অরাজ
প্রচ্ছদ » ডেভিড গ্রেইবার ।। আপনি কি নৈরাজ্যবাদী? উত্তরটি আপনাকে চমকে দেবে!

ডেভিড গ্রেইবার ।। আপনি কি নৈরাজ্যবাদী? উত্তরটি আপনাকে চমকে দেবে!

  •  অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

গ্রেইবারের এই লেখাটি Are You An Anarchist? The Answer May Surprise You! শিরোনামে ২০০০ সালে বের হয়েছিল। বর্তমান অনুবাদটি theanarchistlibrary তে আর্টিকেলটির যে সংস্করণটি রয়েছে সেখান থেকে অনুবাদ করা হয়েছে। সম্পাদক

ডেভিড গ্রেইবার (১৯৬১- ২০২০)

আপনারা হয়তো এরইমধ্যে শুনেছেন যে, নৈরাজ্যবাদী কারা এবং তাদের বিশ্বাস কী। শতভাগ সম্ভাবনা যে, আপনারা তাদের সম্বন্ধে বাজে কথাই শুনেছেন। অনেকে মনে করে নৈরাজ্যবাদিরা হিংস্রতা, বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের সমর্থক, তারা সকল প্রকার শৃঙ্খলা ও সংগঠনের বিরোধী এবং তারা উন্মত্ত নিহিলিস্ট, যারা কেবল সব কিছু উড়িয়ে দিতে চায়। বাস্তবে, এগুলো সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। নৈরাজ্যবাদিরা খুব সাধারণ মানুষ, যারা বিশ্বাস করে: মানুষ কারো দ্বারা বাধ্য না হয়েও যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। এটি খুব সহজ একটি ধারণা। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাবানদের কাছে এই ধারণাকে সব সময়ই বিপজ্জনক মনে হয়েছে।

সহজ করে বললে, নৈরাজ্যবাদী বিশ্বাসগুলো দুটি প্রাথমিক অনুমানের দিকে ঝুঁকেছে। প্রথমত, সাধারণ পরিস্থিতিতে, মানুষকে সুযোগ দেওয়া হলে তারা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত ও শালীন হতে পারে এবং কার দিকনির্দেশনা ছাড়াই নিজেকে এবং তাদের কমিউনিটিকে সংগঠিত করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। সর্বোপরি, নৈরাজ্যবাদ হলো এমন সব সাধারণ শিষ্টাচারের (বা সৌজন্যের) সহজ নীতি গ্রহণ করা যেগুলো সবাই মেনে চলে। এবং যৌক্তিক পরিণতির কথা চিন্তা করে শুধু সেগুলো মেনেই জীবনযাপনের সাহস দেখানো। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের মধ্যে দিয়ে আপনি হয়তো নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছেন নৈরাজ্যবাদী।

দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক।

) জনাকীর্ণ বাসে উঠার জন্য যদি কোনো লাইন থাকে, তাহলে কি আপনি নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করেন? এবং আরেকজনকে কনুই মেরে সামনে এগিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন? এমনকি সেখানে পুলিশের অনুপস্থিতি থাকলেও?

আপনার উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়ে থাকে, তবে আপনি নৈরাজ্যবাদীদের মত কাজ করতে অভ্যস্ত। নৈরাজ্যবাদের সবচেয়ে প্রাথমিক নীতিটি হচ্ছে: স্বসংগঠন। ধারণাটি অনেকটা এরকম যে, মানুষ কোনো মামলা বা সাজার ভয় ছাড়াই, একে অপরের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গত বোঝাপড়ায় আসতে এবং একেঅপরকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে সক্ষম।

প্রত্যেকে বিশ্বাস করে, তারা নিজে যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। তারা আইন ও পুলিশকে প্রয়োজনীয় মনে করে, কারণ তারা মনে করে না যে, অন্যরাও যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম। এখন প্রশ্ন হলো, অন্যরাও তো আপনার সম্পর্কে একইরকম ভাবতে পারে? নৈরাজ্যবাদিরা যুক্তি দেখান: প্রায় সব অসামাজিক আচরণই ভাবতে বাধ্য করে যে, আমাদের জীবন নিয়ন্ত্র করার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, কারাগার ও সরকার থাকা জরুরি। কিন্তু সেই অসামাজিক আচরণগুলো দেখাই যায় সেসব পদ্ধতিগত বৈষম্য ও অন্যায়ের কারণে, যা তৈরি হয় সেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, কারাগার ও সরকারেরই মাধ্যমে। পুরো ব্যাপারটিই একটি দুষ্টচক্রের মতো। মানুষ যদি অনুভব করে যে, তাদের মতামতের কোনো গুরুত্ব নাই, তাহলে তারা স্বভাবতই রাগান্বিত, কট্টর, এমনকি হিংস্র হয়ে ঠে। যা তুলে ধরে ক্ষমতাশীনরা তখন সহজেই দেখাতে পারে যে, এইসব লোকের মতামতের আসলেই কোন গুরুত্ব নাই। একবার যখন কেউ বুঝতে পারে তার মতামত, অন্য সবার মতামতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, তখন সে লক্ষণীয়ভাবে সহানুভূতিশীল বা বুঝদার হয়ে ঠে। সারসংক্ষেপ হলো: নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বয়ং ক্ষমতা এবং ক্ষমতার প্রভাব যা মানুষকে বোকা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলে।

) আপনি কি এমন কোনো ক্লাব, ক্রড়া দল বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্য, যেখানে সব সিদ্বান্ত কোনো এক নেতা চাপিয়ে দেন না বরং সবার সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে নেওয়া হয়?

আপনার উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি এমন এক সংগঠনের সদস্য, যারা নৈরাজ্যবাদী নীতিতে কাজ করে। আরেকটি মৌলিক নৈরাজ্যবাদী নীতি হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সমিতি। এটি সাধারণ জীবনে গণতান্ত্রিক নীতিগুলো প্রয়োগ করে দেখার মতো বিষয়। পার্থক্য কেবল এই যে, নৈরাজ্যবাদিরা এমন এক সমাজ গঠনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন, যেখানে এভাবেই সব কিছু সংগঠিত হবে। বিভিন্ন গ্রুপ পরিচালিত হবে সব সদস্যের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে। ফলে, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বা বড় কর্পোরেশনের মতো উচ্চনিচ পরম্পরার সংগঠনগুলো আর প্রয়োজন হবে না। এমনটিও যে সম্ভব, তা হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না। বা হয়তো করবেন। কিন্ত যতবারই আপনি হুমকির পরিবর্তে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন; যখনই আপনি কার সাথে চুক্তি করেন পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে; বা যখনই আপনি অন্য ব্যক্তির বিশেষ পরিস্থিতি বা জরুরি প্রয়োজনগুলোর কথা বিবেচনা করেন; তখনই আপনি আচরণ করেন নৈরাজ্যবাদির মতো। এমনকি আপনি হয়তো সেটি নিজে উপলব্ধিও করছেন না।

নৈরাজ্যবাদ হলো সেই পথ, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তার পছন্দমতো কাজ করতে পারে, তার মতোই মুক্ত অন্যদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে এবং এর ফলে অন্যদের প্রতি তার যে দায়বদ্ধতা আছে, সে ব্যাপারে সচেতন হয়। এখান থেকে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: সমকক্ষ ব্যক্তির সাথে মানুষ যুক্তিযুক্ত ও সুবিবেচকের মত আচরণ করে। কিন্তু মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, অন্য কার কাছে যদি বেশি ক্ষমতা থাকে, তাহলে তাকে আর বিশ্বাস করা যায় না। কাউকে এ ধরনের ক্ষমতা দিয়ে দেখেন, কোন না কোনভাবে সে তার অপব্যবহার করবেই।

) আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ স্বার্থপর, হঙ্কারী, জঘন্য লোক, যারা জনস্বার্থের কোন তোয়াক্কা করে না এবং আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাস করি যা নির্বোধ ও পক্ষপাতদুষ্ট?

যদি আপনি ‘হাঁ’ উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি আজকের সমাজ নিয়ে নৈরাজ্যবাদী সমালোচনার একজন সমর্থক– অন্ততপক্ষে বিস্তৃত রূপরেখা বিবেচনায় নিলে। নৈরাজ্যবাদিদের মতে, ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্থ হয় এবং যারা পুরো জীবন ক্ষমতার সন্ধানে ব্যয় করে, তাদের হাতেই ক্ষমতাটি সবচেয়ে কম থাকা উচিত। নৈরাজ্যবাদিরা এও বিশ্বাস করে যে, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে সৎ ও যত্নবান আচরণের পরিবর্তে স্বার্থপর ও বিবেকহীন আচরণের জন্য বেশি পুরস্কৃত করে। বেশিরভাগ মানুষই তাই মনে করে। পার্থক্য হলো: বেশিরভাগ মানুষ ভাবে না যে, এই ব্যাপারে তাদের কিছু করার আছে। এমন যে কোনো কিছু তাদের করার আছে, যা বিষয়গুলো আরো খারাপ করে তুলবে না। এবং এই দিকটাতেই সবচে বেশি গুরুত্বারোপ করে ক্ষমতাবানদের বিশ্বস্ত সাগরেদরা।

কিন্তু তা যদি সত্য না হত তখন?

এবং এটি কি বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ আছে? রাষ্ট্র বা পুঁজিবাদের অনুপস্থিতিতে কী ঘটবে, তা নিয়ে সাধারণত যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, তার বেশিরভাগই দেখা যায় পুরোপুরি মিথ্যা। এসব কিছুই আপনি যাচাই করে নিতে পারবেন। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ সরকার ছাড়াই বাস করত। বিশ্বের অনেক জায়গায় আজও মানুষ জীবনযাপন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। তারা সবাই একে অপরকে হত্যা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কারা এমনভাবে বসবাস করে যেমনটা অন্য যে কোনো জায়গায় করা হতো। অবশ্যই জটিল, শহুরে, প্রযুক্তিগত সমাজে এসব বিষয়ের জটিলতা থাকবে। কিন্তু প্রযুক্তি, এসব সমস্যার সমাধান আরও সহজ করে তুলতে পারে। আমরা আসলে চিন্তাও করতে শুরু করিনি যে, প্রযুক্তিকে যদি সত্যিই মানুষের প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করা যেত, তাহলে আমাদের জীবন কেমন হতো। আমরা যদি টেলিমার্কেটজীব, আইনজীব, কারারক্ষী, অর্থনীতি বিশ্লেষক, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, আমলা, রাজনীতিবিদদের মত সমস্ত অকেজো বা ধ্বংসাত্মক পেশা থেকে মুক্তি পাই; আমাদের সেরা বৈজ্ঞানিক মাথাগুলোকে যদি মহাকাশ অস্ত্র বা শেয়ার বাজার ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা থেকে থেকে মুক্ত করতে পারি; কয়লা খনন বা বাথরুম পরিষ্কার করার মত বিপজ্জনক বা বিরক্তিকর কাজের যান্ত্রিকীকরণ করতে পারি এবং অবশিষ্ট কাজকে সবার মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারি, তাহলে দিনে আমাদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে? দিনে পাঁচ ঘণ্টা? চার? তিন? দুই? কেউ জানে না, কারণ কেউ এই ধরনের প্রশ্ন তুলছে না। কিন্তু নৈরাজ্যবাদিদের মতে, ঠিক এই প্রশ্নগুলোই আমাদের করা উচিত।

) আপনি আপনার বাচ্চাদের যা বলেন (বা আপনার মাবাবা আপনাকে যা বলেছিল), আপনি সত্যি তা বিশ্বাস করেন?

কে প্রথম শুরু করেছে এটি বিবেচ্য না’, ‘দুটি ভুল মিলে একটি সঠিকের জন্ম দেয় না’ ‘নিজের বিশৃঙ্খলা নিজে ঠিক কর’, ‘একজন তোমার মত না হওয়ার কারণে তাকে ঘৃণা করো না’। সম্ভবত আমাদের ভাবা উচিত যে, আমরা যখন আমাদের সন্তানদের সঠিক ও ভুল সম্পর্কে বলি তখন আমরা মিথ্যা বলছি কিনা অথবা আমরা আমাদের উপদেশকে গুরুত্ব সহকারে নিতে ইচ্ছুক কিনা। কারণ আপনি যদি এই নৈতিক নীতিগুলোকে তাদের যৌক্তিক সিদ্ধান্তে নিয়ে যান তাহলে আপনি নৈরাজ্যবাদে এসে পৌবেন।

ছবি: Carlo Carrà (১৯১১)

উদাহরণ হিসেবে ‘দুটি ভুল মিলে একটি সঠিকের জন্ম দেয় না’এই নীতির কথা ধরা যাক। আপনি যদি সত্যি এই কথাকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে থাকেন তবে কেবলমাত্র এই একটি কথাই যুদ্ধ এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার পুরো ভিতকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে: আমরা সবসময় বাচ্চাদের বলি যে তাদের ভাগ করে নেওয়া শিখতে হবে, একে অপরের প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিতে হবে, একে অপরকে সহায়তা করতে হবে। কিন্তু তারপর আমরা যখন বাস্তব পৃথিবীতে যাই, তখন দেখতে পাই যে, ধরে নেওয়া হচ্ছে এখানে সবাই স্বভাবতই স্বার্থপর ও প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করবে। কিন্তু এই জায়গায় নৈরাজ্যবাদিরা বলবে যে, আমরা আমাদের বাচ্চাদের যা বলেছি, সেটাই ঠিক। মানব ইতিহাসের প্রতিটি অসাধারণ সার্থক অর্জন, প্রতিটি আবিষ্কার বা সাফল্য যা আমাদের জীবনকে উন্নত করেছে তা সম্ভব হয়েছে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তার কারণে। এমনকি এখনো আমরা আমাদের বেশিরভাগ অর্থ নিজেদের তুলনায় বন্ধু ও পরিবারের জন্যই বেশি ব্যয় করি। হ্যাঁ, বিশ্বে সব সময়ই হয়তো কিছু প্রতিযোগিতামূলক মানুষ থাকবে। কিন্তু তার মানে এই না যে, সমাজেও আমাদের এমন আচরণই উৎসাহিত করতে হবে। জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো মিটানোর জন্যও কেন তাকে প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে? এ ধরনের পরামর্শ শুধু ক্ষমতাবানদেরই স্বার্থসিদ্ধি করে। এবং তারা চায়: আমরা যেন একে অপরকে ভয় করে বাচি। এই কারণে নৈরাজ্যবাদিরা চায় পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে একটি মুক্ত সমাজ গড়ে ঠুক। মূলত, বেশিরভাগ শিশুই শৈশবে নৈরাজ্যবাদী নৈতিকতায় বেড়ে ঠে, তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের পৃথিবী আসলে এভাবে চলে না। পরিণামে অনেক মানুষ হয়ে ওঠে বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্ন। এমনকি অনেকে অনেক কম বয়সে আত্মহত্যাও করে বসে। এবং শেষপর্যন্ত, বড় হয়ে তারা হয়ে ওঠে রুক্ষ ও তিরিক্কি মেজাজের। প্রায়ই তাদের একমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য হয়ে ওঠে তাদের নিজের সন্তানদের বড় করার সামর্থ্য। এবং তারা সন্তানদের কাছে ভান করে যেন দুনিয়াটা খুব ন্যায্য। কিন্তু কেমন হতো, যদি আমরা সত্যিই একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে পারতাম এসব ন্যয়বিচারের নীতিতে? সেটিই কি বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হত না?

) আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, মানুষ মূলগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও খারাপ? অথবা নির্দিষ্ট কিছু মানুষ (নারী, অশ্বেতাঙ্গ মানুষ, সাধারণ মানুষ যারা ধনী বা উচ্চ শিক্ষিত) নিচু প্রজাতির এবং তাদের শাসিতই হওয়া উচিৎ উচ্চ প্রজাতির মানুষদের দ্বারা?

আপনি যদি ‘হাঁ’ উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে মোটেও নৈরাজ্যবাদী বলা যাবে না। কিন্তু যদি আপনি “না” উত্তর দিয়ে থাকেন, তাহলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে যে, আপনার চিন্তাভাবনা নৈরাজ্যবাদী চিন্তাভাবনার সাথে ৯০ ভাগ মিলে যায়। এবং খুব সম্ভবত আপনি সেসব চিন্তাভাবনার ছাপেই আপনার জীবন অতিবাহিত করছেন। যখনই আপনি অন্যের সাথে বিবেচনাপ্রসূত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করেন, তখনই আপনি নৈরাজ্যবাদিদের কাতারে নাম লেখান। যখনই আপনি যুক্তিসঙ্গত সমঝোতার মাধ্যমে আপনার মতবিরোধগুলোর সমাধান করেন; সবার হয়ে একজনের সিদ্বান্ত নেওয়ার পরিবর্তে, আলাদা করে প্রত্যেকের বক্তব্য শোনেন ও বিবেচনা করেন; তখনই আপনি নৈরাজ্যবাদী হয়ে ঠেন। কার পর কর্তৃত্ব করার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও, যদি তা না করে আপনি তাকে যুক্তি বা ন্যায়বোধ দিয়ে সেই কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করেন; তাহলে আপনি নৈরাজ্যবাদির মতই আচরণ করছেন। একই কথা খাটে যখন আপনি বন্ধুর সাথে কিছু ভাগাভাগি করেন বা কে থালাবাসন ধোবে তা নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেন বা অন্য যে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন ন্যায্যতার দিকে খেয়াল রেখে।

ছবি: মার্কো মেনাটো

আপনি হয়ত আপত্তি করে বলবেন, ‘এসমস্ত কিছুই ভালো এবং ছোট গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের মধ্যে এসব চর্চা করতে পারে কিন্তু একটা শহর বা দেশ পরিচালনা করা সম্পূর্ন ভিন্ন বিষয়। এমনকি যদি আপনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণও করেন এবং ছোট ছোট কমিউনিটির কাছে ক্ষমতা তুলে দেন, তাহলেও, রেলপথ পরিচালনা থেকে শুরু করে চিকিৎসা গবেষণার দিকনির্দেশনা; ইত্যাদি নানা কাজের জন্য আপনাকে প্রচুর পরিমাণে সমন্বিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি জটিল মানেই তার অর্থ এই নয় যে, সেটিকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করার কোন উপায় নাই। এটি হয়তো শুধু একটু জটিলই হবে। আসলে জটিল সমাজ কভাবে নিজেকে পরিচালনা করতে পারে সে সম্পর্কে নৈরাজ্যবাদিদের বিভিন্ন ধরনের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সেসবের ব্যাখ্যা এই প্রাবেশিক লেখার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাবে। এখানে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, স্বাস্থ্যকর সমাজ কভাবে কাজ করতে পারে তার মডেল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষ, অনেক সময় ব্যয় করেছে। এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে: কোনো নৈরাজ্যবাদিই কখনো কোনো পরিকল্পনাকে পুরোপুরি নিখুঁত বলে দাবি করে না। যে জিনিসটা আমরা কোনোভাবেই করতে চাই না, তা হলো: আগে থেকে পরিকল্পিত কোনো সমাজের মডেল জোর করে চাপিয়ে দেয়া। প্রকৃতপক্ষে, একটা গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মা করার চেষ্টা করতে গিয়ে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হবে, সম্ভবত তার অর্ধেকও আমরা কল্পনা করতে পারি না; তবুও আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, সব সময়ই এসব সমস্যা মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব। যতক্ষ পর্যন্ত এটি আমাদের মৌলিক নীতিগুলোর চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। শেষ বিচারে এটিই মৌলিক মানবীয় শিষ্ঠাচারের মূলনীতি।

ইফতেখার রুমি

ইফতেখার রুমি লেখক ও অনুবাদক। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ উইন্ডসরে অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। এর আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ের ছাত্র ছিলেন। ইমেইল: [email protected]