Blog

  • অরুন্ধতী রায়।। প্রতিরোধের এনজিওকরণ

    অরুন্ধতী রায়।। প্রতিরোধের এনজিওকরণ

    • অনুবাদ: পূজা রায়

    গণআন্দোলনের সম্মুখে যে বিপত্তি উপস্থিত তা হচ্ছে প্রতিরোধের এনজিওকরণ। আমি যা বলতে যাচ্ছি তাকে সমস্ত এনজিওর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক একটা অভিযোগনামা হিসেবে পেঁচিয়ে ভিন্ন অর্থ করা সহজ হবে। আর তেমনটি করা হলে এটা মিথ্যাচার হবে। ভূয়া এনজিও স্থাপন বা অনুদানের অর্থ মেরে দেয়া বা কর ফাঁকি দেয়ার মতন ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে অবশ্যই কিছু কিছু এনজিও মূল্যবান কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু, এনজিও প্রপঞ্চটিকে একটা বৃহৎ রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

    অরুন্ধতী রায়

    ১৯৮০-১৯৯০ এর দশকের শেষদিকে ভারতে অনুদানপ্রাপ্ত এনজিও’র উত্থান হয়েছিল। একই সাথে ভারতের বাজারে নিওলিবারিজমও চালু হয়েছিলো। সেই সময়ে, কাঠামোগত সামঞ্জস্যতা (structural adjustment) বজায় রাখতে ভারত রাষ্ট্র গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহণ এবং জনস্বাস্থ্য খাত থেকে অনুদান প্রত্যাহার করা শুরু করেছিল। আর রাষ্ট্র যেহেতু চিরাচরিত ভূমিকা পরিত্যাগ করেছিল, এনজিও তখন সেই জায়গাগুলোতে কাজ করা শুরু করেছিল। তবে এখানে তফাৎ হল, জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় তাদের বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ খুবই নগণ্য ছিল।

    বেশিরভাগ বড় বড়ো এনজিও পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে এমন কিছু সংস্থা যারা ঘুরেফিরে পশ্চিমা সরকারগুলো, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং কয়েকটি বহুজাতিক কর্পোরেশন দ্বারা অর্থায়িত হয়। এগুলো হুবুহু একই ধরনের এজেন্সি নাও হতে পারে, তবে অবশ্যই এগুলো একই আলগা রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ যা কিনা নয়া-উদারবাদী প্রকল্পের তদারকি করে এবং শুরুতেই সরকারি ব্যয় কমানোর তাগদা দেয়।

    আর্টওয়ার্ক: নিও-ইকোনোমি
    শিল্পী: তিয়াগো হোসেল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এখন কথা হলো, এই সংস্থাগুলি কেন এনজিওগুলোকে অর্থায়ন দেয়? এটি কি কেবল পুরানো ধাঁচের মিশনারি উদ্দীপনা? নাকি অপরাধবোধ? এটি আসলে তার চেয়েও কিছুটা বেশি। এনজিওগুলো ধারণা দেয় যে, তারা পশ্চাদপসরণকারী রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করছে। তারা তা করছেও কিন্তু সেটি আদতে নিষ্ফল পদ্ধতিতে। তাদের আসল অবদান হলো তারা রাজনৈতিক ক্ষোভকে হ্রাস করছে এবং জনগণের প্রাপ্য অধিকারগুলোকে সহায়তা বা দানশীলতা হিসাবে বণ্টন করছে। তারা জনসাধারণের মানসিকতা পরিবর্তন করছে, যা কিনা জনগণকে নির্ভরশীল শিকারে পরিণত করে এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের তীব্রতাকে ভোঁতা করে দেয়। এনজিওগুলো সরকার এবং জনসাধারণের, সাম্রাজ্য এবং তার প্রজাদের মধ্যে নিরপেক্ষ একধরনের অবস্থান তৈরি করেছে। তারা হয়ে উঠেছে সালিশকারী, ব্যাখাদানকারী এবং সুবিধাদাতা।

    শেষ পর্যন্ত এনজিওগুলি যাদের জন্য কাজ করে তাদের কাছে নয় বরং তাদের অনুদানকারীদের কাছে দায়বদ্ধ। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের ভাষায় তাদেরকে “ইনডিকেটর স্পেসিস” বলা যায়। আসলে নিওলিবারেলিজম দ্বারা সৃষ্ট বিপর্যয় যত বেশি, এনজিওগুলির প্রাদুর্ভাব ততো বেশি। এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দেশকে আক্রমণ করা এবং বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে  সেই দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য এনজিও তৈরি করার প্রস্তুতি একই সাথে চলে। এনজিওগুলোর অর্থায়ন যেন ঝুঁকিতে না পড়ে এবং যে দেশেগুলোতে তারা কাজ করতে চায় সেখানকার সরকার যেন তাদেরকে কাজ করার অনুমতি দেয়, সেজন্য এনজিওগুলোকে তাদের কাজকারবারকে সংকীর্ণ পরিসরে এবং কমবেশি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করেই উপস্থান করতে হয়।

    দরিদ্র দেশ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলির অরাজনৈতিক (এবং, তাই চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক) প্রতিবেদনগুলো [অন্ধকারচ্ছন্ন] দেশগুলোর [অন্ধকারচ্ছন্ন] জনগণকে এমন অসহায় রূপে প্রকাশ করে যেন মনে হবে, আরো একজন অপুষ্ট ভারতীয়, আরো একজন অনাহারী ইথিওপিয়ান, আরো একজন আফগান শরণার্থী, আরো একজন হতাশ সুদানিয়ান… সকলেই শ্বেতাঙ্গ মানুষের সহায়তার জন্য বসে আছে। তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপগুলোকে শক্তিশালী করে এবং পশ্চিমা সভ্যতার কৃতিত্ব, স্বাচ্ছন্দ্য এবং মমত্ববোধ প্রচার করে। এদেরকে আসলে বলা যায় আধুনিক বিশ্বের সেকুলার মিশনারি।

    আর্টওয়ার্ক: কিসান মার্চ
    শিল্পী: মলি ক্রবাপেল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    অবশেষে, যেহেতু দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থনীতিতে ফটকা পুঁজি যুক্ত রয়েছে, এনজিও-র পুঁজি স্বল্প পরিসরে হলেও খুব সুদূরপ্রসারী সমান রাজনৈতিক ভূমিকা রাখছে। এটি এজেন্ডা নির্দেশ শুরু করে, লড়াইকে আপসে পরিণত করে, এবং প্রতিরোদের বি-রাজনীতিকরণ করে। এনজিওগুলো ঐতিহ্যগতভাবে স্ব-নির্ভর স্থানীয় জনগণের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করে। তাদের তহবিল স্থানীয় লোকজনকে বিভিন্ন কাজ যোগাড় করে দেয় যারা কিনা প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী হতে পারতো। কিন্তু এখন তারা অনুভব করেন যে, তারা তাৎক্ষণিক সৃজনশীল কিছু একটা করছেন (এবং, এটা করতে গিয়ে তারা কিছুটা উপার্জনও করছেন)।

    বাস্তবিক রাজনৈতিক প্রতিরোধের এ জাতীয় কোনও সহজ পথ নেই। রাজনীতির এনজিওকরণ প্রতিরোধকে একটি ভদ্রস্থ, সুবিধাজনক, বেতনভুক্ত ৯টা-৫টা চাকরিতে পরিণত করার হুমকি দিচ্ছে। বোনাস হিসাবে রয়েছে কিছু সুযোগ-সুবিধা। প্রকৃত প্রতিরোধের কার্যকর পরিণতি থাকে, এবং কোনো বেতন থাকে না।

    লেখার মূল লিঙ্ক: The NGO-ization of resistance, 2014

     

  • হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    আর্টওয়ার্ক: হাগিয়া সাফিয়া
    শিল্পী: রাফায়ে জাফের
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    গেল ১৫ই জুলাই ছিল ২০১৬ সালে তুরষ্কে যে ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থানটি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল তার চতুর্থ বছর। ঐ দিনটি তুরষ্কের নিওলিবারেল রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনের বেদিতে বলীকৃত অপরিহার্য সমাপ্তি হিসেবেই গণ্য স্মরিত হবে। তুরষ্কের এই নব্যগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালের ক্যু-এর সাথে যা ১৯৯০ সালে আরো কিছুটা ভিত্তি পায়, এবং প্রক্রিয়াটি অবশেষে বড় পরিসরে হলেও শেষ হয় ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)’র মাধ্যমে।

    তুরষ্কের বুর্জোয়া ও অভিজাত শ্রেণি যারা রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রাথমিক ভাবে সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব বা প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাদের ভেতর ১৯৮০’র দশকে একটি আমূল রূপান্তর ঘটে যা আন্তর্জাতিক পুঁজির সাথে সঙ্গতি রেখেই সাধিত হয়েছিল। এই রূপান্তর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পতন ঘটায় যা কিনা লাঠির গায়ে লাগানো ললিপপের মতই ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। চার বছর আগের ঐ দিনটি সেদিন ঘটে থাকা নানা ঘটনার ঘটনা শৃঙ্খলের থেকেও বেশি কিছু, যার অনেকটাই দ্ব্যর্থবোধক থেকে যাবে।

    এটা সেই সব ঘটনাবলীর একটি যা কিনা জোরালোভাবেই প্রতীকী এবং তুরষ্কের গত ৪০ বছরের অতীতকে প্রতিফলিত করে। অপরাধের দায়ে অভিযুক্তরা দাবি করছেন যে তারা ভুক্তভোগী। তারপর আছেন তাঁরাও যারা নিজেদের ঘটনাপ্রবাহের ধারায় নিজেদের জয়ী হিসেবে দেখাচ্ছেন। এই উভয়পক্ষেরই আছে সমাজে ধর্মকে উত্তরণের কাজের সাথে প্রত্যক্ষ সংযুক্তি- গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান ও সুস্পষ্ট ঘটনা।

    তবু জুলাই ১৫ নিছকই একটা দিন নয় যা মিল্লি গোরাস-ভিত্তিক নব্য-ইসলামী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এবং গুলেন আন্দোলনের ভেতরকার উত্তেজনার সমন্বিত রূপ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। সমাজে ধর্মের বৃদ্ধি গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কৌশলগত প্রপঞ্চগুলোর একটি। ধর্মের এই প্রসার অনেক ধ্বংস ডেকে এনেছে এবং বিদ্যমান, অন্ধকার পরিস্থিতির পরিসর বাড়িয়েছে। তবে ধর্ম শুধুই একটি ভাবাদর্শগত খোলস নয়, বরং গত ৪০বছর ধরে তুরষ্কের যে পুঁজিবাদী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তারই এক সতীর্থ যাত্রী হলো এই ধর্ম।

    আর্টওয়ার্ক: নুসায়বিন
    শিল্পী: জেহরা দোগান
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    কেনান এভরেন, ১৯৮০ সালের ক্যু’য়ের নেতা, ক্যু-উত্তর সংবিধানের অনুসমর্থন লাভের আশায় সংগঠিত র‌্যালিগুলোয় কোরান হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন ও জনতার কাছে ভোট চেয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোগান নির্বাচন এবং সাংবিধানিক গণভোট আদায়ের লক্ষ্যে কোরান হাতে বড় বড় র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন। এভরেন এবং এরদোগান তুরষ্কের অর্থনৈতিক কর্মসূচীর উত্তরণে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা সেই অর্থনৈতিক কর্মসূচী যা একই কাঠামোর ভেতরে একজন জান্তা সামরিক নেতা ও একজন নির্বাচিত নব্য-ইসলামী নেতার যুগলবন্দী উপস্থাপন করে। এই অর্থনৈতিক কর্মসূচীই একইসাথে নির্বাচিত, অনির্বাচিত এবং বলবৎকৃত অনুশীলনসমূহ একত্রিত করার সুযোগ দিয়েছে।

    বস্তুত, ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি তার নিজস্ব যাত্রাপথই অনুসরণ করেছে, মধ্যখানে ২০১৬-এর জুলাই ১৫-ও ছিল একটি আত্তীকৃত যাত্রাবিরতি মাত্র। এক নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে একটি সামরিক উত্থানকে সুকৌশলে একটি পরিপূর্ণ গণতন্ত্র-বিরোধী পাল্টা অভ্যুত্থানের চেহারা দেয়া হয়। তবু গোটা ঘটনার পরবর্তী অভিঘাতকে শুধুই নিও লিবারেল যুগের ইসলামপন্থীদের প্রবণতার মাপে মিলিায়ে নেওয়াটাও ভুল হবে।

    ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই তুরষ্কে যা ঘটেছিল তা’ সেইসব রাজনীতিবিদের ঐতিহাসিক ও ভাবাদর্শগত প্রবণতাসমূহের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ যারা এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ‘ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ’ বলেছিলেন। যাহোক, এই সঙ্গতি বা একতা কোন একতরফা প্রবণতার বিষয় নয়। তথাকথিত ‘তুর্কী-পদ্ধতির রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা’ই এই ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর শাসনামলেরও জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসের সেসব পর্বের রাজনৈতিক অনুঘটকদের ব্যক্তিগত চারিত্র্যও এই ঘটনাবলী বিশ্লেষণে যথেষ্ট নয়।

    ১৯৮০-র দশক থেকে শাসক শ্রেণি যারা এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছে এবং তুরষ্কের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বা বহি:স্থ পুঁজিবাদের ভেতরে মাঝে মাঝে বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দিয়েছে। তবে এটা বিভ্রান্তিকরও বটে। ভেহবি কোচের মুখে কেনান এভরেনের প্রশংসা থেকে তুরষ্ক ইউএসএইডের আজকের নৈ:শব্দ্য একাধারে যেমন পুরণো কাঠামোর ধীর পতনের ইঙ্গিতবাহী, একইসাথে তুরষ্কের মূল ক্ষমতাকাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলো একই রয়েছে।

    ১৯৮০-এর সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী শাসনামল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ‘সন্ত্রাস দমন’ নাম্নী ডিসকোর্সের মাধ্যমে পরিচালিত করেছে। ‘পাল্টা-অভ্যুত্থান’-এর ডিসকোর্স আজকের শাসনামলকে বৈধতার পাটাতন দিয়েছে। তবু এই শাসনামল আইন ও গণতন্ত্রের একটি সত্যিকারের শুদ্ধি অভিযান চালাতে অক্ষম যা বরং প্রকৃত ক্যু-এর পরিকল্পনাকারীদের ঈর্ষান্বিত করতে পারে।

    শুধুমাত্র একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তুরষ্কের পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থা ও অন্তর্গত অসঙ্গতির সাথে যুঝতে পারে। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র শুধুই বর্তমানের বদলগুলোর পেছনের মৌন অপরাধী নয়, অনেকসময় এটি সহায়কের কাজও করে। অতীতেও যেমন করেছে।

    আর্টওয়ার্ক: এরদোগানিজম
    শিল্পী: অ্যান্তোনিও রদ্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বর্তমানের মূল সমস্যা হলো যে তুরষ্কে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সঙ্ঘাতগুলো নানা ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে যেখানে আমাদের ‘সীমিত/নিয়ন্ত্রিত’ বুর্জোয়া গণতন্ত্র এমনকি এই পুঁজিবাদকে পরিচালনা করারও ক্ষমতা রাখে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের উদাহরণের থেকে একদম উল্টো মুখে দাঁড়িয়ে, তুরষ্কে বরং পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র পরষ্পরের সহযোগী না হয়ে বরং একে অপরের সাথে বেমানান ও বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। এরদোগান-বাহচেলী কোয়ালিশনকে সমর্থনের বদলে, তুরষ্কের পুঁজি কাঠামো তাই এই দুই নেতাকে তাদের বিদ্যমান মেরু দূরত্বে ঠেলে নিয়ে গেছে।

    মুদ্রাস্ফীতির হার গণনার ক্ষেত্রে এরদোগান সরকারের নয়া উদ্ভাবন এবং সরকারের প্রচারিত নানা অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত এমন এক স্তরে গেছে যা এই সরকারের নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠির বড় অংশটিই আর বিশ্বাস করেনা। তার সাথে চাড়া দিয়ে উঠছে প্রবল বেকারত্ব ও সর্বনাশা নানা অর্থনৈতিক নীতিমালা যা তুরষ্কের সাম্প্রতিক অতীতের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শর্তমালার অধীনে সম্ভব হতো না।

    তুরষ্কের লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্র একটি শুণ্যতা রেখে যায় যা ১৯৮০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে। একেপি এই শুণ্যতাকে ‘দাতব্য’-এর মোড়কে ভরাট করতে থাকে যা সাধারণত: ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী বিভায় আচ্ছাদিত থাকে এবং আত্ম-স্বীকৃত রাজনৈতিক বিষয়ের ক্রমাগত বেড়ে চলা ব্যক্তিগত অভয়দানের ভিত্তিতে টিঁকে থাকে। এই অনুরোধ/যোগান গতিশীলতা যা কিনা সমাজের দরিদ্রতম অংশের ভিত্তি গঠন করেছিল, বর্তমানে এর অতীত সম্ভাব্যতা এবং সক্রিয়তা থেকে বহু দূরে সরে গেছে এবং আজ এত দশক পর একেপি-র সদস্যরা নিজেরাই বুর্জোয়া হয়ে গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    অর্থনৈতিক ধসের ভেতরে সামনে তুর্কী সমাজের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করার মত যা যা আসছে, তাতে দরিদ্রদের জন্য দাতব্য সহায়তার মাধ্যমে একেপি’র অতীত গতিশীলতা অর্জনের বিষয়টি আর কাজে আসবে না।

    জনতার অধিকতর অংশকে কাজে লাগানো একেপির পক্ষে দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তাদের ‘ভোট কমে আসা’ বা ‘ভোট ক্ষয়ে’র বিষয়টি এই আলোকেই বিচার করতে হবে।

    এই প্রেক্ষিতে, সরকার তার মূল সমর্থক গোষ্ঠির জন্য কোন পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেবার মত খরুচে ও কল্পনাবিলাসী কাজে সময়ের বদলে, সম্ভাব্য সব সমালোচকের উপর খড়গ হস্তে দমন-পীড়ন শুরু করেছে। এর একটি উদাহরণ হলো দেশের আইন সমিতিগুলো বিকেন্দ্রীভূত করার একটি বিল আনা যা সম্প্রতি তুর্কী সংসদে পাশ হয়েছে। অন্য পেশাজীবী পরিষদগুলো যারা প্রস্তুত হচ্ছেন তাদের আর একটি আঘাত করার জন্য প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক বিল এরডোগান সরকারের এজেন্ডায় রয়েছে। এভাবেই নিয়োজিত অছি সরকার লাগামহীন ভাবে দেশ চালাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আইন ও নির্বাচন সংস্কারের পরিকল্পনাও চলছে।

    সামাজিক রণাঙ্গনে, সরকার কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছে যার মাধ্যমে সে তার সমর্থক ভিত্তির সবচেয়ে সক্রিয় উপাদানসমূহকে নিরাপদ রাখতে পারে। এই সক্রিয় সমর্থকরা ‘রাস্তার কাজের’ ডাকে সবচেয়ে দরকারি।  সরকারের ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ এই পরিসরের ভেতরেই মূল্যায়িত হতে পারে, একটি পদক্ষেপ যা কিনা একটি বয়সের উপরে ডানপন্থী মানসের সবার কাছে একটি ‘বিশাল অর্থ’ বহন করে এবং এই ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ সমাজের আরো জঙ্গি অংশের চোখ ভিজিয়ে দেবে। এবং সরকারের ‘পরিবার’ নীতিকে ‘উন্নততর’ করতে সরকার ইস্তাম্বুল চুক্তি বাতিল করার অভিপ্রায় পোষন রাখছে যার মাধ্যমে নারীকে পুরুষের একটি হাতের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছুই মনে হবার অবকাশ থাকবে না।

    এই সরকার আরো দাবি করতে থাকবে যে এটি সব নিয়মকানুন ও শর্তাদি বাতিল করছে যেন বর্তমান যে কঠিন সময় আমরা পার করছি সেটা ঠিক মত পার হতে পারি।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    মূলত, এই প্রবণতা থেকেই এই সরকার সময়ে সময়ে নিল্লর্জ্জ আচরণ করে এবং ‘আয়া সোফিয়া’র মত তাসগুলো পকেট থেকে বের করে। অন্য সময়ে, তারা মানুষকে ভয় দেখানো জুয়াড়ির মত ‘খিলাফত’ শব্দটি নিয়ে পড়ে থাকে। লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে সরিয়ে ফেলার ঐতিহাসিক পথ- ইতোমধ্যেই এর সঙ্কুচিত আয়তন সত্ত্বেও- মূলত প্রশস্ত করা হয়েছিল ১৫ই জুলাইয়ের পর। ১৫ই জুলাইয়ে প্রদত্ত সব বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা যা কিনা ‘গণতন্ত্র এবং জাতীয় অভিপ্রায়’কে উদযাপন করেছে- সেই যাবতীয় বক্তৃতার আড়ালে ছিল বর্তমান তুরষ্কের রাষ্ট্রচালকদের রাষ্ট্রচালনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সঙ্কট। আর এটি এখন এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।

    তুরষ্কের বিদ্যমান ইসলামি-জাতীয়তাবাদী জোট বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হুট করে ঘাড়ের উপর এসে বসা কোন রাজনৈতিক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নয়। বরঞ্চ এটা গত ৪০ বছর ধরে তুরষ্কের পুঁজিবাদের একটি জৈব ফসলই বলা যায়। একটি কার্যকারণমূলক সম্বন্ধ যা থেকে এই ইসলামী-জাতীয়তাবাদী জোট অনেক সুবিধা এবং তার জনসমর্থনের বিপুল অংশটি লাভ করে, একইসাথে এর ‘একিলিসের গোড়ালি’ও বটে।

    মূল লেখা দেখুন এখানে

  • পার্ল বাকের নোবেল বক্তৃতা।। চীনের উপন্যাস

    পার্ল বাকের নোবেল বক্তৃতা।। চীনের উপন্যাস

    • অনুবাদ: বখতিয়ার আহমেদ

    আজকের এই বক্তৃতায় কি বলব ভাবতে গিয়ে মনে হল চীনের কথা না বলাটা অন্যায় হয়ে যাবে। জন্ম ও পৈত্রিক সূত্রে আমি একজন আমেরিকান নাগরিক এবং বাকি জীবনটুকু নিজের এই দেশেই অতিবাহিত করতে চাই। কিন্তু আমার লেখালেখির যাত্রা আমেরিকান উপন্যাসকে উপজীব্য করে শুরু হয়নি বরং চীনের উপন্যাসই আমার লেখার আঙ্গিক গড়ে দিয়েছে। গল্পের সাথে প্রথম পরিচয়, গল্প বলা ও লিখতে শেখা ইত্যাদি সব বিষয়েই চীনই আমার মহান গুরু। কাজেই আজকের এই দিনে চীনের কথা উল্লেখ না করাটা হবে কৃতঘ্নতার সামিল। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি কারণে এই আলোচনা আমি সীমাবদ্ধ রাখব চীনের উপন্যাস প্রসঙ্গে। এই একান্ত সিদ্ধান্তটির পেছনে অন্য কারণটি হচ্ছে আমি বিশ্বাস করি চীনের উপন্যাস, পশ্চিমা উপন্যাস আর উপন্যাসিকদের জন্য যে অনন্য দ্যূতি বহন করে তা আমি সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারব, নিজের উপর এই আস্থা নিয়েই শুরু করছি।

    পার্ল বাক

    আমি যখন বলি চীনের উপন্যাস, তখন আমি চীনের সম্পূর্ণ নিজস্ব উপাদান নির্ভর উপন্যাসগুলোকেই বোঝাই, সংকরগুলোকে নয়। এই সংকর উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে বিদেশী ধারায় প্রভাবিত চীনের আধুনিক লেখকদের আত্ম-বিস্মৃত উপন্যাসগুলো।

    উপন্যাস কখনই চীনে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়নি, চীনা উপন্যাসিকেরাও কখনো নিজেদের শিল্পী হিসেবে দেখেননি। চীনা উপন্যাস, এর ইতিহাস, পরিধি আর মানুষের হৃদয়ে এর অবস্থান, সবকিছুকেই বিবেচনা করতে হবে এই সত্যটির আলোকে। নিঃসন্দেহে এই সত্য আপনাদের কাছে অভিনব, পাশ্চাত্যের যে আধুনিক পণ্ডিতেরা উপন্যাসকে একটি উদার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন তাদের জন্য তো বটেই।

    চীনে সবসময়ই শিল্প আর উপন্যাস দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেখানে শিল্প হিসেবে সাহিত্য চর্চার ব্যাপারটি ছিল ক্ষমতাবান বিদ্বানদের একচ্ছত্র দখলে। তারা একে অপরের জন্য শিল্প সৃষ্টি করতো নিজস্ব নিয়মে এবং উপন্যাসের কোন জায়গা সেখানে ছিল না। কিছু সনাতন স্বেচ্ছাচারী আইন দিয়ে তারা দখল করে রেখেছিল দর্শন, ধর্ম আর সাহিত্যের সবকিছু, শিক্ষার সব উপকরণই ছিল তাদের একচ্ছত্র দখলে। ফলে লেখাপড়াও জানতো শুধু তারাই। এই ক্ষমতাবান বিদ্বানদের কোন কোন ক্ষেত্রে সম্রাট পর্যন্ত ভয় পেতেন আর একারণেই তাদের নিজেদের কাজে নিজেদের পাকবদ্ধ রাখবার একটি পথও তিনি বের করে ফেলেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জনের একমাত্র পথ হিসেবে কিছু ভয়াবহ কঠিন পরীক্ষার প্রবর্তন করেন। এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির কাজটি একজন মানুষের সমস্ত জীবন আর চিন্তা নিঃশেষ করবার জন্য যথেষ্ট ছিল। ফলে সে সময় চীনের এই পণ্ডিতদের দেখা গেল বর্তমান সময় আর তার গতি প্রকৃতি বুঝবার জন্য দিন রাত্রি নাক ডুবিয়ে মুখস্থ করছে সনাতন আর মৃত অতীত। আর সেই অতীত ঘেটেই তারা তৈয়ার করছে তাদের শিল্পের নিয়মগুলো যেখানে উপন্যাসের কোন জায়গা নেই। ফলে চোখের সামনে প্রাকৃতজনদের মাঝে উপন্যাসের জন্মটি এই বিদ্বানেরা দেখতে পেল না, সাহিত্যকে এক বায়বীয় শিল্প জ্ঞান করে তারা সব বসে রইল নির্জীব অতীতেই। মানুষদের প্রতি পণ্ডিতদের এই অবজ্ঞার প্রত্যুত্তরে মানুষের মাঝ থেকে এসেছে এই পণ্ডিতদের নিয়ে অসংখ্য রঙ্গ-কৌতুক, তার একটির উদাহারণ দেয়া যাক— একদিন জঙ্গলের পশুদের একটি দল শিকারে যাওয়ার আগে একটি পাহাড়ের পাদদেশে মিলিত হল। সেখানে সিদ্ধান্ত হল যে দিন শেষে যে যা শিকার পাবে তা নিয়ে এই স্থানটিতে এসে মিলিত হবে এবং শিকার সকলে মিলে ভাগ করে নেবে। দিন শেষে দেখা গেল একমাত্র বাঘই কোন শিকার ছাড়া ফিরে এসেছে। সবাই অবাক হয়ে তার কাছে কারণ জানতে চাইলে সে বিমর্ষভাবে জানাল “ভোর বেলায় আমি এক স্কুল বালকের দেখা পেয়েছিলাম কিন্তু মনে হল তার কচি মাংস তোমাদের মুখে ঠিক রুচবে না। দুপুর নাগাদ ঘোরাঘুরি করে দেখা পেলাম এক যাজকের, কিন্তু তাকেও আমি ছেড়ে দিলাম কারণ তোমরা তো জান বাতাস ছাড়া আর তাদের মধ্যে সারবস্তু কিছু থাকে না। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর সারাদিন আর কারো দেখা মেলেনি। যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে তখন দেখলাম এক বিদ্বান এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে। তাকে দেখে আমি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়লাম কারণ এই বিদ্বানদের শুকনো জিরজিরে হাড় চিবুতে গিয়ে আবারো নিজের দাঁতগুলো ভাঙ্গার কোন মানে হয় না”।

    আর্টওয়ার্ক: থ্রি হোয়াইট ওল্ডম্যান
    শিল্পী: হুয়াং ইউমিং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    বিদ্বানেরা শ্রেণী হিসেবে চীনের মানুষদের কাছে এরকমই হাস্যরসের পাত্র ছিল। তাদের লেখা উপন্যাসগুলোতে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে সর্বদা একই রূপে, যেমনটি এদের বাস্তব জীবনে দেখা যায়। একই বিষয়ের বারংবার চর্বণ এবং চর্চা এদের যেমন চেহারায় একরকম করে দিয়েছিল তেমনি এক রকম করে দিয়েছে চিন্তার ক্ষেত্রেও। পশ্চিমে এধরনের কিছু ব্যক্তি মানুষ দেখা গেলেও একটি বিশেষ সামাজিক শ্রেণী হিসেবে এদের পাওয়া যাবে না যেরকমটি চীনের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। এখানকার সব জায়গাতেই তাদের উপস্থিতি একই রকম— ক্ষীণ একটি শরীরের উপর বিশাল একটি মাথা, ঝুলে পড়া মুখ, মোটা চশমার আড়ালে ছোট সরল চোখ, উচুঁ কন্ঠস্বর যা দিয়ে অনর্গল শাস্ত্রকথা বের হচ্ছে যেগুলোর কোন আবেদন তার নিজের কাছে ছাড়া অন্যত্র নেই। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জায়গা ছাড়া এদের সাধারণত অন্য কোথায় দেখা যেত না, বেশিরভাগ সময়ই তারা কাটাত কিছু মৃত সাহিত্য পড়ে আর তার মতই কিছু লিখবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। অভিনব ও মৌলিক সব কিছুকেই তারা ঘৃণা করত কারণ এগুলো তাদের মুখস্থ ছকের কোনটির সাথেই মিলত না। আর না মিললেই তারা নিশ্চিতভাবে ধরে নিত এগুলো ভাল কিছু নয়। যখন তারা কোন কিছু দেখিয়ে বলত “এই হচ্ছে শিল্প” তখন তারা মনে করত এই বস্তুটি এখানে ছাড়া আর কোথাও নেই, তাদের স্বীকৃতি ছাড়া কোথাও কোন শিল্প থাকতে পারে না। আর যেহেতু তাদের এই ছকের সাথে কোন ভাবেই উপন্যাসকে মেলানো যায় না কাজেই তাদের সাহিত্যে উপন্যাস বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না।

    চীনের খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক ইয়াও হাই ১৭৭৬ সালে বিদ্যমান সাহিত্যিক প্রকরণগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করেন যার মধ্যে ছিল প্রবন্ধ, সরকারি নথিপত্র, জীবনী, সমাধিফলক, কবিতা, শোকগাঁথা এবং ইতিহাস। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই তালিকায় উপন্যাস অনুপস্থিত যদিও এই সময়ের আগেই চীনের উপন্যাস গণমানুষের মাঝে জন্ম নিয়ে, প্রাকৃত জীবনের রূপ-রসে পরিপুষ্ট হয়ে এক অনন্য মহিমায় উদ্ভাসিত। ইয়াও হাইয়ের আগে ১৭৭২ সালে প্রতাপশালী সম্রাট চাই এন লুং এর নির্দেশে আরেকটি সাহিত্য কোষ তৈরী করেন সেসময়ের আরেক খ্যাতিমান বিদ্বান সু কু চুয়েন সু। উপন্যাসের কোন উল্লেখ সেখানেও যথারীতি নেই।

    উপন্যাসকে বিদ্বানদের সাহিত্য জ্ঞান না করা চীনের উপন্যাস আর উপন্যাসিকদের জন্য আর্শীবাদই বয়ে এনেছিল। এর ফলে উপন্যাস সবসময় তাদের সাহিত্য দর্শন, সমালোচনা, চাপিয়ে দেয়া শিল্প সংজ্ঞা, প্রকাশের প্রথাগত ভঙ্গিমা ও কৌশল, কোনটি শিল্প আর কোনটি নয় এই কূটতর্ক ইত্যাকার বেড়াজালের বাইরে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে থাকল নিজ চারণ ক্ষেত্র প্রাকৃতজনদের নিয়ে। এই উপন্যাস পরিপুষ্ট হতে থাকল নিজ মাটির সোঁদা গন্ধে, সাধারণ মানুষের প্রাকৃত জীবনে, তাঁদের জীবনের অন্তর্গত আলোকচ্ছটায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তার মাঝে। রক্ষা পেল পণ্ডিতদের শিল্প চর্চার হিম-কুহেলিকার হাত থেকে। প্রসঙ্গত মনে পড়ে যায় আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন একবার লিখেছিলেন “প্রকৃতি এক রহস্যের আধার, আর শিল্প হচ্ছে সেই আধার যা রহস্যময় হতে চায়”। তিনি লিখেছিলেন,

    “প্রকৃতি হল তাই যা আমরা দেখতে পাই
    প্রকৃতি হল তাই যা আমরা শুনতে পাই
    হায়! আমাদের প্রকাশের কোন শিল্প নেই
    তার সারল্যের সামনে এতই তুচ্ছ
    আমাদের অভিজ্ঞান।”

    চীনের সাহিত্য পণ্ডিতেরা যদি উপন্যাসের এই জন্ম আখ্যান জানতেন আরও বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন একে সাহিত্য হিসেবে চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মাঝে মাঝে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তরুণ সম্রাটদের কেউ কেউ উপন্যাস পড়ে আনন্দ পাওয়ায় এটি আর হল না, রাজ আগ্রহের চাপে পড়ে তাদের কখনও কখনও চোখ মেলে তাকাতে হল অন্ত্যজদের এই সৃষ্টিগুলোর দিকে। একারণেই বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন উপন্যাসের প্রশ্নে এবার পণ্ডিতেরা একেবারে খড়গহস্ত হয়ে উঠলেন এবং নিজেদের প্রথম খড়গ হিসেবে আমদানি করলেন একটি প্রত্যয় “সামাজিক তাৎপর্য”। লম্বা লম্বা প্রবন্ধ লিখে তারা জানালেন  উপন্যাস শিল্প নয় কারণ এর কোন সামাজিক তাৎপর্য নেই। আধুনিক কালের সাহিত্য পাড়ার মানুষেরা সামাজিক তাৎপর্য কথাটি সম্প্রতি শিখলেও চীনের পণ্ডিতেরা এটির ব্যবহার করে আসছেন এক হাজার বছর আগে থেকেই। আজকের আধুনিকদের মতই তারা সেসময় বলেছেন উপন্যাসকে শিল্প হয়ে উঠতে হলে আগে তাকে যেটি অর্জন করতে হবে তা হল সামাজিক তাৎপর্য।

    এই যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রাচীন চীনের এই বিদ্বানেরা উপন্যাস সম্পর্কে যে উপসংহারে পৌঁছুলেন সেটি হচ্ছে:

    সাহিত্য হচ্ছে শিল্প
    সব শিল্পেরই সামাজিক তাৎপর্য আছে
    এই বইগুলোর কোন সামাজিক তাৎপর্য নেই
    কাজেই এগুলো সাহিত্য হতে পারে না

    এভাবেই উপন্যাস চীনে সাহিত্য হয়ে উঠেনি দীর্ঘদিন।

    এরকম একটি ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছি আমি নিজেও। আমিও বিশ্বাস করতাম প্রকৃত সাহিত্যের সাথে উপন্যাসের কোন যোগ নেই। বিদ্বানেরা এই রকমটিই শিখিয়েছিলেন আমাদের। আমাকে আরো শিখানো হয়েছিল সাহিত্যে নান্দনিকতা যুক্ত করতে পারেন শুধুমাত্র বিদগ্ধ মানুষেরাই। জীবনের গভীরতর উৎস থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝর্ণাধারার মতো প্রতিভাগুলোকে ঠেকিয়ে রাখতেই যেন বিদ্বানদের মস্তিষ্ক এইসব আইন-কানুনের জন্ম দিত। প্রতিভা, তা সে যে মাপেরই হোক না কেন, তার ভূমিকা সবসময় স্রোতস্বিনীর মত, অন্যদিকে শিল্প, আধুনিক বা ধ্রুপদী যাই হোক না কেন, তার ভূমিকা ক্ষুধিত অবয়বের যার উপর স্রোতস্বিনীর জল নেমে আসে অঝোর ধারায়। চীনের উপন্যাসও সেই স্রোতস্বিনী নদীর মতই যার নেমে আসাকে স্বাগত জানায় প্রকৃতির পাথর আর বৃক্ষেরা, প্রাকৃত মানুষেরা তার জল পানে শীতল হয়, ছায়া আর বিশ্রাম পায় তার আশ্রয়ে।

    চীনে তাই উপন্যাস মাত্রই ছিল সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে উঠে আসা এক অদ্ভুত সৃষ্টি, এ ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। এই উপন্যাসের ভাষাও ছিল তাদের নিজস্ব রীতির, সাহিত্য বা পণ্ডিতদের ভাষা ওয়েন লি নয়। সনাতন এই ওয়েন লি ভাষাটি হচ্ছে আজকের ইংরেজদের জন্য যেমন চসারের ধ্রুপদী ইংরেজি তেমনি এক ভাষা যদিও প্রহসন হচ্ছে এই যে ওয়েন লিও একসময় প্রাকৃত ভাষা হিসেবেই চালু ছিল। কিন্তু পণ্ডিতেরা এ ভাষা গ্রহণ করবার পর আর প্রাকৃত ভাষার প্রাণময় গতি প্রবাহের সাথে কোন যোগ রক্ষা করেননি। একটা প্রাকৃত ভাষাকে সাহিত্যের সাঁড়াশিতে চেপে তারা বসে রইলেন, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের ভাষা নিজস্ব প্রাণময়তার জোরে তাদের ছাড়িয়ে গেল বহু যোজন দুরে। কাজেই চীনা উপন্যাস হয়ে দাঁড়াল পেই হুয়া বা সাধারণ মানুষের সরল কথকতা। সহজ পাঠ্য এই উপন্যাসগুলোর সহজ গতিময়তা দেখে পণ্ডিতেরা মুখ বাঁকিয়ে বললেন, ওতে প্রকাশের কোন কারুকাজ নেই।

    ডানহাঙের গুহাচিত্র

    মুখ বাঁকানো এইসব পণ্ডিতদের বিপরীতে আমি এখন বলতে চাই কিছু ব্যতিক্রমী বিদ্বানদের কথা যারা ভারতবর্ষ থেকে মহান বুদ্ধের বাণী বয়ে এনেছিলেন চীনে। পশ্চিমে দীর্ঘদিন পিউরিটানিজম ছিল উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শত্রু। সে তুলনায় প্রাচ্যের বুদ্ধ অনুসারীরা ছিলেন অনেক বেশি প্রজ্ঞাবান। ঐতিহাসিক কাল বিচারে চীনের ষষ্ঠ রাজবংশের সময়ে তারা চীনে এসে দেখলেন সাহিত্য এখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বহু দুরে আটকে আছে প্রথাবাদিতার বেড়াজালে। চীনের সনাতন সাহিত্যিকেরা তখন নিজেদের রচনাগুলোকে ঘষে মেজে আরো বেশি রীতিসিদ্ধ করে তুলবার কাজে ব্যতিব্যস্ত, যে কোন সৃজনশীল প্রয়াসকে অসাহিত্য আখ্যা দিয়ে খারিজ করে রক্ষা করছেন সাহিত্যের সতীত্ব। এরকম একটি শুচিবাদী সময়েই হৃদয়ে অহিংসার বাণী নিয়ে এগিয়ে এলেন বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা যাদের অনেকেই এসেছেন ভারত থেকে, কেউ কেউ চীনেরই মানুষ। তারা সনাতন শুদ্ধবাদীদের খোলাখুলি জানালেন প্রচলিত সাহিত্যের নিয়ম কানুন ভাঙ্গা তাদের উদ্দেশ্য নয়, তারা শুধু নিজেদের আত্মিক অর্জনটুকু খুব সাধারণ ভাষায় গণমানুষের সামনে তুলে ধরতে চান। ধর্ম প্রচারের জন্য তারা বেছে নিলেন সাধারণ ভাষা, যে ভাষায় লেখা হয় উপন্যাস। অন্যদিকে গল্পের প্রতি এই মানুষদের অমোঘ আকর্ষণ লক্ষ্য করে বাণী প্রচারের জন্য তারা গল্পের আদলটিকেই বেছে নিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে চীনে সবচেয়ে বেশি খ্যাত বই ফাহ সু চিং এর ভূমিকায় লেখা আছে “যখন আমরা ঈশ্বরের কথা বলি, সবচেয়ে সহজ শব্দগুলি বেছে নিই বাহক হিসেবে”। এই কথাটিকেই আমরা চীনা উপন্যাসিকদের মৌল নীতি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি যাদের কাছে ঈশ্বর মাত্রই মানুষ আর সব মানুষেরাই ঈশ্বর।

    চীনের উপন্যাসগুলো লেখা হতো প্রথমত গণমানুষের বিনোদনের জন্য। এখানে বিনোদন বলতে আমি শুধুমাত্র হাস্যরসের কথা বলছি না যদিও চীনের উপন্যাসগুলোতে এ জিনিসেরও সাক্ষাৎ মেলে অজস্র পরিমাণে। আমি বিনোদন বলছি এই অর্থে যে তা মানুষের সামগ্রিক মনযোগ আকর্ষণ করতে পারত। এই বিনোদন তাদের কাছে জীবনের ছবি তুলে ধরে আমন্ত্রণ জানাত তার অর্থ অনুসন্ধানে। নিজেদের জীবনেরই সহজ সরল প্রকাশের মধ্য দিয়ে তারা শিল্পের দুর্বোধ্য নিয়মের বাইরে এসে আলোকময় প্রাণ সঞ্চার ঘটাত হৃদয়ে। বৌদ্ধরাও এই সব মানুষদের ঈশ্বরের সন্ধান জানাতে এসে দেখল এই মানুষেরা নিজেদের আটপৌরে জীবনেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে ভালবাসে।

    কিন্তু তারপরও চীনের উপন্যাস প্রাকৃত ভাষায় লেখা হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে যাদের জন্য এই উপন্যাস লেখা তাদের বেশির ভাগেরই কোন অক্ষর জ্ঞান না থাকা। কথ্য ভাষায় লেখা এই উপন্যাসগুলো কেউ একজন পড়ে শোনালেই সবাই তা বুঝতে পারত সহজেই। দেখা যেত যে প্রায় দুই শত মানুষের কোন গ্রামে একজন মাত্র মানুষ আছে যে পড়তে পারে। ছুটির দিনগুলোতে বা সন্ধ্যার অবসরে পিদিমের আলোয় তাকে ঘিরে বসত অসংখ্য মানুষ আর সে পড়ে শোনাতো উপন্যাস। কখনো কখনো একজনের টুপিতে সবাই সাধ্য অনুযায়ী পয়সা ফেলত পাঠকের জন্য যাতে এই মোহনীয় কাহিনীগুলো নিরন্তর পড়ে যায় পাঠক। একসময় দেখা যেত শুধু এই গল্প পড়ে শোনানই কারো কারো পেশা হয়ে যেত। এই গল্প পাঠকদের আবার শ্রোতা ধরে রাখবার প্রয়োজনেই নিত্য নতুন গল্পের দরকার পড়ত। কিন্তু তখনও এত বেশি সংখ্যক গল্প লেখা হয়ে উঠেনি। কাজেই এই পেশাদার গল্প পাঠকদেরই একসময় দায়িত্ব নিতে হলো নতুন গল্প জন্ম দেওয়ার। গল্পের উপাদান হিসেবে তারা বেছে নিল পণ্ডিতদের লেখা ইতিহাসকেই কিন্তু তার সাথে যোগ হলো নিজেদের উর্বর কল্পনা শক্তি। এই অশিক্ষিত গল্পকারদের হাতেই সাহিত্যের শুকনো নদী যেন প্রাণ ফিরে পেল। ইতিহাসের মৃত চরিত্রগুলোকে কল্পনার রক্তে মাংশে সাজিয়ে তারা হাজির করল সাধারণ মানুষের সামনে। ইতিহাস ছাড়াও তাদের গল্পে স্থান পেল নিজেদের প্রতিবেশীদের অভিনব অভিজ্ঞতাগুলো। কিন্তু সবসময়ই এইসব গল্প লেখা হয়েছে শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে। এভাবেই এক সরল প্রক্রিয়ায় উত্থান ঘটেছে চীনা উপন্যাসের।

    আবার আমি যখন বলছি গল্প, তখন আমি কোন লক্ষ্যহীন খসড়া কর্মকাণ্ডের কথা বলছি না। চীনারা এক্ষেত্রে অনেক বেশি পরিপক্ক। তারা গল্প লিখবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এর চরিত্রগুলোকে। শুই হু চুয়ান, যাকে চীনারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ তিনটি উপন্যাসের একটি বলে মনে করে, তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণও বিদ্যুৎ বা অগ্নিময় কর্মকাণ্ড নয় বরং এর মধ্যে অঙ্কিত একশত আটটি চরিত্র যাদের প্রত্যেককে উপন্যাসটিতে হাজির করা হয়েছে স্বতন্ত্র মহিমায়। এই স্বাতন্ত্র্যের মাত্রা এরকম যে আমি অনেককে বলতে শুনেছি এই একশত আটটি চরিত্রের যে কোনটি কথা বলতে শুরু করলেই আমরা বুঝে যাই সেটি কে, আমাদের নাম বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, চরিত্রের কথা বলার ধরন দেখেই অবলীলায় বলে দেওয়া যায় সেটি কে। চরিত্রসমূহের এই বিশাল বিস্তৃত ছিল উপন্যাসের কাছে চীনের মানুষের প্রথম চাহিদা আর এরপরের বিবেচ্য বিষয়- প্রতিটি চরিত্র দাঁড়াবে নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, উপন্যাসিকের বর্ণনায় নয়।

    আর্টওয়ার্ক: ব্যাংক অ্যালোং দ্য ইয়োলো রিভার
    শিল্পী: ফাং ঝাউলিং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এভাবে যখন চীনের গ্রামে-গঞ্জে, চায়ের দোকানে, জনজীবনের সরু অলিগলিতে নিজেদের মাঝ থেকে প্রায় অশিক্ষিত কাউকে ঘিরে উপন্যাসের বিনম্র উত্থান ঘটছে, কৌতুহলের বিষয় হচ্ছে তখন চীনের রাজকীয় প্রাসাদগুলোতেও উপন্যাস জন্ম নিচ্ছে প্রায় একই প্রক্রিয়ায়। চীনের সম্রাটদের একটি প্রথা ছিল, বিশেষত বিদেশি রাজবংশগুলোর মধ্যে যে সম্রাটের বেতনভোগী কিছু লোক রাখা হতো যাদের বলা হতো “সম্রাটের কান”। এই রাজকীয় কানদের কাজ ছিল ছদ্মবেশে রাজ্যের আনাচে কানাচে ঘুরে সবার কথা শোনা এবং তা সম্রাটকে অবহিত করা। এই প্রথার আসল উদ্দেশ্য ছিল নিঃসন্দেহে সম্রাট সম্পর্কে প্রজাদের মনোভাব জানা এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহ সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখা।

    কিন্তু সম্রাটদের মাঝেও মানব সত্তা কাজ করত এবং এদের বেশির ভাগই শিক্ষিত বা পণ্ডিত ছিলেন না। রাজকীয় কানদের সুযোগ ছিল চীনের প্রাকৃত জীবনের এই সব আশ্চর্য কথকতা শুনবার এবং একসময় তারা আবিস্কার করলো তাদের প্রভূ সম্রাটেরা বিদ্রোহের খবরের চেয়ে এই সব গল্পই শুনতে বেশি পছন্দ করে। ফলে তাদের অনেকেই সম্রাটের সন্তুষ্টি লাভের আশায় আরো বেশি করে এই সব গল্প প্রতিদিন ফিরে এসে শোনাতে লাগল এবং অনেক ক্ষেত্রেই কিছুটা নিজস্ব কল্পনার রঙ মিশিয়ে। কেউ কেউ সম্রাটকে শোনানোর জন্য লিখেও রাখা শুরু করল পাছে এত সুন্দর গল্পগুলো ভুলে যায়। এই রাজকীয় কানদের আরো একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে তারা শুধু প্রজাদের কথা সম্রাটকে জানাতো না, সেই সাথে সম্রাটের অনেক কথাও প্রজাদের জানাত, বিশেষত তিনি কি বলতেন বা করতেন, তাকে সন্তান দানে অক্ষম বেগমের সাথে তিনি কিভাবে ঝগড়া করতেন, কিভাবে সেই বেগম সম্রাটের মন্ত্রণাদাতাদের সাথে ষড়যন্ত্র করে সম্রাটের অপর বেগমকে বিষপান করিয়েছেন ইত্যাদি। সম্রাট সম্পর্কে এই সব গল্প প্রজাদের আনন্দ দিত, তারা ভাবতে পারত স্বর্গপুত্র হওয়া সত্ত্বেও সম্রাটেরও একজন সাধারণ মানুষের মতই জীবনের আটপৌরে ঝামেলাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। আর এভাবেই উপন্যাস সৃষ্টির আরেকটি উৎস বিকশিত হল চীনে যদিও এর অস্তিত্ব তবু কোন স্বীকৃতি পেল না বিদ্বানদের কাছ থেকে।

    তবু এই নিদারুণ তাচ্ছিল্যের মাঝেও এক বিক্ষিপ্ত বিনম্র সুচনায়, চীনের উপন্যাস প্রাকৃত ভাষার নদীতে পাল উড়িয়ে নিজ শরীরে ক্রমাগত গেঁথে নিতে থাকল জনজীবনের উঁচু নিচু সব স্তরের মিথ আর কিংবদন্তী, ভালবাসা আর প্রতারণা, সংঘাত আর সম্মিলনের গল্প।

    পশ্চিমের মত চীনা উপন্যাসের ধারা অল্প কজন উপন্যাসিকের হাতে গড়ে উঠেনি। এখানে সবসময়ই উপন্যাসিকের চেয়ে উপন্যাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চীনে কখনোই কোন ড্যানিয়েল ডিফো জন্ম নেননি, এখানে আমরা ফিল্ডিং, স্মলেট, ডিকেন্স, অস্টিন, থ্যাকারে, ব্রন্টি, মেরেডিথ, হারডি, ফ্লবার্ট বা বালজাকের মত উপন্যাসিকের প্রবল উপস্থিতি কখনই খুঁজে পাই না। কিন্তু চীনে আমরা যে উপন্যাসগুলো দেখতে পাই তা সর্বার্থেই পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের চেয়ে সমৃদ্ধ যেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বোদ্ধাদের বিস্মিত মনে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক যে এই সব উপন্যাসের লেখক কারা?

    আজকে কয়েক শতক পরে এসে চীনের আধুনিক সাহিত্য বোদ্ধারা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে গত বছর পঁচিশেক ধরে চীনের সাহিত্য সমালোচকেরা নিজেদের এই অবহেলিত উপন্যাসগুলোই খুঁজে পেতে পড়ছে। কিন্তু তারপরও বেশির ভাগের ক্ষেত্রে লেখকের পরিচয় শেষ পর্যন্ত একটি অমিমাংসিত বিষয় হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বহুল পঠিত উপন্যাসগুলোর একটি শুই হু চুয়ান কার বা কাদের লেখা, কোথায় তার জন্ম, কোন সময়কালে এটি লেখা ইত্যাদি জানবার জন্যেই এখন গবেষকদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এদের পরিচয় যাই হয়ে থাকুক এটি নিশ্চিত যে তাদের কেউই আর বেঁচে নেই। ইতিহাসের কোন একসময় বেঁচে থাকা এই মানুষেরা নিজেদের জীবনে যা দেখেছে এবং শুনেছে তাই লিখে রেখে গেছে এই উপন্যাসগুলোতে। এরকমই একটি উপন্যাস রেড চেম্বারের ভূমিকায় অজানা লেখক লিখে গিয়েছিলেন “হান বা তুং এর সময় নয়, আমার নিজের সময়ের গল্প বলাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি”।

    কাজেই এই উপন্যাসিকেরা নিজেদের সময়ের গল্পই বলেছেন তাদের উপন্যাসে, বেঁচে থেকেছেন অন্ধকার আশীর্বাদে। নিজেদের উপন্যাসের কোন পর্যালোচনা তাদের কখনও পড়তে হয়নি,পুরস্কার বা তিরস্কারের ধার ধারতে হয়নি কোন প্রথাজীবী প্রতিষ্ঠানের। বিদ্বানদের মত কোন পাতলা বাতাসে শ্বাস নিতে হয়নি তাদের, মুখাপেক্ষি হতে হয়নি কোন পণ্ডিতের স্বীকৃতির। নিজের লিখবার সামর্থ্য নিঙড়ে তারা সাহিত্য রচনার তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ভাল-খারাপ যাই লিখুন প্রত্যেকে মারা গেছেন এই তৃপ্তিটুকু সাথে নিয়ে এবং আজকে চীনের সমস্ত পণ্ডিতদের সম্মিলিত স্বীকৃতিও তাদের কাউকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে না। তারা আজ কোন সাহিত্যিক ময়নাতদন্তেরও উর্দ্ধে। কিন্তু তারপরও তাদের সৃষ্টি বেঁচে থাকবে চীনের গণমানুষের মুখে মুখে, নিরক্ষরদের প্রাকৃত জবানে।

    সুই হু চুয়ানের একটি অধুনাতর সংস্করণের ভূমিকায় উপন্যাসটির অজ্ঞাত সংখ্যক লেখকের অন্যতম একজন শিহ নাই এন লিখেছেন- “এই বইটি লিখবার সময় আমার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার লোকেরা যেন এটি সহজে বুঝতে পারে। সৎ বা শয়তান, শিক্ষিত বা মুর্খ যাই হোক না কেন সবাই যেন এটি পড়তে পারে। আমার গল্পের মান কি হল এটা মোটেও আমাকে ভাবায় না। হায়! আমি যে জন্মেছি একদিন মরে যাব বলে। আমি কি করে জানব আমার পরের মানুষেরা এটি পড়ে কি চিন্তা করবে? আমি নিজেও আরেক জন্মে ফিরে এসে এটি পড়ে কি চিন্তা করব? হয়তো সে জন্মে আমি পড়তেও জানব না। তবে কি হবে আজ এত কথা ভেবে?”

    আশ্চর্যের বিষয় বিদ্বানদের অনেকে এক সময় এই একই দৈন্যতায় মুক্তির স্বাদ পেতে চাইলেন। এদের কারো কারো হৃদয়ে ছিল একান্ত গোপন কষ্টের বোঝা, যা কাউকে বলবার নয়। কেউ কেউ নিজেদের তৈরি জগদ্দল শিল্প কাঠামোর কাছ থেকে মুক্তি চাইছিলেন। তারাও দৈন্যতার এই সুরকে বেছে নিলেন উপন্যাস লিখবার জন্য। বিনম্র নামের এই উপন্যাসগুলোও নিজস্ব সহজ সরল কথকতা নিয়ে স্বতন্ত্র রুপে দাঁড়াল পাঠকের  সামনে।

    এই উপন্যাসিকেরা বিশ্বাস করতেন লিখবার ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি সচেতন হওয়ার কোন দরকার নেই। উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দাবিই তার লেখার পদ্ধতি তৈরি করে দেবে। একজন উপন্যাসিক যখন একটি সুনির্দিষ্ট ঢংয়ের জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেন, একজন উপন্যাসিকের পরিবর্তে তখন তিনি হয়ে যান একজন সাহিত্যওয়ালা।

    অন্তত, চীন আমাকে যা শিখিয়েছে সে হিসেবে, একজন ভাল উপন্যাসিক হবেন অকৃত্রিম, নমনীয় এবং তার মাধ্যমে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর প্রতি নিবেদিত, সম্পূর্ণ তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তার দায়িত্ব নিজের মধ্যে বহতা জীবনকে ফুটিয়ে তোলা, স্থান আর কালের বহুধা বিভাজনে জীবনের অনিবার্য, অন্তর্লীন আঙ্গিক আর ছন্দ আবিস্কার করা। এই উপন্যাসিকদের বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে আমরা কখনই বুঝতে পারব না এটি কার লেখা। একজন লেখকের লেখার ধাঁচ যখন নির্দিষ্ট হয়ে যায়, এই নির্দিষ্টতা কারাগার হয়ে তাকে বেঁধে রাখে। বৈচিত্র আর সৃজনশীলতার পথ ছেড়ে চীনের উপন্যাসিকেরা তাই কখনই সে পথে পা বাড়াননি।

    পশ্চিমের স্কেলে মাপলে চীনের উপন্যাসের অবশ্যই হাজারো খুঁত বের করা সম্ভব। এগুলোতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট প্লট নেই, বাস্তব জীবনের মতই তাদের কোন বাঁধা ছক নেই। প্রায়শই এগুলো অতি দীর্ঘ, হাজারো ঘটনায় ঠাসা, হাজারো চরিত্রে পরিপূর্ণ। বিষয় বস্তুতে এরা বাস্তব আর কল্পনার,পদ্ধতিতে রোমান্টিকতা আর বাস্তবতার সংমিশ্রণ। ফলে যাদু বা স্বপ্ন হিসেবে এখানে যে অসম্ভব ঘটনাগুলো নিয়ে আসা হয় বর্ণনার কারুকার্যের জোরে সব যুক্তির বাইরে গিয়ে পাঠক সেগুলোও অবলীলায় বিশ্বাস করে ফেলেন। এর মধ্যে প্রথম দিকের উপন্যাসগুলো লোকগাঁথায় ভরপুর যেমনটি ছিল সেকালের মানুষের চিন্তা আর কল্পনার জগত। এই উপন্যাসগুলো না পড়ে আজকের দিনেও কারো পক্ষে চীনের মনোজগত বোঝা সম্ভব নয় কারণ এই মনোজগতও এই উপন্যাসগুলোরই নির্মাণ। এই লোকগাঁথা আজও চীনের রাজন্যবর্গ আর পশ্চিমে প্রশিক্ষিত বিদ্বানদের বিরুদ্ধ প্রচারের মুখে টিকে আছে। চীনের এই মনোজগতের তুলনা মেলে জর্জ রাসেলের বর্ণিত আইরিশ মনোজগতের সাথে- “এই মনগুলো লোকজ কল্পনায় সবকিছুই বিশ্বাস করে নিতে অভ্যস্ত। সেখানে অবলীলায় রূপার থাম দিয়ে সোনার জাহাজ তৈরি হয়, সমুদ্র ভেদ করে জেগে উঠে শহর। এই সুবিশাল লোকজ মন যখন রাজনীতির দিকে চোখ ফেরায় তখন সে সবকিছুই বিশ্বাস করতে প্রস্তুত।”

    আর্টওয়ার্ক: ইয়াং লিন
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    চীনের এই লোকজ মনই হাজার বছর ধরে মানব জীবন ঘেটে জন্ম দিয়েছে চীনের উপন্যাসের। প্রতিটি উপন্যাস এখানে বেড়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমি আগেই বলেছি এই উপন্যাসগুলোর কোনটিই একক কোন লেখকের সৃষ্টি নয়, কারণ এর কোনটিই সেভাবে কখনো হাতে লেখা হয়নি। একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অসংখ্য মানুষের কল্পনা শক্তি মিলিয়ে একটি উপন্যাসের কাঠামো গড়ে উঠে। একটি সুপরিচিত গল্পেরই উদাহারণ দেয়া যাক- শাদা সাপ বা পেই শে চুয়ান গল্পটি প্রথম লেখা হয়েছিল সম্রাট তং এর রাজত্বকালে, লেখকের নাম অজ্ঞাত। এটা তখন ছিল সাদা মাটা একটি অতি প্রাকৃত ঘটনার গল্প যার নায়ক একটি শাদা সাপ। একই গল্পের পরবর্তী শতাব্দীর সংস্করণে দেখা যায় নায়ক শাদা সাপ এক মহিলা ভ্যাম্পায়ারের রূপ ধরেছে এবং অশুভ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে। তৃতীয় সংস্করণে আবার এই মহিলা ভ্যাম্পায়ারকে আবার শুভ শক্তির প্রতিরুপ হিসেবে পাওয়া যায় যে এক বিশ্বস্ত স্ত্রী হিসেবে নিজের স্বামীকে একটি সন্তান উপহার দেয়। এভাবেই প্রতিটি ধাপে নতুন চরিত্র যোগ হয়ে একটি অতিপ্রাকৃত গল্প হিসেবে শুরু হওয়া একটি গল্প শেষ হয় মানবিক পরিণতি পেয়ে।

    কাজেই চীনের ইতিহাসের উষালগ্নের এই সৃষ্টিগুলোকে আমাদের উপন্যাসের চেয়ে উপন্যাসের আকর বলে বিবেচনা করাটাই সমীচিন যে রকম আকর দুহাতে ছেনে শেক্সপিয়ার তার ক্লাসিকগুলো লিখেছেন। এই বইগুলোর অনেকগুলোই এখন হারিয়ে গেছে অধিকারী মানুষদের মর্ম-জ্ঞানহীনতার কারণে। তারপরও রয়ে গেছে হ্যানের গল্পের মত অসংখ্য গল্প যে কাহিনীগুলোর উপস্থাপনে রয়েছে তেজী ঘোড়ার স্বতস্ফূর্ততা, রয়েছে রাজ-পরিবারের উত্থান-পতন নিয়ে অসংখ্য গল্প। মিং রাজ বংশের রাজত্বকালে এগুলোর বেশির ভাগই ধর্ম বা সংস্কারের গল্প হিসেবে, স্বপ্ন আর অলৌকিকতার গল্প হিসেবে, কর্মফলের গল্প হিসেবে, ড্রাগন, ঈশ্বর বা পুরোহিতের গল্প হিসেবে, বাঘ বা শেয়ালের, মৃত্যুর পরের জীবন বা পূনর্জন্মের গল্প হিসেবে কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ হয়। বৌদ্ধ দর্শনের ধারায় প্রভাবিত প্রথম দিকের এই গল্পগুলোর বেশির ভাগই অতিপ্রাকৃত কাহিনী নিয়ে যার কোনটিতে নায়ক কুমারী মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া দেবতারা, কোন কোনটিতে মানুষের বেশে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো দেবতারা। সবগুলো কাহিনী চমকপ্রদ অলৌকিকতায় ভরপুর। কোথাও কোথাও বিদ্বানের কলম নিমিষেই ফুল হয়ে যায়, কোথাও এক নারী ও পুরুষ স্বপ্ন নির্দেশিত পথ ধরে হাজির হয়ে যায় গালিভারদের দেশে, কোথাও বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় লোহার খণ্ডও অনায়াসে ভেসে থাকে পানিতে। কিন্তু এই অলৌকিকতা স্বত্ত্বেও প্রতিটি গল্প সাফল্যের সাথে প্রতিফলিত করেছে কোন না কোন যুগকে। হ্যানের স্বতস্ফূর্ত গল্পগুলোর উপজীব্য ছিল প্রচ্ছন্ন জাতীয়তাবাদ যা সবসময়ই কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র বা মহানায়কের বন্দনা করেছে। চীনের সুবর্ণ যুগের এই উপন্যাসগুলোর আরেকটি সমৃদ্ধ দিক হচ্ছে এদের রসবোধ যার একটি অনন্য উদাহারণ হ্যান তং সুয়ানের সংগৃহিত গল্প সংকলন সিও লিং। কিন্তু এই সুবর্ণ যুগ নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে এই গল্পগুলো মানুষ ভুলে না গেলেও নতুনগুলোতে আর এই রসবোধ খুঁজে পাওয়া গেল না। পরের জরাজীর্ণ শতাব্দীগুলোতে এজন্য চীনের অনেক মানুষই নিজেদের হ্যানের পুত্র হিসেবে পরিচয় দিতে ভালবাসত। তারা বলতো “এই ষষ্ঠ রাজ বংশের সময় তারা শুধু ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লিখেছে যেমন,নারী,জলপ্রপাত বা পাখি ইত্যাদি”।

    হ্যান রাজবংশের সময়কালকে আমরা এই সুবর্ণ যুগ বিবেচনা করলে পরবর্তী তং রাজবংশের সময়টি ছিল রৌপ্য যুগ আর এই রৌপ্য যুগ উপন্যাসের ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল প্রেমের যুগ। সম্রাটের হে বঞ্চিত সুন্দরী রাজকুমারী কুই ফেই এর প্রেম নিয়েই রয়েছে হাজারের উপরে গল্প। কাহিনীর বুননে, বিস্তারে তা পশ্চিমা উপন্যাসের মাপকাঠিতেও মাপা চলে অনায়াসে। একারণেই চীনারা এসময়ের উপন্যাসের মুল্যায়নে আরো যোগ করতো “তারপরেও আমাদের এই ছোট বিষয়গুলোই পড়তে হয় কারণ তা আজও অশ্রু নামায় আমাদের চোখে”।

    কাজেই এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে এই প্রেম কাহিনীগুলো সেই প্রেম নিয়ে কথা বলত না যা একমাত্র বিয়েতে পর্যবসিত হয়ে পরিণতি পায়। বরং বিবাহ প্রথার বাইরের প্রেম নিয়েই এদের কাহিনী বিন্যাস। কোন কোনটির ক্ষেত্রে বিয়ে কাহিনীর ঈপ্সিত পরিণতি হয়ে গেলে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তা ট্রাজেডিতে গড়াতো। এর মধ্যে দুটি বিখ্যাত গল্প পেই লি শি এবং চিয়াও ফ্যাং চি- তে দেখা যায় পরকীয়া প্রেমের কাহিনী যেখানে কার্তেজান রমনীদের গুণকীর্তন করা হয়েছে। তারা লেখাপড়া জানা, অনিন্দ্য সুন্দরী, বুদ্ধিমতি এবং সুগায়িকা। অন্যদিকে সাধারণ স্ত্রীদের বলা হয়েছে “হলুদমুখি” স্বভাবতই তারা নিরক্ষরও।

    কিন্তু উপন্যাসের এই প্রথা বিরোধী অভিযাত্রা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তার জনপ্রিয়তা স্বভাবতই ভাবিয়ে তোলে চীনের সামাজিক কর্তৃত্বের কেন্দ্রগুলোকে। কেননা এই বিপ্লবাত্মক এবং বিপদজনক প্রবণতা চীনা সমাজের মৌলিক ভিত্তি পরিবার ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিচ্ছিল। এর বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতারও অভাব ছিল না। উদাহারণ হিসেবে আসতে পারে হুই চেন চি’র একটি গল্পের কথা যেখানে কাহিনীর নায়ক এক তরুণ পণ্ডিতকে নিজের সুন্দরী প্রেয়সী ইং ইং’কে বলতে শোনা যায় “অনন্যা নারীরা সবসময়ই বিপজ্জনক যারা নিজের সাথে অন্যদেরও ধ্বংস ডেকে আনে। এমনকি অনেক সম্রাটকেও তারা ধ্বংস করেছে এবং যেহেতু আমি কোন সম্রাট নই, সযতনে তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলতে চাই”। এবং আরো অনেক মহাজ্ঞানী মহাজনের পথ ধরে চ্যাং নামের এই তরুণ বিদ্বানও তাই করে। তার কথার উত্তরে সুন্দরী ইং ইং জানায় “আমাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার তোমার সবসময়ই আছে এবং আমি তোমাকে পিছু ডাকব না”। কিন্তু এই উপন্যাস প্রথম লেখা হওয়ার পাঁচশত বছর পরে তাদের প্রেমের সহায়তায় এগিয়ে আসে চীনের উপন্যাসপ্রিয় মানুষদের প্রেমিক হৃদয়। যে কারণে একই কাহিনীর এই সময়ের সংস্করণে আমরা ইং ইং এবং চ্যাং’কে দেখতে পাই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। উপন্যাসের নতুন পাদটিকায় বলা হয় “আমরা প্রার্থনা করি জগতের তাবৎ প্রেম যেন মিলিত হয় সুখী দাম্পত্য জীবনে”। চীনে সময়ের যে গতিধারা তাতে একটি সুখময় পরিসমাপ্তির জন্য পাঁচশত বছরের প্রতীক্ষা একেবারেই মামুলি ব্যাপার।

    কথা প্রসঙ্গে বলা যায় এই উপন্যাসটি চীনের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর একটি। সুং রাজত্বের সময় এটি কাব্য রূপে আবার লেখেন চাও তে লিয়াং, অবসন্ন প্রজাপতি নামে। ইয়ুয়ান রাজ বংশের রাজত্বকালে এটি পুনরায় গীতিনাট্যের আঙ্গিকে লেখেন চাই উয়েন, শুহ সি জিয়াং নামে। মিংদের রাজত্বকালে আমরা পাশাপাশি এর আরেকটি সংস্করণ দেখতে পাই- লি রেহ হুয়ার দক্ষিণের ছন্দময় ঢং তজি ’র আঙ্গিকে লেখা নান সি জিয়াং চি নামে যেটি আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমনকি আজকের চীনের শিশুদের কাছেও চ্যাং সেন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র।

    তং যুগের রোমান্সের প্রতি আমি বেশি জোর দিচ্ছি কারণ নর-নারীর প্রেমই চীনের উপন্যাসের ক্ষেত্রে এযুগের সবচেয়ে বড় অবদান। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এযুগে অন্য কোন উপন্যাস লেখা হয়নি। এসময়ে আমরা অসংখ্য রসবোধ সম্পন্ন ব্যাঙ্গাত্মক উপন্যাস পেয়েছি। এর বেশির ভাগই সেময়ের রাজদরবারের নানা কৌতুককর ঘটনা নিয়ে লেখা। এগুলোর মধ্যে সেরা একটি গল্প চেন হুং’এর লেখা তুং চেং লাও ফু চুয়ান’এ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চরিত্র হিসেবে চিয়া চ্যাং নামে এক মোরগযোদ্ধাকে দেখতে পাই যে নিজের কৌতুককর কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে সম্রাটেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে।

    এভাবেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সুং রাজত্বকালে এসে চীনের উপন্যাস একটি সুস্পষ্ট অবয়ব পায়। ইউয়ান রাজত্বের সময় এসে তা পৌঁছে যায় বিকাশের সর্বোচ্চ শিখরে যার কাছাকাছি পরবর্তী যুগের কোন উপন্যাসই পৌঁছুতে পারেনি তুং যুগের হুং লাও মেং বা লাল প্রকোষ্ঠের স্বপ্ন’র মত দু’একটি উপন্যাস ছাড়া। কয়েক শতক ধরে সবার অলক্ষ্যে, প্রাকৃত জীবনে শেকড় গেড়ে ডাল, কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়ে যে উপন্যাস ফুল পাতা মেলে দিল তুং রাজত্বে এসে, তার প্রকৃত রাজকীয় মূল্যায়ন হয়েছিল মোঙ্গলদের সময়। তারা এই প্রাচীন দেশটি দখল করার পর তাদের যাযাবর হৃদয়ে প্রথাগত সাহিত্য কোন আবেদনই সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হল। বরং তারা উৎসাহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল নাটক আর উপন্যাসের দিকে। সাহিত্য জগতের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মাঝেও এই রাজ আনূকুল্য পেয়ে চীনের উপন্যাস যেন সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হল। এসময়েই একে একে লেখা হয় চীনের ইতিহাসের সেরা তিনটি উপন্যাস শুই হু চুয়ান, স্যান কুও এবং সর্বশেষ হুং লাও মেং।

    চীনের মানুষের কাছে এই তিনটি মহান উপন্যাস কি গভীর বার্তা বহন করত তা আপনাদের সামনে তুলে ধরবার সুযোগ আজকের আয়োজনের পরিসরে নেই। কিন্তু আমি পুরো পশ্চিমা সাহিত্যে এদের কোন জুড়ি খুঁজে পাইনি। আমাদের উপন্যাসের ইতিহাসে এমন কোন মুহূর্ত আসেনি যাকে দেখিয়ে আমরা বলতে পারি “এটাই আমাদের উপন্যাসের বিকাশের সর্বোচ্চ চূড়া”। চীনের এই উপন্যাস তিনটি গণমানুষের সাহিত্যের অমিত স্বাক্ষর। বিদ্যাজীবীদের না হলেও এগুলো গণ-সাহিত্যের পরিণত স্তম্ভ। আর সব গণ-সাহিত্যের মত এগুলোকেও পড়তে হয়েছে সমসাময়িক বিদ্যাজীবীদের কোপানলে। বিপজ্জনক, বিদ্রোহী, উদ্ধত ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে দাঁড়াতে হয়েছে রাজরোষের কাঠগড়ায়। কিন্তু তারপরও চীনের সাধারণ মানুষ গল্প হিসেবে পড়ে, বলে, গান হিসেবে গেয়ে, নাটক হিসেবে অভিনয় করে এদের বাঁচিয়ে রেখেছে কয়েক শতাব্দী ধরে। যার ফলে বিদ্যাজীবীরাও একসময় বাধ্য হয়েছে এগুলোকে আমলে আনতে। তাদের সংকীর্ণ স্বর এরপর এগুলোকে আখ্যা দিয়েছে ‘লোককথা’, সেই সাথে পাদটিকায় তত্ত্ব দিয়েছে এগুলোকে সাহিত্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু চীনের সাধারণ মানুষ এসব তত্ত্ব বা তার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য লেখা ভুরি ভুরি নিবন্ধে কর্ণপাত করেনি বিন্দুমাত্র। তারা নিজেদের সৃষ্ট উপন্যাসে মগ্ন থেকেছে, নিপাট আনন্দ ছাড়া যার আর কোন লক্ষ্য নেই, নিজেদের জীবনের প্রকাশ ছাড়া যার আর কোন বাড়তি উদ্দেশ্য নেই।

    চীনের উপন্যাস প্রকৃত অর্থেই সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। শুই হু চুয়ানের লেখক হিসেবে আধুনিক সংস্করণগুলোতে শি নাই এন’ র নাম ছাপলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একক কোন ব্যক্তির লেখা নয়। অনেকগুলো প্রচলিত গল্পের সমন্বয়ে সুং রাজত্বে এক দস্যুদল নিয়ে দাঁড়িয়েছে এই উপন্যাসের বিশাল কাঠামো। এর সুচনা নিহিত ছিল ইতিহাসে। এই দস্যুদের সত্যিকার আখড়াটি এখনও বিরাজমান শানতুং প্রদেশে। সময়ের পশ্চিমা হিসাবে ত্রয়োদশ শতাব্দীর এসময়টি চীনের ইতিহাসের এক দুঃখময় অধ্যায় যখন সম্রাট হুই চুংয়ের রাজত্ব জুড়ে চলছে অরাজকতা। প্রতিদিন ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবেরা আরো গরিব। যখন অনাচার রুখে দাঁড়ানোর মত আর কেউ নেই তখন শোষিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এই দস্যুদল।

    আর্টওয়ার্ক: লু জিসেন
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    চীনের এই উপন্যাসটির সুদীর্ঘ রচনাকালের পুরো ইতিহাস বা প্রতিটি পর্যায়ে এর বাঁকগুলো পুরোপুরি আপনাদের সামনে তুলে ধরবার সুযোগ নেই। বলা হয়ে থাকে শি নাই এন এর আদি রূপটি খুঁজে পেয়েছিলেন একটি পুরনো বইয়ের দোকানে যেখান থেকে নিয়ে গিয়ে তিনি এটি আবার পরিশুদ্ধরূপে লেখেন। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গল্প চীনের ঘরে ঘরে প্রচলিত। আজকে প্রচলিত এর পাঁচ বা ছয়টি সংস্করণ পর্যালোচনার দাবি রাখে। চুং ই শুই হু নামের একটি সংস্করণে রয়েছে একশতটি অধ্যায়, অন্য আরেকটিতে রয়েছে একশত সাতাশটি অধ্যায়, অন্য আরেকটিতে একশতটি। শি নাই এন এর সম্পাদিত সংস্করণটিতে অধ্যায় ছিল একশত বিশটি। কিন্তু আজকের দিনে সবচেয়ে প্রচলিত সংস্করণটিতে রয়েছে মাত্র সত্তুরটি অধ্যায়। এই সংস্করণটি মিং রাজত্বকালে চিং সেন তন লিখেছিলেন যার পেছনে রয়েছে একটি মজার ইতিহাস। চিং জানতেন তার পুত্রও চীনের আর দশজন কিশোরের মত এ উপন্যাস না পড়ে পারবে না। এই বিশাল পরিসরের উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে যাতে পুত্রের বেশি সময় না লাগে এজন্য তিনি নিজেই এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ লিখে ফেলেন। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই উপন্যাসের একটি সরকারি সংস্করণও পাওয়া যায়। চীনের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ যখন বুঝতে পারলেন জনগণকে কিছুতেই তাদের জন্য অস্বস্তিকর এই উপন্যাস পাঠ থেকে নিবৃত্ত করা যাবেনা, নিজেরাই সরকারি আয়োজনে এর একটি সংস্করণ লিখলেন যাতে কাহিনী উল্টে গিয়ে উপন্যাস শেষ হয় রাজকীয় বাহিনীর হাতে দস্যুদলের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে। কিন্তু চীনের সাধারণ মানুষ মোটেও নেয়নি এই চাপানো গল্প, বরং প্রতিদিনের চর্চায় বাঁচিয়ে রেখেছে এই মহান দস্যুদলকে যাদের মধ্যে তারা জরাজীর্ণ রাজনীতির বিরুদ্ধে গণমানুষের নিরন্তর সংগ্রামের অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।

    শুই হু চুয়ান আংশিক অনূদিত হয়েছে ফরাসি ভাষায়, লা শেভালিয়ারস্ চিনইস নামে। সত্তুরটি অধ্যায় নিয়ে যে শুই হু চুয়ান তার পুরোটাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি আমি নিজে, নাম অল মেন আর ব্রাদার্স। বইটির মূল নামের কোন অর্থ ইংরেজিতে দাঁড় করানো যায় না। চীনা ভাষায় কোন বড় লেকের প্রান্তিক জলাভূমি বোঝানো হয় এই শব্দগুলো দিয়ে যেখানে এই দস্যুদের আস্তানা ছিল। এই নাম মুহুর্তেই শতাব্দী প্রাচীন যে স্মৃতি অনুভব চীনাদের মনে নিয়ে আসে, আমাদের পশ্চিমা মনোগড়নে সেই অনুভব কখনই সম্ভব নয়।

    প্রাচীন এই উপন্যাসটি চীনে শুধু টিকেই নেই, সেই সাথে সম্প্রতি ভিন্নতর এক তাৎপর্যও লাভ করেছে। চীনের কমিউনিস্টরা এই উপন্যাসের আরেকটি সংস্করণ প্রকাশ করেছে যার ভূমিকা লিখেছেন সেখানকার এক প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা যাতে তিনি একে উপস্থাপন করেছেন চীনের প্রথম সাম্যবাদী সাহিত্য হিসেবে। উপন্যাসটির মাহাত্ম তার অন্তর্গত আবেদনের এই কাল নিরপেক্ষতার মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই। সাম্রাজ্যের কালে যে সত্যের দ্যূতি এটি ছড়িয়ে ছিল, আজকের সময়েও তা নিষ্প্রভ হয়নি এতটুকু। আজও এর পাঠকের সারিতে আমরা পেয়ে যাই পুরোহিত, আমলা, বণিক, বিদ্বান, নানা পদের, বয়সের নারী এমনকি দুষ্ট কিশোরদেরও। এই সারিতে নেই শুধু পশ্চিমা পি এইচ ডি ধারী আধুনিক বিদ্বানেরা। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে এই বিদ্বানেরা যদি উপন্যাসটিতে শেষ যার কলমের আঁচড় পড়েছে সেই গল্পকারের সময়েও জন্ম নিতেন, তাদের নিয়েও মানুষের মুখে মুখে চালু হয়ে যেত হাজারো মজাক।

    চীনারা বলে কিশোরদের পড়া উচিত না শুই হু আর বুড়োদের স্যান কু। কারণ শুই হু পড়ে তাদের ডাকাত হওয়ার শখ জাগতে পারে আর স্যান কু পড়ে বুড়োদের বল প্রদর্শনের ভীমরতি পেয়ে বসতে পারে। শুই হু চুয়ান যদি চীনের সমাজের প্রামাণ্যরূপ হয়, স্যান কু হচ্ছে চীনের যুদ্ধ আর রাজনৈতিক জীবনের প্রামাণ্যরূপ আর হুং লাও মেং তার পারিবারিক জীবন, মানবিক প্রেমের অনুসন্ধানী কথকতা।

    স্যান কু বা তিন রাজ্য উপন্যাসটির ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় কাঠামোগত বুনন আর লেখক পরিচয়ের সংশয়ের প্রশ্নে এটিও শুই হু চুয়ানের মতই। গল্পটি শুরু হয় হ্যান রাজত্বের সময়ে পরস্পর ভাতৃত্বের শপথে আবদ্ধ তিন বন্ধুর জীবন নিয়ে এবং শেষ হয় সাতানব্বই বছর পরে ষষ্ঠ রাজবংশের সময়কালে এসে। আজকের পরিচিত সংস্করণটির লেখক হিসেবে জানা যায় লো কুয়ান চুং এর নাম যাকে অনেক গবেষকই শিহ নাই এন এর শিষ্য বলে মনে করেন। সম্ভবত শুই হু চুয়ান লিখবার ক্ষেত্রেও তার কিছু অবদান আছে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কটি অনেকটাই বেকোনান্দ-শেক্সপিয়ার সম্পর্কের মত নানা পরস্পর বিরোধী তথ্যে পরিপূর্ণ।

    ইউয়ান রাজত্বের শেষ ভাগে জন্ম নেয়া লো কিয়ান চুং বেঁচে ছিলেন মিং রাজত্বের সময় পর্যন্ত। তার লেখালিখির তালিকায় অনেকগুলো নাটক থাকলেও তিনি বিখ্যাত হন রচিত উপন্যাসগুলোর জন্য, যার মধ্যে সেরা স্যান কু। আজকের চীনে সবচেয়ে প্রচলিত সংস্করণটি সম্রাট কং সি’র সময়ে পরিমার্জন, পরিবর্ধন করেছিলেন মাও চেন কান। এই পরিমার্জনে যেমন অনেক কিছু বাদ পড়েছে তেমনি যুক্ত হয়েছে আরো অনেকটা। যেমন উপন্যাসের অন্যতম প্রধান সুয়ান ফু রেন চরিত্রটি তিনি যোগ করেছিলেন মূল কাহিনীর সাথে। একই সাথে তিনি বদলে ফেলেন কাহিনীর কথকতার ভঙ্গিমাও। শুই হু চুয়ান যেখানে চীনের মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে বুঝবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, স্যান কু সেখানে চীনের একেবারে নিজস্ব সমর-কলা আর সমর-দর্শনকে বিশদভাবে তুলে ধরে। জাপানের সাথে যুদ্ধের সময় চীনের হাজার হাজার কৃষক গেরিলাদের প্রত্যেকেরই পড়া ছিল স্যান কু, নিজে না পড়লেও অন্তত অলস শীতের দিনে বা কোন প্রলম্বিত গ্রীষ্মে ঘরোয়া আসরে অন্যের মুখে শোনা ছিল এই উপন্যাসের কাহিনীগুলো। কোন না কোন গল্প বলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় তাদের শুনিয়েছে তিন রাজ্যের যুদ্ধের কথা, যুদ্ধের প্রাচীন কলা-কৌশলের কথা যেগুলোর অনেকগুলোরই বাস্তব প্রয়োগ হয়েছে জাপানিদের বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধের সময়। এই উপন্যাসের পাঠক হিসেবে চীনের আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই জানে একজন যোদ্ধা হতে হলে কি প্রয়োজন, কিভাবে শত্রু আক্রমণের মুখে পিছু হটতে হয় বা কিভাবে পশ্চাৎধাবন করতে হয় পলায়নপর শত্রুর।

    আর্টওয়ার্ক: শুই ইং ইং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    চীনের শ্রেষ্ঠ তিন উপন্যাসের মধ্যে অধুনাতমটি হুং লাও মেং বা লাল প্রকোষ্ঠের স্বপ্ন। মানচু সাম্রাজ্যের এক প্রভাবশালী রাজকর্মচারী জাও যু চিং আত্মজীবনী আকারে লিখেছিলেন এই উপন্যাসটি। রাজ পরিবারসহ তৎকালীন মানচু সাম্রাজ্যের আট বাহিনীর প্রতিটির সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তিনি এই উপন্যাসটি একা শেষ করেননি, শেষ চল্লিশটি অধ্যায় লিখেছিলেন আরেকজন যার নাম সম্ভবত কাও ও। এছাড়াও জাও যু চিং এর এই আত্মজীবনীও ঐতিহ্যের ধারায় পড়ে পরিবর্তিত-পরিমার্জিত হয়েছে প্রথমে ইউয়ান মেই’র হাতে, পরে হু শিহ’র হাতে। স্বভাবতই এর নামও পরিবর্তন হয়েছে, জাও যু চিং এর নাম দিয়েছিলেন শিহ তো চি যা পরবর্তীতে এসে হয়ে গেছে হুং লাও মেং। ১৭৬৫ সালের দিকে এই উপন্যাসটি পিকিং এসে পৌছায় এবং মাত্র পাঁচ ছয় বছরের মধ্যে চলে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। মুদ্রিত বইয়ের দাম তখনও চীনে আকাশচুম্বী, ফলে বইটির প্রতিটি কপি ঘুরেছে হাজারো হাতে।

    বিষয় বিচারে উপন্যাসটি সরল হলেও রস বিচারে, চরিত্রের গভীরতা, মানবিক আবেগের প্রকাশের প্রশ্নে মোটেও তা নয়। কাহিনীর শুরু এক রাজকর্মচারীর ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের গভীর বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনা দিয়ে যার মূল উৎস জাও যু চিং এর যাপিত জীবন, যেখানে দীর্ঘদিনের লালিত আভিজাত্যে ক্রমশ চিড় ধরছে। সঞ্চিত সম্পদের উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র চিয়াও পাও ইউ পরিবারের ভিতর থেকে পাওয়া ইন্ধনে দুহাতে টাকা ওড়াচ্ছে যদিও সে জন্ম নিয়েছে মুখে সৌভাগ্যতিলক নিয়ে। কাহিনীর শুরুতেই তার পরিচয় দেয়া হয়েছে “স্বর্গ ভেঙ্গে যাওয়ার পরে যখন  আবার নির্মিত হল, ছোট্ট একটি টুকরো বাদ পড়ে গিয়েছিল সে নির্মাণে,ঈশ্বর সেটিকে তিল বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন চিয়াও পাও’র মুখে… …”। অতি-প্রাকৃতিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী এই চীনা ঐতিহ্য আজও আমরা চীনা জীবনে খুঁজে পাই।

    এই উপন্যাস অনায়াসে চীনের পাঠকদের ধরে রাখতে পেরেছিল কারণ এর উপজীব্য বিষয় ছিল তাদের নিজস্ব পরিবার ব্যবস্থার সমস্যাগুলো, বাড়িতে নারীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, মাতৃতান্ত্রিকতার একচ্ছত্র আধিপত্য। চীনের পরিবারে নানী, মা এমনকি কখনও কখনও বাড়ির দাসী পর্যন্ত পারিবারিক ক্ষমতার একক অধিকারী হয়ে যেত। অভিজাত পরিবারের সুন্দরী যুবতী দাসীরা প্রায়শই মালিক পুত্রের ক্রীড়ানকে পরিণত হতো বা নিজেরাই নাচিয়ে বেড়াতো তাদের। চার দেয়ালে আবদ্ধ এই নারীরা, যাদের বেশির ভাগই চিরকাল নিরক্ষর থেকে যেত, প্রাণ দিয়ে আগলে রাখতো বাড়ির পুরুষদের। এমনি এক আগলে রাখা পুরুষ হিসেবে আমরা লাল দেয়ালের প্রকোষ্ঠে চিয়া পাও ইউকে দেখতে পাই।

    এই উপন্যাসের খ্যাতি যখন সাধারণ মানুষের গন্ডি পেরিয়ে সমাজের উঁচু স্তরে পৌঁছে গেল, স্বয়ং সম্রাটকেও দেখা গেল এতে নাক ডুবিয়ে নিমগ্ন থাকতে, বিদ্বানরা ব্যস্ততার সাথে কয়েকশত মাইল সমালোচনা লিখে ফেললো এটাকে খারিজ করে। আমার কোন সন্দেহ নেই যে এই বিদ্বানদেরও অনেকে উপন্যাসটি গোপনে হলেও পড়ে ফেলেছিল।  পণ্ডিতদের এই গোপনে উপন্যাস পাঠ এবং প্রকাশ্যে অস্বীকার নিয়েও চীনাদের মাঝে নানা কৌতুক প্রচলিত আছে। যা হোক, তাদের অনেকে নিবন্ধ লিখে এই অভিযোগও করলো যে হুং লাও মেং আদৌ কোন উপন্যাস নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারণা যা বিদেশি মানচুদের হাতে চীনের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত। উপন্যাসের নামে লাল শব্দটি মানচুদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং পাও ইউ’র বাগদত্তা লিং তাই ইউ, যে কাহিনীর এক পর্যায়ে মৃত্যূবরণ করে, প্রতিনিধিত্ব করে চীনের। অন্যদিকে তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী পাও জাই, যার সাথে শেষ পর্যন্ত পাও ইউ’র মিলন হয়, প্রতিনিধিত্ব করে বিদেশি শক্তির। এরকম বহু যুক্তি খাড়া করে তারা এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এগুলো ছিল উপন্যাসটির বিকৃত বিশ্লেষণ। এই প্রতিবন্ধকতাও পেরিয়ে উপন্যাসটি চীনা ঐতিহ্যে বাস্তবতা আর রোমান্সের শৈল্পিক সংমিশ্রণের আরেকটি শক্তিশালী উদাহারণ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। একই ছাদের তলায় কয়েক প্রজন্মের নারী-পুরুষের সুদীর্ঘ  জীবন যাপনের যে চৈনিক প্রথা, এক ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাবান পরিবারের প্রেক্ষাপটে তারই নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায় এই উপন্যাসের পাঠকেরা।

    এই তিনটি উপন্যাসকে যে আলাদা গুরুত্ব আমি দিয়েছি, চীনের মানুষেরাও তাই দিয়ে থাকে। উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলে গড়পড়তা চীনের মানুষেরা একনাগাড়ে বলে যাবে “শুই হু, স্যান কু, হুং লাও মেং”। কিন্তু তারপরও সত্য যে এর বাইরেও শত শত উপন্যাস রয়ে গেছে চীনে। এর মধ্যে বলতে হয় জি ইউ চি’র নাম যার খ্যাতি এই তিনটির কাছাকাছিই। বলতে হয় এক দেবর্ষি যোদ্ধার কাহিনী ফেং সেন চুয়ান’র কথা যার লেখক অজ্ঞাত হলেও ধারণা করা হয় এটি মিং আমলে লেখা। এছাড়াও আছে তুং রাজত্বে রাজকর্মচারী আর বিদ্বানদের অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে লেখা রু লিং ওয়ে শি, বিদ্রুপাত্মক এই উপন্যাসটিতে রয়েছে দ্ব্যর্থক সংলাপের ছড়াছড়ি যা একাধারে করুণ এবং হাস্যরসাত্মক ঘটনার পরম্পরায় সাজানো। প্রাত্যহিক জীবনের প্রায়োগিকতা বিচ্ছিন্ন, সৃজনশীলতায় অক্ষম বিদ্বানদের নিয়ে এ উপন্যাসে রয়েছে অসংখ্য কৌতুক। দীর্ঘ এই উপন্যাসের কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। প্রতিটি চরিত্র আরেকটির সাথে ঘটনা পরম্পরায় সম্পর্কিত যাকে খ্যাতিমান আধুনিক লেখক লু জুন বলেছেন “একসাথে জড়ানো সিল্ক আর সাটিনের সমাহার”।

    আর আছে কর্তৃত্ব বিরোধী উপন্যাস ইয়ে শো পেই ইন যার অর্থ সূর্যের মাঝে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কন্ঠস্বর, লিখেছেন কিয়াং ইনের এক খ্যাতিমান ব্যক্তি- শিয়া। ব্যতিক্রমী কাহিনীর উপন্যাস চিং হুয়া ইয়েন যার বিষয় কল্পিত এক নারী সাম্রাজ্য যেখানে সম্রাজ্ঞীর অধীনে জ্ঞানচর্চা করে নারী বিদ্বানেরা। কাহিনীর একটি সুপ্ত লক্ষ্য ছিল জ্ঞানের প্রশ্নে নারী-পুরষের সমতার প্রশ্নটি উত্থাপন যদিও উপন্যাসটি শেষ হয় নারী পুরুষের এক যুদ্ধ দিয়ে যেখানে নারী রাজ্যের সম্রাজ্ঞী পরাজিত হন একজন সম্রাটের কাছে।

    তারপরও এগুলো চীনের গণমানুষকে উজ্জীবিত করা উপন্যাস সম্ভারের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ। তারা যদি আজকের এই আলোচনায় থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই বলত “এসব বাদে আসল তিনটির কথাই বলুন, শুই হু চুয়ান, স্যান কু আর হুং লাও মেং”। যেগুলো ধারণ করে হাজার বছর ধরে চীনের মানুষেরা যে জীবন যাপন করছে সেই জীবনের প্রাঞ্জল বর্ণনা, সেই গানের সুর যা তারা গেয়েছে এতদিন। আছে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের রঙ্গরস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের মানস গড়ে উঠেছে এগুলোকে ঘিরে, তারা ফিরে ফিরে এসেছে এই কাহিনীগুলোর কাছে। পরিবর্তিত জীবনের নতুন গান, গীতিকা আর উপন্যাসও সৃষ্টি হয়েছে এখান থেকেই। এগুলোর কোন কোনটি আসলটির মতই খ্যাতি লাভ করেছে, যেমন শুই হু চুয়ানের একটি একক ঘটনাকে ঘিরে লেখা শরীরি প্রেমের গল্প চিং পিং মেই।

    আর্টওয়ার্ক: ফেস্টিভাল
    শিল্পী: ঝাউ লি
    সূত্র: চাইনিজ টাইমস

    কিন্তু আজ আমার উদ্দেশ্য চীনের উপন্যাসের তালিকা প্রণয়ন নয়। যে দিকটির প্রতি আমি জোর দিতে চাই তা প্রোথিত আছে বিশ্ব সাহিত্য ইতিহাসে বিরল এই গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠির কল্পনার প্রাণময় বিকাশে। চীনে বহুল প্রচলিত গল্প’র একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে জিয়াও শু ও যার মানে দাঁড়ায় অর্থহীন, বায়বীয় কোন কিছু। এমনকি উপন্যাসের প্রচলিত প্রতিশব্দ জং পিয়েন জিয়াও শু ও’র মানে দীর্ঘ অথচ অর্থহীন ও বায়বীয়। চীনের মানুষেরা অক্ষরের বেড়াজাল থেকে উপন্যাসকে ক্রমাগত মুক্তি দিয়ে গেছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি কাহিনীকে জীবন্ত রেখে। আজকে আমরা এর যে রুপটি পাই তা বর্তমান তো বটেই, আসছে দিন সম্পর্কেও অনেকখানি ইঙ্গিত বহন করে। বিপরীতে শিল্প নামে যে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের সতীত্ব রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা পণ্ডিতরা কয়েক শতাব্দী জুড়ে করেছেন, প্রকৃত প্রস্তাবে আজ তা মৃত। প্রাণবান উপন্যাসগুলোর বাঁধা কোন প্লট নেই, কাহিনীর মাঝে নেই পরিণতি পাওয়ার আরোপিত প্রয়াস, নায়িকারা যেমন এগুলোতে সবসময় সুন্দরী নয়, সব নায়কই তেমন অদম্য সাহসের অধিকারী নয়। কোন কোনটি আবার ঠিক জীবনের মতই মাঝ পথে এসে থেমে যায়, যেভাবে মৃত্যু আকস্মিকভাবে থামিয়ে দেয় জীবনের স্রোতধারা।

    উপন্যাসের এরকম একটি ঐতিহ্যেই আমি জন্ম নিয়েছি, একজন লেখক হিসেবে অনুসরণ করেছি। শিল্প সৃষ্টি বা আরোপিত নান্দনিকতা তাই কখনই আমার লক্ষ্য ছিল না। চীন থেকে এই একটি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার প্রয়োজন আছে পশ্চিমা উপন্যাসের। শিল্প-কলার পুরোহিতদের মোকাবিলা করবার জন্য চীনের উপন্যাসিকদের এই দৈন্যপন্থী প্রতিরোধ আখ্যানটি আমি নিজের কথায় বললাম যেহেতু তারা কেউ বিষয়টি লিখে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি।

    মানুষের যে প্রবৃত্তিটি শিল্প ‘সৃষ্টি’ করে তা শিল্প ‘তৈরি’র প্রণোদনার চেয়ে ভিন্নতর। চূড়ান্ত বিচারে এবং সহজতম কথায় সৃজনশীল প্রবৃত্তি হচ্ছে একটি বিস্তৃত প্রাণময়তা, এক অমোঘ শক্তি যা ব্যক্তি এককের মাঝে অতিযৌক্তিকভাবেই জন্ম নেয়, নিজের জীবনের সমস্ত প্রয়োজনকে ছাপিয়ে যায় সে তাগিদ, কোন একক জীবন সৃষ্টির সেই শক্তিকে ধারণ করতে পারে না। ফলে এই শক্তি ছড়িয়ে পড়ে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে, কখনও সুর, কখনও ছবি, কখনও সাহিত্য বা প্রকাশের অন্য কোন মাধ্যমকে আধার করে। ব্যক্তি চাইলেও তখন আর একে অগ্রাহ্য করতে পারে না কারণ এই প্রকাশের মাঝেই সে তখন স্বস্তি পায়, এই অদ্ভূত বাড়তি শক্তি ক্ষয় করবার স্বস্তি। এই শক্তি যখন কারো শরীর-মনে ভর করে, তার ইন্দ্রিয় গড়পড়তা মানুষের চেয়ে আরো প্রখর এবং সংবেদনশীল হয়ে যায়, আরো গভীরতর হয় সমস্ত অনুভব। এই সংবেদনশীলতা মস্তিষ্কে যে চাপ সৃষ্টি করে তা বস্তু জগতের সীমানা ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে যায় কল্পনার জগতে। এটি এক অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া যা ক্রমশ তার অস্তিত্বের প্রতি বিন্দুতে ভাগ বসায়। এই প্রক্রিয়া শুধু তাকেই ভাসিয়ে নেয়না, সাথে নেয় তার কল্পনার এবং সক্রিয়তার পরিবৃত্তকেও।

    কখনও কখনও ব্যক্তি না চাইলেও এই সক্রিয়তার ফলাফল থেকে বাদ পড়ে যায় শিল্প। শিল্প সৃজনের প্রক্রিয়া আর শিল্পের আঙ্গিক নির্ধারণের প্রক্রিয়া এক জিনিস নয়। কাজেই শিল্পের সংজ্ঞা নিরূপণ মুখ্য নয় বরং গৌণ একটি প্রক্রিয়া। কাজই কেউ যখন মুখ্য কর্মকাণ্ডের জন্য জন্ম নিয়ে গৌণ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে যায়, তার সক্রিয়তার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। সে যখন আঙ্গিক, রূপ, কৌশল আর নতুন ধারা প্রবর্তনকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে, তখন তার অবস্থা হয় অগভীর খাড়িতে আটকা পড়া জাহাজের মত, শত চেষ্টাতেও আর এগিয়ে যেতে পারে না সমুদ্রের বিশালতার দিকে।

    একজন সত্যিকারের উপন্যাসিকের জন্য রচনার একমাত্র উপাদান তার নিজের ভিতরের ও বাইরের মানব জীবন। তার কাজকে মাপার একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে তার সৃজনীশক্তি নিজ জীবন ছাড়িয়ে কতটা উপচে পড়ল সেই পরিমাপ। তার সৃষ্টি কি বেঁচে আছে? এই হওয়া উচিত তার নিরন্তর প্রশ্ন। আর এ প্রশ্নের উত্তর এক গণমানুষ ছাড়া তাকে আর কে দিতে পারে? শিল্প কি বা এটি কিভাবে তৈরি হয় এই জাতীয় কূটতর্কে এ মানুষরা ডুবে নেই। বরং তারা ডুবে আছে প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুধা, হতাশা, আনন্দ-বেদনা আর সর্বোপরি স্বপ্নের মাঝে। একমাত্র এরাই আসলে একটি উপন্যাসের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারে, কারণ তাদের মূল্যায়ন সব সময়ই হয় বাস্তবতার মাপকাঠিতে। শিল্পের মূল্যায়ন কখনই শিল্পের মাপকাঠিতে হয় না, হয় পাঠকের জীবন বাস্তবতার সাথে সরলতর তুলনার মাধ্যমে।

    একজন উপন্যাসিক শিল্পকে নিখুঁত অবয়ব হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, মার্বেল পাথরের অধিষ্ঠিত দেবতা হিসেবে পূজা করতে পারে দুর থেকে, কিন্তু তার নিজের অবস্থান কখনই তাদের সাথে নয়। তার জায়গা পথে, সেখানেই সে সবচেয়ে সুখী। পথ কখনও নিশ্চল নয়, পথিকদের প্রকাশ ভঙ্গি কখনও পাথরের মূর্তির মত নিখুঁত নয়। তারা কদাকার, খুঁতসম্পন্ন এমনকি মানুষ হিসেবেও অসম্পূর্ণ। তারা কোথা থেকে আসে আর কোথায় যায় তাও বোধগম্য কিছু নয়। কিন্তু তারপরও তারাই গণমানুষ এবং শিল্পের বিষয় হিসেবে তারাই নমশ্য, শিল্পের পাদদেশে দাঁড়ানো প্রতিটি প্রকৃত শিল্পীর কাছে।

    আর চীনের এই উপন্যাসিকদের মত,আমিও এই গণদের জন্য লিখতে শিখেছি। কতিপয়ের পত্রিকার চেয়ে আমি সবসময়ই আমার লেখা ছাপতে চেয়েছি এই গণদের পত্রিকায়। আমি বিশ্বাস করি গল্প তাদের জন্যই। তারা আর যে কারো চাইতে গল্পের ভাল সমঝদার। তাদের বোধ দূষিত নয়, তাদের আবেগ মুক্ত। একজন উপন্যাসিক কখনও খাঁটি সাহিত্য তৈরিকে নিজের লক্ষ্য বানাতে পারেন না। এমনকি তার এই বিষয়টি খুব বেশি বুঝবারও দরকার নেই। কারণ তার লেখার উপাদান যে মানুষেরা, তাদের সাথে এই খাঁটি (?) সাহিত্যের সে সে রকম কোন যোগ নেই। তার ভূমিকা মূলত গ্রামের তাঁবুতে বসা গল্প বলিয়ের যে গল্প দিয়ে জয় করবার চেষ্টা করে তার শ্রোতাদের মন। এক বিদ্বান যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যায় তখন তার কণ্ঠ উঁচু করবার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার ড্রামটি যেন সজোরে বেজে উঠে একদল সমর্পিত অসহায় মানুষ যখন পর্বতের দিকে রওনা হয় ঈশ্বরের খোঁজে। সে যেন চিৎকার করে তাদের বলে “আমিও ঈশ্বরের কথাই বলি”।  সে যেন কৃষকের কাছে জমি আর শস্যের কথা জানতে চায়, বৃদ্ধদের কাছে সে যেন শান্তির কথা বলে, বৃদ্ধাদের কাছে যেন সন্তানদের কথা বলে, তরুণ-তরুণীদের যেন বলে পারস্পরিক সংবাদ। সাধারণ মানুষদের আনন্দিত মুখ যেন তাকে তৃপ্ত করে। একজন উপন্যাসিক হিসেবে মহান চীনের কাছে এই শিক্ষাই আমি পেয়েছি।

    সম্পাদনা নোট: বক্তৃতাটি ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে অনুবাদ করা। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তা ছাপাও হয়। বর্মান সংস্করণটি অনুবাদকের কাছে থেকে প্রাপ্ত।

  • কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    অনুবাদ: জাকির হোসেন

    প্রথম কিস্তি

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বতন্ত্র ও বিকশিত শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: লিবার্টি লিডিং দ্য পিপিল
    শিল্পী: ইউজিন ডেলাক্রইক্স
    সূত্র: উইকিআর্ট

    গণতন্ত্রের সমস্যা    

    ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে কিছু মানুষ যে শাসন করার জন্যই জন্মায় এমনতর  ধারণাটির বিলোপ সাধিত হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং শক্তিশালী রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তার জায়গা দখল করে ‘মানুষ এবং নাগরিকের অধিকারসমূহের ঘোষণা’য় বর্ণিত আইনগত  সাম্য এবং ব্যক্তি মানুষের কতিপয় অধিকার।

    নতুন এই অধিকারগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল একটি বৃহৎ সামাজিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। গ্রহণযোগ্যতা পাবার পর এই অধিকারগুলোই ছিল ফরাসি বিপ্লবের সত্যিকারের ছাপ। সে সময় থেকে উক্ত আইনসমূহ এবং আইন তৈরির প্রক্রিয়ার পুরোটাই ছিল সেই ‘সাধারণ ইচ্ছা’র বহিঃপ্রকাশ। বিষয়টি এমন যেন, কথিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ মাফিক সেই আইনগুলো অনুমোদিত বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। সে সময়ের এই বৈশিষ্ট্যটিই তাকে অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে আলাদা করে ফেলে।

    ফরাসি বিপ্লবের সময়েও ‘সাধারণ ইচ্ছার’ ধারণাটি রাজনীতিতে নতুন ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারপরেও ভবিষ্যতের জন্য এর প্রভাব নির্ণয় করা মোটেই কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। ষাট বছর পূর্বের ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ঠিক এই বিতর্কগুলোই সামনে এসেছিল। রাজতন্ত্রকে যদি বিদায় দেওয়া হয়, তবে কোন ধরণের সমাজ এর জায়গা দখল করবে? ঠিক কোন উপাদানগুলো নিয়ে ‘সাধারণ ইচ্ছা’ গঠিত হয়? এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কে বা কারা ‘সাধারণ ইচ্ছা’র আইন প্রয়োগ করবে?

    পুৎনি বিতর্কের সময় রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে সিংহাসনচ্যুত করতে লড়াই করা শক্তিগুলোর মধ্যে ঠিক এই বিষয়গুলো নিয়েই তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা অলিভার ক্রমওয়েল এবং অন্যান্যরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটানো উচিত। কিন্তু তারা একইসাথে এটিও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজ পরিচালনার ভার কোনো একজন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। একজন রাজার ক্ষমতা তার জন্মগত অধিকার বলে মনে করা হতো। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় তারা একটি নতুন কাঠামোগত উপাধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন; পাছে সমাজের শাসমক্ষমতা সাধারণ মানুষের হস্তগত হয়ে যায়। সম্পদকেই হতে হতো সেই নতুন কাঠামোগত ‍উপাধির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ক্রমওয়েলের সেনাপ্রধান (হেনরি আইরিটন – অনুবাদক) যেমনটা লিখেছেন:

    আমার মতে, সাম্রাজ্যের স্থায়ী কোনো স্বার্থ জড়িত নেই এমন বিষয়গুলোতে কোনো ব্যক্তির সাম্রাজ্যের কোনো স্বার্থ ও সুবিধাদির ব্যাপারে মীমাংসা করার কোনো অধিকার নেই। ১

    তবে রাজার বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্যান্য দলগুলো এই চিন্তাকে সমর্থন করে নি। গৃহযুদ্ধের ফলে অনেকগুলো দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। লেভেলারদের মতো কিছু দল সে সময়ের বিদ্যমান সামাজিক শর্তসমূহ সম্পর্কে সচেতন ছিল। ডিগারদের মতো অন্য কিছু দল পতিত জমিগুলো দখল করে নেয় এবং সেগুলোতে গাছ রোপন করার পর সেই গাছগুলোর জন্য এবং সেখানে তাদের নিয়োগকৃত শ্রমশক্তির জন্য সেগুলোকে নিজেদের বলে দাবি করে। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংগ্রাম এই দলাদলিকে ভেতর থেকে উসকিয়ে দেয়। সে দলগুলো ছিল কর্তৃত্ববাদবিরোধী এবং তারা বেশ কিছু বিষয়ে ক্রমওয়েল এবং তার অনুগামীদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করত। প্রখ্যাত লেভেলার থমাস রেইনসবোরঘ আইরিটনের বক্তব্য খন্ডন করেন এভাবে:

    আমার মতে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্রতম ব্যক্তিরটিরও সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তির মতো যাপনযোগ্য একটি জীবন রয়েছে। এবং সে কারণে কোনো একটি সরকারের অধীনে বসবাস করতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তির সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো নিজেকেই সে সরকারের অধীনে পেশ করা। ২

    কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত দেওয়ার অধিকার থাকবে, এমন একটি ধারণার কিছু বিপজ্জনক প্রভাব ছিল। এর ফলে ‘সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ’ এবং ধনীদের স্বার্থ সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। আইরিটন আবারো বলেন:

    কোনো একজন ব্যক্তির নিজস্ব সরকার নিজেই নির্ধারণ করার যে প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন, সে অধিকার বলেই তার চোখের সামনে দৃশ্যমান যে-কোনো দ্রব্যসামগ্রীর উপর তার অধিকার বর্তায়। ৩

    কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ছিল ‘দ্রব্যসামগ্রী’। গৃহযুদ্ধকালীন ইংরেজ সমাজ ছিল বর্তমান সমাজের তুলনায় ‍অনেক বেশি দরিদ্র। তবে সে সময়ের জনসংখ্যার অনুপাতে সেখানে তারপরেও প্রচুর পরিমাণে সম্পদ মজুত ছিল। সম্পদগুলো সমানভাবে বন্টিত হয় নি। কে কোন সম্পদের মালিকানা ভোগ করছে সে বিষয়ে বিরাট অসমতা বিরাজ করছিল। উইন্সট্যানলির মতো ডিগারদের জন্য এটিই ছিল বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি লিখেন:

    … এবং গরীব মানুষেরা এই দাসত্ববন্ধনের ব্যাপারটিতেই অভিযোগ করে থাকে। তাদের ধনী ভ্রাতৃবৃন্দেরা সে সব জমি নিয়ে তাদেরকে দরিদ্র করে রেখেছে যেখানে সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত রয়েছে। ৪

    সুতরাং, ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধে রাজার শাসন বাতিল হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই অপর একটি অধিকতর একগুঁয়ে সমস্যার উৎপত্তি ঘটে। পুরোপুরি সমানাধিকার-কে স্বীকার করে নেওয়া হলে কি বিত্তবানদের সুবিধাভোগের অবসান ঘটবে না? যাইহোক, হাজার বছর আগে অ্যারিষ্টটল একটি জাজ্বল্যমান সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, “বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ।” যে-কোনো সরাসরি গণনা কিংবা গণভোটে অসংখ্য দরিদ্রের অগ্রাধিকারের সামনে কতিপয় বিত্তবানের স্বার্থ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। ঠিক এভাবেই জন্ম নেয় ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’।

    এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে বিত্তবানেরা স্বাভাবিকভাবেই পেশিশক্তির ব্যবহার করেছিল। ডিগার এবং লেভেলারদের মতো গণতন্ত্রবাদীরা এই নিয়তি বরণ করেছিল যখন তাদেরকে সামরিক কায়দায় বিক্ষিপ্ত করে ফেলা হয়েছিল। ক্রমওয়েল এবং আইরিটনের মতো ‘বিত্তায়িত’ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল। তারা একটি নতুন আইনসভার মাধ্যমে শাসনকাজ পরিচালনা করেছিল এবং বিপুল পরিমাণে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। একই সময়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল দরিদ্ররা। ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডে ভ্রমণকালে একজন পর্যবেক্ষক লিখেছেন:

    এই দ্বীপটি শাসিত হয় এমন সকল ব্যক্তির প্রভাবের ছায়ায়, যারা বাস করে প্রাচুর্যের মধ্যে। তাদের ভাড়াটিয়া এবং পরিচারকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিশোধ করা ভাড়ার উপর তারা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করে। প্রত্যেকেই নিজেদের ভূ-সম্পদের সীমানার মধ্যে রাজপুত্রের মতো আচরণ করে। তারা সকলেই সেখানে পুরোপুরি সার্বভৌম। তাদের সেবায় নিয়োজিত পরিচারক এবং শ্রমিকেরা ছিল ক্রীতদাসের সমজাতীয়। তাদের ভাড়াটিয়ারা মূলত স্বাধীন হলেও তারা প্রজা শ্রেণির মধ্যে পড়ে। ৫

    ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মতো ফরাসি বিপ্লবও স্বল্প মেয়াদে সামাজিক গঠন প্রক্রিয়ার উপর সীমিত আকারের প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফরাসি রাজতন্ত্র মারাত্মকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণি। বণিক এবং ব্যাংকারেরা ছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তারা বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় বেশকিছু ধারণা এবং বুদ্ধিবৃত্তির যোগান দিয়েছিল। বহুদিন ধরে তারা দুর্নীতিবাজ রাজার চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য করের বোঝা বহন করে যাচ্ছিল। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল হিসেবে তাদের হাতে ক্ষমতার লাগাম চলে আসে। তারা আইনকে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থানুযায়ী পরিবর্তিত করে ফেলে।

    আর্টওয়ার্ক: স্টর্মিং দ্য বাস্তিল
    শিল্পী: জ্যা পিয়েরে হোউয়েল
    সূত্র: উইকিআর্ট

    তবে ফরাসি বিপ্লব চূড়ান্তভাবে অন্যান্য বিপ্লব হতে আলাদাও ছিল। একটি দিক দিয়ে এর সামগ্রিক কিছু ফলাফল রয়েছে। প্রথমত, ‘এটিই হলো একমাত্র বিপ্লব যার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে একটি করে সামাজিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।’ ৬ জনগণই ছিল এই বিপ্লবের সফলতার প্রাথমিক চালিকাশক্তি। ক্ষমতার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপস্থিত থেকে তারা একে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এটি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিপীড়িতদেরকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছিল। তবে এই বিপ্লব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দিয়েছিল। সেটি হলো, যখন উপরমহল থেকে সংস্কারকার্য ব্যর্থ হয়, তখন নিচে থেকে বিপ্লব উপকারী বলে বিবেচিত হতে পারে। অংশত এই বিপ্লবের ফল হিসেবে পুরো ইউরোপ জুড়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

    ফরাসি বিপ্লব নির্দিষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় আরেকটি কারণে। এটি সংঘটিত হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। সার্বিকভাবে সমাজে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আঠারো শতকের ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে আনুমানিকভাবে সম্পদের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। যন্ত্রপাতি এবং শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে সম্পদের বৃদ্ধি খুব দ্রুতগতিতে ত্বরান্বিত হয়।

    ইংল্যান্ডের উপযুক্ত পরিবেশে শিল্পবিপ্লব সূচিত হয়ে ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলক দ্রুততার সাথে তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ‘ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে প্রকৃতঅর্থে শিল্প-কারখানার রূপান্তরের পরিমাণ ছিল অল্প। স্পেন, পর্তুগাল, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং পুরো বলকান ‍উপদ্বীপজুড়ে একশ মাইলের কিছু বেশি রেললাইন দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল…।৭ কিন্তু ‘তারপরেও প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।’৮

    এর অর্থ দাঁড়ায় ‘বিত্তবান এবং সুবিধাভোগীদের’ সম্পদ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বৃদ্ধির পরিমাণ কেমন ছিল তা প্রায়ই সঠিকভাবে বোঝা যায় না। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম সেই সময়ের ব্রিটেনে রেলপথ নির্মাণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমাদের সে সংক্রান্ত একটি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। দুই দশকের ব্যবধানে কয়েক মাইল হতে (১৮২০ সালে) ৪,৫০০ মাইল (১৮৪০ সালে) এবং পরবর্তী সময়ে ২৩,৫৫০ মাইল (১৮৫০ সালে) রেলপথ নির্মিত হয়। তিনি এই বিশালাকার উদ্যোগের পেছনে লগ্নি করা অর্থের উৎসের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ’‘ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব চলাকালীন প্রথম কয়েকটি প্রজন্ম সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক সত্যটি হলো তারা খুব দ্রুততার সাথে এতো বিপুল পরিমাণে অর্থ উপার্জন করেছিল যে সেগুলো ব্যয় এবং লগ্নি করার ক্ষেত্রে তা সম্ভাব্য সবধরণের অনুমানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।৯  তারপর যখন ১৮৩৫-৩৭ সালে এবং ১৮৪৪-৪৭ সালে দুই দফায় কথিত ‘উন্মক্ত রেলশিল্প’ ইংল্যান্ডে আঘাত হানে, তখন ‘কল্পনাবিলাসী উন্মাদেরা’ রেলশিল্পের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগে মনোনিবেশ করে ।

    উক্ত বাঞ্চনীয় পরিস্থিতি অসংখ্য শ্রমিক জনতার অবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। তাদের কাজ ছিল মূলত এই ধরণের ‍উদ্যোগের পেছনে শ্রম ব্যয় করা। তাদের জন্য ‘অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নতুন রূপান্তর দুর্ভোগ এবং অসন্তোষের সৃষ্টি করে।’১০ বিত্তহীনেরা তাদের অবস্থার কারণে প্রলেতারিয়েত হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রলেতারিয়েতরা তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে নি। ‘শ্রমিকদেরকে কারখানার উপযোগী পন্থায় কাজ করা শিখতে হয়েছিল। তাদেরকে অর্থনৈতিক প্ররোচনার প্রতি সংবেদনশীল হতেও শিখতে হয়েছিল।১১  শুরুর কয়েকটি প্রজন্মের শ্রমিকদেরকে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তারা এই ব্যবস্থা পছন্দও করে নি। শ্রমিকদের পক্ষ ‍থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রতিরোধের খবর পাওয়া যায়।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রেভ্যুলিউশন অব ১৮৪৮
    সূত্র: প্রিজমা আর্কাইভ

    হবসবম উল্লেখ করেন, ‘এই পরিস্থিতির সমাধান খোঁজা হয় শ্রমিকদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালনের মধ্যে। সর্বোপরি এমন একটি চর্চা শুরু হয় যেখানে শ্রমিকদের এতোই স্বল্প পরিমাণে মজুরি দেওয়া হয় যে তাদের কোনোমতে টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম উপার্জন নিশ্চিত করতে ক্রমান্বয়ে পুরো সপ্তাহজুড়ে পরিশ্রম করতে হয়।’১২  তাতে করে কোনো একজন শ্রমিকের পুরো পরিবারকেই কাজ করতে হয়। ১৮৩৪-৩৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের তুলা কারখানাগুলোতে সবগুলো শ্রমিকের মধ্যে ‘চারভাগের একভাগ ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, অর্ধেকই ছিল নারী, বালিকা এবং আঠারো বছরের নীচে থাকা বালকেরা’১৩ ১৮৪০ সালের পশ্চিম ইউরোপে‘শিল্পায়নের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সামাজিক সমস্যাসমূহ এবং বিপদজনক নগরায়নের দুঃস্বপ্নগুলো উপস্থিত ছিল ভয়াবহ মাত্রায়। সেগুলো মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।’ ১৪

    একটু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে সময়ের ইউরোপ ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের দ্বারা প্রকম্পিত হয়েছিল। ইতালি, ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরিতে উদারনীতিবাদীরা নিজেদের দেশের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। ‘প্যারিস ও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের শ্রমিক’দের পক্ষ থেকে গুরুতর প্রকৃতির স্বাধীন দাবি-দাওয়া ‍উঠতে থাকে। ‘সামাজিক বিপ্লব’ এবং ‘লাল প্রজাতন্ত্র’ এর জন্য তীব্র দাবি ‍উঠতে থাকে। ‘তাদের এ জাতীয় দাবিগুলো সম্পত্তি এবং বাজারের নিয়মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে
    থাকে।’
    ১৫

    একটি উপযুক্ত সমাধান

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বাধীন ও বিকশিত  শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    উক্ত বিষয়টি নিয়ে সে সময় থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগীদের’ কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়। একদিকে ওজোন সম্প্রদায়, যাদের মুখপাত্র থমাস বেবিংটন ম্যাকৌলি বিশ্বাস করতেন, ‘মানবসম্প্রদায়ের মধ্যে উঁচু ও মধ্যম সারির লোকেরা প্রাকৃতিকভাবেই পুরো মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।১৬ তিনি দরিদ্র ও বিত্তহীনদেরকে ভোটাধিকার প্রদানের বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। ১৮৩০ এর দশকে চার্টিস্ট আন্দোলনের উত্থানের সাথে সাথে ব্রিটেনে এই বিতর্কটি ইতিমধ্যেই সামনে চলে আসে। এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কোবেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তার মতে, মানুষ ভোটাধিকার চেয়েছিল ‘যাতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়, যাতে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়। এবং তা কোনো বিমূর্ত খেয়ালের পরিতৃপ্তি সাধনের জন্য নয়।১৭  ম্যাকৌলি এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক ভোটাধিকারের ধারণাকে আক্রমণ করেছেন। তার মতে, এর ফলস্বরূপ ‘বিত্তবানেরা ‘লুন্ঠিত’ হতে পারে… তাতে করে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং মানুষ বর্বরতার দিকে ফিরে যেতে পারে।’১৮

    অন্যেরা অবশ্য এতোটা অনুভূতিহীন ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক জে. এস. মিল ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। সময় যে পাল্টে গেছে, তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। তিনি লিখেন, ‘অশিক্ষিতেরা শিক্ষিতদের উপর আস্থা রাখে।১৯ এমন একটি সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। তার পরিবর্তে এমন একটি সময় এসেছে যখন ‘জনগণ দিশাহীন অবস্থায় রয়েছে এবং সমাজ সবরকমের ভূল-ত্রুটি এবং সমূহ বিপদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।২০ আলোচ্য বিপদসমূহের মধ্যে একটি ছিল সামাজিক বিপ্লব। মিল ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে কিছু একটা করার দরকার। তবে তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘুরে যাবে না।

    জেমস স্টুয়ার্ট মিল

    তিনি নিজে কোনো বিভ্রমের মধ্যেও ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের অজ্ঞতা বিশেষত তাদের স্বার্থপরতা এবং বর্বরতার ব্যাপারে আতঙ্কিত।২১ তার চোখে নিম্নবর্গ ছিল ‘নির্বোধ অজ্ঞ জনসমষ্টি’, ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ অথবা ‘অসভ্যের দল’।২২ বিপরীতে তিনি নিজেকে এবং তার অনুসারীদেরকে ভাবতেন ‘বুদ্ধিমান শ্রেণি যারা শিক্ষার চর্চা করবে এবং তার সুফল ছড়িয়ে দেবে পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে।২৩ এই ধরণের সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। তিনি বলেন: ‘তুলনামূলক ‍উচ্চশিক্ষিত একজন বা কতিপয় ব্যক্তির প্রভাব এবং পরামর্শ সভা ব্যতীত গড়পড়তাদের মধ্যে থেকে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হতে পারে না।২৪  বিকল্প হিসেবে তিনি ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ সম্পর্কে যে অর্থপূর্ণ বয়ান দেন তা বোধগম্য ছিল না। তার মতে: ‘দেশের সংবিধান যদি অজ্ঞতাকে সচেতনতার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তা উপকারী নয় বরং ক্ষতিকর।২৫ মিলের মতে এমনতর সমস্যার একটি ‍উপযুক্ত সমাধান হলো: ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণিগুলোর উচিত সরকারকে পরিচালিত করা ‍এবং সরকারের উচিত বেকুব শ্রেণিগুলোকে পরিচালিত করা।২৬

    সময়ের সাথে সাথে সবখানেই যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কার্যপ্রণালিতে পরিণত হবে, ১৮৫০ এর দশকে তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকরী ছিল না। ‘উঁচু এবং মধ্যম সারির লোকেরা’ প্রাকৃতিকভাবেই সংখ্যার লড়াইয়ে (“বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ”) ‘বর্বর জনতার’ তুলনায় অসুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। উক্ত পরিস্থিতি আলোচ্য সমস্যার একটি অংশ ছিল। সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি ছিল ভোটাধিকার এবং এ সংক্রান্ত আরো বেশ কিছু বিষয়ে ধনী এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যাশার ভিন্নতা।

    এ সংক্রান্ত আলাপে মিল আরো একবার পরিষ্কার ছিলেন। তার মতে, গণতন্ত্র এমন নয় যে ‘জনগণ নিজেরাই নিজেদের শাসন করে। বরং তারা একটি ভাল সরকারের নিশ্চয়তা পায়।’ তার চোখে সেই ‘ভাল সরকার’ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। আইনসভা ছিল সেই ‘ভাল সরকার’ এর নমুনা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপের অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে হবসবম লিপিবদ্ধ করেছেন:

    রাশিয়া ব্যতীত গুণগতভাবে ইউরোপের সবগুলো দেশেই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহ্য কায়েম হয়ে গিয়েছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ঐতিহ্যগতভাবে সম্ভ্রান্ত শ্রেণির ক্ষমতা পুরোপুরি অবিতর্কিত না হলেও নিরাপদেই ছিল। কারণ নির্বাহী বিভাগের উপর আইনসভার ক্ষমতা ছিল নামেমাত্র। তাতে করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে আইনসভার দূর্বল প্রভাব বিদ্যমান ছিল।’২৭ 

    আইনসভা সম্পর্কে এসব খোলাখুলি সত্য ঘটনা এবং তার অসঙ্গতি সে সময়ের মানুষজনের নিকট পরিষ্কার ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনসভায় যারা যোগ দিতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন ইউরোপজুড়ে ক্ষমতাসীন সম্ভ্রান্ত শ্রেণির নিয়োগপ্রাপ্ত লোকজন। তারা ছিলেন বিত্তবান শ্রেণিগুলোর বিভিন্ন কিসিমের ওয়ারিশ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং আরো বিভিন্ন পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন। এমনতর গণতন্ত্রের চিন্তা অন্তত ‘বেকুব শ্রেণির’ মানুষদের মাথায় ছিল না। বিপরীতে ‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে উপরোক্ত পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা-ই বুঝতে হবে, এমন চিন্তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ঠিক সে কারণেই ইতিহাসের সে নির্দিষ্ট সময়জুড়ে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির এমনতর বিপজ্জনক সংজ্ঞায়ন চালু ছিল।

    মিল এবং অন্যান্যরা ধনী ও গরীবদের মাঝে গণতন্ত্র সম্পর্কে ‘বোঝাপড়ার’ যে পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। এটি ছিল একটি প্রধান সমস্যা। এক অর্থে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ বা ‘শাসক এবং শাসিতের বোঝাপড়ার সাধারণ ক্ষেত্র’ বলে কিছু ছিল না যেখানে দুই পক্ষই তাদের নিজেদের অবস্থান এবং নিয়তি সম্পর্কে অবগত থাকবে। এই ধরণের ঐতিহ্য চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ভোটাভুটির প্রক্রিয়াটি ঠেকিয়ে রাখা বা তাকে অকার্যকর করে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।

    ‘গুণসম্পন্ন ভোটের’ মাধ্যমে উক্ত উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছিল। যদিও তার পূর্বেই ‘ভরযুক্ত ভোটের’ ধারণা দিয়ে তারা হাত মশকো করেছিল। মিলের ‍উদ্ভাবিত এই ধারণাটি ছিল অভিনব।

    যদি কোনো সাধারণ অদক্ষ শ্রমিক একটি ভোট দিতে পায়, তাহলে একজন দক্ষ শ্রমিকের দুইটি ভোট থাকা উচিত। স্থানীয় কোনো মোড়ল-মাতবরের থাকা উচিত তিনটি ভোট। কারণ হিসেবে বলা যায়, তার পেশা তার কাছে থেকে সাধারণ সংস্কৃতির চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। এছাড়াও তার কিছু নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ থাকার প্রয়োজন হয়। একজন কৃষক, নির্মাণকর্মী অথবা ব্যবসায়ীর তিনটি বা চারটি করে ভোট থাকা উচিত। নিয়মতান্ত্রিক মানসিক সংস্কৃতির প্রয়োজন হয় এমন যে-কোনো পেশার ব্যক্তির জন্য পাঁচটি বা ছয়টি করে ভোট বরাদ্দ থাকা উচিত। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের জন্যেও কমপক্ষে একই পরিমাণে ভোট বরাদ্দ থাকতে
    হবে।
    ২৮

    উক্ত ‍উপায়ে বিত্তবানদের সংখ্যাবাচক অসুবিধার নিরসন করা যায়; অন্তত যতদিন পর্যন্ত না দরিদ্রেরা তাদের নিয়তিকে স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াল অব স্ট্রাফোর্ড
    শিল্পী: থমাস আলফ্রেড উলনথ
    সূত্র: ইউকে পার্লামেন্ট

    কিন্তু এমনটা হওয়ার ছিল না। ‘গুণসম্পন্ন ভোট’ ছিল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। শিক্ষাগত যোগ্যতা, সম্পদের পরিমাণ, ধর্ম, জাতি, চামড়ার রঙ, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি মনগড়া পার্থক্যের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকারকে সংকুচিত করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া চলেছিল যতদিন পর্যন্ত না জনগণ যথাযথভাবে ‘পরিপক্বতা’ অর্জন করেছিল। ১৮৬৪ সালে ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% ভোটাধিকার ভোগ করত। সে সময়ে ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকের হার ৪% থেকে ৮% এ নিয়ে যাওয়া যায় কিনা এমন একটি বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোন ‘পরিপক্কতা’ বলতে কী বোঝানো হয় তার বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। গ্ল্যাডস্টোনের মতে, ভোটারকে হতে হবে এমন একজন ব্যক্তি যার থাকবে ‘আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, সংযম, শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান, দুর্ভোগের মধ্যে সহনশীলতা, আইনের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং ঊর্দ্ধতনের প্রতি সমীহ।’২৯

    ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সালের এক শতাব্দীর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে মূলধারার আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। পূর্বে এইসব দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার ১-৫% পূর্ণবয়ষ্ক ব্যক্তির ভোটে নির্বাচিত সংসদ বা আইনসভা থেকে পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০০% পূর্ণবয়ষ্ক জনগণের অংশগ্রহণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং চলমান তীব্র অসাম্যকে আমলে নিয়েও পরিবর্তনের এই ধীর গতি মূলত শাসকশ্রেণি (‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণি) এবং শাসিতশ্রেণির (শ্রমিকশ্রেণি) মধ্যে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সার্বিক সমস্যাগুলোকেই তুলে ধরে। দমন-পীড়নের গতানুগতিক তরিকা বাদ দিয়েও এবং ধীরগতিসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে সফল এই প্রক্রিয়াটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করেছিল:

    ১) একটি অনুবর্তী সংসদীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ‍উত্থান।
    ২) শুরু থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থের সেবক হিসেবে গণমাধ্যমের বিকাশ ও প্রভাব।

    (চলবে)                     

    তথ্যপঞ্জি   

    ১ S. Bowles and H. Gintis, Democracy and Capitalism (Routledge Keegan Paul, 1986), p28.

    ২ ibid., p28.

    ৩ibid., p28.

    ৪ A. Arblaster, The Rise And Decline Of Western Liberalism (Basil Blackwell, 1984), p160.

    ৫ ibid., p160.

    ৬ E. Hobsbawm, The Age Of Revolution (Mentor, 1962), p54.

    ৭ ibid., p168.

    ৮ ibid., p42.

    ৯ ibid., p45.

    ১০ ibid., p38.

    ১১ ibid., p49.

    ১২ ibid., p49.

    ১৩ ibid., p49.

    ১৪ ibid., p173

    ১৫ A. Arblaster, op. cit., p267.

    ১৬ ibid., p265.

    ১৭ ibid., p264.

    ১৮ ibid., p265.

    ১৯ ibid., p278.

    ২০ ibid., p278.

    ২১ ibid., p279.

    ২২ ibid., p280.

    ২৩ ibid., p279.

    ২৪ ibid., p279.

    ২৫ ibid., p280.

    ২৬ ibid., p278.

    ২৭ E. Hobsbawm, The Age of Capital (Mentor, 1975), p102.

    ২৮ Norman Wintrop ed., Liberal Democratic Theory and Its Critics, (Croom Helm, 1983) p33.

    ২৯ A. Arblaster, op. cit., p273.

     

  • সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

    সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

    • আসিফ আযহার

    এটা হয়তো সম্ভব যে, আমরা সরকারকে সরিয়ে দিতে পারব। কিন্তু যদি সরকার না থাকে তাহলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দিবে কে? সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজ অর্থাৎ রাজনৈতিক সমাজের জীবনে আমরা এতোটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি যে, সরকার ছাড়া আমরা কোন সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারি না। রাজনৈতিক সমাজের সরকার এবং ক্ষমতাধরদের হাতে আমরা নিজেদেরকে এমনভাবে সঁপে দিয়েছি যে, এদের অনুপস্থিতির কথা ভাবতেও আমরা ভয় পাই।

    আমরা ধরে নিয়েছি সরকার-রাষ্ট্র ও রাজনীতিই আমাদের নিরাপত্তার উৎস। এসব না থাকলে অর্থাৎ সরকারবিহীন অরাজনৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের নিরাপত্তা কে দিবে- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে আমাদের জীবনের দিকে তাকাতে হবে। আমরা আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই এ প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর খুঁজে পাব।

    আর্টওয়ার্ক: কন্ট্রোল
    শিল্পী: লরা বারবোসা
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    সরকার আমাদের জীবনে কী ভূমিকা পালন করে? আমাদেরকে কি সরকারই বাঁচিয়ে রাখে? বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন কি আমরা সরকারের কাছ থেকে পাই? সরকার না থাকলে কি প্রকৃতি আমাদেরকে আলো-বাতাস ও খাবার থেকে বঞ্চিত করত? আপনার জীবনে সরকারের কী প্রয়োজন পড়ে? প্রকৃতির বুকে আপনার বেঁচে থাকার সাথে সরকারের কী সম্পর্ক? প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকার জন্য আপনার যে শারীরিক সামর্থ্য প্রয়োজন তা কি সরকার আপনাকে দিয়েছে?

    সরকার কি আপনাকে বার্ধক্য ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? রোগজীবাণু কি সরকারের কথা শুনবে? আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও কি সরকারের আদেশ অনুযায়ী কাজ করে? যদি এসব প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপর সরকারের কোন হাত না থাকে এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই থেকে যায় তাহলে সরকারের ওপর ভরসা কীসের? সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবনের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই- এটা হল ধ্রুব সত্য।

    মানুষ ছাড়াও অসংখ্য প্রজাতিকে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে যাদের কোন সরকার নেই। মানুষের মধ্যেও এমন অসংখ্য গোত্র ছিল যাদের কোন সরকার ছিল না। প্রকৃতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। এমনকি আজও অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেশ শিথিল। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে নেই। চরম সত্য হল, সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবন কোথাও থেমে থাকে না। জীবন জীবনের নিয়মেই চলতে থাকে।

    পৃথিবীতে জীবন এসেছে প্রাকৃতিক নিয়মের পথ ধরেই, কোন সরকারের কথায় আসেনি। কোন সরকার না থাকলেও যে জীবন প্রকৃতির নিয়মেই চলতে থাকবে তাতে কোন সংশয় নেই। বেশীদিন আগে নয়, মাত্র কয়েক শতক পূর্বেই পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে কোন সরকার ছিল না। আফ্রিকা মহাদেশের সিংহভাগ এলাকা, উত্তর আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের পুরো অঞ্চল এবং এশিয়া মহাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন সরকারের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে ছিল না।

    এসব এলাকা ছিল অসংখ্য মানুষে পরিপূর্ণ। কোটি কোটি মানুষের বসবাস ছিল এসব এলাকায়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান জাতির লোকজন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন গোষ্ঠীসমূহ, আফ্রিকার অসংখ্য নিগ্রো জাতির লোকজন, মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়, পাহাড়ী আদিবাসী গোষ্ঠী, বরফ অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়- প্রভৃতি নৃ-গোষ্ঠী পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিল সরকারবিহীন সমাজব্যবস্থা নিয়ে।

    ১৪৯২ সালে জলদস্যু কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পথ ধরে এসব অঞ্চলে ইউরোপীয়দের আগমন শুরু হয়। সেই সাথে এসব অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রবাদী সভ্যতার চরম অভিশাপ! ইউরোপীয় সরকারগুলো চারটি মহাদেশকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। স্থানীয় মানুষদেরকে তারা হয় মেরে ফেলে অথবা তাদের ক্রীতদাস বানায়।

    ইউরোপীয়রা নতুন মহাদেশগুলোর যেখানেই যায় সেখানেই ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠা করে। এসব সরকারের প্রধান কাজই ছিল স্থানীয় আধিবাসীদেরকে খতম করা কিংবা ক্রীতদাসে পরিণত করা। কেবল আমেরিকার উদাহরণ দেওয়া যাক। রেড ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে আমেরিকা দখল করতে গিয়ে আমেরিকান সরকার কম-বেশী ১৫০০টি যুদ্ধ পরিচালনা করে।

    যখন এসব যুদ্ধ শেষ হয় তখন দেখা গেল উত্তর আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি থেকে মাত্র দুই লক্ষ আটত্রিশ হাজারে নেমে এসেছে। আফ্রিকানদের যেভাবে ক্রীতদাস বানানো হয়েছে তা পৌরাণিক নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। পৃথিবীর বড়ো অংশ জুড়ে ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এমন অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতায় ভরপুর।

    চারটি দুর্বল মহাদেশে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা ‘সরকার’ কায়েম করেছিল নৃশংস গণহত্যা, জাতিগত নিধন, অন্যায় আগ্রাসন আর দাসতন্ত্র কায়েমের মধ্য দিয়ে। যদি ঐ দেশসমূহে এভাবে ‘সরকারের’ আগমন না ঘটতো তাহলে কী হতো? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পরাজিত কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জাতিগুলো এখনও পৃথিবীর বুকে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারত।

    আর্টওয়ার্ক: ইউএসএ ফর আফ্রিকা
    শিল্পী: মিশেল বাসকুয়াত
    সূত্র: কেথ হারি ফাউন্ডেশন

    সরকারগুলো এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে শক্তি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। আসলে সরকার কোনভাবেই মানুষের সহায় নয়। মানুষের সহায় হল তাদের সমাজ। অনেকেই সরকার আর সমাজের পার্থক্য বুঝে না। সরকার আর সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। সরকার হল সমাজে একটি বাড়তি সংযোজন। এটা না থাকলেও সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবেই চলতে পারবে।

    যদি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, আমরা নিজেদের জীবনের তাড়নায় এবং নিজেদের জীবনের তাগিদেই অনেক কিছু ভাবি, অনেক কিছু করি, অনেক কিছু শিখি এবং একটি সমাজজীবন গড়ে তুলি। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে মাত্র। সমাজেরই কিছু লোক নিজেদেরকে ‘সরকার’ ঘোষণা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ‘সম্মতি’ আদায় করে নেয় এবং কতকগুলো নিয়ম-কানুন চালু করে দেয়।

    যদি এ সরকার বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে আমাদের জীবনের তাগিদে যেসব কাজ করা দরকার তা আমরা করবই। আসলে আমাদের জীবন, আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের কাজ এবং আমাদের সমাজ কোন সরকারী আদেশের ফলাফল নয় বরং   জীবনের তাগিদে, বেঁচে থাকার স্বার্থে, অস্তিত্বের প্রয়োজনে আমরা যে সমাজের জন্ম দিয়েছি সে সমাজেরই একটি বাড়তি অংশ হল সরকার।

    বেঁচে থাকার জন্য সরকার নামক একটি বস্তুর প্রয়োজন- এই ভুল বিশ্বাস সরকারই আমাদেরকে শিখায়। আসলে বেঁচে থাকার সাথে সরকারে কোন সম্পর্কই নেই এবং সরকার আমাদের জীবনে হস্তক্ষেপ না করলে আমরা এর কথা ভুলেই যেতাম। যতক্ষণ না সরকার আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ছে, কোন কিছু করতে বাধ্য করছে কিংবা কোনকিছু করতে নিষেধ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের কথা আমাদের মাথায় আসার কোন কারণ নেই।

    এটি অদ্ভূত নয় যে, অধিকাংশ মানুষই মনে করে- আমরা সরকার ছাড়া চলতে পারব না যদিও বাস্তবিক অর্থে মানুষের জীবন সরকার ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সমাজ জীবনে সরকার কেবলই একটি ‘বাড়তি সংযোজন’ মাত্র। সমাজের কিছু লোক ‘সরকার’ হয়ে বাকীদের জীবনে ‘হস্তক্ষেপ’ করে মাত্র। এখন প্রশ্ন হল, সরকার না থাকলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে কে? অপরাধীদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে?

    এ প্রশ্নের উত্তরে একটি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। যদি সরকারই অপরাধী হয়ে বসে তাহলে সরকারের অপরাধ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে? চোর-ডাকাত ও ছিনতাইকারিদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমরা কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসাই। তারাই হল সরকার। এই বাড়তি ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষগুলি অর্থাৎ সরকারের লোকজন যখন সীমাহীন দূর্নীতিগ্রস্থ হয়ে ওঠে এবং জনগণের সম্পদ লুট করতে শুরু করে তখন আমরা কী করি?

    তখন আমরা সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন শুরু করি। ছোটখাটো আন্দোলনে সরকারের কিছুই হয় না। বড় বড় আন্দোলনে অনেক সময় সরকারের পতন ঘটে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর আগের সরকারের মতোই দূর্নীতিগ্রস্থ ও লুটেরা হয়ে ওঠে। জনগণ আবারও আন্দোলন শুরু করে। এভাবে ক্ষমতার পালাবদল চলতে থাকে কিন্তু জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।

    সারা দেশে যতো চোর-ডাকাত রয়েছে তারা সারা জীবনে যে পরিমাণ সম্পদ আয় করে- একটি দূর্নীতিবাজ সরকার একদিনেই তার চেয়ে অনেকগুণ বেশী সম্পদ লুট করে। দূর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, গণহত্যা, পুলিশী অত্যাচার- এ সবই হল সরকারের কাজ। তাহলে সরকারের সাথে জনগণের নিরাপত্তার কী সম্পর্ক থাকল?

    যে সরকার মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা সেই সরকারের বিরুদ্ধে যদি জনগণকে আন্দোলন করতে হয় তাহলে সরকারকে দিয়ে লাভটা কী হল? সরকারের দূর্নীতি ও অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে পারি তাহলে চোর-ডাকাতের মতো মামুলী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেন আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে পারব না? এ কাজের জন্য কি আদৌ সরকারের প্রয়োজন আছে? একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক।

    ধরুন, আপনি আপনার প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করেন না এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনাকে বিশ্বাস করে না। আপনি সবসময়ই আপনার প্রতিবেশীর তরফ থেকে যেকোন অনাচারের আশংকা করেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার তরফ থেকে বিপদের ভয় করে। এমতাবস্থায় মুগুরভাজা শরীর নিয়ে দুজন লোক এসে প্রস্তাব দিল যে, তারা আপনাদের উভয়ের মধ্যে অবস্থান করে আপনাদেরকে নিরাপদে রাখতে রাজী আছে।

    তারা উভয়ের ব্যাপারেই নিরপেক্ষ থাকবে এবং কাউকেই অন্যের ক্ষতি করার সুযোগ দিবে না। বিনিময়ে তাদেরকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। আপনারা উভয়েই এ প্রস্তাবে সানন্দে রাজী হয়ে গেলেন এবং উভয়ের মধ্যবর্তী কিছু জায়গা তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। কিছুদিন পর দেখা গেল, আপনারা উভয়েই ঐ লোক দুটোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এবং তারা যেভাবে খুশী সেভাবে আপনাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে।

    এই পরিস্থিতিতে আপনি আপনার প্রতিবেশীর সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে লাগলেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে শুরু করল। কিন্তু দেখা গেল, মাঝখানের লোক দুটো কোনভাবেই চায় না যে, আপনাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপিত হোক। তারা সম্প্রীতির সকল চেষ্টাই বানচাল করে দিতে শুরু করল।

    শেষ পর্যন্ত আপনারা উপলব্ধি করতে পারলেন যে, আপনাদের উভয়ের বড়ো শত্রু হল ঐ বাড়তি লোক দুটো। এবার আপনাদের বিশ্বাস হলো যে, আপনাদের সমস্যা সমাধানে আপনারা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাড়তি কোন লোকর প্রয়োজন নেই। বাড়তি লোক দুটোর ভূমিকা আপনাদের সমস্যায় কেবলই একটি বাড়তি ‘হস্তক্ষেপ’ মাত্র। আপনাদের নিরাপত্তার মালিক আপনারাই।

    আপনাদের উভয়ের মধ্যে একটি ‘আন্তরিক সমঝোতাই’ আপনাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। বাড়তি লোকের হাতে নিজেদের নিরাপত্তা তোলে দেওয়ার নাম ‘জিম্মি অবস্থা’। এভাবে নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না। এসব উপলব্ধি আপনাদেরকে একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্য করল। আপনারা উভয়েই সম্মত হলেন যে, আপনাকে নিজের নিরাপত্তার খাতিরে অন্যের নিরাপত্তার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে হবে।

    বাস্তব প্রয়োজনই এভাবে আপনাদেরকে একটি ‘যৌথ অঙ্গীকারে’ আবদ্ধ করল যা একসময় আপনাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এই অসম্ভব সম্ভব হয়ে যাওয়ায় আপনাদের আর বাড়তি লোক দুটোর প্রয়োজন হল না। নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারায় ঐ বাড়তি লোক দুটোকে আর কোন সুবিধা দিতে আপনারা উভয়েই অস্বীকার করলেন এবং উভয়ে মিলেই তাদেরকে তাড়িয়ে দিলেন। সরকারকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটাও একইরকম।

    পারস্পরিক নিরাপত্তার অঙ্গীকার বা চুক্তিই যদি আমাদের নিরাপত্তার উৎস হয় তাহলে সরকারের কোন প্রয়োজন পড়ে না। যদি সরকার না থাকে আর আপনি যদি কারও গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন তাহলে সেও আপনার গালে পাল্টা চড় বসিয়ে দিবে। আর যদি সে দুর্বল হয় তাহলে কি আপনি বেঁচে যাবেন? না, তা নয়। আপনার চেয়ে সবল কেউ এসে আপনার গালে চড় বসিয়ে দিলে আপনি কি করবেন? তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই সবাইকে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

    মৎস নীতি ব্যাপারটা কী? আপনারা দেখবেন, একেবারে ছোট ছোট মাছগুলোকে তাদের চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। সেই বড়ো মাছকে তার চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। আর সবচেয়ে বড়ো মাছটির কী হয়? তাকেও বাগে পেলে অন্য কোন প্রাণী খেয়ে ফেলে। মানুষের যেহেতু মাথা এবং বুদ্ধি আছে সেহেতু তারা নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য।

    ‘পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা নীতি’ কতোটা স্বাভাবিক এবং কতোটা যৌক্তিক কারণেই অনিবার্য তা বুঝতে নিশ্চয়ই আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না। সরকার নামক একটি বাড়তি উপদ্রব যা কেবল বেইমানী এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্যেই নিমজ্জিত তার হাতে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহায়তা চুক্তি করে নেওয়াটা কি অনেক বেশী বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

    তাহলে দেখা গেল, আমাদের নিরাপত্তা আসলে আমাদের হাতেই। অন্য কারও হাতে সেটা তুলে দিলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরকারের হাতে আমরা যেভাবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দেই তাতে আমরা সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতির কুফল এটা। নিরাপত্তার একতরফা নীতি হল- জনগণের নিরাপত্তা থাকবে সরকারের হাতে কিন্তু সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকবে না।

    এর ফলে যদি সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বসে তাহলে জনগণের করার কিছু থাকে না। কারণ- জনগণের হাতে ভঙ্গ করার মতো কোন প্রতিশ্রতি নেই; সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকে না। সরকারের নিরাপত্তা থাকে সরকারের হাতেই। সরকারী লোকজনের নিজেদের হাতেই নিজেদের নিরাপত্তা থাকায় তারা সংখ্যালঘু হয়েও শক্তিশালী। অন্যদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে না থাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও দুর্বল।

    সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসল রহস্য এটাই। এখন আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন সরকারই সবসময় শক্তিশালী হয়ে থাকে! নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতিই এর কারণ। কিন্তু যদি ব্যাপারটা একতরফা না হয়ে দ্বিপক্ষীয় হতো তাহলে কেমন হতো? সেক্ষেত্রে সরকারের কোন ক্ষমতাই থাকত না; সরকারের সকল কর্তৃত্বই লোপ পেয়ে যেতো। কিন্তু এরকম কোন সরকারের অস্তিত্ব সম্ভবই নয়।

    কারণ- সরকার মানেই হল: জনগণের চেয়ে এর ক্ষমতা বেশী হবে। জনগণের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে কিন্তু সরকারের ওপর জনগণের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। পুলিশ, সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, জনগণ নয়। এসব বাহিনীর প্রধান কাজই হবে সরকারকে টিকিয়ে রাখা, জনগণ কিংবা বহিরাগত শক্তির হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করা। বিদ্রোহী জনগণের কোন বাহিনীকে সরকার কখনোই মাথা তোলে দাঁড়াতে দেবে না। জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে সরকার সমসময়ই শক্তি দিয়ে দমন করবে।

    যদি এসব শর্তের ওপর কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত না থাকে তাহলে সেটাকে আর সরকারই বলা যাবে না। সেটাকে বলতে হবে সামাজিক সংগঠন। ঐ সমাজটিও আর রাজনৈতিক সমাজ থাকবে না। সেটি হয়ে যাবে অরাজনৈতিক সমাজ। সামাজিক প্রয়াসে ‘সামাজিক সংগঠন’ এবং ‘সামাজিক ব্যবস্থাপনা’ দ্বারাই সে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হবে। এর প্রতিরক্ষাও নিশ্চিত হবে ‘সামাজিক শক্তি’ দ্বারা।

    বিশেষ কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং পারস্পরিক সহায়তা নীতির ভিত্তিতে সে সমাজ চলবে এবং এর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। সে সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হবে ‘মিউচুয়াল’ অর্থাৎ যারা নিরাপত্তার কাজ করবে তাদের অস্তিত্বও নির্ভর করবে জনগণের সমর্থনের ওপর। সরকারী কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সে সমাজে থাকবে না।

    আসলে পৃথিবীতে সমাজের উৎপত্তি এবং সামাজিক জীবনের বিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, মানুষের সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে মূল বিষয় হিসেবে কাজ করেছে ‘যৌথ স্বার্থ’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা’ ও ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’। ‘কর্তৃত্ব’ ব্যাপারটা এসেছে অনেক পরে, সমাজ গঠনের জন্য এটা কোন অনিবার্য শর্ত নয়। এটা হল মানুষের সমাজে একটি ‘বাড়তি সংযোজন’।

    মানুষকে তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই সমাজ গড়ে তোলতে হয়েছে। যেসব যৌথ প্রয়োজন এবং স্বার্থে মানুষ সমাজের জন্ম দিয়েছে সেগুলো পূরণের জন্য সরকারের অস্তিত্ব মোটেও জরুরি নয়। যদি সরকার না-ও থাকে, মানুষ যেসব প্রয়োজনে সমাজ গড়ে তোলেছিল সেসব প্রয়োজনেই সমাজকে টিকিয়ে রাখবে। যদি আপনি মনে করেন, সমাজ থেকে সরকারী কর্তৃত্ব দূর হলে সমাজ ভেঙ্গে পড়বে তাহলে আপনি এস্কিমো ও বেদূইনদের সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

    ওদের সমাজে তো সরকার নেই। তাহলে ওদের সমাজ ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? সারা দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য আদিবাসী, পাহাড়ী, মরুবাসী, বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী এবং এশিয়া ও আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে বসবাসকারী গ্রামীন সমাজগুলো- যাদের মধ্যে সরকারের অস্তিত্ব খুবই দুর্বল কিংবা প্রায় নেই বললেই চলে- তাদের সমাজগুলো ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? কৃষিকাজ, আয়-অর্থনীতি, বিচার, লেনদেন, কলহ নিষ্পত্তি- সবকিছুই তো তাদের সমাজে আছে। সরকার ছাড়াই এতকিছু কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা একবার ভেবে দেখুন।

    আর্টওয়ার্ক: কো-অপারেশন
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    হ্যাঁ, আপনার কাছে মনে হতে পারে এসব সমাজ তো খুবই অনুন্নত। কিন্তু এই অনুন্নত হওয়াটা কারণটা তো মোটেই সরকারের অনুপস্থিতি নয়। আপনি যদি সমাজ সম্পর্কে নূন্যতমও ধারণা রাখেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে, তাদের অনুন্নতির কারণটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়। ঐ সমাজগুলোতে সরকার ও রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে তাদের মাথায় একটি বাড়তি অপচয় ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। উন্নতির জন্য তাদের প্রয়োজন হল- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করা।

    যেসব সমাজে সরকারের অস্তিত্ব দূর্বল কিংবা সরকারের উপস্থিতি নেই সেসব সমাজেও মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এসব বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুন্নত হলেও এটুকু প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে, যেখানেই সমাজ থাকবে সেখানেই বিচার ও নিরাপত্তা থাকবে, এর জন্য সরকার গঠনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

    আপনি আপনার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা জড়ো করলে দেখতে পাবেন যে, মানুষ তাদের বাস্তব প্রয়োজনেই সমাজের সাথে এমনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে যাতে সমাজের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহায়তা পাওয়া যায়। সরকার থাকুক বা না থাকুক, সমাজের সকল মানুষ সবসময়ই সামাজিক সম্পর্কের জালে আবদ্ধ থাকে। এই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই পারস্পরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিহিত।

    সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনে। মানুষ তাদের বস্তুগত এবং মনোজাগতিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে। সরকার সমাজ সৃষ্টি করেনি, সমাজ সৃষ্টি হওয়ার বহু পরেই সরকারের সৃষ্টি হয়েছে। সমাজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের প্রয়োজন ও স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে। অন্যদিকে সরকার বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সমাজে জোর-জুলুম, ক্ষমতা ও শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

    সরকারবিহীন সমাজের সাথে সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া ব্যবস্থাপনা দ্বারাই সরকারবিহীন সমাজ পরিচালিত হবে, সমাজকে পরিচালনার জন্য কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়া হবে না। আরও দশটি বিষয়ের মতোই বিচারকাজ ও অপরাধ দূরীকরণের কাজটিও সরকারবিহীন সমাজের স্বাধীন ব্যবস্থাপনা দ্বারাই নিশ্চিত করা সম্ভব।

    যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের মানুষের ওপর ভরসা না করেন একারণেই যে, তাদের ওপর কোন কর্তৃত্ব ও খবরদারী না থাকায় তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে তাহলে তো বর্তমান সরকারের ওপরেও আপনার ভরসা থাকার কথা নয়। সরকার বলতে তো কিছু মানুষকেই বোঝায়। সেই ক্ষমতাবান মানুষগুলোর ওপরে তো কর্তৃত্ব ও খবরদারী করার কেউ নেই। এদের ওপর কীভাবে আপনি ভরসা রাখতে পারেন?

    এবার আপনি ভেবেচিন্তে বলুন তো, মানুষের হাতে ক্ষমতা না থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী নাকি হাতে ক্ষমতা থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে? অপরাধ করেও পার পেয়ে যায় কারা? ক্ষমতাবানরা নাকি ক্ষমতাহীনরা? এবার আপনি বলুন তো, সরকারবিহীন সমাজ অর্থাৎ যে সমাজের মানুষের হাতে কোনরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকবে না সে সমাজের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার ভয় কি আপনি এখনও করেন?

    সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে যদি আপনার সংশয় থাকে তাহলে বর্তমান সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কি আপনার দ্বিগুণ সংশয় থাকা উচিত নয়? আপনি যদি সরকারবিহীন সমাজের কর্তৃত্বহীন মানুষের তরফ থেকে অপরাধের ভয় করেন তাহলে বর্তমান সমাজের ক্ষমতাবানদের তরফ থেকে কি আরও বেশী অপরাধের ভয় করা উচিত নয়?

    যদি আপনি প্রশ্ন তোলেন যে, সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে কি না তাহলে বর্তমান সমাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলুন যে, এই সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে ক্ষমতাবানদের অপরাধ থেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা। যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দাবী করেন তাহলে আপনি বর্তমান সমাজের কাছ থেকেও নিশ্চয়তা দাবী করুন। বর্তমান সমাজ কি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, এই সমাজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত সরকার কখনও দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী হয়ে উঠবে না?

    সরকারবিহীন সমাজে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তোলে দেওয়া হবে না। সে সমাজের একজন কর্তৃত্ববিহীন মানুষ যদি কোন অপরাধ করেও বসে তাহলে কি সেটা খুব বড় অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারবে? হাতে ক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষ কতটুকু অপরাধ করতে পারে? সরকারবিহীন সমাজের অপরাধের মাত্রা কি বেশ সঙ্গত কারণেই সীমিত হয়ে পড়ে না?

    বর্তমান সমাজে যেভাবে মানুষের হাতে বিপুল ক্ষমতা তোলে দেওয়া হচ্ছে তাতে কি বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে না? হাতে বিপুল ক্ষমতা না থাকলে কি কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করে? হাতে ক্ষমতা থাকায় বর্তমান সমাজের অনেকেই বড় ধরণের অপরাধ ও দুর্নীতি করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে ধরার কেউ নেই। বর্তমান সমাজে কি এই মৎস নীতিই চলছে না? আমাদের কি বর্তমান সমাজ নিয়েই সবচেয়ে বেশী শঙ্কিত থাকার কথা নয়?

    আর্টওয়ার্ক: স্টপ পোলিস
    গ্রাফিতি
    সূত্র: কোপওয়াচ

    বর্তমান সমাজে কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকেই বলেন যে, সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনের জন্য কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসানো আবশ্যক। কিন্তু এ ধরণের যুক্তি যে কতোটা অসার ও খোঁড়া তা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আপনি পেয়ে যাবেন। সমাজের মানুষকে অপরাধ থেকে নিরস্ত করার জন্য যদি ক্ষমতাবান পাহারাদার গোষ্ঠী নিযুক্ত করতে হয় তাহলে সেই পাহারাদার গোষ্ঠীর ওপরেও তো পাহারা বসাতে হবে। কারণ- তারাও তো মানুষ এবং ক্ষমতায় বসে তারাও তো অপরাধ করতে পারে।

    কিন্তু বর্তমান সমাজে পাহারাদারদের ওপরে পাহারাদারীর কেউ নেই। তাই তারা ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একটা বিষয় মনে রাখবেন, চোরের ভয়ে যদি আপনি ডাকাতকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসেন তাহলে আপনার বাড়িটাই বেদখল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার বাড়িতে চুরি হলে বাড়িটা অন্ততঃ বেঁচে যাবে। তাই ডাকাতকে ডেকে আনার চেয়ে অরক্ষিত থাকাই ভালো। ডাকাত দিয়ে প্রতিরক্ষা হয় না।

    এই সহজ উপমাটা আপনাকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে, সরকারবিহীন সমাজ নিয়ে আপনার মনে যতোই অনিশ্চয়তা থাকুক- বর্তমান সমাজের চেয়ে খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনা সে সমাজে নেই। এই প্রবন্ধের প্রথম দিকে বিভিন্ন মহাদেশে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আগ্রাসনের যে নামমাত্র উল্লেখ করা হয়েছে তা যদি বিস্তারিতভাবে আপনার সামনে তোলে ধরা হয় তাহলে আপনি সহজেই স্বীকার করবেন যে, সরকার ছাড়া এতো ভয়ংকর অপরাধ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

    এতক্ষণে আপনি হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, সমাজ থেকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দূর হলে অপরাধও দূর হয়ে যাবে। বৃহৎ অপরাধ সরকারের হাতেই সংঘটিত হয়। সরকারকে বিশ্বাস করার অর্থ হল, সমাজকে অবিশ্বাস করা। আর সমাজকে অবিশ্বাস করার অর্থ হল নিজেই নিজেকে অবিশ্বাস করা। আপনিই সমাজ, আপনারা মিলেই সমাজ। সরকারের হাতেই সমাজ সবচেয়ে বেশী অরক্ষিত।

    সরকারবিহীন সমাজকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকার মানে হল, নিজেই নিজেকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকা করা। তার চেয়ে বরং সরকারকে নিয়েই আশংকা করুন। সরকার মানেই হল ধোঁকাবাজ, লুটেরা ও নিপীড়ক শক্তি। তাই সরকারের হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন যে, আমরা এর হাতে কতোটা নিরাপদ। আসুন, কর্তৃত্ববিহীন সমাজের ক্ষমতাবিহীন মানুষকে নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার আগে ক্ষমতাবান ও বেপরোয়া সরকারকে নিয়ে শঙ্কিত হই।

     

  • জীবাণু যুদ্ধের ইতি?

    জীবাণু যুদ্ধের ইতি?

    • মফিজুল হক

    প্রথম কিস্তি

    এখন সমস্ত পৃথিবী করোনা কম্পিত। এর মূলে আছে চীনের উহান শহরে এক ভাইরাসের দৃশ্যমান  আক্রমণ। এই ভাইরাস সমস্ত পৃথিবীকে সন্ত্রস্ত করে ফেলেছে। শুধু তাই নয় এই অতিআণুবিক্ষণিক ভাইরাসটি ২০০০ বছরেরও বেশি বয়সী বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এটি করোনা ঘরানার এক ভাইরাস এবং এর ইংরেজি নাম SARS-CoV-2। এই ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ বা অচল করার পাশাপাশি একাধিক অঙ্গ অচল করে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি মানুষের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধকে সাড়াকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সমর্থ হয়। এর আদি পুরুষের নাম SARS। উইকপিডিয়ার মতে করোনা ঘরানার প্রথম সার্স ভাইরাসটি প্রতিবেদিত হয় ২০০২-২০০৩ এর দিকে। তারপর এর একাধিক সংস্করণ বের হয়, সার্সের (Severe Acute Respiratory Syndrome) পর মার্স বা মের্স (Middle East Respiratory Syndrome)। প্রথম দিকের সার্স ভাইরাসগুলোর মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিক্রিয় করে ফেলার সক্ষমতা ছিল না। করোনা ঘরানার সর্বশেষ সার্স এই ভাইরাসটি বৈশ্বিক আতঙ্কের রূপ ধারণ করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা বেটাকরোনা গোত্রের (… the spike (S) glycoprotein, that mediates cell entry and membrane fusion. SARS-CoV-2 S gene encodes 22 N-linked glycan sequons per protomer, which likely play a role in immune evasion and occluding immunogenic protein epitopes.১। অর্থাৎ এটি একটি নতুন ধরনের সার্স-কোভি (SARS-CoV) এবং তারা এর নামকরণ করেছেন সার্স-কোভি-২। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরে এর নামকরণ করেছে Covid-19। কিন্তু করোনার তথা সার্স- কোভি-২ এর সাথে যুদ্ধের কী সম্পর্ক? তাও আবার জীবাণু যুদ্ধের? এমন প্রশ্নও করা যেতে পারে যে এমন কাজ কি আদৌ সম্ভব? শেষোক্ত প্রশ্নটির উত্তর হলো— তেমন করা অবশ্যই সম্ভব এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বর্তমান পর্যায়ে উপযুক্ত স্থানে এটা দক্ষ ভাইরোলজিস্ট বা অনুজীব বিজ্ঞানীর পক্ষে সহজেই করা সম্বব২।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড ক্রুসেড
    শিল্পী: ধ্রুবী আচারিয়া
    সূত্র: গুড হোমস

    এই ধরনের কাজকে আরএনএ সম্পাদনা (RNA editing) বলা হয়। আমি পাঠকদের সুবিধার একটি অনলাইন গোলটেবিলের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছি “Francis Boyle is well known for opining that COVID-19 is an engineered biological weapon, not a naturally-occurring mutation. He argues that the novel coronavirus appears to be engineered for “gain of function,” meaning that its ability to infect humans due to its perfectly-structured spike protein is the telltale sign of a bioweapon. Boyle’s view was recently supported by a new study led by vaccine researcher Nikolai Petrovsky of Flinders University in Australia, which compared the coronavirus spike protein’s ability to bind to human versus animal cells. The study found that COVID-19’s spike protein is perfectly tailored to powerfully bind with human cells, but cannot bind efficiently with cells from a large number of sampled animal species. Therefore, the authors conclude, the virus cannot have jumped to humans from any animal intermediary. Instead, it must have become specialized for human penetration by “living” in human cells. There is only one plausible mechanism by which the virus could have existed in human cells long enough to become so perfectly specialized: It must have been introduced into human cell cultures in a laboratory. Germ warfare scientists would have taken a bat coronavirus, put it into cultured human cells, and run it through many generations, selectively breeding the virus to get better and better at binding with human cell receptors.”৩ [ফ্রান্সিস বোয়েল একজন আন্তর্জাতকি আইনের অধ্যাপক এবং জৈব অস্ত্র গবেষণা বিরোধী ব্যক্তিত্ব। তার মতে ভাইরাসটি উহান ইন্সিটিটউট অফ ভাইরোলজিতে তৈরি হয়েছে।]

    সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে আমি উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসাভেনির কয়েকটি কথা উদ্ধৃত করছি: … The army in this war is without mercy. It is without any milk of human kindness. It is indiscriminate— it has no respect for children, women, or places of worship. This army is not interested in spoils of war. It has no intention of regime change. It is not concerned about the rich mineral resources underneath the earth. It is not even interested in religious, ethnic or ideological hegemony. Its ambition has nothing to do with racial superiority. *It is an invisible, fleetfooted, and ruthlessly effective army*… আমি যাকে জীবাণু যুদ্ধ বলছি তিনি তাকে জীবাণু সৈনিক বলছেন এবং উইকিপিডিয়াতে জীবাণুযুদ্ধকে জৈব যুদ্ধ বলা হয়েছে। উইকিপিডিয়ার মতে— Biological warfare (BW)— also known as germ warfare— is the use of biological toxins or infectious agents such as bacteria, viruses, insects, and fungi with the intent to kill or incapacitate humans, animals or plants as an act of war.

    জীবাণু যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ক্রমপঞ্জী পেতে হলে এখানে দেখুন৪। এখনকার কোভিড-১৯ নামের বিশ্বমারীর গোড়ায় আছে জীবাণু যুদ্ধ। যুদ্ধের এমন ধারাণা কৌশল একেবারে নতুন নয় বরং সেই প্রাচীন কাল থেকেই চলছে। এক সময় তীর বা বর্শায় ফলায় বিষ মিশিয়ে সেই তীর ছুঁড়ে দেওয়া হতো শত্রুর দিকে। আমাজনের আদিবাসীরা বিষাক্ত সুই বাঁশে ফু দিয়ে ছুঁড়ে প্রাণী বা শিকারকে অবশ করে ফেলতো। মধ্যযুগে প্লেগকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৩ পর্যন্ত ইয়োরোপীয় শক্তিগুলো সাত বছর স্থায়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেই যুদ্ধে শত্রুদের গুটি বসন্তের বীজ সংক্রামিত কম্বল দিয়ে ঘায়েল করার পরিকল্পনার দালিলিক প্রমাণও আছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হামাস নেতা খালেদ মেশালের কানে বিশেষভাবে তৈরি ফেন্টানাইল (এক ধরনের মাদকদ্রব্য) ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যার চেষ্টা স্মরণ করা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের এজেন্টরা কানাডীয় পাসপোর্ট নিয়ে জর্ডানে প্রবশে করে এবং সেখানে বসবাসরত হামাস নেতা খালেদ মেশালের কানের ভেতর বিশেষভাবে তৈরি করা ফেন্টানাইল প্রয়োগ করে তাকে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু মেশালের দেহরক্ষীর সতর্কতার দরুন অভিযানটি ব্যর্থ হয় এবং আক্রমণকারীরা ধরা পড়ে যায়। খালেদ মেশালের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে দাঁড়ালে ইসরায়েল এবং জর্ডানের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাবার উপক্রম হয়। মেশালের দেহে কোন বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে তা না জানার কারণে জর্ডানের বাদশা হুসেন ইসরায়েলের কাছে বিষের অ্যান্টিডোট দাবী করেন। তা না হলে ধৃত মোসাদ চরদের বিচারের আওতায় আনার হুমকি প্রদানসহ যুদ্ধ ঘোষণারও হুমকি দেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের মধ্যস্থতায় এক পর্যায়ে ইসরায়েল অ্যান্টিডোট দিতে রাজি হলে বাদশাহ হুসেন ইসরাইল থেকে তা সরাসরি নেবার বদলে তার ফর্মুলা দাবী করেন এবং শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে চিকিৎসা পদ্ধতিটি জর্ডানকে হস্তান্তর করতে হয়। খালেদ মেশাল সুস্থ হন। বিনিময়ে জর্ডান মোসাদের এজেন্টদের ছেড়ে দেয়। এসংক্রান্ত একটি অডিও এবং উইকিপিডিয়ার খালেদ মেশাল সংক্রান্ত পেজটি এখানে পাওয়া যাবে৫। ইসরায়েল বিডাব্লিউ কনেভেনশনে সই করেনি এবং এখনো জৈব অস্ত্রের গবেষণা অব্যাহত রেখেছে।

    দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শেষে বহু দরকষাকষির পর ১৯২৫ সালে জেনেভা কনভেনশন করা হলেও এই কনভেনশন রাসায়নিক বা জৈব অস্ত্রের বিস্তার রোধ বা একে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় ১৯৭৫ সালে আলাদাভাবে বায়োলজিকাল উইপনস কনভেনশন করা হয় (BWC) এবং বিশ্বের প্রায় সব দেশই তাতে স্বাক্ষর করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৯ সালে দাপ্তরিকভাবে এর জীবাণু যুদ্ধের গবেষণা পরিত্যাগ করেছে বলে দাবী করছে। তারা বলে “The United States shall renounce the use of lethal biological agents and weapons, and all other methods of biological warfare. The United States will confine its biological research to defensive measures such as immunization and safety measures.” ৬। এটা করা হয় রোনাল্ড রিগান যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন। আমি উইকিপিডিয়ার United_States_biological_weapons_ program অংশ থেকে একটি গবেষণাধীন জীবাণু এবং বিষের একটি তালিকা তুলে ধরছি, In addition to the agents that were ready to be used, the U.S. program conducted research into the weaponization of more than 20 other agents. They included: smallpox, EEE and WEE, AHF, Hantavirus, BHF, Lassa fever, Coronavirus,[36] melioidosis,[36] plague, yellow fever, psittacosis, typhus, dengue fever, Rift Valley fever (RVF), CHIKV, late blight of potato, rinderpest, Newcastle disease, bird flu, and the toxin ricin. তা সত্ত্বেও, অনেক দেশ বিডাব্লিউসি সই করা সত্বেও, এখনো গোপনে জীবাণু যুদ্ধের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকা সেপ্টেম্বর ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০০ মিলিয়ন ডলার জৈব অস্ত্র গবেষণায় ব্যয় করেছে৭। পাঠক কি লক্ষ্য করেছেন ওপরের জীবাণু গবেষণার তালিকাটিতে করোনা ভাইরাসও রয়েছে। তবে এই তালিকাটিতে একটি ভাইরাস অনুপস্থিত। সেই ভাইরাসটি হল HIV। এইচআইভি নিয়ে আমি অন্য কোথাও এবং পরে আলোচনার আশা রাখি।

    মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ আখ্যায়িত করেছেন। একদল বিজ্ঞানী প্রকাশ্যেই বলছেন এটা প্রাকৃতিক ভাবেই হয়েছে। তারা মনে করছেন ভাইরাসটি হয়তোবা এক দশক বা তারও আগে প্রাণী থেকে মানবদেহে প্রবেশ করেছে৮। যদি তাই হয় তাহলে প্রথমত: মার্কিনীরা কেন একে চীনা ভাইরাস বলতে চায়? দ্বিতীয়ত: হয়তো বা সেই একই কারণে এক দশক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ফ্লুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০১০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৭,০০০, ২০১১ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ছিল ১২,০০০, ২০১২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ছিল ৪৩,০০০, ২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ছিল ৩৮ হাজার, ২০১৪ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ছিল ৫১,০০০, ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ছিল ২৩,০০০, ২০১৬ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ছিল ৩৮,০০০ এবং ২০১৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ছিল ৬১,০০০ ৯। এই বছরের (২০২০) অঘোষিত সংখ্যাটি ৮০,০০০ (অনির্ভরযোগ্য)। কিন্তু এত মৃত্যু সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পৃথিবীর মানুষ এতটা আতঙ্কিত ছিল না। এক দশক আগেই এই ভাইরাসটি আবির্ভূত হলে এত দিনে আমরা এইচআইভির মতো মোটামোটিভাবে কাজ করে এমন একটি ভ্যাকসিন পেয়ে যেতাম। কেননা তখন সীমিত আকারে হলেও এখনকার মতই আতঙ্ক তৈরি হতো এবং গবেষণা ও একে প্রতিরোধ করার কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেত। ওপরে এসসিএমপির যে প্রতিবেদনের কথা বলা হয়েছে আমি তার থেকে সরাসরি কিছুটা উদ্ধৃত করছি: Though there could be other possibilities, the scientists said the coronavirus carried a unique mutation that was not found in suspected animal hosts, but was likely to occur during repeated, small-cluster infections in humans.

    যদি আসলেই তেমন হয়ে থাকে সেই মানব গোষ্ঠীর এতদিনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কথা। আমরা বিগত ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে রোগ-বাইলাইর কারণে কোনো মানব গোষ্ঠীর (ছোটো বা বড় এমনকি পাড়া বা মহল্লা পর্যায়েও) নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার কথা শুনতে পাইনি। তাহলে সেই ‘রিপিটেড স্মল-ক্লাস্টার ইনফেকশনস’ কোনো গবেষণাগারে হয়েছিল? বিজ্ঞানীদের মতামত কিন্তু সাধারণভাবে এমন ধারণার পক্ষেই বলছে:

    “The analysis explains that there is still no clear evidence to point to a precise origin of the virus. The researchers explained, based on the genetic makeup and samples of the virus, it remains unclear whether SARS-CoV-2 adapted inside an intermediary animal host, within a human, or in a laboratory setting. It could have potentially jumped from species to species within a lab.

    “Even the possibility that a non-genetically-engineered precursor could have adapted to humans while being studied in a laboratory should be considered, regardless of how likely or unlikely,” the authors wrote.”১০।

    আর যদি তাই হয় তাহলে একথাও বলা যাবে যে, সেই সিআরএসপিআর গবেষণাগারটি চীনের কোথাও ছিলো না। [(CRISPR https://en.wikipedia.org/wiki/CRISPR নিয়মিত ছেদসম্বলিত গুচ্ছের ক্ষুদ্র প্যালিনড্রমিক (উল্টো দিক থেকে শুরু করলেও যার উচ্চার বা বিস্তিৃতির কোনো পরিবর্তন হয় না) পুনরাবৃত্তিমূলক সংক্রমণ বা সঞ্চালন।] একজন মার্কিন গবেষক উহানের ভাইরাস গবেষণাগার সম্পর্কে বলছেন এটা একটা অত্যাধুনিক এবং চার স্তর নিরাপত্তা বিশিষ্ট গবেষণাগার। তিনি এই গবেষণাগারের সাথে মার্কিন সহায়তাপ্রাপ্ত একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন। তার ভাষ্য: “I know that we worked together to develop very stringent safety protocol, and it’s highly unlikely this was a lab accident,” Jonna Mazet, professor of epidemiology and disease ecology at the UC Davis School of Veterinary Medicine, told Business Insider. … … “If you look at the labs in Southeast Asia that have any coronaviruses in culture, there are probably two or three and they’re in high security,” he said. “The Wuhan Institute of Virology does have a small number of bat coronaviruses in culture. But they’re not [the new coronavirus], SARS-CoV-2. There are probably half a dozen people that do work in those labs. So let’s compare 1 million to 7 million people a year to half a dozen people; it’s just not logical.”১১। কিছু বিজ্ঞানী দাবী করছেন যে কিছু জৈব নিরাপত্তা স্তর-২ (বিএসএল-২) গবেষণাগার সার্স-কোভি নিয়ে গবেষণা করছে এবং এই গবেষণাগারগুলো থেকে সার্স-কোভি ভাইরাসটি বেরিয়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব১২। যদি তাই হয়ে থাকে তবে সেটি আমেরিকান সিডিসির ২০০৪ সালের দেয়া সার্স-কোভি নিরাপত্তা গাইডলাইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন১৩। কোনো জৈব নিরাপত্তা স্তর-২ (বিএসএল-২) বিশিষ্ট গবেষণাগারের সার্স-কোভি নিয়ে গবেষণার অনুমতি নেই এবং তা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রথারও পরিপন্থী। তবে এই গবেষণাপত্রের উপসংহারে লেখকরা স্বীকার করছেন যে ভবিষ্যতে গবেষণা বা প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত তাদের বর্তমান ধারণার বিপক্ষে চলে যেতে পারে। শুধু তাই নয় এই একই লেখায় বলা হচ্ছে  “… New polybasic cleavage sites have been observed only after prolonged passage of low-pathogenicity avian influenza virus in vitro or in vivo”. যদি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জায় ক্রমাগত সঞ্চালনের মাধ্যমে পলিবেসিক ফিউরিন খাঁজ— এই খাঁজটিই ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে দেহের কোষের সাথে সংযুক্ত করতে অর্থাৎ সংক্রমণ সৃষ্টিতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে— তৈরি করা যায় তাহলে তা সার্স-কোভির ক্ষেত্রেও করা যাবে। লেখকরা আরো বলছেন, “… Furthermore, a hypothetical generation of SARS-CoV-2 by cell culture or animal passage would have required prior isolation of a progenitor virus with very high genetic similarity, which has not been described.Subsequent generation of a polybasic cleavage site would have then required repeated passage in cell culture or animals with ACE2 receptors similar to those of humans, but such work has also not previously been described.” এখন প্রশ্ন হলো এই কাজটি যদি কোনো সামরিক জীবাণু গবেষণাগারে করা হয়ে থাকে তবে তা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব?

    অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত পাওয়া জিনগুলো বিশ্লেষণ করে বলছেন উহানে যে ভাইরাসটি পাওয়া গেছে সেটি আমেরিকাতে যে ভাইরাসটি পাওয়া গেছে তার একটি সাবটাইপ। অর্থাৎ উহানের ভাইরাসটি মার্কিন ভাইরাসের উত্তরসূরী। মার্কিন ভাইরাসটি উহানে প্রাপ্ত ভাইরাসের উত্তরসূরী নয়১৪। সর্বশেষ গবেষণা তথ্য অনুযায়ী সার্স-কোভি-২ এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর ৬ থেকে ডিসেম্বর ১১ এর মধ্যে। এখানেও কথা থেকে যায়, এক্ষেত্রে যে কথাটি বলা হচ্ছে তেমন ধারা ফ্লুর প্রাদুর্ভাব ইয়োরোপ এবং আমেরিকায় হওয়ার নজির আছে। শুধু তাই নয়, একটি মার্কিন সংবাদপত্র বলছে, “1st known U.S. coronavirus deaths show community spread in CA could’ve started in mid-January or earlier, expert says”১৫। কমুনিটি সংক্রমণ হতে হলে এই ভাইরাসটিকে কমপক্ষে ৩০ দিন বা ৪০ দিন আগে সেই কমুনিটি তথা জনসম্প্রদায়ে প্রবেশ করতে হবে। মধ্য জানুয়ারি থেকে ৪০ দিন বাদ দিলে সময়টি হবে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। তদুপরি ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম দিকের মৃত্যুগুলোতে কোনোভাবেই বাইরের পৃথিবীর যোগাযোগকে সম্পর্কিত করা যায়নি। দেখা যাচ্ছে যে চীনের উহান শহরের সংক্রমণ এবং আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রমণ প্রায় সমসাময়িক।

    অন্যদিকে একজন বাঙ্গালী, আমি তার নাম পরিচয় জানিনা১৬,একটি ভিডিওতে বলছেন “এটা তৈরি হয়েছে আমেরিকার একটি শহরে (এই শহরটি সম্ভবত মেরিল্যান্ড শহর)। সাতাশি সালের শেষে বা আটাশি সালের একেবারে শুরুতে এই করোনাটা আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯০ সালে প্রথম সিদ্ধান্ত হয় যে, এটি সাদ্দামের ওপর প্রয়োগ করা হবে। পরবর্তীতে আমরা যেটা জানতাম সেটা একটু ভিন্ন, সেটা হলো যে ২০২০ এর অক্টোবর নাগাদ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রে এটাকে প্রয়োগ করা হবে। আমরা যেটা জানতাম মুসলিমদের যে একটি শত্রু রাষ্ট্র আছে তারা এটা করবে। কিন্তু ইতিমধ্যে যেটা হয়েছে সেটা হলো, যখন হংকং চায়নার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল তখন, হারভার্ডের একজন প্রফেসর এই টেকনোলজিটা চায়নাকে ট্রান্সফার করে। এফবিআই (মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা) সুনির্দিষ্ট একটি অভিযোগে হারভার্ডের সেই প্রফেসরকে গ্রেপ্তার করে। এফবিআই যখন একটা ট্রাপ করে সেটা চায়নার কাছ থেকে কিনে নিতে চায় তখন মিস হ্যান্ডেলিং-এর কারণে একটা অ্যাম্পুল ভেঙ্গে গিয়ে এই দুর্ঘটনাটা ঘটে। এটা কেউ ইচ্ছা করে করেনি। এটা (ভাইরাসটি) পুরোপুরি মানব সৃষ্ট এবং এটা মানুষের ক্ষতি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। … “তবে ভাইরাস স্থানান্তরের দুর্ঘটনার কথাগুলো তথ্য এবং উপাত্ত দিয়ে সমর্থিত নয়। এমনকি এফবিআই সেই বিজ্ঞানীকে চীনের হাতে সার্স-কোভি-২ এর ফর্মুলা তুলে দেবার জন্য নয় বরং মার্কিন সরকারের গবেষণা অনুদান সহায়তা গ্রহণের সময় চীন সম্পৃক্ততা গোপনের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। যদি ভাইরাসটি চীনের কাছ থেকে গ্রহণের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতো তাহলে মার্কিনীরা এটাকে চাইনিজ ভাইরাস বলার সাহস পেত না।তাছাড়া যদি ফর্মুলা বা কলাকৌশল চীনের হাতে চলে গিয়ে থাকে তাহলে সেটার মাধ্যমে তৈরি করা ভাইরাসের অ্যাম্পুল ফিরিয়ে নিয়ে এসেও আমেরিকার কোনো লাভ নেই। কারণ চীন পরে যেকোনো সময়ই সেটি আবার তৈরি করে নেবে।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড ক্রুসেড
    শিল্পী: ধ্রুবী আচারিয়া
    সূত্র: গুড হোমস

    ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে আমেরিকার সিডিসি মেরিল্যান্ডের ফোর্ট ডেট্রিক’র দুর্ঘটনাজনিত কারণে সৃষ্ট দূষণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে একটি সামরিক ল্যাবরেটরির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। “Safety concerns at a prominent military germ lab have led the government to shut down research involving dangerous microbes like the Ebola virus. … The suspended research involves certain toxins, along with germs called select agents, which the government has determined have “the potential to pose a severe threat to public, animal or plant health or to animal or plant products.” … There are 67 select agents and toxins; examples include the organisms that cause Ebola, smallpox, anthrax and plague, and the poison ricin.১৭। এই ল্যাবরেটরিতে ইবোলা,গুটি বসন্ত, প্লেগ থেকে শুরু করে রিসিন বিষ পর্যন্ত মজুত ছিল। নিরাপত্তার অজুহাতে আমেরিকান সিডিসি দুর্ঘটনা বা দূষণের ধরন কোনোটাই প্রকাশ করেনি। শুধু এটুকুই বলেছে এই ল্যাবের গবেষণা এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে সার্স-কোভি-২ ভাইরাস মজুত ছিল না তা কি কেউ জোর গলায় বলতে পারবে? এসব গবেষণা চালু ছিল বলেই কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বায়োলজিকাল উইপনস কনভেনশনে কার্যকর যাচাইর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে? ফোর্ট ডেট্রিকে এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে (১৯৭১ সালে)১৮। একটি গবেষণাপত্রে বলা হচ্ছে: “…It was later also discovered that some vials of Brucella as well as some diseased laboratory animals had gone missing from the same lab [25]. More recently, there were US government incidents involving the mishandling of anthrax in both 2014 [60] and 2015 [61]. In 2014, the USA also discovered over 300 previously unknown vials of agents that had been kept undocumented in their storage facilities for decades; some of these included smallpox [62]১৯। [অনেকেই হয়তোবা জানেন না যে সর্বোচ্চ ৪ স্তর নিরাপত্তা বিশিষ্ট না হলেও বাংলাদেশে একটি ৩ স্তর নিরাপত্তা বিশিষ্ট জীবাণু গবেষণাগার রয়েছে। সেই গবেষণাগারটি হলো আইসিডিডিআর,বি। উপরোল্লিখিত সূত্রটিতে বিশ্বব্যাপী জৈব গবেষণাগারের একটি তালিকা পাওয়া যাবে। যার মধ্যে কিছু সংখ্যক গবেষণাগার জৈব অস্ত্র গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছে। উপরোক্ত সূত্রের পৃ. ১১-১৫ দ্রষ্টব্য]।

    পাশাপাশি চীনের কোনো সামরিক গবেষণাগারে দুর্ঘটনা বা দূষণের কারণে গবেষণাগার বন্ধ করার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাহলে চীনকে দোষারোপ করা কি উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা এই দোষারোপের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে? আমেরিকা এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। সেখানকার কেউ একজন একটি আদালতে চীনের বিরুদ্ধে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের মামলা ঠুকে দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের আখ্যায়নের হয়তো বা একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরী কর্মসূচীর পরিচালক মাইক রায়ানের মতে এমন লেবেলিং ভাইরাসের জন্য চীনকে অভিযুক্ত করা ছাড়াও জাতিগত প্রোফাইলিং (Racial Profiling) এর মাধ্যমে বর্ণবাদী আচরণ উসকে দিতে পারে। তার মতে ভাইরাস ভাইরাসই। এর কোনো জাত-পাত নেই,ধনী-গরিব বোঝে না। কিন্তু আমি এসব বলার জন্য এই লেখার অবতারণা করিনি।

    তথ্য সূত্র:

    (১)   https://www.biorxiv.org/content/10.1101/2020.03.26.010322v1

    (২) https://www.quora.com/Was-the-coronavirus-created-in-a-lab/answer/Volodymyr-Bezverkhniy?ch=1&share=313182a6&srid=uX7n9Q&fbclid=IwAR18YRaCoUhvV4hC9ODYGaIkplC7wis-uO11KxyGA1cIqv2WJdMPFwLz5Ec

    (৩) এইচটিটিপিএস://ডাব্লুডাব্লুডাব্লু.ইউএনজেড.কম/kbarrett/ron-unz-and-other-truth-seekers-to-explore-corona-bioweapon-hypothesis-this-sunday/

    (৪) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1326439/

    (৫) Audio file: https://russia-insider.com/en/how-israel-turned-fentanyl-weapon-war-ftn-podcast-transcript/ri30208

    https://en.wikipedia.org/wiki/Khaled_Mashal

    (৬) https://en.wikipedia.org/wiki/United_States_biological_weapons_program

    (৭) https://www.opednews.com/articles/Is-Covid-19-a-Biological-W-by-Roger-Copple-Biological-Warfare_China_Coronavirus_Covid-19-200324-16.html

    (৮) https://www.scmp.com/news/china/science/article/3077442/coronavirus-pathogen-could-have-been-spreading-humans-decades

    (৯) https://www.cdc.gov/flu/about/burden/index.html

    (১০)    https://www.newsweek.com/scientists-shouldnt-rule-out-lab-source-coronavirus-new-study-says-1504656

    (১১) https://sputniknews.com/science/202005031079178965-highly-unlikely-us-researcher-rebuts-coronavirus-lab-leak-theory

    (১২)    https://www.nature.com/articles/s41591-020-0820-9.pdf

    (১৩)    https://www.cdc.gov/sars/guidance/f-lab/app5.pdf

    (১৪) https://www.medrxiv.org/content/10.1101/2020.04.27.20081349v1.full.pdf

    (১৫)    https://ktla.com/news/california/1st-known-u-s-coronavirus-deaths-show-community-spread-in-ca-may-have-began-in-mid-january-or-earlier-expert-says/

    (১৬) https://www.facebook.com/mohammadebadat.hossain/videos/2613020855618306

    (১৭) https://www.nytimes.com/2019/08/05/health/germs-fort-detrick-biohazard.html

    (১৮) https://edition.cnn.com/2009/US/04/22/missing.virus.sample/index.html

    (১৯)    https://www.researchgate.net/publication/331496732_The_global_proliferation_of_high-containment_biological_laboratories_understanding_the_phenomenon_and_its_implications/link/5cff5f3e92851c874c5da131/download

  • স্ল্যাভয় জিজেক।। দূষিত মরুতে স্বাগতম

    স্ল্যাভয় জিজেক।। দূষিত মরুতে স্বাগতম

    • অনুবাদ: মোস্তাকিম হায়দার  

    চলমান করোনা মহামারীটির সংক্রমণ সমাজে সুপ্ত আরো কিছু ভাবাদর্শের ভাইরাসকে উসকে দিয়েছে যেমন- ভুয়ো খবর, ভ্রম-বাতুল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, বর্ণবাদের বিস্ফোরণ ইত্যাদি। কোয়ারেন্টাইনের সুপ্রতিষ্ঠিত ডাক্তারি প্রয়োজনের মাঝে ভাবাদর্শের পেষণে অঙ্কিত সীমানায় আমাদের পরিচয়কে হুমকিদানকারী শত্রুদের কোয়ারেন্টাইন করার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।

    স্ল্যাভয় জিজেক

    হয়তো আরো একটি হিতকারী ভাবাদর্শের ভাইরাস ছড়াবে এবং আশা করা যায় তা আমাদের সংক্রমিত করবে। যে ভাইরাসটি হবে বিকল্প এক সমাজ চিন্তার, জাতিরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বের এক সমাজ, এমন এক সমাজ যা নিজেকে বাস্তবায়িত করে বৈশ্বিক সংহতি এবং সহযোগিতায়। গর্ভাচেভের মতে চেরনবিল বিপর্যয় যেভাবে সোভিয়েত সাম্যবাদের পতনের সূত্রপাত করেছিল, সেভাবে করোনা মহামারীও চীনে সাম্যবাদী শাসনের পতন ঘটাতে পারে। এমন নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এইখানে একটি প্যারাডক্স আছে। করোনা ভাইরাস আমাদের তাড়িত করবে সাম্যবাদের পুনরাবিষ্কারে; যার আস্থার ভীত প্রোথিত জনগণ ও বিজ্ঞানে ।

    কুয়েন্টিন টারান্টিনোর কিল বিল-২ মুভির শেষ দৃশ্যে বেয়াট্রিক্স খলনায়ক বিলকে পরাহত করে মার্শাল আর্টের সবচেয়ে প্রাণঘাতী কৌশল ‘Five Point Plam Exploding Heart’ প্রয়োগ করে। এই কৌশলে লক্ষ্যবস্তুর শরীরের পাঁচটি স্পর্শকাতর স্থানে হাতের আঙ্গুলের শীর্ষ দ্বারা পাঁচটি আঘাত করা হয়। তার পরের পাঁচটি পদক্ষেপেই হৃদপিণ্ড শরীরের ভেতরেই বিদীর্ণ হয়ে লক্ষ্যবস্তু মেঝেতে ঢলে পড়ে। এমন কিছু কেবল মার্শাল আর্টের পুরাণেই ঘটা সম্ভব,বাস্তব হাতাহাতিতে মোটেই নয়। মুভিতে বেয়াট্রিক্সের অমন আঘাতের পর বিল স্থিরচিত্তে তার সাথে সমঝোতায় আসে এবং পাঁচটি পদেক্ষেপের পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

    এই কৌশলের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপারটা হলো আঘাত এবং মৃত্যু-মুহূর্তের মাঝের সময়টুকু। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থিরচিত্তে বসে আছি আমি চাইলেই যে কারো সাথে বাক্যালাপ জুড়ে দিতে পারি। তবে পুরো মুহূর্তেই আমার চেতনে আছে যে, যেই না আমি হাঁটতে আরম্ভ করবো হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে যাবে। যারা কল্পনা করছে যে এই ভাইরাস চীনা সাম্যবাদের পতন ঘটাবে তাদের চিন্তায় করোনা ভাইরাস চীনা সাম্যবাদী শাসনের উপর অনেকটা সামাজিক ‘Five Point Palm Exploding Heart Technique’ এর প্রয়োগ। চীনা নেতারা বসে,পর্যবেক্ষণ করে কোয়ারেন্টাইনের নৈমিত্তিক কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থার (social order) যেকোনো লক্ষণীয় পরিবর্তন (যেমন-প্রকৃত অর্থেই জনগণে আস্থা) তাঁদের পতনের কারণ হতে পারে। আমার বিনয়ী অভিমতটি বেশ খানিকটা র‌্যাডিকাল শোনাবে। এই মহামারীটি আদতে আমাদের বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপর ‘Five Point Palm Exploding Heart Technique’ এর প্রয়োগ। সবকিছু যে তালে চলছিল, তা যে আর সম্ভব নয়, এ তারই আভাস অর্থাৎ একটি মৌলিক পরিবর্তন এখন আবশ্যক।

    বেশ কয়েক বছর আগে, ফ্রেড্রিখ জেমিসন চলচিত্রে মহাজাগতিক কোন প্রলয়ের অসম্ভব্য সম্ভাবনায় প্রতি আমাদের নজর কেড়েছিলেন। যেমন- কোন উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়া কিংবা কোন ভাইরাস কর্তৃক মানব প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। এমন যেকোনো বৈশ্বিক বিপর্যয় প্রসব করে বৈশ্বিক সংহতির;যেখানে আমাদের তুচ্ছ পার্থক্যগুলো তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এর সমাধান খুঁজতে থাকি। আজ বাস্তবেই আমরা এমন কিছুর সামনে দাড়িয়ে। এটা আসলে যতক্ষণ আমাদের কাজে না আসছে ততক্ষণ বিকারগ্রস্ত ভাবে দুর্ভোগ উপভোগের কোনো আহ্বান নয়। বরং যে সমাজে আমরা বেঁচে থাকি তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে পুনঃচিন্তার জন্য, একটি মহা-বিপর্যয় যে জরুরী সেই পীড়াদায়ক সত্যেরই এক প্রতিফলন।

    আর্টওয়ার্ক: স্পিরিট
    শিল্পী: মোস্তাক আহমেদ
    সূত্র: এজ ফাউন্ডেশন

    বৈশ্বিক সমন্বয়ের প্রথম ঊন নজির হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যার কাছ হতে সারশূন্য কূটনৈতিক প্রলাপ শুনা না গেলেও উদ্বেগহীন সুস্পষ্ট সতর্কতা শুনতে পাচ্ছি। এমন সংস্থাকে আরো কার্যনির্বাহী ক্ষমতা দেয়া উচিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডারস সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সমর্থন করায় সংশয়বাদীদের বিদ্রুপের শিকার হয়েছিলেন। অথচ করোনা মহামারীটি আমাদের এই শিক্ষাই কি দিচ্ছে না যে আরো বেশি কিছু করা প্রয়োজন? আমাদের কি উচিত না একধরণের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্কের কথা বিবেচনা করা? এক সংবাদ সম্মেলনে করোনার ব্যাপক বিস্তার এবং গণ কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করার পরদিনই ইরানের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ইরাজ হারিরছি একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে স্বীকার করেন যে,তিনি করোনা সংক্রমিত হয়েছেন এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন (Isolation) রেখেছেন (এমনকি টিভিতে তার জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতার লক্ষণ বোঝা যাচ্ছিল)। হারিরছি আরো বলেছিলেন, “এই ভাইরাস ভীষণ গণতান্ত্রিক; এ ধনী-গরীব কিংবা কূটনীতিজ্ঞ-সাধারণ জনগণের মধ্যে কোন ভেদ-বিভেদ করে না”।   এই বিষয়ে তিনি আসলে আগাগোড়াই সঠিক-আমরা সবাই এখন আসলে একই তরীর যাত্রী। অথচ যে বিষয়টি আমাদের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে বৈশ্বিক সংহতির নিশান উড়াচ্ছে সে বিষয়টিই প্রাত্যহিক জীবনে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে এমনকি স্ব-বিচ্ছিনতার কথাও বলছে। এমন চূড়ান্ত বিদ্রূপ মিস করা কঠিন।

    আমরা কেবলই এই ভাইরাল সঙ্কটের মোকাবেলা করছি না আরো মহাবিপর্যয় দিগন্ত হতে ধেয়ে আসছে অথবা বর্তমানেই নানা স্থানে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে। খরা, তাপদাহ, প্রলয়ংকারি ঝড়- এই তালিকাটি আসলেই বেশ দীর্ঘ। এই সবক্ষেত্রেই জবাবটি উদ্বেগ বা আতঙ্কে নয় বরং কার্যকর বৈশ্বিক সমন্বয়ের জন্য দরকারি কঠিন এবং জরুরী কাজের মাধ্যমে দিতে হবে।

    “এই মহামারীটি অতি দ্রুতই দমে যাবে। আমাদের অপেক্ষা করা উচিত এর চূড়ার (Peak) জন্য, তারপর জীবন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।” ট্রাম্প কর্তৃক সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময়ে প্রচারিত এই প্রচারের ফাঁদে হতে বেরিয়ে আসতে হবে। চীন অবশ্য এখনই তার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। তাঁদের সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে এমন খবরও ভেসে বেড়াচ্ছে যে, মহামারী শেষ হয়ে গেলে পুষিয়ে নিতে সবাইকে শনিবার ও রবিবার কাজ করতে হবে। কিন্তু এইসব সরল আশার বিপরীতে দাড়িয়ে, এই সবকটি নেয়া জরুরী যে এই ভাইরাসটি এখানে থাকছেই। এই ধাক্কার ঢেউ মিলিয়ে গেলেও আরো নতুন ঢেউ আসতে পারে, হয়ত আরো ভয়াল মূর্তি ধারণ করে। সত্য হলো যে, যারা করোনার ভয়াল থাবা থেকে বেঁচে গিয়ে আরোগ্য  লাভ করেছিলেন তারাই আবার করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা আসলেই এক অশনিসংকেত।

    ঠিক এই কারণেই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই ভাইরাল মহামারীটি আমাদের আশেপাশের মানুষ ও বস্তু, এমনকি আমাদের স্ব-শরীরের সাথের অনেক মিথস্ক্রিয়াতে প্রভাব ফেলবে। এসব থেকে পরিত্রান পাবার অনুশাসনের অভাব নেই। নোংরা জিনিস স্পর্শ করা হতে বিরত থাকা, কোন হুক স্পর্শ না করা, গণ শৌচাগার ব্যবহার না করা বা উন্মুক্ত কোন বেঞ্চে না বসা, আলিঙ্গন ও করমর্দন এড়িয়ে চলা… এবং বিশেষভাবে নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ ও স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গচালনার ব্যাপারে সচেতন থাকা। নাক স্পর্শ করা বা চোখ রগড়ানো হতে বিরত থাকা… এক কথায় নিজের সাথে কোন খেলা না করা। অর্থাৎ কেবল রাষ্ট্র ও অন্যান্য এজেন্সিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে তৎপর নয়, আমাদের নিজেরও শেখা জরুরী কীভাবে নিজেদের আরো নিয়ন্ত্রিত ও সংযত রাখা যায়। সম্ভবত ভার্চুয়াল রিয়েলিটিই কেবল নিরাপদ বলে গণ্য হবে এবং উন্মুক্ত স্থানে অবাধে চলাচল অতি-ধনীদের অধিকারে থাকা দ্বীপগুলোর জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।২

    তবে আমাদের স্মরণ রাখা দরকার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ইন্টারনেটের স্তরে “ভাইরাস” এবং “ভাইরাল” শব্দগুলি বিগত দশকেও ওয়েব-স্পেসে ডিজিটাল ভাইরাসের সংক্রমণ বুঝাতেই ব্যবহৃত হত। যার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা (যেমন আমাদের প্রয়োজনীয় উপাত্ত ও হার্ড ড্রাইভের ক্ষতি করা) প্রায়শ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে আমাদের অজ্ঞাত থাকে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা আসলে আমূলে ঐ শব্দ যুগলের আক্ষরিক অর্থের প্রত্যাবর্তন। ভাইরাল সংক্রমণ আসলে ভার্চুয়াল ও বাস্তব দুই মাত্রায় হাতে হাত রেখে চলে।

    আর্টওয়ার্ক: এক্সট্রাকশন এন্ড প্যানডেমিক
    শিল্পী: ব্রিগেট ম্যাককেনজি
    সূত্র: মিডিয়াম

    আরেকটি উদ্ভট ঘটনা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো পুঁজিবাদী  সর্বপ্রাণবাদের উচ্ছ্বসিত প্রত্যাবর্তন। যেখানে বাজার ও আর্থিক মূলধনের মতো সামাজিক ব্যাপারকে জীবিত সত্তা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের প্রধান মিডিয়াগুলোতে চোখ বুলালে যে কেউ এই ধারণা পোষণ করতে পারে যে আমাদের আসলে যে বিষয়টি নিয়ে বিচলিত হওয়া উচিত তা হলো- “আমাদের বাজারে চলমান সঙ্কট”। কোনও ভাবেই যে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে বা সামনে আরো যারা মারা যাবে তাঁদের নিয়ে নয়। করোনাভাইরাস আমাদের বিশ্ব বাজারের মসৃণ পথচলাকে সার্বিকভাবেই বিঘ্নিত করেছে। এইসবই কি বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনর্গঠনের অপরিহার্যতার বার্তা দেয় না, যা আর বাজার ব্যবস্থার করুণার উপর ভর করবে না ? অবশ্য তাই বলে এখানে পুরানা ধাঁচের সাম্যবাদের কোন ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে না। শুধুমাত্র এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার কথা ভাবা কি যায় যা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়মাধীন রাখবে, সেই সাথে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লাগাম টেনে ধরবে। রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধকালীন সময়ে এটি করতে সফল হয়েছিল এবং কার্যতই আমরা এখন এক চিকিৎসা যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হচ্ছি।

    এই মহামারীটির কিছু ভালো দিক আমাদের নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করা উচিত। এই মহামারীটির মনে রাখার মতো এক প্রতীকী মুহূর্ত হলো প্রমোদতরীতে আটকে পড়া যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইন। আমার মতে প্রমোদতরীর এমন বেহায়াপনা হতে উৎকৃষ্ট অব্যাহতি। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে নিঃসঙ্গ দ্বীপ বা রিসোর্টসমূহ যেন ধনীদের একচেটিয়া বিলাসে পরিণত না হয়; ঠিক কয়েক দশক পূর্বে উড়োজাহাজ ভ্রমণ যেমনটি ছিল। বিনোদনের নানা পার্কগুলো ভূতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে… চমৎকার! ডিজনিল্যান্ড থেকে বিরক্তিকর ও নীরস কোন স্থানের নাম আমার মাথায় আসে না। ব্যক্তিগত গাড়ির উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে- অসাধারণ! এই পরিস্থিতি হয়তো ব্যাক্তিগত পরিবহণ নিয়ে আমাদের অতিউচ্ছ্বাসের বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য করবে। এই তালিকা আসলে বাড়তেই থাকবে।

    আর্টওয়ার্ক: স্টে হোম
    শিল্পী: সৈয়দা সুলতানা
    সূত্র: এজ ফাউন্ডেশন

    সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় ভিক্টর ওরবান বলেছিলেন, “উদারপন্থী বলে আসলে কিছু নেই। একজন উদারপন্থী ডিপ্লোমাধারী এক সাম্যবাদী ভিন্ন আর কিছু নয়”। এর বিপরীত নির্বচনটি সত্য হলে কেমন হবে? আমাদের স্বাধীনতার প্রতি যত্নশীলদের যদি আমরা “উদারপন্থী” হিসেবে অভিহিত করি এবং “সাম্যবাদী” হিসেবে তাদের যারা জানে (এই বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সঙ্কটের মাঝে) কেবলমাত্র কিছু মৌলিক পরিবর্তনেই ঐসব স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব। যেহেতু বৈশ্বিক পুঁজিবাদ একটি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের মধ্যে যারা এখনও নিজেদের “সাম্যবাদী”  হিসেবে পরিচয় দেয়, তারা আসলে ডিপ্লোমাধারী “উদারপন্থী” ভিন্ন কিছু নয়। এমন ধাঁচের “উদারপন্থী” যারা গুরুত্তের সাথে অধ্যয়ন করেন কেন তাদের উদারনৈতিক মূল্যবোধগুলো সঙ্কটের মুখে এবং বুঝতে পারেন একটি আমূল পরিবর্তনই কেবল তাদের বাঁচাতে পারে।

  • ভিত্তোরিও বুফাচ্চি।। করোনা ভাইরাস: বিশৃঙ্খলা ও আশা জাগানিয়া রাজনৈতিক দর্শন

    ভিত্তোরিও বুফাচ্চি।। করোনা ভাইরাস: বিশৃঙ্খলা ও আশা জাগানিয়া রাজনৈতিক দর্শন

    • অনুবাদ : রাগিব শাহরিয়ার

    কোনোকিছুই আগেরমত হবে না, এবং সম্ভবত এটা একটা ভালো বিষয়। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য বিধ্বংসী প্রভাব আদতে পরিমাপ-সুযোগের বাইরে। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে বিশ্বজুড়ে এই মহামারী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়াতে পারে।

    করোনা-সঙ্কটের শুরুতে ইতালিয়ানদের বাড়ির ব্যালকনি থেকে গাওয়া হৃদয়গ্রাহী গানের দৃশ্যপটে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতা । একইসাথে খাবারের দোকানে লাইন বেড়েই চলেছে। যদি অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তবে তা নাগরিক সমাজকেও ভাঙবে। ঝুঁকিটা এখানেই। রাজনৈতিক দার্শনিকদের মতে, আমরা ‘প্রকৃতিরাজ্যে’র দিকে চালিত হচ্ছি।

    থমাস হবস

    ‘দি লেভিয়াথান’ বইতে থমাস হবস ‘স্টেট অফ নেচার’ বা প্রকৃতিরাজ্যের ধারণা প্রদান করেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন যে, প্রকৃতিরাজ্য- সময়ের দুর্গম অঞ্চলে ঘটে যাওয়া প্রাচীন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু এমনকিছু- যা যেকোনো সময়েই ঘটতে পারে।

    রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়লে তার জায়গা দখল করে বিশৃঙ্খলা। হবসের কাছে অবশ্যই এই ‘স্টেট অফ নেচার’ কোনো আকর্ষণীয় জায়গা ছিল না।

    উক্ত অবস্থায়- শ্রমশিল্পের জন্য কোনো জায়গা নেই, কারণ এটা থেকে ফলাফল অনিশ্চিত; অতএব পৃথিবীতে কোনো সংস্কৃতি নেই; কোনো নৌচালনা বা সমুদ্রপথে পণ্যের আমদানি নেই, ব্যবহার উপযোগী কোনো স্থাপনা নেই; গতিশীলতার জন্যেও নেই কোনো উপাদান।

    হবসের এরূপ ‘স্টেট অফ নেচারে’ আমরা এখনো আসিনি। তাঁর ভাষায় যাকে বলে ‘সময়ের কোনো হিসেব নেই; শিল্প নেই; চিঠিপত্র নেই; কোনো সমাজ নেই’- এরূপ অবস্থা এখনও আমরা অনুমান কিংবা আশা করি না। যদিও বর্তমানে এখন কোনো কনসার্ট, থিয়েটার, ভ্রমণ কিংবা খেলাধুলার আয়োজন নেই। হবস যাকে বলছেন “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ”, ঠিক তা-ই আমরা দেখতে শুরু করেছি; যেমন- বিশ্বমার্কেটে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সামগ্রীর জন্য এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে মারমুখী নিলামে অংশ নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এন্টি-লকডাউন বিরোধী আন্দোলন চলছে, একইসাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত ভারী-অস্ত্রে সজ্জিত র‍্যালিও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

    হবস কতিপয় শীতল ও স্মরণীয় শব্দে ‘স্টেট অফ নেচারের’ সারমর্ম তুলে ধরেছেন: ‘ক্রমাগত ভয় এবং ভয়ংকর মৃত্যুই সবচাইতে ভয়াবহ; মানুষের জীবন নির্জন, দরিদ্র, কদর্য, বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত।’ কোভিড-১৯ আমাদের সকলের ভেতর সঞ্চার করেছে- ক্রমাগত ভয়।

    সবকিছু হারিয়ে যায়নি

    সৌভাগ্যক্রমে, হবস আমাদের শেখায় যে আমরা উচ্ছন্নে যাইনি, ‘স্টেট অফ নেচার’ অতিক্রম করা সম্ভব। কিন্তু টিকে থাকার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতা।

    সকল দুর্ভাগ্য এবং হীনাবস্থা সত্ত্বেও এই ‘স্টেট অফ নেচার’ একটি ‘স্টেট অফ ইকুয়ালিটি’ কিংবা সাম্যাবস্থাও। আমরা সবাই মরণশীল এবং সমানভাবে দুর্বল। কোভিড-১৯ এর অধীনে এটাই এখন জীবনের সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভাইরাস প্রকৃতপক্ষেই একটা মহৎ সমতাসাধক, কারণ তা জাতীয়তা অথবা জাতিগত, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক শ্রেণি, ধর্ম বা ভাষাভেদে পার্থক্য করে না। আজ আমরা সবাই সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই মৌলিক সাম্যাবস্থা থেকে আরেক ধরনের বাস্তবতা উঠে আসে: কেবল একতা, দলগত কাজ এবং সংহতিই উক্ত অদৃশ্য শত্রুকে রুখতে পারে।

    হবসের ‘স্টেট অফ নেচার’ অতিক্রম করতে হলে আমাদের একটি নতুন সামাজিক চুক্তি জারি করতে হবে। একটি পারস্পরিক-লাভের চুক্তি যেখানে প্রত্যেকে একটি দীর্ঘমেয়াদী লাভের স্বার্থে অল্প সময়ের জন্য বিসর্জন দিতে সম্মত হবে। অথবা, এই বোঝাপড়াটুকু তাদের ভেতর কাজ করবে।

    একইভাবে, কোভিড-১৯ কাটিয়ে উঠবার লক্ষ্যে আমাদের একটি অভূতপূর্ব মাত্রার বিসর্জন, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। অস্থায়ী লকডাউনে জীবনযাপন করা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা অনেক মানুষের জন্য একটি বড় বিসর্জন, বিশেষত যেহেতু বেকারত্ব বাড়ছে এবং অনেক ব্যবসায়ে ধ্বস নেমেছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ওপর আমাদের আস্থা রাখাটা জরুরি, যেহেতু (ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে) সবার মেনে চলার ভেতর দিয়েই জরুরি অবস্থাগুলো কার্যকর হবে।

    আর্টওয়ার্ক: টুগেদার
    শিল্পী: আমাদ রাহমা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতা ভঙ্গুর এবং অনিশ্চিত, বিশেষত একটি পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে স্বার্থপরতা একটি গুন এবং লোভীরা পুরষ্কৃত হয়। এই সংকট আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে ধরে নেয়া অনেক অনুমান নতুন করে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। যেমন: ব্যক্তিগত স্বার্থের সাধনা এই মুহুর্তে অকার্যকর এবং কোনো ট্রিকল-ডাউন প্রভাব থাকবে না (ট্রিকল ডাউন তত্ত্বানুযায়ী- বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলিকে দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা একপর্যায়ে ছোট ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের নিকট অর্পিত হবে)। একইসাথে অর্থহীন এবং অপব্যয়ী বস্তুবাদী মনোভাব আর টেকসই নয়।

    নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেবেন না

    পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি হচ্ছে বিনা পরিশ্রমে সুবিধা অর্জনকারী ব্যক্তিত্বরা। এরা জনমানুষের কষ্টার্জিত অর্জনে বিন্দুমাত্র অবদান না রেখে তাদের সহযোগিতা থেকে উপকৃত হতে চায়। এই প্রকৃতির ব্যক্তিত্বকে হবস ‘নির্বোধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    হবস ব্যাখ্যা করেন, নির্বোধেরা বিশ্বাস করে ন্যায় বলতে কোনোকিছু নেই এবং ব্যক্তি-স্বার্থের খাতিরে যেকোনো চুক্তি ভাঙা বৈধ। এই পৃথিবী নির্বোধে ভর্তি, কেবল সংকটের সময়েই তাদের ভেতরকার চরিত্র প্রকাশ পায়। লকডাউনের নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এরা স্বার্থপরের মত পণ্যদ্রব্য মজুদ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে ব্যবসায়ীরাও পড়ে যারা মানুষের ভয়কে কাজে লাগিয়ে খাদ্যদ্রব্য, ফেসমাস্ক অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মূল্যবৃদ্ধি করে যাচ্ছে। নির্বুদ্ধিতার পরিচয় এড়ানোর জন্য ব্যক্তি-স্বার্থ অথবা ব্যক্তিগত লাভের ঊর্ধ্বে গিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

    হবসের ‘স্টেট অফ নেচার’ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ এর সাথে বসবাস আসলে পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার রাজনীতির মুক্তিপরায়ণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে আমরা এমন সামাজিক বন্দোবস্তে প্রবেশ করতে যাচ্ছি যা একটি নতুন নাগরিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে তুলবে।

    সম্পাদকীয় নোট: ভিত্তোরিও বুফাচ্চি, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক এর দর্শন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার। তার এই লেখাটি প্রকাশিত হয় The conversation পত্রিকায়।

  • ডিজিটাল নিরাপত্তা: রাষ্ট্রের সর্বস্বৈরতন্ত্রের প্রহরা-প্রণালী

    ডিজিটাল নিরাপত্তা: রাষ্ট্রের সর্বস্বৈরতন্ত্রের প্রহরা-প্রণালী

    • রোকন রকি

    ক্ষমতাকাঠামো যে রূপেই থাক সে প্রশ্নাতীত থাকতে চায়, সমালোচনার উর্ধ্বে থাকতে চায়। সে তার কর্তৃত্বের বৈধতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে। সে জন্যই সমালোচনাকে, প্রশ্নকে সে ভয় পায়। নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। এই কারণে এরকম কিছু চিন্তা-চেতনার উৎপাদন করতে হয় যে, পরিবারের কর্তা পিতার সমালোচনা করা খারাপ, সমাজে মুরুব্বিয়ানার বা মুরুব্বিদের সমালোচনা করা বেয়াদবি, ধর্মকে প্রশ্ন করলে পাপ হয়, আর রাষ্ট্রের সমালোচনায় হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতা।

    কিন্তু সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, উন্নততর সমাজ কাঠামো নির্মাণের স্বার্থে বিদ্যমান অবস্থার সমস্যা ও অসঙ্গতিকে চিহ্নিত করার কোন বিকল্প নেই। সমালোচনা ঠিক এই কাজটাই করে। এতে বিদ্যমান কাঠামোর অনেক অসঙ্গতি বেরিয়ে পড়ে, জনস্বার্থবিরোধিতা ফাঁস হয়ে যায়। সেসব কিছুর সঙ্গতি নিশ্চিত করে, জনস্বার্থবান্ধব করে তুলে এবং অপ্রয়োজনীয় হলে তার বিলোপ করার মাধ্যমেই সমাজ এগিয়ে যায়। এটাই সামাজিক সজীবতা। সামাজিক সজীবতার প্রথম শর্ত সমালোচনা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ সকল সামাজিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিজ ঘাড়ে নেওয়া রাষ্ট্রকে এর বিপরীত ভূমিকাতেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: এগেইনস্ট ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন
    শিল্পী: নাজি বেনাজি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    চলমান করোনা পরিস্থিতিতে আর সবকিছুর মতো রাষ্ট্রের এই অসহনশীল চরিত্রটাও স্পষ্ট হয়ে দেখা যাচ্ছে। জনগণ যখন প্রত্যক্ষ সঙ্কটের মুখে পড়েছে, যখন রাষ্ট্র প্রতিশ্রুত দায়িত্ব পালন করছে না,  তখন ভুক্তভোগী জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতার সমালোচনা করা খুবই স্বাভাবিক এবং সেটা তার অধিকার। রাষ্ট্র নাগরিক মৌলিক অধিকার পূরণে অসমর্থ হলেও তার সামগ্রিক অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করতে এ নিয়ে করা যাবতীয় সামালোচনাকে দমন করছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সমালোচনাকে অভিযুক্ত করছে রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় পদের ‘মানসম্মান’ বিরোধী হিসেবে। রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা ও ভাবাদর্শের খুবই স্থূল রূপ  ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও ’মানহানি’। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে এই প্রপঞ্চকেই করা হয়েছে সহিসং। রাষ্ট্র আশ্রয় নিয়েছে লাঠিয়াল বাহিনীর পেশির জোরের কাছে।

    রাষ্ট্র ও তার প্রতিনিধিরা যখন সমালোচনাকে দমন করার জন্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’– এর মতো মানুষের শ্বাসরোধী একটা আইন প্রণয়ন করে তখন আসলে তার জীবন ও মানবতা বিরোধী চরিত্রটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রকে প্রশ্নাতীত ও সমালোচনার উর্ধ্বে একটা পবিত্র সংস্থা হিসেবে হাজির করার মাধ্যমে পূর্বের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবিকে দৃশ্যমান করে। এই আইনের বিধান গুলো কোন রকম রাখঢাক ছাড়াই এই উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট ভাবে আমাদের সামনে হাজির করে।

    এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, যদি অন্য কোন আইনের সাথে এই আইনের কোন বিধান বা তার অংশ অসমঞ্জস হয় তাহলে সে অংশের ক্ষেত্রে এই আইনের বিধান কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ শুরুতেই এই আইনকে আর সব আইনের উর্ধ্বে অবস্থান দিয়েছে। শুরুতেই বলে দিয়েছে অন্য কোন আইনে যদি কোন ধরনের অধিকার রাষ্ট্র নাগরিককে দিয়েও থাকে তাহলেও এই আইনে সেগুলো লঙ্ঘনের বিধান থাকলে সে সব অধিকার এই আইন বলে লঙ্ঘিত হতে পারে। ব্যতিক্রম শুধু তথ্য অধিকার আইন।

    রাষ্ট্র যেহেতু জনগণের জন্য কাজ করার কথা বলে সেহেতু রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু এই আইনের ১৫ ধারা মোতাবেক রাষ্ট্র কোন কম্পিউটার সিস্টেম, নেটওয়ার্ক বা তথ্য কাঠামোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসেবে ঘোষণার করতে পারবে। একই সঙ্গে এসব পরিকাঠামোতে প্রবেশকে বেআইনি এবং দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে নির্দেশ করা হয়েছে। আইনে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে এভাবে:  বাহ্যিক বা ভার্চুয়াল তথ্য পরিকাঠামো যা কোনো তথ্য-উপাত্ত বা কোনো ইলেকট্রনিক তথ্য নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াকরণ, সঞ্চারণ বা সংরক্ষণ করে এবং যা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকটাপন্ন হলে জননিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বা জনস্বাস্থ্য, জাতীয় নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

    আপাত দৃষ্টিতে এই সংজ্ঞায়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো বলতে সামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক বলে প্রতীয়মান হতে পারে। কিন্তু আদতে পুরোটা তা নয়। ‘জননিরাপত্তা’ ‘রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা’ বা ‘সার্বভৌমত্ব’ শব্দসমূহের প্রয়োগ অসামরিকও। আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র তার যাবতীয় গণবিরোধী তৎপরতাকে আড়াল করতে আসলে এসব শব্দরই ব্যবহার করেছে। ন্যায্য আন্দোলন-বিক্ষোভ প্রদর্শন ইত্যাদিকে রাষ্ট্র জননিরাপত্তা বিরোধী হিসেবে দেখে। কোন জাতিসত্তার আত্মপরিচয় বা স্বায়ত্বশাসন দাবিকে অখণ্ডতা বিরোধী হিসেবে দেখে। আবার দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ এবং এসব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা ফোরামে তুলে ধরাকে অতীতে সার্বভৌমত্ব বিরোধী হিসেবে গণ্য করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাও হয়েছে।  এই আইনের মাধ্যমে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ হিসেবে ঘোষণা করে বিভিন্ন গণবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নীতিসমূহকে আড়াল করার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।  আদতে এটা রাষ্ট্রের সিক্রেসি কালচারকেই অনেক বেশি নিরঙ্কুশ করবে।

    আর্টওয়ার্ক: মুক্তিযুদ্ধ
    শিল্পী: জয়নুল আবেদীন
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    এর পরে ২১ ধারার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সামালোচনাকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রথমে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে জনমানসে অত্যাধিক সংবেদনশীলভাবে চিত্রায়ন এবং পরবর্তিতে আইন করে এগুলো নিয়ে কোন ধরনের ভিন্ন মতামত ও বৃদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, সামালোচনার পথকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, বিদ্যায়তনিক চর্চায় কোন কিছুকেই সমালোচনার উর্ধ্বে রাখা যায় না, যে কোন কিছুই সমালোচনার বিষয়বস্তু হতে পারে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলার মানুষের ইতিহাসে একটা ঐতিহাসিক কালপর্ব। সেই সময়ের প্রকৃত ঘটনা জানতে ইতিহাস পাঠে ও রচনায় সর্বদা নির্মোহ থাকার বিকল্প নেই। আবার মুক্তিযুদ্ধের মতো কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ন শতাধিক বছর পরেও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নে, পাঠে ও রচনায় অনেক সময়ই একাধিক দৃশ্যকল্প, বয়ান ও বাস্তবতা  এসে হাজির হয়। শাসকের ব্যাখার খাপে না আঁটলে তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ এই আইনে আছে। সুতরাং এই বিধান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

    মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও রাষ্ট্রের নির্ধারিত বিষয় না। মুক্তিকামী জনতা কোন মুক্তির চেতনা থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভের বাইরে জনগণের মাঝে বিচার, বিশ্লেষণ ও মতামত থাকা খুবই স্বাভাবিক। কোন ন্যারেটিভকে কনক্লুসিভ ভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা সত্য উদ্ঘাটনের ও উপস্থাপনের পথকে বাধা দেয়।

    যেকোন ঐতিহাসিক চরিত্রর ঐতিহাসিক ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন, পাঠ ও রচনা হতে পারে এবং এক্ষেত্রে ভিন্নমতকে আইন কানুন দণ্ডবিধি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা অর্থডক্সির মতই এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতার পরিচয়। ‘জাতিরজনক’ ধারণাটির সঙ্গে বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধ আছে।  জাতিবাদ/জাতিরাষ্ট্র ধারণার পাটাতনে দাঁড়িয়েই এই বিরোধ। যিনি জাতিরাষ্ট্র মানেন না তিনি জাতির জনক ধারণাটা মানবেন কেন? ফলে শেখ মুজিবকে জাতির জনক হিসেবে মানা না মানার তর্ক এটি নয়। আদতে কোন সমাজতান্ত্রিক দেশেই ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নেই।

    বিদ্যায়তনিক আলোচনায় খোদ জাতির পিতা ধারণা ও একে আশ্রয় করে কাল্ট নির্মাণের সমালোচনা বহুল প্রচলিত। অনেকটা একই ধরনের সমালোচনা জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা নিয়েও আছে। ঈশ্বর কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থায় শাসকের অস্তিত্বের পেছনে প্রশ্নাতীত ঈশ্বরকে মূর্ত করার প্রয়োজন পড়তো। ঠিক একই ভাবে জাতিরাষ্ট্রে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের পেছনে প্রশ্নাতীত জাতীয় ঐতিহ্যের প্রয়োজন পড়ে। এই ঐতিহ্যগুলোকে জনমানসে জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের ভাবাবেগ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। এগুলো সম্পর্কে সংবেদনশীল করে তোলা হয় যাতে তা প্রশ্নাতীত অবস্থায় থাকে।  এভাবে প্রশ্নাতীত করা মানেই বরং রাষ্ট্রীয় সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করা।

    ধারা ২৫’এ দেখা যায় রাষ্ট্র তার ভাবমূর্তি ও সুনামের সুরক্ষা নিয়ে খুবই চিন্তিত। অথচ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জিনিসটা কী সে বিষয়ে কোন পরিস্কার ধারণা আইনে দেওয়া হয়নি। একটা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য শব্দকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে করা সমালোচনাকে দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের তরফ থেকে এই ভাবমূর্তির কোন স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন না থাকলেও এ যে অত্যন্ত ভঙ্গুর তা বোঝা যায়। দুই কথার ফেসবুক পোস্টেই এই ভাবমূর্তি আঘাতপ্রাপ্ত হতে এবং এই বিধানের প্রয়োগ হতে দেখা যায়। যা রাষ্ট্রের অসহনশীল চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। আর সুনাম জিনিসটাই অপরের মতামত সাপেক্ষ। নিজের সুনাম রক্ষায় অপরের মতামত নির্মাণে তার কাছে সু হিসেবে প্রতীয়মান হতে হয়, খুব বেশি হলে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু জোর জবরদোস্তি করে মতামত আদায় করা যায় না। যে সুনাম রক্ষা করতে আইন লাগে, দণ্ডাদেশের ভয় দেখাতে হয় সে সুনামের মাহাত্ম্য নাই। ২৭ ধারায় তো সরাসরি ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তার’ কথা উল্লেখই করে ফেলেছে।  রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব নিয়ে যে ভয়ে আছে তা এই দুইটা ধারা থেকে বোঝা যায়। তার লেজিটিমেসির দৈন্যতা জনগণের কাছে ফাঁস হওয়ার ভয়ে সে দিশেহারা।

    রাষ্ট্রীয় পদের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ রাষ্ট্রেরই অংশ। রাষ্ট্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হিসেবে তারা কাজ করেন। ফলে তাদের ও তাদের কর্মকাণ্ডকে নিরাপত্তা দেওয়াও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই জন্য ২৯ ধারার মানহানির বিধানের বহুল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার দায়ে দায়ি রাষ্ট্রীয় পদধারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে সমালোচনা হতে পারে। রাষ্ট্র নিজেকে সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাহির করে, রাষ্ট্রের পদ সমুহে অধিষ্ঠান ও তার কার্যাবলি সম্পাদনকে জনসেবা নামে প্রচার করে। উল্লেখ্য যে, এই সেবা মিনি-মাঙনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। অর্থাৎ এই সেবা জনগণকে কিনে নিতে হবে এই তার বক্তব্য। কিন্তু জনগণ যার বিনিময় মূল্য হিসেবে পয়সা দিচ্ছে তা যখন না পায় তখন তার সমালোচনা করে, ভৎসনা করে। এর বেশি কিছু করার মেকানিজম যেহেতু এই রাষ্ট্রে তৈরি হয়নি সেহেতু জনগণের এটুকুই করার থাকে। এটাতেও যখন মানহানির নামে বাধা দেয় তখন এই রাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থবিরোধী চরিত্র প্রকাশ পায়। সুনামের মতোই মানও কোন আইনের ভয়ে দেখিয়ে রক্ষা করার জিনিস না। মান রক্ষা পায় কর্মে। কর্মের সততাই মান সম্মানের রক্ষক।

    একটা কালো আইন ভিত্তি করে বিধান করা আইনও কালো আইন হয়। অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ একটা আগাগোড়া কালো আইন যার উপর ভিত্তি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা রচিত। এর বিধান গুলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে রচিত। জনবিরোধী ব্রিটিশ সরকার এই আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমের ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কাঠামো’র মতো ‘নিষিদ্ধ স্থান’ নির্ধারণ করে সে জায়গার কার্যক্রম জনসম্মুখে আনাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে; বিদেশি এজেন্টের মাধ্যমে খরব সংগ্রহ করাকে অবৈধ করেছে; গোপনে প্রাপ্ত কোন সংবাদ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করেছে এবং এই সব কিছুর জন্য প্রতিবেদক, সম্পাদক, মুদ্রাকর এবং প্রকাশকে অপরাধী করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে। সেই কুখ্যাত ব্রিটিশ সরকার এবং আজকের মহান বাংলাদেশ সরকার কোন তথ্য প্রকাশে ভয় পায়? তারা জনগণের কাছ থেকে কোন তথ্য গোপন করতে চায়? কেন চায়?

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব দ্য প্রেস
    শিল্পী: মাত্তেও বার্তেল্লি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    শুধু এই ধারাই নয়। উপরে উল্লেখিত প্রত্যেকটি ধারাই সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে, স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এর উদ্দেশ্যও খুব স্পষ্ট। এই সরকার-কাঠামোতে জনগণের হাতে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোন ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সেবা বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতিতে গড়ে ওঠা একটা সংগঠন বিক্রয় মূল্য নিয়ে তার সেবা দায়িত্ব কার্যক্রম কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় কতটুকু পালন করছে তার অনুসন্ধান করার উন্নত এবং অনেকাংশেই প্রধান মাধ্যম স্বাধীন সাংবাদিকতা। স্বাধীন সাংবাদিকতাই পারে রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসতে। খোদ রাষ্ট্রই যখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে হরণ করতে চায় তখন সে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারেই জবাবদিহিতার উর্ধ্বে উঠতে চায়। সাংবাদিকতায়, সমালোচনায় সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে সীমাহীন হঠকারি হয়ে উঠতে চায়।

    এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মানুষের প্রাইভেসির অধিকারকে পর্যন্ত হরণ করার ক্ষমতা দিয়েছে। এই আইনের ৪১ ধারার মাধ্যমে তদন্তকারি কর্মকর্তা যে কোন কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস অথবা ডিজিটাল ফরমেটে সংরক্ষিত কোন তথ্য উপাত্ত চাইলেই নিজ অধিকারে নিতে পারে। শুধু তাই নয় কোন ব্যক্তি বা সংস্থার অর্থাৎ কোন সিম কোম্পানি, ফেসবুক, গুগোল বা অন্য যে কোন অনলাইন সেবাদানকরি সংস্থার থেকে আইনত ভাবে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। এখন এই ডিজিটালাইজড সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও তথ্য আদান প্রদানের একটা বড় অংশই ঘটে ডিজিটাল ওয়েতে। আইন করে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে এইসব কিছু দখলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির প্রাইভেসির অধিকার লঙ্ঘন হয়। প্রাইভেসি মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত অধিকার। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের আর্টিকেল ১২ এবং ইন্টারন্যাশনাল কোভেনেন্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটসের আর্টিকেল ১৭ এই প্রাইভেসির অধিকারকে স্বীকার করে এবং নিশ্চিত করার কথা বলে। রাষ্ট্রের এই ধরনের নজরদারি আন্তর্জাতিক আইন বিরুদ্ধ এবং নৈতিকতা বিরুদ্ধ।

    এই আইন পুলিশ অফিসারকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে যে কোন অপরাধ হয়েছে বা হচ্ছে এমনটা যদি পুলিশ অফিসার ‘বিশ্বাস করেন’ অথবা কোন অপরাধ হতে পারে বলে ‘বিশ্বাস করেন’ তাহলে পরোয়ানাসহ বা পরোয়ানা ছড়াই যে কোন ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারবে বা কোন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমন সিম কোম্পানি, ফেসবুক, গুগল, ইনিস্টাগ্রামের তথ্য হস্তগত করতে পারবেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪২ ও ৪৩ ধারায় এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটা উপরের আলোচিত প্রাইভেসির অধিকারকে তো লঙ্ঘন করছেই তার চাইতে ভয়ঙ্কর কথা শুধুমাত্র অপরাধ হতে পারে এই ‘বিশ্বাস’ থেকে প্রাইভেসি লঙ্ঘনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এবং এরকম কোন বিশ্বাসের মাধ্যমে যদি কারো প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে এবং যদি দেখা যায় বিশ্বাসটা ভুল ছিল তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তার বিশ্বাসটাকে সরল বিশ্বাস হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এই আইনের ৫৭ ধারার বিধান এই কথাই বলছে। এই ধারা মতে এরকম বিশ্বাসের ফলে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। এর অর্থ প্রতিটা মানুষ, প্রত্যেকেই এমন ভালনারেবল অবস্থায় আছে যে তার ব্যক্তিগত ব্যবহার্য কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ফোনের মাধ্যমে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য আদান প্রদান বা ব্যক্তিগত কথাবার্তা সব কিছুর দখল নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে।

    ৪৬ ধারায় বলছে কোন ব্যক্তি বা কোন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের (সিম কোম্পানি, ফেসবুক, গুগল, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি) কাছে তদন্ত কর্মকর্তা তথ্য চাইলে সেটা প্রদান করতে সেই ব্যক্তি বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বাধ্য থাকবে। এর পরের ধারা ৪৭-এ বলছে এভাবে তথ্য সরবরাহ করার জন্য কোন ব্যক্তি বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না এবং তেমন কোন উদ্যোগ নিলে তা অপরাধ হবে ও তার জন্য দণ্ডের ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও বলছে এই যে, নজরদারিটা তারা করবে, আপনার আমার সব ধরনের তথ্য তারা নিবে এই কার্যক্রমে কে, কোন জায়গা থেকে, কি কি তথ্য নিচ্ছে তাও গোপন রাখতে হবে। অর্থাৎ আমাদের সবার তথ্য যে রাষ্ট্র নিবে এ নিয়ে রাষ্ট্র তো আমাদের জানাবেই না, যার কাছ থেকে নিচ্ছে সেও জানাতে পারবে না এবং কোন ধরনের তথ্য নেওয়া হচ্ছে তাও জনগণকে জানতে দেওয়া যাবে না। এই নির্দেশ লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হবে এবং দণ্ড ভোগ করতে হবে। আইন করে এই ধরনের গোপন নজরদারির ব্যবস্থা রাষ্ট্রের যাবতীয় ভালো মানুষির মুখোশকে আলগা করে দেয়। রাষ্ট্রের নিপীড়ক রূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

    সমালোচনাকে দমন করতে, বিরুদ্ধ মতকে দমন করতে, রাষ্ট্রের জবাবদিহি পরিস্থিতিকে নষ্ট করতে, ভাবমূর্তি ও মান সম্মান ধরে রাখতে, নিজের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে, প্রাইভেসি লঙ্ঘন করতে যে সমস্ত কাজ গুলোকে অপরাধ হিসেবে এই আইনে চিহ্নিত করেছে তার দুই একটা বাদে অধিকাংশই আমলযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ কাউকে যদি এই অনৈতিক কালো আইনের এই কালো বিধান গুলোতে অভিযুক্ত করা যায় তাহলে কোন পুলিশ কর্মকর্তা কোন ধরনের পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে এবং কোন বিশেষ কারণ ছাড়া তার জামিন হবে না। রাষ্ট্র যদি সত্যই জনবান্ধব হতো তাহলে তার নিজের নাগরিকের বিপরীতে নিজের নিরাপত্তা জন্য এইসব বিধান করার প্রয়োজন পড়তো না।

    একটা রাষ্ট্র যখন তার নিজের নাগরিকের কাছে নিজেকে অনিরাপদ মনে করে, নাগরিকদের সমালোচনা, কথাবার্তা নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে তখন সেই রাষ্ট্র টিকে থাকার সব ধরনের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মুখোশের আড়ালে ভালো মানুষির ছদ্মবেশে বা ছেলে ভোলানো গানেও যখন নাগরিককে নিজের প্রয়োজনীয়তার কথা বোঝাতে পারার মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র থাকে না তখন তার অস্তিত্ব রক্ষায়, নিজের নিরাপত্তার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালা কানুন প্রণয়নের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই দমন- নিপীড়ন দিয়ে শেষ রক্ষা হয় না। রাষ্ট্র যত তার হিংস্র রূপ নিয়ে হাজির হয়, মানুষ তত তার প্রতিরোধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। করোনাকালীন রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার উন্মোচনে সমালোচনায় সরব মানুষজনের এই আইনের সাহায্যে যত মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছে ততই এই আইনের লঙ্ঘনে মানুষ মেতে উঠছে। এটাই প্রতিবাদের ভাষা। অনৈতিক এই কালো আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষ তার সমালোচনা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ জারি রাখছে। আজ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করছে। এই গণবিরোধী  রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র এই গণজোয়ারকে এড়িয়ে যেতে পারবে না।

  • সাম্রাজ্য স্বাধীনতা ইন্টারনেট

    সাম্রাজ্য স্বাধীনতা ইন্টারনেট

    • সেলিম রেজা নিউটন

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ একগুচ্ছ আইন রাষ্ট্রকে দিয়েছে নাগরিকের প্রাইভেসিতে হানা দেয়ার ক্ষমতা। সার্বক্ষণিক নজরদারিকে দেয়া হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। সেলিম রেজা নিউটন  বিশ্বব্যাপী চলতে থাকা গণনজরদারির রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করেছেন বর্তমান প্রবন্ধে। একই সঙ্গে হাজির করেছেন প্রাইভেসি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা নানা তৎপরতা ও আন্দোলনের পর্যালোচনা। লেখাটি প্রথমে অচেনা দাগ গ্রন্থে সংকলিত হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: ইন্টারসেকশন
    মিল্পী: ওলেস্কে কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রাইভেসি, সিক্রেসি, ট্রান্সপারেন্সি, ট্রাস্ট

    নিজেকে আমরা কার সামনে কতটুকু উন্মুক্ত করব, কতটুকু উলঙ্গ করব, সেটা আমাদের যার যার নিজস্ব ব্যাপার। এই নিজস্বতাটুকুর নাম প্রাইভেসি। উলঙ্গ হতে কি কেউ চায়? সদর রাস্তায়? প্রাইভেসি মানে তাই আব্রু। ব্যক্তিগত আব্রু। ব্যক্তির আব্রু। প্রাইভেসিকে সাধারণত ‘গোপনীয়তা’র সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। ‘গোপন’ শব্দটার সাথে প্রাইভেসির ধারণা মেলে না। ‘গোপন’ কথাটার মধ্যে কেমন জানি লুকানো লুকানো একটা ব্যাপার আছে। যেন কিছু একটা অকাজ-অপরাধ করে লুকাতে চাওয়া হচ্ছে। কেমন এক ধরনের চোর চোর ভাব। প্রাইভেসি জিনিসটা মোটেও তা নয়। একদমই না।

    প্রাইভেসির প্রকৃত অর্থ আসলে ‘আব্রু’। প্রাইভেসি হলো এমন একটা অবস্থা যেখানে একটা মানুষকে অন্যরা পর্যবেক্ষণ করে না, বিরক্ত করে না (অক্সফোর্ড ডিকশনারিজ ডট কম)। এটা একটা মানুষের একা থাকার অবস্থা (কেম্ব্রিজ ডিকশনারিজ অনলাইন: ডিকশনারি ডট কেম্ব্রিজ ডট অর্গ)। এটা এমন একটা অবস্থা যেখানে একটা মানুষ একা থাকতে সক্ষম হয়। অন্যে তাকে দেখে না। তার কথা শোনে না। গণমনোযোগের হাত থেকে মুক্ত এরকম একটা অবস্থার নাম প্রাইভেসি (লংম্যান ডিকশনারি অফ কনটেম্পোরারি ইংলিশ: এলডিওসিই অনলাইন ডট কম।) প্রাইভেসি হলো স্বাধীনতা। অন্য লোকের নজরদারির বাইরে, জানার বাইরে, কাজকর্ম করার স্বাধীনতা। (ম্যাকমিলান ডিকশনারি ডট কম)

    কথা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতার কথাও আসতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা আবশ্যক। প্রতিষ্ঠান বলতে এখানে এমনসব রাষ্ট্রীয়-আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হবে যাদের সিদ্ধান্তে-কর্মকাণ্ডে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তথা জনসাধারণ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্তৃত্বতান্ত্রিক এসব প্রতিষ্ঠান অন্যদের ওপর, অন্তত নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর, শাস্তি-পুরষ্কার ইত্যাদি চাপানোর ক্ষমতাও রাখে। যেমন রাষ্ট্র, নানান রাষ্ট্রীয় সংস্থা-সংগঠন-প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, বৃহৎ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ইত্যাদি। এইসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জরুরি।

    পরিবারও একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরিবারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অর্থ আলাদা। এখানে স্বচ্ছতা মানে সবার সামনে উদোম হওয়া না। বেআব্রু হওয়া না। ব্যক্তির বেলায়ও তাই। ব্যক্তির স্বচ্ছতা বলতে সদর সড়কে উলঙ্গ হয়ে হাঁটা বোঝায় না। তবে হ্যাঁ, প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানগত কর্মকাণ্ডসমূহের স্বচ্ছতা আবশ্যক তো বটেই বটে। সেটা আদতে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতারই প্রশ্ন।

    তার মানে, স্বচ্ছতা দরকার প্রতিষ্ঠানের। আর ব্যক্তির দরকার ট্রান্সপারেন্সি নয়, ট্রাস্ট। বিশ্বস্ততা। নিজের প্রতি বিশ্বস্ততা। অন্যের প্রতি বিশ্বস্ততা। বিশ্বস্ততা হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া। পারস্পরিক স্বাধীনতা। পারস্পরিক স্বরাজ। প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রাইভেসির প্রশ্ন নাই। প্রতিষ্ঠানের দরকার জবাবদিহিতা। ব্যক্তি-মানুষের কোনো ট্রান্সপারেন্সির প্রশ্ন নাই। ব্যক্তি-মানুষের দরকার প্রাইভেসি। ব্যক্তিগত আব্রু।

    ইন্টারনেটের স্বাধীনতা রক্ষায় তৎপর মানুষজনকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কেননা তাঁরা ‘সিক্রেসি’র সাথে ‘প্রাইভেসি’র পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েছেন। প্রাইভেসি হলো আব্রু। প্রাইভেসি তাঁদেরই দরকার, যাঁরা বেআব্রু হতে চান না। আর গোপনীয়তা দরকার ক্রিমিন্যাল কর্মকাণ্ডের জন্য। গোপনীয়তা দরকার অপরাধীচক্রের। ক্রিমিন্যাল লোকজনের। যারা অন্যের ক্ষতি করে করতে চায়। সবাই জেনে গেলে তাদের কর্মকাণ্ড চালানো অসম্ভব। এই গোপনীয়তাই হলো ‘সিক্রেসি’। প্রাইভেসিকে যাঁরা গোপনীয়তা বলেন তাঁরা আসলে সিক্রেসির সাথে প্রাইভেসির পার্থক্য খেয়াল করেন না। কিংবা করতে চান না। না করলে তাঁদের সুবিধা হয়।

    গোপনীয়তার সাথে নিতান্ত যদি মেলাতেই হয়, প্রাইভেসিকে তাহলে বড়জোর ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ বলা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সিক্রেসি হলো প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা। গোপনীয়তা ছাড়া প্রতিষ্ঠান বাঁচে না। কোকাকোলার ফর্মুলা মাত্রেই গোপন। প্রতিটা প্রতিষ্ঠান গোপনীয় সিদ্ধান্ত, আচরণ, তথ্যের আস্ত একেকটা স্তূপ।

    সুতরাং সর্বপ্রথম, গোপনীয়তা দরকার রাষ্ট্রের। সরকারের। রাষ্ট্র-প্রধান, সরকার-প্রধান আর মন্ত্রী-বাহাদুরদের তাই ‘গোপনীয়তার শপথ’ই নিতে হয়। সাংবিধানিকভাবে। সরকারের কর্মকর্তাদেরকেও নিতে হয় গোপনীয়তার এই শপথ। অনেক সময় গোপন চুক্তিও করতে হয় সরকারকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে। সরকার এমন আরো অনেক কাজ করে, যা সবাই জানলে ঐসব কাজ করা মুশকিল হয়ে যাবে। অসম্ভব হয়ে যাবে। জানাজানি হয়ে গেলে মানুষ বাধা দেবে। করতে দেবে না ঐসব কাজ। বিক্ষোভ হবে। প্রতিবাদ হবে। নানা কিছু হবে। সরকার অচল হয়ে যাবে। তাই তাদেরকে কাজ করতে হয় গোপনে। গোপনীয়তা দরকার তাই সরকারের।

    একই কারণে গোপনীয়তা দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর। সেনাবাহিনীর। বিশ্ববিদ্যালয়-সিন্ডিকেটের। রাষ্ট্রের মতোই, যেকোনো আমলাতন্ত্রের মতোই, তারা তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণপ্রক্রিয়া ও বিশেষ বিশেষ সিদ্ধান্ত গোপন রাখে। হ্যাঁ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েরও একটা ‘গোপনীয় শাখা’ আছে। এবং এভাবে গোপনীয়তা দরকার কর্পোরেট বাণিজ্যগোষ্ঠীগুলোর। বড় বড় বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানগুলোর। এসবের মধ্যে মিডিয়াও পড়ে। গোপনীয়তা দরকার মিডিয়ারও। রাষ্ট্র-পার্টি-কর্পোরেট ও মিডিয়া কী প্রকাশ করে তার চেয়ে জরুরি হলো এরা কী গোপন রাখে। কী এরা প্রকাশ করে না। অন্যের কিছু না কিছু ক্ষতি না করে এরা নিজেদের মঙ্গল সাধন করতে পারে না।

    গোপনীয়তা আমাদের দরকার নাই। আমরা যারা সাধারণ মানুষ। নাগরিক মাত্র। আমরা অপরাধী নই। ক্রিমিন্যাল নই। অন্যের ক্ষতি করার কাজে আমরা নিয়োজিত নই। আমাদের গোপন করার কিছুই নাই। আমাদের লুকানোর কিছু নাই। কিন্তু আমাদের আড়ালের দরকার আছে। কখনও কখনও। কম অথবা বেশি। যার যার বিবেচনা মতো। সবার সামনে আমরা আমাদের জামাকাপড় ছাড়ি না। সবার সামনে আমরা মলত্যাগ করে আরাম পাই না। সবার সামনে আমরা সঙ্গম করি না। এসব কাজ ষড়যন্ত্রমূলক নয়। অপরাধমূলক নয়। বৈধ। স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক। তবু এগুলোর জন্য আমাদের একটু আড়াল দরকার হয়। ব্যক্তির এই আড়ালটুকুর নাম আব্রু। আমরা একটু আড়াল চাই। আব্রু চাই। প্রাইভেসি চাই। সবাই।

    আব্রু একটা পুরাতন ব্যাপার। স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, চিরন্তন ঘটনা। প্রাইভেসি বা আব্রু বলতে বোঝায় মর্যাদা, মানসম্ভ্রম, সম্মান, ইজ্জত, আবরণ, পর্দা, অন্তরাল, এবং আড়াল[১]। আব্রুই প্রাইভেসি। প্রাইভেসি হচ্ছে একটা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত আড়াল। ইন্টারনেট-পরিসরের জন্য প্রাইভেসি যা, অন্যান্য পরিসরের জন্যও তাই।

    দোকান থেকে আলু-পটল-ডিম-কনডম-অন্তর্বাস কিনে আমরা বাসায় নিয়ে আসি ব্যাগে করে। প্যাকেটে করে। ব্যাগে আমরা বোমা-অস্ত্র-মাদ্রকদ্রব্য বহন করছি, তা কিন্তু নয়। তবু ব্যাগটা ব্যবহার করি কেন? কারণ আমরা আব্রু চাই। স্বভাবত। আমরা প্রাইভেসি চাই। নিজ নিজ বিবেচনা মতো। কেন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ব্যাগে করে বহন করি, এই অভিযোগে কি রাষ্ট্র আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারে? আমাদেরকে আটক করতে পারে? অপরাধী বানাতে পারে? পারে না। কারণ প্রাইভেসি চিরবৈধ একটা ঘটনা। ব্যাগটা আর প্যাকেটটা আমাদের আড়ালের নিশ্চয়তা দেয়। প্রাইভেসির নিশ্চয়তা দেয়। এই নিশ্চয়তাটুকু আমাদের স্বাভাবিক অধিকার।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য কাইট
    শিল্পী: ক্যান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অনলাইন প্রাইভেসি এবং ক্রিপ্টোগ্রাফি

    সনাতন ডাকযোগাযোগের বেলায় ব্যক্তিগত আব্রুর এই নিশ্চয়তাটুকু অক্ষুণ্ণ ছিল। এখনও আছে। ডাকঘরের মাধ্যমে যোগাযোগ করার সময় এতকাল ধরে আমরা খাম ব্যবহার করেছি কেন? শুধুমাত্র পোস্টকার্ড ব্যবহার করি নি কেন? সব সময় করি না কেন? কারণ আমরা চাই না আমাদের চিঠি সবাই পড়ুক। আমরা চাই না আমাদের কথা যেকেউ তাদের খেয়ালখুশি মতো জানুক। আমরা নিজেদের আব্রু চাই। প্রাইভেসি চাই। আমরা তাই আমাদের চিঠিটাকে একটা খামের মধ্যে ভরে পাঠাই। তার মানে এই না যে আমাদের ঐ সব চিঠির মধ্যে মারাত্মক সব অপরাধের পরিকল্পনা লেখা ছিল। ইন্টারনেট-পরিসরে তাহলে কেন আমি আমার ইমেইল ন্যাংটা করে পাঠাতে বাধ্য হবো?

    প্রশ্ন হলো: ইন্টারনেট-পরিসরে আমার ইমেইলটাকে আমি একটা খামে বা এনভেলপে ঢোকাবো কীভাবে? আমার চিঠির এবং যাবতীয় যোগাযোগের প্রাইভেসির ব্যবস্থা করব কীভাবে? উত্তর হলো: ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে। ক্রিপ্টোগ্রাফি কথা এসেছে গ্রীক থেকে। গ্রীক ভাষায় ‘ক্রিপ্টো’ মানে লুকানো, গুপ্ত। আর ‘গ্রাফি’ অর্থ লিখন। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে দুজন ব্যক্তির মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের কলাকৌশল নিশ্চিত করার বিদ্যার নাম ক্রিপ্টোগ্রাফি।

    কম্পিউটার-প্রযুক্তির যুগে ক্রিপ্টোগ্রাফি আবির্ভূত হয়েছে সফটওয়ার হিসেবে। পিজিপি, টর, পিজিন, ওটিআর অরবট, গিবারবট, বিটকয়েন ইত্যাদি প্রভৃতি সফট-ওয়ারের সামনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলো রীতিমতো অসহায় বোধ করছে। এইসব সফটওয়ার নিজেরা কিন্তু কোনো গুপ্তলিপি নয়। এগুলো সব ওপেনসোর্স সফটওয়ার। এদের নিজেদের পূর্ণাঙ্গ সফটওয়ার কোড বা সংকেতলিপি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে।

    এইসব সফটওয়ার রচনা করেছে সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের সফটওয়ার-রচনাকারীরা। এবং তাঁরা এগুলো বিতরণ করেছে বিনামূল্যে। ইন্টারনেট-পরিসরে। সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের জন্ম খোদ ইন্টারনেটের জন্মের যুগে। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে। ইন্টারনেটের তখন সূচনা ঘটছে মাত্র। ইন্টারনেট তখন সামরিকবাহিনীর এবং তাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একচেটিয়া প্রযুক্তি। ঠিক তখনই জন্ম নেয় সাইফারপাঙ্কস। নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে শুরু করে ইন্টারনেট-যোগাযোগ। শুরুতে নিজস্ব ইমেইল-লিস্টের মাধ্যমে। সেই ইমেইল-যোগাযোগ শুরু থেকেই ছিল ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ারকে ভিত্তি করে আত্মসংগঠনে গড়ে ওঠা।

    সাইফারপাঙ্কসদের আন্দোলন আদতে ক্যালিফোর্নিয়া কেন্দ্রিক লিবার্টারিয়ান অ্যানার্কির একটা ধারা। মধ্য আশিতে প্রকাশিত হয় এঁদের ‘ক্রিপ্টোঅ্যানার্কিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (টিমোথি মে, ‘ক্রিপ্টোঅ্যানার্কিস্ট ম্যানিফেস্টো’– পিটার লাডলো, ২০০১)। সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলন মনে করে, অপ্রতিরোধ্য ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার রচনা এবং ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আগ্রাসনকে প্রতিহত করা সম্ভব। সম্ভব ব্যক্তির প্রাইভেসি ও স্বাধীনতার সীমাকে বাড়িয়ে দেওয়া। সম্ভব ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়া।

    বইয়ের মলাটে গুস্তাভের পোট্রেট

    ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার কথাটাই অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে তুলেছিলেন জার্মান নৈরাজ্যপথিক গুস্তাভ ল্যানডাওয়া[২]। গুস্তাভ দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র কোনো চেয়ারটেবিল-স্থাপনা নয় যে একে ভেঙে ফেলা যাবে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা সম্পর্ক। বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। রাষ্ট্রকে আমরা বদলাতে পারি, যদি আমরা রাষ্ট্র-সম্পর্কের বাইরে অন্য ধরনের (আন্তঃব্যক্তিক-সামাজিক) সম্পর্ক-প্রণালীতে পরস্পরের সাথে লিপ্ত হতে পারি। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যখন ২০০৬ সালে তার আইকিউ ডট অর্গ নামের ব্লগ লিখছিলেন, তখন তাঁর ব্লগে সবার ওপরে, নিজের ছবিটার নিচে, ছিল গুস্তাভের এ বিষয়ক উদ্ধৃতি:

    The State is a condition, a certain relationship between human beings, a mode of behavior; we destroy it by contracting other relationships, by behaving differently toward one another. … We are the state, and we shall continue to be the state until we have created the institutions that form a real community and society of men.

    আমি যতটা দেখতে পাই, আজকের সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের মূলমন্ত্র এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই। এবং তাঁরা হাতেকলমে দেখাচ্ছেন। কেমন করে বদলে দিতে হয় রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক, পুরো আর্থসামাজিক সম্পর্কপ্রণালী।

    রাষ্ট্র-কর্পোরেট নজরদারি বনাম ব্যক্তি-মানুষের প্রতিরোধ

    ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার আপনি-আমি ব্যবহার করব কেন? আমাদের সবার ভালো করে জানাও নেই, এনভেলপের চিঠির সাথে তুলনীয় সামান্য কোনো নিশ্চয়তাও ইন্টারনেটে নাই। স্মার্টফোনে নাই। ইয়াহু জিমেইল হটমেইল ওয়াই মেইল গুগল মেইল – এগুলো সবই একেবারে ন্যাংটা। একদম উলঙ্গ ইমেইল সার্ভিস এগুলো। স্কাইপ ফেসবুক টুইটার গুগল প্লাস – এসব সার্ভিসে আমাদের ইমেইল চ্যাট মেসেজ ছবি তথ্য – যাবতীয় কিছু ঠিক যেন খোলা পোস্টকার্ডের মতো। যেকেউ চাইলে আমাদের সমস্ত ইমেইল ইত্যাদি পড়ে ফেলতে পারেন। ব্যক্তিগত সব কিছু জেনে ফেলতে পারেন। তাঁর শুধু সামান্য একটু কারিগরি জ্ঞান থাকলেই হলো। গুগল এবং গ্রামীণ ফোন এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এবং অন্যসব কর্পোরেট-প্রতিষ্ঠানের আইন-অনুগত ও বাণিজ্য-অনুগত পার্টনার মাত্র। আমাদের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য যাচ্ছে রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের হাতে। বিজ্ঞাপনী-বিপণনী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। শুধু ইমেইল চ্যাট এবং এসএমএস-ই নয়, আমাদের সমস্ত ধরনের অনলাইন-কর্মকাণ্ড এবং স্মার্টফোন-তৎপরতা তৃতীয় পক্ষের কাছে উদোম হয়ে থাকছে সার্বক্ষণিকভাবে। এবং সেগুলো নির্বিশেষে রেকর্ড করে রাখা হচ্ছে। পাইকারি হারে। গণহারে।

    এখন আমাকে-আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি কি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে সর্বপ্রকার হস্তক্ষেপমুক্ত এবং স্বাধীন (স্ব+অধীন) ইন্টারনেট চান? নাকি সিকিউরিটি-নজরদারি-নিষেধাজ্ঞার ইলেকট্রনিক দাসপ্রথা চান? সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময় নাই। ভয়ংকর প্রত্যক্ষ হামলা শুরু হয়ে গেছে। আপনার যাবতীয় ইলেকট্রনিক যোগাযোগের চ্যানেলগুলোতে গোপন চোখ বসানো হচ্ছে। দৃশ্যমান সিসি-ক্যামেরা অথবা অদৃশ্যমান সফটওয়ার-চোখ। স্মার্টফোন ইমেইল চ্যাটিং নেট-ব্রাউজিং রাস্তাঘাট স্টেডিয়াম – কোনো জায়গায় আপনার-আমার কোনো প্রাইভেসি নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপে। সর্বত্র। মাইক্রোসফট ইয়াহু গুগল ফেসবুক ইউটিউব অ্যামেরিকান অনলাইন (এ.ও.ল.) অ্যাপল – কোথাও আপনার কোনো আব্রু নাই।

    গুগল আমাদের প্রত্যেকটা ক্লিক রেকর্ড করে। চাহিবা-মাত্র সরকারকে, সরকারি এজেন্সিকে দিয়ে দেয়। সিএআইএ-প্রধানের জিমেইল অ্যাকাউন্টও এফবিআইয়ের কাছে উলঙ্গ করে দেওয়ার ব্যবস্থা গুগলে আছে। (এ ঘটনাও ঘটেছে সাম্প্রতিক কালে।) বাকিদেরও একই অবস্থা। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সবই ন্যাংটা। সেখানে কোন তথ্য কোন পিসি থেকে, কোন ল্যাপটপ থেকে, কোন স্মার্টফোন থেকে, কোন সাইবার-ক্যাফে থেকে কোন আইপি-ঠিকানা হয়ে কোন দিক দিয়ে কোন পথ হয়ে কোথায় গেল সবই ফকফকা পরিষ্কার পদ্ধতিতে নথিভুক্ত থাকে। এমনকি ছদ্মনামেও যদি আপনি কোনো মতপ্রকাশ করেন, যোগাযোগ করেন— নিস্তার নাই। আপনি কোমলমতি প্রেমিক হতে পারেন, সৎ ও আন্তরিক সমাজকর্মী হতে পারেন, কঠিন মনের রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী যোদ্ধা হতে পারেন, ব্লগার হতে পারেন, অনলাইন-অ্যাকটিভিস্ট হতে পারেন, বুয়েটের বা জাহাঙ্গীরনগরের কোনো আবেগপ্রবণ শিক্ষক হতে পারেন, সেনাবাহিনীর সদস্য হতে পারেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারক হতে পারেন — রেহাই নাই আপনার। উপযুক্ত ধরনের কোনো ক্ষমতাশালী মহলের একটুখানি নেকনজর আপনার প্রতি পড়লেই হলো। আপনার ঘাড়ের ওপর পড়তে থাকবে পুলিশী নিঃশ্বাস। গ্রেপ্তার। রিম্যান্ড। কারাগার।

    এটুকুই সব নয়। বিপদ আসলে অকল্পনীয় মাত্রায় ভয়াবহ। উদোম পোস্টকার্ডের সাথে উদোম ইন্টারনেটের পার্থক্য বিপুল। পার্থক্য মারাত্মক। পোস্টকার্ড অ্যানালগ। পোস্টকার্ডের আমলে বিশালতম কোনো গোয়েন্দা-প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও প্রত্যেকটা পোস্টকার্ডের বক্তব্য পড়া সম্ভব ছিল না। দরকারও ছিল না। সনাতন গোয়েন্দাগিরি ছিল নির্দিষ্ট নজরদারির কাল। ছিপ ফেলে মাছ ধরার মতো। নির্দিষ্ট কোনো ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিকে, বা তার সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্যকে, বড়শিতে আটকাতে পারলেই কাজ হাসিল হতো। এখন চলছে পাইকারি নজরদারির যুগ।

    এখন পাইকারি হারে, যেন ‘কারেন্ট জাল’ দিয়ে, সমস্ত মাছ আটক করার প্রচলন ঘটেছে কম্পিউটার-প্রযুক্তির কল্যাণে। এখন আর বিশেষ কোনো সন্দেহ-ভাজনকেই যে খুঁজতে হবে তা নয়। এখন সবাই সম্ভাব্য সন্দেহভাজন। সবাই এখন সম্ভাব্য আলকায়দা। সবাই এখন মনে মনে মাওবাদী। আইনের চোখে এখন সকলেই হতে-পারে-অপরাধী। সুতরাং সবার সম্পর্কে তথ্য চাই। সম্ভব-অসম্ভব সব কিছু হাতে থাকা চাই। কখন কাকে লাগে ঠিক নাই। কখন কোনটা লাগে ঠিক নাই। কাজেই পাইকারিভাবে তথ্যসংরক্ষণ করা চাই। চাই গণনজরদারি। আজ থেকে ১৫ বছর পরে কাউকে বিশেষ সন্দেভাজন মনে হলে তার বিগত ১৫ বছরের অনলাইন-স্মার্টফোন-কর্মকাণ্ডের সুবিস্তারিত রেকর্ড চেক করা চাই। চেক করে দেবে সফটওয়ার। চোখের পলকে। এই হলো গণনজরদারির আদত কথা। (দ্রষ্টব্য: জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, ২০১২)

    ইঙ্গমার্কিন রাষ্ট্র এবং তাদের তাঁবেদার সরকারগুলো নানারকম আইন-কানুন-ফন্দিফিকির করে ইন্টারনেটকে উলঙ্গ করে ফেলার পথে নিয়ে এসেছে বলতে গেলে। ইন্টারনেটের সেবাদানকারী কর্পোরেট সংস্থাগুলো পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা-প্রতিষ্ঠানে। সর্বগ্রাসী নজরদারির রাষ্ট্রীয় প্রকল্প তো আছেই। সাথে আছে সরকার-নিয়োজিত প্রাইভেট গোয়েন্দা কর্পোরেট-সংস্থাসমূহ। অরওয়েলের সেই কিংবদন্তীর সতর্কবাণী এখন ইন্টারনেটের জন্য ডালভাত। বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ। এভরিহোয়ার। এভরি মোমেন্ট।

    কিন্তু বিগ ব্রাদারের ভয়ে দাসের জীবন যাপন করতে পারে না মানুষ। শেকল-বাঁধা ক্রীতদাসও নিজেকে মুক্ত করার জন্য ঝুঁকি নেয়। আজকের যুগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, চাকরি-পরিবার-প্রেম হারানোর ঝুঁকি নিয়ে, পাইকারি নেট-নজরদারির আশঙ্কা ও দাবির সত্যতার সাক্ষাৎ প্রমাণ দিয়েছেন তরুণ মার্কিন কম্পিউটার-বিশ্লেষক এডওয়ার্ড স্নোডেন। সেটা তিনি করেছেন ক্রিপ্টোগ্রাফিক-যোগাযোগের মাধ্যমেই বটে। সিআইএর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে কর্মরত এই ৩০ বছরের তরুণ যা জানিয়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে: এক ডজনের বেশি দেশের এক বিলিয়ন মতো গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহে লিপ্ত আছে মার্কিন সংস্থাগুলো। কোন কোন আইনের অধীনে, কী কী প্রকল্পের অধীনে, কোন কোন সফটওয়ারের মাধ্যমে এই পাইকারি গোয়েন্দা নজরদারি চলছে তার বিস্তারিত বিবরণ স্নোডেনের দেওয়া তথ্য মোতাবেক মাস খানেক ধরে ছেপেছে বৃটেনের গাডির্য়ান পত্রিকা। (দ্রষ্টব্য উইকিপিডিয়া: এডওয়ার্ড স্নোডেন।) অ্যাসাঞ্জ স্বয়ং জানিয়েছেন, স্নোডেনের কাছে আছে অনেক মহাজরুরি তথ্য, যার প্রকাশ অচিরেই ঘটবে। আটকাতে পারবে না কেউ।

    আর্টওয়ার্ক: আইএম আন্ডার সার্ভিল্যান্স
    শিল্পী: জোয়াও কর্ডোসো
    সূত্র: আর্টস্পার

    এভাবে এক দিকে চলছে সর্বগ্রাসী নজরদারি। রাষ্ট্র-কর্পোরেট-সেনাবাহিনীর দিক থেকে। গোটা ইন্টারনেট স্বাধীনতা ও ভবিষ্যত হয়ে পড়ছে বিপন্ন। অন্য দিকে চলছে, প্রাইভেসি রক্ষার লক্ষ্যে অজস্রমুখী সামাজিক নড়াচড়া। নানামুখি আন্দোলন। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের গণডিজিটাল দস্তখতের চাপে এ পর্যন্ত থমকে গেছে বেশ কয়টা মারাত্মক মার্কিন আইন। প্রাইভেসিবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী আইন। পাশাপাশি চলছে সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার লেখার অপ্রতিরোধ্য বাস্তব তৎপরতা। এমন সব সফটওয়ার, যা ইন্টারনেট- প্রাইভেসিকে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য করে তুলছে দিনকে দিন।

    কেন আমি খামে ভরে চিঠি পাঠাচ্ছি, এই অভিযোগ রাষ্ট্র কখনও আমার বিরুদ্ধে তোলে নি। তুলতে পারে নি। তোলাটা নিতান্তই অবান্তর বটে। এ নিয়ে যুক্তিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু আমার ইমেইলকে ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার দিয়ে খামের মতো করে আড়াল করার প্রাইভেসি-প্রচেষ্টার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্র। প্রাইভেসি রক্ষার জন্য নিবেদিত এসব ওপেনসোর্স-সফটওয়ারকে অবৈধ, অপরাধমূলক বলে প্রতিপন্ন করার সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। সফল হচ্ছে কখনো, কখনো-বা ব্যর্থও হয়েছে। সেসবের বিস্তারিত কাহিনী এখন নয়।

    আজ শুধু এটুকুই বলার যে: ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ারের ব্যবহারই পারে ইন্টারনেট-পরিসরে আমাদের প্রাইভেসিকে রক্ষা করতে। এইসব সফটওয়ার ব্যবহারের বিপুল বিস্তৃতি ঘটানোর মধ্য দিয়ে আমরাই পারি ইন্টারনেটের স্বাধীনতা এবং আমাদের প্রাইভেসি নিশ্চিত করতে। ভয়ংকর নিপীড়নমূলক এবং গণনজরদারিমূলক রাষ্ট্র-কর্পোরেট-গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করতে। ব্যক্তির ও সমাজের স্বাধীনতার সীমাকে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তৃত করতে।

    লাভাবিট এবং সাইলেন্ট মেইল বন্ধের ঘটনা

    সবর্গ্রাসী রাষ্ট্রকর্পোরেট-নজরদারি তো আছেই। এবার, আস্ত একটা ইমেইল সার্ভিস ‘লাভাবিট’ বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে মার্কিন সরকার। অভিযোগ: মস্কোর শেরেমেতেভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে-পড়া অবস্থায় এডওয়ার্ড স্নোডেন একটি লাভাবিট-অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ইমেইল করেছিলেন মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ও কর্মীদের কাছে। ইমেইল করেছিলেন তাঁর সংবাদ-সম্মেলনে আসার জন্য। এই ইএমইলের অভিযোগে দশ বছরের পুরানো, চার লক্ষাধিক গ্রাহকের একটা বৈধ, মার্কিন কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় চাপে।

    লাভাবিট গড়ে ওঠে ২০০৪ সালে। ১০ বছর ধরে লাভাবিট ছিল একটা জনপ্রিয় ইমেইল সার্ভিস। ২০১৩ সালে এর গ্রাহক ছিল ৪,১০,০০০। এঁরা ফ্রি সার্ভিস দিতেন। ১২৮ মেগাবাইট পর্যন্ত। আবার পেইড সার্ভিসও দিতেন। ৮ গিগাবাইট পর্যন্ত। টেক্সাসের সফটওয়ার-প্রোগামাররা এটা গড়ে তুলেছিলেন। জিমেইল গুগল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের তথ্য গোপনে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন এবং মার্কেটিং ডাটা প্রস্তুত করে থাকে। গ্রাহকদের কোনো প্রাইভেসি থাকে না। প্রাইভেসির ব্যাপারটা নিয়ে এই উদ্বেগের কারণে লাভাবিট বানান তাঁরা। এতে তাঁরা গ্রাহকদের প্রাইভেসির পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পেরেছিলেন ‘অ্যাসিমেট্রিক এনক্রিপশন’ তথা ‘পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি’র দুর্ভেদ্যতা দিয়ে। কোনো নিরাপত্তা এজেন্সির পক্ষেই লাভাবিটের প্রাইভেসি-প্রতিরক্ষা ভাঙা সম্ভব ছিল না। দশটা বছর ধরে তিল তিল করে নিজের হাতে গড়া এই লাভাবিটের মালিক ল্যাডার লেভিসন গত ৮ই আগস্ট লাভাবিটের হোমপেজে লিখেছেন:

    আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছে। হয় আমাকে মার্কিন জনসাধারণের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে হবে, না হয় আমাকে প্রায় ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা লাভাবিট বন্ধ করে চলে যেতে হবে। বিপুল পরিমাণে আত্ম-অনুসন্ধানের পরে আমি এটা আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই নিয়েছি।

    ‌যা আমাকে এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল আইনসম্মতভাবে তা যদি আমি আপনাদের জানাতে পারতাম! আমি পারছি না। কী ঘটে চলেছে তা আপনাদের জানা দরকার বলে আমার মনে হয়। [মার্কিন সংবিধানের] প্রথম সংশোধনীর দিক থেকে এই ধরনের পরিস্থিতিতে মুখ খোলার স্বাধীনতার গ্যারান্টি মনে হয় আমার পাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কংগ্রেস এমন সব আইন পাশ করেছে যা অন্য কথা বলে।

    এখন অবস্থা যা, আমার গত ছয় সপ্তাহের অভিজ্ঞতা আমি জানাতে পারছি না, যদিও আমি দুই-দুইবার যথাযথভাবে অনুরোধ জানিয়েছি মুখ-
    খোলার অনুমতি পাওয়ার জন্য।

    এখন কী ঘটতে যাচ্ছে? ফোর্থ সার্কিট আপিল আদালতে সংবিধানের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো কাগজপত্র আমরা তৈরি করতে শুরু করেছি। মার্কিন কোম্পানি হিসেবে লাভাবিটকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমাকে অনুমোদন দিতে পারে এই আদালতের অনুকুল একটা সিদ্ধান্ত।

    এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছে। … আমি খুব শক্তভাবে বলে রাখতে চাই। বিশ্বস্ততার গ্যারান্টিসহকারে ব্যক্তিগত তথ্য গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত কোনো কোম্পানিকে কেউ যেন বিশ্বাস না করে।

    লাভাবিট একটা ছোট-কিন্তু-স্বনামধন্য কোম্পানি। এর মালিক লেভিসন একা হাতে এই প্রতিষ্ঠানটা চালান। একজন মাত্র পূর্ণকালীন কর্মচারি আছেন তাঁর, যিনি ইউরোপের একজন গ্রাজুয়েট-ছাত্র। বার্ষিক কমবেশি এক লক্ষ ডলারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল একটা মানুষের। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। মার্কিন মিডিয়া হাফিংটন পোস্টের সাথে একটা ভিডিও-সাক্ষাৎকারে লেভিসন বলেছেন: ‘তোমার সমস্ত টাকাপয়সা এবং স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা [মার্কিন] সরকারের আছে।’ মনের দুঃখে লাডার লেভিসন নিজের ইমেইল-অ্যাকাউন্টটা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে বলেছেন: ‘আমি আর ইমেইল ব্যবহার করছি না। ইমেইল সম্পর্কে আমি যা জানি, তা যদি আপনিও জানতেন তাহলে আপনিও ইমেইল ব্যবহার করতেন না।’

    যে পদ্ধতিতে লাভাবিট বন্ধ করে দিল মার্কিন সরকার তা অকল্পনীয় ধরনের বিপজ্জনক। সরকার নিজে ঘোষণা দিয়ে এটা বন্ধ করে দেয় নি। মালিককে বাধ্য করেছে বন্ধ করে দিতে। এবং মালিক লেভিসন যেন এ ব্যাপারে প্রকৃত ঘটনা কাউকে না জানান সে ব্যাপারে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে মহান আদালত। কী সেই নিষেধাজ্ঞা, তার শর্তাবলী কী, সেগুলো বলার অনুমোদনটুকুও লেভিসনের নাই। গণতান্ত্রিক দেশ বটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    তবে ‘গাডির্য়ান’ পত্রিকার রিপোর্টার স্পেন্সার অ্যাকারম্যান তাঁর ৯ই আগস্টের (২০১৩) রিপোর্টে একটা ধারণা দিয়েছেন। সেটা হলো: গোপন মার্কিন আদালত লাভাবিটকে হুকুম দিয়েছিল যেন তাঁরা তাঁদের গ্রাহকদেরকে রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় আনার ব্যাপারে মার্কিন সরকারের সাথে সহযোগিতা করে। কিন্তু সরকারি নজরদারিতে অংশ নিতে রাজি হয় নি লাভাবিট। গ্রাহকদের প্রাইভেসির ব্যাপারে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবিধানবিরোধী হুকুম তামিল করে ব্যবসা করতে চান না তাঁরা। রাষ্ট্রীয় নজরদারির প্রকল্পে দালালি করার হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর কৌশল হিসেবে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের লাভাবিট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

    লাভাবিটের পর আরো একটা নিরাপদ ইমেইল কোম্পানি ‘সাইলেন্ট সার্কেল’ও মার্কিন নজরদারি প্রতিষ্ঠান এনএসএ-এর ভয়ে বন্ধ করে দিয়েছে নিজেদের ইমেইল সার্ভিস ‘সাইলেন্ট মেইল’। সাইলেন্ট সার্কেলের অন্যতম মালিক ‘ইন্টারনেট সিকিউরিটি গুরু’ ফিল জিমারম্যান। ‘পিজিপি’ (প্রেটি গুড প্রাইভেসি) নামের দুর্দান্ত সিকিউরিটি-প্রাইভেসি সফটওয়ারের উদ্ভাবক তিনি। ওপেনসোর্স এই সফটওয়ার উদ্ভাবন এবং সেটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রায় জেলে যেতে বসেছিলেন তিনি। জিমআরম্যানরা বলেছেন, তাঁরা কোনো সরকারি আদেশ পান নি বটে, কিন্তু ‘দেওয়ালেই তো সব লেখা আছে’। গোপন আদালতের গোপন আদেশ আসার আগেই, লাভাবিট বন্ধের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, তাড়াহুড়া করে তাঁরা তাই তাঁদের সাইলেন্ট মেইল সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়। তাঁরা তাঁদের সার্ভার থেকে গ্রাহকদের যাবতীয় তথ্য মুছে ফেলেছেন। জিমারম্যান বলেছেন, লাভাবিটের লেভিসনের মতো তিনিও এখন ইমেইল কম ব্যবহার করছেন। এর আব্রু-নিরাপত্তা কম। তিনি বরং এনক্রিপ্টেড মোবাইল মেসেজিঙের ওপর নির্ভর করেন বেশি। সাইলেন্ট সার্কেলের মোবাইল সার্ভিস ‘সাইলেন্ট ফোন’ এবং ‘সাইলেন্ট টেক্সট’ অবশ্য পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে চালু আছে। এই সার্ভিস দুটো বন্ধ না করার কারণ আছে। এগুলোর গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে ঢোকার পাসওয়ার্ড গ্রাহকদের কাছেই থাকে। সাইলেন্ট সার্কেলের কাছে থাকে না। কাজেই আদালত হুকুম করলেও তারা গ্রাহকদের কোনো তথ্য আদালত বা সরকারকে দিতে সক্ষম নন। ইমেইলের বেলায় ব্যাপারটা এরকম করা সম্ভব হয় না। সেখানে বিশাল বিশাল পাসফ্রেজ গ্রাহকরা সার্ভারেই গচ্ছিত রাখেন। সেই পাসফ্রেজটা জানার জন্য তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত অন্য একটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করেন। ফলে সার্ভারের মালিককে চাপ দিয়ে গোট সার্ভার-সফটওয়ারটাকে কমবেশি বদলে ফেলার সুযোগ বা গ্রাহকদের সম্পর্কে তথ্য জানার সুযোগ আদালতের বা রাষ্ট্রের থাকে।

    ফিসা-আদালত, এনএসএ এবং এডওয়ার্ড স্নোডেন

    সংগুপ্ত ‘ফিসা’-আদালতের আদেশ একবার এসে গেলে আপনি তা তামিল করতে বাধ্য। কী আদেশ এসেছে তা নিয়ে আপনি কাউকে কিছু বলতেও পারবেন না। এই হচ্ছে ফিসা-আইন বা ফরেন ইন্টেলিজেন্স সারভেইল্যান্স আক্টের মাহাত্ম্য। এই আদালতের গোপন হুকুমে এনএসএ-এফবিআই এখন প্রায় যাবতীয় ইলেকট্রনিক যোগাযোগ কোম্পানির সার্ভারে সরাসরি ঢুকতে পারে। পাইকারি হারে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কোম্পানি গররাজি হতে তো করতে পারবেই না, কাউকে কিছু জানাতেও পারবে না। এই মুহূর্তে, এনএসএ-এফবিআই প্রতিদিন ২০ টেরাবাইট করে গ্রাহক-ডাটা সংগ্রহ করে। গোপনে।

    ‘গোপন কথা সব গোপনই ছিল’। কিন্তু এনএসএ এবং সিআইএর এক স্বাধীনতাপিপাসু কম্পিউটার-বিশ্লেষক এডওয়ার্ড স্নোডেন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন সাম্রাজ্যের সাধ। কাছাখোলা, পাইকারি, রাষ্ট্রীয় নজরদারির বেশ কয়েকটা ভয়ংকর নথি তিনি তুলে দিয়েছেন বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের হাতে। এসব নথি খোদ এনএসএর ‘টপ সিক্রেট’ নথি।

    গার্ডিয়ান তা পরীক্ষানিরীক্ষা করে একের পর এক ধারাক্রমিক রিপোর্ট ছেপেছে গত জুন মাসে। সেসব রিপোর্ট যদি আপনি পড়ে থাকেন তাহলে এরই মধ্যে নিশ্চয়ই আপনার ‘দ্য হেড মুভস রাউন্ড দ্য সান’ অবস্থা। ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে হৈচৈ লেগে গেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একাধিক জার্মান মন্ত্রী বলেছেন, ব্যক্তিগত আব্রু যাঁরা চান, তাঁরা যেন কেউ কোনো মার্কিন সার্ভারের সার্ভিস গ্রহন না করেন। সাইলেন্ট সার্কেলও তাঁদের সার্ভার সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করছে। এবং এরই মধ্যে গ্রাহকদের সচেতনতার কারণে মার্কিন ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় মারাত্মক ধ্বস নামতে শুরু করেছে। মার্কিন সার্ভারগুলোকে কেউ বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না।

    উল্লেখ্য, এইসব মার্কিন সার্ভারের মূল সফটওয়ারের ভেতরে এনএসএ-এফবিআই এখন বসিয়ে দিচ্ছে চোরা সফটওয়ার। ফিসা-আইনের বদৌলতে। সিকিউরিটি-ভাষ্যকাররা বলছেন, লাভাবিটকেও এই একই আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা সেটা তামিল করার বদলে খোদ কোম্পানিটাই বন্ধ করে দিয়েছেন, যেন তাঁদেরকে গ্রাহকদের সাথে বেঈমানি করতে না হয়। স্বভাবতই লাভাবিটকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। স্নোডেন বলেছেন, অন্যসব বড় বড় কোম্পানিও লাভাবিটের পথ অনুসরণ করছে না কেন?

    গোপন আদালতের গণতন্ত্র

    লাভাবিট বন্ধ হয়ে যাওয়া বিষয়ক একটা রিপোর্টে বিশেষ জরুরি একটা কথা মনে করিয়ে দিয়েছে গার্ডিয়ান পত্রিকা। লাভাবিটই প্রথম কোম্পানি যাঁরা সরকারি নজরদারির অংশীদার না হয়ে নিজেদের কোম্পানি নিজেরা বন্ধ করে দিলেন। তাহলে এরকম কোম্পানি নিশ্চয়ই আরো আছে, যারা কোম্পানির ব্যবসা বাঁচানোর স্বার্থে গ্রাহকদের প্রাইভেসি উদোম করে দিয়েছে ‘এনএসএ’র কাছে? গ্রাহকদের আব্রু যায় যাক, কোম্পানির ডলার বাঁচুক।

    আর্টওয়ার্ক: ইন্সপেকশন এন্ড সেন্সুর
    শিল্পী: মোহসেন জারিফিয়ান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    হ্যাঁ, এরকম কোম্পানি আছে। এক গাদা আছে। আপনার-আমার প্রিয় এবং বিশ্বস্ত সব খ্যাতিমান কোম্পানি। এঁরা হলেন: ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগল এবং ইত্যাদি এবং প্রভৃতি। পাইকারি নজরদারি প্রকল্পের তাঁরা আইনসঙ্গত রাষ্ট্রীয় পার্টনার। নোম চমস্কির ‘দ্য স্টেট-কর্পোরেট কমপ্লেক্স’-এরই এ আরেক রূপ বটে।

    এইসব নামজাদা কোম্পানি আপনার-আমার যাবতীয় একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য দৈনিক-ভিত্তিতে কাছা খুলে তুলে দেয় ‘মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি’ বা এনএসএ-র কাছে। সুতরাং ল্যাডার লেভিসনের কথা সিরিয়াসলি আমলে না নেওয়া অসম্ভব। কেউ যেন ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগলকে সামান্য বিশ্বাসও না করেন।

    এই হলো মার্কিনী ‘গোপন আদালতের গণতন্ত্র’। ফিল জিমারম্যান ঠিকই বলেছেন, এই আদালতের আদেশ আর খামে করে পাঠাতে হয় না। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রিত থাকে তা। নিতান্ত অন্ধ না হলে পড়তে সমস্যা হয় না। এগুলো সব ‌‘আইনী প্রক্রিয়া’! আইনের শাসন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন আদালতের গণতন্ত্র’ এই হাল করেছে বিশ্ববন্দিত আইনের শাসনের। এ যেন সত্যিকারের হরর সিনেমা। জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের বিগ ব্রাদারের সর্বগ্রাসী নজরদারি-সাম্রাজ্যের কল্পনাকেও হার মানাতে যাচ্ছে আজকের ওয়াশিংটনের সাইন্স ফিকশন হরর মুভি।

    সেনা রাষ্ট্র-কর্পোরেট নজরদারি ঠেকানোর পথ কী?

    এখানে উপস্থাপিত সার্বিক আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে এবং সমাজ-সচেতন প্রাণী হিসেবে আমাদের নিজেদের কর্তব্যের প্রশ্নটাও এসে যায়। প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, আলোচ্য প্রসঙ্গ সম্পর্কে যথাসম্ভব পড়াশোনা করা, জানা-বোঝার চেষ্টা করা, এগুলো নিয়ে বন্ধু-বান্ধব-সহকর্মী-সাথী-পরিবারের সাথে শেয়ার করা। এইসব কথাবার্তা আপনি নামজাদা-খ্যাতিবাহাদুর অধিপতি মিডিয়ায় পাবেন না। যদিও বা পান, পাবেন টুকরা-টাকরা-বিক্ষিপ্ত-এলোমেলো সংবাদ-কণিকা, যা থেকে সার্বিক কোনো ধারণা পাওয়ার সামান্য উপায়ও নেই। সুতরাং আমাদের নিজেদের দিক থেকে জ্ঞান-কর্ম-সক্রিয়তার কোনো বিকল্প নেই। অন্যরা কী করছেন না করছেন সেদিকে তাকিয়ে বসে থাকার অবকাশও নেই। হাতে সময় নেই একেবারেই।

    যে বিপদের কথা এখানে আলোচিত হচ্ছে তা কিন্তু স্রেফ ইউরোমার্কিন বিপদ নয়। এ বিপদ রওনা দিয়েছে আমাদের ধনলুণ্ঠিত তৃতীয় বিশ্বের দিকেও। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম আশু টার্গেট। ইঙ্গমার্কিন সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের কাছে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। তথাকথিত মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ এবং আফগানিস্তান-ইরাক-পাকিস্তান-সিরিয়ার কথা মনে রাখলে এই বিপদের গন্ধ সুনিশ্চিভাবে আপনার সুনিদ্রা ব্যাহত করবে। উইকিলিকসের উন্মোচনসমূহের মধ্যে যদি আপনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের গোপন দলিলপত্র নাড়াচাড়া করে দেখেন তাহলে শিউরে উঠবেন। বাংলাদেশের যাবতীয় সামরিক সংস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-প্রণালীর ওপরে মার্কিন প্রভাবের যে ইশারা সেগুলোতে আছে তা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র-সরকার-সংসদ ও সামরিক বাহিনী-সমূহের সম্যক আন্দাজ আছে কিনা আমি জানি না। আমার সংশয় আছে।

    সম্প্রতি, বিডিআর-বিদ্রোহ নিয়ে আমার বইটার (‘বিদ্রোহের সপ্তস্ব: বিডিআর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়) বিস্তারিত-পরিমার্জিত-পরিলিখিত দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ করতে গিয়ে ঐসব দলিলপত্র আমাকে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কথাগুলো তোলা। এখানে আপাত বড়ো পরিসরের আলাপে ঢোকার অবকাশ নাই। শুধু মনে রাখলেই চলে যে মূলত ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ দমনের নামে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানারকম গোপন চুক্তি চলছে যা আমরা জানি না। এসব চুক্তির বিষয়বস্তু কী তাও আমরা জানি না। উপরোক্ত মার্কিন দলিলগুলোতে দেখেছি বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন আগ্রহের প্রধান জায়গা হচ্ছে নিরাপত্তা আর কর্পোরেট ব্যবসা।

    সুতরাং নিরাপত্তা চুক্তির নামে যে বাংলাদেশকে মার্কিন এনএসএ-নজরদারি-প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করবে তা ধারণা করাটা অমূলক নয়। জানি না এতদিনে এ কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে কিনা। সুতরাং এ ইন্টারনেটের স্বাধীনতা এবং নজরদারিমুক্ত নাগরিক-স্বাধীনতার প্রসঙ্গগুলো জানা এবং প্রচার করার কর্তব্য আমাদের থাকে। আমাদের দ্বিতীয় কর্তব্য, আমার ধারণা, মার্কিন নজরদারির পার্টনার-কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে নীতিগত কারণে যথাসম্ভব পরিত্যাগ করা এবং বিকল্প-স্বাধীনতার পথে ইন্টারনেট ব্যবহার করার অভ্যাস করা। দ্বিতীয় এই দিকটা নিয়ে এখানে অতি সামান্য দুই-একটা উপায়ের কথা বলে রাখার অবকাশ আছে। নিজের ক্ষেত্রে আমি বহুল ব্যবহৃত সার্চইঞ্জিন ‘গুগল’ বিদায় দিয়েছি। গ্রহণ করেছি নতুন, দুর্দান্ত একটা সার্চইঞ্জিন ‘ডাকডাকগো’। এটা অতি অ-সাধারণ একটা সার্চ ইঞ্জিন। অধিকন্তু, এটা একটা প্রাইভেসি- সার্চইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন আপনার ব্যক্তিগত তথ্য-পরিচয়-স্থান ইত্যাদি অনুসরণ করে না। রেকর্ড করে রাখে না। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে না। রাষ্ট্রীয় এজেন্সিকে দেয় না। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য চাইলে কয়েকটা লিংকে ঢুকে দেখা যাতে পারে। গুগল কীভাবে আপনার বারোটা বাজায়, ‘ডাকডাকগো’ কীভাবে বাজায় না সে সম্পর্কে জানার জন্য দ্রষ্টব্য: http://donttrack.us/। বাবল প্রযুক্তি কীভাবে টিকটিকিগিরি করে আমাদের ব্রাউজারে, সে সম্পর্কে জানার জন্য দ্রষ্টব্য: http://dontbubble.us/। আপনার ব্রাউজারের প্রাইভেসির জন্য দারুণ কিছু টিপস পাওয়া যাবে এখানে: http://fixtracking.com/। ‘ডাকডাকগো’ নিয়ে একটা ছোট অ্যানিমেশন দেখা যাবে এখানে: https://duckduckgo.com/about।

    এখানে যে লিংকগুলো দিয়েছি সেগুলোতে কয়েকটা প্রাইভেসি- অ্যাডঅন আছে। সেগুলো ইন্সটল করলে হাতেনাতে ফল পাবেন। হাতেনাতে দেখতে পাবেন। নিজের চোখে। দেখবেন কারা আপনাকে ট্র্যাক/ফলো করছে। এবং তাদের কীভাবে থামানো হচ্ছে। রাষ্ট্র- কর্পোরেট নজরদারি তো মানি না মানব না দিয়ে থামানো যাবে না। আপনাকে আপনার নিজের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আপনার-আমার অভ্যাস বদলাতে হবে। সফটওয়ার বদলাতে হবে। গুগল ছাড়তে হবে। ফেসবুক ছাড়তে হবে। তবেই এই রাষ্ট্র-কর্পোরেট সিস্টেমের আক্কেল হবে। সুতরাং নিজেকে তৈরি করুন। প্রস্তুত হোন। রাষ্ট্র-কর্পোরেট সফটওয়ার ব্যবহারের চিরঅভ্যাসের চিন্তাদাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন।

    তথ্যচোর, প্রাইভেসি-চোর গুগল তো ছেড়ে দিয়েছি। এবার ফেসবুকের বন্ধুদেরকে ফেসবুকের বিপদআপদগুলো বলা দরকার। এবং ফেসবুকের তাদেরকে ডায়াস্পোরে আসার দাওয়াত দেওয়াও দরকার। এটা নিতান্ত আমার-আপনার নিতান্ত ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপার না। এমন কোনো আকামকুকাম আমি-আমরা করি না যে, আমাকে-আমাদেরকে মুখোশ পরে লুকিয়ে ঘুরতে হবে। আসলে এটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত। কী ধরনের রাষ্ট্র আমি চাই? যে রাষ্ট্র ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা আমাকে অপরাধী জ্ঞান করে নজরদারি করতে থাকবে? কেমন ইন্টারনেট চাই আমি? যে ইন্টারনেট হাজারটা গোয়েন্দা নজরদারিতে আমার প্রত্যেকটা ক্লিক রেকর্ড করবে? গোটা ইন্টারনেটের সমস্ত মানুষ সন্দেহভাজন মারাত্মক অপরাধী, আর রাষ্ট্র-কর্পোরেট-আমলা-গোয়েন্দারা সব ফেরেশতা? তামাশার সত্যি সীমা আছে।

    ফেসবুকে আপনি সম্পূর্ণ বেআব্রু। এখানে প্রাইভেসি বলতে কিছু নাই। ফেসবুক আপনার যাবতীয় তথ্য বিক্রি করে। চাওয়া মাত্র সরকারকে দিয়ে দেয়। সারা দুনিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপনাকে নজরদারি করে। প্রত্যেকটা ক্লিক এখানে রেকর্ডেড থাকে চিরদিনের জন্য। ফেসবুক রাষ্ট্র-বাণিজ্য-কর্পোরেটের কাছে আমার ‘প্রাইভেট পার্টস’ চুরি কোরে বেচে দেয়, আমাকে নাঙ্গা করে দেয়।

    এছাড়া, ফেসবুক-কর্তৃপক্ষের বানানো স্বৈরতন্ত্রী কিছু নিয়ম মেনে চলতে ফেসবুকে আপনাকে বাধ্য করা হয়। আপনি অন্যের বানানো নিয়মের দাস মাত্র। পুতুল মাত্র। শুধু তা-ই নয়, ফেসবুক বিজ্ঞাপনে ভরা। বিরাট এক বাজার। এখানে সামাজিক সম্পর্ক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়। ফেসবুক তাহলে কীভাবে ‘সামাজিক’ নেটওয়ার্ক হলো? এটা আসলে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। আপনাকে বিক্রি করে ফেসবুক।

    একটা প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে। এই আমি ফেসবুকে বসেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছি, নীতিগত দিক থেকে সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য? আমার বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পরিবারের মধ্যে থেকেই কি আমরা পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলি না? নতুন ধারার পরিবার গঠনের কথা বলি না? এ ছাড়া উপায় কী? পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে কি তাহলে আমাকে পরিবারের বাইরে জন্মগ্রহণ করতে হবে? তা তো সম্ভব না? তাহলে কি পরিবার যা তা-ই আমাকে বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হবে? তাজ্জব কিসিমের যুক্তি বটে। আমি তো একটা রাষ্ট্রের মধ্যে জন্মেছি। বসবাসও করি রাষ্ট্রেরই মধ্যে। আমার জীবন-মরণের মালিক আইনত রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সংবিধান-আইনকানুন মানতে আমি আইনত বাধ্য। তাই বলে কি আমি আমার রাষ্ট্র-সংবিধান-আইনকানুনের ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতে পারব না? রাষ্ট্রের অন্যায় আচরণের বিরোধিতা করতে পারব না? তার জন্য কি আমাকে রাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে অবস্থান করতে হবে। রাষ্ট্রের বাইরে তো পৃথিবীতে কোনো জায়গায় নাই। তার মানে কি সমালোচনা পর্যালোনা বিরোধিতা-প্রতিবাদ-রূপান্তর অসম্ভব? এ হলো বিদ্যমান অচলায়তনকে প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেওয়ার যুক্তি। রাষ্ট্রের-পরিবারের-বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাডিক্যাল রূপান্তরের কথা আমরা বলতে পারি। আইনে বাধে না। নীতিতে বাধে না।

    কিন্তু ফেসবুক তো আর আমার কথায় রূপান্তরিত হবে না। উল্টো ফেসবুকই আমার বিরুদ্ধে বহিষ্কারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার রাখে। এটাই ফেসবুকের আইন। তাদের ইন্সট্রাকশানের বাইরে যাওয়ার উপায় আমাদের নাই। আমরা তো আর ফেসবুকের মালিক না। ফেসবুকের মালিক একচ্ছত্র জাকারবার্গ। এখানে মালিকের সাথে ফেস-টু-ফেস হওয়ার কোনো উপায়ই নাই বলা চলে। তাঁর এবং তাঁর পছন্দের লোকজনের তৈরি করা যেকোনো ‘আইন’ আমাকে মেনে চলতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে। এর বিরুদ্ধে কিছুই করার থাকবে না কারো। আমরা ফেসবুকের গোলাম। একেই সম্ভবত একনায়কতন্ত্র বলে।

    ফেসবুক একটা একনায়কতন্ত্রী সামাজিক নেটওয়ার্ক। যা ‘একনায়কতান্ত্রিক’ তা আবার ‘সামাজিক’ হয় কীভাবে? সোনার পাথর-বাটির মতো অবস্থা। যে ফেসবুক আমাকে এবং আমার মতো কোটি গ্রাহকের প্রাইভেসি বিক্রি করে বিলিয়ন ডলার কামাচ্ছে, তার নীতিবোধই বা কোথায় থাকে। সুতরাং ফেসবুক ব্যবহার করে ডায়াস্পোরার প্রচার করার মধ্যে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। এই ধরনের সমস্যায় যারা ভোগেন বা ভুগতে আগ্রহী, একনায়কপ্রীতি, কর্তৃত্ববান্ধব দাসমনোবৃত্তি, অতিরিক্ত ফেসবুক-আসক্তি এবং পরিবর্তন-বিমুখতার চিরপুরাতন ব্যাধিই তাদের আদি অসুখ কিনা তা ভেবে দেখতে প্রলোভন জাগে। যেকোনো প্রলোভনই অবশ্য পরিত্যাজ্য বটে।

    ডায়াস্পোরা ট্রাই করে দেখা যেতে পারে। একটা সত্যিকারের সামাজিক নেটওয়ার্ক। এটা বিজ্ঞাপনমুক্ত। অবাণিজ্যিক। ব্যবহারকারীরাই ডায়াস্পোরা নেটওয়ার্কের আইনানুগ মালিক। ভাবতে পারেন? এটা করা হয়েছে এইজন্য যেন কর্পোরেট পুঁজি একে কোনোদিন কিনে ফেলতে না পারেন। অসাধারণ। ‘ডায়াস্পোরা’য় আপনার প্রাইভেসি সম্পূর্ণ গ্যারান্টিড। ডায়াস্পোরা আপনার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করতে চায় না। জানতেই চায় না। নিজের সম্পর্কে কতটুকু তথ্য আপনি দেবেন, না দেবেন সেটা পুরোপুরি আপনার ব্যাপার। ডায়াস্পোরা থেকে আপনার একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য চাইলেও গোয়েন্দারা পাবেন না। ডায়াস্পোরার সফটওয়ার আপনার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য জমাই রাখে না। গোয়েন্দারা পাবে কীভাবে? এই সফটওয়ারটা ওপেনসোর্স। কারিগরি জ্ঞান থাকা সাপেক্ষে চাইলে আপনি নিজেই পরীক্ষা দেখতে পারেন এইসব দাবি সত্য কিনা, এবং এটা কীভাবে কাজ করে।

    ডায়াস্পোরা আপনার প্রকৃত নাম-জন্ম-দেশ-লিঙ্গ-পরিচয় কিছুই জানতে চায় না। স্রেফ আপনার ইমেইল ঠিকানা, ছদ্মনাম আর পাসওয়ার্ড দিলেই আপনার অ্যাকাউন্ট খুলে যাবে। আপনার ইমেইল ঠিকানাটা সঠিক কিনা এবং আপনি নিজেই সেটা স্বেচ্ছায় ডায়াস্পোরায় দিয়েছেন কিনা সেটাও পরীক্ষা করে দেখে না ডায়াস্পোরা। অথচ ফেসবুকে আইনত আপনার যাবতীয় প্রকৃত তথ্য দিতে আপনি বাধ্য। যারা সেখানে নিক নেম দিয়ে আছেন, আইনত তারা অপরাধী। শুধু এই কারণেই আপনার শাস্তি হতে পারে। ডায়াস্পোরা নিক নামকেই উৎসাহিত করে।

    আপনি নিজে একজন ব্যবহারকারী হিসেবে কী পদ্ধতিতে নিজেকে চালনা করবেন তা ডায়াস্পোরার মাথাব্যথার বিষয়ই না। তার মানে, কীভাবে আপনি ডায়াস্পোরা ব্যবহার করবেন সেটা আপনার নিজের ব্যাপার। এ ব্যাপারে ডায়াস্পোরা আপনার ওপর ফেসবুকের মতো করে কোনো প্রকার আইনকানুন-নিয়মনীতি চাপিয়ে দেয় না। আপনার বিবেকবুদ্ধি-চিন্তাভাবনা যুক্তিবোধের ওপরই তার আস্থা। ডায়াস্পোরার প্রণয়ন করা একটা ‘কমিউনিট গাইডলাইন’ আছে বটে। কিন্তু মেনে চলা বা না চলাটা আপনার ইচ্ছা। এটা বাধ্যতামূলক কিছু না। নীতিমালা ভাঙার দায়ে আপনাকে ডায়াস্পোরা থেকে বের করে দেওয়ার মতো কোনো ‘কর্তৃপক্ষ’ ডায়াস্পোরায় নেই। এটা কর্তৃত্বতন্ত্রমুক্ত একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

    আর্টওয়ার্ক: অব ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন
    শিল্পী: নাজি বেনাজি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ডায়াস্পোরায় ফেসবুকের মতো ‘স্ট্যাটাস’ বলা হয় না, ‘কনভার্সেশন’ বা ‘আলাপ’ বলা হয়। সুন্দর আইডিয়া। স্ট্যাটাস শব্দটা অনেক বেশি অন্তর্মুখীন, নিষ্ক্রিয়, আত্মকেন্দ্রিক। আলাপ তা নয়। আলাপ সক্রিয়, নিজের গুরুত্বের হানি না ঘটিয়েও অপরের সাথে যোগাযোগে আগ্রহী। উপরন্তু, ডায়াস্পোরা’র ‘স্ট্রিম’ পাতায় ফেসবুকের হোমপেজের মতো আবর্জনা জঙ্গল হয়ে থাকে না। এখানে আপনি যা দেখতে চান শুধু সেই বিষয়ের জিনিসপত্রই আপনার ‘স্ট্রিম’ পাতায় দেখায়। সেটা আপনিই নির্ধারণ করবেন। করবেন নতুন নতুন হ্যাশট্যাগ যোগ করে করে। যেমন #art বা #assange ইত্যাদি। এই সব ট্যাগওয়ালা পোস্টই আপনার ‘স্ট্রিম’ পাতায় দেখায় ডায়াস্পোরা। ফলে ডায়াস্পোরার সামাজিক আলাপ অনেক বেশি ফোকাসড্ বা নির্দিষ্ট আগ্রহকেন্দ্রিক। আর অ্যানোনিমিটিই যেহেতু ডায়াস্পোরার মূল ধারা, তাই ফেসবুকের মতো এটা ‘আমাকে দেখো’ টাইপের মঞ্চ মঞ্চ খেলার মাঠ প্রস্তত করে না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির কারিশমার চেয়ে এখানে বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক সামাজিক আলাপ-আলোচনা ডিসকোর্সই মূল ঘটনা হয়ে ওঠে। আবার, ডায়াস্পোরায় সামাজিকতা বজায় থাকে পূর্ণ প্রাইভেসি-আব্রু-ইজ্জত সহকারেই। সুতরাং ডায়াস্পোরায় আসুন। সেখানে আমরা ‘মুক্তধারা’ নামে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করি। এটা একটা খোলা নেটওয়ার্ক। মুক্তধারা নেটওয়ার্ক। আপনিও আসুন। আমাদের যোগাযোগ হোক। তখন আরো শেয়ার করা যাবে। পরস্পরের থেকে শেখা যাবে।

    ডায়াস্পোরা প্রকৃতপক্ষে ফেসবুকের মুনাফাগন্ধী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের কোনো বিকল্প না। ডায়াস্পোরা আমূল পৃথক ধারার সামাজিক নেটওয়ার্ক। ‘সামাজিক’ শব্দটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এটা রাষ্ট্রের পার্টনার না। এটা কর্পোরেট হাউস না। ডায়াস্পোরা স্বতন্ত্র একটা ধারা, বা পরিপ্রেক্ষিত, বা দৃষ্টিকোণ বা প্যারাডাইম বটে। ফেসবুকের ধরণ-ধারণ থেকে এ এক বিরাট বাঁকবদল। নেট-সমাজকে দেখার-বোঝায়-মিথষ্ক্রিয়ার একেবারে আলাদা একটা মনোভঙ্গি বা অ্যাপ্রোচ। সমাজবিজ্ঞানে এই ধরনের ঘটনাকে প্যারাডাইম শিফট বলা হয়ে থাকে।

    ডাকডাকগো কিংবা ডায়াস্পোরা ছাড়াও ইতোপূর্বে উল্লিখিত পিজিপি, টর, পিজিন, ওটিআর অরবট, গিবারবট, বিটকয়েন প্রভৃতি সফটওয়ারগুলো আমাদের আয়ত্ত করা দরকার। এই সফটওয়ারগুলো প্রাইভেসি বা স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। একই সাথে এগুলো ব্যবহারকারীর অনলাইন অ্যানোনিমিটির দিকটাও নিশ্চিত করে। প্রাইভেসি, স্বাধীনতা আর অ্যানোনিমিটির বিষয়গুলো ঘনিষ্টভাবে পরস্পর বিজড়িত প্রসঙ্গ যে সে কথা বলা বাহুল্য বটে।

    অনলাইন অ্যানোনিমিটি অথবা পরিচয়ের রাজনীতি

    আমাদের আজকের নিওলিবারাল পৃথিবীতে ব্যক্তি-মানুষ এবং তার পরিবার-বন্ধুবান্ধব-গোষ্ঠী-পাড়া-গ্রাম-সমাজের ওপরে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রশক্তির দাপট এমনই বেড়েছে যে রাষ্ট্রীয় আইনের অভ্যাসের বাইরে আমরা নিজেদের মতো করে চিন্তা করতেই ভুলে গেছি। আমরা যেন রাষ্ট্র এবং তার পার্টনার-প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনের অবৈতনিক দালাল। হুকুমের গোলাম। সবাই আমরা এখন ইউরো-আমেরিকান পোষা কুকুর। গলায় পরিচয়ের বেল্ট ঝুলিয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রামাণিকতা জাহির করতে হবে।

    আমি বেঁচে আছি অথবা মরে গেছি – এর যেকোনোটা প্রমাণ করতে চাইলে আমাকে আদালতে যেতে হবে। উকিল ধরতে হবে। কাগজ লাগবে। টাকা লাগবে। মানুষের চেয়ে কাগজ বড়। মানুষের চেয়ে আইন বড়। দারোগা বড়। রাষ্ট্র বড়। রাষ্ট্র মাত্রেই এখন ‘হীরক রাজার দেশ’: ‘যার নাম নেই, তার কথার কোনো দাম নেই’। অথচ পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ চিরকালই, নমস্য হাসান আজিজুল হকের ভাষায়, ‘নামহীন গোত্রহীন’ ছিল।

    আজ পরিবার-স্কুল-মিডিয়া-রাষ্ট্র সবাই মিলে আমাদেরকে এবং তাদের নিজে-দেরকেও তোতা পাখির বিদ্যা মুখস্ত করিয়ে শেষ করেছে। যা খবরের কাগজে লেখে না, তা চিন্তা করাও কঠিন। যা টিভিতে দেখায় না, এ জগতে তার অস্তিত্বই নাই। নাম-পরিচয়ের রাষ্ট্রচিন্তাই আজ আমাদের ব্যক্তি-চিন্তা। এখন আমরা অ্যানোনিমিটির কথা শুনলে আঁতকে উঠি। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, আমি তো অপরাধী নই, আমার তো লুকানোর কিছু নেই, তাহলে আমি মিথ্যা-মিথ্যা ‘দুই-নম্বরি’ একটা নিক নাম গ্রহণ করতে যাব কেন? অপরাধচিন্তাই একমাত্র চিন্তা আমাদের। হয় তুমি অপরাধী, নয় তুমি পুলিশ। আমারা আমাদের সমাজকে অপরাধীদের সমাজে পর্যবসিত করেছি। এখানে সকলেই অপরাধী বা সম্ভাব্য অপরাধী।

    অ্যানোনিমিটি জিনিসটা প্রাইেভসিরই বিশেষ একটা রূপ। ‘অ্যানোনিমিটি’ কথাটার গোড়ায় আছে গ্রীক শব্দ ‘অ্যানোনিমিয়া’, যার অর্থ ‘নামহীন’, তথা ‘নামহীনতা’। যেকোনো যোগাযোগ-পরিস্থিতিতে অ্যানোনিমিটি বা ‘নামহীনতা’ বলতে বোঝায় যোগাযোগকারীর নাম অপ্রদর্শিত থাকা। সফটওয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে নামহীনতার প্রয়োগ এমনভাবেও করা হতে পারে যাতে করে বার্তার উৎস ব্যক্তিকে শনাক্ত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব হয়ে ওঠে। নামহীনতার বিশেষ একটা রূপ হচ্ছে ছদ্মনাম গ্রহণ। এক বা একাধিক ছদ্মনাম গ্রহণ করার রেওয়াজ কবি-সাহিত্যিক আর বিপ্লবী লেখকদের মধ্যে বহু পুরোনো। অনেকের একাধিক ছদ্মনাম থাকতে পারে। একেক ধরনের যোগাযোগের জন্য একেকটা ছদ্মনাম ব্যবহৃত হতে পারে। সম্প্রতি মাইক্রোসফটের ইমেইল সার্ভিস আউটলুক বা হটমেইল গ্রাহকদেরকে অনেকগুলো করে ছদ্মনাম গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। একই ইমেইল অ্যাকাউন্ট আমি ব্যবহার করছি। কিন্তু একক জনের কাছে আমার ইমেইল ঠিকানাটা একেক নামে প্রদর্শিত হচ্ছে। এখনই আমি ‘মিনাজেল-উসিটেরন অ্যাট হটমেইল ডট কম’। আবার এখনই আমি ‘সেলিমরেজানিউটন অ্যাট হটমেইল ডট কম’। আবার এখনই ‘ইটইজফরবিডেনটুফরবিড অ্যাট হটমেইল ডট কম’।

    এভাবে অনলাইন অ্যানোনিমিটির ক্রমবর্ধমান সামাজিক দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে মাইক্রোসফট। মাইক্রোসফটের এই অ্যানোনিমিটি অবশ্য লোকদেখানো-লোকঠকানো টাইপের দুধভাত-অ্যানোনিমিটি। কারণ, কম্পিউটার-কারিগরির দিক থেকে এই ধরনের ছদ্মনাম মোটেও কোনো নামহীনতার নিশ্চয়তা দেয় না। আপনার প্রকৃত পরিচয় এক্ষেত্রে কারিগরিভাবে শনাক্ত করাটা ডালভাত মাত্র। সত্যিকারের নামহীনতার জন্য দরকার টর, পিজিন, ওটিআর জ্যাবার, কে-মেইল, এপিজি প্রভৃতি সফটওয়ার। তাহলেও তারপরও মাইক্রোসফটের এই সেবা বলে দিচ্ছে, নামহীনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করাটা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

    নীতিবোধগত-শ্রেয়োবোধগত বিচারে অ্যানোনিমিটি আদৌ কোনো অপরাধকর্ম নয়। নামহীনতার ধারণা ইন্টারনেটের আবিষ্কৃত কোনো ধারণা নয়। এ বস্তু বহু পুরাতন বস্তু। যেমন মহাভারত-রামায়ন-বেদ-পুরাণ-উপনিষদ কোন ব্যক্তির বা ব্যক্তিবর্গের লেখা তা তাঁরা জানিয়ে যান নি। সাহিত্যিক ‘উইলিয়াম শেক্সপিয়ার’ও সম্ভবত কোনো ছদ্মনাম। এ ব্যক্তির আসল নাম কী তা আজ আর জানার উপায় নেই (people.dsv.su.se/~jpalme/society/anonymity.html)। সমাজে-রাষ্ট্রে বহুকাল ধরে পরিচয়ের-অপরিচয়ের অনুশীলন স্বীকৃত। মানে নিজের পরিচয় নিজের বিবেচনাবোধ ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানোর বা না জানানোর অধিকার। এই অধিকার-অনুশীলন-দাবির বিরাট রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে।

    আর্টওয়ার্ক: প্রাইভেসি ২০৩০ শিল্পী: লুইস বুয়েনাভেঞ্চুরা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    নামহীনতার ব্যবহার ঘটতে পারে অনেক ধরনের প্রয়োজন পূরণের জন্য। সুপরিজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি ছদ্মনামে বার্তা পাঠানোর প্রয়োজন বোধ করতে পারেন। তিনি হয়ত চান না যে ঐ বার্তা আগে থাকতেই তার নাম নিয়ে চাউর হোক। তাতে করে জনমনে নানা রকম ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। আমি যদি শিবিরকর্মী হই তাহলে ছাত্রলীগের ডেরায় গিয়ে বলি না যে আমি শিবিরের একনিষ্ঠ কর্মী। আমার পরিচয় এখানে জীবনের নিরাপত্তার সাথে জড়িত। রাবি’র নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, বন্ধু বখতিয়ার আহমদ, পাহাড়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছে অনেক পাহাড়ী সম্প্রদায় বাংলাদেশ, বার্মা, ভারত রাষ্ট্রসমূহের নানান সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহের হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে একাধারে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও বর্মী পরিচয় বহন করে। যেখানে যেটা প্রয়োজন সেখানে সেটা ব্যবহার করে। সমাজবিজ্ঞানীরা বা ব্যবসায়িক-বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানসমূহ বা সরকার বা এনজিওরা যখন সামাজিক জরিপ পরিচালনা করেন তখন তাঁরা উত্তরদাতাদের নাম-পরিচয় অজ্ঞাত রাখার সুযোগ দেন অবারিতভাবে। এই নামহীনতা বা অ্যানোনিমিটি ছাড়া তাদের জরিপের উদ্দেশ্য বৃথা যাওয়ার সম্ভাবনা। এ ছাড়া সাংবাদিকদেরকে বা পুলিশকে স্বেচ্ছায় গোপন তথ্য-সূত্র-ইশারা প্রদানকারী অনেক মানুষ নিজেরা নামহীন বা অ্যানোনিমাস থাকতে চান। পুলিশ এবং সাংবাদিকদেরকে সেটা মেনে নিতে হয় তো বটেই, সেই নামহীনতাকে রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হয়।

    ডাক্তার-উকিল-বিচারক-ধর্মযাজকদেরকে অনেক মানুষের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য ও নাম-পরিচয় গোপন রাখতে হয় পেশাগত সততার স্বার্থেই। অনেক দেশেই এইসব তথ্য-পরিচয় গোপন রাখাটা আইনের চোখে আবশ্যক শর্ত। অনেক চার্চে যাজকের সামনে ব্যক্তির ‘পাপের স্বীকারোক্তি’ বা কনফেশনের জন্য আলাদা বুথ বা কাউন্টার থাকে। সেখানে যাজক ব্যক্তিটিকে সরাসরি দেখতে পান না। এও তো নামহীনতাই বটে। আর সংবাদপত্রে বক্তিগত বিজ্ঞাপনের কলামে বা এমনকি চিঠিপত্রে বা এমনকি সম্পাদকীয় নিবন্ধে বা এমনকি খোদ সম্পাদকীয়তে নামহীনতার চর্চা অথবা ছদ্মনামের চর্চা তো রীতিমতো পুরোনো প্রথা।

    আবার আমাদের সুমহান সংসদীয় গণতন্ত্রেও ভোটাররা ভোট দেন নিজেদেরকে নামহীন রেখেই। এই নামহীনতা তাদের মতের নির্ভিক ও নিরাপদ প্রকাশের নিশ্চয়তা দেয়। অন্য দিকে, সুপ্রাচীন কাল থেকে যারা দানখয়রাত-পরোপকার করে আসছেন, সেইসব হিতৈষী ব্যক্তিরা প্রায়শই নামহীনতার নিশ্চয়তা চান। পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও আছে: ‘ডান হাত দান করলে যেন বাম হাত জানতে না পারে’। অ্যানোনিমিটি এসব ক্ষেত্রে অনিবার্য শর্ত প্রায়। বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের বা মাফিয়াদের বা রাষ্ট্রের বা সামরিক বাহিনীর বা কোনো কর্পোরেট-গোষ্ঠীর গুরুতর দুর্নীতির কথা উন্মোচন করে দিতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই নামহীনতার আশ্রয় নিতে হয়। হুইসল ব্লোয়ারদের জন্য অ্যানোনিমিটি তাই অপরিহার্য। এজন্যই উইকিলিকস তাদের সংবাদ-সূত্রদের অ্যানোনিমিটির পূর্ণাঙ্গ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করেছে এনক্রিপ্টেড সফটওয়ারের সাহায্যে। কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই কোনো ক্ষমতাহীন ব্যক্তির পক্ষে সবসময় স্বনামে সমালোচনা করা সম্ভব হয় না। এসব ক্ষেত্রে নামহীনতার প্রযুক্তির কোনো বিকল্পই নেই।

    অনেক দেশ আছে যেখানে বাকস্বাধীনতা নেই। মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নেই। সত্য প্রকাশের অধিকার নেই। সেই সব দেশের বিবেকবান মানুষদেরকে মতপ্রকাশ, সত্যপ্রকাশ, বাকপ্রকাশের কারণে নিগৃহীত হতে হয়। কারাগারে যেতে হয়। চাকরি হারাতে হয়। নির্বাসিত হতে হয়। এমনকি মৃত্যুবরণও করতে হয়। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, ইসরায়েল, বাংলাদেশ প্রভৃতি রাষ্ট্র। এসব রাষ্ট্রে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে নামহীনতার গুরুত্ব অপরিসীম।

    নামহীনতা বা প্রাইভেসির ব্যাপারগুলো এসব ক্ষেত্রে লজ্জাজনক গোপনীয়তা লুকানোর আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটায় না। নামহীনতার ধারণা এখানে সবসময়ই মতামতের মুক্তপ্রকাশ এবং অধিকতর গণতন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে অনেক দেশের মানবাধিকার কর্মীদেরকে, বার্মার ভিন্নমতাবলম্বী গেরিলাদেরকে, অথবা ভারতের আদিবাসী মাওবাদী গেরিলাদেরকে, কিংবা মেক্সিকোর জাপাতিস্তা-আন্দোলনের কর্মীদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয় পুরোপুরি নামহীন প্রযুক্তিসমূহের সাহায্যে। এ ছাড়া অত্যাচার-বিভীষিকার হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই।

    নামহীনতার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত, ডায়াস্পোরার মতো, অনলাইন সামাজিক ফোরামে মানুষ অনেক বেশি মন খুলে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে আলোচনাকারী সহজেই এক ধরনের পারস্পরিক সমতা অনুভব করতে পারে। নামহীন বার্তার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়নকারীকে অনেক স্বচ্ছন্দে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ব্যাপারটিও এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রকৃত নাম লিখতে পারেন না। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীনতা বজায় রাখার জন্য এখানে অ্যানোনিমিটি বা নামহীনতার ব্যবহার।

    কাউকে উপদেশ দেওয়া আমার খাসলতের মধ্যে পড়ে না। সকলেই নিজের নিজের কাজ বোঝেন। কিন্তু আমি নিজে নিজে ভাবি। আমার মনে হয়, টর ব্রাউজারের সাহায্যে ডায়াস্পোরা জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কে সত্যিকারের অ্যানোনিমিটির সাহায্যে মতপ্রকাশ করলে রাজীব হায়দার, আসিফ মহিউদ্দিন, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, সুব্রত অধিকারী শুভ এবং শফিউর রহমান ফারাবীদের মতো তরুণ ব্লগারদেরকে হয়ত রাষ্ট্রীয়-বিরাষ্ট্রীয় হত্যা-জেল-জুলুম- নিপীড়নের স্বীকার হতে হতো না।

    এঁরা কে কোন পক্ষের মতাদর্শ অনুসরণ করেন, না করেন। তা এখানে আমার বিবেচ্য না। আমার কাছে মতাদর্শের চেয়ে মানুষ বড়। এঁরা ব্লগে ভালো কথা লিখেছেন, না খারাপ কথা লিখেছেন, সেগুলোর সাথে আমি একমত, নাকি একমত নই, তা অবশ্য এখানে আলোচ্য নয়। তা নিয়ে আমি অন্যত্র[3] লিখেছি। আমার কাছে প্রধান প্রশ্নটা হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অবাধ ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে অ্যানোনিমিটির কোনো শক্তিশালী ভূমিকা আছে কিনা তা বিবেচনা করা।

    এই ধরনের ক্ষেত্রে নামহীনতার অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে যে নিপীড়নধর্মী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী তথ্য-প্রযুক্তি-আইন সরকার পাশ করতে যাচ্ছে তা পার পেয়ে গেলে আমাদের অনেককেই নামহীনতার আশ্রয় নিতে হবে যে তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

    নামহীনতা ব্যক্তিমানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত তো করেই। এ ছাড়াও তা সার্বক্ষণিক রাষ্ট্রীয়-প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির হাত থেকে নাগরিকদেরকে রক্ষা করতে পারে। আবার ইন্টারনেটে ব্যবহারীকারীদের আচার ব্যবহার প্রয়োজন অপ্রয়োজন ইত্যাদি প্রভৃতিকে মনিটর করতে থাকে বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানগুলো। এদের হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ারও একটা অ্যানোনিমিটি বৈকি।

    মোট কথা হলো: গুলি-বন্দুক-ছুরি-ফরসেপ-বটি-কাঁচি-ক্ষুরের মতো, কিংবা রাসায়নিক দ্রব্যাদির মতো, এবং এমনকি ওষুধপত্রের মতো অ্যানোনিমিটি বা নামহীনতারও সুপ্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ থাকতে পারে। সেটা যার যার বিবেচনার ব্যাপার। তার জন্য তো খোদ ডাক্তারিবিদ্যা-ছুরি-ফরসেপ-বটি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ওষুধপত্র, অথবা খোদ নামহীনতার ধারণাকে দোষারোপ করার বা অবৈধ প্রতিপন্ন করার বা অপরাধকর্মে পর্যবসিত করার কোনো সুযোগ নেই।

    প্রাইভেসি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একেবারে প্রাথমিক বা মৌলিক মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। যাবতীয় প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চুক্তি ও মুসাবিদায় এইসব অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’র আর্টিকেল ১২ এবং আর্টিকেল ১৯ এর কথা। বলা যায় ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ এর ১৭ এবং ১৯ নম্বর আর্টিকেলের কথা। এ ছাড়া, ‘ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস’ এর ৮ম ও ১০ম অনুচ্ছেদের কথাও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। (দ্রষ্টব্য: ইয়ামান অ্যাকডেনিজ, ‘অ্যানোনিমিটি, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড সাইবারস্পেস’, সোশ্যাল রিসার্চ, খণ্ড ৬৯, সংখ্যা ১, বসন্ত ২০০২।)

    এক দিক থেকে দেখলে, নামহীনতা সবসময়ই যোগাযোগের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ তৈরি করে। আবার নামহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ-বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আইনের দ্বারা অনলাইন নামহীনতাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা এই মুশকিলের ভালো সমাধান হতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানে এরই মধ্যে ‘অনলাইন রেপুটেশন’ নামে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে। অনলাইন রেপুটেশন কোনো একটি ছদ্মনামের বিশ্বস্ততা পরিমাপের একটি পদ্ধতি। এর জন্য নানারকম সফটওয়ার-প্রযুক্তির অবতারণাও ঘটছে। (নামহীনতার প্রয়োজনের ও বিপদের দিক নিয়ে, এবং প্রাইভেসি ও নামহীনতা সংক্রান্ত মৌলিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন নিয়ে, বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: ইয়ামান অ্যাকডেনিজ, ‘অ্যানোনিমিটি, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড সাইবারস্পেস’, সোশ্যাল রিসার্চ, খণ্ড ৬৯, সংখ্যা ১, বসন্ত ২০০২।)

    নামহীনতা ব্যাপারটা আসলে আর কিছু না। বাধ্যতামূলক পরিচয় প্রকাশের রাষ্ট্রীয়-কর্তৃত্বতান্ত্রিক বন্দোবস্তকে মোক্ষমভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসে এই ধারণাটা। এটাই আসলে কর্তৃত্বতন্ত্রের চোখে ‘নামহীনতা’ নামক ধারণাটিকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। মহাকেন্দ্রীভূত, অতি-শক্তিশালী রাষ্ট্র-কর্পোরেট ক্ষমতাকাঠামোর মুখে ব্যক্তিমানুষকে নিতান্তই বিপন্ন করে তুলতে পারে বাধ্যতামূলক পরিচয় প্রকাশের এই রাষ্ট্র-কর্পোরেট বন্দোবস্ত ।

    প্রসঙ্গত, প্রাইভেসি বা অ্যানোনিমিটি মানে কিন্তু শুধু অপ্রকাশের স্বাধীনতাই নয়। প্রকাশের স্বাধীনতাও বটে। প্রাইভেসি বা অ্যানোনিমিটি মানে আমার সম্পর্কে আমি নিজে কতটা প্রকাশ করতে চাই, এবং কতটা প্রকাশ না করতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। খোদ স্বাধীনতা মানে কিছু করার স্বাধীনতা তো বটেই, চাইলে কিছু না করারও স্বাধীনতা। সুতরাং কোথায় কতটা আমি আমার পরিচয় প্রকাশ করব অথবা করব না, তাকে নিতান্তই আমার নিজের এখতিয়ারভূক্ত ব্যাপার বলে ভাবার গুরুত্ব আছে।

    মার্কিন সাম্রাজের পতনের শব্দ

    ফিসা-আদালতের আদেশের কপি ছাড়াই যেমন তা দেওয়ালে পড়তে পারা যাচ্ছে বলে জিমারম্যান জানালেন, তেমনি আরও একটা ভবিষ্যতলিপি স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। সে লিপি ফুটে উঠছে ইতিহাসের দেওয়ালে। সেখানে লেখা আছে: যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দি করছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। বলশেভিক রাশিয়ার মতো আত্ম-অবরুদ্ধ দেশ হয়ে পড়ছে আজকের যুক্তরাষ্ট্র। এটা আরেকটা উত্তর কোরিয়া, আরেকটা চীনে পরিণত হচ্ছে। নিজের নাগরিকদেরকেই নজরবন্দি করতে হচ্ছে তাকে। নাগরিকদের জামাকাপড়-অন্তর্বাস-মোজা খুলে তল্লাশি করতে হচ্ছে তাদেরকে। নিজের দেশের প্রতিটা নাগরিকই সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য শত্রু আজ। নিজ দেশের হুইসলব্লোয়ারদের ভয়ে প্রকারান্তরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের অভ্যন্তরিন যোগাযোগ-পরিধি, কর্তৃত্ব প্রয়োগের সক্ষমতা।

    মনে পড়ছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ২০০৬ সালে লেখা ‘কন্সপিরেসি অ্যাজ গভর্ন্যান্স’ নামের ছয় পাতার প্রফেটিক থিসিস। সেখানে তিনি নেটওয়ার্ক-বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, হুইসল ব্লোয়ারদের সম্ভাব্য ‘উন্মোচন’গুলো কীভাবে আতঙ্কিত করে ফেলবে সাম্রাজ্যের শাসকদেরকে। ‘লিক’ বা উন্মোচনের ভয়ে কমে যাবে তাদের যোগাযোগের পরিসীমা, সেই সাথে কর্মপরিধি। ক্রমাগত অক্ষম হয়ে পড়তে থাকবে সাম্রাজ্য। মাত্র সাত বছরের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে চলেছে অ্যাসাঞ্জের সেই প্রফেটিক থিসিস। ফুরিয়ে আসছে সাম্রাজ্যের অবাধ, অসীম সক্ষমতা। ফুরিয়ে আসছে সাম্রাজ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিন। এসব তারই লক্ষণ।

    আরো মনে পড়ছে, তাঁর নিজের ব্লগে (‘আইকিউ ডট অর্গ’) সম্ভবত ঐ বছরই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ লিখেছিলেন ছোট্ট একটা নোট: ‘ইউনাইটেড স্টেটস অফ হোয়াট?’ মার্কিন বাণিজ্য-কর্পোরেটগুলোর সাথে বলশেভিক রাশিয়ার বেশ কিছু তাক লাগানোর মতো সাদৃশ্য নির্দেশ করে সেখানে তিনি বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-কর্পোরেটগুলো আসলে একেকটা ছোট ছোট বলশেভিক সোভিয়েত। ‘ইউএসএ’ নামটার অর্থ তাই ‘ইউনাইটেড সোভিয়েটস অফ আমেরিকা’। এখন এই ২০১৩ সালে এসে বোঝা যাচ্ছে, জার- বলশেভিক রাশিয়ার পরিণতিই বরণ করতে চলেছে ইউএসএ।

    সাম্রাজ্য নয়, স্বাধীনতা

    সার্বিক পরিস্থিতি আতঙ্কজনক। লাভাবিট, সাইলেন্ট সার্কেল এনএসএ, এবং এডওয়ার্ডের স্নোডেনের ঘটনাক্রম এক মারাত্মক হুঁশিয়ারি-সংকেত। ইন্টারনেটের ওপর নেমে আসছে ভয়ংকর প্রত্যক্ষ আঘাত। কেউ রেহাই পাবেন না। কোনো প্রকার ভিন্নমত সহ্য করবে রাষ্ট্রকর্পোরেট সাম্রাজ্য। কেননা ইন্টারনেট বাঁচলে এবং স্বাধীন থাকলে রাষ্ট্র, কর্পোরেশন, আইন- আদালত, আমলাতন্ত্র, আর্মি— তথা খোদ ‘এম্পায়ার’ বর্তমান কাঠামোকে মৌলিকভাবে সংস্কার না করে কিছুতেই টিকে থাকতে পারবে না। স্বাধীন ইন্টারনেট থাকলে সাম্রাজ্য থাকবে না। টিকবে না বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো। সুতরাং ইন্টারনেটকে তারা নজরবন্দি করবে। খোঁয়াড়ে ঢোকাবে। যেভাবে সম্ভব।

    সাম্রাজ্যিক শাসকরা আতঙ্কিত। অন্যের রক্ত চুষে আরামে বসে ভোগবিলাসের দিন তাদের বিগতপ্রায়। এটা তারা টের পাচ্ছেন হাড়ে হাড়ে। তাই তারা ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইনের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জ্ঞান-প্রাইভেসি-প্রকাশ- সৃজন-যোগাযোগের সহজাত স্বাধীন স্পৃহাকে ধ্বংস করে দেওয়া যায় না। এটা জ্ঞান-বিজ্ঞান-অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান-উপলব্ধি-প্রকাশ ও শেয়ারিং থেকে বঞ্চিত করবে গোটা মানবজাতিকে। এ হবে আত্মিক-সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক গণআত্মহত্যার শামিল। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট হবে ডিজিটাল দাসদের জন্য আইনসঙ্গতভাবে নির্ধারিত একটা সংকীর্ণ খোঁয়ার। কর্পোরেট-বাজারের খোঁয়ার। রাষ্ট্রীয় আমলাদের কাছে বাধ্যতামূলক বশ্যতার খোঁয়ার। থাকবে না আপনার যোগাযোগের স্বাধীনতা। থাকবে না পছন্দের স্বাধীনতা। থাকবে না নিজের মতো করে নিজেকে প্রকাশের বা অপ্রকাশের স্বাধীনতা।

    তাই ইন্টারনেটের স্বাধীনতাকে, যোগাযোগের স্বাধীনতাকে বাঁচাতে না পারলে দমে যাবে কোটি মানুষের আত্মকর্তৃত্বের জায়মান চাকা। আমরা একটা নিখুঁত টাইপের ডিজিটাল দাসপ্রথায় প্রবেশ করতে শুরু করব। ধীরে ধীরে। অবধারিত-ভাবে। আমরা অনেকে আমাদের স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে নিরাপদ এবং অনিশ্চয়তাহীন সামাজিক দাসত্বকে ভালোবেসে মেনে নিতে পারি বৈকি। তবে, সবাই তাতে রাজি হবে না। ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগল মেনে নিয়েছে গোপন আদালতের আদেশ। কিন্তু লাভাবিট মানে নি। সাইলেন্ট সার্কেল মানে নি। আরো অনেকেই মানবে না।

    ইতোমধ্যে ফুটে উঠছে খোদ মার্কিন জনসাধারণের গণপ্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট সব লক্ষণ। ফিসা-আদালতের বিরুদ্ধে লাভাবিট লড়তে যাচ্ছে ফোর্থ সার্কিট আপিল আদালতে। অত্যন্ত শক্তিশালী এই ফেডালের কোর্ট ১৩টা মার্কিন আপিল আদালতের মধ্যে অন্যতম। আদালতে লড়াইয়ের জন্য লাভাবিটের আইনী তহবিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন জনসাধারণ জমা দিয়েছেন ৯০,০০০ মার্কিন ডলার। লাভাবিট জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। লাভাবিট জয়ী হলে সেটা হবে যোগাযোগের স্বাধীনতার জয়।

    একের পর এক নিরাপদ ইমেইল সার্ভিস বন্ধ করে দিয়ে শেষ রক্ষা করতে পারবে না সাম্রাজ্য। রাষ্ট্র-ডেভিলের রক্তচক্ষুকে কলা দেখিয়ে নিরাপদ যোগাযোগের পথ আছে আরো। আছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, ফিল জিমারম্যানদের টিমোথি মে, এডওয়ার্ড পি. বার্লোদের গড়ে তোলা ‘সাইফারপাঙ্কস’দের পথ – ক্রিপ্টো অ্যানার্কির পথ (ক্রিপ্টো অ্যানার্কি সম্পর্কে দ্রষ্টব্য: পিটার লাডলো, ২০০১)। সাইলেন্ট মেইলবন্ধ করে দেওয়ার পর সিকিউরিটি-গুরু ফিল জিমারম্যান বলেছেন, ভবিষ্যতের তাঁরা গ্রাহকদের জন্য আরো সফিস্টিকেটেড সার্ভিস নিয়ে আসবেন। নতুন নতুন পথ বেরুবে। বোঝা যাচ্ছে।

    ইন্টারনেটের কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নাই। এটা কোনো রাষ্ট্রের সম্পত্তি না। এটা কোনো বাদশাহর সাম্রাজ্য না। এটা চলে স্বাধীনতা, স্বনিয়ন্ত্রণ এবং পরস্পর সহযোগিতার নীতিতে। সাম্রাজ্যিক আমলাদের মুসাবিদা করা আইনের হুকুমে ইন্টারনেট চলতে পারে না। ইন্টারনেট মানবজাতির সম্পদ। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মতো এটা মানবজ্ঞানের অসীম ভাণ্ডারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দেশ-রাষ্ট্র-জাতি-ধর্ম-ভাষা ও কালের ক্ষুদ্র গণ্ডীকে ছাড়িয়ে এই প্রথম স্বাধীন বিশ্বমানব হয়ে উঠছে হোমো স্যাপিয়েন্স। তার আর কোনো মোল্লা-মোড়ল-মুরুব্বি দরকার নাই। ভবিষ্যত সাম্রাজ্যের নয়, মনুষ্য-স্বাধীনতার।

    অন্তটীকা

    [১] দ্রষ্টব্য: বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান; হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, ১৯৯৬-খ: ১৯০৭।

    [২] গুস্তাভ ল্যানডাওয়া’র বই রেভোল্যুশন অ্যান্ড আদার রাইটংস (গুস্তাভ ল্যান্ডাওয়া, ২০১০)-এর অন্যতম প্রবন্ধ ‘উইক স্টেটসমেন, উইকার পিপল’-এ এই সংক্রান্ত আলোচনার অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ ঈঙ্গিত আছে।

    [৩] এই বইয়ের ‘স্বাধীনতা সহিষ্ণুতা সংগঠন’ নামের ২৬-সংখ্যক রচনার কথা বলা হচ্ছে।

  • বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জনগণের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’

    বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জনগণের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’

    • সহুল আহমদ ও সারোয়ার তুষার

    সারা দুনিয়া যেখানে করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, করোনার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করছে, সেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার যেন তার জনগণের বিরুদ্ধেই অঘোষিত এক ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। দুই উপায়ে এই ‘যুদ্ধের’ বাস্তবতা উৎপাদন করা হচ্ছে। একদিকে, নজিরবিহীন বিপদজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তহীনতার মাধ্যমে জনগণের একটা বড়ো অংশের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যারা এমনতর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছেন রাষ্ট্র বিভিন্ন আইনী মারপ্যাঁচের মাধ্যমে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা শুরু করেছে। তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া-দীর্ঘদিন ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গ্রেফতার দেখানো-মামলা দায়ের করা সহ নানাবিধ হয়রানি ও নিপীড়ন করা হচ্ছে।

    অরাজ ই-পোস্টার

    গত ৫ মে ইফতারের আগেই বাড্ডা থেকে র‍্যাব পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দিদারুল ভূঁইয়াকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। দিদারুলের স্ত্রী জানান, ‘ইফতারের কিছুক্ষণ আগে দুইটা মাইক্রো নিয়ে ১১-১২ জন লোক আসে বাসায়। তারা র্যা ব পরিচয় দেয়। আমাদের কোনো কিছু বলতে না দিয়ে ইফতারের ঠিক দুই মিনিট আগে তারা দিদারকে তুলে নিয়ে যায়।’ এসময় তারা দিদারের দুটো সিপিউ, ল্যাপটপ, ওনার ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়ে যায়; তার স্ত্রীকে বলা হয়, কিছু কথাবার্তা বলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।

    মিডিয়ার তরফ থেকে র‍্যাবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে, এই নামে কাউকে তারা তুলে আনেন নি, এমন কোনো অভিযানও তারা চালান নি। পরিবার ও স্বজনদের তরফ থেকে র‍্যাবের অফিসে যোগাযোগ করা হলেও তারা অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণ পর মিডিয়ার মারফতে জানতে পারি লেখক মোশতাক আহমদকেও একই কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন (৬ মার্চ) সকালে দিদারুলকে থানায় হস্তান্তরের একটা সংবাদ পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে থানা থেকে সেটা অস্বীকার করা হয়।। দেখা যায়, মোশতাক আহমেদের সাথে কার্টুনিস্ট কিশোর আহমেদকেও গ্রেফতার করা হয়েছে একই অভিযোগে।

    দিদারুলের পরিচিতজন রমনা থানায় গেলে জানানো হয়ে যে, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে র‌্যাব-৩ সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, এক্টিভিস্টসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় মামলা করেছে। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে, কার্টুনিস্ট আহম্মেদ কবির কিশোর, ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য মো দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, মিনহাজ মান্নান, প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও সাহেদ আলম, সায়ের জুলকারনাইন, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে। কিন্তু দিদারুলকে তখনো রমনা থানায় হস্তান্তর করা হয়নি, র‍্যাব-৩ থেকেও দিদারুল কোন কাস্টোডি স্বীকার করা হয়নি। দিদারুল কোথায় আছেন জানতে চাইলে ইনভেস্টিগেশন অফিসার বলেন, দিদারুল ভূঁইয়াকে রমনা থানায় না পাওয়া গেলে আমরা তাকে ‘পলাতক’ ধরে নিব। অবশেষে, সন্ধ্যায় দিদারুলকে রমনা থানায় হস্তান্তর করার সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু জানানো হয়, দিদারুল সহ চারজনকে নাকি ‘সকালে’ই থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

    বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিকদের জীবন কতটা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে তার একটা নজির হিসেবে দিদারুলের ঘটনাকে তুলে ধরা হলো। দিদারুল কি করেছেন তার চেয়ে জরুরি বিষয় হলো তার সাথে ঘটে যাওয়া এই পুরো ঘটনা বা প্রক্রিয়াটা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে কোনো সময় যেকোনো ধরণের পরোয়ানা বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, এবং বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে থানায় হাজির করার আগ পর্যন্ত (দিদারের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ ঘন্টা, সাংবাদিক কাজলের ক্ষেত্রে ৫৪ দিন!) একটা বড়সড় সময় একজন নাগরিককে স্রেফ ‘উধাও’ করে দিতে পারে। দিদারের ভাগ্য ‘সুপ্রসন্ন’ হওয়ায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিনি আবার ‘আসামী’ হিশেবে জনসম্মুখে হাজির হতে পেরেছেন, কিন্তু সাংবাদিক কাজলসহ অনেকের উদাহরণ আমাদের সামনে জ্যন্ত রয়েছে যারা আরো অনেক লম্বা সময় ‘উধাও’ ছিলেন, অনেকেই এখনো ‘উধাও’ আছেন। পাঠক লক্ষ্য করুন, র‍্যাব তথা আলোচ্য মামালার ‘বাদী’ কয়েকজন নাগরিককে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করা হলো, তারপর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পরে থানায় হস্তান্তর করার পর আটকের কথা স্বীকার করা হলো, অথচ মামলার এজহারে ঊল্লেখ আছে আটকের দিন অর্থাৎ ৫ মে রাত ১১ টায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নগুলো হাজির হয়, আটকের দিনই যদি মামলা করা হবে তাহলে আটকের পরেরদিন পর্যন্ত কাস্টোডি অস্বীকার করা হলো কেন? খোদ মামলার ‘বাদী’ কেবলমাত্র রাষ্ট্রের একটি বাহিনী হওয়ার এখতিয়ারেই কি অভিযুক্তকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? মামলা দায়ের করার সাথে সাথেই কি কেউ ‘আসামী’(এজহারে ঠিক এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে) হয়ে যায়? তাহলে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরুই হয় কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাস্টডি অস্বীকার করার মাধ্যমে এবং অভিযুক্তকে ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে, সেই আইনি প্রক্রিয়ার আদৌ কি কোন নৈতিক ভিত্তি আছে? সেই আইনি প্রক্রিয়া ন্যায়বিচার তো দূরে থাক, এমনকি প্রতিশ্রুত ‘স্বচ্ছ’ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেও কি সক্ষম? এখানে এটাও উল্লেখ করা জরুরি যে, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত কাউকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আটকের ৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই আটকের কারণ জানাতে বলেছেন। তাহলে খোদ রাষ্ট্রপক্ষ যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে আদালত অবমাননার মাধ্যমে, সেই রাষ্ট্রপক্ষই কোন এখতিয়ারে কারো বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র’ এর অভিযোগ তুলতে পারে? অন্যত্র আমরা দেখিয়েছি, নির্বাহী ক্ষমতার দ্বারা এই আদালত ‘অবমাননা’র উৎস আসলে একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো।

    আর্টওয়ার্ক: পলিটিক্যাল প্রিজনার
    শিল্পী: মোরো
    সুত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে ছাত্রলীগ নেতার করা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদ ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে  ফেসবুকে লিখেছিলেন: ‘গ্রেফতার বিচার ব্যবস্থার খুব আপৎকালিন প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। কোনো অভিযুক্ত যখন মুক্ত অবস্থায় ভিকটিমের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিত হুমকি হতে পারেন, কোনোভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করতে পারেন, কিম্বা বিচার এড়ানোর জন্য পালিয়ে যেতে পারেন, সেক্ষেত্রেই কেবলমাত্র আদালতে মামলা হওয়া কাউকে বিচার চলাকালিন সময়ে গ্রেফতার করে কারাগারে রাখবার কথা। এসব কারণ ছাড়াই মামলা হওয়া মাত্রই কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালে বিচার নিজেই শাস্তি হয়ে যায়, কাউকে শায়েস্তা করবার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বিচারে শেষমেষ নির্দোষ প্রমাণ হলে তার কারাগারে যাওয়ার ভোগান্তি কিম্বা ক্ষয়ক্ষতির দায় আমাদের বিচার ব্যবস্থা নেয় না।’

    বছর দুয়েক আগে ভারতের পাঁচজন অ্যাক্টিভিস্টকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপটে রোমিলা থাপার সহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন; যার শুরুর কথাটাই ছিল: ‘arrest should be the last step of an investigation, not the starting point for one…’

    দিদার, কিশোর এবং অন্যান্যদের বেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে একেবারে বিপরীত। রাষ্ট্র এখানে প্রক্রিয়া শুরু করেছে এমনকি ‘গ্রেফাতার’ এর মাধযমেও নয়, বরং ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে, এবং রাষ্ট্রীয় খোলা ময়দান থেকে কিছু সময়ের জন্য ‘উধাও’ করে দিয়ে। করোনার এই মহাবিপর্যয়ের সময় যখন আগে থেকেই আটক থাকা বিভিন্ন মামলার আসামীদের জামিনে কিংবা স্থায়ী মুক্তি দেয়া হচ্ছে, সেখানে কেবলমাত্র মত প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনার মত যৌক্তিক কাজকে ‘অপরাধ’ সাব্যস্ত করে লেখক-সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট-কার্টুনিস্টদের মামলা দায়ের করার শুরুতেই ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে কারাগারে প্রেরণে করা হয়েছে। এহেন চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জিঘাংসা সম্পর্কে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)এর এশিয়া পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস যথার্থই বলেছেন:

    ‘কেবল একটি অনিরাপদ ও স্বৈরাচারী সরকার কার্টুনিস্ট, সাংবাদিক এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য মহামারিকে ব্যবহার করে। কেবল ব্যাঙ্গো-বিদ্রূপ পোস্ট করার কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন মামলা দায়ের না করে বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনাগুলো গ্রহণ করা উচিত এবং কোভিড -১৯-এর বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াতে যেকোনো ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত।’

    আর্টওয়ার্ক: থট ফরবিডেন
    শিল্পী: ওগুজ গুরেল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    দিদারুল বা কিশোরদের কোন কাজের জন্য তুলে নেয়া হয়েছে বা গ্রেফতার করা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। তারা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের মত প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন; ভেড়ার পালের মত রাষ্ট্র বা সরকারকে অনুসরণ না করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সমূহের সাথে নিজেদেরকে ক্রিটিক্যালি অ্যাংগেজ করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। দিদারুল ফেসবুকে একটিভিজম করতেন, কিশোর কার্টুন আঁকতেন। কিন্তু নাগরিক হিসেবে এই ‘স্বাভাবিক’ কাজগুলোকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে ভাষায় চিহ্নিত করা হলো, সেটাই রাষ্ট্রের সাথে এখানকার নাগরিকের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে। কোনো সন্দেহ নেই সেই সম্পর্ক ঔপনিবেশিক।

    একেবারে মূলধারায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতির জনক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মহামারী সম্পর্কে গুজব’, ‘রাষ্ট্র/সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিপ্রায়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় এমপির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় ‘মানহানি হয়েছে’ অভিযোগ তুলে সুনামগঞ্জের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। ‘সবুজ ধান’ কাটার ভিডিও শেয়ার করার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে, অভিযোগ ‘সরকার বিরোধী প্রচারণা’ এবং ‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়’। কিছুদিন পূর্বে সাংবাদিক তাসনীম খলিলের বাসায় গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা হুমকি দিয়ে এসেছেন, তিনি নাকি বিদেশে বসে রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করছেন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মহামারী নিয়ে বিবিধ লেখালেখির কারণে কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে। ১০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দায়ের করা হয়েছে; গত এক সপ্তাহে ৮ জন সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছে। মহামারী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখার কারণে তিনজন সরকারি কলেজের শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে, বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে করোনা সংক্রান্ত গবেষণা করবার কারণে তদন্ত চলছে।

    অর্থ্যাৎ, দেখা যাচ্ছে দিদারুল, কিশোরদের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, করোনা সংক্রান্ত আলাপ আলোচনার শুরু হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র/ সরকার ভাবের ‘মূর্তি’ উদ্ধার করার চেষ্টা নিয়োজিত আছেন। মহামারীর সঙ্কট মোকাবিলা করার চেয়ে তাদের মূল নজর হচ্ছে অন্যকিছু মোকাবিলা করা: এখানে যে সঙ্কট আছে এবং ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে সেই সত্য বচন কেউ উচ্চারণ করতে না পারে সেইজন্য নাগরিকের মুখে তালা মারা। সহিংস সার্বভৌম ক্ষমতার সম্মুখে নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকারহীন শুদ্ধ ‘বেয়ার লাইফ’ তথা বধযোগ্য প্রাণ হিশেবে উন্মোচন করা। ফলে আমরা মোটেও অবাক হই না যখন দেখি, বাংলাদেশে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়, ৮ মার্চ ২০২০, ঠিক সেই দিনই নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর আইনবলে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালা-২০২০ জারি করে। শুরু হয় ব্যক্তি ও সমাজকে স্থায়ী ‘কোয়ারেন্টাইন’ করার নয়া বাস্তবতা।

    সরকারী বয়ানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বর্তমানে আসলে কোনো ফারাক নেই, তিনে মিলে একাকার। এবং, একের ভাবমূর্তি তাই অন্যেরও ভাবমূর্তি, একের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া মানে অন্যেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। এসবের যুগপৎ সম্মিলন ঘটেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেলায়। অন্যত্র আমরা ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন ও রাষ্ট্রের সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছি।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘নিরাপত্তা’ আসলে কার নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে? যে কেউই এই আইনে চোখ বুলালে টের পাবেন এই আইন মূলত সরকার, রাষ্ট্র আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ফারাক ঘুচিয়ে এই তিনটি পৃথক সত্তাকে একক সত্তায় পরিণত করেছে। যেকোনো একটির যৌক্তিক সমালোচনা করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ নেমে আসতে পারে।

    এই আইনে ব্যবহৃত ‘রাষ্ট্রের সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা’, ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এই আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ আমাদের এটাই ভাবতে বাধ্য করছে যে, এসব শব্দবন্ধ অস্পষ্ট রাখাই এই আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সরকারের সমালোচনা করলেই এই শব্দবন্ধসমূহের অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে গণ্য করে এই আইন প্রয়োগ করা হতে পারে। ফলে, এ আইন আসলে শুদ্ধ নিপীড়নমূলক ক্ষমতার উপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থেই প্রণীত।

    আইনের ‘ডিজিটাল’ শব্দকে আধুনিক বলে মনে হলেও, সত্য হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টস’ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্র তার ঔপনিবেশিক চরিত্রই উন্মোচন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ অঞ্চলের মানুষকে প্রজা জ্ঞান করতো, তাই তাদের যাবতীয় লুটপাট-দুর্নীতিকে নিরঙ্কুশ, জবাবদিহির ঊর্ধে নেয়ার স্বার্থে তারা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন’ প্রণয়ন করেছিল। আমাদের রাষ্ট্র ও তার কলকব্জাগুলো যে ঔপনিবেশিক এবং সে যে ক্রমাগত আরো বেশি ঔপনিবেশি্ক হয়ে উঠতে চায় (কারণ, এতেই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ফায়দা) তার চরমতম নমুনা হচ্ছে ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন।

    এই যে দিদারুলদের ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, আমাদের কাছে এটা ‘অন্যায়’ বলে মনে হলেও ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের বরাতে এই তুলে নিয়ে যাওয়া ‘আইনত’ সঠিক। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যদি মনে হয় তার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ বা ‘মান-সম্মান’ হুমকির সম্মুখীন তাহলে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে। অর্থাৎ, দিদারুলদেরকে এইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার যাবতীয় রাস্তা এখানে করে দেয়া আছে। ফলে, কোনো ধরণের তত্ত্বের মধ্যে না গিয়েই, একেবারে বাস্তবিক নজির আমাদেরকে দেখাচ্ছে যে, যাবতীয় ভিন্নমতকে ক্রিমিনালাইজ ও অসম্ভব করে তোলাই এই আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সকল নাগরিকের চিন্তার উপর আইনীয় সেন্সরশিপ হাজির করার মাধ্যমে একটা ভিন্নমতহীন ‘জ্বী হুজুর’ ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার নিয়ামক এই আইন। এই আইন এক অন্তহীন ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি করে। রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার তাত্ত্বিকদের তত্ত্বের এমন বাস্তব রূপে হাজির হওয়ার নজির বোধহয় খুব অল্পই আছে।

    দিদারুল, কিশোর, মুশতাক আহমেদ, তাসনীম খলিলসহ এই মামলার শিকার আরো অসংখ্য ব্যক্তির সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা হতে পারতো বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে। কিন্তু, যে ভূখণ্ডের মানুষ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষায় এতো রক্ত ঝরালো, এতো লড়াই-সংগ্রাম করলো, তার কাছে গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরার কিছু নেই। বরঞ্চ, এটা উন্মোচন করা দরকার যে, এতো কাঙ্ক্ষিত একটা রাষ্ট্রে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কীভাবে ও কোন ধরণের আইনি-প্রক্রিয়ায় ব্যহত হচ্ছে, কেনো এখানে গণতান্ত্রিক কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারছে না।

    আর্টওয়ার্ক: মাইন্ড কন্ট্রোল
    শিল্পী: সিমন নস্কা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপরোক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘গুজব’ প্রচারের কথা বলা হচ্ছে; উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ‘গুজব’ বা ‘মিথ্যা’ কি না সেটা প্রায় সকলেই জানেন। এও জানেন যে, ‘গুজব’ রেটরিক বর্তমান রেজিমের নিপীড়নের নয়া হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সরকার বিরোধী যেকোন বক্তব্য-বিশ্লেষণকে ‘গুজব’ বলে সাব্যস্ত করা হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো গণবিরোধী, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা প্রথমত এবং প্রধানত ‘সত্য’ , ‘মিথ্যা’ , ‘গুজব’ এর এক একচেটিয়া বাস্তবতা উৎপাদন করে; যেখানে সরকারি বয়ান মাত্রই ‘সত্য’, সরকারবিরোধী যে কোন বয়ানই ‘মিথ্যা’। এরকম স্বৈর-বাস্তবতায় ‘গুজব’ তথা অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস হয়ে ওঠে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের একমাত্র হাতিয়ার। ‘গুজব’ এর জয় হোক!

    স্পষ্ট করে বলা দরকার, পদ্ধতিগত ‘গুজব’ তৈরির কারখানা আসলে খোদ রাষ্ট্রই; রাষ্ট্র যখন অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত না করবে কিংবা নিজদের অনুকূল একপেশে, জবাবদিহিতাহীন তথ্যের বাস্তবতা তৈরি করবে এবং জনগণ যখন তথ্যের অভাব বোধ করবে, কেবল তখনই ‘গুজবে’র উর্বর জমিন তৈরি হয়। করোনার শুরুতেই বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া মনিটরিং কমিটি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা আমাদের মনে আছে। বিশেষ করে, রাজনীতিবিদরা সত্য গোপন করছেন এই সন্দেহের চেয়ে বেশি আর কোনো কিছুই গুজব ও ভয়ে ইন্ধন জোগায় না। ভয় ও আতঙ্ক গুজবের পালে হাওয়া দেয়। একদিকে করোনার মতো এমন মহামারী সময়ে জীবন ও জীবিকা নিয়ে আতঙ্ক ও ভয়, অন্যদিকে কর্তব্যক্তিদের পক্ষ থেকে লাগামহীন মিথ্যার ফুলঝুরি- উভয়ে মিলে গুজবের জমিন তৈরি করছে। কিন্তু, মুশকিল হলো, যারা রাষ্ট্রের এই ‘গুজব’ তৈরির প্রক্রিয়ার সমালোচনা করছিলেন, রাষ্ট্রের চোখে তারাই ‘গুজব’ সৃষ্টিকারী বলে চিহ্নিত হন। এমনকি কেউ ‘গুজব’ ছড়ালে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা, কেউ ‘কটূক্তি’ করলে, ‘সঠিক’ উক্তি হাজির করা সরকারের দায়িত্ব (তা নাহলে আর সমস্ত কিছুর উপর ‘বৈধতা’ আরোপের ভিত্তিটাই বা কী?); মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতার সীমাকে আমরা এতদূর পর্যন্ত বুঝি।

    সরকারের সমালোচনা করা যাবে না কেন? রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না কেন? সমাজে কি ভিন্নমত থাকবে না? মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি থাকবে না? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এমন মৌলিক বোঝপড়াগুলোকেও ‘আইনি’ প্রক্রিয়ায় রদ করা হচ্ছে। ফলে, আমাদের চোখের সামনেই আমরা ফ্যাসিবাদী ও একচেটিয়াতন্ত্রের উলঙ্গ আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যে অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে, করোনাকালে সেটার নগ্নরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ফলে, এখানে রাষ্ট্রের কাছে করোনা মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা, অন্য অর্থে খোদ জনগণের বিরুদ্ধে অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। মজলুম জনতার এত রক্ত, এত ‘দাম’ দিয়ে ‘কেনা’ এই বাংলা আজ এ কোন লেবিয়াথানের খপ্পরে? এ কোন মহাদানবীয় ‘রাষ্ট্রসোরাস’ আজ আমাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে?

    ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের মত কুখ্যাত নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণক্ষমতাতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপনের, যে গণক্ষমতাতন্ত্র হবে: ‘রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাণহীন যন্ত্রপাতিওয়ালা বর্তমান রাষ্ট্র-সংগঠনের জায়গায় স্বাধীন মানব-সম্প্রদায়সমূহের একটা সঙ্ঘ’; গঠনের দিকে থেকে হায়ারার্কিমুক্ত, আনুভুমিক ও ফেডারেটিভ। আর তা কেবল সম্ভব, ‘যাবতীয় অর্থনৈতিক একচেটিয়া এবং সমাজের মধ্যকার যাবতীয় জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তির মাধ্যমে।’

    সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য বলার দায়ে দিদারুল, কিশোররা দণ্ডিত। কিন্তু আমরা তো জানি: In a time of universal deceit, telling the truth is a revolutionary act…

  • সম্পাদক পরিষদ।। কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছি

    সম্পাদক পরিষদ।। কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছি

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক  স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দেশের স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকগণের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন সম্পাদক পরিষদ  ডিজিটাল

    নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পেশ করে। এই আইনটি শুধু চিন্তা ও মতপ্রকাশই নয়, একই সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেও হরণ করে। সম্পাদক পরিষদের  পর্যালোচনাটি ঐতিহাসিক এবং আজও সমভাবেই প্রাসঙ্গিক। — সম্পাদক

    আর্টওয়ার্ক: দ্য প্রেস ফ্রিডম ডে
    শিল্পী: ফেবিয়ান সটোলনগো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে:

    ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

    ২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

    ৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    ৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে।

    ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যাঁরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তাঁরা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি, কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে এই আইনেও সাংবাদিকেরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উন্মোচন করে।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই।

    অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি, এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাঁকে প্রেপ্তার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন অযোগ্য। এর ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে।

    উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি–সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, ৫টি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে ১ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ ৪ থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

    আইনটি তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ–বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে থাকে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বছরের কারাদণ্ড। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তাঁর মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।

    বিশদ ব্যাখ্যা

    সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।

    আর্টওয়ার্ক: স্টপ পোলিস
    গ্রাফিতি
    সূত্র: কোপওয়াচ

    ধারা ৮

    ৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা।—

    (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন।

    (২) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মান হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন।

    (৩) উপ-ধারা (১) ও (২)–এর অধীন কোনো অনুরোধ প্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো, ব্লক করিবে।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এখানে দুটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যেকোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যেকোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যেকোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে—এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে।

    প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্লক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

    ধারা ২১

    ২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এই আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান।

    আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

    ধারা ২৫

    ২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি।—(১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে।—

    (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা

    (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন,

    তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম–সংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। তাঁরা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাঁদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করে, এমন যেকোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এই বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে।

    এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না–ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে।

    রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণ্ন করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এই আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।

    ধারা ২৮

    ২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কীভাবে জানবেন কখন ও কীভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এই পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওই সব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

    ধারা ২৯

    ২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-এর section 499-এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।

    ধারা ৩১

    ৩১। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ–প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসন্ন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এই আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই না–ও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।

    আর্টওয়ার্ক: কন্ট্রোল
    শিল্পী: লরা বারবোসা
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    ধারা ৩২

    ৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১)–এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে—বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে—সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে?

    বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দপ্তরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হরহামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে, তাই তো?

    এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।

    ধারা ৪৩

    ৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার।—

    (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন,—

    (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;

    (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ;

    (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি;

    (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি।

    এতে পুলিশকে যেকোনো জায়গায় প্রবেশ, যেকোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যেকোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যেকোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

    প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এই আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪টিই জামিন অযোগ্য, তখন গ্রেপ্তারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়্গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

    এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেপ্তার–আতঙ্ক তাঁদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তাঁরা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তাঁরা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যেকোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেপ্তার করতে তাঁরা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন।

    এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার, সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যেকোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করেই আইনের এই ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

    ধারা ৫৩

    ৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা।—এই আইনের—

    (ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লেখিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং

    (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১) এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এই আইনের প্রায় ২০টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন–অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিমিং অব ফ্রিডম
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপসংহার

    ১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে;

    ২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে;

    ৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বারবার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী;

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী।

    ৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করেছি।

    এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এই আইন প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে।

    এই আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসংগত বাধানিষেধ–সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্‌ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে।

    পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়ন–সম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন:

    ‘আপনারা বলে থাকেন যে বাক্‌স্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

    ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তাঁরা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি।…নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে…। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।…

    ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তাঁরা তাঁদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’