Category: গণসংগ্রাম

  • জো লাটিও।। নৈরাজ্যবাদী হওয়া প্রসঙ্গে ডেভিড গ্রেইবার: একটি সাক্ষাৎকার

    জো লাটিও।। নৈরাজ্যবাদী হওয়া প্রসঙ্গে ডেভিড গ্রেইবার: একটি সাক্ষাৎকার

    • অনুবাদ: অরিত্র আহমেদ

    [ডেভিড গ্রেইবার(১৯৬১–২০২০) একজন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ও নৈরাজ্যবাদী। ‘We are the 99%’ স্লোগান সামনে রেখে ২০১১ সালে শুরু হওয়া অকুপাই মুভমেন্টে সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে গ্রেইবার বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে The Debt: The First 5000 Years (2011), The Democracy Project (2013), The Utopia of Rules (2015), Pirate Enlightenment (2018), Bullshit Jobs (2018), প্রভৃতি। বর্তমান সাক্ষাৎকারটি প্রথম ছাপা হয়েছিল নিউ ইন্টারনেশনাল পত্রিকায়। পরবর্তীতে The Anarchist Library আর্কাইভে লেখাটি সংযুক্ত করা হয়। ২০১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি জো লাটিও সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। অকুপাই মুভমেন্টের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, নৈরাজ্যবাদী হওয়া ও না হওয়া, প্রভৃতি বিষয়ে ডেভিড গ্রেইবার সংক্ষিপ্ত, তবে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন এই সাক্ষাৎকারে। – অনুবাদক]

    আর্টওয়ার্ক: ডেভিড গ্রেইবার
    শিল্পী: নায়া চেইনি
    সূত্র: দিস টাইমস

    আপনার রাজনৈতিক সচেতনতার প্রথম স্মৃতি সম্পর্কে কিছু বলুন।

    গ্রেইবার: সেন্ট্রাল পার্কে ষাটের দশকের এক শান্তি মিছিলের কথা মনে পড়ে আমার। অন্যান্য জায়গার মধ্যে ফায়ার আইল্যান্ডের সৈকতে আরেকটা শান্তি মিছিলের কথাও মনে পড়ছে। আমি সেইখানে একটা পতাকা নিয়ে ঘুরছিলাম, যাতে লেখা ছিলো ‘আমরা শান্তি চাই‘। আমার মতো মাত্র সাত বছর বয়সী একটা ছেলের হাতে এই পতাকা লক্ষ্য করে কিছু বয়স্ক লোক জিজ্ঞেস করলেন আমি আদৌ এ কথার অর্থ বুঝি কিনা। যতোদূর মনে পড়ে, আমি জবাবে তাদেরকে বলেছিলাম, অর্থ তো একদম সুস্পষ্ট, পড়লেই বোঝা যায়।

    আপনার সর্বশেষ বই ‘দ্য ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট‘-এ আপনি বলার চেষ্টা করেছেন যে অকুপাই মুভমেন্ট একটা বড়ো সাফল্য ছিলো; অথচ নিরানব্বই ভাগ মানুষের মধ্যে অধিকাংশের জীবনেরই তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি– টানাটানির মধ্যেই কোনোরকমে দিন কাটছে তাদের। সেক্ষেত্রে আপনি এতো ইতিবাচক হতে পারছেন কিভাবে?

    গ্রেইবার: দেখুন, ব্যাপারটা এমন নয় যে, একটা সামাজিক আন্দোলন কোনো দেশের সরকারি নীতির উপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে– এরকমটা কখনোই হয় না আসলে। বিশ্বব্যাপী বৈপ্লবিক উন্মাদনার মুহূর্তগুলো, ১৯৬৮ কিংবা ২০১১ সালে আমরা যেমন দেখেছি, তাৎক্ষণিকভাবে ডামাডোল বা এমনকি পশ্চাদগমনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে; কিন্তু এমন কিছু বীজ ওই মুহূর্তগুলো বপন করে দিয়ে যায়, যা ধীরে ধীরে সবকিছুকেই বদলে দিতে থাকে।

    অকুপাই মুভমেন্ট তো নন–হায়ারার্কিক্যাল গণতন্ত্রের আবহাওয়ায় একটা সামাজিক নিরীক্ষা হিসেবে বিকাশ লাভ করেছিলো। কিন্তু এর কিছু গুরুতর সমস্যাও ছিলো। আজ ওই আন্দোলনের দিকে যখন ফিরে তাকান, তখন এমন কিছু কি চোখে পড়ে যেটা একটু অন্যভাবে করাও সম্ভব ছিলো?

    গ্রেইবার: এই আন্দোলনের গোড়া থেকেই এমন অনেক কিছু ছিলো, যেগুলো অন্যভাবে ঘটলেই আমি খুশি হতাম। অনেক জ্ঞানগত সাহায্য থেকে এ আন্দোলন বঞ্চিত হয়েছিলো, কারণ প্রবীণ পৃষ্ঠপোষক এবং গ্লোবাল জাস্টিস মুভমেন্টের সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অন্যান্য ব্যক্তিদের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম লোকই আসলে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ফলে প্রতিটা জিনিসই আন্দোলনকারীদের একদম নতুন করে আবিষ্কার করে নিতে হয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা এ কাজ করেছে খুবই স্থুল ও বেখাপ্পাভাবে। অনুপ্রবেশকারী এবং আন্দোলনে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারীদের সামলানোর ক্ষেত্রেও তারা প্রায়শই আনাড়িপনার পরিচয় দিয়েছে। তার উপর, এক নির্বোধ ও অন্ধ আইনমুখীনতা ছিলো তাদের মধ্যে, তারা ভেবেছিলো ঐক্যমত্য (consensus) হলো আইন–কানুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিশেষ প্রক্রিয়া মাত্র। ঐক্যমত্য যে এক গুচ্ছ মূলনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়– মানুষের কথা শোনা (listening) ও অ–বাধ্যবাধকতার (non-compulsion) ভিত্তিতেই প্রধানত– এবং এটা যে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিচিত্র হাজারো রূপ ধারণ করতে পারে– এই ব্যাপারটি তারা বুঝতে পারেনি।

    আপনার ‘ডেব্ট: দ্য ফার্স্ট 5000 ইয়ার্স‘ বইয়ের শিরোনাম ইঙ্গিত করে যে আপনি আরো পাঁচ হাজার বছর একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি দেখার আশঙ্কা করছেন। ধারদেনা–ভিত্তিক অর্থনীতির কোনো সম্ভাব্য বিকল্প আছে কি?

    গ্রেইবার: আরে, ওই শিরোনামের উদ্দেশ্য ছিলো একটা খোঁচা দেওয়া: আমরা কি আসলেই আরো পাঁচ হাজার বছর ধরে এই একই জিনিস দেখে যেতে চাই? আমার মনে হয় না বর্তমান ব্যবস্থার মতো কোনো কিছুই আমাদের জন্য অবধারিত; আমার তো বরং মনে হয়, আজ আমরা যেভাবে আমাদের অর্থনীতিকে সংগঠিত করছি, তাতে দু’এক প্রজন্ম পরেই এটা আমাদের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন হয়ে যাবে যে আমরা এমন কিছু কখনো করেছিলাম।

    সূত্র: অ্যানার্কিস্ট আর্ট এন্ড প্রপাগান্ডা

    আপনি বলে থাকেন যে, ‘নৈরাজ্যবাদ হলো এমন কিছু, যেটা আপনি করেন‘, নৈরাজ্যবাদ খালি বিশ্বাস করার ব্যাপার না। একটু বুঝিয়ে বলবেন আপনি কী বলতে চান?

    গ্রেইবার: আমি সবসময়ই খেয়াল করে এসেছি যে মার্ক্সবাদ হলো মূলত: বৈপ্লবিক কর্মকৌশলের একটা তাত্ত্বিক ডিসকোর্স, আর নৈরাজ্যবাদ হলো মূলত: বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের একটা নৈতিক ডিসকোর্স। মানুষজন নিজেদেরকে কিভাবে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছে, সেটা একটু খেয়াল করুন। মার্ক্সবাদীদের মধ্যে আপনি লেনিনবাদী, মাওবাদী, ট্রটস্কিবাদীদের দেখতে পাবেন– এই দলগুলোর নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুর নামানুসারে, যাঁরা বিপ্লবের কর্মকৌশল–বিশ্লেষণের একেকটা ভাণ্ডার রেখে গেছেন। অন্য দিকে নৈরাজ্যবাদীদের মধ্যে আপনি পাবেন সিন্ডিক্যালিস্ট, কমিউনিস্ট, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, অভ্যুত্থানপন্থী (insurrectionist), প্রভৃতি দল; এ ক্ষেত্রে বিভাজন ঘটেছে সংগঠনের ধরণ–ধারণ ও কার্যপদ্ধতির বিভিন্নতার ভিত্তিতে। আমি বলছি না যে, আপনার কর্মকাণ্ডে নৈরাজ্যবাদের কোনো না কোনো প্রতিফলন দেখা না গেলে নিজেকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করা আপনার পক্ষে সম্পূর্ণই অর্থহীন; আপনি চাইলে বিমূর্তভাবে রাষ্ট্রহীন ও পুঁজিবাদহীন এক পৃথিবীর কথা ভাবতে পারেন, সেই পৃথিবীকে উৎকৃষ্টতর ও সম্ভবপর বলে বিশ্বাস করতে পারেন, এবং কিছুই না করে বসে থাকতে পারেন। কিন্তু এতে আসলে খুব কমই যায় আসে। অন্য দিকে, আপনি চাইলে একজন নৈরাজ্যবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন– এমন সব রীতি মেনে কার্য নির্বাহ করতে পারেন, যাদেরকে বলপ্রয়োগের আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ব্যবহার করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না– মানে আপনি নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বা অন্য কিছু হিসেবে চিহ্নিত না করেও একজন নৈরাজ্যবাদী হিসেবে কাজ করে যেতে পারেন। এবং বাস্তবে আমরা প্রায় সবাই অনেক সময়ই একজন নৈরাজ্যবাদীর মতো, এমনকি একজন কমিউনিস্টের মতোই আচরণ করি। আমার কাছে নৈরাজ্যবাদী হওয়ার অর্থ হলো আত্ম–সচেতন থেকে সেই কাজটা করে যাওয়া; পূর্বোক্ত মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যে পৃথিবীর কথা আমরা আজ কল্পনা করছি, তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত করার একটা উপায়ই হলো নৈরাজ্যবাদ।

    আটলান্টিকের দুই পারেই বসবাস করার অভিজ্ঞতা তো আপনার হলো। গণতন্ত্র ও সামাজিক পরিবর্তনের আশা কোথায় বেশি দেখেন– ব্রিটেনে না আমেরিকায়? কী মনে হয় আপনার এবং কেনো?

    গ্রেইবার: এটা বলা খুবই কঠিন আসলে। ব্রিটেনে এক বিশেষ ধরনের স্টয়িক মর্ষকাম দেখা যায়, যেটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢোকে না। দেখে মনে হয় শ্রমিক জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশের ভেতর থেকে সকল ধরনের প্রাণশক্তি নেহাত ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। আবার এ–ও হতে পারে যে সবচেয়ে খারাপ যা কিছু হতে পারতো, ব্রিটেন তা সহ্য করেছে, এবং এখন সে ভালোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। বিষয়টা নিয়ে আমি এখনো ভাবছি– কারণ আমি তো অপেক্ষাকৃত নবাগত এখানে। তবে আমেরিকা হলো একটা টলায়মান সাম্রাজ্য। এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার মতো বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠানগুলোর পায়ের তলার মাটি সরে গেছে, এবং গণতন্ত্রের অবশিষ্ট চিহ্নগুলোকেও একে একে বিলীন করে দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকায় মানুষের রাগ বাড়ছে, কিন্তু আমার মনে হয়, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খোলাখুলি নির্যাতন ও নিপীড়ন।

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। জাদু ও রাজনীতি: বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারছি না

    ডেভিড গ্রেইবার ।। জাদু ও রাজনীতি: বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারছি না

    * অনুবাদ: আনিয়া ফাহমিন

    [ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেইবার এর এই প্রবন্ধটি ২০১২ সালে the Baffler ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধটিতে গ্রেইবার ম্যাজিক বা জাদুর ধারণা ও রাজনীতির মধ্যে একটি অন্তর্গত সম্পর্ক আবিষ্কার করছেন, যেখানে রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের মধ্যে কীভাবে ধর্মতাত্ত্বিক ও জাদুকরী একটা চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায় সেদিকে ইঙ্গিত করছেন। অরাজের জন্য গ্রেইবারের এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন আনিয়া ফাহমিন। মূল ইংরেজি প্রবন্ধটি এই লিংকে ক্লিক করলে পাবেন– সম্পাদক]

    David Graeber, left, speaks at Maagdenhuis occupation, University of Amsterdam, 2015. To his left, political theorist Enzo Rossi. Photo by Guido van Nispe

    ১.

    রাজনীতিবিদরা স্বভাবতই অসৎ, তারা সকলেই মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তবে মার্কিন রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষকই স্বীকার করবেন যে, বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অসততার মাত্রায় একপ্রকার গুণগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পারতপক্ষে নির্দিষ্ট কিছু দলীয় এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যাপারে একপ্রকার গর্হিত, উদ্ভট মিথ্যাচারকে বৈধতা দেয়ার জন্য নিয়ম পরিবর্তনের সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষণীয়, যা অন্যান্য রাষ্ট্রে সচরাচর দেখা যায় না। সারাহ প্যালিন ও তার “ডেথ প্যানেল” এই নতুন শৈলীর প্রবর্তক হলেও দ্রুতই মিশেল বাখম্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়া আইন আরোপের সরকারি পরিকল্পনা বা ডলার ত্যাগ ও চীনা ইউয়ান দিয়ে এটি প্রতিস্থাপনের গোপন পরিকল্পনার দাবির মাধ্যমে বিষয়টিকে দর্শনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়। মিট রমনিই মিথ্যাচারের মহিমা বা আড়ম্বরের দিক থেকে প্যালিন বা বাখম্যানকে অতিক্রম করতে না পারলেও, সম্পূর্ণ জালিয়াতির ভিত্তিতে তার সমগ্র প্রেসিডেন্সিয়াল কেম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে মাত্রায় তা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। রিপাবলিকানদের এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত উস্কানি ছাড়া অন্য কিছু ভাবা কষ্টকর। প্রার্থীরা যেন মিডিয়া এবং ডেমোক্র্যাটদের চ্যালেঞ্জ করছে তাদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দেয়ার জন্য।

    এর অর্থ কী দাঁড়ায়? প্রথমত, ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে না যে উপরোক্ত তিনজন রাজনীতিবিদই অত্যন্ত ধার্মিক। সারাহ প্যালিন এবং মিশেল বাখম্যান ইভেনজিলিকাল; রমনি একসময় মরমন বিশপ ছিলেন। এইসব ধর্মীয় মহলে বিশ্বাস এবং মিথ্যা হল এমন বিষয় যা একজনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নির্দেশ করে। ফলে যখন মিডিয়া কর্তৃক এসব রাজনীতিবিদদের মিথ্যা ফাঁস হয় তখন তাদের ধর্মীয় সমর্থকরা অবিচলিত থাকে। বরঞ্চ, কোন সাংবাদিক যদি সচেতন অসততার প্রতি ইঙ্গিত করে তবে তাদের সমর্থকদের সেই সাংবাদিকের উপর ক্ষুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ক্যারিশম্যাটিকস এবং ইভাঞ্জেলিক্যালরা খ্রিস্টধর্মের এমন রূপ অনুসরণ করে যেখানে পারতপক্ষে বিশ্বাসই একমাত্র উপাদান। বিশ্বাসীদের, যারা স্বর্গীয় আত্মার কাছে নিজেদের সঁপে দিয়েছে,তাদের নিয়তের পবিত্রতা সম্পর্কে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। অথচ কিছু সেকুলার লিবারেল এলিটিস্ট মিডিয়া তাদের মিথ্যাবাদী বলছে?

    ডানপন্থী রিপাবলিকানরা যা করছে তা মূলত একপ্রকার জাদুকরী কৌশলের রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের একটি ধর্মতাত্ত্বিক সংস্করণ। তারা বিশ্বাসের দ্বারা একটা জগতকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে।

    অবশ্যই লিবারেলদের জন্য এর অর্থ হল, রিপাবলিকানরা তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত এক স্বপ্নের দুনিয়ায় বসবাস করে। তারা নিজেদের “রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটি‘ হিসেবে কল্পনা করে, যারা তথ্য–প্রমান সংগ্রহে দৃঢ়ভাবে গুরুত্ব আরোপ করে এবং জগতের প্রকৃত রুপ অনুসন্ধান করে।

    কথাটার উৎপত্তির মধ্যেই এর অর্থ নিহিত। প্রাক্তন ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল প্রতিনিধি রন সাস্কিন্ডের নিউ ইয়র্ক টাইম ম্যাগাজিনে লেখা “Faith, Certainty and the presidency of George W. Bush” – শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে এটি নেয়া।

    প্রবন্ধটি মূলত আমার আলোচ্য বিষয়টিই ব্যাখা করে, যে বুশ ফ্যানদের জন্য তার অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের পবিত্রতাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে অনুচ্ছেদটি সাস্কিন্ড কে বিখ্যাত করে তোলে তা ছিল বুশের একজন অজ্ঞাতনামা ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টার সাথে কথোপকথন, যা তার ভাষ্যমতে বুশের প্রেসিডেন্সির একেবারে মূলে প্রবেশ করে।

    সহযোগীটি বলেছিলেন যে আমার মতো মানুষেরা এমন সমাজে বাস করে ” যাকে আমরা বলি রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটি”। এসব মানুষকে তিনি এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যে, যারা “বিশ্বাস করেন যে সমাধানগুলি আপনাদের উপলব্ধিযোগ্য বাস্তবতার বিচারপূর্ণ অধ্যয়ন থেকে বেরিয়ে আসে।” আমি আলোকিত নীতি এবং অভিজ্ঞতাবাদ সম্পর্কে কিছু বিড়বিড় করে বললাম। সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বর্তমান বিশ্ব আর এভাবে কাজ করে না, আমরা এখন একটি সাম্রাজ্য, এবং যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে আমরা নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করি এবং যেই সময়ে আপনি সেই বাস্তবতা অধ্যয়ন করবেন, অবশ্যই বিবেচনার সঙ্গে, আমরা আবার নতুন বাস্তবতা তৈরি করব, সেগুলিও আপনি অধ্যয়ন করতে পারবেন। আমরা ইতিহাসের অভিনেতা… এবং আপনি, আপনারা সবাই, আমরা যা করি তা শুধুমাত্র অধ্যয়ন করবেন।”

    লিবারেলরা যা যা বিশ্বাস করতে চাইতো তার সবই এই অনুচ্ছেদটি নিশ্চিত করে।

    “Proud member of the reality based community” ঘোষণা দিয়ে বাটন, টিশার্ট তৈরি হতে থাকে। বাক্যটি একটি শিবলেথ–এ পরিণত হয়। তবে এক্ষেত্রেও যে যা দেখা যায় তার সবটা সত্যি নয়, এমনটা ভাবার কারণ আছে। পরবর্তীতে অনেক সাংবাদিকই দেখিয়েছেন যে সাস্কিন্ডের কাজ অবাস্তব সব গুণাবলী এবং এমন কিছু উক্তির সমন্বয়ে গঠিত যার সোর্সদের খুঁজে বের করার পর তারা দাবি করেন এমন কথা তারা কখনো বলেননি। তাছাড়া বুশের কোন সহযোগীকে অন্য কেউ এমন কথা বলতে শোনেননি। পুরো ঘটনাটা বানোয়াট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

    রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটির সম্পূর্ণ ধারণাটাই কি একটি অসাধারণ ভণ্ডামি? বর্তমান আমেরিকার রাজনৈতিক বিতর্কের সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো, মেইনস্ট্রিম ডান এবং বামপন্থীরা তাদের নিজস্ব বাস্তবতা তৈরিতে এতটাই মগ্ন যে কোন প্রকার অর্থবহ কথোপকথন এক্ষেত্রে অসম্ভব। যেমন, কোন এক সময়ে লিবারেল এবং কনজারভেটিভরা দারিদ্র্যের মূল কারণ নিয়ে আলোচনা করত। এখন তারা আলোচনা করে দারিদ্রের আদৌও অস্তিত্ব আছে কিনা। এক সময় তারা বর্ণবাদকে পরাস্ত করার বিষয়ে তর্ক করতো, এখন কনজারভেটিভদের বলতে শোনা যায়, যারা তাদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দেয় তারাই যেমন প্রকৃত মিথ্যাবাদী, ঠিক তেমনি তারাই প্রকৃত বর্ণবাদী যারা অন্যকে বর্ণবাদী আখ্যা দেয়। তবে অপরপক্ষও একই কাজ করে। একজন খ্রিস্টান কনজারভেটিভ যদি মার্কিন মূল ধারার সংস্কৃতিতে সেকুলার চিন্তাধারায় “লিবারেল এলিট” –দের আধিপত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে চায়, অথবা কোনো রান্ড পল সমর্থক যদি ফেডারেল রিজার্ভ এবং ইউ.এস সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনা করতে চায় তবে তারা একই ধরনের অবিশ্বাসের মুখোমুখি হবে।

    মূলধারার বামপন্থাকে আলোকায়নের অভিজ্ঞতাবাদের ঐতিহ্যের সাথে চিহ্নিত করার ব্যাপারটা অদ্ভুত, কেননা বামধারার শ্রেষ্ঠ অবতাররা অবজেক্টিভ সত্যের ধারণাকে ধ্বংস করার পেছনেই গত প্রজন্ম পার করেন। লিবারেল সমাজেও চার্চের সমকক্ষ প্রতিষ্ঠান রয়েছে আর তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ধর্মতত্ত্ববিদদের মতো বুদ্ধিজীবীরা। তারা ঠিক ততটাই শ্রদ্ধার সাথে গিলস ডেলিউজ, মিশেল ফুকো এবং জ্যাক দেরিদার কাজ ব্যাখ্যা করেন যতটা শ্রদ্ধা রেডিক্যালদের রয়েছে কার্ল মার্কস এর জন্য। এইসব লেখকরা আলোকায়নের বিরোধিতা ছাড়া কিই বা করেন?

    মূল ধারার ডেমোক্রেটিক বাম এবং রিপাবলিকান ডানপন্থীরা বহুদিন যাবত আমেরিকান প্রতারণা, প্রবঞ্চনার ঐতিহ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তবে বিভিন্নভাবে তারা এটাকে ন্যায্যতা দেয়। ডানপন্থীরা যা করে অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের যুক্তি দিয়ে; বামপন্থীরা আগে বিজ্ঞানের যুক্তিতে এবং বর্তমানে একপ্রকার উত্তর উপনিবেশবাদী অ্যান্টি সাইন্স এর উপর নির্ভর করে। তবে দুটোই মূলত একই উদ্দেশ্য পূরণ করে।

    দুটো পন্থাই তাদের নিজ নিজ দলের সামাজিক ভিত্তির জন্য যথাযথ– শতকরা এক ভাগ যা তাদের অনুদান, সংস্কৃতি আর সংবেদনশীলতার যোগান দেয়। রিপাবলিকানরা ব্যবসায়িক দল হিসেবে কুখ্যাত। বিষয়টা অবাক করার মতো না যে তারা একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সি.ই.ও. এর অভ্যন্তরীণ কনফিডেন্সকে ধারন করে এবং উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যা যা বলা দরকার তার সবটাই বলতে রাজি এবং কোম্পানি চালানোর জন্য যা করা প্রয়োজন তার সবটাই করতে রাজি। বারবারা এরেনরিচের মতে ডেমোক্রেট্ররা “পেশাদার ব্যবস্থাপক শ্রেণী ” এর দল– শিক্ষক, উকিল, সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানীদের দল। কাজেই এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, তাদের ওয়েল্টানশাউং–এর সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি হল মিশেল ফুকোর কাজ, অন্তত বিশ বছর ধরে সমসাময়িক মার্কিন একাডেমির দেবতা, এবং একজন ব্যক্তি যিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে পেশাদার ডিসকোর্সগুলো শক্তির এমন রূপ যা সেইসব বাস্তবতা তৈরি করে যা তারা পরিচালনার দাবি করে থাকে। বা নব্বইয়ের দশকে এবং কয়েক দশক ধরে যখন মার্কিন অর্থনীতি আরও স্পষ্টভাবে বুদ্বুদ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, এবং হলিউড ও বিশেষ করে ওয়াল স্ট্রিটের অর্থ ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ব্যয় করা হয়, তখন বুদ্ধিজীবী মহলগুলোতে এ জাতীয় ধারণার গ্রহণযোগ্যতা আরও অযৌক্তিক হয়ে ওঠে।

    আমি এক্ষেত্রে কোনো সহজ একক সংযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছি না। বিষয়টা এমন নয় যে বামপন্থী আমেরিকান একাডেমিকরা সরাসরি ওয়াল স্ট্রিট ফান্ডিং দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু এই সিস্টেমের সৌন্দর্যই হল যে তার প্রয়োজন নেই। অন্য সবার মত তারাও বাবলের জগতে বাস করে। এবং তাদের বিদ্যমান তাত্ত্বিক বিন্যাস, এমন একটি পেশাদার বিশ্বের দৈনন্দিন সাধারণ জ্ঞান থেকে জন্ম নেয়া যেখানে পরিচয় ব্যবস্থাপনাই সবকিছু, একটি বুদ্বুদ অর্থনীতির যুক্তিকেই প্রতিফলিত করে।

    ২০০৮ সালে ক্র্যাশের ঠিক আগে আমার কনফারেন্স এবং সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা মনে আছে। যেখানে আমি সাংস্কৃতিক তত্ত্ব বা বিজ্ঞান অধ্যয়নরত ছাত্রদের বা এমনকি মৌলবাদী রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের জটিল জারগন ভরা উপস্থাপনা শুনেছিলাম। তারা দাবি করেছিল “প্রিএম্পশন“, “সিকিউরিটাইজেশন” এবং “আর্থিকীকরণ” এর উদ্ভূত যুক্তি কেবল সামাজিক শক্তির অভূতপূর্ব নতুন রূপের জন্মই দেয় না , বাস্তবতার প্রকৃতির একটি রূপান্তরকেও নির্দেশ করে। “আমাদের বামপন্থীদের নিউলিবারেলদের থেকে কিছু জিনিস শিখা উচিত” আমার মনে আছে কালচারাল স্টাডিজের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের এই মন্তব্য শুনেছি (বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল স্টাডিজের ছাত্ররা প্রায়ই নিজেদের বিশ্ব বামপন্থার ধারক বাহক মনে করে, যদিও তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে না। ), “সত্যি বলতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। তারা প্রায় শূন্য থেকে মান তৈরি করতেও সক্ষম”।

    সেই সময় আমি বলেছিলাম– “জানেন কি, ওয়াল স্ট্রিটের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা এই ব্যাপারটাকে ‘স্ক্যাম‘ বলে থাকে৷” তবে কেউ মনে হয় না আমার কথা শুনছিল৷ বেশিরভাগ একাডেমিক চরমপন্থিরা নিজেদের একপ্রকার তাত্ত্বিক ভাষায় বাক্সবন্দী করে রেখেছিলো, যেই ভাষায় স্ক্যাম শব্দটা ছিল প্রায় অর্থহীন। বিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞানবিরোধী, আলোকিত অভিজ্ঞতাবাদ থেকে তার বিপরীতে অবস্থান করে, একাডেমিক বামরা শেষপর্যন্ত এই ধারণায় পৌঁছেছে যে পারফর্মেন্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

    আশির দশকের শেষের দিকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতাগুলি নিজেরাই “পারফরম্যান্স থিওরি“- বর্জন করে, নব্বই দশকে এক্টর–নেটওয়ার্ক তত্ত্বের উত্থান হয়। এটি দাবি করে যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বস্তুগুলিও মূলত বিজ্ঞানী, প্রতিষ্ঠান, বস্তু, প্রাণী এবং জীবাণুর মধ্যে জোট তৈরির আলোচনা, প্ররোচনার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা গঠিত হয়। বিষয়টির সারমর্ম হল, যে সময়ে আমেরিকান (এবং সম্প্রসারণে উত্তর আটলান্টিক) অর্থনীতির ভিত্তি ছিল ক্রমবর্ধমান আর্থিক বুদবুদের উত্পাদন, সেই সময়ের বুদ্ধিজীবীরা সিদ্ধান্ত নেয় যে একেবারে সবকিছুই কেবলমাত্র রাজনৈতিক পারফরমেন্সের পণ্য। বুদ্বুদ অর্থনীতি ছিল রাজনৈতিক জাদুর এক ধরনের অপথিওসিস।

    তবে যেকোনো প্রকৃত জাদুকরই ( বা সফল রাজনীতিবিদ) বলতে পারে যে ঘটনাগুলি এতটা সরল নয়। আমরা সকলেই স্বীকার করি যে একজন রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এমন ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রপতির মতো আচরণ করতে জানেন। এই ভূমিকাটি সম্পাদন করতে কোনো প্রকার অক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আমরা প্রার্থীদের অবিরাম সমালোচনা করি। কিন্তু একজন প্রার্থী যদি খোলাখুলিভাবে বলেন যে পারফর্ম করাই তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার একমাত্র যোগ্যতা, তবে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। বাস্তবে , দ্বৈত চিন্তার সমস্ত কৌশল আমাদের সাথেই থাকে। আমরা যা করি তা হল এই সকল চিন্তা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন কারণ তৈরি।

    রন সাসকিন্ডের (সম্ভবত কাল্পনিক) বুশ উপদেষ্টা অন্তত এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে নতুন বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বাস যথেষ্ট নয়: আপনার সামরিক শক্তিও দরকার। জাদুকর এবং রাজনীতিবিদের মধ্যে চূড়ান্ত পার্থক্য এটাই যে: রাজনীতিবিদ জানেন, যদি সত্যিই প্রয়োজন হয় তবে তিনি সামরিক শক্তি ব্যাবহার করতে পারেন, সেটা হোক সেনাবাহিনী বা পুলিশ।

    রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময়ই ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং দ্বৈত এবং ত্রি–চিন্তার একটি অস্পষ্ট সংমিশ্রণ। আপনার জিজ্ঞাসা করতে হবে যে সাধারন জনগন স্বীকৃত রাজনৈতিক বিন্যাসকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন, নাকি তিনি বিশ্বাস করেন যে অন্য সবাই এটিকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে। আপনার জিজ্ঞাসা করতে হবে সে বিশ্বাস করে কিনা যে এমন একটি বিশ্ব ছাড়াও তার সবচেয়ে প্রিয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি সে উপলব্ধি করতে পারবে, যে বিশ্বকে সে স্ক্যাম মনে করে। আপনার আরও জিজ্ঞাসা করতে হবে সে বিশ্বাস করে কিনা যে জিনিসগুলি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হলে, এমনকি পুরো জিনিসটি একটি স্ক্যাম তা প্রকাশের চেষ্টা করলে সে গুরুতর আহত হতে পারে। (যেমনটা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট–এর সাম্প্রতিক ভাগ্যে দেখা গেছে, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ লোকেরাও যখন আজকের আমেরিকায় অপ্রীতিকর সত্য কথা বলার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে আসে, তখন সহিংসতা একটি বাস্তব সম্ভাবনা।) এবং তারপর জিজ্ঞাসা করতে হবে অন্য সবাই বিশ্বাস করে কিনা যে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে? নাকি সবাই মনে করে যে অন্য সবাই বিশ্বাস করে তাদের সাথে এমনটা ঘটবে। বিষয়গুলো গোলোকধাঁধায় আবদ্ধ।

    ২.

    দৈনন্দিন সকল বিকৃতি, সুবিধাবাদী অর্ধ–সত্য, এবং কল্পিত মতাদর্শের মধ্যে যা এখন রাজনৈতিক ডিসকোর্স তৈরি করে, যে কোনও সৎ আলোচককে এই প্রশ্নের সাথে লড়াই করতে হয় যে কীভাবে আত্ম–প্রতারণা একটি স্বশাসিত বিশ্বাস ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে । প্রোপাগান্ডা শিল্পের ছাত্ররা দীর্ঘকাল ধরে লক্ষ করেছে যে এর পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে অনুকরণের প্রবণতা রয়েছে , কিন্তু অসত্য আবরণ নিজের পছন্দসই প্রোপাগান্ডায় স্ব–সচেতন বিশ্বাসের গভীর বিভ্রান্তির জন্য দায়ী নয়। সমস্যাটির প্রচলিত সূত্র প্রশ্ন করে যে কীভাবে কিছু লোক এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারে যা অন্যদের কাছে অলীক মনে হয়। তবে এই বক্তব্য ধারণা করে মানুষ যা বিশ্বাস করে সে বিষয়ে সে ভুল হতে পারে না। এটা কি ভাবা সম্ভব যে আপনি যখন কিছু বিশ্বাস করেন, বাস্তবে তা করেন না, বা যখন কিছু বিশ্বাস করেন না, বাস্তবে তা করেন।

    প্রকৃতপক্ষে, এটি কীভাবে সম্ভব হতে পারে তা বোঝার জন্য চিন্তার সম্পূর্ণ ধারা রয়েছে। ধারণা করা হয়, ফেটিশিজম শব্দটি পশ্চিম আফ্রিকায় কর্মরত ইউরোপীয় বণিকদের সৃষ্টি, তাদের আফ্রিকান সমকক্ষরা কীভাবে ব্যবসায়িক চুক্তি করে তা ব্যাখ্যা করার জন্য। এটি ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর ঘটনা, দাস ব্যবসা শুরুর আগে, যখন ইউরোপীয়রা স্বর্ণের সন্ধানে ছিল। তৎকালীন আফ্রিকান অনেক বন্দরনগরেই কোনো বাণিজ্যিক উপলক্ষ্যের জন্য একটি নতুন দেবতা তৈরি করা সম্ভব ছিল। আপনি কিছু পুঁতি, পালক এবং বিরল কাঠের টুকরো একত্রিত করতে পারেন, অথবা সমুদ্র সৈকতে খুঁজে পাওয়া কোনও অদ্ভুত বা উল্লেখযোগ্য–সুদর্শন বস্তু তুলে নিতে পারেন, তারপরে পারস্পরিক শপথের মাধ্যমে এটিকে পবিত্র করতে পারেন। অন্যান্য ফেটিশ, যা সমগ্র সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য পালন করা হত, তাতে আকর্ষণীয় সুন্দর ভাস্কর্য থাকতে পারে, যার মধ্যে চুক্তিকারী দলগুলি পেরেক ঠেকাতো। এইভাবে নতুন সৃষ্ট ঈশ্বরকে রাগান্বিত করা হয় যাতে সে সীমালঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মেজাজে থাকে। তবে একজন বিদেশীর সাথে নিছক ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য আকর্ষণীয় একটি কাঠের টুকরোই যথেষ্ট।

    শপথ নেওয়ার মাধ্যমে বস্তুটি একটি ঐশ্বরিক শক্তিতে পরিণত হয় যা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনকারীকে ভয়ানক শাস্তি দিতে সক্ষম। নতুন ঈশ্বরের শক্তি ছিল তাদের চুক্তির শক্তি। সমস্ত ব্যাপারটা প্রায় স্বীকার করার মত যে বস্তুটি ঈশ্বর কারণ মানুষ তাকে ঈশ্বর দাবি করেছে, কিন্তু সবাই জোর দিয়ে বলত– না, আসলে, বস্তুগুলি এখন ভয়ানক অদৃশ্য শক্তি লাভ করেছে। এবং চুক্তিকারী পক্ষগুলির মধ্যে একটির সাথে অপ্রত্যাশিত কোনো বিপর্যয় ঘটলে – যা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না কারণ ইউরোপীয়রা প্রায়ই ঝড়ের কবলে বা ম্যালেরিয়া জ্বরে মারা যেত, মানুষ সহজেই বলতে পারত যে মৃত ব্যক্তিরা তাদের ওয়াদা ভাঙ্গার ফলেই এই পরিণতি ভোগ করছে।

    আফ্রিকান বণিকরা কি সত্যিই তাদের ফেটিশের শক্তিতে বিশ্বাস করত? অনেকে মনে করেন যে তারা করত, যদিও প্রায়ই তারা এমন আচরন করত যে ফেটিশগুলি কেবল সুবিধাজনক বাণিজ্যিক উপযোগী। কিন্তু ইন্দ্রজালের মনোমুগ্ধকর জগৎ বিভিন্ন প্যারাডক্সে পূর্ণ। এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত ইউরোপিয়োরা এইধরনের আচার–অনুষ্ঠান বুঝে উঠতে পারেনি। ফলস্বরূপ তারা আফ্রিকানদের উপর তাদের নিজস্ব বিভ্রান্তির প্রতিফলন ঘটাতে থাকে। শীঘ্রই ফেটিশের অস্তিত্বকে প্রমান হিসেবে দেখানো হয় যে আফ্রিকানরা আধ্যাত্মিক বিষয়ে গভীরভাবে বিভ্রান্ত ছিল। ইউরোপীয় দার্শনিকরা যুক্তি দেখাতে শুরু করে যে ফেটিশিজম ধর্মের সর্বনিম্ন সম্ভাব্য পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ফেটিশবাদী একেবারে যেকোন কিছুর উপাসনা করতে রাজি, যেহেতু তার কোনও নিয়মতান্ত্রিক ধর্মতত্ত্ব নেই।

    অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই কার্ল মার্কস এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো ইউরোপীয় ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছিলেন যে আমরা কি আসলেই আলাদা? মার্কস যেমনটা উল্লেখ করে, পশ্চিমা ইতিহাস হল আমাদের জিনিসগুলি তৈরি করার এবং তারপরে আমাদের নিজস্ব সৃষ্টির সামনে মাথানত করা এবং তাদের দেবতার মতো পূজা করার গল্প। মধ্যযুগে আমরা ওয়েফার, চালিস এবং রিলিকোয়ারি দিয়ে এটি করেছি। এখন আমরা অর্থ এবং ভোগ্যপণ্য দিয়ে করি– অতঃপর ফেটিশিজম সম্পর্কে মার্কসের বিখ্যাত উক্তি। আমরা ক্রমাগত ব্যবহার বা সুবিধার জন্য বস্তু তৈরি করছি, এবং তারপরে তাদের সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলছি যেন তারা কিছু অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সাথে যুক্ত এবং তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতে সক্ষম – মূলত কারণ, তাত্ক্ষণিক ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সত্যও হতে পারে।

    যখন একজন পণ্য ব্যবসায়ী ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পড়ে এবং জানতে পারে যে স্বর্ণ এটা করছে, বা তেল বা শুকরের মাংস এমনটা করছে, বা এই টাকা বাজার থেকে পালাচ্ছে এবং অন্য কোথাও যাচ্ছে, তখন সে যা পড়ে তা কি বিশ্বাস করে? অবশ্যই তিনি মনে করেন না যে তিনি করেন। ব্যবসায়ীকে একপাশে নিয়ে ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই যে সোনা বা তেল একেবারেই নির্জীব বস্তু যেগুলি কিছুই করতে পারে না। এমনটা করলে সে স্পষ্টতই বিরক্ত হবে। এটি একটি কথার কথা মাত্র। তুমি কি আমাকে বোকা মনে করো? কিন্তু বাস্তবিক অর্থে, তিনি এটি বিশ্বাস করেন, কারণ প্রতিদিন তিনি ট্রেডিং ফ্লোরে যান এবং এমন ভান করেন যে এটিই সত্য।

  • জিগমুন্ট বম্যানের সাক্ষাৎকার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একেকটা ফাঁদ

    জিগমুন্ট বম্যানের সাক্ষাৎকার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো একেকটা ফাঁদ

    • অনুবাদ: মিনহাজুল ইসলাম

    [অনুবাদকের ভূমিকা: জিগমুন্ট বম্যান একজন পোলিশ–ইহুদি সমাজবিজ্ঞানী। তিনি ১৯২৫ সালে পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে হিটলার পোল্যান্ড দখল করার পরপরই তার পিতামাতা সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। ১৯৫৪ সালে তার পরিবার ইজরায়লে চলে যায় কিন্তু বম্যান সোভিয়েতে থেকে যান। ওয়ার্সো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করে সেখানেই প্রভাষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি পোল্যান্ডেই ছিলেন। সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক বম্যান ‘কম্যুনিস্ট’ সরকারের রাজনৈতিক দমন–পীড়নের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন ও নাগরিকত্ব হারান। এরপরে ইংল্যান্ডে বসবাস করতে শুরু করেন। তিনি আধুনিকতা, উত্তরাধুনিকতা, তরল আধুনিকতা ও ভোগবাদ নিয়ে বিস্তৃত কাজ করেছেন। “তারল্য” ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, নজরদারি ও শাসনব্যবস্থা, ভয় ও প্রেম–ভালোবাসা ইত্যাদি। ১৯৭০ সালে তিনি ইংল্যান্ডের লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। বাউম্যান জায়নবাদ–বিরোধী ছিলেন এবং বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেন। তার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে রয়েছে, Liquid Modernity (1999), Liquid Love (2003), Liquid Life (2005) Does the Richness of the Few Benefit Us All? (2014) ইত্যাদি। লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক হিসেবে তিনি ইংল্যান্ডেই বাকি জীবন কাটান। তার বেশ কয়েকটি কাজের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালে পাওয়া স্পেনের প্রিন্স অব অস্টারিয়াস এ্যাওয়ার্ড। বর্তমান সাক্ষাৎকারটি EL PAÍS অনলাইন পোর্টালে ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়।]

    জিগমুন্ড বম্যান

    আপনি বৈষম্যকে এক ধরনের টিউমার (metastasis) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আপনার কী মনে হয়? গণতন্ত্র কি হুমকির মুখে?

    এ মুহূর্তে যা চলছে আমরা তাকে গণতন্ত্রের সংকট বলতে পারি। আমাদের হর্তাকর্তারা শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা নির্বোধই নয়; অদক্ষও বটে— এই ধারণা থেকে আমাদের আস্থায় ধ্বস নেমেছে। কোনো কর্ম সম্পাদনের জন্য দরকার ক্ষমতা ও সক্ষমতা এবং এ কারণে আমাদের প্রয়োজন হয় রাজনীতির; কারণ রাজনীতি হলো কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের হাতে থাকা ক্ষমতা ও রাজনীতির যে পরিণয় তা ফুরিয়ে এসেছে। ক্ষমতার বিশ্বায়ন ঘটে গেছে। কিন্তু রাজনীতি তো আগের মতোই স্থানীয় রূপেই আছে। রাজনীতি তার আবেদন হারিয়েছে। মানুষ এখন আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস রাখে না কারণ এই ব্যবস্থা তার প্রতিশ্রুতি রাখে নাই। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি অভিবাসন সংকটকে দেখি, এটা তো একটা বৈশ্বিক ঘটনা কিন্তু তারপরও আমরা এটাকে সঙ্কীর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা হিসেবে দেখি। গণতন্ত্র রক্ষার্থে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের হাতে আছে সেগুলো আদৌ এ ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রক্ষার কথা মাথায় রেখে উদ্ভাবিত হয়নি। বর্তমানে গণতন্ত্রের যে সংকট তা মূলত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট।

    আপনার মতে এই মুহূর্তে, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যকার যে পেন্ডুলাম তা কোনটির দিকে বেশি দুলছে?

    এ দুটি এমন ধারণা বা মূল্যবোধ যাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা অত্যন্ত জটিল। আপনি যদি বেশি নিরাপত্তা চান আপনাকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাধীনতায় ছাড় দিতে হবে; অন্যদিকে আপনি যদি বেশি স্বাধীনতা চান সেক্ষেত্রে আপনাকে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বলা যায় ত্যাগ করতে হবে। এটা এক ধরনের উভয়সঙ্কট যা চিরদিনই চলতেই থাকবে। চল্লিশ বছর আগে আমরা বিশ্বাস করতাম যে স্বাধীনতার জয় হয়েছে এবং আমরা ভোগবাদের খাই খাইয়ে মজে গেলাম। সবকিছুই যেন টাকা ধার করে পাওয়া যেতো— বাড়ি, গাড়ি, ইত্যাদি এবং পরে কোনো একসময় ঋণ চুকিয়ে দিলেই হলো। ২০০৮ এ যখন সব ঋণ শুকিয়ে গেল, আমাদের যেন টনক নড়ল, অর্থাৎ মহা তারল্যের সংকট। এই যে এক সর্বনাশ হলো, যার ফলাফল এমন আর্থ–সামাজিক অধঃপতন যা বিশেষ করে মধ্যবিত্তকে তীব্র আঘাত করল; এমন এক বিপজ্জনক অবস্থায় তারা পতিত হলো যেখানে তাদের কিছুই করার ছিলো না। তারা জানে না তাদের কোম্পানি অন্য কোম্পানিতে বিলীন হয়ে যাবে কি না কিংবা তাদেরকে ছাঁটাই করা হবে কি না, তারা যা খরিদ করেছে তা আদৌ তাদের কি না। দ্বন্দ্বটা আর শ্রেণিসমূহের মধ্যে নয়; প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের এবং ব্যক্তির সাথে সমাজের দ্বন্দ্ব। এটা কেবলমাত্র আর নিরাপত্তার অভাবই নয়; বরং স্বাধীনতার অভাবও বটে।

    আপনি বলে থাকেন–যে প্রগতি স্রেফ একটি মিথ মাত্র, কেননা মানুষ এখন আর এটা বিশ্বাস করে না–যে অনাগত দিনগুলো অতীতের তুলনায় ভালো হবে।

    আমরা এক ধরনের মধ্যবর্তী সময়ে আছি। বলতে পারেন এমন দুইটা সময়ের মধ্যে আটকা আছি, যে সময়ে আমাদের ব্যাপক নিশ্চিন্তি ছিল এবং আরেকটা সময় যখন আমরা বুঝলাম যে পুরানো পদ্ধতি আর কোনোভাবেই কাজ করছে না। এরকম দুইটা সময়ের মাঝামাঝি আমরা আছি বলা যায়। আমারা জানি না ঠিক কোন অবস্থার দ্বারা পূর্বের অবস্থা প্রতিস্থাপিত হবে। আমরা নানা কিসিমের পরীক্ষা–নিরীক্ষা তথা বিভিন্ন নতুন নতুন পদ্ধতি ঝালিয়ে নিচ্ছি বটে। ১৫ মে’র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্পেন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করেছিল, যখন স্পেনের লোকজন বিভিন্ন জনপরিসরে জমায়েত হয়েছিল, যুক্তিতর্ক চালিয়েছিল, সংসদীয় প্রক্রিয়াকে বদলিয়ে এক ধরনের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা চালিয়েছিল। ওটা বেশিদিন টেকে নাই। [সরকারের] ব্যয় সংকোচন নীতি অব্যাহত থাকবে, এটাকে থামানো মুশকিলই হবে। তবু, নতুন পদ্ধতি অন্বেষণের ক্ষেত্রে [আন্দোলনের এসব নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা] তুলনামূলকভাবে কাজে লাগবে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব থটস
    শিল্পী: ইগোর লাকিয়ানচেনকো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আপনি যুক্তি দিয়েছেন–যে ১৫ মে কিংবা অকুপাই আন্দোলনের মতো আন্দোলনগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নাড়া দিতে জানে ঠিকই, কিন্তু এসব আন্দোলন থেকে নিরেট কিছু বের হয়ে আসে না।

    কোনো একটা সাধারণ লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে মানুষজন নিজেদের মধ্যকার সকল ভেদাভেদ দূরে সরিয়ে রেখে জনপরিসরে একত্রিত হয়। যদি সেই লক্ষ্য নেতিবাচক হয় এবং কারোর প্রতি জনরোষ উদগীরণ সংশ্লিষ্ট হয়, সেক্ষেত্রে লক্ষ্য হাসিলের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। একদিক থেকে দেখলে এটা ঐক্যের জোয়ার, কিন্তু এ ধরনের জোয়ার অনেক শক্তিশালী হলেও এর স্থায়ীত্ব কম।

    আপনি তো এটাও মনে করেন–যে বৈচিত্রপূর্ণ সামাজিক–নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক জোটগুলোতে স্বভাবতই নেতাদের কোনো স্থান নাই।

    ঠিক এ কারণেই, অর্থাৎ নের্তৃত্ব থাকে না বলেই আন্দোলনগুলো টিকে থাকে, আবার অন্যদিক নের্তৃত্ব না থাকার কারণে এসব আন্দোলন তাদের লক্ষ্যবোধকে কার্যে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ।

    স্পেনের ‘১৫ মে’ আন্দোলন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দিয়েছে।

    এক রাজনৈতিক দলের বদলে আরেক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার ফলে তেমন কোনো সমাধান হবে না। রাজনৈতিক দলগুলো আসলে সমস্যা না, মূল সমস্যা হলো তাদের হাতে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। স্পেনের সমস্যা আসলে বৈশ্বিক সমস্যার একটি অংশ। এটা ধারণা করা ভুল হবে–যে দেশীয় পর্যায়ে এই সব সমস্যার সমাধান করা যাবে।

    কাতালানের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রকল্প নিয়ে আপনার কী মত?

    আমার কাছে মনে হয় আমরা এখনো সেই ভারসাই নীতির যুগকে অনুসরণ করছি যখন প্রত্যেকটি জাতির তাদের স্বশাসনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এখনকার দুনিয়ায় এটা একটা কল্পকাহিনি মাত্র, কারণ কোনো অঞ্চলই এখন আর সমরূপ নয়। বর্তমানে প্রত্যেকটা সমাজ হলো বিভিন্ন ধরনের অভিবাসীর সমষ্টি। মানুষজন যে সমাজের প্রতি অনুগত, সেই সমাজে বাস করে এবং কর দেয়, কিন্তু একই সাথে তারা তাদের আত্মপরিচয় ত্যাগ করতেও রাজি নয়। ভূমিকেন্দ্রিক আত্মপরিচয়ের ধারণা ভেঙ্গে পড়েছে। আপনি কোথায় থাকেন তার ওপর আর আপনার আত্মপরিচয় নির্ভর করছে না। কাতালোনিয়া স্কটল্যান্ড কিংবা লম্বারডি, যে অঞ্চলের কথাই বলেন না কেন, এসব জায়গায় যেটা চলছে সেটা হলো গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং নাগরিক পরিচয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। কাতালানরাও ইউরোপিয়ান কিন্তু তারা মাদ্রিদ হয়ে নয়, সরাসরি বার্সেলোনার মাধ্যমে ব্রাসেলসের সাথে যোগাযোগ রাখতে চায়। প্রায় সকল দেশেই এই যুক্তির প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। আমরা এখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুসরণ করছি কিন্তু দুনিয়া এতদিনে অনেক বদলায় গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: ব্যালান্স অব ফ্রিডম
    শিল্পী: রামিরো জাদোর্য়া
    সূত্র: পলিটিক্যাল কার্টুন

    সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথাকথিত “আর্মচেয়ার অ্যাক্টিভিজম”–এর ব্যাপারে আপনি বেশ সন্দিহান। সস্তা বিনোদোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট মানুষজনকে বেশ মূক বানিয়ে ফেলছে। তাহলে আপনি কি বলতে চান–যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হাল জমানার আফিম?

    আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটা কিন্তু আর জন্মগত নয়; বরং অনেকটাই কর্মের সাথে সম্পর্কিত। আপনাকে আপনার নিজস্ব সম্প্রদায় (কম্যুনিটি) তৈরি করতে নিতে হবে। কিন্তু কথা হলো সম্প্রদায় তৈরি করা যায় না; হয় আপনার কম্যুনিটি আগে থেকেই থাকবে অথবা থাকবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এটারই একটা বিকল্প কিছু তৈরি করে ফেলে। কম্যুনিটি আর নেটওয়ার্কের মধ্যে পার্থক্য হলো, আপনি কম্যুনিটির অংশ; অন্যদিকে, নেটওয়ার্ক আপনার অংশ। (নেটওয়ার্কে) আপনার মধ্যে বেশ একটা নিয়ন্ত্রকের ভাব চলে আসে। আপনি সেখানে আপনার ইচ্ছামতো বন্ধু বানাতে পারেন, আবার চাইলে ইচ্ছামতো তাদের অপসারণও করতে পারেন। কাদের আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, আর কাদের সাথে আপনি সম্পর্কিত বোধ করেন, তা বেশ খানিকটা আপনারই নিয়ন্ত্রণে। মানুষ এক্ষেত্রে কিছুটা ভালো বোধ করে কেননা নিঃসঙ্গতা, অপাঙ্‌ক্তেয় হবার ভয়— এগুলো আমাদের এই ব্যক্তিবাদী যুগের মারাত্মক বিমার। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুবান্ধব যুক্ত করা বা অপসারণ করা এত সহজ–যে মানুষ আসল সামাজিকতাটাই শিখতে ব্যর্থ হয়, অথচ এটাই আপনার সবচেয়ে বেশি দরকার যখন আপনি রাস্তাঘাট, বিভিন্ন জনপরিসরে যান, কর্মক্ষেত্রে যান, বিভিন্ন লোকজনদের সাথে মেশেন যেখানে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। পোপ ফ্রান্সিস—যিনি একজন বড় মাপের মানুষ—নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম সাক্ষাৎকারটাই দিয়েছিলেন ইতালিয়ান সাংবাদিক ইউজেনিও স্কালফারিকে, যিনি কি না একজন স্বঘোষিত নাস্তিক। এটাই প্রকৃত সংলাপের নিদর্শন: যাদের সাথে আপনার মত মিলে যায়, তাদের সাথে আলাপ করাকে প্রকৃত সংলাপ বলা যায় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের এরকম প্রকৃত সংলাপ করতে শেখায় না কেননা এখানে যেকোনো ভিন্নমত এড়িয়ে চলা একদম সহজ। অধিকাংশ মানুষ সংঘবদ্ধ হওয়া কিংবা চিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করবার জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে না; বরং নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন একটি কমফোর্ট জোনে আবদ্ধ রেখে, নিজেদের কথার প্রতিধ্বনি শোনার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এস্তেমাল করে। সেখানে তারা স্রেফ আপন সুরতের প্রতিফলনই দেখতে পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানুষকে বিনোদন দেয়ার জন্য খুবই উপকারী বটে, কিন্তু এই মাধ্যমগুলো একেকটা ফাঁদ।

  • রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    × অনুবাদ: সহুল আহমদ

    [অনুবাদকের মন্তব্য: বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের জন্ম ১৮৭১ সালের ৫ মার্চে, পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারে। কৈশোরেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন রোজা। ১৮৮৬ সালে পোলিশ প্রলেতারিয়েত পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, কিন্তু তৎপরতার কারণে তৎকালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে রোজা দেশ ছাড়েন ১৮৮৯ সালে। পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৭ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, ‘দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অফ পোল্যান্ড’ শীর্ষক ডক্টোরাল থিসিস জমা দেন। কিন্তু ততদিনে তার তৎপরতা তাকে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিল। ১৮৯৩ সালে জুরিখে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।

    ১৯০৪ সালের দিকে, যখন বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন রোজা লুক্সেমবার্গ মোটাদাগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের জন্য পোলিশ ও রুশ বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে মেনশেভিক ও বলশেভিকদের যে বিভাজন হয়েছিল সেটা বিশ্লেষণ করতে ইস্ক্রার সম্পাদকরা তাকে অনুরোধ করেন। জার্মান ভাষায় ১৯০৪ সালে তিনি Neue Zeit পত্রিকায় ‘রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক প্রশ্নসমূহ’ শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধ হচ্ছে সংগঠন বিষয়ে লেনিনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের ভেতর পার্টি সংগঠন ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিষয়ে যে তর্ক চলছিল তাতে এই প্রবন্ধ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। রোজা এখানে বৈপ্লবিক পার্টির গঠন ও কেন্দ্রিকতা বিষয়ে লেনিনের অবস্থানের কড়া সমালোচনা হাজির করেন।

    রোজা এই প্রবন্ধে সংগঠন সংক্রান্ত তার ভাবনা তুলে ধরেন। আলাপ শুরু করেন লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদ দিয়ে, এবং এটাকে সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন। তৎকালে এক ধরনের নতুন সংগঠন, যা কিনা বিপ্লব সফল করবে, সে বিষয়ে প্রচুর আলাপ চলছিল। লেনিনের মতে, বিপ্লবী পার্টিকে আসলে শ্রমিকশ্রেণির ভ্যানগার্ড হতে হবে। তারাই নেতৃত্ব দিবে বিপ্লবে, শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালনে উদ্বুদ্ধ করবে। এই যে সংগঠন বা পার্টি হবে সেটাকে খুব কেন্দ্রীভূত হতে হবে, সামরিক বাহিনীর মতো এবং আমলাতান্ত্রিক। সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিই সবকিছুর পরিকল্পনা করবে, বাদবাকি সবাই, সংগঠনের শাখা–প্রশাখা সকলেই কেবল সেই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করবে। বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠন, বিলুপ্তকরণ, নেতা নির্বাচন বা অপসারণ ইত্যাদি সকল কাজের দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে। কেন্দ্রে যা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বাকিরা সেটাই বাস্তবায়িত করবেন, কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে আলাপ–আলোচনা করবেন। শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের এইসব নিয়া ভাবনার সময় নেই। বরঞ্চ সংগঠনের আমলাতান্ত্রিকতা ও কেন্দ্রিকতাবাদ আদতে বৈপ্লবিক। রোজা এই প্রবন্ধে প্রধানত এই প্রস্তাবনা ও এর সাথে জড়িত মনোভঙ্গির সমালোচনা করেন। রোজা বৈপ্লবিক পার্টির জরুরতকে অস্বীকার করেন না, বরঞ্চ তিনি মানেন সেটা লাগবেই। কিন্তু লেনিন যে কেন্দ্রিকতার কথা বলেন, রোজা সেটা মানতে পারেন না। কারণ, রোজার মতে, লেনিন জনগণের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে যান্ত্রিক বানিয়ে তুলতে চান। লেনিন যে ‘সুবিধাবাদে’র ব্যাপক নিন্দামন্দ করেন, রোজার মতে, সেটা কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে বরঞ্চ আরও ত্বরান্বিত হবে। রোজা তার দুই অধ্যায়ে এই অবস্থানকেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। তিনি বরঞ্চ সংগঠনে ব্যাপক অংশগ্রহণ চান। তাতে ভুল হতে পারে, সুবিধাবাদও প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেটাকে কোনো গঠনতন্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ভুল ঠেকানোর জন্য যদি কঠিন কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তোলা হয় তাহলে সেটা ভুল ঠেকানো দূরে থাক, উল্টো বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণির যে সজীবতা ও লড়াই করার যে স্পৃহা তাকেই গলা টিপে মেরে ফেলবে।

    রোজার এমন ভাবনা মোটেই অকস্মাৎ নয়। লেনিনের সাথে তার এই দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্য একেবারেই মৌলিক এবং সেটা আজীবন ছিল। এই প্রবন্ধে যেমন ছিল, তেমনি ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। রোজা বলশেভিক বিপ্লবের প্রশংসা করলেও সেখানেও তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটা বিষয়ে রোজার অগাধ বিশ্বাস ছিল, এগুলোই লেনিনের সাথে তার অবস্থানের ফারাক ঘটিয়েছে, এবং সারাজীবন সকল লেখাতেই বিষ্যগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিষয়গুলো হচ্ছে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা ও গণতন্ত্র। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর রোজা জোর দিতেন। সেখানে শ্রমিকশ্রেণির বা প্রলেতারিয়েতের বা আমজনতার সৃজনশীল সত্তা এই আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদের সমালোচনা করেন সেখানেও এই দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া। অর্থাৎ, কেন্দ্রিকতাবাদ জনগণের আন্দোলনের স্পৃহা, তাদের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা সবকিছুকে দমিয়ে দিয়ে, কাগজ ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কমিটির খপ্পরে তুলে দেয়। ফলে রোজার চোখে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র অবিচ্ছেদ্য। তিনি অবশ্যই সমাজতন্ত্র চাইতেন কিন্তু, তার মতে, যতদূর পর্যন্ত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে বিস্তৃত করা যায় ততদূর ছাড়া তার সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। সকল ধরনের স্বাধীনতা, অর্থাৎ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ব্যতীত সেই সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। তার চিন্তার এই কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো লেনিনের সাথে তার ফারাকটা গড়ে দিয়েছিল, এবং সেটা এই প্রবন্ধ থেকে শুরু করে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তৎকালে তর্কে জিত বোধহয় লেনিনেরই হয়েছিল, (যেহেতু লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়ে গিয়েছিল), কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী অভিজ্ঞতা, স্ট্যালিনবাদের আবির্ভাব, সোভিয়েতের পতন ইত্যাদিসহ আজ প্রায় ১০০ বছর পর আমাদের কাছে মনে হচ্ছে রোজাই বোধহয় সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, বিপদ টের পেয়েছিলেন।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগঠন বিষয়ক আলাপ–আলোচনা একদম অনুপস্থিত। থাকলেও সেটা অল্প। সংগঠন বিষয়ে যে সকল ধারণা প্রবলভাবে রাজনৈতিক মানসজগতে বিরাজ করছে সেখানে লেনিনের সংগঠন বিষয়ক ভাবনার একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু এই ধরনের সাংগঠনিক মডেল আজ আর কাজ করছে না। এই মুহূর্তে সংগঠন বিষয়ে আমাদের নতুন নতুন আলাপ তোলা জরুরি। এই কথা মাথায় রেখেই রোজা লুক্সেমবার্গের প্রবন্ধটির অনুবাদ করা হয়েছে।

    তৎকালে এই তর্কের আরও হদিস পাওয়া যেতে পারে লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান? এবং ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড, টু স্টেপস ব্যাক শীর্ষক রচনাতে। পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ট্রটস্কির আওয়ার পলিটিক্যাল টাস্ক।

    ১৯০৪ সালে এটি প্রকাশিত হয় “Organizational Questions of the Russian Social Democracy” শিরোনামে। প্রকাশিত হয় Iskra এবং Neue Zeit–এ। পরবর্তীতে Marxism vs. Leninism নামে একটি পুস্তিকা আকারেও প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে ইন্টেজারে প্রকাশিত হয় Revolutionary Socialist Organization শিরোনামে। ১৯৩৫ সালে Leninism or Marxism? শিরোনামে আরেকটি ফেডারেশন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে বার্ত্রাম উলফের ভূমিকাসহ The Russian Revolution and Leninism or Marxism? শিরোনামে প্রকাশিত হয়; ১৯৭০ সালে পাথফাইন্ডার প্রেস থেকে প্রকাশিত রোজা লুক্সেমবার্গের আরেকটা সংকলনে “Organizational Questions of Social Democracy” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    এখানে যে সংস্করণটি অনুবাদ করা হয়েছে তার মূল সূত্র হচ্ছে মার্ক্সিস্ট আর্কাইভ। তবে ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিটার হুদিস এবং কেভিন বি এন্ডারসন সম্পাদিত দি রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার–এর সংস্করণটিকেও অনুসরণ করা হয়েছে। কখনো কখনো ফুটনোটে বা বন্ধনীর ভেতর পার্থক্যসূচক মন্তব্যও জুড়ে দেয়া হয়েছে। তবে, এই দুটো সংস্করণকে পাশাপাশির রেখে আরও সম্পাদনার জরুরত রয়েছে।

    রোজা লুক্সেমবার্গের এই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল দুই অধ্যায়ে। রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের জন্য রোজার প্রথম অধ্যায়ের একটি খসড়া অনুবাদ করেছিলেন অনুবাদক মাজহার জীবন; কিন্তু তিনি আর কাজটা শেষ করেননি। এই অনুবাদে বিভিন্ন সময়ে তার খসড়া থেকে আমি সাহায্য নিয়েছি। তার প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা। অনুবাদ করার সময় আরিফ রেজা মাহমুদ, সারোয়ার তুষার ও তানভীর আকন্দের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা নিয়েছি। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।]

    মূল অনুবাদ

    প্রথম অধ্যায়

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ওপর এক নজিরবিহীন দায়িত্ব বর্তেছে। যে দেশে এখনো চরম ক্ষমতাধর রাজতন্ত্র প্রভাবশালী, সেখানে সর্বোত্তম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশলগত নীতি [পলিসি] নির্ধারণ করাই হলো এর দায়িত্ব। [১৮৭৯–৯০ সালের দিকে জার্মানিতে যখন বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইন কার্যকর ছিল] জার্মানির তৎকালীন পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার পরিস্থিতিকে একই সমান্তরালে তুলনা করাটা ভুল হবে। দুই দেশেরই সাধারণ মিল হলো—পুলিশি শাসন। আর কোনো দিক থেকেই দু’দেশের তুলনা চলে না [বিশেষত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে]।

    গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতাগুলো গুরুত্বের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে গৌণ। এমনকি রাশিয়ায় জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত বাধাগুলো অতিক্রম করে সাফল্য লাভ করেছে। রাস্তায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে জনগণ তাদের ‘গঠনতন্ত্র’ (কনস্টিটিউশন) খুঁজে পেয়েছে (যদিও তা অনিশ্চিত)। এই অবস্থা বজায় রেখে একদিন রাশিয়ার জনগণ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করবে।

    রাশিয়াতে বুর্জোয়া আধিপত্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির আড়ালে কার্যকর; এই বাস্তবতাই রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপ পরিচালনার প্রধান সমস্যা। এই স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য শ্রেণিসংগ্রামের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের একটি বিমূর্ত প্রোপাগান্ডামূলক চেহারা প্রদান করে, এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অসন্তোষ বা বিক্ষোভকে একধরনের গণতান্ত্রিক–বৈপ্লবিক চেহারা প্রদান করে।

    বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইনগুলো১ শ্রমিক আন্দোলনকে অতি উন্নত বুর্জোয়া সমাজে সাংবিধানিক চৌহদ্দির বাইরে নিয়ে এসেছে; যে বুর্জোয়া সমাজে শ্রেণিদ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বোচ্চ বিরোধাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। [এখানেই বিসমার্কের পরিকল্পনার অর্থহীনতা নিহিত]। রাশিয়ার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ওখানকার সমস্যা হলো কীভাবে একটা সোস্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় যেখানে রাষ্ট্র এখনো বুর্জোয়াদের কব্জায় নেই।

    এই পরিস্থিতির সাথে কেবল বিক্ষোভ এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে রুশ মাটিতে রোপনের পদ্ধতিই জড়িত নয়; বরঞ্চ এর সাথে পার্টি সংগঠনের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে এবং সরাসরি সামনে চলে আসে।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনে এমনকি সংগঠনকেও [সমাজতন্ত্রের পূর্বেকার ইউটোপিয়ান পরীক্ষা–নিরীক্ষা থেকে স্বতন্ত্র] প্রোপাগান্ডা/প্রচারণার একটি কৃত্রিম ফসল হিসাবে না দেখে বরঞ্চ শ্রেণিসংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক ফসল হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে, যেখানে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব [ডমিনেশন] সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে অগ্রগামী থাকে, সেখানে খোদ বুর্জোয়ারাই শ্রমজীবী শ্রেণির মাঝে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংহতির সূত্রপাত ঘটান। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর মতে, ‘এই পর্যায়ে শ্রমজীবীদের সংহতি তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ফসল নয়, বরঞ্চ এটা বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ।’ […যা কিনা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রলিতারিয়েতদের বাধ্য করে…’]

    তদপুরি, রাশিয়াতে সোশ্যাল ডেমক্রেসিকে নিজের প্রচেষ্টাতেই একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক কালপর্ব মেরামত করতে হবে। রুশ প্রলেতারিয়েতদের বর্তমান যে ‘বিক্ষিপ্ত’ [atomized] অবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক জমানাকে দীর্ঘায়িত করছে সে অবস্থা থেকে তাদেরকে শ্রেণি সংগঠনে রূপান্তরিত করতে হবে। এটা তাদেরকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে এবং সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।

    একটি বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে ধরনের সুযোগ–সুবিধার নিশ্চিয়তা থাকে সেগুলো ছাড়াই রুশ সমাজতন্ত্রীদের এমন একটি সংগঠন নির্মাণের ভার গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যান্য দেশের বুর্জোয়া সমাজ যে রাজনৈতিক রসদ যোগায় তা সেখানে থাকবে না। এভাবে বলা যায় যে, সর্বশক্তিমান ইশ্বরের মতো তাদেরকেও শূন্য থেকে এধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে সংগঠনগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠী/দল ও ক্লাব, এবং এদের প্রধান কর্মসূচি হচ্ছে প্রচারণা/প্রপাগান্ডা। প্রস্তুতি পর্যায়ের এই ধরনের সংগঠনগুলোকে কীভাবে এমন একটি বৃহৎ অখণ্ড জাতীয় কাঠামোতে রূপান্তর করা যায় যেগুলো কিনা রাশিয়া রাষ্ট্র শাসিত বিশাল অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত? এটাই হলো রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রোসির সুনির্দিষ্ট সমস্যা যা বেশ কিছুকাল ধরে আলোচিত হচ্ছে।

    পুরনো সংগঠন সক্রান্ত ধারণার সর্বাধিক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন [অটোনমি] এবং বিচ্ছিন্নতা [আইসোলেশন]। সুতরাং এটা বোধগম্য যে, যিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংগঠন দেখতে চান তাঁর শ্লোগান কেন হয়ে যাচ্ছে ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ [সেন্ট্রালিজম’]। গত পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্য ইস্ক্রা২ যে দারুণ প্রচারাভিযান চালিয়েছে সেখানে কেন্দ্রিকতা ধারণার প্রতি সম্মতি বারংবার প্রকাশিত হয়েছে; এই ধারণা রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটের পুরো তরুণ প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পার্টি কংগ্রেসে৩ এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ প্রত্যয়টি রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সংগঠন প্রশ্নকে পুরোপুরি আলাপে আনতে পারেনি। আমরা আবারও বুঝতে পারলাম যে, সামাজিক আন্দোলনে কোনো বাঁধাধরা নকশা [ফর্মূলা] যে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

    ইস্ক্রা গ্রুপের অন্যতম সদস্য কমরেড লেনিন রচিত এক কদম আগে, দুই কদম পিছে৪ শীর্ষক গ্রন্থটি রাশিয়ার আন্দোলনের “অতি–কেন্দ্রীকতাবাদীদের” ধারণাগুলোর পদ্ধতিগত বর্ণনা। এই গ্রন্থে অতুলনীয় বলিষ্ঠ ও যুক্তি সহকারে নির্মম কেন্দ্রিকতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূলনীতিগুলো হলো: ১) সকল সক্রিয় বিপ্লবীদের নিয়ে একটি আলাদা বাহিনী বাছাই ও গঠন করার জরুরত; এই অভিজাতদের [এলিট] চারপাশে থাকা অসংগঠিত কিন্তু বৈপ্লবিক সাধারণ জনগণ থেকে তারা আলাদা হবেন। ২) পার্টির সকল স্থানীয় কমিটিকে মনোনিত করার সুযোগ–সুবিধা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; সকল স্থানীয় কমিটির কার্যকর পদে নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটির থাকবে; পার্টি পরিচালনার তৈয়ারি নিয়মকানুন সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ারও কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; এমনকি, স্থানীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তকরণ ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে কোনো ধরনের আর্জির সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব থাকতে হবে। এভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রয়োজন অনুসারে পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্তর বিন্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে। পার্টির মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিই হবে একমাত্র চিন্তাশীল অংশ। বাকি সকল গ্রুপ হবে এর কার্যনিবাহী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

    লেনিনের যুক্তি হচ্ছে যে, এমন কেন্দ্রীভূত ধরনের সংগঠনের সাথে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গণআন্দোলনের সংমিশ্রণই বিপ্লবী মার্ক্সবাদের একটি নির্দিষ্ট নীতি। এই থিসিসের সমর্থনে তিনি একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এই ব্যাপারটা আরও একটু গভীরভাবে দেখা যাক।

    কোনো সন্দেহ নেই যে, সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রিকতাবাদের দিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একটি জোরালো ঝোঁক বা প্রবণতা রয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি যেহেতু তার এই ঝোঁকগুলো [কেন্দ্রিকতাবাদের ঝোঁক] সহ পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক জমিনে বেড়ে ওঠে এবং বৃহৎ কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর [ফ্রেমওয়ার্ক] ওপর তার সংগ্রাম ভর করে, সেহেতু সোশ্যাল ডেমোক্রেসি অন্তর্নিহিতভাবে সকল ধরনের স্থানিকতা বা জাতীয় ফেডারেলিজমের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সকল স্থানীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের সাধারণ স্বার্থগুলোর বিরোধিতা করা। এটি সকল শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনকে একটি একক দলে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে, তা তাদের মধ্যে যতই জাতিগত, ধর্মগত বা পেশাগত ভিন্নতা থাকুক। অস্ট্রিয়ার মতো কিছু বিশেষ ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটেছে।৫

    এটা পরিষ্কার যে, রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি নিজেকে অনেকগুলো জাতীয় গ্রুপ/দলের একত্রীভূত ফেডারেটিভ হিসাবে সংগঠিত করা উচিৎ নয়। বরঞ্চ তাকে পুরো সাম্রাজ্যের জন্য একটি একক পার্টি হয়ে উঠতে হবে। তদপুরি, এখানে বিবেচনাধীন প্রশ্ন এটি নয়। আমরা এখানে যা জিজ্ঞেস করছি তা হচ্ছে, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে একীভূত ও একক রুশ পার্টির অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয়করণের মাত্রা কদ্দূর পর্যন্ত জরুরি।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির যথাযথ কার্যক্রমের আঙ্গিক থেকে শ্রেণি সংগ্রামের একটি দল হিসাবে এর সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রতীয়মান হয় যে, পার্টির ক্ষমতা ও শক্তি সরাসরি পার্টির কেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিসমূহের প্রভাবের তুলনায় এগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি সমাজের ইতিহাসে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনই প্রথম যা প্রত্যেক পর্যায়ে এবং সকল ক্ষেত্রে জনগণের সংগঠন এবং প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন কার্যকলাপকে বিবেচনায় নেয়।

    এই কারণেই সোশাল ডেমোক্রেসি এমন এক ধরনের সংগঠন তৈরি করে যা পূর্বতন বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাধারণ সংগঠনের (যেমন জেকোবিন ও ব্লাঙ্কুইদের অনুসারী) চেয়ে পৃথক।

    লেনিন বোধহয় এই বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন যখন তিনি তার বইয়ে মন্তব্য করেন যে, বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট ‘শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের সাথে যুক্ত একজন জেকোবিন’–এর চাইতে বেশি কিছু নয়। লেনিনের কাছে সোশাল ডেমোক্রেসি এবং ব্লাঙ্কুইজিমের৬ পার্থক্য এই জায়গায় নেমে এসেছে যে, মুষ্টিমেয় ষড়যন্ত্রকারীর পরিবর্তে আমরা শ্রেণি–সচেতন প্রলেতেরিয়াত পেয়েছি। তিনি ভুলে যান যে, এই পার্থক্য সংগঠন প্রশ্নে আমাদের ধারণাগুলোর সম্যক পুনঃপাঠের ইশারা দিচ্ছে; কেন্দ্রিকতাবাদ নিয়ে একেবারে নতুন ধরনের ধারণার ইশারা দিচ্ছে; এবং পার্টি ও সংগ্রামের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক বিষয়ে একেবারে ভিন্ন ধারণার ইশারা দিচ্ছে।

    ব্লাঙ্কুইজম শ্রমিক শ্রেণির প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা অংশগ্রহণকে আমলে নেয় না। ফলে বিপ্লবের জন্য তাকে জনগণকে সংগঠিত করতে হয় না। বিপ্লবের মূহূর্তেই কেবল জনগণ তাদের ভূমিকা পালন করবে বলে ধরে নেয়া হয়। বিপ্লবের প্রস্তুতির ভার কেবল ছোট একটি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের, যারা ক্যু করবে। বস্তুত বৈপ্লবিক ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য ধরে নেয়া হয়েছিল যে ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে জনগণকে দূরে রাখাই শ্রেয়। এমন সম্পর্ক কেবল ব্লাংকুইবাদীরাই গ্রহণ করতে পারতেন, কেননা তাদের সংগঠনের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার সাথে জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রামের কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ নেই।

    ব্লাংকুইস্ট বিপ্লবীদের কৌশল ও তৎপরতার সাথে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রামের সংযোগ খুব কমই ছিল। তারা মুক্তভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কাজ করতে পারতেন। ফলে তারা আগ থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি রেডিমেড পরিকল্পনার রূপ নিতে পারেন। এর ফলে, সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা কেবল সাধারণ কার্যনিবাহী অঙ্গে পরিণত হন; তাদের কর্মকাণ্ডের পরিসরের বাইরে পূর্ব নির্ধারিত ইচ্ছা/সিদ্ধান্তের আদেশ পালন করাই হয়ে উঠে তাদের কাজ। তারা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতিয়ারে পরিণত হন। এখানে আমরা ষড়যন্ত্রমূলক কেন্দ্রিকতাবাদের দ্বিতীয় বিশেষত্ব খুঁজে পাই: কেন্দ্রের ইচ্ছার কাছে পার্টির বিভিন্ন অংশের চরম ও অন্ধ সমর্পণ, এবং সংগঠনের সকল অংশে এই কর্তৃত্বের সম্প্রসারণ।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে [র‍্যাডিক্যালি] আলাদা পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এর উত্থান ঘটে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রাম থেকে। এর বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত দ্বান্দ্বিক বিরোধের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে। অর্থাৎ, খোদ এই সংগ্রামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বাহিনী নিজেকে নিযুক্ত করেছে [রিক্রুট], এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। পার্টি গঠনের কার্যক্রম, সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রলেতারিয়েতদের সচেতনতা এবং খোদ সংগ্রাম, কোনোটাই কালানুক্রমিক ও যান্ত্রিকভাবে আলাদা আলাদা বিষয় নয়। এগুলো হলো একই সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন দিক। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির এমন কোনো একগুচ্ছ কৌশল নেই যা কিনা প্রশিক্ষণ শিবিরের সৈনিকদের শেখানোর মতো করে কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির সদস্যদের শেখাবে। বরঞ্চ, যে সংগ্রামের প্রক্রিয়া সংগঠন তৈয়ার করেছে সেটাই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির প্রভাবের পরিসরে একটি ক্রমাগত ওঠানামার প্রয়োজনীয় শর্ত তুলে ধরে।

    এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতা পার্টির কেন্দ্রের প্রতি সদস্যদের যান্ত্রিক অধীনতা ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর ভর করে হতে পারে না। এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন ইতোমধ্যে পার্টিতে থাকা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি সচেতন নিউক্লিয়াস এবং প্রলেতারিয়েতের পার্টিবিহীন অংশের মধ্যে কোনো বদ্ধ দেয়াল তৈরি অনুমোদন করে না।

    এখন লেনিনের কেন্দ্রিকতা যে দুটো নীতির ওপর নির্ভর করে আছে তা হলো:

    ১) পার্টির কেন্দ্রের কাছে পার্টির সকল অংশের অন্ধ আনুগত্য; কেবল কেন্দ্রই সকলের জন্য চিন্তা করবে, নির্দেশনা দিবে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

    ২) সামাজিক–বৈপ্লবিক প্রতিবেশ থেকে বিপ্লবীদের সংগঠিত নিউক্লিয়াসের কঠোর পৃথকীকরণ।

    এ ধরনের কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক শ্রেণির গণআন্দোলনের ওপর ব্লাঙ্কুইজমের সাংগঠনিক নীতিমালার একটি যান্ত্রিক প্রয়োগ।

    এই মতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেনিন তার ‘বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট’কে সজ্ঞায়ন করেছেন ‘শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের যুক্ত একজন জেকোবিন’ হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি প্রলেতারিয়েতের সংগঠনে সাথে যুক্ত নয়। এটা নিজেই প্রলেতারিয়েত; এটা শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের আন্দোলন। এই কারণেই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাবাদ মূলত ব্লাংকুইস্ট কেন্দ্রিকতাবাদ থেকে আলাদা। এটা কেবল মাত্র শ্রমিক শ্রেণির ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রতিনিধিদের পুঞ্জীভূত বা সম্মিলিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। বলা যেতে পারে, এটা প্রলেতারিয়েতের অগ্রসর অংশের [বা নেতৃত্বস্থানীয় স্তরের] ‘স্ব–কেন্দ্রিকতাবাদ’। এটা হলো নিজ পার্টির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাকে বাস্তবে পরিণত করার অপরিহার্য শর্তগুলো হচ্ছে:

    ১) শ্রেণি সংগ্রামে শিক্ষিত এক বিরাট বা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের শ্রমিকের উপস্থিতি

    ২) জনজীবন, পার্টি প্রেস, জনসমাবেশ ইত্যাদিতে প্রত্যক্ষ প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা বিকাশে শ্রমিকদের সম্ভাবনা।

    এই শর্তগুলো রাশিয়াতে এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। প্রথমটি, অর্থাৎ শ্রেণিস্বার্থ সচেতন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনায় সক্ষম একটি প্রলেতারিয়েত ভ্যানগার্ড, এখনো রাশিয়াতে কেবলমাত্র হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের সকল প্রচেষ্ঠা এমন ভ্যানগার্ড গঠনকে ত্বরান্বিত করা উচিৎ। দ্বিতীয় শর্তটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিস্থিতিতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    এই সিদ্ধান্তগুলোর সাথে লেনিন চরমভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিশ্চিত যে, একটি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রিভূত পার্টি গঠনের সকল প্রয়োজনীয় শর্তাবলী ইতোমধ্যে রাশিয়াতে বিদ্যমান। তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘প্রলেতারিয়েতদের নয়, বরঞ্চ সংগঠন ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আমাদের পার্টির কিছু বুদ্ধিজীবীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে’। তিনি কারখানার শিক্ষামূলক প্রভাবকে মহিমান্বিত করেন, যা তার ভাষায়, প্রলেতারিয়েতদেরকে ‘শৃঙ্খলা ও সংগঠনে’ অভ্যস্ত করে তুলবে। এতকিছু বলার পর লেনিন আবারও প্রমাণ করেন যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠন সম্পর্কে তার ধারণা যথেষ্ট যান্ত্রিক। লেনিনের চিন্তায় যে ‘শৃঙ্খলা’ [ডিসিপ্লিন] রয়েছে তা কেবল কারখানার মাধ্যমেই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে রোপণ করেন না, বরঞ্চ সামরিক ও বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বা [আধুনিক] আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেও সেটা করেন। অর্থাৎ, কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সকল কলকব্জা [মেকানিজম] দিয়ে এটা করা হয়।

    আমরা শব্দের অপব্যবহার করি এবং আত্ম–প্রবঞ্চনা চর্চা করি যখন একই শব্দ—যেমন শৃঙ্খলা [ডিসিপ্লিন]—নিম্নোক্ত বিপরীতমুখী ধারণাতে প্রয়োগ করি: ১) সয়ংক্রিয়ভাবে চলমান হাজারো হাত পা যুক্ত শরীরে চিন্তা ও ইচ্ছার অনুপস্থিতি, এবং ২) একদল মানুষের সচেতন রাজনৈতিক তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়। একটি নিপীড়িত শ্রেণির অন্ধ আনুগত্য এবং নিজের মুক্তির জন্য সংগ্রামরত একটি শ্রেণির সংগঠিত বিদ্রোহের মধ্যে কোন সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়?

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলা মানে বুর্জোয়া শাসকদের কর্তৃত্বকে একটি সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব দ্বারা নিছক প্রতিস্থাপন করা নয়। শ্রমিক শ্রেণি নতুন শৃঙ্খলার ধারণা অর্জন করবে, মুক্তভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলাকে গ্রহণ করবে; পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত শৃঙ্খলার ফসল হিসেবে নয়, বরঞ্চ আনুগত্য ও দাসত্বের পুরোনো অভ্যাসের শেষ শেকড় পর্যন্ত উৎপাটন করার মাধ্যমে এটা করবে।

    সমাজতান্ত্রিক [সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক–রিডার] ধারণায় কেন্দ্রিকতাবাদ শ্রমিক আন্দোলনের যে কোনো পর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য এমন কোনো চূড়ান্ত বিষয় নয়। বরঞ্চ এটা একটা প্রবণতা, যা শ্রমজীবীদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অর্জিত বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষার আলোকে মূর্ত হয়ে ওঠে। সন্দেহ নেই, রুশ আন্দোলনে এই ধরনের কেন্দ্রিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মূর্ত করে তুলতে প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর অনুপস্থিতিই একটি দুরূহ বাধা হাজির করেছে।

    এটা ভাবা ভুল হবে যে, যেখানে এখনো পার্টিতে সচেতন শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে সে শাসনকে একটা কেন্দ্রীয় কমিটির চূড়ান্ত ক্ষমতা দিয়ে ‘সাময়িকভাবে’ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে এবং এভাবেই পার্টি বা সংগঠনের ওপর শ্রমজীবী জনগণের উন্মুক্ত নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে বৈপ্লবিক প্রলেতারিয়েতের ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

    রুশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এমন ধরনের কেন্দ্রিকতার মূল্য সম্পর্কে বিবিধ সন্দেহের জন্ম দেয়। নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের সীমাহীন অধিকারসহ সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্র (অল–পাওয়ারফুল সেন্টার), যেমনটা লেনিন হয়তোবা চাইবেন, তা অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে যদি এই কর্তৃত্ব কেবল প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়, যেমন তহবিল পরিচালনা, প্রচারকারী [প্রপাগান্ডিস্ট] ও বিক্ষোভকারীদের কাজের দায়িত্ব বণ্টন, পার্টি পুস্তিকা বহন ও প্রচার। কেবলমাত্র যদি এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সংগ্রামের কৌশল অবলম্বন এবং রাশিয়াতে একটি বিরাট বৈপ্লবিক পদক্ষেপ শুরু করা হয় তবেই এর একটি বোধগম্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

    কিন্তু এখন পর্যন্ত রুশ আন্দোলন যে পরিবর্তনগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছে তার অভিজ্ঞতা কী? গত দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসূ পরিবর্তনগুলো আন্দোলনকারী কোনো নেতার ‘আবিষ্কার’ নয়, এমনকি নেতৃত্বস্থানীয় সংগঠনগুলোরও ফসল নয়, বরঞ্চ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা ছিল আন্দোলনের সক্রিয়তার স্বতঃস্ফূর্ত ফসল। এটা সত্য ছিল রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের জন্য; এটা শুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি ছিল রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রামের নবযুগের সূচনা। পরবর্তী সময়েও এটা কম সত্য ছিল না, ১৯০১ সালের মার্চে সেন্ট পিটার্সবার্গের শিক্ষার্থীরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তার আন্দোলনে নেমে আসে। ১৯০৩ সালের রোস্তভ অন ডনের সাধারণ ধর্মঘট ছিল রুশ প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের পরবর্তী বিশাল কৌশলগত মোড়, এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা। ‘অল বাই ইটসেলফ’, মানে নিজে নিজেই ধর্মঘট পরিণত হয় রাজনৈতিক সমাবেশে, রাস্তার বিক্ষোভে, বিশাল বিশাল সভা, যা কিনা কয়েকবছর পূর্বেই সবচেয়ে আশাবাদী বিপ্লবীও কল্পনা করতে পারেননি।

    প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘পহেলা ছিল কর্ম’; অর্থাৎ এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের কাজের যৌক্তিকতা আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ ও সচেতন নেতৃত্ব এই বিকাশে খুবই নগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এটা সত্য যে এই সংগঠনগুলোকে এমন ঘটনা প্রবাহের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না। তবু বিপ্লবীদের এই অগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে এই ফ্যাক্ট দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। লেনিন যে সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্রীয় পার্টির হাতিয়ারের কথা বলেছিলেন তার অনুপস্থিতি দিয়েও এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। এমন একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অস্তিত্ব সম্ভবত স্থানীয় কমিটিগুলোতে বিশৃঙ্খলা বা সিদ্ধান্তহীনতা বৃদ্ধি করতো; উত্তেজিত জনগণ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বিচক্ষণ অবস্থানের মধ্যে ফাটল ধরানোর মাধ্যমে এটা করা হতো। একই প্রপঞ্চ, মানে কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সচেতন উদ্যোগের গৌণ ভূমিকা, বর্তমানে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। সাধারণত, সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কৌশলগত নীতি এমন কিছু নয় যা আসলে ‘উদ্ভাবিত’ [ইনভেন্টেড] হতে পারে। বরঞ্চ বিভিন্ন পরীক্ষামূলক, এবং প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত, শ্রেণি সংগ্রামের দুর্দান্ত সব সৃজনশীল কর্মতৎপরতার ধাবাহিকতার ফসল।

    এখানেও চেতনের পূর্বে আসে অচেতন। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী মানবজাতির [বা, প্রক্রিয়ার এজেন্টদের] বিষয়ীগত যুক্তির পূর্বে আসে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার [অবজেক্টিভ বা বিষয়গত] যুক্তি। এইসমস্ত ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের ভূমিকা রক্ষণশীল চরিত্রের হয়ে থাকে, কারণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, যখন তারা লড়াইয়ের জন্য নতুন জমিন জিতে নেয় তখন তারা এটার ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা–নিরীক্ষা শুরু করে, এবং আরও বেশি মাত্রার অধিকতর উদ্ভাবনের বিপরীতে এটাকে শীঘ্রই কেল্লা বা দুর্গে পরিণত করে।

    জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বর্তমান কৌশল তাদের অসাধারণ বৈচিত্র্য, নমনীয়তা [ফ্লেক্সিবিলিটি], এবং একইসাথে দৃঢ়তার কারণে সবার কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার [রেজিম] আওতায় প্রতিদিনের ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিয়ে পার্টির খাপ খাওয়ানোর [এডাপটেশন] একটি চমৎকার আলামত। পার্টি তার আয়ত্বে থাকা সকল জিনিসপত্রের একটি পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করেছে; সে জানে তার নীতিগুলো পরিবর্তন না করেও কীভাবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হয়।

    তদপুরি, এই বিশেষ কৌশল, মানে এই এই নিখুঁত অভিযোজন, আমাদের পার্টির বিস্তীর্ণ দিগন্তকে এতই কার্যকরভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে যে, পার্লামেন্টারি কৌশলকে চিরস্থায়ী করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এটাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি জার্মানিতে সাধারণ ভোটাধিকার বিলুপ্ত হয় তখন কৌশলগত নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা (পারভাস৭ দ্বারা উত্থাপিত) বিবেচনা করতে লোকেরা অস্বীকার করেছিল; যদিও এমন একটি সম্ভাব্য ঘটনাকে [মানে ভোটাধিকারের বিলুপ্তি] জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসি একেবারে অবাস্তব মনে করেনি।

    মোটাদাগে এই ধরনের জড়তার কারণ হচ্ছে যে, বিমূর্ত হাইপোথিসিস সমূহের শূন্যতার মধ্যে, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির লাইন ও রূপগুলোকে সংজ্ঞায়ন করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ। স্পষ্টত ভবিষ্যত কৌশলের জন্য রেডি–মেড পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং আন্দাজ করাটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে: ১) প্রদত্ত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সংগ্রামের রুপগুলোর সঠিক ঐতিহাসিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা, এবং ২) বর্তমান পর্যায়ের আপেক্ষিকতা এবং শ্রেণি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্যের অবস্থান থেকে বৈপ্লবিক উত্তেজনার অনিবার্য বৃদ্ধি সম্পর্কে বোঝাপড়া অব্যাহত রাখা।

    লেনিনের চাওয়া মতে পার্টির শীর্ষে নেতিবাচক চরিত্রের এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হলে আমরা এমন অঙ্গের অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতাকে একটা বিপজ্জনক পরিমাণে শক্তিশালী করে তুলবো। সমাজতান্ত্রিক পার্টির কৌশল যদি একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন না হয়ে উল্টো পুরো পার্টি গঠন বা আরও ভালো হবে যদি পুরো শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে পার্টির বিভিন্ন অংশ [সেকশন] ও ফেডারেশনের কর্মের স্বাধীনতার জরুরত রয়েছে। এই স্বাধীনতা তাদেরকে বৈপ্লবিক উদ্যোগ গড়ে তোলার এবং পরিস্থিতি সকল উপাদানকে ব্যবহার করার অনুমতি দিবে। লেনিন কর্তৃক প্রস্তাবিত অতি–কেন্দ্রিকতা একজন প্রহরীর নিষ্ফলা চেতনায় ভরপুর। এটা কোনো ইতিবাচক এবং সৃজনশীল চেতনা নয়। পার্টির কর্মকাণ্ডকে আরও ফলপ্রসূ করার চাইতে লেনিনের তাগিদ হচ্ছে পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা—আন্দোলনকে বিকশিত করার পরিবর্তে আরও সঙ্কুচিত করা ফেলা, সমন্বয় করার পরিবর্তে বেঁধে ফেলা।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বিগুণ বিপজ্জনক হবে। জারের শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রান্তে এটি দাঁড়িয়ে আছে। এখন এটি তীব্র সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কালে প্রবেশের সময় এসেছে, অথবা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেই ফেলেছে; যখন কিনা এটি তার প্রভাবের পরিধিকে বিস্তৃত করে তুলবে [বৈপ্লবিক সময়ে যেমন সাধারণত হয়ে থাকে] এবং জোরেশোরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে পার্টির উদ্যোগকে বেঁধে রাখার চেষ্টা, কাঁটাতার দিয়ে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখার মানেই হচ্ছে এই মুহূর্তের যে অভাবনীয় দায়িত্ব বর্তেছে সেটা পালনে অক্ষম হয়ে পড়া।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আমরা যে সাধারণ ধারণা হাজির করেছি সেগুলো রুশ পার্টির জন্য মানানসই গঠনতান্ত্রিক [কনস্টিটিউশনাল] পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। চূড়ান্ত মুহূর্তে, এই ধরণের বিধিবিধান নির্ধারণ করা যেতে পারে কেবল সেই বাস্তবতায়, যার অধীনে একটি প্রদত্ত যুগে সংগঠনের কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। রাশিয়ায় এই মুহূর্তের প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে একটি বৃহৎ প্রলেতারিয়েত সংগঠন চালু করা যায়। কোনো গঠনতান্ত্রিক প্রকল্পই অভ্রান্ততা দাবি করতে পারে না। অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা থেকে আমরা মনে করি, এর স্পিরিটের জন্য প্রয়োজন, বিশেষ করে গণপার্টির শুরুতেই, আন্দোলনের সমন্বয় ও একত্রীকরণ; একগুচ্ছ নিয়মকানুনের কাছে অন্ধ আনুগত্য নয়। যদি পার্টি রাজনৈতিক গতিশীলতার গুণ ধারণ করতে পারে, পাশাপাশি নীতির প্রতি অটল থাকে এবং ঐক্য নিয়ে ভাবনা থাকে তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, পার্টির গঠনতন্ত্রে যে কোনো ধরনের ত্রুটি চর্চার মাধ্যমে সংশোধিত হয়ে যাবে। আমাদের জন্য এক টুকরো দলিল নয়, বরঞ্চ সদস্যরা সংগঠনের ভেতর যে জীবন্ত চেতনা নিয়ে আসেন সেটাই সাংগঠনিক বিভিন্ন রূপের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    এতক্ষণ আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাধারণ দৃষ্টিকোণ এবং কিছুটা হলেও রাশিয়ার অভিনব পরিস্থিতির আলোকে কেন্দ্রিকতাবাদের সমস্যাকে পর্যালোচনা করলাম। তদপুরি, লেনিন ও তার কমরেডদের বহুল প্রচারিত সামরিক অতি–কেন্দ্রিকতাবাদ মতের আকস্মিক ভিন্নতার ফসল নয়। বলা হয় যে এটা সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযানের সাথে জড়িত যা লেনিন ক্ষুদ্রতর সাংগঠনিক বিবরণের মধ্যে ধারণ করেছেন।

    লেনিন বলছেন যে, ‘সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি কার্যকরী অস্ত্র দাগা জরুরি’। তিনি বিশ্বাস করেন যে, সুবিধাবাদ বিশেষত বিকেন্দ্রীকরণ ও বিশৃঙ্খলার প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ঝোঁক থেকে আসে, কঠোর শৃঙ্খলা ও ‘আমলাতন্ত্র’ এর প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা থেকে আসে; যদিওবা এগুলো পার্টির কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন।

    লেনিন বলছেন যে, বুদ্ধিজীবীরা সোশ্যালিস্ট/সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ার পরও ব্যক্তিবাদী রয়ে যান এবং নৈরাজ্যবাদের প্রতি ঝুঁকে থাকেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল বিরোধিতা কেবল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই দেখা যায়। তিনি বলেন, খাঁটি প্রলেতারিয়েত তার শ্রেণি–প্রবৃত্তির কারণে দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর/নির্দয় শৃঙ্খলার খপ্পরে নিজেকে সঁপে দিয়ে একধরনের ইন্দ্রিয়পরায়ণ সুখানুভূতি খুঁজে পায়। তিনি লেখেন, ‘আমলাতন্ত্রবাদ বনাম গণততন্ত্রবাদ হচ্ছে বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক নীতি বনাম সুবিধাবাদীর সাংগঠনিক নীতি’। তিনি ঘোষণা করেন যে, যেসব দেশে সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্র মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয়বাদী ও স্বায়ত্তশাসনবাদী প্রবণতার মধ্যে একধরনের সংঘাত বিরাজ করছে। আইনভায় সমাজতান্ত্রিক প্রতিনিধির কতটুকু স্বাধীনতা পার্টি অনুমোদন করবে—এই প্রশ্নে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে যে সাম্প্রতিক বিতর্ক চালু আছে সে দিকে লেনিন বিশেষভাবে ইঙ্গিত দেন।৮

    লেনিন উত্থাপিত সাদৃশ্যগুলোকে পরীক্ষা করা যাক।

    প্রথমত, এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের ব্যাপারে প্রলেতারিয়েতের অনুমিত প্রতিভার গুণকীর্তন এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সাধারণ অবিশ্বাস এগুলো ‘বিপ্লবী মার্ক্সবাদী’ মানসিকতার আবশ্যক লক্ষণ নয়। এটা খুব সহজেই দেখানো সম্ভব যে, এই ধরনের যুক্তি নিজেই আসলে সুবিধাবাদের বহিঃপ্রকাশ।

    শ্রমিক আন্দোলনে খাঁটি প্রলেতারিয়েত উপাদান ও অ–প্রলেতারিয়েত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যকার বিরোধকে মতাদর্শিক বিষয় হিসাবে উত্থাপিত করা হয় নিম্নোক্ত উপায়ে: ফরাসি সিন্ডিকালিস্টদের আধা–নৈরাজ্যবাদ, যার জিগির হচ্ছে, ‘রাজনীতিবিদ থেকে সাবধান!’; ইংরেজ ট্রেডইউনিয়বাদী, ‘সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্ট্রা’দের ব্যাপারে অবিশ্বাসী; এবং আমাদের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এরপরেই রয়েছে ‘খাঁটি অর্থনীতিবাদী’, রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে রাবচায়া মিসলে৯ কিছুদিন আগে এর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, সেন্ট পিটাসবার্গ–এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির মধ্যে সুবিধাবাদ ও ‘বুদ্ধিজীবী’দের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি যোগসূত্র রয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ ও বিকেন্দ্রীকরণ প্রবণতার মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক জমিন থেকে সামাজিক প্রপঞ্চগুলোকে আলাদা করা এবং প্রপঞ্চগুলোকে বিমূর্ত নীতি হিসাবে উপস্থাপন (যেন এগুলোর একটি চূড়ান্ত ও সর্বজনীন প্রয়োগ রয়েছে) করার চাইতে মার্ক্সবাদী চিন্তার ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিপরীত আর কিছুই হতে পারে না।

    ধরে নেয়া যাক, যে কেউ বলতে পারেন, বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে উঠে আসা একটি সামাজিক উপাদান হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ আদতে প্রলেতারিয়েত থেকে দূরবর্তী থাকেন; তিনি তাঁর শ্রেণি–পরিচয়ের বোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাজতন্ত্রে যোগ দেন না, বরঞ্চ মতাদর্শিক পথকে গ্রহণের মাধ্যমে সেই বোধকে মাড়িয়ে তিনি যোগ দেন। এই কারণে তার শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতের তুলনায় বেশি সুবিধাবাদী বিভ্রান্তে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। যেহেতু শ্রেণি–সচেতন প্রলেতারিয়েতের নিজস্ব সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জনতার সাথে যোগসূত্র হারিয়ে যায়নি, সেহেতু তার তাৎক্ষণিক শ্রেণি–প্রবৃত্তি তাকে বিপ্লবী মেরুদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু সুবিধাবাদের দিকে বুদ্ধিজীবীর ঝুঁকে থাকার এই পূর্বানুমানের দৃঢ় রূপ এবং সর্বোপরি সাংগঠনিক প্রশ্নে এই প্রবণতা যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করে তা সবসময়ই প্রদত্ত সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

    জার্মান, ফরাসি ও ইতালির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে লেনিন যে প্রপঞ্চ চিহ্নিত করেছেন সেখানে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজম বা সংসদীয় রীতি হচ্ছে সেই প্রপঞ্চের নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি। পশ্চিমা সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে বিদ্যমান সকল সুবিধাবাদী প্রবণতার উর্বর জমিন হচ্ছে এই পার্লামেন্টারিজম।

    ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিতে আমরা বর্তমান সুবিধাবাদের যেসকল বিভ্রান্তির বিষয় দেখতে পাচ্ছি, যেমন: সামাজিক সংস্কার, শ্রেণি ও পার্টির সহযোগিতা, সমাজতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ বিকাশের আশা ইত্যাদির অতি–মূল্যায়ন, পার্লামেন্টারিজম কেবল এগুলোকে সমর্থনই যোগাচ্ছে না, বরঞ্চ এটা সেই জমিন তৈরি করে দিচ্ছে যেখানে এই বিভ্রান্তিগুলোকে অনুশীলন করা যায়। কারণ, এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ভেতরেই, পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে বুদ্ধিজীবীদেরকে এটি প্রলেতারিয়েত থেকে আলাদা করে ফেলে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতদের ওপরে স্থান দিয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্লামেন্টারিজম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারবাদীদের উর্বর জমিন। এই কারণেই বুর্জোয়াদের এত বেশি উচ্চাভিলাষী ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক পার্টির ব্যানারে ভিড় জমিয়েছে।

    এইসকল কারণ পশ্চিম ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অরাজকতা ও শৃঙ্খলতার অভাবের দিকে একটি নির্দিষ্ট ঝোঁকের উত্থান ঘটিয়েছে। বর্তমান সুবিধাবাদী ঢেউয়ের দ্বিতীয় নির্দিষ্ট শর্ত হচ্ছে উচ্চ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এর ফলে একটি প্রভাবশালী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংগঠনের উপস্থিতি। বুর্জোয়া–পার্লামেন্টারি প্রবণতার বিরুদ্ধে এই পার্টি বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামের দুর্গ হিসাবে কাজ করবে। যদি প্রলেতারিয়েতদের সুদৃঢ় ও সক্রিয় প্রাণভোমরাকে ভেঙে একটি নিরাকার গণ ‘ভোটারে’ পরিণত করতে হয় তাহলে এই দুর্গকে ভেঙে ফেলতে হবে এবং অকার্যকর করে তুলতে হবে। এভাবেই আধুনিক সুবিধাবাদের ‘স্বায়ত্তশানবাদী’ ও বিকেন্দ্রীয়করণের প্রবণতাগুলোর জন্ম হয়। তারা ঐতিহাসিকভাবে সু–প্রতিষ্ঠিত এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এগুলোকে ‘বুদ্ধিজীবী’র অন্তর্নিহিত অস্থিরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যেমন করে লেনিন বলছেন; বরঞ্চ এগুলোকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বুদ্ধিজীবীদের ‘মনস্তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরঞ্চ সুবিধাবাদী ‘রাজনীতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

    তদপুরি জারের রাশিয়ার পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। সাধারণত রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ কোনোভাবেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির শক্তিশালী বিকাশ অথবা বুর্জোয়া সমাজের বিভাজনের ফসল নয়, বরঞ্চ এটি রুশ সমাজের পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল।

    এটা বোধগম্য যে, রাশিয়ার যে বিদ্বৎসমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা উঠে এসেছেন সেই সমাজের এখনো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিচরিত্র গড়ে ওঠেনি, এবং পশ্চিম ইউরোপের বিদ্বৎসমাজের চাইতে কিছুদূর অব্দি এখনো শ্রেণিচ্যুত বলা যায়; অর্থাৎ, তারা সে তুলনায় এখনো কম বুর্জোয়া। এটি রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের অপরিপক্বতার সাথে যুক্ত হয়ে তত্ত্বীয় অস্থিরতা ও সুবিধাবাদী দোদুল্যমানতার বিস্তর সুযোগ তৈরি করে দেয়; যা কখনো শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়, কখনো এর একদম বিপরীতে গিয়ে সন্ত্রাসকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসাবে বিশ্বাস করে, এবং পরিশেষে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে লিবারেলিজমের পঙ্কিলতায় অথবা দার্শনিক পরিমণ্ডলে কান্টের আদর্শবাদীতার খপ্পরে পড়ে।১০

    আমাদের মতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠনহীনতার দিকে একটি নির্দিষ্ট সক্রিয় প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্য বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজমের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কেবল অভাবই নয়, বরঞ্চ এটা সংশ্লিষ্ট সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে জড়িত। আধুনিক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের যারা এই সময়ে ‘ইগোর কাল্টে’ নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং এমনকি ‘প্রভু জাতের নৈতিকতা’কে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও সংগ্রামের জগতে টেনে নিয়ে আসছেন, তারা সাধারণত বুর্জোয়া বিদ্বৎসমাজের আদর্শ প্রতিনিধি নন, বরঞ্চ তারা তাদের সামাজিক বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্য ভাবে বলা যায়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু ও বিকৃত বুর্জোয়া সমাজের ফসল, যা কিনা ইতোমধ্যে তার নিজের শ্রেণি আধিপত্যের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে এবং সঙ্গত কারণেই, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির ইউটোপিয়ান ও সুবিধাবাদী কল্পনাগুলো বরঞ্চ আত্ম–অস্বীকৃতি ও আত্ম–অননুমোদনের বিপ্রতীপ তাত্ত্বিক রূপের গ্রহণ করার দিকে ঝোঁকে। নিশ্চিতভাবে পুরনো নারদনিকদের ‘জনতার কাছে যাওয়া’১১ নামক আন্দোলন, মানে বুদ্ধিজীবীকে বাধ্যতামূলকভাবে কৃষকের ছদ্মবেশ ধারণ ছিল একটি হতাশাজনক আবিষ্কার। একইভাবে সাম্প্রতিক খাঁটি ‘অর্থনীতিবাদে’র শীষ্যরা শ্রমিকের ‘মসৃণ হাত’–এর সামনে আমাদেরকে মাথা নত করাতে চায়।

    আমরা যদি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রশ্নটিকে সরাসির ইউরোপ থেকে রাশিয়াতে আমদানি না করে খোদ রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করতে চাই তাহলে আমরা একদম ভিন্ন ফলাফল পাবো। সংগঠনের কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো, যেমন বিকেন্দ্রীকরণ, এর প্রতি প্রবল উৎসাহের জন্য সুবিধাবাদকে দায়ী করার (যেমনটি লেনিন করেছেন) মানে হলো সুবিধাবাধের অন্তর্নিহিত নির্যাসকে ভুল বোঝা। সাংগঠনিক প্রশ্নে সুবিধাবাদের কেবল একটাই নীতি থাকে: নীতির অনুপস্থিতি। এটা সবসময়ই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে পদ্ধতি নির্বাচন করে, যতক্ষণ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু যদি লেনিনের মতো করে আমরা সুবিধাবাদকে একটি প্রবণতা বা আকাঙ্ক্ষা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করি যা কিনা প্রলেতারিয়েতদের স্বাধীন বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামকে অসাড় করে ফেলে এবং এটাকে উচ্চাভিলাষী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের একটি হাতিয়ারে পরিণত করে, তাহলে আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে, শ্রমিক আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফলাফল বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নয়, বরঞ্চ দৃঢ় কেন্দ্রিকতাবাদের মাধ্যমেই কায়েম হয়ে যায়। কঠোর কেন্দ্রিকরণের মাধ্যমেই একটি নব–বিকশিত ও অপরিষ্ফুটিত প্রলেতারিয়েত আন্দোলন একটি কেন্দ্রীয় কমিটির বুদ্ধিজীবী নেতাদের হাতের মুঠোয় চলে যায়।

    জার্মানিতেও আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, সচেতন প্রলেতারিয়েতদের একটি শক্তিশালী নিউক্লিয়াস এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশল হাজির হওয়ার পূর্বেই বিপরীতমুখী দুই সাংগঠনিক প্রবণতাই বিবাদে মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে রয়েছে লাসালের জেনারেল জার্মান ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কর্তৃক প্রচারিত উগ্র কেন্দ্রিকতাবাদ, এবং অন্যদিকে রয়েছে আইজেনাখার কর্তৃক প্রচারিত ‘স্বায়ত্বশাসনবাদ’। আইজেনাুখারদের কৌশলগত নীতি কিছুটা দিশেহারা হওয়া সত্ত্বেও এটি জার্মানের জনগণের মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা বৃদ্ধিতে লাসালিয়ানদের তুলনায় বেশি অবদান রেখেছিল। অতি শীঘ্রই শ্রমিকরা এই পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা শুরু করেছিল এবং আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটেছিল। একইসময়ে লাসালিয়ানরা তাদের ‘স্বৈরশাসক’দের নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা উল্টো বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করেছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডিজএপেয়ার্ড
    শিল্পী: স্যাগাল
    সূত্র: ফ্রিপিক্স

    সাধারণভাবে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী উপাদান এখনো অসংগঠিত এবং খোদ আন্দোলনই দোদুল্যমান, (সংক্ষেপে, এই পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার মিল রয়েছে) এমন পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা একটি কঠোর স্বৈরাচারী কেন্দ্রিকতাবাদী সাংগঠনিক প্রবণতাকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, একটি সংসদীয় শাসনামলে এবং একটি শক্তিশালী শ্রমিক দলের মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদী প্রবণতা তখন ‘বিকেন্দ্রীকরণে’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।

    শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে বিদ্বৎসমাজের বিপজ্জনক প্রভাব সম্পর্কে লেনিনের যে ভয় সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, সংগঠন প্রশ্নে তার নিজের ধারণা রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হাজির করছে। প্রকৃতপক্ষে, বিকাশমান প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে একটি আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের পকেটে ঢুকাতে পারলে এই আন্দোলন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী একদল বুদ্ধিজীবীদের কব্জায় খুব সহজে, এবং নিশ্চিতভাবেই চলে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সংগ্রামী শ্রমিকদের একটি ‘কমিটি’র অনুগত হাতিয়ারে পরিণত করে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অর্জন করেন, তা তাদেরকে উচ্চাভিলাষী বিদ্বৎসমাজ পরিচালিত কমিটির সুবিধাবাদী ব্যবহার থেকে রক্ষা করবে।

    লেনিন আজ যাকে অলীক ছায়া বা ভূত হিসাবে দেখছেন কাল তা সহজেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে রাশিয়ার আশু বিপ্লব একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হতে যাচ্ছে, কোনো সর্বহারা বিপ্লব নয়। এটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের সকল পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন রুশ বুদ্ধিজীবীরা দ্রুতই বুর্জোয়া মতাদর্শে ডুব দিবে। যদি বর্তমানে রুশ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্রেসিই প্রধান ধারা হয়ে থাকে, তাহলে বুর্জোয়া বিপ্লবের পরপরই, সর্বোপরি এর বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে সংসদীয় হেজেমনির জন্য স্তম্ভমূল বানাতে চাইবে। স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড, স্বাধীন উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাধারী অংশ যত কম হবে, তত বেশি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক জবরদস্তির শিকার হবে, নতুন রাশিয়ার বুর্জোয়া বক্তৃতাবাজ নেতাদের খেলা তত সহজ হবে, এবং আজকের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক শ্রমিকদের ফসল তত বেশি বুর্জোয়াদের মাচায় উঠবে।

    সর্বোপরি, অতি–কেন্দ্রিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মূল অভিমুখ, অর্থাৎ সাংগঠনিক অবস্থা বা পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা–উপধারা দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদের হাত থেকে রক্ষা করার ধারণাটি, আসলে মিথ্যা। ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মাঝেও সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এলিয়েন বা বিজাতীয় উপাদান হিসাবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেন এটা কেবল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উপাদানের সাথে বাইরে থেকে এসেছে। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ধারা–উপাধারা এই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না। অর্থাৎ, সুবিধাবাদী উপাদানের চাপে এটা অকার্যকর হিসাবে প্রমাণিত হবে। প্রলেতারিয়েত সংগঠনে বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে নন–প্রলেতারিয়েত উপাদানের এই অন্তঃপ্রবাহ আসলে বিভিন ধরনের সামাজিক কারণের ফলাফল, যেমন পাতি–বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক পতন, বুর্জোয়া উদারবাদের দেউলিয়াপনা এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অবক্ষয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে লিখিত ফর্মুলা দিয়ে এই প্রবাহকে আটকানোর আশা করা বোকামিই। কয়েকটি অনুচ্ছেদ, বা বিধিবিধানের ম্যানুয়াল কেবল একটি ছোট উপদল বা গোপন (প্রাইভেট) চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ইতিহাসের প্রবাহ সবসময় এই অনুচ্ছেদকে মাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, বুর্জোয়া সমাজের ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া উপাদানগুলোকে ঠেকানোর মানে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করা—এও সত্য নয়। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি সর্বদাই দাবি করে এসেছে যে, এটি কেবল প্রলেতারিয়েতদের শ্রেণি স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে না, বরঞ্চ সমগ্র সমসাময়িক সমাজের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। বুর্জোয়া আধিপত্যের জুলুমের শিকার সবার স্বার্থকে এটা তুলে ধরে। এটাকে নিছক এই অর্থে বোঝা যাবে না যে, এইসমস্ত স্বার্থ আদর্শস্বরূপ সোশ্যালিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়াতেই এই ধারণাটি বাস্তবে হাজির হবে, যেখানে কিনা রাজনৈতিক পার্টি হিসাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের সকল অসন্তুষ্ট উপাদানগুলোর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। যার ফলে এটি গুটিকয়েক আধিপত্যকামী বুর্জোয়াদের পার্টি হওয়ার বিপরীতে জনতার পার্টি হয়ে উঠবে। এ জন্য জানতে হবে কীভাবে এই বিচিত্র সমষ্টির যন্ত্রণা, ক্রোধ ও আশাকে শ্রমিক শ্রেণির চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা যাবে। বিদ্যমান সমাজের বিরুদ্ধে অ–প্রলেতারিয়েতের বিক্ষোভকে প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সাথে একত্রে আবদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ, আগত উপাদানগুলোকে একীভূত করতে হবে। এটা কেবল তখনই সম্ভব যদি সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েত নিউক্লিয়াসের উপস্থিতি থাকে (যেমন এখন পর্যন্ত জার্মানি) যারা কিনা শ্রেণিচ্যুত ও পাতি–বুর্জোয়া উপাদানগুলোকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণের নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং দলীয় বিধি অনুসারে গঠিত কঠিন শৃঙ্খলা সুবিধাবাদের বিপদের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর সুরক্ষা হতে পারে। এভাবেই ফ্রান্সের বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন জ্যোরাসি১২ বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করেছিল। সেদিকে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির গঠনতন্ত্রের সংশোধন একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হবে। কিন্তু এমনকি এক্ষেত্রে কেবল দলীয় গঠনতন্ত্র বা বিধিকে সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার ভাবা উচিৎ নয়, বরঞ্চ এটাকে পার্টির মধ্যে বিদ্যমান বৈপ্লবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রলেতারিয়েত কর্তৃত্বমূলক প্রভাব প্রয়োগের একটি বাহ্যিক বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তিমূলক হাতিয়ার হিসাবে দেখা উচিৎ। যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব থাকে তাহলে সবচেয়ে ভয়ানক কাগুজে অনুমোদনও বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

    তদপুরি আমরা উল্লেখ করেছি যে, কেবল বুর্জোয়া উপাদানের অনুপ্রবেশই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবাহের একমাত্র উৎস নয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে খোদ সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের চরিত্র ও এর মধ্যে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য। সর্বমুক্তির দিকে প্রলেতারিয়েতদের আন্তর্জাতিক লড়াই বা বিজয়ের দিকে প্রলেতারিয়েতদের ঐতিহাসিক অগ্রগতি একটি অভূতপূর্ব প্রক্রিয়া। কারণ ইতিহাসের প্রথমবারের মতো জনগণ [পিপল] সচেতনভাবে নিজেদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, এবং সমস্ত শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু এই ইচ্ছা কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থা বা সমাজের উর্ধ্বে উঠে বা ছাড়িয়ে গিয়ে সিদ্ধ হতে পারে। তদপুরি অন্যদিকে, এই জনতা তাদের এই ইচ্ছাকে গঠিত বা বিকশিত করতে পারে কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে, অর্থাৎ কেবল বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই (অর্থাৎ, পুঁজিবাদী সমাজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে)। একদিকে রয়েছে জনতা [মাস] অন্যদিকে রয়েছে এর ঐতিহাসিক লক্ষ্য যা কিনা বিদ্যমান সমাজের বাইরে অবস্থিত। একদিকে রয়েছে দৈনন্দিন সংগ্রাম, অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বিপ্লব। এই দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের [সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক আন্দোলন] বিকাশ ঘটছে বা ঘটে। এই পথচলায় দুটো বিপদকে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করেই যেতে হয়, একদিকে রয়েছে গণচরিত্রের ক্ষতি, অন্যদিকে রয়েছে এর লক্ষ্যে পরিত্যাগ। একদিকে রয়েছে একটি উপদল বা সম্প্রদায়ের দশায় পুনঃপতিত হওয়ার বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে একটি বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হওয়ার বিপদ।

    এই কারণেই এটা চিন্তা করা অনৈতিহাসিক ভ্রান্তি যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক কৌশল পূর্ণরূপে সবার জন্য নির্ধারণ করা যাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তি থেকে একেবারেই মুক্ত করা সম্ভব। অবশ্যই, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব আমাদেরকে সুবিধাবাদী সাধারণ প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার সরবরাহ করে। কিন্তু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি গণ–আন্দোলন এবং এর বিপদগুলো ব্যক্তির মনন থেকে উদ্ভূত না হয়ে বরঞ্চ সামাজিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত হয়, ফলে আগ থেকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না। যখন এগুলো বাস্তবে মূর্ত আকার ধারণ কবে কেবল তখনই, খোদ আন্দোলনের মাধ্যমেই এটাকে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে; এবং অতি অবশ্যই মার্ক্সবাদ প্রদত্ত হাতিয়ার দিয়ে, মানে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সহায়তায়। এদিক থেকে দেখলে সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিকাশের অনিবার্য পর্যায় ও ফসল বলে মনে হবে। রাশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি এখনো অবিকশিত, এবং যেখানে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক, সেখানে সুবিধাবাদ মোটাদাগে এই উৎস থেকে উৎসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের কৌশলের ক্রমাগত পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান থেকে উৎসারিত হতে পারে, সমাজতান্ত্রিক মৌলিক নীতিগুলোর ব্যতিক্রমী ও অতুলনীয় পরিস্থিতিতে বর্তমান সংগ্রামকে নিয়ে আসার প্রয়োজন থেকে উৎসারিত হতে পারে।

    যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে কোনো একটা নির্দিষ্ট সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র দিয়ে রাশিয়ার আন্দোলনে সুবিধাবাদের উত্থান এড়ানোর ধারণাটা অদ্ভুত খেয়ালিপনায় পূর্ণ। এক টুকরা কাগজ দিয়ে সুবিধাবাদকে নিবৃত্ত করার প্রয়াস প্রচণ্ড ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে, সুবিধাবাদের জন্য নয় বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যই। কারণ একটি সুস্থ জীবনের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বন্ধ করার মাধ্যমে আপনি তার লড়াই করার স্পৃহাকেই দুর্বল ও দমন করে ফেলেন। যা কিনা কেবল সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরঞ্চ বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তার লড়াইর স্পৃহাকে দুর্বল করে দেয়। উপায় উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধেই চলে যায়।

    শিল্পী: পল স্নোডেন

    রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের একটা অংশের (বা লেনিনের) এই যে অতি–উদ্বিগ্নতা, অর্থাৎ একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন শ্রমিক আন্দোলনকে কোনো ধরনের ভুল–ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য একটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আমরা সেই একই সাবজেক্টিভিজমের আলামত দেখতে পাচ্ছি, যা কিনা রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার জগতে ইতোমধ্যে একের অধিক প্রতারণা করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক রাশিয়ার ইতিহাসে শ্রদ্ধেয় মানব ‘অহং’কে যে অদ্ভুত ডিগবাজিগুলো করতে হয়েছে তা আগ্রহোদ্দীপক। রুশ স্বৈরাচার কর্তৃক একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়ে এই ‘অহং’ নিজেকে, নিজস্ব চিন্তার পদ্ধতিতে, সিংহাসনে বসিয়ে এবং অস্তিত্বহীন ‘নারোদনায়া ভোলিয়া’র১৩ নামে ষড়যন্ত্রকারীদের একটি কমিটি হিসাবে নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসাবে ঘোষণা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ‘বিষয়’ [অবজেক্ট] শক্তিশালী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। এই কষাঘাত (knout/knot একেক স্থানে এককটা দেয়া আছে) বিজয়ী হয়েছিল, কারণ এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ‘বৈধ’ অভিব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করেছিল।

    সময়ে সময়ে আমরা দৃশ্যপটে ইতিহাসের আরও বেশি ‘বৈধসম্মত’ সন্তানকে দেখতে পেলাম, মানে রুশ শ্রমিক আন্দোলনকে। প্রথমবারের মতো একটি খাঁটি ‘পিপলস উইল’ বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ গঠনের ভিত্তি রাশিয়ার জমিনে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে আবারও রুশ বিপ্লবী ‘অহং’! মাথার উপর দাঁড়িয়ে এটা আরেকবার নিজেকে ইতিহাসের সর্বশক্তিমান পরিচালক হিসাবে ঘোষণা করছে; এইবার রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহামান্য কেন্দ্রীয় কমিটির নামে। এই তুখোড় কসরতবাজ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, আজ যে কর্তা বা সাবজেক্ট পরিচালকের ভূমিকা পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সমষ্টিগত ‘অহং’। শ্রমিক শ্রেণি তাদের ভূল করার এবং ইতিহাসের দ্বন্দ্ব শেখার অধিকার দাবি করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারি। ঐতিহাসিকভাবে, সবচেয়ে চতুর কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্রান্ততার চাইতে কোনো একটি সত্যিকারের বৈপ্লবিক আন্দোলনের ভুল বা ত্রুটিগুলো বহুগুণ উপকারী।

    টীকা:

    ১. জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৮৭৮ সালে জার্মানির রাইখস্ট্যাগে বিসমার্ক কর্তৃক উত্থাপিত সমাজতন্ত্র–বিরোধী আইনটি গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে এই আইন প্রত্যাহার করা হয়।

    ২. ইস্ক্রা হচ্ছে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি [RSDLP] কর্তৃক প্রকাশিত রুশ সংবাদপত্র। ভি আই লেনিনের তত্ত্বাবধানে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দমন পীড়নের জন্য এটি রাশিয়ার বাইরে প্রকাশ করতে হতো, এবং বিদেশে প্রকাশিত হয়ে গোপনে রাশিয়াতে প্রচার করা হতো। ১৯০৩ সালে RSDLP এর বিভাজনের পর পত্রিকাটি মেনশেভিকদের দখলে যায়।

    ৩. এখানে ১৯০৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত RSDLP এর দ্বিতীয় কংগ্রেসের কথা বলা হচ্ছে। এই কংগ্রেসেই মেনশেভিক ও বলশেভিকরা আলাদা হয়েছিল।

    ৪. লেনিনের এই গ্রন্থটি ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ৫. এখানে অস্ট্রীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রীয়–হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বহুজাতিক চরিত্রের প্রতিক্রিয়ায় তারা যেভাবে একটি ফেডারেল পার্টি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে কিনা তাদের বিভিন্ন জাতির স্বায়ত্তশাসনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

    ৬. লুই অগাস্ট ব্লাঙ্কুই (১৮০৫–১৮৮১) কর্তৃক প্রচারিত বিপ্লবের ধারণাকে ব্লাংকুইজম বলা যায়। এর মতে, তুলনামূলক একটি ছোট ও খুব সঙ্ঘবদ্ধ গ্রুপ এবং গোপন ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালিত হওয়া উচিত। ক্ষমতা দখলের পর বিপ্লবীরা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্র চালু করবে। এটা মনে করে যে, রাজনৈতিক বিপ্লব আসলে একধরনের ক্যু’র মাধ্যমেই হতে হবে।

    ৭. পারভাস আলেক্সান্ডার হেলফান্ড (১৮৬৭–১৯২৪) এর ছদ্মনাম ছিল। তিনি ছিলেন রুশ বিপ্লবী; ১৮৯১ এর SPD এর সাথে সক্রিয় ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আগ পর্যন্ত তিনি লুক্সেমবার্গের সাথে কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালের পর তিনি যখন জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেন তখন রোজা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

    ৮. এস্পিডি এর সংস্কারপন্থীরা এসপিডির অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতাবাদের বিরুদ্ধে স্থানিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে যুক্তি দিতেন, তাদের সংস্কারপন্থী নীতিকে তুলে ধরার একটা উপায় হিসাবে।

    ৯. রবচায়া মিসলে (শ্রমিকদের চিন্তাধার) অর্থনীতিবাদীদের সংবাদপত্র। ১৮৯৭ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ১৬টি সংখ্যা বের হয়েছিল, ৩ থেকে ১১ সংখ্যা এবং ১৬তম সংখ্যা বের হয়েছিল বার্লিন থেকে, অন্যান্য সংখ্যা বেরিয়েছিল সেন্ট পিটাসবার্গ থেকে। – তথ্যসূত্র: ভি আই লেনিন, কী করিতে হইবে, পৃষ্ঠা. ১৮৭ [ফুটনোট]

    ১০. ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক্যাল ফিলোসফির উল্লেখ; রোজা তাঁর লেখাপত্রে ধ্রুপদী দার্শনিকদের কথা যে অল্প কয়বার উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে এটা অন্যতম। এসপিডির কয়েকজন সংস্কারপন্থী নেতা কান্টবাদী ছিলেন। – সম্পাদক, রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার

    ১১. ‘জনতার কাছে যাওয়া’ ছিল ১৮৭০–১৮৮০ সালের দিককার রুশ পপুলিস্ট বিদ্বৎসমাজের একটি শ্লোগান।

    ১২. জ্যা জ্যোরাসি (১৮৫৪–১৯১৪) একজন সংস্কারপন্থী ফরাসি সমাজতন্ত্রী নেতা, তিনি L Humanite নামক পত্রিকা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। লুক্সেমবার্গ অনেকবার তার সাথে বিতর্ক করেন। কিন্তু তার উচ্চকিত প্রশংসা করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের বিরোধীতা করার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন।

    ১৩. নারোদনায়া ভোলিয়া ১৮৭৯ এর আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল রুশ পপুলিস্ট সংগঠন, বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের চর্চা করতো। ১৮৮১ সালের মার্চে এই দলের সদস্যরা জার আলেক্সান্ডার দ্বিতীয়কে হত্যা করে। এরপরে রুশ সরকার এই গোষ্ঠীকে মারাত্মক দমন পীড়নের মাধ্যমে নিধন করেছিল।

  • সোশ্যাল ইকোলজি কো-অপারেটিভ ।। একুশ শতকের জনস্বার্থে প্রাণ-প্রকৃতির জন্য একুশটি থিসিস

    সোশ্যাল ইকোলজি কো-অপারেটিভ ।। একুশ শতকের জনস্বার্থে প্রাণ-প্রকৃতির জন্য একুশটি থিসিস

    * অনুবাদ: রাহুল বিশ্বাস

    জ্যানেট বিহলের ভূমিকা

    “২১ থিসিস” লেখা হয় ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আর ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে সেটি প্রকাশিত হয়। এ লেখাটি প্যারিসে সামাজিক বাস্তুবিদ্যা সমবায় (সোশ্যাল ইকোলজি কো–অপারেটিভ)-এর জন্মকে সূচিত করেছে৷ ২০১৬ সালের মে মাসে এটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক ফারবিয়াজকে (Patrick Farbiaz) আমি জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেয়েছিলাম, সামাজিক ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র দ্বারা সমবায় (কো–অপারেটিভ) বলতে কী বোঝায়। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি গ্লোবাল সাউথের দরিদ্রদের দৃষ্টি দিয়ে ইকোলজি তথা বাস্তুতন্ত্রকে দেখে। এটি ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি “মুক্তির বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দরিদ্রদের চোখ দিয়ে দেখা খ্রিস্টীয় মতবাদের একটি প্রণয়ন। পলিটিকাল ইকোলজির এই রূপটি পরিবেশগত ন্যায্যতা আন্দোলনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। যেটি ১৯৭০–এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যা পরিবেশগত বিপর্যয়ে—দরিদ্র, আদিবাসী সংখ্যালঘু, নারী এবং অতিসম্প্রতি জলবায়ু ন্যায্যতা আন্দোলনের সাথে যারা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের সংগঠিত করতে চেয়েছিল। এই “২১টি গবেষণা প্রবন্ধ” মানুষের ইকোলজি তথা প্রাণ–প্রকৃতির (écologie populaire) ধারণাকে অগ্রসর করে, যা “লোকায়ত শ্রেণির” আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্ট, যারা বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী আধুনিকতা দ্বারা ছিটকে পড়েছে।

    বুকচিনের সামাজিক বাস্ততন্ত্রের সাথে কুটুম্বিতা এখানে স্পষ্ট। এই কুটুম্বিতা বিশেষ করে বাস্তুতন্ত্রের সংকটের সামাজিক উৎসের সাথে; পরিবেশবাদ (স্বভাবগতভাবে সংস্কারপন্থী) এবং ইকোলজির (যা রাজনৈতিক পরিভাষায় সামাজিকভাবে বিপ্লবী) মধ্যে যে তফাৎ তার সাথে; দরিদ্রদের দিকে যে অভিযোজন তার সাথে; স্থাণীয়করণ নিয়ে সচেতনতার সাথে; এবং সবুজ পুঁজিবাদের তিক্ত বিরোধিতার সাথে।

    কোঅপারেটিভ ইকোলজি সোস্যালের (Cooperative Ecologie Sociale) তিনজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ১৯৯০–এর গোড়ার দিক থেকে বিকশিত বিভিন্ন ফরাসি বাস্তুতান্ত্রিক দলগুলোর (লেস ভার্টস, ইকোলজি ইউরোপ, ইকোলজি ইউরোপ–লেস ভার্টস, বা ইইএলভি) সাথে সম্পৃক্ত। ২০০৪ সালে ফ্রানসাইন বেভয় (Francine Bavay) ইলে–ডি–ফ্রান্স–এর আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচিত হয়ে দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন এবং সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক অর্থনীতি, সংহতি, স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের দায়িত্ব স্বাদরে গ্রহন করেন। তিনি তখন থেকে নির্বাচনী অফিস ত্যাগ করেছেন এবং এখন স্থানীয় পন্থায় সংগঠিত হচ্ছেন। প্যাট্রিক ফারবিয়াজ ফরাসি জাতীয় পরিষদের ডেপুটি নোয়েল মামেরের অফিসে কাজ করেন। ইইএলভি অফিসকর্তা সার্জ করোনাডো ফরাসিদের কাছে লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ানদের প্রতিনিধিত্ব করেন।

    একবিংশ শতাব্দীতে সামাজিক ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার জন্য এবং পরিবেশগত ন্যায্যতার উপর জোর দেওয়ার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমি এর ইংরেজি অনুবাদ এখানে প্রকাশ করছি। সহযোগিতা–সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য, এর অন্যান্য নথি দেখতে এবং এটির জন্য আসল ফরাসি তথ্যের জন্য, Ecolgiesociale.org-এর ওয়েবসাইট দেখুন৷

    একুশ শতকের পিপলস ইকোলজি বা জনস্বার্থে বাস্তুতন্ত্রের জন্য একুশটি থিসিস

    শিল্পী: লিয়াহ্ লারিসা বানশেফট

    এই ইশতেহারটি এই সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু হয় যে দুই ধরনের ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র রয়েছে, একটি উপরের দিক থেকে এবং একটি নিচের দিক থেকে। উপর হতে উৎসারিত বাস্তৃতন্ত্র সবুজ প্রবৃদ্ধির (গ্রিন গ্রোথ) উপর ভিত্তি করে অর্থনীতির বিকাশের পক্ষে। এটি বাস্তবে বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হটানোর চালিকাশক্তি হতে চায়। অন্যদিকে নিম্ন হতে উৎসারিত ইকোলজি হলো লোকায়ত শ্রেণিগুলোর টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম এবং তাদের প্রয়োজনগুলো মেটানোর স্বার্থে পরিবেশগত সম্পদে প্রবেশাধিকার। এই দুই স্তরের ইকোলজির মধ্যে, ব্যবধান প্রতিদিন ক্রমশ বাড়ছে, এবং এটিকে স্থির করা প্রয়োজন। আর যে অভিঘাত আসছে তা বিবেচনা করে বিকল্প হতে হবে পলিটিক্যাল ইকোলজি।

    ১) আমরা যে বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন তা বহুমাত্রিক: এটি অর্থসংস্থানগত (ফিন্যান্সিয়াল), অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিচয়বাদী (আইডেন্টিটারিয়ান) এবং প্রাণ–প্রকৃতিমূলক। এই শেষ বৈশিষ্ট্যটি হলো মৌলিক নতুন উপাদান যা পৃথিবীকে টিকে থাকার দিকে পরিচালিত করছে: বর্বরতা যা বাজারব্যবস্থায় কতিপয় লোকের আধিপত্য ও ‘ভালোভাবে বেঁচে থাকা’ নামক রাষ্ট্রের সভ্যতাকরণের রাজনীতি থেকে উদ্ভূত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ধ্বংসের মন্ত্রণায় নিযুক্ত, যার সংস্কার করা যাবে না, এমনকি সবুজ অর্থনীতি তার সংকট সমাধানের জন্য চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালালেও। ‘পুঁজিবাদের সভ্যকরণের মিশন’, উৎপাদনবাদী শক্তির সম্প্রসারণের উপর ভিত্তি করে এবং যা উদার চিন্তাবিদদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রীদের দ্বারাও সুরক্ষিত। এটি পৃথিবীর শৃঙ্খলাজনিত গঠনতন্ত্রের আবশ্যক ভারসাম্য বিঘ্নিত করেছে যা মানুষের জীবনকে অসম্ভব করে তুলছে।

    পুঁজিবাদ প্রাকৃতির সীমাবদ্ধতার সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম নয়। যার প্রধান লক্ষণ ইকোসিস্টেমগুলোর নিত্যকার অতিদ্রুত বিনাশ, জলবায়ু অবস্থার অবনতি, রাসায়নিক দূষণ এবং এর ফলে সৃষ্ট রোগ, জীববৈচিত্র্যের দ্রুত হ্রাস, মাটির অবক্ষয়, চিরহরিৎ বা অতিবৃষ্টির বন (রেইনফরেস্ট) ধ্বংস, নিষ্ঠুরতার ফলে বিকশিত বৈশ্বিক সামাজিক বর্ণবৈষম্য এবং পরিচয়বাদী এবং ধর্মীয় সহিংসতার উত্থান। এই সঙ্কটগুলি উত্পাদনব্যবস্থার পদ্ধতি থেকে উদ্ভূত হয়েছে যা দুই শতাব্দী ধরে চরমে পৌঁছেছে—পুঁজিবাদ—এবং এর ফলে ভোগ ও তত্পরতার কারণে। এই পরিবেশগত এবং সামাজিকভাবে অস্থিতিশীল উন্নয়নের পদ্ধতি জীবজগৎকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

    ২) পলিটিকেল ইকোলজিই হলো একমাত্র শক্তি যা কিনা এই সংকটকে দেখতে পেয়েছে। পলিটিক্যাল ইকোলজির বিভিন্ন ধারা রয়েছে, কিন্তু সব পলিটিক্যাল পরিজনবর্গের মধ্যে একমাত্র, ইকোলজি আমাদের বাস্তুতান্ত্রিক পদাঙ্ক/পদচিহ্ন (ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট) কমানোর মাধ্যমে উন্নয়নের মডেল পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করে, প্রাণ–প্রকৃতিখেকোদের প্রতিহত করে গ্রহের ইকোসিস্টেম তথা বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করে, এবং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা রক্ষা করে যেহেতু তা মৌলিক সামাজিক প্রয়োজনগুলি মেটায়। স্বশাসনের অধিকার, দায়িত্ব এবং ভারসাম্যের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ইকোলজি মাটি এবং মানুষ ও জীবসম্প্রদায় রক্ষার সার্বজনীন মূল্যবোধকে গ্রহণ করার আহ্বান জানায়। ইউরোপে এবং অন্যান্য ধনী দেশে ১৯৮০–এর দশকে প্রাণ–প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে যখন প্রতিদিনকার প্রতিরোধ মানব সম্প্রদায়ের টিকে থাকার প্রশ্ন এবং গণতন্ত্র বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তির সাথে একীভূত হয়। এটি প্রাণ–প্রকৃতিবাদী দলগুলো (Green parties) দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল, যাদের সামাজিক ভিত্তি ১৯৬৮–উত্তর ছাত্র প্রজন্মের সাথে মিলে যায় যেটি যুদ্ধ পরবর্তী দশকগুলিতে সমৃদ্ধ হয়েছিল। এই সামাজিক ভিত্তিকে মধ্যবিত্ত হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, যার আয়ত্তে উচ্চ সাংস্কৃতিক পুঁজি রয়েছে এবং যারা বড় শহরগুলির শহুরে কেন্দ্রগুলিতে বাস করে; এটি তার নিজস্ব ধারণায় পলিটিক্যাল ইকোলজিকে রূপ দিয়েছে এবং যা তার স্ব–অধিকারে কাজ করে। এটি প্রাণ–প্রকৃতিবাদী রাজনীতির সমর্থন করে যা উপরে থেকে (ঊর্ধ্বস্থিত) মান নির্ধারণ করে এবং যেটি পলিটিক্যাল ইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে সবুজ অর্থনীতির উপায়ে পুঁজিবাদের অভিযোজনকে বিবেচনা করে।

    ৩) আরেকটি ইকোলজি, দরিদ্রদের ঐতিহাসিক শক্তি থেকে প্রবর্তিত, নিচে থেকে উৎসারিত ইকোলজি, যা এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় উদ্ভূত হয়েছিল। এই লোকায়ত ইকোলজি, গ্রহের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ থেকে উদ্ভূত, যারা সর্বত্র মনুষ্যপ্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে। সামাজিক পরিধির প্রকৃতিগত, এটি আর্থিক ও শিল্প অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নারী ও পুরুষকে একত্রিত করে যা গ্রহকে ধ্বংস করছে এবং হুমকি দিচ্ছে মনুষ্যপ্রকৃতির টিকে থাকার এবং সারা বিশ্বে ছিন্নমূলদের জীবনের পরিস্থিতি: বন উজাড়ের বিরুদ্ধে, বড়সব বাঁধের বিরুদ্ধে, তেল ও খনিজ সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে, এবং তাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের টিকে থাকার জন্য, শিল্পকারখানাজাত ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে, পরিবেশগত বিভক্তির বিরুদ্ধে।… নিম্নস্থিত ইকোলজিকে বর্তমানে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে স্থানান্তরণ করা হয়নি। যখন এটি প্রাণ–প্রকৃতিপন্থী দলগুলোর (green parties) মধ্যে উপস্থিত হয়, এটি প্রায়শই সংখ্যাল্প হয়।

    এটি সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনে (ব্রাজিলের ভূমিহীন মজুর আন্দোলন, ভিয়া ক্যাম্পেসিনা১, আদিবাসী আন্দোলন) এবং জনপ্রিয় বিদ্রোহে (বলিভিয়ায় জলযুদ্ধ, চীনে আইন বিরোধীতা, ভারতে বাঁধ বিরোধী আন্দোলন) প্রকাশিত হয়। এটি এখনও তার তথ্যসূত্র খুঁজছে, তবে ইতিমধ্যে এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, বিশেষত রিও+ ২০–এর মতো পলিটিক্যাল ইকোলজির এই ধরনের বড় বৈঠকের সময় কিংবা যখন হাজার হাজার পরিবেশবিদ সবুজ অর্থনীতি এবং এর পরিণতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং ক্লাইমেট জাস্টিস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামাজিক প্রাণ–প্রকৃতিমূলক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করে… ধীরে ধীরে, পশ্চিমা দেশগুলিতে পিপলস ইকোলজি ছড়িয়ে পড়ছে, শিল্প কৃষি এবং রাসায়নিক শিল্পের বিরুদ্ধে লড়াইকারী গ্রামীণ সম্প্রদায়গুলিতে, জনবহুল পাড়াগুলোতে যেখানে দূষণ প্রচ্ছন্নভাবে কেন্দ্রীভূত, এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাজনিত রোগ, জাঙ্ক ফুড খাওয়া এবং তার ফলস্বরূপ স্থূলতা দেখা দিচ্ছে। সমবেত সামাজিক এবং পরিবেশগত অবিচারের মুখোমুখি হয়ে, একটি নতুন পলিটিক্যাল ইকোলজি একইসাথে প্রয়োজনীয় এবং সম্ভবপর।

    ৪) পলিটিক্যাল ইকোলজির এই দুই মেরুর কারণ পূর্বের বিবরণে রয়েছে যা শুরু থেকেই বিভক্ত। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে, ঊর্ধ্বভাগের বৈজ্ঞানিক ইকোলজির মধ্যে একটি ব্যবধান বিস্তৃত হয়েছে, যা ঔপনিবেশিক বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সংরক্ষণবাদ এবং সামাজিক ডারউইনবাদ দ্বারা বৃহৎ অংশে গঠিত হয়েছে। ইতিবাচক মতাদর্শ এবং অনন্ত অগ্রগতির ধর্মচারণ দ্বারা চালিত, ঊর্ধ্বভাগের এই ইকোলজি বিংশ শতাব্দীতে প্রথমে প্রাণ–প্রকৃতিবাদীদের, পুনঃপুন প্রকৃতিবাদী এবং পরিবেশবাদীদের প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে, নীচের দিক থেকে (নিম্নস্থিত) ইকোলজি হলো পিপলস ইকোলজি তথা জনস্বার্থে প্রাণ–প্রকৃতি। শ্রমিক, কৃষক এবং ঔপনিবেশিক বিরোধী জনগণের বেঁচে থাকার সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত মুক্তিপরায়ণ প্রাণ–প্রকৃতিবাদ। বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম পিপলস ইকোলজির ভিত্তি। পুঁজিবাদী আধুনিকতা তাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করার কারণে লোকায়ত শ্রেণীগুলি কেবল তাদের জীবনের বস্তুগত অবস্থা–ই নয়, তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকেও রক্ষা করবে।

    শিল্পী: ওলাফ হাজেক

    পুঁজি অগ্রগতি, বিজ্ঞান ও যুক্তির নামে কৃষক ও কারিগর সম্প্রদায়ের জীবন ও কর্মের অবস্থাকে ধ্বংস করেছে। এই অর্থে ডানপন্থী এবং একইসাথে বামরাও উদার ব্যক্তিবাদের দোহায় দিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা অর্জন করেছে। আমরা যদি এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করতে চাই, তবে পিপলস ইকোলজির প্রথম কাজটি হলো প্রগতি ও বিজ্ঞানবাদের এই ধর্মচারণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বামপন্থী এবং বাস্তুবিদ্যার সম্মিলিত বোধকে বিউপনিবেশায়ন করা, যা লোকায়ত শ্রেণীর উপর মধ্যবিত্ত আধিপত্যের ফলাফল। টেরা নোভা ফাউন্ডেশন বামপন্থীদের ভবিষ্যত “দৃঢ়তা” নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে অভিহিত করেছে, যেহেতু তারা কার্যত লোকায়ত শ্রেণীগুলিকে বর্জন করেছে বা জাতীয় ফ্রন্টের পক্ষে; এইভাবে তারা তাদের উদ্ভব বা মূলবিন্দু শ্রমিক, আদিবাসী এবং কৃষক আন্দোলনের সমাজতন্ত্রকে তুচ্ছ করে সমাজতন্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তুশাস্ত্রের যুক্তি অনুসরণ করছে, এবং দাবি করছে যে তারা এখনো আগের মতোই। বিউপনিবেশায়ন তথা উপনিবেশায়ন থেকে সামগ্রিক মুক্তির ভাবনা এইভাবে মূল্যবোধ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ইতিহাসের পুনঃআবিষ্কারে অবদান রাখে, যা মুনাফা এবং ব্যক্তিবাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রতিযোগিতার উপর ভিত্তি করে বাজার সমাজের ঠিক বিপরীত: তারা সংঘবদ্ধতা, অন্যদের জন্য উদ্বেগ, জমির সমষ্টিগত মালিকানা, সহজাত, পারস্পরিক সাহায্য, সহযোগিতা এবং সৌজন্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে।

    (কোঅপারেটিভ ইকোলজি–সোশ্যালে ইন প্যারিস–এর প্যাট্রিক ফারবিয়াজ এবং ফ্রানসাইন বেভয়)

    ৫) ঊনবিংশ শতাব্দীতে পিপলস ইকোলজি উদ্ভূত হয়েছিল শ্রমিকদের সঙ্ঘবদ্ধতা, কৃষিজীবীদের সংখ্যাধিক্যতা, যান্ত্রিকীকরণ বিরুদ্ধতা (লুড্ডিজম), নাগরিক অবাধ্যতা, এবং মুক্তিমুখীন ভূ–বিদ্যায়। শ্রমিক সঙ্ঘবদ্ধতা সামাজিক ও সংহতিমূলক অর্থনীতির মূল ভিত্তি; লুড্ডিজম শিল্পায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের সমালোচনার মূল ভিত্তি; গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম ও যুদ্ধ থেকে কৃষিভিত্তিক জনসংখ্যার উদ্ভব হয়েছিল তাদের জীবনযাত্রা এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পৃথিবীর সাথে অন্য কোনো সম্পর্ক এবং পণ্যায়নের বিকাশের বিরুদ্ধে; থোরো থেকে গান্ধী পর্যন্ত এবং ব্রাজিলের ভূমিহীনদের মধ্য দিয়ে যাওয়া সংগ্রামে অসহযোগের পদ্ধতিতে নাগরিক অবাধ্যতার উদ্ভব হয়েছিল; এলিসি রেক্লাস এবং পিটার ক্রোপোটকিনের মুক্তিপরায়ণ ভূ–বিদ্যা সমাজবিজ্ঞানকে কাউন্টারিং করে, যা পারস্পরিক সাহায্য এবং সহযোগিতার ধারণার বিকাশ ঘটায়।

    ইকোলজির পদপরিচায়ক বা দাপ্তরিক ইতিহাস প্রকৃতির প্রতি বুর্জোয়া সংবেদনশীলতার সাথে বৈজ্ঞানিক বাস্তব্যবিদ্যা বিশেষজ্ঞ থেকে পরিবেশবাদী এবং প্রকৃতিবাদী আন্দোলনে পুলিশি লাঠিসোঁটা এড়িয়ে এর উত্থানকে বর্ণনা করে। ১৯৬৮ সালের পরে, বিভিন্ন প্রভাব (নারীবাদ, তৃতীয় বিশ্ব, শান্তিবাদ এবং অহিংসাবাদ, স্বাধীনতাবাদী, সমাজতান্ত্রিক স্ব–ব্যবস্থাপনা) দ্বারা পুষ্ট একটি সাংস্কৃতিক এবং প্রজন্মগত আন্দোলন থেকে ১৯৭০–এর দশকে জন্ম নেওয়া স্রোতের একটি পথধারা একত্রিত হয় এবং পলিটিক্যাল ইকোলজি ও প্রাণ–প্রকৃতিবাদী দলগুলোর জন্ম দেয়। এই গল্পটি মিথ্যা। কারণ এটি ইচ্ছাকৃতভাবে দরিদ্রদের ইকোলজিকে বাদ দেয়। যা উনিশ এবং বিশ শতকে পুঁজিবাদী আধুনিকতা এবং উন্নয়নের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই করা বন্ধ করেনি।

    ৬) পিপলস ইকোলজি তার সূচনা থেকেই সম্পদের সীমাহীন শোষণ, বিশ্বায়ন বাণিজ্য এবং পুঁজি সঞ্চয়সহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিরোধী। প্রধানতম চার রকমের বিশ্বায়ন প্রাণ–প্রকৃতিমূলক সঙ্কটের জন্য দায়ী।

    প্রথম বিশ্বায়ন ছিল বহুমাত্রিক আটলান্টিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, যা মানব দাসত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যার ফলে আদিবাসীদের নিধন করা হয় এবং সম্পদ আহরণের কাজে লাগানো হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কাঁচামাল দখল করা হয়।

    দ্বিতীয় বিশ্বায়ন কয়লা এবং বাষ্প শক্তির উপর ভিত্তি করে, মজুরি শ্রম, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং উত্পাদনবাদ উদ্ভূত। অর্থাৎ যে উৎপাদনের ধর্ম ছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলোর প্রাপ্ত লাভের বনিয়াদ করে। ইতোমধ্যে সে বেড়াজাল জমির সাধারণ মালিকানার অবসান ঘটিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ কৃষককে যন্ত্রের সম্প্রসারণে ভিন্ন অবস্থায় পর্যবসিত করেছে। শিল্প শ্রমজীবী শ্রেণীর জন্মের সাথে সাথে কৃষক সম্প্রদায়ের ধ্বংসের ঘটনা ঘটে।

    তৃতীয় বিশ্বায়ন তেল শোষণের দ্বারা সৃষ্ট, তা ছিল ফোর্ডিজম২ এবং বিদ্যুৎ, ভোগবাদ এবং বিচ্ছিন্নতা।

    চতুর্থ বিশ্বায়ন পারমাণবিক শক্তি, তেল আহরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে সৃষ্ট বস্তু এবং মনুষ্যপ্রকৃতি বা মানবিকতার পরিকল্পিত বিলোপপ্রবণতার সাথে সমসাময়িক। এই যুগ হয় বর্বরতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যাবে নয়তো বিশ্ব নাগরিকতা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে একটি মানবিক রেনেসাঁর জন্ম দিবে। বর্তমান বিশ্বায়ন মানবিকতার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

    একটি প্রাণ–প্রকৃতিমূলক বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এই চার ধরণের বিশ্বায়ন পাঠ করলে দেখা যায় যে পুঁজিবাদী আধুনিকতা সর্বদা শ্রমিকশ্রেণীর শোষণ এবং তাদের বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের উপর ভিত্তি করে। যারা আধিপত্যশীল তারা মানুষ ও প্রকৃতির অভিমুখে আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করেনি। ভারতের প্রতিরোধ, পলায়নপর ক্রীতদাস, দাস বিদ্রোহ, আইনভঙ্গ ও কৃষক বিদ্রোহ, অধিকার ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যরক্ষার সংগ্রাম, এবং আজকাল সম্পদ আহরণ, বিশাল বাঁধ, বন উজাড় এবং বড়সব অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের প্রতিরোধ দ্বারা তা প্রমাণিত।

    পিপলস ইকোলজি কী?

    ৭) পিপলস ইকোলজি মূলধারার কিছু নয়, নিরপেক্ষ কিছুও নয়। ইকোলজি স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক সামাজিক সম্পর্ক ও আনুকূল্যতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আন্তঃসম্পর্কিত। এটি তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে লোকায়ত শ্রেণী এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাততন্ত্রের মধ্যে মতবিরোধ রাখে এই সাধারণ কারণে যে মনুষ্যপ্রকৃতির সমস্ত অংশ একইভাবে পরিবেশগত সংকট অনুভব করে না। আয়, অধিকার, এবং সাংস্কৃতিক সাবলীলতার অসমতা, যা পরিবেশগত সংকটের মূলে রয়েছে, তা নিশ্চিত করে যে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এর প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সামর্থ্যের অভাব বোধ করে। পিপলস ইকোলজির লক্ষ্য পানি, বাতাস, মাটি এবং সর্বসাকুল্যে সমস্ত ব্যক্তিমালিকানা (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি) নস্যাৎ করার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য দূর করা।

    বিশ্বের ফিন্যান্সিয়ালাইজেশন পণ্যের আসক্তিবাদের (ফেটিসিজম) সর্বোচ্চ পর্যায়, যেখানে একমাত্র মানদণ্ড ধনাঢ্যদের মূলধন (কিং মানি) এবং বস্তুগত সম্পদের স্তর হলো সুখ গণনার সূচক। পিপলস ইকোলজি, অর্থনৈতিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, এবং দরিদ্রদের জন্য এর অগ্রাধিকার তাদের জীবনের শোচনীয় অবস্থা প্রতিরোধের শক্তি খুঁজে পায়, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, বর্জিত, অচ্ছুত এবং ভাগ্যহতদের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সাথে আরও ভালভাবে লড়াই করার জন্য। জলবায়ু, শক্তি (Energy) এবং প্রাণ–প্রকৃতির সঙ্কট মূলধারার মধ্যে সমাধান করা হবে না কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি এবং সঙ্কটের দ্বারা সরাসরি হুমকির সম্মুখীন জনগণের মধ্যাকার সংঘর্ষের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।

    ৮) পিপলস ইকোলজি হলো প্রাণ–প্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রাণ–প্রকৃতিবাদী আন্দোলনের একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক স্রোত। এটি মৌলিকভাবে অন্যান্য প্রবণতা থেকে নিজেকে আলাদা করে:

    পরিবেশবাদ– এই প্রবণতা পলিটিক্যাল ইকোলজিকে সঙ্কুচিত করে পরিবেশ রক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু পলিটিক্যাল ইকোলজি হলো মানুষ, সমাজ এবং প্রকৃতির মধ্যকার সম্পর্কের জন্য একটি বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগত পন্থা। একটি পরিবেশবাদ যা শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করে, প্রাণ–প্রকৃতির গোটা দিক থেকে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করার সময় NIMBY-টাইপ৩ কর্পোরেটবাদে পরিণত হয়।

    গভীর বাস্তুশাস্ত্র বা ডিপ ইকোলজি – মনুষ্যপ্রকৃতি বা মানবিকতা বিবর্জিত এই রূপটি সংরক্ষণবাদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা সর্বদা বাস্তুতন্ত্রের থেকে মানুষকে বাদ দিয়েছে। নরওয়ের দার্শনিক আর্নে নেস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই চিন্তাধারাটি প্রাণকেন্দ্রিকতার (biocentrism) উপর ভিত্তি করে, যা মনুষ্যপ্রকৃতি বিবর্জিত রূপে সঙ্কুচিত হয়। যদিও পিপলস ইকোলজি নৃ–কেন্দ্রিকতার (মানুষের কেন্দ্রীভূত জীবনব্যবস্থা) সমালোচনা করে, তবে এটিকে এমন একটি ইকোলজির সাথে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয় যা মানুষকে প্রকৃতির বাইরে রাখে।

    উদারনৈতিক বাস্তুশাস্ত্র, টেকসই উন্নয়ন, সবুজ অর্থনীতি এবং সর্বসাকুল্যে যারা ইকোলজিকে পুঁজিবাদকে সবুজ করার কর্তব্যপালনে রাখতে চান। উদারনৈতিক বাস্তুশাস্ত্র, যা দক্ষতাকে সম্মান করে ও প্রাণ–প্রকৃতির পণ্যায়নের উপর ভিত্তি করে। এটি বিশ্বাস করে যে প্রকৃতির একটি মূল্য (price) রয়েছে এবং এর অর্থনীতি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতাকে সমর্থন করা, যা এটিকে দুর্দমণীয় বলে মনে করে এবং কার্বন বাজারের মতো জুতসই প্রক্রিয়া গড়ে তোলে….

    পিপলস ইকোলজি– অবস্থা বদলের ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রের অনুসরণকারী, এই মৌলিক বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে সাম্যবস্থার উৎপাদন (de-growth), সামাজিক বাস্তুতন্ত্র, এবং প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের সমর্থকরা। অবস্থা বদলের এই ইকোলজি বিশ্বাস করে যে পুঁজিবাদকে সংস্কার করা যায় না। এটি সামাজিক অনুশীলন, মূর্ত সংগ্রাম এবং কোন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিস্তারের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে কাবু করার শর্ত তৈরি করে, যা বাজারের আইন বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাবর্গের আশ্রয় নেয় না।

    ৯) পিপলস ইকোলজি মানে ইকো–সোশ্যালিজম তথা প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্র নয়। এটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এবং ইকোলজির থিসিসের কপি–পেস্ট নয়। এটি উৎপাদনবাদী সমাজতন্ত্রের উত্তরসূরি নয় বরং এর বিকল্প হিসেবে বিদ্যমান। তথাকথিত “বৈজ্ঞানিক” সমাজতন্ত্র এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যে বুর্জোয়াদের দ্বারা কাঙ্খিত এবং সমর্থিত উত্পাদনশীল শক্তির বিকাশ আধুনিক শিল্প প্রলেতারিয়েত গঠনে সাহায্য করেছিল সেই শ্রেণী দ্বারা তার নিজস্ব উৎখাতের পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    এই ধারণাটি অগ্রগতির মতাদর্শ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দেবত্ববাদ, পরিণতি নির্বিশেষে প্রযুক্তির বিকাশ, জাতি–রাষ্ট্রের ভূমিকাকে দেওয়া অসম গুরুত্ব এবং সমাজ পরিচয়কে অস্বীকার করার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়েছিল। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদ কৃষক সম্প্রদায়, কারিগর এবং সাধারণ দোকানদারদের জীবনযাত্রাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং এটি শিল্প ও উৎপাদনবাদী বিপ্লবের বাইরে অন্য কোন উল্লেখ ছাড়াই লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে একটি শিল্পবাহিনীতে তালিকাভুক্ত করেছিল। উপনিবেশগুলিতে, এটি মানুষের জমির উপর ঘাঁটি গেড়ে পূর্বপুরুষের সভ্যতাগুলিকে আক্রমন করেছিল যেগুলি এটি আত্মীকরণ এবং সভ্যকরণের দাবি করেছিল….

    প্রযুক্তির সমালোচনা ইকো–সোশ্যালিজম এবং পিপলস ইকোলজির মধ্যে আরেকটি পার্থক্য। মার্কসবাদ মনে করে যে প্রযুক্তি হলো একটি পক্ষপাতশূন্য (নিরপেক্ষ) যন্ত্র যা শ্রমিক শ্রেণীর কাজে লাগানো যেতে পারে এবং সেই প্রযুক্তি সামাজিক রূপান্তর ও অগ্রগতির জন্য একটি নির্ণায়ক উপাদান।৪ এর বিপরীতে, পিপলস ইকোলজি বিবেচনা করে যে প্রযুক্তি আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে এবং পৃথিবী এবং মানবজাতিকে বিপন্ন করছে। তবুও, প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সমাজতন্ত্রের বুদ্ধিভিত্তিক ঝোঁক পিপলস ইকোলজির কাছাকাছি। মিলগুলি অসংখ্য, এবং তারা একই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসাবে একসাথে কাজ করতে পারে।

    ১০) পিপলস ইকোলজি উৎপাদনের স্থিতিবস্থা (ডি–গ্রোথ) সদৃশ নয়। এমনকি যদি সাম্যবস্থার উৎপাদনের নীতিগুলো সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়, তবুও পিপলস ইকোলজি এখনও লোকায়ত শ্রেণীর জন্য খাদ্য, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। এই অঞ্চলগুলিতে প্রয়োজনগুলি মেটানোর জন্য সামাজিক এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে প্রাণ–প্রকৃতির উন্নীতকরণের বিকাশসাধনের ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দক্ষিণে ও দরিদ্রতম দেশগুলিতে, এছাড়াও উদীয়মান এবং পশ্চিমা দেশগুলিতে, এটি খেসারতের নীতিতে পর্যবসিত হতে পারে (যেমন আর্থিক বা পরিবেশগত দায়ের জন্য ক্ষতিপূরণ)। লোকায়ত শ্রেণী যাদেরকে সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তারা কিছু এলাকার ব্যবহার এবং উৎপাদন বিকাশের মাধ্যমে একটি মদত পেতে পারে। যদি বাস্তুতান্ত্রিক পদাঙ্ক/পদচিহ্নের (ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট) পতন একটি নিরঙ্কুশ নিয়ম হতে হয়, তবে এটি লোকায়ত শ্রেণীর কাজে আসবে না। উৎপাদনের স্থিতিবস্থা মানে পিছু হটা নয়। বিপরীতে, এটিকে অবশ্যই পুঁজিবাদের পরিমাণগত বৃদ্ধি এবং এর সঞ্চয়ের যুক্তিকে গুণগত বৃদ্ধির যুক্তির সাথে প্রতিস্থাপন করতে হবে, যা প্রধানত প্রভাবশালী পুঁজিবাদী দেশগুলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণগত উৎপাদনের স্থিতিবস্থাকে বোঝায়।

    ১১) পিপলস ইকোলজি হলো মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র। এটি ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া এবং আফ্রিকার দরিদ্রদের একটি ইকোলজি বা বাস্তুশাস্ত্র। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্ব হলেন চিকো মেন্ডেস, বন্দনা শিবা এবং কেন সারো–উইওয়া। এটি পানি, বায়ু ও মাটির পণ্যায়ণ নিষিদ্ধ করে মাতৃস্থানীয় ধরিত্রী (মাদার আর্থ) এবং দরিদ্রদের সংযোগ অটল রাখে। নিজেদের মুক্ত করে, দরিদ্ররা সমস্ত মনুষ্যপ্রকৃতিকে মুক্ত করে এবং গ্রহ এবং এর সমস্ত উপাদান সংরক্ষণ করে। মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র তথা প্রাণ–প্রকৃতির একটি মৌলিক নীতি রয়েছে যে পৃথিবীর মালিকানা নেই।

    মুক্তির বাস্তুশাস্ত্র বেঁচে থাকার বাস্তুশাস্ত্র। এটি বসতি, স্বাস্থ্য এবং খাদ্যের অধিকারসহ ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় (Universal Declaration of Human Rights) নির্ধারিত অধিকারগুলিতে প্রবেশের দাবি করে।

    মুক্তির প্রাণ–প্রকৃতির একটি অন্তর্মুখ মাত্রা রয়েছে, যা খ্রিস্টীয় মুক্তির ধর্মতত্ত্ব এবং মাতৃস্থানীয় ধরিত্রীর ধারণার মধ্যে একটি পুনর্মিলনের মাধ্যমে বৈশিষ্ট্যযুক্ত, যা আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলে এবং অন্যত্র কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে পাওয়া যায়।

    শিল্পী: আলেক্সিস রকম্যান

    ১২) পিপলস ইকোলজি হলো পরিবেশগত ন্যায়পরতার একটি ইকোলজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮০–এর দশকে স্পষ্ট হওয়া এই আন্দোলনটি পরিবেশগত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। পরিবেশগত সংকট ধনী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যতটা প্রভাব ফেলে, দরিদ্র এলাকাগুলিতে একইরূপ প্রভাব ফেলে না। একটি আঞ্চলিক এবং জাতিগত–সামাজিক বৈষম্য গঠনের জন্য পরিবেশগত বৈষম্য সামাজিক ও জাতিগত অসাম্যের সাথে একাকার হয়ে যায়। পিপলস ইকোলজি বৈষম্য বিরোধী। এই অর্থে মুক্তিপরায়ণ প্রাণ–প্রকৃতিবাদী সক্রিয় কর্মী ও সংগঠক মারে বুকচিনের তাত্ত্বিক সামাজিক ইকোলজির সাথে এটির একটি গভীর সুসম্পর্ক রয়েছে।

    ১৩) পিপলস ইকোলজি হলো যৌথ বা সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনার ইকোলজি। কৃষক সম্প্রদায়ের একটি অর্জন হিসাবে যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থাপনার উদ্ভব, বিশেষত “দখলদারদের” বিরুদ্ধে লড়াই করে, এবং এটি আজ সামাজিক এবং পরিবেশগত সংগ্রামের ঝুঁকিতে রয়েছে। যখন কিনা এটি জীবনের পেটেন্টিং, জমির মালিকানা, সাইবারস্পেস আত্মসাৎ, সংস্কৃতির কর্পোরেট মালিকানা, কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামালের উপর নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করে, তখনি সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনার জন্য সংগ্রাম জনগণের নতুন প্রাণ–প্রকৃতিগত সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ করে। সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা যৌথ পণ্য, সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তা এবং পূর্বপুরুষের দক্ষতা যেমন ফলিত বা প্রায়োগিক জানাশোনা তা পুনরুদ্ধার করছে, যা কর্পোরেট মালিকানাকে প্রতিহত করে।

    ১৪) পিপলস ইকোলজি হলো একটি আন্তর্জাতিক এবং পরিবর্তিত–বিশ্বায়ন ইকোলজি। এটি সংগঠিত সামাজিক শক্তির উপর নির্ভর করে যেমন কৃষক আন্দোলন (লা ভায়া ক্যাম্পেসিনা), বন উজাড় এবং বড়সব বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন, জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলন, অকেজো বড় প্রকল্প আরোপের বিরুদ্ধে আন্দোলন, টিকে থাকার জন্য আদিবাসীদের আন্দোলন, বিনামূল্যের সফ্টওয়্যার, এবং প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের (ইকো–ইউনিয়নিজম) জন্য আন্দোলন। এটি সামাজিক ফোরামে পরিবর্তিত–বিশ্বায়ন (অলটার গ্লোবালাইজিং) আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

    ১৫) প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের সাথে পিপলস ইকোলজির সাদৃশ্য রয়েছে। সামাজিক ও পরিবেশগত অবিচারের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম পিপলস ইকোলজির অংশ। অ্যাসবেস্টস (সিলিকেট খনিজ), সীসা বিষক্রিয়া এবং বিষাক্ত পণ্যগুলির বিরুদ্ধে পেশাগত স্বাস্থ্যের জন্য সংগ্রাম একটি অপরিহার্য বিষয়। প্রাণ–প্রকৃতিবাদী শ্রমিকসংঘবাদের মতো পিপলস ইকোলজি স্ব–ব্যবস্থাপনার পক্ষে। এটি একটি সংঘবদ্ধ এবং বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলির প্রত্যক্ষ পরিচালনার পক্ষে সমর্থন করে, এছাড়া ব্যবহারকারী–নাগরিক (user-citizen) উত্পাদন এবং পরিবেশের উপর নিয়ন্ত্রণও করে।

    ১৬) পিপলস ইকোলজি ইকো–ফেমিনিস্ট। পুরুষশাসিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নারীকে নিপীড়ন ও শোষণ করছে, যেমন তার জমি আছে। ইকো–ফেমিনিজম মনে করে যে পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জীবনের অখণ্ডতা রক্ষা করা একটি ঐক্যবদ্ধ লড়াই। শিল্পায়ন শুধু প্রকৃতিকে নয়, নারীদেহকেও পণ্যে পরিণত করেছে। মানুষকর্তৃক প্রকৃতির শাসন পুরুষকর্তৃক নারীর শাসনের সাথে অন্তর্নিহিতভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। নারী ও পুরুষের মধ্যে মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করে মানুষ প্রকৃতির সাথে নতুন সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। ইকো–ফেমিনিজম এই নীতিগুলি সমর্থন করে যেমন: পারস্পরিকতা, পারস্পরিক সহায়তা, সংহতি, ভাগ করে নেওয়া, বিশ্বাস, অন্যদের জন্য যত্ন, ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমস্ত প্রাণ–প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

    ১৭) পিপলস ইকোলজি বিশ্বজনীন। মনুষ্যোচিত বহুত্ববাদের সংরক্ষণ গ্রহের প্রতিরক্ষার সংগ্রামে একটি অপরিহার্য উপাদান। ছয় হাজার মানুষ এই গ্রহটি রচনা করে, এবং তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচয় সংরক্ষণ করা প্রাণ–প্রকৃতিমূলক সংগ্রামের একটি অপরিহার্য উপাদান। ১৯৯০–এর দশকে আমেরিকান নব্য রক্ষণশীলদের দ্বারা সমর্থিত সভ্যতার যুদ্ধ নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যানকারী লোকদের বিরুদ্ধে বিশ্বায়িত বর্ণবাদের জন্ম দেয়। পিপলস ইকোলজি রাষ্ট্রীয় সীমাহীন (বর্ডারলেস) এবং বিশ্ব নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করে। বিশ্বজনীনতা একুশ শতকের জীবন দর্শন।

    পিপলস ইকোলজির পরিচালনাকৌশল

    ১৮) পিপলস ইকোলজি একটি নতুন হিস্টোরিক ব্লক বা ঐতিহাসিক জোট তৈরির জন্য লড়াই করে: সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার জন্য জোট। সংগ্রামটি শহুরে সংস্কৃতিবান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর নির্ভর করতে পারে না, তবে নয়া প্রলেতারিয়েত তথা সর্বহারা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারীদেরকে অবশ্যই একত্রিত করতে হবে: বুদ্ধিজীবী শ্রমিক, প্রিকারিয়েট (অনিশ্চিত অস্তিত্বধারী), শিল্প শ্রমিক শ্রেণীর অংশ, ক্ষুদ্র কর্মকর্তা এবং কৃষক–শ্রমিক। এই নতুন ঐতিহাসিক জোটে পিপলস ইকোলজির সহযোগী হলো সেই সমস্ত আন্দোলন যা সকলের অধিকার এবং প্রাণ–প্রকৃতিগত সাম্যের জন্য লড়াই করে। এই জোটটি যৌথ বা সমষ্টিগত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি জোট, যারা প্রাকৃতিক সাধারণ উপাদান (জল, মাটি, বায়ু) এবং মনুষ্যপ্রকৃতির টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে এবং যারা নতুন দখলদারদের বিরুদ্ধে অস্পৃশ্য সাধারণ বিষয়গুলোর (তথ্য, সংস্কৃতি, সাইবারস্পেস) জন্য লড়াই করছে। এই জোটটি সংখ্যাগরিষ্ঠ। শ্রমজীবী ​​মানুষের সুবিশাল অংশ সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার জন্য এবং তাতে অভিগমনের জন্য একটি বিপ্লবের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়।

    ১৯) পিপলস ইকোলজি উন্নয়নের একটি বিকল্প ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে একটি প্রাণ–প্রকৃতিমূলক পরিবর্তন চায় যা মানুষের চাহিদা এবং গ্রহের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে। এটি উৎপাদনের সামাজিক উপযোগিতা, ভোগের উপায়, আমাদের পণ্যের উদ্দেশ্য এবং সেগুলি কীভাবে উত্পাদিত হয় তা পুনর্বিবেচনা করে। এটি অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পুনঃস্থানীয়করণ এবং অকেজো বা লুণ্ঠনমূলক কার্যকলাপের পরিবর্তন এবং সম্পদ ও কাজের পুনর্বন্টনের সমার্থক। উৎপাদনবাদী কৃষির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, এটি কৃষি–বাস্তুবিদ্যাকে তুলে ধরে এবং কৃষকদের পূর্বপুরুষের জ্ঞানকে সম্মান করে। অন্তর্বর্তীকালীন কার্যক্রম হলো:

    একটি জ্বালানি ও শিল্প নীতি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শক্তি সংরক্ষণ, পারমাণবিক শক্তির সমাপ্তি, জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রচলিত বা অপ্রয়োগসিদ্ধ উত্সের অশোষণ, এবং স্থানীয় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার

    জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এড়াতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য সম্পদ ভাগাভাগি করতে অর্থনীতির পুনঃস্থাপন। এটি একটি অনানুষ্ঠানিক স্থানীয় অর্থনীতি এবং একটি নতুন পুঁজিবাদ–উত্তর পারস্পরিক নির্ভরতার অর্থনীতিকে সমর্থন করে….

    পরিবেশগত সংকট কাটিয়ে সমাজের সহনশীল বিকাশের জন্য, আমাদের অবশ্যই সামর্থ্যের উপর তেল উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পূর্বজ্ঞান করার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে….[আমাদের অবশ্যই অগ্রগামী হতে হবে] বৈশ্বিক, মহাদেশীয়, জাতীয় এবং আঞ্চলিক জননীতিগুলি গণতান্ত্রিক পরিবেশগত পরিকল্পনা গ্রহণে সক্ষম করে; প্রাকৃতিক সম্পদ, সাধারণ পণ্য, এবং খাদ্যে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রামকে সমর্থন করে; এবং বেসরকারী খাত, একটি সামাজিক এবং পারস্পরিক নির্ভরতার অর্থনীতি এবং সরকারী পরিষেবাগুলিকে একত্রিত করে বহুমাত্রিক অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য স্থান তৈরি করে….

    ২০) পিপলস ইকোলজি রাজনীতির পেশাদারিকরণ এবং সামাজিক ও প্রাণ–প্রকৃতিমূলক মুক্তির সংগ্রাম থেকে এর বিচ্ছিন্নতাকে প্রত্যাখ্যান করে। লোকায়ত শ্রেণীর রাজনীতিতে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক সকলক্ষেত্রে তারা তাদের জীবন, তাদের কর্ম এবং তাদের পরিবেশের অবস্থার উপর সিদ্ধান্ত নিতে চায়। রাজনীতি প্রত্যেকের ক্ষেত্রে পেশা (business)। এটি শক্তিশালী যেখানে সামাজিক এবং পরিবেশগত আন্দোলন দেখা যায় এবং রুপান্তরের জন্য তাদের শক্তি প্রকাশ করে। তারা যেখানে নেই সেখানে এটি দুর্বল। পিপলস ইকোলজি একটি পার্টিতে বুঁদ হতে পারে না, যদিও এটি বিভিন্ন আন্দোলন, দল বা ফ্রন্টের একটি উপাদান হয়ে উঠতে পারে। পিপলস ইকোলজি লোকায়ত উদ্যোগ, স্ব–পরিচালিত সংগ্রাম, নিচ থেকে গণতন্ত্রের নির্মাণ এবং সামাজিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। সুতরাং এটি আদর্শবাদ–নির্ভর (ইউটোপিয়ান) এবং মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রের উৎসের দিকে ফিরে আসে, যা প্রাথমিকভাবে মুক্তিমুখীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, কারিগরি শিল্প এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ধ্বংস, শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে লোকায়ত শ্রেণীগুলোকে অপসারণ বা ক্ষমতাচ্যুতকরণ এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাছে তাদের দাসত্ব এসবের বিপরীতে একটি যৌথ, গতিশীল এবং সংহতিমূলক প্রতিক্রিয়া চেয়েছিল।

    পিপলস ইকোলজি অ্যামিয়েন্সের সনদ৫ [১৯০৬ সালের] সেকেলে বলে মনে করে। শ্রমিক ইউনিয়ন, সমিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ শিল্প বিপ্লব দ্বারা আরোপিত হয়েছিল। একইভাবে, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীভূত সংগঠন সেই সময়কার। আজ সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনগুলিকে অবশ্যই একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ–বিকশিত করতে হবে এবং সেটিকে গতিশীল করতে হবে। ভিন্নভাবে রাজনীতি করা মানে গণতন্ত্রকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুশীলন করা, সহযোগিতার তাগিদে বেতনভুক্ত পদের জন্য অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ত্যাগ করা। যাইহোক, এই ঐতিহাসিক করণীয়–এর মুখোমুখি হয়ে, পিপলস ইকোলজি বা জনস্বার্থে প্রাণ–প্রকৃতি আন্দোলন রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিস্তারের একটি ফোরাম, সংগ্রামে নিয়োজিত সামাজিক শক্তিকে একত্রিত করার ক্ষমতা এবং সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ এবং জননীতি হিসাবে তাদের প্রস্তাব রাখার ক্ষমতা ছাড়া বিকশিত হতে পারে না। যে আন্দোলন এই ভূমিকা গ্রহণ করে তাকে অবশ্যই ভ্যানগার্ডের সেকেলে সাংগঠনিক প্যাটার্নকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে, একটি পূর্ব–নির্ধারিত ব্যবস্থা হিসাবে আলাদা আলাদাভাবে বিকশিত একটি কর্মসূচিসহ। তাই এটিকে প্রাণ–প্রকৃতিমূলক আন্দোলনের মধ্যে একটি স্বাধীন প্রবণতা হিসাবে নিজেকে সংগঠিত করতে হবে।

    শিল্পী: আরতুরো এসেনশিয়ো

    একটি পলিটিক্যাল কোঅপারেটিভ (রাজনৈতিক সমবায়) গঠনের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা…পার্টি গঠনের বিষয়ে বায়না ছিল, যা ২১ শতকে অপ্রচলিত হয়ে পড়েছে। যাদেরকে যোগ্য বলা হয় এবং যারা নয় তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক অভিনেতা/থিয়েটারকর্মী এবং ইউনিয়ন সংগ্রামীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, যা শিল্প বিপ্লবের রাজনীতির অন্তর্গত, যেখানে লোকায়ত শ্রেণীগুলি কাজ সম্পাদনে সংকুচিত হয়েছে। বস্তুত, সমগ্র দল এবং সমাজের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার জন্য, এটি একটি ছোট গোষ্ঠীর আধিপত্যকে খারিজ করেছিল, যা অন্যদের উপর আরোপিত হয়েছিল। এই ধরনের সংগঠনের প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হয়েছে। সোজাসুজিভাবে নেটওয়ার্কের সাবালকত্বের অভিমুখে উপযুক্ত একটি পার্টি ফর্ম উদ্ভাবন করা পিপলস ইকোলজির কাজ।

    ২১) পিপলস ইকোলজি গোষ্ঠীকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের বিন্যাসকে সমর্থন করে। শুধু স্বাধীন মত প্রকাশের ভিত্তিতে পিপলস ইকোলজি বিকল্প গড়ে তুলতে পারে না। সকল স্তরের মানুষের গভীর সম্পৃক্ততা ছাড়া গণতন্ত্র আজ অস্তিমান থাকতে পারে না; অন্যথায় এটি একটি প্রকৃত আদমশুমারি হয়ে যায়। মিডিয়া, বিজ্ঞাপনের অপপ্রচার এবং ভোটদানকে পুঁজি করে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কণ্ঠনিষ্পেষণ করা হয়েছে এবং এটি তার নিজস্ব শর্তে গণতান্ত্রিক বিতর্কের আয়োজন করে। যে নাগরিকরা রাজনীতি পুনরুদ্ধার করতে চান তাদের অবশ্যই নীচ থেকে তা করতে হবে, সামাজিক রূপান্তরে নিযুক্ত স্থানীয় সম্প্রদায়গুলির দ্বারা তৈরি ক্রান্তিকালীন উদ্যোগগুলিকে ফেডারেশনের মাধ্যমে শুরু করে এবং পিপলস ইকোলজির মূল্যবোধগুলি গ্রহণ করে, যেমন: স্বশাসন, সমতা, মর্যাদা এবং পারস্পরিক সহায়তা।

    পিপলস ইকোলজি রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের তালাস করতে চায় না কিন্তু সমাজকে নীচে থেকে পরিবর্তন করতে চায় যখন একই সাথে প্রবর্তন, প্রতিরোধ এবং সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার পথ ব্যবহার করে। এই কৌশলটি দ্বারা নিচ থেকে স্বশাসনের অনুশীলন বোঝায়, যা ফেডারেল এবং স্ব–ব্যবস্থাপনা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি আজও সামাজিক আন্দোলনে অব্যাহত রয়েছে যা রাষ্ট্রীয় শক্তিকে সম্মুখভাবে আক্রমণ না করে স্থানগুলিকে মুক্ত করতে চায়। এটি রাষ্ট্রের প্রশ্নটিকে তার চিন্তাভাবনা থেকে বাদ দেয় না, তবে এটি বিবেচনা করে যে উত্তরণঅবস্থাটি স্ব–শাসনের একটি ব্যবস্থার জন্ম দেবে যেখানে নাগরিকরা পৌরসভা, অঞ্চল এবং কোম্পানিগুলিতে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করবে। রাজনৈতিক সংগঠনকে অবশ্যই এই স্ব–শাসনের অনুশীলনগুলি বাস্তবায়নে এবং তাদেরকে আগের অবস্থায় রাখা ছাড়াই সাহায্য করতে হবে।

    গোষ্ঠীকেন্দ্রিক গণতন্ত্র সর্বস্তরে একটি ফেডারেশনমূলক (ফেডারেটিভ) প্রজাতন্ত্র গঠনের পূর্ব–ধারনা করে। ফেডারেলিস্ট নীতি ইউরোপীয় মহাদেশ বা বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রযোজ্য হবে না যদি না এটি জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রযোজ্য হয়।

    রাজনৈতিক জোটের বিষয়ে, পিপলস ইকোলজি মনে করে যে সামাজিক রূপান্তরের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ জোটের অংশগ্রহণ হলো পরিবেশবিদদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার উপায়। পরন্ত যে দেশে সামাজিক উদারতাবাদ সামাজিক গণতন্ত্রের ভিত্তিকে ধ্বংস করেছে, তা সমাজ বিরোধীতা এবং পরিবেশ বিরোধীতার দলভুক্ত হয়। সামাজিক উদারনৈতিক সরকারের অংশগ্রহণ পিপলস ইকোলজিকে কোনঠাসা করে এবং এটিকে সবুজ পুঁজিবাদের এজেন্ট করে তোলে। আমাদের অবশ্যই একটি সামাজিক এবং পরিবেশগত বিরোধী দল গঠনে অংশগ্রহণ করতে হবে, সমস্ত স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং ইউরোপীয় নির্বাচনে পরিবেশবিদদের উপস্থিতি জোরদার করতে হবে যেখানে স্বায়ত্তশাসন তৈরি করা যেতে পারে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে, কিন্তু সামাজিক–উদারনৈতিক সরকারগুলোতে অংশগ্রহণ প্রত্যাখান করতে হবে যেটি পুঁজিবাদী আধুনিকতার সবথেকে কার্যকর উপকরণ।

    অনুবাদকের টীকা:

    ১) ভিয়া ক্যাম্পেসিনা: লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা হলো একটি আন্তর্জাতিক কৃষক সংগঠন যা ১৯৯৩ সালে বেলজিয়ামের মন্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা ৮১ টি দেশে ১৮২টি সংস্থা দ্বারা গঠিত। যা এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা এবং ইউরোপের ক্ষুদ্র ও মধ্যম মানের উৎপাদক, কৃষি শ্রমিক, গ্রামীণ নারী এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের কৃষক সংগঠনগুলির সমন্বয় সাধন করে। ভায়া ক্যাম্পেসিনা পরিবার–খামার–ভিত্তিক টেকসই কৃষির পক্ষে কাজ করে, এবং সেই দলটি “খাদ্য সার্বভৌমত্ব” শব্দটি সামনে এনেছিল। লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা কৃষকদের বীজের অধিকার রক্ষায়, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে, কৃষি সংস্কারের জন্য এবং সাধারণত কৃষকদের অধিকারের জন্য প্রচারণা চালায়।

    ২) ফোর্ডিজম: ফোর্ডিজম হলো বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হেনরি ফোর্ড দ্বারা পরিচালিত বৃহৎ আকারের উৎপাদন পদ্ধতি। এটি ব্যাপক উৎপাদন ও ভোগের আধুনিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার বর্ণনা দেয়।

    ৩) NIMBY- NIMBY, “not in my back yard” শব্দগুচ্ছের সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রচলিত অর্থে নিম্বি হলো বাসিন্দাদের কর্তৃক তাদের স্থানীয় এলাকায় প্রস্তাবিত উন্নয়নের বিরোধিতার বৈশিষ্ট্য, সেইসাথে কঠোর ভূমি ব্যবহার বিধিগুলির সমর্থনকারী। সেঅর্থে এটি এই অর্থ বহন করে যে এই ধরনের বাসিন্দারা শুধুমাত্র উন্নয়নের বিরোধিতা করছে কারণ এটি তাদের কাছাকাছি এবং যদি এটি দূরে নির্মিত হয় তবে তারা এটি সহ্য করবে বা সমর্থন করবে। বাসিন্দাদের প্রায়ই নিম্বি বলা হয়, এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বলা হয় নিম্বিজম।

    ৪) কার্ল মার্কস তার কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার (রচনাকাল: নভেম্বর, ১৮৪৭–জানুয়ারি ১৮৪৮)–এর ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বলছেন, “গত ২৫ বছরে আধুনিক যন্ত্রপাতি যে বিপুল পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে, তাতে যে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তার ফলে….কিছু ব্যাপার সেকেলে হয়ে পড়েছে।” দ্য ক্যাপিটাল –এর তৃতীয় খণ্ড (রচনাকাল: ১৮৬৩–১৮৮৩) লিখতে গিয়ে মার্কস বলছেন, “বিশ্ব পরিবেশের ক্ষতিসাধন–সমস্যার একমাত্র প্রকৃত অর্থাৎ টেকসই সমাধান পাওয়া যাবে “যৌথ উৎপাদকের” সেই সমাজব্যবস্থায় যেখানে উৎপাদকেরা মানুষের বিপাক ক্রিয়াকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্তিশীল পন্থায় পরিচালিত করতে পারবে; প্রাকৃতিক শক্তিকে কেবল এক অন্ধ শক্তি রূপে কর্তৃত্ব করতে না দিয়ে, এক যৌথ বা সমষ্টিগত নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসবে। এর ফলে ন্যুনতম পরিমাণ শক্তি ব্যয়িত হবে এবং এমনভাবে ব্যবহৃত হবে যা মানবপ্রকৃতির যোগ্য ও উপযুক্ত।”

    ৫) অ্যামিয়েন্স সনদ: অ্যামিয়েন্সের সনদ (ফরাসি: Charte d’Amiens) ফরাসি ট্রেড–ইউনিয়নের নবম কংগ্রেসে গৃহীত হয়েছিল, যা ১৯০৬ সালের অক্টোবরে অ্যামিয়েন্সে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রধান প্রস্তাব ছিল ইউনিয়ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিচ্ছেদ। কনফেডারেশনে তখন অ্যানার্কো–সিন্ডিক্যালিস্টদের (অরাজক শ্রমিকতন্ত্রী) আধিপত্য ছিল যারা নির্বাচনী পথের মধ্য দিয়ে মধ্যপন্থী সংস্কারের পরিবর্তে শ্রমিক ইউনিয়নগুলির বিস্তৃতির মাধ্যমে একটি বিকল্প ব্যবস্থার সংবিধানকে পছন্দ করেছিল।

  • বাকস্বাধীনতার ফজিলত ও বাংলাদেশের হালচাল

    বাকস্বাধীনতার ফজিলত ও বাংলাদেশের হালচাল

    • সহুল আহমদ

    বাকস্বাধীনতা মানে যে কোন বাক্যের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একটি ব্যবস্থাই নেয়া যেতে পারে: আরেকটা বাক্য, লাগলে আরো একশ-হাজার বাক্য। বাকস্বাধীনতা মানে মানুষের লিখিত বা উচ্চারিত কোন বাক্যের বিরুদ্ধেই বাক্য ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাক্যের বিরুদ্ধে বাক্য ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম ফ্যাসিবাদ।

    – বখতিয়ার আহমেদ, ফেসবুক, ১৬ জুন ২০২০

     

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বেহাল দশার খবর বহু আগেই দুনিয়াজুড়ে রটে গিয়েছে, করোনাকালে এর এক তীব্র রূপ আমরা প্রত্যক্ষ্য করেছি এবং কার্যত এখনো করছি। তবুও এখানে বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কে নানাবিধ সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। যেমন, বাক স্বাধীনতা পেলে মানুষ গালাগালি করবে, অশালীন বক্তব্য দিবে। বাকস্বাধীনতা থাকলে ইতিহাস বিকৃতি করবে। ‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’দের জন্য দরকার ‘সীমিত ও শর্তায়িত’ বাক ও মতের স্বাধীনতা। ফলে অনেকেই ‘শালীন’ ও ‘সংযত’ ভাষা ব্যবহারের নীতিমালাও দেখিয়ে থাকেন। এই প্রবণতা এতই প্রবল যে, রাষ্ট্রের সবচাইতে ‘মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ স্থান হওয়ার কথা যে বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলের তাতেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। এই স্বাধীনতাকে খর্ব করার যত আইন করা হয় তার কারণ হিসেবে জনপ্রিয় চালু-মত হচ্ছে, মানুষ মূলত খারাপ, অফুরন্ত স্বাধীনতা পেলে সে যা ইচ্ছা তাই করবে। কিন্তু বাস্তবে ইতিহাস আমাদেরকে দেখায় যে, এমন আইন কেবল তাদের উপর প্রয়োগ করা হয় যারা মূলত বিভিন্নভাবে (লেখা-গান-কবিতা-ছবি-ব্যঙ্গোক্তি-কৌতুক ইত্যাদি) ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

    এমন পরিস্থিতিতে আলোচ্য প্রবন্ধে বাকস্বাধীনতার দুয়েকটা ফজিলত তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। তবে শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আলোচ্য ‘ফজিলত’গুলো মোটেও নতুন কোনো বিষয় নয়, বহুদিন-বহুবছর যাবত চিন্তার বাজারে চালু থাকা মত। সম্ভবত জনপ্রিয়ও বটে। বাংলাদেশের বিদ্যমান নাজুক আবহাওয়াই এমন চালু মতকে হাজির করতে প্রণোদনা দিচ্ছে।

    অন লিবার্টি: একটি ধ্রুপদী পাঠ

    বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কিত আলাপে সবচেয়ে ধ্রুপদী রচনা হচ্ছে স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’।১ কথা বলা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে লিখিত এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে।  ধ্রুপসী পাঠ হিসেবে তা এখনো কেবল স্মরণীয়ই নয়, কার্যত বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার যে কোনো আলাপে-তর্কে মিলের সেই পাঠ এখনো হাজিরা দেয়। মিল উপযোগবাদী, ফলে তিনি যখন কথা বলার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তখনও মূল জিজ্ঞাসা ছিল এর উপযোগিতা কি? কেন কথা বলার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার দরকার? মত প্রকাশে বাধা দিলে, তা রাষ্ট্র কর্তৃক হোক বা সমাজ কর্তৃকই হোক, এতে ক্ষতি কি?

    বাকস্বাধীনতা প্রশ্নে মিলের চিন্তার একেবারে দুটো গোড়ার জায়গা আছে। প্রথমত, সত্য জানা লাগবে, এবং দ্বিতীয়ত, সত্য সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত না। শতভাগ অভ্রান্ততা কেউ দিতে পারবেন না, এমনকি যিনি শতভাগ নিশ্চয়তার দাবি করেন তিনি সেটা নাও হতে পারেন। মিল স্থান কালের বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিগত কালের অনেক ‘অভ্রান্ত’ সত্য বলে প্রতীয়মান কথা এইকালে এসে স্রেফ উড়ে গিয়েছে। এর ভ্রান্ততা নিয়ে এখন আর কেউ কোনো কথাই বলেন না। স্থানের বেলাতেও একই; কপালের ফেরে আরবদেশে জন্ম নেয়া ব্যক্তি আল্লা নিয়ে যে ‘অভ্রান্ত’ ধারণা, চীন দেশে জন্ম নেয়া কনফুসিয়াসবাদী ব্যক্তির সেটা আলাদা। ফলে, শতভাগ সত্যবচন বলে কিছু নেই, আজ যিনি দাবি করছেন তার বচন অভ্রান্ত, কয়েকযুগ পর সেটা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে। এটাই ইতিহাসপ্রাপ্ত শিক্ষা।

    মিলের কাছে ‘সত্য’ জানা জরুরি, এই জরুরতের কারণে তিনি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। স্বাধীনতা পেয়ে সত্য-মিথ্যা দুটোই মানুষ বলতে পারে। সত্য বা মিথ্যে দুটো বলার স্বাধীনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বাধীনতা যদি না থাকে তাহলে দুটো ঘটনা ঘটতে পারে। এক, যে আলাপটাকে রুদ্ধ করা হচ্ছে সেই আলাপ যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমরা খোদ সত্য থেকেই বঞ্চিত হবো। দুই, আলাপটা যদি মিথ্যে হয়ে থাকে তাহলে এই মিথ্যের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সত্যের আরো স্পষ্ট ও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হবে। ফলে দুটোই মিলের কাছে সমান জরুরি। সত্য হোক মিথ্যে হোক কোনো অবস্থাকেই বাকস্বাধীনতাকে বাধা দেয়া চলবে না। বাধা দিলে দিনশেষে ‘সত্য’প্রাপ্তি থেকেই আমরা বঞ্চিত হবো। ফলে মিল বলেন, যদি একজন ব্যতীত দুনিয়ার সকল মানুষও একটা মতের দিকে যান, তাহলে এই একজনের যেমন অন্যদের মতকে দমন করার এখতিয়ার নেই, তেমনি বাকিসকলের এখতিয়ার নেই সেই একজনের মতকে দমন করার।

    অন লিবার্টি গ্রন্থের ১৮৫৯ সালের প্রথম সংস্করণ

    মিলের যুক্তি হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা চিন্তার আদান-প্রদানের বাজার যদি মুক্ত-স্বাধীন হয়ে থাকে তাহলে এটি যে কোনো বিষয়ে সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ ফল এনে দিতে পারে। ভুল-ত্রুটিকে কমিয়ে ‘সঠিক’ পথ বাতলাতে সাহায্য করবে। এমন জীবন্ত আলাপ-আলোচনার পরিসর বজায় রাখার পক্ষে এবং যে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করার পিছনে মিলের চারটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, নিষিদ্ধ মতটি সত্য হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এমনকি যদি সেই মতটি মিথ্যেও হয়ে থাকে, এতে কিছুটা সত্য থাকতেও পারে। তৃতীয়ত, যদি একেবারেই মিথ্যে হয়ে থাকে, তবুও এই নিষিদ্ধ মতটি সত্যকে ‘ডগমা’ হয়ে উঠা থেকে বিরত রাখতে পারবে। এবং চতুর্থত, ডগমা হিসেবে যে কোনো ‘আনচ্যলেঞ্জড’ মত তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। মিল বলেন, এমনকি আমি যদি আমার মতের সত্যতা বা সঠিকতা নিয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসীও থাকি এবং পুরদোমে বিশ্বাস করি যে এটাই ঠিক, তবু এটা স্বাধীনভাবে খোলা ময়দানে আলোচিত না হলে দিনশেষে একটা মৃত মতবাদ বা ডগমাতেই পর্যবসিত হবে। যে কোনো মত যদি নিয়মিত প্রশ্ন ও তর্কের সম্মুখীন না হয় তাহলে মিলের কথা অনুযায়ী সেটা তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ মতেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাবে, যা কিনা মানবজাতির জন্যই হুমকিস্বরূপ।

    স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের বহু সমালোচনাও আছে, বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদের সমর্থক হিসেবে। আমরা সেদিকে যাবো না। আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনার খাতিরে ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলাপেই সীমাবদ্ধ থাকবো। মিলের উপরোক্ত আলোচনা সংক্রান্ত একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৯৪ সালে হলোকাস্ট গবেষক ও ইতিহাসবিদ দেবোরা লিপস্টাড তাঁর বইতে আরেক ইতিহাসবিদ ডেভিড আরভিংকে ‘হলোকাস্ট অস্বীকারকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আরভিং মানহানির মামলা করলে লিপস্টাডকে প্রমাণ করতে হয় যে তাঁর বক্তব্য সঠিক। মানে, আরভিং হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের বহু সাক্ষ্য-প্রমাণাদি দিয়ে লিপস্টাড প্রমাণ করেন যে, আরভিং ইতিহাস বিকৃতি করেছেন। এখানে, আরভিং একাডেমিক পদ্ধতিতে লিপস্টাডের সাথে তর্ক-বিতর্ক না করে সরাসরি আইনের আশ্রয় নেন তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য। এই মামলার একটা বড় পার্শ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলা হয়, হলোকাস্ট গবেষকরা তাদের গবেষণা আরো বিস্তৃত করেছিলেন, যেটা অনেকক্ষেত্রে পূর্বে হয়নি। আবার, উল্টো আরেকটি ঘটনা ঘটে। অস্ট্রিয়াতে হলোকাস্ট ডিনায়েল আইন আছে। ফলে ২০০৬ সালে যখন আরভিং ভিয়েনা যান তখন সেই আইনের অধীনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় আরভিং নিজেকে একধরনের ‘বাকস্বাধীনতার শহিদ’ হিসেবে হাজির করেন। এই দুটো ঘটনাই মিলের উপরোক্ত যুক্তির একটা বাস্তবতা হাজির করে। আরভিং এর বক্তব্য নির্জলা মিথ্যে হওয়া সত্ত্বেও লন্ডনের খোলামেলা তর্কবিতর্ক ‘সত্য’ উদঘাটন করতে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার আইন তাকে এক ধরনের নায়করূপ দেয়।২

    বাকস্বাধীনতা, নাকি রাষ্ট্রের হাতে ‘সত্য-মিথ্যা’ নির্ধারণের ভার 

    ১৯৭৮-১৯৭৯ এর দিকে রবার্ট ফুরিসন নামক এক ফরাসী অধ্যাপক তাঁর লেখায় এবং টিভি সাক্ষাতকারে হলোকাস্ট অস্বীকার করেন, বিশেষ করে নাৎসী বাহিনীর গ্যাস চেম্বারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তিনি কয়েক স্থানে আক্রমণেরও শিকার হোন। তখন নোয়াম চমস্কি সহ প্রায় ৬০০ জন বুদ্ধিজীবী একটি খোলা চিঠিতে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তারা ফুরিসনের বাকস্বাধীনতার এবং মত প্রকাশের অধিকার পক্ষে দাড়ান, এবং তাকে নিরব করিয়ে দেয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ জানান। এই খোলা চিঠি ফ্রান্সে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করে। তখন অনেকের অনুরোধে চমস্কি আরেকটি নিবন্ধ লিখেন, যেখানে বাকস্বাধীনতা নিয়ে একেবারে ‘এলিমেন্টারি’ কিছু কথাবার্তা বলেন। যে কেউ চাইলে তাঁর এই নিবন্ধ ব্যবহার করতে পারবেন, এই অনুমতি চমস্কি দেন।

    ১৯৮০ সালের দিকে যখন ফুরিসনের এই সংক্রান্ত বই প্রকাশিত হয় তখন চমস্কি লিখিত এই নিবন্ধ ‘মুখবন্ধ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু চমস্কি এটা জানতেন না। পরে জানার পর তিনি এটা সরানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কেননা এতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে যায়, বই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চমস্কি বলেছিলেন, লেখা সরানোর অনুরোধ করাটা তার ঠিক হয় নি।

    এই ঘটনার পর চমস্কিকে ঘিরে আরো বেশি বিতর্কের ঢেউ উঠে। চমস্কির বিভিন্ন সেমিনার-বক্তৃতায় ঘুরেফিরে এই প্রসঙ্গ হাজির হতো, দর্শক-শ্রোতার কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। আগ্রহী পাঠক চমস্কি ও ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন। চমস্কিও বিভিন্ন সময়ে এই ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, মন্তব্য করেছেন।

    চমস্কির অবস্থান কি ছিল? চমস্কির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, হলোকাস্ট অস্বীকারকারীকে সমর্থন করার মাধ্যমে তিনিও হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। চমস্কি তার বিভিন্ন লেখা বা বক্তৃতায় দুটো বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। প্রথমত, কারো বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো মানে তার মতের পক্ষে দাঁড়ানো না, বা তার মতকে সমর্থন করাও না। আমি কারো মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিলাম, তার মানে এই নয় যে, আমি তার মতকে সমর্থন করি। তার প্রকাশিত মতকে সমর্থন না করেও আমি তার মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ জারি রাখতে পারি। রোজা লুক্সেমবার্গ যেমন করে বলেছিলেন, বাকস্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে আসলে ভিন্নমতাবলম্বীর বাকস্বাধীনতা।

    চমস্কি যে কেবল এই প্রথম এমন ‘বিতর্কিত’ অবস্থান নিয়েছেন, তা না। তিনি এর পূর্বে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধীদের একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণা করার স্বাধীনতা, সেই গবেষনার ফল প্রকাশ করার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থানকে অনেকেই ‘absolutist’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু, চমস্কি তার এই অবস্থান থেকে কখনোই সরে দাড়ান নি। হাল আমলে ক্যান্সেল কালচার নিয়ে চমস্কির অবস্থানও সমান বিতর্কের মধ্যে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে, বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থান মোটেও নতুন কিছু নয়। চমস্কির বারবার ভলতেয়ারকে উদ্ধৃত করেছেন, আমি তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জান দিতে পারি।

    দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, চমস্কি ফুরিসনের ঘটনাকে দেখছেন ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হিসেবে। তার মতে, বোধহয় এই প্রথম পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্ট্যালিনবাদী ও নাৎসীবাদী মতাদর্শ মেনে নিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রই ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করে দিবে এবং এর থেকে বিচ্যুতি ঘটলে শাস্তি দিবে, এই আদর্শ মেনে নিল। তিনি বলেন, হলোকাস্টের শহিদদের আত্মার প্রতি সবচেয়ে বড়ো বেইমানি হচ্ছে এটাই যে, তাদের খুনীদের মতাদর্শকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।৩

    উন্নয়নেও বাকস্বাধীনতা

    উন্নয়ন প্রশ্নটা আমাদের রাষ্ট্রে খুবই জরুরি ‘প্রসঙ্গ’; এতই জরুরি যে, যে রাষ্ট্র ক্রমাগত গণআন্দোলন ও জনযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে, যে রাষ্ট্রের জন্ম প্রক্রিয়াতে ‘গণতন্ত্র’ সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ও স্পষ্ট ছিল, সেই রাষ্ট্রে হঠাৎ করে খোদ ‘গণতন্ত্র’ই উন্নয়নের জন্য ‘উটকো ঝামেলা’ হিসেবে হাজির হয়েছে। তাই, ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ এমন ডিসকোর্স শক্তিশালী হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু, যুক্তির খাতিরে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও এই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যাবশ্যকীয়; এটা আমার কথা নয়, অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের কথা।৪ উল্লেখ্য, অর্মত্য সেন যে জরুরি কাজটা করেছেন সেটা হচ্ছে, ‘উন্নয়ন’ নামক ধারণার সঙ্গে নীতি/ন্যায়ের একটা সম্পর্ক, তথা উন্নয়ের একটি ‘নৈতিক’ আবেদন তৈরি করেছিলেন।   

    উনিশ শতকে দুনিয়াজুড়ে খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল কোন কোন দেশ ‘গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত’ আর কোন কোন দেশ অনপযুক্ত তা নিয়ে আলাপ করা। এই বিশ শতকে এসে দেখা গেলো, খোদ এই প্রশ্নটাই সমস্যা-জর্জরিত, এবং ভুল। জনগণ গণতন্ত্রের জন্য ‘ফিট’ কি না এটা কোনো প্রশ্নই হতে পারে না, বরঞ্চ গণতন্ত্রের মাধ্যমেই জনগণকে ‘ফিট’ করে তুলতে হয়। ফলে, অর্মত্য সেনের কাছে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বোধের সার্বজনীনতা সাম্প্রতিক প্রপঞ্চ। তার মূল জিজ্ঞাসা হচ্ছে এই গণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতার বোধ কীভাবে উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে?

    ২০০১ সালে অর্মত্য সেন এক বক্তৃতায় মিডিয়া কেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন। নির্দিষ্টভাবে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করলেও আমরা এটাকে সার্বিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে পাঠ করতে পারি।

    অর্মত্য সেন শুরুতে বলে নেন যে, বাক-স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে মানব স্বাধীনতারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই যে অপরের সাথে কথা বলতে পারা, অপরের কথা শুনতে পারার সক্ষমতা, এটি হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের মূল্যবান হওয়ার কেন্দ্রীয় কারণ। যেমন করে মনিষী এরিস্টটল বলে গিয়েছিলেন, আমরা সামাজিকভাবে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল বা ইন্টারেক্টিভ প্রাণী; জীবনের পূর্ণতার জন্যই ঘর ও বাইরের মানুষদের সাথে পারষ্পরিক সহযোগীতা, আলাপ-আলোচনা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কথা বলা তাই মানব জীবনেরই একটা অংশ, এবং বাক-স্বাধীনতা তাই মানব স্বাধীনতারই একটি মৌলিক অঙ্গ।

    অর্মত্য সেনের মতে, উন্নয়নের জন্য চারটি কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কারণ হচ্ছে কথা বলা এবং যোগাযোগের সহজাত গুণের সাথে এই স্বাধীনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উন্নয়নকে কেবল জিডপি বা জিএনপি ইত্যাদি দিয়ে মাপা যাবে না, বরং দেখতে হবে দায়িত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সেটা করার স্বাধীনতা তার আছে কি না। উন্নয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটার উপকারিতা নির্ভর করে উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার হালচালের উপর। তার কাছে স্বাধীনতা উন্নয়নের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত বা বাকস্বাধীনতার দমন সরাসরি মানব স্বাধীনতাকেই হ্রাস করে, এবং উন্নয়নকেই দুর্বল করে দেয়।

    দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম তথ্যের যোগান দেয়, যা সমাজে বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা ছড়িয়ে দিতে এবং পর্যালোচনামূলক কাজকারবারে উৎসাহ দেয়। তার মতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষাকবচ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তাতেও ভূমিকা রাখে। অর্মত্য সেন ব্যাখ্যা দিয়ে দেখান যে, ১৯৫৮-৬১ সালের চীনের দূর্ভিক্ষের একটা বড়ো কারণ ছিল সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকা। সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীন ভাবে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে হয়তোবা এই দুর্ভিক্ষ এড়ানো যেতো। তিনি বলেন, কর্তৃত্বমূলক সরকারব্যবস্থা সেন্সরশিপের কারণে যে বিরাটসংখ্যক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তা আসলে খোদ সেই সরকারকেই দিনশেষে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না থাকলে কেবল জনগণই অন্ধকারে থাকে না, খোদ সরকারও অন্ধকারে থাকে।

    ছবি: মিডিয়া কনট্রোল
    শিল্পী: আলফ্রেডো গারজন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তৃতীয় কারণটা হচ্ছে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের ‘প্রটেক্টিভ’ ভূমিকা’; সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জনগোষ্ঠীর অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং সুবিধাবঞ্চিত অংশের জবান উঠে আসতে পারে, যা সামাজিক নিরাপত্তাকেই মজবুত করে। বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের ইতিহাস থেকে অর্মত্য সেন দেখিয়েছেন, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে দুর্ভিক্ষের আশংকা বেড়ে যায়। কারণ, সেন্সরশিপ একদিকে সঠিক তথ্য তুলে আনতে বাধা প্রদান করে, অন্যদিকে সরকারি সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে আলাপ-আলোচনাও রুদ্ধ করে দেয়।

    অর্মত্য সেনের কাছে চতুর্থ কারণ হচ্ছে এর ‘গঠনমূলক’ ভূমিকা; মুক্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক সমাজে বিভিন ধ্যান-ধারণার উদ্ভব ঘটাতে, মূল্যবোধ গঠনে এবং জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার সহজলভ্য হয়। কোথায় কোথায় আমাদের অভাব রয়েছে, আমাদের অসুবিধে রয়েছে, এর থেকে উত্তরণের উপায় কি, এসব নিয়ে বোঝাপড়া তৈরির জন্য আলাপ-আলোচনার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা জরুরি।

    বাকস্বাধীনতা: এশীয় মূল্যবোধ?

    মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ‘এশীয় মূল্যবোধ’ বা Asian Values এর দোহাই দিয়ে অনেকেই মানবাধিকারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ করেন; বিভিন্নভাবে বলা হয় মানবাধিকার, বিশেষত মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার প্রতি এশীয়মূল্যবোধ সমর্থন জোগায় না।

    এশীয় মূল্যবোধগুলো কি? সামষ্টিকতা বা কালেক্টিভিজম, আদর্শ মেনে চলা, আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক স্বীকৃতির জন্য অর্জন, নম্রতা, পিতারমাতার প্রতি ভক্তি, কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি। যেমন, ‘ব্যক্তির মঙ্গলের চেয়ে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে’, ‘কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো’, ‘যাই ঘটুক না কেন, একজন পুত্র বা কন্যা হিসেবে পিতা-মাতার কথা অবশ্যই মানতে হবে’ ইত্যাদি বহু বিবৃতি এশীয়মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

    মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ব্যাপারে এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে দুইভাবে সমালোচনা হতে থাকে। একপক্ষ দাবি করেন যে, এগুলো এশীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় অথবা এর সঙ্গে মাননসই নয়। এশীয় সংস্কৃতিতে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হলো পরিবার, ব্যক্তি নয়। দ্বিতীয় পক্ষের সমালোচনা অন্যরকম, তারা দাবি করেন, এশীয়সংস্কৃতি মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের জন্য এখনো ‘প্রস্তুত’ নয়। এখানে উন্নয়ন আগে ঘটাতে হবে; অর্থনৈতিক উন্নয়নের অধিকার মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও প্রায় সমান গুরুত্বই বহন করে।

    এসবের বিপরীতেও প্রচুর যুক্তি দেয়া হয়েছে। এশিয়া কোনো সমগোত্রীয় ভৌগলিক সত্তা নয়। ফলে পুরো অঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধের সুতোয় বাঁধা যাবে না। ‘এশীয় মূল্যবোধ’ তত্ত্ব বহনকারীদের বিপক্ষে আরেকটা ‘রাজনৈতিক’ যুক্তিও হাজির করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণেই এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দেয়া হচ্ছে; মূলত স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা দেয়ার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, এশীয় মূল্যবোধ গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক তো নয়ই, বরঞ্চ পরিপূরক।

    সময় পাল্টেছে, এখন মত প্রকাশের একটা বড়ো ময়দান হচ্ছে ইন্টারনেট। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন আরও বৃদ্ধি করে। ইন্টারনেটের ব্যবহার গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে। তো, এই সময়ে (মানে ইন্টারনেটের জমানায়) এসে প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ পর্যায়ে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে এশীয় মূল্যবোধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ফেই শেন ও লুকমান সুই তাদের গবেষণা চালান।৫ এগারোটা দেশে (উল্লেখ্য এখানে বাংলাদেশ নেই, ভারত-পাকিস্তান আছে) ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়। তিনটা দিক থেকে তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পরিমাপ করেছেন: ব্যক্তিগত বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা।

    ফেই শেন ও লোকমান সুই যে তথ্য-উপাত্ত পান তাতে দেখা যায়, বেশির ভাগ এশীয় দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাক ও ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা চেয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমের প্রশ্নে বৈচিত্রপূর্ণ মতামত পাওয়া গিয়েছে। তবে, সব বিষয়ে পাকিস্তান সম্পূর্ণ চিত্র থেকে আলাদা থেকেছে। গবেষকদ্বয় তাদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন, সামাজিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রায় এশীয় মূল্যবোধ থাকার সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি কম সমর্থনের কোনো প্রমাণ নেই। ব্যক্তি পর্যায়েও দেখা যায়, এশীয় মূল্যবোধের সাথে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কোনো নেতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

    তার মানে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌছাচ্ছেন, এশীয় মূল্যবোধ থাকা মানেই এই নয় যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কম থাকবে। তাদের ভাষায়, ‘এশীয় মূল্যবোধ থিসিসকে বাতিল করে দেয়ার মতো যত প্রমাণ পাই, তার সমর্থনে তত প্রমাণ পাইনি।’ যদিও তারা যে কয়টা এশীয়মূল্যবোধের মাত্রা ব্যবহার করেছেন তার দুইটার সাথে (আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য) মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও বাকিগুলোর সাথে এই সম্পর্ক ইতিবাচক। বলছেন, ‘কিছু এশীয় মূল্যবোধ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থনকে দমন করে; কিন্তু অন্যান্য এশীয় মূল্যবোধ বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনের সমতুল্য’।

    তাদের ফলাফলে আরো দেখা যায় যে, ইন্টারনেটের ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়াটা একটি মুক্তিকামী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করে। যেসব মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তারা মুক্তবাকের প্রতি বেশি ঝোঁকে; যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশি, সেখানে বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনও বেশি।

    গবেষকদ্বয়ের মূল কথা হচ্ছে, কেউ ‘এশীয় মূল্যবোধ’ ধারণ করলেই যে সে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতি সমর্থন কম দিবে বিষয়টা এমন নয়। বরঞ্চ ‘ব্যক্তি অধিকারের ধারণার সঙ্গে প্রথাগত এশীয় মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই।’

    বাংলাদেশ: দৌড় শুরু করতে হবে অনেক পিছন থেকে 

    যে ডিসক্লেইমার শুরুতেই দেয়া দরকার ছিল, সেটা এখন দেই। বাকস্বাধীনতাকে মানবীয় কর্তাসত্তার সাথে মিলিয়ে পাঠ করার রেওয়াজ আছে; ফরহাদ মজহার৬, বখতিয়ার আহমেদ৭ এ নিয়ে লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। কথা বলার স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অধিকারই নয়, আমাদের মানবীয়তারও অংশ। বন্ধু সারোয়ার তুষারও সম্প্রতি কয়েকটা লেখাতে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মানুষের মানবীয়তার সাথে সম্পর্কিত করে বোঝার কমনসেন্স তৈরি উপর জোরারোপ করেছেন।৮ সঙ্গত কারণেই আলোচ্য প্রবন্ধে এই বিষয়টি উল্লেখিত হয় নি, বরঞ্চ কেবল বাকস্বাধীনতার উপকারিতা বা উপযোগীতার দিকেই নজর দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিখ্যাতজনের বরাত দিয়ে।

    বাংলাদেশে তাহলে আমাদের হালচাল কেমন? বাংলাদেশে আসলে আমাদের এই দৌড়টা অনেক পিছন থেকে শুরু করতে হবে। কারণ, উপরে যে বাকস্বাধীনতার ফজিলত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেই ‘বাকস্বাধীনতা’ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক বিভিন্ন সমাজে আছে। প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী নতুন নতুন তর্ক-বিতর্ক হাজির করছে। সময়ের সাথে সাথেও এর নানান মাত্রা দিয়ে আলাপ হয়েছে, হচ্ছে। যেমন, সত্তরের দশকে ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ নামে একটা আন্দোলন হয়েছিল। মানে ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী মত প্রকাশকারীদের জন্য প্লাটফর্ম দেয়া হবে না। কেউ কেউ একে বাকস্বাধীনতা হরণ বলে অভিহিত করলেও অনেকে বলেছেন, কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে কথা বলার সুযোগ না দেয়া মানেই যে কারো কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া তা কিন্তু না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এই যে মঞ্চ না দেয়া বা ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ একধরনের নিরব ও পরোক্ষ সেন্সরশীপ চালু করতে পারে। সমাজে এই ধরনের তর্ক-বিতর্ক জারি থাকা সজীবতার লক্ষণ। নাগরিকগণ ক্রমাগত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রায়োগিক বিষয়াদি ঠিক করে নিবেন।

    এখানেই বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া। বাংলাদেশের রাষ্ট্রের নাগরিকদের সবচেয়ে বড়ো সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞাকে উপড়ে ফেলার সংগ্রাম।  আমাদের সংবিধান চিন্তা করার স্বাধীনতা দিলেও নাগরিকদের সেই চিন্তাকে হাজির করার স্বা্ধীনতা দেয় নি। বিস্তারিত আলাপ করার পূর্বে বাকস্বাধীনতা নিয়ে এই দেশের মানুষের একটা দীর্ঘ আন্দোলনের কিছু নমুনা পেশ করি।

    বাক-স্বাধীনতার জন্য আমরা পাকিস্তান আমলেও লড়েছি

    খুব বেশি ঘাটাঘাটি করার দরকার পড়েনি; হাতের কাছে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বিতীয় খণ্ড’ ছিল।  আইয়ুব আমলের শুরু থেকে একাত্তরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন দলিলপত্র সেখানে সংকলিত হয়েছে। যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও যদি কেবল চোখ বুলিয়ে যান তাহলে খেয়ালে আসবে যে, পাকিস্তান আমলে সংগঠিত বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের দাবি-দাওয়াতে বাক স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে। এই স্বাধীনতাসমূহের কথা কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর ছিল না, প্রায় সকলেরই লিফলেট-প্রচারপত্রে পাওয়া যায়। অবশ্য, কখনো স্বাধীনতা এসেছে শর্তহীনভাবে, কখনো শর্তায়িতভাবে স্বাধীনতা। কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন
    শিল্পী: মোহাম্মেদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সরকার একটা প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর বিরুদ্ধে পুরো পাকিস্তানের সাংবাদিকমহল ফুঁসে উঠেছিল। প্রেস অধ্যাদেশ বাতিল, সকল প্রেস আইনের সংস্কার, ঢাকার তিনটা দৈনিক পত্রিকার কালো-তালিকাভুক্তি বাতিল এবং গ্রেফতারকৃত সাংবাদিকদের মুক্তি এমন দাবিদাওয়াসহ সারাদেশে [মানে, পুরো পাকিস্তানে] তখন সাংবাদিকরা হরতাল পালন করেন। ১৯ সেপ্টেম্বরের পাকিস্তান অবজারভার লিখেছিল, খাইবার পাস থেকে চট্টগ্রাম সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই ‘কালাকানুনের’ বিরুদ্ধে আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছে। ঢাকাতেও, পত্রিকার ভাষ্যমতে, বিরাট সমাবেশ হয়েছে। সেখানে আজাদ পত্রিকার মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম খান বলেন, আমার এই বয়স ও শারীরিক অবস্থাতে বিছানায় শুয়ে থাকার কথা, কিন্তু দেশে যা হচ্ছে তা আমাকে উঠে দাঁড়াতে ও আওয়াজ তুলতে বাধ্য করছে। তিনি এই বয়সে, দরকার পড়লে, জেলে যেতেও রাজি আছেন বলে সমাবেশে ঘোষণা দেন। তার মতে এই আইন কেবল সংবাদমাধ্যমকে শেকলে বাঁধেনি, বরঞ্চ পুরো জাতিকেই শেকল পরিয়েছে। অন্যান্য সম্পাদকরাও এই সমাবেশে বক্তৃতা করেন।

    সেদিন সমাবেশ থেকে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তার মধ্যে শুরুতেই ছিল:

    ‘A gagged press is a national disgrace and is essentially anti-national in character. Press freedom is the basis of all freedoms. Press curbs are a clear denial of the fundamental rights of the people. There can be no free people without a free Press..’

    ১৯৬৪ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায়ের জন্য জনগণের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান কয়েকজন নেতা আবেদন জানিয়েছিলেন। ‘সর্বদলীয় সার্বজনীন ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন কর্মপরিষদ’ নামক সেই প্ল্যাটফর্মে মওলানা ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবর রহমান, মওলানা সৈয়দ মোসলেনউদ্দীন সহ আরো কয়েকজন ছিলেন। ভোটাধিকারের দাবীতে প্রদেশব্যাপী সভা, শোভাযাত্রা ও হরতালের আহ্বান সম্বলিত তাদের প্রচারপত্রের শুরুতে ‘জাতীয় জীবনের এক সংকটজনক সন্ধিক্ষণে’র কথা বলা হয়। যেসকল সঙ্কটের কথা ছোট আকারে বলা হয়েছে তাতে এও ছিল, ‘অর্ডিন্যান্স এর যাঁতাকলে বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রায় লুপ্ত’। এই প্রচারপত্রের আরেকটা বক্তব্য বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ: ‘ভাইসব, পাকিস্তান অর্জিত হয় জনগণের ভোটে। আর আজ সেই পাকিস্তানের জনগণ কে ভোটাধিকার হইতে চিরতরে বঞ্চিত করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্র চলিয়াছে। উহার নজীর কোন স্বাধীন ও সভ্য দেশে নাই – এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ছিল না।’ কেন সামঞ্জস্যপূর্ণ, আশা করি খোলাসা করে বলার দরকার নেই।

    ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি থেকে একটি পুস্তিকা প্রচারিত হয়। আইয়ুব খান তৎকালীন নির্বাচনীয় প্রচারণায় ‘গণতন্ত্রে’র কথা বলে বেড়াচ্ছিলেন, এর জবাবে এই পুস্তিকায় ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ শীর্ষক এক অনুচ্ছেদে লেখা হয়, ‘… কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে যে ‘বিপ্লব’ তিনি করিয়াছিলেন সেই ‘বিপ্লবের’ প্রথম কাজই ছিল গণতন্ত্রকে জবেহ করা। সামরিক শাসন জারির প্রথম ঘোষণাতেই আইনের শাসন উচ্ছেদ করিয়া সামরিক আইনে দেশ শাসন করার কথা ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণাতে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করিয়া, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করিয়া, বাক-স্বাধীনতা হরণ করিয়া, জনগণের সভা-মিছিল করিবার  অধিকার পদদলিত করিয়া এক নিমিষে সারা দেশে সামরিক সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়।’

    পুস্তিকাটিতে গণতন্ত্রকে ‘হত্যা’ করার কথা বারংবার দেখা যায়। এই ‘অসহ্য অবস্থার প্রতিকারের জন্য’ একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিসহ আরো কিছু দাবি তোলা হয়; এর মধ্যে ছিল: ‘জনগণের পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা স্বীকৃত হোক’।

    ন্যাপের ১৪ দফা ‘জাতীয় মুক্তির কর্মসূচি’ প্রচারিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালের জুন মাসে। সেখানে পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকগণের ‘স্বাধীন ও অবাধ বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথ’ রুদ্ধ করার নানান আইনি সরঞ্জামের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বর্তমানে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক আরোপিত শাসনতন্ত্র ও সরকারী নীতিসমূহ শুধু যে একটি মুষ্টিমেয় শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী এক ব্যক্তির হাতে সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করিয়া দিয়াছে তাহাই নয় ইহা জনসাধারণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করিয়েছে’। সেখানে দ্বিতীয় দফাতে বলা হয় ‘পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ঘোষিত জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করিতে হইবে। সকল দমনমূলক আইন প্রত্যাহার করিতে হইবে’।

    ১৯৬৬ সালের ৮ জুনে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কর্তৃক প্রচারিত একটি লিফলেটেও বলা হয় ‘সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী এই জালিম সরকার সাম্রাজ্যবাদেরই সহযোগিতায় ১৯৫৮ সনে সামরিক শাসন জারির মারফত দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি কব্জা করিয়া নিয়াছে। আপামর জনসাধারণের সুখী-সুন্দর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা মাটিচাপা দিয়াছে। বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ মানুষের সকল মৌলিক অধিকার ছিনাইয়া লইয়াছে।’ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয় সেখানে।

    ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে একটা পুস্তিকা প্রচারিত হয়। ৮ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ৫টি বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের আহ্বান জানায়। সেই ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘প্রত্যেক সভ্য দেশে গণ-অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা মৌলিক বলিয়া স্বীকৃত এবং স্বাধীন ও সভ্য সমাজের অস্তিত্বটুকু প্রয়োজনেই তাহা অলঙ্ঘ্য ও পবিত্র বলিয়া বিবেচিত।’ ৮ দফা কর্মসূচীর প্রথম দফাতেই ‘সংবাদপত্রের অবাধ আযাদী’র কথা উল্লেখ করা হয়। পুস্তিকায় দেশবাসীর নিকট আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘আজ ব্যক্তিস্বাধীনতার অবস্থা অত্যন্ত করুণ। জরুরি অবস্থা অপ্রয়োজনীয়ভাবে চালু রাখা, কথায় কথায় ১৪৪ ধারা জারি করা, সভা-সমিতি ও মিছিলের সুযোগ না দেওয়া, বিনা বিচারে আটক রাখা, প্রতিরক্ষা আইনের অপপ্রয়োগ করা, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা ইত্যাদির ফলে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে।’ রাজনৈতিক দাবিতে বলা হয়: ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা -স্বীকার কর।’

    সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালে সাংবাদিকরা মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। সংবাদ মারফত জানা যায় যে, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবীতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের আহবানে গতকল্য (রবিবার) প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে সংবাদপত্রে নিয়োজিত ঢাকায় কার্যরত সাংবাদিক, কর্মচারী ও প্রেস কর্মচারী এবং হকারদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং সমাবেশ শেষে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সেবীদের একটি দীর্ঘ মিছিল রাজপথে নামিয়া আসে। মিছিলকারীগণ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, পূর্ণ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার, দেশ রক্ষা বিধি, প্রেস অর্ডিন্যান্স সহ সকল কালা কানুন বাতিল, সংগ্রামের মাঝে পূর্ব-পশ্চিম এক হও, নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশ প্রত্যাহার, ইত্তেফাক ছাপাখানার বাজেয়াপ্তি প্রত্যাহার, রাজ বন্দীদের মুক্তির দাবীতে গভর্নর হাউজের সম্মুখে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।’

    ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি একটি প্রচারপত্র প্রচারিত হয়, লেখক স্বাধিকার সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং আন্দোলনে সমর্থনে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় একটি সভা ও মিছিলের আয়োজন করেন। প্রতিবাদ সভাটি ১৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে হওয়ার কথা ছিল, সভাপতি ড. এনামুল হক। বক্তার তালিকায় জয়নুল আবেদিন, আহমদ শরীফ, সুফিয়া কামাল, সিকানদার আবু জাফর, কে জি মোস্তফা, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লা কায়সা, অধ্যাপক মনসুরউদ্দীনের নাম ছিল। সেই প্রচারপত্র যা বলা হয়েছিল সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; আমাদের বর্তমানের সময়ের বিচারে আরো গুরুত্বপূর্ণ:

    ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। সকল উন্নত জাতির বিকাশের মূলেই রয়েছে এই অধিকারের নিশ্চয়তা। সে কারণেই প্রতিটি উন্নতিকামী স্বাধীন জাতিই চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রাণেরও অধিক মূল্যবান বলে মনে করেন এবং তা সংরক্ষণের জন্য কোন ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধাগ্রস্ত হন না। পক্ষান্তরে এও লক্ষণীয় যে কোন জাতিকে দাবিয়ে রাখতে চাইলে তাঁদের শাসকবর্গ চান প্রথমেই সে জাতির চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দিতে। এ উদ্দেশ্যে শাসকবর্গ জাতির চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে এমন ষড়যন্ত্র নেই যার জাল বিস্তার করতে ইতস্তত বোধ করেন, এমন কোন সরকারি মাধ্যম নেই যার সাহায্য সক্রিয় হয়ে উঠতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেন।

    আমাদের বেলাতেও বিগত বাইশ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, সরকার স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশেষ করে এই প্রদেশের জনসাধারণের কণ্ঠ রোধ করা এক প্রধান নীতি হিসাবে অনুসরণ করে চলেছেন। কুখ্যাত প্রেস ও পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারী করে  সংবাদপত্রের  প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়ার যে স্বেচ্ছাচারী নজির স্থাপন করা হয়েছে, তা শুধু ব্রিটিশ শাসন নীতির সঙ্গেই  তুলনীয় হতে পারে। এই অর্ডিন্যান্স জারী করার পূর্বেই স্বাধীনতা লাভের পরপরেই পূর্ব বাংলার সংবাদপত্রের প্রকাশ বন্ধ করা হয়েছে এবং আজ পর্যন্ত প্রকাশনা ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধের খাঁড়া সমানভাবে ঝুলে রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে সংশ্লিষ্ট দফতরের যে কোন কর্মচারীর মাধ্যমে লিখিত, অলিখিত যে কোন উপায়ে ‘প্রেস উপদেশ’ ও সংবাদ বিশেষের উপর ‘এমবার্গো’ জাতীয় ব্যবস্থার সাহায্যে জনমতের স্বাধীনতার উপর হামলা।

    অন্যদিকে জনসাধারণের অর্থে পরিচালিত রেডিও এবং টেলিভিশন সরকার সম্পূর্ণরূপে নিজস্ব প্রচারযন্ত্ররূপে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। সকলের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ রেডিও, টেলিভিশনে তো নেই-ই, এমনকি এইসব প্রচারযন্ত্রে স্বাধীনভাবে শব্দও ব্যবহার করা যায় না। …

    এরই পাশাপাশি রয়েছে গ্রন্থ প্রকাশের ওপর সরকারের ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত দমননীতি। স্বাধীনতার পর এ প্রদেশে সরকার যে একে একে কত বই বাজেয়াপ্ত করেছেন, তার হিসাব নেই। বিশেষ করে সম্প্রতি সেই কুখ্যাত প্রেস ও পাবলিকেশন্স-এর কালাকানুনের সাহায্যেগ্রন্থ বিশেষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে, কারণ দর্শানোর নোটিশ জারী এবং কোন বই আটক ও বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে সরকার নতুনভাবে চিন্তা ও মত প্রকাশের কণ্ঠরোধে তৎপর হয়ে উঠেছেন। …

    বস্তুত: স্বৈরাচারী শাসকবর্গের নিকটও একটি জাতিকে অবদমিত রাখার জন্যে এটাই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা। … তাই এ মুহূর্তে লেখকদের স্বাধিকার সংরক্ষণ এবং চিন্তা ও মত প্রকাশের ওপর যে কোন প্রকারের হামলার প্রতিরোধে প্রতিটি নাগরিককে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। শেষবারের মতো এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যে, আমরা স্বাধীন জাতি  এবং আমাদের চিন্তা ও মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ আমরা যে কোন মূল্যে প্রতিরোধ করবো এবং এই অনাচারকে আমরা কিছুতেই কায়েম থাকতে দেবো না।’

    ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ‘সংগ্রামী ছাত্রসমাজ’ পক্ষ থেকে এগার দফার দাবী জানানো হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফাতে বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উল্লেখ পাওয়া যায়: ‘প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হইবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিতে হইবে।’

    সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রামের কমিটির আহবানে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র ও গণহত্যা, সহকারী নির্যাতন ও ব্যাপক হারে গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রদেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ‘…দেশরক্ষা আইন ও নিরাপত্তা আইন বাতিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান, ইত্তেফাক ও অন্যান্য সংবাদ পত্রের উপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদান…’ এর দাবি জানানো হয়।

    ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারিতে পল্টনে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জনসভায় কিছু প্রস্তাবলী গৃহীত হয়। সেখানে ‘শপথ প্রস্তাব’-এ বলা হয়: ‘এই সমাবেশ ঘোষণা করিতেছে যে, স্বৈরাচারী একনায়কত্ববাদী আইয়ুব সরকারের অবসান ঘটাইয়া অবিলম্বে সারা পাকিস্তানের সকল জনগণের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার কায়েম ….সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা কায়েম, সকল দমনমূলক আইন প্রত্যাহার করিয়া ছাত্র ….কায়েম না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকিবে।’

    ১৯৬৯ সালের এপ্রিলে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি কর্তৃক ‘স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’র কর্মসূচি পেশ করা হয়। এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন কাজী জাফর আহমদ, হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন। কর্মসূচির রূপরেখাতে বলা হয়, ‘জনগণের বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও প্রকাশনার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা প্রদান করা হইবে।’ কিন্তু পুরো কর্মসূচিতে এই স্বাধীনতার সাথে কিছু শর্তও যুক্ত ছিল। যেমন, ‘কোন অবস্থাতেই সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি বৃহৎ  পুঁজির পক্ষেও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশ ও সংগঠিত করিবার অধিকার দেওয়া হইবে না’, ‘নোংরা মার্কিনী সিনেমা,  অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ও গণবিরোধী সকল প্রকার সাংস্কৃতিক কার্যকে উৎখাত করাহইবে ও নিষ্ঠুর হস্তে দমন করা হইবে’, এবং ‘…রাষ্ট্র মার্কসবাদকে বিৃকতকারী সংশোধনবাদী নয়াসংশোধনবাদ ভাবাদর্শে পূর্ণশিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিষিদ্ধ করিবে।’

    ১৯৬৯ সালের আগস্টে প্রচারিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’ অনুচ্ছেদে বলা হয়: ‘…মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, বই-পুস্তক, সংবাদপত্র ও প্রচারপত্র মুদ্রণ ও প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা, সমবেত হইবার ও সংগঠন করিবার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা থাকিতে হইবে। …একমাত্র যুদ্ধকালীন সময় ব্যতীত অন্য কোন সময়ে এই সকল অধিকার খর্ব করা হইবে না। ‘জরুরী অবস্থার’ অজুহাতে অন্যায়ভাবে কোন নাগরিকের অধিকার খর্ব করা চলিবে না।…’

    ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ১১-দফা কর্মসূচি সম্পর্কিত একটি প্রচারপত্রের ৩ নং দফাতে ছিল: ‘জনগণের সকল প্রকার মৌলিক অধিকার, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতাদর্শের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে’। ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শাসনতন্ত্র সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৪ দফা দাবি জানায়। সেখানেও ৪র্থ দফাতে ছিল: ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজ বিবেক অনুযায়ী দল, সংঘ-সংগঠন গঠনের অধিকার, বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকারের পূর্ণ গ্যারান্টি থাকিতে হইবে…’

    ১৯৭১ সালের ৩ মার্চে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে যে ইশতেহার পাঠ করা হয় সেখানে তিনটা লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়। তৃতীয় লক্ষ্যে স্পষ্টত বলা হয়েছে: ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে ব্যক্তি, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে’।

    অতি অল্প কিছু নমুনা হাজির করলাম কেবল; সেগুলোতে স্পষ্টতই  দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন দল সংগঠনের দাবিদাওয়াতে বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা একেবারে মৌলিক প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয়েছিল। তারা যখন জনগণের সামনে দেশের তৎকালীন দুরবস্থার কথা বলছিলেন তখন সেগুলোর ‘অনুপস্থিতি’র দিকে বিশেষভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। ফলস্বরূপ আন্দোলনের দাবি-দাওয়াতেও এই স্বাধীনতাগুলো ‘নিশ্চিত’ করার ওয়াদাও বারেবারে দিয়েছেন, বা তাদেরকে দিতে হয়েছে। দুয়েকটা দল বা সংগঠন বাদে অধিকাংশ সময়ই এই স্বাধীনতাকে প্রায় ‘নিঃশর্ত’ আকারেই হাজির করা হয়েছিল। এমনকি বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকারের বর্গেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এই আন্দোলনে কেবল রাজনৈতিক সংগঠনই জড়িত ছিল না, আমরা দেখেছি সাংবাদিক মহল ও লেখক-বুদ্ধিজীবী মহলও বিভিন্ন সময়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য রাস্তায় নেমেছেন। আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

    সংবিধানে চিন্তার স্বাধীনতা থাকলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নানাভাবে শৃঙ্খলিত  

    দীর্ঘ পঁচিশ বছরের নানামুখী সৃজনশীল অহিংস সংগ্রাম, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, পঁচিশ মার্চের রাতের পর সশস্ত্র লড়াই, জেনোসাইডে তিরিশ লাখ লোকের প্রাণহানি- এতো এতো ত্যাগ তিতিক্ষার পর আমরা যে সংবিধান তৈয়ার করলাম বাহাত্তর সালেই, সেখানে বাক-স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা শব্দগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকাররক্ষণ’ সংক্রান্ত ৩২ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ এই বাক্যকে উল্টো করে পড়লে দেখা যাবে, জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে যদি সেটা আইনানুযায়ী হয়ে থাকে। এর সবচাইতে ‘কার্যকর’ ব্যবহার আমরা দেখতে পাই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে লড়াইয়ের কালে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার সাথে কোনো শর্তারোপ না করলেও লড়াই সফল হওয়ার পর বলা হচ্ছে, সেই স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে যদি সেটা আইন অনুযায়ী হয়ে থাকে। ঔপনিবেশিক আইনকাঠামো দিয়ে নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার নজির আমাদের দেশে প্রচুর। আবার, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা’ শীর্ষক ৩৯ নং অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা’ দেয়া হলেও বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে করা হয়েছে শর্তাধীন। সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাক।

    ৯ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে বাউল শরিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করা হয়; ১১ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মির্জাপুর থানা পুলিশ; এবং ১৪ জানুয়ারি তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়। বেশ কিছুদিন জেল খাটার পর অতঃপর শরিয়ত সরকারের জামিন হয়। বাউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে; বলা হয়েছে যে, বাউল বলেছিলেন, গান-বাজনা হারাম বলে ইসলাম ধর্মে কোনো উল্লেখ নেই। কেউ প্রমাণ দিলে তিনি গান ছেড়ে দেবেন। এমন বক্তব্য শুনেই বাদী মামলা করেছিলেন।

    বাউল কী বলেছেন? বা বাউল কি আদৌ ধর্মকে অবমাননা করেছিলেন? বা, বাউলের কথায় যৌক্তিকতা ছিল কি না বা তার জামিন সংক্রান্ত কোনো ধরনের আলাপে আমরা প্রবেশ না করে বরং বাউলের ঘটনাকে একটা বিশেষ বিষয়ের কেসস্টাডি হিসেবে পাঠ করতে চাই: বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সাংবিধানিক বাকস্বাধীনতার অস্তিত্বের স্বরূপ চিহ্নিত করতে এবং সংবিধানের এই স্বাধীনতা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে (৩৯ নং) যে প্যারাডক্স হাজির আছে তা তুলে ধরতে।

    বাউল শরিয়তকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন মূল প্রশ্নটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ঘিরে তৈরি না হয়ে বরং শিল্পী-বাউল-গান-বাজনার উপর আঘাতই মূল প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয়েছিল। করোনা পরিস্থিতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সরকার সমালোচকদের গণ-গ্রেফতার বা গণ-মামলার অভিজ্ঞতা এই আইন এবং বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মূল প্রশ্ন হিসেবে হাজির করেছে। আন্দোলনে তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলই মূখ্য দাবি।

    যারা এই আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এমন মতও পোষণ করেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। অভিজ্ঞতা বলে যে, প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চায় জড়িতদের সিংহভাগই সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতায় গভীর আস্থা প্রকাশ করেন। ফলে, অনেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সংবিধানের পরিপন্থী বা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করছেন। কিন্তু, এই আমরা বলতে চাচ্ছি যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে মামলাগুলো করা হচ্ছে সেগুলোকে সাংবিধানিকভাবেও ‘বৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। মানে, আদতে এগুলো যে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না সেটা প্রমাণ করা সম্ভব। উল্টো সাংবিধানিক এখতিয়ারের আওতায় এ ধরনের মামলা-জুলুম করা সম্ভব।

    উল্লেখ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যে বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পথকে রুদ্ধ করে দেয় তার প্রমাণ দেয়াটা এই মুহূর্তে বাহুল্যই হবে; বিস্তর লেখাপত্র অনলাইন-অফলাইনে রয়েছে।

    বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে মূলত বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত আলাপ রয়েছে। এই অনুচ্ছেদের নামকে দুইভাবে ভাগ করা যায়: ১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, ২) বাক স্বাধীনতা। ‘ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতা’ এবং ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’ দুটোকে বাক-স্বাধীনতার মধ্যেই ফেলে দেয়া যায়।

    সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের প্রথমেই কোনো বিধিনিষেধ বা ‘সাপেক্ষে’ ছাড়াই ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান’ করা হয়েছে। কিন্তু বাকস্বাধীনতা, ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে এভাবে নির্বিঘ্নে ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরং একটা বিরাট বাক্যের অধীনে এই স্বাধীনতাগুলোকে শর্তায়িত করে রাখা হয়েছে। শর্তগুলো হলো,

    ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে…’

    এই অনুচ্ছেদ খেয়াল করে পড়লে বোঝা যাচ্ছে, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়া হলেও বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, বাক স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা আদৌ কি কোনো অর্থ বহন করে? ধরুন, আমি একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছি, কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই চিন্তাকে ভাষার মাধ্যমে হাজির করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেই চিন্তা কি আদৌ ‘চিন্তা’ হয়ে উঠতে পারবে? বা পেরেছে বলে কি আমি নিশ্চিত হতে পারি? উদাহরণস্বরূপ এই লেখাটার কথাই ধরা যাক। আমি সংবিধানের একটা ধারার প্যারাডক্স নিয়ে চিন্তা করছি, কিন্তু আমি যদি সেটা মৌখিক বা লিখিত রূপে ভাষার মধ্যে দিয়ে হাজির করতে না পারি তাহলে সেই চিন্তার অস্তিত্ব তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই চিন্তার থাকা বা না থাকাটা কি তখন তাৎপর্য বহন করে? চিন্তা বা চিন্তার বিষয়বস্তু পরীক্ষিত বা পরিশীলিত বা যুক্তির কঠিন ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বা এমনকি ভুল প্রমাণিত হওয়ার জন্যও সেই চিন্তাকে প্রকাশ ঘটাতে হবে। সংবিধানের যে বিষয়টা আমার কাছে প্যারাডক্স মনে হচ্ছে, সেটা আমার বুঝতে ভুলও হতে পারে, সেটা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু সেই তর্ক-বিতর্ক তো হবে চিন্তার প্রকাশ ঘটার পর। মানে, মত প্রকাশের পর।

    জে. বি. বিউরি যখন ‘চিন্তার স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস’ লিখা শুরু করেন, তখন একেবারে গোড়াতেই ঘোষণা দেন, চিন্তার স্বাধীনতার ইতিহাস আসলে বাক স্বাধীনতারও ইতিহাসও বটে। ‘কথা বলার স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তার স্বাধীনতা কোনো অর্থ বহন করে না’।

    বিষয়টা তাহলে দাঁড়ালো এই, আমাদের সংবিধান বলছে আপনি চিন্তা করতে পারবেন স্বাধীনভাবে, কিন্তু সেই চিন্তার প্রকাশ করার বেলায় আপনি পরাধীন, শর্তায়িত। যে শর্তগুলোর কথা সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, মানে যেসব ব্যাপারে আপনার বাকস্বাধীনতা সীমিত সেগুলো হচ্ছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, ‘বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ , ‘জনশৃঙ্খলা’, ‘শালীনতা’ বা ‘নৈতিকতা’ ইত্যাদি।

    উপরে উল্লিখিত বাউল শরিয়তের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ‘জনশৃঙ্খলা’ ও ‘নৈতিকতা’ এই দুটোর সাপেক্ষে বিবেচনা করতে পারি। ‘নৈতিকতা’ সবসময়ই নির্ধারিত হয় মূলধারার বয়ান অনুযায়ী। প্রমিন্যান্ট ডিসকোর্সই মূলত ঠিক করে দেয় কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক। এটা একেবারেই স্থান-কাল-ধর্ম-আচার-ক্ষমতা সাপেক্ষ। বাউল শরিয়ত বলেছেন ইসলামে গান বাজনা হারাম নয়; দাবি করা যেতেই পারে, বাউলের এই উক্তি এখনকার বিদ্যমান ইসলামের আধিপত্যশীল বয়ানের সাথে খাপ খায় না। বাংলাদেশের অধিকাংশ ধর্মীয় পণ্ডিতরা মনে করেন, গান বাজনা হারাম। ইসলামি জগত ও দর্শনে এ নিয়ে বিস্তর জ্ঞানতাত্ত্বিক তর্ক-বিতর্ক থাকলেও সেটা এখানে একেবারে ‘গৌণ’ হয়ে পড়ে, কারণ ‘নৈতিকতা’ সর্বত্রই নির্ধারিত হয় মূলধারা ও ক্ষমতার ইচ্ছাধীন। একইভাবে যখনই কেউ কোনো সামাজিক ট্যাবু ভাঙ্গতে চান বা যান বা সেই ট্যাবু নিয়ে কথা বলতে যান তখনও একইভাবে মূলধারার ‘নৈতিকতা’র মানদণ্ডে আটকা পড়তে পারেন। সাম্প্রতিক সমকামিতা সংক্রান্ত আলাপও এখানে ‘নৈতিকতা’ বা ‘শালীনতা’র বেড়াজালে বন্দী হতে পারে। সেটা খুব সহজেই ধর্মীয় অবমাননা বা বিভিন্নধরনের অনুভূতিসংক্রান্ত ফ্যাসাদের দিকে ধাবিত হতে পারে। মানে, নৈতিকতা ও শালীনতার ‘স্বাপেক্ষে’ কখনোই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায় না। দেখা যাচ্ছে, বাউলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে আনীত অভিযোগ যে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেটা প্রমাণ করা সম্ভব।

    ‘নৈতিকতা’র সাথে কীভাবে ‘জনশৃঙ্খলা’ মিশে যেতে পারে তার একটা ধ্রুপদী উদাহরণও হচ্ছে শরিয়ত বাউলের ঘটনা। বাউলকে রিমান্ড শেষে জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানোর আবেদন জানিয়েছিল পুলিশ; বলা হয় যে, ‘আসামী জামিনে মুক্তি পাইলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে এবং … সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে’। এই লেখার প্রাথমিক খসড়া তৈরি পর্যন্ত তার জামিন ঝুলে ছিল, বারেবারে আবেদন করা হচ্ছিল, কিন্তু ‘জামিন পেলে আবারও এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে…’ এই কারণে তাকে জামিন দেয়া হচ্ছিল না। (প্রথম আলো, বাউল শরিয়তের জামিন আবেদন নাকচ, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। সমাজে চালু থাকা কোনো মতের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতানুসারী কর্তৃক ‘জনশৃঙ্খলা’ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভবনা থাকায় আপনার মতকে কাটছাঁট করেই প্রকাশ করতে হবে, আর নাহলে মত প্রকাশকে দমন করতেই হবে। আর এই ক্ষেত্রে, বাউল যে অপরাধ করেছেন তার সার্টিফিকেট দিয়েছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতাতন্ত্রের একেবারে চূড়ায় বসে থাকা ব্যক্তিটি। ২২ জানুয়ারিতে (২০২১) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, ‘অপরাধে জড়িত বলেই বাউল শরিয়তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ [প্রবন্ধের খসড়া তৈরির মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্ধৃতি ডেইলি স্টারের বরাত উল্লেখ করা হয়েছিল। পাণ্ডুলিপি রেডি করার সময় যখন লিঙ্কে প্রবেশ করতে গেলাম, আবিষ্কার করলাম, লিঙ্ক আর কাজ করছে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই বক্তব্য অন্যান্য অনলাইন মিডিয়াতেও প্রকাশিত হয়েছে।]

    সহজ কথা হচ্ছে, ‘শালীনতা’ বা ‘নৈতিকতা’ ধারণাগুলোর ব্যাখ্যা এত বিস্তৃত এবং ক্ষমতা ও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনযোগ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ছয়মাস পূর্বের বাউল শরিয়ত বা এই সময়ের সিরাজাম মুনিরা, তারা যে সংবিধানের বরখেলাপ করেছেন, তা শালীনতা বা নৈতিকতার বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ দেয়া সম্ভব।

    পাশপাশি, এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, বা ‘বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এর মতো বাক্য বাকস্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। যেমন, একজন গবেষক চিন্তা করলেন তিনি ভারতের সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটা গবেষণা করবেন। তিনি সেই গবেষণার চিন্তা করতেই পারেন, কেননা তিনি চিন্তায় স্বাধীন। কিন্তু, এখন ভারত যেহেতু আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র গবেষকের সেই চিন্তার বহিঃপ্রকাশ বা গবেষণা প্রকাশিত হলে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। বা, কোনো সংবাদপত্রে এমন কোনো রিপোর্টের বেলায় আমাদের রাষ্ট্র মনে করতেই পারে যে, এই রিপোর্ট প্রকাশিত হলে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। তখন আপনি সংবিধানের বেড়াজালে আটকা পড়ে গেলেন, আপনার গবেষণা তখন অ-সংবিধানিক।

    ফলে এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশের সংবিধান আসলে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করলেও সেই চিন্তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা (মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা) নিশ্চিত করে নি। তাই বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হিসাবে দেখার যে জনপ্রিয় মত চালু আছে সেটা আসলে কোনো অর্থ বহন করে না।

    ‘চিন্তা’র সাথে ‘চিন্তাকে হাজির করা’র মধ্যে যে দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে সেটা আসলে একটা জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত চিন্তাকে, চিন্তার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়। চিন্তা আসলে কোনো ‘ব্যক্তি’র বিষয় নয়, এটা আসলে ‘কালেক্টিভ’ বিষয়। তাই জ্ঞান উৎপাদন ও চর্চাও আসলে ‘কালক্টিভ’ বিষয়। আমার চিন্তা বহু জনের চিন্তার সাথে মিলবে, বহুজনের চিন্তা আমার চিন্তার সাথে মিলবে, মোলাকাত করবে, পরীক্ষা দিবে, খারিজ হবে, গৃহীত হবে – এমন বহু যৌথ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই আসলে চিন্তাচর্চা এগিয়ে যায়। কিন্তু এই সব ‘কর্মকাণ্ড’ কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন সেই চিন্তাকে হাজির করার স্বাধীনতা বজায় থাকবে। এটাই আসলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এটাই আসলে বাক স্বাধীনতা। এটাই এর ফজিলত।

    ফলে, বাকস্বাধীনতাকে কীভাবে কাজে লাগাবে এই জিজ্ঞাসার পূর্বে তাকে স্বাধীনতার সেই অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। মরার ওপর খাড়ার ঘা স্বরূপ যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছিল ৭৩২টি, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৬০৭। এবং ২০২০ সালে প্রথম ৫ মাসেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৪০৩টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫৩ জন। অর্থাৎ, করোনাকালে কথা বলার দায়ে দমন-পীড়নের হার বেড়ে গিয়েছে। মামলার প্রধান প্রধান ‘খাত’ হচ্ছে: মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ পরিবেশন, ফেসবুকে লেখা, বঙ্গবন্ধু, তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি’, করোনাভাইরাস ও এর চিকিৎসা নিয়ে ‘গুজব ছড়ানো’, ত্রাণ চুরির ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানো ও সংবাদ পরিবেশন, সরকারবিরোধী প্রচারণা, পুলিশের সমালোচনা করে সংবাদ পরিবেশন ও ফেসবুক লেখা, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি।৯

    অর্মত্য সেন স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, উপনিবেশকালে কেবল যে সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেফতার করা হয়েছে, তা কিন্ত না; সুযোগ পেলে সরকারের সমালোচনা করতে পারে এই ‘আন্দাজ’ থেকে ‘সম্ভাব্য দুষ্কৃতিকারী’কে গ্রেফতার করা হতো। আমাদের গর্দানের উপর জারি থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এমন ঔপনিবেশিক আমলের ইশারা আছে। এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আপনার না করলেও চলবে, কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি মনে করে অপরাধ ‘হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে’ তাহলেও আপনাকে গারদে ভরতে পারবে। অর্থাৎ যদি উর্দিওয়ালাদের মনে হয় আপনার অপ্রকাশিত ‘মত’ খতরনাক হতে পারে তাহলে আপনি আইনের জালে বন্দী হতে পারেন।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকদের মূল দ্বন্দ্ব তাই রাষ্ট্রের সাথেই। এই রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবেই মত প্রকাশকে বিবিধ শর্তের অধীন করে করেছে, উপরন্তু দিনকে দিন মানুষের বাকস্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়ার জন্য আরো বেশি আইনি হাতিয়ার তৈরি করছে। আবার, ইতিহাস-বিকৃতি রোধের জন্য বিভিন্ন আইন তৈরির খায়েশ রয়েছে জাতীয়তাবাদী মহলেরও; ইতিহাসের সত্য- মিথ্যা নির্ধারনের ভার আমরা তুলে দিতে চাই রাষ্ট্রের হাতে। [উল্লেখ্য, একসময় আমিও ইতিহাস-বিকৃতি রোধের আইনের পক্ষে ওকালতি করেছি। ইতিহাসের সত্যমিথ্য নির্ধারণের ভার আদালত বা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে চেয়েছি। নিঃসন্দেহে এই লেখা আমার পূর্বের অবস্থান থেকে একটি ‘উত্তরণ’; এবং কেন- সেটাও এই লেখাতে হাজির করতে পেরেছি বলে মনে করি।] ফলে, একদিকে এমনিতেই এই রাষ্ট্র বাকস্বাধীনতার অনুমোদন দেয় না, অন্যদিকে যেটুকু স্বাধীনতা আছে সেটুকুও কেড়ে নেয়ার বাস্তবতা শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগত তৈরি করছে। ফলে, আমাদের লড়াই একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আমার কথা বলার উপর রাষ্ট্রীয় খবরদারিকে ন্যাস্যাৎ করতে হবে। এর ফজিলত কি- তার কিছুটা আভাসমাত্র উপরে দেয়া হয়েছে।

    বর্তমানে যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের জন্য জোরেশোরে আওয়াজ উঠছে, তখন আমাদের এও মনে রাখা উচিৎ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের মাধ্যমেই আমাদের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হয়ে যাবে না। খোদ আমাদের সংবিধানেই এই স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নেই। তাই, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি দাবি তুলতে হবে সাংবিধানিকভাবে আমরা বাকস্বাধীনতা চাই। নিঃশর্ত কথা বলার অধিকার চাই। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে যে, কোনো আইনের বিরুদ্ধে জনমত ফুঁসে উঠলে এটাকে সংশোধন করে আরো বেশি নিপীড়নমূলক আইন বানানো হয়। ফলে, এমন গণবিরোধী আইন তৈরির যে কাঠামো চালু আছে খোদ সেটাকেও আমাদের বদলাতে হবে। অন্যথায়, গণ-আন্দোলনের মুখে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হলেও সেটা আরো নয়া নয়া রূপে ফিরে আসবে।

    শেষ কথা

    দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে যে দাবি-দাওয়া সবচাইতে স্পষ্ট ছিল একাত্তরের পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সেগুলোই বরঞ্চ বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেলো। খাঁচার ভেতর পাখির উড়াউড়ি। উল্টো, এই স্বাধীনতাগুলো সবচাইতে ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েছে বর্তমান কালে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে আক্ষরিক অর্থেই কারাগারে পুরে দিয়েছে। এই আইনের ব্যবহার যে ‘আপেক্ষিক’ খোদ সেটা বাংলাদেশের ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রধানমন্ত্রীও মেন নেন।১০ অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, যে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ সংগ্রামে ‘বাক-স্বাধীনতা’, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা’ ইত্যাদির উপস্থিতি সবচাইতে স্পষ্ট ছিল, বর্তমানে সেই স্বাধীনতাগুলোকে বন্দী করা হচ্ছে খোদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে।[ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য]১১ বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের দীর্ঘ লড়াই জানান দিচ্ছে, গণমানুষের যে মুক্তিযুদ্ধ ও তার সংগ্রামের চেতনা, তার সাথে বিদ্যমান রেজিমের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক মতাদর্শিক বয়ানের কোনো মিল নাই। বরঞ্চ দুটোর গতি-প্রকৃতি ভিন্ন ও উল্টো।

    বহুদিন যাবত বলা হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে একধরনের অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে। মাত্রাগত রকমফের হচ্ছে কখনো সখনো। ফলে এখানে রাষ্ট্রের কাছে মহামারি মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা। অন্য অর্থে, খোদ নাগরিকের বিরুদ্ধেই এক অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। ডিজিটাল নিরাপত্ত আইন বাতিল এবং সংবিধানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার আমাদের এই লড়াইয়ে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর।

    দোহাই:

    ১) John Stuart Mill, On Liberty, 1859

    ২) Nigel Warburton, Free Speech: A Very Short Introduction, OUP Oxford, 2009

    ৩) চমস্কিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্কের হদিস পাবেন: Noam Chomsky, Some Elementary Comments on The Rights of Freedom of Expression, [Appeared as a Preface to Robert Faurisson, Mémoire en défense, October 11, 1980], chomsky.info; The Faurisson Affair, Noam Chomsky writes to Lawrence K. Kolodney, Circa 1989-1991, chomsky.info; Faurisson affair, Wikipedia; Film: Manufacturing Consent: Noam Chomsky and the Media, 1992

    ৪) উন্নয়নের সাথে স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে অর্মত্য সেনের বহু আলাপ আছে। এই প্রবন্ধের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে: Amartya Sen, ‘Speaking of Freedom: Why Media Is Important for Economic Development’, The Country of First Boys, 2015

    ৫) ফেই শেন ও লোকমান সুই, ‘এশীয়মূল্যবোধ ফিরে দেখা: ইন্টারনেটের ব্যবহার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, প্রতিচিন্তা, ২০১৮। [অনুবাদ: খলিলুল্লাহ]

    ৬) ফরহাদ মজহার, প্রস্তাব, আগামী প্রকাশনী, ১৯৭৭

    ৭) বখতিয়ার আহমেদ, ‘ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবসত্তা: একটি নৃবৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা’, রাষ্ট্রচিন্তা, ২০২০

    ৮) সারোয়ার তুষার, ‘বাকস্বাধীনতা রাজনৈতিক শর্তের অধীন নয়, মানবীয়তার অংশ’, সময়ের ব্যবচ্ছেদ, গ্রন্থিক, ২০১৯

    ৯) প্রথম আলো, করোনাকালে সমালোচনা-কটূক্তির বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা-গ্রেপ্তার বেড়েই চলেছে, ৭ জুলাই ২০২০

    ১০) ‘আইন তার আপন গতিতে চলে। আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা, এটা হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। কোনটা আপনার কাছে অপপ্রয়োগ আর কোনটা অপপ্রয়োগ না, এটাও একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমি মনে করি, আইন তার নিজ গতিতে চলছে এবং চলবে। যদি কেউ অপরাধ না করে, তার বিচারে শাস্তি হবে না।’- প্রধানমন্ত্রী; ডেইলি স্টার, “আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে কিনা, এটা হলো দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার: প্রধানমন্ত্রী”, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

    ১১) মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড:

    ২১। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১(এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    (৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা ৩(তিন) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

  • ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

    ‘সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক’ নাকি ‘সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক’?

    সাভারের যে স্কুলশিক্ষককে হত্যা করা হলো, তিনি ধর্মের দিক থেকে হিন্দু হলেও, এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সাম্প্রদায়িক এঙ্গেল নাই। এটা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গুণ্ডা মাস্তান হয়ে উঠা ছাত্রের দ্বারা শিক্ষক হত্যা। এখানে শিক্ষক মুসলমান হলেও একই ঘটনা ঘটত। যারা এ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা হিন্দু শিক্ষক হত্যা এভাবে লেবেলিং করতে চাইছেন, তাদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ।

    নড়াইলের যে অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হলো, এটা বিশেষভাবে সাম্প্রদায়িক ঘটনা। ওই শিক্ষক মুসলমান হলেও তিনি প্রভাবশালীদের তোপের মুখে পড়তেন, কিন্তু ধর্মে হিন্দু হওয়ায় যা যা হলো—অর্থাৎ ঘটনাপ্রবাহ ঠিক একই রকম হতো না। অর্থাৎ, ওই অধ্যক্ষ হিন্দু হওয়াতেই ধর্ম অবমাননার জিকির তোলা গেছে। এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, পুলিশের উপস্থিতি ইত্যাদি দেখিয়ে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, ‘এই ঘটনা সাম্প্রদায়িক না, রাজনৈতিক…’। এ ধরনের বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য সুবিধার নয়। আওয়ামী লীগ ও পুলিশের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেই একটা ঘটনা আর সাম্প্রদায়িক হতে পারবে না কেন? ‘সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক’ এই ধরনের বক্তব্যেরই বা মানে কী? একটা ঘটনা একই সাথে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক তথা সাম্প্রদায়িক–রাজনৈতিক হতে পারবে না কেন? উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস তো আগাগোড়া রাজনৈতিক ঘটনা। বিজেপির মুসলিম–নিধনের রাজনীতি কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? সুতরাং, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি মাত্রই তা আর সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিক—এমন দাবি নির্বুদ্ধিতা মাত্র। যে পুলিশ হাজার হাজার শ্রমিকের দাবিদাওয়ার মিছিলকে মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ করে দিতে পারে, সেই একই পুলিশ “উত্তেজিত জনতার” অন্যায্য দাবির মুখে নিষ্ক্রিয় থাকে কী করে? এই সক্রিয় নিষ্ক্রিয়তার অর্থ কী? এ সময়ের পুলিশী ভূমিকাকে বিশেষভাবে ‘মুসলমান পুলিশ’ আকারে না বুঝলে এ ধরনের ঘটনার কোনো অর্থবহ কুলকিনারা করতে পারা যাবে না। দিল্লিতে মুসলমান শিক্ষার্থীর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং তাকে বুঝতে হবে ‘হিন্দু পুলিশ’ আকারে। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেয় যে পুলিশ, সেই পুলিশকে শুধু পুলিশ নয়; বরং বুঝতে হবে ‘বাঙালি পুলিশ’ আকারে।

    ধর্মে হিন্দু/মুসলমান বা জাতে চাকমা কেউ আক্রান্ত হলেই তা সাম্প্রদায়িক হবে এমন কোনো কথা নাই। দেখতে হবে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তাদের হিন্দুত্ব/মুসলমানিত্ব বা চাকমাত্ব কোনো ভূমিকা রাখছে কি না। যে–কারণে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে মুসলমান হলেও এ ধরনের ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলার সুযোগ নাই। একইভাবে, ভারতে এনকাউন্টার বা গুমের শিকার বহু মানুষ ধর্মে হিন্দু হলেও এ ধরনের ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িক বলা যাবে না। কারণ তাদের সম্প্রদায়গত পরিচয়ের কোনো ভূমিকা এসব ক্ষেত্রে নাই। 

    আবার ভারতে মুসলমানরা তাদের মুসলমান পরিচয়ের কারণেই আক্রান্ত হচ্ছেন এবং সেটা হচ্ছেন সে দেশের একটা রাজনৈতিক দল ও সরকার দ্বারা, এ ধরনের নিগ্রহের ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক নয়; রাজনৈতিক’ বলার কোনো অর্থ হয় না, ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক–রাজনৈতিক। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য নাগরিক নিপীড়নের সাথে একে এক কাতারে এনে বলার কোনো উপায় নাই যে, আলাদা করে এগুলোকে সাম্প্রদায়িক বলছেন কেন, ভারতে কি হিন্দুরা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয় না?

    একই কথা খাটবে বাংলাদেশের অনেক হিন্দু নির্যাতনের সময়ে। হৃদয় মণ্ডল ও স্বপন কুমার বিশ্বাস হিন্দু না হলেও, তাদেরকে ফাঁসানো সম্ভব ছিল। কিন্তু তারা হিন্দু হওয়ায় তাদেরকে ফাঁসানোর, অপমান করার একটা বিশেষ প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছে। এই বিশেষ প্যাটার্নকে আমলে না নিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করলে তা সত্যের প্রতি অবিচার করা হবে।

    প্রথিতযশা মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তো মুসলমানরাও গুম–খুনের শিকার হচ্ছে, তাহলে আলাদা করে হিন্দু নির্যাতন বলা হচ্ছে কেন? আমাদের উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, উমরের এই যুক্তি বিভ্রান্তিকর ও গোঁজামিলপূর্ণ। এমন কোনো তথ্য প্রমাণ নাই যে, বাংলাদেশে গুম–ক্রসফায়ারের শিকার ব্যক্তিরা ‘মুসলমান’ হওয়ার দরুন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে যদি এমন কোনো নজির থাকে যে, মুসলমান বা ইসলামিস্ট হওয়ার দরুন কাউকে গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হতে হয়েছে, তাহলে সেই মর্মান্তিক ঘটনাকেও সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে বুঝতে হবে—এমনকি তা যদি বাংলাদেশেও ঘটে থাকে। কিন্তু মোটাদাগে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিরা ধর্মে মুসলমান হলেই-যে ঘটনাগুলো সাম্প্রদায়িক নয়, সে কথা বলাই বাহুল্য। উমরের এ যুক্তি বিজেপিপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী বুদ্ধিজীবিদের বেশ কাজে আসবে বলে মনে হয়। কারণ তারাও বলবেন, আলাদা করে মুসলমান নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে কেন? ভারতে কি হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হয় না?

    উপরের ছবিটি বাংলাদেশের এবং নিচের ছবিটি ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে। সূত্র: ইন্টারনেট

    দুটি কথা বলে শেষ করা যায়। বাংলাদেশে মুসলমান এবং ভারতে হিন্দুরা নির্যাতনের শিকার হতে পারে। সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক হিসেবেও অভিহিত করার দরকার পড়তে পারে। কখন ও কীভাবে? ধরা যাক, বাংলাদেশে আহমাদিয়া ও কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের প্রতি ‘মূলধারা’র মুসলমান সমাজের অনেকেরই মনোভাব সাম্প্রদায়িক তো বটেই। কেবল সাম্প্রদায়িকই নয়, তা বর্ণবাদও বটে। একইভাবে ভারতে তথাকথিত নিচু জাতের হিন্দু ও দলিতদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের মনোভাব–আচরণকেও সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ বলতে হবে। তাই বলে বলার কোনো সুযোগ নাই যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ও ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজ স্ব–স্ব দেশে নানাবিধ জুলুমের শিকার হলেই তা সাম্প্রদায়িক। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ কথাটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, নৈতিক আবেদন ও জরুরতকে ‘অল লাইভস ম্যাটার’ বলে ঢেকে দেয়া এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

    এমনকি আরেক ধরনের অনালোচিত সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গও টানা দরকার—সেক্যুলার সাম্প্রদায়িকতা। বাংলাদেশ ও ভারতের এলিট অ্যাক্টিভিস্ট–বুদ্ধিজীবী–সংস্কৃতিকর্মীদের একটা বড় অংশই এই সাম্প্রদায়িকতায় নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও রোজকার জীবনযাপনকে উল্লিখিত এলিটকুল যে চোখে দেখে থাকেন এবং যে মনোভাব পোষণ করেন, তা সাম্প্রদায়িকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই সেক্যুলার সাম্প্রদায়িক–বর্ণবাদের অস্তিত্বও আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

    সুতরাং, সাম্প্রদায়িকতাকে এক ধরনের সিচুয়েটেড এথিকস দ্বারা বোঝা দরকার। কোনো দেশ বা কোনো সম্প্রদায়কে যেমন হরেদরে সাম্প্রদায়িক বলা যায় না, ঠিক একইভাবে অমুক দেশের তমুক ধরনের নির্যাতনসমূহ ‘সাম্প্রদায়িক নয় রাজনৈতিক’ বলারও কোনো মানে হয় না। সাম্প্রদায়িকতা আছে আবার নাই। একেবারেই ‘নাই’ আবার সবই ‘সাম্প্রদায়িক’ কোনোটাই নির্মোহ অবস্থান নয়—বিশেষ ধরনের পজিশনালিটি দ্বারা নির্ধারিত।

    [এই লেখাটি মূলত আমাদের দীর্ঘ এক প্রবন্ধের যুক্তিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আগ্রহীগণ বিস্তারিত দেখতে পারেন: সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদ, সহিংসতা ও সংখ্যাগুরুবাদী চৈতন্য প্রসঙ্গ]

  • নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    • অনুবাদ: ইমন রায় 

    অনুবাদকের নোট: নোম চমস্কি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী ও আধুনিক ভাষাতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বর্তমানে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লরিয়েট অধ্যাপক এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভাষাতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের নাম কনসিক্যুয়েন্সেস অফ ক্যাপিটালিজম: ম্যানুফ্যাকচারিং ডিসকন্টেন্টস এন্ড রেজিস্ট্যান্স। নোম চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সি.জে. পলিক্রনিউ। তিনি একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও সাংবাদিক যিনি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করেছেন ও পড়িয়েছেন। বর্তমানে তাঁর গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে মার্কিন রাজনীতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক একীভবন, বিশ্বায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অর্থনীতি, এবং নব্য–উদারনৈতিকতার আর্থ–রাজনৈতিক প্রকল্পের বিনির্মাণ। তিনি ট্রুথ আউট এর একজন নিয়মিত প্রদায়কের পাশাপাশি ট্রুথ আউট এর পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রকল্পের একজন সদস্য। মূল লেখাটি ট্রুথআউটে Noam Chomsky: Russia’s War Against Ukraine Has Accelerated the Doomsday Clock শিরোনামে ৩০শে মার্চ ২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

    নোম চমস্কি; শিল্পী: সার্জ মেজেট; সূত্র: আর্টমেজেউর

    মূল সাক্ষাৎকার  

    ইউক্রেইন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার সামরিক কৌশল ও ভ্লাদিমির পুতিনের ভূ–কৌশলগত লক্ষ্যসমূহ নিয়ে অনেক জল্পনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, পুতিন কী চান সেটা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, এবং ইউক্রেইনীয় প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনেস্কির বারংবার মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো, যদিও এটি শীঘ্রই পরিবর্তিত হতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সম্ভাব্য স্পষ্টতম ইঙ্গিত দিয়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে তখন ইউক্রেইনের ধ্বংস অদ্যবধি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) তার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং ওয়াশিংটন থেকে এমন কোনো লক্ষণ নেই যে ইউক্রেইনে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাইডেন প্রশাসন গঠনমূলক কূটনীতিতে লিপ্ত হতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কার্যত রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহার করে আগুনে ঘি ঢালছেন।

    নিচের সাক্ষাৎকারে বিশ্বখ্যাত স্কলার ও নেতৃস্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী নোম চমস্কি ইউক্রেইন যুদ্ধের সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনীয়তাকে আমাদের নিকট সুচারুভাবে উন্মোচন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্পর্কে তাঁর কিছু অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টির মতাদর্শিক জগতের পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক উত্তাপ ও বই নিষিদ্ধকরণ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: নোম, ইউক্রেইনের যুদ্ধের সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কতিপয় ইউক্রেইনীয় কর্মকর্তার মতে, দেশটিকে “উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া”র মত ভাগ করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া তার কৌশল পরিবর্তন করছে। এর মধ্যে ন্যাটো তার পূর্ব ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেন রাশিয়ার বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও স্লোভেনিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেইনে শান্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন কেবল নীরবই থাকছে না, বরং আমরা শুনেছি বাইডেন তাঁর সাম্প্রতিক পোল্যান্ড সফরে পুতিনের বিরুদ্ধে অনেকটা বিষাক্ত তেজোদ্দীপ্ত কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছেন। এর ফলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছেন কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি আমেরিকান অভিজ্ঞ কূটনৈতিক রিচার্ড হাস বলেছেন যে বাইডেনের কথাগুলো একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। সমস্ত একাগ্রতার সাথে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবতে পারে যে ভীতিপ্রদর্শন ও নিরন্তর শক্তির ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে?

    নোম চমস্কি: কয়েকটি প্রশ্ন আছে, সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ, আমি এখানে যা বলার চেষ্টা করতে পারি তার চেয়েও বেশি আলোচনার যোগ্য। আমি মোটামুটি ক্রমানুসারে বলবো।

    চলমান সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দুটো গল্প আছে। পরিচিত গল্পটি দিয়েছেন ইউক্রেইনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল কিরিলো বুদানভ : ইউক্রেইনীয় সরকার উৎখাতের জন্য রাশিয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই রাশিয়া এখন একটি “কোরিয়ান দৃশ্যপট” পরিকল্পনা করার মাধ্যমে দেশটির দক্ষিণে ও পূর্বে, ডনবাস অঞ্চলে ও পূর্বাঞ্চলীয় আজভ সমুদ্র উপকূলের দিকে পিছু হটছে।

    রাশিয়ান ফেডারেশনের জেনারেল স্টাফ অফ দ্য আর্মড ফোর্সেস–এর প্রধান পরিচালন অধিদপ্তরের প্রধান কর্নেল জেনারেল সের্গেই রুদস্কয় একদম ভিন্ন একটি গল্প বলেছেন (২৫ মার্চ পর্যন্ত): ইরাকে জর্জ ডব্লিউ বুশের “মিশন সম্পন্ন” হওয়ার অনুরূপ, যদিও নাটকীয় কৃত্রিমতা নেই:

    বিগত আট বছর ধরে ইউক্রেইনীয় নাৎসিদের গণহত্যামূলক আক্রমণ থেকে ডনবাস পিপলস রিপাবলিককে রক্ষা করাই হচ্ছে “বিশেষ সামরিক অভিযান” এর মূল লক্ষ্য। ইউক্রেইন যেহেতু কূটনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই অসামরিকদের রেহাই দিয়ে খুব সতর্কতার সহিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ইউক্রেইনের “বিসামরিকীকরণ ও বিনাৎসিকরণ” এর জন্য অভিযানটি বিস্তৃত করা প্রয়োজনীয় ছিলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাযথভাবে দক্ষতার সহিত প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে। যা অবশিষ্ট আছে তা হলো “ডনবাসের পূর্ণ মুক্তি।”

    দুটো গল্প, একই সমাপ্তি, যা আমি মনে করি নিখুঁত।

    পশ্চিম, বেশ স্বাভাবিকভাবে, প্রথম গল্পটি গ্রহণ করেছে। এটি সেই গল্পটি গ্রহণ করেছে যা আমাদের বলে যে রাশিয়ানরা তাদের সীমান্ত থেকে কয়েক মাইলের মধ্যে শহরগুলো দখল করতে সক্ষম নয়, যেগুলো বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসারে একটি নাগরিক সৈন্যবাহিনী সমর্থিত সীমিত সামরিক শক্তি দ্বারা রক্ষিত।

    অথবা পশ্চিম কি এই গল্পটি গ্রহণ করে? এর কার্যকলাপ ইঙ্গিত দেয় যে এটি জেনারেল রুদস্কয়ের সংস্করণটি বেশি পছন্দ করে—একটি অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষমতাধর ও সুদক্ষ রাশিয়ান সামরিক যন্ত্র ইউক্রেইনে তার লক্ষ্যসমূহ তাড়াতাড়ি অর্জন করার মাধ্যমে হয়ত দক্ষতার সহিত ন্যাটোকে গ্রাস করে এখন ইউরোপকে আক্রান্ত করার জন্য এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। যদি তাই হয়, তাহলে এই দানবীয় শক্তির আসন্ন আক্রমণকে ঠেকানোর করার জন্য ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তিবৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

    আরেকটি ভাবনা নিজেই প্রকাশিত হয়—এটা কি হতে পারে যে ইউরোপকে ওয়াশিংটনের খপ্পরে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে পুতিন তাকে যে দারুণ উপহার দিয়েছেন সেটাকে ওয়াশিংটন আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, এবং সেজন্য পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তার জানামতে আক্রমণের হুমকি না থাকার পরেও সেখানে শক্তিবৃদ্ধি করতে ইচ্ছুক?

    আমরা পূর্বে যে যৌথ বিবৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি সে অবস্থান থেকে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন সরে আসেনি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার বিবৃতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে ইউক্রেইনকে স্বাগত জানিয়েছে এবং “ন্যাটোর বর্ধিত সুবিধাদির একটি অংশীদার হিসেবে ইউক্রেইনের পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখার জন্য বলিষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন কর্মসূচি”র পাশাপাশি ইউক্রেইনকে উন্নত এন্টি–ট্যাংক ও অন্যান্য অস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে “মার্কিন–ইউক্রেইন কৌশলগত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি ভিত্তি রচনা করে এমন একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত করেছে।”

    পুতিন কেন ইউক্রেইন আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুঁজে বের করার জন্য তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত মনের গভীর নিভৃতে পৌঁছানোর ব্যাপারে অনেক বিদগ্ধ আলোচনা রয়েছে। অপরাধমূলক আগ্রাসনের দিকে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি ইউক্রেইনের সীমান্তে বাৎসরিক সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করার জন্য তাঁর নিরুত্তর আহ্বানের বিষয়ে কিছুটা মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি অনেক উচ্চপদস্থ মার্কিন কূটনৈতিক, সিআইএ পরিচালক, এবং আরও অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত যারা এসমস্ত উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করার বোকামি সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন।

    শিল্পী: এলেক্স উইলিয়ামসন; সূত্র: নিউস্টেটসম্যান

    ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের সিদ্ধান্তকে বোঝার সঠিক পন্থা হচ্ছে সম্ভবত পুতিনের মনের অনুসন্ধান করা। হয়ত আরেকটি সম্ভাবনা আছে। হয়ত ২৫ বছর আগে বরিস ইয়েলেৎসিন থেকে শুরু করে তিনি ও অন্যান্য রাশিয়ান নেতৃবৃন্দ ইউক্রেইনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে যা বলে আসছিলেন সেটাই বুঝিয়েছেন; এবং সম্ভবত, অত্যন্ত উস্কানিমূলক যৌথ বিবৃতিটি যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাবিয়ে রাখা হয়েছে, পুতিন হয়ত এ বিষয়ে ভেবে থাকবেন এবং তাই সরাসরি সংঘর্ষের যে প্রচেষ্টাকে প্রতি বছর উপেক্ষিত রাখা হয় সেটিকে ত্বরান্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    হয়ত, এটি একটি সম্ভাবনা।

    সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, “যদি রাশিয়া সেনা প্রত্যাহার করে নেয় এবং কিয়েভ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পায় তাহলে ইউক্রেইন নিরপেক্ষতা ঘোষণা করতে, ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা ত্যাগ করতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিকশিত না করার জন্য প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত।”

    এটি একটি প্রশ্নকে তুলে ধরে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে ও গত সেপ্টেম্বরের নীতিমালা বিবৃতির অবস্থানকে বজায় রাখার মাধ্যমে এসব প্রচেষ্টায় বাগড়া দেওয়ার পরিবর্তে নমনীয় হবে, এবং ইউক্রেইনকে অধিকতর দুর্দশা থেকে রক্ষা করার চেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে যাবে?

    পুতিনকে পালাবার কোনো পথ না দিয়ে, তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বাইডেনের অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্যের দিকে এই প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে যায়। বাইডেনের বক্তব্য কার্যত একটি যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে স্বীকৃত যার পরিণতি হতে পারতো ভয়াবহ, বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই আতঙ্ক তাঁর কর্মকর্তাদের মধ্যেও কম নয়, যারা ত্বরিত হয়ে বিশ্বকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি যা বলেছেন তাঁর কথায় সেটা বুঝায় না। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের অবস্থানকে বিচার করলে এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া মুশকিল।

    বাইডেন তখন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে তাঁর বক্তব্য “নৈতিক ক্ষোভের” একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, রাশিয়াকে যে “কসাই” শাসন করে তাঁর অপরাধের প্রতি বিতৃষ্ণা। অন্য কোনো চলমান পরিস্থিতি আছে যা নৈতিক ক্ষোভকে অনুপ্রাণিত করতে পারে?

    ঘটনাগুলো ভেবে দেখা কঠিন কিছু নয়। সবচেয়ে ভয়াবহগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান। আক্ষরিকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারের সম্মুখীন, একটি সুবিশাল ট্র্যাজেডি। বাজারে খাবার আছে, কিন্তু ব্যাংকে যাওয়ার সুযোগ না থাকার কারণে যাদের অল্প টাকা আছে তাদের সন্তানদের অনাহারে দেখতে হয়।

    কেন? একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ওয়াশিংটনের ২০ বছরের যুদ্ধকে প্রতিরোধ করার সাহস দেখানোর কারণে দরিদ্র আফগানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নিউ ইয়র্কের ব্যাংকগুলোতে রক্ষিত আফগানিস্তানের তহবিলগুলো মুক্ত করতে ওয়াশিংটন অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সরকারি অজুহাত আরও বেশি লজ্জাজনকঃ আমেরিকানরা ৯/১১ এর অপরাধের ক্ষতিপূরণ চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই অনাহারী আফগানদের থেকে তহবিলগুলো আটকে রাখতে হবে, যার জন্য আফগানরা দায়ী নয়। মনে রাখুন তালেবানরা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলো, যার অর্থ দাঁড়ায় আল–কায়েদা সন্দেহভাজনদের ফিরিয়ে দেওয়া। (মার্কিন আক্রমণের সময়, আদতে তার অনেক পরে, যেটা এফবিআই নিশ্চিত করেছিলো, তারা কেবল সন্দেহভাজন ছিলো) তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘোষণার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছে যে, “যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণের বিষয়ে দরকষাকষি করতে ইচ্ছুক নয়।” ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামসফেল্ডের কথাটি জর্জ ডব্লিউ বুশের দ্বারা প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো।

    এই চলমান অপরাধের ব্যাপারে যদি কোনো নৈতিক ক্ষোভ থাকে, সেটা শনাক্ত করা কঠিন। এটি একমাত্র ঘটনা নয়। কোনো শিক্ষণীয় কিছু আছে? হয়ত আছে, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট সাধারণ মনে হলেও এ বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার।

    ইউক্রেইনে রাশিয়ার অপরাধের ব্যাপারে নৈতিক ক্ষোভটি বোধগম্য এবং ন্যায়সঙ্গত। নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনও বোধগম্য কিন্তু ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি অনেক দেখা যায় বলে বোধগম্য।

    শ্রেষ্ঠ নিয়মের চেয়ে আরও বেশি প্রাথমিক মৌলিক নীতির কথা চিন্তা করা দুষ্কর—ইহুদী ঐতিহ্যে নিয়মটি হচ্ছে, “তোমার কাছে যা ঘৃণিত তা অন্যদের সাথে করো না।”

    এমন কোনো নিয়ম নেই যা এর চেয়ে বেশি মৌলিক, কিংবা নিয়মিতভাবে এর চেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়। একটি অনুসিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তা সত্য : উদ্যম ও মনোযোগ সেখানেই কেন্দ্রীভূত করা উচিত যেখানে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালো করতে পারি। আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে সাধারণত এর অর্থ হচ্ছে নিজ রাষ্ট্রের কাজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা, বিশেষত কম–বেশি গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে যেখানে ফলাফল নির্ণয়ে নাগরিকদের কিছু ভূমিকা থাকে। আমরা মিয়ানমারের [বার্মা নামেও পরিচিত] অপরাধকে ঘৃণা করতে পারি, কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরে কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করার জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পারি না। যেসকল দুর্দশাগ্রস্ত ভুক্তভোগী পালিয়ে এসেছেন কিংবা উৎখাত হয়েছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা, তাদেরকে সাহায্য করার জন্য অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু আমরা করবো না।

    পর্যবেক্ষণটিকে সর্বজনীন করা হয়। নীতিটি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক। প্রকৃত চর্চাটি নীতির সাথে সঙ্গতি রাখতে ব্যর্থ হয়, এটা বললে খুবই অবমূল্যায়ন হবে। 

    ওয়ার; কার্টুনিস্ট: ফ্রাগিস্কস; সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন নয় যে আমরা নীতিটি বুঝি না এবং সেটাকে সম্মান করি না। আমরা সত্যিকারের অনুরাগের সহিত তা করি যখন আনুষ্ঠানিক প্রতিপক্ষদের সমাজে এই নীতিটি পরিলক্ষিত হয়ঃ যেসকল রাশিয়ান সাহসিকতার সাথে কঠোর রাশিয়ান স্বৈরতন্ত্রকে অস্বীকার করছেন ও রাশিয়ান আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন তাঁদের প্রতি আমরা কুর্নিশ জানাই। এর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা সবসময়ই সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বীদের গভীরভাবে সম্মানিত করেছি যারা তাঁদের নিজ রাষ্ট্রের অপরাধগুলোর নিন্দা জানিয়েছেন এবং এমনকি অন্যরা যখন প্রধান মার্কিন অপরাধগুলোকে প্রশংসিত করতেন, তাদের নিয়েও কথা বলতে একদমই কুণ্ঠিত হতেন না। চীনা ও ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তা–ই। যখনই কেবল আমাদের ওপর নীতিটি প্রযোজ্য হয় তখন এটি একদমই অনুশীলন করা হয় না।

    ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ হচ্ছে আমাদের অনেক নাটকীয় নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। একে একটি “কৌশলগত সাংঘাতিক ভুল” (বারাক ওবামার মতে) হিসেবে সমালোচনা করা যেতে পারে এবং এটি যা ছিলো সে হিসেবে নয়ঃ অপ্ররোচিত ও খুনে আগ্রাসন, ন্যুরেমবার্গের দণ্ডাদেশ অনুসারে “সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ।”

    সে অনুযায়ী নৈতিক ক্ষোভের নাটকীয় নির্বাচনটি বোধগম্য এবং সেটি আরেকটি ক্ষোভ। অপরাধকে লঘু করার দুর্বল প্রয়াস হিসেবে আমরা আরও বলতে পারি যে এটি মার্কিন আবিষ্কার নয়। আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা, ব্রিটেন সহকারে, ভিন্ন কিছু ছিলেন না; তর্কসাপেক্ষে আরও খারাপ ছিলেন, যদিও শতাব্দীব্যাপী জঘন্য আচরণের পর এখন দায়স্বীকারের সূচনা হয়েছে।

    পরবর্তী প্রশ্নের দিকে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবে যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে? কোনো সন্দেহ নেই। দৃষ্টান্ত রয়েছে যেগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার। আমরা চাইলে আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ব্যাপারে সেগুলো থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।

    ঠিক এই মূহুর্তে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তকে উদযাপন করার জন্য আমাদের সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে—ইসরায়েল ও চার আরব স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে চলমান “নেগেভ সম্মেলন।” এই ঐতিহাসিক সভাতে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্থনি ব্লিংকেনের মতে, এটি “এই অঞ্চলে শান্তি ও সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনাকে বর্ধিত করবে।”

    সম্মেলনটি আব্রাহাম চুক্তির ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথের মধ্যে থাকা সর্বাধিক নিষ্ঠুর ও সহিংস রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করেছে। চুক্তিটি ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও মরক্কোর মধ্যকার মৌন সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকতা দিয়েছে, যেখানে সৌদি আরব তার মুখাপেক্ষী বাহরাইন একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে অন্তর্নিহিতভাবে উপস্থিত ছিলো। সম্মেলনে মিশর তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো, যেটি এখন প্রায় ৬০,০০০ রাজনৈতিক বন্দী ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তার কুৎসিত ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য একনায়কতন্ত্রের অধীনে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সবচেয়ে বড় গ্রাহক হচ্ছে মিশর। সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বর্ণবাদী রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া শীর্ষস্থানীয় গ্রাহকের জঘন্য রেকর্ড পর্যালোচনা করার দরকার নেই।

    বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানবিক সংকট হিসেবে জাতিসংঘ যাকে আখ্যা দিয়েছে, সেই ইয়েমেনের জন্য প্রাথমিক দায়ের ভাগীদার হচ্ছে ইউএই ও সৌদি আরব। গত বছর সরকারি হিসেবে মৃত্যু সংখ্যা তিন লাখ সত্তর হাজারে পৌঁছেছে। আসল সংখ্যা কেউ জানে না। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত একমাত্র বন্দরটির ওপর সৌদি আরব তার অবরোধ জোরদার করেছে। জাতিসংঘ চরম সতর্কবার্তা প্রচার করছে, লক্ষ লক্ষ শিশুর আসন্ন অনাহারের ঝুঁকির কথা বলছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা সাধারণ সতর্কবার্তার সাথে গলা মিলিয়েছেন। ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ব্রুস রিডেলের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য, যিনি চার জন প্রেসিডেন্টের আমলে মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএ–এর সাবেক শীর্ষ বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, সৌদির “আক্রমণাত্মক কাজকে” একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, খুচরা যন্ত্রাংশ ছাড়া সৌদি ও আমিরাতি বিমান বাহিনী কাজ চালাতে পারে না। অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সাথে ব্রিটেন এই অপরাধে অংশ নিচ্ছে, তবে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগে মরক্কোর একনায়কতন্ত্রকেও স্বাগত জানানো হয়েছিলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি তাঁর ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিরুদ্ধে গিয়ে মরক্কো কর্তৃক পশ্চিম সাহারার অন্তর্ভুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন—যা ঘটনাক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপূরণীয় সম্পদ পটাশিয়ামের ওপর মরক্কোর কার্যত একাধিপত্যকে জোরদার করেছে, যা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন।

    মরক্কোর অপরাধমূলক অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দেওয়াকে আশ্চর্যজনক হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি ইসরায়েল কর্তৃক গোলান উপত্যকা এবং বিশালাকারে বিস্তৃত বৃহৎ জেরুজালেমের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে অনুসরণ করেছে, উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিষদের আদেশগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই চমৎকার বিচ্ছিন্নতা, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই উপভোগ করে, তার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থনটি গৃহীত হয়েছিলো, যেমনটা ৬০ বছর ধরে কিউবাকে তার অত্যাচারের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

    এগুলো কেবল “আইনের শাসন” ও সার্বভৌমত্বের অলঙ্ঘনীয়তার প্রতি অঙ্গীকারের আরও কিছু দৃষ্টান্ত, যা ওয়াশিংটন ৭০ বছর যাবত ইরান, গুয়াতেমালা, ব্রাজিল, চিলি, ইরান ও আরও অনেক দেশে দেখিয়েছে—ইউক্রেইনকে ন্যাটোতে যোগ দিতে স্বাগত জানানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।

    আমরা এখন যে সম্মেলটিকে উদযাপন করছি সেটি আব্রাহাম চুক্তির একটি সরাসরি বিকাশ। এগুলো প্রণয়ন করার জন্য জেয়ারড কুশনারকে (হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক অ্যালান দারশোভিচ কর্তৃক) নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

    সংঘাতের শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় ওয়াশিংটন যে তার নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছে সেটা আব্রাহাম চুক্তি ও আজকের নেগেভ সম্মেলনেই প্রথম নয়। সর্বোপরি, হেনরি কিসিঞ্জার কূটনৈতিক ইতিহাসে গণহত্যার অন্যতম অসাধারণ আহ্বানটি প্রচার করার পরপরই ভিয়েতনামে শান্তি আনয়নে তাঁর অর্জনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেনঃ “কম্বোডিয়াতে এক ব্যাপক বোমা হামলা অভিযান। যা কিছু চলনশীল তার ওপর দিয়ে উড়তে হয়।” পরিণাম ছিলো ভয়াবহ, কিন্তু কোনো ব্যাপার নয়।

    কিসিঞ্জারের পুরস্কার মনে করিয়ে দিয়েছে যে [ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী] মেনাশিম বেগিনকে পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার প্রদানের জন্য একজন ইসরায়েলি পদার্থবিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন, তাঁকে শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের পুরস্কার কেন নয়?”

    এই ঠাট্টা অনেক সময় অন্যায্য। জিমি কার্টার নিশ্চিতভাবে শান্তি পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন যা তিনি প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তাঁর প্রচেষ্টার জন্য লাভ করেছিলেন। পুরস্কার কমিটি অবশ্য জোর দিয়ে বলেছিলো যে ক্ষমতায় থাকার সময় প্রেসিডেন্ট কার্টারের “ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যকার ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি নোবেল পুরস্কারের জন্য যোগ্য হওয়ার একটি অতিশয় যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিলো।”

    কার্টারের ১৯৭৮ সালের প্রচেষ্টাগুলো নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম নিয়তের সহিত গৃহীত হয়েছিলো। এটি পুরোপুরি সেরকম ফল লাভ করেনি। মেনাশিম বেগিন মিশরীয় সিনাইয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রকল্পকে পরিত্যাগ করতে রাজি হয়েছিলেন কিন্তু চুক্তিগুলো থেকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারসমূহকে বাদ দেওয়ার জন্য জোর করেছিলেন, এবং অ্যারিয়েল শ্যারনের পরিচালনায় সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সহায়তার সহিত ও নিরাপত্তা পরিষদের নিদের্শনাকে লঙ্ঘন করে অবৈধ স্থাপনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। আর ইসরায়েলি কৌশলগত বিশ্লেষকরা দ্রুতই বের করেছিলেন যে, মিশরীয় প্রতিবন্ধকতাকে সরিয়ে ফেলার কারণে ইসরায়েল লেবাননে তার আক্রমণ বৃদ্ধি করতে পেরেছিলো, যার ফলে অবশেষে ১৯৮২ সালের মার্কিন সমর্থিত আক্রমণে প্রায় ২০,০০০ লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং কোনো বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত ছাড়াই লেবাননের অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো।

    রাজধানী শহর বৈরুতের ওপর বোমাবর্ষণ যখন ওয়াশিংটনের জন্য আন্তর্জাতিক গ্লানি তৈরি করছিলো তখন রোনাল্ড রিগ্যান অবশেষে ইসরায়েলকে আক্রমণ বন্ধ করতে আদেশ দেন। ইসরায়েল অবশ্যই সম্মত হয়েছিলো কিন্তু তাদের ভাষায় যে “সন্ত্রাসবাদী গ্রামবাসীরা” নিষ্ঠুর দখলদারিত্বের প্রতিরোধ করেছে তাদের প্রতি ক্রমাগত অত্যাচারের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলো। এটি খিয়ামে–ও একটি জঘন্য নির্যাতন কক্ষ স্থাপন করেছিলো। হিজবুল্লাহ গেরিলা যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে শেষমেশ ইসরায়েলকে চলে যেতে বাধ্য করার পর একে একটি স্মৃতিস্থাপনা হিসেবে রাখা হয়েছিলো। ইসরায়েলি বোমা হামলার মাধ্যমে অপরাধের স্মৃতিকে ধ্বংস করার আগে আমাকে সেটা ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিলো।

    অতএব, হ্যাঁ, কিছু ঘটনা আছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার পূর্বেকার অন্যান্য আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মত, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেছে।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: দেশে রিপাবলিকানরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির জন্য মদদ দিচ্ছে, যদিও তাদের “মহান নেতা” চলমান ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাল মেলানোর জন্য পুতিনের ব্যাপারে তাঁর সুর পরিবর্তন করে চলেছেন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছেঃ এখনও জিওপি (রিপাবলিকান পার্টি) সদস্যদের মধ্যে, বিশেষত রাজনৈতিক বলয়ের অতি ডানপন্থীদের মধ্যে, রাশিয়া ও পুতিনের জন্য সমর্থন থাকার কারণ কী? দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত যখন ইউক্রেইনের পক্ষে তখন কোন জিনিসটি রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে রাশিয়ার বিষয়ে মতদ্বৈধতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অতি ডানপন্থীদের অনুপ্রাণিত করছে?

    নোম চমস্কি: এটি শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেইন নয়। ইউরোপ যখন হাংগেরিতে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের “সংকীর্ণ গণতন্ত্র”কে নিন্দা জানিয়েছে তখন এটি আমেরিকান ডানপন্থার অনেকাংশের প্রিয়ভাজন হয়েছে। ফক্স নিউজ ও তার প্রধান সম্প্রচারক টাকার কার্লসন এর নেতৃত্বে আছেন, কিন্তু অন্যান্য প্রখ্যাত “রক্ষণশীলরা” হাঙ্গেরির স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে ওরবান কর্তৃক আরোপিত আদি–ফ্যাসিস্ট খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রশংসায় গা ভাসাচ্ছে।

    এসব কিছুই রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে একটি সংঘাতকে প্রতিফলিত করে—অথবা আরও সঠিকভাবে বললে, এক সময়কার একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের যা অবশিষ্ট আছে তা এখন নব্য–ফ্যাসিবাদী উৎসের ইউরোপীয় দলগুলোর কাতারে অবস্থান করছে। ট্রাম্প যে প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছেন তার মূলে আছে ৩০ বছর আগে নিউট গ্যাংরিচ কর্তৃক পার্টির কর্তৃত্ব গ্রহণ। ট্রাম্প এখন ডানপন্থীদের কাছে পরাস্ত হচ্ছেন, খুব বেশি দিন আগেও এটা কল্পনা করা কঠিন ছিলো না। অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ তাদের সাথে ভক্তিপূর্ণ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ওরবান মডেলের দিকে ঝুঁকছেন অথবা তার চেয়েও বেশি কিছু। আমি মনে করি রাশিয়া ও ইউক্রেইনের বিষয়ে দলটির ভেতরের বিতর্ককে এই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: জিওপি আইনপ্রণেতারা বর্ণ বিষয়ক বইগুলোকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টাকে জোরদার করছেন, যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব ও বর্ণগত অত্যাচার ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে কারোর কল্পনাপ্রসূত উদ্ভাবন। বই নিষিদ্ধ করা ও ভোট দমন করার চেষ্টা কি সম্পর্কযুক্ত? এসব ঘটনাপ্রবাহ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ঘনীভূত হওয়ার ইঙ্গিতকে প্রতীয়মান করে?

    নোম চমস্কি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধকরণ নতুন কিছু নয় এবং গতানুগতিকভাবে বলা যায়, “ভুল” লোকদের ভোট দমন করা আপেল পাইয়ের মতই আমেরিকান। শীঘ্রই ক্ষমতা পুনঃদখল করতে উদ্যত রিপাবলিকান প্রতিষ্ঠান যখন এক ধরনের আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে তখন এগুলো শক্তি নিয়ে ফিরে আসছে। কতিপয় সাবধানী বিশ্লেষক গৃহযুদ্ধকে আঁচ করেন। অন্ততপক্ষে একটি গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকট রূপধারণ করছে। আমেরিকার অবক্ষয় নিয়ে অনেক দিন যাবত অনেক আলোচনা হচ্ছে। এর যতটুকু বাস্তব, তার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ। গভীরে তাকালে দেখা যাবে অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবক্ষয়ের বেশিরভাগই বিগত ৪০ বছরের নব্য–উদারনৈতিক কার্যক্রমের নিষ্ঠুর প্রভাব থেকে উদ্ভূত। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। হাঙ্গেরি যখন খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে যায় তখন এটি যথেষ্ট খারাপ। বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে যখন এটি ঘটে তখন এর পরিণাম হয় অশুভ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: যেসব দেশ ওয়াশিংটনের আদেশ মোতাবেক চলতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশল। এমনকি নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা দেশগুলোতে বসবাসরত বিদগ্ধজনদের অবাঞ্ছিত হিসেবে গণ্য করা হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণপরিসরে ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠস্বরদের ব্যাপকভাবে শুনতে দেওয়ার অনুমোদন দিতে একদমই আগ্রহী নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু বলতে চান?

    নোম চমস্কি: এটি এত বড় বিষয় যে এখানে বলা যাবে না। আর এটি নৈমিত্তিক বক্তব্যের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি স্মরণ করা উচিত যে আবারও এটি নতুন কিছু নয়। আমরা সবাই স্মরণ করতে পারি যে ইরাকে ওয়াশিংটনের অপরাধমূলক হামলায় যোগ দিতে ফ্রান্সের দুর্বিনীত অস্বীকৃতির ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহান সিনেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে পরিবর্তিত করে “ফ্রিডম ফ্রাইজ” করেছিলো। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন, যিনি পাশ্চাত্য মহলের মুষ্টিমেয় কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কণ্ঠস্বরদের মধ্যে একজন, যদি কথায় ও কাজে পরিমিতির এবং কূটনৈতিক বিকল্পসমূহের খোঁজ করতে আহ্বান জানান তাহলে আমরা একই রকম কিছু দেখতে পারি। ভীতি প্রদর্শনের এই সহজ প্রবণতার ঝোঁক অনেক আগে থেকে চলে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো তখন এটি হাস্যকর গভীরতায় পৌঁছেছিলো এবং জার্মান সবকিছুই তৎক্ষণাৎ গর্হিত হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলো।

    যে রোগের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন তা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দেই, আমি সম্প্রতি এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম যে ব্রিটেনের একটি অত্যন্ত সম্মানিত দর্শনের জার্নাল তাঁর একটি নিবন্ধ না পড়েই ফেরত দিয়েছে। তাঁকে নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছে নিবন্ধটি বিবেচনা করা যাবে না কারণ তিনি ইরানের নাগরিক, যা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা একটি দেশ।

    নিষেধাজ্ঞাকে ইউরোপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেছে, কিন্তু বরাবরই প্রভুর কাছে নতি স্বীকার করেছে, এমনকি একজন ইরানি দার্শনিকের নিবন্ধটিও নিষিদ্ধ করেছে। ক্ষমতার প্রতি এই নতি স্বীকারকে জোরদার করাই হচ্ছে ওয়াশিংটনকে দেওয়া পুতিনের সেরা উপহার।

    আমার কিছু নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি এখানে অনেক উদাহরণ যোগ করতে পারি, কিন্তু বিদ্বেষ যে এর চেয়েও বেশি দূর যেতে পারে সেটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

    আমরা বিপজ্জনক সময়ে বাস করি। আমরা হয়ত স্মরণ করতে পারি মহাপ্রলয়ের ঘড়িটি ট্রাম্পের আমলে মিনিট ত্যাগ করে সেকেন্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং বর্তমানে মধ্যরাত—সমাপ্তি—থেকে ১০০ সেকেন্ড আগে স্থির করা হয়েছে। যেসকল বিশ্লেষক ঘড়িটিকে স্থির করেছেন তারা তিনটি কারণ দেখিয়েছেন—পারমাণবিক যুদ্ধ, পরিবেশগত ধ্বংস, এবং গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসরের পতন। এগুলো এই আশাকে ক্ষুণ্ণ করে যে অবগত ও জাগ্রত নাগরিকরা তাঁদের সরকারকে দুর্যোগের এই দ্বৈত প্রতিযোগিতাকে অতিক্রম করতে বাধ্য করবে।

    ইউক্রেইনের যুদ্ধ এই তিনটি দুর্যোগময় প্রবণতার সবগুলোকে খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। পারমাণবিক হুমকি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার হাত থেকে সভ্যতাকে রক্ষার জন্য পৃথিবীতে জীবনের ধ্বংসকারীদের প্রশংসিত করার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমশ কম ব্যবহারের গুরুতর প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করা হয়েছিলো। আর গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসর ভয়ানক পতনের দিকে রয়েছে।

    এসব কিছু আমাদেরকে ৯০ বছর পেছনে নিয়ে যায়। অবশ্য ঝুঁকিগুলো আজ অনেক বেশি। তারপর, ব্যাপকভাবে পুনরুজ্জীবিত শ্রম আন্দোলনের প্রেরণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোশ্যাল ডেমোক্রেসির পথে অগ্রসর হয়ে এই সংকটের মোকাবেলা করেছিলো। ইউরোপ ফ্যাসিবাদী অন্ধকারের নিমজ্জিত হয়েছিলো।

    এখন কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। এটি যে আমাদের ওপর নির্ভর করছে সেটাই একমাত্র নিশ্চয়তা।

  • রিসেট।। বীজের কর্পোরেট বাণিজ্যিকীকরণ

    রিসেট।। বীজের কর্পোরেট বাণিজ্যিকীকরণ

    • অনুবাদ: রাহুল বিশ্বাস

    সম্পাদকীয় মন্তব্য:  RESET – Digital for Good স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি প্ল্যাটফর্ম; বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু/সমস্যা সমাধানের দিকে নজর দেয়াটাই তাদের মূল লক্ষ্য। ডিজিটাল পরিসরকে ব্যবহার করে তারা এমনসব প্রকল্প বা ব্যবসা-উদ্যোগকে সামনে নিয়ে আসেন যেগুলো ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম। বর্তমান জমানার দুটো প্রধান প্রবণতাকে- অর্থাৎ, ক্রমবর্ধমান ডিজিটালাইজেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তন- সামনে রেখে তারা কাজ করে যান। প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে তাদের পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়নের জন্য কীভাবে ডিজিটাল টুলসগুলো ব্যবহার করা যায়। নিচের প্রবন্ধটি ‘The Privatisation of Seeds’ শীর্ষক প্রবন্ধের অনুবাদ। প্রবন্ধে বীজের প্রাইভেটাইজেশন নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ জরুরি কিছু মন্তব্য করা হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: মাদার আর্থ
    শিল্পী: সুমিত দত্ত
    সূত্র: পিকটোরেম

    মূল প্রবন্ধ 

    বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা তাদের নিজস্ব ফসল থেকে বীজের প্রাপ্তি হারাচ্ছে এবং বীজ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নতুনভাবে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। মনসান্টো বীজের বাজারকে একচেটিয়াভাবে দখল করেছে। ফলশ্রুতিতে বাজারে উদ্ভিদের জাত বৈচিত্র্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে। যার পরিণতি স্বরূপ আমাদের পরিবেশ এবং কৃষক, যারা বীজ থেকে ফসল ফলায়, উভয়ের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

    বীজ কারখানাগুলো আগের তুলনায় এখন আরো বেশি একীভূত। বাণিজ্যিক বীজ বাজারের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ দশটি বৃহত্তম বীজ কর্পোরেশনের আওতাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ তিনটি বীজ কর্পোরেশন মনসান্টো, ডুপন্ট এবং সিনজেন্টা বাজারের অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ ভাগ) দখল করে আছে। গ্রিনপিসের জিনগতভাবে পরিবর্তিত বীজের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মনসান্টো ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৯০ শতাংশ জিনগত পরিবর্তিত বীজ বিক্রি করেছে।

    তবে আঞ্চলিক পার্থক্য রয়েছে। যদিও শিল্পোন্নত দেশগুলিতে কৃষি প্রধানত বাণিজ্যিক বীজ সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল, তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও এগুলির থেকে তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র। ভারতীয় কৃষিতে বিদ্যমান বাণিজ্যিক বীজের অনুপাত আনুমানিক ৩০ শতাংশ, এবং সমগ্র আফ্রিকায় ১০ শতাংশের কম।

    যদিও এক তৃতীয়াংশ পটপরিবর্তনের মতো নাও শোনাতে পারে, বাণিজ্যিক বীজ বাজার এবং বিশেষ করে মনসান্টো ভারতীয় কৃষকদের উপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছে। তুলা চাষীরা বিশেষ করে চাপে পড়েছে কারণ মনসান্টো তার জিনগত পরিবর্তিত বীজের মাধ্যমে তুলার বীজের বাজারের ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

    কিভাবে আমরা এই পর্যায়ে এলাম? খামার থেকে কর্পোরেশন

    উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বাণিজ্যিক বীজের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের পিছনে রয়েছে কৃষির পট–পরিবর্তনের ইতিহাস, টার্গেটেড কোম্পানগুলো একীভূত হয় এবং পেটেন্টিং প্রক্রিয়া এবং আইনি কাঠামোর ব্যবহারের মাধ্যমে বীজের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে।

    মুষ্টিমেয় কৃষি–ব্যবসা কীভাবে কৃষিতে বীজের মতো মৌলিক কিছুর উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল তা বোঝার জন্য আমাদের পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। ঐতিহ্যগতভাবে বীজ একটি পূর্ণ পরিমণ্ডল তথা চক্র তৈরি করে, ফসল তোলার পর বীজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পরের বছরের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং চক্রটি কখনই বিঘ্নিত হয় না।

    ১৯৫০–এর দশকে কৃষিকে শিল্পায়ত করা শুরু হয়েছিলো এবং ১৯৬০ এবং ১৯৭০’র দশকে এর রমরমা অবস্থা শুরু হয়েছিল। ফলস্বরূপ, উৎপাদন পদ্ধতি ক্রমবর্ধিতভাবে যান্ত্রিক এবং যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ প্রবর্তিত হয়েছিল উল্লেখযোগ্যহারে ফসলের ফলন বৃদ্ধি এবং ব্যাপক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সংকট দূর করার লক্ষ্যে।

    রমরমা শিল্প কৃষির এই নতুন মডেল মেনে চলার জন্য, খামারগুলিকে আরও বড় হতে হবে এবং আরও বিশেষায়িত কাজগুলি করতে হবে। কৃষিকে যেমনটা আমরা জানি এটি আগের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যেমন এর মধ্যে বাজার রয়েছে। কাণ্ড–প্রজনন, বীজ, পশু খাদ্য, সার এবং কীটনাশক প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা বাজার আবির্ভূত হয়েছে। এই ধরনের একটি ব্যবস্থায়, কৃষকরা নিছক একটি উৎপাদন শিকলের সদস্য হয়। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ফসল উৎপাদন করতে পারে না।

    মনসান্টোসহ আরও কিছু সর্ববৃহৎ কৃষি কর্পোরেশন বাজারে প্রবেশ করায়, মাঝারি আকারের খামার এবং ব্যবসাগুলো নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি অন্যদের কেনার মাধ্যমে বা অন্যদের ব্যবসা নিজের সাথে যুক্ত করে প্রসারিত হতে সক্ষম হয়েছিল। ফলস্বরূপ, কৃষি অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে শুরু করে। সেই সাথে বীজের প্রকরণ হ্রাস পায় এবং তা ন্যায্য মূল্যে পাওয়া যায় না। উপরন্তু, যে কর্পোরেশনগুলি বীজ উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত তারা অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশক সরবরাহকারীও, যা বিক্রি করা হয় তাদের বীজের সাথে সাথে। বীজ এবং কীটনাশক উভয়ই সম্ভাব্য সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে যুক্ত থাকে এবং এই পদ্ধতিটি মনসান্টো দ্বারা সার্বিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

    মনসান্টোর মত বড় কর্পোরেশন কি অফার করছে? কৃষকরা এটা শুনে আঁতকে ওঠেন যে উচ্চ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন বীজের সাহায্যে তারা অনেক বেশি ফলন পাবে, যা শক্তপোক্তভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং কীটপতঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং সেই সাথে মেশিনের সাহায্যে দক্ষতার সাথে এবং অল্প খরচে ফসল কাটা হবে। সত্যিকার অর্থে ব্যবসাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে, ফলন আরও বাড়াতে এবং লাভ সর্বাধিক করতে, কর্পোরেশনগুলোর সংকর (হাইব্রিড) বীজের জাত রয়েছে।

    হাইব্রিড বীজ: যেমন গুণসম্পন্ন তেমন ক্ষতিকর

    কৃষির সূচনা লগ্ন থেকেই সর্বদা কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের একটা বাছাইকৃত অংশ আসন্ন বছরের চাষাবাদ বা ব্যবসার জন্য যত্ন সহকারে আলাদা করে রাখতো। বীজ হিসেবে ফসলের একটা অংশের এইরুপ পুনঃব্যবহার, বিশ্বব্যপী বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রয়েছে। তবে বীজ প্রকৌশলী ও প্রদানকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে, বীজ হিসেবে ফসলের অংশের এই পুনঃরোপন কিংবা এই বীজ কেনাবেচার অর্থ হল সম্ভাব্য গ্রাহকদের হারানো। আর এজন্যই সংকরীকৃত বীজ গুণসম্পন্ন।

    সর্বোত্তম সেচ, সার এবং কীটনাশকসহ সংকর জাতের প্রথম ফসলের ফলন ১৫–৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। যাইহোক এই বীজগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্ম একইধরণের ফলন দেয়না, এর পরিবর্তে এটি বিভিন্নধরণের উদ্ভিদের জন্ম দেয়। তাই সংকরীকৃত বীজ পুনরায় রোপণ করা সম্ভব হয় না এবং কৃষকরা প্রতি মৌসুমে বীজ পুনরায় ক্রয় করতে বাধ্য হয়। বীজ পরিবেশকদের (ডিস্ট্রিবিউটর) জন্য এটি সত্যিই দারুণ, এই বীজ বিক্রির মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সুরক্ষিত এবং পরিচালিত হয়।

    এটা বলা হয় যে সংকরীকৃত বীজ উচ্চমাত্রায় ফলন প্রাপ্তির জন্য প্রযুক্ত করা হয়, পোকামাকড় ও রোগ প্রতিরোধী ফসল উৎপাদন করে, যা প্রযুক্তিগতভাবে বলতে গেলে, অনেক সহজে কাটা যায়। তবে প্রকৃত অনুসন্ধানকারীরা দেখতে পান যে এই ফলাফলগুলি প্রাকৃতিক বীজের জাতগুলির সাথেও উপলব্ধি করা যেতে পারে, এবং অপরদিকে সংকরীকৃত ফলনের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসলের গুণমান, সেগুলি উত্পাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ ব্যয়, ফসলের বিরাজমান জাত বৈচিত্র্যতা হ্রাস এবং বড় বীজ কর্পোরেশনগুলির উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার প্রশ্নগুলি যার সাথে সম্পর্কিত।

    ক্ষুধার পরিবর্তে ‘উন্নয়ন’

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ জুড়ে কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাজারে একটি শক্তপোক্ত দখল নিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অফ এগ্রিকালচারাল নলেজ, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট (IAASTD)-এর তথ্যমতে, কর্পোরেশনগুলো যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে তা নিম্নোক্ত কারণে সমস্যাযুক্ত:

    • একচেটিয়া শক্তি গবেষণা ও উন্নয়নের একীভূতকরনের দিকে পরিচালিত হয় যা শুধুমাত্র অল্প সংখ্যক বীজের জাতগুলিতে বিনিয়োগ করে।

    • কেন্দ্রীভূত বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্যান্য খামারগুলোকে (যা বিকল্প পণ্য ও ব্যবসায়িক মডেল প্রদানে সক্ষম হতে পারে) অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে।

    • একটি অধিপত্যমূলক বাজারের প্রতিযোগীতা দমনকারী প্রভাব বীজের দামে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। জীবের জিনগত পরিবর্তন প্রবর্তনের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুলার বীজের দাম তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। তুলার বীজের দামের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও দেখা যায়।

    বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, হাইব্রিড বীজ এবং বীজের কঠোর পেটেন্টিংয়ের প্রভাব বিশ্বের দক্ষিণে অবস্থিত দেশগুলোকে মারাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

    ভারতে মনসান্টো

    বন্দনা শিবা একজন ভারতীয় অ্যাকটিভিস্ট এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইকোলজি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Research Foundation for Science, Technology and Ecology) প্রণেতা ও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যুক্তি দেন যে ভারতে মনসান্টোর একচেটিয়া বীজ কৃষকদের আত্মহত্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হয়ে উঠেছে। আলজাজিরাতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে শিবা যুক্তি দিয়েছেন যে “মনসান্টো এবং এর জনসংযোগকারীরা মরিয়া চেষ্টা করছে, তুলার বীজ সরবরাহে মনসান্টোর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলশ্রুতিতে ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার মহামারী যে পরস্পর সম্পর্কিত এই বিষয়টিকে আলাদা করার জন্য৷ আমাদের জন্য এটি বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ, সর্বপ্রথম সম্পর্কটা খাদ্য শৃঙ্খলের ভিতরকার, যেটা আমাদের জীবনের উৎস সেটা আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। যখন একটি কর্পোরেশন বীজ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কৃষকদের জীবনও যার অন্তর্ভুক্ত।

    ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতে মনসান্টোর উপস্থিতি রয়েছে যখন কিনা বিশ্ব ব্যাংক একটি নতুন বীজ নীতি প্রবর্তন করেছিল যার জন্য সরকারকে বীজ খাতকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে, যা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস নীতিগুলির সাথে অনেকগুলি পদক্ষেপের মধ্যে একটি। শিবা পাঁচটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন যা মনসান্টো ভারতীয় বীজ বাজারে প্রবেশ করার পর থেকে শুরু হয়েছে:

    • ভারতীয় কোম্পানিগুলো যৌথ উদ্যোগ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মনসান্টোর সাথে সূত্রবদ্ধ হয়, যা এটিকে সেক্টরের উপর একটি শক্তিশালী দখল নিশ্চিত করতে সক্ষম করে।

    • মনসান্টোর বীজগুলিকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল, যার অর্থ হল মনসান্টো রয়্যালটি সংগ্রহ করতে পারতো–এগুলি অর্জিত মোট বিক্রয়লব্ধ আয় বা নেট আয়ের (gross or net revenues) একটি পার্সেন্টেজ বা ভাগ বা ফসলের একটি নির্ধারিত মূল্য।

    • উপরন্তু যে বীজগুলি একসময় নবায়নযোগ্য সম্পদ ছিল তা এখন নবায়নযোগ্য নয় কারণ পেটেন্টযুক্ত সংকর ও জিন পরিবর্তিত জাতগুলো দ্বারা প্রাকৃতিক, মুক্ত–পরাগায়িত তুলার বীজ প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।

    • তুলা, যা পূর্বে অন্যান্য ফসলের সাথে সমন্বয় বজায় রেখে জন্মানো যেত, তা একটি একক শস্যে পরিণত হয়েছে যেটি পোকামাকড়, রোগ, খরা ও শস্যক্ষয়ের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল কীটনাশক ও সারের উপর নির্ভরশীল।

    • এবং সবশেষে মনসান্টো সরকারি নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াগুলিকে বিকল করতে শুরু করে। এমনকি ‘সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব’–এর মাধ্যমে অ–নবায়নযোগ্য সংকর এবং জিন পরিবর্তিত জাতগুলোকে বর্ধিত করার জন্য সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য সম্পদে প্রবেশাধিকার লাভ করে।

    শিবা আরও বলেন, “বীজে একচেটিয়া কর্তৃত্ব সৃষ্টি, বিকল্পের নিধন, রয়্যালটি আকারে অতিমুনাফা সংগ্রহ এবং এক–ফসলী চাষের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা ঋণগ্রস্ততা, আত্মহত্যা এবং কৃষি সংকটের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।”

    কয়েক বছর ধরে তিনি ভারতে মনসান্টোর একচেটিয়া ক্ষমতার বিরোধিতা করে আসছেন। উপদ্রব এবং অন্যদের প্রতিযোগিতা কিনে নেবার ফলে এটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে তুলা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ভারতীয় তুলা চাষীদের কাছে মনসান্টোর জিনগত পরিবর্তিত জাতের বিকল্প নেই।

    তবে অধিকাংশ কৃষকের কাছে এই বীজ তাদের সামর্থ্যের অধিক এবং ফলন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। পরিস্থিতিকে আরও সমস্যাজনক করে তুলেছে নতুন নতুন রোগ যার শস্য বোনা হয়েছে। যা তুলা গাছকে বিনষ্ট করছে কিংবা সম্পূর্ণরূপে তার ফলন ধ্বংস করছে।

    অপরদিকে বংশপরস্পরায় চলে আসা তুলা গাছগুলি সেই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির অবস্থার সাথে উপযোগী যেখানে তারা জন্মায়। জিনগতভাবে পরিবর্তিত উদ্ভিদগুলো জলবায়ুর সাথে অভিযোজিত (খাপ খাওয়ানো) হতে পারেনা। জিন পরিবর্তিত শস্যগুলোকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, স্বাস্থ্যবিনষ্টকারী এবং পরিবেশ অবান্ধব সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়।

    মনসান্টোর কারণে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কৃষক আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ঋণগ্রস্ত হয়েছে, কেউ কেউ অন্য উপায় না দেখে আত্মহত্যার দিকেও ঝুঁকছে। ভারত সরকারের মতে, প্রায় ৭৫% গ্রামীণ ঋণ নেওয়া হয় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের প্রয়োজনগুলো মেটাতে। কৃষকের ঋণ যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি মনসান্টোর লাভও বাড়ে এবং এটি এমন পদ্ধতি যে তাদের বীজের নাম দেওয়া হয়েছে “আত্মহত্যার বীজ”। শিবা নোট করেছেন, “প্রতি কেজি তুলার বীজের দাম ৭ থেকে ১৭০০০ রুপি…. মনসান্টো বছরে ১৫০০ কেজি ফলন হওয়ার প্রতারণামূলক দাবি করে তার জিনগতভাবে পরিবর্তিত বীজ বিক্রি করে, যখন কৃষক বছরে গড়ে ৩০০–৪০০ কেজি ফলন পেয়ে থাকে”।

    বছরের পর বছর ধরে বৃহৎ বীজ কর্পোরেশনগুলি উন্নয়নশীল দেশের বাজারগুলিতে প্রভাব বিস্তার করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক বীজ সরবরাহকারীদের উপস্থিতি নগণ্য ছিল। এই অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করার সময়, তারা এই আশা নিয়ে জুয়া খেলেছে যে বীজের ক্রমবিকাশ এবং জিনগত প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যার অলৌকিক সমাধান পাওয়া যাবে। যাইহোক, তথ্য–উপাত্ত একটি ভিন্ন গল্পকে সামনে আনে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর মতে, বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত ৮৬৮ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সম্পদ বঞ্চিত কৃষক যারা উর্বর জমির ছোট ছোট প্লটে চাষ করে।

    এতদসত্ত্বেও, বিশাল বীজ কর্পোরেশনগুলি তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ বীজে বিনিয়োগ করে যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত। একই সাথে, তারা চাপ এবং তাপ–প্রতিরোধী জিনগুলির উপর কঠোর পেটেন্ট অর্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের এই বাজারগুলিতে খাদ্য সরবরাহ করা থেকে আটকাতে সক্ষম হয়, যা ফলত নিশ্চিত করে যে বাজারে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক যেকোন কর্পোরেশনগুলিকে প্রথমে তাদের সাথে নিজেদের সন্ধি স্থাপন করতে হবে।

    অলিভিয়ার ডি শুটার, যিনি জাতিসংঘের খাদ্য অধিকার কর্মসূচির জন্য ‘বীজ নীতি এবং খাদ্যের অধিকার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছিলেন, বলেছেন যে বিশ্বের দক্ষিণ অঞ্চলে দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা মোকাবেলা করতে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে ক্ষুদ্র পরিসরের, জীবিকানির্বাহের উপায় অবলম্বনকারী কৃষকদের বীজে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় কাঠামোগুলির মাধ্যমে এগুলো বিক্রি ও লেনদেন করা যেতে পারে এবং তা আবহাওয়া, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনের জন্য যথাযথভাবে বিকশিত করা দরকার।

    জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন

    একটি একচেটিয়া বীজ অর্থনীতি এবং বীজ জাতগুলোর উপর আরোপিত প্রকৌশলের ফলে, উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সামগ্রিক হ্রাস উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর মতে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ৭৫% ফসলের জাত হারিয়ে গেছে। ভারতে সবুজ বিপ্লবের আগে প্রায় ৫০,০০০ ধানের জাত ছিল, এবং বিশ বছরের মধ্যে এই সংখ্যাটা মাত্র ৪০–৫০,০০০ থেকে ৪০। অনেকগুলো নতুন সংকর জাত সৃষ্টি হয়েছে যা সর্বপ্রকারের জিনগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে সক্ষম হবেনা।

    এই পরিসংখ্যানগুলি দেখলে অনেকটা ক্ষয়ক্ষতির মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু ফসলের বৈচিত্র্য রক্ষা করা কি সত্যিই এতটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ জাত বৈচিত্র্যতা অগণিত জিনগত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিমুখে উদ্গত হওয়ার (জন্মানোর) কার্যকর বিকল্প হিসাবে কাজ করতে পারে। আসুন আমরা ভুলে না যাই যে আমাদের পরিবেশ তীব্রভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর সাথে আমাদের কৃষি পদ্ধতি বা অন্তত আমরা যা রোপণ করি, তারও পরিবর্তন হতে পারে। যদি জলবায়ু অবস্থার বদল ঘটে তবে এমনও হতে পারে যে একটি পুরানো জাতের উদ্ভিদ আরও উপযুক্ত হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০–এর দশকে ভারতে একটি ভাইরাস দ্বারা প্রচুর পরিমাণে ধানের ফসল (জাত) নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যাইহোক, বাদবাকি ৬২৭৩ ধানের জাতগুলির মধ্যে একটি ছিল যা ভাইরাস প্রতিরোধী।

    জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি প্রথম সারির প্রতিবেদন যা ৪০০ জন বিজ্ঞানীর জ্ঞান সংকলন করেছে এবং ৫৮ টি দেশ দ্বারা সমর্থিত হয়েছে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসলগুলি দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা খুব কমই করে থাকে। উত্তম বিকল্প সুলভ–সহজলভ্য এবং রিপোর্টটি টেকসই উপায় হিসাবে জৈব (অর্গানিক) চাষকে বিজয়ী করেছে।

    এটি কার্যকর কিছু করার সময়

    এটি উদ্বেগের কারণ যে মুষ্টিমেয় কিছু বীজ কর্পোরেশন বীজের বাজারে, এবং পরবর্তীকালে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার বুনিয়াদগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে।

    আপনি যদি এই সমস্যার বিপরীতে অধিকতর সক্রিয় হতে চান তবে কেন কতক পিটিশনে স্বাক্ষর করে শুরু করবেন না?

    প্রয়াস ২, কৃষকের আত্মহত্যার সংকটে ঠেলে দেওয়ায় মনসান্টোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে একটি পিটিশন সাইট সাক্ষরের আহ্বান জানাচ্ছে, পক্ষান্তরে অনিবার্য ঋণে ভুগছেন এমন কৃষকদের মনসান্টোকর্তৃক আর্থিক সহায়তার তাগিদে, যদি আপনিও এটি করতে চান তবে স্বাক্ষর করুন৷

    অনলাইন অ্যাক্টিভিজম সংগঠন Avaaz মনসান্টোর পেটেন্ট অধিকার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি পিটিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, এটি সম্পর্কে এখানে আরও পড়ুন:

    যদি এই বিষয়টি আপনার আগ্রহের হয়, তাহলে আপনি লিয়া বোরোমিও (Leah Borromeo)-এর একটি ডকুমেন্টারি ডার্টি হোয়াইট গোল্ড দেখতে আগ্রহী হতে পারেন যার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন শিল্প ও আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের স্বভাব–প্রকৃতি ভারতীয় কৃষকদের জীবন ও মৃত্যুতে কতোটা অবদান রাখে তুলার সরবরাহ চেইন তদন্তের মাধ্যমে তার উপর আলোকপাত করা৷

    বিটার সীডস মিচা পেলেড পরিচালিত সিনেমা, যা একটি কিশোরী মেয়ের গল্প ধরে আগায় যার বাবা অনতিক্রম্য ঋণের বোঝা বইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলো৷ এটি মর্মস্পর্শীভাবে কৃষকদের সাথে মনসান্টোর প্রতারণাপূর্ণ আচরণ এবং তাদের পরিণতি দেখায়৷

  • হাওয়ার্ড জিন।। এমা গোল্ডম্যান: জীবন ও রাজনীতি

    হাওয়ার্ড জিন।। এমা গোল্ডম্যান: জীবন ও রাজনীতি

    • অনুবাদ: মাজহার জীবন

    অনুবাদকের ভূমিকা: এমা জীবনীভিত্তিক নাটক। এই নাটকের প্রধান চরিত্র এমা গোল্ডম্যান বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমেরিকা আর ইউরোপে অ্যানার্কিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রচারক। জন্ম বর্তমান ১৮৬৯ সালে লিথুনিয়ায় হলেও পরিবারের সাথে ১৮৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান। শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণের ঘটনার পর এমা অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনে আকৃষ্ট হন। বন্ধুত্ব ও ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে আরেক অ্যানার্কিস্ট আলেকজান্ডার বার্কম্যানের সাথে। ‘রেড এমা’ আর ‘বিদ্রোহী নারী’ নামে খ্যাত এমা নারীমুক্তি, মুক্তচিন্তা, মুক্তভালবাসা, বিবাহসম্পর্ক, হোমোসেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি প্রসঙ্গ সামনে এনে আমূল পরিবর্তনবাদী রাজনীতি এবং নারীর স্বার্থ তুলে ধরেছেন। পুঁজিবাদ, সামরিকায়ন, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি ইস্যুতে অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনে জড়িত থাকায় জেল খাটতে হয়েছে কয়েকবার। শেষে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করে রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৭০ বছর বয়সে কানাডায় তাঁর মৃত্যু হয়। হাওয়ার্ড জিন এমা নাটকে এমা গোল্ডম্যানের বৈচিত্রময় জীবনের এক বড় অংশ তুলে এনেছেন সাহিত্যিক দক্ষতায়। হাওয়ার্ড জিন (১৯২২ – ২০১০) আমেরিকান ইতিহাসবিদ, নাট্যকার, দার্শনিক এবং সমাজচিন্তক। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। স্পেলম্যান কলেজ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। বই লিখেছেন ২০টির অধিক যার মধ্যে অন্যতম আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস। এখানেএমা নাটকের ভূমিকার অংশ বিশেষ প্রকাশিত হলো।   

    Howard Zinn — Daniel Baxter Art
    হাওয়ার্ড জিন

    মূল ভূমিকা : এমা 

    আমার মতোই আরেক ইতিহাসবিদ রিচার্ড ড্রেনোনের মাধ্যমে এমা গোল্ডম্যানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় (যদিও ব্যক্তিগত না)। ষাটের দশকের প্রথমদিকে পেনসিলভেনিয়ার এক কনফারেন্সে ড্রেনোনের সাথে আমার পরিচয়। তিনি আমাকে জানান, রেভেল ইন প্যারাডাইস  নামে এমা গোল্ডম্যানকে নিয়ে তিনি একটি জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। বাড়িতে ফিরে এসে আমি বইটি পাই এবং পড়ে ফেলি। আমার মুগ্ধতা বাড়তে থাকে আমেরিকার ইতিহাসের সাথে জড়িত এই বিস্ময়কর নারীর প্রতি। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম আমেরিকার ইতিহাসের সংক্রান্ত আমার যাবতীয় কাজে, তা সে স্নাতক কি স্নাতকোত্তর পর্যায়েই হোক না কেন, এমার নামটি কখনো উঠে আসেনি।

    এই ধরনের অনেক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছাড়ার পর যে সকল ব্যক্তি ও ঘটনা সাধারণত ট্র্যাডিশনাল ইতিহাস কারিকুলামে কখনই অন্তর্ভুক্ত হয়নি সেগুলো পড়তে শুরু করি। যেমন: মাদার জোনস্, বিগ বিল হেইউড, জন রিড, লুডলো হত্যাযজ্ঞ, লরেন্স টেক্সটাইল ধর্মঘট, হে মার্কেটের ঘটনাবলী এমন আরও অনেক বিষয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্ট, শিল্পপতি, সমরনায়কদেরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নেয়া হয়। শ্রমিকনেতা, বিপ্লবী, সমাজতন্ত্রী, অ্যানার্কিস্টদের উপেক্ষা করা হয়। এমা গোল্ডম্যানও এই উপেক্ষিতদের একজন।

    এরপর আমি এমা গোল্ডম্যানের আত্মজীবনী লিভিং মাই লাইফ পড়তে উদ্বুদ্ধ হই। রাশিয়ার অ্যানার্কিস্ট পিটার ক্রপোটকিন ও মিখাইল বাকুনিনের লেখা পড়ি। এভাবে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে অ্যানার্কিজমের ওপর আমার আগ্রহ তৈরি হয়। আমি বুঝতে পারি, এটা একাডেমিক জগতের গতানুগতিক অর্থোডক্স রাজনৈতিক তত্তে¡র বাইরের বিষয়।

    ১৯৬৪ সালে শরৎকালীন সেশনে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দিয়ে দর্শনের একজন নতুন ফ্যাকাল্টির সাথে পরিচিত হই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেছি শুনে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-আপনার রাজনৈতিক দর্শন কী ?

    আমি হালকাভাবে উত্তর দিলাম-অ্যানার্কিজম।

    তিনি তীর্যকভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-অসম্ভব।

    ১৯৭৪ সালে প্যারিসে অধ্যাপনার সময় একবার আমস্টারডাম গিয়ে  সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব সোস্যাল হিস্টোরিতে যাই। সেখানে এমা গোল্ডম্যান ও আলেকজান্ডার বার্কম্যানের চিঠিপত্রের এক বিশাল ধনভাণ্ডারের সন্ধান পাই- যেগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁরা আমেরিকা থেকে নির্বাসিত হয়ে ইউরোপে এসে পরস্পরকে লিখেছিলেন। চিঠিগুলো আমার সাধ্যমতো একটা অবিন্যস্ত নোটবইয়ে কপি করি কিন্তু ফেরত আসার পর দেখি রিচার্ড আর আনা মারিয়া ড্রেনোন একই বিষয়ে কাজ করেছেন। এবং তারা নো হোইয়ার এট হোম নামে গোল্ডম্যান-বার্কম্যানের চিঠিপত্রের একটা সংকলন প্রকাশ করেছেন।

    যদিও ষাট ও সত্তরের দশকের প্রথম দিকে আমার জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে-বক্তৃতা দিয়ে, বিক্ষোভে অংশ নিয়ে, জাপান ও ভিয়েতনামে ভ্রমণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় আমেরিকান আগ্রাসনের ব্যাপারে লেখালেখি করে। ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে এতদিন ধরে যা চাইছিলাম, এমা গোল্ডম্যানের ওপর অবশেষে একটা নাটক লেখার সুযোগ পাই।

    Emma by Howard Zinn

    এমা  নাটকটিতে বাস্তবতার কারণেই গোল্ডম্যানের বৈচিত্র্যময় জীবনের একটা অংশ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ১৮৬৯ সালে লিথুনিয়ার কভনোতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন এটি রাশিয়ার অংশ ছিল। তাঁর স্মৃতিতে দরিদ্র ইহুদি জীবনের দুঃখের স্মৃতি আর সাথে সাথে জীবনকে আনন্দময় করে তোলে এমন ঘটনার দেখা পাওয়া যায়। আবেগপূর্ণ সম্পর্কে জড়ানোর ব্যাপারে তিনি খুব খোলামেলা ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। একটা ছোট মেয়ে হয়ে তিনি কীভাবে গ্রামের এক যুবকের কাছে বারবার ধরা দিয়েছেন। কোনিংসবার্গে তাঁর ধনী আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে অপেরা দেখার অভিজ্ঞতা বলেছেন। বলেছেন অপেরায় ভার্দির কনসার্ট দেখতে দেখতে হল ভর্তি মানুষের মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার কথা।

    তাঁর পরিবার এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন গ্রহণ করে। তাঁরা রোচেস্টার আর নিউইয়র্কের ইহুদি বলয়ে বসবাস করতেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে এমা একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন। তিনি দ্রুততর সময়ের মধ্যে এক যুবককে বিয়ে করে ফেলেন, যার সাথে তাঁর কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না। বিয়েটাকে তিনি ফলপ্রসু করতে ব্যর্থ হন। এমার বাবা ছিলেন অত্যাচারী। তাই অল্প বয়সেই বাবা ও স্বামীর সুবাদে তিনি নারীদের অধীনস্ততার বিষয়টি অবগত হন। আর মাত্র সতেরো বছর বয়সে শিকাগো শহরের শ্রমিকদের দৈনিক আটঘন্টা কাজের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৮৮৬ সালের হে মার্কেট আন্দোলনের ঘটনাবলী এসব আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।

    এ আন্দোলনের উৎস ছিল ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার কোম্পানির বিরুদ্ধে ধর্মঘট, যেখানে পুলিশ বেশ কয়েকজন ধর্মঘটী শ্রমিককে হত্যা করে। শিকাগোর অ্যানার্কিস্ট আন্দোলন তখন তুঙ্গে। তারা হে মার্কেট স্কয়ারে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। সভাটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু কিছু পুলিশ সভাটি পণ্ড করার চেষ্টা করলে পুলিশের ওপর একটা বোমা ফাটানো হয়। এতে ৬৬ জন পুলিশ আহত হন, যার মধ্যে ৭ জন পরে মারা যান। এতে পুলিশ জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে, ফলে বেশ কয়েকজন মারা যায় আর আহত হয় দুশোর মতো।

    সেই বোমাটি কে নিক্ষেপ করেছিল তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি (এটা আজ পর্যন্ত রহস্যই রয়ে গেছে)। কিন্তু পুলিশ শিকাগোতে আটজন অ্যানার্কিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করে। ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার কোম্পানির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে অ্যানার্কিস্টদের প্রচারিত সার্কুলার ‘রিভেঞ্জ’, যা বিচারকদের মতে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়েছে। ফলে ঐ বোমা বিস্ফোরণের দায় অ্যানার্কিস্টদের ওপর চাপিয়ে আটজনকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়।

    এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষে সারা ইউরোপজুড়েই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ইলিনয়ের সুপ্রিম কোর্টে তাদের আবেদন নাকচ হয়ে গেলে জর্জ বার্নাড শ লেখেন, ‘দুনিয়াকে যদি তার আটজন সদস্যকে হারাতেই হয়, তবে সেই আটজন ইলিনয়ের সুপ্রিম কোর্টের হলেই ভালো।’ তাদের মধ্যে একজন জেল প্রকোষ্ঠে নিজেকে উড়িয়ে দেয়। গর্ভনর জন পিটার আল্টগেল্ট তিনজনকে ক্ষমা করে দেন। (পরে তিনি হাওয়ার্ড ফাস্টের ঐতিহাসিক উপন্যাস দি আমেরিকান-এর একটি চরিত্র হন)। আর চার জনের ফাঁসি কার্যকর হয়।

    এ সব ঘটনা তরুণ এমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি রোচেস্টারে তাঁর পরিবার ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে স্বামী, চাকরি ও পরিবার ছেড়ে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল নতুন শহরে তিনি স্বাধীনভাবে বসবাস ও চলাফেরা করতে পারবেন। সেখানে তিনি একদল তরুণ অ্যানার্কিস্টের সংস্পর্শে আসেন। যাদের মধ্যে অন্যতম আলেকজান্ডার বার্কম্যান। বার্কম্যান নিজেও রাশিয়া থেকে অভিবাসিত হয়ে আমেরিকায় আসেন। নতুন সমাজ গড়ার এক নিবেদিতপ্রাণ পুরুষ ছিলেন তিনি। এমা ও সাশা (বার্কম্যান বন্ধুদের কাছে এই নামে পরিচিত ছিলেন) ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন।

    জার্মান বিপ্লবী জোহান মোস্ট। তিনি রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ) সদস্য ছিলেন এক সময়। দীর্ঘদিন জেলে কাটিয়েছেন। অ্যানার্কিজম প্রতিষ্ঠার পক্ষে বক্তৃতার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। এমা ও সাশা দুজনই এই বিপ্লবীর দ্বারা প্রভাবিত হন। মোস্টের সাথে এক পর্যায়ে এমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর ফলে এমা ও সাশার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়।

    এমা ম্যানহাটনে একটা কারখানায় চাকরি জোগাড় করে সেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের (অধিকাংশ নারী) সংগঠিত করা শুরু করেন। ১৮৯২ সালে পেনসিলভেনিয়ার হোমস্টিড শহরে জনৈক এন্ড্রু কার্নেগির স্টিল মিলের বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা ধর্মঘটের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মিলগুলোর দায়িত্বে ছিলেন নিষ্ঠুর হেনরি ক্লে ফ্রিক (পরবর্তী কালে তিনি কার্নেগির মতোই একজন জনহিতৈষী)। ধর্মঘট দমনের জন্য ফ্রিক পিঙ্কারটন ডিটেকটিভ এজেন্সি ভাড়া করেন। এই এজেন্সি তখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ধর্মঘট দমনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। ধর্মঘটের এক পর্যায়ে তারা রাইফেল ও মেশিনগান দিয়ে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে যার ফলে সাত জন শ্রমিক মারা যায়।

    এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমা, সাশা ও আরও কয়েকজন কমরেড প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের এই সাহসী প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে, বৃহৎ শিল্প কলকারখানাগুলোও নিরাপদ নয়। তাঁরা হেনরি ক্লে ফ্রিককে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। সাশা এ কাজ সম্পাদনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং তা একাই। সেজন্য তিনি পিটসবার্গে চলে আসেন। ফ্রিকের অফিসে জোর করে ঢুকে পড়েন। এবং গুলি করতে থাকেন। সাশা ঘাতক হিসেবে নিতান্তই অপটু ছিলেন। তাঁর ছোড়া গুলি ফ্রিককে কেবল আহত করতে সক্ষম হয়। তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর বিচারকার্য অতি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। তাঁর ২২ বছরের নির্বাসন হয় পেনসিলভানিয়ার স্টেট জেলে। জেল জীবনে তাঁর লেখা প্রিজন মেমোয়রস অব এন অ্যানার্কিস্ট একটা ক্লাসিক কারাসাহিত্য।

    জেল জীবনে সাশা নানাভাবে কারাপ্রশাসনের আদেশ-নিষেধ অমান্য করতে থাকেন। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাঁকে এবং তাঁর শাস্তিও বেড়ে যায়। কারা কর্তৃপক্ষের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক কয়েদি আত্মহত্যা করে। সাশা নিশ্চিত ছিলেন না শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা। তাঁর এই হতাশার কথা এমা ও তাঁর বন্ধুদের জানান। তাঁরা সবাই মিলে সাশাকে জেল থেকে বের করে আনার এক অবাস্তব পরিকল্পনা করেন। জেলখানার খুব নিকটে একটা বাড়ি ভাড়া করেন তাঁরা। সেখান থেকে একটা টানেল খোঁড়া শুরু করেন যা জেলখানার উঠান পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা করা হয়। একজন কমরেড গর্ত খোঁড়ার শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে পিয়ানো বাজাতেন, যাতে টানেল খোঁড়ার শব্দ শোনা না যায়। কিন্তু টানেল খোঁড়া প্রায় শেষ হয়ে আসার এক পর্যায়ে তা কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে। সাশাকে এর জন্য চরম অত্যাচার করে কারা কর্তৃপক্ষ।

    বার্কম্যান জেলে থাকার সময় এমা মানুষকে সংগঠিত করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। ১৮৯৩ সালে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। শহরগুলোতে শতশত শিশু না খেয়ে অসুস্থ হয় পড়ে ও অনেকে মারা যায়। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে এমা ইউনিয়ন স্কয়ারে কর্তৃপক্ষের কাছে আর্জি বা আইনের জন্য অপেক্ষা না করে খাদ্যের দোকান লুট করে খাবার সংগ্রহের আহ্বান জানান প্রতিবাদ সমাবেশে। এটা ছিল অ্যানার্কিস্টদের ‘ডাইরেক্ট একশন’ নীতির অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। এমাকে বক্তৃতা মঞ্চ থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁর ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডে দু’বছরের জন্য কারাদণ্ড হয়। কারাগারে এমা নার্সিং ও দাইয়ের কাজ শেখেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর বাকি জীবনে কাজে লেগেছিল। (ই. এল. ডকটোরোর র‌্যাগটাইম উপন্যাসে ঐ আমলের এক শোর্গালকে এমা চমৎকারভাবে বার্তা দিচ্ছেন এমন বর্ণনা রয়েছে)।

    এদিকে সাশা যখন জেলে শাস্তি ভোগ করছিলেন এমা তখন দ্রুত শ্রমিক ও অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক ও বক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন।

    ১৯০১ সালে লিওন ক্লোগেজ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলেকে গুলি করে হত্যা করার পর এমাকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়। ভুলবশত পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে এমার ওপর যে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন।

    বস্তুত এমা যেমনটি ফ্রিকের ঘটনার সময় মনে করতেন হত্যা অ্যানার্কিজমের জন্য যৌক্তিক কিন্তু তিনি এ সময় থেকে তা আর মনে করতেন না। আবার তিনি ক্লোগেজের শাস্তিরও বিপক্ষে ছিলেন। যেমনটি তাঁর অন্যান্য র‌্যাডিক্যাল বন্ধুরাও মনে করতেন। তাঁদের যুক্তি হলো হত্যাকাণ্ড অযৌক্তিক হলেও, মানুষকে বুঝতে হবে হত্যাকারীর ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকে।

    ভালোবাসার স্বাধীনতার দর্শনে বিশ্বাসী এমা এই সময়কালে অনেক প্রেমিকের সংস্পর্শে আসেন। যদিও তিনি আলেকজান্ডার বার্কম্যানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অব্যাহত রাখেন। ১৯০৬ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই অব্যাহত থাকে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যৌন সম্পর্কে ভাটা পড়ে। তাঁরা অ্যানার্কিজমের স্বার্থে পরস্পরের কমরেড হিসেবেই থাকেন এবং দু’জন মিলে মাদার আর্থ জার্নাল প্রকাশ করেন।

    ১৯০৮ সালে শিকাগোতে বক্তৃতা দেয়ার সময় এমা প্রথমবারের মতো আকর্ষণীয় বেন রেইটম্যানের সাক্ষাৎ পান। যার সাথে পরবর্তীকালে এমার জীবনে ঝঞ্চাবিক্ষুব্ধ আবেগের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ডা. বেন রেইটম্যান মেডিকেল স্কুলে কোনোরকমে পড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। তথাকথিত ডাক্তারদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ ছিলেন তিনি, যা ভাবাও যায় না। তাঁর চুল কালো এবং তিনি সুপুরুষ ছিলেন। কেতাদুরস্ত পোশাক পরতেন। শিকাগোতে একটা স্টোরফ্রন্ট ক্লিনিক খোলেন তিনি যেখানে সাধারণত যৌনকর্মী, ভবঘুরে আর দরিদ্ররা চিকিৎসাসেবা নিতে আসত। তিনি গর্ভপাত করাতেন আর এভাবেই চিকিৎসাসেবা ও সমাজকে বিদ্রুপ করতেন।

    রেইটম্যানের যৌনক্ষুধা ছিল তীব্র। তিনি এমার সাথে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন। মাত্র কিছুকাল আগেই আবিষ্কৃত তাদের চিঠিপত্র- এযাবৎকাল লেখা সবচেয়ে উষ্ণ ও খোলামেলা চিঠিপত্রের নজির বহন করে। এমার বয়স ছিল ঊনচল্লিশ আর রেইটম্যানের ঊনত্রিশ বছর। কিন্তু তাঁদের এই বয়সের পার্থক্য ভালোবাসায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। লিভিং মাই লাইফ -এমা রেইটম্যানের সাথে সাক্ষাতের বর্ণনা করছেন:

    ‘ও বিকেলে এলো। যৌন আবেদনময়, চিত্রোপম চেহারার পুরুষ। মাথায় কালো কাউবয় হ্যাট। সিল্কের টাই বাধা, হাতে বড় বেতের ছড়ি-কণ্ঠ গম্ভীর, কমনীয় আর অকৃত্রিম-লম্বা আর সুন্দর গড়নের মাথা যা কোঁকড়ানো কালো চুলে ঢাকা। হয়তো বেশ কিছুদিন ধোয়া হয়নি। চোখ দুটো খয়েরি, বড় এবং স্বপ্নীল। ওর ঠোঁট যখন হেসে ওঠে-সুন্দর দাঁত বের হয়ে আসে: আকর্ষণীয় ও কমনীয়। ও দেখতে সুদর্শন, বুনো। -আমি তার হাতের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারতাম না।’[1]

    রেইটম্যানের সাথে সাক্ষাতের কিছুদিনের মধ্যে এমা তাঁকে লেখেন, ‘তুমি আমার নারীত্বের কারাদুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছ। জানা বোঝার জগত আর আমার শরীরের আগুন জ্বালানো বসন্তের মাঝে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বললে আমি বসন্তকেই বেছে নিতাম।’[2]

    আর্ট: দি স্ট্রাইক
    আর্টিস্ট: রবার্ট কোয়েহলার

    এমা শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য রেইটম্যানের ওপর দ্রুত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রেইটম্যান এমার সাথে সব জায়গাতেই সফরসঙ্গী হতে থাকেন। তাঁর বক্তৃতার ব্যবস্থাপনার কাজ করেন কিন্তু অন্য নারীর প্রতি তার আসক্তি অব্যাহত থাকে। তারপরও এমা রেইটম্যানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি। এক পর্যায়ে এমা তাঁকে লেখেন: ‘যদি কখনো আমাদের দু’জনের চিঠিপত্র প্রকাশিত হয় দুনিয়া এই ভেবে হতবুদ্ধি হয়ে যাবে যে, আমি, এমা গোল্ডম্যান, একজন পরাক্রমশালী বিপ্লবী, ডানপিটে যে আইন ও কনভেনশনকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে- সে কিনা ফেনিল সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজের একজন অসহায় নাবিক।’[3]

    তারপরও এমা গোল্ডম্যান তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন বক্তৃতা দেওয়া, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ আর সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে কখনো বিরত থাকেননি। তিনি নিরলসভাবে সারা দেশের সর্বত্র চষে বেড়িয়েছেন, অসংখ্য মানুষের সামনে বক্তৃতা করেছেন-জন্মনিয়ন্ত্রণ (একজন নারীর তার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত), প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবাহের সমস্যাবলী (ভালোবাসার সাথে বিবাহের কোনো সম্পর্ক নেই), দেশপ্রেম (ধনীলোকের শেষ আশ্রয়স্থল), মুক্ত ভালোবাসা (যদি মুক্তই না হয় তাহলে কীসের ভালোবাসা) এবং স্ট্রিন্ডবার্গ, ইবসেন ও বানার্ড শ এর নাটক।

    তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন কেবল বক্তৃতা করার অপরাধে। ১৯০৮ সালে শিকাগোতে তাঁকে মঞ্চ থেকে গ্রেফতার করা হয়। শিকাগো ট্রিবিউন এর এক সাংবাদিক এই ডায়লগ লিপিবদ্ধ করেন: ‘এখানে এসে ঝামেলা পাকাবেন ভেবেছেন?’ ক্যাপ্টেন বলেন। ‘ভদ্র ব্যবহার করুন’ এমা গোল্ডম্যান তীক্ষ্ণভাবে উত্তর দিলেন, ‘একজন পুরুষের মতো কথা বলুন, যদিও আপনি একজন পুলিশ।’[4]

    ১৯০৯ সালে পুলিশ এক মাসে এমার এগারোটি সভা পণ্ড করে দেয়। সান ফ্রান্সিসকোতে দেশপ্রেমের ওপর ৫ হাজার শ্রোতার সামনে তিনি বক্তৃতা করেন যেখানে জনতা পিছু না হটা পর্যন্ত পুলিশকে বাধা দিয়ে আটকে রাখে।[5] সানদিয়াগোতে উত্তেজিত জনতা বেন রেইটম্যানকে অপহরণ করে তাঁকে শহরের বাইরে নিয়ে যায়। নগ্ন করে আলকাতরা ও পালক লাগিয়ে দেয় তাঁর শরীরে। তাঁর পশ্চাৎদেশে আইডব্লিউব্লিউ [ইন্ডাসট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড] চিহ্ন এঁকে দেয়। (তাঁর সাহসের প্রশংসা করতে হয় সাথে সাথে এমারও) এ ঘটনার পরও তাঁরা তৎক্ষণাৎ সানদিয়াগোতে এমার বক্তৃতার জন্য ফেরত আসেন।

    পেনসিলভেনিয়ার নিউ কেনসিংটনের এক নারীর সাথে এমার অল্পদিনের যৌন সম্পর্ক এমার যৌন স্বাধীনতার বিষয়টি লক্ষ করা যায়। সেই নারী আলমেদা স্পেরি। যদিও এমার আত্মজীবনীতে কোথাও আলমেদার উল্লেখ নেই, বোস্টন ইউনিভার্র্সিটি লাইব্রেরিতে রক্ষিত এমাকে লেখা আলমেদার অনেকগুলো চিঠি আমি পেয়েছি। আলমেদা একজন অসাধারণ নারী ছিলেন। একজন শ্রমজীবী নারী। যখন তাঁর অর্থের প্রয়োজন হতো তখন তিনি পুরুষদের দেহদান করতেন। থিয়েটার আর অপেরা ভালোবাসতেন তিনি। নিউ কেনসিংটনে তিনি সোস্যালিস্ট গ্রুপ তৈরি করেন।

    এমাকে লেখা আলমেদা স্পেরির চিঠিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রণয়ের তীব্র আবেগীয় বহিঃপ্রকাশ, সমাজ সম্পর্কে গভীর সচেতনতা, বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত কোনো নারীর জীবন নিয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, অপেরা, থিয়েটার এবং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা-এর সব কিছুই চিঠিতে পাওয়া যায়। চিঠিগুলো পড়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, যে কোনোভাবে আলমেদার উপস্থিতি আমার নাটকে রাখব-এমনকি তাঁর একটা চিঠির ঘটনার মাধ্যমে হলেও। যে চিঠিটাতে তিনি বেন রেইটম্যানের সাথে তাঁর সাক্ষাতের বর্ণনা করেছেন। অন্য আরেকটি চিঠি থেকে একটি অনুচ্ছেদ তুলে দিচ্ছি: ‘আমি ভাবি, শো দেখার জন্য আমার মতো আর সবাই এমন পাগল কিনা-আমি প্রায় আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলাম, গতবার যখন সারা বার্নহাডার্স্ট এখানে এসেছিলেন, আমার হাতে তখন একদম টাকা-পয়সা ছিল না। অবশেষে ফ্রেড আমাকে এক ডলার দিয়েছিল, তাই সারার অপেরা দেখতে পেরেছিলাম। কী অসাধারণ কণ্ঠ সারার-কী সোনালি আর মধুর কণ্ঠস্বর আর কী চমৎকার উচ্চারণ! আয়নার সামনে আমি তাঁর লা টোসকা অপেরা প্র্যাকটিস করেছি।-এটা কি দারুণ হতো, এমা, যদি সরকার থিয়েটার পরিচালনা করত আর জনগণকে তা বিনে পয়সায় দেখতে দিত-আমি যদি প্রতি রাতে একটা ভালো শো দেখতে যেতে পারতাম তাহলে আমার শরীরের নগ্নতা ঢাকার জন্য কাপড় আর খাবারের জন্য কেবল কাজ করতাম। আমি সবার প্রতি দয়ালু হতাম।’[6]

    এমা আর রেইটম্যান ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশ বছর একসাথে কাটিয়েছেন। এই সময়ে মানসিক অশান্তি থাকলেও এমা অসাধারণ রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে গেছেন, যা শেষপর্যন্ত ১৯১৭ সালে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা পর্যন্ত গড়ায়। এ ঘটনা তাঁদের মধ্যে সম্পর্কেরও পরিসমাপ্তি ঘটায়। যদিও অনেকক্ষেত্রেই ব্যক্তিগতভাবে বেশ সাহসের পরিচয় রেইটম্যান দেখিয়েছেন কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেবার সাহস দেখাননি।

    এমা আর বার্কম্যান এতকিছুর পরও একে অপরের সহযোদ্ধা হিসেবে কনসক্রিপশন ও যুদ্ধকে ধিক্কার জানিয়ে আইন অমান্য করেছেন। ফলে তাঁরা দুজনই ১৯১৮ সালে জেলে যান। যুদ্ধ শেষ হলে তাঁদের মুক্তি দেয়া হয় অন্যান্য র‌্যাডিক্যালদের সাথে দেশ ত্যাগের শর্তে। যুদ্ধ শেষে ভয়াবহ অত্যাচার শুরু হয়। একজন ডানপন্থী ফ্যানাটিক হিসেবে তাঁর কুখ্যাত ক্যারিয়ার শুরুর প্রথম দিকে জে এডগার হুভার তাদের দেশত্যাগের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। তাঁদেরকে জন্মস্থান রাশিয়াতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

    Color illustration of 1886 Haymarket Square Riot
    আর্ট: হে মার্কেট স্কয়ার রায়ট সূত্র: থটকো

    তখন রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান হয়েছে। নতুন সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন নানা রাজনৈতিক মতামতের প্রতিনিধিত্বকারী সংসদ ভেঙে দিয়ে বলশেভিকদের শাসন শুরু করেছেন। এমা ও সাশা লেনিন ও ট্রটস্কির সাথে সাক্ষাত করেন। ভিন্নমতালম্বীদের জেল, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা, পেত্রগাদের বাইরে ক্রনস্টাডট্ এ নাবিকদের সহিংসভাবে দমন ইত্যাদি ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁদের অবস্থান করার ইচ্ছার মৃত্যু ঘটায়।

    তাঁরা পরবর্তী বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে অতিবাহিত করেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের মেডিটারিয়ান উপক~লে। এক অপরকে অসংখ্য চিঠি লেখেন (এসব চিঠির বড় অংশ রিচার্ড ও আনা মারিয়া ড্রেনোন সংগ্রহ করেন)। তাঁরা ইউরোপ ও আমেরিকার চলমান ঘটনাবলীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। মানুষের মুক্তির পক্ষের ঘটনাবলীর সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত ও সমর্থন অব্যাহত রাখেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় এমা স্পেনে ছুটে গেছেন। এবং ১৯৩৬ সালে বার্সেলোনায় বিশাল জনসমাবেশে বক্তৃতা করেছেন যেটা ছিল মূলত অ্যানার্কিস্টদের দখলে (জর্জ অরওয়েলের হোমেজ টু কাতালোনিয়া-তে বিস্তারিত বর্ণনা আছে)।

    বার্কম্যান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অপরিসীম শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করে ১৯৩৬ সালে তিনি মারা যান। এমা ১৯৪০ সালে রুজভেল্টের প্রগতিশীল শ্রমমন্ত্রী ফ্রান্সেস পার্কিন্সের অফিসের মাধ্যমে আমেরিকায় এক বিরল সফরের সুযোগ পান। কিন্তু শর্ত ছিল তিনি কেবল নাটক নিয়ে বক্তৃতা করতে পারবেন। ফলে তিনি আমেরিকায় ইবসেন, বানার্ড শ, স্ট্রিন্ডবার্গ এবং চেখভের ওপর বক্তৃতা করেন। পরে সে বছরই কানাডায় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।

    ১৯৬০ দশককে অ্যানার্কিজমের প্রতি আগ্রহের পুনর্জন্ম বলা যেতে পারে। এর একটা কারণ আমেরিকায় সরকারের প্রতি চরম অসন্তোষ। ফেডারেল সরকার প্রায় একশ বছর ধরে দক্ষিণের সাথে জাতিগত বিভেদে সহযোগী ছিল। এই সহযোগিতার সমাপ্তি হয় যখন জর্জিয়া, আলাবামা, মিসিসিপি এবং অন্যান্য দক্ষিণের রাজ্যগুলোর জনগণ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামে এবং জাতিকে সারা বিশ্বের সামনে নগ্নভাবে তুলে ধরে।

    আর সেই একই সরকার দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দানবীয় যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছিল। এই যুদ্ধ থেকে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয় যখন ভিয়েতনামে প্রতিরোধ এবং আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।

    ১৯৩০ দশকের মতো ১৯৬০-এর দশকে র‌্যাডিক্যালরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক ছিল না। তারা নিজেদেরকে নিউ লেফ্ট হিসেবে পরিচয় দিত। এবং তাদের অ্যানার্কিজমের সাথে গভীর মানসিক ও আদর্শগত সম্পর্ক ছিল যদিও অ্যানার্কিজম শব্দটার সাথে সরাসরি তেমন পরিচয় ছিল না। এই যোগসূত্রে কেবল সরকারের প্রতি সন্দেহই ছিল না, স্টুডেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক সোসাইটি ও অন্যান্যদের ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ওপর বিশ্বাস ও ভূমিকা রেখেছিল। পুরাতন বামপন্থীদের পার্টি শৃঙ্খলার বিপরীতে অ্যানার্কিস্ট নীতি বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠনের ধারণা ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনে বিকশিত হতে থাকে। স্টুডেন্টস নন-ভায়োলেন্ট কোঅর্ডিনেটিং কমিটি যার অধিকাংশ সদস্য ছোট ছোট গ্রুপ, যুবক আর অধিকাংশই কৃষ্ণাঙ্গ। এই কমিটি ডিপ সাউথের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গায় কাজ করত। তারা স্থানীয় কমিটি গঠন করত এবং তাদের আটলান্টার প্রধান কার্যালয়ের সাথে কেবল মাঝে মাঝে যোগাযোগ রাখত।

    এমা গ্রন্থের প্রচ্ছদ, গ্রন্থিক প্রকাশনী, ২০২১

    এই সময়ের ফেমিনিস্ট আন্দোলনও, অ্যানার্কিজমের সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠন এই অ্যানার্কিস্ট নীতি অনুসরণ করত-ছোট ছোট নারী সংগঠনে তারা সারা দেশব্যাপী কাজ করত। সময়ে সময়ে যৌন-সমতার পক্ষে প্যারেড এবং জাতীয় আন্দোলন পরিচালিত হতো। নারী আন্দোলনকারীরা কোনো একক ক্যারিশমাটিক নেতার অধীনস্ত ছিল না।

    অ্যানার্কিজমের ঐতিহাসিক দর্শন হলো ডাইরেক্ট একশন। এই ডাইরেক্ট একশনের আইডিয়া ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এর অর্থ হলো কোনো পার্টির রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব না। কিন্তু নাগরিকের সম্মিলিত ঐক্য এবং তাদের শোষণের উৎসের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে ডাইরেক্ট একশনের মাধ্যমে তা সম্ভব।

    ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় নেতৃত্ব রক্ষণশীল না হলে শ্রমিক আন্দোলন নানামুখী কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমঘণ্টা আদায় করতে সমর্থ হয়েছিল। এ ধরনের প্রতিবাদের একটা ধরন ছিল মালিকের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্মঘট। সরকার শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনো কিছুই করেনি। শ্রম সেক্টর কর্পোরেট শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে পুরোপুরি ধনী ও ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাই শ্রমিকদের দাবি শ্রমিকদেরই আদায় করতে হতো।

    দক্ষিণে সিভিল রাইটস আন্দোলন ‘নন-ভায়োলেন্ট ডাইরেক্ট একশন’ এই শ্লোগান ব্যবহার করতো তাদের ক্যাম্পেইনে। আর এসব ক্যাম্পেইন ছিল মূলত অবস্থান-ধর্মঘট ও মুক্তিযাত্রা। যুদ্ধবিরোধী একটিভিস্টরা ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তা অবরোধ করতো, পেন্টাগন ঘেরাও করতো, দাবি আয়ের জন্য আন্দোলনে নামতো। উপরোক্ত কর্মসূচিগুলো ছিল ডাইরেক্ট একশন। ভিন্নমতালম্বীদের আইন ও সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে নানা ধরনের সিভিল আইন অমান্য আন্দোলন অ্যানার্কিস্ট দর্শনের পরিপূরক-আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানুক বা না জানুক।

    দর্শন হিসেবে অ্যানার্কিজম ঊনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় কিন্তু ১৯১৬ সালের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্কের কারণে এ দর্শন ম্লান হয়ে পড়ে।

    কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নতুন রাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতি সাথে সঙ্গীত, যৌনতা, যৌথ জীবনযাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বাধীনতার সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি অ্যানার্কিজমের প্রতি আগ্রহের পুনর্জন্ম ঘটে। দশকের পর দশক অজ্ঞাত থাকার পর এমা গোল্ডম্যান এখন একজন স্মরণীয় নাম বিশেষ করে নারী আন্দোলনে। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলন ও নানামুখী আন্দোলনেও তিনি স্মরণীয়।

     

    তথ্যসূত্র ও টীকানির্দেশ: 

    [1] বোস্টন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি স্পেশাল কালেকশনস, এমা গোল্ডম্যান পেপারস, কালেকশন # ২৪৩, বক্স ১, ২, ৩। আরো দেখুন দি এমা গোল্ডম্যান পেপারস: এ মাইক্রোফিল্ম এডিশন (অ্যান আরবার, এমআই: চাডউইক-হিলি, ১৯৯১), রিলস ৬,৭ এবং ৬৮; এমা গোল্ডম্যান: এ গাইড টু হার লাইফ অ্যান্ড ডকুমেন্টারি সোর্সেস (অ্যান আরবার, এমআই: চাডউইক-হিলি, ১৯৯৫); এমা গোল্ডম্যান: দি আমেরিকান ইয়ারস (বেকার্লি: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বেকার্লি;

    [2] ক্যানডাস ফক, লাভ, অ্যানার্কি, এন্ড এমা গোল্ডম্যান (নিউইয়র্ক: হল্ট, রাইনহার্টম অ্যান্ড উইন্সটন, ১৯৮৪), ৪

    [3] প্রাগুক্ত

    [4] প্রাগুক্ত, ৬৫

    [5] গোল্ডম্যান, লিভিং মাই লাইফ, ভলুউম ১, ৪২৭-২৮। সংলাপটি ‘প্যাট্রিয়াটিজম: এ ম্যানাস টু লিবার্টি’ তে রয়েছে যা গোল্ডমানের অ্যানার্কিজম এন্ড আদার এসেজ এ অন্তর্ভুক্ত।

    [6] দেখুন নোট ১

  • পার্থ চট্টোপাধ্যায়।। জরুরি অবস্থার সংক্রমণ

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়।। জরুরি অবস্থার সংক্রমণ

    • অনুবাদ : সারোয়ার তুষার

    অনুবাদকের ভূমিকা: প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের The State of Exception Goes Viral শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় সাউথ আটলান্টিক কোয়ার্টারলি জার্নালে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। বাংলায় আমি এর শিরোনাম করেছি ‘জরুরি অবস্থান সংক্রমণ’। ভারতে বিজেপি দ্বিতীয়-দফায় ক্ষমতায় আসার পর এমন অন্তত চারটি বিপদজনক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে, যা ভারত রাষ্ট্রকে আরও প্রকটভাবে ফ্যাসিবাদ ও হিন্দু-জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দেয়। কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করা, আসামে এনআরসি প্রণয়ন করা, গোটা ভারতজুড়ে সিএএ আইন পাশ করা এবং উচ্চ-আদালত কর্তৃক উত্তরপ্রদেশের বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়ার সাথে জড়িত হিন্দুত্ববাদী নেতাদের দায়মুক্তি দেয়া, সেই মসজিদের স্থলে রামমন্দির স্থাপনের অনুমোদন দেয়া।

    এই সিদ্ধান্তসমূহ ভারতজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করে, বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনে গণজোয়ার তৈরি হয় এবং হিন্দুত্ববাদীদের সাথে দেশটির গণতন্ত্রকামীদের সংঘাতকে অনিবার্য করে তোলে। পাশাপাশি, ‘বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ’ বলে পরিচিত ভারত রাষ্ট্রের নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি-বিশেষত মুসলমানদের প্রতি-নগ্ন একচোখা ও দমনমূলক নীতি বিশ্ববাসীর সম্মুখে উন্মোচিত হয়। এসময় বিপুলসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রগতিশীল তরুণ-তরুণী, শহরবাসী এবং গ্রামীণ কৃষকশ্রেণী রাজপথে মোদি সরকারকে মোকাবেলা করে। এই প্রবন্ধে স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি ভারতের নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তনের জিনিওলজি তুলে ধরেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং দেখিয়েছেন কী করে নাগরিকত্বের ধারণার সাথে বিজেপি তাদের হিন্দুত্বের ধারণাকে একাকার করে ফেলেছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখাচ্ছেন, একদিকে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদ সৃষ্ট রাজনৈতিক মহামারি, অন্যদিকে করোনা মহামারির দরুন সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি; সবমিলিয়ে ভারত রাষ্ট্র যেন জরুরি অবস্থাকে অনিবার্য ও স্থায়ী করে তুলছে। তবে এ অবস্থা কেবল ভারতে নয়, বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রেই জরুরি অবস্থার মতো আপদকালীন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক শাসনপ্রণালীতে পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে।

    -সারোয়ার তুষার,  ১ মার্চ ২০২১ 

     

    পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    মূল অনুবাদ 

    ২০১৯ সালের মে মাসে নরেন্দ্র মোদি যখন দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেন, তার সরকার অভিমুখ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। ২০১৪ সালে মূলত বৃহৎ ব্যবসায় ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে তুষ্ট করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে তার প্রথম দফা শুরু হয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক মন্দা কর ও শ্রম আইন মারাত্মকভাবে পরিবর্তন করা কিংবা সামাজিক ব্যয় সংকোচনের তেমন একটা সুযোগ রাখেনি। বরং কৃষকসহ অন্যান্য আঞ্চলিক লবিগুলোর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মুখোমুখি হয়ে মোদি নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠিত বিপুল সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে সুযোগ-সুবিধা বন্টনের কাল-পরীক্ষিত জনতুষ্টিবাদী পদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছিলেন। যাইহোক, পুনর্বার ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক কূটকৌশলে ওস্তাদ বলে স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি অমিত শাহকে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিশেবে পাশে নিয়ে মোদি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘোষণা করলেন যে তার সরকার এবার  বিজেপির ‘হিন্দু জাতিরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার মতাদর্শিক স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করবে।

    হিন্দু জাতি-রাষ্ট্রের অভিমুখে পদযাত্রা

    প্রথম বড় পদক্ষেপটি ছিল মুসলিম প্রধান রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা কেড়ে নেয়া। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারায় মূর্ত এই বিশেষ মর্যাদা ছিল ব্রিটিশদের সাথে তৎকালীন ভারতীয় শাসকদের সমঝোতার মাধ্যমে গৃহীত বিভিন্ন চুক্তির অংশ যার মাধ্যমে প্রায় ছয়শত ‘দেশীয় রাজ্য’ (প্রিন্সলি স্টেট) ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বিশেষ মর্যাদার অধিকারী এমন আরো বেশ কয়েকটি রাজ্য ইতোপূর্বে ছিল, এমনকি এখনো আছে। কিন্তু সংবিধানের ৩৭০ ধারা বরাবরই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের চক্ষুশূল ছিল কারণ তারা এ’কে কাশ্মীরের মুসলমানদের ভারতে রাখার প্ররোচনামূলক উৎকোচ মনে করতো; বিশেষত এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাথে তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিপ্রেক্ষিতে।

    বিজেপি বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী নিবাসীদের কোন বিশেষ সুরক্ষা ব্যতিরেকেই এই অঞ্চলকে ভারতের অন্য যেকোন রাজ্যের মতো করেই বিবেচনা করা হোক। বহুজন এই অভিযোগ তুলেছেন যে, বিজেপির পরিকল্পনা হলো অন্যান্য রাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে কাশ্মীরে বসতি স্থাপন করার অনুমোদন দেয়া যেন এর ফলে কাশ্মীরের জনসংখ্যার বিন্যাসগত চরিত্র বদলে যায়। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে কেবলমাত্র ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করাই হয়নি, বরং বৌদ্ধ-অধ্যুষিত লাদাখকেও বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং পূর্বতন রাজ্যের দুই অংশকে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত তথা সরাসরি নয়াদিল্লি থেকে শাসিত অঞ্চলের স্তরে পর্যবসিত করা হয়েছে। হাজার হাজার সশস্ত্র সেনা মোতায়নের মাধ্যমে আগাগোড়া লকডাউন কায়েম করা হয়েছিল এবং কাশ্মীরের যাবতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে জেলে পোরা হয়েছিল। যদিও গুটিকয়েক নেতাকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেয়া হয়, দশমাস পরেও আজ অব্দি মোটাদাগে কাশ্মীরের পরিস্থিতি অপরিবর্তিতই আছে।

    জম্মু-কাশ্মীরের বিরুদ্ধে এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে বিপুল উল্লাসের সাথে উদযাপন করা হয়, যেখানে কিনা পাকিস্তানের সাথে কয়েক মাস পূর্বের অতি সাম্প্রতিক যুদ্ধের উন্মাদনায় একটা বড় অংশের মানুষ এখনো বুঁদ হয়ে আছে। তারা এই পদক্ষেপকে পাকিস্তান ও কাশ্মীরে পাকিস্তানের সমর্থকগোষ্ঠীর গালে এক প্রকাণ্ড চড় হিশেবে বিবেচনা করেছে। এর ফলে দীর্ঘকাল যারা অন্যান্য নানা কারণে বিজেপির সমালোচনায় মুখর ছিল, তারা পর্যন্ত এবার কাশ্মীরকে ভারতের বৈধ ভূসম্পত্তি এবং কাশ্মীরের জনগণকে ‘স্থায়ী উপদ্রব সৃষ্টিকারী’ ভাবতে শুরু করলো। তখনো পর্যন্ত বিজেপির নির্বাচনী বিজয়ের অপ্রত্যাশিত সাফল্যের মাত্রায় হতবাক বিরোধীদলসমূহ [বিশেষ মর্যাদা রদের] প্রতিক্রিয়ায় মোটাদাগে নীরব ছিল। এরপর মোদি-শাহ জুটি বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তথাকথিত বেআইনি কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে এমন সব আইন প্রয়োগ করতে থাকলেন যা মূলত সংগঠনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিবেচনায় প্রণীত হয়েছিল। এর ফলে অস্বস্তিকর সমালোচকদের বিনাবিচারে জেলে পাঠানো অধিকতর সহজ হয়েছে। (এই আইন সাম্প্রতিকালে বিভিন্ন সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে।) নভেম্বর মাসে ভারতের উচ্চ আদালতের এক রায় হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনার আগুনে নতুন করে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। ১৯৯২ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা চারশত বছরের পুরানা বাবরি মসজিদের স্থাপনাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, উচ্চ আদালতের রায়ের ফলে সেই মসজিদের স্থলে রামমন্দির নির্মাণের আইনি অনুমোদন মেলে। মোদি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মন্দির নির্মাণ প্রক্রিয়া তরান্বিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

    DSC09878
    আর্টিস্ট: পরিপ্লব চক্রবর্তী

     

    এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামে ক্রমবর্ধমান এক উদ্বেগ সংকটবিন্দুতে পৌঁছায়। আসাম রাজ্যে অ-অসমিয়া তথা বহিরাগত অনুপ্রবেশের (মূলত অ-অসমিয়দের বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী ধরে নেয়া হয়) বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৮৫ সালে [ভারত সরকার এবং অসম আন্দোলন এর নেতৃত্বের মধ্যে] একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল যে, আসামে বসবাসরত প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্বপুরুষের ঠিকুজি যাচাই করা হবে এবং একটি নাগরিকপঞ্জি সংকলন করা হবে। কিন্ত এই প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন অসংখ্য আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখে ব্যাহত হয়। যেহেতু জাতীয় পরিচয়পত্র বলতে তেমন কিছু ছিল না এবং জন্মনিবন্ধন সনদ এই সেদিন পর্যন্ত বেশ দুর্লভ ছিল; রেশন কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড অথবা সম্পত্তির স্বত্বসহ নানাবিধ নথিপত্র এই রাজ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের সাপেক্ষে স্থায়ী নিবাসী এবং কালক্রমে নাগরিকতায় স্বাভাবিক প্রত্যর্পণের প্রমাণের স্মারক হিশেবে গৃহীত হয়। ২০০৩ সালে নয়াদিল্লিতে তৎকালীন বিজেপি সরকার ভারতে অনুপ্রবেশরত অবৈধ শরনার্থী অথবা ভারতে বসবাসরত বৈধ ভিসাবিহীন মানুষদের নাগরিকত্ব প্রদান ঠেকাতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে। সুপ্রিমকোর্টের পুনঃপুন তাগাদার পর, আসামে নাগরিকপঞ্জি সংকলন শেষ করা হয় এবং ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশ করা হয়।

    ফলাফল ছিল হতবুদ্ধিকর। ঘোষিত ১৯ লাখ ‘অবৈধ শরনার্থী’র মধ্যে ১২ লাখ ছিল হিন্দু এবং ৭ লাখ মুসলমান। এটা বিজেপিকে বেশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় ফেলে দেয় কারণ এত বিপুল সংখ্যক হিন্দু জনসংখ্যা, যারা মূলত বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের মুখে বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করা শরনার্থী বলে বিজেপি বরাবর দাবি করেছে, তাদেরকে আটক করা কিংবা নির্বাসনে পাঠানো বিজেপির পক্ষে সম্ভব ছিল না। এটাই ছিল তড়িঘড়ি করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) পাশ করানোর তাৎক্ষণিক উদ্দীপনার কারণ। এই সংশোধনীর ফলে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ভারতে আগত অ-মুসলিমদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে গণ্য করা হবে না এবং একটি তরান্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। সংসদে অমিত শাহ ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশজুড়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) সংকলনের মাধ্যমে এই নতুন আইন অনুসরণ করা হবে।

    উল্লেখ করা জরুরি যে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নাগরিকত্বের jus soli (ভূমিসন্তানের অধিকার) ধারণাকে বরণ করেছিলেন-অর্থাৎ দেশের মাটিতে জন্মের সাপেক্ষে নাগরিকত্ব। ১৯৫০ সালে গৃহীত সংবিধানে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ভারতে বসবাসরত যেকোন ব্যক্তি যিনি অন্য কোন দেশের নাগরিক নন তিনি ভারতের নাগরিক। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন ভারতে জন্মগ্রহণ করা প্রত্যেক ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব প্রদান করেছিল। তবে ১৯৮০’র পর থেকে এ সংক্রান্ত সাধারণ ঐক্যমত jus sanguinis (রক্তের অধিকার) এর দিকে পরিবর্তিত হতে থাকে-অর্থাৎ পিতামাতার ধর্মীয়, জাতিগত, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্বের দাবি শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালের সংশোধনী ঘোষণা করে, ১৯৮৭ সালের পর জন্মগ্রহণকারীরা নাগরিক হতে পারবে কেবলমাত্র যদি পিতামাতার অন্তত একজন ভারতীয় হয়; ২০০৩ এর পর জন্মগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে হয় পিতামাতা দুজনকেই ভারতীয় হতে হবে অথবা অন্তত একজনকে ভারতীয় হতে হবে এবং সেক্ষেত্রে অন্যজন অবৈধ অভিবাসী হতে পারবেন না। একইসাথে ২০০৩ এর সংশোধনীতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অন্য দেশের (বলাই বাহুল্য, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বাদে) নাগরিকদেরও ভারতের ‘বিদেশী নাগরিক’ মর্যাদা প্রদান করে; এই বিশেষ নাগরিক মর্যাদা কেবলমাত্র ভারতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার ছাড়া ভারতীয় নাগরিকত্বের অন্যান্য সকল অধিকার নিশ্চিত করে। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের দিকে সম্পদশালী অভিবাসী জনগোষ্ঠীর এক বিপুল স্রোত তৈরি করে।

    ছবি: মহাভারতের একটি দৃশ্য
    সূত্র: খান একাডেমি

     

    সিএএ-বিরোধী প্রতিবাদ

    বিজেপি সরকারের এসব পদক্ষেপ ছিল খুল্লামখুল্লা মুসলিমবিরোধী। স্বাধীনতার পূর্বে ঘোষিত ও প্রচারিত [সাংগঠনিক] মতাদর্শিক অবস্থানের সাথে এইসব পদক্ষেপ দারুণভাবে খাপ খাচ্ছিল। বিজেপীর অন্যতম জাতীয়তাবাদী গুরু, বিনায়ক দামোদার সাভারকর, ১৯২৩ সালে লিখিত আকারে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে হিন্দুত্ববাদ (Hindutva) বা হিন্দুত্ব (Hinduness) হিশেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এবং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যারা ভারতকে তাদের পিতৃভূমি ও পূণ্যভূমি বিবেচনা করে, কেবলমাত্র তারাই এই জাতির অন্তর্গত হওয়ার যোগ্য। এই সংজ্ঞায় মুসলমান ও খৃষ্টানদের বাদ দেয়া হয়েছিল, কারণ তারা অন্যস্থানকে তাদের পূণ্যভূমি বিবেচনা করে। ১৯৩৯ সালে বিজেপির আরেকজন মতাদর্শিক গুরু মাধব সদাশিব গোলওয়াকার লেখেন, যারা সাংস্কৃতিকভাবে হিন্দু নন, তারা হিন্দু জাতি-রাষ্ট্রে থাকতে পারবেন বটে; তবে নাগরিকত্বের অধিকার ছাড়া কেবলমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা হিশেবে। দেশভাগের পর হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা প্রায়শই এই তর্ক তুলতেন যে সমস্ত হিন্দুকে পাকিস্তান থেকে ভার‍তে এনে বসতি স্থাপন করতে দেয়া উচিত এবং সমস্ত মুসলমানকে ভার‍ত থেকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা ভারতে মুসলমানদের উপস্থিতিকে দেশভাগের অসমাপ্ত কাজ বলে উল্লেখ করছেন। এমনকি নরেন্দ্র মোদিকে যদিও এহেন খুল্লামখুল্লা মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা থেকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, অন্যান্য বিজেপি নেতারা কদাচিৎ মুসলিমবিদ্বেষী ঘৃণা ছড়ানো থেকে বিরত থেকেছেন; যার দরুণ বিজেপির সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দ্বারা মুসলমানরা অসংখ্য খুনে হামলার শিকার হয়েছেন।

    ফলে ভারতজুড়ে বসবাসরত মুসলমানদের জন্য ২০১৯ এর ডিসেম্বর পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ছিল বিশেষ উদ্বেগের ব্যাপার। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের সংজ্ঞায়ন ও অনুমোদন এবং নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) অনুসরণ করে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হবে এই তথ্য মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় যে এবার তাদেরকে টার্গেট করা হবে। বিশেষত আসামের অভিজ্ঞতা মুসলমানদের আতঙ্ককে আরও প্রবল করে তুলেছিল; যেখানে লক্ষ লক্ষ বাসিন্দাকে ‘অবৈধ শরনার্থী’ ঘোষণা করা হয়েছে কারণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের মতে তাদের পর্যাপ্ত নথিপত্র নেই। কৌতূহলোদ্দীপকভাবে, আতঙ্ক কেবল মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উদাহরণস্বরূপ, আসামের সীমান্তরাজ্য পশ্চিমবঙ্গে, যেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (এবং পরে বাংলাদেশ হিশেবে স্বাধীনতা লাভ করা) থেকে বহুদশক আগে বহু হিন্দু স্থানান্তরিত হয়েছিলেন এবং ধরে নিয়েছিলেন এতদিনে তারা ভারতীয় নাগরিকত্বে আত্মীকৃত হয়েছেন, তারা আসামের এনআরসি কাণ্ড ও সিএএ আইন পাশের ফলে নতুন করে বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিজেপির নেতারা যতই বলুক সিএএ প্রকৃত নাগরিকদের নাগরিকত্ব প্রদানের নিমিত্তে প্রণীত হয়েছে, নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার জন্য নয়; বিভ্রান্তি ও সন্দেহ দূর হয়নি। যদি দেশব্যাপী এনআরসি শুরু করা হয় তার মানে প্রত্যেকের নাগরিকত্বকে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

    ২০১৯ এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষিপ্তভাবে সিএএ’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। উত্তরভারতে দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি রাজ্য সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়। আন্দোলনের ওপর সরকারী নিপীড়নের প্রতিবেদন প্রকাশ করাকে এমন মাত্রায় স্তব্ধ করা হয় যে পুলিশী সহিংসতার প্রকৃত মাত্রা এখনও অব্দি অজানা। অন্তত তিনটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ নির্মমভাবে হামলা চালায় এবং পেটায়। পুলিশী বর্বরতার দৃশ্যাবলী অতিদ্রুত প্রচারিত হয় এবং নগর ও ছোট শহরগুলোতে তড়িৎগতিতে সিএএ-বিরোধী জনমত গড়ে উঠতে শুরু করে।

    আর্টিস্ট: অনির্বাণ ঘোষ

    জনপরিসরে পরবর্তী দশ সপ্তাহের প্রতিবাদী জনসমাগম নানাদিক থেকে অভিনব ছিল। এই জনসমাগম সংগঠিত ও জনাকীর্ণ হয় এমন সব মানুষের দ্বারা যারা ইতোপূর্বে কখনো রাজনৈতিক মিছিলে অংশ নেয়নি; এদের মধ্যে অনেকেই আবার নিজেদেরকে রাজনীতি সম্পর্কে অনাগ্রহী ও অজ্ঞ হিশেবে দাবি করেন। বিশেষত নানা বয়সের মুসলমান নারীদের উপস্থিতি  ছিল লক্ষণীয় যারা নাগরিকত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে কাগজপত্র দেখানোর ক্ষেত্রে তাদের অস্বীকৃতি ঘোষণা করতে রাজপথ ও বিভিন্ন পার্কে কয়েক সপ্তাহব্যাপী অবস্থান করেন। কিন্ত কেবল তারাই ছিলেন না। নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাদের সমর্থন জানান, বিশেষত তরুণ প্রজন্ম। তরুণরা সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুর অংশ বারবার পাঠ করেছেন যেখানে বলা হয়েছে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইন্ডিয়ার জনগণ নিজেদেরকে এই সাধারণতন্ত্র (republic) অর্পণ করেছে। এই প্রতিবাদগুলো শান্তিপূর্ণ হওয়ায় এবং বিশেষ কোন রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের সাথে সম্পৃক্ততাহীন মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ বিজেপি সরকারকে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে বাধ্য করে।

    চমকপ্রদ বিষয় হলো বিরোধীদলসমূহ শুরুর দিকে সিএএ’র ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সূত্রহীন থাকলেও ধীরে ধীরে এই মোটাদাগে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের সমর্থনে যোগ দিতে শুরু করে। কিন্ত পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে তারা একমত হতে পারেনি। আঞ্চলিক দলগুলো দ্বারা গঠিত কতিপয় রাজ্যসরকার ঘোষণা দেয় যে তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোতে তারা এনআরসি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবে না। কিন্ত এসব দলেরও অন্যান্য নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ ছিল এবং এমন  ইস্যুতে পক্ষপাতদুষ্ট হিশেবে চিহ্নিত হতে চায়নি যেখানে মুসলমানদের এত বিপুল দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল। ২০২০ এর জানুয়ারির দ্বিতীয়ভাগে দিল্লিতে রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে ছিল। ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টি (এএপি) নির্বাচনে জয়ের অগ্রভাগে ছিল, ফলে এই ইস্যুতে বেশ সতর্কতার সাথে পা ফেলেছে। অন্যদিকে, বিজেপি এএপিকে রাজধানীতে বিশাল সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভের উস্কানিদাতা হিশেবে অভিযুক্ত করেছে। তবে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে এএপি নির্বাচনে জয়লাভ করে।

    গোটা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় বিজেপি আন্দোলনকারী এবং তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহী (anti-national) ও শহুরে সশস্ত্রপন্থীদের প্রতি তাদের বিষোদগার উগরে দিয়েছে; যারা কিনা এই আন্দোলন সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ। বিজেপি নেতৃবৃন্দ প্রায়শই বিজেপি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে “এইসব জারজদের গুলি” করার নির্দেশ দিয়েছে। নির্বাচনে হারের পর তারা (বিজেপি) দাবি জানাতে শুরু করে যে আন্দোলনকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ছত্রভঙ্গ করে দিতে হবে; অন্যথায়, তারা নিজেরাই সে দায়িত্ব পালন করবে। ২০২০ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি যখন মোদি ও শাহ জুটি গুজরাটে একটি বিশাল র‍্যালি দ্বারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তুষ্ট করছিলেন, দিল্লির মুসলমান অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হামলা শুরু হয়। প্রথম এক কি দুইদিন, ইটপাটকেল, পাথর ও দেশজ অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত সংঘর্ষ কিছুটা দ্বিপাক্ষিক ছিল। কিন্তু পরবর্তী দিনগুলোতে এটা ছিল সম্পূর্ণতই মুসলমান বিরোধী হত্যা ও লুন্ঠনযজ্ঞ। বাসাবাড়ি, দোকানপাটে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়, মানুষজনকে এলোপাথারি কেটে টুকরা টুকরা করে, পাথর মেরে এবং পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। এই তাণ্ডবলীলা চলাকালীন পুলিশ আক্ষরিক অর্থেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। আনুষ্ঠানিক মৃতের সংখ্যা তিপ্পান্ন, যাদের মধ্যে ছত্রিশজন ছিল মুসলমান।

    দিল্লি সহিংসতার মাধ্যমে বিজেপির গৃহীত বিপজ্জনক অভিমুখ অত্যন্ত পরিস্কারভাবে উন্মোচিত হয়। নাগরিকত্ব ইস্যু পুনর্বিবেচনার আহবানকে ন্যূনতম তোয়াক্কা না করে বিজেপি সিএএ-বিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রতি নির্লজ্জ কট্টর অবস্থান জারি রাখে। এমনকি বেশ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী হারের পর, বিজেপি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কলকব্জাগুলোতে নিজের লাগাম আরও দৃঢ় করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন ধরনের মিডিয়ার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা যজ্ঞ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। মার্চের মধ্যভাগে মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের পতন এবং মুখ্যমন্ত্রী পদে বিজেপির নেতাকে অধিষ্ঠিত করানোর উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসে একাধিক পদত্যাগের ঘটনা ঘটে অমিত শাহের কারসাজিতে। এই ক্যু সংঘটনে নিশ্চই যথেষ্ট সময় ও উদ্যম ব্যয় করতে হয়েছে বিজেপিকে, কারণ এর ফলে কোভিড-১৯ মহামারির ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে বিলম্ব হয়েছে।

    কার্টুনিস্ট: মীর সোহেইল
    সূত্র: মীর সোহেইলের ফেসবুক পেজ

    মহামারির রাজনৈতিক পরিণতি

    ইউরোপ থেকে আগত ভ্রমণকারীদের মধ্যে প্রথম কোভিড-১৯ সনাক্তের রিপোর্ট আসে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে। এক সপ্তাহের মধ্যে দেশের বিভিন্নপ্রান্তে কোভিড লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে, বিশেষত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ফেরতদের মধ্যে। কিন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্চের ২৩ তারিখের আগে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হয়ে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করার ফুরসত পাননি। ঘোষণা পরবর্তী প্রশাসনিক বিভ্রান্তি প্রস্তুতিহীনতার সমস্ত চিহ্ন বহন করেছিল। পরিকল্পনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়েছিল যে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ার মুখে আদতে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে রক্ষা করাই ছিল উদ্দেশ্য। যেহেতু মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সরকারী কর্মচারী, এমনকি যখন তারা কাজে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তখনও সরকার তাদের আয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। বৃহৎ বেসরকারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহও তাদের কর্মচারীদের ছাঁটাই না করার মাধ্যমে জাতীয় আবেগ তুষ্ট করার যজ্ঞে সামিল হয়েছে। বেশিরভাগ দাপ্তরিক কাজকর্ম নানাবিধ “ঘরে থেকে কাজ করা”র দিকে সরে আসতে বাধ্য হয়। লকডাউনের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করেছিল নিজেদের ঘর থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের কোন স্থানে অস্থায়ী কাজে নিযুক্ত বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক এবং তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকেরা, যাদের বেশিরভাগই খুব সামান্য অথবা শূন্য সঞ্চয় সম্বলিত স্ব-কর্মসংস্থানে নিযুক্ত। যেহেতু সরবরাহ চেইন প্রায় পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিল, যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায় ও কৃষিতে জড়িত তাদের অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পর্যবসিত হয়। ঠিক এই সময়েই শীতের ফসল কাটা ও সংগ্রহের অপেক্ষায় ছিল, ফলে গ্রামাঞ্চলে আতঙ্ক বিরাজ করছিল কারণ ফসল কাটার পর্যাপ্ত মজুর পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া শস্যাদি বাজারজাত করা যাবে কিনা এমন কোন নিশ্চয়তাও ছিল না।

    পুঁজিতান্ত্রিক পুঞ্জীভবনের সাধারণ সূত্র মেনে গড়ে ওঠা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং মূলত বাজার বিনিময়ের মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্ভর যেই অর্থনীতি গড়ে উঠে, ভারতে তাদের মধ্যে বহুকাল ধরেই একটি বড়সড় ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পরেরটি যদিও বাস্তবিক অর্থে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রথাগত অর্থনীতি নয়, বরং মার্ক্স যাকে বলেছেন পুঁজির আদিতম পুঞ্জীভবন এটি হচ্ছে তারই সৃষ্টি। অনানুষ্ঠানিক খাতের লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্পোরেট পুঁজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতাভুক্ত হতে হবে তেমন কোনো কথা নেই, বরং বেশ ক্ষীণ একটা যোগাযোগ থাকে কেবল দুইয়ের মধ্যে। তারা টিকে থাকে সংগঠিত নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেয়ার মাধ্যমে, সরকারের কাছ থেকে পাওয়া সস্তা খাবার ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপাতির মাধ্যমে নিজেদের জীবিকার কিছুটা নিরাপত্তা বিধান তারা করতে পারে। সরকারও তাদেরকে শ্রম আইন, দূষণ, জনস্বাস্থ্য ও কর সংক্রান্ত বিধিমালার ক্ষেত্রেও কিছু কিছু ছাড় দেয়। ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির চরিত্র নির্ধারণ করে যে প্রতিযোগিতামূলক লোকরঞ্জনবাদ (populism), তা-ই এই বিপুল জনসংখ্যাকে টিকিয়ে রাখে।

    স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় নয়াদিল্লিস্থ সরকারের নজিরবিহীন ও ব্যতিক্রমী চরিত্র এর জনতুষ্টিবাদী মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। হাজার হাজার কর্মহীন গৃহহীন পরিযায়ী শ্রমিক হাজার হাজার মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কেউ জানে না পথিমধ্যে ঠিক কতজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। একইসময় ইউরোপ ও চীনে আটকা পড়া শিক্ষার্থী ও ট্যুরিস্টদের ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মাঝেমাঝে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হয়ে মানুষজনকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিবাদন জানানোর আহবান জানিয়েছেন। কখনওবা ঘরের আলো নিভিয়ে মোমবাতি, প্রদীপ অথবা মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে করোনা দানবকে তাড়াতে বলেছেন। যাদের বাসায় ব্যালকনি আছে, অর্থাৎ শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, বিপুল উদ্দীপনাসহ নেতার নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন।

    Kashmir story Mir Suhail
    কার্টুনিস্ট: মীর সোহেইল সূত্র: আল-জাজিরা

    সত্যি বলতে গেলে, কোভিড-১৯ মহামারি এতটাই অভূতপূর্ব যে বিশ্বের বিভিন্ন সরকার এর মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রমাদ গুনছে। ইন্ডিয়ার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে আসন্ন অনিবার্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। সমস্ত রকমের রাজনীতি স্থগিত করা হয়েছে কারণ মোদি নতুন শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আদেশ জারির একটা কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলমান যা প্রত্যেক রাজ্য, প্রত্যেক জেলা ও প্রত্যেক এলাকায় এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালনা করবে। যেমনটা এক জন-আদেশে [পরবর্তিতে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়] উত্তরপ্রদেশের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, “এটা আপনার বিচার-বিবেচনা কিংবা বুদ্ধিমত্তা চর্চার সময় নয়। এটা আদেশ অনুসরণের সময়।” সরকারের চাকায় এমনভাবে প্রলেপ লাগানো হয়েছে কিংবা এমনভাবে বাঁধা হয়েছে যেন এ এক জরুরি অবস্থা যেখানে স্বাভাবিক আইন-কানুন স্থগিত।

    কিন্তু স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনার দাবি এবং অনিবার্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রকট পূর্বাভাসের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সরকারি প্রচেষ্টার মধ্যে টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের দৃশ্যমান মরিয়াভাব কর্তৃপক্ষকে তাদের জন্য বাড়ি ফেরার ট্রেনের বন্দোবস্ত করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যেই, কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণে আসা মহামারি আবার জ্যামিতিক হারে ছড়াতে শুরু করেছিল। রাজ্য সরকারসমূহ, যারা কিনা মানুষের জীবনের প্রাথমিক জিম্মাদার, আকস্মিকভাবে রাজ্য সীমান্তে টহল ও পুলিশী ব্যবস্থা জোরদার করতে শুরু করে এবং নিজেদের জনসংখ্যার প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে থাকে। তবুও কেন্দ্রীয় সরকারই মূলত সমস্তকিছুর মুখ্য নিয়ন্ত্রক। মোদি সরকার একদিকে কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে, অন্যদিকে রাজ্য সরকারগুলোর কাছে জনগণের ক্ষোভ ও অভিযোগ সামাল দেয়ার দায়িত্ব ঠেলে দিয়েছে। স্বাভাবিক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে, জরুরি অবস্থার আনুষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়া চলমান। অতিশীঘ্রই নির্বাচনী গণতন্ত্রের সাজসজ্জা/অলঙ্কারাদি ব্যতিরেকেই হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘটতে পারে।

     

  • ক্যাম্পাসে কেন ডেমোক্রেসি দরকার

    ক্যাম্পাসে কেন ডেমোক্রেসি দরকার

    আলতাফ পারভেজ 

    বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় সংকট—সেখানে কথা বলা যাচ্ছে না। ‘রাজনীতি’ সেখানে নিষিদ্ধ। অথচ দুনিয়ায় কেউ রাজনীতির বাইরে নেই। বুয়েটকে বাংলাদেশের অগ্রসর বিদ্যাপীঠ গণ্য করার রেওয়াজ আছে। বুয়েট কিছুকাল আগে সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীদের সংগঠনচর্চা থাকবে না। এর ঢেউ তোলা হয় অন্যত্রও। অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সমাজ-ভাবনা বন্ধের আয়োজন বেগবান হয়। তাতে একের পর এক সব ক্যাম্পাসে রক্তপাতই কেবল ঘটছে।

    ক্যাম্পাস গণতন্ত্রের চর্চা নিষিদ্ধ করতে অজুহাত হিসেবে হাজির করা হয় ‘মারামারি’ ও ‘সন্ত্রাস’-কে। গুটিকয় সন্ত্রাসী কাজকে ‘ছাত্ররাজনীতি’র পোশাক পরিয়ে জবাই দেওয়া হয় মানবিক ভাবনা-চিন্তাচর্চার স্বাভাবিকতাকে। আরও স্পষ্ট করে বললে তরুণ-তরুণীদের প্রশ্ন তোলা ও উত্তর খোঁজার চেষ্টাকে টার্গেট করা হচ্ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) তার নিষ্ঠুর এক পরিণতি দেখলাম আমরা।

    আবরার ফাহাদ হত্যার আগে-পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ও প্রতিবাদের একটা নতুন তরঙ্গ দেখা যাচ্ছিল।

    বিপুল সামাজিক সংহতিও পায় সেটা। ওই সামাজিক সমর্থন দ্রুত অস্ত্র হিসেবে নিপীড়নবিরোধীদের স্তব্ধ করার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। তরুণ-তরুণীদের খাঁচায় পোরার জন্য আবরার হত্যাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষাঙ্গন বাঁচাতে ‘ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসি’ নিষিদ্ধ রাখতে হবে—এ রকম ফর্মুলা জনসমাজে বেশ সম্মতি পেয়ে যায় তখন। কিন্তু তারপর শাবিপ্রবিতে কী দেখা গেল? এবার হয়তো আবরারের মতো কেউ মরল না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের রক্তে ক্যাম্পাসের মাটি সিক্ত হলো। যে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অব্যবস্থাপনার বিষয়ে বলছিল কেবল।

    মাইন্ড কন্ট্রোল;
    শিল্পী: ব্রায়ান টেয়লর;
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    জ্ঞান-অর্থনীতির প্রকৃত প্রতিপক্ষ কারা
    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় আকারের খাঁচায় পোরার কাঠামোগত ‘কাজ’-টি রাজনৈতিক-অর্থনীতির জন্য খুব জরুরি। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রচর্চা বন্ধের আয়োজন একালে তাই অনেক রাষ্ট্রে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প। তরুণদের কথা বলা বন্ধের কাজটি প্রয়োজন মূলত ক্ষমতাবানের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছোট ছোট অনেক কর্তৃত্বশালী তাঁদের ঊর্ধ্বতনদের মতো জবাবদিহির বাইরে থাকতে চান।

    কিন্তু তরুণেরা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের জায়গাগুলোর অন্যায্যতা ও অযৌক্তিকতা চিনে ফেলছে। দুর্নীতিকে শনাক্ত করছে। সেগুলো চ্যালেঞ্জ করছে, কথা বলছে, গান করছে, কবিতা লিখছে, গ্রাফিথি আঁকছে, প্রশ্ন তুলছে, উত্তর খুঁজছে এবং গণতন্ত্র চাইছে—যে গণতন্ত্র সবাইকে মতামত প্রকাশের সুযোগ দেয়। কিন্তু অনেকের জন্য এ পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়া কষ্টকর। তাঁরা ক্যাম্পাস ডেমোক্রেসিতে বাইরের ‘ইন্ধন’ দেখেন। তাঁদের মানসম্মান থাকে না তাতে।

    পাকিস্তান আমলে এ দেশে এ রকম তরুণদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ গালি দেওয়া হতো। পাশের দেশ ভারতে একই ধরনের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ মোহর দেওয়া হয়। এ রকম মনস্তত্ত্বের মাঝেই আমরা আছি এখন।অথচ যেকোনো জ্ঞানপীঠে মেধা ও যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যকে যদি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের মানদণ্ড করা হয়, তখন সেটাই ওই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের জন্য বড় সন্ত্রাস হয়ে ওঠে। এই সন্ত্রাস নির্বিঘ্নেই কি চলছে না? সেই অভিজ্ঞতাগুলো আড়াল করেই কয়েক দশক ধরে ক্যাম্পাসগুলোর সব সহিংসতার দায়ভার চাপানো হচ্ছে ছাত্রসংগঠনগুলোর ওপর এবং ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও ঐতিহ্যের ওপর।

    কিন্তু ছাত্র সংসদ বা ইউনিয়ন বন্ধ হওয়ায় মোটেই সন্ত্রাস কমেনি। প্রত্যেক কালেই ক্ষমতাবানেরা সন্ত্রাস করে, এখনো ক্ষমতাবানদের দ্বারাই ছাত্রছাত্রীরা রক্তাক্ত হয়। ইউনিয়ন না থাকলে ক্ষমতাবানদের বাড়তি সুবিধা এটুকু—শিক্ষার্থীদের অনায়াসে পেটানো যায়। পিটিয়ে সাংবাদিক ডেকে বাইরের ইন্ধনের দিকে আঙুল দেখানো যায়। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রচর্চা করতে দেওয়া হবে না বলে বহুকাল দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ইউনিয়নের নিয়মিত নির্বাচন বন্ধ।

    ঔপনিবেশিক আমলেও যা হয়নি, স্বাধীনতার আমলে তা-ই সম্ভব হয়—ক্যাম্পাস, সমাজ ও দেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনাচিন্তাকে ‘অপরাধ’ ও ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। শিক্ষার্থীদের মতামত গঠনের প্রক্রিয়া বন্ধ করা গেছে এতে। সমাজের নিচ থেকে নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশাল বিশাল তহবিলের ওপর প্রশ্নহীন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গুটিকয়েকের। জ্ঞান-অর্থনীতির প্রকৃত প্রতিপক্ষরা বেশ আড়ালে থাকতে পারছে এতে।

    আজকে নির্মীয়মাণ পদ্মা সেতুর পিলারে একটা বার্জ ধাক্কা খেলে পুরো দেশ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিন্তু দেশের সম্পদ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাচার নিয়ে তরুণদের আকুতিতে প্রতিক্রিয়া অতি সামান্য। অথচ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে দেশের প্রতিটি পরিবারের হিস্যা আছে।

    ডেমোক্রেসি
    শিল্পী: ওয়ার্নার হোরভাথ

    শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন না থাকায় লাভ কার
    সামান্য ১-২টি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় ৩০ বছর দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ইউনিয়ন নেই। কিন্তু গুন্ডা বাহিনীগুলো বাধাহীনভাবে কাজ করছে সব জায়গায়। এমন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না—ইউনিয়ন থাকার সময়ের চেয়ে না থাকার সময়ে শিক্ষার পরিবেশ ও মান বেড়েছে, সন্ত্রাস কমেছে কিংবা শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টি বেড়েছে। এই ৩০ বছরে শিক্ষকেরা ঠিক ঠিক জাতীয় রাজনীতি করে গেছে। অফিসার-কর্মচারীরাও করেছে। বহু শিক্ষক বড় ‘নেতা’ হয়েছেন। সেই ‘নেতা’দের সহায়তায় বহু ‘ছাত্র’ কোটিপতি হয়েছে।

    শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ-বদলি-পদায়ন যে রাজনৈতিক বিবেচনায় হচ্ছে সেটা সবাই জানে। সবাই অভ্যস্ত এতে। এসব অনায়াসে চলতে পারছে। চলতে পারবে। কেবল চলতে পারছে না এসবের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ। কোনো কিছুতে আপত্তি তোলা, প্রশ্ন উত্থাপন, উত্তর অন্বেষণ বিপজ্জনক। সেসব তাই নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নের জায়গা নয়, একে গড়ে তোলা হচ্ছে আনুগত্যের জায়গা হিসেবে!

    কিন্তু প্রতিনিধি বাছাই, সংগঠিত হওয়ার অধিকার কিংবা ইউনিয়ন না থাকার পরও তরুণ-তরুণীদের সচেতনতাবোধ কমছে না।

    এত নষ্ট একটা সমাজে সেটা সম্ভব নয়। যে ছোট একটা গোষ্ঠী সমাজের প্রায় সবকিছু দখল করে রাখে, শিক্ষাঙ্গনের ক্ষুদ্র চত্বরগুলো তাদের কাছে নতজানু হয় না দেখে স্বাভাবিকভাবেই ক্রোধ হতে পারে তাদের। এটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও বটে। সে জন্য তাঁরা ক্যাম্পাসে সশস্ত্র রক্ষীদের ডাকেন। কেবল এ কারণেই ক্যাম্পাস রক্তাক্ত হয়। তবে এটাকে কখনো ‘সন্ত্রাস’ বলা হয় না।

    শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রতিবাদ (পড়ুন ‘অবাধ্যতা’) চলতি রাজনৈতিক-অর্থনীতির জন্য, একচেটিয়া কারবারিদের জন্য, ভূমিদস্যু, পরিবহন মাফিয়া, নদীখেকো, ক্যাসিনো মালিক, কিছু কিছু মিডিয়া ব্যবসায়ীর জন্যও অসহনীয়। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের খাঁচায় পোরার প্রয়াসে সবার সমর্থন থাকে। খাঁচায় পোরার কাজটি হয় কোথাও ‘সান্ধ্য আইন’-এর নামে। কোথায় ফি বাড়ানোর নামে। কোথাও ফেসবুকে লেখার কারণে। কোথাও বিশেষ বিশেষ পোশাক পরা কিংবা না পরার কারণে। হরেক অছিলায় তরুণ-তরুণীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ-নিপীড়ন-নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসছে। কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ধূমপানের কারণেও শিক্ষার্থীর ‘সিট বাতিল’-এর ঘটনা ঘটেছে।

    শিক্ষার্থীদের মুখ বন্ধ করা আসলে ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের কথা বলা বন্ধ করা, পরিবার ও সমাজে নারীর কথা বলা নিষিদ্ধ করা, ব্রাহ্মণের সামনে দলিতের কথা বলা কমানো, প্রশাসনের সামনে করদাতার কথা বলার সুযোগ না রাখা, ১ শতাংশের সামনে ৯৯ শতাংশের কথা বলা নিষিদ্ধের থেকে আলাদা কিছু নয়। শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশ নিষিদ্ধ করা কার্যত অন্যান্য সামাজিক বিভাজনকেই উদোম করে মাত্র।

    শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, মজলুমসহ সবাইকে কথা বলতে দিয়ে একালে আর ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলো নিজের ন্যায্যতা টিকাতে পারে না। ‘ছাত্র’রা তাই উপলক্ষ, দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য কিন্তু ‘সবাই’। যদিও সবাই সেটা চট করে বোঝে না। একদল বোঝে না রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে; অন্যরা মনোজগতে উপনিবেশের কারণে।

    ‘রাজনীতিমুক্ত’ শিক্ষাঙ্গনগুলোর মান বেড়েছে কি?
    পুরো সমাজ থেকে, বিশ্ব থেকেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আবার সেগুলো, নিজে এক-একটা খুদে ‘রাষ্ট্র’ও বটে। ক্যাম্পাসে গণতন্ত্র নিষিদ্ধের সঙ্গে দেশ গঠনমূলক রাজনীতি নিষিদ্ধের ফারাক ও দূরত্ব তাই সামান্য। এটা মানবসত্তার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত মাত্র। সেই আঘাত নয়াদিল্লিতে যেমন, তেহরানে যেমন, পেশোয়ার এবং সিলেটেও তেমন।

    যে সমাজে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান রাজনীতির খবরদারিতে রয়েছে—যেখানে ব্যক্তির জীবনের সবকিছু, এমনকি তার খাবার, পোশাক, সংস্কৃতিতে লেপটে থাকে রাজনীতি—যেখানে পাঠ্যবইয়ের গল্প-কবিতা নিয়েও গভীর রাজনীতি চলে, বিবাদ হয়; সেখানে কেবল বেছে বেছে তরুণদের ‘রাজনীতিমুক্ত’ জীবন যাপন করতে হবে কেন? কারণ, তার প্রতিবন্ধিতার বিপরীতেই কেবল গুটিকয়েকের কণ্ঠ উচ্চকণ্ঠ হয়ে উঠতে পারে।

    এটা এক বোবাযুদ্ধ। বুয়েট থেকে শাহজালাল পর্যন্ত এই যুদ্ধের পরিসর আসলেই অনেক বড়। খেয়াল করলে আমরা দেখব বুয়েটে আবরার মারা যাওয়ার পর সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল,Ñকিন্তু আজ শাহজালালে শিক্ষার্থীরা মার খাওয়ার সময় বুয়েট পড়াশোনাতেই মন ডুবিয়ে আছে। বুয়েট পরিবার ‘রাজনীতি’ করতে যাচ্ছে না আর। বেখাপ্পা লাগলেও এটা আমাদের দেখাচ্ছে ক্যাম্পাসে বিবেক বন্ধের চেষ্টা পদ্ধতিগতভাবে বেশ কাজে লাগছে। ‘সিস্টেম’-এর জন্য ‘শান্তি’ খুব দরকার!

    তবে ক্যাম্পাসে বিবেকে তালা লাগানোর সময় ‘সিস্টেম’ নয় ‘মান’-এর কথাই শোনা যায়। কিন্তু ‘উন্নত শিক্ষা’র সঙ্গে তথাকথিত ‘রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন’-এর কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। ডাকসু-রাকসু-ইকসু না থাকায় ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক সূচক এগিয়েছে কিংবা সেসব জায়গায় শিক্ষার্থীদের পেটানো, টেন্ডারবাজি কিংবা হল দখল কমেছে, এমন দেখা যায়নি। অথচ প্রবল রাজনৈতিক কলরব ধারণ করে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) কিংবা যাদবপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে বহু ধাপ এগিয়ে।

    দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে ‘ছাত্ররাজনীতি’ বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গবেষণায়, জ্ঞানচর্চা, আবিষ্কারে সেসব প্রতিষ্ঠান এগিয়েছে এমন শোনা যায় না। হ্যাঁ, কোথাও কোথাও ‘কবরের শান্তি’ বিরাজ করছে। চরম বিপন্নতার মাঝেও সেখানে শিক্ষার্থীরা কথা বলতে পারে না। এ রকম ‘কবরের শান্তি’ এবং ‘শিক্ষার উন্নত পরিবেশ’ নিশ্চিতভাবেই আলাদা কিছু। যেমন আলাদা কিছু কারা প্রাচীরের দুই দিকের পরিসর।

    বাস্তবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্ঞানচর্চার ভয়হীন পরিবেশের জন্য দরকার গণতন্ত্র তাড়ানো নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সত্যিকারের স্বশাসন। আবার ‘স্বশাসন’ ও ‘গুটিকয়েকের শাসন’ মোটেই এক নয়। স্বায়ত্তশাসনের নামে কোনো ‘কর্তৃপক্ষ’ শিক্ষার্থীদের বলা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে ছিনতাই করতে পারে না। বাংলাদেশ সংবিধান সেটা সমর্থন করে না। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংবিধানের পরিসরের বাইরে রাখতে চাইছেন অনেকে।

    গণতান্ত্রিক আবহ না থাকা এবং ইউনিয়ন না থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা বসবাস ও অধ্যয়ন-অনুশীলনের জন্য ন্যূনতম জরুরি সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গার সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের সুবিধা নেই, বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায় না, বিনোদনের কিছু নেই, ভালো পরিবহন নেই, লাইব্রেরি নেই, গবেষণা তহবিল নেই, গুণগতভাবে উন্নত শিক্ষা নেই, কবে পরীক্ষা হবে আর কবে ফল পাওয়া যাবে—সেসব নিয়েও অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়।

    শিক্ষকেরা অন্যায় করলে কথা বলা যায় না। কর্মচারীদের অবহেলায় চুপ থাকতে হয়। অথচ জনগণের করের টাকাতেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সুউচ্চ ভবন উঠছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে। তাঁদের আবাসন সুবিধা বাড়ছে। তাঁদের ভর্তিকালীন আয় বাড়ছে। সরকার তাঁদের প্লট দিচ্ছে, পদক দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দেখিয়েই শিক্ষা খাতের যাবতীয় ব্যয় বৃদ্ধি।

    কিন্তু শিক্ষার্থীরা অসন্তুষ্ট। তারা অসুখী। তারা বঞ্চিত। সন্ধ্যা হলে হলগুলোতে ক্যাডারদের সামনে হাজিরা দিতে হয়। দিনে মিছিলে খাটতে যেতে হয়। অনেক স্থানে যৌন হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার তারা। এত সব অসন্তোষ ও অসুখী জীবনের কথা, নিরাপত্তাহীনতা ও বঞ্চনার কথা প্রকাশের নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ রাখা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে এটা ‘রাজনীতি’। এটা নিষিদ্ধ।

    দেশজুড়ে সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমবেশি একই রকম দৃশ্য এখন। এর ফল এত ভয়াবহ যে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করতে দেখা যাচ্ছে। এসব মৃত্যুর কারণ কেউ খোঁজে না। এই মেধাবীদের নিশ্চয়ই কিছু বলার ছিল। তাদের সতীর্থরা কার কাছে এই মৃত্যুর জবাবদিহি চাইবে? এ রকম জবাবদিহি চাওয়াও যে ‘রাজনীতি’! ইউনিয়ন ও গণতন্ত্রহীন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা কীভাবে আছে, আত্মহত্যার ঘটনাবলি তার বড় এক মানদণ্ড। অনুসন্ধান হলে হয়তো দেখা যেত, এসব আত্মহত্যা একধরনের পদ্ধতিগত হত্যা মাত্র।

    যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে চলছে, যেহেতু মেধাবী মানবসম্পদ দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় ভরসার ধন—সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে জনগণের সন্তানেরা কীভাবে থাকবে, কেন রক্ষীদের হাতে তারা রক্তাক্ত হচ্ছে, কেন আত্মহত্যা করছে—এই বিষয়গুলো নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনা দরকার।

    বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ভয়মুক্ত পরিবেশে একটা নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশের জন্য। শিক্ষার্থীরা যদি দেশের ভবিষ্যৎ হয়, তাহলে তাদের অনিরাপদ পরিবেশ থেকে বাঁচাতে হবে। তাদের কথা বলতে দিতে হবে।