এনিমেল ফার্ম অরওয়েলের শৈল্পিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে একীভূত করার প্রথম সচেতন প্রয়াস; কথাটা আমার নয়, খোদ জর্জ অরওয়েলই বলেছেন। এই উপন্যাস লেখার চিন্তা তার মাথায় এসেছিল ১৯৩৭ সালের দিকে, এবং ৪৩ এর আগ পর্যন্ত এটা লিখতে পারেন নি। এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের বাহিনীকে পরাস্ত করতে ব্রিটিশ শক্তি ও সোভিয়েত শক্তি হাতে হাত মিলিয়ে একত্রে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল। ব্রিটিশদের সাথে সোভিয়েতের এই ক্ষণিকের ‘প্রেম’ অরওয়েলের এই ‘সচেতন প্রয়াস’ প্রকাশে নানারূপী বাধা হাজির করেছিল। এনিমেল ফার্ম প্রকাশে তাকে যে ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল এবং এমন ঝুটঝামেলা আসলে কোন প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তার এক প্রস্থ বিবরণ তিনি বইয়ের ‘ভূমিকা’য় উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে এই ভূমিকা ছাড়াই এনিমেল ফার্ম প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, এবং ১৯৭১ এর আগ পর্যন্ত এই ভূমিকার হদিস পাওয়া যায় নি। একাত্তরে মূল পাণ্ডুলিপির সাথে ‘দি ফ্রিডম অব প্রেস’ শিরোনামে এই ভূমিকা পাওয়া যায়, এবং বাহাত্তরে সেটা আলোর মুখ দেখে।
জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) পোট্রেট: প্যাট্রিক হার্ডজেইজ সূত্র: মিসটক
এনিমেল ফার্মের যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন এর কাহিনীর আদল রুশ বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত আমল (বিশেষত স্ট্যালিনের আমল)। কিন্তু, কৌতূহল জাগানিয়া প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাদী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কেনো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবির সম্পর্কে ‘সমালোচনামূলক’ গ্রন্থ প্রকাশে বাধা দিবে? পাশাপাশি, গ্রন্থ প্রকাশে এই কাঠখড় পোহানো কীভাবে প্রেসের স্বাধীনতা তথা বাক স্বাধীনতাকে মূল প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে? আর, দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে পড়ে থাকা এই ‘ভূমিকা’য় আসলে কি বিষয়ে আলাপ রয়েছে? এই বিষয়াদি হালকা বাৎচিত করাটাই আপাতত উদ্দেশ্য। অরওয়েল যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন তখন তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে উপন্যাসের স্ট্যালিন-বিরোধিতা এটা প্রকাশে ঝট পাকাতে পারে; অন্তত তার কিছু চিঠিপত্রে এমন আলামতই পাওয়া যায়। তবে, ইতিহাসের প্রহসন হচ্ছে এই, স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনামলকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্য যে গ্রন্থকে এতো বাধা দেয়া হয়েছিল, কয়েকবছর পর স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনকে আক্রমণ করার জন্য সেই গ্রন্থকেই ব্যবহার করা হয়।
এনিমেল ফার্ম প্রকাশের জন্য অরওয়েল বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তারা বিভিন্ন ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেন। একজন রাজি হলেও প্রকাশ করবে কি না তা পরামর্শ করার জন্য তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মোটাদাগে দুটো আপত্তির কথা জানানো হয়। এক, এনিমেল ফার্ম স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা ও স্বৈরাচারদের নিয়ে লিখিত হলেও সোভিয়েত ও স্ট্যালিনের দিকে ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট। তাই, ‘বর্তমান সময়ে’ এটা প্রকাশ করা অনুচিত। দুই, উপন্যাসে কর্তৃত্বপরায়ণ গোষ্ঠী হিসেবে শুয়োরদের দেখানো হয়েছে, এতে অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হবেন, বিশেষ করে সোভিয়েতের শাসক সমাজ।
এই পুরো বিষয়টাকে অরওয়েল একটা খারাপ আলামত হিসেবে দেখছেন। তিনি যুদ্ধাবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে সিকিউরিটি সেন্সরশিপ পর্যন্ত মেনে নেন, কিন্তু বইপত্র-লেখালেখির উপর সরকারের কোনো ধরনের সেন্সরশিপ থাকবে সেটা তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তার কাছে এর চেয়েও বড়ো বিপদ আসলে অন্যটা। সেই সময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ তার কাছে যতটা ভয়ের তার চেয়ে বড়ো ভয় হচ্ছে, প্রকাশক-সম্পাদকরা যেন একধরনের সম্মতিতে পৌঁছে গিয়েছেন কোনটা প্রকাশ করবেন, কোনটা প্রকাশ করবেন না। তারা কি তাহলে শাস্তির ভয়ে আছেন? অরওয়েলের জবাব হচ্ছে, না। তাদের ভয় শাস্তি নয়, তাদের ভয় জনমত। তার কাছে মনে হয়েছে, ব্রিটেনে একজন লেখক বা সাংবাদিককে যত ধরনের শত্রুকে মোকাবিলা করতে হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা হচ্ছে সবচাইতে খারাপ শত্রু। এই ‘শত্রু’কে নিয়ে যতটা আলাপ-আলোচনা করা দরকার সেটাও করা হয় না।
এনিমাল ফার্ম
অরওয়েল যখন লিখছেন তখন তিনি সরকারি সেন্সরশিপ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়, বরঞ্চ মিডিয়াপাড়া ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোন লেখা প্রকাশযোগ্য ও কোন লেখা প্রকাশযোগ্য না তা নিয়ে যে একধরনের নীরব সম্মতি তৈরি হয় সেটা নিয়ে বেশি চিন্তিত। অ-জনপ্রিয় চিন্তাকে দমিয়ে রাখা হয়, অস্বস্তিকর তথ্যকে লুকিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এসব করতে কোনো ধরনের সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না। উপরোক্ত ‘নীরব সম্মতি’ ঠিক করে দেয়, কোন ঘটনা লুকানো হবে আর কোন ঘটনা প্রকাশিত হবে। প্রতিটি সময়ে কিছু প্রচলিত ধ্যান-ধারণা-চিন্তা-ভাবনা বিরাজ করে, সাধারণত এর বাইরে তারা যেতে চান না।
নোম চমস্কি এই জমানায় সম্মতি উৎপাদনে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ও বিস্তৃত আলাপ করেছেন; বিশেষ করে কীভাবে হাল জমানার রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন নিজেদের ফায়দার জন্য মিডিয়া ব্যবহার করে তা দেখিয়েছেন। অরওয়েল চল্লিশ দশকে লেখা তার ‘ভূমিকা’তে এই সংক্রান্ত ইশারা-ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ প্রেস প্রচণ্ড কেন্দ্রীভূত; অল্পকিছু সম্পদশালী ব্যক্তির হাতে সমগ্র সংবাদমাধ্যম বন্দি। সংবাদ মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার তাদের ইচ্ছানুযায়ী ঘটে। অবশ্য, নিও-লিবারেল জমানার বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন (বা, সম্পদশালী ব্যক্তি) নিজেদের মধ্যে প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মিডিয়ার উপর কর্তৃত্ব বিরাজ করে- অরওয়েল এই ভয়াবহ বাস্তবতা দেখে যেতে পারেন নি, কিন্তু কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন। অবশ্য, একটা বিষয় অরওয়েলের চোখ এড়ায়নি: সংবাদ মাধ্যমে বা প্রেসের স্বাধীনতার সাথে বন্ধু/শত্রু রাষ্ট্রের সম্পর্ক। কোনো রাষ্ট্র যদি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, তাহলে তার কোনো দোষত্রুটি প্রচার করা যাবে না, আর শত্রুরাষ্ট্রের ভালো খবরও প্রকাশিত হবে না। বর্তমান একবাল আহমেদ, চমস্কি এ বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি ও সাক্ষী-সাবুদ হাজির করেছেন আমাদের সামনে, কীভাবে রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র গড়ে উঠার সাথে সংবাদ মাধ্যমের আচার-আচরণ পাল্টে যায়। অরওয়েলও অনেকটা একইভাবে তার সময়ের এমন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।
তো, অরওয়েল যখন এনিমেল ফার্ম লিখছেন তখন মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী পাড়ায় কোনটা প্রচলিত বা অর্থোডক্সি ছিল? উত্তর হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রায় সবাই এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের দিলখোলা প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের সমালোচনা-পর্যালোচনা করা যাবে না। কোনো তথ্য যদি সোভিয়েত শাসনামল চায় প্রকাশিত না হোক, তাহলে সেটা প্রকাশিত হবে না। অবস্থাটা এমন, সাময়িকী বা বই-পুস্তকে চার্চিলের সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু স্ট্যালিনের সমালোচনা করা যাবে না। সোভিয়েত প্রসঙ্গ ছাড়া বাদবাকি সব বিষয়ে ছিল অফুরন্ত বাকস্বাধীনতা। এটা যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। এমন আরো অনেক ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় আছে, অরওয়েল সঙ্গত কারণেই এই ভূমিকায় গুরুত্বারোপ করেছেন কেবল সোভিয়েতের প্রতি এমন দিলখোলা মনোভাবের প্রতি। তার কাছে এটা গুরুতর আলামত।
১৯৪১ সালের পর থেকে তৎকালীন বিদ্বৎসমাজ গোগ্রাসে রাশিয়ান প্রোপাগান্ডা গিলেছে। এমনকি রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কোনো কথাই বলা হয়নি। অরওয়েল অনেকগুলো উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন বিবিসি রেড-আর্মির ২৫ বছর উদযাপনে ট্রটস্কির নাম পর্যন্ত মুখেই নেয়নি। অরওয়েল বলছেন, কখনো কখনো ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা নিজেরাই সেন্সরশিপ আরোপ করেন, কখনো কখনো বাইরের বিভিন্ন চাপের কারণে করেন। তিনি এই দুটোর মধ্যে ফারাক করেন। তার মতে, সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের প্রায় জাতীয়তাবাদী মনোভাব ছিল। অরওয়েলের লেখালেখির সাথে যাদের হালকা-পাতলা পরিচিত আছেন তারা জানেন যে, তিনি বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ডকে প্রচণ্ড সমালোচনামূলকভাবে বা ক্রিটিক্যালি দেখতেন। একের অধিক জায়গাতে বুদ্ধিজীবীদের বিবিধ সমস্যামূলক প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন। ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে তিনি কোনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের অন্ধ-আনুগত্যকে জাতীয়তাবাদী মনোভাব বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই ছোট ভূমিকাতেও সে ধরনের ইঙ্গিত দেন। কেবল এই ভূমিকা পড়লে মনে হতে পারে, অরওয়েল বুঝি শুধু সোভিয়েত প্রেমিকদের মধ্যেই এমন প্রবণতা খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু, ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে এমন অনেকগুলো গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলোর প্রতি বুদ্ধিজীবীদের এমন অন্ধ-আনুগত্য বিরাজ করতো।
তাহলে অরওয়েলের প্রশ্ন হচ্ছে, তার বই প্রকাশে বাধা কোথায়? কেউ হয়তো বলবেন, লেখা হয়নি, বাজে লেখা। কিন্তু অরওয়েলের কথা হচ্ছে, প্রতিবছর যেখানে হাজার হাজার পৃষ্ঠার আজে-বাজে বই প্রকাশিত হয়, সেখানে এটা কি আদৌ কোনো যুক্তি? বরং, তিনি নিশ্চিত, স্ট্যালিনকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্যই তার উপর এমন খড়গ নেমে এসেছে। ইংরেজ বুদ্ধিজীবীদের মতে এটা তাদের প্রগতিতে বাধা দিবে।
তো, এই জায়গায় এসে অরওয়েল মূল যে প্রশ্নটা উত্থাপন করেন সেটা হচ্ছে, কোনো মতামত তা যতই অ-জনপ্রিয় হোক, যতই বোকামি হোক, তা কি প্রকাশের অধিকার রাখে কি না? তিনি বলছেন যে, এই প্রশ্নের উত্তরে ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা ইতিবাচক উত্তর দিলেও কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে নেতিবাচক উত্তর দিবেন। অরওয়েলের মতে, যেহেতু একটা সংগঠিত সমাজে আমরা বসবাস করি, বাক স্বাধীনতার কিছু না কিছু সাধারণ সীমানা থাকে। কিন্তু অরওয়েল যেহেতু পশ্চিমা জগতের মানুষ, তিনি উল্লেখ করতে ভুলেন না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম উপাদান। এই স্বাধীনতা না থাকলে পশ্চিমা সংস্কৃতি আদৌ টিকত কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তিনি রোজা লুক্সেমবার্গকে স্মরণ করেন, স্বাধীনতা মানে ভিন্নমতের স্বাধীনতা। ভলতেয়ারকেও স্মরণ করেন, তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার সে মত প্রকাশের জন্য জান দিতে রাজি আছি। অরওয়েল বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা লিবারেল চিন্তকদের সাথে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ (বলা যায়, আমজনতা) অস্পষ্টভাবে হলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে নেন। অথচ, যাদের স্বাধীনতার রক্ষক হওয়ার কথা ছিল সেই বুদ্ধিজীবীরা তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জায়গাতে সেটা তুচ্ছ ভাবা শুরু করেছেন।
এগুলো তার কাছে কর্তৃত্বপরায়ণতার নমুনা। যারা কিছুটা ভালোর জন্য কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থা বা পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলেন অরওয়েল তাদের সমালোচনা করেন। তারা বুঝেন না, যে কর্তৃত্বপরায়ণ পদ্ধতির পক্ষে আজকে তারা ওকালতি করছেন কাল সেগুলো তাদের দিকেই ফিরে আসবে। তিনি মনে করেন, সহনশীলতা ও পরিমিতিবোধ ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথিত, কিন্তু তাই বলে এগুলো অবিনাশী নয়। সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এগুলোকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ মতাদর্শ সেই সহজাত প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে ফেলে যেগুলোর মাধ্যমে মুক্ত মানুষ কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সে সিদ্ধান্ত নেয়। ভূমিকার বিভিন্ন জায়গায় এই বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক বহু উদাহরণ দিয়েছেন।
বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সাথে অরওয়েল পরিচিত। বাক বা চিন্তার স্বাধীনতা সম্ভব না, বা দেয়া উচিৎ নয় – এমন দাবি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং তিনি মনে করেন গত কয়েকশত বছরের পশ্চিমা সভ্যতার সংগ্রাম আসলে বিপরীত ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৎকালীন যুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া তাদের মিত্রপক্ষ এবং তিনিও মনে প্রাণে চান সে যুদ্ধে তারা জয়ী হোন, তবু তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বিদ্যমান সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা একটা শয়তানি ব্যবস্থা, এবং আমি এটা বলার অধিকার রাখি।’ তার মতে, কোনো অবস্থাতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। স্বাধীনতা শব্দ যদি কিছু বুঝিয়ে থাকে, তাহলে সেটা হচ্ছে লোক যা শুনতে চায় না তা বলার অধিকার। তিনি বলেন, [তৎকালীন ব্রিটেনে] ইংরেজ স্বাধীনতাকামীরা বা লিবারেলরাই স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন, এবং বুদ্ধিজীবীরাই বুদ্ধিজীবীতায় সবচেয়ে বেশি ময়লা ফেলছেন। এই অনালোচিত প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার ‘ভূমিকা’ লেখার মূল উদ্দেশ্য, একেবারে শেষে অরওয়েল এই ঘোষণা দেন।
অরওয়েলের প্রবন্ধ বা উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সাথে নিজেদের ডিস্টোপিয়ান পরিস্থিতিকে মেলাতে মোটেও কাঠখড় পোহাতে হয় না। এনিমেল ফার্ম যতই স্ট্যালিন-বিরোধিতায় ভরপুর থাকুক না কেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না অরওয়েল সেখানে আসলে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থার গলদকেই তুলে ধরেছেন। কীভাবে একটা বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে, কীভাবে কর্তৃত্বপরায়ণতার সূচনা ঘটতে পারে তা যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন। বহু দিন আগে [স্থান, কাল, পাত্র মনে পড়ছে না] একটা প্রতিবেদনে পড়েছিলাম, বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে অরওয়েল নাকি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। আমাদের এখানেও কি তাই? আমার এই অরওয়েল নিয়ে লেখাটা কি এই কারণেই? উপরওয়ালা ভালো জানেন। তবে, এটা নিশ্চিত যে, অরওয়েল বাক স্বাধীনতা নিয়ে যে আলাপ করেছেন তা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বেশ খানিকটা মিলে যায়। আমাদের বিদ্বৎসমাজে কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে যে অদ্ভুত নীরবতা লক্ষ্য করা যায় তা কে না জানে? তার কিছুটা সরাসরি রাষ্ট্র/সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে, আর কিছুটা বিষয়ের প্রতি জাতীয়তাবাদী আনুগত্যের ফলে। এই জাতীয়তাবাদী আনুগত্য বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতায় বাধা প্রদান করে। সেই ‘আনুগত্য’ ও ‘নির্বাচিত আবেগ’ দিয়ে ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’র নির্মাণ করতে চায়। কোনটা আলাপযোগ্য বা প্রকাশযোগ্য বিষয় তা নিয়ে একধরণের ঐক্যমত্য তৈরি হয়ে আছে। এই বাস্তবতার বাসিন্দারা ঠিকই এমন ‘নীরবতা’র গন্ধ পেয়ে যান।
আজকাল স্বপ্নেও অরওয়েলের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। এগুলো কিসের আলামত?
ঢাকায় এখন সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গে এক মনোহর পাখপাখালির কলরবে। কত যুগ এই কলরব শুনি নাই, মনে পড়ে না। চারপাশ এতো নিস্তব্ধ, কেবল কুহু কুহু কুজন আধো ঘুমে আধো জাগরণে শরীরের চারপাশ ছেয়ে রাখে। এখনও কিছু গাছপালা টিকে আছে। সবুজতর হয়ে উঠেছে ছোটছোট অদম্য দ্বীপগুলো। বাতাসে সুনীল নির্মলতা। কতদিন রাস্তায় আর হাঁটতে যাই না, উঠে ছাদে যাই। বুক ভরে বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিয়ে নিই। এই কোভিড-১৯ মহামারি কেবল জীবন নিয়েই যাবে না, নতুন করে জীবন দিয়েও যাবে। দুনিয়ার কলকারখানা, জাহাজ-বিমান-রেল-গাড়ির চলাচল বন্ধ হয়ে জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়া থেমে গেছে। এই সুবর্ণ সুযোগে পৃথিবী নিজেই নিজের ওজন স্তরের ফুটো মেরামত করে নিয়েছে। পাখপাখালি-জীব-জানোয়ার অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে শহরের রাস্তায় রাস্তায়। বেলা বাড়তে থাকলে অচিরেই এমন ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির বাতাস কেটে ভেসে আসে ‘আম্মা কিছু সাহায্য করেন, বাড়িতে খাবার নাই’– এমনতর আর্তস্বর। উন্নত নগরীর হাইরাইজে বিশ্রামরত নাগরিকদের সব ভাল থাকাকে ভেঙ্গে চুরে খান খান করে দেয়। এরা কারা? এরা কি দেশের নাগরিক? ২ মে, ২০২০ শুক্রবার রাত বারোটায় রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের উপর দুই কিলোমিটার রাস্তা ধরে হাজার হাজার কর্মহীন মানুষের ত্রাণের আশায় বসে ছিল, যাদের না আছে সঞ্চয়, না আছে খাবার, কতজনের জন্যে কি ত্রাণ আসবে– কেউ জানে না। প্রতিদিন এ রকম অসংখ্য রিপোর্ট আসে। একি এক কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের আভাস দিচ্ছে না? কোথায় কতজন নারী-পুরুষ-শিশুর কি পরিমাণ ত্রাণ প্রয়োজন তা নিয়ে সরকারের কাছে কি পর্যাপ্ত তথ্য নেই? ১৭ মার্চ ২০২০-এ ‘নিও নরমাল’ লক ডাউন জীবন শুরু হওয়ার পরে অধিকাংশ কলকারখানা, দোকানপাট, সেবা বন্ধ হয়ে পড়াতে কোটি কোটি কর্মহীন সঞ্চয়হীন সম্পদহীন পরিবারে নেমে এসেছে অনাহার, রোগশোক, সংক্রমণ ও মৃত্যুর বিভীষিকা।
এই সুখবর ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এবারে খাদ্য উৎপাদন বেশি হয়েছে। বিশ্বে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট থাকলেও খাদ্যের কোন অভাব নেই। দেশের সরকারি খাদ্য গুদামে ১৪ লক্ষ টন খাদ্য মজুত আছে, যা গত বছরের চেয়ে ৪% বেশি। এবারে বোরো ফলন বাম্পার হয়েছে। এই মৌসুমে আরও ২০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য সংগ্রহ করবে সরকার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫০ হাজার টন গম আমদানি করেছে। গত বছরের মে থেকে এ বছরের এপ্রিল (২০১৯-২০) পর্যন্ত বাংলাদেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৫৩ লক্ষ মেট্রিক টন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে বলে আগামি বছর (২০২০-২১) বাংলাদেশে আরও ১০ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন বাড়বে, বলেছে যুক্তরষ্ট্রের কৃষি ও খাদ্য বিষয়ক সংস্থা (USDA)। মোটকথা, আমরা খাদ্যের প্রাচুর্যের যুগে বাস করছি। দেশে খাদ্যের কোন সংকট নেই, কিন্তু আছে অনাহারী মানুষ। উদ্বেগের বিষয় হল, কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মানুষের হাতে খাদ্য কেনার টাকা আসবে কিভাবে?
আর্টওয়ার্ক: ড্রিম অব এ হার্মিংবার্ড শিল্পী: ফারহানা ইয়াসমিন সূত্র: ফেসবুক
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহামারি শুরুর আগে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল সোয়া তিন কোটির বেশি। গত দেড় যুগে যে আড়াই কোটি মানুষ নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে এসেছিলো, এই লকডাউনে উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়াতে এরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে । বিশেষ করে যেহেতু দেশের ৮৫% মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, তাদের রোজগারের কোন নিশ্চয়তা নেই, না আছে আপৎকালীন সঞ্চয়। ফলে পুরনো দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাথে নতুন করে যোগ হতে যাচ্ছে প্রায় নতুন করে সৃষ্টি ৪১% দরিদ্রদের দল। ব্র্যাকের সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা যায় যে, করোনার ফলে দেশের নিম্নবিত্তের আয় ৮৫% কমে গেছে। হতদরিদ্র অর্থাৎ যাদের দৈনিক আয় ১৬০ টাকার কম এমন মানুষের সংখ্যা ৬০% বেড়ে গেছে। পৃথিবীর ক্লাসিক নয়া উদারবাদী দেশগুলোর মতো নয়া মধ্যআয়ের দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যে কোন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অবকাঠামো সৃষ্টি করা হয়নি। ফলে খরা, বন্যা, ঝড়, মহামারি– যে কোন ধরনের দুর্যোগেই মুহূর্তের মধ্যে প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ বেঁচে থাকার সম্বল হারিয়ে বারে বারে দারিদ্র্য সীমার নীচে অনাহারে, অর্ধাহারের জীবনে নেমে যায়। করোনার মধ্যে ২১ মের এক রাতেই ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ২২ জনের প্রাণহানি হল। পৌনে দুই লাখ হেক্টর কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হল, সম্বল হারা মানুষের সংখ্যা এখনও অজানা।
অর্থনীতি বাঁচাতে সরকার বিপুল অঙ্কের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে যার আকার ৯৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। (৩ মে, ২০২০ ডয়চে ভেলে) । এই মুহূর্তে মহামারি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের বড় কৌশল হল পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান এবং হতদরিদ্র জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া। এপ্রিলের মধ্যে ত্রাণ আকারে চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। ষাট হাজার মানুষকে ফোন করা হয়েছে, দুইলাখ মানুষকে মোবাইল মানি ট্রান্সফার সার্ভিসের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে।
সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখিরেখার চূড়ায় বসে একে নিচে নামিয়ে সমান করতে হলে এখন পর্যন্ত আরও কিছু সময় লকডাউনের কোন বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ২৮,৫১১; সুস্থ ৫,৬০২ এবং মৃত ৪০৮ জন। এই সংখ্যা করোনার উপসর্গে মৃত্যুর যে হিসাব প্রতিদিন পত্রিকায় আসে, তার থেকে খুবই ভিন্ন। বাংলাদেশে টেস্টের সংখ্যা বিশ্বে সবচেয়ে কমের দিকে। পত্রিকার আসা রিপোর্টগুলোর ভিত্তিতে করোনা ভাইরাস: বাংলাদেশ পরিস্থিতি শিরোনামে একটি গবেষণায় ৮ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, সরকার ঘোষিত তথ্য-উপাত্তের তুলনা করা হয়েছে এবং মৃতদের চিকিৎসা প্রাপ্তির পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাস্তবে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি (৩ মে ২০২০)।
নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুজীবুল আনাম এই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা কি সংখ্যা দ্বারা আক্রান্ত?’। অর্থনীতি আর জনস্বাস্থ্যের এই দুইপ্রকার পরিসংখ্যানের বিপুল সংখ্যার খেলা প্রতিদিন আমাদের সামনে দৃশ্যমান বাস্তবতাই নয়, আমাদের জীবনকে সম্পূর্ণ কব্জায় নিয়ে নিয়েছে এই সংখ্যার ন্যারেটিভ। সংখ্যার রাজনীতির মাঠে বিশেষজ্ঞদের লড়াই চলছে সংখ্যা দিয়ে। কিন্তু এই বাস্তবতায় মানুষগুলো কই? সংখ্যার দৃষ্টিনন্দন প্রেজেন্টেশন নিয়ন্ত্রণ করছে জনগণের জীবনের সকল সিদ্ধান্ত, যা তাদের মোটেই বোধগম্য নয়। কিন্তু আমজনতার যাপিত জীবনকে এই সংখ্যার চোখ ধাঁধানো ডিসপ্লে বোর্ডে দেখতে পাচ্ছেন কি? জীবনের গল্পগুলোকে কি কানে শুনতে পাচ্ছেন? মহামারি ক্লিষ্ট, মৃত্যু ভয়ে ভীত, অনাহারে মনুষ্যত্বের মর্যাদা হারিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গ্রামের দিকে পলায়নরত মানুগুলোকে গরু-ছাগল-ভেড়ার পালের মত কারা রিপ্রেজেন্ট করছে? অর্থনীতি কব্জা করে, ভেন্টিলেটর কব্জা করে, মিডিয়া কব্জা করে, ভাষা কব্জা করে বুদ্ধিমান হোমো সাপিয়েন্সের সংখ্যাগরিষ্ঠের মানবিক মর্যাদা ছিনিয়ে মানবেতর অবস্থায় ছুঁড়ে দিয়ে কতিপয় কে বা কারা ত্রাতার ভূমিকায় নেমেছে? মিডিয়ার উন্নাসিক স্পর্ধায় ত্রস্ত পলায়নপর মানুষগুলোকে দেখাচ্ছে বিশৃঙ্খল জনতার পিণ্ড হিসেবে, যাদের কোন সমাজ নেই, সংস্কৃতি নেই, পরিবার নেই। এরা কি কারো পিতা, স্বামী, মাতা, স্ত্রী, কন্যা, ভগ্নী নাকি মূর্খ অশিক্ষিত জংলি-জানোয়ারের দল মাত্র? এরা মধ্যে কি কেউ প্রেমিক, প্রেমিকা, বন্ধু, কবি, গায়ক, চিন্তুক, নেতা ও সংগঠক হতে পারে? এদের পক্ষে কি ‘কারও লাগি মালা গাঁথা’ সম্ভব নয়? করোনার কালে কি আমসমাজে প্রেম-বন্ধুত্ব-ভালবাসা- করুণার মত মানবিক শক্তির প্রকাশ হতে পারে না?
কোন বিশেষজ্ঞতার অন্ধত্বে রক্তে-মাংসের জীবন্ত মানুষগুলোর জলজ্যান্ত জীবনের সংগ্রামকে দেখা যাচ্ছে না? কেন দেখতে পাচ্ছি না সংগ্রামী মানুষের সৃষ্টিশীল কৌশল, মানসিক শক্তি, নৈতিক দৃঢ়তা, সামাজিক সংহতির শক্তি এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বিপুল প্রকাশ? এ পর্যন্ত মহামারি নিয়ে যত মতামত, চিন্তাভাবনা, আলাপ- আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের সুনামি বয়ে যাচ্ছে, তার প্রায় সবটাই বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকদের দখলে। এই হট্টগোলে জনমানুষের আলাপ-বিলাপ কোথায়? মানব ইতিহাসের সবচাইতে বড় এই দুর্যোগে আমজনতা কি করেছিল? আমজনতার কি কোন এজেন্সি ছিল, আছে বা থাকতে পারে? সেইসব গল্প উচ্চবর্গের হট্টগোলের তলায় চাপা পড়ে গেছে। নীরব হয়ে রয়েছে আমজনতার কণ্ঠস্বর।
মহামারিতে দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদন এবং নীরব গণহত্যা
ভারতীয়-আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী অখিল গুপ্ত তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণা গ্রন্থ দ্য রেড টেপ এ দেখিয়েছেন, কিভাবে ভারতে ব্যাপক দারিদ্র্য উৎপাদন শেষ পর্যন্ত কাঠামোগত সহিংসতার ফসল। এই এথনোগ্রাফিক গবেষণার বয়ানগুলো পড়তে পড়তে দেখা যায়, একই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর উত্তরাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের দারিদ্র উৎপাদনের মডেল প্রায় অবিকল এক রকম। এই দারিদ্র স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক নয়– রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পলিসি, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির মধ্য দিয়ে দারিদ্র সৃষ্টি হয় এবং টিকে থাকে। এই দারিদ্র বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘকাল রোগশোক, অনাহার, বেকারি ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে বাঁচতে বাধ্য করে রাষ্ট্রই তাদের অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। শুধু তাই নয়, এই সহিংসতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও মিডিয়া ও সাহিত্যের বাগাড়ম্বরের তলায় অদৃশ্য করে ফেলে। শিক্ষিত-এলিট উচ্চবর্গ হিসেবে বেড়ে ওঠায় উদারবাদী মূল্যবোধ আমাদের এমন একটা লেন্স দেয়, যাতে এই নোংরা দরিদ্র ক্ষুধার্ত অপুষ্ট মানুষগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত ঘোরাফেরা করা সত্ত্বেও আমাদের চোখে তারা যেন ভুতের মত অদৃশ্য থেকে যায়। আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া রোজকার বৈষম্য, অন্যায্যতা, দুর্নীতি, পরিবেশের সমূহ বিপর্যয়ের চাক্ষুষ জাজ্বল্যমান সাক্ষ্য-প্রমাণগুলোকে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না, উন্নয়নের গালভরা রূপকথাগুলোকেই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ভাষা, বাতচিৎ, এবং পরিবেশনের চাতুর্যে দারিদ্র ও দূষণ উৎপাদনের কারখানাকেই জিডিপি সমৃদ্ধির উৎস মনে হয়।
এই দারিদ্য কেবল অর্থনৈতিকভাবেই পুনরুৎপাদিত হয়, তা নয়; সামাজিক সাংস্কৃতিকভাবে পুনরুৎপাদিত না হলে এইভাবে বৈষম্যকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করে তোলা সম্ভব হত না । অক্সিজেন বা ভেন্টিলেটরের অভাবে, কিংবা হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে করোনা আক্রান্ত হয়ে শত শত মৃত্যুকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হয়। রাস্তার পাশে ক্ষুধার্ত সংক্রমিত মানুষের মৃত্যু দেখে অপরাধবোধের দংশন ছাড়াই গাড়ি করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়, ঈদের শপিং করা যায়, কৃষকের কাঁচা ধান কেটে দেয়া যায় কোন রকম নৈতিক সংকট ছাড়াই। কেবল নিও-লিবারেল ইকোনমি একা এ কাজটা করতে পারে না। একটা গোটা সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক, নৈতিক ব্যবস্থার শক্তিশালী মেশিনারি অতি ধনীদের, কর্পোরেটদের নৈতিক জীবনকে মসৃণ করতে, অপরাধবোধ মুক্ত করে, মানসিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করতে সদা ক্রিয়াশীল। দারিদ্র এবং কাঠামোগত অবস্থাকে টিকিয়ে রেখে কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি, চ্যারিটি, ফিলানথ্রোপি, ভিকটিম ব্লেমিং, ব্যক্তিগত সচেতনতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিগত দায়িত্বের উদার মূল্যবোধের বাতাবরণে তারা নিজেদের মানবিক অধঃপতনকে ঠেকনা দেয়। দারিদ্র্যকে একটা গোটা ব্যবস্থার ফসল হিসেবে এরা দেখতে নারাজ, যেমনটি অখিল গুপ্তের কাজ আমাদের দেখায়।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মত বেঁচে থাকার সর্বনিম্ন শর্তগুলোকেও নয়া-উদার অর্থনীতি প্রতিযোগিতার বাজারে নিয়ে আসে। এই অবস্থায় সব সময়ই বিপুল মানুষ স্থায়ীভাবে ক্ষুধার্ত, নগ্ন ও রুগ্ন ও গৃহহীন থেকে যায়। এই ব্যবস্থা উৎপাদিত তাদের অকাল অস্বাভাবিক গণমৃত্যুর মিছিলকে স্বাভাবিক মৃত্যুর সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এই ব্যবস্থার স্রষ্ঠা ও পালক হিসেবে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা অথবা দায়িত্ববোধ থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে রয়েছে তাদের টকশো স্টার, টিভি চ্যানেল, হলিউড, বলিউড, ঢালিউড, কবি, সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ এবং মোটিভেশনাল স্পিকারের দল। তাই মহামারি কেবল হাত ধোয়া, ঘরে থাকা, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা, স্টিমুলাস প্যাকেজ ও ত্রাণ বিতরণের বিষয়। কিন্তু সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্যগুদামে মজুতদারি, সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে কৃষকের টমেটো, খামারির মুরগি কিম্বা দুধ পঁচে যাওয়ার ক্ষয়-ক্ষতি, করোনা আক্রান্ত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক বিপর্যয় রাষ্ট্রের গায়ে আঘাত করে না। ক্ষমতায় আসীন কতিপয়তন্ত্র কোন তাপ-অনুতাপ, মর্মপীড়া বা দায়-দায়িত্ব ছাড়াই সামাজিক সুখ্যাতি ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করে। রাষ্ট্রীয় তহবিল লোপাট করে মসজিদে অনুদান করে ভারমুক্ত হয়ে যায়। পাবলিক ফান্ড লোপাটকারীদের সংঘ, ধর্মগুরু, পত্র-পত্রিকা, সাহিত্যিক, মোটিভেশন স্পিকার, থেরাপিস্টের দল এই নীরব গণহত্যাকে জায়েজ করবার মতাদর্শ উৎপাদন করে।
মহামারি এই গোটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে দেবে না, কিন্তু ভেঙ্গে পড়া ব্যবস্থায় দারিদ্র্য এবং বৈষম্যকে একেবারে নাঙ্গা করে দিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীবিহীন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার সুরক্ষাবিহীন এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকদের উপর ভিআইপিতন্ত্রের সহিংসতা এখন খুল্লাম খোলা। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র সকল নাগরিকদের জীবনের সমান সুরক্ষার দায়িত্ব খোলাখুলিভাবে অস্বীকার করে ভিআইপিদের জীবন রক্ষাকে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে দরিদ্র জেলায় সবচেয়ে কম ত্রাণ দিয়ে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন এলাকায় বেশি ত্রাণ বিতরণ করেছে। রাষ্ট্রের এই ধরনের নীতি ও অব্যবস্থাপনায় মধ্যে সুরক্ষাহীন দরিদ্রদের অধিকতর সংক্রমণ ও মৃত্যুর মুখোমুখি করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে তাদের ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত রোগপ্রতিরোধের জৈব ক্ষমতার উপর। তাই এটা এতক্ষণে পরিষ্কার যে, করোনা সংক্রমণে ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাবান-প্রান্তিক-একইভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ছে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠী প্রত্যক্ষভাবে গণমৃত্যুর মুখোমুখি। এই অবহেলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধমূক নয়? এইসব মৃত্যু কি স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, নাকি দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদনমূলক রাষ্ট্রীয় পলিসি মানুষকে এই হৃদয়বিদারক মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে? করোনার স্বাস্থ্য মহাবিপর্যয়ে জুডিথ বাটলার এই অপরাধমূলক অবহেলাকেই পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করেছেন সিধা সহিংসতা হিসেবে (Wade, 2020) ।
রাষ্ট্র বনাম সমাজ, সম্প্রদায় ও সংঘ
বাংলাদেশে মহামারি সংক্রান্ত প্রায় সব আলোচনার ভরকেন্দ্র হল জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি যেখানে বিশ্বব্যবস্থা এবং ন্যূনতম রাষ্ট্রের নিচে যাওয়া যাচ্ছে না। জালের মত বিছিয়ে থাকা এনজিওগুলো রাষ্ট্রেরই সহায়ক সংগঠন। গ্রাম পর্যায়ে তৃণমূলে উদার অর্থনীতি ও বাজারকে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিয়োজিত এনজিওগুলো গ্রাম সমাজের নিজস্ব সমাজিক সংগঠনগুলোকে অনেকটাই গিলে ফেলছে। সামাজিক সাংস্কৃতিক গ্রাম-মহল্লাভিত্তিক উদ্যোগগুলো গত কয়েক দশকে এনজিওগুলোর ভেতরে হজম হয়ে গেছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার যে, এই কোভিড পরিস্থিতিতেও এনজিওগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোন নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না। বরং, দেশব্যাপি স্বেচ্ছাসেবী ত্রাণসংগঠনগুলোর কার্যক্রমে সামাজিক শক্তিগুলোর একটা পুনরুত্থান ঘটতে দেখা যাচ্ছে। প্রণোদনা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর যে অবিকশিত অবকাঠামো তার স্তর স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় এর সুফল কতখানি দেখা যাবে, তা নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে। এই অবস্থায় দেখা গেছে সমাজের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত স্বেচ্ছাসেবার দলগুলোর বেড়ে ওঠা! স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের এই দলগুলো রাতদিন সক্রিয় থেকে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ত্রাণসেবা দরিদ্র ও দুর্গত মানুষদের পৌঁছানোর জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক তরুণ যুব সংগঠনগুলো ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ এবং বিতরণের নানা উপায় ও কৌশল খুঁজে নিয়েছে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা, এলাকার তরুণ সংগঠকেরা এতে সম্পৃক্ত। অনেক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিও নানাভাবে ত্রাণ পৌঁছানোর কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু নাগরিকদের এই বিপুল মানবিক স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রমের কোন জাতীয় সমন্বয় নেই, নেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এরা মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে শিখতে কাজ করে যাচ্ছে।
এদের ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ এবং বিতরণের অভিজ্ঞতার ভেতর আমরা তল থেকে আসা কিছু কণ্ঠস্বর, সামান্য কিছু মানুষজনকে দৃশ্যমান দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নিম্নবর্গের নিজের কথা নিজে বলতে পারেনি, তাদের কণ্ঠস্বর এখনও অশ্রুত। লক ডাউন চাপিয়ে দেয়া বা উঠিয়ে নেয়ার কৌশলে, হার্ড ইমিউনিটির নীতি গ্রহণের সময়, চলাচলে পাস আরোপের সময় গণতন্ত্রের কথা রাষ্ট্র বেমালুম ভুলে গেছে। কখন কি নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে অথবা বাতিল করা হচ্ছে, তা জানানোর, আলাপ- পরামর্শ করবার, মূর্খ জনগণের সম্মতির তোয়াক্কা করার কোন প্রয়োজন হয়নি। দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা আইন’ ২০১২– এ লব্ধ ক্ষমতা প্রয়োগে জনকল্যাণে ব্যবহারে জনমতের প্রতি সম্মান ও ন্যায্যতা প্রদর্শন আদৌ কোন বিবেচনা পায়নি।
আর্টওয়ার্ক: দ্য নিউ মুন-১ শিল্পী: ফারহানা ইয়াসমিন সূত্র: ফেসবুক
দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যখাত, হাসপাতালগুলোর অবস্থা, সংক্রমণ ও মৃত্যুর তথ্যের গরমিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ, মিডিয়ার স্বাধীনতা ইত্যাদি মহাগুরুত্ববহ আলোচনায় বিশেষজ্ঞ ছাড়া আমজনতার কি বলার কিছু থাকতে পারে? চাপিয়ে দেয়া শাসনের চাপে বেঁচে থাকতে তাদের কি কোন কৌশল আছে? নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমার ভীষণ কৌতূহল যে, সমাজ বলে কি বাংলাদেশে কোন সংগঠন আদৌ আছে? সম্প্রদায় আছে?– যেমনটি বাংলাদেশের গ্রাম গবেষকরা দেখিয়েছে (উদাহরণস্বরূপ, ইয়ানেকা আরেন্স, ইয়োস ফান ব্যুরদেন, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, পিটার বারটুচ্চি, ভেলাম ভান সেন্দেল, এরিক জানসেন, সারা সি হোয়াইট প্রমুখ )? সমাজ সংগঠনের কি কোন এজেন্সি আছে? তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না কেন? রাষ্ট্রের সংস্কার, সংবিধানের ত্রুটি, রাষ্ট্রযন্ত্রের অকার্যকারিতা, চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেঙ্গে পড়ার অভিঘাতে রাষ্ট্রের তলাকার লণ্ডভণ্ড জীবনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না কেন? তল থেকে আসা কোন আলোচনা শোনা যাচ্ছে কি? মহামারি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের সাথে সমাজ ও সম্প্রদায়ের কোন সংঘাত আছে কি, যেমনটা দীপেশ চক্রবর্তী কিম্বা ডেভিড আর্নল্ডরা ঔপনিবেশিককালের স্মল পক্স, কলেরা ও প্লেগের মহামারির ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন যে, মহামারির আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার হস্তক্ষেপের সাথে রাজনৈতিক শাসনের কাঠামোও প্রস্তুত করা হয়েছিল? নৃবিজ্ঞানী জহির আহমেদ (আহমেদ, ১৩ মে, ২০২০) ইংল্যান্ডের ইয়াম গ্রামে বুবনিক প্লেগের গ্রাম-সংগঠনের যে ঐতিহাসিক প্রস্তুতি, চার্চের ভূমিকা, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শক্তি ব্যবহারকে দেখিয়েছেন, তেমন বাংলাদেশের গ্রাম-সম্প্রদায়ের মোকাবেলায় প্রকৃতি কেমন?
সমাজ ও সম্প্রদায়ের মহামারি মোকাবেলায় কোন স্থানীয়, ভেতর থেকে আসা কোন মেকানিজম আছে কিনা? কিম্বা আদৌ সম্প্রদায়ের কোন অস্তিত্বই আছে কিনা? পরিবার, গোষ্ঠী, গার্হস্থ্য দল, ভ্রাতৃসংঘ, জ্ঞাতিসম্পর্ক সম্প্রদায়, গ্রাম-সংগঠন, আন্তগ্রাম সহযোগিতার কোন এজেন্সি আছে কিনা, নাকি সমাজ পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধুই রাষ্ট্র? মহামারি মোকাবেলায় রাষ্ট্রের ঘোষিত স্টিমুলাস প্যাকেজ ছাড়া আর কোন সামাজিক সাংস্কৃতিক কৌশল, মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শক্তির পথ থাকতে পারে কিনা? কোন সংঘের শরণ খোঁজা যায় কিনা? কোন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি ঘরে থাকা সম্ভব কিনা, যদি থাকে, কিভাবে আমরা এসব পুঁজি কাজে লাগাতে পারি?– করোনার মহাদুর্যোগকালে এই অনুত্থাপিত প্রশ্নগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমি না ভেবে থাকতে পারি না।
২২ মে, ২০২০
তথ্য ও গ্রন্থনির্ঘণ্ট
আহমেদ, জহির (১৩ মে ২০২০)ইংল্যান্ডে প্লেগ মোকাবেলা ও কোভিড-১৯ এর শিক্ষা, https://www.somoynews.tv/pages/details/213481?fbclid=IwAR2d7JvyX6MyPJynT_NoiMO6AEbApbVbWBQgcbvZygQUCp-8sLcqTOI5-Sc , প্রবেশ, ২২ মে ২০২০
করোনা ভাইরাস বাংলাদেশ পরিস্থিতি, ( ৩ মে ২০২০) কোভিড – ১৯ উপসর্গে মৃত্যু সমূহ এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
https://bdcoronainfo.wordpress.com/2020/05/03/research-findings-deaths-covid19-symptoms/ , প্রবেশ, ২২ মে ২০২০
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, http://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-1103.html , প্রবেশ, ২২ মে, ২০২০
চক্রবর্তী, দীপেশ (১৯৯৮) শরীর, সমাজ, রাষ্ট্র: ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারি ও জনসংস্কৃতি, নিম্নবর্গের ইতিহাস, গৌতম ভদ্র ও রনজিৎ গুহ সম্পাদিত, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা
Andrews, B. (1996). Colonizing the Body. State Medicine and Epidemic Disease in Nineteenth-Century India. By David Arnold University of California Press, 1993. – Public Health in British India. Anglo-Indian Preventive Medicine 1850–1914. By Mark Harrison Cambridge History of Medicine Series, Cambridge University Press, 1994. Modern Asian Studies,30(3), 707-714. doi:10.1017/S0026749X0001670X
Wade, Francis (13 may, 2020) Judith Butler on Violence and Neglect amid a Health Crisis. https://www.thenation.com/article/culture/judith-butler-force-of-nonviolence-interview/, Accessed on, 22 May, 2020
Gupta, Akhil (2012). Bureaucracy, Structural Violence, and Poverty in India. Duke University Press, London
ভূমিকা: পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং “শক্তিক্ষয়ের রাজনীতি” (Politics of Attrition) । যে সঙ্কটসমূহের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি সেগুলিকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে এই বিশ্ব-ব্যবস্থা? জলবায়ু সঙ্কট, চলমান বৈশ্বিক মহামারি এবং অভিবাসী সঙ্কটের মধ্যে কি কি মিল রয়েছে? ভারতীয় লেখক অমিতাভ ঘোষ এই সাক্ষাৎকারে এমন নানান প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
২০১৯ সালে Penguin Random House কর্তৃক প্রকাশিত অমিতাভ ঘোষের সর্বশেষ উপন্যাস Gun Island এক অস্থিতিশীল বাস্তবতার গল্প রচনা করেছে। এমন এক বাস্তবতা যার মধ্যে আমরা এই মুহুর্তে রয়েছি। এই বাস্তবতা হল জলবায়ুর বিনাশ এবং বাধ্যতামূলক বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা। করোনাভাইরাস অতিমারির আলোকে বিশ্বকে সংক্রমণকারী এই সঙ্কটসমূহের পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাব এই সমমাত্রিক বাস্তবতাসমূহের গভীরতর বোঝাপড়ার দিকে।
ইতালীয় সংবাদপত্র il manifesto-কে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে লেখক অমিতাভ ঘোষ কথা বলেছেন কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাহিত্য কিভাবে আমাদের বদলানো বিশ্বকে বোধগম্য করে তুলতে পারে, সেই সম্পর্কে। ইতালীয় ভাষার সেই সাক্ষাৎকারের ইংরেজী সংস্করণের একটি বাংলা রূপান্তর এটি।
Gun Island-কে আমি আমাদের চলিত বাস্তবতার বই হিসেবেই চিন্তা করি। যে সময়ে আমরা বসবাস করছি, যে মুহুর্তটিকে আমরা অধিকার করে আছি, তারই বাস্তবতা। আমার মনে হয় এখানে আসল প্রশ্নটি হল, এই বাস্তবতাকে কেন আমাদের অনেকের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে? মোটাদাগে, লেখকগণ জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত একটি বিষয় হিসেবে দেখতে চান। আমি, অপরদিকে, এই বিষয়গুলোকে অতীতের আলোকে ভেবে থাকি। আমি মনে করি, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল গত ত্রিশ বছরের মধ্যে ঘটে যাওয়া কোনও বিষয় নয়। এটি এমন কিছু যার রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস, যা আমাদের অতীতের অনেক গভীরে গিয়ে পৌঁছায়। এটিই সেই প্রেক্ষাপট যার আলোকে আমি সমস্যাটিকে বিবেচনা করি এবং এটিই সেই প্রেক্ষাপট যার আলোকে আমি Gun Island রচনা করেছি।
অতিমারির প্রসঙ্গে বললে, আমি মনে করি না জলবায়ুর মত এটিও একইভাবে সাহিত্যকে এড়িয়ে যাবে। ২০১২ সালে নিউইয়র্ককে ধ্বংস করে দেওয়া হ্যারিকেন স্যান্ডি সম্পর্কে নগণ্য-সংখ্যক উপন্যাস বা গল্প রয়েছে। ২০১৭ সালে হস্টনে তান্ডব চালানো হ্যারিকেন হার্ভি নিয়ে আমার জানা মতে একটিও নেই। কিন্তু আমি টের পাচ্ছি অতিমারি সংক্রান্ত উপন্যাসের বিশাল একটি ঢেউ আসতে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ৯/১১-এর পরে হয়েছিল। মহামারি ঐতিহাসিকভাবেই অনেক লেখাপত্রের জন্ম দেয়। ইতালি একটি ভালো উদাহরণ। ইতালির সর্বোৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে দুইটি উঠে এসেছে মহামারির ভেতর থেকে । একটি হল Decameron এবং অপরটি মানজোনির The Betrothed ।
এই সঙ্কট “আত্মীকরণ”-এ জনমানুষকে সহায়তা করা সাহিত্যের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু আমি মনে করি না এই উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে কোনও ঔপন্যাসিকের বই লিখতে শুরু করা উচিৎ। এটি প্রোপাগান্ডা চালানোর মত ব্যাপার হবে এবং আমি মনে করি না এটি কাজ করবে। যারাই মানুষকে “শিক্ষিত” করে তুলবার অথবা তাদের মনোজগতে পরিবর্তন আনবার উদ্দেশ্য নিয়ে লেখার প্রয়াস পেয়েছেন তারাই বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। আসল ঘটনাই যদি মানুষের মনকে পরিবর্তন না করে, তাহলে একটি উপন্যাস কিভাবে তা করবে?
অপরদিকে, আমি মনে করি, যে বাস্তবতার মধ্যে থেকে একটি উপন্যাস লেখা হয় তার প্রতিফলন উপন্যাসে থাকতে হবে। এই বাধ্যবাধকতা থেকেই আমি অনুভব করি, আমাকে অবশ্যই লিখতে হবে আমাদের যৌথ সঙ্কটের বিষয়ে। মানুষকে পরিবর্তন করা অথবা প্রোপাগান্ডা চালানোর কোনও ইচ্ছা থেকে নয়, যা মোটামুটি নিরর্থক।
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে অনেক দূর্ভাগ্যজনক জিনিসের মধ্যে একটি হল এটিকে দেখানো হয় প্রযুক্তিগত-বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে। কারণ এ সম্পর্কে আমরা যাই পড়ি না কেন তা কোনও না কোনও থিংক-ট্যাঙ্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে আবির্ভূত হয়। অথচ বৈজ্ঞানিক এবং বিশেষজ্ঞবৃন্দই একমাত্র ব্যক্তি নন যারা বুঝতে পাচ্ছেন যে, জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। বিশ্বের যেকোনও স্থানে চাষী এবং জেলেদের সাথে কথা বললে আপনি দেখবেন তারাও জলবায়ুর পরিবর্তন টের পেয়েছেন। জেলে বা চাষী অথবা সেই নারী যিনি জল আনতে পাঁচ মাইল হেঁটে যান, তাদের বদলে বিজ্ঞানীদের কথা আমরা শুনি তার কারণ হল, জেলে বা চাষী অথবা সেই নারী জগতের কাছে তাদের কন্ঠস্বরকে শ্রবণযোগ্য করে তুলতে পারেন না। অপরদিকে বিজ্ঞানীরা ক্ষমতা কাঠামোর একটি অংশ যা বিশেষজ্ঞবৃন্দের মতামতকে প্রচার করে। আমি অনুভব করি, আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা যেন মনে না করি, বিজ্ঞান এবং কেবলই বিজ্ঞান ‘প্রকৃতি’র হয়ে কথা বলতে পারবে। এবং দূর্ভাগ্যজনকভাবে ঔপন্যাসিকদের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে এটিই ঘটে যখন তারা প্রাকৃতিক জগত নিয়ে লিখতে যান।
আপনারবইThe Great Derangement–এআপনিলিখেছেন, জলবায়ুসঙ্কটএকইসাথেসংস্কৃতিরওসংকটএবংফলতকল্পনারসঙ্কটওবটে।অতিমারীরক্ষেত্রেওকিএটিসত্য? আপনিকিমনেকরেনজলবায়ুসঙ্কট, সংস্কৃতিরসঙ্কটএবংকোভিড–১৯এরসঙ্কটএকইসুতায়গাঁথা?
এই সঙ্কটসমূহ– এবং এর সাথে আমি যুক্ত করব ‘অভিবাসী সঙ্কট’-কে – সমজাতীয়, যদিও এদের মধ্য কোনও প্রত্যক্ষ নৈমিত্তিক সংযোগ নেই। এরা সকলেই এক প্রকান্ড ত্বরণের (Enormous Acceleration) ফলাফল যা গত ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে ঘটে চলেছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় বায়ুমন্ডলে যে গ্রীন হাউস গ্যাস ১৯৯০ সাল থেকে (সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ‘ওয়াশিংটন ঐক্যমত্যের’ প্রায় সার্বজনীন গ্রহণের পর থেকে) আজ অবধি পাঠানো হয়েছে তার পরিমাণ মোট গ্যাসের অর্ধেকের কম হবে না। এই সময়কাল-কে বলা হচ্ছে ‘Great Acceleration’ এবং নামটি বেশ যুতসই। কারণ, আমি মনে করি আমাদের সকল সঙ্কট যেমন, জলবায়ুর অস্থিতি, অভিবাসী সঙ্কট, এবং অবশ্যই করোনাভাইরাস অতিমারি এই ত্বরণেরই প্রভাব।
বর্তমানজলবায়ুসঙ্কটেরপ্রধানচালকহিসেবেপুঁজিবাদকেচিহ্নিতকরাহয়।আপনারবইThe Great Derangement–এআপনিআরেকজনচালককেপরিচয়করিয়েদিয়েছেন: সাম্রাজ্যএবংসাম্রাজ্যবাদ।বর্তমানসঙ্কটেরকারণযেসাম্রাজ্যবাদতারব্যাপারটিকি? এইঅতিমারীরক্ষেত্রেওকিএটিপ্রধানঅনুঘটকহিসেবেহাজিরহতেপারে?
আমার দৃষ্টিতে, জীবাষ্ম জ্বালানীকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্য এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ সবসময়ই আমাদের ভাগ্যের একটি অপরিহার্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কার্যকর থেকেছে এবং থাকছে। এটি বলাই যথেষ্ট যে, জীবাষ্ম জ্বালানী – এর উত্তোলণ এবং পরিবহন – বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রীয় বিষয়। এখন এটি প্রতিষ্ঠিত যে, জীবাষ্ম জ্বালানী থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে রূপান্তর শুধু যে সম্ভব তাই নয়, অন্যান্য অনেক দিক দিয়ে এটি উপকারিও হতে পারে। অবশ্য এমন একটি পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রকে এবং আরও সাধারণ ভাবে, পশ্চিমকে লুটে নিতে পারে, জরুরি কিছু অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে যা তারা তেলের বৈশ্বিক সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে পেয়ে থাকে।
ক্ষমতা কিভাবে কাজ করে এই অতিমারিও তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে, ধনী এবং ক্ষমতাবান দেশগুলো পরীক্ষা করার জন্য এবং হাসপাতালগুলোর জন্য সরঞ্জামের বন্দোবস্ত করতে পেরেছে যখন দরিদ্র দেশগুলো পারে নি। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ধনী এবং সেলিব্রেটিরা বিনা ঝামেলায় পরীক্ষিত হতে পেরেছেন যখন সাধারণেরা তা পারেন নি। এবং, আপনি অবশ্যই জেনে থাকবেন, আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভুত মানুষেরা সামঞ্জস্যহীনভাবে অতিমারি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। কিছু শহরে এই সামঞ্জস্যহীনতা বিষ্ময় জাগানিয়া।
The Great Derangement–এআপনিউল্লেখকরেছেন, “শক্তিক্ষয়েররাজনীতি“র (Politics of Attrition) ভিত্তিহিসেবেযেঅনুমানটিকাজকরেতাহল, যেহেতুগরীবজাতিসমূহেরমানুষেরা (এবংঐজাতিসমূহেরমধ্যেদরিদ্রতমজনগোষ্ঠীগুলো) কঠোরপরিশ্রমেঅভ্যস্ত, তাইতারাএমনকিছুচাপএবংধাক্কাসহ্যকরবারক্ষমতারাখেনযাধনবানজাতিগুলোকেসহজেইপরিশ্রান্তএবংঅবশকরেফেলতেপারে।এইদৃশ্যকল্পে, দরিদ্রেরহারাবারআছেঅল্পইএবংঅভিজাতরানিজেদেরঅবস্থাকেস্থিতিশীলরাখতেগরীবদেরব্যবহারকরেথাকেন।অবশ্যএটিকখনইব্যক্তনয়বরংগুপ্ত।চলমানসঙ্কটইএরপ্রমাণ।আপনিকিবিশ্বাসকরেনসেইঅর্থেসংস্কৃতিররয়েছেএকটিরূপান্তরকামীক্ষমতা? এটিকিব্যবস্থারবদলঘটাতেপারে?
আমার সন্দেহ হয়, আর যাই ঘটুক না কেন, অতিমারির মত এই সঙ্কটগুলো পুরোনো ধারণাসমূহকে সুরক্ষিত করতে চায়। গরীব এবং বর্ণের মানুষদের (People of Color) এই অতিমারিতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হবার ঘটনা, আমার দৃষ্টিতে, সামাজিক ডারউইনবাদের ধারাটিকে চাঙ্গা করে তুলেছে যা পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সতত উপস্থিত। তরুণ সাদা মানুষদের (বিশেষত পুরুষ) বেশ কিছু সাক্ষাৎকার আমি দেখেছি। তারা বলছেনঃ “আমি তরুণ, স্বাস্থ্যবান এবং উপসর্গহীন। তাই কোভিড-১৯ নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা করার কোনও কারণ নেই”। যা অব্যক্ত থেকে যায় তা হলঃ “যারা স্বাস্থ্যহীন এবং খারাপ অবস্থার অধিকারী তাদেরই কেবল দুশ্চিন্তা করা উচিৎ”। ট্রাম্পের সমর্থকরা যারা লকডাউন তুলে নেবার দাবী জানাচ্ছেন তাদের মনোভাবও এমনই। প্রথম দিকে পরোক্ষভাবে বরিস জনসন এবং ম্যাক্রোনের অবস্থানও তাই ছিল।
লকডাউন শুরুর দিনগুলিতে, ব্রুকলিনে, যেখানে আমি থাকি সেখানে আমাকে তীব্রভাবে যা নাড়া দিয়েছে তা হল, মাস্ক ছাড়া যারা বাহিরে বের হতেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন তরুণ সাদা চামড়ার পুরুষ। তারা হয়ত ভেবেছিলেন মহামারি নিয়ে তাদেরকে চিন্তা করতে হবে না। এই ধরণের আত্মবিশ্বাসের শেকড়, আমি মনে করি, শেষ পর্যন্ত প্রোথিত থাকে সেটেলার-উপনিবেশবাদের ইতিহাসের মধ্যে, যেখানে জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সেটেলাররা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। পুরাতন দুনিয়ার সেইসকল জীবাণুর বিরুদ্ধে কোনও প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানীয়দের ছিল না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর সেই দূর্বলতা একটি খুঁটি হয়ে ইউরোপীয় জৈবিক শ্রেষ্ঠত্বের বদ্ধমূল ধারণাগুলোকে আরও মজবুত করেছে এবং একধরণের সবলত্বের অনুভূতি তৈরী করেছে। এই ইতিহাসকে বিবেচনায় না নিলে কোভিড-১৯ এর প্রতি পাশ্চাত্যের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি বোঝা সম্ভব হবে না। পাশ্চাত্যের, বিশেষত অ্যাংলোফোনদের, অনেক নেতাই সম্ভবত বিশ্বাস করেছেন যে, এই রোগটি একটি এশিয়ান (পড়ুন, ‘প্রাচ্চীয়’) বিষয় এবং তাদের দেশ এটি দ্বারা আক্রান্ত হবে না। এমনকি তাদের জনগণ কোভিডে আক্রান্ত হবার পরেও তারা সেই সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গড়িমসি করেছে যেগুলো গ্রহণ করেছিল চীন, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া। তারা ভেবেছিল এশিয়ার পথ অনুসরণ করলে তারা নিচে নেমে যাবে।
এমনকি আজও নিউইয়র্কটাইমস-এ একটি নিবন্ধ দেখলাম যেখানে একজন ফরাসি বিদেশনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছেঃ মি. রচ বলেন, “ফ্রান্স নিজেকে দক্ষিণ কোরিয়া অথবা তাইওয়ানের সাথে তুলনা করতে পারে না। আরেকটি পরাশক্তির সাথেই কেবল এটি নিজের তুলনা করতে পারে । পরাশক্তি নয় এমন দেশের সঙ্গে এর তুলনা করার ঘটনাটি রীতিমত অসহনীয়”। এই অতিমারি যা কিছু উন্মুক্ত করল তার অপরিহার্য একটি অংশ হিসেবে হাজির হয়েছে বর্ণবাদ। পরিহাসটি হচ্ছে, এই অতিমারি বিশ্বকে এটিও স্পষ্ট দেখিয়ে দিল যে, পাশ্চাত্য দেশগুলো আর সু-শাসনব্যবস্থা অথবা সর্বোৎকৃষ্ট অনুশীলনের উদাহরণ নয়।
অর্জুন আপ্পাদুরাই(Arjun Appadurai) ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী। বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক গতিপ্রবাহ নিয়ে কাজে বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। জনসংস্কৃতি নামের একাডেমিক জার্নালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। American Academy of Arts and Sciences-এর ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৯৭ সনে। বিশ্বায়ন অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ণ এই তাত্ত্বিকের We are witnessing the revolt of the elites শীর্ষক একটি লেখা ‘The Wire’ নামের ইন্ডিয়ান অনলাইন পোর্টালে গত ২২ এপ্রিল প্রকাশিত হয়েছে। অর্জুন আপ্পাদুরাই’য়ের এই নিবন্ধের অনুবাদ করেছেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট সারোয়ারতুষার।
হোসে ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট (Jose Ortega y Gasset) ছিলেন বিশ শতকের বিস্মৃতপ্রায় অপ্রথাগত স্পেনীয় চিন্তক ও দার্শনিক, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাজ বিজ্ঞানের কাজ জনতারউত্থান (১৯৩০)। উদারনৈতিক মনোভাবাপন্ন ইন্ডিভিজুয়ালের ক্রমশ উধাও হতে থাকা এবং ‘উন্মত্ত জনতা’র আবিভার্ব তাকে উদ্বিগ্ন করেছিল।
ওর্তেগার ‘আম-জনতা’র ধারণা গরীব, নিঃস্ব কিংবা সর্বহারা জনগোষ্ঠীর নয়, বরং একই অভিরুচি, মূল্যবোধ, স্বভাব-চরিত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গড়পড়তা সাধারণ মানুষের চিত্র। এইভাবে, ওর্তেগা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের গণ-সমাজের সমালোচনার চেয়েও বেশি সাম্প্রতিক মার্কিনী সমালোচকদের কাছাকাছি ছিলেন। তবুও, উনিশ শতকের উদার আদর্শের বিপরীতে উন্মত্ত জনতার উত্থানকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে (সেই ব্যাখ্যা যেমনই হোক) ওর্তেগা শুরুর দিককার কন্ঠই ছিলেন।
হোসে ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট ১৮৮৩-১৯৫৫
আমি এখন ওর্তেগায় ফিরে আসলাম কারণ আমি মনে করি নানা কিসিমের গণজাগরণেই বিশ শতক নিঃশেষ হয়েছে এবং আমরা ‘নব্য এলিটদের উত্থান’-এর এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। এই উদীয়মান এলিটরাই নরেন্দ্র মোদী, ডোনাল্ড ট্রাম্প, এরদোগান, জেইর বলসোনারো, বরিস জনসন, ভিক্টর ওর্বান এবং এমন আরো বহু নব্য স্বৈরাচারদের আবরণ হিসেবে কাজ করে। তাঁদের সমর্থন আর তোষামোদ করে। তাঁদের পক্ষে প্রচারণা চালায়। নরেন্দ্র মোদী’সহ যেসব নব্য স্বৈরাচারদের নাম উল্লেখ করলাম, এরা এইসব নব্য এলিটদের উপর ভর করে এমন এক ব্যবস্থা কায়েম করেছে, যাকে বলা যেতে পারে ‘উপর থেকে আরোপিত লোকরঞ্জনবাদ (populism)’। এই লোকরঞ্জনবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমজনতা কেবল গণতন্ত্র থেকে ব্যাপকমাত্রায় নিষ্ক্রমণের উপকরণ মাত্র।
এইসব নতুন স্বৈরাচারী এলিটদের আচরণকে লুন্ঠনজীবী পুঁজিবাদ, পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কপ্রণালীর নয়া উদারতাবাদী পুঁজিবাদের নতুন ছদ্মবেশ, দুর্যোগ পুঁজিবাদ না বলে ‘অভ্যুত্থান’ বলছি কেন? এই নব্য এলিটরা কারা? তাদের অভ্যুত্থানটাই বা কিসের বিরুদ্ধে?
প্রথমত, তাঁদের এই উত্থান অন্য সমস্ত এলিটদের বিরুদ্ধে, যাদের তাঁরা হেয়, ঘৃণা ও ভয় করেঃ উদারনীতিবাদী এলিট, মিডিয়া এলিট, সেক্যুলার এলিট, কসমোপলিটান এলিট, “হার্ভার্ড” এলিট, ঝানু অর্থনৈতিক এলিট, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং শিক্ষাবিদ। সুতরাং, ‘অ্যান্টি-এলিট’ ডিসকোর্সের ছদ্মবেশে এটা আসলে নতুন এক এলিটিজম।
দ্বিতীয়ত, এই উত্থান তাঁদের বিরুদ্ধে যারা মনে করে প্রকৃত এলিটদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা হয়েছেঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা, ভারতে মুসলিম আর সেক্যুলারপন্থীরা, ব্রাজিলে বামপন্থী ও এলজিবিটি সম্প্রদায়, রাশিয়ায় ভিন্নমতাবলম্বী, এনজিও এবং সাংবাদিক, তুরস্কে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংখ্যালঘু, যুক্তরাজ্যে অভিবাসী, শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নবাদীরা। এই প্রতি-অভ্যুত্থান তাঁদের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে যারা মনে করে ‘দখলদার’ কিংবা ‘ভুয়া’ এলিটদের বিপরীতে তাঁরাই ‘প্রকৃত’ এলিট।
তৃতীয়ত, নব্য এলিটদের এই প্রতি-উত্থান লিবারেল গণতন্ত্রের যুগে নির্ণীত মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও। কেবলমাত্র নিজেদের জন্য ব্যতিরেকে তাঁরা স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বকে স্রেফ ঘৃণা করে। কোন রকম বাধা ছাড়াই যা খুশি করার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্যকে(চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) তাঁরা ‘অবৈধ’ জ্ঞান করে। তাঁরা যে কোনও ধরনের নিয়ন্ত্রণকে ঘৃণা করে, বিশেষত কর্পোরেট সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে; কারণ তাঁরা একে মনে করে তাঁদের নিজস্ব এখতিয়ারের ক্ষেত্র পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। সর্বোপরি, তাঁরা বিবেচনা এবং পদ্ধতিগত যুক্তিবোধকে ঘৃণা করে। কারণ এগুলো অন্যের বক্তব্য শোনা, ধৈর্য এবং সম্মিলিত যুক্তিবোধের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি। কেবলমাত্র তাঁদের বন্ধুবান্ধব ও সমমনাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে, এমনকি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণেও তাঁদের আস্থা নাই।
তার মানে, একেবারে সোজাসাপ্টাভাবে বলতে গেলে, নব্য এলিটদের এই প্রতি-অভ্যুত্থান আসলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই, কিন্তু এক্ষেত্রে মোচড় বা টুইস্ট হলো এই প্রতি-অভ্যুত্থান সংঘটিত হচ্ছে জনতার নামে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আধুনিককালের ‘জনতা’র ধারণা ‘গণ’ (demos) এবং গণতন্ত্র ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। এটি একটি অভ্যুত্থান—এই অর্থে যে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে উত্থান বরাবরই অভ্যুত্থান—আবশ্যিকভাবে বিপ্লব নয়। বিপ্লবের অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হওয়া। অন্যদিকে, এই অভ্যুত্থান কেবল এক এলিটের জায়গায় আরেক এলিটকে প্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টা।
উল্লেখিত সব কথাই মারাত্মকভাবে সরলীকরণের দোষে দুষ্ট এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত মনে হবে যদি আমরা কিছু সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্নের পর্যালোচনা না করি। এই নতুন এলিটদের প্রকৃতি কী? তাদের আবির্ভাবের শর্তগুলো কারা ব্যাখ্যা করে? কে এদের পক্ষে কথা বলে? এদের সামাজিক শেকড় কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের সামনে নির্দিষ্ট ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রকে হাজির করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, ট্রাম্প যে এলিটদের পক্ষে কথা বলেন এবং নিজে যে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন, তারা কেউই খুব বেশি শিক্ষিত নয়। তারা সেলফোন উদ্যোক্তা কিংবা রাজনীতিবিদ, রিপাবলিকান সিনেটের শাসক, হাউজের রিপাবলিকান অংশ, চায়ের পার্টি কিংবা রাজিনীতির প্রত্যেক স্তরেই উটকো, অনাহুত লোকজন। এছাড়াও, এই তালিকায় আরো রয়েছে ক্ষমতার বিমারে বিকারগ্রস্ত সিইও(CEO, যেমন পিটার থিয়েলের মতো সিলিকন ভ্যালি আইকন) , টেলিভিশন ও রেডিও মিডিয়ার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এবং বর্ণবাদী ও লোভী ধর্মপ্রচারক যাজক, গীর্জা এবং দাতাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এর সাথে যোগ করুন ডানপন্থী থিংক ট্যাঙ্কের ক্যারিয়ারবাদী ভাড়াটে লেখকদেরও। কোনও সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক শিকড় ছাড়াই এলিটদের এই নেটওয়ার্কের একেবারে গভীরে কাজ করছে ফেডারেল সোসাইটির ওপাস দেই’য়ের(Opus Dei) মতো ট্রান্সন্যাশনাল গ্রুপগুলোর গোপন নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কগুলো হলো সুবিধাবাদ, লোভ এবং মুনাফাগন্ধীর নেটওয়ার্ক, যাদের কোন ঐতিহ্যগত বন্ধন কিংবা মূল্যবোধের বালাই নেই।
ভারতের বর্তমান রেজিমের এলিটদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র আঁকা যেতে পারে, কেবলমাত্র নির্বাচন ছাড়া তাঁরা বাদবাকি সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারেই চরম ঘৃণা পোষণ করে। এটি অর্ধশিক্ষিত অর্থনীতিবিদ, ক্যারিয়ার জোচ্চোর, একচেটিয়া কায়-কারবার, তদবির ও খুল্লামখুল্লা দুর্নীতির মাধ্যমে স্বার্থ হাসিল করা লুন্ঠনজীবী ব্যবসায়িক সম্প্রদায় এবং নির্লজ্জ অপরাধী রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতাদের সমন্বয়ে গঠিত। এদের প্রতি-অভ্যুত্থান নেহরুবাদী সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ও বহুত্ববাদে বিশ্বাসী যেকোন ব্যক্তি কিংবা গ্রুপের বিরুদ্ধে।
এটি নব্য এলিটদের এমন এক সংঘ যারা মনে করে ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদীরাই ভারতীয় ইতিহাসের একমাত্র ত্রাতা এবং এই তথাকথিত ‘ত্রাতা’রা মোঘল, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল এবং কংগ্রেসের দীর্ঘশাসনের পর নিদ্রা ভেঙ্গে জেগে উঠেছে। এই জোট ভয়াবহভাবে মুসলিমবিদ্বেষী মতাদর্শ, নীতিনির্ধারণ ও গণহত্যা সংঘটনের ক্ষেত্রে নিজেদের অত্যন্ত কার্যকর শক্তি মনে করে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়মুক্তি ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে এই নব উত্থিত এলিটদের মধ্যে কোন শ্রেণীগত ঐক্যও নেই। ট্রাম্পের এলিট অংশীদারদের মতোই এই ভারতীয় এলিট সম্প্রদায়ও সুবিধাবাদ আর সক্রিয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নিদারুণ অবজ্ঞায় পরিপূর্ণ।
যদিও আমি এরদোগান, পুতিন, বলসোনারো কিংবা দুতের্তের মতাদর্শিক লেঠেল বাহিনী ও মোসাহেবকূলের সামাজিক উৎস সম্পর্কে সেইভাবে অবগত নই, তারপরেও আমি অনুমান করতে প্রস্তুত যে এই প্রত্যকটি ক্ষেত্রে নব্য এলিট সম্প্রদায় কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বহন করে : চিরাচরিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এলিটদের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা, উদারনৈতিক কার্যপ্রণালীর প্রতি নিদারুণ অবহেলা, বুদ্ধিজীবী-গবেষক-শিল্পী-অ্যাক্টিভিস্ট-সমাজতন্ত্রী-নারীবাদীদের প্রতি চরম ঘৃণা, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে ততক্ষণ পর্যন্ত পুঁজিবাদের বন্দনা এবং জনগণ নয় বরং নিজেদের ভোটারদের কাল্ট অনুসরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা।
হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওর্বান তাঁর ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করেছে। ট্রাম্প রিলিফ চেকে তাঁর নাম মুদ্রণ এবং বর্তমান সংকটে একক নির্বাহী ক্ষমতাবলে যেকোন জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। মোদী মোটাদাগে নিজেকে সংবিধানের ঊর্ধে ঘোষণা করেছেন এবং ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও বলসোনারোর মত গণশত্রুদের ভারতে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তিনি কোভিড-১৯ এর সংকটময় পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গোটা ভারতে কারফিউসম ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করেছেন, পুলিশী পিটুনি, ভুয়া কারণ দেখিয়ে কারাগারে প্রেরণ এবং ইতোপূর্বে কাশ্মীরে পরীক্ষিত কাছাখোলা দমন-পীড়ন নীতিকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করেছেন।
এই সমস্ত পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে, এই নেতারা অন্ধ সমর্থক এবং সহযোগীদের নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল, যারা মনে করে ‘সুপ্রিম লিডার’-এর তালে তাল মিলিয়ে চলার মধ্যেই তাঁদের নিজেদের এবং জাতির সমৃদ্ধি নিহিত। তাহলে, পূর্ববর্তী এলিটদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানরত এই নব্য এলিটবৃন্দ, যারা বর্তমান দুনিয়ার লোকরঞ্জনবাদী স্বৈরতন্ত্রের ঘনিষ্ঠ দোসর, যাদের এই ক্যু লিবারেল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে; অনুসারীগোষ্ঠী, বুনিয়াদি শক্তি, ভোটার, এমনকি যে ‘জনগণ’-এর নাম ও দোহাই দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে একটা অনন্ত ‘যুদ্ধ’ চালানো হচ্ছে, এই সমস্ত কিছু সমেত এই নব্য এলিটদের আমরা কীভাবে ‘পাঠ’ করব? কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
এই অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের কিছু গড়পড়তা উত্তর আছে। একটি হলো এই স্বৈরশাসকেরা আবেগ-অনুভূতির (প্রেম, ক্ষত, ত্যাগ, ঘৃণা, রাগ, ক্ষোভ) গুরুত্ব বোঝে এবং এগুলোকে হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে তাঁদের প্রতিপক্ষরা এমন সব তত্ত্ব, মূল্যবোধ, যুক্তি বিষয়ক আধা-বিদ্যায়তনিক তর্ক-বিতর্কে ডুবে থাকে, যেগুলোর আজকাল গণ আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। দ্বিতীয়টি হলো আকাঙ্ক্ষার প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী উত্থান (বিজ্ঞাপন, ভোক্তা পণ্য, সেলেব্রিটি কাল্ট, কর্পোরেট সংস্কৃতি), যেটি কিনা উদারনৈতিক পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াগুলোর ধীরগতির প্রতি দরিদ্র ও নিম্নবর্গ শ্রেণী ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। তাঁরা এখন সমৃদ্ধি ও মর্যাদা চায় এবং এই লোকরঞ্জনবাদী নেতারা তাঁদেরকে সেগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আরও একটি যুক্তি হলো ক্রমাগত বাদ পড়া, দরিদ্র থাকা এবং অপমানের শিকার হওয়া নিম্ন শ্রেণীগুলোকে এতটাই বিদ্বিষ্ট করেছে যে তাঁরা এখন এইসব লুটেরা নেতাদের মধ্যেই নিজেদের পরিচয়কে জুড়ে দিতে চায় (যেসব নেতারা যা চায়, ঠিক তাই হাতিয়ে নিতে সক্ষম)। ফলে তারা মুসলিম, শরণার্থী, চৈনিক, জিপসি, ইহুদি, অভিবাসী এবং এমন আরও অনেক ‘অপর’-এর প্রতি আতঙ্কের দিকে আমজনতার মনোযোগ সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় বাস্তবতায় এই যুক্তিগুলো কিছুটা হলেও বোধগম্য।
তবে আমি মনে করি, ওর্তেগা গ্যাসেটের অন্তর্দৃষ্টি আমাদের এটা বুঝতে সহায়তা করে যে আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে আম-জনতার অভ্যুত্থান এলিটদের প্রতি-অভ্যুত্থান দ্বারা বেদখল হয়ে গেছে। এই বেদখল হওয়ার ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বৈরাচারদের দ্বারা ঘনঘন ব্যবহার হতে থাকা এটাই উন্মোচন করে যে, এই ‘জনতা’ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে এইসব নব্য এলিটদের উত্থান মূলত তাঁদেরই উত্থান এবং তাঁদের সর্বোচ্চ করণীয় হচ্ছে, এইসব বীভৎস দানবীয় নেতাদের উত্থানের উদযাপন করা (সম্ভব হলে অনুকরণ করা)। সামাজিক পরিস্থিতি ও বিন্যাসের অর্থবহ বৈপ্লবিক কিংবা গণমুখী পরিবর্তনের চেয়ে এইসব নেতাদের মুহুর্তের মধ্যে সব ঠিকঠাক করে ফেলার ফাঁপা কারিশমার প্রতি তাঁদের অধিক আস্থা।
কথা বলার ধরনে মনে হয় যেন এই নব্য ভোটারু (electoral) জনতা মনে করে বসে আছে তাঁদের নেতাদের সীমাহীন লুন্ঠনের সুফল তাঁদের দিকেও চুইয়ে পড়বে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি দরিদ্র ও নিম্নবর্গ শ্রেণীর আম-জনতার কাছে কেবল তাঁদেরই অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলির পাঁঠা অংশকে খুন করা, অঙ্গহানি করা এবং লাঞ্ছিত করার নিরঙ্কুশ দায়মুক্তি ছাড়া আর কিছু চুইয়ে পড়েনি। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চতর আয় এবং নিরাপদ শহরের মতো প্রাত্যহিক প্রয়োজনগুলো চুইয়ে পড়ার জন্য পিরামিডের একেবারে তলানিতে পড়ে থাকাদের সীমাহীন ধৈর্য ও অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু তাঁরা এই আশায় বাঁচে যে, যদি তাঁদের কাছে ঘৃণা চুইয়ে পড়তে পারে, তাহলে হয়তো সমৃদ্ধিও চুইয়ে পড়বে।
এই নিবন্ধে অর্জুন আপ্পাদুরাই বিশ্বজুড়ে বিরাজমান ফ্যাসিবাদী, ডানপন্থী রাষ্ট্রপ্রণালী সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন। আমরা মনে করছি অপেক্ষাকৃত ন্যায্য, গণমুখী, গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা যারা বলেন, সমাজ-সম্পর্কের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে যারা চিন্তা করেন, সক্রিয় থাকেন; অর্জুন আপ্পাদুরাই’য়ের এই পর্যবেক্ষণ তাঁদের আমলে নিতে হবে। কারণ বর্তমানে আমরা এমন এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সমাজ বিন্যাসে আছি, যা প্রতি মুহুর্তে নিজেকে হালনাগাদ করছে, কৌশল বদলাচ্ছে। অত্যন্ত ক্ষীপ্র এই ব্যবস্থাকে যারা মোকাবেলা করছেন, তাঁরা তদ্রুপ ক্ষীপ্রতা অর্জন করতে না পারলে, আধিপত্যশীল ব্যবস্থা সম্পর্কে শত শত বছরের স্থবির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ব্যস্ত থাকলে, কখনোই সমাজ-সম্পর্কের পরিবর্তন আশা করা সম্ভব না।
আপ্পাদুরাই বলছেন, বর্তমান দুনিয়ার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে তার একটা অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এলিটদের মধ্যেই এক নতুন এলিট সম্প্রদায় এর উত্থান ঘটেছে। যারা বদলে দিয়েছে পুরোনো হিশাব নিকাশ। একে আমরা বলতে পারি, এলিটদের বিরুদ্ধে নব্য এলিটদের পাল্টা-অভ্যুত্থান।
দেখা যাচ্ছে যে, এই নব্য এলিট সম্প্রদায় কোন কোন ক্ষেত্রে, যারা জনগণ কেন্দ্রীক রাজনীতির কথা বলে তাঁদের চেয়ে বেশি জনসংশ্লিষ্ট। নব্য এলিটদের এই রাজনীতি-ধর্ম ব্যবসা-সংস্কৃতি কারখানার পেছনে আছে ব্যাপক জনসমর্থন। অন্তত আপাতদৃষ্টে তাই মনে হবে। প্রথাগত এলিটরা যেসব উদারনৈতিক, গণতান্ত্রিক, মানবতাবাদী মূল্যবোধকে স্বীকার করত অন্তত নিজেদের শ্রেণীর মধ্যে, এরা এমনকি সেইসব মূল্যবোধের প্রতিও বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাশীল না। এদের কোন ছদ্মবেশ নেই। মহৎ মহৎ কথার কোন ফুলঝুরি নেই, তারা যা করতে চায়, তা অত্যন্ত খুল্লামখুল্লাই করে।
বুর্জোয়া মানবতাবাদ, গণতন্ত্র, উদারনীতির সমন্বয়ে যে রাষ্ট্রপ্রণালী প্রচলিত ছিল, যেগুলো অন্তত কিছুটা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় কাজ করত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসন ছিল, ক্ষমতার অন্তত লোকদেখানো বিভাজন ছিল; তার কিছুই আজকে আর অবশিষ্ট নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, এমনকি বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোতে। যেন এক সর্বত্র এক সর্বব্যাপ্ত মাফিয়াতন্ত্র কায়েম হয়েছে।
যারা প্রচলিত এলিট সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুত গণতন্ত্র, মানবতাবাদ, উদারনৈতিকতার বিরুদ্ধে এক অনন্ত ‘ক্যু’ সংঘটিত করে চলেছে। অর্জুন আপ্পাদুরাই বলছেন, এক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো, আগেকার যে কোন স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদের সাথে আজকের দুনিয়ার এই নব্য এলিট সম্প্রদায়ের নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদের পার্থক্য হলো, বর্তমানে যা কিছু হচ্ছে, তার সবকিছুর পেছনেই এক আপাত বিপুল জনসমর্থন আছে।
কী করে সম্ভব হলো এই পরিস্থিতি? বুদ্ধিজীবী-অ্যাক্টিভিস্ট-শিল্পী-নারীবাদী-সমাজতন্ত্রী-পরিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে এত বিপুল ক্ষোভ ও ঘৃণা উৎপাদনের কারণ কী? কী করে জনগণকে তাদের আসল বাস্তব প্রাত্যহিক সমস্যা-সংকট থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়া যাচ্ছে নানা রকম ফাঁপা প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শিক চর্চায়? কী করে জনগণকে পরিণত করা যাচ্ছে ‘উন্মত্ত মব’-এ?
এই প্রবন্ধের প্রাথমিক পাঠে মনে হতে পারে যেন, অর্জুন আপ্পাদুরাই জনগণের উপরেই সমস্ত দায় চাপাচ্ছেন। কিন্তু আরেকটু গভীরভাবে পাঠ করলেই এটা পরিস্কার হবে যে, তিনি মূলত বলছেন, বর্তমান কালের নব্য এলিটরা ‘জনতা’র ধারণাতেও ক্যু সংঘটিত করে চলেছে। ‘জনতা’র নামে তারা মূলত এমন এক কাল্ট[গোষ্ঠীতন্ত্র] , এমন এক ক্রোধান্মত্ত মব তৈরিতে সক্ষম হয়েছে, যারা যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত হতে হতে, নানা ধরনের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে, শেষমেষ নিজেদের বাস্তব পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন না দেখতে পেয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, কোন এক ‘অতি-মানব’ সুপারলিডারে আস্থা রাখা ছাড়া, জিহাদি জোশ সম্বলিত কোন মতাদর্শের খরিদ্দার হওয়া ছাড়া তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হবেনা।
ফলে এইসব ‘অতি-মানব’ স্বৈর-শাসকদের নির্মিত ‘কল্পিত শত্রু’র বিরুদ্ধেই তাঁরা তাঁদের সমস্ত ক্ষোভ ঢেলে দিতে উদ্যত। স্বৈর-শাসকদের সৃষ্ট বাস্তব সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে ঘৃণা, বিভাজন উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশে যখন আমরা করোনাভাইরাস মহামারীতে সরকার-রাষ্ট্রপ্রণালীর নিদারুণ ব্যর্থতা, উন্নয়নের রোলমডেল রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাতের অকল্পনীয় অব্যবস্থাপনা (যার শিকার হচ্ছে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষ), মাসখানেকের লকডাউনে সমস্ত কিছুতে ধস, তীব্র খাদ্যাভাব প্রত্যক্ষ করছি; ঠিক তখন ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ এর মত অন্তঃসারশূন্য বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার মত চরম অসংবেদনশীলতাও দেখতে পাচ্ছি।
অর্জুন আপ্পাদুরাই’য়ের লেখার সার কথাটুকু যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে আমরা হয়তো উপলব্ধি করব যে, জনগণকে নানা মতাদর্শে, চিন্তার বৈচিত্র্যকে পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিণত করা, স্বীয় নলেজ সিস্টেমকে অন্য নলেজ সিস্টেমের উপর চাপিয়ে দেয়ার এই প্রবণতা বর্তমান কালের নব্য এলিটদের প্রধানতম সার্থকতা।
আরেকটা ব্যাপারও খেয়াল রাখা দরকার, এমনকি শতাব্দী পুরোনো ‘শ্রেণী’ বিশ্লেষণ দিয়েও আজকের পরিস্থিতি পুরোটা বোঝা অসম্ভব। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এলিট কমপ্লেক্সে পূর্ব অনুমিত অবধারিত কোন শ্রেণীগত ঐক্য নেই। একই শ্রেণীতে অবস্থিত সমস্ত পক্ষই একই মূল্যবোধে দীক্ষিত নয়।
যদি তাই হতো, তাহলে লিবারেল গণতন্ত্র ও মানবতাবাদের বিরুদ্ধে একই শ্রেণীগত অ্যান্টি-লিবারেল, অ্যান্টি-হিউম্যানিস্ট, অ্যান্টি-ডেমোক্রেটিক ফ্যাসিস্ট এলিটদের উত্থান দেখতে হতোনা আজকের পৃথিবীকে। শ্রেণীবাদী রাজনীতি-অর্থনীতির বিরুদ্ধে অবশ্যই সক্রিয় হতে হবে, কিন্তু চিরাচরিত যুক্তি-বিশ্লেষণ দিয়ে নয়। সেক্ষেত্রে আমরা পরিস্থিতির গুণগত নেতিবাচক পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হব। এলিটদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান রত নব্য এলিটদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হবো।
সেই সাথে চরম প্রতিক্রিয়াশীল-প্রলয়ঙ্করী নয়া উদারনৈতিক রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষকে স্রেফ ভোক্তা-ভোটারে পরিণত করার মাধ্যমে বাদবাকি সমস্ত সক্রিয়তা, কর্তাসত্তাকে ‘নাই’ করে দিতে পারে, সেটা অনুধাবন করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, সেই আলাপটাও জরুরি।
হলিউডের এক্সট্রাকশন সিনেমা নিয়ে আমার কতেক আলাপ আছে। এই আলাপ যতটা না নন্দনতত্ত্বের, তার চেয়ে বেশি সিনেমার উপস্থাপনের। এক্সট্রাকশন সিনেমাটির গল্প একটি কমিক বই থেকে নেয়া হয়েছে। কমিক বইটিতে প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের চিত্র আঁকা হয়েছিলো আর সিনেমাটিতে তা রূপান্তর করা হয়েছে ভারত ও ঢাকার চিত্র। এই স্থান বদলের কারনে সিনেমাটির চিত্র উপস্থাপনে একদিকে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অর্থ পাল্টে গেছে; সাথে সংস্কৃতি উপস্থাপনে গলদ ধরা পড়েছে এবং এর গৎবাঁধা ছাপ বেশ নজর কেড়েছে।
সিনেমার গল্প, বাংলাদেশের এক মাদক ব্যবসায়ী ভারতের আরেক মাদক ব্যবসায়ীর ছেলেকে অপহরণ করে অর্থদাবী করে। ভারতের মাদক ব্যবসায়ীরা ছেলেকে উদ্ধারের জন্য তৃতীয় শক্তির শরনাপন্ন হয়। এই তৃতীয় শক্তি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র টাইলর রেক। রেক একজন ভাড়াটে গুন্ডা, যে টাকার বিনিময়ে কাজ করে।
এক্সট্রাকশন
রেক যথারীতি ভারতের মাদক ব্যবসায়ীর ছেলেকে উদ্ধার করতে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ীর গুন্ডাদের মেরে সে ছেলেটিকে উদ্ধার করে। রেক ও ছেলেটিকে ধরতে মাদক ব্যবসায়ী তার গুন্ডা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, পিচ্চি বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। রেক তা দেখে আন্দাজ করে এখানে তাকে কঠিন মূল্য দিতে হবে। ছেলেটিকে উদ্ধারের যে অর্থচুক্তি হয়েছিল তা তার অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে আসে না, ততক্ষণে তার পক্ষের কিছু লোককে জীবন খোয়াতে হয়েছে, ছেলেটির প্রতি তার মায়া কাজ করে; সে এক উভয়সংকটে পড়ে। শেষমেস সে ছেলেটিকে সাথে নিয়েই বিশাল এক বাহিনীর সাথে স্পার্টানের মতো লড়ে। এ লড়াই অ্যাডভেঞ্জারস ইনফিনিটি ওয়্যার, ব্লাক প্যানথার বা অ্যাকুয়াম্যানের মতো কমিক সিনেমা থেকে এ ঢের বাস্তব, আবার এর কতেক সাজানোও। এখানে বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ী গুন্ডা আর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যাপক ব্যবহার করে। মনে রাখতে হবে, এই রাষ্ট্রীয় বাহিনী ঘুষখোর, মাদক ব্যবসায়ীর টাকায় চলে। তাই তার কথামতো নায়ককে ধরতে এমনকি শহরে লকডাউন দিতেও এই রাষ্ট্রীয় বাহিনী পরোয়া করে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নানান সমস্যা আছে কিন্তু এই সিনেমায় পরিচালক যে চিত্র তুলে ধরেছেন তার সাথে মিল কিঞ্চিতই। এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে এমন খোলামেলা নয়, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন আকছার ব্যবহার কোনো ব্যক্তি এখানে করতে পারে না।
রেক ছেলেটিকে নিজের লোকদের সহায়তায় সহিসালামতে ভারতে পাঠাতে সমর্থ হয়। তার আগে ছেলেটির সাথে তার নিটোল আবেগের, আদরের আর স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়; রেক তার হারানো সন্তানের ছবি ওই ছেলেটির মধ্যে খুঁজে পায়। যে কারণে ছেলেটির জন্য তার বাড়তি আবেগ কাজ করে। ছেলেটির সাথে তার শরীরি বিচ্ছেদ হয় ঠিকই, কিন্তু মনের বিচ্ছেদ থেকে যায়। যেন সমরেশ মজুমদারের সেই কথার মতো, শরীর কিছু নয় মনটাই সব। ততক্ষণে রেক জীবনসায়াহ্নে, তার শরীরে ভিলেনের গুলি লেগে আছে। শরীর ছেড়ে দিয়েছে, এ শরীরে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার নিয়ন্ত্রণহীন শরীর বুড়িগঙ্গায় মুষড়ে পড়ে। নায়কের মৃত্যু অব্দী যে আবেগ এই সিনেমায় পরিচালক হাজির করেছেন, তার রেশ দর্শকের মন থেকে খুব সহজে উবে যাবার নয়।
সংস্কৃতি পাঠের দৈন্যতা
এক্সট্রাকশনের বাংলাদেশ আদতে আমাদের দেখা বাংলাদেশ নয়, পরিচালক আমাদের এক মিথ্যা বাংলাদেশের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। এখানে যে বাংলাদেশ উপস্থাপিত হয়েছে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর চালচিত্রের যে পরিচয় আমরা পেয়েছি তা কোনোভাবেই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এ সিনেমায় বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ীকে একজন ভয়ঙ্কর মানুষের চরিত্রে দেখা যায়, যার দয়ামায়া নাই, যে হিংস্র, যার লোভ আর ক্ষমতার সীমা বিস্তৃত। যার বাড়ির সাজগোজ বাদশাহী টাইপের; সেই বাদশাহী মধ্যযুগের নয়, আধুনিক যুগের। বাড়ির ভিতরে পরতে পরতে জৌলুস, এর ভিতরের রমণীদের আনাগোনা, বিদেশী মদ আর দ্রব্যের ছড়াছড়ি। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীর সাদামাটা কস্টিউম, অঙ্গভঙ্গি, তার রাগ আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশের স্থানীয় দুষ্কৃতিকারীদের কারও সাথে যায় না। গুন্ডাদের যে চিত্র পরিচালক এঁকেছেন, তাও বাংলাদেশের সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না। গায়ে ম্যাগি টাইপ গ্যাঞ্জি, গলায় তিন’চার প্রকারের বস্তু, কব্জিতে রিস্ট ব্যান্ডের কম্বিনেশন আর হাতে বন্দুকসহ যে কস্টিটিউম সিনেমায় দেখানে হয়েছে তার সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতির মিল নেই। ঢাকার অলিগলিতে কম বয়সী কিশোরদের বন্দুক হাতে ঘুরে বেড়ানোর যে দৃশ্য এক্সট্রাকশনে উঠে এসেছে তার সাথে বাংলাদেশের কিশোরদের উপস্থাপন লেজে গোবরে। এই সিনেমার বাংলা ভাষার ব্যবহার ও উচ্চারণ এদেশের মানুষের সাথে যায় না। ঢাকার মহল্লায় যে হিন্দিগান প্রতিবার বাজে তার সাথে হিসেব কষলে বুঝা যায় পরিচালক বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশ ধরে নিয়েছেন। পুরান ঢাকায় বহুমাত্রিক সংস্কৃতির মানুষের বসবাসের কারণে এখানে যেমন ভারতীয় ডিজে বাজে, সাথে ইংলিশ ও বাংলা ফোক গানও সমানতালে বাজে। অথচ সংস্কৃতি পাঠের এমন দৈন্যতা বাংলাদেশের অবস্থা সম্পর্কে মানুষকে ভুল ধারণায় পর্যবসিত করবে। ডেসমন্ড মরিচ (১৯৮৮) জানাচ্ছেন ‘কান টেনে দেয়া’ ব্যাপারটার ভূমধ্যসাগরের আশেপাশে পাঁচটি দেশে পাঁচ ধরনের অর্থ আছে। যেমন পর্তুগালে এর অর্থ কারও কাজে খুশি হয়ে প্রশংসা করা, ইতালিতে এর অর্থ কারও কাজে অখুশি হয়ে বকা দেয়া, গ্রিসে কারও কাজে অল্প সন্তুষ্ট হয়ে তাকে কাজটি ভালোভাবে সম্পাদনের জন্য উৎসাহিত করা। এভাবে সংস্কৃতি ভেদে একই অঙ্গভঙ্গির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হাজির হয়। সেই ব্যাপারটা এক্সট্রাকশনের পরিচালক বুঝে উঠতে পারেননি, তাই এ সিনেমায় সংস্কৃতি পাঠের দৈন্যতা ফুটে উঠেছে।
সিনেমার যে দৃশ্যে রেক বাংলাদেশে আসে, সেই দৃশ্য খেয়াল করলে দেখা যাবে সাইনবোডে বাক্যের গঠন ভুল এবং যে সেট তৈরি করা হয়েছে তাতেও সমস্যা; একটা ঘিঞ্জি গলির সাইনবোডে কলেজের নাম, ডাক্তারের চেম্বারের নাম, বিউটি পার্লারের নাম যা কোনোভাবেই একসাথে ঘিঞ্জি গলিতে হতে পারেনা। এই সিনেমায় পহেলা বৈশাখের র্যালী রাতে করা হয়েছে। সংস্কৃতি বোঝাপড়ার ভুলের প্রভাব মানুষের জীবনে ব্যাপকভাবে পড়ে। এ প্রভাব আমাদের জীবনেও পড়বে, এরকম প্রভাব পড়ার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা যাক:
একবার আমেরিকার এক ব্যবসায়ী কাতারের এক ব্যবসায়ীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে কাতারে যান। কাতারে ব্যবসা সংক্রান্ত সব আলাপ শেষ হয়ে গেলে নিজ ব্যাগ থেকে দুই বোতল মদ বের করে দেন; তিনি ধরে নিয়েছিলেন মদ পেলে কাতারের ভদ্রলোক খুশী হবে। শেষে দেখা গেল কাতারের ব্যবসায়ী একসাথে ব্যবসা করাতো দূরে থাক বরং আর সম্পর্কই রাখেনি। গেরি ফেরাও (১৯৯২)
এখানে দেখা যাচ্ছে এক সমাজের মানুষের সাথে আরেক সমাজের মানুষের সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার ভুলের কারণে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে, এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে তাও স্বাভাবিক; সিনেমার বেলায়ও একই ঘটে। তাই সিনেমায় যেকোনো সংস্কৃতি উপস্থাপনের আগে সেই সংস্কৃতি পাঠ বহুল পরিমানে প্রয়োজন। কিছু বছর আগেও সিলেটের হোটেলগুলোতে গিয়ে কেউ পুরি খোঁজ করলে, স্থানীয়রা কিলঘুষি দিত, কিন্তু দীর্ঘ যোগাযোগের ফলে তারা বুঝে ফেলেছে; পুরি মানে শুধু মেয়েদের নির্দেশ করা হয় না, পুরির অন্য আরেক অর্থ আছে। মাদক ব্যবসায়ীর অবাধ পদচারণা আর রাষ্ট্রে তাদের প্রভাব সম্পর্কে যে ধারণা পরিচালক সৃষ্টি করেছেন; বাংলাদেশে বিদেশিরা যেকোনো কাজ সম্পাদন করতে উসখুস করবে। এমনও হতে পারে এসব উপস্থাপনের দরুণ বাংলাদেশে বিদেশি ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাবে, টুরিস্ট আগমনের হার অনেক কমে যেতে পারে। সে কারণে এক্সট্রাকশন সিনেমার সেট নিমার্ণের আগে বাংলাদেশকে গভীরভাবে অধ্যয়নের প্রয়োজন ছিল। এখানে পরিচালক সংস্কৃতি অধ্যয়নের সাথে জড়িত কাউকে নিয়োগ দিতে পারতেন। কালচারাল অ্যানথ্রপোলজিস্ট বা কালচারাল স্ট্যাডিজের কারও কাছে তালিম নিতে পারতেন। পরিচালক হয়তো তা চাননি, তিনি ভারত দিয়ে বাংলাদেশকে বুঝতে চেয়েছিলেন; যে কারনে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে বুঝে উঠতে সক্ষম হননি। এই একই কারণে সিনেমার পুরো উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে।
জনপ্রিয় সিনেমার রাজনীতি
এক্সট্রাকশন সিনেমায় উদ্ধার অভিযানের নায়ক রেকের সাথে ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ীর ছেলের আচমকা এক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ক অদ্ভুত, চাপিয়ে দেয়া বা উড়ে এসে জুড়ে বসা নয়। ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর রিয়েকশনে এই সম্পর্ক তৈরি হয়। এর আগে অনেকক্ষণ ধরে গোলাগুলি চলে, উভয়ে কাছ থেকে মৃত্যুময় পরিস্থিতি অবলোকন করে। তারা একে অপরের কাছাকাছি থাকলেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করার সময় পায় না। যখনই একটু অবসর পেল, তখনই তারা এক নতুন সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গেল। জীবনের কঠিন মুহুর্তের ফাঁকে এমন সম্পর্ক তৈরি হবে তাই বরং স্বাভাবিক। এই সম্পর্ক মানবিকতার আর আবেগের, মানুষে মানুষে মিলনের। মানুষ যে আর দশটা প্রাণী থেকে আলাদা এই তার বহিঃপ্রকাশ। মানুষের ভিতরে ভালো আর খারাপ সত্ত্বার যে সংমিশ্রণ থাকে এটা তার দৃশ্যভাষিক রূপ। দীর্ঘক্ষণ মার মার কাট কাট দৃশ্যের পর এমন একটি আবেগময় দৃশ্য মানুষকে নাড়িয়ে দেয়, মানুষের চেতনাজগতকে পুরো ঘুরিয়ে নেয়। চেতনাজগত ঘুরে যাওয়ার ফলে মানুষ এক দারুণ অনুভূতি উপভোগ করে। সিনেমা ও সিনেমার নায়ক সম্পর্কে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। এটা জনপ্রিয় সিনেমার রাজনীতি। মানুষের এই অনুভূতি ঘুরিয়ে দেয়ার খেলাই হচ্ছে আজকের জনপ্রিয় সিনেমার মূল কাজ, প্রোপাগান্ডা ছড়ায় যে সিনেমাগুলো তারও একই কাজ। ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করা যাক।
সল্ট
আঞ্জেলিনা জোলির সল্ট সিনেমার কথা এখানে বলা যেতে পারে। এই সিনেমার প্রধান চরিত্র সল্টের সঙ্গীকে রাশিয়ানরা মেরে ফেলে, সেই সঙ্গী ছিল সল্টের প্রিয় মানুষ। প্রেমের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যার সাথে তার বিয়ে হয়। পারতপক্ষে তারা সুখী দম্পতিও, অন্যান্য আমেরিকান দম্পতিদের মতো নয়। সঙ্গী হত্যার ক্ষোভ থেকে রাশিয়ানদের প্রতি সে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠে অথচ শুরুতে সে রাশিয়ান স্পাই ছিল। এখানে আমেরিকান দেশপ্রেমের দারুণ এক কাহিনী সাজানো হয়েছিলো কিন্তু ব্যাপারটা আদতে তেমন নয়, পুরোটাই মেকি। আমেরিকা-রাশিয়া বৈশ্বিক দুই শক্তি, এদের প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব চলে। নিজেদের উৎকৃষ্ট প্রমাণের যুদ্ধ চলে; এই যুদ্ধ ময়দানে বন্দুকে বন্দুকে নয়, বা পারমাণবিক বোমা মেরে নয়; এটা চলে সংস্কৃতি দিয়ে, সেটারই অংশ সল্ট সিনেমা। শুধু কি কাহিনী দিয়ে এই কাজ করা যায়? না, তা যায় না। সল্ট সিনেমায় কি মিউজিক, কি যৌন উত্তেজক কস্টিউম আর সিনেমাটোগ্রাফি সাথে জোলির দুর্দান্ত অভিনয়শৈলী এসবের মিশেলে প্রথমে দর্শককে বিনোদিত করে অর্থ কামানো হয়, এরপর রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার কাজে জবরদস্ত ব্যবহার চলে। কখনো কখনো আবার শুধুমাত্র প্রোপাগান্ডার তাগিদেই সিনেমায় অর্থ ঢালা হয়, সেসবে ব্যবসার বালাই কম থাকে। সল্টের প্রথম ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে আমরা এক্সট্রাকশনকে বেছে নিব, দ্বিতীয় ভূমিকার কারণেও আমরা একে বেছে নিতে পারবো। অন্যদিকে দর্শককে আবেগে নিমজ্জিত করার কাজটিও এই দুই সিনেমায় উপস্থিত আছে; সল্টের প্রেমিককে হারানোর বেদনা আর রেক ও ছেলেটির মানবিক এবং আবেগীয় সম্পর্ক মানুষের হৃদয় কেড়ে নিতে একই ভূমিকা পালন করে। সেই তালিকায় ভারতীয় সিনেমা ‘রোমিও আকবর ওয়াল্টারকে’ও ফেলা যাবে।
গার্ডিয়ান অব দ্যা গ্যালাক্সি সিনেমায় এমন একটা মানবিকতা হাজির করা হয়েছিল, সিনেমাটি ভালো অর্থ বাগিয়েছে; অ্যাকুয়াম্যান ও ব্লাক প্যান্থার একই ফর্মূলা নিয়েছিলো। কিন্তু জোকার সিনেমার সাথে এগুলোর মিল নেই। জোকার সিনেমা আগাগোড়াই সিস্টেম বিরোধী, আগাগোড়াই জীবনের দুর্দান্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। সামাজিক বৈচিত্র্যকে অপর হিসেবে গ্রহণ করার মানুষের যে মানসিকতা, সেই জায়গায় কুঠারাঘাত করে। শুধু কি এতেই শেষ? তাও নয়। সমাজের ক্যান্সার যে পুঁজিবাদ, তার বিরুদ্ধেও একহাত নেয়। একদল চিকিৎসা পায় না, আরেকদলের চিকিৎসা হাতের নাগালে। একদল অভাবে হাহুতাশ করে, আরেকদলের জৌলুসের অভাব নেই। এই সিস্টেমে অসমতা ব্যাপক, এই সিস্টেমে বিচিত্র মানুষের স্থান অনুপস্থিত; যদি এখানে মানুষেরই স্থান না থাকে তাহলে এমন সিস্টেম নিষ্প্রয়োজন- জোকার সিনেমার তা কেন্দ্রীয় বক্তব্য। কিন্তু জোকার সিনেমার মতো এক্সট্রাকশন হতে পারেনি, বরং হয়েছে উল্টো। আজকের দিনে ভারত ও আমেরিকা জনপ্রিয় সিনেমা দিয়ে দুনিয়াব্যাপী নিজেদের অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় শক্তিমত্তা বারংবার জাহির করছে। রোজ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির কাছে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। সেই কাজে এক্সট্রাকশন সিনেমা নিয়োজিত আছে বলে মনে হয়।
এক্সট্রাকশনে বাংলাদেশ গৎবাঁধা
গৎবাঁধা হচ্ছে এমন একটি প্রবণতা যেখানে কোনোকিছুর সম্পর্কে অল্প জেনে বাড়িয়ে বলা হয় এবং এই বাড়িয়ে বলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। মুসলিমরা ধর্মান্ধ, হিন্দুরা কৃপণ আর নিগ্রোরা অলস- আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেকগুলো গৎবাঁধা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। এক্সট্রাকশনে পরিচালক সেরকম কতগুলো গৎবাঁধা চিত্র উপস্থাপন করেছেন। তিনি ধরে নিয়েছেন বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশ যে কারণে এখানে সারাক্ষণ হিন্দি গান বাজে। এখানকার কিশোরেরা বিদ্যালয়ে যায় না, বন্দুক হাতে অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায়। তিনি ধরে নিয়েছেন দেশে মাদক ব্যবসায়ীর দাপট, এখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ঘুষলোভী মনোভাব, রাষ্ট্র মোটাদাগে বিকশিত নয় ফলে বাংলাদেশ একটি পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র। তার দেখানো বাংলাদেশের আকাশ উন্মুক্ত নয়, এখানে অবলীলায় বাইরের দেশের হেলিকপ্টার উড়তে পারে। অবলীলায় মাদক ব্যবসায়ী রাস্তায় লকডাউন বাস্তবায়ন করতে পারে। এরকম গৎবাঁধা নির্মাণের সাথে জড়িত থাকে বর্ণবিদ্বেষ, এর সাথে জড়িত উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্টের ধারণা, এখানে থাকে বৈষম্য। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে কখনো কখনো জায়েজ করা হয়। পুঁজিবাদী সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সমাজে গৎবাঁধা নির্মাণ হাজির করে বিভেদ জিইয়ে রাখা, সাথে নানান মতলব হাসিল করা।
এক্সট্রাকশন
এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘কাভারিং ইসলাম’ (১৯৯৭, দ্বিতীয় সংস্করণ) বইয়ে বলেছেন, ট্রু লাইজ, ডেল্টা ফোর্স, ইন্ডিয়ানা জোনসের মতো সিনেমায় মুসলমান ধ্রুপদ খল চরিত্র নির্মাণ করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করিয়ে তাদেরকে শয়তানরূপে হাজির করা হয় এবং শেষে আমেরিকান নায়ক দিয়ে তাদের পরাজিত করানো হয়। সাঈদ দেখিয়েছেন, এভাবে সিনেমায় মুসলমানদের ইচ্ছাকৃত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের পিছনে আমেরিকানদের মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ দখলের রাজনীতি লুকিয়ে আছে। বঙ্গোপসাগর দখলের প্রতিযোগিতা আমেরিকা-চীন-ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই দখলের সাংস্কৃতিক রাজনীতি এক্সট্রাকশন সিনেমায় থাকতে পারে- এমন আশঙ্কা অমূলক হবে না।
দুনিয়াব্যাপী প্রশংসা পাওয়া ও অস্কার জিতে নেয়া গডফাদার সিনেমাটির সিনেমাটোগ্রাফি, গল্প আর দুর্দান্ত সব ডায়লগের কারণে আলাদা বিশেষত্ব আছে। কিন্তু সিনেমাটি ইতালিয়ান-আমেরিকানদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন ইতালিয়ান-আমেরিকানরা ড্রাগ ব্যবসায়ী হয়, এই তাদের চিরাচরিত পেশা, এই কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়। ‘আই বিলিভ ইন আমেরিকা, আমেরিকা হ্যাজ মেড মাই ফরচুন’ ডায়লগের মাধ্যমে সেই ব্যাপারটি পরিচালক আরও পরিষ্কার করেন। রবার্ট জেমেকিসও এর বাইরে ছিলেন না; রোমান্সিং দ্যা স্টোন সিনেমায় একই তিনি ভূমিকা সেরেছেন। তিনি সেখানে কলম্বিয়াকে মাফিয়া আর মাদক ব্যবসায়ীর রাষ্ট্র হিসেবে দেখিয়েছেন ঠিক এক্সট্রাকশনের মতো। এই একই পরিস্থিতি হিন্দি সিনেমায় ভিন্ন আঙ্গিকে আছে; হালের অমিতাভ বচ্চনের শোলে সিনেমাও এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এগুলো জনপ্রিয় ঘরানার সিনেমার বাস্তবতা; এই বাস্তবতা ইন্ডাস্ট্রি আর সময়ভেদে ভিন্ন হয়।
লিখতে হবে, বলতে হবে, সৃষ্টি করতে হবে
এক্সট্রাকশন যা করেছে, তা ভুল; যা দেখিয়েছে, তা মিথ্যা আর গৎবাঁধায় ভরা। এমন কোনো উপস্থাপনা এক্সট্রাকশনে নাই যার কারনে এর পক্ষ নেয়া যাবে। আমরা এখানে যে বাংলাদেশ দেখতে পেয়েছি, তা আমাদের বাস্তবের বাংলাদেশ নয়; কল্পনার বাংলাদেশতো নয়-ই। আমাদের কল্পনার বাংলাদেশ আরও সুন্দর, আরও মনোরম।
সিনেমার কাজ শুধু বিনোদন দেয়া আর অর্থ কামানো নয়, বিনোদন দেয়া যেকোনো সিনেমার প্রথম শর্ত হবে। কিন্তু এর বাইরেও সিনেমা নানান কাজ করে, বহু ফায়দা তুলে নেয়। আজকের দুনিয়ায় বৃহৎ অংশের মানুষের সম্মতি আদায়ের সবচে বড় টুল হিসেবে সিনেমা ব্যবহার হচ্ছে; এক্সট্রাকশন সেই কাজ করেছে। বাংলাদেশ এখানে উপস্থিত নাই, উপস্থিত আছে মাদক ব্যবসায়ী আর ঘুষখোর রাষ্ট্রীয় বাহিনী। আছে অলিগলিতে বন্দুক হাতে ঘুরে বেড়ানো কিশোরেরা। সারাবিশ্ব নিশ্চয় বাংলাদেশের এমন রূপ আন্দাজ করবে, বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। এ আশঙ্কা আমার যেমন আছে, অন্য আর দশজন সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষেরও আছে। এর মানে কি নেটফিলিক্স থেকে সিনেমাটি সরিয়ে নিতে বলবো? সিনেমাটিকে কি নিষিদ্ধ করার দাবি জানাবো? তা করা যাবে না, তা করা একজন সংস্কৃতি সচেতন মানুষের উচিত আর কর্তব্য কোনোটাই হবে না। বরং আমাদের আশু কর্তব্য হবে সিনেমাটির উপস্থাপনাকে যৌক্তিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা, এর নতুন নতুন পর্যালোচনা হাজির করা। এর আসল উদ্দেশ্য উদঘাটন করা, এর ভিতর কোন ধরনের রাজনীতি যুক্ত আছে তার হদিশ করা। আর এর বিপরীতে পাল্টা সিনেমা সৃষ্টি করে বিশ্ববাসীর কাছে হাজির করা।
এই লেখাটি কেন লেখা প্রয়োজন? প্রয়োজন এ জন্য যে ভাবনা ঠিক বা শুদ্ধ যাই হোক, আলোচিত ও বিশ্লেষিত হওয়া দরকার। এই লেখাটির ভাবনা-বিনিময়ে নামার কাজেও ইতোমধ্যে দেরি হয়ে গেছে। আরো পাঁচ-সাত বছর আগেই এই কথাগুলো আলোচনায় আসা দরকার ছিল মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছিল কেউ না কেউ তো বলবেনই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংশ্লিষ্টগণ হয়ত কোথাও না কোথাও বলেই রেখেছেন। হয়ত আমারই নজর এড়িয়ে গেছে। সেই ধারণা হতেই এই ভাবনার বা কাছাকাছি ধরনের ভাবনার সন্ধানে নেমেছি। এখনো তেমন কিছু পাইনি। পাঠকগণ সন্ধান পেলে জানাবেন।
এই লেখাটিকে তত্ত্বকথা হতে মুক্ত রাখতে সচেষ্ট থাকব। সুগভীর অথবা অগভীর রাজনৈতিক দর্শনও রাখব না। পরের কিস্তির লেখাগুলোতে তত্ত্বের সহজ ব্যাখ্যা আনতে চেষ্টা করব। উদ্দেশ্য একটিই। সকলেই যেন কথাগুলো সহজে বুঝতে পারেন। তবে “মৌল-কাঠামো” বা “অর্থনীতি” এবং “উপরিকাঠামো” বা ‘অ-অর্থনীতি’কে (অর্থনীতির বাইরে সকল অবস্তুগত সামাজিক-মানবিক চাহিদা) ধরেই আলোচনাটির সহজ সরল বিস্তার-বিস্তৃতি প্রয়োজন হবে।
প্রথমেই নিচের চিত্রটি বুঝতে চেষ্টা করা যাক। মডেলটির সঙ্গে অনেকেরই পরিচিতি আছে নিশ্চিত। মোটা দাগে সারা দুনিয়াকেই বুঝা যাবে দুই ধরনের সমাজকাঠামোর মাধ্যমে। একটি রম্বস আকৃতির সমাজকাঠামো। অন্যটি পিরামিড আকৃতির সমাজকাঠামো।
সবগুলো ধনী দেশ, শিল্পোন্নত দেশ, উন্নত দেশ, এমন কি কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোরও আকৃতি ডান পাশের চিত্রটির মত। অর্থাৎ রম্বসের মত। কারণ, এসব দেশে “মধ্যবিত্ত” বেশি। বেশির ভাগ মানুষই কমবেশি মধ্যবিত্ত। সেখানে দরিদ্র কম। ধনীও কম।
অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ, দরিদ্র দেশ, অনুন্নত দেশ যা-ই বলি না কেন এই সব দেশে দরিদ্ররাই বড় অংশ। ধনীদের সংখ্যা কম। মধ্যবিত্তর সংখ্যাও কম।
এবার দেখা যাক, মহাসমুদ্র আকারের ভয়ংকর গলদ দুইটি কোথায় কোথায়, এবং কীভাবে হয়?
এক নম্বর মহাগলদ: রাষ্ট্র-পরিকল্পনার মহাগলদ
দুই আকৃতির সমাজ-কাঠামো বিচারে রাষ্ট্র-পরিকল্পনার ধরন তা হলে কী রকম হবে?
একেবারে প্রথম ও মৌলিক কর্তব্য– সংখ্যাধিক্যকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ–
রম্বস আকৃতির ধনী দেশগুলোর সব পরিকল্পনাই হবে “মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক”।
পিরামিড আকৃতির উন্নয়নশীল দেশগুলোর সকল রাষ্ট্রপরিকল্পনাই হতে হবে “দরিদ্রকেন্দ্রিক”।
দরিদ্র, অনুন্নত, উন্নয়নশীল যা-ই বলা হোক না কেন, দরিদ্রের সংখ্যাধিক্যের কারণে পিরামিড আকৃতির দেশে রাষ্ট্র-পরিকল্পনাকে অবশ্যই হতে হবে দরিদ্রকেন্দ্রিক ও দরিদ্রবান্ধব– এই মূলনীতির আলোকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র-পরিকল্পনাকে কি আদৌ দরিদ্রকেন্দ্রিক ও দরিদ্রবান্ধব বলা চলে?
মোটেই না। কাঁচা অর্থনীতি, হতে হঠাত কাঁচা-টাকা, আকাশচুম্বি অট্টালিকা, জিডিপি-জিএনপির উল্লম্ফন ইত্যাদির লোভে রাষ্ট্র-পরিকল্পনা ধনিক-শ্রেণিকেন্দ্রিক এবং দুর্বৃত্ত-শ্রেণিকেন্দ্রিক।
এখানে রাষ্ট্র-পরিকল্পনার ধরন পিরামিডের ১৮০ ডিগ্রী উল্টো। পিরামিডের উল্টো দিক বা সংখ্যালঘু ধনিক শ্রেণিই শুধুমাত্র অর্থনীতির হাল ধরতে জানে, টাকা-পয়সার পাহাড় গড়তে জানে– এ রকম বদ্ধমূল চিন্তাকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশল-পদ্ধতি ঠিকঠাক করা হয়।
মধ্যবিত্তপ্রধান হবার কারণে আমেরিকা, কানাডা, সুইডেন, জাপান, কোরিয়া যে রাষ্ট্রই বিবেচনায় নিন না কেন, তাদের রাষ্ট্র-পরিকল্পনা কিন্তু রম্বসের নিয়ম মেনেই মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক ও মধ্যবিত্তবান্ধব। ইউটিউবে এই সব দেশের নির্বাচনী প্রচারণাগুলো দেখুন। দেখবেন সকল প্রার্থীই বলছেন মধ্যবিত্তের পকেটের টাকা যেন খোয়া না যায়, অপচয় না হয়, চিকিৎসা-শিক্ষা-বাসস্থান সেবার মান যাতে অনুন্নত না হয়ে আরো উন্নত হয় তার জন্য এই করব সেই করব ইত্যাদি। “মধ্যবিত্ত” শব্দটি কতবার উচ্চারিত হয় গুনে রাখুন। পরের কিস্তির লেখায় আলোচনা করব কীভাবে সেটি সংখ্যালঘু ধনী ও দরিদ্রের জন্য ন্যায্য সুবিধা বয়ে আনে।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে মৌল কাঠামো, তথা “অর্থনীতি”, তার বিকৃতির শুরু রাষ্ট্রপরিকল্পনার এই গলদ হতেই। সংবিধানে “জনবান্ধব” “রাষ্ট্রপরিকল্পনাও”র উল্লেখ থাকলে দরিদ্র বেশি থাকলে “দরিদ্রকেন্দ্রিক” রাষ্ট্রপরিকল্পনা হবে। মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেলেই মধ্যবিত্তের দেশ হয় না। তবু মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়লে, দেশ রম্বস আকৃতির হয়ে গেলে “মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক” পরিকল্পনাও করা যাবে। সংবিধান কোনো ঐশিবাণী নয়, প্রয়োজনে “জনবান্ধব রাষ্ট্রপরিকল্পনাও” অন্তর্ভূক্ত করা যাবে।
গার্মেন্টস শিল্পের কথাই ধরুন। বিশ্ব-পরিসরের মানবিক রাষ্ট্রগুলোর পরিকল্পনা-পদ্ধতি আমলে নিলে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে অবশ্যই হতে হবে গার্মেন্টস-শ্রমিককেন্দ্রিক। কৃষিই যেহেতু অর্থনীতির সবচাইতে নির্ভরযোগ্য ও টেকসই খাত, রাষ্ট্র-পরিকল্পনাকে কৃষককেন্দ্রিকও হতেই হবে। পর্যায়ক্রমে দরিদ্রদের ও গরিবানার অন্যান্য স্তরগুলোকে বিবেচনায় নিতে হবে। অবশ্যই পরিপার্শ্ব-চিন্তা এবং প্রান্ত-চিন্তাও আসবেই। পর্যায়ক্রমে।
আর্টওয়ার্ক: মেড ইন বাংলাদেশ শিল্পী: ফারহানা সূত্র: ফেসবুক
গার্মেন্টস শিল্পের অবস্থা আজ আছে তো কাল নেই–একেবারেই অনির্ভরশীল একটি বেলুন খাত– তবু দেখুন রাষ্ট্রের রক্ত-মাংস-চর্বি-মগজ সবকিছু এখানে জড়ো করা হয়েছে। কিন্তু তা করা হয়েছে মালিক শ্রেণির রক্ষাকবচ হিসেবে, শ্রমিকের জীবন-জীবিকার ও বেঁচে থাকার নিরাপত্তা-বর্ম হিসেবে নয়। মূল কারণ, সংবিধানে উল্লেখ না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষকে এ ব্যাপারে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। দায়বদ্ধতা (একাউন্টেবিলিটি) এবং স্বচ্ছতা (ট্রান্সপারেন্সি) নিয়ে প্রশ্ন করার পথও তাই রুদ্ধ।
বাংলাদেশের মত অবস্থাতেই ছিল, কিন্তু দরিদ্রবান্ধব রাষ্ট্রপরিকল্পনা দিয়ে মৌল কাঠামো তথা “অর্থনীতি”কে টেকসই করে তুলতে পেরেছে চীন, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বহু রাষ্ট্র। এসব দেশে তাই জিডিপির অস্বাভাবিক উল্লম্ফনও নাই, অস্বাভাবিক পতনও নাই।
পিরামিড আকৃতিকে বিবেচনায় না নিলে, সমাজকাঠামোকে এখনো বাস্তবের চোখে পাঠ না করলে, রাষ্ট্র-পরিকল্পনা দরিদ্রকেন্দ্রিক ও দরিদ্রবান্ধব না করার মত মহাগলদটি রয়েই যাবে। তার সুরাহা করা না গেলে বাংলাদেশে রাষ্ট্র-কাঠামোয় বা রাষ্ট্র-চরিত্রে কোনোই পরিবর্তন আসবে না।
দুই নম্বর মহাগলদ: রাষ্ট্রনৈতিকতার গলদ–কলকব্জার ফাঁদের গলদ
রাষ্ট্রচিন্তায় দুটি প্রপঞ্চের ব্যবহারকে গুলিয়ে ফেললে কী যে মহাবিপদ হয়, তার উৎকৃষ্ট এবং প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলাদেশ। এই দুইটি প্রপঞ্চ হচ্ছে–
বাংলাদেশে কয়েক দশক যাবৎ বুঝে না বুঝে, কিংবা জেনে বা না জেনে বাংলাদেশের ডান-বাম চিন্তার মানুষেরা আইডিয়লজি বা তত্ত্বাদর্শ কচকচানিকে অবলম্বন করে ঝগড়াঝাটি এবং নিজেদের মধ্যে দল-উপদল ও বিভাজনের রাজনীতি করে চলেছেন, যেগুলোর বেশির ভাগই অনর্থক ও অহেতুক। পৃথিবীর সকল অগণতান্ত্রিক সরকারই এরকম কাইজাসর্বস্ব রাজনীতি চায়, এবং কাইজার আগুনে সম্ভাব্য সব উপায়ে ঘি কেরোসিন ঢালতে থাকে। যত বেশি বিভেদ, তত অনৈক্য, তত বেশি দমন-পীড়ন ও ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণের সুযোগ তৈরি হয় তাদের জন্য।
বাংলাদেশে অন্তত গত দুই দশকের জাতীয়তাবাদ বিতর্ক, ডান-বাম বিতর্ক ইত্যাদির ভল্যুম ভল্যুম বাহাসের স্তুপ নিয়ে বসলে বুঝা যায়, যে বিষয়টির আলাপ সবচাইতে বেশি প্রয়োজন ছিল, “প্রিন্সিপলস” বা নীতিমালা, তার প্রায় কিছুই হয়নি। আইডিয়লজি– যা তত্ত্ব-নির্মাণে ও জ্ঞান-নির্মাণে প্রয়োজনীয় হলেও রাষ্ট্রচিন্তায় সামান্যই দরকার ছিল, তার অহেতুক চর্চ্চার সীমা-পরিসীমা ছিল না। এখনো নেই।
খানিকটা আলগা করে বুঝার চেষ্টা করা যাক বিষয় দুইটিকে–
আধুনিক রাষ্ট্রে কিছু শ্রেয়নৈতিকতার কথা আমরা রোজই উচ্চারণ করি। তাদের বেশির ভাগই কতকগুলো কন্সেপ্ট বা ধারণা। কতকগুলো বোধ। বোধগুলোতে থাকে প্রত্যাশা। যেমন, মৌলিক অধিকার, মৌলিক মানবাধিকার, গণতন্ত্র, মত প্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার, সুবিচার, সুশাসন, মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ইত্যাদি। এগুলো সবই সমাজের উপরিকাঠামো।
সময়ের পরিক্রমায় সভ্য রাষ্ট্রগুলোতে যুক্ত হতেই হবে ‘বহুত্ববাদ’ (ডাইভার্সিটি), ‘অন্তস্থকরণ’/ ‘অন্তর্গতকরণ’ (ইনক্লুশন), ‘সুরক্ষা-বর্ম’ (সেইফটি-নেট) ইত্যাদি ধারণা।
রাষ্ট্র-পরিচালনমন্ডলের জন্য অত্যাবশ্যক ও অবশ্যমান্য প্রিন্সিপলস যেগুলো যুক্ত হয়েছে ১) আইনানুগ বৈধতা (লেজেটিম্যাসি), ২) স্বচ্ছতা (ট্রান্সপারেন্সি), ৩) দায়বদ্ধতা (একাউন্টেবিলিটি), এবং ৪) সুশাসন (গুড গভার্নেন্স)।
আধুনিক, মানবিক, সাম্য ও সমতামূলক রাষ্ট্র চলেই শুধুমাত্র “প্রিন্সিপলস” বা নিয়ম-নৈতিকতাপূর্ণ নীতিমালার ভিত্তিতে। আধুনিক শোষণহীন মানবিক গণরাষ্ট্র হতে হলে “প্রিন্সিপলস” বা নীতিমালা অত্যাবশ্যক, অর্থাৎ লাগবেই লাগবে। “আইডিয়লজি” মোটেই দরকারি নয়।
তাহলে কে ডান, কে বাম, কে মৌলবাদী, কে নারীবাদী, কে অ-নারীবাদী, কে কোন ধর্মের, মতের বা পথের বা বিশ্বাসের এই সব বিভাজনমূলক খুঁটিনাটি বেদরকারি বিষয় নিয়ে আমরা এত দলে-উপদলে বিভাজিত হতে থাকি কেন? এই সকল ভাবনার ও ভাবের বৈচিত্র্যে ভরপুর মানুষের উপস্থিতি সকল রম্বস সমাজ-কাঠামোয়ও আছে। কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তার বেলায় তাদের মধ্যে কোনো বিভাজন নাই কেন? সবাই এক কেন?
কারণ, যে কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের চোখকে হতে হবে মায়ের চোখের মত– সকলে সমান। ঘরের খাবারে যেমন সকলের সমান ভাগ ও অধিকার। ঘরে মায়ের সন্তানদের মধ্যে চিন্তার ও ভাবনার ভিন্নতা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু মা কোনো একজনের বিভাজনমুখি, সংঘাতমুখি ভাবনার প্রতি পক্ষপাত দেখাবেন না, বা বিভাজন উস্কে দিবেন না। পক্ষ নিয়ে উস্কানি দিলে তিনি মা নন, ডাইনি। আধুনিক মানবিক রাষ্ট্র সংক্ষেপে এই রকমই। এটি কল্পস্বর্গ নয়। পৃথিবীর সভ্য ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সবগুলো এই রকমই। এইজন্যই আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রের উদাহরণ বারবার টানি।
আইডিয়লজি বিষয়টি কেমন? রাষ্ট্রচিন্তায় অপ্রয়োজনীয়, আসলে খারাপই জানব কেন?
তাহলে আইডিয়লজি কী কী রকম হতে পারে দেখি। সমাজতন্ত্র, ইসলামি শাসনতন্ত্র, হিন্দুত্ববাদ, নাজিবাদ, জায়নবাদ, আরববাদ, নারীবাদ ইত্যাদি।
জ্ঞান-নির্মাণের বেলায় এগুলোর প্রয়োজন আছে–দ্বিমত নেই। কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তায় ও শাসন-ব্যবস্থায় এগুলোর প্রয়োগ কি আমরা এখনো দেখিনি? কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন এগুলোর একটিও মানুষে-মানুষে বিভেদ-বৈষম্য এবং একদল দ্বারা আরেকদলকে নিষ্ঠুর অবদমন ছাড়া অন্য কোনো কাজে লেগেছে? কে বলতে পারবেন যেসব রাষ্ট্রগুলো প্রকৃত মানবিক রাষ্ট্র– যেমন নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, কানাডা– তাদের কোনো রাজনৈতিক আইডিয়লজি না থাকায় আদৌ কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? না কি আইডিওলজি নিয়ে কামড়াকামড়ি না করে প্রিন্সিপলস-নির্ভর থাকার কারণেই বরং রাষ্ট্রগুলো চুড়ান্ত মানবিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পেরেছে?
আরেকটি কাজ করুন। পৃথিবীর সবগুলো দেশকেই ভাগ করুন। স্পষ্ট দেখবেন প্রিন্সিপলস-নির্ভর সবগুলো রাষ্ট্রই মানবিক রাষ্ট্র। যেগুলোতেই আদর্শের কচকচানি সেগুলোতেই দাঙ্গা, বর্ণবাদ, সংখ্যালঘু নিবর্তন, সাংস্কৃতিক অবদমন, যুদ্ধ লেগেই আছে। অনাদি-অনন্তকালের অশান্তি সেগুলোতে।
আবারো বলি আইডিয়লজি কী? আইডিয়লজি চিন্তার কাঠামো বা ধরন যেগুলোর মাধ্যমে অর্থনীতি বা রাজনীতি-সম্পর্কিত তত্ত্ব বা নতুন নতুন ভাবনা দাঁড় করানো যেতে পারে। রাষ্ট্রচিন্তায় শুদ্ধি আনা যেতে পারে। প্রিন্সিপলসগুলোকে আরো ঘষে-মেজে নেয়া যেতে পারে ইত্যাদি।
কিন্তু আইডিয়লজি দিয়ে একবিংশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্র মোটেই চলবে না। এজন্যই কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর কথাই উদাহরণ হিসেবে আবারো আনব। উদাহরণটি টানব এটা বলতে যে যতগুলো প্রিন্সিপলস-এর কথা উল্লেখিত হয়েছে এই লেখায়, এই সব রাষ্ট্রেই সবগুলো মানার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে।
তাহলে এই ধরনের রাষ্ট্রগুলোর আইডিয়লজি কী বা কোথায় দেখেন? অনেকেই বলেন– “হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ! কিন্তু না! মানবতাবাদের প্রয়োগও একটি প্রিন্সিপল, কোনো আইডিয়লজি নয়।
আইডিয়লজির মধ্যে চূড়ান্ত খারাপতমটির নাম ‘ন্যাশনালিজম’ বা জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ মানেই অন্যকে আমার শ্রেষ্ঠত্বের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। সে জন্য শত্রু লাগবে। যুদ্ধ লাগবে। বিভাজন লাগবে। প্রতিপক্ষ লাগবেই। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য।
হিটলার মুসোলিনির জাতীয়তাবাদের মডেল কি দেখেন নি? স্ট্যালিনেরটি? সেসব কি টিকেছে? সাদাতের প্যান-অ্যারাবিজম টিকেছে? কামাল পাশার তার্ক-জাতীয়তাবাদ টিকেছে? এরদোয়ানের প্যান-ইসলামিজম টিকবে? বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও নাই। বাংলাদেশে ইসলামি শাসনতন্ত্র কিংবা ইসলামি জাতীয়তাবাদ কোনোদিনও আসবে? বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও নাই। এরা কল্পস্বর্গ বা বোকার স্বর্গ যেখানেই বাস করুক বা না করুক, এদের অনর্থক জুজু ভেবে ভয়ে থরহরি কম্পমান বা হিস্টিরিক হবার সুযোগ কি আসলেই আছে? মোটেও নাই। ভয়গুলো অমূলক। বানোয়াট ভয়গুলো মানুষের মাঝে সঞ্চারিত করে দেওয়া হয় সজ্ঞানে। যাতে তারা কোনো যথার্থ কোনো কারণ ছাড়াই শুধুমাত্র স্টিগমার বশবর্তী হয়ে চিরশত্রু হয়ে থাকতে পারে, এবং এক না হতে পারে।
আমরা যে বাঙালি না বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়ে যুগের পর যুগ যুদ্ধ-ঝগড়া করলাম, টনে টনে কাগজ নষ্ট করলাম, অশেষ খিস্তি-খেউড় মারামারি করলাম– ঠিক কেন করলাম, আসলে কোথায় কি কাজে লাগবে সেসব? আমাদের স্পষ্ট নৃতাত্ত্বিক পরিচয় থাকার পরও জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের দরকারটি কেন বা কোথায়? কে কে ঠিকমত জানেন বা বুঝাতে পারবেন দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের–বুঝান দেখি! যদি বলেন– হে দরিদ্র, তুমি খেতে পাবে, সুবিচার পাবে, শান্তিতে ঘুমাতে পাবে পস্ট বুঝবে– না কি দেরিদা ফুকো বুর্দো ডিকন্সট্রাকশন হ্যাবিটাস বুঝান তো ভাল বুঝবে? যার দরকার, সে নিজেই তার প্রয়োজনে তত্ত্বীয় আদর্শ বুঝে নিবে, শিখে নিবে।
ল্যুই আলথুসারের আইডিয়লজি ব্যাখ্যা এক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন রাষ্ট্র নিপীড়ক হয়ে ওঠার দুইটি কলকব্জা আছে। এক আদর্শিক কলকব্জা (আইডিয়লজিক্যাল স্টেইট অ্যাপারেটাস), এবং দুই, দমন-পীড়নমূলক কলকব্জা (রিপ্রেসিভ স্টেইট অ্যাপারেটাস)। প্রথমটির একটি নমুনার কথা মাত্রই বলা হল–বাঙ্গালি না বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ তর্ক নিয়ে বিভক্তি। আরো আছে শাহবাগ-অশাহবাগ এবং তারও ভিতরের খুঁটিনাটি নাড়ি-নক্ষত্র নিয়ে দল-উপদল, ক্ষুদ্র দল, নুড়ি দল, ভাব-ভাবনা-কর্মপদ্ধতির ভিন্নতায় তর্কবাগীশ বিভাজন। মহান মুক্তিযুদ্ধের আবেগও ঐক্যের শক্তি না হয়ে বুশ ডক্ট্রিনের মতো– ‘আমার মতই চুড়ান্ত, এর বাইরে ভিন্নমত হলেই তুমি আদর্শচ্যুত’ আইডিয়লজিতে রূপ নেওয়া, এবং এই বিষয়ক চলমান ঘটমান সংঘাত আরেকটি উদাহরণ। দমন-পীড়নমূলক কলকব্জার কথা বলাই বাহুল্য। পক্ষপাতহীন ও নির্মোহ মানুষদের কারোরই নজর এড়ানোর কথা নয় যে রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তিই যেন জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করে গণঅবদমনে নিয়োজিত। কারণ একটিই– আইডিউলজি আর আইডিয়লজি কলকব্জার সক্রিয় ফাঁদ, এবং প্রিন্সিপলস এবং প্রিন্সিপলস-এর নিদারুণ অনুপস্থিতি।
আমাদের রাষ্ট্রটি এখনো পিরামিড শেইপেই আছে। দরিদ্রের সংখ্যাই এখনো সুবিশাল। এই রাষ্ট্রে দরিদ্রের জন্য দরিদ্রবান্ধব ও ঐক্যমুখি স্টেইট “প্রিন্সিপলস” দরকার, অনৈক্য-প্রসারক “আইডিয়লজি” অদরকারি। প্রিন্সিপলস নিয়ে এখনো কথা বলাই শুরু হয়নি। সেই শুরুতে পা রাখায় আর দেরি না করাই বিশেষ প্রয়োজন।
কয়েক দশক ধরে নোয়াম চমস্কি বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো, নয়া উদারবাদী অর্থনীতি এবং কর্তৃত্বপরায়ণতার বিরুদ্ধে প্রবল স্বর হিসেবে হাজির হয়েছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক মহলেও একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আসছেন। তার বিভিন্ন গ্রন্থ এবং বক্তৃতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, (more…)
সম্প্রতি অধ্যাপক ইউভাল নোহা হারারির প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। ঘোষণাটি এমন সময়ে এলো যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রফেসর ইউবাল নোহা হারারি জার্মানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলের কাছে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি দ্যা উয়ার পত্রিকায় গত ২৪ সে এপ্রিল প্রকাশিত হয়।
ইউভাল নোয়াহ হারিরি
আমরা বৈশ্বিক মহামারির মাঝামাঝি পর্যায়ে আছি। পৃথিবীর কোন পরিবর্তন নিয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন?
আমি মনে করি না ভাইরাস সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। মানবাজাতির কাছে এই ভাইরাস মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং প্রযুক্তি রয়েছে। আমাদের মধ্যে থাকা কুচিন্তা যেমন লোভ , ঘৃণা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মত বিষয়গুলো আসলেই একটা বড় সমস্যা। আমি ভয় পাচ্ছি এই মানুষদের নিয়ে যারা এই সংকটকে বৈশ্বিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা দিয়ে মোকাবেলার পরিবর্তে এই সংকটের জন্য অন্য রাষ্ট্র, আদিবাসী কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুর উপর ঘৃণা ছড়াতে চাচ্ছে, তাদের উপর দায় চাপাতে চাচ্ছে।
কিন্তু আমি আশাবাদী যে, আমরা এই ঘৃণা চর্চার পরিবর্তে এই সংকট মোকাবেলায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়াব। যা মানুষকে সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সাহস জুগাবে। যদি এইটা করা সম্ভব হয়, আমি নিশ্চিত আমরা এই সংকটকে খুব সহজেই মোকাবেলা করতে সক্ষম হব।
আপনি বলছিলেন যে আমরা এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি যে, আমদেরকে রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং নাগরিকের ক্ষমতায়ন মধ্য থেকে যেকোন একটাকে বেছে নিতে হবে।যদি আমরা সতর্ক না হই, তাহলে এই মহামারি নজরদারির ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ ছাপ ফেলবে । কিন্তু যেটা আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই এমন একটি বিষয়ে আমরা কিভাবে সতর্ক থাকতে পারি?
হারারি: এমন না যে এই বিষয়টা আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই , অন্ততপক্ষে গণতন্ত্রের কথা যদি আমরা বলি। আপনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তি এবং দলকে ভোট দিয়েছেন, যে বা যারা রাষ্ট্রের পলিসি তৈরি করে। ফলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর আপনার সামান্য হলেও নিয়ন্ত্রণ আছে। এমনকি এখন যদি কোন নির্বাচন নাও হয়, জনগণের চাপে হলেও রাজনীতিবিদরা কাজ করতে কিছুটা বাধ্য থাকে।
যদি জনগণ মহামারিতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে একজন শক্তিশালী নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের তাগিদ অনুভব করেন। এটা আসলে একজন স্বৈরাচারীকে তার ক্ষমতার ভাগ নেয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। অপরপক্ষে জনগণ যদি রাজনীতিবিদদেরকে তার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে পারে, তবে সেটা রাষ্ট্রে যেকোন বিধ্বংসী প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা দিতে সক্ষম।
আমি কিভাবে বুঝব যে আমাকে কার উপর আস্থা রাখতে হবে অথবা যদি বলি সেই আস্থার জায়গাটা কি হবে ?
হারিরি: প্রথমত আপনার কাছে পূর্ব অভিজ্ঞতাগুলো আছে। আপনি যদি জানেন যে এই রাজনীতিবিদরা বিগত সময়গুলোতে মিথ্যাচার করে গেছে, তাহলে এই জরুরি অবস্থার সময়ে তাদের উপর আস্থা রাখার কোন কারণ নেই। দ্বিতীয়ত, যারা আপনার কাছে বিভিন্ন তত্ত্ব নিয়ে আসে, তাদেরকে সেসব তত্ত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে পারেন। যদি এমন হয় যে কেউ আপনার কাছে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি এবং বিস্তার সংক্রান্ত বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করল, সেক্ষেত্রে আপনি সেই ব্যক্তিকে ভাইরাস কি এবং সেটা কিভাবে ছড়ায় সেটা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। যদি সেই ব্যক্তির কাছে এই প্রশ্নগুলোর কোন গ্রহণযোগ্য উত্তর না থাকে। সেক্ষেত্রে সেই ব্যাক্তির কোন কিছু আপনার বিশ্বাস না করাটাই যৌক্তিক হবে। এর জন্য আপনার জীববিজ্ঞানে পিএইচডি থাকতে হবে এমন না। আপনার শুধু বিজ্ঞানের প্রাথমিক কিছু বিষয়ের উপর বোঝাপড়া থাকলেই চলবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা অনেক জনতোষণবাদী রাজনীতিবিদকে দেখেছি বিজ্ঞানকে আক্রমণ করে কথা বলতে। তাদেরকে বলতে শুনেছি যে বিজ্ঞানীরা হল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন একদল অভিজাত শ্রেণির লোক। তারা এও বলছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের মত ঘটনাগুলো একধরনের ভাঁওতাবাজি। কিন্তু এই সংকটকালীন মুহূর্তে আমরা সারা পৃথিবীতে দেখতে পাচ্ছি যে, মানুষ বিজ্ঞানকে অন্য যেকোন বিষয়ের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করছে।
আমি আশা করব এই বিশ্বাসটা যেন শুধুমাত্র সংকটের সময়েই সীমাবদ্ধ না থাকে, সংকটের পরেও যাতে এই বিশ্বাসটা থাকে। আমরা যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের ছাত্রদের ভাইরাস কি, বিবর্তন তত্ত্ব এই বিষয়গুলো সম্বন্ধে একটা ভালো বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা দিই। মহামারির পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা যেসব বিষয় যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিবেশের বিলোপ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেসব বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এই বিষয়গুলোকেও যাতে আমরা মহামারির মত গুরত্ব দিই।
অনেক দেশ ভাইরাসের বিস্তার রোধে ডিজিটাল নজরদারির কৌশল নিয়েছে। এই কৌশল কিভাবে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করবে?
হারারি: যখন আপনি নাগরিকদের উপর নজরদারির বাড়িয়ে দিবেন সেটা যেন একই সাথে সরকারের উপরও নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। এইরকম সংকটকালীন সময়ে সরকার জলের মত টাকা খরচ করছে। আমেরিকাতে এটা প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার (২ লক্ষ কোটি ডলার ), জার্মানিতে ১০০ বিলিয়ন ইউরোর মত। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে আমি জানতে চাই কারা এই সিদ্ধান্তগুলো নিলো এবং টাকাগুলো কোন কোন খাতে ব্যায়
হচ্ছে । এই টাকা কি সেসব বড় বড় কর্পোরেশনকে আর্থিক প্রণোদনা হিসাবে দেয়া হবে যারা তাদের অদক্ষতার জন্য মহামারি শুরু হওয়ার আগে থেকেই ক্ষতির মুখে ছিল? নাকি এই টাকা ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ি, রেস্টুরেন্ট, দোকানের সহায়তার জন্য খরচ করা হবে?
সরকার যদি জনগণের উপর নজরদারির বিষয়ে বেশি তৎপর হয়, তবে নজরদারির ব্যাবস্থা সরকার এবং জনগণ উভয় দিক থেকে হওয়া উচিত। সরকার যদি তার আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো জটিল বলে এড়িয়ে যেতে চায়। তখন আপনার বলা উচিত, “ বিষয়গুলো মোটেই জটিল কিছু না। আমি এমন একটা নজরদারির ব্যাবস্থা তৈরি করতে পারি যেটা দিয়ে আপনার কার্যক্রমের উপর নজরদারি করা সম্ভব হবে । এটা আমাকে দেখাবে যে আপনি আমার করের টাকা কি করছেন”।
এটা কি একক ব্যাক্তি বা দলের উপর ক্ষমতার ভার না দিয়ে, ক্ষমতাকে মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিলে কাজ করবে?
হারারি: একদমই তাই। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যাক্তির আশেপাশের মানুষদেরকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য একটা পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে । এই কাজটা দুইভাবে করা যায়। একটা হতে পারে একটা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ থাকবে যার কাছে আপনার সকল তথ্য জমা থাকবে। সে পর্যবেক্ষণ করবে আপনি কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যাক্তির কাছাকাছি আছেন কিনা, কাছাকাছি থাকলেই আপনাকে সতর্ক করে দিবে । আরেকটা হতে পারে সরাসরি ফোনের মাধ্যমে একে অপরের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা। এটার জন্য কোন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন পড়বে না যার কাছে আপনার সকল তথ্য জমা থাকবে। যদি আমি কোন কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাই, তখন আক্রান্ত ব্যক্তির এবং আমার ফোন বেজে উঠবে যাতে করে আমি সতর্ক হয়ে যেতে পারি। যার ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য সম্বলিত কোন কর্তৃপক্ষ না থাকাতে সে সবাইকে অনুসরণও করতে পারবে না।
চলমান সংকটে সম্ভাব্য নজরদারি ব্যবস্থা এক ধাপ এগিয়ে আছে । যেটাকে আপনি বলছিলেন ত্বকের নিচে নজরদারি। তাহলে আমাদের শরীরের ত্বক নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমরা এই বিষয়টাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করব?
হারিরি: আমাদেরকে এই বিষয়ে অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে। ত্বকের উপর নজরদারির মাধ্যমে আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে সাক্ষাৎ করছেন, আপনি টেলিভিশনে সেটে কি দেখছেন কিংবা আপনি অনলাইনে কোন সাইট ভিজিট করছেন এসব কিছু জানতে পারা যাবে। আর ত্বকের নিচে নজরদারির মাধ্যমে আপনার শরীরের অভ্যন্তরে কি ঘটছে তা জানতে পারা যাবে। এর শুরুটা হবে আপনার শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু পরের ধাপে এটা হয়ত আপনার রক্তচাপ, হৃৎপিণ্ডের চাপ, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এবং এটা যদি আপনি একবার শুরু করতে পারেন, তাহলে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে মানুষকে অনেক বেশি জানতে পারবেন।
এর মধ্য দিয়ে আপনি একটা টোটালিটেরিয়ান শাসন কায়েম করতে পারবেন যেটার অস্তিত্ব আগে ছিল না। আপনি যদি জানতে পেরে যান আমি কি পড়ি অথবা টেলিভিশনে আমি কি দেখি, তাহলে সেটা আপনাকে আমার রুচি, রাজনৈতিক আদর্শ, ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে একটা ধারণা দিবে। কিন্তু এইগুলো এখনও সীমিত পর্যায়ে আছে। এখন একটা বিষয় ভাবা যাক, আমি যখন কোন বই পড়ি কিংবা টেলিভিশনে কোন অনুষ্ঠান দেখি আপনি সেই সময়ের আমার শরীরের তাপমাত্রা অথবা রক্তচাপ, হার্টের রেট পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে আপনি জানতে পেরে যাবেন প্রতিটা মুহূর্তে আমি কি অনুভব করি। এইসব কাজ খুব সহজেই একটা রাষ্ট্রকে ডিস্টোপিয়ান টোটালিটেরিয়ান শাসনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এটা এমন না যে প্রতিরোধ করা সম্ভব না। আমরা এইটা হওয়ার আগেই আটকাতে পারি। কিন্তু এটা প্রতিরোধ করার আগে শুরুতে আমাদের দু’টা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত আমাদেরকে বিপদটা ভালো করে বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে যে, এই জরুরি পরিস্থিতিতে আমরা কোন পদক্ষেপগুলো ঘটতে দিচ্ছি।
এই সংকট কি একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের সম্বন্ধে আপনার ধারনাকে পুনর্বিন্যস্ত করেছে ?
হারিরি: আমি আসলে জানি না। কারণ সবকিছু নির্ভর করছে মানুষ এই মুহূর্তে কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তার উপর। চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শ্রমজীবী মানুষের বিপদ নাটকীয়ভাবে বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে । আমরা এখন দেখছি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যাবহার বেড়ে গেছে। মানুষজন গৃহবন্দি থাকার কারণে কাজের জায়গায় প্রচুর পরিমাণে রোবট ব্যাবহার হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হল মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু রোবটের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই। আমরা হয়ত সামনে দেখব কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ বাসায় বসেই করা যাবে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যাবহার এবং বিশ্বায়ন বন্ধের ফলে এই বিষয়গুলো ঘটতে পারে। বিশেষত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো যারা সস্তা শ্রমের উপর ভর করে চলে, সেখানকার অনেক শ্রমিক তাদের চাকরি হারাবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যাবহার এবং কারখানা অন্যত্র সরিয়ে ফেলার কারণে।
এমনকি ধনী রাষ্ট্রগুলোর চাকরির বাজারেও এই পরিবর্তনগুলো ঘটতে পারে। এই সংকটগুলো চাকরির বাজারে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনবে। মানুষজন বাড়িতে বসে কাজ করবে, অনলাইনে কাজ করবে। যদি আমরা সতর্ক না হই ইন্ডাস্ট্রির কিছু কিছু সেক্টরের দক্ষ লোকজনও চাকরি হারাতে পারে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো যে ঘটবেই বিষয়টা এমন না । এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত । আমরা কিন্তু চাইলেই আমাদের দেশ কিংবা সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব । শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করবে এমন শর্তে সরকার ইন্ডাস্ট্রি এবং কর্পোরেশনগুলোকে বড় অংকের আর্থিক ছাড় দিতে পারে। ফলে সবকিছু নির্ভর করছে আমরা কি সিদ্ধান্ত নিবো তার উপর।
একজন ভবিতব্য ইতিহাসবিদ বর্তমান পরিস্থিতিটা কি বলবে?
হারিরি: আমি মনে করি একজন ভবিতব্য ইতিহাসবিদ এই পরিস্থিতিটাকে একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে একটা মোড় ঘুরানো বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন। এখন ইতিহাসের বাক বদলটা কোন দিকে ঘটবে সেটা আসলে নির্ভর করছে আমরা কি সিদ্ধান্ত নিবো তার উপর। এটা কোন অনিবার্য পরিস্থিতি না।
অনুবাদকেরভূমিকা : আদিত্য নিগাম ইন্ডিয়ান চিন্তক এবং Centre for the Study of Developing Societies (CSDS)-এর ফেলো। করোনাভাইরাস মহামারীর প্রেক্ষিতে পুঁজিবাদ পরবর্তী সম্ভাব্য রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিন্যাস নিয়ে ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখছেন। গত ০৯ই এপ্রিলে দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিত হয়েছে Kafila.Com ওয়েব পোর্টালে, শিরোনাম Life after capitalism and the new ‘al Shatir-Copernicus’ revolution-A Manifesto of Hope (পুঁজিবাদের পরের জীবন ও নয়া শাতিরীয়-কোপার্নিসীয় বিপ্লব: আশার ইশতেহার) । ভারত’সহ বাংলাদেশ ও অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বাস্তবতায় আদিত্য নিগামের প্রবন্ধটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সিরিজের প্রথম কিস্তির ( করোনা জৈব-রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার ) অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
আদিত্য নিগম
এই সিরিজ প্রবন্ধে আদিত্য নিগাম বিশ্বপরিসরে করোনা মহামারীকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক উঠেছে, সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করার মাধ্যমে পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজের সম্ভাব্য রূপরেখার ইঙ্গিত করার চেষ্টা করছেন। করোনা মহামারীর ফলে একটা ভিন্ন সমাজের বিমূর্ত স্বপ্ন আরও প্রবলভাবে মূর্ত হয়ে উঠছে বলে মনে করেন তিনি। এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ইতিহাসচেতনা- চিন্তাচর্চা ও সক্রিয়তাই কেবল পারে পৃথিবীতে মানুষের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে।
আদিত্য নিগাম মূলত সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্বের বিউপনিবেশায়নে বিশেষভাবে আগ্রহী। এই প্রবন্ধেও আমরা দেখব, তিনি পুঁজির ধারণার পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। পুঁজি বিশ্লেষণের সনাতনি ঐতিহাসিক ভ্রান্তিই যে বিগত শতকগুলোর সমস্ত সামাজিক বিপ্লবকে মহাদানবীয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রীয় গাড্ডায় নিক্ষেপ করেছে আদিত্য নিগাম তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষত, এই কিস্তিতে তিনি ‘অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি’, ‘সংহতি অর্থনীতি’ ইত্যাদি ধারণাগুলোর তাত্ত্বিক ভিত্তি ও বিশ্বের নানা জায়গায় এ ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতির বিরাজমান থাকা এবং রাষ্ট্র ও পুঁজির বাইরে বিদ্যমান সমাজের গর্ভেই অপেক্ষাকৃত নতুন এই ধারাগুলোর আরো বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনার দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। চতুর্দশ শতকের সিরীয় আরব জ্যোতির্বিদ আল শাতির ও ষোড়শ শতকের পোলিশ জ্যোতির্বিদ কোপার্নিকাসের১ সূর্যকেন্দ্রীক সৌরজগত তত্ত্বের আলোকে সমাজবিজ্ঞান ও দার্শনিক বিবেচনায় প্রকৃতির সাথে মানুষের অন্টোলজিকাল বা অস্বিত্বসম্বন্ধীয় সম্পর্কের প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। একেই নিগাম বলছেন ‘নয়া শাতিরীয়-কোপার্নিসীয়’ বিপ্লব।
এই ধরনের ইতিহাস ও চিন্তাচর্চা পৃথিবীর উপর মানুষের সার্বভৌমত্ব /উপনিবেশ নাকচ করে দিয়ে মানুষকে ‘বায়োলজিকাল এজেন্ট’ হিসেবে প্রস্তাব করে। মানুষও আর দশটা প্রজাতির মত এক প্রজাতি, অধীশ্বর নয়। মানুষের ইতিহাস মানে মানুষের ‘নায়ক’ হবার ইতিহাস না, অন্তত ‘recorded history’ যেভাবে দেখাতে চায়; বরং ‘deep history’ অনুযায়ী মানুষের ইতিহাস আসলে ‘জীবনের ইতিহাস’-এর অংশ, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি পরস্পরের সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা— দুই সম্পর্কেই আবদ্ধ। (দীপেশ চক্রবর্তী , ‘আরেক টোয়েন্টি টোয়েন্টি: পৃথিবীর উষ্ণতা-বৃদ্ধি ও মানুষের ইতিহাস’; ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ ; আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ,২০১৬, কলকাতা)
এ রকম একটা সামাজিক রূপান্তর সম্ভব বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রূপান্তরের মাধ্যমেই।
এই নিবন্ধটির গত কিস্তিতে, আমি কোভিড-১৯ থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদ-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বব্যাপী লকডাউন এবং ‘ভোগের কোয়ারেন্টিন’-এর তাৎপর্য নিয়ে আলাপ করেছিলাম। এই কিস্তিতে, আমি দুটো বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই :
(ক) সেই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করব যা এই ধরনের ভবিষ্যতকে কেবল কল্পনাযোগ্যই নয়, বরং সম্ভব করে তোলে। এবং
(খ) এমন দিকের নির্দেশ করব যা এই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যেই গ্রহণ করছে— এমন সব উপায়ের দিকে আমরা অগ্রসর হচ্ছি যা আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত করে।
তত্ত্ব / ধারণা / ডিসকোর্স
যেহেতু পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতের সমস্ত আলোচনাই আমরা আমাদের বাইরের জগতটাকে ঠিক যতটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় দেখি ততটাই নিদারুণ আকাশকুসুম কল্পনা কিংবা সামঞ্জস্যহীন বলে মনে হয়, তাই প্রথমেই আমাদের চিন্তার জগত কিছুটা ঘষামাজা করে নেয়া দরকার। এবং খুব স্পষ্টভাবে বলা যাক যে এই ‘চিন্তার জগতে ঘষামাজা’র অর্থ কোনভাবেই অনুশীলনের জগতে ঘষামাজা নয়, বরং জ্ঞানকাণ্ডওতত্ত্বের ঘষামাজা। এছাড়াও কোন গোঁড়া হিস্টেরিয়াগ্রস্ত বস্তবাদী—যার কাছে তত্ত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া কেবলই ‘ভাববাদ’ এবং ‘আসল’ ব্যাপার হচ্ছে বস্তুবাদিতা, সব ঘটে কেবল ‘রাজপথে’— তার খপ্পরে পড়ার আগে আমি অন্তত তিনটা বিষয় খোলাসা করতে চাই।
প্রথমত, অতিশাস্ত্রবাদীদের জন্য আমি লেনিনের দোহাই পাড়তে চাই। লেনিন ক্রমাগত বলে গেছেন ‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন একটা কাঠালের আমসত্ত্ব।’ ( কীকরিতেহইবে?) শুধু তাই নয়, কাউটস্কির পরে তিনিই জোর দিয়ে বলে গেছেন, নিজস্ব তত্ত্ব ছাড়া শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলন কেবলমাত্র ‘ট্রেড ইউনিয়নের চেতনা’ উৎপাদন করতে পারে এবং শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে ‘সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব’ বাইরেথেকে (মূলত বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে) আমদানি করতে হবে। এই চিন্তাভাবনাই বিপ্লবের ‘রাখাল বালক’ তত্ত্ব (vangurdism) সহ যাবতীয় মুসিবত নিশ্চিত করেছিল, কিন্তু আপাতত আমরা এই বিষয়টা তুলে রেখে সামনে অগ্রসর হব।
দ্বিতীয়ত, (এবং এখানে বিষয়গুলো জটিলতর হয়) দুনিয়ার যে কোনও ‘আন্দোলন’-এর দিক নজর দিলে তত্ত্ব/ডিসকোর্স এবং অনুশীলনের মধ্যকার সম্পর্কের একই প্যাটার্ন উন্মোচিত হবে। লেনিন যা বলেছিলেন তা কেবল মার্কসবাদ কিংবা সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, বরং নারীবাদ, পরিবেশবাদ, ক্যুইয়ার রাজনীতি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও সত্য। এমনকি, আদিকালের মহান ধর্মীয় আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে প্রযোজ্য— সবগুলো আন্দোলনই আগে নিজেদের ইশতেহার পেশ করেছে এবং পূর্ববর্তী প্রতাপশালী মতবাদ থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র হিশেবে জাহির করেছে। আমাদের সময়ের জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এটি কম সত্য নয়। আসলে, ‘আধুনিকতা’র ক্ষেত্রেও এই কথাই প্রযোজ্য, যা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই— বিভিন্ন ক্ষেত্রের আন্দোলনের ফলাফল ছিল এই ‘আধুনিকতা’। আধুনিকতার ডিসকোর্স কেবল কিছু ঘটনার পরম্পরা, অনুশীলন এবং প্রতিষ্ঠানকেই বিবৃত করেনি, বরং এগুলোকে আদর্শিকভাবে কাঙ্ক্ষিত এবং গঠন করেছিল। এর ডিসকোর্সই আধুনিক রাষ্ট্র ও আইন বলতে যা বিরাজমান তার ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং রাষ্ট্র কিভাবে কার্যকর থাকবে তা নিশ্চিত করেছিল।
‘তত্ত্ব’ বা ধারণাকে ‘সত্য’ হতেই হবে এমন কোন দিব্যি নেই ( উদাহরণস্বরূপ হিন্দুত্ববাদের কথা চিন্তা করুন), তবে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি২ যেমন বলতেন, ‘এটা অনুরণন সৃষ্টি করে’ এবং ক্ষেত্রটিকে একটি নির্দিষ্ট রূপে বিন্যস্ত করে দেয়।(দেল্যুজএবংগুয়াত্তারি, দর্শনকী?) একটি ধারণার বিবৃতি আসলে সুনির্দিষ্ট অনুশীলনকে দৃশ্যমান (এবং বোধগম্য) করে যা ইতোমধ্যেই হয়তো বিরাজমান আছে অথবা অভিজ্ঞতার নির্দিষ্ট সেটগুলোকে এমনভাবে মূর্ত করে যার মর্ম বহুসংখ্যক মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে। সুতরাং, আমরা বলতেই পারি, যে ‘ক্যুইয়ার’৩ যৌন চর্চা সম্ভবত ইতিহাসে বরাবরই ছিল, কিন্তু যেই কিনা সংশ্লিষ্ট তত্ত্বসমূহ ভাষায় প্রকাশিত হতে শুরু করল, তখনই আমাদের দর্শনক্ষেত্রে এর আবির্ভাব ঘটল। এটা কেবল অতীতের এমন যৌনচর্চার অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমাদের জ্ঞাত করেনা। বরং একটা পূর্বশর্ত হিসেবে যৌনতার ‘বিষমকামী ছাঁচ’কেও (heterosexual matrix) পরিস্কার করে (জুডিথবাটলার), যেটি নারী-পুরুষ ভিন্ন সকল লিঙ্গীয় পরিচয়কে আড়াল করে ফেলেছে। এই ধারণার আত্মপ্রকাশ আমাদের তাৎক্ষণিকভাবেই দেখিয়েছে, যৌনতার বাইনারি বিভাজনের প্রমিতকরণে কী পরিমাণ প্রচেষ্টা, সময় ও বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং ‘অস্বাভাবিক’, মধ্যবর্তী (in-between) চর্চাগুলোকে চিকিৎসাব্যবস্থার অধীনস্থ করা হয়েছে।
জে. কে গিবসন-গ্রাহাম তাঁদের ‘পুঁজিবাদের পরিসমাপ্তি: রাজনৈতিক অর্থনীতির নারীবাদী পর্যালোচনা’ (১৯৯৬) বইতে ঠিক এরকমই কিছু একটা যে ‘অর্থনীতি’র ক্ষেত্রেও ঘটেছে তা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখিয়েছেন । ‘ক্যুইয়ার’পুঁজিবাদে গিবসন-গ্রাহাম মূলত এটাই দেখিয়েছেন যে, অর্থনীতি কেবল পুঁজি আর শ্রমের সমন্বয়েই গঠিত না (পুঁজিকেন্দ্রিক প্রবণতা, জেন্ডারের ফ্যালাসকেন্দ্রিকতার অনুরূপ)। বরং নানাবিধ অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপ এবং লেনদেনের সাথে বিজড়িত থাকে, যা আমাদের প্রচলিত তাত্ত্বিক কাঠামো/ছাঁচগুলো আড়াল করেছে। গিবসন ও গ্রাহাম তাঁদের নিজস্ব অবস্থান আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে তাদের এই অভিঘাত সৃষ্টি করলেও, এই কাজ পৃথিবীর অন্যত্র অবস্থিত সমাজগুলোর বিচিত্র ক্ষেত্রের বোঝাপড়া আমাদের জন্য সহজ করেছে। ইন্ডিয়ার মত ‘না-আদর্শনিষ্ঠ অর্থনীতি’র (non-normative economics) জয়জয়কারের দেশে তো বটেই। এগুলো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির কৃষি উৎপাদন, সমবায়, ক্ষুদ্রঋণ এবং মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত স্বনির্ভর গোষ্ঠী (উত্তরভারতে যাদের ‘কমিটি’দালনা নামে ডাকা হয়), পণ্য ফেরি করা, রিকশা চালানো, বেচাকেনা ইত্যাদির মতন বিভিন্ন খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই খাতগুলোকে অতীতের ক্ষয়প্রাপ্ত চিহ্ন হিশেবে অন্তর্ভুক্ত করছে না যে এগুলোকে মুছে ফেলতে হবে কিংবা ‘আনুষ্ঠানিক’ (পড়ুন কর্পোরেট) খাতে বিলীন করে দিতে হবে। বরং এই খাতগুলোকে পুঁজিবাদ-উত্তর অর্থনীতির জন্য আরো সুগঠিত এবং শক্তিশালী করতে হবে। আমি পরে এই খাতগুলোর সম্ভাবনা নিয়ে আরো বিশদ আলোচনা করব, আপাতত শুধু এটুকু উল্লেখ করে রাখছি যে: গিবসন-গ্রাহামের বই লেখার প্রায় আড়াই দশক আগে কেনিয়ার ‘অনানুষ্ঠানিক’ খাতগুলো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কর্মসংস্থান মিশন আশ্চর্যজনক তথ্যের মুখোমুখি হয় : প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘গতানুগতিক’ খাতগুলো তো সংকুচিত হয়ইনি, বরং আরো বিস্তৃত হয়েছে। তারও কয়েক বছর আগে ঘানা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক নৃবিজ্ঞানী কেইথ হার্টও একই সিদ্ধান্তে আসেন এবং ‘গতানুগতিক খাতের’ বদলে ‘অনানুষ্ঠানিক খাতের’ ধারণার প্রস্তাব করেন। এই ধারণার সারবক্তব্য ছিল, এই খাতগুলোকে অতীতের অবশিষ্টাংশ হিশেবে না দেখে সমকালীন হিশেবে চিহ্নিত করা। আইএলও ‘অনানুষ্ঠানিকতা’ বিষয়ক হার্টের পরিভাষাটি গ্রহণ করে এবং একে ‘ধারণাগত আবিষ্কার’ হিশেবে আখ্যায়িত করে যা এ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনার পাটাতনই বদলে দিয়েছে।
টিমোথি মিচেল (বিশেষজ্ঞদেরবিধি) ও মিশেল কলনের মতো পণ্ডিতদের আরও একটি অভিঘাত এই বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল: ‘অর্থনীতি’ একটি কল্পিত নির্মাণ বলার পরিবর্তে, তাঁরা (বিশেষত মিচেল) দেখিয়েছেন যে বিশেষত বিশ শতকের শুরুর দশকগুলোতে অর্থনীতি/সামষ্টিক-অর্থনীতি’র মতো উদীয়মান শাস্ত্রের মাধ্যমে ‘অর্থনীতি’ বলতে কোন একটা বাঁধাধরা ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। এর বস্তুগততাকে (materiality) কোথাও অস্বীকার করা হয়নি, বরং এর উপর জোর দেওয়া হয়। ধারণাগত অভিঘাত ও কলকব্জার এক ধারাবাহিক পম্পরায় ‘অর্থনীতি’কে এই গুরুত্বের জায়গায় বসানো হয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির প্রশ্ন, যেটা আমরা ইতর মার্ক্সবাদী ঐতিহ্যসূত্রে পেয়েছি: এটি “উৎপাদন শক্তির ইহজাগতিক বিকাশ”কে একটি নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া হিশেবে ব্যাখ্যা করে যেটি ধারণার জগতের ঘটমান সমস্তকিছুরই একটি অবধারিত ‘বস্তুগত ভিত্তি’ আছে বলে মনে করে (এইসব বিকশিত উৎপাদিকা শক্তির দ্বারা এমনকি উৎপাদন সম্পর্ক পর্যন্ত নির্ধারিত হয় বলে মনে করে)। যদিও বহু মার্ক্সবাদীই অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর ‘ধারণা’র বিকাশ ঘটে এই মত ত্যাগ করেছেন, তারপরেও মার্ক্সবাদী শিবিরের অনেকেই এখনো ‘অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ’-এর ভূত দ্বারা তাড়িত। তারা এখনো মনে করেন এটি একটি নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া, ফলে অপরিবর্তনীয়। এখন, এই মুহুর্তে সামান্য আলোকপাত করেই দেখানো সম্ভব যে প্রযুক্তির বিকাশে এমনকি ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও বৈজ্ঞানিকজ্ঞানেরক্ষেত্রেকোননাকোনউন্নতিরফলাফল; এটি আপনাআপনি নিজের মর্জিমাফিক ঘটেনা। যেকোন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি বা যুগান্তকারী উদ্ভাবন (যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার [এআই] উদাহরণ দেয়া যেতে পারে) জ্ঞানজগতে তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশের একটি যৌক্তিক পরিণতি। তবে, কোন প্রযুক্তি গ্রহণ করা হবে এবং প্রভাবশালী হবে তা কর্পোরেশনগুলোর সম্ভাব্য ভবিষ্যত মুনাফার হিসাবনিকাশের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় এবং সেই অনুযায়ী সরকারি পলিসি ও বিনিয়োগের পরিমাণ ওঠানামা করে। কোনও প্রযুক্তিই ‘আপনাআপনি’ বিকশিত হয়না এবং যেহেতু মুনাফা ও রাষ্ট্রীয় নজরদারির কথা মাথায় রেখে সুনির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ( যেমন, শ্রম সাশ্রয়), পাশার দান সবসময়ই উল্টে দেয়া যায়।
হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই বিশ শতকে ফিরে যেতে পারি না এবং তখনকার দিনে নেয়া প্রযুক্তি সম্পর্কিত পশ্চাদমুখী সিদ্ধান্তগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারিনা, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের দর্শন অবশ্যই নতুন করে পরখ করা কিংবা পুনরায় কল্পনা করা যেতে পারে। তবে পুঁজির প্রয়োজনের সাথে খাপ খেলে এমন পরিবর্তন হতেই থাকে। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যখন বিশ শতকের শেষের দিকে পুঁজি যেই ‘নমনীয় পুঞ্জিভবন’(flexible accumulation) এর পথ খুঁজে পেয়েছিল, তৎক্ষণাৎ বৃহৎ বৃহৎ কলকারখানা ও প্ল্যাণ্টের বিশ শতকীয় ফোর্ডিস্ট উৎপাদনের৪ যুগ স্রেফ বাতিল ও পরিত্যাগ করা হয়েছিল। পরিত্যক্ত কারখানাগুলোর ল্যান্ডস্কেপ এখনও ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের অনেক জায়গায় রয়েছে। তাদের মধ্যে কিছু কিছু ইতোমধ্যেই পার্ক বা যাদুঘর এমনকি শপিংমলে পরিণত হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে বড় বাঁধগুলো বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও মানবজাতির কাছে অজানা কোন প্রক্রিয়া নয়। চীন বিশ্বের বর্তমান শিল্পকেন্দ্র (এবং কোভিড-১৯ বিতর্কের কেন্দ্রস্থল) কেবল কারখানাগুলোই পরিত্যাগ করেনি বরং বিভিন্ন প্রদেশের ভূতুরে নগরীগুলোকেও পরিত্যাক্ত করেছে।
সংক্ষেপে বললে, প্রযুক্তি বা উন্নয়ন, না এমন কোন ‘অধীশ্বর’ যার অমোচনীয় ক্ষমতার কাছে দুনিয়াকে মাথা নত করতে হবে, না এগুলোকে অপরিবর্তনীয় ভাবার কোন যুক্তি ধোপে টেকে।
কোপার্নিকাস
নয়া ‘কোপার্নিসীয়’ বিপ্লব
মার্কিন পরিবেশ বিশ্লেষক লেস্টার আর. ব্রাউনের কাজ থেকে এই পরিভাষাটি আমি নিয়েছি, যিনি প্রায় দুই দশক আগে এ সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। ব্রাউন নয়া কোপার্নিসীয় বিপ্লবের জরুরতের কথা বলেন, কিন্তু আমার যুক্তি হলো যে এটি আসলেঅনেকদিনধরেইচলমান। আদি উৎসের বিবেচনায়, আমাদের সম্ভবত এটিকে ‘আলশাতির— কোপার্নিকাসবিপ্লব’ বলা উচিত, কারণ আজকের দিনে এসে আমরা জানি কোপার্নিকাস মূলত সিরিয়ান জ্যোতির্বিদ ইবনে আল-শাতিরের মডেল ধরেই কাজ করেছিলেন। এই তথ্যটা অবশ্য পোলিশ কোপার্নিকাস নিজে কখনো লুকান নি, কিন্তু পরবর্তী ইতিহাস থেকে এটি সুকৌশলে আড়াল করে ফেলা হয়েছে। শাতিরীয়—কোপার্নিসীয় বিপ্লব যদি পৃথিবী মহাবিশের কেন্দ্র এবং সূর্য এর চারপাশে ঘোরে এই ধারণাটিকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে আমরাও দুনিয়া কাঁপানো বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। এর উপাদানগুলো বেশ কিছু কাল ধরে বিরাজ করছে এবং নতুন ‘সার্বভৌম’ অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে প্রকৃতিকে শোষণ এবং এর উপর আধিপত্য কায়েম করতে হবে কিংবা একে পোষ মানাতে হবে—আঠারো উনিশ শতক থেকে আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাসের জগতের প্রাণভোমরায় পরিণত হওয়া এই ধারণার মধ্যে যে মারাত্মক মৌলিক গলদ আছে এই উপলব্ধি ক্রমবর্ধমানভাবে বিস্তার লাভ করছে। ‘প্রকৃতি’কে কেবল ‘অর্থনীতি’র জন্য ‘সম্পদ’ ও ‘কাঁচামাল’-এর যোগানদাতা হিশেবে বিবেচনা করা হতো। ‘অর্থনীতি’ ছিল বৃহত্তর সেট; ‘প্রকৃতি’ ছিল এর উপসেট। এই ধারণার গোড়া খুঁজতে গেলে সেই কার্তেসীয় মুহুর্তের মুখোমুখি হতে হয়, যাকে ব্রুনো লাতুর[v] ‘মহা বিভাজন’ হিশেবে আখ্যা দিয়েছেন; ‘আধুনিক’ দুনিয়ার সেই ‘আবির্ভাব’ যখন ‘সমাজ’কে ‘প্রকৃতি’ থেকে আলাদা করা হলো, ‘মানুষ’কে ‘না-মানুষ’(Non-humans) থেকে আলাদা করা হলো। ফলে মানুষ হয়ে উঠল মহাবিশ্বের ‘কেন্দ্র’ এবং একটা স্বতন্ত্র সত্তা হিশেবে নিজস্ব বিধি-বিধানসহ ‘অর্থনীতি’ হয়ে উঠল মানব অস্তিত্বের কেন্দ্র। এই নতুন সত্তা ‘প্রগতি’র চিহ্ন হিশেবে আরো বেশি বেশি সম্পদ পুঞ্জিভবনের দর্শনকে বাস্তবে পরিণত করেছিল। আমরা এই মুহুর্তটিকে পশ্চিমাজ্ঞানতত্ত্বওসংস্কৃতির (Episteme)উত্থানওআধিপত্যেরসূচনাবিন্দু হিশেবে চিহ্নিত করতে পারি।
নতুন বিপ্লবের রূপরেখা এখনো বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং এটাকে নামকরণ করতে হবে। কিন্তু একদিক থেকে এটা কোপার্নিকাসদের সেই বিপ্লবের কথাই আমাদেরকে বলছে যে-পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়(প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে)। একইভাবে মানুষও মহাবিশ্বের কেন্দ্র না(সামাজিক বিজ্ঞানে ও দার্শনিক অর্থে)। নয়া বিপ্লব আমাদের জানান দিচ্ছে যে, নিজেদের ‘সার্বভৌমত্ব’ ও এবং ‘অর্থনীতি’র বৃহত্তর সত্তাকে (সেটাকে প্রকৃতি, বাস্তুতন্ত্র অথবা যে নামেই ডাকুন না কেন) ছাপিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাস করা মানুষের জন্য আত্মঘাতী ও শিশুসুলভ বৃথা চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা এখন ভীষণ প্রতাপশালী ও বিশ্বজয়ী পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্বের সাথে সর্বত্র বিরাজমান এক মোহমুক্তি প্রত্যক্ষ করছি। যেহেতু বিশ্বজুড়ে আরও বেশি বেশি অঞ্চল তাদের সংস্কৃতি, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনযাত্রা ও সত্তার ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে। তারা জীবনযাত্রার ঐতিহ্যগত ধারণাগুলোর সাথে নিজেদের সাপেক্ষিকঅস্তিত্বের সম্পর্ক বিনির্মাণের চেষ্টা করছে। এর বেশ কিছু নজির আমরা দেখতে পাচ্ছি আফ্রিকার দক্ষিণ অংশে উবুন্টু, দক্ষিণ আমেরিকায়বুয়েন ভিভির, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভূটানের ‘সুখ’-এর মত জীবনদর্শনে। এই প্রত্যেকটি দর্শনই যে ধারণা প্রকাশ করে, তা অন্তত দুটি প্রতাপশালী পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের সরাসরি বিপরীত :
(১) ‘হোমোইকোনমিকাস’ (homo economicus) নামক আত্মসর্বস্ব ‘যুক্তিবাদী’ ব্যক্তির ধারণা ;
(২) প্রকৃতিকে শাসন করা মানুষের ‘সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণা।
উল্লেখিত জীবনদর্শনসমূহ মানুষকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে বিজড়িত এক সত্তা মনে করে, যা কিনা অন্যান্য প্রজাতির মতোই স্রেফ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশীদার। এই ধারণাগুলোকে আর ‘প্রান্তিক’ আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিলুপ্তির পথে হাঁটা ‘অতীতমুখী’ অনুশীলন বলে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না, এতদিন পশ্চিম যেটা করে এসেছে। এই ধারণাগুলো ইকুয়েডর এবং বলিভিয়ার মতো দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অবশ্যই শক্তিশালী কর্পোরেট পুঁজিবাদী স্বার্থের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং উত্থান-পতন এই ধারণাগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এক বড় অন্তরায়, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সাংবিধানিক ধারা হিশেবে এগুলো গণপরিসরে তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে গৃহীত হচ্ছে। ইকোয়েডরের ক্ষেত্রে তো রীতিমতো গণভোটের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। এগুলো আসলে প্রমাণ করে খোদ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ‘প্রধান ধারা’য় ধারণাগুলো জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির খোদ ‘মূলধারা’ নিজেই বদলে যাচ্ছে।
এবং কেবলমাত্র আদিবাসীদের মধ্যেই প্রকৃতির বৃহত্তর সত্তার সাথে নিজেদের সাপেক্ষিকঅস্তিত্বগত সত্তার পুনর্নিমাণের চেষ্টা দেখা যায় না, বরং এমনকি চৈনিক ও ভারতীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রকৃতির সত্তা হিশেবে নিজেদের পুনরায় যুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা লক্ষণীয়। চীন ও ভারতের এলিট সম্প্রদায় নিওলিবারেল পুঁজিবাদের ফাঁপা বুদবুদ ও ফ্যান্টাসির জগতে যে এখনো বুঁদ হয়ে আছে সেটা ভিন্ন ব্যাপার, তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীর বাইরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোগবিলাসের বিকারের প্রতি মন্ত্রমুগ্ধ মনোভাব অনেকটাই কেটে যাচ্ছে।
এই প্রবন্ধের প্রথম কিস্তিতে, আমি কর্পোরেট জগতের লোকদের ভিন্ন জীবনযাত্রা বেছে নেয়ার কথা উল্লেখ করেছিলাম , নগর-জীবনের রুদ্ধশ্বাস গতির বাইরে বেছে নেয়া এক ‘ধীরস্থির’ জীবন ; যা দরিদ্র বাচ্চাদের পড়ানো থেকে শুরু করে জৈবকৃষি এমনকি শিল্পকলার চর্চা পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা অনুতাপহীন ‘আধুনিকতাবাদী’রা যেমনটা মনে করে, তেমন আদিমকালের গুহার জীবনে ফিরে যেতে চায়না, বরং রাষ্ট্র ও পুঁজির থাবার বাইরে একটা নির্ঝঞ্ঝাট অর্থবহ জীবন খুঁজে পেতে চায়।
বর্তমান প্রবন্ধের শেষ ভাগে এসে, আমি এখন সংক্ষিপ্তভাবে সম্ভাব্য এই নতুন জীবনের কিছু খসড়া চিত্র আঁকতে চাই। আমি মনে করি এটাই হতে হবে আমাদের ভবিষ্যত জীবনের গতিমুখ এবং ইতোমধ্যেই যা ঘটমান, সেসবের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে আমার এইসব চিন্তা।
পুঁজিবাদ–উত্তরভবিষ্যত: একটিরূপরেখা
ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রণয়ন করা যে কারোর জন্যই কঠিন, ভবিষ্যতের নীলনকশা তো বহু দূরের আলাপ! আবার, যেহেতু যেকোন প্রকারের পূর্বতসিদ্ধ ইশতেহার ঘোষণার বিরুদ্ধে আমার দার্শনিক অবস্থান, আমি এখানে একেবারেই সেই চেষ্টা করব না; বরং ইতোমধ্যেই বিরাজমান ধারণাগুলোই আমি আরও পরিষ্কার করার চেষ্টা করব। আমার ধারণা, পরিস্থিতিগত কারণেই, ব্যাপারগুলো আমাদের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হবে এখন।
নিচে আমি এখন যে নজিরগুলো চিহ্নিত করব, তা বহুকাল ধরেই একটা পর্যায় পর্যন্ত ক্রিয়াশীল ছিল, কিন্তু আমরা এগুলোকে দেখতে পাইনি কিংবা ভেবেছি এগুলো ‘অতীতের ক্ষয়িষ্ণু স্মারক’।
তাহলে এটা বলে শুরু করা যেতে পারে : (একবার যদি আমরা বুঝে ফেলতে পারি যে শিল্পোদ্যোগ, ব্যবসাবাণিজ্য মাত্রই পুঁজিবাদী নয়) যে পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যত অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন রূপের সমন্বিত একটি রামধনু হবে। এরমানেহলোগণসম্পত্তি, সমবায়, বেসরকারিকুটিরশিল্প, কৃষি, শহুরেওবনাঞ্চলেরখাসজমিতেসাধারণঅধিকারথেকেশুরুকরেরাষ্ট্রীয়তথাগণমালিকানাপর্যন্তনানাকিসিমেরমালিকানারসহাবস্থান।জনস্বাস্থ্যএবংশিক্ষারমতোবিষয়গুলোসম্ভবতরাষ্ট্রেরহাতেইথাকবে, যেহেতুএখনএটিবেশপ্রতিষ্ঠিতধারণায়পরিণতহয়েছে।
পুঁজিবিহীন একটা দুনিয়া কল্পনা করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় কর্মসংস্থান তৈরিতে পুঁজির বিকল্প নেই এই ‘অর্থনৈতিক’ কল্পকাহিনী। ফলে কর ভর্তুকি, শ্রম আইন মেনে চলার স্বাধীনতা, ভর্তুকিযুক্ত বিদ্যুৎসুবিধা এবং বিনিয়োগের ‘নিরুপদ্রব পরিবেশ’ ইত্যাদির মতো চাহিদারগলায় আমাদের (পড়ুন সরকার) মালা পড়াতে হয়।
প্রথমেই মনে রাখবেন যে বেকারত্ব পুঁজিবাদের সৃষ্টি; সুতরাং পুঁজিবাদ বেকারত্বের সমাধান হতে পারে না। প্রথম বিশ্বে (‘উন্নত পুঁজিবাদী দেশসমূহ’) এই পুঁজিবাদ অন্য সকল ধরণের সম্পত্তির (সাধারণ সম্পত্তি) সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে এবং বছরের পর বছর ধরে ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ তথা ‘কর্মসংস্থান খোয়ানো প্রবৃদ্ধি’ নিশ্চিত করেছে। পশ্চিমকে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার(এআই) ভূতে পেয়েছে, যেটা কিনা নিকট ভবিষ্যতে কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেইচাকরিরবাজারেরচল্লিশভাগখেয়েফেলবে। ইন্ডিয়ার মতো দেশগুলোতেও এর মারাত্মক বিপর্যয়কর প্রভাব তৈরি হতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, এটা মহামারি আকারে সৃষ্ট বেকারত্ব ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার পটভূমিতে ইউরোপের নানা দেশে গৃহীত কিংবা গুঞ্জনরত সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (ইউবিআই) ধারণার বিরুদ্ধ একটি ধারণা। এই ধারণার আদিসূত্র (একটা পর্যায় পর্যন্ত) থমাস মুরের ষোড়শ শতকীয় ইউটোপিয়া। কিন্তু গত শতকের সত্তুরের দশক থেকে একটা দারুণ সম্ভাবনা হিশেবে এটাকে বেশ গুরুত্বের সাথে আমলে নেয়া হয়েছে। আন্দ্রে গোর্জ ১৯৮০’র দিকেই এই ধারণার পক্ষে ওকালতি করেছেন এবং সম্প্রতি নীতিনির্ধারণী বিতর্কে জায়গা করে নেয়ায় এই ধারণাটির গুরুত্ব একটা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এমনকি জেমস ফার্গুসনের Give a Man a Fish গ্রন্থেও৬ এটা স্বীকৃত হয়েছে যে সমসাময়িক পুঁজিবাদে জনসংখ্যার একটা বড় অংশই স্রেফ উদ্বৃত্তে পরিণত হয়েছে এবং তারা কখনোই আর কাজ ফিরে পাবেনা।
কর্মসংস্থান দাবি করা স্রেফ মরুভূমিতে মরীচিকা ধরতে যাওয়ার মতো। ন্যূনতম সর্বজনীন আয়ও (ইউবিআই) তাই।পশ্চিমে, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘদিনের এই দাবি সম্প্রতি নীতিনির্ধারণী পরিসরেও প্রবেশ করাটা একটা বিরাট বাঁকবদলের নির্দেশক। তবে বাস্তবটা একটু মাথায় রাখুন, পশ্চিমে ক্ষুদ্র সম্পত্তি, সাধারণ কিংবা যৌথ সম্পত্তির এত নিদারুণ বেসরকারিকরণ /ধ্বংস ঘটানো হয়েছে যে সেখানে এখন ইউবিআইকেই একমাত্র সম্ভাব্য বিকল্প মনে হচ্ছে।
আমি সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলাম যে, কোভিড-১৯ মহামারী সৃষ্ট পরিস্থিতি এমনকি যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও একটি অস্থায়ী ইউবিআই নিয়ে গুরুতর আলোচনার দিকে পরিচালিত করেছে। স্পেনের সরকার এখন বলছে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা স্থায়ী ইউবিআইয়ের পরিকল্পনাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। স্মর্তব্য যে ভারতের সিকিম ইতোমধ্যে ইউবিআইর কিছু রূপ বাস্তবায়ন শুরু করেছে এবং গত সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী রাহুল গান্ধী ‘নয়া প্রোগ্রাম’ (Nyunatam Aay Yojana) প্রস্তাব করেছিলেন— যেটা আসলে ইউবিআই এরই একটি ভারতীয় সংস্করণ। ইউবিআইয়ের এর মতো ‘বামপন্থী’ দাবি বর্তমানে বেশ গুরুত্ব সহকারে আলাপ-আলোচনা-নীতিনির্ধারণী পরিসরে জায়গা পাচ্ছে কারণ করোনা মহামারি প্রাদুর্ভাবেরও আগে সৃষ্ট নাজুক পরিস্থিতির বাস্তবতায় আমজনতার হাতে যেন কিছু ক্রয়ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে। এটি ইতোমধ্যে স্বীকৃতি যে খোদ বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিরই ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় থেকে এটা একটা অনন্ত সংকটে পতিত হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে সেই সংকট আরো প্রকট হচ্ছে।
এই মুহুর্তে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি প্রশ্নে ফিরে আসাটা কার্যকর হতে পারে, কারণ বেশিরভাগ ‘অ-পশ্চিমা’ অঞ্চলে এটা একেবারে প্রধান গুরুত্বের ব্যাপার। বিশ্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি কর্মসংস্থানে নিযুক্ত মানুষ বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সাথে জড়িত। বস্তুত, এটা এখন আর ‘অ-পশ্চিমা উন্নয়নশীল অর্থনীতি’র একার বিষয় নয়। মার্থা চেনের মতে, অনানুষ্ঠানিকীকরণের বিতর্ক আশির দশক থেকেই ‘প্রথম বিশ্বে’ বিস্তৃত হচ্ছে, যদিও সম্পূর্ণ নেতিবাচক কারণে। ফোর্ডিস্ট-পরবর্তী ‘নমনীয় পুঞ্জিভবন’-এর উদ্দেশ্যে :
অন্যত্র, আমি আলোচনা করেছি যে কীভাবে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে, এটি এমন একটি খাত বলে মনে হয়েছিল যা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে চাকরি খোয়ানো লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। এই পুনর্মূল্যায়নটা জরুরী, কারণ দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই খাতকে কেবল ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া, ‘জবাবদিহিতাহীন’ খাত হিশেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু দিনদিন এই খাতকে অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত হিশেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কল্যাণ স্যানালের ভাষ্যে যেটি ‘পুঞ্জিভবনের অর্থনীতি’র যুক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তিতে চলে। স্যানাল এই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে একটি ‘প্রয়োজনের অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং এটিকে ‘পুঁজি বহির্ভূত’ (non-capital) ডোমেইন হিশেবে চিহ্নিত করেছেন। এখানে যেটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বেশ কয়েকটি খাত অবিকশিত এবং অপর্যাপ্ত পর্যায়ে কেবল অস্তিত্বসমেত টিকে থাকে, কারণ এই খাতকে প্রায়ই চরম প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হয়। এবার প্রতিকূলতাসহই এই খাত যেভাবে টিকে থাকে তার সাথে সরকারি প্রণোদনা, সহায়তা ও নিরাপত্তাসহ সদর্পে বিরাজ করা বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর সাথে বিবেচনা করুন। এতে একটা বিষয়ই পরিস্কার হবে যে এই অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো যদি নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের আনুকূল্য ও সুনজর পেত, এগুলোর বিকাশ অন্য মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাবে।
আমরা পুঁজিবাদ-উত্তর যে দৃশ্যকল্পের কথা বিবেচনা করছি, সেখানে বৃহৎ কর্পোরেশনগুলোর কী হবে? তারাও নিশ্চিতভাবেই অন্য সমস্ত খাতের সাথে সহাবস্থান করবে, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসহ। কর্পোরেশনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে গৃহীত সিদ্ধান্ত যদি কোনভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে, যদি বায়ু কিংবা পানি দূষণ করে, কিংবা যদি প্রকৃতি ধ্বংস করে, তাহলে তাদেরকে অতি অবশ্যই পর্যাক্রমিক সামাজিক নিরীক্ষণের মুখোমুখি হতে হবে। প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তও এরকম নিরীক্ষণের মুখোমুখি হবে।
এবং সর্বোপরি, এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রয়েছে যা অত্যন্ত সচেতনভাবে বিকল্প তৈরির চেষ্টা করেছে। যেমন ‘সংহতি অর্থনীতি’র ধারণা কিংবা গণসম্পত্তির ধারণা। এগুলো কী তা ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে আসুন আমরা এগুলোর প্রবক্তাদের কাছ থেকেই ধারণাগুলো সম্পর্কে শুনি এবং অবশ্যই যেন মনে রাখি যে বেশ বড় সংখ্যক মানুষ এখন এ ধরণের উদ্যোগের সাথে জড়িত। সুতরাং সংহতি অর্থনীতির ধারণার অন্যতম প্রবর্তক এমিলি কাওনো’র(Emily Kawano) এ সম্পর্কে বলছেন:
এই ধরনের অনুশীলনের মধ্যে শ্রমিকদের সমবায় থেকে শুরু করে গোষ্ঠী উদ্যোগ, ক্রেডিট ইউনিয়ন, স্বনির্ভর অর্থনীতি, বিকল্প স্থানীয় মুদ্রা ইত্যাদি রয়েছে। অন্যদিকে, ‘কমনিং’ (commoning) এর আদি প্রেরণা গণসম্পদের ধারণা, তবে বিষয়গুলোকে সাধারণ করে তোলার অনুশীলনের দিকে জোর দেয়। এখানে ডেভিড বোলিয়ার (David Bollier) কমন্স( commons) এবং কমনিংয়ের (commoning) ধারণাটি ব্যাখ্যা করছেন:
কর্পোরেশনের উপর সামাজিক নজরদারি’সহ এখানে উল্লেখিত প্রত্যেকটি অনুশীলনই এমন একটা ভবিষ্যতের দিকে যাওয়ার পাথেয় যা অধিকতর বৈচিত্রপূর্ণ, বহুত্ববাদী এবং সাম্য ও ন্যায্যতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্র এবং কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত বাজারের গণ্ডির বাইরে ‘প্রান্তিক’ মনে হওয়া বর্তমানকালের ক্রিয়াশীল বহু কর্মকাণ্ডই অদূর ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ খেলারাম হিশেবে আবির্ভূত হতে পারে। দশকের পর দশক ধরে প্রতিকূলতার মুখেও বিস্তার লাভ করা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি সেই ইশারাই দেয়। আসল বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোর ফলে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া বিরাট সংখ্যক মানুষ এই অনানুষ্ঠানিক খাতেই পারস্পরিক সহমর্মিতা’সহ তাদের জীবন ও জীবিকা ভাগ করে নিবে। এই ভবিষ্যৎ ভাবনা ‘বেকারত্ব’ ফ্রেমওয়ার্ক থেকে মুক্ত। পুঁজিকে ক্রমাগত অপ্রাসঙ্গিক করতে করতে এটা অগ্রসর হয়।
অনুবাদকেরটীকা
[ অনুবাদকের টিকা তৈরি করার ক্ষেত্রে অলিউর সান , আব্দুল্লাহ আল মামুন, শাহিন খান সহায়তা করেছেন। তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই]
১. ইবনে আল শাতিরঃ একজন আরব জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তিনি দামেস্কের উমাইয়া মসজিদে মুওয়াক্কিত (ধর্মীয় টাইমকিপার) হিসেবে কাজ করতেন এবং ১৩৭১-৭২ সালের দিকে মিনারের জন্য একটি সূর্যঘড়ি নির্মাণ করেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞানমূলক গ্রন্থ কিতাব নিহাতআল–সালফতাসিহআল–উসুল (The Final Quest Concerning the Rectification of Principles)। এতে তিনি সূর্য, চাঁদ এবং গ্রহগুলির টলেমীয় মডেলকে ব্যাপকভাবে সংস্কার করেন। তাঁর কাজকে ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পূর্ববর্তী ‘বৈজ্ঞানিক বিপ্লব’ বলে বিবেচনা করা হয়। উল্লেখ্য যে, আর্যভট্টেরসৌরকেন্দ্রিকমডেলইবনেবতুতারমারফতেআরবেপৌঁছায়এবংইবনেহাইসামওআল–শাতিরেরহাতেবিকশিতহয় (সৈয়দ নিজার, জ্ঞানের বিকাশের তত্ত্ব ও বৈচিত্র্যময় ধারাসমূহ)। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীর জ্যোতির্বিদ কোপার্নিকাসের কাজে শাতিরের প্রভাব লক্ষণীয়।
কোপার্নিকাস : ষোড়শ শতকের পোলিশ জ্যোতির্বিদ। কোপার্নিকাসের সময়ে সৌরজগত সম্পর্কে প্রচলিত প্রভাবশালী ধারণা আজকের মতো ছিল না। তখন মনে করা হতো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহ আবর্তিত হয়। কিন্তু কোপার্নিকাস তাঁর পর্যবেক্ষণ থেকে বলেছেন, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ উপগ্রহ আবর্তিত হয়। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, “পৃথিবী নয়, সূর্যই হলো সৌরজগতের কেন্দ্র। সূর্যই পুরো সৌরজগতকে আলোকিত করে।” পৃথিবী নয়, বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র; কোপার্নিকাসের এই ঘোষণা তৎকালীন ইউরোপের সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে পৃথিবীকে আর সৃষ্টির আদি বলে গণ্য করা সম্ভব ছিল না। ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে সকল পরিবর্তন ও বিনাশের উৎস হিসেবে পৃথিবী আর পরিগণিত হতে পারল না। প্রাচীন চার্চকেন্দ্রীক কর্তৃত্বের পুরো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্যে মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের দার্শনিক ধারণার পরিবর্তন দরকার ছিল। কোপার্নিকাসের তত্ত্বের ফলে তা সম্ভব হয়েছিল। একেই ‘কোপার্নিসীয় বিপ্লব’ বলে অভিহিত করা যায়।
২. দর্শন, বিজ্ঞান আর শিল্পের অ/ভিন্ন গাঁথুনিতে যে এক চমৎকার অট্টালিকা সম্ভব তা দেল্যুজ আর গুয়াত্তারির What is philosophy পড়লে বোঝা যায়। দুইজনের প্রথোমক্ত জন দার্শনিক, আরেকজন মনোবিশ্লেষক। তাঁদের প্রথম বই Capitalism and Schizophrenia প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। তার ২০ বছরের মাথায় এই বই; প্রধান আলোচ্য বিষয়: দর্শনের ধরন আর এর সাথে অন্যান্য বিষয়ের পার্থক্য। দর্শনকে পুরোপুরি যুক্তির ফসল বলতে নারাজ দুইজন। ব্যাপারটা ব্যাখা করতে গিয়ে concept এর আলোচনা আনা হয়েছে, আর বলা হচ্ছে, “দর্শন হলো এক ধরনের শিল্প যা concept গড়ে, আবিষ্কার করে আর এর অতিরঞ্জন করে।” আবার এই concept ব্যাপারটার পিছে দাড়িয়ে আছে শুধু দার্শনিক নয়, ঐতিহাসিক আর সামাজিক প্রেক্ষাপট। এইভাবে আলোচনা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বেশ্বরবাদের দিকে। বোঝায় যাচ্ছে, transcendence নয় immanence বা সর্ব ভূ’তে ইশ্বর দেখার ঝামেলার দিকে নজর এদের। প্রচুর সমালোচনা সত্ত্বেও উত্তর-গড়নবাদী চিন্তা চেতনায় বিরাজ করার মতো যথেষ্ট উপাদান আছে এই বইয়ে।
৩. ক্যুইয়ার: ক্যুইয়ার শব্দটির অর্থ বিচিত্র/অদ্ভুত। নিপীড়িত বিভিন্ন যৌন ও লিঙ্গ পরিচয় বোঝাতে বৃহদার্থে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, সমকামিতা বোঝাতে ‘ক্যুইয়ার’ নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হতো, যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এলজিবিটির(LGBT) বদলে আরও অন্তর্ভূক্তিমূলক শব্দ হিসেবে ‘ক্যুইয়ারের’ নেতিবাচকতাকে পরাভূত করে আন্দোলনকারীরা রাজনৈতিকভাবে এর ব্যবহার শুরু করে।
জুডিথ বাটলারের তাত্ত্বিকভাবে বায়োলজিক্যাল সেক্সের ধারণা আর সামাজিক জেন্ডারের ধারণার ফারাক মোচন/সংকোচন, ক্যুইয়ারথিয়োরী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটা তত্ত্ব হিসেবে দাঁড়িয়েছে বাটলারসহ অন্যান্য তাত্ত্বিক ও দার্শনিকদের কাজের ভিত্তিতে। বাটলারের শরীরের ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যালাসকেন্দ্রিকতাঃ ফ্যালাসকেন্দ্রিকতা বলতে ফ্যালাস বা, লিঙ্গম বা, শিশ্নকে সামাজিক অর্থবোধকতার কেন্দ্রে ঠাহর করা বোঝায়। ১৯২৭ সালে আর্নেস্ট জোনস ফ্রয়েডের মনঃসমিক্ষণে নারীদের মন-যৌন বিকাশে শিশ্ন-ঈর্ষার ভূমিকার সমালোচনায় শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
ফ্যালাসকেন্দ্রিকতাকে(phallocentric) পশ্চিমা দর্শনের বচনকেন্দ্রিকতার (Logocentrism) সাথে যুক্ত করে, দেরিদা ফ্যালোগোকেন্দ্রিকতা (বচশ্নকেন্দ্রিকতা?) শব্দটি ব্যবহার করেন, যা পাশ্চাত্য (ভাষা) দর্শনে নির্দেশিত/জ্ঞাপিতের(signified) এক আধ্যাত্মিক উপস্থিতিকে শিশ্নের মতোই ঠাহর করে। লুসি ইরিগারে জ্যাক লাকাঁর ফ্যালাসের সাথে পুরুষ শরীরের সম্পর্ক প্রত্যাখানের সমালোচনায় তাঁকে ফ্রয়েডীয় চিন্তার বাহক হিসেবেই সাব্যস্ত করে, ফ্যালাসকে প্রচলিত পুরুষালি কতৃত্বের স্মারক হিসেবে, অর্থবোধকতা ও দর্শনের ক্ষেত্রে ফ্লুইডের(তরল/নরম) তুলনায় সলিডের(কঠিন/শক্ত) প্রাধান্যের প্রবণতাকে খোলাসা করেন।
৪. ফোর্ডিস্ট উৎপাদন : বিশ শতকের শিল্পায়িত সমাজের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। সাধারণত ব্যাপক উৎপাদন ও ব্যাপক ভোগ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমেরিকার শিল্পপতি ও ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতে হেনরি ফোর্ডের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
৫. ব্রুনো লাতুর : ফরাসি দার্শনিক। We have never been modern তাঁর বিখ্যাত বই। সম্প্রতি করোনাভাইরাস মহামারীর প্রেক্ষিতে এটাকিকোনপোশাকীমহড়া? শীর্ষক প্রবন্ধ লিখেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী তাফসিন প্রবন্ধটির অনুবাদ করেছেন। লাতুরের ‘সমাজ’ ধারণা, মানুষ ও না-মানুষের এজেন্সি, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির আধুনিকতাবাদী বিভাজনের অসাড়তা বোঝাতে গিয়ে অনুবাদকের টীকায় কাজী তাফসিন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধের সাথে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দীর্ঘ উদ্ধৃতি হুবহু তুলে ধরছি :
৬. Give a Man a Fish (Reflections on the New Politics of Distribution) মার্কিন নৃবিজ্ঞানী জেমস ফার্গুসনের ২০১৫ সনে প্রকাশিত গ্রন্থ। এই গ্রন্থে, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিকাশ পর্যবেক্ষণ করেছেন ফার্গুসন, যেখানে নিম্ন আয়ের নাগরিকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক প্রণোদনা পায়। এই ধরনের কর্মসূচি বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে। ফার্গুসন মনে করেন পুঁজিবাদের পুনর্বিবেচনা সম্ভব। বন্টনের নতুন পরিকল্পনা ভিন্ন রকমের রাজনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে বাজার, জীবিকা, শ্রম ও ভবিষ্যতের প্রগতিশীল রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদল ঘটাতে পারে বলে মনে করেন ফার্গুসন।
লি ওয়েন লিয়াঙ হলেন সেই ডাক্তার যিনি সর্বপ্রথম করোনা ভাইরাস মহামারি টের পেয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে সেন্সর করে ফেলে। তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের একজন সত্যিকারের বীর। তাকে বলা যায় চীনের চেলসি ম্যানিং বা এডওয়ার্ড স্নোডেন। তাই তাঁর মৃত্যু ব্যাপক-বিস্তৃত ক্ষোভের জন্ম দেবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। চৈনিক রাষ্ট্রের এই করোনা মোকাবিলা কীরূপে আদৃত হয়েছিল তা সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় হংকং-কেন্দ্রিক সাংবাদিক ভের্না ইউ’র করা মন্তব্যে। তিনি বলেন, “চীন যদি কথার স্বাধীনতাকে মূল্য দিত, তাহলে করোনা ভাইরাস-ই থাকত না। চীনা নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারকে সম্মান না করা হলে এমন ঘটনা আবার ঘটবে… মনে হতে পারে, চৈনিকদের মানবাধিকার থাকা বা না থাকায় বাকি বিশ্বের কী যায় আসে! কিন্তু দূর্যোগ তখনই ঘটতে পারে যখন চীন তার নাগরিকদের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করে দেয়। আন্তর্জাতিক মহলকে অবশ্যই বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।”
সত্য, কেউ বলতেই পারেন, চীনা রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কাজ বুড়ো মাও-এর নীতি “মানুষকে বিশ্বাস করার” বিরুদ্ধে ছুটছে। এর পরিবর্তে সরকার পরিচালনার প্রধান প্রস্তাবনা হল মানুষকে বিশ্বাস করা উচিৎ নয়। মানুষকে ভালোবাসা উচিৎ, মানুষকে রক্ষা করা উচিৎ, মানুষের যত্ন নেওয়া উচিৎ, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ, কিন্তু বিশ্বাস করা উচিৎ নয়। এই অবিশ্বাস সেই একই অবস্থানেরই চরম সীমা যা চীনা কর্তৃপক্ষ প্রতিবেশ আন্দোলন অথবা শ্রমিকের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার সময় প্রদর্শন করে। চীনা কর্তৃপক্ষ প্রায়শই একটি বিশেষ ব্যবস্থার উপর ভরসা রাখে। একজন মানুষ, হতে পারেন তিনি একজন প্রতিবেশ কর্মী, একজন মার্কসবাদী ছাত্রী অথবা ছাত্র, ইন্টারপোলের কোনও প্রধান, একজন ধর্মীয় প্রচারক, হংকংয়ের একজন প্রকাশক, এমনকি সিনেমার একজন জন-নন্দিতা অভিনয়শিল্পী, তিনি শ্রেফ উধাও হয়ে যাবেন দুই সপ্তাহের জন্য। এরপর সুস্পষ্ট কিছু অভিযোগ ঘাড়ে নিয়ে পুনরায় জনসম্মুখে উদয় হবেন। এবং এরপরের সুদীর্ঘ নিরবতা কেবল একটি বার্তাই দেবে: ক্ষমতাকে এমন অপ্রোথনযোগ্য উপায়ে প্রয়োগ করা হয়েছে যে এখন কোনও কিছুকে আর প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। এই বুনিয়াদি বার্তাটি যখন পৌছে দেওয়া হয় আইনী যুক্তিগুলো তখন দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। মার্কসবাদী শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা বিশেষ ঘটনা। অদৃশ্য হবার অন্যান্য ঘটনায় যেখানে কোন না কোনও ভাবে একক ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে ধরে নেওয়া হয়, সেখানে মার্কসবাদী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খোদ রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শের সাথে সম্পর্কিত।
পার্টি নেতৃবৃন্দের এমন ভয় পাবার কারণ হল একটা স্ব-সংগঠিত সম্পর্কজালের ভুত। এই জালটি বোনা হয়েছে মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীদের দিগন্ত বিস্তৃত সম্পর্ক দিয়ে এবং পুরাতন পার্টি ক্যাডার আর সেনাবাহিনীর এক অংশের সমর্থন নিয়ে। এমন একটি সম্পর্কজাল পার্টির শাসনের ন্যায্যতাকে সরাসরি প্রশ্ন করে এবং একে প্রতারক হিসেবে আখ্যায়িত করে। এ জন্যই বোঝা যায় কেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার অনেকগুলো “মাওবাদী” ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কসবাদী বিতর্ক সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শে সিরিয়াসলি বিশ্বাস রাখা এই মুহুর্তে চীনে সবচেয়ে বিপদজনক কাজ। চীন এখন এমন অবস্থার জন্য মূল্য পরিশোধ করছে।
হংকং-এর শীর্ষ স্থানীয় গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ গ্যাব্রিয়েল লিয়াঙের মতে, “নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়তে পারে”। তিনি আরও বলেন, “বৈজ্ঞানিক মহল যখন এমন অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করতে থাকে তখন জনগণের উচিত সরকারের উপর আস্থা এবং বিশ্বাস রাখা। কিন্তু একদিকে যখন হাতে হাতে সোস্যাল মিডিয়া আর একদিকে ভুয়া খবর-আসল খবর মিলেমিশে একাকার, তখন চারিদিকে বিরাজ করে শূণ্য-বিশ্বাস। এমন অবস্থায় আপনি কী করে মহামারির সাথে লড়াই করবেন? আপনার প্রয়োজন একটু বেশী বিশ্বাস, একটু বেশী সংহতির চেতনা, একটু বেশী সদিচ্ছা, যার কোনও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই”।
মৃত্যুর ঠিক আগে হাসপাতালে শুয়ে ডাক্তার লি বলেছিলেন স্বাস্থ্যবান একটা সমাজে একাধিক কন্ঠস্বর থাকতে হয়। কিন্তু এই অপরাপর কন্ঠস্বরগুলো শুনতে চাওয়া মানে কেবল পাশ্চাত্য ধাঁচের বহুদলীয় গণতন্ত্র নয়। এটা নাগরিকদের সুচিন্তিত মতামত প্রবাহের উপযোগী একটি উন্মুক্ত পরিসরও বটে। মুখরোচক একটা যুক্তি হল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে রাষ্ট্রকে গুজব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ নিজেই অবিশ্বাস ছড়ায় এবং ফলস্বরূপ আরও বেশী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার পারস্পারিক বিশ্বাসই কেবল এসব বন্ধ করতে পারে।
মহামারিকালে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজন পড়ে। কারণ তখন কোয়ারেন্টাইন-এর মত বড় পদক্ষেপ নিতে হয়, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা দিয়ে তা বজায় রাখতে হয়। চীন তার কোটি মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পেরেছে। একই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এমন ঘটনায় উদারবাদীদের বিরাট এক দল হয়ত হাত তুলে দাবী করবেন, এই কোয়ারেন্টাইন হল রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। তারা হয়ত লড়াই করে বের হয়ে আসারও চেষ্টা করবেন। তো, বেশী বাক স্বাধীনতা দিয়ে এই মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব নাকি বিশ্বকে বাঁচাতে চীন বাধ্য হয়ে হুবেই প্রদেশের নাগরিক-স্বাধীনতাকে উৎসর্গ করে দিয়েছে? কিছু ক্ষেত্রে দুটোই সত্য। কিন্তু যা আসলে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তা হল, “ভালো” বাক স্বাধীনতা থেকে “খারাপ” গুজবকে পৃথক করার সহজ কোনও রাস্তা নেই। সমালোচকরা যখন অভিযোগ করেন, চীনা কর্তৃপক্ষ “সত্যকে সবসময় গুজব বানিয়ে ছাড়ে”, তখন এটাও বলা যায় রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের বিরাট পরিসরটি গুজবে পরিপূর্ণ।
আর্টওয়ার্ক: ও টেম্পোরা শিল্পী: টিমো এসনার সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
জ্বলজ্বলে একটি উদাহরণ দেখবেন রাশিয়ার অন্যতম টিভি নেটওয়ার্ক, চ্যানেল ওয়ান-এ। সান্ধ্যকালীন খবরের অনুষ্ঠানে একটি অংশ বরাদ্দ করা হয় করোনা ভাইরাস ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর জন্য। অনুষ্ঠানটির নাম “সময়” (Vremya)। প্রতিবেদনের স্টাইলে একধরনের দ্যোতনা আছে। মনে হবে তত্ত্বগুলোকে নাকচ করা হচ্ছে, কিন্তু দর্শকদের মধ্যে এই অনুভূতিটিও রাখছে যে কিছু সত্য থাকলেও থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় বার্তাটি হল, কিছু পাশ্চাত্য এলিট বিশেষত মার্কিন, তারা কারা কেউ জানে না, করোনা ভাইরাস মহামারির জন্য দায়ী- এটি গুজব হলেও হতে পারে; এটা সত্যি হবার কথা না, কিন্তু কে জানে…? আশ্চর্যজনকভাবে, আসল সত্যকে সন্দেহ করে এর গুরুত্বকে মুছে ফেলা যায় না। একই সাথে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আতঙ্ক প্রতিরোধে জনসম্মুখে পুরো সত্য না বলাটা মাঝে মাঝে মানুষকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন সমস্যাটিকে আর সমাধান করা যায় না। পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হল জনগণ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে পারস্পারিক বিশ্বাস। আর চীনে এটাই সামগ্রিকভাবে অনুপস্থিত।
গোটা বিশ্বে মহামারি যত বাড়তে থাকবে আমরা তত বুঝতে পারব বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষুধা মোকাবিলায় বাজার-ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। আজ যে সব উপায়কে “কমিউনিস্ট” বলে মনে হচ্ছে, কাল বৈশ্বিক পর্যায়ে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। উৎপাদন এবং বন্টনের সমন্বয় হতে হবে বাজারের সমন্বয়ের বাহিরে। ১৮৪০ সালের আইরিস আলু মহামারির কথা অনেকেই মনে করতে পারবেন; আয়ারল্যান্ডকে যা তছনছ করে দিয়েছিল। দশ লক্ষাধিক মানুষ হয় মারা গিয়েছিলেন নয়ত হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাজার-ব্যবস্থার উপর আস্থা অক্ষুন্ন রেখে বিলেত সেসময় আয়ারল্যান্ড থেকে খাদ্য রপ্তানি করেছিল। যদিও সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ ছিলেন অভুক্ত। আমাদের আশা করতে হবে একই ধরনের নির্মম পদক্ষেপ আজকের দিনে আর গ্রহণযোগ্য নয়।
অনেকেই হয়ত চলমান করোনা ভাইরাস মহামারিকে এইচ.জি ওয়েলস রচিত The War of the Worlds (১৮৯৭)-এর উলটা সংস্করণ হিসেবে পাঠ করবেন। মঙ্গল গ্রহের প্রাণীদের পৃথিবী দখলের গল্প। দখলের পরে কথক আবিষ্কার করেন, পৃথিবীর এক জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে তারা সবাই মারা গেছে। এই জীবাণুর বিরুদ্ধে কোনও ইমিউনিটি তাদের ছিল না। তারা “নিহত হল, মানুষের সকল অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাবার পর, খোদার ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র সৃষ্টি দ্বারা, যার উপস্থিতির জ্ঞান কেবল তাঁরই ছিল”। এক্ষেত্রে ওয়েলস আর তার ভাই ফ্রাঙ্কের কথোপকথনটা নোট করার মত এবং গল্পের প্লটটাও এই আলাপ থেকেই এসেছে। তারা কথা বলছিলেন তাসমেনীয় আদিবাসীদের উপর বিলেতীদের বয়ে আনা কেয়ামত নিয়ে। ওয়েলসের জিজ্ঞাসা, বিলেতীরা তাসমেনীয়দের সাথে যা করলো, কী হবে যদি মঙ্গলের প্রাণীরা বিলেতীদের সাথে একই কাজ করে? দুঃখের বিষয়, শত্রুদের পরাজিত করার মত ঘাতক জীবণু তাসমেনীয়দের ছিলনা। এবার ওয়েলসের গল্পটা উলটো করে পড়া যাক। নির্মমভাবে শোষণ করতে থাকা আর পৃথিবীর প্রাণগুলোকে ধ্বংস করা সেই “মঙ্গল গ্রহের বাহিনী” হলাম আমরা, মানবজাতি। পৃথিবীর বুদ্ধিমান বানরদের সকল অস্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাবার পর, আমরা বিপদে পড়ে গেলাম “খোদার ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র সৃষ্টি দ্বারা, যার উপস্থিতির জ্ঞান কেবল তাঁরই ছিল”, সেই সব স্টুপিড ভাইরাস দ্বারা যারা কেবল সংখ্যায় বেড়ে চলে আর বদলায়।
করোনা ভাইরাস মহামারি সম্ভবকারী সামাজিক শর্তগুলো বিশ্লিষ্ট হবার দাবী রাখে। কেবল ভাবুন, এক বিলেতী সিঙ্গাপুরে একজনের সাথে দেখা করলেন, ইংল্যান্ডে ফিরলেন, তারপর স্কি করতে চলে গেলেন ফ্রান্সে, সেখানে আরও চারজনকে আক্রান্ত করলেন… প্রশ্নের সম্মুখীন হবে বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদী বাজার, সম্পদের নশ্বরতা। চলমান মহামারিকে গভীর কোনও মানে দেওয়ার লোভটি আমাদের সংবরণ করতে হবে। এই ধরুন, নির্মম হলেও এটা মানবজাতির শাস্তি, তারা যেভাবে পৃথিবীকে শোষণ করছে, প্রাণের বিনাশ করছে সেই জন্যই এই শাস্তি। আমরা যদি এমন গোপন ম্যাসেজ খুঁজতে থাকি তাহলে আমরা পূর্ব-আধুনিকই থেকে যাবো। ব্রহ্মাণ্ডকে বিবেচনা করব কথা বলার সঙ্গী হিসেবে। আমাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লেও স্বস্তি পাব এই ভেবে যে, আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড (বা কেউ একজন) আমাদের সাথে যুক্ত। আমরা একটা ঘটনা। সবচেয়ে কঠিন হল এটা স্বীকার করা যে, চলমান মহামারি সাধারণ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। শ্রেফ ঘটে গেছে এবং এর কোনও নিগূঢ় অর্থ নেই। বিষয়ের বৃহৎ বিন্যাসে আমরা কেবল আরেকটি প্রজাতি যার বিশেষ কোনও তাৎপর্য নেই।
করোনা ভাইরাসের হুমকির মুখে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সাথে সাথে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাহায্য এবং সমন্বয়ের প্রার্থনা করেছেন। ভালোমানুষী বা মানবিক বিবেচনায় নয়। বরং ওখানে ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের আলাদা করা অসম্ভব, তাই। এক পক্ষ আক্রান্ত হলে আরেক পক্ষ অবশ্যই ভুগবে। এই বাস্তবতাকেই আমাদের তর্জমা করতে হবে রাজনীতিতে। “ম্যারিকাই (বা যে কেউ) সর্বাগ্রে” এমন কথা ফেলে দেওয়ার সময় এসেছে। মার্টিন লুথার কিং অর্ধশতাব্দী পূর্বে যেমনটি বলেছিলেন: “আমরা বিভিন্ন জাহাজে করে আসতে পারি কিন্তু আমরা এখন একই নৌকায় আছি”।
[প্রবন্ধটি “We’re All in the Same Boat Now” শিরোনামে স্ল্যাভয় জিজেকের সাম্প্রতিক বই “প্যানডেমিক”-এর একটি অধ্যায় হিসেবে প্রকাশিত]
করোনা ভাইরাস ও তার বিস্তার নিয়ে পৃথিবীব্যাপী সরকারগুলোর অবস্থান এবং মোকোবেলার পথ নিয়ে চলছে নানা তর্ক বিতর্কেএই অবস্থায় ইউরাকটিভের পার্টনার এফি’র সাথে টাকসন শহর থেকে কথা বলেছেন ভাষাবিজ্ঞানী নোম চমস্কি। ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি-এমআইটি থেকে ২০১৭ সালের শীতকালে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনায় অধ্যাপনা শুরু করেন তিনি।অরাজের জন্য সাক্ষাতকারটির চুম্বক অংশ অনুবাদ করেছেন জাকিরহোসেন।
নোম চমস্কি
কোভিড-১৯ আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে, এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিরাজমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলোর দিকে আঙুল তোলেন।
“একটি শিক্ষা হলো, এটি পুঁজিবাদের নব্য-উদারবাদী সংস্করণের আরেকটি প্রকাণ্ড ব্যর্থতা। আমরা যদি এ থেকে শিক্ষা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বাজেভাবে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”
“যা ঘটেছে তা খুব পরিষ্কার। ২০০৩ সালের সার্স মহামারীর পরে বিজ্ঞানীরা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে আরো একাধিক মহামারী (বিশেষত করোনা ভাইরাসেরই আলাদা প্রকরণ)আসছে সামনে। সেই মূহুর্তে এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল। অন্যান্য ফ্লুয়ের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়েছিল আরকি। প্রতিবছরই নতুন নতুন ফ্লুয়ের ভ্যাকসিন বানানোর প্রয়োজন হয়। কারণ ভাইরাসের মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। কিন্তু আপনি যেহেতু এর জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন, সুতরাং আপনি খুব দ্রুতই ভ্যাকসিন তৈরি করে ফেলেন।”
“এইক্ষেত্রে তা করা হয়নি। কারণ কাউকে না কাউকে কাজটি শুরু করতে হতো।”
“দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। ঔষধ কোম্পানি: তাদের যথেষ্ট পুঁজি রয়েছে। আমাদের বদান্যতায় তারা বিপুল পরিমাণে ধন-সম্পদের মালিক। তারা তা করবে না। তারা বাজার থেকে আসা সংকেতের অপেক্ষা করবে। বাজার থেকে আসা সংকেত আপনাকে বলবে,কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের অগ্রীম প্রস্তুতি নেওয়াতে কোনো মুনাফা আসবে না।”
“আর তারপরেই আসে উদারবাদী হাতুড়ি: সরকারগুলোকে কোনো কিছু করতে দেওয়া যাবে না। সরকার মূলত নিজেরাই সমস্যা; সমস্যার সমাধান নয়।”
“যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ব্যাপক বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। এর দায় পুরোপুরি ওয়াশিংটনের হর্তাকর্তাদের। তারা জানে কিভাবে পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে দোষারোপ করতে হয়, কেবল নিজেদেরকে ছাড়া। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই সংকটের উপকেন্দ্র। এটিই একমাত্র অকর্মা দেশ, যারা কিনা ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগ্যানাইজেশনকে তাদের সংক্রমিত ও মৃত রোগীর তথ্যটাও ঠিকমতো দিতে পারেনি।”
এই সংকট ঠেকাতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপকে চমস্কি ‘পরাবাস্তব’ বলে উল্লেখ করেছেন।
“ফেব্রুয়ারীতে এই মহামারী তর্জন-গর্জন শুরু করেছিল। ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের সকলেই একে আমলে নিয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প তার পরের বছরের জন্য নতুন বাজেট ঘোষণা করল। তার সেই বাজেট ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সেখানে রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সহ আরো বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খাতে বরাদ্দ পুনরায় কমানো হয়েছে। এমনকি মহামারী চলাকালীন সময়ে বরাদ্দ আরো কমানো হয়। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর শিল্প-কারখানাগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর ফলে সুসংবদ্ধ মনুষ্যজীবনের ধ্বংস খুব নিকটে ডেকে আনা হয়েছে।”
“উপরোক্ত কার্যাবলীই আপনাকে কতিপয় সোসিওপ্যাথিক ভাঁড়দের স্বভাব সম্পর্কে একটি বার্তা দেবে, যারা কিনা সরকার চালাচ্ছে এবং যাদের কারণে দেশ দুর্দশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।”
“তারা এখন দোষারোপ করার জন্য মরিয়াভাবে অন্য কাউকে খুঁজছে। চীনকে দোষারোপ করছে, ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগ্যানাইজেশনকে দোষারোপ করছে। এবং তারা যা করছে তা রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেশনের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ কী হতে পারে? এই সংগঠনটি পুরো বিশ্বব্যাপী বিশেষত দরিদ্র দেশগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য কিংবা ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার কমানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। সুতরাং আপনি আসলে বলছেন: “ঠিক আছে। চলো প্রচুর মানুষকে হত্যা করি! কারণ তাতে হয়তো আমার নির্বাচনী প্রত্যাশা পূরণ হবে!”
করোনা ভাইরাসের হুমকি ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার পর ট্রাম্প সংকট সামাল দেওয়া ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। যদিও তিনি তার পূর্বের ত্রুটিপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বেমালুম ভুলে গেলেন।
“আপনাকে ট্রাম্পের প্রশংসা করতেই হবে। তিনি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী মানুষ। পি.টি. বারনামকে তিনি আনাড়ি প্রতিপন্ন করেছেন। তিনি একহাতে একটি ব্যানারে লিখিত “আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমার রক্ষাকর্তা। আমার উপর আস্থা রাখ। আমি তোমার জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি।” ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে আপনার পেছনে ছুরিকাঘাত করার সামর্থ্য রাখেন। এভাবেই তিনি তার সমর্থকদের সাথে বোঝাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। সে সকল সমর্থক, তিনি যা-ই করুন না কেন, যারা কিনা তাকে মাথায় তুলে রাখে। বিষয়টি মর্মান্তিক। তিনি এই কাজে দারুণ আগ্রহ জাগানিয়া একটি গণমাধ্যম প্রপঞ্চের সাহায্য পাচ্ছেন। রিপাবলিকানরা শুধু গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফক্স নিউজ, রাশ লিমবঘ এবং ব্রেইটবার্ট অংশকেই গুরুত্ব দেয়।”
‘‘ট্রাম্প যা বলেন, তারা তারই প্রতিধ্বনি করে মাত্র। ট্রাম্প যদি বলেন, ‘এটা শুধুই একটা ফ্লু। একে এতো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’ তারাও বলবে, ‘ঠিক। এটা শুধুই একটা ফ্লু। একে এতো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’ পরের দিন তিনি বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ মহামারী। আমিই সর্বপ্রথম বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলাম।’ তারা সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠে বলবে, ‘তিনি হলেন ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ব্যক্তি। তার আবিষ্কার হলো এযাবৎকালের সবচেয়ে অপূর্ব আবিষ্কার।”
“এবং এভাবে দিনের পর দিন যায়। ইতিমধ্যে একদিন সকালে ট্রাম্প ফক্স নিউজ দেখে ঠিক করেন সেদিন তার কী বলা দরকার। এটি একটি বিষ্ময়কর প্রপঞ্চ: রুপার্ট মারডক, রাশ লিমবঘ এবং হোয়াইট হাউজের সাইকোপ্যাথটা মিলে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।”
এই মহামারির ফলে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের ধরণ পরিবর্তন হবে কিনা, এ প্রসঙ্গে চমস্কি বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর আসবে তরুণদের কাছে থেকে।
“ভবিষ্যদ্বাণী করার কোনো উপায় নেই। এটা নির্ভর করছে চলমান ঘটনাবলীর বিষয়ে গোটা পৃথিবীর মানুষ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তার উপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপক কর্তৃত্ববাদী এবং দমনমূলক রাষ্ট্রের উত্থান ঘটতে পারে। তাতে করে এই নব্য-উদারবাদী মহামারী বর্তমানের চেয়ে আরো বাজেভাবে ছড়িয়ে পড়বে। আসলে তারা এই মূহুর্তে এটা নিয়েই কাজ করছে। মনে রাখবেন, পুঁজিবাদী শ্রেণি কখনোই স্বীকার করবে না যে তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই মহামারীর মধ্যেও তারা জীবাশ্ম জ্বালানির উপর আরো বেশি বরাদ্দ চাইছে। ন্যূনতম সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় এমন সবগুলো শর্তকেই তারা অগ্রাহ্য করে যাচ্ছে।”
‘‘যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের অধীনে কয়লা উৎপাদকদের অধস্তন সহকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। গতকালকেই (২৪শে এপ্রিল) তারা কয়লা কারখানার আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে মার্কারি এবং অন্যান্য পরিবেশ দূষণকারী পদার্থের উৎপাদনের ব্যাপারে যে বিধি-নিষেধ ছিল তা বাতিল করেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘চলুন, আরো কিছু আমেরিকান শিশু হত্যা করি এবং পরিবেশ ধ্বংস করি। কারণ তাতে করে আপনি কয়লা কোম্পানিগুলোর জন্য আরো বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারবেন।’ তারা প্রতিনিয়তই এই কাজ করে যাচ্ছে। প্রত্যেকদিন তাদের কাজের কোনো বিশ্রাম নেই। এর বিরুদ্ধে যদি কেউ নাও দাঁড়ায়, তাহলে স্বয়ং পৃথিবীই সে ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।’’
কোভিড-১৯ এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করতে গিয়ে চমস্কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সংহতির অভাবকে দোষারোপ করেছেন।
“আপনি খেয়াল করলে দেখবেন আন্তর্জাতিকভাবে যা ঘটছে, তা খুবই আতঙ্কজনক।’’
“জার্মানি এই সংকটকে ভালোভাবে সামাল দিচ্ছে। তাদের হাসপাতালগুলোর অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা ছিল। তাদের অতিরিক্ত রোগনির্ণয় ক্ষমতাও ছিল। তাছাড়া নব্য-উদারবাদী নীতিও তারা কঠোরভাবে অনুসরণ করেনি।’
‘‘ইতালিতে এই মহামারী মারাত্মকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। তারা কি জার্মানির কাছে থেকে কোনো সাহায্য পাচ্ছে? সৌভাগ্যবশত তারা সাহায্য পাচ্ছে আটলান্টিকের অপরদিকের ‘পরাশক্তি’ কিউবা থেকে। কিউবা ইতালিতে ডাক্তার পাঠাচ্ছে, চীন পাঠাচ্ছে প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী। তাতে করে তারা অন্তত কিছু সাহায্য পাচ্ছে এবং তা-ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো ধনী দেশ থেকে নয়। এই বিষয়টি আপনাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার যোগান দেবে।”
“কিউবা-ই হলো একমাত্র দেশ যারা কিনা এই মূহুর্তে খাঁটি আন্তর্জাতিকতাবাদ দেখাচ্ছে। এটিই প্রথমবারের মতো নয় যদিও। বিষয়টি আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে। কিউবা গত ৬০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুষ্ট আক্রমণের শিকার হয়ে আসছে। তাদের অর্থনীতির বিকাশ রুদ্ধ হয়ে আছে। দীর্ঘমেয়াদী সন্ত্রাসবাদে জরাজীর্ণ হয়ে আছে তারা। তারপরেও কোনো দিক দিয়ে তারা অলৌকিকভাবে টিকে গেছে এবং পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত দেখাচ্ছে আন্তর্জাতিকতাবাদ কী বস্তু।”
“কিন্তু আপনি যুক্তরাষ্ট্রে এই বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। এখানে আপনি কিউবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কথা বলতে পারবেন। যেটা সত্যিই ঘটেছিল কিউবার দক্ষিণ-পূর্বে গুয়ান্তানামো নামক অঞ্চলে, যা কিনা এই গোলার্ধের সবচেয়ে গুরুতর মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র বন্দুকের নল ঠেকিয়ে কিউবার নিকট থেকে সেটি ছিনতাই করেছিল এবং এখন পর্যন্ত তা ফেরত দেয়নি। কিন্তু এই বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।”
“যুক্তরাষ্ট্রের ভদ্র এবং অনুগত মানুষেরা অন্য কথা বলবে। আপনি চীনকে দোষারোপ করবেন। ‘হলুদ আতঙ্ক‘ জাগিয়ে তুলবেন। আমেরিকার ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখবেন,চীনারা আমাদেরকে ধ্বংস করতে আসছে। ঊনিশ শতকের ফিরে গেলে দেখবেন,আপনি এই হলুদ ভীতি যে-কোনো সময়ে জাগিয়ে তুলতে পারছেন।”
“প্রগতিশীল আন্তর্জাতিকতাবাদের একটি ডাক এসেছে। এর ডাক দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্স, ইউরোপে ইয়ানিস ভারোফাকিস। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে প্রগতিশীল উপাদানগুলোকে একত্র করার প্রচেষ্টা চলছে। একে হোয়াইট হাউজে নির্মিত প্রতিক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।”
চমস্কির মতে, ট্রাম্প প্রশাসন “চরম প্রতিক্রিয়াশীল বর্বর রাষ্ট্রগুলো” কে এক জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে আছে উপসাগরের তেলবণিক রাজারা, আল-সিসির মিসর, মোদীর ভারত, ডানপন্থী নেতৃত্বাধীন ইসরায়েল, ভিক্টর ওরবানের হাঙ্গেরি এবং আরো অনেকে।
“দিগন্তে একমাত্র সুষ্পষ্ট এবং সত্যিকারের আশার আলো হিসেবে আমি দেখতে পাচ্ছি বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল আন্তঃর্জাতিকতাবাদের উত্থানকে। স্যান্ডার্সের প্রচারণাকে ব্যর্থ বলে মনে করা হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। তার প্রচেষ্টা ব্যাপক এবং অবিশ্বাস্য রকমের সফলতা অর্জন করেছে। আলোচনা এবং নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রটিকে স্যান্ডার্স খুব ভেতর থেকে পরিবর্তন করে ফেলেছেন। কয়েক বছর আগেও যে বিষয়গুলো অপাংক্তেয় ছিল,সেগুলো বর্তমানে নীতি-নির্ধারণী আলাপে কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নতুন সবুজ চুক্তির মতো এটিও আমাদের টিকে থাকার জন্য জরুরী।”
আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ সূত্র: চাইনা ডেইলি
শ্রম প্রক্রিয়া এবং উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন-প্রক্রিয়া
ব্যবহার মূল্য সৃষ্টি বা একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের জন্যই পুঁজিপতি শ্রমশক্তি ক্রয় করে। শ্রমশক্তি সক্রিয় হয় শ্রমদানকারীর মাধ্যমে। নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থায় এর রূপ ভিন্ন ভিন্ন হয়। মার্কস সামাজিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে প্রথমে আলাদা করে শ্রম প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন। পরে নির্দিষ্টভাবে তাকে শনাক্ত করেছেন পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভেতর। মার্কস বলছেন, শ্রম হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়ই অংশগ্রহণ করে। আর মানুষই তার ও প্রকৃতির মধ্যেকার এই সম্পর্ক শুরু করে, নির্ধারণ করে এবং যাবতীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ তার হাত পা মস্তিষ্কসহ নিজের সকল প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৃতি থেকে দ্রব্যাদি আহরণের জন্য। তার ফলে তার বহিঃস্থ দুনিয়ার উপর ক্রিয়া করে মানুষ যেমন তাকে পরিবর্তিত করে, তেমনি একই প্রক্রিয়ায় সে নিজের প্রকৃতিকেও পরিবর্তিত করে। যখন আমরা স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হিসেবে শ্রমকে বিবেচনা করি তখন মানুষের শ্রম আর অন্য যে কোন প্রাণীর শ্রমের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। মার্কস আরও বলছেন, একটা মাকড়সা যেভাবে কাজ করে তার সাথে একজন তাঁতীর কাজের সাদৃশ্য আছে। মৌমাছি যেভাবে চাকের ক্ষুদ্র কোষগুলো তৈরী করে তা একজন স্থপতিকেও লজ্জায় ফেলে দিতে পারে। কিন্তু যা একটি দক্ষ মৌমাছির সাথে একজন অদক্ষ স্থপতিরও পার্থক্য তৈরি করে তা হল, একজন স্থপতি বাস্তবে তার নির্মাণের বহু আগেই কল্পনায় তার সৃষ্টি নির্মাণ করে। প্রতিটি শ্রম প্রক্রিয়ার শেষে আমরা এমন একটি ফল পাই যা শ্রমদানকারীর কল্পনায় আগেই তৈরী হয়েছে। সে শুধু যা নিয়ে কাজ করে সেই বস্তুর রূপ পরিবর্তন করে তাই নয়, সে একটা নিয়মের অধীনেও নিজের ইচ্ছাকে স্থাপন করে। কাজের প্রকৃতির প্রতি তার আগ্রহ যত বেশি থাকে তত তার মনোযোগদান ঘটে থাকে এবং তত সে আনন্দবোধ করে এবং তা তার শারীরিক মানসিক ক্ষমতা প্রয়োগে কম চাপ সৃষ্টি করে। শ্রম প্রক্রিয়ার প্রাথমিক উপাদান হল তিনটি:
১. মানুষের ব্যক্তিগত সক্রিয়তা বা কাজ,
২. এই কাজের বিষয়, এবং
৩. এই কাজ করবার হাতিয়ারসমূহ।
মাটি পানিসহ প্রকৃতি টিকে থাকে মানুষের অস্তিত্বনিরপেক্ষভাবে এবং মানুষকে তার প্রয়োজনীয় টিকে থাকার সামগ্রী যোগান দেয়। এই প্রকৃতি মানুষের শ্রমপ্রয়োগের বিশ্বজনীন ক্ষেত্র। মানুষ তার নিকটতম প্রাকৃতিক জগত থেকে নিজের শ্রম দিয়ে অনেক প্রয়োজনীয় দ্রব্যই আহরণ করে। পানি, কাঠ, মাছ, ফল, লোহা সবই এর মধ্যে পড়ে। অনেক দ্রব্য আছে যেগুলো আগের শ্রম দিয়ে প্রস্তুত কিন্তু এখন আবার নতুন শ্রমের ক্ষেত্র; এরকম দ্রব্যকেই আমরা বলি কাঁচামাল। সব কাঁচামালই শ্রমের ক্ষেত্র, কিন্তু সব শ্রমের ক্ষেত্রই কাঁচামাল নয়। শ্রমের হাতিয়ার একটি দ্রব্য বা দ্রব্যসমষ্টি যা শ্রমিক তার এবং শ্রমের ক্ষেত্রের মধ্যে যোগাযোগে ব্যবহার করে।
আর্টওয়ার্ক: এনসিয়েন্ট সূত্র: ভাস্কো
মানুষ যখন প্রকৃতি থেকে কোনকিছু আহরণ করে তখন সে তার শরীরেরই কোন না কোন অঙ্গ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তার ফলে শ্রমিক প্রথম যার মালিকানা লাভ করে তা শ্রমের ক্ষেত্র নয়, বরং শ্রমের হাতিয়ার। মানুষের সক্রিয়তার একটি অঙ্গ তাই হয়ে ওঠে প্রকৃতি, যা মানুষ নিজের শরীরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য করে ফেলে। এই পৃথিবী যেমন মানুষের আদি খাদ্যভাণ্ডার, তেমনি এটিই তার আদি গৃহ। এটি আবার তাকে ছোঁড়ার জন্য, গুঁড়া করবার জন্য, কাটা বা চাপ দেবার জন্য পাথর যোগান দেয়। সেজন্য প্রাচীন গুহায় আমরা পাথরের অনেক হাতিয়ার বা অস্ত্র পাই। সব মিলিয়ে পৃথিবী নিজেই শ্রমের একটি হাতিয়ারও। আবার যখন কৃষিকাজ হয় তখন মানুষের কাজে অনেক নতুন ধরনের হাতিয়ার যুক্ত হয় এবং শ্রমেরও তুলনামূলকভাবে অনেক উন্নয়ন ঘটে। সেকারণে মানুষের ইতিহাসের আদিপর্বে বিশেষভাবে নির্মিত পাথর, কাঠ, হাড় ছাড়াও শ্রমের হাতিয়ার হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে গৃহপালিত পশুও। শ্রমের হাতিয়ারের সহযোগে মানুষের সক্রিয়তা বস্তুর রূপান্তর ঘটায় শ্রম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। উৎপাদিত নতুন দ্রব্যের মধ্যে এই প্রক্রিয়ার অবসান ঘটে, দ্রব্যটি আবির্ভূত হয় ব্যবহার মূল্য হিসেবে। এর মধ্যে দিয়ে প্রকৃতির বস্তু রূপান্তরিত হয়ে মানুষের ব্যবহার উপযোগী দ্রব্যে পরিণত হয়। শ্রম তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়, শ্রম দ্রব্যায়িত হয়, আর আগের দ্রব্য রূপান্তরিত হয়। যে শ্রম একটি গতিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে সেটি নির্দিষ্ট গুণ নিয়ে একটি দ্রব্যে স্থিত হয়। মার্কস বলছেন, শ্রমের হাতিয়ার ও শ্রমের ক্ষেত্র দুটোই উৎপাদনের উপকরণ। আর এখানে শ্রম উৎপাদনশীল শ্রম। যদিও ব্যবহার মূল্য শ্রম প্রক্রিয়ারই ফসল, কিন্তু এর মধ্যে উৎপাদন উপকরণ হিসেবে কাজ করে পূর্বতন শ্রমের ফসল, অন্য কোন ব্যবহার মূল্য। একই ব্যবহার মূল্য একদিকে যেমন পূর্বের শ্রমের ফসল অন্যদিকে তেমনি পরবর্তী প্রক্রিয়ায় এটি উৎপাদন উপকরণ। উৎপাদিত দ্রব্য তাই শুধু ফলাফল নয়, শ্রমের একটি প্রয়োজনীয় শর্তও। শুধুমাত্র খনি, শিকার, মাছ ধরা এবং আদি পর্যায়ের কৃষি ছাড়া অন্যসব শিল্পই আগের শ্রমে উৎপাদিত কাঁচামাল পরিবর্তনের কাজ করে। কৃষিক্ষেত্রে বীজও তাই। এমনকি পশু ও অনেক গাছপালা, ফল যেগুলো প্রকৃতিরই সম্পদ সেগুলোর অনেককিছুর বর্তমান রূপ ঠিক কিছু আগের শ্রমের ফসল না হলেও দীর্ঘদিনে মানুষের শ্রমে তদারকিতে ধীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এই পর্যায়ে এসেছে। প্রত্যেক দ্রব্যের মধ্যেই একইসঙ্গে অনেকগুলো গুণ থাকে। একই দ্রব্য বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগতে পারে। যেমন একই শস্য বিভিন্ন জায়গা, যেমন শস্য ভাঙানোর কল, রুটি কারখানা, পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক একেক জায়গায় একেক উদ্দেশ্যে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গরু মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় গরু হচ্ছে কাঁচামাল আবার একই গরু গোবর উৎপাদনের হাতিয়ার। আঙুর এমন এক ফল যা আহরণের সঙ্গে সঙ্গে ভোগ করা সম্ভব আবার একই সঙ্গে এটি ওয়াইন বানানোর ক্ষেত্রে একটি কাঁচামাল। কাজেই কোন একটি ব্যবহার মূল্য কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগবে নাকি শ্রমের উপকরণ হিসেবে কাজে লাগবে নাকি উৎপাদিত দ্রব্য হিসেবে কাজে লাগবে তা বস্তুত নির্ভর করে শ্রম প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকার উপর, এর অবস্থানের উপর। শ্রমপ্রক্রিয়া যখন পুঁজিপতির দখলে আসে তখন তার দুটো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, শ্রমিক কাজ করে পুঁজিপতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, যার দখলেই তার শ্রম। দ্বিতীয়ত, তার শ্রমে উৎপাদিত দ্রব্যের মালিকও পুঁজিপতি। শ্রম প্রক্রিয়া ক্রয়ের মাধ্যমে পুঁজিপতি যা করে, তা হলো জীবন্ত শ্রমকে সে যুক্ত করে উৎপাদিত দ্রব্যের প্রাণহীন উপাদানের সঙ্গে। তার দিক থেকে শ্রম প্রক্রিয়া কিনে-নেওয়া একটি পণ্য অর্থাৎ শ্রমশক্তি ভোগ ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু উৎপাদনের উপায় যোগান না-দেয়া পর্যন্ত এই শ্রমশক্তি ভোগ কোন কাজে লাগবে না। ক্রয়কৃত বিভিন্ন দ্রব্যের মধ্যে শ্রম প্রক্রিয়াও একটি প্রক্রিয়া যার মালিক পুঁজিপতি। সুতরাং উৎপাদিত দ্রব্যেরও মালিকও সে-ই।
জুতা বা কাপড় যাই হোক, পুঁজিপতি দখলকৃত দ্রব্যটি একটি ব্যবহার মূল্য। যদিও এসব উৎপাদন প্রগতির লক্ষণ এবং পুঁজিপতি ‘প্রগতিবাদী’ হিসেবেই পরিচিত, তারপরও পুঁজিপতি নিছক ব্যবহার মূল্য উৎপাদনের জন্যই উৎপাদন করে না। তারা এই ব্যবহার মূল্য উৎপাদনে ততক্ষণ রাজি থাকে যতক্ষণ তা বিনিময় মূল্যের আধার হিসেবে কাজ করে।১ পুঁজিপতির দিক থেকে দুটো লক্ষ্য থাকে। এক. সে এমনকিছু উৎপাদন করতে চায় যার বিক্রয় মূল্য আছে অর্থাৎ যেটি একটি পণ্য। এবং দুই. সে এমন একটি পণ্য উৎপাদন করতে চায় যার মূল্য তার উৎপাদনে ব্যবহৃত উৎপাদনের উপায় ও শ্রমশক্তির মোট মূল্য থেকে অধিক হবে। মার্কস এখানে উৎপাদনকে মূল্যসৃজন প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে তৎকালীন সময়ে একটি সাধারণ ঐকমত্যের উল্লেখ করছেন। সেটি হল, প্রতিটি পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় এটি উৎপাদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় শ্রমসময়ে ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণ দিয়ে।২ মার্কস উদাহরণ হিসেবে তুলা থেকে সুতা উৎপাদনে শ্রম প্রক্রিয়া ও মূল্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বলছেন, সুতার উৎপাদনে কতটা শ্রম যুক্ত হচ্ছে তা নির্দিষ্ট করতে গেলে এর কাঁচামাল তুলার উৎপাদনে কতটা শ্রম কাজ করেছে সেটাও হিসাব করতে হবে। যে টাকু সুতা বানানোর যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেটি উৎপাদনে যে শ্রমসময় লেগেছে সেটাও একই কারণে বিবেচনায় আনতে হবে। শ্রমিক যখন কাজ করে তখন তার শ্রম অবিরাম একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যায়: ক্রমে তা গতি থেকে গতিহীন একটি বস্তুতে পরিণত হয়। সক্রিয় শ্রম থেকে এটি পরিণত হয় উৎপাদিত দ্রব্যে। একঘণ্টা সুতাবোনার পর একঘন্টার সেই শ্রম সুতার মধ্যে যুক্ত হয়। একঘণ্টার এই শ্রম সব সামাজিক ও প্রযুক্তিগত অবস্থায় এক হয় না। তুলা থেকে সুতা উৎপাদনের প্রতিটি পর্ব ব্যাখ্যা করে মার্কস দেখাচ্ছেন, যদি অন্যসব উপাদানের মতো শ্রমের মূল্যও পুরোপুরি পরিশোধ করা হয় তাহলে পুঁজিপতি হতাশ হয়ে আবিষ্কার করতে পারে যে, সে যা বিনিয়োগ করেছে সেই টাকাই ফেরৎ আসছে। এর মধ্যে থেকে কোন উদ্বৃত্ত মূল্যই তৈরী হচ্ছে না।৩ পুঁজিপতি এখানে নিশ্চয়ই বলবে, ‘কেন তাহলে আমি এই টাকা বিনিয়োগ করলাম। আমি তো আরও টাকা বানানোর জন্যই এই বিনিয়োগ করেছি। অন্যকোথাও বিনিয়োগ করলে তো আমার লাভ হতো। তা না করে আমি এই উৎপাদনশীল কাজে টাকা খাটিয়েছি। সুতা বানিয়েছি। এই সুতা তো আমার কোন কাজে লাগবে না। আমি তো বিক্রির জন্যই এগুলো বানিয়েছি।’ মূল্যসৃজনে বা দ্রব্যউৎপাদনে শ্রমের ভূমিকা সম্পর্কে পুঁজিপতি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলবে, ‘খালি হাত আর পা দিয়ে শ্রমিক কি শূন্যের উপর কোনোকিছু তৈরী করতে পারে? তাকে কি আমি সব সরঞ্জাম আর প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যাদি যোগান দেই নি যার কারণে সে তার শ্রম দিতে পেরেছে? আমি কি সমাজকে আমার উৎপাদনের যন্ত্রপাতি, আমার সুতা আমার টাকু দিয়ে অপরিমেয় সেবা দেইনি? শুধু সমাজকে নয়, সেই সাথে শ্রমিককে কি আমি তার জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যোগান দেইনি? আর আমার এতসব সেবার বিনিময়ে আমার জন্য কি কিছুই থাকবে না? কিছুই পাবো না আমি?’৪ তার সহযোগীদের কাজও ভুলে গিয়ে পুঁজিপতি আরও বলবে, ‘আমি নিজে কি এত কাজ করিনি? আমি কি সব কাজ দেখাশোনা করিনি? এই কাজ কি মূল্য সৃষ্টি করে না?’ শ্রমের মূল্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্কস বলছেন, ধরে নেই, একদিনের শ্রমশক্তির দাম ৩ শিলিং। শ্রমশক্তির উৎপাদনে প্রয়োজনীয় টিকে থাকার সামগ্রী সংগ্রহের জন্য সেই পরিমাণ অর্থ লাগে। অর্ধেকদিনের শ্রমই এই পরিমাণ শ্রমশক্তি তৈরি করে। কিন্তু সেই শ্রমশক্তির মধ্যে যুক্ত পুরনো শ্রম আর বর্তমানে ক্রিয়ারত শ্রম হিসাব করলে আমরা দেখবো টিকে থাকার সামগ্রী আর শ্রমের চলতি খরচ সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটি শ্রমশক্তির বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করছে, আর দ্বিতীয়টি নির্ধারণ করছে তার ব্যবহার মূল্য। শ্রমশক্তির মূল্য আর শ্রম প্রক্রিয়ায় এই শ্রমশক্তি যে মূল্য তৈরি করে এই দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিমাপ। এবং শ্রমশক্তি ক্রয়ের সময় এই দুইএর পার্থক্যকেই পুঁজিপতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। যা তাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে তা হল এই পণ্যের নির্দিষ্ট ব্যবহার মূল্য যা শুধু মূল্যের উৎস নয়, তা একইসঙ্গে তার চাইতে অধিক মূল্য সৃষ্টিরও উৎস। শ্রমশক্তির কাছ থেকে পুঁজিপতি আশা করে এই বিশেষ সেবা এবং এই লেনদেনে সে পণ্য বিনিময়ের ‘শাশ্বত বিধি’ অনুযায়ীই কাজ করে। শ্রমশক্তির বিক্রেতা অন্য যে কোন পণ্যবিক্রেতার মতোই সাধারণভাবে তার শ্রমশক্তির বিনিময় মূল্য আর এর আংশিক ব্যবহার মূল্য উশুল করে। ডিলারের কাছে তেল বিক্রি করে দেবার পর যেমন তেলের কোন ব্যবহার মূল্য আর সেই তেলবিক্রেতার থাকে না, তেমনি বিক্রি করে দেবার পর শ্রমিকের কাছে শ্রমশক্তির, অন্যকথায় শ্রমের কোন ব্যবহার মূল্য থাকে না। টাকার মালিক একদিনের শ্রমশক্তির মূল্য পরিশোধ করেছে অর্থাৎ একদিনের শ্রমের মালিকানা তার। পরিস্থিতি তখন এরকম দাঁড়ায় যে, অর্ধেকদিনের শ্রমের মূল্য দিয়ে একদিনের শ্রমশক্তির টিকে থাকার খরচ উঠে যায়, কিন্তু সেই শ্রমশক্তি দিনভরই কাজ করে যায়। তারফলে একদিনে তা যে-মূল্য সৃষ্টি করে, তা পুঁজিপতি যে-মূল্য পরিশোধ করে তার দ্বিগুণ। এটি ক্রেতার জন্য নিশ্চয়ই খুব সুবিধাজনক অবস্থা। মার্কস উদাহরণ দিয়ে দেখাচ্ছেন মোট উৎপাদন ব্যয় যখন ২৭ শিলিং তখন তা সৃষ্টি করছে ৩০ শিলিং মূল্য। এর মধ্যে দিয়ে ৩ শিলিং বাড়তি বা উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরী হচ্ছে। এভাবেই টাকা রূপান্তরিত হচ্ছে পুঁজিতে। এখানে বিনিময়ের কোন শর্তই ভঙ্গ করা হয়নি। বিনিময় হয়েছে সমানুপাতেই। ক্রেতা হিসেবে পুঁজিপতি সবগুলো পণ্যেরই মূল্য পরিশোধ করেছে। তুলা, টাকু এবং শ্রমশক্তি সব কিছুরই। তারপর অন্য ভোক্তারা যা করে সে তাই করেছে, এসব পণ্যের ব্যবহার মূল্য ভোগ করেছে। পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমশক্তির ভোগ উৎপন্ন করেছে ২০ পাউন্ড সুতা, যার মূল্য ৩০ শিলিং। আগে যে পণ্যের ক্রেতা ছিলো সেই পুঁজিপতি এখন বাজারে হাজির হয়েছে পণ্য বিক্রেতা রূপে, সুতা বিক্রি করছে প্রতি পাউন্ড ১৮ পেন্স দরে, এর মধ্যে দিয়ে আগে যা ব্যয় করেছে তার থেকে অতিরিক্ত ৩ শিলিং তুলে নিচ্ছে। টাকা থেকে পুঁজির এই রূপান্তর বা মেটামরফসিস একইসঙ্গে সঞ্চালন স্তর ও তার বাইরে ঘটে থাকে। সঞ্চালন স্তরে ঘটে, কারণ বাজারে শ্রমশক্তি ক্রয়ের মধ্য দিয়েই তা সূচিত হয় আর এর বাইরে ঘটে কারণ উদ্বৃত্ত মূল্যসৃজন আসলে ঘটে থাকে উৎপাদন পর্যায়েই। অতীতের শ্রমকে মৃতশ্রম আখ্যায়িত করে মার্কস বলছেন, এর সঙ্গে জীবন্ত শ্রমকে যুক্ত করে পুঁজিপতি তার টাকাকে পণ্যে রূপান্তর করে এবং এই প্রক্রিয়ায় তার টাকা পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি হয় অধিক মূল্য, একটি দানব যা খুবই উপযোগী এবং যা অবিরাম মূল্য বর্ধন করে চলে গুণিতক হারে। তিনি বলছেন, আমরা যদি মূল্য উৎপাদন ও উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি এই দুটো প্রক্রিয়াকে তুলনা করি তাহলে দেখবো দ্বিতীয়টি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর পর প্রথমটির ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। একদিকে বিবেচনা করলে শ্রম প্রক্রিয়া ও মূল্যসৃষ্টি প্রক্রিয়ার ঐক্যের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া, অন্যদিকে শ্রম প্রক্রিয়া ও উদ্বৃত্ত মূল্যসৃষ্টি প্রক্রিয়ার ঐক্যের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয় পণ্যের পুঁজিবাদী উৎপাদন অথবা পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া।
আর্টওয়ার্ক: মিউনিশন ফ্যাক্টরি সূত্র: আলামি
অপরিবর্তনীয় পুঁজি এবং পরিবর্তনীয় পুঁজি
শ্রম প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উপাদান উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য গঠনে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। এই উৎপাদনের উপায়ের মূল্য অপরিবর্তিতভাবে থাকে এবং তা উৎপাদিত নতুন পণ্যের মূল্যের একটি অংশ গঠন করে। আগের আলোচনার সূত্র ধরে বলা যায়, তুলা ও টাকুর মূল্য সুতার মূল্যের মধ্যে পুনরায় আবির্ভূত হয়। এই স্থানান্তর ঘটে এই উপায়গুলোর একটি দ্রব্যে রূপান্তরের মধ্যে, অন্য কথায় শ্রম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আর এটি নিয়ে আসে শ্রমই। কিন্তু কীভাবে? দুটো কাজ অর্থাৎ উৎপাদনের উপায়ের মূল্য রক্ষা করা ও নতুন মূল্য যোগ করা, শ্রমিক একইসঙ্গে করে না। বস্তুত নতুন মূল্য যোগ করেই সে ঐগুলোর পুরনো মূল্য রক্ষা করে। এই এক কাজের মধ্য দিয়েই দুটো কাজ হয়। প্রতিটি ব্যবহার মূল্য অদৃশ্য হয়ে যায় শুধুমাত্র নতুন রূপে নতুন ব্যবহার মূল্য হিসেবে আবির্ভূত হবার জন্য। বিশেষ ধরনের শ্রম বা উৎপাদনশীল শ্রমের স্পর্শেই মৃত উৎপাদনের উপায় হয়ে ওঠে শ্রম প্রক্রিয়ার জীবন্ত অংশ এবং একসঙ্গে মিলে তা নতুন দ্রব্য উৎপাদন করে।মার্কস এই পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন উদাহরণসহ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, উৎপাদনের উপায়সমূহ কখনোই শ্রম প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে যতটা তার নিজের ব্যবহার মূল্য হারায়, তার থেকে বেশি মূল্য নতুন দ্রব্যে যোগ করে না। এরকম কোন উৎপাদনের উপায় যদি দেখা যায় যা মানুষের শ্রম থেকে উৎপাদিত নয়, যার মূল্য হারাবার কিছু নেই, যেমন প্রকৃতি প্রদত্ত মাটি, বাতাস, পানি বা ধাতব দ্রব্য তাহলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এগুলো কোন মূল্য স্থানান্তর করবে না। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোন কোন উৎপাদন উপায় পুরোটাই যুক্ত হয়, কোন কোনটির যুক্ত হয় এক ভগ্নাংশ। যেমন কোন যন্ত্র যখন ব্যবহৃত হয় তার মেয়াদ যদি হয় ১০০০ দিন তাহলে প্রতিদিন তার ১০০০ ভাগের ১ ভাগ মূল্য যুক্ত হবে নতুন উৎপাদিত দ্রব্যের সাথে। এখানে মার্কস আবার এটাও উল্লেখ করেছেন যে, ঐ যন্ত্রটি যখন আবার মেরামত হবে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পর্যায় তৈরি হবে যেখানে যন্ত্রটি মোটেই তখন উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে না, শ্রম তখন তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না, বরং তার উপর প্রযুক্ত হচ্ছে। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় এই শ্রম তার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের সঙ্গে হিসাব করে তার মূল্য পরিমাপ করবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যখন উৎপাদনশীল শ্রম উৎপাদনের উপায়কে পরিবর্তিত করে একটি নতুন দ্রব্যের উপাদানে পরিণত করছে তখন এগুলোর মূল্যেরও ঘটছে নতুন দেহে নতুন জীবনপ্রাপ্তি। মার্কস যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটি হল, মেটেমসাইকোসিস অর্থাৎ মৃত্যুর পর জীবাত্মার দেহান্তরপ্রাপ্তি। মূল্যের ক্ষেত্রেও ঘটছে তাই। এটি পুরনো শরীর ছেড়ে তখন নতুন শরীরে ভর করে। এতসব ঘটনা ঘটে, কিন্তু শ্রমিকের ক্ষেত্রে তার রূপ হয় ভিন্ন। শ্রমিক নিজের পুরনো শরীর রক্ষা না করে, পুরনো মূল্য রক্ষা না করে নতুন শ্রম বা নতুন মূল্য যোগ করতে পারে না। সুতরাং জীবন্ত শ্রমের এই বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ একইসঙ্গে পুরনো মূল্য রক্ষা আবার নতুন মূল্য সৃষ্টি, এটি প্রকৃতি প্রদত্ত। এর জন্য শ্রমিককে বাড়তি কোন খরচ করতে হয় না, কিন্তু তা পুঁজিপতির জন্য খুবই সুবিধাজনক। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবসাবাণিজ্য ঠিক থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লাভ সংগ্রহে ব্যস্ত পুঁজিপতির জীবন্ত শ্রমের এই ভূমিকা বা গুরুত্ব খেয়াল করবার দরকার হয় না, দরকার হয় যখন কোন সংকটে পতিত হয়ে শ্রম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় তখনই। একদিকে উৎপাদনের উপায়, অন্যদিকে শ্রমশক্তি এই দুটো বস্তুত ভিন্ন দুই জগত। পুঁজির আদিরূপ শ্রম প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পুঁজিতে রূপান্তরিত হবার ধারায় এই দুটোকে সমন্বিত করে। পুঁজির সেই অংশকে মার্কস অপরিবর্তনীয় পুঁজি বলছেন, যাকে প্রতিনিধিত্ব করে-উৎপাদনের উপায়, কাঁচামাল অর্থাৎ যেগুলো শ্রমের উপায় বা সহযোগী দ্রব্যাদি। এগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে মূল্যের কোন পরিমাণগত পরিবর্তন করে না। সেজন্য মার্কস এটাকে বলছেন পুঁজির অপরিবর্তনীয় অংশ বা সংক্ষেপে অপরিবর্তনীয় পুঁজি। অন্যদিকে পুঁজির যে-অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে শ্রমশক্তি, তা উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে গিয়ে মূল্যের পরিবর্তন ঘটায়। এটি একইসঙ্গে নিজ মূল্যের সমতুল্য সৃষ্টি করে, আবার অতিরিক্ত মূল্য বা উদ্বৃত্ত মূল্যও যোগ করে। যা পরিস্থিতি অনুযায়ী উঠানামা করতে পারে। পুঁজির এই অংশ অবিরাম অপরিবর্তনীয় থেকে পরিবর্তনীয় পরিমাণের দিকে যেতে থাকে। সেজন্য মার্কস এটাকে বলছেন পুঁজির পরিবর্তনীয় অংশ বা সংক্ষেপে পরিবর্তনীয় পুঁজি। অন্যদিকে পুঁজির এই দুটো অংশ ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকেও দেখেছেন মার্কস। বলছেন, শ্রম প্রক্রিয়ার দিক থেকে দেখলে উৎপাদনের উপায় হল বস্তুগত আর শ্রমশক্তি হল আত্মগত। একই উপাদানগুলোকে আবার উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিক থেকে দেখলে পাওয়া যাবে যথাক্রমে অপরিবর্তনীয় ও পরিবর্তনীয় পুঁজি। যেকোন দ্রব্যের মতো তুলারও মূল্য নির্ধারিত হয় তার মধ্যে অন্তর্গত শ্রম দিয়ে, কিন্তু এই শ্রমের পরিমাণও নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট সামাজিক শর্ত দ্বারা। এখানে মার্কস ‘সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম’ ধারণা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমের অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। বলেছেন, কাঁচামালের মূল্য যদি পরিবর্তন হয়, যদি ব্যবহৃত যন্ত্রের কর্মক্ষমতা পরিবর্তিত হয় তাহলে উৎপাদিত দ্রব্যে তার অংশের মূল্যও পরিবর্তিত হবে। যদি নতুন কোন আবিষ্কারে নতুন কোন যন্ত্র কাজে লাগানো হয় তাহলে শ্রমের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কম খরচ হতে পারে। তাহলে উৎপাদিত দ্রব্যেও কম মূল্য স্থানান্তরিত হবে। কিন্তু এখানেও এ যন্ত্রের মূল্য পরিবর্তন ঘটেছে উৎপাদনের উপায় হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নয়, উৎপাদিত হতে গিয়ে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। এমন হতে পারে যে, আগে যে কাজ করতে দশজন লাগতো, একটি দামী যন্ত্র নিয়ে একজন তার থেকে বেশি উৎপাদন করতে পারছে। এক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় পুঁজির অর্থাৎ উৎপাদনের উপায়ে নিয়োজিত পুঁজির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে, আর সেই সাথে হ্রাস ঘটেছে পরিবর্তনীয় পুঁজির অর্থাৎ শ্রমশক্তিতে বিনিয়োজিত পুঁজির। যাই হোক, মার্কস বলছেন, এরকম একটি বিপ্লবী ঘটনা অপরিবর্তনীয় ও পরিবর্তনীয় পুঁজির পরিমাণগত সম্পর্কেরই কেবল পরিবর্তন ঘটিয়েছে বা মোট পুঁজির মধ্যে এগুলোর আপেক্ষিক বা আনুপাতিক পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু কোনভাবেই তা এইদুটোর আবশ্যিক পার্থক্যকে পরিবর্তন করে নি।
তথ্যসূত্র
১. মার্কস তৎকালীন সময়ে ইংরেজী ভাষায় শ্রমের দুধরনের ব্যবহার নির্দেশ করেছেন। সাধারণ শ্রম প্রক্রিয়া যা দিয়ে ব্যবহার মূল্য তৈরী হয় তাকে বলা হয় কাজ বা ওয়ার্ক; আর যে শ্রম প্রক্রিয়া বিনিময় মূল্য সৃষ্টি করে তাকে নির্দিষ্টভাবে বলা হয় শ্রম বা লেবার।
২. বলে রাখা দরকার যে, পরবর্র্তীতে উপযোগবাদীরা এর কঠোর বিরোধিতা করেন এবং তাদের দ্বারা মূল্যনির্ধারণে শ্রমের ভূমিকা পুরোপুরি অস্বীকৃত হয়।
৩. মার্কস এখানে ফিজিওক্র্যাটদের কথা উল্লেখ করে বলছেন, তাঁরাও কৃষি বাদে বাকি সব খাতে নিয়োজিত শ্রমকে অনুৎপাদনশীল বলেছেন কেননা সেগুলো তখন কোন উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরী করে নি।
৪. সমাজে সেবাদান প্রসঙ্গে মার্কস এখানে জার্মান ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথারের ১৫৪০ সালে লেখা ব্যঙ্গাত্মক কিছু বাক্য স্মরণ করেছেন। লুথার বলেছেন,‘এই সমাজে কতরকম সেবা (সার্ভিস) আমরা দেখি। একজন ঘোড়াচালক মহাসড়কে ডাকাতিতে সেবাদান করছে, রোমান পোপ আমাদের বিরাট উপকার করছে সবাইকে খুন না করে বা সবাইকে ডুবিয়ে বা পুড়িয়ে না মেরে জেলে পচার ব্যবস্থা করে। শয়তানও সমাজে কম সেবাদান করছে না।’