Blog

  • স্ল্যাভয় জিজেক ।। ভাইরাসের দুনিয়ায় পহেলা মে : নতুন শ্রমিক শ্রেণীর ছুটির দিন

    স্ল্যাভয় জিজেক ।। ভাইরাসের দুনিয়ায় পহেলা মে : নতুন শ্রমিক শ্রেণীর ছুটির দিন

    অনুবাদ: তাসবির কিঞ্জল

    বৈশ্বিক মহামারি থেকে আমাদের নিবিড় দৃষ্টি একটুখানি সরিয়ে এই করোনা ভাইরাস ও এর বিধ্বংসী প্রভাব একটা সমাজ হিসেবে আমাদের সম্পর্কে কী উন্মোচিত করল তা বিবেচনা করে দেখার অনুমতি নিজেদেরকে প্রদান করবার সেই মূহুর্তটি মনে হয় এসে পড়েছে।

    স্ল্যাভয় জিজেক

    প্রথমেই যে জিনিসটি তীব্র ভাবে চোখে পড়ে তা হল, “আমরা সবাই একই নৌকায় আছি”- এই সস্তা কথাটির একদম বিপরীতে শ্রেণী বিভাজনগুলো বিষ্ফোরিত হয়েছে। আমাদের মোড়লতন্ত্রের একদম তলানিতে রয়েছেন শরণার্থীরা। তারা যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলগুলোতে আটকা পড়েছেন । তাদের জীবন এমন ভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে যে, তাদের জন্য এই মহামারি প্রধান কোনও সমস্যা নয়। এই মানুষগুলোকে যখন মিডিয়া ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করছে, ঠিক তখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ফ্রন্টলাইনে থাকা নার্সদের অতি আবেগপ্রবণ উদযাপনের তোড়ে আমরা ভেসে যাচ্ছি। অথচ নার্সেরা হলেন শোষিত হতে থাকা “সেবাপ্রদানকারী” শ্রেণীটির সবচাইতে দৃশ্যমান অংশ। এই শোষণ মোটেও মার্কসীয় চিত্রকল্পের পুরাতন শ্রমিক শ্রেণীর শোষণের মত নয়। এর বদলে ডেভিড হার্ভি যেমনটি বলে থাকেন, তারা গঠন করেছে এক “নতুন শ্রমিক শ্রেণী”।

    তিনি বলেন: “সেই কর্মশক্তি যা ক্রমেই বাড়তে থাকা অসুস্থদের দেখাশোনা করবে অথবা দৈনন্দিন জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার মত নূন্যতম সেবা প্রদান করবে বলে আশা করা হয়েছিল তাকে উচ্চমাত্রার লৈঙ্গিক, বর্ণবাদী এবং জাতিবিদ্বেষ মূলক চরিত্র প্রদান করা হয়েছে। এটিই সেই “নতুন শ্রমিক শ্রেণী” যা সমকালীন পুঁজিবাদের পুরোভাগে রয়েছে। এই শ্রেণীর সদস্যদের দুইটি বোঝা বইতে হয়। প্রথমত, তারা হলেন সেই শ্রমিকের দল যারা পেশাগত কারণে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। দ্বিতীয়ত, ভাইরাস কর্তৃক আরোপিত অর্থনৈতিক সংকোচনের কারণে আর্থিক সংস্থান ছাড়াই লে-অফের শিকার হোন। যুক্তরাষ্ট্রের সমকালীন শ্রমিক শ্রেণীটিকে – যা প্রধানত আফ্রো-মার্কিন, লাতিন এবং বেতুনভুক্ত নারীদের নিয়ে গঠিত – এক নোংরা বাছাই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। একদিকে থাকে, মানুষের সেবা করতে গিয়ে এবং জরুরী পরিষেবাগুলো (যেমন, গ্রোসারি স্টোর) চালু রাখতে গিয়ে সংক্রমিত হবার দূর্ভোগকে বরণ করে নেওয়া। আর অপরদিকে বেকারত্ব; কোনও ধরণের সুযোগ-সুবিধা (যেমন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা) ছাড়া”।

    এই কারণেই ফ্রান্সে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল; প্যারিসের উত্তরে দরিদ্র শহরতলিগুলোতে যেখানে ধনীদের সেবকেরা থাকেন। এবং এই কারণেই, কয়েক সপ্তাহ আগে সিঙ্গাপুরে বিদেশী শ্রমিকদের ডরমেটরিগুলোতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। সিএনএন বলছে, “সিঙ্গাপুরে প্রায় ১৪ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের বাস। তাদের একটি বৃহৎ অংশ এসেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে। তারা গৃহপরিচালক, গৃহকর্মী, নির্মাণ শ্রমিক এবং সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সিঙ্গাপুরকে সচল রাখতে এই অভিবাসীদের বিকল্প নেই। অথচ তারাই আবার এই শহরের সর্বনিম্ন মজুরীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাহীন মানুষ। নতুন এই শ্রমিক শ্রেণীটি এখানে বরাবরই ছিল। মহামারি কেবল একে দৃষ্টিসীমার আওতায় নিয়ে এসেছে।

    এই ক্ষেত্রটিকে যথার্থরূপে সংজ্ঞায়িত করার উদ্দেশ্যে ব্রুনো লাতুর এবং নিকোলায় সুলজ নতুন একটি পরিভাষা তৈরি করেছেন। তারা একে বলছেন “ভূ-সামাজিক শ্রেণী”। এই শ্রেণীর অনেকেই ধ্রুপদী মার্কসীয় পন্থায় উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিকদের জন্য কাজ করতে গিয়ে শোষিত হোন না। বরং তারা শোষিত হোন তাদের জীবনের বস্তুগত শর্তাবলীর ভেতরেই। এর মধ্যে রয়েছে পরিস্কার পানি এবং বাতাস, তাদের স্বাস্থ্য, তাদের নিরাপত্তা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলো শোষিত হয় যখন তাদের জমিগুলোকে রপ্তানি বাজারের চাহিদা মাফিক বড় আকারের কৃষিকাজে অথবা বিস্তীর্ণ খনির খননকাজে ব্যবহার করা হয়। কোনও বিদেশি কোম্পানিতে কাজ না করেও শ্রেফ জীবনযাপনের প্রয়োজনে নিজেরই একখন্ড জমি পূর্ণাঙ্গরূপে ব্যবহার না করতে পেরে তারা শোষণের শিকার হচ্ছেন। সোমালিয়ার জলদস্যুদের কথাই ধরা যাক। তারা দস্যুপনা বেছে নিয়েছেন কারণ বিদেশী কোম্পানিগুলো বড় শিল্পের প্রয়োজনে মাছ শিকার করতে গিয়ে তাদের সমুদ্র উপকূলকে প্রায় ফাঁকা করে ফেলেছে। তাদের ভূখন্ডের একটা অংশ উন্নত দেশগুলোর অধিকারে চলে গেছে। ওদের জীবনকে শুকিয়ে মেরে আমাদের জীবনকে পরিপুষ্ট করবার কাজে তা ব্যবহার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে লাতুর প্রস্তাব করলেন, “উদ্বৃত্ত মূল্যের উপর অধিকার” ব্যাপারটিকে “উদ্বৃত্ত অস্তিত্বের উপর অধিকার” দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিৎ। এখানে “অস্তিত্ব” মানে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত শর্তাবলি।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড -১৯
    শিল্পী: গিলি নিকোলাস
    সূত্র: ইয়ুথ ভয়েস

    মহামারি কালে আমরা আবিষ্কার করি যখন এমনকি কারখানাগুলোও থমকে যায় তখনও সেবা-প্রদানকারী এই ভূ-সামাজিক শ্রেণীটিকে কাজ করে যেতে হয়। তাই, ধ্রুপদী শিল্পশ্রমিক শ্রেণীর বদলে বরং তাদের উদ্দেশ্যেই এই পহেলা মে-কে উৎসর্গ করাটা যথার্থ হবে। তারাই সত্যিকার অর্থে মাত্রাতিরিক্ত শোষণের শিকার হচ্ছেন। যখন কাজ করছেন তখন শোষিত হচ্ছেন কারণ তাদের কাজটি মোটা দাগে অ-দৃশ্যমান এবং কাজ না করলেও তাদের বস্তুগত শর্তাবলির কারণে শোষিত হচ্ছেন। তারা যা করছেন তার মধ্যেই কেবল শোষিত হচ্ছেন না, তারা শোষিত হচ্ছেন খোদ তাদের অস্তিত্বের মধ্যেও।

    গরীবের দূষিত চারপাশ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন একটা ভূ-খন্ডে বাস করবার এক অনন্ত স্বপ্নে ধনী মানুষ বিভোর থাকে। সেই সমস্ত ব্লকবাস্টারগুলোর কথা চিন্তা করে দেখুন যেগুলোতে দেখানো হয় কেয়ামত-পরবর্তী কোনও দৃশ্য। নীল ব্লুমকাম্পের “Elysium” এমনই একটি সিনামা। ২১৫৪ সাল হল এর প্রেক্ষাপট। এখানে এলিটেরা বাস করেন মানব-নির্মিত এক প্রকান্ড মহাকাশ ঘাঁটিতে। আর বাকীদের বাস করতে হয় ধ্বংস হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে। সেই পৃথিবীকে দেখলে আবার মনে পড়ে লাতিন আমেরিকার কোনও এক বিস্তীর্ণ ঘিঞ্জি বস্তির কথা। আজকের এই বাস্তব দুনিয়াতেও বৈশ্বিক দূর্যোগের আশঙ্কায় ইতিমধ্যে ধনীরা নিউজিল্যান্ডে বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করছেন অথবা ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন কোনও পাথুরে পর্বতের গায়ে বানানো শীতল যুদ্ধের বাংকারগুলোকে। কিন্তু এই মহামারির সংকটটি হলো, কেউ কখনই নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারবে না। সন্তান মাতৃগর্ভে যেমন নাড়ির বাঁধনে বাঁধা থাকে, এটিও তেমনি। কী আপনার সামাজিক অবস্থান, কিচ্ছু আসে যায় না, দূষিত বাস্তবতার সাথে এক অনিবার্য বাঁধনে আপনি বাঁধা পড়ে গেছেন।

    লেখার মিূল লিংক এখানে…

  • সাইমন মেইর।। কেমন হবে করোনার পরে পৃথিবী?

    সাইমন মেইর।। কেমন হবে করোনার পরে পৃথিবী?

    অনুবাদ: ইলোরা সুলতানা ও বখতিয়ার আহমেদ

    সাইমন মেইর এখন ইউনিভার্সিটি অব সারি’র সেন্টার ফর দি আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব সাসটেইনেবল প্রসপেরিটি’তে প্রতিবেশ অর্থনীতির গবেষক হিসেবে যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে ‘উৎপাদনশীলতা’ বিষয়ক এক প্রকল্পের আওতায় জন-কল্যাণ ও অর্থনৈতিক উৎপাদনের আন্ত:সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন। নিজের গবেষণায় তিনি মূলত একটা বিকল্প অর্থনীতি তৈরীর উপায় খোঁজার জন্য বিদ্যমান অর্থনীতিকে বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাস, ইউটোপিয়ান অর্থশাস্ত্র, এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক মডেল। বর্তমানে তিনি উৎপাদনের বিভিন্ন তত্ত্বে শ্রম’কে কীভাবে দেখা হয় এবং কীভাবে এখানে শক্তির ব্যবহার হচ্ছে সে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। সেই সাথে প্রবৃদ্ধিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ‘স্টক ফ্লো কনসিস্টেন্ট মডেলিং এবং ইউটোপিয়ান কল্প-কাহিনীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে সাইমনের। পাশাপাশি তিনি স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। প্রতিবেশ অর্থনীতিতে পিএইচডি করা সাইমন পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়েছেন। তিনি ইউরোপের প্রতিবেশ অর্থনীতিবিদদের পেশাদার সংগঠনের একজন মূল সংগঠকও।

    সাইমন মেইর

    কেমন হবে করোনার পরে পৃথিবী?
    চারটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ

    এখন থেকে ছয় মাস, এক বছর বা দশ বছরের মধ্যে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

    রাত জেগে শুয়ে শুয়ে ভাবি আমার কাছের মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কি? চরম ঝুঁকিতে থাকা আমার আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুদের কী হবে? আমার চাকরির কি হবে? যদিও আমি অনেকের চেয়ে অনেক ভাগ্যবান, ভাল চিকিৎসা-ভাতা পাই, এবং বাসা থেকে কাজ করতে পারি। আমি এখন যুক্তরাজ্য থেকে লিখছি, এখানে আমার এমন সব বন্ধু আছেন যারা স্বনির্ভর উদ্যোক্তা, এখন কোনরকম রোজগার ছাড়া মাস পার করছেন। এমন বন্ধু আছেন যারা এর মধ্যেই চাকরি হারিয়েছেন। আমার বেতনের শতকরা আশি ভাগ যে চুক্তির আওতায় আসে তার মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। করোনা ভাইরাস অর্থনীতিকে খুব বড় আঘাত করছে। কেউ কি আমাকে আর চাকরি দেবে যখন আমার প্রয়োজন হবে?

    সামনে বেশ কয়েকটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সবকিছুই নির্ভর করছে কীভাবে সরকার এবং সমাজ করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করে তার উপর। আশা করি আমরা এই ক্রান্তিকাল মোকাবেলা করে আরো ভালো, আরো মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। কিন্তু আরো খারাপ পরিস্থিতিতেও পড়ার সম্ভবনাও কম নয়।

    আমার  মনে হয়, অন্যান্য সঙ্কটের রাজনৈতিক-অর্থনীতির দিকে তাকিয়ে আমরা এই পরিস্থিতি আর আমাদের ভবিতব্য বোঝার চেষ্টা করতে পারি। আমার চলমান গবেষণা আধুনিক অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো নিয়েই: বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, শ্রম ও মজুরি এবং উৎপাদনশীলতা। আমি দেখার চেষ্টা করছি কীভাবে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি জলবায়ু পরিবর্তন এবং নিম্ন-আয়ের শ্রমিকদের দূর্বল মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের মত চ্যালেঞ্জের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই গবেষণায় আমি দেখাতে চেয়েছি সামাজিকভাবে ন্যায়সঙ্গত এবং প্রতিবেশগত দিক থেকে সুষম একটি ভবিষ্যতের জন্য আমাদের খুব অন্যরকম অর্থনীতি দাঁড় করাতে হবে। কোভিড-১৯ এর আবির্ভাবের পরে এর চেয়ে অনিবার্য সত্য আর কিছু হতে পারে না।

    কোভিড-১৯ প্যানডেমিক বা বিশ্ব-মারী প্রতিরোধে নেয়া পদক্ষেপগুলো আর সব সামাজিক এবং প্রতিবেশগত সঙ্কটের মূলে থাকা একটা নীতিরই সশব্দ সম্প্রসারণ: এক ধরনের অর্জনকে আরেক ধরনের অর্জনের উপরে অগ্রাধিকার দেয়া। এই নীতির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে নেয়া বৈশ্বিক পদক্ষেপ নির্ধারণে।

    সুতরাং, এই ভাইরাস-রোধে নেয়া পদক্ষেপগুলোর আবর্তনে আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে?

    অর্থনীতির চোখ দিয়ে দেখলে সামনে চারটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আছে: ১) বর্বরতায় পর্যবসিত হওয়া; ২) বলিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ গড়া; ৩) কট্টর রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র গড়া; এবং ৪) পারস্পরিক সহায়তাভিত্তিতে গড়া বড় সমাজে রূপান্তর।

    এই চার ভবিষ্যতের সবগুলোই সত্য হওয়ার সমান সম্ভবনা রাখে, সবগুলো সমান কাঙ্ক্ষিত না হলেও।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা
    শিল্পী: আলেসান্দ্রো সিভিগলিয়া
    সূত্র: সাচ্চি আর্ট

    ছোটখাট পরিবর্তনে কাজ হবে না

    করোনা ভাইরাসও জলবায়ু পরিবর্তনের মত যা আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি অঙ্গীভূত সমস্যা। দুটাকেই আপাত-দৃষ্টিতে “পরিবেশগত” বা “প্রাকৃতিক” সমস্যা মনে হলেও এগুলো আসলে সামাজিক কার্য-কারণ তাড়িত সমস্যা।

    হ্যাঁ, এটা সত্য যে কিছু সুনির্দিষ্ট গ্যাস তাপ শোষণ করার ফলেই জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু, এটা পুরাপুরি আবছা একটা ব্যাখ্যা। জলবায়ু পরিবর্তনকে পুরাপুরি বুঝতে হলে আমাদের এর কিছু সামাজিক কারণ বুঝতে হবে, কোন সব কারণে আমরা গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করি সেটা বুঝতে হবে। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। হ্যাঁ, সরাসরি কারণটা ভাইরাস। কিন্তু এর প্রভাব মোকাবেলার ক্ষেত্রে আমাদের মানব প্রজাতির আচরণ আর তার বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝাটাও জরুরী ।

    কোভিড-১৯ এবং জলবায়ু পরিবর্তন, দুই সমস্যাকেই মোকাবেলা করা অনেক সহজ যদি আপনি আপনার অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক কাজ-কারবার কমিয়ে দেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব যদি আপনি কম জিনিস তৈরী করেন, কম শক্তি খরচ করেন এবং কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করেন। কোভিড-১৯ এর মহামারী খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। কিন্তু এর মুল বিষয় কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মতই সাধারণ। মানুষ মেলামেশার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এটা প্রতিনিয়ত ঘটছে মানুষের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং চলার পথে। এই মেলামেশা কমিয়ে এনে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির সংক্রমণ কমানো সম্ভব যার ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যাও কমে আসবে।

    মানুষের সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে আনার পাশাপাশি তার অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ কৌশলগুলোকেও জোরদার করা সম্ভব। ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের একটি সাধারণ কৌশল হলো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং ঐ ব্যক্তিকে সবার থেকে আলাদা রাখা। যখন একজন আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয় তখন তাকে আলাদা করে ফেলা যাতে রোগ আরো ছড়াতে না পারে। এটা সবচেয়ে কার্যকর যখন আপনি আক্রান্তের সংস্পর্শে আসা বেশিরভাগ মানুষকেই খুঁজে বের করতে পারেন। আক্রান্ত মানুষ যত কম লোকের সংস্পর্শে আসবেন আপনি তত বেশি হারে সংস্পর্শে আসা মানুষদের খুঁজে বের করতে পারবেন।

    আমরা উহানের অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই যে, সামাজিক দূরত্ব এবং লকডাউনের মত পদক্ষেপ ভাল কাজ করে সংক্রমণরোধে। এখন রাজনৈতিক অর্থনীতিআমাদের বুঝতে সাহায্য করবে ইউরোপ এবং আমেরিকা কেন শুরুতেই এই পথ অনুসরণ করে নাই।

    একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি

    লকডাউনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরী হচ্ছে। আমরা একটা কঠিন অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। এই চাপের ফলে কিছু বিশ্বনেতা লকডাউনের মাত্রা ও পরিধি শিথিল করার কথা বলছেন। এমনকি লকডাউনের এমন পরিস্থিতিতেও উনিশটা দেশের নেতারা একসাথে বসেছেন। উনাদের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো সমস্ত আইন শিথিল করার আহবান জানিয়েছেন। ট্রাম্প তিন সপ্তাহের মধ্যে আমেরিকান অর্থনীতি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নিয়ে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন (এই সামাজিক দূরত্ব যে আরো বেশ কিছুদিন মেনে চলতে হবে সেই বিষয়টি কিন্তু এখন তিনি মেনে নিয়েছেন)। বলসোনারো বলেছেন: “আমাদের জীবন চলমান রাখতে হবে। চাকুরি বাঁচাতে হবে… আমাদের অবশ্য অবশ্যই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে হবে।”

    এদিকে যুক্তরাজ্যে চারদিন আগে তিন সপ্তাহের লকডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একটু কম আশাবাদী ছিলেন। তিনি বলেছেন, এই জোয়ার তার দেশ বারো সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। জনসনের ধারণা ঠিক হলেও, আমরা এমন এক অর্থনৈতিক ধারার মধ্যে রয়েছি যা এই প্যানডেমিকের পরের ধাপেই ভেঙে পড়ার হুমকিতে রয়েছে।

    ধ্বসের অর্থনীতির হিসাব খুব সোজা-সাপটা। ব্যবসা টিকে থাকে লাভের উপর। যদি তারা উৎপাদন করতে না পাওে, তাহলে তারা বিক্রি করতে পারবে না। এর মানে দাঁড়ালো তারা লাভও করতে পারবে না, যার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে আসবে। যদি হাতে ব্যবসা নাও থাকে, ব্যবসা-বাণিজ্যগুলো অল্প কিছুদিনের জন্য তাদের কর্মী বসিয়ে রাখতে পারে এই আশায় যে অর্থনীতি আবার চাঙা হয়ে উঠলে তখন তাদের কাজে লাগিয়ে বাজারে ফিরতে পারবে। কিন্তু সবকিছু আরো খারাপের দিকে গেলে তারা আর সেটা করবে না। সুতরাং আরো বেশী মানুষ কাজ হারাবে অথবা কাজ হারানোর ভয়ে থাকবে। সুতরাং তারা আরো কম কেনা-কাটা করবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে এবং এই পাকচক্রে ঘুরপাক খেতে খেতে আমরা একটা অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে ডুবে যাব।

    সাধারণ সঙ্কটের সময় খুব সহজ নিয়মে সমস্যার সমাধান করা যায়। সরকার সাধারণ মানুষের ভার বহন করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষ আবার আয় করতে শুরু করবে এবং কেনাকাটা করতে পারবে (অর্থনীতিবিদ জন ম্যানিয়ার্ড কেইনজ তার এই তত্ত্বের জন্যই বিখ্যাত)।

    কিন্তু এখন এসব সাধারণ পদক্ষেপ কাজে লাগবে না কারণ আমরা এই অর্থনীতির পুনরুদ্ধার চাইনা (নিদেন পক্ষে এখনই না)। লকডাউনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষ যেন কাজে না যায়, ভাইরাস যেন না ছড়ায়। সম্প্রতি একটা গবেষণা জানাচ্ছে যে, উহান থেকে যদি তাড়াতাড়ি লকডাউন তুলে নেয়া হতো তাহলে চীন ২০২০ সালের পরের দিকে আরেকবার সংক্রমণের শীর্ষে চলে যেত।

    অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে লিখেছেন, কোভিড-১৯ মোকাবেলা করার জন্য ব্যাপক মাত্রায় উৎপাদন বাড়িয়ে যুদ্ধকালীন অর্থনীতি চালু করা কোন সঠিক পথ নয়। বরং দরকার হচ্ছে যুদ্ধকাল-বিরোধী অর্থনৈতিক নীতি যা ব্যাপক মাত্রায় উৎপাদন কমাবে। আমরা যদি সামনে বিশ্ব-মহামারীর বিপরীতে টিকে থাকার সামর্থ্য অর্জন করতে চাই (সাথে যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল থেকে পরিত্রাণ চাই), তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক উৎপাদন এমনভাবে বদলাতে হবে যাতে কারো জীবিকা হারাতে না হয়।

    এজন্য আমাদের প্রয়োজন খুব অন্যরকম একটা অর্থনৈতিক দৃষ্টি। অর্থনীতিকে আমরা সাধারণত নিজেদের ভোগ্যপণ্য কেনা-বেচার ব্যাপার হিসেবেই দেখি। কিন্তু অর্থনীতি তো আসলে এটা না এবং এটা হওয়াও উচিত না। অর্থনীতির মূলে আছে যেভাবে আমরা আমাদের সহায়-সম্পদগুলোকে দেখি এবং সেগুলোকে আমাদের বেঁচে থাকবার নানা উপকরণে রূপান্তরিত করি। এভাবে দেখতে পারলে অনেক সম্ভবনাই আমাদের চোখে পড়ে যেখানে অনেক কম জিনিস উৎপাদন করেও কারো দূর্দশা না ঘটিয়েই বেঁচে থাকা যায়।

    আমি এবং আরো অনেক প্রতিবেশ-অর্থনীতিবিদ দীর্ঘদিন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছি যে, কীভাবে সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করে উৎপাদনের প্রয়োজনটাই আমরা কমাতে পারি। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবেলা করার সাথেও এই উৎপাদন কমানোর সম্পর্ক রয়েছে। এটাও সহজ হিসাব- আমরা যত কম উৎপাদন করব তত কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসৃত হবে। তাহলে মানুষের জীবিকা ঠিক রেখে কীভাবে আমরা সবকিছু উৎপাদনের পরিমাণ কমাবো?

    এর জন্য একটা আলোচিত প্রস্তাব হচ্ছে সাপ্তাহিক কার্য-দিবস কমিয়ে আনা। এছাড়াও আছে, আমার সাম্প্রতিক গবেষণা যেভাবে দেখিয়েছে: মানুষকে আরো ধীরে-সুস্থে কাজ করতে দিয়ে তাদের উপর চাপ কমিয়েও অর্থনীতি চলতে পারে। এর কোনটাই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সরাসরি কোন কাজে আসবে না যেখানে মূল লক্ষ্য মানুষের সামাজিক সংস্পর্শ কমানো, উৎপাদন কমানো না। কিন্তু দুই প্রস্তাবনার মূল বিষয় একটাই: বাঁচতে হলে মানুষের মজুরী নির্ভরতা কমাতে হবে।

    কীসের জন্য এই অর্থনীতি?

    অর্থনৈতিকভাবে কোভিড-১৯ মোকাবেলাকে বোঝার মূল উপায় হচ্ছে হুমকির মুখে পড়া এই অর্থনীতি আসলে কি কাজে লাগে তা বোঝার চেষ্টা করা। চলমান বিশ্ব অর্থনীতির মূল কাজ হচ্ছে মুদ্রার বিনিময় ব্যবস্থাকে ক্রিয়াশীল রাখা, এটাকেই অর্থনীতিবিদরা বলেন “বিনিময় মূল্য” বা এক্সচেইঞ্জ ভ্যালু।

    বিরাজমান এই ব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবল ধারণাটি হচ্ছে ‘বিনিময় মূল্য’ আর ‘ব্যবহারিক মূল্য’ আসলে একই জিনিস। আসলে মানুষ যা চায় বা তার যা প্রয়োজন সেটার জন্যই টাকা খরচ করে এবং এই খরচ করাটাই বলে দেয় যে সে জিনিসটার ‘ব্যবহার’কে সে কতখানি ‘মূল্য’ দেয়। এজন্যই ইদানিং বাজারকেই সমাজ ব্যবস্থাপনার মূল উপায় হিসাবে দেখা হচ্ছে। বাজার আপনাকে নিজের সাথে খাপ-খাইয়ে নেয়ার সময়-সুযোগ দেবে, এবং এই ‘ব্যবহারিক মূল্য’র সাথে নিজের উৎপাদন-সামর্থ্যের সামঞ্জস্য রাখবার মতন স্থিতি-শক্তি তার যথেষ্ট আছে।

    কোভিড-১৯ বাজার সম্পর্কে আমাদের ভুয়া বিশ্বাসগুলো থেকে মুক্তি দিচ্ছে। যেমন বিশ্বের সব সরকারের মধ্যে এই ভয় কাজ করছে যে জরুরী সেবাখাতগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা, এবং প্রধানত স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এর পেছনে অনেক কার্য-কারণ আছে, কিন্তু আপাতত আমরা দুইটা বেছে নিই।

    প্রথমত, বেশিরভাগ জরুরী সামাজিক পরিষেবা থেকে টাকা বানানো খুব কঠিন কাজ। এটা অংশত এজন্য যে মুনাফার অন্যতম চালিকা শক্তি হচ্ছে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানে অল্প মানুষ দিয়ে অনেক বেশী কাজ করানো। এধরনের ব্যবসায় কর্মীরাই খরচের বড় একটা খাত, বিশেষত স্বাস্থ্যসেবার মত ব্যবসাগুলোতে যেখানে সেবার ক্ষেত্রে ব্যক্তি-পর্যায়ের মিথষ্ক্রিয়ার প্রয়োজন পড়ে। ফলে অন্য খাতের ব্যবসার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম হওয়ার কারণে এর সেবার দাম অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ে।

    দ্বিতীয়ত অনেক জটিল এবং জরুরী সেবা-খাতেও চাকরিগুলো এমন কাজের জন্য না যেগুলোকে সমাজ কদর করে। সবচেয়ে ভাল বেতনের অনেক চাকরিই মূলত লেনদেন ব্যবস্থাপনার কাজ যার মূল লক্ষ্য হলো মুনাফা তৈরী। এই চাকরিগুলো সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে কিছুই করে না: তারা যা করে তাকে নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেবার বলেন  ‘আজাইরা কাজ’, বা “বুলশিট জবস”। তারপরেও যেহেতু তারা মুনাফা বানানোর কাজ করেন, আমাদের অনেক অনেক কনসালটেন্ট আছেন, আছে বড় বড় বিজ্ঞাপন-শিল্প, এবং আছে বিরাট বড় একটা বিনিয়োগ খাত। এদিকে আমাদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবায় বড় সঙ্কট হচ্ছে এখানে নিজের কাজ উপভোগ করা লোকজন চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয় কারণ এসব চাকরি তাদের জীবন-ধারণের জন্য যথেষ্ট টাকা দেয় না।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা
    শিল্পী: আলেসান্দ্রো সিভিগলিয়া
    সূত্র: সাচ্চি আর্ট

    ‘আজাইরাকাজ’

    কোভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতির যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে অনেক বেশি মানুষ এমনসব অনর্থক বা আজাইরা কাজের সাথে জড়িত। এই মহামারী অনেক কাজকেই চিহ্নিত করছে যেসব কাজের আসলে কোন গুরুত্ব নেই। যার ফল হিসেবে খারাপ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য আমাদের যথেষ্ট দক্ষ বা কাজ জানা কর্মী মানুষ নাই।

    মানুষ এসব অর্থহীন কাজ করতে বাধ্য হয় এমন সমাজে যেখানে ‘বিনিময় মূল্যে’ই অর্থনীতির মূলসূত্র হিসেবে কাজ করে, জীবনের মৌলিক চাহিদার সবকিছুই বাজার থেকে আসে। এর মানে হলো আপনাকে এগুলো কিনে নিতে হবে, কিনতে হলে আপনাকে আয় করতে হবে এবং এই আয় আসবে আপনার কাজ বা চাকরি থেকে।

    অন্যদিকে কোভিড-১৯ সংক্রমণরোধে আমরা এখন এমনসব অভিনব (এবং কার্যকর) প্রয়াস দেখতে পাচ্ছি যেগুলো বাজার এবং ‘বিনিময় মূল্যে’র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিশ্বের সবখানেই সরকারগুলোকে আমরা এমনসব পদক্ষেপ নিতে দেখছি যা তিনমাস আগেও অসম্ভব দেখাতো। যেমন, স্পেইনে সব ব্যক্তি মালিকানাধীন হাসপাতালকে রাষ্ট্রায়াত্ত করে নেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যে সবধরনের পরিবহন জাতীয়করণ করার সম্ভবনাও প্রবল। ফ্রান্স তার বড় বড় ব্যবসাগুলোকে জাতীয়করণ প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যেই বলছে।

    পাশাপাশি আমরা শ্রম-বাজারে ধ্বস দেখতে পাচ্ছি। ডেনমার্ক এবং যুক্তরাজ্যের মত দেশগুলো তাদের জনগণকে আয়ের বিকল্প হিসেবে একটা টাকা দিচ্ছে যাতে তারা কাজের জন্য বাইরে না যায়। যে কোন সফল লকডাউনের জন্য এই পদক্ষেপ খুব জরুরী। এসব পদক্ষেপ খুব নির্ভুল কিছু না। তারপরও এসব পদক্ষেপের মানে হচ্ছে সেই অমোঘ অর্থনৈতিক সূত্রের পালা-বদল যে জীবিকা অর্জনের জন্য মানুষকে কাজ করতেই হবে। এসব পদক্ষেপের মানে হচ্ছে কেউ কাজ করতে না পারলেও যে তার বেঁচে থাকার সমান অধিকার আছে, এবং এসব পদক্ষেপ মানে সেই অর্থনৈতিক সূত্রের দিকে একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

    কোভিড-১৯ অর্থনীতিতে গত চল্লিশ বছরের প্রতাপশালী প্রবণতাগুলোর চাকা উল্টা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এতদিন বাজার আর ‘বিনিময়-মূল্য’র সূত্রই ছিল অর্থনীতি চালানোর সেরা চাবিকাঠি হিসেবে স্বীকৃত। ফলে, জনসেবার উপর বাজারিকরণের চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলছিল, এসব ব্যবসার মত করে চালানোর চেষ্টা হচ্ছিল যাদের টাকা আয় করেই চলতে হবে। একইভাবে, শ্রমিকদেরও বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যার ফল হিসেবে কর্মঘন্টাহীন নিয়োগ-চুক্তি এবং একটা অস্থির ও চটকদার অর্থনীতি এসে দীর্ঘ-মেয়াদের স্থিতিশীল চাকরিগুলো বাজার পরিস্থিতির বিপরীতে মানুষকে যে সুরক্ষা দিত সেটা প্রায় তুলে দিয়েছে।

    কোভিড-১৯ এই প্রবণতাকে উল্টে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য-সেবা এবং শ্রম ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বাজারের হাত থেকে নিয়ে রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিচ্ছে। রাষ্ট্র নানা কারণেই উৎপাদন করে। তার মধ্যে কিছু কারণ ভাল এবং কিছু খারাপ। কিন্তু রাষ্ট্র বাজারের মত না, যাকে শুধুমাত্র ‘বিনিময় মূল্যে’র জন্যই উৎপাদন করতে হয়।

    এই পরিবর্তনগুলো আমাকে আশার আলো দেখায়, অনেক জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনা দেখায়। এমনকি এমনসব দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরী হচ্ছে যা আমাদের সত্যিকার অর্থে সুখী করতে পারে, যা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন সামলাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এই পর্যন্ত আসতে আমাদের এত সময় লাগল কেন? কেন এত এত দেশের শিল্প-উৎপাদনের গতি কমানোর কোন প্রস্তুতিই ছিলনা? এর সদুত্তর পাওয়া গেছে বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার একটা সাম্প্রতিক রিপোর্টে যা বলছে যে তাদের সঠিক মনভাব ছিল না।

    আমাদের অর্থনৈতিক কল্পলোক

    এসবের উপরেই গত চল্লিশ বছর ধরে আমাদের অর্থনৈতিক বোঝাপড়া দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে এধরনের অর্থনীতিতে যে গলদ আর ফাটল আছে সেটা দেখা বা বোঝার সামর্থ্য, বা বিকল্প কিছু ভাবার সামর্থ্য আমাদের রাজনীতিক আর উনাদের উপদেষ্টাদের ছিল না। উনাদের মনভাবে দুইটা আন্ত:সম্পর্কিত বিশ্বাস খুব প্রবল:

    বাজার উচ্চমান-সম্মত জীবন-যাপনের সবকিছু সরবরাহ করে, সুতরাং এটাকে রক্ষা করতে হবে।

    সাময়িক সঙ্কট কাটিয়ে উঠে বাজার সবসময়ই আবার তার স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে।

    অনেক পশ্চিমা দেশেই এটাই সবচে স্বাভাবিক মনভাব। যেকারণে যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের মত শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থার দেশকেও দেখা গেল কোভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য বাজে রকমের অপ্রস্তুত।

    যেমন যুক্তরাজ্যে, এক ব্যক্তিগত আলোচনার সূত্র ধরে কোভিড-১৯ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এক জ্যেষ্ঠ সহচরের দৃষ্টিভঙ্গি জানা গেল– “এই অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র ঝাঁক-প্রতিরোধশক্তি (herd immunity), এবং এটা করতে গিয়ে যদি কিছু পেনশনভোগী মারা যায়, তাহলে সেটা আফসোসের কথা।” এখন সরকার এটাকে অস্বীকার করছে, কিন্তু সত্য হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মহামারীর শুরুর দিকে সরকারি এক অনুষ্ঠানে এক জ্যেষ্ঠকর্তা আমাকে বলেছিলেন: “অর্থনীতি অচল করে রেখে কী লাভ আছে? একটা প্রাণের আপনি অর্থমূল্য হিসাব করেন, সম্ভবত লাভ নাই”।

    একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর এলিটদের মাঝে এধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর প্রাদুর্ভাব প্রবল। যেমন টেক্সাসের একজন সরকারী কর্মকর্তার যুক্তি মোতাবেক আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দা দেখার চাইতে অনেক বুড়ো মানুষ হাসিমুখে মরতে রাজি আছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গী আদতে ঝুঁকিতে থাকা আরো অনেক মানুষদের আরো বিপদের মুখে ঠেলে দেবে (এবং ঝুঁকিতে থাকা সবমানুষই কিন্তু বয়স্ক নন), এবং, আমি বলতে চাইছি এইটা একটা এখানে বিনিয়োগের চেষ্টা করছি সেটাও আসলে একটা অসৎ চিন্তাধারা।

    কোভিড-১৯ এই সঙ্কটের সময় যে কাজটি চালাতে পারে তা হলো আমাদের অর্থনৈতিক কল্পনাশক্তিকে আরো প্রসারিত করতে থাকা। সরকার এবং নাগরিকরা এখন যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তার অনেকগুলাই তিন মাস আগেও অসম্ভব মনে হতো। দুনিয়া কীভাবে চলছে সে সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণাও দ্রুত বদলে যেতে পারে। দেখা যাক এই নতুন কল্পনাশক্তি আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।

    সামনে চার ভবিতব্য

    ভবিষ্যতে ঘুরে আসার কৌশল হিসেবে আমি কিছু ভবিষ্যৎ গণনার কৌশল ব্যবহার করব। ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হিসাবে আপনি দুইটা নির্ধারক বেছে নেন। এখন এই দুই নির্ধারক বিভিন্ন বিন্যাস বা ছকে সাজিয়ে ভাবার চেষ্টা করেন যে আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে।

    https://images.theconversation.com/files/323253/original/file-20200326-132965-15inuhk.jpg?ixlib=rb-1.1.0&q=45&auto=format&w=600&h=574&fit=crop&dpr=1আমি যে দুইটা নির্ধারক নিতে চাই তা হচ্ছে ‘মূল্যবোধ’ এবং ‘কেন্দ্রীকরণ’। এখানে মূল্যবোধ বলতে আমাদের অর্থনীতি পরিচালনার যে মূলনীতি রয়েছে তাকেই বোঝানো হচ্ছে। আমরা আমাদের সহায়-সম্পদগুলো কী যথাসম্ভব বিনিময় এবং টাকা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করবো নাকি যথাসম্ভব জীবন বাড়ানোর কাজে লাগাবো? কেন্দ্রীকরণ বলতে যেভাবে আমাদের সবকিছু সংগঠিত হয়ে আছে তার সমাহারকে বোঝাতে চাইছি যা অনেকগুলো ছোট ছোট এককের সমষ্টিও হতে পারে বা বড় কোন অধিপতি শক্তি হতে পারে। এই নির্ধারকগুলোকে আমরা একটা জটিল জালে সংগঠিত মানুষের সমষ্টি হিসাবেও ভাবতে পারি। এভাবে চিন্তা করলে করোনা ভাইরাস মোকাবেলার জন্য যদি আমরা ‘মূল্যবোধ’ এবং ‘কেন্দ্রীকরণ’ এর চারটা চূড়ান্তবিন্যাস যা দাঁড়ায় সেগুলো এরকম:

    ১)   রাষ্ট্রীয় পুঁজিতন্ত্র: কেন্দ্রীভূত পদক্ষেপ, ‘বিনিময় মূল্য’কে অগ্রাধিকার দেয়া
    ২)   বর্বরতা: বিকেন্দ্রীকৃত পদক্ষেপ, ‘বিনিময় মূল্য’কে অগ্রাধিকার দেয়া
    ৩)   রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র: কেন্দ্রীভূত পদক্ষেপ, জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া
    ৪)   সহমর্মিতা: বিকেন্দ্রীকৃত পদক্ষেপ, জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া

    রাষ্ট্রীয় পুঁজিতন্ত্র

    বর্তমানে সারা দুনিয়াকে শাসন করছে রাষ্ট্রীয় পুঁজিতন্ত্র। এর আদর্শ উদাহরণ হলো যুক্তরাজ্য, স্পেইন এবং ডেনমার্ক।

    এসব রাষ্ট্রীয় পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ‘বিনিময় মূল্যে’ অর্জনের পথকেই অর্থনীতির দিক-নির্দেশক হিসাবে দেখছে এখনো। কিন্তু এটাও তারা বুঝতে পারছে যে সঙ্কটে পড়া বাজার-ব্যবস্থার এখন রাষ্ট্রীয় সহায়তা দরকার। যেহেতু শ্রমিকরা কাজ করতে পারছে না কারণ তারা অসুস্থ, এবং তারা প্রাণের ভয় পাচ্ছে -এরকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র তার কল্যাণমূলক কাজের আওতা বাড়িয়ে এগিয়ে আসবে। সেই সাথে বিরাট অংকের কেইঞ্জিয়ান প্রণোদনা থাকবে ঋণ-সুবিধার সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়ীদের সরাসরি টাকা দেয়ার মতন।

    এখানে মূল প্রত্যাশা হচ্ছে যে, এসব খুব স্বল্প-মেয়াদের জন্য দরকার হবে। এসব পদক্ষেপের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে যত বেশি সম্ভব ব্যবসাকে কারবারে টিকিয়ে রাখা। যেমন যুক্তরাজ্যে এখনো খাদ্য-দ্রব্য বাজার-ব্যবস্থা দিয়েই সরবরাহ ও বন্টন হচ্ছে (যদিও সরকার প্রতিযোগিতামূলক আইনগুলো শিথিল করেছে)। যেখানে শ্রমিকদের সরাসরি নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে, সেটা দেয়া হচ্ছে শ্রম-বাজারের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের ব্যাঘাত কমানোর জন্য। যেমন যুক্তরাজ্যের মতন দেশগুলাতে শ্রমিকদের নগদ সহায়তা নিতে হচ্ছে দরখাস্ত করে এবং সেটা মালিকের হাত হয়ে। এবং নগদ সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হচ্ছে বাজার-ব্যবস্থায় শ্রমিকের যে ‘বিনিময় মূল্য’ ছিল সেই অনুযায়ী, তাদের কাজের উপযোগিতা দিয়ে না।

    এটা কি কোন সফল বা কার্যকর পথ হতে পারে? হয়তো হতে পারতো যদি কোভিড-১৯ খুব অল্প সময়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যেতো তাহলে। কিন্তু যেহেতু বাজার চালু রাখার জন্য পুরাপুরি লকডাউনকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেহেতু সংক্রমণও মনে হয় চলতেই থাকবে। যেমন, যুক্তরাজ্যে এখনো অনেক অ-জরুরি নির্মাণকাজ চলছে যেখানে শ্রমিকরা মিলেমিশে কাজ করছেন। কিন্তু যদি মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে তাহলে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সীমিত রাখা কঠিন হয়ে যাবে। ক্রমবর্ধমান অসুখ এবং মৃত্যু অস্থিরতার জন্ম দেবে করোনার অর্থনৈতিক প্রভাবকে আরো গভীর করবে যা বাজার ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য রাষ্ট্রকে আরো বেশি বেশি কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করবে।

    বর্বরতা

    এটা সবচেয়ে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ। আমরা যদি বিদ্যমান মূলনীতিঅনুযায়ী ‘বিনিময় মূল্যে’র উপর নির্ভর করে চলতে থাকি এবং অসুখ বা বেকারত্বের কারণে যারা বাজার ব্যবস্থা থেকে ছিটকে যাচ্ছে তাদের সহায়তা দিতে অস্বীকার করি। এএমন এক সম্ভাব্য পরিস্থিতি যা আমরা আগে কোনদিন দেখি নাই।

    ব্যবসা লাটে উঠে বা কর্মীরা অনাহারে ভোগে কারণ বাজারের রূঢ় বাস্তবতার হাত থেকে তাদের রক্ষা করবার কোন বন্দোবস্ত নাই। হাসপাতালগুলোকে অভাবনীয় কোন পদক্ষেপে কোন বিশেষ সহায়তা দেয়া হয়নি, ফলে সেসব হতভম্ব হয়ে পড়েছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। বর্বরতা একটা নড়বড়ে পরিস্থিতি যা নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের পর্ব পার হয়ে শেষমেষ আরেক ধরনের ছকে পর্যবসিত হয়।

    এটা কি সম্ভব? দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে এটা প্যানডেমিকের সময় ভুলবশত; ঘটতে পারে, অথবা প্যানডেমিকের চূড়ান্ত পর্যায়ে ইচ্ছে করে ঘটানো হতে পারে। ভুল হচ্ছে যদি কোন সরকার প্যানডেমিকের সবচে বাজে পর্যায়ে যথেষ্ট বড় মাপের পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়। ব্যবসা বা গেরস্থালি পর্যায়ে সহায়তা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু সেটা যদি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়া অসুখের মুখে বাজার-ব্যবস্থার বিপর্যয় ঠেকানোর মত যথেষ্ট বড় না হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে। হাসপাতালগুলাতে হয়তো অতিরিক্ত টাকা ও জনশক্তি দেয়া যায়, কিন্তু সেটা যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে অনেক বেশি সংখ্যক অসুস্থ মানুষকে বিনা-চিকিৎসায় ফিরিয়ে দিতে হবে।

    পরের ধাপে রয়েছে প্যানডেমিকের চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যাপক কৃচ্ছতা-সাধন এবং সরকারগুলোর “স্বাভাবিক” অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। এই পথে গিয়ে জার্মানি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। কৃচ্ছতা-সাধনকালে জরুরী সেবাগুলো থেকে অর্থ প্রত্যাহারের কারণে প্যানডেমিক মোকাবেলায় রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে।

    অর্থনীতি ও সমাজের ব্যর্থতায় এরপর রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে, যা ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে মোড় নেবে এবং জনকল্যাণ ব্যবস্থা পুরাপুরি ধ্বসে যাবে।

    রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র

    রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র কোন সাংস্কৃতিক পালা-বদলের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির কেন্দ্রে ভিন্ন কোন ‘মূল্যবোধ’ বসিয়ে দেখা প্রথম ভবিষ্যৎটাকে আমাদের সামনে মেলে ধরে। আজকে যুক্তরাজ্য, স্পেইন বা ডেনমার্কে আমরা যে পদক্ষেপগুলো দেখতে পাচ্ছি সেটাকে প্রলম্বিত করে আমরা এই ভবিষ্যতে পৌঁছাতে পারি।

    এক্ষেত্রে মূল ব্যাপার হচ্ছে হাসপাতাল জাতীয়করণ এবং শ্রমিকদের নগদ সহায়তা দেয়াটা বাজার রক্ষার উপায় হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন রক্ষার উপায় হিসাবে দেখা। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র অর্থনীতির এমন অংশগুলো রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে যেগুলো মানুষের জীবনের জন্য জরুরী: যেমন খাদ্য ও জ্বালানি-শক্তি উৎপাদন, এবং আশ্রয়ণ– যাতে করে তাহলে জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো আর বাজারের চাকচিক্যের হাতে চাবিমারা থাকবে না। রাষ্ট্র হাসপাতাল জাতীয়করণ করবে এবং বিনামূল্যে বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে। সর্বোপরি, রাষ্ট্র বিভিন্ন নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিস তার নাগরিকদের নাগালের মধ্যে রাখবার জন্য কোন একটা ব্যবস্থা করবে। সেসব জিনিস যেমন মৌলিক চাহিদা হতে পারে তেমনি কম শ্রমশক্তি নিয়োগ করে তৈরী ভোগ্যপণ্যও হতে পারে।

    জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো এবং নাগরিকদের মাঝখানে নিয়োগকর্তা বা মালিকেরা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকবে না। রাষ্ট্র সবাইকে সরাসরি নগদ টাকা দেবে যার সাথে নাগরিক ‘বিনিময় মূল্য’ বা মুনাফা তৈরী করে কিনা তার কোন সম্পর্ক থাকবে না। তার বদলে, সব নাগরিকই সমানভাবে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পাবেন (যাতে আমরা খুব সাধারণ মানের জীবন-ধারণ করে বেঁচে থাকতে পারি। অথবা এই টাকার অঙ্ক ঠিক হবে তাদের কাজ কতটা সমাজের কাজে লাগে সেই মাপকাঠি দিয়ে। সুপারমার্কেটের কর্মী থেকে শুরু করে পণ্য-পরিবহন ও বিপণন কর্মী, গোডাউন কর্মী, নার্স, শিক্ষক, চিকিৎসক আর আমাদের হাল-জমানার সিইও’রা পর্যন্ত সবাই।

    রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ দীর্ঘসময় প্যানডেমিক সামলানোর জন্য নেয়া পদক্ষেপের কারণেও রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র আবির্ভূত হতে পারে। যদি গভীর মন্দা দীর্ঘদিন চলে, সরবরাহ ব্যবস্থা যদি ব্যাহত থাকে, বাজারে যদি চাহিদা ফিরিয়ে আনা না যায়, কেনিজিয়ান নীতির মানদণ্ডে চলা এখন আমরা যা যা দেখতে পাচ্ছি (টাকা ছাপানো, খুব সহজেই ঋণ পাওয়ার বিধান এবং আরো অন্যান্য), তখন হয়তো রাষ্ট্র উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

    এই রাস্তায় অনেক ঝুঁকি আছে, কর্তৃত্ববাদ নিয়ে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু তারপরেও কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ বিস্তারের বিপরীতে এইটাই আমাদের সবচে বড় আশা দেখাতে পারে। এক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র সহায় সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থা নিজের হাতে তুলে নেবে সমাজ ও অর্থনীতির মৌলিক কার্য-কলাপটুকু রক্ষার জন্য।

    পারস্পরিক সহায়তা

    পারষ্পরিক সহায়তা আমাদের দ্বিতীয় ভবিষ্যৎ, যেখানে অর্থনীতির মূলনীতি হবে মানুষের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কোন নির্ধারক ভূমিকা থাকবে না। তার বদলে নিজ নিজ পাড়া-মহল্লায় ব্যক্তি ও ছোট ছোট সার্কেল কমিউনিটিতেই নানা ধরনের সহায়তা ও সেবা সংগঠিত করবে।

    এই ভবিষ্যতের ঝুঁকি হলো, এই ধরনের সামাজিক উদ্যোগগুলোর দ্রুত গতিতে স্বাস্থ্যসেবার মত খাতগুলোর

    পরিসর বাড়ানোর মত সহায়-সম্পদ নাই। কিন্তু পারস্পরিক সহায়তা হয়তো আরো কার্যকরভাবে সংক্রমণ ঠেকাতে পারতো। কমিউনিটি সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরীর মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে রক্ষা করা এবং সামাজিক দূরত্ব বা আইসোলেশন বজায় রাখতে পারতো আরো কার্যকরভাবে। এই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হতে পারে একটা নতুন গণতান্ত্রিক কাঠামোর উদয় হওয়া। সম্ভাব্য গতিতেই কমিউনিটির দলগুলো জরুরী সহায়তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও সরবরাহ করতে পারে। আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে রোগের বিস্তার মোকাবেলা ও রোগীদের চিকিৎসার পরিকল্পনা হবে, নিজেদের নাগালে থাকা দক্ষতাকে পুঁজি করে।

    আগের তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যতের যে কোনটি থেকেই এই ভবিষ্যতের আবির্ভাব ঘটতে পারে। এটা বর্বরতা বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ থেকে বেরুনোর একটা সম্ভাব্য পথ হতে পারে, অথবা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রকে জোরদার করবার কাজেও লাগতে পারে। আমরা জানি যে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার রোধে স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে নেয়া পদক্ষেপগুলোই ছিল সবচে কার্যকর। এবং আমরা এরমধ্যেই এই ভবিষ্যতের শেকড়গুলো দেখতে পাচ্ছি অজস্র সামাজিকভাবে সংগঠিত দল যেভাবে ত্রাণ ও কমুনিটি সহায়তায় এগিয়ে এসেছে তার মাঝে। এটাকে আমরা রাষ্ট্রের নেয়া পদক্ষেপগুলোর ব্যর্থতা হিসেবেও দেখতে পারি। অথবা, এসবকে আমরা একটা উদীয়মান সংকটের মুখে খুব বাস্তববাদী এবং সহমর্মী সহজাত সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখতে পারি।  দেখতে পাই। অথবা একটি নতুন সঙ্কটকে আমরা প্রায়োগিক, সমাজের সহানুভূতিশীল সাড়া হিসেবে দেখতে পাই।

    আর্টওয়ার্ক: কো-অপারেশন
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    আশা আর আশঙ্কাগুলো

    এই দৃষ্টিপাতগুলো আসলে একদম চরমতম কল্পনা, খানিকটা ক্যারিক্যাচারও বটে। এবং এগুলোর একটার সাথে একটার কাটাকাটির মধ্য দিয়েই সম্ভবত আমাদের সামনের কাল গড়াবে। আমার প্রথম ভয় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ থেকে বর্বর সমাজে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। আমার প্রথম আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের সাথে পারস্পরিক সহায়তার সংমিশ্রণ: একটি বলিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যা শক্তিশালী স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা তৈরীতে সহায়-সম্পদ ব্যয় করবে, বাজারের হাত থেকে বিপদাপন্ন মানুষকে সুরক্ষা দেয়াটাকে অগ্রাধিকার দেবে অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে। এমন একটি রাষ্ট্র যা নাগরিকদের পারস্পরিক সহায়তা জোরদার করবার জন্য কাজ করবে, বেহুদা কাজ কমিয়ে মানুষকে এধরণের কাজ করবার সময় ও সুযোগ করে দেবে।

    আশা করি এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, এই চার ভবিষ্যতের সবগুলোতেই আশঙ্কার দিক যেমন আছে তেমনি আশাবাদের জায়গাও আছে। কোভিড-১৯ আমাদের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলার খুব ভীতিকর কিছু গলদ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। এর বিপরীতে কার্যকর প্রতিকার চাওয়ার মানেই হচ্ছে একটা আমূল সামাজিক পরিবর্তন চাওয়া। আমার গবেষণা দেখাচ্ছে যে, এজন্য প্রথমেই মার্কেট আর মুনাফা দিয়ে অর্থনীতি গড়ার পথ থেকে একেবারে সরে আসতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম সম্ভাবনা হচ্ছে আমরা আরো মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো যা আমাদের সামনের প্যানডেমিকগুলোর জন্য প্রস্তুত করবে, জলবায়ু পরিবর্তনের মত বাড়তে থাকা আরো সব সঙ্কট মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলবে।

    সামাজিক পরিবর্তন অনেক ধরনের পরিস্থিতি ও তার প্রভাবের মধ্য দিয়ে আসতে পারে। আমাদের সবার একটা মূল কাজ হচ্ছে এই দাবি তোলা যে, উদীয়মান সমাজ জীবন যেন এমন সব নীতিবোধ থেকে তৈরী হয় যা সেবা, মানুষের জীবন, আর গণতন্ত্রিক সমঝোতাকে মূল্য দেয়। আজকের এই দুঃসময়ে আমাদের মূল রাজনৈতিক কর্তব্য হচ্ছে বেঁচে থাকা এবং (আপাতত ভার্চুয়ালি) নিজেদের এইসব মূল্যবোধ ঘিরে সংগঠিত করা।

    মূল লিংক এখানে…

  • স্ল্যাভয় জিজেক।। ভাবাদর্শের ভাইরাস

    স্ল্যাভয় জিজেক।। ভাবাদর্শের ভাইরাস

    অনুবাদ: তাসবির কিঞ্জল

    আমার মত পরিসংখ্যান অ-বিশেষজ্ঞের সামনেও করোনা ভাইরাস মহামারি একটা কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হাজির করেছে । প্রশ্নটি হল: তথ্য কোথায় থেমে যায় আর কোথায় শুরু হয় ভাবাদর্শ?

    আর্টওয়ার্ক: জিজেক
    শিল্পী: টরিবাট
    সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট

    এখানে একটা প্যারাডক্স আছে: দুনিয়া যত কাছাকাছি আসবে স্থানীয় দূর্যোগ তত বেশী বৈশ্বিক আতঙ্ককে উষ্কে দেবে এবং ধীরে ধীরে মহাপ্রলয়ের রূপ নেবে। ২০১০ এর বসন্তে আইসল্যান্ডে ছোটখাট একটা অগ্ন্যুৎপাতে তৈরি হওয়া ধুলোমেঘ; পৃথিবীতে জীবনের জটিল মেকানিজমে ছোট্ট একটা গোলমাল গোটা ইউরোপের আকাশে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল। এই ঘটনাটি আরও একবার বেশ ধারালোভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল কীভাবে প্রকৃতিকে বদলে দেবার বিপুল কর্মযজ্ঞ সত্ত্বেও মানুষজাতি এই পৃথিবী নামক গ্রহে আরেকটি প্রজাতি হিসেবেই থেকে গেছে। একটা ছোটখাটো বিষ্ফোরণের এমন প্রলঙ্কারী আর্থসামাজিক ধকলের কারণ হল আমাদের প্রযুক্তিক বিকাশের ভঙ্গুরতা। এক শতাব্দী আগে হলে এই ধরণের অগ্ন্যুৎপাত নিঃশব্দেই ঘটে যেত। প্রযুক্তিক বিকাশ আমাদের প্রকৃতি থেকে স্বাধীনতা দিয়েছে ঠিকই এবং একই সাথে ভিন্ন আরেক মাত্রায় আমাদের আরও প্রবলভাবে করেছে প্রকৃতির খামখেয়ালের অধীন। এবং করোনা ভাইরাসের বিস্তারের বেলাতেও ঐ একই কথা: দেং জিয়াওপিঙের সংস্কারকর্মের পূর্বে এই ঘটনা ঘটলে আমরা সম্ভবত তা শুনতেই পেতাম না।

    একটা ব্যাপার নিশ্চিত: কেবল আইসোলেশন করে, নিত্যনতুন দেওয়াল বানিয়ে আর কোয়ারেন্টাইন বাড়িয়ে দিয়ে কোনও কাজ হবে না। প্রয়োজন হল নিঃশর্ত সংহতি আর সু-সমন্বিত বৈশ্বিক সাড়া। একসময় যাকে বলা হত কমিউনিজম, তারই এক নবরূপ। আমরা যদি আমাদের উদ্যোগগুলোকে এই দিকে ধাবিত না করি তাহলে আজকের উহান শহরই হবে আমাদের ভবিষ্যত।

    আর্টওয়ার্ক: ও টেম্পোরা
    শিল্পী: টিমো এসনার
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অনেক ডিস্টোপিয়াই ইতিমধ্যে এমন ভবিষ্যৎ ভেবে ফেলেছে— আমরা বাড়িতে থাকব, নিজেদের কম্পিউটারে কাজ করব, ভিডিও-কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ করব, আমাদের গৃহ-দপ্তরের এক কোনায় একটা যন্ত্রে শরীরচর্চা করব, মাঝে মাঝে মাস্টারবেট করব একটা স্ক্রিনের সামনে হার্ডকোর সেক্স দেখতে দেখতে এবং ডেলিভারির মাধ্যমে খাবার আসবে; মানুষের সাথে আর স্বশরীরে দেখা করা হবে না।

    আসলে এই দুঃস্বপ্নের মধ্যেও একধরণের মুক্তির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আমাকে স্বীকার করতেই হবে গত কয়েকদিনে উহান শহরে ঘুরে বেড়াবার স্বপ্ন আমাকে পেয়ে বসেছে। একটা মহানগরীর ধু ধু পড়ে থাকা রাস্তাগুলো— সাধারণের ভিড়ে উপচে পড়া নগরকেন্দ্রগুলোকে দেখাচ্ছে ভুতুড়ে পাড়ার মতন। দরজা খোলা সব দোকান এবং কোনও ক্রেতা নেই। কেবল একজন নিঃসঙ্গ পথিক বা এখানে সেখানে একটা গাড়ি। অ-ভোগবাদী দুনিয়া দেখতে কেমন হবে তারই একঝলক দেখিয়ে দিচ্ছে। সাংহাই বা হংকংয়ের ফাঁকা চত্ত্বরগুলোর বিষাদময় সৌন্দর্য আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে On the Beach সিনেমার পুরোনো কোনও কেয়ামত-পরবর্তী দৃশ্যের কথা; যেখানে একটা নগর তার প্রায় সকল নাগরিক সমেত শ্রেফ মুছে গিয়েছে। বড় কোনও দৃশ্যমান ধ্বংসযজ্ঞ নয়; কেবল দুনিয়া হারিয়ে ফেলেছে তার ‘চাহিবামাত্র দিতে বাধ্য থাকিবার’ চরিত্রটি। আমাদের অপেক্ষায় আছে, আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে এবং আমাদের খুঁজছে। এমনকি সাদা মাস্ক পড়ে যে-কজন এদিক সেদিক হাঁটছেন তারা দেখাচ্ছেন একধরণের সম্ভাষিত নামহীনতার ছবি; যেন তারা মুক্তি পেয়েছেন ‘পরিচয়’-এর সামাজিক চাপ থেকে।

    আর্টওয়ার্ক: নো পাসারান
    শিল্পী: হালিত কুরতুল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমাদের অনেকেই মনে করতে পারবেন ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত সিচুয়েশনিস্ট ধারার শিক্ষার্থীদের ইস্তেহারের সেই বিখ্যাত উপসংহার: ‘Vivre sans temps mort, jouir sans entraves’ (মৃত-সময়কে ছেড়ে বাঁচো, অবাধে উপভোগ করো)। ফ্রয়েড এবং লাকাঁ যদি আমাদের কিছু শিখিয়ে থাকেন তা হল, বিবেকের হুকুম আসলে বিপর্যয়ের একটা রেসিপি (লাকাঁ যথাযথভাবে দেখিয়েছেন, বিবেক তার বুনিয়াদি স্তরে উপভোগের একটি ইতিবাচক হুকুম; কোনও কিছুতে বাঁধা দেবার নেতিবাচক কর্ম নয়)। আমাদের প্রাপ্ত সময়ের সবটুকুকে নিবিড় ব্যস্ততা দিয়ে ভরিয়ে তোলার তীব্র বাসনা অনিবার্যভাবে দমবন্ধ করা একঘেঁয়েমিতে পরিণত হয়। মৃত-সময়, প্রত্যাহারের মুহুর্ত, প্রাচীন সাধুরা যাকে বলতেন ‘ওম শান্তি’ [Gelassenheit], ছেড়ে দেওয়া— এসবই আমাদের জীবন অভিজ্ঞতাকে চনমনে করে তুলবার জন্য খুবই জরুরি। এবং সম্ভবত কেউ আশা করতেই পারেন বিশ্বজুড়ে শহরগুলোতে করোনা ভাইরাস কোয়ারেন্টাইনের অনিচ্ছাকৃত ফলাফল হিসেবে কিছু মানুষ যান্ত্রিক ব্যস্ততার বাহিরে এসে সময়কে অন্তত নিজের মত ব্যবহার করবার এবং নিজেদের (নন)সেন্স অবস্থাটা ভেবে দেখবার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন।

    এইসকল ভাবনাকে গণপরিসরে আনার মধ্য দিয়ে আমি যে বিপদ টেনে আনলাম সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ অবগত আছি। আমি কি আমার নিরাপদ বাহ্যিক অবস্থান থেকে ভুক্তভোগীদের উপরেই কিছু গভীর বিশুদ্ধ উপলব্ধি আরোপ করছি না এবং এভাবে তাচ্ছিল্যভরে তাদের দূর্ভোগকে ন্যায্যতা দিচ্ছি না? যখন উহানের একজন মাস্ক পরিহিত নাগরিক ঔষধ বা খাবারের খোঁজে হেঁটে বেড়ান তখন তার মনে অবশ্যই ভোগবাদবিরোধী চিন্তা থাকে না। থাকে আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং ভয়। আমি কেবল বলতে চাচ্ছিলাম সাঙ্ঘাতিক কোনও ঘটনারও থাকতে পারে অনিশ্চিত ইতিবাচক পরিণাম।

    কার্লো গিন্সবার্গ একটা ধারণা হাজির করেছিলেন, ‘ভালবাসা নয় বরং নিজ দেশ সম্পর্কে লজ্জিত হওয়াই সম্ভবত দেশকে ধারণ করবার বিশুদ্ধতম চিহ্ন’। সম্ভবত আইসোলেশন আর বাধ্যতামূলক নীরবতার এই কালে কিছু ইজরায়েলি লজ্জিত হবার মত সাহস সঞ্চয় করতে পারবেন। সেই রাজনীতির জন্য যা তাদের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প করছে। ইহুদি হবার কারণে অবশ্যই লজ্জা নয় বরং একদম উল্টোটা। লজ্জা পাওয়া দরকার ইজরায়েলি রাজনীতি পশ্চিম তীরে খোদ ইহুদি ধর্মবাদের সবচাইতে মূল্যবান সিলসিলার সাথে যা করছে তার জন্য। সম্ভবত কিছু বিলেতী মানুষ লজ্জিত হবার মত সাহস সঞ্চয় করবেন সেই ভাবাদর্শিক স্বপ্নে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন বলে যা তাদের এনে দিয়েছে ব্রেক্সিট।

    আর্টওয়ার্ক: সেটেলমেন্ট ভাইরাস
    শিল্পী: নাসের জাফরী
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু উহানে এবং বিশ্ব জুড়ে যারা আইসোলেশনে আছেন তাদের জন্য লজ্জিত বা কলঙ্কিত হবার সময় এটা নয়। বরং এখন সময় সাহস সঞ্চয় করবার এবং ধৈর্য ধরে নিজ নিজ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার। সত্যিকারের লজ্জা বরং পাচ্ছে চীনের সেই সকল মানুষ যারা জনসম্মুখে এই মহামারিকে পাত্তা দেয় নাই কিন্তু নিজেদেরকে ঠিকই নিরাপত্তার চাদরে মুড়েছে। চেরনোবিলের সেইসব সোভিয়েত কর্তাদের মত যারা জনসম্মুখে বিপদহীনতার দাবী করে যতদ্রুত সম্ভব নিজেদের পরিবারগুলোকে পাঠিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়ে। অথবা সেইসব বড় ম্যানেজারেরা যারা বৈশ্বিক উষ্ণতাকে জনসম্মুখে নাকচ করে দিয়ে ইতিমধ্যেই নিউজিল্যান্ডে বাড়ি কিনে ফেলেছেন বা কোনও পাথুরে পর্বতের গায়ে বানিয়ে নিচ্ছেন বাংকার। সম্ভবত এমন দ্বৈত নীতির (পড়ুন, ভিআইপি-গিরির) বিরুদ্ধে গণ-বিক্ষোভ এই সঙ্কটের অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াটির জন্ম দিয়ে দেবে।

    [প্রবন্ধটি “The Virus of Ideology” শিরোনামে স্ল্যাভয় জিজেক-এর সাম্প্রতিক বই “প্যানডেমিক”-এর একটি অধ্যায় হিসেবে প্রকাশিত]
  • অরুন্ধতী রায়।। ভারত, নরেন্দ্র মোদী এবং করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে

    অরুন্ধতী রায়।। ভারত, নরেন্দ্র মোদী এবং করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে

    • তাসবির কিঞ্জল

    ভূমিকা
    ভারতের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি এবং রাজনীতি নিয়ে অরন্ধতী রায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন ইন্টারসেপ্ট এর সাংবাদিক মেহেদী হাসান। সাক্ষাতকারে ভারতীয় রাষ্ট্র এবং সমাজের বৈষম্য করোনায় উন্মোচিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভারতীয় সমাজে শ্রেণী শোষণ, ইসলামোফোবিয়া ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তৃত আলাপ করেছেন অরুন্ধতী।   উগ্র-হিন্দুত্ববাদী শাসনে ‘ধাবমান গণহত্যা’র বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। অরাজের জন্য সাক্ষাতকারটি অনুবাদ করেছেন বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী তাসবির কিঞ্জল।

    অরুন্ধতী রায়

    মেহেদী হাসান: কেমন আছো? তুমি কি নিরাপদে আছো? দিল্লীতে বসে সামাজিক-দূরত্ব চর্চা করতে পারছো?

    অরুন্ধতী রায়: তুমি জানো,ভারতে ‘সামাজিক-দূরত্ব’ কথাটার ভয়াবহ অর্থ রয়েছে। কারণ, যেখানে একটা জনগোষ্ঠীর মানুষ বর্ণপ্রথার চর্চা করে সেখানে তারা সামাজিক-দূরত্বকে ভয়াবহভাবেই বুঝবে। তাই আমরা আরেকটা শব্দ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। আমরা একে বলছি, শারীরিক-দূরত্ব। আবার অনেক দরিদ্র দেশের মত ভারতেও সামাজিক-দূরত্ব বা শারীরিক-দূরত্ব আসলে তাদের জন্য যাদের বাড়ি আছে; যারা মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। গরীব মানুষের জন্য এই লকডাউনের মানে শারীরিক নৈকট্য। মুম্বাইয়ের একটা বস্তিতেই আড়াই বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। দিল্লীর প্রধান সড়কগুলোর পাশে অল্পকিছু জায়গার মধ্যে মানুষ গাদাগাদি করে থাকেন। ফলে লকডাউন বলতে যা বোঝায় তার একটা নির্মম চিত্র আমরা এখানে দেখি।

    মেহেদী হাসান: ভারতে যেখানে একশ কোটির বেশি মানুষের বাস সেখানে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কম। আক্রান্তের সংখ্যা বিশ হাজারের কম এবং এক হাজারের চেয়ে কিছু কম মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন এই পর্যন্ত। আমাদের কি এই সংখ্যা বিশ্বাস করা উচিৎ?

    অরুন্ধতী রায়: আমি আসলে জানি না তুমি কোথাকার সংখ্যা বিশ্বাস করতে পারবে। কারণ এ পর্যন্ত যা পড়ছি আর দেখছি তাতে মনে হচ্ছে পরিসংখ্যানগুলো তৈরি করা  হয়েছে এমন এক ভিত্তির উপর যা একটা চাদরের মত উত্তাল সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক কিছুর উপরেই সংখ্যা নির্ভর করে। এই ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতে একই ভাবে থাকে কি না? আবহাওয়ার কোনও ভূমিকা আছে কি না? পরীক্ষা করার মাত্রাটি কেমন? এখানে যেমন খুবই কম পরীক্ষা হচ্ছে। তারা বলছে ৮০ ভাগ পরীক্ষায় লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত উভয় দেশেই আমাদের চিন্তার চাইতেও বেশি মানুষ ভাইরাসটি বহন করছেন। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ৮০ ভাগ পরীক্ষায় লক্ষণ না পাওয়াটা একইসাথে সুসংবাদ এবং দুঃসংবাদ। আক্রান্তের হার কম হলেও হয়ত আমরা জানি না ঠিক কত মানুষ এই মুহুর্তে আক্রান্ত হয়েছেন।

    মেহেদী হাসান: ভারতে এখন লকডাউন চলছে। তুমি একে বলেছো, ‘পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক লকডাউন’। আরও বলেছো, ‘এর যা করার কথা ছিল তার ঠিক উলটো কাজটাই করছে’। তুমি কি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবে? 

    অরুন্ধতী রায়: আমি আসলে যা বলতে চেয়েছি তা হল, ধর প্রধানমন্ত্রী একদিন রাত ৮টায় এলেন এবং দেশের ১৩৮ কোটি মানুষকে ১ ঘন্টা সময় দিলেন নিজেদের বন্দী করে ফেলার জন্য। গণপরিবহণ থেমে গেল। সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। এবং তুমি হঠাৎ দেখলে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ যারা দিনের পর দিন গ্রাম থেকে শহরে এসে গাদাগাদি করে থেকেছেন; নির্মাণশিল্প, পোশাকশিল্প, আরও আন্যান্য জায়গায় মধ্যযুগীয় জমিদারি কায়দার অধীনে সস্তা শ্রম জুগিয়ে গেছেন তারা এই মাসে তাদের মজুরি পেলেন না। জমির মালিকও তাদের ভাড়া মওকুফ করলো না। ফলে, লকডাউন ঘোষণার পরের সকালেই লক্ষ লক্ষ মানুষ হাঁটা শুরু করলেন। তারা হেঁটে চললেন তাদের বাড়ির দিকে। একশ কিলোমিটার, দুইশ কিলোমিটার, আটশ কিলোমিটার হাঁটলেন। কারণ তাদের পয়সা ছিল না। কোনও খাবার ছিল না। তাদের আর কিছুই করার ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম শহরে বিশাল কিছু একটা ঘটছে। তাই আমি আমার মিডিয়া-পাসটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমি তাদের কয়েকজনের সাথে দিল্লী আর উত্তর প্রদেশের সীমান্ত পর্যন্ত হাঁটলাম। তাদের অনেকের সাথে কথা বললাম। এটা ছিল অবিশ্বাস্য। মনে হচ্ছিল, সরকার আসলে নিজেকে গরীবের সরকার বলে কখনও চিন্তাই করেনি। সরকারের সকল ভাষা আর ইঙ্গিত ছিল মধ্যবিত্তের জন্য। যেমন,বলা হয়েছে ‘বারান্দায় এসে দাঁড়ান’। মানুষের তো বারান্দাই নেই। মানুষের খাদ্য নেই। এই মানুষগুলো যখন হাঁটছিলেন তখন তাদের পেটানো হয়েছে। কারণ তারা কারফিউ ভেঙ্গেছেন। কেবল পেটানোই হয়নি, লাঞ্ছিতও করা হয়েছে। কান ধরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি হয়তো ভিডিওতে দেখেছো, তাদের কয়েকজনকে কেমিক্যাল স্প্রে করা হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। অনেকেই পৌঁছাতে পারেনি। তাদেরকে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, যাকে বলা হচ্ছে কোয়ারেন্টিন ক্যাম্প। তারা এখনও সেখানে আছেন। তাদের কাছে অর্থ নেই, খাদ্য নেই, তারা পরিবারের সাথে যোগাযোগও করতে পাচ্ছেন না।

    আর্টওয়ার্ক: লকডাউন
    শিল্পী: শো
    সূত্র: ফেসবুক

    মেহেদী হাসান: তুমি যখন কথাগুলো বলছো, ঠিক তখন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেস আরেকটি ‘প্রণোদনা বিল’ পাস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থের পরিমাণ কত হবে, বেকারভাতা কত বড় হবে, ছোট ব্যবসাগুলোকে কেমন সাহায্য দেওয়া উচিৎ, সাধারণ মানুষকে অর্থ দিতে হবে কি না, এমন আরও অনেক সমস্যা নিয়ে তারা বিতর্ক করছেন। আবার অন্যদিকে ভারতের মত দেশও আছে যেখানে সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তার কোনও বালাই নেই। এটি পাশ্চাত্য ধাঁচের কল্যাণ রাষ্ট্রও নয়। সেখানে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে কোনও ধরনের আর্থিক সাহায্য ছাড়াই। ভারতে লকডাউন মানে তো তাহলে আক্ষরিক অর্থেই ‘অনাহার’।

    অরুন্ধতী রায়: হ্যাঁ, অনাহার। আমি খাদ্য বিতরণের ভিডিও দেখছিলাম। দেখলাম সেখানে গোলোযোগ শুরু হয়ে গেছে। বড়রা বাচ্চাদের মাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের হাতে খাবারের থালা। মাইলের পর মাইল লম্বা সারি। ভেতরের ঘটনা আমরা জানি না। আমরা এখনও জানি না এই ট্রাজেডির কাঠামোটা আসলে কেমন। আমাদের ক্ষুধার সমস্যা আছে। আমাদের ঘৃণার সমস্যা আছে। আমাদের বেকারত্বের সমস্যা আছে। এবং কোভিডের বাহিরেও আমাদের বিশাল স্বাস্থ্য সমস্যা আছে। মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই ভাইরাসটি কী করেছে? আমি বলি, এক্স-রে’র মত এটা সবকিছু উন্মোচন করে দিয়েছে। ব্যবস্থার উলঙ্গ রূপ দেখিয়ে দিয়েছে। ভয়ানক যা কিছু আমরা করেছি আর যে ভয়ানক অসাম্য বজায় রেখেছি তা বিস্তৃতভাবে দেখিয়ে দিয়েছে। সবকিছুকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। ভারতে এসবই হয়েছে।

    মেহেদী হাসান: তুমি ঘৃণা সমস্যার কথা বললে। অনেক মানুষ লিখেছেন, আমিও Intercept-এর জন্য লিখেছি, কীভাবে ভারতে এবং অন্যান্য দেশে ইসলাম-ফোবিকরা মুসলিম সংখ্যালঘুদের দানবীয়ভাবে রূপায়ন করতে এবং বলির পাঠা বানাতে এই মহামারিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। ভারতে যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মুসলিমদের দোষারোপ করছে। তারা বলছে, মুসলিমরা বিরামহীন ভাবে ভাইরাস ছড়াচ্ছে। তারা হিন্দুবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ওদিকে আবার করোনা-জিহাদের সমস্যাটাও প্রকট হয়ে উঠছে। উগ্র ডানপন্থী জনতা ভারতীয় মুসলিমদের হত্যা করছে। এই মহামারি মুসলিমদের পরিস্থিতিকে আসলে কতটা ভয়াবহ করে তুলেছে বলে তুমি মনে কর? সম্প্রতি তুমি এই পরিস্থিতিকে ‘ধাবমান গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছো এবং বিপুলভাবে সমালোচিত হয়েছো।

    অরুন্ধতী রায়: করোনা ভাইরাস আসার আগে থেকেই স্বাস্থ্যসেবা যেমন ঝুঁকির মধ্যে ছিল, মুসলিমদেরকে আক্রমণের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঠিক তেমনই। এ বিষয়ে আমি তোমার সাথে আগেও কথা বলেছি। বছরের পর বছর ধরে লিখছিও। জানুয়ারির ৩০ তারিখে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ঠিক আগে ডিসেম্বর মাসে সরকার একটা মুসলিমবিরোধী নাগরিকত্ব আইন পাস করে ফেলে। ফলে গোটা দেশ টালমাটাল হয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন চলতে থাকে। কোথাও কোথাও এই সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। ভারতীয় সংবিধানের এই চূড়ান্ত অপমানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলতে থাকে। এর মধ্যেই ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লীতে একটা নির্বাচন হয়। বিজেপি তার সবচেয়ে উৎকট মুসলিমবিরোধী প্রচারণাটি নিয়ে হাজির হয়। বিজেপির বড় বড় নেতারা রাস্তায় এসে স্লোগান দেন, ‘ব্যাটারা সব দেশদ্রোহী, এই শালাদের মারো গুলি’। নির্বাচনে তারা হেরে যায়। এরপর মুসলিমদের শাস্তি দেবার জন্য উত্তর-পূর্ব দিল্লীতে হামলা করা হয়।

    আর্টওয়ার্ক: দিল্লী রায়ট
    সূত্র: সিয়াসত

    পুলিশি নিরাপত্তায় ডানপন্থী হিন্দুরা এই হামলা চালায়। হত্যাকাণ্ড-ধ্বংসযজ্ঞ চলে। মুসলিমরাও পাল্টা আঘাত করেছিল। কারণ সেই জঘণ্য পরিস্থিতি সেটাই করছিল। মৃতদেহ পড়ে ছিল ড্রেনের ভেতর। সেগুলো বের করা হচ্ছিল। সারি সারি জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া বাড়িঘর। হাজার হাজার মানুষ কবরস্থান আর রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেসময় ট্রাম্প এখানেই ছিল, আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই চলছিল হত্যাকাণ্ড। স্টেডিয়ামে এক লক্ষ মানুষ তাকে বরণ করে নেয়। আহমেদাবাদের রাস্তায় লক্ষাধিক মানুষ অবস্থান নেয়। এসব হয়েছে। যদিও আমরা জানতাম করোনা ইতিমধ্যে চলে এসেছে। ১৩ই মার্চের আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একে জরুরি অবস্থা বলে নাই। লকডাউনের ঠিক আগে তাবলিগ জামাত নিজামুদ্দিনে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ করে। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে ১০-১৫ মিনিট দূরেই। লকডাউন ঘোষিত হবার সময় এই মানুষগুলো সেই ছোট্ট জায়গাটির ভেতরেই ছিলেন। এরপর তারা স্থান ত্যাগ করেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই ততক্ষণে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলে পরিসংখ্যানটিকে এমন দেখাচ্ছে। একই সময় হিন্দু মন্দিরগুলোতেও বড় বড় সমাবেশ হচ্ছিল। তবুও মুসলিমদের বলা হতে লাগল, ‘মানববোমা’, ‘করোনা-জিহাদি’। এমনকি এখনও এসব চলছে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে, টিভিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হল। তাদেরকে ভাইরাস ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করা হল। ভয়াবহ সব ঘটনা।

    আমি আজকেই পড়ছিলাম, হাসপাতাল বলছে মুসলিমরা এখানে আসতে পারবে না অথবা আগে তাদের কোভিড পরীক্ষা করাতে হবে। কোথাও কোথাও মুসলিমদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে। আজকে ঝাড়খণ্ডের এক গর্ভবতী মেয়ের ঘটনা পড়ছিলাম। তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন এবং তার ভাষ্যমতে তাকে জুতো দিয়ে পেটানো হয়। শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে মেঝেতে পড়তে থাকলে তাকে মেঝে পরিষ্কার করতে বলা হয়। এবং শেষ পর্যন্ত তার বাচ্চাটি মারা যায়। ভারতীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যম এ ধরনের প্রোফাইলিং করার ক্ষেত্রে খুবই দক্ষ। এই কারণেই আমি এই পরিস্থিতিকে ‘ধাবমান গণহত্যা’ বলেছি। গণহত্যার ইতিহাস বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন যে কেউ তোমাকে বলবে, গণহত্যা কোনও এক রবিবারে হুট করে ঘটে যাওয়ার মত বিষয় নয়। এখানে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির বিশাল একটা ব্যাপার থাকে। একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে বিমানবীকরণ করা হচ্ছে। তাদের আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। ১৯৩০ সালে নাৎসিরা যেভাবে টাইফাস ব্যবহার করে ইহুদীদের কলুষিত করেছিল একই ভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন মুসলিমবিরোধী নাগরিকত্ব বিলটি উত্থাপন করছেন তখন তিনি বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের বলে বসলেন ‘উঁইপোকা’। আমি আসলে একটা সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির কথা বলছি যা অবশ্যই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। ভয় না পেয়ে এখানে বাস করা আর দিনরাত এইসব প্রোপাগান্ডা শুনতে থাকা একেবারেই সম্ভব নয়।

    মেহেদী হাসান: তুমি তোমার সমালোচকদের কী বলবে? অনেক মুসলিমকেও তো বলতে শোনা যায়, ‘অরুন্ধতী, আমরা গণহত্যার মুখোমুখি নই’। প্রায় ২০ কোটি মুসলিম এইদেশে বাস করেন, মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ। তাদের মতে এই সংখ্যা তাদের নিরাপত্তা দেবে; পরিস্থিতি খারাপ কিন্তু এতটাও খারাপ নয় যতটা তুমি বলছো। এ ব্যাপারে তুমি কী বলবে?

    অরুন্ধতী রায়: আমি বলছি না যে ২০ কোটি মানুষকে মানচিত্র থেকে স্রেফ মুছে ফেলা হবে। আমি বলছি আসলে ঝোঁকটার কথা। ইতিমধ্যেই নাগরিকত্ব আইন, এনআরসি, ডিটেনশন ক্যাম্প এসব একধরনের মোড়লতন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে যেখানে কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে বেশি অধিকার ভোগ করবে। এবং তারপর এই প্রোফাইলিং। খুবই বিপজ্জনক এক চিত্র। মুসলিমরা রাস্তাঘাটে বিপদে পড়ছেন। যেকোনো মুসলিম যেকোনো সময় বিনা কারণে খুন হয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি হল, কোনও কিছু না ঘটা পর্যন্ত সে সম্পর্কে চুপ থাকার কোনও মানে নেই। আমার মত মানুষেরা বছরের পর বছর ধরে এসব নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। এসব ঘটনাও ঘটেই যাচ্ছে। আবার কিছু মানুষ আছে যারা বলছে, পরিস্থিতি এতটাও খারাপ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এমন আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে সাড়া দেবার এটাই কি উপায়? কিছুদিন আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষ, নারী, পুরুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা ঘরে ফিরে যেতে অস্বীকার করেছেন কারণ তাদের ভবিষ্যৎ সুতায় ঝুলছে। তারপর হঠাৎ করোনা ভাইরাস এসে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ঘরে পাঠিয়ে দিল। প্রত্যেককে আলাদা করে ফেলা হল। আন্দোলনের সংগঠকদের গণহারে গ্রেফতার করা শুরু হল। ছাত্রছাত্রী আর বুদ্ধিজীবীদের ঘিঞ্জি কারাগারে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। আর এখন আমাদের বলতে হবে পরিস্থিতি এতটাও খারাপ নয়? আমি বলছি না এখন গণহত্যা চলছে। আমি বলছি একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে আলাদা করে ফেলার গতিটা কেবল দেখো। আসো এই প্রক্রিয়াটির দিকে মনযোগ দিই।

    মেহেদী হাসান: আমি আনন্দিত যে তুমি এটা বলছো। কাউকে না কাউকে তো বলতেই হবে। কাশ্মীরের বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই। কাশ্মীর,ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য, একটা বিশেষ ধরনের লকডাউনের মধ্যে আছে। গত আগস্টে সেখানে সেনা অভিযান হয়। গণ-গ্রেফতার, কারফিউ, চেকপয়েন্ট, ইন্টারনেট ব্লকেজ, মিডিয়া-ব্ল্যাকআউট চলতে থাকে। তো অরুন্ধতী, আমরা কি জানি এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিরা কীভাবে করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা করছে? বিশেষ করে যখন তাদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে কারাগারের ভেতর।

    অরুন্ধতী রায়: দেখো, কাশ্মীরে ঘিঞ্জি বস্তি বা শরীরে শরীরে ঘেঁষাঘেঁষির সমস্যাটা নেই। এটা একটা ভালো দিক। কিন্তু তারা অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিপদে আছেন। তারা একটা ‘ডাবল-লক’ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন। আর্টিকেল-৩৭০ প্রত্যাহার করার পর থেকেই তারা লকডাউন হয়ে আছেন। আর এখন এই করোনা লকডাউন। আমার ধারণা করোনা লকডাউন তাদের ততটা মাথাব্যথার কারণ নয় যতটা হল কিনা রাজনৈতিক এবং সামরিক লকডাউন। আজকে একজন তরুণ ফটো-সাংবাদিক এবং আরেকজন সাংবাদিকের খবর এসেছে। ‘বে-আইনি’ কর্মকান্ড চালাবার অভিযোগে তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। এখানে ভয় এবং বিচ্ছিন্নতার এক প্রবল অনুভূতি কাজ করছে। লকডাউন চলাকালে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডকে কিন্তু লকডাউন করা হয়নি। বরং এটি খুব দ্রুত গতিতে কাশ্মীরের আইনকানুনগুলোকে বদলে দিচ্ছে। শেখাচ্ছে অনুগত থাকার আইন। যে সমস্ত কাজ করতে তারা একসময় ভয় পেত তার সবই এখন করা হচ্ছে। মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে ঘরে ঢোকানো হয়েছে। এটা কেবল ভারতের ব্যাপার নয়। এটা গোটা দুনিয়ার জন্যই চরম ভীতিকর এক দৃশ্য।

    আর্টওয়ার্ক: সোসাল ডিসটেন্স
    শিল্পী: মির সুহায়েল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমরা এই ডিজিটাল যুগে এমন এক পরিস্থিতিতে করোনার মুখোমুখি হয়েছি যখন অর্ধেক দুনিয়া শাসন করছে খুবই নিম্ন-বুদ্ধিমত্তার কিছু কর্তৃত্ববাদী মানুষ। তারা নজরদারি বাড়াচ্ছে আমাদেরকে হাতে ডিজিটাল হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করবে বলে। সমাজ থেকে সকল ধরনেরর সম্মান এবং স্বাধীকার নির্মূল করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের অবশ্যই চিন্তিত হওয়া উচিৎ। এ কারণেই আমি লিখেছি,এই মহামারি আসলে একটা ‘পোর্টাল’। একটা পোর্টাল যার ভেতর দিয়ে এখন আমরা যাচ্ছি। একদিকে একদল মানুষ যাদের কাছে এই সমস্যার সমাধান হল অবিচারকে আরও গভীরে প্রোথিত করে দেওয়া। এই মহামারির কালেই ডোনাল্ড ট্রাম্প চাঁদে খনন-কার্য চালাবার অনুমতি প্রদান করেছেন। চাঁদ তার অধিকারে; কোনও কবি বা প্রেমিক/ প্রেমিকার অধিকারে নয়। বাণিজ্যিকীকরণ, নৃশংস ধরনের পুঁজিবাদ, ডিজিটাল নজরদারি; এসব কিছুকে অতি দ্রুতই স্থান করে দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ নিজেদের গৃহেই অবরুদ্ধ হয়ে হয়ত ভাবছেন গোটা যন্ত্রটিকে পুনরায় ভেবে দেখবার এইতো সুযোগ। কিন্তু ঘরে বন্দী থেকে কীভাবে আমরা ক্ষমতা নিতে পারি? আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, গৃহে অবরুদ্ধ হয়ে পড়াটা আসলে আমাদের জন্য সঠিক কি না?

    মেহেদী হাসান: Financial Times-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটির কথা তুমি বললে। তুমি পোর্টালের কথা বললে। তুমি বললে মানুষ ভিন্ন একটা ভবিষ্যৎ ভাবার চেষ্টা করছে। আমি জানতে চাই তুমি আশাবাদী না নিরাশাবাদী?

    অরুন্ধতী রায়: আমি এমন সব মানুষদের সাথে যুক্ত আছি যারা অনেক বছর ধরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে লড়াই করছেন। তারা আশাবাদী অথবা নিরাশাবাদী হবার এই দ্বৈতের মধ্যে নেই। কারণ আমরা জিতি বা হারি; লড়াই আমাদের করে যেতেই হবে। এটা আশাবাদ বা নিরাশাবাদের প্রশ্ন নয়, কারণ অনেক মানুষের কাছে সেই সুযোগটিই নেই। মধ্যবিত্তের হয়ত সুযোগ আছে কিন্তু একটা বিশাল অংশের মানুষ লড়াই করছেন কেবল অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখতে। এবং লড়াই না করার সুযোগ তাদের নেই। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হল,আমার বুঝতে অনেক কষ্ট হয়; একদিকে মহামারি সংক্রান্ত সংবাদের অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ যেখানে মান্দারিনরা ক্রমাগত যুদ্ধের ভাষা ব্যবহার করে যাচ্ছেন। যুদ্ধ মানে তো মানুষকে হত্যা করা; প্রাণ বাঁচানো নয়। কিন্তু তারা প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টাই সম্ভবত করছেন। অথচ এদিকে পর্যাপ্ত ঔষধ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার একই সময়ে এই একই দলের মানুষ ইরাকে ঔষধ পাঠাতে অস্বীকার করছেন, যেখানে লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে। ফলে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর এই ধারণা একই সাথে বিনাশেরও ধারণা। পারমানবিক অস্ত্র, রাসায়নিক অস্ত্র, জৈব অস্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি; এসবই এই বিনাশের একধরণের স্বীকার। শেষ পর্বতটা খনন করবার পর,শেষ নদীটিতে বাঁধ দেবার পর, শেষ জীবাষ্ম জ্বালানিটুকু পুড়িয়ে ফেলার পর যে কেয়ামত তুমি আনতে যাচ্ছো তার কাছে করোনা ভাইরাস তো খেলনা মাত্র।

    মেহেদী হাসান: গত সপ্তাহে নোম চমস্কিও একই প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তিনি বললেন, আধুনিক মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহুর্তে আমরা বাস করছি। করোনা ভাইরাসের কারণে নয় বরং এর পরে যা আসতে যাচ্ছে তার কারণে। কারণ, ভ্যাকসিন বানিয়ে ফেললেও বরফপুঞ্জ তার গলে যাওয়া থামাবে না।

    অরুন্ধতী রায়: একদম তাই। যেমন ধরো, কাশ্মীর ভৌগোলিকভাবে একটা সম্ভাব্য পারমানবিক যুদ্ধের সীমানায় অবস্থান করছে। এই ইসলাম-ফোবিয়া এবং কাশ্মীরিদের দানবীয় রূপায়ন সকলকে এক অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিষয়গুলোর দিকে মনযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

    মেহেদী হাসান: গত বছরের শুরুতে যখন তোমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তখন আমরা কথা বলছিলাম কংগ্রেসকে নিয়ে। কীভাবে স্বাধীনতার পর থেকে বিজেপির উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তারা ভারতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর নিজেরই একটা ভয়াবহ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তবুও বিজেপির মত ফ্যাসিবাদী দলের চাইতে কংগ্রেস কিছুটা হলেও বেশী সমর্থনযোগ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাম-ঘেঁষা অনেকেই নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে গভীর বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, হ্যাঁ, ট্রাম্প একজন ভয়াবহ নেতা। কিন্তু তাই বলে তো তুমি জো বাইডেনের মত একজন নয়া-উদারবাদী যুদ্ধবাজকে ভোট দিতে পারো না। গত সপ্তাহে আমার সাথে এখানে নোম চমস্কি ছিলেন এবং বললেন,তিনি চোখ বন্ধ করে বাইডেনকে ভোট দেবেন। কারণ,দুই শয়তানের মধ্যে সে একটু কম শয়তান। তোমার কাছেও আমার একই প্রশ্ন। তুমি কি মোদীর বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে ভোট দেবে, তা সে যতই খারাপ হোক? তুমি কি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একজন ডেমোক্র্যাটকে ভোট দেবে,তা সে যতই খারাপ হোক? তোমার অবস্থান কী?

    অরুন্ধতী রায়: কয়েক বছর আগে হলে, হয়তো তখন আমার বয়স কম ছিল বলে বা পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না বলে, আমি একটা বিশুদ্ধ অবস্থানই নিতাম এবং নিয়েছিও। কিন্তু এখন আমি মনে করি ট্রাম্পকে সরিয়ে দিতে হবে। এবং আমি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের ছাড়া যে কাউকে ভোট দিব এবং আমি দিয়েছিও।

    আর্টওয়ার্ক: মোদি
    শিল্পী: মেহেদী
    সূত্র: মেহেদী’জ কার্টুন

    মেহেদী হাসান: তোমার কাছে সর্বশেষ একটি প্রশ্ন। অনেক মানুষ ভারতকে দেখছেন এবং নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে দেখছেন। রক্তপাতের ইতিহাস এবং বিজেপি ও আরএসএসের ভাবাদর্শের কথা চিন্তা করলে মোদীর পাশে ট্রাম্পকে মামুলি মনে হবে। এই মানুষটা সত্যিকার অর্থেই নাৎসি এবং ইতালীয় ফ্যাসিবাদীদের মত ফ্যাসিবাদ-সদৃশ্য ভাবাদর্শ ধারণ করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের কোনও ভাবাদর্শ নেই। যারা এই মুহুর্তে ভারতের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং মোদী কত খারাপ তা দেখছেন কিন্তু জানছেন না কী করতে হবে, তাদের জানানোর জন্য তোমার কাছে কী উপদেশ রয়েছে? যারা ভারতে গণতন্ত্র, সমতা, ন্যায়বিচারের জন্য এবং বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তাদের এই লড়াইয়ে সাহায্য করার জন্য পৃথিবীবাসী কী করতে পারে?

    অরুন্ধতী রায়: বছরের পর বছর ধরে ভারতে কী ঘটে যাচ্ছে সে সম্পর্কে কিছু বলাটাও ইদানিং কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ সকলেই বলিউড, ইয়োগা, গান্ধী, সুন্দর খেলনা এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। গণতন্ত্র তো আর তেমন সুন্দর নেই। কিন্তু যখন তুমি সত্যিকার অর্থেই চেষ্টা করবে এবং তাদের দেখাবে বর্ণপ্রথা কী, হিন্দু জাতীয়তাবাদ কী, শ্রেণী কী তারা কিন্তু দেখবেন। আমার মতে বর্ণপ্রথা হল বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে বর্বর মোড়লতান্ত্রিক এক সামাজিক বিন্যাস। এটা মোটেও মানবিক নয় যে, মানুষকে উপর থেকে সাজিয়ে পাঠানো হয়েছে; একটা সেরা জাতি আছে ব্রাহ্মণ আর আছে অচ্ছুৎ। দেখতেই পাচ্ছো এখান থেকে একটা ফ্যাসিস্ট অবস্থানে চলে যাওয়া কত সহজ, যেখানে তুমি একটা সেরা জাতির ধারণাকে গ্রহণ করে নেবে। তাই আমি বলব মানুষকে প্রথমত এটা বুঝতে হবে। পুরাতন ধারণাগুলোকে ফেলে দিতে হবে। ভারতে অনেকেই আছেন যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, লড়াই করছেন। কিছু লেখক কেবল নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে নেই।

    মেহেদী হাসান:রাজনৈতিক মহলের মানুষ এবং ধর্মীয় মহলের মানুষ যেমন, হিন্দু, মুসলিম, খ্রীষ্টান, এথিস্ট অনেকেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন?

    অরুন্ধতী রায়: সকল হিন্দুই তো হিন্দু জাতীয়তাবাদী নন। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ছিল কবিতা, ছবি আর একটা সেক্যুলার, বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্র ধারণার পক্ষে এক চমৎকার সময়। খুবই সুন্দর ছিল সব কিছু লকডাউন শুরু হবার আগের মাসগুলোতে। আর যখন লকডাউন শুরু হল তখন সাথে শুরু হল গ্রেফতার। নিশ্চিত করা হল লকডাউন শেষ হলে বিক্ষোভের বিষ্ফোরন যেন আর না ঘটে। কারণ আইনগুলো তো থেকেই যাবে। তবে আমার ধারণা বিশ্ব বুঝতে শুরু করেছে এই দেশ যেমন ছিল তেমনটি আর নেই। জায়গাটি এখন বিপদজনক।

    মেহেদী হাসান: এটা সত্যিই দুঃখজনক ভারত থেকে এই ধরনের গল্প শুনতে হল। এই বিপদজনক জায়গায় অরুন্ধতী তুমি প্লিজ নিজের খেয়াল রেখো। কেবল করোনা ভাইরাসের কারণে নয়। আমি জানি এভাবে কথা বলার জন্য হুমকি এবং চাপ আসতে পারে এবং আমরা এটার তারিফ করি। তোমাকে ধন্যবাদ সময় বের করে কথা বলার জন্য। আমি চাইব তুমি কথা বলা জারি রাখবে এবং অবশ্যই সাবধানে থাকবে।

  • মৃত্যুপুরীতে কোয়ারেন্টাইন

    মৃত্যুপুরীতে কোয়ারেন্টাইন

    রোকন রকি

    আর্টওয়ার্ক: মাস্ক
    শিল্পী: হালিস কুর্তুলমুস
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মৃত্যুপুরীতে দুঃসময়

    আমারে তালা বদ্ধ রেখে
    আমারে আগুনে পুড়িয়ে মেরে
    প্রেসনোট, শুধু প্রেসনোট আমি চাই না
    –কফিল আহমেদ

    একটা পরিকল্পিত মৃত্যুকূপ তৈরি করা হয়েছে। একটা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভেতর আটকে রেখে খুন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তারপর হিসেব করা হচ্ছে লাশের সংখ্যা। দৃশ্যমান ভাইরাস নিজের অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করে প্রতিদিন প্রেসনোট দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে অদৃশ্যমান ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কতজন মারা গেছে, কতজনকে ঘরবন্দী করেছে, মানুষকে ঘরবন্দী করতে কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে। এক নিশ্চিত মৃত্যু উপত্যকায় বসে মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে। আর এই আতঙ্কগ্রস্থ মানুষের মাঝে ক্রমাগত ভয়ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে ক্রমাগত অসহায়ত্বের বোধ জাগিয়ে তোলা হচ্ছে।

    তারপর রক্ষকের ভূমিকায় থেকে অদৃশ্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধবাজ দৃশ্যমান ভাইরাস ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ করে মানুষের সামগ্রিক চিন্তার ফোকাসকে একমুখি করে তুলছে।১ যেন এর পেছনে আর কারো কোন দায় নাই। পৃথিবীর মেইন্টেনেন্সের দায়িত্ব নিয়ে রাখা ঠিকাদাররা যেন পৃথিবীটাকে স্বর্গে রূপান্তর করেছিল, করোনা ভাইরাস হঠাৎ এসে তা নষ্ট করেছে। মানুষের চৈতন্যকে এই পথে চালোনা করার ফলে প্রাণ-প্রকৃতি বিরুদ্ধ যে অবকাঠামো এই ভাইরাসের বিস্তৃতিতে সহায়ক হয়েছে তা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    কিন্তু এই তাৎক্ষণিক ভয়াবহতা কেটে গেলে আমাদের এই প্রশ্নে ফিরে আসতেই হবে যে কোন অবস্থায় এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং কোন অবস্থায় তা এতো ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়? সুন্দর এক নতুন পৃথিবী নির্মাণের প্রয়োজনে এই ভয়াবহাতার মাঝেই আমাদের জেনে নিতে হবে এই সভ্যতার সঙ্কটগুলো। যেহেতু পরিবেশবাদীরা হুশিয়ার করে বলছেন, এটাই শেষ মহামারী নয়। যদি আমরা আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি বিরুদ্ধ মানুফাকেন্দ্রিক কার্যক্রম জারি রাখি তাহলে অতিশীঘ্রই এরকম আরো বেশ কিছু মহামারির কবলে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

    বিশ্বব্যাপি কোভিড-১৯ এর প্রতাপ ভয়াবহ রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। আমরা দেখছি বড় পুঁজির ওয়েল ইকুয়িপড রাষ্ট্রগুলো তুলনামূলক উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। আমাদের এখানে এখনো পরিস্থিতির ভয়াবহতা অতোটা দৃশ্যমান হয়ে না উঠলেও শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ প্রস্তুতির যথেষ্ট সময় পাওয়ার পরও একদম শুরু থেকে আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা দেখেছি। দেখেছি নাজুক চিকিৎসা ব্যবস্থা, পলকা অর্থনীতি, শ্রমনির্ভর শিল্প কারখানায় মালিক পক্ষের মাস্তানি, জনমানুষের হক মেরে খাওয়া ক্ষমতার শোষণ। করোনার আগমন সামগ্রিক অব্যবস্থাপনাকে স্পষ্ট করে চোখের সামনে তুলে ধরছে। সম্ভাব্য ভয়াবহতা মোকাবেলায় বড় ধরনের খেসারত দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: হেলথ মিনিস্টার
    শিল্পী: মেহেদী
    সূত্র: মেহেদী’জ কার্টুন

    অথচ ইতালি, আমেরিকা, স্পেইন, ফ্রান্সের ভয়াবহ মহামারি পরিস্থিতি দেখে আমরা বাংলাদেশিরা হয়তো কিছুটা স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলছি। কারণ আমাদের রাষ্ট্রনেতারা বার বার সেসব দেশের পরিস্থিতিকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন আমাদের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। কিন্তু একটু চোখ কান খোলা রাখলেই এদেশের প্রকৃত পরিস্থিতির ভয়াবহতা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। গত ১৮ এপ্রিল ঢাকা ট্রিবিউন এক রিপোর্টে জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশে প্রথম ২০০০ জন আক্রান্ত হতে সময় লেগেছে মাত্র ৪০ দিন। যা ইতালি বাদে উপরে উল্লেখিত অধিক সংক্রমিত দেশ গুলোর চেয়ে দ্রুততম সময়ে ঘটেছে। একই রিপোর্টে আরো জানাচ্ছে বাংলাদেশে করোনা পরীক্ষার হার দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর সর্বনিম্ন এবং সমগ্র পৃথিবীর ভেতর নিম্ন হারের দিক থেকে ১৪তম। অর্থাৎ এই উন্নয়নের দেশ সমগ্র পৃথিবীর মাত্র ১৩টা দেশের চেয়ে বেশি করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করতে পেরেছে। তারপরেও এই অল্প সংখ্যক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা ২০০০ জন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অধিক সংক্রমিত দেশ গুলোর চেয়ে দ্রুততম সময়ে ঘটেছে। তার উপর এখানে আজ পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুস্থ হওয়ার হারের চাইতে মৃত্যু হার বেশি।

    অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে যে প্রতিদিনের বাগাড়ম্বর প্রেস ব্রিফিংয়ের বাইরে প্রকৃত পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। এবং তা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাদির বেহাল দশা এই সামগ্রিক ভয়াবহতার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়।

    এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সঙ্কটই প্রধান চিন্তার বিষয়। কিন্তু সম্ভাব্য বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির পরের পৃথিবীটাকে গড়তে আরো কিছু বিষয়ের বোঝাপড়াটাও জরুরি। রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিকার নিশ্চিত করার দায়িত্বকে তদরকি করা, প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা, সমাধান বাতলে দেওয়া এবং সমাধান করতে বাধ্য করা যেমন এই সময়ের একটা জরুরি কাজ, ঠিক তেমনই রাষ্ট্রের কোন অব্যবস্থাপনা এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানির সম্ভাবনা তৈরি করেছে তা খুঁজে বের করা, চ্যালেঞ্জ করা, সমাধানের পথ খোজার চেষ্টা করা এবং সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়াও এই সময়ের দাবি।

    মৃত্যুপুরীর অবকাঠামো

    ঘরে থাকো, ঘরে থাকো, ঘরটা যে কই?
    এখনো সে পথে পথে করে টই টই!
    -সমগীত

    আমরা সকলেই জানি যে, সংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে জনঘনত্ব অত্যাধিক সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অতুলনীয় অবস্থানে আছে। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১১১৬ জন, যা সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ।২ এটাকে অনগ্রসর সামাজিক পরিস্থিতির ফল হিসেবে দেখা যেতেই পারে, যদিও এর সাথে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীর সংযোগ আছে। কিন্তু তার বাইরে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এই জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণ এবং জীবন মানকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। এই অবকাঠামো কতটা জনবান্ধব আর কতটা মৃত্যুবান্ধব তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ দরকার।

    আর্টওয়ার্ক: হাঙ্গার অব লিভিং স্পেস
    শিল্পী: স্ভিতালস্কাই
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে ভিড় করে গড়ে উঠেছে দেশের সার্বিক কর্মতৎপরতা। এই অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে শিল্প কারখানা, অফিস আদালত, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান থেকে শতশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ সব অবকাঠামোর গড়ে উঠেছে। পুঁজির বিকাশের সাথে সাথে বিকশিত হচ্ছে এই মুনাফামুখিন অবকাঠামো। যা মানুষজনকে বাধ্য করছে তার দ্বারস্থ হতে। প্রাণ-প্রকৃতি বান্ধব জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে মুনাফামুখি বিধ্বংসী শিল্পায়নের বিকাশে। বন-জঙ্গল, নদী-নালা, আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। বেকার হয়ে পড়ছে এর উপর নির্ভরশীল বিপুল সংখ্যক লোকজন। যারা এখনো টিকে আছে তারাও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। ফলে কর্মহীন গরিব থেকে গরিব হতে থাকা মানুষজন, অনিশ্চয়তা থেকে গোলামির শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া মানুষজন, অর্থবিত্তর মরীচিকায় মোহগ্রস্ত মানুষজন দলে দলে ভিড় করছে এই শহরগুলোতে। কেউ দুমুঠো খাবারের নিশ্চয়তা পেতে, কেউ গোলামি করতে বা অধিকতর ভালো গোলাম হয়ে জীবিকার নিশ্চয়তা পেতে, আবার কেউ উদ্দেশ্যহীন মোহগ্রস্ত হয়ে। সমগ্র দেশ থেকে, অধিকাংশটা বাধ্য হয়ে এবং কিছুটা ভ্রমে পড়ে, দলে দলে ছুটে যাচ্ছে এই কেন্দ্রীভূত শহরে।

    বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড সিটিস রিপোট থেকে জানা যায় এই অতিকায় মহানগরী ও রাজধানী শহরে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লক্ষ মানুষের বসবাস। এ রিপোর্টে আরো বলেছে, এ শহরে মানুষের সংখ্যা এতো দ্রুত এবং ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে ২০৩০ সাল নাগাদ তা আরো ১ কোটি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২ কোটি ৮০ লক্ষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আয়তন অনুপাতে এতো বিপুল সংখ্যক লোকসংখ্যার ফলে দেখা গেছে এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যাধিক বেশি। উপরে উল্লেখিত জনসংখ্যার হিসাবে এখানে প্রায় প্রতি বর্গমাইলে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার লোকের বসবাস। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা এই শহরকে এই ভাবে কেন্দ্রীভূত করেছে যে প্রায় সব ধরনের সুবিধা এবং সেবা একটু ভালো ভাবে পেতে অনেকটা বাধ্য হয়ে এখানে পাড়ি জমাতে হয়। অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ভালো চিকিৎসা সেবা নেই, এই শহরকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে সব মন্ত্রনালয়, সরকারি বেসরকারি শতশত প্রতিষ্ঠান এবং তাদের প্রধান কার্যালয় এখানে, প্রায় সবগুলো বিদেশি রাষ্ট্রের দূতাবাস এই শহরে এবং এই শহরেই গড়ে উঠেছে শতশত শিল্প কারখানা।

    ঢাকার গা ঘেসে নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল। স্থানীয় সরকারের হিসাব মতে বর্তমানে এখানে লোকসংখ্যা ৫০ লক্ষেরও অধিক। আয়তনের দিক থেকে ছোট এই জেলায় ৫০ লক্ষ জনসংখ্যা ধরে নিলে জনসংখ্যার ঘনত্ব দাঁড়ায় প্রতি বর্গ মাইলে প্রায় ১৯ হাজার। এছাড়াও ছোট বড় সব মিলিয়ে কয়েকশ শিল্প কারখানা এই জেলায় গড়ে ওঠায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে ভিড় করেছে আরো প্রায় ২০ লক্ষ শ্রমিক।

    প্রায় একই রকম চিত্র দেখা যায় রাজধানী ঢাকার স্পর্শে গড়ে ওঠা শহর গাজীপুরেও। এর বর্তমান জনসংখ্যা সঠিক ভাবে জানা যায়নি। তবে রাইসিং বিডি অনলাইন পোর্টালে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৯এ এক রিপোর্টে জানাচ্ছে যে গাজীপুর প্রায় ৮০ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি অঞ্চল। ভারি ও মাঝারি শিল্প কারখানা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দুই বড় বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এক ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠেছে গাজীপুর। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, শিক্ষার্থী সহ নানা রকম কর্মজীবী মানুষ নিয়ে একটা কেন্দ্রীভূত ঘিনঘিনে অস্বাস্থ্যকর স্থান হয়ে উঠেছে।

    মৃত্যুপুরীর আর্তনাদ

    আমিও পেতেছি কান,
    শুনি বৃক্ষের ক্রন্দন
    ধূসর রাজপথের প্রান্তরে।
    –মেঘদল

    এই কেন্দ্রীকরণ নানা রকম সমস্যা সহ আজকের সম্ভাব্য করোনা মহামারীর ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যতসামান্য টেস্টের মাধ্যমে দেওয়া সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের হারের দিকে নজর দিলে দেখতে পাওয়া যাবে দেশের ভেতর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে কেন্দ্রীভূত অবকাঠামোর এই তিনটা শহরে। আইইডিসিআর এর দেওয়া তথ্যমতে ২১ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সব চাইতে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকাতে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ১২২৯ জন, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল নারায়ণগঞ্জে ৪৬৯ জন এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল গাজীপুরে ২৬৯ জন। এই দেশে কোভিড-১৯ এর অতিমাত্রায় বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরির হওয়ার পেছনে এই অবকাঠামোর কেন্দ্রীকরন বিশেষ ভাবে দায়ি।

    এরকম পরিস্থিতিতে ঘন হয়ে বসবাস করায় একে অপরের সাথে অধিক ছোঁয়াছুঁয়ি, ঘেঁসাঘেঁসি এবং স্পর্শের ঘটনা ঘটে শুধুমাত্র এই কারণেই এই ভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় ব্যাপারটা তেমন না। বরং এই অবকাঠামোর আরো নানাবিধ পার্শপ্রতিক্রিয়া এর পেছনে কাজ করে।

    এই অবকাঠামো মূলত পুঁজিবাদী অবকাঠামো। ফলে এখানে মানুষের চাইতে গুরুত্ব বেশি মুনাফার। এটা কেবলই মুনাফার প্রত্যাশায় এর কর্মতৎপরতা চালায়। মানুষ, মানুষের জীবন, প্রাণ-প্রকৃতি এই মুনাফার চাহিদার কাছে সব সময় উপেক্ষিত। সারাদেশ থেকে আশা এই বিপুল সংখ্যক মানুষজন, বিশেষ ভাবে নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা, এখানে অমানসিক পরিশ্রমের পর যে কয়টাকা পায় তা দিয়ে প্রতিটা মাস পার করতে হিমসিম খেতে হয়। মাস শেষে টাকা কয়টা হাতে পাওয়ার পরে তা থেকে প্রথমে একটা বড় অংশ দিয়ে দিতে হয় স্যাঁতসেতে, অন্ধকার, গাদাগাদি করে থাকা ঘরটার ভাড়া হিসেবে। তারপর মুদি দোকানে গতমাসের শেষের দিন গুলোর বকেয়া পরিশোধ করে এবং গ্রামে পরিবার পরিজনের জন্য সামান্য কিছু পাঠিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে মাস পার করতে হয় এদের অধিকাংশকে। এই নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষগুলো তাদের সাংসারিক বাজেটে ঘাটতি বাজেট পুরণ করতে যে কায়দা-কানুনের আশ্রয় নেয় তা রীতিমত অর্থনীতির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হতে পারে। যেখানে তিন বেলা খাবার জোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে সেখানে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রেশনের ব্যবস্থা করার কথা চিন্তাতেও আসে না। ফলে বরাবরই তারা শারীরিক ভাবে অপুষ্টিতে ভোগে।

    আর্টওয়ার্ক: টিশার্ট বাংলাদেশ
    শিল্পী: মারিয়েন কামেনস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    একই সাথে দেখা যায় এই প্রকৃতি বিরুদ্ধ শিল্পায়ন ও কেন্দ্রীভূত অবকাঠামো মানুষ সহ জীববৈচিত্র্যের জন্য অসম্ভব ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করে। আজকের এই লকডাউনের দিনেও সারা পৃথিবীর ভেতর ঢাকা দূষিত শহরের  র‌্যাংকিং–এ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে।৩ এনভায়রনমেন্টাল পরফরম্যান্স ইনডেক্স এর একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে পরিবেশ সুরক্ষার র‌্যাংকিং-এ সারা বিশ্বের ১৮০টি দেশের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯ অর্থাৎ শেষের দিক থেকে দ্বিতীয়। উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ের গবেষক মাহা মির্জা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে দেখাচ্ছেন যে, ‘ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম আর সিসার দূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে৪। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় সিসাদূষণের শিকার ছয় লাখ মানুষ (বেশির ভাগই শিশু)৫ এবং দেশের ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষের দেহে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি ঘটছে৬। এ ছাড়া পরপর কয়েক বছর ধরেই ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বসবাস-অনুপযোগী শহরগুলোর মধ্যেও অন্যতম শীর্ষে৭।’

    আন্তাজাতিক সংবাদ মাধ্যম দি গার্ডিয়ান ২০ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গবেষণা মতে সম্ভবত অত্যাধিক বায়ুদূষণ কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুতে অধিক ভূমিকা রাখছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতালি, স্পেইন, ফ্রান্স ও জার্মানির ৬৬টি প্রদেশের করোনায় মৃত্যুর হারকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ৭৮ শতাংশ মৃত্যুই ঘটেছে এই প্রদেশ গুলোর ভেতর মাত্র ৫টি প্রদেশে, যেগুলো অতিমাত্রায় দূষিত। এই প্রতিবেদনের সাথে বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুর হারকে মিলিয়ে দেখলে দূষণে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের অবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

    এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের ফলে সংক্রামক ব্যাধি সহ নানা রকম রোগ ব্যাধি আমাদের অপুষ্টিতে ভোগা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন শরীর গুলোকে আক্রান্ত করে এবং আমাদের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়; আমাদের মৃত্যুর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। উপরে উল্লেখিত কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের হার যেমন এই পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে তেমনই আক্রান্তদের মাঝে সেরে উঠা এবং মারা যাওয়ার আনুপাতিক হার দেখেও তা বোঝা যায়। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে দেখানো মোট আক্রান্তের মাঝ থেকে সেরে উঠেছে ৮৭ জন এবং মারা গেছে ১১০ জন। অর্থাৎ ক্লোসড কেসের ভেতর ৪৪.১৬ শতাংশ সুস্থ হয়েছে এবং ৫৫.৮৪ শতাংশ মানুষ মারা গেছে। তার মানে আক্রান্ত হলে আমাদের প্রত্যেকের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৪৪.১৬% এবং মারা যায়ার সম্ভাবনা ৫৫.৮৪%।

    চায় সোনার কাঠির অনুসন্ধান

    জল, জমি, জঙ্গল, পশুর আর ইরাবতি
    সুন্দরী ও দুখু হারালে দেশের ক্ষতি।
    -স্বরব্যাঞ্জো

    কিন্তু আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে এই অবকাঠামোগত মৃত্যুপুরী শুধুমাত্র সংক্রামক রোগের মাধ্যমেই আমাদের মারে না। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগেও এই কেন্দ্রীভূত পুঁজিবাদী অবকাঠামোতে স্লো পয়জনিং-এর মাধ্যমে আমরা তিলে তিলে মারা যাচ্ছিলাম। এটা করোনার পূর্বেরও যে কোন মুহুর্তের জন্য সত্য। আজ করোনা নতুন যা করেছে তা হচ্ছে এই পরিস্থিতিটাকে বুঝতে সাহায্য করেছে। একই রোগে একই সময়ে এতো বিপুল সংখ্যক আক্রন্ত হওয়ায় এই অবকাঠামোর গলদটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে।

    এই অবকাঠামো যেমন গণহারে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার জন্য, আক্রান্ত হয়ে মরে যাওয়ার জন্য বড় ভূমিকা রেখেছে, একই সাথে এটা সংক্রামক ব্যাধি ছাড়াও গণহারে মৃত্যুর নিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এখানে আগুন লেগে হাজারে হাজারে মানুষ মরে, বিল্ডিং ধসে হাজার হাজার মানুষ মরে, যানজটপূর্ণ রাস্তাঘাটে প্রতিদিন গাড়ির তলায় পিষ্ট হয়ে মানুষ মরে, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয়ে শয়ে মানুষ মরে, এই অবকাঠামোতে স্রেফ না খেতে পেয়েও, কেড়ে খেতে যেও মানুষ মরে। রানা প্লাজার, তাজরিন গার্মেন্টসের, পুরান ঢাকার আগুন বা ভদ্র পাড়ার এফ আর টাওয়ারের বীভৎস স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বল করছে। হর হামেশা ছোটলোক শ্রমিকের বস্তি পোড়ার খবরে তো আমরা প্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই বিধ্বংসী অবকাঠামো করোনার মতো প্রাণঘাতী ব্যাধির মাধ্যমে লাখে লাখে মানুষকে এক ধাক্কায় মেরে ফেলছে আবার এই একই অবকাঠামো স্লো পয়জনিং –এর মাধ্যমে তিলে তিলে লাখ লাখ মানুষকে মেরে ফেলেছে, মেরে ফেলছে।

    আর্টওয়ার্ক: বিজনেস অব বাংলাদেশ
    শিল্পী: মারিয়েন কামেনস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অপরদিকে মানুষ ও প্রকৃতির লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামোতে উপকৃত হচ্ছে অল্প কিছু সুবিধাভোগী। চিকিৎসা ক্ষেত্রে, বসবাসের ক্ষেত্রে, শিক্ষা ক্ষেত্রে এরকম জীবন ধারণের প্রতিটি বিষয়ে কিছু সংখ্যালঘু মুনাফাভোগী বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। এই করোনা কালেও তা স্পষ্ট ভাবেই বুঝতে পারা যায় যখন দেখি স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাসচিব বলছেন, ভিআইপিদের করোনা চিকিৎসার জন্য থাকবে আলাদা আইসিউ এবং আলাদা হাসপাতাল, যখন দেখি যোদ্ধা ঘোষণা করা ডাক্তারদের জোর জবরদস্তির মাধ্যমে অনিরাপদ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়ে আইইডিসিয়ার এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক কোন কারন ছাড়া অধিক নিরাপাত্তার জন্য কোয়ারেন্টাইনে গেছেন, যখন দেখি প্রণোদনার নামে সরকারি ঋণ সুবিধায় বড় পুঁজির ব্যবসায়ী এবং প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে প্রায় একই হারে সুদ ধার্য করা হয় এবং কোন কোন ব্যবসায় খাতের চাইতে কৃষিখাতের ধার্যকৃত সুদের হার বেশি থাকে।

    অতএব বাঁচতে হলে আমাদের এখনই ভাবেত হবে আমরা কোন সভ্যতা চাই। কোন অবকাঠামোগত পরিবর্তন মানুষবান্ধব হবে, পরিবেশ বান্ধব হবে। যুথবদ্ধ বসবাসের অর্থ দম বন্ধ হওয়া ঘনবসতির জীবন না, নয়া উদারবাদের নয়া দাসত্বের জীবন না। আমাদের ছড়িয়ে পড়তে হবে কিন্তু থাকতে হবে সামাজিক ভাবে সংযুক্ত। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও কর্পোরেশনের বিপরীতে হয়ে উঠতে হবে স্বনির্ভর এবং সমাজনির্ভর। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিকে স্বীকার করে এবং প্রয়োজনমত সাথে নিয়েই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে প্রাণ-প্রকৃতিবান্ধব জীবন যাত্রায়। এই অবকাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলে নতুন ভাবে ঢেলে সাজাতে হবে এমন ভাবে যেন আমাদের জীবন যাত্রা হয়ে উঠে প্রকৃতি নির্ভর এবং প্রকৃতিবান্ধব। যেন আমাদের কারণে আজকের মতো প্রকৃতিকে ভুগতে না হয় এবং প্রকৃতির কোন উপাদানের কারণেও যেন আমাদের আজকের মতো ভোগান্তির পরিস্থিতিতে না পড়তে হয়।

    তথ্যপঞ্জি

    ১. যুদ্ধ পরিস্থিতি মঞ্চায়ন করে ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়েছে জনমানসকে। এই যুদ্ধে ভাইরাসকে শত্রু নির্ধারন করা হয়েছে, ডাক্তার, পুলিশ, আর্মি, র‌্যাবকে যোদ্ধা ঘোষণা করা হয়েছে, কোরেন্টাইনের নির্দেশনা অমান্য করা মানুষকে নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে।
    ২. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো; বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০১৮; ২০১৯
    ৩. আইকিউ এয়ার; ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি; ২১ এপ্রিল, ২০২০; বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪:৩৫।
    ৪. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ, ২০১৮
    ৫. বাংলাদেশ পরিবেশ সমীক্ষা-২০১৭, বিশ্বব্যাংক
    ৬ ক্যানসার কন্ট্রোল ইন বাংলাদেশ, জাপানিজ জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (জেজেসিও), ২০১৫
    ৭. গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স, ২০১৭

  • মানুষ যে কারণে মানুষের পাশে দাঁড়ায়

    মানুষ যে কারণে মানুষের পাশে দাঁড়ায়

    • আলতাফ পারভেজ

    বিশ্বজুড়ে এখন দুটো দৃশ্য। একটা হলো ভাইরাসের তোপের মুখে মানুষ নিজেদের রক্ষায় মরিয়া সংগ্রামে লিপ্ত। এই সংগ্রামের শ্রেণীভেদ আছে। ধনীরা বড় বড় দোকান থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় বিপুল জিনিস কিনে যার যার ঘরে থিতু হয়ে আছে। আর গরীবরা রুটি-রুজি হারিয়ে দিশেহারা,বিপর্যস্ত, ক্ষুব্ধ। এর বাইরে আরেকটি বড় দৃশ্যও দেখছি সবাই। মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে মানুষ।

    আর্টওয়ার্ক: পিস
    শিল্পী: চ্যাং ওয়াই থান
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    বিশ্বের সকল দেশে লাখ লাখ মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে করোনা-দুর্যোগে কোন না কোন প্রতিকারমূলক কাজে নেমেছে এমুহূর্তে। কেউ কেউ একে ‘ত্রাণ’ বলছেন। এভাবে বলাটা এক ধরনের দৈন্যতার প্রকাশ। ‘ত্রাণ’ একটা ‘টপ-ডাউন’ মনোভাবের ফল। এর পেছনে ‘সিস্টেম’কে রক্ষার পরোক্ষ তাগিদ থাকে। বিপরীতে ‘পারস্পরিক সহায়তা’ একটা আনুভূমিক প্রক্রিয়া। মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে সেখানে। কার্যত এখন সেটাই ঘটছে।

    হাজার হাজার যেসব মানুষ এখন বিশ্বজুড়ে করোনা-দুর্যোগে পারস্পরিক সহায়তায় নেমেছে তাদের অধিকাংশেরই ত্রাণধর্মী মনোভাব নেই। এদের মাঝে রয়েছে তীব্র সংহতির তাগিদ।

    এমন দৃশ্য বিরল নয় যে,কিছু কিছু ব্যাক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্যকে সংহত ও জাহির করতে দুর্যোগ এলেই ‘ত্রাণ’ধর্মী কাজে নামে। এরা সবসময়ই দাতা-গ্রহীতা একটা সম্পর্ক জারি রাখতে চায়। এরা সচরাচর ‘ক্ষমতা’র নিকটবর্তী চরিত্র হয়ে থাকে। সমাজে ক্ষুদ্র একটা ধারা হিসেবেই এরা উপস্থিত থাকে। তবে এদের তৎপরতাও সমাজের গভীরে থাকা পারস্পরিক সহযোগিতার প্রবণতার কথাই জানায়।

    রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে ‘সহায়তা’

    সমাজে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা যে এগিয়ে যায়– এটা সভ্যতার সমান পুরানো ঐতিহ্য। পারস্পরিক সহায়তার ওপর ভর করেও মানুষ এগিয়েছে বরাবর। এই শক্তি মানুষের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান হিসেবে উপস্থিত ছিল।

    ‘পারস্পরিক সহায়তা’র ধারণায় ভিন্নমতও আছে অনেকের। একদল মনে করে, করোনা মহাসংকট সামাল দেয়ার দায়িত্ব ‘রাষ্ট্র’-এর। পরিবর্তনবাদী মানুষদের কাজ নয় কেবল সহযোগিতা-সংস্কৃতিতে আটকে থাকা। এটা অরাজনৈতিক কাজ। বরং রাজনৈতিক কর্মীদের জোর দেয়া উচিত দুর্যোগকবলিত মানুষের দায়িত্ব নিতে ‘রাষ্ট্র’কে বাধ্য করার ওপর।

    অবশ্যই মহাদুর্যোগে মহাকর্তৃত্বশালী রাষ্ট্রেরই মানুষকে রক্ষার মূল কাজ। এটা করতে যেয়ে রাষ্ট্র ক্রমে আরও দানবীয় হয় এবং পারস্পরিক সহায়তার মানবিক ঐতিহ্যকে আরও ধ্বংস করে। আর ‘পারস্পরিক সহায়তা’ একই কাজ করতে যেয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের জনবিচ্ছিন্ন অতিকেন্দ্রীভূত চরিত্রের বর্তমান কর্তৃত্ববাদী ‘সিস্টেম’ সারানোর পদ্ধতিগত পথ দেখায়। এই অর্থে এটা এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদ্ধতিও বটে।

    মানুষের প্রধান বুদ্ধিদৃপ্ত ঐতিহ্য অপরকে সহায়তা করা

    পুরানো উদাহরণগুলো বাদ দিয়ে আমরা করোনাকালে বাংলাদেশের দিকেই কেবল মনোযোগ দিতে পারি। চলতি সময়ের পারস্পরিক সহায়তার দৃষ্টান্তগুলো দেখলে সেখানে পাবো স্বেচ্ছাসেবায় প্রণোদিত বিপুল মানুষ। পরস্পরকে সহায়তার মনোভাব থেকে এই মানুষরা বহু বিচিত্র পথে কাজ করে যাচ্ছে। ক্রমে এই সংখ্যা বাড়ছে। লক-ডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই সংখ্যা যে আরো কয়েকগুণ বাড়তো– তাতে সন্দেহ নেই। এরকম মনোভাব মানুষের প্রাচীন বৈশিষ্ট্য।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিম
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সমাজের স্বার্থে সঠিক ভূমিকায় নামাই ছিল মানুষের প্রধানতম বুদ্ধিদৃপ্ত অভ্যাস ও সবচেয়ে পুরানো রাজনীতি। মানুষ কেবল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ তাড়িত হয়ে পরস্পরের মাঝে মারামারি-যুদ্ধ-বিগ্রহ করে এগোয়নি। সংঘাতের চেয়ে সংহতিই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে অধিক। পরস্পরের প্রয়োজনে মানব গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মাঝে হাজার হাজার বছর ধরে শ্রম ও সম্পদের বিনিময় করেছে অকাতরে– কোন ধরনের স্বীকৃতি ও প্রশংসার অপেক্ষা না করেই। ‘রাষ্ট্র’ নয়, মানুষের এসব পারস্পরিক সহায়তাই তার অস্তিত্বের সংগ্রামকে বেশি এগিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সংকটকালে। এর জন্য কোন ‘কেন্দ্রীভূত’ কর্তৃত্বের চাপ দরকার হয়নি। যখন ‘কর্তৃত্ব’কে দুর্বল দেখা গেছে তখনি মানুষ মানুষকে রক্ষায় বেশি ভূমিকা পালন করেছে। বস্তুগত সম্পদের অধিকতর বিলি-বন্টনের দায়িত্ব হাতে নিতে চাওয়া মানুষের সবচেয়ে পুরানো মানবিক আকাঙ্খা।

    ভয়ঙ্কর কোভিড-১৯ এর মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ তার সেই পুরানো রাজনৈতিক অস্ত্রই ব্যবহার করতে চাইছে এখন পুনঃপুন। এটা অস্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক। মানুষের পারস্পরিক সহায়তার এই চেষ্টাগুলো ‘স্বতঃস্ফূর্ত’। কিন্তু এগুলো  তার ঐতিহাসিক জীববিদ্যারই পরম্পরা মাত্র। একই প্রবণতা দেখবো আমরা প্রাণীজগতেও। প্রতিনিয়তই তারা অস্তিত্বের শত্রুদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বা দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পরস্পরের সহায়তার ওপর ভর করে। তবে ইতিহাস লিখিয়েদের সংকট হলো তাঁরা প্রতিনিয়ত প্রাণীজগতের সংঘাত ও সংঘর্ষকে যেভাবে নথিবদ্ধ করছেন– পারস্পরিক সহায়তার অবদানকে ততটা করেন না।

    স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে থাকে মুনাফাহীন মনোভাব

    করোনাকালে যাদের আমরা পারস্পরিক সহায়তার কাজে লিপ্ত দেখছি– তাঁদের বড় অংশই স্বউদ্যোগে এই কাজে নেমেছে। দুর্যোগকবলিত মানুষদের সাহায্যের কাজে তাঁদের মাঝে আমরা দেখবো মুনাফাহীন একটা মনোভাব। তাঁরা এই কাজে পরস্পরকে সমান মর্যাদায় দেখছে। প্রতিদিনকার কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হচ্ছে অংশগ্রহণমূলকভাবে। একটা সমতার মনোভাব কাজ করে স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে। এরূপ গ্রুপগুলোতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের স্তরায়িত কাঠামো বা পরম্পরা থাকে খুব কম। থাকে না আমলাতান্ত্রিক মনোভাবও। মুখ্যত সদস্যনির্ভর কাঠামো এগুলো। দ্রুত ‘স্থানীয় জ্ঞান ও সম্পদ ব্যবহার করে’ ‘কিছু করা’র সমবায়মূলক মনোভাবই প্রধান প্রবণতা হিসেবে দেখা যায় এসব সাংগঠনিক তৎপরতায়। এরা তাদের কোন ‘উদ্যোগ’কে সচরাচর ‘প্রাইভেটাইজ’ করতে চায় না। সংহতির মনোভাব এত তীব্র যে, মানুষ অন-লাইনে পরস্পরকে না দেখেও ‘পারস্পরিক সহায়তা’র আহ্বানে অকাতরে সাড়া দিচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: কোয়াপরেশন
    শিল্পী: লিন্ডা লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    নিকট অতীতে দেখা গেছে, অনেক দেশে, অনেক দুর্যোগে– গতানুগতিক বাজার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যাওয়ায় পারস্পরিক সহায়তা হিসেবে ‘সমাজ’ যার যার উৎপাদিত পণ্য বিনিময়েরও ব্যবস্থা করে নিয়েছে। যে সব্জি উৎপাদন করে সে তার পণ্য দুধ কিংবা মাংস কিংবা অন্য কিছু উৎপাদনকারীর সঙ্গে বিনিময় করে সংকট এড়িয়ে নতুন এক সামাজিক সম্পর্ক ও বিনিময় ব্যবস্থার পত্তন করে নেয়। যদিও এসব তৎপরতার কাঠামোসমূহের অনেকগুলোই ঠিক প্রথাগত কোন ‘সংগঠন’ নয় – কিন্তু এর মাঝেই লুকিয়ে থাকে খুবই কেজো এক পজিটিভ সাংগঠনিক মডেল।

    সন্দেহ নেই যে, বিশ্ব ঐতিহাসিকভাবে শুধু পারস্পরিক সহায়তার ‘মডেল’ই এগোয়নি। নানান দ্বন্দ্ব-সংঘাত-শ্রেণী সংগ্রামও সেখানে প্রবলভাবে কাজ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক সহায়তার মডেলকে বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক পরিসরে অনেকখানি পুনঃস্থাপিত করেছে প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। যার বড় এক ফল সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক যুদ্ধ-বিগ্রহ-সহিংসতা এবং ধর্ম-বর্ণ-জাতি ঘৃণা। ফ্যাসিবাদও এরই অনিবার্য ফল।

    যখন আমরা ‘প্রতিযোগিতামূলক’ সমাজে এলাম

    এখনকার বর্তমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটি মূলত প্রতিযোগিতার মন্ত্রকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। এর প্রধান বার্তা হলো কেউ ‘লাভবান’ হবে– কেউ ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হবে। এই পদ্ধতির ভূমিকা-উপকারিতা-অপকারিতা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক আছে। প্রতিযোগিতা– না সহায়তার মাধ্যমে মানুষ অধিক সম্পদ সৃষ্টি করতে সক্ষম সেটাও বিশদ বিশ্লেষণ দাবি করে। এ লেখায় সেসব আলোকপাত করা হচ্ছে না আপাতত। তবে প্রতিযোগিতামূলক-মডেলের বড় সফলতা হলো বিশ্বজুড়ে পারস্পরিক সহায়তার ঐতিহাসিক অর্জনগুলোকে নবীনদের থেকে বেশ আড়াল করতে পেরেছে তা। প্রতিযোগিতার ধারণা সম্পদের বন্টনধর্মী অসমতাকে পরোক্ষে ন্যায্যতা দেয়।

    ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র ধারণা ও ‘রাষ্ট্র’ চলে আসার পর মানুষের পারস্পরিক সহায়তার প্রবণতাকে খাটো করা হয়, এর অর্জন ও ক্ষমতাকে আড়াল করা হতে থাকে – এমনকি একে দমনের চেষ্টা চালানো হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা দেখবো,যে রাষ্ট্র যত কর্তৃত্ববাদী হয়েছে সেখানে ইউনিয়নধর্মী কাজ তত নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

    আর্টওয়ার্ক: হারমনি
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    পারস্পরিক সহায়তার ধারণা অন্তর্গতভাবেই কেন্দ্রীভূত-কর্তৃত্ববাদী-একক ক্ষমতার ধারণাকে নাকচ করে। যে কারণে বরাবরই পারস্পরিক-সহায়তা-সংস্কৃতির প্রধান প্রতিপক্ষ ‘রাষ্ট্র’ ও এর অধিপতিশ্রেণী। তাদের হয়ে কাজ করে অনেক প্রচার মাধ্যম ও বিদ্যাপীঠ। প্রতিযোগিতার বদলে সহায়তার পথে এগোলে মানুষ যে আরও নিরাপদ ও সবল একটা বিশ্ব গঠন করতে পারে সেটার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত তরুণ-তরুণীদের ‘প্রতিযোগিতায় জেতা’র জন্য আহ্বান জানানো হয়। দশকের পর দশক এভাবে প্রচার ও উস্কানির কারণে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মাঝে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থবাদী প্রবণতা বড় হয়ে ওঠে। তারা অপরকে ‘হারিয়ে’ কেবল নিজে ‘লাভবান’ হতে চায়।

    কিন্তু পারস্পরিক সহায়তার বিষয়টি তারপরও মানুষের প্রবণতার অভ্যন্তরে রয়ে যায়। কারণ তার প্রবণতার স্বাভাবিক অভিমুখ পারস্পরিক সহায়তা। করোনা দুর্যোগকালে আমরা তারই জয়জয়কার দেখছি। অতীতের সকল দুর্যোগেও তাই ঘটেছে। মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে বিকৃত করার জন্য বহু চেষ্টাও জারি থাকে সমাজে। এমনকি ‘ত্রান’-মডেলও দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে মানুষের পারস্পরিক সক্ষমতার সামর্থ্যকে খাটো করে।

    তবে শেষমেষ যে নতুন প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ হাজির হয় তাহলো,পরস্পরকে সহায়তার চলতি মানব-প্রবণতা ও তার বিচিত্র সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাগুলোকে কীভাবে আরও বিকশিত করা যায়? দুর্যোগকালে সংহতির সাম্প্রতিক বিপুল অর্জনকে কীভাবে ভবিষ্যতের পুনর্গঠনে মূলধারা করা যায়? যে বিপুল একাত্মতা আজ আমরা দেখছি স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে– তাকে কীভাবে অব্যাহত রাখা যায়? নিঃসন্দেহে এসব চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক। এই চ্যালেঞ্জে পরাজিত হলেই কেবল বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নেয় কর্তৃত্ববাদী,প্রতিযোগিতামূলক এবং কেন্দ্রীভূত ‘রাজনীতি’। আর এই রাজনীতি যখনি কর্তৃত্ব নেয়– তখনি আমরা দেখি পরস্পরকে সহায়তার শক্তি অদৃশ্য হয়ে গেছে।

  • এডওয়ার্ড স্নোডেন।। করোনা, নজরদারি, ভবিষ্যত

    এডওয়ার্ড স্নোডেন।। করোনা, নজরদারি, ভবিষ্যত

    • অনুবাদ: প্রদীপ মার্ডী

    ভূমিকা
    কোভিড-১৯ এর মহামারীর প্রেক্ষাপটে কানাডীয় সাংবাদিক ও ভাইস নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শেন স্মিথ সাক্ষাৎকার নেন এডওয়ার্ড স্নোডেনের। যেখানে শেন ও স্নোডেন কথা বলেছেন সমসাময়িক নানা বিষয়ে। অতি অবশ্যই সেই আলোচনায় করোনাভাইরাস মহামারী, প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় (more…)

  • ম্যানুফ্যাকচারিং ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি

    ম্যানুফ্যাকচারিং ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি

    • বাধন অধিকারী ও মোকাররম রানা

    যখন এই নিবন্ধ লিখতে বসেছি, ততক্ষণে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশে। এই ভাইরাস সীমানা আর কাঁটাতারে ঘেরা জাতিরাষ্ট্র মানেনি। কল্পিত চাকচিক্যের ম্যারিকা-ব্রিটেন মানেনি। পবিত্রভূমি মক্কা-মদিনা মানেনি। হিন্দু-মুসলমান-মুসলিম-খ্রিস্টান-সেমিটিক-অ্যান্টিসেমিটিক মানেনি। এই ভাইরাস সাদা-কালোও মানেনি। মানেনি ধনী-গরীব। ব্রিটিশ প্রধামন্ত্রী বরিস জনসন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী, বাংলাদেশের দুদক পরিচালক কিংবা গার্মেন্টস মালিক কিচ্ছু মানেনি। এই ভাইরাস আঘাত করেছে নির্বিশেষে, প্রজাতি হিসেবে মানুষকে।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা ফোবিয়া
    শিল্পী: মাহমুদ আব্বাস
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই প্রবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে, ততক্ষণে করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ। বিশ্বব্যপী আক্রান্ত করেছে ২০ লক্ষাধিক মানুষকে। বাঁচাতে পারছে না কেউ। জনগণকে ধোঁকা দিতে গরুর মূত্র খেয়ে ও খাইয়ে একাকার করেছে ভারতের গেরুয়াধারীরা। লাভ হয়নি। কাজে আসেনি ধর্মব্যবসায়ী ওয়াজকারীদের দেওয়া সমাধানবটিকায়। বিজ্ঞান/চিকিৎসা বিজ্ঞানও কোনও ইমিডিয়েট সমাধান হাজির করতে পারেনি। অর্ধশতাব্দী আগে চাঁদে পা দেওয়া মানুষ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করা মানুষ, তথা ২১ শতকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল পৃথিবীর মানুষকে স্তব্ধ-স্থির-হতভম্ব করে দিতে সমর্থ হয়েছে এই অদৃশ্য অণুজীব।  

    আসুন তো বন্ধুরা, প্রশ্ন করি ক্ষমতাশালীদের। কীসের এতো গর্ব তাদের? কীসের এত অহঙ্কার। কোথায় গ্লোবাল ভিলেজ আর কোথায় মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন? কোথায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর কোথায় জ্ঞানের উৎকর্ষ? মহাকাশ জুড়ে যে মানুষের সৃজন-সম্ভাবনা; সেই মানুষ চোখে দেখা যায় না- এমন একটা ভাইরাসের কাছে এভাবে আত্মসমর্পিত বাস্তবতা উদযাপন করছে! কোথায় গেল সব অহম?  

    ঠিক কোথায় থেকে ভাইরাসটি উহানে এলো, তা এখনও সুনিশ্চিত নয়। তবে একটি বন্যপ্রাণীকে এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। এটি হলো প্যাঙ্গোলিন। বাংলাদেশে একে সম্ভবত বনরুই নামে ডাকা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চীনের বাজারে চোরাই পথে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা এই প্রাণীটির দেহে এমন একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে যা কোভিড নাইনটিনের সাথে ‘ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।‘ তারা মনে করছেন, বাদুড়ের শরীর থেকে প্যাঙ্গোলিনই মানুষের দেহে করোনা এনেছে।

    বিজ্ঞানীদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে নিছক প্রাকৃতিক ব্যাপার হিসেবে চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। বলতে হয়, একটি অবৈধ বন্যপ্রাণীর মাংসের বাজার সিন্ডিকেট এই ভাইরাসকে আমাদের পরিসরে মহামারী আকারে হাজির করেছে।

    বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যাঙ্গোলিন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চোরাই পথে পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটা খাদ্য হিসেবে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি ব্যবহৃত হয় ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির জন্য। ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে প্যাঙ্গোলিনের গায়ের আঁশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং এর মাংসও চীনে একটি উপাদেয় খাবার বলে গণ্য করা হয়।

    খবরে দেখেছি, বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, বন্যপ্রাণীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আমাদের শরীরে ভর করার চরম ঝুঁকি থাকে। প্রাণসংরক্ষণবাদীরা বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা বন্ধ করতে বলছেন।  তবে বাজার তো থামবে না। কেনা-বেচাই তার টিকে থাকার শর্ত। টেকার স্বার্থেই সে এইসব জীবাণুবাহী প্রাণীর মাংস বিক্রির বৈধ/অবৈধ নেটওয়ার্ক নিরন্তর রাখে। আর বাজার ব্যবস্থার দায় এসে পরে সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতির ওপর। 

    নব্য উদারবাদী উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা কী করে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্য ভূমিকা পালন করে, তা নিয়ে জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস বলেন, মহামারীর সময় সবচেয়ে বিপদজনক জিনিসটা হল ব্যর্থতা– বা বলা বাহুল্য– এটি অস্বীকার করা যে প্রত্যেক নতুন কোভিড-১৯ আসলে অভিন্ন ঘটনা। ভাইরাসগুলোর ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনাফামুখিতা। যদি কেউ গবেষণা করতে চান যে ইদানিং সব ভাইরাস কেন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে তাহলে তাকে অবশ্যই কৃষির শিল্প-মডেল ও পশুসম্পদের উৎপাদন সম্পর্কে গভীর ভাবে জানতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে খুব কম সংখ্যক রাষ্ট্র ও কম সংখ্যক বিজ্ঞানীই এটি করতে ইচ্ছুক। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক প্রতিবেশকে প্রতিস্থাপনকারী পুঁজির নেতৃত্বাধীন কৃষি এমন সব পদ্ধতিতে তার কাজকর্ম চালায় যা ভাইরাসগুলোকে মারাত্মক ক্ষতিকারক ও সংক্রামক ফিনোটাইপ এ বিবর্ধিত করে। বলতে গেলে আপনি কোন মারাত্মক রোগ তৈরি করতে চাইলে এর চেয়ে ভালো  সিস্টেম আশাই করতে পারবেন না।

    তো যে সংখ্যালঘু অংশ রাষ্ট্র ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তারা সবসময় অন্যের ওপর দুর্যোগ চাপিয়ে দিয়ে ফায়দা তুলতে চায়। নিজেরা থাকতে চায় সুরক্ষিত। এবার তা হয়নি। করোনা ক্ষমতাধরদের সুরক্ষাবলয় ভেদ করে ঢুকে পড়েছে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফখণ্ড গলে মাটির নিচ থেকে বহু অজানা ভাইরাস বের হয়ে আসছে বলেও খবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।  তারমানে করোনাই শেষ কথা নয়। আরও বড় বড় বিপদ সামনে। সে কথা আপাতত থাক। আমরা বরং বুঝতে চেষ্টা করি, কেন ছড়িয়ে পড়তে পারলো করোনা? কেন আমাদের একুশ শতকের জ্ঞান-বিজ্ঞান-অগ্রগতি-ক্ষমতা-দম্ভ সব পরাস্ত হলো?

    নন্দিত মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি বলছেন, করোনা ভাইরাসের এই বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধ করা যেত, তথ্যউপাত্ত হাতের কাছেই ছিল, এমনকি মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ২০১৯-এর অক্টোরবরেও এটা বেশ পরিচিত ছিল। এধরনের সম্ভাব্য বৈশ্বিক মহামারির দুনিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্টে লেভেল সিমুলেশানের মাধ্যমে করা একটি বড় মাত্রার সিমুলেশান আমাদের হাতে ছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি, এখন এই সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। যে সমস্ত তথ্যউপাত্ত নিয়ে তারা (যারা লেভেল সিমুলেশন করেছিলেন) সচেতন ছিলেন সেগুলোর দিকে আমরা মনোযোগ দেইনি, ৩১ শে ডিসেম্বর চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অজানা কারণে ঘটা নিউমোনিয়ার মতো লক্ষণগুলো নিয়ে সচেতন করে। এক সপ্তাহ পরে, কিছু চীনা বিজ্ঞানী একে করোনা ভাইরাস বলে শনাক্ত করেন, এছাড়াও তারা এর অণুক্রম তৈরি করে সারা দুনিয়াকেই জানান, ততক্ষণে ভাইরোলজিস্ট ও অন্যান্যরা যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টটি পড়েছে, তারা জেনে গেছে যে এটা করোনা ভাইরাস এবং একে মোকাবিলা করতে হবে কীভাবে।

    চমস্কি বলছেন, আমাদের পৃথিবীটা ক্ষমতাশালীরা যেভাবে পরিচালনা করছে, এর যে পরিচালনাকাঠামো, সমস্যাটা সেখানেই। মানে সমস্যাটা গণতন্ত্রহীনতার। আমিও তাই মনে করি। নয়া উদারনীতিক বাজারব্যবস্থা ও তার পাহারাদার জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার এই বিশ্বকাঠামোই পৃথিবীর ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে মানুষের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে।

    নব্য উদারবাদী পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে দুনিয়াজুড়েই উন্নয়নতত্ত্ব আর মানুষের বিপন্নতার বাস্তবতা যেন সমান্তরাল। অন্ধ বাজার মুনাফা ছাড়া আর কিছুই দেখতে সক্ষম নয়। সে কারণেই এই যুগে ‘সোশ্যাল ডারউইনিজম’র রমরমা; যোগ্য হলে টিকে থাক, নয়তো ধ্বংস হও। বাজার অর্থনীতি সবকিছুকে ব্যবসায়ের উপজীব্য করতে করতে এখন এসে আঘাত তীব্র করেছে প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের ওপর। অসংখ্য-অগণন প্রাণের আধার জল-জঙ্গলকেও মুনাফার উপজীব্য করে তারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিয়েছেন হুমকির দিকে। মাতৃদুনিয়াকে (মাদার আর্থ) কার্বন মচ্ছবে আচ্ছাদিত করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত  দুর্যোগকেও তারা হাতিয়ার করেছেন মুনাফার। নওমি ক্লেইন নামের একজন কানাডিয়ান লেখক এই পরিস্থিতিকে বেশকিছুদিন আগেই তার এক বইতে ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’র যুগ আখ্যা দিয়েছেন। 

    আর্টওয়ার্ক: উইদাউট একসেপশন
    শিল্পী: মাজেগ
    সূত্র: কার্টুন নেটওয়ার্ক

    বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণাও আছে, তারাই জানেন, অন্যসব প্রজাতি আর প্রতিবেশকে ধ্বংস করে মানুষ পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের এই পৃথিবী হলো এমন এক স্থান, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়েই জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সঙ্গে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে। তাই জল-জঙ্গলকে দখলে নিয়ে বাস্তু প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে টিকে থাকার প্রচেষ্টা একটা উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে অন্ধ বাজার এসব বোঝে না। বোঝে না মুনাফাবাজ করপোরেশন আর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। বাজার কেবল মুনাফাই বোঝে। মুনাফার লোভে পৃথিবী ধ্বংসে তার কোনও আপত্তি নেই। মুনাফার লোভে যেমন বন্যপ্রাণীর ভেতর দিয়ে ভয়াবহ সব রোগ  আসার আশঙ্কা জেনেও তার বাজার বন্ধ হয় না। এভাবেই তো করোনারা আসে। মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষমতাশালী মানুষের এই অপকর্মের দায় নিতে হয়, সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতিকে, এমনকী অপরাপর প্রাণ ও প্রকৃতিকেও।

    করোনার বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও আমরা উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বাজার রক্ষার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি শুরুর দিকে। বিরল ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে ভয়াবহ আক্রান্ত দেশগুলোর সবাই মানুষের জীবনকে গুরুত্ব না দিয়ে, তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনারই অংশ হিসেবে টেস্ট-লকডাউন-কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গেছে। কারণ লকডাউন-কোয়ারেন্টিন মানেই বাজার ব্যবস্থার অচলতা। এই বিশ্বব্যবস্থা মানুষের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর তাই বাজারের অবাধ সরবরাহ ব্যবস্থা অটুট রাখতে সে জীবাণুকে ছড়িয়ে পড়তে দেয় অনায়াসেই।

    তবে একসময় তো থামতে হয়। থামতে হয়েছে সবাইকেই। যখন ক্ষমতাশালীরা দেখতে শুরু করেছে, কেবল গরীব মানুষ নয়; এভাবে তাদের নিজেদের তৈরি করা রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য সবকিছু ভেঙে পড়তে পারে। এখন তাই সব ক্ষমতাশালীরা লকডাউন আর কোয়ারেন্টিন প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মতি আদায় ও বলপ্রয়োগ করছে। মানুষকে ঘরে রাখতে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি চলছে র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় দমন প্রক্রিয়া। করোনা মহামারিকে অনিবার্য করে তোলার মধ্য দিয়ে এই জাতিরাষ্ট্র আর বাজারব্যবস্থা মানুষকে নির্ভরশীল করে তুলতে চাইছে ‘ঘরে থাকা’র জীবনব্যবস্থায়। একেই আমরা নাম দিয়েছি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং স্টে হোম’ রিয়ালিটি।  বিশ্ববাস্তবতাকে সরিয়ে রেখে আমি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ‘রিয়ালিটি’ প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে হাজির করার চেষ্টা করব।

    বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরপর তিন মেয়াদ শাসনক্ষমতায় থাকা এই সরকারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে ক্রমাগত রাষ্ট্র সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করেছে। নির্বাচনতন্ত্রের নিয়মটুকুও না মেনে জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকারটুকুও হরণ করে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে এই সরকার ক্রমাগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও বিরোধী দমনের পথ বেছে নিয়েছে। এই সরকার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র নিজস্ব সংজ্ঞা নির্মাণ করে, ইতিহাসের একমুখী কট্টর জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বাদবাকী ভাষ্যকে অস্বীকার করতে চায়। আর তাদের কথিত সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাদবাকি চিন্তাধারার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে বিরোধী মত দমনের চূড়ান্ত বাস্তবতা সৃষ্টি করা হয়। শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় যাবতীয় ভিন্নমত। সে কারণেই ‘মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী’ তকমা জুটে যায় যে কারও, কেউ প্রকৃতি বিনাশী উন্নয়নের সমালোচনা করুক, কেউ সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্র সরকারকাঠামোর সমালোচনা করুন, আর সরকারের নির্বিচারি গুম-খুন-ক্রসফায়ার-আটক-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলুক; সবাই ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ আখ্যা নিয়ে দমনপীড়নের শিকার হবে। 

    বস্তুত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারের এ সংক্রান্ত কোনও প্রস্তুতিই বলতে গেলে ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিল ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনে। বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তবে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতায় আমরা কেউ প্রশ্ন করতে পারিনি, এই ভূখণ্ডের মানুষের সাম্য-মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের যে সাধারণ সংকল্পের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে যে শেখ মুজিব অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন, সেই বাংলাদেশের পক্ষে এই উৎসবের ভূমিকা কী ছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সম্মিলিত সংকল্প ভাষা পেয়েছিল শেখ মুজিবের কণ্ঠে, নিঃসন্দেহে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক, এই জনগোষ্ঠীর নিরন্তর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তিনি এক অপরিহার্য নাম; তবে এই সরকার তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর করে; ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন এক প্রতীকে রূপান্তর করে তার স্তুতি/মাহাত্ম্যের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। 

    আর্টওয়ার্ক: আতশবাজি
    শিল্পী: তীর্থ
    সূত্র: তীর্থ

    অনেকেই মনে করেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার নেপথ্যে মুজিববর্ষই মূল কারণ। তবে তা যথাযথ নয়। সরকারের ব্যর্থতায় মুজিববর্ষের ভূমিকা থাকতেই পারে, তবে এমন নয় মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রশ্ন না থাকলে আমরা করোনা-মোকাবিলায় খুব সফল হয়ে যেতাম। বস্তুত আমাদের ব্যর্থ হওয়ার সব ধরনের শর্ত হাজির রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র ও শাসনকাঠামোর মধ্যে।

    সরকারের আত্মপ্রচারের আরেক প্রপঞ্চ উন্নয়ন। উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প দিয়েই আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির বারোটা বাজানো হচ্ছে প্রতিদিন। প্রধানমন্ত্রী একদিকে কৃষি জমি রক্ষার কথা বলছেন, আরেকদিকে সেইসব জমি নষ্ট করে তোলা হচ্ছে উন্নয়নের ঢেউ। নিজেদের কথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে অবস্থান নির্মাণ, স্বাধীনতাবিরোধী উন্নয়নবিরোধী পক্ষ নির্ধারণ করে বাকিদের আলাদা করা, তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত কিছুর দায় চাপানো আর তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের বলপ্রয়োগ ও সম্মতি উৎপাদনের মেশিনগুলো নিয়ে নেমে পড়ে বিরোধী দমনকে দিনকে দিন নিরঙ্কুশ করে যাচ্ছে এই সরকার। এক ব্যক্তির নামে চলছে দেশ। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিতে গিয়ে প্রায়শই ভুল করে বলেন, ‘আমরা এটা করে দিয়েছি, ওটা করে দিয়েছি। এটা দিচ্ছি ওটা দিচ্ছি।’  তিনি ভুলে যান, তার সরকার ব্যবস্থাপনা করেছে মাত্র। যা করেছেন, যা দিয়েছেন; তার সবটাই হয়েছে জনগণের টাকায়, যাদের প্রজাতন্ত্রের মালিক হওয়ার কথা ছিল! তবে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্র সে কথা মনে রাখে না। সে কারণেই ত্রাণের বস্তায় ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার’ লিখে দিতে একটুও  দ্বিধা করে না তাদের সামন্ত মনন। 

    আমাদের বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় বাংলাদেশে করোনাকে নিরঙ্কুশভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে তিন ধাপে। প্রথমত, বিমানবন্দর অরক্ষিত রাখা ও দেশে ফেরা প্রবাসীদের যথাযথ কোয়ারেন্টিন না করা। দ্বিতীয় ধাপে গণপরিবহন বন্ধ না করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে করোনাকে ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া। এবং তৃতীয়ত, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকের ‘দাসযুগের আচরণ’র বিরুদ্ধে কোনও অবস্থান না নেওয়া। 

    জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, “সবাইকে কেয়ারফুল থাকতে হবে। বিশেষ করে এয়ারপোর্ট এবং পোর্টে স্পেশাল কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে আমাদের মধ্যে বিস্তার না ঘটতে পারে। চীন বা হংকং থেকে যেসব প্লেন আসবে সেগুলোতে বিশেষ নজর রাখতে হবে। চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয় এমন পোর্টে বিশেষ নজর রাখতে হবে।” সচিব জানান, কোনোভাবেই যেন করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে আসতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

    এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে করোনাভাইরাস নিয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভা কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। জানান, চীন থেকে আসা বাংলাদেশিদের আশকোনা হজ ক্যাম্পে ‘কোয়ারেনটাইন’ করে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের থাকা-খাওয়াসহ সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে যারা বাংলাদেশে যারা আসছেন, তাদেরও যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।’ 

    কেমন ছিল চীনফেরতদের সেই কোয়ারেন্টিন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল একটি কামরার মেঝেতে সারি সারি বিছানা পাতা। এই বিছানাগুলোই ছিল চীন ফেরতদের কোয়ারেনটিনে থাকার ব্যবস্থা। এদের একজন ছিলেন ফারজানা ইয়াসমীন। পিএইচডি করতে  স্বামী সন্তানসহ চীনে গিয়েছিলেন। ফারজানা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “চীন থেকে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলাম আমাদের বাচ্চাদের জন্য। কিন্তু এখানে এসে দেখি বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। বড়রা সারাক্ষণ মাস্ক পড়ে থাকতে পারে কিন্তু বাচ্চারা তো পারে না,” ইয়াসমিন বলছেন, “কোয়ারেন্টাইন তো করা হয় আলাদা আলাদাভাবে। এখন লোকের সংস্পর্শে এসেই যদি এরা কোয়ারেন্টাইন করে তাহলে এটা কি হলো ?একই রুমের মধ্যে আমরা গ্যাদারিং করে পড়ে আছি। আমাদের রুমেই ৪০ থেকে ৫০ জন হব। এই রুমেই আছে ৮টা পরিবার। এদের মধ্যে বাচ্চারাও আছে। আবার ব্যাচেলর আছে,” ফারজানার মতে, এর চেয়ে তো চীনে থাকাটাই ভাল ছিল।

    চীনের উহান থেকে ফেরা আরেকজন শামীমা সুলতানা জানান, “কোয়ারেন্টাইন বলতে যা বোঝায় সেটা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন রাখা। তো সেটাতো এখানে দেখছি না,” “কালকে থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখলাম তাতে আমার মনে হচ্ছে যে অব্যবস্থাপনার একটা বিষয় আছে। কাল থেকে যে খাবারগুলো আসছে সে খাবারগুলোর প্যাকেটও এখনো পড়ে আছে“। রাকিবুল তুর্য নামের একজন জানান, এক রুমে এক সাথে ৫১ জন রয়েছেন তারা। হজ ক্যাম্পের মোট তিনটি ফ্লোরে রাখা হয়েছে চীন ফেরত বাংলাদেশিদের। এরমধ্যে তিনি যে ফ্লোরে রয়েছেন সেখানে তিন রুম রয়েছে। তিনি জানান, তিন রুমের জন্য দুটি টয়লেট আর দুটি ওয়াশরুম। রয়েছে পানির সংকটও। তবে তুর্য বলেন, একই রুমে যদি গণরুমের মতো ৫০ জন করে থাকতে হয় তাহলে বাংলাদেশে এসে লাভটা কী হলো। “কারো মধ্যে যদি করোনাভাইরাস থেকে থাকে তাহলে সেটা সবার মধ্যেই সংক্রমিত হবে। কারণ সবাই এক সাথে আছে। এটারই ভয় পাচ্ছি,” তিনি বলেন। 

    এদের মধ্যে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে দেশে ফেরার পর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয় নি। ভেতর থেকে কয়েকজন টেলিফোনে জানান, দেশে তাদের কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। এমনকি মেডিকেল টিমও কাছে যেতে চায় না। তাদের মধ্যে যারা ডাক্তার আছে তাদের দিয়েই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।‘ ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে চীন ফেরত এই প্রবাসীরা যার যার বাড়িতে ফিরে যান। 

    সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল করোনা ঠেকাতে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের এই তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশফেরত সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২১ জানুয়ারি থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। এদিকে, ১০ মার্চ  দেশের একটি সংবাদমাধ্যম  জানাচ্ছে,শাহজালাল বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের পরীক্ষার জন্য সচল থাকা সর্বশেষ স্ক্যানারটিও অচল হয়ে পড়েছে । শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিআইপি যাত্রীদের জন্য বসানো স্ক্যানারটি সচল থাকলেও বিদেশফেরত সাধারণ যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে  হ্যান্ডহেল্ড থার্মোমিটার দিয়ে।

    বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, ‘আগের স্ক্যানারগুলোই তো নষ্ট। শাহজালাল বিমানবন্দরে তিনটি থার্মাল স্ক্যানার রয়েছে। এর মধ্যে দুটি নষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘নতুন থার্মাল স্ক্যানার বসানোর কথা বলা হলেও আমরা সেগুলো পাইনি। তা ছাড়া সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানারগুলো আগে থেকেই নষ্ট হয়ে আছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।’

    পাঠক, খেয়াল করে দেখুন, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে ফেরার স্রোতের  মধ্যেই কয়েক দিন ধরে  প্রধান বিমানবন্দরটির তিনটি স্ক্যানার মেশিনের মধ্যে দুটিই অচল হয়ে পড়েছিল। যদিও স্ক্যানার নষ্ট থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ার দিন, ১০ মার্চেই বিমানবন্দরগুলোতে নতুন স্ক্যানার বসানোর খবর প্রকাশিত হয়। একই খবরে জানানো হচ্ছে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের স্ক্যানারগুলো ২১ জানুয়ারি থেকে জারি করা বিশেষ সতর্কতার আগেই নষ্ট ছিল।’

    অভিযোগ উঠেছে, বিদেশফেরত বিপুল পরিমাণ যাত্রীকে কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে ছাড়া হয়েছে। এদের মধ্যে যাদের ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ থাকার কথা ছিল তাও যথাযথভাবে হয় নি। ১২ মার্চ বিবিসি তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, “কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশ থাকা আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশটির ২০টি জেলায় প্রায় দুইশো জনকে নিজ নিজ বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় হোম কোয়ারিন্টিনে রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গত প্রায় দুই মাসে চীন-ইতালিসহ ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সাড়ে পাঁচ লাখের মতো বাংলাদেশি দেশে এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকায় বিমানবন্দর পার হয়ে গেছেন।” 

    বিবিসি’র ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “ ইতালি থেকে একজন প্রবাসী ঢাকায় আসেন ১২দিন আগে, গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি। তিনি ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে আসেন। তিনি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শরিয়তপুর জেলায় তার গ্রামের বাড়িতে যান। এই প্রবাসী বলছিলেন, যদিও তিনি সুস্থ রয়েছেন, কিন্তু কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের মধ্যে না পড়ায় তার নিজের মাঝেই এক ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। “২৯শে ফেব্রুয়ারি রাত ২টায় আমি ঢাকায় বিমানবন্দরে নেমেছি। এখানে আসার পর একটা ফরম দিছে। সেটা পূরণ করে জমা দেয়ার পর আর কিছুই আমাকে বলেনি। শুধু ইমিগ্রেশন যখন পার হই, তখন পাসপোর্ট দেখে বললো, আপনার কি পরীক্ষা হয়েছে? আমি বললাম না। তখন ইমিগ্রশনে বললো, পরীক্ষাটা হলে ভাল হতো। এই বললো। আর কিছুই না। তারপর পাসপোর্টে সিল মেরে দিলো। আমি এসে পড়লাম।” তিনি আরও জানিয়েছেন, তিনি যে ফরমটা পূরণ করেছেন, তাতে কোন দেশ থেকে এসেছেন, সেই দেশের নাম এবং পাসপোর্ট নম্বর-এসব লিখতে হয়েছে।এই প্রবাসী বাংলাদেশি বলছিলেন, ১২ দিন ধরে দেশে এসে তাকে কেউ পর্যবেক্ষণ করেনি বা সরকারের কোনো বিভাগ থেকে তাকে কোনো পরামর্শও দেয়া হয়নি।”

    এর পরে, ১৪ মার্চ ১৪২ জন ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশে আসেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোয়ারেন্টিন করার জন্য আশকোনা হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাভাবিক ভাবেই, চীন থেকে ফেরাদের অভিজ্ঞতার পর ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে এই প্রবাসীরা  হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিনে থাকতে অস্বীকৃতি জানান। তারা হজ ক্যাম্পের ভিতরে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে থাকেন। 

    ইতালিফেরত এক ব্যক্তি ক্যাম্পের গেটে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের রোমে পরীক্ষা করা হয়েছে,দুবাইয়ে আরেক দফায় পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে করোনাভাইরাসের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে আসার পর এখন এখানে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি বলেন, এখানে তাঁরা অমানবিক অবস্থার মধ্যে আছেন। শিশুরা আছে। কিন্তু কোনো খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা অভিযোগ করেন, হজ ক্যাম্পে আনার পর তাঁদের নিয়ে কর্তৃপক্ষ কী করতে চায়, তা বলছে না। শুধু পানি ছাড়া তাঁরা কোনো খাবার পাচ্ছেন না। তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, তাঁরা বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে চান।

    কোয়ারেন্টিনের দুরাবস্থা দেখে প্রবাসীরা যখন বিক্ষোভ করলেন,হজ ক্যাম্পে অবস্থান করতে অস্বীকৃতি জানালেন তখন  আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আপত্তিকর ভঙ্গিতে  উলটো দোষারোপ করলেন সেই প্রবাসী নাগরিকদেরকেই। এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের সামনে তিনি বললেন,‘প্রবাসীরা দেশে এলেই নবাবজাদা হয়ে যান। তারা কোয়ারেনটাইনে যাওয়ার বিষয়ে খুব অসন্তুষ্ট হন। ফাইভ স্টার হোটেল না হলে তারা অপছন্দ করেন।’ প্রবাসীরা কি আসলেই ফাইভ স্টার হোটেল চেয়েছিলেন? দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে আসার পর সম্মান জনক কোয়ারেন্টিন চাওয়াটা কি খুব বেশি কিছু ছিল? শেষমেশ এই প্রবাসীরা নিজেদের বাড়িতে ‘হোম কোয়ারেন্টনে’ থাকবেন এই শর্তে তাদের ছাড়া হয়। 

    আসলে সরকারের কোনও যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি ছিল না কোয়ারেন্টিন করার। বিমানবন্দর অরক্ষিত রেখে এবং বিদেশফেরত নাগরিকদের জন্য যথাযথ কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা না করে এভাবেই করোনাকে দেশে ঢোকানো হয়।  

    ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরেও ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নি। স্কুল-কলেজ বন্ধের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা স্কুলে থাকলেই বরং ভালো। স্কুলে হাত ধুতে হয়, কীভাবে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকা যায়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধের উপায় শিখছে। বাড়িতে গেলে তারা ঘুমাবে এবং খারাপ কাজ হবে।’ এ কে মোমেন বলেন, ‘তবে এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সতর্ক। প্রতিনিয়ত নজর রাখা হচ্ছে। যখন প্রয়োজন হবে এবং কোনো ‘ইন্ডিকেশন’ পাওয়া যাবে, তখন অবশ্যই স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হবে।’ ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জনগণকে দায়ী করেন। বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ খুব অসচেতন। তারা যেখানে সেখানে থুতু ফেলছে। টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করে যেখানে সেখানে ছুড়ে ফেলছে। বাইরে থেকে ঘরে এসে হাত না ধুয়ে ছেলেমেয়েকে স্পর্শ করছে, বিভিন্ন কিছু করছে।’ তিনি বলেন, ‘যে যে কাজগুলো করলে তার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় সে কাজগুলো করবেন না। যেখানে সেখানে কফ, থুতু ফেলবেন না। হাঁচি–কাশি দিলে রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করবেন। নিজে ভালো থাকবেন, অপরকে ভালো রাখবেন।’

    অনেকে ধারণা করছিলেন যে ১৭ মার্চ মুজিব বর্ষের মূল অনুষ্ঠান পালনের জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দেয়া হচ্ছে না। শেষমেশ, ১৬ তারিখে এসে ১৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে থাকা সাধারণ ছুটির দিনে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে হয়নি। প্রথম জন শনাক্ত হওয়ার ১০ দিন পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামাঞ্চলমুখী শিক্ষার্থীদের স্রোত ভাইরাসটির কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটানোর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন হলো, দেশে করোনা আক্রান্ত প্রথম জন  শনাক্ত হওয়ার পরেই  যেখানে মার্চের  ৯ তারিখেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন সীমিত করা হলো সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি  বন্ধ ঘোষণা করতে ১৮ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হল কেন?  এই অপেক্ষা কি  বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী-অভিভাবক-সাধারণ মানুষের জীবনকে  হুমকির মুখে ফেলে দেয়নি? এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং ওইদিন থেকে গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে ছুটির আগে গণপরিবহন সচল পেয়ে মানুষ সড়ক-রেল-নদীপথে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। দেশছুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। 

    ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরেই সবেতন কারখানা ছুটির দাবি তুলেছিল গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এ নিয়ে শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান বিজিএমইএ-বিকেএমইএ’র মুখপাত্র হয়ে হাজির হয়ে এক বৈঠকে শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান বলেন,  মিল-কারখানা বন্ধ করতে হবে এই চিন্তা যেন কারও মাথায় না আসে।

    এরই মধ্যে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক কাতরভাবে বিদেশী বায়ারদের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও বার্তা দেন, যেন তারা তাদের অর্ডার বাতিল না করে, এবং যা উৎপাদন করা হয়েছে তা যেন তারা নিয়ে নেয়। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস বিস্তারের কারণে বাংলাদেশের ১০৮৯ গার্মেন্টের ১.৪ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে, এর ফলে এই ফ্যাক্টরীগুলোতে ১২ লাখ শ্রমিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। রুবানা হক তার ভিডিও বার্তায় বারে বারে পুরো গার্মেন্ট সেক্টরের ৪১ লক্ষ শ্রমিকের কাজ হারানো, না খেয়ে থাকা, এমনকি  সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন।

    শ্রমিকদের অসন্তোষ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সমালোচনায় এক পর্যায়ে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে। তবে শ্রমিকদের ঢাকায় থাকার কোনও উপায় বর্তে দেওয়া হয়নি। স্বভাবতই তারা লাখে লাখে গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: আয়সোলোট
    শিল্পী: তন্ময়
    সূত্র: ফেসবুক

    সরকারঘোষিত প্রথম দফার সাধারণ ছুটি ছিল ২৬ মার্চ থেক ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। সেই ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল  পর্যন্ত করতে বাধ্য হয় সরকার, সেটা পরিস্থিতিগত ভয়াবহতার কারণেই। তবে ৪ এপ্রিল গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

    শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তির ও শ্রমিকদের অনিচ্ছার মুখেও কারখানা খোলার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কঠোর অবস্থান নেন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। রুবানা হক অত্যন্ত দম্ভভরে বলেন, শ্রমিকরা যেভাবে গ্রামে গেছে, সেভাবেই তাদের ফিরে আসতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার দায় বিজিএমইএ নেবে না। রুবানা বলেন, ‘আমরা কারখানা বন্ধ দিলাম লকডাউনের পর। এরপর শ্রমিকরা কীভাবে গ্রামে গেল? যারা যে প্রক্রিয়ায় বাড়িতে গেছে সেই প্রক্রিয়ায় আসবে। কাজ করবে না, আবার হাজিরাও উঠবে এটা তো হতে পারে না। দেশে আইনকানুন তো কিছু আছে।’ 

    জীবিকা বাঁচানোর  তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আবার ঢাকায় ফিরতে শুরু করে।রাস্তায় কোন যানবাহন না পেয়ে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে তারা  ঢাকায় ফিরতে শুরু করেন।দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পায়ে হেঁটে,পণ্যবাহী ফাঁকা ট্রাকে করে,পিক আপ ভ্যানের ফাঁকা তেলের ড্রামের ভিতর লুকিয়ে ফেরি পার হয়ে,ইজিবাইকে চড়ে নৌকায় করে নদী পার হয়ে  কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকায় পৌঁছেন।

    সরকারি নির্দেশনা ভেঙে শ্রমিকদের ভাবে ঢাকায় ফেরত আনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে কারাখানা খোলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয় একইদিনে। তবে ততক্ষণে ঢাকায় পৌঁছা শ্রমিকেরা আবার এক বিপন্নতার মুখে পড়তে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রের পুলিশ-সেনাবাহিনী মাঠে নামে তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে। 

    এদিকে, বিজিএমইএ’র ফেসবুক পেজ থেকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে শ্রমিকদের ঢাকা ফেরত আনার দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়। 

    এভাবেই কাঠামোগত হত্যার সম্ভাব্য শিকার এই প্রত্যেকটা মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নকে একইদিনে দুইবার হুমকিতে ফেলা হলো। প্রথমবার তাদের প্রত্যেককে সম্ভাব্য এক একজন “সোর্স অফ ইনফেকশন‘ বানিয়ে ঢাকায় আসতে বাধ্য করা হলো। দ্বিতীয় ধাপে তীব্র সমালোচনার মুখে তাদেরকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে এবার রাষ্ট্রের লাঠিয়াল বাহিনী নামছে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে ওরা ছুটে আসতে চাইছিলো কারণ না এলে এমনিই মরতে হবে না খেয়ে। অস্তিত্বের নিয়ম মেনে ওরা জীবিকা বাঁচিয়ে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে আসছিলো। 

    সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে শ্রমিকদের জীবনকে এভাবে বিপন্ন করার নেপথ্য কারণ। কারণটা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত পোশাকখাতের প্রণোদনা। গার্মেন্টস মালিকরা সরকারের কাছে চেয়েছিল প্রণোদনা, কিন্তু তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে ঋণ। তাও আবার সেই ঋণের টাকায় শ্রমিকের বেতন দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে, যা তারা দিতে অভ্যস্ত নয়। এই ঋণের টাকা গার্মেন্টস মালিকদের শোধ দিতে হবে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিলেন না গার্মেন্টস মালিকরা। তাই সরকারের কাছ থেকে ফের প্রণোদনা নেওয়ার কৌশল হিসেবে সাধারণ ছুটির মধ্যেও গার্মেন্টস কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গার্মেন্টস মালিকরা। নিঃসন্দেহে এই সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসের সবথেকে শক্তিশালী-কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার। তাদের সেই ক্ষমতা-শক্তি-কর্তৃত্বের সবটাই বিরোধী দমন, খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালা, শ্রমিক কিংবা দিন এনে দিন খাওয়া নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের ওপর নৃশংস ও গণবিরোধী কায়দায় প্রয়োগ হয়। তবে সরকারের কোলে বসে থাকা এই গার্মেন্টস মালিকদের নেতা, কিংবা সরকারকে উপদেশ দেওয়ার ভূমিকায় থাকা শেয়ার বাজারের চোর-বাটপার কিংবা ঋণখেলাপীদের বেলায়? 

    এই ভয়াবহ করোনা বাস্তবতাতেও তাদের দিকে একটুও মানবিক দৃষ্টিতে তাকায়নি আধুনিক দাসমালিক রুবানা হকরা। তাইতো ১৬ এপ্রিল যখন সারাদেশকে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে, তখনও তাদের পাওনা বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করতে হয়েছে। বুধবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে কমপক্ষে ৪০টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন৷ তারা করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই বিক্ষোভ করায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়৷ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা স্লোগান দেন, ‘‘পেটে মোদের ভাত নাই, করোনায় ভয় নাই৷’’ 

    ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ২০১৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৪১ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে  আরও ১০ জনের। এ নিয়ে দেশে আক্রান্তে সংখ্যা ১৫৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ৬০ জনে। এদিকে দেশের বহু স্থানে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সারাদেশকে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। 

    বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ছে না, আমরা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই অনুধাবন করতে পারছি পরিস্তিতি কতো ভয়াবহ। আমাদের দুই লেখকের একজন পেশাগতভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদ তত্ত্বাবধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে নিজ অভিজ্ঞতায় দেখতে বাধ্য হয়েছি, বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতিকে অগ্রাহ্য করা দেশগুলোরই ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রক্ষমতা তার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে করোনা পরিস্থিতি আড়াল করার কাজে। অথচ আমাদের ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার পথটাই হলো স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি উন্মোচনের কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করা।

    বিশ্বব্যাপী করোনা মোকাবিলার স্বীকৃত পথ যেখানে সম্ভাব্য আক্রান্তদের শনাক্ত করে বেশি বেশি টেস্ট করা, আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেখানে শুরু থেকে  ‘পরীক্ষা পরীক্ষা পরীক্ষা‘র পথে না হেঁটে নাটুকে হেল্পলাইন সাজিয়ে রেখে ‘করোনা হয়নি, করোনা হয়নি, করোনা হয়নি‘ করেছে সারাদিন। মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত তারা মোটে ২/৪ হাজার কীট নিয়ে বসে বসে তাঁ দিচ্ছিল। এদিকে ততদিনে আমাদের কারও বুঝতে বাকি নেই, এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে রাষ্ট্রীয় ছুটির আওতায় করোনা বাস-ট্রেন-লঞ্চে করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাস্তবায়নে নিয়োজিত। পরিস্থিতি আড়াল করতে গিয়ে তারা করোনাকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার স্পেস তৈরি করে দিয়েছে এভাবেই।

    আর্টওয়ার্ক: ট্রখ
    সূত্র: দিহাজ লিমাজ

    আইসিডিডিআর হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের নিউস্পিক। তার সঙ্গে বেসরকারি মিডিয়াগুলো যুক্ত হয়ে সরকারের ট্রুথ মিনিস্ট্রির দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের সংবাদ রচনার পদ্ধতি আর ভাষাও তাদের প্রচারণা কৌশলকে বৈধতা দেয়। আমরা কেন লিখি বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত … জন, মৃত্যু …জনের। কার ভরসায় লিখি? আইসিডিডিআর কিংবা সরকার? যারা এখনও পর্যন্ত ২০০০০ মানুষের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেনি? আমরা কেন অন্তত বলি না, ‘সরকারের টেস্টকৃত …টি নমুনা থেকে … জনের করোনা শনাক্ত’? কেন রাষ্ট্রের দেওয়া পরিসংখ্যানকেই আমরা চূড়ান্ত জ্ঞান করি? আমরা ব্রিফ্রিং শুনি। শুনে এসে নিজ নিজ হাউসে বসে তাদের জনসংযোগের কাজ করি। প্রশ্ন করি না। প্রশ্ন তুলি না। ক্ষমতাকে প্রশ্ন না করলে কীসের সাংবাদিকতা? 

    রাষ্ট্রের ম্যানেজারদের কথা-কাজে টের পাওয়া গেছে, তারা করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। মানুষ তাদের প্রতিটি ভূমিকার মধ্য দিয়ে টের পাইয়ে দিচ্ছে, এই রাত্রিকালিন ভোটের সরকারকে তারা একবিন্দুও বিশ্বাস করে না। এক ফোঁটা আস্থাও তাদের নেই সরকারের প্রতি। রাষ্ট্র আড়ালের পথ নিয়েছে। তবে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের বদান্যতায় বাড়ি বসে অফিস করতে পারা আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত সৌভাগ্যবানরা খুব দরকারে রাস্তায় বের হলেই দেখতে বাধ্য হচ্ছে, উৎকণ্ঠা আর মলিন মুখ নিয়ে খালি রিকশা নিয়ে ঘুরছে রিকশাওয়ালা, চোখে অসীম হতাশা নিয়ে ফেরিওয়ালা মৃদু গলায় গাইছে পণ্যের বিজ্ঞাপন। জেনেভা ক্যাম্প থেকে বিহারীরা আজ কাজী নজরুল ইসলাম রোডের উঁচু উঁচু দালান বাড়িগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে সাহায্য চেয়ে গেছে, আমাদের একজন তার প্রত্যক্ষদর্শী। কেবল করোনার বিস্তারকে অবিরত থাকতে দিয়েই নয়, সমাজের প্রিভিলেজড অংশকে ঘরে রেখে; দিনমজুর-বস্তিবাসী-শ্রমিকদের বিপন্নতা রুখতে কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন এই সরকার গোপনে একটি গণমৃত্যুর মিছিল আয়োজন করছে। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই যে প্রান্তিক মানুষ হবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

    সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পেয়েও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সরকার সার্বিক পরিস্থিতিকে আজকের অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। ভয়াবহভাবে বিশ্বের আর সব আক্রান্ত দেশের মতো করে আক্রান্তের সংখ্যা গুনিতক হারে বাড়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্টত পদক্ষেপ ও প্রস্তুতির অভাবের কারণে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এখনও সরকার বলে যাচ্ছে তাদের হাতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা কিট রয়েছে। সব রকম প্রস্তুতি রয়েছে। চিকিৎসাকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় পিপিই আছে। অথচ চিকিৎসাকর্মীরাও ক্রমাগত আক্রান্ত হতে শুরু করেছেন। ১৫ এপ্রিল সিলেটের ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

    ডা. মঈন উদ্দিন কোভিড পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন গত ৫ এপ্রিল। পরের দিনই তাকে সিলেটের শহীদ সামসুদ্দীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু, সেখানে ভেন্টিলেটরসহ আনুষাঙ্গিক সুবিধা না থাকায় স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রতিবাদ, এই চিকিৎসকের আকুতি ও তার পরিবারের  দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৮ এপ্রিল তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরদিনই তাকে নিয়ে আসা হয় সিলেট থেকে ঢাকাতে। ৯ এপ্রিল থেকে প্রথমে আইসিইউ ও পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাকে। আজ ভোরে তিনি মারা যান। তবুও বলা হবে, ডাক্তারদের সবরকম সুরক্ষার ব্যবস্থা করা আছে। তারা সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে কর্তব্য পালনে ভয় পেলে তাদেরকে দাঁড় করানো হবে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায়। কর্তব্যে অবহেলার দায়ে তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এলিট মধ্যবিত্ত শ্রেণী সরকারি প্রচারণার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ডাক্তারদের গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকবে। তবে আমাদের তো ভাবতে হবে, সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া মারণ ভাইরাসের মুখে আপনাকে ঠেলে দিতে চাওয়া হলে আপনি কি যাবেন? যদি না যান, তাহলে ডাক্তারকে কেন যেতে বলবেন? তারা মানুষ নয়? তাদের মৃত্যু নেই?

    ডাক্তারদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা হয়েছে জোরেশোরেই। দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বিদেশ থেকে ডাক্তার আনতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজকে এসে সরকার যখন মৃত্যুর শিকার হওয়া ডাক্তারের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে; তখন  করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের ২৭ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন। এদের মধ্যে একটি হাসপাতালেই সংক্রমিত হয়েছেন ১৬ জন।

    তবুও সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলতেই থাকবে, তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল তাই ডা. মঈনের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘একটা মানুষ একদিন মারা যাবে এটা জেনেই সে বেঁচে থাকে, মানুষ মারা যাবে, যাবেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন অক্ষম হাহাকার আমাদের সবকিছু চুরমার করে দেয়। একজন ডা. মঈন প্রথমে নিজ শহরে একটা ভেন্টিলেটর চেয়েছিলেন, তারপর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছিলেন, তারপর চেয়েছিলেন নিদেনপক্ষে একটা আইইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। আর আমরা ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম’ তার এই চাওয়াগুলোকে অগ্রাহ্য করবার জন্য।’’

    আর্টওয়ার্ক: রেসপন্ডার
    শিল্পী: খালিদ আলবাহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এইযে দেশজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব, সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকায় থাকা মানুষদের কোনও রকমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করা; সেই বাস্তবতা যখন প্রতিদিনের দৃশ্যমান বাস্তব; তখন ১৭ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সে একজন ডাক্তার নারায়ণগঞ্জ জেলার জন্য করোনা পরীক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পিসিআর ল্যাব ও এন-৯৫ মাস্ক চাইলে প্রধানমন্ত্রী অবাক হয়ে যান! তবে তার এই অবাক হয়ে যাওয়া আমাদের অবাক করে না। 

    কেবল সুরক্ষা সামগ্রী না দেওয়াই নয়, অগণতান্ত্রিক এই সরকার করোনা মোকাবিলায় জটিল আমলাতান্ত্রিক পথ-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে। যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করবে, তাদেরকে করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপ নির্ধারণে যুক্তই করা হয়নি। কে না জানে, স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সুরক্ষিত না হয়, তাহলে তাদের জনস্বাস্থ্য গুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। আমরা বিপর্যয়ের চূড়ান্ত বাস্তবতায় গিয়ে হাজির হব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেমন মানুষের মৃত্যুর দায় চীনের ওপরে চাপানোর সুযোগ আছে, আমাদের সরকারেরও সুযোগ আছে দায়টা ডাক্তারদের ওপর চাপানোর। 

    কেবল ডাক্তার নয়, জনগণকে তারা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নিজেদের করোনা মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতির বিপরীত প্রান্তে। এখন সব দায় তাদের। বলা হচ্ছে ঘরে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। এভাবেই করোনাভাইরাসজনিত নতুন পরিস্থিতি আর এ সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ‘স্টে হোম’র পক্ষে বলপ্রয়োগ সম্মতি আদায়ের প্রচেষ্টা চলছে জোরেশোরে। রাষ্ট্র তার চিরাচারিত নিয়মে এখানে ভাইরাসকে জাতীয় শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। আর ব্লেম গেইমের জন্য রেখেছে দেশের আপামর মানুষকে। রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রচারণা যন্ত্রকে ব্যবহার করছে এটা বোঝাতে যে আমাদের বাঁচবার একমাত্র রাস্তা ঘরে থাকা। যারা মানছে না, মানতে চাইছে না তারা জাতীয় শত্রু করোনার দোসর।

    ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি বাস্তবায়নে সরকারের পুলিশ-সেনাবাহিনী কেবল বলপ্রয়োগ আর পেটাপিটিই করছে না। কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার তাদের ফেসবুক পাতায় ঘোষণা দিয়েছেন, কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন, তাহলে তাদেরকে আট ঘণ্টা পুলিশের সাথে বাজারে ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সিলেটের ছাতক উপজেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাউকে যদি কোন কারণ ছাড়াই কাউকে ঘরের বাইরে পাওয়া যায় তাহলে তাকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সেবা এবং এই রোগে মৃত ব্যক্তির দাফন কাজে নিয়োজিত করা হবে। গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লায় কার্যত লকডাউনের এই সময় মানুষকে বাড়িতে থাকার আর্জি জানাতে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ দলবদ্ধ হয়ে গান গেয়ে গেয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

    ‘‘হোম স্টে’ রিয়ালিটি বাস্তবায়নের আরেক পার্টনার করপোরেট মিডিয়া। কোথায় কে কোয়ারেন্টিন ভাঙল, কোথায় মানুষ একটু জটলা করলো, কোথায় ‘হোম স্টে’ সফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তা দেখভাল করার দায়িত্ব নিয়েছে তারাও। ভূমিকা পালন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর আইসিডিডিআর-এর সহযোগী হিসেবে। সংবাদকর্মী স্বয়ং পোস্টার সাটিয়ে ফেসবুকে প্রোফাইল পিক দিচ্ছে ‘আমরা আপনার জন্য সংবাদ পৌঁছে দেব, আপনারা আমার জন্য ঘরে থাকুন’। রয়েছেন সেলিব্রিটিরিাও। অভিনেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিচ্ছেন, স্টে হোম। কাউকে ফোন করলেই ‘দায়িত্বশীল’ আচরণ করার,ঘরে থাকার বার্তা দিচ্ছে গ্রামীন ফোন। বিচ্ছিন্নতার বার্তা প্রচারিত হচ্ছে সর্বত্র। বুদ্ধিজীবী বার্তা দিচ্ছেন, হোম কোয়ারেন্টিন, ‘সামাজিক দূরত্ব’ রক্ষা করার। রাষ্ট্রের গণবিরোধী অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের দায় নিয়ে ঘরে থাকা এখন জনগণের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

    এখন যারা এসব বার্তা দিচ্ছেন, সমাজের সেই সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের জন্য ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি সংকটের না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে ঘরে থাকার ‘কর্তব্য’  পালন সম্ভব হয়ে উঠছে না কোনমতেই। রাষ্ট্র আদতে বড়লোকের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে লকডাউন/কোয়ারেন্টিন বাস্তবায়ন করে। তার ‘হোম স্টে’ রিয়ালিটিতে দেখেন; ফুডপান্ডা ঠিকই খবার সরবরাহ করে বাড়িতে। মধ্যবিত্ত ঠিকই গ্যাস-বিদ্যুতের বিল দেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়। জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা মানে যা জারি থাকে, সেটা মধ্যবিত্তের রিয়ালিটি। এই রিয়ালিটিতে ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা নেই, রাস্তায় বসা মুড়ি বিক্রেতা নেই।লকডাউনে ঢাকায় আটকে পড়া  বস্তিতে থাকা মানুষের ঘর ভাড়া জুটবে কী করে সে আলাপ নেই।  স্মার্টফোন কিংবা ইন্টারনেটবিহীন বিপুল সংখ্যক মানুষ কী করে সরকারি-বেসরকারি ডিজিটাল সেবা নেবে সেই প্রশ্ন নাই। ওদের যদি কেউ অসুস্থ হয়; কী করে খাবার কিনে খাবে নিজে রান্না না করে? ওদের যখন সব্জির দরকার হয় তখন কতোদূর যেতে হয়, সুপারশপে যাওয়ার সামর্থ যাদের নাই।

    আর্টওয়ার্ক: হাঙ্গার
    শিল্পী: তন্ময়
    সূত্র: ফেসবুক

    ক্ষুধার যন্ত্রণা ‘ভিক্ষার অভাব’ পর্যায়ের মতোও দাঁড়িয়েছে কোনকোন ক্ষেত্রে। নওগাঁ শহরে ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবন নির্বাহ করা সাবিয়া বেগমের একটি ছবি ও ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। বিধবা সাবিয়া একসময় মানুষের বাড়িতে কাজ করে খেলেও এই ৭০ বছর বয়সে এসে আর পারেন না। তাই ভিক্ষা করে খান। তবে ভিক্ষারও আকাল পড়েছে। বিহারি কলোনির বাসিন্দা সাবিয়া তাই কলোনির মাঠে একটি টিনের ওপর নষ্ট ভাত শুকাচ্ছেন; সেটা চাল হয়ে গেলে আবার রান্না করে খাবেন।  সংবাদ প্রতিবেদন বলছে, শুধু সাবিয়া বেগম নন, ওই কলোনির প্রায় ২০-২৫টি পরিবারের একই অবস্থায় দিন কাটছে। করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের জীবন ধারণ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

    এরইমধ্যে ব্রাকের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে,   করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে চরম দারিদ্র্য অবস্থা আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে, আর খাবার নেই প্রায় ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে। করোনা জরিপের তথ্য তুলে ধরে ব্র্যাক বলছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণাই নেই জরিপে অংশ নেয়া ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতার।

    ব্র্যাক জানায়, করোনা মহামারিতে সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্বের কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন অথবা তাদের কাজ কমে গেছে। আর ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকলেও এখনও বেতন পাননি। অন্যদিকে মানুষের পারিবারিক আয় ৭৫ শতাংশের মতো কমে এসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ৮৪ শতাংশ, রংপুর ৮১ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগের ৮০ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে সবচেয়ে বেশি। আর করোনা প্রাদুর্ভাবে ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনও খাবারই নেই এবং ২৯ শতাংশের ঘরে আছে ১ থেকে ৩ দিনের খাবার।

    আসলে কোনও গবেষণার দরকার হয় না। আপাত সুরক্ষিত বাসায় অফিস করার সুযোগ সম্বলিত ‘হোম স্টে’ বাস্তবতা হঠাৎই নড়ে ওঠে সিগারেট বা নিত্য প্রয়োজনীয় কোনও জিনিস কিনতে খুব হঠাৎ বের হতে গেলে। মলিন মুখে খালি রিকশা নিয়ে ভয়ে ভয়ে ঘুরছে রিকশাওয়ালা, কখন আবার পুলিশের বাড়ি পড়ে পিঠে। সব্জির ভ্যান নিয়ে ক্লান্ত বিক্রেতা সস্তায় কেনার জন্য উচুঁ তলার মানুষের জন্য ডাক হাঁকছে। এরইমধ্যে কয়েকজন আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে মৃত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে অঙ্কে। প্রবল সব খবরের ভীড়ে তারা হারিয়ে গেছে অগুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে। ক্ষুধার্ত মানুষ এক একজন সম্ভাব্য জীবাণু বাহক কিংবা আক্রান্ত হতে দ্বিধা না করে রাস্তায় নেমেছে মিছিল নিয়ে। রাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি হয়েও সংবাদমাধ্যম ক্ষুধার খবর দিতে বাধ্য হচ্ছে।  

    করোনাকালে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁতশ্রমিক আলম শেখের কারখানা। ক্ষুধায় কাতর শিশু বারবার খাবার চাইছিল তার কাছে। জোটাতে পারেননি বাবা আলম। খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকা সন্তানকে এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ধমক দেন । শিশুটি আত্মহত্যা করে।  কেবল শিশু নয় আত্মহত্যা করেছেন এক বৃদ্ধও। 

    রামপুরার একটি বস্তি এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা আক্তার বাসাবাড়ির কাজ হারিয়েছেন, পরিবহন শ্রমিক স্বামীও বেকার। খাবারই জুটতে চাইছে না। শিশু সন্তানের দুধ কী করে জোটাবেন, তা নিয়ে শঙ্কিত। বিবিসিকে ওই নারী বলেন, “আমরা তো কারো কাছে হাত পাততে পারি না। স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই এখন ঘরে বসা। কাজ নাই। আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। সরকার যদি সাহায্য না করে তাহলে বাঁচার কোন কায়দা নাই। আমরা খুবই কষ্টে আছি।” তিনি বলছেন, এখন প্রতিদিন ডাল-ভাতই তাদের প্রধান খাবার। সেটাও দুইবেলা জোটে না। “বাচ্চারা আর ডাইল-ভাত খাইতে চায় না। ছোট বাচ্চাটার দুধের টাকা নাই। এইজন্যে ডাবল করে পানি মিশায় খাওয়াইতেছি। আমি তো মা। এই দুঃখ কই রাখি!“

    বিবিসি তাদের ওই প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঢাকা শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এরকম অভাবী মানুষের ভীড় । “এইভাবে আর কতদিন চলবো, কতদিন থাকবে, আগের মতোন কবে হবে সেইটাই এখন টেনশন। টিভিতে দেখাইতেছে সরকারিভাবে নাকি বাসায় বাসায় দিয়া যায় চাউল-ডাল, আমাদের এইখানে তো কিছুই দিয়া যায় নাই।” মানিক মিয়া এভিনিউ‘তে রিকশাচালক মোকসেদুল ইসলাম বলছিলেন, ঘরে খাবার না থাকায় পাঁচ দিন পর রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তিনি। “যেইখানে যাই সেইখানেই পুলিশের দৌড়ানি। ধানমন্ডি ২৭ রোডে গেছি, মাইরও খাইছি। পরে আইসা পড়লাম। কি করমু? পেটে ভাত নাই। রিকশা চালায়া তো ভাত খাই। সংসার চালাইতে হইবো না?” বিবিসিকে এটুকু বলার পরই ফুপিয়ে কেঁদে উঠেন মোকসেদুল।

    সেই কান্না আর্তনাদ হয়ে আকাশে মিলিয়ে যায়। নিষ্প্রাণ রাষ্ট্রযন্ত্র ওই কান্না শুনতে পায় না। ‘হোম স্টে’ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে খেদিয়ে মানুষকে ঘরে পাঠাতে। কে খেতে পেল, কার ঘরে চাল নাই শোনার কিংবা চিন্তা করার সময়তো তাকে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র এমনই গণবিরোধী। তার বিরোধিতা, তার বৈরিতা সবথেকে বেশি প্রান্তিকের প্রতি। যার অর্থনৈতিক অবস্থান যত বেশি নিচে, রাষ্ট্র তাকে তত বেশি নিপীড়ন করে।  তবে নিপীড়ন সবসময় প্রতিরোধহীন হয় না। মানুষ তাই প্রতিবাদী হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: করোনা শাসকতা
    শিল্পী: সারশু
    সূত্র: অরাজ

    যারা আরও বেশি প্রান্তিক, তাদের পরিস্থিতি নিশ্চয় আরও ভয়াবহ।  ডেইলি স্টার খবর দেয়,  ‘বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম কাপ্রু পাড়ার পেক্রু ম্রো ও তার পরিবার গত কিছুদিন ধরে বাড়িতে খাবার না থাকায় বুনো আলু খেয়ে বেঁচে আছেন। কেবল পেক্রুর পরিবারই নয়, কাপ্রু পাড়ার ৫০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩০টি পরিবারের ঘরে খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক সঙ্কটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন বলে জানান, কাপ্রু পাড়া প্রধান (স্থানীয় ভাষায় কারবারি) ইন চং ম্রো।‘ সমকাল পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফুলবাড়িয়ার তিনশ কোচ-বর্মণ পরিবারের খাদ্য সংকটের কথা। একজন বলেন, ‘জীবনে কোনোদিন এমন দিন দেহি নাই দাদা। বিলের মাছ বাজারে বেচতে না পাইরা চালে হুকনা দিছি। ঘরে চাইল নাই, মেয়ারে এক মাস হইলো হুদা সুজি খাওয়াই পালতাছি। নিজেরা এক-আধবেলা না খায়া থাকতে পারি, কিন্তু বাচ্চাটার এই কষ্ট কত সহ্য করন যায়। মেয়ের বাপ সারাদিন কাম খোঁজে। অহন কিয়ের করুনা নাকি, হেইডার লাইগা কেউ কাজ দেয় না।‘ কষ্টে আছে হিজড়া সম্প্রদায়। তাদের আর্তনাদ ‘‘আমাদের কেউ খোঁজ নেয়নি। একটা দোকান করে দিয়েছিলেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। সেটিও বন্ধ রয়েছে। কবে খুলবো, তাও কেউ কিছু বলছে না। বাসায় যে সদাই ছিল তাও শেষ। আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে একজন নারী অল্প কিছু চাল দিয়ে গেছেন। সেটাই রান্না করে খাবো। আমাদের দেখার কেউ নেই।’

    আমরা যতটুকু বললাম, সেটা নিশ্চয় একটা বড় সামগ্রিকতার এক ক্ষুদ্রাংশ। বেশিরভাগ ক্ষুধাই নিশ্চয় খবর হয় না। আর এখানে তো মাত্র কয়েকটা খবর আলাপে এসেছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার অপরিহার্যতা উপেক্ষা করে মানুষ তাই ক্ষুধামুক্ত হতে রাস্তায় নামে। রাস্তায় নামে স্রেফ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। বিবিসি খবর লেখে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে অভাবী মানুষের ভীড়। ঢাকা শহরে কিছুক্ষণ ঘুরলেই মোড়ে মোড়ে কিংবা রাস্তার ধারে অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে, যারা মূলতঃ খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে এসেছেন পথে। লাজ-লজ্জা, করোনা আতংক সবকিছু ছাপিয়ে ক্ষুধা নিবারণই এখন তাদের কাছে মূখ্য বিষয়। ত্রাণের গাড়ি দেখলেই তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্ষুধার্ত মানুষ। মিরপুর এলাকায় এরকমই একজন বলছিলেন, “পরপর তিনদিন রাস্তায় দাঁড়াইলাম, কেউতো দেয় না। বাড়িতেও দেয় না, রাস্তাতেও পাই না। তাইলে চলমু ক্যামনে? যারা ভোট দিছে, মিছিল করছে তারাই পাইতেছে। আমরা এইখানকার ভোটার না। আমার নামও নাই লিস্টে। কিছুই পাই নাই।” 

    আমরা নিশ্চয় খেয়াল করলেই টের পাই, যাদের শ্রমের বড় অংশটা শোষণ করে বিত্তবৈভব, তাদেরকে শোষিত সেই শ্রমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার ভান করে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে ত্রাণ দেওয়া বলে। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রাণ বণ্টনের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। তাই লকডাউন উপেক্ষা করে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে নারায়ণগঞ্জেও। ‘ আমাগো কাছ থাইকা ভোটার কার্ডেও ফটোকপি নিছে, কিন্তু আমাগো এহন পর্যন্ত কোনো খাওন দেয় নাই। চাইতে গেছি কয় নাই শেষ হইয়া গেছে। আমরা এহন কই যামু। আমাগো সরকারের কাছে প্রার্থনা আমরা বাঁচার মতন বাঁচতে চাই। নেতাকর্মীরা সব খাইয়া লায়। খাওন না দিলে আমরা এ লকডাউন মানি না”- লকডাউন নারায়ণগঞ্জে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভে যোগ দিয়ে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন এক নারী।  কাশিপুর এলাকার দিনমজুর বাসেদ মোল্লা বলেন, “কাজ না থাকায় কোনো আয় নেই, ঘরে খাবারও নেই। সরকার তো বলছে আমাগো ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছায় দিব। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা ভোটার লিস্টও নিয়া গেছে কিন্তু আমাগো কাছে তো খাবার পৌঁছায় দেয় নাই। এমনকি একটা খবর নেয় নাই যে আমরা বাঁইচা আছি নাকি মইরা গেছি। আবার আমাগো বাসায় আটকাইয়া রাখছে।”

    ঢাকা আর তার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের মতো স্থানের ক্ষুধার খবর তাও খানিকটা পাওয়া যায়। গ্রামের খবর, এমনকী জেলাশহরগুলোর খবরও তেমন করে সংবাদ হয় না। কেননা তাদের জন্য বরাদ্দ ‘মফস্বল ডেস্ক’ কিংবা ‘ন্যাশনাল নিউজ’ নামের কম প্রায়োরিটির প্লেস। তো যে অর্থনীতি আর উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে ‘ভোট চুরি’র বাস্তবতা আড়াল করা হয়, যে ‘জিডিপি’ নিয়ে গর্ব করা হয়; তার চেহারাটা এমন ক্যান হয়? এক মাসেরও কম সময়ের অচলাবস্থা সামাল দিতে পারে না? মানুষের পক্ষের অর্থনীতিবিদরা তাই যথার্থই এই জিডিপিকে ভুয়া বলেন। এই জিডিপির নেপথ্য কারিগর হিসেবে বিদেশি শ্রমিকরা মানবিক কোয়ারেন্টিনের সুযোগ পাননি, তাই তারা পালিয়েছে, ক্ষুব্ধ হয়েছে। এই জিডিপির নেপথ্য কারিগর গার্মেন্টের লাখ লাখ শ্রমিক ভয়াবহ ভঙ্গুর অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। সৃষ্টি হয় বেশকিছু বিলিওনারই। সেই চাকচিক্য এখন কোথায়? কোনটা তবে গুজব? দৃশ্যমান ক্ষুধা নাকি প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গালগল্প?

    আর্টওয়ার্ক: স্টে হোম
    শিল্পী: আদনান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প দিয়েই আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির বারোটা বাজানো হচ্ছে প্রতিদিন। প্রধানমন্ত্রী একদিকে কৃষি জমি রক্ষার কথা বলছেন, আরেকদিকে সেইসব জমি নষ্ট করে তোলা হচ্ছে উন্নয়নের ঢেউ। কথিত উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির আলাপকে  ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তার সহযোগী জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের ক্ষমতাপক্ষীয় বুদ্ধিজীবীরা ‘ভারি আলাপ’ ও সাধারণের বোধগম্যতার বাইরের জিনিস হিসেবে হাজির রাখতে চাইলেও আজকে এসে কি তা আর সম্ভব হচ্ছে? যখন উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির পোশাকের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা? যখন কিনা দৃশ্যমান বাস্তব: রাজা তুমি ল্যাংটা?

    আমরা অর্থনীতির ছাত্র নই। তবে সাধারণভাবে মানুষের ওপর অর্থনীতির অভিঘাত বোঝার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞানকে আমি অপরিহার্য মনে করি না। তাই এটা টের পেতে কোনও সমস্যা হয় না, নব্য উদারবাদী অর্থনীতির প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের যে কথিত উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প এতোদিন ধরে চালিয়ে আসা হচ্ছে, অর্থশাস্ত্রে তার গুরুত্ব থাকলেও (আছে কিনা, আমার ঠিকঠাক জানা নেই) সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে তা নেই। এই অর্থনীতির শেকড় কি? নদী বিলীন করে, বন উজাড় করে, বাতাস দূষিত করে যে উন্নয়ন আমরা কিনছি প্রতিদিন রাষ্ট্রকে দেওয়া আমাদের ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকার বিনিময়ে? সরকারের মেগা মেগা সব সব প্রজেক্টের জন্য বিদেশি ঋণের প্রবাহ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তোয়াক্কা না করে বিলিওনার তৈরি, গার্মেন্টস এর লাখ লাখ কর্মীর সীমাহীন দুর্ভোগের জীবনের বিপরীতে ফুলেফেপে ওঠা মালিকদের দিয়ে বানানো প্রবৃদ্ধি দিয়ে আমরা কী করব; যখন সংখ্যাগিরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন কয়েকটা দিনের ধকল নিতে সমর্থ নয়? বহিরাঙ্গে চাকচিক্যে ভরা এই অর্থনীতির আড়ালে চাপা পড়ে ছিল স্রেফ মাটির সঙ্গে সংলগ্নতার কারণে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখা কৃষক, গার্মেন্টস-এর শ্রমিক, হকারসহ ও ভাসমান জীবিকার নিম্ন আয়ের মানুষেরা। কয়েকদিনের অচলাবস্থায় আড়াল ভেঙে তারা বের হয়ে এসেছে। প্রান্তিক এলাকায় পরিস্থিতি নিশ্চয় আরও ভয়াবহ। তার খোঁজখবর মেলা বেশ কঠিনই। কারণ সংবাদমাধ্যমের আলো প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছায় না সচারাচর। 

    গার্মেন্টস শ্রমিক ছাড়া সমাজের নিচুতলার আর কারও জন্য সরকারের কোনও প্রণোদনা নেই। কৃষকদের জন্য যে ঋণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে; তা কাজে আসবে বলে বিশ্বাস করার মতো কোনও বাস্তব পরিস্থিতি নাই। তাদের জন্য আছে কেবল ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি। এই রিয়ালিটির মধ্যে সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের পাণ্ডারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারের কম মূল্যের চাল নিয়ে। চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে সব। সরকার এতোদিন ক্ষমতায়, বড় নেতারা কত কত খায়, তাদেরতো বেশি খাওয়ার সুযোগ নাই। তাই তারা চাল খায়। চাল চুরির অভিনব সব ঘটনা নিত্যদিন খবর হচ্ছে। ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার কেড়ে খাওয়া রাজনীতিকরা নাকি জনপ্রতিনিধি!!!  তবে এদের বিরুদ্ধে দ্রুততর পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপের বদলে আইনপ্রণেতারা তাদের জামিন করানোর চেষ্টা করছে সঙ্গত কারণেই। আর সরকারের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে কথিত ‘গুজব’ ঠ্যাকানোর পদক্ষেপ। 

    করোনা নামের মহামারি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ‘হোম স্টে রিয়ালিটির’ পক্ষে সম্মতির পাশাপাশি র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়ে রাস্তায় বের হতে বাধ্য হওয়া মানুষকে সাইজ করার দমনমূলক পদ্ধতি জারি করেছে সরকার‍। দমনের বিরুদ্ধে ভিন্নমতকে রুখে দিতে নেওয়া হয়েছে কথিত ‘গুজব ঠেকানোর পদক্ষেপ’। করোনার ছড়িয়ে পড়া নিয়ে, মানুষের ক্ষুধা নিয়ে ততোটা চিন্তিত নয় সরকার, যতোটা চিন্তিত গুজব ঠেকানো নিয়ে। ‘

    আর্টওয়ার্ক: ভাত দিবার পারে না, কিল মারা যম
    শিল্পী: হেলাল সম্রাট
    সূত্র: ফেসবুক

    রাষ্ট্রের ভীতি ছড়ানোর হাতিয়ার ও সহযোগী হিসেবে মিডিয়া এরইমধ্যে খবর দিয়েছে,  করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে অকারণে ঘোরা-ফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও র‍্যাব রাজধানী জুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরো জোরদার করেছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে যেকোনো ধরনের গুজব প্রতিরোধে আরো কঠোর হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য সঠিক কিনা তা যাচাই না করে অর্থাৎ না বুঝে লাইক শেয়ার দিলে তাকে গ্রেপ্তার করবে র‍্যাব ও পুলিশের সাইবার ইউনিট।

    সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল অভিযোগ করেছেন, যে তার লেখালেখির কারণে বাংলাদেশে একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে ‘ভয়ভীতি প্রদর্শন‘ করেছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর তিনজন সদস্য বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটে তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে নানা বিষয়ে বিশেষ করে তার লেখালেখির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। “প্রথমে তারা আমার মায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং পরে সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজকর্ম সম্পর্কেও জানতে চান। তারা তাকে বলেন আমি যা করছি সেটা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।“

    বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা সংক্রান্ত গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দুই সপ্তাহে প্রায় ৫০ জন আটক হয়েছে। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই অভিযানের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়। এই সংগঠনের একজন মুখপাত্র মিনাক্ষী গাঙ্গুলী মনে করেন, গুজব বিরোধী অভিযানের নামে করোনা পরিস্থি নিয়ে সরকারের সমালোচকদেরই বেশি আটক করা হচ্ছে। “ভুয়া তথ্য যেনো না ছড়ানো হয়, সেটা সরকার ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমরা দেখছি, যারা সরকারের নিন্দা করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ফেক নিউজ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাদেরকেই টার্গেট করা হচ্ছে।” মিনাক্ষী গাঙ্গুলী তার বক্তব্যে সমর্থনে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক তাসনীম খলিলী যেহেতু সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমারোচনা করেন, সেজন্য বাংলাদেশে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন গিয়ে শাসিয়েছে। এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমালোচনা করেন, এমন দু‘জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাদের ইতিমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে।

    এভাবেই এককটি সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতার মধ্যে নির্মিত হচ্ছে আমাদের ভয়াবহ ভবিষ্যত। যেখানে আমাদের গন্তব্য অজানা। মহামারির সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গণবিরোধিতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে মানুষকে; এটা অবাক করার মতো বিষয় নয়, বরং এটাই রাষ্ট্র আর মানুষের সম্পর্কসূত্র। এই সম্পর্কে একের অবস্থান অন্যের বিপরীতে। আসলে অখণ্ড মানুষকে কাঁটাতারে আটকে রাখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়পত্রে আপাতত পৃথক করা যায়। তবে তার অখণ্ড সত্তা বিলীন করা যায় না। স্বাস্থ্য প্রশ্নও তাই রাষ্ট্রের বেধে দেওয়া ‘সামাজিক দূরত্বের’ ছকে ফেলে বিবেচনা করা যায় না। আপাত শারীরিকে দূরত্বের প্রশ্ন হলেও আমাদের প্রত্যেকের সুরক্ষা প্রত্যেকের ওপর নির্ভর করে। আর আমাদের সবার সুরক্ষা নির্ভর করে প্রকৃতির ভারসাম্যের ওপর। আমাদের বাস্তুপ্রক্রিয়া আর জলবায়ুর ওপর। মানুষকে পারা গেলেও এইসব জিনিসকে কাটাতার আর জাতিরাষ্ট্রের সীমানায় ভাগ করা যায়নি। পাহাড়-পর্বত-বাতাস-নদী-আকাশকে জাতিরাষ্ট্র সীমানাভূক্ত করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। স্রোতস্বী এক দেশ পেরিয়ে আরেক দেশে গেছে। পাহাড় ছাড়িয়েছে সীমানা। বাতাস মিশছে পূব থেকে পশ্চিমে। নির্বিশেষ আক্রমণের মধ্য দিয়ে করোনা এসেছে সমগ্র মানুষের প্রতি আঘাত হয়ে। আর সামগ্রিক মানুষের প্রশ্ন বিবেচনায় নিতে গেলে আমাদের প্রকৃতির কথা না ভেবে উপায়ই নেই। প্রকৃতিকে উত্তেজিত করে আমরা বাঁচতে পারব না।  

    এই লেখা চলমান থাকা অবস্থাতেই অ্যামাজনের আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে করোনা সংক্রমণের খবর পড়তে হলো । প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা এই আদিবাসীরাই পৃথিবীটাকে কোনও রকমে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই জনগোষ্ঠীর প্রতি একজন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পৃথিবীর আয়ু এক হাজার বছর করে কমে যায় বলে আমার ধারণা। ঐতিহাসিকভাবেই ‘জার্ম’ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছে ওরা। তাই ‘সভ্য‘দের মতো করে জীবাণু প্রতিরোধের সক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি তাদের। এখন নির্বিচারে ওরা মরতে থাকলে তো পৃথিবীটা ধ্বংস হতে ৫০ বছরও লাগবে না! আমি বিশ্বাস করতে চাই,তা হবে না। পরিস্থিতি যতোই অপরিচিত হোক, লোকায়ত বিজ্ঞানের বোঝাপড়ায় ওরা মৃত্যু প্রতিরোধে সক্ষম হবে। তবে বিশ্বাস সব সময় বাস্তব হয় না।

    সভ্য দুনিয়ার কোনও সভ্য মানুষ পবিত্রভূমি জঙ্গলে ওই ভাইরাস বয়ে নিয়ে গেছে! বনখেকো কোনও সভ্য ক্ষমতাশালী?? [কারা নিয়ে গেছে করোনা] আমাজনে খনিজের জন্য অনুসন্ধান চালানো খনি শ্রমিক হয়তো মুনাফা আর ভোগ লালসার আগুনের উত্তাপে গলতে থাকা বরফের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে এই ভাইরাস; যা গলে যাওয়ার পেছনে ওদের কোনও ভূমিকা নাই। ওরা বরং সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য লড়াই করে, শহীদও হয়। সোসিও এনভায়রনমেন্টাল ইনস্টিটিউট (আইএসএ) আন্দাজ করছে, খনি শ্রমিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশের মাধ্যমে অরণ্যের ভিতরে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস। নৃবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ব্রাজিলের সাড়ে আট লাখ আদিবাসী মানুষের জীবন সংশয় ঘটাতে পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। 

    সুতরাং ভাবুন এবার, করোনাকে কী করে নিছক একটা প্রাকৃতিক রোগবালাই হিসেবে দেখবেন? কেমন করে আড়াল করবেন, এটা রাষ্ট্রযন্ত্র, এর স্বৈরতন্ত্রী সরকার আর পুঁজিবাদী বাজার-ব্যবস্থার যৌথ উদ্যোগে ডেকে আনা এক গণ-হন্তারক, যা তাদেরকেও ছাড়ছে না!

    আর্টওয়ার্ক: করোনা শাসকতা-২
    শিল্পী: সারশু
    সূত্র: অরাজ

    শুরুতে বলেছিলাম, এই ভাইরাস আক্রমণ করেছে মনুষ্যপ্রজাতিকে। ভাইরাস মোকাবিলার প্রশ্নটা তাই কোনভাবেই বাংলাদেশের আর আমেরিকার আলাদা করে মোকাবিলার প্রশ্ন নয়। এটা ধনী-গরীব, হিন্দু মুসলমান কিংবা পাহাড়ি বাঙালি আকারে বোঝার প্রশ্ন নয়। এতো এত বিপর্যয়ের আলাপ করলাম; এর বাইরে এসে দেখতে পাই; চেনাজানা ইতিহাসের দুর্লভ ঘটনা হিসেবে এই ভাইরাস আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট করে সামনে এনেছে আমাদের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে। হিমবাহের বরফ একটু একটু গলছে আর আমাদের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্ন মীমাংসার সুযোগ ফুরিয়ে আসছে। তবে সেটার ধীর গতি, দূরবর্তী বাস্তবতা তাকে এখনকার মতো করে সামনে আনতে পারে না, করোনাভাইরস যেভাবে পেরেছে। প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান বাস্তবতায় হাজির করেছে এই ভাইরাস। করোনা সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতির প্রতি আঘাত হয়ে বিশ্বমানুষকে প্রকৃতি সংলগ্লতার বার্তা দিতে এসেছে যেন। আবার ঘরে থাকো কিংবা হোম কোয়ারেন্টিন জাতীয় প্রপঞ্চের সাপেক্ষে বাড়তে পারে সর্বাত্মক নজরদারির পরিসর। রাশিয়া এরইমধ্যে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতে প্রাযুক্তিক নজরদারিকে সর্বাত্মক করেছে। অ্যাপল-গুগলরা করোনা রোগীর অবস্থান শনাক্তের প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত। সবমিলে করোনা সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতাকে নিরঙ্কুশ করার শর্তও হাজির করেছে শাসকদের জন্য। 

    আমাদের বাংলাদেশের পরিসরে নিজেদের অস্বিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনে সুন্দরবনের ক্ষতির কথা গুরুত্ব পায় না, সেই রাষ্ট্র আর তার উন্নয়নবাদকে আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেব কিনা। প্ল্যাস্টিক-কোক বোতল-উচু দালানের মতো মৃত বুড়িগঙ্গার বিনিময়ে আমরা উন্নয়ন গিলব কিনা। আমাদের ভাবতে হবে, যে প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় অচলাবস্থার সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ১ মাসের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গালগল্প আমরা জীবনভর শুনে যেতে রাজি কিনা। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, যে সরকারকাঠামো আর রাষ্ট্রব্যবস্থা মুষ্টিমেয়ের স্বার্থ রক্ষিত হয়, বাদবাকী মানুষের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তা আমরা সারাজীবন বহন করতে চাই কিনা। আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে, যে রাষ্ট্রকাঠামো সর্বাত্মক নজরদারি ও দমনমূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাবতীয় ভিন্নমতকে দমনের ক্ষেত্রভূমি, আমরা তাকে অবিরত থাকতে দেব কিনা। এইসব প্রশ্ন না তুলতে পারলে আগামীর পৃথিবী ভয়াবহ হতে পারে।

  • দুঃখিত, সবাই ভ্যাকসিন পাবে– এমন নিশ্চয়তা নেই

    দুঃখিত, সবাই ভ্যাকসিন পাবে– এমন নিশ্চয়তা নেই

    • আলতাফ পারভেজ

    বিশ্বে ভ্যাকসিন বাজারের আকার ন্যূনপক্ষে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। গত দু’দশকে এটা ছয় গুণ বেড়েছে। রোগশোক, আতংক, মৃত্যুভয় বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের মহা প্রাণভোমরাই বটে। (more…)

  • আলাঁ বাদিয়্যু।। বৈশ্বিক মহামারী পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

    আলাঁ বাদিয়্যু।। বৈশ্বিক মহামারী পরিস্থিতি প্রসঙ্গে

    • অনুবাদ: শাহারিয়ার জিম

    ভূমিকা

    আঁলা বাদিয়্যু প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক। করোনা ভাইরাস মহামারী প্রসঙ্গে বাদিয়্যু’র বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে verso -তে On the Epidemic Situation শিরোনামে।বাদিয়্যু’র লেখাটির ইংরেজি অনুবাদক আলবার্তো তসকানো। তসকানো বাদিয়্যু’র বই ও অন্যান্য লেখাজোঁখা নিয়মিত অনুবাদ করেন। গত ২৩ শে মার্চে এই ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তসকানোকৃত ইংরেজি অনুবাদ থেকে এখানে বাংলা ভাষায় বাদিয়্যু’র লেখাটির অনুবাদ করেছেন শাহারিয়ার জিম। বোধিচিত্তর সৌজন্যে প্রকাশ করা হল।

    আলাঁ বাদিয়্যু

    মূল রচনা

    শুরু থেকে আমার কাছে মনে হচ্ছিল বর্তমানে এই ভাইরাসজনিত মহামারী বিশেষ কোনো ব্যতিক্রম পরিস্থিতি না। এইডস’সহ আরও অন্যান্য জীবাণু যেমন এভিয়ান ফ্লু, ইবোলা ভাইরাস এবং সার্স-১ ভাইরাস, এমনকি নতুন ধরনের যক্ষ্মা ও হাম ধরনের রোগ, এগুলো বর্তমানে আর অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দমন করা সম্ভব হয় না- আমরা এও জানি যে, বর্তমানে চিকিৎসাব্যবস্থা ও ভ্যাক্সিনেশনের ব্যাপারে বৈশ্বিক বাজারের অবহেলা এবং বৈশ্বিক শৃঙ্খলার অভাব, এই দুই কারণে অবধারিতভাবেই গুরুতর এবং বিধ্বংসী মহামারী রূপ নেয় (যেমন এইডসের ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু)। এছাড়াও বর্তমানের মহামারী পরিস্থিতি পশ্চিমা তথাকথিত আরামের জীবনকে ব্যাহত করছে এমন বিলাপও শোনা যাচ্ছে যা কোনো নতুন তাৎপর্য বহন করে না। বরং এটি একটি অনিশ্চিত আর্তনাদের মতই যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নির্বুদ্ধিতা বৈ আর কিছুই না। ভাইরাস প্রতিরোধের পূর্বপ্রস্তুতি এবং ভাইরাস যাতে আর নতুন কাউকে সংক্রমণ করার মত না পায়, এমন কোনও পদ্ধতি গ্রহণ করা হলেও অন্তত নৈতিকতার প্রশ্নে একটি বিশেষ অবস্থান পাওয়া যেত।

    বর্তমান মহামারীর নামের দিকে তাকালেও আমরা বুঝতে পারি যে এটা নতুন কোনও পরিস্থিতি নয়। সার্স-২ বা Severe Acute Respiratory Syndrome 2 নামটিই ইঙ্গিত করে যে এই ভাইরাসের দ্বিতীয়বারের মত আবির্ভাব ঘটেছে। এর পূর্বেও সার্স-১ ভাইরাসের আক্রমণ ঘটে ২০০৩ সালের বসন্তকালে। সেসময়ে এটিই ছিল ‘একবিংশ শতাব্দীর প্রথম অজ্ঞাতরোগ’। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে বর্তমানের মহামারী কোনো অর্থেই একেবারে আমূল নতুন কিছুর আবির্ভাব নয়। এর আগেও একই জাতের ভাইরাস আমরা এই শতাব্দীতেই দেখেছি এবং তারই বংশধর এটি। এরকম পরিস্থিতিতে এটাই বলা যায়, সার্স-১ এর আবির্ভাবের পর চিকিৎসাক্ষেত্রে যথাযথ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করা হয়নি যাতে করে এমন ভাইরাসের (সার্স-২) আবার আবির্ভাব ঘটলে সেটিকে মোকাবেলা করা যায়।

    আর্টওয়ার্ক: পাসওভার
    শিল্পী: পেড্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তো এই সময়ে সবার মতই বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বসে থাকার চেষ্টা করা এবং সবাইকে একই পদ্ধতি অবলম্বন করার কথা বলা ছাড়া আমার আর কিছু করার আছে বলে মনে হয়নি। ভাইরাস থেকে বাঁচাতে কাজ করা সুরক্ষাকর্মী যেমন মেডিকেল স্টাফ, শৃঙ্খলাকর্মী যারা একেবারে সামনের কাতারে এই ভাইরাসের মুখোমুখি তাদেরও যথাযথা নিরাপত্তা এবং যথাযথ শৃঙ্খলাপ্রদানের ব্যবস্থা করাটাও জরুরী। এছাড়াও সংক্রমিত রোগীদের পাশাপাশি যারা এই ভাইরাসের আক্রমণে সবথেকে ঝুঁকির মুখে যেমন বৃদ্ধবয়সের লোকজন এবং মহামারীর আতঙ্ক নিয়েও কাজে যেতে হয় যাদের, তাদের চিকিৎসার নিশ্চিত ব্যবস্থা রাখাও অত্যাবশ্যক। ‘বাড়িতে থাকুন’ ধরনের সতর্কবার্তা দেয়ার আগে এটিও ভাবা উচিত যে, যাদের থাকার বাসস্থানই নেই তারা কোথায় থাকবে, তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থার কথাটিও ভাবা দরকার। এক্ষেত্রে হোটেলগুলোতে সাময়িক বাসস্থানের ব্যবস্থাও করা যেত।

    এটা সত্য যে এই ধরনের দায়িত্বগুলো অন্তত প্রাথমিক অবস্থায় খুব দ্রুতই অত্যন্ত দরকারি হয়ে পড়েছে, কিন্তু এগুলোর ব্যবস্থা করতে খুব বেশি বিশ্লেষণী মাথা কিংবা নতুন ধরনের চিন্তা করার দরকার পড়ে না।

    আমরা এখন যে পরিস্থিতিতে আছি এমন একটি সোজাসাপ্টা পরিস্থিতি নিয়ে আমার আশেপাশের মহলগুলোয় অনেক ধরনের আলাপ আলোচনা শুনছি এবং পড়ছি। এই সোজাসাপ্টা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের বোঝাপড়ার অক্ষমতা আমার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এক প্রকার অসন্তোষ এবং ধাঁধার জন্ম দিয়েছে।

    এসব দৃঢ় বিবৃতি, করুণ আবেদন এবং জোরালো দোষারোপ বিভিন্ন রূপধারণ করে, তবে এগুলো সবই বর্তমান মহামারী পরিস্থিতির সারল্য এবং নতুনত্বের ব্যাপারটিকে এমনভাবে উপেক্ষা করছে যা কৌতুহলের উদ্রেককারী। কেউ কেউ ক্ষমতার সামনে অপ্রয়োজনীয়ভাবেই নতজানু এবং তারা বর্তমানে সেই কর্মকান্ডগুলোই করছে যেগুলো করতে তাদের এই দুর্বলতা বাধ্য করে। বাকিরা পৃথিবী এবং এর সম্পর্কিত কিছু অতীন্দ্রিয়বাদী ঘটনার সাথে তুলনা করছে সেটিও কোনও কাজের নয়। কেউ কেউ আবার সব দোষ অভাগা ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাকরনের উপর চাপাচ্ছে, যদিও একজন রাষ্ট্রপ্রধান যুদ্ধ কিংবা দুর্যোগের সময় যা করে থাকে, তাই করছে ম্যাকরন স্বাভাবিকভাবে। অনেকে আবার এই সময়ে এমন এক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে যা এখন পর্যন্ত নজিরবিহীন এবং এই ভাইরাস মোকাবেলায় বর্তমানে যার কোনও তাৎপর্য নেই, ফলশ্রুতিতে এই ভাইরাস ঠেকাতে নতুন কোনো উদ্যোগ বা চিন্তার লক্ষণ নেই ‘বিপ্লবীদের’ মধ্যেও। কেউ কেউ আবার এটিকে কেয়ামতের লক্ষণ ভেবে হতাশায় পর্যবসিত হচ্ছে। আর বাকিরা সমসাময়িক মতাদর্শ অনুযায়ী ‘আমি আগে’ ধাঁচের ‘সুবর্ণমন্ত্র’ অবলম্বন করছে, এবং এই মন্ত্রও আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিষ্টই ডেকে আনে জোরালোভাবে।

    মহামারীর চ্যালেঞ্জে মনে হচ্ছে সব জায়গাতেই যুক্তিবুদ্ধির কার্যক্ষমতা ভেঙ্গে পড়েছে, যার কারণে মধ্যযুগীয় প্লেগের সময় যেমন মানুষের মধ্যে এক ধরনের অতীন্দ্রিয়বাদ, প্রার্থনা এবং দৈববাণীসংক্রান্ত কর্মকান্ড বেড়ে যেত ঠিক তেমনটাই দেখা যাচ্ছে বর্তমান সময়েও। সুতরাং এই সোজাসাপ্টা বিষয়গুলো নিয়ে একসাথে কিছু আলোচনা করার তাড়নাবোধ করছি। এই আলোচনায় আমি কোনো সংকোচ ছাড়াই কার্তেসীয় পদ্ধতি অবলম্বন করবো।

    যেহেতু অন্যান্য আলোচনায় সমস্যাটির সংজ্ঞায়ন এবং বোঝাপড়া বেশ নাজুক, তাই প্রথমেই সমস্যাটির সংজ্ঞায়ন দিয়ে শুরু করা যাক।

    যেকোন মহামারী সবসময়েই প্রাকৃতিক এবং সামাজিক কিছু উপাদানের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে, যার ফলে ব্যাখ্যার সময় এটি স্বভাবতই একটি জটিল পরিস্থিতির তৈরী করে। সুতরাং এটির সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ এই দুইয়ের সমন্বয়েই হতে পারে: পরিষ্কার বোঝাপড়ার জন্য অবশ্যই এর প্রাকৃতিক ও সামাজিক দুটি দিক নিয়েই ভাবা উচিত এবং এই দুটি ব্যাপার কোথায় এসে মিলিত হয় তার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে আসা দরকার।

    উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান মহামারীর কেন্দ্রস্থল হিসেবে বলা যায় উহান প্রদেশের বাজারগুলোকে চীনাবাজারগুলো তাদের ভয়ংকর নোংরা পরিবেশ এবং উন্মুক্তস্থানে সব ধরনের পশুপাখি গাদাগাদি অবস্থায় রেখে বিক্রিবাট্টা চালানোর জন্য পরিচিত। তাই বলা চলে, বাদুড়ের শরীরে ভাইরাসটি জন্মলাভের পর ছড়িয়ে পড়ার জন্য বেশ উপযুক্ত একটি জনবহুল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেল।

    আর্টওয়ার্ক: ফরবিডেন ব্যাট স্যুপ
    শিল্পী: আলি মিরায়ি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি কীভাবে ছড়ালো সেটির ব্যাখ্যা এখনও আমরা জানি না। একমাত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমেই সেটি আমরা জানতে পারব। আপাতত অনলাইনে চলমান বর্ণবাদী মিথ যেমন চীনা জাতির লোকজন আধাকাঁচা বাদুড়ের মাংস খায়, এসব বাদ দিয়ে পুরো বিষয়টি নিয়ে একটু পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা যাক…

    লোকালয়ের সাথে অন্যান্য প্রাণীর সংস্পর্শ, যা মূলত মানুষের সাথে প্রাণীগুলোর সম্পর্ক স্থাপন করে, এই বিষয়টি পুরো ঘটনার মূলকেন্দ্র। এই সম্পর্ক ছাড়াও সমসাময়িক বিশ্বের একটি মৌলিক উপাত্তও রয়েছে: চীনা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সাম্রাজ্যবাদী পর্যায়ে উত্থান, অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারে চীনের তীব্র প্রভাব। ভাইরাসটি মূলত যেখান থেকে ছড়িয়ে পড়লো, সেই জায়গাটির সাথে বিশ্বের অন্যান্য অসংখ্য স্থানের একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারপরেও অবশ্য ভাইরাস ধরা পড়ার পর পুরো অঞ্চলটিকে যেখানে ৪ কোটি লোকের বসবাস, সেটিকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয় চীন। তবে ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে আসলে, মহামারী ভাইরাস ততক্ষনে জাহাজ এবং উড়োজাহাজে ভ্রমণের মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে অস্তিত্ববান হয়ে ওঠার পথে।

    আমি প্রথমে যে দ্বিমুখী বিশ্লেষণের কথা বললাম সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে এখন কিছু বিষয় খোলাসা করা যাক: আজকে উহান প্রদেশে সার্স-২ ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা গেলেও সাংহাইতে এই ভাইরাসে অনেকেই সংক্রমিত হচ্ছে এখনও, এবং সেটি স্থানীয় লোকজন নয় বরং বাইরে থেকে আসা প্রবাসী চীনা লোকজনের মাধ্যমেই সংক্রমণ ঘটছে। যেকারণে বুঝা যায় চীন দুইটি বিষয়ের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে, এর মধ্যে একটি আদিম, অন্যটি আধুনিক। একদিকে প্রকৃতি-সমাজ যোগসূত্র যা পরিচালিত হয় আদিম পর্যায়ের নোংরা পরিবেশের বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে। অন্যদিকে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত থাকা, পুঁজিবাদী বৈশ্বিক বাজারের মত গতিশীল ব্যবস্থায় অংশগ্রহন করা, যেটি আধুনিক পর্যায়কে ইঙ্গিত করে।

    এরপর আলোচনা করা যাক স্থানীয় পর্যায়ের প্রাদেশিক সরকারগুলো নিয়ে, যারা এই ব্যাপ্তিকে দমন করতে সচেষ্ট। আমাদেরকে এটা খেয়াল রাখতে হবে যে প্রশাসনিক বিষয়গুলো একেবারেই স্থানীয়, অন্যদিকে মহামারী ব্যাপারটি আন্তর্জাতিক। কিছু আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের অস্তিত্ব থাকলেও, এটি পরিষ্কার যে স্থানীয় বুর্জোয়া সরকারই প্রথম সারিতে রয়েছে প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে।

    এখানে আমরা বর্তমান বিশ্বের একটি মুখ্য স্ববিরোধীতা দেখতে পাই। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বৈশ্বিক বাজারের উপর নির্ভর করে তার উৎপাদনব্যবস্থা জারি রাখে— আমরা জানি যে একটি মোবাইল ফোন প্রস্তুত করতেই কয়েকটি রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন কাঁচামাল যোগাড় করতে হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থা আবার জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত হয়ে থাকে। পুরানা সাম্রাজ্যবাদ (ইউরোপ ও আমেরিকা) এবং নতুন সাম্রাজ্যবাদ (চীন, জাপান…) এই দুইয়ের দ্বন্দের ফলে এখনও পুঁজিবাদী বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই মহামারীও ঠিক তেমনই একটি পরিস্থিতি যেখানে অর্থনীতি ও রাজনীতির দ্বন্দ্ব ঘোরতর হয়ে ওঠে। এমনকি ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের মধ্যে কোনও সমন্বিত পলিসির দিকে যেতে পারছে না এই ভাইরাসের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও।

    এই স্ববিরোধিতার ফলে জাতীয় রাষ্ট্রগুলো এমন সব কর্মকাণ্ড এবং পলিসি নিচ্ছে যা পুঁজির কার্যক্ষমতাকে বলবৎ রেখেই প্রয়োগ করা যায়, যদিও ভাইরাসের হুমকির মুখে তাদের এখন অন্য পদ্ধতি এবং অন্য ধরনের ক্ষমতা চর্চা প্রয়োগ করতে হবে।

    আমরা আগে থেকেই জানি যে স্থানীয় পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র শুধু জনগণই নয় বরং বুর্জোয়াদের উপরেও অনেক ধরনের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে থাকে। কিছু কলকারখানা একেবারে রাষ্ট্রীয়করণ করে ফেলা হয় অস্ত্র তৈরী করার জন্য এবং যুদ্ধকালীন উদ্বৃত্ত সম্পদ তৈরীর জন্য। অনেক বুর্জোয়াদেরকে অফিসার করে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়। বিজ্ঞানীরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে চলে নতুন অস্ত্র আবিষ্কারের জন্য। অসংখ্য বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পী-সাহিত্যিকরা নেমে পড়ে জাতীয় প্রপাগান্ডা ছড়ানোর দায়িত্বে ইত্যাদি।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা এন্ড হিউম্যান এচিভমেন্ট
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এরকম মহামারীর মুখে রাষ্ট্রের পক্ষে নিজের ভোল পাল্টে ফেলা খুবই স্বাভাবিক। যেকারণে আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি উৎপাদনব্যবস্থা, কলকারখানা ইত্যাদি প্রায় বন্ধ হবার উপক্রমের পরেও ম্যাকরন কিংবা প্রধানমন্ত্রী এডুয়ার্ড ফিলিপ্পে ঘোষণা দিচ্ছে কল্যাণ-রাষ্ট্রীয় নীতিমালা গ্রহণের। শ্রমিকদেরকে কাজে যাওয়ার জন্য বিবিধ সুবিধা দেয়া হবে, যেসব ব্যক্তিমালিকানার দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে তাদেরকে আলাদা টাকাপয়সা দেয়া হবে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ১০০ বা ২০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা দেয়া হবে, এবং এমনকি আরও অনেক সেক্টরে রাষ্ট্রীয়করণ নীতি গ্রহণ করা হবে। এসব কোনো কিছুই আসলে তেমন আপাতবিরোধী বা বিস্ময়কর কোনো ঘটনা না। ম্যাকরনের ভাষণে ‘আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি’ এরকম উপমা ব্যবহার করা পুরোপুরি যথার্থ। যুদ্ধ হোক কিংবা মহামারী, এমন অনেক পরিস্থিতিই রয়েছে যেখানে রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক শ্রেণীচরিত্রকে এড়িয়ে গিয়ে একদম ভিন্ন ধরনের পলিসি গ্রহণ করে, যা একই সাথে কর্তৃত্ববাদী আচরণ এবং কৌশলগত বিপর্যয় থেকে বাঁচার উপায় মাত্র।

    বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা যথাসম্ভব নিশ্চয়তার সাথেই জারি রেখে যুদ্ধ জেতার (আবারও ম্যাকরনের উপমা ব্যবহার করলাম) ব্যাপারটি, অর্থাৎ এখন মহামারী ঠেকানোর ব্যাপারটি একেবারেই স্বাভাবিক, এখানে জটিল কোনো সমীকরণ নেই আসলে। এটা কোনও হাসিঠাট্টার বিষয় না, এটা একটা প্রয়োজনীয়তা যা প্রকৃতি (যেকারণে এখানে বিজ্ঞানীদের একটা বড় ভূমিকা আছে) এবং সমাজ (যেকারণে এর সাথে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের জবরদস্তি চলে আসে)-এর মিথস্ক্রিয়া ও ব্যাপ্তি প্রক্রিয়ার ফলে ডেকে আনা প্রাণঘাতী পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে।

    তবে এতসব প্রচেষ্টার মধ্যেও কিছু ঘাপলা থেকে যায় অনিবার্যভাবেই। যেমন নিরাপত্তা মাস্কের সংকট অথবা হসপিটালগুলোতে আইসোলেশনের ব্যবস্থার অভাব। তবে এমন পরিস্থিতি হবে সেটা আগে থেকে কেইবা ‘হিসাব করেছে’? নিদির্ষ্ট কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় তেমন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি এটা সত্যি। দশকের পর দশক ধরে জাতীয় চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাখাতে টাকা না খাটিয়ে অন্যখাতে খাটানো যা সাধারণ জনগণের স্বার্থের বিপরীত, একটা রাষ্ট্র মহামারীর সংক্রমণে মুখথুবড়ে পড়ার পিছনে এই কারণগুলোও রয়েছে অবশ্যই। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবস্থান নিন্দনীয়, কিন্তু সেটা শুধু ম্যাকরনের সরকার নয়, বরং গত ত্রিশ বছরে যারাই রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছে, তাদের সবারই দোষ।

    তবে এখানে একটা বিষয় অবশ্যই লক্ষনীয় যে, অল্প কয়েকজন বিজ্ঞানী ছাড়া কেউ কস্মিনকালেও ভাবেনি ফ্রান্সে এমন ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। বেশিরভাগই হয়ত এটা ভেবে বসে ছিল যে, এই ধরনের মহামারী গজব অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকা কিংবা কর্তৃত্ববাদী চীনের জন্য, গণতান্ত্রিক ইউরোপে এমন গজব আসবে না। বামপন্থী-হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনকারীরা অথবা ট্রেড-ইউনিয়নবাদী যারা সবসময় ম্যাকরনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যস্ত, তারাও এইরকম দশা হবে সেটা একবারও ভাবতে পারেনি। অন্যদিকে, মহামারী ততক্ষনে চীন থেকে রওনা দিয়েছে সারাবিশ্বের উদ্দেশ্যে, ভ্রমণের পথে সে তার সংখ্যা বাড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাকরনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হোক বা যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেয়ার অভাবে যত অভিযোগ সমাবেশই হোক, এরপরেও এই সত্য স্বীকার করতে হবে যে, ফ্রান্সের অন্য কোনও রাজনৈতিক পক্ষই এই মহামারীর সংক্রমণ সংক্রান্ত কোনো আন্দাজ করতে পারেনি।বরং ম্যাকরোনীয় রাষ্ট্রই প্রথম এই মহামারী সংক্রমণের পরিমাণকে আমলে আনে।

    আর্টওয়ার্ক: আওয়ার লিডার
    শিল্পী: আলি রাস্ত্রু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই অবস্থার পাশাপাশি, বুর্জোয়া রাষ্ট্র এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে যেখানে তাকে শুধু আর বুর্জোয়াশ্রেণীর স্বার্থের কথা ভাবলেই হচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথাও ভাবতে হচ্ছে ঘোষনা দিয়ে, এবং সেটা মূলত ভবিষ্যতে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া স্বার্থ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনেই। অর্থাৎ যেই শ্রেণীর স্বার্থ বুর্জোয়া রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কাজ করে, এই সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেটি বাদ দিয়ে এখন সাধারণ স্বার্থের কথাও ভাবতে হচ্ছে তার অভ্যন্তরীন স্বভাবগত শত্রুকে মোকাবিলার জন্য—যুদ্ধের সময় যে ভূমিকায় থাকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সার্স-২।

    এই ধরনের পরিস্থিতি (বিশ্বযুদ্ধ অথবা বৈশ্বিক মহামারী) রাজনৈতিক পর্যায়ে সাধারণত একেবারেই অসাড় ভূমিকা পালন করে থাকে। অতীতের বিশ্বযুদ্ধগুলোর ফলে মাত্র দুইটি জায়গাতেই বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল, তাও এমন দুইটি স্থান যেখানে তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তেমন শক্তিশালী ছিলোনা। আমি চীন ও রাশিয়ার কথা বলছি। রাশিয়ার ক্ষেত্রে বলা যায়, জারের ক্ষমতা সবদিক থেকেই অনেকদিন ধরে পতনশীল ছিল যার মধ্যে ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের ভ্রুণ জন্মাচ্ছিল। অন্যদিকে এর বিপরীতে ছিলো বলিষ্ঠ বলশেভিকরা, অসাধারণ নেতাদের হাতে তৈরী একটি আধুনিক রাজনৈতিক ভ্যানগার্ড পার্টি। চীনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বিপ্লবী যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবকে অতিক্রম করে গিয়েছিল, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪০ সালে ইতোমধ্যে একটি পরীক্ষিত জনপ্রিয় সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। বিপরীত দিকে আমরা দেখতে পাই কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রেই জয়লাভকারী কোনও বিপ্লব ঘটেনি। ১৯১৮ সালে জার্মানি পরাজিত হয়ে দুর্বল শক্তি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বিপ্লবের চেষ্টাকে দুমড়ে ফেলা হয়।

    উপরের উদাহরণগুলো দিয়ে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি সেটা খুবই পরিষ্কার, চলমান মহামারীর ফলে আসলে ফ্রান্সের মত দেশে কোনো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। এমনকি এসব বালখিল্য প্রতিবাদ কিংবা ফিল্মি স্লোগানের উত্তেজনায় যদি বুর্জোয়ারা এটা বিশ্বাসও করে বসে যে ম্যাকরনের পতন অনিবার্য, তাতেও বিশেষ কোনো পরিবর্তন হবে না সামনে। ম্যাকরনের পতনে কিছু হবে না, কারণ ইতোমধ্যে অন্যান্য অনেক ‘সুশীল’ (Politically Correct) রাজনৈতিক প্রার্থীরা তাদের ঝোলার ভেতর অধুনালুপ্ত বিরক্তিকর সূক্ষ্ম জাতীয়তাবাদের বিষ নিয়ে অপেক্ষা করছে জনগণকে গেলানোর জন্য।

    যারা আমাদের মত আসলেই বাস্তব কোনো পরিবর্তন চান এই দেশের রাজনৈতিক অবস্থার, তাদের অবশ্যই এই মহামারী সময়ের সুবিধা নেয়া উচিৎ, এমনকি তা যদি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন (isolation) অবস্থায় থেকেই হয় তবে তা-ই সই। রাজনীতির নতুন কাঠামো’র কথা আমাদের ভাবা উচিৎ এবং এর নতুন দিকগুলো নিয়ে কাজ করা উচিত। তাই এ সময়ে কোনও বাস্তব পরিবর্তন চাইলে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক কম্যুনিজমের তৃতীয় ধাপের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত, যার পূর্বসুরী গত শতাব্দীর গৌরবান্বিত আবিষ্কারঃ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কম্যুনিজম পরীক্ষণ।

    আর্টওয়ার্ক: রেসপন্ডার
    শিল্পী: খালিদ আলবাহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মহামারীর মতো ধারণা নতুন কোনো রাজনৈতিক আবিষ্কারের দিকে আমাদেরকে ধাবিত করতে পারে, এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে গেলেও আমাদেরকে অনেক কঠোর সমালোচনার জবাব প্রস্তুত রাখতে হবে। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে মহামারী সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলি প্রকাশিত হলে, হাস্পাতাল, গণস্বাস্থ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাম্যবাদী শিক্ষা, প্রবীণদের দেখাশুনা করা এবং এই ধরনের আরও অনেক প্রশ্নের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত ও অভিযোগের ব্যাপারগুলো সামনে আসবে। এই বিষয়গুলোকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে এসব ক্ষেত্রে ভয়ংকর দুর্বলতাসমূহও বুঝতে হবে যেগুলো বর্তমান মহামারী পরিস্থিতির কারণে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

    এছাড়াও এই বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত যেসব প্রপাগান্ডা এবং গণ-মানসের অসাড়তা দেখতে পাচ্ছি যা শুধু বিলিয়নিয়ারদের পকেট ভড়তে সাহায্য করে এবং এক ধরনের ফ্যাসিবাদী ধোঁয়া তৈরী করে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে, সেগুলোর মুখোমুখি হতে হবে সহী জবাব নিয়ে।

    আমরা যেন বৈজ্ঞানিক সত্য এবং নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যা স্থানিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার কৌশলগত লক্ষ্যকে গড়ে তোলে, তা বাদ দিয়ে অন্য কোনও ভ্রান্ত বিশ্বাসে মেতে না উঠি, বিশেষ করে আমাদের এই বিচ্ছিন্ন অবস্থার মধ্যে।

  • অরুন্ধতী রায়।। মহামারি আরেক পৃথিবীর প্রবেশদ্বার

    অরুন্ধতী রায়।। মহামারি আরেক পৃথিবীর প্রবেশদ্বার

    • অনুবাদ: বীথি সপ্তর্ষি

    একটুও না কেঁপে “ভাইরাল হয়ে গেছে” কথাটি এখন কে ব্যবহার করতে পারে? কে আর পারে অদৃশ্য, উন্মুখ, নিষ্প্রাণ তন্তুগুলি শোষক প্যাডের সাহায্যে আমাদের ফুসফুসে আক্রমণ করার অপেক্ষায় রয়েছে না ভেবে দরজার হাতল, কার্ডবোর্ডের কার্টন, শাকসব্জির ব্যাগগুলোর দিকে স্বাভাবিকভাবে তাকাতে?

    অরুন্ধতী রায়

    একেবারেই ভয় না পেয়ে আগন্তুককে চুমু খাওয়া, লাফ দিয়ে বাসে ওঠা বা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর কথা কে ভাবতে পারে? ঝুঁকির পরিমান না ভেবে কে পারে নিত্য আনন্দের কথা ভাবতে? আমাদের মধ্যে কে হাতুড়ে মহামারি বিশেষজ্ঞ,  ভাইরাসবিদ,  পরিসংখ্যানবিদ বা ভবিষ্যতবক্তায় পরিণত হননি?  কোন বিজ্ঞানী বা ডাক্তার গোপনে কোনও অলৌকিক ঘটনার জন্য প্রার্থনা করেনি?  কোন পুরোহিত, অন্তত গোপনে, বিজ্ঞানের মুখ চেয়ে বসে নেই? 

    এমনকি যখন এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ল, শহরগুলোতে ঝাঁক-বাঁধা পাখির গান, ট্রাফিক ক্রসিংয়ে নেচে বেড়ানো ময়ূর বা সুনসান আকাশ দেখে কে রোমাঞ্চিত হয়নি? 

    এই সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে মারা গেছে ৫০,০০০ এরও বেশি লোক। বাস্তবতার নিরিখে অনুমান করা যায় এই সংখ্যা লাখ লাখে পরিণত হবে। কে জানে হয়তো আরও বেশি! বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে অবাধে বিচরণের পথ ধরে ভাইরাসটি যে ভয়াবহ অসুস্থতা এনেছে তা মানুষকে তাদের দেশ, শহর ও ঘরে বন্দি করে ফেলেছে। 

    কিন্তু পুঁজির প্রবাহের ব্যতিক্রম,  এই ভাইরাস মুনাফা নয় বরং বিস্তৃতি লাভের চেষ্টা  করে গেছে। ফলে কিছুটা বেখেয়ালে হলেও পুঁজি প্রবাহের গতিমুখ উল্টে দিয়েছে। এটি ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ, বায়োমেট্রিক্স, ডিজিটাল নজরদারি এবং অন্যান্য সমস্ত ধরণের তথ্য বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার বিরাট রাষ্ট্রযজ্ঞকে চোখের পলকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।  নিষ্ঠুর চপেটাঘাত করেছে । এ যেন এক নির্মম বিদ্রুপ! সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা মহাপরাক্রমশালী দেশগুলোর  পুঁজির ইঞ্জিন সশব্দে থমকে গেছে। সম্ভবত ক্ষণিকের জন্য কিন্তু এই ইঞ্জিনের কলকব্জাগুলোকে পরখ করে দেখার জন্য তা যথেষ্ট সময়। এরপর আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি ধুঁকতে থাকা এই ইঞ্জিন মেরামত করব নাকি নতুন ইঞ্জিনের খোঁজ করব।

    আর্টওয়ার্ক: লেটস প্লে বোলিং বল
    শিল্পী: মির সুহাইল
    সিূত্র: র্কাুন মুভমেন্ট

    এই মহামারিটি মোকাবিলারত ম্যান্ডারিনরা (চীনের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের ভাষিক জনগোষ্ঠী, সাধারণত চৈনিক জাতি বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়- অনুবাদক) যুদ্ধপ্রিয়। ‘যুদ্ধ’ তাদের কাছে কোন রূপক নয়, তারা আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ বুঝিয়ে থাকে। কিন্তু এটা যদি সত্যিই ‘যুদ্ধ’ হত, তাহলে এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আর কে নিশ্ছিদ্র প্রস্তুত থাকত?  মাস্ক-গ্লাভস না; অগ্রভাগের সৈনিকদের যদি বন্দুক,  অত্যাধুনিক বোমা,  বাঙ্কার বুস্টারস,  সাবমেরিন,  ফাইটার জেটস এবং পারমাণবিক বোমার প্রয়োজন হত, তবে সেগুলোর কোন অভাব কি পড়ত?  

    রাতের পর রাত, বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে,  আমরা অনেকেই নিউ ইয়র্কের গভর্নরের প্রেস ব্রিফিং যে রুদ্ধশ্বাসে দেখেছি, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমরা পরিসংখ্যানে নজর রেখেছি। আক্রান্তদের সারিয়ে তুলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবর্জনা বিন লাইনার থেকে মাস্ক ও জীর্ণ রেইনকোট দিয়ে পিপিই বানানো অকিঞ্চিৎকর মজুরির বিনিময়ে  অমানুষিক খাটাখাটনি করা নার্সদের মরিয়া চেষ্টার গল্প শুনেছি। ভেন্টিলেটরের জন্য এক রাজ্যের সাথে আরেক রাজ্যের প্রতিযোগিতা এবং রোগীদের মধ্যে কা্দের বাঁচানো দরকার আর কাদের মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত সম্পর্কিত বিহ্বল ডাক্তারদের খবরগুলো পড়েছি। আর স্বগোক্তি করেছি, “হায় খোদা, এই তাহলে অ্যামেরিকা!’’ 

    তাৎক্ষণিক,  বাস্তব ও মহাকাব্যের মতো প্রলম্বিত এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু এমন ঘটনা নতুন নয়। এটি একটি ট্রেনের ধ্বংসস্তুপ যা বছরের পর বছর ধরে রেললাইনের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে। “রোগী খালাস” এর সেই   ভিডিওগুলি কার মনে নেই? হাসপাতাল-গাউন গতরে চাপানো, পাছা উদাম, অসুস্থ মানুষগুলোকে রাস্তার কোণে গোপনে ফেলে রাখার সেই দৃশ্য! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হতভাগ্য নাগরিকদের জন্য হাসপাতালের দরজা প্রায়শই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা কতটা অসুস্থ বা কতটা ভোগান্তি পোহাচ্ছে তা বিবেচনা করা হচ্ছে না। 

    অন্তত এখন পর্যন্ত না– কারণ এখন ভাইরাসের যুগে একজন গরীব মানুষের অসুস্থতা সমাজের ধনী অংশের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এত কিছুর পরেও, এমনকি এখনো পর্যন্ত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার জন্য তারস্বরে চেঁচাতে থাকা সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স হোয়াইট হাউসে ঢোকার টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্রাত্যই থেকে যাচ্ছেন। এমনকি নিজের দলের কাছেও। 

    তাহলে এবার সামন্ততন্ত্র ও ধর্মীয় মৌলবাদ, জাতপাত ও পুঁজিবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট; ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা শাসিত, আমার সমৃদ্ধ অথচ দরিদ্র দেশ ইন্ডিয়ার খবর কী?

    আর্টওয়ার্ক: করোনাকোলাজ
    সূত্র: আর্রে

    ডিসেম্বরে, উহানে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে চীন যখন লড়াই করছিল,  ভারত সরকার তখন সবেমাত্র সংসদে পাস হওয়া মুসলিম বিরোধী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে হাজার হাজার নাগরিকের গণ-আন্দোলনকে নির্লজ্জভাবে দমন করছিল। 

    আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেডের ‘সম্মানিত’ প্রধান অতিথি,  অ্যামাজনখেকো এবং কোভিড অস্বীকারকারী জেইর বলসোনারো দিল্লি ত্যাগ করার ঠিক কয়েকদিন পরেই ৩০ শে জানুয়ারি ভারতে কোভিড -১৯ এর প্রথম আক্রান্তের খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ভাইরাসকে আমলে নেয়ার চেয়েও ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার’ ক্ষমতাসীন দলের কর্মপরিকল্পনায় ছিল। সেই মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক সফর ছিল। গুজরাটের একটি স্টেডিয়ামে ১০ লাখ মানুষ জমায়েতের মূলা ঝুলিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল। এসব আয়োজন করতে প্রচুর টাকা ঢালতে হয়েছে এবং সময় নষ্ট করতে হয়েছে।  

    তারপর দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রত্যাশিত হার আঁচ করতে পেরে  তাদের চিরাচরিত ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠল  এবং চরম বেপরোয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রচারণায় ‘বিশ্বাসঘাতক’দের প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিতে থাকল।

    যাইহোক, শেষমেশ তারা হারলই। সুতরাং পরাজয়ের ‘কলঙ্ক’ ঢাকতে মুসলমানদের বলির পাঁঠা সাব্যস্ত করা হল। পুলিশের প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য সমর্থনে হিন্দুত্ববাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা  উত্তর-পূর্ব দিল্লির শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মুসলমানদের উপর আক্রমণ করল। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ ও স্কুল স্রেফ পুড়ে ছাই করে দেয়া হয়েছিল। আক্রমণের লক্ষ্য মুসলমানরা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল। মূলত মুসলমান এবং কিছু হিন্দু মিলিয়ে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ  নিহত হয়েছিল। 

    হাজার হাজার নিরুপায় মানুষ স্থানীয় কবরস্থানকেই ‘শরণার্থী শিবির’ বানাতে বাধ্য হয়েছিল। ছিন্নবিচ্ছিন্ন মৃতদেহগুলো নোংরা পুঁতিগন্ধময় ড্রেন থেকে যখন বের করা হচ্ছিল, তখন সরকারী কর্মকর্তারা কোভিড -১৯ বিষয়ক প্রথম সভা করছিলেন এবং বেশিরভাগ ভারতীয় সেই প্রথম শুনতে পেল ‘হ্যান্ড স্যানিটাইজার’ বলতে কোন বস্তুর অস্তিত্ব আছে!

    সরকারের তরফে মার্চও যথেষ্ট ‘ব্যস্ততা’র মাস ছিল। প্রথম দুই সপ্তাহ  ভারতের কেন্দ্রীয় রাজ্য মধ্য প্রদেশে কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠা করার পেছনে ব্যয় করা হয়েছিল। ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ কে  ‘বৈশ্বিক মহামারি’ হিশেবে ঘোষণা করল। এর দু‘দিন পরে, ১৩ মার্চ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে বসল যে করোনা “কোনও হেলথ ইমার্জেন্সি নয়”।অবশেষে ১৯ শে মার্চ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী  জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। এর জন্য তিনি খুব বেশি হোমওয়ার্কও করেন নি। তিনি ফ্রান্স এবং ইতালি থেকে ধার করা ভাঙ্গা রেকর্ডটাই বাজালেন। তিনি আমাদের “সামাজিক দূরত্ব” ধারণাটি (জাতপাতে বিভক্ত একটা সমাজের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণই বটে!) বোঝাতে বেশ কসরত করলেন এবং ২২  মার্চ একদিনের জন্য “জনতার কারফিউ” ডাকলেন। তাঁর সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কী কী করতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি কিছুই বলেলেন না। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের স্যালুট জানাতে তিনি সবাইকে যার যার বারান্দা থেকে ঘন্টাধ্বনি ও ঘটি-পাতিল বাজাতে বললেন।

    সেই মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি ভারতবাসীকে ঘুর্ণাক্ষরেও জানতে দেননি যে,  স্বাস্থ্যকর্মী এবং হাসপাতালগুলোর জন্য সুরক্ষা সরঞ্জামাদি এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করার পরিবর্তে সেগুলো রফতানি করা হচ্ছে।  

    আর্টওয়ার্ক: করোনাভাইরাস সিরিজ
    শিল্পী: সাতীশ আচারিয়া
    সুত্র: আর্রে

    অবাক হবার কিছু নেই যে, নরেন্দ্র মোদীর লোটা-ঘণ্টি বাজানোর অনুরোধ বিপুল উদ্দীপনায় রক্ষা করা হয়েছিল। থালা-বাটি বাজিয়ে মার্চ,  কমিউনিটি ডান্স এবং মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেক্ষত্রে ‘সামাজিক দূরত্ব’র কোন বালাই ছিল না । পরের দিনগুলোতে, ‘পবিত্র’ গরুর গোবরের পিপায় ঝাঁপাঝাঁপি থেকে শুরু করে,  বিজেপি সমর্থকদের গো-মূত্র পানের পার্টি সবই হলো। এখানেই শেষ নয়! মুসলিম সংগঠনগুলো থেকে ফতোয়া জারি হলো যে একমাত্র সর্বশক্তিমান খোদাই ভাইরাসের চূড়ান্ত দাওয়াই এবং মুমিনদের দলে দলে মসজিদে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হল। 

    ২৪ মার্চ, রাত ৮ টায় মোদী আবার টিভির পর্দায় হাজির হলেন এবং ঘোষণা করলেন যে, মধ্যরাত থেকে গোটা ভারত লকডাউনে চলে যাবে। বাজার বন্ধ থাকবে। সমস্ত সরকারী-বেসরকারী পরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে। 

    তিনি বলেছিলেন যে এই সিদ্ধান্তটি তিনি কেবল প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নয়, আমাদের পরিবারের ‘মুরুব্বী’ হিশেবে  নিচ্ছেন। ন্যূনতম প্রস্তুতি ছাড়া ৪ ঘণ্টার নোটিশে ১.৩৮ বিলিয়ন মানুষকে ‘লকডাউন’ করার এই সিন্ধান্তের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হবে যাদের , সেই রাজ্য সরকারগুলোর সাথে শলাপরামর্শ ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত ‘মুরুব্বী’ ছাড়া আর কে-ই বা নিতে পারে?  তার সিদ্ধান্ত নেয়ার পদ্ধতিগুলো থেকে  স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নাগরিকদের ‘শত্রু’ জ্ঞান করেন, যাদের অতর্কিতে অ্যামবুশ করা দরকার এবং কখনোই বিশ্বাস করা উচিত নয়। 

    আর্টওয়ার্ক: মোদি
    সূত্র: গালফ নিউজ

    আমরা অবরুদ্ধ হলাম। অনেক স্বাস্থ্যজীবী ও মহামারি বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপের প্রশংসা করলেন। তাত্ত্বিকভাবে তারা হয়তো ঠিকই আছেন। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের কেউই বিশ্বের সবচেয়ে নির্মম শাস্তিমূলক লকডাউনের (আসল অর্থের ঠিক বিপরীত) বিপজ্জনক পরিকল্পনাহীনতা ও প্রস্তুতিহীনতা কোনভাবেই সমর্থন করতে পারবেন না।

    যিনি ‘তামাশা’ দেখতে পছন্দ করেন , সেই তিনিই নিষ্ঠুরতম ‘তামাশা’র জন্ম দিলেন। 

    হতবাক বিশ্ব লজ্জা শরমের মাথা খাওয়া ভারতের নিজেকে উদাম করে দেয়া প্রত্যক্ষ করল; পাশবিক,  কাঠামোগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুঃখ-দুর্দশার প্রতি তার নির্মম উদাসীনতা।

    লকডাউনটি রাসায়নিক পরীক্ষার মতো কাজ করেছিল যেটা এতদিনকার অন্ধকার গোপন জিনিসগুলিকে আচমকাই উন্মোচন করে দিয়েছিল। দোকান,  রেস্তোঁরা,  কারখানা এবং নির্মাণ শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেদেরকে কলোনির খোঁয়াড়ে আবদ্ধ করে ফেলল, এতদিন আমাদের শহর ও মেগাসিটিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা মেহনতি মানুষ ​​ও অভিবাসী শ্রমিকরা – মুহুর্তেই অযাচিত ‘উপদ্রব’ আর ‘অপাংক্তেয়’ বস্তুতে পরিণত হয়ে গেল।

    বহু লোক তাদের মালিক এবং ভূস্বামীদের তাড়িয়ে দেয়ার শিকার হলো। লাখ লাখ হতদরিদ্র,  ক্ষুধার্ত,  তৃষ্ণার্ত মানুষ,  আবালবৃদ্ধবনিতা,  অসুস্থ,  অন্ধ, প্রতিবন্ধী মানুষ কোন আশ্রয় না পেয়ে,  কোন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট না থাকায় গ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে দিয়েছিল। দিনের পর দিন তারা  বাডাউন, আগ্রা, আজমগড়, আলীগড়, লখনৌ,  গোরক্ষপুরের দিকে- শত শত কিলোমিটার হেঁটে গেছে। কেউ কেউ পথেই দেহত্যাগ করেছে।

    তারা জানতেন যে বাড়িতে যাচ্ছেন কম সময় অনাহারে থাকার জন্য। এমনকি সম্ভবত  এও জানতেন যে তারা সাথে করে ভাইরাস বহন করে থাকতে পারেন এবং গ্রামে ফিরে তাদের পরিবার,  বাবা-মা এবং দাদা-দাদিদের  সংক্রমিত করতে পারেন; কিন্তু ভালোবাসা তো বটেই,  এমনকি পরিবার-পরিজনের সান্নিধ্য, ভরসা, মর্যাদা এবং খাবারের জন্য তারা উন্মুখ ছিলেন।

    যারা ক্রোশের পর ক্রোশ হাঁটছিলেন তাদের অনেককেই, কারফিউ বলবৎ করার কড়া নির্দেশপ্রাপ্ত পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল। তরুণদের মহাসড়কে হামাগুড়ি, ব্যাঙ্গের লাফ দিতে হয়েছে। বেরিলি শহরের বাইরে,  একদল মানুষকে একসাথে জড়ো করে রাসায়নিক স্প্রে মারা হয়েছিল।

    কিছু দিন পরে, ছড়িয়ে পড়া জনগোষ্ঠী গ্রামে ভাইরাস ছড়াবে এই শঙ্কায়, সরকার এমনকি পথচারীদের জন্যও রাজ্য সীমানা বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েকদিন ধরে হাঁটা মানুষদের আবার থামিয়ে ছেড়ে আসতে বাধ্য হওয়া শহরের ক্যাম্পেই ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা শাসকতা-২
    শিল্পী: সারশু
    সূত্র: অরাজ

    এই ঘটনা বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে ’৪৭ এর দেশান্তরের স্মৃতি উস্কে দিয়েছে, যখন ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। ’৪৭ এ যেটা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে, এবার সেটা হলো শ্রেণীর ভিত্তিতে। এমনকি এরপরেও,  এই মানুষেরা ভারতের দরিদ্রতম মানুষ নয়। এদের অন্তত (এখন পর্যন্ত) শহরে কাজ আছে এবং ফেরার জন্য ঘর আছে। বেকার,  বাস্তুহারা ও ছিন্নমূল মানুষেরা যেখানে ছিলেন সেখানেই রয়ে গেছেন; কি শহরে আর কি গ্রামে , যেখানে এই ট্র্যাজেডির বহু আগেই সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছিল। এইসব ভয়াল দিনেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেলেন। 

    দিল্লিতে যখন মানুষ পদব্রজে শহর ছাড়ছিলেন,  তখন আমি প্রায়ই লিখি এমন একটি ম্যাগাজিনের প্রেস পাস ব্যবহার করে গাড়ি চালিয়ে দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের সীমান্তে গাজীপুর গিয়েছিলাম। 

    সে এক মহা বাইবেলিক দৃশ্য! কিংবা কে জানে হয়তো তাও নয়। এত বিপুল আকার বাইবেলের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে লকডাউন প্রয়োগের হিতে বিপরীত হয়েছে – অভাবনীয় মাত্রা্র গাদাগাদি ঠাসাঠাসি। এমনকি ভারতের শহরগুলোতেও একই দৃশ্য! প্রধান প্রধান রাস্তাগুলি হয়তো ফাঁকা,  কিন্তু বস্তি এবং খুপরিতে গরিব জনগোষ্ঠী অবরুদ্ধ হয়ে আছে। 

    হন্টনরত যাদের সাথেই আমি কথা বলেছি প্রত্যেকেই ভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু বেকারত্ব, অনাহার এবং পুলিশি নিপীড়নের মুখে ভাইরাস তাদের জীবনে অপেক্ষাকৃত কম বাস্তব , কম প্রাসংগিক। 

    আমি সেদিন যত মানুষের সাথে  কথা বলেছি তাদের মধ্যে একদল মুসলিম দর্জি ছিল যারা মাত্র কিছুদিন আগেই সপ্তাহব্যাপী মুসলিমবিরোধী আক্রমণ থেকে বেঁচে ফিরেছে।  একজনের কথা  আমাকে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল। রামজিৎ নামের এক ছুতারমিস্ত্রী, নেপাল সীমান্তের নিকটবর্তী গোড়খপুর পর্যন্ত পুরোটা পথ হাঁটার পরিকল্পনা তার। 

    সম্ভবত মোদিজি যখন এই সিদ্ধান্ত নেন তখন কেউই তাকে আমাদের সম্পর্কে বলেনি। তিনি হয়তো আমাদের সম্পর্কে জানেনই না!

    “আমাদের” মানে প্রায় ৪৬০ মিলিয়ন মানুষ!

    ভারতে রাজ্য সরকারগুলো (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতোই) সংকটে তুলনামূলক বেশি আন্তরিকতা ও আক্কেলপনা দেখিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন, বেসরকারী নাগরিক এবং অন্যান্য সংগঠন খাবার ও অন্যান্য জরুরী ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মহামারির প্রতিক্রিয়ায় তহবিল সংগ্রহে তাদের মরিয়া আবেদনের প্রতিক্রিয়ায় বেশ ঢিলেমি ছিল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিলে এই মুহুর্তে কোন নগদ অর্থ প্রস্তুত নেই। বরং, শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রদত্ত অর্থ রহস্যজনক নতুন ‘পিএম-কেয়ার’(PM-CARES) তহবিলে ঢালা হচ্ছে। খাবারের মোড়কে মোদীর চেহারাযুক্ত খাবার আসা শুরু করেছে ।

    এছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী তাঁর  ইয়োগা নিদ্রার ভিডিও শেয়ার করেছেন যেখানে মোদীসম নিদ্রারত এক অ্যানিমেটেড ‘ড্রিমবডি’ যোগাসনের  মাধ্যমে কী করে লক-ডাউনের সময়ে সেল্ফ-আইসোলেশনের চাপ মোকাবিলা করতে হবে সে সম্পর্কে ছবক দিচ্ছে। 

    এই আত্মরতি খুবই বিরক্তিকর। যোগাসনের মধ্যে অন্তত একটি আসন ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর জন্য থাকতে পারত, যেখানে মোদী তাকে ৭.৮ বিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিপূর্ণ রাফায়েল ফাইটার জেট চুক্তি থেকে আমাদের সরে আসার অনুরোধ করতে পারতেন এবং সেই টাকায় কয়েক মিলিয়ন ক্ষুধার্ত মানুষকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থা করা যেত। নিশ্চয়ই ফরাসিরা এই ব্যাপারটা বুঝবে। 

    লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরবরাহ কমে গেছে। কয়েক  হাজার ট্রাক চালক এখনও যৎসামান্য খাবার ও পানিসহ মহাসড়কে এতিমের মতো দিন অতিবাহিত করছে। ফসল কাটার উপযোগী শস্য ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছে। 

    আর্টওয়ার্ক: পুর পিপল
    শিল্পী: ওয়াসিম আসাদ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অর্থনৈতিক সংকট হাজির। রাজনৈতিক সঙ্কট তো চলছেই। মূলধারার মিডিয়া ২৪/৭ কোভিডকে বিষাক্ত মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণায় পরিণত করেছে। তাবলিগী জামায়াত নামে একটি সংগঠন লকডাউন ঘোষণার আগে দিল্লিতে একটি সভা ডেকেছিল, এটাকে এখন “সুপার স্প্রেডার” হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে এবং তা মুসলমানদের কালিমালিপ্ত করা  ও দানব হিশেবে প্রচার করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রচারনার ভঙ্গিটা এমন যেন মুসলমানরা এই ভাইরাস আবিষ্কার করেছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জিহাদের অস্ত্র হিশেবে ছড়িয়ে দিয়েছে।

    কোভিড-১৯ এর  সংকট আসার এখনো বাকি। অথবা আর বাকি নেই, আমরা ঠিক জানি না। যদি তার বিস্তৃতি ঘটে থাকে,  তবে নিশ্চয়ই আমাদের ধর্ম, বর্ণ এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সমস্ত প্রচলিত পক্ষপাতমূলক আচরণ পরিত্যাগ করে এর মোকাবিলা করতে হবে।

    আজ (২ এপ্রিল) ভারতে প্রায় ২,০০০ নিশ্চিত আক্রান্ত এবং ৫৮ জন মারা গেছে। মাত্র অল্পকিছু পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে এ সংখ্যাগুলো অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য নয়। সরকারি পরিসংখ্যান এবং বিশেষজ্ঞের মতামতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কেউ কেউ তো কয়েক লাখ আক্রান্তের শঙ্কা প্রকাশ করছেন, কেউ কেউ আবার মনে করছেন, আক্রান্তের সংখ্যা আরো কম হবে। আমরা হয়ত কখনোই সংকটটির আসল চিত্র সম্পর্কে জানতে পারব না, এমনকি আমরা আক্রান্ত হওয়ার পরেও। আমরা যা জানি তা হল, হাসপাতালগুলোতে এখনো মড়ক লাগেনি।

    ভারতের পাবলিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো- যেগুলো প্রতি বছর ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাই সামাল দিতে পারে না, প্রায় ১০ লাখ শিশু মারা যায়। লাখ লাখ যক্ষ্মার রোগী (বিশ্বের এক চতুর্থাংশ), রক্তস্বল্পতা ও পুষ্টিহীনতার শিকার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যে কোন ছোটখাটো শারীরিক জটিলতায় পড়লেও তাদের জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। সেখানে এমন একটি সংকট রাষ্ট্রের  হাসপাতাল ও ক্লিনিক মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে না, বিশেষ করে এখন ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে তা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়।

    কমবেশি সকল হাসপাতাল ভাইরাস আক্রান্তদের সেবা দেয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অন্যান্য সকল স্বাস্থ্যসেবা একপ্রকারের বন্ধই আছে । দিল্লির বিখ্যাত অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেসের ট্রমা সেন্টারটি বন্ধ, ‘ক্যান্সার শরণার্থী’ হিশেবে পরিচিত শত শত ক্যান্সার রোগীকে গবাদি পশুর মতো তাড়িয়ে দেয়ায় তারা এই বিশাল হাসপাতালের বাইরের রাস্তায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছে। 

    আর্টওয়ার্ক: হেলথবাজেট
    শিল্পী: সাতীশ আচারিয়া
    সূত্র: আর্রে

    মানুষজন অসুস্থ হয়ে ঘরেই মারা যাবে। আমরা কখনই তাদের কথা জানতে পারব না। তারা এমনকি পরিসংখ্যানেও থাকবে না। আমরা কেবল আশা করতে পারি, যে গবেষণাগুলো বলছে যে এই ভাইরাসের জন্য ঠাণ্ডা আবহাওয়ার আনুকূল্য দরকার, সেগুলো সত্য হোক (যদিও অন্যান্য গবেষকরা এতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন)।  কোন মানুষ কখনো এত ব্যাকুল হয়ে কাঠফাটা, অতিষ্ঠ ভারতীয় গ্রীষ্মের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেনি। 

    আমাদের আসলে হয়েছেটা কী? হ্যাঁ, এটি একটি ভাইরাস। এবং এটি নিজের চরিত্র সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা দেয় না। কিন্তু আসল ঘটনা অবশ্যই ভাইরাসের চেয়ে বেশি কিছু। কেউ কেউ বিশ্বাস করছে যে আমাদের সম্বিত ফেরানোর জন্য এটি একটি ঐশ্বরিক পন্থা। অন্যরা বলছে যে বিশ্বের ওপর প্রভুত্ব কায়েম করতে এ এক চাইনিজ ষড়যন্ত্র।

    আর্টওয়ার্ক: স্টে এট হোম
    শিল্পী: নাসের জাফরি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যাই হোক না কেন, করোনাভাইরাস এমনভাবে প্রবল পরাক্রমকে হাঁটু গেঁড়ে বসতে এবং দুনিয়াকে থমকে যেতে বাধ্য করেছে যা অন্যকিছুই পারেনি। আমাদের মন এখনো ছটফট করছে, “স্বাভাবিক” জীবনে ফিরে যাওয়ার জন্য আকুপাকু করছে, অতীত ও ভবিষ্যতকে একসুতোয় গেঁথে বিচ্ছেদকে অস্বীকার করতে চাইছে। কিন্তু এই বিচ্ছেদই সত্য। আত্মবিনাশের যে কুয়ো আমরা খনন করেছি তাতে নিজেদেরকে আরেকবার দেখে নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, এই বীভৎস নৈরাশ্যের বাতাবরণ। এই অস্বাভাবিক ‘স্বাভাবিকতা’য় ফিরে আসার চেয়ে নির্মম আর কিছুই হতে পারে না।

    ঐতিহাসিকভাবে,  মহামারি মানুষের অতীতের সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং নতুন দুনিয়া কল্পনা করার অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। এটি একটি প্রবেশদ্বার, এক পৃথিবী থেকে আরেক পৃথিবীর মধ্যবর্তী একটি তোরণ।

    আমরা আমাদের কুসংস্কার ও বিদ্বেষ, অর্থলিপ্সা,  আমাদের ডেটা ব্যাংক ও অসাড় ধারণা, মৃত নদী ও ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশ পেছনে ফেলে সামনে এগোতে পারি। কিংবা অন্য একটি পৃথিবীর কথা ভাবতে ভাবতে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে নির্ভার হেঁটে যেতে পারি। সেই পৃথিবীর জন্য লড়াইও করতে পারি… 

    নোট: করোনা ভাইরাসের হুমকি, ইণ্ডিয়া ও বিশ্বের করণীয় সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের বয়ান। এটি ৩ এপ্রিল ভারতীয় কাগজ ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ এ প্রকাশিত হয়।

  • সিসি দ্যুতসিও ও তাসোস সাগ্রিস।। করোনাভাইরাস ও পারস্পারিকতা

    সিসি দ্যুতসিও ও তাসোস সাগ্রিস।। করোনাভাইরাস ও পারস্পারিকতা

    অনুবাদ : সজীব সাখাওয়াত

    অনুবাদকের ভূমিকা: গোটা বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস আমাদের অনেকগুলো ধাক্কা দিয়েছে। সেই ধাক্কাগুলো প্রশ্নের মুখে ফেলেছে আমাদের নাগরিক জীবন, সামাজিক জীবনকে। ‘যোগ্যতমর টিকে থাকার লড়াই’ না কি ‘পারস্পরিক সহযোগিতায় টিকে থাকার লড়াই’ এ প্রশ্নের উত্থান হয়েছে আজকে আবার। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেখানে ‘আমিত্ব’র প্রচার করে যাচ্ছে বারবার সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বলে যাচ্ছি যৌথ জীবনের কথা। মানুষ সামাজিক জীব, এটি আমরা ছোটোবেলা থেকে মুখস্ত করে এসেছি। কিন্তু এই সমাজ, এই সামাজিক সংহতির কতটুকু আমরা দেখাতে পেরেছি– করোনা হাজির হয়েছে এ প্রশ্ন নিয়ে। করোনার এই ধাক্কাটা খুব গভীরভাবে আমাদের আঘাত করে।

    সিসি দ্যুতসিও

    কোয়ারেন্টাইন বা সামাজিক দূরত্বের শ্লোগান তুলে রাষ্ট্রগুলো যখন তার সমাজকে বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে তখন আমরা বলছি সামাজিক দূরত্ব নয়, শারীরিক দূরত্ব এবং সামাজিক সংহতি করোনা মোকাবেলা করবে। মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতার কথা আমরা বলছি। এই পারস্পরিক সহযোগিতা মানুষের মধ্যকার আদিম এক প্রবৃত্তি। নৃবিজ্ঞানী মার্গারেট মীড সংস্কৃতিতে সভ্যতার প্রথম চিহ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন মানুষের উরুর ভাঙা হাড় যা আবার জোড়া লেগেছে। মীড বলেছেন সভ্যতার প্রথম চিহ্ন– পারস্পরিক সহযোগিতার কথা, যে সহযোগিতা ছাড়া উরুর হাড় জোড়া লাগত না। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর যাবতীয় দুর্যোগ, মহামারিকে মানুষ মোকাবেলা করেছে একে অপরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে, একে অন্যের দেখভাল করার মাধ্যমে।

    করোনা আমাদের বারবার প্রকৃতির দ্বারস্থ করেছে। প্রকৃতির স্বাভাবিকতার দ্বারস্থ করেছে। আর সেই স্বাভাবিকতা হলো যৌথ জীবন। কোনো মানুষ একা বেঁচে থাকতে পারে না– এই চিরন্তন বাক্যটিকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে। পিওতর ক্রপোতকিন তার মিচুয়াল এইড গ্রন্থে বলেছেন পূর্ববর্তী কয়েক শতকে রাষ্ট্রগুলো কর্তৃত্ববাদী আর শোষণবাদী রূপ ধারণ করার আগ পর্যন্ত মানুষ পারস্পরিক সাহায্য আর সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজকে পুনঃনির্মাণ করতে চেয়েছে। আর সেই সমাজের আদর্শ ছিল–মৈত্রীবোধ। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ হবে সমাজকে এই পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে পুনঃনির্মাণ করতে চাওয়া। এই সমাজকে যদি আমরা পুনঃনির্মাণ করতে পারি তবেই ভালোবাসা-সৌহার্দ্য-পারস্পরিকতার এক যৌথ জীবন আমরা লাভ করতে পারব যেখানে আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, থাকবে গান গাইবার স্বাধীনতা, চিৎকার করার স্বাধীনতা।

    Sissy Doutsiou আর Tasos Sagris এর Cronavirus and Mutual aid রচনাটি আশা জাগানিয়া একটি রচনা। এই লিখা আমাদের সমানুভূূূতি-সমযোগিতার কথা বলে, বলে প্রেম-ভালোবাসা-যত্নের কথা। আমাদের নতুন সমাজ বিনির্মাণে এই ভাবনাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সংহতির হাত ধরে গোটা বিশ্ব এই করোনা মহামারি মোকাবেলা করবে এটাই কামনা।

    আজকের এই সময়ে আমরা সকলে সাধারণ এক ইতিহাসে বসবাস করছি

    আমরা এমন এক সর্বনাশা ভাইরাসের মুখোমুখি যা গোটা দুনিয়ায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমাদের উদ্বেগকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য আমরা বলছি, আমরা যদি সতর্কতামূলক আগাম ব্যবস্থা নিই, তবে আমরা বেঁচে যাব। এই সময়টাতেই আমরা টেলিভিশন দেখার সময়গুলো কমানোর চেষ্টা করি। আসলে, টেলিভিশনে খবর দেখাটা নিত্যদিনের গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ভুল সংবাদ, গণমাধ্যমের প্রতি আমাদের অনাস্থার মানসিক আঘাত প্রতিস্থাপিত হয়েছে এক গভীর ক্ষত দ্বারা, মহামারির নিত্যদিনের ব্রিফিং আমাদের সকলকেই প্রভাবিত করছে।

    আর্ট্ওয়ার্ক: সলিডারিটি
    শিল্পী: প্যাট্রিক হারজিগ
    সূত্র: সাটসি আর্ট

    আমরা প্রত্যেকেই, পুনর্বিবেচনার পরে নিজেদের ভয়গুলোকে মোকাবিলা করছি, নিজেদের সাথে কথোপকথনে জড়াচ্ছি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবনের অর্থকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছি। আমরা ভাবনার আদানপ্রদান করছি এবং কোনো একটা সমাধান খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছি। অনেক অনেক প্রবন্ধ, বিশ্লেষণ লিখা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে আমরা পুঁজিবাদের সীমার বিরুদ্ধে, বাণিজ্যিক-ভোগবাদী বিশ্বের বিরুদ্ধে।

    কিভাবে আমরা আমাদের প্রাণ বাঁচাব, আমাদের সহ-মানবদের প্রাণ বাঁচাব? সমবেদনা আর সুখের আলোকে কোন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব? এই ভাইরাসের পাশাপাশি আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার এবং বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর ভালোবাসা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আন্তরিকতা, আর আরোগ্য দিতে না পারার ব্যর্থতাকে মেনে নিতে হচ্ছে। অথচ যখন কারো জীবন সংকটাপন্ন হয় এসবেরই সবচেয়ে বেশি দরকার হয়।

    কিভাবে আমরা আমাদের ভয়কে নিরস্ত করতে পারব যখন এই পৃথিবীটা হঠাৎ করেই বদলে গেল? এর শেষ কখন হবে? কখন আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাব আমরা কি তখন দেখব শোষণ ও সামাজিক বৈষম্যের এই ব্যবস্থা পরবর্তী সংকট না আসা পর্যন্ত আবারও কাজ করা শুরু করেছে?

    মূল হুমকি হলো আমাদের জীবন যাপনের ধরন বৈশ্বিক উদ্বেগ, বৈশ্বিক ভয় মানুষকে ভীত করে। সৌভাগ্যজনকভাবে, এখানে নির্মম রসবোধ আছে এবং অনেকেই আছে যারা এই ঘটনা অবলোকন এবং চিন্তা করছে, বিভিন্ন লেখা এবং বিশ্লেষণ, ভিডিও, স্বাধীন সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগ এর মাধ্যমে তল থেকে উপরে তথ্য সরবরাহ করছে; প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে বাইরেও এ সকল যোগাযোগ মাধ্যম কাজ করছে।

    যখন সমাজ আতঙ্কিত অবস্থায় থাকে, ব্যক্তিও আতঙ্কিত হয়। সমাজ যখন উন্নতির দিকে ধাবিত হয়, ব্যক্তি কেবল তার মৌলিক অধিকার পায়। সমাজ যখন ভাইরাসের মুখোমুখি হয়, ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে।

    কোনো গাছ কিংবা গাছের শাখায় বসে থাকা পাখির চোখে আমরা যদি অতীত আর ভবিষ্যত দেখি, আমাদের উচিত শুধু সুখ,আনন্দ আর স্বাস্থ্য খোঁজা। সংকটের সময় স্বাধীনতা কোথায়? সমাজ, প্রতিষ্ঠান, আইন, এবং ব্যক্তির আধুনিক জীবনব্যবস্থা সব চেতনে বা অবচেতনে পুনরাৎপাদিত হয়। এখন যখন আমরা কেবল বাঁচতে চাই এবং প্রিয়জনের সুস্থতা চাই তখন এই মুক্ত-বাজারে আসলে কি ঘটছে? জীবনের সহজাত প্রবৃত্তি এবং মৃত্যুর উপলব্ধি আমাদের মনে সমভারেই থাকে।

    যখন কোনো জীবনব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং জীব দুর্বল হয়ে পড়ে তখন নিরাপত্তার অভাব আর উদ্বেগ জন্মায়। আমাদের জীবনের প্রতি ভালোবাসা, চিন্তার সক্ষমতা আর ঘটনাকে বোঝার সক্ষমতা– এই চেতনার ঐকতানকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে: এখানেই আমরা বসবাস করছি এবং একত্রে এটাকেই আমাদের পরিবর্তন করতে হবে। এটি অদ্ভুত নয়। পুঁজিবাদীরা শতাব্দী ধরে সকল জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে– বৈশ্বিক পুঁজিবাদ এই হুমকিকে বিশ্বব্যাপী আরো বৃদ্ধি করছে। শিল্পায়ন এবং প্রকৃতির ধ্বংস, যুদ্ধ শরণার্থীর বেদনা, দারিদ্র্য, প্রতিযোগিতা এবং বেঁচে থাকার দৈনন্দিন সংগ্রাম আমাদের জীবনে মহামারির মতোই। আমাদেরকে অবশেষে প্রতিরোধ ও একে অপরকে সমর্থন করার নতুন উপায় শিখতে হবে।

    রোমান্টিকরা কল্পনা করেন শহরের গুপ্ত জায়গাগুলোতে বাজেয়াপ্তকরণ আর গোপন যুদ্ধের মাধ্যমে প্রলেতারিয়েতরা বা প্লেবিয়ানরা সামাজিক বিদ্রোহ সম্পন্ন করবে। র‍্যাডিকেলরা পুঁজিবাদের পতন চান, সামাজিক-ন্যায়বিচার বিশ্লেষকরা সামরিকায়িত সমাজ, একটা টোটালেটারিয়ান দুনিয়ার পূর্বাভাস দেন।

    এবং আমরা সকলেই ভাবি: ‘কিন্তু, এ কেমন জীবন?’

    আমাদের মধ্যে যারা সামাজিক ন্যায়বিচারের ব্যাপারে উৎসাহী এবং কেবল নিজেদের বেঁচে থাকা নিয়ে নয়– তারা প্রতিনিয়তই এই মেশিনের ভুল, ভাঙা দান্তটি খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমরা বেঁচে থাকার অন্য উপায় খুঁজছি, একটা নতুন ভাষা, নতুন অর্থ, নতুন সম্পর্ক এবং অন্যায়ে বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একে অপরের সাথে যুক্ত হওয়ার উপায় খুঁজছি। আমরা আজ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি নিঃসন্দেহে তা আমাদের বদলে দেবে। আমরা উৎকৃষ্টের জন্য বদলাই, আমাদের সাথী মানবজাতির প্রতি দয়াশীল হই, এবং তাদের প্রতি ভীত বা বর্ণবাদী যেন না হই। মহানুভবতা হোক আমাদের জীবনের যাপনের একটি উপায়। এই শ্বাসরোধী-বিশ্ব প্রাণকে হত্যা করে আর পৃথিবীকে করে শিল্পায়িত, আমাদের তাই দরকার বাস্তুতান্ত্রিক সচেতনতা যাতে আমরা এই শ্বাসরোধী-বিশ্বে দম নিতে পারি। নিজেদেরকে পুনঃআবিষ্কৃত করা রাজনৈতিক জগতের সাথে সম্পৃক্ত। আমরা আমাদের অস্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে কি বুঝেছি এবং কি বুঝতে যাচ্ছি? আমরা নিজেদের সম্পর্কে কি বুঝতে যাচ্ছি? ব্যক্তিগত জটিলতা, সমস্যা এবং চাপ সবকিছুই আমাদেরকে এটি বোঝার সুযোগ করে দিচ্ছে যে:

    মুক্তির (emancipation) মাধ্যমেই আমরা সম্প্রীতি লাভ করব।

    এবং ‘মুক্তি’ মানে কী? নিঃশর্ত আত্ম-নিয়ন্ত্রণ (self-determination) – নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারা এবং যে সিদ্ধান্তগুলো অন্যের জন্যও মঙ্গলজনক বটে। কেউ আসলে প্রকৃতপক্ষে নিজেরটুকু নিয়ে সুখী থাকতে পারে না। একে অপরকে সাহায্য করার মাধ্যমে চরম আনন্দ লাভ প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ন্যায়সঙ্গত সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন করে।

    কিন্তু এই মুহুর্তে আমি কি ভাবছি? এই মুহুর্তে পৃথিবী গভীরভাবে আহত, এবং আমি ভাবছি আত্ম-নিয়ন্ত্রণের কথা? হ্যাঁ, তাঁর কারণ আমার শরীর এবং মন এই ভয়কে কাটাতে চাচ্ছে। আমি জানি একটি সম্পর্ক আমাদের বেঁচে থাকার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো মানবতা আর প্রকৃতির মধ্যকার সম্পর্ক। আমাদের শরীর হলো মানুষ আর প্রকৃতির মাঝের ছেদ। এখন যখন আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে হয়ে পড়ছে তখন সমাজও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আমাদের অবশ্যই আমাদের মনকে একদম কোনো ডিসটোপিয়ান আর শ্বাসরোধী-চিন্তা দিয়ে বিরক্ত করা যাবে না। আমি আশা করি অসুস্থ ও ভাইরাস বাহকের জন্য এর মর্যাদা সুরক্ষিত ও মজবুত রয়েছে, এবং তাদের সাথে যেন কীটপতঙ্গের মতো আচরণ না করি। আমার আশা হলো, আমরা করোনাভাইরাস রোগীদের সাথে যুদ্ধের শরণার্থীদের মতো আচরণ যেন আচরণ না করি; করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের এ লড়াই অন্যান্য আক্রান্তদের বেদনা ও যন্ত্রণা বোঝার সুযোগ করে দিবে।

    কর্মক্ষেত্র এবং ভোগের স্থানগুলো এখন মৃত্যু ফাঁদ

    এমন একটা দুনিয়ায় কোয়ারেন্টাইন অর্জন করা কীভাবে সম্ভব যেখানে কিনা আমাদের মৌলিক চাহিদা নির্ভর করে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর যার ভিত্তি হচ্ছে শোষণ ও উৎপাদনের হাতিয়ারসমূহের মালিকানা, এবং যার পণ্যের বাজার সরবরাহ মুনাফামুখী বক্তিমালিকানায় রয়েছে? খাদ্য সংগ্রহের জন্য এখন চাকরি আর সুপারমার্কেট প্রয়োজন। এই করোনাভাইরাস যুগে আমরা যেসব জায়গায় যেতে সর্বদা বাধ্য সেগুলোই ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাব্য উৎস। কাজের জায়গাগুলো, সুপারমার্কেটগুলো কোনো কারণে যদি আমরা সেসবে ভিড় জমাই।

    খাবার কেনার ক্ষেত্রে আপনাকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে গ্লাভস পরার জন্য, অন্যান্য ক্রেতাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার জন্য, সার্জিকাল মাস্ক পরিধান করার জন্য। কিন্তু যদি আমাদের বাড়িতেই বাগান থাকত, আমাদের ছাদে, কিংবা চত্বরে কিংবা আশেপাশে? আমাদের মধ্যে কজনের ছোট মাঠ আছে, একটা শস্যক্ষেত্র যেখানে সবজি, ফল আর মসলা আছে– এগুলোই কী প্রাচীন এথেন্সে গণতন্ত্রের উত্থানের কারণ ছিল না? সামন্ততন্ত্র পরবর্তী আধুনিক মানুষ একপাক্ষিক আজ্ঞা পালনে বাধ্য, এক ধরনের কাজকর্ম করতে বাধ্য এবং সেটা হলো ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য শ্রম ও ভোগ করা, এবং নিজেদের অসীম সম্ভাবনা এবং আমাদের সামষ্টিক শক্তিকে দাবিয়ে রাখা।

    এখন আমরা মুনাফা আর নিয়ন্ত্রণের এক জলাভূমিতে বাস করি। এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় অভ্যস্ত হতে হবে আমাদের বেঁচে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান হিসেবে। আমরা আমাদের নিদারুণ যন্ত্রণা ও তিক্ত কাজে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি, টাকা দুর্লভ এবং কখনোই পর্যাপ্ত হয় না, সময় পার করা কঠিন হয়ে পড়ে– আমাদের কর্মক্ষেত্র আজ আমাদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। যেখানে কোনো ‘অপ্রয়োজনীয় হাঁটাচলা নেই’, বরং আছে অনেক অপ্রয়োজনীয় এবং ভিত্তিহীন চাকরি, যেগুলোকরতে বাধ্য হয়েছি কেবল মুনাফার ইঞ্জিন সচল রাখার জন্য, তা আমাদের জমিন আর জীবন ধ্বংস করে হলেও।

    তাদের প্রশ্ন করতে হবে যারা আমাদের জীবন ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে

    এই মুহুর্তে বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা এবং মুক্তির পথ খোঁজা অযৌক্তিক নয় । রাষ্ট্রগুলো ভাইরাস প্রতিরোধের যে ব্যবস্থাগুলো নিচ্ছে সেগুলো নিষ্ঠুর এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্যু এর মতো ভয়ানক, এবং ক্ষেত্রে আংশিকভাবে– যেহেতু তারা প্রথম শ্রেণির নাগরিক যারা নয় (যেমন ঘরহীন, মানসিক অসুস্থ, দরিদ্র, কয়েদি, শরণার্থী এবং সামাজিকভাবে বর্জিত) তাদের খাদ্যাদি সরবরাহের ব্যাপারে থোড়াই কেয়ার করে এবং দিনের পর দিন কারারোধ আর পাগলামোর সীমানার মধ্যে কাজগুলো পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর চোখে কোন মানুষগুলো পরজীবী, এবং ফলস্বরূপ স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থার নাগাল পেতে ব্যর্থ? তাদের সকলের কি থাকার মতো ঘর আছে? তারা কি সকলে কাজকর্ম ফেলে ঘরে বসে থাকতে পারে অথবা দুরবর্তী অবস্থান থেকে কাজ করতে পারে?

    আর্টওয়ার্ক: থ্রি মাস্ক
    শিল্পী: হাসান ব্লেবেল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই ভাইরাস থেকে সকল গণ ও বেসরকারি খাতের চাকরিজীবী, সকল ফ্রীল্যান্সার এবং কৃষকদের রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এটি সম্ভব কেবল যদি রাষ্ট্র সকল ‘অপ্রয়োজনীয়’ ব্যয় বন্ধ করে, ‘বুলশিট’ কাজকর্ম বন্ধ করে এবং অর্থের বন্টন করে (আমাদেরই অর্থ!)– এই বন্টন হবে তরুণ, গৃহিণী, ডাক্তার, শিক্ষক, দরিদ্র শিল্পী, এবং সেই সকল মানুষের দেখভাল আর সাহায্যের জন্য যাদের আয় নষ্ট হয়েছে। ইউরোপে এমন অনেক ‘সাংস্কৃতিক’ অনুষ্ঠান আছে যেখানে কোটি কোটি ইউরো দেয়া হয় সাংস্কৃতিক এন্টারপ্রাইজ ও এনজিওগুলোকে ‘ইউরোপীয় মান’ অথবা ‘সংহতি’ এবং ‘লিঙ্গ ও জাতি’ অভিগম্যতার জন্য। সকল ভন্ডামিপূর্ণ স্লোগানের জন্য কোটি কোটি ডলার পায় বিনিয়োগকারী প্রতারকরা যারা অনুদানে খেয়ে পরে বাঁচে। আমাদের কি দাবি তোলা উচিত না এসব তহবিলগুলোকে করোনাভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্তদের সহযোগিতায় বন্টন করার জন্য এবং সামাজিক কাঠামোগুলো ঠিক করার জন্য যাতে আমরা একে অপরের দেখভাল করতে পারি কার্যকরীভাবে? আমাদের সভ্যতাকে রক্ষা করার জন্য সাথী মানবজাতিকে সাহায্য এবং রক্ষা করা ব্যতীত আমাদের আর কোনো উপায় নেই।

    এই ভাইরাসের বিস্তৃতি এবং এর প্রতিকারের ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রশ্নগুলো জাগে: কি ধরনের ব্যবস্থাপনা আমরা চাই? কি ধরনের ব্যবস্থাপনা আমরা পেতে পারি? সিদ্ধান্ত কারা গ্রহণ করবে? নিশ্চয়ই আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করতে চাই যেখানে ভালো অবস্থা আর সমৃদ্ধি আছে, যেখানে আমরা স্বাস্থ্যবান এবং ভালো থাকবো। রাষ্ট্র, শাসক, পুঁজিবাদ কি সর্বনাশা আপস ছাড়া এমন ভালো জীবন দিতে পেরেছে? এখন কি তারা জনগণকে রক্ষা করতে সক্ষম? তারা কি সক্ষম এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে একটা নিরাপদ আর কম যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতি তৈরি করতে? এটা কি বিশ্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ব্যর্থতার নির্দেশক নয় যা ক্রমাগত মানবিক, বাস্তুতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক আর সামাজিক সংকট আর দুর্যোগ তৈরি করছে? কি পরিমাণ ‘সংযম আর ধৈর্য’ আমরা সহ্য করব? আর কি পরিমাণ আনুগত্য আমরা ঐসব রাজনীতিবিদদের দেখাব যারা মানবজাতিকে উত্তম জগতে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত করে?

    আমাদের জীবন আমাদেরই অধীনে

    বাস্তবতার আরো সামগ্রিক একটা দৃশ্য আমাদের প্রয়োজন। টোটালেটারিয়ান যুগের ক্রান্তিতে মানবজাতি একটি বিরাট স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে। যারা আমাদের পরিচালিত করে তারা এই সংকট সমাধানের রাস্তা হিসেবে কেবল বেছে নিয়েছে- আদেশ দেয়া এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। এর মাধ্যমে এত বছর ধরে তারা যা করেছে এবং যা করেনি তার দায় আমাদের উপর চাপাতে চায়। পুঁজিবাদের প্রয়োজন আমাদের জীবন ধ্বংস করা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্র নির্মিত দমনযন্ত্র। আমাদের দরকার সামাজিক স্থাপনাগুলোর সংহতি আর পারস্পরিক সহযোগিতা; আমাদের রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদ কোনোটারই দরকার নেই।

    শাসকগোষ্ঠী একমাত্র পরামর্শ নেয়ার সাহস করে যেটা হলো সমাজের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। বাধ্যতামূলক কারাবাস চাপিয়ে দেয়া আমাদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি করে যা আমাদের ব্যক্তিক স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ভবিষ্যত আমাদের জন্য কি রেখেছে? বিদ্যমান আর অবিদ্যমান শত্রুদের কাছে সকল ধরনের দাসত্ব করা? কে প্রত্যেকবার এই সমাজের শত্রুদেরবেছে নেয়?

    মেডিক্যাল কোয়ারেন্টাইন গুরুত্বপূর্ণ, যদিওবা একইসময়ে এটি এক অস্বস্তি তৈরি করছে এই অনিশ্চিত পৃথিবীতে। আমরা এমন এক অবস্থায় আছি যা এই অনিশ্চয়তাকে চিরস্থায়ী করছে আর সরকারকে অধিকার দিচ্ছে আমাদের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার।

    আমরা এমন এক মানবিক মানবসভ্যতা চাই যা আমাদের আবেগকে শ্রদ্ধা করবে। পারস্পরিক সহযোগিতা আমাদের একাকীত্ব আর ভয় থেকে মুক্ত করতে পারে। এটা এখন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে আমরা সকলে একত্রে ইতিহাসের একই অধ্যায়ে আছি, একই নৌকায়, এই ঝোড়ো সমুদ্রে। আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে, কিছু সময়ের জন্য একে অন্যের থেকে দূরে থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত আরোগ্য আর সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। আসুন, এই দিনগুলোকে ব্যবহার করি আমাদের চিন্তাভাবনার কর্তৃত্ববাদী দিককে চ্যালেঞ্জ করার জন্য, চিন্তা করি কিভাবে একটা সমাজ প্রত্যেক শহর আর গ্রামে আইসিইউ সুবিধাসহ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দিতে পারে, যাতে অ-রক্ষিত জনগণকে সাহায্য করা যায়, যাতে আমাদের বার্তা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়, আমরা নিজেদের সাথে কিছু সময় পার করতে পারি, আমাদের কোনো কর্মকান্ড দ্বারা আমাদের সাথী মানুষদের জীবন বা স্বাস্থ্য বিপন্ন না হয়, নতুন দক্ষতা (পড়া, লেখা, আঁকা, সেলাই করা) আবিষ্কার করি, প্রয়োজনে আমাদের প্রতিবেশির জন্য রান্না করি, প্রাচীন ভেষজ উদ্ভিদদের নাম শিখি, আমাদের সঙ্গীদের থেরাপি মাসাজ প্রদান করি, ভালোবাসতে শিখি এবং আমাদের প্রিয়জনদের সাথে কথা বলি। এবং আমি এমন গোপন রীতির সন্ধান করছি যা আমার পরিবার ও আমাদের সকলকে এই মহামারি থেকে বাঁচাতে পারবে। এবং আমি কেবল একটাই পেয়েছি:

    পর্যালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (critical thinking) আমাদের সবার জন্য জরুরি।

    মিচুয়াল এইড- আসুন একে অপরকে যত্ন ও শক্তি প্রদান করি

    করোনাভাইরাস কি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ধ্বংস করতে পারবে? আমি জানি না, আমি তা মনেও করি না। কিন্তু অন্তত এর কাঠামো আর উপকরণকে প্রশ্ন করুক; ক্ষমতায় যারা আছে তাদের দিকে আমাদের কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া উচিৎ এবং দাবি করা উচিত তৎক্ষণাৎ উত্তরের। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে যে জিনিসটি আমাদেরকে গ্রাস করছে সেটা হলো: প্রতিদিন টিকে থাকার উদ্বেগ; এটি আমাদের অসুস্থ করে তোলে। এই আতঙ্ক আর উদ্বেগ আমাদের সামাজিক জীবনের সকল ক্ষেত্রকে অধীন করে যা প্রকাশ করে এই শোষণবাদী আর কর্তৃত্ববাদী যুগে আমাদের উপর ভর করা অশুভ এবং আমাদের বেঁচে থাকতে বাধ্য করার কার্যকরী ব্যবস্থাপনার অপর্যাপ্ততা!

    সলিডারিটি মুরাল

    আমরা নিজেদের আরো নিরাপদ মনে করতাম যদি আমাদের দেশ এবং অন্যান্য দেশগুলো বছরের পর বছর জনস্বাস্থ্য ধ্বংস না করত, যদি আমরা জানতাম যে আমাদের ঘরে বিনামূল্যের বিদ্যুৎ, পানি আর টেলিফোন ব্যবস্থা রয়েছে, যদি প্রতিমাসে আমাদের বেতনের ৮০% বিভিন্ন ভাড়া আর বিল দিতে চলে না যেত। আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করতাম যদি আমাদের পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র থাকত। যদি আমরা জানতাম একটা বিরাট সংখ্যক ডাক্তার, শিক্ষক, নার্স, রাধুনি, শিল্পি, কবি এবং সুখী দাদা-দাদি বাচ্চাদের রূপকথার গল্প শোনাত। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন জাগে কীভাবে বিভিন্ন সমাজ আসলে স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংকট কাটিয়ে ওঠে-কোনটিকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি আর কোনটিকে অর্থহীন মনে করি। আমরা কিভাবে জনগণের স্বাস্থ্যগত আর জীবন ধারণের উপাদান সরবরাহ করি? কিভাবে আমরা ফটকাবাজ, সুবিধাবাদী, শোষণবাদীদের হাত থেকে দুর্বল, গরীব আর বৃদ্ধদের রক্ষা করি? আমরা কিভাবে সামাজিক অবিচার থেকে এই পৃথিবীকে সারিয়ে তুলি?

    এই উত্থানরত করোনাভাইরাস মহামারির মুখোমুখি হওয়া কেবল নিষেধাজ্ঞার ব্যাপার নয়, বরং দরকার চিকিৎসা আর ভ্যাক্সিন যা বিনামূল্যে সকলের জন্য বন্টন করা হবে; এটা প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং নিরাপত্তা সামগ্রীসহ স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাইভেট সেক্টরের ক্লিনিক প্রস্তুত করার বিষয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মানবসম্পদ প্রদান করে এবং নতুন পাবলিক হাসপাতাল তৈরি করার মাধ্যমে। আমাদের প্রয়োজন সকলের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা-প্রত্যেকের অধিকার আছে সে সুস্থ কি অসুস্থ তা জানার। চলুন সাহসী হই আর ভাবি: আমাদের জীবন ধারণের শর্ত পরিবর্তিত হচ্ছে, আজকে আমাদের বেঁচে থাকার নতুন এক পরিকল্পনা চালু করতে হবে। সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে দিই, শাসকদের নয়। অবশ্যই এখন থেকেই যারা ‘প্রাইভেট হাসপাতাল’ এর কথা বলবে তারা অপরাধী গণ্য হবে। যতক্ষণ না এই সংকট শেষ হয় ভাড়াটিয়ারা কোনো ভাড়া প্রদান করবে না এবং মহামারি শেষে ভাড়ার একটি অংশ কমানোর দাবি করবে। পুরো পৃথিবীজুড়ে বিশাল ভাড়া ধর্মঘট চলছে। আমাদের দায়িত্ব এটিকে সমর্থন করা।

    আসুন আমরা আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা আর প্রশংসা প্রকাশ করি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের, মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের, কল্যাণের জন্য কাজ করা লোকজন, যারা নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং যারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রাখছে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য, এবং আশপাশের লোকজনকে যারা অন্যের বেদনাকে কমানোর চেষ্টা করছে তাদের প্রতি। এফিনিটি গ্রুপ হিসেবে ভয়েড নেটওয়ার্ক শপথ নেয় যে আমরা সংগ্রাম করব তাদের জন্য যারা বিভিন্নভাবে সকলকে সাহায্য করছে, করবে।

    এটাই আমাদের প্রয়োজন– যত্ন আর চিকিৎসা।দীর্ঘজীবী হোক মানব স্বাধীনতা, সমতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভালোবাসা।

    আমরা প্রত্যেকেই এক একটা গল্প বহন করি, আমাদের বেদনার গল্প। এখন আমাদের সকলের একটি সাধারণ ইতিহাস আছে। আসুন এই সময়টাকে পৃথিবীকে ভালোভাবে বোঝার কাজে ব্যবহার করি। এই অভিযান শেষ হবে, আসুন আমরা নিজেদের উন্নত করার চেষ্টা করি, নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করি, সামাজিক কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করি যাতে একটি নৈতিক আর সহযোগিতামূলক পৃথিবী গড়ে তুলি, যে পৃথিবী সামাজিক অবিচার, অসাম্য আর স্বাধীনতা-দমনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।

    এতে ধৈর্য লাগবে, আমাদের জীবনকে নতুন এক উপায়ে দেখতে হবে। নিশ্চিত আমরা আবার মিলিত হবো। আসুন আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো কেবল ভালোবাসা আর উদারতার ভিত্তিতে তৈরি করি।

    আমরা আবারো একে অপরকে আলিঙ্গন করব!