Category: গণসংগ্রাম

  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে নারীবাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের পুরুষের করণীয়: পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা

    জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে নারীবাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের পুরুষের করণীয়: পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা

    • নিসর্গ নিলয়

    ১

    আমার মতে, হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষদের নিজেদের নারীবাদী দাবি না করাই উত্তম। বর্তমানে লিবারেল রাজনীতির প্রভাবে এই চল আমরা বৈশ্বিক উত্তরের সমাজে দেখি। যদি ধরে নেই নারীবাদ একটি প্রয়োজনীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারা, তবে তিনটি কারণে এই প্রবণতা থেকে দূরে থাকা উচিত। প্রথমত, নারীবাদের প্রয়োজনীয়তা হেটেরোসেক্সুয়াল পুরুষের তৈরি বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থাকে (heteropatriarchy) চ্যালেঞ্জ করতে গিয়েই উদ্ভূত। তাদের বিশ্বদর্শনে (ontology) যে নারী বিষয়ক ধারণা রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে সাম্যবাদী হয়ে গেছে, তা আমরা বলতে পারি না। দ্বিতীয়ত, বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ নিজেকে নারীবাদী বলে দাবি করতে পারে, যা আদতে নারীবাদী এক্টিভিজমের জন্য ক্ষতিকর। তৃতীয়ত, নারীবাদের প্রতি সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়ার অনেক জায়গা রয়েছে। একটি বড় সমালোচনা হল, সমসাময়িক নারীবাদ অনেক ক্ষেত্রেই নারীবাদী দৃষ্টিকোণে পুরুষের ইতিবাচক অবস্থান কী হবে, তা বলতে পারে না।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    উক্ত অবস্থান থেকে আমি বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমসাময়িক ও পরবর্তী নারীবাদী এক্টিভিজম নিয়ে এই লেখাটি লিখছি। এই লেখাতে আমি দেখাবো, কীভাবে সমসাময়িক নারীবাদী এক্টিভিজমের প্রতি একটি পরিমার্জিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা যায় এবং কেন তা জরুরী। এই লেখাতে আমি মূলত বলছি, জুলাই–গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী বাংলাদেশে নারীবাদী এক্টিভিজম বৈশ্বিক পরিস্থিতির তুলনায় এমন এক অনন্য অবস্থানে এসেছে যেখানে পূর্ববর্তী নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার পৃথকভাবে ভাবার এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ এসেছে। সুতরাং, যেসকল (হেটেরোসেক্সুয়াল) পুরুষ এই নারীবাদকে সমর্থন করতে চায়, তাদের কিছু করণীয় আছে এবং আমি তার একটি প্রস্তাবনা আলাপ করছি। এই লেখার দ্বিতীয় অংশে বাংলাদেশের নারীবাদী এক্টিভিজমের একটি সার অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা বর্ণনা করেছি। তৃতীয় অংশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে নারীবাদী এক্টিভিস্টরা কী ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন তা ব্যাখ্যা করেছি। চতুর্থ অংশে নারীবাদী এক্টিভিজমের সামনে উপস্থিত কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছি। পঞ্চম অংশে আমি উল্লিখিত প্রস্তাবনা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি।

    ২

    বাংলাদেশের নারীবাদী এক্টিভিস্টদের দুইটা ধরন মূলত চোখে পড়ে। এক) শহুরে অধিকারভিত্তিক নারীবাদী, দুই) কিছুটা গ্রাম–স্বীকার–করা উন্নয়নভিত্তিক নারীবাদী। উল্লেখ্য, এর বাইরে ক্রিটিকাল ঘরানার নারীবাদী যে নেই—তা নয়। তবে,‌ তাদেরকে ব্যক্তি হিসেবে গুণে গুণে আলাদা করা সম্ভব। যে দুটি ধরনের কথা উল্লেখ করলাম, তাদের মধ্যে বিভিন্ন পার্থক্য থাকলেও একটা বিষয়ে খুবই মিল—পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সাথে তাদের কাজকর্ম সামঞ্জস্যপূর্ণ। অবশ্য স্বীকার করতেই হয়, আমাদের সবকিছুই শেখায় পশ্চিম। তবে অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মতই নারীবাদেরও পশ্চিম থেকে বের হওয়ার চিত্র ধীরে ধীরে বাড়ছে। সে বিষয়ে পরে যাচ্ছি। এই পশ্চিমকেন্দ্রিকতার কারণে উন্নয়নভিত্তিক নারীবাদীরা মূলত ক্ষমতায়ন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন ও আছেন বহুদিন ধরেঃ যেমন মেয়েদের বাল্যবিবাহ রোধ (আইনগত ক্ষমতায়ন), স্যানিটারি ন্যাপকিন ও কনডম ব্যবহার (স্বাস্থ্যগত ক্ষমতায়ন), স্কুলে যাওয়া (শিক্ষাগত ক্ষমতায়ন), ক্ষুদ্রঋণ (আর্থিক ক্ষমতায়ন) ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এই ক্ষমতায়নের ধারণা ধরে নিচ্ছে যে উল্লিখিত সামাজিক কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো ঘটালে নারীরা সমাজে ক্ষমতার ভাগ পাবে।

    অন্যদিকে শহুরে অধিকারভিত্তিক নারীবাদীরা নারীর দেহ–মন–ভাষা–চেতনা সম্পর্কিত অধিকারের দিকে বেশি মনোযোগী। এই অধিকারগুলো নারীর দেহ (physical body) থেকে শুরু করে রাজনীতি (political body) পর্যন্ত তরজমা করা যেতে পারে। তাদের আগ্রহের বিষয় তাই সম্মতি (মূলত যৌনসম্মতি), যৌননির্যাতন, মবিলিটি, উপস্থাপন (যেমনঃ পোশাক) ইত্যাদি। এই ধারার উল্লেখযোগ্য কিছু আন্দোলনের মধ্যে চোখে পড়ে মি–টু আন্দোলন, পোশাকের অধিকার নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন, ‘মেয়েরা রাত দখল কর’ আন্দোলন, কনসেন্ট সচেতনতা, ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি।

    উভয় ক্ষেত্রেই কিছু এক্টিভিটি ও চিন্তাগত মিল দেখা যায়। প্রথমত, এই দুই ধরনের নারীবাদই একটা জিওপলিটিক্স অব নলেজে আক্রান্ত। খেয়াল করলে দেখা যাবে ডেভেলাপমেন্ট ইন্টারভেনশনগুলোও আমাদের স্থানীয় ধারণাপ্রসূত না, কোন না কোন ভাবে সেই ফাইভ স্টেজ অব ডেভেলাপমেন্টের পশ্চিমা ধারণারই বাহক। তেমনি, অধিকারগুলোর ধারণাও আমাদের স্থানের বিচারে আসে নাই, এগুলো পশ্চিমা অধিকারের ধারণা। প্রসঙ্গত, অনেকে এ কথা শুনলে বলতে পারেন যে, ‘পশ্চিমা ধারণার অধিকারকে সমালোচনা করার মাধ্যমে আসলে নারীর অধিকারের সার্বজনীন একটি দাবিকেই আটকে দেওয়ার চেষ্টা এটি।’ আমি মোটেও সে উদ্দেশ্যে বলছি না, বরং আমার দাবি এর বিপরীত। পশ্চিমা জেন্ডার বা যৌনতার অধিকারের ধারণা একটা কাঠামোর ভেতরে আটকানো, একটা রক্ষণশীল কলোনিয়াল সংস্কৃতির ধারক। যেমন, পশ্চিমা সেক্সুয়াল ফ্রিডমের আলোচনার মধ্যেও আমরা খুঁটে খুঁটে ভিক্টোরিয়ান মোরালিটিকে খুঁজে পাবো, যেখানে কোর্টশিপের ব্যাপারটা পুরোপুরি পুরুষকে বহন করতে হয়, এবং নারীকে নির্জীব ও বাধ্যগত (docile) অংশগ্রহণকারী হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে নির্মাণ করা হয়। আবার, আসিরীয়, মেক্সিকান প্রাচীন দেবদেবীদের জেন্ডার ফ্লুইডিটি পশ্চিমা কলোনিয়াল শাসকরা ধরতে পারে না। ফলত, জেন্ডার বা যৌনতার অধিকার বিষয়েও তা সীমাবদ্ধ হয়। 

    দ্বিতীয়ত, নারীর মাঝে যে হায়ারার্কি থাকতে পারে এবং এই হায়ারার্কির কারণে প্রান্তিক নারীর যে এসব আন্দোলন কোন কাজে আসতে না–ও পারে, সে বিষয়টি উভয় ঘরানাই এড়িয়ে যায়। যেমন, উন্নয়নভিত্তিক নারীবাদীদের ইন্টারভেনশনগুলো শহুরে আর্থসামাজিক শ্রেণীর জীবনধারণা থেকে উদ্ভূত সমস্যা–সমাধানের ধারণা থেকে প্রসূত। একটা গ্রামের মেয়ের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোন সমস্যা যে থাকতে পারে, অথবা সেই ইন্টারভেনশন যে গ্রামের মেয়েটির জন্য সমাধানের বদলে নতুন জটিলতা ডেকে আনতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা তাদের প্রস্তাবনায় কম ধরা পড়ে। আবার, অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে যেসব ধ্যানধারণা ও উপায় ব্যবহার করে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেগুলো সব শ্রেণীর মানুষের কাছে পরিষ্কার না–ও হতে পারে। তখন তা শুধু শহুরে অভিজাতের সুবিধা বজায় রাখা ছাড়া আর কিছু করে না। যেমনঃ যে মেয়ের কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই, সে তার নির্যাতনের কথা কীভাবে মি–টু করবে তা বোধগম্য না। এছাড়া, যে নারী জানেই না যে সে নির্যাতিত হচ্ছে, তার পক্ষে এসব অধিকারের বাহাস বোঝাই সম্ভব না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর খুবই বীভৎস একটি উদাহরণের কথা আমার শোনা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলে একাডেমিক কাজে যাওয়া আমার এক অগ্রজের কাছে শুনেছিলাম, সেখানে ধর্ষণ বলে কোন ধারণাই নেই। সেখানে একে বলা হয় ‘জোর করা’। মেয়েদের সাথে এই ‘জোর করা’ হলে তার তেমন কিছু করার নাই, বড়জোর সালিশ ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হয়। এই শব্দবন্ধ প্রমাণ করে যে, সেখানকার নারীর জীবনধারণায় এই ‘জোর করা’ প্রসঙ্গটি ‘মেনে নেওয়ার’ বিষয়, সেখানে ‘নির্যাতনের’ ধারণাটি তর্কসাপেক্ষে অনুপস্থিত।

    তৃতীয়ত, উভয় ক্ষেত্রেই হেটেরোপ্যাট্রিয়ার্কি এবং কর্তৃত্ববাদের চূড়ান্ত রূপ তথা রাষ্ট্রের সাথে নারীবাদী এক্টিভিজমের কোন বিরোধ নেই। উল্লিখিত এক্টিভিজমে অংশ নিয়েও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের পক্ষে থাকা যায়। যেমন: আওয়ামী কর্তৃত্ববাদী সরকার যখন ’নারীর ক্ষমতায়ন’–কে প্রচার করে, তখন তার পক্ষে থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নারীমুক্তির পথের বিরোধকে এড়িয়ে যাওয়া যায়। গত ১৫ বছরের ঘটনা আমলে নিলে এটি ভালো উদাহরণ। সুতরাং, এরকম পরিস্থিতিতে নারীবাদী এক্টিভিস্টরা কর্তৃত্ববিরোধী গোষ্ঠী দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হবেন এটা স্বাভাবিক। সেটা হয়েছেনও। তবে এসব বিরোধের মোড় ঘুরিয়ে ঐতিহাসিক একটি অধ্যায় সূচনা করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।

    ৩

    স্পষ্টত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের কোন নির্দিষ্ট সংগঠন, দল বা সংস্থা নয়, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এতে রাষ্ট্রকাঠামোর কোন পরিবর্তন না ঘটলেও অবশ্যই তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এসময়ে নারীবাদীদেরকেও কোন একটা পক্ষ নিতে হতো, এবং তারা তা নিয়েছেন। ঘরানাগত পার্থক্য, এক্টিভিজমগত পার্থক্যের বেড়া পার করে তাদের সামনে বিশাল প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা কি রাষ্ট্রীয়–সরকারি কর্তৃত্ববাদের পক্ষে না বিপক্ষে? উল্লেখ্য, অধিকাংশ নারীবাদীই এসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন গণঅভ্যুত্থানের বড় একটি শক্তি হিসেবে। গণঅভ্যুত্থানের একটি বিখ্যাত ছবি আছে। কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে লাঠি হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে বের হচ্ছেন এক হিজাব পরিহিতা (যাকে ইসলামিক চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) এবং এক প্যাণ্ট–শার্ট পরা (যাকে লিবারেল–মডার্ন চিন্তাধারার প্রতীক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন) তরুণী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাদের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশী নারীবাদীদের অবস্থানকে আরও রাজনৈতিক করেছে। রাজনীতির ময়দানে কর্তৃত্ববাদবিরোধী নারীবাদীদের নতুন একটি অবস্থান তৈরি করেছে। যে নারীবাদীরা আওয়ামী সরকারের পক্ষ নিয়েছেন, তাদের আওয়ামীলীগকে বাঁচাতে গিয়ে নারীবাদী অবস্থানের বদলে কর্তৃত্ববাদী বয়ানেই ব্যস্ত হয়ে যেতে হবে। ফলে তারা যে আদতে নারীর জীবন–দর্শন–রাজনীতির চিন্তায় চিন্তিত নয় বরং রাষ্ট্রীয় এপারেটাসের মোলায়েম অংশ মাত্র, সেটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে মুনমুন শারমিন শামস, তসলিমা নাসরীন প্রমুখের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোকে আমলে নেওয়া যায়।

    এই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের ফলে নারীবাদী এক্টিভিস্টরা পূর্বে উল্লিখিত সংকটগুলি ছাড়াও উন্নয়নভিত্তিক নারীবাদীদের প্রথাগত রৈখিক উন্নয়নের বয়ান এবং অধিকারভিত্তিক নারীবাদীদের শহরকেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন। উন্নয়নের ধারণা যে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র নির্ধারণ করে তা এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী এক্টিভিস্টদের কথায় বারবার উঠে আসছে। তারা হয়ত ভবিষ্যতে এধরনের উন্নয়নকে আরও কাটাছেঁড়া করে পর্যালোচনা করবার যথেষ্ট সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি অধিকার সংক্রান্ত আন্দোলন এখন শুধু শহুরে নারীর জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশা করা যায়।

    ৪

    দুর্ভাগ্যের বিষয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো যেমন রাতারাতি কৃষক–শ্রমিকবান্ধব হয়ে যায়নি, তেমনি নারীদের জন্য স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিও ডেকে আনেনি। সদ্য শেষ হওয়া ঈদুল ফিতরে আমরা দেখতে পেলাম দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন। একইভাবে, নারীর অধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্দোলন চলমান। এর কোন রাজনৈতিক সমাধানের বা সমঝোতার পথে পৌঁছাতে আমরা পারিনি। আরও ভীতিকর বিষয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণের বিভিন্ন বয়ান লুপ্তপ্রায়। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নারীদের অংশগ্রহণের ন্যারেটিভ এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অংশগ্রহণ হারিয়ে গেছে কিংবা দাবিয়ে রাখা হয়েছে বলে অনেক নারী গণঅভ্যুত্থানকারী অভিযোগ করেন। এছাড়া, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণের অনেক আখ্যান রয়েছে যেগুলো হয়ত উপযুক্ত অন্বেষণের অভাবে অব্যক্তই থেকে যাবে। একটা ছোট্ট ঘটনা আমার চোখে পড়েছিল। সেটা স্মৃতি থেকে লিখছি। কোন এক মেয়ের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল অনেকটা এরকমঃ জুলাইয়ের সময় তিনি ঘরে বসে বসে দেখছেন তাঁর ছাত্রলীগ দেবর বাসার সবাইকে হুমকিধামকি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে আন্দোলনে যাওয়া যাবে না। মেয়েটি আরও সন্দেহ করছিলেন যে দেবর নিশ্চয়ই ছাত্রদের উপর হামলায় অংশগ্রহণ করছেন নিয়মিত। তাই তিনি সেদিন দেবরের রাতের খাবারের সাথে জামালগোটা (ল্যাক্সেটিভ) মিশিয়ে দেন। পরেরদিন দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখেন যে দেবর বাসা থেকে বের হচ্ছে না ‘শরীর খারাপ’ বলে। এতে তিনি বেজায় আমোদিত হন। এই ঘটনায় মেয়েটি সরাসরি রাস্তায় নেমে যুদ্ধ না করেও একজন যোদ্ধা। কিন্তু রাস্তার ময়দানে যতটুকু ডকুমেন্টেশন ছিল, এইধরনের আখ্যানের তত ডকুমেন্টেশন আমরা করে উঠতে পারিনি, বা পারব না।

    এছাড়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতা পুনর্গঠনের অলিখিত সমঝোতার স্বার্থে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীবাদী এক্টিভিস্টদের সরাসরি বিরোধিতা করেনি। এক্ষেত্রে ডানপন্থী রক্ষণশীল, বিশেষ করে ইসলামিস্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কথা উল্লেখ করবো। এসব গোষ্ঠী সরাসরি নারীর অধিকার ও এজেন্সিকে অস্বীকার করে, নারীবাদের কথা তো বলা বাহুল্য। গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই এসব গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভাগ বসাচ্ছে, বা বসানোর জন্য সমঝোতা করছে। ফলত, এই রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো নারীবাদী এক্টিভিস্ট এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণকে যতভাবে সম্ভব ততভাবে বিস্মৃত করবার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টার প্রতিফলন হিসেবে আমরা নারী অধিকার সম্পর্কিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনার বিরোধিতা করতে দেখি। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনগুলোয় নারী নেতৃত্ব উঠে আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে দেখি– ব্যক্তিগত জীবনের সমালোচনা, চরিত্রহনন বা চিরাচরিত ‘নারী নেতৃত্ব ভালো নয়’ আলাপের মধ্য দিয়ে।

    ৫

    এমতাবস্থায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশি নারীবাদী এক্টিভিস্টদের জন্য যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একটি হেটেরোপ্যাট্রিয়ার্কাল সামাজিক অবস্থায় নারীবাদী এক্টিভিস্টদের সহযোদ্ধা ও সমর্থক হিসেবে আমাদের মত পুরুষদের করণীয় কী? এক্ষেত্রে আমি চারটি কাজসংবলিত একটি প্রস্তাবনা দিচ্ছি। এই চারটি কাজ হলো উপলব্ধি (realization), দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণ (documentation), যোগাযোগ (communication) এবং সমন্বিতকরণ (integration)।

    প্রথমত, সাংস্কৃতিক, জৈবিক ও মানসিক গড়নে স্বকীয়তা থাকলেও পুরুষ হিসেবে আমরা নারীর থেকে বিচ্ছিন্ন কোন বাইনারি পোল না। নারী দৈহিক এবং ধারণাগতভাবে আমাদের আত্ম ও সমষ্টির অংশ। অথচ পুরুষ হিসেবে আমরা নারীকে বুঝে ওঠার কতটা চেষ্টা করি সেটা প্রশ্নের বিষয়। কেননা, হেটেরোপ্যাট্রিয়ার্কাল সমাজ আমাদের এই বাইনারি বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। ফলে নারীর ভাষা, নারীর মনস্তত্ব এবং নারীর সামাজিক–রাজনৈতিক লড়াই আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই। নারীর বিশ্বদর্শন বুঝতে গেলে আমাদের এই ধারণাগত বাইনারি থেকে বের হতে হবে। এই কাজটি করতে গেলে পুরুষ হিসেবে আমাদের নিজেদের মনস্তত্ব বোঝার সুযোগ এবং কর্তব্য রয়েছে।

    দ্বিতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ, বয়ান, রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদির দালিলিক প্রমাণ সংরক্ষণ জরুরি, যার কারণ আগেই উল্লেখ করেছি। এক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব এড়াতে বিভিন্ন পদ্ধতি আমরা ব্যবহার করতে পারি, যেমনঃ থিক ডেস্ক্রিপশন, ডায়ালগ, টেক্সচুয়াল বিশ্লেষণ ইত্যাদি।

    তৃতীয়ত, উপলব্ধির অভাবের কারণে আমরা অধিকাংশ সময়ে নারীর সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই। ঘরে মা–বোন থাকা সংক্রান্ত বিভিন্ন বুলি ছাড়লেও (যা হেটেরোপ্যাট্রিয়ার্কিকেই পুনরুৎপাদন করে), আমরা কতটুকুই বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি? কতটুকু বা আমরা শুনি মায়ের দুঃখ, প্রেমিকার অনুভূতি? আরও বড় পরিসরে চিন্তা করলে– কতটুকু যোগাযোগ আমরা স্থাপন করতে পেরেছি নারীবাদী এক্টিভিজমের সাথে, তাদের অবস্থা ও অবস্থানের আলোচনার সাথে? নারীবাদের প্রতি সমালোচনামূলক আলোচনায় থেকেও সেই যোগাযোগ করতে কী বাধা আছে? সেটা আমরা যতক্ষণ না এক্টিভিস্টদের সাথে আমাদের যোগাযোগ বাড়িয়ে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করি, ততক্ষণ জানা সম্ভব না।

    চতুর্থত, এই যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে নারীবাদী এক্টিভিস্টদের সঙ্গে সমন্বয়সাধন বাড়ানো যায়। প্রথাগত এক্টিভিজমের বাইরে নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনলাইন ইভেন্ট, লেখালেখি ইত্যাদি কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এক্টিভিস্টদের এসকল আয়োজনে অংশগ্রহণ করা যায়। তাদের সঙ্গে মতামত না মিললেও– সেখানে তারা কী বলতে চান, কার্যক্রমগুলো কেমন বা তার ভালো দিক কিংবা সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী– সেগুলো ভাবা যায়। এসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব।

    প্রশ্ন হলো, আমার মত অবস্থান থেকে যারা এসবে আগ্রহী হবেন তাদেরকে নারীবাদী এক্টিভিস্টরা মেনে নিবেন কিনা? বাংলাদেশে ‘নিঃস্বার্থ’ ও ‘প্রভু–দল–সংগঠন–ভক্ত’ রাজনৈতিক এক্টিভিজমের যে প্রচলন, তা থেকে তারা যে মুক্ত– এ কথা তো সহজে বলার মত যথেষ্ট তথ্য উপাত্ত নেই। তারা আমাদের কতটুকু গ্রহণ করবেন? এ দায়ভার নারীবাদীদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

  • গণবিপ্লব-প্রবাহ: চলমান ইশতেহারের খসড়া

    গণবিপ্লব-প্রবাহ: চলমান ইশতেহারের খসড়া

    • সেলিম রেজা নিউটন

    বিপ্লব1 যাঁরা শুধু বইয়ে পড়েছেন, বিপ্লব শুরু হলে তাঁরা তাকে চিনতে পারেন না। পূর্বনির্ধারিত কোনো বৈপ্লবিক কর্মসূচির জামা গায়ে আসে না বিপ্লব। মুখস্থ মতবাদের বইপড়া প্রশিক্ষিত মাথা অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক কাল্ট, মাচো মস্তিষ্ক অথবা ব্যক্তিগত স্টেকহোল্ডার্স, কিম্বা ষড়যন্ত্র–তত্ত্ব অথবা দল–গোষ্ঠী–পার্টিগত সংকীর্ণ পজিশন দিয়ে ঠিকঠাক চেনা যায় না তাকে। যখন সত্যি সত্যি দৃশ্যমান হতে শুরু করে গণবিপ্লব–প্রবাহ, এমনকি তখনও রাষ্ট্রীয় একনায়কতন্ত্রের বাইরেকার সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের মনে হতে থাকে, “এ ধরনের আন্দোলনকে তৈরি করা হচ্ছে” আসলে “দেশের মূল সমস্যা”কে “ডাইভার্ট করার জন্য”।2

    আরো বড়ো পরিসরে যখন জাগতে লাগে সুস্পষ্ট গণঅভু্যত্থান, সবচাইতে অগ্রসর তরুণ–যুবারা যেদিন মধ্যরাতে সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভাষাগত বৈপ্লবিক বাঁকটা নেন সর্বাত্মক একনায়কের বহুকালের বিশেষ্য–বিশেষণ, ন্যারেটিভ ও বাগধারাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে, সেসবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসার মধ্য দিয়ে, সেই দিন সকালেও বছরের পর বছর ধরে আন্তরিক একাগ্রতার সাথে গণঅভু্যত্থান নিয়ে বইপত্র লিখতে থাকা প্রবীণ বিপ্লবী দার্শনিকের মনে হতে থাকে, “তরুণরা বিদ্যমান দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং তার ফ্যাসিস্ট শক্তি ও কাঠামো … টিকিয়ে রাখতে চায়। বিদ্যমান ব্যবস্থাটা বজায় রেখে [তারা] নিজেরা দুর্নীতিবাজ আমলা, পুলিশ ইত্যাদি হতে চায়, রাষ্ট্রের চাকরি চায়।” এই বলে সতর্ক করতে থাকেন তিনি: “নৈতিকতার দিক থেকে ভাবুন, তরুণরা দুর্নীতিবাজ হতে চায়— এটাই তাদের বাসনা।”

    আরেকটু পরই ১৫ বছরের একনায়কতন্ত্রকে একটানে গোড়া উপড়ে ফেলে দেবেন যাঁরা, সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের মুক্তিপিপাসু লড়াই সম্পর্কে মহা–আত্মবিশ্বাসের সাথে এই কটাক্ষ করতে তাঁর বাধে না যে: “আমরা কতো বড় গর্তে পড়ে গিয়েছি একটু ভাবেন। এটাই তো সরকারি আমলা হয়ে দুর্নীতি করা ও সহজে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার খায়েশ ও জীবন পণ আকাঙ্ক্ষা? এটা দেখে যারপর নাই মোহিত না হয়ে উপায় নাই।” এই বলে আফসোসের সীমা থাকবে না তাঁর যে: “পৃথিবীর কোত্থাও অন্য কোন ইতিহাসে তারুণ্যের বিপুল অপচয়ের এই বিশাল নজির আপনি পাবেন না।”3

    কোরান শরিফের আয়াতের তীব্র সুন্দর কাব্যিক–দার্শনিক আত্মীকরণ ঘটিয়ে যে–তরুণ বিপ্লবীরা লিখেছিলেন “প্রতিটি শ্বাস একটি বিপ্লবের স্বাদ গ্রহণ করবে”,4 স্বপ্ন দেখেছিলেন কোনো একদিন তাঁরাও পার্লামেন্ট–ভবনে বা গণভবনে শ্রীলঙ্কার তরুণদের মতো গাইবেন “বেলা চাও” গান5— সেই তরুণরাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার হাঙ্গরের হাঁ–করা দাঁতের ফাঁকে দাঁড়িয়ে যখন ডাক দিবেন “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচির,6 যখন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করবেন ঢাকা শহরের সাধারণ শ্রমজীবী–চাকুরিজীবী মানুষ, এমনকি তখনও হাসিনাশাহীর অত্যাচারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া আগাগোড়া লড়াকু ও অত্যন্ত জনপ্রিয় অনলাইন–অ্যাক্টিভিস্টের মনে হতে থাকবে, ‘ব্লকেড’ শব্দটা যেহেতু কোলকাতার, এবং “‘বাংলা ব্লকেড’ … কথাটা” যেহেতু “একজন বাংলাদেশীর মাথা থিকা বাইর হবে না”, সুতরাং এই আন্দোলন হয়তো তৈরি করা হয়েছে ভারতের স্বার্থে হাসিনার ওপর এই মর্মে চাপ সৃষ্টির জন্য যেন সে চীনের দিকে ঝুঁকে না যায়।7

    অতঃপর ছাত্র–জনতার ফ্যাসিবাদ উচ্ছেদের এক দফার ঘোষণায় বঙ্গভবনের দিকে ধাবমান লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল দেখে ৪০ মিনিটের নোটিশে খুনি হাসিনা যেদিন পালিয়ে যাবে ভারতে — ৩৬শে জুলাই — ঠিক তার আগের দিনও অতীব সম্মানিত একজন অধ্যাপক–সম্পাদকের মনে হতে থাকবে, “দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ার কারণেই এ ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা দুঃখজনক ও হতাশাজনক। … দেশ ও জাতির জন্য এহেন হতাহতের ঘটনা অত্যন্ত ক্ষতিকর। উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতা জরুরি।”

    অথচ ততক্ষণে স্বয়ং হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে তার বিভিন্ন বাহিনী মেরে ফেলেছে একজন–দুইজন নয়, হাজার–বারোশো মানুষকে। তাদের নির্বিচার গুলিতে অন্ধ হয়ে গেছেন, পঙ্গু হয়ে গেছেন, আরো হাজার হাজার লোক। ভরা–শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে অলিতে–গলিতে–রাস্তায়–মহল্লায়। এরকম একটা মুহূর্তেও নব্বই ছুঁই–ছুঁই বয়েসের প্রাজ্ঞ, আজীবন–বামপন্থী, ঐ বুদ্ধিজীবীর শান্ত–নিরাপদ মস্তিষ্ক বলতে থাকবে, “শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে সরকারের পদত্যাগের বিষয়টি প্রধান করে এনেছে। … পদত্যাগ হচ্ছে একপ্রকার শাস্তি বা বিচার, সেটা দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।” এবং এখানেই থামবেন না তিনি। ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের অসারতা তুলে ধরে বলতে থাকবেন সমঝোতার কথা: “এ অবস্থায় আন্দোলন দীর্ঘ সময় চালানোর চেষ্টা হলেও, মানুষ রোজ রোজ রাস্তায় নামবে না, অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রশক্তির চূড়ান্ত ব্যবহার করে তা থামানোর চেষ্টা করবে; মাঝখান থেকে একের পর এক নিরীহ প্রাণ ঝরতে থাকবে, সম্পদ ধ্বংস হবে। এটা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। তাই দু’পক্ষকে একটা সমঝোতায় আসতে হবে।”8

    ততক্ষণে হাসিনাও বলছে সমঝোতার কথা।9 বলছে “শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই”।10 এমনকি যখন সে তার রাজকীয় তাচ্ছিল্যের অনুগ্রহ প্রকাশের ভঙ্গিতে বলছে আলোচনার জন্য “গণভবনের দুয়ার খোলা”,11 এবং সে খবর যখন পরের দিন ৩৫শে জুলাই সরকার–সমর্থক পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে “সমঝোতা চায় সরকার” শিরোনামে,12 এবং ছাত্রনেতারা রীতিমতো “ছাত্র–নাগরিক অভ্যুত্থানে”13 অংশগ্রহণের আহবান জানাচ্ছেন “বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের” কাছে,14 তখনও এই সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী একনায়কের মনে বিন্দুমাত্র সংশয় আসে না যে, এর পরের দিনই তাকে তার গণভবন ফেলে রেখে জান হাতে নিয়ে পালাতে হবে প্রতিবেশী প্রভু–পরাশক্তির কোলে। আর পলায়নপর হেলিকপ্টার উড্ডয়নের দুই ঘণ্টা আগেও তার ভারতমাতার ‘র’ ইন্টেলিজেন্স বাহিনী টেরটাও পাবে না, এতকাল তাদেরই মদদে টিকে থাকা “ঠাকুরমা ঝুলি”র রাক্ষসী রাণীর মতো15 মানুষখেকো এই মহিলার দৈনিক ব্যক্তিগত ভরণপোষণের দায়দায়িত্বও এবার তাদেরকেই নিতে হবে। ভবিষ্যতে শুধু এই সান্ত্বনাটুকু তারা পেতে পারবে যে, তাদের চীন–মার্কিন গোয়েন্দা–প্রতিদ্বন্দ্বীরাও একই রকম অন্ধকারে ছিল।

    ॥ দুই ॥

    এই হলো বিপ্লব। অথরিটারিয়ান ইন্টেলিজেন্স কখনোই আন্দাজ পায় না গণবিদ্রোহের, গণবিপ্লবের। কেননা স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লব গলায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে হাঁটে না। বিপ্লবের প্রধান একটা শনাক্তকরণ চিহ্নই হচ্ছে, ঘটমান বর্তমানে চেনা যায় না তাকে। বৈপ্লবিক প্রশ্ন ওঠে: ইহা কি বিপ্লব বটে? পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তর আসে: “আমি বলছি না, এটা একটা বিপ্লবী আন্দোলন”।16 বিপ্লবের সংজ্ঞায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বইতে, এরকম তো লেখা নাই, বাছা! মার্কস–লেনিন–খোমেনী তো এরকম বলে নি কখনো! বামবিপ্লবী হুজুরেরা বরং বারবার বলেছেন, বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী পার্টি হয় না; বিপ্লবী পার্টি ছাড়া বিপ্লব হয় না। এটা যদি বিপ্লবই হয় তবে বিপ্লবের লেনিনটা কে, শুনি? কেইবা এই বিপ্লবের খোমেনি?

    চিরমুখস্থ মার্কসবাদী–লেনিনবাদী বিপ্লব এটা না। এটা কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রো, চে গুয়েভারার সামরিক বাহিনীগত বিপ্লব না। এটা ইরানের ‘ইসলামী’ বিপ্লবও না। এটা উনবিংশ শতাব্দীর অ্যানালগ–আমলাতান্ত্রিক বিপ্লব নয়। পরিণামে পুরাতনী ফেউ একে চিনতে পারছে না। উনিশ শতকের জ্ঞান–বুদ্ধি–তত্ত্ব দিয়ে আপনি এই চলমান গণবিপ্লব–প্রবাহের প্রকৃত পরিচয়ের কুল পাবেন না। চিরদিন চিন্তাপ্যারেড করা, বস্তাপচা ও বাতিল বুদ্ধি–সেপাইরা তাই আহাজারি করেই চলেছেন। চলছে অন্ধদের অন্তহীন হস্তিদর্শন।

    অথেনটিক বৈপ্লবিক বার্থ সার্টিফিকেট নাই বলে চোখের সামনে জলজ্যান্ত বিপ্লবকে শনাক্ত করতে পারছেন না আঁতেলেকচুয়াল। বড়োজোর ‘গণঅভু্যত্থান’! এই বলে বড়ো একটা দম ফেলে হাঁসফাঁস করতে থাকেন বুকিশের দল। ঘাড়ের উপর মাথার বদলে কিছু বই নিয়ে ঘোরেন এই পণ্ডিতের পাল। জলজ্যান্ত বিপ্লবের জন্মসনদ নিয়ে গোলমাল লাগে ইনাদের। বই ছাড়া, থিয়োরি ছাড়া, দার্শনিক–হুজুরের নাম ছাড়া, দর্শন ও সমাজতত্ত্বের পবিত্র গ্রন্থগত সংজ্ঞা ছাড়া নিছক নিজের চোখে, সাদা চোখে, দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে, জেনে–বুঝে–উপলব্ধি করে পাঁচটা কথা বলতে পারে না এই মুখস্থ মতাদর্শের সর্বদলীয় বিদ্বৎসমাজ। অথচ ঘটনা হলো, যাহা গণঅভ্যুত্থান তাহাই বিপ্লব।

    গণঅভ্যুত্থানের তুলনায় বিপ্লবের দুইখানা অতিরিক্ত শৃঙ্গ থাকে না। সরল শব্দার্থকোষের17 সরল বিবরণীও জানে, সমাজের “যে সুস্থিত সত্তা উপরিস্থ থাকিয়া অভিভাবকের ন্যায় সক্রিয় হয়”, তাকে বলে “অভি”। অভির উত্থানকেই “অভু্যত্থান” বলে। যখন খোদ জনগণ রাষ্ট্রীয় ময়মুরুব্বিদেরও উপরে স্থাপন করে বসেন নিজেদের সামাজিক সত্তাকে, যখন তাঁরা নিজেরাই নিজেদের অভিভাবক হিসেবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন, তাকে বলে “গণঅভু্যত্থান”। এই সেই সময় যখন মরা গাঙে বান ডাকে। ভেসে যায় পুরাতন। ভাঙনের জয়গান শুরু হয়ে যায়। প্লাবন আসে দেশজুড়ে, স্থানজুড়ে, রাষ্ট্রজুড়ে। মহাপ্লাবন। জনপ্লাবন। কারো পক্ষে নিজেকে আর ছোটো করে দেখার উপায় থাকে না। কারো পক্ষে নিজেকে আর বড়ো করে দেখার উপায় থাকে না। প্লাবন ছাড়া পলি পড়ে না। নতুন জমি জাগে না। নতুন নির্মাণ শুরু করা যায় না। নতুন সমাজের পত্তন ঘটানো যায় না। বান ডাকলে গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে যায়— গণেশ উল্টে গেছে, বিপ্লব ঘটেছে। বিপ্লবে ‘প্লব’ থাকে। প্লবই প্লাবন। প্লাবনে সকলে ভাসে। প্লাবনে সকলই ভাসে। ভেসে যায় মসনদ, পুরাতন যাবতীয় আইকন–চিহ্ন–প্রতিমা। বৈপ্লবিক বানে ভাসে এমনকি বিপ্লবের মুখস্থ, পুরাতন, বস্তাপচা লাল বই, নীল নকশা, সবুজ বিধান।

    বিপ্লব ছক কষে ঘটে না কখনো। স্বতঃস্ফুর্ত বিপ্লবের কেন্দ্রীয় সচিবালয় থাকে না। স্মলনি ইন্সটিটিউটের মতো বলশেভিক সদর দপ্তর থাকে না। বিপ্লব বুরোক্র্যাসি নয়। স্বতঃস্ফুর্ত গণঅভু্যত্থান তাই আমলাতান্ত্রিক কোনো কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং দিয়ে হয় না। মজলিশে শুরা কিম্বা পলিটবুরোর ঘোষণাপত্রে নির্ধারিত কর্মসূচি ফলো করে বিপ্লব হয় না। স্ট্র্যাটেজি ও পূর্বপরিকল্পনা থাকে গুটিকয়ের অভু্যত্থানে। রাজনৈতিক দলের বা সামরিক সংস্থার বন্দুকীয় অভু্যত্থানে। এরকম অভু্যত্থানে লাগে আগে থেকে নির্ধারিত সিলেবাসভিত্তিক ‘বিপ্লবী’ তত্ত্বের বই, সহি ও মুখস্থ মতাদর্শ, আর পঞ্চবাৎসরিক রণকৌশল। বিপ্লব বুরোক্র্যাটিক নয়। বুরোক্র্যাসি দিয়ে বিপ্লব হয় না। প্রতিবিপ্লব হয়, সামরিক অভ্যুত্থান হয়। রাষ্ট্রের, আদালতের, সেনাবাহিনীর, বিশ্ববিদ্যালয়ের, পরিবর্তনকামী পত্রিকার, এমনকি পেশাদার বিপ্লবীদের রাজনৈতিক পার্টিগুলোরও আনুষ্ঠানিক আমলাতান্ত্রিক হায়ারার্কি থাকে। স্বতঃস্ফুর্ত গণবিপ্লবে বৈচিত্র্য থাকে, হায়ারার্কির উচ্চনিচ–কাঠামো থাকে না। রাজনৈতিকতাময় সামাজিক বন্ধুত্বের অর্গানিক নেটওয়ার্ক থাকে। এ জিনিস গড়ে ওঠে ব্যথিতদের বেদনার আনুভূমিক গঠনকাঠামো দিয়ে। বিপ্লব চিরকালই স্বতঃস্ফূর্ত আর গণ। বিপ্লব মানেই স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব। বিপ্লব মানেই গণবিপ্লব। আকাশ থেকে বিনামেঘে বাজ পড়ার মতো নেমে আসে বিপ্লব18। আড়ালে তিলে তিলে সিঞ্চিত শ্রাবণের মেঘে জমা বৈদ্যুতিক শর্তাবলী চট করে গোচরে আসে না। সব তত্ত্ব চমকে যায় বৈদ্যুতিক বজ্রপাতে। শেখানো বিপ্লববুদ্ধি রাতারাতি লোপ পায়। থ মারে থতমত বিদ্বৎসমাজ।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    রাজতন্ত্র এবং জমিদারির হাজার হাজার বছরে আমাদের কোষে কোষে জমে আছে কর্তার ইচ্ছায় কর্মের চিন্তাদাসত্ব। কর্তাপ্রথার বীজ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সাম্রাজ্যের, রাষ্ট্রের ও সমাজের কর্তৃত্বপরায়ণতা হয়তোবা সহজেই শনাক্ত করা যায় কিন্তু যেটা উনবিংশ শতকে বসবাসকারী িবপ্লবীরা সহজে দেখতে পান না তা হলো, “বিবাহে — পরিবারেও — মতাদর্শ রয়েছে দেদার”19। প্রচ্ছন্ন–আচ্ছন্ন যত মতাদর্শ— মাতব্বরির। বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাময় ব্যক্তিরও আত্মা আর ঘরের ভেতরে থাকে পিতৃত্বের–কর্তৃত্বের ভূত। চিন্তাদাসত্বের গড্ডলিকা–প্রণালীর ভেতরে লুকিয়ে থাকে কর্তাপ্রথার ক্রমিকতা। পিতৃতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ চিন্তাপ্রণালীর লোকেরা তাই বৈধ বৈবাহিক পিতা খোঁজেন বিপ্লবের, অথবা অনুমোদিত নেতা। পৈতা খোঁজেন তাঁরা বিশুদ্ধ বিপ্লবী ব্রাহ্মণের। আগে থেকে নির্ধারিত, বিশুদ্ধ, বৈপ্লবিক তত্ত্বাবলী খোঁজেন। মুখে তাঁরা বলেন ঠিকই “জনতার বিপ্লব, জনতার দ্বারা বিপ্লব, জনতার জন্য বিপ্লব” কিন্তু খোদ জনতার হাতে বিপ্লবকে ছেড়ে দেওয়ার কথা তাঁরা ভাবতেও পারেন না। জনতার পক্ষ থেকে জনতারই অভিভাবক হয়ে উঠতে চান তাঁরা। তাঁরা ভাবেন জনতার জ্ঞান নাই, বৈপ্লবিক বিজ্ঞান নাই। জনতার কাজ শুধু জিন্দাবাদ বলা। আর নেতার পেছনে হাঁটা। কামলা খাটা— গায়ে ও গতরে। বিপ্লব, তাঁরা ভাবেন, বিপ্লবী আমলাদের কাজ। অথচ চিরটা কাল ইতিহাস দেখিয়েছে, আড়ালে বন্দুক নিয়ে, পেছনে লোক জুটিয়ে, মহামতি ধুরন্ধর কৌশলী নেতা আর পলিটিক্যাল পার্টি মিলে ক্ষমতা দখলের ‘অভ্যুত্থান’ এক জিনিস, বিপ্লব অন্য জিনিস। এক কিম্বা একাধিক আমলাতান্ত্রিক পার্টির নেতৃত্বে, স্বঘোষিত বিপ্লবী নেতার নেতৃত্বে যত বিপ্লবের গল্প শোনা যায়, সেগুলো ‘অভু্যত্থান’ মাত্র। ছলে–বলে–কৌশলে সামরিক অভু্যত্থান। প্রায়শই প্রকৃত গণক্ষমতার বিপরীতে সামরিক প্রতিবিপ্লব মাত্র। কখনো কখনো লোকে তাতে খুশি হতে পারে বটে, আন্তরিক অংশগ্রহণ থাকে না তাদের। এরকম অভু্যত্থানে কয়েক শত কিম্বা কয়েক হাজার সমর্থকের সোচ্চার উল্লাসের আলোকচিত্রকে গণঅভু্যত্থান বলে চালানোটা ইতিহাস–গ্রন্থে চলে, বিপ্লবে চলে না। “ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপই হলো বিপ্লবের সবচাইতে সন্দেহাতীত বৈশিষ্ট্য। … বিপ্লবের ইতিহাসের প্রথম কথাটাই হলো … শাসকতার জগতে জনসাধারণের প্রবল প্রবেশ।”20

    তিন শ বছর ধরে রাশিয়া শাসন করা জারতন্ত্রের যেদিন পতন ঘটে, মুখস্থ মতাদর্শে প্রশিক্ষিত পেশাদার বিপ্লবীরা টাশকি খেয়ে যায়। সত্যিকারের স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবে সবচেয়ে সামনের সারিতে থাকেন তরুণ ছাত্র আর সাধারণ মেহনতি মানুষ। আগামাথা না বুঝে নেতারা দৌড়ান পিছে পিছে। তাঁদের পেছনে থাকে পুরাতনী রাজনৈতিক দল। আর সবার পেছনে থাকে কনফিউশনে ভুগতে থাকা বুদ্ধিজীবীর পাল। উদ্ভ্রান্তের মতো বিড়বিড়িয়ে তাঁরা বলতে থাকেন, “কাজটা কি ঠিক হচ্ছে”, “কাজটা কি ঠিক হচ্ছে”। তাঁদের কথায় কান না দিয়ে সমস্ত কিছুকে পর্যালোচনার অধীনে আনে বিপ্লব।

    ॥ তিন ॥

    রাজশক্তিকে ফেলে দিয়ে বিপ্লব মাথা তুলে দাঁড়াতেই না দাঁড়াতেই এসে পড়ে প্রতিবিপ্লবী, প্রতিক্রিয়াশীল, গুপ্ত, পঞ্চমবাহিনীর সোচ্চার ও সক্রিয় উপস্থিতির চিহ্ন। তাঁরা শুধু দোষ ধরেন— “ঐ যে মূর্তি ভাঙলো”! তাঁরা শুধু খুঁত বের করেন। ঐ দ্যাখো, বিপ্লবপ্রবাহে যাঁরা শত শত হত্যায় সায় দিয়েছিল উচ্চকণ্ঠ কথা দিয়ে, নিঃশব্দ নীরবতা দিয়ে, সেই চিরবেঈমান, চিরদুঃখিতরা আজ বাধা পাচ্ছে পুরাকালে ধ্বংসপ্রাপ্ত গোত্রপিতার তরে মায়াক্রন্দনে। ফেসবুকে তারা খুব হেঁয়ালি রচনা করে বলতে থাকে, “এ কেমন বিপ্লব! আমাদের অধিকার নাই! পিতৃশোক–প্রকাশের স্বাধীনতা নাই!” তারা বলে, “দুষ্কৃতিরা তলে তলে চেক করছে আমাদের টাইমলাইন! একনায়কের প্রতি আমাদের পক্ষপাত গোপন থাকছে নাকো, হায়! আমাদের প্রাইভেসি নাই হয়ে গেছে! এর নাম বিপ্লব! এই জন্যই কি আমরা বিপ্লব করেছিলাম? এরই জন্য কি এত এত শহীদের আত্মদান?” আহ! পঞ্চমবাহিনী দেখে মনে হয়, বিপ্লবকে আটকানো যায় নি যেহেতু, বিভ্রান্তি ছড়ানোর অধিকারই বিপ্লব।

    বিপ্লবে এই এক বড়ো চিহ্ন বটে— মানুষের মুখে মুখে, ফেসবুকে, বাক্যের অবাধ প্রকাশ। হাসিনাৎসির রাজত্বকালে এতকাল কথা বলতে হতো ভান–ভনিতায়, ঠারেঠুরে, অভিনয় করে, আর সাংকেতিক সান্ধ্যভাষায়। রাজনৈতিকভাবে মূক ও বধির হয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণ সমাজ। সর্বশেষ মেষ ছিল সর্বাত্মক সরকারি ইন্টারনেট শাটডাউন। বিপ্লব রাতারাতি জাদু দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে গোটা জরামরা সমাজের আপামর মানুষকে। কথা বলছেন তাঁরা ফ্যাসিবাদ বিলোপের পথ নিয়ে, অধিকার–স্বাধীনতা নিয়ে। এমনকি দু–দিন আগের শাসকের ছদ্মবেশী সমর্থক ছুপালীগও করে যাচ্ছে কত কত কলকল। তিনাদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আতঙ্ক অস্থিরতা পৌঁছাচ্ছে আকাশ অবধি। প্রশ্ন তুলছে তারা নিজেদের বাক– আর শোক–স্বাধীনতার। তাতেই প্রমাণ মিলছে, প্রকৃতই বিপ্লব ঘটেছে। সত্যি সত্যি শতফুল ফুটছে এবার। বিকশিত হচ্ছে শত মত। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, এই বিপ্লব পর্যাপ্ত গণতান্ত্রিক বটে। বহুস্বর, বহুমত, বহুকেন্দ্র এই গণবিপ্লবের গড়নেই আছে।

    ছিমছাম হয় না বিপ্লব। ক্যাওস, বিশৃঙ্খলা, হাজার রকমের কথা, আর অজস্র মতামত বিপ্লবের সাধারণ লক্ষণ। যে কখনো কথা বলে নি, সেও আজ কথা বলছে। যে কখনো রাষ্ট্রের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে কোনো মত দেয় নি, সেও বলছে কী করা উচিত, আর কী করা ঠিক না। এলোমেলো ঝোড়ো বাতাস, আর কুজ্ঝটিকা–কুহেলিকা বিপ্লবের চিরন্তন হাওয়া। পুরাতন সমস্ত শাসনচিহ্নের প্রতি আউলাঝাউলা গণক্রোধ বিপ্লবের প্রাথমিক ঝাপট। অরাজকতা— সে তো বিপ্লবের অংশ চিরকাল। ফরাসি বিপ্লবেও ছিল। রাজতন্ত্রের বিপরীতে গণবিপ্লবের অরাজতন্ত্র চির–অর্গানিক।

    এরই মধ্যেও থানা ফেলে, বন্দুক–ইউনিফর্ম ফেলে, প্রায় পুরো পুলিশবাহিনীর আত্মগোপন এবং তিন–তিনটা দিবস–রজনী জুড়ে পরিপূর্ণ সরকারহীনতা এই জায়মান বিপ্লবপ্রবাহের সামাজিক স্বরাজের অসামান্য উজ্জ্বল স্বাক্ষর। আত্মপরিচালনার সামাজিক সক্ষমতা জেগে উঠছে পূর্ণাঙ্গ উৎসাহে। নেটজুড়ে, পাড়ায় পাড়ায়, আর মোড়ে মোড়ে আপামর মানুষের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক সামাজিক মেলামেশার সংগঠন জেগে উঠছে প্রবল আগ্রহে। প্রত্যেকেই ভাবছে আজ এদেশ আমারও। দেশ নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে, আইন ও সংবিধান নিয়ে আমিও লিখতে পারি, বলতে পারি, পাঠচক্র করতে পারি। কর্তব্য আমারও। উপরন্তু প্রবল ফ্যাসিস্ট শত অত্যাচার সত্ত্বেও আগাগোড়া নারীদের প্রবল উপস্থিতি বিপ্লবের বিশেষ দৃশ্যরূপ। সবাই সবার সাথে মিলেমিশে ভিজতে থাকে বর্ষাবিপ্লবে। বৃষ্টির সাথে মেশে শহিদের উজ্জ্বল লাল রক্তধারা। শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে মেশে আশুরার মর্সিয়া, কারবালার কান্না–হাহাকার। এত যে বৃষ্টি তবু তৃষ্ণার্ত সন্তানের জন্য পানি নিয়ে পথে নামে মায়েরা–বাবারা। দিগন্ত–প্রসারিত আবু সাঈদের হাতে মিশে যায় লক্ষ লক্ষ হাত। ব্যক্তিতে–সমষ্টিতে জেগে ওঠে আন্দোলনের আধ্যাত্মিকতা21, সম্মিলিত রুহানিয়াত। আগুন, গুলি আর মৃত্যু–অধ্যুষিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নানাবিধ ফেতনা–ফ্যাসাদ আর বিভেদ–বিভক্তিগুলো পার হয়ে আসতে থাকে নানাবিধ দল–গোষ্ঠী–সম্প্রদায়। জুলাই–শ্রাবণময় ধারাপাতে ভিজতে থাকে মিছিলে মিছিলে যত হিজাব ও বোরখার পাশাপাশি টিশার্ট ও জিনস। স্কুল–কলেজের আর মাদ্রাসার–ভার্সিটির প্রোগ্রামে–কর্মসূচিতে, স্লোগানে–গ্রাফিতিতে, মুখস্থ মতাদর্শের এতকালের অনতিক্রম্য বিভাজনগুলো সব পড়ে থাকে নতুন বৃষ্টিতে ধোয়া জুলাইয়ে জেগে ওঠা এজমালি ভাষার22 পিছনে। সর্ববিধ ক্যাওস ও গণ্ডগোল পার হয়ে এগোয় বিপ্লব। পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে প্রতিদিন নিন্দুকের মনে দুঃখ দিয়ে।

    ॥ চার ॥

    মুক্তি সবাই চান কিন্তু মুক্তি এসে হাজির হলে ভয় পান অনেকে। কেননা মুক্তির সব দায়দায়িত্ব নিতে হয় মুক্ত মানুষকে নিজেকেই। বাকিরা দোষারোপ করেন। বোঝাতে চান তাঁরা, শৃঙ্খলেই মঙ্গল। যেন সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের শৃংখলই ভালো ছিল— আমরা মুক্তির উপযুক্ত নই। এইসব দোষারোপকারী দালালদের যুক্তির শেষ নাই, বিদ্যাবুদ্ধির অন্ত নাই।

    চলমান গণবিপ্লব–প্রবাহের সামনে সবার প্রথমে এলো মন্দিরে–বাড়িঘরে হামলা। পেছনের পেছনে এলো কত যে নালিশ। এলো গুজব। এলো উদ্বেগ। এলো আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা, হাহাকার, আহাজারি। যত দোষ বিপ্লব ঘোষ। গণঅভ্যুত্থান করাটাই অপরাধ হয়ে গেছে যেন। আরো এলো হাসিনার ঘাপটি মারা দালাল যত সব। হিন্দুদের জন্য তাদের মায়াকান্নার শেষ নাই। অথচ এই গত পূজার সময়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা রানা দাশ গুপ্ত আঙুল তুলেছিলেন হাসিনা সরকারের দিকেই।23 কে না জানে, গত ১৬ বছর হিন্দুদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলার রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগই। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়পর্বে “অর্পিত (শত্রু) সম্পত্তি আইন” প্রণয়ন করেছিল তারাই। সেই আইনের ছত্রছায়ায় কেড়ে নিয়েছিল হাজার হাজার হিন্দুর জমি। হাসিনা পালানোর পরে পাহারায় বসলো লোকে মন্দিরে–বাড়িঘরে হামলা ঠেকাতে। মাদ্রাসার ছাত্ররা যোগ দিল রাত–পাহারায়।

    তারপর এলো ডাকাতি। ডাকাতির অজস্র গুজব। ডাকাত–লীগে যেন ভরে গেল দেশ। আবারও পাহারা বসল গণমানুষের। ডাকাতির বিরুদ্ধে পাহারা। গুজবের বিরুদ্ধে, ভয়ের বিরুদ্ধে, আতঙ্কের বিরুদ্ধে পাহারা। রাত জাগল সারা বাংলাদেশ।

    এক মাস না যেতেই নেমে এলো বিকট বন্যা। সীমান্ত ডিঙিয়ে এলো। ত্রিপুরার ডম্বুরের রিজার্ভয়ার উপচে পড়া ঢল এলো। ভেসে গেলো কুমিল্লা। ভেসে গেলো ফেনী। ছাত্রদের আহবানে জুলাইয়ে জেগে ওঠা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের তরফে রাতারাতি গড়ে উঠলো কোটি কোটি টাকার গণতহবিল। খাদ্য–ওষুধ গেল, অন্য ত্রাণসামগ্রী গেল, ট্রাকে চেপে নৌকা গেল, মানুষের পাশে গিয়ে মানুষ দাঁড়াল, শিল্পীর পোস্টারে এলো নতুন স্লোগান “যত বিপদ তত ঐক্য”।24 বিপদ আসছে, ভয় আসছে, কোটি টাকা প্রজেক্টের প্রোপাগান্ডা আসছে। উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো। কিন্তু মানুষ ভয় পাচ্ছে না। মানুষ সংগঠিত হচ্ছে। বিপ্লব তৈরি করে নিচ্ছে সবাইকে।

    ॥ পাঁচ ॥

    ছাত্রতরুণেরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বিপ্লবের। এই বিপ্লব বাংলাদেশের ছাত্র–নাগরিক অভ্যুত্থান। এই বিপ্লব বাংলাদেশের ছাত্র–জনতার বিপ্লব। গঠনবিন্যাস এর ইন্টারনেটের মতো। নেটওয়ার্কগুলো এর স্বাধীন, উন্মুক্ত, বিকেন্দ্রীভূত, গণতান্ত্রিক, বহু কণ্ঠের এবং সহযোগিতামূলক। আবার, ইন্টারনেটই কিন্তু এই গণবিপ্লবের অন্যতম হৃৎপিণ্ড, রক্তচলাচলতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র। এই বিপ্লব একক কেন্দ্রহীন। পুরোপুরি কেন্দ্রহীন নয়। পূর্বনির্ধারিত অনড় আকারের বাইরে এর আছে শিথিল, অ্যামোর্ফাস, স্বাভাবিক–প্রাকৃতিক–সামাজিক নিউক্লিয়াস। সমাজ নিজেই যেহেতু প্রাকৃত সত্তা, ‘সামাজিক’ অর্থ তাই প্রাকৃতিক, ন্যাচারাল, স্বাভাবিক। একক কেন্দ্রহীন, একক ও আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বহীন হলেও এই বিপ্লব পরিচালিত হয়েছে, ক্রমশ বেড়ে উঠেছে, আনুভূমিক একটা নেটওয়ার্ক–নিউক্লিয়াসের নেতৃত্বে।

    আনুভূমিক নেটওয়ার্কেরও কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস থাকে বৈকি। নিউক্লিয়াস মানেই তো কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস। আনুভূমিক নেটওয়ার্কেরই বরং নিউক্লিয়াস জিনিসটা থাকে। টপ–ডাউন বুরোক্র্যাটিক নেটওয়ার্কের থাকে পিরামিডের চূড়াসম, উচ্চতম, কর্তৃত্ব–কমিটি। গণমানুষের রক্ত–মাংস–দেহ দিয়ে গড়া একটা পাদদেশের ঘাড়ে সেটা চেপে বসে থাকে। ‘কেন্দ্রীয়’ কমিটি বলা চলেই না তাকে। ‘কেন্দ্রীয়’ তো ‘কেন্দ্র’ থেকে। কেন্দ্র মানে বৃত্তের কেন্দ্র। আর সমাজের বৃত্ত মানে অনেক বৃত্ত। তার কেন্দ্রও অনেক। স্বতঃস্ফুর্ত সামাজিক মহা–গণআন্দোলনের স্বভাব মহাসাগরের মতো, বায়ুমণ্ডলের মতো, ঝড়ের চোখের মতো। তাতে করে অনেক স্রোতের, অনেক পরিধির, অনেক বৃত্তের এবং অনেক কেন্দ্রের পারস্পরিক, ওভারল্যাপিং, ক্রস–কানেকশনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আপাত–অদৃশ্য এক শিথিল নিউক্লিয়াস। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না তাকে, অথচ সে থাকে।

     

    শিল্পী: দেবাশীষ চক্রবর্তী
    উৎস: ফেসবুক

    নেটওয়ার্ক হচ্ছে ইন্টারনেটের সংগঠন। নেটওয়ার্ক হচ্ছে সমাজের আদিতম ইনবিল্ট প্রতিষ্ঠান। ডিফল্ট, প্রাকৃতিক সংগঠন। নেটওয়ার্ক হচ্ছে দেহ–কোষ–শরীরের সহজাত সংগঠনপ্রণালী। নেটওয়ার্ক মানে কানেকশন। মানবীয় যুক্ততা। প্রাণে প্রাণে বিদ্যুৎপ্রবাহ। নেটওয়ার্ক বলতে প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের মুক্ত–স্বাধীন যোগাযোগ–বিন্যাস। প্রতিটা নেটওয়ার্কের প্রতিটা নোড মুক্ত, স্বাধীন, স্বপরিচালিত। সমাজ বলতে পেশাকেন্দ্রিক, পাড়ামহল্লাকেন্দ্রিক, আগ্রহকেন্দ্রিক, কর্মকাণ্ডকেন্দ্রিক, বয়সকেন্দ্রিক, জেন্ডারকেন্দ্রিক, বিভিন্ন সৃজনশীল সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতাকেন্দ্রিক কোটি কোটি নেটওয়ার্কসমূহের নেটওয়ার্ক। ছাত্র–গণঅভ্যুত্থান–প্রবাহও তাই মুক্ত–যুক্ত অজস্র নেটওয়ার্ক দিয়ে গড়া একটা রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। এ হলো স্বতঃস্ফূর্ত, স্ব–পরিচালিত, বহু স্বরের, বহু রঙের, বিকেন্দ্রীভূত, আনুভূমিক, ছাত্র–গণআন্দোলনের ধারাবাহিক যোগাযোগ–প্রবাহ। গঠিতব্য নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর প্রাথমিক বিন্যাসও তাই রচিত হোক আন্দোলন–অভ্যুত্থান–ইন্টারনেটের নেটওয়ার্কসমূহের প্রাকৃত বিন্যাসে। মূলগতভাবে এর আমলাতান্ত্রিক হওয়া চলবে না। উঁচুনিচু কর্তৃত্বতন্ত্র মার্কা জিনিস হলে চলবে না। নতুন ধারার নতুন নতুন রাজনৈতিক দলও হোক জুলাইবিপ্লবের মতো নেটওয়ার্ক–সংগঠন।

    ॥ ছয় ॥

    এই বিপ্লব মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলা শত শত তাজা মানুষের জীবনের মূল্যে কেনা, হাজার হাজার মানুষের অন্ধ্বত্বের–পঙ্গুত্বের দামে কেনা সত্যিকারের স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লব। এ জিনিস সস্তা না। এ জিনিস প্রতিদিন আসে না। এ যখন আসে, সব কিছুকে ঠেলে নিয়ে যায়। সব কিছু দৌড়ায় সামনের দিকে। মুক্তির দিকে।

    অসম্ভব দ্রুতগামী এক ঝড়ের গতিতে পূর্ণতর বিপ্লবের পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আক্ষরিক অর্থেই অজস্র মানুষের বিপ্লব। প্রত্যক্ষভাবে যারা এই বিপ্লবের কাজে নেমে পড়েছেন তারা নিজেরাও কতটা খেয়াল করছেন তা আমি জানি না কিন্তু বাংলাদেশ একটা দীর্ঘস্থায়ী গণঅভ্যুত্থান–প্রবাহের ভেতর দিয়ে তুমুল বেগে অগ্রসর হচ্ছে মহাবিপ্লবের দিকে। এই বিপ্লব–প্রবাহ কোথায় গিয়ে থামবে কেউ বলতে পারে না। বলা যায় না, গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে বদলে দেবে বাংলাদেশের জুলাই–বিপ্লবপ্রবাহ।25 এর তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ইজ্জত, ইনসাফ, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আকুতি।26

    অকল্পনীয় দ্রুততর লয়ে সময়, সমাজ এবং মানুষকে তৈরি করে নিতে নিতে এগিয়ে চলেছে এই গণবিপ্লব। আপনা–আপনি তৈরি হচ্ছে সব। জেগে উঠছে গোটা সমাজ— একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দাপটে যেটা ডুবে যেতে বসেছিল দু–দিন আগেই। যে–দুই তরুণ রাগ করে কথা বলতেন না অনেক দিন, তাঁরা এখন হাতে হাত রেখে রাস্তা সামলাচ্ছেন সারাদিন। বিপ্লব মানে বন্ধুত্ব। ছোটো ছোটো বিভেদ ও অভিমান ম্লান করে দিচ্ছে বিপ্লব। ব্যক্তিগত দুঃখ কিম্বা অপার হতাশা আর টিকতে পারছে না। সক্রিয় হয়ে উঠছেন প্রত্যেকেই। এসবের পাশাপাশি ভেঙে পড়ছে চিন্তা–বন্ধুত্ব–সংগঠনের পুর্বতন বিন্যাস। অথচ একা হয়ে যাচ্ছেন না কেউ। বিপ্লব সব কিছু নাড়িয়ে দিয়েছে। কাউকে নির্লিপ্ত আর থাকতে দিচ্ছে না বিপ্লব। নতুন করে তৈরি করে তুলছে প্রত্যেককে। চিন্তায়, কথায়, তৎপরতায়। কাউকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেবে না সে আরো বহু দিন। আপনি টেরও পাচ্ছেন না, অথচ আপনিও তৈরি হয়ে উঠছেন আরো বড়ো বড়ো ঢেউয়ের জন্য।27

    মনোযোগ দিন। প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নিজের নিজের মতো করে স্থানীয়ভাবে, পাড়ায়–মহল্লায়–কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করুন। গড়ে তুলুন নিজের নিজের এবং নিজেদের নেটওয়ার্ক সংগঠন— যত ছোটোই হোক তা। এই বিপ্লব আপনারও। এটা আসলে বহু বহু ছোটো ছোটো বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে, চলবে। ধাপে ধাপে সে নিজেকে মেলে ধরছে ক্রমশ। নিজেকে প্রকাশ করে চলেছে ক্রমাগত। আগের ধাপেও কেউ জানে না পরের ধাপে কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ। প্রতি মুহূর্তে চলমান, পরিবর্তমান পরিস্থিতিসমূহের পরবর্তী গতিপ্রবাহ সত্যি সত্যি কোন কোন বাঁক ঘুরে কোন দিকে অগ্রসর হবে সেটা ঠিকঠাক মতো অনুমান করতে পারাটা আজ মোটেই সহজ কাজ নয়। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান গণঅভ্যুত্থান–প্রবাহ সম্ভবত বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রের আমূল বৈপ্লবিক সংস্কার সম্পন্ন করতে চলেছে বড়োজোর দশক খানেকের মধ্যেই। এখনই প্রশ্ন তুলুন: স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন কোন পথে হবে। কোন পথে যাবেন আপনি।

    সমস্ত রাজনৈতিক দলকে চোখে চোখে রাখুন। একটা দলও তার নিজের গঠনতন্ত্র মোতাবেক গণতান্ত্রিক দল নয়। সব দলই দলের ভিতরে ভিতরে কাঠামোগতভাবে আমলাতান্ত্রিক এবং স্বৈরতান্ত্রিক। তাদের নেতা সব আজীবন নেতা। শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্র একদিনে তৈরি হয় নি। আকাশ থেকে পড়ে নি। ১৯৭২ সাল থেকে গত ৫০ বছর ধরে সবগুলো রাজনৈতিক দল দেশের রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজেদের হাতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে নেওয়ার ধান্দা করেছে। যে যেভাবে পারে। ছলে বলে কৌশলে। এটা একটা সর্বদলীয় শয়তানির টুর্নামেন্ট ছিল। শেখ হাসিনা তাতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্টের সব রাজনৈতিক দল মিলেই কিন্তু টুর্নামেন্টটা সম্পন্ন করেছিলেন।‌ অন্য কেউও চ্যাম্পিয়ন হতে পারতেন কিন্তু। ফলাফল একই হতো। এই প্রথমবারের মতো ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে ঘটেছে গণশক্তির উদ্বোধন। নতুন একটা ‘বাংলাদেশ–বন্দোবস্ত‘ তৈরি করার দিকেই তারা এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ৫০ বছরের শয়তানির টুর্নামেন্টের ইতি ঘটতে চলেছে এবার।28

    এনালাইটিক্যাল কম্পাস হিসেবে কাজ করতে পারাটা আমাদের জন্য জরুরি। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আন্দোলন–প্রবাহের গতিপ্রকৃতি মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করা, অনুমান করা, বিশ্লেষণ করা, প্রকাশ করা, লেখা, সবার সামনে বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরা, পরমতসহিষ্ণু এবং বহুমতনির্ভর সমাজের কথা তুলে ধরা— এগুলো এখনকার জরুরি কর্তব্য।

    শিল্পী: দেবাশীষ চক্রবর্তী
    উৎস: ফেসবুক

    বিপ্লব চলমান। জুলাই চলছে। তৈরি হোন দীর্ঘমেয়াদী এই বিপ্লব–প্রবাহের জন্য। দেশ যেমন কারুর বাপের না, স্বতঃস্ফূর্ত এই গণবিপ্লবও কারো বাপের না। এই বিপ্লব আপনার। আপনি এতে অংশগ্রহণ করুন। তাহলে পেছনে আর ফিরবে না বাংলাদেশ। এই বিপ্লব দূরগামী, দীর্ঘমেয়াদী। আমাদেরকে ভবিষ্যৎ দেখতে পারতে হবে এবং মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে আসন্ন ইতিহাসের নির্মীয়মান ছবি, কেননা বিপ্লব শুধু রক্ত দিয়ে হয় না। চিন্তা দিয়ে হয়। চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ চর্চার মধ্য দিয়ে হয়। জুলাইবিপ্লবের শহীদেরা, আহত যোদ্ধারা, আমাদের নয়নমণি। কিন্তু বিপ্লব নিছক কোনো শহিদি প্রকল্প নয়। বিপ্লব নিজেই এক মুক্তভাবে বাঁচার ইশতেহার।29

    * * *

    প্রাসঙ্গিক তথ্য: গত ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মিলে খুব তাড়াহুড়া করে এই “ইশতেহারের খসড়া”র প্রথম পাঠটা লিখেছিলাম। বন্ধু মনজুরুল আজিম পলাশের উদ্যোগে ১৭ই আগস্ট ২০২৪ সেটা পড়া হয়েছিল কুমিল্লায় তাঁদের “যৌথ খামার”–এর অনুষ্ঠানে। আমার যাওয়ার কথা ছিল, যেতে পারি নি। পলাশ নিজেই এটা পড়েছিলেন। সেটা তখন তাঁদের পক্ষ থেকে ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানেই বিতরণ করা হয়েছিল ও রচনার কাগজে মুদ্রিত কিছু কপি। অনুষ্ঠানটা হয়ে যাওয়ার পরে ঐ রাতেই ১০টার দিকে পোস্ট করা পলাশের আহবানে যারা সাড়া দিয়েছিলেন, তাদের কাছে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন এর পিডিএফ–কপি। বর্তমান রচনা ইন্টারনেট আর্কাইভে আপলোড করে রাখা সেই আদি পিডিএফ–কপিরই পরিমার্জিত ও ঈষৎ–বর্ধিত পাঠ। ডেডলাইনের বিড়ম্বনায় এবং আমার এলোমেলোমির পরিণামে আদি এবং বর্তমান খসড়ার মধ্যবর্তী কালপর্বে দুটো ‘আধামার্জিত’ পাঠ চলে গেছে ঢাকার বাংলা একাডেমির একটা বইয়ে এবং কলকাতার “জনসাহিত্য” পত্রিকায়। ফেরানোর উপায় ছিল না। আশা করি, “জুলাইবিপ্লব: ইশতেহার ও অনুষঙ্গ” নামে প্রকাশিতব্য আমার বইয়ে প্রকাশিত হবে এই “চলমান ইশতেহারের খসড়া”র চূড়ান্ত পাঠ, আরো কিছু সম্ভাব্য সংশোধন ও পরিমার্জনার পর। সরন, রাবি: ৩রা আগস্ট ২০২৫।

    1এ রচনা লিখিত ও উপস্থাপিত হচ্ছে ২০২৪ সালের বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই–বিপ্লবের পরিপ্রক্ষিতে। এ রচনায় ব্যবহৃত ‘বিপ্লব’ শব্দটি সাধারণভাবে জুলাই–বিপ্লবকে বোঝাবে, যেকোনো স্বতঃস্ফুর্ত গণবিপ্লবকে বোঝাবে, কেননা জুলাই–বিপ্লব একটি স্বতঃস্ফুর্ত গণবিপ্লব। প্রসঙ্গত, বিদ্রোহ এবং স্বতঃস্ফুর্ত গণবিদ্রোহের ধারণার জন্য দ্রষ্টব্য বর্তমান লেখকের “বিদ্রোহের সপ্তস্বর: বিডিআর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়” গ্রন্থটির তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য (ঢাকা: যেহেতু বর্ষা, ২০১০)।

    2বিএনপি–মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রেস ব্রিফিং। প্রথম আলো, ৯ই জুলাই ২০২৪, ৪র্থ পৃষ্ঠা, ১ম কলাম, উপরের ভাঁজে [উত্তরবঙ্গ সংস্করণ]। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/FQkni।

    3 ফরহাদ মজহার, “তরুণরা দুর্নীতিবাজ হতে চায়”। ফেসবুক–পোস্ট, ১৪ই জুলাই ২০২৪, সকাল ৯:৩৯। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/oArCN।

    4মাহফুজ আলম, ফেসবুক–পোস্ট, “প্রতিটি শ্বাস একটি অভ্যুত্থানের স্বাদ গ্রহণ করবে”, ১৫ই মার্চ ২০২৩। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/UW6Ge। কোরান শরিফের মূল আয়াত “কুল্লু নাফসিন দায়িকাতুল মাউত” (সূরা আল–ইমরান ৩:১৮৫ এবং সূরা আল–আনকাবুত ২৯:৫) অবলম্বনে “কুল্লু নাফসিন দায়িকাতুল ইনকিলাব”।

    5আসিফ মাহমুদ, ফেসবুক–পোস্ট, “Bella Ciao”, ১১ই জুলাই ২০২২। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/eXju8। এই গানটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটা ইতালীয় গান যা পরে বিশ্বজুড়ে বিদ্রোহ, প্রতিরোধ ও মুক্তির গান হয়ে উঠেছে।

    6নাহিদ ইসলাম, বাংলা ব্লকেড, ফেসবুক–পোস্ট, ৬ই জুলাই ২০২৪, রাত ১০টা। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/9qVPs।

    7“বাংলা ব্লকেড” ভাষাটা কি আপনার পরিচিত? … “বাংলা ব্লকেড” এই কথাটা একজন বাংলাদেশীর মাথা থিকা বাইর হবেনা। … আচ্ছা, এইটা আবার এইরকম না তো? হাসিনাকে চিন সফরের আগে চাপ দিয়ে দেখানো, লাইনে থাকো নাহলে কিন্তু খাইয়া দিবো। … আমার মাথায় আসলো, হুট করেই “বাংলা ব্লকেড” কথাটা দেখে। “ব্লকেড” শব্দটা ওভারহোয়েংম্লি ইউজ করা হয় কোলকাতায়।” (পিনাকী ভট্টাচার্য, “বাংলা ব্লকেড”। ফেসবুক–পোস্ট: ৭ই জুলাই ২০২৪, সন্ধ্যা ৭টা। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/kS99W।) সেখানে একজনের কমেন্টের উত্তরে তিনি লেখেন, ““বাংলা ব্লকেড” শব্দটা কি দাদারা খুঁজে দিছে? আমারে বলতে পারেন, আমি কাউরে বলবো না” (আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/TbgJj)। আরেকটা কমেন্টের উত্তরে তিনি আরো বলেন, “এই আন্দোলন … ছাত্রলীগের দ্বিতীয় সারির নেতার নেতৃত্বে হয়েছে। … এখনকার নেতারা সবাই ছাত্রলীগ” (আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/YN1bF)।

    এখানে ব্যাপারে সতর্ক থাকার দরকার আছে। এই যে মির্জা ফখরুল (বর্তমান রচনার ২ নম্বর পাদটীকা দ্রষ্টব্য), ফরহাদ মজহার (বর্তমান রচনার ৩ নম্বর পাদটীকা দ্রষ্টব্য), পিনাকী ভট্টাচার্য, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (বর্তমান রচনার ৮ নম্বর পাদটীকা দ্রষ্টব্য) প্রমুখ ব্যক্তি যে জুলাইবিপ্লবের প্রকৃত রূপ অনুধাবনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেন সেটা কি তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা, বা অজ্ঞতা, বা মেধাগত ঘাটতি? না। মোটেই নয়। একেবারেই নয়। এঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে মেধার সাক্ষর রাখা উজ্জ্বল ও সফল মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা কেউই সমালেচনার উর্ধ্বে নই কিন্তু চার জনই আমার বিশেষ পছন্দের মানুষ। জুলাইবিপ্লবে এঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং ধারাবাহিক। তা সত্ত্বেও জুলাইবিপ্লবকে এঁদের তরফে অন্তত আংশিকভাবে মিসরিড করার কারণ কী হতে পারে? প্রধানতম কারণ বিপ্লবকে “স্বতঃস্ফুর্ত গণবিপ্লব” হিসেবে না দেখার চোখ। জুলাইবিপ্লব নিয়ে প্রকাশিতব্য আমার বইতে আমি অন্যান্য কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব আশা রাখি। আপাতত একটা চাবিসূত্র হলো, জুলাই–গণঅভ্যুত্থানকে যথাযথভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বদরুদ্দীন উমরের কিন্তু এ জাতীয় মিসরিডিং নাই। দৈনিক বণিক বার্তার সাথে ৩০শে জুলাই ২০২৪ তারিখে একটা সাক্ষাৎকারে বলতে গেলে এক প্রকার দিব্যদৃষ্টিতে তিনি দেখতে পান: “১৯৫২ থেকে যত গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে এটিই সবচেয়ে ব্যাপক”।

    8সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, “উভয় পক্ষকে সাময়িক হলেও সমঝোতায় আসতেই হবে”, সমকাল, ৪ঠা আগস্ট ২০২৪, ২২:৪৫। আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/ksUKX।

    9“‘অসহযোগের ডাক, সমঝোতা চায় সরকার’”, বিবিসি নিউজ বাংলা, ৪ঠা অগাস্ট ২০২৪। আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/5C68Z।

    10“প্রধানমন্ত্রী বললেন: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই”, কালের কণ্ঠ, ৪ঠা আগস্ট ২০২৪। আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/oS33W।

    11“গণভবনের দুয়ার খোলা: আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান”, কালবেলা, আপডেট : ৪ঠা আগস্ট ২০২৪, ০৮:৫৭ এএম। আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/3ACX5।

    12“আন্দোলনে এক দফা ঘোষণা: অসহযোগের ডাক, সমঝোতা চায় সরকার”, কালের কণ্ঠ, ৪ঠা আগস্ট ২০২৪, ০৩:১৬।

    13“সরকারের আলোচনার প্রস্তাবে সমন্বয়ক আসিফের পোস্ট”, সময় নিউজ টিভি, মহানগর ডেস্ক, ১৬ টা ২৬ মিনিট, ৩রা আগস্ট ২০২৪, আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/lEJY0। এ ছাড়া, “‘ছাত্র–নাগরিক অভ্যুত্থান’ লিখে সমন্বয়কদের পোস্ট”, ঢাবি প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস, প্রকাশিত: ৩রা আগস্ট ২০২৪, ১১:৫৯; আপডেট: ৩রা আগস্ট ২০২৪, ১২:২২, আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/MWbxL।

    14“প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পর যা বললেন সমন্বয়ক আসিফ”, একাত্তর অনলাইন ডেস্ক, প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৪, ০৩:০৭ পিএম, আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৪, ০৪:৪৪ পিএম।

    15“রূপ দেখতে তরাস্‌ লাগে, বলতে করে ভয়, / কেমন ক’রে রাক্ষসীরা মানুষ হয়ে রয়!”, কবিতার নাম: ‘রূপ–তরাসী‘, গল্প: নীলকমল আর লাল কমল, ঠাকুরমার ঝুলি: বাঙ্গালার রূপকথা, সংগ্রাহক ও সম্পাদক: শ্রীদক্ষিণারঞ্জন মিত্র, মজুমদার,পৃষ্ঠা: ১১৮, দ্বপঞ্চাশত সংস্করণ, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ISBN-81-7293-045-3।

    16সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, “উভয় পক্ষকে সাময়িক হলেও সমঝোতায় আসতেই হবে”, সমকাল, ৪ঠা আগস্ট ২০২৪, ২২:৪৫।

    17কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী, সরল শব্দার্থকোষ: ক্রিয়াভিত্তিক–বর্ণভিত্তিক ষব্দার্থের অভিধান, প্রকাশক: একুশ শতক, কলকাতা, ২০১৩।

    18“মন খুলে, সানন্দে, কবুল করেছিলেন সোশ্যালিস্ট রেভলুশানারি পার্টির সভাপতি জেনজিনোভ যে, “আকাশ থেকে বাজ পড়ার মতো নেমে এসেছিল বিপ্লব। শোনেন, স্রেফ খোলামেলা কথা বলি চলেন, বিপ্লব এসেছিল আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে। আমরা যারা বিপ্লবীরা বছরের পর বছর ধরে এর জন্য কাজ করেছি আর সবসময়ই অপেক্ষা করেছি এরই জন্য, সেই আমাদেরও প্রত্যাশার বাইরে ছিল তা। (Trotsky, Leon. History of the Russian Revolution. Unabridged. Translated by Max Eastman. Chicago, Illinois: Haymarket Books. Trotsky, 2008, p. 105; উদ্ধৃত: নোম চমস্কি, ভবিষ্যতের সরকার, ভূমিকা, ভাষান্তর, সম্পাদনা: সেলিম রেজা নিউটন, পেণ্ডুলাম পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০২০, পৃষ্ঠা ২১।)

    19 বর্তমান লেখকের আশু–প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ “জেন–যৌনতার ফাঁকে ফাঁকে”র অন্তর্ভুক্ত “যুদ্ধ নয়— নৈরাজ্যই নিয়ম” (২০১১) কবিতার একটা চরণ। ছাপা হয়েছিল ১৩ বছর আগে সাহিত্য ক্যাফে’র ওয়েবসাইটে। সেটা এখন খুলছে না। সাহিত্য ক্যাফে’র অনলাইন ঠিকানা: https://www.sahityacafe.com/।

    20Trotsky, Leon. History of the Russian Revolution. Unabridged. Translated by Max Eastman. Chicago, Illinois: Haymarket Books. Trotsky, 2008, p. xv.

    21ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারে দেখুন জুলাইবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে রচিত আমার “মাজার, মব, মাফিয়া অথবা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার ইশতেহার”, বাংলা আউটলুক, ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২৪। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/md4Ce।

    22মোহাম্মদ আজম, “বাংলাদেশের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পটভূমিতে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪”, ২১শে আগস্ট ২০২৪ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “জুলাই গণপরিসর” –এর সেমিনারে ধারণাপত্র হিসাবে উপস্থাপিত। পরে “রাষ্ট্রচিন্তা”র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/AW30d।

    23“সরকার চাইলে ঘটবে না, সরকার না চাইলে ঘটবে: দুর্গাপূজায় হামলা প্রসঙ্গে রানা দাশগুপ্ত”, প্রথম আলো, ১লা অক্টোবর ২০২৩। আর্কাইভ করা অনলাইন–লিংক: https://archive.ph/Ktg4c।

    24শিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তী, ফেসবুক–পোস্ট, ২৩শে আগস্ট ২০২৪, আর্কাইভ করা অনলাইন লিংক: https://archive.ph/zMD1q।

    25এই অনুচ্ছেদ এবং নিচের আরো কিছু অংশ বর্তমান লেখকের ৪ঠা আগস্ট ২০২৪ তারিখের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া। আর্কাইভ–করা লিংক: https://archive.ph/5cMQx।

    26এই বাক্যটা বর্তমান লেখকের ৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া। আর্কাইভ–করা লিংক: https://archive.ph/sjeOF।

    27উপরে বর্তমার রচনার চতুর্থ অংশের শুরু থেকে এই অনুচ্ছেদ পর্যন্ত অংশ বর্তমান লেখকের ৮ই আগস্ট ২০২৪ তারিখের ফেসবুক পোস্টের পরিমার্জিত রূপ। পোস্টের আর্কাইভ–করা লিংক: https://archive.ph/DiOLG।

    28এই অনুচ্ছেদটা বর্তমান লেখকের ৪ঠা আগস্ট ২০২৪ তারিখের ফেসবুক পোস্টের সামান্য পরিমার্জিত রূপ। পোস্টের আর্কাইভ–করা লিংক: https://archive.ph/1fxI0।

    29দ্রষ্টব্য: বর্তমান লেখকের “অচেনা দাগ” গ্রন্থের ৩৩তম অধ্যায় “ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০১৫)।

  • এমএন রায়।। ফ্যাসিবাদ: অতিমানবের কৌলিকতা

    এমএন রায়।। ফ্যাসিবাদ: অতিমানবের কৌলিকতা

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ হেল বুবন

    ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি নির্দেশক সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘অতিমানবের কূলভক্তি’। এই কূলভক্তির জনক ছিল নিৎসে, যিনি ছিলেন আবার শোপেনহাওয়ারের শিষ্য; এবং শোপেনহাওয়ার  ‘উপনিষদের দর্শনে স্বান্তনা’ খুঁজে পেয়েছিলেন। একারণেই সম্ভবত স্থূল বস্তুবাদের এর নিরেট অভিব্যক্তি ও রক্ষণশীল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আধাত্মবাদী ভাবাদর্শের মাঝে ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতিত্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদ আসলে পুনরূজ্জীবনবাদী ধ্যানধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত জাতীয়তাবাদ। পুনরূজ্জীবন বাদের পরিণতি কী, তা দেখায় ফ্যাসিবাদের অনুশীলন। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক পটভূমি প্রকাশ করে যে, পুনর্জাগরণবাদ সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার আত্মাস্বরূপ; ফ্যাসিবাদ একটি ভাবাদর্শিক অস্ত্র যা প্রগতির (যে প্রগতির একটি পূর্বশর্ত বিপ্লব) বিরুদ্ধে লড়াই করে।

    ফ্যাসিবাদের পিতামহ শোপেনহাওয়ার ছিলেন নৈরাশ্যবাদের প্রচারক৷ উপনিষদের “ঐশ্বরিক দর্শন” এর একজন প্রশংসক হিসেবে তিনি সারাজীবন হেগেলীয় দর্শনের বিপ্লবী সত্তার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। তবে হেগেলীয় দর্শনকে দার্শনিকভাবে মোকাবেলা করা ছিল তার চিন্তাশক্তির বাইরে৷ একারণে প্রতিক্রিয়াশীলতার অক্ষম ক্রোধ অভিব্যক্ত হয় কুকথায়। প্রকৃতপক্ষে, শোপেনহাওয়ারের দর্শন ছিল ১৮৪৮ সালের বিপ্লবে পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার ভাবাদর্শ। পরাজয় থেকে তৈরি হতাশা প্রকাশিত হয়েছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে পালানোর আকুলতায়।

    শোপেনহাওয়ারের মতে, প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় ও নিত্য নীতির কারণেই মানুষ বাস করছে সবথেকে নিকৃষ্ট এক দুনিয়াতে। যেহেতু জীবনের এই অসহনীয় পরিস্থিতি গুলোকে পরিবর্তন করা যায় না, তাই এই ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতি দ্বারা পূর্ণ এই পৃথিবী থেকে পালানোর আকুলতা অপ্রতিরোধ্য। স্বাভাবিকভাবেই, শোপেনহাওয়ারের পীড়িত আত্মা—যা পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার হতাশাকেই প্রতীকায়িত করতো—উপনিষদের দর্শনে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। উপনিষদের দর্শন যুগের পর যুগ ধরে ভারতীয় জনগণকে জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সেগুলো পরিবর্তনের সাহসী প্রয়াস থেকে বিরত রেখেছে। শোপেনহাওয়ারের দর্শনের সারবত্তা হলো মানব ইচ্ছাশক্তিকে অবমূল্যায়ন—যে ইচ্ছাশক্তিকে তিনি বর্ণিত করেছেন “সম্পূর্ণরূপে অশুভ ও হীন” হিসেবে। এই দর্শনের তাৎপর্য হলো সকল ধরনের প্রগতির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব৷ কেননা, প্রগতির বস্তুগত উপাদান সমূহ তাদের বিষষী অভিব্যক্তি খুঁজে পায় ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিতে৷ এই মতবাদ ধারণ করার মাধ্যমে শোপেনহাওয়ার হিন্দু দর্শনের সাথে একই ভূমিতে দাঁড়ায়; হিন্দু দর্শনও আকাঙ্ক্ষাকে আত্ম-উপলব্ধির (যা প্রকৃত জ্ঞানের উৎস) পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করে। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই অন্তঃদ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ যে দর্শনের একজন ক্রিটিকাল দার্শনিক এই মন্তব্যটি করতে বাধ্য হন:

    যদি বিশ্ব এমন এক সত্তা হয়, যার অস্তিত্ব না থাকাই শ্রেয়, তবে দার্শনিকের চিন্তাও—যিনি নিজেও সেই বিশ্বের একটি অংশ—চিন্তা না হয়ে ওঠাই অধিকতর শ্রেয়। (ফ্রাঞ্জ মেহেরিং: অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি”)

    কিন্তু, একজন দার্শনিকের চিন্তা তার সময়ের প্রয়োজনীয়তা এবং যে সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবস্থায় সে জীবন যাপন করেছে, তা দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তিনি প্রতিক্রিয়াশীলতার দার্শনিক ছিলেন এবং অবস্থানগত কারণেই তিনি এর বাইরে যেতে পারেননি। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল ছিল যে, ফ্যাসিস্টদের ঘৃণাপূর্ণ ইহুদিবিদ্বেষ ও নারী প্রশ্নে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গির উৎস তার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।

    নিৎসে তার শিক্ষকের দর্শনকে আরো শাণিত করেন এবং ঘোষণা করেন যে, নিজেদের সহজাত “শয়তানি ও হীনতা” নিয়ে মানুষের লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই। যেহেতু, মানব ইচ্ছাশক্তি এরকমই, মানুষের উচিত তা অকপটে গ্রহণ করে নেয়া এবং তা নিয়ে গর্বিত হওয়া। শোপেনহাওয়ার জীবনকে দেখতো একটি অপরাধ হিসেবে। নিৎসে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন “ভোগপরায়ণতা, রূঢ়তা, নিষ্ঠুরতা এবং অপরিচিত ও দুর্বলকে পরাভূত করা, অত্যাচার ও শোষণ করার আকাঙ্ক্ষা”-র অভিব্যক্তি হিসেবে। এগুলোই ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নিজের শিক্ষকের নৈরাশ্যবাদ থেকে নিৎসে এরকম রণতান্ত্রিক মতবাদ তৈরী করতে পারলেন কিভাবে? প্রতিক্রিয়াশীলতার দর্শনের এরকম পুনঃসংগঠন সম্ভব হয়েছিল জার্মান সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে বুর্জোয়াদের অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে।

    শোপেনহাওয়ার নৈরাশ্যবাদ প্রচারের পরে জার্মানিতে বহুবিধ ঘটনা ঘটেছিল, যা সেখানকার বুর্জোয়াদের শক্তিশালী করে৷ তখন জার্মান বুর্জোয়ারা নিজেদের মনোভাবকে একটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করতে শেখে। নৈরাশ্যবাদ রূপান্তরিত হয় কৌপদর্শনে। জার্মান বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হয়, কারণ তারা বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কিন্তু, এই বিপ্লব ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা; এটা হওয়ার কথাই ছিল। বুর্জোয়ারা বিপ্লবকে সফল করতে ব্যর্থ হলেও এটা পরবর্তীতে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল—বিসমার্কের শ্রেষ্ঠ কৃতি হলো একটি দুর্বল ও হতোদ্যম বুর্জোয়া শ্রেণিকে প্রুশীয় ভূমি অভিজাতন্ত্রের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির অবস্থানে নিয়ে যাওয়া (যদিও এই সম্পর্কে জার্মান বুর্জোয়াদের অবস্থান ছিল অধীনস্ত)। সামাজিক অবস্থানে জার্মান বুর্জোয়াদের এই পরিবর্তন তাদের দর্শনকেও প্রভাবিত করেছিল।

    পুঁজিবাদী বিকাশের পথ এখন আর বন্ধ নয়। একই কারণে, নৈরাশ্যবাদের কারণও রইলো না। কিন্তু এই নৈরাশ্যবাদ কোন স্বাস্থ্যকর আশাবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি। কারণ, স্বাস্থ্যকর আশাবাদ বিজয় দ্বারা অর্জিত আত্মবিশ্বাসের ফসল। প্রকৃতপক্ষে, জার্মান বুর্জোয়াদের জীবন তখনও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সামরিক গোষ্ঠী ও ভূমি অভিজাতদের অধীনস্ত ছিল। জীবন তখনও ছিল “অশুভ ও হীন”। তাই, তারা ভাগ্যে যা আছে, সেটার সর্বোত্তম ব্যবহারে মনোনিবেশ করেন। এটার প্রতিফলন আমরা পাই নিৎশের কৌপকেন্দ্রিক দর্শনে।

    জীবন একটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনা; তাই, জীবন থেকে যতটা সম্ভব আদায় করে নেয়া উচিত। জীবনকে দেখার এই পুনপৌনিক আবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিকেও—যেখানে প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে, পাশেরজন গোল্লায় যাক— একটি আধাত্মিক বাঁক দেয়া সম্ভব। যদি আমরা হিন্দু দার্শনিক মানদণ্ড গ্রহণ করি: “জীবন আমাকে গ্রাস করছে না, বরং আমি এর অধিপতি”। আধুনিক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের আধ্যাত্মিক গুরু বিবেকানন্দ নিৎসেকেই প্রতিনিধিত্ব করেন, যখন তিনি সগৌরবে বলেন, “আমি মদ পান করি, কিন্তু আমি তা দ্বারা আচ্ছন্ন হই না।” তিনি সম্ভবত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনের সেই নৈরাশ্যবাদী দার্শনিকের (নিৎশে) কাছ থেকে শিক্ষা নেননি। কারণ, বিবেকানন্দ তা শিখেছেন তার পবিত্র, ভারতীয় গুরুর থেকে। নিজস্ব খেয়ালি ভাষায় রামকৃষ্ণ প্রচার করেছেন, “শুকর খাওয়া ব্যক্তি ঈশ্বরের প্রতি অনুগত হতে পারেন। আবার, হবিষ্যি গ্রহণ করা ব্যক্তি হতে পারেন কামিনী-কাঞ্চনের দাস।” এটার মানে হলো, যদি কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিকতার পোশাক পরিধান করতে সক্ষম হয়, তবে স্থুল বস্তুবাদী জীবন যাপনে তার আর কোন বাঁধা নেই৷ বিংশ শতকের এই অবতারের শিক্ষা নিৎশের নৈরাশ্যবাদ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। আসলে, রামকৃষ্ণের সমগ্র শিক্ষণী (যা বিবেকানন্দ যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেয়েছে) এই ধারারই অংশ, যা আবার হিন্দুধর্মের মর্মকে প্রতিফলিত করে। যেহেতু, কলিযুগে আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছানো সম্ভব নয়, তাই এ সময়ে মানুষের উচিত সংসারী হওয়া; সংসারী হওয়া কোন পাপ বা অন্যায় নয়, যদি তা ঈশ্বর আরাধনার উদ্দেশ্যে কোন মায়া ছাড়া করা হয়। বাস্তব জীবনে এই আধ্যাত্মিক আদর্শ ও মূল্যবোধ সাধারণত উপেক্ষিত হয়। এটা অবশ্য কখনোই বাস্তবতা ছিল না। সুদীর্ঘ কাল ধরে চলা এই বিভ্রমকে শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হয়েছে; তবে তা বিপ্লবী সাহসিকতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মধ্বজার মাধ্যমে। ইতিমধ্যে, পোশাকি আধ্যাত্মিকতাহীন স্থুল বস্তুবাদ ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে ফেলেছে। (কিন্তু বস্তুবাদী দর্শন এখনো ট্যাবু হিসেবে রয়ে গেছে।) অনেক পূর্বেই নিজস্ব সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় (জীবন সম্পর্কিত) ধর্মীয় দর্শন তার অসততা ও দ্বিভাব থেকে বের হতে পারে না।

    পূঁজিবাদ সম্পর্কে নিৎশের দর্শন ভাবনা এই ভারতীয় পন্থাকেই অনুসরণ করে। নিৎশের গুরু শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, মানবজীবন একটি অপরাধ ও (মানব) ইচ্ছাশক্তি “অশুভ ও হীন”। নিৎশে দ্বিমত না করে যুক্ত করলেন, যদি মানব জীবন অপরাধই হয়, তবে নিজের আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে দুষিত না করেই আপনি এই অপরাধে নিমজ্জিত হতে পারবেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজের ইচ্ছা শক্তির অধিপতি, ততোক্ষণ পর্যন্ত এই ইচ্ছাশক্তির হীনতা আপনার সত্ত্বার পবিত্রতাকে দূষিত করতে পারে না। সুতরাং, আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন—লাগামহীন ভোগ-লালসার পেছনে ছোটা, দুর্বলকে নিপীড়ন, পরাভূত ও আঘাত করা; বিবেকের কোন তাড়না ছাড়া নৈতিক বল নিয়েই আপনি তা করতে পারবেন; কেননা, এই দুনিয়াটাই সবথেকে নিকৃষ্ট দুনিয়া, আপনি যা-ই করেন না কেনো, তা এই দুনিয়াকে অধিক নিকৃষ্ট বানাবে না। নিৎশে শোপেনহাওয়ারের উপনিষদীয় দর্শন থেকে যৌক্তিকভাবে এই সিদ্ধান্ত গুলোতে পৌঁছেছেন। জীবনের সংকল্পের নেতিকরণ থেকে জন্ম নিয়েছে ক্ষমতার সংকল্প। জীবনের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে সহানুভূতি রূপান্তরিত হয়েছে তার প্রতি তীব্র ঘৃণায়। এভাবেই জন্ম গ্রহণ করেছে অতিমানবের কৌল। এবং এই অতিমান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছিল আধুনিক শিল্পের কাপ্তানরা।

    অতিমানবরা “মুক্ত আত্মা”, “ভালো ইউরোপীয়ান”—দুনিয়ার জার্মান রক্ষাকর্তা এবং ‘আর্য আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি’-র গর্বিত অভিভাবক। ব্রিটিশদের সাথে ‘সাদাদের দায়’ বহন করার সভ্যকরণের মিশন গ্রহণে তারা প্রস্তুত। আসলে নিৎশের দর্শনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল জার্মান সাম্রাজ্যবাদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরী—যার অর্থ ছিল উপনিবেশবাদী সম্প্রসারণ। ক্ষমতা ও লুণ্ঠন কেন্দ্রিক এই দর্শনের সবথেকে স্থুল অভিব্যক্তি হলো ফ্যাসিবাদ। (ফ্যাসিবাদের সবথেকে মৌলিক মতবাদ) অতিমানবের নিৎশীয় কৌলকে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে “এটা সেই দর্শন যা বৃহৎ পুঁজিকে মহিমান্বিত করে এবং এভাবেই জনতার মাঝে তার জন্য আবেদন সৃষ্টি করে।” (মেহেরিং, ‘অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি’)

    ছবি: নাৎসী ভোটিং ক্যাম্পেইনের পোস্টার

    উপনিষদের স্বর্গীয় দর্শন থেকে জার্মান সাম্রাজ্যবাদ এবং পরবর্তীতে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শ নির্মিত হয়। এই ভাবাদর্শ উপনিষদের অপব্যবহার কিংবা দূষিত রূপ ছিল না। দুনিয়াতে স্বীয়-ইচ্ছা অনুযায়ী অবাধ ক্ষমতা আরোপের বৈধতা সর্বদাই অধিবিদ্যক প্রাথমিক নীতি থেকে আসে, যে প্রাথমিক নীতি অন্য কোন নীতির অধীনস্ত নয়। এই অনুমিতির উপর নির্মিত ভারতীয় দর্শনও একসময় স্থুল বস্তুবাদের ভাবাদর্শে পরিণত হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে শ্রেণি সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, যা বুর্জোয়াদের বল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতায় সজ্জিত করতে হবে। ক্ষমতার ভাগ দিলেই দেখা যাবে যে, বুর্জোয়ারা আমাদের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সুপ্রাচীন রূপ ও পরিভাষা ঝেড়ে ফেলে নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের স্বর্গীয় আধ্যাত্মিক দর্শন উঁচু শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা ছাড়া কখনোই অন্য কিছু করেনি। তবে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের শাসক শ্রেণির সামাজিক গঠন অনুযায়ী এই দর্শনকে তার রূপ ও পরিভাষা পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এমনকি আজও ‘সত্য ও অহিংসা’-র স্বর্গীয় মতবাদ সামাজিক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের গতিকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ প্রদত্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতার স্বাদ এখনি আমাদের আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদীদের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে দেশের দর্শন (জার্মান) ফ্যাসিবাদের অগ্রদূতদের অনুপ্রাণিত করেছে, সে দেশে সম্ভবত এটা ঘটারই ছিল।

    নিৎসের নির্মিত “মুক্ত আত্মা”-দের মাঝে ঈশ্বরের ‘বিভূতি’ রয়েছে। একারণেই স্বভাবতই তারা ‘শাসক’ ও ‘অধিপতি’ হবে; তাদের জন্মগত ‘অধিকার রয়েছে মানব পালকে শাসন ও অধীনস্ত করার’; যে মানুষরা ‘সহজাতভাবেই ক্ষমতাহীন এবং যাদের ভাগ্যই অন্যায্য আচরণের শিকার হওয়া’। মানুষের স্বভাবগত শয়তানি ও হীনতা সম্পর্কে শোপেনহাওয়ারের মতবাদ থেকে যৌক্তিকভাবে উদ্ভুত হয়েছে মানব সম্পর্ক নিয়ে নৈরাশ্যবাদী এই নিৎশীয় দর্শন৷ এই দর্শনের কারণেই নিৎশে ছিল সমাজতন্ত্রের উগ্র বিরোধী। একারণেই মার্ক্সবাদ বিরোধী ফ্যাসিবাদী ক্রুসেডের প্রাথমিক ভাবাদর্শিক গুরু হিসেবে ইতিহাসে আমরা নিৎশেকে খুঁজে পাই।

    আর্য-ভারতীয় আধ্যাত্মিক জীবন-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হলো আনন্দের সহিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও দূর্দশাকে গ্রহণ করে নেয়া। নিৎশে এই নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি ধারণা করতেন, শ্রমিক শ্রেণির অবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন, কেবল তাদেরকে আনন্দের সহিত দুর্দশাকে মোকাবেলার শিক্ষাদানের মাধ্যমেই আনা সম্ভব। এটা খুব সহজেই বোঝা যায় যে, নিৎশের সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রোপাগান্ডা আসলে ছিল গান্ধীবাদের আগাম ছায়া। সুতরাং, যদি গান্ধীবাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ধর্মীয়-নৈতিক মতবাদের একটি সুসংগঠিত আকর হিসেবে—যা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সারমর্ম—তবে বলা চলে যে, এর আধুনিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। একটি দার্শনিক ঐতিহ্য হিসেবে গান্ধীবাদ আমাদেরকে চালিত করেছে হিটলারবাদের অভিমুখে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই সত্যটা মাথায় রাখা উচিত৷ কেননা, ইতিহাসের যুক্তি ভারতেও ততটাই প্রয়োগযোগ্য, যতটা ছিল জার্মানিতে।

    ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক গুরু (নিৎশে) বিশ্বাস করতেন যে, যা ধনীদের জন্য অসহনীয়, তা গরীবরা (শ্রমিক) বহন করতে সক্ষম; একারণে, তিনি মনে করতেন যে, শ্রমিকদের খুব সহজেই কষ্টভোগের (যা একটি পুণ্যকর্ম) শিক্ষা দেয়া যাবে। গান্ধীবাদও একই স্বরে বলছে, পুঁজিপতি ও শ্রমিক উভয়ই ঈশ্বরের সন্তান; এবং দরিদ্রদের উচিত না তাদের ধনী ভাইদের হিংসা করা। গান্ধীবাদ ত্যাগ ও দুর্দশাকে পূণ্য কর্ম হিসেবে মহামান্বিত করে। যদি এই গান্ধীবাদী মতবাদকে গ্রহণ করেই নেয়া হয়, তবে এই “পূণ্য” গুলোকে (ত্যাগ ও দুঃখ-দুর্দশা) বাস্তব করে তোলার জন্য গৃহীত সকল পদক্ষেপকে নীতি (নৈতিকতা) ও যুক্তি উভয় দিক থেকে বৈধতা দিতে হবে। একটি আদর্শ ধারণ করে লাভই বা কি, যদি না ব্যক্তি সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত না থাকে? সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনায় দায়িত্বরত গান্ধীবাদীরা প্রমাণ করছে যে, তারা এই পূণ্য কর্মগুলোর অনুশীলন নিশ্চিতকরণে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত। কেননা, তাদের বিকৃত দর্শন অনুযায়ী, এই পূণ্যগুলোর অনুশীলনই সক্ষম হবে ভারতীয়দের উন্নত করতে।

    শ্রেণি শোষণকে বৈধতা দানকারী নিৎসের দর্শনের সাথে হিন্দু দর্শনে বিদ্যমান ‘কর্ম’ ধারণার লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। প্রকৃতিপক্ষে, নিৎশের দর্শন যেন ভারতীয় ঈশ্বরেরই প্রতিধ্বনি: “গুন ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমি চারটি বর্ণ তৈরী করেছি” (গীতা)। এই বর্ণ প্রথা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থায় স্থাপন করেছে। এই প্রথা যদি ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তবে নিম্নকোটির চিরতরে এই অবস্থানে মানিয়ে নিতে হবে। স্বর্গীয় ইচ্ছা সামাজিক অসমতাকে চিরস্থায়ীত্ব প্রদান করেছে। দাসকে চিরদিনের জন্যই দাস হতে হবে! শাসক শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা ও ক্ষমতা থেকে লব্ধ সুযোগ-সুবিধাকে দেখে ঈশ্বরের উপহার হিসেবে, যা কেবল পাপীরাই তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইবে। গীতায় ঈশ্বর আরো ঘোষণা করেন যে, সকল পার্থিব ক্ষমতা তার নিজস্ব ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। ব্রাহ্মণদের যাজকীয় কর্তৃত্বকে ঈশ্বরের ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখানো হতো; অতীতের রাজা-বাদশাহরাও ঈশ্বরের অবতার হিসেবে শাসন করতেন; এমনকি আজকের দিনের পরজীবী ভূস্বামীরা নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন কৃষক জনতার “সহজাত নেতা” বলে (যদিও তারা নিজেরাই এই কৃষক জনতার শোষক)। আবার, দেশীয় রাজারা ঐ সব সনাতনী জাতীয়তাবাদীদের সহায়তায় (নিজ রাজত্বে) স্বৈরতান্ত্রিক বল প্রয়োগ করে, যারা নিজেরা আবার ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে প্রতিনিধিত্ব সূচক গণতন্ত্রের জন্য গোলমাল করছে।

    “মানব পাল”-এর ভাগ্যে কেবল ক্ষমতাহীনতা ও অধীনস্ততা আরোপ করে নিৎশে বলেন: “প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন দ্বারা পৃথিবীতে সুখ আসবে না। সুখ আসবে কেবল দুখি, বিষাদগ্রস্ত, করুণা প্রার্থী ও (সবসময় যারা অভিযোগ করায় ব্যস্ত) অভিযোগকারীদের অনুপস্থিতির মাধ্যমে।” এখানে আমরা আবারো খুঁজে পাই ভারতীয় দর্শনের প্রতিধ্বনি—যে ভারতীয় দর্শন আসলে ফ্যাসিবাদেরই দর্শন। পার্থিব বিষয়বস্তু মানুষকে সুখি করতে পারে না: সুখ একটি মানসিক অবস্থা, এবং তা বস্তুগত অবস্থার উপর নির্ভর করে না। সুখ মনন নির্ভর। অর্থ্যাৎ, কেবল নিজেকে সুখি ভেবেই আপনি সুখি হতে পারবেন।

    যখন ভারতীয় জনগণকে সামাজিক অসাম্যের কথা বলা হয়, তখন তারা একই হাতে থাকা পাঁচ আঙুলের ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের (অর্থ্যাৎ হাতের পাঁচ আঙুল তথা সবাই সমান হয় না) দিকে লক্ষ্য করতে বলেন। এটা তাদেরকে শিখিয়েছে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও দর্শন। আরো শেখানো হয়েছে—নিজেদের সামাজিক অবস্থানকে নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করে নিতে। অবশ্য কেবল নিজেদের নিষ্ঠুর ভাগ্যকে মেনে নেওয়ার শিক্ষাই তাদের দেওয়া হয়নি, একইসাথে তাদেরকে শেখানো হয়েছে — প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যাবস্থাকে স্বর্গীয় ইচ্ছার অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে। নিৎশে আরো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “এতো এতো কঠিন ও কষ্টকর কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তাই, কিছু কিছু মানুষকে এমন অবস্থায় রাখা উচিত, যা তাদেরকে এইসব কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে।” ভারতীয় প্রতিভার বিশেষ সৃষ্টি—বর্ণ প্রথা, পুরোপুরি এই নীতির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক (নিৎশে) বর্ণপ্রথা সম্পর্কিত আর্য চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই সম্ভবত লিখেছিলেন, “এশীয় ও আফ্রিকার বর্বরদের এখানে নিয়ে আসা যেতে পারে, যাতে করে অ-সভ্যরা সর্বদাই সভ্য পৃথিবীর সেবা ও কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে।” কেন নয়? আর্য ব্রাহ্মণরা কি তাদের ক্ষত্রীয় মিত্রদের সহায়তা নিয়ে ভারতীয় আদিবাসীদের শূদ্র হওয়ার চিরস্থায়ী দাসত্বে বন্দী করেননি? আপনি (অন্যের সাথে) যেমন আচরণ করেছেন, কেউ যদি আপনার সঙ্গে ঠিক তেমনটাই করে, তবে সেটা নিয়ে অভিযোগ করা ভণ্ডামি বা অন্যায়। কৌল সেবাধর্ম ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি অংশ। এটা গান্ধীবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, আর গান্ধীবাদ সনাতনী জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ। সেবাকে অধিবিদ্যক গুনের মোড়ক পড়ানো গেলে, দাসত্বকেও সম্মানের মর্যাদায় উন্নীত করা সম্ভব এবং এর পরিসরের উপর কোন যৌক্তিক সীমা আরোপ করা যায় না। তোমার উচিত সেবা করা, যখন কিনা তুমি ঈশ্বরের কৃপায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত, যা তাঁর অধিক সৌভাগ্যবান শ্বেতাঙ্গ সন্তানদের মাধ্যমে কার্যকর থাকে।

    নিৎশে মুক্ত-আত্মাদের ভালো ও মন্দ সম্পর্কিত নৈতিকতার উপরে স্থাপন করেন। কেননা, নিৎশের মতে, খ্রিস্টধর্মের জন্মলগ্ন থেকে ভালো-মন্দের এই নৈতিকতাকে দুর্বল মানব-পালরা ব্যবহার করেছে মুক্ত-আত্মাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার হিসেবে। অতিমানবের নৈতিকতা নিয়ে নিৎশের কাজ ফ্যাসিবাদের বাইবেলে রূপান্তরিত হয়েছে। নিৎশে থেকে উদ্ধৃত এই অনুচ্ছেদ তার পরিচয় বহন করে: “ধর্ম শক্তিশালী ও স্বাধীন সত্ত্বাদের জন্য সর্বদাই একটি অস্ত্র। যারা শাসন করতে প্রস্তুত এবং যাদের নিয়তিই শাসন করা; বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পের মিশ্রণ যাদেরকে গড়ে তোলে একটি শাসক জাতি হিসেবে, তারাই ধর্মকে ব্যবহার করতে পারবে। শাসন করার ক্ষেত্রে তারা যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তা দূর করার হাতিয়ার ধর্ম। ধর্ম অধীনস্তদের শাসকদের সাথে বেঁধে রাখে, তাদের ভিতরের সেই লুকায়িত ও সুপ্ত বিবেককে দমিয়ে দেয়—যা তাদের শাসকদের অমান্য করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারত।

    ধর্ম যখন সর্বময় ক্ষমতা অধিকার করতে চায়, নিজেকে একটি লক্ষ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে একটি উপায় হিসেবে না থেকে, তখন এর পরিণতি সর্বদা অকল্যাণকর হয়। ধর্ম যদি দার্শনিকদের হাতে গঠন ও লালনের একটি উপায় না হয়ে নিজেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তবে তা বিপর্যয় ডেকে আনে।

    একটি সত্যিকারের সুস্থ ও উৎকৃষ্ট অভিজাত শ্রেণির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা পরিস্কার বিবেক নিয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে যে, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থে নিপীড়িত হতে হবে, মানবিক মর্যাদার নিচে নামিয়ে আনতে হবে, দাসত্বে পরিণত করতে হবে—শুধুমাত্র শ্রমের যন্ত্ররূপে।

    অহমভাব হলো উচ্চ আত্মাদের স্বভাব। আমি ‘ঈগোবাদ’ বলতে বুঝি সেই দৃঢ় বিশ্বাস, যেখানে স্বভাবতই ধরে নেওয়া হয় যে, অপরেরা আমাদের মতো সত্তাদের অধীন হবে, নিজেদের উৎসর্গ করবে। এই ধরণের অহমবোধ উচ্চ আত্মাদের অন্তর্গত; এর মধ্যে কঠোরতা, জোরজবরদস্তি কিংবা খামখেয়ালিপনা নেই। বরং এটি হলো জগতের মৌলিক বিধান।

    এর জন্য যদি আমি একটি নাম খুঁজতে চাই, তবে একে আমি বলব—ধার্মিকতা। (নিৎশে “Beyond Good and Evil”)

    ফ্যাসিবাদের সকল মৌলিক নীতি নিৎশে দ্বারা নির্মিত হলেও, এই রক্তাক্ত আন্দোলনের ভাবাদর্শ উৎপাদনকারী হিসেবে আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এদের মধ্যে বার্গসন ও জর্জ সোরেলের অনুসারীরা উল্লেখযোগ্য। এই আধ্যাত্মিক সিলসিলার তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এটা মনে রাখা জরুরী যে, বার্গসন তার অধিবিদ্যাগত মতবাদের সাথে বস্তুর বিষয়গত বাস্তবতার সামঞ্জস্যবিধান করতে চেয়েছেন। বস্তুবাদী দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করলেও, আধ্যাত্মিকতার মোড়কে স্থুল বস্তুবাদের চর্চা করেছেন তিনি। আধ্যাত্মবাদ তথা ভাববাদের প্রাথমিকতা স্বীকার করে তিনি বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মিকতার একটি সংযুক্তি নির্মাণ করতে চেয়েছেন। এই প্রচেষ্টা দর্শনকে আবারো দ্বৈতবাদের দুষ্টচক্রে স্থাপন করেছে। অতীতে দ্বৈতবাদী দর্শনের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল সামন্তীয় রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার; আজকের দিনে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ও ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। দ্বৈতবাদী দর্শন ধর্মীয় মৌলবাদকে পুনরুত্থিত করে—যে ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষ স্বরূপ ঈশ্বর ও তার দ্বারা সৃষ্ট জগতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই আদিম ধর্মীয় ভাবনা নিজেই অবাধ (রাষ্ট্রীয়) ক্ষমতা প্রয়োগের একটি ভাবাদর্শিক প্রতিফলন—যা বর্তমান সময়ে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের (তথা বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্রের) রূপ গ্রহণ করেছে। একটি বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে অতীতে বুর্জোয়ারা রাজাদের ঐশি অধিকারকে অস্বীকার করেছে; বর্তমানে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি হিসেবে তারাই আবার ঐ কল্পিত-ঐশি অধিকারের দিকে ঝুঁকছে; নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অতীতে তারা যেসব সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে লড়েছেন, এখন তারা সেগুলোকেই সমর্থন করছে; রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র, জনগণের উপর বলপ্রয়োগ, অর্থনৈতিক তাণ্ডব ও সামাজিক বর্বরতা সহ যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণে তারা রাজি।

    অবাধ ক্ষমতার প্রয়োগ এবং সর্বশক্তিমান ইচ্ছার সমর্থনে দার্শনিক-নৈতিক সম্মতি অতিমানবের কৌলিকতার ভিত্তি—এই কৌল অনিবার্যরূপে নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বল প্রয়োগ ও নিপীড়নের জন্ম দেয় (সবগুলোই ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য)। একজন মুসোলিনি বা হিটলার, এই অতিমানব কৌলিলতারই মূর্তায়ন। অতিমানব হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিক ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পার্থিব বিষয়ে স্বাধীনতা, অধিকার, ন্যায্যতা অথবা নৈতিকতার মতো মানবীয় ধারণা দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। একারণে পৃথিবীর এই রক্ষাকর্তা ও পুনর্জীবনদানকারী, কোন রাখডাক না রেখেই ঘোষণা করেন যে— স্বাধীনতা নাগরিকত্বের কোন অপরিহার্য উপাদান নয়; ব্যক্তি নাগরিক কেবল রাষ্ট্রের অবাধ ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাঝেই প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে৷ একইভাবে, বুর্জোয়া স্বার্থ রক্ষাকারী আধুনিক একনায়ক অতীতের সামন্ত প্রভুর মতো ঘোষণা করেন “L’État c’est moi”—”আমি নিজেই রাষ্ট্র”। সামন্ত প্রভুর মতো তিনিও ঐশি অধিকারের দাবি করেন। প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণকালে গোয়েরিং নিজেকে ঐ সব প্রুশীয় রাজাদের “সরাসরি উত্তরাধিকারী” বলে ঘোষণা করেন, যারা একইসাথে ছিলেন সর্বশক্তিমান বিশপ। এই সর্বশক্তিমানরা “পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি” হিসেবে শাসন করতেন; তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে ফ্যাসিবাদী একনায়করাও এই ঐশি অধিকার লাভ করেছেন।

    হিটলারের মতে, রাষ্ট্রই সবকিছু এবং সার্বভৌম শক্তি রাষ্ট্রের গুটি হিসেবে বেঁচে থাকা ছাড়া ব্যক্তি নাগরিকের অন্য কোন অধিকার নেই। সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজ খেয়াল খুশি অনুযায়ী যেকোন মুহুর্তে তার জীবন নিয়ে বাজি ধরতে প্রস্তুত। সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যযুগীয়-আধ্যাত্মবাদী রাজনৈতিক দর্শন যৌক্তিকভাবেই ফ্যাসিবাদীদের দায়িত্ব-জ্ঞানশূন্য যুদ্ধ-প্রোপাগান্ডার দিকে বাঁক নেয়। সার্বভৌম-সর্বশক্তিমান শাসকের অহমিকা অথবা খাম-খেয়ালিতা যেকোন সময় জনগণকে আহবান কর‍তে পারে মলোখের (কাননবাসীদের ঈশ্বর, যার বেদীতে শিশুদের উৎসর্গ করা হতো) বেদীতে আত্মো-উৎসর্গ করতে। জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগুক বা না লাগুক, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য অথবা দেশপ্রেমের কর্তব্যের কারণে নিজেদেরকে উৎসর্গের জন্য জনগণকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে৷ জার্মান বুর্জোয়াদের মাঝে হিটলারের (ক্ষমতা গ্রহণের) পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করা ভ্যান পাপেন, ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের এই ব্যবহারিক তাৎপর্য অত্যন্ত অকপটে ঘোষণা করেছেন। তার মতে: “নারীদের কাজ হলো ভবিষ্যৎ যোদ্ধা তৈরির জন্য সন্তান জন্ম দেয়া৷ যুদ্ধ ময়দানে প্রাণদানের থেকে উত্তম কোন জীবন-আদর্শ পৃথিবীতে নেই।” রক্তদানের এই ফ্যাসিবাদী কৌলিকতা মাতৃত্বকে অবমূল্যায়িত করে এবং ঠিক এ কারণেই তারা বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীদের সমালোচনা ও বাধার শিকার হয়৷ তখন ফ্যাসিস্টরা ধর্মধ্বজধারী ভন্ডামির পথ গ্রহণ করে। তাদের অভিযোগ বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীরা পবিত্র পরিবারকে ভেঙে ফেলতে চায়। অবশ্য, সনাতনী ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের কানে আত্মউৎসর্গের এই ফ্যাসিবাদী আহবান পরিচিতই শোনাবে—তারা ক্ষত্রীয় গুণাবলির এক মনোরম প্রতিধ্বনিই শুনতে পাবে এই ফ্যাসিবাদী আহবানে।

    “জাতীয় সমাজতন্ত্র” বা “হিটলার” উভয়ই মধ্যযুগীয় প্রুশীয়বাদের বিভৎস ভূত। ভারতে এখনো যা ক্ষত্রীয় গুন বলে মহিমান্বিত হয়, তারই প্রতিনিধিত্ব করে প্রুশীয়বাদ। যখন জনগণ ভূমিদাসত্বে বন্দি ছিল, তখন তাদের কাছে এই ক্ষত্রীয় ‘গুন’ প্রচার করা হতো। সামন্ত প্রভুর ভূমিদাসদের (ভারতীয় ও প্রুশিয় উভয়ই) অনেক সময়ই চাষের ক্ষেত ছেড়ে তরবারি ধর‍তে হতো। এই পেশাগত পরিবর্তন যেহেতু তাদের নয়, বরং সামন্ত প্রভুদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল (ঐ সময়ে ক্ষেতে খাটার থেকে ডাকাতি বেশী লোভনীয় পেশা ছিল), সেহেতু, ক্ষত্রীয় গুনের ভাবাদর্শ তথা মহিমা তাদের মাঝে স্থাপন করা প্রয়োজনীয় ছিল। একারণেই, যুদ্ধ ক্ষেত্রে মৃত্যুর আদর্শ মহাকাব্যে মহামান্বিত হয়েছে এবং প্রচারিত হয়েছে বহুবিধ কিংবদন্তি আখ্যানে। প্রকৃতপক্ষে, জনগণের মাঝে বীরত্ব সম্পর্কে এক বিকৃত ধারণা নির্মাণের জন্য এই মহাকাব্য গুলো রচিত হয়েছে; প্রুশীয় জাতীয়তাবাদের মতোই ক্ষত্রীয় বীরত্ববাদের ব্যবহারিক মূল্য ছিল সামন্ত প্রভুর ক্ষমতার সম্প্রসারণ। যদিও কখনো কখনো প্রভুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে একে দেখতে হবে এই খেলার অংশ হিসেবে। ফটকাবাজি ও রোমাঞ্চের লাভ-ক্ষতি উভয়ই রয়েছে।

    “এটা আমাদের সমাধি ফলকে লেখা হোক: আমরা কঠোর ছিলাম, আমরা নিষ্ঠুর ছিলাম; কিন্তু আমরা ভালো জার্মান ছিলাম” (হিটলার)। অতিমানবের কৌলিকতা হিটলারবাদের আরেকজন নায়ককে সক্ষম করেছিল এটা ঘোষণা করতে: “নিজের তৈরী আইন ভাঙার সাহস রাষ্ট্রের থাকতে হবে”। দুনিয়াতে এই ধরনের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা চর্চার নৈতিক সম্মতি কেবল এমন একটি অতিপ্রাকৃতিক আধ্যাত্মবাদী শক্তি তথা সর্বশক্তিমান স্বর্গীয় ইচ্ছার ছদ্ম-দার্শনিক ধারণার মাঝেই পাওয়া সম্ভব, যা কোন ধরনের প্রাকৃতিক আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না, কিন্তু তার ভূমিকা হবে সকল মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণকারী এক সার্বভৌম শক্তির। এটাই ফ্যাসিবাদের দর্শন, যার সারবত্তা হলো অতিমানবের কৌলিকতা । এটা এমন একটি দর্শন, যার সাথে বেদান্ত দর্শনে বিদ্যমান ভারতীয় আধাত্মবাদের লক্ষণীয় মিল পাওয়া যায়। দুনিয়াকে ঈশ্বরের লীলা হিসেবে দেখা ভারতীয় দ্বৈতবাদী দর্শনের সাথেও এর সাদৃশ্য রয়েছে। ঠিক এই দার্শনিক জ্ঞাতিত্বের কারণেই স্পেঙ্গলার, স্প্যান, কেইজারলিং সহ জার্মান ফ্যাসিবাদের অনেক ভাবাদর্শিক নির্মাতা প্রাচ্যের আধ্যাত্মবাদী দর্শনকে প্রশংসা করে—তাদের মতে, প্রাচ্যের বার্তাই পারবে আধুনিক পাশ্চাত্যকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে।

    ফ্যাসিবাদের দর্শন ও ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ সারগত ভাবে অভিন্ন। যদি ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদী সভ্যতাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়, তখন ভারতের আধ্যাত্ম সম্ভবত একটি প্রতিরূপ গৌরবের দাবি করতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে বস্তুবাদের দুনিয়া মুক্ত হবে না। বরং, তা স্থুল বস্তুবাদের প্রভুত্বে মানবতাকে বন্দী রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে। এই ধরনের ‘গৌরব’ আনা দর্শন নিয়ে আমরা কি গর্বিত হতে পারি? যুগের পর যুগ ধরে একটি মিথ্যা আদর্শ লালন করার জন্য এই গৌরব কি আমাদের লজ্জিত করবে না? এই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এবং সেই সকল ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবা উচিত, যারা চিন্তা করতে জানেন, যারা পূর্ব সংস্কার দ্বারা চালিত নন অথবা যারা সচেতন প্রতিক্রিয়াশীল নন—অর্থাৎ, সম্ভাব্য ফ্যাসিস্ট নন।

  • এম এন রায়।। ফ্যাসিবাদের দর্শন

    এম এন রায়।। ফ্যাসিবাদের দর্শন

    • অনুবাদ: বাধন অধিকারী

    ছবি: মুসোলিনি ও হিটলার, ১৯৩৭

    ফ্যাসিবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা। এর আবির্ভাব ১৯১৯ সালে ইতালিতে। তারপর থেকে এটি ইউরোপের সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে ফ্যাসিবাদ পূর্ণ বিজয় অর্জন করেছে। আকস্মিক উপস্থিতি এবং দর্শনীয় অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই ফ্যাসিবাদকে হাল আমলের অসামান্য আলোচ্য বিষয় করে তুলেছে। এর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী বিশ্বকে হতবাক করেছিল। এর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। কৈফিয়তবাদী আর স্তাবকেরা না চাইলেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করার জন্য হিংসাত্মক প্রচেষ্টা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে একে। মহাযুদ্ধের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের) ধ্বংসাত্মক পরিণতি দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এর বাড়বাড়ন্ত শনাক্ত করা যায়। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের সাফল্যের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাদের সময়ের এই দানবীয়তা নিয়ে অনুসন্ধান এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে তীক্ষ্ণ নয়। ঐতিহাসিকভাবে, এটি যুদ্ধ-পরবর্তী বিকাশ নয়। এমন ব্যাপক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হঠাৎ করে ঘটতে পারে না। ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ সময়ব্যাপী দার্শনিক চিন্তাধারার বিকাশের যৌক্তিক পরিণতি এই ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে যা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।

    ফ্যাসিবাদের দর্শন হেগেল-পরবর্তী অতি-আধুনিক দৃষ্টবাদ, নয়া-বাস্তববাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক স্কুলগুলোর [চর্চিত] ভাববাদের যৌক্তিক পরিণতি। এই দর্শন ভাববাদকে প্রত্যাখ্যান করার ভান করলেও এক নতুন ধরনের অধিবিদ্যক রহস্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ছদ্ম অথবা অসৎ আদর্শবাদের ওই স্কুলগুলি প্রয়োগবাদ এবং নব্য-হেগেলবাদে এসে তাদের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। প্রথমটি (প্রয়োগবাদ) “অর্বাচীন বস্তুবাদের ইন্দ্রীয়সুখ নির্ভর উদরপূর্তির দর্শন” (অধ্যয়ন) কে “ধর্মীয় অভিজ্ঞতার” সাথে সমন্বয় করে; অন্যদিকে দ্বিতীয়টি (নব্য হেগেলবাদ) জঙ্গি প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্যে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার বিপ্লবী অস্ত্রকে বিকৃত করে। নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার সমস্ত পার্থিব মান লঙ্ঘন করে, ফ্যাসিবাদ দাবি করে, তারা ঈশ্বর-মনোনীত।

    ইতালীয় ফ্যাসিবাদের সরকারি দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিলে সর্বপ্রথম এই দাবি তোলেন। তিনি লিখেছেন: “মানুষ স্বভাবতই ধর্মীয়। চিন্তা করার মানে ঈশ্বরের আরাধনা করা। যত বেশি চিন্তা করা হয়, তত বেশি মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের উপস্থিতিতে অনুভব করে। মানুষের সাপেক্ষে ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়।” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক বর্বরতাকে ন্যায্যতা দিতে ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক আধুনিক ইউরোপীয় সংস্কৃতির অন্যতম মৌলিক নীতি মানবতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। মানুষকে তার ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পেতে হয়েছিল পার্থিব স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করার আগে। আর মানুষের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে হলে, তাকে রেনেসাঁ যুগ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আত্মিক মুক্তি থেকে বঞ্চিত করতে হয়।

    ফ্যাসিবাদী দর্শনের প্রচারিত মানুষের অতিধার্মিক আত্মবিলোপ অর্বাচীন বস্তুবাদেরই একটি প্রকাশ যা দার্শনিক বস্তুবাদের বিপ্লবী মতবাদগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আকারে জেগে ওঠে। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাসে বিশ্বাসী মরণশীল মানুষ নিজেকে প্রতীকীভাবে সর্বব্যাপী ঈশ্বরত্বে বিলীন করে, যেন সে সর্বশক্তিমানের একটি যন্ত্ররূপে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে—যার (সর্বশক্তিমানের) ইচ্ছা ও কার্যকলাপ পৃথিবীর সকল নীতিনিয়মের ঊর্ধ্বে। বর্বরতা ও হিংসার কার্যাবলীকে যেন একটি সর্বজনীন ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য পূরণে সংঘটিত বলে ন্যায়সঙ্গত প্রতিপন্ন করা যায়, সেজন্য যে চিন্তার প্রক্রিয়ায় এইসব কাজ সংঘটিত হয়, তাকে ভণ্ডামিপূর্ণভাবে ‘ঈশ্বরচিন্তা’ হিসেবে কল্পনা করা হয়।”

    “এই সকল কার্যকলাপ ঈশ্বরপ্রণোদিত। ঈশ্বর পচে যাওয়া ও বিপর্যস্ত পুঁজিবাদকে তাঁর আশ্রয়ে গ্রহণ করেন, এবং অশালীন বস্তুবাদের এই পরিত্যক্ত ব্যবস্থার প্রতিটি উগ্র রক্ষক হয়ে ওঠে এক এক জন ঈশ্বরপ্রণোদিত, অলৌকিক যন্ত্র। আত্মবিলোপের এই কূটকৌশলের মাধ্যমে সে নিজের জন্য সংরক্ষণ করে সীমাহীন ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা—যা অন্যদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী হলো অতিমানব। তবুও, আত্মবিসর্জনের অতির্ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের বহুরূপী দার্শনিককে “মানবের অনন্ত ও অমর সারবস্তু” আবিষ্কার করতে বাধা দেয় না।

    একটি জীর্ণ-শীর্ণ সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব কাজের জন্য, এই “পবিত্র মিশনে” নিয়োজিত মানুষের সম্ভাবনাকে “অসীম, শর্তহীন এবং স্বাধীন” হতে হবে। আত্মবিসর্জনের মতবাদ এবং ফ্যাসিবাদের সর্বশক্তিমানতাবাদের আরাধনার এই নির্লজ্জ বৈপরীত্যকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে জেনতিলের কোনো অসুবিধা হয় না। তিনি একজন নব্য-হেগেললীয় এবং জানেন কিভাবে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির অপব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করতে হয়। প্রয়োগবাদ, অর্থাৎ সুবিধাবাদী “আধ্যাত্মিক” দর্শনও তাকে সাহায্য করে। তিনি যেহেতু শেখান “ভাবনা মানেই ঈশ্বরের ধ্যান”, সেহেতু তিনি যা করেন, তা তিনি সম্ভবত এক অসাধারণ দ্বান্দ্বিক দক্ষতার কৃতিত্ব বলে মনে করেন।

    “ঈশ্বর এবং চিন্তা (যথাক্রমে) জীবনের দুটি বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে; উভয়ই প্রয়োজনীয় এবং উভয়ই অপরিহার্য, তবুও একে অপরের বিরোধী এবং বিরোধিতাকারী” (“ফ্যাসিবাদ এবং সংস্কৃতি”)। আবার ঈশ্বর ও মানুষকে বলা হয়েছে একটি “নমনীয় ঐক্য, যা আত্ম-উপলব্ধির চিরন্তন গতিতে চলে—একটি জীবন্ত এবং সে কারণেই অস্থির ঐক্য, যা সর্বদা নিজের প্রতি অসন্তুষ্ট” (ঊহ্য)। এই হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার তদ্ভবরূপে এই নব্য-স্কলাস্টিক দর্শন হিন্দু আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আধ্যাত্মবাদ তো শেষমেষ মানসিক বিভ্রান্তিই, যা পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শিত বৈজ্ঞানিক সত্য এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য অস্পষ্টতার আশ্রয় নেয়। “চিন্তা হলো ঈশ্বরের ধ্যান, অথচ চিন্তার সঙ্গে ধ্যানের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক বিরোধের ও বৈপরীত্যের!” ধ্যান যদি হয় নিষ্ক্রিয় অবস্থা, আর বিরোধিতা হয় সক্রিয় কার্যকলাপ—তবে একই বস্তুকে ঘিরে এই দুটি বিপরীত সম্পর্ক কিভাবে একসাথে যুক্ত হতে পারে, তা যুক্তিবোধসম্পন্ন মানসের বোধগম্য নয়।

    কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাগুলি যুক্তির পরিধির বাইরের বিষয়। সুতরাং, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা তা নিয়ে জ্ঞান অর্জন করি। ধ্যান আমাদের এমন কোনো ফলাফল দেয় না। ধ্যানের অর্থ হলো—যা ইতিমধ্যে জানা, তাতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। যদি কেউ ধর্মীয় পূর্বধারণা নিয়ে শুরু করে, তবে সে ঈশ্বরকে আরোপ করা গুণাবলী নিয়ে ধ্যান করতে পারে। কিন্তু তার নিজের পূর্বধারণাগুলিই ধ্যানের বিষয়কে এমন এক স্থানে স্থাপন করে, যা ‘চিন্তা’ নামে পরিচিত মানসিক কার্যকলাপের নাগালের বাইরে। অতএব, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে এক করে দেখা, হয় চিন্তার নিছক বিভ্রান্তি, নয় তো ইচ্ছাকৃতভাবে জ্ঞানতত্ত্বের মূল নীতিকে বিকৃত করা।

    দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আধ্যাত্মবাদ যতই বিভ্রান্তিকর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, তার বাস্তব পরিণতি অত্যন্ত স্পষ্ট। এগুলি সবচেয়ে নিম্নমানের অর্থে বিশুদ্ধ বস্তুবাদী। হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, জেনতিলে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের জন্য ধর্মতাত্ত্বিক অনুমোদন উদ্ভাবন করেন। “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ধর্মসহ সমস্ত আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত ও ধারণ করে… রাষ্ট্র যদি অন্য কোনো সার্বভৌম শক্তিকে সহ্য করে, তবে তা আত্মহত্যার সামিল। যা কিছু আধ্যাত্মিক/ধর্মীয় তা স্বাধীন—কিন্তু সেই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষমতার (যে রাষ্ট্র নিজেই আধ্যাত্মিক) পরিধির মধ্যে।” (ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি ) ফ্যাসিবাদের যে চর্চা, তা অন্য অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। সেখানে দেখা যাবে—এই আধ্যাত্মবাদী ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা কতটা নীচু স্তরের বস্তুগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

    “বুর্জোয়া শ্রেণি, তাদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাকে রক্ষা করতে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের রক্তাক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে। তারা রাজাদের ‘ঈশ্বর-প্রদত্ত অধিকার’ উত্তরাধিকারসূত্রে দাবি করে বসে। রাজারা ইতিহাসের অতীত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত এই ‘ঈশ্বরতাত্ত্বিক অনুমোদনের অধিকার’ রাষ্ট্রের জন্য সংরক্ষিত থাকে—একটি বিমূর্ত হেগেলীয় দর্শনে রাষ্ট্রকে কল্পনা করে—ততদিন তা দাবি করতে পারবে সেই শ্রেণি, যারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। মধ্যযুগের প্রবাদ—”রাজা কখনো ভুল করেন না”—কে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকরা বানিয়ে ফেলেছে আধুনিক প্রবাদ—“রাষ্ট্র কখনো ভুল করে না।”

    প্রসঙ্গত, এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের দর্শনের মূল গীতার ঐশ্বরিক দর্শনেও খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি (বিভূতি) ঈশ্বরের শক্তি। সুতরাং, দার্শনিকভাবে, ফ্যাসিবাদ কোনও নতুন ঘটনা নয়; এবং এটা বলাও সঠিক নয় যে ফ্যাসিবাদের কোনও দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদী দর্শন জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিক ফলাফল। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী নব্য-হেগেলীয় আধিবিদ্যামূলক ধারণার মধ্যে যৌক্তিক সংযোগ সহজেই অনুমেয়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের দর্শন সরাসরি আধুনিক রহস্যবাদ/অতিন্দ্রীয়বাদ এবং আধ্যাত্মিকতার স্কুল থেকে উদ্ভূত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ভারতীয় বংশপরিচয় শনাক্ত করা যায় শোপেনহাওয়ারের মাধ্যমে, যার শিষ্য নিৎশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। এর বংশপরিচয় অনুসন্ধানে এগোনোর আগে, চলুন এই আধ্যাত্মিক বিলাসিতার বিভীষিকাময় প্রকাশের সাথে একটু ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হই। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলন একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণায় চালিত। ফ্যাসিবাদের দর্শন হলো তার কার্যকলাপ। এটি কোনো অনড় মতাদর্শ নয়। এটি চিন্তার একটি নতুন রূপ, জীবনের একটি নতুন পদ্ধতি। ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো এর ধর্মীয় অনুভূতি।”— জিওভান্নি জেনতিলে, “ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”। ফ্যাসিবাদের প্রেরণা তার কার্যকলাপের মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা এর দার্শনিকের মতে, তার দর্শনেরই সংক্ষিপ্ত রূপ।

    “ফ্যাসিবাদী আন্দোলন হতাশ ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত জনগণকে এক উন্মত্ত বাহিনী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করে। তারা তাদের নিজস্ব দাসত্বের শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করার জন্য বিপরীতধর্মী ধর্মযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়। দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস কায়দায় দমন করার ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ হল পুঁজিবাদ, এবং সেই লজ্জাজনক ভূমিকা পালন করার জন্য; পুজিবাদকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় যাদের একনায়কতন্ত্র ক্ষমতা গ্রহণের প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদের “গভীরভাবে প্রোথিত” আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় অসংখ্য সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, যা বহু বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে পুঁজিবাদকে রক্ষা করার পবিত্র উদ্দেশ্যে। বাস্তবে এটি অশ্লীল বস্তুবাদ। “গভীরভাবে প্রোথিত আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য”-এর সাথে এই ধরনের কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যুক্তিসঙ্গত মতাদর্শের ব্যবস্থায় আবদ্ধ নয়। আধ্যাত্মিকতা কোন কারণ জানে না, এতে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক চরিত্র তার স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে প্রকাশ পায়।

    ফ্যাসিবাদের তথাকথিত “গভীর আত্মিক প্রেরণা” প্রকাশ পায় বহু বছর ধরে সংঘটিত নির্মম সহিংসতার মধ্য দিয়ে। এই সহিংসতার সবটাই পুঁজিবাদকে রক্ষা করার “পবিত্র উদ্দেশ্যে”, যার প্রকৃত রূপ (পুঁজিবাদের) কিন্তু আসলে নিতান্তই জড়বাদী ও লোভনীয়। তাহলে এই ধারার নিষ্ঠুরতা কীভাবে ফ্যাসিবাদের ‘গভীর আত্মিক প্রেরণার’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোনো নীতি নেই। এটি কোনো যুক্তিবদ্ধ মতাদর্শের ভারে ভারাক্রান্ত নয়। আধ্যাত্মিকতায় যুক্তির স্থান নেই—তাতে কোনো নিয়ম নেই, নেই কোনো কাঠামো । ফ্যাসিবাদের এই তথাকথিত আত্মিক প্রকৃতি প্রকাশ পায় এর স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে। এখানে একমাত্র নীতি হলো উপযোগিতা—পুঁজিবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার উপযোগিতা। ফ্যাসিবাদ আসলে কোনো সত্যিকারের দার্শনিক তত্ত্ব কিংবা যুক্তিনিষ্ঠ নীতিকে নিজের উপর আরোপ করতে চায় না—কারণ সে তার হাত মুক্ত রাখতে চায়, যেন যেকোনো অস্ত্র ব্যবহার করে সে তার রক্তাক্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এই যুদ্ধ সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে যারা সমাজকে পুঁজিবাদী সভ্যতার জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করতে চায়। ঈশ্বরের রহস্যময় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আত্মিক প্রেরণা, ধর্মীয় অনুভূতির মতো ধারণাগুলি এই সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য খুবই সুবিধাজনক—সবই যেন এক অলৌকিক উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন, যার জন্য মানুষের তৈরি আইন কোনো গুরুত্বই রাখে না।

    এমনকী, জিওভান্নি জেনতিলের মতে, ফ্যাসিবাদ হল এমন এক আদর্শ যা “প্রত্যেক ধরনের যুক্তিনিষ্ঠ, ধর্মহীন, বিমূর্ত চিন্তাধারার শত্রু—এমনকি ‘অস্বাভাবিক’ উদারতন্ত্র ও মৌলিকভাবে বস্তুবাদী গুপ্ত ভাতৃসংঘের।” এখানেই আমরা ফ্যাসিবাদের আসল রূপ দেখি। এখানে আধ্যাত্মিকতার উন্মোচন হয় তার প্রকৃত তাৎপর্যে। ফ্যাসিবাদ ধর্মীয়, তাই তা যুক্তিবাদকে বিপজ্জনক ঘোষণা করে এবং উদারতন্ত্রকে অস্বাভাবিক বলে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরোধিতা করে, কারণ সেটিই প্রকৃতপক্ষে সেই বস্তুবাদী পুঁজিবাদী বাস্তবতার বিপরীত ধারা। এটি ধর্মের পক্ষে অবস্থান নেয়, কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতাকে উৎসাহিত করে, যা সাধারণ মানুষকে শোষণের পথ সহজ করে তোলে।

  • এম এন রায়।। জাতীয় সমাজতন্ত্র

    এম এন রায়।। জাতীয় সমাজতন্ত্র

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ
    ছবি: নাজি পোস্টার

    জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ প্রতারণা ও জনমত্ততাকে ভিত্তি করে “জাতীয় সমাজতন্ত্র” নামটি গ্রহণ করেছে। বাস্তবে, এটি না সমাজতান্ত্রিক, না জাতীয়তাবাদী। রাজনৈতিকভাবে, এটি মূলত পুঁজিবাদী সমাজের অবক্ষয়কালীন শাসনব্যবস্থা। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র ইতালির তুলনায় আরও বেশি সহিংসতা ও বর্বরতা সংঘটিত করেছে, কারণ ফ্যাসিবাদের বিজয়ের পর পুঁজিবাদ আরও তীব্রভাবে অবনমিত হয়েছে এবং তার রক্ষকদের ঠেলে দিয়েছে নৈরাশ্যের উন্মাদনায়।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল এমন এক যন্ত্র যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ভান বর্জিত পুঁজিপতিশ্রেণির একনায়কতন্ত্রের হাতিয়ার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ও রাষ্ট্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, হিংস্র ও রক্তক্ষয়ী উপায়ে শ্রমজীবী শ্রেণি এবং সেইসব সমাজ-সচেতন শক্তিকে দমন করা, যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের উপর নতুনতর এক মানবিক সভ্যতা নির্মাণে নিযুক্ত।

    ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে করুণ দিক হলো, সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তা গঠিত হয়েছে সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে, যা পুঁজিবাদ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত। কী এক প্রহসনমূলক বাস্তবতা, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম শিকার, পুঁজিবাদের লালসার বলি মানুষরাই উন্মত্ত সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নিরর্থক প্রয়াসে আত্মনিয়োগ করছে, যা তাদের বিনাশের কারণ। এমন একটি আন্দোলনের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতার জন্য স্বাভাবিকভাবেই কোনো স্থান থাকে না। এমনকি ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধেরও না।

    ফ্যাসিবাদ অবশ্যম্ভাবীভাবে মিথ্যা, প্রতারণা ও ভণ্ডামির উপর প্রতিষ্ঠিত। হিটলারের আত্মজীবনীকে জার্মান লেখক লিওন ফয়েখটভাঙ্গার ব্যঙ্গ করে বর্ণনা করেছেন, একটি এক লক্ষ চল্লিশ হাজার শব্দের গ্রন্থ, যাতে এক লক্ষ ঊনচল্লিশ হাজার ভুল রয়েছে। এই মহান জার্মান সাহিত্যিককে হিটলারের জার্মানি ত্যাগ করতে হয়েছিল, “জার্মান-বিরোধী” মতাদর্শ বহনকারী বলে দাহ করা হয় তাঁর রচনাসমূহকে। বস্তুত, ফ্যাসিবাদের প্রধান অস্ত্রই হলো জনমত্ততা।

    পুঁজিবাদী লুন্ঠনের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এবং সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত নির্মম শিকার মানুষদের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয় এক প্রতারণাধর্মী পুঁজিবাদ-বিরোধী উন্মাদনার মাধ্যমে। ছদ্ম-সমাজতন্ত্রের পতাকার অধীনে, তাদের সংগঠিত করা হয় সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদকে রক্ষার্থে ঝটিকা-সেনারূপে। এই ‘অলৌকিকতা’ সাধিত হতে পারে কেবলই নিরঙ্কুশভাবে নির্লজ্জ মিথ্যাচার, নির্লজ্জ প্রতারণা এবং চরম মাত্রার জনমত্ততাপূর্ণ ধোঁকাবাজির মাধ্যমে।

    যে আন্দোলন আপাতভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে প্রতিভাত, প্রকৃতপক্ষে তা নিশানা করেছিল রাজনৈতিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে, ঐতিহাসিকভাবে যা সংশ্লিষ্ট পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সঙ্গে। অর্থাৎ সেই রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, যা পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল তার প্রগতিশীল পর্বে।

    সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুঁজিবাদেরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে ঘোষণা করা হয় যে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সমস্ত দুর্বিপাকের একমাত্র নিরাময় হলো এর বিলুপ্তি।

    ফ্যাসিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ বিদ্যমান থেকেছে, পূর্বের তুলনায় অধিকতর ক্ষমতা সহকারে, এবং শ্রমিক শ্রেণিকে আরও নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে চলেছে। বস্তুত, এই বৈপ্লবিক অস্থিরতার যুগে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি পুঁজিবাদী শাসন রক্ষায় বাড়তি নিশ্চয়তা প্রদান করে।

    সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দ্বারা প্রাপ্ত আপেক্ষিক স্বাধীনতা শ্রমজীবী শ্রেণিকে সংগঠিত হওয়ার এবং পুঁজিবাদ উৎখাত ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সুতরাং, নিজেদের গৃহীত অর্জনসমূহ বিলুপ্ত করাই পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষে তাদের ক্ষমতা ও উপরি সুবিধাসমূহ রক্ষার সংগ্রামে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই নিকৃষ্ট কর্মটি সম্পাদনের উদ্দেশ্যেই ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়, পুঁজিবাদকে রক্ষার জন্য।

    বুর্জোয়া দার্শনিকেরা এই আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি রচনা করে দেয়। যে টাকাওয়ালা ও শিল্পপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনালগ্নে প্রচণ্ড ভাষায় আক্রমণ চালানো হয়, তারাই এই আন্দোলনের জন্য উদারভাবে অর্থসাহায্য প্রদান করে। বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার ধ্বংস আহ্বান করে এই আন্দোলন, সেই রাষ্ট্রই একে সহ্য করে। বরং গোপনে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করে।

    বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গোপনে এই আন্দোলনের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে। চতুর জনমত্তকরণ, সস্তা আবেগ, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি (যার বাস্তবায়নের কোনো ইচ্ছা থাকে না), বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অপবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদের উসকানি, জাতিগত ঘৃণার উত্তেজনা—এই সব কৌশল এবং অনুরূপ আরও বহু উপায় ব্যবহৃত হয়, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণকে বশীকরণের জন্য।

    এভাবে জনগণকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাটকীয় এক রাষ্ট্রক্ষমতা-দখল (coup d’État)-এর মাধ্যমে, যেমন ইতালিতে হয়েছে; কিংবা “সংবিধানসম্মত” ও “রক্তপাতহীন” পন্থায়, ঘটেছে জার্মানিতে।

    যেসব ব্যাঙ্কার ও শিল্পপতি গোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততায় প্ররোচিত করার জন্য অর্থ সরবরাহ করেছিল, তারাই জার্মানির পরাজয় ও অপমান থেকে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছিল। প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে ১৯২৩-২৪ সালের নিরঙ্কুশ মুদ্রাস্ফীতিতে বাধ্য করেছিল তারা, যার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকালীন সময়ে সৃষ্ট বিপুল অভ্যন্তরীণ ঋণ অবলুপ্ত করা।

    “দেশবাদ” যাকে তারা ধারণ করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দেয়। যদি এই অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতারণামূলক উপায়ে লোপ না করা হতো, তাহলে তার সুদ ও পরিশোধ বাবদ সরকার বাধ্য হতো উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর উপর ব্যাপক কর আরোপ করতে। যুদ্ধকালীন কালাবাজারি ও মুনাফাখোরদের ন্যায্য করের বোঝা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সরকার একপ্রকারভাবে সেই বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় বাজেয়াপ্ত করে নেয়, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশবাদী দায়িত্ববোধ থেকে যুদ্ধ-ঋণে বিনিয়োগ করেছিল।

    এই বাজেয়াপ্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ধ্বংস করে এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করে দেয়। শেষপর্যন্ত, এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্তরসূরিরাই গায়ে চাপায় ব্রাউন শার্ট, ধারণ করে রহস্যময় স্বস্তিকা চিহ্ন এবং নিজেদের সঁপে দেয় সেইসব শক্তির হাতে, যারা তাদের লুণ্ঠন ও বঞ্চনার মাধ্যমে নিঃস্ব করে দিয়েছিল।

    মোটা পুঁজিপতিরা—যারা যুদ্ধকালীন কালোবাজারি ও মুনাফাবাণিজ্যের মাধ্যমে আরও স্ফীত ও বিত্তবান হয়ে উঠেছিল—প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সহযোগিতা ও নীরব মদতে কর প্রদান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর ফলে ভার্সাই চুক্তিজনিত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বোঝা গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীল জনসাধারণের উপর। এর প্রত্যক্ষ ফল ছিল, জনসংখ্যার বৃহৎ অংশের ক্রমাগত দারিদ্র্যকরণ। অপরদিকে, সমাজের একটি ক্ষুদ্র উচ্চবিত্ত গোষ্ঠী ক্রমাগত আরও ধনী হয়ে ওঠে।

    এই দারিদ্র্যকরণের ফলে সাধারণ জনগণের কর পরিশোধের সামর্থ্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা চরম ভারসাম্যহীনতায় পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে জার্মান সরকার কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় ছিল। দৈনন্দিন ব্যয় হ্রাস করার একটি উপায় ছিল, সমাজকল্যাণ খাতের বরাদ্দ এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ও আহত সৈনিকদের পেনশন কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিকে যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতেই হতো।

    যারা যুদ্ধ থেকে বিপুল সম্পদ উপার্জন করেছিল এবং পরাজয়ের দায় এড়াতে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিঃস্ব করেছিল, বিজয়ী শক্তিসমূহের দাবিগুলো পূরণ করা যেত কেবল তাদের কাছ থেকেই অর্থ আদায় করে। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের—যার অর্থায়ন করছিল সেই বিত্তশালী শ্রেণি—এমন প্রচার যে “ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে ধ্বংস করছে”, খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

    কারণ, প্রজাতান্ত্রিক সরকারই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং এর আওতায় উত্থাপিত দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করছিল। তাই এই সরকার জার্মান জনগণের শত্রু— একেঅবশ্যই উৎখাত করতে হবে। এইভাবেই তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” শুরু হয়, একটি প্রতিবিপ্লব হিসেবে।

    শ্রমিক শ্রেণি এবং নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক ধ্বংস জার্মানিতে এক চরম বৈপ্লবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। জনসাধারণ আরও কোনো অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে প্রস্তুত ছিল না। অপরদিকে, উচ্চবিত্ত শ্রেণিও তাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের সামান্য অংশ ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে জার্মানি পড়েছিল দ্বিমুখি সংকটে—অভ্যন্তরে বিপ্লবের ভূত এবং বাইরে থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা।

    এই দ্বৈত সংকটের মোকাবিলায় শাসক শ্রেণিই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের রচনা করে—যাকে তারা উভয় বিপদের বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে স্থাপন করতে চেয়েছিল। ছলনাপূর্ণ “সমাজতন্ত্র” কথনের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির পশ্চাৎপদ অংশকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব ছিল; অপরদিকে, ভার্সাই চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধান্মদনাl জাগিয়ে তুলে একটি কার্যকর প্রতিরোধও গড়ে তোলা যেত।

    গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পর, তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” পুঁজিবাদকে বিন্দুমাত্র আঘাত করেনি। যদিও ক্ষমতায় আসার পূর্বপর্যন্ত জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল পুঁজিবাদের বিনাশ। নাৎসি রাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপই ছিল শ্রমিক শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহের দমন, যা সাময়িকভাবে বিপ্লব বিরোধী বিপদ থেকে একপ্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই কাজটি সম্পন্ন করার পর, নাৎসি সরকার বেপরোয়া জাতীয়তাবাদী উন্মত্ত অভিযানে নেমে পড়ে। জার্মান জনগণের কল্যাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, বরং শিল্পপতি শ্রেণিকে ভার্সাই চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে।

    যদি বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চাইতো, তা আসতে পারত কেবল তাদের কাছ থেকেই, যাদের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব ছিল। জার্মান জনগণের ইতোমধ্যেই শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল । “ভার্সাইয়ের দাসত্ব” থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ছিল সামরিক প্রতিরোধ প্রদর্শন, যদি মিত্রশক্তিরা দাবির ব্যাপারে কঠোর হতো। এমন উদ্যোগ পাগলামির শামিল, কিন্তু তা কার্যত সফল হয়, কারণ মিত্রশক্তিগুলো তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিল যে, সামরিক হস্তক্ষেপ লাভজনক নয়।

    তদুপরি, তারাও জার্মানিতে বিপ্লবের ভূতের ভয়ে কাঁপছিল। ফলস্বরূপ, নাৎসি জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এগুতে থাকে। পুঁজিবাদীদের কোনো ক্ষতি তো করেইনি বরং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এই জাতীয়তাবাদই তাদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ করে দেয়। “জাতীয় সম্মান রক্ষার্থে পুনঃসামরিকায়নের” যে কর্মসূচি গৃহীত হয়, তা শিল্প খাতে এক নতুন বাড়বাড়ন্তর সূচনা করে; যার সমস্ত মুনাফা যায় পুঁজিপতিদের পকেটে।

    কিন্তু, একেবারে ফাঁকা কোষাগার নিয়ে সেই অলৌকিক-বাচনধর্মী “মসিহা”র পক্ষেও পুনঃসামরিকায়ন কর্মসূচির ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তখন শিল্পপতি ও অর্থলগ্নিকারকগণ নতুন সরকারের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিপুল অর্ডারের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে। এর ফলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কার্যত তাদের কাছে বন্ধক হয়ে পড়ে।

    এই পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের কোনো কথাই বলা সম্ভব ছিল না। হিটলারবাদের তাত্ত্বিক পরিণতি ছিল— প্রারম্ভিক পর্যায়ের ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক মুখোশ ত্যাগ এবং জাতীয়তাবাদকে নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের কার্যকর হাতিয়ারে রূপান্তর।

    জাতীয় সমাজতন্ত্র শব্দযুগল একধারে বিভ্রান্তিকর এবং পরস্পরবিরোধী। সমাজতন্ত্র কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা চেনে না; তা জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আর ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এর সংশ্লেষের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। “জাতীয় সমাজতন্ত্র” আসলে একটি প্রতারণাপূর্ণ শিরোনাম, যার আড়ালে আদতে গভীরভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী, শ্রমজীবী শ্রেণিবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন লুকায়িত।

    মার্কসবাদকে ধ্বংস করা হলো ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের প্রকাশ্য লক্ষ্য। আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন—অর্থাৎ পুঁজিবাদী শোষণ থেকে সমাজকে মুক্ত করার সংগ্রাম—কার্ল মার্কস প্রদত্ত দার্শনিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক নীতিমালার ভিত্তি ব্যতীত কল্পনাও করা যায় না। যেমনটি বলা হয়েছে:

    নিশ্চয়ই, মার্কসবাদ ব্যতীত সমাজতন্ত্র বলে কিছু নেই এবং বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রনায়কদের তা বিবেচনায় নিতেই হয়।

    এই মত শুধু উদারনৈতিক অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রক্ষণশীল পণ্ডিতদের পক্ষ থেকেও একে অকপটে স্বীকার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, খ্যাতনামা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুলার লায়ার লিখেছেন:

    “অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের মার্কসীয় তত্ত্ব আজ সামাজিক বিজ্ঞানের এক অক্ষয় সূত্রে পরিণত হয়েছে।”

    এই প্রসঙ্গ থেকে এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যে আন্দোলন নিজেকে সমাজ সংস্কারের ন্যূনতম রূপের সঙ্গেও সংযুক্ত রাখে না, এবং যা সমাজ অগ্রগতির যেকোনো ধারণার বিরুদ্ধাচরণ করে, সেই আন্দোলনের প্রকৃতি কী ভয়ানকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, যা কিনা আবার মার্কসবাদকে তার প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।

    মার্কসবাদের প্রতি উগ্র ঘৃণাই এই সত্য প্রমাণে যথেষ্ঠ যে, ফ্যাসিবাদের সমাজতান্ত্রিক পরিচয় কেবলই এক ছলনাপূর্ণ মুখোশ। ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের বহু পূর্ব থেকেই তার প্রধান কার্য ছিল শ্রমিক শ্রেণিকে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস ও হিংসার মাধ্যমে আতঙ্কিত করা। লক্ষণীয় যে, এই সমস্ত সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন করেছিল ঠিক তারাই, যাদের সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক মনে করার কথা।

    ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, ফ্যাসিবাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল রক্তক্ষয়ী নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে কেবল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকেই দমন করা নয়, বরং যারা বিপ্লববিরোধী, তেমন সমাজিক-গণতন্ত্রী দলগুলোকেও নির্মমভাবে দমন করা, এমনকি সর্বাধিক সংশোধনবাদী ধাঁচের ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই পায়নি।

    ফ্যাসিবাদ তার দমন-পীড়নের ভারী হাত তুলে দিয়েছিল সেই উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ওপরও, যারা শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতি সহানুভূতি পোষণ করত এবং তাদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানাতো।

    পুঁজিবাদকে আধ্যাত্মিকীকরণ করার প্রত্যয় ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির অন্যতম স্পষ্ট ভণ্ডামি। ধ্বংসপ্রাপ্ত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পশ্চাৎপদ শ্রমজীবী জনগণের কল্পনা জয় করার উদ্দেশ্যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন লিপ্ত হয় এক ধরনের ছলনাপূর্ণ পুঁজিবাদ-বিরোধী জনমত্ততায়।

    কিন্তু বাস্তবে, পুঁজিবাদের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈরী এমন সকল শক্তিকে দমন করার পর, নাৎসিরা ঘোষণা করে যে তাদের তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” সম্পন্ন হয়েছে।

    পুঁজিবাদের সুবিধাসমূহে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ না করেই, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নাৎসি একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে—এই ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি। প্রতারিত জনসাধারণের প্রতি এই নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতাকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে, ফ্যাসিবাদী তাত্ত্বিকরা পুঁজিবাদের দুটি শ্রেণিবিন্যাস আবিষ্কার করে: “শোষণকারী পুঁজিবাদ” এবং “গঠনমূলক পুঁজিবাদ”। প্রথমটিকে দমন করা হবে, আর পরেরটি রক্ষা ও উৎসাহিত করা হবে।

    এই শ্রেণিবিন্যাস অর্থনৈতিক তত্ত্বের এক নির্লজ্জ বিকৃতি। অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞানই দেখায় যে, শোষণ ব্যতীত পুঁজিবাদ কল্পনাতীত। পুঁজিবাদের যেকোনো “গঠনমূলক” সাফল্য শ্রমিকশ্রেণির শ্রমের মূল্য থেকে একটি অংশ ছিনিয়ে নিয়ে নির্মিত হয়। অর্থনৈতিক তত্ত্বকে বিকৃত করে ব্যবহার করা হয়, যাতে পুঁজিবাদ জাতীয় সমাজতন্ত্রের আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বিঘ্নে বিকাশ লাভ করতে পারে।

    পুঁজিবাদী শোষণের পুরোধা ব্যক্তি, যেমন: ক্রুপ ফন বোলেন (তার বৃহৎ অস্ত্রকারখানাসমূহসহ), থিসেন (তার বিশাল লোহা ও ইস্পাত শিল্পসমূহসহ), ফ্যোগলার (তার কয়লা-রাজ্যসহ) প্রমুখকে “গঠনমূলক পুঁজি”র প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাঁদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রের দৃঢ় স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়।

    বাস্তবত, বৃহৎ শিল্প ও আর্থিক স্বার্থসমূহকে সর্বাত্মক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়, যে রাষ্ট্র অন্যদিকে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার রক্তাক্ত শুঁড় প্রবিষ্ট করেছে, এক সর্বগ্রাসী অক্টোপাসের মতো। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, যার সভাপতি ক্রুপ ফন বোলেন এবং যার সদস্যরা সবাই প্রধান শিল্পপতি এমন এক “অতি-রাষ্ট্র” হিসেবে কাজ করে, যার উপরে এমনকি নাৎসি রাষ্ট্রেরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।

    এই নবরূপী সমাজতন্ত্রে, “ব্যক্তি নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা প্রয়োজনীয় নয়, এবং মুক্তিও অপরিহার্য নয়।” এই ভাবেই উচ্চারণ করেছিল আধুনিক জরথুস্ত্র—হিটলার। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি পরিণত হয় জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণির একমাত্র রাজনৈতিক শক্তিতে, এবং নাৎসি রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জার্মান পুঁজিবাদের বিশ্বস্ত রক্ষক।

    হিটলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই, জার্মান পিপলস পার্টি— যা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারী শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি প্রধান দল হিসেবে কাজ করেছিল—নিজেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং তাদের সদস্যদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে যোগ দিতে আহ্বান জানায়।

    এমনকি রাজতন্ত্রবাদীরাও জাতীয় সমাজতন্ত্রকে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে। তারাও তাদের প্রভাবশালী আধাসামরিক সংগঠন দ্য স্টিল হেলমেট কে নাৎসি স্টর্ম ট্রুপসে সঙ্গে একীভূত করে দেয়।

    জাতীয় সমাজতন্ত্রের সামাজিক চরিত্র ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তখনই ভণ্ডামি ও জনমত্ততার মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে, যখন ১৯৩৩ সালের মার্চে হিটলারের নিয়ন্ত্রিত সংসদ “ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট”-এর সমাধিস্থলে সমবেত হয় প্রজাতন্ত্রকে সমাহিত করতে এবং প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক সামরিকতন্ত্রের ভূতকে পুনরুজ্জীবিত করতে।

    পটসডামের রাজতন্ত্রীয় আবহে, যেখানে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতার সমস্ত আনুষ্ঠানিক উপকরণ উপস্থিত ছিল, সেখানে হিটলার বিস্মৃত হন তাঁর প্রতারিত অনুসারীদের—ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পশ্চাৎপদ শ্রমিকদের। নাৎসি সংসদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তৃতায়, যেখানে তিনি একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দাবি করেন, হিটলার আবেগঘনভাবে প্রশংসা করেন হোহেনৎসোলার্ন রাজবংশের “গুণাবলীর”, যার অবক্ষয়িত বংশধরগণ ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এই উপলব্ধি করেন যে, তারা স্বস্তিকা চিহ্ন ধারণ করে বৃথা যাননি।

    হিটলার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা লাভ করেন জার্মান জনগণের ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে নয়, বরং সেই সমস্ত ঐতিহাসিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনগণকে শোষণ ও নিপীড়নের মাধ্যমে অবদমিত করেছে।

    অন্যদিকে, কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মমভাবে দমন করে এবং নিরীহ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রী দলকেও বিলুপ্ত করে, নাৎসিরা এমনকি সংশোধনবাদী ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। এসব ইউনিয়নকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তাদের অর্থসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। কার্যত, শ্রমিক আন্দোলনের প্রায় সমস্ত নেতা ও সক্রিয় কর্মী—যারা সময়মতো দেশত্যাগ করতে পারেননি—গ্রেপ্তার হন এবং কোনো বিচার তো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও গঠন করা হয়নি।

    তাদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং প্রায় সকলেই কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই নিষ্ঠুর আক্রমণের পর, একটি সরকারি ঘোষণা প্রকাশিত হয়, যাতে বলা হয়:

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারের তিন মাস তোমাদের শ্রমিকদের কাছে প্রমাণ করেছে যে হিটলার তোমাদের বন্ধু, হিটলার তোমাদের স্বাধীনতার সমস্যা নিয়ে লড়াই করছে, এবং হিটলার তোমাদের কাজ ও রুটি দেবে।

    জার্মানিতে যখন ফ্যাসিবাদ প্রতারিত ও বিভ্রান্ত জনতার উদ্দেশে ধোঁকাবাজিমূলক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, তখন ক্ষমতা গ্রহণের বারো বছর পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একেবারেই ভিন্ন ভাষায় কথা বলছিল।

    ১৯৩৪ সালের শেষদিকে ফ্যাসিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আখিলিস স্তারাচে (Achilles Starace), মূলত বেকার শ্রমিকদের এক সমাবেশে ভাষণ দিয়ে ঘোষণা করেন:

    মনে রাখো, ফ্যাসিবাদ তোমাদের সম্মান, চাকরি বা মুনাফা প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং কেবল কর্তব্য ও সংগ্রামের আহ্বান জানায়।

    এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, দলের সর্বোচ্চ নেতা (মুসোলিনি) মিলানে এক অন্য শ্রমিক সমাবেশে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির এক ধরনের “আদর্শবাদ” ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:

    একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা একমাত্র ব্যক্তিগত লাভ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তা এখন প্রতিস্থাপিত হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র সমাজের স্বার্থ রক্ষা করা। শ্রমিকদের উচিৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়া এবং এর অপরিহার্য শৃঙ্খলায় অংশগ্রহণ করা। যদি গত শতাব্দী ছিল পুঁজিবাদের শক্তির শতাব্দী, তবে বর্তমান শতাব্দী শ্রমের মহিমা ও গৌরব।

    এইরকম একটি ব্যবস্থা, যেখানে সরকারি মুখপাত্ররা একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, তার কোন নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। এটা শুধুই এক ধরনের কূটাভাস এবং নির্লজ্জতা।

    শ্রমিকদের সমস্ত স্বাধীন সংগঠনকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে, ধর্মঘটের অধিকার বাতিল করে এবং জাতীয় প্রয়োজনের অজুহাতে মজুরি হ্রাস করে মুসোলিনি শ্রমের মহিমা ও গৌরব নিয়ে দম্ভ করে বক্তৃতা দেন!

    ছবি: মুসোলিনির সময়কার প্রোপাগান্ডা পোস্টার

    বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী, যাঁরা আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন কমিউনিজম ও সিন্ডিকালিজমের ভূতের দ্বারা, তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় আরোহণকারী মুসোলিনি কখনোই শ্রমিকদের কল্যাণ সংক্রান্ত তাঁর ঘোষণাগুলোর প্রতি আন্তরিক ছিলেন না। তাঁর ফ্যাসিস্ট পার্টির প্রাথমিক কর্মসূচি ছিল সিন্ডিকালিজম ও জাতীয়তাবাদী যুদ্ধবাজ চেতনার একটি অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কর্মসূচি রূপান্তরিত হয় বিপ্লবের উত্থানরোধে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচে।

    “জাতীয় সংহতির তত্ত্ব” ছিল এই ছদ্ম-বামপন্থা থেকে চরম ডানপন্থায় সরে যাওয়ার আদর্শিক অজুহাত। মুসোলিনির কালো-শার্ট পরিহিত বাহিনী মূলত গঠিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত দাঙ্গাবাজদের দ্বারা; যাঁদের মাসোহারা ও অস্ত্রসজ্জার জন্য অর্থ প্রদান করত বৃহৎ শিল্পপতিরা।

    মুসোলিনি ক্ষমতায় আসার আগেই তাঁর ভাড়াটে বাহিনীকে সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতা দখলের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনী শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা চালায়, এবং প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক নেতাকে হত্যা, কারাবন্দি কিংবা নির্বাসনে বাধ্য করা হয়।

    ফ্যাসিবাদী শাসনের পনেরো বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইতালির শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে এক ফ্যাসিবাদপন্থী অর্থনীতিবিদের রচিত গ্রন্থে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ইতালীয় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি অর্ধেকে নেমে আসে। ১৯১৯-২১ সালের মধ্যে সেই মজুরি যুদ্ধপূর্ব স্তরে ফিরে আসে। এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবাত্মক কর্মযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ফল, যার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের রক্তাক্ত হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

    বর্তমানে, প্রকৃত মজুরি পুনরায় যুদ্ধকালীন নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। (দ্রষ্টব্য: ড. পাওলা আর্কারি, Wages and Cost of Living)।

    শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই বাড়তি শোষণের বিপরীতে, ধনীক শ্রেণির ওপর করের বোঝা ফ্যাসিবাদী নীতির দ্বারা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। উত্তরাধিকার কর উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, অপরদিকে পরোক্ষ কর ব্যবস্থার পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় আয়ের ষাট শতাংশেরও বেশি এখন সংগৃহীত হয় সেইসব কর থেকে, যা প্রধানত শ্রমজীবী ও শ্রমনির্ভর জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

    ফ্যাসিবাদী সরকারের ভূস্বামী অভিজাত শ্রেণির প্রতি মনোভাবও ছিল সমানভাবে সদয় ও পক্ষপাতদুষ্ট। সরকার সহিংসভাবে দমন করে ক্যাথলিক পপুলার পার্টিকে, যারা দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে ভূমি পুনর্বণ্টনের দাবি তুলেছিল।

    আজও, ইতালির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি মাত্র অর্ধ শতাংশ কৃষিজনসংখ্যার হাতে কেন্দ্রীভূত। বাকি ভূমি পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি কৃষক পরিবারে বিভক্ত, যাদের মধ্যে প্রায় দুই মিলিয়ন পরিবারই ভাগচাষি বা ইজারাদার। একটি কৃষক পরিবারের গড় জমির পরিমাণ সামান্য দুই একরেরও কিছু বেশি।

    কৃষি উৎপাদনের মোট ফসলের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশই চলে যায় জমিদারদের ভাড়ার খাতে। এর চেয়েও বড় একটি অংশরাজস্ব আকারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকার আদায় করে৷

    জার্মানিতে, ফ্যাসিবাদ যা আবির্ভূত হয় “জাতীয় সমাজতন্ত্রের’’ ভ্রান্ত মুখোশ পরে, তার শাসনকালের অন্ধকার খতিয়ানও কোনও অংশে কম নয়। স্বনির্ভরতার অতিজাতীয়তাবাদী নীতির ফলে জীবন-যাপন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

    অন্যদিকে, রপ্তানি বাণিজ্য কৃত্রিমভাবে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে শ্রমিকদের মজুরি কাটছাঁট করা হয়েছে।

    বেকারত্ব সমস্যারব বহুল প্রচারিত “সমাধান” বাস্তবে ছিল, মজুরি অতি নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা এবং বেকারদের বলপূর্বকভাবে কুখ্যাত শ্রম শিবিরে পাঠানো, যেখানে কার্যত বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম আদায় করা হতো।

    “জার্মান জনগণ নিম্ন মজুরি, খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের ভারে প্রায় বিপর্যস্ত; এবং সেই নাৎসি শ্রম ফ্রন্ট, যার উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিসংঘর্ষ বিলুপ্ত করে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন রচনা, সেটিও দ্রুত ভেঙে পড়ছে।”( The New Statesman and Nation, লন্ডন, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪)

    এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে শ্রম ফ্রন্টের এই পতনকে রোধ করা হয়েছে, শ্রমিকদের জন্য দাসত্বের এক নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করে। জাতীয় স্বার্থের নামে ঘোষিত শ্রেণি-সহযোগিতার এই কাঠামোয় শ্রমিকদের ভাগে পড়েছে “শৃঙ্খলা ও আত্মবলি”— অধিকার নয়।

    এই রকম এক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় পার্টি নেতৃবৃন্দ, অর্থাৎ তথাকথিত “বিপ্লবের” প্রকৃত বিজয়ী শ্রেণির উদ্দেশ্যে, হিটলার ঘোষণা করেন:

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব জার্মানির সামাজিক কাঠামোকে হাজার বছরের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত করেছে।

    অতএব, জনগণের জীবনযাত্রার দুর্দশাকে কোনো আমূল পুনর্গঠনের সাময়িক ফল হিসেবে দেখা চলবে না; বরং এটি কমপক্ষে এক হাজার বছর স্থায়ী হওয়ার জন্য নির্ধারিত।

    হিটলার আরও উপদেশ দেন:

    জনগণকে শিখতে হবে যে বিপ্লবের কাছে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করা অনুচিত এবং কী সম্ভব আর কী অসম্ভব—এই পার্থক্যটা বুঝে নিতে হবে।

    এই চমকপ্রদ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: নাৎসি কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক অংশে যে তথাকথিত “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর আকাঙ্ক্ষা লালন করা হচ্ছিল, তাকে একবারে কবর দেওয়া।

    এক বিশ্লেষকের ভাষায়:

    ফ্যাসিবাদের যা কিছু ‘সম্ভব ও বাস্তব’ অর্জন, তা হলো: বন্দিশিবির, চাবুক, স্বাধীনতার ধ্বংস, জনমতের বিকৃতি, সামরিক অনুশীলন, সেনাবাহিনী এবং বর্বরতায় প্রত্যাবর্তন। (প্রাগুপ্ত)

    নিজেরই কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক দিকগুলোর প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানে হিটলারের উৎসাহে, তৃতীয় রাইখের তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্‌ট (Dr. Hjalmar Schacht) জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। তিনি ‘’অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকতা’’ কে অবজ্ঞাভরে খারিজ করে বলেন,

    আমরা অতীতে সংগৃহীত অভিজ্ঞতাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।

    এখানে “অতীত অভিজ্ঞতা” বলতে মূলত পুঁজিবাদকেই বোঝানো হচ্ছে, যা এখন থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মানির অর্থনৈতিক জীবনে আধিপত্যশীল ভূমিকা পালন করবে—এই মতই প্রকাশ করেন তিনি।

    ড. শাখ্‌ট আরও যুক্তি দেন,

    আমাদের সময়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে কোনও কৃত্রিম কাঠামো নির্মাণ করা সমীচীন নয়। জাতীয় সমাজতন্ত্র কেবল ‘কর্ম’ চেনে, পরিকল্পনা নয়। আমরা কোনও অস্পষ্ট তত্ত্বের দ্বারা নিজেদের পরিচালিত হতে দেব না।

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder) ঠিক সেই সময়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি পার্টির অর্থনৈতিক কর্মসূচির বিভিন্ন ধারার পুনর্বিবেচনা করেন। ক্ষমতায় আসার আগে পার্টির একটি প্রধান অর্থনৈতিক দাবি ছিল— “সুদ দাসত্বের বিলুপ্তি”

    ফেডার এই দাবিকে আবার মনে করিয়ে দেন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারকে অনুরোধ করেন যেন তারা ব্যাঙ্কের ডিসকাউন্ট রেট এবং বন্ধকি সুদের হার হ্রাস করার নির্দেশ দেয়।

    তিনি জোর দিয়ে বলেন:

    জার্মান অর্থনীতি আগের চেয়েও বেশি পরিমাণে উচ্চ পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদেরকে সুদের দাসত্বে আবদ্ধ রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, এই শ্রেণির কর্মপ্রয়াস কেবল ঋণের সুদ শোধ করতেই নিঃশেষ হচ্ছে।

    ড. শাখ্‌টের এই প্রচণ্ড আক্রমণ সম্ভবত ফেডারের এই দুর্বল “ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক” কণ্ঠস্বরের বিরোধি থেকেই উদ্ভূত। কারণ, শ্রেষ্ঠ পুঁজিপতিদের আশীর্বাদেই ক্ষমতায় আসা হিটলার আর মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদের দুশ্চিন্তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন না।

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূল দর্শন ছিল যে, “সুদের দাসত্বই’’ জার্মান জনগণের সব দুর্ভোগের মূল কারণ। নাৎসি সামাজিক কর্মসূচির কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার ছিল, সুদের দায় বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় ঋণ ব্যবস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।

    এই তত্ত্বের জনক ছিলেন গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder), যিনি হিটলারকে শিখিয়েছেন— “জাতীয় বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যা কিছু আমি শিখেছি, সবই তাঁর কাছ থেকে।”( হিটলারের আত্মজীবনী অনুসারে)

    কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অচিরেই হিটলার তাঁর এই অর্থনৈতিক গুরু ফেডারকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব পদ ও প্রভাব থেকে সরিয়ে দেন। এরপর উচ্চ পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি ড. শাখ্‌ট হয়ে ওঠেন জার্মান অর্থনীতির প্রকৃত স্বৈরশাসক।

    ১৯৩৪ সালের শেষ নাগাদ, সুদের দাসত্বের জন্য এক ‘নির্দ্বন্দ্ব ও বেদনাহীন সমাধান’ আবিষ্কৃত হলো। এই সমাধানের প্রস্তাবক ছিলেন নতুন এক তথাকথিত অর্থনৈতিক ওঝা—ক্যোহলার (Köhler), যিনি পার্টির অর্থনৈতিক কমিশনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।

    তাঁর “ঔষধি পরামর্শ” ছিল:

    আপনার ঋণ পরিশোধ করুন, নতুন ঋণ গ্রহণ করবেন না। ঋণ না থাকলে, সুদের দাসত্বও থাকবে না।

    রিশার্ড দারে (Richard Darré) ছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্রের শেষ “আদর্শবাদী মোহিকান”।

    হিটলারের ক্ষমতায় আসার দুই বছর পরও তিনি এখনো মনে রেখেছিলেন পার্টির কৃষকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ ভূমি বিতরণ।

    এমন “স্মরণশক্তি” জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ছিল গুরুতর অপরাধ।

    তবে রিশার্ড দারেকে কৃষিমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় তুলনামূলকভাবে আরও লঘু অপরাধে। তিনি কেবলমাত্র এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে—মার্ক মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো উচিত।

    কিন্তু এই অর্থনৈতিক মতাদর্শ, যা ছিল শিল্পপুঁজিপতিদের স্বার্থের পরিপন্থী, চিহ্নিত হয়—একটি আর্থিক ধর্মদ্রোহ হিসেবে।

    ফলে তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্‌ট তাঁর অপসারণ দাবি করেন, এবং হিটলার তাঁর অনুগত শিল্পপতিশ্রেণিকে সন্তুষ্ট করতে দ্রুতই সেই দাবিতে সাড়া দেন।

    ১৯৩৪ সালের শেষদিকে হিটলারের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:

    ফিরার হিসেবে হিটলার নিঃসন্দেহে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন, কিন্তু তিনি সর্বশক্তিমান নন। তাঁকেও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে হয় এবং জনমতকে দমন করার পরেও জনগণের যে অপ্রতিরোধ্য প্রবৃত্তিগত আবেগ বেঁচে থাকে, সেগুলোর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁকেও সতর্ক থাকতে হয়।

    সাধারণ জনগণের আবেগ এখনো তাঁকে বিশেষভাবে চিন্তিত করে না; কারণ, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, প্রচারের মাধ্যমে তিনি এখনো তা সামাল দিতে পারবেন, এবং আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের মনোরঞ্জনও করতে পারবেন। সর্বশেষ উপায় হিসেবে, তিনি সেই আবেগকে পিষে ফেলবেন এবং আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দমন করবেন, যেমন তিনি ইতোমধ্যেই নাৎসি ব্রাউন আর্মির ‘কম নির্ভরযোগ্য অংশ’কে নির্মমভাবে দমন করেছেন।

    কিন্তু তাঁর প্রাক্তন অর্থদাতারা, যাঁরা বৃহৎ শিল্পপুঁজির অধিপতি, তাঁদের প্রতি হিটলারের দহরম-মহরম অনেক বেশি।

    তাঁর সেই পুঁজিপতি অভিভাবকেরা তাঁকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি পার্টির ছদ্ম-বিপ্লবী বামপন্থীদের ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ করেন। হিটলার নিজেকে সেই নির্দেশের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন বলে ভেবে আত্মতুষ্ট হন, এবং তাঁদের আদেশ পালন করেন বিনা দ্বিধায়। এবং সম্ভবত, ভবিষ্যতেও তিনি এই পুঁজিবাদী শ্রেণির আদেশ মান্য করে যাবেন।

    — (“The New Statesman and Nation”, লন্ডন, ১১ আগস্ট ১৯৩৪)

    বারবার, হিটলার এবং তাঁর পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই দাবি করেছেন যে, জার্মানিতে জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিজয় ইউরোপকে বলশেভিক বিপ্লব থেকে রক্ষা করেছে। তাঁদের ভাষায়:

    যদি নাৎসিরা বিজয়ী না হতো, তবে বলশেভিকবাদের কবলে পড়ত শুধু জার্মানি নয়, সমগ্র ইউরোপ। নাৎসি সাফল্যই আমাদের পরিত্রাণ এনেছে বলশেভিক বর্বরতার হাত থেকে।

    বাস্তবতা হলো, প্রারম্ভিক পর্যায়ে জার্মান ফ্যাসিবাদ কখনোই নিজেদের সমাজতান্ত্রিক দাবি করেনি। ১৯১৯ থেকে ১৯২০ সালের বিপ্লবী দিনগুলোতেই তারা ঘোষণা করেছিল, তাদের লক্ষ্য হলো—

    লাল বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম (Fight against the Red Peril)।

    হিটলার ১৯২২ সাল থেকেই নিয়োগকর্তা সংগঠনগুলোর নিকট থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে আসছিলেন এই যুক্তিতে যে—তার পার্টি একটি স্পষ্টভাবে শ্রমিকবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে।

    ক্ষমতায় এসে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি; বরং শুরু থেকেই তিনি তাঁদের বিরোধী ছিলেন।”—(কনরাড হেইডেন, “History of National Socialism”)

    শুধুমাত্র ১৯২৬ সালে হিটলারের দল তথাকথিত পুঁজিবাদবিরোধী প্রচারে লিপ্ত হয়। পার্টির কর্মসূচিতে যে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটি হিটলারের নিজস্ব উদ্যোগে নয়, বরং তাঁর বিরোধিতা সত্ত্বেও স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়ের (Gregor এবং Otto Strasser) উদ্যোগে সংযোজিত হয়।

    কিন্তু, যখন নাৎসি পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তখনই স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়কে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরিণামে, একজনকে হত্যা করা হয় এবং অপরজন দেশত্যাগে বাধ্য হন।

    হিটলার শাসনের দ্বিতীয় বছরে, পার্টির বামপন্থী অংশ স্পষ্টভাবে ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে।

    পার্টির অভ্যন্তরে এক বৃহৎ শ্রমজীবী অংশ সক্রিয় ছিল। নাৎসি ব্রাউন আর্মির সাধারণ সদস্যরা ছিল মূলত বেকার তরুণ শ্রমিকদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।

    তাঁরা আশা করেছিল যে পার্টির অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতিগুলোর কিছু অন্তত বাস্তবায়িত হবে। এই পটভূমিতে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠেছিল— “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর দাবি।

    কিন্তু হিটলারের মঞ্চের নেপথ্যের শক্তিগুলো, বিশেষত জমিদার ও সামরিকপন্থীরা, এই দাবি দেখে ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত হয়ে ওঠে। জমিদার ও সামরিক অভিজাতদের পক্ষ থেকে ভন পাপেন (von Papen) একটি হুঁশিয়ারিমূলক ভাষণে বলেন:

    হিটলার যেভাবে তাঁর প্রচেষ্টায় জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন, তাতে তার বোঝা উচিত, যদি পাপেট তার পোষকের ইচ্ছামতো আচরণ না করে, তবে তাকে সরিয়েও ফেলা যেতে পারে।

    একইভাবে, ক্রুপ ভন বোলেন (Krupp von Bohlen), জার্মান শিল্পপতিদের অন্যতম মুখপাত্র,জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দেন।

    এই হুমকি ছিল একপ্রকার ভারী শিল্পপুঁজির পক্ষ থেকে হিটলার সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত। অবশেষে আদেশ আসে এবং হিটলার বাধ্য হন তা পালন করতে।

    ফলে, ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন তিনি নাৎসি পার্টির অভ্যন্তরে নৃশংস “রক্তপাত’’ পরিচালনা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল “দ্বিতীয় বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা”।

    (গেরিং-এর ভাষায়—“destroy the danger of a second revolution”)।

    ভূস্বামী, সামরিকতন্ত্রী এবং পুঁজিপতিদের নির্দেশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করার মধ্যেই, হিটলার ঘোষণা করেন:

    “আমাদের কর্মসূচি তাৎক্ষণিক নয়, এটি এক যুগান্তকারী অধ্যায়। আমাদের ব্যবস্থা এক হাজার বছর টিকে থাকবে। আমরা সহস্রাব্দের জন্য কাজ করছি। ধৈর্য ধরো! অপেক্ষা করো!”

    শিল্পের সমাজিক মালিকানা, যা তাঁর প্রতারিত অনুসারীরা দাবি করেছিল, সে বিষয়ে হিটলার তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিরোধিতা করেন।

    তাঁর ভাষ্যে, এই ধরনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ “বিপজ্জনক”, কারণ এগুলো “শিল্প প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্টিশীল উপাদান এবং ব্যক্তিত্বের শক্তিকে নির্মূল করে দেয়”।

    একইভাবে, তাঁর পার্টির প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে বৃহৎ জমিদারির অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে হিটলার মত প্রকাশ করেন যে, “দক্ষ উৎপাদন বজায় রাখতে হলে বৃহৎ জমিদারির কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক”।

    ‘’নতুন জার্মানিতে প্রকৃত ক্ষমতার নাটাই ঘোরান যারা, তারা হলো—ভারী শিল্পপতি, বৃহৎ অর্থিক খাতের পুঁজিপতি এবং জমিদার শ্রেণি। তাঁদের নির্দেশেই হিটলার জাতীয় বিপ্লবের ঘোষিত কর্মসূচি থেকে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক উপাদানসমূহ বাদ দেন।

    পুঁজিবাদ তার অনুচরকে নির্দেশ দেয়—লাভে হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। হিটলার সেই আদেশ পালন করে; বিপ্লব শেষ।’’

    — (“Hitler Over Europe” থেকে উদ্ধৃত)

    এটি হিটলার শাসনামলে জার্মানির বাস্তব পরিস্থিতির একটি যথার্থ বিবরণ। ফ্যাসিবাদের সমাজতন্ত্রের দাবি ছিল একটি ছলনা।

    শাসক শ্রেণির দ্বারা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত নাৎসিরা, তাদের প্রভুদের লোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে জার্মানিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

    ফ্যাসিবাদের জাতীয়তাবাদ যেমন ছলনাপূর্ণ, তেমনি তাদের সমাজতন্ত্রের দাবিও প্রতারণামূলক। জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে প্রকৃত জাতীয় কল্যাণ সম্ভব নয় শ্রমজীবী শ্রেণির অবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত; কারণ, সেখানে শ্রমজীবী জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ধারিত হওয়া উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণের ভিত্তিতে।

    তাই শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের বিরোধী হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমিক শ্রেণির প্রতি ফ্যাসিবাদীদের তীব্র শত্রুভাবাপন্নতা তাদের তথাকথিত জাতীয় কল্যাণচিন্তার সাথে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ।

     

    ছবি: ফিল্ম পোস্টার (১৯৩৯)

    নাৎসিরা ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন অর্জন করেছিল। তাদের মূল স্লোগান ছিল: জার্মান জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধার। যাঁরা এই অপমানজনক চুক্তি জার্মানির ওপর চাপিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধের আহ্বান।

    কিন্তু ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই, হিটলার এক বক্তৃতায় এই ঘোষণা দেন:

    আমাদের জাতির সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সেখানে কেউ আমাদের সম্মান ছিনিয়ে নেয়নি।

    আমাদের কেবল একটিই অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তা ছিল না পশ্চিমে, না পূর্বে, তা ঘটেছিল আমাদের নিজ গৃহে। আর এই অপমান আমরা কাটিয়ে উঠেছি।”

    (নুরেমবার্গ উৎসবে প্রদত্ত ভাষণ, সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)

    এখানে হিটলার যে “অপমান”-এর কথা বলছেন, সেটি জার্মান বিপ্লব (নভেম্বর বিপ্লব)— যার সাফল্যই কেবল জার্মান জাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারত।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যতিক্রম ছাড়া, ফ্যাসিবাদের যুদ্ধবাজ মনোভাব মূলত জনতাকে প্রতারণা করার কৌশলমাত্র। একটি জনমত্তকরণে ধাপ্পাবাজি ও দম্ভ। ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলিকে যে নাটকীয়ভাবে হিটলার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা মিত্রশক্তিগুলোর নিঃশব্দ সম্মতির সহায়তা ব্যতিরেকে সফল হতো না।

    আজ জার্মানি আবারও একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছে। কিন্তু চার বছর আগে, যখন ফ্যাসিস্ট সরকার ঘোষণা করল যে তারা ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে জার্মানিকে পুনরায় সশস্ত্র করবে, তখন ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য এমন ছিল যে যদি মিত্রশক্তিরা চাইত, এই ধাপ্পাবাজিকে যেকোনো সময় প্রতিহত করা যেত।

    ফ্রান্সে বহুল উচ্চারিত ও সমর্থিত মত ছিল, একটা প্রতিরোধক যুদ্ধ উদ্ধত নাৎসিদেরকে তাদের পদানত করতে সক্ষম। জার্মান ভূখণ্ডেই যুদ্ধ হতো, এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ফ্রাঙ্কো-পোলিশ মৈত্রী বাহিনী বার্লিন দখল করে ফেলত। এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিম জার্মানির শিল্পাঞ্চলগুলো অবিলম্বে ফরাসিদের দ্বারা অধিকৃত হতো এবং প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে ধ্বংস করা হতো।

    স্বাভাবিকভাবেই, নাৎসিদের পৃষ্ঠপোষকেরা এই ধরনের পরিস্থিতি চাননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, নাৎসি সরকারের যুদ্ধোন্মাদ নাটকীয়তাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্যে বিপুল মুনাফা অর্জন। তাঁরা এই বিপজ্জনক খেলা খেলতে সাহস করেছিল, কারণ তাঁরা জানত, ফ্রান্স আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

    সুতরাং, পরাজয়ের পর জার্মানির পুনরায় সশস্ত্র হয়ে ‘সূর্যের নীচে’ নিজের স্থান দাবি করে ফিরে আসাটা ফ্যাসিবাদের দর্শনে উজ্জীবিত “জার্মান পৌরষের দুর্জয় চেতনার” কৃতিত্ব নয়। বরং, এই তথাকথিত ‘নবজার্মান সাম্রাজ্যবাদ’ আসলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের বিপ্লব-ভীতির বিকৃত সন্তান।

    জার্মানিতে বিপ্লবী শক্তিকে দমন করার মাধ্যমে, নাৎসিরা আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের পক্ষে একটি “সেবা” প্রদান করছিল। ফলে, এই কাজে তাঁদের সাহায্য করা উপযুক্ত বিবেচিত হয়।

    ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার গৌরব হিটলারকে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য প্রদান করে, যার মাধ্যমে তিনি অন্তত সাময়িকভাবে বিপ্লবের গতি রোধ করতে সক্ষম হন।

    যাঁরা জার্মানির সামরিক শক্তির অলৌকিক পুনরুত্থানে মুগ্ধ, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে জানেন না, এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে মিত্রশক্তির সহযোগিতা ও সম্মতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল, যারা সে সময় জার্মানিতে বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিল।

    কথিত ‘জাতীয় সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ অভিপ্রায় নিয়ে হিটলারের আবির্ভাবের আগেই, ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলোর ব্যাপকভাবে রদ হয়েছি লোকার্নো চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে জার্মানির প্রজাতন্ত্রী সরকার, যাদেরকে নাৎসিরা জার্মানিকে মিত্রশক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।

    লোকার্নো চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল, জার্মান অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে মিত্রশক্তির পূর্বনির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সেনা প্রত্যাহার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় ছিল, মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার, যার দায়িত্ব ছিল জার্মানিকে নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং বিশেষত রাইন নদীর বাম তীরের সামরিকীকরণ প্রতিরোধ।

    ব্রিটেন ও ফ্রান্স, সেই সময় চেম্বারলেইনের নেতৃত্বাধীন এক সোভিয়েত-বিরোধী বলয় গঠনের কৌশলে বিভোর ছিল। ফলে, তারা জার্মানিকে যে ছাড় দিয়েছিল, তা ব্যবহারিকভাবে পুনঃসশস্ত্রীকরণের অনুমতি প্রদান করে। এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল বহু বছর আগে, যখন হিটলারের ধামাকা-ভাষণের মাধ্যমে ‘জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারে’ জার্মান পৌরষ উদ্দীপ্ত করার প্রচেষ্টা শুরুই হয়নি।

    ব্রিটিশ কূটনীতি, চেম্বারলেইনের নেতৃত্বে, চেয়েছিল একটি শক্তিশালী জার্মানি— “বলশেভিক বিপদ” প্রতিরোধের একটি দুর্গ। অন্যদিকে, জার্মানিতে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা, যা সহজেই রাইন নদী অতিক্রম করতে পারত, ফ্রান্সকে আতঙ্কিত করে তোলে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিয়াঁর ভুলভাবে প্রয়োগকৃত উদারনীতিই ছিল সেই প্রধান কারণ, যার ফলে ভার্সাই চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ফ্রান্সের নিরাপত্তা কাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে।

    যুক্তরাজ্যের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ, জে. এইচ. মরগান, কে.সি., যিনি মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি লেখেন:

    এই উভয় চুক্তি (অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার) যথাযথভাবে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই দেশে (যুক্তরাজ্যে) খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ জানেন যে, ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার এই চুক্তিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কত দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, এমনকি চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু সম্পাদন করেছিল।

    এটা শুধু এমন নয় যে, জার্মান সরকার প্রদত্ত অঙ্গীকারেট ওপর আস্থা রেখে নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এই বিশ্বাসে যে, জার্মানির অব্যাহত বিচ্যূতি সংশোধন করবে। বরং রাইনল্যান্ডকে নিরস্ত্রীকরণের কাজ, অর্থাৎ ভেরসাই চুক্তির ৪৩ এবং ১৮০ অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন, কার্যত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

    (“ডেইলি টেলিগ্রাফ”, লন্ডন, এপ্রিল ১৯৩৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত।)

    এই বিচক্ষণ ও দক্ষ পর্যবেক্ষক আরও সাক্ষ্য দেন যে, এর আগেও নিয়ন্ত্রণ কমিশন জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণের ব্যাপারে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল, বেসামরিকায়িত অঞ্চলে কৌশলগত স্থাপনা অক্ষুণ্ণ রেখে। জার্মান পক্ষের তথাকথিত ‘বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা’র যুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুদ্ধোপযোগী স্থাপনাগুলিকে অক্ষত রাখা হয়েছিল। এমনকি রাইন নদীর বাম তীরে অবস্থিত দুর্গ, পরিবহনব্যবস্থা এবং অন্যান্য “স্থায়ী সামরিক অভিযান কাঠামো” মিত্রশক্তির সেনা প্রত্যাহারের সময়ও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, লোকার্নো চুক্তির মর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

    বহু বছর ধরেই জানা যাচ্ছিল যে, অধিকৃত অঞ্চলসমূহে জার্মান ‘নিরাপত্তা পুলিশ’ মূলত ছদ্মবেশী রাইখসভেয়ার। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও, “জার্মান সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে,” ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার ১৯২৭ সালে সম্মত হয় যে, এই বাহিনী রাইনল্যান্ডে টিকে থাকবে, এই শর্তে যে তাদের চরিত্র ‘নিরস্ত্রীকৃত’ থাকবে। (প্রাগুক্ত)

    আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল—”ছায়া সেনাবাহিনী” গঠন—যা ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার লোকার্নো চুক্তি স্বাক্ষরের পর কার্যত উপেক্ষা করে। নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উপস্থিতিতেই, ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে, জেনারেল ফন সেক্ট প্রাক্তন সেনাবাহিনীর পুরানো ক্যাডার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সাধারণ সামরিক নিয়োগ পুনর্বহালের প্রস্তুতি নেন।

    ফলে, লোকার্নো চুক্তি, যা অন্তত জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এই গোপন প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়।

    সুতরাং, জার্মানির পুনঃসশস্ত্রীকরণের তথাকথিত গৌরবময় বিজয়, যা নাৎসি প্রচারযন্ত্রে হিটলারের কৃতিত্ব হিসেবে উদযাপিত হয়, বাস্তবিক অর্থে হিটলারের অর্জন নয়। এই অধিকার জার্মানিকে প্রদান করা হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে, এবং তা ছিল একটি উপহার— জার্মান জনগণের জন্য নয়। বরং তাদের জন্য, যারা জার্মানিকে প্রথম মহাযুদ্ধের বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছিল এবং সেই লজ্জাজনক বিপর্যয় থেকেই বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। এবার তারা সেই “গৌরব” থেকেই নতুন করে মুনাফা অর্জনের কাজে লিপ্ত।

    নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রত্যাহারের এক বছরের মধ্যেই জার্মান সরকারের সামরিক বাজেট দশগুণ বৃদ্ধি পায়, যার অর্থ হলো ভারী শিল্পক্ষেত্রে বিপুল সামরিক সরঞ্জামের অর্ডার। নাৎসি উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল মূলত একটি অজুহাত—পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার, যাতে বড় পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত হয়।

    হিটলার ক্ষমতায় আসার পরপরই, মাসিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়েও এই ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পার্লামেন্টারি পদ্ধতিকে বাতিল করে বাজেট প্রকাশের নিয়মও বাদ দেয়, ফলে সামরিক খাতে আসল ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

    তবে দক্ষ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৩৪ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছিল ১,০০০ মিলিয়নেরও বেশি মার্ক, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। পরের বছর বাজেট আবার দ্বিগুণ হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, হিটলার শাসনের প্রথম চার বছরে শুধুমাত্র পুনঃসশস্ত্রীকরণে ব্যয় হয়েছিল ১৬,০০০ মিলিয়ন মার্ক। একই সময়কালে গণপূর্ত খাতে খরচ করা হয় আরও ৪,০০০ মিলিয়ন মার্ক, যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ছদ্মবেশী সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ।

    অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকার প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির মোট ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে পুনঃসশস্ত্রীকরণে।

    এই বিপুল অর্থের অধিকাংশ, যা কার্যত ভারী শিল্পক্ষেত্রের জন্য একটি ভর্তুকি, সংগ্রহ করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে। জনগণকে এই ঋণে অবদান রাখতে বাধ্য করা হয়।

    ১৯৩৫ সালে, জার্মানির অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। যেহেতু পুনঃসশস্ত্রীকরণ কর্মসূচির ব্যয় চলতি আয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই তা পূরণ করতে হবে ভবিষ্যৎ আয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ, জাতির ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা হয়েছে অস্ত্র উৎপাদনকারীদের হাতে।

    কর আদায়ের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হলো—জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।

    অন্যদিকে, যারা সহজে পরিশোধ করতে পারতেন, তারা কৌশলে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন।

    ১৯৩৪ সালে এক সরকারি ফরমান জারি হয়, যেখানে বলা হয় যে, সব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ছয় শতাংশের বেশি লভ্যাংশ সরকারের কাছে জমা রাখতে হবে।

    তারপরপরই, বড় বড় শিল্পট্রাস্টের (যেমন: ক্রুপ, টাইসেন, আই.জি. ফারবেন, এ.ই.জি. ইত্যাদি) ব্যালান্স শিটে দেখা গেল, যারা জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা থেকে বিপুল মুনাফা করছিল, তারা দেখাচ্ছে—তাদের মুনাফা ছয় শতাংশের কম।

    অন্যদিকে, সঞ্চয় ব্যাংক, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় ও অন্যান্য সামাজিক বীমা প্রতিষ্ঠানের সকল তহবিল সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার বিনিময়ে প্রদান করা হয়েছে তথাকথিত “পুনঃসশস্ত্রীকরণ বন্ড”।

    এর ফলে সম্পূর্ণ আর্থিক বোঝা বর্তেছে দরিদ্র মধ্যবিত্ত ও প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ওপর, যাদেরকে ভবিষ্যতে “জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে’’ নিজের জীবন দিয়ে চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে।

    এই সময়ে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, জাতির মূল খরচের ভার বহন করিয়ে। গরিবদের রক্ত চুষে নেওয়ার সর্বশেষ কৌশল হলো বিক্রয় কর। এটি এক ধরনের মোট আয় ভিত্তিক কর, যা উপার্জনের বিপরীত অনুপাতে করদাতার ওপর বোঝা চাপায়।

    উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি যার মাসিক আয় শত একক, তিনি প্রায় সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে—ফলে তাঁর পুরো আয় করযোগ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, যার আয় হাজার একক, তিনি এই একই প্রয়োজনের জন্য ব্যয় করেন মাত্র একটি অংশ—ফলে তাঁর আয়ের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ করযোগ্য হয়। আয় যত বেশি, করের বোঝা অনুপাতে তত কম।

    এটাই হলো “জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনীতির’’ বাস্তব প্রয়োগ।

    একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, যিনি পূর্বে জার্মান সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন, লিখেছেন:

    হিটলারের শাসনকালের গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে, একমাত্র লাভবান হবে অস্ত্রশিল্পের উৎপাদকরা। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না, কারণ সরকারের আমদানি নীতি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তুলনায় সামরিক প্রয়োজনীয় কাঁচামালের আমদানিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

    — (পল ক্রসার, দ্য নিউ রিপাবলিক, নিউ ইয়র্ক, ৬ মার্চ ১৯৩৫)

    ফলস্বরূপ, জনগণের ভোগের মাত্রা জোরপূর্বক হ্রাস করা হয়েছে।

    ভোগের মান নির্ধারণ করে সরকার। খাদ্যপণ্যের সকল মৌলিক উপাদানের মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। পোশাক-পরিধানের ক্ষেত্রে এই মান অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। জোরপূর্বকভাবে ভোগের এই হ্রাসকৃত মানকে মজুরি নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও কৃষকরা শ্রমজীবী জনগণের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

    ছবি: নাজি পোস্টার

    নাৎসি নেতারা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না; বরং তার পরিবর্তে জাতীয় সম্মানের নামে আত্মত্যাগ ও আরও আত্মত্যাগের আহ্বান জানান। গোয়েবলস চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন যে, “মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয়”। স্বভাবতই, এর কারণ রয়েছে। নাৎসী অর্থনীতিবিদ উইন্ডশু এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান মজুরি হার অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হবে জীবনের মান আরও নিম্নগামী হওয়া; তথাপি, তিনি অস্ত্রশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির খরচ বহনের প্রয়োজনে রপ্তানি বৃদ্ধির আহ্বান জানান এবং নির্দয়ভাবে বলেন, “জীবনের মান সেই লক্ষ্যর অধীন হতে হবে।”

    এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয়। নাৎসি শাসনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বারবার জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই স্লোগান উচ্চারণ করেছেন:

    যদি জার্মানি স্বাধীন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয় এবং যথেষ্ট বন্দুক থাকে, তবে মাখন, ডিম ও কাপড়ের মতো তুচ্ছ বিষয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।

    এইভাবে জার্মান জনগণের অর্থনৈতিক ধ্বংস সাধন করা হচ্ছে তথাকথিত ‘জাতীয় সম্মান’ পুনরুদ্ধারের নামে। মানুষ যখন রুটির জন্য হাহাকার করছে, তখন তাদের বিনোদনের জন্য সার্কাস পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু এমনকি এই সার্কাসও একদিন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যদি নাৎসি যুদ্ধোন্মত্ততা সত্যিই জার্মানির প্রাক্তন শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।

    শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেই, নাৎসি যুদ্ধোন্মাদরা যা বলে তা-ই বোঝায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় বিসমার্কের সূত্র—“ড্রাং নাখ্ অস্টেন” —পূর্বাভিমুখে আগ্রাসন—অনুযায়ী। বলশেভিজম ধ্বংস করা এবং রাশিয়ার উর্বর ভূমি জয় করা হল নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই হিটলার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন, যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ।

    এই তথাকথিত বলশেভিকবিরোধী ‘পবিত্র ক্রুসেডে’ অংশ নিতে নাৎসিরা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো জার্মান জাতীয় শত্রুদের সঙ্গেও জোট বাঁধতে প্রস্তুত ছিল। ভার্সাই চুক্তির অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার নামে যুদ্ধের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল নিছক ভণ্ডামি।

    ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে হিটলার বার্লিনে পোলিশ মন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব দেন। পোল্যান্ডও জার্মান জাতীয় শত্রুদের অন্যতম ছিল, তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হিটলার পুরোনো বিদ্বেষ ভুলে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। জানা যায়, তিনি পোল্যান্ডের সঙ্গে রুশ ভূখণ্ড বিভাজনের প্রস্তাবও দেন।

    পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে হিটলার রোজেনবার্গকে বিশেষ দূত হিসেবে লন্ডনে পাঠান, যার মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটেনকে একটি সোভিয়েতবিরোধী জোটে যুক্ত করা। লক্ষ্যণীয় যে, জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই প্রধান মতাদর্শিক নেতা লন্ডন সফরকালে রয়্যাল ডাচ পেট্রোলিয়াম কম্বাইনের প্রধান ডেটারডিং-এর আতিথ্য গ্রহণ করেন, যিনি সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্তে বরাবরই সক্রিয় ছিলেন।

    হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজের প্রিয় ‘রাশিয়া-বিরোধী যুদ্ধের’’ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন, কারণ এই প্রস্তাব লন্ডন ও প্যারিস, কোনো দিক থেকেই ইতিবাচক সাড়া পায়নি। এটা অবশ্য এমন নয় যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শাসকরা এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন; বরং তারা হিটলারের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও অভিজ্ঞ ছিলেন, এবং তাই এই বিপজ্জনক অভিযানে হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি হননি।

    বাস্তবিক অর্থেই, নাৎসিরা শুধু ইংল্যান্ডের সঙ্গেই নয়, বরং এমনকি ফ্রান্সের সঙ্গেও আপস করার চেষ্টা করে এসেছে, যাকে তারা বাহ্যত সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে দেখায়। জার্মান সেনাবাহিনী যখন নাটকীয়ভাবে রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘন করে, তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই হিটলার একজন গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি সাংবাদিককে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন।

    সেই সাক্ষাৎকারে হিটলার ফ্রান্সের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করেন। যখন ওই সাংবাদিক তাঁর আত্মজীবনীতে প্রকাশিত ফ্রান্স-বিরোধী মন্তব্যগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখন হিটলার ব্যাখ্যা দেন যে, এসব ছিল কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলা।

    যেহেতু রাইনল্যান্ডে সেনা-প্রবেশ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না এবং তার আগেই ফ্রান্সকে সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, তাই ফ্রান্স এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ যদি ফ্রান্স সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলত, তাহলে নাৎসিদের এই পদক্ষেপ সহজেই থামানো যেত। কারণ তখনো জার্মানি একটি বৃহৎ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে সক্ষম ছিল না। এমনকি জার্মান জেনারেল স্টাফও এই উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিল বলে জানা যায়।

    কিন্তু ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড, কেউই এমন কিছু করতে চায়নি যা হিটলারের অভ্যন্তরীণ মর্যাদাকে হানি করতে পারে। কারণ, তা হলে নাৎসি শাসনের পতন ত্বরান্বিত হতো এবং রাইনের পশ্চিম তীরে আবারও বিপ্লবের আশঙ্কা দেখা দিত। তদুপরি, ফ্রান্স পূর্বেই নিশ্চিত হয়েছিল যে জার্মানির এই পদক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার উদ্দেশ্যে নয়।

    নাৎসি পার্টির “রকশুদ্ধি’র ঘটনার কিছুদিন পরেই, হিটলারের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী রুডলফ হেস ফরাসি চরম-জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ বীর সমিতির (French War Veteran Association) উদ্দেশ্যে “শান্তি ও শুভেচ্ছা” বার্তা প্রেরণ করেন।

    তিনি ফরাসি সৈন্যদের সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করেন, এমনকি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্তুকে শ্রদ্ধা জানান। বার্তু ছিলেন সেই ক্লেমঁসোর অনুসারী, যিনি কুখ্যাত ভার্সাই চুক্তি রচনা করেছিলেন। অথচ সেই চুক্তি ছিন্নভিন্ন করাই ছিল নাৎসি আদর্শের ঘোষিত লক্ষ্য।

    হেস অত্যন্ত মোলায়েম ভাষায় শান্তির কথা বলেন। তিনি ফরাসি জাতিকে, যাদের নাৎসিরা এতদিন শত্রু হিসেবে তুলে ধরেছিল, এই ভাষায় সম্বোধন করেন:

    একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে আরেকজন গর্বিত সৈনিককে বলছি, যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী? আমরা কি একসাথে বসে আলোচনা করতে পারি না? আমরা কি সদিচ্ছার মাধ্যমে মানবজাতিকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করতে পারি না?

    নাৎসি যুদ্ধোন্মাদনার ফাঁপা প্রচারণা তখনই উদ্ঘাটিত হয়, যখন জানা যায় যে ১৯২৪ সাল থেকে ফ্রান্সবিরোধী ঘৃণা-প্রচারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন রুডলফ হেস নিজেই। তাঁর অশ্লীল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছিল একটি কবিতার চরণে:

    এই যে ফ্রাঁসি, তোদের মরতেই হবে, যেন আমরা বাঁচতে পারি।

    এসব ছিল নিছক জনতাকে উন্মত্ত জাতীয়তাবাদে উসকে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা ভণ্ডামি ও লোকদেখানো প্রচারণা। যার একমাত্র উপকারভোগী ছিল বৃহৎ শিল্পপতিরা, যারা যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্য থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। আর এই তথাকথিত ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদের এটুকুই ছিল একমাত্র “অর্জন”।

  • এম এন রায়।। “রক্তপাতহীন” বিপ্লব

    এম এন রায়।। “রক্তপাতহীন” বিপ্লব

    • অনুবাদ: তানিয়াহ্‌ মাহমুদা তিন্নি

    ফ্যাসিবাদীরা ইতালি এবং জার্মানিতে রক্তপাতহীনভাবে বিপ্লবের দাবি করে। তবে প্রাপ্ত নথি কেবল এ দুটি দেশের নয় বরং আরও অনেকগুলো দেশের ক্ষেত্রেই তাদের এই ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করে। তবে যাই হোক, এই দেশগুলোতে ‘অতিমানবের’’ উত্থানের পেছনের গল্প পাঠকদের জন্য চিন্তা উদ্রেগকারী হতে পারে।

    ইতালিতে মুসোলিনি বিজয়ী জনপ্রিয় সৈন্যদলের প্রধান সেনাপতি হিসেবে রোম দখলের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে নি। রোম দখলের যাত্রা মঞ্চস্থ হওয়ার সময় ইতিহাসের এই ‘নায়ক’ নিজেকে অনেক দূরে সুরক্ষিত রেখেছিল। তার অর্থের জোগানদার ছিল সেসময়ের পুঁজিবাদীরা। পুঁজিবাদীদের অফুরন্ত অর্থের সাহায্যে সে ভাড়াটে কালো শার্ট বাহিনী জড় করে যারা বিপ্লবী মজুর এবং কৃষকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছিল। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক, কিন্তু দুর্বল ও আতঙ্কিত বুর্জোয়া সরকারের হাত থেকে কালো-শার্টধারী ভাড়াটে সৈন্যরা ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। বরং নিয়মিত সৈন্যরাই, মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কারণ মুসলিনিই নিজেকে বিপ্লবী গণআন্দোলনের সবথেকে ভয়ঙ্কর এবং নির্মম শত্রু হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। নিয়মিত সেনাদের কাছ থেকে সম্মতি লাভের পরই কেবল রোমের উদ্দেশ্যে ফ্যাসিবাদীদের পদযাত্রা শুরু হয়। নিয়মিত সেনারা যদি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করত তাহলে হয়ত কখনোই এই ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ সংঘটিত হত না। ইতালির জনগনকেও মুসলিনির মতো একনায়কের শাসনের মত দুর্ভাগ্য সহ্য করতে হত না।

    উদারনৈতিক বুর্জোয়া সরকার বিপ্লবী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ ছিল। ফলে শোষক শ্রেণি—বিশেষত ভূস্বামী এবং পুঁজিবাদী—এই দুই দল বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করতে পুরাতন সরকারকে নতুন আরেকটি দক্ষ সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একইসাথে তারা এমন একটি সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল যারা শাসক শ্রেণির আরও বেশি অধীনস্ত হয়। নিয়মিত সৈন্যরা তাদের নিজেদের লোকের তত্ত্বাবধানেই ছিল। কিন্তু একটি বিপ্লবী পরিস্থিতিতে সাধারণ সৈনিকদের উপর ভরসা করা যায় না। এ কারণেই নিয়মিত সৈনিকদের উপর একটি জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন দমনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ নির্ভরযোগ্য ছিল না। জনগনের কিছু অংশ অবশ্যই প্রতিবিপ্লবী হয়ে উঠতে পারে। ছদ্ম-সিন্ডিকালিস্ট প্রোপাগাণ্ডা এবং জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্যই পূরণ করছিল। মধ্যবিত্ত বিদ্রোহী এবং প্রান্তিক শ্রমিকেরা মুসলিনির ভাড়াটে কালো-পোশাকের সৈন্যদের তালিকাভুক্ত ছিল। মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল কারণ প্রতি-বিপ্লব জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভবনা ছিল। অবশ্যই, সে তার ‘সুপারম্যান’ ইমেজ দ্বারা কোন নোংরা কাজ করাতে আগ্রহী ছিল না। এই কাজের জন্য তো নিয়মিত সৈন্যদেরকেই মজুত রাখা হয়েছিল।

    সেই পরিস্থিতিতেই মুসোলিনির পক্ষে ‘ক্ষমতা দখল’ করা সম্ভব হয়েছিল। তখন থেকেই নিয়মিত সেনারা তার রক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, কখনও কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় নি। ক্ষমতা তাঁর পায়ে এসে লুটিয়ে পড়েছে। তবুও শেষ সময়ে এসে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল। রোমের পথে পদযাত্রার সময়ও সে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব প্রদানের ঝুঁকি নেয়নি। যখন মহানায়কের বীরত্বগাঁথা মঞ্চস্থ হচ্ছিল তখনও নায়ক মিলানে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন। রোম দখলের পর, তাঁর বিশ্বস্ত কিছু লেফটেন্যান্ট টেলিফোনে তাকে সুসংবাদ দেয় এবং দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে বলে। এমনকি তখনও সে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলতে আগ্রহী ছিল না। আসলে সে কোন অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিল না। অবশেষে, জেনারেল স্টাফের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পরই কেবল সে রোমজয়ী হিসেবে একটি ঘুমন্ত গাড়িতে করে পদযাত্রায় অংশ নেয়।

    তখন পর্যন্ত বিপ্লব রক্তপাতহীন ছিল। কিন্তু এই করুণ-কৌতুকের পটভূমি যথেষ্ট রক্তাক্ত ছিল। হাজারো শ্রমিক গণহত্যার সম্মুখীন হয়েছিল। শ্রমিকরা সহিংসতা শুরু করেনি। তারা কেবল কাজ হারিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছিল। কারণ পর্যাপ্ত লাভ করতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যাক্টরি মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে দেয়। শান্তিপূর্ণভাবে ফ্যাক্টরি চালাতে দিলেই বরং সত্যিকারের রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হত। সেটা করতে দেওয়া হয়নি। বরং শ্রমিকদের উপর সংঘটিত সহিংসতা চালানো হচ্ছিলো যা এমনকি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইন কানুনের খেলাপ। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাঁধা দেওয়া হচ্ছিল, যা কিনা পুঁজিবাদীরাও করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা দেশের কারখানার চাকা চলমান রাখতে চেয়েছিল যাতে শ্রমিকদের জীবিকা অর্জনের উপায় থাকে। তাহলে হয়ত দেশের অর্থনীতিও পঙ্গু হয়ে পড়বে না।

     

    ক্ষমতা গ্রহণের পর মুসোলিনি নতুন রাজত্বে সকল ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে গণহারে সহিংসতা চালায়। ফ্যাসিবাদের বিজয়কে কোনভাবেই বিপ্লব তো বলা যাবেই না, এমনকি তা রক্তপাতহীনও নয়। এটি পূর্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত শাসন ব্যবস্থার থেকে কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। সেকারণেই সব সময় রক্ত ঝরানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিপ্লবী জনগণের প্রতিরোধ ছিল নিরস্ত্র। ফলে সহিংসতা ঘটানোর জন্য অনেক রক্তপাতের প্রয়োজনই হয়নি। কিন্তু অসংখ্য নারী-পুরুষকে সারা জীবনের জন্য জেলে বন্দী করা তলোয়ারের আঘাতে রক্তাক্ত করার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। পাশাপাশি, জনসাধারণের একটি অংশের কথাও মাথায় রাখা জরুরি যারা হত্যা এবং গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

    ছবি: মুসোলিনির প্রোপাগান্ডা পোস্টার

    এবার জার্মানির প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। হিটলার ‘সাংবিধানিকভাবে’ ক্ষমতায় এসেছেন এই ভ্রান্তি দূর করা দরকার। কিংবদন্তি চরিত্র সম্পর্কে এ ধরনের বয়ান স্বাভাবিক। প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে হিটলারের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। সে সংবিধান লঙ্ঘন করেনি। তার কর্মচারী এবং পৃষ্ঠপোষকেরা তার জন্য এ কাজটি করেছিল। সে ওয়েইমার সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ক্ষমতা গ্রহণকে উদযাপন করেছিল। যা কিনা ইতোমধ্যেই জুনকার-মিলিটারিস্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ পরিচালিত ‘রিপাবলিকান সরকার’ ধ্বংস করেছিল। জার্মানিতেই ইতালির মতোই পুঁজিবাদীদের মদদপুষ্ট অর্থপ্রাপ্ত এজেন্টদের দ্বারা ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের বিনা প্রতিরোধেই তারা সফল হয়। তারা যে জনপ্রিয় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল তা রাষ্ট্রীয় দমননীতির দ্বারা মুখ থুবড়ে পড়ে এবং এর মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। ক্ষমতায় যাওয়ার এই পন্থার সঙ্গে সহিংসতার গল্প জড়িয়ে রয়েছে। এই সহিংসতা তারা ঘটিয়েছে যারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের শত্রু হিসেবে স্বীকৃত, শুধুমাত্র তাদের সাথে যোগসাজশই নয়, বরং তাদের থেকে প্রকৃত সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

    হিটলার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিজয়ী হয়ে সরকার প্রধান হয়। ফলে, সে ছিল জনগণের পছন্দ। সে ক্ষমতায় এসেছে ‘জনপ্রিয় সমর্থন’ পেয়ে। এই সত্য কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? এর ব্যাখ্যা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই রয়েছে। হিটলারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে ১৯৩৩ সালে যে নির্বাচন হয়েছে তা লজ্জাজনক একটি ঘটনা। সে ইতোমধ্যেই হিন্ডেনবার্গের অনুগ্রহে চ্যান্সেলর হয়েছিল, যা কিনা জার্মানির সামরিকতন্ত্রী শাসকের প্রতিনিধিত্বকারী। ফলে এই মহানায়ক এমন সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন যেখান থেকে তিনি সুকৌশলে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পথ তৈরি করতে সক্ষম ছিলেন। তারপরেও সে পরাজিত হয়েছিল।

    একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল দুটো শ্রমিক পার্টি। এই দুই পার্টি সম্মিলিতভাবে আগের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এই দুই দলকেই ‘আইনি’ দমন এবং বেআইনি সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে উধাও করার পরই নতুনভাবে আবার নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তখনও ‘সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক’ পার্টিকে নামেমাত্র টিকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং কাজ করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিকে পুরোপুরি দমন করা হয়েছিল। এটা সে সময় ঐ দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পার্টি যাদের সংসদে ১০০টির মত সিট ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির উপর দমনপীড়ন এটাই প্রমাণ করে যে ফ্যাসিস্টদের ‘গণতান্ত্রিক বিজয়’ মঞ্চস্থ করতে গেলে তার পূর্বেই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে হবে। সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট নেতাদের প্রত্যেকে ছিলেন হয় জেলে, নয়তো লুকিয়ে। এই দলের সদস্যরা ফ্যাসিবাদীদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের সম্মুখীন হয়েছিল। এমনকি সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরাও সমান আতঙ্কিত ছিল। পোলিং বুথগুলো ফ্যাসিবাদী গুণ্ডাদের নজরদারির আওতায় ছিল। ফলে, সাধারণ মানুষের জন্য কমিউনিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট যে কোন পার্টিকে ভোট প্রদানই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অনেকে ভোটই দেন নি; অনেকে নিজের পছন্দের দলকে ভোট দিতে পারেন নি। যারা ফ্যাসিবাদিদের ভোট দিয়েছেন তাদের অনেকেই চাপের মুখে বা ভয়ে ভোট দিয়েছেন। অসংখ্য কমিউনিস্ট ভোট দিতে যেতে পারেন নি কারণ তারা লুকিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে যারা হিটলারকে ভোট দিতে চাচ্ছিলেন না তাদেরকে নাৎসি সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বিরোধীদলীয় পত্রিকাগুলোকে দমন করা হচ্ছিল, তাদের প্রচারমূলক লেখাপত্র বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল, তাদের সভাগুলো ভাড়াটে গুন্ডার দ্বারা পণ্ড করে দেওয়া হচ্ছিল, তাদের সমর্থকদের নিজের পছন্দে ভোট দেওয়া আটকানো হচ্ছিল অথবা ভোটে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই যেন ফ্যাসিবাদের প্রচারণা যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

    এমতাবস্থায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। এই পরিবেশে অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচনের’ ফলাফল কোনভাবেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় না। এরকম লজ্জাজনক নির্বাচনও হিটলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। ফ্যাসিবাদীরা ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পায় নি। এই ফলাফল আবারও সকল ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশেরই কেবল প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভোটারদের একটি বড় অংশই কেন ভোট দিতে পারে নি।

    অন্যদিকে সীমাহীন নিপীড়ন, কঠোর পরিশ্রম, নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেও কমিউনিস্ট পার্টি সংসদে পূর্বের ১০০টির থেকে ৮০টি সিটে বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে, এই বিজয়কে প্রকৃত বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ভোট হলে তারা অনেক বেশি ভোট পেতে পারত। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হিটলারের ভাগ্যে অসম্মানজনক পরাজয়েরই সম্ভবনা বেশি। তুলনামূলক স্বাধীনতায়ও কমিউনিস্ট পার্টি যে অসাধ্য সাধন করেছে তা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, এই অসম প্রতিযোগিতায় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও আগের থেকে ভাল ফল করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি, সোশ্যাল-ডেমক্র্যাট এবং অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছোট কতক দল মিলে নতুন সংসদের প্রায় অর্ধেক আসনে বিজয়ী হয়। বিজয়ীরা এরকম সংসদের মুখোমুখি হতে চায়নি। ফলে নতুন উদ্যমে আরও সহিংস পথ তারা বেছে নেয় ভিন্নমত দমন করতে। গণতন্ত্রের সর্বশেষ চিহ্ন বাতিল করে ‘সাংবিধানিক একনায়কত্বের’ পথ বেছে নেয়। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত ৮০ জন জনপ্রতিনিধিকে সংসদে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই ৮০ জন জনপ্রতিনিধি এমন ৪০ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিল যারা সংগঠিত সন্ত্রাস মোকাবিলা করেও ভোট দিয়েছিল। আরও অনেকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিনিধিদের ভোট দিতে পারেন নি। সোশ্যাল ডেমক্র্যাটদের একটা বড় অংশের প্রতিনিধিরাও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিজেদের সংসদে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। ফলে যে সংসদ হিটলারকে একনায়ক ক্ষমতা প্রদান করেছিল তা ৭০ শতাংশেরও বেশি নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিনিধিত্ব করে না। এমনকি নির্বাচকমণ্ডলীর যে একটি অংশ ফিরে এসেছিল তাদের অনেকেই হিটলারকে ভোট দেয়নি। ফলে, ফ্যাসিস্টরা তখনই ক্ষমতায় এসেছিল যখন কিনা তারা কোনভাবেই ৩৫ শতাংশ নির্বাচক মণ্ডলীর ভোট পায়নি। এটিই হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’-ভাবে ক্ষমতায় আসার সত্য উদঘাটন করে।

    হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’ বিজয়ের সত্য আরও একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে। ১৯২৮ সালের পর থেকেই নির্বাচনে ফ্যাসিস্টদের ভোট ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু হিটলারের ‘সাংবিধানিক একনায়কত্ব’ লাভের মাত্র কয়েক মাস আগের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা একটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হন। হঠাৎ করেই নাৎসিরা প্রায় বিশ লাখ কম ভোট পায়। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী করা আন্দোলন তার চূড়ান্তে রূপ লাভ করেছে এবং খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে। অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণিও ফ্যাসিস্টদের প্রতি তাদের বিশ্বাস হারানো শুরু করেছে। তারা নাৎসিদের মিথ্যাচার এবং ধাপ্পাবাজি ধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। পূর্ববর্তী নির্বাচনে নাৎসিরা বেশ কিছু প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে। তারা মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটারদের প্রতিশ্রুত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনুসরণীয় নেতাদের আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েছে, পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা না পেলে চলমান আন্দোলন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তারা এবং তাদের বেশি কথা বলা লেফট্যান্যান্টরা সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নিতে পারছে না, অন্যদিকে বিপ্লবী শ্রমজীবীরা রাস্তায়। ফলে বুর্জোয়া বুঝতে পারে এখনি সময় তাদের নায়কদের ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলার।

    বৃদ্ধ হিন্ডেনবার্গকে নির্দেশনা দেওয়া হয় তাঁর সমস্ত বংশ মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এমন একজনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যে কিনা নির্বাচনে খুব বেশি ভাল করতে পারেনি, এমনকি সংসদেও খুব অল্প সংখ্যক আসনের প্রতিনিধিত্ব করছে। হিটলারের ক্ষমতায় আবির্ভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের সমর্থনের মধ্য দিয়ে ঘটেনি, বরং একজন উদ্ধত ফিল্ড মার্শালের ইচ্ছায় ‘শঠ বোহেমিয়ান ড্রিল সার্জেন্টের’ অনিচ্ছাকৃত অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে ঘটেছে। অতঃপর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে অধিকাংশের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সে ক্ষমতায় গিয়েছে। হিটলার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নাটক মঞ্চস্থ করতে সকল ধরনের বৈধ এবং অবৈধ নিপীড়ন কৌশল ব্যবহার করেছেন। সভ্যতার ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ কাজ রাজনৈতিক কারণে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছে সে। এই অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মূল করার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করতে। কারণ সেসময় কমিউনিস্ট পার্টিই একমাত্র সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম ছিল। নাৎসিরা রাইখস্টয়াগ ভবন পুড়িয়ে দেয়।১ অগ্নিসংযোগের এই ঘটনাটিই ছিল ‘রক্তপাতহীন বিপ্লবের’ সূচনা সংকেত।

    হিটলার রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর ঘটনাকে ঈশ্বরের ইশারা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। ঐশ্বরিক অনুমোদনের মাধ্যমে সকল ভিন্নমত দমন করেছিল। তারপরেও, অধিকাংশ মানুষ তাকে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ঈশ্বর হয়ত এই আধুনিক মোজেসকে সাহায্য না করতেও পারতেন, কিন্তু বুর্জোয়ারা তাদের নায়ককে মহিমান্বিত করতে পাশে ছিল। তাদের কৌশল হিসেবে যে কোন উপায়ে হিটলারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করতে চেয়েছিল যাতে করে সে তার প্রতি অর্পিত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার মধ্য দিয়ে ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ আনা হয়েছিল এবং তার ফলাফল ছিল সবথেকে রক্তক্ষয়ী। বুর্জোয়া পৃষ্ঠপোষকতায় স্বৈরাচারী ক্ষমতা বাড়িয়ে পূর্বসূরি ইতালির মুসলিনির মতোই হিটলার তার প্রভুদের মর্জিমত চলা শুরু করে।

    ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ মানবজাতির মহৎ অর্জন ধ্বংস করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল। “জার্মানি একটি দুর্দান্ত এবং অবিশ্বাস্য মাত্রায় একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি করছে। বিংশ শতাব্দীর জার্মানির জাতীয় সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত শিক্ষামূলক পরিবেশনার সমান্তরাল হিসেবে প্রাথমিক মধ্যযুগীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করতে হবে”। (Robert Briffault, “The Nationalist Crazee in Culture” in the Curent History”, New York, August 1933)। একইরকমভাবে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেকজন বিশিষ্ট চিন্তক লিখেছেন: “সকল বিদেশি সমালোচক ফ্যাসিস্ট ইতালির অনন্য শিল্পকর্ম এবং সাহিত্যের বন্ধাত্ব নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন”।

    আধুনিক সংস্কৃতির প্রতি ফ্যাসিবাদের শ্ত্রুতা এক কথায় হিংস্র। এটি নিছক বর্বরতার দিকে ধাবিত হওয়াকেই প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্যাসিবাদের এই চরিত্র সভ্য সমাজে চরম বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। এটি এমনকি তাদেরকেও হতবাক করে যারা কিনা ফ্যাসিবাদের মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারেও আপত্তি জানায় না, যেমন- শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সীমাহীন সহিংসতা ঘটানো। পুঁজিবাদের নড়বড়ে কাঠামোকে মজবুত করতে এই সহিংসতাগুলোই ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

    যারা নিজেদের ‘অতিমানব’ রূপে উপস্থাপন করে রক্তপাতহীন বিপ্লব সাধনের অলৌকিক কৃতিত্বের দাবি করে, তাদের প্রসঙ্গে পক্ষপাতহীন প্রামাণ্য উদারপন্থী মতামত উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট।

    “জার্মানি বর্তমানে মাদকাসক্ত, খুনি, চোর, জালিয়াত এবং নৈতিক স্খলনযুক্ত মানুষ দ্বারা শাসিত হচ্ছে। নিছক গালাগাল করার জন্য এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না; এগুলো বরং নাৎসি আন্দোলনের বেশিরভাগ নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা দিতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত শব্দ।” (“The Nation”, New York, August 2, 1933).

    “অপরাধের মাত্রা এত বেড়ে গিয়েছিল যে প্রতিরোধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। সভ্য মানুষ অবিশ্বাসে হতবাক হয়ে পড়েছিল। লাখো জার্মানির পরিণতি কল্পনা করাও দুষ্কর, যারা কিনা এই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্মাদনার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অতি সভ্য ও অতি বুদ্ধিমান ছিলেন।” (Harrison Brown, “Six Month of Hitlerism”, Ibid)। এই ইংরেজ সাংবাদিক জার্মানিতে প্রায় চার বছর বসবাস করেছেন। তাঁর মতে, নাৎসিদের যুদ্ধ প্রচারণা মাত্রা ছাড়িয়ে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, বৈধভাবে কোন শান্তিবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়াও (!) শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়েছিল—যেমন, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড। জার্মানির বিখ্যাত লেখক কার্ল ভন ওসিয়েটজ্‌কি কেবল শান্তিকামী হওয়ার কারণেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কারাভোগ করেছেন। এইতো গেল বছর তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার লাভের পরেও তিনি কারান্তরীণ, প্রকাশ্য আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত।

    একজন উদারপন্থী আমেরিকান সাংবাদিক ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মানির সাধারণ জনগণের উপর চলা অন্যায় এবং দুর্দশা দেখে, সাধারণ জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে লিখেছেন: “রাইখস্ট্যাগ ঘিরে ধর্মের মত যুদ্ধ-পূর্ব সামরিকবাদ এবং নৃশংসতার উত্থান ঘটতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি একটি জাতিকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে আধা-ভৌতিকভাবে মিলিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠী অতিমানবের কাছে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়। অতিমানবদের কাছে এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অপ্রতিরোধ্য হিসেবে প্রতীয়মান এবং এদের কাছে ইহুদি, অধ্যাপক, শান্তিবাদী, সমাজতান্ত্রিক, র‍্যাডিকাল, উদারপন্থী, এবং গণতন্ত্রী প্রত্যেকেই ঊন-মানুষ।” (John Gunther, “The Nation”, New York, June 7, 1933)।

    ব্যাভারিয়ার প্রাদেশিক সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ফ্রিটজ শেয়ের, যিনি কিনা বর্তমানে একজন ফ্যাসিস্ট প্রো-কন্সুলের দ্বারা স্থানান্তরিত হয়েছেন, তিনি একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে তাঁর সাবেক সহকর্মী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বরাবর লিখেছেন: “অধিকার এবং ন্যায়ের কিংবা আইনশৃঙ্খলার কোন চিহ্নই রাখা হয়নি। ঐশ্বরিক এবং মানবিক সকল ধরনের অধিকার পদদলিত হচ্ছে। অধঃপতিতরা নিজেদের জার্মানির নৈতিকতার পুনর্জন্মদাতা বলে দাবি করে, অথচ বাস্তবে তারা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে এবং বন্য প্রাণীর মতো তাদের অহংকারী প্রবৃত্তি চরিতার্থ করেছে।” ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে দৈনন্দিন ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে মত প্রকাশের জন্য, ড. শেয়েরের বিচার করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

    “এটি একেবারেই স্পষ্ট যে, বর্তমান জার্মান সরকার পাশবিক এবং প্রগতিবিরোধী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগাতে প্রস্তত যা কিনা জার্মান সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক এবং মূল্যবান।” (The New Republic”, New York, April 26, 1933)। এই উদ্ধৃতিটি একটি বেনামে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে। লেখক ভয়ে তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। সত্য বলার অপরাধে বর্বর ফ্যাসিস্টদের প্রতিশোধের মুখে পড়তে পারেন এই ভয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপক নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন। সত্যকে এমন সন্ত্রাসী কায়দায় ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছিল যে সিস্টেমের নাগালের বাইরে পালিয়ে যাওয়া জার্মানরা পর্যন্ত সত্য বলতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ তাদের অনেকের বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজন তখনও জার্মানিতে বসবাস করছে। প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তারা এই মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করত। সাধারণত ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনকে জিম্মি করে দেশের বাইরেও তাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করত।

    ছবি: মুসোলিনি ও হিটলার, ১৯৩৭

    রক্তপাতহীন বিপ্লবের বর্বর সহিংস অনুশীলন এতটাই তীব্র ছিল যে, ‘অতিমানবদের’ মধ্যেও ব্যতিক্রমী কিছু ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ উস্কে দিচ্ছিল। এদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভদ্রতা অবশিষ্ট ছিল। কাউন্ট ভন রিভেন্টলো নামের একজন ব্যক্তিকে হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় “ট্রেড ইউনিয়নের কর্মচারীদের টেনে হিছড়ে নাৎসিদের প্রধান কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এই কর্মচারীদের ভেতরে নারীও ছিলেন। তাদের মারধর করা হয় এবং নারীদের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করা হয় যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।”

    আধুনালুপ্ত প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এটির প্রথম চ্যান্সেলর, ফিলিপ শেইডম্যান প্রাগে নির্বাসিত অবস্থায় লিখেছিলেন, “হিটলারের বার্লিন হল অগ্নিসংযোগকারী টর্চের মত যেখানে অপরাধী এবং একদল উন্মাদ গানপাওডারের পিপা নিয়ে খেলছে।” (“The Times”, London, end of June 1933)। এই মত প্রকাশের অপরাধে বেশ কয়েকজন নারীসহ শেইডেনের পরিবারের যারা তখনও জার্মানিতে অবস্থান করছিল তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে কমিউনিকেডো নামের বন্দি শিবিরে রেখে তাদের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যাচার চালানো হয়। বয়স কিংবা লিঙ্গের বাছ- বিচার ছাড়াই ‘অপরাধী এবং মানসিকভবে উন্মাদ’ ব্যক্তিদের দ্বারা হিটলারীয় কায়দায় এই বর্বরতা চালানো হয়েছিল।

    এডলফ হিটলার জীবনীকারদের জন্য হতাশা উদ্রেককারী। একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতার জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করা সবথেকে কঠিন। কিন্তু সেই নেতা যখন আধা-উন্মাদ, ক্ষমতাধর, সেই ক্ষমতা যখন সে অন্ধ উন্মাদনার দ্বারা আরও বাড়াতে চেষ্টা করে; যখন সে একইসাথে অস্তিত্বহীন এবং ত্রাণকর্তা; তার আচরণ যখন সাধারণ থেকে শুরু করে ভয়ঙ্কর পর্যন্ত বিস্তৃত, একইসাথে বিরক্তিকর এবং মহৎ, অর্বাচীন থেকে শুরু করে আবেগপূর্ণ; যখন সে বাইরের অন্ধকার থেকে উঠে আসা ভুতুড়ে কণ্ঠস্বর শুনতে পায় এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তখন জীবনীকারদের কাজ শুধু কঠিন নয় অসম্ভব হয়ে ওঠে।” (The New Republic”, New York, June 10, 1936)।

    “যখন কেউ একজন নেতার বক্তব্য শোনে, সে বুঝতে পারে যে রোগাক্রান্ত মনের সান্নিধ্য অনুধাবন করতে পারে। গত জুনের ঘটনা (তাঁর একসময়ের বিশ্বস্ত লেফট্যান্যান্টদের হত্যাকাণ্ড) আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে সে নিপীড়নকারী এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ একজন মানুষ। একটি মহান এবং অতি সভ্য একটি জাতি এমন একজন ব্যক্তির করুণা প্রার্থী যে কিনা স্নায়বিক অস্থিরতাক্রান্ত, পরিকল্পিতভাবে ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। পরামর্শদাতা হিসেবে একজন ব্যক্তিই তার পাশে থেকে তাকে পরিচালিত করতে পারে, সে হল গোয়ারিং। গোয়ারিং তার নিজের রেকর্ডেই হিটলারের থেকে বেশি নিষ্ঠুর এবং আরও বেশি বেপরোয়া।” (The New Statesman and Nation”, London, August 14, 1934)।

    “ফ্যাসিবাদ হল যুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; সহিংসতা, আবেগ এবং গভীর আসক্তির প্রতি আহবান। এর ফলাফল অতি আবশ্যকভাবে নিষ্ঠুরতা, উন্মাদনা এবং গুন্ডাগিরি।” (Robert Dell, “Germany Unmasked”)। বিভিন্ন অফিশিয়াল প্রকাশনার উদ্ধৃতিসমূহ ঘেঁটে লেখক এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মি. ডেল দেখিয়েছেন কিভাবে নাৎসিরা অনেক সময় নিষ্ঠুরতাকে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করত এবং কখনও কখনও ‘ইহুদি মিথ্যাচার’ হিসেবে নিন্দা করত। সত্যিকার অর্থে নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো কোন দূর্ঘটনা তো নয়ই বরং যুক্তিসঙ্গত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত নাৎসি নীতিরৈ অংশ। রক্তপাতহীন বিপ্লবের সবথেকে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গান হল: “ছুরি থেকে যদি ইহুদির রক্ত পড়ে, তাহলে আমরা দুইবার করে মার্চ করব”।

    হিটলারের জীবনীগ্রন্থে কর্তৃত্বমূলকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফ্যাসিবাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হল দূর্বলের ধবংস এবং সবলের জয়। সামাজিক ব্যাধির ফ্যাসিবাদী ঔষধ হল ইহুদিদের ধ্বংস এবং জোরপূর্বক পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখা। এর রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো অস্ত্রশস্ত্র বৃদ্ধি এবং বিজয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। “উপনিবেশগুলো ক্ষমতার অধিকারে অধিগ্রহন করা হয়েছিল। ইউরোপের দরকার ছিল কাঁচামাল এবং উপনিবেশ। যেখানে জীবনের এক বীরত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে শ্বেতাঙ্গরাই শাসন করার জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শাসক জাতি যদিশান্তির ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, উপনিবেশগুলোকে নিজেদের শাসন করতে অনুমতি দেয়, তাহলে তারা বলতে পারে ‘আমাদের এখানে ইউরোপের আর কোন দরকার নেই’।’’ (Hitler at the Conference of university Students, Munich, January 26, 1936)।

    নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে, হিটলার ইতিহাসে একজন দক্ষ বাগ্মী জননেতা এবং একজন সুযোগসন্ধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করবেন, যিনি কোন নীতি জানেন না। তার মতে, জনগনকে শাসন করার সবথেকে কার্যকর পদ্ধতি হল তাদের প্রতারিত করা। তার শাসনের নীতি হল একই স্লোগান বারবার উচ্চারণ করতে থাকা ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণে জনগণ তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। “তার জীবনের দর্শন যুদ্ধের পূর্বে ভিয়েনায় কাটানো তার ভবঘুরে জীবনের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত। তারপর আর কোন বিকাশ হয়নি; কেবল নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছে। প্রায় বিশ বছর ধরে তার কোন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যা হয়নি। তার রাজনীতি করার ধরন খুবই অদ্ভুত। অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা, শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের বোকা জ্ঞান করা, তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করাটাই যেন স্বাভাবিক তার কাছে। সাধারণ রাজনীতিবিদদের যে জিনিসগুলো আক্রান্ত করে হিটলারকে তা করে না। অন্যায় কিংবা বৈষম্য নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই। সেনাবাহিনী, পুঁজিবাদী এবং সামন্তপ্রভু এই তিন গোত্রের কাছে সে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। দুর্বল এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এরকম প্রতিটি কাঠামো সে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। গণতান্ত্রিক সভ্যতার মৌলিক নীতিসমুহ প্রত্যাখ্যান করে সে জার্মানির আদি গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল যেখানে সবলেরা শাসক আর দুর্বলেরা প্রজা।” (Rudolf Olden, “Hitler”)।

    পরিশেষে একটি সাম্প্রতিক বই থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হল। বইটির লেখক ষোল মাস জার্মানিতে অবস্থান করে ‘নিরপেক্ষভাবে’ পরিস্থিতি তদন্ত করেছেন। হিটলারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে সে ব্যাপারে সতর্ক করে তিনি লিখেছেন: “সে নিজেকে একজন ক্রুসেডার মনে করে যে কিনা গোটা মানব জাতিকে রক্ষা করতে এসেছে। ফলে সে যখন বলশেভিকদের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষার ব্যাপার নিয়ে কথা বলে নিজেকে মহিমান্বিত মানুষ ভেবে আত্মতুষ্টি পায়।” (Stephen H. Roberts. “The House that Hitler Built”)। হিটলার জনসম্মুখে বক্তৃতা দেওয়ার সময় পাগলের মত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ত, কাঁদত অথবা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এ ব্যাপারে বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক রবার্ট, হিটলার সম্পর্কে গোয়ারিং এর করা মন্তব্য উদ্ধৃত করেন: “কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই আমরা হিটলারকে কাঁদতে দেখেছি।” সব ধরনের অসংযত আচরণের কথা মাথায় রেখে রবার্ট গোয়েবলসকে ইউরোপের সবথেকে বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। “কারণ এই লোকটি মানবিকতাকে অগ্রাহ্য করেও সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দায়িত্বপ্রাপ্ত। শারীরিক ত্রুটি থেকে সৃষ্ট তীব্র বিরক্তি এবং নির্যাতনের শিকার স্নায়ুতন্ত্রের অসুবিধার কারণেই হয়ত মানবতার প্রতি তার এক ধরনের অবজ্ঞা রয়েছে। সব সময়ই তার মধ্যে তিক্ততা ভর করে থাকত। পুরো জার্মানি জুড়ে কাউকেই তার ব্যাপারে মমতা নিয়ে কথা বলতে শুনিনি”। (প্রাগুক্ত)

     এমন ‘অতিমানবেরাই’ আজ জার্মানির ভাগ্য বিধাতা। তাদের মত ইতালি এবং অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতেও শাসন চলছে। সমগ্র ইউরোপ এই বর্বর উন্মাদ ধর্মপ্রচারকদের অধীনে আসবে না, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। আজকের দিনে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা ইউরোপীয় সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হিটলার সেই জঘন্য প্রেতাত্মার প্রতিনিধি। “হিটলার এমন একটি প্রপঞ্চ যাকে কেউ হত্যা করে অথবা যার দ্বারা কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।” (Konard Heiden, “Hitler”)।

  • এম এন রায়  || ফ্যাসিবাদ

    এম এন রায় || ফ্যাসিবাদ

     

    ফ্যাসিবাদ আচানক আবির্ভূত হয়নি।

    ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ চিন্তাচর্চারই ফল এই মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।

    ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে, যে দর্শন অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।

    প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এম এন রায় ফ্যাসিবাদের দর্শন ও অনুশীলনেরই আকর অনুসন্ধানই করেছেন। গেল শতকের তিরিশের দশকে ভারতে ফেরার পর গ্রেপ্তার হন এম এম রায়। কারাগারেই লেখেন ফ্যাসিবাদ নিয়ে লেখেন ‘ফ্যাসিবাদ: প্রতীতি, প্রতিজ্ঞা, প্রয়োগ’ গ্রন্থটি। ১৯৩৮ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি থেকে।

    গ্রন্থটিতে সাতটি অধ্যায়। পুরো গ্রন্থটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয় অরাজ। এরই মধ্যে অনুবাদ শেষ পর্ষায়ে। গ্রন্থটির চারটি অধ্যায় অরাজের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত করা হল।

    লেখাগুলো পড়তে লিংকে ক্লিক করুন:

    ১৷ ফ্যাসিবাদের দর্শন

    ২. অতিমানবের কৌলিকতা

    ৩. জাতীয় সমাজতন্ত্র

    ৪. রক্তপাতহীন বিপ্লব

  • আওয়ামী জমানার ‘ফ্যাসিবাদ’ : কাঠামো ও প্রবণতা

    আওয়ামী জমানার ‘ফ্যাসিবাদ’ : কাঠামো ও প্রবণতা

    • সহুল আহমদ

    Fascism is a set of ideologies and practices that seeks to place the nation, defined in exclusive biological, cultural, and/or historical terms, above all other sources of loyalty, and to create a mobilized national community.- Kevin Passmore[mfn]Kevin Passmore, Fascism: A Very Short Introduction, Oxford University Press, 2014[/mfn]

    আওয়ামীলীগের বিগত পনের বছরের শাসনামলকে স্বৈরতন্ত্র, ইলেক্ট্রোরাল অটোক্রেসি, হাইব্রিড রেজিম ইত্যাদি নানা বর্গে চিহ্নিত করা হলেও, বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক পরিসরে এই রেজিমকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলেই চিহ্নিত করা হয়।

    ৫ আগস্টের আগে ‘ফ্যাসিবাদি’ বলে কেবল আওয়ামী-রেজিমকেই চিহ্নিত করা হলেও, ৫ আগস্টের পরপর সেটা হরেদরে সবার বিরুদ্ধে দাগানো হচ্ছে। আওয়ামীলীগকে তো বলা হচ্ছেই, তেমনি আওয়ামীলীগের ফেসবুক পেজ থেকে উল্টো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমেও একে অপরের বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদ’ কায়েমের অভিযোগ তুলছেন হরদম। এমনকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ে ছিলেন—এমন ব্যক্তিরাও মতের মিল না হলে একে অপরকে ফ্যাসিবাদী বলে তকমা দিচ্ছেন। যেমন, চিন্তক ফরহাদ মজহারের সমালোচনা করতে গিয়ে সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক সালাহ উদ্দিন শুভ্র যে মন্তব্য করেন সেটাকে এই শব্দের এমন হরেদরে ব্যবহারের উদাহরণ হিসাবে পাঠ করা যায়: ‘ফরহাদ মজহার গঠন, জনগণ ইত্যাদি নানা ধরনের শব্দ দিয়ে চিন্তার একটা ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চান। এগুলা ভেঙে দিতে হবে’। (২৬ অক্টোবর, ২০২৪)

    অরওয়েল ১৯৪৪ সালে ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক রেটরিক হিসাবে এর অস্পষ্টতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন,  For if you examine the press you will find that there is almost no set of people — certainly no political party or organized body of any kind — which has not been denounced as Fascist during the past ten years.[mfn]George Orwell, ‘What is Fascism?’, Tribune, 1944 (https://www.orwell.ru/library/articles/As_I_Please/english/efasc)[/mfn] বাংলাদেশে বর্তমানে এই পরিস্থিতি হাজির রয়েছে।

    হরেদরে ‘ফ্যাসিবাদী’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দেওয়ার ফলে আওয়ামী-রেজিমের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী হওয়ার যে অভিযোগ, সেটাই লঘু হয়ে যাচ্ছে।

    আবার, আওয়ামীলীগ বা ছাত্রলীগের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত যে আলাপ বা বাহাস চলছে, সেখানেও রেফারেন্স বিন্দু হিসাবে আছে ইউরোপের ফ্যাসিবাদ। ইউরোপে ফ্যাসিবাদকে ন্যাস্যাৎ করা হয়েছে, তাদের সকল চিহ্নকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ফলে এখানেও করতে হবে একই তরিকায় – অনেকটা এই তরিকার যুক্তি।

    ইউরোপের ফ্যাসিবাদ, নাজিবাদ, গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধ ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে বেশি আলাপ করেছেন শাহরিয়ার কবির ও মুনতাসীর মামুন। তারা দুজনেই আওয়ামী লীগের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতনের অন্যতম স্তম্ভ।  ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের সাথে জামায়াতের সম্পৃক্ততার কারণে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে যুক্তি তারা দিতেন, বা জামায়াতকে নিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তারা তৈরি করেছিলেন সেটাও ছিল একই তরিকায় ইউরোপের নাজিবাদ/ফ্যাসিবাদের রেফারেন্স ধরে। বর্তমানে যারা একই ইউরোপের রেফারেন্সে ফ্যাসিবাদ নিয়ে আলোচনা করছেন, তারা মারাত্মকভাবে – সচেতন বা অবচেতনভাবে – মুনতাসীর মামুন বা শাহরিয়ার কবিরদের লেখাপত্র দ্বারা প্রভাবিত।

    ইউরোপের ফ্যাসিবাদ বা নাজিবাদকে রেফারেন্স বিন্দু হিসাবে হাজির করে বাংলাদেশের ইতিহাসের সহিংস ঘটনা ব্যাখ্যার যে প্রবণতা এটা আসলে সমস্যাজনক। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির খণ্ডিত চিত্র হাজির হয়। শুধু ইউরোপের সঙ্গে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে এখানকার রাষ্ট্র ও সহিংসতার নানা মাত্রাকে লঘু করে ফেলা হয়। যেমন একাত্তরের জেনোসাইডকে কেবল নাৎসি জমানার জেনোসাইডের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেক স্থানিক বিষয় বাদ পড়ে। ধারণ করে একটা খণ্ডিত চেহারা। এই খণ্ডিত চিত্র আওয়ামী জমানা তাদের মতাদর্শিক অবস্থান তৈরিতে এস্তেমাল করেছিল।

    ফ্যাসিবাদ নিজে কোনো মতাদর্শ না, বরঞ্চ যে কোনো মতাদর্শের কাঁধে সওয়ার হয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে পারে। জাতীয়তাবাদী চিন্তার কাঁধে সওয়ার হওয়াই সর্বাধিক সহজ-প্রবণতা।

    আওয়ামীলীগের শাসনামলকে আমরা যেভাবে ফ্যাসিবাদী বলে থাকি, তার সাথে এই জমানার একাডেমির বহু লোক আসলে একমত হবেন না। তারা বরঞ্চ এই রেজিমকে ‘স্বৈরতন্ত্র’ বা ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ বা ‘অটোক্রেসি’ বা ‘হাইব্রিড রেজিম’ ইত্যাদি বর্গ দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন।

    ইউরোপের উদাহরণ দিয়ে আওয়ামী শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদ’ বর্গে ঢুকানোর করার কোশেশ আদতে খুব একটা ফলপ্রসু হবে না। হিটলারের নাজিবাদ বা স্ট্যালিনের কমিউনবাদ বা মুসোলিনির ফ্যাসিবাদকে অনেক বেশি ‘টোটালিটারিয়ানিজম’ বর্গের আওতায় ব্যাখ্যা করার চল আছে। হানা আরেন্টের যুগান্তকারী কাজটাকে বিবেচনায় নিতে পারি। ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও সতর্কতামূলক অবস্থান নেওয়া উচিত বোধ হয়। সম্প্রতি চিন্তক ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ আজমকেও ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দের ব্যবহার নিয়েও সতর্কতামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন :

    ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্তত শেষ এগার বছরের শাসনে ফ্যাসিস্ট শাসনের ও মতাদর্শের নানা উপাদান থাকলেও একে আসলে আধা-ফ্যাসিস্ট, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসন বলাই শ্রেয়। তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে দুটির উল্লেখ করি। প্রথমত, ফ্যাসিস্ট শাসনের ক্লাসিক উদাহরণগুলোতে (যেমন ইতালি ও জার্মানি) ইডিয়লজিকেল স্টেট অ্যাপারেটাসের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের মোটামুটি ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। বাংলাদেশে গত অন্তত বছর দশেকের বাস্তবতা বিশেষভাবে আলাদা। তথ্য-প্রমাণ বলছে, গত বার-তের বছরের মধ্যে যেকোনো সময় সাধারণ নির্বাচন হলেই আওয়ামী-বিরোধী শিবিরই ক্ষমতায় আসত। এ শাসন জনগণের মধ্যে মোটেই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিস্ট শাসনগুলোর, এমনকি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও (যেমন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়া), জনসম্মতির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনা, রাষ্ট্রের ও জনগণের উন্নতি, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং নীতি-নৈতিকতার প্রবলতা দেখা গেছে। আওয়ামী-রেজিমে এসব বস্তু বিন্দুমাত্রও লক্ষ করা যায়নি। দুর্নীতি ও লুটপাটই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। কাজেই একে ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসন বলে সম্মানিত না করাই ভালো।’[mfn]মোহাম্মদ আজম, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পটভূমিতে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪’, রাষ্ট্রচিন্তা, ত্রয়োদশ সংখ্যা, ২০২৪[/mfn]

    ফলে, আওয়ামী-শাসনামলকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’-এর ব্যবহারের কথা বলছি, তাকে বুঝতে হবে আসলে আমাদের কাঠামো ও প্রবণতার আলোকে। ইউরোপের ইতিহাস দিয়ে বুঝতে গেলে এটা মিসপ্লেসড হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মুখের কথা হিসেবে ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দ ব্যবহার এক কথা। কিন্তু এর বাইরে সরকারি সিদ্ধান্ত বা কোনো দল নিষিদ্ধের যুক্তি হিসেবে ইউরোপীয় অর্থে ‘ফ্যাসিবাদ’ ব্যবহার সরকারকে বিপদে ফেলবে। কেননা, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক কোনো মানবাধিকার সংগঠনই ইউরোপের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আওয়ামী জমানার পরিস্থিতির তুলনামূলক আলাপ ও যুক্তিকে আমলে নেবে না।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ বিষয়ক আলোচনা চালু আছে, আওয়ামী-শাসনামলকে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, তার চরিত্র ও গঠন গত শতকের প্রথম অর্ধেকের ইউরোপীয় অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের আলোকে বোঝা দরকার বলে মনে করি।

    দুইভাবে আওয়ামী রেজিমের ফ্যাসিবাদকে বোঝা যেতে পারে : একটা কাঠামোগত জায়গা থেকে, আরেকটা প্রবণতার জায়গা থেকে।

    বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠে চারটি উপাদানের মিথস্ক্রিয়াতে : ঔপনিবেশিক আইন, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ (কখনো সেটা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রূপ ধারণ করে) এবং নয়া-উদারনীতিবাদ।

    প্রথমত, বাংলাদেশের সকল আইন-কানুন, পেনাল কোড সবকিছু গভীরভাবে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করে চলছে। এখানকার আইন-কানুন যে ধারাবাহিকভাবে নাগরিকের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তাঁর মূল কারণ হচ্ছে এর সাথে লেপ্টে থাকা উপনিবেশের অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশে যে সংবিধান রচনা করা হয়েছিল সেটার ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো। যদিও, গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু চর্চার ক্ষেত্রে সবকিছু নজিরবিহীনভাবে একব্যক্তিকেন্দ্রিক। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা নানাভাবে ক্রিয়াশীল। কখনো ‘হাজার বছরের’ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আবার কখনো ‘নব্বইভাগ মুসলমানের দেশ’ এর বাঙালি+মুসলমান=বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। চতুর্থত, নয়া-উদারনীতিবাদ হয়ে গিয়েছে বাংলাদেশে বর্তমানের ‘উন্নয়ন’কেন্দ্রিক শ্লোগান এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে বিপরীতমুখী হিসেবে হাজির করার মতাদর্শিক হাতিয়ার।

    আওয়ামী-জমানার এই ফ্যাসিবাদকে ‘কাঠামো’র জায়গা থেকে বোঝার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গা থেকেও বোঝা দরকার। অর্থাৎ, কেবল সর্বাত্মক রাষ্ট্রপ্রণালীর জায়গা থেকে ‘ফ্যাসিবাদ’কে বুঝতে চাচ্ছি না, বরঞ্চ একে গণ-হিস্টেরিয়া হিসেবেও চিহ্নিত করছি; এর ব্যপ্তি একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত। এটা এক ধরনের উন্মাদনা। যে মানুষ সারাবছর যুক্তিশীল মানুষ হিসেবে পরিচিত তিনিও স্রেফ কোনো গুজবের পাল্লায় পড়ে এমন উন্মাদনার জোয়ারে গা ভাসাতে পারেন।

    এ ধরনের উন্মাদনা তথা ফ্যাসিবাদ আসলে সমাবেশ বা গণজোয়ারও বটে। দুটো প্রবণতা থাকে জোয়ারের মধ্যে : একদিকে বিদ্রোহ, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন চালানোর প্রকট বাসনা। এ জায়গা থেকে তেরো সালের দুটো আন্দোলন/সমাবেশ – শাহবাগ ও শাপলা- এর মধ্যে আমরা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখতে পাই।

    সহজ কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক পরিসরে যে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দের হরদম এস্তেমাল চলছে, তাকে এই দুটো জায়গা থেকে বুঝতে পারা জরুরি। কেবল তখনই বোঝা যাবে ‘ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ চাই’ বলে কী বোঝানো হচ্ছে? যখন আমরা ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ চাই বলছি, তখন কেবল মতাদর্শিক অবস্থানের ‘স্থানান্তর’ চাই না। বরং পুরো কাঠামোর একধরনের রদবদল, সংস্কার বা বিলোপ চাই।

    তবে, আওয়ামী-রেজিমকে কী নামে চিহ্নিত করবো, তা যেমন জরুরি, তার চেয়েও জরুরি হচ্ছে, এই রেজিমের কালে যে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ইনসাফ নিশ্চিত করা। পনের বছরের গুম ও ক্রসফায়ার ও জুলাই মাসের হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকারের মতো ব্যাপক সহিংস ঘটনার বিচার ও ইনসাফ কেবল সাধারণ আইন-আদালত ও বিচকা-প্রক্রিয়া দিয়েই সম্ভব হবে না। আমাদেরকে ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফ বিষয়েও আলাপ শুরু করতে হবে।

    বাংলাদেশে যে ধরনের সহিংসতা জুলাই-আগস্ট মাসে ঘটেছে, যে সামূহিক ট্রমার জন্ম দিয়েছে, তা লাঘব কেবল সাধারণ বিচার দিয়ে হবে না। মাস্টারমাইন্ডদের বিচার যেমন লাগবে, তেমন ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, স্মৃতি সংরক্ষণ, ট্রমা লাঘবকরণ, ট্রুথ-কমিশন তৈরি করা ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারণ, এই ধরনের সহিংসতায় কেবল দুয়েকজন ব্যক্তি জড়িত থাকে না, বরঞ্চ সমাজের এক বিরাট অংশ জড়িয়ে পড়ে। এগুলোকে কেবল ‘শাস্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ’ দিয়ে সমাধা করা যাবে না।

    প্রথম প্রকাশ (খসড়া) : প্রথম আলো, ২৪ নভেম্বর ২০২৪ 

  • গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    • সহুল আহমদ

    সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী-জনতা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও জুলুমবাজ স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। সহিংসতার মাত্রাকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের ইতিহাস, এমনকি তামাম দুনিয়ায় ইতিহাসে এত রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ঘটনা খুব কমই আছে। যেকোনো আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভ্যুত্থানে স্লোগান, পোস্টার, গ্রাফিতি ও গান জনগণের বাসনাকে ব্যক্ত করতে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এগুলোর ভাষিক কথকতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আর আশা-আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ও জোরালো চেহারায় ধরা দেয়।

    বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এর প্রায় প্রতিটি সংগ্রাম ও আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬—১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) গান ও কবিতা বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেটি ১৯৬০–এর দশক হোক, ১৯৯০–এর দশক হোক বা হোক এই ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব সময় নজরুল যেন নিত্যনতুন চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    সব শাসকগোষ্ঠীই কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিবাদী কবিতা ও গানকে নিজেদের মনমর্জিমতো নিস্তেজ করে রাখার নানা কূটকৌশল করেছে। কিন্তু জনতা যখনই তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন এই বিদ্রোহী কবির গান–কবিতাই হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়া জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রে দেখা যায়, স্বৈরশাসকের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দীরা সমস্বরে গেয়ে উঠছেন, ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট/ ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/ রক্ত-জমাট শিকল–পূজার পাষাণ-বেদী’।

    একই গানের লাইনগুলোকে এবারের রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের দেয়াললিখনেও হাজির হতে দেখা গেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে অন্যান্য জেলা শহরের দেয়ালে–দেয়ালে শিক্ষার্থীদের তুলির আঁচড়ে লেখা হয়েছে, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ কিংবা ‘বল বীর—/ বল উন্নত মম শির!’। কেবল দেয়াললিখনেই নয়, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে যোগাযোগের যত নিত্যনতুন তরিকা যুক্ত হয়েছে, সবখানেই ছিল নজরুলের সৃষ্টির সরব উপস্থিতি। যেমন ধরা যাক, ১৯৭১ সালে নজরুলের গানের এস্তেমাল দেখেছি সিনেমার জগতে, ১৯৯০ সালে দেখেছি গানের আসর বা দেয়াললিখনে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে রাজপথের দেয়ালের বাইরে ‘জেন–জি’ প্রজন্মের নতুন মাধ্যমগুলোও ছিল বহুল আলোচিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    টিকটক, ফেসবুক, রিলস, এক্স (সাবেক টুইটার) ইত্যাদির আবির্ভাবের পর গণপরিসরের বৈপ্লবিক গণতন্ত্রায়ন ঘটেছে। সমাজের বিপুল শ্রেণির মানুষের এমন অভাবিত অংশগ্রহণ মতামত উৎপাদনকারী ও ভোক্তা এই দুই বর্গের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে দিন দিন। সংস্কৃতিচর্চার যে গতি এ যাবৎ ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হতো, হালফিল জমানার ঘটনাবলি সেই গতির উল্টো যাত্রারও সাক্ষ্য দিচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে গিয়েছে, সেখানে নতুন এই পরিসর প্রতিবয়ান তৈরিতে মারাত্মক কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। শাসকগোষ্ঠীর চাপে মূলধারায় উপেক্ষিত ঘটনা বা বয়ান নতুন গণপরিসরগুলো তুলনামূলকভাবে ‘অসম্পাদিত’ কায়দায় তুলে এনেছে। এহেন ‘অসম্পাদিত’ জনপরিসরের বিপজ্জনক কিছু দিক নিয়েও আলোচনা চলছে। তবু মেনে নিতেই হবে যে এবারের আন্দোলনে এর বৈপ্লবিক প্রভাব ঠাহর করা গিয়েছে। দেয়াললিখনের মতো সাবেকি কায়দার চেয়ে আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দিতে দশ-বিশ সেকেন্ডের রিলস, ফেসবুক বা এক্সের পোস্টার অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই নতুন ‘সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রসারিত’ সিনেজগতেও নজরুলের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ ছিল সরব। শুধু সরবই নয়, এগুলোর অনেকাংশই ছিল নজরুলের এই গানকে কেন্দ্র করে।

    স্বাধীনতার আগে–পরের গণ–আন্দোলনে—যেখানে জনতা তাদের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, সেখানে সমসাময়িক ও সাবেকি সব কায়দা-কানুনের ভেতরে নজরুল কেন বারবার হাজির হন? এবার আমরা দেখেছি, প্রথাগত গণসংগীতের স্থান দখল করে নিয়েছে র‍্যাপ গান। তারপরেও, আমরা দেখছি, বিভিন্ন ব্যান্ড দলের মাধ্যমে নজরুল দিন দিন আরও বেশি ‘মেটালিক’ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু কেন?

    নজরুলের এই হাজিরানার কারণ নজরুলের সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনই পাওয়া যাবে গণ–আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি থেকেও।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুল–সাহিত্যের বিচারকালে কবি ও সমালোচক হুমায়ূন কবির তাঁর যে কয়টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছিলেন, তার মধ্যে আমাদের জন্য দুটি প্রসঙ্গ খুব জরুরি বলে মনে হয়। প্রথমত, নজরুল ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের কবি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বাংলার কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর কুটুম্বিতা। অসহযোগ আন্দোলনের কালে যে তাঁর ব্রিটিশবিরোধী তথা উপনিবেশবিরোধী চেতনার স্ফূরণ ঘটেছিল, সেটির ভাষিক সাক্ষ্য যেমন দিয়েছিল নজরুলের কবিতা, তেমনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম—যেমন লাঙ্গল—দেখলে কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর সহজাত সম্পর্ক ও রাজনীতি ধরা পড়ে। এমনকি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান বাসিন্দাদের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এবং কৃষকের আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও ধরা পড়ে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা থেকে।

    এই দুটি বৈশিষ্ট্য নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ অনুসন্ধানে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। অসহযোগ আন্দোলনে, যেখানে জনগণ আনুভূমিক কায়দায় রাজপথে অংশগ্রহণ করে, সেটি যদি হয়ে থাকে নজরুলের সাহিত্যের অন্যতম প্রেক্ষাপট, তাহলে যখনই জনতা নিজেদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন অবধারিতভাবে নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।

    অন্যদিকে, কমিউনিজম বা সাম্যবাদের প্রসঙ্গ তাঁর পত্রিকা ও কবিতায় বারবার এলেও সেটি কোনো জমাটবদ্ধ তত্ত্বের আদলে আসেনি, বরং এসেছে কৃষক–শ্রমিকসহ সব অবহেলিত ও নিম্নশ্রেণির মানুষের মুক্তির প্রতি কবির গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এ কারণে নজরুলের কবিতা কেবল শ্রেণি-রাজনীতির স্লোগানে পর্যবসিত না হয়ে বরং হয়ে উঠেছে যেকোনো মুক্তিমুখী রাজনৈতিক সক্রিয়তায় উচ্চারিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুলের সৈনিক জীবন—যাপন বা তাঁর জীবনের ‘সৈনিক’ পর্যায় তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে গভীর প্রভাব রেখেছে বলে সাহিত্য–সমালোচকেরা দেখিয়েছেন। ইনসাফের প্রশ্নে সদা অকুতোভয় এবং পুরোনোকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে বন্দী মানুষকে মুক্ত করে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠার বাসনার যে তীব্র প্রকাশ একের পর এক কবিতায় তিনি করে গিয়েছেন, তাতে তাঁর সৈনিকতার দিকটি স্পষ্ট। তিনি যে নেতা না হয়ে রাজপথের সৈনিক হতে চেয়েছেন, তাতে কোনো রাখঢাক ছিল না। তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সেবার নই, আমি যুদ্ধের। আমি সেবক নই, আমি সৈনিক।’

    নজরুলের এই সৈনিকতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই সৈনিকতা—যাকে আমরা তাঁর সাহিত্যে বিদ্রোহ বা বিপ্লব আকারে দেখি—তার মানে হচ্ছে, জনতার নিত্য সক্রিয়তা। তাঁর কবিতায় উপমার এস্তেমাল এবং একের পর এক যুদ্ধংদেহী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কাহিনি। তবে এই ‘ব্যক্তি’দের উপমা থেকে মনে হতে পারে, নজরুল তেমন কোনো মহান পুরুষ বা উদ্ধারকর্তার অপেক্ষায় আছেন! আদতে নজরুল কোনো ‘উদ্ধারকর্তা’য় আস্থা রাখেন না, বরং তাঁর সৈনিকতা জনতার প্রাত্যহিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয়তাকেই ইঙ্গিত করে।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    অর্থাৎ নজরুল ইসলামের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাহিত্যের ভেতরকার মসলায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা জনতার সক্রিয়তাকে কালের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদা ধারণ করতে সক্ষম। নজরুল যে জনগণের কথা বলেন, তাকে কোনোভাবেই জাতীয়তার পরিচয়ে আবদ্ধ রাখা যায় না। মনে হতে পারে, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। পাকিস্তান আমলে তাঁকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী আকারে হাজির করার কোশেশও করা হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদও তাঁকে নিজের আদলেই গড়ে তোলার চেষ্টাচরিত্র করেছে। কিন্তু মজলুম ও মেহনতি জনতা যখন রাজপথে নেমেছে, তখন নজরুলকে নিয়ে নির্মিত নানাবিধ ‘সুরত’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আন্দোলনের মুহূর্তে নজরুলের ‘জনগণ’–এর পরিচয় ফুটে ওঠে কেবল তাদের সক্রিয়তার ভিত্তিতেই।

    নজরুলের ফিরে আসার কারণ যেমন তাঁর সাহিত্যের মধ্যে তালাশ করতে হয়, তেমনি যে পরিস্থিতিতে তিনি ফিরে আসেন, সেই পরিস্থিতির মধ্যেও তালাশ করতে হয়। পাকিস্তান আমলে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দারা যে পরাধীন জীবন যাপন করেছিলেন, তাতে নজরুলের কবিতা তার মুক্তির ভাষা দিয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও আমরা ভিন্ন বাস্তবতায় পরাধীন পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছিলাম। এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যাবতীয় রাজনৈতিক দল ও কর্মযজ্ঞকে গায়েব করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিকতা নির্দিষ্ট দল ও মতের বাইরেই আশ্রয় নিয়েছিল। এর ফলে জনতা যখন নেমে এল রাস্তায়, নজরুলের সৈনিকতার বেশে দাঁড়িয়ে গেল সশস্ত্র রাষ্ট্রের সামনে, তখন তাকে কোনো নির্দিষ্ট ‘রাজনৈতিক দল’ বা ‘মতবাদ’ দিয়ে চেনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। নিকট ইতিহাসে এমন আনুভূমিক আন্দোলনের নজির আমরা দেখতে পাই না। এই অবস্থার বহিঃপ্রকাশে নজরুল–সাহিত্য যে আমাদের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?

    গ্রাফিতি, খুলনা

    ‘গাজনের বাজনা বাজা!/ কে মালিক? কে সে রাজা?/ কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’ বলার মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতার কথা বলেন, তার বাস্তবায়ন দূরে থাক, রাজনৈতিক কল্পনাও আমরা দেখতে পাইনি। কিন্তু জনতা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের গঠন করতে থাকে, তখন তারা নজরুলের এই ‘কল্পনা’র মধ্যেই নিজেদেরই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। যেমন, হাসিনার পতনের পর প্রশাসন ও পুলিশবিহীন অবস্থায় জনগণ যেভাবে নিজেদের হেফাজত করতে সংগঠিত হয়ে উঠল, তার মধ্যে দিয়ে নজরুলের উপরোক্ত ‘কল্পনা’র এক বাস্তব রূপই যেন আমাদের সামনে ধরা দিল।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    গণ–আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ নজরুল–সাহিত্যে হাজির থাকা ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের সক্রিয়তা ও গণক্ষমতার বৈপ্লবিক সম্ভাবনার মধ্যেই নিহিত। এর প্রেক্ষাপট হিসেবে রয়েছে তৎকালের অসহযোগ আন্দোলন, নজরুলের সৈনিক জীবন এবং সমাজের নানা শ্রেণির সঙ্গে তাঁর বা তাঁর সাহিত্যের সম্পৃক্ততা। নজরুলের জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতা ও পত্রিকা ঘন ঘন শাসকগোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে। ফলে যখনই ক্ষমতাকে ‘ত্যক্ত-বিরক্ত’ করার সুযোগ আসবে, গণক্ষমতার সম্ভাবনা দেখা দেবে এবং যে পরিসর যত বেশি শ্রেণি বা বর্গকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হবে, তখনই এবং সে পরিসরেই নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

  • নান কার আজাদি: ভাত কাজ আর জীবনের সংগ্রাম

    নান কার আজাদি: ভাত কাজ আর জীবনের সংগ্রাম

    • জান্নাতুল মাওয়া আইনান

    পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া কলোনি এবং ব্রিটিশ সূর্য যেসব কলোনিতে অস্ত যাবে যাবে করছে সেই সময়ে ওই অঞ্চলগুলোতে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে কলোনির নির্মমতার শিকার মানুষগুলো নিজ নিজ অস্তিত্ব নির্মাণ করছিলো। এইসময়ে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতিগত দাঙ্গাসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে চোখ রাখলেই আমরা এই প্রবণতা দেখতে (more…)

  • সঙ্ঘবদ্ধ মুক্তির খোঁজে : কেনান থেকে বাংলায়

    সঙ্ঘবদ্ধ মুক্তির খোঁজে : কেনান থেকে বাংলায়

    • জান্নাতুল মাওয়া আইনান

    আমার সাংবাদিক বন্ধু ফারিয়া (ছদ্মনাম) কিছুদিন আগে কেনান* দেশে গিয়েছিলেন। শনিবারের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে তার কেনান ভ্রমণের পুঙ্খানুপুঙ্খ গল্প শুনছিলাম। খুবই টানটান উত্তেজনায় ভরা গল্প। প্রাচীন কেনানের বুকে প্রতিষ্ঠিত ঝকঝকে নতুন রাষ্ট্রটির বিমানবন্দরে দারুণ কড়াকড়ি। ফারিয়া তাই তার নিয়মিত ফোনটি সাথে নিয়ে যান নাই। তাই দীর্ঘদিন তার কোন যোগাযোগ ছিলো না বন্ধুদের সাথে।

    ফারিয়া গিয়েছিলো কেনানের অধিকৃত অঞ্চলগুলো দেখতে। ওই অঞ্চলগুলোতে প্রায় শতাধিক শান্তিকামী সংস্থা কাজ করে। এদের মধ্যে কেনানের দাবীদার দুই গোষ্টি তথা ফিলিস্তিনি এবং ইহুদি উভয় দলের লোকেরাই আছেন। অনেক সংস্থায় তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। এই ভ্রমণে ফারিয়া এই শান্তিকামী মানুষদের সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। এছাড়াও কথা বলেছেন সাধারণ মানুষের সাথে। সেটলারদের আক্রমণের শিকার বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে সেখানকার মানুষদের গল্প শুনেছেন। তারা গল্প শোনাতে ভীষণ ভালোবাসে। এইজাতির মানুষদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের গল্প রক্ষার তাগিদ লক্ষ্য করেন ফারিয়া। জেরুজালেমের একেকটা পাথর তাদের অস্তিত্বের সাক্ষী দেয়।

    উম সাফা নামের এক গ্রামে যেদিন ফারিয়ারা গিয়েছিলেন সেদিন সেইখানে শোক সভা হচ্ছে। কিছুদিন আগে এই অঞ্চলের দুইজনকে সেটলাররা গুলি করে হত্যা করেছে। এইজন্য সেদিন গ্রামের মাঝখানে শোকসভা বসেছে। সেইখানে গ্রামের সব নারী পুরুষ কিশোর যুবা বৃদ্ধ একত্র হয়েছেন। নিহতদের স্মরণ সহ ক্ষোভ প্রকাশ চলছে। ফারিয়া অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন তাদের ছোট ছোট শিশুরাও এইসব আলোচনা অনুষ্ঠানে বেশ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। তারা সবাই মোবাইল দিয়ে ক্রমাগত ছবি ভিডিও সংগ্রহ করছিলো। শুধু উম সাফা নয় সমগ্র অধিকৃত কেনানের নির্যাতিত মানুষেরা প্রচুর পরিমাণে ডকুমেন্টেশন করা শিখে গেছে। তারা সর্বত্র তথ্য আর ইতিহাস জমা করে রাখে। তাদের অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনটাকে তারা ছবিতে যতটা পারে আটকে রাখতে চায়। নিজেদের ইতিহাস রক্ষার তাগিদ থেকেই তারা এই কাজ করেন। আমার আরেক বন্ধু রুবির (ছদ্মনাম)বাবা তো তার গ্রামের ইতিহাস থেকে শুরু করে তাদের পরিবারের সকলের পরিচয় কাজ ইত্যাদি নিয়ে বেশ মোটা মোটা দুই খণ্ডের বই লিখেছে।

    বিহারের কবি আমির আজিজের বিখ্যাত সেই বিপ্লবী কবিতায় বলা আছে,

    “আর আমি এই সব ঘটনা আমার হাড়ে লিখে রাখব
    আমি হাড়ে লিখে রাখব সব প্রমাণ
    তুমি যা চাও আমার উপস্থিতির প্রমাণপত্র,
    তোমাকে আমার জীবনের সকল প্রমাণ দেওয়া হবে”।

    অর্থাৎ, আমরা যে ছিলাম, আমরা যে কথা বলছিলাম, আমরা যে দলে দলে জড়ো হচ্ছিলাম চৌরাস্তার মোড়ে, উম সাফা গ্রামের মাঝখানে, যাত্রাবাড়ির মোড়ে; সেইসব গল্প লিখে রাখতে হবে, দেয়ালে দেয়ালে, অনলাইনে-অফলাইনে। ক্যাফে গ্র্যাটিচুডে বসে উম সাফা গ্রামের গল্প শুনতে শুনতে ঢাকা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। একটা দেশের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছালে সেই দেশের দশ বারো বছর বয়সের কিশোরদেরকেও রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠতে হয়?

    যেই ছেলেটি তার বন্ধুর মৃতদেহ দেখে রাগে ক্ষোভে ফেটে গিয়ে দেয়ালে দেয়ালে লিখে রেখেছে :

    “বুকের ভেতর অনেক ঝড়
    বুক পেতেছি গুলি কর”

    আপনি তাকে কী করে ফেরাবেন? এর মতো তীক্ষ্ণ তীব্র অহিংস বিপ্লবের বাণী আমরা আর কোথায় শুনেছি কবে?

    ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবে বিপ্লবী জনগণ ছিলো নিরস্ত্র, তাদের হাতে পাথরের টুকরো আর লাঠি ছাড়া কিছু ছিলো না। বিপরীতে ছিলো এই জনগণেরই ট্যাক্সের টাকায় কেনা অস্ত্রের মুখ। একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে তাদের সরকার নামক যন্ত্রটি ভয়াবহভাবে শোষণ আর অত্যাচার শুরু করলে সেই রাষ্ট্রটিকে কি স্বাধীন বলা যায়?

    ফারিয়া যখন আমাকে বলছিলো কেনানের অধিকৃত অঞ্চলের মানুষ কড়া নজরদারিতে বন্দী থাকে, তখন আমার মনে পড়ে গেলো, মাত্র দুই মাস আগে বাংলাদেশের মানুষেরা বাসায় রেগুলার মোবাইল রেখে বাড়ির বাইরে যেতো ভিন্ন মোবাইল নিয়ে। কারণ মোবাইলে বিপ্লবের কোন ছবি বা ফেসবুকে কোন সক্রিয়তা দেখতে পেলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো সাধারণ ছাত্রদের।

    বাংলাদেশের সব মানুষ সংঘবদ্ধভাবে একটা ভয়াবহ ট্রমাটিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগেরই তাদের শহরের অলিতে গলিতে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর অস্ত্রযান ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা মূলত মানুষ খুন করে বাকিদের ভয় দেখিয়েছে, যেন আর কেউ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি কথাও না বলে। সাভারে তারা একজন অর্ধমৃত ছাত্রের লাশ নিয়ে শহরের রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল তারপর সেই শরীরটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবারও দরকার বোধ করলো না, ছেলেটিকে ট্যাংক থেকে টেনে হিঁচড়ে ফেলে দেয়া হলো, দুর থেকে ধারণ করা ক্যামেরায় দেখা গেলো ছেলেটার তখনো শ্বাস ছিলো। ঢাকা শহরের অলি গলি এখনো অনেক মানুষকে ট্রমাচ্ছন্ন করে ফেলে। এরকম অনেকেই লিখেছেন, শহরের পথে পথে হাঁটতে চলতে দারুণ কষ্ট হয়। বারবার সেই ভয়ংকর কয়েকটা দিন, সেই যুদ্ধক্ষেত্র ফিরে ফিরে আসে।

    এটা একটা অদ্ভুত সময় ছিলো। যেই কয়দিন দেশের মানুষ বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের জন্যে, সেই কয়দিন প্রবাসের ডায়াস্পোরা দেশের বাংলাদেশিরা দলে দলে রাস্তায় নেমে এলো। তাদের দাবী ছিলো খুব সহজ- আমরা আমাদের পরিবারের লোকেদের সাথে কথা বলতে চাই। এটা একটা রীতিমত মানবিক বিপর্যয় ছিলো। এক প্রবাসী শ্রমিক তার মায়ের মুখ শেষবারের মত দেখতে পেলো না, মায়ের বিদায় মুহূর্তে ভারচুয়ালিও উপস্থিত হতে পারলো না। দেশের মানুষ যখন জানেও না তখন প্রবাসী বাঙালিরা নানান জায়গায় “দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ” বলে শ্লোগান দিয়েছে। সুতরাং, এই আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রে অরগ্যানিক ছিলো।

    আওয়ামী লীগের কঠোর সমর্থক বাদে, সচেতন মানুষেরা প্রায় সবাই যে যার মত করে কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন। অনেকেই নতুন করে তার রাজনৈতিক স্বত্ত্বাকে খুঁজে পেয়েছেন, অনেকে পুরানো ঘর ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু নতুন ঘরের সন্ধান পান নাই। অনলাইন এবং অফলাইন সমাজজুড়ে আজকে নানান রকমের মত। রাজনীতিবিমুখ তরুণেরাও ধীরে ধীরে রাজনীতি বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। আমাদের পারিবারিক গ্রুপ মেসেজে মধ্য জুলাইয়ের আগে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিলো আম্বানিদের বিয়ে। তারপর আমরা দেখতে পেলাম একটা মামুলি গল্পের পারিবারিক গ্রপ সরাসরি রীতিমত রাজনৈতিক আলোচনার একটা জায়গা হয়ে উঠলো।

    অনেকদিন কোনরকমে পিঠ বাঁচিয়ে বেঁচে থাকতে থাকতে বাংলাদেশের বাঙালিরা ও অন্যান্য জাতিগোষ্টীর মানুষেরা যে বুক উঁচু করে রাইফেলের নলের সামনে দাঁড়িয়ে শাসকের চোখে সরাসরি চোখ রেখে ভীষণ রাগে বলে উঠেছিলো, “মইরা যামু কী হইছে! কইয়া যামু কী হইছে! ষোল বছর কী হইছে, আর স্বাধীনতার কী হইছে?”

    এই যে, মুক্তির জন্য জীবনের মায়া ছেড়ে দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে নিরস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে যেতে কখন আর মানুষ দ্বিধা করে না? যখন মানুষের আর কিছুই থাকে না। সে যখন বুঝতে পারে যে তাকে যাদের রক্ষা করার কথা অথবা যারা তাকে রক্ষা করতে পারতো তারা তাকে মানুষ বলেই গণ্য করছে না। শাসকের অথবা শোষকের কাছে তার দুঃখ যেন অদৃশ্য, কিংবা সে নিজেই অদৃশ্য। মজলুম অবাক হয়ে লক্ষ্য করে তাকে যেন কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। অনস্তিত্বের এই অনুভূতি তার অস্তিত্বকে স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ করে তোলে। সে তুমুল শক্তি নিয়ে প্রতিরোধ করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়।

    হ্যাঁ, আমরা ঠিক করেছি, যা হবার হবে, আমরা বলে যাবো, বলে যেতে থাকবো- আমাদের স্বাধীনতার কী হইছে? আমাদের স্বাধীনতা কারা হরণ করেছে, আমরা বলবো। যেই প্রচণ্ড শক্তি এই মানুষগুলো অর্জন করেছে জুলাই মাসের ৩৬ দিনে, সেই শক্তিকে যদি আমরা কাজে না লাগাই তাহলে সেইটা হবে ক্ষতিকর একটা ব্যাপার।

    এই বিপ্লবে বাংলাদেশের সকল ধারার মানুষ যোগ দিয়েছিলো, কিন্তু একটা পর্যায়ে পরাজয় চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আওয়ামী লীগ নামের কুচক্রী দলটি গোটা আন্দোলনটিকে জামায়াতের এবং ইসলামপন্থীদের আন্দোলন বলে প্রচার করতে চায়। এইজন্য তারা, আন্দোলনের উত্তপ্ত সময়ে হুট করে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। তবে, ওই অভূতপূর্ব সময়টাতে বাংলাদেশের সব মানুষ প্রচণ্ড শক্তভাবে একমাত্র একটা লক্ষ্যে একত্রে এগিয়ে যায়। সেই একমাত্র লক্ষ্য ছিলো হাসিনার পতন। আর এর ফলেই ৩৬ জুলাই অথবা ৫ আগস্টে লক্ষ লক্ষ মানুষ বুলেটের ঝড় উপেক্ষা করে ঢাকার পথে এগিয়ে যায়। পথে পথে তাদেরকে জনতা স্বাগত জানায়। নিরস্ত্র জনতা নিজেদের জান আর জীবন দিয়ে একটা ভয়াবহ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। সারাবিশ্ব দেখে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান।

    স্বাভাবিকভাবেই, বিপ্লবে অংশগ্রহণ করা প্রতিটা পক্ষই নিজ নিজ দলের ভূমিকাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রমাণে তর্কে লিপ্ত হয়। মজার ব্যাপার হলো, হাসিনাশাহীর সমর্থকেরা এইক্ষেত্রে ইসলামপন্থীদের সাথে যুক্ত হয়েছে এখন। অর্থাৎ তারা প্রচার করছে যে এটা শুধুমাত্র ইসলামপন্থীদেরই বিপ্লব ছিলো। এর ফলে, সাধারণ মানুষদের একটা বিশাল অংশের ভয়েসকে পুরাপুরি নাই করে দেয়ার একটা চেষ্টা দেখা যায়। মধ্য জুলাইয়ে আমরা দেখি হাজার হাজার নারী বিভিন্ন পোশাকে হিজাবে অথবা জিনসে এসে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, অসীম সাহস নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে দেশ করেছেন মুখরিত। মধ্য আগস্টে তাদেরকে সেভাবে আর দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, আওয়ামীপন্থীদের সাথে সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতিকরাও সাধারণ জনতার ভয়েসকে অগ্রাহ্য করছেন।

    জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ জনতা যে রাজনৈতিক কর্তাস্বত্ত্বা অর্জন করেছে এইটাকে সুশৃঙ্খলভাবে ধরে রাখতে পারলেই কেবল আমাদের বিপ্লব পরিপূর্ণ হবে। তাই অন্য অনেকের মত আমি মনে করি, আমাদের বিপ্লব এখনো চলমান।

    ফারিয়া কেনানের শান্তিকামী বিপ্লবীদের গল্প করছিলেন। তারা অহিংস পথে সংগ্রামে বিশ্বাসী। অনেকে ভাবে, যারা শান্তির কথা বলে থাকে তারা কাপুরুষ। অথচ, এই যোদ্ধারা কী ভয়াবহ বিপদ মাথায় নিয়ে শান্তির লক্ষ্যে কাজ করে যান কেউ এটা হয়তো বোঝে না। তারা দুইপক্ষেরই প্রচুর লোকের অপছন্দের পাত্র। এদের মধ্যে অনেক প্রাক্তর ইহুদি যোদ্ধা আছে যারা সেটলার আক্রমণ থেকে ফিলিস্তিনীদেরকে রক্ষার জন্য আক্রান্ত গ্রামগুলোতে ঢাল হিসেবে সক্রিয় অবস্থান করেন। মেরুকরণের আর ভয়ের রাজনীতির দুনিয়ায় এই অসাধারণ বিপ্লবীদের গল্প আমরা খুব কমই শুনতে পাই। কেনানের দুই মেরুর দুই পক্ষই এই শান্তিকামী মানুষদেরকে নিয়ে আলোচনায় নারাজ। ফিলিস্তিনের অনেক সশস্ত্র বিপ্লবীও এই শান্তিকামীদের দলে যোগ দিয়েছেন। দীর্ঘ অনেক বছরের ট্রমার সাথে যুদ্ধ করতে করতে এই মানুষেরা একটা বিপুল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসে একে অপরের হাত ধরে অহিংস বিপ্লবের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। আমরা তাদের সাথে একমত হতে পারি আবার না ও পারি, কিন্তু তাদেরকে উপস্থিতিকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

    জেরুজালেম থেকে উপহার হিসেবে ফারিয়া আমার জন্য একটা টাইল নিয়ে এসেছে, বিখ্যাত জেরুজালেম পাথরের তৈরি টাইল। জেরুজালেম পাথর তার বুকে যত্ন করে রেখে দিয়েছে সেইসব মানুষদের গল্প যাদের গল্প মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে বিস্তর। সেই শীতল প্রাচীন পাথর গালে ঠেকিয়ে ভাবি, জেরুজালেম আমাদেরকে কী শেখায়?

    জেরুজালেম আমাদেরকে শেখায় রেজিস্ট্যান্স। জেরুজালেমে সকল সত্য উন্মোচিত হয়। যেদিন নিরস্ত্র যীশুকে হত্যা করা হয়েছিলো, সেইদিন জেরুজালেমের বড় মন্দিরের বিশাল পর্দা দ্বিখণ্ডিত হয়েছিলো, সেইদিনও সত্য উন্মোচিত হয়েছিলো। তাই মুসলিমদের দয়াল নবী জেরুজালেম থেকেই মেরাজে যান। জেরুজালেম আমাদেরকে দেখায় পার্টিশনে ছিন্নবিচ্ছিন্ন জাতিসমূহের ট্রমাটাইজড মনস্তত্ত্ব। পোস্ট ট্রমাটিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত অতীতের শেকলে বন্দী মানুষদেরকে দেখায় জেরুজালেম, তেমনি দেখায় ট্রমার পথে হাঁটতে হাঁটতে নিজের কর্তাস্বত্বাকে হাতে তুলে নেয়া অহিংস বিপ্লবীদের। ট্রমার সাইকেলে ঘুরপাক খেতে থাকা জীবন অথবা মুক্তি; দুই পথই দেখায় জেরুজালেম। মানুষ ঠিক করুক তারা কী চায়! মুক্তি নাকি শেকল!

    পাদটীকা : 

    *কেনান : জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগরের মধ্যখানে বিস্তীর্ণ ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ ভূমিটিকে আমার ইহুদি বন্ধু শেকিনা (ছদ্মনাম) কেনান বলে ডাকার পক্ষপাতী। এছাড়াও এই অঞ্চলের প্রচলিত রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নামগুলো উচ্চারণ করাকেও সমস্যাজনক করে তুলেছে সোশ্যাল মিডিয়ার এলগরিদম। ফলে আমি এই লেখায় কেনান নামটিই ব্যবহার করেছি। শেকিনা অহিংস বিপ্লবী এবং কালেক্টিভ লিবারেশনে বিশ্বাসী একজন নন-বাইনারি ইহুদি। শেকিনা ও তার বন্ধুরা ইফ নট নাও নামের একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে, চিরস্থায়ী অস্ত্রবিরতির দাবিতে তিশা বাভের দিন পশ্চিম লস এঞ্জেলসের ব্যস্ত সড়ক ৪০৫ ফ্রি ওয়েতে কিছুক্ষণের জন্য যান চলাচল বন্ধ করে দেন। তাদের দাবি ছিলো তিশা বাভকে ইহুদিদের ক্যালেন্ডারে সবচাইতে দুঃখের দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দিন নানান ধরণের রিচুয়ালের মাধ্যমে তারা শোক উদযাপন করে। কেউ কেউ ২৫ ঘণ্টা রোজা রাখে। এই দিনটিতে মূলত সেকেন্ড টেম্পল ধ্বংসের ইতিহাস মনে করে রিলিজিয়াস ইহুদিরা শোক প্রকাশ করে থাকেন। তবে ইহুদি এক্টিভিস্টরা তাদের ট্র্যাডিশনাল রিচুয়াল গুলোকে চলমান অন্যায়ের প্রতিবাদের মাঠে নিয়ে আসেন। ইফনটনাও সংগঠনটির কর্মসূচিগুলোতে প্রায়ই ধর্মীয় রিচুয়াল উদযাপনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ করে থাকে এবং কালেক্টিভ লিবারেশনের পক্ষে কথা বলে।

  • মাজার, মব, মাফিয়া অথবা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার ইশতেহার

    মাজার, মব, মাফিয়া অথবা ব্যক্তির আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার ইশতেহার

    • সেলিম রেজা নিউটন 

    ধর্ম দুই রকম। আল্লাহ্‌র ধর্ম আর রাজা-ফেরাউনের ধর্ম। গরিবের ধর্ম এবং বড়লোকের ধর্ম। নিপীড়িত-শাসিতের ধর্ম এবং নিপীড়ক-শাসকের ধর্ম। মজলুমের ধর্ম এবং জালিমের ধর্ম। মায়ের ধর্ম এবং মাফিয়ার ধর্ম। ব্যক্তির ধর্ম এবং পাল অথবা ‘মব’-এর ধর্ম।

    আল্লাহ্‌র ধর্ম আল্লাহ্‌র এলাকা। কওম, কমিউনিটি এবং সমাজের এলাকা। সংহতি আর পারস্পরিক সহযোগিতার এলাকা। আল্লাহ্‌র এলাকা সব প্রাণির জন্য খোলা। সূর্যের আলো অথবা নদীর জল সবার জন্য অবারিত।

    অন্যদিকে রাজার ধর্ম রাজনীতির এলাকা। শাসন ও বলপ্রয়োগের এলাকা। রাজার রাজ্য শুধু অনুগতদের জন্য, দাস-প্রতিপালনের জন্য এবং আজাদি উচ্ছেদের জন্য। রাজনীতি মানে ভাগ করা এবং শাসন করা। গায়ের জোরে অপরকে দমন করা। আল্লাহ্‌র ধর্ম হলো মনুষ্যধর্ম। কৌতূহল, ভালোবাসা, মুক্তি ও স্বাধীনতার ধর্ম। ধর্ম নিছক দণ্ডবিধি নয়। ধর্ম এসেছে মানুষকে এবং নিখিল মাখলুকাতকে ধারণ করার জন্য, মুক্ত ও স্বাধীন করার জন্য। কিন্তু রাজার ধর্ম স্রেফ শাস্ত্রের ধর্ম। আর শাস্ত্রের ধর্মই হলো শাসন ও বলপ্রয়োগ। শাস্ত্র নিতান্তই কতকগুলো কঠোর বিধিবিধান, যে-বিধিবিধান মেনে না চললে তুমি ধর্মের বাইরে। তুমি একঘরে। তুমি বাতিল।

    শাস্ত্রধর্মই কিন্তু রাজধর্ম, রাষ্ট্রধর্ম। মানে রাষ্ট্রের ধর্ম। হ্যাঁ, আল্লাহ্‌র ধর্মের বিপরীতে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ধর্ম কায়েম করে বৈকি। সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ্‌র কাছে আশ্রয় প্রার্থনার বিপরীতে রাষ্ট্রধর্ম চায় তার নিজের প্রতি সমস্ত মানুষের আনুগত্য। আল্লাহ্‌র সার্বভৌমত্বের বিপরীতে সে দাবি করে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব। জীবন-মৃত্যুর মালিক তো আল্লাহ্‌, অথচ গণবিরোধী আইন ও দণ্ডবিধির জোরে রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে নাগরিকদের জীবনমৃতু্য এবং মানইজ্জতের মালিক।

    গায়ের জোরে, একচেটিয়া শাস্তির জোরে, ভয়-আতঙ্ক-প্রোপাগান্ডার জোরে এবং ফেতনা-ফ্যাসাদ-বিভক্তির কৌশলে রাষ্ট্রধর্ম হয়ে ওঠে সর্বশক্তিমান। আল্লাহ্‌র ধর্ম আনুভূমিক, কিন্তু রাষ্ট্রের ধর্ম উলম্ব-আমলাতান্ত্রিক। আল্লাহ্‌র ধর্ম প্রেম, ভক্তি, ভালোবাসার। রাষ্ট্রের ধর্ম ভয়, আতঙ্ক এবং প্রোপাগান্ডার, এবং জুলুম ও বলপ্রয়োগের। আল্লাহ্‌র ধর্ম সর্বজনীন ঐক্যের। রাষ্ট্রের ধর্ম ফেতনা-ফ্যাসাদ-বিভক্তির।

    রাষ্ট্রধর্মই জন্ম দেয় ফ্যাসিবাদের। ফেতনা-ফ্যাসাদ-বিভক্তি, খুন-গুম-ক্রসফায়ার, এবং ভয়-আতঙ্ক-প্রোপাগান্ডার শক্তিতেই টিকেছিল খুনি ফ্যাসিবাদী হাসিনা। এর বিপরীতে আপামর নিপীড়িত-মজলুম নাগরিকদের আন্তরিক দরদভরা ভালোবাসা ও ঐক্যের অতুলনীয় উজ্জ্বলতায় ভরপুর সাহস ও সংহতির পথে, মনুষ্যধর্মের পথে, আল্লাহ্‌-ঈশ্বর-ইউনিভার্সের পথে নিজেদের জান হাতে করে নেমেছিল ছাত্রজনতা, আপামর মেহনতি মানুষ। ঘটিয়েছিল ৩৬ শে জুলাইয়ের অভ্যুত্থান, গণ-অভ্যুত্থান, বিপ্লব। ছিনিয়ে এনেছিল ইবলিস-ফ্যাসিবাদের হাত থেকে বাংলাদেশের মুক্তি।

    শিল্পী : সুলতান ইশতিয়াক

    দুই॥

    গতকাল যাঁরা মন্দির ভাঙতে গিয়েছিলেন, অথবা আগামীকাল যাঁরা মাজার ভাঙতে যাচ্ছেন, তাঁরা দুর্বল-মজলুম-গরিবের ধর্মের ওপর হামলা চালাচ্ছেন। এই জালিমদের ধর্ম বড়লোক-বড়হুজুরদের পোষা পালের ধর্ম। জুলুমের ধর্ম। এরা আসলে প্রান্তিক দুর্বলের, গরিবের ও মজলুমের ‘ব্যক্তি’ হয়ে ওঠার রাস্তা বন্ধ করতে চাচ্ছেন। মাজার মূলত গরিবের প্রতিষ্ঠান। গরিবের গণপরিসর। গরিবের একান্ত আত্মগত, অন্তর্গত এবং আত্মাগত পরিচয়কে ধারণ করে খোদ আল্লাহ্‌র সামনে ব্যক্তিগতভাবে হাজির থাকার পথ।

    আরবিতে মাজার শব্দটার আক্ষরিক অর্থ হলো জিয়ারত বা পরিদর্শন করার স্থান। শব্দটা এসেছে “জারা” ধাতু থেকে, যার অর্থ পরিদর্শন করা বা জিয়ারত করা। কিন্তু এ কথা ভুলে যাওয়ার কোনো উপায়ই নাই যে, গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদে আধ্যাত্মিক পথ-পিপাসুদের পরিদর্শনকে ছাড়িয়ে গেছে খুনি আওয়ামী রাষ্ট্রের মারাত্মক উন্নয়নমূলক মাজার-পরিদর্শন। অর্থাৎ গরিবের গণপরিসরে অনুপ্রবেশ ঘটেছে রাষ্ট্র-শিক্ষিত, বড়োলোক, উঁচু শ্রেণীর ধান্দাবাজ এবং মাফিয়া লোকজনের।

    ঢুকেছে এরা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের নেতা-হাতা হিসেবে। ঢুকেছে মাজার-কমিটির রূপ ধারণ করে। আরো ঢুকেছে মাজার-উন্নয়নের মাফিয়া-ঠিকাদার হিসেবে। এলাকার কমিশনার, ইউএনও, এমপি এবং ডিসি সাহেবদের নিয়ে লাইন ধরে তৈরি হয়েছে মাজার পরিচালনার আত্মাহীন আমলাতান্ত্রিক কমিটি। একেকটা মাজারের পরিচালনা কমিটি ভরে গেছে বিয়ে-এমএ পাশ-ফেল করা কবি-সাহিত্যিক-মার্কা পোশাক-আশাক পরা লোকজন দিয়ে। এরা হলো মাজারের প্রথম শ্রেণীর মাফিয়া। আর অর্থপিপাসু যত ইবলিস নিয়ে গঠিত খুনি হাসিনার উন্নয়ন-ঠিকাদার-লীগ মাজারে মাজারে গড়ে তুলেছে নতুন নতুন দালানকোঠা এবং তোরণ। দ্বিতীয় শ্রেণির মাফিয়া এরা।

    এই দুই টাইপ মাফিয়াদের উন্নয়নের টাইলসে নিরিবিলি গাছতলার পুরানা শ্যাওলাপড়া অন্তরঙ্গ কবরগুলো এমনই জাতে উঠেছে, তাকে আর চিরচেনা মাজার বলে চেনাই মুশকিল। এই মাফিয়ারা একেবারে শেষ করে ফেলেছে ঘন সবুজ গাছপালা দিয়ে ঘেরা খোলা উঠান এবং সর্বপ্রাণ-সর্বপ্রকৃতি ও পাগলসাধুর স্মৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের মিলনমেলাকে। মাজারগুলোর চিরায়ত অর্গানিক প্রাণপ্রবাহের সিলসিলা চিরকাল যাঁরা বহন করেছেন সেই গরিব, সাধু, পাগল এবং সমাজ-পরিত্যক্ত ব্যক্তি-মানুষদের জায়গাই গেছে কমে। মাজারে, খানকায়, আখড়ায় এঁরাই এখন অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত, পরিত্যক্ত।

    সবাই নিশ্চয়ই এক না, কিন্তু তৃতীয় শ্রেণির মাফিয়ার মধ্যে আছে স্থূল মাজার-ব্যবসায়ী পীর-বাবা-খাদেমের দল। এরা আছে অনেক কাল ধরে। মাজারগুলো হয়ে উঠেছে দুর্নীতিপরায়ণ ধান্দাবাজদের পয়সা কামানোর মেশিন — আল্লাহ্‌র নামে, অলি-আউলিয়ার নামে, ধর্মের নামে। মাফিয়া-মানবতার মাদারবোর্ড-আম্মার মাফিয়া-সন্তান এই বদমাশের দল। তাই, মাফিয়া-রাষ্ট্রের উঁচুতলার শয়তানির সমস্ত ছোটো ছোটো রূপই আপনি দেখতে পাবেন এইসব মাজারের মধ্যে।

    এসবের বাইরে ছিল আরো এক উৎপাত। মঠ-মন্দির-প্যাগোডা অথবা শহীদ মিনারের মতো মাজার-খানকা-আখড়াগুলোতেও ঢুকেছিল ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরায়েলি এবং ভারতীয় ডিপস্টেটসমূহের গোয়েন্দাযন্ত্র কর্তৃক বিনির্মিত এবং সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র কর্তৃক পুনঃ পুনঃ মঞ্চায়িত জঙ্গি-আতঙ্ক। আত্মশক্তি, গণশক্তি, সমাজশক্তি এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার বদলে এসব স্থান ও প্রতীকের আশ্রয়ে থাকা বিভিন্ন আতঙ্ক-প্রিয় জনগোষ্ঠী গিয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদ নামক সর্বাত্মক রাষ্ট্রতন্ত্রের কপট আশ্রয়ের কোলে। ফলত হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান, ভুয়া-সেকুলার এবং বিভিন্ন লোকধর্মের অন্তত কিছু কিছু মানুষ পরিণত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী হাসিনার সমর্থকে। আর অতীব দুঃখজনক ঘটনা হলো, সুফি ধারার কতিপয় নেতাও আওয়ামী ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক এনাবলার মিত্র হয়ে উঠেছিল। আল্লাহ্‌- ঈশ্বর-ইউনিভার্সের ধর্মকে ক্রমাগতভাবে ফোকলা করে দিচ্ছিল ইবলিসের রাষ্ট্রধর্ম। আমরা এসব থেকে উদ্ধার পেয়েছি আমাদের রূপকথার মতো আশ্চর্য কিন্তু অতি-আকাঙ্ক্ষিত জুলাই-বিপ্লবের মাধ্যমে।

    এই সার্বিক প্রেক্ষাপটেই যে বঙ্গীয় ফ্যাসিবাদের পিতা শেখ মুজিবের অতিকায় মূর্তি এবং আওয়ামী লীগের মতো করে জুলাই বিপ্লবের উপর্যুপরি ঢেউয়ের ধাক্কায় এই সমস্ত স্থান, প্রতীক, স্থাপনা ও জনগোষ্ঠীও খানিকটা দুলে দুলে উঠেছে সেটা বিস্মৃত হওয়াটা আমাদের ইনবিল্ট বিচারবুদ্ধি ও বিবেকবুদ্ধির অপ্রতুলতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

    তিন॥

    মাজার আমার আরাধ্য নয়। পীর-মুরশিদ-গুরু-গোঁসাই-বাবাদের চরণ ধরে মুক্তি খোঁজার পথও আমার নয়। কিন্তু প্রতীক-রূপক হিসেবে দেখলে, পূণ্য-প্রেরণা লাভের আশায় প্রার্থনা ও পরিদর্শনের জন্য যাই এমন কত কিসিমের ‘মাজার’ যে আমাদের সমাজে আছে! আখড়া, থান, খানকা, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, পার্টি-অফিস, সামরিক-কর্পোরেট হেডকোয়ার্টার, মহাবিহার, মঠ, বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়, বঙ্গভবন, বিজ্ঞান, নাসা, অথবা শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, নাস্তিক-সংশয়বাদী সমিতিসমূহের বিভিন্ন পবিত্র কার্যালয় ইত্যাদি-প্রভৃতি পবিত্র-অপবিত্র কোনো স্থানই আমার আরাধ্য নয়। তবে, প্রাচীন রোমান নাট্যকার টেরেন্সের কোনো নাটক যদিও আমি দেখি নি কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় তাঁর এই কথাটা আমারও কথা: “Homo sum, humani nihil a me alienum puto”, অর্থাৎ “আমি মানুষ, মানুষ সম্পর্কিত কিছুই আমার অনাত্মীয় নয়।”

    তদুপরি, কোনো ‘হুজুর’ই আমার পরম আরাধ্য নন। শিক্ষা-হুজুর, দীক্ষা-হুজুর, ধর্ম-হুজুর, মাদ্রাসা-হুজুর, বিশ্ববিদ্যালয়-হুজুর, ক্যান্টনমেন্ট-হুজুর, মিডিয়া-হুজুর, সচিবালয়-হুজুর, পারিবারিক হুজুর, সামাজিক হুজুর, রাষ্ট্রীয় হুজুর — এত হাজার হাজার ‘হুজুর’ ঘাড়ে করে নিয়ে ঘোরার মতো অবস্থা আমার নাই। তা ছাড়া, সব হুজুরের একই রা। সবাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। নিজের গোয়ালের গরু বানাতে চান। সবাই মানুষকে ভেড়ার পাল মনে করেন, আর নিজেকে মনে করেন সর্বোত্তম রাখাল। আমার প্রয়োজন মতো, আমার নিজের মতো করে, আমি সবার কাছ থেকে শিখতে রাজি আছি। কিন্তু আমার শিক্ষক কে হবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাকেই। নানা জায়গা থেকে আসা নানা জিনিস শেখার পরে আমি কী বুঝলাম, আমার করণীয় কী, সেটা নির্ধারণ করতে হবে আমাকেই। হৃদয়মন দিয়ে, এবং বিবেকবুদ্ধি, বিচারবুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে কেননা আমার আল্লাহ্‌-ঈশ্বর-ইউনিভার্সই আমাকে এইসব সহজাত-অন্তর্জাত গুণাবলি দিয়েছেন।

    ব্যক্তির স্বাধীনতাকে কোনো-না-কোনোভাবে কম গুরুত্ব দেয় এমন কোনো প্রকার বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মতবাদ বা প্রতিষ্ঠানেরই অনুরাগী আমি নই। সব ধরনের মাজারেই দেখি ব্যক্তির চাইতে বড় কিছু-একটার উপাসনা, আরাধনা, এবাদত, বন্দনার জায়গা। ব্যক্তি সেখানে বড়ই তুচ্ছ। রাষ্ট্র, জাতীয় পতাকা, দেশপ্রেম, ধর্ম, নাস্তিকতা, বিজ্ঞান, শিক্ষা, কালচার, তমুদ্দুন ইত্যাদি সব ধরনের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মতবাদ এবং মতাদর্শের যে-প্রাধান্যশীল চেহারা আমরা দেখতে পাই তাতে দেখি সবচেয়ে মূল্যহীন ভাবা হয় ব্যক্তিকে। এদের অনুমান হলো, বিরাট বিরাট অট্টালিকায় ব্যক্তি হবে পরিচয়হীন ইটের গাঁথুনি মাত্র। বিরাট বিরাট কারখানায় ব্যক্তি হবে বড়োজোর নাট-বল্টু। সমাজ-অরণ্যে ব্যক্তি হবে পোকামাকড় মাত্র।

    তাই বলে ওপরে যাদের নাম বলেছি সেইসব বিশ্বাস-অবিশ্বাসমূলক ধারণা ও প্রতিষ্ঠানের কোনোটার প্রতিই কোনো প্রকার বিদ্বেষ বা বিরাগ আমার নাই। তার প্রশ্নও ওঠে না। আল্লাহ্‌র দুনিয়ায় যাবতীয় কিছুর মধ্যেই সত্য এবং হকের অস্তিত্ব আমি দেখতে পাই। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়, এবং তিনি সর্বত্র বিরাজমান — এই চরম সত্য আমি বিস্মৃত হতে পারি না। সত্য একই সাথে বহুবিচিত্র, অখণ্ড এবং সমগ্র। নিজের বিবেকবুদ্ধি ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে জীবনের সামনে অথবা পেছনে এসে হাজির হওয়া প্রতিটা প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গকে কেস-বাই-কেস যাচাই-বাছাই, গ্রহণ-বর্জন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় মানুষকে, ব্যক্তিকে, আমাকে। কারো মহামূল্যবান মুখস্থ প্রেসক্রিপশনে আমার জীবন আমি দাঁড় করাতে পারি না।

    আল্লাহ্‌ আমাকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে। হ্যাঁ, আমি সমাজে জন্মেছি, রাষ্ট্রের মধ্যে জন্মেছি। তাই বলে ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দিলে আমি সামাজিক মানুষ হিসেবে উন্নত হতে পারি না, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে উন্নত হতে পারি না, স্বাধীনও থাকতে পারি না। আল্লাহ্‌ আমাকে সৃষ্টি করেছেন স্বাধীন, কৌতূহলী ও বুদ্ধিমান প্রাণি হিসেবে। আমাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন দেখে, শুনে, পড়ে, বুঝে, চিন্তা করে, বিচার করে, এবং ঠেকে শেখার মতো গুণসম্পন্ন প্রাণি হিসেবে। স্থায়ী পদ-পদবি-উপাধি অথবা ইউনিফর্মওয়ালা কোনো মুরুব্বির হুকুমতন্ত্র ছাড়াই মানুষ নিজে নিজে শিক্ষা অর্জন করতে পারে।

    আল্লাহ্‌, ঈশ্বর, মা-প্রকৃতি, বিশ্বজগত, ইউনিভার্স বা পরম সত্তা ইত্যাদি যে-নামেই ডাকেন না কেন, আমি আমার আল্লাহ্‌কে জানতে-চিনতে-বুঝতে এবং আত্মস্থ করতে চাই সবার আগে ব্যক্তিগতভাবে। তাঁর সমস্ত রূপময় এবং অরূপময় অভিপ্রকাশের মধ্যদিয়ে। নিজের মতো করে, নিজের স্ব-অধীনতার চৈতন্য বজায় রেখেও নিজেকে সমর্পণ করতে চাই নিখিল অস্তিত্বের কাছে। হাশরের মাঠে আমার জবাব তো আমাকেই দিতে হবে। কোনো প্রকারের মাজার, পরিবার, সমাজ, কওম, রাষ্ট্র, জাতীয় পতাকা অথবা সৈন্যবাহিনী আমার তরফ থেকে আমার জবাবদিহি করার জন্য সেদিন অনুমোদন পাবে না। ফলে আমার স্রষ্টার সাথে আমার বোঝাপড়া আমারই একান্ত ব্যক্তিগত। একান্ত আধ্যাত্মিক। আমি নানান ব্যক্তির কাছ থেকে, সমাজ-সংসার-প্রতিষ্ঠান থেকে নানান কিছু শিখতে পারি, বুঝতে পারি, জানতে চাইতে পারি, কিন্তু দিনশেষে আমার পরম করুণাময়ের সামনে আমার মনুষ্যধর্ম রক্ষা করতে হয় আমাকেই।

    চার॥

    যতদিন এই জীব-জীবনের গভীর থেকে ব্যক্তির আত্মার আত্মশক্তি জেগে না উঠছে, ততদিন যত শেখা বুলিই আওড়াক না কেন, মানুষ হয়ে ওঠার পথ থেকে পিছিয়ে থাকবে সে। আল্লাহ্‌, ঈশ্বর বা ইউনিভার্সের পরম শক্তিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিনম্র ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ যত দিন না ঘটছে, ততদিন সমাজ চলবে মব-উত্তেজনায়। রাষ্ট্র চলবে স্রেফ জিন্দাবাদ-মুর্দাবাদ দিয়ে। তা ছাড়া, মবও তো বিভিন্ন রকম হতে পারে বৈকি। পরিবার, বংশ, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, এমনকি সুমহান আইনশৃঙ্খলা-বাহিনীও মব হয়ে উঠতে পারে তো! পুলিশের যে-বাহিনী আমাদের সন্তান-ভাই-বোনদের লাশ ভ্যানের উপর গাদি করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোতে, তারা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নাকি মব? কথা হলো, সমাজে যত বেশি করে ব্যক্তির দেখা আমরা পাব, ততই সর্ব প্রকারের মবগিরির আপদ-বিপদ-উৎপাত কমবে। অন্য কোনো উপায় নাই। পালের অথবা মবের ভেতরের অবিকশিত জন্তুসত্তাকে আপনি শুধু আইনকানুন দিয়ে, ধরে-মেরে-পিটে, আটকাতে পারবেন না। আমাদের লাগবে মানুষের ভেতরে মনুষ্যসত্তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা, এবং শুধু বৈষয়িক-জাগতিক ধার্মিকতাই নয়, আমাদের লাগবে মানুষের ভেতরে আধ্যাত্মিক ধর্মসত্তারও উন্মেষ ঘটানো।

    এ জন্যই ব্যক্তিকে ভয় পান সবাই। মা-বাবা চান তাঁদের সন্তান যেন বাধ্য সন্তান হয়েই থাকে, ব্যক্তি হয়ে না ওঠে। মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ওস্তাদ-হুজুরেরা চান তাঁদের শিক্ষার্থীরা যেন নিতান্ত শিক্ষার্থী হয়েই থাকে, ব্যক্তি হয়ে না ওঠে। রাজনৈতিক দলের নেতারা চান তাঁদের সদস্যরা যেন স্রেফ রাজনৈতিক কর্মী বা কামলা হয়েই থাকে, ব্যক্তি হয়ে না ওঠে। রাষ্ট্রনেতা-রাষ্ট্রপতিরা চান দেশের মানুষ যেন শুধু আইনকানুন-জানা ভদ্র নাগরিক হয়েই থাকে, ব্যক্তি হয়ে না ওঠে। ব্যক্তি বিপজ্জনক, কেননা ব্যক্তি তার বন্ধুদের সাথে চলাফেরা করতে পারে কিন্তু পালবদ্ধ হয়ে প্যারেড করতে পারে না। মব হচ্ছে পাল। নিরীহ ভেড়ার পাল অথবা হিংস্র হায়নার পাল হয়ে চলতে পারে না ব্যক্তি। তাঁর আত্মমর্যাদায় বাধে। পালের সবচাইতে বড় উদাহরণ কিন্তু পলিটিক্যাল পার্টি।

    আমাদের গরিব দেশের জন-ইতিহাসে যখন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক স্ব-অধীনতার আবির্ভাব ঘটতে শুরু করবে তখন আর কোনো পাল, পার্টি বা জাতীয় পতাকাই মানুষের চেয়ে বড়ো হতে পারবে না। আল্লাহ্‌, ঈশ্বর বা ইউনিভার্স ছাড়া আর কারো সামনেই মাথা নোয়াবে না সে। এই জন্যেই আমার আল্লাহ্‌ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে, সরাসরি তাঁর নিজের খলিফা হিসেবে। কোনো দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, জাতীয় পতাকা, অথবা কোনো চার্চতন্ত্র, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, যাজকতন্ত্র অথবা হুজুরতন্ত্রের গোলাম হিসেবে নয়।

    পাঁচ॥

    মাদ্রাসা আমাদের, মসজিদ আমাদের। মাজারও আমাদেরই। বাংলার সমাজ চিরকাল বহুমত-বহুপথকে একই সাথে ধারণ করেছে। ফেতনা-ফ্যাসাদ ও বিভেদ-বিভক্তি তো ফ্যাসিবাদের ধর্ম। মানুষের ধর্ম হলো জুলাই বিপ্লবের লড়াইয়ের ধর্ম। বিভিন্ন মত-পথের অন্তর্ভুক্তিমূলক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মাহুতির ধর্ম। এবারের জুলাইয়ে তো আশুরাও ছিল। আর চব্বিশের আশুরাতে ঝরেছিল মানুষের খুন। রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের দিনগুলোতে কেউ কারো বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। ফ্যাসিবাদী বাহিনীর গুলিতে জখম মানুষের দেহ থেকে বেরিয়ে এসেছিল রক্ত। এবং তার রঙ ছিল রক্তিম লাল। সর্বাত্মক একনায়ক হাসিনা যতদিন আমাদেরকে আমাদের মত-পথ-আদর্শ, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের প্রশ্নে পৃথক করে রাখতে পেরেছিল, ততদিনই ছিল তার ফ্যাসিবাদের আয়ু। তারপর যেদিন শাহবাগের সাথে দেখা হলো শাপলার, সেই দিনটাই তো ছিল হাসিনা-শাহীর পতনের দিন।

    জুলাই-শ্রাবণে আমাদের ঐক্য তৈরি হয়েছিল পথে। বিপ্লবের বৃষ্টিতে আমরা ভিজেছিলাম সবাই। মসজিদ-মাদ্রাসা-মাজারের মতপার্থক্য আত্মস্থ ও অতিক্রম করে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে জুলাই বিপ্লবের পথ ধরে। সেই পথ গেছে ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের জাগতিক স্বাধীনতা এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে।