Blog

  • আদিত্য নিগাম।। করোনা জৈবরাজনীতি এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন

    আদিত্য নিগাম।। করোনা জৈবরাজনীতি এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    অনুবাদকের ভূমিকা: বাঙ্গালি বংশোদ্ভূত ইণ্ডিয়ান চিন্তক ও Centre for the Study of Developing Societies (CSDS) এর সম্মানিত ফেলো আদিত্য নিগাম গত ২৬ মার্চ, ২০২০ এ Kaflia.online এ Corona Biopolitcs and Life After Capitalism-A Manifesto of Hope (করোনা জৈব-রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার) শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধে তিনি বিশ্বপরিসরে করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক উঠেছে, সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করার মাধ্যমে পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজের সম্ভাব্য রূপরেখার ইঙ্গিত করার চেষ্টা করেছেন। ভারত, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বাস্তবতায় আদিত্য নিগামের প্রবন্ধটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

    আদিত্য নিগম

    আদিত্য নিগাম মূলত সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্বের বিউপনিবেশায়নে (decolonization) বিশেষভাবে আগ্রহী। এই প্রবন্ধেও আমরা দেখব তিনি পুঁজির ধারণার পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। পুঁজি বিশ্লেষণের সনাতনি ঐতিহাসিক ভ্রান্তিই যে বিগত শতকগুলোর সমস্ত সামাজিক বিপ্লবকে মহাদানবীয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রীয় গাড্ডায় নিক্ষেপ করেছে আদিত্য নিগাম তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

    পশ্চিমের বাস্তবতায় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জনবান্ধব প্রকল্পগুলোর দাবিকে পশ্চিমের বাইরের বিশাল দুনিয়ার (অরিয়েন্টালি ‘তৃতীয় বিশ্ব’) আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় পরখ করছেন এবং সঙ্গত প্রশ্ন তুলছেন।

    এই প্রবন্ধে তিনি একাধিকবার ফ্যাশন তাত্ত্বিক লি এডেলকুর্টের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। ‘ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডের একজন ইনসাইডার হিশেবে এডেলকুর্টের ‘slow life’ এর উপলব্ধি তাৎপর্যপুর্ণ তো বটেই! কিন্তু এই ‘slow life’ এর অর্থ কোনভাবেই প্রাচিন যুগে ফিরে যাওয়া কিংবা কৃচ্ছতাবাদী জীবনের বাসনা নয়। বরং, পণ্য ভোগের নামে ক্রমাগত পুঁজির ধর্ষণ ‘উপভোগ’ করার যে জীবন; যা মানুষকে পরিণত করে ভোক্তায়, সমাজকে পরিণত করে বাজারে, সেই নিওলিবারেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যক্তি ও সমাজের আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্রিয়তাই  এডেলকুর্ট কথিত ‘slow‘life’। জীবনানন্দ দাশ সেই কবেই লিখে গেছেন:

    আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাইনা;
    আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
    পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।

    জীবনানন্দ দাশের আকুতিকে ‘কবির ভাবালুতা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু এডেলকুর্টের মতো কর্পোরেট দুনিয়ার আইকনদের একই আকুতিকে অস্বীকার করাটা বোধহয় আর সহজ হবে না।

    করোনা মহামারির ফলে একটা ভিন্ন সমাজের বিমূর্ত স্বপ্ন আরো প্রবলভাবে মূর্ত হয়ে উঠছে বলে মনে করেন আদিত্য নিগাম। এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ইতিহাসচেতনা-চিন্তাচর্চা ও সক্রিয়তাই কেবল পারে পৃথিবীতে মানুষের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে।

    এই ধরনের ইতিহাস ও চিন্তা চর্চা পৃথিবীর উপর মানুষের সার্বভৌমত্ব /উপনিবেশ নাকচ করে দিয়ে মানুষকে বায়োলজিকাল/জিওলজিকাল এজেন্ট হিসেবে প্রপোজ করে। মানুষও আর দশটা স্পিসিসের মত স্পিসিস। অধীশ্বর নয়। মানুষের ইতিহাস মানে মানুষের ‘নায়ক’ হবার ইতিহাস না, অন্তত ‘recorded history’ যেভাবে দেখাতে চায়; বরং ‘deep history’ অনুযায়ী মানুষের ইতিহাস আসলে ‘জীবনের ইতিহাস’ এর অংশ, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি পরস্পরের সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা, দুই সম্পর্কেই আবদ্ধ। (দীপেশ / ২০১৬)

    এরকম একটা সামাজিক রূপান্তর সম্ভব বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রূপান্তরের মাধ্যমেই। আদিত্য নিগামের প্রকাশিতব্য দ্বিতীয় প্রবন্ধে তিনি পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন। আমরা সেই প্রবন্ধটিরও অনুবাদ হাজির করার চেষ্টা করব।

    করোনা জৈব-রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার

    মনে হচ্ছে যেন আমরা ব্যাপকভাবে ভোগের কোয়ারেন্টিনে ঢুকে পড়েছি যেখানে জীবনকে সুন্দর করার জন্য আমরা খুব অল্পেই তুষ্ট থাকব— একটি অতি সাধারণ জামা, নিজেদের পুরোনো পছন্দের বিষয়গুলো পুনরায় আবিষ্কার করা, বিস্মৃত কোন বই পড়া এবং তুমুল আড্ডাবাজিতে লিপ্ত হওয়া। একটা বিকল্প ও গভীরভাবে ভিন্ন দুনিয়া গড়ে তুলতে ভাইরাসের প্রভাব হবে সাংস্কৃতিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

    – লি এডেলকুর্ট, ট্রেন্ডফোর কাস্টার এবং ফ্যাশন উপদেষ্টা 

    যখন বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলের মানুষ লকডাউনের পাঁকচক্রে পড়ে বিশ শতকের গোড়ার দিককার স্প্যানিশ ফ্লু, এমনকি চতুর্দশ শতাব্দীর প্লেগের স্মৃতি স্মরণ করছে; আমার চিন্তাভাবনা তখন আসলে অন্যখাতে প্রবাহিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিমান চলাচল সর্বনিম্নতম পর্যায়ে নেমে যাওয়ার সাথে সাথে, স্পষ্টতই ব্যয়বহুল খরচাদি বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাস্তাগুলোতে লক্ষ লক্ষ গাড়ি এবং নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় আমি আচমকাই এক অতিসাধারণ চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম: এরকম একটা লকডাউন জনগোষ্ঠীর সবচাইতে দরিদ্র অংশের জন্য আবশ্যিকভাবে যে দুঃখকষ্ট বয়ে আনে, তার দুর্ভোগের মেঘের আড়ালে সম্ভাবনার সূর্য উঁকিও দিতে পারে। আমরা যখন এই সংকটটি কাটিয়ে উঠব, খুব সম্ভবত তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি নেমে আসবে এবং এর চেয়েও বেশি যা হতে পারে, সম্ভবত পৃথিবীতে অস্তিত্বের এক ভিন্ন রূপের সূচনা হতে পারে। এটি বিশ্বকে সেটাই দেখার সুযোগ করে দিতে পারে যা এ যাবৎকাল জলবায়ু সংকট অস্বীকারকারীরা প্রত্যাখান করে এসেছিল (নাওমি ক্লেইন যেমনটি দেখিয়েছেন, জলবায়ুকে অস্বীকার করার এই রাজনীতি মার্কিন ডানপন্থি ফাউন্ডেশন এবং কর্পোরেশনগুলোর বিশাল তহবিল দ্বারা সমর্থিত)। এটা হয়তো আমরা যা পেছনে ফেলে এসেছি এবং আমরা গভীরভাবে যার প্রতীক্ষায় আছি— জীবনের এক ভিন্ন গতি (ধীরতা যেখানে সুন্দর)— তার সাথে আমাদের বিচ্ছিন্ন সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: হিলাল জেক্যান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সে যাই হোক, কর্পোরেট সেক্টরে ছিলেন এমন অনেককেই আমি জানি, যারা নিওলিবারেল কালপর্বে জটিল জীবনযাপনের সমস্ত কিছুই নিলামে তোলার ইঁদুরদৌড় খাপ খাওয়াতে না পেরে কর্পোরেট দুনিয়া থেকে বের হয়ে এসেছেন। তারাই একসময় ‘সাহসী ও সুন্দর’ এর এই জীবন বিপুল উৎসাহে বেছে নিয়েছিলেন— যেখানে আপনি কোনও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটেই থাকুন আর অবকাশ যাপনের জন্য সমুদ্রবিলাসেই থাকুন না কেন, আপনাকে অবশ্যই নিজের ল্যাপটপে মনোযোগ রাখতে হবে। আমি এমন অনেক লোককে জানি যারা জীবনকে পুনরায় খুঁজে পেতে গত কয়েক দশকে তাদের নিশ্চিত স্বাচ্ছন্দ্যের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নিওলিবারেল যুগ আমাদেরকে অতিক্রম করে যাওয়ার সাথে সাথে, গতির সাথে আধুনিকতার দহরমমহরমও দ্রুত শেষ হতে চলেছে। করোনা ভাইরাস কেবল সেই পরিণতিই আমাদের সামনে মঞ্চস্থ করে চলেছে। এই লেখার শুরুতেই ‘ভোগের কোয়ারেন্টিন’ এবং এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলোকে নির্দেশ করা উদ্ধৃতিটি কৃচ্ছতাবাদী কোনও গান্ধীবাদী তপস্বী কিংবা পুনরায় প্রাণ ফিরে পাওয়া কোন বামপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট-বুদ্ধিজীবীর নয়; বরং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে বেঁচে থাকা এবং কাজ করা কারোর উদ্ধৃতি।

    জৈব রাজনৈতিক [১] কলকব্জা

    ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, এই বিষয়ে জোর দেয়া জরুরি যে, জৈবরাজনৈতিক কল্পনা থেকে আমরা যদি মুক্ত হতে না পারি তাহলে খুব সম্ভবত করোনা ভাইরাস মোকাবেলার নামে আমরা এক ভয়ঙ্ককর পরিস্থিতিতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি। নতুন প্রযুক্তির জৈবরাজনৈতিক বিভীষিকার যে উন্মোচন মিশেল ফুকোর মারাত্মক দুঃস্বপ্ন ছিল, সেই বিভীষিকারই আরো বিস্তৃত রূপ সঙ্গতকারণেই আমাদেরকে আতঙ্কিত করা উচিত। এর কিছু কিছু সম্প্রতি ইজরায়েলের ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি তুলে ধরেছেন।

    মিশেল ফুকো

    ফুকোর বায়োপলিটিকস হলো খোদ জীবনকেই সরকারি ক্ষমতার বস্তুতে পরিণত করা। মৃত্যুহার হ্রাস, প্রত্যাশিত আয়ু বাড়ানোসহ এমন মেলা অপেক্ষাকৃত ‘মঙ্গলজনক’ কর্মসূচির মাধ্যমে এর শুরু হয়। এই প্রাথমিক ‘মঙ্গলজনক’ নাক গলানোই অবশেষে মানুষের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে আধুনিক সরকারি হস্তক্ষেপের অনুমোদন এবং নৈতিক ন্যায্যতা দিয়েছে। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র মানুষের জীবনের এত গভীরে পৌঁছাতে পারে যা পুরোনা সাম্রাজ্য ও সার্বভৌম রাজাদের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। সর্বাত্মক নজরদারি রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক ক্ষমতাকে ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা তখন থেকেই ভয়াবহভাবে বেড়েছে এবং আমরা ভারতেও সেই হতবুদ্ধিকর নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবৃদ্ধির ট্র্যাজি-কমিক ( নাকি পরাবাস্তব?) সংস্করণ প্রত্যক্ষ করছি। ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত হারারির উল্লেখিত প্রবন্ধে তিনি যেমনটি বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবেলার ক্ষেত্রে চীনের মতো অনেক রাষ্ট্রের সরকারই নজরদারির নিত্যনতুন প্রযুক্তি নজিরবিহীন কায়দায় ব্যবহার করছে:

    জনসাধারণের স্মার্টফোনগুলোকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় এনে, লক্ষ লক্ষ চেহারা-শনাক্তকরণ ক্যামেরা ব্যবহার করে, এবং জনসাধারণকে তাদের দৈহিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চেক করতে এবং এই বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য করে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস বাহকদেরকে শনাক্ত করতে পেরেছে তাই নয়, তাদের গতিবিধিও ট্র্যাক করতে পেরেছে, এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। নাগরিকদেরকে সংক্রমিত রোগীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপস সতর্ক করে দেয়।

    অনুবাদ ইরফানুর রহমান রাফিন

    আমি এখানে এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে চাই কারণ আধুনিক রাষ্ট্র এবং শাসনপ্রণালী নিজেই জৈবরাজনৈতিক কলকব্জা গঠন করে; এই গঠনপ্রক্রিয়া কেবলই মূলধন আর পুঁজিবাদের একচেটিয়া মামলা নয়। একটা রাষ্ট্র প্রবণতার দিক থেকে বামপন্থি বা সমাজতান্ত্রিক কিনা এতে আদৌ কিছু এসে যায় না এবং বিশ শতকের সমাজতান্ত্রিক রেজিমগুলো সর্বাত্মকবাদী (নাগরিকদের জীবন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে) হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই রেজিমগুলো বাছবিচার ছাড়াই জৈবরাজনৈতিক কলকব্জায় পরিণত হয়েছিল। আমি এখানে এই বিষয়টি ঊর্ধে তুলে ধরতে চাই কারণ আমাদের সমসাময়িক অনেক চিন্তাভাবনাই রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে চিন্তা করতে অপারগ বলে মনে হচ্ছে এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে গেলে আমাদের অবশ্যই রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে ভাবতে পারতে হবে।

    যাইহোক, এই মুহুর্তে, এই লেখাটিতে আমার ঝোঁক শেষপরিণতির চিত্র ভাবার দিকে নয় কারণ আজকাল এ নিয়ে মেলা ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। কোভিড-১৯ এর এই কালে হতাশার অনুভূতি সর্বজনীন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। আর ইতোমধ্যেই বিরাজমান হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ভারতে এই প্রবণতা আরো তীব্র হয়েছে। একটা বৈশ্বিক মহামারির মোকাবেলা অপরাপর যে সকল দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেই সকল দুর্যোগের আলামতও ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: হেড ইন ক্লাউডস
    শিল্পী: ইমানুয়েল দেল রসো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এর মধ্যে আরও আছে নাওমি ক্লেইনের পূর্বাভাস, ট্রাম্প ও তার মোসাহেবগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মূলত দায়ী কর্পোরেশনগুলোকেই বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ক্লেইন পুঁজিবাদ, বিশেষত ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ কীভাবে প্রতিটি শক (Shock), প্রতিটি বিপর্যয়কে আরও বেশি অর্থোপার্জন ও মুনাফা কামানোর সুযোগে রূপান্তরিত করে সে সম্পর্কে তাঁর যুক্তি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। [হতাশাজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে The Intercept এ প্রকাশিত ক্লেইনের ভিডিও বার্তার শ্রুতিলিখনের অনুবাদ ও একই বিষয়ে The Vice এ প্রকাশিত ক্লেইনের একটি সাক্ষাতকারের অনুবাদ  এখানে হাজির করা হলো— অনুবাদক]

    রূপান্তরশীল পুঁজিবাদ

    আমি অবশ্যই হারারি এবং ক্লেইন উভয়ের সাথেই একমত। যদিও ক্লেইনের ভিডিওর দ্বিতীয় অংশটি প্রকৃতপক্ষে আশার কথা বলেছে যেহেতু তিনি সঙ্কটটিকে স্বাস্থ্যসেবা বহুমুখিকরণের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখতে চাইছেন। আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ‘গ্রিন নিউ ডিল’[২] এর দাবিকে জোরালো করতে এই সংকটের পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর গুরুত্বের কথাও বলছেন— আসলে একই কথা অন্য আরো অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বলে যাচ্ছেন। সংকটের প্রতিক্রিয়ায় সরকারগুলো যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, অনেক পণ্ডিত ও বিশ্লেষকই ভাবতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন যে এর ফলে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনায় একটি পরিবর্তন ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দ্য গার্ডিয়ান– এ লিখিত প্রবন্ধে পণ্ডিত এবং বিশ্লেষক উইলিয়াম ডেভিস পরামর্শ দিয়েছেন যে এটি সম্ভবত ‘বিশ্বজগতের ঘটনা’ হয়ে উঠবে যা ‘নতুন অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সূচনা’র দ্বার উন্মোচন করবে।’ ডেভিস এখনও এই নতুন সূচনাটিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের মধ্যে এক ধরনের রূপান্তরের আগাম ঘোষণা হিসেবে দেখেন। তবে, এখানে আমার মনোযোগ অন্যদিকে কারণ স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সিস্টেমের কাছ থেকে আমরা যা কিছু আদায় করতে পারি পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তাকে ছাপিয়ে আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে, আমাদের অবশ্যই সাধ্যের সবটুকু অর্জন করতে হবে— গ্রিন নিউ ডিল, সাময়িক সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (Universal basic income-UBI), এবং স্পেনের মতো স্বাস্থ্যসেবার সাময়িক জাতীয়করণও হতে পারে। আসল ব্যাপার হলো অনেক সরকার— এমনকি ইংল্যান্ডের বরিস জনসনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের মতো ডানপন্থি সরকারগুলোকেও সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে কোম্পানিগুলোর বেতনভুক্ত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশকেই সরকার বেতনভর্তুকির আওতাভুক্ত করবে (উপরের লিঙ্কে ডেভিসের নিবন্ধটি দেখুন) ।কিছুদিন আগ পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এমন কোন সিদ্ধান্তের ঘোষণা অভূতপূর্ব ও কল্পনাতীত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার নীচে অবস্থিত সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ন্যূনতম আয় গোছের নগদ অর্থ বিতরণের বিষয়টি গুরুতর আলোচনার মধ্যে রয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনে অ্যাবি ভ্যাসলিসের টাইম ম্যাগাজিনে অ্যাবি ভ্যাসলিসের ( Abby Vesoulis) পর্যবেক্ষণ :

    স্যান ডিয়েগো’র সেন্টার ফর এথিক্স, ইকোনমিক্স এবং পাবলিক পলিসির পরিচালক ম্যাট যোলিন্সকি (Matt Zwolinski) বলেছেন, ‘একজন রিপাবলিকানের ২০২০ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের আহবান জানানো এই ইঙ্গিত দেয় যে ইউবিআই(UBI) জনপ্রিয় হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘ডানপন্থি কোন রাজনীতিবিদের এরকম কিছু সমর্থন করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ; একটি নির্দিষ্ট বলয়ে, যারা অন্যসময়ে এই দাবি ও উদ্যোগকে এক ধরনের ‘সমাজতন্ত্র’ হিশেবে দেখতেন, তাদের মধ্যে এই প্রকল্পের ন্যায্যতা সৃষ্টি করতে এটি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

    আমার মতে, এই জাতীয় নীতিমালা ও ব্যবস্থাকে, (যদিও তারা স্বল্প-মেয়াদী ব্যবস্থা হতে পারে), অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার সাথে নতুন প্রবণতা হিশেবে গাঁটছড়া বাঁধার সম্ভাবনা আছে। সর্বজনীন ন্যূনতম আয় এমন একটি উদাহরণ। এইসব নীতিমালা মধ্যমেয়াদে অধিকতর মৌলিক পুনর্বিবেচনার দিকে ধাবিত করতে পারার মত প্রশ্ন হাজির করতে পারে, যেমনটি এতদিন ধরে করে এসেছে পরিবেশবাদী অর্থনীতির বিভিন্ন ঘরানা এবং আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে প্রবৃদ্ধি-বিরোধি/ প্রবৃদ্ধি-উত্তর আন্দোলন (এ সম্পর্কে Kafila তে আমরা আগেও লিখেছি)। এই সমস্ত কর্মপরিকল্পনা পুঁজিবাদের রূপান্তর না ঘটিয়ে পারেই না— এমন রূপান্তর যা পুঁজিবাদী শোষণের পাটাতনকে অক্ষত রেখে টুকিটাকি পরিবর্তনের চর্চাকে বহুদূর পর্যন্ত ছাপিয়ে যাবে।

    পুঁজিবাদের পরের জীবন

    আমি এখানে যে পরিবর্তনগুলোর কথা বলছি তার মধ্যে অন্য কিছু ব্যাপার আছে যা আমলে নেয়া দরকার। এটি দীর্ঘকালীন দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন যা বেশ কিছুকাল ধরেই ঘটে চলেছে তবে বর্তমান সংকটের প্রবল ঝাঁকুনি এই পরিবর্তনগুলোকে আরো তীব্রতার সাথে অবশ্যসম্ভাবী করে তুলছে। মার্কসবাদীরা এখনও মনে করেন ‘বৈপ্লবিক’ উপায়ে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমেই কেবল পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপান্তর সম্ভব। এবং কোন না কোনভাবে ভোগকে ছেঁটে ফেলে বা প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করে এমন যেকোনও পরিবর্তনকে তারা ‘পশ্চাৎগামিতা’ মনে করে। তাদের ‘ধর্মীয়’ শাস্ত্র অনুযায়ী পুঁজিবাদকে কেবল ‘আরও অগ্রসর’ (আজকের দুনিয়ায় এর যা যা মানে হওয়া সম্ভব) কোনকিছু দ্বারাই ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব। একটি সাদামাটা নজির হিশেবে, আমি আরও একবার এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লি এডেলকুর্টের সাক্ষাতকারটির প্রসঙ্গ টানতে চাই। আমি যখন প্রথমে আমার মার্ক্সবাদী বন্ধুদের সাথে এডেলকুর্টের সাক্ষাতকারটি শেয়ার করলাম, তারা তার সমস্ত কথাকেই ‘ভোগের কোয়ারেন্টিন’, ‘পিছিয়ে পড়া’ হিশেবে বিবেচনা করে এক কথায় বাতিলই করে দিল। তারা ধরেই নিয়েছিল কোন গান্ধীবাদী মেজাজের তপস্বীর কাছ থেকে কথাগুলো আসছে। আমার ঘোরতর সন্দেহ এডেলকুর্ট ব্যক্তি হিশেবে কে এটা খুঁজে বার করার মত ধৈর্যও আমার এই মার্ক্সবাদী বন্ধুদের ছিল না। তার ব্যাপারে আমার কাছে সবচেয়ে যেটা চমকপ্রদ লেগেছে সেটি হলো তিনি কর্পোরেট দুনিয়া— আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ফ্যাশন ও ডিজাইন জগতের প্রাণকেন্দ্রের মানুষ—ফলে তার বক্তব্য কোন ক্ষ্যাপাটে গান্ধীবাদী কিংবা ‘বিকারগ্রস্ত পরিবেশবাদী’র বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আমার বদ্ধমূল ধারণা, তার এই অবস্থান আমার পূর্বেই উল্লেখিত প্রবণতার সাথে জড়িত, কর্পোরেট দুনিয়ার বহু মানুষ সেই দুনিয়া থেকে বের হয়ে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চাইছে স্কুল চালানো থেকে শুরু করে জৈব কৃষি সহ অন্য অনেক কাজের মাধ্যমে।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড
    শিল্পী: মেনেকসে কাম
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই প্রবণতা আমাদেরকে কোন পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে কি যাবেনা, তা অন্য অনেক কিছুর সাথে নির্ভর করছে আমাদের ভিশন ও পুঁজিবাদ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া পুনর্বিবেচনার মধ্যে।

    প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের পতনের কারণ অন্বেষণের কোন গভীর বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যার অনুপস্থিতিতে, ‘বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতার দখল’ সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত করবে বা পুঁজিবাদের রূপান্তর ঘটাবে এমনটা বিশ্বাস করার কোন কারণই নেই। অন্যদিকে, যদি কেউ যুক্তি দেয় যে নানাবিধ কারণে পুঁজিবাদ আগাগোড়া (যেমন সভ্যতার পূর্বশর্ত হিশেবে ‘সম্পদ তৈরি’-করের মাধ্যমে রাজস্ব উৎপাদন যা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি তৈরির মাধ্যমেই সম্ভব), পূর্বেও এবং এখনো, আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকল্প; তাহলে আমাদের কাছে পরিস্কার হয় কেন বিপ্লব পরবর্তী প্রতিটি রাষ্ট্রই পুঁজিবাদে পর্যবসিত হয় কিংবা সংকটে পতিত হয়। অবশ্য, পণ্য উৎপাদন, বাজার সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং শিল্পোদ্যোগ মাত্রই তা পুঁজিবাদের লক্ষণ বা অনিবার্যভাবে পুঁজিবাদের দিকে পরিচালিত করে এমন বিভ্রান্তিকর ধারণাও পুঁজিবাদের রূপান্তর কিংবা পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজ গঠনের এক বড় অন্তরায়। এগুলো শত শত বছর ধরে পুঁজিবাদের দিকে যাওয়া ব্যতিরেকেই মান্ধাতার আমল থেকে বিরাজমান ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের মতো দেশগুলোতে এগুলো এখনও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে যা পুঁজিবাদী নিয়মে চলে না। (বিস্তারিত বোঝার জন্য কল্যাণ স্যানালের ‘প্রয়োজনের অর্থনীতি‘র ধারণার সাথে ‘পুঞ্জিভবনের অর্থনীতি’র পার্থক্য খেয়াল করতে পারেন।) প্রকৃতপক্ষে, উপরের প্রথম বন্ধনীতে নির্দেশিত পার্থক্য যদি কেউ গভীরভাবে লক্ষ্য করে থাকেন, তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন ভারত এবং দক্ষিণ বিশ্বের বিরাট অংশে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (UBI) একটি নির্মম ধারণা কারণ তা আগেই সম্পূর্ণ সর্বহারাকরণকে (proletarianization) মেনে নেয়। যেসব সমাজে সম্পত্তির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিকনা আছে, সেখানে ইউবিআই (UBI) তাদেরকে কেবলমাত্র রাষ্ট্রের জৈবরাজনৈতিক কলকব্জায় পরিণত করবে। নিজেদের জীবনের উপর তাদের যে ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসন ও নিয়ন্ত্রণ আছে, সেটিকে ধ্বংস করবে।

    দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষয়িষ্ণু প্রকৃতির সংকটের মুখে নিরবিচ্ছিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে রূপান্তরে বাধ্য করা সম্ভব নয়— এমনটা মনে করার কোন কারণই নেই। পুঁজিবাদ যেমন সামন্ততন্ত্রের মতো পুরানো অর্থনীতির রূপান্তর ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল ঠিক তেমনই । তবে আমার মাথায় ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’ গোছের এমন কোন ‘বিপ্লব’ নেই যা সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পুঁজিবাদ নিশ্চিত করেছিল। পল ম্যাসন খুব সম্প্রতি তাঁর PostCapitalism-A Guide to Our Future বইতে পুঁজিবাদের ‘মিউটেশন’ ও একটি পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যত সমাজের কথা বলেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হ’লো তিনি দেখান যে, পূর্ববর্তী সমস্ত সংকটগুলোর যাবতীয় পরিবর্তন পুঁজিবাদকে পুঁজিবাদেই অপরিবর্তিত রাখে। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ মৌলিকভাবে উৎপাদন ও শ্রমের শর্তকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে যে, পুঁজিবাদের এখন আর পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে না। এটিকে এখন পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতকে জায়গা করে দিতে হবে। যদিও হুবুহু পশ্চিমের বাস্তবতায় তার যুক্তির প্রাসঙ্গিকতা আছে, কিন্তু তিনি প্রযুক্তিতে মুগ্ধ এবং ইউবিআই (UBI) এর পক্ষে ওকালতি করা অনেকও আজকাল পূর্ণ অটোমেশন এবং শ্রমকে সম্পূর্ণ অবসর দেয়ার পক্ষে। (আমার এমনই মনে হয়েছে।) এ বিষয়ে এখানে আমি বিস্তারিত যেতে চাইনা কারণ এই লেখায় আমার মূল মনোযোগ পুঁজিবাদের রূপান্তর। এমন মনে করার সত্যিই কোন কারণ নেই যে পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যত পুঁজিবাদের ভিতর থেকেই ছোট ছোট রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আসবে না বা আসতে পারে না। তবে সেই উত্তর-পুঁজিবাদ কেমন হবে? উপরের আমার বক্তব্যটি যদি সঠিক হয় তবে এর অর্থ সব রকমের পণ্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলোপ হতে পারে না; এর অর্থ সর্বজনীন, সমষ্টিগত সম্পত্তি, সমবায় ও বাজারের সম্পর্কের (এমনকি টাকাও; পল পটের কাম্বোডিয়ায় যেমনটি হয়েছিল) বিলুপ্তি হতে পারে না। এর অর্থ পণ্য উৎপাদন, যাবতীয় সম্পত্তি, বাজার সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিস্থাপন নয় এবং বাজারের যা করার কথা তাই করার মত কোনও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা সংস্থার আবির্ভাবও না। প্রকৃতপক্ষে, এই জাতীয় কল্পনা চোখ বন্ধ করে ইংল্যাণ্ডকে পুঁজিবাদের ‘ধ্রুপদী রূপ’ হিশেবে ধরে নেয়ার (এমনকি খোদ মার্ক্স পর্যন্ত তাই করেছিলেন) ‘যৌক্তিক’ পরিণতি। সাধারণ সম্পত্তির বেসরকারিকরণ, কৃষক সম্পত্তিসহ সব কিছুর বুর্জোয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর এবং কেবলমাত্র বুর্জোয়া ব্যতীত বাদবাকি সবাইকে সম্পত্তিহীন ‘সর্বহারা’য় পরিণত করা। এই বোঝাপড়াই সমস্ত রকমের সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ‘আত্মসাৎকারীদের আত্মসাৎ’ (expropriation of the expropriator) মার্কা সমাজতন্ত্রের কল্পনা হাজির করেছিল। তাত্ত্বিকভাবে, হয় সব সম্পত্তি ইতোমধ্যেই বুর্জোয়া সম্পত্তি ছিল অথবা আরো করুণ অবস্থা, কমিউনিস্টদের দ্বারা ‘বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন’ করার মাধ্যমে সব সম্পত্তিকে আগে বুর্জোয়া সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে।

    আর্টওয়ার্ক: সামিট
    শিল্পী: ফাদিটুন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন প্রচুর কাজ বর্তমানে বিদ্যমান যেগুলো দেখাচ্ছে যে, বিংশ শতাব্দীতে ভোগের উল্লম্ফন আবশ্যিকভাবেই ‘পুঁজিবাদের অমোঘ বিধান’ ছিল না, বরং মানুষকে কীভাবে ভোগের বস্তুতে পরিণত করা যায় সেই দুরভিসন্ধি দ্বারা তাড়িত ছিল। পুরোনা শহরগুলোকে ধ্বংস করা থেকে শুরু করে এবং তাদেরকে পরে এমনভাবে ঢেলে সাজানো যেন মনে হয় অটোমোবাইল ছাড়া শহরগুলো অচল; ভোগের ক্ষেত্রে বিরাজমান রীতিনীতিকে পরিকল্পিত উপায়ে অকার্যকর করে তোলা পর্যন্ত পুরোটাই ছিল ব্যবয়াসিক ধান্দা। পুঁজিবাদী উপায়ে ফাংশন করার স্বার্থে অর্থনীতিকে ক্রমাগত ভোক্তা উৎপাদন করতে হয়েছিল এবং এই ‘দুশ্চিন্তা’ ছিলই যে, মানুষজন যদি ভোগ বন্ধ কিংবা কমিয়ে দেয় তাহলে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। এবং এই প্রক্রিয়াগুলো জারি রাখার জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দোহাই ছিল। আমরা সবসময়ই ভেবে এসেছি যে, কেবলমাত্র অবৈতনিক শ্রমই ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ উৎপাদন করে এবং কখনোই এই বাস্তবতা আমলে নেইনি যে (উৎপাদন-ভোগ-প্রবৃদ্ধির) পরিবেশগত মাশুল অপরিশোধিতই থেকে যাচ্ছে। কেবল ‘প্রাকৃতিক কাঁচামাল’ এর ব্যবহারের মূল্য চুকানো অর্থে নয়; বরং বাস্তুসংস্থানের ধ্বংসযজ্ঞ, বায়ু দূষণ করা, পানি দূষণ, নদী শুকিয়ে মারা এবং বর্তমানে সারা বিশ্ব যে বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে তার মাশুল চুকানো অর্থে বলা হচ্ছে। এই লেখাটিতে আমরা রবার্ট ওয়ালেসের ২০১৬ সালে লিখিত বই-Big Farms Make Big Flu‘র উপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক প্রকাশিত, চীনের অণুজীববিজ্ঞান সংক্রান্ত শ্রেণীযুদ্ধ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে গ্রাফ সহকারে যা বর্ণিত হয়েছে, সেই প্রসঙ্গটি আলোচনা করিনি। প্রবন্ধটি ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করে থাকতে পারে তা প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞানীরা আরও আশঙ্কা করছেন যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গলতে থাকা হিমবাহগুলো বরফের একেবারে নিচে চাপা থাকা সুপ্ত ভাইরাসগুলোকেও উন্মুক্ত করবে। আমরা যদি অপরিশোধিত শ্রমের সাথে পুঁজিসৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির মূল্য বিচার করি তাহলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বলে আর কিছুই বাকি নেই। ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ -এর কল্পকাহিনী কেবল ততক্ষণই বজায় রাখা যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম অপচয়কে আমলে না নিয়ে সম্পদসৃষ্টির হিসাব একদিক বিবেচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শেষ পর্যন্ত, এটি কেবল শূন্য সমষ্টির গেইম (zero sum game) কিংবা আরো খারাপ পরিস্থিতিতে নেতিবাচক সমষ্টির গেইম ( negative sum game) এ পরিণত হতে পারে। পুঁজিবাদের পরের জীবন নিশ্চিতভাবেই চিন্তনীয় যদি আমরা পুঁজিবাদকে ভিন্নিভাবে চিন্তা করতে শিখি। পুঁজিবাদকে কেবল আর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শ্রমিক শ্রেণীর এন্টি-থিসিস (anti-thesis) হিশেবে ভাবাই যথেষ্ট নয়, পুঁজিবাদ আজকে সমগ্র মানব অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অর্থাৎ ৯৯ ভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত মালিকানা বনাম রাষ্ট্রীয় মালিকানা কিংবা বাজার বনাম রাষ্ট্রের অত্যন্ত ক্লিশে তর্ককে ছাপিয়ে প্রথমবারের মতো পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে এমন জীবনের সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অনুবাদকের টীকা
    ১. এই প্রবন্ধটিতে প্রবেশ করার একটি অন্যতম চাবিশব্দ হচ্ছে ‘বায়োপলিটিকস’ তথা ‘জৈব রাজনীতি’। বায়োপলিটিকস শব্দটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকলেও এই প্রবন্ধে এটি মূলত ফুকোডিয়ান বায়োপলিটিকস হিশেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ফরাসি তাত্ত্বিক ও দার্শনিক মিশেল ফুকো যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার করতেন সেই অর্থে। জৈবরাজনীতির ফুকোডিয়ান তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষের জীবন সার্বভৌম রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হওয়া। এটি আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের এমন এক প্রকৌশল যা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলিত করে।

    প্রাচীন বা মধ্যযুগের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন রাজা। তিনিই সব ক্ষমতার উৎস ছিলেন। তাঁকে অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান ছিল এবং সেটা প্রয়োগ করা হতো প্রকাশ্যে, সর্ব সম্মুখে। যাতে করে প্রজাগণ বুঝতে পারে সার্বভৌম ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে শাস্তির ধারণা ও প্রকৌশল। আঠারো শতকে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর ইউরোপের সর্বত্রই এই শাস্তি প্রদানের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ শুরু হয়। ফলে আবিষ্কৃত হয় ‘শাস্তির নম্র উপায়’। মধ্যযুগে প্রজার প্রাণ হরণের মধ্যে নিহিত ছিল সার্বভৌম শাসকের চূড়ান্ত ক্ষমতা। আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করা ও অনুশাসনের ছকে আবদ্ধ করার মত শাসনপ্রণালী গড়ে উঠেছে।

    তারপরেও মানুষকে বধযোগ্য প্রাণে পরিণত করার মত মধ্যযুগীয় চর্চাও আধুনিক রাষ্ট্রের জৈবরাজনীতির অংশ। রিমান্ডে টর্চার থেকে শুরু করে এনকাউন্টার-ক্রসফায়ার এর অংশ। পার্থক্য শুধু এই যে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার এমন সব কলাকৌশল রপ্ত করেছে যা রাজতন্ত্রের সার্বভৌম রাজার পক্ষে অকল্পনীয় ছিল।

    ফুকো মনে করতেন, আধুনিক ক্ষমতাকে কেবল কেতাবী সংজ্ঞায় বোঝা সম্ভব নয়। ক্ষমতাকে বুঝতে হবে তার কার্যকলাপ, প্রয়োগ ও বিস্তারের মাধ্যমে। এই আধুনিক ক্ষমতার একটা জৈবিক অস্তিত্ব রয়েছে। এটি হচ্ছে ক্ষমতার সেই প্রকৌশল যা দিয়ে রাষ্ট্র নাগরিক জনগোষ্ঠীকে শাসনের অনুকূল বশ্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। তাদের জীবন-মৃত্যুর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মহামারি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিজের শরীরও হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র। জৈব রাজনীতির মাধ্যমে আধুনিক শাসনপ্রণালী নাগরিকের জীবনের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। জীবন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগের অবজেক্ট। পুলিশ, আইন-আদালত, ক্লিনিক, কারাগার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও আপাত অর্থে রাষ্ট্র নয় এমন সব প্রতিষ্ঠান এবং মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো লেভেল পর্যন্ত জীবনকে কেন্দ্র করে জৈব রাজনীতির চর্চাই ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র-শাসনপ্রণালীর অন্যতম প্রধান চিহ্ন। তবে এই জৈবরাজনীতি এতদিন পর্যন্ত ছিল রাজনৈতিক লক্ষ্য, করোনা মহামারির কালে তা নতুন সম্পর্কপ্রণালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে-শরীর মাত্রই ‘সন্দেহজনক’, আচরণ মাত্রই ‘বিশেষ সতর্কতা’। আদিত্য নিগাম এই ভয়াবহতাকেও খেয়াল রাখা কথা বলছেন।

    [২] গ্রীন নিউ ডিল (জিএনডি) হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিপুল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত আইনের প্যাকেজ। গ্রীন নিউ ডিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ পরিণতি এড়াতে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জাতিগত বর্ণবাদের রাষ্ট্রীয় সমস্যাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের রিপোর্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিজ্ঞানীদের দুটি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই মূলত গ্রিন নিউ ডিলের পক্ষের রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা তাঁদের যাবতীয় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে, যদি তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে তাহলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং খরা দুনিয়ার পরিবেশ-প্রতিবেশকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করবে। আরো বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখোমুখি হবে। গ্রিন নিউ ডিলের সমর্থকরা মনে করেন, কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক-রাষ্ট্রিক সকল প্রকারের বৈষম্য, নিপীড়নের অবসানের মধ্যেই মানবসভ্যতার ভবিষ্যত নিহিত।

    তথ্যপঞ্জি
    দীপেশ চক্রবর্তী ( ২০১৬) ‘আরেক টোয়েন্টি টোয়েন্টি: পৃথিবীর উষ্ণতা-বৃদ্ধি ও মানুষের ইতিহাস’; ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ ; আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, কলকাতা

  • নোম চমস্কি।। নিওলিবারাল মহামারী

    নোম চমস্কি।। নিওলিবারাল মহামারী

    অনুবাদ: নুরে আলম দুর্জয়

    বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস এবং  একে মোকাবেলায় শাসকগোষ্ঠীর নীতি ও সমগ্র রাজনৈতিক ব্যবস্থার সক্ষমতা ব্যাখ্যা করে  ডেমোক্রাসি ইন ইউরোপ মুভমেন্ট– ডিয়েম ২৫ কে একটি সাক্ষাতকার দেন নোম চমস্কি। গত ২৮ মার্চ, ২০২০ তা ইউটিউবে প্রচারিত হয়। ডিয়েমের হয়ে সাক্ষাতকার নেন স্রােয়েকো হোরবেট। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গৃহীত সাক্ষাতকারটি শ্রুতি লিখনের সময় কতক জায়াগার অডিও অস্পষ্ট ছিল। স্থানগুলো চিহ্নিত করা আছে। অরাজের হয়ে শ্রুতিলিখন ও অনুবাদ করেছেন নূরে আলম দুর্জয়। পরে টেক্সট মিলিয়ে দেখা ও সম্পাদনার কাজটি করেছেন তানভীর আকন্দ।

    নোম চমস্কি

    স্রােয়েকো হোরবেট: ‘করোনা ভাইরাস পরবর্তী বিশ্ব’-এর আরেকটি এপিসোডে  আপনাদের স্বাগতম। এই বিশেষ পর্বের জন্য আমি সত্যিকার অর্থে আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছি। কেননা আমাদের সঙ্গে আজ একজন বিশেষ অতিথি রয়েছেন। সেই বিশেষ অতিথি শুধু আমারই নয়, আমাদের আনেক প্রজন্মেরই নায়ক তিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা উভয়ই এখন সেল্ফ-আইসোলেশনে রয়েছি, ফলে এটি একটি বিশেষ উপলক্ষও বটে। তবে বাড়তি পরিচয় না দিলেও, যারা দেখছেন তাদের অধিকাংশই আমার ধারণা নোম চমস্কিকে চেনেন এবং আমার খুব ভালো লাগছে যে নোম আজকে আমাদের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছেন।

    হ্যালো নোম, আপনি কি আমাদের একটু জানাতে পারেন বর্তমানে আপনি কোথায় রয়েছেন? এর মধ্যেই কি সেল্ফ-আইসোলেশানে চলে গেছেন? গেলে কতদিনের জন্য?

    নোম চমস্কি: আচ্ছা, আমি অ্যারিজোনার তুসন শহরে সেল্ফ-আইসোলেশনে আছি।

    স্রােয়েকো হোরবেট: আপনার জন্ম ১৯২৮ সালে। যতদূর জানি আপনি আপনার প্রথম প্রবন্ধটি লিখেন মাত্র দশ বছর বয়সে, যেটি ছিল স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ নিয়ে। কার্যত, ঠিক বার্সেলোনার পতনের পরপরই, ১৯৩৮ সালে, আমার প্রজন্মের কাছে যা সুদূর অতীত। আপনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বেঁচে ছিলেন, দেখেছেন হিরোশিমা। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে তেল সংকট, বার্লিন ওয়ালের পতন পর্যন্ত আপনি অনেক বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার আগে, আপনি চেরোনোবিলের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এরপরে, ৯০ এর দশকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন যেটি ৯/১১ পর্যন্ত গড়ায়, যেটি সাম্প্রতিক সময়ের একটি বৈশ্বিক ঘটনাও বটে। এবং খুব সম্প্রতি— আপনার মতো একজন ব্যক্তির জীবনব্যাপী দীর্ঘ ইতিহাসের সার-সংক্ষেপ টানার চেষ্টা করছি আমি— একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা যদি বলি, তবে ২০০৭ ও ২০০৮ এর অর্থনৈতিক মন্দার কথা উল্লেখ করতে হয়। এই প্রেক্ষিতে, এমন একটি সমৃদ্ধ জীবনে, একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এবং এই প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একজন অনুঘটক হয়ে, আপনি বর্তমান করোনাভাইরাস সংকটকে কীভাবে দেখছেন? এটি কি একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা, এটি কি এমন কিছু যেটি আপনাকে অবাক করে দিয়েছে? বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এসবই আমার প্রশ্ন। 

    নোম চমস্কি: আমার বলা উচিত, আগেকার দিনের যেসব স্মৃতি এখন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেসব ১৯৩০ এর দশকের। বার্সেলোনার পতনের উপর যে নিবন্ধটির কথা আপনি উল্লেখ করেছেন সেটি মূলত, আপাতদৃষ্টিতে, সারা ইউরোপ জুড়ে মহামারি আকারে ফ্যাসিবাদের নির্দয় বিস্তার এবং কীভাবে এটির সমাপ্তি ঘটবে সেই সম্পর্কে। পরে, অনেক পরে আমি আবিষ্কার করি, যখন অভ্যন্তরীণ তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ পেতে শুরু করল, সেই সময়ে এবং পরের বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশ্লেষক আশা করেছিল যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে সারাপৃথিবীকে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মান আধিপত্যের অধীন দুটি অঞ্চলে বিভাজিত করার মাধ্যমে । সুতরাং, আমার শৈশবকালীন ভয় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক ছিল না। এইসব স্মৃতি এখন ফিরে আসছে। আমার মনে আছে, ছোটবেলায়, বাচ্চা একটা ছেলে রেডিওতে হিটলারের নুরেমবার্গ জনসভা শুনছে। একটা বর্ণও আমি তখন বুঝতাম না কিন্তু এর হাবভাব, হুমকি এবং আরও অনেক কিছু ঠিকই বুঝা যেত। বলেতই হয় যে আজকে যখন আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমাবেশ শুনছি, ঠিক যেন সেটারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এমন নয় যে তিনি একজন ফ্যাসিস্ট, ঐরকম আদর্শও তিনি ধারণ করেন না। তিনি একজন সোসিওপ্যাথ মাত্র, এমন একটা লোক যে শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু এই হাবভাব, এই আতঙ্ক ঠিক আগের মতোই। একজন সোসিওপ্যাথিক ভাঁড়ের হাতে দেশের এবং সারা বিশ্বের ভাগ্য নির্ভর করছে এই চিন্তাটাই হতবুদ্ধিকর। করোনাভাইরাস নিজেই যথেষ্ট গুরুতর একটি বিষয়, তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, আরও বড় ভয়ের ঘটনা এগিয়ে আসছে। ধ্বংসের দোরগোড়ায় এগিয়ে চলেছি আমরা, মানব ইতিহাসের এখনপর্যন্ত সবচাইতে জঘন্যতম পরিণতির দিকে। আর এই অতল গহ্বরে ছুটে চলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডোনাল্ট ট্রাম্প আর তার চামচারা। প্রকৃতপক্ষে, দুটি বৃহত্তর হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমরা বর্তমানে। একটি হচ্ছে পারমাণবিক যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান হুমকি, আর্মস কনট্রোল রেজিমের অবশিষ্ট যা ছিল সেটাও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই হুমকি আরও প্রবল হয়েছে। এবং অবশ্যই দ্বিতীয় হুমকিটি হচ্ছে ক্রমবর্ধমান বৈষ্ণিক উষ্ণতা। এ দুটি হুমকিরই মোকাবিলা করা সম্ভব, তবে এর জন্য খুব বেশি সময় হাতে নেই। করোনা ভাইরাস অবশ্যই ভয়ঙ্কর এবং এর ভয়াবহ পরিণতিও হতে পারে। কিন্তু এর থেকেও উদ্ধারলাভ সম্ভব, কিন্তু অন্যগুলো থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় নেই, সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। আমরা যদি এসবের মোকাবিলা না করি তাহলে মরতে হবে আমাদের। এ কারণেই শৈশবের স্মৃতিগুলো ভিন্ন এক মাত্রায় ফিরে এসে তাড়া করছে আমাকে। পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি আঁচ পায়নি পৃথিবীর অবস্থান আসলে কোথায়। গোড়ার দিকে তাকালে, এই জানুয়ারির কথাই ভাবুন, প্রতিবছরই আপনি জানেন হয়তো কেয়ামতের দিনক্ষণ এগিয়ে আসছে, একেবারে মিনিটের কাঁটা ধরে। যেকোনো মাঝরাতেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যখন থেকে ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন, ঘড়ির কাঁটা আরও দ্রুত এগিয়ে আসছে সেই মাঝরাতের দিকে। গত বছর, দুই মিনিটের ব্যবধানে চলে এসেছিল তা। এ যাবতকাল সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল এটাই । এই বছর বিশ্লেষকেরা মিনিটের হিসাব ছেড়ে সেকেন্ডের হিসাবে চলে এসেছেন, সেই মাঝরাত থেকে ১০০ সেকেন্ড দূরে, এটাই সবচেয়ে কাছাকাছি।

    আর্টওয়ার্ক: ডিপার্চর অব কালার
    শিল্পী:
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তিনটি বিষয় দেখা যাচ্ছে: পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হুমকি এবং গণতন্ত্রের অধপতন। যদিও এই তালিকায় গণতন্ত্র ঠিক পড়ে না, কিন্তু সেটা আনতে হচ্ছে, কেননা সংকট মোকাবিলার এই একটা আশাই আমাদের আছে। [এ জায়গাটি স্পষ্ট শোনা যায়নি] জনগণ তার নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিচ্ছে, আর যদি না নেয়তো আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। আমাদের ভাগ্য যদি আমরা কোনো সোসিওপ্যাথিক ভাঁড়ের হাতে ছেড়ে দেই, তাহলেই গেছি। এবং এই পরিণতি ঘনিয়ে আসছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার কারণেই ট্রাম্প সবচেয়ে ভয়াবহ।

    যুক্তরাষ্ট্রের পতন নিয়ে আমরা কথা বলছি, কিন্তু বিশ্বের দিকে তাকান। আপনার চোখে পড়বে না, যুক্তরাষ্ট্র যখন তার নির্দেশনা চাপিয়ে দেয়— খুনে, বিধ্বংসী সব নির্দেশনা (এই একটা দেশই এটা করতে পারে) তখন সবাইকেই সেটা মানতে হয়। ইউরোপের সেটা পছন্দ নাও হতে পারে, প্রকৃতপক্ষে ইরানের প্রতি বিষেদাগার, কিন্তু তাদেরকে সেটা মেনে চলতে হয়। প্রভুর কথায় উঠতে বসতে হবে, নাহলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে। এটা কোনো প্রাকৃতিক আইন নয়, এটা ইউরোপের ওয়াশিংটনের প্রভুদের আজ্ঞাবাহী হয়ে চলার সিদ্ধান্ত, আর এমনকি অন্যান্য দেশগুলোর মতামতের তো কোনো দামই নেই এখানে।

    করোনাভাইরাসের আলাপে ফিরে আসি। এর সবচেয়ে দুঃখজনক ও রূঢ় দিকটি হলো, সম্পূর্ণ সচেতনভাবে এই কষ্টের মাত্রা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে নির্দেশনার ব্যবহার। ইরান এমন একটি এলাকায় অবস্থিত যেখানে এমনিতেই অসংখ্য অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে। সচেতনভাবে তৈরি করা নির্দেশনগুলোর কড়াকড়ির মাধ্যমে, বেশ খোলাখুলিভাবেই নির্মম ভোগান্তি তৈরি করা হয়েছে। স্বাধীনতার সময় থেকেই কিউবা এতে ভুগছে। বিস্ময়করভাবে কিউবা টিকে আছে, এবং বেশ স্থিতিশীল অবস্থায়। আজকের ভাইরাস সমস্যার একটা বড় কৌতুককর দিক হচ্ছে, কিউবা ইউরোপের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি বলতে চাচ্ছি আরকি, এটা আমাদের এতটাই হতবুদ্ধি করে দেয় যে ব্যাপারটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তাও আমরা জানি না। জার্মানি পারছে না গ্রিসকে সাহায্য করতে, কিন্তু কিউবা পারছে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সাহয্য করতে। এর মানে কী সেটা যদি ভাবতে বসেন তাহলে ভাষা খুঁজে পাবেন না। ঠিক যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, শত শত বছর ধরে বিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে মানুষজন পালিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে, তখন শব্দ খুঁজে পাবেন না আপনি। এই সংকট, সভ্যতার এই সংকট এই পর্যায়ে এসে বেশ বিধ্বংসী চেহারা লাভ করেছে, এ ব্যাপারে ভাবতে গেলে শৈশবে রেডিওতে উত্তাল জনস্রোতের উদ্দেশ্যে হিটলারের প্রলাপ শোনার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এবং ভাবতে বাধ্য হই এই প্রজাতির পক্ষে কি আসলেই টিকে থাকা সম্ভব?

    স্রােয়েকো হোরবেট: আপনি গণতন্ত্রের সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এই মুহূর্তে আমি মনে করি, ঐতিহাসিকভাবে একটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্যে আমরা নিজেদেরকে আবিষ্কার করেছি, এই অর্থে যে প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনোভাবে গৃহবন্দি রয়েছেন, এই পরিসংখ্যানটা আজকে পেয়েছি আমি। এটি আইসোলেশন হোক, সেল্ফ-আইসোলেশনই হোক আর কোয়ারেন্টিনই হোক। বিশ্বের প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ ঘরের মধ্যে, যদি একটি ঘরের মালিক হওয়ার জন্য তারা যথেষ্ট ভাগ্যবান হয়ে থাকেন আরকি। একই সঙ্গে যা আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি তা হলো ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশগুলোও তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে, শুধু অভ্যন্তরীণ সীমান্তগুলোই নয়, বাইরের সীমান্তও। সম্ভাব্য সব দেশেই একটি ব্যতিক্রম অবস্থা বিরাজ করছে, যার মানে হলো অনেক দেশেি কারফিউ জারি করা হয়েছে। যেমন ফ্রান্স, সার্বিয়া, স্পেন, ইতালি এবং অন্যান্য দেশে রাস্তায় সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। একজন ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে আপনাকে আমি যা জিজ্ঞেস করতে চাই তা হলো যে ভাষা এখন চারপাশে প্রচার করে বেড়ানো হচ্ছে। শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্প নয়, আপনি যদি ম্যাক্রোঁর কথা শোনেন, অন্যান্য ইউরোপীয় রাজনৈতিকদের কথা শোনেন, আপনি ক্রমাগত শুনতে থাকবেন যে তারা যুদ্ধের ব্যাপারে বলছে। এমনকি মিডিয়া চিকিৎসকদের সম্পর্কে বলছে যারা প্রথম “ফ্রন্ট লাইনে” রয়েছেন এবং ভাইরাসকে ডাকা হচ্ছে শত্রু বলে। যা আমাকে মনে করিয়ে দেয় ভাগ্যক্রমে শৈশবের কোনো স্মৃতি নয় বরং একটি বইয়ের কথা, যেটি ওই সময়ে লেখা হয়েছিল— ভিক্টর ক্লেমপেরার Lingua tertii imperii যেটি ছিল  Third Reich এর ভাষাব্যবহার সম্পর্কে এবং ভাষার মাধ্যমে কীভাব ঐ ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল সে সম্পর্কে একটি বই। সুতরাং, আপনার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যুদ্ধ সম্পর্কিত এই ডিসকোর্স আমাদের কী বলে এবং কেন তারা একটি ভাইরাসকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করছে, এটি কি কেবল নতুন ব্যতিক্রমী দশার বৈধতাপ্রদানের জন্য নাকি এই ডিসকোর্সে আরও গভীরতর কিছু আছে?

    নোম চমস্কি: [এখানে কিছু অংশ শোনা যায়নি] এই বাগাড়ম্বর, কিন্তু আমি মনে করি এটি অতিরঞ্জিত নয়। তবে এর কিছু গুরুত্ব রয়েছে। মানে হলো, আমরা যদি সংকটকে মোকাবিলা করতে চাই, তাহলে আমাদেরকে যুদ্ধকালীন মোবিলাইজেশনের মতো কিছু একটার দিকে এগুতে হবে। কাজেই আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি ধনী দেশের কথা চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন আশু অর্থনৈতিক [সংকটাবস্থা] উৎরানোর মতো সম্পদ এর রয়েছে। বর্তমানের তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোবিলাইজেশানের কথা যদি বলেন তাহলে সেটা আরও অনেক বেশি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল দেশটির উপরে, কিন্তু একটা ব্যাপক সফল একটি মোবিলাইজেশান ছিল, কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতাকে চারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, মন্দাবস্থা কটিয়ে তুলে দেশটিকে বিপুল ঋণের দিকে ঠেলে দিলেও প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা প্রদান করেছিল। সম্ভবত এর থেকেও আমাদের কম কিছুর প্রয়োজন, অন্তত ঐ মাত্রায় না, এটি কোনো বিশ্বযুদ্ধের মতো নয়, কিন্তু স্বল্পকালীন মারাত্মক সংকট অতিক্রম করার জন্য আমাদের একটি সামাজিক আন্দোলনের মানসিকতা গঠন করা জরুরি। এখানে আমরা ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লু মহামারির কথাও স্মরণ করতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষ প্রথম দফায় আশংকাজনক অবস্থা থেকে আরাগ্য লাভ করেছিলেন। তবে একে মোকাবিলা করতে হয়েছিল। এই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি ধনী দেশের অবস্থা। এখন এখানে দুই বিলিয়ন মানুষ, যার একটি বড় আংশই ভারতে। ভারতীয়দের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? তারা দিনে আনে দিন খায়, যাদের আলাদা করে রাখা হবে তারা না খেতে পেয়েই মারা যাবে । কী ঘটবে তাহলে? একটি সভ্য পৃথিবীতে ধনী দেশগুলোর অসহায়দের সাহায্য করার কথা ছিল, তাদেরকে শ্বাসরোধ করার বদলে, ঠিক যা আমরা করছি, বিশেষ করে ভারতে, এবং বিশ্বের বহু জায়গায়ও।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা এন্ড হিউম্যান এচিভমেন্ট
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এধরনের সংকট, তা ধরুন সেটা ভারতের মতো দেশেই হোক, আমি ঠিক জানি না,  তবে চলমান এ অবস্থা যদি দক্ষিণ এশিয়াতে স্থায়ী হয় তাহলে মনে রাখবেন যে কয়েক দশকের মধ্যে তা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। এই গ্রীষ্মে রাজস্থানে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে পৌঁছেছিল এবং তা বেড়ে চলেছে। বর্তমানের পানি সংকট আরও করুণ অবস্থায় পৌঁছাবে। সেখানে দুটি পারমাণবিক শক্তি রয়েছে, তারা হ্রাসকৃত পানি সরবরাহকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকবে। আমি বলছি করোনাভাইরাস খুবই সিরিয়াস, আমরা এটাকে অবজ্ঞা করতে পারি না, কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে এটা হচ্ছে একটি ভগ্নাংশ মাত্র, অনেক বড় সংকটের সামান্য একটা অংশ, যা ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। তারা হয়তো সেভাবে জীবনকে বিপর্যস্ত করবে না, যেমনটা করোনাভাইরাস আজকে করছে, কিন্তু তারা জীবনকে বিপর্যস্ত করবে এমন একটি মাত্রায় যাতে প্রজাতির টিকে থাকার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে এবং সেটি খুব দূরে নয়। কাজেই মোকাবিলা করার জন্য আমাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। এটা ঠিক, নগদ সমস্যা যেটা—করোনাভাইরাস, সেটা বেশ মারাত্মক। একে মোকাবিলা করতে হবে,  কিন্তু আরও বড় সমস্যা, অনেক বড় সমস্যা এগিয়ে আসছে। বর্তমানে সভ্যতাগত সংকট বিদ্যমান। করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ভালো দিকগুলো আমলে নিতে হবে আমাদের। এই যেমন, মানুষকে ভাবাতে পারে, কেমন পৃথিবী আমরা চাই? আমরাকি এমন পৃথিবী চাই যা আমাদের এরকম পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে? আমাদের চিন্তা করা উচিত সংকটের উৎপত্তি নিয়ে, কেন এই করোনা ভাইরাস সংকট দেখা দিল? এটা এক বিরাট বাজার ধ্বস, বাজারের একেবারে মূলে ফিরে গিয়ে, এই বর্বর, নয়া-উদারনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গভীরতর সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর তীব্রতাবৃদ্ধি করে এই ধ্বসের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অনেকদিন থেকেই আমরা জানি যে সম্ভাব্য মহামারিগুলো খুবই সন্নিকটে, এটা জানা ছিল, খুব ভালোভাবেই এটা বুঝা গিয়েছিল যে সার্সের মহামারির সামান্য রূপান্তর হিসেবে করোনা ভাইরাসের মহামারি আসন্ন। ১৫ বছর আগে এর মোকাবিলা আমরা করেছি, ভাইরাসগুলো চিহ্নিত হয়েছে, অনুক্রম তৈরি করা হয়েছে, ভ্যাকসিনও পাওয়া যাচ্ছে, সম্ভাব্য করোনা ভাইরাসের মহামারি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সারা দুনিয়াজুড়েই গবেষণাগারগুলোর এতদিনে এ নিয়ে কাজে নেমে পড়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন সেটা হলো না?

    বাজারের আভাসগুলো ভুল ছিল। ওষুধ কোম্পানিগুলো, প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর দৌরাত্মের হাতে আমরা আমাদের ভাগ্য সপে দিয়েছি। মালিক করপোরেশানগুলো যাদেরকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, এইক্ষেত্রে যেমন-  বড় ঔষধ কোম্পানিগুলো, তারা নতুন বডি ক্রিম বানায়, কারণ মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নতুন ভ্যাকসিন খুঁজে বের করার চেয়ে সেটা বেশি লাভজনক। সরকারের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা অসম্ভব। যুদ্ধকালীন মোবিলাইজেশানের সময় যা ঘটেছিল, আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে সে সময় পোলিও আতঙ্কজনক একটি হুমকি ছিল। যার অবসান ঘটে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সল্ক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে, রোজভেল্ট প্রশাসন যার শুরু করেছিল। কোনো প্যাটেন্ট ছিল না, সবার জন্যই তা উন্মুক্ত ছিল। এবারও সেটা করা যেত, কিন্তু নয়া-উদারনৈতিক মহামারির সে পথ বন্ধ করে রেখেছে। আমরা এমন একটি ভাবাদর্শের অধীনে বাস করছি, যার জন্য অর্থনীতিবিদরা যথেষ্টই দায়ী, করপোরেট সেক্টর থেকেই মূলত যার আবির্ভাব। এই ভাবাদর্শ, রোনাল্ড রিগ্যান যার দৃষ্টান্ত খাড়া করেছিল, হাস্যোজ্জ্বল চেহরায় তার করপোরেট প্রভুদের ধরিয়ে দেয়া স্ক্রিপ্ট পড়ার মাধ্যমে- সরকারই হচ্ছে সমস্যা। সরকারের হাত থেকে পরিত্রাণ দরকার, মানে বেসরকারি স্বৈরতন্ত্রের হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দিয়ে দেই, যাদের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। আটলান্টিকের অপরপ্রান্তে, থ্যাচার আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, সমাজ বলে কিছুই নেই, শুধুমাত্র বাজারে ছেড়ে দেয়া মানুষের কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকা, এছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।   

    আর্টওয়ার্ক: সন অব ম্যান করোনা
    শিল্পী: রাবাত আল খাতিব
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ধনীদের পদতলে বছরের পর বছর ধরে পৃথিবী ভুগছে। এখন এটি এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের মতো ঘটনা যার ফলে সল্ক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মতো সুযোগ তৈরি হতে পারত, নয়া-উদারনৈতিক মহামারির থেকে উদ্ভূত ভাবাদর্শিক কারণে সে পথও বন্ধ হয়ে গেছে। মূল কথা হচ্ছে যে, করোনা ভাইরাসের এই বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধ করা যেত, তথ্যউপাত্ত হাতের কাছেই ছিল, এমনকি মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ২০১৯-এর অক্টোরবরেও এটা বেশ পরিচিত ছিল। এধরনের সম্ভাব্য বৈশ্বিক মহামারির দুনিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্টে লেভেল সিমুলেশানের মাধ্যমে করা একটি বড় মাত্রার সিমুলেশান আমাদের হাতে ছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি, এখন এই সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। যে সমস্ত তথ্যউপাত্ত নিয়ে তারা সচেতন ছিলেন সেগুলোর দিকে আমরা মনোযোগ দেইনি, ৩১শে ডিসেম্বর চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অজানা কারণে ঘটা নিউমোনিয়ার মতো লক্ষণগুলো নিয়ে সচেতন করে। এক সপ্তাহ পরে, কিছু চাইনিজ বিজ্ঞানী একে করোনা ভাইরাস বলে শনাক্ত করেন, এছাড়াও তারা এর অণুক্রম তৈরি করে সারা দুনিয়াকেই জানান, ততক্ষণে ভাইরোলজিস্ট ও অন্যান্যরা যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টটি পড়েছে, তারা জেনে গেছে যে এটা করোনা ভাইরাস এবং একে মোকাবিলা করতে হবে কীভাবে।

    তারা কি কিছু করেছেন, হ্যা, কেউ কেউ করেছেন। ঐ অঞ্চলের দেশগুলো— চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর— কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছিল এবং অন্তত প্রথম ধাক্কায় কোনো একভাবে একে নিয়্ন্ত্রণেও রাখতে পেরেছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউরোপেই তা ঘটেছিল। জার্মানি সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, তাদের হাসাপাতাল ব্যবস্থা রয়েছে উদারনীতিবাদের আওতায়, তাদের বাড়তি পরীক্ষা করানোর সক্ষমতাও ছিল, এবং তারা স্বার্থপর কায়দায় অন্যদের সাহায্য না করে শুধুমাত্র নিজেদের জন্য হলেও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত যাতে করে রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অন্যান্য দেশগুলো শ্রেফ এড়িয়ে গেছে ব্যাপারটা, এদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। আর সবথেকে করুণ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের, যেই দেশটা কিনা একজন সোসিওপ্যাথ চালায়। তার কথামতো, একদিন আপনি দেখবেন কোনো বিপদ নেই, শ্রেফ ফ্লু এর মতোই একটি ব্যাপার, তার পরের দিন সেটা ভয়াবহ সংকট হয়ে গেল, এইসব আমার জানা আছে, পরের দিন আমাদের একে তুলে দিতে হবে ব্যবসার জন্য, কারণ আমাকে নির্বাচনে জিততে হবে। এইসব মানুষদের হাতে দুনিয়া চলছে এই চিন্তাটাই আতঙ্কজনক। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে যে, বিরাট বাজার ধ্বসের হাত ধরেই এর শুরু, যা মৌলিক সমস্যাগুলো অর্থাৎ সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। নয়া-উদারনীতিবাদের মহামারি যেগুলোকে আরও অনেক বেশি দুরবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে, আর এই দুরবস্থা বাড়তেই থাকবে, কারণ এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন এমন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি যদি আমাদের কার্যকর থেকেও থাকে সেগুলো বিকল হয়ে পড়ছে। এই বিষয়গুলো নিয়েই আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে, এবং আরও গভীরররভাবে ভাবতে হবে যেমনটা আমি আগেই বলেছি, কোন ধরনের পৃথিবীতে আমরা বাস করতে চাই? সেটা নিয়ে। 

    আর্টওয়ার্ক: ফাইটিং দ্য ভাইরাস
    শিল্পী: মুজাফফর ইয়েলচি
    সূত্র: আর্টওয়ার্ক

    আমরা যদি কোনোভাবে জয়লাভ করি, তাহলে সেখানে বিকল্প থাকবে। প্রচণ্ড কর্তৃত্ববাদী পাশবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার থেকে ব্যক্তিগত মুনাফার মানবিক চাহিদা মাথায় রেখে, আরও মানবিক অর্থে সমাজের বৈপ্লবিক পুনর্গঠন পর্যন্ত যেই বিকল্পের সীমানা। আমাদের মাথায় রাখা উচিত যে নয়া-উদারনীতিবাদের সাথে প্রচণ্ড কর্তৃত্ববাদী ব্যাধিযুক্ত রাষ্ট্র পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বস্তুত, নয়া-উদারনীতিবাদের লক্ষ্য হচ্ছে, [এ জয়গাটা স্পষ্ট শোনা যায়নি] থেকে  হায়েক পর্যন্ত। বাকিরা ব্যাপক আকারে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়েই সন্তুষ্ট, যতক্ষণ পর্যন্ত এটা তাদের ভাষায় সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য কাজ করে যাবে। নয়া-উদারনীতিবাদের উৎস ১৯২০ এর দশকের ভিয়েনা [এ জয়গায় কিছু কথা স্পষ্ট শোনা যায়নি] অস্ট্রিয়ান রাষ্ট্রের প্রোটো-ফ্যাসিস্ট, এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ও অস্ট্রিয়ার সোসাল-ডেমোক্রেটিক সরকারকে গুড়িয়ে দিয়ে, প্রোটো-ফ্যাসিস্ট সরকারের দলে যোগ দেয়। ফ্যাসিবাদের জয় ঘোষণা করে, তার সমৃদ্ধ অর্থনীতিকে রক্ষা করার জন্য। পিনোশে যখন চিলেতে একটা খুনে, নৃশংস একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, তারা সবাই একে সমর্থন দিয়েছিল, তারা সবাই এর জন্য লড়াই করেছিল  [এ জয়গায় কিছু কথা স্পষ্ট শোনা যায়নি] এই অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনাকে সহায়তা করেছে, যা তাদেরকে সমৃদ্ধ অর্থনীতির এনে দিয়েছিল, জনগণের একটা ছোট অংশকে শোষণের মাধ্যমে বড় মুনাফা এনে দিচ্ছিল। সুতরাং এটা ভাবা বেশি হয়ে যাবে না যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাধ্যমে স্বঘোষিত উদারনীতিবাদীদের হাতে একটি হিংস্র নয়া-উদারনীতিবাদী ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটতে পারে। এটি একটি দিক, একটি দুঃস্বপ্ন, যা ঘটে যেতে পারে। কিন্তু এটা অবিসম্ভাবী নয়, একটা সম্ভাবনা রয়েছে মানুষের সংগঠিত হওয়ার, সংযুক্ত হওয়ার, যেমনটা অনেকেই করছে। আরও ভালো একটা পৃথিবী প্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা রয়েছে, তাতেও অবশ্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।  ইতোমধ্যেই যেসব পথ আগলে আছে, পারমাণবিক যুদ্ধের সমস্যা, অতীতের অনেক বেশি কাছে চলে এসেছে যা এবং রয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি, একবার ঐ পর্যায়ে চলে গেলে যার থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমরা যদি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তাহলে এই বিপদ খুব বেশি দূরে নয় আমাদের। সুতরাং, এটি হচ্ছে মানব ইতিহাসের একটি সংকটপূর্ণ মুহূর্ত, শুধু করোনাভাইরাসের কারণে নয়, বরং আমাদের উচিত হবে পৃথিবীর গভীর ত্রুটিগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা যেটি যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, পুরো আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অথর্ব বৈশিষ্ট্য, যেটি গভীরতর তা ভেঙে ফেলা, যদি একটি বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ পেতে চাই। সুতরাং এটি একটি সতর্কতামূলক সঙ্কেত, একে মোকাবিলার জন্য বা বিষ্ফোরিত হওয়া একে রক্ষা করতে আজকের দিনে এটা একটা শিক্ষা হতে পারে। আবার এর উৎস নিয়ে ভাবা এবং এর উৎসস্থল কীভাবে আরও সংকট তৈরি করতে পারে সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা বাড়তি পাওনা হতে পারে।

    স্রােয়েকো হোরবেট: আমাদের হাতে যেহেতু সময় কম, আমি শুধু শেষ একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। হ্যা, আমি মনে করি অনেক মানুষ আগ্রহী এবং আমরাও, যারা দশকের পর দশক ধরে সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছি, মোবিলাইজড ও সংগঠিত  হচ্ছি, মানুষে মানুষে শারীরিক এবং সামাজিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে। তবে এখন হঠাৎ করে আমরা সবাই এমন একটা বিষয়ে অভ্যস্ত হতে চলেছি যাকে বর্তমানে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলা হচ্ছে। সুতরাং, আমার প্রশ্ন হলো, সোসাল ডিসট্যান্সের সময়ে সামাজিক প্রতিরোধের ভবিষ্যতকে আপনি কীভাবে দেখছেন? এবং এটি যদি আরও কয়েক মাস সময় নেয়, বলার অপেক্ষা রাখে না, এক বছর বা দুই বছর যদি হয় এবং আমরা প্রধানত বাসায় সেল্ফ আইসোলেশনে থাকি, সারাবিশ্বের প্রগতির পক্ষের এক্টিভিস্ট, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, শ্রমিকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে? এই নতুন পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে সংগঠিত হবেন? এবং আপনি কোনো আশা দেখেন কিনা সম্ভবত সে সম্পর্কেও আমাদের বলতে পারেন যে একটি বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদে পতিত হওয়ার বিপরীতে, এই উন্মুক্ত ঐতিহাসিক পরিস্থিতি একটি বৈপ্লবিক রূপান্তরের দিকে যাবে কিনা, যেটি হবে সবুজ, সমান, ন্যায় এবং সংহতিপূর্ণ?

    নোম চমস্কি: সর্বপ্রথম, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিগত কয়েক বছর ধরেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার একটি রূপ চালু রয়েছে, যা খুবই ক্ষতিকর। এখন আপনি ম্যাকডোনাল্ডের একটি শপে যান এবং একগুচ্ছ তরুণদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, টেবিলের চারিপাশে তারা বসে আছে, হ্যামবার্গার খাচ্ছে, আপনার চোখে যা পড়বে তা হলো সেখানে দুটি কথোপকথন চলছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের হালকা আলাপ চলছে, আরেকটি হলো সেলফোনে দূরের কোনো এক ব্যক্তির সাথে চলানো কথোপকথন। এটা বেশ অস্বাভাবিক মাত্রায় মানুষকে ক্ষুদ্রতর ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সমাজ বলতে কিছু নেই থ্যাচারের এই নীতিটি আরও দূর বর্ধিত হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমগুলোর অপব্যবহার যা মানুষকে বিশেষ করে তরুণদের মারাত্মক বিচ্ছিন্ন প্রাণী হিসেবে গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সত্য সত্যই এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেগুলোর ফুটপাতে “দেখে চলুন“ লেখা ফলক টাঙানো থাকে, কারণ হেঁটে চলা প্রতিটি ছেলেপেলেই নিজের মধ্যে সেঁটে থাকে। এটা স্ব-প্রণোদিত সামাজিক বিচ্ছিন্নতারই একটা রূপমাত্র, এটা চরম ক্ষতিকর। আমরা এখন সত্যিকারের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি। যেকোনো উপায়েই হোক সামাজিক বন্ধন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে আমাদের এটা উৎরাতে হবে, যাদের সাহায্য দরকার তা সে যে কোনো উপায়েই হোক না কেন, সাহায্য করতে হবে। তাদের সাথে যোগাযোগ রেখে, সংগঠন দাঁড় করিয়ে, বিশ্লেষণের মাত্রা বাড়িয়ে, এবং পূর্বের মতোই আমি সেগুলোকে কার্যকর ও সক্রিয় করে তুলতে বলছি, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে, মানুষকে একসাথে নিয়ে আসতে হবে, ইন্টারনেটের যুগে সেটা খুবই সম্ভব, সবাইকে এক করে সামনে আসা সমস্যাগুলোর সমাধান বের করতে সুচিন্তিতভাবে আলোচনা করতে হবে, এসব সম্ভব, যদিও এই প্রক্রিয়া সামনা-সামনি  যোগাযোগের মতো নয়, মানুষের জন্য যা অপরিহার্য। তবে কিছুদিনের জন্য তা ব্যহত হবে, এটা কিছুদিনের জন্য থামিয়ে রেখে ভিন্ন উপায় খুঁজতে হবে, এবং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে, আরও গভীর ও বিস্তৃতভাবে হয়তো চালিয়ে নেয়া যাবে। সহজ হবে না, তবে মানুষ আগেও সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। (কুকুরের ডাকে কথা থেমে যায়)

    স্রােয়েকো হোরবেট: আমি কি একটি প্রশ্ন রাখতে পারি যেহেতু আমরা দুজনই সেল্ফ-আইসোলেশনে রয়েছি?

    নোম চমস্কি: আমরা কুকুর আলাপচারিতায় অংশ নিতে চাচ্ছে। 

    স্রােয়েকো হোরবেট: এর আগে কি ওটা তোতাপাখি ছিল? সেখানে একটি পাখির শব্দের মতো শুনতে পেয়েছিলাম, সেটি কি তোতাপাখি ছিল?

    নোম চমস্কি: হ্যা, তোতাপাখি, এটি পর্তুগিজ ভাষায় বলতে পারে: সকল মানুষের প্রতি সার্বভৌমত্ব।

    (উভয়ের মৃদু হাসি)

  • ইউভাল নোয়াহ হারিরি।। মহামারী, ক্ষমতা ও সংহতি

    ইউভাল নোয়াহ হারিরি।। মহামারী, ক্ষমতা ও সংহতি

    • অনুবাদ: ইকরামুল হক

    করোনা কোন অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়।মহামারী রোধে রাজনৈতিক ব্যবস্থারই ধরন ও কাঠামো এক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য। করোনা ভাইরাস নিয়ে রাষ্ট্র’র সৃষ্ট সংকট বোঝাপড়ার জন্য হারারির এই সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ । করোনা ভাইরাস বায়োমেট্রিক নজরদারি, পরিচালনা ও বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সাউদ চায়না মর্নিং পোস্ট  পত্রিকায় সাক্ষাতকারটি Homo Deus author Yuval Harari shares pandemic lessons from past and warnings for future শিরোনামে প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লিন্ডা লিউ।

    ইউভাল নোয়াহ হারিরি

    লিউ: আপনি হোমো ডিউস বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি সত্যি দুর্ভিক্ষ, প্লেগ এবং যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতাম…’। সেকথা ধরেই  বলছি, করোনা ভাইরাস মহামারীর বিস্তার অব্যাহত রয়েছে, আপনি কি এখনও বিশ্বাস করেন যে, মানুষ এই প্লেগের লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে?  

    হারারি: আমরা স্পষ্টতই নতুন সংক্রামক রোগের আগমন বন্ধ করতে পারবো না। রোগজীবাণু প্রতিনিয়ত প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে জেনেটিক রূপান্তরের (মিউটেশন) মাধ্যমে আগের চেয়ে আরো বেশি সংক্রামক এবং মারাত্মক হয়ে উঠে। তা সত্ত্বেও, আমাদের কাছে প্লেগের লাগাম টেনে ধরার এবং এর  হাত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং অর্থনীতির ধ্বংস রোধ করার উপায় আছে।

    আমাদের বর্তমান যুগের পরিস্থিতির সাথে আগের যুগের পরিস্থিতির তুলনা করতে পারি। খেয়াল করুন, আগের  যুগে যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়ত তখন সাধারণত মানুষ বুঝতে পারতো না– এই রোগগুলো কী কারণে ঘটেছে বা তাদের থামানোর জন্য কী করা যেতে পারে। তারা মনে করত মহামারী দেব-দেবীর অভিশাপে কিংবা ব্ল্যাক ম্যাজিকের কারণে হচ্ছে। সে কারণে তারা রোগ নিরাময়ের জন্য  দেব-দেবীর কাছে একত্রিত হয়ে প্রার্থনা করত, যেটা আসলে সংক্রমণকে আরো বাড়িয়ে দিত। চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন ব্ল্যাক ডেথের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের এক চতুর্থাংশের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল, তখনও মানবজাতি জানতো না, ঠিক কি কারণে এতো মানুষ মারা যাচ্ছে। এমনকি যখন ষোড়শ শতাব্দীতে গুটি বসন্ত এবং অন্যান্য মহামারীতে আমেরিকার আদি জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল, অ্যাজটেক, মায়া এবং ইনকা সভ্যতার মানুষজন ধারণা করতে পারেনি, কেন তারা মারা যাচ্ছে ।

    অন্যদিকে, খেয়াল করেন করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর, বিজ্ঞানীদের এই ‘নোভেল ভাইরাস’ চিনতে, এর জিনোম সিকুয়েন্স বের করতে এমনকি আক্রান্ত  ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে, একটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার উদ্ভাবন ঘটাতে মাত্র দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছে। করোনা ভাইরাসের সাথে লড়াইয়ে চিকিৎসকরা এগিয়ে  আছেন, কারণ রোগজীবাণুগুলি কোনরকম তথ্য ছাড়া কেবলমাত্র মিউটেশনের [mutation] এর উপর ভিত্তি করে আক্রমণ করে, অন্যদিকে চিকিৎসকরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের উপর নির্ভর করেন। একই সাথে অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে সরকার এবং ব্যাংকগুলি একটি সাধারণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: মেডিকেল মাজেল
    শিল্পী: মোহাম্মদ আফেফা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যাই হোক, এইখানে একটা বড় রকমের সতর্ক বার্তা আছে। এই মহামারী কাটিয়ে উঠার সক্ষমতা মানুষের রয়েছে। তার মানে এই না যে, এই সক্ষমতাকে ভালভাবে প্রয়োগ করার মত বোধশক্তি মানুষের সবসময় কাজ করে। ২০১৫ সালে আমি হোমো ডিউস বইতে লিখেছিলাম যে ‘যদিও আমরা নিশ্চিত নয় যে, নতুন ইবোলার প্রাদুর্ভাব বা একটি অজানা ফ্লু স্ট্রেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে কি পড়বে না এবং লক্ষ লক্ষ লোককে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলতে সমর্থ হবে কি হবে না। তবে তেমনটি হলে তখন আমরা একে অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে বিবেচনা করব না। বরং আমরা একে মানবজাতির ক্ষমার অযোগ্য কাজ হিসাবে বিবেচনা করব এবং এই ঘটনার  পিছনের মূল ব্যক্তিদের এরজন্য দায়ী করব। মানুষের কাছে মহামারী রোধ করার জন্য পর্যাপ্ত  জ্ঞান এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকার পরেও যদি মহামারীটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে সেটা ঈশ্বরের অভিশাপের (Divine Anger) জন্য ঘটবে না, ঘটবে মানুষের অক্ষমতার কারণে।

    আমি মনে করি, আমার এই কথাগুলো এখনকার পরিস্থিতির জন্যও সত্য। আমরা এখন গোটা পৃথিবী জুড়ে  যা দেখছি তা অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি মানুষের ব্যর্থতা। দায়িত্বজ্ঞানহীন সরকারগুলো তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অবহেলা করেছে, সময় মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখনো তারা বিশ্বব্যাপী কোন ধরনের কার্যকর  সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত  করতে পারেনি। আমাদের এটাকে থামানোর সক্ষমতা আছে, তবে এখনও পর্যন্ত এর লাগাম টেনে ধরার জন্য পর্যাপ্ত বুদ্ধির অভাব রয়েছে ।

    লিউ: মহামারী নিয়ন্ত্রণে চীন তার সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে বলছে যে, স্থানীয়ভাবে এই ভাইরাসের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। মহামারী মোকাবেলার জন্য লকডাউনে সক্ষম– এমন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কি পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর হবে?

    হারারি: ঠিক তেমনটা না। আপনি যদি কোন অসচেতন এবং সরকারের প্রতি আস্থাহীন জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে সেই  জনগোষ্ঠীকে সচেতন এবং সঠিক তথ্যে দীক্ষিত করতে পারেন, তখন মহামারী মোকাবেলা করা আপনার জন্য সহজ হবে। আর আপনি কি চাইলেও প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে টয়লেটে পুলিশ কিংবা ক্যামেরা রেখে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কাজটি করাতে পারবেন ? এইটা আসলে অসম্ভব একটা বিষয়। তার বদলে আপনি যদি মানুষকে সচেতন করতে পারেন এবং তারা যে তথ্য পাচ্ছে তার উপর তাদের আস্থা থাকে সে ক্ষেত্রে তারা নিজ উদ্যোগে সঠিক কাজটি করতে পারবে।

    আর্টওয়ার্ক: ও টেম্পোরা
    শিল্পী: টিমো এসনার
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমি স্কুলে শিখেছিলাম যে, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার কারণে রোগ হয়, সাবান দিয়ে হাত ধুলে রোগজীবাণু মরে যায়। সেই তথ্য আমি বিশ্বাস করেছিলাম। তাই আমি স্বেচ্ছায় হাত ধুই। একই কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষও তাই করে। সমস্যাটা হল সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের জনতোষণবাদী [Populist] রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞান, নির্ভরযোগ্য  গণমাধ্যম এবং পাবলিক অথোরিটির [Public Authority] প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাকে সংকুচিত করেছে। এই ধরনের আস্থাহীনতার ফলে জনগণ কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। কোন স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়াটা সমাধান না, বরং সমাধানটা হল বিজ্ঞান, গণমাধ্যম এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের উপর মানুষের আস্থা পুনর্নির্মাণ করা। যদি শাসন কাঠামো মানুষের প্রতি বিশ্বাস তৈরি করতে পারে, আপনি মানুষের প্রতি এই আস্থা রাখতে পারবেন যে, তারা কোন ধরনের নজরদারি বা শাস্তির ভয় ছাড়াই সঠিক কাজটি করবে ।

    লিউ: আমরা দেখেছি যে, চীনের মতো দেশগুলি মহামারীর  বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নাগরিকদের অবস্থান এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করতে স্মার্টফোন এবং অ্যাপস এর সাহায্য নিয়েছে। মহামারী বিশ্বব্যাপী কি আরও বায়োমেট্রিক রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটাতে পারে?

    হারারি: হ্যাঁ, এটা একটা বড় আশঙ্কার জায়গা। নজরদারির ইতিহাসে করোনা ভাইরাসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে । প্রথমত, যেসমস্ত দেশে গণনজরদারি (mass surveillance) ব্যবস্থা এতদিন ধরে ছিল না, এই ঘটনা সে সমস্ত দেশে গণনজরদারির (mass surveillance) সরঞ্জাম স্থাপনকে বৈধতা দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটি ‘ত্বকের ওপরে’ থেকে ‘ত্বকের নীচে’ পর্যন্ত নজরদারির নাটকীয় রূপান্তরকে নির্দেশ করতে পারে। আগে, সরকার প্রধানত আপনার গতিবিধি  পর্যবেক্ষণ করত–আপনি কোথায় যান, কার সাথে সাক্ষাত করেন, এসব । এখন তারা আপনার দেহের ভিতরে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আপনার শারীরিক অবস্থা যেমন: শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ–এই জাতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য আপনার সম্পর্কে সরকারকে আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য দিচ্ছে ।

    এমন কিছু টোটালিটেরিয়ান  রাষ্ট্রের কল্পনা করুন– ১০ বছরে যে রাষ্ট্রগুলো প্রতিটি নাগরিককে বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে বাধ্য করে–যা তাকে ২৪ ঘন্টা নজরদারির মধ্যে রাখবে। মানব দেহ এবং মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের ক্রমবর্ধমান জ্ঞান এবং একই সাথে মেশিন লার্নিংয়ের অপরিসীম ক্ষমতা ব্যবহার করে শাসন ব্যবস্থা, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, প্রতিটি নাগরিক প্রতিটি মুহুর্তে কী অনুভব করছে তা জানতে সক্ষম হতে পারবে। টেলিভিশনে ‘মহান’ নেতার  বক্তব্য শোনার সময় বায়োমেট্রিক সেন্সরগুলি যদি আপনার রাগ নির্দেশক (যেমন উচ্চ রক্তচাপ, শরীরের তাপমাত্রায় সামান্য বৃদ্ধি,অ্যামিগডালার ক্রমবর্ধমান ক্রিয়াকলাপ) শনাক্ত করে, আপনি ভালো রকমের সমস্যায় পড়তে পারেন। আপনি হাসতে এবং হাততালি দিতে পারেন, কিন্তু আপনি যদি সত্যিই রেগে থাকেন তবে শাসকরা তা বুঝতে পেরে যাবে।

    আর্টওয়ার্ক: গ্লোবাল সিকিউরিটি
    শিল্পী: অং থেইন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    লিউ: যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের কিছু রাষ্ট্রের হাতে এতো সময় থাকার পরও করোনা মোকাবেলায় তারা ধীর গতিতে এগিয়েছে । এ থেকে আমরা কি শিক্ষা নিতে পারি? 

    হারারি: আমি মনে করি এই মহামারী থেকে আমাদের মূল শিক্ষাটা হল যে, আমরা সকলেই একে অপরের সাথে যুক্ত। এটি কোনও চীনা বা ইতালিয়ান সংকট নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট । সারা বিশ্বের মানুষ একই রকমের অভিজ্ঞতা এবং ভয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভাইরাসের কাছে সবাই সমান। যতক্ষণ মহামারীটি যেকোন একটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে, এটি আমাদের সকলের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে, কারণ এটি আমাদের সবার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

    লিউ: এই মহামারী রাষ্ট্রগুলোর দিকে থেকে  বিশ্বায়নকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে এবং সীমানা, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির আদান প্রদানের ক্ষেত্রে আরও বাধা স্থাপন করতে পারে?

    হারারি: কিছু লোক করোনা ভাইরাস মহামারীর জন্য বিশ্বায়নকে দায়ী করে এবং তারা এও বলে যে, এইরকম ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য আমাদের বিশ্বায়নের রাস্তা বন্ধ করতে হবে।

    তাদের এই ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। মহামারী বিশ্বায়ন ঘটার অনেক আগেই ছড়িয়েছে। মধ্যযুগে ভাইরাসগুলি একটি মালবাহী ঘোড়ার মত গতিতে ভ্রমণ করেছিল এবং বেশিরভাগ জায়গায় তারা কেবলমাত্র ছোট শহর এবং গ্রামগুলিকে সংক্রমিত করতে পারত। যদিও ব্ল্যাক ডেথের মতো মহামারীগুলো আজকের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ ছিল। আপনি যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে মহামারী থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চান তবে আপনাকে প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে হবে। এটি সর্বশেষ সময় ছিল যখন মানুষ মহামারী থেকে মুক্ত ছিল, কারণ সেই সময়ে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের পরিধি ছোট ছিল।

    মহামারীটির আসল প্রতিষেধক বিচ্ছিন্নতা নয়, এর প্রতিষেধক হচ্ছে তথ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময় করা। ভাইরাসের চেয়ে মানুষের বড় সুবিধাটা হল মানুষ কার্যকর পদ্ধতিতে সহযোগিতা করতে পারে। ভাইরাস চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের উপর তার সংক্রমণের ধরন অদল বদল করতে পারে না। তবে চীন চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। তার চেয়েও বড় কথা, চীন সরাসরি বিশেষজ্ঞ এবং সরঞ্জাম প্রেরণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে পারে। ভাইরাসগুলি মানুষের মতো এরকম কিছু করতে পারে না।

    দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আমরা আমাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যাবহার করতে পারছি না। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর আস্থা কম রেখেছেন। আমাদেরকে এখন সে ভুলের মাসুল দিতে হচ্ছে। বিষয়টা অনেকটা অভিজ্ঞ মানুষ না থাকার মত।

    আর্টওয়ার্ক: সেলফলেস হিরো
    শিল্পী: ডোডি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আশা করি, আমরা অতিদ্রুত নিম্নে উল্লেখিত কমপক্ষে পাঁচটি ক্ষেত্রে অধিকতর সহযোগিতা দেখতে পাব:

    ১. নির্ভরযোগ্য তথ্য শেয়ার করা। যে দেশগুলি ইতিমধ্যে এই  মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে তাদের উচিত অন্যান্য দেশের সাথে তাদের পরামর্শ বিনিময় করা। মেডিসিন এবং ভ্যাকসিন এর উদ্ভাবনের প্রচেষ্টাতে বিশ্বজুড়ে সমস্ত তথ্য খোলাখুলিভাবে এবং দ্রুততার সাথে বিনিময় করা।

    ২. টেস্টিং কিট, ব্যাক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (PPE) এবং ভেন্টিলেটর মেশিন এর মত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের বৈশ্বিক উৎপাদন এবং বিতরণে সমন্বয় সাধন করা । বিশ্বব্যাপী সমন্বিত উৎপাদন ব্যাবস্থার সকল বাধা দূর করা এবং এটা  নিশ্চিত করা যে, এই চিকিৎসা উপকরণগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর পরিবর্তে যেন সেই সমস্ত দেশগুলো পায় যাদের এইগুলো বেশি প্রয়োজন।

    ৩. কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর চিকিৎসক, নার্স, বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে পাঠানো উচিত যাতে করে তারা সেই দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে  এবং সেই  সাথে মূল্যবান অভিজ্ঞতাও যেন অর্জন করতে পারে। মহামারীর কেন্দ্র পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে এটি চীন ছিল, এখন এটি ইউরোপ, সম্ভবত পরের মাসে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে ব্রাজিল হবে। ব্রাজিল যদি আজকে ইতালিকে সহায়তা করে, সম্ভবত ইতালির পরিস্থিতি দুই মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হবে, তখন তারা আবার ব্রাজিলকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবে ।

    ৪. সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও খাতগুলোকে বাঁচাতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরি করা। এটি দরিদ্র দেশগুলির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং জার্মানির মত সমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতি হয়ত কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে একবার মহামারীটি আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়লে আমরা যদি কোন ধরনের বৈশ্বিক পরিকল্পনা না নিই, তবে এই আক্রান্ত দেশগুলোর মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

    ৫. ভ্রমণকারীদের ভ্রমনপুর্ব স্ক্রিনিং এর বিষয়ে একটি বৈশ্বিক সমঝোতায় আসা দরকার যা ভ্রমণকারীদের আসা যাওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদান করবে। বিমানে চড়ার আগে ছেড়ে যাওয়া রাষ্ট্রের বিমান বন্দরে যদি ভ্রমণকারীদের ভালভাবে স্ক্রিন করা হয়, সেক্ষেত্রে গন্তব্য রাষ্ট্র ভ্রমকারীদের সেই দেশে প্রবেশের বিষয়ে নিরাপদ বোধ করা উচিত।

  • অনি মৈত্র।। কোভিড-১৯ ও নয়া-উদারনীতিবাদী জরুরি অবস্থা

    অনি মৈত্র।। কোভিড-১৯ ও নয়া-উদারনীতিবাদী জরুরি অবস্থা

    অনুবাদ : সারোয়ার তুষার

    আর্টওয়ার্ক: ডেনজারেস এপ্রোচ
    শিল্পী: অ্যালেক্স ফ্যাল্ক চ্যাং

    অনুবাদকের ভূমিকা: ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ এ “অকারণ জরুরতের ডেকে আনা জরুরি অবস্থা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লেখেন। করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে ইতালিতে আরোপিত জরুরি অবস্থার সমালোচনা করে উক্ত আর্টিকেলটি লিখেছিলেন জর্জিও আগামবেন। আগামবেনের আর্টিকেলটি ইতালি এবং ইতালির বাইরে দার্শনিক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তুমুল তর্কের সূচনা করে। পরেরদিনই, অর্থাৎ ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ফরাসি দার্শনিক জঁ-লুক ন্যান্সি  ‘ভাইরাসজনিত ব্যতিক্রম বা জরুরি অবস্থা‘ শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখে আগামবেনের সমালোচনা করেন। ন্যান্সির লেখা প্রকাশিত হবার পরের দিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ এ এই বিতর্কে ঢুকে পড়েন আরেক ইতালীয় দার্শনিক রবার্তো এসপজিতো। তিনি ‘তিক্ত নিরাময়‘ শিরোনামে প্রবন্ধে ন্যান্সির সমালোচনা করেন।

    বাংলা ভাষার সংশ্লিষ্ট পাঠকদের জন্য উল্লেখিত তিনটি প্রবন্ধের অনুবাদ হাজির করেছে বোধিচিত্ত। উপযুক্ত সময়ে জরুরি কাজটি করায় বোধিচিত্তকে ধন্যবাদ।

    এই ধারায় সর্বশেষ সংযোজন আল জাজিরায় গত ২৯ মার্চ, ২০২০ এ প্রকাশিত “COVID-19 and the neoliberal state of exeception” আর্টিকেল। এটি লিখেছেন বাঙালি বংশোদ্ভূত ভারতীয় নাগরিক ও নিউইয়র্কের হ্যামিল্টনে অবস্থিত কোলগেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ মৈত্র। তার এই প্রবন্ধটিকে জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত আগামবেনীয় মতের সমালোচনা ও সংযুক্তি বলা যেতে পারে।

    মহামারির বাস্তবতায় নিও লিবারেল তথা নয়া উদারনীতিবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিশ্বপরিসরে রাষ্ট্রকর্তৃক আরোপিত চিরাচরিত নিয়মের ‘ব্যতিক্রম’ জরুরি অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিবেচনা হাজির করেছেন অনিরুদ্ধ। এর মাধ্যমে ‘জরুরি অবস্থা’র এমন একটি বয়ান তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ, যেখানে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক-একচেটিয়া-নিপীড়নমূলক-আরোপিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক ক্ষমতাসম্পর্ক জিইয়ে রাখতে কেবল রাষ্ট্রই নয়, আপাত অর্থে রাষ্ট্র-বহির্ভূত ক্ষমতাধর বৈশ্বিক এলিটগোষ্ঠীর স্বার্থের ভূমিকাও টের পাওয়া যায়।

    কার্ল স্মিট মনে করতেন সার্বভৌম হলো সেই, যে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে। অন্যভাবে বললে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব এক আইনি প্যারাডক্স (একইসাথে আইনের ভেতর ও ঊর্ধে বিরাজ করা) হাজির করে। এই প্যারাডক্সই সার্বভৌমত্ব তথা আইনের শাসনের ভিত্তি। ( আলম/ ২০২০: ২৪৬)

    কিন্তু অনিরুদ্ধ মৈত্র কথিত নিওলিবারেল বিশ্বব্যবস্থা তথা পুঁজির সার্বভৌমত্বের কালে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে ট্র‍্যাডিশনাল কিংবা দৃশ্যমান সার্বভৌম ক্ষমতা কর্তৃক জরুরি অবস্থা জারির প্রাথমিক দ্বিধাকে আমরা কীভাবে পাঠ করব? পুঁজির সার্বভৌমত্বের যুগে জাতিরাষ্ট্র প্রবল বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও জরুরি অবস্থা জারির কার্যকর ক্ষমতা বা শর্ত কোথায় নিহিত ? এবং এর মাধ্যমে জরুরি অবস্থার কোন ডিসকোর্স হাজির হয়?

    এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা বসবাস করছি বৈশ্বিক দুর্যোগ পুঁজিবাদ ও শক ডক্ট্রিনের কালে (Klein 2007) । বাংলাদেশ রাষ্ট্র বৈশ্বিক ‘শক ডক্ট্রিন’ এর স্থানীয় গ্রাহক। সদা সর্বদা জরুরি অবস্থা এখন আর ‘স্টেট অব এক্সসেপশন’ তথা নিয়মের ‘ব্যতিক্রম’ নয়, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থাই এখন রুল বা নিয়ম। এই দুর্যোগ পুঁজিবাদ ও শক ডক্ট্রিনকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক সম্পর্কের জাল, মূল্যবোধ। এর ফলে এমন এক শাসনপ্রণালী অনিবার্য হয়ে উঠেছে যার লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় পরিসরে কাছাখোলা পুঁজির অবাধ প্রবাহ নির্বিঘ্ন করা, পুঁজির প্রবাহে নূন্যতম হস্তক্ষেপ না করা। রাষ্ট্র যদি অর্থনীতিকে বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’ এর নিকট ছেড়ে দেয় তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী? রাষ্ট্র থেকে কী লাভ? কিন্তু রাষ্ট্রকে তো থাকতে হবে!

    এই কারণেই আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা, নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা, ক্রমাগত সংকট উৎপাদন করা রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুগে ‘সংকট’ শাসনপ্রণালীর অনিবার্য ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র-কর্পোরেশন আঁতাতে গৃহীত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করতে নাগরিকের মনোজগতে সংকটকে স্থায়ী করে তোলা হয়েছে। সমাজে নিরাপত্তাহীনতা, ত্রাস ইনজেক্ট করা হচ্ছে পদ্ধতিগতভাবে। এভাবে কায়েম হয়েছে এক অনন্ত জরুরি অবস্থা, যাকে আর কেবল ট্রেডিশনাল সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের ‘ব্যতিক্রমী’ অবস্থার মাধ্যমে বোঝা যায়না। এই অনন্ত জরুরি অবস্থাকে বুঝতে হয় রাষ্ট্র-কর্পোরেশন, মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে গড়ে ওঠা মহাদৈত্যাকার কমপ্লেক্স এর সম্পর্ক ও সংঘাতের মাধ্যমে।

    একদিকে আছে কাছাখোলা প্রতিক্রিয়াশীল বাজার মৌলবাদ। বাজারব্যবস্থাকেই মানুষের জীবন-জীবিকার চূড়ান্ত পরিণতি জ্ঞান করানোর মতো আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনীতি মূল্যবোধ। বিশ্বের আপামর মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে শোচনীয়ভাবে অকার্যকর প্রমাণিত এই নয়া-উদারনীতিবাদ আবার শ্রেণী ক্ষমতাকে সুসংহত করতে ভীষণ কার্যকর। বহুজাতিক পুঁজির প্রবাহ ও অবাধ লুন্ঠন রোধ করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা শূন্য, বরং অনেকাংশেই শোষণ-লুন্ঠনের এই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয় রাষ্ট্র।

    অন্যদিকে আছে এরকম একটা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ, বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে কিংবা পুঁজির নির্বিঘ্ন বিচরণের বিরুদ্ধে সামান্যতম সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠলে তাকে দমন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রবল উপস্থিতি।

    নিও লিবারেল দুনিয়ায় এটাই হলো একইসাথে রাষ্ট্রের অস্তিত্বশীল না থাকা ও থাকার প্যারাডক্স। (মুহাম্মদ/ ২০১৯)

    নিওলিবারেল তথা নয়া-উদারনীতিবাদের যুগে রাষ্ট্র ও বৃহৎ বৃহৎ কর্পোরেশনের সমন্বয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এলিটশ্রেণী, গোটা বিশ্বের ১ শতাংশ হলেও সম্পদ-ক্ষমতা-সিদ্ধান্তের একচেটিয়া দখলদার।

    মহামারির কালে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই পলিটিকাল-ইকনমিক ক্লাস শক থেরাপির মাধ্যমে কিভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে, অনিরুদ্ধের এই প্রবন্ধে তা চমৎকারভাবে বিধৃত হয়েছে।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে জরুরি অবস্থা বহুল চর্চিত বিষয়। করোনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশেও জরুরি অবস্থা জারির গুঞ্জন এবং জারির পক্ষে হাইকোর্টে রিট করার মতো ঘটনা ঘটেছে বিগত দিনগুলোতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালে জরুরি অবস্থার বাংলাদেশী প্রেক্ষাপট-বাস্তবতা নিয়ে তুমুল মত-দ্বিমত লক্ষ্য করা গেছে।

    মহামারির কালে রাষ্ট্র-কর্পোরেশন বলয় তাদের ক্ষমতাকে আরো নিরঙ্কুশ করতে চায়, পক্ষান্তরে যেসকল রূপান্তরকামী রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষ সক্রিয় থাকে, তাদের জন্যও সংকটের কাল একটা সম্ভাবনা নিয়েও হাজির হয়। যে কথা, যে রূপকল্পকে আঁকড়ে ধরে তারা লড়াইরত, তা মানুষের কাছে আরো মূর্ত করে তুলবার সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হয়। আপাত ‘বিকল্পহীনতা’ গণমানুষের মধ্যে যে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে, সেখান থেকে ভিন্ন দুনিয়া, ভিন্ন ও অধিকতর ন্যায্য সমাজের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর পরিসর তৈরি হয়। সেই সম্ভাবনার উদ্দেশ্যেই এই অনুবাদটি প্রণীত।]

    জরুরি পরিস্থিতিতে নয়া-উদারনীতিবাদী সরকারসমূহ বেসরকারি খাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে কী ভূমিকা পালন করে ?

    ফেব্রুয়ারি ২০২০ এর শেষেরদিকে, ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন দেশটির মিডিয়া ও সরকারের সমালোচনা করেছিলেন কারণ তারা অন্য যেকোন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চেয়ে করোনা ভিন্ন কিছু তার যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়াই কোয়ারেন্টিন ও ‘সামাজিক দুরত্ব’ মেনে চলার বিধান দিয়েছিল।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ব্যাটেল
    শিল্পী: মোরো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আগামবেনের মতে, এই পদক্ষেপগুলো তিনি তাঁর কাজে যেমন “জরুরি অবস্থা”র উল্লেখ করেছেন তেমন প্রচণ্ড ‘ব্যতিক্রম’ সামারিকায়িত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে যা নাগরিক ও তাদের স্বাধীনতার উপর সরকারের অস্বাভাবিক ক্ষমতা চর্চার পাটাতন তৈরি করে। এরকম ‘জরুরি অবস্থা’য় ‘সুরক্ষা’র নামে রাষ্ট্রীয় পুরোহিতরা স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে, যে ‘স্বাধীনতা’ আবার বাহ্যত তারাই নিশ্চিত করতে পারে।

    বিগত বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা বিশ্ব জুড়ে কোয়ারানটাইন, লকডাউন এবং সরকারি মনিটরিং আমাদেরকে  ফরাসি দার্শনিক

    মিশেল ফুকো কথিত অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে প্লেগ-প্রবর্তিত ব্যতিক্রমি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির স্মরণ করিয়ে দেয়। ফুকো লিখেছেন, “মহামারিই হলো সেই মুহুর্ত যখন কোন জনগোষ্ঠীর স্থানিক বিভাজন ও পুনর্বিভাজনকে (quadrillage) এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যেখান থেকে আর বিপজ্জনক বার্তা, বিশৃঙ্খল সম্প্রদায় ও নিষিদ্ধ যোগাযোগগুলো সম্ভব নয়।”

    সংক্রামক রোগের বিস্তার রুখতে সরকার কর্তৃক জনগোষ্ঠীর বিভাজন হলো “নিরঙ্কুশ ক্ষমতার নির্মম প্রদর্শনি যা স্বীয় উদ্দেশ্যের প্রতি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগকৃত।” ফুকোর মতে সংক্রমণকালে (জনগোষ্ঠীকে) খুপরিবদ্ধ করে রাখা উদাম সরকারি ক্ষমতার উন্মোচন ঘটায়।

    আগামবেন হয়তো কেবলমাত্র ইতালিতেই দশহাজারেরও বেশি মৃত্যুর পর করোনা ভাইরাসের তীব্রতা সম্পর্কে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তবে “জরুরি অবস্থা” সম্পর্কে তার ফুকো-অনুপ্রাণিত যুক্তি আরও ঘনিষ্ঠ পর্যালোচনার দাবি রাখে। মোটের উপর নয়া-উদারনীতিবাদী একটা বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে সরকারি ‘ক্ষমতা’ বেসরকারি খাতের স্বার্থের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে, সেখানে “জরুরি অবস্থা”র তাৎপর্য কী আসলে?

    নাগরিকদের বাড়িতে অবস্থানের নির্দেশনা দিতে বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার ক্ষেত্রে সরকারগুলোর প্রাথমিক দ্বিধাকে আমরা কীভাবে পাঠ করব? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন সরকার কেন তাৎক্ষণিকভাবে তার ‘নিরঙ্কুশ’ ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটালো না?

    আর্টওয়ার্ক: স্টে এট হোম
    শিল্পী: সানাউনি ইমাদ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রথমে লকডাউন বা গণ কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা গ্রহণে বিভিন্ন সরকার কর্তৃক প্রদর্শিত নানামাত্রার অনিহার বিষয়টি বিবেচনা করুন। সর্বার্থেই চীনা শহর উহানে গৃহীত লকডাউন ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর ছিল। তবে লকডাউনটি এসেছিল করোনা প্রাদুর্ভাব একটা নির্দিষ্ট চূড়ায় পৌঁছানোর পর।

    মহামারির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে চীন সরকারের নিজস্ব আশঙ্কা অবশ্যই এখানে একটি ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু এই ‘নির্দিষ্ট চূড়া’র আবির্ভাবের পেছনে দেশি-বিদেশি উভয়ক্ষেত্রের অ-রাষ্ট্রীয় প্রভাবকদের চাপও ভূমিকা পালন করেছে।

    দ্য গার্ডিয়ান সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, চীন সরকার নভেম্বরের শুরু থেকেই প্রাথমিক কোভিড-১৯ কেস সম্পর্কে অবহিত ছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ অন্তত ৬০ টি নিশ্চিত কেস ছিল। তবে প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা তদন্তের পরিবর্তে, চীন সরকার গণমাধ্যম প্রতিবেদনগুলো সেন্সর করেছে। এমনকি নতুন সার্স (Severe Acute Respiratory Syndrome) এর মতো ভাইরাসের উহানে প্রাদুর্ভাব ঘটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হুইসেল ব্লোয়ারদের দমনও করেছে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চীনা অধিদপ্তর ডিসেম্বরের পাঁচ আরিখেই “অজ্ঞাত উৎসের ৪৪ জন নিউমোনিয়া রোগীর” ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি করলেও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কেন্দ্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল জানুয়ারির ৭ তারিখে নভেল করোনা ভাইরাসের কথা নিশ্চিত করেছে। জানুয়ারি ২০ এর আগে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভাইরাসটির মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের তথ্য স্বীকার করেনি এবং শেষমেষ জানুয়ারির ২৩ তারিখে উহান লকডাউন শুরু হয়।

    তারপর এই ধরণের একটি বৃহৎ আকারের লকডাউন বা কোয়ারানটাইন চীন সরকার তার জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চাপিয়ে দিয়েছে।

    ভাইরাস সম্পর্কিত প্রতিবেদন দমন করে চীন সরকার যা আটকাতে চেয়েছিল, লকডাউন সেইদিকেই চীনকে ধাবিত করেছে-গত দুইমাসে দেশটির শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে ঐতিহাসিক ধস।

    আসলে সত্য হলো আজকের দুনিয়ার নয়া উদারনীতিবাদী বৈশ্বিক অর্থনীতিতে-যা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, শেয়ারবাজার ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর আধিপত্য এবং অস্বীকৃত অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ – মূলধন, শ্রম ও পণ্যের অবাধ বিচরণকে বাধাগ্রস্ত করে এমন যে কোনও বৃহৎ প্রতিবন্ধকতাকে ‘প্রবৃদ্ধি-বিরোধি’ হিশেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এই কারণেই সরকার ও কর্পোরেশনগুলোর কাছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত।

    ইতালিও প্লেগসম ‘জরুরি অবস্থা’য় ধরাশায়ী হয়ে, মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত নয়। স্থানীয় এবং রাজ্য সরকারগুলোকে অভূতপূর্ব ক্ষমতা দেয়ার পরেও, লকডাউন ইতালিতে মন্দার আশঙ্কাও তৈরি করেছে।

    বিনিয়োগ সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাকস-এর (Goldman Sachs) মতে, লকডাউনের ফলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ খাতগুলো হলো- পর্যটন, ভ্রমণ, আতিথেয়তা এবং ক্ষুদ্রব্যবসায়। এই খাতগুলো ইতালির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৩ শতাংশ।

    ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়া উদারনীতিবাদী কঠোর নীতিসমূহের বহু সমালোচকদের কাছে, ইতালি ও স্পেনের লকডাউন সৃষ্ট পরিস্থিতি আসলে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দুর্বলতা, বেসরকারি খাতের উপর অতিনির্ভরশীলতা এবং নজিরবিহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ প্রদর্শনি।

    মার্চের ১৬ তারিখ, ঠিক যেদিন স্পেনিশ সরকার সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ; সেইদিনই মাদ্রিদের একটি হাসপাতালের বাইরে অঝরো ক্রন্দনরত এক নারীর ভিডিও ফুটেজ দেখেছিল গোটা বিশ্ব। তার স্বামী সবেমাত্র করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন এবং পরীক্ষায় তারও করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছিল। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসা করার মতো ‘যথেষ্ট অসুস্থ নয়’ বলে এই নারীটিকে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    জরুরি অবস্থাই সিদ্ধান্ত নেয় নাগরিকদের মধ্যে কাদের জীবন রক্ষাযোগ্য এবং কাদের জীবন নয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার এই সক্ষমতা আবার বিপরীত দিক থেকে বেশিরভাগ নাগরিককে রক্ষা করা ও সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে নয়া উদারনীতিবাদী রাষ্ট্রের অক্ষমতার মুহুর্তও উন্মোচন করে।

    তাহলে সম্ভবত একেবারেই বিস্ময়কর নয় যে, এই ভাইরাসকে মোকাবেলার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই লকডাউন ব্যবস্থা আরোপে বেশ ‘ধীরে চলো’ নীতিতে ছিল। এখানে অনুচ্চারিত ভয়টি হলো এই যে, ‘জরুরি অবস্থা’ কেবলমাত্র মানুষ, পণ্য ও আর্থিক বাজারের নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহের উপরই প্রভাব ফেলবে না, বরং জাতীয় সরকারগুলোর উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব (বহু আগেই যা বাজারের হাতে ন্যস্ত) অর্পণ করবে।

    অর্থাৎ, জরুরি অবস্থা জারির প্রতি এই অনিহা ‘স্বাভাবিক’ কারণ সকলের জন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা হয় অপ্রতুল (যেমন যুক্তরাজ্যে), অথবা অস্তিত্বহীন (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে)। মহামারি মোকাবেলায় ধুঁকতে থাকা প্রত্যেকটি দেশই এখন, ভাইরাসটির ক্রমবর্ধমান বিস্তারের প্রেক্ষাপটে তার সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের স্বাস্থ্য এবং ‘উন্নত’ পুঁজিবাদী অর্থনীতি হিশেবে নিজের বৈশ্বিক খ্যাতির সাংঘর্ষিক বাস্তবতা স্মরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

    নয়া উদারনীতিবাদী আত্মশ্লাঘা এবং সংকটকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়ার সাংঘর্ষিক বাস্তবতা সম্ভবত সবচেয়ে প্রকটভাবে দৃশ্যমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়। শেষাবধি মধ্যমার্চে জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং ‘সামাজিক দুরত্বের’ দিকনির্দেশনা দেয়ার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার টানা কয়েক সপ্তাহ ভাইরাসের ভয়াবহতার মাত্রাকে ক্রমাগত অস্বীকার করে গেছে। তবে আমরা যেন ভুলে না যাই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিংবা বাইরের মৃত্যুসংখ্যা নয়, বরং শেয়ারবাজারের ঐতিহাসিক ধসের মুখে এই সরকার ভাইরাসজনিত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে নড়েচড়ে বসেছে।

    প্রকৃতপক্ষে, জরুরি অবস্থার আগ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফক্স নিউজের রক্ষণশীল হোস্টের দৃষ্টিভঙ্গি ও কথার ভঙ্গিতে চমকপ্রদ মিল ছিল, যিনি দাবি করেছিলেন যে “রাষ্ট্রপতির উপর অভিশংসন চাপিয়ে দেয়ার আরও একটি [ডেমক্রেট] কৌশল” হচ্ছে কোভিড-১৯।

    আমরা যেন এও না ভুলে যাই যে, ‘সামাজিক দুরত্ব’ পালনের নির্দেশনা কিংবা এমনকি করোনা টেস্টিং অবকাঠামোর উন্নতির লক্ষ্যে প্রাইভেট-পাবলিক অংশীদারিত্বের ঢোল পিটানোর চাইতেও ফেডারেল সরকারের কাছে কী অগ্রাধিকার পেয়েছে : অর্থনৈতিক সংকট ঠেকাতে ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকের পেছন পেছন ছুটছে।

    যদিও কেউ কেউ তর্ক তুলতে পারে যে, অবশ্যসম্ভাবী ধসের হাত থেকে বাজারকে রক্ষায় এই ঋণ জরুরি প্রতিরক্ষা, আমাদের খেয়াল রাখা উচিত রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা ঘোষণার সাথে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল সহায়তার প্রাথমিক ঘোষণাও এসেছিল যা ব্যাংকগুলোর জন্য বরাদ্দ অর্থের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণের কম।

    পলিটিকো’র অনিতা কুমার যেমনটি উল্লেখ করেছেন, এমনকি জরুরি অবস্থায় ভাইরাস মোকাবেলায় ফেডারেল সহায়তার ঘোষণার মধ্যেও “একটি স্পষ্ট বাজারবান্ধব ঘ্রাণ”(market-first) বিদ্যমান ; কারণ সারাদেশে করোনার লক্ষণ পরীক্ষা বাড়াতে হোয়াইট হাউজ গুগল, টার্গেট, অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের মতো কর্পোরেশনগুলোর সাথে নজিরবিহীন মধ্যস্থতা করেছে।

    যদিও সরকারের নিষ্ক্রিয়তার চাইতে এইসব অংশীদারিত্বই বরং বেশি কাঙ্ক্ষিত মনে হতে পারে, তারপরেও এর ফলে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এই জরুরি অবস্থার মূল কারিগর আসলে বেসরকারি খাত। বিশেষত দৈত্যাকার বহুজাতিক সংস্থাসমূহ যাদের কপাল খুললে ওয়ালস্ট্রিটের কপাল খুলে যায়। জরুরি অবস্থার ‘ব্যতিক্রমি’ নয়া উদারনীতিবাদী রাষ্ট্র এই ‘অংশিদারিত্ব’ ছাড়া এই মুহুর্তে সম্পূর্ণ অকার্যকর।

    একই সাথে, ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে জনগণের মধ্যে ‘দেশপ্রেম’ চাগিয়ে দেয়া এবং নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন’ অবতার হিশেবে পুনঃপুন ব্র্যান্ডিং এর ডোনাল্ড ট্রাম্প্রীয় কূটকৌশলের পরেও, ফেডারেল সরকার ও স্থানীয় রাজ্য সরকারগুলোর মধ্যে ক্রমাগত সংযোগহীনতার নিহিতার্থও আমাদের উপেক্ষা করলে চলবে না।

    এখানেও, আগামবেন কথিত ‘জরুরি অবস্থা’ কিংবা ফুকো কথিত অদম্য সরকারি ক্ষমতার ধারণার পুনর্মূল্যায়ন দরকার। ফেডারেল সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার বহু আগেই, স্কুল বন্ধ এবং ‘সামাজিক দূরত্ব’ পালনের নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য গভর্নর ও নগরপ্রধানরা নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছেন। এবং অবশ্যই স্মর্তব্য, রাষ্ট্রপতি যেখানে এখন ইস্টার ( যিশুর পুনরুত্থান দিবস) এর আগে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশিকা শিথিল করে অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং রাজ্য গভর্নররা আক্রান্তের হার শুন্যে নামিয়ে আনতে এখনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়ে যাচ্ছেন।

    আর্টওয়ার্ক: হেলথ সিস্টেম
    শিল্পী: ভাস্কো গারগ্যালো
    সিূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কোভিড -১৯, তাই এমন এক মার্কিনী ‘জরুরি অবস্থা’ হাজির করেছে, যা ভেতর থেকেই দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সম্পূর্ণ ধসে পড়া ওয়েলফেয়ার কাঠামোর বাস্তবতায় কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করার মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর

    আশুকর্তব্যের উপলব্ধি এবং আর্থিক বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে যেকোন নতি স্বীকার করতে উন্মুখ নব্য উদারনীতিবাদী নীতি পরস্পর দ্বন্দ্বমুখর।

    যদি এই ফাটল এবং বিভাজনগুলোর সাথে এই নির্বাচনের বছরের হিসাবনিকাশকে রাঙ্গানো যায় ; তাহলে আসন্ন মাসগুলোতে ধাবমান যে গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক জরুরি পরিস্থিতির আলামত পাওয়া যাচ্ছে, তাকে না রাষ্ট্রপতির  বাগাড়ম্বর, না ‘স্বাধীনতা, ‘গণতন্ত্র, ‘বাজার’ এর মতো নয়া উদারনীতিবাদী ফাঁপা বুলি ঠিক করতে সক্ষম হবে।

    সদ্য পাস হওয়া ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্দীপক বিলের ‘দুর্যোগ সমাজতন্ত্র’ পুনর্নিবাচনের কৌশল (re-election strategy) কিনা তা বলার সময় এখনো হয়নি। একদিকে, এটি রাজ্য সরকার, হাসপাতাল এবং শিল্পগুলোকে  অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, বিলের অগ্রাধিকারের খাতগুলো বলছে: ব্যবসায়ের জন্য ৫০০ বিলিয়ন ডলার, স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলার, রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য প্রায় শূন্য ভর্তুকি।

    চিকিৎসাখাতের মারাত্মক অবকাঠামোগত সঙ্কট এবং বেকারবীমার আকাশছোঁয়া দাবির মুখোমুখি হয়ে নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো ইতিমধ্যে তার রাজ্যে বরাদ্দকৃত অর্থকে “বিশাল বালতিতে এক ফোঁটা” হিশেবে সমালোচনা করেছেন। কুমো এবং অন্যান্য ডেমোক্র্যাটরাও ফেডারেল সরকারের প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন প্রণয়নের তোরজোড়ের পরেও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি উৎপাদনকে জাতীয়করণে ট্রাম্পের অস্বীকৃতিকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

    এখানে আবারও আমরা নিজেদেরকে এক উদ্ভট জরুরি অবস্থায় আবিষ্কার করছি যেখানে ফেডারেল সরকার পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এটা কেবল প্রতিনিধিত্ব করতে চাইছে।

    আগামবেন ও ফুকো বর্ণিত জরুরি অবস্থায় সরকারি ক্ষমতা মানে শুদ্ধ শৃঙ্খলা। বিপরীত দিক থেকে মার্কিন জরুরি অবস্থাকে শুদ্ধ বিশৃঙ্খলা বলেই মনে হচ্ছে।

    ভাইরাসের প্রকোপ কমে আসতে আসতে এবং প্রতিষেধক সহজলভ্য হতে হতে, লক্ষ লক্ষ আমেরিকান, যাদের জীবন  ও জীবিকার মারাত্মক অধঃপতন ঘটবে, তাদের জন্য এই বিশৃঙ্খল জরুরি অবস্থা একটা আগাগোড়া ব্যক্তি ও বেসরকারি মালিকানাধীন অর্থনীতির অনিশ্চয়তার উপর নির্ভরশীল কোন দেশে বসবাসের ঝুঁকি উপলব্ধি করার ঘুম ভাঙ্গানিয়া মুহুর্তও বটে। বিশেষত এমন এক রাজনৈতিক অর্থনীতি যার ওঠানামায় সাধারণ আমেরিকানদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।

    রাজনীতিবিদ এবং টেলিভিশনের উপস্থাপকেরা ‘মার্কিন জনগণ’কে মুক্তবাজার প্রদত্ত ‘স্বাধীনতা’র প্রতি অনুরক্ত হিশেবে প্রচার করতে পছন্দ করে। প্রহেলিকাপূর্ণ এই জরুরি অবস্থার ভুক্তভোগী মার্কিনীরা এবার এই ধারণা পরিবর্তনে সক্রিয় হতে পারে।

    নাওমি ক্লেইন যেমন সম্প্রতি তাঁর “করোনা-পুঁজিবাদ” ভিডিওতে যুক্তি দেখিয়েছেন, সঙ্কটের সময়ে অসম্ভব ধারণাগুলোই সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে। তবে কাদের ধারণাগুলো সম্ভবপর বলে বিবেচিত হবে সেটাই মুখ্য : বাস্তুহারা এবং লাঞ্ছিত-বঞ্চিতদের নাকি ইতিমধ্যেই সম্পদশালী ও সুবিধাপ্রাপ্তদের।

    এই জরুরি অবস্থাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যত্রও পরিবর্তনের একটা মওকা হয়ে উঠতে পারে। তবে এটা কেবলমাত্র তখনই হবে, যখন আমরা জনগণ কেন্দ্রীক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর সমাবেশ ঘটাতে পারব এবং ‘চুইয়ে পড়া’ নীতি ও বাজারপন্থী কর্পোরেট প্রণোদনায় সন্তুষ্ট হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করতে পারব।

    আলম, পারভেজ,(২০২০) ‘আসল জরুরি অবস্থা’, মদিনা; আদর্শ প্রকাশনি, ২০২০, ঢাকা।

    Klein, Naomi, (2007) THE SHOCK DOCTRINE : THE RISE OF DISASTER CAPITALISM , Metropolitan Books , 2007 , New York.

    মুহাম্মদ ,আনু, (২০১৯) রাষ্ট্র আছে রাষ্ট্র নাই ; সংহতি প্রকাশন , ২০১৯ , ঢাকা ।

  • জঁ-লুক ন্যান্সি।। কম্যুনোভাইরাস

    জঁ-লুক ন্যান্সি।। কম্যুনোভাইরাস

    অনুবাদ: শাহারিয়ার জিম

    ভূমিকা:
    জঁ-লুক ন্যান্সি প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত La Communauté désœuvrée (The Inoperative Community) ন্যান্সির অন্যতম সুপরিচিত কাজ। গোষ্ঠী বা কম্যুনিটি’র প্রশ্ন তাঁর এই কাজের বিষয়বস্তু। করোনা মহামারি ও এর সাপেক্ষে জরুরী অবস্থার প্রসঙ্গে জর্জিও আগামবেন ও রবার্তো এসপজিতো’র সাথে বিতর্কে জড়িয়ে ইতোমধ্যেই Viral Exception ও A Much Too Human Virus শিরোনামের লেখা লিখেছেন। করোনা ভাইরাস মহামারী প্রসঙ্গে ন্যান্সি’র তৃতীয় রচনা Communovirus , ২৪শে মার্চ, ২০২০ তে প্রকাশিত হয়েছে Libération–এ। ২৭শে মার্চে ডেভিড ফেয়ার্নবাখকৃত ইংরেজি অনুবাদ verso-তে প্রকাশিত হয়েছে।করোনা ভাইরাস আমাদের কম্যুনাইজ বা গোষ্টীবদ্ধ করছে, কেননা আমাদেরকে এজমালি বা যৌথভাবে একে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এতে আমাদের কম্যুনিটি’র সত্যিকারের অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ রয়েছে বলে ন্যান্সি মনে করেছেন। ন্যান্সি’র এই Communovirus রচনাটি অনুবাদ করেছেন শাহারিয়ার জিম। বোধিচিত্তের সৌজন্যে রচনাটি প্রকাশিত হল।

    জঁ-লুক ন্যান্সি

    মূল রচনা
    আমার এক ইন্ডিয়ান বন্ধুর মুখে শুনলাম তাদের ওইখানে ভাইরাসটাকে ‘কম্যুনোভাইরাস’ (Communovirus) নামে ডাকে। এই বিষয়টা কিভাবে ইতোমধ্যে আমাদের মাথায় নাড়া দেয়নাই? এটাতো বেশ সহজেই ধরা যায়! কী একটা অদ্ভুত এবং সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থব্যঞ্জক ঘটনাঃ কম্যুনিজম থেকে আবির্ভাব ঘটা এক ভাইরাসের, যে ভাইরাস আমাদেরকে কম্যুনাইজ (গোষ্ঠীবদ্ধ) করে। করোনা(Corona)‘র মত একটা বিদ্রুপাত্মক নাম যা ইতিহাসের পুরানা রাজতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদী গন্ধ ছড়ায়, সেটার তুলনায় কম্যুনো(Communo) নামটা বেশ ফলপ্রসূ। নিদেনপক্ষে এটা ভাল দিক যে, কম্যুনো নামটা করোনা‘র মুন্ডুপাত না করতে পারলেও এটিকে সিংহাসনচ্যুত করতে পারে বটে।

    প্রথম নজরে বিষয়টির অর্থ অনেকটা এরকমই মনে হয়, যেহেতু এই ভাইরাসের আবির্ভাব এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ঘটেছে যারা নিজেদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম্যুনিস্ট বলেই দাবী করে বর্তমান সময়ে। তবে শুধু প্রাতিষ্ঠানিকতাই নয়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ভাষ্যমতেঃ এই ভাইরাল এপিডেমিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের যে সাফল্য, সেটি মূলত “চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা”রই সাফল্য। যদিও ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ ঘটানো কম্যুনিজমের একটি মূল বৈশিষ্ট্য, তবে চীনা কম্যুনিজমের ক্ষেত্রে আমরা সামষ্টিক(বা রাষ্ট্রীয়) সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি(জমির মালিকানা বাদে)– এই দুইয়ের এক মিশ্রণ লক্ষ্য করছি অনেক বছর ধরেই।

    আর্টওয়ার্ক: চাইনা
    শিল্পী: দানিয়েল মারফি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই বিকল্প ব্যবস্থা চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার কতটা উন্নতিসাধন ঘটিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী এর যে ভূমিকা সেটি আমাদের সবারই জানা আছে। এই বিকল্প ব্যবস্থার সমাজকে ঠিক কী নামে অভিহিত করা যায় সেটি এখনই বলা যাচ্ছে নাঃ কারণ ঠিক কোন অর্থে এটি কম্যুনিস্ট এবং একইসাথে আবার ব্যক্তি প্রতিযোগিতার বিষ ছড়াতেও সক্ষম, যা উদারনীতিবাদের চূড়ান্ত রূপ বা আলট্রালিবারেল এক্সট্রিম পর্যায় ধারণ করে এমন প্রশ্ন থেকে যায়। তবে আপাতত কোভিড-১৯ ভাইরাস ঠেকাতে চীনের যে সাফল্য সেটি তার সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। এই সাফল্য এতটাই প্রমাণিত যে, চীন এখন ইতালি এবং ফ্রান্সের জন্যও নতুন একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

    বর্তমান সময়ে চীনা রাষ্ট্র যে কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবল ক্ষমতা উপভোগ করছে সেটি নিয়েও বিতর্কের কমতি নেই অবশ্য। এমনকি এখন বিষয়টা এমন মনে হচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক চীনা কম্যুনিজমের ঝান্ডাকে উদীয়মান করতে একেবারে ঠিক সময়েই এই ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে এর ফলে ‘কম্যুনিজম’ ধারনাটির অর্থ নিয়ে আরও যে ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরী হবে সেটি কপালে ভাঁজ ফেলার মত বিষয় বটে।

    মার্ক্সের লেখায় এই বিষয়টা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাবে সামষ্টিক সম্পত্তির উচ্ছেদ ঘটে এবং এই দুই ধরনের সম্পত্তিই একটা সময় গিয়ে ‘স্বীয় সম্পত্তি’(individual property) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এই ‘স্বীয় সম্পত্তি’ দ্বারা এখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যক্তি কত সম্পত্তির মালিক সেটা বুঝানো হয়না। বরং ব্যক্তির যথাযথভাবে সামগ্রিক বিকাশের সম্ভাবনাকে বুঝানো হয়। এই ধারণাটি আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপায় বা সময় হয়তো ছিল না মার্ক্সের হাতে। তবে কম্যুনিস্ট প্রস্তাবনার এই দিকটি বর্তমানে আমাদের কাছে প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ধরা দিয়েছে। ‘আত্ম উপলব্ধি’ ধারনাটির অর্থ বস্তুগত কিংবা প্রতীকি সম্পত্তি অর্জন করা নয়, বরং স্বতন্ত্র পন্থায় বাস্তবিক, কার্যকরী এবং অস্তিত্ববান হয়ে ওঠা।

    এবার কম্যুনোভাইরাস শব্দটির দ্বিতীয় অর্থটির দিকে একটু নজর দেয়া প্রয়োজন। ভাইরাসটি মূলত আমাদেরকে কম্যুনাইজ(গোষ্ঠীবদ্ধ) করে। ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে গিয়ে আমরা সর্বজনীনভাবে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে আমরা সবাই একত্রে সমানভাবে হুমকির মুখে। আমরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও আপাতবিরোধী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধতার এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। শুধুমাত্র গোষ্ঠীবদ্ধতার মাধ্যমেই আমরা স্বতন্ত্র একক হয়ে উঠতে পারি। এই স্বাতন্ত্র্যবোধের অংশীদারীত্বই সর্বাধিক একতাবদ্ধ গোষ্ঠী তৈরীর প্রণালী।

    একতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সংহতির কথা আজকে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রত্যেকভাবেই। এগুলোর যে প্রয়োজনীয়তা, তার প্রমাণ ও উদ্যোগ আমরা সবদিক থেকেই অনুভব করছি। এর সাথে যদি আমরা যানবাহন এবং কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বায়ু দূষণের হার কমে যাওয়ার ব্যাপারটিও যোগ করি, তাহলে এই ব্যাপারটির ফলে ইতোমধ্যে অনেকেই টেকনো-ক্যাপিটালিজমের পতনের কথা ভেবে খুশীতে গদগদ হচ্ছে। তবে এসব ব্যাপার নিয়ে এত গদগদ হওয়ার কিছু নেই আমাদের, বরং আমরা আমাদের গোষ্ঠী’র প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কীভাবে আরও ভালো বোঝাপড়া তৈরী করতে পারি, এই প্রশ্নটি করা উচিত নিজেদেরকে।

    আর্টওয়ার্ক: র‌্যাপেনজেল কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: ক্যামেডেলাফু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সংহতি’র সক্রিয়তা এবং আমন্ত্রণ দেখতে পাচ্ছি আমরা বহুলাংশেই, কিন্তু সামগ্রিক গণমাধ্যম মূলত রাষ্ট্রের নিজস্ব কল্যাণেই ব্যবহৃত হচ্ছে- যার সুবর্ণ সুযোগ এমানুয়েল ম্যাকরনকে ব্যবহার করতে দেখি আমরা। আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে কোয়ারেন্টাইনে না রেখে বরং জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বন্দী অবস্থায় রয়েছি, যদিওবা সেটা আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই। বিচ্ছিন্নতার এই অভিজ্ঞতাটি আমরা বঞ্চনাবোধ হিসেবে অনুভব করছি, এমনকি যখন সেটি আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে তখনও।

    একদিক থেকে এই সময়টি নিজেদেরকে আবিষ্কার করারও একটা সুযোগঃ এটা সত্য যে আমরা অসামাজিক জীব না। আমাদেরকে পরস্পরের সাথে মিশতে হয়, দেখা করতে হয়, একসাথে বসে আড্ডা মারতে হয় এবং ঘোরাঘুরি করতে হয় এসবও সত্য। এছাড়াও, ফোনে কথা বলা, ই-মেইল এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে আমাদের আকস্মাৎ এত সক্রিয়তা আরও একটি ব্যাপারের দিকে ইঙ্গিত করে, সেটি হচ্ছে যোগাযোগহীন হয়ে পড়ার ভীতি।

    তার মানে কি এরকম যে, এই গোষ্ঠী নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার জন্য আমরা একটা উত্তম অবস্থানে আছি? সমস্যাটা হচ্ছে, ভাইরাসটি এখনও প্রধান প্রতিনিধি(representative) হিসেবে কাজ করছে; হোক সেটি নজরদারিমূলক কোনও ব্যবস্থা অথবা কল্যাণমূলক কোনও ব্যবস্থা, ভাইরাসটিই এখন একমাত্র সাধারণ বৈশিষ্ট্য উভয় ব্যবস্থাতেই।

    আর্টওয়ার্ক: মার্ক্স এনিভার্সারি
    শিল্পী:িএলান ম্যাক ডোনাল্ড
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যদি ব্যাপারটা এমনই হয়ে থাকে, তাহলে সামষ্টিক এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া বলতে কী বুঝানো হয় সেই ব্যাপারটি নিয়ে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনও অগ্রগতি ঘটবে না। সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া বলতে এখানে দুইটা অর্থ রয়েছে। একটি হচ্ছে সাধারণ অর্থে সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া, আরেকটা হচ্ছে সাবজেক্টের দ্বারা দখলকৃত যে অবজেক্ট, সেই দখলের ব্যাপারটিকে অতিক্রম করা (Transcending)। মার্ক্সের ভাষায় বলতে গেলে, ব্যক্তি’র প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে অতুলনীয়, অদ্বিতীয় এবং অকৃত্রিম হয়ে উঠবে এমনকি তার নিজের সাথেও। বস্তু বা সম্পত্তি অর্জন করা ব্যক্তি’র প্রকৃতি নয়। ব্যক্তি হবে স্বতন্ত্র। নিজেকে উপলব্ধি করার স্বতন্ত্র সম্ভাবনা থাকবে তার মধ্যে, এবং এই স্বাতন্ত্র্য আবার সামগ্রিকতার মধ্যেই ক্রিয়ারত থাকে সামগ্রিকতার বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও। সামগ্রিকতা ও স্বাতন্ত্র্যের এই পরস্পর দ্বান্দিক ব্যবস্থাটি বজায় থাকে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ও বিনিময় স্থাপিত হওয়ার মাধ্যমে(ন্যান্সির ভাষায়, যোগাযোগ)। এটা এমন এক ধরনের ‘মূল্য’ যা টাকাপয়সা কিংবা শোষণকৃত উদ্ধৃত্ত কোনওটা দিয়েই ক্রয়যোগ্য নয়, এমন ‘মূল্য’ যা কোনওভাবে পরিমাপও করা যায়না।

    প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এরকম দুঃসাধ্য এবং ধোয়াঁটে কায়দায় ভাবতে সক্ষম? এটা একটা ভাল দিক যে ‘কম্যুনোভাইরাস’ আমাদের নিজেদেরকে এইসব প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে। তাই সময় থাকতে থাকতেই এই প্রশ্নগুলোর সমাধান আমাদের ভাবা উচিত। নয়তো আমরা আবার আগের পরিস্থিতিতেই পতিত হব। হয়তো আমরা এই বৈশ্বিক মহামারী থেকে বেঁচেও যাবো, কিন্তু অন্যান্য মহামারীর জন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিৎ।
  • জঁ-লুক ন্যান্সি ।। ভাইরাসজনিত ব্যতিক্রম বা জরুরী অবস্থা

    জঁ-লুক ন্যান্সি ।। ভাইরাসজনিত ব্যতিক্রম বা জরুরী অবস্থা

    অনুবাদ: বোধিচিত্ত

    বোধিচিত্তর ভূমিকা: করোনা মহামারি ও এর সাপেক্ষে জরুরী অবস্থার প্রসঙ্গে জর্জিও আগামবেনের ২৬শে ফেব্রুয়ারি,২০২০-তে প্রকাশিত The state of exception provoked by an unmotivated emergency  লেখাটার সমালোচনা করে বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক জঁ-লুক ন্যান্সি “Antinomie” তে Viral Exception নামে একটি রচনা লেখেন। এই লেখাটি জর্জিও আগামবেনের লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই অর্থাৎ ২৭শে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দার্শনিক ন্যান্সির লেখাটি ইংরেজি অনুবাদ থেকে এখানে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।

    জঁ-লুক ন্যান্সি

    মূল রচনা

    আমার বহু পুরনো বন্ধু জর্জিও আগামবেন তর্ক তুলেছে যে সাধারণ ফ্লু-এর সাথে করোনা ভাইরাসের পার্থক্য কদাচিৎ। তিনি ভুলে যাচ্ছেন যে ‘সাধারণ’ ফ্লু’র জন্য কার্যকর প্রমাণিত প্রতিষেধক আছে। ভাইরাসের পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার কারণে এমনকি এই প্রতিষেধকও ক্রমাগত মানোন্নত করে যেতে হয় । এতদসত্ত্বেও ‘সাধারণ’ ফ্লু প্রচুর মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। অথচ, করোনা ভাইরাস যার কোন প্রতিষেধক নেই তা পরিষ্কারভাবেই আরো উচ্চ মৃত্যুহারের কারণ হয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখে। এই ব্যবধান (আগামবেন যেই তথ্যসূত্র ব্যবহার করছেন সেইরকমের তথসূত্রই বলছে) হচ্ছে প্রায় ১ আর ৩০। এই পার্থক্য আমার কাছে কোনোভাবেই অগুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না।
    আগামবেন বলছেন যে, সরকারগুলো সকল ধরনের অছিলার সুযোগ নিয়ে ক্রমাগত ব্যতিক্রমী অবস্থা কায়েম করতে চায়। কিন্তু তিনি এটা চিহ্নায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে ব্যতিক্রমী অবস্থা কার্যতই এই দুনিয়ার নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে যেখানে সকল প্রকারের প্রযুক্তিগত আন্তঃযোগাযোগ (তৎপরতা, যেকোন ধরনের আদান-প্রদান, বিভিন্ন উপাদানের উৎপাদন এবং তা ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি ইত্যাদি) এমন এক আচানক তীব্রতায় পৌঁছাচ্ছে যা কি-না জনসংখ্যার হার বেড়ে চলার মতই বাড়ছে। এমনকি উন্নত ও ধনী দেশগুলিতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির এই বর্ধিত হার গড় আয়ু বৃদ্ধি করে। এতে করে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ে, আর বেড়ে চলে ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা।
    আর্টওয়ার্ক: রেড জোন
    শিল্পী: মার্কো ডি আঞ্জেলিস
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমাদের খুবই সতর্ক থাকা জরুরী, যাতে করে আমরা ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ না করে বসি।

    এতে কোনই সন্দেহ নেই যে একটা গোটা সভ্যতা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক রকমের ভাইরাসজনিত ব্যতিক্রম আছে —জৈবিক, কম্পিউটার-সায়েন্টিফিক, সাংস্কৃতিক— যেটা হচ্ছে বৈশ্বিক মহামারি। সরকারগুলো কঠোর দায়িত্ব পালনকারী বৈ কিছুই নয়। তাদের ওপরে ঝাল মেটানোটা যতখানি না রাজনৈতিক চিন্তা, বরং তার থেকেও অনেক বেশি ভিন্ন খাতে চালিত করার চাতুরী।
    আমি বলেছি যে আগামবেন আমার পুরনো বন্ধু। এবং আমি একটা ব্যক্তিগত স্মৃতি টেনে আনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু এটা করে আমি একটা সাধারণ দৃষ্টিপাতের মূল জায়গা ছেড়ে যাচ্ছি না। প্রায় ত্রিশ বছর আগে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে আমার হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করতে হবে। আগামবেন ছিল সেই খুবই কম মানুষের মধ্যে একজন যে আমাকে ডাক্তারদের কথা না শোনার পরামর্শ দিয়েছিল। যদি আমি সেইদিন তাঁর পরামর্শ মেনে নিতাম তাহলে আমি সম্ভবত খুব দ্রুতই মরে যেতাম। ভুল করা খুবই সম্ভব একটা ব্যাপার। সে যাইহোক, আগামবেন এমনই সূক্ষ্মতা ও কোমলতায় ভরা এক মহাত্মা, যাকে কোনো প্রকার আয়রনি ছাড়াই ব্যতিক্রম বলা যায়।
    অরাজের নোট: বোধিচিত্তের সৌজন্যে পুনঃপ্রকাশিত
  • জর্জিও আগামবেন।। বাইরে নয়, শত্রু রয়েছে আমাদের নিজেদের ভিতরেই

    জর্জিও আগামবেন।। বাইরে নয়, শত্রু রয়েছে আমাদের নিজেদের ভিতরেই

    • অনুবাদ: নিসর্গ নিলয়
    জর্জিও আগামবেন
    শিল্পী: আলফ্রঁস ফ্রেইরে
    সূত্র: ফ্লিকার

    ভূমিকা: করোনা মহামারি ও এর সাপেক্ষে জরুরী অবস্থার প্রসঙ্গে ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের Lo stato d’eccezione provocato da un’emergenza immotivata শিরোনামের লেখাটা il manifesto’তে প্রকাশিত হলে দার্শনিক ও অন্যান্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সূচনা হয়। বিতর্কের সাপেক্ষে পরবর্তীতে Contagio (Contagion) এবং Chiarimenti (Clarifications) শিরোনামের আগামবেনের আরও দুটি লেখা প্রকাশিত হয়। এই দুটি লেখায় তিনি তাঁর অবস্থানকে সুসংহত ও পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। আগামবেনের এই Chiarimenti শিরোনামের লেখাটির অনুবাদ করেছেন নিসর্গ নিলয়। অনুবাদটি প্রথম প্রকাশ হয় বোধিচিত্ততে।

    মূল রচনা
    জনৈক ইতালীয় সাংবাদিক সর্বোত্তম পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে আমার বক্তব্যকে বিকৃত করতে ও অসত্য প্রতিপন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। চলমান মহামারী [করোনা মহামারী] আমাদের যে বিভ্রান্তির মাঝে ছুঁড়ে দিচ্ছে বারবার এবং এর কারণে উদ্ভুত নৈতিক বিভ্রান্তিকে বিবেচনায় রেখে আমি আমার বক্তব্য লিখেছিলাম। এ এমন এক অবস্থা যেখানে মৃতের প্রতি সম্মান দেখাবার জায়গাটাও আর নেই। একইসূত্রে, সেই ব্যক্তির (নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি না) প্রত্যাশিত অপকৌশলের ত্রুটি ধরিয়ে দেবারও প্রয়োজন নেই। যদি কেউ স্বেচ্ছায় তা করতে চান তবে আমার ‘সংক্রমণ’ (Contagio) শিরোনামের লেখাটি পড়তে পারেন, লেখাটি Quodlibet প্রকাশনীর ওয়েবসাইটে আছে। এই লেখায় বরং আমি আমার ভাবনার আরও কিছু প্রতিফলন নিয়ে আলোচনা করব যাদের স্বচ্ছতা থাকা সত্ত্বেও, ভুল প্রমাণিত করবার (falsify) চেষ্টার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

    আর্টওয়ার্ক: র‌্যাপেনজেল কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: ক্যামেডেলাফু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ভয়-ভীতি জীবনের শিক্ষক বা পরামর্শক হিসেবে তেমন সুবিধার নয়, তবে তা এমন কিছু বিষয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যা আমরা সচরাচর না দেখার ভান করতাম। চলমান মহামারীর ব্যাপকতা নিয়ে মতামত দেওয়া তেমন কোন ব্যাপার নয়; সমস্যাটা তৈরি হয় যখন এর নৈতিক (ethical) ও রাজনৈতিক পরিণতি সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা জাগে। প্রথমত, যে ভীতির জোয়ার আমাদের সমাজকে স্থবির করে ফেলেছে তা স্পষ্টতই দেখিয়ে দেয়, আমরা একদম নাঙ্গা জীবন (naked life)[১] ছাড়া আর কিছুতে বিশ্বাস করি না। ইতালীয়রা সংক্রমিত ও অসুস্থ হবার বিপদ থেকে বাঁচতে স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, কাজকর্ম, এমনকি বন্ধুত্ব, প্রেম, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস – সবই ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ন্যাংটো জীবন ও তা হারাবার ভয় মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে না, বরং অন্ধ করে, বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আলেসান্দ্রো মানজোনির উপন্যাসে প্লেগের বর্ণনায় যেমন পাওয়া যায়, তেমনিভাবে অপর (other) মানুষেরা এখন কেবলই সন্দেহজনক রোগের বাহক। তাদেরকে যে কোন মূল্যে এড়িয়ে চলতে হবে, অথবা তাদের সাথে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। মৃতরা, আমাদের মৃতরা, মৃত্যুর পরে সৎকার পাবার অধিকারটুকুও আর পাচ্ছে না। আমাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহের কী হবে সেটাও আমরা জানি না। আমাদের আশপাশের মানুষেরা ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। কোন এক অদ্ভুত কারণে চার্চ এসব ব্যাপারে পুরোপুরি নীরব। জানি না কতদিন আমাদের এভাবে জীবনযাপন করতে হবে। এ দেশের মানবিক সম্পর্কগুলো কেমন হয়ে দাঁড়াবে ততদিনে?

    আর্টওয়ার্ক: দ্য কার্ডেল অব সিভিলাইজেশন
    শিল্পী: ইমানুয়েল দেল রোসো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কেমন সেই সমাজ, যেখানে শুধু টিকে থাকা বাদে আর সবকিছু মূল্যহীন? দ্বিতীয় বিষয়টা প্রথমটার থেকে কম গোলমেলে নয়। সরকার দীর্ঘদিন ধরে যে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’য়[২](state of exception) আমাদের অভ্যস্ত করে তুলেছে তা এখন নিতান্ত স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে। এর থেকেও অনেক ভয়াবহ মহামারী পূর্বে এসেছিল, কিন্তু আমাদের চলাফেরাকেও নিষিদ্ধ করা হবে এমন জরুরি অবস্থা আগে কখনো জারি করা হয় নি। একটা স্থায়ী সংকটের মধ্যে বাস করতে করতে মানুষ আর বুঝতেই পারছে না যে তার জীবন পুরোপুরি জৈবিক একটা অবস্থায় সংকুচিত হয়ে এসেছে। এই জীবনের কোন সামাজিক-রাজনৈতিক মাত্রা নেই। শুধু তা-ই নয়, নেই কোন আবেগীয় ও সহানুভূতিশীল মাত্রাও। যে সমাজ একটা স্থায়ী জরুরি অবস্থার মধ্যে বাস করছে তা কোনভাবেই মুক্ত সমাজ হতে পারে না। আমরা সফলভাবে এমন এক সমাজের মধ্যে বাস করছি যেটি তথাকথিত ‘নিরাপত্তাজনিত কারণ’ দেখিয়ে স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছে। ফলস্বরূপ, আমরা নিরন্তর অনিরাপত্তা ও ভীতির জীবনে দণ্ডিত হয়েছি।

    ভাইরাসের সময়কে যুদ্ধের সময়ের সাথে মিলিয়ে ফেলা আশ্চর্য কিছু নয়। সঙ্কটকালের বিধান দক্ষভাবে আমাদের কারফিউয়ের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য করে। কিন্তু যেকোন মানুষের মাঝে লুকানো এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে যে যুদ্ধ চলছে তা যেকোন যুদ্ধের চেয়ে কিম্ভুত (absurd)। সত্যি বলতে গেলে যেন এক গৃহযুদ্ধ চলছে।
    আর্টওয়ার্ক: লকড
    শিল্পী: শার্লি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    শত্রু আমাদের বাইরে নয়, শত্রু রয়েছে নিজেদের ভিতরেই। কেবল বর্তমানটাই দুশ্চিন্তার বিষয় নয়, আরও চিন্তার বিষয় হল এর পরিণাম। যুদ্ধ শেষ হবার পরেও শান্তির সময়ে যেমন কাঁটাতারের বেড়া, নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির মত বিভীষিকাময় চিহ্ন রেখে যায়, এই স্বাস্থ্যজনিত সংকট শেষ হবার পরেও সরকারব্যবস্থা আমাদের নিয়ে তেমনি কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করবে— যেগুলো সে আগে কখনও সেভাবে করতে পারেনি। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা চলবে; সকল ধরনের সভা-আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে, কোন রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সমাবেশ চলবে না— কেবল ডিজিটাল মেসেজিং চলবে, যেখানে যেখানে সম্ভব সব জায়গাতে যন্ত্র প্রতিস্থাপন করবে মানুষ-মানুষের সম্পর্ক নামক ‘সংক্রমণ’কে।

    অনুবাদকের টীকা
    [১]  আগামবেন তাঁর নাঙ্গা জীবন বা naked life (ফরহাদ মজহার যার অনুবাদ করেছেন ন্যাংটো জীবন) ধারণাটি ব্যাখ্যা করেন তাঁর Homo Sacer বইয়ে। নাঙ্গা জীবন বলতে এমন এক অবস্থাকে বুঝানো হয় যেখানে মানুষের সকল অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে মোটাদাগে একটি মানবিক অধিকারহীন জৈবিক প্রাণীতে পরিণত করা হয়। এখানে আগামবেন বলতে চাচ্ছেন, করোনা মহামারীর কারণে ইতালিতে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষের জীবন এমন অবস্থাতেই রূপান্তরিত হয়েছে। হোমো স্যাকার, বা এমন মানুষ যাকে যে কোন অবস্থায় হত্যা করা যায় কিন্তু কোন ধর্মীয় বা পবিত্র কাজে উৎসর্গ করা যায় না, মহামারীর কালে অপর (other) মানুষ তেমন একটা রূপ নিয়েই ধরা দিচ্ছে, যেখানে মানুষের জীবন অনেকটা বিকিয়ে দেবার মতই, সরাসরি হত্যা করা না হলেও তাকে অধিকারহীন এবং নিতান্ত জৈবিক সত্তার জীবন যাপন করতে হচ্ছে, যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই আসল। এই নাঙ্গা জীবন আসলে রোমান হোমো স্যাকারেরই একটি সেকুলার আদল। ড্যানিশ লেখক লারস ওটস্মান একে একধরনের জৈবিক রাজনীতি বা বায়োপলিটিক্স বলেও আখ্যা দিচ্ছেন (ওটস্মান, ২০১২)।
    [২] অঘোষিত জরুরি অবস্থা বা ব্যতিক্রমী অবস্থা (State of Exception) শিরোনামে আগামবেন একটি বই-ই লিখেছেন। মোটাদাগে বলতে গেলে, আধুনিক রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের কিছু অধিকার থাকে যা রাষ্ট্র আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়েও খর্ব করতে পারে না। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে সরকার সাংবিধানিকভাবেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, যেখানে এইসব অধিকার বাতিল করা হয়। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেখা যায়, সরকার সবসময়েই এক ধরনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি রাখে এবং মানুষের অধিকার খর্ব করে, এবং প্রচার করা হয় যে মানুষের ভালোর জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, এর মাধ্যমে সরকার তার বিরোধী মতাবলম্বীদের দমন করে, তাদের অধিকার কেড়ে নেয় এবং কিছু অবস্থায় তাদের জীবন হোমো সাকেরের নাঙ্গা জীবনে পরিণত হয়। করোনা মহামারীর সময়েও আমরা একই বিষয় দেখতে পাচ্ছি, যেখানে এমনকি আমাদের চলাফেরাকেও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, কীভাবে আমরা আমাদের সামাজিক জীবন কাটাবো তাও বলে দিচ্ছে ‘উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’। এমনকি আনুষ্ঠানিক জরুরি অবস্থা না থাকলেও বা তার ঘোষণা উঠে গেলেও আমাদের জীবন সেরকম এক ব্যতিক্রমী অবস্থার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছে, এবং আমাদের মানবিক সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়ছে।
  • জর্জিও আগামবেন।। অকারণ জরুরতের ডেকে আনা জরুরি অবস্থা

    জর্জিও আগামবেন।। অকারণ জরুরতের ডেকে আনা জরুরি অবস্থা

    অনুবাদ: বোধিচিত্ত

    বোধিচিত্তর ভূমিকা: ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের এই লেখাটা il manifesto তে ২৬শে ফেব্রুয়ারি,২০২০ এ Lo stato d’eccezione provocato da un’emergenza immotivata শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়। যে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য থেকে এই জরুরী অবস্থা কায়েম ও জায়েজ করা হচ্ছে তার একটা ইশারামূলক ব্যাখ্যা এই লেখাটাতে আছে। বর্তমান পৃথিবীতে এমন এক পরিস্থিতিতে এই মহামারির সাপেক্ষে দেশে দেশে আমরা জরুরী অবস্থার সুতীব্র বাসনা এবং তা কায়েম হতে দেখছি তাকে আরও ভালোভাবে বুঝতে এই ইশারা কাজের হতে পারে। সন্ত্রাসবাদের বাইরে গিয়েও নজরদারী ও জরুরী অবস্থা আকাঙ্ক্ষিত ও অনুমোদিত হওয়ার একটা অছিলা হিসেবে Covid-19 মহামারি ক্রিয়াশীল আছে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে, যার ভেতর থেকেই মহামারি ডিসকোর্স হাজির হচ্ছে ও তা মোকাবিলায় সে রাষ্ট্রকাঠামোরই প্রাণভোমরা(জরুরী অবস্থা) ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আগামবেনের সাথে পুরোপুরি একমত না হয়েও আমরা এই সমস্যায়ন জারী রাখতে পারি। এই জরুরী অবস্থার দিকে জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে তাকানো মানে বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্বীকার করা নয়, বরং এইরকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের যৌথ অবস্থান কি কি রকমের হতে পারে নিরন্তর তারই অনুসন্ধান হাজির রাখা।

    জর্জিও আগামবেন
    শিল্পী: আলফ্রঁস ফ্রেইরে
    সূত্র: ফ্লিকার

    মূল রচনা

    করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবিলার জন্য যে প্রমত্ত, অযৌক্তিক ও চূড়ান্ত রকমের অন্যায্য জরুরী পদক্ষেপ নেয়া হল তা বুঝতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে ইতালীয় জাতীয় গবেষণা পর্ষদের [The Consiglio Nazionale delle Ricerche(CNR)] ঘোষণা থেকে। এই পর্ষদ ঘোষণা দিয়েছিল যে SARS-CoV2 মহামারি ইতালীতে নেই।
    এই ঘোষণায় আরো বলা হল যে, যে কোন ক্ষেত্রেই ‘হাজার হাজার কেসের ওপরে ভিত্তি করে অদ্যাবধি মহামারির যে উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে তা অনুযায়ী এই সংক্রমণ ৮০-৯০% কেসে খুবই মৃদু উপসর্গের উদ্রেক ঘটায় (আরেক পদের ফ্লু)। ১০-১৫% এর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রেও বেশিরভাগের গুরুতর কিছু হবেনা। আমাদের হিসাব অনুযায়ী সকল রোগীর মধ্যে ৪% এর নিবিড় থেরাপির প্রয়োজন পড়বে।’
    আর্টওয়ার্ক: লকড
    শিল্পী: শার্লি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পরিস্থিতি যদি এইরকমই হয়, তবে গণমাধ্যম এবং প্রশাসন একটা আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে কেন? এমন একটা পরিস্থিতি যা আসল জরুরী অবস্থার উস্কানি দেয় এবং যা চলাচলের ওপরে তীব্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ও পুরো অঞ্চলের প্রাত্যহিক জীবনকে রদ করে। এরকম একটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপকে দুইটা বিষয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

    প্রথমত, এখানে আরো একবার জরুরী অবস্থাকে শাসন করার একটা স্বাভাবিক প্যারাডাইম হিসেবে ব্যবহার করার ক্রমবর্ধমান ঝোঁকের বিষয়টা প্রকাশিত হচ্ছে।
    ‘স্বাস্থ্যবিধি (hygiene) এবং গণ নিরাপত্তার কারণে’ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নির্বাহী আদেশ (executive decree) একধরনের আসল আসল সামরিকীকরণ(Militarization)। এই সামরিকীকরণ ‘তাদের জন্য ঘটে যে সব এলাকায় (Municipalities and areas) অন্ততপক্ষে একজন ব্যক্তির টেস্ট পজিটিভ এসেছে এবং তাদের জন্য যাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের উৎস চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। অথবা এমন একটা এলাকার জন্য যেখানে কেউ অন্য কোন সংক্রমিত দেশে সাম্প্রতিককালে ভ্রমণ করেছে এমন কারোর সংস্পর্শে আসেনি, অথচ সংক্রমিত হয়েছে সেই সব এলাকার ক্ষেত্রে একধরনের সামরিকীকরণ ঘটে।’
    আর্টওয়ার্ক: মেক ফ্লাওয়ার ফর নট ওয়ার
    শিল্পী: আন্দ্রে পেসিয়া
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এরকম একটা অস্পষ্ট ও অনির্ণীত ফর্মুলা [সরকারকে] এই জরুরী অবস্থা সকল অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করার সুযোগ করে দিবে। যেহেতু এটা বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব যে একই পরিস্থিতি অন্য জায়গায় তৈরি হবেনা।

    এই নির্বাহী আদেশের ফলে স্বাধীনতার ওপরে যে প্রচন্ড নিয়ন্ত্রন জারী হবে তা নিয়ে ভাবা যাক:
    ১।সকলের জন্য আক্রান্ত এলাকা থেকে বের হওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা;
    ২। আক্রান্ত এলাকায় ঢোকার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা;
    ৩। সকল উদ্যোগ ও আয়োজনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা (হোক সেটা সংস্কৃতি, খেলাধূলা, ধর্ম অথবা বিনোদনসংক্রান্ত)। আবদ্ধ জায়গা সহ ব্যক্তিগত ও জন পরিসরে যেকোন সমাবেশ যদি তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকে তার ওপরে নিষেধাজ্ঞা;
    ৪। দূর-শিক্ষণ কার্যক্রম বাদে উচ্চ শিক্ষা সহ কিন্ডারগার্টেন ও সকল পর্যায়ের বিদ্যালয়ের শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম রদ;
    ৫। ‘কালচারাল হেরিটেজ ও ল্যান্ডস্কেপের ধারা’র ১০১ নম্বর আর্টিকেল ও ১/২২/২০০৪ এর ৪২ নম্বর নির্বাহী আদেশে যে সকল জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত আছে তা বন্ধ ঘোষণা। এই সকল প্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার অবাধ প্রবেশাধিকারের নিয়ম রদ;
    ৬। ইতালী ও এর বাইরে সকল প্রকার শিক্ষা সফর রদ;
    ৭। জনপরিসরের গৃহীত সকল পরীক্ষা রদ। জনপরিসরে নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা কার্যক্রম (essential services or public utility services) বাদে সকল প্রকার গণ কার্যালয় বন্ধ করে দেয়া;
    ৮। যেই সকল ব্যক্তি সংক্রমিত ব্যক্তির কাছাকাছি ছিলেন তাঁদের ওপরে কোয়ারেন্টাইন ও নজরদারী আরোপ করা।
    আর্টওয়ার্ক: ফরর্জা ইতালিয়া
    শিল্পী: আলেন ম্যাকডোনাল্ড
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আরেকটা যে বিষয় আছে সেটা হচ্ছে ভয়ের পরিস্থিতি যা সাম্প্রতিক কালে ব্যক্তির চেতনায় দ্রবীভূত হয়েছে এবং যেটা যৌথ-আতঙ্ক পরিস্থিতির একটা আসল জরুরতে রূপ নেয়। এই বিষয়টাও বেশ অশান্তিকর এবং যার জন্য এই মহামারি একটা আদর্শ ছুতো তৈরি করে দেয়।

    অতএব, নিরাপত্তার বাসনার নামে সরকার কর্তৃক আরোপিত স্বাধীনতার সীমিতকরণ একটা উদ্ভট দুষ্টচক্রে জায়েজ হয়ে যায়। এই বাসনা আবার তৈরি হয়েছে সেই সরকারেরই হাতে যে এটাকে ঠিকঠাক করার জন্য এখন হস্তক্ষেপ করছে।
    টীকা

    ইংরেজি অনুবাদের হদিস The state of exception provoked by an unmotivated emergency । অন্যত্র অবশ্য The Invention of an Epidemic ( L’invenzione di un’epidemia, এক বৈশ্বিক মহামারীর উদ্ভাবন ) নামে পাওয়া যাবে ইংরেজি অনুবাদেই।
    পাদটীকা: এই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরে জঁ-লুক ন্যান্সি সহ অন্যান্য দার্শনিকদের মধ্যে বিতর্কের সূত্রপাত হয় যার সাপেক্ষে পরবর্তীতে ১১ই মার্চ, ২০২০-তে Contagio এবং ১৭ই মার্চ, ২০২০-তে Chiarimenti(Clarifications) নামে আগামবেনের আরও দুটি লেখা প্রকাশিত হয়।
    অরাজের নোট: বোধিচিত্তের সৌজন্যে প্রকাশিত
  • স্লাভয় জিজেক।। সবাই শান্ত থাকুন এবং আতঙ্কিত হোন!

    স্লাভয় জিজেক।। সবাই শান্ত থাকুন এবং আতঙ্কিত হোন!

    অনুবাদ: সাজিয়া শারমীন

    সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের অনবরত বলেই চলেছে ,‘আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না’, অথচ আসল খবর পাওয়ার পর আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকছে না। অবস্থা দেখে আমার কমিউনিস্ট দেশে বেড়ে ওঠার স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জনগণকে বিভিন্ন প্রসঙ্গে প্রায়ই বোঝাতেন: আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আসলে তারা নিজেরাই যে যথেষ্ট আতঙ্কিত, এ ধরনের আশ্বাসকে আমরা তার লক্ষণ হিসেবেই বিবেচনা করতাম।

    আর্টওয়ার্ক: লেটস প্লে বোলিং বল
    শিল্পী: মির সুহাইল
    সিূত্র: র্কাুন মুভমেন্ট

    আতঙ্কের কিছু নিজস্ব নিয়ম আছে। এই যে যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে দোকান থেকে টয়লেট পেপার উধাও হয়ে গেল, তাতে আমার কৈশোরের সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ার একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল।একবার হঠাৎ এ রকম একটা গুজব রটল যে দেশে যথেষ্ট পরিমাণে টয়লেট পেপার মজুত নেই। সরকার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্বাস দিল যে তাদের কাছে স্বাভাবিক চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট টয়লেট পেপার অবশ্যই মজুত আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সেই একবারই তাদের দাবি যেমন সত্য ছিল, আর মানুষও মোটের ওপর সেটা বিশ্বাসও করেছিল। তারপরও সাধারণ ক্রেতারা ঠিকই এ রকম একটা হিসাব কষেছিল যে ‘টয়লেট পেপারের কোনো সংকট নেই জানি এবং এটা মিথ্যা রটনা। কিন্তু তারপরও যদি কিছু লোক গুজবটিকে সত্যি ধরে নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দরকারের বেশি টয়লেট পেপার কিনে মজুত করতে থাকে, তাহলে তো সত্যি সত্যিই সংকট তৈরি হয়ে যাবে! তার চেয়ে বরং আমি নিজেই কিছু টয়লেট পেপার মজুত করে ফেলি না কেন!’ আমরা নিজেরা হয়তো কেউ এমনটা বিশ্বাস করতাম না যে কেউ এমন কিছু করতে পারে, আমরা হয়তো নিছক ধরে নিয়েছিলাম যে এ রকম কিছু অন্য ধরনের মানুষ তো আছেই, যারা এটা বিশ্বাস করে যে কিছু লোক ঠিকই গুজবে কান দেবে। কিন্তু কার্যত এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য ঘটেনি, কারণ ফলাফল হয়েছিল একই—বাজার থেকে টয়লেট পেপার উধাও। এখন ক্যালিফোর্নিয়া বা যুক্তরাজ্যে কি এমন কিছুই ঘটছে?

    এই প্রতিক্রিয়ার আরেকটা রূপ হলো পরিস্থিতি যখন প্রকৃতপক্ষেই আতঙ্কজনক, তখন আতঙ্কের অনুপস্থিতি। গত কয়েক বছরে সার্স ও ইবোলা মহামারির পর আমাদের বারবার বলা হয়েছে যে ধেয়ে আসছে এর চেয়েও ভয়ংকর নতুন মহামারি। সেটা যে আসছেই তা ছিল প্রশ্নাতীত, শুধু প্রশ্ন ছিল, কবে আসবে? আমরা এই অশনিসংকেত সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও কেন যেন গুরুত্ব দিইনি, কোনো প্রস্তুতি নিতেও নিরুৎসুক ছিলাম—আমরা একে ঠিকমতো মোকাবিলা করেছি কেবল ‘কনটাজিওন’ জাতীয় চলচ্চিত্রে।

    এই দুই বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া থেকে আমরা বুঝতে পারি যে প্রকৃত বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার বেলায় আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কোনো মানে নেই। আমরা যখন বিপদে আতঙ্কগ্রস্ত হই, পরিস্থিতিকে তখন যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে বরং একে খেলোই করে ফেলি। ভেবে দেখুন যে একটা প্রাণঘাতী মহামারির মধ্যে টয়লেট পেপার নিয়ে মাথা ঘামানো কতটা হাস্যকর!

    তাহলে এই করোনাভাইরাস মহামারির যথাযথ প্রতিক্রিয়া আসলে কী হতে পারে? আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত? কীভাবে এই সংকটকে মোকাবিলা করা উচিত?

    আর্টওয়ার্ক: উহান ইন কোয়ারেন্টনি
    শিল্পী: আরর্কাডো এস্কুইভেল
    সিূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমি যখন বলেছিলাম যে এই মহামারি সাম্যবাদকে একটা নতুন জীবন দিতে পারে, আমার কথাটাকে প্রত্যাশিতভাবেই কটাক্ষ করা হয়েছে। অথচ আমরা দেখছি সংকট নিরসনে চীনের কঠোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অন্তত ইতালিতে এখন যা চলছে তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। তবে অন্যদিকে ক্ষমতায় আসীন কমিউনিস্টদের সনাতন কর্তৃত্ববাদিতার সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। এর একটা উদাহরণ হলো যে ক্ষমতাধরদের (সেই সঙ্গে জনসাধারণকে) দুঃসংবাদ দেওয়ার বিষয়ে শঙ্কা এতটাই প্রবল ছিল যে শুরুর দিকে এই ভাইরাস নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। এখন সংক্রমণ যখন কমে আসছে, আবারও এ রকম ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে।

    ‘করোভাইরাস সৃষ্ট অচলাবস্থা থেকে চীনকে আবার কর্মমুখর করে তুলতে গিয়ে একটি পুরোনো অভিলাষ মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে: উপাত্ত এদিক-ওদিক করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যা দেখতে চান, তা-ই দেখিয়ে দেওয়া। চীনের পূর্ব উপকূলীয় শিল্পপ্রধান ঝেইজিয়াং প্রদেশে বিদ্যুতের ব্যবহার এর উদাহরণ। অন্তত তিনটি শহরে স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অভিজ্ঞরা বলছেন, এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা যে উৎপাদন আবার শুরু হয়ে গেছে। এর কারণে কিছু কারখানা খালি প্ল্যান্টে অকারণ যন্ত্রপাতি চালাতে বাধ্য হয়েছে।’

    এই প্রতারণা যখন ক্ষমতাধরদের কাছে স্পষ্ট হবে, তখন কী ঘটবে আমরা আন্দাজ করতে পারি: স্থানীয় ব্যবস্থাপকেরা অন্তর্ঘাতমূলক কাজের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কঠোর সাজা পাবেন, আর সেই সঙ্গে সচল হবে অবিশ্বাসের দুষ্ট চক্র। করোনাভাইরাসকে যুঝতে গিয়ে চীন যে ঠিক কী কী গোপন করেছে, তা কেবল একজন চীনা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে পেলেই জানা যাবে। কিন্তু এই আমি, যদি এই কমিউনিজমের কথাই না বলে থাকি, তাহলে আমি আসলে কোন সমাজতন্ত্র কথা বলতে চেয়েছি? সেটা বুঝতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু বিজ্ঞপ্তি পড়তে হবে, যেমন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রোয়াসুস গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে গণস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এই ভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেও কিছু কিছু দেশের ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সামঞ্জস্য নেই। আমরা আর কোনো মহড়া দিচ্ছি না। এখন হাল ছাড়ার সময় নয়, অজুহাত দেওয়ার সময় নয়। এখন সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে প্রস্তুত থাকার সময়। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রগুলো কয়েক দশক ধরে পরিকল্পনার সুযোগ পেয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়।’ তিনি আরও রোগ করেন, ‘এই মহামারিকে পিছু হটানো সম্ভব, কিন্তু সে জন্য প্রয়োজন সরকারযন্ত্রগুলোর যাবতীয় কলকবজার সমবেত, সমন্বিত এবং সামগ্রিক প্রয়াস।’

    তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে আরও যোগ করা যায়, এই কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সরকার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেই শুধু চলবে না, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে মানুষের স্থানীয় উদ্যোগ এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। যদি হাজার হাজার মানুষ শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের জন্য বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র যেভাবে অসংখ্য অস্ত্র জোগাড় করে ফেলে, ঠিক সেই একইভাবে এসব সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য অবশ্যই প্রয়োজন হবে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। সামরিক তৎপরতার মতোই এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রগুলোকে তথ্য বিনিময় করতে হবে, সব পরিকল্পনা হতে হবে সমন্বিত। এ রকম ‘কমিউনিজম/সাম্যবাদ’ই এখন সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি। যেমন উইল হাটন বলেছেন, ‘একধরনের সংকট এবং মহামারিপ্রবণ অনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার বিশ্বায়নের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু জন্ম হচ্ছে নতুন একধরনের বিশ্বায়নের, যা পারস্পরিক নির্ভরতা এবং প্রমাণভিত্তিক সামষ্টিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়।  কিন্তু এখন পর্যন্ত ‘প্রতিটি দেশ যার যার তার তার’(এভরি কান্ট্রি ফর ইটসেলফ) ধরনের চিন্তারই দাপট বেশি: ‘জাতীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর বিভিন্ন দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, স্থানীয় ঘাটতি আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিশৃঙ্খল সেকেলে সব ব্যবস্থার মধ্যে ডুবে থেকে, সংকটের আঞ্চলিক বোঝাপড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে তারা।

    আর্টওয়ার্ক: হেলথ সিস্টেম
    শিল্পী: ভাস্কো গারগ্যালো
    সিূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    করোনাভাইরাস মহামারি কেবল বাজারভিত্তিক বিশ্বায়নের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে না, আরও দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতার ক্ষতিকর দিক। এই সার্বভৌমত্ব জাতীয়তাবাদী লোকরঞ্জনের একটি দাবি। কিন্তু স্পষ্টতই ‘সবার আগে আমেরিকা (বা যেকোনো দেশ)’ জাতীয় স্লোগানের দিন এখন শেষ, কেননা আমেরিকাকে বাঁচাতে পারে শুধু বৈশ্বিক সহযোগিতা। আমি কোনো কল্পরাজ্যের আলাপ করছি না, মানুষে মানুষে মহান সংহতির আদর্শের কথা বলছি না, বরং বিদ্যমান সংকট আমাদের চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের সবার টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিশ্বজনীন সংহতি এবং সহযোগিতা। পরার্থপরতাই আমাদের নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার একমাত্র যুক্তিসম্মত উপায়। আর এ কথা শুধু করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়: কয়েক মাস আগেও চীন বিরাট একটা সোয়াইন ফ্লু সংক্রমণে ভুগেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে পঙ্গপাল দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে বলে খবর আছে। লক্ষণীয়, পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের প্রাণনাশ করছে জলবায়ু সংকট, অথচ সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই—এ কথা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন ওয়েন জোনস।

    আর্টওয়ার্ক: নো পাসারান
    শিল্পী: হালিত কুরতুল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কঠোর প্রাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করোনাভাইরাসকে একটা হিতকর সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মাধ্যমে মানবসমাজ থেকে বৃদ্ধ আর দুর্বলদেরকে আধমরা আগাছার মতো উপড়ে ফেলা যাবে, যাতে নতুন সতেজ চারারা বেড়ে উঠতে পারে। সামগ্রিকভাবে তাতে বিশ্বে স্বাস্থ্যের উন্নতিই ঘটবে। আমি যে বৃহত্তর সাম্যবাদী নীতির কথা বলছি, একমাত্র তার মাধ্যমেই এই ধরনের প্রাগৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটতে পারে। ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির চাপে সংহতির আদর্শ জলাঞ্জলি দেওয়ার আলামত স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যে মহামারি যদি আরও ভয়ানক আকার ধারণ করে, হাসপাতালগুলো ‘তিন জ্ঞানী ব্যক্তি’ বিধির দ্বারস্থ হবে: ‘অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন যে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটগুলো রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে শুরু করলে রোগীরা জীবনদায়ক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তথাকথিত ‘তিন জ্ঞানী ব্যক্তি’ বিধি অনুযায়ী এ রকম ক্রান্তিকালে প্রতিটি হাসপাতালের তিনজন জ্যেষ্ঠতম পরামর্শক কোন কোন রোগী শয্যা বা শ্বাসপ্রশ্বাস সহায়ক ভেন্টিলেটর পাবে, তা ঠিক করে দেবেন।’ এই তিন পণ্ডিত কোন নীতির ভিত্তিতে তা ঠিক করবেন? বৃহত্তর স্বার্থে বৃদ্ধ এবং নাজুকদের উৎসর্গ? এ রকম পরিস্থিতি কি সীমাহীন দুর্নীতির পথ খুলে দেয় না? এই সব পন্থা কি এটাই প্রমাণ করে না, যে আমরা শেষ পর্যন্ত সবলের টিকে থাকার নির্মম নীতিই আঁকড়ে ধরতে প্রস্তুত? অতএব আবারও দেখছি যে আমাদের সামনে বিকল্প দুটি: বর্বরতা অথবা একধরনের পুনরাবিষ্কৃত সাম্যবাদ।

    নোট: স্লাভয় জিজেক এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দার্শনিক। স্লোভেনিয়ায় জন্ম নেওয়া অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা এ দার্শনিক যুক্ত রয়েছেন বিশ্বের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এখানে অনূদিত লেখাটি এপ্রিল মাসে প্রকাশিতব্য তার ‘প্যানডেমিক’ বই থেকে নেওয়া। গত ২৮ মার্চ,২০২০ তারিখে রচনাটি প্রকাশ করে প্রথম আলো ।

  • স্যা-তো।। কোভিড-১৯ লকডাউন: কোয়ারেন্টাইন ভাবনা

    স্যা-তো।। কোভিড-১৯ লকডাউন: কোয়ারেন্টাইন ভাবনা

    অনুবাদ: রোকন রকি

    সামরিক শাসন নয়, আমাদের শত্রু ভাইরাস
    -ম্যালাকানাং এর কিছু ফাঁপা রাজনীতিবিদ১

    ধীরে ধীরে শ্বাস নিন ১০০১, ১০০২, ১০০৩, ১০০৪। ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন ১০০১, ১০০২, ১০০৩, ১০০৪।

    আমরা বাস করছি সেই ১৯৮৪ তে। মার্কোসের দুঃস্বপ্ন যেন ফিরে এসেছ।

    এটা আসলে আমাদের সামাজিক প্রক্রিয়ার ভেতরেই গড়ে ওঠা একটা চর্চা। কর্তৃত্ববাদেরই সামাজিকীকরণ, যার চুড়ান্ত লক্ষ্য একটি কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজ।

    দারিদ্র্য একটি সামাজিক পরিস্থিতি। আমাদের প্রত্যেকের বেঁচে থাকা অথবা ন্যূনতম জীবনমানের নিশ্চয়তার জন্য প্রত্যাশিত প্রয়োজনীয় সম্পদের স্বল্পতার ভিত্তিতে একে বৈশিষ্টমণ্ডিত করা হয়। আমারা (ফিলিপিনীয়রা) এইখানেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছি। আর আমরা যদি আমাদের চিন্তাশক্তিকে একটু বিস্তৃত করি তাহলে দেখতে পাবো এটা স্পষ্টতই একটি শ্রেণীযুদ্ধ।

    আর্টওয়ার্ক: পলিটিশিয়ান
    শিল্পী: ওলেহ সমাল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমার নিত্যদিন যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছি তা মেনে নিতে এবং সরকার ও তার সহযোগীদের হাতে আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে প্রত্যেককে সম্মত করা হচ্ছে। সেনাকর্তা ও রাজনীতিবিদরা মিলে আমাদের জন্য যে শাসনতন্ত্র তৈরি করেছে তা  শুধুমাত্র মান্য করতেই বলা হচ্ছে না, এমনকি সেগুলোকে করে তোলা হয়েছে প্রশ্নাতীত। অন্ধ ভক্তিই হয়ে উঠেছে নিরঙ্কুশ। কেবলই আজ্ঞাপালন করতে থাকা।

    আসলে এটাই এই লকডাউনের লক্ষ্য। এরই মধ্যে বর্ধিত করা হয়েছে কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন। আর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ। শুধু দেখতে নয়, সত্যিসত্যিই এটা সামরিক শাসন ছাড়া আর কিছু নয়।

    বর্তমান রাষ্ট্রপতি যখন কমিউনিটি কোয়ারেন্টাইন জারি করে, তারপর তা বৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত তা চরম মাত্রায় গিয়ে দাঁড়ায় তখন আমরা ধন্দে পড়ে যাই। দুতের্তে কোভিড–১৯ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা  শীর্ষক কমিটিতে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্তাদের বাদ দিয়ে সেনাবাহিনীর অবসরকপ্রাপ্ত সব জেনারেলদের নিয়োগ করেছেন। একই সঙ্গে অজুহাত হিসেবে সামরিক শাসন জারি এবং তা আড়ালের  জন্য এটি একটি যুতসই পন্থা। শেষ পর্যন্ত, ‘বিশেষ ক্ষমতা’ নাজিল করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা আইন’২০২০ পাশ করা হযেছে যা চরম স্বৈরতান্ত্রিক হস্তক্ষেপকেই বিধিবদ্ধ করে। ভাবখানা এমন যে, তারা এভাবেই কোভিড-১৯ থেকে উদ্ভুত সঙ্কটের মোকাবেলা করবে।

    প্রকৃতপক্ষে, কর্তৃত্ববাদ অতিকায় ব্যক্তিমূর্তি২ যা এর সামাজিক আসক্তিকে ব্যক্তি স্বাধীকারের উপর প্রাধান্য দিয়ে নির্দিষ্ট মূল্যবোধকে পুনঃপ্রকাশ করে। এবং এইখানেই অরাজপন্থার কাজ শুরু।

    আমরা আজ নিপীড়িত, আমাদের মানবতা আজ হুমকির মুখে। আইন-কানুন বা যাবতীয় শাসননীতির বশ্যতার বিপরীতে স্বাধীনতা, স্বভাব বা নিয়ম আমাদের অস্তিত্বে বিরাজিত। দুনিয়া সম্পর্কে এই আমাদের মৌলিক ভাবনা।

    কমিউনিটি পাস আরোপ, কারফিউ লঙ্ঘনকারীদের বেয়াইনি আটক, দেশব্যাপি ত্রাণসরবরাহে দূর্নীতি, সুবিধাপ্রাপ্ত বা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রাধান্য, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অনলাইন বা অফলাইনের সামগ্রিক ভিন্নমত দমন হয়ে উঠেছে খতিয়ান।

    আমাদের মানবাধিকারের উপর নিত্য দিনের আঘাতে আমাদের ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কেননা আমারা ভয় নিয়ে চিন্তিত। এই আরোপিত বিচ্ছিন্নতায় আমাদের জীবন বিপন্ন। সবাই না হলেও অনেকেই স্বীকার করে যে, এই ক্রান্তিকালে আমাদের যা প্রয়োজন তার যোগান দিতে দুনিয়া ব্যাপি সরকার গুলো অক্ষম। আর হ্যা, আমরা খুব ভালো করেই জানি পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতা কি এবং এই গ্রহের জন্য তা কতটা অস্বাস্থ্যকর।

    আর্টওয়ার্ক: দুতের্তে
    শিল্পী: আঞ্জেলো লোপেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই জন্যই আমারা নৈরাজ্যবাদী। ভূ-বিদ্যার পুরোধা ক্রপোৎকিন বলেছিলেন যে মানুষ হিসেবে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতি যে প্রাথমকি জীববিদ্যাসংক্রান্ত ঝোঁক আছে তা নিশ্চিত। কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির সাথে সহযোগী হয়ে প্রজাতি সমূহের টিকে থাকার সাফল্য ততটা দৃশ্যমান নয়। নৃবিজ্ঞানীরা এটা উদ্ঘাটন করেছে যে, প্রাচীন সমাজ প্রায় সব সময়েই নানা ধরনের ‘উপহার অর্থনীতির’ (এটা অনেকটা এরকম যে দ্রব্যের পুঞ্জিভূতকরণ নয় বরং উন্মুক্ত রাখা৩) চর্চা করেছে এবং তারা সম্পদ অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতেই পছন্দ করতো। মানুষজনের আন্তসম্পর্কে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিনিময় রেষারেষির পরিবর্তে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।

    বর্তমান সময়ে এটা কিভাবে কাজে লাগানো যায়? কোভিড-১৯ সনাক্তকরণে টেস্টিং কিটের হালহকিকৎ নিয়ে হাজির প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয়ে যায় সৃজনশীল কবিতার৪ আসর এবং অন্যদের তা প্রভাবিত করে।আর আমরাও তাকে স্বাগত জানায়।আদতে রাষ্ট্রকে কবর দেয়ার জন্য আমাদের আর গভীরতর গর্ত করার প্রয়োজন নেই,রাষ্ট্র নিজেই তা সুদরকাল আগেই খুঁড়ে রেখেছে ।

    সঙ্কটকালে নৈরাজ্যিক মূল্যবোধ সক্রিয় হয়ে ওঠে। আসে পাশে তাকালেই দেখবেন আমরা আছি (বা কোন না কোন ভূমিকা রাখছি) এবং আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি। আর, হ্যাঁ এটা উচ্চস্বরেই বলতে চাই। আমরা সর্বত্র বিরাজমান!

    তথ্যপঞ্জি

    ১. একদল ক্রেতা একটা ব্যয়বহুল সপিং মলে দুতের্তের সাথে সেলফি তোলে। ভার্জিল লোপেজ। জিএমএ নিউজ অনলাইন। মে ৭, ২০১৮. www.gmanetwork.com
    ২.কর্তৃত্বপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। এডরনো, লেভিনসন, সানফোড এবং ফ্যাঙ্কেল ব্রানসুইক। ১৯৫০
    ৩.উপহার : প্রাচীন সমাজে বিনিময়ের ধরন এবং কারন। মার্কেল মাওস। ২০০২. Libcom.org
    ৪. কিট : কোভিড-১৯ সংবাদ সম্মেলনে ডিউটারটের উপস্থিতিই এখন সৃজনশীল কবিতা। জেলিন মালাসিগ। Interaksyon. মার্চ ১০, ২০২০ www.interaksyon.com

  • স্লাভো জিজেক।। উহান নিয়ে দেখা আমার স্বপ্ন

    স্লাভো জিজেক।। উহান নিয়ে দেখা আমার স্বপ্ন

    • অনুবাদ: কাজী তাফসিন

    ভূমিকা
    করোনা ভাইরাস মহামারী প্রসঙ্গে প্রখ্যাত স্লোভেনীয় দার্শনিক স্লাভো জিজেকের প্রথম ইন্টারভেনশন বা অভিঘাত ছিল welt.de তে প্রকাশিত My Dream of Wuhan শিরোনামের লেখাটা। এই রচনা ২২শে জানুয়ারি, ২০২০ তে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও পরবর্তীতে আলোচ্য প্রসঙ্গে আরও বেশ কিছু লেখা ও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ওয়েবসাইটে। জিজেকের My Dream of Wuhan লেখাটির অনুবাদ করেছে কাজী তাফসিন। তাফসিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। লেখাটির অনুবাদ গত ২৮ মার্চ, ২০২০ তারিখ প্রকাশ করে বোধিচিত্ত। বোধিচিত্তের সৌজন্যে লেখাটি পুনপ্রকাশ করা হল।

    আর্টওয়ার্ক: জিজেক
    শিল্পী: টরিবাট
    সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট


    মূল রচনা
    করোনা ভাইরাসের মহামারী নিয়ে যেহেতু ইতোমধ্যেই অনেক লেখালেখি হয়ে গেছে—একজন অ-বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার হাতে থাকা এই সীমিত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমি সর্বোচ্চ আর কি-ই বা যোগ করতে পারি? কিন্তু তবুও এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়ঃ কোন জায়গায় এসে তথ্য-উপাত্ত তার গুরুত্ব হারায় আর কোথা থেকে শুরু হয়ে যায় মতাদর্শের খেল?

    সবচেয়ে প্রথমে যে বিভ্রান্তিটা এসে হাজির হয় সেটা হচ্ছে: এর চেয়ে আরও বাজে রকমের মহামারী যেহেতু হয়ে চলছে, যেখানে হরেক পদের রোগ বালাইতে প্রতিদিন আরও হাজারও মানুষ মারা যাচ্ছে, তাহলে কেন আমরা করোনা নিয়ে এত অবসেশনে ভুগছি? এখানে স্পেনীয় ফ্লু নামে সুপরিচিত ১৯১৮-১৯ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর কথা স্মরণ করবার দরকারই নেই যেটাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল বলে আন্দাজ করা হয়। বর্তমানেও, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রায় ১৫০ লক্ষ আমেরিকানকে আক্রান্ত করে রেখেছে: যার মধ্যে এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে এবং মারা গেছে প্রায় ৮ হাজার ২০০ মানুষ—কেবল এই ঋতুতেই।

    এর মধ্যে একটা বর্ণবাদী ভাবালুতা তো অবশ্যই আছে—ধরুন নোংরা চাইনিজ বুড়িদের জ্যান্ত সাপের চামড়া ছাড়ানো আর বাদুড়ের স্যুপে শব্দকরে চুমুক দিয়ে খাওয়া নিয়ে আমাদের মধ্যে যতরকম ফ্যান্টাসি আছে সেগুলোর কথাই মনে করে দেখতে পারেন… কিন্তু এই মুহূর্তেই চায়নার একটা বড় শহর হয়তো সবচাইতে নিরাপদেই আছে।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা প্যানিক
    শিল্পী: পেড্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু এর মধ্যে আরও বড় একটা প্যারাডক্স কাজ করছে—পৃথিবীতে পরস্পরের সাথে আমাদের সংযুক্তি যত বাড়তে থাকবে, যেকোন একটা স্থানিক দূর্যোগ ঘটলে পুরো পৃথিবীতে এটার ভীতি আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকবে এবং অকস্মাৎ মহাদুর্ঘটনা ঘটাবে। ২০১০ সালের এপ্রিলে আইসল্যান্ডের একটা দ্বীপে আগ্নেয়গিরির সামান্য একটা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে উৎপন্ন ধোঁয়ায় একটা মেঘের মত তৈরি হয়েছিল—যেটাকে বলা যায় পৃথিবীতে জীবের বেঁচে থাকার এই জটিল ব্যবস্থায় খুবই ছোট্ট একটা ঘটনা। কিন্তু এটার জন্য তখন পুরো ইউরোপের বিমান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হয়েছিল—যেটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতিকে মানুষ এত ভয়াবহভাবে রূপান্তর করার পরেও শেষ পর্যন্ত মানুষ কিন্তু মাত্র একটা প্রজাতিই রয়ে গেছে।

    প্রকৃতিতে এত ক্ষুদ্র একটা ঘটনা ঘটার ফলশ্রুতিতে এইযে সামাজিক-অর্থনৈতিক দিকে এত ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সেটা আমাদের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের (পড়ুন, বিমান চলাচল) কারণেই হচ্ছে। এক শতক আগে এরকম কিছু একটা ঘটলে সেটা হয়তো আমাদের নজরেও আসতো না। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আমাদেরকে প্রকৃতি থেকে মুক্ত করে কিন্তু একইসাথে আমরা অন্যদিক দিয়ে প্রকৃতির খেয়ালখুশির উপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। এই বিষয়টাই একইভাবে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে হয়েছে: যদি এই ভাইরাসের কাহিনীটা চীনে ডেন জিয়াও পিংয়ের আমলের আগে হত, তাহলে আমরা কেউই হয়তো এটা নিয়ে খুব বেশি কিছু একটা জানতামই না।

    তাহলে আমরা কিভাবে এই ভাইরাসকে টেক্কা দিব যখন এটা কিনা প্রতিনিয়ত গুণিতকের আকারে একটা অদৃশ্য পরজীবীর মত ছড়িয়ে পড়ছে, যেন এটা একটা ‘জ্যান্তে মৃতের’ মতন ভুতুড়ে জিনিস (entity) যেটার কার্যকলাপ এখনও আমাদের অজানা। এই অজ্ঞানতাই প্যানিকের কারণ: যদি ভাইরাসটা হিসাবমত রাস্তায় পরিবর্তিত না হয় এবং বিশ্বব্যাপী এক সত্যিকার মহাদুর্ঘটনা ঘটায়, তাহলে কি হবে?

    [তবে] আমার নিজের দুশ্চিন্তা হচ্ছে: যদিও এখন অব্দি এটার প্রভাব একটা সীমার মধ্যে আছে, তবুও আমাদের অথোরিটির প্যানিক করা কি এই কারণে যে এই ভাইরাসের সম্ভাব্য মিউটেশন (পরিবর্তনের গতিবিধি) নিয়ে তারা এমন কিছু একটা জানে যেটা তারা লুকাতে চাচ্ছে জনগণের বিশৃঙ্খলা আর অবরোধ/সভা সমাবেশের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে?

    এখানে একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, পৃথকীকরণ (আইসোলেশন), নতুন নতুন দেয়াল তোলা এবং কোয়ারেন্টাইন করতে থাকা আসলে কোনো কাজেই আসবে না। এইক্ষেত্রে দরকার সম্পূর্ন শর্তহীন ঐক্য আর বিশ্বব্যাপী সমন্বিত প্রতিক্রিয়া; দরকার একটা নতুন সুরৎ যেটাকে একসময় বলা হত কমিউনিজম। যদি আমরা এই পথে না এগোই, তাহলে আমাদের পুরো পৃথিবীটা হয়তো দেখতে এখনকার উহান শহরের মতনই হবে।

    আর্টওয়ার্ক: র‌্যাপেনজেল কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: ক্যামেডেলাফু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ইতোমধ্যেই অনেকগুলো ডিস্টোপিয়াই আছে একই ধাঁচের একটা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়: যেখানে আমাদের সবাইকে বাসায় বসে থাকতে হবে, কম্পিউটারে বসে বসে কাজ করবো, ভিডিও কনফারেন্সে যোগাযোগ করবো আর বাসায় বানানো অফিস রুমের কোণায় পড়ে থাকা মেশিনে ফিটনেস মাপাবো, মাঝে মাঝে স্ক্রিনে হার্ডকোর সেক্সের ভিডিও দেখে দেখে মাস্টারবেট করে নিবো আর তারপর ডেলিভারীতে খাবারের অর্ডার করবো…

    কিন্তু যাইহোক আমার এই দুঃস্বপ্নের মধ্যে কিন্তু একরকম মুক্তির সম্ভাবনাও লুকিয়ে আছে। এখানে এসে আমাকে বলতেই হচ্ছে যে, বিগত কয়েকদিন যাবত আমি উহান শহরে এই অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। এই অর্ধপরিত্যক্ত বড় শহরের রাস্তাঘাট—যেখানে প্রতিদিনকার ভিড়বাট্টার কেন্দ্রগুলো এখন একটা ভুঁতুড়ে জায়গায় পরিণত হয়েছে, দোকান খোলা থাকলেও নেই কোনো খরিদ্দার, আছে কেবল দু’একজন উদাসী পথচারী কিংবা আর এদিক সেদিক পড়ে থাকা গাড়িগুলো—কি নিজেই আমাদেরকে একটা ভোগবাদহীন পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয় না? সাংহাই কিংবা হংকংয়ের রাজপথের শুনশান এই বিষাদগ্রস্থ সৌন্দর্য আমাকে মনে করিয়ে দেয় On the Beach-এর মতন কিছু পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক মুভির কথা—যেখানে কিনা অধিকাংশ মানুষ নাই হয়ে গেছে বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই; যেন এই দুনিয়ার সবকিছু যেমন আমাদের হাতের কাছে সদাপ্রস্তুত ছিল তেমনটা আর নাই।

    বরং দুনিয়াটা আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে আর আমাদের জন্য তাকিয়ে আছে… এমনকি রাস্তায় দাঁড়ানো সেই সাদা মাস্ক পড়া লোকগুলি তাদের এই ছদ্মবেশকে রীতিমতো বরণ করেই নিবে, যেহেতু এই মাস্ক তাঁদেরকে সামাজিক পরিচিতি পাবার জন্য প্রতিদিনকার যে চাপ ছিল সেটা থেকে রীতিমতো মুক্তি দিয়েছে।

    আমদের অনেকেরই হয়তো ১৯৬৬ সালের ফ্রান্সের সিচুয়েশনিস্ট ধারার ছাত্রদের মধ্যে প্রচলিত: «Vivre sans temps mort, jouir sans entraves» (বাঁচো মৃত সময়ের হাত থেকে, প্রতিবন্ধকতা ভেঙে আনন্দ করতে বাঁচো) স্লোগানটার কথা মনে আছে। ফ্রয়েড আর লাকাঁ যদি আমাদেরকে নতুন কোনো কিছু বলে থাকে সেটা হচ্ছে এই বিষয়টাই যে— সুপারইগোর প্রতিমুহূর্তে এই বারণ করার ঢংটা কোনো বাজে বিষয় না যেটা থেকে আমাদের উদ্ধার পেতে হবেই (বা যেহেতু এটা বারণ করে, সেহেতু এটাকে আমাদের মেনে-না-চলতে হবেই) যেখানে লাকাঁ আমাদেরকে দেখাচ্ছেন যে সুপারইগোর বারণ করা’টাই হচ্ছে উপভোগ করার সবচেয়ে যথার্থ উপায়। এই বারণ করার বিষয়টাই যদি না থাকে তাহলে নিজেদের কোনো কাজ করার সময় প্রত্যেকটা মুহূর্ত প্রচন্ড একঘেয়েমি দিয়ে শেষ হবে।
    আর্টওয়ার্ক: নো পাসারান
    শিল্পী: হালিত কুরতুল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মৃত সময়— মানে সত্তার এইযে নিজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া বা প্রত্যাহার করে নেয়া [২], যেটাকে পুরানা মরমীবাদীরা বলেছিলো Gelassenheit (গেলাসেনহাইট)[১] বা খালাস হওয়া— সেই বিষয়টাই এখন পারবে আমাদের প্রতিদিনকার এই অভিজ্ঞতাগুলোকে চাঙ্গা করতে। আর করোনাভাইরাসের আরো একটা পরিণাম হিসেবে যে কেউ আশা করতেই পারে যে, এই মৃত সময়টা হয়তো চায়নার শহুরে মানুষের দৈনন্দিনকার নন-সেন্স চিন্তাভাবনা আর ব্যস্ততা থেকে খালাস পাবার একটা অছিলা হয়ে দাঁড়াবে।

    আমজনতার সামনে আমার এই আলাপ দেয়াটার যে বড় ঝামেলা আছে সেটা আমার আমলে আছে—মানে একদিক থেকে আমার এইসব যুক্তি করোনায় দূর্দশাগ্রস্ত আক্রান্ত জনতার দুঃখ-কষ্টকে কি একরকম বৈধতা দিয়ে দেয়না? ধরুন একজন মাস্কপরা লোক যখন ওষুধ বা খাবারের খোঁজে উহানের রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে তখন তারা কিন্তু ভোগবাদবিরোধী মনোভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকবে তা নয়, বরং তাদের চোখেমুখে থাকবে রাগ, ক্ষোভ আর আতঙ্ক। কিন্তু আমার ঐ আলাপটার কৈফিয়ত শুধু এই জায়গাতেই যে, অনেক সময় ভীতিকর সময়গুলো থেকেও কিন্তু অকল্পনীয়ভাবে ভালো কোনো কিছুর সূচনা হইতে পারে।
    কার্ল গিন্সবার্গ এই নিয়ে একটা কথা বলেছিলেন যে, ভালোবাসার চেয়ে নিজের দেশ নিয়ে লজ্জিত থাকলেই বরং দেশের সাথে নিজের একাত্মতাকে সত্যিকাররূপে অনুভব করা যায়। হয়তো ইসরায়েলীরাও নেতানিয়াহু কিংবা ট্রাম্পের রাজনীতি নিয়ে এভাবে লজ্জিত হওয়ার মত মুরোদ দেখাবে একদিন। কিন্তু এই লজ্জিত হবার কারণ অবশ্যই এটা হওয়া উচিত না যে সে একজন ইহুদি। বরং এই কারণে লজ্জিত হবে যে, ইসরায়েলী রাজনীতি আজকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে যেটা করছে সেটা ইয়াহুদী ধর্মের কি পরিমাণ ক্ষতিটা করেছে। হয়তো ব্রিটিশদেরও একইভাবে ব্রেক্সিট নিয়ে লজ্জিত হবার মুরোদ দেখানো উচিত।
    কিন্তু আর যাই হোক, এখন উহানের মানুষের লজ্জিত হবার বা স্টিগমাটাইজ হওয়ার সময় না, বরং এখন তাদের দরকার সাহস আর ধৈর্যের সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। চায়নায় এখন লজ্জিত হওয়া উচিত শুধুমাত্র তাঁদেরই যারা এই মহামারীকে হালকা গুরুত্ব দিয়ে জনতার সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছে, কিন্তু নিজে ঠিকই চুপচাপ আইসোলেশনে সময় কাটিয়ে বেড়াচ্ছে। এই ভঙ্গিটা অনেকটা চেরনোবিলের কর্মরত সেইসব সোভিয়েত কর্মকর্তাদের কথা মনে করিয়ে দেয় যারা জনসমক্ষে চেরনোবিলের দূর্ঘটনাকে অস্বীকার করলেও সবার আগে নিজের পরিবারকে চেরনোবিলের কোয়ার্টার থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছিল। অথবা এটা আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় সেইসব হর্তাকর্তা (কর্পোরেট) ম্যানেজারদের কথা যারা জনসমক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করলেও, ঠিকই উল্টোদিকে আবার নিউজিল্যান্ডের উঁচু জায়গায় বাড়ি কিনে রেখে দিয়েছে কিংবা কোনো এক পাথুরে পর্বতের ওপর নিজের জন্য সার্ভাইভাল বাঙ্কার বানাচ্ছে দূর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য।
    আর্টওয়ার্ক: ওয়ার্ল্ড লিডারশিপ
    শিল্পী: মির সুহায়েল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এদের এই দ্বিমুখী আচরণের(শাসকদের স্বচ্ছতা নিয়ে যা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে) বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থেকেই চীনের রাজনীতিতে নতুন একটা পটপরিবর্তন হবে।

    কিন্তু বিশ্বজুড়ে আমাদের আশেপাশের যেসব মানুষ কেবল চাইনিজদেরকে কীভাবে কোয়ারেন্টাইনে আটকে রাখা যাবে তা নিয়ে ভাবে তাদেরই সত্যিকার অর্থে লজ্জিত হওয়া উচিৎ।
    টীকা:

    [১] Gelassenheit জার্মান ভাষার শব্দ। শব্দটা পাওয়া যায় পরের দিকের হাইডেগারের অপ্রকাশিত কিছু লেখাপত্রে। এই অপ্রকাশিত লেখাগুলো Country Path Observations(২০১০) বইয়ের প্রথম লেখাটায় পাওয়া যায়। এখানে একজন বিজ্ঞানী, পণ্ডিত এবং দিকনির্দেশকের সাথে পারস্পরিক কথা চালাচালির সময় চিন্তা’র কাজ কি এবং চিন্তা’র সারসত্তা কি এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে Gelassenheit শব্দটা প্রাসঙ্গিক হয়েছিল।এই শব্দটা হাইডেগার নিয়েছে খ্রিস্টান মিথোলজিস্ট এখার্টের থেকে।

    [২] জিজেকের এই প্রবন্ধে সরাসরি বলা না থাকলেও অনেক জায়গাতেই হাইডেগারের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। হাইডেগার নিয়ে জিজেকের নিজের বোঝাবুঝি নিয়ে বিস্তারিত পড়তে চাইলে তাঁর Ticklish Subject(2000) বইটি কাজের হবে। এখানেও জিজেক হয়তো হাইডেগারের দিকে আমাদেরকে ইঙ্গিত করছেন। হাইডেগার মনে করতেন সবকছুই সর্বদা নিজের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে বা আড়াল করে রাখে। যার জন্য সত্তা’র প্রকৃত দশাকে আমরা ঠাওর করতে পারিনা। যেমন করোনা ভাইরাসের আগমনের ফলে আমরা যে পৃথিবীর মুখোমুখি হয়েছি সেটা এর আগে আমরা কখনো পরখ করতে পারিনি। এই পরখ করতে না পারার বা ঠাওর করতে না পারার কারণটাই হচ্ছে ‘Withdrawal’ বা সরিয়ে নেয়া। আর এই সরিয়ে নেয়ার কারণেই কোনো কিছুই আসলে আমাদের হাতে পুরোপুরি হাজির থাকে না কিংবা ‘বিদ্যমান’ দশায় (present-at-hand) থাকে না।
  • অ্যান্না অ্যাপলবাম ।। মহামারির কালে শাসকেরা ক্ষমতা আরও নিরঙ্কুশ করে

    অ্যান্না অ্যাপলবাম ।। মহামারির কালে শাসকেরা ক্ষমতা আরও নিরঙ্কুশ করে

    • অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    অনুবাদকের ভূমিকা: মার্কিন সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ অ্যান্না অ্যাপলবাম গত ২৩শে মার্চ, ২০২০-এ The Atlantic সংবাদমাধ্যমে  When Disease Comes, Rulers grab More Powers শিরোনামে একটি আর্টিকেল লেখেন। এই আর্টিকেলে তিনি করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে কীভাবে ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করছে ইউরোপ ও আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহ তার বিবরণ দিয়েছেন। মহামারির কালে মানুষ যখন চরম নিরাপত্তাহীন ও উদ্বেগের মধ্যে দিন যাপন করছে, রাষ্ট্রগুলো তখন নজরদারির নিত্যনতুন কৌশল রপ্ত করছে, সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করার মাধ্যমে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করে মানুষের জীবনযাপনকে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করার আয়োজন সম্পন্ন করেছে।

    এই আর্টিকেলে তিনি দেখিয়েছেন মানুষের সামনে যদি ভালো–মন্দ বাছাই এর উন্মুক্ত সুযোগ থাকে, তাহলে মানুষ নিজ স্বার্থেই পরিস্থিতি অনুযায়ী ভূমিকা পালন করে এবং সার্ভেইলেন্সের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত করোনা ভাইরাসের মতো সংকট মোকাবেলা করা, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন–যাপন নিয়ন্ত্রণ করা নয়। মানুষ যেন চাইলেই প্রয়োজনে সার্ভেইলেন্স সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসতে পারে সেরকম ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

    করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সেইসব দেশই সাফল্য অর্জন করেছে যারা পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেছে মানুষের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে। যেসকল রাষ্ট্র তথ্য গোপন করেছে, পরিস্থিতিকে অস্বীকার করেছে, তারা সবচাইতে বাজে অবস্থা পার করছে।

    বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, করোনা ভাইরাসকে কাজে লাগিয়ে জনগণের উপর নজিরবিহীন পুলিশি নিপীড়ন শুরু হয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষকে মারধোর, কান ধরে উঠবস করানোর মতো ঘটনার কথা জানা যাচ্ছে প্রতিদিন। রাষ্ট্রের আচরণ দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে বাংলাদেশের মানুষ যেন কোনো অমোচনীয় ‘পাপ‘ করেছে, যার ফলে এক নির্মম শাস্তি দেয়া হচ্ছে তাদের। ‘লক ডাউন‘-এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জীবনকে রক্ষা করা, কোনোভাবেই আসামীর মতো ট্রিট করা নয়। অথচ করোনা মোকাবেলায় সরকার শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জামাদি না থাকায় ডাক্তাররা রোগী দেখছেন না। ‘গুজব‘ মোকাবেলা করতে র‍্যাবের সাইবার মনিটর টিম গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই স্ব ইচ্ছায় অধীন টেলিভিশন মিডিয়াগুলোর উপর নজরদারির উদ্দেশ্যে সচিব–উপসচিবদের সমন্বয়ে টিম গঠন করা হয়েছে। ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় শিক্ষকদের বহিস্কার করা হয়েছে।

    সবমিলিয়ে করোনা নয়, যেন বাংলাদেশের মানুষকেই দমন করতে চায় রাষ্ট্র। মহামারির অজুহাতে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রকে আরও প্রবল করতে চায়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রথম উপায় হলো সমাজ রূপান্তরকামী রাজনৈতিক কর্মী, অ্যাক্টিভিস্টদের রাষ্ট্র সম্পর্কিত বোঝাপড়া আরও তীক্ষ্ণ করা এবং ভিন্নভাবে সমাজ–সম্পর্ক ভাবতে পারার মতো সংকল্প–রূপকল্প।

    আর্টওয়ার্ক: গেট দ্য হিন্ট
    শিল্পী: বার্ল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মূল প্রবন্ধ

    গত ১৩ ই মার্চ— যেমনটি ঘটেছিল— আমার স্বামী পোলিশ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে খবর চালু করল এবং জানতে পারল যে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশের সীমানা বন্ধ করে দেয়া হবে। ও আমাকে তৎক্ষণাৎ ফোন করল। কয়েক মিনিট পরেই আমি লন্ডন থেকে ওয়ারশের টিকিট কিনলাম। আমি সেখানে সব সময় থাকি না, তবে আমার স্বামী পোলিশ, আমার নিজের একমাত্র বাড়িটি পোল্যান্ডের এক পল্লী গ্রামে এবং আমি সেখানে যেতে চাইছিলাম। পরের দিন সকালে, ওয়ারশের ফ্লাইট ছাড়া হিথ্রো বিমানবন্দর বলতে গেলে একেবারেই ফাঁকা ছিল, যা আবার বাণিজ্যিক ট্রিপের মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরতে চাওয়া মানুষে ঠাসা ছিল । চেক-ইন করার সময় এজেন্টরা কোনো পোলিশ পাসপোর্ট বা রেসিডেন্স ডকুমেন্ট ছাড়া যাত্রীদের বোর্ডিং করতে দিচ্ছিল না । তারপরে কেউ একজন বুঝতে পেরেছিল যে, নতুন নিয়মগুলো কেবল মধ্যরাতে কার্যকর হয়েছে । আমি একজন স্টুয়ার্ড এবং দুই নন-পোলিশ যাত্রীর কথোপকথন শুনতে পেলাম : ‘আপনি বুঝতে পারছেন যে আপনি আবার ফ্লাইটে চড়তে পারবেন না এবং লম্বা সময়ের জন্য ওয়ারশে আটকা পড়তে পারেন…।’

    একই দিনে, আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের সদ্য কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে ফোন করে তাকে বিমানবন্দরে যেতে বলেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পরে সে বন্ধুবান্ধবের সাথে থাকার পরিকল্পনা করছিল । কিন্ত আমরা তাকে বার্লিনে যাওয়ার শেষ ফ্লাইটের সাথে সংযোগকৃত লন্ডনের শেষ ফ্লাইটগুলোর একটিতে উঠে পড়তে আধঘণ্টার একটা নোটিশ দিয়েছিলাম। রবিবার, সে ইউরোপে অবতরণের করতে করতেই, পোল্যান্ড তার সীমান্ত সমস্ত গণপরিবহন প্রবেশের ক্ষেত্রে বন্ধ করে দিয়েছিল। সে বার্লিন থেকে পোলিশ-জার্মান সীমান্তের একটি শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট আন ডের ওদার (Frankfurt an der Oder) যাওয়ার ট্রেন ধরেছিল। তারপরে সে স্টেশন থেকে বেরিয়ে লাগেজসহ হাঁটতে শুরু করেছিল যেন শীতল যুদ্ধের সময়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সিনেমা। সে রোডব্লক ও বন্দুকধারী সৈনিক দেখতে পেল । আমার স্বামী তাকে সীমান্তের অপর পাশ থেকে রিসিভ করল ।

    পোল্যান্ডই সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া প্রথম কিংবা শেষ ইউরোপীয় দেশ ছিল না। প্রায় এক ডজন ইউরোপীয় দেশ বর্তমানে সীমান্ত চলাচল বন্ধ কিংবা নাটকীয়ভাবে শিথিল করে রেখেছে। এছাড়াও, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত-চলাচল অঞ্চল – শেঙ্গেন (Schengen) অঞ্চল- বর্তমানে অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রবেশ বন্ধ রেখেছে। এই নাটকীয় সীমান্ত বন্ধের মেডিকেল প্রমাণাদি বিব্রতকর: ২০১৪ সালে ইবোলা সংকট নিয়ে কাজ করেছিলেন জাতীয় সুরক্ষা কাউন্সিলের প্রাক্তন কর্মী অ্যামি পোপ, তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, ওবামা প্রশাসন তৎকালীন পশ্চিম আফ্রিকার যাত্রীদের সীমান্ত বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করেছিল, যদিও ‘বিজ্ঞানীরা দৃঢ়ভাবে এটি করতে বারণ করেছিল কারণ এতে করে রোগের প্রাদুর্ভাব আরও বেড়ে যাবে।’ সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছাড়াই সীমান্ত বন্ধ করে দিলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গতি কমিয়ে দিতে পারে এবং বিমানবন্দর, নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে আক্রান্ত মানুষের ভিড় বাড়াতে পারে। এইভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দিলে আসলে বাস্তবতার পরিবর্তন হবে না তবে ‘সুনিশ্চিত’ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এমন ভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। গত জানুয়ারিতে চীন থেকে আগত ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প এবং এই সিদ্ধান্ত তিনি সহ তার প্রশাসনকে এই ভ্রান্ত ধারণায় উপনিত করেছিল যে তারা COVID-19 ভাইরাসকে রুখে দিয়েছে। আসলে তারা রুখতে পারেনি।

    আর্টওয়ার্ক: টু ভাইরাস ইন পোলান্ড
    শিল্পী: দরিউস দাব্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পোল্যান্ডের ক্ষেত্রে, এই আকস্মিক, আপাতদৃষ্টিতে অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। পোলিশ নাগরিকরা এখন সর্বত্র আটকা পড়েছে এবং তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার চার্টার ফ্লাইট ( রাষ্ট্রীয় লিখিত অনুমোদন সাপেক্ষে ফ্লাইট) এর ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছে। ইউক্রেন, বেলারুশ এবং বাল্টিক দেশসমূহের বাড়ি ফিরতে চাওয়া ট্রাক চালক থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট পর্যন্ত হাজার হাজার নাগরিককে— তাদের গাড়ি সহকারে পোলিশ-জার্মান সীমান্তে ঠায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। তারা খোলা ময়দানকে টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করেছে কারণ সীমান্তরক্ষীরা নন-পোলিশদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছিল। আটকে পড়া এই মানুষদের জার্মান রেড ক্রস খাবার, পানীয় এবং কম্বল সরবরাহ করেছিল।

    এইসব কঠোর, নাটকীয় কোনো পদক্ষেপই পোল্যান্ডে ভাইরাসটির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারেনি। মহামারিটি কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই সংক্রমিত হতে শুরু করেছিল এবং এখনো সংক্রমিত হচ্ছে। তবে বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও— সম্ভবত বিশৃঙ্খলার কারণেই— সীমান্তের এই চিরুনি অভিযান অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাষ্ট্র ‘কিছু’ কাজ তো অন্তত করছে! এবং অনাগত সংকটে এই ‘কিছু’ই হবে আশ্রস্থল!

    স্বাস্থ্য সঙ্কটের সময়ে আগ্রাসী এবং অতিউৎসাহী সরকারি হস্তক্ষেপের নজির নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে বরাবরই, মহামারি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার ঘটিয়েছে। ১৩৪৮ সালে যখন প্লেগ মহামারিতে মৃত্যু ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ জুড়ে, ভেনিসের কর্তৃপক্ষ শহরের বন্দর বন্ধ করে দিয়েছিল যেন প্লেগ-উপদ্রুত অঞ্চল থেকে আগত জাহাজগুলো ভেনিসে প্রবেশ করতে না পারে এবং সব ভ্রমণকারিকে ৩০ দিনের জন্য সমস্ত কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বাধ্য করেছিল, যা অবশেষে ৪০ দিনে গড়ায়; সেই থেকেই ‘কোয়ারেন্টিন’ শব্দটির উৎপত্তি। তারও কয়েক শতাব্দী পরে রানি প্রথম এলিজাবেথের মুখ্যমন্ত্রী উইলিয়াম সেসিল এই মহামারিকে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে এমন একটি আইন প্রণয়ন করেছিলেন যা অসুস্থদের ছয় সপ্তাহের জন্য নিজ গৃহে বাধ্যতামূলক বন্দি রাখার অনুমোদন দিয়েছিল কর্তৃপক্ষকে। কয়েক বছর পরে এইসব পদক্ষেপের সমালোচনা করে এবং এগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে ‘প্লেগ আইন ১৬০৪’ প্রণীত হয়েছিল।

    অন্তত যখন মানুষ আতঙ্কিত ছিল, তারা মেনে চলেছে। প্রায়ই যখন লোকেরা মৃত্যুর ভয়ে থাকে, তারা ভুল বা সঠিকভাবে, যেভাবেই হোক, এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে যেগুলো তাদের রক্ষা করবে বলে তারা বিশ্বাস করে। যদি এমনকি এতে তাদের স্বাধীনতা কিছুটা খর্বও হয়। এমন সব পদক্ষেপ অতীতেও জনপ্রিয় ছিল। উদারনৈতিক, মুক্তিমুখী, গণতন্ত্রী এবং সকল ধরনের স্বাধীনতাপ্রেমীদের উচিত হবে না নিজেদের বোকা বানানো। এমন পদক্ষেপ এখনো জনপ্রিয় হবে।

    আর্টওয়ার্ক: লকড
    শিল্পী: শার্লি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিছু কিছু ইউরোপীয় দেশে, আমরা ইতোমধ্যেই ব্যাপক পরিমাণে সামাজিক সম্মতি সহকারে সেইসব প্রক্রিয়া শুরু হতে দেখছি। ইতালি সম্পূর্ণ লক-ডাউনে গেছে। নিতান্তই অপরিহার্য মনে হওয়া খাতগুলো বাদে বাদবাকি সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় চলাচল রোধ করতে রোডব্লক করা আছে, পাবলিক পার্ক, খেলার মাঠ বন্ধ আছে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাইরে থাকা হাজার হাজার মানুষকে ইতালির পুলিশ জরিমানা করেছে। গত মঙ্গলবার থেকে প্যারিস একইভাবে কঠোর লকডাউনে ছিল। কোনো ফর্ম পূরণ না করে আপনি বাড়ি ছাড়তে পারবেন না; মানুষ যেন নিয়ম ভঙ্গ না করে তা নিশ্চিত করার জন্য এক লক্ষ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গত সপ্তাহের বুধবার, একদিনেই ফরাসি পুলিশ অযথা বাইরে থাকার কারণে চার হাজার জরিমানা করেছে।

    হ্যাঁ, এই পদক্ষেপগুলো নির্মম। কিন্তু মানুষ এখন এসব পদক্ষেপকে জরুরি মনে করছে। এই মুহূর্তে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ কন্টি প্রত্যেক ১০ ইতালীয়র মধ্যে ৭ জনের সমর্থন উপভোগ করছেন। ঐতিহাসিকভাবে রাজনীতিবিদদের অবিশ্বাস করে এমন কোনো দেশে এই সংখ্যা অভূতপূর্ব। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রন করোনার বিরুদ্ধে এই সংগ্রামকে ‘যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছেন এবং এই ধরনের আগ্রাসী মনোভাব ও ভাষা তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয় সমর্থন পাইয়ে দিয়েছে।

    পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, কোনো কোনো দেশ আরও মারাত্মক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকেছে। গত শুক্রবার, হাঙ্গেরি সরকার সংসদে একটি বিল প্রেরণ করেছে যা প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওর্বানকে “জরুরি অবস্থা”র অজুহাতে স্বৈরাচারী ক্ষমতা প্রদান করবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য, আইনপ্রণেতাদের পরামর্শ ছাড়াই তিনি চাইলে যেকোনো আইন তার ইচ্ছামাফিক উপেক্ষা করতে পারবেন। নির্বাচন ও গণভোট স্থগিত থাকবে। কোয়ারেন্টিন ভঙ্গ করা ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হবে, অর্থাৎ কারাদণ্ডের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য। মিথ্যা তথ্য ছড়ানো অথবা ‘বিশৃঙ্খলা’, ‘অস্থিতিশীলতা’ তৈরি করতে পারে এমন কোনো তথ্য পরিবেশন করাও আইনত দণ্ডনীয় হবে। কিন্তু কে ‘মিথ্যা’কে সংজ্ঞায়িত করবে তা অস্পষ্ট। এই আইনের ভাষা এতটাই অস্পষ্ট যে সরকারের জনস্বাস্থ্য নীতির যেকোনো সমালোচনাই এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এইসব ব্যবস্থার কোনোটাই কিন্তু এই সত্য প্রকাশ করছে না যে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে মহামারির মোকাবেলায় হাঙ্গেরি সবচাইতে অপ্রস্তুত, কারণ দেশটির জাতীয়তাবাদী সরকারের নীতিসমূহ ডাক্তারসহ বহু শিক্ষিত মানুষকেই দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল।

    স্বাভাবিক সময়ে, হাঙ্গেরির সরকার বিরোধীরা একব্যক্তিতে সমস্ত ক্ষমতার কাছাছোলা সমর্পনকে কোনোভাবেই সমর্থন করত না, বিশেষত এমন একটি আইন যা সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে ডিজাইন করা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে, এমনকি সরকারের বিরোধীদের অনেকেও সরকারকে সমর্থন জানাবেন। হাঙ্গেরিয়ান বিশ্লেষক পিটার ক্রেকো আমাকে বলেছিলেন, “তাদের সজাগ থাকার সমস্ত সিস্টেমকে স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলছিলেন, ক্রমবর্ধমান আতঙ্কের এই মুহূর্তে, কেউই নিজেকে ‘দেশদ্রোহী’ কিংবা কোনোভাবে হাঙ্গেরিয়ানদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার ক্ষতি করছে এমনভাবে হাজির করতে চায় না। প্রত্যেকেই জাতি ও রাষ্ট্রের আবশ্যিক ‘মঙ্গলে’ বিশ্বাস রাখতে চায়।

    ইজরায়েলেও একই রকম আকস্মিক রূপান্তর ঘটছে। নির্বাচনে হেরেও প্রধানমন্ত্রীত্বে বহাল থাকা বেনজামিন নেতানিয়াহু জরুরি আদেশ জারি করেছেন যা তাকে নিজের অপরাধের বিচারের সূচনা স্থগিত সুযোগ করে দিয়েছে এবং যা বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নবনির্বাচিত ইসরাইলি সংসদকে কার্যকর হতে বাধা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো তদারকি ছাড়াই তিনি নিজেকে নজরদারি করার বিপুল নতুন ক্ষমতাও দিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহৃত প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগুলো এখন ব্যবহৃত হবে কোয়ারেন্টিন আনুগত্য পর্যবেক্ষণে। সাধারণ নাগরিকদের ক্রিয়াকলাপ, চলাফেরার অনুসরণ করতে এবং তাদের তাপমাত্রা এবং স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে নজর রাখার জন্যও এসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে। তবে ইজরায়েলি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কখনোই এই নজরদারি কার্যক্রম কিংবা নেতানিয়াহুর স্ব-প্রণোদিত ক্র‍্যাকডাউনের কোনটাই মেনে নিবেনা। ইজরায়েলি পত্রিকা হা’আরেজ (Haaretz) ইতিমধ্যেই এসব পদক্ষেপকে ‘করোনা ক্যু’ হিশেবে অভিহিত করেছে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত ইজরায়েলিরা ভীত থাকবে, জনসংখ্যার অপর অংশ এসব পদক্ষেপ মেনে নিবে।

    আর্টওয়ার্ক: প্রেটেকশন অব ডোনাল্ড ট্রাম্প
    শিল্পী: গ্যালো প্যারাডেস
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সহনাগরিকদের এমন প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আমেরিকানদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের ফেডারাল সিস্টেম আমাদের কিছু সুবিধা দেয়: কোয়ারেন্টিন ক্ষমতা একেক রাজ্যে একেক রকম এবং এই ক্ষমতা খুব সম্ভবত প্রয়োগ করবে রাজ্য পুলিশ, ফেডারেল নিরাপত্তা বাহিনী নয়। তবে আমেরিকান রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে তিনি বাস্তব পদক্ষেপ নেয়ার চেয়ে ভান করতে বেশি পছন্দ করেন। টেস্ট কিট এবং মাস্কের ব্যাপক উৎপাদনের চাইতে সীমান্ত বন্ধ কর‍তে বেশি পছন্দ করেন। আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তাঁর এ ধরনের কীর্তিকলাপের তালিকা বেশ দীর্ঘ: ইউক্রেন কেলেঙ্কারি আমাদের সামনে উন্মোচন করেছিল আইনের শাসনের প্রতি ট্রাম্পের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই এবং মুলার তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে তিনি থোড়াই পরোয়া করেন। তিনি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক কারণে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং তার একটি শক্তিশালী মোসাহেবগোষ্ঠী আছে যারা তার সকল কর্মকাণ্ডের বন্দনায় মেতে থাকে। আসন্ন সপ্তাহ বা মাসগুলোতে খুব সম্ভবত তিনি নিজের আরও ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হাঙ্গেরির ওর্বান এবং ইজরায়েলে নেতানিয়াহুর মতোই এই সংকটকে ব্যবহার করবেন এবং ফক্স নিউজ তাকে সমর্থন করবে। অনেক আমেরিকানও তাই করবে।

    পলিটিকো জানিয়েছে, বিচার বিভাগ ইতোমধ্যেই কংগ্রেসের কাছে বিনা বিচারে আমেরিকানদের আটক করার ক্ষমতা চেয়েছে, যদিও এই ধরনের ক্ষমতা দূরবর্তী কারণেও প্রয়োজনীয় নয়। এই আইনজীবীদের মধ্যে যারা এসব পদক্ষেপ এবং এমন আরও অনাগত পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন, তারা তাদের নির্বাচনী ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে যাচ্ছেন।

    ভিন্ন এক দুনিয়ায় অন্য ধরনের রাষ্ট্রপতির অধীনে মার্কিন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাজ করার আরও ভালো সুযোগ বিরাজ করত। গণউদ্বেগ কাটানোর আরও ভালো উপায় থাকত। জনগণের ভালো-মন্দ তদারকি করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করা, আইনের শাসনকে স্থগিত না করার আরও কার্যকরী পথ উন্মুক্ত থাকত। দক্ষিণ কোরিয়া, একটি প্রতিশ্রুতিশীল গণতন্ত্র, করোনভাইরাস রোগীদের এবং কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে অ্যাপস ব্যবহার করছে, কিন্তু এজন্য তাকে সংসদ স্থগিত করতে হয়নি। জনস্বাস্থ্যে ডেটা এবং আচরণগত বিজ্ঞানের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে এমন একটি সংস্থা সার্গো ফাউন্ডেশনের সেমা সগাইয়ার উল্লেখ করেছেন যে প্রযুক্তিকে অন্য উপায়েও কাজে লাগানো যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, COVID-19 এর প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ করা যেন কোয়ারান্টিন লকডাউনগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকা বা শহরে সীমাবদ্ধ রাখা যায় এবং এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলোর চাপিয়ে দেয়া কাছাছোলা শাটডাউন এড়ানো সম্ভব। মহামারি শেষ হয়ে গেলে নাগরিকদের ট্র‍্যাকিং সিস্টেম থেকে লগ আউট করার অধিকার প্রদান করে স্বচ্ছ উপায়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহারও করতে পারা উচিত।

    আর্টওয়ার্ক: হোপ গিভার্স
    শিল্পী: মেহনাজ ইয়াজদানি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    পোল্যান্ডে, সরকার এই ধরনের অত্যাধুনিক কৌশল প্রয়োগ করা থেকে এখনো অনেক দূরে এবং পুরানো পদ্ধতিগুলোই এখনো বলবৎ আছে। আমাদের গ্রামীণ জেলার স্থানীয় পুলিশ নিয়মিত ফোন করছে, আমাদের বাড়ির সবাই যেন ঘরেই থাকে তা নিশ্চিত করতে। বিদেশফেরত প্রত্যেকের জন্যই ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুলিশের আচরণ বেশ নম্র। আমি বুঝতে পারি যে তারা তাদের কাজটাই করছে এবং এর উদ্দেশ্য মানুষকে নিরাপদ রাখা। তবে আমি বা তাদের তালিকায় থাকা অন্য কারোর পক্ষেই জানা সম্ভব না, মহামারি দূর হওয়ার পরে, সংকটকালে কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত নতুন ক্ষমতা খর্ব করা সম্ভব হবে কিনা।