমাটা দেখেছি ‘ছেলে’ হিসেবে। তবে দুই একটা বিষয় বলা যায়। যেমন, এই সিনেমার ঘটনাপ্রবাহ পুরোটাই আবর্তিত হয় তিনজন ছেলেকে ঘিরে — জো, ডেকার্ড আর নিয়াণ্ডার ওয়ালেস। এমনকি যে মেয়ে চরিত্রগুলো আছে, তাদের চরিত্রও গড়ে ওঠে এই তিনজন ছেলে চরিত্রকে কেন্দ্র করে। ন্যারেটিভগুলো সব ছেলের। এবং প্রত্যেক মেয়ের চরিত্রই(স্টেলিন বাদে) ওয়ালেস কিংবা জো-য়ের সাথে কোন না কোন সেক্সুয়াল টোনের ভিত্তিতে সামনে গড়ায়।

    এই পরিস্থিতিতে সিনেমায় সেক্সিজম এসেছে কিনা আমার জানা নাই। বা এই আসাটা খুব ব্যতিক্রম কিছু, তাও না।আধুনিক ফ্যাণ্টাসি ফিকশনের বেশিরভাগ মেল ফ্যাণ্টাসিই। সে লর্ড অব দ্য রিংস হোক কিংবা ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ। তবে নয়া সাইকোএনালিস্টরা নারীকে যে আল্টিমেট সাবজেক্ট হিসেবে দেখেন, তার কিছু প্রতিচ্ছবি হয়ত এখানে পাওয়া যায়, যেমন জো-র প্রেমিকা জোয়ি অবজেক্ট থেকে উল্টোদিকে গিয়ে সাবজেক্ট হয়ে ওঠে। লাভ চরিত্রটা পুরোপুরিই সাবজেক্টিভিটিতে ভরা, নিয়ান্ডার ওয়ালেসের কমপ্লিমেন্ট (“তুমি সব রেপ্লিক্যাণ্ট থেকে সেরা, তুমি এঞ্জেল”) তার প্রথম মৃত্যু ঘটায়, সেটা প্রমাণ করতে গিয়ে তার দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে।

    “The best of all angels. Aren’t you, Luv?”

    তবে ডিস্টোপিয়াতে মেয়েদেরকে আবর্জনা ভাবা হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। ডিস্টোপিয়াতে মেয়েদের বেচাকেনা করা হবে, তাদের যৌনতা পরাধীন হবে, তাদেরকে পুরুষের চাহিদামত আচরণ করতে হবে, তাদের একটার পর একটা মানসিক মৃত্যু ঘটবে, সেটাই তো হবে, সেটা তো বাস্তবেই হচ্ছে, হচ্ছে না?

    পরিশেষ

    সিনেমার পরিচালক ডেনি ভিলনুভ, আমার খুবই পছন্দের পরিচালক। ভিলনুভের সিনেমা অনেকেই হয়ত দেখেছেন, না দেখলে এরাইভাল আর ইন্সেন্ডিজ দেখে ফেলতে পারেন। রায়ান গসলিংকে আমি যেভাবে চিনতাম, ব্লেড রানার দিয়ে গসলিং আমার সেই ধারণা মোটামুটি আকাশ-পাতাল ঘুরিয়ে দিলেন।প্রথমে আমি ব্লেড রানার হিসেবে গসলিংকে দেখে ধাক্কাই খেয়েছিলাম বলা যায়! গসলিং এত অসাধারণ, এত ঠিকঠাক অভিনয় করেছেন যে বলার মত না।নিয়ান্ডার ওয়ালেসের সংক্ষিপ্ত চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেছেন জ্যারেড লেটো। সিনেমার সাউণ্ডট্র্যাক অসাধারণ, বিশেষ করে সেই বিখ্যাত ‘Tears in Rain’. শেষ দৃশ্য টেনে টেনে অন্তত ১৫-২০ বার দেখা হয়ে গেছে। এই সিনেমা সবার জন্য না, সবাই হয়ত একে মিলাতে পারবেন না। তবে আমি চোখ বন্ধ করে ১০ এ ৯ দেব। এরকম সিনেমা বারবার পাওয়া যায় না!

    ৬ই আগস্ট, ২০২০
    শংকর

  • এমা গোল্ডম্যান।। বিয়ে

    এমা গোল্ডম্যান।। বিয়ে

    • অনুবাদ: ফাতিন ইশরাক

    বিবাহ। কত দুঃখ, দুর্দশা, অপমান; কত অশ্রু এবং অভিশাপ; কত যন্ত্রণা ও কষ্ট; এই শব্দটি মনুষ্য জাতিতে নিয়ে এসেছে। এর জন্ম থেকেই, আজ অবধি, আমাদের বিবাহ প্রতিষ্ঠানের লোহার জোয়ালের নিচে বেড়ে উঠেছে পুরুষ এবং নারী, এবং এ থেকে বেরোনোর ​​কোনও উপায় নেই বলে মনে হয়। সর্বকাল এবং সর্ব যুগে নিরুদ্ধ গোষ্ঠী মানসিক ও শারীরিক দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা করেছে। ঐসব সাহসী বীরদের চিন্তাচেতনা গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজারো মূল্যবান জীবনের আত্মত্যাগ এবং ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর মাধ্যমে এবং বাকিরা মৃত্যুবরণ করেছে কারাগারে অথবা আইনের নির্দয় হাতে। এভাবে ধর্মীয় দাসত্ব, সামন্তবাদ এবং কৃষ্ণাঙ্গ দাসত্ব বিলোপ হয়েছে, এবং নতুন মতাদর্শ, আরও প্রগতিশীল, বিস্তৃত এবং স্পষ্টতর, সামনে এসেছে, এবং আবারও আমরা দেখি নিষ্পিষ্ট মানবতা তার অধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মৌলিক, সর্বাপেক্ষা স্বৈরাচারী প্রতিষ্ঠান- বিবাহ, চিরকালের মতই দৃঢ় এবং বিপদ নিয়ে আসে তাদের ওপর, যারা এর পবিত্রতা সন্দেহ করার ও স্পর্ধা করে। এমন কি আছে যা এদেরকে বিবাহ রক্ষা করতে প্রভাবিত করে? এমন কি আছে যা এদেরকে এই কুসংস্কার আঁকড়ে ধরায়? (এটা কুসংস্কার বৈকি কিছুই নয়) এর কারণ, বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তি, তথা, আমাদের নিষ্ঠুর এবং অমানবিক সিস্টেমের ভিত্তি। একদিকে সম্পত্তি এবং উদ্বৃত্ত, অপর দিকে অপরাধ; এজন্য বিবাহ প্রথার বিলোপ এর অর্থ উল্লেখ্য সবকিছুর বিলোপ।

    এমা গোল্ডম্যান
    (১৮৬৯-১৯৪০)
    আর্টওয়ার্ক: এলিয়া-ইলাস্ট্রেশন
    সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট

    কিছু প্রগতিশীল মানুষ আমাদের বিবাহ সংক্রান্ত আইন গুলো উন্নত করার চেষ্টা করছে। তারা চার্চকে আর বৈবাহিক সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করতে দেয় না; অনেকে আরও অগ্রসর হয়, তারা মুক্ত বিবাহ করে, যেটা আইনের সম্মতি ব্যতিরেকে হয়; কিন্তু, তবুও বিবাহের ধারণা আত্মসমর্পণমূলক, ঠিক যেমনটা “পবিত্র”, আদি ধারণা হিসেবে, কারণ এটা আমাদের মধ্যে প্রচলিত বৈবাহিক সম্পর্কের মত নয়; কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, প্রথাটি আপত্তিকর, ক্ষতিকর এবং অবমাননাকর। এটা সর্বদা পুরুষকে তার স্ত্রীর ওপর অধিকার এবং ক্ষমতা দেয়, শুধুমাত্র তার শরীরের ওপর না, বরং তার কর্ম, তার ইচ্ছা; এমনকি তার সমগ্র জীবনের ওপর। এবং এছাড়া আর কিভাবে হতে পারে? স্বতন্ত্র পুরুষ এবং নারীর যেকোনো সম্পর্কের পেছনে কাজ করে সাধারণত ঐতিহাসিক ভাবে বিবর্তিত হয়ে আসা দুই লিঙ্গের মধ্যকার সম্পর্কের, যা বর্তমানে তাদের অবস্থান এবং সুযোগ সুবিধার মধ্যকার ফারাক তৈরি করেছে। দুইজন অল্পবয়সী মানুষ একত্রে আসে, কিন্তু তাদের সম্পর্ক বৃহত্তরভাবে এমনসব কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যার ওপর তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা নিজেদের সম্পর্কে অল্প জানে, সমাজ এই লিঙ্গদ্বয়কে আলাদা রেখেছে, ছেলে এবং মেয়ে বড় হয়েছে ভিন্ন পন্থায়। অলিভ স্ক্রাইনার তার আফ্রিকান ফার্মের গল্পে যেমনটা বলেছেন, “ ছেলেকে ছেলে হতে শেখানো হয়েছে, মেয়েকে মেয়ে মনে হতে।’’ ঠিক তেমনটাই, ছেলেকে শেখানো হয়েছে বুদ্ধিমান, উজ্জ্বল, চালাক, শক্তিশালী, পালোয়ান, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল হতে; স্বীয় প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত দক্ষতা উন্নত করতে, স্বীয় আবেগ এবং ইচ্ছার অনুসরণ করতে। মেয়েকে শেখানো হয়েছে পোশাক পরতে, আয়নার সামনে দাড়িয়ে আত্মপ্রশংসা করতে, স্বীয় অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, মানসিক ত্রুটি লুকাতে এবং স্বীয় ক্ষুদ্র বুদ্ধিমত্তা এবং যোগ্যতার সাথে সমন্বয় করতে একদিকে, এবং তাই হল স্বামী আকৃষ্ট করার, লাভজনকভাবে বিয়ে করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। এবং এজন্যই দুই লিঙ্গ একে অপরের প্রকৃতি বুঝে না, তাদের মানসিক চাহিদা এবং বৃত্তির ফারাক বুঝে না। জনমত তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব, তাদের সম্মান এবং অসম্মান খুব কঠোরভাবে একে অপর থেকে পৃথক করে। যৌন বিষয় নারীর কাছে নিষিদ্ধ, কারণ তাকে বোঝানো হয় যে, যৌন বিষয়ে প্রশ্ন করাও অপবিত্র, অনৈতিক এবং অশ্লীল। পুরুষের কাছে তা এমন এক বিষয়, যা অসুখ এবং কলঙ্ক নিয়ে আসবে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ধ্বংস এবং মৃত্যু। বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে প্রেমে পড়া হালের চল না। সমাজের পুরুষেরা বিবাহ করে লাম্পট্য এবং কামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করার পরে, তাদের নষ্ট গড়ন বিনির্মাণ করতে। বাকিরা জুয়া খেলা বা ফটকা ব্যবসায় নিজেদের পুঁজি হারিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তরাধিকারী একমাত্র বস্তু যা তাদের দরকার; তারা একথা ভালমতই জানে যে তাদের বিত্তশালী স্ত্রী দের উপার্জন আত্মসাৎ করতে তাদের বৈবাহিক বন্ধন কোন বাধার কারণ হবে না। যে বুর্জোয়া নারীকে শেখানো হয়েছে জীবনমুখী এবং বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হতে, এবং শেখানো হয়েছে বেঁচে থাকতে, শ্বাস নিতে, খেতে, হাসতে, হাঁটতে এবং পোশাক পরিধান করতে কেবলমাত্র হালের চল অনুযায়ী; সে তার প্রাচুর্যকে বিক্রি করে কোন পদবীর কাছে, বা সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন পুরুষের কাছে। তার একমাত্র সান্ত্বনা হল সমাজ বিবাহিত নারী কে অধিক স্বাধীনতা দেয় এবং বিবাহে অসন্তুষ্ট হলে তাকে অন্য উপায়ে তার ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। আমরা জানি যে নারীর খাসকামরা এবং বৈঠক খানার দেয়াল মূক এবং বধির, এবং এই দেয়ালের আড়ালে ক্ষুদ্র সুখানুভূতি কোন অপরাধ না।

    প্রলেতারিয়েত শ্রেণির নারী পুরুষে বিবাহ ভিন্ন জিনিস। উঁচু শ্রেণির মধ্যকার প্রেম অতটা বিরল না এবং বেশিরভাগ সময়েই উভয়কে সাহায্য করে জীবনের হতাশা এবং দুঃখ সহ্য করতে, কিন্তু এমনকি এখানেও বেশিরভাগ বিবাহ প্রত্যহ জীবনের একঘেয়েমি এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে স্বল্পকালীন সময়ে ভেঙে যায়। আবার, শ্রমিক শ্রেণির পুরুষ বিবাহ করে কারণ সে তার পেনসিত্তন জীবনে পরিশ্রান্ত এবং তার নিজের ঘর বানানোর মনবাসনা আছে, যেখানে সে স্বস্তি খুঁজে পাবে। তার মূল উদ্দেশ্য এমন নারী খোঁজা যে তার জন্য ভাল রাঁধুনি এবং গৃহিণী হবে; যাকে দিয়ে সে নিজের সুখ এবং কামের চাহিদা পূরণ করতে পারবে; যে তাকে নিজের ঈশ্বর, মালিক, রক্ষক এবং পৃষ্ঠ পোষক  প্রতিপন্ন করবে; একমাত্র উদ্দেশ্য যাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকা যায়। অন্য পুরুষ আশা করে সে যেই নারী কে বিয়ে করবে, সে কাজ করতে পারবে এবং বৃষ্টির দিনে কয়েক সেন্ট উপার্জনে সাহায্য করতে পারবে কিন্তু কয়েক মাসের তথাকথিত সুখের পরে সে তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, সে জানতে পারে তার স্ত্রী মা হতে চলেছে এবং সে কাজ করতে পারবে না; এতে করে বুঝতে পারে সেই নারী এবং তার “দয়ালু” মালিক মিলেমিশে যে ক্ষুদ্র উপার্জন করেছে এযাবতকালে , তা পরিবার চালাতে যথেষ্ট না।

    যেই মেয়ে তার শৈশব এবং যৌবনের একটা অংশ ফ্যাক্টরি তে কাটিয়েছে, সে অনুভব করে তার শক্তি কমে যাচ্ছে এবং সে নিজেকে আবিষ্কার করে এমন একটা ভয়ংকর অবস্থায়, যেখানে তার কর্মচারী হয়ে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে, কাজের ব্যাপারেও নিশ্চিত না এবং এজন্য সে বাধ্য হয় পুরুষ খুঁজতে, ভাল স্বামী খুঁজতে, যে তাকে সাহায্য করতে এবং তাকে ভাল বাসস্থান দিতে পারবে। নারী পুরুষ উভয়ই একই উদ্দেশ্যে বিয়ে করে, একমাত্র বিশেষত্ব হচ্ছে, পুরুষ তার স্বাতন্ত্র্য, তার নাম, তার স্বাধীনতা ত্যাগ করবে এটা আশা করা না হলেও নারীকে তার নিজকে বিক্রি করতে হয়, নিজের শরীর ও আত্মা বিক্রি করতে হয় কারও স্ত্রী হওয়ার সুখের জন্য; অতএব তারা সমান অবস্থানে থাকে না, এবং যেখানে সমতা নেই, সেখানে কোন ঐকতান থাকতে পারে না। ফলাফল হল প্রথম কয়েক মাসের পরে বা সমস্ত ভাতা আত্মসাৎ করার জন্য এক বছর পরেই উভয় এই সিদ্ধান্তে আসে যে বিবাহ ব্যর্থ হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রেসকিউ
    শিল্পী: পাবলো পিকাসো
    সূত্র: পিকাসো আর্ট

    যেহেতু তাদের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হতে থাকে, এবং সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে উক্ত নারী  নিরাশ, করুণ, অসন্তুষ্ট এবং দুর্বল হতে থাকে, তার সৌন্দর্য তাকে ছেড়ে যায়, এবং কঠোর পরিশ্রম, নির্ঘুম রাত, ছোটদের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা এবং স্বামীর সাথে মতানৈক্য এবং ঝগড়া বিবাদে, সে শারীরিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং যেই মুহূর্ত তাকে এই গরিব পুরুষের স্ত্রী বানিয়েছে, সেই মুহূর্তকে অভিশাপ দিতে থাকে। এরকম বিষণ্ণ এবং করুণ জীবন নিশ্চিতভাবে একে অপরের প্রতি ভালবাসা বা সম্মান টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। উক্ত পুরুষ নিজের দুর্দশা বন্ধুদের সঙ্গে ভুলতে পারে অন্তত; সে নিজেকে রাজনীতি তে ব্যস্ত রাখতে পারে, বা সে তার দুর্ভাগ্য কে মদের গ্লাসে ডুবাতে পারে।  নারীটি তার গৃহস্থের হাজারো দায়িত্ব এর দ্বারা গৃহের শেকলে আবদ্ধ; সে পারে না তার স্বামী কে পছন্দ করতে, বিনোদন উপভোগ করতে কারণ হয় তার কোন পুঁজি নেই এর জন্য, নতুবা জনমত তাকে তার স্বামীর সমান অধিকার দেয় না। এই ক্রুশ তাকে বহন করতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত কারণ আমাদের বৈবাহিক আইনে কোন দয়া নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার বৈবাহিক জীবন মিসেস গ্রানডির সমালোচনা মুলক চোখ এর সামনে উলঙ্গ করতে চায়, এবং এমনকি তখনও সে শুধুমাত্র তখনই তার ঘৃণার পুরুষের সাথে শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে যদি সে সমস্ত দোষ নিজের কাঁধে নেয়, এবং যে পৃথিবী তার বাকি জীবন তাকে লাঞ্ছনা করবে, তার সামনে দাঁড়ানোর মত পর্যাপ্ত শক্তি যদি তার থাকে। এরূপ করার মত সাহস কয়জনের আছে? খুবই অল্প সংখ্যকের। এরকম বজ্রপাত কালে ভদ্রে দেখা যায়, যেমন, প্রিন্সেস ডি চিমেই এর স্পর্ধা ছিল প্রচলিত বাধা উপেক্ষা করার এবং হৃদয়ের ইচ্ছার অনুসরণ করার। কিন্তু এই ব্যতিক্রম হল পুঁজিপতি নারী, যে স্বনির্ভর। দরিদ্র নারীর তার সন্তানদের কথা চিন্তা করতে হয়; সে তার ধনী বোনের তুলনায় কম ভাগ্যবান, এবং তারপরও যে নারী দাসত্ব এর বন্ধনে থাকে, তাকে মর্যাদা সম্পন্ন বলা হয়ঃ যদিও বা তার সমগ্র জীবন বিভিন্ন মিথ্যা, প্রতারণা এবং বিশ্বাস ঘাতকতার লম্বা শিকল, সে তার বোন দের দিকে নিচু দৃষ্টি তে তাকায়, যারা সমাজের দ্বারা বাধ্য হয়ে নিজ মোহ এবং প্রণয় রাস্তায় বিক্রি করেছে। একজন বিবাহিত নারী যতই দরিদ্র, যতই করুণ হোক না কেন, সে অন্যদের থেকে নিজেকে উপরে ভাববে, যাদেরকে সে নিশিকন্যা ডাকে, যারা সকলের দ্বারা নির্বাসিত, ঘৃণিত এবং অপমানিত, এমনকি যারা তাদের পরিরম্ভ ক্রয় করতে দ্বিধা বোধ করে না, তারাও গরিব নরাধম কে প্রয়োজনীয় মন্দ হিসেবে দেখে, এবং তথাকথিত ভাল মানুষেরা পরামর্শ দেয় এই কু নারী দের নিউ ইয়র্কের একটা ডিসট্রিক্টে নির্বাসিত করতে, যাতে বাকি ডিসট্রিক্ট “পবিত্র” থাকে। কি এক প্রহসন! সংস্কারক রা এও দাবি করতে পারে যে নিউ ইয়র্কের বিবাহিত মানুষদের যাতে বের করে দেয়া হয় কারণ তারা রাস্তার নারীদের চেয়ে নৈতিক ভাবে উচ্চ না।  রাস্তার নারী এবং বিবাহিত নারীর একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে, একজন নিজেকে বাসস্থান বা পদবীর জন্য দাসী হিসেবে বিক্রি করে নাই,  এবং আরেকজন নিজেকে বিক্রি করেছে নিজের সাময়িক বাসনার জন্য; একজনের অধিকার আছে নিজের প্রেমের পুরুষকে বেছে নেয়ার, যেখানে বিবাহিত নারীর এরূপ কোন অধিকার নেই; উপরন্তু তাকে তার মালিকের কাম বাসনার কাছে আত্ম সমর্পণ করতে হবে, এই পরিরম্ভ তার কাছে যতই জঘন্য মনে হোক না কেন, তাকে তার মালিকের সকল আদেশ মান্য করতে হবে; মালিককে সন্তান উপহার দিতে হবে, নিজের শক্তি এবং স্বাস্থ্যের বিনিময়ে হলেও; এক কথায়, সে তার জীবনের প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন বেশ্যাবৃত্তি করে। আমি আমার বিবাহিত বোনদের এরকম জঘন্য, আবমাননাকর এবং অধঃপতিত অবস্থার জন্য জঘন্য রকমের বেশ্যাবৃত্তি ব্যতিত আর কোন শব্দ পেলাম না, একমাত্র বিশেষত্ব হচ্ছে একটা বৈধ, আরেকটা অবৈধ।

    শুধুমাত্র যেসব ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে বিবাহ প্রেম এবং সম্মানের ওপর দাড়িয়ে আছে, সেগুলো বিবাহকে যথার্থতা দেয়। কিন্তু বৈধ হোক বা অবৈধ, যেকোনো ধরণের পতিতাবৃত্তি অস্বাভাবিক, ক্ষতিকর এবং জঘন্য, এবং আমি এও ভালভাবে জানি যে এই পরিস্থিতি বদলাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এই নারকীয় প্রথা বিলোপ করা না হয়, কিন্তু আমি এও জানি যে শুধু মাত্র অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাই নারীর দাসত্ব এর জন্য দায়ী না, তার অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারও দায়ী, এবং আমি জানি আমার অনেক বোনকে এমনকি এখনই স্বাধীন করা যেত, যদি না বৈবাহিক প্রতিষ্ঠান সমূহ তাদেরকে অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন করে  রাখত। এজন্য বিবাহ প্রথা বিলোপ করা আমি দায়িত্ব বলে মনে করি, শুধু মাত্র আদি প্রথার নয়, এমনকি তথাকথিত আধুনিক বিবাহেরও, যার অর্থ হল একজন স্ত্রী এবং বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক অধিকৃত করা, যার অর্থ হল এক লিঙ্গকে অপর লিঙ্গ দ্বারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অধিকৃত করা। আমি নারীর স্বাধীনতা দাবি করছি; তার নিজেকে সাহায্য করার স্বাধীনতা, নিজের জন্য বাঁচার স্বাধীনতা, যাকে খুশি ভালবাসার স্বাধীনতা, বা যতজনকে খুশি ভালবাসার স্বাধীনতা। উভয় লিঙ্গের স্বাধীনতা দাবি করছি, ভালবাসার স্বাধীনতা এবং মাতৃত্ব এর স্বাধীনতাও।

    আমাকে এ কথা বলবেন না যে শুধুমাত্র নৈরাজ্যের অধীনেই এসব সম্ভব; এটা সম্পূর্ণ ভুল। আমরা যদি নৈরাজ্য অর্জন করতে চাই, আমাদের প্রথমে নারীদের মুক্ত করতে হবে, ওইসব নারীদের কে যারা তাদের ভাই দের মত স্বাধীন এবং যতক্ষণ না আমাদের স্বাধীন নারী আছে, আমরা স্বাধীন মা পেতে পারব না, এবং মা রা যদি স্বাধীন না হয়, আমরা তরুণ প্রজন্ম কে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্যকারী হিসেবে পাব না, যেটা হচ্ছে নৈরাজ্যবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।

    আর্টওয়ার্ক: লাভার্স
    শিল্পী: আর্নেস্ট কার্নাশর
    সূত্র: ফজ ওয়ার্ল্ড

    আপনাদের যারা মুক্তমনা এবং উদার বাদী, যারা এক ঈশ্বর কে বিলোপ করেছেন এবং বহু তৈরি করেছেন, যাদের আপনারা পূজা করেন; আপনাদের যারা রক্ষণশীল এবং সমাজতন্ত্রী, যারা এখনও নিজেদের সন্তানদের সানডে স্কুলে পাঠান এবং যারা প্রত্যেকে নৈতিক মানদণ্ডের অনুমোদন দেন; তাদের প্রত্যেককে আমি বলব এটা আপনাদের সৎসাহসের অভাব যা আপনাদের বিবাহ কে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করে, এবং যদিও আপনারা তাত্ত্বিকভাবে এর অর্থহীনতা কে স্বীকার করেন, আপনাদের জনমত খণ্ডানোর এবং নিজের জীবনে বাস্তবিক অর্থেই বেচে থাকার শক্তি নাই। আপনারা লিঙ্গের সমতা ভবিষ্যতের জন্য মনে করেন কিন্তু আপনারা নারীর ভোগান্তি কে প্রয়োজনীয় মন্দ মনে করেন। আপনারা বলেন নারীরা দুর্বল এবং অধীনস্থ, এবং তাদের কে শক্তিশালী হতে সাহায্য করার পরিবর্তে আপনারা তাদের কে নিচু অবস্থানে রাখতে সাহায্য করেন। আপনারা আমাদের জন্য স্বাতন্ত্র্য দাবি করেন কিন্তু নিজেরা বৈচিত্র্য ভালবাসেন এবং উপভোগ করেন যখনই সুযোগ পান।

    বিবাহ, বহু শতাব্দীর অভিশাপ, ঈর্ষা, আত্মহত্যা এবং অপরাধের কারণ, বিলোপ করতে হবে যদি আমরা চাই তরুণ প্রজন্ম স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী এবং স্বাধীন পুরুষ ও নারী হিসেবে বড় হোক।

  • সম্পর্ক স্বাধীনতা রবীন্দ্রনাথ

    সম্পর্ক স্বাধীনতা রবীন্দ্রনাথ

    • সেলিম রেজা নিউটন

    মুখস্থ সম্পর্কে ছিলাম না কোনো দিন। মুখস্থের মুখ চোখে পড়া মাত্র মুখ ফিরিয়েছি। শিরোনামের ‘সম্পর্ক’টাও আমার অজানা সম্পর্ক বটে। সম্পর্ক মাত্রই আমার কাছে প্রেম। প্রেমে পড়েছি তাঁর। এ রচনা লিখতে বসে তাঁর সাথে আমার প্রেমের দাগগুলোকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি মাত্র। খেয়াল করছি, বিশ্বপ্রকৃতিতে অবস্থিত ব্যক্তি-মানুষের “স্বাধীনতার নিয়ম”গুলোকে ক্রম-আত্মস্থ করার সূত্র ধরেই সম্পর্ক আমার তাঁর সাথে। রবীন্দ্রনাথের সাথে। যুক্তি আর মুক্তিকে কেন্দ্র করেই আমার রবীন্দ্রনাথ। যুক্ত তিনি সকলের সাথে। সর্বময় যুক্ততার সর্বজনীন উপলব্ধিই তাঁর মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার সারসত্তা। যাবতীয় বদ্ধতাকে মুক্ত করার সাধনাই তাঁর সাধনা। “যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ” তাঁর মূলমন্ত্র।১ আবিশ্ব যুক্ততার “বিশ্বধর্ম” তাঁর একান্ত উপলব্ধি। যুক্ততার যুক্তি তাই বন্ধন হয়ে ওঠে না তাঁর জন্য। বিশ্বধর্ম হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন মুক্তিধর্ম। “বিশ্বধর্মের সঙ্গে আমাদের ইচ্ছাকে মেলাতে পারলেই আমরা বস্তুত স্বাধীন হই। স্বাধীনতার নিয়মই তাই।”২

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    আমার যুক্তিবোধ কোনো গুরুজনের কাছ থেকে আয়ত্ত-বস্তু নয়। বই পড়েও শেখা নয়। আগুনের সাথে কয়লার সংযুক্তির শিখায়ই কেবল শিক্ষা করা যায় এ যুক্তিবোধ। নিছক মনুষ্যস্বভাবে। নিতান্তই জন্মসূত্রে। কোনোকিছু সহকারে যা জন্মায়, তা-ই সহজ। আমার যুক্তিবোধ আমার সাথেই জন্মেছে। তাই আমার যুক্তিবোধ সহজ। সহজাত। সহজ যুক্তি এই যে: যুক্তি কোনো তর্কযুক্তি নয়। মতবিরোধের যুক্তিও নয়। ওসব নিছক গালাগালির যুক্তি। (স্মর্তব্য: “মতবিরোধ নিয়ে তোমরা যাকে যুক্তি বলো আমরা তাকে বলি গাল”।৩)। গালাগালির যুক্তির কথা এখানে হচ্ছে না। লজিকবিদ্যার যুক্তির কথাও নয়। আমার যুক্তিবোধ সম্পর্কের। ভালোবাসার। প্রেমের। এবং অবশ্য-অবশ্যই মুক্তির আর স্বাধীনতার।

    যুক্তি বলতে যুক্ততা বোঝায়। আমার যুক্তিবোধ হলো যুক্ততার বোধ। একটা কিছু অন্য কিছুর সাথে যেভাবে সম্পর্কিত, যেভাবে যুক্ত, যেভাবে পার্থক্যযুক্ত, সেটাই তাদের মধ্যকার যুক্তি। ঐ যুক্তিতেই তারা পরস্পর-সম্পর্কিত। এই অর্থে যুক্তিবোধ লজিকবিদ্যা-বিবর্জিত কিছুও নয়। সম্পর্কই যুক্তি – যুক্ততা। আর প্রেমও এক প্রকার সম্পর্ক। যুক্তিই তাহলে প্রেম। যুক্তিবোধই প্রেমবোধ। যুক্তির অনুভূতি তথা যুক্ততার অনুভূতিই তাহলে প্রেমের অনুভূতি। উপরন্তু প্রেম স্রেফ এক প্রকার সম্পর্কই নয় – সর্ব প্রকার সম্পর্কই প্রেম। যাবতীয় সম্পর্কই একেক ধরনের প্রেম। প্রেম তাহলে নিছকই সম্পর্ক। টান। কীভাবে একে অন্যকে টানে, টানাটানি হয়, সেটাই তাদের মধ্যকার যুক্ততা, সম্পর্ক, প্রেম। প্রেম তাই টানাপোড়েনমুক্ত হয় না। হতে পারে না। টানাটানিতে অন্তর পোড়ে। না পুড়লে প্রেম হয় না। আলো হয় না। সম্পর্ক হয় না। যে সম্পর্ক এমনকি নষ্ট হয়ে যায় বলে মনে হয়, সেও এক প্রকার সম্পর্কই। তাতে দূরত্ব বেশি। টান কম। তাই টানাটানি কম। দহনও কম। তবু সেটা সম্পর্ক। দুর্বল সম্পর্ক। দুর্বল সম্পর্ক মানেই খারাপ সম্পর্ক না। প্রবল সম্পর্কও খারাপ হতে পারে। টানাপোড়েন তাহলে সমস্যা না। টানাপোড়েনই সম্পর্ক বরং। কোনো না কোনো প্রকার টানাপোড়েন। টান ছাড়া সচলতা নাই। আর এই মহাবিশ্বে কিছুই স্থির নয়। অনড় নয়। সচল। সম্পর্ক তাই অনড় নয়। সদাপরিবর্তমান। “পাল্টায় মন, পাল্টায় চারপাশ, রাস্তায় আসে নতুন রুটের বাস; পাল্টায় চেনা মুখের দেখন-হাসি, পাল্টাও তুমি তোমায় দেখতে আসি” (কবীর সুমনের গান)।

    অনেকেই এই অপরিহার্য পরিবর্তন মানতে চান না। নিজেরা বদলান। কিন্তু বদলটাকে খেয়াল করতে চান না। স্বীকার করেন না। যাঁরা স্বীকার করেন, তাঁদেরকে উল্টো বলেন পাল্টি-খাওয়া লোক। পাল্টে যাওয়া প্রেমিকের মুখ দেখতে চান না কেউ। মান্নাদের মতো তাঁদের অন্যতম ‘সিগনেচার সং’ হয়: “তুমি কি সেই আগের মতোই আছ? নাকি অনেকখানি বদলে গেছ? খুব জানতে ইচ্ছে করে।” জানতে আসলে ইচ্ছা করে ‘তুমি’ বদলাও নি। কেউ বদলাবে না। সব আগের মতো থাকবে।

    কৃষি-কেন্দ্রিক, ভূমি-মালিকানাভিত্তিক এই সামন্ত মনন ভারতবর্ষকে ভাষায় গাছের মতো অনড় করে রেখেছিল সহস্র বছর (কার্ল মার্ক্স, “ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ভবিষ্যত ফলাফল”)। আমাদের মন এখনও সেই অচলায়তনে স্থির হয়ে থাকতে চায়। একেবারে কালাপাহাড়ি আইকনোক্লাস্টের মতো করে সেই “অচলায়তন“কে আক্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। বাঁধ ভেঙে “মুক্তধারা” বওয়ানোর সাধনায় অনির্লিপ্ত থাকেন জীবনভর।

    জীবন তো আর থেমে থাকে না। “রাস্তার নাম পাল্টায় একদিন, ধারা পাল্টায় মাও সে তুং-এর চীন; প্রেম পাল্টায়, শরীরও পাল্টে যায়, ডাকছে জীবন: আয় পাল্টাবি আয়” – এ ডাক কবীর সুমনের নয় আসলে। এ ডাক শুষ্ক-সজল জীবনের। এ ডাকে সাড়া দেয়া সহজ নয়। তার জন্য নিজেকে সহজ করে তুলতে হয়। স্বরচিত মুখোশের আড়ালে, আর কল্পখোলসের ভেতরে নিজেকে বন্দি করে রাখলে চলে না। নিজের দায়িত্বটুকু অন্তত নিতে হয়। নিজের অধীন হতে হয়। স্বাধীন হতে হয়। তবেই জীবনপ্রবাহের গতিধর্ম-স্থিতিধর্মের স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। পরিবর্তনকে ভয় লাগে না। অনেকে সেটা মানতে পারেন না। অনড় স্থিরতা চান তাঁরা। ধ্রুব প্রেম চান। তাঁদের প্রেমও পাল্টায় না, শরীরও পাল্টায় না। ওগুলো পাল্টালেও মনটা পাল্টায় না। রবীন্দ্রনাথের ‘পুরাতন হৃদয়’ পর্যন্ত ‘পুলকে দুলিয়া’ ওঠে অথচ আমাদের নতুন হৃদয়ের ভদ্রলোকেরা সুস্থির, গৃহপালিত, গেরস্থালি প্রেম চান।

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    সম্পর্কের স্থিরতা চাওয়া কেন? ভয়ে। পরিবর্তনের ভয়। নতুনের ভয়। তা ছাড়া, সম্পর্ক সুস্থির হলে, তাকে নিজের দরকার মতো ব্যবহার করতে সুবিধা হয়। সুস্থির সম্পর্ক হলো কেজো সম্পর্ক। প্রয়োজন পূরণের সম্পর্ক। দরকারের সম্পর্ক। উদ্দেশ্য হাসিলের সম্পর্ক। উদ্দেশ্য: নিজের স্থূল কামনা বাসনা প্রলোভনকে চরিতার্থ করা। এ হলো স্থূল সম্পর্ক। স্থূল সম্পর্ক কামপরায়ণ। স্থূল প্রেমিক আসলে প্রেমিকই নন। সম্পর্ক-সন্ধানী তিনি – সুযোগসন্ধানী। ধান্দাবাজ। কামুক তিনি। তিনি শুধু নিজের ইন্দ্রিয়বাসনা চরিতার্থ করতে চান। ষড়রিপুর কাছে নিজেকে সঁপে দেন তিনি। রিপু আর ইন্দ্রিয়ই তার সুখ। নিজেকে সুখী করতে চান তিনি। কিন্তু তাঁর আনন্দ হয় না। কেননা কামনা কোনোদিন পরিতৃপ্ত হয় না। এই অপরিতৃপ্তি তাঁকে ব্যর্থতার অনুভব দেয়। ব্যর্থতা তাঁর কাছে অসহনীয়। তিনি চান সফলতা। সফলতার তাড়না থামতে দেয় না। আরো চাই আরো চাই স্পৃহা কেড়ে নেয় স্বাধ-আহ্লাদ-সাধনার স্বাদ। প্রয়োজনের সম্পর্ক তাই আনন্দহীন। কেননা তা উদ্দেশ্যপরায়ণ।

    প্রেম অবসরের ঘটনা। প্রেম কোনো ব্যস্ত কাহিনী নয়। ব্যস্ততা অফিসের প্রসঙ্গ। বাণিজ্যের প্রসঙ্গ। অবকাশ নিজেই প্রেম। উদ্দেশ্যহীন অবকাশ। এর সম্পর্ক রিক্ততার সাথে। রবীন্দ্রনাথের দেখা সেই রিক্ত একটা ঘরের মধ্যে এর বাস:

    ঘরের মধ্যে একেবারে কোনো আসবাব নেই। একটি দেয়ালে একখানি ছবি ঝুলছে। ওই ছবি আমার সমস্ত চোখ একা অধিকার করে; চারি পাশে কোথাও চিত্তবিক্ষেপ করবার মতো কিছুই নেই। রিক্ততার আকাশে তার সমস্ত অর্থটি জ্যোতির্ময় হয়ে প্রকাশ পায়। ঘরে যদি নানা জিনিস ভিড় করত তবে তাদের মধ্যে এই ছবি থাকত একটি আসবাবমাত্র হয়ে, তার ছবির মাহাত্ম্য ম্লান হত, সে আপনার সব কথা বলতে পারত না।

    কাব্য সংগীত প্রভৃতি অন্য-সমস্ত রসসৃষ্টিও এইরকম বস্তুবাহুল্যবিরল রিক্ততার অপেক্ষা রাখে। তাদের চারিদিকে যদি অবকাশ না থাকে তা হলে সম্পূর্ণ মূর্তিতে তাদের দেখা যায় না। আজকালকার দিনে সেই অবকাশ নেই, তাই এখনকার লোকে সাহিত্য বা কলাসৃষ্টির সম্পূর্ণতা থেকে বঞ্চিত। তারা রস চায় না, মদ চায়; আনন্দ চায় না, আমোদ চায়। চিত্তের জাগরণটা তাদের কাছে শূন্য, তারা চায় চমকলাগা। (রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    চিত্তের এ জাগরণই প্রেম। আত্মজাগরণ। হেনরি ম্যাকে-এর “নৈরাজ্য” কবিতার মতো “যখন প্রত্যেকে জেগে উঠবে অন্ততপক্ষে নিজের নিকটে” তখন আমরা প্রেমময় সমাজ পাব। আত্মজাগরণই আত্মবিকাশ। আত্মপরিচয়। আত্ম-অধীনতা। স্ব-অধীনতা। স্বরাজ। এ বস্তুর নামই প্রেম। প্রেম ছাড়া স্বাধীনতা নাই। আত্মপরিচয়ের বিকাশ যার মধ্যে ঘটে নি, যার আত্মা এখনও সুপ্তিকাতর, প্রেম তার কাছে অনুষ্ঠান। নায়কনায়িকার হাত-ধরাধরি করে সিনেমা দেখতে যাওয়ার অনুষ্ঠান। মিডিয়া-ম্যানুয়ালে সূচিবদ্ধ অনুষ্ঠান। প্রেম কোনো ভিড়ের গল্প নয়–

    ভিড়ের ঠেলাঠেলির মধ্যে অন্যমনস্কের মন যদি কাব্যকে গানকে পেতে হয় তা হলে তার খুব আড়ম্বরের ঘটা করা দরকার। কিন্তু সে-আড়ম্বরে শ্রোতার কানটাকেই পাওয়া যায় মাত্র, ভিতরের রসের কথাটা আরো বেশি করে ঢাকাই পড়ে। কারণ, সরলতা স্বচ্ছতা আর্টের যথার্থ আভরণ। যেখানে কোলাহল বেশি, ভিড় বৃহৎ, মন নানা কিছুতে বিক্ষিপ্ত, আর্ট সেখানে কসরত দেখাবার প্রলোভনে মজে, আপনাকে দেখাতে ভুলে যায়। আড়ম্বর জিনিসটা একটা চিৎকার; যেখানে গোলমালের অন্ত নেই সেখানে তাকে গোচর হয়ে ওঠবার জন্যে চীৎকার করতে হয়; সেই চীৎকারটাকেই ভিড়ের লোক শক্তির লক্ষণ জেনে পুলকিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আর্ট তো চীৎকার নয়, তার গভীরতম পরিচয়ে হচ্ছে তার আত্মসংবরণে। আর্ট বরঞ্চ ঠেলা খেয়ে চুপ করে যেতে রাজি আছে, কিন্তু ঠেলা মেরে পালোয়ানি করার মতো লজ্জা তার আর নেই। হায় রে লোকের মন, তোমাকে খুশি করবার জন্যে রামচন্দ্র একদিন সীতাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন…। (রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    দেশ-দশ-সমাজের বাইরে নয় প্রেম। যে নিজেকে চেনে, পরিবেষ্টনী-প্রকৃতিপুঞ্জকে সহকারেই নিজেকে চেনে সে। যে নিজেকে ভালোবাসে, সে ভালোবাসে সবাইকে। কিন্তু তাই বলে প্রেম চিৎকার নয়। আড়ম্বর নয়। কোলাহল নয়। গোলমাল নয়। ক্রমাগত ভিড় ঠেলাঠেলি করে সিনেমা হলের টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট জোটানোর সফলতা নয়। প্রেম অপ্রয়োজনের। অকারণের। অকারণই তো কাব্য, কলা, সাহিত্য, গান, আর্ট। অকারণেই আনন্দ। “তাসের দেশ“-এর “বসন্তে যারা ঝাঁকে ঝাঁকে চলেছে হিমালয়ের দিকে”, সেই হাঁসের দলের অকারণ আনন্দের মতো। রবীন্দ্রনাথ জানেন: “ওড়বার আনন্দ [হলো] অকারণের আনন্দ”।

    বৃথা ওড়ার আনন্দের নাম প্রেম। বৃথা-সম্পর্কের নাম প্রেম। উদ্দেশ্যহীন, কামনাহীন, প্রত্যাশাহীন সম্পর্কের নাম প্রেম। প্রেম শুধু প্রেমকেই চায়। প্রেমের কোনো পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নাই। পূরণ করার মতো বিশেষ কোনো ধান্দা নাই। সম্পর্কিত সত্তাকে সুখী করার সাধনার নাম প্রেম। সম্পর্কিত সত্তা সুখী হলেই প্রেমিকের সুখ। এ হলো কামনা মোচনের সাধনা। রিপু, ইন্দ্রিয়, আর কামনাকে অতিক্রম করে প্রেম। নিষ্কাম কর্মযোগের নাম প্রেম। প্রেমে তাই সবই পাওয়া যায়। কোনো অভাবই থাকে না প্রেমে। মন মলিন হয় না। ভাব থাকে শুধু। আনন্দ থাকে। মিলনের আনন্দ। রক্ত-ক্ষরণের আনন্দ। পোড়ার আনন্দ। আলোর আনন্দ। অকারণ আনন্দ।

    প্রেম এতই অকারণ যে এমনকি দায়িত্বহীনও বটে। কর্তব্যবোধতাড়িত সম্পর্কের নাম প্রেম নয়। চুক্তি। বিবাহ। তার সম্পর্ক দায়-দায়িত্ব-অধিকারের সাথে। প্রেমের সাথে নয়। আনন্দের সাথে নয়। আনন্দ তো বন্ধুকে সুখী করাতেই। কিন্তু তা কর্তব্য নয়। কর্তব্য সংবিধানের অংশ। প্রেম বেআইনী। আইন-অতিক্রমী। সংবিধান-বহির্ভূত। তার আইন তার নিজের রচিত। তা সে বদলায়ও নিজে। প্রেম এক্ষেত্রে আর্টের মতোই। “তার মধ্যে কোনো দায়ই নেই, কর্তব্যের দায়ও না।” রবীন্দ্রনাথের কাছে শিখি উপনিষদের গল্প:

    উপনিষদে লিখছে, এক ডালে দুই পাখি আছে, তার মধ্যে এক পাখি খায় আর এক পাখি দেখে। যে পাখি দেখছে তারই আনন্দ বড়ো আনন্দ। কেননা তার সে বিশুদ্ধ আনন্দ, মুক্ত আনন্দ। মানুষের নিজের মধ্যেই এই দুই পাখি আছে। এক পাখির প্রয়োজন আছে, আর-এক পাখির প্রয়োজন নেই। এক পাখি ভোগ করে, আর-এক পাখি দেখে। যে পাখি ভোগ করে সে নির্মাণ করে, যে পাখি দেখে সে সৃষ্টি করে। নির্মাণ করা মানে মাপে তৈরি করা, অর্থাৎ যেটা তৈরি হচ্ছে সেইটেই চরম নয়, সেইটেকে অন্য কিছুর মাপে তৈরি করা — নিজের প্রয়োজনের মাপে বা অন্যের প্রয়োজনের মাপে। আর সৃষ্টি করা অন্য কোনো-কিছুর মাপের অপেক্ষা করে না, সে হচ্ছে নিজেকে সৃজন করা, নিজেকেই প্রকাশ করা। এইজন্য ভোগী পাখি যে সমস্ত উপকরণ নিয়ে কাজ করছে তা প্রধানত বাইরের উপকরণ, আর দ্রষ্টা পাখির উপকরণ হচ্ছে আমি-পদার্থ। এই আমির প্রকাশই সাহিত্য, আর্ট। তার মধ্যে কোনো দায়ই নেই, কর্তব্যের দায়ও না। (রবীন্দ্রনাথ, “জাপান যাত্রী“, দ্বিতীয় অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    এই আমির প্রকাশই সত্তার প্রকাশ। সর্বসত্তার। এই আমির প্রকাশই ব্যক্তি-মানুষের স্বাধীনতার সম্ভাব্য চূড়ান্ত বাস্তব রূপ। কেননা স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। আমার প্রকাশের সীমাই আমার স্বাধীনতার সীমা। তাই বলে কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য-আইন-কানুন-আদালত আমার প্রকাশের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। এই সীমা নির্ধারণ করতে পারি শুধু আমি। তা আমি নির্ধারণ করি আমার প্রকাশের সীমা অনুভব করার মধ্য দিয়ে। এ সীমাবদ্ধতা আরোপিত নয়, অন্তর্জাত নয়, অন্তঃনিবিষ্ট। আমার ভেতরের এ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রমও করতে পারি আমি। নবরূপ নবপ্রকাশের কর্তব্য-ঊর্ধ্ব আনন্দে। আবার, রূপ সৃষ্টির এ স্বাধীনতা যেহেতু আমার, এ তাই বন্ধুরও (সবার)। তাঁর স্বাধীনতাই তো আমার স্বাধীনতার মানদণ্ড। জিম মরিসনের গানের মতো: “বন্ধু তো সে যে তোমাকে পেতে দেয় পূর্ণ স্বাধীনতা যেন তুমি হয়ে ওঠো তুমিই নিজে”। প্রেম তাই স্বাধীন। সে জন্যই সীমাহীন।

    ধ্রুব প্রেম বলে কিছু নাই। প্রেমকে যাঁরা নিটোল, গতিহীন সত্তা বলে চাউর করে চলেছেন হাজার বছর ধরে, তাঁরা প্রেমের নিজস্ব যুক্তির দিকে তাকান না। তাঁরা যুক্তিবোধহীন। আর সেকারণেই তাঁরা আবেগবোধবর্জিত। প্রেমের চাইতে প্রবল আবেগ কী আছে? অন্যের সাথে যুক্ত হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা আর কী আছে? এ জন্যই যুক্তিবোধহীন যিনি, তিনি আবেগবোধহীনও বটে। (দেখার বিষয়: যুক্তিহীন বলি নি, আবেগহীন বলি নি।) যুক্তি তাহলে আবেগই বটে। যুক্তি আর আবেগ পরস্পর-বিপরীত কিছু নয়। এরা একই জিনিসের দুই নাম। একই জিনিসকে দুইভাবে দেখার জন্য দুইটা নাম মাত্র।

    জ্ঞান-ইন্ডাস্ট্রি যে বস্তুকে যুক্তি বলে চালায় তা আসলে অস্ত্র। হাতিয়ার। অন্যকে ঘায়েল করার হাতিয়ার। এই যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। করা হয়ে থাকে। এই যুক্তি হলো ব্যক্তির অন্ধ বাসনার শার্টের হাতায় লুকানো ছুরি। চক্ষুহীন কামনার আঁচলে লুকানো বল্লমের ফালা। আমার বাসনা পূরণে যা কিছু প্রবল বাধা, এ দিয়ে সে সবকে বধ করা যায়। বিচারবুদ্ধিহীন কামনাবাসনা পূরণের পথ পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার্য কাস্তে এই প্রচলিত যুক্তি। এর সাথে প্রেম নেই। সম্পর্ক নেই। আছে জোরাজুরি। আছে জবরদস্তি। অর্থাৎ বলপ্রয়োগ। যুক্তির এই অর্থে বলপ্রয়োগ আর যুক্তিপ্রয়োগ একই কথা। এ যুক্তি তাই প্রেমের নয়। প্রভুত্বের। এ যুক্তি মালিকের যুক্তি। মালিকানার যুক্তি। অন্যকে নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-কামনাবাসনা অনুসারে পরিচালিত করার যুক্তি। “যদি দেখি যে মনের মতো ফল হচ্ছে না তাহলে জবরদস্তি করতে ইচ্ছা করে, তখন, নিজের শক্তি ও অধিকারকে নয়, অন্যেরই বুদ্ধি ও স্বভাবকে ধিক্কার দিতে প্রবৃত্তি জন্মে।”৪ জবরদস্তির যুক্তিবোধ রবীন্দ্রনাথের নয়। তাঁর যুক্তি “স্বাভাবিক” যুক্তি। ছন্দের লয় যেমন স্বাভাবিক, সে রকম স্বাভাবিক এ যুক্তিবোধ। এ যুক্তিতে জবরদস্তি নিতান্তই অচল। “আমাদের প্রাণের, আমাদের হৃদয়ের ছন্দের একটা স্বাভাবিক লয় আছে; তার উপরে দ্রুত প্রয়োজনের জবরদস্তি খাটে না”।৫

    জবরদস্তির প্রবৃত্তি-যুক্তির সাথে প্রেম-ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই। এ হলো ভালোবাসার নামে, প্রেমের নামে, পিতৃত্বের নামে, মাতৃত্বের নামে, ধর্মের নামে, অন্যকে নিজের দাসত্ব করানোর যুক্তি। এ যুক্তি রবীন্দ্রনাথের না। রবীন্দ্রনাথ জানেন, মানুষ নিজেই নিজের প্রভু হতে চায়। “সমস্ত প্রলোভনসত্ত্বেও দাসত্ব তাহার পক্ষে স্বাভাবিক নয়”; কেননা “সে জানে তাহার [নিজেরই] মধ্যে প্রভুত্বের একটি স্বাধীন সম্পদ আছে”; “স্বভাবতই সে প্রভু; সে বলে আমি নিজের আনন্দে চলিব, আমার নিজের কাজের বেতন আমার নিজেরই মধ্যে— বাহিরের স্তুতি বা লাভ, বা প্রবৃত্তি-চরিতার্থতার মধ্যে নহে। যেখানে সে প্রভু যেখানে সে আপনার আনন্দে আপনি বিরাজমান, সেইখানেই সে আপনাকে দেখিতে চায়; সেজন্য সে দুঃখ কষ্ট ত্যাগ মৃত্যুকেও স্বীকার করিতে পারে। সেজন্য রাজপুত্র রাজ্য ছাড়িয়া বনে যায়— পণ্ডিত আপনার ন্যায়শাস্ত্রের বোঝা ফেলিয়া দিয়া শিশুর মতো সরল হইয়া পথে পথে নৃত্য করিয়া বেড়ায়।” আর “এই জন্যই মানুষ এই একটি আশ্চর্য কথা বলে, আমি মুক্তি চাই”। (রবীন্দ্রনাথ, “ধর্মের অর্থ“, প্রবন্ধ-সংকলন: “সঞ্চয়“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।) মুক্তি ছাড়া তাই যুক্তি নাই। মুক্তি-যুক্তির সম্পর্ককে আবিষ্কার করাই আমার রবীন্দ্রনাথকে দেখার আনন্দ।

    সম্পর্ক ঘরে থাকে। সম্পর্ক থাকে বাইরেও। ঘর আর পথ শেষ পর্যন্ত আলাদা কিছু নয়। মুসাফির-রাস্তাই তো ঢোকে ঘরে। আবার, ঘর থেকেই পথে বেরোয় মানুষ। ঘর যাঁর নাই কিংবা ছিল না, পথ নামক বস্তুটার কোনো ধারণাও তাঁর নাই। ঘরে ছিলেন বলেই তিনি পথে নেমেছেন। ঘর মানে যেকোনো আশ্রয়। সকল আশ্রয়ই অস্থায়ী আশ্রয়। সম্পর্ক তাই সরাইখানা বটে। সরে সরে যায় সে সারাক্ষণ। তার ওপরকার সামিয়ানা কখনও দূরের আকাশ। কখনও তা কাছের ছাউনি, গাছতলা, ছাদ, চাতাল। সম্পর্ক তাহলে যেমন আশ্রয়ের— বিশ্রামের, সম্পর্ক তেমনই আবার অবিশ্রাম পথচলারও। কেননা পথই ঘর অনেকের। উপরন্তু, অনেকের জন্য এমনও হতে পারে: ঘরই পথ তাঁদের। ঘটনা তাহলে পথ কিংবা ঘর নয়। ঘটনা হচ্ছে হাঁটা।

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার আশ্রয়। আশ্রয় দরকার তার। কেননা তা হাঁটে। পথ চলে। হাঁটে, অনুসন্ধান করে, আস্বাদন করে। আস্বাদন করে একাধারে অমৃত এবং গরল। যখন সে অবিরাম হাঁটে, তখনও কিন্তু শান্ত নিষ্ঠার সাথে অস্তিত্বে একাগ্র থাকে তার আত্মা। আবার, আশ্রয় তাঁর ঘরও। কেননা সে থামেও। থামে, অনুসন্ধান করে, আস্বাদন করে। আস্বাদন করে একাধারে অমৃত এবং গরলের মধ্যবর্তী আনকা নহর। যখন সে থেমে থাকে, তখনও কিন্তু অশান্ত পরিভ্রমণে বহু-অগ্রে রত থাকে আত্মা তাহার। গৃহক্লান্ত-গৃহত্যক্ত মানুষের কাছে পথই অবিকল্প আশ্রয়। পথ হচ্ছে ঘরের সাথে তার সম্পর্ক অনুধাবনের অবসর। আবার, মরুপথে দিশাহারা মুসাফিরের আশ্রয় হচ্ছে মরুদ্যান— এক চিলতে ঘর। মরুদ্যানই মরুভূমির সাথে তার সম্পর্ক উপলব্ধি করার অবকাশ।

    রবীন্দ্রনাথ আমার অবসর। আলো আনন্দ আর গানের এই অবসরটুকু আছে বলেই হাঁটতে পারি আমি। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পাই: “আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে; আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।” আমার নশ্বর দেহ তখন আর জৈবযান্ত্রিক সায়েন্স-সম্মত জড়দেহমাত্র নয়, সদামুক্ত অবিনশ্বর আত্মার সশরীর সামাজিক অস্তিত্ব। “শরীরকে হত্যা করিলেও ইনি নিহত হন না” (শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা, দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ২০)। আমি তখন উপলব্ধি করতে পারি সমুদয় প্রপঞ্চের সাথে আমার সমুচয় সম্পর্কের মুক্ততার সারসত্তা। অনুধাবন করতে পারি অন্তহীন সম্পর্করাশির পারস্পরিক মুক্ততার নিত্যস্বভাবটাকে। টের পাই: অনতিক্রম্য যুক্ততার স্বরূপ উপলব্ধি করার মধ্যেই আছে মুক্তির অভিজ্ঞান। টের পাই অস্তিত্বজোড়া অবিণাশী মুক্ত সম্পর্কের স্বাদ। পারস্পরিক দাসত্বের অচলায়তনে জবুথবু আমাদের প্রেম-পরিবার-রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ আইনী সম্পর্কের সীমা তখন অনন্ত স্বাধীন সম্পর্কের অভিসারী হয়ে ওঠে।

    আরো অনেক কিছুর মতো, রবীন্দ্রনাথ আমার অবকাশ। নিরাকার আঁধার আর বিশেষণ-অযোগ্য বিষণ্ণতার এই অবকাশটুকু আছে বলেই আমি অনুধাবন করতে পারি এ মহাবিশ্বের সাথে আমার বন্ধনহীন যুক্ততার স্বরূপ। টের পাই বাঁচার যুক্তি। এই যুক্তিবোধ আমাকে মুক্তি দেয় যুক্তিহীন সম্পর্কের গতিহীন গ্লানি থেকে। বদ্ধ ও বাধ্যতামূলক সম্পর্করাজির যাবতীয় রাষ্ট্র-সামাজিক জবরদস্তি থেকে।

    রচনা: রাবি, জুলাই-আগস্ট ২০১৩
    প্রকাশ: দৈনিক বণিক বার্তা, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৩

    প্রাসঙ্গিক তথ্য
    পত্রিকায় প্রকাশের সময় রচনাটা আমি উৎসর্গ করেছি আমার বন্ধু “চিহ্ন-সম্পাদক প্রফেসর শহীদ ইকবালের প্রীতিকমলে”। ইকবালদের পত্রিকা “চিহ্ন”-র সাম্প্রতিক কোনো একটা রবীন্দ্রবিষয়ক সংখ্যার জন্য তিনি আমাকে “আমার রবীন্দ্রনাথ” নামে একটা লেখার জন্য বলেছিলেন। এটাই সেই রচনা। কিন্তু একটুর জন্য এটা আমি তাঁর হাতে সময়মতো পৌঁছাতে পারি নি বলে চিহ্ন-তে এটা ছাপা হয় নি। এখানেও রইল এটা প্রফেসর ইকবালের প্রীতিকমলে।

    পাদটীকা

    ১. রবীন্দ্রনাথ, গীতবিতান, পূজাপর্ব, ১১১ সংখ্যক গান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভাষা-প্রযুক্তি-গবেষণা পরিষদ পরিবেশিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ, রবীন্দ্র-রচনাবলী ডট এনএলটিআর ডট অর্গ। এর পর থেকে শুধু “রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ” হিসেবে উল্লেখিত।

    ২. রবীন্দ্রনাথ, “শান্তিনিকেতন” গ্রন্থের ১ম পর্বের “ত্যাগ” নামাঙ্কিত অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৩. রবীন্দ্রনাথ, “সংগীতচিন্তা” বইয়ের “সংযোজন” অংশে “কল্যাণীয় ধূর্জটি”প্রসাদকে লেখা চিঠি, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৪. রবীন্দ্রনাথ, “শান্তিনিকেতন” গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বের “সঞ্চয়তৃষ্ণা” অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৫. রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি”, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

  • রবীন্দ্রনাথের বৈচিত্র্যময় শিক্ষা দর্শন

    রবীন্দ্রনাথের বৈচিত্র্যময় শিক্ষা দর্শন

    শহিদুল ইসলাম

    রবীন্দ্র বিশ্বে ঢুকতে আমি ভয় পাই। তাই তাঁকে নিয়ে আমি কোন লেখা আজও লিখিনি। আগামি ২২ শ্রাবণ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা নিয়ে একটা কিছু লেখার তাগিদ এসেছে। লিখতে সাহস পেলাম এজন্য যে উপমহাদেশ ও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সামন্য চিন্তা-ভাবনা করেছি এবং কিছু লিখেওছি। তখন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন আমার ওপর প্রবল প্রভাব ফেলে। তাঁর কেবল ‘শিক্ষা’ নামের বই-ই নয়; তাঁর অনেক লেখা, বক্তৃতা ও চিঠিপত্রে শিক্ষা নিয়ে অনেক চিন্তার কথা আমাদের জানিয়েছেন। আমার লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অতি স্পষ্ট। তাঁর অনেক উদ্ধৃতি আমি ব্যবহার করেছি। ভাব প্রকাশ করতে যখন ভাষা খুঁজে পাই না, তখন তাঁর স্মরণাপন্ন হয়েছি। তিনি আমাকে পথ দেখিয়েছেন।

    আর্টওয়ার্ক: রবীন্দ্রনাথ
    শিল্পী: হোসেন শেখ আফজাল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    তবে শিশু শিক্ষার ওপর তাঁর গুরুত্ব দেবার বিষয়টি কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি এক থেকে পাঁচ বছর শিশুদের শিক্ষা নিয়ে বেশি ভেবেছেন। অত্যন্ত সাধারণ ভাষায় আমাদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছেন এবং তিনি নিজেও শহরের ইট-পাথর-সুরকি ও যানবাহনের উৎকট আওয়াজ, মানুষের হইহুল্লোড় থেকে দূরে এক মনোরম ছায়াঘেরা গ্রামে তেমনি একটি আশ্রম গড়ে তুলে নিজের চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। চারধারে আদিবাসী সাঁওতাল গ্রাম। পায়ে চলা ধুলো ভর্তি রাস্তা। পাখির কিচির মিচির শব্দ। বিভিন্ন ঋতুতে রঙ বদলানো পরিবেশের মধ্য তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর আশ্রম। তিনি লিখেছেন ‘কেজো শিক্ষা’ দেয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন এবং তাদের হাতে-কলমে শিক্ষার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাদের মতই ‘কেজো শিক্ষা’ প্রচলনের চেষ্টা করেছেন। কেজো শিক্ষা বলতে তিনি শিশুদের দৈনন্দিন কাজ, যেমন নিজের জামাকাপড় নিজে পরা ও পরিস্কার রাখা, রুটি বানানো, ঘরদোর পরিস্কার রাখা, যেখানে-সেখানে কফ বা থুতু না ফেলা ইত্যাদি। কিন্তু  তিনি তা পারেননি। কারণ ‘পুঁথিগত বিদ্যায় আমাদিগকে কেবল যে অকর্মণ্য করিয়া দিয়েছে তাহা পুঁথির বাহিরে যাহা-কিছু আছে তাঁহার প্রতি আমাদের ঔৎসুক্য চলিয়া গেছে।’ (উদ্যোগশিক্ষা, রবীন্দ্র-রচনাবলী, পঞ্চদশ খণ্ড: ক, বিবিধ, পৃষ্ঠা-৮৬৫)।

    রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ প্রবর্তিত তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা কাঠামোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘যতটুকু অত্যাবশ্যক কেবল তাঁহার মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নয়।… আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না। স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে।’ (শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্ররচনাবলী-চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩১১)

    এর  মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মূল শিক্ষা দর্শন নিহিত আছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য ‘সুদক্ষ উৎসাহী চোখ-কান খোলা মানুষ পাওয়া।’ কিন্তু ‘মুখস্তবিদ্যার নীচে তাদের [ছাত্র] সব শিক্ষা সমাধিস্থ হয়ে যায়।’ ‘বিদ্যায়তনগুলি সংসারক্ষেত্রের বাইরে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে মানুষকে তার স্বস্থান থেকে উৎপাটিত করে এনে খাঁচার মধ্যে পাখিকে যেমন করে রাখা হয় তেমনি করে রেখে শিক্ষার বাঁধা খোরাক দেওয়া হয়। এই যে বাল্যকাল থেকেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হওয়া, এ দৈন্য আর কিছুতেই কখনো দূর হয় না।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৮৭৯)।

    মুখস্তবিদ্যার পরিণতি সম্পর্কে তাঁর মজাদার উক্তি হল, ‘আমরা যতই বি.এ. এম.এ. পাশ করিতেছি, রাশি রাশি বই গিলিতেছি, বুদ্ধিবৃত্তিটা তেমন বেশ বলিষ্ঠ এবং পরিপক্ক হইতেছে না।… ইহার প্রধান কারণ, বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা-কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে যায় মাত্র, কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমত হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়া দরকার। তেমনি একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমত হজম করিতে অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক’ (শিক্ষার হেরফের, প্রাগুক্ত)।

    নতুনের প্রতি আমাদের ভয়ের শেষ নাই। আমেরিকা প্রভৃতি উন্নত দেশে খাদ্যের অভাব না থাকলেও তারা নিত্য নতুন খাদ্য প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ চির অভাবের আমাদের দেশে তা সম্ভব হয় না। কেন? উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘যাহা চলিয়া আসিতেছে, তাহা নিঃসন্দেহেই ভালো বলিয়াই চলিয়া আসিতেছে এই জড় বিশ্বাস আমাদের শিক্ষিত লোকদের মন হইতেও কিছুতেই তাড়ানো যায় না।… ইহা আমাদের অন্তরতম দাসত্বের লক্ষণ।’ (উদ্যোগশিক্ষা, পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৬৫)। দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ বরাবর কর্মমুখি শিক্ষার জন্য সারা জীবন লিখে গেছেন। ১৯৪০ সালের ২৩ জুলাই শান্তিনিকেতনে শিক্ষাভবনের ছাত্রাবাসে প্রদত্ত রবীন্দ্রনাথ শেষ ভাষণে বলেন, ‘বন্ধ স্কুল গৃহের কঠোর শিক্ষাব্যবস্থা আমার মনকে দারুণভাবে পীড়িত করেছিল— আমি স্কুল পালাতে বাধ্য হয়েছিলাম।’ (পঞ্চদশ খণ্ড-পৃষ্ঠা-৮৯৬)।

    আধুনিক শিক্ষা প্রসঙ্গে

    শিল্প বিপ্লব সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। তা ক্রমশ সমস্ত পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। সম্পদের অতি দ্রুত বৃদ্ধি মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে প্রাচুর্য। সেই স্রোতে গা ঢেলে না দিয়ে কোন জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। সে কথাটি রবীন্দ্রনাথ ভাল ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সেইসাথে মানুষের কাছ থেকে কী কেড়ে নিচ্ছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল তাঁর। সেকথা তিনি তাঁর বহু লেখায় লিখে রেখে গেছেন। আমরা যারা আধুনিক সভ্যতার তীব্র আলোকে চোখে কম দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথ তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দিয়েছেন আধুনিক সভ্যতা আমাদের কি কেড়ে নিয়েছে। জীবনের শেষ বছরে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে অতি স্পষ্টভাবে তা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বহুল আলোচিত সে প্রবন্ধ সম্পর্কে আজ আর কিছু লিখবো না। ১৩২৬ সনের অগ্রহায়ণ মাসে ‘কলাবিদ্যা’ নামের শান্তিনিকেতনের পত্রে সে সম্পর্কে আমাদের জানান যে ‘বর্তমান যুগ য়ুরোপীয় সভ্যতার যুগ। ইহাই হয়, গায়ের জোরে নয়, সম্মোহনের দ্বারা সমস্ত পৃথিবীকে বশ করিতেছে। এই সভ্যতা পৃথিবীর যে জাতিকে স্পর্শ করিতেছে তাঁহারই আকৃতি ও প্রকৃতি হইতে নিজের বিশেষত্ব ঘুচিয়া যাইতেছে।’ তিনি জাপানের কথা উল্লেখ করেন। আধুনিক সভ্যতা পৃথিবীর সকল দেশের মানুষের কি ক্ষতি করছে, সে সম্বন্ধে বলছেন, ‘যুদ্ধপ্রণালী ব্যবসায়প্রণালী আজ পৃথিবীতে সকল দেশেই একাকার হইতেছে, ইহাতে আশ্চর্য নাই কেননা ও দুটো যন্ত্রমাত্র এবং যন্ত্রের রূপ সকল দেশে একই রকম হইবে বৈকি? কিন্তু মানুষের মন তো যন্ত্র নহে; … সে সমস্তই আপনার করিয়া লয়— মোটের উপর কাঠামোটা ঠিক থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সাথে ভাব পাই না। আবার বয়স হইলে ঠিক তাঁহার বিপরীত ঘটে; যখন ভাব জুটিতে থাকে, তখন ভাষা পাওয়া যায় না।’

    আর্টওয়ার্ক: ম্যান
    শিল্পী: মকবুল ফিদা হুসেন
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    ‘কিন্তু আজ পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষের নিজের মনের সঙ্গে তার নিজের তৈরি কলের সাংঘাতিক লড়াই বাধিয়া গেছে। মানুষের ব্যবহার্য দ্রব্যে তাঁহার মনের স্বাক্ষর কোথাও আর দেখাবার জো নাই, সর্বত্রই কলের ছাপ। এই কলের সন্ততিগণের মধ্যে কোথাও আর রূপভেদ নাই। সুলভতা ও সুবিধার প্রলোভনে মানুষ ইহা স্বীকার করিয়া লইয়াছে— সেই প্রলোভনে মানুষ নিজের মনের কর্তৃত্বকে নিজের সৃষ্টিশক্তিকে অস্বীকার করিতেছে।’ ‘য়ুরোপের সভ্যতার সেই রুচিস্বাতন্ত্র্যনাশক মরু হাওয়া ভারতবর্ষীয় শিল্পগুলিকে সবই প্রায় নষ্ট করিয়াছে।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭০)। উদাহরণ স্বরূপ তিনি আইরিশ শিক্ষা ব্যবস্থার উল্লেখ করেন। ‘য়ুরোপের যে যুগকে অন্ধকার যুগ বলে, যখন বর্বর-আক্রমণের ঝড়ে রোমের বাতি নিবিয়া গেল, সেই সময়ে য়ুরোপের সকল দেশের মধ্যে কেবলমাত্র আয়র্লন্ডেই বিদ্যার চর্চা জাগিয়া রইল। কিন্তু যখন ইংলন্ড আয়র্লন্ড দখল করিয়া উনবিংশ শতাব্দীতে ‘ন্যাশনাল স্কুল’ প্রণালীর সুত্রপাত করিল তখন আয়র্লন্ডের স্বদেশী উন্নত শিক্ষা কাঠামো ভাঙ্গিয়া পড়িল। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘আইরিশদিগকে জোর করিয়া স্যাকসনের ছাঁচে ঢালা এবং ইংরেজ করিয়া তোলাই ন্যাশনাল স্কুল-প্রণালীর মতলব ছিল। ফলে এই চেষ্টার ব্যর্থতা প্রমাণ হল। ভালোই বল আর মন্দই বল, প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে এমন ভিন্ন করিয়া গডিয়াছেন যে এক জাতকে ভিন্ন জাতের কাঠামোর মধ্যে পুরিতে গেলে সমস্ত খাঁপছাড়া হইয়া যায়।’ ফলে যা হবার তাই হল। ‘আইরিশভাষী ছেলেরা বুদ্ধি এবং জিজ্ঞাসা লইয়া বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিল, আর বাহির হইল পঙ্গু মন এবং জ্ঞানের প্রতি বিতৃষ্ণা লইয়া।’

    জাতীয় শিক্ষাপরিষদের সদস্যরা তাঁকে স্কুল-বিভাগের একটি গঠনপত্রিকা তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছিল। ‘শিক্ষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন যে কাজটি সহজ নয়। ‘জাতীয়’ বলতে কী বোঝায়, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা চাই, কিন্তু কী চাই, তাহা বাহির করা যে সহজ তাহা মনে করি না। এই সম্বন্ধে সত্য-আবিষ্কারের ‘পরেই আমাদের উদ্ধার  নির্ভর করে। যদি ভুল করি— যেটা হাতের কাছেই  আছে, আমরা যেটাতে অভ্যস্ত, জড়ত্ববশত যদি সেইটাকেই সত্য মনে করি, তবে বড়ো বড়ো নাম আমাদিগকে বিফলতা থেকে রক্ষা করিতে পারিবে না।’ তারপরেই বলছেন, ‘যদি শিক্ষিত সমাজের প্রচলিত সংস্কারের সঙ্গে ইহার বিরোধ বাঁধে তবে ইহা গ্রাহ্য হইবে না, জানি।’ ইস্কুল বলতে তিনি মনে করেন ‘একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন; ছাত্ররা দুই-চার পাতা কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে।… কলের একটা সুবিধা, ঠিক মাপে, ঠিক ফর্মাশ-দেওয়া জিনিষটা পাওয়া যায়; এক কলের সঙ্গে আর-এক কলের উৎপন্ন সামগ্রীর বড়ো একটা তফাত থাকে না, মার্কা দিবার সুবিধা হয়।’

    ‘কিন্তু এক মানুষের সঙ্গে আর-এক মানুষের অনেক তফাত। তবু মানুষের কাছ হইতে মানুষ যাহা পায় কলের কাছ হইতে তাহা পাইতে পারে না।’ কল ‘তেল দিতে পারে, কিন্তু আলো জ্বালাইবার সাধ্য তাঁহার নাই।’ স্কুলে আমরা যা শিখি, তার সঙ্গে জীবনের, আশেপাশের, বাড়ীঘরের ও মানুষের সঙ্গে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই স্কুল বলতে রবীন্দ্রনাথের চোখে ভেসে ওঠে যা মনোহর নয়, তা ‘বারিক, পাগলাগারদ, হাসপাতাল বা জেলেরই এক গোষ্ঠিভুক্ত।’ তাই তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকদিন হইল একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করিয়াছি; তাঁহার পরে বৎসরে বৎসরে বিলাপ করিয়া আসিতেছি দেশের লোক বিজ্ঞানশিক্ষায় উদাসীন। কিন্তু  একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করা এক, আর দেশের লোকের চিত্তকে বিজ্ঞানশিক্ষায় নিবিষ্ট করা আর। সভা ফাঁদিলেই তাঁহার পরে দেশের লোক বিজ্ঞানী হইয়া উঠিবে, এরূপ মনে করা ঘোর কলিযুগের কল-নিষ্ঠার পরিচয়।’ (চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৫)।

    শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ

    তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বলিষ্ঠ কণ্ঠ ছিলেন। তিনি পাদ্রী এডাম সাহেবের তিনটি শিক্ষা রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেন। মেকলে যখন ইংরেজি ভাষার সিঁডিভাঙ্গা শিক্ষা কাঠামোর প্রস্তাব করছেন, তখন বড় লাট উইলিয়াম বেন্টিকের নির্দেশে এডাম সাহেব তিনটি বড় রিপোর্ট পেশ করেন ১৮৩৫-৩৮ সালের মধ্যে। সেখানে তিনি দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছিলেন যে জনগণকে যদি শিক্ষিত করে তুলতে হয়, তাহলে তা কেবল জনগণের মুখের ভাষার মাধ্যমেই তা সম্ভব। ইংরেজ আসার আগে এদেশের প্রতিটি গ্রামে সাধারণ জ্ঞান দেবার জন্য একলক্ষ পাঠশালা ছিল। কিন্তু মেকলের চাপে পড়ে বেন্টিক এডামের রিপোর্টটি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে নিক্ষেপ করেন। শুরু হয় এদেশের শিল্প-কারখনার মত শিক্ষা ব্যাবস্থার ধ্বংসসাধন।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিম
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    অনেকেই অবশ্য বাংলাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আশুতোষ মুখার্জি। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘বাঙালির ছেলে ইংরেজিবিদ্যায় যতই পাকা হোক, তবু শিক্ষা পুরো করবার জন্যে বাংলা শিখতেই হবে, ঠেলা দিয়ে মুখুজ্জেমশাই বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়কে এতটা দূর পর্যন্ত বিচলিত করেছিলেন।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্টা, ৪২৩)। বাংলা ভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন, ‘একদা মধুসূদনের মতো ইংরেজি-বিদ্যায় অসামান্য পণ্ডিত এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিজাতীয় বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র এই মুখোশের ভিতর দিয়ে ভাব বাৎলাতে চেষ্টা করেছিলেন; শেষকালে হতাশ হয়ে সেটা টেনে ফেলে দিতে হল।’ (ত্বদেব, পৃ-৪২৭)। লেখাটা তিনি লিখেছিলেন ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

    আজ বাংলাদেশের  শিক্ষা  ব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হয় আমাদের রাষ্ট্র যদি রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শনের দিকে ফিরে তাকাতো, তাহলে হয়তো আমাদের শিক্ষার এই করুণ অবস্থা হত না। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের দেশে যতটা জনপ্রিয়, রবীন্দ্র-চর্চা ততটাই অবহেলিত। রবীন্দ্রনাথ যা চাননি, আমরা তাই করেছি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কেবল পাঠ্য পুস্তকভুক্ত করে জাতীয় জীবন থেকে তাঁকে বিসর্জন দিয়েছি।

    এতে রবীন্দ্রনাথের কোন ক্ষতি হয়নি। হয়েছে আমাদের।

    মোহম্মদপুর, ঢাকা
    ৫ আগস্ট, ২০২০

  • রবীন্দ্রনাথ এবং রাষ্ট্রতন্ত্র, নেশন ও জাতীয়তাবাদ

    রবীন্দ্রনাথ এবং রাষ্ট্রতন্ত্র, নেশন ও জাতীয়তাবাদ

    • আলী রীয়াজ

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান, এমনকি তার উপন্যাসের তুলনায় তাঁর সমাজ ও সভ্যতা বিষয়ক নিবন্ধসমূহ কম আলোচিত হয়ে থাকে। কিন্ত রবীন্দ্রনাথের অন্যসব সৃষ্টির মতোই এখনও সেগুলো প্রাসঙ্গিক এবং সম্ভবত আজকের দিনে তার প্রাসঙ্গিকতা আরো বেশি। রবীন্দ্রনাথের সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তার একটি বড় দিক হচ্ছে যে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সভ্যতা বিষয়ক রচনাগুলো।

    ১৮৭৮-৮০ সালে তার প্রথম বিলেতবাসের সময় রচিত পত্রগুচ্ছ যা ভারতী সাময়িকীতে ‘য়ুরোপ প্রবাসী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্র’ বলে প্রকাশিত হয় এবং যা ১৮৮১ সালে ‘য়ুরোপপ্রবাসীর পত্র’ হিসবে গ্রন্থাকারে ছাপা হয় সেখানেই আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতা বিষয়ে তাঁর প্রথম ধারণা ও প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হই। সেই থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যুর অব্যবহিত আগে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ পর্যন্ত ৬০ বছরে তিনি এই এই বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। এই সময়ে পাশ্চাত্যের দেশগুলো যেমন অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত হয়েছে, তেমনি সারা পৃথিবী জুড়ে তাঁদের উপনিবেশিক শাসনের বিস্তার ঘটিয়েছে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।

    আর্টওয়ার্ক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    শিল্পী: দেবরাজ জানা
    সূত্র পিন্টারেস্ট

    রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার ইউরোপ সফরের সূচনায় – ১৮৯০ সালে – যদিও বিনয় করে বলেছিলেন যে, ‘আমার মতো অভাজনের পক্ষে য়ুরোপীয় সভ্যতার পরিণাম অন্বেষণের চেষ্টা অনেকটা আদার ব্যাপারীর জাহাজের তত্ত্ব নেয়ার মতো’ তথাপি এই বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি এতটা গভীর, এতটাই কৌতুহলদ্দীপক যে এতদিন পরেও আমাদের তা পাঠ করা দরকার। দীর্ঘ ৬০ বছরে বিভিন্ন সময়ে তিনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন তাতে আমরা যে বিবর্তন দেখতে পাই তা হচ্ছে প্রবল আশবাদ থেকে হতাশা, গভীর বিশ্বাস থেকে প্রবল অবিশ্বাস।

    রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন রাষ্ট্র ও নেশনকে, প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন রাষ্ট্রতন্ত্র, ন্যাশনালইজম এবং ইমপীরিয়ালইজমকে। লক্ষ্যনীয় যে, তিনি এগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন ক্ষতিকারক এবং ভয়াবহ বলে। এখন সারা পৃথিবী জুড়ে যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালইজমের বিস্তার ঘটেছে এবং তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় সহিংসতা এখন প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথের চোখে এই প্রবণতাগুলোর যে বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়েছিলো সেই দিকে আমরা মনোনিবেশ করতে পারি। সম্ভবত তা করা জরুরিও। এতে করে আমরা দেখতে পাবো যে সমসাময়িক কালের এই প্রবণতার উৎস কোথায় এবং তাঁর ভয়াবহতা কতটুকু।

    রবীন্দ্রনাথ যখন জাতীয়তাবাদের ত্রুটি গুলো চিহ্নিত করেন তখন রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশের সময় এবং সেই ন্যাশনালইজমের ভিত্তিতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো। ইউরোপের দেশে দেশে এখন আবার যে চিন্তা বিকশিত হচ্ছে তা হচ্ছে তার মর্মমূলে যে এক ধরনের জাতীয়তাবাদের চিন্তাই উপস্থিত তা সহজেই চোখে পড়ে। আজকের যুগে কেবল যে রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদেরই পুনর্জীবন ঘটছে তা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদও। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ। হুমকি কেবল নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে আটকে নেই, তা বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। জাতীয়তাবাদের ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে এর উদ্ভব হয়েছিলো নিজস্বতাকে অন্যের চেয়ে বড় করে, তুলামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ বলে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা থেকেই। পশ্চিমের এই ধারণা যখন প্রাচ্যে বিকশিত হয়েছে তখন তা বিবেচিত হয়েছে মুক্তির একটি পথ হিসেবে। ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মুক্তচিন্তার যে আদর্শ তা রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিলো, এই বিষয়ে ১৯০১ সালের আগের রচনাগুলোতে তিনি সেই কথাই বলেছেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী রচনায়ও আমরা দেখতে পাই যে তিনি পশ্চিমা সভ্যতার কিছু দিককে ইতিবাচক বলেই বিবেচনা করেছেন। ‘সফলতার সদুপায়’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন–

    ভারতবর্ষে একচ্ছত্র ইংরেজ-রাজত্বের প্রধান কল্যাণই এই যে, তাহা ভারতবর্ষের নানা জাতিকে এক করিয়া তুলিতেছে। ইংরেজ ইচ্ছা না করিলেও এই ঐক্যসাধন-প্রক্রিয়া আপনা-আপনি কাজ করিতে থাকিবে। নদী যদি মনেও করে যে, সে দেশকে বিভক্ত করিবে, তবু সে এক দেশের সহিত আর-এক দেশের যোগসাধন করিয়া দেয়, বাণিজ্য বহন করে, তীরে তীরে হাট-বাজারের সৃষ্টি করে, যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত না করিয়া থাকিতে পারে না। ঐক্যহীন দেশে এক বিদেশী রাজার শাসনও সেইরূপ যোগের বন্ধন। বিধাতার এই মঙ্গল অভিপ্রায়ই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকে মহিমা অর্পণ করিয়াছে।

    একার্থে রবীন্দ্রনাথ কার্ল মার্ক্সের মতোই ইংরেজকে ভারতে উজ্জীবনের শক্তি এবং ইতিহাসের অচেতন শক্তি বলে বিবেচনা করেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৬ সালে তিনি যখন ন্যাশনালইজম-এর সমালোচনায় মুখর, সেই সময়ে জাপানে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন–

    I must not hesitate to acknowledge where Europe is great, for great she is without doubt. We cannot help loving her with all our heart, and paying her the best homage of our admiration,—the Europe who, in her literature and art, pours out an inexhaustible cascade of beauty and truth fertilizing all countries and all time; the Europe who, with a mind which is titanic in its untiring power, is sweeping the height and the depth of the universe, winning her homage of knowledge from the infinitely great and the infinitely small, applying all the resources of her great intellect and heart in healing the sick and alleviating those miseries of man which up till now we were contented to accept in a spirit of hopeless resignation; the Europe who is making the earth yield more fruit than seemed possible, coaxing and compelling the great forces of nature into man’s service. Such true greatness must have its motive power in spiritual strength.

    কিন্ত রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের এই শক্তিকে রাষ্ট্রতন্ত্র বা ন্যাশনালইজমের মধ্যে নয়, দেখেছেন তাঁর আত্মার শক্তির ভেতরে। ‘সমাজভেদ’ প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা বিষয়ে তাঁর ধারণাগুলো আরো সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্য সভ্যতার পার্থক্য চিহ্নিত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে বিষয়ের ওপরে জোর দিয়েছেন তা হচ্ছে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ। তিনি লিখেছেন যে, ‘রাষ্ট্রতন্ত্রই য়ুরোপীয় সভ্যতার কলেবর; এই কলেবরটিকে আঘাত হইতে রক্ষা না করিলে তাহার প্রাণ বাঁচে না। … পূর্বদেশে তাহার বিপরীত। প্রাচ্যসভ্যতার কলেবর ধর্ম। ধর্ম বলিতে রিলিজন নহে, সামাজিক কর্তব্যতন্ত্র; তাহার মধ্যে যথাযোগ্যভাবে রিলিজন পলিটিক্স সমস্তই আছে।” তাঁর এই ধারণাটি তিনি আরো বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেন ‘প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য সভ্যতা’ প্রবন্ধে। ফরাসী মনীষী গিজর মত অনুসরণ করে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার ‘মূল প্রকৃতি ও শ্রেষ্ঠত্ব’ হিসবে যাকে চিহ্নিত করেন তা হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’। আর প্রাসঙ্গিকভাবে এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন যে ভারতে ইংরেজের আগমনে ‘জ্ঞানের বন্ধনমুক্তি’ ঘটেছে। তিন মহাদেশ ব্যাপৃত যে সভ্যতা তাঁকে তিনি বলেছেন ‘মহাসভ্যতা’ “পৃথিবীতে এমন আশ্চর্য বৃহদ্‌ব্যাপার ইতিপূর্বে আর ঘটে নাই।” কিন্ত এই অভূতপূর্ব মহাসভ্যতার ঐক্যসূত্রটি হলো – রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’। “ইংলন্ডে বল, ফ্রান্সে বল, আর সকল বিষয়েই জনসাধারণের মধ্যে মতবিশ্বাসের প্রভেদ থাকিতে পারে, কিন্তু স্ব স্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রাণপণে রক্ষা ও পোষণ করিতে হইবে এ সম্বন্ধে মতভেদ নাই। সেইখানে তাহারা একাগ্র, তাহারা প্রবল, তাহারা নিষ্ঠুর, সেইখানে আঘাত লাগিলেই সমস্ত দেশ একমূর্তি ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান হয়। জাতিরক্ষা আমাদের যেমন একটা গভীর সংস্কারের মতো হইয়া গেছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষা য়ুরোপের সর্বসাধরণের তেমনি একটি অন্তর্নিহিত সংস্কার”। আর এই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, রবীন্দ্রনাথ অনুমান করলেন, ‘তাহার অপেক্ষা উচ্চতর ভাবকে হনন’ করতে উদ্যত হয়েছে। সেই উচ্চতর ভাবটি হচ্ছে মানবধর্ম – “রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে য়ুরোপীয় সভ্যতা এতই আত্যন্তিক প্রাধান্য দিতেছে যে, সে ক্রমশই স্পর্ধিত হইয়া ধ্রুবধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করিতে উদ্যত হইয়াছে।” রবীন্দ্রনাথ আশংকা প্রকাশ করলেন যে, “য়ুরোপীয় সভ্যতার মূলভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ যদি এত অধিক স্ফীতিলাভ করে যে, ধর্মের সীমাকে অতিক্রম করিতে থাকে, তবে বিনাশের ছিদ্র দেখা দিবে এবং সেই পথে শনি প্রবেশ করিবে।”

    এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার আরেকটি মৌলিক ধারণা বিষয়ে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন, তা হচ্ছে ‘নেশন’। রবীন্দ্রনাথ নেশন শব্দটির কোনো বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করেননি, ইচ্ছে করেই। কেননা ‘নেশন’-এর ধারণাটি পাশ্চাত্য থেকে আহরিত; রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “‘নেশন’ শব্দ আমাদের ভাষায় নাই, আমাদের দেশে ছিল না। সম্প্রতি য়ুরোপীয় শিক্ষাগুণে ন্যাশনাল মহত্বকে আমরা অত্যাধিক আদর দিতে শিখিয়াছি। অথচ তাহার আদর্শ আমাদের অন্তঃকরণের মধ্যে নাই। আমাদের ইতিহাস, আমাদের ধর্ম, আমাদের সমাজ, আমাদের গৃহ, কিছুই নেশন-গঠনের প্রাধান্য স্বীকার করে না”। শুধু তাই নয় রবীন্দ্রনাথ নেশন-এর চেতনার মধ্যে আবিষ্কার করলেন এক ধরনের নিষ্ঠুরতা – “পনেরো-ষোলো শতাব্দী খুব দীর্ঘকাল নহে। নেশনই যে সভ্যতার অভিব্যক্তি তাহার চরম পরীক্ষা হয় নাই। কিন্তু ইহা দেখিতেছি, তাহার চারিত্র-আদর্শ উচ্চতম নহে। তাহা অন্যায় অবিচার ও মিথ্যার দ্বারা আকীর্ণ এবং তাহার মজ্জার মধ্যে একটি ভীষণ নিষ্ঠুরতা আছে”।

    নেশন বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারণার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমরা পাই তাঁর ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে। যদিও ফরাসী ভাবুক আর্নেস্ট রেনা’র আদর্শে লেখা এই প্রবন্ধ ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’ ব্যাখ্যার ভূমিকা মাত্র, তথাপি সেখানে রবীন্দ্রনাথ নেশনকে যে ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন সেখানে আমরা পশ্চিমা সভ্যতার এই উপাদান বিষয়ে তাঁর অবস্থান বুঝতে সক্ষম হই। রবীন্দ্রনাথ দেখালেন যে, “জাতি ভাষা বৈষয়িক স্বার্থ ধর্মের ঐক্য ও ভৌগোলিক সংস্থান নেশন-নামক মানস পদার্থ সৃজনের মূল উপাদান নহে”। তাঁর মতে এই মানস-পদার্থের উপাদান দুটি – “অতীতে সকলে মিলিয়া ত্যাগ দুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেইজন্য সকলে মিলিয়া প্রস্তুত থাকিবার ভাব হইতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাহাই নেশন”। নেশন বিষয়ে তাঁর এই ধারণার আলোকেই তিনি ভারতের সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে তিনি দেখিয়েছেন যে, পাশ্চাত্যে নেশনতন্ত্র কি করে এক ভয়াবহ উদগ্র রূপ লাভ করছে। ‘বিরোধমূলক আদর্শ’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন পাশ্চাত্যে এই নেশনতন্ত্র তৈরি করেছে অন্ধত্ব, অবিচার ও নিষ্ঠুরতা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–

    অন্ধতা নেশনতন্ত্রেরই মূলগত ব্যাধি। মিথ্যা দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হউক, নিজেদের কাছে নিজেকে বড়ো করিয়া প্রমাণ করিতেই হইবে এবং সেই উপলক্ষে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতে হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা প্যাট্রিয়টিজ্‌মের প্রধান অবলম্বন। গায়ের জোর, ঠেলাঠেলি, অন্যায় ও সর্বপ্রকার মিথ্যাচারের হাত হইতে নেশনতন্ত্রকে উপরে তুলিতে পারে, এমন সভ্যতার নিদর্শন তো আমরা এখনো য়ুরোপে দেখিতে পাই না।পরস্পরকে যথার্থরূপ জানাশুনা কেমন করিয়া সম্ভব হইবে। নেশনের মেরুদণ্ডই যে স্বার্থ। স্বার্থের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী, এবং স্বার্থের সংঘাতে মানুষকে অন্ধ করিবেই। ইংরাজ যদি সুদূর এশিয়ায় কোনোপ্রকার সুযোগ ঘটাইতে পারে ফ্রান্স্ তখনই সচকিত হইয়া ভাবিতে থাকিবে, ইংরাজের বলবৃদ্ধি হইতেছে। প্রত্যক্ষ সংঘাত না হইলেও পরস্পরের সমৃদ্ধিতেও পরস্পরের চিত্তকে বিষাক্ত করে। এক নেশনের প্রবলত্ব অন্য নেশনের পক্ষে সর্বদাই আশঙ্কাজনক। এ স্থলে বিরোধ, বিদ্বেষ, অন্ধতা, মিথ্যাপবাদ, সত্যগোপন, এ-সমস্ত না ঘটিয়া থাকিতে পারে না।

    বিংশ শতাব্দীর সূচনায় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছিলেন যে, ইউরোপকে “তাহার ন্যাশনালত্বের ব্যাধি, অতিমেদস্ফীতির স্থায় তাহার হৃদয়কে, তাহার মর্মস্থানকে, তাহার ধর্মনীতিকে আক্রমণ করিতেছে”।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কাছে এই বিষয় মোটেই অস্পষ্ট ছিলো না যে তার সূচনা হয়েছে পাশ্চাত্যের নেশন তন্ত্র বা ন্যাশনালইজম থেকে। ভয়াবহ যুদ্ধের বিভীষিকার এই সময়েই তিনি এই কথাটি বলতে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানে। ১৯১৬ সালে জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে তিনি যে সব বক্তৃতা দেন তা প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে Nationalism শিরোনামের গ্রন্থে। এই সব বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিলো একটাই– ন্যাশনালইজমের যে একটি ভয়াবহ রূপ আছে তা তুলে ধরা, এর ভেতরেই যে সভ্যতার অবমাননার, ধ্বংসের বীজ আছে সেই বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। এই গ্রন্থে আছে তিনটি নিবন্ধ– Nationalism in the West, Nationalism in Japan, Nationalism in India। তৃতীয় লেখাটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়েই লেখা।

    এই শতকের শুরু থেকে নেশনতন্ত্র বিষয়ে তিনি যে সব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর সমন্বিত রূপ হচ্ছে তাঁর এই নিবন্ধগুলো। তাঁর এই সব লেখায় তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিবাচক দিক বা অবদানকে অস্বীকার করলেন না, কিন্ত সুস্পষ্টভাবেই বললেন যে ইউরোপের মহত্ব যেমন আছে তেমনি আছে তাঁর ক্ষুদ্রতা – ‘Europe is supremely good in her beneficence where her face is turned to all humanity; and Europe is supremely evil in her malefic aspect where her face is turned only upon her own interest, using all her power of greatness for ends which are against the infinite and the eternal in Man.’

    কিন্ত তাঁর প্রধান বক্তব্যই হল ন্যাশনালইজমের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, “The Nation, with all its paraphernalia of power and prosperity, its flags and pious hymns, its blasphemous prayers, in the churches and its literary mock thunders of its patriotic bragging, cannot hide the fact the Nation is the greatest evil of the Nation, that all of its precautions are against it… its one wish is to trade on the feebleness of the rest of the world.” যুদ্ধের দিকে অঙ্গুলি সংকটে করে তাঁর বক্তব্য ছিলো –This European war of Nations is the war of retribution. Man, the person, must protest for his very life against the heaping up of things where there should be the heart, and systems and policies where there should flow living human relationship. The time has come when, for the sake of the whole outraged world, Europe should fully know in her own person the terrible absurdity of the thing called the Nation. … The Nation has thriven long upon mutilated humanity.”

    ভারতে ন্যাশনালইজমের প্রসঙ্গ আলোচনায় তিনি একে ভয়াবহ বলেই চিহ্নিত করলেন – “Nationalism is a great menace, it is the particular thing which for years has been at the bottom of India’s troubles. And in as much as we have been ruled and dominated by a nation that is strictly political in its attitude, we have tried to develop within ourselves, despite our inheritance from the past, a belief in our eventual political destiny.” রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তাঁর এই বক্তব্য কোনো বিশেষ জাতির বিরুদ্ধে নয়, বরঞ্চ জাতির ধারণার বিরুদ্ধেই – “I am not against one nation in particular, but against the general idea of all nations.”

    রবীন্দ্রনাথ নেশন এবং ন্যাশনালইজম বা জাতীয়তাবাদের যে অন্ধত্বের কথা বলেন সেখানে এই সব ধারণা এবং আদর্শ একটি দেশের ভেতরেই কীভাবে বিভক্তি এবং অসহিষ্ণুতার জন্ম দিতে পারে তার ইঙ্গিত থাকলেও তা বিস্তারিত ভাবে আলোচিত নয়। কিন্ত যদি নেশন এবং জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের মর্মবাণী আমরা উপলব্ধি করতে পারি তবে সেটা বুঝতে অপারগ হবারও কোনো কারণ নেই।

    আজকের দিনে, সারা বিশ্বেই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদের লেলিহান শিখার বিস্তার দেখতে পাই, যখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে – ভারতে, বাংলাদেশে, শ্রীলংকায় – আমরা দেখতে পাই নেশনের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে এমন সব শক্তির উত্থান ঘটছে যা মানবিক মর্যাদাকে পদদলিত করছে সেই সময়ে আমাদের এই বিষয়ে কেবল উপলব্ধি করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের করণীয় কী তাও রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই জানতে পারি ‘for the sake of humanity we must stand up and give warning to all, that this nationalism is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age, eating into its moral vitality.’

    বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন, এক শতাব্দী পরে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তা আমাদের স্মরণ করা দরকার, আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সেইখানেই।

    সম্পাদকীয় নোট: হৃদবাংলা: বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সমাবেশ ২০১৯ স্মারক সংকলনে প্রথমে প্রকাশিত।

  • একটি আষাঢ়ে গল্প

    একটি আষাঢ়ে গল্প

    • শহিদুল ইসলাম

    এক.
    ১৯৮১ সালে লিখেছিলাম ‘সাম্প্রতিক আবিষ্কারের আলোকে মানুষের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশ’ নামে একটি প্রবন্ধ। সেটি ছাপা হয়েছিল মফিদুল হক সম্পাদিত গণসাহিত্য পত্রিকার নবম বর্ষ: চতুর্থ-দশম সংখ্যা; আশ্বিন ১৩৮৮, অক্টোবর ১৯৮১ সংখ্যায়। মানুষের জন্ম কবে? মানুষ এলো কোথা থেকে? আজ যে চেহারা নিয়ে আমরা পৃথিবীতে বিচরণ করছি, এই চেহারা নিয়েই কি আমরা পৃথিবীতে এসেছি? এসব প্রশ্ন মানুষকে যুগে যুগে ভাবিয়েছে। জন্ম নিয়েছে হাজারো মিথ ও ধর্মের। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম এসব প্রশ্নের একটা সমাধান দেবার চেষ্টা করে এসেছে। বহুকাল পর্যন্ত মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে, সৃষ্টির প্রথম দিনটি থেকে মানুষ এই পৃথিবীতে বাস করছে মানুষ হিসাবেই। ধর্মীয় প্রভাবের আওতায় মানুষ কোনদিন ভাবতেই পারেনি যে নিম্নতর প্রাণিজগতের সঙ্গে রয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন।

    শহিদুল ইসলাম

    ১৯৯১ সালে নরওয়ে ভাষায় প্রকাশিত জাস্টিন গার্ডারের সফির জগত বইতে দু’টি প্রশ্ন উত্থাপন করে ১৪ বছরের সফিকে দর্শনের ক্রমইতিহাস শিখিয়ে ছিলেন। সে প্রশ্ন দু’টি হল: ‘তুমি কে?’ এবং ‘পৃথিবী কোথা থেকে এল?’ আদি গ্রিক দর্শন থেকে তিনি সাম্প্রতিককালের দর্শনের ইতিহাস উপন্যাসের মত তুলে ধরেছেন।

    ২০০৪ সালে রোনাল্ড রাইট তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করে মানুষের ভবিষ্যত কি তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সে তিনটি প্রশ্ন হল: এক. আমরা কোথা থেকে এলাম? দুই. আমরা কে? ও তিন. আমরা কোথায় চলেছি? রাইট বলছেন যে, মনে হতে পারে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে মানুষের কি হবে, তা কি আগে থেকে বলা যায়? কিন্তু রাইট মনে করেন, তা সম্ভব যদি আমরা প্রথম দু’টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। সে ইতিহাস তো আমাদের সামনেই আছে। তিনি আমাদের সভ্যতাকে একটি জাহাজ মনে করেন। প্রকৃতির সব আত্মীয়-স্বজনকে সে জাহাজে তুলে আমরা ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছি। সে জাহাজের গতিবেগ ক্রমাগত বাডছে। অতীতের চাইতে সে জাহাজ আজ অনেক বড়। আরো বেশি ভারাক্রান্ত। যে জাহাজে আজ আমরা চলেছি, সে জাহাজ কেবল সর্বকালের সর্ববৃহৎ জাহাজ নয়, সেটাই একমাত্র জাহাজ। অতীতে একটি জাহাজ ডুবলে আমাদের রক্ষার্থে আর একটি জাহাজে ওঠার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আজ আর কোনো জাহাজ নেই। আজকের জাহাজ ডুবলে আর কোনো জাহাজ আমাদের উদ্ধার করতে আসবে না। তার অর্থ নির্ঘাত মৃত্যু। অন্যান্য প্রাণীর মত আমরাও ভুল করি। তারপর শিখি। এভাবেই আমরা এতদূর এসেছি। কিন্তু আজ ভুল করা বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়।

    আমরা অধিকাংশ আজও ভিক্টোরিয়ো যুগের উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বাসী। সে দর্শনের মূল কথা উন্নয়ন সবসময় উন্নয়নমুখি। তার গতি একমুখি। কেবল সামনের দিকে এগিয়ে চলে। সমাজ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সে পরিবর্তন কেবল উন্নয়নমুখি। এটাই হল ভিক্টোরিয়ো যুগের দর্শনের আসল কথা। উন্নয়ন কি কেবল প্রকৃতিক? স্তন্যপায়ী জীব সরীসৃপ থেকে দ্রুতগামী, উল্লুক ষাঁড়ের চেয়ে চালাক, মানুষ সবার চেয়ে চালাক। কিন্তু আমাদের প্রাযুক্তিক সংস্কৃতি প্রযুক্তির উন্নয়ন দিয়ে বিচার করা হয়। ঘুষির চাইতে মুগুর অনেক বেশি উন্নত, তীর-ধনুক মুগুরের চেয়ে ভাল এবং বুলেট তীর-ধনুকের চাইতে অনেক বেশি উন্নত।

    আজ বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনবরত সাবধানবাণী উচ্চারণ করে চলেছেন। সুইডেনের ১৬ বছরের স্কুল ছাত্রী গ্রেটা থানবার্গ তো বলেইছে, আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে। সে আগুন নেভানোর জন্য বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এখুনি তৎপর হতে আহবান জানিয়েছে। তার সে ডাক পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে গেছে। তা এক বিরাট আন্দোলনের সূচনা করেছে। কিন্তু কোন দিক থেকে কোনো শুভ সংবাদ আসছে না। কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের ফল আমরা ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছি। সমগ্র পৃথিবী আজ অগ্নিদগ্ধ। জলবায়ু দূষণ চরম পর্যায়ে চলে গেছে। মানুষের তৈরি প্লাস্টিক মাত্র একশ’ বছরের মধ্যে আমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁডিয়েছে। আজ প্লাস্টিকমুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য সারা বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা গড়ে উঠেছে।

    আর্টওয়ার্ক: সামিট
    শিল্পী: ফাদিটুন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আজ পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭.৭ বিলিয়ন। আগামী ২০৫০ সালে তা ৯.৭ বিলিয়নে পৌঁছাবে এবং ২১০০ সালে ১১ বিলিয়নে। অর্থাৎ আর মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে আমাদের আরো দুই বিলিয়ন মানুষের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়বে। এখুনি আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ শোনা যাচ্ছে, তাতে লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী নিশ্চিহ্ন হবার পথে। ১৯৭০ সালের পর আমাদের বৈষয়িক উন্নয়নের ফলে ৬০ ভাগ প্রাণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শাসকশ্রেণীর কানে সেসব সাবধানবাণী প্রবেশ করছে না। প্রাযুক্তিক উন্নয়ন চোখে দেখা যায়। তাই প্রাযুক্তিক উন্নয়নের প্রতি পৃথিবীর সমস্ত সরকার একাট্টা। বুলেট ট্রেন, নয়নাভিরাম নগর- বন্দর-শহর, আকাশছোঁয়া ভবন, রিসোর্ট, পাঁচতারা হোটেল তৈরির দিকেই সবার মনোযোগ। জলবায়ুর ক্ষতি হোক কোন ক্ষতি নেই। লক্ষ কোটি গাছ কেটে, নদীনালা ভরাট করে সেখানে হাই রাইজ ভবনসহ ইকোপার্ক ইত্যাদি তৈরি করলে মানুষ একদিন সেই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা ভুলে যাবে। যেমন আমরা জঙ্গলাকীর্ণ গুলশান বনানীর কথা ভুলে গেছি। পৃথিবীর উন্নতদেশের আলোকোজ্জ্বল শহরগুলি দেখে আমরা অবাক হয় ভাবি দেশটি কত উন্নত। কিন্তু যে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে সেইসব শহর গড়ে উঠেছে, আমরা তা ভুলে যাই।

    তাই জন রাইটের জাহাজটি ডুবেছ। ষষ্ঠবারের মত পৃথিবী প্রাণ শুন্য হতে চলেছে। টাইটানিক জাহাজের মত আমাদের মানব-সৃষ্ট সভ্যতার জাহাজটি ডুবছে। আমরা ছুটাছুটি করছি। উদ্ধার করার কেউ নাই। অবশেষে সত্যিই একদিন জাহাজটি ডুবলো। পৃথিবী পৃষ্ঠ সবরকম প্রাণচাঞ্চল্য, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, পানি দূষণের জন্য আর কোন প্রাণী রইলো না। প্রাণশূন্য পৃথিবী মহাশূন্যে তার দৈনন্দিন ঘুর্ণনে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রইলো।

    দুই.
    বহু বছর নিঃসঙ্গ, প্রাণহীন পৃথিবী কক্ষপথে ঘুরেছে। নিঝুম, উদ্ভিদ, প্রাণীর নেই কোন কোলাহল। নেই মানুষের অত্যাচার। কত বছর কেটে গেছে কেউ জানে না। কবে যে সেখানে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার হল, তা’ও কেউ বলতে পারে না। তারপর বছরের পর বছর ঘুরে আসে। পৃথিবী আবার ফুলে ফলে ভরে ওঠে। নতুন নতুন গাছগাছড়া, নতুন নতুন প্রাণীর কোলাহলে আবার পৃথিবী নতুনভাবে জেগে ওঠে।

    দশ হাজার পর সেখানে উদ্ভব ঘটে এক নতুন বুদ্ধিমান প্রাণী। তখনও তার নাম ছিল না। কে দেবে তাদের নাম। মানুষের মত দেখতে কিন্তু মানুষ নয়। সবই মানুষের মত কেবল তাদের কপালের ওপর একটিমাত্র চোখ। আমরা দু’চোখ দিয়ে যা দেখতে পাই না। তারা একচোখ দিয়ে অনেক বেশি দেখতে পায়। ক্রমে তারা পৃথিবী দখল করে। হিংস্র প্রাণীগুলি তাদের বুদ্ধির কাছে হার মেনে তাদের শাসন মেনে নেয়।

    আর্টওয়ার্ক: ডেট্রোয়েট ম্যুরাল

    সময় গড়িয়ে চলে। তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাডতে থাকে। তারা সমাজ, সভ্যতা, বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সৃষ্টি হয় সামাজিক বিভাজন। অধিকাংশ মানুষ উৎপাদনে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও দু’বেলা দু’মুঠো খাবার পায় না। আর মুষ্টিমেয় শাসকশ্রেণী বিলাস-ব্যাসনে সমাজের মাথায় বসে থাকে। তাদের খেদমত করার জন্য একদল মধ্যবর্তী মানুষের সৃষ্টি হয়। তারা শাসক শ্রেণীর সেবা করে বেশ ভালভাবে জীবন যাপন করে। গড়ে ওঠে শিল্প কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণাগার, বাজার, যাতায়াত ব্যবস্থা। যা প্রয়োজন তার সব কিছু গড়ে তোলে নতুন পৃথিবীর নতুন শাসকশ্রেণী। মাঠে-ঘাটে-কলকারখানায় হাড্ডিসার মানুষ পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়েও শাসকশ্রেণীর মন ভেজাতে পারে না।

    জ্ঞানে বিজ্ঞানে তারা বহু কিছু আবিষ্কার করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ দূর হয় না। গতরখাটা মানুষগুলো ভিতরে ভিতরে ফুঁসতে থাকে। মাঝে মাঝে অসন্তোষের আগুন জ্বলে ওঠে। তখন শাসকশ্রেণী অনন্ত অসীম আকাশে এক বিরাট উপগ্রহ স্হাপন করল। তার এমন শক্তি যে কেবল কোন বহিঃশক্তি নয়, দেশের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টিকারীদের মুহুর্ত নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। শত শত বছর পার হয়ে গেল। মানুষের মনে সেই উপগ্রহটি ঈশ্বরের স্থান গ্রহণ করল। সবাই তাকে স্রষ্টার আসনে বসিয়ে তার পূজোঅর্চনা করতে শুরু করে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সমাজ ও নৃবিজ্ঞানী এবং পুরাতত্ববিদ পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল।

    তিন.
    একদল সমাজ বিজ্ঞানী ও পুরাতত্ত্ববিদ পাঁচ বছর গবেষণা পরিচালনার পর একটি পুরানো সভ্যতার সন্ধান পায় যার বয়স দশ হাজার বছর। তারা আবিষ্কার করে যে, তখন অনেক ধরনের প্রাণীর সাথে ‘মানুষ’ নামের এক বুদ্ধিমান প্রাণী বাস করতো। তারাও আজকের মত বিশ্বময় নানা ধরনের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। যারা সবচে’ উন্নত মারণাস্ত্র তৈরি করেছে, তারা অন্যসব জাতি, রাষ্ট্র, সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য স্থাপন করেছে এবং নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এখনকার মত তখনও সমাজ ছিল ধনী ও দরিদ্রে বিভাজিত। এখনকার মত তখনও মুষ্টিমেয় শাসক শ্রেণী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে শাসন ও শোষণ করতো। যারা সম্পদ উৎপাদন করতো, তাঁরাই অর্ধভুক্ত থাকতো। তাদের কোন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ছিল না। শাসকশ্রেণী তাদের সুবিধার্তে আইন তৈরি করতো এবং সবাইকে তা মানতে বাধ্য করা হত। সেসব আইন প্রয়োগের জন্য আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল।

    আর্ট্ওয়ার্ক: আইডেনটিটি
    শিল্পী: ভ্লাদিমির কাজানভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সেইসাথে তারা ‘ঈশ্বর’ নামে এক শক্তিশালী আন্তঃবিষয়ী সত্তার ধারণা প্রচার করে, যিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী। তার খেদমত করার জন্য সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ উপাসনালয় গড়ে তোলে এবং সেগুলি দেখভালের জন্য লক্ষ লক্ষ খেদমতগার নিয়োগ করে। তারা সেই  ‘আন্তঃবিষয়ী’ সত্তার প্রতি সমস্ত মানুষের বিশ্বাস ও সভয় শ্রদ্ধা আদায়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকতো। শাসক শ্রেণী তাদের সর্বোতভাবে সাহায্য করে। তাদেরও কোন অভাব থাকে না। তারা ‘স্বর্গ-নরকের’ ধারণার সৃষ্টি করে। যারা ঈশ্বরের আদেশ মত চলবে, তাদের জন্য এক অনন্ত আনন্দ-সুখের স্বর্গে যাবে আর যারা বেয়াদবি করবে তারা নরকের অনন্ত লেলিহান আগুনে পুডবে। শাসক শ্রেণীর শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারা। তাছাড়া উচ্চ শিক্ষিত একদল মানুষের সৃষ্টি হয়। তাদের বলা হত ‘বুদ্ধিজীবী’। তারা নিত্য নতুন দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সৃষ্টি ক’রে সমাজ-সভ্যতার প্রভূত উন্নতি সাধন করে। তখনকার শাসকশ্রেণী তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করে। তাদের বড় বড় পুরস্কার, খেতাবে ভূষিত করে। তারা শাসকশ্রেণীর শাসন টিকিয়ে রাখতে বড় বড় গবেষণা করে, বই-পুস্তক লেখে। এতে শাসকশ্রেণী খুশি হয়। আর যে দু’চার জন বুদ্ধিজীবী বেয়াদবি করে, সত্য প্রকাশ করে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করে। এ রকম বেয়াদব বুদ্ধিজীবীর নামও তারা খুঁজে পেয়েছে। আবিষ্কারের পর গবেষকদল সিদ্ধান্ত নিল যে তারা তাদের গবেষণাপত্রটি প্রধান শাসকের হাতে তুলে দেবেন।

    তারা তার সাক্ষাতকারের জন্য আবেদন করল। রাজা মাত্র প্রধান গবেষকের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিল। সঠিক সময়ে প্রধান গবেষক রাজার দরবারে গেল। তিনি সহাস্যে তাকে আহবান করলেন। তিনি তার গবেষণার বিষয় জানতে চান। গবেষক সব কিছু খুলে বলে। শোনার পর রাজা সহাস্যে তার গবেষণালব্ধ ফলের জন্য বাহবা দিলেন। গবেষকের চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল। তখন রাজা বলেন, ‘দেখ, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ মহাশূন্যে ঐ সর্বশক্তিমান মহাকাশযানটি প্রতিস্থাপন করে গেছেন এবং তিন হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সব মানুষ তা সাগ্রহে বিশ্বাস ক’রে গ্রহণ করেছে। তোমাদের এই গবেষণালব্ধ ফলাফল যদি প্রকাশ করো, তাহলে তার পরিণাম কী হতে পারে?’ গবেষকের প্রশ্নবোধক চেহারার দিকে চেয়ে রাজা বলেন, ‘তোমার এই সত্য কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। বরং তারা মিছিল ক’রে আমার কাছে আসবে তোমার বিচারের জন্য। তখন আমি কী করবো? শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আমাকে তো কিছু করতেই হবে। জনগণ তোমাদের মৃত্যুদণ্ড চাইতে পারে। তাদের চাপের মুখে আমাকে কিছু করতেই হবে।’ গবেষক বলে, ‘তাহলে কি সত্য প্রকাশ করা যাবে না?’ রাজা বলেন, ‘তোমার ইচ্ছা হলে তুমি তা প্রকাশ করতে পার। কিন্তু তার দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে। তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আমাকে তোমার বিচার করতে হবে। আদালত কী রায় দেয়, তা তো আমি জানি না। আমাকে সেইমত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

    আর্টওয়ার্ক: সেল্ফ এক্লোজার
    শিল্পী: এলিনা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    একথা শুনে গবেষক নীরব হয়ে যান। কিছুক্ষণ নীরবতার পর রাজা বললেন, ‘দেখ, তোমাকে আমি ভালবাসি। তাই তোমার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্তে আমি দু’টি বিকল্প রাস্তার কথা বলবো। যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করার তোমার পূর্ণ অধিকার আছে।’ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে গবেষক রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রাজা বললেন, ‘এক, তুমি সত্য প্রকাশ করো এবং তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকো এবং দুই, তুমি ফাইলটি আমাকে দাও। বদলে তুমি গবেষণার জন্য যত টাকা প্রয়োজন তুমি পাবে। লক্ষ-কোটি যত চাও, তোমার সহকর্মীদের নিয়ে আরো উন্নত গবেষণা পরিচালনা করো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কারে তোমাকে ভূষিত করা হবে। সমগ্র পৃথিবী তোমার জয়গান করবে। তুমি ঠিক করো তুমি কোনটা গ্রহণ করবে।’ গবেষক কিছু সময় নিস্তব্ধ থেকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলেন। ঘড়ির কাঁটার শব্দ যেন গর্জন করছে। রাজা ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো মৃদু হাসি ধরে রেখে তার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তারপর গবেষক নিরবে ফাইলটি রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা সহাস্যে সেটি নিয়ে বললেন, ‘এই তো তুমি সুন্দর সিদ্ধান্ত নিলে। তুমি তো জান যে দশ হাজার বছর আগে সত্য কথা বলে কতজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমি চাইনি তুমি তাদের পথ বেছে নাও।’ একথা বলে রাজা দশ কোটি টাকার একটি সিলমোহর গবেষকের হাতে তুলে দিলেন।

    গবেষক সেটি নিয়ে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে এল। সত্যি কিছুদিনের মধ্যে তার খ্যাতি সমগ্র বিশ্ব ছডিয়ে পড়ল। একদিন রাজা এক বিরাট সম্বর্ধনার মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানটি তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

  • লরা স্পিনি।। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো ১৯১৮’র স্প্যানিশ মহামারী

    লরা স্পিনি।। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো ১৯১৮’র স্প্যানিশ মহামারী

    • নাঈমা নুসরাত যূথীকা

    মূল রচনাটির লেখক  লরা স্পিনি, তিনি একজন বৃটিশ বিজ্ঞান বিষয়ক সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “পেল রাইডার” ১৯১৮ সালের মহামারী অবলম্বনে লেখা। এই প্রবন্ধটি তিনি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রচনা করেন।  অনুবাদটি  প্রথমে নয়া দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ইনটেরিয়র অব হসপিটাল টেন্ট
    শিল্পী: জন সিঙ্গার
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    মূল রচনা
    প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯১৮ সালে, সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে বা পুরো মানব ইতিহাসে, ব্ল্যাক ডেথের পর মৃত্যুর জোয়ার নেমেছিল। আমরা সেই জোয়ারকে স্প্যানিশ ফ্লু বলি এবং এর ফলে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য খাতেও সর্বাধিক বিপ্লব ঘটে তখনই।

    বিশ শতকের প্রথম দশকে পৃথিবী অন্যরকম ছিল। বিশেষত, স্বাস্থ্যসেবার সম্পর্কে তখনও কোন নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা ছিল না। শিল্পোন্নত বিশ্বে বেশিরভাগ ডাক্তার হয় স্বাধীনভাবে কাজ করতেন নয় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা অনুদান পেতেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে থাকত তারা।

    জনস্বাস্থ্য নীতি যেমন অভিবাসন নীতিগুলি ধার্য করত ইউজেনিক্সরা। সুবিধাপ্রাপ্ত এলিটরা কর্মীদের এবং গরিবদেরকে নিম্নমানের মানুষ হিসেবে গণ্য করত। তারা মনে করত, প্রাকৃতিক অবক্ষয়ের ফলে গরিবদের মধ্যে রোগব্যাধি লেগে থাকে। এলিটরা এটা বুঝত না যে দরিদ্রদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, অত্যাধিক শ্রম এবং নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের কারণে তাদের অসুস্থতা দেখা দিত। কলেরা বা টাইফয়েড অথবা অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে নিম্ন শ্রেণির মানুষদের মৃত্যু ঘটলে ইউজেনিসিস্টরা দায়ী করতো তাদেরই কারণ দরিদ্র মানুষের মধ্যে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল না। মহামারীর সময়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বোঝাতে অভিজাতদের জীবন রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপকে বোঝান হত।

    স্প্যানিশ ফ্লু এর প্রথম তরঙ্গটির উদ্ভব হয়েছিল ১৯১৮ সালের বসন্তে যদিও এর সাথে স্পেনের কোন সম্পর্ক ছিল না। একে স্প্যানিশ ফ্লু বলা হয় কারণ অন্যান্য যুদ্ধরত দেশগুলির পক্ষপাত যুক্ত সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে স্পেনের নিরপেক্ষ সংবাদপত্রগুলি এই রোগের গতিবিধি সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ফ্লুটি অন্যান্য সংক্রামক জ্বরের মত কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে যখন অনেক মানুষ এক জায়গায় একত্রিত হয়, উদাহরণস্বরূপ বস্তি অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে। অতএব এই রোগকে ভিড়ের অসুখ (ক্রাউড ডিজিজ) বলেও উল্লেখ করা হয়।

    ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের প্রথম তরঙ্গটি তুলনামূলকভাবে হালকা ছিল, মৌসুমী সংক্রামক জ্বরের মতই প্রায়। কিন্তু  যখন মহামারীটির দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায় ১৯১৮ সালের শরৎকালে শুরু হল তখন জনগণ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এটি একই রোগ। উদ্বেগজনকভাবে এর আগের মহামারী সংক্রামক জ্বরের চেয়ে এই সময় ২৫ গুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। যদিও প্রাথমিকভাবে তারা সংক্রামক জ্বর, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথাকেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু শীঘ্রই আক্রান্ত ব্যক্তিদের মুখ নীল হয়ে উঠছিল, শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল, এমনকি তাদের নাক এবং মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল। মুখ নীল থেকে কালো হয়ে গেলে তাদের আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকত না। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্কুচিত ফুসফুসগুলোতে এত বেশি পানি জমেছিল যে তারা শ্বাস নিতে পারত না এবং কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতো। ঐ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তে এসে দ্বিতীয় তরঙ্গটি দেখা দিয়েছিল, তবে ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত তরঙ্গ দেখা দেয় যেটি অন্য দুটোর চেয়েও অত্যাধিক তীব্র ছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডেথ অ্যান্ড দ্য মেইডেন
    শিল্পী: এগন শেইলি
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    সংক্রামক জ্বরটি একটি ভাইরাসের কারণে হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ চিকিৎসকই ধরে নিয়েছিলেন যে তারা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিয়ে কাজ করছেন। অর্থাৎ সকলে স্প্যানিশ ফ্লুর বিরুদ্ধে প্রায় সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিল। তাদের কাছে কোনও সংক্রামক জ্বরের ভ্যাকসিন বা  অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ছিল না, এমনকি কোনও অ্যান্টিবায়োটিকও ছিল না যেটি সেকেন্ডারি ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণের বিরূদ্ধে কার্যকর হতে পারে। ফলে বেশিরভাগ আক্রান্ত মানুষই মারা যায় (নিউমোনিয়ার মত)। জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ যেমন- আক্রান্তদের পৃথকীকরণ বা জনসভার স্থানগুলি বন্ধ কার্যকর করা হয়েছিল কিন্তু অনেকটা দেরিতে, যেহেতু ১৯১৮ সালের এই ইনফ্লুয়েঞ্জা কোন নির্ণয়যোগ্য রোগ ছিল না। এর অর্থ হল চিকিৎসকরা কর্তৃপক্ষের কাছে কেসগুলি রিপোর্ট করতে বাধ্য ছিলেন না, যার ফলস্বরূপ কর্তৃপক্ষ এই মহামারীটির প্রাদুর্ভাব আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়।

    বর্তমান অনুমান অনুযায়ী এই রোগটি ৫০ থেকে ১০০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ছড়িয়েছিল। এই সংখ্যাগুলির সাথে বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি মানুষ। এরপর বিশ্বজুড়ে অসুস্থতা এবং মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বহুবিধ কারণে, মহামারীবিদরা তখন থেকেই সেগুলো নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন মহামারীতে ব্যাপকভাবে দরিদ্র মানুষেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবচেয়ে বেশি তবে অভিজাতরাও কোনভাবে রেহাই পায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ এই বিপর্যয় থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, সেটা হল সংক্রামক রোগের জন্য কোনও ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত না বা তাকে একঘরে করে রাখাও উচিৎ না।

    ১৯০০ শতকের বিশের দশকে বহু সরকার সামাজিক চিকিৎসার ধারণাকে গ্রহণ করেছিল- সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় স্থানে বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান করা হত। রাশিয়াই প্রথম দেশ যেখানে একটি কেন্দ্রীভূত জনস্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যকর করা হয় এবং পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্যরাও এটা অনুসরণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়োগকর্তা-ভিত্তিক বীমা স্কিমগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা পথ গ্রহণ করে, তবে সেখানেও সংক্রামক জ্বর মহামারী পরবর্তী বছরগুলিতে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

    ১৯২৪ সালে সোভিয়েত সরকার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর মাধ্যমে তারা পেশাগত এবং সামাজিক অবস্থা যা রোগ সৃষ্টি করে তা নিয়ে গবেষণা করার সামর্থ্য অর্জন করে এবং শুধুমাত্র রোগ নিরাময় নয় তারা রোগ প্রতিরোধের উপায়গুলোও জানতে পারে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে এই নীতিই গৃহীত হয়েছিল। নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল জৈবিক এবং পরীক্ষামূলক নয়, সমাজবিদ্যাগতও। জনস্বাস্থ্য এখন প্রায় এরকম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

    সোভিয়েত পোস্টার

    জনস্বাস্থ্যবিদ্যার মূল ভিত্তি হল মহামারী সম্পর্কে অধ্যায়ন। যেখানে রোগের ধরণ, কারণ এবং রোগের প্রভাবগুলির অধ্যায়ন যা এখন পুরোপুরি বিজ্ঞান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মহামারী সংক্রান্ত বিদ্যার জন্য তথ্য প্রয়োজন। ফলে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ আরও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত রাজ্য একটি জাতীয় রোগ প্রতিবেদন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। ১৯১৮ সাল থেকে যে সকল প্রাথমিক সতর্কতা নির্ণয় যন্ত্রের অভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছিল সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু হয়। দশ বছর পরে, জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যের প্রতি কর্তৃপক্ষ নজর দেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রথম জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ করা হয়।

    ১৯২০ এর দশকে অনেক দেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তৈরি বা সংস্কার করেছিল এই মহামারীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে। এ সময় জনস্বাস্থ্য নেতারা হয় পুরোপুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বাদ পড়েছিলেন অথবা শুধুমাত্র অন্যান্য বিভাগের তহবিল এবং ক্ষমতাগুলির জন্য অবেদন করতে পারতেন। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে জনস্বাস্থ্যের সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতিও ছিল, কারণ স্পষ্টতই সংক্রামক রোগগুলি কোন দেশের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় মহামারী নিয়ে লড়াইয়ের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ব্যুরোর উদ্বোধন করা হয়েছিল, একে আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক কাঠামো বলা চলে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গড়ে তোলার আগে ইউজানিকদের নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল এবং নতুন সংগঠনটির সংবিধান স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এতে বলা হয় ‘জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে’। যদিও এই দর্শন সংক্রামক জ্বরের মত মহামারীগুলির হুমকিকে দূর করতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গড়ে ওঠার পর এরকম তিনটি মহামারী এসেছে এবং ভবিষ্যতে নিশ্চয় আরও আসবে, তবে মানুষ আগে যেভাবে এর মোকাবেলা করত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আসার পর এগুলোর মোকাবেলায় অনেকগুলো বদল এসেছে। এর দ্বারা এটা বোঝা গেছে যে, মহামারী কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয় বরং সামষ্টিক কেন্দ্রিক।

     

  • লাভলক, গাইয়া তত্ত্ব ও বায়োস্ফেয়ার

    লাভলক, গাইয়া তত্ত্ব ও বায়োস্ফেয়ার

    • শহিদুল ইসলাম

    বরেণ্য শিক্ষাগুরু, অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম এখনো লিখে চলেছেন। অষ্টতিতেও তরুণদের জন্য রীতিমত চ্যালেঞ্জ তিনি। প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। উদ্রেক করছেন নতুন চিন্তার। ষাটের প্রজন্মের শিক্ষকগণ আর খুব বেশি আমাদের মাঝে নেই। আমরা সৌভাগ্যবান বিপুল প্রাণ স্ফূরণ নিয়ে অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম তাঁর রচনার মাধ্যমে আমাদের ‍ঋদ্ধ করছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো এখনো সহজলভ্য হলেও বেশিরভাগ রচনাই অনলাইনে নেই। অরাজ তাঁর গ্রন্থিত এবং অগ্রন্থিত রচনা অনলাইনে প্রকাশে আগ্রহী, তিনিও সম্মত। প্রবহমান রচনাটি তাঁর একটি ফেসবুক পোস্ট।  জেমস লাভলকের চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই তাঁর এই প্রাত্যহিক চিন্তা তৎপরতা। লাভলকের কথা তিনি হাজির করেছেন অনেকটাই নিজ জবানীতে। মূল সাক্ষাতকারটি দীর্ঘ, এখানে কিয়দাংশ তিনি হাজির করেছেন।-সম্পাদক

    জেমস লাভলক

    মূল রচনা
    বিখ্যাত ‘গাইয়া’ তত্ত্বের জনক জেমস লাভলক গত ২৬ জুলাই,২০২০ তারিখে ১০১ বছরে পা রাখলেন। সেই উপলক্ষে সাংবাদিক জোনাথান অটো তার এক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেটি গত ১৮ জুলাই,শনিবার,২০২০ গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। লেখাটির শিরোনাম ছিল: The Biosphere and I are both in the last 1% of our life.’

    আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এই ‘গাইয়া’ তত্ত্ব সম্পর্কে হয়ত কিছু জানেন না। তত্ত্বটি বৈপ্লবিক। মূল কথা— পৃথিবীতে জীবন একটি আত্মপরিচালিত ( self-regulated) সত্তা। তাদের সুনির্দিষ্ট গঠন আছে, দেহ আছে, অবয়ব আছে। তারা জীব ও অবয়বী। তারা সব সময় পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের সঙ্গে ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় নিয়োজিত থাকে। লাভলক সাধারণত ‘ধ্বংসের পয়গম্বর’ (prophet of doom) নামে পরিচিত। তিনি জলবায়ু সংক্রান্ত দার্শনিক। তিনি কোন মতাদর্শ পোষণ করেন না, কোন নিয়মের বশবর্তী হতে চান না। তিনি মালিকানাহীন পশু ও উদ্ভিদের বিকাশে বিশ্বাসী। তিনি মানুষের বাক স্বাধীনতা ও একাডেমিক স্বাধীনতার একজন বড় প্রবক্তা।

    প্রথম প্রশ্ন ১৪ বছর আগে আপনি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে জলবায়ু চরম আকার ধারণ করবে এবং ২০২০ সালে পৃথিবী আরো সর্বনাশা দূর্ঘটনায় পড়তে পারে। এ বছরের প্রথমার্ধে পৃথিবী এক বৈশ্বিক মহামারীর (কোভিড-১৯) সম্মুখীন, মেরু প্রদেশের তাপমাত্রা এই প্রথম ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করলো, অস্ট্রেলিয়া ও সাইবেরিয়ায় দাবানলে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় পুনরায় প্লেগ দেখা দিয়েছে। এভাবে আপনার ভবিষ্যতবাণী প্রমাণ হওয়ায় আপনি আনন্দিত না হতাশাগ্রস্ত?

    উত্তরে বলেন যে, আমি বিজ্ঞানী নই— একজন প্রযুক্তিবিদ। একটি ভবিষ্যতবাণী সত্য কি মিথ্যা তা বোঝার জন্য অনেক সময় দিতে হয়। আমি বলবো, এখন পর্যন্ত পৃথিবী তাপমাত্রা এমন জায়গায় রেখেছে, যে তাপমাত্রায় জীবন বাঁচতে পারে— এটাই গাইয়া  তত্ত্বের মূল কথা। আমি বলবো যে আমি ও বায়োস্ফেয়ার উভয়েই জীবনের শেষ ১% সময়ের মধ্যে বাস করছি।

    তিনি মনে করেন ভাইরাসও আত্মপরিচালিত একটি প্রাণী। ডারউইনের ক্রমবিকাশতত্ত্বের অধীন। নতুন কোন প্রজাতির বংশবৃদ্ধি সম্ভব নয় যদি তার খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আজ যে ভাইরাসটির সম্প্রসারণ ঘটছে, তার অর্থ সে যথেষ্ট খাদ্য পাচ্ছে এবং সে খাদ্যটি হলাম আমরা, মানুষ। পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে ভাইরাসের ছডিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আমরা প্রকৃতির পছন্দের প্রাণী নই যারা বাধাহীনভাবে বংশবৃদ্ধি করে পৃথিবীকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে। মালথুস এখানে সত্যি। তাঁর সময়ে মানুষের সংখ্যা এত কম ছিল যে ভাইরাস এত দ্রুতগতিতে ছডিয়ে পারত না।

    আর্টওয়ার্ক: বার্নিং আর্থ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    লকডাউনে কি কোন উপকার হবে?

    অবশ্যই। মানুষের জীবনযাত্রায় এক পরিবর্তন আসবে। আমি বিশ্বাস করি মানুষ বুঝতে পারবে যে তারা আগে যে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এখন তা করা যাবে না। অতিরিক্ত খেয়ে মোটা হওয়া মোটেই ভাল না।

    আপনি কি বিশ্বাস করেন যে জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষ কিছু করবে?

    কিছু করা উচিত। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। বায়ু, সূর্যরশ্মি ও নিউক্লিয়ার শক্তির ওপর আমাদের আস্থা বৃদ্ধি করতে হবে। তা নাহলে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।

    লকডাউন কি আপনার ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার সৃষ্টি করেছে?

    ১০১ বছর বয়সে স্ত্রী স্যান্ডির সঙ্গে প্রায়ই ২/৩ মাইল হাঁটি। লকডাউনের ফলে রাস্তায় লোক চলাচল কম থাকায় হাঁটতে সুবিধা হয়।