Blog

  • বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয়

    বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয়

    • ফাহমিদুল হক

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক  স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। প্রবাহমান প্রবন্ধে  ফাহমিদুল হক মত প্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিকে খোলাসা করেছেন, শাসকতার নানা ধারা- প্রবণতা- চর্চাকে সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোকপাত করে। প্রবন্ধটির বর্তমান সংস্করণটি শুদ্ধস্বর থেকে পুন:প্রকাশ করা হল। — সম্পাদক 

    ভূমিকা
    মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নির্মাণ ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ হয়েছে, নিশ্চয়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকে বাদ দিয়ে নয়। “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” – ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত এই জনপ্রিয় গান কিংবা স্লোগানটি কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারের বয়ান করে না, সার্বিকভাবে চিন্তার স্বাধীনতার কথাও বলে। বাংলাদেশের সংবিধানেও মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে কিছু ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা’ ব্যতিরেকে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই রচনায় স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হবে। তাতে আমরা দেখতে পাবো, স্বাধীনতার পর নানান সরকারের সময়ে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমবেশি লঙ্ঘিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

    ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা জনপরিসরে বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ভাবনা প্রকাশের অধিকার হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (ড্যানেসি, ২০০৯: ১২৮)। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে একত্রে মিলিয়ে আলোচনা করে থাকি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে পাঠ করা হয়। একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি নেই, এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতার আছে কি নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব। সে হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে গত এক দশকে সরকারব্যবস্থা যেমন গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে ক্রমশ একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: অক্টোপাস
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রেক্ষাপট
    স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই আদর্শ পরিস্থিতিতে ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা সরাসরি মত প্রকাশ করতে পারছেন। এর আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমিত ছিল, কারণ ব্যক্তি নাগরিকের মত প্রকাশের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। সেই বিবেচনায় বলা যায়, স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় চারটি পত্রিকা ছাড়া বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৭০-র দশকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে ও ১৯৮০-র দশকে এরশাদ আমলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন চলাকালে সংবাদপত্রের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। সাংবাদিকরা একটি নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি সবসময়ই টের পেতেন, তবুও অনেকে নির্ভিকভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর নব্বই দশকে অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে দেশে মুক্তবাজার নীতি গৃহীত হলে বেসরকারি পর্যায়ে নতুন নতুন অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে এবং সাংবাদিকরা অনেকখানি স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ পান। আর নতুন শতকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমের বিস্ফোরণে অনেক টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলের আগমণ ঘটে। তবে এসব ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম চালু করবার লাইসেন্স কেবল সরকারঘনিষ্ঠ লোকজনই পেয়ে থাকেন। ফলে সরকার পরিবর্তনে বেশ কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায় অথবা মামলার মুখোমুখি হয়। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে যেহেতু একটি দলই ক্ষমতাসীন রয়েছে এবং লাইসেন্স প্রদানের নীতি যেহেতু একই থেকে গিয়েছে, তাতে দেশে বহু সংবাদপত্র, প্রায় চল্লিশটি টেলিভিশন, প্রায় ২০টি এফএম রেডিও থাকার পরও সরকারপসন্দ মতই ‘স্বাধীনভাবে’প্রকাশিত হচ্ছে, এবং সরকারবিরোধী মত প্রকাশিত হচ্ছে স্বনিয়ন্ত্রণের (সেলফ-সেন্সরশিপ) মধ্য দিয়ে ও সীমারেখা মধ্যে থেকে। সাম্প্রতিক সময়েই যুক্ত হয়েছে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি মতপ্রকাশের মাধ্যম সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক ইউটিউব) ও ব্লগ। প্রাথমিকভাবে এই পাটাতনগুলোর ব্যবহারকারীরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারলেও, আইনী বেড়াজাল এবং হত্যা-হামলা-মামলা ইত্যাদির মুখে তারাও স্বনিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছেন। আবার স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে, মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের অংশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহারের চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। আবার বেসরকারি সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণের ফলে, আধেয় নির্বাচন অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পরিবর্তে মিডিয় প্রতিষ্ঠানের পুঁজিপতি মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। অর্থাৎ মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রভাবও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

    মতপ্রকাশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
    প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্ট্রিয়ার (আরএসএফ) প্রতিবছর সারাবিশ্বের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম ১। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল ১৩৮তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৯তম। আরএসএফ যেসব সূচকের ভিত্তিতে এই র‌্যাংকিং করে সেগুলো হলো – বহুত্ববাদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পরিবেশ ও স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনী কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, অবকাঠামো, সহিংসতা২। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যেকয়েকটি স্থানের পিছিয়ে পড়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো – স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনী কাঠামো ও সহিংসতা। বহু মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও, স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ সেন্সরশিপ খুব স্পষ্ট, পূর্বেকার আইসিটি আইন ও হালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে খুবই কঠোর এক আইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং অনলাইন ব্যবহারকারী ও সাংবিাদকদের ওপর মামলা ও প্রত্যক্ষ হামলা অব্যাহত রয়েছে।

    সর্বোপরি, দেশব্যাপী এক ভয়ের পরিবেশ রয়েছে যা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম এক বাধা। গুম, ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টারের  নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধীদলের ও বিরোধীমতের ব্যক্তিদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার ও হয়রানি, ফোনে আড়িপাতা ও সুবিধামতো সেগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ, ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের দুই আন্দোলন – শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন – নিষ্ঠুরভাবে দমন এবং প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলমকে গ্রেফতার ও কারাগারে প্রেরণের মতো ঘটনা সার্বিকভাবে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। ২০১৮ সালের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে একতরফাভাবে শতকরা ৯৬ ভাগ আসন বর্তমান সরকার নিজের করে নেবার মাধ্যমে দেশে একদলীয় কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী হয়েছে যা এক ভীতিকর, হতাশাজনক ও চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। এই পরিবেশ প্রকারান্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসরকে একেবারে সঙ্কুচিত করে ফেলেছে।

    আইনী কাঠামো
    বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে, নীতিমালা গ্রহণ করেছে। এর কিছু খসড়া আকারে এখনও আছে, কিছু চূড়ান্ত  হয়েছে। এসবকিছুর মধ্যে একমাত্র ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয় নি। নয়তো প্রায় সব আইন ও নীতিমালা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। এসব আইন ও নীতিমালাকে বিশ্লেষক-সাংবাদিক-অনলাইন ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ‘নিবর্তনমূলক’হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪’ প্রচুর বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সবচেয়ে বেশি বির্তক হয় আইসিটি আইনকে (২০০৬ সালে প্রণীত, ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়) নিয়ে। বিশেষত এর ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনের ৫৭ ধারাটি নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়। এটি বিশেষত ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানিকর কিছু বলা হলে তার বিরুদ্ধে যে শাস্তির বিধান রাখা হয় তা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক পরিকাঠোমের বিরোধী। একই ধরনের মানহানিকর বক্তব্য মুদ্রণ মাধ্যমে দেয়া হলে, তার জন্য যদি ২ মাসের কারাদণ্ড বরাদ্দ হয়, তবে কেবল ডিজিটাল মাধ্যম বা অনলাইনে তা প্রকাশ করলে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এবং যেকোনো মামলা জামিন-অযোগ্য, যেকোনো কিছু পুলিশ আমলে নিতে পারবে এবং ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করতে পারবে। অর্থাৎ অভিযুক্তের নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনো ফাঁকই রাখা হয় নি। ফলে এটা ছিল প্রচলিত অর্থে এক ‘কালো আইন’এবং এর ভয়ঙ্কর দিকটির কথা সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং তারা বলতে থাকেন যে, নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৫৭ ধারার মতো কিছু থাকবে না৩। কিন্তু নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হবার দেখা যায়, তা আইসিটি আইনের তুলনায় আরো ভয়ঙ্কর। আইসিটি আইন ছিল অনলাইনের ব্যবহারকারীদের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার কারণে সাংবাদিকতাকে নিগড়ে বেঁধে ফেলা হয়।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে পুনরায় বিতর্ক শুরু হয় এবং এপর্যায়ে সাংবাদিকরা এবং বিশেষত ‘সম্পাদক পরিষদ’আইনের আপত্তিকর দিকগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করে সংবাদপত্রে পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপী প্রতিবেদন ছাপেন এবং স্পষ্টভাবে বলেন এই আইনের কয়েকটা ধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। সম্পাদকরা এমনকি প্রেসক্লাবের সামনে এবিষয়ে প্রতিবাদী মানববন্ধনও করেন। কিন্তু সরকার যেহেতু কর্তৃত্ববাদী আচরণে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাই তারা কোনো আপত্তিই কর্ণপাত করেন নি। ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে সংসদে আইনটি পাশ হয়ে যায়। সারা দেশের মানুষের আপত্তি আমলে না আনা হলেও, পুলিশের আপত্তির মুখে একটি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের অনুমোদন নেওয়ার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুলিশের আপত্তির মুখে মাত্র এক দিনের মধ্যেই অনুমোদনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। অর্থাৎ তারা কারো কোনো অনুমতি ছাড়াই তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করতে পারবে।

    আর্টওয়ার্ক: ওপেন মাইন্ড
    শিল্পী: ব্রাডি রড্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বস্তুত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পূর্বেকার ৫৭ ধারার ব্যাপারগুলো ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে নির্বাচিত দু’টি ধারা (৩২ ও ৪৩) আলোচিত হলো। ৩২ ধারায় বলা আছে:

    (১)       যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923), এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করনে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডেদণ্ডিত হবেন।

    (২)    যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা অনধিক  ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    ৪৩ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো পুলিশ অফিসারের মনে করেন যে এই আইনের (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, বা হচ্ছে বা হবার সম্ভাবনা আছে তবে ওই স্থানে প্রবেশ করে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি করতে পারবে, ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারবে, দেহ তল্লাশি করতে পারবে এবং সন্দেহ হলে গ্রেফতার করতে পারবে।

    এটা বেশ কৌতুকপ্রদ ব্যাপার যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ১৯২৩ সালের আইনকে সাক্ষী মানা হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত এই আইনটি তৎকালীন সরকারের জবাবদিহিতা এড়ানোর জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল যাতে নিঃসন্দেহে একটি অগণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ছিল। অর্থাৎ সরকার যা প্রকাশ করবে না বা করতে চায় না, তাই ওই আইনের সুরক্ষায় অধরা থেকে যাবে। তাহলে সাংবাদিকরা করবেটা কী? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ লোপাট হয়ে গেলে, সেসংক্রান্ত কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে, সেই তথ্য যদি ডিজিটাল ফরম্যাটে থাকে, তবে তা সংগ্রহ করা অপরাধ হবে? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হলে তদন্ত করা যাবে না, যেক্ষেত্রে আজকার অনেক তথ্যই ডিজিটাল ফরম্যাটে রক্ষিত থাকে? অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে যত অঘটন, অনিয়ম, কেলেঙ্কারি হোক, অনুসন্ধানের সুযোগ থাকবে না? অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে বা তথ্য সংগ্রহ করলে ১৪ বছরের জেল হবে? একদিকে তথ্য অধিকার আইন বলবৎ আছে, অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বরাত দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দূর্গ গড়ে তোলা হচ্ছে। আইনী তামাশা বলা যেতে পাওে একে।

    অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারা হলো ৪৩ ধারা। পুলিশকে কী অপরিসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে! পুলিশ যদি নেহায়েৎ মনে করে কোনো অপরাধ ‘সংঘটিত হতে পারে’তবেই তল্লাশি-জব্দ-গ্রেফতার করতে পারবে, কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই। পুলিশের ‘মনে হওয়া’ই যথেষ্ট কাউকে শাস্তি দেবার জন্য, হয়রানি করার জন্য! পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে এরকম আইনই বোধহয় প্রয়োজন পড়ে, যেখানে নাগরিকের বা অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৩টি ধারা জামিন-অযোগ্য। প্যারিসভিত্তিক আরএসফ, নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে), ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম অব জার্নালিস্টস – মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতা পরিবীক্ষণকারী সব আন্তর্জাতিক সংস্থাই এই আইনটির বিরুদ্ধে উদ্বেগ জানিয়েছে।

    সম্পাদক পরিষদ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে কয়েকটি পত্রিকায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে তাদের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের শুরুতে তারা তাদের বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

    জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে:

    ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

    ২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

    ৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    ৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে।

    (প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)

    কিন্তু সরকার কারো কোনে ওজর, কোনো প্রতিবাদ আমলে নেয় নি। একতরফা সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো তর্কবিতর্ক করতে হয় নি। বস্তুত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সরকার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সফলভাবে এর প্রয়োগও আমরা দেখেছি। যেমন সরকারপ্রধান বা কোনো মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতার নামে অনলাইনে কেউ প্রতিবাদমূলক কিছু লিখলে দেখা গেছে ওই নেতার নির্দেশে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ৫৭ ধারায় দ্রুত মামলা করছে কোনো ছাত্রনেতা বা চাটুকার কর্মী। এভাবে আইসিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়। ২৪ জুলাই, ২০১৮ তারিখে প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান জানান, ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে৪। বস্তুত আইসিটি আইন প্রবর্তনের পর সনাতনী মানহানিবিষয়ক আইন ব্যবহার হয়নি বললেই চলে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে:

    বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মামলা হু হু করে বাড়ছে। অঙ্কের হিসেবে ৩ বছরে মামলা বেড়েছে প্রায় ২০০০ গুণ। আর এসব মামলার প্রায় সবই করা হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায়। ধারাটি অজামিনযোগ্য (আসাদুজ্জামান, ২০১৬)৫।

    এই হিসেব প্রতিবেদক সাইবার ক্রাইম ট্রাইবুনালের মামলার সংখ্যা হিসেব করেই বলেছেন। এমন নয় যে, অনলাইনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে সত্যি সত্যি অত্যন্ত মানহানিকর কেউ কিছু লেখে না। কিন্তু মামলার হারের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে, স্বাভাবিক সমালোচনা, যা গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, সেটা হরণ করার জন্যই এই আইনের প্রবর্তন করা হয়েছে। শহিদুল আলমকেও আইসিটি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আবার অরাজনৈতিক কারণেও, ব্যক্তিগত-পেশাগত দ্বেষ-বিদ্বেষ থেকেও অন্যকে হয়রানি করার জন্য এই আইনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এই লেখকের বিরুদ্ধেও ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী, অসহিষ্ণু ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে এই আইন খুব অবদান রেখেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই প্রবণতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

    মূলধারার গণমাধ্যম
    আইসিটি আইন পরোক্ষভাবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রত্যক্ষভাবে মূলধারার সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি চলতি সংবাদ বা হার্ড নিউজ পরিবেশনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও আইনমন্ত্রী ডয়েচে ভেলে বাংলাকে বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকরা চিন্তা করবেন না, ৩২ ধারা আপনাদের বিরুদ্ধে নয়’৬, কিন্তু এই আশ্বাসসবাণী বলবৎ থাকে নি। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে খুলনার দু’জন সাংবাদিক রিপোর্ট করেন যে খুলনা-১ আসনে ভোটারের সংখ্যার চাইতে ভোটপ্রদানের সংখ্যা বেশি হয়েছে। ওই দু’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় এবং একজন গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃত সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্থা করার অভিযোগও পাওয়া যায় ৭। পরে অবশ্য তিনি জামিন পান। জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি ওই রিপোর্ট করেন এবং ভুলটা নির্বাচন কমিশনের লোকজনের।

    আর্টওয়ার্ক: ট্রিকল ডাউন
    শিল্পী: অরনাল্ডো কুলার
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু এই আইনী বাধার বাইরেও একটা চিত্র আছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়াই মোটের ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আগেই বলা হয়েছে লাইসেন্স প্রদানের নীতি অনুযায়ী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খুব একটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। অনলাইন পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দক্ষিণপন্থী সংগ্রাম, দিনকাল, ইনকিলাব ইত্যাদি পত্রিকার প্রভাব তেমন নেই পাঠকমহলে। তবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বণিকবার্তা বা নিউ এইজ পত্রিকা কিছুটা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার শীর্ষস্থানীয় দু’টি পত্রিকা এবং সমাজে তাদের প্রভাব রয়েছে। এই দুটো পত্রিকা নিয়ে আমাদের পুরনো অভিযোগ রয়েছে – নব্বই দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসারের জন্য জনমনে ভোক্তামনষ্কতা তৈরি করতে (দেখুন হক, ২০১১) এবং রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে সুশীল সমাজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনা করতে (দেখুন নিউটন, ২০১৩) পত্রিকা দু’টি ভূমিকা রাখতে চেয়েছে। প্রথমটিতে সফল হলেও তারা দ্বিতীয়টিতে ব্যর্থ হয়েছে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বা রাজনীতিবিদরা পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পরে। তবে গত এক দশকে পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে অন্য সব পত্রিকা-মিডিয়া যেমন গাঁটছড়া বেঁধেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই দুই পত্রিকা স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছে। ফলে তাদের ওপরে চাপ এসেছে। ‘সরকারের ইমেজ ক্ষুণ করার চেষ্টা’র অভিযোগে ২০১৫ সালে শীর্ষস্থানীয় টেলিকম কোম্পানিগুলোকে বিজ্ঞাপন না দিতে সরকারের দিক থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে৮। বস্তুত, প্রচুর সংবাদপত্র, প্রচুর টেলিভিশন ও বেতার চ্যানেল থাকার পরেও সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচারমাধ্যমগুলোতে কমই দেখা যায়। সংবাদপত্রের কলামে বা টেলিভিশন চ্যানেলে সরকারপন্থী সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিও প্রবল, যাদের দাপটে ভিন্নমত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কেবল বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের রুটিন কর্মসূচি নয়, জনগণের স্বার্থে যে আন্দোলনগুলো হয়ে থাকে, সেগুলোর খবরাখবর এসব মিডিয়ায় সামান্যই পরিবেশিত হয়। পরিবেশবাদী ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার উদ্দেশে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন, তার সীমিত ও খণ্ডিত কাভারেজ হতে দেখি আমরা। উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষের মত সবলভাবে উপস্থিত হয়ে থাকে। এরকম পরিস্থিতি তৈরী হয় বলেই ড্যানি শেকটার  (১৯৯৮) বলেছিলেন, “দ্যা মোর ইউ সি, দ্য লেস ইউ নো”। শেকটার অবশ্য কথা বলেছিলেন ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

    গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন মতপ্রকাশে যেমন বাধা আছে, বা ভয়ের পরিবেশ তৈরী হয়ে আছে এবং গণমাধ্যমগুলো স্বনিয়ন্ত্রণ করছে৯, কিন্তু সরকারকে বাড়তি সেবা দেবার জন্য বেশ কিছু গণমাধ্যম মাঠে সরব থাকে। যখন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধে (ধরা যাক, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন), কিছু টেলিভিশন চ্যানেল চেষ্টা করে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে টক-শোতে ডেকে নিয়ে, সহযোগী সাংবাদিকদের সহায়তায়, আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কলঙ্ক আরোপ করতে, এভাবে পুরো আন্দোলনকে অপশক্তির আন্দোলন বলে প্রমাণ করতে। একদিকে রয়েছে সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতি – গুম-নিখোঁজ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার; অন্যদিকে রয়েছে পোষ্য মিডিয়া, যারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কাজটি করে থাকে। তারই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে একাত্তর টিভি ও সময় টিভিতে নির্বাচনকালীন বিরোধী জোট নাগরিক ঐক্য ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের বেশ কিছু ফোনালাপ ফাঁস করা হয়। এতে তাদের নির্বাচনকালীন পরিকল্পনা, যাতে কিছু সহিংস ঘটনার পরিকল্পনাও রয়েছে, সেগুলোকে বারবার প্রচার করা হয়। আমরা জানি, সূত্র ছাড়া কোনো সংবাদ হয় না, কিন্তু এগুলো প্রাইম টাইম নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ফোনে আড়ি পাতা এমনিতেই নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী, সেই অনৈতিক কাজটিকে তারা সংবাদ উপাদান হিসেবে প্রচার করেছে। এসব ফোনালাপকে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’র ট্রিটমেন্ট দিয়ে, অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য প্রচার ছাড়াই একতরফা প্রচারকে অনৈতিক ও দালালীর সাংবাদিকতা বলতে হবে। কারণ এই আলাপগুলো সবই একপাক্ষিক, এগুলোর সব সুবিধা সরকারই পেয়েছে। এসব ‘দালাল মিডিয়া’র ক্ষমতা ছিল না নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের নেতৃবৃন্দ কী পরিকল্পনা করছে, তা জানানোর – কীভাবে ভোট কারচুপি হবে, কীভাবে নির্বাচনের আগে বিরোধী কর্মীদের গ্রেফতার করা হবে বা হুমকি দিয়ে নিজ নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকতে বাধ্য করা হবে?

    হুমকি ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বনিয়ন্ত্রণ ও দালালীর বাইরে অবশ্যই আরেকটি বিষয় হলো সাংবাদিকদের ওপর প্রত্যক্ষ বা শারীরিক হামলা। দেশীয় বেসরকার মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে ১২২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা বা হুমকি-হয়রানির শিকার হয়েছেন।… আর ২০১৮ সালে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা হয়েছে ২০৭টি। এর মধ্যে খুন হয়েছেন ৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১১৭টি (সুলতান, ২০১৯: ২)। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় কর্মরত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিকদের সরাসরি আঘাত করে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা এবং এতে অন্তঃত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন১০।

    সামাজিক মাধ্যম
    ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো এমন পাটাতন যাতে সাধারণ মানুষ যুক্ত এবং এখানে সরাসরি তারা তাদের মত প্রকাশ করে থাকেন। ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস (২০০৫) বর্ণিত ‘নেটওয়ার্ক সমাজ’-এর সার্থক উদাহরণ হলো এই সামাজিক মাধ্যম। এর সদস্যরা ‘আনুভূমিক যোগাযোগ’-এর মাধ্যমে একটি ‘প্রতি-ক্ষমতা’র (ক্যাস্টেলস, ২০০৭) জন্ম দেয় এবং এর মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আর উত্তর আফ্রিকায় এরকম কয়েকটি সরকারের পতন হয়েছিল ২০১০-১১ সালে। এই ঘটনা সব দেশের সরকারকে সতর্ক করে তোলে এবং সরকারগুলোর প্রণোদনায় নজরদারির এমন যন্ত্র তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবহারকারীদের নজরদারি করা যায়, অফিসে বসেই। কোনো সরকার এগুলো তৈরি করেছে, আর কোনো সরকার জনগণের করের টাকা দিয়ে বেশি দামে এগুলো কিনেছে এবং এরপর জনগণকেই নজরদারি করা শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়১১। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। গত নির্বাচনের আগে এই নজরদারি আরও বৃদ্ধি পায়১২। বোঝাই যায়, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের নজরদারিতে রেখে নির্বাচনে সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নজরদারি, কঠোর আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকারকে সরকার অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন রেপ্রিসিভ রেজিম
    শিল্পী: ফাদি আবু হাসান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এধরনের নজরদারি ও শাস্তি প্রদানের পেছনে সরকারপক্ষ এবং তার পক্ষে সাফাই প্রদানকারী টকশোকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও অনলাইন পণ্ডিতেরা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ভুয়া সংবাদ ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টাকে। একথা সত্যি ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো ভুয়া সংবাদ ও গুজবের উর্বর ক্ষেত্র। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলাও করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় এক পর্যায়ে টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলে, সেই সুযোগে হত্যা-ধর্ষণের গুজব ডালপালা মেলে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে অভিনেত্রী নওশাবা গ্রেফতার হন। তখন আন্দোলনকারীরা গুজবনির্ভর আন্দোলন করছে এবং তারা ‘অপশক্তি’দের দ্বারা চালিত বলে নিন্দা জানায় সরকারের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া এবং অনলাইন যোদ্ধারা। কিন্তু অচিরেই জানা যায়, গুজব ও মিথ্যা সংবাদ ছড়াতে সরকারপক্ষীয়রা কম যান না। নির্বাচনের ১০ দিন আগে, সরকারের বিভিন্ন পদে থাকা কিছু লোক দ্বারা পরিচালিত একাউন্ট ও পেজ ফেসবুক বন্ধ করে দেয়১৩। এছাড়া ব্লগ-জমানা (২০০৭ পরবর্তী সময়ে) থেকেই কিছু গ্রুপ (যেমন ‘এ-টিম’) অনলাইনে লড়াই-আক্রমণ-গালাগালিতে পরিচিত হয়ে ওঠে যার কিছু নিম্নমানের সংস্করণ (যেমন ‘সিপি গ্যাং’) ফেসবুকে সন্ত্রাস কায়েম করে এবং শেষপর্যন্ত এরা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই তাদের ‘লাঠিয়ালগিরি’কে উৎসর্গ করে। এই অনলাইন যোদ্ধারাও অনলাইনে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য বাধা। এদের আক্রমণের লক্ষ্য সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারী স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থী জামাতগোষ্ঠী কেবল নয়, প্রগতিশীল, বাম, কিংবা স্বাধীনচিন্তার মানুষদেরও এরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করতে সক্ষম। উল্টো সমালোচনামুখর প্রগতিশীলদেরও তারা ছদ্ম জামাতি বা ‘বামাতি’ উপাধি দেয় এবং প্রয়োজনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এরা সরকারকে ক্রিটিক করছেন এরকম যেকোনো ব্যক্তি, তিনি যদি সম্মানীয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিও হন, তাদের বিরুদ্ধে এদের কেউ একজন মিথ্যা বা বানোয়াট কথা লেখে এবং বাকিরা তা শেয়ার করে করে প্রায় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে১৪।

    একটি কারচুপির নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে সরকার কিছু ‘কল্যাণমুখী’পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে তারা বহু পর্নোগ্রাফির সাইট বন্ধ করে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় অশ্লীলতা ও জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করতে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজিগুলোকে ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে একটি তালিকা পাঠায় বিটিআরসি। সেই তালিকায় সামহোয়ারইন… ব্লগের নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে সামহোয়ারইন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই লেখা পর্যন্ত সামহোয়ারইন সব নেটওয়ার্ক থেকে দেখা যাচ্ছে না, অর্থাৎ আংশিক নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান আছে। বাংলা ভাষার প্রথম কমিউনিটি ব্লগ, যেটা ২০০৬ সালের শেষে চালু হয়, যেখানে অনেক লেখকের জন্ম হয়েছে এবং অনলাইনে বাংলা ভাষায় লেখালেখি চর্চায় যে সাইটটির অবদান পথিকৃতের, সেই সাইটটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ অত্যন্ত আপত্তিজনক১৫।

    মতপ্রকাশের অন্যান্য উপায়
    এতদিন কেবল চলচ্চিত্র সেন্সরবিধির আওতায় ছিল। কিন্তু আজকাল সাহিত্যচর্চা বা বইপুস্তকের মাধ্যমে মতপ্রকাশের বিষয়টিও পরোক্ষ সেন্সরশিপের মধ্যে পড়ে গেছে। একসময় লেখালেখির কারণে তসলিমা নাসরীনকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, কিন্তু এখন লেখালেখি করে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশ দুই দিক থেকে আক্রান্ত – একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন, আরেকদিকে জঙ্গির চাপাতির ঝিলিক। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই সবচেয়ে আলোচিত (অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য তার প্রকাশক দীপনকেও হত্যা করা হয় এবং আরে প্রকাশক টুটুলকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমন করা হয়), কিন্তু একের পর এক যখন ব্লগার খুন হচ্ছিল, তখন খুনিদের গ্রেফতার করতে সরকার কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেয়নি। বরং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে  লিখলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে মধ্যে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেন১৬। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীও সেই ধারায় বক্তব্য দেন। নিজেকে জাহির করার জন্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক লেখালেখি নিশ্চয়ই দায়িত্ববোধের পরিচয় নয়, কিন্তু সেকারণে কাউকে হত্যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং সেই হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করে, ঘটনার শিকার নিহত ব্লগারদের দায়ী করা হলে মূলত হত্যাকারীদেরই উৎসাহিত করা হয়। আস্কারাপ্রাপ্ত বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠী ব্লগারদের পরে, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান পাদ্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমুখকে একের পর এক হত্যা করতে থাকে। এই ধারাবাহিক জঙ্গি কার্যক্রম থামাতে সরকার লক্ষ্যযোগ্য কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে নি, হোলি আর্টিজেনে মর্মান্তিক হামলার আগ পর্যন্ত। হোলি আর্টিজেনের হামলার পর সরকারের টনক নড়ে এবং তারা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করে। এক পর্যায়ে বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে সরকার জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত নেতা ও কর্মীদের হত্যার মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রমকে সাময়িকভাবে দমন করে।

    কিন্তু এর মধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেমে আসে নানান অবাঞ্ছিত পদক্ষেপ। বইমেলা থেকে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০১৫ সালে রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ করে দেয় বাংলা একাডেমি। ২০১৬ সালে ব-দ্বীপ প্রকাশনীকে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেফতার করা হয়। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার, বইমেলার নতুন বই-পুস্তক পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এর চেয়ে হানিকর আর কী হতে পারে! আর এও বড় খেদের বিষয় যে, যে শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হেফাজতে ইসলামের উত্থান, যে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল ‘নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে’১৭, সেই হেফাজতের তালিকা মোতাবেক সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে রচনা সরিয়েছে, হাইকোর্টের সামনে থেকে থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণ করেছে এবং তাদেরই দেয়া ‘কওমী জননী’১৮ উপাধি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। অথচ এই সরকারকেই ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল নাস্তিকদের সরকার১৯। ঢাকা দখল করলে এই সরকারই হেফাজতে ইসলামকে নির্মমভাবে শাপলা চত্বর থেকে সরিয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ই মে। যে দল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দল পরিচালিত বর্তমান সরকার একদিকে আচরণে অসহিষ্ণু-ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় শক্তির কাছে নতজানু হয়ে পড়েছে। মতপ্রকাশ স্বাধীনতা পরিস্থিতি শোচনীয় হবার জন্য গুরুতর কারণগুলো আমাদের সামনে এভাবে হাজির হয়ে পড়েছে। হোলি আর্টিজেনের ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকেল’ যে সেন্সরবোর্ডে আটকা পড়বে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তেমনি বিস্ময়কর নয় ৫ই মার্চ, ২০১৯ তারিখে এশিয়ার বৃহত্তম আলোকচিত্র মেলা ‘ছবিমেলা’উপলক্ষ্যে শহিদুল আলমের সঞ্চালনায় বিশ্বখ্যাত প্রতিবাদী লেখক অরুন্ধতী রায়ের জনগণের জন্য উন্মুক্ত বক্তৃতাটি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে২০।

    আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
    শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপসংহার
    একটি বদ্ধ পরিস্থিতিতে সরাসরি বক্তব্যপ্রদান কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আসলেই অনেকখানি পাল্টে গেছে। নির্বাচনের পরে খুলনা-১ আসনসংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিবেদন দ্বারা যদি কেউ আক্রান্ত বোধ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে পত্রিকায় একটি প্রতিবাদলিপি পাঠাতে পারেন, পত্রিকা সেটা ছাপবে প্রতিবেদকের ব্যাখ্যাসহ। কিন্তু সেসব চর্চার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি সাংবাদিককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় বোঝা যায়, পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। সাংবাদিক-লেখক-অনলাইন ব্যবহারকারীর জন্য স্বাধীনতার পরিধি খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্যাটায়ার-সাহিত্য কিছুটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় সরকার টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে যদি আরেকটু সহনশীল হয়, ভিন্নমতের জন্য কিছুটা পরিসর ছেড়ে দেয়। সরকারের মনে রাখা উচিত যারা সারাক্ষণ তার প্রশংসা করছে, তাদের মধ্যেই স্তাবকের সংখ্যাই বেশি। আর যারা সমালোচনা করেন, তাদের মধ্যে কিছু বন্ধুও হয়তো আছে। তারা হয়তো সমালোচনার মধ্য দিয়ে তাকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করছে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সরকারের যথেষ্ট দুর্নাম ইতোমধ্যে জুটেছে, তার অন্যতম একটি কারণ হলো মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা সবাই জানেন ও মানেন। কিন্তু জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আজকাল আর কেউ উন্নয়ন বলে না, উন্নয়নের জন্য সঙ্গে চাই সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং অবশ্যই নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা।

    অন্তঃটীকা

    ১ rsf.org/en/ranking_table| ০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ২ rsf.org/en/detailed-methodology|  ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৩ ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ২৬শে জুলাই ২০১৮ তারিখে গণমাধ্যমকে জানান, ৫৭ ধারা বস্তুতপক্ষে ডেড। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার পরে ৫৭ ধারা নামক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকবে না। সুতরাং এটা নিয়ে টেনশনেরও কোনো কারণ নেই। দেখুন: :www.priyo.com/articles/201807261740|০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৪www.dhakatimes24.com/2017/07/24/41575।০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৫www.prothomalo.com/bangladesh/article/983584।০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৬ www.dw.com/bn/সাংবাদকিরা-চন্তিা-করবনে-না-৩২-ধারা-আপনাদের বিরুদ্ধে নয়/a-42630246। ০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৭ bonikbarta.net/bangla/news/2019-01-02/182318/২০১৯-০১-০২/১৮২৩১৮।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৮ www.dw.com/bn/বিজ্ঞাপন-বন্ধেরনির্দেশে-সরকাররে-ইমজে-ক্ষ্ণ্ণু-করার-চেষ্টা/a-18780505। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৯ বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও টেলিভিশনের ৩২ জন সাংবাদিক ও সম্পাদকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে এক খবরে জানিয়েছে, এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর গণমাধ্যম আইনের কারণে তাঁরা একটি ভয়ের পরিবেশের মধ্যে আছেন। এ জন্য অনেকে ‘স্ব–আরোপিত’নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করছেন। দেখুন, election.prothomalo.com/news/1570056?suggestion=। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১০ www.jugantor.com/national/77480/সাংবাদকিদরে-ওপর-ছাত্রলীগরে-র্ববর-হামলা-আহত-১০। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১১ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ৯ মে, ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সিস্টেম (এসএমএমএস) নামের উন্নত প্রযুক্তি খুব শিগগিরই যুক্ত হচ্ছে এলিট ফোর্স র্যা বের বলয়ে। বিশেষায়িত এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নজরদারির মধ্যে রাখবে ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইনস্টগ্রামসহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বাদ থাকছে না বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালও। প্রযুক্তির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ২০ জন র‌্যাব সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র (কাওসার, ২০১৬)। দেখুন: www.bd-pratidin.com/first-page/2016/05/09/143555। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১২ ২৫ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে দৈনিক সমকাল-এ প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক তথ্য প্রচার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব। এ লক্ষ্যে আগামী চার মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির দুই হাজার ৫০ জন অভিজ্ঞ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ২৪ ঘণ্টা উল্লিখিত মাধ্যমগুলো নজরদারিতে রাখবেন। তারা রাষ্ট্রবিরোধী গুজব, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তিমূলক পোস্টের জবাব দেবেন। একই সঙ্গে এসব কাজে যারা যুক্ত থাকবেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবকে সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া এসব মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের সঠিক তথ্য প্রচারেও দায়িত্ব পালন করবেন প্রযুক্তিবিদরা (সাইফুদ্দিন, ২০১৮)। দেখুন: samakal.com/bangladesh/article/18101517।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৩ বিবিসি বাংলা ২০শে ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলছে, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ভুয়া খবর প্রচারের জন্য তারা বাংলাদেশে তাদের প্ল্যাটফর্মে ৬টি একাউন্ট এবং ৯টি পেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফেসবুক বলছে, এগুলোতে ‘বাংলাদেশের সরকারের সমর্থনে বিভিন্ন কনটেন্ট পোস্ট করা হচ্ছিল’, এবং ‘এর সাথে সরকার-সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের সম্পর্ক আছে’। দেখুন: www.bbc.com/bengali/news-46636943। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৪  এসংক্রান্ত আলোচনার জন্য দেখুন (সুলতানা, ২০১৫)।

    ১৫ দেখুন:  www.prothomalo.com/bangladesh/article/1580737। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৬ দেখুন:  www.channelionline.com/ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত-দ-ি২/। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৭www.prothomalo.com/bangladesh/article/196120/নাস্তিকদের-কতল-করা-ওয়াজিব হয়ে গেছে।  ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৮www.banglatribune.com/national/news/382643/এবার-‘কওমি-জননী’-উপাধি পেলেন শেখ হাসিনা। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৯ www.youtube.com/watch?v=0HKZCkvGOlw।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ২০ দশম ছবিমেলা উপলক্ষ্যে আমন্ত্রিত অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতাটি ৫ই মার্চ ২০১৯ তারিখে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন কমপ্লেক্স মিলনায়তনে বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। কিন্তু আগের রাতে আয়োজকরা জানতে পারেন, ‘অনিবার্য কারণে’বক্তৃতাটির অনুমতি বাতিল করেছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। আয়োজকরা ওইদিনই বিকল্প ভেন্যু হিসেবে ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে সন্ধ্যা ৬টায় আলোচনার ব্যবস্থা করে ফেলেন। কিন্তু শ্রোতা হিসেবে লেখক অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে জানতে পারেন এখানেও অনুষ্ঠানটি করতে নিষেধ করেছে পুলিশ। এক পর্যায়ে অনুমতি মেলে এবং সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় বক্তৃতা শুরু হয়। উল্লেখ্য অরুন্ধতি রায় শহিদুল আলমের মুক্তির জন্যও কলম ধরেছিলেন। দেখুন www.prothomalo.com/bangladesh/article/1581975। ০৭ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    তথ্যসূত্র

    ড্যানেসি, মার্সেল (২০০৯)। ডিকশনারি অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স। নিউ ইয়র্ক: এম. ই. শার্প ইনক.।

    ক্যাস্টেলস, ম্যানুয়েল (২০০৭)। কমিউনিকেশন, পাওয়ার অ্যান্ড কাউন্টার-পাওয়ার ইন দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কমিউনিকেশন ১।

    ক্যাস্টেলস, ম্যানুয়েল (২০০৫)। দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি: ফ্রম নলেজ টু পলিসি। ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস ও গুস্তাভো কারদোসো (সম্পা.), দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি: ফ্রম নলেজ টু পলিসি। ওয়াশিংটন ডিসি: জন হপকিনস সেন্টার ফর ট্রানস্যাটল্যান্টিক রিলেশনস।

    শেকটার, ড্যানি (১৯৯৮)। দ্য মোর ইউ সি দ্য লেস ইউ নো: নিউজ ওয়ারস। নিউ ইয়র্ক: সেভেন স্টোরিস প্রেস।

    হক, ফাহমিদুল (২০১১)। অসম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যমবিষয়ক প্রতিভাবনা। ঢাকা: সংহতি।

    নিউটন, সেলিম রেজা (২০১৩)। বাজারের যুগে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আম্মু-আব্বু সমাচার অথবা বাংলাদেশে বিদ্যমান মহাজনি মুদ্রণের পলিটিাল ইকোনমি। ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন (সম্পা.), মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি। ঢাকা: আগামী।

    সুলতান, টিপু (২০১৯)। মতপ্রকাশে বাধা আইন, ভয় ও চাপ। প্রথম আলো। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।

    সুলতানা, আইরিন (২০১৫)। সাইবার সন্ত্রাস ও ‘সিপি গ্যাং’সমাচার। opinion.bdnews24.com/bangla/archives/28999|০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    আসাদুজ্জামান (২০১৬)। সাইবার অপরাধের মামলা হু হু করে বাড়ছে। | www.prothomalo.com/bangladesh/article/983584//

    প্রথম প্রকাশ: অগ্রায়ন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রকাশনা), এপ্রিল ২০১৯, ঢাকা।

  • মাইকেল সাফি।। দুনিয়া বদলে দেয়া ১০০ দিন

    মাইকেল সাফি।। দুনিয়া বদলে দেয়া ১০০ দিন

    • অনুবাদ: ইলোরা সুলতানা

    শুরুটা হয়েছিল একটা সতর্কবার্তা দিয়ে। আর এখন আমরা জানি, এটা কিভাবে বিশ্বমহামারীতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের চেনা জীবনকে বদলে দিয়েছে। (more…)

  • নোম চমস্কি।। ৪০০ বছরের পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ

    নোম চমস্কি।। ৪০০ বছরের পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ

    • তানভীর আকন্দ

    পুলিশ সদস্য কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আমেরিকায় বর্তমানে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ভ্যালেন্টিনা নিকোলাই। গত ২রা জুন, ইতালিয়ান দৈনিক ‘ইল মেনিফেস্তো’তে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। ৩রা জুন পত্রিকাটির আন্তর্জাতিক সংস্করণে ইংরেজিতে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। বর্তমান অনুবাদটি সেই ইংরেজি সংস্করণ থেকেই করা হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারে চমস্কি যুক্তি দেখান যে এই বিক্ষোভ সাময়িক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয় বরং ৪০০ বছর ধরে চলতে থাকা আমেরিকান সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদেই এই
    বিক্ষোভ । – অনুবাদ

    নোম চমস্কি

    সাক্ষাতকার

    যুক্তরাষ্ট্র জ্বলছে। কালো ও সাদারা একযোগে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করছে, থামবার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।  সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। একাধিক শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

    করোনা সংকট, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে ইতোমধ্যেই ক্ষুব্ধ হয়ে থাকা জনগণের সাথে কোনোরকম আপোষে যাওয়ার তেমন একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না মার্কিন সরকার, বিশেষ করে ট্রাম্পের কথা ও কাজে ( “আইন ও শাসন“ নিয়ে তার সর্বশেষ বক্তব্য একটি টেলিভিশন নাটকের কথা মনে করিয়ে দেয়)।

    দাঙ্গার ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণ বোঝার জন্য আমরা প্রফেসর নোম চমস্কিকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম। দুনিয়াজুড়ে আমেরিকার রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ে প্রসিদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে একজন তিনি।

    জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে দাঙ্গায়, যা মিনেপোলিশ শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে পেন্টাগন সামরিক পুলিশকে মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছে।  প্রফেসর চমস্কি, যুক্তরাষ্ট্রে আসলে কী ঘটছে? বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্যের দ্বারা ক্ষমতার অপব্যবহারের বাইরে আরও গভীর কিছু কি রয়েছে এই বিক্ষোভের পেছনে?

    গভীরে যা আছে তা হলো ৪০০ বছরের নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস: প্রথমত, মানব ইতিহাসে দাসত্বের সবচেয়ে জঘন্যতম ব্যবস্থা, যা কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এরপর ১০ বছরের জন্য আসে স্বাধীনতা, যেখানে কালোরা সমাজে প্রবেশ করার অধিকার পায়, অসাধারণ সাফল্যের সাথে তারা সেটা করেছিলও। তারপর উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে চুক্তি যার ফলে সাবেক দাস রাষ্ট্রগুলো নিজের মতো করে চলার অনুমতি পায়। কালো মানুষদের অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে তারা যা করেছিল তা হলো “ভিন্ন নামে দাসপ্রথা“ প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটির শিরোনাম এটি।১

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েড ডেথ
    শিল্পী: এমাদ হাজ্জাজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত কার্যকর ছিল এটা, যখন দরকার ছিল শ্রমের। তারপর আপেক্ষিক স্বাধীনতার যুগ আসে। বর্ণবাদী আইনের দ্বারা এর পথ রুদ্ধ করা হয়। এতটাই চরমপন্থী আইন ছিল এটা যে নাৎসিরা পর্যন্ত একে খারিজ করে এবং ফেডারেল আইনের দ্বারা যুদ্ধের পর সরকারি অর্থায়নে তৈরি আবাসনে কালোদের পৃথকীকরণ২ করে দেয়া হয়। যুদ্ধফেরতদের বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার কর্মসূচি থেকেও কালোদের (এবং নারীদের) বাদ দেয়া হয়। আর তারপর আসে কালোদের অপরাধীকরণের আরও একটা ধাপ।

    এর ফলাফল সহজেই অনুমান করা যায়। বর্ণবাদ বহাল থাকে, যদিও আগের থেকে এর তীব্রতা কিছুটা  কম। আর যখনই ফ্লয়েড হত্যার মাধ্যমে এই বর্ণবাদের প্রকাশ ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিস্ফোরণ ঘটে। শ্বেতাঙ্গদের একটা বড় অংশ এতে অংশগ্রহণ করে, যা জনগণের অন্তত কিছু অংশ যে এই জঘন্য অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে তারই প্রতিফলন।

    আপনার কি মনে হয় সাম্প্রতিক কালে ফুঁসে উঠা এ বিক্ষোভে বৈশ্বিক মহামারির কোনো ভূমিকা আছে? এটা কি দেশের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর সংকটকেই সামনে তুলে আনছে? নাকি এটা কিছুদিন ধরে জমতে থাকা বারুদে আগুনের স্ফূলিঙ্গ ছুড়ে দিয়েছে মাত্র?

    বৈশ্বিক মহামারি কিছু সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন, করোনা সংক্রমণে কালোদের মৃত্যুহার শ্বেতাঙ্গদের তিনগুণ। ট্রাম্পের বদমায়েশিরতো কোনো শেষ নেই, মহামারির সুযোগ নিয়ে সে বায়ুদূষণ সংক্রান্ত নীতিমালাগুলো তুলে দিয়েছে, যার বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে। বিজনেস প্রেসের হিসাব অনুযায়ী দশ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হতে পারে এর ফলে। এদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যাই বেশি, যারা মূলত সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাস করে। এই তথ্য জনমতকে কীভাবে প্রভাবিত করবে সেটা নির্ভর করে তথ্যগুলো আসলে কতটুকু বর্ণবাদী যুক্তিতে আচ্ছন্ন।

    কোনো পরিস্থিতিতেই কি ক্ষুব্ধ জনতার এরকম সহিংস হয়ে উঠা ন্যায়সঙ্গত হয়?

    এর উত্তর বেশ সহজেই অনুধাবন করা যায়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। স্বাভাবিকভাবেই এটা আরও কঠোর নিপীড়নের প্রতি জনসমর্থন তৈরি করে দেয়।

    বিক্ষোভের জবাবে ডোনাল্ট ট্রাম্প টুইট করেন “লুটপাট শুরুতো, গুলিও শুরু“। পরে তিনি সেটা সরিয়ে ফেলেন, কিন্তু ততক্ষণে আগুনে যথেষ্ট পরিমাণ ঘি ঢালা হয়ে গেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উস্কানির কথা বাদ দিলে আর ঠিক কী কারণে এই উক্তি আমেরিকান সমাজকে এত প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে? সেটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন। আপনি কি মনে করেন সেই “আদি পাপ, আমাদের জাতিকে আজও যা কলঙ্কিত করে রেখেছে“ (জো বাইডেনের উক্তি) ট্রাম্পের উপস্থিতিতে তার ভার বেড়ে গেছে আরও অনেক বেশি? তার এই উত্তেজিত বাগাড়ম্বর কি তাকে পোলে এগিয়ে যেতেও সাহায্য করবে? এখন যেখানে বাইডেন এগিয়ে আছেন?

    ৫০ বছর আগে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জবাবে ফ্লোরিডার এক মেয়রের কথাকেই  পুনরাবৃত্তি করেছে ট্রাম্প।৩ এর মানে বেশ স্পষ্ট, যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে ট্রাম্প এ নিয়ে মিথ্যা সাফাই গাওয়া শুরু করে। দাবি করে যে সে আসলে বুঝাতে চেয়েছে লুটপাটকারিরাই গুলি ছুঁড়বে। ট্রাম্প আসলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে, শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিগুলো টেনে এনে ট্রাম্প এই ‘কলঙ্গের দাগ’ আরও বড় করছে, এটা তার নির্বাচনের ভিত্তি। তবে জনমতে এর প্রভাব অনুমান করা আসলে কঠিন।

    উদারনৈতিকদের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আপনার কী মত? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে উদারনৈতিক ও বাইডেনের শিক্ষা নেয়ার মতো কি কিছু আছে?

    শিক্ষা নেয়া উচিত। তবে নেবে কি নেবে না সেটা দেখার বিষয়।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লয়েড লাইফ ম্যাটার
    শিল্পী: কিয়ানৌস রামজানি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    শেষ আরেকটি প্রশ্ন। আপনি “কালো মানুষদের অপরাধীকর’’-এর কথা বলেছেন, আপনার বইগুলোতে প্রায়ই এটা নিয়ে বলে থাকেন আপনি। সংক্ষেপে একটু ব্যাখ্যা করবেন কি, আমেরিকার সমাজ ও অর্থনীতিতে এটা কীভাবে কাজ করেছে এবং এখনো করছে?

    এই বাক্যাংশের কৃতিত্ব আমার নয়। আমেরিকার সমাজ নিয়ে আলোচনাগুলোতে এটা বেশ পরিচিত। ঊনিশ শতকের শেষাংশে সাবেক দাস রাজ্যগুলোতে৪ এটি বেশ সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ ছিল। কোনো কালো মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে, ভবঘুরে অভিযোগে তাকে বন্দি করা হতো, এমন একটা জরিমানা ধরিয়ে দেয়া হতো যা তার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। তাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হতো। যেখানে নানা কাজে তাকে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো যাবে, এমন শ্রমিকের কোনো বিকল্প হয় না যে কিনা নিয়মনিষ্ঠ, কোনো প্রতিবাদ করবে না আর সস্তায় কাজ করানো যাবে। সে সময়ের বিপ্লব প্রতিষ্ঠা ও কৃষিব্যবসার পেছনে একটা বড় ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছিল এটা।

    অপরাধীকরণের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় রোনাল্ড রিগ্যানের আমলে। ১৯৮০ সালে, তার দায়িত্বগ্রহণের সময় কারারোধের পরিমাণ ইউরোপের সমান ছিল। এরপরই বিস্ফোরণ ঘটে, ইউরোপকে ছাড়িয়ে সংখ্যাটা অনেকদূর এগিয়ে যায়। কারারুদ্ধদের মধ্যে কালোদের সংখ্যাটা ছিল আনুপাতিক হারে অনেক বেশি । এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ছিল মাদকযুদ্ধের প্রভাব, বাকিটাকে কালোদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার হার বেশি হওয়ার সাথে সম্পর্কিত করা যায়। দ্বিতীয় কারণটিকে প্রায়ই বর্ণবাদী যুক্তির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। কিন্তু কালোদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কেন বেশি এই প্রশ্নকে আড়াল করা হয়। এটাই নিপীড়িত সমাজের বৈশিষ্ট্য। আর কাৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে এটাতো আরও অনেক বেশি গুরুতর।

    অনুবাদকের টীকা

    ১. ভিন্ন নামে দাসপ্রথা- ডগলাস এ. ব্ল্যাকমন এর লেখা বই Slavery by Another Name: The Re-Enslavement of Black Americans from the Civil War to World War II এর কথা বলছেন চমস্কি। ২০০৮ সালে এনকর বুকস থেকে প্রকাশিত হয় বইটি।

    ২. পৃথকীকরণ (segregation/Racial segregation) – বলতে পদ্ধতিগতভাবে কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোকেদের সামাজিকভাবে আলাদা করে দেয়াকে বুঝায়। আইনের দ্বারা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থান যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদিতে স্বাভাবিকভাবে  প্রবেশ ও চলাফেলার অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয় এর মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফেডারেল হাউজিং এডমিনিস্ট্রেশান (FHA) ও ভেটারানস এডমিনিস্ট্রেশানের (VA)  মাধ্যমে নাগরিকদের স্বল্প সুদে আবাসন ব্যবস্থা প্রদান করে। এই প্রকল্প থেকে লিখিতভাবে সরাসরি কৃষ্ণাঙ্গদের বাদ দেয়া না হলেও, উদ্যোক্তারা কৌশলে সারা দেশজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিতএলাকাগুলোকে এই প্রকল্পের আওতা থেকে বাদ দিতে থাকে। যার ফলে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে স্পষ্ট বিভেদের সৃষ্টি হয়। নিচের লিংকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আছে-

    https://www.npr.org/2017/05/03/526655831/a-forgotten-history-of-how-the-u-s-government-segregated-america

    ৩. ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন চলাকালীন সময়ে মায়ামি পুলিশ প্রধানের বক্তব্য। সে সময় কিশোর বয়েসিদের উপর লুটপাটের অভিযোগ এনে পুলিশকে সহিংস উপায়ে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন তিনি।

    https://www.washingtonpost.com/outlook/2020/06/01/police-chief-who-inspired-trumps-tweet-glorifying-violence/

    ৪. ১৮৬৫ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের যেসমস্ত রাজ্যগুলোতে দাস ব্যবসা বৈধ ছিল সেগুলোকে দাস রাজ্য বলা হতো। ১৮৬৫ সালে সংবিধানের তেরতম সংশোধনীর মাধ্যমে সমগ্র আমেরিকাজুড়ে দাসপ্রথার পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। এবং দাস রাজ্য ও স্বাধীন রাজ্য বলেও আলাদা কিছু আর থাকে না।

     

  • স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    অনুবাদকের ভূমিকা

    হাওয়ার্ড জিন প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী। প্রায় বিশের অধিক বই-পুস্তক লিখেছেন, পাশাপাশি নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আলাপ-আলোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ও প্রভাবশালী A People’s History of the United States গ্রন্থ সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানেন, সিনেমা থেকে শুরু করে বিদ্বৎসমাজ সবখানেই এই গ্রন্থ বহুরূপে উল্লেখিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন এয়ারফোর্সে যোগদান করেছিলেন, এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সাধারণ জনগণের ত্যাগ-তিতীক্ষাকে ব্যবহার করে গুটিকয়েক ফায়দা হাসিল করেন। আজীবন বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গিয়েছেন।

    হাওয়ার্ড জিন এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল Counter Punch এ ২০০৮, ১২ মে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জিগা ভদোভনিক।  তিনি স্লোভেনিয়ার University of Ljubljana এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক; কাজ করেন আমেরিকার সামাজিক আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব ও সমসাময়িক রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে।

    জিগা ভদোভনিকের সাথে কথোপকথনে হাওয়ার্ড জিন নিজেকে অ্যানার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী হিসেবে অভিহিত করেই কথা বলা শুরু করেন। তারপর কথা বলেছেন নৈরাজ্যবাদী বিভিন্ন ধারণা, মানুষের স্বাধীনতা, সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব, নির্বাচনী ও ভোটের রাজনীতি বনাম সামাজিক আন্দোলন, কর্তৃত্বপরায়ন আন্দোলন বনাম মুক্তিমুখীন আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদের ইতিহাস, উপায় ও উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে।

    বর্তমানে anarchism এর ভাষান্তর ‘নৈরাজ্যবাদ’ না করে অরাজ/ অরাজপন্থা ইত্যাদিও করা হয়, বা অনেকেই ‘অ্যানার্কিজম’ই রেখে দেন, কেননা প্রচলিত অর্থে ‘নৈরাজ্য’ শব্দ নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয় (যেমন, বিশৃঙ্খলা)। এই সাক্ষৎকারে হাওয়ার্ড জিন অ্যানার্কি শব্দকে chaos বা বিশৃঙ্খলা অর্থে ব্যবহার করার রাজনীতি নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাই, অ্যানার্কিজমের বাংলা রূপান্তর হিসেবে নৈরাজ্যবাদই রাখা হয়েছে।

    হাওয়ার্ড জিন

    ১৯৮০’র দশক থেকে আমরা দেখছি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াটি দিনে দিনে শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক বামপন্থীরা এখন একটা ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বে’র মধ্যে পড়ে গিয়েছেন: বিদেশি ও বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরির লক্ষ্যে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের হাতের শক্তি বাড়াতে কাজ করবেন, নাকি বিদ্যমান বিশ্বায়নের একধরনের অ–জাতীয় বিকল্পের দিকে ঝুঁকবেন, যা সমানভাবে বৈশ্বিক। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

    আমি একজন নৈরাজ্যবাদী, এবং নৈরাজ্যবাদী নীতি অনুসারে জাতিরাষ্ট্র সত্যিকারের মানবিক বিশ্বায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক অর্থে বিশ্বায়নের দিকে এই আন্দোলন, যেখানে পুঁজিবাদীরা জাতিরাষ্ট্রের সীমানা ডিঙানোর চেষ্টা করছেন, সেখানে আন্দোলনের জন্য জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করার একধরনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; যা বৈশ্বিক পুঁজির বিরুদ্ধে মানুষকে একত্রে নিয়ে আসতে পারে, বিশ্বায়নের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে জনগণের বিশ্বায়ন সৃষ্টি করতে পারে। অন্য ভাবে বললে, বিশ্বায়নকে এমন ভাবে ব্যবহার করা (বিশ্বায়ন ধারণার সাথে কিন্তু কোনো ঝামেলা নেই) যেন, এটি জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করবে এবং অবশ্যই দুনিয়ার মানুষ সম্পর্কে যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তাতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

    পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ একদা লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতাই হলো জননী, হুকুমের সন্তান নয়’। জাতিরাষ্ট্রের পরে বা বাইরে জীবনকে আপনি কোন জায়গায় দেখেন?

    জাতিরাষ্ট্রের বাইরে? (হাসি) আমি মনে করি, জাতিরাষ্ট্রের বাইরে যা আছে সেটা হচ্ছে জাতীয় সীমানা ব্যতীত এক জগত, কিন্তু সংগঠিত জনসাধারণ নিয়েই। কিন্তু জাতি হিসেবে সংগঠিত না হয়ে বরঞ্চ দল হিসেবে, সমষ্টি হিসেবে জনসাধারণ সংগঠিত হবে; জাতীয় বা এই ধরনের কোনো সীমানা ছাড়াই। কোনো ধরনেরই সীমানা, পাসপোর্ট, ভিসা থাকবে না। এসবের একটাও না। বিভিন্ন আকারের সমষ্টি যৌথ বা সমবেত কাজের উপর ভিত্তি করে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোট ছোট গোষ্ঠী খুঁজে পাবেন না, কারণ তাদের কাছে কাছে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসপাতি থাকবে। এটা এমন কিছু যা নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব এখনো তৈরি করেনি, এবং হয়তোবা আগাম করা সম্ভবও না, কারণ চর্চার মাধ্যমেই একে কার্যে পরিণত করতে হবে।

    পিয়েরে যোসেফ প্রুধোঁ

    আপনি কি মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক পার্টি রাজনীতির মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব? নাকি অসহযোগ আন্দোলন, সমান্তরাল কাঠামো তৈরি, বিকল্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির মতো বিকল্প মাধ্যমেই কেবল করতে হবে? 

    আপনি যদি বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করেন আপনি দূষিত হবেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবেশকে বিষাক্ত করে, এমনকি প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকেও। আপনি দেখবেন আমেরিকাতেও, ‘বাম’ধারার লোকেরা নির্বাচনী প্রচারণায় ধরা পড়েছেন এবং কোন তৃতীয় শক্তিকে সমর্থন দেয়া যায় তা নিয়ে যুক্তি-তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। এটা খুব ছোট একটা নমুনা যে, আপনি যদি নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ করতে শুরু করেন তাহলে আপনি আপনার আদর্শকে দূষিত করা শুরু করেছেন। সুতরাং আমি মনে করি, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, ভোট, নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ না করে, কর্মস্থলে, পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আন্দোলন ও সমষ্টি গড়ার চিন্তা করতে হবে, যেন এগুলোই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণের মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে: প্রথমত, কর্তৃত্ব তাদের সাথে যা করছে তা প্রতিরোধ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা এবং দ্বিতীয়ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা।

    একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। আপনি কি নির্বাচনে যান? ভোট দেন?

    যাই, কখনো সখনো, সবসময় না। এটা নির্ভর করে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে কখনো কখনো এক প্রার্থীর বদলে আরেক প্রার্থীকে পাওয়া হয়তো জুতসই, যদিও আপনি মানেন এটাই সমাধান নয়। কখনো কখনো কম মন্দটিও তত কম মন্দ হয় না, তাই আপনি এটা উপেক্ষা করতে চান, এবং হয় আপনি ভোট দিবেন আর না হয় পার্টি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে আপনি তৃতীয় পার্টিকে ভোট দিবেন। কখনো কখনো দুই প্রার্থীর মধ্যকার পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ এবং যিনি একটু ভালো, একটু কম বিপজ্জনক তাকে দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টাটাও বোধগম্য। কিন্তু কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না যে কে পদের দায়িত্ব নিচ্ছেন এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়, বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কোন ধরনের সামাজিক আন্দোলন রয়েছে। কারণ আমরা ঐতিহাসিকভাবে দেখেছি, যদি আপনার কোনো শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে তাহলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটা অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। দায়িত্বে যেই থাকুক না কেন, রিপাবলিক বা ডেমোক্রেট যেই হোক না কেন, যদি আপনার শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে, তাহলে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে সমর্পণ করতেই হবে, কোনো না কোনোভাবে সামাজিক আন্দোলনের শক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেই হবে।

    ষাটের দশকে আমরা এটি দেখেছি, রিচার্ড নিক্সন মোটেও কম শয়তান ছিলেন না, বরঞ্চ তিনি অধিকতর শয়তান ছিলেন। কিন্তু তার আমলেই অবশেষে যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল, কারণ তাকে যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলনের শক্তি মোকাবিলার পাশাপাশি ভিয়েতনামি আন্দোলনের শক্তিকেও মোকাবিলা করতে হয়েছিল। আমি ভোট দেব, কিন্তু সর্বদা এই সতর্কতার সাথে যে ভোটদান চূড়ান্ত নয়, এবং সংগঠিত করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    যখন কেউ ভোটদানের বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, তারা জিজ্ঞেস করে আপনি কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিবেন? একে নাকি ওকে? আমি বলি: ‘আমি যখন বুথে ভোট দেব কেবল তখনই মাত্র এক মিনিটের জন্য কোনো এক প্রার্থীকে সমর্থন করব, কেবল সেই মুহূর্তে আমি ক বনাম খ-কে সমর্থন দেব। কিন্তু ভোটিং বুথে যাওয়ার পূর্বে এবং বুথ থেকে বের হওয়ার পরও আমি আসলে মনোযোগ দেব মানুষকে সংগঠিত করার দিকে এবং কোনো নির্বাচনী প্রচারণা সংগঠনের দিকে নয়।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    এই ক্ষেত্রে নৈরাজ্যবাদ যথাযথভাবেই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বিরোধিতা করছে, কারণ এটাও একধরনের স্বৈরশাসনের রূপ—সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের এই ধারণাতে আপত্তি জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সবসময় নৈতিকভাবে সহি মতের সাথে মিলে না। থোরিও একদা বলেছিলেন, বিবেকের হুকুমে কাজ করার প্রতি আমাদের একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমনকি সেটা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বা সমাজের আইনকানুনের বিরুদ্ধেও যায়। আপনি কি এর সাথে একমত?

    একদম। রুশো একবার বলেছিলেন, যদি আমি একশ জনের দলে একাও হয়ে থাকি, বাকি ৯৯ জন কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার রাখে? না। সংখ্যাগরিষ্ঠরাও ভুল করতে পারেন, তারা সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করতে পারেন। যদি সংখ্যাগুরুরাই শাসন করতো তবে এখনো দাসপ্রথা বহাল থাকত। জনসংখ্যার ৮০% একদা ক্রীতদাস বানিয়েছিল ২০% লোককে। সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়মানুযায়ী এটা ঠিক ছিল। এটা আসলে গণতন্ত্রের খুব ত্রুটিযুক্ত ধারণা। গণতন্ত্রকে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে— জনগণের আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তা; কেবল সংখ্যাগুরুদের চাহিদাই নয়, সংখ্যালঘুদের চাহিদাকেও আমলে নিতে হবে। এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, যে সমাজে মিডিয়া জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত বা অশুভ হতে পারে। সুতরাং হ্যাঁ, জনগণকে বিবেক অনুসারেই কাজ করতে হবে, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট দিয়ে নয়।

    যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের ঐতিহাসিক উৎস কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

    নৈরাজ্যবাদ নিয়ে কাজ করার একটা মুশকিল হচ্ছে এখানে আপনি অনেক লোক পাবেন যাদের ধারণাগুলো নৈরাজ্যবাদী, কিন্তু নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেন না। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে প্রুধোঁ এটা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেন, কিন্তু তার পূর্বে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বহু নৈরাজ্যবাদী ধারণা চালু ছিল।উদাহরণস্বরূপ থমাস পেইনের কিছু ধারণার কথা বলা যায়, তিনি নৈরাজ্যবাদী ছিলেন না, নিজেকে এই নামে অভিহিতও করতেন না, কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। আরো আছেন হেনরি ডেভিড থোরিও। তিনি নৈরাজ্যবাদ শব্দটাও জানতেন না এবং শব্দটা কখনো ব্যবহারও করেন নি। কিন্তু তার চিন্তা নৈরাজ্যবাদের খুব কাছাকাছি। তিনি যে কোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। যদি আমরা যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের  উৎস সন্ধান করি, তাহলে সম্ভবত থোরিও প্রথম আমেরিকান নৈরাজ্যবাদী হওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন। সিভিল ওয়ার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসলে নৈরাজ্যবাদের সাথে আপনার মোলাকাত হয়নি, যখন ইউরোপীয় নৈরাজ্যবাদী, বিশেষত জার্মান নৈরাজ্যবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করেন। তারাই আসলে সংগঠিত করা শুরু করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদ প্রথমবারের মতো সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং সর্বজনীন পরিচিত লাভ করেছিল শিকাগোতে, হেমার্কেট ঘটনার সময়ে।

    যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক নৈরাজ্যবাদের মূল অনুপ্রেরণা আপনি কোথায় দেখেন? ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম সম্পর্কে আপনার মতামত কি? মানে, এই ক্ষেত্রে হেনরি ডি থোরিও, রালফ ডব্লিউ এমারসন, ওয়াল্ট হুইটম্যান, মার্গারেট ফুলারদেরকে অনুপ্রেরণা হিসেবে?

    আচ্ছা, ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজমকে আমরা বলতে পারি নৈরাজ্যবাদের একেবারে গোড়ার দিকের এক রূপ। তারাও নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেননি, কিন্তু তাদের চিন্তা ও সাহিত্যে নৈরাজ্যবাদী ধ্যানধারণা ছিল। হারমেন মেলভিলে বিভিন্ন ভাবে এমন কিছু নৈরাজ্যবাদী ধারণা প্রকাশ করে। তারা সকলেই কর্তৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আমরা বলতে পারি যে, কর্তৃত্ব ও সরকারব্যবস্থার প্রতি একধরনের সন্দেহের পরিবেশ তৈরিতে ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম একটা ভূমিকা রেখেছিল।

    দুর্ভাগ্যক্রমে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে কোনো প্রকৃত সংগঠিত নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন নেই। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দল বা গোষ্ঠী রয়েছে যারা নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করে, কিন্তু এগুলো ক্ষুদ্র। আমার মনে আছে ১৯৬০’র দশকে এখানে বোস্টনে একটা নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী ছিল যারা সংখ্যায় প্রায় পনের জনের মতো, কিন্তু তারা তখন বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ষাটের দশকের অন্যান্য আন্দোলনের সাথে মিলে ষাটের দশকে নৈরাজ্যবাদ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

    এনার্কিস্ট পোস্টার

    আজকাল র‌্যাডিকাল রাজনীতির বেশিরভাগ সৃজনশীল শক্তি নৈরাজ্যবাদ থেকে উঠে আসছে, কিন্তু এই আন্দোলনে জড়িত খুব কম লোকই নিজেকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করেন। আপনার মতে এর মূল কারণ কি? রাজনৈতিক কর্মীরা (অ্যাক্টিভিস্ট) কি এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে চিহ্নিত করতে লজ্জা পাচ্ছেন? নাকি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, সত্যিকারের মুক্তির জন্য যে কোনো ধরনের লেবেল থেকেও মুক্তি প্রয়োজন?

    নৈরাজ্যবাদ শব্দটি এমন দুটো প্রপঞ্চের সাথে জড়িয়ে পড়েছে যেগুলোর সাথে প্রকৃত নৈরাজ্যবাদীরা যুক্ত হতে চান না। একটা হচ্ছে সহিংসতা এবং অন্যটা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। নৈরাজ্যবাদের জনপ্রিয় ধারণাগুলোর একদিকে রয়েছে বোমা-নিক্ষেপ ও সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যদিকে রয়েছে কোনো বিধি-বিধান, শৃঙ্খলার অভাব, যা ইচ্ছা তাই করতে পারা, বিভ্রান্তি ইত্যাদি। এই কারণে এই শব্দ ব্যবহারে একরকম অনিচ্ছা আছে। কিন্তু ১৯৬০ এর দশকের আন্দোলনগুলো যেভাবে ভাবতে শুরু করেছিল তাতে নৈরাজ্যবাদের প্রকৃত ধারণা মিশে গিয়েছে।

    আমার মনে হয় এর সর্বোত্তম প্রকাশটি ঘটেছিল সম্ভবত এসএনসিসি (Student Nonviolent Coordinating Committee) এর সাথে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে। এসএনসিসি দর্শন হিসেবে নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে না জেনেই এর বৈশিষ্ট্যগুলোকে মূর্ত করে তুলেছিল। তারা বিকেন্দ্রীভূত ছিল। অন্যান্য নাগরিক অধিকারের সংগঠনগুলো, যেমন সেভেন খ্রিষ্টান লিডারশিপ কনফারেন্স, একজন নেতা (মার্টিন লুথার কিং) সমেত কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। এনএএসিপি (National Association for the Advancement of Colored People) নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক একধরনের কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। অপরদিকে, এসএনসিসি ছিল পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত। তাদের ফিল্ড সেক্রেটারি ছিল, যারা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ছোট শহরে স্বায়ত্তশাসনের সহিত কাজ করত। জর্জিয়ার আটলান্টায় তাদের একটা অফিস ছিল, কিন্তু অফিসের কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব ছিল না। আলবামা, জর্জিয়া, লুসিয়ানা এবং মিসিসিপির বিভিন্ন মাঠে যারা কাজ করতেন তারা নিজেদের ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। তারা স্থানীয় ও তৃণমূল জনগণের সাথে কাজ করতেন। এবং তাই এসএনসিসির কোনো এক নেতা ছিল না, এবং সরকারের প্রতি সন্দিহান ছিল।

    তারা সাহায্য-সমর্থনের জন্য সরকারের উপর নির্ভর করতো না, যদিও ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকে সরকারকে প্রগতিশীল লিবারেল বলে ভাবা হতো। বিশেষ করে জন এফ কেনেডিকে। কিন্তু তারা তার আচরণ প্রত্যক্ষ করেছিল। কেনেডি কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকারের জন্য দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠা আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করেননি। যারা পৃথকীকরণে বিশ্বাস করে (segregationists) এমন বিচারকদের তিনি দক্ষিণে পাঠানো শুরু করলেন এবং তাদেরকে যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি দিলেন। সুতরাং এসএনসিসি ছিল বিকেন্দ্রীভূত, সরকার-বিরোধী, নেতৃত্বহীন। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতো ভবিষ্যতের সমাজ নিয়ে তাদের কোনো ভিশন ছিল না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ছিল না, ভবিষ্যতে আমাদের কি ধরনের সমাজ হবে তা নিয়ে তাদের কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। তারা আসলেই জাতিগত পৃথকীকরণের তাৎক্ষণিক সমস্যায় মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু তাদের মনোভঙ্গি, তার যেভাবে কাজ করছিল, যেভাবে সংগঠিত হচ্ছিল তা বলা যায় নৈরাজ্যবাদী ধারায় ছিল।

    আপনার কি মনে হয় যে, মানুষ মুক্ত হতে পারবে ধারণাটি ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর হওয়ার কারণেই নৈরাজ্যবাদ শব্দের নিন্দাসূচক (অপ)ব্যবহার করা হয়? 

    কোনো সন্দেহ নেই। নিঃসন্দেহে, নৈরাজ্যবাদী ধারণা ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর। ক্ষমতাসীনেরা লিবারেল ধারণাগুলোকে সহ্য করতে পারেন। যে ধারণাগুলো সংস্কারের ডাক দেয় সেগুলোকে তারা সহ্য করতে পারেন, কিন্তু কোনো রাষ্ট্র থাকবে না, কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব থাকবে না— এমন ধারণা তারা সহ্য করতে পারেন না। সুতরাং নৈরাজ্যবাদের ধারণাটিকে বিদ্রূপ করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেন সহিংস ও বিশৃঙ্খলা হিসেবে নৈরাজ্যবাদের একটা ছাপ তৈরি হয়। হ্যাঁ, তাদের জন্য এটা দরকারি।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    তত্ত্বীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আমরা বিশ্লেষণাত্মকভাবে অ্যানার্কিজমের দুটো ধারণা শনাক্ত করতে পারি, একদিকে ইউরোপের মধ্যে তথাকথিত যৌথতাবাদী নৈরাজ্যবাদ (collectivist anarchism), এবং অন্যদিকে আমেরিকার মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদ (individualist anarchism)। বিশ্লেষণাত্মক এমন পৃথকীকরণের সাথে আপনি কি একমত?    

    আমার কাছে এটি একটি কৃত্রিম পৃথকীকরণ। বিশ্লেষকরা প্রায়শই বিষয়গুলো নিজেদের জন্য সহজ করে তুলতে বিভিন্ন বর্গ তৈরি করেন এবং আন্দোলনগুলোকে সেই বর্গে পছন্দসই বসিয়ে দেন। কিন্তু আমি মনে করিনা আপনি এটি করতে পারেন। এখানে যুক্তরাষ্ট্রে নিশ্চয়ই অনেকেই আছেন যারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদে বিশ্বাস করেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেই আবার ১৮৮০ সালে শিকাগো অথবা এসএনসিসিতে সংগঠিত নৈরাজ্যবাদীদের পাওয়া যায়। আমার মনে হয় উভয় নজিরই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাবেন, তবে ইউরোপে অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ধারণাটা আমেরিকার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যদিও, যুক্তরাষ্ট্রে আপনার কাছে আইডব্লিউডব্লিউ (IWW) এর মতো অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিস্ট সংগঠন এবং নিশ্চিতভাবেই এটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদের সাথে মিলে না।

    বিপ্লব বনাম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন— উপায়ের এই ‘উভয়সঙ্কট’ বিষয়ে আপনি কি অভিমত? 

    আমি মনে করি এখানে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার বিষয়, এবং এখানে নৈরাজ্যবাদীরাই দ্বিমত পোষণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আপনি মতবিরোধটি খুঁজে পাবেন, এবং আপনি একক ব্যক্তির মধ্যেই এই মতবিরোধটি পেতে পারেন। আপনি বলতে পারেন এমা গোল্ডম্যান, তার মৃত্যুর পর, ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদকে সামনে নিয়ে আসেন। তখন তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। কিন্তু এমা গোল্ডম্যান হেনরি ক্লে ফ্রিকের হত্যার পক্ষে ছিলেন, আবার তিনিই পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এটা ঠিক পথ নয়। তার বন্ধু ও কমরেড অ্যালেক্সান্ডার বার্কম্যান সহিংসতার ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি। অন্যদিকে আপনি টলস্টয় এবং এমনকি গান্ধীরও মতো অ্যানার্কিস্ট পাবেন যারা অহিংসতায় বিশ্বাস করতেন।

    উপায়ের বিষয়ে নৈরাজ্যবাদের একটি কেন্দ্রীয় নীতি আছে, এবং সেই নীতি হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামের (ডিরেক্ট একশন) নীতি— প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারব্যবস্থা, ভোটদান, আইন প্রণয়নের মতন সমাজ কর্তৃক প্রস্তাবিত রূপগুলোর মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ। ট্রেড ইউনিয়ন, অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ক্ষেত্রে এর অর্থটা কেবল শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়াই নয়, বরঞ্চ তারা যে কারখানায় কাজ করেন সেগুলো দখল করা এবং পরিচালনা করা। প্রত্যক্ষ সংগ্রামটা কি? দক্ষিণে যখন কৃষ্ণাঙ্গরা জাতিগত পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিল, তারা তখন সরকারের সংকেতের জন্য অপেক্ষা করেনি, আদালতের মাধ্যমে যায়নি, মামলা দায়ের করেনি, কংগ্রেসে আইন পাস করার অপেক্ষা করেনি। তারা সরাসরি একশনে চলে গিয়েছিল, তারা রেস্টুরেন্টে গিয়েছে, বসে পড়েছে এবং নড়েনি। তারা বাসে উঠে পড়েছে এবং যে পরিস্থিতিকে হাজির করতে চায় সেটাই বাস্তবায়ন করেছে।

    অবশ্য, ধর্মঘট-হরতাল সর্বদাই একধরনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। ধর্মঘটের মাধ্যমে আপনি কেবল আইন পাস করে বিষয়গুলো সহজ করার জন্য সরকারকে বলছেন না, বরঞ্চ আপনি মালিকের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামেই নেমেছেন। আমি বলব, উপায় বিষয়ে যতদূর যাওয়া হোক না কেন, আপনি যে অশুভ শক্তিকে সরাতে চান তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ধারণাই নৈরাজ্যবাদী চিন্তা ও আন্দোলনের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমি এখনও মনে করি, নৈরাজ্যবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে, আপনি উপায় ও উদ্দেশ্যকে পৃথক করতে পারবেন না। যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে সমতাবাদী (egalitarian) সমাজ, তাহলে আপনাকে সমতাবাদী উপায় ব্যবহার করতে হবে, আপনার যদি উদ্দেশ্য হয় যুদ্ধবিহীন অহিংস সমাজ, তাহলে সেটা আপনি কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে হাসিল করতে পারবেন না। আমি মনে করি নৈরাজ্যবাদের চাওয়া হচ্ছে উপায় ও উদ্দেশ্যকে সামঞ্জস্য রেখে চলা। আমি মনে করি এটা আসলে নৈরাজ্যবাদের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

    নোয়াম চমস্কিকে তার নৈরাজ্যবাদী সমাজের ভিশনের ব্যাপারে এবং সেখানে পৌঁছানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি যদি এগুলো নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা না করেন তাহলে কোন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে তার সুরাহা করতে পারবেন না’। আপনার কি এমন মনে হয় যে, অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা চর্চার ক্ষেত্রে ‘পরীক্ষা–নিরীক্ষা’ শুরু করতেই সহি উপায় ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে প্রচুর শক্তি হারাচ্ছেন?

    আমি মনে করি নমনীয়তা বজায় রেখে বিভিন্ন আইডিয়া বা ধারণা পেশ করা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন উদারহরণস্বরূপ মাইকেল অ্যালবার্টের ParEcon (Participatory economics, often abbreviated ParEcon) কথা বলা যায়। আমরা ভবিষ্যৎ সমাজের ব্লুপ্রিন্ট এখন তৈরি করতে পারবো না, কিন্তু আমি মনে করি এটা নিয়ে চিন্তা করা ভালো। মনের মধ্যে একটা লক্ষ্য রাখা ভালো। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তা করাটা গঠনমূলক, সহায়ক এবং স্বাস্থ্যকর, কারণ তখন আপনি আজকে যা করছেন তা খানিকটা পথপ্রদর্শন করবে, কিন্তু সেটা কেবল ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ভবিষ্যতের দিকে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। অন্যথায়, আপনি এই ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা বনাম ঐ ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্কেই সময় খোয়াবেন, এবং এই সময়ে সেটার কাছাকাছি যাওয়ার মতো কাজও করছেন না।

    সূত্র: অ্যানার্কিস্ট আর্ট এন্ড প্রপাগান্ডা

    Peoples History of United States গ্রন্থে আপনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের স্বাধীনতা, অধীকার, পরিবেশগত মান ইত্যাদি গুটিকয়েক ধনী ও প্রভাবশালীরা কখনো দিয়ে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বদা লড়াই করেই সেটা আদায় করেছে। এই ক্ষেত্রে আরেকটি ভালো দুনিয়ার দিকে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিৎ?

    আমি মনে করি আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নিজেদের সংগঠিত করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা— যুদ্ধের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক ও যৌন শোষণের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ইত্যাদি। কিন্তু এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন উপায়ের সাথে উদ্দেশ্যের সামঞ্জস্য থাকে, এবং এমন এক মানবিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন সে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ সমাজে বিদ্যমান থাকতে পারে। এর মানে হলো কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছাড়াই এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন তা ভবিষ্যতের সমতাবাদী সমাজের আদর্শের একটি ছোটখাটো চিত্র হাজির করে। ফলে, আপনি যদি আগামীকাল অথবা পরের বছর যদি কিছু নাও জিতেন, তবু এর মাঝেই কিন্তু আপনি একটা মডেল দাড় করিয়ে ফেলেছেন। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হওয়া উচিৎ তা আপনি বের করে ফেলেছেন এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না করতে পারলেও আপনি একটা তাৎক্ষনিক পরিতৃপ্তি তৈরি করে ফেলেছেন।

    মানুষের ‘স্বাধীনতার প্রবৃত্তি’ রয়েছে, কেবল ইচ্ছাই নয় জৈবিক প্রয়োজনও আছে, বাকুনিনের এই অন্টোলজিক্যাল অনুমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?

    আমি আসলে এই ধারণায় বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি মনে করি এর স্বপক্ষে আপনি বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক প্রমাণ পাবেন না। স্বাধীনতার জন্য কি আপনাকে জিন খুঁজে পেতে হবে? না। আমি মনে করি আরেকটা উপায় হচ্ছে মানব আচরণের ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া। মানব আচরণের ইতিহাস স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষাই প্রমাণ করে। ইতিহাস এটা প্রমাণ করে যে, জনগণ যখনই স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করেছে, এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

  • কল্পনা চাকমার ডায়রি।। রণাঙ্গনের সারিতে আমরা হবো সৈনিক

    কল্পনা চাকমার ডায়রি।। রণাঙ্গনের সারিতে আমরা হবো সৈনিক

    • কল্পনা চাকমা

    কল্পনা চাকমার ‘রণাঙ্গনের সারিতে আমরা হবো সৈনিক’ লেখাটি প্রথমে ১৯৯৭ সালের ২০ আগস্ট ‘স্বাধিকার’ এর সাত নম্বর বুলেটিনে এবং পরে হিল ইউমেন্স ফেডারেশনের সম্পাদনায় ২০০১ সালের ১২ জুন ‘কল্পনা চাকমার ডায়রি’তে প্রকাশিত হয়।

    কল্পনা চাকমা

    পশ্চাৎপদ দেশে, এমন কি অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশেও নারী-পুরুষের অধিকারের ক্ষেত্রে বাস্তবতা অনেক বৈষম্য আরো অনেক বেশী। বিশ্বের নারী সমাজ সুদীর্ঘকাল ধরে যে পুরুষ কর্তৃক অনেক নির্যাতীত হয়ে আসছে, বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়ে আসছে, সে সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বজুড়ে পশ্চাৎপদ দেশেও সমাজে নারীদের পারিবারিক নিপীড়ন একই রকম। কিন্তু আমি মনে করি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারীরা বেশী নির্যাতীত। কেননা দীর্ঘকাল ধরে চলছে পাহাড়িদের জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।

    এই পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ শ্যামল পাহাড়ের অন্তরালে রয়েছে বুকফাটা আর্তনাদ, গগণবিদারী আর্তচিৎকার। একদিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১০ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠির জাতীয় অস্তিত্ব সংরণের জন্য গণসংগ্রাম এবং অন্যদিকে সেই সংগ্রামকে দমন করার জন্য সামরিক প্রচেষ্টা, যা পার্বত্য চট্টগ্রামকে পরিনত করেছে এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে। এখানে উগ্র বারুদ-অত্যাচারে জনজীবন হয়েছে দুর্বিসহ। দীর্ঘ অত্যাচার, নির্যাতন আর যন্ত্রনায় ত-বিত পার্বত্য জনতার আজ বেদনার্ত উচ্চারণ: জীবন আমাদের নয়।

    এই অবস্থায় বাংলাদেশের অপরাপর নারী সমাজের চাইতে পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীদের অবস্থা করুণ। এ রূপ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নারীর ভূমিক পালন অত্যন্ত কঠিন কাজ নিঃসন্দেহে। তারপরেও আমাদের অগ্নি পরীক্ষার মধ্যদিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হবে। রণাঙ্গনের সারিতে, মুক্তির মিছিলে সামিল হতে হবে।

    পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারীরা একদিকে সরকারি, সেনা বাহিনী ও স্থানীয় বেআইনী অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী ও চরম লাঞ্চনার শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে তাদেরকে সামাজিক বৈষম্য, গণ্ডিবদ্ধ জীবন যাপন ও পুরনো ধ্যান – ধারণায় নিমজ্জিত করে রাখা হয়েছে।

    আসলে পাহাড়িদের আত্ননিয়ন্ত্রণাধিকার ব্যতীত পৃথকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারীদের মুক্তি হতে পারে না। কাজেই নারীকে শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু নারী মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে সেটা সম্ভব নয়। এ মুক্তি পুরুষ ও নারী জাতির একে অপরের মুক্তির সাথে সম্পর্কিত।

    তাই নারী ও পুরুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে আতœনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সে জন্য প্রত্যেক জুম্ম (পাহাড়ি) নারীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে প্রকৃত নারী মুক্তি আন্দোলনে, তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসতে হবে, অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। অবশ্য ইতিমধ্যে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগ্রামরত বিভিন্ন সংগঠনের সাড়া দিয়ে পাহাড়ি নারী সমাজ কিছুটা হলেও ঐক্যবদ্ধ। যেহেতু চূড়ান্ত বিজয় এখনো অর্জিত হয়নি, সেহেতু বিজয়ের জন্য আরো বেশী ঐক্যবদ্ধ হওয়া বর্তমান অবস্থায় জরুরী।

    আমরা এখনো সামাজিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ও রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত। এ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। এই বৃহত্তর অংশকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই সম্ভব নয়। আমরা চাই এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। এক শ্রেণীর মানুষ অন্য শ্রেণীর মানুষকে শোষণ করতে পারবে না। এক জাতি অন্য জাতির উপর শোষণ – নির্যাতন চালাতে পারবে না। সব মানুষই মানবিক গুনাবলীতে সমৃদ্ধ হবে এবং জীবন – জীবিকাসহ সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। এ ধরণের বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একমাত্র পরিপূর্ণ নারী মুক্তি সম্ভব।

    আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি যে, নারীরা সচেতন হবার চেষ্টা করলে অনেক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শৃংখল ভেঙ্গে আসার চেষ্টা করলে অনেকে তাকে উচ্ছৃঙ্খলতা হিসাবে আখ্যায়িত করেন। আন্দোলনে সামিল হলে তাকে চরিত্রহীন বলে মনে করা হয়। কিন্তু এসব কুপমণ্ডকতায় আমরা বিচলিত নই। বেগম রোকেয়া যেভাবে ঘুণে ধরা সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে নারী শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন, বীরকন্যা প্রীতিলতা যেমনি কাঁধে অস্ত্র তুলে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, সেভাবে জুম্ম নারী সমাজকে জাগাতে হবে। স্বাধিকার আদায়ের মহান সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

    নারী অধিকার এমনি এমনি আসবে না। অধিকার কারোর দয়ার সামগ্রী নয়, অনুদানের বিষয় নয়। এ অধিকার অর্জন করতে হয়, ছিনিয়ে আনতে হয়। অধিকার বঞ্চিত পাহাড়িরা স্বাধীন বাংলাদেশে স্বতন্ত্র নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় যা একমাত্র স্বায়ত্তশাসন কায়েমের মাধ্যমেই সম্ভব।

    ” পুরুষ অবরুদ্ধ আপন দেশে নারী অবরুদ্ধ নিজ নিবাসে” এ অবস্থা আর কত দিন চলবে? আর আমাদের জুম্ম নারীদের অবস্থার বর্ণনা করার জন্য আমরা আর কতদিন বলব-

    সচল হয়েও অচল সে
    যে বস্তার চেয়েও ভারী
    মানুষ হয়েও সঙ-এর পুতুল
    পার্বত্য কোলের নারী।

  • কল্পনা চাকমা অপরহণ তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু কথা

    কল্পনা চাকমা অপরহণ তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু কথা

    • শ্রীমানী চাকমা

    এই লেখাটি সিএইটি নিউজ ব্লগে প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি। কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনায় গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। বিচারপতি আবদুল জলিল নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রতিবেদনের অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে লেখাটিতে। কল্পনা চাকমা অপহরণের দুই যুগ পূর্তিতে অরাজ এটি পুনপ্রকাশ করছে। 

    কল্পনা চাকমা

    সম্প্রতি সিআইডি কল্পনা চাকমার অপহরণ বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করলে পাহাড়ি সংগঠনসমূহ তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিভিন্ন সভা সমাবেশের মাধ্যমে পুনঃতদন্তসহ চিহ্নিত অপহরণকারী লেঃ ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। এর ফলে কল্পনা চাকমার অপহরণ ইস্যুটি আবার সামনে চলে এসেছে।

    কল্পনা চাকমা অপহৃত হন আজ থেকে সাড়ে ষোল বছর আগে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাতে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি থানার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে। কল্পনা চাকমার ভাই লাল বিহারী চাকমা অপহরণকারীদের তিন জন লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে চিনতে পেরেছিলেন। এই ঘটনা দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় তোলে এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক ড. অনুপম সেন ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন। এই কমিটি তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী রিপোর্ট পেশ করে বলে জানা গেলেও সরকার তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে রাঙামাটির আদালত থেকে তদন্ত রিপোর্টটি পাওয়া যাচ্ছে এবং পুলিশ ও সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারাও এই রিপোর্টের সাহায্য নিয়েছেন। এই নিবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশন রিপোর্ট (এর পর তদন্ত কমিশন বলে উল্লেখিত হবে) ও সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট (এরপর কেবল চূড়ান্ত রিপোর্ট বলে উল্লেখিত হবে) সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

    তদন্ত রিপোর্ট

    বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং স্বঃ মঃ (রাজ -২) পার্বত্য ৩/৯৫(অংশ) / ৯৬৫ তারিখ ৭/৯/৯৬ ইং মোতাবেক দি কমিশন অফ ইনকোয়ারী এক্ট, ১৯৫৬ (১৯৫৬ সালে ৬ নং আইন) এর ৩ নং পারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের কার্যপরিধি ও দায়িত্ব হলো (১) উন্মুক্ত তদন্তের মাধ্যমে কল্পনা চাকমা অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম (? এই দুটো শব্দ অস্পষ্ট, লেখক) পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনবোধে এর জন্য দায়ী কর্মকর্তা / কর্মচারী ও ব্যক্তিগণকে সনাক্ত করণ। (২) উপরোক্ত সনাক্তকৃত কর্মকর্তা / কর্মচারী ও ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করণ। এবং (৩) ভবিষ্যতে এ এলাকায় এ ধরনের অপহরণের প্রতিরোধ করণ ও এই লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে অনুসরণীয় পদ্ধতি/কার্যক্রম সনাক্ত ও সুপারিশ করণ। (৪) এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়।

    যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় সেখানে ৭ নং প্যারায় বলা হয়েছে: ‘এই প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং: স্বঃ মঃ (রাজ-২) পার্বত্য-৩/৯৫ (অংশ) /৬৬৭ তারিখ: ১৪-৮-৯৬ ইং) বাতিল করা হইল।’ অর্থাৎ আবদুল জলিলকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিশনের আগে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে একই বিষয়ে অন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কি কারণে সেই কমিটি বাতিল করা হয়েছে, কারা সেই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ও টার্মস অফ রেফারেন্স কি ছিল তা পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে বলা হয়নি।

    ৪০-পৃষ্ঠার এই তদন্ত রিপোর্টে বলা হয় কমিশন ২৬ অক্টোবর ১৯৯৬ থেকে ৩১ অক্টোবর ১৯৯৬ পর্যন্ত রাঙামাটি সার্কিট হাউজে ৮৬ জন এবং ২৬ ও ২৭ নভেম্বর ১৯৯৬ ঢাকায় সেন্ট্রাল সার্কিট হাউজের স্থায়ী কার্যালয়ে আরও ৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণে করে।

    কিন্তু কমিশন তাদের তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। রিপোর্টের শেষে সিদ্ধান্ত টেনে কমিশন লিখেছে: “উপরোক্ত কারণাদিতে অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম ও স্যা প্রমাণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা উপযুক্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং কারো বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করবার কোন কারণ নেই।”

    কমিশন কেন অপহরণকারীদের সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে তার কারণ তদন্ত কমিশনের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার মধ্যেই পাওয়া যাবে। নিচে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

    ১। পদ্ধতিগত দুর্বলতা:

    তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পড়লেই বোঝা যায় তদন্তের ব্যাপারে এর সদস্যের মধ্যে কোন seriousness বা আন্তরিকতা ছিল না। তারা ঢাকা ও রাঙামাটি শহরে বসেই তাদের পুরো তদন্ত কার্যক্রম চালান। আর এই তদন্ত কার্যক্রম ব্যক্তি বিশেষের সাক্ষাতকার গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কমিশনের সদস্যরা কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি এবং অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করে দেখেননি। অথচ যে কোন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ট তদন্তের জন্য, সংঘটিত অপরাধটির একটি সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামতের পরীক্ষা একান্ত অপরিহার্য।

    ২। সাক্ষ্য গ্রহণে দুর্বলতা

    কমিশন ৯৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করলেও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তির সাক্ষাতকার নেয়নি। এদের মধ্যে একজন হলেন বাঘাইছড়ি থানার তৎকালীন টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম, যিনি ঘটনার পরদিন কল্পনা চাকমার ভাই কালিন্দ কুমার চাকমার জবানবন্দী লিখেছিলেন। যখন কালিন্দ কুমার তার ঐ জবানবন্দীতে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও অন্যান্যদের নাম বলেছেন নাকি বলেননি এ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তখন এ বিষয়ে হাসান জাহাঙ্গীর আলম সাহেবের জবানবন্দী গ্রহণ সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিশন তার বক্তব্য নেয়ার কোন প্রয়োজন মনে করেনি। ফলে কমিশন কালিন্দ কুমার চাকমার বক্তব্যের সত্যাসত্যতা অন্যান্য সাক্ষীদের জবানবন্দীর আলোকে যাচাই করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

    কমিশন এছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাতকার নেয়নি। এরা হলেন কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমা ও কালিন্দ কুমার চাকমার স্ত্রী চারুবালা চাকমা। কমিশন বলেছে ‘বাধুনী চাকমার পক্ষে তার পুত্র ১ নং সাক্ষী কালিন্দ কুমার চাকমা সময় প্রার্থনা করে এ কমিশনের বরাবর এক আবেদন করে এবং সে প্রেক্ষিতে তাদেরকে ৩১/১০/৯৬ ইং তারিখ পর্যন্ত সময় দেয়া হয় কিন্তু ঐদিনও তিনি উপস্থিত হননি।’ এ প্রসঙ্গে কালিন্দ কুমার চাকমা এই নিবন্ধকারকে জানান তদন্ত কমিশন থেকে কেবল তাদের দুই ভাইকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য লিখিতভাবে আহ্বান করা হয়েছিল। বাধুনী চাকমা বার্ধক্যজনিত রোগে ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর মারা যান। (স্বাধিকার, বুলেটিন নং ১৫, ১৮ জুন ২০০০) অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাক্ষ্য দেয়া সম্ভব হওয়ার কথা নয়। তবে যেই হোক, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বাধুনী চাকমা ও কালিন্দ কুমারের স্ত্রী চারুবালা চাকমাকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য কমিশনের আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। এটা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর কমিশন যদি বাঘাইছড়ির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেন এবং সেখানেই একদিন সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করতেন তাহলে উক্ত দুই প্রত্যক্ষদর্শী ও তাদের প্রতিবেশীসহ অনেকে তাদের জবানবন্দী দেয়ার সুযোগ পেতেন। এতে বর্তমান তদন্ত রিপোর্টের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা বহুলাংশে কাটানো সম্ভব হতো। তাই প্রশ্ন জাগে, তদন্ত কমিশন কি ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটনাস্থলে যায়নি, যাতে অনেকে তাদের জবানবন্দী দেয়া থেকে বঞ্চিত হয়?

    ৩। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যকে গুরুত্ব না দেয়া

    সাধারণত সবার সাক্ষ্য সমান গুরুত্ব পায় না। যে কোন অপরাধের ঘটনা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। অথচ তদন্ত কমিটি আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দ কুমার ও লাল বিহারী চাকমার সাক্ষ্যকে কোন গুরুত্ব দেয়নি, বরং নানা কূট যুক্তি দিয়ে খারিজ করে দেয়। অপরদিকে, সেনাবাহিনী কল্পনা চাকমার অপহরণকে ঘিরে যে মিথ্যা প্রচারণা চালায় তাকেই তারা প্রামাণিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।

    লাল বিহারী চাকমা (তদন্ত রিপোর্টে ২ নং সাক্ষী) অপহরণকারীদের তিন জনকে চিনতে সক্ষম হন। এরা হলেন কজইছড়ি আর্মি ক্যাম্পের অফিসার লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদ। ঘটনার পরদিন সকালে লাল বিহারী কল্পনা চাকমার খোঁজে অনিল বিহারী কার্বারী ও পূণ্য রঞ্জন মেম্বারকে নিয়ে ওই আর্মি ক্যাম্পে যান এবং ফেরদৌসের সাথে দেখা করেন। অপরদিকে কালিন্দ কুমার চাকমা সম্রাটসুর চাকমাকে নিয়ে টিএনওর কাছে যান। তিনি টিএনওর কাছে ঘটনা বর্ণনা করার সময় চিহ্নিত অপহরণকারী তিন জনের নাম উল্লেখ করেন। কিন্তু পুলিশের এফআইআর-এ এদের নাম না লিখে অজ্ঞাতনামা লেখা হয়। এখানে তদন্ত কমিশনের জন্য প্রমাণের বিষয় হলো কালিন্দ কুমার চাকমা টিএনও’র কাছে অপহরণকারীদের নাম বলেছেন কিনা। এক্ষেত্রে তিনি সত্যতা যাচাইয়ের জন্য (corroboration) যার উপর ও যে সব evidence এর উপর নির্ভর করতে পারতেন তা হলো তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম ও সে সময় প্রকাশিত পত্রপত্রিকার রিপোর্ট ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন। কিন্তু তদন্ত কমিশন সেটা করেনি। কমিশন প্রকাশিত অপ্রকাশিত অনেক গুজবকে গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কিন্তু টিএনও কর্তৃক লেখা কালিন্দ কুমার চাকমার জবানবন্দী বিষয়ে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পত্র পত্রিকায় ও মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে যা লেখা হয় তা আদৌ আমলে নেয়নি। এখানে এ বিষয়ে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে:

    ক. বাঘাইছড়ি ঘুরে এসে প্রিসিলা রাজ “কল্পনা চাকমা গেলো কোথায়?” শিরোনামে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ১৭ জুলাই ১৯৯৬ সংখ্যায় লেখেন: “কল্পনা অপহরণ মামলার এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) নিয়েও ঘনিয়ে উঠেছে রহস্য। মামলার বাদি কালিন্দী কুমার জানিয়েছেন, এফআইআর তাকে পড়ে শোনানো হয়নি। তিনি জানান টিএনওর কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন এফআইআর-এ তার পুরোপুরি উল্লেখ নেই। এফআইআর কে লিখেছেন তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। রাঙ্গামাটি ডিসি, এসপি ও বাঘাইছড়ি থানার ওসি এলাকা সফরকারী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীসহ অন্যান্যদের জানিয়েছেন, বাঘাইছড়ি থানার টিএনও তা লিখেছিলেন। কিন্তু টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন তিনি কালিন্দী কুমারের অভিযোগ রেকর্ড করে তাকে থানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সাংবাদিকসহ অন্যান্যদেরকে টিএনও জবানবন্দির কপিটি দেখিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই জবানবন্দিতে আততায়ীদের ‘হাতে বন্দুক ও টর্চের’ উল্লেখ থাকলেও এফআইআরএ তা নেই। এছাড়া কালিন্দী কুমার চাকমা’র জবানবন্দি নেওয়ার পর এফআইআর পড়ে শোনানো হয়নি বলে যে অভিযোগ আছে সে বিষয়ে ওসি শহীদুল্লাহ বলেন, টিএনও কালিন্দী কুমারের জবানবন্দি নিয়েছেন, এবং তাকে পড়ে শুনিয়েছেন।

    “কিন্তু টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম তা অস্বীকার করে বলেছেন, কালিন্দী কুমার তার কাছে এসেই প্রথম জবানবন্দি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা এফআইআর হিসেবে রেকর্ড হয়নি। কালিন্দী কুমারের জবানবন্দী লেখার পর তিনি তাকে তা পড়ে শোনাননি স্বীকার করেছেন টিএনও জাহাঙ্গীর আলম।”

    খ. ডেইলী স্টারের সাংবাদিক মোর্শেদ আলী খানও ঘটনার পর রাঙামাটি ও বাঘাইছড়ি সফর করেন। তিনি লেখেন: ÒThe OC of Baghaichari Shahidullah, also the Investigative Officer (IO) of the case confirmed taking Khudiram statement as identifying the abductors, but said that despite his best efforts to rescue Kalpana, his investigation was hampered due to various reasons. …. During the investigation it was found out that the First Information Report (FIR), written by the OC from Khudiram’s description, did not match the one recorded by the TNO of Baghaichari. The statement given to the TNO by Kalicharan was recorded with clear facts and figures while the FIR written by the OC lacked clarity. No one read out the FIR to Kalicharan before accepting it, it was alleged.” [Focus: A Month After Abduction, Kalpana Chakma Yet to be Rescued: Dhaka Saturday, 13 July 1996]

    ৩. আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিনিধিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন মহলের সাথে কথা বলেন। ৬ জুলাই ১৯৯৬ Draft Field Report এ সংগঠনটি লিখেছে: “TNO said he did not write the FIR. Rather, he said that he handwrote a statement on blank white paper for his own records. He then told Kalpana’s older brother to go to the police. The TNO’s notes are with him. He would not agree to let us copy it, but we did read it. It was far more thorough and specifc (eg how many men came, what time, name of Lt. Ferdous) than the FIR. We advised him to keep it in a safe place. He said he would produce it if ordered by the court.” [হিল উইমেন্স ফেডারেশন সম্পাদিত ‘কল্পনা চাকমার ডায়েরী’তে সংকলিত, প্রথম প্রকাশ ১২ জুন ২০০১: পৃ: ১৮৩]

    তদন্ত কমিশনের উচিত ছিল তৎকালীন টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলমের জবানবন্দী নেয়া ও তিনি কালিন্দী কুমার চাকমার যে জবানবন্দী রেকর্ড করেছিলেন তা উপস্থাপন করতে বলা। কিন্তু কমিশন কেন সেটা করেনি তা রহস্যজনক।

    উপরোক্ত তিনটি উদ্ধৃতি থেকে যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় তা হলো: ক. কালিন্দী কুমার চাকমা লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসসহ তিন জন অপহরণকারীর নাম টিএনও ও পরে থানায় ওসির কাছে বলেছিলেন। খ. টিএনও সেটা হুবহু রেডর্ক করলেও ওসি তা করেননি। গ. টিএনওর লেখা জবানবন্দীটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি। ঘ. টিএনও এবং ওসি কেউ লেখার পর জবানবন্দীটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করার আগে কালিন্দী কুমারকে পড়ে শোনাননি।

    এত সাক্ষ্য প্রমাণ থাকা সত্বেও তদন্ত কমিশন এ প্রসঙ্গে তার রিপোর্টে লিখেছে: “অথচ তিনি (কালিন্দ কুমার চাকমা) এ কমিশনে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন উহাতে বলেননি যে তাকে পড়ে শোনানো হয়নি। তিনি বলেছেন ‘আমি ঘটনার কথা টি,এন,ও সাহেবকে বললে তিনি লেখেন এবং আমি উহাতে দস্তখত দেই’। কাজেই তাকে পড়ে শুনানো হয়নি ইহা ঠিক নয়।” তদন্ত কমিশনের এ কথার প্রেক্ষিতে প্রথমে যা বলা দরকার তা হলো, কালিন্দ কুমার চাকমা তাকে তার জবানবন্দী পড়ে শোনানো হয়নি বলে শুরু থেকেই সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীসহ সবার কাছে বলে আসছেন, অথচ তিনি তা তদন্ত কমিশনকে বলবেন না তা বিশ্বাস করা যায় না। দ্বিতীয়ত, তদন্ত কমিশনের কথা যদি আমরা সত্য বলে ধরেও নিই এবং বিশ্বাস করি যে, ঘটনার কথা বললে টিএনও সাহেব লেখেন এবং উহাতে কালিন্দ দস্তখত দেন, তাহলেও কমিশনের কথা থেকে এটা কোন মতেই প্রমাণ হয় না যে, কালিন্দ কুমারকে এফআইআর পড়ে শোনানো হয়েছে।

    ৪। বিশেষ গোষ্ঠীর অপপ্রচারণায় প্রভাবিত হওয়া

    কমিশন সদস্যরা যে সেনাবাহিনীর অপপ্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন অথবা বলা যায় ফরমায়েশ মোতাবেক একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে প্রমাণ করতে শুরু থেকেই তৎপর ছিলেন, তা তাদের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ঘটনার পর সেনাবাহিনী ও তাদের ভাড়াটে এজেন্টরা যে সব অপপ্রচারণা ও গুজব ছড়িয়েছিলেন সেগুলোর প্রতি কমিশন অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে, এমনকি রিপোর্টে সেগুলো থেকে বেছে বেছে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়। যেমন একটা গুজব হলো এ রকম: কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আছেন। কমিশন তাদের রিপোর্টের ৩৫ ও ৩৬ পৃষ্ঠায় ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ দৈনিক সংবাদে “কল্পনা চাকমাকে নিয়ে ত্রিপুরাতেও নানা বিভ্রান্তি” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়। এই উদ্ধৃতির কয়েক লাইন এ রকম: “কল্পনা চাকমা ত্রিপুরাতে আছেন কেউ কেউ এ রকম মতও প্রকাশ করেন এবং সে সূত্রের দেয়া তথ্যের অনুযায়ী কল্পনা এখন দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার আন্দারছড়া গ্রামে তার মাসীর বাড়ীতে আছেন। প্রথমে তাকে রাখা হয় দক্ষিণ ত্রিপুরার বারমাভেলি [সংবাদের মূল রিপোর্টে রাইমা ভেলি] সাবডিভিশনে শুক্রাই গ্রামে।”

    প্রথমত, ত্রিপুরার আগরতলা থেকে ঘুরে এসে সংবাদের উক্ত প্রতিবেদন লেখা হয়েছে বলে তদন্ত রিপোর্টে দাবি করা হলেও প্রতিবেদকের নাম নেই। সাধারণত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শুরুতে প্রতিবেদকের নাম দেয়া না হলে “নিজস্ব প্রতিবেদক” অথবা “নিজস্ব বার্তা পরিবেশক” লেখা হয়। সংবাদের উক্ত প্রতিবেদনে এই কথাও লেখা নেই। দ্বিতীয়ত, সংবাদের উক্ত রিপোর্টটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং এতে কোথাও লেখা নেই যে প্রতিবেদক নিজে ত্রিপুরা সফর করেছেন। এমনকি তার পরিবেশিত তথ্যের সূত্র এবং প্রতিবেদন তৈরির জন্য কার কার সাথে কথা বলেছেন তার বিন্দু বিসর্গও উল্লেখ নেই।

    তৃতীয়ত, কল্পনা চাকমা ত্রিপুরাতে আছেন এমন গুজব প্রচারিত হলে সে সময় বিবিসির উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবাদদাতা সুবীর ভৌমিক জানান যে, তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তিনি জেনেছেন কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন এমন গুজব ভিত্তিহীন। তার ওই রিপোর্ট বিবিসিতে প্রচারিত হয়েছিল।

    চতুর্থত, সংবাদের ওই কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যমূলক রিপোটের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিশনের উচিত ছিল বস্তুনিষ্ঠতার স্বার্থে ওই সংবাদদাতাকে তলব করা। এমনকি কমিশন বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে ভারত সরকারকে অনুরোধ করতে পারতো যাতে ভারত সরকার সংবাদে উল্লেখিত স্থানে কল্পনা চাকমার সন্ধান কাজে সহায়তা দেয়। কিন্তু কমিশন সে সব কিছুই করেনি, লিখেছে: “অনেকে অনেক কথা বললেও তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি।”

    তদন্ত কমিশন তাদের পূর্ব নির্দিষ্ট বিষয় প্রমাণের জন্য যে কেবল তাদের পছন্দের মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টকে গুরুত্ব দিয়েছে ও পত্রিকা থেকে বেছে বেছে উদ্ধৃতি দিয়েছে তা আরো স্পষ্ট হয়েছে কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে। কমিশন ৩৯ পৃষ্ঠায় লিখেছে:

    “মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক একটি তদন্ত করা হয় এবং অন্যান্যরা সহ কল্পনার মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এবং তা ভিডিও করা হয়। উহার এক কপি সেনাবাহিনীর একজন সাক্ষী কর্তৃক আমাদের নিকট উপস্থিত করা হয়। উহাতে কল্পনা চাকমার মা বাধনী চাকমা বলেছেন যে তিনি তার মেয়ের খোঁজ খবর পান এবং সে ভালো আছে। আমরা ঐ ভিডিও রেকর্ড শুনেছি ও দেখেছি। কল্পনা চাকমার মা এর বিভিন্ন কাগজে যে ছবি ছাপা হয়েছে উক্ত ছবির সহিত ভিডিওতে ধারণকৃত ছবির হুবহু মিল রয়েছে।”

    তদন্ত কমিশন তথাকথিত বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (সরকার কর্তৃক গঠিত বর্তমানের বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নয়) তদন্ত ও ভিডিওর কথা সোৎসাহে উল্লেখ করলেও, কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমার বক্তব্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। বাধুনী চাকমা উক্ত তথাকথিত মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য সত্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। ১৯ আগষ্ট ১৯৯৬ “কল্পনার মা বলেন মানবাধিকার কমিশন মিথ্যাচার করেছে, আমি মেয়েকে ফেরত চাই” শিরোনামে দৈনিক সংবাদ ওই সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশ করে। সংবাদ জানায়:

    “সাংবাদিক সম্মেলনে কল্পনার মা বাঁধুনী চাকমা বলেন, গত ৪ঠা আগষ্ট বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের একটি দল হেলিকপ্টারে করে প্রথমে সেনাবাহিনীর জোনে যায়। সেখান থেকে বিকেলে তারা কয়েকজন বিডিআর সদস্য ও স্থানীয় বাঙালিদের নিয়ে তাদের (কল্পনার) বাড়িতে যায়। মানবাধিকার কমিশনের দলটি তার (কল্পনার মায়ের) কাছে শুধুমাত্র অপহরণের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি অপহরণের ঘটনা বর্ণনা করেন। বাঁধুনী আরো জানান যে, তিনি মানবাধিকার কমিশনের দলের কাছে এমন কোন কথা বলেননি যে কল্পনা অপহরণের পরেও দুবার তার সঙ্গে দেখা করেছে। এটি ডাহা মিথ্যা, মানবাধিকার কমিশন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করেছে।

    “বাঁধুনী চাকমা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তথ্য বিকৃত করে পরিবেশনের দায়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান।”

    বাঁধুনী চাকমার উক্ত সংবাদ সম্মেলনের খবর দেশের অন্যান্য জাতীয় দৈনিকেও প্রকাশিত হয়। অথচ তদন্ত কমিশন সে সম্পর্কে তাদের রিপোর্টে বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেনি। কমিশন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রর রিপোর্ট এবং অনেক নিরপেক্ষ রিপোর্টার ও ব্যক্তি বিশেষ কর্তৃক ঘটনাস্থল ঘুরে এসে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করা প্রতিবেদন ও মন্তব্যগুলোকে কোন গুরুত্ব দেয়নি, তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ পর্যন্ত করেনি।

    মন্তব্য

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্ত্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট একপেশে, পক্ষপাতদুষ্ট ও অসঙ্গতিপূর্ণ। অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের রক্ষার জন্যই উক্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। কেবল সেনাবাহিনীর দেয়া অসংলগ্ন বক্তব্যকেই সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। অপরদিকে যারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাদের বক্তব্যকে কথার মারপ্যাচে খারিজ করে দেয়া হয়েছে। কমিশন লিখেছে: “২ নং সাক্ষী (কল্পনার ভাই লাল বিহারী চাকমা) কোন সময় থানায় গিয়েছে উহার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। অতএব, ১ ও ২ নং সাক্ষী অত্র কমিশন সমীপে যে জবানবন্দী দিয়েছে তা অসত্য এবং ভিত্তিহীন। উপরোক্ত কারণাদিতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে কল্পনা চাকমার কথিত অপহরণের ব্যাপারে লেঃ ফেরদৌস ও ২ জন ভিডিপি সদস্য বা সেনাবাহিনী বা ভিডিপি জড়িত নয়।”

    জোর যার মুল্লুক তার। অপহরণকারীদের চিহ্নিত করতে না পারলেও, কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রমাণ করেছে যে, কখনো কখনো গায়ের জোরে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় উপনের মতো এভাবে আক্ষেপ করা ছাড়া কালিন্দ কুমার ও লাল বিহারী চাকমার আর কী আছে: “তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে”।

    সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট

    অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্ত্বাধীন তদন্ত কমিশন অপহরণকারীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলেও, “দায়েরকৃত এফ,আই,আর এর ভিত্তিতে (বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং ২ তাং ১২/৬/৯৬) তদন্ত চালিয়ে অপহৃত মিস কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করত ও অপরাধীদের চিহ্নিত করত যথারীতি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া যেতে পারে” বলে সুপারিশ করেছিলেন। তাদের সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বাঘাইছড়ি থানার এস আই ফারুক আহম্মদ তদন্ত চালান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া সাক্ষ্যে উল্লেখিত অপহরণকারীদের নাম বাদ দিয়ে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেন। বাদী কালিন্দ কুমার চাকমা উক্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজী আবেদন জানালে আদালত সিআইডির মাধ্যমে তদন্ত করানোর নির্দেশ দেন। এরপর সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা শহীদুল্লাহ গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ সিআইডি চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন।

    উক্ত দুই চূড়ান্ত রিপোর্টের মূল সুর ও লক্ষ্য একই — অপহরণকারীদের রক্ষা করা। সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে,

    “বাদীর ভাই লাল বিহারী চাকমা @ ক্ষুদিরাম চাকমাই একমাত্র সাক্ষী যিনি লেঃ ফেরদৌস সাহেব, ভিডিপি নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে চিনিতে পারিয়াছেন বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। বাদী তাহার পরিবারের লোকজন ও এলাকার গণ্যমান্য লোকদের সাথে আলোচনা করিয়া এজাহার দেন। কিন্তু তিনি তাহার লিখিত এজাহারে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করেন নাই। তাই লাল বিহারী চাকমা @ ক্ষুদিরাম চাকমার প্রদত্ত বক্তব্যটি রহস্যপূর্ণ। তবুও তাহার দেওয়া তথ্য তদন্তকালে যাচাই করা হয়। কিন্তু সমর্থনে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় নাই।”

    এজাহারে কেন অপহরণকারীদের নাম নেই সে ব্যাপারে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। মূলতঃ শুরু থেকেই অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য সরকার ও সেনাবাহিনীর মরিয়া প্রচেষ্টা ল্যণীয়। ঘটনার পর এফআইআর-এ লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও দুই ভিডিপি সদস্যের নাম না লিখে অজ্ঞাতনামা লেখা, বাদী কালিন্দ কুমার চাকমাকে এফআইআর পড়ে না শোনানো, তদন্ত কমিটির সদস্যদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে না যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দী না নেয়া, দায় এড়ানোর জন্য তদন্তের নামে eyewash — ইত্যাদি সবই একই ল্য বাস্তবায়নের জন্য করা হয়েছে। আর এখন সিআইডি ঘটনার আলামত নষ্ট করার জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল্লাহ তার চূড়ান্ত রিপোর্টে একদিকে বলেছেন ‘ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে বা উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির পুনরায় তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’, অন্যদিকে ১ নং ও ২ নং আলামত (‘একটি রশি যাহার দ্বারা ঘরের দরজা বাধা ছিল এবং ঐ রাতে আগত অজ্ঞাত লোকেরা কাটিয়াছে বলিয়া কথিত’ এবং ‘একটি খয়েরী রং এর পলিষ্টার কাপড়ের তৈরী গুলি রাখার তোজধানী’) ধ্বংস করার আদেশ প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো আলামত নষ্ট করে ফেলা হলে ভবিষ্যতে কিভাবে তদন্ত করা সম্ভব হবে? এ বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্টে তার বক্তব্য পুরোপুরি স্ববিরোধী। আসলে ভবিষ্যতে অপহরণের সাথে লেঃ ফেরদৌস এবং সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা যাতে কোনভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব না হয় তার জন্যই সকল আলামত নষ্ট করার এই ষড়যন্ত্র।

    মোট কথা, পুলিশ ও সিআইডির তদন্ত অত্যন্ত দায়সারাভাবে করা হয়েছে। তদন্তের নামে এ ছিল এক মহা কেলেংকারী। তদন্ত কর্মকর্তারা কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি এবং সংশ্লিষ্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যেমন বাঘাইছড়ির তৎকালীন টিএনওর সাক্ষাতকার নেননি। কালিন্দ কুমার চাকমা নিবন্ধকারকে জানান, “আমার ভাই লাল বিহারী চাকমা ঘটনার সাথে জড়িতদের মধ্যে যাদের চিনতে পেরেছেন তাদের নাম বলেন, আমিও বলি। কিন্তু তারপরও তিনি লেঃ ফেরদৌস, নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে আসামী করেননি।” তার বক্তব্য থেকে আরো জানা যায়, এসআই ফারুক তদন্তে গিয়ে তাকে বলেন সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যই কল্পনা চাকমা অপহরণ সাজানো হয়েছে। তার এই কথায় কালিন্দ কুমার দৃঢ় প্রতিবাদ জানান। এইআই ফারুকের উক্ত মন্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, তিনি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কাজ সম্পাদন করেননি, শুরু থেকেই বাদী সম্পর্কে বিরূপ ধারণা গঠন করে তদন্তে অগ্রসর হয়েছিলেন।

    উপসংহার:

    অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের তদন্ত রিপোর্ট এবং পুলিশ ও সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট চিহ্নিত অপহরণকারীদের রক্ষার জন্য বিধায় তা কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইউনাইটেড পিপলস্‌ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতির উভয় গ্রুপ ও বিভিন্ন সংগঠন উক্ত তদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশ-সিআইডির রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। ন্যায় বিচারের স্বার্থে সরকারের উচিত হবে অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে গ্রেফতার পূর্বক পুনঃতদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

  • অপহরণ: ক্ষমতার সামনে ভাষা যেভাবে বেঁকে যায়

    অপহরণ: ক্ষমতার সামনে ভাষা যেভাবে বেঁকে যায়

    • আহমেদ শামীম

    অপহরণ কাকে বলে তা সমকালের বাংলাদেশ খুব ভাল করেই টের পেয়েছে। এই শব্দের অর্থের জন্য এ দেশের কাউকে আর অভিধান ঘাটতে হয় না। এর অর্থ মানুষের মানস-অভিধানে অন্তর্ভুক্ত আছে; বাংলার মানুষ জীবন দিয়ে তা তাতে লিখে নিয়েছে। তবু আদালত যেহেতু মনহীন, উপরন্তু চোখ বন্ধ, কেবল কানের ওপর নির্ভর করে চলে, অপহরণের মামলায় অপহরণের লিখিত অর্থে তাকে কান দিতে হয়। সেই সুযোগে আদালতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন ক্ষমতাধর পক্ষ শব্দের অর্থ ব্যঞ্জনা নিজেদের স্বার্থে বাঁকা করে নিয়ে সুবিধামত কার্য হাসিলের প্রয়াস পায়। এবং, অপহরণ সম্পর্কে এত কাল আমার যা জানি তা ভুল প্রমাণ করে। ক্ষমতাধররা আমাদের মুখের ভাষা কাইরা নিয়া আমাদের মুখে গুঁজে দেয় তাদের স্বার্থানুকূল অর্থ। ভাবছেন এমনতর ভাষিক হেরাফেরি থেকে রক্ষা করতে বাংলাভাষার অভিধানগুলো আপনার পাশে দাঁড়াবে? সে আশা সর্বক্ষেত্রে নাও খাটতে পারে।

    কল্পনা চাকমা

    সম্প্রতি, নারীর অধিকার নিয়ে সরব ব্লগ ঠোঁটকাটার ছোট্ট একটি পোস্ট “শাসকের অভিধান: অপহরণ” এমনি এক ঘটনা তুলে ধরেছে বাংলাভাষীদের দরবারে। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ (আমারও একই কথা, তাই অনুমতি সাপেক্ষে ঠোঁটকাটার কথা কোট না দিয়েই ব্যবহার করছি), বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সোচ্চার, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠ কল্পনা চাকমা অপহরণের পর ১৯ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এ দুই দশকে বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থার বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে অপহরণ বিষয়টিকে যে ভাবে উপস্থান করা হয়েছে তা অপহরণ শব্দটির পুর্নসংজ্ঞায়নের সামিল। তা কেমন? রাংগামাটি পার্বত্য জেলার মিস কল্পনা চাকমা অপহৃত হওয়ার ঘটনা তদন্ত করিবার জন্য গঠিত [বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭/০৯/৯৬ ইং গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি] কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত তদন্ত প্রতিবেদনে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে তা নিম্নরূপ:

    সিদ্ধান্ত: ” …অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম ও সাক্ষ্য প্রমাণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা উপরোক্ত সাক্ষ্য প্রমাণে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরায় কারো বিরূদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করার কোনও কারণ নেই।”

    কী বোঝা যায় তাদের এই সিদ্ধান্ত থেকে? মোদ্দা কথায় তাদের বক্তব্য হতে পারত এই যে, “প্রমাণ পাওয়া গেছে যে কল্পনা অপহৃত হয়েছে। কিন্তু অপহরণকারী কে তা নির্ণয় করা যাচ্ছে না।” কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের বক্তব্য তা নয়। তারও কিছু বেশি। কমিটি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে। তো কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা যদি উপরোক্ত সাক্ষ্য প্রমাণে নির্ণয় করা সম্ভব না-ই হয়ে থাকে, তাহলে কল্পনা চাকমা যে ইচ্ছায় অপহৃত হয়ে থাকতে পারে সে সম্ভাবনার কথা কী ভেবে যুক্ত করা হল? ‘হতেও পারে আবার নাও হতে পারে’ মার্কা মকারিতো তদন্ত কমিটির কাজ না। তাহলে কি? মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ রাখতেই কি অমন একটা কথা জুড়ে দেয়া হল? মানে সম্ভব হলে বাদীকে আসামী করার পথ খোলা রাখা? ইতিহাসে এমন নজির নাই তা কিন্তু নয়। তাছাড়া, “কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় অপহৃত হয়েছে” এর মানে কী দাঁড়ায়? সামাজিক স্তরে যদি ‘অপহরণ’ শব্দটির প্রায়োগ বিচার করি তাহলে দেখতে পাই, “কোন ব্যক্তি বা পক্ষ ‘ক’ যদি অন্য ব্যক্তি বা পক্ষ ‘খ’কে তার বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে আমরা ‘ক’ ‘খ’কে অপহরণ করেছে বা ‘খ’ ‘ক’ কর্তৃক অপহৃত হয়েছে বলি। শব্দটি জনমানুষের মানস-অভিধানে এ অর্থেই অন্তর্ভুক্ত। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আরও দেখা যায়, ‘ক’-এর পরিচয় তক্ষুনি না জানা গেলে সাধারণত বলি, ‘খ’কে অপহরণ করা হয়েছে কিংবা ‘খ’ অপহৃত হয়েছে। মানে, বাচ্য পরিবর্তনের ক্ষমতাসম্পর্ক এবং প্রাপ্ত তথ্যের ব্যাপারস্যাপার অবশ্যই আছে। কিন্তু, বাচ্য এখানে যাই হোক, অপরহণ ক্রিয়াটি কর্তার ইচ্ছায় ঘটে এতে কোনো দ্বিমতের অবকাশ নাই। কর্মের, বা যাকে অপহরণ করা হয়, তার ইচ্ছায় অপহরণ ক্রিয়াটি ঘটে না; সেরকম ঘটলে ক্রিয়াটিকে আর অপহরণ বলা যায় না। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বলতে হয় কল্পনা চাকমার অপহরণ তাহলে সাজানো নাটক! আর, তা চালিয়ে দিতে পারলে মিথ্যে মামলার জন্য বাদীপক্ষকে দণ্ড দেয়া যায়। তো এই হল “কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে”-এর বাকচাল।

    সোজাকথায় যদি বলা হয় কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছে, এর অর্থ দাড়ায় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি বা পক্ষ তাকে তুলে নিয়ে গেছে। এমন ঘটনা বাংলাদেশে বহু ঘটেছে; কল্পনার স্বজনেরা অপহরণ মামলা দায়ের করেছে; অন্য অপহৃতদের স্বজনেরা যেমন করে। এক্ষেত্রে মামলা কোর্টে গড়ায়, তা গড়িয়েছে। তদন্তের পর তদন্ত হয়েছে। তো গত উনিশ বছর ধরে সেই মামলা কেবল গড়াচ্ছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে। তো কী পেলাম আমরা এই তদন্তসমূহ থেকে? গতবছর মামলার তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন (২০/০৭/২০১৪):

    “যেহেতু এই মামলার মূল সাক্ষী ভিক্টিম কল্পনা চাকমা নিজেই, তাই উক্ত কল্পনা চাকমার উদ্ধার না হওয়া কিংবা তার বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।”

    কল্পনা চাকমা কেন উদ্ধার হচ্ছেন না? কারো উদ্ধার হওয়া সম্ভব হয় যখন উদ্ধার কেউ করে, তাই না? এখানেও ইচ্ছার কথা আসে: কর্তায় ইচ্ছায় ক্রিয়া। উদ্ধার করা উদ্ধারকারী কর্তাপক্ষের কাজ। যে উদ্ধার হবেন তার কাজ না এটা। এ বাবদে অগ্রগতি প্রতিবেদনটির ওই বাক্যের পাঠ এভাবে করা যায়, “কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার না করা কিংবা তার বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।” অর্থাৎ অপহরণ ক্রিয়ার কর্তাপক্ষ কি কল্পনা চাকমাকে তাদের জিম্মায় জীবিত রেখেছে, নাকি মেরে লাশ গুম করেছে; কিংবা অন্যকিছু ঘটেছে এর ভেতর- এর কোন তথ্যই কিংবা তথ্যসূত্রই উদ্ধার করতে পারছেন না উদ্ধারকারী কর্তাপক্ষ। তো তারা কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করবেন কী ভাবে? অপহরণের তদন্ত কার্যে প্রমিত প্রক্রিয়া যতদূর জানি তা হল সাক্ষীসাবুত ইত্যাদি থেকে সূত্র বের করা, সন্দেহ করা পক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা ইত্যাদি উদ্ধারকারী কর্তাপক্ষের কাজ। সে কাজে অগ্রগতি কী তা অগ্রগতি প্রতিবেদনের ওই বাক্যটিতেই পরিষ্কার। কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে না “কল্পনা চাকমার উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত” কিংবা “তার বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত” তদন্ত চলবে- এই কথার প্রায়োগিক মানে কি এই যে কল্পনা চাকমার সুরতহাল না দেখে বলা যাচ্ছে না কে অপহরণ করেছে, আদৌ অপহরণ করেছে কি না! বোঝা যাচ্ছে না কারণ তা কর্তৃপক্ষের ভাষা। জনমানুষের ভাষার সঙ্গে এর যোগাযোগ নেই বললেই চলে। এমনকি বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃপক্ষকেই সমর্থন যোগায়; জনগণের বিরুদ্ধে তাদের মুখের ভাষাই ব্যবহৃত হয়। ঠোঁটকাটার সঙ্গে সংযুক্তি আকারে আমি এ কথাটুকুই বলতে চাই: প্রাতিষ্ঠানপ্রসূত বাংলা অভিধানগুলো প্রায়শই জনমানুষের মানস-অভিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আজ এই অপহরণ দিয়েই তার উদাহরণ দেয়া যাক।

    আপনি যদি গুগলে অপহরণ লিখে একটা সার্চ দিন; প্রায় আধা সেকেন্ডে আপনি প্রায় চার লক্ষ বার অপহরণ শব্দটি পাবেন। এখন যদি আপনার হাতের কাছে একটি কোড থাকে তাহলে জেনে নিতে পারবেন প্রতিটি টেক্সটে অপহরণের ঠিক আগের পরের শব্দগুলো কী কী- ফলে জানতে পারবেন সেখানে কোন প্যাটার্ন আছে কিনা। আরও জানতে পারবেন অপহরণ সঙ্গে আর কী কী ক্রিয়া যুক্ত। কোড নাই ঠিক আছে, কিন্তু স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করুন। দেখুন একই রকম উত্তর পাবেন। ‘শিশু অপহরণ’ ‘কলেজ/স্কুল ছাত্রী অপহরণ’, ‘তরুণী অপহরণ’, ‘ব্যবসায়ী অপহরণ’, ‘যুবক অপহরণ’, ‘প্রবাসী অপহরণ’ এমন শিরনাম অনেক দেখেছেন। দেখেছেন ‘অপহরণের পর ধর্ষণ’, ‘অপহরণের পর ধর্ষণ তারপর খুন’, ‘অপহরণের পর খুন’, ‘অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়’ ইত্যাদি। তাহলে অপহরণ সম্পর্কে আপনার ধারণা কি দাঁড়ায়? অপহরণের উদ্দেশ্য অপহরণকারীর স্বার্থ উদ্ধার এবং/অথবা অপহৃতার ক্ষতিসাধন। ফলে জনমানুষের মানস-অভিধান জানে ‘ক’ ‘খ’কে অপহরণ করে মানে “‘ক’ ‘খ’কে ‘খ’-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে যায়- তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের কব্জায় রেখে নিজের স্বার্থ উদ্ধার এবং/অথবা অপহৃতার ক্ষতিসাধন করার উদ্দেশ্যে।

    তো কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করায় অপহরণকারী পক্ষের স্বার্থ কী? আদালত এখনো জানে না। কারণ, তদন্ত চলছে, তাই বিচার শুরু হচ্ছে না। কিন্তু তদন্তে অপহরণের অর্থের ব্যাপ্তির ওইরূপ সঙ্কোচন আমাদের সংশয়ী করে। আমাদের সন্দেহ হয়, ওইরূপ অর্থসঙ্কোচন ঘটলে আদালত সঠিক তথ্যপ্রমাণ পাবে কি না!  সন্দেহ নিয়ে আমরা বাংলা ভাষায় লিখিত সব অভিধান হাতরাই। আদালতকে বলতে চাই, তদন্তে অপহরণের অর্থব্যাপ্তিকে খেলো করে দেয়া হচ্ছে। আদালত কেবল মানস অভিধানের ওপর নির্ভর করে না, তার লিখিত অভিধান লাগে। তাই হাতের কাছের প্রাতিষ্ঠানিক  অভিধানগুলোকে সাক্ষী মানি। কিন্তু হায়, চোরের সাক্ষী যখন হয় গাঁটকাটা, তখন যে অপহৃত হয়েছে সে যায় কোথায়? দেখুন, প্রতিষ্ঠানপ্রসূত অভিধানগুলো কী সাক্ষ্য দেয়। হাতের কাছে যে কয়টা বাংলা অভিধান পাবেন সব কটিতে অপহরণ শব্দটির অর্থ, সমার্থক শব্দ খুঁজে ঠোঁটকাটা একটা তালিকাটা তৈরি করেছে। তালিকাটি নিম্নরূপ:

    ব্যবহারিক শব্দকোষ: চুরি

    বির্বতনমূলক বাংলা অভিধান: জোর করে কেড়ে নেয়া, লুটতরারজ দ্বারা ক্বরিত, আপনাদিগের কালহরণ, আত্মসাৎ, চুরি
    চলন্তিকা: চুরি
    বাংলা এ্যাকাডেমি ব্যবহারিক: চুরি, লুণ্ঠন
    সংসদ: ১. বিনা অনুমতিতে বা অন্যায়ভাবে অন্যের জিনিস নেয়া, চুরি; ২. লুণ্ঠন [সংস্কৃত অপ+হৃ+অন] বঙ্গীয় শব্দকোষ: দ্র: অপহর, অপহর=অপহারক, নাশক। ১. অপনয়ন, অপসারণ। ২. স্তেয়, চৌর্য। সীতাদ্রব্য। ৩. অপকৃষ্টভাবে গ্রহণ। ৪. ইাশ, ক্ষয়।

    কই সেই ব্যাপ্তি অপহরণের? কবে কে অন্য কারো কলম অপহরণ করেছে? সম্পদ অপহরণ করেছে? টাকা অপহরণ করেছে? এভাবে অপহরণের অর্থ কে ব্যবহার করি আমরা, বাঙালিরা? হিন্দি এবং মারাঠিতেও অপহরণ শব্দটি আছে। সেই ভাষাদুটিতেও আমাদের মানস অভিধানের যে অর্থব্যপ্তি হাজির করেছি, সেই অর্থব্যপ্তি নিয়েই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলা অভিধানগুলোর সব অর্থ মিলিয়েও সেই ব্যাপ্তিতে পৌঁছাতে পারে না। এ বাবদে আমাদের লিখিত অভিধানগুলো জনমানুষের মানস অভিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আভিধানিক অর্থ পড়ে অপহরণের নৃশংসতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িত ক্রিয়াকলাপের লেশ মাত্র নেই ওই অর্থগুলোতে। সে বাবদে, ঠোঁটকাটার এই কথার সঙ্গে আমি একমত যে, শাসন ব্যবস্থা, শাসনের সম্পর্ক যে চাইলেই আইনি প্রক্রিয়ায়, দাপ্তরিক নথি-পত্রে শব্দের অর্থ বদলে দিতে পারে – তার নির্মম উদাহরণ কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা। কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলার নথিপত্র থেকে উল্লেখিত উদ্ধৃতি দুটো উক্ত তালিকাটি পাশে রেখে পড়লে শব্দের অর্থকে শাসন করে আধিপত্য বজায় রাখার, টিকিয়ে রাখার কৌশল নিয়ে ভাববার রাজনৈতিক গুরুত্ব আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়। সঙ্গে এও স্পষ্ট হয় যে, ক্ষমতাপক্ষ যা বলে তা ভাষা নয় তাদের ভাষ্য বা বয়ান, তাই ক্ষমতার বয়ান বাছবিচার করেই তবে পাওয়া যাবে ক্ষমতাপক্ষের বাক্য কীভাবে জনমানুষের মানস অভিধানে অন্তর্ভুক্ত শব্দের অর্থকে স্তব্ধ করে দেয়।

    *প্রবন্ধটি নারীবাদী ব্লগ ঠোঁটকাটায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

  • অরুণ কুন্দনানি।। ফানোঁ, ভেন্টিলেটর এবং আমাদের শ্বাস নেয়ার অধিকারের লড়াই

    অরুণ কুন্দনানি।। ফানোঁ, ভেন্টিলেটর এবং আমাদের শ্বাস নেয়ার অধিকারের লড়াই

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    অনুবাদকের  ভূমিকা

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্ল্যাক আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডকে পুলিশ খুন করার আগেই লিখিত হয় এই প্রবন্ধটি। কিন্তু জর্জ ফ্লয়েড নির্মম পুলিশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার বাস্তবতায় এই প্রবন্ধ যেন আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। গোটা পৃথিবীতেই আজকে মানুষ শ্বাস নেয়ার অধিকারের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে।

    এই ‘শ্বাস নেয়া’র অধিকার যেমন জৈবিক তেমনি রাজনৈতিক। করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে দেখা যাচ্ছে নিওলিবারাল দুনিয়ার স্বাস্থ্যখাতের ভয়াবহ বিপর্যয়। চিকিৎসার অভাবে শ্বাস নিতে না পেরে মারা যাচ্ছে মানুষ।

    বাংলাদেশেও আমরা দেখছি , হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর সুবিধা না পেয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে হাসপাতালের সামনে। অর্থাৎ, এত এত উন্নয়ন, আধুনিকতা, প্রগতির দোহাই দেয়া হলেও মানুষকে জৈবিকভাবে শ্বাস নিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে না বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ। কারণ স্বাস্থ্যসেবার মত অত্যন্ত অপরিহার্য মৌলিক অধিকারকে অনেক আগেই বাজারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

    ফলে স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্তির অধিকার চিকিৎসা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এই দায় সম্পূর্ণতই মুনাফাবাজ নিওলিবারাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং তার সাথে সংগতিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ।

    ‘শ্বাস নেয়া’র অধিকারের রাজনৈতিক তাৎপর্যও ব্যাপক। কালো হওয়ার দরুণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অধিকারহীন জীবন যাপন করতেন জর্জ ফ্লয়েড।

    আর্টওয়ার্ক: রেসিয়া ডেসক্রিমিনেশন
    শিল্পী: এলান ম্যাকডোনাল্ড
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাজনৈতিকভাবে অধিকারহীন ‘ন-মানুষ’ উৎপাদন করাই আজকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম ক্ষমতার টিকে থাকার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন না কোন বর্গে রাজনৈতিক অধিকারহীন ‘হোমো স্যাকের’ উৎপাদন করাটাই সার্বভৌম ক্ষমতার ভিত্তি হিশেবে কাজ করে।

    বাংলাদেশে আমরা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন। ‘নাস্তিক’, ‘শিবির’ নানা বর্গে এখানে বধযোগ্য প্রাণ উৎপাদন করা হয়। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা আজকে এতটাই বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে যে তার পক্ষে বাংলাদেশের যেকোন মানুষকেই রাজনৈতিক অধিকারহীন বধযোগ্য ‘ন-মানুষ’ উৎপাদন করা সম্ভব। তার জন্য এমনকি জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুও হতে হয় না।

    আবরার, বিশ্বজিৎ, তনু থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি পুলিশের হাতে নিহত কৃষক নিখিল কিংবা যশোরের কিশোর ইমরান সকলেই আজক এই শ্বাসরোধী ক্ষমতার নির্মম রোষের শিকার। এই দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সারা বিশ্বেই নজিরবিহীন। অন্যান্য অঞ্চলে অন্তত ‘মূলধারা’র মানুষ কোনভাবেই বাংলাদেশের মানুষের মত সার্বভৌম ক্ষমতার রোষের সম্মুখে এতটা উন্মোচিত না। বাংলাদেশের জাতিগত-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সংখ্যালঘুদের অবস্থা সেক্ষেত্রে সহজেই অনুমেয়।

    জৈবিক ও রাজনৈতিক শ্বাস নেয়ার অধিকারহীনতার বঞ্চনা ও নিপীড়ন থেকেই মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে গোটা বিশ্বে। বাংলাদেশেও, বিক্ষিপ্ত আকারে নানা রকম প্রতিরোধ-লড়াই এর নজির দেখতে পাই।

    সেই প্রতিরোধ-লড়াইকে আরো বেগবান, আরো তীব্র করার নানামুখী প্রচেষ্টায় যারা নিয়োজিত, তাদের উদ্দেশ্যেই এই অনুবাদটি প্রণীত।

    মূল প্রবন্ধ

    কোভিড-১৯ মোকাবেলার প্রতিক্রিয়ায় শাসকগোষ্ঠীর এলিটেরা তাদের দুটি বাসনাকে চরিতার্থ করছে : রাষ্ট্রীয় বাসনা এবং বাজারের বাসনা। রাষ্ট্রীয় বাসনাটি হলো জনপরিসরকে গরীব, অভিবাসী শ্রমিক, জাতিগত সংখ্যালঘু, প্রতিবাদীর মতো ‘অবাধ্য’ জনতাশূন্য করা। আর বাজারের বাসনা হলো এমন একটি দুনিয়া কায়েম করা যা সম্পূর্ণতই মনুষ্য-সম্পর্ক বিবর্জিত এবং আগাগোড়া বাজারকেন্দ্রিক অ্যালগোরিদম দ্বারা পরিচালিত হবে। কোভিড-১৯ এই দুই উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার এক মোক্ষম অজুহাত হিশেবে হাজির হয়েছে। তীব্র সরকারী দমন-পীড়নের মুখে নিঃশর্ত আনুগত্যের যে বেসরকারি, ঘরকুনো , বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠার মতো জীবনযাপনের চাপে আমাদের পড়তে হয়; তার বাস্তবতায়  কেবলমাত্র স্বাস্থ্যসেবার অধিকারই নয়, পুরোদস্তুর মানুষের জীবনযাপন করার অধিকারকেই আমাদের আদায় করে নিতে হবে। আমাদের শ্বাস নেয়ার অধিকার আদায় করে নিতে হবে— জৈবিক ও রাজনৈতিক সকল অর্থেই।

    ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অনন্ত যুদ্ধ আমাদের জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে কী ঘটে সে সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। ৯/১১-এর পরে অস্থায়ী জরুরি ব্যবস্থা হিশেব যে সব পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের স্থায়ী ক্ষমতার স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল। ৯/১১’র এর পরের দিনগুলিতে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন মার্কিন সেনাবাহিনীকে কার্যকরভাবে সমগ্র বিশ্বকে যুদ্ধক্ষেত্র হিশেবে বিবেচনা করতে সক্ষম করেছিল; এটি আজ পর্যন্ত একই মাত্রায় কার্যকর রয়েছে। গুয়ান্তানামোতে এখনও এমন বহু বন্দি আছে যারা কোনও অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হননি। এবং ৯/১১-এর পরের বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে প্রণীত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনটি একই কায়দায় পুরোপুরি বিধিবদ্ধ আছে। এছাড়াও, ‘সন্ত্রাসবিরোধী’  যুদ্ধ যে মুসলমানবিরোধী বর্ণবাদ উস্কে দিয়েছিল, তা এখনও এই সময়ে বিরাজমান। প্রকৃতপক্ষে, এটি চীন, মায়ানামার, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে মুসলমানরা এখন ভাইরাস সংক্রমণের বলির পাঁঠা।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা ভার্সেস ওয়ার্ল্ড ট্রেড
    শিল্পী: কিয়ানৌরুশ রামজানি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অপ্রয়োজনীয় সামরিক সহিংসতায় ৮ লক্ষেরও অধিক মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়েছে। এই ‘যুদ্ধের’  ৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট পর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা যেত। প্রকৃতপক্ষে, আমরা যারা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সমালোচনা করেছি, বহু আগে থেকেই যৌক্তিকভাবে বলে এসেছি যে, সুরক্ষা নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মতো ফাঁপা ‘হুমকি’ অবসানে সময় আর অর্থ অপচয় না করে, সুস্থ সামাজিক ও পরিবেশগত সম্পর্কপ্রণালী গড়ে তোলার পথ গ্রহন।

    ‘নিরাপত্তা’ ধারণাটিকে স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত করে সংজ্ঞায়িত না করার খেসারত হিশেবে এই মহামারির কালে আমরা স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি। নয়া উদারবাদী রাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে পদ্ধতিগতভাবে জনসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতাকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করেছে, অন্যদিকে নানাবিধ পুলিশি ব্যবস্থা এবং যুদ্ধোন্মাদনা জারি রেখেছে। এখন আমাদের জনস্বাস্থ্য রক্ষার জরুরতকেও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র বিস্তৃত বর্গে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে।

    জনপরিসরের নিয়ন্ত্রণ

    কোভিড-১৯ এর প্রতিক্রিয়ায় লকডাউন এবং কোয়ারান্টাইনের প্রকৃত জরুরতকে বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রসমূহ সহিংসতার তীব্রকরণে ব্যবহার করেছে, যে সহিংসতা ইতিমধ্যেই পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। ফ্রান্সে, শ্রমজীবীদের শহরতলিগুলোতে আবদ্ধ থাকার বিধি লঙ্ঘনের শাস্তি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অন্তত তিনগুণ বেশি। গ্রীসে, অভিবাসী এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তাদের দিকে থুতু ছিটানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। কোভিড-১৯ বিধি প্রয়োগে ন্যস্ত পুলিশ তাদের চিরুনি তল্লাশির আওতায় নিয়ে এসেছে। বুলগেরিয়ায় বেশ কয়েকটি রোমা সেটেলম্যান্টকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন্ড করা হয়েছে, পৃথকীকরণ দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, জোরপূর্বক টেস্টিং করানো হচ্ছে এবং বাসিন্দাদের শরীরের তাপমাত্রা দূর থেকে পরীক্ষা করার জন্য থার্মাল সেন্সর সম্বলিত ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

    ইজরায়েলে, জনস্বাস্থ্য সহায়তার খাতিরেও গাজা অবরোধ শিথিল করা হয়নি ; বরং মনে হচ্ছে ভাইরাস ‘দমনের’ অন্তরালে ইজরায়েল পশ্চিমতীরের অধিকাংশ অংশই দখলে নিয়ে নিবে। ভারতে সরকার কাশ্মীরে দমন-পীড়ন তীব্র করার কাজে মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতি কাজে লাগাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহামারির বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কেন্টাকি, দক্ষিণ ডাকোটা এবং পশ্চিম ভার্জিনিয়া রাজ্যগুলো তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনগুলির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দমনে নতুন ফৌজদারি দণ্ড আরোপের আইন পাস করেছে।

    অভিবাসী এবং শরণার্থীরা বিশেষভাবে দুর্বল। কাতারে শত শত অভিবাসী শ্রমিককে টেস্টিং এর কথা বলে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দি করা হয়েছে কিংবা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে মাল্টিজ সেনারা একটি আটকে পড়া নৌকায় ভাঙচুর চালিয়ে কমপক্ষে পাঁচজন শরণার্থী যাত্রীর মৃত্যু ঘটিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রবার্ট আবেলা বলেছেন, কোভিড -১৯ এর কারণে এ জাতীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি ছিল। একইভাবে, মালয়েশিয়া তার দেশের দিকে ধাবমান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহনকারী নৌকা ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং ৫০০ জনেরও বেশি অভিবাসীকে আটক করেছে।

    অঅর্টওয়ার্ক: হোস্টেজ মায়াগ্রান্ট
    শিল্পী: শৌনাক সম্ভাতসার
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মহামারির কালে জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে চলাফেরার স্বাধীনতার উপর যৌক্তিক বিধিনিষেধের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যখন নৌকায় আগত গরীবদের ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং ব্যক্তিগত জেট বিমানে আগত ধনীদের অবাধে প্রবেশ করতে দেয়া হয়, তখন ব্যাপারটা আর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ হিশেবে থাকে না, সর্বহারা নিধনে গিয়ে ঠেকে।

    ইমিগ্রেশনের ডিটেনশন সেন্টারগুলো, যেগুলো মহামারি প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই জনাকীর্ণ অবস্থায় আছে, সেগুলোতে ভাইরাস সংক্রমণ রোধকল্পে কোন কার্যকর সুরক্ষা নেই— সম্ভবত সেখানে ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষ সংক্রমিত হবে।

    খাবার, পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনা না করেই যখন গরীবদের উপর লকডাউন চাপিয়ে দেয়া হলো, তখন বিক্ষোভ-অসন্তোষ একপ্রকার অবশ্যসম্ভাবীই ছিল। এই বিক্ষোভ-অসন্তোষ রাষ্ট্রগুলোর একমাত্র জানা তরিকা  চরম পুলিশি সহিংসতার মাধ্যমেই মোকাবেলা করা হয়েছে।

    দক্ষিণ আফ্রিকাতে, অনানুষ্ঠানিক জনবসতিগুলোর বাসিন্দারা বাড়ির ভিতরে থেকে অনাহারে ধুঁকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আনুমানিক ৫৫ লক্ষ অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যার প্রভাব এক কোটি পয়ষট্টি লক্ষ মানুষের জীবনে গিয়ে পড়েছে। শহুরে গরীবদের উপর লকডাউন চাপিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান এবং রবার বুলেট ব্যবহার করেছে। একইভাবে ভারতে, লকডাউনের বিরোধীতাকারী কর্মহীন, অভিবাসী শ্রমিকদের উপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেউপ।

    অন্যত্র, সমালোচক সাংবাদিক, ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেফতার করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায়, সরকারী কর্মকর্তাদের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। পাকিস্তানে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদির অভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী কয়েক ডজন চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

    অ্যালগোরিদমিক বিধি

     ইন্টারনেটযুক্ত  ঘরে বন্দিদশায় (যদি সেই সুবিধা আমাদের থাকে), আমাদের জীবন ডিজিটাল মিডিয়া কর্পোরেশনগুলোর প্রতি স্থায়ীভাবে নির্ভর হয়ে পড়েছে। অ্যামাজন, জুম, নেটফ্লিক্স এবং এমনতর ডিজিটাল মাধ্যমগুলো বিচ্ছিন্নতার অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। কিন্তু আমাদের সম্পর্কপ্রণালী যতবেশি ডিজিটাল অ্যালগোরিদমের মধ্যস্থতার ফাঁদে পড়বে, তত বেশি নয়া উদারনীতিবাদের বাজারচালিত দুনিয়ার স্বপ্ন তরান্বিত হবে। যখনই মহামারিকালীন জরুরি সময়কাল শেষ হবে, আমরা সম্ভবত নিজেদের এমন এক সামাজিক কাঠামোতে আবিষ্কার করব যা আরও গভীরভাবে ডিজিটালাইজড, বাজারতাড়িত এবং গৃহায়িত এবং এই নয়া বাস্তবতা বাজারের মধ্যস্থতার বাইরে মানব সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতাকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

    উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাইরাসটির আশু প্রতিক্রিয়া হিশেবে অনলাইন পরিষেবা চালু করেছে। কিন্তু এই পরিষেবার জন্য অবকাঠামোগত সরবরাহকারী কর্পোরেশনগুলো এখন এমন এক স্ট্যান্ডার্ড তৈরির চেষ্টা করবে যেন অপেক্ষাকৃত কম সম্পদশালীরাও এই নিয়মে স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য হয়।

    আর্টওয়ার্ক: ক্লাপ সোসাইটি
    শিল্পী: মারিয়ান খান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ইতিমধ্যেই, রাজনৈতিক নেতারা সংকটের মধ্যে নিজেদের বাজারীকরণের পুরোধা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। ৩ রা ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন একটি ভাষণে বলেছিলেন, ‘করোনাভাইরাস জাতীয় নতুন রোগ আতঙ্ক এবং বাজার বিচ্ছিন্নকরণের আকাঙ্ক্ষাকে উদ্বুদ্ধ করার ঝুঁকিতে রয়েছে,’। যার অর্থ তিনি নব্য উদারতাবাদী বিশ্বায়নের উপর নিষেধাজ্ঞাকে বুঝিয়েছেন। পরিবর্তে, তিনি বলেছিলেন, ‘মানবতার কোথাও কোথাও এমন সরকার দরকার যা অন্তত শক্তিশালীভাবে ক্ষেত্রটি তৈরি করতে ইচ্ছুক… পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর একে অপরের মধ্যে অবাধে কেনা বেচা করার অধিকার  রয়েছে।’ সুতরাং বিশ্বব্যাপী যারাই ভাইরাসকে অন্য কোন মডেলের উপলক্ষ ভাবতে চায়, ব্রিটেন তাদের কাছ থেকে মুক্তবাজারকে রক্ষা করবে।

    সুতরাং আমাদের নিজেদের এই প্রবোধ দিলে চলবে না যে, মহামারি বৈশ্বিক বামপন্থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাঙ্গা করবে। এমনকি কেউ কেউ তো এই দাবিও করেন যে নয়া উদারতাবাদ ভেঙ্গে পড়ছে কারণ রাষ্ট্রগুলো ভাইরাসের চিকিৎসা এবং অর্থনৈতিক নিরাময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটি একটি সম্মোহনী মরীচিকা। এটি এই ভ্রান্ত ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে নব্য উদারতাবাদের মানে কম সরকার। নয়া উদারতাবাদকে বুঝতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য গৃহীত সমষ্টিগত পদক্ষেপকে ভন্ডুল করার বাজারি যুক্তিপ্রণালীর মাধ্যমে।  এই সংজ্ঞা অনুসারে, মহামারি নব্য উদারতাবাদী মওকা ততটাই বয়ে আনে, যতটা ঝুঁকি সাথে করে নিয়ে আসে। আর্থিক বাজারগুলি বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করে যে, ঝুঁকির চেয়ে সম্ভাবনাই বেশি। গত এপ্রিল ছিল বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ওয়ালস্ট্রিটের সেরা মাস।  এবং, ইন্সটিটিউট ফর পলিসির গবেষণা অনুযায়ী, মার্চ ১৮ থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে আমেরিকার কোটিপতিদের সম্মিলিত সম্পদ প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

    আমাদের শক্তি রাজপথে

    মহামারির ধবংসযজ্ঞের উপর দাঁড়িয়ে, আমাদের অবশ্যই একটা নতুন সামাজিক বিন্যাস গড়ে তোলার লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া উচিত; এমন একটি সম্পর্কপ্রণালী যা মানুষের প্রয়োজনের নিমিত্তে গঠিত, কর্পোরেশনের লাভের নিমিত্তে নয়। তবে আমাদের স্বীকার করা উচিত যে, আমরা এমন একটি অবস্থান থেকে এটি করছি যেখানে আমাদের নিজেদের মধ্যে যে পরিস্থিতি বিরাজমান তার কাঠামোর মধ্যে প্রগতির কোন গ্যারান্টি নেই। আমরা যেটা অবশ্যই জানি-যেসব ব্যবস্থাদি অনাগত , তা প্রতিরোধের কোন বিকল্প আমাদের সামনে নাই , কারণ আজকে যা কায়েম করা হয়ে গেছে, আগামীকাল তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা আরো কঠিন হবে।

    অঅর্টওয়ার্ক: ডিফারেন্ট ইয়েট ইউনাইটেড
    শিল্পী: সাবা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমরা আরও জানি যে আমাদের শক্তি নিহিত আমাদের মানব সংহতিতে এবং আমাদের সামাজিক সংগ্রামের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারের মধ্যে। আমাদের সংগঠিত করার, আন্দোলন গড়ে তোলার, একত্রিত হওয়ার তাগিদ-নতুনভাবে-আগের তুলনায় অনেক বেশি মূল্যবান। শিবানন্দন যেমন বলেছেন, আমাদের অবশ্যই ‘মানুষের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাস এবং গভীর জ্ঞান ধরে রাখতে হবে যে, নিজের দ্বারা বা ব্যক্তি নিজেই কিছুই নয়, পারস্পরিকতার মধ্যেই আমাদের অস্তিত্ব নিহিত। কেবলমাত্র সামস্টিক মঙ্গলের মাধ্যমেই আমরা প্রকাশিত এবং বেড়ে উঠতে পারি।’

    ভাইরাসটি যেভাবে আমাদের সামাজিক জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পেরেছে, সেই পদ্ধতিই ভাইরাসটিকে এত বিধবংসী করে তুলেছে। কিন্তু সম্মিলিতভাবে গতিশীল থাকার অনেক অনেক উপায় এখনো রয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে, কল সেন্টার, ডেলিভারি এবং পণ্যগুদাম শ্রমিকদের জন্য ধর্মঘট ‘কাজ’ এর চেয়ে অধিক নিরাপদ। এবং অবশ্যই, আমরা রাস্তা ছেড়ে দিতে পারিনা। রাস্তাই আমাদের ক্ষমতার উৎস। সাংবাদিক সুসি ডে যেমনটি বলেন, ‘বিপ্লব কোয়ারেন্টাইন্ড হবে না!’

  • বন্দনা শিবা ।। একটি ভাইরাস, মানবিকতা আর এই পৃথিবী

    বন্দনা শিবা ।। একটি ভাইরাস, মানবিকতা আর এই পৃথিবী

    • অনুবাদ: সুস্মিতা চক্রবর্তী
    বন্দনা শিবা

    একটি ছোট্ট ভাইরাস সারা পৃথিবীকে লকডাউন করে দিয়েছে। এর কারণে বিশ অর্থনীতি থমকে গেছে। এটা কেড়ে নিয়েছে সহস্র মানুষের জীবন আর লক্ষ মানুষের জীবিকা।

    করোনাভাইরাস মানব প্রজাতি হিসেবে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আমাদেরকে, আমাদের আগ্রাসী অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দৃষ্টান্তগুলি, আর এই পৃথিবী সম্পর্কে কি বলছে?

    আর্ট ওয়ার্ক: কোয়ারেন্টাইন ফিলিং
    শিল্পী: মোহাম্মদ আফিফা
    সূত্র কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রথমত, আমাদের লকডাউন মুহূর্তগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এই পৃথিবী সকল প্রজাতির জন্য আর আমরা যখন সবকিছু থামিয়ে দিয়ে রাস্তাগুলোকে ‘গাড়িশূন্য’ ফাঁকা করে দিলাম, বায়ুদূষণ কমে গেল। হাতিগুলো দেরাদুন শহরের উপকন্ঠে হরিদ্বারের হারকি পৌরির গঙ্গায় এসে স্নান করতে লাগল। লা কর্বিউসারের (La Corbusier’s) চন্ডীগড়ে চিতাবাঘ এসে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ালো।

    দ্বিতীয় শিক্ষাটি হলো যে, এই মহামারীটি কোনো ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ নয় ঠিক যেমন জলবায়ুর চরমভাবাপন্নতা কোনো ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই উদ্ভূত মহামারী রোগগুলো— ‘মনুষ্যজাত’ (Anthropogenic) যেগুলো মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণেই ঘটেছে।

    বিজ্ঞান আমাদেরকে জানাচ্ছে যে, যখনই আমরা বন-জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র দখল নিতে শুরু করি, বিভিন্ন প্রজাতির বাসস্থান ধ্বংস করি এবং লাভের জন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করি— এসবের ফলে আমরা নতুন নতুন রোগের ক্ষেত্রগুলো তৈরি করি। গত পঞ্চাশ বছরে তিনশত নতুন রোগজীবাণু উদ্ভূত হয়েছে। এটা ভালোভাবেই নথিভুক্ত যে, এইচআইভি, ইবোলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মার্স ও সার্সসহ মানুষের বিভিন্ন রোগের প্রায় সত্তর শতাংশের বিস্তার ঘটেছে তখনই যখন অরণ্যের বাস্তুতন্ত্র দখল করা হয়েছে আর এর ফলে ভাইরাসগুলো বিভিন্ন প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। যখন বৃহৎ লাভের জন্য প্রাণীদের উৎপাদন বাড়াতে তাদেরকে কারখানায়-খামারে আটকে রাখা হয়েছে সোয়াইন ফ্লু এবং বার্ড ফ্লু-এর মতো নতুন রোগগুলো তখনই ছড়িয়ে পড়েছে।

    বর্তমান মহামারী এবং ভবিষ্যতের আরো মহামারীর মূলে প্রোথিত মানুষের লোভ, সেই সাথে অন্য প্রজাতির প্রাণীর অধিকারের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না থাকা এমনকি স্ব-প্রজাতির প্রতিও মানুষের কোনো শ্রদ্ধাবোধ না থাকা। অপরিমেয় সম্পদের মোহভিত্তিক একটা বিশ্বঅর্থনীতি যার ফলশ্রুতিতে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর সম্পদগুলোর প্রতি মানুষের সীমাহীন ক্ষুধা যার পরিপ্রেক্ষিতে সীমাহীনভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে আমাদের এই গ্রহভিত্তিক, বাস্তুতন্ত্রনির্ভর এবং প্রজাতিগত মূল্যবোধের সীমানাগুলো।

    আর্টওয়ার্ক: ব্যাট বর্ন
    শিল্পী: অলাফ হাজেক
    সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

    তৃতীয় শিক্ষাটি হলো, এই ভাইরাসটি আমাদের উপলব্ধি করাচ্ছে এভাবে যে, আমাদের এই স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সঙ্কট প্রজাতি ধ্বংস এবং অবলুপ্ত হওয়ার মতো সঙ্কটের সাথে সংশ্লিষ্ট। এটি জলবায়ু সঙ্কটের সাথে সংশ্লিষ্ট। যখন আমরা কীটনাশক ও আগাছানাশক বিষ ঢেলে পোকামাকড় এবং আগাছা ধ্বংস করি তখন কোনো প্রজাতি অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতো সঙ্কট অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যখন আমরা জীবাশ্ম কার্বন পোড়াই যা এই পৃথিবী ছয়শত মিলিয়ন বছর ধরে জীবাশ্মে পরিণত করেছে, তখন আমরা এই গ্রহবাসী হিসেবে গ্রহের সীমা লঙ্ঘন করি। এর পরিণতি হলো জলবায়ুর পরিবর্তন।

    বিজ্ঞানভিত্তিক অনুমানগুলো এই আভাস দেয় যে, আমরা যদি পৃথিবী এবং তার প্রজাতিগুলোর বিরুদ্ধে এই মানবসৃষ্ট যুদ্ধ না থামাই তবে আগামী একশ বছরের মধ্যে আমরা মানুষের জীবনধারণ ও টিকে থাকার উপযোগী এই একমাত্র পরিবেশটি ধ্বংস করে ফেলবো। আমাদের প্রজাতি অবলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে আরও দুইশত রকমের অন্যান্য প্রজাতিও লুপ্ত হয়ে যাবে যারা আজও এই হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অবলুপ্ততার হুমকির সম্মুখীন এক লক্ষ প্রজাতির সাথে আরো একটি প্রজাতি হিসেবে যুক্ত হবো আমরা— শুধুমাত্র মানুষের লোভ, ঔদ্ধত্য আর দায়িত্বহীনতার কারণে।

    আমাদের এই সময়ের সকল জীবন বিপন্নতার সঙ্কটের মূলে রয়েছে মানুষের যান্ত্রিকতানির্ভর, যুদ্ধবাজ, এবং মানবস্বার্থ-কেন্দ্রিক বিশ্বভাবনা যা প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন— যেখানে মানুষ পৃথিবীর প্রভুত্ব দাবি করে, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে আর অন্যান্য প্রজাতিদেরকে লাভের জন্য বস্তুর মত নিয়ন্ত্রণ করে। এই মনোভাব অবশ্য অর্থনৈতিক মডেলের মধ্যেও নিবদ্ধ যেখানে বাস্তুতান্ত্রিক এবং নৈতিক সীমানাবোধকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হয়। কর্পোরেট মুনাফার প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে এই সব প্রতিবন্ধকতা অবশ্যই দূর করার মতো বিষয়। মা পৃথিবীর অধিকার, অন্যান্য প্রজাতিসমূহের অধিকার, মানুষের অধিকার, এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের অধিকারের জন্য এই মডেলে কোনো জায়গাই নেই ।

     

    আর্টওয়ার্ক: কমবাটিং দ্য আর্থ
    শিল্পী: মেটিওরাইট লান্ডালোউ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং লকডাউন পরবর্তী ক্ষতি পুষিয়ে নেবার পর্যায়ে, এই পৃথিবী, তার জলবায়ু ব্যবস্থাপনাগুলো, অধিকারসমূহ এবং বিচিত্র প্রজাতিসমূহের বাস্তুতান্ত্রিক জায়গা, আদিবাসী মানুষ, নারী, কৃষক ও শ্রমিকদের রক্ষা করতে পারাটা আমাদের শেখা জরুরি।

    আমাদেরকে এই লোভের অর্থনীতি এবং সীমাহীন উন্নয়নের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যা আমাদেরকে এক ধরনের অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।। আমাদের এই সত্যে জেগে ওঠা জরুরি যে, আমরা ‘পৃথিবী পরিবার-এর সদস্য’ এবং প্রকৃত অর্থনীতি হলো ‘পরিচর্যার অর্থনীতি’— এই পৃথিবী এবং আমাদের পরস্পরের পরিচর্যার জন্য।

    আগামীতে মহামারী, দুর্ভিক্ষ এবং একটি নতুন মৃত্যুর সম্ভাবনা, মানুষ মানুষকে ফেলে রেখে যাওয়া এসব এড়াতে চাইলে আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্বায়িত, শিল্পোন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, এগুলোই জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, বিভিন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করছে এবং জীবননাশী রোগব্যাধি ছড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয়করণ বৈচিত্রপূর্ণ প্রজাতি, বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি আর বৈচিত্রপূর্ণ স্থানীয় জীবনযাত্রা-অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য স্থান ছেড়ে দেয়।

    আমাদেরকে সচেতনভাবেই বাস্তুতান্ত্রিক পদচিহ্ন কমিয়ে ফেলতে হবে যেন আমরা অন্য প্রজাতি, সমগ্র মানবজাতি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সম্পদের ন্যায়সঙ্গত অংশ এবং বাস্তুসংস্থানের জায়গা বরাদ্দ রাখতে পারি।

    আর্টওয়ার্ক: মনসান্ত
    শিল্পী: মার্টিন ওল্টে
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    স্বাস্থ্যক্ষেত্রের এই জরুরি অবস্থা এবং লকডাউন আমাদের দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আমরা বিশ্বায়ন রোধ করতে পারি। বিশ্বায়ন রুদ্ধ করার এই অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে আত্মীকরণ করা হোক, এবং উৎপাদন স্থানীয়করণের মাধ্যমে গান্ধীজি’র স্বদেশী দর্শনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে পণ্য বানানো হোক।

    গত তিন দশক ধরে ‘নবধান্য’-এর অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, স্থানীয়, জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জৈবিক খাদ্যব্যবস্থা সকলের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার যোগান দিতে পারে এবং একই সাথে এটি মাটি, পানি এবং জীববৈচিত্র্যকে পুনর্জীবিত করে।

    আমাদের অরণ্যে, খামারগুলোতে, খাদ্যে, আমাদের অন্ত্রনালীতে জীববৈচিত্র্যের যে ঐশ্বর্য তা এই গ্রহকে, তার বিচিত্র প্রজাতিগুলোকে সেই সাথে মানবপ্রজাতিকে রোগ নয় বরং সুস্বাস্থ্যের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত রাখে ।

    একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস আমাদেরকে প্রকৃতির সাথে সমন্বয়ের ভিত্তিতে গ্রহনিবিষ্ট, বাস্তুতান্ত্রিক সভ্যতার মতো একটা বড় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করতে পারে ।
    অথবা, আমরা প্রকৃতির উপর আধিপত্য করার এই বিভ্রম নিয়েই বেঁচে থাকতে পারি এবং দ্রুত পরবর্তী মহামারীর গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারি এবং চূড়ান্তভাবে প্রজাতির বিলুপ্তির দিকে।

    এই পৃথিবী ঠিকই টিকে থাকবে তা আমাদের নিয়েই হোক অথবা না নিয়ে।

    রাজশাহী: ৩ মে, ২০২০।

    সূত্র: ডেক্কান হেরাল্ড থেকে লেখাটি নেয়া হয়েছে। ২০২০-এর এপ্রিলের ৫ তারিখে প্রকাশিত।

     

  • জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

    জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

    • অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

    সম্পাদকীয় নোট: আমেরিকায় সম্প্রতি চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভকালে বিভিন্ন বড়ো বড়ো কর্পোরেট শো-রুম, দোকানপাট ভাঙ্গচুর হয়েছে, অনেক স্থানে বিক্ষোভকারীরা জিনিসপত্রও নিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলও এই সব দৃশ্য দেখিয়ে বারবার ‘লুটিং’ ‘লুটারস’ ইত্যাকার শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রচারণার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্ণবাদ বিরোধী এই আন্দোলন এবং এই আন্দোলনকারীদের নৈতিকভাবে খাটো করা। এই ধরনের ‘লুট’ বা ‘সহিংস’ কর্মকাণ্ড কতটা দিনের পর দিন থেকে নিপীড়ত ও বিক্ষুব্ধ  মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ, আর কতটা ‘লুট’ তা নিয়ে জসুয়া ফ্রাঙ্ক জুনের ১ তারিখ কাউন্টারপাঞ্চে নিবন্ধ লিখেছেন। এতে খুব সংক্ষেপে এই আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচিত হয়েছে। উক্ত নিবন্ধের ভাবানুবাদ হাজির করেছেন ইফতেখার রুমি।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েডের ম্যুরাল
    শিল্পী: জনাথন ফ্রো পেরি
    সূত্র: কিটস্যাপ সান

    মূল প্রবন্ধ

    লস এঞ্জেলসের এর অন্যতম নামীদামী শপিং জেলা হিসেবে পরিচিত মেলরুজ এভেনিউ বরাবর যে দৃশ্য  দেখা যাচ্ছে তাকে এক রকমের প্রতিশোধের দৃশ্য বলা যায়। গ্লাসের টুকরা বিক্ষিপ্ত আকারে ফুটপাতে পড়ে আছে, দোকানপাটগুলোর সম্মুখভাগ গ্রাফিতিতে ভরা। ভোরের বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ এখনো তাজা রয়েছে। মেয়র এরিক গ্রাসেত্তি কর্তৃক শহরময় জরুরী অবস্থা ও  কারফিউ ঘোষণার কিছু আগে শনিবার রাতে যে লুটপাট ঘটে গেল তার কেন্দ্রস্থল ছিল এই জায়গাটা– মেলরুজ এভেনিউ। গ্রাসেত্তি এরপর গভর্নর নিওসোমকে ফোন করেছিলেন ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ডেকে আনার জন্য। এর ফলে ১৯৯২ সালের পর প্রথম বারের মত  লস এঙ্গেলেসের রাস্তায় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা চক্কর দিল। শেষ বার ন্যাশনাল গার্ড রাস্তায়ে নেমেছিল যখন ’৯২ সালে রডণী কিং এর রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। ছুটির দিনের গনরোষ আর যন্ত্রণার প্রদর্শন শেষে যা অবশিষ্ট থাকল তা রক্ষা করতে রোববার সামরিক যান আর সেনা রাস্তায় নামল।

    জনভীতি উষ্কিয়ে দিতেই কিনা ফক্স নিউজ শনিবারের প্রতিবাদী সমাবেশ পরবর্তী ধ্বংসকরনকে নাম দিল ‘সহিংস দাঙ্গা’। আঞ্চলিক পত্রিকা এল এ টাইমস প্রথমে দেখাতে চাইলো ‘আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভাজন ছিল’, এবং এরপরে লুটপাটকারিদেরকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে উঠেপড়ে লাগলো। এরই মধ্যে রোববার সকালে ট্রাম্প ঘোষণা দিল যে, তার সরকার এন্টিফাকে সন্ত্রাসী সংঘটন হিসেবে আখ্যায়িত করতে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে যে আন্দোলনকারীরা নিজেদের সম্মিলিত ক্রোধকে কণ্ঠ দিবেন বলে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, তারা ছিলেন অনেকটা লস এঞ্জেলসের চরিত্রের মতনই: নানা উদ্দেশ্যের একটা বিচিত্র ভিড়।

    সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর যারা রয়ে গিয়েছিল তাদেরই একটা অংশকে এখন লুটপাটকারি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। রোববার সন্ধ্যানাগাদ সান্তামনিকা ও লঙ বিচ জুড়ে যে হতাশা স্পষ্টত অনুভব করা যাচ্ছিল তা আমলে না নিয়েই তাদেরকে খুব সাবলিলভাবে ‘দুর্বৃত্ত’ ও ‘চোর’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটা আমলে না নেয়ার মাধ্যমে তারা কেবল আমেরিকার পদ্ধতিগত বর্ণবাদকে উপেক্ষাই করছে না, বরঞ্চ আমাদের শোচনীয় সামাজিক স্তরবিন্যাসকেও দেখেও না দেখার ভান করছে। গেল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লস এঞ্জেলসের রাস্তায় ও দেশের অন্যান্য জায়গায়, যে বিক্ষোভ-জাগরণ দেখা যাচ্ছে তা যতটুকু জাতিগত বর্ণবাদ ও পুলিশি বর্বরতা নিয়ে ততটুকুই শ্রেণিগত।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য বাঙ্কার হেড
    শিল্পী: গ্রেগরি দাসি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই ঘটনার ফলাফলরুপে ট্রাম্প তার নিজস্ব দাম্ভিক কায়দায় যে আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন,  তিনি ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ হতে চান, তার সে মনোবাসনা পূর্ণ হল। অফিসের দায়িত্ব গ্রহন করার পর থেকে ট্রাম্প যে অগ্নিশিখাকে বাতাস দিয়ে যাচ্ছিলেন তা শেযপর্যন্ত আমারিকায় বিস্ফোরিত হলো এবং সে আগুন এখন তার দোরগোড়ায় জ্বলছে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা আসলে পুরাদস্তুর একটা শ্রেণি-সংগ্রাম। কোনো সন্দেহ নেই যে অনেকগুলো ঘটনার ঝড় বয়ে চলছে; কভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বৃহৎ আকারের বেকারত্ব (সংখ্যায়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন), ভাইরাস জনিত মৃত্যু বৈষম্য, পুলিশ বাহিনী কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের ধারাবাহিক নিপীড়ন, এবং এসবের পাশাপাশি এমন এক কর্পোরেট-সরকার যারা ঝুঁকির মধ্যে থাকা নাগরিকদেরকে রক্ষা করতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

    দোকান লুটপাট স্বভাবতই একটি শ্রেণি প্রসঙ্গ, তা আপনার পছন্দ হোক বা না হোক (ব্যতিক্রম কিছু তো সর্বদাই থাকে)। মূলত আফ্রিকান দাসত্ববন্ধন ও স্থানীয়দের জমি ছিনতাই করার সময় থেকেই লুন্টন করা আমেরিকার দীর্ঘকালস্থায়ী একটা ঐতিহ্য। এবং এই জমানায় এসে, ধনী লোকেরা শপিংমলগুলো লুট করে না, বরং তারা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কয়েলাখনি থেকে শুরু করে জেফ বাজেসের আমাজন গুদাম পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রম লুট করতে খুবই পারদর্শী। এইসময়ে গরীবরা তাদের নামমাত্র ক্ষমতাকে যেভবে জাহির করছে, ধ্বংসাত্মক ও সহিংস আকারে হলেও, তা ক্রমাগত ক্ষমতাহীন অবস্থায় থাকার বিলকুল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাদের জন্য লুটপাট  হচ্ছে সাহায্যের জন্য চিৎকার, হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

    আমরা সবাই বীভৎস ভিডিওটা দেখেছি। জর্জ ফ্লোয়েডকে মিনেপলিস পুলিশ অফিসার ডেরেক চৌভিন প্রকাশ্য দিবালোকে যখন হত্যা করছিল, শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে ফ্লয়েড তখন মায়ের সাহায্যের জন্য কাঁদছিল। আমরা সবাই দেখেছি কিভাবে শ্বেতাঙ্গ নির্মম প্রহরীরা, যাদের মধ্যে একজন সাবেক গোয়েন্দা, পথচারী আহমদ আরবেরিকে হত্যার পূর্বে পিকআপ ট্রাকে তুলে নিয়েছিল। যে বিস্ময়কর হারে কালো মানুষদের পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে সে দীর্ঘ তালিকার সাথে আমরা সবাই পরিচিত – শ্বেতাঙ্গের তুলনায়ে ২.৫ গুন বেশি। আমরা এও জানি যে কোভিড সংকটের আগেও পুরো কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যার ২০% মানুষ অতি-দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, সংখ্যায়ে প্রায় ৯ মিলিয়নের মতো। বর্তমানে দেশজুড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ,  এবং এর ফলশ্রুতিতে সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েড ডেথ
    শিল্পী: এমাদ হাজ্জাজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অবশ্যই, আমাদের দেশের গরীব মানুষের মধ্যে ফেনাইয়া উঠা অসন্তোষ এবং সরকার সমর্থিত গুণ্ডাদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের উপর যে বর্বরতা উভয়ই ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ব থেকেই ছিল। কর্নেল ওয়েস্ট এক প্রোগ্রামে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

    ‘আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি নিঊলিবারেল উইং পেয়েছেন যা এখন চালকের আসনে রয়েছে …তারা সত্যিই জানে না কি করতে হবে কারণ তারা যা আসলে করতে চায় তা হল আরও বেশি কালো মুখ দেখাতে চায়। তবে প্রায়শই এই কালো মুখগুলো বৈধতা হারাচ্ছে, কারণ ‘ব্ল্যাক লাইভস মেটার’ আন্দোলন একজন কালো রাষ্ট্রপতি, একজন কালো অ্যাটের্নি জেনারেল এবং একজন কালো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনেই গড়ে উঠেছিল। এবং তারা আন্দোলনের দাবি মেটাতে পারেননি।’

    আপনি কি মনে করেন গত সপ্তাহান্ত ভয়ংকর ছিল? তাহলে অপেক্ষা করুন। যদি ডেরেক চৌভিনকে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয় তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপনার কাছে গৌণ বলে মনে হবে। নিশ্চিতভাবেই, ছোটখাটো ব্যাবসাপাতি লুটের মতো কিছু সংহতিনাশক ঘটনা হিতে বিপরীত ফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে; এই কারণেই প্রকৃত অপরাধী, পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের সহায়ক গোষ্ঠীর প্রতি এই ক্রোধকে সংঘটিত ও পরিচালনা করার একটা বাধ্যবাধকতা বামপন্থীদের রয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: আই কান্ট ব্রেথ
    শিল্পী: লাউলি শেনবানজো
    সূত্র: সিএনএন

    আমেরিকাতে অর্থনৈতিক ও জাতিগত নিপীড়ন অবশেষে এক উত্তেজনাকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পদ্ধতিগত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি পদ্ধতিগত পুনর্নির্মাণের রূপ নিবে। জানালা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত কিছু কিছু ক্রিয়াকলাপ হতাশা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। তবুও, এটি হচ্ছে অন্তর্নিহিত জাতিগত এবং শ্রেণিগত দিক যা এই বিদ্রোহকে আরও জাগিয়ে তুলবে। কোনো সিটি মেয়রের কাছ থেকে চাপিয়ে দেয়া কার্ফিউ এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত বিদ্রোহ বা জাগরণের রাশ লম্বা সময়ের জন্য টেনে ধরতে সক্ষম হবে না।

  • অরুন্ধতী রায় ।। লকডাউনের পর আমাদের হিসেব কষা দরকার

    অরুন্ধতী রায় ।। লকডাউনের পর আমাদের হিসেব কষা দরকার

    • অনুবাদ: উম্মে সালমা

    মহামারীর নিয়ে ভারতের কাণ্ডকারখানা একটি সামাজিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এর জন্য জবাবদিহি করবে কে?

    লক-ডাউন থেকে বের হবার পর আমি কোন দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টিপাত করছি? সবচেয়ে জরুরি হল, খুব যত্নসহকারে জবাবদিহিতার খতিয়ান রচনা।

    অরুন্ধতী রায়

    ২৪ শে মার্চ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্বের স্বল্পতম সময়ের মধ্যে, মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে ভারতের ১৩৮ কোটি মানুষের উপর সবচেয়ে নিপীড়নমূলক লকডাউনের ঘোষণা দেন। ৫৫ দিন লকডাউনের পরেও, এমনকি অবিশ্বাসযোগ্য  সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কোভিড-১৯ পজিটিভ আক্রান্তের গ্রাফ ৫৪৫ থেকে বেড়ে এক লাখেরও উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। গণমাধ্যমগুলো প্রধানমন্ত্রীর কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, লকডাউন যে উপায়ে প্রয়োগ করা হয়েছিল, সেই পন্থার কারণেই এটি ব্যর্থ হয়েছে।

    সৌভাগ্যক্রমে, বহুসংখ্যক রোগীর মধ্যে আক্রান্ত হবার কোনো লক্ষণ নেই। আমেরিকা-ইউরোপের তুলনায় নিবিড় যত্নের প্রয়োজন এমন রোগীর সংখ্যাও ভারতে খুবই কম। মহামারিকে ঘিরে সমস্ত সামরিক বাগাড়ম্বর, ভীতি প্রদর্শন, ঘৃণা ছড়ানো এবং কালিমালেপনের পরে আমারা জানতে পারছি, যেহেতু লকডাউন শিথিল করা হয়েছে, আমাদেরকে ভাইরাস সাথে নিয়েই বাঁচতে শিখতে হবে।

    ভারতে আমরা অসুস্থতা নিয়ে বাঁচতে বেশ অভ্যস্ত। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৩০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে। কিন্ত একই সময়ে (জানুয়ারির ৩০ তারিখ থেকে শুরু করে) হাতে থাকা তথ্য উপাত্ত পরিমাপ করলে দেখা যাবে, দেড় লক্ষ মানুষ, যাদের অধিকাংশই দরিদ্র, মারা যেতো শ্বাসযন্ত্রে অন্যান্য সংক্রমণজনিত রোগ বা যক্ষ্মায়। শরীর ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে পড়া আবার অনেকেই মৃত্যুর কারণ।

    এই অন্তঃসারশুন্য  লকডাউনের মাজেজা হল, গেল ৫৯ দিনে (কাশ্মীরের জন্য এই লকডাউন ১২০ দিনের এবং ১০ মাসের ইন্টারনেট অবরোধ) ভারত অতিক্রম করেছে দুঃস্বপ্নের বিভীষকা যার থেকে আমরা হয়তো আর কখনোই পরিত্রাণ পাব না। লকডাউনের আগেই বেকারত্ব ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। এবার লকডাউনে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    লাখ লাখ শ্রমিক শহরেই আটকা পড়ে, যাদের কোন খাদ্য, আশ্রয়, অর্থ বা যাতায়তের উপায় ছিল না। শহর থেকে গ্রামের দিকে দিশাহারা এই মানুষগুলোর শতশত মাইলের যাত্রা, যা শুরু হয়েছিল ২৫ মার্চ, এখন এসে পরিণত হয়েছে মহাপ্লাবনে। একদা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এই মানুষগুলো এখন মর্যাদাহীন। ছিনতাই হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন। পায়ে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে অথবা অবৈধভাবে বেসরকারি ট্রাকে মালপত্রের সঙ্গে গাদাগাদি করে শতশত মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে তারা। সঙ্গে করে ভাইরাস বহন করেছে এবং দাবানলের মতোই তা ছড়িয়ে দিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামে। এই বেপরোয়া যাত্রায় অনেকেই মারা গেছেন ক্ষুৎপিপাসায়। কেউবা ক্লান্তি আর দুর্ঘটনায়।

    আর্টওয়ার্ক: মায়াগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স
    শিল্পী: লাবনী জাঙ্গি
    সূত্র: পারী

    মহাসড়ক দিয়ে যাবার সময় পুলিশি বর্বরতা থেকে বাঁচতে তারা রেলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করেন। মালবাহী ট্রেন দূর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হবার পরে পুলিশ এই পথগুলিতেও টহল দিতে শুরু করে।  আমরা দেখতে পাচ্ছি, হাতে নিজেদের সহায়-সম্বল আর ছোট বাচ্চাদের নিয়ে মানুষ নদী-ছড়া পার হচ্ছে। তারা বাড়ি যাচ্ছে, ক্ষুধা এবং বেকারত্বকে সঙ্গী করে।

    আমরা মানুষকে খাবারের জন্য পদদলিত হতে দেখছি। হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছে বাসস্টপ আর ট্রেন স্টেশনে যেখানে, সামাজিক দূরত্ব একটি নির্মম রসিকতা। অভিবাসন বিপর্যয় শুরু হবার কয়েক সপ্তাহ পর সরকার যে অল্প কটা বাস-ট্রেন চালু করেছে তাতে চেপে বসতে চায় তারা। আপাতত, আমাদের কাছে ভয়াবহতার মাত্রার মোটামুটি ধারণা রয়েছে। এর গভীরতা এবং ব্যাপ্তি সম্পর্কে আমরা যৎসামান্যই জানি।

    জাতির উদ্দেশ্যে তার বিভিন্ন ভাষণে মোদী কেবল একবার এই অসহায় যাত্রার কথা উল্লেখ করেছেন। অথচ তীর্যকভাবে একে তপস্যা ও ত্যাগ– আত্মসংযম ও উৎসর্গ হিসেবে প্রতিপণ্ন করে হিন্দুত্ববাদী ধ্যানধারণার লেবাসে হাজির করেছেন।

    এরই মধ্যে, বিপুলভাবে প্রচারিত ‘অপারেশন বন্দে ভারত’ এর মাধ্যমে বিদেশে আটকা পড়া ভারতীয়দের দেশে ফেরত আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে কী কী করা হচ্ছে সে বিষয়ে সামাজিক দূরত্বে অবস্থানকারী সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীকে আশ্বস্ত করতে টিভি রিপোর্টে এয়ারপোর্ট এবং প্লেনের স্যানিটাইটেজন প্রটোকলগুলো বিশদভাবে প্রচার করা হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা
    শিল্পী: ইন্দ্রজিৎ শিং
    সূত্র: গ্যালিরিস্ট

    কোভিড-১৯ এর এই যুগে, একটি শ্রেণীর প্রতি এমন মনোযোগ এবং অন্য শ্রেণীর প্রতি প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা এই উপলব্ধিই দেয় যে, ভবিষ্যতে ভারত নিজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী এবং শ্রমজীবী মানুষকে পারস্পারিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেবে এবং কস্মিনকালেও এরা শারীরিকভাবে একে অপরের মুখোমুখি হবে না।

    আমাদের একটি নতুন মুসলিম বিরোধী নাগরিকত্ব আইন রয়েছে এবং নাগরিকত্ব নিবন্ধন বলবৎ রয়েছে। যারা এর প্রতিবাদ করেছিল, বিশেষ করে মুসলিম তরুণদের অ-জামিনযোগ্য কঠোর আইনে গ্রেফতার করা হচ্ছে। মুসলিম ঘেটো এবং বিশাল বন্দীশালা এরই মধ্যে পরিণত হয়েছে ভারতের বাস্তবতায়। এখন আমরা শ্রেণী বিদ্বেষকে স্বাগত জানাতে পারি। এটা অস্পৃশ্যতার সেই যুগ, যেখানে একটি শ্রেণী অন্য শ্রেণীর মানুষের শরীরকে জৈব-বিপর্যয় হিসেবে দেখে।

    এই জৈব-ঝুঁকিপূর্ণ শরীরগুলোকেই শ্রম দিতে হবে আর অবশ্যই সেটা এই মহামারি পরিস্থিতিতে এবং বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের আওতায় থাকা সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই। আর পারস্পারিক সম্পর্কিত এই ব্যবস্থাটি— সেবাপ্রদানকারী শ্রেণীসমূহকে প্রতিস্থাপিত করা হবে অবিপজ্জনক যন্ত্র দ্বারা । কিন্তু কেবল ভারত নয়, বিশ্বব্যাপী এই উদ্বৃত্ত শ্রমজীবী— সিংহভাগ জনসংখ্যার কী হবে?  এই চরম পরিণামের জন্য কে দায়ী? আমার ধারণা, একটি ভাইরাস নয়, নিশ্চয়।

    আমাদের কোভিড ট্রায়াল দরকার। একটি আন্তর্জাতিক আদালতে। একবারে ন্যূনতম পর্যায়ে হলেও দরকার।  এটা আমার লক-ডাউন পরবর্তী বাস্তব-স্বপ্ন।

     

  • ইসাবেল ফ্রে।। হার্ড ইমিউনিটি: মহামারির নয়া উদারবাদ

    ইসাবেল ফ্রে।। হার্ড ইমিউনিটি: মহামারির নয়া উদারবাদ

    অনুবাদ: ইকরামুল হক

    ভূমিকা

    করোনা মোকাবেলায় লকডাউন ও হার্ড ইমিউনিটি–দুটি পন্থা নিয়ে শুরু থেকেই চলছে তর্ক-বিতর্ক। লকডাউন-কোয়ারেন্টাইন-সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিও লিবারাল শাসনে কি ধরনের বাস্তাবতা নির্মাণ করে; কেমন করে শাসন-প্রণালীর কৃৎকৌশল হিসেবে আত্মীকৃত হয় এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করে তোলে তা এখন বেশ পষ্ট।

    অন্যদিকে মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় হার্ড ইমিউনিটি মুনাফামুখিন প্রকল্পের নীতির সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ।

    বাংলাদেশে আমরা দুই ধাপে এই দুটো পন্থাকেই নীতি হিসেবে প্রয়োগ করতে দেখেছি আমরা। সরকারি হিসেবে যখন অর্ধলাখ মানুষ করোনা আক্রান্ত এবং প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, এমন সময়ে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, করোনার সঙ্গে বসাবাস করতে হবে। উন্নয়নের বাগাড়ম্বড়, সমাজের নিম্নকোটির উপর ভয়ঙ্কর শোষণ এবং এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণবিরোধী রূপ উন্মোচিত হয়েছে।

    হার্ড ইমিউনিটি এবং নিও লিবারালিজমের সম্পর্ক পাঠের ইশারা এই প্রবন্ধ।  প্রবন্ধটি গেল মার্চে The Quarantimes -এ প্রকাশিত হয়। হার্ড ইমিউনিটি কেন এবং কিভাবে মানুষ খেকো মুনাফার স্বার্থে গৃহীত হয়, তা-ই আলোচিত হয়েছে এই প্রবন্ধে।

    এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর নেদারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করে। পাঠের সময় এটা খেয়াল রাখা দরকার।

    আর্টওয়ার্ক: ডেথ বাই ভাইরাস
    শিল্পী: গ্রে ওয়াট
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মূল প্রবন্ধ

    কোভিড-১৯ মোকাবেলায় যখন ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ লকডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইউরোপের কিছু দেশ ‘হার্ড ইমুনিটি’ নামে  ভিন্ন এক কৌশলের পথে হাঁটছিল। জনগণের মাঝে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং যথাসাধ্য টেস্ট করার ব্যবস্থা না রেখে তাদের লক্ষ্য ছিল অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মাঝে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়া, যাতে করে জনগণের একটা বড় অংশের এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সর্বপ্রথম এই হার্ড ইমুনিটির প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যিনি বেশ কিছুদিন আগ পর্যন্তও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন না । কিন্তু সেই যুক্তরাজ্য যখন আনুষ্ঠানিকভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা ঘোষণা করে, তখনও নেদারল্যান্ড এবং সুইডেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমালোচনাকে গ্রাহ্য না করে হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটছিল।

    হার্ড ইমুনিটির পক্ষে তাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু মহামারির লাগাম পুরোপুরি টেনে ধরা যাবে না এবং যেকোন মুহূর্তে আবার সংক্রমণ ঘটাতে পারে, সেহেতু দীর্ঘমেয়াদি হার্ড ইমিউনিটি হচ্ছে এই ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরার একমাত্র উপায়।

    পুরো দেশকে লকডাউন রাখার পরিবর্তে তারা যেটা করেছে তা হল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে বাড়ির ভেতরে কোয়ারেন্টাইনে রেখে, কম ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আক্রান্ত হবার সুযোগ করে দেয়া । যাই হোক, এই নীতিকে অসংখ্য মহামারি এবং জীবাণু বিশেষজ্ঞ সমালোচনা করে বলেছেন যে, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অবৈজ্ঞানিক নীতি। এই নীতির কারণে অনেক মানুষের মৃত্যুও ঘটতে পারে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্টের কারণে ব্রিটিশ সরকার তার হার্ড ইমিউনিটি নীতি থেকে সড়ে আসে, সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল ব্রিটেনে যদি এই নীতি প্রয়োগ করা হয় প্রায় ২,৫০০০০ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এখন ভাইরাস যেভাবে ছড়াচ্ছে চাইলেও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের বাড়িতে আইসোলেসনে রাখা সম্ভব না। উপরন্তু এর ফলে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার উপর ভয়ানক চাপ পড়ার এবং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

    মহামারির নয়া উদারবাদ

    কেন যুক্তরাজ্যের মত একটি দেশ এরকম ঝুঁকিপূর্ণ নীতি শুরুতে নেয়ার চিন্তাভাবনা করেছিল এবং কেন কিছু কিছু দেশ এখনো এই নীতি মেনে চলছে? এর কারণটা হচ্ছে নিও লিবারেলিজম । আশির দশক থেকে, আমরা নিও লিবাররেলিজমের রাজনৈতিক প্যারাডাইমের দ্বারা শাসিত হচ্ছি, যেটা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় স্বীকৃত সামাজিক নীতিগুলোর স্থলে বেসরকারিকরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যাবস্থা চালু করেছে। এর বিশ্বাস হল যে, বাজারের অন্তর্নিহিত ন্যায়ই একটি রাজনৈতিক যুক্তি গঠন করতে পারে, যা আক্ষরিক অর্থে মুনাফার প্রশ্নটিকে জনগণের সামনে আনে। মননের উপর এর উপনিবেশিক দখল মানুষের মাথায় এই ধ্যান-ধারণা ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে যে, মানুষ তার নিজের দোষে গরিব কিংবা কর্মহীন থাকে।

    আর্টওয়ার্ক: মডার্ন টাইম
    শিল্পী: অ্যান্টোনিও রদ্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    নিও লিবারেলিজমের বিড়ম্বনা হল, এটা সমাজের গতিশীলতার একটা বিভ্রম তৈরি করার মধ্য দিয়ে সামাজিক বৈষম্যের পুনরুত্থান ঘটায়। এটি ধরে নেয়া হয় যে, মুক্ত বাজারে যে কেউ এর প্রয়োগ ঘটাতে পারে, আর এতে করে দারিদ্র হয়ে পড়লে সেটা তার নিজের দোষ।

    কিন্তু এই ধারণাটা শুধুমাত্র বানোয়াটই না, রীতিমত একটা উগ্রতা। নিও লিবারেলিজমের ফলে ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে। এটা একদিকে যেমন গরীবের উপর কাঠামোগত সহিংসতাকে উস্কে দিচ্ছে, একই সাথে তাদেরকে সেই সহিংসতার বিরুদ্ধে যেকোন প্রকার প্রতিরোধের চেষ্টাকে বাধা প্রদান করছে।

    হার্ড ইমিউনিটি হচ্ছে মহামারির নিও লিবারেলিজম। অনেকটা মুক্ত বাজার অর্থনীতির উপর শর্তহীন বিশ্বাসের মত, হার্ড ইমিউনিটি এই অনুমানের উপর ভর করে চলছে যে, একটা মহামারি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে এর উপর কোন প্রকার নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা না করা। কিন্তু নিও লিবারেলিজম মতোই, এই হার্ড ইমিউনিটি নীতির কারণে অসহায়, গরীব, বাস্তুহারা, বয়স্ক, শারীরিকভাবে অসমর্থ, উদ্বাস্তু এবং অসুস্থ মানুষদের উপর অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নেমে আসবে। এই নীতির কারণে পরিস্কারভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের বিপদে পড়বে। কারণ অসুস্থ হওয়ার সাথে আর্থ সামাজিক অবস্থার একটা সম্পর্ক রয়েছে। যদি রোগীর চাপ সামাল দিতে না পেরে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়ে তাহলে এই শ্রেণির মানুষেরা সবচেয়ে বেশি কোভিড-১৯ এর মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়বে।

    ভঙ্গুর কল্যাণ রাষ্ট্র  ব্যাবস্থা

    ইউরোপের দুইটা গুরুত্বপূর্ণ নিও লিবারেল রাষ্ট্র হল যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ড, যে দেশ দুইটি এই হার্ড ইমিউনিটির পক্ষে ছিল এবং এটা মোটেই কোন দৈবক্রম ঘটনা না। গত কয়েক দশক ধরে এই রাষ্ট্রগুলো নিওলিবারেল পলিসি বাস্তবায়ন করার পিছনে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেছে। পরিকল্পনামাফিক ভাবে তারা বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সংকোচন করেছে। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর লকডাউন পলিসির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার সাথে তাদের এই রাজনৈতিক অবস্থানের একটা সুসামঞ্জস্য আছে। যাই হোক কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সুইডেনের অবস্থান একটা ধোঁয়াশার মধ্যে আছে: সুইডেন এমন একটা রাষ্ট্র যেটা তার ভালো সামাজিক এবং কল্যাণমূলক রাষ্ট্রনীতির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। কিন্তু সুইডেনের মতো এতো চমৎকার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক রাষ্ট্র পর্যন্ত নিও লিবারেল পলিসি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের মতো, কল্যাণরাষ্ট্রগুলোও গত কয়েক দশকে তার নীতি থেকে দূরে সরে এসেছে।

    করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘কার্ভ কে শুইয়ে দেয়া’ যাতে করে গুরুতর এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চাইতে বেশি রোগী উপচে না পড়ে। কিন্তু এই তিন দেশে গুরুতর রোগীদের পরিচর্যা করার সক্ষমতা এতো কম যে, কড়া লকডাউন দিয়েও রোগীর চাপ সামাল দেয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডে জনপ্রতি বেডের সংখ্যা ইতালির চেয়ে কম এবং সংখ্যায় সেটা ইতালির অর্ধেক। সুইডেনকে মনে করা হয় ইউরোপের অন্যতম সেরা কল্যাণ রাষ্ট্র, সেখানেও বেডের সংখ্যা ইতালির অর্ধেকেরও কম।

    আর্টওয়ার্ক: থ্রি মাস্ক
    শিল্পী: হাসান ব্লেবেল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যদি এই রাষ্ট্রগুলো হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পরা ভিড় সামাল দিতে চাইত, সেক্ষেত্রে তাদের অনেক আগে থেকেই এটা নিয়ে কাজ করতে হত। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই প্রস্তুতির জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে গেছে। লকডাউন ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি করেনি, এটা একই সাথে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা নিও লিবারেল পলিসির কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশাকে উন্মোচিত করেছে। এখন হার্ড ইমিনিটি একটা ব্যর্থ সরকারের উপর দায় না চাপিয়ে স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতার উপর দায় চাপিয়ে দিয়ে সরকারের দায়মুক্তির একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যেমনটা দেখা যায় ব্যক্তির দরিদ্রতার জন্য বেশি পরিশ্রম না করাকে এবং অসুস্থ হওয়ার জন্য কোয়ারেন্টাইন বিধি না মানাকে দায়ী করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করা যাচ্ছে তার আগ পর্যন্ত প্রকৃতি , ভাগ্য কিংবা ব্যক্তির নিজের দোষ কোনটাই বিবেচ্য বিষয় না।

    হার্ড ইমিউনিটি শুধুমাত্র অপবিজ্ঞান বা অপনীতিই নয়, এটা একটা জীববৈজ্ঞানিক যুদ্ধক্ষেত্র। অনেক মানুষ শুধুমাত্র এই নীতির কারণে মার যাবে এবং সরকার এর কোন দায় নিবে না। কিন্তু মানুষ মারার এই কৌশল যে এই প্রথম চালু হয়েছে সেরকমটা না। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব যে রাজনৈতিক ভাবাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এটা তারই একটা অংশ, যে ভাবাদর্শ এসেছে কট্টর মুক্তবাজার সামাজিক ডারউইনবাদ থেকে। কারণ যে মানুষ অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখতে পারে সে অনিয়ন্ত্রিত মহামারির উপরও আস্থা রাখতে পারবে  রাখবে-এমনকি এর ফলে যদি মানুষের মৃত্যুও ঘটে।