Blog

  • আবরার হত্যা ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি : আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?

    আবরার হত্যা ও নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি : আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?

    • পার্থ প্রতীম দাস
    প্রায় একসঙ্গেই নানা প্রতিবাদ-বিক্ষোভে মুখর হয়েছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন স্বেচ্ছাচারী-স্বৈরাচারী উপাচার্য। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
    আর্টওয়ার্ক: মন্তব্য নিস্প্রজন
    শিল্পী: মিশু
    সূত্র: ফেসবুক

    তবে গত কয়েকদিন এগুলো ছাপিয়ে আমাদের মনোজগত আচ্ছন্ন করে ছিল একটি নাম—আবরার। স্বাধীন মতপ্রকাশের দায়ে যাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। এরপর আন্দোলন হলো, অনেকেই গ্রেপ্তার হলো, জানা গেল কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গড়ে উঠেছে টর্চার সেল; কিভাবে শিক্ষার্থীদের হীনমন্য, দাস বানিয়ে রাখার জন্য প্রবল ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে সরকার ও প্রশাসনের মদদে। এবং সবশেষে বুয়েটে দ্বিতীয়বারের মতো (এর আগে ২০০২ সালে) সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের মাধ্যমে আন্দোলন স্থগিত করা হলো।

    বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী উপাচার্যেট স্বেচ্ছাচার অনেকদিন ধরেই চলছিল। এবার তার গদি ধরে টান মেরেছে একটামাত্র প্রশ্ন। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ প্রশ্নটা ফেসবুকে লিখেছিলেন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক জিনিয়া। খুবই সহজ, সাধারণ ও মৌলিক প্রশ্ন। কিন্তু এটাই সহ্য হলো না উপাচার্য নাসিরের। হম্বিতম্বি করলেন, কুৎসিত আচরণ করলেন। আর সেটার রেকর্ডিং ফাঁস হওয়াতেই পড়লেন বিপাকে। ফুঁসে উঠলেন শিক্ষার্থীরা আর শেষমেষ পদত্যগ করতে বাধ্য হলেন উপাচার্য। রাতের আঁধারে শিক্ষার্থীদের ‘লুচ্চা”লুচ্চা’ ধ্বনি শুনতে শুনতে একপ্রকার পালিয়েই গেলেন।

    পরবর্তীতে বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ড, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ইত্যাদি ঘটনাগুলো পরপর দেখে মনে হচ্ছে জিনিয়ার সেই প্রশ্নটাই এখন সর্বত্র জোরেসোরে তোলা দরকার। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ কেন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, পড়ায়? এর সঙ্গে মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্রের সংযোগ কোথায়, সম্পর্ক কী?

    প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমার শুরুয়াদ খুবই নিকট অতীতের ঘটনা। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে ছিল শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এবং মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে অধ্যাদেশ জারি করে এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। কারণ তখনকার স্পিরিট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। নতুন বাংলাদেশ এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিল যেখানে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা যাবে। স্বাধীনভাবে সভা, সমিতি, সেমিনার, সংগঠন ইত্যাদি করা যাবে। রাষ্ট্র বা সরকার সেখানে বাধা দিতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্তে তারা নাক গলাতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পুলিশ, র‌্যাব সেনাবাহিনী ঢুকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রক্টরিয়াল বডি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার ব্যবস্থাপনা করবে।

    সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্পিরিট এটাই ছিল যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাজের কল্যানে কাজ করবে, জনমানুষের মঙ্গলের উদ্দেশে কাজ করবে। সেই লক্ষ্যে নতুন জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করবে, সৃজন করবে। এবং নতুন কিছু সৃজনের জন্য চাই স্বাধীনতা। যদি চিন্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, মুক্ত বিচরণের অধিকার না থাকে তাহলে কিভাবে নতুন কিছু ভাবতে পারা যাবে? বোধহয় সম্ভবও না। তাই পাকিস্তানের কবল থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া হয়েছিল চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যৌথ চিন্তাচর্চা অনুশীলনের জন্য সংগঠন করার স্বাধীনতা।

    মনে রাখা দরকার এগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছে কিন্তু পাবলিক। শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে কিন্তু পাবলিক। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আরও তলিয়ে দেখলে দেখা যায় যে, টাকাটা আসলে আসছে কৃষক-শ্রমিকদের শ্রমঘামে সিক্ত উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলো থেকেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কিন্তু এই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। জনগণের কল্যানে, সমাজের কল্যাণের স্বার্থে, অগ্রগতির স্বার্থে কাজ করার কথা এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এজন্যই তাদেরকে জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দেয় পাবলিক। যেন সমাজের মঙ্গলের জন্য তারা নতুন দিশা দিতে পারেন। নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে পারেন, নতুন কোনো আইডিয়ার কথা বলতে পারেন। এভাবেই হয়েছে মানবসভ্যতার অগ্রগতি। নতুন চিন্তাচর্চার ফলে। এবং এই কাজগুলোই করার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। পাবলিক এগুলোই করার জন্য টাকা দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। বাবা-মা আমাদের ভরন-পোষণ করে, আমাদের পড়ালেখা শেখায় এজন্য যেমন তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে; ঠিক একই রকম দায়বদ্ধ অনুভব করা উচিৎ পাবলিকের কাছেও।

    পিটিয়ে শিক্ষার্থী মেরে ফেলা, টর্চার সেল বানিয়ে অসীম সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের মানসিকভাবে পঙ্গু বানিয়ে ফেলা, নারী শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন, সর্বত্র প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক হয়রানি, উন্নয়নের নামে লুটপাট; এগুলো করার জন্য পাবলিক টাকা দেয় না। অথচ এগুলোই হয়ে চলেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আর সমাধান হিসেবে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্র-প্রশাসনের আরো স্বেচ্ছাচারী-স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার টোটকা। বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সংগঠন করার অধিকার।

    আর্ট্ওয়ার্ক: চেইন অব থটস
    শিল্পী: এলিনা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করলে, শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিলে কী অবস্থা দাঁড়ায়, তা খুব প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৯ সালে শিবির বনাম ছাত্রলীগ+জাসদ ছাত্রলীগ+মৈত্রী ইত্যাদির সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দুই-আড়াই মাস পর ক্যাম্পাস খোলার পর প্রশাসন জারি করেছিল ‘জরুরি অবস্থা’। ছাত্র রাজনীতি বন্ধ, কারোরই সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল; কিচ্ছু করা যাবে না। শিবির ঠেকানোর নাম করে জারি করা সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ আছে বলে জানি। এবং এই ১০ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে তা পত্রপত্রিকা মারফত সবাই কমবেশি অবগত আছেন।

    ২০০৫-০৬ সালের দিকে রাবিতে অনেকগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রবলভাবে সক্রিয় ছিল। মাঝেমধ্যেই এখানে ওখানে আয়োজিত হতো পথনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এমনও হয়েছে যে একই দিনে একই সময়ে দুই-তিন জায়গায় পথনাটক হচ্ছে। অনেক ছোটবড় প্রকাশনা বের হতো। সেগুলো ঘিরে একধরনের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার পরিবেশ ছিল। আড্ডা, পড়াশোনা, তর্কবিতর্ক, গান-নাটক দিয়ে মুখরিত থাকত মতিহারের ক্যাম্পাস।

    এসবই কিন্তু হয়েছে শিবিরের প্রবল দাপুটে আমলে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের মিছিল গেলে মিনিট দশেক ক্লাস থামিয়ে রাখতে হতো। এক মাথায় দাড়ালে আরেক মাথা দেখা যেত না। এরকম একটা আবহের মধ্যেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে  প্রাণ ছিল ভরপুর। শিবিরের নিপীড়ন-নির্যাতনও অবশ্যই ছিল। বাম রাজনীতি, সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ছোটকাগজ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা হলে থাকতে পারতেন না। মারধর, হুমকিধামকির মুখে পড়তে হতো। হলগুলোতে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ, দখলদারিত্ব ইত্যাদি ছিলই।

    কিন্তু নানাবিধ চিন্তাচর্চার প্রাণবন্ত পরিবেশ সেই সময়টাতে ছিল। এটা নাই হতে শুরু করে ২০০৯ সালের সেই নিষেধাজ্ঞার পর থেকে। এই নিষেধাজ্ঞা কিন্তু আবার ছাত্রলীগের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। ছাত্রলীগ অস্ত্র নিয়ে প্রক্টরের সঙ্গে হেঁটেছে। সেই সময়ের প্রক্টর,  ড. জাকারিয়া এখন উপ-উপাচার্য হয়েছেন। যার নিয়োগ সংক্রান্ত টাকা চাওয়ার অডিও প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। অন্য সবার মুখ বন্ধ করে ছাত্রলীগকে দেওয়া হয়েছিল অবাধ স্বাধীনতা। এবং শিবির দমনের নামে যা নয় তা করেছে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। মারধর করেছে, চাঁদাবাজি করেছে, ‘শিবির বলে ধরিয়ে দিব’ এমন হুমকি দিয়ে হেনস্তা করেছে।  সর্বশেষ বুয়েটে আবরারকেও কিন্তু ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়েই মারা হয়েছে। ছাত্রলীগ-প্রশাসনের সেই মৈত্রী এখনো অটুঁট আছে।

    সেসময় কোনো ছাত্র সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি। গত ১০ বছরে এসব সংগঠনের বেশ কিছু বিলুপ্ত। কতক সংগঠন টিকে আছে নামকাওয়াস্তে, প্রতিবাদ- প্রতিরোধহীনভাবে।

    পথনাটকের সেই ক্ষুরধার প্রতিবাদ আর নেই। চতুর্থ বর্ষ বা মাস্টার্সের কোনো শিক্ষার্থী বোধহয় ১-২টা পথনাটক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছে কিনা, সন্দেহ আছে। ক্যাম্পাস থেকে প্রকাশিত কোনো পত্রপত্রিকা হাতে নিয়েছে কিনা, সন্দেহ আছে। অন্যান্য জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক চিন্তাচর্চার কথা বাদই দিলাম। পড়ালেখা-গবেষণার পরিমাণ, সেগুলোর মান কোনোকিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আনলাম না।

    তো এই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তর। ‘মৌলবাদী’ শিবিরের আমল থেকে ‘প্রগতিশীল-চেতনাধারী’ আমলের রূপান্তর। প্রাণবন্ত প্রাণময় এক দশা থেকে প্রাণহীন দশায় রূপান্তর। আর এসব কিছুর মূলে ছিল ২০০৯ সালের সেই নিষেধাজ্ঞা এবং সেটা বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত।

    নিষেধাজ্ঞার রাজনীতিতে তাই ভরসা রাখা কঠিন। এমনিতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো খুব দারুণ কিছু করছে- এমনটাও না। তাদের অনেক কিছু নিয়েই অনেক সমালোচনা আছে। কিন্তু সেটা এভাবে আদেশ জারি করে নিষিদ্ধ করে দেওয়ার কিছু নেই। এতে বরং শঙ্কা বাড়ে, শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাচর্চার পরিবেশ আরো সঙ্কুচিত হয়ে যাবে না তো? প্রশাসনিক ও একাডেমিক নিপীড়ন আরো বাড়বে না তো? শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারবে তো সরকার-প্রশাসনের গণবিরোধী, শিক্ষার্থীবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে? নিজেদের শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে তো?

    এখানেই আসে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। তারা যদি সংগঠিত হওয়ার নতুন পদ্ধতিপন্থা ভাবতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী এই প্রশ্ন সামনে এনে জনকল্যাণমুখী তৎপরতায় সামিল হতে পারেন; তাহলে সেটাই হবে আবরারের প্রতি সুবিচার। যে ছেলেটা প্রাণ দিল নায্য কিছু কথা বলার জন্য, নিজের মতপ্রকাশের জন্য।

    এই স্বাধীন পরিবেশটা কিন্তু সরকার-প্রশাসন এমনি এমনি দিয়ে দিবে না। শিক্ষার্থীদের সদা তৎপর থাকতে হবে সেটা নিশ্চিত করার জন্য। ঠিক যেভাবে তারা তৎপর হয়েছিলন আবরার হত্যার প্রতিবাদে। সিসি টিভি ফুটেজ উদ্ধারের সময়; সেভাবে তৎপর থাকতে হবে। সবসময় চোখে চোখে রাখতে হবে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের। আর এসব করার জন্য চাই শিক্ষার্থীদের সংগঠিত শক্তি। সেখানেও নতুন করে ভাবতে পারে শিক্ষার্থীরা।

    হলগুলোতে টর্চার সেল বন্ধ ও গেস্টরুম-গনরুম কালচার বন্ধ করার জন্য শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে পারে ব্লক ধরে ধরে। সবগুলো ব্লক নিয়ে গঠন করা যেতে পারে হল ফেডারেশন। যে ফেডারেশন কাজ করবে ব্লকগুলো থেকে আসা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই প্রতিনিধিদেরও বিশেষ কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তারা স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারবে না। পুরো ব্লকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে প্রতিনিধিকে রিকল করা যাবে। সভাপতি-সেক্রেটারিওয়ালা হায়ারার্কির চর্চা বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে পারেন এমন আরো অনেক নতুন উপায়ে। যেখানে সবার মত প্রকাশের সমান অধিকার থাকবে। বড়ভাই বা নেতার কথার বিরুদ্ধে কথা বললে যেখানে তিরস্কার বা বহিস্কারের মুখে পড়তে হবে না। সবার সমান মর্যাদা থাকবে।

    শুধু বুয়েটই না, দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীই এভাবে প্রচলিত পচাগলা ছাত্র রাজনীতির বাইরে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারেন। শুধু হলেই না, বিভাগগুলোতেও শিক্ষার্থীদের  আরো বেশি বেশি অংশগ্রহণের দাবি উঠাতে পারেন। শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু, বিভাগীয় সভায় শিক্ষার্থী প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্তি, এ ধরনের আরো দাবি উঠাতে পারেন। এমন পরিবেশ তৈরির দাবি তুলতে পারেন যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে পারবে না এখনকার মতো। তাদেরও জবাবদিহিতার জায়গা থাকবে শিক্ষার্থীদের কাছে।

    আর্টওয়ার্ক: গ্রাফিতি অন টর্চার
    সূত্র: বাংলা রিপোর্ট

    আবরার হত্যার প্রতিবাদকে যদি একটা নতুনের সূচনা হিসেবে ধরি, আবরারের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু শুরু করতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী পরিবর্তন চাই, তাহলে এমন অনেক দাবি-প্রশ্ন তুলতে হবে শিক্ষার্থীদের। জোরেসোরে তুলতে হবে সেই মোক্ষম প্রশ্ন: ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?’ যে জনগণের করের টাকায় এবং কৃষক-শ্রমিকের প্রত্যক্ষ অবদানের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে, শিক্ষকরা শিক্ষকতা করার সুযোগ পাচ্ছে  তাদের কাজ কী আসলে?

    একটা প্রধান কাজ জনকল্যাণর্থে নতুন জ্ঞানের চর্চা  ও সৃজন করা। কিন্তু নতুন কোনো চিন্তাচর্চার অনুশীলন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় হয় না বললেই চলে। দেশে একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক রকম আইন দিয়ে চলে। এর মধ্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রণীত আইনগুলোর মধ্য ৭৩ এর অধ্যাদেশকেই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ভাবা হয়। বুয়েট চলে আবার সেই পাকিস্তানি আমলের ৬১’র অধ্যাদেশ দিয়ে।

    মুক্তিযুদ্ধের পর ৭৩-এর অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে এতো স্বাধীনতা দেওয়ার পরেও তাহলে কেন বজায় থাকছে না সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্ত পরিবেশ? কারণ নামে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেও রাষ্ট্র-রাজনীতির শুঁড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। সেজন্যই বারবার দেখা যায়, সরকার পরিবর্তন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য-প্রশাসননিক পদগুলো পরিবর্তন হয়ে যায়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সে দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসগুলোতে দাপট দেখায়। তাদের সন্ত্রাসের মুখে জিম্মি হয়ে থাকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কিভাবে রাষ্ট্রের শুঁড় প্রবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে?

    প্রবেশ করে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাটিউট বা নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ ফোরাম সিনেট। সিনেটরদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি। বলাবাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এ নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুসারে, তথাকথিত পরামর্শ নামে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই দলীয় চূড়ান্ত ক্ষমতা। আর তাই উপাচার্য হতে গেলেও পার্টিজান হতে হবে। আর এ কারণেই দেখা যায়, রাষ্ট্র ক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বদলে যান।’ আবার ‘উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে কি দৃশ্যমান, কি অদৃশ্যমান, সকল ক্ষমতার মালিক তিনি।’ ফলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ই এই উপাচার্যের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। এবং অন্যদিকে উপাচার্য রাষ্ট্র-সরকারের পদলেহন করতে থাকেন। ৭৩’ এর অধ্যাদেশল এই হাল হলে, ৬১’র অধ্যাদেশে প্রশাসনিক স্বৈতন্ত্রর চেহারা কেমন হতে পারে!

    আর্টওয়ার্ক: স্প্রিং
    শিল্পী: পেয়াম বোরোম্যান্ড
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এসব অন্যায্য ক্ষমতা-কর্তৃত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো, উপাচার্যের ক্ষমতা, রাষ্ট্র-বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে। নতুন কাঠামো প্রণয়নের দাবি তুলতে হবে। সেই দীর্ঘমেয়াদী কাজগুলো ধীরে ধীরে শুরু হবে- এমনটাই প্রত্যাশা।

    টর্চার সেলওয়ালা, প্রশাসনিক কারাগারওয়ালা, প্রাণহীন একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে রাতারাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আদর্শ পরিবেশে পরিণত করা সম্ভব না। কিন্তু রূপান্তরের প্রক্রিয়াটা শুরু হোক। একটু একটু করে আরো নানা কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করুক শিক্ষার্থীরা। সংগঠিত হোক, চিন্তা-চর্চার শিখা প্রজ্জলিত রাখুক, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখুক।

    তথ্যসূত্র:

    ১. বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন অর্থায়ন ।। রাষ্ট্র-বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্ক পাঠ: মুক্তিপরায়ন রূপকল্প— আরিফ রেজা মাহমুদ

    আরও পড়ুন:
    আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

    — সেলিম রেজা নিউটন

    মহামান্য ভয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা– সেলিম রেজা নিউটন

  • আবরার হত্যা: রাষ্ট্র-ভায়োলেন্স-নিষেধাজ্ঞা

    আবরার হত্যা: রাষ্ট্র-ভায়োলেন্স-নিষেধাজ্ঞা

    • খন্দকার তূর আজাদ

    সোমবার রাতে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগের সদস্যরা। ভারত রাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পোস্ট দেয়ার পর শিবির ট্যাগ দিয়ে তার উপর ভয়ানক রকমের নির্যাতন চালানো হয়৷ এরপর থেকেই বুয়েট সহ সারাদেশে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চলে৷ বুয়েটে ছাত্রলীগের নির্যাতনের আরো অসংখ্য ঘটনা বের হয়৷ সেসব ঘটনা প্রকাশ করা ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে, এদিকে আবরারের ভাইয়ের উপর চড়াও হয় পুলিশ।

    আর্টওয়ার্ক: মন্তব্য নিস্প্রজন
    শিল্পী: মিশু
    সূত্র: ফেসবুক

    অথচ সবকিছু পর শেষ পর্যন্ত আলাপ যেয়ে ঠেকলো সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করাতে। তাই আমাদের আবার প্রথম আলাপেই ফেরত যেতে হয় যে কেমন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এরকম করে একটা ছেলেকে পিটায় মেরে ফেলা সম্ভব হল। কেন নিজের দেশের জনগণের স্বার্থ নিয়ে মতপ্রকাশ করায় ছাত্রলীগ টর্চার সেলে ডেকে এনে ঘন্টার পর ঘন্টা পিটিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলতে পারলো?

    বিদ্যালয়ের হলগুলাতে ছাত্রলীগের প্রশ্নহীন দখলদারিত্বর কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। সেই ক্ষমতা তারা পেয়েছে সরকার থেকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাস চালানোর ফ্রি লাইসেন্স পেয়েছে প্রশাসন থেকে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নির্যাতন-হত্যাকান্ড এটাই প্রথম না৷ প্রশাসনের নাকের ডগায় ম্যানার শেখানোর নাম করে, শিবির নিধনের নাম করে প্রতিনিয়ত টর্চার সেলগুলাতে নির্যাতন চালানো হয় শিক্ষার্থীদের উপর৷ কিন্তু প্রশাসন ও ছাত্রলীগ পরস্পরের পোষা জানোয়ার হওয়ায়, শিক্ষার্থীরা কখনো প্রতিরোধ গড়তে চাইলেও তা থামিয়ে দেয়া হয়েছে৷ পুলিশের সাথেও এই দুই পক্ষেরই ভালো সম্পর্ক৷ বড় কারণ তো অবশ্যই সরকারের স্বার্থ রক্ষা, তবে তা ছাড়াও টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজিতে এসব পক্ষ নিকটাত্মীয়। এরা প্রত্যাকেই এই স্বৈরাচারী সরকারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

    আবরার হত্যার পর আরেকটা ব্যাপারে সবাই সোচ্চার ছিল যে, এখানে বাকস্বাধীনতা নাই৷ বাকস্বাধীনতা চর্চার কারণে নির্যাতন-হত্যা কিন্তু শুধু লীগ বা অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনই করে না, সবচেয়ে বেশি মাত্রায় করে ‘আইন- শৃঙখলা রক্ষাকারী’ বাহিনীগুলাই। গুম-ক্রসফায়ারে কতজনকে হত্যা করা হয়েছে? পুলিশি হেফাজতে কতটা ভয়ানক অত্যাচার চালানো হয়? সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার বৈধভাবেই নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। যেকোন প্রতিবাদকারীকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে জেলখানায় ঢুকানো সম্ভব। এবং ‘ অপরাধ সংঘটিত হইবার সম্ভাবনা’ দেখলেই পুলিশ যে কাউকে তল্লাশি, গ্রেফতার করতে পারে। এই বৈধ নিপীড়নের সুযোগেরই ভিন্নমাত্রার প্রতিফলন হচ্ছে ট্যাগ দিয়ে ছাত্রলীগের নির্যাতন চালানোটা।

    আবরারের সর্বশেষ স্ট্যাটাস ছিল ভারত রাষ্ট্রের আগ্রাসন নিয়ে, জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি নিয়ে৷ ‘ বন্ধু রাষ্ট্রের ‘ স্বার্থরক্ষায় কিছুদিন আগেও কাশ্মীরে মোদি সরকারের নিপীড়ন নিয়ে উচ্চবাচ্য না করতে দেশীয় বৈধ নিপীড়ক বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশের মানুষকে প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করে, নজরদারি বাড়িয়ে বিভিন্নভাবে ভারত রাষ্ট্রের নিপীড়ন জারি রাখার সুযোগ দিচ্ছে সরকার৷ কারণ কারচুপির নির্বাচন দিয়ে আসা এই সরকারের প্রধান রক্ষাকবচগুলির একটি ভারত রাষ্ট্র।

    আর্টওয়ার্ক: নিও প্রিজন
    শিল্পী: কার্লোস ডেভিড
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    বুয়েটের বন্ধুরা তদের দৃষ্টিকোণ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করাকে সমাধান ভাবতে পারেন, কিন্তু আমাদের বুঝা দরকার যে সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, শ্রেণীর, পেশার আবরারদের জন্য এটা বুমেরাং হয়ে উঠতেই পারে।

    আপাতত, ছাত্রলীগের মত লাভজনক প্রকল্প থেকে সরকারের সরে আসার সম্ভাবনা দেখি না৷ কিন্তু নিওলিবেরাল নীতিতে চলা সরকার, প্রশাসনিক চরম স্বৈরতন্ত্রের এই সরকার ভবিষ্যতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেই ভায়োলেন্স আরো ভয়ানকভাবে জারি রাখতে পারবে৷আন্দোলন করা নারী শ্রমিকককে মেরে গর্ভপাত ঘটানোর ভায়োলেন্স, ফি বাড়ানো নিয়ে কথা বলায় ছাত্র বহিঃষ্কারের ভায়োলেন্স, কৃষককে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করার ভায়োলেন্স আরো বহুগুণে বাড়বে৷ সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে, কিন্তু ছাত্র অধিকারের রাজনীতি করতে দিবে, স্বৈরাচারের কাছে এমনটা আশা করা অমূলকই বটে৷

    তাই নিজেদের অধিকার আদায়ের জায়গা নিষিদ্ধ না করে বরং স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের নিপীড়নের জায়গাগুলাতে আঘাত করার জন্য নিজস্বতা বজায় রেখেই নিপীড়িতদের ঐক্য দরকার যার লক্ষ্য হবে জনতার সার্বিক মুক্তি৷

     

     তথ্যসূত্র

    ১. আবরার হত্যাকান্ড (https://www.bbc.com/bengali/news-49982663)

    ২. নির্যাতনের তথ্য প্রকাশের সাইট বন্ধ (https://www.bbc.com/bengali/news-50001035)

    ৩. আবরারের ভাইয়ের উপর পুলিশি হামলা (http://www.banglatribune.com/country/news/564585/%E0%A6%86%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9B%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%B9-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97)

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (http://www.banglatribune.com/national/news/287899)

    ৫. বাংলাদেশ-ভারত সর্বশেষ চুক্তি্র বিশ্লেষণ (https://www.bbc.com/bengali/news-49953300)

    ৬. পুলিশের লাঠিচার্যে নারী শ্রমিকের গর্ভপাত (https://jogfal.com/2019/25620/?fbclid=IwAR0tnr1P4Avhf2F8IKLDz3dT88vdl9uMP6EgDn9sXg8ksbvFIX77cwZbWW0)

     

     

  • আবরার-হত্যাকাণ্ড: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দায় নিতে হবে

    আবরার-হত্যাকাণ্ড: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দায় নিতে হবে

     সেলিম রেজা নিউটন

    বুয়েটের ছাত্র আবরারকে ছয়/সাত ঘণ্টা ধরে, ঠান্ডা মাথায়, সমবেতভাবে অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলাটা আদৌ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একেবারেই নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদেরকে হলের বিভিন্ন রুমে ডেকে নিয়ে অত্যাচার করাটা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নিয়মিত ঘটনা। এটাই ছাত্রলীগের সিস্টেম। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসে গোটা ছাত্রলীগ এই সিস্টেমেই চলে।

    সিস্টেমটা হচ্ছে পুরো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সিস্টেম। এই সিস্টেম বর্তমান সরকার-প্রণালী এবং রাষ্ট্র-প্রণালীর (অর্থাৎ সামগ্রিক সিস্টেমের) অংশ। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, তার সহযোগী অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসন, হল-প্রশাসন এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের আশেপাশে কর্তব্যরত পুলিশ প্রশাসনসহ রাজনৈতিক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সকলেই এই সিস্টেমের অংশ। উপরন্তু, এই সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ-সিস্টেম শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নয়, সারা বাংলাদেশেই নানান রকম চেহারা নিয়ে জারি আছে। এটা আজকের একচেটিয়া ও একদলীয় বাংলাদেশের সর্বাত্মক শাসন-সিস্টেম। এই সিস্টেমের মূল পদ্ধতি হলো অনুগ্রহ এবং নিগ্রহ। অনুগ্রহ মানে শত কোটি হাজার টাকার দুর্নীতি, আর নিগ্রহ মানে হামলা অথবা মামলা। হামলার মধ্যে আছে বৈধ পুলিশের পাশাপাশি এবং অবৈধ পুলিশের (অর্থাৎ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ইত্যাদি) আক্রমণ।

    আর্টওয়ার্ক: স্টপ পোলিস
    গ্রাফিতি
    সূত্র: কোপওয়াচ

    কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সময় আমরা এই সিস্টেমের বিপুল প্রকাশ্য প্রয়োগ দেখেছি। আমরা হাতুড়ি দেখেছি, হেলমেট দেখেছি, মিথ্যা মামলা দিয়ে সাংবাদিক শহিদুল আলম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে জেল খাটাতে দেখেছি। প্রকাশ্য রাস্তায় দলবদ্ধভাবে একজন সাধারণ নিরস্ত্র শিক্ষার্থীকে হাতুড়ি দিয়ে, লোহার রড দিয়ে মেরে মেরে হাড়গোড় ভেঙে ফেলে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া পর্যন্ত এই সিস্টেমটা ছাত্রলীগের জন্য জায়েজ।

    আবরারের বেলায় সিস্টেমের যে ব্যতিক্রমটুকু ঘটেছে সেটা হলো তাঁর মৃত্যু। ছাত্রলীগের সর্বাত্মক ক্যাম্পাস-নিয়ন্ত্রণ-সিস্টেমের অলিখিত ম্যানুয়ালের মধ্যে — সাধারণত — প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ‘নিয়ম’ নাই। এই সিস্টেমে যেকোনো মাত্রার অত্যাচার জায়েজ, কিন্তু হত্যাকাণ্ড জায়েজ নয়। কোনরকমে আবরারের শুধু প্রাণটুকু যদি টিকে যেত, তাহলে তার অত্যাচারকারীরা সরকারি পার্টির ভেতরে আরো বেশি বুক ফুলিয়ে চলতে পারত, ‘গৌরব’ করতে পারত। এই জাতীয় ‘গৌরব’ দিয়েই নিজেদের সংগঠনের অভ্যন্তরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মাঠ পর্যায়ের র‍্যাংকিং নির্ধারিত হয়। আনন্দ-উত্তেজনাময় অত্যাচারে ক্রমাগতভাবে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় বুয়েট-ছাত্রলীগের অত্যাচারীরা সম্ভবত বোঝে নি যে, আবরার সত্যিই মরে গেছেন। বুঝলে তারা অন্য পদ্ধতিতে যেত। লাশটা গুম করে দিতে পারলে, নিদেন-পক্ষে দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসতে পারলে, সিস্টেমটা ব্যতিক্রমহীন হয়ে থেকে যেতে পারত।

    কিন্তু সিস্টেমেটিক রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক অত্যাচার সত্যিই অনেক মুশকিলজনক ব্যাপার। মেরে ফেলা যাবে না অথচ সর্বোচ্চ মাত্রায় অত্যাচার গোটা দেশে জারি রাখতে হবে— এমন একটা সুদক্ষ সিস্টেম দাঁড় করাতে গেলে যে ধরনের সুশৃঙ্খল পার্টি-সংগঠন লাগে তা এই সরকারের রাজনৈতিক মহলের নেই। উপরন্তু প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তারাও কী করা উচিত, আর কী করা থেকে বিরত থাকা উচিত, সেটা প্রায়শই বুঝে উঠতে পারেন না। আওয়ামী লীগ/ছাত্রলীগের এত বেশি মাথা আর এত বেশি মুখ যে, কাকে সন্তুষ্ট করলে সরকার সন্তুষ্ট হবে, চাকরি অক্ষত থাকবে আর কে অসন্তুষ্ট হলে ঘাড়ের উপর সমূহ বিপদ নেমে আসবে— সেটা ঠিকমতো উপলব্ধি করনতে পারাটা তাঁদের পক্ষে দুষ্কর হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে বর্তমান সিস্টেমে অনুগ্রহ ও নিগ্রহ (অর্থাৎ দুর্নীতি ও অত্যাচার) অতিরিক্ত ‘গণতান্ত্রিক’ হয়ে উঠেছে। অতিশয় বিকেন্দ্রায়িত হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগ-মৎস্যলীগ-ফুলপাখিলতাপাতালীগ ইত্যাদি যেকোনো লীগের নাম ধারণ করতে পারলেই, জোরে জোরে “জয় বাংলা” “জয় বঙ্গবন্ধু” বলতে পারলেই এবং/অথবা বঙ্গবন্ধু-তনয়া শেখ হাসিনার নাম-জপ-স্তুতি করতে পারলেই, প্রায় যেকোনো ব্যক্তি অনুগ্রহ পাওয়ার অথবা নিগ্রহ করার অধিকারী হয়ে উঠতে পারেন। এটাই সিস্টেম।


    বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সামগ্রিক সিস্টেম রচনার দায় এড়াতে পারেন না। তাঁর নেতৃত্বের ছায়াতেই যে এই সিস্টেমটা গড়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। “তাঁর হুকুমে দল চলে, রাষ্ট্র চলে, আমলাতন্ত্র চলে, পুলিশ-প্রশাসন চলে। … সর্বময়, একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এই গোটা সিস্টেমটাকে অনুমোদন না করেন, তাহলে এই সিস্টেমটা চলে কীভাবে?” (দ্রষ্টব্য: “বাংলা” পোর্টালে সেলিম রেজা নিউটনের সাম্প্রতিক রচনা; অথবা সেলিম রেজা নিউটনের ফেসবুক-পোস্ট )  এ কথা সবাই জানে, বাংলাদেশ সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক তিনি। সামান্য সব খুচরা খুচরা রাজা-নবাব-বাদশা-সম্রাটকে গ্রেপ্তার করতে গেলে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বা সংকেত লাগে লাগে। গোটা দেশের মানুষ-মিডিয়া-প্রশাসন-পুলিশ অপেক্ষা করতে থাকেন কখন বিদেশ সফরশেষে প্রধানমন্ত্রীর ফিরবেন, কেননা তিনি ফিরে আসলেই শুধু মাত্র বোঝা যাবে, ক্যাসিনো-সম্রাট ইসমাইলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারবে কি পারবে না। এমনকি আবরার হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী সংবাদ-সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন যে, তিনি স্বয়ং পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আবরারের খুনি ছাত্রলীগ-নেতাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার মানে আবরার-হত্যাকাণ্ডের মতো চরমভাবে নাড়া-দেওয়া একটা খুনের আসামিদেরকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে গেলে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ লাগে— পুলিশ নিজে থেকে পারে না। এই হচ্ছে অবস্থা।

    আর্টওয়ার্ক: মোয়িং টাইম
    শিল্পী: তীর্থ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
    এখন এই অবস্থায়, এই এক-ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সর্বাত্মক সিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে তিনি যদি বলেন, গোটা বাংলাদেশের ছোট-বড় কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের এই সামগ্রিক সিস্টেম সম্পর্কে তিনি অবহিত নন, তাহলে সেটা কিন্তু তাঁর গাফিলতির মধ্যে পড়ে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী দল এবং জোটের মধ্যে এ কথা সুবিদিত এবং বহুলকথিত যে, একমাত্র প্রধানমন্ত্রীকেই তাঁরা ঠিকঠাক মতো সৎ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর ইদানীংকার খোলামেলা কথাবার্তা এবং তীব্র বিরক্তি থেকেও এটা পরিষ্কার যে, তাঁর নিজের দলের এবং জোটের বড় বড় নেতাদের দুর্নীতি ও ক্ষমতার বাড়াবাড়িতে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট। তাহলে এখন কর্তব্য হয় গত ১০ বছর ধরে সারা বাংলাদেশে ছাত্রলীগের-যুবলীগের-আওয়ামী লীগের ভয়াবহ সব সিস্টেমেটিক অত্যাচার, দুর্নীতি, অপকর্ম এবং খুনখারাবির দায় কবুল করা। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পেছনে সবচাইতে বেশি দায় ছিল কিন্তু তাঁরই স্ব-কথিত “চাটার দল”-এর। আজ একটানা ১০ বছরের ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার পরও বর্তমান আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে যেভাবে একটা অতল খাদের কিনারে নিয়ে এসেছে, তারপর এই দলের আর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “এক-এগারো লাগবে না, যা করার আমিই করব।” এবার তাঁকে সেটা করতে হবে। দুই-চারটা চুনোপুঁটিকে (এমনকি বিরাট বিরাট রাঘব-বোয়ালকে) ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে এই পরিস্থিতি সামান্যও বদলাবে না। এখন প্রয়োজন খোদ এই সর্বাত্মক সিস্টেমটাকে পরিবর্তন করা। সে জন্য দরকার বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে সত্যিকারের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারপ্রবণ বর্তমান আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে পুনর্গঠিত নতুন একটি আওয়ামী লীগ নিয়ে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা।
    আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
    শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
    আবরারের হত্যাকাণ্ড নিছক একটা ফৌজদারি হত্যাকাণ্ড নয়। এটা পরিস্কার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। সিস্টেম-বিরচিত হত্যাকাণ্ড। এটা স্রেফ থানা-পুলিশের মামলা নয়। এটা সরকার, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক দল পরিচালনার পদ্ধতিগত মামলা। গোটা বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে, নিরঙ্কুশভাবে, ভিন্নমতহীন করে ফেলার যে-রাজনৈতিক পদ্ধতি আজ ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বর্তমান সরকার পরিচালনা করে আসছেন, আবরার-হত্যাকাণ্ড তারই অনিবার্য পরিণতি। আবরার-হত্যাকাণ্ড খুচরা ঘটনা নয়, সিস্টেমের পার্ট। সবার আগে এই রাজনৈতিক পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা না-তুলে আবরারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্রেফ শব্দ-বাক্য রচনা করার খেলা খেলতে থাকাটা নিম্নস্তরের তামাশা মাত্র। সুতরাং ভিন্নমতহীন এই রাজনৈতিক পদ্ধতি রচনার দায় আজকের বাংলাদেশের সর্বময় রাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী হিসেবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিতে হবে। চুরিচামারি না-করার সততা প্রকৃতপক্ষে নিম্নতর পর্যায়ের সততা। উচ্চতর পর্যায়ের সততার নাম রাজনৈতিক সততা। রাজনৈতিকভাবে সৎ মানুষ যেমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য সম্পর্কে তৃপ্তি অর্জন করেন, তেমনি ব্যর্থতার দায় কবুল করতেও পিছপা হন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমরা রাজনৈতিকভাবে সৎ দেখতে চাই— এমনকি সেটা একচেটিয়া রাজনৈতিক শাসন পরিচালনার ১০ বছরের মাথায় এসে হলেও।
  • বেল হুকস।। নারীবাদী সচেতনতা: চিন্তা বদলের এক নিরন্তর সংগ্রাম

    বেল হুকস।। নারীবাদী সচেতনতা: চিন্তা বদলের এক নিরন্তর সংগ্রাম

    • অনুবাদ: মুহম্মদ গোলাম সারওয়ার

    কোনো মানবসন্তান নারীবাদী হয়ে জন্মায় না, তাঁরা নারীবাদী হয়ে ওঠেন। এমন কি কেউ কেবল জন্মগত লৈঙ্গিক পরিচয়ে নারী বা কন্যা সন্তান হবার কারনেই নারীবাদী রাজনীতির সমর্থক হয়ে ওঠেন না। আরও অনেক রাজনৈতিক অবস্থানের মতোই একজন মানুষ নানান ধরনের বিবেচনা ও (more…)

  • মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নৈরাজ্য

    মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নৈরাজ্য

    • সেলিম রেজা নিউটন
    আর্টওয়ার্ক: সত্যাগ্রহ
    শিল্পী: পরেশ মৈত্র
    সূত্র: টুইটার

    সহিংসতার ঘনীভূত ও সুসংহত রূপের প্রতিনিধিত্ব করে রাষ্ট্র। ব্যক্তির আত্মা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু আত্মাবিহীন একটা মেশিন, সেহেতু তা কখনোই সহিংসতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না— কেননা এর খোদ অস্তিত্বটাই তো সহিংসতার কাছে ঋণী। (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, ১৯৩৪-ক: ৩১৮)

    (more…)

  • জর্জ অরওয়েলের উনিশ শ চুরাশি: তোমার দ্বেষ আমার দ্বেষ বাংলাদেশ বাংলাদেশ

    জর্জ অরওয়েলের উনিশ শ চুরাশি: তোমার দ্বেষ আমার দ্বেষ বাংলাদেশ বাংলাদেশ

    • সেলিম রেজা নিউটন

    চিন্তা বলতে এখন আমরা যা বুঝি সেই অর্থে চিন্তা বলে কিছুই আর থাকবে না আসলে। গোঁড়ামি মানে চিন্তা না করা – চিন্তার প্রয়োজনই না পড়া। গোঁড়ামি হলো অচেতনতা। (জর্জ অরওয়েল, ‘উনিশ শ চুরাশি’, ১৯৪৯)

    (more…)

  • শোয়েব ড্যানিয়েল।। ভারত নয়, সংস্কৃত’র আদিসূত্র সিরিয়া

    শোয়েব ড্যানিয়েল।। ভারত নয়, সংস্কৃত’র আদিসূত্র সিরিয়া

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    সম্পাদকীয় নোট: বিজেপি’র আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদের অন্যতম ভিত্তি সংস্কৃত ভাষার নেটিভিজম। ভারতের মাটিতেই এই ভাষার উৎসারণ- এমন প্রকল্প আর্য-আগামন তত্ত্বকে অস্বীকার করে এবং জাতিগত শুচিতাকে হিন্দুত্ববাদী সর্বভারতীয়তার ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে। পার্সি-আরব-তুর্কি ইত্যাদিকেই কেবল  ‘বহিরাগত’ বর্গীকরণ করে। এই সাম্প্রদায়িক প্রকল্পের একটি প্রতিকল্পই খুঁজেছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও গবেষক শোয়েব ড্যানিয়েল। এমন আরও হয়তো অনেক প্রতিকল্পই আছে। ২০১৫ সালে প্রবন্ধটি স্ক্রলে প্রকাশিত হয়। লেখাটি সময়োপযোগি করে অনুবাদ করেছেন অদিতি ফাল্গুনী।

    শিল্পী: সিদ্ধার্থ সাজিরাও

    মূল প্রবন্ধ

    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দেশের প্রাচীন সভ্যতার নানা উপাদানের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ইয়োগার পর সংস্কৃত ভাষার মর্যাদা পুন:প্রতিষ্ঠায় ব্রতী। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডে ‘১৬তম বিশ্ব সংস্কৃত সম্মেলন’-এ ভারত সরকার প্রবল উদ্দীপনার সাথে অংশ নেয়। ভারত থেকে প্রায় ২৫০ সংস্কৃত জানা পণ্ডিত এই সম্মেলনে অংশ নেন। ভারত সরকার সম্মেলন আয়োজনের খরচ আংশিক বহন করে। ভারতের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এবং তদানীন্তন মানব সম্পদ মন্ত্রী স্মৃতি ইরানী ২০১৫-এর ২রা জুলাই সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণা করেন। সুষমা স্বরাজ সেসময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংস্কৃত ভাষা বিষয়ক সচিবের পদও ঘোষণা করেন। শুনতে যতই অস্বাভাবিক শোনাক। যদিও সংস্কৃতের মত এক প্রাচীন ভাষা যা আজ হয়ত কেউই আর পড়ে না, বলে না বা লেখে না, সেই ভাষা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে কতটা সহায়ক হবে সেটা বলা কঠিন।

    ভারতের অভ্যন্তরে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার পরিষ্কার অর্থবোধক: ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্কেত এই ভাষা। সংস্কৃত ভাষা হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় আচার-আচরণ ও কৃত্যাদি সমাপনের ভাষা, এত পবিত্র যে নিচু জাতদের (যারা আধুনিক হিন্দু জনতার ৭৫ শতাংশ) এই ভাষার আবৃত্তি শোনারও অধিকার ছিল না। ভারত রাষ্ট্রের নাগরিকদের ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে সংস্কৃত এমন কোন কাজে আসবে না। যেখানে রাষ্ট্র সব নাগরিককে তাদের জীবন্ত মাতৃভাষাতেই লিখতে-পড়তে দেবার সুযোগ দেয় না, সেখানে প্রাচীন এক ভাষার অনুশীলন বা উদযাপনে কি যাবে আসবে? তবে এতে বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্য বা প্রাচীন ঐতিহ্যভিত্তিক পুনরুজ্জীবনবাদী এক ধরনের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের চর্চা সহজতর হয়।

    দূর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও বাস্তবতা প্রায়ই অতি সরলীকৃত জাতীয়তাবাদী পুরাণের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিজেপির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সংস্কৃত ভাষা যেখানে কিনা এক চিহ্নায়ক, সেখানে যদি এমনটা শুনতে পান যে ভাষা-তাত্ত্বিক বা পুরাতাত্ত্বিক নানা উপাদানের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে যে পৃথিবীতে প্রথম যারা বা যে জনগোষ্ঠি সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে তারা হিন্দু বা এমনকি ভারতীয়ও নয়- তারা ছিল সিরিয়ার অধিবাসী বা সিরীয়।

    সংস্কৃত ভাষী প্রাচীন সিরীয়রা
    ঋগ্বেদে সংস্কৃত ভাষার যে আদিতম নির্দশন পাওয়া যায় সেই ঋগ্বেদীয় সংস্কৃতের প্রথম শিলালিপি ভারতে নয়- পাওয়া গেছে আজকের সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে। খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১৩৫০ অব্দে মিতান্নী নামে এক রাজবংশ ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীদ্বয়ের উর্দ্ধ অববাহিকায় রাজত্ব করতেন। ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস নদীদ্বয়ের উর্দ্ধ অববাহিকার সংলগ্ন ভূ-খণ্ডই আজকের সিরিয়া, ইরাক ও তুরষ্কের ভূখণ্ড। মিতান্নীরা হুররিয়ান নামে যে ভাষায় কথা বলতেন, তার সাথে সংস্কৃতের সম্পর্ক নেই। তবে, প্রত্যেক মিতান্নী নৃপতিরই একটি সংস্কৃত নাম থাকত। শুধু রাজা নয়, মিতান্নী অভিজাতদেরও একটি সংস্কৃত নাম থাকত। এই নামগুলোর ভেতরে ছিল ‘পুরুষ’, ‘তুসরত্ত (যার আছে আক্রমণকারী রথ),’ ‘সুবরদাতা (স্বর্গ থেকে পাওয়া সৌভাগ্য),’ ‘ইন্দ্রতা (ইন্দ্র কর্তৃক সাহায্যপ্রাপ্ত)’ এবং ‘সুবন্ধু’ যা আজকের ভারতেও একটি সাধারণ নাম হিসেবে প্রচলিত।

    আর্ট্ওয়ার্ক: ট্রি অব লাইফ
    শিল্পী: দীপা হেক্রে
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এই মিতান্নীদের সংস্কৃতি ছিল বৈদিক আর্যদের মতই, ছিল রথ ও যুদ্ধভিত্তিক সভ্যতা। একটি মিতান্নী অশ্ব-প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে বেশ কিছু সংস্কৃত শব্দ পাওয়া যাচ্ছে: ঐক (এক), তেরা (তিন), সত্ত (সাত) এবং আশুয়া (অশ্ব বা ঘোড়া)। এছাড়াও, মিতান্নী অভিজাত সামরিক রথবাহী যোদ্ধা বা ‘মারিয়ান্না’দের দ্বারা গঠিত হত। উল্লেখ্য, সংস্কৃত ভাষায় ‘মারিয়া’ অর্থ ‘যুবক’।

    মিতান্নীরা যে দেবতাদের উপাসনা করতেন তাদের ভেতর নিজস্ব বা স্থানীয় কিছু দেব-দেবী ছাড়াও ঋগ্বেদে একাধিক দেবতার নাম পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, খৃষ্টপূর্ব ১৩৮০ অব্দে এক প্রতিদ্বন্দ্বী রাজার সাথে চুক্তি সম্পাদনের সময় ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য (অশ্বিনী ভ্রাতাদ্বয়) মিতান্নীদের পক্ষে দৈব স্বাক্ষী হচ্ছেন। আজকের ভারতে হিন্দুরা এই দেবতাদের প্রায় বিস্মৃত হলেও ঋগ্বেদে তাঁরাই ছিলেন প্রধান দেবতা।

    এই বিষয়টা সত্যিই চমকে দেবার মত। তবে ডেভিড অ্যান্থনি তাঁর বই অশ্ব, চক্র এবং ভাষা –য় উল্লেখ করেছেন যে এই পুরাতাত্ত্বিক উদাহরণ এটাই বোঝাচ্ছে যে উত্তর-পশ্চিম ভারতে ঋগ্বেদীয় সংস্কৃত ভাষার সঙ্কলণ হবার আগে শুধু যে এই ভাষাই বহির্বিশ্বে প্রচলিত ছিল তা’ নয় বরং ‘ ঋগ্বেদে সঙ্কলিত কেন্দ্রীয় দেব-দেবী এবং নৈতিক বিশ্বাসও সমপরিমাণ অতীতকাল থেকেই ভারতীয় ভূখন্ডের বাইরেও প্রচলিত ছিল।’

    সংস্কৃত ভাষা ভারতের আগে সিরিয়া কিভাবে পৌঁছেছে?
    এই অভাবনীয় ঘটনার কি ব্যখ্যা? পিএন ওক ও তাঁর চড়া মাত্রার হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসই তবে সত্য? গোটা পৃথিবীই একসময় হিন্দু ছিল? মক্কার কাবা ছিল শিবলিঙ্গ? এমন হাস্যকর সব গল্প? দূর্ভাগ্যজনকভাবে, পেছনের ইতিহাস অনেক বেশি গদ্যময় ও বেরসিক। সংস্কৃত ভাষা যে ভাষা-গোত্রর সন্তান সেই প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোত্রর আর এক সন্তান হচ্ছে প্রোটো-ইন্দো-ইরানীয়। প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাই ইরান ও উত্তর ভারতের অধিকাংশ ভাষার প্রপিতামহ। জেপি ম্যালোরি ডিকিউ অ্যাডামস সম্পাদিত এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইন্দো-ইউরোপীয়ান কালচার দেখাচ্ছে যে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার প্রাচীনতম ব্যবহারকারীরা উরাল হ্রদের দক্ষিণে ও কাজাখস্থানে ছিলেন। স্তেপ তৃণভূমির এই সন্তানেরা খৃষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলতেন যাদের ‘আন্দ্রোনভো’ সংস্কৃতির প্রতিনিধিও মনে করা হয়। মধ্য এশিয়ার এই জন্মভূমিতে একটি গোষ্ঠির মানুষের উদ্ভব হলো যারা প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় বলা ছেড়ে সংস্কৃতের আদি রূপে কথা বলা শুরু করলেন। এদেরই একটি অংশ পশ্চিমে সিরিয়া ও আর একটি অংশ পূর্বে ভারতের পাঞ্জাবের দিকে যাত্রা শুরু করলেন।

    শিল্পী: সিদ্ধার্থ সাজিরাও

    ডেভিড অ্যান্থনির মতে পশ্চিমে সিরিয়ার পথে যারা যাত্রা করলেন তারা সম্ভবত: সিরিয়ার হুররিয়ান রাজাদের দ্বারা ভাড়াটে রথ-যোদ্ধা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই রথ-যোদ্ধারা যে ভাষায় কথা বলতেন বা যেসব মন্ত্র আবৃত্তি করতেন সেটাই পরবর্তী সময়ে পূর্বে পাঞ্জাবের পথে যাত্রা করা তাদের সহযোদ্ধারা আবৃত্তি করবেন।

    এই ঋগ্বেদীয় সংস্কৃতভাষীরাই একটা সময় সিরিয়ায় তাদের নিয়োগদাতা রাজবংশকে সরিয়ে মিতান্নী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের ভেতরেই মিতান্নীরা তাদের নিজ সংস্কৃতি হারিয়ে স্থানীয় হুররিয়ান ভাষা ও ধর্ম গ্রহণ করে। তবে, রাজকীয় নাম, রথবিদ্যা সংক্রান্ত কিছু প্রযুক্তিগত শব্দ এবং ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র ও নাসত্য দেবতারা তাদের শব্দ ভান্ডারে থেকে যান।

    অন্যদিকে পূর্বে যারা গেলেন তারাই পরে ঋগ্বেদের রচনা ও সঙ্কলণ করবেন। নিজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের সৌভাগ্য তাদেরই হয়েছিল। এই ভারত উপমহাদেশেই তাদের ভাষা ও ধর্ম এমন শেকড় গাড়ল যে  ৩৫০০ বছর পরও আধুনিক ভারতীয়রা সেই বহু আগের স্তেপ তৃণভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়া পশুচারী যাযাবরদের ভাষাকে উদযাপন করতে ব্যাঙ্কক যান!

    সংস্কৃতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের হিন্দুত্বকরণ
    দূর্ভাগ্যজনকভাবে যদিও সেই প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় জনতার ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে উদযাপন করা হচ্ছে, তবে তাদের স্মৃতিকে আজকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বেদিমূলে মুছে ফেলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে সংস্কৃত ভাষা ভারতের ভূমি থেকেই উঃসারিত। প্রবল হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভারতীয় ভৌগোলিক অবস্থানকে জাতীয়তাবাদের শর্ত হিসেবে দেখতে চায়। অথচ, ভারতে প্রবেশের আগেই [বা ভারত-পূর্ব সময়ে] হিন্দুধর্মের ভিত্তি ভাষা সংস্কৃতর অস্তিত্ব ছিল- এই তথ্য হিন্দুত্ববাদের পায়ের নিচ থেকে গালিচা বা ছিন্ন বস্ত্র যাই বলুন তা’ সরিয়ে নেয়।

    আর্ট্ওয়ার্ক: হেড
    শিল্পী: মিশেল বাসকুয়াত
    সূত্র: উইকি আর্ট

    খুব কৌতুককরভাবেই ভারতের যমজ রাষ্ট্র পাকিস্তান পুরো উল্টো পথে হাঁটছে। তারা আরবে তাদের পিতৃ পরিচয় খুঁজছে ও উপমহাদেশে নিজ শেকড় ভুলতে চাইছে। ভারত বা পাকিস্তান, আরবীয় বা সংস্কৃত ভাষা নির্ভর যে কাল্পনিক, বিশুদ্ধ ও কুমারী দেশভাবনা গড়তে চাইছে যেখানে কোন ‘ভিন্ন’ প্রভাব নেই তা’ অলীকই। বাস্তব জগত মিথের মতো নয়, খুবই আলাদা বিষয়। পাকরা আরব নয় এবং এনসাইক্লোপেডিয়া অফ ইন্দো-ইউরোপীয়ান কালচার খুব তীব্রভাবেই জানাচ্ছে যে ‘এই তত্ত্ব (সংস্কৃত এবং এর পূর্বসূরী প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয়ান পূর্বসুরীরা ভারতের আদিবাসী) যা ইন্দো-ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিষয়ে কিছু আদিতম অনুমানকে পুনরুজ্জীবিত করে- তার স্বপক্ষে কোন ভাষা-তাত্ত্বিক বা পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।’
    মোদ্দা কথায়, সংস্কৃত ভাষা ভারতে বহির্পৃথিবী থেকেই এসেছে।

  • সাউল নিউম্যান ।। মার্ক্সবাদ ও ক্ষমতা প্রশ্ন

    সাউল নিউম্যান ।। মার্ক্সবাদ ও ক্ষমতা প্রশ্ন

    অনুবাদ: তৌকির হোসেন

    (প্রথম অংশ)
    মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার যে বিতর্ক, তা ঊনবিংশ শতাব্দীর র‍্যাডিকাল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এনার্কিস্ট মিখাইল বাকুনিন ছিলেন মার্ক্সের অন্যতম দুর্দান্ত সমালোচক, যার বিরুদ্ধ মত প্রথম আন্তর্জাতিকে বিভক্তি পর্যন্ত টেনেছিল। এই দুই বিপ্লবী শক্তির মধ্যকার যে বিতর্ক তা আজকের দিনেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই আলোচনা মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার সকল তর্ক-বিতর্ক নিয়ে না বরং আধিপত্য, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব— সংক্রান্ত বিতর্কের সাহায্যে বর্তমান রাজনৈতিক তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি মোকাবেলা করবে। বিভিন্ন ঘরানার তাত্ত্বিক, এক্টিভিস্টগণ প্রায় সময়ই নিজেদের মধ্যে আলোচনায় থাকেন কিভাবে এমন একটা বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন অর্জন করা যাবে, যেই বিপ্লবের ধারণার সাথে কর্তৃত্ব কিংবা শাসনের ইঙ্গিত যুক্ত থাকবে না। সাম্প্রতিক কম্যুনিজমের ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্ট অন্তত আর কিছু না হলেও, বিপ্লবের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চর্চার পথ যে আরও সুগম করা যায় সেই বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে দেয়। ইতিহাসের অন্যতম মুক্তিকামী আন্দোলনটিও দিনশেষে যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলো সেইগুলোকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। মিশেল ফুকোর মতে এক অর্থে যা ছিলো কেবল গার্ডের পরিবর্তন।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    যদিও রাশিয়ার বিপ্লব পুরোপুরি মার্ক্সের তত্ত্বকে প্রতিনিধিত্ব করে না। যারা বলে থাকেন— বলশেভিক বিপ্লব কোন সত্যিকার মার্ক্সিস্ট বিপ্লব না, তাদের অভিযোগও আমাদের আমলে নিতে হবে। এবং মার্ক্স নিজেও সম্ভবত কবরের মধ্যে নড়াচড়া করে উঠেছিলেন এই বিপ্লবের ধরনধারণ দেখে। মার্ক্সিজম এবং এনার্কিস্ট ক্রিটিকগুলো আমরা তাদের মতো করেই তত্ত্বের আতশীতে বিচার করব। মার্ক্স, এঙ্গেলস কিংবা ক্লাসিকাল মার্ক্সিস্টদের আলাপ আলোচনাতেই আমরা আটকে থাকব না, বর্তমান সময়ের মার্ক্সিস্ট/এনার্কিস্ট চিন্তকদের নিয়েও আমরা কথা বলব। মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার বিতর্ক ক্ষমতা, আধিপত্য এবং কর্তৃত্বের ধারণা ঘিরে আবর্তিত হয়। এর সাথে অবধারিতভাবে চলে আসে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ব্যাপারটি। মার্ক্সিস্ট এবং এনার্কিস্ট  উভয়ের কাছেই রাষ্ট্র— ব্যক্তি স্বাধীনতার পরম শত্রু । মার্ক্স এবং এঙ্গেলস উভয়েই রাষ্ট্রকে বিচার করেছেন একটি অস্ত্র হিসাবে যার মাধ্যমে এক অর্থনৈতিক শ্রেণি অন্য শ্রেণির উপর প্রভাব খাটায়, আধিপত্য বিস্তার করে। তাহলে রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে এমন একটা জিনিস যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গায় মার্ক্স খুব সোজাসাপ্টা না। তিনি সব জায়গায় খাটে— এরকম আলাদা কোন রাষ্ট্রের ধারণা দিয়ে যান নাই। তিনি কিছু কিছু সময় রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক, শ্রেণি শাসনের অস্ত্র হিসাবে দেখেছেন আবার কিছু সময় একে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিধি কতটুকু তা মার্ক্স-এনার্কিস্ট বিতর্কের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং তা নিয়ে আরও বিশদভাবে আমরা আগাব।

    ফ্রেডরিখ হেগেল
    ১৭৭০–১৮৩১
    পোট্রেট: স্কলেসিঙ্গার
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    মার্ক্সের রাষ্ট্র বিষয়ে আলাদা হওয়ার জায়গাটি হচ্ছে হেগেল। হেগেলের মতে লিবারেল বা উদারনৈতিক রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক নীতিবান মুরুব্বি যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব, সংঘাত আমরা প্রতিহত করতে পারি। ফিলোসফি অফ রাইট বইয়ে হেগেল দাবি তুলেন, নাগরিক সমাজ প্রচন্ড অহংকারে জর্জরিত এবং নিজের নিজের স্বার্থের জন্যে ক্রমাগতই নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। নাগরিক সমাজের শরীর এক সর্বজনীন স্বার্থপরতা দিয়ে গঠিত। এবং এ থেকে মুক্তির জন্যে হেগেলের মতে আধুনিক রাষ্ট্রকে এমন একটি ইউনিভার্সাল বা বিশ্বজনীন আইনি ব্যবস্থা, সামষ্টিক চেতনার উৎপাদন ঘটাতে হবে যাতে করে এই স্বার্থপরতাকে রাজনৈতিক খেলার মাঠ থেকে দূরে রাখা যায়। সোজা করে বললে, এমন একটা রাষ্ট্র যা সমাজের কতিপয়ের স্বার্থের জন্যে কাজ না করে, সর্বজনীন হয়ে উঠবে। এবং এই রাষ্ট্র সর্বসাধারণের ভালোই চায় এবং ভালোই করে। হেগেলের কাছে আধুনিক উদারনৈতিক রাষ্ট্র সমাজের দ্বন্দ্ব-বিভক্তির সমাধান। এটি নৈতিক এবং যৌক্তিক জ্ঞানের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। এই যে রাষ্ট্র সর্বসাধারণের ভালো চায় কিংবা সমাজের ভালো চায়, অথবা করতে পারে— মার্ক্স এই বক্তব্য মানতে পারলেন না। মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রই যেটা নিজেকে সর্বজনীন দেখাতে চায়। এর বিশ্বধার্মিক ভাবসাব কতিপয় অর্থনৈতিক স্বার্থ (যেমন— ব্যক্তিগত সম্পদ) ঢাকার একটা মুখোশ। এই জায়গা থেকেই মার্ক্স পরবর্তীতে দাবি করেন, রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শ্রেণি— বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব করে। হেগেলের বিপরীতে গিয়ে মার্ক্স প্রশ্ন তুলেন, রাষ্ট্র আদৌ নাগরিক সমাজের মধ্যকার সমস্যা, দ্বন্দ্বগুলোকে হটাতে পারে কিনা এবং যেহেতু পারে না, তাই রাষ্ট্রকেই সরাতে হবে। এইভাবে মার্ক্স নাগরিক সমাজের সর্বজনীন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে বু্র্জোয়া রাষ্ট্রের বিলোপের কথা বলেন।  যারা মার্ক্সের অরাজ কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তাভাবনার আলাপ তুলেন, তারা মূলত এই পয়েন্টকেই নানাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে মজার ব্যাপার, মার্ক্স যতই হেগেলের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বের ধারণার বিরোধিতা করেন না কেন তিনি এই তাত্ত্বিক কাঠামোর বাইরে যেতে পারেন নাই। এর প্রমাণ আমরা পাই, মার্ক্স বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যে ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রের ধারণা দেন তাতে, যেখানে মার্ক্স বলেন রাষ্ট্র সকল কর্তৃত্বকে কেন্দ্রীভূত করবে একক শক্তি/পার্টির হাতে। মার্ক্সের তাই এখানের চিন্তাভাবনা যতই কর্তৃত্ববিরোধিতাকে ফুটায়ে তুলুক না কেন, তিনি যে এখানে কর্তৃত্বের সমস্যার সাথে— আধিপত্য এবং উঁচু-থেকে-নিচু এইরকম শ্রেণিকাঠামোর (যা পার্টিযন্ত্রের মধ্যে থাকে, কলকারখানা এবং প্রযুক্তির মাঝে বিরাজ করে) সাথে বোঝাপড়ায় যাননি— তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, যারা মার্ক্সের কর্তৃত্ববিরোধী চিন্তার বৈশিষ্ট্যকে বারবার উল্লেখ করেন, তারাও দিনশেষে এটা মানতে বাধ্য হবেন, মার্ক্স ক্ষমতার বিস্তৃত সমস্যার জায়গাগুলোর সাথে বোঝাপড়ায় যথেষ্ট উপকারি নন। যে ক্ষমতার সমস্যা শ্রেণিদ্বন্দ্বের বাইরে অবস্থান করে এবং যাকে অর্থনৈতিক মাপকাঠির ছাঁচে ফেলা যায় না।

     

    মার্ক্সের রাষ্ট্র-ধারণা

    বাউয়ারের ক্রিটিক

    মার্ক্সের বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হচ্ছে, অর্থনৈতিক এবং শ্রেণি শক্তি রাজনৈতিক বিষয়াদি নির্ধারণ করে থাকে। এমনকি মার্ক্সের নিজের কাছেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিই সমস্ত ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংষ্কৃতিক, সামাজিক ঘটনাবলীর নিয়ামক। আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থাই সমাজে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে; বাস্তবে— উৎপাদন ব্যবস্থা যে ধরনের সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণ করে তার ভিত্তিতেই রাজনীতি নির্ধারিত হয়। মার্ক্সের এই বক্তব্যের হদিশ আমরা পাই তার অন দ্য জুইশ কোশ্চেন প্রবন্ধে। এটি আসলে ব্রুনো বাউয়ারের এক প্রবন্ধের প্রতি মার্ক্সের সমালোচনা ছিলো, যেখানে বাউয়ার অভিমত দেন, ধর্মীয় যে সকল ব্যাপারস্যাপার মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে তা থেকে মুক্তির জন্যে রাষ্ট্রকে সেকুলার হয়ে উঠতে হবে। মার্ক্স অন্যদিকে বলেন, রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে উঠলে ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে উঠবে, ব্যক্তিগত চর্চার জায়গা হয়ে উঠবে; যার অর্থ এটা না— রাষ্ট্র ধর্ম থেকে মুক্তি পাচ্ছে। ধর্ম তখনও নানাভাবে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা অন্যান্যভাবে প্রভাবিত করে যাবে: “ধর্ম থেকে রাজনৈতিক মুক্তি মানুষের সর্বশেষ কিংবা সর্বোচ্চ মুক্তি না।” বাউয়ারের যে রাজনৈতিক মুক্তি তা বরং সমাজে ধর্মকে আরও সুসহংত করবে এবং সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত বিভাজনের জায়গা প্রশস্ত করবে। বরং মার্ক্স রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার এই বিভাজনগুলো মুছবার চেষ্টা করেছেন। ওই রাজনৈতিক মুক্তি ধর্মের খপ্পর থেকে উদ্ধারের কোন সুবিধাই তৈরি করবে না। বাউয়ার রাষ্ট্রের ধার্মিক বৈশিষ্ট্য এবং ধর্ম থেকে সমাজকে মুক্ত করার যে ক্ষমতা এর রয়েছে তার উপর জোর দেন। আর মার্ক্সের জোর এখানে নাগরিক সমাজের উপর। সমাজে ধর্ম বা অর্থনীতির কারণে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা থেকে রাষ্ট্র মুক্তি দিতে পারে না; কারণ, রাষ্ট্র নিজেই এই বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন। মার্ক্সের জন্যে এইখানে আসল ক্ষমতা নিহিত রয়েছে নাগরিক সমাজ এবং ধর্মীয়/ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে প্রভাব তার ভিতর।

    ব্রুনো বাউয়ের
    (১৮০৯- ১৮৮২)

    রাজনৈতিক শক্তি নয় বরং অর্থনৈতিক শক্তিই সমাজকে চালনা করে, শাসন করে। একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ— বাউয়ারের মতই মার্ক্স রাজনৈতিক মুক্তির সুরাহা খুঁজতে চেয়েছেন। তিনি দেখলেন এই মুক্তি আসতে পারে যদি রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যকার যে ফারাক রয়েছে তা আরও বিস্তৃত হয়। এবং যে সকল অব্যক্তিগত অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে (সামষ্টিক উৎপাদন, ব্যক্তিগত ফায়দা বাদে) তাকে আরও বলবৎ করা যায় (তাদের উপর রাজনৈতিক প্রভাবগুলোকে ধীরে ধীরে হ্রাস করার মাধ্যমে)। কম কম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অর্থই হলো একক মালিকানার নিয়ন্ত্রণ কমানো।

    এইখানে অন দ্য জুইশ কোশ্চেন প্রবন্ধের আলোচনার উদ্দেশ্য মার্ক্স এবং বাউয়ারের ফারাক দেখানো। মার্ক্স যেখানে সমাজ তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রের দিকে কথা তুলেন, সেখানে বাউয়ার রাষ্ট্র থেকে সমাজের দিকে ফেরত আসেন। বাউয়ার বিশ্বাস করতেন, সমাজকে ঠিকঠাক রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই নিহিত, তাই রাষ্ট্র যদি ধর্ম থেকে মুক্ত হতে পারে তাহলে সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্ম তার গুরুত্ব এমনিতেই হারাবে। মার্ক্স অন্যদিকে বিশ্বাস করতেন, আসল আধিপত্য, আসল ক্ষমতা নিহিত রয়েছে নাগরিক সমাজের ভিতর: “রাজনৈতিক না, বরং নাগরিকের জীবনই তাদের পরস্পরের মধ্যকার আসল বন্ধন।” মার্ক্সের মতে, বাউয়ার রাষ্ট্রকে একটা স্বাধীন সত্তা হিসেবে ধরে নিয়েছেন যা একটি মারাত্মক ভুল। রাষ্ট্র একক নির্ধারক এবং স্বায়ত্তশাসিত হয়ে কাজ করতে পারে না। রাষ্ট্র বরং অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার কাজকর্ম পরিচালনা করে।

    যদিও বাউয়ার কোনভাবেই এনার্কিস্ট ছিলেন না, কিন্তু তার বিশ্বাসের একটা জায়গায় নৈরাজ্যবাদী ধারণার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র নিজেই একটি নির্ধারক, স্বায়ত্তশাসিত শক্তি যার আলাদা অস্তিত্ব রয়েছে, আলাদা ক্ষমতা রয়েছে সমাজের উপর। বাউয়ার যেখানে এই ক্ষমতাকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন, নৈরাজ্যবাদীরা একে নেতিবাচক এবং ধ্বংসাত্মক হিসেবে দেখেন। অবশ্য চিন্তার এই ধারা এও বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক ক্ষমতাই সমাজের প্রধান নির্ধারকরূপে কাজ করে থাকে (যা মার্ক্স সমালোচনা করেন)। মার্ক্স এইজন্যে পিয়েরে জোসেফ প্রুঁধোর বক্তব্য খারিজ করেন যার বক্তব্য ছিলো— রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নানাভাবে তৈরি করতে পারে। মার্ক্সের মতে, রাষ্ট্রের কাছে এইরকম কোন ক্ষমতা থাকতে পারে না, কেননা এটি তো কেবল অর্থনৈতিক শক্তিসমূহেরই এক প্রতিফলন যার পরিবর্তন ঘটানো উচিত। বাউয়ার বিশ্বাস করতেন, মার্ক্স রাষ্ট্রের ব্যাপারে এক প্রকার অন্ধবিশ্বাস পোষণ করেন৷ রাষ্ট্র তার কাছে অর্থনৈতিক শক্তির এক রকম ফলাফল: ” তিনি (মার্ক্স) বলেন, ‘দারিদ্র্য রাজনৈতিক দাসত্ব সৃষ্টি করে থাকে— যা রাষ্ট্র।’ কিন্তু তার এই বক্তব্যকে যদি একটু ঘুরায়ে বলা হয়— ‘রাজনৈতিক দাসত্বের প্রতিরূপ রাষ্ট্র নিজে টিকে থাকার জন্যে সবসময়ই দারিদ্র্যকে হাজির রাখে; যার অর্থ— দারিদ্র্য মুছতে চাইলে রাষ্ট্রকেই মুছে ফেলা প্রয়োজন’— এই বক্তব্য মার্ক্স মানতে পারেন না।

    বোনাপার্টিজমের প্রশ্ন

     যদিও এটা সত্য, মার্ক্স রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক শক্তি এবং শ্রেণিস্বার্থের উৎপাদন হিসেবেই দেখেছেন, কিন্তু কিছু কিছু সময়ে তিনি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হিসাবেও চিন্তা করেছেন। তার দ্য এইটিন্থ ব্রুমাইর অফ লুই বোনাপার্ট গ্রন্থে ১৮৫১ সালের ফ্রান্সে সংঘটিত একটি অভ্যুত্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে লুই বোনাপার্টের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় শক্তি সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখল করে। রাষ্ট্রীয় শক্তি বুর্জোয়াদের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে কাজই করেনি, কিছু ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করেছে। এইজন্যে মার্ক্স বলেন, “কেবল দ্বিতীয় বোনাপার্টের সময়েই রাষ্ট্র নিজেকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন করে রাখতে পেরেছিলো।” যদিও এই রাষ্ট্রের ধারণা রাজনৈতিকভাবে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলেও, এর সীমানা বা পরিধি ওই বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরে যেতে পারে নাই। বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র পুঁজিবাদী শ্রেণিরই সন্তান, ক্রমশ তা দৈত্যাকার রূপ ধারণ করেছিলো। বু্র্জোয়ারা বোনাপার্টকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠ করেছিলো যেন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সে ঠিক রাখতে পারে এবং শ্রমিকদের ঠান্ডা করে রাখতে পারে। কিন্তু, বু্র্জোয়া পার্লামেন্টের বিরুদ্ধেই এক সময় বোনাপার্ট খেপে উঠে। মার্ক্সের মতে, বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র বু্র্জোয়া ক্ষমতারই একটি বিকৃত, সহিংস রূপ— যা নিজেই একটি বু্র্জোয়া দৈত্য হয়ে উঠে বু্র্জোয়াদের বিরুদ্ধাচারণ করতে শুরু করে। এটি বুর্জোয়া স্বার্থ বাঁচাবার জন্যে বু্র্জোয়াদের আত্মহত্যার একটি অন্যতম উদাহরণ। অন্যভাবে, অর্থনৈতিক স্বার্থের গতি ঠিক রাখার জন্যে এই দৈত্যের প্রয়োজন ছিলো: “যদি অর্থসম্পত্তি রক্ষা করতে হয়, তাহলে রাজার মুকুট মাটিতে নামাতে হবে।” এবং বু্র্জোয়ারাও একপ্রকার নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলো, যদি এর অর্থনৈতিক ক্ষমতা টিকায়ে রাখতে হয়। আর বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র এই বিসর্জনেরই ফলাফল।

    লুই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
    ১৮০৮- ১৮৭৩
    শিল্পী: জেভিয়ার উইন্টারহল্ট

    তাহলে, মার্ক্সিস্ট তত্ত্বে বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা তাকে আসলে কতখানি স্বাধীন বলা যাবে? এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। ডেভিড হেল্ড এবং জোল ক্রিগারের মতে, মার্ক্সিস্ট তত্ত্বে রাষ্ট্র এবং শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্কে দুটো ধারা আছে। প্রথমটি, আমরা একে যদি ধরি ১(ক)— যা বোনাপার্টিজমের খোদ মার্ক্সের ব্যাখা দ্বারা প্রভাবিত— রাষ্ট্রের তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসনের ধারণার উপর জোর দেয়। এই ধারা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ ও আমলাতন্ত্র যে সমাজে আলাদা বলয়জুড়ে রয়েছে, সেই ধারণার উপর জোর দেয়। এর কাঠামো যে অর্থনৈতিক শ্রেণি দিয়ে পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে আছে এরকমও নয়, কিন্তু তাদের এই আলাদা বলয় সমাজের কেন্দ্রীয় একটি বিষয়। আর দ্বিতীয় ধারা, ২(ক), যা হেল্ড এবং ক্রিগারের মতে মার্ক্সিস্ট চিন্তায় সবচেয়ে প্রভাবশালী, রাষ্ট্রকে দেখে শ্রেণি আধিপত্য জারি রাখার একটি অস্ত্র হিসেবে। শ্রেণিস্বার্থ রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

    হেল্ড এবং ক্রিগারের মতে, এই দুই  বিপরীতধর্মী ধারা আলাদা আলাদা বিপ্লবী কৌশলের জন্ম দেয়। কারণ, প্রত্যেকের রাষ্ট্রকে দেখার চোখ ভিন্ন। প্রথমটির সাপেক্ষে বিপ্লবী কৌশল হবে ১(খ)— রাষ্ট্র যেখানে বিপ্লবী কৌশল এবং মুক্তির একটি অস্ত্রবিশেষ। কারণ, রাষ্ট্রকে এখানে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানরূপে দেখা হচ্ছে এই অর্থে রাষ্ট্র শ্রেণিস্বার্থের সাথে এসেনশিয়ালভাবে যুক্ত নয়। একে পুঁজিবাদ এবং বুর্জোয়া শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। দ্বিতীয়টির সাপেক্ষে বিপ্লবী কৌশল হবে ২(খ)— সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রাষ্ট্রের ধ্বংসই কাম্য। কারণ, রাষ্ট্র এখানে এসেনশিয়ালি বুর্জোয়া রাষ্ট্র, শ্রেণি শোষণের অস্ত্র। লেনিন এই ধারার খুব ভালো উদাহরণ।

    রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসনের এই প্রশ্ন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে এর ভূমিকার পৃথক পৃথক ব্যাখা এই ছকের মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে:

    মার্কিস্ট  প্রস্তাবনা

    ১(ক) স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র ———-> ১(খ) রাষ্ট্র বিপ্লবের একটি অস্ত্র

    ২(ক) নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ———–> ২(খ) বিপ্লবে রাষ্ট্র ধ্বংস করতে হবে

    এই রাষ্ট্রের তত্ত্ব এবং এদের সাথে সংযুক্ত বিপ্লবী ধারণার ডাইকোটমির বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলা যায়। কেউ কেউ বলতে পারেন, ২(ক) থেকেও তো ১(খ) তে যাওয়া যায়। অর্থাৎ, যদি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সবকিছুই শ্রেণির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় ২(ক) তাহলে এই রাষ্ট্রকেও তো আমরা বিপ্লবের একটি অস্ত্র হিসাবে দেখাতে পারি। আবার, রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা শ্রেণি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, কেবল স্বায়ত্তশাসিত বা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে কাজ করতে থাকে ১(ক) তাহলে এই রাষ্ট্রকেও তো বিপ্লবের মাধ্যমে ধ্বংস করা যায়।

    একটি এনার্কিস্ট প্রস্তাবনা

    ১(ক) স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র ———-> ২(খ) বিপ্লবে রাষ্ট্র ধ্বংস করতে হবে

    ২(ক) নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ———–> ১(খ) রাষ্ট্র বিপ্লবের একটি অস্ত্র

    এই দুই আর্গুমেন্টের র‍্যাডিকালি দুই জায়গায় বসানোর পিছনে এই যুক্তিটিই রয়েছে। এবং এই যুক্তি এক ধরণের এনার্কিস্ট রাষ্ট্রের ধারণার কাছাকাছি বসবাস করে। এনার্কিজম রাষ্ট্রকে দেখে স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার আধিপত্য বিস্তারের নিজস্ব কৌশল রয়েছে। এই কারণে রাষ্ট্রকে বিপ্লবের নিরপেক্ষ অস্ত্র হিসেবে দেখাটা ভুল যেমনটা মার্কিস্ট ১(খ) প্রস্তাবনায় আমরা দেখি। বিপ্লবের সময়ে, পরিবর্তনের সময়ে রাষ্ট্র নিজস্ব কৌশলের বদৌলতে ঠিকই আধিপত্য, শোষণ কায়েমের পথে টিকে থাকতে পারে। এই বিপ্লব যদি প্রলেতারিয়েতদের হাত ধরেও হয় (মার্ক্সের প্রস্তাব যা), এই রাষ্ট্রকে তখনও বিশ্বাস করা যায় না কারণ এর নিজের টিকে থাকার আলাদা কৌশল আছে যা বিপ্লব নিরপেক্ষ। তাই রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে নিরপেক্ষ ধরে বিপ্লবের সহায়ক অস্ত্র হিসাবে বিবেচনা করা আদতে খুব যুক্তিসঙ্গত কিছু না। এইজন্যে রাষ্ট্রকেই এখানে বিপ্লবী কৌশলে ধ্বংস করতে হবে। আবার এনার্কিস্ট যুক্তি অনুসারে, ২(ক) থেকে আমরা দেখি, রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের একটা যন্ত্র— যা আরও ক্ষতিকর; কারণ রাষ্ট্র এখানে এমন একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান যা সবসময়ই বুর্জোয়া শ্রেণির আজ্ঞাধীন। বু্র্জোয়া শ্রেণি যেমন খুশি তেমনভাবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে পারে স্বার্থরক্ষার জন্যে। এইখান থেকে এনার্কিস্ট প্রস্তাবনা ২(খ) অনুসারে, বিপ্লবী কৌশলে রাষ্ট্রের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কখন করতে হবে? যখন এই রাষ্ট্র বিপ্লবী গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, যখন তারা একে নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এই নিরপেক্ষ শব্দের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক আছে। মার্ক্সিস্ট যুক্তি অনুসারে, নিরপেক্ষতা হচ্ছে শ্রেণিস্বার্থ থেকে মুক্ত হয়ে স্বায়ত্তশাসন, যেখানে এনার্কিস্টদের কাছে নিরপেক্ষতা ঠিক তার বিপরীত জিনিস বোঝায়— শ্রেণিস্বার্থের অধীনে থাকা। কারণ, রাষ্ট্র যখন শ্রেণিস্বার্থের অধীনে থাকে তখন রাষ্ট্রেরও যে টিকে থাকার নিজস্ব কৌশল আছে তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না; তখন এটি শ্রেণিস্বার্থের আজ্ঞাবহ দাস হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মার্ক্সের বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র যা তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র সেখানেও রাষ্ট্রের নিজস্ব কলাকৌশল চিন্তাভাবনার বাইরে রাখা হয়। এনার্কিস্টরা ঠিক এই কারণে, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন, কারণ রাষ্ট্র স্বায়ত্তশাসিত একটি ব্যাপার যার নিজস্ব কৌশল রয়েছে অর্থনৈতিক/শ্রেণি-স্বার্থের বাইরে; তাই রাষ্ট্রকে বিপ্লবের নিরপেক্ষ অস্ত্র ভাবা ভুল। এনার্কিস্টদের কাছে নিরপেক্ষতা এইক্ষেত্রে সন্দেহপূর্ণ একটি ধারণা।

    মার্ক্স যতটা না এই বোনাপার্টিজমের প্রশ্ন নিয়ে ভাবান্বিত ছিলেন তার থেকে বেশি এনার্কিস্টরা এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তিত। কেননা বোনাপার্টিজমের প্রশ্নের আলোকে মার্ক্সের রাষ্ট্র, বিপ্লবের ধারণার বিভিন্ন আঙ্গিক প্রকাশ পায়। নিঃসন্দেহে মার্ক্স এইক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছেন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তিনি কিভাবে এই বিরোধিতা করেছেন— একটা স্বায়ত্তশাসিত বোনাপার্টিস্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে না বুর্জোয়া আধিপত্যেরই এক ভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং এর বিপ্লবী কৌশলে কিরকম ভূমিকা থাকতে পারে সেই আঙ্গিকে—যা আমাদের বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে বিবেচিত হবে।

    নিকোস পুলাঁতজাস যিনি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দিয়েছিলেন, বলেন— মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের কাছে বোনাপার্টিজম ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের একটা ব্যতিক্রমী ধরন না বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বেশভূষা এই বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের পরতে পরতেই আছে। এই চিন্তা মার্ক্সের রাষ্ট্র-ব্যাখাকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে। রালফ মিলিব্যান্ড অন্যদিকে বলেন, মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের কাছে এই রাষ্ট্র সমানভাবেই শ্রেণি শাসনের একই অস্ত্র। আমরা এইখান থেকে কী বুঝতে পারি? মার্ক্স নিজে কখনো রাষ্ট্রের তত্ত্ব দিয়ে যাননি, অন্তত যদি একটা সঙ্গতিপূর্ণ তত্ত্বের আশা করি, মার্ক্স তাও দিয়ে যাননি। রাষ্ট্রের ব্যাপারে কখনো কখনো তাকে খুব একপেশে বা ‘একটা অস্ত্র’— এইরকম দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাতে পাওয়া যায়। জার্মান ইডিয়োলজিতে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র হচ্ছে সেইটাই যাতে শাসকশ্রেণির ব্যক্তিবর্গরা নিজেদের সাধারণ স্বার্থ জাহির করতে পারে।” আবার কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলতে দেখা যায়, “আধুনিক রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহী পরিষদ বেসিকালি বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষার জন্যে একটি কমিটি।” কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো যেহেতু একটা রাজনৈতিক প্যাম্ফলেট তাই এর উপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত হবে না; কারণ আমরা তাত্ত্বিক জায়গাতে মার্ক্সকে দেখার চেষ্টা করছি। তবুও এটি মার্ক্সের রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তাভাবনার কিছু দিকনির্দেশনা আমাদের দিতে পারে।

    সুতরাং, রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে আমরা কিভাবে দেখতে পারি? এর কোন পরিষ্কার উত্তর আসলে নাই। তাই এই প্রসঙ্গে মার্ক্সের অবস্থান কী ছিলো (যদিও মার্ক্সের এই বিষয়ে সচেতন কোন অবস্থান সম্ভবত ছিলোও না) তা এভাবে দাঁড় করাতে পারি: রাষ্ট্রের ফাংশনালিস্ট জায়গাগুলো বাদ দিয়েই হোক কিংবা রাষ্ট্রকে কিছু পরিমাণে স্বায়ত্তশাসন দিয়েই হোক, মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শ্রেণি আধিপত্যের মাঝেই। এই কথার অর্থ, রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক অস্ত্রই হোক কি  বুর্জোয়াদের পক্ষে বা কোন কোন সময় বিপক্ষে কাজ করুক না কেন, মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র একটা প্রতিষ্ঠান যা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণিটিকে (যারা উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে) অন্য শ্রেণিদের শোষণ করতে সাহায্য করে। অন্যভাবে, রাষ্ট্রই বুর্জোয়াদের প্রলেতারিয়েতের উপর আধিপত্য এবং শোষণ তরান্বিত করতে ভূমিকা রাখে। এই ব্যাখা কিন্তু রাষ্ট্রকে তুলনামূলক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনও দেয়: রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে কিন্তু তখনও একে বুর্জোয়াদের বৃহৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে চলতে হয়।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের অস্ত্র। আরও ভালো করে বললে— রাষ্ট্র বুর্জোয়া শ্রেণি আধিপত্য জারি রাখার একটা প্রতিরূপ বা রিফ্লেকশান; একটা প্রতিষ্ঠান যার কাঠামো পুঁজিবাদী সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত। হ্যাল ড্রেপারের মতে, রাষ্ট্র “শ্রেণি-বিকৃতকরণ”-এর মাধ্যমে কাজ চালাতে থাকে। কী কাজ? এমন একটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বজায় রাখা যার মাধ্যমে বু্র্জোয়াদের প্রলেতারিয়েত শোষণ করাটা সহজ হয়। সাধারণের ভালো চাওয়ার বুলি আউড়িয়ে যেন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যায়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আমরা দেখি বু্র্জোয়াদের স্বার্থের জন্যে নিবেদিত প্রাণ। মার্ক্স ‘সমাজের কতিপয় শ্রেণিস্বার্থের ফলাফল রাষ্ট্র’ বলতে এটিই বুঝিয়েছেন।

    মার্ক্সের রাষ্ট্র-ধারণার মধ্যে এইটাও দেখা সম্ভব— মার্ক্স পক্ষপাতিত্বমূলক রাষ্ট্রের একরকম হেগেলিয়ান ক্রিটিকই চালু রেখে গেছেন। যে রাষ্ট্র এক পক্ষের জন্যে কাজ করে; সমাজের, সবার জন্যে কাজ করে না। মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র তো এক ছদ্মবেশি চরিত্র। এটি একটি ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক কম্যুনিটি আকারে নিজেকে হাজির করে অথচ কাজ করে কিছু নির্দিষ্ট পক্ষীয় স্বার্থের বরাতে। এই ছদ্মবেশের আড়ালে অর্থনৈতিক শ্রেণির আসল সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের দৈন্যদশা ও বিচ্ছিন্নতা চাপা পড়ে যায়। হেগেলের মতই মার্ক্স একটি ন্যায়সঙ্গত এজেন্সি খুঁজতে চেয়েছিলেন— এক ধরনের গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার বৈধ ফর্ম আকারে, যার আবির্ভাব ঘটবে সবার স্বার্থরক্ষার্থে, ব্যক্তিগত/অব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্য ছাপিয়ে। মার্ক্স পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে দেখেছেন নাগরিক সমাজের বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ হিসেবে এবং এই বিচ্ছিন্নতা তখনই অতিক্রম করা সম্ভব যখন কোন মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট সমাজে চলমান অর্থনৈতিক/সম্পত্তির এই বিভেদপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করবে না। তবে মার্ক্স হেগেলের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন এই জায়গাতে— এজেন্ট কে হতে পারে? মার্ক্স আধুনিক রাষ্ট্র যে এজেন্ট হতে পারে তা একেবারেই নাকচ করে দেন। কারণ, এই রাষ্ট্র বুর্জোয়া সম্পর্কের রাষ্ট্র। হেগেল যখন মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট হিসেবে আধুনিক রাষ্ট্রকে বেছে নেন, অন্যদিকে মার্ক্স প্রলেতারিয়েতের মাঝেই ওই এজেন্টকে খুঁজে পান।

    প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র

    প্রলেতারিয়েত হচ্ছে মার্ক্সের সেই ইউনিভার্সাল এজেন্ট যেই এজেন্ট সমাজের সকল দ্বৈততা থেকে মুক্তি দিবে; অন্তত এমনটাই মার্ক্স তার হেগেলিয়ান ট্র্যাডিশন থেকে খুঁজে পেয়েছেন। প্রলেতারিয়েতের মুক্তি এক অর্থে পরিপূর্ণভাবে সমাজের মুক্তিরই সমার্থক। মার্ক্সের তত্ত্বে আমরা এক সম্ভাবনার খোঁজ পাই। সমাজের উপর ন্যায়সঙ্গত কর্তৃত্বচর্চার সম্ভাবনা। এইখানে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের চর্চা, জনগণ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা কর্তৃত্বের সাথে জনগণের যে বিচ্ছিন্নতা এই সমস্ত দোষে দুষ্ট। কম্যুনিজমের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে মার্ক্সের মতে সর্বসাধারণের এই সামাজিক ক্ষমতার চর্চার এই ধাপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

    কিন্তু এই সামাজিক ক্ষমতা কিভাবে সংগঠিত হবে? মার্ক্সের মতে, কিছু সময়ের জন্যে হলেও, এই ক্ষমতা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সংগঠিত হতে হবে। পুঁজিবাদী ও কম্যুনিস্ট সমাজের মধ্যবর্তী এই ক্রান্তিকালীন সময়ে প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়েই রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা ঘটাবে: “এই ক্রান্তিকালীন সময় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রলেতারিয়েতের হাতে সোপর্দ হবে।” মার্ক্স তার অ্যাড্রেস অফ দ্য সেন্ট্রাল কমিটি টু দ্য কম্যুনিস্ট লিগ এ আরও জোর দেন, “শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে যেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্রীভূতিকরণ করা যায়” সেজন্যে লড়াই করে যেতে হবে। প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী ক্ষমতা শ্রেণিশত্রু  নির্মূল করার কাজে এবং পুরোনো বুর্জোয়া সংষ্কৃতি সরানোর কাজে ব্যবহার করতে পারে। এই কারণে মার্ক্স কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো তে বলেন: “প্রলেতারিয়েত তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য কাজে লাগিয়ে বুর্জোয়াদের হাত থেকে সকল প্রকার পুঁজি ও উৎপাদন যন্ত্র ছিনিয়ে এনে রাষ্ট্রের হাতে জড়ো করবে।” সুতরাং মার্ক্সের কাছে প্রলেতারিয়েতের নিয়ন্ত্রণাধীন এই রাষ্ট্র, সাময়িক হলেও, পুরো সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি মাধ্যম। যে মাধ্যম সমাজকে বুর্জোয়া আধিপত্য থেকে মুক্তিদান করবে। মার্ক্সের কাছে এই বিপ্লব তাই রাষ্ট্র ক্ষমতা ধ্বংস করা না বরং এর লাগাম অন্য কারো হাতে আনা এবং “ক্রান্তিকালীন সময়ে” এই ক্ষমতার প্রয়োজনমাফিক সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, মার্ক্সের কাছে এই প্রলেতারিয়ান রাষ্ট্র একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এঙ্গেলস দাবি করেন, এই রাষ্ট্র যখন আর প্রয়োজন হবে না তখন এমনিতেই “ভেঙ্গে যাবে”। এনার্কিস্টরা এই প্রসঙ্গে মনে করেন, রাষ্ট্র এমনি এমনি ভেঙ্গে যাবে এইরকম আশা করা শিশুতোষ। এর কারণ পরবর্তীতে আরও পরিষ্কার হবে।

    মিখাইল বাকুনিন
    (১৯১৪-১৮৭৬)

    সুতরাং, মার্ক্সের “ক্রান্তিকালীন সময়ের” বিপ্লবী-কৌশল মোতাবেক, বৃহৎভাবে ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। যদিও মার্ক্স সবসময় রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির “অস্ত্র” হিসেবে কিংবা শ্রেণি আধিপত্যের রিফ্লেকশান আকারে দেখেছেন; তাহলে এই জায়গায় তিনি কিভাবে ভাবেন এই “ক্রান্তিকালীন” রাষ্ট্র সমাজের সবার হয়ে কথা বলবে? এটা কি মার্ক্সের রাষ্ট্র-বিরোধিতা এবং তার হেগেল থেকে ব্যতিক্রমী হওয়ার অবস্থানটিকেই প্রশ্ন করে না? এনার্কিস্টরা এই জায়গায় মার্ক্সের চিন্তাভাবনায় অন্যতম বড় একটা গলদ খুঁজে পান। যদিও মার্ক্স এইখানে কোন সমস্যা দেখেন না। কারণ, ক্রান্তিকালীন রাষ্ট্র এখানে প্রলেতারিয়েতের হাতে তথা “সর্বজনীন শ্রেণি”-র হাতে রয়েছে যা পুরো সমাজকেই প্রতিনিধিত্ব করবে। মার্ক্স এই রাষ্ট্রকে কোন একপক্ষীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন না যেমনটা তিনি বুর্জোয়া সমাজে দেখতেন। এখন এটা দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্বরাষ্ট্র বা ইউনিভার্সাল রাষ্ট্র হিসেবে। এমনকি মার্ক্সের ভাষ্যমতে, এই রাষ্ট্রের কোন রাজনৈতিক ক্ষমতাও নাই। কারণ, রাজনৈতিক ক্ষমতা সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হতো। এখন যেহেতু সমাজে কোন শ্রেণি-বিভাজন বসবাস করে না, আবার বুর্জোয়াদেরও অর্থনৈতিক উচ্চ আসন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই রাজনৈতিক আধিপত্যও আর বিরাজ করে না। এই কারণে, রাজনৈতিক ক্ষমতা বলেও আর কিছু থাকছে না: “যখন ক্রমান্বয়ে শ্রেণি-বিভাজন উধাও হয়ে যাবে, সমস্ত উৎপাদন ব্যবস্থা সমগ্র জাতির হাতে সংঘের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত হবে তখন সাধারণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চরিত্র হারাবে।” তিনি বাকুনিনের এই ক্রান্তিকালীন রাষ্ট্রের সমালোচনার উত্তরও দিয়েছেন: “যখন শ্রেণি আধিপত্যের পতন ঘটবে, তখন বর্তমান রাজনৈতিক সেন্সে আসলে কোন রাষ্ট্র থাকবে না।” মার্ক্সের জন্যে রাজনৈতিক আধিপত্য এবং দ্বন্দ্ব আসলে শ্রেণি আধিপত্যেরই একরকম প্রকাশ। একবার শ্রেণি আধিপত্যকে মুছে দেওয়া গেলে, রাজনৈতিক আধিপত্যও মুছে দেওয়া কঠিন কিছু হবে না: রাষ্ট্র প্রলেতারিয়েতের দ্বারা পরিচালিত একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যতক্ষণ না এটা “মিলিয়ে যায়”।

    আমরা মার্ক্সের যুক্তিই যদি অনুসরণ করি: যেহেতু শ্রেণি ও পুঁজিবাদী সম্পর্কের ফলাফলই হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা, তাই এইসবকে হটানো গেলে, একদম সরাসরি বললে— রাজনৈতিক ক্ষমতাই আর থাকবে না। যদিও তখন মার্ক্সিস্ট বিপ্লবী প্রোগ্রামের এই রাষ্ট্র যেকোন বু্র্জোয়া সমাজের কিংবা যেকোন ধরনের রাষ্ট্র থেকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত এবং শক্তিশালী। ক্রমান্বয়ে এই “ক্রান্তিকালীন” রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হলে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা আর প্র্যাকটিস করবে না— এনার্কিস্টরা এই বক্তব্যকে খুবই খোঁড়া মানেন। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতার এই সাধারণ ধর্ম (একই সাথে যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ধর্ম) অস্বীকার করেন; যে ধর্ম মানে— ক্ষমতা অর্থনৈতিক শক্তি থেকে স্বাধীন এবং যার নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং যা নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এখন এটি সত্য যে মার্ক্স বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের বেলায় রাষ্ট্রকে শ্রেণি থেকে কিছুটা হলেও আলাদা করে দেখেছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো তা যথেষ্ট কিনা। এনার্কিস্টদের মতে, তা যথেষ্ট না; কারণ, মার্ক্স পরবর্তীতে বিপ্লবের জন্যে রাষ্ট্রকেই ব্যবহার্য বিষয় হিসেবে মেনেছেন। রাষ্ট্র, প্রাকৃতিক সত্তা  হিসেবে বিচার করলে, অর্থনৈতিক শক্তি থেকে এটি স্বাধীন। এই কারণে রাষ্ট্রকে ধার করে বিপ্লব পরিচালিত করার যে প্রকল্প (যে শ্রেণিই তা নিয়ন্ত্রণ করুক না কেন) তা বিশ্বাস করা যায় না। বোনাপার্টিজমের যে সম্ভাবনা, এক অর্থে বলা যায়, এনার্কিজম তা আরও বড় পরিসরে চিন্তা করতে সাহায্য করে।

    মার্ক্সের চিন্তার তাৎপর্য কোন জায়গায়? রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারণায়। রাষ্ট্রযন্ত্র যে শ্রেণির স্বার্থ ফুটায়ে তুলে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সমাজের উপকারও করতে পারে তা মার্ক্স আমাদের দেখান। যদিও মার্ক্সের মতে এই উপকারের ঘটনা যখন প্রলেতারিয়েত বা “বিশ্বজনীন শ্রেণি” রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে তখনকার ব্যাপার এবং এই যন্ত্র আদতে আধিপত্যকারী শ্রেণিরই আজ্ঞাবহ যন্ত্র। এবং আমরা এও দেখিয়েছি, মার্ক্সের এই চিন্তায় স্থূল সরলীকরণের অস্তিত্ব দৃশ্যমান। রবার্ট সল্টম্যানের মতে মার্ক্সিস্ট তত্ত্ব আপাতদৃষ্টিতে যে কাজের কাজটি করে তা হলো রাজনৈতিক শোষণ কিভাবে সংঘটিত হয় তা দেখিয়ে দেয়। এই কিভাবে— রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের মধ্যে দিয়ে না; বরং এই কিভাবে— একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থরক্ষার জন্যে, আজ্ঞাবহ হয়ে বা ওই শ্রেণির দাস হয়ে, শোষণের কার্যক্রম তরান্বিত করার মাধ্যমে।

  • রিফিউজি ক্রাইসিস: জাতি-রাষ্ট্রের দুনিয়ায় বেনাগরিকদের জৈবিক অধিকারহীনতা

    রিফিউজি ক্রাইসিস: জাতি-রাষ্ট্রের দুনিয়ায় বেনাগরিকদের জৈবিক অধিকারহীনতা

    • ইরফানুর রহমান রাফিন

    ১৯৪৮এ যখন ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনে ইজরায়েল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর ফলশ্রুতিতে প্রায় ৭০০,০০০ ফিলাস্তিনি রিফিউজিতে পরিণত হন। ফিলাস্তিনিদের কয়েকটি প্রজন্ম জর্দান আর লেবাননের রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে বেড়ে উঠেছেন, লেবাননের গৃহযুদ্ধে ইজরায়েলের যুক্ত হওয়ার উছিলাও তারাই। এটা দুনিয়ার সবচে দীর্ঘস্থায়ী রিফিউজি ক্রাইসিসগুলোর একটা। (more…)

  • সাশা আব্রামস্কি ।। হংকং থেকে কাশ্মীর থেকে আমেরিকা: কর্তৃত্ববাদের উত্থান

    সাশা আব্রামস্কি ।। হংকং থেকে কাশ্মীর থেকে আমেরিকা: কর্তৃত্ববাদের উত্থান

    • অনুবাদ: তৌকির হোসেন

    গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক  ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে কর্তৃত্ববাদের ছবি স্পষ্টভাবে আমাদের চোখের সামনে ধরা পড়ছে। বিশ্বের রাজনীতি দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর সাথে রাজনৈতিক ডিসকোর্স এক ধরনের বিপদজনক রূপ ধারণ করছে। (more…)

  • জরুরি জমানার রাজনীতি ও প্রচারণা-প্রকৌশল

    জরুরি জমানার রাজনীতি ও প্রচারণা-প্রকৌশল

    সম্পাদকীয় নোট: আগস্ট বিদ্রোহের এক যুগ। ২০০৭ সালে সেনাকর্তৃত্বের জরুরি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যে অল্প  ক‘জন শিক্ষক সেই জরুরি শাসনকে ক্রিটিক্যালি  দেখতে পেরেছিলেন  সেলিম রেজা নিউটন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’- এই উচ্চারণকে ধারণ করে প্ররতিবাদী মৌন মিছিল করার দায়ে তিনিসহ তাঁর সহকর্মিদের আটক করা হয়। জরুরি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁদের। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। কারামুক্তির পর ক্ষমতা-কর্তৃত্ব- রাষ্ট্র-সমাজ-কারাগার-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিয়ে বিপুল পরিসরে রচনা শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন, যা এখনও চলমান। তাঁর অচেনা দাগ গ্রন্থের তৃতীয় দাগে জরুরি শাসন সংক্রান্ত রচনা সংকলিত হয়েছে। আগস্ট বিদ্রোহের যুগপূর্তিতে অরাজ ধারাবাহিতভাবে তা প্রকাশ করছে। (more…)

  • আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

    আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: আগস্ট বিদ্রোহের এক যুগ। ২০০৭ সালে সেনাকর্তৃত্বের জরুরি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যে অল্প  ক‘জন শিক্ষক সেই জরুরি শাসনকে ক্রিটিক্যালি  দেখতে পেরেছিলেন  সেলিম রেজা নিউটন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’- এই উচ্চারণকে ধারণ করে প্ররতিবাদী মৌন মিছিল করার দায়ে তিনিসহ তাঁর সহকর্মিদের আটক করা হয়। জরুরি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁদের। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। কারামুক্তির পর ক্ষমতা-কর্তৃত্ব- রাষ্ট্র-সমাজ-কারাগার-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিয়ে বিপুল পরিসরে রচনা শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন, যা এখনও চলমান। তাঁর অচেনা দাগ গ্রন্থের তৃতীয় দাগে জরুরি শাসন সংক্রান্ত রচনা সংকলিত হয়েছে। আগস্ট বিদ্রোহের যুগপুর্তিতে অরাজ ধারাবাহিতভাবে তা প্রকাশ করছে। (more…)