Blog

  • জর্জ মনবিয়ট।। করোনা: আত্মতুষ্টিতে ভোগা সভ্যতাকে প্রকৃতির সতর্কবার্তা

    জর্জ মনবিয়ট।। করোনা: আত্মতুষ্টিতে ভোগা সভ্যতাকে প্রকৃতির সতর্কবার্তা

    • অনুবাদ: শুভম ঘোষ

    আমরা একটি বুদবুদের ভেতর বসবাস করে আসছি, যে বুদবুদের বুনিয়াদ মিথ্যে আশ্বাস আর সত্যকে অস্বীকার করার মধ্যে নিহিত। সম্পদশালী দেশগুলোর বাসিন্দা হিসেবে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, আমরা বস্তু জগতের সীমাকে অতিক্রম করে ফেলেছি। যে সম্পদের পাহাড় (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা শোষণের মধ্য দিয়ে পুঞ্জিভূত হয়েছে ) আমরা গড়েছি তা আমাদেরকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। মূল দৃশ্যপটকে সরিয়ে রেখে গাড়ি, বাড়ি, আভিজাত্যে মোড়ানো বিলাসবহুল জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের বুঝ দিয়েছিলাম, যে কোনো ধরনের আকস্মিকতাকে পেছনে ফেলে এসেছি। ভেবেছিলাম, আমরা সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছি, যা কিনা প্রতিটা সভ্যতাই চায়।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড- ১৯
    শিল্পী: আন্দ্র পেসিয়া
    সূত্র : কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু এখন যখন মরীচিকার ধোয়া উবে গেলো তখন আমরা নিজেদের নগ্ন ও বিধ্বংসী বাস্তবতার স্বরূপ দেখতে পেলাম; যে বাস্তবকে আমরা আজীবন অস্বীকার করে এসেছি। এই মহামারীর ঝড় বয়ে যাওয়ার পর আরেকটা বুদবুদের আশায় আমাদের বুক বাঁধতে হবে। আমরা এখানেই আমাদের ইতি টানতে পারি না। ঠিক এই মুহূর্ত থেকে আমাদের উচিত যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেয়া যা আমরা দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করে আসছি।

    পৃথিবীতে অসংখ্য রোগের বিস্তার, যেগুলোর তুলনায় করোনা ভাইরাসের উপশম অনেক সহজ। কিন্তু সবকিছুর উপরে সম্প্রতি একটা চিন্তা আমাকে বিচলিত করে তুলছে: আমরা আমাদের খাদ্যের যোগান কীভাবে দিবো? টয়লেট পেপার নিয়ে সংঘাত বেঁধে যাওয়া বেশ বিচ্ছিরি ঘটনা, আশা করি খাদ্যের অভাবে কখনো সংঘাতে জড়াতে হবে না আমাদের। কিন্তু এই সংঘাত এড়ানোর রাস্তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।

    জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের খাদ্যাভাব প্রকট করে তুলতে পারে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা এই দুর্যোগের সম্ভাবনা প্রবল করে তুলেছে । ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বন্যা, খরা, দাবানল আর পঙ্গপালের প্রকোপে কৃষিখাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এসব দুর্যোগকে আমরা ‘biblical’ বলে আখ্যা দিই: আমরা বোঝাতে চাই এই ধরনের জিনিস বহু আগে ঘটেছিল, যাদের সাথে ঘটেছিল তাদের জীবন আমরা কল্পনাই করতে পারিনা। বর্তমানে এই ঘটনাগুলোই খুব ঘনঘন আমাদের সাথে ঘটছে।

    আর্টওয়ার্ক: ডিপার্চর অব কালার
    শিল্পী:
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি কীভাবে আমাদের খাদ্যের যোগানে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, মার্ক লিনাস তার আশু বই আওয়ার ফাইনাল ওয়ার্নিং এ তা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি প্রাক শিল্প স্তরের তাপমাত্রার চেয়ে তিন থেকে চার ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার বৃদ্ধিতে ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত খুঁজে পেয়েছেন। উক্ত পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত দুর্যোগগুলোর প্রভাব খাদ্যোৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা মানুষের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে যা আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষিকাজ অসম্ভব করে তুলবে। প্রাণী বৈচিত্র্য অসহনীয় তাপমাত্রায় বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হবে। পৃথিবীর সিংহভাগ অঞ্চল জুড়ে তাপমাত্রা শস্য জাতীয় ফসলের ফলনের জন্য অনুপযোগী হয়ে উঠবে এবং অধিকাংশ আবাদী জমি ধুলোর চাদরে ঢাকা পড়বে। বৈশ্বিক কৃষিখাত ধ্বংসের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠবে; আধুনিক দুনিয়ার এমন অভিজ্ঞতা কখনোই হয়নি।

    সেচের পানির স্বল্পতা, অনুর্বর মাটি এবং পরাগবাহকের বিলুপ্তির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা জনসংখ্যা পৃথিবীকে একটি ‘স্ট্রাকচারাল ফ্যামিনে’র দিকে নিয়ে যাবে। এমনকি বর্তমানে খাদ্যের উদ্ধৃত যোগান থাকার পরও লক্ষ লক্ষ মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়ে অপুষ্টিতে ভুগছে। একটি ব্যাপার স্পষ্টত অনুমেয় যে, খাদ্যের ঘাটতি শত কোটি মানুষের অনাহারের কারণ হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে সবসময়ের মত ক্ষমতাবান শ্রেণি দারিদ্রের মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে অনৈতিকভাবে খাদ্যের মজুদ করবে। যদি সবগুলো দেশ প্যারিস চুক্তির প্রতি অনুগত থাকেও (যা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছে), তাও বৈশ্বিক তাপমাত্রা তিন থেকে চার ডিগ্রী অনায়াসে বৃদ্ধি পাবে।

    নিরাপত্তার এই বিভ্রমের কারণেই আমরা আসন্ন ভয়াবহ দুর্যোগের ব্যাপারে কোনো পূর্বানুমানই করতে পারছি না। এই অস্তিত্বের বিষয়টিকে আমরা আমাদের মনোজগতে খুব একটা জায়গা দিচ্ছি না। খাদ্যোৎপাদনের প্রতিটি সেক্টর নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবছে এবং পরিবর্তনের কোনো প্রকার তাড়না এদের নাই। আমি যখন তাদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম তখন আমি এমন ঘৃণা, ক্ষোভ ও হুমকির মুখোমুখি হলাম যা ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করার পর থেকে নিকট অতীতে দেখিনি। পবিত্র গরু আর মেষশাবক সর্বত্রই আছে কিন্তু কোথাও কেউ গবেষণাগারে খাদ্য উৎপাদনের মত বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছে না।

    এই দুর্যোগ আমাদের জন্য আসন্ন বিপদগুলোর একটি মাত্র। মানুষের শরীরে এন্টিবায়োটিকের কার্যকরিতা হারানোর ঘটনা অন্য যেকোনো নতুন ও অপরিচিত রোগের মতই ভয়ঙ্কর। পশুপাখির ফার্মে এনটিবায়োকের মত গুরুত্বপূর্ণ ঔষধের অনৈতিক এবং লাগামছাড়া ব্যবহারই এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এসব ফার্মে বেশি সংখ্যক পশু গাদাগাদি করে একসাথে রাখা হচ্ছে এবং এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগের সংক্রমণ ঠেকাতে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় এগুলো কেবল রোগ প্রতিরোধের জন্যই ব্যবহৃত হয় না, বরঞ্চ বৃদ্ধি বর্ধক (growth promoter) হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

    আর্টওয়ার্ক: স্টে এট হোম
    শিল্পী: সানাউনি ইমাদ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমেরিকার মত দেশে যেখানে ২৭ মিলিয়ন মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় নেই, সেখানে কিছু মানুষ ভেটেরিনারি এন্টিবায়োটিকগুলো দিয়ে নিজেদের চিকিৎসা করছেন। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো নতুন ধরনের মেডিসিনের সন্ধান করতে এবং যথেষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করত ব্যর্থ হচ্ছে। মানব শরীরে এন্টিবায়োটিক যদি পুরোপুরি কার্যকারিতা হারায় তবে পৃথিবীর বুকে সার্জারি অসম্ভব হয়ে পড়বে। নবজাতকের জন্ম পুনরায় মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কেমোথেরাপির ব্যবহারও বিপদজনক হয়ে উঠবে। অতি পরিচিত সংক্রামক ব্যাধিগুলো মরণব্যাধি হয়ে উঠবে। এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের মধ্যে আলোচনা হওয়া উচিত যেমনটা আমরা ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে করি, কিন্তু তা আর হয়ে উঠে না।

    এই দুটোর মতো আমাদের একাধিক সঙ্কটের গোড়া এক জায়গাতেই নিহিত। বাথ হাফ ম্যারাথন এর সংগঠকদের একটি সিদ্ধান্ত এর একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। ১৫ ই মার্চ একটি বিশাল ম্যারাথন দৌড় হওয়ার কথা ছিল, এবং এই পরিস্থিতিতে সবাই আয়োজনটি বাতিল করতে অনুরোধ করেছিলেন। সংগঠনটি তখন জানিয়েছে ‘এখন এই আয়োজন বাতিল করা অসম্ভব, ভেন্যু এবং যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারেরাও প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে।’ এর মানে দাঁড়াচ্ছে ইভেন্টটি বাতিল হলে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, সে ক্ষতির কাছে ইভেন্টটি অদূর ভবিষ্যতে যে স্বাস্থ্য-ঝুঁকি ও মৃত্যু ডেকে আনবে তা নস্যি, গুরুত্বহীন।

    বিশ্ব অলিম্পিক কমিটি আয়োজন বাতিল করতে যে পরিমাণ সময় নিয়েছে তাও চোখে পড়ার মত যদিও তারা শেষপর্যন্ত পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। জীবাশ্ম জ্বালানী শিল্প, কৃষিকাজ, ব্যাংকিং, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য খাতে ডুবে থাকা ব্যয়গুলো আমাদের প্রয়োজনীয় দ্রুত রূপান্তরগুলোকে বাঁধা দিবে। জীবনের চেয়ে টাকাই বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

    এই পরিস্থিতি দুই দিকে যেতে পারে। একটি হলো মিথ্যে আশ্বাসের বুদবুদে আরো বেশি করে ডুবে যাওয়া বা সত্যকে আরো বেশি করে অস্বীকার করা; যেমন করে আমাদের অনেকেই মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ অনায়াসেই মোকাবেলা করতে পারবো, এমনকি করোনা ভাইরাসও তেমন কোনো হুমকি না। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি বলসোনারোকেই দেখুন যিনি দাবি করেন করোনা ভাইরাস সাধারণ একটা ফ্লু ছাড়া আর কিছুই না। মিডিয়া এবং বিরোধীদলীয় রাজনীতিকসহ যারাই লকডাউনের কথা বলছেন তাদেরকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশীদার বলে আখ্যা দেয়া হচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: সেলফলেস হিরো
    শিল্পী: ডোডি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অথবা আমরা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বসবাসযোগ্য পৃথিবীর দিকে ফিরাতে পারি। আমরা আর কখনোই মিথ্যুক এবং সত্য অস্বীকারকারীদের কথা শুনবো না। তেঁতো সত্যকে আড়াল করার জন্য আমরা আর কখনো মিথ্যে আশ্বাসের বুদবুদে ডুব দিবো না। যাদের কাছে জীবনের চেয়ে অর্থ বেশি মূল্যবার তাদের হেডমগিরি আমরা আর বরদাস্ত করতে পারিনা। করোনাভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা এই বস্তুজগতে (material world) বসবাস করি।

    নোট: গার্ডিয়ান-এর মতামত পাতায় ২৫ মার্চ ২০২০ তারিখে কলামিস্ট জর্জ মনবিয়ট ‘Covid-19 is nature’s wake-up call to complacent civilisation’ শিরোনামের এই নিবন্ধ লিখেন।

  • রব ওয়ালেস।। পুঁজিবাদী কৃষি ও কোভিড-১৯: মৃত্যুমুখি সমন্বয়

    রব ওয়ালেস।। পুঁজিবাদী কৃষি ও কোভিড-১৯: মৃত্যুমুখি সমন্বয়

    অনুবাদ: অনিক সন্ধি

    নতুন করোনাভাইরাস পুরো পৃথিবীকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এই মহামারীর কাঠামোগত কারণগুলোকে ট্যাকেল না করে ইমারজেন্সি কর্মতৎপরতার উপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

    নতুন ভাইরাস, শিল্পভিত্তিক কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন, বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনাফা অর্জনের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখা করেছেন সমাজবাদী জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস।

    সম্প্রতি জার্মান সমাজবাদী ম্যাগাজিন মার্ক্স-২১ কে সাক্ষাতকার দেন তিনি। মার্ক্স ২১ এর হয়ে ইয়াক পাবস্ত সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন। রব ওয়ালেশ একজন বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী। ২০১৬ সালে তার বই মহাখামার ছড়ায় মহারোগ প্রকাশিত হয় এবং সাড়া ফেলে।

    কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি, এগ্রিব্যাবসার সৃষ্ট সংকট ও করণীয় এবং মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টেকসই সমাধানের পথ নিয়ে কথা বলেছেন ওয়ালেস।

    সাক্ষাতকারটি ৩০ মার্চ প্রকাশের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে মার্ক্স ২১ তা আগেই প্রকাশ করে।

    বিগফার্মস মেক বিগ ফ্লু /১৯১৬

    মার্ক্স ২১ : নতুন করোনাভাইরাসটি ঠিক কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ?

    এটি নির্ভর করে মহামারীর ঠিক কোন সময়ে আপনি এ প্রশ্ন করছেন। খুব আগে, পিক লেভেলের সময়ে নাকি তার পরে? আপনার অঞ্চলে গণস্বাস্থ্য প্রতিক্রিয়া কেমন? সে অঞ্চলের জনতত্ত্ব কেমন? আপনার বয়স কত? আপনার শরীরের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কি আপসকামী ? আপনার গড় স্বাস্থ্য কেমন? অথবা উত্তর দেয়া যায় না এমন কিছু প্রশ্ন, যেমন আপনার ইমিউনোজেনেটিক্স অর্থাৎ আপনার রোগ প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ার জন্য দায়ী জেনেটিক্স এই ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারবে কিনা।

    মার্ক্স ২১: তাহলে এর সম্পর্কে সব হৈচৈ কি শুধু ভয় দেখানোর কৌশল?

    না মোটেও না। উহানে মহামারি আকার ধারণ করার শুরুতে ভাইরাসে  মৃত্যুহার অথবা সি.এফ.আর ছিল ২ থেকে ৪ শতাংশ। উহানের বাইরে সি.এফ.আর যদিও কোথাও কোথাও এক শতাংশের নিচে চলে আসে তবুও আমেরিকা ও ইতালির মতো জায়গায়ও তা খুবই উঁচু। হ্যাঁ, এটা মানতেই হবে যে,এর মৃত্যুর হার– সার্স এর ১০%, ১৯১৮ এর ইনফ্লুয়েঞ্জার ২০%, বায়বীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা H5N1 এর ৬০% ও ইবোলার ৯০% এর সাথে তুলনীয় নয়। তবুও এটি অবশ্যই সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা এর মৃত্যুর হার ০.১% থেকে অনেক বেশি। তবে ক্ষতিকর দিকটি শুধু মৃত্যুর হার নয়। আমাদের যেটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সেটি হল ভেদন ক্ষমতা অথবা কমিউনিটি অ্যাটাক হার অর্থাৎ বৈশ্বিক জনসংখ্যা এই মহামারি দ্বারা ঠিক কতটুকু ভেদিত হয়েছে।

    মার্ক্স ২১: অনুগ্রহ করে আরেকটু নির্দিষ্টভাবে বলবেন…

    বৈশ্বিক যাতায়াত নেটওয়ার্ক এখন রেকর্ড কানেক্টিভিটির সমতুল্য। কোন ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন অথবা কোন অ্যান্টিভাইরাল অথবা কোন হার্ড বা পাল ইমিউনিটি ঠিক এই মুহূর্তে না থাকার কারণে ১% মৃত্যুর হারও সামনে খুবই ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। সুপ্ত অবস্থা় দুই সপ্তাহ থাকায় ও হাতে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে রোগাক্রান্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করবে যেখানে মনে হবে যেন কিছু অঞ্চল রোগমুক্ত। কিন্তু কোভিড-১৯ যদি ৪০০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে এক শতাংশ মৃত্যুর হারও বয়ে আনে তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় চার কোটি। একটা বড় সংখ্যার মধ্যে ছোট শতাংশ কিন্তু এক বিশাল সংখ্যা দাঁড় করায়।

    আর্টওয়ার্ক: ডেনজারেস এপ্রোচ
    শিল্পী: অ্যালেক্স ফ্যাল্ক চ্যাং

    মার্ক্স ২১: আপাতদৃষ্টিতে কম ক্ষতিকারক মনে হওয়া একটি ভাইরাসের জন্য এ তো খুব সাংঘাতিক এক সংখ্যা…

    অবশ্যই। আর আমরা তো মহামারীর মাত্র শুরুতে আছি। এটা বুঝা খুবই জরুরি যে অনেক নতুন রোগ কিন্তু মহামারীর মাঝখানে বদলিয়ে যায়। সংক্রমণ-ক্ষমতা বা ক্ষতিক্ষমতা অথবা উভয়েই কিন্তু বদলাতে পারে। অন্যান্য রোগ কিন্তু ক্ষতিক্ষমতায়  বৃদ্ধি পায়। ১৯১৮ এর বসন্তের ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রথম হামলায় রোগাক্রান্তের সংখ্যা মাঝারি আকারের ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় ১৯১৯ এর শীতকালীন সংক্রমণে লাখ লাখ মানুষ মারা যাওয়া শুরু করে।

    মার্ক্স ২১:  কিন্তু মহামারী নিয়ে উন্নাসিকরা বলছেন যে করোনায় আক্রান্ত মৃত রোগীর সংখ্যা সিজনাল ফ্লু এর আক্রান্ত মৃত রোগীর সংখ্যা থেকে অনেক কম। আপনার এ সম্পর্কে কী বলার আছে? 

    আসলে যদি তা হতো তাহলে আমিই প্রথমে তার উদযাপন করতাম। কিন্তু কোভিড-১৯ এর সাথে ইনফ্লুয়েঞ্জা এর তুলনা করে বিপদ কে ছোট করা আসলে একটি রেটোরিক কৌশল, যা একে ঘিরে তৈরি উদ্বেগ উৎকণ্ঠা থেকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলে।

    মার্ক্স ২১: তাহলে সিজনাল ফ্লু এর সাথে তার তুলনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন?

    দুটো ভিন্ন রোগকে তাদের এপিকার্ভ অর্থাৎ মহামারীবক্রের ভিন্ন সময়ে একে অপরের সাথে তুলনা করা যুক্তিহীন। হ্যাঁ, অবশ্যই সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতি বছরে লাখ লাখ মানুষের মাঝে ছড়ায়।​ হু এর মতে প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কোভিড-১৯ মাত্র তার এপিডোমলজিকাল যাত্রা শুরু করলো। আবার খেয়াল করুন, ইনফ্লুয়েঞ্জার মত তার সংক্রমণ বিলম্বিত করার জন্য অথবা সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য আমাদের কাছে সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে হার্ড বা পাল ইমিউনিটি অথবা ভ্যাকসিন– কিছুই নেই।

    মার্ক্স ২১: যদিও উভয়কে তুলনা করাটা ভুল তবুও এটা বলা যায় যে, দুটো রোগই আরএনএ ভাইরাস আর উভয়ই মুখ ও গলা এবং কখনো কখনো ফুসফুস অঞ্চল সংক্রমণ করে এবং উভয়েই অত্যন্ত ছোঁয়াচে।

    ওগুলো বহিঃস্থ মিল বৈকি কিছু না এবং এরকম ধারণা দুটো রোগের তুলনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ধরতে ব্যর্থ হয়। যেমন আমরা কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অনেকটা জানি। কিন্তু কোভিড-১৯ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। এদের সম্পর্কে অনেক কিছুই আমাদের অজানা। বিশেষত কোভিড-১৯ সম্পর্কে অনেক কিছু জানাই হয়তো সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত মহামারী পুরোটা ছড়িয়ে পড়ছে। একই সাথে এটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, ব্যাপারটা কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা বনাম কোভি- ১৯ নয় বরং এটা কোভিড এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা। একই সাথে একের অধিক রোগ মহামারী আকার ধারণ করা এবং কম্বো গঠন করে জনগোষ্ঠী আক্রান্ত করা কিন্তু সম্পূর্ণ অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়। আমাদের অবশ্যই এর বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে।

    মার্ক্স ২১: আপনি বহু বছর ধরে মহামারী ও তার করণীয় সম্বন্ধে গবেষণা করে আসছেন। আপনার মহাখামার ছড়ায় মহারোগ বইটিতে শিল্পভিত্তিক কৃষি, জৈবিক কৃষি এবং সংক্রামক এপিডেমোলোজি’র পারস্পারিক সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন। আপনার এই সম্বন্ধে অর্ন্তদৃষ্টি কি?

    মহামারীর সময় সবচেয়ে বিপদজনক জিনিসটা হল ব্যর্থতা– বা বলা বাহুল্য– এটি অস্বীকার করা যে প্রত্যেক নতুন কোভিড-১৯ আসলে অভিন্ন ঘটনা। ভাইরাসগুলোর ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনফামুখিতা। যদি কেউ গবেষণা করতে চান যে ইদানিং সব ভাইরাস কেন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে তাহলে তাকে অবশ্যই কৃষির শিল্প-মডেল ও পশুসম্পদের উৎপাদন সম্পর্কে গভীর ভাবে জানতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে খুব কম সংখ্যক রাষ্ট্র ও কম সংখ্যক বিজ্ঞানীই এটি করতে ইচ্ছুক।

    যখনই কোন নতুন মহামারীর খবর পাওয়া যায় তখনই আমাদের রাষ্ট্র ও মিডিয়া আর কিছুসংখ্যক মেডিকেল প্রফেশনাল মহামারীর কাঠামোগত দিকগুলোকে সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা করে একেকটি আলাদা মহামারীকে তারকা খ্যাতির বিষয়ে পরিণত করেন ৷

    আর্টওয়ার্ক: ডলার সাইন
    শিল্পী: এলিহু দুয়ায়ের
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্ক্স ২১: সব আসলে ঠিক কার দোষ?

    আমি আগে বলেছিলাম শিল্পভিত্তিক কৃষি। কিন্তু ব্যাপারটি আরো বেশি প্রসারিত৷ দুনিয়জুড়ে পুঁজি প্রবল প্রতাপে, পৃথিবীতে টিকে থাকা শেষ কয়েক টুকরো প্রাথমিক বন অর্থাৎ মৌলিক অরণ্যের ভূমি আর ছোট ছোট কৃষি জমি গ্রাস করছে। এসব বিনিয়োগ তৈরি করছে অরণ্যবিনাশ ও এমন ধরনের উন্নয়ন যার ফলে এসব রোগবালাই খুব সহজেই মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভূমি-অঞ্চলগুলো যেখানে আগে বৈচিত্র্য ও জটিল সমারোহ সক্রিয় রাখত সেখানে তা এমন ভাবে সংকোচন করা হয়েছে যে, এতে সুপ্ত বীজাণু উন্মুক্ত হয়ে পশুসম্পদ ও মানব সম্প্রদায়ের় মাঝে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। আর সহজ ভাষায় বলতে গেলে বড় বড় সব রাজধানী যেমন নিউইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংকে আমরা রোগের হটস্পট হিসেবে ধরে রাখতে পারি।

    মার্ক্স ২১: ঠিক কোন সব রোগের জন্য এ কথাগুলো বলছেন?

    আসলে কোনো রোগই বর্তমানে পুঁজিমুক্ত নয়। সবচেয়ে দূরবর্তী কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক রোগগুলো যেমন ইবোলা, জিকা, করোনাভাইরাস, পীতজ্বর ও আরো অন্যান্য বায়ুবাহিত রোগ এবং আফ্রিকান সোয়াইন ফ্লু খুবই দূরবর্তী অঞ্চল থেকে শহুরে অঞ্চলে ছড়াচ্ছে। আমাদের বৈশ্বিত ভ্রমণ নেটওয়ার্ক রোগগুলোকে এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে সপ্তাহের মধ্যেই তা কঙ্গোর কোন এক বাদুড় থেকে মায়ামির সূর্যস্নানকারীর দেহে ছড়াতে পারে।

    মার্ক্স ২১:  বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর এর মধ্যে ভূমিকা কী?

    আসলে বায়োম্যাস ও আবাদি জমির দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় যে, পৃথিবী গ্রহ মোটামুটি খামার গ্রহে পরিণত হয়ে গেছে। এগ্রিব্যবসা খাদ্যবাজারকে সম্পূর্ণভাবে কোণঠাঁসা করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থা সংগঠিত হচ্ছে বড়বড় সব কোম্পানির মদদে যার ভিত্তি কিনা শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্তৃক দুর্বল দেশগুলোর জমি ও কাঁচামাল লুণ্ঠন। এমন অবস্থায় ওইসব দেশের কোটি বছর ধরে বিবর্তিত যেসব অরণ্য-প্রতিবেশ দেয়ালের মত দুনিয়া থেকে রোগগুলোকে ঠেকিয়ে রাখতো তা আজ ধ্বংসের মুখে।

    মার্ক্স ২১:  এগ্রিব্যবসার উৎপাদন পদ্ধতি এর উপর কিরূপ প্রভাব ফেলে?

    প্রাকৃতিক প্রতিবেশকে প্রতিস্থাপনকারী পুঁজির নেতৃত্বাধীন কৃষি এমন সব পদ্ধতিতে তার কাজকর্ম চালায় যা ভাইরাসগুলোকে মারাত্মক ক্ষতিকারক ও সংক্রামক ফিনোটাইপ এ বিবর্ধন করে। বলতে গেলে আপনি কোন মারাত্মক রোগ তৈরি করতে চাইলে এর চেয়ে ভালো  সিস্টেম আশাই করতে পারবেন না।

    মার্ক্স ২১: ঠিক কিভাবে এ জিনিসগুলো হয়?

    খামারি পশুর শুধু জিনগত মনোকালচারের ফলে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা–যা সংক্রমণকে নিম্নমুখি করে তোলে– সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। বিশাল আকারের জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব এসব রোগ ছড়ানোকে ত্বরান্বিত করে আর এরকম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাও রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। আর এই ধরনের দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন পশু বংশ বৃদ্ধির ফলে ভাইরাস গুলোর ক্ষতিকারক ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ এগ্রিব্যবসা মুনাফাকে এমন ভাবে তার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে যে কোন এক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন প্রজাতির প্রাণী কে নির্বাচিতভাবে বংশবৃদ্ধি করানো তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

    আার্টওয়ার্ক: সেকেন্ড বার্ড ফ্লু
    শিল্পী: ফিরোজ কোটাল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্ক্স ২১:  কী!?

    হ্যাঁ। এই কোম্পানিগুলো আসলে মহামারী সৃষ্টিকারী বিপজ্জনক সব অপারেশনের মূল্য অন্য সবার মাঝে উন্মুক্ত করে দেয়। প্রাণী থেকে শুরু করে ভোক্তা, কৃষি শ্রমিক, আঞ্চলিক পরিবেশ ও ভৌগোলিক রাষ্ট্রগুলোর মাঝে তা চাপিয়ে দেয়। ওরা যে পরিমাণ ক্ষতি করে তা যদি আলাদা আলাদা ভাবে এগ্রি-কোম্পানিগুলোর হালখাতায় বসিয়ে দেয়া যায় তাহলে চিরদিনের জন্য এগ্রিবিজনেস নামক জিনিসটি ধ্বংস হয়ে যাবে। কোম্পানিগুলো যে পরিমাণ ধ্বংসাত্মক কাজ করে তার ক্ষতি তারা নিজেরাই কখনোই বহন করতে পারবে না।

    মার্ক্স ২১:  অনেক মিডিয়া দাবি করছে যে, করোনাভাইরাসের মহামারী শুরু উহানের এক্সোটিক খাদ্য মার্কেট থেকে। এটা কি সত্য?

    হ্যাঁ এবং না। এই দাবির প্রমাণগুলোর মাঝে অনেক ফাঁক রয়েছে। ভাইরাস ট্রেসিং হুনানের সামুদ্রিক খাবারের পাইকারি মার্কেটের ইঙ্গিত করে, যেখানে বন্য প্রাণীও বিক্রি করা হত। কিন্তু ইনভায়রমেন্টাল স্যাম্পলিং গুলো মার্কেটের পশ্চিমপ্রান্ত যেখানে বন্য প্রাণী থাকে সেদিকে ইঙ্গিত করে না৷

    কিন্তু আমরা ঠিক কত পেছনে এবং কতটা বৃহৎ পরিসরে গবেষণাটি করবো? এই জরুরি পরিস্থিতি ঠিক কখন শুরু হয়েছিল? ওই বাজারটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত যে জিনিসটা অবজ্ঞা করে সেটা হল বুনো কৃষির উৎপত্তি ও তাকে অজ্ঞাত চরাচরে নির্বাসন এবং তা থেকে পুঁজিরস্ফীতি।

    চীন ও পুরা বিশ্বেই বর্তমানে বন্য-খাদ্যর অর্থনীতি ক্রমশই বিধিবদ্ধ হচ্ছে। এর সাথে শিল্পভিত্তিক কৃষির সম্পর্ক কিন্তু টাকার থলিতেই সীমিত নয়। শিল্পভিত্তিক কৃষির শূকর ও হাঁস-মুরগীর চাহিদা পূরণের জন্য  প্রাথমিক বনের দিকে যেতে হয়। যার ফলে বন্য-খাদ্য কর্মকর্তারা সেই অরণ্যের আরো গভীর থেকে পশুপাখি আনতে বাধ্য হয়। এর ফলে যা হয় তা হল নতুন নতুন বীজাণু যেমন কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা ল্যাব
    শিল্পী: শহিদ আতিকুল্লাহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্ক্স ২১:  কোভিড ১৯ কিন্তু চীন থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রথম ভাইরাস নয় যা তার সরকার প্রথম প্রথম সবার থেকে লুকানোর চেষ্টা করেছিল। 

    হ্যা, কিন্তু এরূপ আচরণ শুধু চীনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ কিন্তু H5N2 ও H5Nx ভাইরাসের মহামারী ছড়ানোর উৎপত্তিস্থল ছিল। মার্কিন সরকার ২০০৯ এর H5N1 ও H5N2 মহামারী ঢাকতে সেই দেশের এগ্রিব্যবসাকে সাহায্য করেছিল।

    মার্ক্স ২১: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু মহামারীটিকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটা কি সঠিক?

    হ্যাঁ, এ ধরনের বীজানুর বিপদ হলো যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হাতে ঝুঁকি বিতরণের কোনো ক্ষমতা নেই। বীজাণু কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবে সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। একটা ক্ষুদ্র বাজারের থেকে এখন আমরা আন্তর্জাতিকভাবে মহামারী আকারে সংক্রমণে পৌঁছে গেছি। বীজাণুটি আপনাআপনি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, তাহলে ব্যাপারটি ভালই হবে। কিন্তু কি হবে না হবে তা আমরা কিন্তু আসলে জানি না। কিন্তু যত ভালো প্রস্তুতি নেয়া যাবে ততো ভালোভাবে ভাইরাসটির ক্ষতিক্ষমতা ও সংক্রমণী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

    আসলে হু এর ঘোষণাটিকে আমার ভাষ্যমতে ‘প্যানডেমিক থিয়েটার’৷ অতীতে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো নিষ্ক্রিয়তার মুখে ক্ষয়ে গেছে৷ যেমন ধরুন লীগ অব নেশনস। এরই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সারাক্ষণ তার প্রাসঙ্গিকতা, ক্ষমতা ও অর্থায়ন এর চিন্তায় ব্যস্ত। কিন্তু এরকম কাজকর্ম কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের সমন্বয়ের মাধ্যমে সংক্রমণ শৃঙ্খলটিকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য ভালো হতে পারে।

    মার্ক্স ২১: নব্য-উদারবাদের ফলে স্বাস্থ্যসেবার পুনর্গঠন, গবেষণা ও রোগীদের জন্য মন্দই বয়ে এনেছে; যেমন ধরুন আমাদের হাসপাতালগুলো। একটা ভাল স্বাস্থ্য সেবা নীতি কিভাবে ভাইরাসটির মোকাবিলা কাজে আসতে পারে?

    কয়দিন আগে মিয়ামির একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, যিনি সম্প্রতি চীন থেকে ফিরেছিলেন হালকা ঠান্ডা জ্বর নিয়ে, তার এলাকার হাসপাতালের কাছে দাবি জানান কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য। তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন যে, তার সামান্যতম স্বাস্থ্যবীমার অপশন এর জন্য যথেষ্ট হবে না। তিনি ঠিকই ধারণা করেছিলেন। সেই টেস্টের জন্য তার বিল আসে ৩২৭০ মার্কিন ডলার।

    আমেরিকানদের অবিলম্বে দাবি করতে হবে যে, সকল কোভিড-১৯ সম্পর্কিত টেস্ট ও ট্রিটমেন্ট এর খরচ যাতে ফেডারেল সরকার বহন করে। আমরা কোনভাবেই চাই না যে অতিরিক্ত উঁচু খরচের ভয়ে মানুষ টেস্ট সম্পন্ন না করে। আমরা চাই যে, তারা না লুকিয়ে অবিলম্বে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়। কিন্তু তার জন্য অবশ্যই সরকারকে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সকল চিকিৎসা এর ভার বহন করতে হবে।

    মার্ক্স ২১:  যখনই কোন দেশে ভাইরাসটি ধরা পড়ে তখনই সে দেশগুলোর সরকার কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী কাজকর্ম করে যেমন সম্পূর্ণ শহর অঞ্চলের জোরপূর্বক কোয়ারান্টিন। এসকল
    পরিমাপগুলো কি সমর্থনযোগ্য?

    মহামারীর নাম ধরে স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র পুঁজিবাদের অকার্যকারিতাই প্রমাণ করে। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে আমি বলব যে, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও সমবেদনা সব সময়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কিছু থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সংহতি ও পারস্পরিক সম্মান মর্যাদা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংহতি মূলক কর্মের বাস্তবায়ন ঘটতে পারে স্ব-কোয়ারেন্টিন, সবার সকল প্রয়োজনীয়তা পূরণ হচ্ছে কিনা তার জন্য ট্রেনিং প্রাপ্ত মহল্লা- ব্রিগেড এর দ্বারা নিয়মিত দেখাশোনা, প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে খাদ্য ট্রাক দ্বারা খাদ্য বিতরণ, পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও বেকারত্ব বীমা ব্যবস্থা।

    আর্টওয়ার্ক: ডুমস ডে
    শিল্পী: নাসরিন মিতু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্ক্স ২১:  আপনি হয়তো আগে থেকে জেনে থাকবেন যে, আমাদের জার্মানিতে এএফডি নামক মোটামুটি নাৎসি ধারণার একটি পার্টি রয়েছে যাদের পার্লামেন্টে ৯৪ টি আসন রয়েছে। এসকল ডানপন্থি দল করোনা ভাইরাসের নাম ধরে তাদের ঘৃণামূলক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা করোনা সম্পর্কে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সরকার দ্বারা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা হাসিল করছে ও অভিবাসীদের দেশে আসা বন্ধ, জোরপূর্বক কোয়ারেন্টিন এবং সকল ফ্লাইট বন্ধের ব্যবস্থা করাচ্ছে…

    এগুলো সব অবশ্যই ভিত্তিহীন। বর্ডার বন্ধ করা হোক বা না হোক হোক একটা বিশ্ব-মহামারীকে দেশে আসা থেকে বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। যৌক্তিক কাজটি হলো আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নীতিকে ভালো ভাবে বিকশিত করা যাতে ভাইরাস দেশে ঢুকলেও তার সংক্রমণ ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় ও রোগী যেই হোক না কেন তাদের ভালোভাবে চিকিৎসা ও রোগ সারানোর ব্যবস্থা করা যায়। আর অবশ্যই এসব কিছুর মূল অর্থাৎ অন্য দেশের মানুষের ভূমি দখল প্রকল্প ও প্রতিবেশ ধ্বংস কর্মসূচি বন্ধ করার মাধ্যমেই মহামারীর উৎপত্তিকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব।

    মার্ক্স ২১: টেকসই পরিবর্তন কী কী হতে পারে?

    নতুন মহামারীর আশঙ্কা বন্ধ করতে চাইলে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষকদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য এবং একটি শক্তিশালী পাবলিক সেক্টর পরিবেশের ধ্বংস ও রোগ সংক্রমণ কমাতে পারবে। ফসল ও ভান্ডারে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং কৌশলগতভাবে খামারে ও আঞ্চলিক ভাবে পুনঃঅরণ্যকরণ ব্যবস্থা করতে হবে। খামার-পশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিত্তিতে অন-সাইট বংশবৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। ন্যায় ভিত্তিক উৎপাদনের সাথে ন্যায় ভিত্তিক বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। মূল্য ও ভোক্তা সমর্থন কর্মসূচির সাথে এগ্রো-ইকোলজিকাল উৎপাদনকে সমর্থন করতে হবে৷ আর অবশ্যই এসকল পরীক্ষাগুলোকে নব্য-উদারবাদী চাপ ও পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের শাসন থেকে রক্ষা করতে হবে।

    আর্টওয়ার্ক: টুগেদার
    শিল্পী: আলি রাস্তু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্ক্স ২১: মহামারীর মুখে সমাজবাদীরা কী কী করতে পারে?

    অন্তত জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এগ্রিব্যবসা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের এরকম উচ্চ পুঁজিকরণ অবশ্যই এমন সব চর্চা বাস্তবায়ন করে যা মানব জাতির জন্য ধ্বংস নিয়ে আসে ও এরকম মারাত্মক রোগ উন্মুক্ত করে।

    খাদ্য সিস্টেমগুলোর সামাজিকীকরণের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে যাতে এরকম মারাত্মক মহামারীর সূচনাই না ঘটে। তার জন্য আমাদের যা করতে হবে তা হল খাদ্য উৎপাদনকে গ্রামীণ মহল্লার প্রয়োজনীয়তার সাথে আত্নীকরণ করা আর তার জন্য  দরকার এগ্রো-ইকোলজিকাল চর্চা যা আমাদের পরিবেশ ও কৃষকদের রক্ষা করবে। আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশনীতির মধ্যকার পার্থক্য ঘুচিয়ে ফেলতে হবে। অর্থাৎ বলাই যায় আমাদের এ পৃথিবী জয় করতে হবে।

    মার্ক্স ২১: এই ইন্টারভিউয়ের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  • ইউভাল নোয়াহ হারারি।। করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী

    ইউভাল নোয়াহ হারারি।। করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী

    • অনুবাদ: ইরফানুর রহমান রাফিন

    মানবজাতি এখন একটা বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এটা সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে দেশে সরকার ও জনসাধারণ যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, সেগুলো সম্ভবত আসন্ন বছরগুলোর জন্য দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দেবে। এগুলো যে শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার রূপটাই নির্ধারণ করে দেবে তা নয়, নির্ধারণ করে দেবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির রূপটাও। যা করার, কোনো ধরণের সংশয়ের বশবর্তী না হয়ে, আমাদেরকে দ্রুত করে ফেলতে হবে। যেসব পদক্ষেপ আমরা নেবো, সেসবের দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে, সেটাও আমাদেরকে আমলে নিতে হবে। একাধিক বিকল্পের ভেতর থেকে একটাকে বেছে নেওয়ার সময় আমাদের, শুধু এই নিয়ে ভাবলেই চলবে না যে আশু হুমকি মোকাবেলা করার জন্য কী করার আছে আমাদের, এটাও ভাবতে হবে যে, ঝড় কেটে যাওয়ার পর কোন ধরণের পৃথিবীতে থাকতে চাই আমরা। হ্যাঁ, ঝড়টা কেটে যাবে, মানবজাতি টিকে থাকবে, আমাদের অধিকাংশই বেঁচে থাকবে—কিন্তু আমরা একটি ভিন্ন দুনিয়ায় বাস করবো।

    জরুরি অবস্থার কারণে নেওয়া বহু স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপই জীবনের একটা বাস্তবতায় পরিণত হবে। এটা জরুরী অবস্থার প্রকৃতি। তারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোকে ত্বরান্বিত করে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করা লাগে, সেগুলো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেওয়া হয়ে যায়। অবিকশিত, এবং এমনকি বিপজ্জনক প্রযুক্তিও কাজে লাগানো হয়, কারণ কিছুই না-করার ঝুঁকিটা তারচেয়েও অনেক বেশি। বৃহদায়তন সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পুরো দেশটাকেই গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সবাই যখন ঘরে বসে কাজ করে আর দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ করে, তখন কী ঘটে? যখন গোটা স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনলাইনে চলে যায়, তখন কী ঘটে? স্বাভাবিক সময়ে, সরকার, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, আর শিক্ষাবোর্ডগুলো এই ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে কখনোই রাজি হতো না। কিন্তু এগুলো তো স্বাভাবিক সময় নয়।

    এই সংকটের সময়ে, আমাদের সামনে সুনির্দিষ্ট দুইটা বাছবিচার আছে। প্রথমটা সর্বাত্মক স্বৈরাতান্ত্রিক নজরদারি আর নাগরিক ক্ষমতায়নের মধ্যে। দ্বিতীয়টা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে।

    নজরদারিকে চামড়ার নিচে নিয়ে যাওয়া

    মহামারিঠেকাতে গোটা জনগোষ্ঠীকেই কিছু দিক-নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এটা অর্জন করার দুটি প্রধান তরিকা আছে। একটা হচ্ছে, সরকার জনগণকে তত্ত্বাবধানে রাখবে, এবং যারা নিয়ম ভাঙে তাদেরকে শাস্তি দেবে। আজকে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি সবাইকে তত্ত্বাবধানে আনাটা সম্ভবপর করে তুলেছে। পঞ্চাশ বছর আগে ২৪ কোটি সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করা কেজিবির পক্ষে সম্ভব ছিলো না, জড়ো করা সব তথ্যকে কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করার আশাও রাখতে পারতো না তারা। কেজিবি নির্ভর করতো মানব এজেন্ট আর বিশ্লেষকদের ওপরে, এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের পেছনে একজন এজেন্টকে লেলিয়ে দেওয়াটা স্রেফ অসম্ভব ছিলো। কিন্তু এখন সরকারগুলো সর্বব্যাপী সেন্সর আর ক্ষমতাশালী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করতে পারে, রক্তমাংসের টিকটিকির আর কোনো প্রয়োজন নেই।

    একাধিক সরকার ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে তাদের সমরে নতুন নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে চীন। জনসাধারণের স্মার্টফোনগুলোকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় এনে, লক্ষ লক্ষ চেহারা-শনাক্তকরণ ক্যামেরা ব্যবহার করে, এবং জনসাধারণকে তাদের দৈহিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চেক করতে এবং এই বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য করে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস বাহকদেরকে শনাক্ত করতে পেরেছে তাই নয়, তাদের গতিবিধিও ট্র্যাক করতে পেরেছে, এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। নাগরিকদেরকে সংক্রমিত রোগীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপস সতর্ক করে দেয়।

    এই ধরণের প্রযুক্তি স্রেফ পূর্ব-এশিয়ায় সীমিত নয়। করোনাভাইরাস রোগীদেরকে চিহ্নিত করতে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইজরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাকে সেইসব নজরদারি প্রযুক্তি বহাল করার অনুমতি দিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে যেগুলো সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। যখন সম্পৃক্ত সংসদীয় উপকমিটি এই পদক্ষেপে সায় দিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন নেতানিয়াহু এটাকে একটা ‘জরুরী অবস্থাকালীন ডিক্রির’ জোরে পাশ করিয়ে নেন।

    আপনি বলতে পারেন এতে নতুন কী আছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসাধারণকে ট্র্যাক, তত্ত্বাবধান, আর নিজেদেরকে স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য সরকার আর কর্পোরেশন উভয়েই অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর নমনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তথাপি, আমরা যদি সাবধান না থাকি, এই মহামারীটি নজরদারির ইতিহাসে একটা সন্ধিক্ষণ হিসেবে হাজির হতে পারে। শুধুমাত্র এই কারণেই নয় যে, এখন পর্যন্ত যেসব দেশ গণ নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করার প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করে আসছিলো, সেসব দেশে তা বহাল করাটা স্বাভাবিক করে তোলা হবে। বরং এই কারণেও যে, একটা নাটকীয় রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এটা নজরদারিকে ‘চামড়ার ওপর’ থেকে ‘চামড়ার নিচে’ নিয়ে যাবে।

    আজকের আগ পর্যন্ত, আপনার আঙুল যখন আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করেছিলো এবং একটা লিংকে ক্লিক করেছিলো, সরকার জানতে চেয়েছিলো আপনার আঙুল ঠিক কী ক্লিক করেছিলো? কিন্তু করোনাভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের ফোকাস বদলে গেছে। এখন সরকার জানতে চায় আপনার আঙুলের তাপমাত্রা কতো এবং এর ত্বকের নিচের রক্তচাপ কতো।

    জরুরি অবস্থার পুডিং

    নজরদারির ব্যাপারে আমরা এখন কোন দশায় আছি, সেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে আমরা যে-সমস্যাটার সম্মুখীন হই, সেটা হচ্ছে, আমরা কেউই জানি না ঠিক কীভাবে আমাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, এবং আসন্ন দিনগুলোতে কেমন হবে। নজরদারি প্রযুক্তি বিপজ্জনক গতিতে বিকশিত হচ্ছে, এবং আজ থেকে মাত্র ১০ বছর আগে যেটাকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলে মনে হতো, সেটা এখন বাসি খবর। একটা চিন্তা পরীক্ষা হিসেবে, এমন একটি কাল্পনিক সরকারের কথা ভাবুন, যে দাবি করে প্রতিটি নাগরিককে একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হবে, যা দিনের ২৪ ঘণ্টাই দৈহিক তাপমাত্রা আর হৃৎস্পন্দনের হার তত্ত্বাবধান করবে। এর ফলে যে ডাটা পাওয়া যাবে, তা সরকারি অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। আপনি যে অসুস্থ, এটা আপনি নিজে টের পাওয়ার আগেই, অ্যালগরিদম টের পেয়ে যাবে। আপনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সব অ্যালগরিদমের নখদর্পণে থাকবে। সংক্রমণের শেকলটাকে ব্যাপকভাবে ছোট করে আনা যাবে, এমনকি সেটাকে একেবারে কেটেও ফেলা যাবে। তর্কসাপেক্ষে বলা চলে, এরকম একটি ব্যবস্থা মহামারীটাকে এর যাত্রাপথে কয়েকদিনের মধ্যেই থামিয়ে দিতে পারবে। চমৎকার শোনাচ্ছে, তাই না?

    বিপদের দিকটা হচ্ছে, অবশ্যই, এটা একটা ভয়ানক রকমের নতুন নজরদারি ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে বসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি যদি জানেন আমি একটা সিএনএন লিংকের বদলে একটা ফক্স নিউজের লিংকে ক্লিক করেছিলাম, এটা থেকে আপনি আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং খানিকটা আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও আভাস পেয়ে যাবেন। কিন্তু একটা ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় আমাদের দৈহিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, ও হৃৎস্পন্দনের হার কতো থাকে, সেটাও যদি আপনি তত্ত্বাবধান করতে পারেন, তাহলে কী আমাকে হাসায়, কী আমাকে কাঁদায়, এবং কী আমাকে প্রকৃতই, ক্ষুব্ধ করে তোলে আপনি সেটাও জানতে পারবেন।

    এটা মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সর্দি-কাশির মতো আনন্দ-বেদনা-বিরক্তিবোধ-ভালোবাসাও জৈবিক ব্যাপার। যেই প্রযুক্তি কাশি চিহ্নিত করতে পারে, সেই প্রযুক্তি হাসিও চিহ্নিত করতে পারে। যদি সরকার আর কর্পোরেশনসমূহ আমাদের বায়োমেট্রিক ডাটা গণহারে জড়ো করা শুরু করে, আমরা নিজেদেরকে যতটা জানি, তারা আমাদেরকে তারচেয়ে ঢের বেশি ভালো জানতে পারবে। তারা যে শুধু আমাদের অনুভূতিই অনুমান করবে তাই নয়, সেই অনুভূতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, এবং তাদের যা মন চায় তাই বিক্রি করবে আমাদের কাছে। তা সে একটা পণ্যই হোক, আর একজন রাজনীতিবিদই হোক। বায়োমেট্রিক তত্ত্বাবধান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ডাটা হ্যাক করার পদ্ধতিগুলোকে প্রস্তর যুগের জিনিসে পরিণত করতে পারে। ২০৩০-এর উত্তর কোরিয়ার কথা কল্পনা করুন, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে দিনে ২৪ ঘণ্টাই একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হয়। মহান নেতার একটা ভাষণ শুনছেন, আর বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট সুস্পষ্টভাবেই আপনার রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে, তো আপনি গেছেন।

    একটা জরুরি অবস্থার সময়ে সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে অবশ্যই আপনি বায়োমেট্রিক নজরদারির পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। জরুরি অবস্থা কেটে গেলেই পদক্ষেপটা বাতিল করা হবে। কিন্তু সাময়িক পদক্ষেপগুলোর একটা নোংরা অভ্যাস আছে। সেটা হলো, এগুলো সাধারণত সাময়িক থাকে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমার দেশ ইজরায়েল ১৯৪৮-এ তার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জরুরি অবস্থা জারি করেছিলো। সংবাদপত্র সেন্সরশীপ ও ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে পুডিং বানানোর বিশেষ বিধিবিধান (আমি ঠাট্টা করছি না) পর্যন্ত অনেক ব্যাপারে একগুচ্ছ সাময়িক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বহুদিন আগে জেতা হয়ে গেছে, কিন্তু ইজরায়েল আজও আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থার অবসান ঘোষণা করেনি, এবং ১৯৪৮-এর অনেক ‘সাময়িক’ পদক্ষেপ বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে (ঈশ্বর করুণাময়, জরুরি অবস্থাকালীন পুডিং ডিক্রিটা ২০১১’য় বাতিল করা হয়েছে)।

    করোনাভাইরাস সংক্রমণ যদি কমতে কমতে শূন্যেও নেমে আসে, এমনকি তখনো কিছু ডাটা-ক্ষুধার্ত সরকার দাবি করবে, বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে তাদের, কারণ করোনাভাইরাসের একটা দ্বিতীয় ঢেউ উঠতে পারে, অথবা কেন্দ্রীয় আফ্রিকায় নতুন ইবোলার জীবাণু দেখা দিচ্ছে, অথবা…বোঝেনই তো। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের গোপনীয়তাকে কেন্দ্র করে একটা বিশাল লড়াই চলছে। করোনাভাইরাস সংকট এই লড়াইটার শীর্ষবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। কারণ জনসাধারণকে যখন গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের মধ্য থেকে যেকোনো একটা বেছে নিতে বলা হবে, জনসাধারণ স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে।

    সাবান পুলিশ

    আসলে জনসাধারণকে গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের ভেতর যে-কোনো একটিকে বেছে নিতে বলাটাই সমস্যার একেবারে গোড়ার কথা। কারণ এটা একটা ভুল বাছ-বিচার। আমরা দুটোই বেছে নিতে পারি, এবং আমাদের দুটোই উপভোগ করার অধিকার আছে। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি, এবং করোনাভাইরাস মহামারি ঠেকাতে পারি, সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী নজরদারি ব্যবস্থাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মাধ্যমে নয়, বরং, নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, করোনাভাইরাস মহামারিপ্রতিরোধ করার সবচেয়ে সফল কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ও সিঙ্গাপুরে। এই দেশগুলো ট্র্যাকিং অ্যাপ যে একেবারেই ব্যবহার করেনি তা নয়, তবে তারা অনেক বেশি জোর দিয়েছে ব্যাপকভাবে রোগ পরীক্ষণ, সততার সঙ্গে তার প্রতিবেদন দাখিল করা, এবং ওয়াকেফহাল নাগরিকদের আন্তরিক সহযোগিতার ওপরে।

    জনসাধারণ কার্যকর দিকনির্দেশনা মেনে চলবে, সেটা নিশ্চিত করতে, কেন্দ্রীভূত তত্ত্বাবধান আর কঠিন শাস্তি প্রদানই একমাত্র পথ নয়। যখন জনসাধারণের সামনে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো তুলে ধরা হবে, এবং জনসাধারণ এই তথ্যাবলীর ব্যাপারে গণকর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রাখতে সমর্থ হবে, তখন ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলা কোনো বড় ভাই ছাড়াই নাগরিকরা সঠিক কাজটা করতে পারবে। স্বপ্রণোদিত ও ওয়াকেফহাল জনগোষ্ঠীগুলো সাধারণত পুলিশি নজরদারিতে থাকা অজ্ঞ জনগোষ্ঠীগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্যকর।
    সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারটি বিবেচনা করুন। মানুষের স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম অসাধারণ অর্জনগুলোর একটি এটি। এই ছোট্টো কাজটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচায়। আজকে আমরা এটাকে মামুলি ব্যাপার ধরে নিয়েছি, অথচ সাবান দিয়ে হাত ধোয়াটা যে গুরুত্বপূর্ণ, এটা কেবলমাত্র উনিশ শতকে এসে আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর আগ পর্যন্ত এমনকি চিকিৎসক আর সেবিকারা পর্যন্ত হাত না ধুয়েই, একটার পর একটা সার্জিক্যাল অপারেশন করে গেছেন। আজকে কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিনভাবে তাদের হাত পরিষ্কার করেন, এই কারণে না যে তারা কোনো সাবান পুলিশের ভয়ে ভীত, এই কারণে যে তারা তথ্যগুলো জানেন। আমি সাবান দিয়ে হাত ধুই কারণ আমি ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানি। আমি এটা বুঝি যে, এই ছোট ছোট প্রাণকণাগুলো অসুখ বাঁধাতে পারে। আর আমি এটাও জানি না, সাবান দিয়ে আমি এগুলোকে ধুয়ে দিতে পারি।
    কিন্তু এই মাপের মান্যতা আর সহযোগিতা অর্জন করার জন্য আস্থার প্রয়োজন পড়বে। জনসাধারণকে বিজ্ঞানের ওপর, গণকর্তৃপক্ষের ওপর, ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখতে হবে। বিগত কয়েক বছরে, দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের ওপর জনসাধারণের আস্থা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রেখেছে। আজকে এই একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা কর্তৃত্ববাদের মহাসড়কে উঠতে প্রলুব্ধ হতে পারে, এই যুক্তি নিয়ে হাজির হতে পারে যে সঠিক কাজটি করার ব্যাপারে জনসাধারণের ওপর আস্থা রাখা যাবে না।
    সাধারণত, বছরের পর বছর ধরে যে আস্থা ভঙ্গ করা হয়েছে, সেটা রাতারাতি ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু এটা কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। সংকটের সময়ে, মানুষের মনও খুব দ্রুত বদলায়। বছরের পর বছর ধরে আপনার ভাইবোনদের সঙ্গে তিক্ত বিবাদের সম্পর্ক থাকতে পারে আপনার। কিন্তু জরুরি অবস্থার কালে আস্থা আর বন্ধুত্বের একটা গোপন কুয়ার সন্ধান আপনি পেয়ে যাবেন, এবং একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে ছুটে যাবেন। একটা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ, আর গণমাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এখনো খুব বেশি দেরী হয়ে যায়নি। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু সেটা নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করার জন্য। আমি নিশ্চয়ই আমার দৈহিক তাপমাত্রা আর রক্তচাপ তত্ত্বাবধান করার পক্ষে, কিন্তু সেটা কোনো সর্বশক্তিমান সরকার তৈরি করার জন্য নয়। বরঞ্চ, সেই ডাটার কাজ হবে ব্যক্তিগত বাছবিচারের ক্ষেত্রে আমাকে অধিকতর ওয়াকেফহাল করে তোলা, এবং সরকারকেও এর সিদ্ধান্তগুলোর জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।
    যদি আমি দিনের ২৪ ঘণ্টাই আমার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ট্র্যাক করতে পারি, তাহলে আমি অন্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছি কিনা শুধু সেটাই যে জানতে পারবো তাই নয়, কোন অভ্যাসগুলো আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটাও জানতে পারবো। আর করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে যদি আমার প্রবেশাধিকার থাকে, এবং যদি আমি সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে সরকার এ-ব্যাপারে আমাকে সত্য বলছে কিনা এবং মহামারিপ্রতিরোধে সঠিক নীতি অনুসরণ করছে কিনা সেটা আমি যাচাই করতে পারবো। যখন লোকে নজরদারির কথা বলে, মনে রাখবেন প্রযুক্তি শুধু যে সরকারই নাগরিকদেরকে তত্ত্বাবধানে রাখতে ব্যবহার করতে পারে তাই নয়—নাগরিকরা সেই একই প্রযুক্তি সরকারকে তত্ত্বাবধানে রাখতেও ব্যবহার করতে পারে।

    করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবটা তাই নাগরিকত্বের একটি প্রধান পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে, আমাদের প্রত্যেককে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখতে হবে, ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক আর স্বার্থপর রাজনীতিবিদদের ওপর নয়। আমরা যদি সঠিকটা বেছে নিতে ব্যর্থ হই, তবে দেখা যাবে নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান স্বাধীনতাগুলোই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি আমরা, আর ভাবছি এটাই স্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র উপায়।

    আমাদের একটা বৈশ্বিক পরিকল্পনা দরকার

    আমরা দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বাছ-বিচারের সম্মুখীন, সেটা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে। খোদ মহামারিটা, এবং এর ফলে দেখা দিতে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকটটা, দুটোই বৈশ্বিক সমস্যা। কেবলমাত্র বৈশ্বিক সহযোগিতার ভেতর দিয়েই কার্যকররূপে এগুলোর সমাধা করা সম্ভব।

    সবার আগে ভাইরাসটাকে হারিয়ে দেয়ার জন্য, আমাদেরকে বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। ভাইরাসের ওপর মানুষের একটা বড় সুবিধার জায়গা এটা। চীনে থাকা একটা করোনাভাইরাস আর আমেরিকায় থাকা একটা করোনাভাইরাস কীভাবে মানুষকে সংক্রমিত করতে হবে সেই বিষয়ে তথ্য বিনিময় করতে পারে না। কিন্তু কীভাবে করোনাভাইরাসের মোকাবেলা করতে হবে, সে-ব্যাপারে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করতে পারে। ভোরবেলা একজন ইতালিয়ান চিকিৎসক মিলানে যা আবিষ্কার করেন তা বিকেল নাগাদ তেহরানে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। কয়েকটি নীতির মধ্য থেকে কোনটা অনুসরণ করা হবে, সে-ব্যাপারে যুক্তরাজ্য সরকার যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, তখন দেশটি কয়েকমাস আগে একই ধরণের সংকটের সম্মুখীন হয়েছে যে কোরিয়ানরা, তাদের পরামর্শ নিতে পারে। কিন্তু এটা যাতে সম্ভবপর হয়ে ওঠে, সে-জন্য আমাদের একটা বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আস্থার প্রয়োজন পড়বে।

    দেশগুলোর উচিত হবে নিজেদের মধ্যে মুক্তভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা এবং বিনয়ের সঙ্গে পরস্পরের পরামর্শ চাওয়া। যে ডাটা আর ইনসাইট তারা পাচ্ছে সেটার ওপর আস্থা রাখতেও সমর্থ হতে হবে তাদেরকে। মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো টেস্টিং কিট আর শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র, উৎপাদন ও বিতরণের জন্য আমাদের একটি বৈশ্বিক প্রয়াসের প্রয়োজন পড়বে। প্রতিটা দেশ স্থানীয়ভাবে এটা করার চেষ্টা চালাচ্ছে, এবং হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই মজুদ করছে, এরকম করার চেয়ে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়াসই বরং উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করতে পারবে এবং জীবন-বাঁচানো যন্ত্রপাতি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে পারবে। যুদ্ধের সময় দেশগুলো যেভাবে প্রধান প্রধান শিল্পখাতগুলোকে জাতীয়করণ করে, তেমনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন লাইনগুলোকে ‘মানবিকীকৃত’ করার প্রয়োজন হতে পারে। করোনাভাইরাসের স্বল্পসংখ্যক কেস ধরা পড়েছে এমন ধনী দেশগুলোর অনেক বেশি কেস ধরা পড়েছে এমন গরিব দেশগুলোতে তারা মূল্যবান যন্ত্রপাতি পাঠাতে সম্মত থাকা উচিত। তাদেরকে এই ব্যাপারে আস্থা রাখতে হবে, পরবর্তী যদি ও যখন তাদের নিজেদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, অন্য দেশগুলো সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

    মেডিক্যাল পার্সোনেলের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের বৈশ্বিক প্রয়াস বিবেচনায় আনতে পারি। যেসব দেশ এখনো ততোটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সবচেয়ে খারাপ দশায় থাকা অঞ্চলগুলোতে সেসব দেশ তার মেডিক্যাল স্টাফ পাঠাতে পারে। বিপদে পাশে দাঁড়ানোও হলো, আবার মূল্যবান অভিজ্ঞতাও অর্জন করা হলো। পরবর্তীতে মহামারির ফোকাসটা যদি ঘুরে যায়, সাহায্য বিপরীত দিকেও বইতে পারে।

    অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও বৈশ্বিক সহায়তাটাও ব্যাপকভাবেই জরুরি। অর্থনীতি ও সরবরাহ শেকলের বৈশ্বিক চরিত্রটার কারণে, প্রতিটি সরকার যদি অন্য সবার কথা ভুলে গিয়ে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলটা দাঁড়াবে বিশৃঙ্খলা আর সংকটের গভীরতর হওয়া। আমাদের একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা দরকার, তাড়াতাড়ি দরকার।

    আরেকটা প্রয়োজনীয়তা : ভ্রমণের ব্যাপারে একটা বৈশ্বিক বন্দোবস্তে পৌঁছানো। মাসের পর মাস ধরে সর্বপ্রকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ রাখা ব্যাপক ভোগান্তির জন্ম দেবে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্তত কিছু মানুষের জন্য ভ্রমণ করাটা জরুরি, যাদেরকে সীমান্ত পেরোনোর ব্যাপারে দেশগুলোকে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। এদের মধ্যে আছেন : বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ও ব্যবসায়ীগণ। ভ্রমণকারীদেরকে তাদের স্ব-স্ব দেশ আগেভাগেই স্ক্রিনিং করবে, এ-ব্যাপারে একটি বৈশ্বিক বোঝাপড়ায় সম্মত হতে পারলে কাজটা করা সম্ভব হবে। আপনি যদি জানেন শুধু সতর্কভাবে স্ক্যান করা যাত্রীদেরকেই একটা উড়োজাহাজে চড়ে বসতে দেয়া হয়েছে, নিজের দেশে তাদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে আপনি অধিকতর সম্মত থাকবেন।

    দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে দেশগুলো এসব থোড়াই কেয়ার করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর একটি সামষ্টিক পক্ষাঘাত চেপে বসেছে। মনে হচ্ছে ঘরে কোনো মুরুব্বি নাই। এই প্রত্যাশা করাটা কারো জন্য অস্বাভাবিক ছিলো না যে, হপ্তাখানেক আগেই বিশ্ব নেতারা একটি সাধারণত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জরুরি সভায় বসেছেন। অথচ জি৭-ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা মোটে এই সপ্তাহে একটা ভিডিও সংবাদ-সম্মেলন করতে পেরেছেন, এবং তাতে এমন কোনো কর্মপরিকল্পনা উঠে আসেনি।

    পূর্ববর্তী বৈশ্বিক সংকটগুলোতে—যেমন ২০০৮’র আর্থিক সংকট বা ২০১৪’র এবোলা মহামারী— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বনেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই নেতৃত্বমূলক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা তাদের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার করেছে : মানবজাতির ভবিষ্যতের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহত্ত্ব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা অনেক বেশি।

    এই প্রশাসন এমনকি তার নিকটতম মিত্রদেরকেও পরিত্যাগ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে আমেরিকায় সব ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার সময়, এটা ইইউকে একটা অগ্রিম নোটিশ দেয়ার গরজটা পর্যন্ত বোধ করেনি—এই মারাত্মক পদক্ষেপটা নিয়ে ইইউ-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা তো দূরের কথা। একটা নতুন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের একচেটিয়া সত্ব কিনে নিতে একটি জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ১ বিলিয়ন ডলার অফার করার মাধ্যমে এটি জার্মানিকে একটা কলঙ্কজনক দশায় ফেলেছে। বর্তমান প্রশাসন যদি হাওয়া বুঝে ঘোড়া বদলও করে, এবং একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়েও আসে, এমনকি তখনও খুব কম লোকই এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করবে, যিনি কোনোদিন দায়িত্ব নেন না, ভুল স্বীকার করেন না, এবং সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে শুধু বাহবা কুড়ানোর তালে থাকেন।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেলে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে অন্য দেশগুলো যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে বর্তমান মহামারিঠেকানোটাই যে কেবল কঠিন হয়ে উঠে তাই নয়, আগামী বছরগুলোতে এর উত্তরাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলাটা অব্যাহত রাখবে। তবু সব সংকটই একইসঙ্গে একটা সম্ভাবনাও বটে। আমরা আশা করতে পারি, বৈশ্বিক অনৈক্য যে তীব্র বিপদ ঘনিয়ে আনে, সেই উপলব্ধি করতে বর্তমান মহামারিটা মানবজাতিকে সহায়তা করবে।

    মানবজাতির সামনে একটা বাছবিচার করার সময় এসেছে। আমরা কি অনৈক্যের পথ ধরে নিচের দিকে নেমে যাবো, নাকি বেছে নেবো বৈশ্বিক সংহতির পথ? যদি আমরা অনৈক্যকে বেছে নেই, এটা যে শুধু সংকটটাকেই ঘনীভূত করবে তাই নয়, ভবিষ্যতে এরচেয়েও মারাত্মক সব ধবংসযজ্ঞের পথ খুলে দেবে। আর আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতিকে বেছে নেই, শুধু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, ভবিষ্যৎ সব মহামারিআর একুশ শতকে মানবজাতি অন্য যেসব সংকটের সম্মুখীন হতে পারে তার বিরুদ্ধেও এটা একটা বিজয় হয়ে থাকবে।

    প্রখম প্রকাশ: বাংলা ট্রিবিউন
    shorturl.at/nuQX5

    (more…)

  • কোয়ারেন্টাইন স্টেট

    কোয়ারেন্টাইন স্টেট

    • সারোয়ার তুষার

    করোনা যুগের বিশ্ব

    গোটা বিশ্ব করোনা ভাইরাসের থাবায় পর্যুদস্ত। অদৃশ্য জীবাণু ইতোমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম। দিনের পর দিন ঘরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। কতদিন এভাবে ‘লকডাউন’ অবস্থায় থাকতে হবে তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না। বিশ্বের বহু বিশ্লেষক-বুদ্ধিজীবী করোনা মহামারিকে ‘নজিরবিহীন’ হিশেবে আখ্যা দিয়েছেন। নিকট অতীতেও নানা রকম ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্বের বহু জনপদ। কিন্তু করোনা মহামারি এবং মহামারির প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের মানুষের জীবনযাপন, রাজনৈতিক দর্শন, ধর্মীয় চেতনা এবং শাসনপ্রণালীর এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর সবটাই যে ব্যক্তি ও সমাজের অনুকূল হবে এমন নয়।

    আর্টওয়ার্ক: পাওয়ারড আই
    শিল্পী: গ্যালো প্যারাডেস
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের আগের পৃথিবী এবং পরের পৃথিবী একরকম হবে না। কী কী পরিবর্তন হবে? রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির কোনদিকগুলো বদলে যাওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? ইতোমধ্যেই আমরা লক্ষ্য করছি, করোনা ভাইরাসের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিটরা এমন সব নীতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গ্রহণ করতে গেলে নূন্যতম বিরোধিতা কিংবা সমালোচনার শিকার হতে হতো। কিন্তু এখন করোনার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’, ‘জরুরি অবস্থা’ ইত্যাদি ছুতোয় রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা আরো নিরঙ্কুশ করা হচ্ছে। ব্যক্তি ও সমাজের স্বাধীন উদ্যোগ, স্বাধীন তৎপরতার উপর খবরদারি-নজরদারি-দমন-পীড়ন এতদিন ছিল রাজনৈতিক লক্ষ্য কিংবা কৌশল, তা এখন মানুষের জীবন ও আচরণকে কড়া রাষ্ট্রীয় অনুশাসন নিগড়ে শৃঙ্খলিত করার মাধ্যমে নতুন মূল্যবোধ ও জরুরতের ডিসকোর্স হিশেবে হাজির করা হচ্ছে। এবং এটা করা হচ্ছে গণমানুষের মনোজগতে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ উৎপাদনের জন্য, যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর। ভাইরাস সহ যেকোন ‘অশুভ’ শক্তিকে দমন করতে হলে রাষ্ট্রের মহাকেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকেই জীবন ও মৃত্যুর একমাত্র অধীশ্বর হিশেবে ভাবানোর মত সম্মতি উৎপাদন ও পরিস্থিতি নির্মাণের পর, বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা এমন এক মুডে অবস্থান করছেন যেন সর্বব্যাপী নজরদারি-খবরদারি ও নিপীড়নই এখন জনআকাঙ্ক্ষা। মানুষই যখন নিজেদের ‘কল্যাণের’ উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের ছড়ি ঘোরানোকে অনিবার্য জ্ঞান করছে!

    ফুকোর মতে ক্ষমতার একটি জৈবিক অস্তিত্ব রয়েছে। এটি হচ্ছে ক্ষমতার কিছু টেকনোলজি যা দিয়ে নাগরিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই জৈব ক্ষমতাকে ফুকো মনে করেন আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কার্য সাধনের অন্যতম প্রধান একটি উপায়। বায়ো পাওয়ারের মাধ্যমে শাসনপ্রণালী নাগরিকের শরীরের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের শরীর রাজনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পুলিশ, আইন-আদালত, কারাগার, ক্লিনিক থেকে শুরু করে সব ধরণের বল প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র জৈব ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। শাসিত মানুষের শরীরের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।

    (সারোয়ার তুষার/২০১৯)

    জৈব ক্ষমতার নানা প্রকরণ প্রকট হয়ে উঠছে।  শাসনের অনুকূল ‘বশ্য শরীর’ থেকে ক্ষমতা বিচ্ছুরিত হচ্ছে সামাজিক সংবহনতন্ত্রে। ফলে শরীর মাত্রই সন্দেহভাজন, আচরণ মাত্রই ‘বিশেষ সতর্কতা’।

    মহামারি ও শরীর

    করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে অভিনব সার্বভৌম ক্ষমতার পাটাতন তৈরি হচ্ছে। স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রীর সংকল্প হিসেবে ধারাণায়িত সামাজিক চুক্তির রক্ষণাবেক্ষণের  সার্বভৌম ক্ষমতা আর অধিকারের বাঁধনে আটকা নাই।

    নতুন ধরনের সভেরিন পাওয়ার তৈরি হচ্ছে, যেটা ‘সচেতনতা’র উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ‘সচেতনতা’ নিয়ন্ত্রণ কৃৎ-কৌশলের আরও আরও প্রকরণকে অবিসম্ভাবী করে তোলে। নজরদারি যা এতদিন ছিল একটা রাজনৈতিক লক্ষ্য তা এখন নিপাট জীবন ও আচরণকে নতুন মূল্যবোধে আটক করছে আর এটাই হয়ে উঠছে নিয়মিত!

    সচেতনতাকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করে পুরো পাবলিক পরিসরই অ-সচেতনতাকে শুধু দোষারোপই করে না, অ-সচেতনতা হয়ে ওঠে সরাসরি সেনা- পুলিশ- রাষ্ট্রর চিরুনি অভিযানের লক্ষ্য।

    (আরিফ/ ২০২০)

    ক্ষমতা হাজির হয়েছে নতুন শর্ত নিয়ে। যেখানে ব্যক্তির সমর্পণ আর এমন নয় যে, প্রত্যেকের এবং সকলের স্বাধীনতা একবিন্দুতে মেলে। বরং সেই স্থান দখল করেছে নতুন যে শর্ত তার নাম: সতর্কতা তথা নিরাপত্তা। কোয়ারেন্টাইন হয়ে উঠেছে নতুন সামাজিক চুক্তি। একেই আমরা বলছি কোয়ারেন্টাইন স্টেট।

    আর্টওয়ার্ক: স্টে এট হোম
    শিল্পী: হিলাল জিক্যান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ফুকোর চিন্তায় এর ইশারা মেলে…

    আমার এই গবেষণা-প্রকল্প হবস্‌-এর ‘লেভিয়াথান’ সংক্রান্ত প্রকল্পের ঠিক বিপরীত। হবস্‌ যেখানে বুঝতে চাচ্ছেন কীভাবে অসংখ্য মানুষের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা থেকে ক্রমশ ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’র স্পিরিটের উদয় হয়, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে এর উল্টোটা দেখানো। কীভাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সামনে অসংখ্য মানুষ ক্রমশ পরাধীন-অধীনস্থ প্রজার অবস্থান স্বীকার করে নেয়, সেই শোচনীয় পরিণতিকে প্রত্যক্ষ করা।

    (ফুকো/২০১৯)

    মহামারিকে প্রতিরোধ করা নয়, বরং মহামারি ও সম্ভাব্য মহামারির আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে হাইপার-ইন্ডুভিজুয়ালিজমের অনুকূল কনশাসনেস তৈরি করার মাধ্যমে সমাজকে স্থায়ী কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো।

    মহামারির কালে আগ্রাসী রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ইতিহাসে নতুন নয়। অতীতের প্রায় সমস্ত মহামারি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিস্তার ঘটানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৩৪৮ সালে ইউরোপে প্লেগ মহামারি দেখা দিলে ভেনিসের কর্তৃপক্ষ তাদের সমুদ্র বন্দর সিলগালা করে দেয় যেন প্লেগ উপদ্রুত অঞ্চল থেকে অন্তত চল্লিশ দিনের জন্য কেউ ভেনিসে ঢুকতে না পারে। সেই থেকেই ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দের উৎপত্তি। যার অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি অর্থ হচ্ছে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক আইসোলেশন (isolation) নিশ্চিত করা। প্লেগ মহামারির কয়েক শতাব্দী পরে প্রথম রাণী এলিজাবেথের মুখ্যমন্ত্রী উইলিয়াম সেসিল এমন আইন প্রণয়ন করেন যার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোন ‘অসুস্থ’ ব্যক্তিকে ছয় সপ্তাহের জন্য বন্দি করে রাখতে পারত।

    বাংলাদেশেও ২০১৮ সালে যে ‘সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল’ আইন প্রণয়ন করা হয় তার মূল লক্ষ্য রোগের সংক্রমণ ঠেকানো নয়, বরং সংক্রমণ ঠেকানোর নামে পপুলেশন ম্যানেজমেন্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা বছর এই আইনের আওতায় কাজ করবে। আইনে সংশ্লিষ্টদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করা হয়েছে। যে কাউকে পরীক্ষার জন্য বলপূর্বক ধড়পাকড়-অবরোধ-আইসোলেশনেরও বিধান আছে। কিন্তু আইন যারা প্রয়োগ করবেন, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে কি হবে তার উল্লেখ নেই। বলপ্রয়োগের শর্ত কি হবে তারও স্পষ্ট উল্লেখ নেই। সকল দায়বদ্ধতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের। ফলত এরকম একটা আইনের মাধ্যমে সংক্রমণ রোধ কিংবা আক্রান্তকে সারিয়ে তোলার চেয়েও যে ব্যাপারটি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তা হলো, এমনকি জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিও রাষ্ট্রের ‘জরুরি অবস্থা’র ডিসকোর্সকে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত করেছে। এর সাথে যদি বাংলাদেশের একব্যক্তিকেন্দ্রীক নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকাঠামোর বিষয়টি মাথায় রাখা যায়, তাহলে যে কেউই বুঝতে পারবেন, আইন যদি হয় প্রশ্নাতীত, নিরঙ্কুশ তাহলে তার পক্ষে কেবল বলপ্রয়োগের অথরিটি ভিন্ন অন্য কিছু হওয়া সম্ভব নয়।

    করোনা ভাইরাস কিংবা অন্য যে কোন মহামারির থ্রেট অত্যন্ত বাস্তব। কোন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ দিয়ে ভাইরাসে মানুষের জীবনাবসান হওয়ার সম্ভাবনাকে তিল পরিমাণও খাটো করা এই লেখার অভিপ্রায় নয়। এই লেখায় বরং আমরা দেখাতে চাই, ভাইরাসে মানুষের প্রাণহানি হওয়ার মত শর্ত তৈরি হয় কোন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এবং কিভাবে মহামারির পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এলিটরা ক্ষমতা ও একচেটিয়া সিদ্ধান্তকে আরো কেন্দ্রীভূত করে সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে। এই কারণেই আইনশৃঙ্খলা জনিত সমস্যা, নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা, ক্রমাগত সংকট উৎপাদন করা রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুগে ‘সংকট’ শাসনপ্রণালীর অনিবার্য ডিসকোর্সে পরিণত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করতে নাগরিকের মনোজগতে সংকটকে স্থায়ী করে তোলা হয়েছে। সমাজে নিরাপত্তাহীনতা, ত্রাস ইনজেক্ট করা হচ্ছে পদ্ধতিগতভাবে। এরই লক্ষ্যে রাষ্ট্র মাত্রই পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সর্বব্যাপী নজরদারির জাল বিস্তার করার মাধ্যমে নাগরিকের সমস্ত কর্মকান্ড রাষ্ট্রের নাগালের মধ্যে আনা হচ্ছে।
    দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর এক প্রবন্ধে চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন, উন্নতি, প্রগতির পাশাপাশি ‘জনস্বাস্থ্য’ রক্ষা করার স্বনির্বাচিত প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্রের মোক্ষম মতাদর্শিক হাতিয়ার। পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মহামারি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত সবকিছুই হয়ে ওঠে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সংগতিপূর্ণ ‘শরীর’ গড়ে তোলার কারবার। ‘কৃষক ও আদিবাসী শরীরকে ভেঙ্গেচুড়ে, দুমড়ে-মুচড়ে, নতুন অভ্যাসের ফাঁদে ফেলে, নতুন রুটিনের ছাঁচে ফেলে তবে তো তৈরি হয় শ্রমিকের শরীর, বিপণন সমাজের অসংখ্য ভোগ্যবস্তুর ক্রেতার শরীর, ফ্যাশন-ম্যাগাজিনের, স্বাস্থ্য পত্রিকার শরীর। ‘ ( দীপেশ/ ২০১৬: ৫২)
    কিন্তু দীপেশ বলছেন, এই পরিবর্তন একদিনে সাধিত হয়না এবং এই পরিবর্তনের পথ সর্বদা মসৃণও না। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের হাতে নানাধরণের নিপীড়নমূলক ও মতাদর্শিক হাতিয়ার থাকে। এরমধ্যে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান-ভিত্তিক ‘জনস্বাস্থ্য’ নীতি এক বড় অস্ত্র।

    ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত জনস্বাস্থ্য নীতি, যা এখনো মোটাদাগে অপরিবর্তিত আছে, তার কেন্দ্রীয় লক্ষ্যই হলো বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ এবং এই জনস্বাস্থ্য নীতি সরাসরি রাষ্ট্রীয় শাসনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ও মহামারি নিয়ন্ত্রণ নীতিকে ইতিহাস-নিরপেক্ষ কিংবা প্রাকৃতিক মনে করার কোন সুযোগই নেই।

    দুর্যোগ ও শক ডক্ট্রিন

    নাওমি ক্লেইন দুর্যোগ পুঁজিবাদ ও শক ডক্ট্রিন নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। সে সম্পর্কে অন্যত্র আমরা বিস্তারিত কথা বলেছি। আপাতত এই শক ডক্ট্রিনের প্রয়োগগুলো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন করোনার অজুহাতে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছেন পাবলিক ফাণ্ড থেকে। অথচ করোনার মত মহামারির জন্য এই ধরনের ইন্ডাস্ট্রিগুলো যে দর্শন দ্বারা পরিচালিত হয় তা মূলত নিওলিবারাল পুঁজির দর্শন। এই নিওলিবারাল পুঁজির উদগ্র মুনাফার নেশার বলি বিশ্বজুড়ে প্রাণ-প্রকৃতি। ফলে এমন সব জৈবনিক উপাদান তথা বীজানু উন্মুক্ত হয়ে পড়ে যা ছিল সুপ্ত। কাঁচামালের যোগান ও শিল্পোৎদানের উদ্দেশ্যে প্রকৃতির উপর যে নির্মম উপনিবেশ গড়ে তোলে পুঁজিকেন্দ্রীক দর্শন যার ফলে বনের পর বন উজাড় হতে থাকে, জলাশয় বিনাশ হতে থাকে, কার্বণ নিঃসরণে বায়ু মন্ডলে প্রভাব পড়ে, ওজন স্তর ফুটো হয়ে যায়, মহাকাশে ক্ষতিকর রশ্মি ও সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। এমন সব শিল্প-কারখানাই ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে মহামারির সুযোগে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলো আরো সংকুচিত হচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: ট্রাম্প কিওরভ্যাক
    শিল্পী: ইমাদ হাজ্জাজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ফ্রান্স এবং ইতালিতে করোনার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রীর আগ্রাসী ম্যাস্কুলিনিস্ট ভাষার কারণে আতংকিত মানুষ প্রধানমন্ত্রীকেই সর্বরোগের দাওয়াই ভাবছেন। প্রত্যেক ১০ ইতালীয় নাগরিকের মধ্যে ৭ জন এই মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রীর যেকোন পদক্ষেপকে সমর্থন জানাচ্ছেন। ইতালির মত দেশে, যেখানে কিনা রাজনীতিবিদদের অবিশ্বাস করার ঐতিহাসিক পরম্পরা আছে, সেখানে এই পরিস্থিতি অভিনবই বটে।

    হাঙ্গেরির ভিক্টর ওর্বানের সরকারের কিছুদিন আগে সংসদে এমন আইন পাশ করেছেন যার ফলে তিনি নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী ক্ষমতা উপভোগ করছেন। নির্বাচন, গণভোট তিনি চাইলেই বাতিল করতে পারবেন একক নির্বাহি ক্ষমতাবলে। ‘অস্থিরতা’, ‘উদ্রেক’ সৃষ্টি করতে পারে এমন কোন কথা বলা, ‘মিথ্যা’ তথ্য পরিবেশন করা ‘অপরাধ’ হিশেবে গণ্য হবে এবং এরজন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। কিন্তু কোনটা ‘মিথ্যা’ তা কে ঠিক করবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোন উল্লেখ নেই। আইনের ভাষাকে এতটাই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে যে সরকারের জনস্বাস্থ্য নীতির যেকোন সমালোচনাই এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। এত কঠোর আইনের ফলে কিন্তু বোঝার উপায় নেই যে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে করোনা মোকাবেলায় হাঙ্গেরির অবস্থা সবচাইতে শোচনীয়।
    ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জরুরি ডিক্রি জারির মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান ক্রিমিনাল ট্রায়াল বন্ধ ঘোষণা করেছেন এবং নতুন নির্বাচিত সংসদকে কার্যকর হওয়া থেকে বিরত রেখেছেন। ইজরায়েলের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মহল একে বলছেন ‘করোনা ক্যু’।

    কলোম্বিয়ার রাষ্ট্রীয় কিলিং স্কোয়াড ভিন্নমতাবলম্বী অ্যাক্টিভিস্ট-রাজনৈতিক কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হত্যা করছে এই করোনা লকডাউনের মধ্যেও।

    বাংলাদেশ পরিস্থিতি 

    এ তো গেল বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেয়া শক ডক্ট্রিন। বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা কী?

    বাংলাদেশে গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি চরম ‘স্বাভাবিক’। ১৭ মার্চে মুজিববর্ষকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ফোটানোর মত নির্মম রসিকতা করা হলো এমন একটা অবস্থায় যখন কিনা করোনার আতংক ও রাষ্ট্রীয় হাত সাফাই এর ফলে মানুষ উদ্বিগ্ন, দিশেহারা এবং বিভ্রান্ত। ১৭ মার্চের পরে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবরাখবর মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ জানতে শুরু করে। কিন্তু এমন একটা দুর্যোগের পরিস্থিতিতে কি করতে হবে তার সুস্পষ্ট কোন দিকনির্দেশনা নেই। প্রথম আলোতে প্রকাশিত পুলিশের রিপোর্টের খবর অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে ৬ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন, কেবলমাত্র মার্চ মাসেই দেশে ফিরছেন ৩ লাখ প্রবাসী।

    এদের শারিরীক পরীক্ষার সাধারণ নিয়মগুলোও অনুসরণ করা হয়নি। বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল না। অথচ বলা হয়েছে ঠিকঠাক মত সব পরীক্ষা হচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: হেলথ মিনিস্টার
    সূত্র: ফেসবুক

    শুরুর দিকে চীন থেকে আগতদের আশকোনা হজক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে অনুসরণের পরিবেশ সেখানে ছিল না। পরবর্তীতে যারা এসেছেন তাদের জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা না করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়েছে। আদতে এই প্রবাসীরা দেশে ফিরে কি করবেন, কিভাবে নিজেদের পরিবার ও কমিউনিটির সাথে মিশবেন সে ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট স্বাস্থ্য নির্দেশনা ছিল না । করোনা আক্রান্ত দেশগুলোতে থেকে আগত প্রবাসীরা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। এখন পুলিশ এমনভাবে তাদের ‘ধরা দিতে’ বলছে যেন তারা হুলিয়াপ্রাপ্ত আসামী। অথচ শুরু থেকেই যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এবং জরুরি স্বাস্থ্য  নির্দেশনা থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই প্রবাসীরা দেশে এসে এমন অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে পড়তেন না। দেশের মানুষদের মধ্যেও প্রবাসীভীতি ও জেনোফোবিয়া কাজ করত না। পুরো দেশকেও লকডাউন করে সমাজকে কোয়ারেন্টাইন করার প্রয়োজন পড়ত না।

    এরই মধ্যে শাটডাউন/লকডাউনের আভাস পেতেই বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সিন্ডকেট সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে। আর সমাজের বিপুল বৈষম্য একে আরও উস্কে দিয়েছে। দীর্ঘ সময়ের জন্য পণ্য মজুদ করেছে উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো। বিপরীত চিত্র নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে।

    এছাড়াও করোনা গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের চিরাচরিত অন্যায় আচরণের উছিলাও হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেতন ছাড়াই ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, আগের পাওনা বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না। কর্মি ছাঁটাই চলছে পুরোদমে। ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ৫০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তার সুফল কতটা গার্মেন্টস কর্মিরা পাবেন তা নিয়ে সংশয় আছে। উপরন্তু যে টাকা মালিকের দেবার কথা তা, রাষ্ট্রকে দিয়ে পুরণ করার সহজ অর্থ হল, প্রণোদনার সুফল ভোগী আসলে মালিকই।

    এরমধ্যেই আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ছুটি’ ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের খাতিরে ঢাকায় থাকা মানুষ গ্রামে ছড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। একদিকে করোনা অন্য দিকে শাট ডাউন লক ডাউনের ভয়। একইসঙ্গে পণ্য সরবরাহ অনিশ্চয়তা। ফলে করোনাও সারাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

    সমাজের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত অংশকে বিশেষ প্রণদনা না দেয়া হলেও করোনার জন্য ভারত কর্তৃত্বাধীন সার্ক তহবিলে ১৫ লাখ ডলার দিচ্ছে রাষ্ট্র। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও ঋণের শ্রেণিমানে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁকে খেলাপি করা যাবে না। তবে যদি কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সময়ের মধ্যে ঋণ শোধ করেন, তাঁকে নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। এর সুফল পাবে প্রধানত ব্যাবসায়ীরা।

    মোটের উপর এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রের তরফ থেকে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি তাকে চূড়ান্ত গণবিরোধী অবহেলা ছাড়া অন্য কিছু বলার কোন উপায় নাই। ডাক্তারদের নূন্যতম সুরক্ষা নাই, পিপিই নাই, টেস্ট কিট নাই, জ্বর-সর্দি-কাশি থেকে মৃত্যুর খবর পর্যন্ত আছে, আক্রান্তদের চিকিৎসা করতে গিয়ে ডাক্তাররা আক্রান্ত হচ্ছেন।

    দেশের কোটি কোটি মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের জীবন-জীবিকা-ভবিষ্যত। আমাদের বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না যে এই অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতাকে বজায় রেখেই তথা সমাজকে কোয়ারেন্টাইন করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র প্রবল পরাক্রমে বিরাজ করতে চায়। একক প্রশ্নাতীত নিরঙ্কুশ ক্ষমতার পাটাতনকে পোক্ত করতে চায়।

    জরুরি অবস্থা ও সেনা ফ্যাটিশিজম 

    করোনার কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নেতিবাচকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অর্জিত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী-সরকার-আদালত-বিরোধিদলসমূহ আইন ও সুরক্ষা কাঠামোর সমগ্র রাষ্ট্রপ্রণালীই সামাজিক কোয়ারেন্টাইনকে উপর্যুপরি অনিবার্য করে তুলছে। সমাজকে গলাটিপে হত্যা করাই যেন এই আপাত পরস্পরবিরোধী বিবদমান পক্ষসমূহের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। শরীর থেকে ব্যক্তি, ব্যক্তি থেকে পুরো সমাজকেই করা হচ্ছে কোয়ারেন্টাইন্ড। অনুশাসনের নামে। ‘বৃহত্তর কল্যাণের’ নামে।

    ‘জরুরি অবস্থা’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহুল চর্চিত বিষয়। করোনা মহামারি থেকে তৈরি হওয়া সামাজিক উদ্বেগকে পুঁজি করে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল বেশ কদিন থেকেই। সরকারের বিরোধিতাকারী কোন কোন রাজনৈতিক পক্ষকেও ‘জরুরি অবস্থা’ জারির দাবি জানাতে দেখা গেল। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র এক অনন্ত ‘জরুরি অবস্থা’র মধ্যেই আছে। ঘোষিত জরুরি অবস্থার দাবি জানানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে তার জনগণের উপর অঘোষিতভাবে জরুরি অবস্থা জারি করে রেখেছে তার তাৎপর্যকে লঘু করা হয়। এটা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক নিদারুণ ব্যর্থতাই বটে। এই বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া ‘জরুরি অবস্থা’কে কেবল সাংবিধানিক বন্দোবস্ত হিশেবে বুঝতে চায়, যেন ঘোষণা না দিলে ‘জরুরি অবস্থা’ বিরাজ করতে পারে না। এই রাষ্ট্রবাদী চিন্তাপদ্ধতি একব্যক্তির হাতে একছত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা, আইনি প্রক্রিয়ায় ক্রসফায়ার সহ বিপুল জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের নতুন দাসে পরিণত করার মধ্যে ‘জরুরি অবস্থা’ খুঁজে পায় না। অথচ জরুরি অবস্থাকে এসব প্রবণতার দিক থেকেই বোঝা দরকার।

    আর্টওয়ার্ক: টুগেদার
    শিল্পী: আলি রাস্তু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    করোনাকে কেন্দ্র করে জরুরি অবস্থা জারির দাবি জানানো ইতোমধ্যেই হাজির থাকা ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’র ভয়াবহতাকে অস্বীকার, অন্তত লঘু করে। ইতোমধ্যেই বলবৎ থাকা অঘোষিত জরুরি অবস্থার উপরে যদি আবার ঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, তাহলে তা মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের জন্য। যেটুকু পাবলিক স্পেস কোন না কোন ভাবে রক্ষা করা গেছে এতদিন,  সেটুকুও ঝেটিয়ে বিদায় করা হবে।

    নিপীড়িতের ইতিহাসের মাধ্যমে আমরা জানি, যে জরুরি অবস্থার মধ্যে আমরা আছি, তা নিয়মের ব্যতিক্রম নয়, তা-ই নিয়ম। ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের এই উক্তি সহ ‘জরুরি অবস্থা’র তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে কার্ল স্মিট, জর্জিও আগামবেন ও সলিমুল্লাহ খানের মত পর্যালোচনা করেছেন পারভেজ আলম তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশিত মদিনা বইয়ের ‘আসল জরুরি অবস্থা’ প্রবন্ধে। সার্বভৌম নিয়মের ‘ব্যতিক্রম’ যে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে, সেটাই তার সার্বভৌমত্বের ভিত্তি বলে মনে কর‍তেন কার্ল স্মিট। ফলে সার্বভৌম একইসাথে আইনের ভিতরে এবং বাইরে অবস্থান করে। ওয়াল্টান বেনিয়ামিন মনে করতেন, নিপীড়িতের অবস্থান থেকে বিবেচনা করলে এই জরুরি অবস্থা ‘ব্যতিক্রম’ নয়, বরং নিয়ম। বর্তমান রাষ্ট্রের শাসনপ্রণালীর দিক বিবেচনা করে আগামবেনের মত হল, সদা সর্বদা জরুরি অবস্থা অ্যাকসেপশন নয়, বরং রুল। পারভেজ আলম এই মতগুলোর সুদীর্ঘ পর্যালোচনা হাজির করেছেন এবং এই ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’কে অকার্যকর করে মজলুম জনতা কোন প্রক্রিয়ায় ‘আসল জরুরি অবস্থা’ জারি করতে পারে তার প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এই প্রবন্ধটি। তথাপি, এই প্রবন্ধের একটা বড় দুর্বলতা হলো, যে ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ বাংলাদেশে জারি আছে বলে বহু আগেই লিখেছেন সলিমুল্লাহ খান, সেই ‘জরুরি অবস্থা’কে সংবিধানে বর্ণিত ‘মৌলিক অধিকার’ এর সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন পারভেজ আলম। বাংলাদেশের সংবিধান তার নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেই মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়ার মাধ্যমে এক প্যারাডক্স হাজির করেছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি এবং এর মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ‘অসাংবিধানিক’ বলতে চেয়েছেন। আসলে, বাংলাদেশে যে ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে, তার একটা শক্ত সাংবিধানিক ভিত্তি আছে। যার ফলে সংবিধানে জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত কোন বিশেষ অনুচ্ছেদ এমনকি যদি নাও থাকে, গোটা সংবিধানের ক্ষমতাবিন্যাস এক ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ কায়েম করে। সংবিধানবর্হিভূত ক্ষমতাকে নিত্যদিনের চর্চায় পরিণত করার মাধ্যমে ‘ব্যতিক্রম’কে ‘নিয়মে’ পরিণত করার যে রাষ্ট্রদর্শন, তাকে সংবিধানসম্মত করার এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী। পারভেজ আলমের সাথে আমরা অন্তত এক্ষেত্রে একমত যে আওয়ামীলীগ সরকার এই ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’র ধারাবাহিকতাই কেবল নয়, ‘প্রকটতম আত্মপ্রকাশ’ (পারভেজ/২০২০: ২৫৩)। আমরা কেবল বলতে চাই, এই ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ সাংবিধানিকভাবেই জারি আছে।

    এখানে সংবিধান সম্মতভাবেই সমস্ত ক্ষমতা প্রধান নির্বাহির হাতে ন্যস্ত। ফলে তিনি চাইলেই নিপীড়ন-নিবর্তনের এমন সীমানায় পৌঁছাতে পারেন, যা আসলে আপাতদৃষ্টে আইনের ‘ব্যতিক্রম’ মনে হতে পারে। কিন্তু সংবিধানই তাকে এই ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে। তাহলে এই সীমাহীন ক্ষমতাকে ‘সাংবিধানিক’ না বলে কোন উপায় আছে? এমন ক্ষেত্রে ডিজিটাল আইন যদি প্রণীত হয় সেই একব্যক্তির ইচ্ছায়, তাকেও কি ‘অসাংবিধানিক’ বলা যায়? আবার বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের ‘মৌলিক অধিকার’ নিশ্চিত করেছে বলে মনে হলেও, যদি সংবিধানের ৩২ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদ গভীরভাবে পড়া যায় সেখানে উল্লেখিত ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘সাপেক্ষে’, ‘আইনানুযায়ী’, ‘যৌক্তিক বাধা নিষেধ সাপেক্ষে’, তাহলে এটা স্পষ্ট হয় যে, আসলে সংবিধান একদিকে নাগরিকদের অনেক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে বলে মনে হলেও, সমস্ত অধিকারই আসলে কেড়ে নিয়েছে। এই কেড়ে নেয়ার জন্য কোন ‘বিশেষ আইন’ এর দরকার পড়েনা। অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব, আপাতত দুটো উদাহরণই যথেষ্ট মনে করছি। যেমন ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে ‘আইনানুযায়ী ব্যতিত কোন ব্যক্তিকে জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবেনা’, তার মানে কি ‘আইনানুযায়ী’ বঞ্চিত করা যাইবে? এই ‘আইনানুযায়ীর’ প্যারামিটার কে ঠিক করবে? আইন যদি হয় আনচ্যালেঞ্জড একব্যক্তির হাতে সোপর্দ তাহলে সেই আইন তো অথরিটি মাত্র!

    ৪৬ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে ‘এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানাবলীতে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন কিংবা ঐ অঞ্চলে প্রদত্ত কোন দন্ডাদেশ, দন্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোন কার্যকে বৈধ করিয়া লইতে পারিবেন।’

    এই অনুচ্ছেদের ‘অন্য কোন ব্যক্তি’, ‘শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে’, ‘কোন কার্য’ শব্দবন্ধনীগুলো বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এই শব্দবন্ধনীগুলো মারাত্মকভাবে অনির্দিষ্ট এবং অস্পষ্ট।

    ফলে, আসলে, ‘স্বাভাবিক/অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ জারি আছে ঠিকই, তা সংবিধানের ব্যত্যয় কিংবা ‘বেআইনি’ নয়, প্রবলভাবে সাংবিধানিক এবং এটা এই দেশের মানুষের সাথে চলমান সবচাইতে নির্মম ডার্ক হিউমার।

    ‘জরুরি অবস্থা’ সংক্রান্ত এই আলাপগুলো আপাত অর্থে মহামারি পরিস্থিতি কিংবা জনস্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহামারি সম্পর্কে জনতাকে সম্যক অবহিত না করে, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না দিয়ে, মহামারি বিস্তারের আশংকার মধ্যে বিভ্রান্তিকর ‘ছুটি’ ঘোষণা করে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর খবর মিডিয়ায় প্রচার করে রাষ্ট্র একইসাথে তার গরীব জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রবল শ্রেণীঘৃণা ও অবহেলা জাহির করল। আবার ঔপনিবেশিক শিক্ষায় দীক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের কাছে গ্রহণযোগ্যও হতে চাইল।
    এতে করে আরো প্রমাণিত হয়, রাষ্ট্রের কাছে মহামারি সামাজিক শক্তিকে রুদ্ধ করার এক মোক্ষম উপলক্ষ্যই বটে।

    সেনা-পুলিশ-আইনরক্ষী দিয়ে কানধরে উঠবস করানো, মারধোর করা (কোন রকম জরুরি অবস্থা ঘোষণার দরকার পড়ছে না কিন্তু! ) প্রমাণ করে মহামারি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং মহামারি যে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও সংকটকে উন্মোচন করছে, তার বিরুদ্ধে সামাজিক বিদ্রোহ যেন না হয় সেজন্যই সমাজকে কোয়ারেন্টাইন করার উদ্দেশ্যেই এইসব পদক্ষেপ।

    মহামারি যেন শাসনের সঙ্গে শরীরের, রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। দীপেশ যথার্থই বলেছেন, মহামারি, মড়ক বা দুর্ভিক্ষ বিষয়ক যেসকল ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা পাওয়া যায়, তা একটা সাধারণ সূত্রের নির্দেশ করে-তা হল রাষ্ট্র বনাম সমাজ বা গোষ্ঠীর সংঘর্ষের ইতিহাস। মহামারির ইতিহাস ঘাঁটলে একথাই মনে হয় যে ‘সমাজ’ এর চোখে রাষ্ট্র অনেকসময়ই একটি বাইরের অনুপ্রবেশকারী শক্তি। তাই জনমানসের মহামারি চিন্তায় একটি রাজনৈতিক বিষয় থাকে যার প্রকাশ অনায়াসেই রাষ্ট্রবিরোধিতা হতে পারে। দ্বিতীয়ত দেখা যায়, মহামারিকে ঘিরে ‘সমাজ’ এর আত্মসংবদ্ধ হবার প্রয়াস। (দীপেশ/২০১৬: ৫৯)

    বাংলাদেশেও আমরা দেখছি, করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে। কমিউনিটি পর্যায়ে করোনা প্রতিরোধের সংকল্প। ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগে ভলান্টারি কার্যক্রম, উপদ্রুত ও সবচাইতে দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের সহায়তা করা, পিপিই বানানো, রিলিফ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক বানানো ও বিতরণ করা। নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রের জন্য এই সামাজিক শক্তি করোনার চাইতে বেশি আতংকের। কারণ করোনা পরবর্তী সময়ে এই সামাজিক যূথবদ্ধতা, যা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অনাচারে নিষ্পেষিত, তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে নিজে কোয়ারেন্টাইন্ড হওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রকেই কোয়ারেন্টাইন করে ফেলতে পারে। (রাষ্ট্রের জন্য) সে বড় বিপদের কথা!

    প্রয়োজন সামাজিক সংহতি 

    করোনা ভাইরাসই কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের সামনে হাজির হওয়া একমাত্র বিপদ নয়। বরং করোনাকে পুঁজি করে যে রাষ্ট্রশক্তি সমস্ত রকমের স্বাধীনতা-সৃজনশীলতা-সংহতির পথকে রুদ্ধ করতে চায়, সেই রাষ্ট্রশক্তি কিন্তু করোনার চাইতেও অধিকতর বিপদের। এরকম নিরঙ্কুশ গণবিরোধী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সংহতির কোন বিকল্প নাই। করোনার কালে আমাদের দরকার সর্বোচ্চ সামাজিক সচেতনতা, শারীরিক দুরত্ব ও সামাজিক সংহতি।

    চিরকালই পারস্পরিক সহমর্মিতা সমাজশক্তি বিকাশের পথ। স্বাধীনতাশীল সমাজ মানেই স্বয়ংক্রিয় সমাজ। এ ধরনের সমাজে স্ব-শাসনই হলো উৎকৃষ্ট ম্যানেজমেন্ট। একবার ভাবুন, নিদেনপক্ষে  স্থানীয় সরকার বলতে যদি কিছু আমাদের দেশে থাকত (যা আছে সেগুলো মূলত সংসদ তথা প্রধানমন্ত্রীর অধীন কেন্দ্রীয় শাসনের স্থানীয় এক্সটেনশন মাত্র), তাহলে করোনার মত এরকম একটা সংকটে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারত তারা! কেন্দ্রীয় শাসনের খবরদারি মুক্ত স্থানীয় সরকার কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত সামাজিক শক্তির একটা নিদর্শন। এরকম স্থানীয় সরকার সহ সামাজিক উদ্যোগ না থাকায় গোটা দেশ তাকিয়ে থেকেছে একব্যক্তির নির্দেশের অপেক্ষায়।

    আমাদের দেশে সত্যিকারের স্বাধীন সংগঠন না থাকায় আমাদের সামাজিক সংহতি নেই বললেই চলে। অন্যান্য অনেক কিছুর মত করোনা সমাজ সংগঠন তৈরির কর্তব্যও হাজির করেছে।

    সমাজের উত্থান মানে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজ সংগঠন ও সেল্ফ ম্যানেজমেন্ট। অন্যদিকে রাষ্ট্র যেখানে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী সেখানে তাকে মানুষের অধিকার বাস্তবায়নে বাধ্য করা এবং মানবমুক্তির পথকে সে আদলেই প্রসারিত করা। তাহলে করোনাকে মোকাবেলার পাশাপাশি আমরা সমাজকেও কোয়ারেন্টাইন মুক্ত করতে পারব এবং সেই কাজটা শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

    তথ্যপঞ্জি 

    সারোয়ার তুষার (২০১৯) মিশেল ফুকো: শাসনপ্রণালী ও জৈবক্ষমতার কথকতা; সময়ের ব্যবেচ্ছদ, গ্রন্থিক ঢাকা।

    বিনায়ক সেন (২০১৯) ক্ষমতা প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো, কালের খেয়া, ঢাকা।

    আরিফ রেজা মাহমুদ ( ২০২০) করোনা, কোয়ারেন্টাইন, কর্তৃত্ববাদ; অরাজ, ঢাকা।

    দীপেশ চক্রবর্তী ( ২০১৬) শরীর, সমাজ ও রাষ্ট্র: ঔপনিবেশিক ভারতে মহামারি ও সংস্কৃতি; ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ ; আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, কলকাতা

    পারভেজ আলম (২০২০) আসল জরুরি অবস্থা, মদিনা; আদর্শ প্রকাশনি, ২০২০, ঢাকা।

  • করোনা, কোয়ারেন্টাইন ও কর্তৃত্ববাদ

    করোনা, কোয়ারেন্টাইন ও কর্তৃত্ববাদ

    • আরিফ রেজা মাহমুদ

    এক.
    লাগাম ছাড়া লগ্নিপুঁজি এবং তার মুনাফার নেশা এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করে যার ভেতরে নিহিত থাকে প্রকৃতি এবং তার শৃঙ্খল বিনাসী তৎপরতা। ফলশ্রুতিতে এমনসব জৈব-জৈবনিক উপাদান তথা বীজানু উন্মুক্ত হয়ে পড়ে যা ছিল এতদিন সুপ্ত।

    আর্টওয়ার্ক: ডলার সাইন
    শিল্পী: এলিহু দুয়ায়ের
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অতি উৎপাদন, কাঁচামালের যোগান, শিল্পোৎপাদনের জন্য বন উজাড়, জলাশয় বিনাস, কার্বন নিঃসরণে বায়ু দূষণ ও বায়ুমন্ডলে প্রভাব, ওজন স্তর ফুটো করে ফেলা এবং মহাকাশের নানা রশ্মির প্রভাব, সাগরের পানি উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা সৃষ্টি ইত্যাদি পুঁজিবাদী শিল্পোৎপাদনেরই ফল। মুনাফার লোভ প্রাণ-প্রকৃতিকে শুধু ধ্বংসই করে না, তৈরি করে এমন একটা ব্যবস্থা যার উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে পুরো সামাজিক জীবন।

    পুঁজিবাদ আর এই সামাজিক জীবনের রক্ষণভাগই হল আধুনিক রাষ্ট্র– একটা সার্বভৌম ক্ষমতা যা পুরো সিস্টেমটাকে অভিভাবকের মতো দেখভাল করে আর কোথাও কোন বিচ্যুতি ঘটলে তাকে ঠিকঠাক করতে আরও দক্ষভাবে প্রয়োগ করে তার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতা। বলাই বাহুল্য এই নিয়ন্ত্রণ শুধু বল প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তৈরি করা হয় তার শর্ত এবং প্রতিনিয়ত স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে বহাল থাকে জীবন্ত কর্তৃত্ব।

    স্বাস্থ্য বলতে পুঁজিবাদ বোঝে না তার নাগরিকের জীবনের সুস্থতা। স্বাস্থ্য তার কাছে একটি মুনাফামুখিন খাত। বৈষম্য টিকিয়ে রেখে তার ভেতরেই রোগনিরাময়কে একটি অর্থনৈতিক চাহিদা হিসাবে গঠন করে পুঁজিবাদ। আর তাই মহামারি এবং আক্রান্ত তার কাছে নতুন ভোক্তার আবির্ভাব। এটা ততটুকুই বিপজ্জনক যতটুকু তা শ্রেণী সংহত একটা ব্যবস্থায় এলিট শাসক গোষ্ঠী ও তার দুর্ভেদ্য প্রাচীরকে আক্রান্ত করে।

    তাই মহামারী হয়ে ওঠে রাষ্ট্রর ম্যানেজমেন্টের বিষয়। একদিকে যেমন মহামারী মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, অন্যদিকে মহামারি ম্যানেজমেন্ট রাষ্ট্রকে এনে দেয় নাগরিকের উপর যাবতীয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপের শর্ত। একটা কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ক্ষমতা চর্চা।

    দুই.
    করোনা শুধু একটি সংক্রমণী ভাইরাস নয়। একই সঙ্গে ভয়– নিরেট ভয়ের সংস্কৃতি। একটি গণআতঙ্ক। এই আতঙ্ক বিস্তৃত হয় মন থেকে সমাজশরীরে। পুরো সমাজের সংবহনতন্ত্রকেই আক্রান্ত করে ভয়। এই ভয়ই দাবি করে শাসকীয় একশন। একেবারে বিদ্যুতবৎ একশন। ভয়কে ভিত্তি করেই সমাজের চিরায়ত এলাকায় ঢুকে পড়ে রাষ্ট্র কর্তৃত্বর শুঁড়।

    ভয়ের সমানুভূতির উপরেই দণ্ডায়মান হয় রাষ্ট্র। ভীত জনগণের সামনে এবার নির্মিত হয় এক ‘জাতীয় শত্রু’– করোনা।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা প্যানিক
    শিল্পী: পেড্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই ‘জাতীয় শত্রু’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পার্টনার মিডিয়া। রাষ্ট্র- মিডিয়া মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে। মিথোজীবিতার ভিত্তি ‘জাতীয় শত্রু’ নিধন নয়– জাতীয় শত্রুর ভীতি এবং রাষ্ট্রর সর্বশক্তিমান রূপকে কাঙ্খিত করে তোলা। বল প্রয়োগ ও নিবর্তনমূলক ব্যবস্থাকে পাবলিক স্মৃতিতে সর্বাত্মক করে তোলা।

    ভয় উৎপাদন,  সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক করে তোলে।

    তিন.
    রাষ্ট্র স্বয়ং প্রপাগান্ডা– কর্তৃত্ববাদেরই অমোঘ পরিণতি। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে এক ও অদ্বিতীয় তথ্যকেন্দ্র। তথ্য তা-ই যা রাষ্ট্র সার্টিফাই করে। মিডিয়া আর সমগ্র প্রচার মাধ্যম তার বাহনমাত্র।

    আর্টওয়ার্ক: সেল্ফ এক্লোজার
    শিল্পী: এলিনা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাষ্ট্র শুধু ফরমান বা ঘোষণায় হাজির করে না। পটু হয়ে ওঠে মিথ্যাকে অবলীলায় কার্যকরী করে তুলতে। গুজবের জুজু রচনা করে রাষ্ট্র। আর একইসঙ্গে পরিণত হয় সকল ‘সত্য’র রচনাকারী নিউস্পিকে।

    রাষ্ট্র হাজির করে সংখ্যা ব্যবস্থাপনার রাজনীতি। যেখানে অধিকাংশ সময় থাকে ধাঁধা। এই ধাঁধা তৈরি হয় সবসময় খারাপ কোন উদাহরণকে বেছে নিয়ে এবং তারপর মহান নেতা নেত্রীকে প্রতীক বানিয়ে তার সাফল্য ও স্তুতি রচনা করে রাষ্ট্র। প্রতীকস্বয়ং রাষ্ট্রপ্রসূত!!

    শুধু প্রতীক পূজা নয়, প্রতিটি নিউস্পিকের
    পক্ষ- বিপক্ষ দ্বিত্ব নির্মাণ করে রাষ্ট্র। আর বহুবর্ণিল মতের ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করে এই দ্বিত্বতে আটকে।

    চার.
    নতুন ধরনের সভেরিন পাওয়ার তৈরি হচ্ছে, যেটা ‘সচেতনতা’র উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ‘সচেতনতা’ নিয়ন্ত্রণ কৃৎ-কৌশলের আরও আরও প্রকরণকে অবিসম্ভাবী করে তোলে। নজরদারি যা এতদিন ছিল একটা রাজনৈতিক লক্ষ্য তা এখন নিপাট জীবন ও আচরণকে নতুন মূল্যবোধে আটক করছে আর এটাই হয়ে উঠছে নিয়মিত!

    সচেতনতাকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করে পুরো পাবলিক পরিসরই, অ-সচেতনতাকে শুধু দোষারোপই করে না, অ-সচেতনতা হয়ে ওঠে সরাসরি সেনা- পুলিশ- রাষ্ট্রর চিরুনি অভিযানের লক্ষ্য।

    প্রতিটি শরীর একদিকে যেমন সন্দেহভাজন, অন্যদিকে প্রতিটি আচরণই তৈরি করে একটি ‘সতর্ক’ অবস্থা।

    প্রধানমন্ত্রী-সরকার ও বিরোধীদলসমূহ- আইন ও সুরক্ষা কাঠামো সমগ্র রাষ্ট্রপ্রণালীই কোয়ারেন্টাইনকে উপর্যুপরি ব্রিডিং করছে আর তার নতুন নতুন সংস্করণ হাজির হচ্ছে। শরীর থেকে ব্যক্তি, ব্যক্তি থেকে সমাজ সংবহনতন্ত্র কোয়ারেন্টাইনড। কোয়ারেন্টাইন এখন সামাজিক চুক্তি!

    আর্টওয়ার্ক: কোয়ারেন্টিনা
    শিল্পী: বেকস
    সূত্র কার্টুন মুভমেন্ট

    আমরা এখন এমন এক বিন্দুতে যেখান থেকে ক্ষমতাকে চিনে নেয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

    কর্তৃত্ববাদী একটা ব্যবস্থায় সচেনতা অপরিহার্য করে তোলে যাবতীয় নিবর্তনমূলকপন্থাকে। সমাজ ও কমিউনিটির আত্ম উপলব্ধির উত্থান ছাড়া আত্মশক্তি গড়ে ওঠে না।

    সচেতনতা মনে সমাজ অবরুদ্ধকরণ নয়। সচেতনতা মানে সামজিক উত্থানের পরিসরকে প্রশস্তকরণ। সমাজ ছাড়া শরীর বা ব্যক্তি বাঁচে না। পরিণত হয় অর্থহীন জিন্দা লাশে।

  • নাওমি ক্লেইন।। করোনা পুঁজিবাদ ও প্রতিরোধের রাজনীতি

    নাওমি ক্লেইন।। করোনা পুঁজিবাদ ও প্রতিরোধের রাজনীতি

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার 

    আর্টওয়ার্ক: ফ্যানাটিক ভাইরাস
    শিল্পী: মিগুয়েল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অনুবাদকের ভূমিকা
    গত ১৭ই মার্চ, ২০২০ এ The Intercept  অনলাইন পোর্টালে কানাডিয়ান লেখক, সামাজিক ও জলবায়ু আন্দোলনের তাত্ত্বিক-অ্যাক্টিভিস্ট নাওমি ক্লেইনের একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি করোনা মহামারির ফলে সৃষ্ট নজিরবিহীন সংকট ও সংকটকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক (more…)

  • জাস্টিন ওরল্যান্ড।। গণস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারি

    জাস্টিন ওরল্যান্ড।। গণস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মহামারি

    অনুবাদ: মোহাম্মদ শাহিন

    আর্টওয়ার্ক: ক্লাইমেট চেঞ্জ
    শিল্পী: বাতিস্তা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ভূমিকা
    দুনিয়ার জমিনে কোনো ঘটনা বা দূর্যোগ হঠাৎ করে নাজিল হয় না। এর পেছনে আর্থ-সামাজিক-অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রভাবকের পরিপ্রেক্ষিতেই সেই ঘটনার বা দূর্যোগের জমিন নির্মাণ হয়। তাই, গাছের রোগ ধরতে ডালপালার আগে এর গোড়ায় সংঘটিত কার্য-কারণের খোঁজ করা (more…)

  • নাওমি ক্লেইন।। দুর্যোগ পুঁজিবাদের জন্য মোক্ষম সুযোগ করোনা ভাইরাস

    নাওমি ক্লেইন।। দুর্যোগ পুঁজিবাদের জন্য মোক্ষম সুযোগ করোনা ভাইরাস

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার 

    আর্টওয়ার্ক: নাওমি ক্লেইন
    সূত্র : ডিপি

    অনুবাদকের ভূমিকা: কানাডিয়ান লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট নাওমি ক্লেইন ২০০৭ সালে Shock Doctrine : The Rise of Disaster Capitalism নামে একটি বই লেখেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কীভাবে নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকে মূলত সংকট তৈরি করে এবং সংকটকে কাজে লাগিয়ে। তিনি দেখিয়েছেন ১৯৭৩ সালের চিলি থেকে শুরু করে ইরাক পর্যন্ত কীভাবে মিল্টন ফ্রিডম্যানের ‘মুক্ত-বাজার অর্থনীতি’র প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্ব বাস্তবায়ন করা হয়েছে ‘শক থেরাপি’র মাধ্যমে। বিশ্বের উন্নত, অনুন্নত দেশ নির্বিশেষে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কাজে লাগিয়ে (কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্যোগ সৃষ্টি করে) নয়া উদারবাদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিট ও আন্তর্জাতিক কর্পোরেট মহল তাদের প্রতিক্রিয়াশীল, আরোপিত নীতি গ্রহণে বিশ্বের জনপদগুলোকে বাধ্য করে এবং একের পর এক অঞ্চলের নিজস্ব রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি সহ গোটা জীবনযাপন মুখ থুবড়ে পড়ে। ক্লেইন একে বলছেন ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ (Disaster Capitalism)। স্থানিক রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির স্বচ্ছন্দ বিকাশকে শক থেরাপির মাধ্যমে স্তব্ধ করাই যার মূল্য লক্ষ্য। এইভাবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিটদের আরোপিত প্রতিক্রিয়াশীল নীতি চাপিয়ে দেয়ার মতবাদই ‘শক ডক্ট্রিন’ (Shock Doctrine)।

    গোটা পৃথিবী করোনা ভাইরাসের থাবায় পর্যুদস্ত। ইতোমধ্যেই অসংখ্য মানুষ নিহত ও আরো বেশি সংখ্যক মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। থমকে গেছে গোটা পৃথিবী। সমস্ত রকমের সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। ক্লেইন এই সাক্ষাতকারে দাবি করছেন, তাঁর দুই দশকের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আঁচ করতে পারছেন, এ রকম একটা নজিরবিহীন সংকট ও সংকট-পরবর্তী সময়কে কীভাবে বিশ্বের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এলিটরা তাদের ফায়দা লোটার কাজে লাগাতে পারে।

    যে নীতিগুলো হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গ্রহণ করলে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হতো রাষ্ট্রসমূহকে, সেই নীতিগুলোই এখন দুর্যোগের অজুহাতে অনায়াসে চাপিয়ে দেয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা খাতগুলোকে সংকুচিত করে কর্পোরেট শিল্পখাতগুলোকে বিশেষ আর্থিক ভর্তুকি দেয়ার পাঁয়তারা চলছে, যে কর্পোরেশনগুলো আসলে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই রকম সংকটের জন্য দায়ী। অন্যদিকে সবেতন ছুটির অধিকার না থাকায় শ্রমজীবী মানুষকে অসুস্থতা নিয়েও কাজে যেতে হচ্ছে। আবার চীনা সরকার ঘোষণা দিয়েছে, সংকট ‘কাটিয়ে উঠতে’ তারা যেসব পরিবেশগত মান ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে মানতে হত, তা শিথিল করবে।

    বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে ‘জরুরি অবস্থা’ জারির পাঁয়তারা চলছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম বলছেন, ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ আর ‘প্রক্লেমেশন অব ইমার্জেন্সি’ এক কথা নয়। আমাদের একদিকে ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করা দরকার এবং অন্যদিকে মানুষ যাতে সরকারের উপর নজরদারি এবং সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি নিয়ে আরো বেশি কথা বলতে পারে তার জন্য স্বাধীনতাও দরকার । মেডিকেল ইমার্জেন্সির অজুহাতে ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে মানুষের যতটুকু বাক স্বাধীনতা আছে তাও কেড়ে নিলে, এ বিপর্যয় থেকে এখানকার মানুষদের রক্ষা করা যাবে না। ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করার অর্থ হচ্ছে সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারসমূহ রদ করা যাবে এবং এ নিয়ে আদালতে চাইলেই রিট করা যাবে না। করোনার মত দুর্যোগে আমাদের দরকার নিরাপদ থেকে পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখা। সামাজিক সংহতিকে সুদৃঢ় করা। কোনভাবেই এমন কোন দাবি জানানো উচিত নয় যা আদতে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে আরো সুসংহত করে। করোনার কালে আমাদের দরকার শারীরিক দুরত্ব ও সামাজিক সংহতি। আমাদের দরকার আতঙ্ককগ্রস্ত না হয়ে সর্বোচ্চ সক্রিয়তা ও সতর্কতা। ভিন্নভাবে সমাজকে সংগঠিত করতে পারার মত একাগ্রতা ও রূপকল্প।

    নিশ্চিতভাবেই করোনা পূর্ববর্তী পৃথিবী ও করোনা-উত্তর পৃথিবী এক রকম থাকবে না। খুব ভালো কিংবা আরো খারাপ দুই সম্ভাবনাই আছে। মহামারির মত এরকম জরুরি পরিস্থিতি কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য বেশ ভালো ছুতা। ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত করা, ‘জনকল্যাণ’ এর নামে যেকোন ডিক্রি জারির করতে পারার পক্ষে একটা জনসম্মতি তৈরি হয়ে থাকে এই সময়ে। আবার যারা ভিন্নভাবে সমাজকে সংগঠিত করতে চায়, তাদের যদি পরিস্কার বোঝাপড়া থাকে, পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকে; তাহলে মহামারির সুযোগে রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক এলিট কর্তৃক সমাজকে আরো সংকুচিত করার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার হতে পারবে।

    এই প্রেক্ষিতেই নাওমি ক্লেইনের শক ডক্ট্রিন ও দুর্যোগ পুঁজিবাদের পাঠ করা দরকার আমাদের। চিন্তা ও তৎপরতার মাধ্যমে নয়া উদারবাদী রাজনৈতিক-অর্থনীতির ‘শক’ এর বিরুদ্ধে গণমানুষকে সংগঠিত করা দরকার। তাহলেই কেবল আমরা বর্তমান ‘দুর্যোগ’ এবং ভবিষ্যত ‘দুর্যোগ’ এর সম্ভাবনাকে নাকচ করতে পারব।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড- ১৯
    শিল্পী: আন্দ্র পেসিয়া
    সূত্র : কার্টুন মুভমেন্ট

    বৈশ্বিক মহামারির সংকট থেকে সরকার ও বৈশ্বিক এলিটদের ফায়দা লুট সংক্রান্ত নাওমি ক্লেইনের বিশ্লেষণ

    করোনাভাইরাস আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত একটি বৈশ্বিক মহামারি যা এ পর্যন্ত সার্সের (Severe acute respiratory syndrome) চেয়ে ১০ গুণ বেশি লোককে সংক্রমিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, যাদুঘর এবং থিয়েটারগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এবং সম্ভবত খুব শীঘ্রই, সবগুলো শহরও একই পরিণতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে কিছু লোক যাঁরা আশংকা প্রকাশ করেছেন যে তারা COVID-19 নামে পরিচিত ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন, তারা তাদের প্রাত্যহিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ আমাদের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় সিস্টেমেটিক ব্যর্থতার কারণে বেতনভুক্ত অবসরের সুবিধা নেই।

    কী করতে হবে বা কার কথা আমলে নিতে হবে সে ব্যাপারে আমাদের বেশিরভাগই নিশ্চিত না। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রসমূহের সুপারিশগুলোর সাথে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বার্তা সাংঘর্ষিক এবং এই মিশ্র বার্তাসমূহ অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসের ক্ষয়-ক্ষতি প্রশমিত করার ক্ষেত্রে আমাদের সময়কে আরও সংকুচিত করেছে।

    এই হলো সেই মোক্ষম পরিস্থিতি যখন আমরা সকলে উদ্বিগ্ন থাকার ফলে সরকার ও বৈশ্বিক এলিটদের পক্ষে এমন সব রাজনৈতিক এজেণ্ডা চরিতার্থ করা সম্ভব হয় যা অন্যক্ষেত্রে প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারত। এহেন ঘটনাপ্রবাহ কেবল করোনভাইরাস দ্বারা উদ্ভূত সংকটের ক্ষেত্রেই অনন্য তা নয়; বরং রাজনীতিবিদ এবং সরকারসমূহ কয়েক দশক ধরে ‘শক ডকট্রিন’ হিশেবে পরিচিত এই নীলনকশাই অনুসরণ করে আসছে। অ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক নাওমি ক্লেইম ২০০৭ সালে লিখিত বইয়ে একেই ‘শক ডকট্রিন’ হিশেবে অভিহিত করেছেন।

    ইতিহাস হচ্ছে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সঙ্কট এর আঘাত এবং আঘাত পরবর্তী পরিণতির প্রবাহমানতা। ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ (Disaster Capitalism)-এ এই পরিণতিকেই রূপায়িত করা হয়। পূর্বনির্ধারিত, মুক্ত-বাজার ‘সমাধান’ দ্বারা সংকটগুলোর যে ‘সমাধান’ হাজির করা হয় তা বিদ্যমান বৈষম্য ও শোষণকে আরো তীব্র করে তোলে।

    ক্লেইন বলেন যে, আমরা ইতিমধ্যেই দুর্যোগ পুঁজিবাদকে জাতীয় পর্যায়ে প্রবল পরাক্রমে বিরাজ করতে দেখছি; করোনা ভাইরাসের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ৭০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উদ্দীপক প্যাকেজ প্রস্তাব করেছেন যা পে-রোল ট্যাক্সকে সংকুচিত করার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তাকে ধ্বংস করবে এবং মহামারির বদৌলতে ব্যবসায় লোকসানের শিকার হওয়া শিল্পখাতগুলোকে সহায়তা প্রদানের মত কর্মসূচিকে অন্তর্ভূক্ত করবে।

    ক্লেইনের ভাস্যমতে, ‘তারা এটা এজন্য করছে না যে তারা মনে করে মহামারির ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার এটাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা ; বরং তারা এটা এজন্য করছে যে আগে থেকেই পরিকল্পিত এসব কৌশল বাস্তবায়নের একটা মওকা তাদের সামনে হাজির হয়েছে’।

    করোনাভাইরাসের ‘আঘাত’ কীভাবে এক দশকেরও বেশি সময় আগে তাঁর বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহের পরিসর তৈরি করছে সেই ব্যাপারে ‘VICE’ ক্লেইনের সাথে আলাপ করেছে।

    প্রশ্ন : একেবারে গোড়া থেকে শুরু করা যাক। দুর্যোগ পুঁজিবাদ কী? ‘শক মতবাদ’ এর সাথে এর সম্পর্ক কী?

    নাওমি ক্লেইন : দুর্যোগ পুঁজিবাদকে আমি যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছি তা সত্যিই সোজাসাপ্টা। এটি বেসরকারি শিল্পগুলো যেভাবে বড় আকারের সঙ্কট থেকে সরাসরি মুনাফার জন্য চাঙ্গা হয় তার বিবরণী পেশ করে। দুর্যোগ ও যুদ্ধ থেকে মুনাফা অর্জনের ধারণা নতুন কিছু নয়, তবে বুশ প্রশাসনের অধীনে ৯/১১’র পরে এই প্রবণতা আরো গভীরতর হয়েছে। যখন প্রশাসন এই ধরনের অনন্ত নিরাপত্তা সঙ্কট ঘোষণা করেছিল এবং একই সাথে এটি বেসরকারিকরণ ও আউটসোর্স করেছিল — এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল অভ্যন্তরীণ বেসরকারি সুরক্ষা রাষ্ট্রের পাশাপাশি ইরাক ও আফগানিস্তানের [বেসরকারি] আক্রমণ ও দখল। ‘শক ডকট্রিন’ হ’ল বড় আকারের সংকটকে পুঁজি করে বৈষম্যকে পদ্ধতিগতভাবে আরও গভীরতর করে তোলার রাজনৈতিক কৌশল যা এলিটদের আরো সমৃদ্ধ করে এবং অন্য সকলকে আরো নিঃশেষ করে। সংকটের মুহুর্তগুলোতে, মানুষ সাধারণত সেই সংকট উতরানোর নিত্যনৈমিত্তিক জরুরি পরিস্থিতির দিকেই মনোনিবেশ করে; এবং যাই হোক না কেন ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের উপর খুব বেশি ভরসা রাখার প্রতি ঝোঁক থাকে। সঙ্কটের মুহুর্তগুলোতে আমরা সাধারণত মূল ঘটনা থেকে আমাদের নজর কিছুটা হলেও অন্যত্র সরিয়ে নেই।

    প্রশ্ন : রাজনৈতিক কৌশলটি কোথা থেকে আসে? আমেরিকান রাজনীতিতে আপনি এর ইতিহাস কীভাবে চিহ্নিত করবেন?

    নাওমি ক্লেইন : শক-মতবাদ কৌশলটি এফডিআরের অধীনে মূল নতুন চুক্তির প্রতিক্রিয়া হিসাবে ছিল। অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান বিশ্বাস করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দা ও ধূলোঝড়ের প্রতিক্রিয়ায় গৃহীত নতুন চুক্তির অধীনে সমস্ত কিছু ভুল হয়েছে। দেশে অধিকতর সক্রিয় সরকার গড়ে উঠেছে, যা কিনা সরকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ত্রাণ সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রত্যক্ষ সমাধানকে নিজের লক্ষ্য হিশেবে নিয়েছিল। আপনি যদি মুক্তবাজার অর্থনীতির কট্টরপন্থী সমর্থক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি জানেন যে, যখন বাজার ধসে পড়ে তখন তা, বড় বড় করপোরেশানগুলোর স্বার্থ উদ্ধার করে এমন নিয়ন্ত্রণবিহীন পলিসি গ্রহণের চেয়ে বরং অধিক স্বতস্ফূর্তভাবে নিজেকে প্রগতিশীল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ প্রগতিশীল নীতিসমূহের আবির্ভাব ঘটে যেইসব মুহূর্তে সেসব মুহূর্তকে পথ ছেড়ে দিলে যে ‘সংকট’ তৈরি হবে তাকে প্রতিহত করার জন্যই শক ডকট্রিনের আবির্ভাব ঘটেছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এলিটরা বুঝতে পারে যে সংকটের মুহুর্তগুলোই তাদের অজনপ্রিয় নীতিসমূহের তালিকা চাপিয়ে দেয়ার মোক্ষম সময়, যার এই দেশে এবং বিশ্বজুড়ে সম্পদের আরো মেরুকরণ সম্ভব হয়।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা প্যানিক
    শিল্পী: পেড্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রশ্ন : এই মুহুর্তে আমাদের একাধিক সংকট ঘটমান: একটি মহামারি, এটির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা এবং পতনোন্মুখ স্টক মার্কেট। আপনি কি ব্যাখ্যা করবেন আপনার শক মতবাদ প্রকল্পের সাথে এই প্রত্যেকটি উপাদান কীভাবে খাপ খায়?

    নাওমি ক্লেইন : আসলে ভাইরাস নিজেই একটা শক । এবং এটি এমনভাবে ব্যবস্থাপিত হয়েছে যা বিভ্রান্তি বাড়িয়ে সুরক্ষা হ্রাস করেছে। আমি মনে করি না যে এটি কোন ষড়যন্ত্র, বরং ঠিক এইভাবেই মার্কিন সরকার এবং ট্রাম্প এই সঙ্কটের তালগোল পাকিয়েছে। ট্রাম্প এ পর্যন্ত এটিকে জনস্বাস্থ্য সংকট নয় বরং উপলব্ধিজনিত সংকট হিশেবে চিহ্নিত করেছেন এবং তার পুনর্নির্বাচনের সম্ভাব্য সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করেছেন। পরিস্থিতির এই হচ্ছে সবচাইতে খারাপ দিক, বিশেষত আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি নেই এবং শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে। সংকটের এই ঘনীভবন সর্বোচ্চ ঝাঁকুনি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি শিল্পখাতগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার অজুহাত হিশেবে ব্যবহৃত হবে যার ফলে আমরা জলবায়ু সঙ্কটের মতো চরম কোন সঙ্কটের কেন্দ্রে ঠেলে দিচ্ছে। এয়ারলাইন, গ্যাস ও তেল, সমুদ্র শিল্পের মতো শিল্পগুলোর পতন তারা এই সুযোগে ঠেকাতে চায়।

    প্রশ্ন : ইতোপূর্বে আমরা এই নাটকটি কীভাবে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি?

    নাওমি ক্লেইন : The Shock Doctrine বইয়ে আমি হারিকেন ক্যাটরিনার পরে এটি কীভাবে ঘটেছিল তা নিয়ে কথা বলেছি। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মতো ওয়াশিংটন থিংকট্যাঙ্কগুলো ক্যাটরিনার জন্য মুক্তবাজারের অনুকূল সমাধানগুচ্ছ হাজির করেছিল। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ঠিক একইরকমের প্রকল্প এই ক্ষেত্রেও আনা হবে। আসলে, ক্যাটরিনা গ্রুপের প্রধান ছিলেন মাইক পেন্স। ২০০৮ সালে, আপনি ব্যাংকগুলোকে আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার ক্ষেত্রে দেখেছেন যেখানে বিভিন্ন দেশ ব্যাংকগুলোকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সাদা চেক দিয়েছিল। কিন্তু এর আসল প্রভাব টের পাওয়া গিয়েছিল অর্থনৈতিক কৃচ্ছতাসাধন তথা সামাজিক সেবাসমূহ সংকোচন নীতির মধ্যে।সুতরাং এখন যা কী চলছে কেবল তাই নয়, যখন এই সমস্ত কিছুর জন্য কড়া মাসুল চুকানোর পরিস্থিতি হাজির হবে তখন তারা কীভাবে তা পাশ কাটায় সেটাই মূল বিবেচ্য।

    প্রশ্ন : করোনাভাইরাসের ইতোমধ্যেই যে দুর্যোগ পুঁজিবাদের মওকা হাজির হয়েছে তার ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের জন্য জনগণ কী করতে পারে? হারিকেন ক্যাটরিনা বা সর্বশেষ বৈশ্বিক মন্দার সময়ে যে সংকটের মধ্যে আমরা ছিলাম, বর্তমানে কি আমরা তার চেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে আছি? নাকি পরিস্তিতি আরো করুণ হয়েছে?

    নাওমি ক্লেইন : যখন আমরা কোন সঙ্কটে পতিত হই তখন আমরা আরো পিছিয়ে কিংবা ভেঙ্গে পড়ি, অথবা আরো লায়েক হয়ে উঠি এবং মনোবল ও মমত্ববোধের দুর্গ হয়ে উঠি যা ইতোপূর্বে আমাদের পক্ষে সম্ভব বলে আমরা মনে করতাম না। এবারো একই রকমের পরীক্ষার মুখোমুখি আমরা। আমি কিছুটা আশাবাদী কারণ এবার বিকশিত হওয়া ও আমাদের সমস্ত দুর্বলতার গোড়া এই সংকটকে ভিন্নভাবে মোকাবেলা করার মত রাজনৈতিক বিকল্প এবং সেই বিকল্পকে সমর্থন যোগানোর মত বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন বর্তমানে আছে ; যা ২০০৮ এ ছিল না। গ্রিন নিউ ডিলের সমস্ত পরিকল্পনার মূলে কাজ করছে এই ধারণাই : এরকম একটা মুহুর্তের জন্য তৈরি হওয়া। আমরা কোনভাবেই আমাদের সাহস হারাতে পারি না; সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সার্বজনীন শিশু যত্ন, অসুস্থতাকালীন সবেতন ছুটি প্রদানের জন্য আমাদের আগের তুলনায় আরও কঠোর লড়াই করতে হবে — কারণ এই সমস্ত কিছুই অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা ভাইরাস
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    শিল্পী: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রশ্ন : সরকারসমূহ এবং বৈশ্বিক এলিটরা তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে যদি মহামারির সঙ্কটকে ব্যবহার করে, তাহলে পরস্পরের প্রতি যত্নশীল হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কী কী করতে পারে?

    নাওমি ক্লেইন : ‘নিজের ভরণপোষণ আমি নিজেই করব এবং প্রচলিত সর্বোৎকৃষ্ট বীমাটাই আমি পাব; আপনার যদি ভাল বীমা না হয় তবে এটি সম্ভবত আপনারই দায়, আমার নয়’। ‘যে জিতবে সেই সিকান্দার’ মার্কা অর্থনীতি এই ধারণাই আমাদের মস্তিষ্কে গ্রথিত করে। সংকটের এমন মুহুর্তগুলো পরস্পরের প্রতি আমাদের ছিদ্রান্বেষী মানসিকতাকেই উন্মোচন করে। কিন্ত এরকম কঠিন সময়ে আমরা উপলব্ধি করি বিচ্ছিন্নতা ও অপরের প্রতি নির্লিপ্তির যে বোধ চরম নির্মম এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমাদের মধ্যে গেঁথে দিতে চায়, তার চেয়ে অনেক বেশি আমরা পরস্পরের সাথে যুক্ত। ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা থাকলেই আমরা নিরাপদ থাকব এরকমটা আমরা মনে করতেই পারি; কিন্তু যে লোক আমাদের খাদ্য তৈরি করে বা আমাদের খাবার সরবরাহ করে, আমাদের বাক্সপেটরা গোছগাছ করে, তাদের যদি ভালো স্বাস্থ্যসেবা না থাকে কিংবা অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে তারা যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর সুযোগ না পায় (অসুস্থতার সময়ে সবৈতনিক ছুটি না থাকার কারণে বাড়িতে অবস্থানের কথা নাহয় বাদই দিলাম) মনে করার কোন কারণ নাই যে আমরা নিরাপদ থাকব। যদি পরস্পরের যত্ন না নেই, তাহলে আমরা নিজেরাও অযত্নে থাকব। সেক্ষেত্রে আমরা চোরাবালিতে আটকা পড়ব। সমাজকে সংগঠিত করার বিভিন্ন উপায় আমাদের বিভিন্ন অংশকে আলোকিত করে। আপনি যদি জানেন আপনি এমন কোনও সিস্টেমে আছে যা মানুষের খেয়াল রাখেনা এবং সম্পদের ন্যায্য বন্টন করে না; তার মানে আপনার নিষ্ক্রিয় সত্তাটি জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। সুতরাং নিষ্ক্রিয় না থেকে, সচেতন হোন এবং ভাবুন। কেবলমাত্র আপনার নিজের এবং আপনার পরিবারের যত্ন নেয়ার কথা না ভেবে, আপনার প্রতিবেশী এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষটির দিকে নজর রাখুন।

  • নারীর ক্ষমতায়ন ধারণার সমস্যা: ক্ষমতাবিরোধিতা ও মানবমুক্তি

    নারীর ক্ষমতায়ন ধারণার সমস্যা: ক্ষমতাবিরোধিতা ও মানবমুক্তি

    • ইরফানুর রহমান রাফিন

    মিসেস গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো আমেরিকা সফরে যান, তখন লাইফ ম্যাগাজিন তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেয়। তাতে তিনি বলেন, তাঁকে কেউ মাদাম প্রাইম মিনিস্টার বলে সম্বোধন করছে, এটা তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না। প্রেসিডেন্ট জনসন লাইফ ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকারটি পড়ে যখন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সেই ক্ষেত্রে ইন্দিরা কীভাবে সম্বোধিত হতে পছন্দ করবেন; রাষ্ট্রদূত মারফত ইন্দিরা জবাব পাঠিয়েছিলেন, ‘ইন্দিরা গান্ধী’। (more…)

  • রবার্ট গ্রাহাম।। বাকুনিন: পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে

    রবার্ট গ্রাহাম।। বাকুনিন: পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে

     অনুবাদ: বীথি সপ্তর্ষি 

    প্রুধোঁর তুলনায় বাকুনিন অনেক বেশি পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরোধী ছিলেন। তাঁর প্রবন্ধ সমন্বিত শিক্ষায়১ তিনি সন্তানের ওপর পিতার কর্তৃত্বের নিন্দা করেছিলেন। তাঁর বিপ্লবী কর্মসূচী ও ইশতেহারে তিনি ধারাবাহিকভাবে নারীর সমানাধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। ১৮৬৬ সালে তাঁর বিপ্লবী (more…)

  • কর্নেল তাহের রূপকথার ৩৭ বছর: কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা

    কর্নেল তাহের রূপকথার ৩৭ বছর: কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: বর্তমান রচনাটি জাসদ-ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কর্তৃক ২২শে জুলাই ২০১১ তারিখে আয়োজিত তাহের-দিবসের আলোচনার পরিমার্জিত ও পুনর্লিখিত অডিও-অনুলিপি। অডিও ইউটিউবে: কর্নেল-তাহের-রূপকথার ৩৭ বছর

    অডিও অনুলিপির পরিমার্জনা শেষ হয় ২০১৩ সালে। এরপর দৈনিক বণিক বার্তা: ২৩শে নভেম্বর ২০১৩, ২১শে ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮শে ডিসেম্বর ২০১৩, দৈনিক সোনার দেশ: ৭ই নভেম্বর ২০১৩, ২৩শে নভেম্বর ২০১৩, ৭ই ডিসেম্বর ২০১৩, ১৪ই ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮শে ডিসেম্বর ২০১৩ রচনাটি প্রকাশিত হয়।

    বর্তমান সংস্করণটি লেখকের অচেনা দাগ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। (more…)

  • ধীমান দাশগুপ্ত।। আফগানিস্তানই কি ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট?

    ধীমান দাশগুপ্ত।। আফগানিস্তানই কি ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট?

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    আজ আমরা ‘মানবিক অনুষদ’-এর বিষয় বলে যেসব বিষয় পড়ছি, এই গোটা অনুষদেরই মূল বা আদিতম বিষয় নাকি ছিল ইতিহাস। এমনটা সম্ভবত একারণেই বলা হয়ে থাকে যে, জ্ঞান প্রপঞ্চে প্রতিটি শাখারই একটি ইতিহাস থাকে— এমনকি গণিত অথবা জ্যোতির্বিদ্যার মত বিমূর্ত বিষয়গুলোতেও—আর ইতিহাসের প্রতিটি টুকরোরই রয়েছে একটি ভূ-প্রাকৃতিক প্রেক্ষিত বা পরিসর। (more…)