অরাজ
প্রচ্ছদ » হরবংশ মুখিয়া।। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি

হরবংশ মুখিয়া।। মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি

অনুবাদ: তনিকা সরকার

[এই রচনাটি ১৯৬৮ সালে আকাশবাণী আয়োজিত ‘বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিততে রেডিও-প্রচারকের ভূমিকা’ শিরোনামের আলোচনা সভায় পাঠ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই সভার পঠিত রচনাগুলির সংকলন যা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ‘ভারতীয় ইতিহাস অনুসন্ধান পরিষদ’-এর বাংলা ইউনিটের তত্ত্বাবধানে সংকলনটির বাংলা অনুবাদ করেন তনিকা সরকার। লেখাটি অনলাইন পাঠকদের জন্য অরাজে পুনঃপ্রকাশিত হলো। লেখাটি নেয়া হয়েছে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত বইটির তৃতীয় মুদ্রণ (১৯৯৩) থেকে। মূল গ্রন্থের বানান ও ভাষারীতির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।- সম্পাদক]
মুগল দরবার

বহুকাল যাবৎ আমাদের সাতশো বছরেরও বেশিদিনের মধ্যযুগের ইতিহাসকে ‘মুসলমান আমল’ বলে অভিহিত করা হয়ে এসেছে, এবং আজকের দিনেও এই কথাটির যথেষ্ট ব্যবহার দেখা যায়।

একাদশ বা এয়ােদশ শতক থেকে ভারতে যে নতুন শাসকগােষ্ঠী ক্ষমতালাভ করলেন তারা ইসলামধর্মাবলম্বী ছিলেন, যদিও তাদের পূর্ববর্তী শাসকশ্রেণী ছিলেন হিন্দু; আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় আমাদের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যার পেছনে এই যুক্তিই কাজ করেছে। ডাঃ থাপার আগেই এই ধরনের ব্যাখ্যার অনেক গুরুতর ত্রুটি খুঁজে বার করেছেন। তাছাড়াও, এর অন্তর্নিহিত দুটি ধারণা সম্বন্ধে কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রথমত, রাজার জীবনের, বা রাজবংশের, কি বড়ােজোর শাসকগােষ্ঠীর ইতিহাসকে ভারতের ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, এবং এক্ষেত্রে বাজার ব্যক্তিগত ধর্মই সবচেয়ে বড়ো কথা। দ্বিতীয়ত, আরবদেশ থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত ইসলামধর্মের যে সহস্র বছরেরও বেশি দিনের ইতিহাস, তাকে একেবারেই পরিবর্তনবিহীন বলে মনে করা হয়েছে। বহু শতাব্দী ধরে স্থান-কালভেদে তার যতো পরিবর্তন ঘটেছে তা গ্রাহ্যই করা হয়নি। সপ্তমশতকের আরবদেশে মুসলমান সমাজ সাম্যনীতির মৌলিক গুরুত্ব ছিলো, কিন্তু তা সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতকের ভারতবর্ষে বা তার আগে কি পরে অন্যান্য জায়গাতে স্বেচ্ছাতন্ত্র ও সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হলাে। যদিও তা সাম্যনীতির সম্পূর্ণ বিরােধী। তাছাড়া, ইসলামধর্ম বিভিন্ন লােকের কাছে বিভিন্ন অর্থ বহন করে এনেছে। আলাউদ্দীন খল্‌জী ও মহম্মদ তুঘলক, আকবর ও ঔরংজেব, ‘উলেমা তাণ ও সুফি সন্তরা—এঁরা সকলেই মুসলমান হলেও প্রত্যেকেই ইসলাম সম্বন্ধে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পােষণ করতেন।

সুতরাং মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস যাকে বলা হয় তা প্রকৃত ইতিহাসের অংশমাত্র, এবং যে দিকটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, আসলে তার গুরুত্ব খুবই কম। সমাজবিবর্তনের ক্রমবিকাশ আর উৎপাদন পদ্ধতির অদলবদল, এবং তার ফলে সমাজের গড়নের পরিবর্তন—এই সবই হলো প্রকৃত ইতিহাসচর্চার উপজীব্য। এইভাবে রচিত ইতিহাসই হতে পারে অতীতসমাজের সামগ্রিক ইতিহাস, এখানে শাসকের ব্যক্তিগত ধর্ম কী ছিলো সেটা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে যে ধরনের রাজনৈতিক ইতিহাস আমরা পড়ে এসেছি তাও শাসকশ্রেণীর বংশবিবরণী ছাড়া কিছুই নয়। শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত আঞ্চলিক ধর্মীয়, জাতিগত ইত্যাদি নানারকমের গােষ্ঠীগুলির প্রায় কোনােরকম পর্যালােচনাই এখনাে পর্যন্ত হয়নি, অথচ এগুলির দ্বন্দ্বসংঘাত এবং আপােষের চাপেই শাসকশ্রেণীর সেই সময়ের নীতি নির্ধারিত হতাে।

মধ্যযুগীয় ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে খুব সহজলভ্য তৎকালীন উপাদান, অর্থাৎ সেযুগের ঐতিহাসিকদের লেখা। এদের প্রায় প্রত্যেকের লেখাই হলাে সেযুগের রাজদরবারের ইতিহাস, যথা জিয়াউদ্দিন বরনির তারিখ-ই-ফিরুজশাহী বা আবুল ফজলের আকবরনামা ইত্যাদি। পরবর্তী ঐতিহাসিকরা কিন্তু এইসব লেখা ব্যবহার করার আগে এদের চরিত্রের বিশেষ কোনাে বিশ্লেষণ করেননি।

সেযুগের যে ঐতিহাসিকদের তথ্যের ওপর আমরা খুবই নির্ভর করি, তাদের প্রত্যেকের বিষয়েই যে কথাটি বিশেষভাবে প্রযােজ্য তা হলো এরা প্রত্যেকেই হয় রাজ-অমাত্য, অথবা সেই পদপ্রার্থী ছিলেন। ফলে তারা সকলেই দরবারের কোনাে না কোনো উপদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতেন। তাই রাজদরবার ছিলাে তাদের আলােচনায় কেন্দ্রবিন্দু, তাঁদের লিখিত ইতিহাসের সব ঘটনাই প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ ভাবে এর সঙ্গে জড়িত থাকতো। দরবারের অবস্থার সঙ্গে তাঁদের রচনার ভাষার পর্যন্ত যােগ থাকত।

উদাহরণ হিসেবে খুব বিতর্কমূলক একটি শব্দ ধরা যাক—“হিন্দু” শব্দটি।

সেযুগের ঐতিহাসিক অভিজাত অমাত্যশ্রেণীর লােক ছিলেন বলে তারা এই শ্রেণীর চরিত্রের ও কাঠামাের বা রাজার সঙ্গে এর সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন চাইতেন না। জিয়াউদ্দিন বরনি ছিলেন চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একজন অন্যতম তত্ত্ববিদ ও পেশাদার ঐতিহাসিক। ইনি তার বইটিতে এই দুটি দিকের ওপরে বিশেষ জোর দিয়েছেন (তার বইয়ের নাম ফতও-য়া-ই জাহান্দারী, অধ্যাপক মহম্মদ হাবিব ও বেগম আফসর খান The Political Theory of the Delhi Sultanate নামে বইটি ইংরিজিতে অনুবাদ করেছেন)। বরনি একদিকে বলেছেন যে শুধুমাত্র উচ্চকুলজাত বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই অর্থাৎ মুষ্টিমেয় অভিজাত শ্রেণীরাই দরবারের উচ্চপদ পেতে পারেন, যাতে তার গঠন ও চরিত্রের কোনাে পরিবর্তন না হয়; অন্যদিকে তিনি একটি উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপন করতে বলেছেন, যার সভার সব নিয়ম সুনির্দিষ্ট থাকবে, যার সভ্যেরা সকলেই উচ্চবংশের হবেন এবং কোনােরকম ভয় বা প্রত্যাশা না রেখে তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। এই উপদেষ্টামণ্ডলী স্থাপিত হলে সম্রাট ও অভিজাতশ্রেণীর মধ্যেকার সম্পর্ক একটা প্রতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, যার ফলে কোনাে যথেচ্ছা সম্ভব হবেনা।

জিয়াউদ্দিন বরনি

এই স্থিতাবস্থার এক প্রধান বিপদস্বরূপ ছিলেন হিন্দু রাজা, রাও, রাণা, জমিদার প্রভৃতি। আমরা পরে দেখবাে যে এরাও ছিলেন বৃহত্তর শাসকশ্রেণীরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজেই যখন সেযুগের ঐতিহাসিকরা হিন্দুদের বিনাশকামনা করতেন, তখন তাঁরা হিন্দু বলতে এই গোষ্ঠীর কথাই চিন্তা করতেন। পুরাে হিন্দু সমাজ ধ্বংস করা তাঁদের অভিপ্রায় হতেই পারে না, বিশেষ করে যেখানে হিন্দু কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনার ওপর নির্ভর করে হিন্দু রাজা ও মুসলমান ইক্তেদারদের তাঁদেরও বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নির্বাহিত হতাে। সুতরাং এই ঐতিহাসিকরা যখন ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী হিন্দু সমাজভুক্ত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কথাই মনে করতেন। এক্ষেত্রে ‘হিন্দু’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অর্থে, ধর্মীয় অর্থে নয়।

শাসকশ্রেণীর আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও আপােষ সেযুগের ঐতিহাসিক দের শব্দচয়নে প্রতিফলিত হয়েছে এবং এই শাসকশ্রেণীর মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই লােক ছিলেন। এই দ্বন্দ্বের সঙ্গে সামাজিক স্তরের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কোনাে যােগ ছিলােনা।

দ্বিতীয় তদানীন্তন ঐতিহাসিকদের লেখায় তথ্যনিষ্ঠার চেয়ে ব্যক্তিগত মতামতের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিলাে। যা সত্যই ঘটেছে তা নিয়ে তাঁরা যতাে না লিখতেন, তার চেয়ে বেশি লিখতেন যা তাঁদের মতে হওয়া উচিত ছিলাে সে-বিষয়ে।

আজকের দিনের ইতিহাসবিদদের অনেকেই সে যুগের ঐতিহাসিকদের ব্যবহৃত পরিভাষা থেকে তখনকার পুরাে সমাজের অবস্থা বুঝে নেবার চেষ্টা করেন।[১] তাই শাসকশ্রেণী আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষকে তাঁরা মনে করেন বৃহত্তর সমাজের মধ্যেকার সংঘর্ষ। আলাউদ্দিন খলজী বিদ্রোহী হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে দমননীতি প্রয়ােগ করেছিলেন, তাই তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন একজন ধর্মোন্মত্ত সম্রাট যিনি হিন্দুদের সহ্য করতে পারতেন না। আমরা মনে রাখিনা যে মুসলমান ইক্তেদারদেরও (তাদের মধ্যে খুব ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিও অনেকেই ছিলেন যারা কোনাে অর্থেই বিদ্রোহী ছিলেন না) দমন সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-ইতিহাস রচনা করতে আলাউদ্দিন কিছুমাত্র দ্বিধা করেননি এবং জিয়া বনি আক্ষেপ ক’রে বলেছিলেন যে আলাউদ্দিন তার রাষ্ট্রব্যবস্থায় বা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামীয় ধর্মনীতি একটুও মেনে চলতেন না। সেরকম, শা-জাহান বা ঔরংজেব রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি বা পরিবারকে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে করা হয় যে, তারা সমগ্র হিন্দুসমাজের ধর্মান্তরের চেষ্টা করেছিলেন।

এছাড়া, আধুনিক ঐতিহাসিকরা সেযুগের ঐতিহাসিকদের সমস্ত লেখার ওপরে এত আক্ষরিকভাবে নির্ভর করেন যে সেইসব লেখার কোনখানে যে খাটি তথ্য আর কোনখানে যে ব্যক্তিগত ইচ্ছা, আশা ইত্যাদি এসে পড়েছে তা তারা একেবারেই আলাদা করে দেখেন না। যে কোনাে উপাদানের ওপর এতােটা নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ অনৈতিহাসিক। তাছাড়া এটাও লক্ষণীয় যে আজকের দিনে যিনি যতো গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিক, তিনি ততােই সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকদের লেখার ওপর নির্ভর করেন। এই শতকের বিশ, তিরিশ ও চল্লিশের “জাতীয়তাবাদী”[২] ঐতিহাসিকরা এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণের মােকাবিলা করতে ঐকান্তিক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারাও একই প্রথায় এই চেষ্টা করেছেন, অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক মনােভাবসম্পন্ন ঐতিহাসিক দের মতাে তাঁরাও রাজদরবারের বাইরের বৃহত্তর সমাজ ও তার ক্রমবিকাশের ধারা অধ্যয়ন করেননি। দ্বিতীয়ত, পূর্বোক্ত ঐতিহাসিকদের মত তারাও অন্য ধরনের তথ্য হয় লক্ষ্য করেননি, আর নয়তাে ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেছেন, যদিও নিঃসন্দেহে তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক ভালাে ছিলো।

সুতরাং সাম্প্রদায়িক বা জাতীয়তাবাদী—উভয় শ্রেণীর ঐতিহাসিকদেরই আলােচনার মূল ধরন একই রকম থেকে গেছে। এর ফলে বিশেষ একটি পর্যায়ে এসে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিককে সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকের বক্তব্য মেনে নিতে হয়েছে।

এই বক্তব্যের সমর্থনে উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন, এই সেদিন পর্যন্ত মনে করা হতো মধ্যযুগীয় ভারতে বিশেষ কোনাে শাসকের ব্যক্তিত্বই সেসময়ের ইতিহাসের কেন্দ্রস্বরূপ ছিল, তার শাসনকালের সব ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দায়ী তার ব্যক্তিগত চরিত্র বা ইচ্ছা। তাই, আলাউদ্দীন খলজি কেবল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যেই বিশাল ভূখণ্ড জয় করলেন। অথবা, মহম্মদ বিন্ তুঘলকের উন্মত্ত পরিকল্পনার পেছনে ছিলাে সামঞ্জস্যবিহীন, পরস্পরবিরােধী ধাতুতে গড়া তার চরিত্র। কিংবা আকবরের উদার ধর্মনীতি তার উদার মানসেরই প্রতিফলন। যদি আকবরের উদার ধর্মনীতিকে আমরা তার মানসিক উদারতার পরিচয় হিসেবে দেখি, তাহলে ঔরংজেবের ধর্মান্ধতাকে তার গোড়া ধর্মীয় নীতির কারণ বলে মেনে নিতেই হবে।

সুতরাং গোঁড়ামি বা উদারতা রাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থার চাপে এবং গােষ্ঠী ও দলগত আনুগত্যের ঘাত-প্রতিঘাতে নীতি-নির্ধারিত হয়, বিভিন্ন শাসকের ধর্মান্ধতা ও উদারতা দিয়ে নয়। সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকও আকবরের উদারতার যথেষ্ট প্রশংসা করতে পারেন, কারণ তাহলে অন্য সব শাসকের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতার অভিযােগ সহজেই আনা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী আখ্যা দিয়ে আকবরের প্রশস্তি করা প্রথমত অনৈতিহাসিক কারণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটি সম্পূর্ণ আধুনিক; মধ্যযুগীয় ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা (অথবা মধ্যযুগীয় অন্য যে কোনাে রাষ্ট্র) স্বভাবতই ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে। ধারণাটি এতােই আধুনিক যে আমাদেরও কেউ কেউ এখনাে পর্যন্ত এটি নীতিগতভাবে মেনে নিতে পারেন নি, বাস্তবে অনুসরণ সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত-ইতিহাস রচনা করা তো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের প্রশস্তি করে কোনাে লাভই হয় না। কারণ এর ফলে আকবরের অর্ধশতাব্দীর শাসনকাল বাদ দিলে বাকি সাড়ে ছয় শতকের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধর্মপ্রধান বলে মনে করতে হয়। কাজেই আকবরের শাসন হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের মূলসূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন, আকস্মিক এবং অস্বাভাবিক ঘটনামাত্র।

যখন আমরা ইতিহাসচর্চার ধারা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে পারব, যখন বিশেষ কোনাে শাসক বা শাসকশ্রেণীর ইতিহাসমাত্র না পড়ে সমস্ত সমাজের ইতিহাস পর্যালােচনা করবাে, একমাত্র তখনই আমাদের ইতিহাসচেতনা প্রকৃতই এবং যুক্তিযুক্তভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারবে। সমগ্র সমাজের ইতিহাস, তার চরিত্র ও গঠনভঙ্গি, যার থেকে পরস্পরবিরােধী হওয়া সত্ত্বেও কাছাকাছি সময়ে বা একই সঙ্গে জন্ম নেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বিরােধ, সেই সম্প্রীতি ও বিরোধের ক্ষেত্র—এই সবই আমাদের আলােচনার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। তাহলে জাতীয়তাবাদী বা সাম্প্রদায়িক মনােভাবের ঐতিহাসিকদের মতো সমাজ-ইতিহাসের কোনাে একটি দিকের ওপর বিশেষভাবে আলােকপাত করার জন্যে অন্য একটি দিক সম্বন্ধে আমাদের নীরব থাকতে হবে না।

[২]

সপ্তম শতকে আরবদেশে ইসলামধর্মের অভ্যুত্থান সমসাময়িক পৃথিবীর পক্ষে বিশেষ একটি প্রগতিশীল প্রভাব। যখন ধর্মগুরু মহম্মদ একেশ্বরবাদ প্রচার করলেন—এক আল্লাহ ছাড়া আর দ্বিতীয় ঈশ্বর নেই—তখন তিনি একটি বিরাট সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন। কারণ, একেশ্বরবাদ তত্ত্বের মধ্যে সাম্যনীতিও নিহিত। যদি ঈশ্বর এক হন এবং যদি তিনি সব মানুষকে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তো তাঁর কাছে সবাই সমান, যেমন পিতার কাছে সব সন্তান সমান। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষই প্রতেক মানুষের সমান। এই মূল ধারণা থেকে মুসলমান সৌভাত্রের (“মিল্লাৎ”) ধারণাটি গড়ে উঠলাে। এছাড়া ইসলাম ধর্মে কোথাও সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠী, এমন কি সংকীর্ণ কোনো পুরােহিতগােষ্ঠীরও স্থান ছিলো না।

কিন্তু সপ্তম শতকের শেষ অথবা অষ্টম শতকের শুরু থেকে ইসলামধর্ম যখন বিরাট এক ভূখণ্ডের ওপর ছড়িয়ে পড়লো এবং প্রকাণ্ড সব সাম্রাজ্য গড়ে উঠলাে, তখন থেকে স্বৈরতান্ত্রিক রাজা (যিনি ঈশ্বরদত্ত অধিকারের দাবিতে রাজ্যচালনা করেন) ও তার অধীনস্থ সংকীর্ণ শাসকগােষ্ঠীর আবির্ভাব হলাে। বিশেষ করে, অনুন্নত সভ্যতা ও শাসনপ্রণালীর অধিকারী পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়ের পরেই বেশি করে এই নতুন রীতি প্রবর্তিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে সামাজিক সাম্য ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হলো তার বিপরীতে । সুলতান মামুদ গজনী প্রথম বিধিসম্মতভাবে স্বীকৃত সুলতান—এই স্বীকৃতির সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে সামাজিক সাম্যের ধারণা স্পষ্টই লােপ পেলাে। তাই একাদশ ও ত্রয়ােদশ শতকে আমরা দেখতে পাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাটেরা তাদের সাম্রাজ্যবিস্তার করার জন্যে কেবল কাফেরদের নয়, পরস্পরের বিরােধিতা করেছেন। তুর্কিরা একটি সাহসী, যুদ্ধব্যবসায়ী শাসকশ্রেণী হিসেবে রাজ্যজয়ের উদ্দেশ্যে ভারতে এলেন, অসিধারী ধর্ম-প্রবর্তকের ভূমিকা নিয়ে নয়।

সুলতান মাহমুদের দরবার

ভারতবর্ষে কীভাবে তুর্কিশাসন প্রতিষ্ঠিত হােল?—বহুসংখ্যক হিন্দুকে হত্যা করে, না জোর করে তাদের ধর্মান্তর ঘটিয়ে? তুর্কি-আক্রমণের বিরুদ্ধে যে কোনােরকম গণপ্রতিরােধ একেবারেই দেখা দিলো না তারই বা কারণ কী?

দ্বাদশ বা ত্রয়ােদশ শতকে তুর্কিরা প্রায় বারাে হাজার সৈন্য নিয়ে এখানে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেন। উন্নততর রণকৌশল ও সংগঠনের ফলেই তাদের জয়লাভ সম্ভব হলো, যদিও কোনো কোনো হিন্দু রাজার সামরিক বল ও অর্থনৈতিক সম্পদ তুর্কিদের চেয়ে বেশি ছিলাে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সমগ্রীভূত শক্তিকে পরাজিত করা আর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা এক নয়, এবং তারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছিলেন প্রথমটিই অপেক্ষাকৃত সহজ। যদি তারা কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বস্তরে পূর্বতন সরকারী কর্মচারীদের পদচ্যুত করে নিজেদের লােক নিয়ােগ করতেন তাহলে তাদের যে প্রতিরােধের মুখােমুখি হতে হতাে তা পরাস্ত করার ক্ষমতা তাদের ছিলো না। তাই বেশি ক্ষমতাশালী শাসকদের পরাজিত করার পর পুরােনাে শাসকগােষ্ঠীর অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের ব্যক্তিদের সঙ্গে (অর্থাৎ রাজা, রাণা, জমিদার, চৌধুরী প্রভৃতি) তারা একটি রফা করলেন, সেই রফা অনুযায়ী ঠিক হলো যে জমিদার শ্রেণীর লােকেরা তাদের পুরােনাে জমি, পদমর্যাদা, সুযােগ-সুবিধা সবই রাখতে পারবেন, যদি তারা প্রতিবছর সুলতানকে একটি নির্দিষ্ট খাজনা দিতে সম্মত থাকেন। যতােদিন এই কর তারা ঠিকমতো নির্দিষ্ট সময়ে দেবেন (কর দেওয়া মানেই সুলতানের আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া) এবং পরস্পরকে আক্রমণ না করবেন, ততদিন তাদের স্থানচ্যুত করা হবে না এবং তাদের নিজস্ব এলাকার শাসনব্যবস্থাতেও হস্তক্ষেপ করা হবে না।

কাজেই, শাসনব্যবস্থার নিম্নস্তরে হিন্দুরাই সর্বেসর্বা রয়ে গেলেন। এইভাবে তারাই ভারতে তুর্কি সাম্রাজ্য পত্তনে সাহায্য করলেন এবং শাসনব্যবস্থার ভারও তাদের হাতেই রইলাে। তাদের সাহায্য না পেলে তুর্কিদের বেশিদিনের জন্যে ভারতে অবস্থান কোনােমতেই সম্ভব হতােনা। তাই তারাও শাসকশ্রেণীরই অংশভুক্ত রয়ে গেলেন তুর্কিদের মতাে তাদের অস্তিত্ব কৃষকের অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতাে। আগেই বলা হয়েছে যে, বরনি প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা ‘হিন্দু’ বলতে বুঝিয়েছেন হিন্দুসমাজের যে-অংশটি শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত তাদের কথা।

প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে শাসকশ্রেণীর মধ্যে যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তাকে প্রায়ই ধর্মীয় বা আদর্শগত রূপ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা মহম্মদ তুঘলকের শাসন কালে আলি শাহ, নাথুর বিদ্রোহের কথা মনে করতে পারি। নাথু নামে এক খলজিকে কিছু জমি দেওয়া হয়েছিলো তার থেকে তিনি রাজস্ব আদায় করতেন। কিছুদিন পরে ভরন নামে এক হিন্দু ব্যক্তি সরকারের কাছে নাথুর বিরুদ্ধে রাজস্বের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযােগ আনলেন। তার ফলে নাথুর জমি ভরনকে দিয়ে দেওয়া হলো। নাথু ও তাঁর ভাইরা একজন কাফেরকে তাদের ওপরে বসানাের বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে আবেদন করলেন কিন্তু আবেদন অগ্রাহ্য হওয়ায় তাঁর বিদ্রোহ করলেন।

রাষ্ট্র যে কখনাে ব্যাপকভাবে সব হিন্দুদের মুসলমান ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, বা প্রচণ্ড উৎসাহে ইসলামি আদর্শ প্রচার করেছিলেন এ রকম কোনাে প্রমাণ নেই। ধর্মান্তরের চেষ্টা একমাত্র হয়েছে রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনাে কোনাে ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে, কখনােই ব্যাপকভাবে সাধারণের মধ্যে নয়। এবং আশ্চর্যের কথা হলো এই ধরনের চেষ্টাও হয়েছে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের মাঝামাঝি সময়ে, প্রথম দিকে নয়। অথচ প্রথম দিকে এ-ধরনের প্রচেষ্টা হলে তা আরাে অর্থ পূর্ণ হতো। কেউ কেউ তর্কের খাতিরে বলতে পারেন যে, রাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিলাে এইসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবার ধর্মান্তর গ্রহণ করলে তাঁদের অনুচররাও তাদের অনুসরণ করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় হলো শুধুমাত্র সেইসব ব্যক্তিদেরই ধর্মান্তরের কথা উঠতো যারা হয় বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্ট্রের বিরােধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিলাে তাদের ক্ষমা করা এবং তাদের গুরুত্বের কথা মনে রেখে তাঁদের কাছ থেকে নির্দ্বিধ আনুগত্যের স্বীকৃতি আদায় করা। মধ্যযুগে ধর্মকে জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতাে বলে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে সম্রাটের ধর্মকে গ্রহণ করাকেই আনুগত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন মনে করা হতাে। তা নইলে কেনই বা অন্যান্য বিশ্বস্ত ও কর্মপটু হিন্দু রাজা, রাণা ও রাজপুত পরিষদের বেলায় ধর্মান্তর-গ্রহণের কথা বলা হতাে না। 

কেউ এভাবে তর্ক করতে পারেন যে, জিজিয়া করের সাহায্যে হিন্দুদের ওপর চাপ দেওয়া হতাে, মুসলমান হবার জন্য। অবশ্য মুসলমান হলেও তাঁদের “জাক” কর দিতে হতো এবং এই করটি কেবলমাত্র মুসলমানদেরই দেয় ছিলাে। দ্বিতীয়ত, জিজিয়া সম্বন্ধে যেসব তথ্য জানা যায় তা সবই নিতান্তই অস্পষ্ট। চতুর্দশ শতকের পর্যটক ইবন বতুতা বলেছেন যে, দক্ষিণ ভারতে এক হিন্দু রাজবংশ (‘জামােরিণ’) তাঁদের ইহুদি প্রজাদের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করতেন। ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান শাসকরা তাদের মুসলমান প্রজাদের ওপরেও জিজিয়া কর বসাতেন বলে আমরা জানি। তাছাড়া ফিরােজ তুঘলকের শাসনকাল বাদ দিলে অন্য সব সময়ে জিজিয়ার আওতা থেকে নারী, শিশু, পঙ্গু, ব্রাহ্মণ ও সৈন্যেরা বাদ পড়তেন। তর্কের খাতিরে যদিই বা ধরে নেওয়া হয় যে জিজিয়া করের উদ্দেশ্য ছিলো সম্পূর্ণই ধর্মীয়, তাহলেও একথা মনে করার কোনাে কারণ নেই যে হিন্দুরা তাদের ধর্ম সম্বন্ধে এমনই উদাসীন ছিলেন যে সামান্য একটা কর এড়াবার জন্যে ধর্মত্যাগ কতে পারতেন (বিশেষত যেখানে পুরােপুরি এড়াবার কোনাে প্রশ্নই ওঠেনা, কারণ মুসলমান হলেও, তাঁদের ‘জাক’ কর দিতে হতো)। তাছাড়া যদি মনে করতে হয় যে, হিন্দুরা কিছু টাকা বাঁচাবার জন্যেই ধর্মান্তর গ্রহণ করতেন, তাহলে আমরা কেনই বা ধরে নেবোনা যে রাষ্ট্রও শুধুমাত্র আর্থিক কারণেই এই কর বসিয়েছিলেন ?

মন্দির ধ্বংস করার ব্যাপারেও একই কথা খাটে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে সেযুগের গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা যেরকম উৎসাহের সঙ্গে সেসব কথা বর্ণনা করে গেছেন, আজকের দিনের গোঁড়া হিন্দু ঐতিহাসিকরাও ঠিক একইভাবে তা বর্ণনা করেছেন। হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার উদ্দেশ্য আর যাই হােক না কেন, হিন্দুদের মুসলমান ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা নিশ্চয় নয়। কেননা কী করে আমরা ভাবতে পারি যে, কোনাে সম্প্রদায়ের হৃদয় জয় করা যায় তাদের মন্দির ধ্বংস করে? এই ধ্বংসক্রিয়া তাদের মনে ইসলাম সম্বন্ধে প্রেম নয়, বরং ঘৃণারই উদ্রেক করতে পারে। তাহলে এধরনের কার্যকলাপের উদেশ্য তাঁদের ধর্মান্তরিত করা নয়, নিশ্চয়ই অন্য কোনাে অভিপ্রায় ছিলাে। এটা লক্ষণীয় যে সাধারণত কেবলমাত্র শত্রুপক্ষের এলাকায় মন্দিরগুলিই ধ্বংস করা হয়েছে। মন্দিরগুলি ষড়যন্ত্র বা বিদ্রোহের কেন্দ্র হয়ে না দাড়ালে (যেমন ঔরংজেবের আমলে হয়েছিল) সুলতানের নিজের এলাকার মধ্যে কখনােই তা ধ্বংস করা হতােনা। শক্ত এলাকায় মন্দির ধ্বংস করা যেন জয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলাে। প্রসঙ্গত উল্লেখযােগ্য যে, মুসলমান আক্রমণের বহু আগেই অনেক হিন্দু শাসক তাঁদের শত্রু এলাকায় গিয়ে একই কাজ করেছেন। পারমার রাজা সুভাত বর্মণ (১১৯৩-১২১০  খ্রীষ্টাব্দ) গুজরাট আক্রমণ করে দাভয় ও ক্যাম্বে অঞ্চলে বহুসংখ্যক জৈন মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। পূর্বোল্লিখিত কাশ্মীরের রাজা হর্ষ তার রাজভাণ্ডার পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে তাঁর নিজের রাজত্বেই চারটি বাদে আর সব মন্দির লুণ্ঠন করেছিলেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কোনাে প্রতিবাদ হয়নি। অথচ, আরাে বেশি অর্থের প্রয়ােজন হওয়ায় যখন তিনি অধীন সামন্তবর্গের ওপর কর বাড়িয়ে দিলেন তখন তাঁকে শ্রীনগরের পথে পথে টেনে নিয়ে ঘােরানাে হয়েছিলাে। এবং পরিশেষে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো।

ধর্মান্তরীকরণ যে হতাে একথা কেউ অস্বীকার করছেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়েই তা ছিলাে ইচ্ছাকৃত বর্ষায় কিংবা হয়তাে সুফি সন্তদের জনপ্রিয়তার ফল ; তাঁরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাস করতেন এবং তাদের সঙ্গে তাঁদের ভাষাতেই কথা বলতেন। আমাদের প্রতিপাদ্য শুধু এইটুকুই যে রাষ্ট্র কখনাে ধর্মান্তরের জন্য কোন ব্যাপক প্রচেষ্টা করেনি। সেরকম কিছু করলে তদানীন্তন গোঁড়া মুসলমান ঐতিহাসিকরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবং অনেক অতিরঞ্জনসহ সে তথ্য লিপিবদ্ধ করে যেতেন।

সম্রাট অশােক যদিও সর্বপ্রকারে বৌদ্ধধর্ম প্রচলন করার এবং জনসাধারণকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টায় সরকারিভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছিলেন, তবুও আমরা তাকে একজন মহান সম্রাট বলে মনে করে থাকি। কিন্তু মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্র কখনো ধর্ম প্রচারে কোনাে আগ্রহ দেখায়নি—তবু জনমানসে তা কেবলমাত্র ইসলামধর্ম প্রসারের একটি মাধ্যম হিসেবেই রয়ে গেছে। এই ধারণার পেছনে আছে আমাদের সুপ্ত সাম্প্রদায়িক মনােভাব বা মুসলমানধর্ম গ্রহণের বিরােধিতা পােষণ করে এসেছে। এইধরনের মনােভাবকে দমন করার জন্যে আমাদের সচেতনভাবে চেষ্টা করা উচিত।

ভিক্ষুদের সাথে সম্রাট অশোক

আমরা এখানে এরকম কোনো ইঙ্গিত করছি না যে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণই ধর্মনিরপেক্ষ ছিলাে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণাটিই সাম্প্রতিক কাজেই মধ্যযুগে বা তারও আগে এই আদর্শের প্রয়ােগ ঐতিহাসিকভাবে সম্ভব ছিল না। সুতরাং রাষ্ট্র যদি কখনাে ধর্মপ্রচারে লিপ্ত হয়েও থাকে, তাহলে অশােকের ক্ষেত্রে যেমন তা হয়েছে, এক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত।

তবে মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা নেতিবাচকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলাে; অর্থাৎ, রাষ্ট্র ধর্মকে রাজনীতির পরে স্থান দিতে, রাজনীতির উর্ধ্বে ধর্মকে তুলে ধরতো না। সুলতানরা উলেমাদের অনেক মাইনে দিয়ে অল্প দায়িত্বের পদে নিযুক্ত করতেন, যাতে তারা সাধারণ লােকের ওপর তাদের যা প্রভাব আছে তার সবটাই সুলতানদের রাজনীতিক প্রয়ােজনে খাটাতে পারেন এবং উলেমারাও অধিকাংশই সুলতানের নির্দেশ পালন করতে যথেষ্ট আগ্রহী থাকতেন এবং প্রায়ই ইসলামধর্মের নিয়ম-কানুন তাঁর সুলতানের সুবিধা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতেন। সুফিরা উলেমাদের রৌপ্যের বিনিময়ে এই আত্মবিক্রয়ের তীব্র নিন্দা করতেন এবং সেই নিন্দা ন্যায়সঙ্গত ছিলো। এ বিষয়ে অনেক উদাহরণ থেকে একটি বিচিত্র দৃষ্টান্ত তুলে ধরলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। বাদাউনি নামে আকবরের সমসাময়িক একজন রাজসভার ঐতিহাসিক বলেছেন যে যদিও ধর্মত একজন পুরুষের মাত্র চার স্ত্রী থাকতে পারেন, তবু সম্রাট আকবরের ন’জন স্ত্রী ছিলেন।আকবর উলেমাদের এক সভায় প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। সম্রাটের প্রসাদভিক্ষু একজন অতি আগ্রহী উলেমা বলে উঠলেন যে কানুন অনুসারে একজন মুসলমানের ২-২, ৩-৩, ৪-৪ জন পত্নী, অর্থাৎ সব মিলিয়ে আঠারোজন পত্নী থাকতে পারেন। অন্য কেউ কেউ তখন একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে করে বললেন যে প্রকৃতপক্ষে আইন-সম্মত সংখ্যা হােল ২, ৩, ৪—অর্থাৎ নয়।

[ ৩ ]

ধর্মান্তরের (স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে) সঙ্গে-সঙ্গেই নব্য মুসলমানরা যে শাসকশ্রেণীর পুরােপুরি অংশ হয়ে যেতে পারতেন তা নয়। প্রকৃতপক্ষে উচ্চস্তরের মুসলমানের নিম্নশ্রেণীর মুসলমানদের সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করতেন। বরনি একটি স্বরচিত ‘ফরমা’ মিথ্যা করে খলিফা মামুদের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন। ফরমাটি খলিফার নামে চলতো বলে তা কেবল মুসলমানদের সম্বন্ধেই প্রযােজ্য ছিলো। এটি

হ’লো—“সব ধরনের গুরুদের কঠোরভাবে আদেশ করা হচ্ছে যেন তাঁরা শুকর এবং ভল্লুকের গলায় সােনার শিকল না পরান বা কুকুরের গলায় জোর করে মণিমাণিক্য পুরে না দেন…অর্থাৎ, ক্ষুদ্র, সামান্য, দীনহীন ব্যক্তিদের, দোকানদার ও নিম্নজাত জনকে তাঁরা যেন প্রার্থনা, উপবাস ইত্যাদি ব্যাপারের নিয়ম ছাড়া অন্য কিছু না শেখান…”

অন্যদিকে শাসকশ্রেণী গঠিত হয়েছিলাে মুসলমান ও হিন্দু, বা ‘ইক্তেদার’ (পরে যাদের ‘মনসবদার’ বলা হতাে) এবং জমিদার এই দুই পক্ষকে নিয়েই। প্রথমে ইক্তেদারদের সকলেই তুর্কি জাতীয় ছিলেন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার উর্ধ্বভাগে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তুর্কি নন এমন কোনাে ব্যক্তি ক্ষমতালাভ করতে পারতেন না। পরে অবশ্য ভারতীয় মুসলমান, এমন কি হিন্দুদের নামও উচ্চপদের তালিকায় পাওয়া যেত। মােগলদের সময়ে অবশ্যই রাজপুতরা এবং রাজা টোডরমল, বীরবল প্রমুখ আরাে কেউ কেউ রাজ্যের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী পদ অধিকার করেছেন। জমিদাররা প্রত্যেকেই প্রথম দিকে হিন্দু হিলেন, যদিও পরে কয়েকজন মুসলমান জমিদারদের নামও জানা যায়।

বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বিভিন্ন গােষ্ঠীর মধ্যে মধ্যে ক্রমাগত বিরােধ চলতাে। এবং কোনাে সংঘর্ষেরই নির্দিষ্ট কোনাে সীমানা (আঞ্চলিক, ধর্মীয় অথবা জাতিগত) ছিলােনা। মুসলমান ওমরাহগণ সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেন এবং নিজেদের মধ্যেও কলহ-বিবাদ করতেন। হিন্দুরাও ঠিক একই কাজ করতেন। এবং উভয় পক্ষই যেমন পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ করতেন তেমনি নিজেদের মধ্যেও কলহ করতেন এবং সবেরই মূলে ছিলাে রাজত্ব ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ দখল। এ সত্ত্বেও দুপক্ষেরই অনেক ব্যাপারে মিলও দেখা যেতাে। উভয়েই কৃষকের অতিরিক্ত উৎপন্ন দ্রব্যের ওপর নির্ধারিত খাজনার দ্বারা জীবন নির্বাহ করতেন এবং তাঁদের প্রভূত আয়কে ছাড়িয়ে যেতো ভােগবিলাসবহুল জীবনযাত্রা। ঋণভার ছিলাে মর্যাদার নির্দেশক—এই পরিমাণ যাঁর যত বেশি, তার সম্মানও সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পেতো। তাদের জীবনযাত্রা ওপরওয়ালাদের অনুকরণ করে চলতাে। চাক-শিল্পের যে তারা এতােটা পৃষ্ঠপােষকতা করতেন তা আসলে সেযুগের মূল্যবোধের একটি পক্ষে ফলবিশেষ ছাড়া কিছু নয়। পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করে তারা তাদের আশ্রয়ভুক্ত কবি বা সঙ্গীতদের সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা করতেন। এবং, সর্বোপরি তারা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সাধারণ লােক সম্বন্ধে গভীর অবজ্ঞা পােষণ করতেন।

এর আগে আমরা একটি প্রশ্ন তুলেছিলাম: তুর্কি আক্রমণের সময়ে, বা পরে মােগল আক্রমণের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে কোনাে প্রতিরোধ দেখা যায় নি কেন? গণ-প্রতিরোধের যা নিদর্শন পাই, তা সপ্তদশ শতাব্দীতে, যখন মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব এবং আগ্রা—মথুরা অঞ্চলের কৃষকরা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।

এর দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। প্রথমত তদানীন্তন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে তাদের রাজপুত এদের হয়ে লড়াই 

মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি করার কোনাে উৎসাহ জনসাধারণ খুঁজে পেতেন না, বিশেষত যেখানে প্রভুরা আজকের দিনেও রাজস্থানের মােট লােকসংখ্যার শতকরা আট ভাগেরও বেশি নন। এমনিতেও সাধারণ লােকের কাছে তুর্কিরা মােটামুটি পরিচিত ছিলেন কারণ রাজপুতদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতি সম্পর্ক ছিলো। কেননা রাজপুতের একসময়ে একই ভূখণ্ড থেকে এসেছিলেন এবং তুর্কিদের মতাে একই স্তরের সংস্কৃতির অন্ত ভুক্ত ছিলেন। তাছাড়া তুর্কিদের মধ্যে এমন ভয়াবহ কিছু ছিলােনা যা তারা আগেই রাজপুতদের মধ্যে দেখেননি। দ্বিতীয়ত তুর্কি তদানীন্তন রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামাের ওপর কোনােরকম আঘাত করেননি, কেবলমাত্র ওপরদিকে সামান্য, আংশিক পরিবর্তন করেছিলেন।

কাজেই, যা কিন্তু বিয়ে তা শাসকশ্রেণীর মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। এই সংঘাত সাম্রাজ্যের শাসকশ্রেণীর অন্তর্বিরোধও হতে পারতো যেমন হিন্দু ও মুসলমান জায়গিয়াদের অসংখ্য বিদ্রোহ; আয় দুটি শাসকগােষ্ঠীর মধ্যে বিরোধও হতে পারতাে, যেমন দেখা গিয়েছিলাে রাণা প্রতাপের ব্যর্থ বীরত্বপ্রকাশে। প্রকৃতপক্ষে প্রতাপ সমগ্র ভারতবর্ষ তাে নয়ই, এমন কি সমগ্র রাজপুতানার সঙ্গেও লড়াই করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছিলেন শুধু তাঁর নিজ রাজ্যাংশটুকুর জন্যে।

একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার আমাদের লক্ষ্য করা উচিত, সপ্তদশ শতকে যখন মারাঠা, শিখ ও জাঠ অভ্যুত্থান দেখা দিলে এবং মােগল রাষ্ট্রের সঙ্গে মারাঠী ও শিখদের প্রচণ্ড সংঘর্ষ বাধলাে, তখনো কিন্তু সামাজিক জীবনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। এমন কি, ঔরংজেবের সর্বাধিক স্বৈরাচারের পর্বেও হয়নি। অথচ যদিও আমাদের রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থা সরকারিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, তবুও আমাদের জীবনকালেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এত ঘন ঘন হয়েছে যে আমরা কেউ কেউ হয়তাে সেগুলির অমানুষিকতা ও অন্ধ গোঁড়ামি সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে পড়েছি। মারাঠা, শিখ ও জাঠ অভ্যুত্থানের প্রকৃত কারণ ছিলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয় এবং যদিও বিবাদমান দলগুলি মুখে অন্যরকম প্রচার করতেন, তবুও বিরােধ সেইসব স্তরেই আবদ্ধ থাকতো।

এ প্রসঙ্গ শেষ করার আগে আর একটি কথা বাকি থেকে যায়; রাজপুতরা যদিও তুর্কিদের ঢের আগে ভারতে আসেন, তাঁরা কিন্তু এযাবৎ তাঁদের স্বতন্ত্র সত্তা বরাবর বাঁচিয়ে এসেছেন এবং আজ অবধি তা পরিহার করার কোন লক্ষণও দেখা যায়না। চৌহান, পরিহার, শােলাঙ্কি— অদ্যাবধি আমাদের পরিচিতমহলে এ নামগুলি শােনা যায়। কিন্তু যেসব বিরাট রাজবংশ এককালে ভারতবর্ষ শাসন করেছেন তাঁদের বংশধররা আজ কোথায়? সেই দাশবংশ, খলজীবংশ, তুঘলক বংশ, লােদীবংশ, এমনকি সেই মােগলরা যাদের কেন্দ্র করে মাত্র একশাে বছর আগেও বিরাট বিদ্রোহ ঘােষিত হয়েছিলাে, তারা কোথায় গেলেন? দেখা যাচ্ছে এই ভারতীয় জীবনের মূল ধারণাটির সঙ্গে একেবারে মিশে গেছেন এবং নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দিয়ে এই জীবন প্রবাহকে তারা যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন আর কোনাে কিছুতেই তা হয়নি।

পাদটীকা:

১. এমন কি যাঁরা রীতিমত সচেতনভাবে ধর্মনিরপেক্ষ তায়াও প্রায়ই এই দুই

করে থাকেন।

২.  “জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক বলতে তাঁদের বােঝানাে হয়েছে, যারা মনে করেন ভারতে মধ্যযুগের ইতিহাস হলো সাম্প্রদায়িক ঐক্যের যুগ, নিরবচ্ছিন্ন সাম্প্রদায়িক বিরোধের চিত্র নয়।

তনিকা সরকার