Category: সাম্রাজ্য-নৈরাজ্য

  • বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়, এবং জার্মানিসহ অন্যান্য দেশেও এর প্রসার ঘটে। ইতালির স্বঘোষিত ফ্যাসিস্ট নেতা, বেনিতো মুসোলিনির শাসনামলে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করা হয়। তখনকার সাথে বর্তমান দুনিয়ায় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর একটি বড় তফাৎ হচ্ছে,  এখন আর কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিই নিজেকে ফ্যাসিবাদী বলে ঘোষণা করে না। বরং ফ্যাসিবাদ কথাটিকে বিরোধী শক্তিগুলোই ব্যবহার করে থাকে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসনকে বোঝানোর জন্য। আবার কেবল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসন হলেই তা ফ্যাসিবাদ নয়। গেল শতাব্দীর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, ফ্যাসিবাদকে ‘ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া একনায়কত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এথেকে ফ্যাসিবাদের চিন্তা-মতবাদের আকর ও পাটাতন বোঝা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশেও  ফ্যাসিবাদ কী সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট তাত্ত্বিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা সামান্যই হয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ চিহ্নিত করাও সবসময়ই সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সে উদ্দেশ্য নিয়েই অরাজ ফ্যাসিবাদের বোঝাপড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিলসমূহ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে মুসোলিনির ১৯৩২ সালে প্রকাশিত Doctrine Of Fascism রচনাটির অনুবাদ প্রকাশ করছে অরাজ। ইতালীয় ভাষায় এই রচনার শিরোনাম La dottrina del fascismo। কথিত আছে, পুরো রচনাটি মুসোলিনির নামে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম অংশটুকু Fundamental Ideas ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিল্লের লেখা। আর Political and social doctrine অংশটুকু মুসোলেনির, যা লিখিত হয় ১৯২৭ সালে। Doctrine Of Fascism রচনাটির ফ্যাসিবাদী সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রণীত ইংরেজি সংস্করণের অনুবাদক ব্রিটিশ লেখক জেন সোয়ামস। বর্তমান বাংলা অনুবাদে  ফ্যাসিবাদী প্রকাশনার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Ardita Publishers কর্তৃক  Fascism: Doctrine and Institutions সংকলনে প্রকাশিত সংস্করণকে (১৯৩৫) অনুসরণ করা হয়েছে। অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন আরিফ রেজা মাহমুদ। — সম্পাদক]

    বেনিতো মুসলেনি

    সকল সুস্থিত রাজনৈতিক ধারণার ন্যায়, ফ্যাসিবাদও কর্ম ও চিন্তার সমন্বিত রূপ, যার মধ্যে নিহিত আছে এমন এক মতবাদ, যা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শক্তিসমূহের অন্তর্গত বলয়ে উদ্ভূত এবং আভ্যন্তরীণভাবে কার্যকরী। সুতরাং, ফ্যাসিবাদের একটি রূপগত বিন্যাস রয়েছে যা কালিক ও স্থানিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ; তবে এর পাশাপাশি একটি আদর্শবাদী অন্তর্বস্তুও বর্তমান, যা একে চিন্তার ইতিহাসের উচ্চতর স্তরে সত্যরূপে ব্যক্ত করে।

    বিশ্বে আত্মিক প্রভাব বা প্রভুত্ব বিস্তার, অর্থাৎ একের ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বারা অপরের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন কর্মক্ষেত্রের স্বল্পস্থায়ী ও বিশেষ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়, এবং সেই স্বল্পস্থায়ী বাস্তবতার অন্তরে নিহিত চিরন্তন ও সার্বজনীন বাস্তবতার উপলব্ধি থাকে। মানুষকে জানার জন্য ‘মানবসত্তা‘কে জানতে হয় এবং মানবসত্তাকে জানার জন্য অপরিহার্য হলো বাস্তবতা ও তার বিধিবিধান সম্পর্কে গভীর বোধ।

    রাষ্ট্র বিষয়ক কোনো ধারণাই প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না, যদি তা মৌলিকভাবে জীবন–দর্শনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিফলিত না হয়। সেটা হতে পারে দার্শনিক প্রক্রিয়াজাত ধারণা কিংবা প্রত্যক্ষ অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে বিবর্তিত একটি ভাবতাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা বিশ্বাসভিত্তিক একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন্দ্রীভূত অভিজ্ঞান; কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই, অন্তত সম্ভাব্যভাবে, তা বিশ্বের প্রতি একটি সংহত জৈবিক ধারণার প্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদের বহু ব্যবহারিক রূপ—যেমন দলীয় সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও শৃঙ্খলার ধারণা—কে সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব কেবল তখনই, যখন সেগুলোকে জীবনের প্রতি এর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি আধ্যাত্মিক মনোভাব। ফ্যাসিবাদ পৃথিবীকে কেবল এমন কোন উপরিতলীয় ও বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না, যেখানে মানুষ একটি স্বতন্ত্র, স্ব–কেন্দ্রিক, প্রকৃতির বিধি–নির্ধারিত সত্তা হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং যা জীবনকে পরিচালিত করে ক্ষণস্থায়ী আত্মকেন্দ্রিক সুখের প্রবৃত্তি দ্বারা। ফ্যাসিবাদ কেবল ব্যক্তি নয়, বরং জাতি ও রাষ্ট্রকে দেখে; এমন এক বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে, যেখানে ব্যক্তি ও প্রজন্মসমূহ এক নৈতিক বিধানের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ; যাদের মধ্যে রয়েছে একটি অভিন্ন ঐতিহ্য এবং একটি নির্ধারিত ঐতিহাসিক মিশন।

    এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে এমন এক উচ্চতর জীবন নির্মাণ, যা বদ্ধ আত্ম–কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং কর্তব্যনিষ্ঠার ভিত্তিতে গঠন করে এমন এক জীবন যা কাল ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। এই জীবনেই ব্যক্তি আত্মত্যাগ, স্বার্থপরতা থেকে সরে আসা, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে এক নিখাদ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়, যেখানে তার ‘মানবিক‘ মূল্য নিহিত থাকে।

    অতএব, এই ধারণাটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রকাশ, যা উনবিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদী দৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে বিশ শতকের সাধারণ বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত। দৃষ্টিবাদবিরোধী হলেও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন; এটি সংশয়বাদী নয়, নাস্তিক্যবাদীও নয়; আবার তা নি:সঙ্গ নৈরাশ্যবাদী কিংবা নির্বিকার আশাবাদীও নয়—যেমনটি সাধারণত দেখা যায় সেই সকল মতবাদে, যেগুলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দুকে মানুষের বাইরে কোথাও স্থাপন করে, ফলে তার চরিত্র হয়ে পড়ে মূলত নেতিবাচক।

    ফ্যাসিবাদ বরং বিশ্বাস করে যে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ নিজেই তার বিশ্ব গঠনের সক্ষমতা ও কর্তব্য ধারণ করে। অর্থাৎ, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও নৈতিক সত্তার মধ্যেই নিহিত, বাইরের কোনো বহিরাঙ্গ বাস্তবতায় নয়।

    ফ্যাসিবাদ চায় মানুষ হোক সক্রিয় এবং সে যেন তার সমস্ত শক্তি ও সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়। এটি প্রত্যাশা করে, মানুষ যেন সাহসিকতার সঙ্গে তার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে উপলব্ধি করে এবং সেগুলোর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকে। ফ্যাসিবাদ জীবনকে একটি সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে—এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একজন মানুষের উচিত নিজেকে প্রকৃত অর্থে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের যোগ্য করে তোলা। আর তা সম্ভব প্রথমত তখনই, যখন সে নিজেকে শারীরিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়, যেন সে হয়ে উঠতে পারে সেই ‘উপকরণ‘—যার মাধ্যমে সে উক্ত মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

    যে নীতি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা–ই জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বিস্তৃত অর্থে সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেও। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ফ্যাসিবাদ সকল প্রকার সংস্কৃতিকে (শিল্প, ধর্ম, বিজ্ঞান) উচ্চরূপে মূল্যায়ন করে, এবং শিক্ষার ব্যতিক্রমী গুরুত্বকে স্বীকার করে।

    এই দর্শন অনুসারে, শ্রমেরও মৌলিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতিকে আয়ত্ত করে এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রায় মানবিক জগৎ গড়ে তোলে।

    এই ইতিবাচক জীবনচিন্তা মূলত একটি নৈতিক ধারণা। এটি বাস্তবতার সামগ্রিক ক্ষেত্রকেই পরিব্যাপ্ত করে, ঠিক যেমনটি করে সেই সকল মানবিক কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তবতাকে আয়ত্তে আনে। কোনো কার্যই নৈতিক বিচারের আওতার বাইরে নয়; কোনো কর্মপ্রচেষ্টাই এমন নয়, যাতে নৈতিক উদ্দেশ্য একটি অন্তর্নিহিত মূল্য সংযোজনে ব্যর্থ।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ–অনুসারী যে জীবনচিত্র আঁকে, তা গম্ভীর, সংযমপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিকতায় পরিপুষ্ট; জীবনের সকল প্রকাশ ও কর্মকাণ্ড এমন এক বিশ্ববোধের মধ্যে অবস্থিত, যা নৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ববোধের দ্বারা পরিচালিত।

    ফ্যাসিবাদ সেই জীবনধারার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যা কেবলমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ–বিলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ফ্যাসিবাদী জীবনচিন্তা একটি ধর্মীয় দর্শন, যেখানে মানুষকে দেখা হয় এমন এক উচ্চতর বিধানের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে, যা ব্যক্তিসীমার অতীত—একটি বস্তুগত ইচ্ছাশক্তিতে পরিপুষ্ট, যা ব্যক্তি–অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এবং তাকে একটি আধ্যাত্মিক সমাজের সচেতন সদস্যরূপে উন্নীত করে।

    যাঁরা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধর্মনীতিতে কেবল তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী কৌশল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পান না, তাঁরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে—ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং সর্বাগ্রে এটি একটি চিন্তাব্যবস্থা, একটি দার্শনিক বিন্যাস।

    ফ্যাসিবাদী ইতিহাসবোধে মানুষ কেবলমাত্র তখনই মানুষ, যখন সে একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে—একজন পরিবার সদস্য, সামাজিক গোষ্ঠী, জাতি, ও সমগ্র ইতিহাস–প্রবাহের একটি কার্যকর অংশগ্রহণকারী হিসেবে, যেখানে প্রতিটি জাতি নিজস্ব অবদান রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ভাষা, রীতি, সমাজজীবনের বিধিবিধান এবং ঐতিহাসিক দলিলপত্রে নিহিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের বাইরে মানুষ নিছক এক অস্তিত্বহীনতা।

    শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু

    এই কারণে, ফ্যাসিবাদ সমস্ত ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী বিমূর্ততা, যা উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিবাদনির্ভর বস্তুবাদ থেকে উদ্ভূত, তার বিরোধিতা করে। একইভাবে, এটি প্রত্যাখ্যান করে ফরাসি বিপ্লব–পরবর্তী জ্যাকোবিন ঘরানার কল্পনাপ্রসূত ইউটোপিয়া ও ছকবদ্ধ সমাজ–নবীকরণ প্রচেষ্টাকে। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে না ১৮শ শতাব্দীর অর্থনৈতিক সাহিত্যের সেইসব ভাবনাকে, যেখানে মানুষের ‘পৃথিবীতেই সুখলাভ’–এর সম্ভাবনাকে চিত্রিত করা হয়েছিল। একইসঙ্গে, এটি প্রত্যাখ্যান করে সেই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকেও, যেখানে ধারণা করা হয় যে, ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে মানবজাতি তার যাবতীয় সমস্যা ও সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছে যাবে।

    এই ভাবনা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয়—জীবন একটি অব্যাহত পরিবর্তন ও বিবর্তনের প্রক্রিয়া।

    রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ বাস্তববাদে বিশ্বাসী; তার নীতিগত অবস্থান হলো এই যে, কেবল সেই সমস্যাগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেগুলো ইতিহাস–প্রসূত বাস্তবতার স্বাভাবিক ফসল এবং যেগুলোর সমাধান সেই বাস্তবতার অভ্যন্তরেই নিহিত থাকে কিংবা নিজেই তার সমাধানের ইঙ্গিত প্রদান করে।

    মানুষ কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষ ও প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যখন সে নিজেকে এই বাস্তবতার প্রবাহে সম্পৃক্ত করে এবং এর অন্তর্নিহিত কার্যক্ষম শক্তিগুলোকে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়।

    ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিরোধিতা করে, ফ্যাসিবাদী জীবনদর্শন রাষ্ট্রের গুরুত্বকে সর্বোচ্চ মাত্রায় তুলে ধরে এবং ব্যক্তিকে কেবল তখনই স্বীকৃতি দেয়, যখন তার স্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে একীভূত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ রাষ্ট্রই হলো ইতিহাসবদ্ধ মানবসত্তার নৈতিক চেতনা ও সর্বজনীন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ।

    ফ্যাসিবাদ সেই ধ্রুপদী উদারতান্ত্রিকতার বিরোধিতা করে, যা এক সময় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং যার ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখনই, যখন রাষ্ট্র জনগণের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলনরূপে প্রতিষ্ঠা পায়।

    উদারতন্ত্র ব্যক্তি–অধিকারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে অস্বীকৃতি জানায়; পক্ষান্তরে, ফ্যাসিবাদ সেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আদর্শকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

    রাষ্ট্রের অধিকারকে ফ্যাসিবাদ এমন এক স্বরূপে বিবেচনা করে, যা ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত সারবস্তুকে প্রকাশ করে। আর যদি স্বাধীনতা বাস্তব জীবনে মানুষের একটি গুণ হয়ে থাকে— যা কেবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উদারতন্ত্র কর্তৃক কল্পিত বিমূর্ত মানবপ্রতিমাদের জন্য সংরক্ষিত নয় —তবে ফ্যাসিবাদ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়; এবং এমন একমাত্র স্বাধীনতার পক্ষেই যা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান: তা হলো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তির স্বাধীনতা।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রধারণা একটি সর্বাঙ্গীন দৃষ্টিভঙ্গি, যার বাইরে কোনো মানবিক কিংবা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব থাকতে পারে না, থাকলেও তা অর্থহীন। এই অর্থে, ফ্যাসিবাদ একটি সর্বাত্মকতাবাদী মতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি একীভূত ও সর্বসমন্বিত সংগঠন—যা সমস্ত মূল্যবোধকে ধারণ করে, ব্যাখ্যা করে, বিকশিত করে এবং জনগণের সামগ্রিক জীবনকে শক্তি ও দিশা প্রদান করে।

    রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর (রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, সমাজবর্গ) অস্তিত্ব নেই। ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে, কারণ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ধারণা অজ্ঞাত এবং যা ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেখে।

    রাষ্ট্রীয় ঐক্য মানে যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি একক অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতায় মিলিত হয়। একইভাবে, ফ্যাসিবাদ ট্রেড ইউনিয়নবাদকেও শ্রেণি–অস্ত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

    তবে যখন এই সংগঠনসমূহ রাষ্ট্রীয় পরিসরের আওতায় আসে, তখন ফ্যাসিবাদ স্বীকার করে যে সমাজতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নবাদের উত্থানের পেছনে বাস্তব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনগুলোর যথোচিত মূল্যায়ন করা হয় রাষ্ট্রের কর্পোরেত–কাঠামোর মধ্য দিয়ে, যেখানে বিভিন্ন স্বার্থসমূহকে সমন্বিত ও সঙ্গতিপূর্ণ করা হয় রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তিতে।

    নানাবিধ স্বার্থ অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যক্তি শ্রেণি গঠন করে; তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুযায়ী সংগঠিত হলে ট্রেড–ইউনিয়ন তৈরি করে; কিন্তু সর্বাগ্রে তারা রাষ্ট্র গঠন করে—রাষ্ট্র কোনো সংখ্যাগত বাস্তবতার সমষ্টি নয়, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তির যোগফল নয়। এই কারণে ফ্যাসিবাদ সেই ধরনের গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে, যা একটি জাতিকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সমতুল করে দেখে এবং একে বৃহত্তম সংখ্যার অধীনস্ত করে তোলে।

    বরং, যদি জাতিকে বিবেচনা করা হয় তার গুণগত দিক থেকে—পরিমাণগত নয়—তাহলে ফ্যাসিবাদই হয় ‘শুদ্ধতম গণতন্ত্র’; একটি ভাবধারা হিসেবে জাতি সবচেয়ে নৈতিক, সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সর্বাধিক সত্যরূপে পরিগণিত হয়, যা ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়—কখনো স্বল্পসংখ্যক, কখনো এমনকি এককের বিবেক ও ইচ্ছারূপে—এবং শেষে তা রূপ নেয় জনসাধারণের, একটি জাতির সমগ্র ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গঠনে গঠিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বিবেক ও ইচ্ছারূপে; যারা একক আত্মসচেতনতা ও অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মিক বিকাশ ও গঠনের পথে এগিয়ে চলে।

    জাতি এখানে কোনো বর্ণগোষ্ঠী নয়, নয় কোনো ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা নির্ধারিত অঞ্চল; বরং এটি হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখে—একটি ভাবনাতাড়িত ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণ, যাদের মাঝে জীবনের ইচ্ছা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মসচেতনতা ও ব্যক্তিত্বের উদ্ভব ঘটে।

    যতদূর পর্যন্ত এই উচ্চতর ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্ররূপে রূপায়িত হয়, ততদূর পর্যন্তই তা একটি জাতিতে পরিণত হয়। জাতিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে—এই ধারণা একটি পুরাতন, প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা উনবিংশ শতকে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচারণার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বরং, ফ্যাসিবাদী মতানুসারে, রাষ্ট্রই জাতিকে সৃষ্টি করে; রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে নৈতিক ঐক্য সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তোলে, তাদের ইচ্ছাশক্তি দান করে, এবং সেইসঙ্গে প্রকৃত জীবনের সূচনা ঘটায়।

    জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার কেবলমাত্র কোনো সাহিত্যিক কিংবা ভাববাদী আত্মসচেতনতা থেকে উদ্ভূত হয় না; বরং এর উৎস কোনো নিস্পৃহ ও অচেতন বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেও নিহিত নয়। বরং, এই অধিকার গড়ে ওঠে একটি সক্রিয়, আত্মসচেতন, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থেকে—যা কার্যকর কর্মকাণ্ডে নিজেকে প্রকাশ করে এবং সেই অধিকারকে প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। সংক্ষেপে, এই অধিকার উদ্ভব হয় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থেকে, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে হলেও। বস্তুত, রাষ্ট্রই হচ্ছে সেই সর্বজনীন নৈতিক ইচ্ছার অভিব্যক্তি, যা জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার সৃষ্টি করে।

    রাষ্ট্রে উদ্ভাসিত একটি জাতি কেবলমাত্র ততক্ষণই জীবন্ত ও নৈতিক সত্তা, যতক্ষণ পর্যন্ত তা প্রগতিশীল থাকে।

    নিষ্ক্রিয়তা মানেই মৃত্যু। অতএব, রাষ্ট্র কেবল কর্তৃত্ব নয়—যা শুধু শাসন করে আর ব্যক্তির ইচ্ছাসমূহের উপর আইনি রূপ ও আত্মিক মূল্য আরোপন করে, বরং রাষ্ট্র এক ধরনের ক্ষমতা যা সীমাহীনভাবে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিকে অনুভব করায় এবং মান্য করতে শেখায়। এইভাবে রাষ্ট্র তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য সিদ্ধান্তগুলোর সার্বজনীনতা কার্যত প্রমাণ করে। এই প্রক্রিয়া স্বয়ং সংগঠন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে—তা সম্ভাব্য হোক বা বাস্তব। এইভাবেই রাষ্ট্র মানব–ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিজেকে সমতুল্য করে তোলে, যার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা যায় না এবং যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তার অসীমতাকে প্রমাণ করে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল ব্যক্তিত্বের এক উচ্চতর ও অধিক শক্তিশালী প্রকাশ, তবে তা কেবল বাহ্যিক শক্তি নয়—বরং একটি আত্মিক শক্তি। এটি মানবের নৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের সকল রূপ ও প্রকাশের সমাহার।

    এই কারণে, রাষ্ট্রের কার্যপরিধিকে কেবল আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না—যেমনটি উদারনৈতিক মতবাদে প্রত্যাশিত। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, যা কেবল নাগরিকের তথাকথিত অধিকার চর্চার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

    বরং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি অন্তর্নিহিতভাবে গৃহীত নৈতিক মানদণ্ড ও আচরণবিধি—একটি শৃঙ্খলা, যা ব্যক্তিমানুষের সমগ্র সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে; এটি যেমন ইচ্ছাশক্তিকে প্রভাবিত করে, তেমনই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকেও অনুপ্রাণিত করে।

    এটি একধরনের কেন্দ্রীয় নৈতিক নীতি, যা সভ্য সমাজের নাগরিক হিসেবে মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয়; এটি তার আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে। এই নীতি কর্মনিষ্ঠ মানুষ ও চিন্তক, শিল্পী ও বিজ্ঞানী—সকলের হৃদয়জুড়ে বাস করে; এটি আত্মারও আত্মা।

    সংক্ষেপে, ফ্যাসিবাদ কেবল আইনপ্রণেতা বা প্রতিষ্ঠান–প্রতিষ্ঠাতা নয়, বরং তা একাধারে একজন শিক্ষাগুরু এবং আত্মিক জীবনের উন্নয়নকারী। এর লক্ষ্য কেবল জীবনযাপনের বাহ্যিক রূপকে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুকেও পুনর্গঠন করা—অর্থাৎ মানুষ, তার চারিত্রিক গঠন এবং তার বিশ্বাসকে পুনরায় নির্মাণ করা।

    এই লক্ষ্য পূরণের জন্য, ফ্যাসিবাদ শৃঙ্খলা আরোপ করে এবং কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে অবিসংবাদিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

    এই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ, ফ্যাসিবাদ “লিক্টর’স রডস”–কে তার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে—যা ঐক্য, শক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক।

    রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ

    ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে—যা আজ অনেক দূরবর্তী অতীত— মিলানে আমি Popolo d’Italia পত্রিকার পাতায় সেই বিপ্লবী হস্তক্ষেপবাদীদের যখন আহ্বান জানিয়েছিলাম— যারা ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদের কার্যক্রমের সূচনালগ্ন থেকেই আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছেন— তখন আমার মনে কোনো সুস্পষ্ট মতবাদগত কর্মসূচি ছিল না।

    আমি একমাত্র যে মতবাদকে ব্যবহারিক অর্থে চিনতাম, তা ছিল সমাজতন্ত্র—যার সঙ্গে আমি ১৯১৪ সালের শীতকাল পর্যন্ত, প্রায় এক দশকব্যাপী, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা ছিল একজন অনুসারী এবং পরবর্তীকালে একজন নেতা হিসেবে, কিন্তু তা মতবাদগত নয়—বরং ছিল কর্মনির্ভর অভিজ্ঞতা। সেই সময়ে আমার মতবাদ ছিল কর্মতৎপরতার মতবাদ।

    ১৯০৫ সালের পর থেকে সমাজতন্ত্রের কোনো একক, সর্বজনগ্রাহ্য মতবাদ বিদ্যমান ছিল না। যখন বার্নস্টাইনের নেতৃত্বে জার্মানিতে সংশোধনবাদী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত হয় এক বামপন্থী বিপ্লবী প্রবণতা, যা ইতালিতে কেবল প্রবচনের পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, অথচ রাশিয়ান সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে উঠেছিল বলশেভিকবাদের পূর্বভূমিকা।

    সংস্কারবাদ, বিপ্লববাদ, মধ্যপন্থা—এই পরিভাষাগুলোর প্রতিধ্বনিও আজ মৃতপ্রায়। অথচ ফ্যাসিবাদের বিশাল প্রবাহে এমন কিছু স্রোত খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলোর উৎস ছিল সোরেল, পেগি, লাগারদেলের মত গণসংগ্রামপন্থী সমাজবাদীদের চিন্তায়, এবং ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক পরিবেশে নতুন স্বরের প্রবর্তক ইতালীয় সিন্ডিক্যালিস্টদের কর্মধারায়।

    এই নতুন স্বরটি সেই সময়ের ইতালীয় সমাজতন্ত্রকে দুর্বল ও অচেতন করে দেওয়া জিওলিত্তির দলের সঙ্গে অশুভ মেলবন্ধনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছিল। এই স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় অলিভেত্তির

    Pagini Libere, ওরানোর Lupa, এবং এনরিকো লেওনের Divenirs Socials– এ।

    ১৯১৯ সালে যুদ্ধ–সমাপ্তির পর মতবাদ হিসেবে সমাজতন্ত্র মৃত হয়ে পড়ে। টিকে ছিল কেবল একটি প্রতিহিংসার অনুভূতি হিসেবে—বিশেষত ইতালিতে, যেখানে সমাজতন্ত্রের একমাত্র কৌশল ছিল যুদ্ধ–চাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগানো এবং তাদের সেই যুদ্ধের দায়ভার বহনের জন্য বাধ্য করা।

    The Popolo d’Italia পত্রিকাটি তার উপশিরোনামে নিজেকে ঘোষণা করেছিল “যোদ্ধা ও উৎপাদকদের দৈনিক মুখপত্র” হিসেবে। এখানে “উৎপাদক” শব্দটি তখনকার এক বিশেষ মানসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। ফ্যাসিবাদ কোনো পূর্বনির্ধারিত মতবাদ থেকে গড়ে ওঠেনি, টেবিলে বসে রচিত তাত্ত্বিক পরিকল্পনার ফল নয়; তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত এক কর্মচাঞ্চল্য—নিজেই ছিল কর্ম ও আন্দোলন। প্রাথমিক দুই বছর এটি কোনো দল ছিল না, বরং ছিল “দলবিরোধী” ও একটি আন্দোলন। আমি যে নাম দিয়েছিলাম আমাদের সংগঠনকে, তা–ই এর স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

    তবে, কেউ যদি ইচ্ছা করে সেদিনকার সেই ভাঁজপড়া কাগজগুলো আবার পড়ে দেখে—যেখানে Italian Fasci di combattimento গঠনের বৈঠকের বিবরণ রয়েছে—তাহলে তিনি তাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ মতবাদ খুঁজে পাবেন না। বরং তিনি দেখবেন একগুচ্ছ নির্দেশনা, পূর্বাভাস, ইঙ্গিত, যেগুলো সময়ের সাথে সাথে, তাৎক্ষণিক বাস্তবতার আবরণ সরিয়ে, কয়েক বছরের মধ্যেই পরিণত হয়েছিল পরিপূর্ণ মতবাদে—এমন এক রাজনৈতিক মতবাদ যা ফ্যাসিবাদকে অতীত ও সমসাময়িক অন্যান্য সব মতবাদ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

    যদি বুর্জোয়ারা—আমি তখন বলেছিলাম—ভাবেন যে তারা আমাদেরকে বজ্রনিরোধকের মতো ব্যবহার করতে পারবে, তবে তারা ভুল করছে। আমাদের জনগণের দিকে এগোতে হবে… আমরা চাই শ্রমিক শ্রেণি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে অভ্যস্ত হোক, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে যে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়… আমরা লড়ব প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে… এখন যেহেতু শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকারের পথ উন্মুক্ত, আমাদের সাহস হারালে চলবে না। আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে; যদি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করতে হয়, তবে সেই স্থান আমাদের নিতে হবে। উত্তরাধিকার লাভের অধিকার আমাদেরই, কারণ আমরাই জাতিকে যুদ্ধে প্রবেশ করতে বলেছিলাম এবং আমরাই তাকে বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম… প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না; আমরা চাই বিভিন্ন স্বার্থের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব… কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন যে এই কর্মসূচি গিল্ড ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ারই নামান্তর। তাতে কী! আমি চাই এই সমাবেশ জাতীয় সিন্ডিক্যালবাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অর্থনৈতিক দাবিসমূহকে গ্রহণ করুক…”

    এটা কি আশ্চর্যজনক নয় যে ঠিক প্রথম দিন থেকেই, Piazza San Sepolcro তে, “গিল্ড” শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল—একটি শব্দ যা, ফ্যাসিস্ট বিপ্লব বিকাশ লাভের সঙ্গে সঙ্গে, শাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক আইনগত ও সামাজিক সৃষ্টিকে প্রকাশ করতে শুরু করে?

    রোম অভিযানের পূর্ববর্তী কয়েক বছর এমন একটি সময়পর্বকে চিহ্নিত করে, যখন কর্মের প্রয়োজনে বিলম্ব ও সুচিন্তিত মতবাদ রচনার সুযোগ ছিল না। শহর ও গ্রামে চলছিল সংঘর্ষ। আলোচনা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এর থেকেও পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল—মৃত্যু। ফ্যাসিস্টরা জানতো কীভাবে মরতে হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ মতবাদ—যা অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত, টীকাসহ উপস্থাপিত—অনুপস্থিত ছিল বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে উপস্থিত ছিল আরও দৃঢ় কিছু—একটি বিশ্বাস।

    তবুও, যদি কেউ বইপত্র, প্রবন্ধ, কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাব, প্রধান ও গৌণ বক্তৃতার সাহায্যে সেই দিনগুলোর স্মৃতি পুনর্জীবিত করতে চায়, তবে সে দেখবে—যদি তার অনুসন্ধান ও নির্বাচনের যথাযথ দক্ষতা থাকে—যে যুদ্ধের মাঝখানেই মতবাদের ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছিল। বাস্তবেই, ওই সময়েই ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা অস্ত্রধারণ করেছিল, নিজেকে পরিশীলিত করেছিল, এবং সংগঠনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।

    ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সমস্যা, কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার সমস্যা কিম্বা রাজনৈতিক, সামাজিক, বিশেষত জাতীয় প্রশ্নগুলো তৎকালীন সময়ে আলোচিত হচ্ছিল। একইসঙ্গে, দণ্ডমূলক অভিয়ানের সময় উদারবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, মাসনিক মতবাদ এবং Partito Popolare এর সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। তথাপি, একটি প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদের অভাবকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কুপ্রবণ বিরোধীরা ফ্যাসিবাদকে মতবাদ গঠনে অক্ষম প্রমাণ করতে চেয়েছিল—ঠিক সেই সময়ে, যখন এই মতবাদই প্রবল উত্থানের সঙ্গে রচিত হচ্ছিল। শুরুতে, প্রতিটি নতুন মতবাদের মতোই, তা প্রকাশ পায় প্রচণ্ড নেতিবাচক ও মতবাদবিরোধী রূপে; পরে, গঠনমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক আকার গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ১৯২৬, ১৯২৭ এবং ১৯২৮ সালে ফ্যাসিস্ট শাসনের আইন ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সংযুক্ত হয়।

    ফ্যাসিবাদ এখন কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়, একটি মতবাদ হিসেবেও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। এর অর্থ হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ—নিজস্ব সমালোচনাশক্তিকে আত্মপর্যালোচনা ও অপরের বিশ্লেষণে প্রয়োগ করে—নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিশ্বের সকল জাতির জন্য দুশ্চিন্তার উৎস হয়ে ওঠা বস্তুগত ও বৌদ্ধিক স্বার্থ–সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ অধ্যয়ন করেছে এবং নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করেছে, এবং এখন এসব সমস্যার মোকাবিলায় নিজস্ব নীতির দ্বারা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

    প্রথমেই, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিকাশ–সংক্রান্ত বিষয়ে এবং বর্তমান সকল রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে ফ্যাসিবাদ মূলত অনন্ত শান্তির সম্ভাবনা বা কার্যকারিতায় বিশ্বাস করে না। সে কারণে ফ্যাসিবাদ আত্মোৎসর্গের বিপরীতে ভীরু ও আত্মসমর্পণমূলক নির্জীবতা ঢেকে রাখার মাধ্যম হিসেবে শান্তিবাদকে পরিত্যাগ করে। শুধু যুদ্ধই মানবিক শক্তিকে তার চূড়ান্ত উৎকটতায় পৌঁছে দিতে পারে এবং কেবল যুদ্ধই তাদের উপর মহত্ত্বের টীকা এঁকে দেয়, যারা সাহসের সঙ্গে এর মুখোমুখি হতে সক্ষম। অন্য সব পরীক্ষা অমূলক যা কখনোই একজন মানুষকে জীবন অথবা মৃত্যুর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে না। এই কারণে, যে সকল মতবাদ বলে ‘শান্তি যেকোনো মূল্যে’—তা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে অসঙ্গত।

    একইভাবে ফ্যাসিবাদের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—যদিও কখনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযোগী মনে হতে পারে—সেই সব আন্তর্জাতিকতাবাদী বা ‘লীগ–ভিত্তিক’ কাঠামো, যেগুলো ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের হৃদয় আবেগ, আদর্শবাদ বা বাস্তব বিবেচনায় গভীরভাবে আলোড়িত হলেই ভেঙে পড়ে।

    ফ্যাসিবাদ ব্যক্তি–জীবনেও এই যুদ্ধবাদী মানসিকতাকে বহন করে। “আমার কিছু যায় আসে না“—যেটি ছিল ফ্যাসিবাদী স্কোয়াড সদস্যদের অহংকারী মন্ত্র এবং আহত সৈনিকের ব্যান্ডেজে লিখিত—এটি কেবল দার্শনিক স্তোইকবাদের প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সংগ্রামী আত্মাকে প্রতিফলিত করে—যে আত্মা সকল ঝুঁকিকে গ্রহণ করে। এটি হলো ইতালীয় জীবনের এক নতুন রীতির প্রতীক।

    ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি জীবনকে গ্রহণ করে এবং ভালোবাসে; আত্মহত্যাকে সে ভীরুতার নিদর্শন হিসেবে প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণা করে। তার কাছে জীবন মানে দায়িত্ব, উৎকর্ষ, বিজয়; জীবন হতে হবে মহান এবং পরিপূর্ণ—এটি হবে নিজের জন্য, তবে সর্বাগ্রে হবে অপরের জন্য—নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য।

    এই সমস্ত পূর্বধারণার ফলস্বরূপই ফ্যাসিবাদী শাসনের জনসমাজ নীতি গঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ভালোবাসে, তবে ‘প্রতিবেশী‘ শব্দটি কোনো অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ধারণাকে নির্দেশ করে না। প্রতিবেশীকে ভালোবাসা মানেই এমন কোনো ভালোবাসা নয়, যা প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কঠোরতাকে বাদ দেয়; আর এর মানে এই নয় যে, তা শৃঙ্খলা ও মর্যাদাগত পার্থক্য অগ্রাহ্য করে । ফ্যাসিবাদ ‘সর্বজনীন আলিঙ্গন’ জাতীয় কোনো মানবতাবাদী বিভ্রমকে গ্রহণ করে না।

    জাতিসমূহের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ফ্যাসিবাদ অন্য জাতিকে চোখে চোখ রেখে সম্মুখীন হয়; সে সদা সতর্ক ও প্রহরায় নিয়োজিত; অন্যদের সমস্ত কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের স্বার্থের যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য রাখে; এবং সে কখনোই পরিবর্তনশীল ও প্রতারক বহিঃরূপের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় না।

    জীবন সম্পর্কে এই ধারণার জন্যই ফ্যাসিবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তিস্বরূপ যে মতবাদ, অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ—তাকে দৃঢ় ও সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মানবজাতির ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংঘর্ষ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদন–উপকরণের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করে, এবং অন্যান্য সকল সাংস্কৃতিক, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক উপাদানকে উপেক্ষা করে। ফ্যাসিবাদ এই একমাত্রিক ও অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে একটি বহুমাত্রিক, নৈতিক–আধ্যাত্মিকভাবে সংগঠিত জীবনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।

    অর্থনৈতিক জীবনের নানা উত্থান–পতন—যেমন কাঁচামাল আবিষ্কার, নতুন কারিগরি পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন—এসব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা কেউ অস্বীকার করে না; কিন্তু এসব উপাদান এককভাবে মানব ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে পারে—এই ধারণা নিছক অযৌক্তিক। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে—এখনও এবং সর্বদা—পবিত্রতা ও বীরত্বে; অর্থাৎ এমন সব কর্মে, যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রেরণা কাজ করে না।

    ফ্যাসিবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এই মতবাদ মানুষকে কেবলমাত্র ইতিহাসের উপরিতলের পাপেটরূপে বিবেচনা করে, যা ঢেউয়ের তোড়ে কখনো দেখা যায় ও আবার মিলিয়ে যায়। অথচ গভীরে গেলে নির্ধারক শক্তি হিসেবে মানুষই গতিময় ও ক্রীয়াশীল থাকে।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ শ্রেণিসংঘর্ষের সেই অপরিবর্তনীয় ও অনিবার্য চরিত্রকেও অস্বীকার করে, যা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি বলে বিবেচিত। এইভাবে ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের দুটো প্রধান মতাদর্শিক ভিত্তিতে আঘাত হানে।

    অবশিষ্ট থাকে কেবল মানবসভ্যতার প্রাচীনতম একটি আবেগ—সমাজে এমন এক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নীচু শ্রেণির দুঃখ–দুর্দশা লাঘব পাবে। কিন্তু এখানেও ফ্যাসিবাদ সমাজতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত অর্থনৈতিক বিবেচনাধর্মী সুখের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে—যা মনে করে, ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বজনের সর্বোচ্চ ভোগ–সুবিধা নিশ্চিত হবে।

    ফ্যাসিবাদ এই বস্তুবাদী সুখ–ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদদের উপর ছেড়ে দেয়। এর অর্থ, ফ্যাসিবাদ ‘সমৃদ্ধি = সুখ‘ এই সমীকরণকে অস্বীকার করে—যা মানুষকে কেবলমাত্র ভক্ষণে তৃপ্ত জন্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং জীবনকে নিছক এক প্রকার উদ্ভিদসুলভ অস্তিত্বে রূপান্তরিত করে।

    সমাজতন্ত্রের সমালোচনার পর, ফ্যাসিবাদ তার আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে নেয় গণতান্ত্রিক মতবাদসমূহের পুরো কাঠামোকে এবং তাদের মৌলিক ভিত্তি ও কার্যকর প্রয়োগ—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে। ফ্যাসিবাদ অস্বীকার করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বয়ং সমাজে নির্ধারক শক্তি হতে পারে; এটি প্রত্যাখ্যান করে সংখ্যার ভিত্তিতে শাসনের অধিকার, যা সাধারণত পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

    ফ্যাসিবাদ ঘোষণা করে, মানুষের মধ্যে এক অপরিবর্তনীয়, সৃজনক্ষম এবং কল্যাণকর বৈষম্য বিদ্যমান, যেটিকে “সার্বজনীন ভোটাধিকার” নামক যান্ত্রিক ও বাহ্যিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমতায় পরিণত করা সম্ভব নয়।

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে এমন এক পদ্ধতি, যেখানে জনগণকে নিয়মিতভাবে এই বিশ্বাসে ভুলিয়ে রাখা হয় যে, তারা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে; অথচ প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্ব অন্য শক্তির—প্রায়শই অদৃশ্য, জবাবদিহিহীন ও গোপন শক্তির—হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।

    গণতন্ত্র হলো এমন এক রাজাহীন শাসনব্যবস্থা, যেখানে একাধিক রাজা সক্রিয়, যারা অনেক সময় একক স্বৈরশাসকের চেয়েও বেশি একচেটিয়া, স্বেচ্ছাচারী এবং বিধ্বংসী।

    এই কারণেই ফ্যাসিবাদ—যদিও ১৯২২ সালের আগে তা প্রাসঙ্গিক কারণে প্রজাতন্ত্রপন্থী ছিল—‘রোম অভিযাত্রার আগেই সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে। কারণ, ফ্যাসিবাদ তখন বুঝতে শুরু করে যে শাসনব্যবস্থার গঠনমূলক রূপ (রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র) আর মুখ্য বিষয় নয়।

    এর কারণ, ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, অতীত ও বর্তমানের রাজতন্ত্র কিংবা প্রজাতন্ত্র—কোনোটিই “শাশ্বততার দৃষ্টিকোণ” থেকে বিচারযোগ্য নয়। বরং প্রতিটি শাসনব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির রাজনৈতিক বিবর্তন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদ রাজতন্ত্র বনাম প্রজাতন্ত্র—এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করেছে, যা নিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলি দীর্ঘকাল ধরে কালক্ষেপন করেছে। তারা প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য রাজতন্ত্রকে দায়ী করেছে এবং প্রজাতন্ত্রকে নিখুঁত শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করেছে।

    কিন্তু অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে, কিছু প্রজাতন্ত্র নিজস্ব কাঠামোতেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী, আবার কিছু রাজতন্ত্র সবচেয়ে সাহসী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষাকেও গ্রহণ করেছে।

    রেনান, যিনি ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাসপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন, তাঁর একটি দার্শনিক ধ্যান–চিন্তায় মন্তব্য করেন:

    “যুক্তি ও বিজ্ঞান মানবজাতির সৃষ্টি, তবে সরাসরি জনতার মাধ্যমে কিংবা জনতার জন্য যুক্তির সন্ধান করা কল্পনাবিলাস মাত্র। যুক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সকলের তা জানা অপরিহার্য নয়; আর যদি জানানো আবশ্যকই হয়, তবুও তা গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয় — কারণ গণতন্ত্র যেন নির্ধারিত হয়েছে সমস্ত পরিশ্রমসাধ্য সংস্কৃতি ও উচ্চতর জ্ঞানের রূপ বিলুপ্তির পথে নিয়ে যেতে।

    সমাজ কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্যই বিদ্যমান— এমন নীতিবাক্য প্রকৃতির পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কারণ প্রকৃতি কেবল প্রজাতির বিষয়ে চিন্তা করে এবং ব্যক্তিকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।

    তবে আশঙ্কাজনকভাবে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত অর্থ দাঁড়ায় (যদিও আমি তৎক্ষণাৎ স্বীকার করছি যে এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও সম্ভব) এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে অবক্ষয়গ্রস্ত এক জনসমষ্টি চিন্তা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই কেবল জড় প্রবৃত্তিনির্ভর অশ্লীল ভোগ–বিলাস ছাড়া।’’

    .

    গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক সমতার সেই অযৌক্তিক প্রচলিত মিথ্যাকে, যা প্রকৃতপক্ষে একটি সামষ্টিক দায়হীনতার অভ্যাস এবং সুখ–সমৃদ্ধি ও অনন্ত অগ্রগতির এক বিভ্রমময় কাহিনি।

    কিন্তু যদি গণতন্ত্র বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে জনগণকে রাষ্ট্রে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় না, তাহলে এই রচনার প্রণেতা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটি “সংগঠিত, কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র” হিসেবে।

    আর্লি ফিগার্স
    শিল্পী: অভিনাশ চন্দ্র
    সূত্র: ফ্রিজি

    ফ্যাসিবাদ নিঃসন্দেহে ও সম্পূর্ণভাবে উদারতন্ত্রের মতবাদগুলোর বিরোধী— রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে। উনবিংশ শতাব্দীতে উদারতন্ত্রের গুরুত্বকে যেমন সমকালীন বিতর্কের খাতিরে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়; তেমনি, সেই শতকে বিকাশ লাভকারী বহু মতবাদের মধ্যে একটিকে চিরকালের জন্য মানবজাতির ধর্মে পরিণত করাও সমীচীন নয়।

    বাস্তবে, উদারতন্ত্র প্রকৃত অর্থে মাত্র পনেরো বছরের জন্য বিকশিত হয়েছিল। এটি জন্ম নিয়েছিল ১৮৩০ সালে, Holy Alliance এর প্রতিক্রিয়ায়, যারা ইউরোপকে ১৭৮৯ সালের চেয়েও পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আর শিখর স্পর্শ করেছিল ১৮৪৮ সালে, এমনকি সেই সময়ে পোপ নবম পিয়াসও ছিলেন একজন উদারবাদী। কিন্তু সেই বছর থেকেই এর পতন শুরু হয়। যদি ১৮৪৮ হয় আলো ও কাব্যের বছর, তবে ১৮৪৯ ছিল অন্ধকার ও বেদনার বছর। রোমান প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল আরেকটি প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্সের হাতে। সেই একই বছরে কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে সমাজতন্ত্রের বাণী প্রচার করেন।

    ১৮৫১ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয় এক ‘অনুদারবাদী’’ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৮৭০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, যতক্ষণ না এক ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের পর দেশজুড়ে গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়। বিজয়ী ছিলেন বিসমার্ক, যিনি উদারবাদ এবং এর প্রচারকদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন না। এটি একটি লক্ষণীয় বিষয় যে, পুরো উনবিংশ শতকে এত উচ্চ সভ্যতাসম্পন্ন জাতি হওয়া সত্ত্বেও জার্মানদের কাছে উদারতন্ত্র একটি অজানা ধর্ম ছিল, শুধু একবারের ব্যতিক্রম—যেটি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টের হাস্যকর সংসদ’ নামে খ্যাত, যা মাত্র এক মৌসুম স্থায়ী হয়েছিল।

    জার্মানি তার জাতীয় ঐক্য অর্জন করে উদারবাদের বাইরে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। এই মতবাদ একেবারে সেই জার্মান স্বভাবের পরিপন্থী, যাদের রাজতান্ত্রিক মানসিকতা প্রবল, বিপরীতে উদারতন্ত্র ঐতিহাসিক ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নৈরাজ্যের আঁতুড়ঘরমাত্র। জার্মান জাতীয় ঐক্যের তিনটি ধাপ ছিল ১৮৬৪, ১৮৬৬ ও ১৮৭০ সালের তিনটি যুদ্ধ, যার নেতৃত্বে ছিলেন ‘মোল্টকে’ ও ‘বিসমার্ক’–এর মতো তথাকথিত ‘উদারবাদী’রা।

    ইতালীয় জাতীয় ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে উদারতন্ত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যা জুসেপ্পে ম্যাজিনি ও গারিবল্ডির অবদানের তুলনায় অনেকটাই কম, যাঁরা কেউই উদারবাদী ছিলেন না। যদি অনুদার নেপোলিয়ন তৃতীয় হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে আমরা লম্বার্ডি পেতাম না; এবং অনুদার বিসমার্ক যদি সদোয়া ও সেডানে হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে সম্ভবত ১৮৬৬ সালে ভেনিস বা ১৮৭০ সালে রোম দখল আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

    ১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি এমন এক পর্বকে নির্দেশ করে, যা এমনকি উদারতন্ত্রের নতুন ধর্মের পুরোহিতদের কাছেও ছিল এক ধসযাত্রার কাল—সাহিত্যে ‘দেকাদেন্তবাদ’ এবং বাস্তবতায় ‘সক্রিয়তাবাদ’–এর দ্বারা আক্রমণে পর্যুদস্ত । এই ‘সক্রিয়তাবাদ’ বলতে জাতীয়তাবাদ, ভবিষ্যতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদ।

    উনবিংশ শতকের উদারতাবাদ, বহু জটিল ও অবিভাজ্য সমস্যার সঞ্চয় ঘটিয়ে, সেগুলোর সমাধান হিসাবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পথকেই বেছে নেয়। কোনো ধর্মই এরূপ নিষ্ঠুর আত্মত্যাগ দাবি করেনি। তবে কি উদারতাবাদের দেবতাগণ রক্তের জন্যই এত উদগ্রীব ছিলেন?”

    এখন উদারতাবাদ তার মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—সেই মন্দির, যা জনগণের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছে। কারণ, জনগণ অনুধাবন করেছে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতাবাদের যে সংশয়বাদ এবং রাজনীতি এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রে এর যে উদাসীনতা—তা অতীতে যেমন বিশ্বকে বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনি সর্বনাশ ডেকে আনবে।

    এই ব্যাখ্যা থেকেই প্রতীয়মান হয় কেন আমাদের সমসাময়িক কালের সকল রাজনৈতিক অনুশীলন ও প্রয়োগসমূহ উদারবাদবিরোধী। আর এই কারণে তাদের ইতিহাসচ্যুত করার প্রয়াস চরম আজগুবি —যেন ইতিহাস কেবলমাত্র উদারতাবাদ ও তার অনুগতদের জন্য সংরক্ষিত কোনো সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র; যেন উদারতাবাদই সভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি, যার গণ্ডি অতিক্রম করার আর কোনো সম্ভাবনাই অবশিষ্ট নেই।

    সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং উদারবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী প্রত্যাখ্যানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা অনুচিত, যা ফ্যাসিবাদকে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক অবস্থানে বিশ্বকে পুনঃস্থাপনের সমর্থক বলে প্রতিভাত হয়—ঐ বছরটিকে সাধারণত গণতান্ত্রিক–উদারবাদী শতাব্দীর সূচনাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাস কখনও পশ্চাদগামী হয় না। ফ্যাসিবাদী মতবাদ দেমেস্ত্রকে তার পয়গম্বররূপে বিবেচনা করে না। রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র অতীতের বিষয়; তেমনি অন্ধচার্চপূজাও। মৃতপ্রায় এবং বিলুপ্ত হয়েছে সামন্তীয় বিশেষাধিকার ও সমাজের অন্তরীত, পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন বর্ণব্যবস্থার বিভাজন। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদের ধারণার মধ্যেও পুলিশের দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই।

    একটি দল যখন কোনও জাতিকে ‘সর্বাত্মকভাবে‘ শাসন করে, তা ইতিহাসে নতুন এক প্রবাহের সূচনা। পূর্বে এর কোনো তুলনামূলক উদাহরণ পাওয়া যায় না। উদারতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতবাদসমূহের ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে ফ্যাসিবাদ কেবলমাত্র সেই উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে, যেগুলো এখনো প্রাণবন্ত এবং কার্যকর।ইতিহাসের ‘অর্জিত বাস্তবতা’ হিসেবে যেটি টিকে আছে ফ্যাসিবাদ তাকে সংরক্ষণ করে; বাকি সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, এটি এমন কোনো মতবাদের ধারণাকে গ্রহণ করে না, যা সর্বকালীন এবং সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য। যদি মেনে নেওয়া হয় যে উনবিংশ শতাব্দী ছিল সমাজতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের শতাব্দী, তবু তা এই ধারণা দেয় না যে বিংশ শতাব্দীও সেই একই মতাদর্শ দ্বারা চিহ্নিত হবে। রাজনৈতিক মতবাদসমূহ ক্ষণস্থায়ী; জাতিসমূহ টিকে থাকে। এই বাস্তবতার আলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে এটি কর্তৃত্বের শতাব্দী, ডানপন্থিতার দিকে গমনরত একটি ফ্যাসিবাদী শতাব্দী। যদি উনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্যক্তির শতাব্দী (যেহেতু উদারতন্ত্র ব্যক্তিবাদকে অনুষঙ্গ করে), তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি এটি ‘সমষ্টির’ শতাব্দী—অতএব রাষ্ট্রের শতাব্দী।

    একটি নতুন মতবাদ তার নিজস্ব রচনায় পূর্ববর্তী মতবাদগুলির মধ্য থেকে এখনো কার্যকর উপাদানসমূহ গ্রহণ করাই যৌক্তিক। কোনো মতবাদ সম্পূর্ণ নতুন, দীপ্তিমান ও অভূতপূর্ব রূপে জন্মায় না। কোনো মতবাদই একেবারে মৌলিক বলে দাবি করতে পারে না। প্রতিটি মতবাদই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মতবাদের সঙ্গে ইতিহাসগতভাবে যুক্ত। যেমন, মার্ক্সীয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সংযুক্ত হয়ে আছে ফুরিয়ে, ওউয়ন এবং সাঁ–সিমঁ–র কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে; যেমন, উনবিংশ শতাব্দীর উদারতন্ত্রের উৎপত্তি নিহিত আছে অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন আন্দোলনে; আবার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ উদ্ভূত হয়েছে এনসাইক্লোপেডিস্টদের চিন্তাধারা থেকে। প্রতিটি মতবাদই মানব ক্রিয়াকলাপকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে চায়; কিন্তু এই কার্যকলাপসমূহ আবার বিপরীতমুখে মতবাদকে প্রভাবিত করে, নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রূপান্তরিত করে কিংবা তাকে অতিক্রম করে যায়। সুতরাং, একটি মতবাদ হতে হবে এক প্রকার ‘জীবন্ত কর্ম’, কেবল শব্দসমূহের প্রদর্শন নয়। এই কারণেই ফ্যাসিবাদে রয়েছে একটি প্রায়োগিক ধারা, রয়েছে তার ক্ষমতার ইচ্ছা, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, সহিংসতার প্রতি মনোভাব এবং তার নিজস্ব মূল্যবোধ।

    ফ্যাসিবাদী মতবাদের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো রাষ্ট্র সম্পর্কিত তার ধারণা—রাষ্ট্রের স্বরূপ, কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্যাসিবাদের কাছে রাষ্ট্র হল পরম; ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সত্তাগুলি আপেক্ষিক। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত অস্তিত্ব কেবল তখনই স্বীকৃত, যতক্ষণ তারা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল ফলাফল রেকর্ড করার সীমিত ভূমিকায় নিজেকে আবদ্ধ রাখে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সেখানে সমাজের বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতির খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সজাগ, সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন; এই কারণেই তাকে ‘নৈতিক রাষ্ট্র‘ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

    ১৯২৯ সালে শাসনব্যবস্থার প্রথম পঞ্চবার্ষিক সম্মেলনে আমি বলেছিলাম— “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো রাত্রি–প্রহরীর মতো নয়, যে কেবল নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; কিংবা এটি এমন কোনো কাঠামোও নয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ভৌত কল্যাণ ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান—এই কাজ তো পরিচালনা পর্ষদও করতে পারে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাজনৈতিক নয়, এমনকি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নাগরিক ও জাতির বহুবিধ কার্যক্রমের প্রতি নির্লিপ্তও নয়। ফ্যাসিবাদ যে রাষ্ট্র ধারণা লালন ও বাস্তবায়ন করে, তা একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তা, যার লক্ষ্য জাতির রাজনৈতিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক সংগঠনের রূপায়ন; আর এই সংগঠন আত্মারই প্রকাশ, যার উৎস ও বিকাশ একধরনের আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতিফলন।

    রাষ্ট্র কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয় না, বরং জাতির আত্মাও সংরক্ষণ করে ও উত্তরাধিকারসূত্রে তা হস্তান্তর করে—যা গঠিত হয় দীর্ঘ ইতিহাসে তার ভাষা, রীতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে। রাষ্ট্র কেবল বর্তমান নয়; এটি অতীত, এবং সর্বোপরি ভবিষ্যতেরও প্রতীক। ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্র জাতির অন্তর্নিহিত নৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্রের অভিব্যক্তির রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।

    রাষ্ট্র নাগরিকদের নাগরিকচেতনায় শিক্ষিত করে, তাদের মিশনের প্রতি সচেতন করে, ঐক্যের আহ্বান জানায়; রাষ্ট্রের বিচার তাদের পারস্পরিক স্বার্থকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে; রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের বিজয়—বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও মানবিক সংহতির ক্ষেত্রসমূহে—হস্তান্তর করে; রাষ্ট্র মানুষকে আদিম গোত্র–জীবন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ রূপ—সাম্রাজ্যিক শাসনের দিকে নিয়ে যায়।

    রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে তাদের স্মৃতি, যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা এর আইন মান্য করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন; রাষ্ট্র ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরে সেই সকল অধিনায়কের নাম, যারা এর ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করেছেন, এবং সেই প্রতিভাবানদের নাম, যারা একে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা যখন কমে যায়, আর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বিচ্ছিন্নতা ও কেন্দ্রবিমুখ প্রবণতা যখন আধিপত্য বিস্তার করে, তখন জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।”

    ১৯২৯ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সর্বত্র এই সত্যগুলোকেই তুলে ধরেছে ও জোরদার করেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাকথিত যে ‘সঙ্কট’ চলছে, তা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। কোথায় গেলেন সেই জুল সিমোঁর ছায়া, যিনি উদারবাদের সূচনালগ্নে ঘোষণা করেছিলেন— “রাষ্ট্রের উচিত নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং ইস্তফা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে”? কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাককালকরা, যারা বলেছিলেন যে ‘রাষ্ট্রের উচিত শাসন থেকে নিজেকে বিরত রাখা’?

    আর ইংরেজ দার্শনিক বেন্থাম, যিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের একমাত্র চাহিদা রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা; অথবা জার্মান চিন্তাবিদ হাম্বোল্ট, যিনি মনে করতেন ‘সেরা সরকার’ সেই যা ‘আলসে’? আজকের দিনে রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অবিরাম, অপরিহার্য এবং জোরালো হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাঁরা কী বলতেন?

    নিশ্চয়ই একথা সত্য যে দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থনীতিবিদগণ রাষ্ট্রহীনতার প্রশ্নে প্রথম প্রজন্মের মতো কঠোর ছিলেন না, এবং এমনকি অ্যাডাম স্মিথ–ও—যদিও অনেক সতর্কতার সঙ্গে—রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার একটি সামান্য পথ উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

    ডেমোক্রেসি;
    শিল্পী: আভো ঘারিবিয়ার
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    যেখানে উদারবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, ফ্যাসিবাদ সেখানে শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক সৃষ্টিরূপে চিহ্নিত; এটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং বিপ্লবাত্মক। কারণ এটি এমন কিছু সার্বজনীন সমস্যার সমাধান পূর্বাভাস দেয়, যেগুলো অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছে।

    উদাহারণ স্বরূপ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে—দলগুলোর বিভাজন, সংসদের ক্ষমতা দখল, আইনসভাগুলোর দায়িত্বহীনতা; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে—বাণিজ্য ইউনিয়ন ও পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যেগুলোর দ্বন্দ্ব ও সমঝোতা শ্রম ও পুঁজি—উভয় ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে; এবং নৈতিক ক্ষেত্রে— দেশবাদের নৈতিক আদেশ পালনে শৃঙ্খলা, কর্তব্যপরায়ণতা ও আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিপন্ন করে।

    ফ্যাসিবাদ চায় একটি শক্তিশালী ও জৈবিক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হবে জনগণের বিস্তৃত সমর্থনের ওপর। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শাসনের দাবি করে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই; এটি তার কর্পোরেত কাঠামো, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করে। জাতির সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি—যেগুলো নিজ নিজ সংগঠনে সংগঠিত—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রবাহিত হয়।

    একটি রাষ্ট্র, যা লাখো মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তার কার্যকলাপ অনুভব করে এবং তার লক্ষ্যসাধনে আত্মনিয়োগে প্রস্তুত—সে রাষ্ট্র কোনো মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসকের অত্যাচারী রাষ্ট্র নয়। এটির সাথে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মিল নেই। ব্যক্তি–মানুষকে চূর্ণ করার পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তার শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে; যেমন একটি রেজিমেন্টে একজন সৈনিক তার সহযোদ্ধাদের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে বরং বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জাতিকে সংগঠিত করে, তবে ব্যক্তি–মানুষের জন্য যথাযথ কর্মকাণ্ডের পরিসরও বজায় রাখে। এটি অনাবশ্যক বা ক্ষতিকর স্বাধীনতাকে হ্রাস করেছে, কিন্তু যে স্বাধীনতাসমূহ অপরিহার্য, সেগুলিকে সংরক্ষণ করেছে। এ বিষয়ে ব্যক্তি নিজে বিচারক হতে পারে না; কেবল রাষ্ট্রই এই বিচার করার অধিকার রাখে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সাধারণভাবে ধর্মীয় অভিব্যক্তিগুলোর প্রতি নিরাসক্ত নয়, এবং এটি ইতালীয়দের বিশেষ ও ইতিবাচক ধর্ম—রোমান ক্যাথলিক ধর্মের প্রতিও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে না। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব নেই, তবে একটি নৈতিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। ফ্যাসিবাদ ধর্মকে আত্মার গভীরতম প্রকাশগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এই কারণেই এটি কেবল ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, বরং তা রক্ষা করে ও সংরক্ষণ করে। ফরাসি বিপ্লবের চরম পর্যায়ে কনভেনশনের সময় রোবসপিয়ের যেভাবে নিজের মতো করে একটি “ঈশ্বর” দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তেমন কোনো প্রয়াস গ্রহণ করে না; আবার বলশেভিকপন্থীরা যেভাবে মানুষের আত্মা থেকে ঈশ্বরকে মুছে ফেলতে চায়, তেমন নিষ্ফল প্রচেষ্টাও এটি করে না। বরং ফ্যাসিবাদ আত্মসংযমী সাধক, সাধু এবং বীরদের ঈশ্বরকে যেমন শ্রদ্ধা করে, তেমনি সরল ও আদিম হৃদয়ের সাধারণ জনগণের ঈশ্বরকেও সম্মান জানায়—যাঁর উদ্দেশে তারা প্রার্থনা করে।

    শিল্পী: মিম্মো পালাদিনো

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র শাসন করার এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রোমান ঐতিহ্য এক শক্তিশালী চেতনারূপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা কেবল ভূখণ্ডগত, সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; বরং তা একাধিক মাত্রায় আত্মিক ও নৈতিকও বটে। একটি সাম্রাজ্যবাদী জাতি—অর্থাৎ যে জাতি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্য জাতিগুলোর নেতৃত্ব দেয়—সে এক বর্গমাইল ভূখণ্ড দখল না করেও অস্তিত্বশীল হতে পারে। ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চেতনার মধ্যে—অর্থাৎ জাতির সম্প্রসারণমূলক প্রবণতার মধ্যে—তাদের প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখতে পায়। বিপরীত প্রবণতা, যা জাতীয় স্বার্থকে কেবলমাত্র স্বদেশের সীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তাকে ফ্যাসিবাদ অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করে। যে জাতিগুলো পুনরুত্থিত হয়, তারা স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ধারণ করে; পক্ষান্তরে, যে জাতিগুলো পতনের পথে, তাদের বৈশিষ্ট্য হলো ত্যাগের মনোভাব। ফ্যাসিবাদী মতবাদই এমন একটি মতবাদ, যা এমন এক জাতির প্রবণতা ও অনুভূতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেমন ইতালীয় জাতি, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশি দাসত্বে নিষ্ক্রিয় থাকার পর এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠা করছে।

    কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মানেই শৃঙ্খলা, প্রচেষ্টার সমন্বয়, দায়িত্ববোধের গভীরতা এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে শাসনব্যবস্থার বহু ব্যবহারিক কার্যক্রম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তির গতিপথ এবং সেই কঠোরতাকেও, যা প্রয়োগ করতে হয় তাদের বিরুদ্ধে—যারা বিংশ শতকের ইতালির এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য অভিযাত্রাকে প্রতিহত করতে চায়, উনবিংশ শতকের পরিত্যক্ত মতাদর্শকে উসকে দিয়ে। এই মতাদর্শসমূহ আজ সর্বত্র বর্জিত, যেখানে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাহসী পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

    কোনো যুগেই মানুষ আজকের মতো কর্তৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলার জন্য এত গভীর তৃষ্ণা প্রকাশ করেনি। যদি প্রতিটি যুগেরই একটি নিজস্ব মতবাদ থাকে, তবে অসংখ্য লক্ষণ এটিই নির্দেশ করে যে আমাদের যুগের মতবাদ হলো ফ্যাসিবাদ। এর প্রাণশক্তির প্রমাণ হলো—এটি এক বিশ্বাসকে উদ্দীপিত করেছে; এবং সেই বিশ্বাস যে মানুষের আত্মাকে জয় করেছে, তার প্রমাণ হলো—ফ্যাসিবাদ আজ দেখাতে পারে তার আত্মোৎসর্গকারী বীর ও শহিদদের।

    ফ্যাসিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী সেই সর্বজনীনতা অর্জন করেছে, যা প্রতিটি মতবাদ লাভ করে, যখন তা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মানব চিন্তার ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

  • ডিপ ও শ্যালো স্টেইটের সঙ্গে ইন্টেরিমের বিবাহ ও বিরহ পর্যালোচনা

    ডিপ ও শ্যালো স্টেইটের সঙ্গে ইন্টেরিমের বিবাহ ও বিরহ পর্যালোচনা

    জুলাইয়ের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে কিছু রাজনৈতিক গুরুত্ববহ শব্দ বা বচনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নাগরিক সমাজ অহরহ এগুলো ব্যবহার করছেন, এমনকি রাষ্ট্রের দায়িত্বরত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যাদি থেকেও সেসব শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এই যেমন “মব,” “মব করা,” “ডেভিল,” এবং “ডেভিল হান্ট” ইত্যাদি। এমনিতে শব্দ অর্থ প্রকাশের দিক থেকে একটা পিচ্ছিল ব্যাপার, অর্থাৎ এর ব্যবহারে নানান অনির্দিষ্টতা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র এবং বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ যখন এই শব্দগুলো একই প্রেক্ষিতে ব্যবহার করেন সেগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা থিতু হয় এবং শব্দগুলো সরকারি ও নাগরিক সমাজের শব্দভাণ্ডারে নির্দিষ্ট অর্থসহ যুক্ত হয়। এইসব শব্দের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং সরকার নাগরিককে কিছু বার্তা দিতে চায়, নাগরিক সমাজও সরকারকে কিছু বার্তা দিতে চায়। ফলে সর্বজনের স্বার্থে এই শব্দগুলোর সরকারি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবহারকে ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন আছে। সেই তাগিদ থেকে তৈরি করেছি আমার এই লেখাটি। শব্দগুলো ব্যবচ্ছেদের ফলে যা বেরিয়ে এসেছে এই লেখায়, তা হলো গণআন্দোলনের সঙ্গে ডিপ স্টেইট ও শ্যালো স্টেইটের সংহতি এবং সংঘাতের কিছু চিত্র। এই চিত্রগুলোর পর্যালোচনা করতে গিয়ে যথাস্থানে ডিপ স্টেইট ও শ্যালো স্টেইটের উদাহরণসহ সংজ্ঞা হাজির করব। এটা বলে নেয়া দরকার যে, শব্দগুলোর ব্যঞ্জনার উদাহরণ দেখাতে গিয়ে নাগরিক সমাজের যেসকল চিন্তকের বয়ান এখানে ব্যবহার করা হয়েছে তারা সকলেই জুলাই অভ্যুত্থানে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন এবং যুগিয়েছেন। অর্থাৎ শব্দগুলোর ব্যঞ্জনার যে হেরফের আমরা পাব এখানে তা বক্তাদের জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে এবং বিপক্ষে থাকা বাবদে উদ্ভূত নয়, পার্থক্যটা তাদের রাষ্ট্রচিন্তাগত পার্থক্য থেকে আসা।

    প্রথমেই আসি মধ্যে ‘মব‘ প্রসঙ্গে। মব কী, এ নিয়ে সবার মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন ধারণা আছে যা প্রথম আলো প্রস্তাবিত অর্থ “দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা“র সঙ্গে যায়। মবের আদি অর্থ মোবাইল ভারগাস, অর্থাৎ অস্থির জনতা। মোবাইল ভারগাসকে সংক্ষেপে মোবিলিটিও বলা হতো নোবিলিটির বিপরীতে, যেখানে নোবিলিটি হচ্ছে সুস্থির উচ্চবর্গ, আর মোবিলিটি হচ্ছে অস্থির নিম্নবর্গ। অস্থির নিম্নবর্গ যখন সুস্থির উচ্চবর্গের স্থাপিত স্থিতিশীলতা ভাঙে তখন তাদের তাচ্ছিল্যভরে বলা হতো মব। কালে কালে মবের বৈশিষ্ট্যের বিস্তার হয়েছে, আধুনিক ব্যবহারে অর্থ দাঁড়িয়েছে নৈরাজ্যমূলক ও ধ্বংসাত্মক কাণ্ডে লিপ্ত উত্তেজিত জনতা। তবে এই বাংলাদেশে যাদের “মব” বলা হয়েছে এবং হচ্ছে সেই মবের প্রতি নাগরিক সমাজের সবার মনোভঙ্গী এক নয়। এই প্রসঙ্গে অন্তত দুজন স্বনামখ্যাত চিন্তককে দেখেছি, মব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোর উপর ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করছেন, ভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন, যা আমদের আহ্বান জানায় মবকে ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখতে। এরমধ্যে একজন হলেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, “জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভকে ‘মব‘ বলা হাসিনার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের ভাষা।” অর্থাৎ –এর সঙ্গে মজহার যুক্ত করে দিচ্ছেন এই যে, রাজ্যের (রাষ্ট্রের) নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই নৈরাজ্য, রাষ্ট্র কর্তৃক নিপীড়ন করার ব্যবস্থা গড়ার প্রতিক্রিয়ায় জনতার এই ভাঙা। অর্থাৎ এই বিশৃঙ্খলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ বাবদে ন্যায়সিদ্ধ। এটা অনেকটা মবের আদি অর্থ নোবিলিটির বিপরীতে মোবিলিটির সমার্থক। পাঠক, এখানে মজহার উল্লেখিত “ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র” প্রসঙ্গে একটা নোক্তা দিয়ে রাখি। এই লেখায় স্টেইট বা রাষ্ট্র বলতে, পরিচালনা বাবদে উদ্ভূত রাষ্ট্রের একটা সংস্করণ বা ভার্শনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যেক সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের একটি উপস্থিত সংস্করণ তৈরি করেন। যেমন শেখ হাসিনার আমলের শেষ দশ বছর “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” এর যে ভার্শনটি উপস্থিত ছিল তা হলো একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    ফরহাদ মজহারের ব্যাখ্যাটি এমন সময় প্রকাশ পেলো যখন অন্তর্বর্তী সরকার এবং জুলাই অভ্যুত্থানে সমর্থন দেয়া বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশটি “তৌহিদী জনতার” নামে দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে মব বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং এসময়ের গুরুত্বপূর্ণ তরুণ চিন্তক মাহফুজ আলম ওই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য করে অনুরোধ করেছেন, “অভ্যুত্থানের পক্ষে হলে মব করা বন্ধ করেন, আর যদি মব করেন, তাইলে আপনাদেরও ডেভিল হিসাবে ট্রিট করা হবে।” অনুরোধটির মধ্যে একটি সতর্কবাণী আছে যা বহু পাঠকের কাছে হুমকি বলে মনে হয়েছে। তার কারণ হলো দেশে যৌথবাহিনীর “অপারেশন ডেভিল হান্ট” চলছে। এধরনের অপারেশনের একটা ইতিহাস আছে যা জনমনে ভীতি তৈরি করে রেখেছে। ফলে মাহফুজ আলমের হুঁশিয়ারিমূলক কথাটি তৎক্ষণাৎ ওই ইতিহাসের প্রেক্ষিতে পঠিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষিত প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক। “অপারেশন ক্লিন হার্ট“-এ বহু লোক প্রাণ হারিয়েছে যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সংস্থাগুলোর মতে, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে সন্দেহভাজনদের প্রাণ গেছে, সন্দেহ প্রমাণের জন্য ডিউ প্রসেস অবলম্বন করা হয়নি। এমনিতে “অপারেশন ডেভিল হান্ট” এর ব্যাপারে ওই সকল সংস্থাসহ নাগরিক সমাজের অনেকে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন। আপত্তির কারণ আছে। সংবিধানে “মানবিক মর্যাদা“কে অন্যতম মূলনীতি রেখে, নাগরিককে “ডেভিল” হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না। মানবিক মর্যাদার মূল কথাই হলো মানুষকে তার মানবজন্মের জন্য মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। মানবদেহের মর্যাদাও এর মধ্যে পড়ে। একারণে, চোখের বিনিময়ে চোখ তুলে নেয়া সুবিচার হিসেবে গ্রাহ্য হয় না। কেউ কারও “রগ কেটে” জেলে গেলে, বিচারক অপরাধীর “রগ কেটে” “উচিত বিচার” করেন না। সে বাবদে নাগরিককে আগেই “ডেভিল” নাম দেয়া হচ্ছে “গিভ দেম এ ব্যাড নেইম, অ্যান্ড হ্যাং দেম” পলিসির অংশ। এটা সম্মতি উৎপাদনের কৌশলও বটে। এই অপারেশনে প্রাণ যাদের যাবে তারা কোনো বিচার ছাড়াই “ডেভিল” হিসেবে সাব্যস্ত হবে। কেননা কোনো কাজ একজন নাগরিককে “ডেভিল” বানায় তার কোনো আইনি ব্যাখ্যা নেই। রাষ্ট্র “মানবিক মর্যাদা“কে অন্যতম মূলনীতি রেখে নাগরিককে মানবেতর “ডেভিল” সাব্যস্তই করতে পারে না, সেখানে রাষ্ট্র উল্টা “ডেভিল” ক্যাটাগরিটাকে উন্মুক্ত রেখেছে, যাতে রাষ্ট্র তার সঙ্গে বনিবনা না হলে নাগরিককে “ডেভিল” হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারে।

    মাহফুজ আলম সতর্কবাণীটা যদিও লঘু পাপে গুরুদণ্ডের মতোই শোনায় আপাত পাঠে কিন্তু অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখলে বিষয়টা মোটেও লঘু নয়। তার ব্যাখ্যাও উপদেষ্টা দিয়েছেন, “বিপ্লবী জনতা আর খণ্ড খণ্ড মব আলাদা জিনিস। লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন এ মবসংস্কৃতির কারণে উপকৃত হচ্ছে আমাদের শত্রুরা। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আমাদের কঠোর হতে হবে।” অর্থাৎ “মব করা” বা দলবদ্ধভাবে লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্যাটাগরিতে পড়ছে। যা কঠোরভাবে দমন করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। শুধু ইন্টেরিম নয়, জনগণের একটি বড় অংশও মনে করে মব সংস্কৃতির কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের শত্রুরা অর্থাৎ পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার উপকৃত হচ্ছে। তাদের “টুপ করে” ঢুকে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, জুলাইয়ের অর্জনে যারা অবদান রেখেছেন এবং যারা এই অর্জনে সমর্থন যুগিয়েছেন তাদের কারোরই তা কাম্য নয়। সম্প্রতি আয়নাঘরের আংশিক চিত্র সবাই দেখেছেন, এটা কেবল কয়েক হাজার ভুক্তিভুগির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, খোদ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে জাতিসংঘ। সেবাদে ইন্টেরিম সরকারের ভয়টা কত সর্বগ্রাসী হতে পারে তা ভাবনার বিষয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা বাবদে পাশার দান পাল্টে গেলে তাদের কী অবস্থা হবে সেই ভয়ের মাত্রা নিয়ে বললাম কথাটা। কিন্তু ভয় থেকে রাষ্ট্র অপারেট করলে কী বিপদ হতে পারে সেদিকে এবার নজর দেয়া যাক।

    এক্ষেত্রে উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মন্তব্য প্রাসঙ্গিক, তা হলো, “পতিত ফ্যাসিস্টরা লাখ লাখ কোটি টাকা খরচ করে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।” এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রে দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাটা আর লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যবিহীন থাকে না, কিংবা দেশকে অস্থিতিশীল করার শত্রুপক্ষীয় উদ্দেশ্য থেকে আলাদা করা যায় না। তাই পত্রিকায় পাই, “দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টাকারী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীরা যাতে সহজে জামিন না পান”, সেটা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ ও আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রের মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং আইনের আসিফ নজরুল। একই রিপোর্টে পাচ্ছি, আইন উপদেষ্টা “মবতন্ত্র” নিয়েও মন্তব্য করেছেন, বলেছেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিকভাবে কাজ করলে মব–তন্ত্র কমে যাবে।” উপরোক্ত ভয়ের মাত্রাগত দিকটা উপদেষ্টাদের ‘জামিন‘ সংক্রান্ত উপদেশের মধ্যেও প্রকাশ পায়। এখন প্রশ্ন হলো, আইন উপদেষ্টা কি আইনত এই উপদেশ দিতে পারেন? না, পারেন না। সেটাই বলেছেন স্বনামখ্যাত আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, তার মতে “জামিন বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যা বলেছেন তা বিচার বিভাগের উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার সামিল।” আসিফ নজরুল এবং জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দুজনেই আইনের ছাত্র এবং স্বনামখ্যাত চিন্তক, অভ্যুত্থানে সরাসরি সমর্থন যুগিয়েছেন। তবু আইনের ব্যাখ্যা ছাড়াও যে ভেদটা চোখে পড়ছে তা হলো অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশকে কে কীভাবে দেখতে চান। নাগরিক সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করে ইন্টেরিম পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর ফিরে আসার ভয়ে অন্ধ না হয়ে যাক, কেননা তাতে নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম নিতে পারে।

    “মব সংস্কৃতি” বা “মবতন্ত্র” দমনে “অপারেশন ডেভিল হান্ট“-এর হুঁশিয়ারি দেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশ দেয়া বাবদে উপদেষ্টাদের বক্তব্যগুলো অনেকে শেখ মুজিবের “লাল ঘোড়া দাবড়ে দেয়ার” হুঁশিয়ারি সঙ্গে তুলনা করেছেন। আসলেই মিলটা কোথায়? মিলটা হচ্ছে রেজিম তার অস্তিত্ব রক্ষায় আক্রমণাত্মক হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন রেজিমের তৈরি করা স্টেইটের ভার্শনটি টিকিয়ে রাখতে পুরনো ভার্শন টিকিয়ে রাখার অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইছে। ভালোমন্দ বিচার মুলতবি রেখে বিষয়টি এভাবে দেখা যেতে পারে, স্টেইট মাত্রই স্থিতি চায়, শব্দের ব্যুৎপত্তিতেও ব্যাপারটি খোদিত আছে, স্টেইট এবং অবস্থা একই শব্দের দুইরূপ, এখানে ‘স্থা-‘ থেকেই স্থিতি। যখন কেউ সেই স্থিতি নষ্ট করতে চায়, রাষ্ট্রকে অ–স্থিতি–শীল করতে চায়, রাষ্ট্র তা প্রতিহত করতে প্রতিক্রিয়া করে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভার্শন অন্তর্বর্তী রাষ্ট্র সেই প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করছে। এখন অভ্যুত্থানকারী ছাত্র–জনতার সমর্থিত রেজিম আমাদের দুধ দিবে বলে তার লাত্থি খেয়ে হজম করার পক্ষে নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ দাঁড়িয়েছেন। তাদের অবস্থান হলো, “অপারেশন ডেভিল হান্ট” হান্ট করবে পতিত ফ্যাসিস্টদের। এখানে মানুষকে ডেভিল জ্ঞানে “হান্ট” করা যায় কিনা, তাতে মানবিক মর্যাদার হানি হয় কিনা সেই আলাপকে তারা ত্যানা প্যাঁচানো বলে এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু নাগরিক সমাজের সবাই তা মেনে নিচ্ছেন না। তাদের কথা হলো সংবিধানের প্রস্তাবিত নতুন মূলনীতি মতে সরকারের হাতে যেকোনো অর্থে হান্টার থাকাটা নাগরিকের জন্য অমর্যাদাকর। প্রশ্ন উঠবে আয়নাঘর যে ফ্যাসিস্টদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার সাক্ষ্যবহন করছে তাদের জন্যও কি “অপারেশন ডেভিল হান্ট” পরিচালনা করা যাবে না? নাগরিক সমাজের একটি অংশের উত্তর হচ্ছে যাবে না, কেননা এধরনের অপারেশন দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার রাস্তা তৈরি হয়। তাছাড়া ডিউ প্রসেস ছাড়া কে ফ্যাসিস্ট আর কে মব তা বাছবিচার সমসময় সম্ভব হবে না। ডিউ প্রসেস দিয়েই ফ্যাসিস্টদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া সম্ভব।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    নানাবিধ ব্যবহারিক কারণেও আমি মনে করি “মব” এবং “ডেভিল” ক্যাটাগরি দুটাই বাদ দিতে হবে আমাদের। নাগরিক সমাজের একটি অংশ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনাকে মবের কাজ মনে করেন। নাগরিক সমাজের অন্য একটি অংশ মনে করেন এটা ফ্যাসিবাদ বিরোধী অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা। ফলে তা হান্টযোগ্য মব নয়। কেননা সেটা মজহারের কথা ধার করে বলা যায় “জনগণের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ“-এর বহিঃপ্রকাশ। কাছাকাছি একটি ক্রিটিকাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরেক স্বনামখ্যাত চিন্তক সেলিম রেজা নিউটন, বলেছেন “হাজার হাজার মানুষ যখন রাজনৈতিক কারণে জড়ো হয়, তাকে মব বলে না, তাই যদি হয় তাহলে তো ৩৬শে জুলাই বঙ্গভবনে যে জনতা ঢুকেছিল তারাও মব।” সেলিম রেজা নিউটনের কেবল চিন্তক হিসেবে এই বক্তব্যে হাজির করা তাই শুধু নয়, তিনি আন্দোলনেরও ক্ষুব্ধ অংশ: যখন আন্দোলনকারী ছাত্রদের পুলিস ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তিনি পুলিসের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে ছাত্রদের ছিনিয়ে এনেছিলেন। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি আরও বলেন, “মব একটা পুলিশি শব্দ মাত্র।” একই প্রসঙ্গে তার ব্যাখ্যা ও অভিমত ব্যক্ত হয়েছে তার এই মন্তব্যে, “গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তাঁকে আশ্রয়দানকারী ভারতীয় শাসকদের প্রতি প্রচণ্ড আক্রোশও আজকের ধ্বংস–তাড়নার পেছনে কাজ করেছে।…এই তাড়নাকে বিবেচনায় নিয়েই জুলাই–নেতৃত্বকে সামনে যেতে হবে।” এখানে নিউটনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারও একমত। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, “ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনা অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। পলাতক অবস্থায় ভারতে বসে জুলাই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণে জনমনে গভীর ক্রোধের সৃষ্টি হয়েছে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।”

    উপরোক্ত মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে স্বনামখ্যাত চিন্তক আনু মুহাম্মদসহ ২৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। যেখানে ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনাটিক গণ–উত্তেজক সহিংসতা বা মব ভায়োলেন্স হিসেবে সাব্যস্ত করেন, এবং বিচারযোগ্য অপরাধ মনে করেন। এবং তারা এও মনে করেন “কোনো ধরনের গণ–উত্তেজক সহিংসতা বা মব ভায়োলেন্স কেবলমাত্র ফ্যাসিবাদের কর্মী–সমর্থক এবং তাদের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকদের নাশকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকেই উৎসাহিত করবে।” এর সঙ্গে আনু মুহাম্মদের ব্যক্তিগত মতও যোগ যাক, তিনি বলেন, “সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ী, চিহ্ন, প্রতীক ভেঙে রাগ দেখানো যায়, ফ্যাসিবাদ যায় না। ফ্যাসিবাদের পুনরুৎপাদন হয়!” এই প্রসঙ্গে এটা বলা দরকার যে সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ভাঙাকে নেতিবাচক কাজ হিসেবেই দেখেছেন, ফ্যাসিবাদের আইডলস (মূর্তি) ভাঙার চেয়ে উনি ফ্যাসিবাদের আইডিয়ালস (চিন্তা, আদর্শ) ভাঙার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ নিয়ে সেলিম রেজা নিউটনের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছোট্ট একটি সংলাপ হয়। নিউটনের “গণবিক্ষোভের কার্যকারণও বিবেচনায় নেয়ার প্রয়োজন আছে” মন্তব্যের জবাবে উপদেষ্টা আলম বলেন “এ সব সাপ্রেশনের (গণবিক্ষোভের কারণ) বহিঃপ্রকাশ ইতিবাচক হলেই আমরা দীর্ঘমেয়াদে জিতব।” এখানে এসে নিউটনও একমত হন। কিন্তু নৈরাষ্ট্রবাদী নিউটন বর্তমান রাষ্ট্রকে জুলাই আন্দোলনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন বাবদে একটু ছাড় দিলেও, “মব” বিষয়ে মজহার তার একই অবস্থানে আছেন, বই মেলাতে তৌহিদী জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন।

    ফরহাদ মজহার তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধের দাবিতে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভের কার্যকারণও বিবেচনায় নিতে চান। তিনি বলেন, তসলিমা নাসরিন স্বঘোষিত জুলাই অভ্যুত্থানের বিরোধী। তিনি শুধু লেখক নন, হিন্দুত্ববাদী দিল্লীর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পক্ষে একজন প্রপাগান্ডিস্ট। তার বিরুদ্ধে ‘তৌহিদী জনতার‘ প্রতিরোধ এবং রণধ্বনি সকল প্রকার গোলামির বিরুদ্ধে। এটা জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিতকতা। উপদেষ্টা সরকারকে এটা বুঝতে আহ্বান করেছেন যে এই প্রতিরোধের পেছনে জনগণের গণঅভিপ্রায়ের উপাদান আছে। পাঠক খেয়াল করে দেখুন, সেলিম রেজা নিউটন ৩২ নম্বর বাড়িতে ভাংচুরের ঘটনার পেছনে যে কারণটি উপদেষ্টা সরকারকে বিবেচনা করতে বলেছেন, সেই একই কারণ ফরহাদ মজহার বিবেচনা করতে বলছেন বইমেলায় বই নিষিদ্ধের দাবিতে তৌহিদী জনতার বিক্ষোভ প্রসঙ্গে। লেখকের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষুব্ধ সমাজের প্রতি মজহারের পাল্টা জবাব হচ্ছে জাহানারা ইমামের গণআদালত ছিল “মবজাস্টিস” প্রকৃষ্ট উদাহরণ, তখন নাগরিক সমাজ এর সমর্থনই দিয়েছিলেন। এখানেও একটি নোক্তা প্রয়োজন। জাহানারা ইমামের গণআদালতও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন তৎকালীন নাগরিক সমাজ, এর মধ্যে গণঅভিপ্রায় দেখেছেন, এমনকি ফরহাদ মজহার নিজেও দেখেছেন সেই গণঅভিপ্রায় যা তার “রাষ্ট্রদ্রোহী জাহানারা আসছে, হুঁশিয়ার” কবিতায় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এর মধ্যে ব্যক্তি হিসেবে মজহারের অবস্থানের স্ববিরোধিতা আছে কি না সেটা জানা আমাদের উদ্দেশ্য না, আমাদের উদ্দেশ্য হলো, যেসব ঘটনাগুলো বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র থেকে “মব” বলা হয়েছে তা আসলে “গণঅভিপ্রায়ের বিধ্বংসী বহিঃপ্রকাশ” কি না।

    উপরের আলোচনায় দেখা যাচ্ছে “মব” এবং “অন্যায়ের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ জনতা” কখনো এক হয়ে যাচ্ছে কখনো আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এখানে যারা এক করছেন তারা কখনো আলাদা করছেন, আবার যারা আলাদা করছেন তারা কখনো কখনো এক করছেন। এই বিষয়টি আরও জটিল আরও একটি যুক্তিতে। জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের একদল দাবি করছেন তৌহিদী জনতাই যাত্রাবাড়ির যুদ্ধে প্রাণ দিয়ে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনকে তরান্বিত করেছে। এই তৌহিদী জনতা শাহবাগ আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদের সূতিকাগার মনে করে, এবং শাপলাচত্বরের পাল্টা আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শুরুয়াত মনে করে। অর্থাৎ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে তৌহিদী জনতার একটা সংহতি ছিল যখন ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই প্রত্যক্ষ ছিল। আজ সেই লড়াইয়ে জিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া অংশ যখন সরকার গঠন করেছে তখন তৌহিদী জনতার লড়াই শেষ হয়নি। তৌহিদী জনতা তাদের মনমত রাষ্ট্র চায়, যা এখনো অর্জিত হয়নি। সেই বাবদে তৌহিদী জনতা একটি রাজনৈতিক কমিউনিটি যাদের ইমাজিনেশনে একটি আদর্শ রাষ্ট্র বর্তমান। বাস্তবে বিদ্যমান রাষ্ট্র যদি সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে নৈরাজ্য (নৈরাষ্ট্র) তৈরি করা তাদের জন্য দায়িত্ব হয়ে পড়ে, আইন নিজের হাতে নেয়া কর্তব্য হয়ে পড়ে। তারা তাই করছে, ফলে তারা মাইন্ডলেস মব না। তুলনার জন্য “ঘাতক–দালাল নির্মূল কমিটি“র কথা তোলা যেতে পারে, কমিটিটি কি মব ছিল? ছিল না। জাহানারা ইমাম কি রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন? ছিলেন না। তাদের ইমাজিনেশনের আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে রাষ্ট্রের আদালত থাকার পরও তারা গণআদালত গঠন করেছিলেন, অভিযুক্তের বিচার করে শাস্তি দিয়েছিলেন। ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। এখানে কোনটা ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ আর কোনটা নেতিবাচক তার কোনো সার্বজনীন ঐক্যমত্য নাই।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    এমতাবস্তায় এদেরকে “মব” বলব না, বলব শ্যালো স্টেইট। শ্যালো স্টেইটের ধারণাটি আলোচিত হয় ডিপ স্টেইটের বিপরীতে। সরকার চালায় স্টেইট, কোনো কোনো রাষ্ট্রে সরকারকে চালায় রাষ্ট্রের অরাজনৈতিক অংশের ক্ষমতাধরদের একটি অংশ। সেই অংশটি রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভেতর থেকে প্রভাবিত করে। মূলত রাষ্ট্র বিষয়ে নিজস্ব মতামতের প্রকাশ দেখতে ইচ্ছুক আর্মি, পুলিস ও আমলারা এই অংশটি তৈরি করেন। এরা তুলনামূলকভাবে স্থায়ী, অর্থাৎ সরকার আসে সরকার যায়, ডিপ স্টেট থেকে যায়। এরা সংগঠিত, অনুচ্চ, রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে অভিজ্ঞ, বাস্তবে রাষ্ট্র কেমন হবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। যদিও ডিপ স্টেট নিয়ে অনেক ফাঁপানো গল্প আছে, যার বেশির ভাগেরই ভিত্তি পাওয়া যায় না। সেসব বাদ দিয়ে এটুকুতো আমরা দেখতে পাই কখনো কখনো শাসন সরকারের হাতে থাকলেও প্রশাসন আমলা, পুলিস এবং আর্মিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই প্রভাবকে সাধারণতো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, কেননা এটার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা নাই। আবার এও দেখেছি রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে ডিপ স্টেইট কখনো কখনো ইতিবাচক ভূমিকাতে জেগে ওঠে। এমনটাও প্রচার হয়েছে যে আর্মির ভেতর থেকে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পক্ষে একটি অংশ ভূমিকা রেখেছে। পারিপার্শ্বিক উপাত্তের আলোকে এটা বিশ্বাস করা যায়।

    এবার ডিপ স্টেইটের প্রেক্ষিতে শ্যালো স্টেইটকে দেখা যাক। শ্যালো স্টেইট ডিপ স্টেইটের ঠিক উল্টা, এরা দৃশ্যমান, উগ্র, রাষ্ট্র কিংবা সমাজের আচরণে ক্ষুব্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ। কিন্তু মিলের জায়গাটি হলো তাদেরও রাষ্ট্রচিন্তা আছে, তারা লক্ষ্য উদ্দেশ্যহীন না। যেমন ঘাতক–দালাল নির্মূল কমিটির একটা রাষ্ট্রচিন্তা ছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে তার বনিবনা হয়নি। তাই তারা যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ভার নিজদের হাতে তুলে নিয়েছিল, সেটা প্রতীকী হলেও রাষ্ট্রের জন্য একটা চাপ। আবার যেমন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রকল্পনার সঙ্গে হেফাজতের বনিবনা না হওয়া। হেফাজত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। এরা শ্যালো স্টেইট, এরা রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু রাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করেই সংগঠিত। আজ যাদের তৌহিদী জনতা বলছি তারাও আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল, তখন অবশ্য ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে তার সংহতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটাতো বোধগম্য যে তৌহিদী জনতার যে রাষ্ট্রকল্প তা পুরপুরি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলেই তারা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। আজ ড. ইউনূসের রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তোলাটা নেতিবাচক হিসেবে দেখছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই নেতিবাচকভাবে দেখার পেছনে যে যুক্তি সেটা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি। যে প্রতিক্রিয়া সরকার দেখাচ্ছে সেটারও সমালোচনা হাজির করেছি। তবে এটা স্বীকার্য যে জুলাই অভ্যুত্থান যে প্রতিশ্রুতি আর সুযোগ নিয়ে এসেছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রাষ্ট্রকে, তার সংবিধানকে সংস্কার করার, তা করতে রাষ্ট্রের সুস্থিতি প্রয়োজন। তাই উপদেষ্টা পরিষদকে উপদেশ দিতে চাই, তারা যেন কোনো শ্যালো স্টেইটকে ডিপ স্টেইটের অ্যাপেরাটাস দিয়ে “ট্রিট” না করে, বরং নিজেরাই “ডিল” করে বা মোকাবেলা করে। বিগত সরকার শ্যালো স্টেইটকে ট্রিট করতেই কিন্তু তাদের জঙ্গি সাব্যস্ত করে, আয়নাঘর বানায়, অনন্ত যুদ্ধে ঢুকে পড়ে।

    তৌহিদী জনতার নামে যে ক্ষোভের প্রকাশ হয় তার মধ্যে তাৎক্ষণিকতা থাকলেও একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। যেমন মাজার ভাঙা, বাউল–ফকির–বয়াতিদের উপর আক্রমণ করা গত রেজিমেও বেশ বিদ্যমান ছিল, বর্তমান রেজিমেও বিরাজমান আছে। তৌহিদী জনতার ব্যাখ্যা হলো, এসব শিরকী কাজ কারবার। এটা কোনো নতুন কথা নয়, বাউল ধ্বংসের ফতোয়াগুলো এই ধারণা থেকেই দেয়া। শিরক হলো তৌহিদের বিপরীত, ফলে একে ধ্বংস করতে হবে। শিরকের প্রশ্নে ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে ঘাবড়ে দেয়া সহজ, কেননা একটা ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ এবং এই অপরাধ কেবল মুসলমানদের উপরই প্রযোজ্য। শিরকের পরেই তৌহিদী জনতা আরও একটি বিষয়কে ক্ষমার অযোগ্য একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেন, তাহলো হযরত মুহম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তি করা, যাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা যায় শাতিম করা। শাতিমের অপরাধে যেকোনো ধর্মের ব্যক্তিকে শাস্তি দেবার বিধান রয়েছে তৌহিদী জনতার কাছে। বহু কেইস আছে যেখানে শাতিম–এ–রসুল, রসুল (সাঃ)-এর অবমাননার অভিযোগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিপীড়ন করা হয়েছে, বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি কবি সোহেল হাসান গালিবকে একটি কবিতায় তৌহিদী জনতার শাতিম–এ–রসুল খোঁজার অতি উৎসাহ নিয়ে ক্রিটিক করে একটি কবিতা লিখেছেন, সেটাকেও শাতিম–এ–রাসুল হিসেবে সাব্যস্ত করে তাকে বিপদে ফেলা হয়েছে, খবরের কাগজে এসেছে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও, বসন্তবরণ, নববর্ষবরণ, নারীদের ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে তৌহিদী জনতার বক্তব্য আছে যা নাগরিক সমাজের সবার জন্য গ্রহণযোগ্য না। ফলে তাদের ক্ষোভ হয়, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সামনে শিয়া, আহমদিয়াদের ব্যাপারেও তাদের অসন্তোষ নিয়ে হাজির হবে অনুমান করা যায়। এখন উপায়? আমার মতে মুসলমান সমাজকে, নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়েই উপায় বের করতে হবে সরকারকে। তার কিছু ইঙ্গিত রেখে লেখাটির উপসংহার টানছি। তবে বলে নেয়া ভালো এ কোনো নতুন উপায় না, বহুল আলোচিত এবং উপেক্ষিত উপায়।

    শিল্পী: ধ্রুব চন্দ্র রায়

    উপায়টি এক বাক্যে বললে বলা যায়: জান–মান–মাল ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের জবানকে স্বাধীন করে দেয়া। তো, জবান স্বাধীন করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কেননা, জবান সরাসরি চিন্তাভাবনার সঙ্গে জড়িত। জবানের বা প্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া চিন্তাভাবনা আগাতে পারে না। চিন্তাভাবনা না আগালে কোনো ব্যক্তি, বর্গ, জাতি (নেশন) আগাতে পারে না, তা পর্যবেক্ষিত সত্য। রাষ্ট্রকে তাই পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে রাষ্ট্র কী ধরনের জবানকে সুরক্ষা দিবে, কী ধরনের জবানকে দিবে না। যেমন সরকার এবং সরকারের তৈরি করা রাষ্ট্রের ভার্শনের সমালোচনার সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। আবার, যেমন জনগণের জান–মান–মালের ক্ষতিসাধনের হুমকি ও সহিংসতার প্ররোচনা যেহেতু আইনত অপরাধ তার সুরক্ষা রাষ্ট্র দিবে না। এটা পরিষ্কার হতে হবে, যেসব বাচনিক, আঙ্গিক এবং অন্যান্য মাধ্যমগত প্রকাশ আইনত অপরাধ সেই অপরাধের অভিযুক্তের বিচার করা কেবলমাত্র রাষ্ট্রের এখতিয়ার। কোনো ব্যক্তি বা বর্গ অভিযুক্তের ক্ষতিসাধন করতে গেলে তাও অপরাধ বলে বিবেচ্য হবে প্রচলিত আইনে। কোনো স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নয়, ট্রিটমেন্টের কোনো অর্থেই নয়। এটা হলো পূর্বকথিত উপায়ের সূচনার দিকটা, তবে দীর্ঘমেয়াদি সুফলের জন্য একটি বৃহত্তর সংলাপের প্রয়োজন। সেই সংলাপের বিষয় হলো বাংলাদেশে মুসলমান প্রশ্ন। সামাজিক পরিসরে নাগরিক সমাজ মুসলমান প্রশ্নটির ধারাবাহিক আলাপ হওয়া দরকার।

    প্রসঙ্গত বলে রাখি, ইসলাম প্রশ্নের কথা বলছি না, বাংলাদেশে ইসলাম কোনো প্রশ্ন নয়। যা হাজির আছে, তাহলো মুসলমান প্রশ্ন। মাইনরিটিকেই সবসময় প্রশ্ন আকারে দেখা হয়ে আসছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, হেফাজত, তৌহিদী জনতা, প্রভৃতির শ্যালো স্টেইটের ক্ষুব্ধ উপস্থিতির প্রেক্ষিতে, ম্যাজোরিটির প্রশ্নটি ফয়সালা করা দরকার। কেননা উপরোক্ত শ্যালো স্টেইটগুলো ম্যাজোরিটির দোহাই দিয়েই চাপটা তৈরি করে। উল্টো দিকে যাদের দোহাই দিয়ে এরা তাদের ক্ষোভ দেখায়, সেই বাংলাদেশে মুসলমানদের মধ্যে তৌহিদী জনতা নামের উপবর্গ বা সাব–ক্যাটাগরিটি হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে। প্রশ্ন জাগে, বাকি মুসলমানরা তাহলে তৌহিদী না? অথচ বিশ্বাসী মুসলমান মানেই তৌহিদী জনতা, কারণ তারা তৌহিদ অথবা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করেন। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, অর্থাৎ এক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই, এ কথা বিশ্বাস করেই একজন মানুষ মুসলমান হয়।

    ফলে, প্রায় নব্বই শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে “তৌহিদী জনতা” বা “আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী জনতা” নামে একটি বিশেষ বর্গ করার কারণ নিয়ে জনপরিসরে তাদের প্রশ্ন করা দরকার। “তৌহিদী জনতা” নামে পরিচিত মুসলমানদের যদি সত্যিই কোনো রাষ্ট্রকল্প থাকে, অর্থাৎ আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা থাকে, যেমন তৌহিদী রাষ্ট্র বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্র, তবে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সেটা শোনা উচিত, তাদের সঙ্গে সংলাপ করা উচিত। বাংলাদেশের ম্যাজোরিটি মুসলমান যে গণতন্ত্র চায়, সেটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। ম্যাজোরিটি মুসলমানের রাষ্ট্রকল্পের সাক্ষী বাংলাদেশের ইতিহাস। তৎকালীন পাকিস্তান পূর্ববঙ্গসহ ইসলামিক রিপাবলিক গড়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে গিয়েছিল, ইসলামের অপমান করে লাখো মুসলমানকে হত্যা করেছিল সেই একনায়কতন্ত্র। শেষপর্যন্ত, পূর্ববঙ্গের লক্ষ লক্ষ মুসলমান পিউপল‘স রিপাবলিক আনার জন্য সত্তরে ভোট দিয়েছিল, একাত্তরে জীবন দিয়েছিল। সেই পিউপল‘স রিপাবলিক যখন বিভিন্ন সময় একনায়কতন্ত্রে বা ফ্যাসিবাদে মোড় নেয়, গণতন্ত্রকামী মুসলমানরা তাদের পিউপল‘স রিপাবলিক ফিরিয়ে আনতে জীবন দিয়েছে। এখন “তৌহিদী জনতা” বাংলাদেশের ম্যাজোরিটি মুসলমানের আদর্শ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় কি না, সেটা পাবলিক পরিসরে পরিষ্কারভাবে বলুক।

  • নোম চমস্কি ।। মানুষের স্বাধীনতা ও মানুষের মন

    নোম চমস্কি ।। মানুষের স্বাধীনতা ও মানুষের মন

    • অনুবাদ: আব্দুল্লাহ হেল বুবুন

    [নোম চমস্কি ভাষাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছেন এই তত্ত্বের মাধ্যমে যে, মানুষের ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা প্রকৃতিগত বা জৈবিক (innate) এবং ভাষা ব্যবহার ও অর্জন শুধুমাত্র পরিবেশগত উদ্দীপনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, বরং তা মানুষের মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কগ্নিটিভ কাঠামোর অস্তিত্বকে প্রমাণ করে।

    স্বভাবতই তার কাজ ওইসব অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্বগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে, যা মানুষের মনকে ট্যাবুলা রাসা বা ফাঁকা স্লেট বলে মনে করে ( চমস্কি এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলিকে “উগ্র পরিবেশবাদ” বলে উল্লেখ করেছেন)। রাজনৈতিকভাবে নিজেদেরকে র‍্যাডিকেল মনে করা বিভিন্ন তাত্ত্বিক (যাদের মধ্যে মার্ক্সবাদী এবং পোস্ট–স্ট্রাকচারালিস্টরাও ছিলেন, যেমনঃ মিশেল ফুকো) চমস্কির ভাষা তত্ত্বকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন; তারা একটি স্থির অপরিবর্তনীয় মানব প্রকৃতির ধারণাকে অস্বীকার করেন। এই সংক্ষিপ্ত লেখনীতে চমস্কি উলটো যুক্তি দেন যে, “স্থির অপরিবর্তনীয় মানব প্রকৃতি“-কে অস্বীকার করা তত্ত্বগুলি কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যকে বৈধতা প্রদান করে কিংবা করতে সক্ষম; অন্যদিকে মানব মনের জৈবিক/সহজাত কাঠামো যে মানব সৃষ্টিশীলতার ভিত্তি প্রদান করে— এই তত্ত্ব মানব মুক্তি জন্য আরও শক্তশালী যুক্তি হতে পারে পারে।

    লেখাটি রবার্ট গ্রাহাম সম্পাদিত “অ্যানার্কিজম: অ্যা ডকুমেন্টারি হিস্ট্রি অব লিবার্টারিয়ান আইডিয়াস” এর তৃতীয় ভলিউম থেকে নেয়া হয়েছে। মূল লেখা চমস্কির “রিফ্লেকশান অন ল্যাংগুয়েজ” এ প্রথম প্রকাশিত হয়। – অনুবাদক]

    যেসব মতবাদে বলা হয়, মানুষের মনের জৈবিকভাবে কোন স্থির ও অপরিবর্তনীয় কাঠামো নেই এবং মানুষের মন ও তার সক্ষমতা পরিবেশ ও সমাজের বিবর্তনের সাথে পরিবর্তনশীল, সেই মতবাদগুলো বেশীরভাগ সময় প্রগতিশীল, এমনকি বিপ্লবী সামাজিক চিন্তার অংশ বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অ–পরিবর্তনীয় মানব প্রবৃত্তি নিয়ে তৈরি বিভিন্ন তত্ত্ব ও ধ্যানধারণাকে প্রায়শই রক্ষণশীল এবং হতাশাবাদী বলা হয়ে থাকে। কেন সংস্কারক এবং বিপ্লবীরা উগ্র পরিবেশবাদী হন, তা সহজেই অনুধাবনযোগ্য এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, স্থির–অপরিবর্তনীয় মানব প্রকৃতির ধারণাগুলি সামাজিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাধা তৈরি করতে এবং প্রতিষ্ঠিত বিশেষাধিকার তথা স্ট্যাটাস কুয়ো রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং হচ্ছে।

    কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যাবে যে, “ফাঁকা স্লেটের” ধারণাটি (অর্থ্যাৎ কোন অ–পরিবর্তনযোগ্য ট্রান্সহিস্ট্রিকাল মানব প্রকৃতি নেই) শুধুমাত্র মিথ্যা নয়, এটি স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক মতবাদকে সমর্থন করতে পারে। যদি মানব প্রকৃতি আসলেই প্লাস্টিকের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হয় অর্থ্যাৎ নির্দিষ্ট সামাজিক–অর্থনৈতিক পরিবেশে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে যারা কর্তৃত্বের দাবী জানায়, “বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন” হয়, এবং কম প্রজ্ঞাবানদের জন্য কোনটা ভালো, তা জানে, তাদের দ্বারাই তো অন্যান্যদের নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত?

    অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব খুব সহজেই এমন একটি মতাদর্শে রূপান্তরিত হতে পারে যা ভ্যানগার্ড পার্টির জন্য উপযোগী, যারা মনে করে, তারা জনগণের জন্য কোনটা ভালো তা জানে এবং জনগণকে একটা ‘বেটার‘ সমাজে নেতৃত্ব দেয়ার অথোরিটি তাদের রয়েছে। এই ‘বেটার‘ সমাজ হবে ‘লাল আমলাতন্ত্র‘ (রেড ব্যুরোক্রেসি) দ্বারা শাসিত এক সমাজ; এই ব্যবস্থা সম্পর্কে বাকুনিন পূর্বেই আমাদেরকে সতর্ক করে গেছেন। এবং একইভাবে মানব প্রকৃতির প্লাস্টিসিটির এই মতবাদ উদারবাদী টেকনোক্রাট বা কর্পোরেট ব্যবস্থাপকদের জন্যও উপযোগী হতে পারে, যারা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে “গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ” একচেটিয়া করে; যাকে বাকুনিনের ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বলেছিলেন জনগণের লাঠি দিয়ে জনগণকেই আঘাত করা। উভয়েরই যুক্তি হবে এমনঃ যেহেতু আমরা জানি মানুষের জন্য কোনটা ভালো এবং আমরা এটাও জানি, মানুষের কোন অ–পরিবর্তনীয় ন্যাচার বা প্রকৃতি নেই, তাই মানুষকে আমরা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে পরিচালিত করতে পারি।

    মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে নিয়ে মানব প্রকৃতি যদি ইতিহাস এবং বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্কের ফলাফল ছাড়া আর কিছুই না–ই হয়, তবে এই মতাদর্শ তথা ধারণা ক্ষমতাসীনদের জন্য সকল প্রকারের জবরদস্তি তথা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দেয়। আমার মনে হয়, এ কারণেই এই ধারণাটি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্টিজানদের কাছে এতোটা আকর্ষণীয়। আমি অন্যত্র কর্তৃত্ববাদী সমাজতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সমর্থকদের মধ্যে বিকাশিত মতবাদগুলোতে বিস্ময়কর সাদৃশ্য আলোচনা করেছি, যারা “স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতক উভয় ক্ষেত্রেই একটি সেকুলার পুরোহিতশ্রেণী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, যাদের মানুষ এবং পৃথিবীর সকল বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে অনন্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞান রয়েছে” (ইসাইয়া বার্লিন, “দ্য বেন্ট টুইগ”)। বাকুনিনের কাছে এই টেকনোক্র‍্যাট বুদ্ধিজীবীরা ছিল একটা “নতুন শ্রেণি“, যারা এমন একটি “বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা সমস্ত শাসনব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে অ্যারিস্টোক্রেটিক, স্বৈরাচারী, উদ্ধত এবং এলিটিস্ট”। তাদের কাছে “ট্যাবুলা রাসা” মতবাদ যে আবেদন তৈরী করবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

    মাইন্ড কন্ট্রোল;
    শিল্পী: ব্রায়ান টেয়লর;
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    সৃজনশীলতা কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম এবং রীতির একটি সিস্টেমের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, যা আংশিকভাবে মানুষের জৈবিক তথা সহজাত (inherent) সক্ষমতা দ্বারা নির্ধারিত হয়। সিস্টেমের এমন সীমাবদ্ধতা তথা constraint ছাড়া শুধুমাত্র র‍্যান্ডম ও এলোমেলো কার্যক্রমই সম্ভব, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড নয়। কমন সেন্স এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান উভয় বৈশিষ্ট্যই মানব মনের কাঠামোর সাথে যুক্ত নীতিগুলো থেকে উদ্ভূত হয়। সুতরাং, কেবল প্রতিবন্ধকতার অভাবকেই মানব স্বাধীনতা ভাবা একটি ভুল হবে। বাকুনিন একবার বলেছিলেন যে “মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যই (laws of our nature)… আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি গঠন করে” এবং এই মানব প্রকৃতিই “আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত শর্ত এবং কার্যকর কারণ”। একটি মুক্তিকামী সামাজিক তত্ত্ব মানব প্রকৃতি কি, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করবে এবং এর উপর ভিত্তি করে সামাজিক পরিবর্তনের ধারণা এবং এর তাৎক্ষণিক এবং দূরবর্তী লক্ষ্য তৈরি করবে। যদি সত্যিই মানব প্রকৃতি বাকুনিনের “বিদ্রোহের প্রবৃত্তি” বা মার্কসের ‘স্পিসিজ ক্যারেক্টার” (species character— যার উপর ভিত্তি করে মার্ক্স তারা বিচ্ছিন্ন শ্রম বা Alienated Labour এর ধারণা তৈরি করেছে) ধারণ করে, তবে অবশ্যই এমন কর্তৃত্ববাদী সামাজিক ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চলতে থাকবে যা “আমাদের নিজস্ব প্রকৃতি” –র বাইরে গিয়ে মানবাচরণের উপর অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতা তথা বিধিনিষেধ আরোপ করে। প্রকৃত বিপ্লবী চিন্তক এবং অ্যাক্টিভিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে এধরণের কর্তৃত্ববাদী ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে কাজ করে আসছেন।

    মনের অন্তর্নিহিত জৈবিক কাঠামো যেমন কগ্নিটিভ ডেভেলপমেন্ট এর ভিত্তি তৈরী করে, একইভাবে “স্পিসিজ ক্যারেক্টার” বা “প্রজাতির চরিত্র” নৈতিক চেতনা, সংস্কৃতির নির্মাণ ও বিকাশ, এবং এমনকি একটি মুক্ত ও ন্যায্য সমাজে অংশগ্রহণের ফ্রেমওয়ার্ক প্রদান করে—এটা অনুমান করা যৌক্তিক। অবশ্যই, কগ্নিটিভ বিকাশের ভিত্তি সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ থেকে মানব প্রকৃতির রূপ এবং সেগুলির পূর্ণতার শর্তসমূহ সম্পর্কিত নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক লাফ (ইন্টেলেকচুয়াল লিপ); অর্থ্যাৎ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যে, মানবিক চাহিদা ও সক্ষমতাগুলো তাদের পূর্ণ প্রকাশ পাবে এমন একটি সমাজে, যেখানে স্বাধীন ও সৃজনশীল উৎপাদকরা ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন ব্যবস্থায় কাজ করবে, যেখানে “সামাজিক বন্ধন” মানব সমাজের “সকল শৃঙ্খলকে প্রতিস্থাপন করবে” [উইলহেম ভন হাম্বোল্ট]। এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, এমন দাবী উত্থাপনে সক্ষম একটি শক্তিশালী ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেডিশন রয়েছে। যদিও এই ট্রেডিশন প্রগতি এবং আলোকায়নের প্রতি অভিজ্ঞতাবাদী প্রতিশ্রুতি থেকে উদ্ভূত, আমি মনে করি এর গভীরতর শিকড় মানব স্বাধীনতার একটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার যুক্তিবাদী প্রচেষ্টার মধ্যে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে বিকশিত ধারণাগুলিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান করা, শক্তিশালী করা এবং সম্ভব হলে প্রমাণিত করা মুক্তিপরায়ণ সামাজিক তত্ত্বের জন্য একটি মৌলিক কাজ। ভবিষ্যতে আরও অনুসন্ধান সমস্যাগুলি সমাধান করার উপায় বের করবে না হাজির হবে এমন সব রহস্য নিয়ে যা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করবে, তা শুধু সময়ই বলে দিবে।

    যদি এই প্রচেষ্টা সফল হয়, তাহলে তা বার্ট্রান্ড রাসেলের এই নিরাশাবাদী ধারণাকে খণ্ডন করবে যে, মানুষের “আবেগ ও প্রবৃত্তি” তাকে যুক্তি দ্বারা সৃষ্ট “বৈজ্ঞানিক সভ্যতা”–র সুযোগ–সুবিধা উপভোগ করতে অক্ষম করে তোলে (রাসেলের “ইকারাস, অথবা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান“)। এটা সম্ভব যদি আমরা “আবেগ ও প্রবৃত্তি”–র মাঝে সেই “প্রবৃত্তিগুলো”–কে অন্তর্ভুক্ত করে নেই (যেমন রাসেল কখনও কখনও করেছিলেন) যা সৃজনশীল বুদ্ধির সাফল্যের ভিত্তি তৈরী করে, এবং সেই সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নেই আরোপিত কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে “বিদ্রোহের প্রবৃত্তি”—যা কিছুটা হলেও, একটি সাধারণ মানবীয় বৈশিষ্ট্য। মানব প্রকৃতি ব্যাখ্যায় এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্তর্ভুক্তি একারণেই জরুরী যে, এই আবেগ এবং প্রবৃত্তিগুলো মার্কস যাকে “মানব সমাজের প্রাক–ইতিহাস” বলেছেন, তার সমাপ্তি টানতে সক্ষম। প্রতিযোগিতামূলক এবং কর্তৃত্ববাদী সামাজিক কাঠামো দ্বারা আর দমিত এবং শোষিত না হয়ে এই আবেগ এবং প্রবৃত্তিগুলো হয়তো এমন এক নতুন বৈজ্ঞানিক সভ্যতার মঞ্চ প্রস্তুত করবে, যেখানে “প্রাণীর স্বভাব” তথা অ্যানিমল ন্যাচার অতিক্রমিত হবে এবং মানব প্রকৃতি সত্যিকারের বিকাশ লাভ অর্জন করবে।

  • ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকে যে চোখে দেখতেন গান্ধী

    ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকে যে চোখে দেখতেন গান্ধী

    [ভারত–ইসরায়েল পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে। আড়াই দশকের ব্যবধানে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েল সফর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ২৫ বছরে ইসরায়েল ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মোট রফতানিকৃত অস্ত্রের ৪১ শতাংশ ক্রয়ের মধ্য দিয়ে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই ২৫ বছরের কথা বাদ দিলে বিগত ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ভারতের প্রায় সাড়ে চার দশক সময় লেগেছিল দিল্লিতে ইসরায়েলি দূতাবাস স্থাপন (১৯৯২ সাল) করতে। এর প্রধানতম কারণ, ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার প্রতি ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন, যার প্রেরণায় ছিলেন ভারতের জাতিগত মুক্তি আন্দোলনের প্রবাদ–ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী। ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর জার্মান বিদ্বেষের সূচনার দিনগুলোতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গান্ধী ‘দ্য জিউস’ শিরোনামে এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য ১৯৩৮ সালে রচিত সেই নিবন্ধের ভাষান্তর হাজির করেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায়, ২০১৮ সালে। অরাজের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা পুনরায় অরাজে তুলে দেয়া হলো।– সারোয়ার তুষার]

    আর্টওয়ার্ক: মেনি সেন্সশিপ
    শিল্পী: রামিরো জারদোয়া
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন অনেক চিঠি আমার হাতে এসেছে যেগুলোতে ফিলিস্তিনের আরব–ইহুদি প্রশ্ন আর জার্মানিতে ইহুদি নিপীড়ন সম্পর্কে আমার মতামত প্রত্যাশা করা হয়েছে। খুবই জটিল এই প্রসঙ্গকে ঘিরে আমার নিজের মতামত অস্বস্তিহীন নয়, যা আপনাদের সামনে হাজির করার ঝুঁকি নিচ্ছি।

    ইহুদিদের প্রতি আমার পরিপূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমি তাদের ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছি। কেউ কেউ আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছেন। সেই বান্ধবদের কাছ থেকে আমি তাদের ওপর বহু বছর ধরে চলতে থাকা নিপীড়নের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছি। খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে তারা অস্পৃশ্য। ইহুদিদের প্রতি খ্রিস্টানদের আচরণ আর নমশূদ্রদের প্রতি হিন্দুদের আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই অমানবিক আচরণের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় দোহাই তোলা হয়েছে ধর্মীয় অনুমোদনের। সুতরাং বন্ধুত্বের বাইরেও ইহুদিদের প্রতি আমার সমবেদনার একটা সাধারণ সর্বজনীন পাটাতন রয়েছে। তবে সমবেদনার সেই প্রশ্নটি আমাকে ন্যায়বিচারের অপরিহার্যতার প্রশ্নে অন্ধ রাখতে পারেনি। কেবল ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্রের আকুতি আমার মনে তেমন কোনও আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। এর পক্ষে যুক্তি খোঁজা হয় বাইবেল আর সেই গ্রোথিত বিশ্বাসের মধ্যে যে, ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের জন্য আকুল।

    কিন্তু কেন ইহুদিরা দুনিয়ার আর সবার মতো জন্ম নেওয়া আর জীবিকা যাপন করার দেশকে জন্মভূমি ভাবতে পারে না ? ফিলিস্তিন আরব জনগণের, ঠিক যে অর্থে ইংল্যান্ড ইংরেজদের অথবা ফ্রান্স ফরাসিদের। ইহুদি জনগোষ্ঠীকে আরবদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একইসঙ্গে ভুল আর অমানবিক। ফিলিস্তিনে বর্তমানে যা ঘটে চলেছে তাকে নৈতিকতার কোনও মানদণ্ডেই ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। চলমান বাস্তবতার তাৎপর্য একটাই, বিগত যুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা। আরবদের অপদস্থ করে ফিলিস্তিন অংশত কিংবা পুরোপুরি ইহুদিদের জাতীয় আবাস হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে তা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের শামিল হবে। এর চেয়ে বরং যেখানে ইহুদিদের জন্ম ও রুটি–রুজি সেখানেই তাদের সাথে ন্যায্য আচরণের দাবির প্রতি জোর দেয়া উচিত। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা একজন ইহুদি ততটাই ফরাসি, যতটা ফরাসি সেখানে জন্ম নেওয়া একজন খ্রিস্টান।

    ইহুদিদের যদি ফিলিস্তিন ছাড়া আর কোনও আবাস না থাকে, তাহলে কি তারা পৃথিবীর অন্য যেসব প্রান্তে এতকাল ধরে বসতি স্থাপন করে আছে, সে সবের বেলায় কী হবে? সেই সব স্থান থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে চাওয়া হলে তারা কি তা সহজভাবে নেবে? নাকি তারা কোনও দ্বৈত আবাসভূমি চায়, যেখানে তারা খেয়ালখুশি মতো থাকতে পারবে? জাতীয় আবাসভূমির জন্য এই তোড়জোড় জার্মানির ইহুদি বিতাড়নকেই কৃত্রিম বৈধতা দেয়। তবে ইতিহাসে জার্মানির ইহুদি নিপীড়নের সমতুল্য কোনও নজির নেই। প্রাচীনকালের নিপীড়কেরাও হিটলারের সমান উন্মাদ হতে পারেনি। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হিটলার এটা করছেন। একচেটিয়া ও জঙ্গি জাতীয়তাবাদ হলো হিটলারের সেই ধর্মীয় মতবাদ, যার মাধ্যমে যেকোনও অমানবিক কাজকেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মানবিক বলে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত করা যায়।

    একজন নির্দয় উন্মাদ তরুণের অপরাধ তার গোটা জাতিকে অবিশ্বাস্যরকমের হিংস্রতা সমেত তাড়া করে ফিরছে। সমগ্র জাতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত নিপীড়ন প্রতিরোধ করতে জার্মানির বিরুদ্ধে মানবতার নামে ও মানবতার স্বার্থে একটা ন্যায়যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাহলে সেটা সম্পূর্ণ ন্যায্য হবে। কিন্তু যুদ্ধে আমার কোনও আস্থা নেই। এমন একটি যুদ্ধের ইতি–নেতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করা তাই আমার মনোগত অবস্থান ও নীতির বাইরে। ইহুদিদের সাথে এমন অপরাধ সংঘটিত করার পরেও জার্মানির বিরুদ্ধে কোনও ন্যাযুদ্ধ নাই হতে পারে। তবে কোনোভাবেই জার্মানির কোনও মিত্র থাকতে পারে না। যে জাতি (যুক্তরাজ্য) নিজেদের ন্যায় ও গণতন্ত্রের পক্ষের বলে দাবি করে তার সাথে কী করে ওই দুই নীতির ঘোষিত শত্রুর মৈত্রী হয়? ইংল্যান্ড কি তাহলে সশস্ত্র একনায়কতন্ত্র বলতে যা বোঝায় সেই পথে যাত্রা শুরু করেছে?

    গোটা দুনিয়াকে জার্মানি দেখাচ্ছে, মানবতার মুখোশে হাজির হওয়া সহিংসতাকে কী নিপুণভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ভণ্ডামি আর ভানগুলোকে তখন দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। জার্মানি আরও দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত নগ্নতায় হাজির হওয়া সহিংসতা কতটা কুৎসিত, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় হতে পারে। ইহুদিরা কি এই সংগঠিত ও নির্লজ্জ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে? নিজেদের আত্মমর্যাদা সংরক্ষণ করা ও নিজেদের অসহায়, ঘৃণিত, অচ্ছুত না ভাবার কি কোন উপায় তাদের আছে? আমি মনে করি আছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও ব্যক্তিই নিজেকে নিঃসহায় কিংবা অচ্ছুত ভাবতে পারে না।

    শিল্পী: ভাসিলি কান্ডিনস্কি

    মূলগতভাবে ঈশ্বর সর্বজনীন–অদ্বিতীয় ও বর্ণনাতীত। তবে খ্রিস্টান, মুসলমান ও হিন্দুদের স্রষ্টার চেয়ে ইহুদিদের ঈশ্বর Jehovah আরও বেশি করে তাদের একান্ত। যেহেতু ইহুদিরা তাদের সেই ঈশ্বরের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যশীল এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডকেই ইশ্বর–নিয়ন্ত্রিত মনে করেন; সুতরাং তাদের নিজেদের অসহায় মনে করার কোনও কারণ নেই। আমি যদি জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এবং সেখানে জীবনযাপন করা একজন ইহুদি হতাম, তাহলে আমি জার্মানিকে আমার মাতৃভূমি মনে করতাম এবং সর্বোচ্চ অ–ইহুদি জার্মান শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে বুক পাতিয়ে আমাকে গুলি করার চ্যালেঞ্জ জানাতাম। অথবা আমাকে ভূগর্ভস্থ কারাগারে নিক্ষেপ করতে বলতাম। আমি বিতাড়নকে প্রত্যাখ্যান করতাম, বৈষম্যপূর্ণ আচরণের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতাম না। আমার ইহুদি সতীর্থরা গণপ্রতিরোধে আমার সাথে যোগ দিবে এই অপেক্ষা করতাম না। কারণ, আমার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস থাকতো যে শেষমেশ অন্য ইহুদিরা আমার পথেই হাঁটতে শুরু করবে।

    এখন ফিলিস্তিনি ইহুদিদের উদ্দেশে কিছু কথা। আমার কোনও সন্দেহ নেই যে তারা ভুলপথে অগ্রসর হচ্ছে। বাইবেলের ধারণায় বর্ণিত ফিলিস্তিন কোনও ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়। এটি ইহুদিদের আধ্যাত্মভূমি। তারপরও তারা যদি ফিলিস্তিনি ভূমিকে তাদের জাতীয় আবাস মনে করে, তাহলেও ব্রিটিশ বন্দুকের ছত্রছায়ায় সেখানে প্রবেশ করা ঠিক নয়। কারণ, বেয়নেট কিংবা বোমার সাহায্য নিয়ে কোন ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা উচিত নয়। একমাত্র আরবদের সদ্দিচ্ছায় তারা ফিলিস্তিনে থিতু হতে পারে। তাদের উচিত আরবদের হৃদয় জয় করার উপায় খোঁজা।

    আরবদের মনোভূতিতে যে ঈশ্বরের আবাস, একই সেই ঈশ্বর রয়েছেন ইহুদিদের হৃদয়ভূমিতেও। তাদের ধর্মীয় প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে তারা বিশ্ব–জনমতকে তাদের অনুকূলে পাবে। ব্রিটিশ বেয়নেটের সহায়তা পরিত্যাগ করলেই কেবল আরবদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর ভিন্ন–বিভিন্ন পথ বের হবে। কিন্তু ব্রিটিশদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা এমন একটা জনগোষ্ঠীকে সর্বস্বান্ত করছে, যারা (ফিলিস্তিনি) তাদের কোনও ক্ষতি করেনি। আমার এই অবস্থান আরবদের প্রতি আমার মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাত নয়। আমি শুধু চাইছি, যাকে তারা [আরবদের দখলকৃত ভূমিতে] অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা অনিবার্য আঘাত হিসেবে দেখছেন তা প্রতিরোধে তারা অহিংসার নীতি অবলম্বন করুক। কিন্তু অভূতপূর্ব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও, ন্যায় অন্যায়ের সর্বজনীন বিধিবিধানের কারণেই আরবদের প্রতিরোধকে নাকচ করা যায় না।

    তাহলে যে ইহুদিরা নিজেদের (ঈশ্বর কর্তৃক) নির্বাচিত জাতি মনে করে, তারা পৃথিবীতে তাদের যথার্থতা প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে অহিংস নীতি অবলম্বন করে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করুক। ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর সব দেশই তাদের দেশ, কিন্তু সেটা আগ্রাসনের মাধ্যমে [দখল] নয়, ভালোবাসার মাধ্যমে জয় করুক তারা। আমার এক ইহুদি বন্ধু আমাকে সেসিল রথের ‘সভ্যতায় ইহুদিদের অবদান‘ বইটি পাঠিয়েছেন। এতে পৃথিবীর শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষির সমৃদ্ধিতে ইহুদিদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিজেদের ইচ্ছাশক্তির বলেই ইহুদিরা পশ্চিম কর্তৃক উচ্ছিষ্ট, উপেক্ষিত কিংবা পৃষ্ঠপোষিত হওয়ার বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তারা ঈশ্বর কর্তৃক বর্জিত নিষ্ঠুর হওয়ার পরিবর্তে ঈশ্বরের নির্বাচিত সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীর মনোযোগ ও শ্রদ্ধার দাবিদার হতে পারে। তারা তাদের অজস্র অবদানের বাস্তবতায় অহিংস নীতির ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অতুলনীয় বিষয়টিকে যুক্ত করতে পারে।

  • ডেভিড গ্রেইবার ।। জাদু ও রাজনীতি: বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারছি না

    ডেভিড গ্রেইবার ।। জাদু ও রাজনীতি: বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারছি না

    * অনুবাদ: আনিয়া ফাহমিন

    [ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেইবার এর এই প্রবন্ধটি ২০১২ সালে the Baffler ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধটিতে গ্রেইবার ম্যাজিক বা জাদুর ধারণা ও রাজনীতির মধ্যে একটি অন্তর্গত সম্পর্ক আবিষ্কার করছেন, যেখানে রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের মধ্যে কীভাবে ধর্মতাত্ত্বিক ও জাদুকরী একটা চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায় সেদিকে ইঙ্গিত করছেন। অরাজের জন্য গ্রেইবারের এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন আনিয়া ফাহমিন। মূল ইংরেজি প্রবন্ধটি এই লিংকে ক্লিক করলে পাবেন– সম্পাদক]

    David Graeber, left, speaks at Maagdenhuis occupation, University of Amsterdam, 2015. To his left, political theorist Enzo Rossi. Photo by Guido van Nispe

    ১.

    রাজনীতিবিদরা স্বভাবতই অসৎ, তারা সকলেই মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তবে মার্কিন রাজনীতির অনেক পর্যবেক্ষকই স্বীকার করবেন যে, বিগত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অসততার মাত্রায় একপ্রকার গুণগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পারতপক্ষে নির্দিষ্ট কিছু দলীয় এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যাপারে একপ্রকার গর্হিত, উদ্ভট মিথ্যাচারকে বৈধতা দেয়ার জন্য নিয়ম পরিবর্তনের সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষণীয়, যা অন্যান্য রাষ্ট্রে সচরাচর দেখা যায় না। সারাহ প্যালিন ও তার “ডেথ প্যানেল” এই নতুন শৈলীর প্রবর্তক হলেও দ্রুতই মিশেল বাখম্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়া আইন আরোপের সরকারি পরিকল্পনা বা ডলার ত্যাগ ও চীনা ইউয়ান দিয়ে এটি প্রতিস্থাপনের গোপন পরিকল্পনার দাবির মাধ্যমে বিষয়টিকে দর্শনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়। মিট রমনিই মিথ্যাচারের মহিমা বা আড়ম্বরের দিক থেকে প্যালিন বা বাখম্যানকে অতিক্রম করতে না পারলেও, সম্পূর্ণ জালিয়াতির ভিত্তিতে তার সমগ্র প্রেসিডেন্সিয়াল কেম্পেইন পরিচালনার মাধ্যমে মাত্রায় তা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। রিপাবলিকানদের এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত উস্কানি ছাড়া অন্য কিছু ভাবা কষ্টকর। প্রার্থীরা যেন মিডিয়া এবং ডেমোক্র্যাটদের চ্যালেঞ্জ করছে তাদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দেয়ার জন্য।

    এর অর্থ কী দাঁড়ায়? প্রথমত, ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে না যে উপরোক্ত তিনজন রাজনীতিবিদই অত্যন্ত ধার্মিক। সারাহ প্যালিন এবং মিশেল বাখম্যান ইভেনজিলিকাল; রমনি একসময় মরমন বিশপ ছিলেন। এইসব ধর্মীয় মহলে বিশ্বাস এবং মিথ্যা হল এমন বিষয় যা একজনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা নির্দেশ করে। ফলে যখন মিডিয়া কর্তৃক এসব রাজনীতিবিদদের মিথ্যা ফাঁস হয় তখন তাদের ধর্মীয় সমর্থকরা অবিচলিত থাকে। বরঞ্চ, কোন সাংবাদিক যদি সচেতন অসততার প্রতি ইঙ্গিত করে তবে তাদের সমর্থকদের সেই সাংবাদিকের উপর ক্ষুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ক্যারিশম্যাটিকস এবং ইভাঞ্জেলিক্যালরা খ্রিস্টধর্মের এমন রূপ অনুসরণ করে যেখানে পারতপক্ষে বিশ্বাসই একমাত্র উপাদান। বিশ্বাসীদের, যারা স্বর্গীয় আত্মার কাছে নিজেদের সঁপে দিয়েছে,তাদের নিয়তের পবিত্রতা সম্পর্কে কোন প্রশ্নই থাকতে পারে না। অথচ কিছু সেকুলার লিবারেল এলিটিস্ট মিডিয়া তাদের মিথ্যাবাদী বলছে?

    ডানপন্থী রিপাবলিকানরা যা করছে তা মূলত একপ্রকার জাদুকরী কৌশলের রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের একটি ধর্মতাত্ত্বিক সংস্করণ। তারা বিশ্বাসের দ্বারা একটা জগতকে বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে।

    অবশ্যই লিবারেলদের জন্য এর অর্থ হল, রিপাবলিকানরা তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত এক স্বপ্নের দুনিয়ায় বসবাস করে। তারা নিজেদের “রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটি‘ হিসেবে কল্পনা করে, যারা তথ্য–প্রমান সংগ্রহে দৃঢ়ভাবে গুরুত্ব আরোপ করে এবং জগতের প্রকৃত রুপ অনুসন্ধান করে।

    কথাটার উৎপত্তির মধ্যেই এর অর্থ নিহিত। প্রাক্তন ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল প্রতিনিধি রন সাস্কিন্ডের নিউ ইয়র্ক টাইম ম্যাগাজিনে লেখা “Faith, Certainty and the presidency of George W. Bush” – শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে এটি নেয়া।

    প্রবন্ধটি মূলত আমার আলোচ্য বিষয়টিই ব্যাখা করে, যে বুশ ফ্যানদের জন্য তার অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের পবিত্রতাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে অনুচ্ছেদটি সাস্কিন্ড কে বিখ্যাত করে তোলে তা ছিল বুশের একজন অজ্ঞাতনামা ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টার সাথে কথোপকথন, যা তার ভাষ্যমতে বুশের প্রেসিডেন্সির একেবারে মূলে প্রবেশ করে।

    সহযোগীটি বলেছিলেন যে আমার মতো মানুষেরা এমন সমাজে বাস করে ” যাকে আমরা বলি রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটি”। এসব মানুষকে তিনি এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যে, যারা “বিশ্বাস করেন যে সমাধানগুলি আপনাদের উপলব্ধিযোগ্য বাস্তবতার বিচারপূর্ণ অধ্যয়ন থেকে বেরিয়ে আসে।” আমি আলোকিত নীতি এবং অভিজ্ঞতাবাদ সম্পর্কে কিছু বিড়বিড় করে বললাম। সে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বর্তমান বিশ্ব আর এভাবে কাজ করে না, আমরা এখন একটি সাম্রাজ্য, এবং যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে আমরা নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করি এবং যেই সময়ে আপনি সেই বাস্তবতা অধ্যয়ন করবেন, অবশ্যই বিবেচনার সঙ্গে, আমরা আবার নতুন বাস্তবতা তৈরি করব, সেগুলিও আপনি অধ্যয়ন করতে পারবেন। আমরা ইতিহাসের অভিনেতা… এবং আপনি, আপনারা সবাই, আমরা যা করি তা শুধুমাত্র অধ্যয়ন করবেন।”

    লিবারেলরা যা যা বিশ্বাস করতে চাইতো তার সবই এই অনুচ্ছেদটি নিশ্চিত করে।

    “Proud member of the reality based community” ঘোষণা দিয়ে বাটন, টিশার্ট তৈরি হতে থাকে। বাক্যটি একটি শিবলেথ–এ পরিণত হয়। তবে এক্ষেত্রেও যে যা দেখা যায় তার সবটা সত্যি নয়, এমনটা ভাবার কারণ আছে। পরবর্তীতে অনেক সাংবাদিকই দেখিয়েছেন যে সাস্কিন্ডের কাজ অবাস্তব সব গুণাবলী এবং এমন কিছু উক্তির সমন্বয়ে গঠিত যার সোর্সদের খুঁজে বের করার পর তারা দাবি করেন এমন কথা তারা কখনো বলেননি। তাছাড়া বুশের কোন সহযোগীকে অন্য কেউ এমন কথা বলতে শোনেননি। পুরো ঘটনাটা বানোয়াট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

    রিয়ালিটি বেসড কমিউনিটির সম্পূর্ণ ধারণাটাই কি একটি অসাধারণ ভণ্ডামি? বর্তমান আমেরিকার রাজনৈতিক বিতর্কের সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো, মেইনস্ট্রিম ডান এবং বামপন্থীরা তাদের নিজস্ব বাস্তবতা তৈরিতে এতটাই মগ্ন যে কোন প্রকার অর্থবহ কথোপকথন এক্ষেত্রে অসম্ভব। যেমন, কোন এক সময়ে লিবারেল এবং কনজারভেটিভরা দারিদ্র্যের মূল কারণ নিয়ে আলোচনা করত। এখন তারা আলোচনা করে দারিদ্রের আদৌও অস্তিত্ব আছে কিনা। এক সময় তারা বর্ণবাদকে পরাস্ত করার বিষয়ে তর্ক করতো, এখন কনজারভেটিভদের বলতে শোনা যায়, যারা তাদের মিথ্যাবাদী আখ্যা দেয় তারাই যেমন প্রকৃত মিথ্যাবাদী, ঠিক তেমনি তারাই প্রকৃত বর্ণবাদী যারা অন্যকে বর্ণবাদী আখ্যা দেয়। তবে অপরপক্ষও একই কাজ করে। একজন খ্রিস্টান কনজারভেটিভ যদি মার্কিন মূল ধারার সংস্কৃতিতে সেকুলার চিন্তাধারায় “লিবারেল এলিট” –দের আধিপত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে চায়, অথবা কোনো রান্ড পল সমর্থক যদি ফেডারেল রিজার্ভ এবং ইউ.এস সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনা করতে চায় তবে তারা একই ধরনের অবিশ্বাসের মুখোমুখি হবে।

    মূলধারার বামপন্থাকে আলোকায়নের অভিজ্ঞতাবাদের ঐতিহ্যের সাথে চিহ্নিত করার ব্যাপারটা অদ্ভুত, কেননা বামধারার শ্রেষ্ঠ অবতাররা অবজেক্টিভ সত্যের ধারণাকে ধ্বংস করার পেছনেই গত প্রজন্ম পার করেন। লিবারেল সমাজেও চার্চের সমকক্ষ প্রতিষ্ঠান রয়েছে আর তা হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ধর্মতত্ত্ববিদদের মতো বুদ্ধিজীবীরা। তারা ঠিক ততটাই শ্রদ্ধার সাথে গিলস ডেলিউজ, মিশেল ফুকো এবং জ্যাক দেরিদার কাজ ব্যাখ্যা করেন যতটা শ্রদ্ধা রেডিক্যালদের রয়েছে কার্ল মার্কস এর জন্য। এইসব লেখকরা আলোকায়নের বিরোধিতা ছাড়া কিই বা করেন?

    মূল ধারার ডেমোক্রেটিক বাম এবং রিপাবলিকান ডানপন্থীরা বহুদিন যাবত আমেরিকান প্রতারণা, প্রবঞ্চনার ঐতিহ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তবে বিভিন্নভাবে তারা এটাকে ন্যায্যতা দেয়। ডানপন্থীরা যা করে অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের যুক্তি দিয়ে; বামপন্থীরা আগে বিজ্ঞানের যুক্তিতে এবং বর্তমানে একপ্রকার উত্তর উপনিবেশবাদী অ্যান্টি সাইন্স এর উপর নির্ভর করে। তবে দুটোই মূলত একই উদ্দেশ্য পূরণ করে।

    দুটো পন্থাই তাদের নিজ নিজ দলের সামাজিক ভিত্তির জন্য যথাযথ– শতকরা এক ভাগ যা তাদের অনুদান, সংস্কৃতি আর সংবেদনশীলতার যোগান দেয়। রিপাবলিকানরা ব্যবসায়িক দল হিসেবে কুখ্যাত। বিষয়টা অবাক করার মতো না যে তারা একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সি.ই.ও. এর অভ্যন্তরীণ কনফিডেন্সকে ধারন করে এবং উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যা যা বলা দরকার তার সবটাই বলতে রাজি এবং কোম্পানি চালানোর জন্য যা করা প্রয়োজন তার সবটাই করতে রাজি। বারবারা এরেনরিচের মতে ডেমোক্রেট্ররা “পেশাদার ব্যবস্থাপক শ্রেণী ” এর দল– শিক্ষক, উকিল, সমাজকর্মী ও মনোবিজ্ঞানীদের দল। কাজেই এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, তাদের ওয়েল্টানশাউং–এর সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি হল মিশেল ফুকোর কাজ, অন্তত বিশ বছর ধরে সমসাময়িক মার্কিন একাডেমির দেবতা, এবং একজন ব্যক্তি যিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে পেশাদার ডিসকোর্সগুলো শক্তির এমন রূপ যা সেইসব বাস্তবতা তৈরি করে যা তারা পরিচালনার দাবি করে থাকে। বা নব্বইয়ের দশকে এবং কয়েক দশক ধরে যখন মার্কিন অর্থনীতি আরও স্পষ্টভাবে বুদ্বুদ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, এবং হলিউড ও বিশেষ করে ওয়াল স্ট্রিটের অর্থ ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে ব্যয় করা হয়, তখন বুদ্ধিজীবী মহলগুলোতে এ জাতীয় ধারণার গ্রহণযোগ্যতা আরও অযৌক্তিক হয়ে ওঠে।

    আমি এক্ষেত্রে কোনো সহজ একক সংযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছি না। বিষয়টা এমন নয় যে বামপন্থী আমেরিকান একাডেমিকরা সরাসরি ওয়াল স্ট্রিট ফান্ডিং দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। কিন্তু এই সিস্টেমের সৌন্দর্যই হল যে তার প্রয়োজন নেই। অন্য সবার মত তারাও বাবলের জগতে বাস করে। এবং তাদের বিদ্যমান তাত্ত্বিক বিন্যাস, এমন একটি পেশাদার বিশ্বের দৈনন্দিন সাধারণ জ্ঞান থেকে জন্ম নেয়া যেখানে পরিচয় ব্যবস্থাপনাই সবকিছু, একটি বুদ্বুদ অর্থনীতির যুক্তিকেই প্রতিফলিত করে।

    ২০০৮ সালে ক্র্যাশের ঠিক আগে আমার কনফারেন্স এবং সেমিনারে যোগ দেওয়ার কথা মনে আছে। যেখানে আমি সাংস্কৃতিক তত্ত্ব বা বিজ্ঞান অধ্যয়নরত ছাত্রদের বা এমনকি মৌলবাদী রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের জটিল জারগন ভরা উপস্থাপনা শুনেছিলাম। তারা দাবি করেছিল “প্রিএম্পশন“, “সিকিউরিটাইজেশন” এবং “আর্থিকীকরণ” এর উদ্ভূত যুক্তি কেবল সামাজিক শক্তির অভূতপূর্ব নতুন রূপের জন্মই দেয় না , বাস্তবতার প্রকৃতির একটি রূপান্তরকেও নির্দেশ করে। “আমাদের বামপন্থীদের নিউলিবারেলদের থেকে কিছু জিনিস শিখা উচিত” আমার মনে আছে কালচারাল স্টাডিজের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের এই মন্তব্য শুনেছি (বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল স্টাডিজের ছাত্ররা প্রায়ই নিজেদের বিশ্ব বামপন্থার ধারক বাহক মনে করে, যদিও তারা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে না। ), “সত্যি বলতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। তারা প্রায় শূন্য থেকে মান তৈরি করতেও সক্ষম”।

    সেই সময় আমি বলেছিলাম– “জানেন কি, ওয়াল স্ট্রিটের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা এই ব্যাপারটাকে ‘স্ক্যাম‘ বলে থাকে৷” তবে কেউ মনে হয় না আমার কথা শুনছিল৷ বেশিরভাগ একাডেমিক চরমপন্থিরা নিজেদের একপ্রকার তাত্ত্বিক ভাষায় বাক্সবন্দী করে রেখেছিলো, যেই ভাষায় স্ক্যাম শব্দটা ছিল প্রায় অর্থহীন। বিজ্ঞান থেকে বিজ্ঞানবিরোধী, আলোকিত অভিজ্ঞতাবাদ থেকে তার বিপরীতে অবস্থান করে, একাডেমিক বামরা শেষপর্যন্ত এই ধারণায় পৌঁছেছে যে পারফর্মেন্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

    আশির দশকের শেষের দিকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতাগুলি নিজেরাই “পারফরম্যান্স থিওরি“- বর্জন করে, নব্বই দশকে এক্টর–নেটওয়ার্ক তত্ত্বের উত্থান হয়। এটি দাবি করে যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বস্তুগুলিও মূলত বিজ্ঞানী, প্রতিষ্ঠান, বস্তু, প্রাণী এবং জীবাণুর মধ্যে জোট তৈরির আলোচনা, প্ররোচনার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা গঠিত হয়। বিষয়টির সারমর্ম হল, যে সময়ে আমেরিকান (এবং সম্প্রসারণে উত্তর আটলান্টিক) অর্থনীতির ভিত্তি ছিল ক্রমবর্ধমান আর্থিক বুদবুদের উত্পাদন, সেই সময়ের বুদ্ধিজীবীরা সিদ্ধান্ত নেয় যে একেবারে সবকিছুই কেবলমাত্র রাজনৈতিক পারফরমেন্সের পণ্য। বুদ্বুদ অর্থনীতি ছিল রাজনৈতিক জাদুর এক ধরনের অপথিওসিস।

    তবে যেকোনো প্রকৃত জাদুকরই ( বা সফল রাজনীতিবিদ) বলতে পারে যে ঘটনাগুলি এতটা সরল নয়। আমরা সকলেই স্বীকার করি যে একজন রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এমন ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রপতির মতো আচরণ করতে জানেন। এই ভূমিকাটি সম্পাদন করতে কোনো প্রকার অক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য আমরা প্রার্থীদের অবিরাম সমালোচনা করি। কিন্তু একজন প্রার্থী যদি খোলাখুলিভাবে বলেন যে পারফর্ম করাই তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার একমাত্র যোগ্যতা, তবে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। বাস্তবে , দ্বৈত চিন্তার সমস্ত কৌশল আমাদের সাথেই থাকে। আমরা যা করি তা হল এই সকল চিন্তা প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন কারণ তৈরি।

    রন সাসকিন্ডের (সম্ভবত কাল্পনিক) বুশ উপদেষ্টা অন্তত এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে নতুন বাস্তবতা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বাস যথেষ্ট নয়: আপনার সামরিক শক্তিও দরকার। জাদুকর এবং রাজনীতিবিদের মধ্যে চূড়ান্ত পার্থক্য এটাই যে: রাজনীতিবিদ জানেন, যদি সত্যিই প্রয়োজন হয় তবে তিনি সামরিক শক্তি ব্যাবহার করতে পারেন, সেটা হোক সেনাবাহিনী বা পুলিশ।

    রাজনৈতিক বাস্তবতা সবসময়ই ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং দ্বৈত এবং ত্রি–চিন্তার একটি অস্পষ্ট সংমিশ্রণ। আপনার জিজ্ঞাসা করতে হবে যে সাধারন জনগন স্বীকৃত রাজনৈতিক বিন্যাসকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন, নাকি তিনি বিশ্বাস করেন যে অন্য সবাই এটিকে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করে। আপনার জিজ্ঞাসা করতে হবে সে বিশ্বাস করে কিনা যে এমন একটি বিশ্ব ছাড়াও তার সবচেয়ে প্রিয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি সে উপলব্ধি করতে পারবে, যে বিশ্বকে সে স্ক্যাম মনে করে। আপনার আরও জিজ্ঞাসা করতে হবে সে বিশ্বাস করে কিনা যে জিনিসগুলি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হলে, এমনকি পুরো জিনিসটি একটি স্ক্যাম তা প্রকাশের চেষ্টা করলে সে গুরুতর আহত হতে পারে। (যেমনটা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট–এর সাম্প্রতিক ভাগ্যে দেখা গেছে, এমনকি মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ লোকেরাও যখন আজকের আমেরিকায় অপ্রীতিকর সত্য কথা বলার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে আসে, তখন সহিংসতা একটি বাস্তব সম্ভাবনা।) এবং তারপর জিজ্ঞাসা করতে হবে অন্য সবাই বিশ্বাস করে কিনা যে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে? নাকি সবাই মনে করে যে অন্য সবাই বিশ্বাস করে তাদের সাথে এমনটা ঘটবে। বিষয়গুলো গোলোকধাঁধায় আবদ্ধ।

    ২.

    দৈনন্দিন সকল বিকৃতি, সুবিধাবাদী অর্ধ–সত্য, এবং কল্পিত মতাদর্শের মধ্যে যা এখন রাজনৈতিক ডিসকোর্স তৈরি করে, যে কোনও সৎ আলোচককে এই প্রশ্নের সাথে লড়াই করতে হয় যে কীভাবে আত্ম–প্রতারণা একটি স্বশাসিত বিশ্বাস ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে । প্রোপাগান্ডা শিল্পের ছাত্ররা দীর্ঘকাল ধরে লক্ষ করেছে যে এর পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে অনুকরণের প্রবণতা রয়েছে , কিন্তু অসত্য আবরণ নিজের পছন্দসই প্রোপাগান্ডায় স্ব–সচেতন বিশ্বাসের গভীর বিভ্রান্তির জন্য দায়ী নয়। সমস্যাটির প্রচলিত সূত্র প্রশ্ন করে যে কীভাবে কিছু লোক এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারে যা অন্যদের কাছে অলীক মনে হয়। তবে এই বক্তব্য ধারণা করে মানুষ যা বিশ্বাস করে সে বিষয়ে সে ভুল হতে পারে না। এটা কি ভাবা সম্ভব যে আপনি যখন কিছু বিশ্বাস করেন, বাস্তবে তা করেন না, বা যখন কিছু বিশ্বাস করেন না, বাস্তবে তা করেন।

    প্রকৃতপক্ষে, এটি কীভাবে সম্ভব হতে পারে তা বোঝার জন্য চিন্তার সম্পূর্ণ ধারা রয়েছে। ধারণা করা হয়, ফেটিশিজম শব্দটি পশ্চিম আফ্রিকায় কর্মরত ইউরোপীয় বণিকদের সৃষ্টি, তাদের আফ্রিকান সমকক্ষরা কীভাবে ব্যবসায়িক চুক্তি করে তা ব্যাখ্যা করার জন্য। এটি ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর ঘটনা, দাস ব্যবসা শুরুর আগে, যখন ইউরোপীয়রা স্বর্ণের সন্ধানে ছিল। তৎকালীন আফ্রিকান অনেক বন্দরনগরেই কোনো বাণিজ্যিক উপলক্ষ্যের জন্য একটি নতুন দেবতা তৈরি করা সম্ভব ছিল। আপনি কিছু পুঁতি, পালক এবং বিরল কাঠের টুকরো একত্রিত করতে পারেন, অথবা সমুদ্র সৈকতে খুঁজে পাওয়া কোনও অদ্ভুত বা উল্লেখযোগ্য–সুদর্শন বস্তু তুলে নিতে পারেন, তারপরে পারস্পরিক শপথের মাধ্যমে এটিকে পবিত্র করতে পারেন। অন্যান্য ফেটিশ, যা সমগ্র সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য পালন করা হত, তাতে আকর্ষণীয় সুন্দর ভাস্কর্য থাকতে পারে, যার মধ্যে চুক্তিকারী দলগুলি পেরেক ঠেকাতো। এইভাবে নতুন সৃষ্ট ঈশ্বরকে রাগান্বিত করা হয় যাতে সে সীমালঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য উপযুক্ত মেজাজে থাকে। তবে একজন বিদেশীর সাথে নিছক ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য আকর্ষণীয় একটি কাঠের টুকরোই যথেষ্ট।

    শপথ নেওয়ার মাধ্যমে বস্তুটি একটি ঐশ্বরিক শক্তিতে পরিণত হয় যা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনকারীকে ভয়ানক শাস্তি দিতে সক্ষম। নতুন ঈশ্বরের শক্তি ছিল তাদের চুক্তির শক্তি। সমস্ত ব্যাপারটা প্রায় স্বীকার করার মত যে বস্তুটি ঈশ্বর কারণ মানুষ তাকে ঈশ্বর দাবি করেছে, কিন্তু সবাই জোর দিয়ে বলত– না, আসলে, বস্তুগুলি এখন ভয়ানক অদৃশ্য শক্তি লাভ করেছে। এবং চুক্তিকারী পক্ষগুলির মধ্যে একটির সাথে অপ্রত্যাশিত কোনো বিপর্যয় ঘটলে – যা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না কারণ ইউরোপীয়রা প্রায়ই ঝড়ের কবলে বা ম্যালেরিয়া জ্বরে মারা যেত, মানুষ সহজেই বলতে পারত যে মৃত ব্যক্তিরা তাদের ওয়াদা ভাঙ্গার ফলেই এই পরিণতি ভোগ করছে।

    আফ্রিকান বণিকরা কি সত্যিই তাদের ফেটিশের শক্তিতে বিশ্বাস করত? অনেকে মনে করেন যে তারা করত, যদিও প্রায়ই তারা এমন আচরন করত যে ফেটিশগুলি কেবল সুবিধাজনক বাণিজ্যিক উপযোগী। কিন্তু ইন্দ্রজালের মনোমুগ্ধকর জগৎ বিভিন্ন প্যারাডক্সে পূর্ণ। এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত ইউরোপিয়োরা এইধরনের আচার–অনুষ্ঠান বুঝে উঠতে পারেনি। ফলস্বরূপ তারা আফ্রিকানদের উপর তাদের নিজস্ব বিভ্রান্তির প্রতিফলন ঘটাতে থাকে। শীঘ্রই ফেটিশের অস্তিত্বকে প্রমান হিসেবে দেখানো হয় যে আফ্রিকানরা আধ্যাত্মিক বিষয়ে গভীরভাবে বিভ্রান্ত ছিল। ইউরোপীয় দার্শনিকরা যুক্তি দেখাতে শুরু করে যে ফেটিশিজম ধর্মের সর্বনিম্ন সম্ভাব্য পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ফেটিশবাদী একেবারে যেকোন কিছুর উপাসনা করতে রাজি, যেহেতু তার কোনও নিয়মতান্ত্রিক ধর্মতত্ত্ব নেই।

    অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই কার্ল মার্কস এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো ইউরোপীয় ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছিলেন যে আমরা কি আসলেই আলাদা? মার্কস যেমনটা উল্লেখ করে, পশ্চিমা ইতিহাস হল আমাদের জিনিসগুলি তৈরি করার এবং তারপরে আমাদের নিজস্ব সৃষ্টির সামনে মাথানত করা এবং তাদের দেবতার মতো পূজা করার গল্প। মধ্যযুগে আমরা ওয়েফার, চালিস এবং রিলিকোয়ারি দিয়ে এটি করেছি। এখন আমরা অর্থ এবং ভোগ্যপণ্য দিয়ে করি– অতঃপর ফেটিশিজম সম্পর্কে মার্কসের বিখ্যাত উক্তি। আমরা ক্রমাগত ব্যবহার বা সুবিধার জন্য বস্তু তৈরি করছি, এবং তারপরে তাদের সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলছি যেন তারা কিছু অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃতিক শক্তির সাথে যুক্ত এবং তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতে সক্ষম – মূলত কারণ, তাত্ক্ষণিক ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সত্যও হতে পারে।

    যখন একজন পণ্য ব্যবসায়ী ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পড়ে এবং জানতে পারে যে স্বর্ণ এটা করছে, বা তেল বা শুকরের মাংস এমনটা করছে, বা এই টাকা বাজার থেকে পালাচ্ছে এবং অন্য কোথাও যাচ্ছে, তখন সে যা পড়ে তা কি বিশ্বাস করে? অবশ্যই তিনি মনে করেন না যে তিনি করেন। ব্যবসায়ীকে একপাশে নিয়ে ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই যে সোনা বা তেল একেবারেই নির্জীব বস্তু যেগুলি কিছুই করতে পারে না। এমনটা করলে সে স্পষ্টতই বিরক্ত হবে। এটি একটি কথার কথা মাত্র। তুমি কি আমাকে বোকা মনে করো? কিন্তু বাস্তবিক অর্থে, তিনি এটি বিশ্বাস করেন, কারণ প্রতিদিন তিনি ট্রেডিং ফ্লোরে যান এবং এমন ভান করেন যে এটিই সত্য।

  • তারেক হাসান ।। কাপড়ের দাম

    তারেক হাসান ।। কাপড়ের দাম

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ হেল বুবুন

    [পুঁজিবাদী বিকাশ কোথাও ‘শান্তিপূর্ণ’ প্রক্রিয়ায় হয় না, এই বিকাশ স্বভাবগতভাবেই ভায়োলেন্স নির্ভর। অষ্টাদশ শতকের শিল্প বিপ্লব ঘটত না, যদি না ‘এনক্লোজার’ পলিসি এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভূমিহীন না করত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য সস্তা শ্রম নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে পুঁজিবাদী বিকাশও শান্তিপূর্ণভাবে ঘটেনি। বাংলাদেশে শিল্পায়ন, বিশেষ করে পোশাক শিল্পের বিকাশ সম্ভব হয়েছে একটি সস্তা ও ভূমিহীন শ্রমিক শ্রেণির উপস্থিতির কারণে। কোন কোন সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক উপাদান এই সস্তা ও ভূমিহীন শ্রমিক শ্রেণিকে সম্ভবপর করে তুলেছে, তা-ই এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। এছাড়া, এই প্রবন্ধের আরেকটি ফোকাস ছিল প্রচণ্ডভাবে অসম পৃথিবী, যেখানে অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর মনমার্জির উপর। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি এরকম নির্ভরশীলতার একটি উদাহরণ। লেখক প্রবন্ধে এই নির্ভরশীলতা থেকে উত্তরণের পথ দেখানোরও চেষ্টা করেছেন। তারেক হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। তিনি নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব বারগেন থেকে সামাজিক নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া, তিনি লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এশিয়ান স্ট্যাডিজ থেকে পোস্টডক্টোরাল রিসার্চ ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। তার কাজের বিষয়বস্তুতে দেখা যায় গার্মেন্টস শ্রমিক, কাজের নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্র গঠন, রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞান ও সাম্যবাদ। তার এই প্রবন্ধটি Red Pepper ম্যাগাজিনে The Cost of Clothes শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিলো। – অনুবাদকের ভূমিকা]

    শিল্পী: সমীক্ষা সিং

    ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর, এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফাল্যকে দেখা হচ্ছে এক বিস্ময় হিসেবে। এক সময়ে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামে পরিচিত এই দেশে গত ৩০ বছরে বার্ষিক মোট জাতীয় উৎপাদন ৬ শতাংশেরও বেশি হারে বেড়েছে, যা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে এশীয় ‘টাইগার অর্থনীতি’-র স্বীকৃতি৷ এই আপাত সাফাল্যের জন্য সাধারণত বাণিজ্যের উদারীকরণ (liberalisation), বিকেন্দ্রীকরণ ও বেসরকারিকরণকে (privatisation) কৃতিত্ব দেয়া হয়। তবে এদেশের কৃষি সম্প্রদায়ের উপর এই অর্থনৈতিক উদারবাদের প্রভাব ছিল ভয়াবহ, কারণ ঋণ তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়। এবং অনেকেই বাধ্য হয় সস্তা মজুরি শ্রমিক হিসেবে দেশের ক্রমবর্ধমান কারখানাগুলোতে কাজ করতে। 

    স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট 

    ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর, বাংলাদেশ আরো ২৪ বছর পাকিস্তান কর্তৃক জাতীয় সম্পদ লুট ও শোষণের শিকার হয়েছে। এরপর ১৯৭১ সালে নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর নতুন সরকার এদেশের বিঃধস্ত  অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও অন্যান্য দাতা সংগঠনের থেকে সহায়তা গ্রহণ করে। এই ‘সহায়তা’-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ছিলো স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম। 

    [অনুবাদকের নোট: স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SAPs) বলতে সাধারণত কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারমূলক ব্যাবস্থাকে বোঝায় এবং এই ব্যাবস্থাগুলোকে আইএমএফ কিংবা বিশ্ব ব্যাংক থেকে লোন নেয়ার জন্য প্রত্যেক দেশরই মেনে চলতে হয়। যেমন: অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয় কমানো, বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বাজার উন্মুক্তকরণ ইত্যাদি।

    ১৯৮০ সালের মধ্যে সরকার পরিচালিত “সবুজ বিপ্লব” কৃষি উৎপাদনে ভর্তুকির পরিমাণ কমায় এবং বাণিজ্যের উদারীকরণ করে। অর্থনৈতিক উদারবাদের এই ট্রেন্ড চলতে থাকে আশি ও নব্বই দশকজুড়ে: আমদানির উদারীকরণ, শস্য বাজারের বেসরকারিকরণ এবং জনগণের মাঝে শস্যের বণ্টন নিশ্চিত করতে এতোদিন ধরে পরিচালিত সরকারী প্রোগ্রামগুলো হ্রাসকরণ। 

    স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্টের পূর্বে কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, বীজ ও সার সরবরাহ করা হতো। কিন্তু আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংক আরোপিত স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্টের নীতি অনুযায়ী, সরকার ভর্তুকির পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণরূপে কমিয়ে ফেলে, যার ফলশ্রুতিতে কৃষিতে ব্যবহৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। এবং, তখনই কৃষি উৎপাদনের জন্য কৃষকদের বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীলতা শুরু হয়। একইসাথে, কৃষকরা সেচ সুবিধা ও যন্ত্রপাতির জন্য বিনিয়োগ করা শুরু করে। এসব কিছুই কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে, তবে বাজারে কৃষি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বিনিয়োগের তুলনায় উৎপাদক কৃষকের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হয়। এই ট্রেন্ডের একটি ধ্বংসাত্মক পরিণতি ছিল কৃষকদের মাঝে ক্রমবর্ধমান ঋণগ্রস্ততা। এই কৃষকরাই পরবর্তীতে উৎপাদনের উপকরণের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং শেষ পর্যন্ত মজুরি শ্রমিক হিসবে ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়।

    বিশেষ করে নারীদের জন্য এই পরিস্থিতি ছিলো আরো চ্যালেঞ্জিং। কারণ, আশির দশকে যন্ত্রনির্ভর রাইস মিলের আবির্ভাব ঘটে, যার ফলে হঠাৎ করে তখন পর্যন্ত নারীদের আয়ের একটি বিশাল উৎস — ধান শুকানো ও মাড়ানো — অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। ভূমিহীন পুরুষ আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজে পেলেও অধিকাংশ নারীর আয় ও উৎপাদনের উপকরণের উপর আর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। 

    আর্তনাদ; (১৯৭১)
    শিল্পী: স্বপন চৌধুরী;
    সূত্র: স্বপন চৌধুরীর ফেসবুক পেজ

    ক্ষুদ্রঋণ, দেনা ও গার্মেন্টস শ্রমিক

    নতুন ভূমিহীন শ্রেণির ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা দূর করার জন্য এনজিও (NGO) গুলো গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীদেরকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল ভাঙতে এবং উপার্জন মূলক কার্যক্রমে যুক্ত হতে উৎসাহিত করতে শুরু করে। ২০০৬ সালে গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তার ব্যাংক-কে “সমাজের নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন” এর জন্য নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়। কিন্তু, যেভাবে ক্ষুদ্রঋণ আরো ব্যাপক পরিমাণে ঋণগ্রস্ততা তৈরি করে, তা লামিয়া করিম (২০১১) ও আমিন রহমান (১৯৯৯) এর মতো গবেষকরা খুব দক্ষভাবেই দেখিয়েছেন। এবং এই ঋণগ্রস্ততা নারীদেরকে (শ্রমের বিনিময়ে) মজুরি উপার্জনের উপর আরো বেশি নির্ভরশীল করে তোলে। যখন তারা ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করতো, তখন তাদেরকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হতো। এবং এই ক্ষুদ্রঋণে সুদের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি । এবং এই সাপ্তাহিক কিস্তি প্রদানের জন্য তাদেরকে আবার অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ দাতা প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নিতে হতো। সাধারণত গ্রামীন নারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণের অর্থ ছিল উপার্জন, ঋণ গ্রহণ ও কিস্তি প্রদানের একটি চক্রের মাঝে বন্দী হওয়া। 

    বাংলাদেশে শিল্পায়ন দাঁড়িয়ে আছে সস্তা ও অধিকারহীন শ্রম শক্তি বা বাহিনীর উপর। অর্থ্যাৎ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার পুনঃবিন্যাস এবং এই পুনঃবিন্যাস ও ক্ষুদ্রঋণের মিথস্ক্রিয়ায় তৈরি ঋণগ্রস্ততাই জন্ম দিয়েছে এক বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে, যাদের শ্রম বিক্রি ছাড়া জীবিকা অর্জনের অন্য কোন উপায় নেই। দেশের উঠতি ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য এই জনগোষ্ঠীই ছিল সস্তা ও আবশ্যকীয় শ্রমের উৎস। 

    ১৯৭৮-৭৯ সালে, পোশাল শিল্পের বৈশ্বিক বিস্তৃতির শুরুর দিকে, বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এবং এই সেক্টর লক্ষ লক্ষ নিম্ন আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে; বিশেষ করে নারীদের জন্য। এনজিও থেকে গ্রহণ করা পারিবারিক লোন (সাপ্তাহিক) কিস্তিতে পরিশোধ করার জন্য অনেক গ্রামীণ নারী যেভাবে গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় এসে ফ্যাক্টরিতে কাজ করে এবং পরিবারকে টাকা পাঠায়, তা আমার বই এভ্রিডে লাইফ অব রেডিমেড গার্মেন্টস কর্মী ইন বাংলাদেশ (২০২২) – এ আলোচিত হয়েছে।

    যদিও গার্মেন্টস শিল্পে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের উপস্থিতিকে দেখা হয় বাংলাদেশের “অর্থনৈতিক বিস্ময়” ও “নারীর ক্ষমতায়ন”- এর প্রতীক হিসেবে, তবে বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। এরকমই এক বাস্তবতা হলো ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস (রান্না প্লাজা একটি আট তলা ভবন, যেখানে আটটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল)। এই ঘটনা তখন আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এখন আমরা জানি যে, ফ্যাক্টরি ব্যাবস্থাপকরা চাকরিচ্যুত করা ও বেতন আটকে দেয়ার ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের অনিরাপদ ভবনে কাজ করতে বাধ্য করেছিল এবং এর পরিণতিতেই এক হাজার শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে। 

    যদিও বিল্ডিং সেইফটি নিশ্চিত করণের জন্য ফ্যাশন ব্যান্ডগুলো বেশ কিছু প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যেমনঃ ক্রেতা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মধ্যকার অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স এগ্রিমেন্ট। তবুও রানা প্লাজা ধসের এক দশক পরে,  শ্রমিকরা এখনও কঠোর কর্ম পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছে। যেমনঃ বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র‍্যান্ডগুলোর শিপমেন্ট ডেডলাইন পূরণের জন্য শ্রমিকরা দিনে ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করছে। এক নারী পোশাক শ্রমিক (যার সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছিলাম) জানান, “আমরা পানিও পান না করার চেষ্টা করি, যাতে আমাদের টয়লেটে যেতে না হয়। আমরা খাবারের জন্যও বিরতি নেই না। আমাদেরকে প্রোডাকশান টার্গেট পূরণ করতে হবে।”

    আমরা কী করতে পারি 

    বর্তমানে সরকার ও বেসরকারি পুঁজি বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে দেশের উচ্চ অবস্থানকে উদযাপন করছে। এইচ অ্যান্ড এম, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার ও প্রিমার্ক এর মতো হাই-স্ট্রিট ব্র‍্যান্ড (যেসব ব্র‍্যান্ড ট্রেন্ড ও সামর্থের উপর ভিত্তি করে কম মূল্যে পণ্য উৎপাদন করে এবং টমি হিল্ফিগার ও বারবেরির মতো হাই-এন্ড ব্র‍্যান্ড (যেসব ব্র‍্যান্ড উচ্চ মানের দামী পণ্য বিক্রি করে) বাংলাদেশের ফ্যাক্টরি ব্যবহার করে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজার দখলে রাখতে এই ব্র‍্যান্ড গুলো পণ্যের দাম যতোটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করে। তবে এই ব্র‍্যান্ডগুলোই উৎপাদক ফ্যাক্টরিগুলোকে উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় সমান অর্থ প্রদান করছে, যার ফলে শ্রমিকের মজুরি আরো কমছে। 

    মুক্ত বাণিজ্য (ফ্রি ট্রেড) নিশ্চিতকরণের জন্য স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনের সাথে পরিচিত ব্র‍্যান্ডগুলো দিনদিন তাদের উৎপাদনী বিবরণ (প্রোডাকশান ডিটেইলস) প্রকাশের ব্যাপারে অনিচ্ছুক হচ্ছে। তবে, অন্তত পক্ষে, আমরা ভোক্তারা যদি সমাজ ও পরিবেশের উপর আমাদের কঞ্জাম্পশান প্রাক্টিসের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকি এবং ওইসব ব্র‍্যান্ডকেই বেছে নেই যারা তাদের উৎপাদনী বিবরণ (sourcing) নিয়ে স্বচ্ছ, তাহলে এটা উৎপাদক ও বিক্রেতা উভয়কেই বাধ্য করবে উৎপাদনের বর্তমান এই পাগলাটে ও শোষণমূলক চর্চা থেকে সরে দাঁড়াতে। 

    সাধারণত বৈশ্বিক রিটেইল ব্র‍্যান্ডগুলো দরিদ্র দেশে অবস্থিত ম্যানুফ্যাকচারারদের  (উৎপাদক ফ্যাক্টরি) উপর নির্দিষ্ট ‘কোডস অব কন্ডাক্ট’ (codes of conduct) চাপিয়ে দেয়। কিন্তু, উৎপাদক ফ্যাক্টরিগুলো এ ধরনের কোনো আচরণ বিধি (যেমন: ন্যুনতম মূল্য নির্ধারণ বা ক্রয় সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড) ব্র‍্যান্ডগুলোর উপর আরোপ করতে পারে না। অধিকন্তু, ফ্যাক্টরিগুলো অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি কিংবা অন্য কোনো দেশের কাছে ক্রেতা হারানোর ভয়ে ব্র‍্যান্ডগুলোর সাথে দরাদরি করতে পারে না। সম্ভবত, তৈরি পোষাক শিল্পের উৎপাদকদের নিয়ে একটি নিয়ন্ত্রকসংস্থা গঠনের এটাই যথার্থ সময়, যা বরঞ্চ ফ্যাশন ব্র‍্যান্ডগুলোর কার্যক্রমকে  নিয়ন্ত্রণে রাখবে। 

    বর্তমানের এই অবস্থাকে সমর্থন ও ন্যায্যতা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি জনপ্রিয় যুক্তি হলোঃ বেশি উৎপাদন মানে বেশি কর্মসংস্থান। তা সত্ত্বেও, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আন্তর্জাতিক অ্যাপারেল সাপ্লাই চেইনের (আন্তর্জাতিক পোশাক উৎপাদন ও বিক্রি) মতো একটি ধ্বংসাত্মক ব্যাবস্থার র‍্যাডিক্যাল পরিবর্তন দরকার ও আমরাই হতে পারি এই পরিবর্তনের পথ প্রদর্শক।

  • জর্জ উডকক ।। ঘড়ির স্বৈরাচার

    জর্জ উডকক ।। ঘড়ির স্বৈরাচার

    • অনুবাদ: আনন্দ অন্তঃলীন

    [সম্পাদকীয় ভূমিকা: কানাডিয়ান লেখক জর্জ উডকক মূলত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের জীবনী লেখবার জন্য জনপ্রিয় হলেও নৈরাজ্যবাদী চিন্তাচেতনা ও লেখালেখিতেও তার সক্রিয় অবদান ছিল। কানাডিয়ান এ নাগরিক জন্মেছিলেন ১৯১২ সালে। দীর্ঘ ৮২ বছরের জীবনে লিখেছেন অসংখ্যা বই, প্রবন্ধ, কবিতা। বর্তমান লেখাটি (The Tyranny of the Clock) প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালে ওয়ার কমেন্টারি নামক একটি অরাজপন্থী পত্রিকায়। আধুনিক সমাজজীবনে রৈখিক সময়ের ধারণার উদ্ভব ও মানবজীবনের উপর তার নিয়ন্ত্রণপ্রতিষ্ঠা কীভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রমশোষণের পথ সুগম করেছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যাবে লেখাটিতে। সময় এককালে মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও পুঁজিবাদী সংস্কৃতি সেটিকে পরিণত করেছে একটি অবদমনমূলক যান্ত্রিক কাঠামোতে। সময় হয়ে উঠেছে উৎপাদনব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত নিছক গাণিতিক হিসাবনিকাশ, যা প্রতিনিয়ত শ্রমিকের শোষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। উডকক তাই মনে করেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামই যথেষ্ট নয়, সময়ের মতো মানুষের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর পুনর্ভাবনাও জরুরি।]

    অতীতের যেকোনো ইউরোপীয় বা অইউরোপীয় সমাজের তুলনায়, বর্তমান পশ্চিমা সমাজের একটি সুস্পষ্ট জায়গায় বৈশিষ্ট্যগত ফারাক আছে। সেই বৈশিষ্ট্যটি হলো সময়ের ধারণা। প্রাচীন চীনা বা গ্রিকদের থেকে বর্তমানের আরব পশুপালক বা মেক্সিকান ক্ষেতমজুর পর্যন্ত সকলের কাছেই সময় উপস্থাপিত হয় প্রকৃতির একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে, দিন ও রাতের বিভাজন হিসেবে, এক মৌসুম থেকে আরেক মৌসুমের যাত্রা হিসেবে। যাযাবর পশুপালক ও কৃষকরা তাদের সময় মাপতো সুর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ভিত্তিতে এবং এখনো অনেক ক্ষেত্রে তা–ই করে থাকে। তাদের বছরের হিসাব রাখার সূত্র ছিল বীজ বপনের সময়, ফসল তোলার সময়, পাতা ঝরার সময়, কিংবা নদী ও জলাধারে বরফ জমার সময়ের হিসাব। কৃষক কাজ করতো প্রাকৃতিক উপাদানসমূহের অবস্থার ওপর নির্ভর করে, একজন কারিগর কাজ করতো তার পণ্য তৈরির জন্য যতোক্ষণ কাজ করা প্রয়োজন ততোক্ষণ। সময়কে দেখা হতো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে এবং সময়ের নিখুঁত পরিমাপের ব্যাপারে মানুষ খুব বেশি চিন্তিত ছিল না। এই কারণে সে সকল সভ্যতায় অন্যান্য বিষয়ে প্রভূত অগ্রগতি দেখা গেলেও সময় পরিমাপের ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে আদিম পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করতো; বালিঘড়ির চুঁইয়ে পড়া বালু কিংবা পানি, সূর্যঘড়ি—যা মেঘলা দিনে পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়তো, কিংবা মোমবাতি বা প্রদীপ—যেখানে পুড়ে না যাওয়া তেল বা মোম সময় নির্দেশ করতো। এই সবগুলো যন্ত্রই ছিল অনুমান ভিত্তিক ও ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত আলস্য ও যত্নের অভাবে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়তো। প্রাচীন জগতের কোথাওই অল্প কিছু মানুষ ব্যতীত কেউ সময়ের গাণিতিক সূক্ষ্মতার ব্যাপারে চিন্তিত ছিল না।

    অন্যদিকে আধুনিক, পশ্চিমা মানুষ এমন একটি জগতে বাস করে যা ঘড়ির সময়ের যান্ত্রিক ও গাণিতিক প্রতীক দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে ঘড়ি মানুষের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ ও দমন করে থাকে। ঘড়ি সময়কে প্রাকৃতিক একটি প্রক্রিয়া থেকে একটি পণ্যে পরিণত করে যা সাবানের মতোই মাপা যায় ও কেনাবেচা করা যায়। যেহেতু সময়ের নিখুঁত পরিমাপ ব্যতীত শিল্পায়িত পুঁজিবাদ বিকাশ লাভ করতে এবং পরবর্তীতে শ্রমিককে প্রতিনিয়ত শোষণ করতে পারতো না, তাই ঘড়ি আধুনিক মানুষের জীবনে যান্ত্রিক স্বৈরাচারের একটি প্রতীক যা অন্য যেকোন ব্যক্তি বা যন্ত্রের চেয়ে অধিক শোষণমূলক। ঘড়ি কোন প্রক্রিয়ায় আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার সামাজিক সংগঠনকে প্রভাবিত করেছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

    ইতিহাসের সাধারণ প্রবণতা হলো, একটি সভ্যতা বা সংস্কৃতি এমন কিছু উপাদান বা কলাকৌশল উৎপাদন করে যা পরবর্তীতে তার নিজেরই ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন চীনের একটি আবিষ্কার হলো বারুদ, যা পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞদের হাতে বিকশিত হয় এবং একটা পর্যায়ে এই বারুদই শক্তিশালী বিস্ফোরক ও আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের সূচনা ঘটিয়ে চীনাসভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে। একইভাবে মধ্যযুগের ইউরোপীয় শহরের কারিগরদের সর্বোৎকৃষ্ট উদ্ভাবনসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল ঘড়ি, যা সময়ের ধারণায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং একই সাথে শোষণমূলক পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়তা করে ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির অবসান ঘটায়।

    বলা হয়ে থাকে ঘড়ির আবির্ভাব ঘটে ১১ শতকে, মঠগুলোতে নির্ধারিত সময় পর পর ঘণ্টা বাজানোর যন্ত্র হিসেবে। মঠ এবং কারাগারের কয়েদিদের জীবন নিয়ন্ত্রণের এই মধ্যযুগীয় পন্থার সাথে বর্তমান সময়ের কারখানার শ্রমিকদের জীবনের তুলনা করা যায়। প্রথম নির্ভুল প্রমাণিত ঘড়ির আবির্ভাব অবশ্য ঘটে ১৩ শতকে এবং ১৪ শতকে এসে ঘড়ি জার্মান শহরগুলোর বিভিন্ন গণ–স্থাপনার অংশ হয়ে উঠতে থাকে।

    ঘড়ির এই আদিম রূপগুলো ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং খুব বেশি কার্যকর ছিল না। নির্ভরযোগ্য ঘড়ির আগমন ঘটে ১৬ শতকে। ইংল্যান্ডের হ্যাম্পটন কোর্টে অবস্থিত ১৫৪০ সালে নির্মিত একটি ঘড়িকে বলা হয় সে দেশের প্রথম ত্রুটিমুক্ত ঘড়ি। ১৬ শতকের এই ঘড়িগুলোর নির্ভরযোগ্যতাও আপেক্ষিক, কারণ এগুলোর কেবল ঘণ্টার কাঁটা ছিল। সময়কে মিনিট ও সেকেন্ডে ভাগ করার চিন্তা ১৪ শতকের গণিতবিদদের মধ্যে থাকলেও ১৬৫৭ সালে পেন্ডুলাম আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মিনিটের পরিমাপ সম্ভব হয়ে ওঠেনি; সেকেন্ডের কাঁটার আবির্ভাব ঘটে ১৮ শতকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ১৭ ও ১৮ শতক ছিল পুঁজিবাদের গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়; যখন এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শিল্প বিপ্লবের সুযোগ নিয়ে পুরো সমাজের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে।

    লুইস মামফোর্ডের মতে ঘড়ি যান্ত্রিক যুগের সবচেয়ে গুরুত্ববহ যন্ত্র। কারণ ঘড়ি, প্রযুক্তি এবং মানুষের কাজকর্ম ও অভ্যাস উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। কার্যত ঘড়িই প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যা মানব জীবনে গুরুত্ব লাভ করে। এর আবিষ্কারের পূর্বে যন্ত্র সাধারণত এমন হতো যে সেগুলোর পরিচালনা নির্ভর করতো পেশি শক্তি কিংবা পানি বা বায়ুর মতো বাহ্যিক অনির্ভরযোগ্য শক্তির ওপর। প্রাচীন গ্রিকরা যদিও কিছু স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিল, কিন্ত সেগুলো তৈরি করা হয়েছিল হিরোর বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতোই মন্দিরের অতিপ্রাকৃতিক প্রভাব দৃশ্যমান করে তোলার উদ্দেশ্যে, নয়তো লেভান্টাইন শহরগুলোর স্বৈশাসকদের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ঘড়ি ছিল প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যা জনজীবনে গুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং সামাজিক ক্রিয়া সম্পন্ন করা শুরু করে। ঘড়ি উৎপাদনের শিল্প থেকেই মানুষ অন্যান্য জটিল যন্ত্রপাতি তৈরির কলাকৌশল রপ্ত করে এবং এর ফলে শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

    সামাজিক ভাবে অন্য যেকোন যন্ত্রপাতির চেয়ে ঘড়ির প্রভাব অনেক বেশি। এর মাধ্যমেই মানুষের জীবনের নিয়মিতকরণ ও সময়ের নিখুঁত বিভাজন করা সম্ভব হয়েছে, যা শিল্পের শোষণমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যক। ঘড়ির কাঁটা ও ডায়ালের মাধ্যমে সময়কে—এটি এমন একটি প্রসঙ্গ যার প্রকৃতি এখনও কোন দর্শনে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি—পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মাপা সম্ভব হয় ও সময়ের ধারণাকে মূর্ত করে তোলা সহজ হয়। সময়কে ব্যাপ্তিকাল হিসেবে দেখা বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ সময়কে ‘দৈর্ঘ্যের’ ভিত্তিতে মাপা শুরু করে, অনেকটা কাপড় মাপার মতোই। এবং এই সময়কে—যা গাণিতিক প্রতীকসমূহ দ্বারা চিহ্নিত হওয়া শুরু করে – দেখা হতে থাকে একটি পণ্য হিসেবে, যাকে অন্য যেকোন পণ্যের মতোই কেনাবেচা করা সম্ভব।

    বিশেষত নব্য পুঁজিপতিরা অতিমাত্রায় সময় সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। তাদের কাছে সময়ের আরেক অর্থ ছিল শ্রমিকের শ্রম এবং তারা এই শ্রমকে দেখতো শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হিসেবে। পুঁজিবাদী আদর্শের স্লোগান হয়ে ওঠে ‘সময়ই অর্থ’ এবং সময়ের হিসাবরক্ষক তথা ‘timekeeper’ হয়ে ওঠে পুঁজিবাদী বিধানের নতুন কর্মচারীদের মধ্যে অন্যতম।

    প্রথম দিককার কারখানাগুলোতে নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের থেকে অতিরিক্ত শ্রম শোষণ করে নেওয়ার জন্য নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সময়ের হিসাব রাখার মতো কাজও করতো, যাতে করে শ্রমিকের কাছ থেকে বিনামূল্যে কিছুটা হলেও সময় নামক পণ্যটি আদায় করে নেওয়া যায়। পরবর্তীতে যদিও এ ধরনের ঘৃণ্য কাজের প্রবণতা কমে যায়, কিন্তু ঘড়ির প্রভাব বেশিরভাগ মানুষের জীবনকেই কাঠামোবদ্ধ করে ফেলে, যা আগে কেবল যাজকাবাসগুলোতে দেখা যেতো। বলা যায় মানুষই আসলে ঘড়ির মতো হয়ে ওঠে; তার কাজকর্ম হয়ে ওঠে একঘেয়ে নিয়মানুবর্তী, যার সাথে কোন প্রাকৃতিক বা জীবিত সত্তার কাজকর্মের কোন মিল নেই। মানুষ হয়ে ওঠে এমন এক সত্তা যাকে ভিক্টোরিয়ান একটি প্রবাদে বলা হয়েছে ‘ঘড়ির মতো নিয়মানুবর্তী’ (as regular as clockwork)। কেবল গ্রামাঞ্চলগুলোতে, যেখানে পশুপাখি, উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ মানুষের জীবনের সাথে অধিক সম্পৃক্ত, সে জায়গাগুলোতেই কেবল জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এই একঘেয়েমির ফাঁদে পড়েনি।

    প্রাথমিকভাবে সময়ের সাথে নতুন এই বোঝাপড়া, জীবনের নতুন এই কাঠামো ঘড়ির মালিক পুঁজিপতিশ্রেণি অনিচ্ছুক দরিদ্র মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েহিল। এর প্রতিক্রিয়ায় কারখানার একজন দাস তার অবসর সময় কাটাতো বিশৃঙ্খল অনিয়মের সাথে; যার চিত্র ফুটে উঠেছিল ১৯ শতকের শিল্পায়নের ফলে গড়ে ওঠা বস্তিগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপানের প্রবণতার মধ্যে। শোষণ থেকে পলায়নের একমাত্র মাধ্যম ছিল মদ কিংবা খৃষ্টীয় মেথডিস্ট চর্চায় নিমজ্জিত হয়ে সময়ের উর্ধ্বে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু নিয়মানুবর্তিতার ধারণা ক্রমশ শ্রমিকদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। ১৯ শতকের ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধ ‘সময় নষ্ট’ করাকে পাপ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাদী আদর্শকেই বলবৎ করে তোলে। ১৮৫০ এর দশকে হাতঘড়ি ও দেয়াল ঘড়ি গণউৎপাদনের ফলে সময় সচেতনতা এমন মানুষের কাছেও পৌঁছে যায় যারা পূর্বে কেবল কারখানার বাঁশি শুনে বা সময়ের হিসাবরক্ষকের কথায় চলতো। চার্চ, স্কুল, অফিস থেকে কারখানা পর্যন্ত সব জায়গায় সময়ানুবর্তিতা হয়ে ওঠে মহত্তম গুণ।

    শিল্পী: সালভাদর দালি

    যান্ত্রিকভাবে সময় নির্ধারণের এই প্রতারণামূলক পদ্ধতি ও এর দাসত্ব সুলভ নির্ভরশীলতা ১৯ শতকের মধ্যেই সকল শ্রেণির মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে গড়ে উঠেছিল মনোবল বিনষ্টকারী একটি কাঠামো, যা আজও কারখানার কাজের একটি বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি এই কাঠামোর সাথে খাপ খাওাতে পারে না তাকে সামাজিক হেনস্তা আর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। কারখানায় আসতে দেরি করলে রমিক তার চাকরি হারাতে পারে, এমনকি এখনকার দিনে (১৯৪৪ সাল, যখন যুদ্ধকালীন নীতি বলবৎ ছিল) তাকে কারারুদ্ধও করা হতে পারে। তাড়াহুড়ো করে খাবার খাওয়া, সকালে সন্ধ্যায় বাস বা ট্রেনের জন্য ঠেলাঠেলি করা, শিডিউল অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার চাপ, এর সবকিছুই হজম সংক্রান্ত ও স্নায়বিক ব্যধির বিকাশে, স্বাস্থ্যের অবনতিতে এবং আয়ু কমাতে ভূমিকা রাখে।

    যদিও দীর্ঘ মেয়াদে, নিয়মানুবর্তিতার ওপর এরূপ জোরারোপ কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে না। বরং দেখা যায় উৎপাদিত পণ্যের মান তুলনামূলকভাবে খারাপ হতে থাকে; কারণ নিয়োগকর্তা সময়কে একটি পণ্য হিসেবে দেখে যা তাকে কিনতে হয় এবং সেজন্য কাজের গতি বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের ওপর এতোটাই চাপ তৈরি করে যে শ্রমিকেরা বাধ্য হয় কাজের মান কমিয়ে আনতে। পণ্যের গুণগত মানের চেয়ে পরিমাণ হয়ে ওঠে মুখ্য মানদণ্ড। এর ফলে কাজ করার আনন্দ পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে যায় এবং শ্রমিকের পুরো মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয় ঘড়ির দিকে, অর্থাৎ কাজ শেষ হওয়ার সময়ের দিকে। কাজের চেয়ে শ্রমিকের মনোযোগ বেশি থাকে কখন এই কাজ শেষ হবে সেদিকে এবং কাজ শেষ হওয়া মাত্রই সে শিল্পায়িত সমাজের একঘেয়ে অবসরে নিজেকে নিমজ্জিত করে ফেলে। এই অবসরে সে তার নির্ধারিত ও যান্ত্রিক সময় কাটায় সিনেমা, রেডিও কিংবা খবরের কাগজে ডুবে থেকে; অর্থাৎ তার মজুরি ও ক্লান্তি তাকে বিনোদন উপভোগের যতোটুকু সুযোগ দেয় ততোটুকুর মধ্যে। কেবল যদি কেউ তার বিশ্বাস বা বুদ্ধির মাধ্যমে বিত্তহীন হয়ে বেঁচে থাকার বিপত্তি মেনে নিতে পারে তবেই সে পারবে ঘড়ির দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে।

    ঘড়ির সমস্যা অন্যান্য যন্ত্রের সমস্যার মতোই। সময় নির্ধারণের যান্ত্রিক পদ্ধতি উন্নত সমাজের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; ঠিক যেভাবে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অপ্রয়োজনীয় শ্রম হ্রাস করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দুটোই সামাজিক কার্যক্রম সাবলীলভাবে চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলোকে ব্যবহার করা উচিত একঘেয়ে শ্রম ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা দূর করার জন্য। কিন্তু বর্তমানে এগুলো যেভাবে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে তা কোনভাবেই হওয়া উচিত না।

    এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, ঘড়ির কাঁটার তালই মানুষের জীবনের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ সময়ের একটি যান্ত্রিক ধারণার দাস হয়ে উঠেছে, যেই ধারণার জন্ম সে নিজেই দিয়েছে। অনেকটা ফ্রাংকেন্সটাইনের মতো সে নিজেই তার সৃষ্টির ব্যাপারে ভীত। একটা সুস্থমস্তিষ্ক ও মুক্ত সমাজে মানুষের কার্যক্রম কোনভাবেই ঘড়ি বা অন্য কোন যন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে না। মানুষ কর্তৃক মানুষের অবদমনের চেয়েও উদ্ভট ধারণা হলো মানুষের একটা সৃষ্টির দ্বারা মানুষের অবদমন। যান্ত্রিক সময় গণনা পদ্ধতিকে যদি তার প্রকৃত কাজ তথা সমন্বয়কারী বা উল্লেখ বিন্দু (means of reference) হিসেবে তার কাজের পর্যায়ে আবদ্ধ রাখা যায়, তবেই মানুষ ঘড়ির আরাধনা ও কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হতে পারবে। পূর্ণ স্বাধীনতার অর্থ মানুষের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিমূর্ত চিন্তার কর্তৃত্ব থেকেও মুক্ত হওয়া।

  • জন পেরি বার্লো ।। সাইবারভুবনের স্বাধীনতার ঘোষণা

    জন পেরি বার্লো ।। সাইবারভুবনের স্বাধীনতার ঘোষণা

    ছবি: জন পেরি বার্লো

    ইন্ডাস্ট্রিয়াল পৃথিবীর হে সরকারবৃন্দ, মাংস আর ইস্পাতের হে পরিশ্রান্ত দৈত্যগণ, আমি আসছি সাইবারভুবন থেকে। মনের নতুন নীড় থেকে। ভবিষ্যতের পক্ষ থেকে বলছি আমি অতীতচারী তোমাদের: আমাদেরকে থাকতে দাও আমাদের মতন। আমাদের মধ্যে স্বাগত জানাতে চাই না আমরা তোমাদেরকে। আমাদের মিলনমেলায় তোমাদের কোনো সার্বভৌমত্ব নাই।

    আমাদের নাই কোনো নির্বাচিত সরকার। চাইও না আমরা ওরকম কিছু। ফলে আমি কথা বলছি তোমাদের উদ্দেশে—যেভাবে কথা বলে চিরকাল স্বাধীনতা নিজে, তার চে অধিক কোনো কর্তৃত্ব নিয়ে নয়। আমি ঘোষণা করছি, বৈশ্বিক যে সামাজিক ভুবন গড়ে তুলছি আমরা, আমাদের ওপর চাপাতে চাওয়া তোমাদের দৌরাত্ম্যের হাত থেকে তা স্বভাবতই স্বাধীন। আমাদেরকে শাসন করার নৈতিক কোনো অধিকার তোমাদের নাই, না আছে তোমাদের শাসন বলবৎকরণের কোনো উপায়, যাকে ভয় করার সত্যিকার কোনো কারণ থাকতে পারে আমাদের।

    শাসিতের সম্মতি থেকেই আসে সরকারের ন্যায়সম্মত ক্ষমতা। আমাদের সম্মতি তোমরা চাও–ও নি, আমরা তা দিইও নি। তোমাদেরকে আমন্ত্রণ জানাই নি আমরা। তোমরা তো চেনোই না আমাদের। চেনো না আমাদের জগতটাকেও। সাইবারভুবন তোমাদের সীমানার মধ্যে পড়ে না। ভেবো না এত বিরাট একটা জিনিস বানানো তোমাদের পক্ষে সম্ভব। সাইবারভুবনকে কোনো সরকারি প্রকল্প বলে ধরে নিয়ো না যেন। তোমরা এটা বানাতে পারো না। এ আসলে প্রকৃতির কাজ। এ আসলে গড়ে উঠছে আমাদের সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে।

    আমাদের বিপুল আড্ডার আলাপচারিতায় যুক্ত হও নি তোমরা। আমাদের বাজারবিপণির ধনসম্পদও তোমাদের সৃষ্টি নয়। তোমরা আমাদের সংস্কৃতি জানো না, আমাদের নীতি–কর্তব্য জানো না, জানো না আমাদের অলিখিত বিধিবিধানও। এগুলো আমাদের সমাজকে ইতোমধ্যে দিয়েছে সুন্দরতর গঠনবিন্যাস। তোমাদের তরফে আরোপ করা কোনো কিছু দিয়েই তা অর্জন করা যেত না।

    তোমরা দাবি করে বেড়াও যে, আমাদের মধ্যে এমন সমস্যা আছে যা নাকি তোমরা এসে সমাধান করে দেবে। আমাদের জায়গাটাকে দখল করে নেওয়ার অজুহাত হিসেবে আসলে তোমরা ব্যবহার করো এই দাবিটাকে। এসব সমস্যার অনেকগুলোর অস্তিত্বই নাই কোনো। সত্যিকার কাজিয়া–ফ্যাসাদ ও ভুলভ্রান্তি যেখানে আছে, সেগুলো আমরা শনাক্ত করব এবং সমাধানের ব্যবস্থা করব আমাদের নিজস্ব উপায়ে। আমরা গড়ে তুলছি আমাদের নিজস্ব সামাজিক চুক্তি। এই পরিচালন–প্রণালী বিকশিত হয়ে উঠবে আমাদের জগতের শর্ত–পরিস্থিতি অনুসারে—তোমাদের জগতের নয়। আমাদের জগত তো আলাদা।

    সাইবারভুবন গড়ে উঠেছে লেনদেন, সম্পর্ক, এবং খোদ চিন্তার সমন্বয়ে। আমাদের যোগাযোগ–জালের অভ্যন্তরে এগুলো বিছিয়ে রয়েছে একেকটা সুস্থির তরঙ্গের মতন। আমাদের এ জগত বিরাজ করে একাধারে সর্বস্থানে এবং অ–স্থানে। কিন্তু এর অবস্থান এমন কোথাও নয় যেখানে বসবাস শরীরের।

    আমরা সৃজন করছি এমন এক জগত যেখানে প্রবেশ করতে পারে যেকোনো মানুষ। জাতিবর্ণ, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক শক্তি বা জন্মস্থানজনিত সুবিধা অথবা সংস্কার ব্যতিরেকেই।

    আমরা সৃজন করছি এমন এক জগত যেখানে যেকেউ যেকোনো জায়গায় ব্যক্ত করতে পারে তার নিজের বিশ্বাস। তা সে যত অপ্রচলিতই হোক, যত অদ্ভুতই হোক। এখানে থাকে না তার বলপ্রয়োগে স্তব্ধ হওয়ার ভয় অথবা প্রথাগত প্রত্যাশার চাপ।

    সম্পত্তি, অভিপ্রকাশ, পরিচয়, চলাফেরা আর পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে তোমাদের যত আইনি ধ্যানধারণা আছে সেগুলো আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ওগুলো তো সবই বস্তুগত। আমাদের এখানে কোনো বস্তু নাই।

    আমাদের পরিচয়সমূহের কোনো শরীর নাই। সুতরাং শারীরিক বলপ্রয়োগের জোরে চাপানো কোনো হুকুম আমরা গ্রহণ করতে অক্ষম। তোমাদের ঠিক উল্টা আর কী। আমাদের পরিচালন–প্রণালীর অভ্যুদয় ঘটবে নীতিনৈতিকতা, আলোকায়িত আত্মস্বার্থ, এবং গণমঙ্গলের ভেতর দিয়ে— এ–ই আমাদের বিশ্বাস। হতে পারে যে, আমাদের পরিচয়গুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে তোমাদের আইনগত এক্তিয়ারের মধ্যে। যেসব সংস্কৃতি নিয়ে আমরা গড়ে উঠেছি তারা একমাত্র যে আইনটাকে সাধারণত স্বীকার করে থাকে সেটা হলো “সোনালী বিধান”। [সোনালী বিধান, তথা গোল্ডেন রুল, বিশেষ এক নীতিনৈতিকতাগত দিকনির্দেশনা। এর সারকথা হলো, অপরের কাছে তুমি যে ধরনের ব্যবহার প্রত্যাশা করো, অপরের সাথে যেন সেই ধরনের ব্যবহারই করো।] আশা করি, এরই ভিত্তিতে আমরা আমাদের সুনির্দিষ্ট সমাধানগুলো তৈরি করতে পারব। কিন্তু তোমরা যেসব সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছ আমাদের ওপর, আমরা তা কবুল করি না।

    আর্টওয়ার্ক: সংস অব ফ্রিডম
    শিল্পী: ভ্লাদেমির কাজানেভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আজকে তোমরা একটা আইন বানিয়েছ। টেলিযোগাযোগ সংস্কার আইন। তোমাদের নিজেদের সংবিধানকেই সেটা খারিজ করে দেয়। আর অপমান করে জেফারসন, মিল, ম্যাডিসন, ডিটকভিল এবং ব্র্যান্ডাইসের স্বপ্নকে। নতুন করে এই স্বপ্নগুলো আজ অবশ্যই জন্মানো দরকার আমাদের মধ্যে।

    নিজেদেরই সন্তানদের ভয়ে আতঙ্কিত তোমরা। কেননা এমন এক দুনিয়ার তারা আদি বাসিন্দা, যেখানে চিরকাল অভিবাসী থেকে যাবে তোমরা। যেহেতু ভয় করো সন্তানদের, মাতাপিতার দায়িত্ব–কর্তব্য পালনের ব্যাপারে তোমরা তাই ভরসা করো আমলাতন্ত্রকে। এতই তোমরা ভীরু যে, ঐ দায়িত্ব–কর্তব্যের প্রশ্নে নিজেরা নিজেদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মতো অবস্থাই তোমাদের নাই। আমাদের এই জগতে ইতর থেকে ঐশ্বরিক পর্যন্ত মানবিকতার সমস্ত অনুভূতি ও অভিপ্রকাশ এক অখণ্ড সমগ্রের অংশ। সমস্তটাই বৈশ্বিক আলাপচারিতার একেকটা টুকরা। যে বাতাসে আটকায় দম, আর যে বাতাসে ঝাপটানো যায় পাখা—সে দুই বাতাসে আমরা পার্থক্য করতে পারি না।

    স্বাধীনতার ভাইরাস আটকানোর জন্য পাহারাচৌকি বসাচ্ছ তোমরা সাইবারভুবনের সীমান্তে সীমান্তে। চীনে, জার্মানিতে, ফ্রান্সে, রাশিয়ায়, ইতালিতে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এসব দিয়ে সংক্রমণটাকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রাখতে পারবে হয়ত। কিন্তু ওসবে কোনো কাজ হবে না। তথ্যকণাবাহিত মাধ্যম দিয়ে শিগগিরই ছেয়ে যাবে পুরোটা পৃথিবী।

    ক্রমবর্ধমানভাবে অচল হতে থাকা তোমাদের তথ্য–ইন্ডাস্ট্রি বিলুপ্তির হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে চাইবে খোদ কথার ওপর মালিকানা দাবি করা নানাবিধ আইন উপস্থাপনের মাধ্যমে। সারা দুনিয়া জুড়ে। আমেরিকায় এবং অন্যত্র। নানাবিধ আইডিয়াকে স্রেফ আরেকটা শিল্পপণ্য বলে ঘোষণা করবে এইসব আইন। কাঁচা লোহার চেয়ে বিশেষ কোনো মহৎ বস্তু হিসেবে আর বিবেচিত হবে না তা। কিন্তু আমাদের জগতে মানুষের মন যা–কিছু সৃষ্টি করতে পারে তার সবকিছুরই সীমাহীন পুনরুৎপাদন ও বিতরণ হতে পারে। বিনাখরচে। বিশ্বজোড়া চিন্তা–চলাচলের জন্য তাই এখন আর তোমাদের কারখানার কোনো দরকার পড়ে না।

    ক্রমবর্ধমানভাবে শত্রুতাপূর্ণ ও ঔপনিবেশিক হয়ে ওঠা এসব পদক্ষেপ আমাদেরকে ঠেলে দেয় আগেকার দিনের স্বাধীনতাপ্রিয় ও আত্মকর্তৃত্বকামী মানুষজনের মতো অবস্থায়। যতসব বহুদূরবর্তী ও খোঁজখবরহীন ক্ষমতার কর্তৃপক্ষকে প্রত্যাখ্যান করতে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও আমাদের শরীরের ওপর তোমাদের শাসনের ব্যাপারে আমরা আমাদের সম্মতি অব্যাহত রেখেছি, তবু এ ঘোষণা তো আমাদের করতেই হবে যে: আমাদের ভার্চুয়াল বা অপার্থিব ‘আমি’রা তোমাদের সার্বভৌমত্বের সংক্রমণ থেকে মুক্ত। আমরা আমাদের বিস্তার ঘটাব পুরোটা গ্রহ জুড়ে যেন কেউ আমাদের চিন্তাভাবনাকে আটক করতে না পারে ।

    সাইবারভুবনে আমরা সৃজন করব মনের এক সভ্যতা। অতীতে তোমাদের সরকারসমূহ যে–দুনিয়া বানিয়েছে তার তুলনায় সেটা হবে অধিক মনুষ্যোচিত, আরো বেশি সুন্দর।

    দাভোস, সুইজারল্যান্ড: ৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

    মূল রচনার হদিস

    John Perry Barlow (2001) “A Declaration of the Independence of Cyberspace” in Peter Ludlow (ed.) Crypto Anarchy, Cyberstates, and Pirate Utopias, pp. 27-30, Cambridge, Massachusetts: The MIT Press. অনলাইন: https://archive.is/rAkuG

  • অ্যালবার্ট মেল্টজার ।। নৈরাজ্যবাদ: পক্ষে-বিপক্ষে

    অ্যালবার্ট মেল্টজার ।। নৈরাজ্যবাদ: পক্ষে-বিপক্ষে

    ভূমিকা 

    নৈরাজ্যবাদের ঐতিহাসিক পটভূমি

    মজার ব্যাপার যে আমরা যেই বিষয়গুলোকে নৈরাজ্যবাদী পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করি সেগুলোর মূল প্রোথিত রয়েছে প্রাচীন সমাজে। একই সাথে এটাও বেশ আগ্রহোদ্দীপক যে, শত শত বছর ধরে রাষ্ট্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংঘটিত কৃষক আন্দোলনগুলোর মধ্যেও রয়েছে এক প্রকারের নৈরাজ্যবাদী চিন্তা। কিন্তু আধুনিক সময়ের নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনগুলোর পক্ষে অন্যান্য শ্রমজীবী তত্ত্বের চেয়ে পুরনো আমলের সেসকল আন্দোলনকে অধিক প্রাসঙ্গিক ভাবার কোন সুযোগ নেই। আধুনিক নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনকে বুঝতে হলে আমাদের তুলনামূলক সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকাতে হবে। যদিও ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগেও লিবারেল তথা উদারবাদী, রাষ্ট্র-বিরোধী এবং ফেডারালবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল যাদেরকে আমরা বর্তমানে নৈরাজ্যবাদী আখ্যা দেই, কিন্তু ১৯ শতকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে এসেই এ ধরনের গোষ্ঠীগুলো প্রকৃত অর্থে নৈরাজ্যবাদী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া শুরু করে। 

    আমরা নৈরাজ্যবাদের পূর্বসূরি হিসেবে পৃথক তিনটি দার্শনিক ধারার কথা বলতে পারি—গডউইন, প্রুধোঁ এবং সম্ভবত হেগেল। এদের কেউই আসলে নৈরাজ্যবাদী ছিলেন না, যদিও প্রুধোঁই প্রথম নৈরাজ্যবাদের আধুনিক অর্থের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন (তিনি সেটা গ্রহণ করেছিলেন ফরাসি বিপ্লব থেকে, যেখানে সর্বপ্রথম ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটা নিন্দাসূচকভাবে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল)। এদের কেউই নৈরাজ্যবাদী কার্যক্রম বা সংগ্রামে যুক্ত হননি এবং প্রুধোঁ তো সরাসরি সংসদীয় কার্যক্রমেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। নৈরাজ্যবাদের ওপর রচিত সবচেয়ে অসমৃদ্ধ, কিন্তু আপাতভাবে নৈর্ব্যক্তিক বই হলো পল এলটজবেশারের (Paul Eltzbacher) ‘নৈরাজ্যবাদ’। এই বইয়ে নৈরাজ্যবাদকে দেখানো হয়েছে অনেকটা বহুমুখী একটি তত্ত্ব হিসেবে যার কিছুটা গডউইন কিংবা প্রুধোঁ কিংবা স্টার্নার (আরো একজন ব্যক্তি যিনি নৈরাজ্যবাদের কোন উল্লেখ করেন না) কিংবা ক্রপোতকিন থেকে এসেছে, যার প্রত্যেকটিই একটি নির্দিষ্ট চিন্তার বিভিন্ন রূপ। এই বইটিকে মোটামুটি মূল্যহীন একটি জিনিসের মতো ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তির চিন্তার বিবরণ হিসেবে তা গ্রহণযোগ্য। প্রুধোঁ সারা জীবনেও কোন কার্যক্রমের ঘোষণা দেননি এবং ক্রপোতকিনও তার সময়ের কেবল বিশেষ কিছু নৈরাজ্যবাদীদের জন্য লেখেন নাই। একই সাথে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর লেখা অন্যান্য বইও একই রকম মূল্যহীন। নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে অনেক অধ্যাপকের ধারণাই তৈরি হয়েছে মূলধারার গণমাধ্যম থেকে। নৈরাজ্যবাদ কোন চিন্তাহীন ধ্বংসাত্মক তত্ত্ব নয়। আবার কিছু উদারনৈতিক চিন্তা নৈরাজ্যবাদকে যেমন মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের উপাসনাকারী তত্ত্ব মনে করে, নৈরাজ্যবাদ সেটাও না—সেই মানুষ বা প্রতিষ্ঠান যতোই স্বাধীন হোক না কেন। 

    গডউইন ছিলেন রাষ্ট্রবিহীন সমাজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, যা পরবর্তীতে তিনটি পৃথক ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একটি ধারা ছিল নৈরাজ্যবাদীদের (যেই বিষয়ে আমরা আলোচনা করবো)। দ্বিতীয় ধারাটি হলো মার্কিন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, যার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন হেনরি ডেভিড থরো এবং তার অনুসারীরা। এটিকে মাঝেমধ্যে নৈরাজ্যবাদী ভাবা হলেও এই চিন্তা একই সাথে আধুনিক ‘উদারবাদী’ পুঁজিবাদেরও উদ্ভব ঘটায়। একই সাথে তা টলস্টয় ও গান্ধীর শান্তিবাদী সংঘের উদ্ভবের জন্যও দায়ী, যার দ্বারা পরবর্তীতে পুরো হিপি সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়েছিল। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত না হয়ে পুঁজিপতির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ফলে) একটি ডানপন্থী তত্ত্বে পরিণত হয়েছে। 

    গডউইনের চিন্তা থেকে উৎসারিত দ্বিতীয় ধারা থেকে ‘শান্তিবাদী নৈরাজ্যবাদ’ কিংবা ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদের’ উদ্ভব ঘটেছে, যা প্রথম ধারার চিন্তা তথা বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদ থেকে পুরোপুরি আলাদা। মাঝেমধ্যে এই শান্তিবাদী ধারার ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে ‘এটিই নৈরাজ্যবাদ’। শান্তিবাদী আন্দোলনগুলো, বিশেষত গান্ধীর আন্দোলন, সাধারণত ছিল সর্বগ্রাসী এবং সেগুলো কর্তৃত্ব ফলাতো (হয়তো-বা কেবল নৈতিক পন্থায়)। বেঞ্জামিন টাকারের (Benjamin Tucker) মতধারা—তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের কারণে—হরতাল প্রতিরোধের জন্য পুলিশী ক্ষমতার আরোপকে মেনে নিয়েছিল, কারণ এমনটা করা মালিকপক্ষের ‘স্বাধীনতা’। এসকল তথাকথিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা কোন না কোন সময়ে পুলিশী ক্ষমতা প্রয়োগের পক্ষে, তথা সরকারব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেছে। কিন্তু নৈরাজ্যবাদের সংজ্ঞাই হলো সরকারব্যবস্থার অনুপস্থিতি। 

    গডউইন থেকে উদ্ভুত তৃতীয় ধারাটি হলো সাধারণ উদারনৈতিকতাবাদ, কিংবা রক্ষণশীল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। 

    গডউইনের চিন্তার প্রথম ধারা অর্থাৎ রাষ্ট্রবিহীন সমাজ নির্মাণের ধারণাকে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল অ্যাম্ব্রোস কুডনের (Ambrose Cuddon) মাধ্যমে। কুডনের বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতাবাদ ও রাষ্ট্রবিহীন সমাজতন্ত্র ইংরেজ চার্টিস্ট আন্দোলনের শেষ ভাগে এসে যুক্ত হয়েছিল। এটি ফরাসি প্রুধোঁবাদীদের সাথেও সংহতি প্রকাশ করেছিল। প্যারিসে যারা প্রুঁধোর তত্ত্ব গ্রহণ করেছিল তারা নিজেদের নৈরাজ্যবাদী মনে করতো না, বরং তারা নিজেদের রিপাব্লিকান বলতো। তাদের বেশিরভাগই ছিল স্বনির্ভর কারিগর যারা নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করতো। তৎকালীন ফরাসি অর্থনীতির পুরোটাই কৃষক ও কারিগরদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মুদ্রণকারী, বই বাঁধাইকারী, কামার, দর্জি, স্বর্ণকার, টুপির কারিগর—এরা সবাই ছিল নিজস্ব ব্যবসার পরিচালক বা খামারি, যারা ছিল মালিকের অধীনে কাজ করা একজন শ্রমিক থেকে আলাদা। এরা ছিল স্বাধীন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এবং রাষ্ট্র থেকে তারা কোন সুযোগ সুবিধা ভোগ না করলেও করের বোঝা তাদের বহন করতে হতো, যুদ্ধেও তাদের অংশগ্রহণে বাধ্য করা হতো। সেই সময়ে তারা টিকে থাকার জন্য সহায়ক একটি অর্থনৈতিক কাঠামো খুঁজছিল এবং ক্রমবর্ধমান পুঁজিবাদের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল। 

    মার্ক্স এদেরকে বলেছেন ‘পেটি বুর্জোয়া’ (petty bourgeois) অর্থাৎ গৌণ বুর্জোয়া শ্রেণি। ১৯ শতকের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ ভিন্নতর ছিল। তিনি যৌক্তিকভাবেই দাবি করেছেন এই ‘পেটি বুর্জোয়া শ্রেণি’ সমসাময়িক কারখানা শ্রমিকদের মতো সংঘবদ্ধ ছিল না (তিনি খামারের শ্রমিকদের অবজ্ঞা করতেন); তিনি আরো বলেন, এই শ্রেণির মানুষকে যখন জোরপূর্বক শিল্পায়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তারা তাদের শ্রেণি বহির্ভুত কোন সুশৃঙ্খল দলের তৈরি করা নিয়ম মেনে কাঠামোভুক্ত হয়নি, বরং তারা ছিল স্বাধীনচেতা এবং চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোর ব্যাপারে তারা ছিল সন্দিহান। তাদের এই অসন্তুষ্টি প্রায়শই সহিংসতার রূপ নিতো। তারা নৈরাজ্যবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং সিন্ডিকালবাদের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির মাঝে নৈরাজ্য ছড়িয়ে দেয়। (এই দাবি এখনকার মার্ক্সবাদীদের মধ্যে দেখা যায়, যখন তারা পেটি বুর্জোয়া বলতে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু বোঝায়—হিসাবরক্ষক কিংবা আইনজীবী—এবং এর ফলে মার্ক্সের যথেষ্ট যৌক্তিক একটি পর্যালোচনাটি বর্তমান সময়ে এসে উদ্ভট একটি তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।)

    এসকল ইংরেজ ও ফরাসি আন্দোলন প্রথম ইন্টারন্যাশনালে একত্রিত হয়। শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক অ্যাসোসিয়েশন তার অস্তিত্বের জন্য মার্ক্সের কাছে ও পরোক্ষভাবে হেগেলীয় দর্শনের কাছে ঋণী। কিন্তু ইন্টারন্যাশনালের ভেতরে কেবল মার্ক্সের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই ছিল না, একই সাথে ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র, ব্লাংকিবাদ (শ্রমিক শ্রেণির রিপাব্লিকানবাদ), ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নবাদ, জার্মান কর্তৃত্ববাদ ও সুবিধাবাদী সমাজতন্ত্র, এবং স্প্যানিশ, সুইস ও ইতালীয় রাষ্ট্রবিহীন সমাজতন্ত্রও বিদ্যমান ছিল। একই সাথে ছিল জাতীয় রিপাব্লিকানবাদ ও বিভিন্ন ফেডারালবাদী ধারার চিন্তা। 

    বাকুনিনকে সাধারণত যেভাবে নৈরাজ্যবাদের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়, তিনি আসলে তা ছিলেন না। জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত তিনি নৈরাজ্যবাদীই ছিলেন না। তিনি ফেডারালবাদ ও সমাজতন্ত্রের দীক্ষা পেয়েছিলেন জুরার (Jura) সুইস শ্রমিকদের কাছ থেকে এবং গডউইন ও প্রুধোঁপন্থী ‘ফেডারালবাদী’ কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী সমাজতন্ত্রীদের চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। অনেক দেশেই, বিশেষত স্পেন ও ইতালিতে, বাকুনিন কর্তৃক মার্ক্সের চিন্তার সমালোচনাই ফেডারালবাদী আন্দোলনকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। (যদিও নৈরাজ্যবাদীদের কাছে মার্ক্স ছিলেন ইন্টারন্যাশনালের একজন ‘খলনায়ক’, এটা বলতেই হয় যে, মার্ক্স যদি সমাজতন্ত্রের একটি বিশেষ রূপের কাঠামো দাঁড় না করাতেন তাহলে কোন দ্বন্দ্ব তৈরি হতো না এবং বাকুনিনও এর বিরোধী কোন তত্ত্ব দিতে পারতেন না।) 

    ১৮৬৯ সাল নাগাদ ইন্টারন্যাশনালে একটি যথেষ্ট স্পষ্ট প্রবণতা গড়ে ওঠে যাকে ‘বাকুনিনবাদী’ বলা হচ্ছিল; যা একদিকে ছিল গডউইন প্রভাবিত, অন্যদিকে প্রুধোঁ প্রভাবিত। যখন এই ইন্টারন্যাশনাল প্যারিস কমিউনের মুখোমুখি হয় তখন তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় (যদিও এই বিচ্ছেদ বহু আগেই ঘটার কথা ছিল এবং অনেকটাই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জায়গায় চলে গিয়েছিল)। অ-নৈরাজ্যবাদী ও মার্ক্সবাদীরা প্যারিস কমিউনের ব্যাপারে তাদের ভিন্ন ভিন্ন পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের ফলে বুঝতে পারে যে তারা একে অপরের থেকে আলাদা। 

    একই ভাবে, অনেক বছর ধরে নৈরাজ্যবাদীরা সমাজতন্ত্রী আন্দোলনের একটা অংশ গঠন করে যেতে থাকে যেখানে মার্ক্সবাদী ও সমাজ-গণতন্ত্রীরাও (Social-Democrat) অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্ক্স একটি গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। জার্মান সমাজতন্ত্রী আন্দোলন লাসাল (Lassalle) দ্বারা অধিক প্রভাবিত ছিল; অন্যদিকে ইংরেজ সমাজতন্ত্রের ওপর অধিক প্রভাব ছিল র‍্যাডিকাল প্রথাবিরোধিতার খৃষ্টীয় ও সংস্কারবাদী ধারাসমুহের। কেবল মার্ক্সের মৃত্যুর পরেই, যখন তাঁর চিন্তা জার্মান সমাজ-গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক মতবাদ হয়ে ওঠে, নৈরাজ্যবাদীরা সমাজতন্ত্রী ইন্টারন্যাশনালগুলো থেকে পুরোপুরি বহিষ্কৃত হয়। সমাজ-গণতন্ত্রও বিভক্ত হয়ে পড়ে যার একদিকে ছিল ইংরেজ উদারনৈতিকতা এবং অন্যদিকে সমাজ-গণতন্ত্র। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ’ সমাজ-গণতন্ত্রী (বলশেভিকরা, যারা প্রকৃত অর্থে কখনো সংখ্যালঘিষ্টের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারেনি) এবং সংস্কারবাদের মধ্যেও দেখা দেয় বিরোধ। 

    সে সময়ে নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের মধ্যে সেই অর্থে কোন বিভাজন দেখা দেয়নি। মূলধারার জনমত টলস্টয়ের মতো মানুষকেও নৈরাজ্যবাদী আখ্যা দিয়ে দেয় (তিনি নিজে কখনো দাবি করেননি তিনি নৈরাজ্যবাদী। তিনি তা ছিলেনও না; এমনকি প্রচলিত অর্থে তিনি খৃষ্টান কিংবা শান্তিবাদীও ছিলেন না। তার ভক্তরা এসব বিষয়ে তার চেয়ে বোধহয় একটি বেশিই বুঝতে চেয়েছিল)। বরং তিনি ছিলেন অন্যান্য ব্যঙ্গাত্মক-নৈরাজ্যবাদীদের মতো গডউইনবাদের ‘দ্বিতীয় ধারার’ অনুসারী একজন ব্যক্তি। আমরা যেটিকে ‘মূলধারার’ নৈরাজ্যবাদ বলতে পারি তা ছিল অনেক বেশি সংলগ্ন ও সংহত এবং তার কাঠামো গঠিত হয়েছিল কয়েকজন তাত্ত্বিকের লেখার মাধ্যমে; পিটার ক্রপোতকিন তাঁদেরই একজন।

    প্যারিস কমিউনের রক্তাক্ত অবদমন ও পৃত্থিবীর বিভিন্ন স্থানে নিপীড়নের পর—জারের রাশিয়া এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য—নৈরাজ্যবাদ তার পরিচিত জঙ্গিবাদের পর্যায়ে এসে উপনীত হয়। নৈরাজ্যবাদ পালটা লড়াই চালিয়ে যায়, টিকে থাকে এবং বিপ্লবী সিন্ডিকালবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায় (কিংবা সেখানে উপস্থিত হয়) যা শুরু হয়েছিল ফ্রান্সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশপ্রেমের চিন্তার পুনর্জাগরণ, সংস্কারবাদী সমাজতন্ত্রের বিস্তার এবং ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটা শুরু করলে নৈরাজ্যবাদ তার ভিত্তি হারিয়ে ফেলতে থাকে। এবং যদিও নৈরাজ্যবাদ রুশ বিপ্লবের সময় সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছিল, পরবর্তীতে তা বলশেভিক প্রতিবিপ্লবের দ্বারা পরাজিত হয়। ১৯৩৬ সালের স্প্যানিশ বিপ্লবের সময় নৈরাজ্যবাদকে দেখা যায় প্রতিরোধমূলক ও সৃষ্টিশীল উভয় ক্ষেত্রেই সোচ্চার হতে। 

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ নৈরাজ্যবাদকে একাধিক বৈপ্লবিক কার্যক্রম ও শ্রমিকদের আন্দোলনে প্রয়োগ করা হয়। বিকল্প পন্থাসমূহও প্রয়োগের চেষ্টা করা হয় এবং ব্যর্থতার পর বাতিল করে দেওয়া হয়। জার্মান বিপ্লবের ফলে শ্রমিকদের কাউন্সিল গঠনের ধারণার সূত্রপাত ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প শ্রমিকদের সংগঠনের (IWW) অভিজ্ঞতা শিল্প শ্রমিকদের ইউনিয়ন গঠনের সম্ভাব্যতাকে স্পষ্ট করে তোলে এবং দেখায় কীভাবে ‘পুরনো জগতের খোলসের ভেতরেই নতুন জগৎ’ নির্মাণ সম্ভব। মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘আগুন বনাম আগুনের’ চিন্তা, রাশিয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা বিহীন সমাজতন্ত্রের অর্থ, এবং সর্বত্র সংস্কারবাদী সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে নৈরাজ্যবাদী চিন্তাধারা রূপ লাভ করে। 

    যদিও অনেকেই নৈরাজ্যবাদী দর্শনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন, তবুও সে অর্থে নৈরাজ্যবাদের কোন ধরাবাঁধা তাত্ত্বিক ছিলেন না। নৈরাজ্যবাদ এমন একটি ধারা যা কোন দর্শনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং চর্চার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। প্রায়শই কোন একজন বুর্জোয়া তাত্ত্বিক হাজির হন যিনি ইতোমধ্যে কৃষক-শ্রমিকদের দ্বারা গঠিত হওয়া চিন্তাগুলোই পুনরায় লিপিবদ্ধ করেন। বুর্জোয়া ইতিহাসবিদ ও অন্যান্য লেখকেরা (সেই বুর্জোয়া ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই) তাকে একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। এর ফলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় শ্রমজীবী মানুষ যেন বুর্জোয়া নেতৃত্বের ওপরই নির্ভরশীল। 

    প্রায়শই, বুর্জোয়া একাডেমিকরা তাদের নিজস্ব উদারনৈতিক দর্শন প্রকাশের জন্য ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটি ধার করেন। কিংবা মূলধারার সাংবাদিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের অপছন্দের বিষয়গুলো প্রকাশের জন্য ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কিছু অধ্যাপক ও শিক্ষকের জন্য ‘নৈরাজ্যবাদের’ অর্থ টলস্টয়বাদ থেকে আইরিশ রিপাব্লিকান বাহিনী, মাদক গ্রহণ থেকে জঙ্গিবাদী ট্রেড ইউনিয়ন, জাতীয়তাবাদ থেকে বলশেভিকবাদ, হিপি দল থেকে ইসলামী মৌলবাদ, পাংক সংস্কৃতি থেকে কোন কিছুর সহিংস প্রতিবাদ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই হতে পারে! এটা একাডেমিকদের মূর্খতা ছাড়া কিছুই না। তাদের এমনটা করার উদ্দেশ্য ছিল ১৯৬০ এর দশকের কিছু সাংবাদিকদের থেকে নিজেদের আলাদা করে তোলার চেষ্টা, যেসকল সাংবাদিক উপরওয়ালাদের হুকুম অনুযায়ী চর্চামুখী মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী যেকোন কিছুকেই‘নৈরাজ্যবাদী’ এবং নৈরাজ্যবাদী যেকোন কিছুকে ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবে উপস্থাপন করতো। 

    নৈরাজ্যবাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য নীতি

    আমাদের জন্ম হয় মুক্ত মানুষ হিসেবে 

    আমাদের অধিকার আমাদের থেকে অবিচ্ছেদ্য। জগতে জন্মানো সকল মানুষ তার পূর্ববর্তী সকল প্রজন্মের কর্মফলের উত্তরাধিকারী। কেবল জন্মসূত্রেই পুরো জগতের ওপর সকলের অধিকার রয়েছে। আদর্শ বা বাধ্যবাধকতার নামে চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব—যেমন দেশপ্রেম, রাষ্ট্রের প্রতি দায়, ঈশ্বরের উপাসনা, ক্ষমতাশালী ও কর্তৃত্ববান শ্রেণির প্রতি আনুগত্য, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার প্রতি সম্মান—সবগুলোই মিথ্যা। 

    সকলের জন্ম যদি মুক্তমানব হিসেবে হয়, তাহলে দাসত্ব মানেই হত্যাকাণ্ড 

    কেউই কাউকে শাসন করার যোগ্য নয়। এমনটা কোথাও বলা হচ্ছে না যে, মানবাজাতি নিখুঁত, কিংবা কেবল তার সহজাত সাধুচরিত্রের (বা সেটার অভাবের) মাধ্যমে তাকে শাসন করতে দেওয়া উচিত (কিংবা উচিত না)। এ ধরনের শাসন অপশক্তির কারণ হয়ে ওঠে। এমন কোন অতিমানব বা সুবিধাভোগী শ্রেণি নেই যারা ‘ত্রুটিপূর্ণ মানবজাতির’ উর্ধ্বে এবং আমাদেরকে শাসন করা যাদের নৈতিক দায়িত্ব। দাসত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ মানে জীবনের আত্মসমর্পণ। 

    দাসত্বের অর্থ যদিও হয় হত্যাকাণ্ড, তাহলে সম্পদ মানেই চৌর্যবৃত্তি

    মানুষ যে তার প্রাকৃতিক, সহজাত উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তার কারণ এর একটা অংশ তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তা ঘটেছে বলপূর্বক (ক্ষমতা কাঠামোর মাধ্যমে বৈধতা পাওয়া দখলদারিত্ব কিংবা লুটতরাজ) কিংবা ভাঁওতাবাজির (যেখানে মানুষকে বোঝানো হয়েছে রাষ্ট্র কিংবা তার তাঁবেদার শ্রেণি কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদশালী শ্রেণির সুযোগ-সুবিধাসমূহ তাদের প্রাপ্য) মাধ্যমে। মালিকানার সকল বিদ্যমান কাঠামো নিশ্চিত করে যেন কিছু মানুষ তাদের শ্রমের ফসল থেকে বঞ্চিত হয়। এটা সত্য যে, একটা প্রতিযোগিতামূলক সমাজে, কেবল ব্যক্তি মালিকানাই মানুষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে (প্রুধোঁ এটাই বলতে চেয়েছিলেন যখন তিনি নিজেকে আত্মনির্ভরশীল কারিগর হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঘোষণা দেন “সম্পত্তি মানে মুক্তি”, যেটিকে তার প্রাথমিক বক্তব্যের সাথে সংঘাতময় মনে হতে পারে যেখানে তিনি বলেন সম্পত্তি মানেই চুরি)। কিন্তু মালিকানার নীতি, যার সাথে সমাজ জড়িত, সেটি বিদ্যমান সকল বৈষম্যের মূল কারণ। 

    সম্পত্তি যদি চুরি হয়, তাহলে সরকারব্যবস্থা মাত্রই স্বৈরাচার

    আমরা যদি সমাজতন্ত্রী সমাজের নীতি মেনে নেই এবং উত্তরাধিকারী সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতাশালী শ্রেণির বিলুপ্তি ঘটাই, রাষ্ট্র তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। যদি রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা হয়, অপ্রয়োজনীয় সরকারব্যবস্থা স্বৈরাচারের রূপ ধারণ করবে যেহেতু সরকার কাঠামোর তখন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অন্য কোন উপায় থাকবে না। “সমাজতন্ত্র বিহীন স্বাধীনতা মানে শোষণ, স্বাধীনতা বিহীন সমাজতন্ত্র হলো স্বৈরাচার” (বাকুনিন)। 

    সরকারব্যবস্থার অর্থ যদি হয়ে থাকে স্বৈরাচার, তবে নৈরাজ্যের অর্থ মুক্তি

    যারা ‘নৈরাজ্য’ বলতে বিশৃঙ্খলা কিংবা কুশাসনকে বুঝে থাকেন, তারা আসলে ভুল না। যদি তারা সরকারব্যবস্থাকে আবশ্যক মনে করে, যদি তারা মনে করে সচিবালয় থেকে আমাদের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে আমরা বাঁচতে পারবো না, বা যদি ভাবেন আমাদের ভালো থাকার জন্য রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণ বজায় রাখার জন্য পুলিশ প্রয়োজন, তাহলে তারা সঠিক যদি তারা মনে করে থাকেন নৈরাজ্য বলতে সরকারব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত কিছুকে বোঝায়। কিন্তু যারা ভিন্নমত পোষণ করে থাকেন এবং মনে করে থাকেন সরকারব্যবস্থা মাত্রই স্বৈরাচার, তারাও সঠিক, যদি তারা মনে করে থাকেন নৈরাজ্য মানে মুক্তি। সরকারব্যবস্থা যদি হয়ে থাকে সুবিধাভোগী শ্রেণির তোষামোদ, শোষণ এবং বণ্টনব্যবস্থার অকার্যকারিতা, তাহলে নৈরাজ্য মানে সুশৃঙ্খলা। 

    শ্রেণি সংগ্রাম

    বৈপ্লবিক নৈরাজ্যবাদের ভিত্তি হলো শ্রেণি সংগ্রাম; যদিও এটা সত্য যে, অনেক নৈরাজ্যবাদী তাত্ত্বিকই মার্ক্সীয় পরিভাষা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই কথাটাকে অন্যভাবে উপস্থাপন করবে। তবে নৈরাজ্যবাদের এই বক্তব্য মার্ক্স, এঙ্গেলসের শ্রেণি সংগ্রাম বিষয়ক যান্ত্রিক (যেখানে মনে করা হয় কেবল শিল্পের সাথে জড়িত সর্বহারার পক্ষে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে না। এটাও মনে করে না যে নির্দিষ্ট সর্বহারা শ্রেণির অনিবার্য ও বৈজ্ঞানিকভাবে অনুমানযোগ্য জয়ই চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করবে। বরং যদি ১৯১৪ সালের আগে কোন সময়ে নৈরাজ্যবাদের জয় হতো—যখন শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে নৈরাজ্যবাদের চিন্তা জনপ্রিয় হয় ওঠেনি—তাহলে তা হতো কৃষক ও কারিগর শ্রেণির জয়, যারা ছিল শিল্প শ্রমিক ও সর্বহারা শ্রেণির চেয়ে অধিক দরিদ্র। 

    আগেও যেমনটা বলেছি, মার্ক্সবাদীরা নৈরাজ্যবাদীদের পেটি বুর্জোয়া বলে গালি দেয়। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এই পরিভাষা মার্ক্সের চিন্তাকে হাস্যকর করে তোলে। মার্ক্স তা করেছিলেন বুর্জোয়া (যারা নিয়োগকর্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করতো) ও গৌণ নাগরিকদের (যেমন, স্বনিযুক্ত শ্রমিক) মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের জন্য। মার্ক্স যে সময়ের প্রেক্ষাপটে নৈরাজ্যবাদীদের ‘পেটি বুর্জোয়া’ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন নৈরাজ্যবাদীরা একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও কৃষি সমাজের ভাঙ্গনের ফলে উদ্ভুত ‘হতাশার’ কারণে সহিংসতার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছিল, যেহেতু নৈরাজ্যবাদীরা শিল্প শ্রমিকদের মতো চাপিয়ে দেওয়া নিয়মকানুন সহজে মেনে নিতে পারেনি। মার্ক্স কেবল তার সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর্যালোচনা করেছেন, বিশেষত প্যারিস ও বার্সেলোনার কমিউনগুলো ভেঙে যাওয়া কিংবা তাঁর সময়ে ঘটা পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভাঙ্গন। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটে, আজকের দিনের নৈরাজ্যবাদীদের কেতাদূরস্ত ব্যাংকার, ব্যবসায়ী বা ভদ্রলোক শ্রেণির লোক হিসেবে ভাবা (যাদেরকে জোরপূর্বক শিল্পকাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তারা সহিংস হয়ে উঠেছে) হবে নিতান্ত হাস্যকর। 

    মার্ক্স মনে করতেন শিল্প শ্রমিক বা সর্বহারার পক্ষে নিজেদের মতো চিন্তা করার সামর্থ্য নেই—এর কারণ তাদের যথেষ্ট অবসর বা স্বাধীনতা নেই—এবং সে কারণে ট্রেড ইউনিয়নের ধারণা তৈরি ও সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটি বহিরাগত ‘শিক্ষিত শ্রেণির’ নেতৃত্ব প্রয়োজন হয়। তার সময়ে এই পণ্ডিতদের, ও পরবর্তীতে ছাত্রদের অভিজাত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মনে করা হতো। 

    মার্ক্স বর্তমান সময়ের বাস্তবতা অনুমান করতে পারেননি, যেখানে ছাত্ররা নিজেরাই একটি হতাশ শ্রেণি যারা মার্ক্সের দীক্ষা গ্রহণ করে একঘেয়ে চাকরি নয়তো বেকারত্ব বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং নিজেদের চিন্তা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে নব্য বামপন্থা তৈরি করেছে, যারা স্পষ্টতই উৎপাদক শ্রেণির (productive class) অন্তর্ভুক্ত নয়। যেকোন শ্রেণিই তার নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে বৈপ্লবিক শ্রেণি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে; তবে কেবল উৎপাদক শ্রেণিই পারে উদারবাদী (libertarian) বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে, কারণ তাদেরই কোন প্রয়োজন নেই কাউকে শোষণ করার। বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশে শিল্পায়ন সংঘটিত হওয়ার ফলে পুরনো ‘পেটি বুর্জোয়া’ শ্রেণি শিল্পে নিযুক্ত সর্বহারা শ্রেণি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং এই পেটি বুর্জোয়াদের অবশিষ্ট সবাই শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বদলে হয়ে ওঠে পুঁজিপতি শ্রেণি; যেহেতু তারা টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিকভাবে সম্প্রসারণ করতে এবং শ্রমিক নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু কিছু পশ্চিমা দেশের সাম্প্রতিক প্রবণতা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির স্থানচ্যুতি (displacement) এবং তাদেরকে উৎপাদনকারীর ভূমিকা থেকে ক্রমাগত সরিয়ে ফেলা। খননকার্য, জাহাজ নির্মাণ, বস্ত্র উৎপাদন, বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প, এমনকি গোটা শহরও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং এসকল শ্রমিকদের বাধ্য করা হচ্ছে গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানে বা সুপারমার্কেটের কর্মীর মতো সেবাখাতে বিভিন্ন চাকরি নিতে। এই কাজগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না এবং এর ফলে শ্রমিকরা ক্রমশ তাদের শক্তির উৎস (industrial muscle) হারাচ্ছে।

    শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিক বা সর্বহারা শ্রেণি গঠনের সময়ে নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়, যার উৎপত্তি হয়েছিল স্বয়ং শ্রমিকদের মধ্য থেকে। ফলে, বহিরাগত নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারে না—এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদ হলো কর্মস্থলে শ্রমিকদের সংগঠিত করা—প্রাথমিকভাবে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের জন্য এবং পরবর্তীতে কর্মস্থলসমূহ দখল করে নেওয়ার জন্য। ফলে এটি প্রথাগত ট্রেড উনিয়ন আন্দোলনের চেয়ে অধিক কার্যকরী হয় এবং একই সাথে পুঁজিবাদকে এড়িয়ে যাওয়ার বদলে রাষ্ট্র পরিচালিত অর্থনীতিকেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। 

    নৈরাজ্যবাদ বা মার্ক্সবাদ কোনটাই শ্রমিক শ্রেণিকে আদর্শায়িত (idealise) করেনি (প্রোপাগাণ্ডা এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম)—এটি ছিল খৃষ্টান সমাজতন্ত্রীদের কাজ। এমনকী এটাও কখনো বলা হয়নি যে, শ্রমিক শ্রেণি প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারে না। বরং দেখা যায়, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে পরিবর্তন মেনে নিতে চাওয়ার প্রবণতা কম। শ্রমিক শ্রেণির সকল সদস্য ফেরেশতা না এমনটা বললে একদিকে যেমন পাঠকের ধৈর্য্য পরীক্ষা করা হবে, একই সাথে এর মাধ্যমে এক অর্থে এমনটাই দাবি করা হবে যে শ্রমিকেরা নিজেদের কর্মক্ষেত্রের ব্যাপারে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে অনুপোযোগী। আর আমার ধারণা, কেবল স্বর্গেই ফেরেশতাদেরকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। 

    আর্টওয়ার্ক: ডিসকোভারিং আননোন
    শিল্পী: মেডেরিক তুরে
    সূত্র: আর্টসি

    সংগঠন ও নৈরাজ্য

    কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক দলের সদস্য বা অনুসারীদের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা বেশ কঠিন যে, কোন প্রকারের সরকারব্যবস্থা ছাড়াই মানুষ নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। এর ফলে তারা দাবি করে—এবং এটি নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে একটি প্রচলিত সমালোচনা—‘নৈরাজ্যবাদীরা সংগঠনে বিশ্বাস করে না’। কিন্তু সরকার গঠিত হয় মানুষকে কেন্দ্র করে, সংগঠন গঠিত হয় কোন বিষয় বা চিন্তাকে কেন্দ্র করে। 

    একটি প্রচলিত ধারণা হলো নৈরাজ্যবাদীরা ‘অন্যদের সংগঠন ভেঙে ফেলে কিন্তু নিজেদের সংগঠন তৈরি করতে পারে না’। এই কথাটাও সাধারণত বলা হয়ে থাকে এমন একটি বাস্তবতায় যেখানে বিপজ্জনক, শ্রেণিবিভক্ত, কিংবা অর্থহীন সংগঠনগুলো প্রভাবশালী এবং সেগুলো উদারবাদী সংগঠন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। একই সাথে এটাও মেনে নিতে হয় যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে অনেকেই নৈরাজ্যবাদী সংগঠন নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছেন; কিন্তু পৃথিবীর অনেক স্থানে এমন সংগঠন দেখাও যায়। 

    একটি সংগঠন হতে পারে গণতান্ত্রিক কিংবা স্বৈরাচারি, কর্তৃত্বপরায়ণ কিংবা উদারবাদী। এমনকি অনেক উদারবাদী সংগঠন রয়েছে যারা ঠিক নৈরজ্যবাদী নয়; যা প্রমাণ করে সকল সংগঠনকে শ্রেণিবিভক্ত হতে হবে এমনটা না।  

    অনেক ট্রেড ইউনিয়নই, বিশেষত যদি তারা সফলতার মুখ দেখে, তখন তারা তাদের আন্দোলনকে সুশৃঙ্খল রাখতে ও পুঁজিবাদী বাস্তবতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য কর্তৃত্বপরায়ণ বা শ্রেণিবিভক্ত হয়ে ওঠে (যদি তারা শুরু থেকেই এমনটা না হয়ে থাকে)। কিন্তু নিয়োগকর্তাদের সংগঠনগুলোর মধ্যে কি এমন প্রবণতা দেখা যায়? সেখানে এমনটা ঘটলে এবং কোনরূপ স্বার্থহানি ঘটলে অনেকেই সংগঠন থেকে বেরিয়ে আসবে। এমন সংগঠনে সবাইকে স্বাধীনভাবে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হয় কারণ কারো কারো কাছে হুমকি প্রতিরোধের উপায় ও ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি যখন কর্তৃত্বপরায়ণতা ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করে, নিয়োগকর্তারা তখনও তাদের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখে। নাৎসিবাদ এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পুঁজিপতিদের প্রতিও নিষ্ঠুরতা দেখায় যখন শ্রমিকদের অবদমন সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁবেদার শ্রেণিরও (যে শ্রেণির কারণে একনায়ক ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে) স্বাধীনতা সীমিত করে ফেলা হয় নয়তো পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়। 

    কেবল সবচেয়ে বৈপ্লবিক ইউনিয়নগুলোই পেরেছে তাদের গণ শ্রমিক আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামোকে অনানুষ্ঠানিক রাখতে যেখানে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ সীমিত এবং যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেই তৃণমূল পর্যায়ের শ্রমিককেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

    একটি কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজে নৈরাজ্যবাদীর ভূমিকা 

    থর‍্যো (Thoreau) বলেছিলেন, “দাস সমাজে মুক্ত মানুষের জন্য একমাত্র জায়গা হচ্ছে জেলখানা” (যদিও তিনি নিজে সেখানে কেবল এক রাত কাটিয়েছেন)। এটি যথেষ্ট উত্তেজনাদায়ক একটি কথা হলেও সে অনুযায়ী জীবনযাপন করা ঠিক হবে না, তার যতোই সত্যতা থাকুক না কেন। একজন বিপ্লবীকে সকল প্রকারের দমন নিপীড়ণের ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে হবে, কিন্তু কেবল একজন আত্মনিগ্রহকামীর (masochist) পক্ষেই সম্ভব সেগুলোকে স্বাগতম জানানো। একজন ব্যক্তি তার বিদ্রোহে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারবে বা চাইবে তা পুরোপুরি নির্ভর করে তার নিজস্ব কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তের ওপর; এর কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। নৈরাজ্যবাদীরা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সামাজিক বিদ্রোহ ও পুনর্নির্মাণ কর্মকাণ্ড সংগঠিত ও তাতে অংশগ্রহণ করেছে। উদারবাদী শিক্ষাব্যবস্থা (libertarian education), শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করা, যৌথীকরণ (collectivisation), ব্যক্তির বিভিন্ন প্রকারের ডাইরেক্ট অ্যাকশন, এর কিছু উদাহরণ।  

    নৈরাজ্য-সিন্ডিকাল্বাদ প্রচারের কারণ, পুরো সমাজের সার্বিক সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটানো। এটাও সত্য যে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড কিছু মুক্তিকামী কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কিছু মানুষ গ্রামাঞ্চলে একটি কমিউন নির্মাণ করে যেখানে তারা সমমনা অন্য মানুষদের নিয়ে বসবাস শুরু করতে পারে এবং যতোক্ষণ না বাইরের জগত তাদের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে ততোক্ষণ তারা বাইরের জগতের ব্যাপারে না ভেবেও থাকতে পারে। এই ব্যবস্থায় তারা একটি মুক্ত অর্থনীতির মধ্যে বসবাস করতে পারে যদি তারা মৌলিক কিছু সমস্যার সমাধানে সমর্থ হয়; কিন্তু এতে করে কোন সামাজিক পরিবর্তন ঘটবে না।

    ব্যক্তিগত উদ্যোগের নিন্দা করা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়, বরং তার বিপরীত। পুরো একটি দেশ স্বৈরশাসকের অধীনে থাকতে পারে এবং পুরো জনগোষ্ঠী পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, কিন্তু কেউই কিছু করবে না যতোক্ষণ না কোন একজন ব্যক্তি সামনে এগিয়ে এসে প্রতিবাদ জানায় এবং স্বৈরশাসকের পতনের দাবি তোলে। কিন্তু এরকম কোন প্রতিবাদী, সাহসী, ও যোগ্য মানুষের উদ্ভব ঘটার আগেই অনেক সময় সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।  

    এমনটা ঘটলে যেকোন গণমুখী কার্যক্রমই শেষমেশ হয়ে উঠবে গ্যাস চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সারি। আমরা মনে করি না “সর্বহারা শ্রেণি খারাপ কিছু করতে পারে না”, বরং দেখা গেছে যে তারা এমনটা করতে পারে। কিন্তু সংগঠন মানেই শক্তি। আমরা গণ কার্যক্রমের কথা বলি কারণ তা কার্যকরী এবং সর্বহারার হাতেই ক্ষমতা রয়েছে পুরনো অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলে নতুন কাঠামো নির্মাণের। এই মুক্ত সমাজ গঠিত হবে শ্রমিকদের কাউন্সিলের ভিত্তিতে কর্মক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া ও কর্তৃত্ববাদী কাঠামোসমূহ গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। বর্তমান সময়ের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ব্যবস্থার ভেতরেই তা করা সম্ভব। 

    শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণ

    যখন আমরা কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণের কথা বলি, তা অন্যদের থেকে—যারা কেবল ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকের অংশগ্রহণ দাবি করে কিংবা মনে করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনেই ব্যবস্থাপনামূলক কার্যক্রমে শ্রমিকের অবদান থাকতে পারে—আলাদা। পুঁজিবাদী সমাজে আত্ম-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারা একটি বড় মাপের অর্জন এবং তা মাঝেমধ্যে সম্ভব হয় যখন শ্রমিকরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে, কিংবা আরো বেশি সম্ভবপর হয় যদি সেই কাজ হয়ে থাকে যথেষ্ট বিপজ্জনক এবং যদি সেই কাজকে বাইরে থেকে তদারকির কোন সুযোগ না থাকে। এটিই নৈরাজ্যবাদের মূল কথা এবং এটাকে সিন্ডিকালবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না, যদিও উভয়ই মনে করে ভবিষ্যতের সমাজ হতে হবে স্বনিয়ন্ত্রিত ও স্বশাসিত। আমরা শ্রমিকের ওপর যেকোন কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে, এমনকি যদি তা তাদের নিজেদের প্রতিনিধির মাধ্যমেও হয়ে থাকে। 

    এর অর্থ সম্ভবত শিল্পকে ক্ষুদ্রতর ইউনিটে বিভক্ত করা এবং আমরা তার পক্ষে। আমরা জাতীয়করণের নামে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। 

    এটা বলা জরুরি নয়, তবুও বলতে হয়, শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়াও ব্যক্তিগত মুক্তির অন্যান্য পন্থা রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পেটের দায়ে তা প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু এগুলোর কোনটির পক্ষেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজ পালটানো সম্ভব নয়। আত্ম-নিয়োগকৃত কারিগর আর প্রুধোঁর যুগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে না (হয়তো নতুন সমাজ ব্যবস্থায় তা পুনরুজ্জীবিত হবে)। নিজের ইচ্ছামতো কাজ করা থেকে মানুষ সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে, কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমগুলো সব রয়েছে মৌলিক অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত মানুষদের হাতে।

    সাম্প্রতিক সময়ের প্রবণতা আত্ম-নিয়োগকৃত কারিগরের গুরুত্বকেই তুলে ধরে। পুঁজিবাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ার কারণে শাসকগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিল্পকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। এমতাবস্থায়, সমাজে পরিবর্তন আনতে হলে মূলধারার পুঁজিবাদের বাইরে কাজ করে যাওয়া মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পুঁজিবাদের প্রবণতার বিগত পরিবর্তনসমূহের সময় এই অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা থেকেই মূলত নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদের উদ্ভব ঘটেছে। 

    নৈরাজ্যবাদী যেখানে বিদ্রোহী

    প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একজন নৈরাজ্যবাদীর নিজের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু না। ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে একজন নৈরাজ্যবাদী একাই তার সংগ্রাম চালিয়ে গেছে; হয়তো কখনো তার পুরো দেশে সে-ই একমাত্র নৈরাজ্যবাদী ছিল। বর্তমান সময়ে হতো এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, যেখানে অনেকেই নিজেদের নৈরাজ্যবাদী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। যদিও এদের সংখ্যা অতি নগণ্য, কিন্তু এরা কেবল তরুণ বয়সে নিজেদের রাগ কিংবা বিরুদ্ধাচরণকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটা ব্যবহার করে না। 

    এমন পরিস্থিতিতে নৈরাজ্যবাদীরা হয়তো একাই নৈরাজ্যবাদী আদর্শের জন্য লড়াই করে যাবে, কিন্তু পাশাপাশি অন্যান্য লড়াইয়েও অংশগ্রহণ করবে; যেমন, সামরিকতার বিরোধিতা, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদ বিরোধিতা, কিংবা শ্রেণি সংগ্রাম। অৎবা তারা চাইলে নিজেদের সংগঠনও তৈরি করতে পারে। 

    নৈরাজ্যবাদের চিন্তাভাবনা প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে তা মানুষের চরিত্র পালটে দেয়, বা নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনকে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিচার করতে হবে—এমনটা মনে করা ভুল হবে। নৈরাজ্যবাদীদের তৈরি করা সংগঠনও সংস্কারবাদী (reformist) কিংবা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে; মানুষ নিজেই ক্ষমতা বা অর্থের লোভে নীতিভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। দেখা যায় এমন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার পর সাধারণত এসকল ব্যক্তি ‘নৈরাজ্যবাদী’ শব্দটাকে তার উদ্দেশ্য হাসিলের পথে একটা বাধা হিসেবে দেখে এবং তার পরিচয় থেকে শব্দটি সরিয়ে ফেলে। এই শব্দটি যদি কোন কারণে ‘সম্মানজনক’ হয়েও ওঠে তখন আমাদের নতুন কোন শব্দ খুঁজে বের করতে হবে, যা উদারবাদী বিদ্রোহের ধারণাকে সমানভাবে ধারণ করে। বর্তমানে, আপাতত ‘নৈরাজ্যবাদ’ শব্দটি বর্ণনামূলক কিন্তু অপব্যবহৃত শব্দ হিসেবে থাকতে পারে। 

    সকল সংগঠনেই সংযুক্ত ব্যক্তিদের একটা প্রভাব থাকে এবং অঞ্চল বা দেশ ভেদে বিরোধী চিন্তাধারা ও উপদলেরও উদ্ভব ঘটতে পারে। কেউ কেউ বলে থাকে নৈরাজ্যবাদের বিভিন্ন রূপ রয়েছে। সিন্ডিকালবাদ, সমাজতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, শান্তিবাদ, এই সবগুলোই নৈরাজ্যবাদের বিভিন্ন ধরন হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা আসলে এমন না। কেউ যদি বিরোধী উপদল তৈরি করতে চায়, তা ব্যক্তিগত কারণে হোক কিংবা মতাদর্শিক পরিবর্তনের কারণে—তখন তাকে ব্যানারের জন্য হলেও একটা পৃথক নাম ঠিক করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে নৈরাজ্যবাদের কোন পৃথক পৃথক রূপ নেই। নৈরাজ্যবাদী-সমাজতন্ত্রকে যেকোন সংজ্ঞায় (সাধারণত ক্রপোতকিনের আলোচনায়) দেখানো হয় সরকারব্যবস্থা বিহীন সমাজতন্ত্র হিসেবে, নৈরাজ্যবাদের কোন আলাদা রূপ হিসেবে নয়। একটি বিকল্প চিন্তা, যাকে নৈরাজ্যবাদী-সংহতিবাদ বলা হয়ে থাকে (যা একসময় স্প্যানিশ নৈরাজ্যবাদীদের পছন্দ ছিল), দেখা যায় সেটিও তার চর্চার জায়গায় একই রকম। কর্তৃত্ববিহীন সমাজ তৈরি করতে গেলে ভবিষ্যতের পুঙ্খানুপুঙ্খ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা সম্ভব হয় না। সমাজতন্ত্র বা সংহতিবাদ—উভয় ক্ষেত্রেই যেখানে শাসনকার্য পরিচালিত হয় তৃণমূল পর্যায় থেকে—একে অপরের থেকে বা সিন্ডিকালবাদ থেকে আলাদা কিছু না। সবগুলোই একই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্থায়ী সংগ্রাম। 

    সমাজতন্ত্র, নৈরাজ্যবাদীদের চিন্তায়, হলো এমন একটি সমাজ যার ভিত্তি জনসাধারণ। সংহতিবাদ (Collectivism) হলো সমাজকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইউনিটে বিভক্ত করা। যদি সমাজ খুবই ক্ষুদ্রাকার না হয় (যেমন, গ্রামাঞ্চল) তাহলে সেটিকে বিভিন্ন ইউনিটে (Collectives) ভাগ করতে হবে, যাতে প্রত্যেকেই (কেবল তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নয়) শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতে পারে। তা না হলে এই কাঠামোটি হয়ে উঠবে স্রেফ এক প্রকারের শিল্পায়িত গণতন্ত্র (industrial democracy)। মুক্ত সমাজতন্ত্র যদি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে থাকে, সিন্ডিকালবাদ হচ্ছে সংগ্রাম চালিয়ে নেওয়ার উপায় বা মাধ্যম। এটি হলো শ্রমিকদের ইউনিয়নের মাধ্যমে শিল্পায়িত ব্যবস্থাকে মুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপদানের প্রচেষ্টা। 

    রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র মুক্ত সমাজতন্ত্রের বিকল্প নয়, বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র হলো পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক দলের একটি বিকল্প। সমাজতন্ত্র মানেই নৈরাজ্যবাদ নয়, যদি তা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র না-ও হয়ে থাকে। সমাজতন্ত্রের প্রকৃত কর্তৃত্ববাদী কাঠামোকে (যেখানে পূর্ণ শ্রেণিবিভক্ত ক্ষমতা চর্চা ছাড়াই রাষ্ট্র সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, কিংবা যখন সরকারব্যবস্থা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে) কোনভাবেই নৈরাজ্যবাদ বলা যাবে না। সিন্ডিকালবাদ মানেই তা বৈপ্লবিক না, আবার বৈপ্লবিক সিন্ডিকালবাদ (যেখানে কারখানাগুলোতে সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে শ্রমিকরা কর্মস্থলের দখল নিয়ে নেয়) মানেই তা উদারবাদী নয়, যেহেতু তা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের চর্চাকারী রাজনৈতিক দলের সাথে মিলে কাজ করতেও পারে। এই কারণেই আমরা বেশ ভারি একটা শব্দ ব্যবহার করি: নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদ (anarcho-syndicalism)। যেখানে শ্রমিক উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে, সমাজ হবে স্বশাসিত ও তৃণমূল পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত, থাকবে না কোন কর্তৃত্বকামী সরকারব্যবস্থা। 

    শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু

    অহিংসা

    শান্তিবাদ কি নৈরাজ্যবাদের একটি ধারা? যদিও অপ্রকৃত বা ভুয়া নৈরাজ্যবাদের মধ্যে শান্তিবাদ অনেকখানি জায়গা দখল করে রেখেছে, শান্তিবাদের সংগ্রামী উদারনীতি ও নৈরাজ্যবাদের যেকোন ইতিবাচক কার্যক্রমকে অস্বীকার করার প্রবণতা একে (যা চূড়ান্ত অহিংসার কথা বলে, কেবল সামরিকতা-বিরোধিতার কথা না) করে তোলে কর্তৃত্বপরায়ণ। চরম অহিংসার পক্ষে থাকা গোষ্ঠী সবসময় একজন অভিজাতকে মেনে চলে। গান্ধীর সত্যাগ্রহ এর একটি উদাহরণ উদাহরণ, যে সবাইকে এক প্রকারের বল প্রয়োগের মাধ্যমে কিংবা নৈতিকতার দোহাই তুলে সবাইকে তার নীতি মেনে চলার জন্য চাপে রাখতো। প্রথাগত শান্তিবাদী আন্দোলনগুলোর সাধারণ ইতিহাস হলো, তারা যেকোন বৈপ্লবিক উত্থানকে নিস্তেজ করার চেষ্টা করতো এবং দেখা যেতো তারা হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান করছে নয়তো তাদের সমর্থিত সরকারের আগ্রাসী আচরণকে ক্ষমা করে দিচ্ছে।  

    ভারত ও ইজরায়েল দুটো দেশের অভ্যুদয়ের পেছনেই একটা সময়ে শান্তিবাদী ভাবাদর্শ বিদ্যমান ছিল। পারমাণবিক বোমা উদ্ভাবন ও নির্মাণের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল অহিংস শান্তিবাদীরা এবং জাতিপুঞ্জ (League of Nations) গঠনে অতি উৎসাহী ব্যক্তিরা। কোয়েকাররা ছিল শান্তিপ্রিয় জনগোষ্ঠী কিন্তু ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তারা ছিল যথেষ্ট অত্যাচারী। আর ঔপনিবেশিকদের কুখ্যাতি সম্পর্কে তো সবাই জানেই। সাম্প্রতিক কালে যারা স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময়কার নৈরাজবাদী কার্যক্রমকে প্রত্যাখ্যান করেছিল (কারণ তারা “অহিংস নৈরাজ্যবাদী”), তাদের অনেককেই অন্যান্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলোতে সংঘটিত আরো ভয়াবহ সহিংসতায় সমর্থন দিতে দেখা গেছে। 

    আবার এমন নৈরাজ্যবাদীও রয়েছে যারা মনে করে, শান্তিবাদের সাথে নৈরাজ্যবাদ অসংগতিপূর্ণ নয়; কিন্তু বর্তমানে এটাও বলা হয়ে থাকে যে, এই শান্তিবাদী পদ্ধতিসমূহ কেবল একটি কৌশলগত দিক, তা কোন মৌলিক নীতি নয়। এমন চিন্তাকে আবার ‘টলস্টীয় নৈরাজ্যবাদের’ (যা টলস্টীয় কিংবা নৈরাজ্যবাদী কোনটিই নয়) সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। টলস্টয় মনে করতেন নৈরাজ্যবাদীরা সব বিষয়েই ঠিক কিন্তু তারা মনে করে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিপ্লবের প্রয়োজন। তাঁর কাছে সামাজিক পরিবর্তনের অর্থ ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অর্থাৎ ব্যক্তি নিজেকে পালটানোর মাধ্যমে সমাজকে পালটাবে (যা শেষমেশ গিয়ে আধ্যাত্মিকতায় ঠেকে)। তিনি কোন অহিংস বিপ্লবের কথা বলেননি, বরং তিনি এমন একটি বিরোধিতা বিহীন নীতির (nonresistance) কথা বলতেন যা ছিল খৃষ্টীয় শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু তিনি নিজেও সবসময় সেই জীবনযাপন করতেন না। 

    এখানেই বলতেই হয় যে, এমন চিন্তাধারা অ্যাংলো-আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গির শান্তিবাদের প্রতিই ইঙ্গিত করে। গ্রেট ব্রিটেনে তা আরো ভয়াবহ, যেখানে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকারের প্রসঙ্গের কারণে শান্তিবাদ ও রাষ্ট্রের মধ্যে তর্কের সূত্রপাত ঘটে। যেসকল দেশে সামরিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি আইনত নিষিদ্ধ, সেসকল জায়গায় শান্তিবাদের অর্থ চূড়ান্ত অহিংসা না-ও হতে পারে। 

    নৈরাজ্যবাদীর আশু লক্ষ্য

    যে ব্যক্তি সংস্কার ঘটায় তাকে ‘সংস্কারপন্থী’ (reformist) বলা হয় না (সাধারণত তারা তা করেও না, তাদের কাজ রাজনৈতিক কৌশলের দিকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া); সে এমন একজন ব্যক্তি যে সিস্টেমের বিভিন্ন অংশের উন্নয়নসাধন ছাড়া আর কোন উপায় দেখতে পায় না। কিছু আইন বাতিল করা ও অবিলম্বে কিছু আইন সংস্কারের জন্য আন্দোলন পরিচালনা করা অপরিহার্য; কিন্তু এই সংস্কারের জন্য পরিচালিত আন্দোলনকে ইতিবাচক মনে করা, কিংবা সংখ্যালঘিষ্ট গোষ্ঠী বা পুরো সমাজের সংস্কারের দাবি তোলা, বৈশিষ্ট্যগতভাবেই সংস্কারপন্থী। এই সংস্কারপন্থা থেকে পরিব্যাপ্ত ভাবাদর্শ ও কার্যক্রমকেই আমরা বর্তমানের বামপন্থা বলে থাকি। তা উচ্চাভিলাষী, ও আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যালঘিষ্টের অধিকার রক্ষায় নিযুক্ত আমলাদের জন্য নতুন শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রি) সূচনা করে, যা স্বয়ং সংখ্যালঘুদের কাছ থেকেই তাদের লড়াই করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। নারী মুক্তির প্রসঙ্গেও এমন প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যা বামপন্থীদের দ্বারা প্রান্তিকীকরণের শিকার হওয়ার কারণে একটি সংখ্যালঘিষ্টের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। 

    অনেক সময় অপরাধ ঠেকানোর জন্য প্রণীত আইন মূল অপরাধের থেকে বেশি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সামাজিকভাবে কল্যাণকর হতে পারে ভেবে কখনোই আইন প্রণয়ন করা উচিত নয়, যেহেতু নিশ্চিতভাবেই সে আইনের ভুল ব্যাখ্যা করা হবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বিচারকদের ব্যক্তিগত অভিমত চাপিয়ে দেওয়ার একটা মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে। দরিদ্র শ্রেণির মানুষকে সামান্য আর্থিক মূল্যের চুরির দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পুরনো ব্রিটিশ প্রথা পার্লামেন্ট কিংবা বিচারকদের আদেশের মাধ্যমে বাতিল হয়নি, বরং তা হয়েছিল যখন জুরি সদস্যরা বলা শুরু করলো যে চুরি হওয়া পণ্যের মূল্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। 

    নৈরাজ্যবাদীরা একক কিংবা দলবদ্ধভাবে সংস্কারের জন্য দাবি তুলতে পারে, কিন্তু নৈরাজ্যবাদী হিসেবে তারা চায় মানুষের চিন্তায় ও আচরণে পরিবর্তন আনতে, আইন পাশ করতে নয়। যখন মানুষের চিন্তাভাবনা পালটাবে, আইন আপনাআপনি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে এবং একটা পর্যায়ে আইন প্রয়োগকারীরাও সেই আইন পরিচালনা করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত মদ উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা এবং ব্রিটেনে জনকর (Poll Tax) এর দুটি উদাহরণ। এমতাবস্থায় আইন পরিবর্তন করে জনমতের সাথে খাপ খাওয়াতে হয়।

    ব্রিটেনের কালোজাদুবিদ্যা সংক্রান্ত আইন (Witchcraft Act) বিলোপ করা হয় ১৯৫১ সালে এবং এর ঠিক আগ পর্যন্ত এর প্রয়োগ দেখা যেতো। হাসি তামাশার বিষয় হয়ে ওঠার ভয়ে সরকারি অভিযোক্তারা (Public Prosecutor) এই আইনের অল্প কিছু অনুচ্ছেদেরই ব্যবহার করতো। রাজনৈতিক কারণে এই আইন বিলুপ্ত ঘোষিত হয়, কিন্তু একই রকম হাস্যকর ধর্মনিন্দা আইন (Blasphemy Act) রয়ে যায় এবং মুসলিমদের বিক্ষোভের কারণেই কেবল তা পার্লামেন্টের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মুসলিমদের বিক্ষোভের বিষয় ছিল, যদি খৃষ্টবাদকে অপমানের জন্য কাউকে দণ্ডিত করা হয়, ইসলাম ধর্মের অবমাননার জন্য কেন কাউকে দণ্ডিত করা হবে না? 

    ‘১৩৮১’ নামে পরিচিত একটি ব্রিটিশ আইন স্কোয়াটারদের (squatter, যারা বেআইনিভাবে কোন অব্যবহৃত স্থাপনা বা জমিতে বসবাস করে) বোঝাতে সমর্থ হয়েছিল যে, যেকোন পরিত্যক্ত বা উপেক্ষিত স্থাপনায় বসবাস শুরু করা কোন অপরাধ নয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে ব্রিটেনে এ ধরনের কোন আইনই ছিল না। এমন একটি আইন বিদ্যমান থাকার উড়োকথাই মানুষের জন্য যথেষ্ট ছিল। 

    যেকোন প্রকারের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ জারি রাখতে হয়। যখনই সরকারের সুযোগ-সুবিধা কোন কারণে হুমকির মুখে পড়ে, তারা গণতন্ত্র আর দয়াশীলতার ভান ধরা বন্ধ করে দেয়; যেই ভণ্ডামি অধিকাংশ রাজনীতিবিদেরই পছন্দের কাজ। তখন নৈরাজ্যবাদীরা বাধ্য হয় ‘বিশৃঙ্খলার প্রতিনিধি’ (agents of disorder) হয় উঠতে। যদিও নৈরাজ্যবাদ এই বিশৃঙ্খলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু এবং বিশৃঙ্খলার প্রতিনিধি মাত্রই নৈরাজ্যবাদী নয়। 

    একজন মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী হয়তো বলবে, “নৈরাজ্যবাদীরা বিশৃঙ্খলা ঘটাতে সমর্থ হলেও তারা ক্ষমতা দখল করতে পারে না। ফলে তারা তাদের সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয় এবং বুর্জোয়া শ্রেণি তার ক্ষমতা সংগঠিত করে ফ্যাসিবাদের সূচনা ঘটায়”।

    রক্ষণশীল রাজনীতির সমর্থক হয়তো বলবে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরাই নৈরাজ্যবাদী কারণ “তারা তারা ক্ষমতা নিজেদের দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে”। দুটোই খুব উদ্ভট চিন্তা। নৈরাজ্যবাদীরা ‘ক্ষমতা দখলে’ ততোটাই সক্ষম, যতোটা একজন টিটোটালার (teetotaler; যারা মদ ও অন্যান্য সকল ধরনের চিত্তপ্রভাবকারী দ্রব্য থেকে দূরে থাকে) মাতাল হতে সমর্থ। কিন্তু তাতে আর সে নৈরাজ্যবাদী থাকবে না। ক্ষমতায় থাকা নৈরাজ্যবাদীরা কারো চেয়ে বেশি ভালো বা বেশি খারাপ হবে এমন না, বরং তারা সমাজতন্ত্রী বা ফ্যাসিবাদীদের মতো খারাপও হতে পারে। ক্ষমতার প্রভাবে সবচেয়ে নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিও কলুষিত হতে পারে। নৈরাজ্যবাদীদের কাজ “ক্ষমতা দখল” করা নয় (যারা এই পরিভাষা ব্যবহার করে তারা নিজেদের জন্য ক্ষমতা দখল করতে অধিক আগহী), বরং ক্ষমতার সকল ভিত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া। সবার হাতে ক্ষমতা থাকার অর্থ বিশেষ কারো হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত না হয়ে পড়া। 

    কেউ যদি কোন প্রকারে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন রাষ্ট্র আগের চেয়ে বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে এবং সবকিছু ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, নয়তো নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। এ কারণে নৈরাজ্যবাদীরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসার জন্য সংগঠন তৈরি করে। নৈরাজ্যবাদ প্রকৃত অর্থেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী মতবাদ হওয়ার কারণে অনেকেই মনে করে এমন সংগঠন তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ও ‘স্বেচ্ছাকৃত’। অর্থাৎ, যতোক্ষণ না পুরো সমাজ নিজেদের সংগঠন তৈরি করছে ততোক্ষণ পর্যন্ত (প্রচারণামূলক সংগঠন ব্যতীত) কোন সংগঠন থাকতে পারে না। এটা একদিকে যেমন আরামকেদারায় বসে নৈরাজ্যবাদ চর্চার মতো, অন্যদিকে তা এমন একটি প্রসঙ্গও উত্থাপন করে যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না—যতোক্ষণ না নিজেদের সংগঠনের ওপর সমাজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, ততোদিন এসকল সংগঠনের পক্ষে মানবজীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব না, উচিতও না। 

    বিভিন্ন ঘটনাসূত্রে দেখা গেছে অবদমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন হয় ঐক্যের, থাকতে হয় ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি। এমনকি যখন শ্রমিকদের কাউন্সিল গঠন করা হয়, সেখানেও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলাদলি দেখা দেয়, যারা কাউন্সিলের পরিসীমার বাইরে নিজেদের সংগঠিত করে সেটিকে কব্জা করতে চায় এবং পরিশেষে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণেই এমন একটি সংগঠিত আন্দোলন প্রয়োজন যা এ ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণতাকে রুখতে পারবে। কোন কোন ক্ষেত্রে সংগঠনের ভেতর থেকেই নেতৃত্বের ওপর আক্রমণ চালানোর মতো অনুশাসনকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসনের মতোই তীব্র হতে হয়। এ ধরনের আক্রমণ বা সন্ত্রাসবাদের সাথে জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসবাদের কোন মিল নেই; জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসবাদ রাষ্ট্র প্রণোদিত সন্ত্রাসবাদেরই অপর নাম এবং একে অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের চেয়ে প্রায়ই কম সমালোচনার শিকার হতে হয়। নৈরাজ্যবাদী সন্ত্রাসবাদ মূলত ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতালোভী অত্যাচারী ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাস হলো জনগণের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধের মতো। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ হচ্ছে ক্ষমতার অপব্যবহার। 

    শ্রমিকের আত্মরক্ষা

    বিপ্লবের সময়ে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা লাল ফৌজ গঠনের ওপর নির্ভর করে। এক পার্টির অধীনস্ত এই “লাল” ফৌজ হয়ে ওঠে একটি লাল পতাকার তলে থাকা পুরনো সামরিক বাহিনী। আমরা বারেবারেই দেখেছি, কীভাবে এরূপ ফৌজ নতুন পতাকাতলে আসা জাতীয়তাবাদী সামরিক বাহিনীর মতো সেটিও অবদমনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার ওঠে—অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষমতা গ্রহণের আগেই হয়ে থাকে। 

    শ্রমিকের দ্বারা গঠিত সেনাদলকে রহিত করার জন্য একটি সামরিক বাহিনী তৈরি করা হলে তা বিপ্লবকে নস্যাৎ করে ফেলে (স্পেন ১৯৩৬)। চে গেভারা লাল ফৌজ সম্পর্কিত কিছু নতুন রোমান্টিক ধারণা প্রচার করতে চেয়েছিলেন, যেখানে তিনি এই ফৌজকে কল্পনা করেছিলেন কৃষকদের সেনাবাহিনীর অগ্রদল (advance guard) হিসেবে। গেভারার এই চিন্তায় মাখনোভীয় (ইউক্রেন ১৯১৭) ও জাপাতিস্তা/ম্যাগোনিস্তা (মেক্সিকান-নৈরাজ্যবাদী) স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে সংযুক্ত হয়েছিল পার্টি বুদ্ধিজীবীদের নিয়মতান্ত্রিক চিন্তাধারা। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে, প্রারম্ভিক উদ্যম বিজয়ের দিকে ধাবিত করলেও, নিয়মতান্ত্রিক নেতৃত্ব একটা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়; কিন্তু তা যদি ব্যর্থ হয়, নেতারা তখন পালানোর পথ বেছে নেয়। 

    নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদীদের কাছে আত্মরক্ষার অর্থ হলো, শ্রমিকেরা প্রত্যক্ষ শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার জন্য অস্ত্র ধারণ করবে; এবং এখানে শ্রমিকের দ্বারা গঠিত সেনাবাহিনীর গণতান্ত্রিক ধারণা বিদ্যমান। যদিও কৌশলগত কারণে এখানে বিভিন্ন ধরনের নেতৃত্ব, আদেশ প্রদান ও দায়িত্ব অর্পণের মতো বিষয়ের উদ্ভব ঘটতে পারে, কিন্তু এই বাহিনীতে এমন কোন অফিসার থাকবে না যার দায়িত্ব কেবল আদেশ দেওয়া, কিংবা এমন কোন শ্রেণিবিভাজন থাকবে না যেখানে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ক্রমানুসারে আদেশ প্রদানের ‘চেইন অফ কমান্ড’ বিদ্যমান। 

    সশস্ত্র জনগণের ধারণা অনেক তথাকথিত সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের কাছেই উপহাসের বিষয়, কিন্তু এ উপহাস কেবল শ্রমিকেরা যখন নিজেদের স্বার্থে বাহিনী গঠন করে থাকে তখনই দেখা যায়। আবার ক্ষুদ্রাকার কোন রাষ্ট্রে যদি এমনটা ঘটে, তখন তারা সেটিকে নাগরিকদের বাহিনী (অর্থাৎ একটি অপেশাদার বাহিনী যারা তাদের অস্ত্র রেখে পুনরায় কাজে ফেরত যায় এবং প্রয়োজন মোতাবেক আবার অস্ত্র তুলে নেয়) বলার চেষ্টা করে থাকে। এ ধরনের ‘নাগরিকদের বাহিনী’ (ইজরাইল বা দক্ষিণ আফ্রিকায় যেমনটা দেখা যায়) সাধারণত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া জাতীয়তাবাদী ও আগ্রাসী নীতিরই বাস্তবায়ন করে। এ জাতীয় সেনাবাহিনী যদি আন্তর্জাতিক শ্রেণি সংগ্রামে কোন ভূমিকা না রাখে, তখন আবার এই “বিশেষজ্ঞেরা” সেনাদলটির গণতান্ত্রিক কার্যপ্রক্রিয়া ও সেটির কার্যকারিতার প্রশংসা করতে কুন্ঠিত হয় না। 

    বিপ্লব কীভাবে হবে?

    আমরা জানি না। বৈপ্লবিক অবস্থা আসন্ন হলে—যেমনটা ১৯৩৬ ও ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে কারখানা দখল করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছিল, ১৯৩৬ সালে স্পেনে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সময়ে হয়েছিল, ১৯১৭ সালে রুশ সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে হয়েছিল, কিংবা ইতিহাসে আরও অসংখ্যবার অসংখ্য জায়গায় ঘটেছে—আমরা হয় সেটার জন্য প্রস্তুত থাকি, নয়তো থাকি না (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকি না)। প্রায়শই শ্রমিকেরা আংশিকভাবে প্রস্তুত থাকে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আংশিক ক্ষতি করার মাধ্যমে সেটিকে আরও হিংস্র ও আক্রমণাত্মক করে তোলে। কেবল একজন ব্যক্তির মাধ্যমেও বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু কেবল তখনই তা ঘটে, যদি সেই সমাজে ইতোমধ্যেই পুরনো শেকল ভেঙে ফেলে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠে। এমতাবস্থায় সামগ্রিক পরিস্থিতি একটি সামাজিক বিপ্লবের রূপ নিতে পারে। বর্তমানে আমাদের যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হয় তা হলো, জগতের অর্ধেক মানুষই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মুখিয়ে আছে, কিন্তু অবদমন প্রতিরোধের জন্য তাদের কোন সামরিক শক্তি নেই কিংবা বিপ্লব টিকিয়ে রাখার মতো সক্ষমতাও তাদের নেই। বাকি অর্ধেকের শক্তি ও সামর্থ দুটোই আছে, কিন্তু পরিবর্তন ঘটানর কোন ইচ্ছা তাদের নেই; তারা হয় পুঁজিবাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে নয়তো প্ররোচণার কাছে মাথানত করেছে। 

    নতুন সমাজ নির্মাণ

    কর্তৃত্ববাদী সমাজ বলতে কী বোঝায়?

    শোষণ—স্বার্থের জন্য নিয়ন্ত্রণ—অবদমন। নিপীড়নের মাধ্যমগুলো গঠিত হয় রাষ্ট্রের নানা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে—

    সরকারব্যবস্থার হাতিয়ার: আইন, আদালত, রাজতন্ত্র, জনপ্রশাসন, সামরিক বাহিনী, পুলিশবাহিনী ইত্যাদি।

    প্ররোচনার হাতিয়ার: শিক্ষাব্যবস্থা, টিভি, রেডিও, পত্রিকা ও অন্যান্য গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি আপাত দৃষ্টিতে বিরোধী শক্তি মনে হলেও যেগুলো প্রকৃতপক্ষে বিদ্যমান অবস্থা মেনে নেওয়ার কথাই বলে (সংসদের বিরোধী দল এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ)। এছাড়া মূলধারার বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন বিকল্প ভাবাদর্শও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; উদাহরণস্বরূপ, বিপ্লবকে কেবল একটি জীবনযাপন পদ্ধতি কিংবা সঙ্গীতের ধরন হিসেবে তুলে ধরা, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের একাডেমিক শিক্ষা ইত্যাদি। 

    শোষণের হাতিয়ার: মুদ্রাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যক্তিগত, সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় চাকরিদাতা, ভূমির মালিকানা। পুঁজিবাদের অধীনের এগুলো থেকে কোন মুক্তি নেই। 

    সংস্কারের দাবি করা অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মীই এই স্বাধীনতা বিরোধী ব্যবস্থার কোন না কোন অংশের শোষণ থেকে মুক্তির দাবি তোলেন। রিপাব্লিকানরা রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি চান, সেক্যুলাররা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে মুক্তি চান, সমাজতন্ত্রীরা চান শোষণের সকল হাতিয়ার থেকে মুক্তি পেতে, শান্তিকামীরা চান সামরিক বাহিনীর বিলোপ। আর নৈরাজ্যবাদ এই সবগুলোর বিলুপ্তির দাবি তোলে। একজন প্রকৃত নৈরাজ্যবাদীর বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মনে করেন সকল প্রকারে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকেই মানুষকে মুক্ত করা দরকার, তিনি মনে করেন তা করা সম্ভব, যতো দ্রুত সম্ভব ততোই মঙ্গল এবং তা করার জন্য তিনি প্রতিনিয়ত কাজ করে যান। 

    অনেকেই রয়েছে, বিশেষত বামপন্থীদের মধ্যে, যারা মনে করেন এমন একটা অবস্থা আকাঙ্ক্ষিত হলেও তা অসম্ভব। আবার ডানপন্থীদের অনেকে মনে করেন এমনটা সম্ভব, কিন্তু তারা সেটা চান না। আবার অনেকে নৈরাজ্যবাদী আদর্শের দাবিগুলোকে আকাঙ্ক্ষিত ও সম্ভব মনে করলেও তা বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করতে অনাগ্রহী। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী মানুষদের দিকে তাকালে হয়তো আমরা নৈরাজ্যের আদর্শের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করা মানূষদেরও খুঁজে পেতে পারি। 

    পুলিশবাহিনী হলো রাষ্ট্রের ভিত্তিস্বরূপ (যদিও অনেক ক্ষেতে সরকারকে এর বদলে কিংবা এর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর ব্যবহারও করতে হয়; অনেক দেশে সরকারের বদলে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ এতো বেশি সময় ধরে অব্যাহত যে সামরিক নেতারাই সকল নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে ফেলছে)। 

    কেবল নৈরাজ্যবাদই পুলিশবাহিনীর বিলোপ সাধনে বিশ্বাস করে এবং এটি নৈরাজ্যবাদের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে আমরা বর্তমানে যে ধরনের পুলিশবাহিনী দেখে থাকি সেগুলো যথেষ্ট সাম্প্রতিককালে উদ্ভূত এবং যে সময়টাতে পুলিশবাহিনী গঠনের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তখন এর বিরুদ্ধে যে আপত্তিগুলো তোলা হয়েছিল তার প্রায় সবগুলোকেই আমরা সত্য হয়ে উঠতে দেখি। আপত্তিগুলোর মধ্যে একটি ছিল, পুলিশবাহিনী স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে সমর্থ, যা একটা পর্যায়ে পুলিশী রাষ্ট্রের সূচনা ঘটাবে। পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সংসদীয় বিতর্ক স্কুল কলেজের বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো অর্থহীন হয়ে পড়ে (এবং হয়তো তার চেয়েও বেশি একঘেয়ে হয়ে যায়)।

    হেলফান্ড পারভুসের দেওয়া জার্মান টাকার কারণে লেনিন রাশিয়ায় ফিরে এসে লেটিশ (লাতভিয়ার অধিবাসী) ভাড়াটে সৈনিকদের পুলিশ হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। লেনিনই ছিলেন একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি সে সময়ে এমনটা করতে সমর্থ ছিলেন এবং তা বলশেভিকদের সাফল্য নিশ্চিত করেছিল। নাৎসিরা একটা সময়ে খুনিদের গ্যাং তৈরি করলে রিপাব্লিকান পুলিশবাহিনী তা নীরবে সহ্য করে যায়; কিন্তু কেবল যখন আইনি প্রক্রিয়ায় নাৎসিরা পুলিশবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে, তখনই তাদের বিজয় নিশ্চিত হয়। 

    রাষ্ট্র ব্যতীত কি জীবন নির্বাহ সম্ভব? 

    সাধারণভাবে এটা প্রায়ই মেনে নেওয়া হয় যে, রাষ্ট্রের কিছু উপাদান ছাড়াও জীবনযাপন করা সম্ভব। কিন্তু সকল উপাদান বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কি তা সম্ভব? রাষ্ট্রের কিছু উপাদান স্পষ্টতই অপ্রয়োজনীয়, কিছু বিষয় স্রেফ আলঙ্করিক, কিছু বিষয়ের উদ্দেশ্য আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়, কিছু জিনিস শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত, তবে কিছু বিষয় হয়তো কার্যকরী এবং সমাজের অনিবার্য কিছু ক্রিয়া বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয়। 

    একটি দিয়ে অপরটির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। রাজতন্ত্রের যদি কোন সামরিক বাহিনী না থাকে, তাহলে সেটা যেমন বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারবে না, তেমনই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব না থাকলে পুলিশও কাউকে স্বর্গে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। মানুষের সাধারণ বোধবুদ্ধির মধ্য দিয়ে যদি কোন আইন বানানো হয়, সেটা নিঃসন্দেহে বর্তমানে আইন নামের যে জগাখিচুড়ি বিদ্যমান, তার থেকে বহুগুণে ভালো হবে। বিদ্যমান আইনের ধারক বাহক হচ্ছে আইনজীবী ও রাজনীতিবিদেরা, যারা একে অপরের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত। 

    এটা সত্য যে, সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় সামাজিক ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে এবং কখনো কখনো তা করেও থাকে; রাষ্ট্রের অন্যান্য উপাদানগুলোও তা করে থাকে, সে উপাদান যতোই নিপীড়নমূলক হোক না কেন। রেলব্যবস্থা সবসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ছিল না, বরং বিভিন্ন পুঁজিপতির মালিকানাধীন ছিল এবং একইভাবে ভবিষ্যতে তা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণাধীনও হয়ে উঠতে পারে। যদি বলা হয়, যেহেতু কয়লা খনিগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত বিধায় রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় এবং রাষ্ট্র না থাকলে আমাদের কয়লা থাকবে না, তাহলে তা বোকামি ছাড়া কিছুই হবে না। সামরিক বাহিনীকেও মাঝেমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ সহযোগিতা প্রদানের মতো সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব অর্পণ করা হয়; মাঝেমধ্যে শ্রম-সংহতি বিরোধী শক্তি হিসেবেও (শ্রমিকদের হরতাল বা অবরোধের সময়ে) তাদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে; একই সাথে পুলিশবাহিনী হিসেবেও তাদের ব্যবহার করা হয়। এর কারণ রাষ্ট্র এমন একটা সমাজ ভেঙে দিতে চায় না, যা তাকে সমর্থন করে। 

    এমনকি পুলিশও মাঝেমধ্যে প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সম্পাদন করে থাকে—কারও পোষা কুকুর হারিয়ে গেলে তাকে থানায় যেতে হতে পারে কারণ হারানো পোষা কুকুরকে সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় এবং পুলিশ নিজে থেকেই এই দায়িত্বটা নিয়েছে। তার মানে এই না যে, পুলিশ বা থানা না থাকলে আমরা কোনদিনই আমাদের হারিয়ে যাওয়া পোষা কুকুর খুঁজে পেতাম না; বা এর অর্থ এটাও না যে, মানুষ মাঝেমধ্যে কুকুর হারিয়ে ফেলে ও থানায় সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায় বলে পুলিশের নৃশংসতা (বিশেষত সামাজিক অশান্তির সময়ে) আমাদের আমাদের প্রতিনিয়ত সহ্য করে যেতে হবে। ইনস্যুরেন্সের জন্য সকল গাড়ির মালিকই তাদের হারানো বা চুরি হয়ে যাওয়া গাড়ির কথা পুলিশকে জানায়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এই কাজটা পুলিশ ছাড়া সম্ভব না। 

    পুলিশ ছাড়া কীভাবে প্রতারণা সনাক্ত করা যায়, তা যদি ইনস্যুরেন্স কোম্পানি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কীভাবে পুলিশ ছাড়া সমাজ নিরাপদ রাখা যায়, তাও মানুষ খুঁজে বের করতে সমর্থ। দুঃখজনকভাবে পুলিশবাহিনী থাকার কারণেই সমাজের মানুষ ভাবতে পারে না কীভাবে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। মানুষ সামাজিক সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সকল চিন্তাই হারিয়ে ফেলেছে। কয়েকটা বাচ্চাকে রাস্তায় দৌঁড়াতে দেখলেই তারা এখন ভয় পেয়ে যায়, বাচ্চাগুলোর বয়স যা-ই হোক না কেন। তাদের একমাত্র প্রতিক্রিয়া হলো পুলিশের কাছে ছুটে যাওয়া এবং পুলিশও বিষয়টি সামাল দিতে পারে না। 

    এককালে কুসংস্কার প্রচলিত ছিল যে, চার্চ যদি কোন দেশকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে, তাহলে সে দেশের ওপর দুর্যোগ নেমে আসবে। চার্চের দ্বারা ত্যাজ্য হওয়া দেশের কোন মানুষের পক্ষেই আর সাধারণভাবে তার জীবনযাপন করে যাওয়া সম্ভব থাকে না। এই কুসংস্কার কোন অনর্থক বিষয় ছিল না, যতোক্ষণ মানুষ চার্চের কথায় বিশ্বাস করতো। কোন দেশ যদি বিশ্বাসীদের সংঘ থেকে বহিষ্কৃত হতো, সেখানকার চার্চ পরিচালিত হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে যেতো, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভরসার অভাব দেখা দিতো (যাজকেরা ব্যবসায়ীদের শপথ গ্রহণ করাতো এবং এ ধরনের শপথ ব্যতীত অঙ্গীকার রক্ষার কোন দায় কারও ওপর বর্তাতো না), শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বসে পড়তো (সে সময়ে চার্চগুলোই স্কুল পরিচালনা করতো), শিশু জন্মালেও (এটা আবার চার্চ বন্ধ করতে পারেনি) তাকে খৃষ্টীয় বিধি মোতাবেক নামকরণ করা যেতো না এবং ফলে শিশুটিকে বিশ্বাসীদের সংঘে যোগ দিতে দেওয়া হতো না। চার্চের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন হতো বলে সকল দম্পতিই এক অর্থে ছিল অবিবাহিত এবং তাদের শিশুরা গণ্য হতো ‘জারজ সন্তান’ হিসেবে। অর্থাৎ নরক কাকে বলে সেটা আর বাস্তবে কাউকে বোঝানোর দরকার পড়তো না। আমাদের বোধশক্তি আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেলেও একটি কুসংস্কারের জায়গায় আরেকটি কুসংস্কার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চার্চের বিশ্বাস স্থানান্তরিত হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস আনার মধ্যে। আমরা যদি সরকারকে প্রত্যাখ্যান করি তাহলে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বসে যাবে (যেহেতু স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা বড় অংশই সরকারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হয়), অনেক হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাবে ও স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হবে, কেউই কাজে যোগ দিবে না কারণ সরকারই শ্রমবাজারের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, ইত্যাদি। এখানে বাস্তবতা হচ্ছে, চার্চ বা রাষ্ট্র কোনটাই নয়, বরং আমরা মানুষেরা নিজেরাই সবকিছু শ্রম দিয়ে তৈরি করেছি, এবং মানুষ শ্রম না দিলে তাদের পক্ষে কিছু করাই সম্ভব না। এমনকি অভিজাত, সুবিধাভোগী শ্রেণীকেও মানুষের শ্রম টিকিয়ে রেখেছে, চার্চ বা রাষ্ট্র নয়। 

    টাকার মিথ

    রাষ্ট্রের মিথের সাথে জন্ম নেয় দ্বিতীয় আরেকটি মিথ—টাকা তথা মুদ্রার মিথ। কোন মুদ্রার মুল্য নির্ভর করে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর। সরকারের পতন ঘটলে তাদের মুদ্রাও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে আসা কিছু জালিয়াত কনফেডারেট ডলার বিনিময়ের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মার্কিন গৃহযুদ্ধে দক্ষিণের রাজ্য তথা কনফেডারেসির পরাজয়ের কারণে সেই ডলার ছিল মূল্যহীন। পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের কাছে রয়ে যাওয়া সেই ডলার তার প্রাথমিক মূল্য হারিয়ে ফেললেও শখের সংগ্রহযোগ্য জিনিস হয়ে ওঠে এবং প্রতিটা ডলারের দাম এক ডলারের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করেই অতিরিক্ত মাত্রায় কনফেডারেট ডলার ছাপাতে থাকে ও চুইংগামের মোড়ক হিসেবে সেগুলোর ব্যবহার শুরু করে যাতে করে প্রকৃত ডলারের দাম কমে না যায়। 

    কাইজারের জার্মানির যখন পতন ঘটে, রাজকীয় মার্কও মূল্যহীন হয়ে পড়ে। স্প্যানিশ রিপাব্লিক যখন পরাজিত হয়, তাদের ব্যাংকগুলো তখন তাদের মুদ্রা বাতিল ঘোষণা করে। এরকম অসংখ্য গল্প খুঁজে পাওয়া যাবে। তারপরেও অনেক মানুষই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তাদের দেশের সম্পদ খুঁজে পাওয়া সম্ভব কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদিত কোন মুদ্রণশালায়। এই প্রিন্টিং কারখানাগুলো থেকে টাকা বের হওয়া মাত্রই যেন আমাদের সম্পদ তৈরি হয়, তা বন্ধ হয়ে গেলে আবার আমরা দরিদ্র হয়ে পড়ি। এর বিকল্প হিসেবে আবার ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ড বের করা শুরু করে। এ সম্পর্কিত আরেকটি পুরনো ও বর্তমানে অপ্রচলিত মিথ হলো, ছাপানো মুদ্রাকে কোন এক রহস্যময় ভল্টে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রখা স্বর্ণের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। যে স্বর্ণ আবার কয়েক হাজার মেইল দূরের কোন এক খনি থেকে তুলে আনা। তবে সরকারব্যবস্থাগুলো এই মিথকে অনেক আগেই অচল ঘোষণা করেছে (যদিও তারা এ সংক্রান্ত রিচুয়াল জারি রেখেছে)। সরকারের প্রচার করা নতুন মিথ হলো, যদি অধিক হারে মুদ্রা ছাপানো হয় তাহলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিবে এবং সে কারণেও আমরা দরিদ্র হয়ে যাবো। মুদ্রাস্ফীতির কারণে যাতে আমরা গরিব না হয়ে যাই সে জন্য আমাদের অর্থনৈতিক কঠোরতা বজায় রাখতে হবে, চাকরি ও ঘরবাড়ি হারাতে হবে; অর্থাৎ অন্যভাবে গরিব হতে হবে। 

    যুদ্ধের সময়ে, খাদ্যদ্রব্য ও কাপড়ের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হলে মুদ্রার স্থান দখল করে নেয় কুপন, যার মাধ্যমে পণ্যের যথাযথ বণ্টন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হতো। মুদ্রাব্যবস্থা যতোই চলতে থাকে, পণ্যের কালোবাজার ততোটাই অনিবার্য হয়ে ওঠে; তবে রেশনিং প্রক্রিয়া আমাদের ধারণা দেয় মুদ্রা ব্যতীত রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র কেমন হতে পারে। যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কুপন ছাপানো হয় তাহলে পদ্ধতিটা অর্থহীন হয়ে পড়বে। মুদ্রাও রেশনিং ব্যবস্থার একটি রূপ, যেখানে কিছু মানুষ অন্যান্যদের চেয়ে বেশি পেয়ে থাকে। মজুরি বৃদ্ধির সংগ্রাম মূলত নিজের অংশ খানিকটা বৃদ্ধির চেষ্টামাত্র। তারাই ধনী যারা অন্য সবার আগে নিজের ভাগটুকু বুঝে নিতে পারে। কিন্তু মুদ্রা বা কুপন কোন ব্যবস্থাই সামগ্রিক সম্পদের আকারে কোন পার্থক্য তৈরি করতে পারে না, এগুলো মূলত বণ্টন প্রক্রিয়ার—সম কিংবা অসম—দুটি রূপ। রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাজে পণ্য সংগ্রহের জন্য মুদ্রা অপরিহার্য। এমনটা বলা হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে যে, মুদ্রা একটি মিথ—“হোক না সেটা মিথ, আমার তা আরও লাগবে”—কিন্তু তা মিথই বটে। 

    অনেকেই মনে করে থাকে, যদি কোন ধনকুবের একটা ইয়ট না কিনতো, তাহলে সেই টাকা দিয়ে একটা বা কয়েকটা হাসপাতালের জন্য এক্স-রে মেশিন কেনা সম্ভব হতো। তারা এটা বুঝতে চায় না যে, যারা ইয়ট বানায় তারা এক্স-রে বানাতে পারে না। আবার অন্য অনেকে মনে করে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করা রাষ্ট্রীয় খরচ যারা কাজ করে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে, বেকারত্বকে রাষ্ট্র একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যেখানে, বেকারত্বের দ্বারা জর্জরিত মানুষের শোচনীয় অবস্থাকে অন্যান্যদের জন্য কাজ করার একটি উদ্দীপনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একটি প্রতিযোগিতামূলক সমাজে একজন ব্যক্তি সেটাই পায় যা সে দখলে নিতে সমর্থ। 

    করারোপের মিথ 

    অনেকের মধ্যেই একটা উদ্ভট চিন্তা রয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় সাহায্যের অর্থ হলো, যারা কাজ করে তাদের কাছ থকে নিয়ে অকর্মণ্য মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা। একই রকম উদ্ভট ধারণা হলো, ধনী মানুষেরা কর্মসংস্থান তৈরি কিংবা দানশীলতার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করে থাকে। ব্রেন্ডান বেহানকে একবার একজন বলার চেষ্টা করেছিল, আয়ারল্যান্ডের অন্যতম ধনী গিনেস (Guinness) পরিবার ডাবলিনের দরিদ্র মানুষদের জন্য কতোকিছুই না করেছে। উত্তরে বেহান বলেন, “ডাবলিনের দরিদ্র মানুষ গিনেস পরিবারের জন্য যা করেছে, সে তুলনায় তা কিছুই না”। ‘যাদের অর্থ-সম্পদ আছে তারা দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করে থাকে’—কর ধার্য করার মাধ্যমে এমনই একটি মিথের পুনরুৎপাদন করা হয়। যাদের সম্পদ কম তারা তাদের টাকা গুনতে পারার আগেই করারোপের মাধ্যমে সেটা তাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে ধনীরা পেশাদার উপদেষ্টাদের সাহায্যে কর ফাঁকি দেওয়ার নানা ফন্দি আঁটে। অর্থের ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হয়। অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো কিংবা ঋণের ব্যবস্থা করা, উভয়ই সম্ভব হয় যদি তা অর্থনৈতিক অভিজাতদের স্বার্থে কাজে লাগে। আবার এই অভিজাতেরা যদি অর্থনৈতিক শিথিলতা ডেকে আনতে চায়, তখন তারাই বাজার থেকে মুদ্রা তুলে নেয় এবং ঋণের বণ্টন নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়। অর্থনৈতিক মন্দাকে যেভাবে দুর্ভিক্ষ, খরা, বন্যা কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তা সেরকম নয়। 

    অভিবাসনের প্রভাব

    বৃহদাকার কোন চাকরিদাতা যদি তার মুনাফা বাড়াতে চায় কিংবা উৎপাদন খরচ কমাতে চায়, তার জন্য কয়েকটি বিকল্প রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে সহজসাধ্য উপায় হলো মজুরি কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু যদি শ্রমিকেরা সংঘবদ্ধ থাকে তাহলে তারা এমন পদক্ষেপ প্রতিহত করতে সমর্থ হয় এবং এর ফলে পুঁজিপতির হাতে আর দুটি বিকল্প থাকে। হয় তাকে তার কারখানা এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে যেখানে শ্রমিকের খরচ তুলনামূলকভাবে কম, নয়তো কম খরচের শ্রমিককে তার কারখানায় নিয়ে আসতে হবে। প্রথম বিকল্পটিতে অনিবার্যভাবেই অনেকখানি পরিবেশ দূষণ ঘটবে (যদিও তাতে পুঁজিপতিদের কখনোই কিছু যায় আসেনি) এবং তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল কোন জায়গায়ও যেতে হতে পারে। ফলে সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের উপায় হলো কম খরচের শ্রমিককে নিয়ে আসা। 

    এভাবে অভিবাসনকে উসকে দেওয়ার মাধ্যমে, তার সকল অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পর, পুঁজিপতি একজন ডানপন্থী রাজনীতিবিদের রূপ ধারণ করে এবং অভিবাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে সে মূলত শ্রমিকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বকেই প্ররোচিত করে; এই দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে ওঠে ধর্মীয় কিংবা বর্ণগত বিভাজন যা কয়েক প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে জানপন্থী রাজনীতির প্রতি একটা ঝোঁক তৈরি হয়। শ্রমিকশ্রেণি যদি সারাক্ষণ ঘৃণা ও বিদ্বেষের মধ্যে অবস্থান করে এবং প্রতিনিয়তই নির্বাসিত হওয়ার ভয়ে থাকে, তাহলে সেটা পুঁজিপতির জন্যই লাভজনক হয়। অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়ার ফলে মালিক মজুরি সংক্রান্ত ব্যাপারেও পুঁজিপতির যথেষ্ট লাভ হয়। কেবল তখনই পুঁজিপতির ক্ষতি হয় যখন হিটলারের মতো ফ্যাসিবাদী শক্তি সামরিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে পুঁজিপতিদের ইচ্ছার বদলে নিজের স্বার্থ হাসিলে অধিক মনোযোগী হয়ে ওঠে। 

    মজুরি প্রথা ও মুদ্রাব্যবস্থার বিলোপ

    “সমাজতন্ত্র” শব্দটি এতো পরিব্যাপ্ত হয়েছে যে তা প্রায় সব ধরনের পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে, এমনকি বিপ্লব-বিরোধী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হওয়া শুরু করেছে। এই শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে উদারনৈতিকতাবাদ থেকে স্বৈরাচার পর্যন্ত সবকিছুই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে যেকোন সমাজতন্ত্রী তত্ত্বই মজুরি প্রথা ও মুদ্রাব্যবস্থার বিলুপ্তির কথা বলে। এর কারণ, প্রকৃত অর্থেই একটি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন হবে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন এবং এর মাধ্যমে তারা মজুরির দাসত্ব থেকে মুক্তির চেষ্টা চালাবে। মজুরি ও মুদ্রাব্যবস্থা হচ্ছে সেই দাসত্বের শেকলস্বরূপ যা ভাঙতে হবে। 

    মজুরির কোন একটি পুনর্গঠিত ধরন কিংবা বিনিময়ের কোন একটি মাধ্যমে হতে পারে একটি মুক্ত সাম্যবাদী সমাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামো; বিশেষত একটি বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে, যেখানে মানুষ তখনও শ্রমের বিনিময়ে কিছু পেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু বিদ্যমান মুদ্রাব্যবস্থায় অর্থ কোন ভৃত্য (বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে) নয়, বরং তা নিজেই মানুষের ওপর কর্তৃত্ব আরোপ করে থাকে। মজুরি হচ্ছে সমাজের শ্রেণিবিভাজনে ব্যক্তির অবস্থান নির্ধারণের একটা উপায় যা ব্যক্তিকে বজায় রাখতে বাধ্য করা হয়। এমনকি নিজের তৈরি করা মানদণ্ডেও সেটা ব্যক্তির যথাযথ মূল্যায়নেও ব্যর্থ হয়। এ ধরনের কাঠামো নস্যাৎ করা জরুরি। 

    আমরা আগেই দেখেছি, বর্তমান সরকার, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের চেয়েও ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠান (যেমন, ব্যাংক) জাতীয় সম্পদের হিসাবনিকাশ করে থাকে। সেই হিসাবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তারা মুদ্রা ছাপায়, ঋণের পরিমাণ ও বণ্টনের ধরন নির্ধারণ করে। বিদ্যমান সরকারব্যবস্থার কার্যকারিতার (যা দৈনন্দিন গণমাধ্যমে চলতে থাকা রাজনৈতিক বুলি সংক্রান্ত প্রসঙ্গ এবং এই মুহুর্তে আমাদের ভাবনার বিষয় নয়) ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক পর্যালোচনা কিংবা বাজেট কতোটুকু নির্ভুল হবে। অর্থ মন্ত্রনালয় এরপর তার বিবেচনা অনুযায়ী জাতীয় সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘দানশীল’ কিংবা ‘কঞ্জুস’ হতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে বেতন ও মজুরি নির্ধারিত হয় সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, পারিবারিক ক্ষমতা, ট্রেড ইউনিয়নের দর কষাকষির ক্ষমতা, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে। এসকল উপাদানের কার্যকারিতার ভিত্তিতে জাতীয় সম্পদে প্রত্যেকের ‘ভাগ’ নির্ধারিত হয়। যারা এই উপাদানগুলোর কোনটাই ব্যবহার করতে পারে না, তাদেরকে টিকে থাকার জন্য যা দেওয়া হয়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সরকার জাতীয় সম্পদ নিয়ে যা-ই করুক না কেন, তার কোন বাস্তব পরিবর্তন ঘটে না। 

    নৈরাজ্যবাদ কি পুঁজিবাদের সাথে সংগতিপূর্ণ? 

    নৈরাজ্যবাদকে কেবল এমন একটি কাঠামো হিসেবে ভাবা সম্ভব যেখানে তা মুক্ত, সমাজতান্ত্রিক এবং তা এমন কোন অর্থনৈতিক চাহিদা তৈরি করে না যার মাধ্যমে অবদমনের চর্চা করা সম্ভব।  সাধারণ জ্ঞান আমাদের বলে, যেকোন পুঁজিবাদী সমাজই চাইলে “রাষ্ট্রকে” (মার্কিন পরিভাষায়) উৎখাত করতে পারে, কিন্তু যদি সেখানে কিছু মানুষ ক্রমশ অর্থ কুক্ষিগত করতে থাকে এবং অন্য মানুষেরা অপরের হাতে অর্থ কুক্ষিগত করার জন্য প্রতিনিয়ত শ্রম দিতেই থাকে, তাহলে তা সংগঠিত সরকার কিংবা সরকারব্যবস্থার ব্যক্তিমালিকানাধীন কোন রূপকে উৎখাত করতে পারে না। “উদারবাদী” নব্য ডানপন্থীরা যে “নৈরাজ্য-পুঁজিবাদের” (anarcho-capitalism) স্বপ্ন দেখে, তার সাথে প্রকৃত নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের নৈরাজ্যবাদী চিন্তার কোন সম্পর্ক নেই। এটি এক প্রকারের মিথ্যা যা অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা করে, অনেকটা জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্রের মতো। লাগামহীন, অবাধ পুঁজিবাদ, যদি তা পরিবর্তনকামী রাষ্ট্রের দ্বারা বাধাগ্রস্ত না-ও হয় (রাষ্ট্রকে সামাজিক সহিংসতা ও সংঘাত এড়ানোর জন্য শোষণের ওপর খানিকটা লাগাম টানতেই হয়), তারপরেও পুঁজিবাদকে শ্রেণি সুবিধা বজায় রাখার জন্য বল প্রয়োগের আশ্রয় নিতে হয়, তা রাষ্ট্রের তরফ থেকে হোক কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে। তারা যে বিষয়ে বিশ্বাস করে তা হলো মূলত সীমিত রাষ্ট্রের ধারণা—যেখানে রাষ্ট্রের একমাত্র দায়িত্ব শাসক শ্রেণিকে রক্ষা করা, শোষণের জায়গায় হস্তক্ষেপ না করা, এবং শাসক শ্রেণিকে যতোটা সম্ভব সুলভ মূল্যে সেবা প্রদান করা। এছাড়াও তা আরো একটি দায়িত্ব পালন করতে পারে—কোন ধরনের অপরাধবোধ ছাড়া কর ফাঁকি দেওয়ার বুর্জোয়া চিন্তাকে নৈতিক ন্যায্যতা প্রদান। অনেকটা শান্তিবাদ যেভাবে কোন ধরনের অপরাধবোধ ছাড়াই বিপদ এড়িয়ে যাওয়াকে বৈধতা প্রদান করে, সেরকম। 

    সামাজিক নিয়ন্ত্রণ

    পুঁজিবাদী সমাজে সমষ্টিগত নিয়ন্ত্রণ আরোপের ইতিহাস বেশ অস্বস্তিকর। সামগ্রিক কাঠামো এড়িয়ে গিয়ে বিভিন্ন সংঘ বা কমিউনিটি নির্মাণের অনেক চেষ্টাই হয়েছে যেগুলো পুরোপুরি সামগ্রিক, প্রকৃত সমাজ না হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি। সমবায়মূলক সমাজ ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতোই একচেটিয়া পুঁজিবাদের চাপের ঝুঁকিতে থাকে। সমবায় খামারগুলো—অর্থাৎ যে সমষ্টিগত ব্যবসায়িক সত্তাসমূহে ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মজুরির চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করে থাকে—কারুশিল্পের ব্যবসার মতো কখনোই একচেটিয়া বাজারে ঠিক উঠে দাঁড়াতে পারে না। এই সবগুলোই সমৃদ্ধি লাভ করতে পারতো যদি সামগ্রিক কাঠামোটি মুক্ত হতো, কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। 

    তারপরেও আমরা দেখি, বিভিন্ন সামাজিক পণ্য সমান ভাবে সবার জন্য বিদ্যমান, তা কোন মূল্য পরিশোধের বিনিময়ে হোক কিংবা বিনামূল্যে। হাইওয়েগুলো এখনো উন্মুক্ত, রাষ্ট্র কিংবা পুঁজিবাদ (এখনো) পারেনি সকল রাস্তায় প্রবেশ ও চলাচলের জন্য টোল আদায় করতে (তবে ইউরোপের প্রধান হাইওয়েগুলোতে তা ঘটেছে)। পানি একসময় বিনামূল্যে পাওয়া যেতো, বর্তমানে পানির মূল্য নির্ধারণের জন্য মিটার বসানো হয়, যেন আমরা সবাই সাহারায় বসবাস করছি যেখানে পানির রেশনিং প্রয়োজন। তবে আপাতত বায়ুর জন্য আমাদের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে না। 

    নৈরাজ্যবাদ মনে করে অর্থনীতিবিদ্যা ভিত্তিক এসকল বক্তব্য বাজে কথা ছাড়া কিছুই না। যেসকল সেবা প্রাকৃতিকভাবে কিংবা মানুষের শ্রমের দ্বারা উৎপাদিত হয়, তার মালিকানা থাকবে মানুষেরই হাতে। 

    একটি ক্রান্তিকালীন সমাজ কি প্রয়োজন? 

    নৈরাজ্যবাদ মনে করে না কোন ক্রান্তিকালীন তথা transitional সমাজের প্রয়োজন রয়েছে। এমন এওটি সমাজের চিন্তা প্রচার করেছিল লেনিনবাদীরা, যারা মনে করতো কয়েক বছরের কঠোর একনায়কতন্ত্রের পর রাষ্ট্র আপনাআপনি ক্ষয়ে যাবে। এমন দাবি প্রাথমিকভাবে তোলা হয়েছিল সদ্য জন্মানো সোভিয়েত রিপাব্লিককে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ হিসেবে, কিন্তু সেই একনায়কতন্ত্র স্থায়ী হয় দীর্ঘ ৭০ বছর এবং মানুষ বিরক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষয়ে গিয়েছিল কেবল সেসকল মানুষ যারা একটি মুক্ত সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতো। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রকে জিইয়ে রেখে ও ক্রমাগত শক্তিশালী করে তুলে সেটির ‘ক্ষয়ের’ কথা ভাবা অযৌক্তিক। লেনিনবাদীরা এটিকে ন্যায্যতা দেয় এটা বলে যে, রাষ্ট্র হচ্ছে সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র যা শ্রমিক শ্রেণিকে অবদমনের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শ্রেণিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় তার একটি একটি অংশমাত্র। এই অংশটুকু ক্ষয়ে যেতে পারে (যদিও দীর্ঘ সময়ের রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রে তেমনটা ঘটেনি)। যা ক্ষয়ে যাবে না তা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য অংশগুলো, যদি না রাষ্ট্রকে গোড়া ও আগা উভয় দিক থেকেই উৎপাটিত করা যায়। 

    নৈরাজ্যবাদের কাছে ক্রান্তিকালীন একটি সমাজ প্রয়োজনীয় মনে হয় না বলে এমন নয় যে এরকম কোন সমাজের উদ্ভব ঘটবে না। নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় কি? হয়তো বর্ণবাদ, লিঙ্গীয় বৈষম্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রথাবাদী আচরণ, ইত্যাদির প্রতি পালটাতে থাকা আচরণ হয়তো একটি ক্রান্তিকালীন সমাজেরই লক্ষণ, যা ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে হয়তো কোন সচেতন বিপ্লব ছাড়াই শ্রমিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যা নিজেই একটি ক্রান্তিকাল। 

    এমনও একটি ক্রান্তিকালের কথা ভাবা যেতে পারে যেখানে সমাজের একটি অংশ নতুন কাঠামোর দিকে বিবর্তিত হচ্ছে এবং অপর অংশ পুরনো কাঠামোতে আটকে রয়েছে। শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানার উপস্থিতি, একই এলাকায় কট্টরপন্থী পুরনো ঘরানার পারিবারিক ব্যবস্থার পাশাপাশি উন্মুক্ত সম্পর্কে জড়িত মানুষদের বসবাস হয়তো এরকম একটি সময়ের প্রতিই ইঙ্গিত করে। কিন্তু স্পষ্টতই কোন একটা সময়ে দুটি ব্যবস্থার একটিকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতেই হবে। মানুষ যদি কোন বাধ্যবাধকতা ছাড়া নিজেই ঠিক করতে পারতো সে কোন ধরনের কাজ করবে, তাহলে পুঁজিবাদ টিকে থাকতো না। তখন পুঁজিবাদ চেষ্টা করতো তার কর্তৃত্বকে আরও সুসংহত করে তোলার (সম্ভবত ফ্যাসিবাদী গ্যাং গড়ে তোলার মাধ্যমে, ইতালিতে শ্রমিকেরা কারখানার দখল নেওয়ার সময়ে যেমনটা হয়েছিল) নয়তো তার কর্মকাণ্ড গুটিয়ে ফেলতো (যা ইতালিতে পুঁজিপতিরা সাময়িকভাবে করতে বাধ্য হয়েছিল, যদিও তাদের অনেকেরই গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল)। 

    একটি মুক্ত সমাজ

    কেবল সরকারব্যবস্থার শৃঙ্খলা থেকে মুক্ত হলেই চলবে না, জীবনধারণের সকল প্রয়োজীনয়তা বিনামূল্যে লভ্য হলেই কেবল একটা সমাজকে মুক্ত বলা যাবে। 

    এটাও সত্য যে, যদি কোন পণ্যের যোগান কম থাকে, তাহলে সমাজ যতোই মুক্ত হোক না কেন, সেসকল পণ্যকে কোন না কোন ভাবে রেশনিং ব্যববস্থার মধ্যে আনতেই হবে। তা হতে পারে ‘শ্রম-মূল্য’ কার্ডের দ্বারা কিংবা সাধারণ ‘ন্যায্য রেশনিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে। যাকে দেখা যেতে পারে একটি ভিন্নতর মুদ্রাব্যবস্থা বজায় রাখার প্রক্রিয়া হিসেবে (কিন্তু সেখানে মুদ্রা বা অর্থ বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থার মতো হবে না, সেখানে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমের উর্ধ্বে অর্থের কোন মূল্য থাকবে না)। 

    একটি মুক্ত সমাজের এমন একটা অর্থনীতি আমরা সাজাতে পারি না যা বৈশিষ্ট্যগতভাবেই কোন কিছু মেনে নিতে বা প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থ। একজন কর্তৃত্ববাদী অর্থনীতিবিদ সেটা পারেন (“যতোক্ষণ আমি বা আমার পার্টি ক্ষমতায়, আমরা এটা-ওটা করবো”)।

    একটি নৈড়াজ্যবাদী সমাজ সহজাতভাবেই একটি মুক্ত সমাজ, কিন্তু একটি মুক্ত সমাজ সকল ক্ষেত্রেই একটি নৈরাজ্যবাদী সমাজ নয়। কয়েকটি জায়গায় এর ঘাটতি থাকতে পারে এবং কিছু কিছু ঘাটতি এর প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে স্তিমিত করে ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষেরা বিপ্লব ঘটালে লিঙ্গীয় বৈষম্য জারি থাকতে পারে, যার ফলে সমাজের একাংশের স্বাধীনতা খর্ব হবে এবং বিপ্লব তার গৌরব হারাবে; একই সাথে আগ্রাসী মনোভাব টিকে থাকারও একটা আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। বিভ্রান্ত উদারবাদী তথা লিবারেলরা মনে করে অবদমনমূলক শক্তিগুলোকে সহ্য করে যেতে হয়, কিন্তু তা একটা সময়ে সকল স্বাধীনতাই কেড়ে নিবে এবং বিরোধিতা করার অধিকার বিপন্ন হলে তা বিপ্লবকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে। 

    একটি মুক্ত সমাজ সকল প্রকারের অবদমনমূলক প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান হয়তো অন্যগুলোর চেয়ে বেশিই স্থায়ী হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এমনই একটি কাঠামো; ধর্মীয় বিশ্বাস সবচেয়ে ভয়াবহ ও অত্যাচারী স্বৈরতন্ত্রের মাঝেও টিকে থাকতে পারে এবং নিশ্চিতভাবেই সরকারব্যবস্থাবিহীন সমাজেও তা টিকে থাকবে। তবে যেসকল ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের মতামত অপরের ওপর চাপিয়ে দেয় না, ধর্মান্তরে বাধ্য করে না, ধর্মীয় বিদ্বেষ উসকে দেয় না, তাদের আইন, রীতিনীতি অপরকে মানতে বাধ্য করে না, নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবের সাথে তাদের কোন সংঘাত থাকার কথা নয়। 

    চাকরিদাতারা কাজের সুযোগ তৈরি করে দেয় না

    নৈরাজ্যবাদ একটি আদিম, মৌলিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় বিশ্বাস করে এবং তা হলো, কাজ এমন কোন বিষয় নয় যা চাকরিদাতা প্রদান করে থাকে। চাকরিদাতার হয়তো কাজ বণ্টনের আইনি অধিকার রয়েছে, কিন্তু একটি দেশের সম্পদ তৈরি হয় শ্রমিকের শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়ে, নিয়োগকর্তা কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে নয়। চাকরিদাতারা কেবল পারে সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে। 

    নৈরাজ্যবাদ মনে করে অস্থিতিশীল বাজার, মুদ্রাস্ফীতি, মন্দা, বেকারত্ব, এমনকি যুদ্ধের মতো ঘটনা বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, খরার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। বর্তমানে প্রায় সবাইই জানে অনেক ক্ষেত্রে এসকল বিপর্যয় সৃষ্টিই করা হয় প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে। 

    হয়তো ভবিষ্যতের কোন প্রযুক্তিনির্ভর, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সমাজে (এক ধরনের ‘নিয়োগকর্তাদের ইউটোপিয়ায়’) শ্রমিক শ্রেণি উৎপাদনশীল শ্রেণি দ্বারা স্থানচ্যুত হবে। আমরা প্রতিনিয়তই এমনটা ঘটতে দেখি, যেখানে অলাভজনক হওয়ার কারণে অর্থনীতির বৃহদাকার অংশ বন্ধ করে ফেলা হয় এবং মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। ইতোমধ্যেই আমরা এমন কিছু প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটতে দেখি যা মানুষকে একটি কেবল উৎপাদনশীল শ্রেণিতে পরিণত করার চক্রান্তে লিপ্ত—যেখানে মানূষ হবে কেবল প্রযুক্তির পরিচালক, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সহকারী কিংবা রিসেপশনিস্ট, পরিচারক, কেরানি, ধনী মানুষের ভৃত্য। নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদীরা মনে করে এমন সমাজ তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করতে হবে। তারা কাজের আরাধনা করতে অসম্মতি জানায় এবং কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেওয়া ও তাকে বিচ্ছিন্নতাবোধে জর্জরিত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এ দিক থেকে তারা অন্যান্য ঘরানার কিছু নৈরাজ্যবাদী থেকে আলাদা যারা মনে করে কাজের কোন উদ্দেশ্য নেই এবং তারা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। 

    নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপত্তি

    যখনই নৈরাজ্যবাদীরা বর্তমান সমাজকে আক্রমণ করে, তখনই সাধারণ মানুষের ভয় ও পূর্বানুমানকে উসকে দেয়। এই সাধারণ মানুষও জানে বিদ্যমান সমাজ কতোটা ভয়াবহ এবং তারা ভয়াবহ অবস্থার কিছু কাঠামোর বাইরে কোন জীবনের কথাও ভাবতে পারে না। নৈরাজ্যবাদের কথা শুনলে তারা এমন কিছু আপত্তির কথা তুলে, যেগুলো এক অর্থে ভবিষ্যতের একটি মুক্ত সমাজ বলতে তারা যা বোঝে, তারই বিরুদ্ধে উত্থাপিত কিছু আপত্তি। 

    আসলে তারা রাষ্ট্র প্রচারিত ‘নৈরাজ্যকর অবস্থার’ ধারণাকে ভয় পায়। তারা মনে করে কোন শাসকগোষ্ঠী না থাকলে সমাজ খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, নৃশোংসতায় ভরে যাবে। কিন্তু আমরা জানি যে, শাসক বা রাষ্ট্র থাকা অবস্থাতেও এগুলো নেহাত কম হচ্ছে না, রাষ্ট্র এগুলো থামাতে পারছে না, হয়তো চাচ্ছেও না। একটা খবরের কাগজ তুললেই বোঝা যায় সরকার শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক অশান্তি, সংঘাত বেড়েই চলেছে, কিংবা সরকার দুর্বল হয়ে পড়লেও এগুলোর কোন কমতি থাকে না। এমনকি যে জায়গায় সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং একাধিক গোষ্ঠী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য উঠে পরে লেগেছে, সেখানে অবস্থা আরও ভয়াবহ। বাস্তবে “নৈরাজ্যকর অবস্থা” কোথাওই বিদ্যমান নেই—সব জায়গাতেই সরকার প্রণোদিত নয়তো সরকার গঠনের জন্য সহিংসতা বিদ্যমান।

    সরকার সর্বোচ্চ যা করতে পারে তা দুর্দশার নিবারণ নয়, বরং যা করে থাকে তা হলো শাস্তি প্রদান। সরকার যদি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবদমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং এর ফলে প্রাথমিক অপরাধের চেয়ে শাস্তির ভয়াবহতাই অধিক হয়ে ওঠে—‘সমাধান’ হয়ে ওঠে সমস্যার চেয়ে বেশি ভয়াবহ। 

    “পুলিশবাহিনী ছাড়া আমরা কীভাবে থাকবো?” কোন সমাজই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিবে না, সেখানেই পুলিশ থাকুক বা না থাকুক। যখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয় তা কেবল অপরাধপ্রবণতা ‘দেখে রাখে’ না, একই সাথে অপরাধপ্রবণতাকে উসকেও দেয়, কিন্তু অপরাধের সাথে সমাজের মানুষের বোঝাপড়া চালানোর ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এর কারণ হলো, পাশের বাসায় একটা খুন হলে সেটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আমার নয়! একটি কর্তৃত্ববাদী সমাজে প্রতিবেশির প্রতি আমাদের দায়িত্ব ক্ষুণ্ণ করা হয়, যেখানে রাষ্ট্র আমাদের আচরণের দায়ভার গ্রহণ করে থাকে। 

    “নোংরা কাজগুলো কারা করবে?” এই প্রশ্নটার উত্তর দেওয়া কেবল একজন নৈরাজ্যবাদীর দায়িত্ব নয়, তা পুরো সমাজের দায়িত্ব। অনেক কাজই রয়েছে যেগুলো সামাজিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত, যার মজুরি অত্যন্ত কম এবং যেসকল কাজ কেউ আদতে করতে চায় না। ফলে মানুষকে এক রকম বাধ্যই করা হয় সেগুলো করতে, নয়তো বাজার অর্থনীতির মাধ্যমে সেগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সেসকল কাজের মজুরি বাড়ানো হয় (তখন আবার সেটার চাহিদা সামাজিকভাবে বৃদ্ধি পায়)। কিংবা এ ধরনের কাজের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যে চাপ তৈরি করা হয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে নয়তো বেকারত্বের ভয় দেখিয়ে। মাঝেমধ্যে পুঁজিপতি সস্তা শ্রমের জন্য অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়ে থাকে, যার মাধ্যমে সমস্যাটা কয়েক প্রজন্মের জন্য ধামাচাপ দিয়ে রাখা যায়। কিংবা হয়তো সে কাজগুলো একেবারেই সম্পন্ন হয় না। 

    এমতাবস্থায় রাষ্ট্র কী করবে তা অনেকটাই নিররভর করে রাজনৈতিক বিষয়সমূহের ওপর। একটি নৈরাজ্যবাদী সমাজ কী করবে, তা কেবল একজন ভবিষ্যদ্বক্তাই বলতে পারবেন। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, নৈরাজ্যবাদী সমাজ কী করতে পারবে না—তা কারও ওপর জোরজবরদস্তি করতে পারবে না, যেহেতু বল প্রয়োগের কোন অর্থনৈতিক বা অন্য হাতিয়ার তার থাকবে না। এই প্রশ্নটা সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতার পর্যালোচনার দাবি রাখে, যা নতুন কিছু সমস্যারও উদ্রেক করে। কিন্তু এই কারণে কি আমরা সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করবো?

    “নৈরাজ্যবাদীরা যদি ক্ষমতা দখল না করে এবং অন্যান্য ধরনের সমাজতন্ত্রকে রহিত করে, তাহলে তারা এক অর্থে ফ্যাসিবাদের জন্যই জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে”। নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ভ্রান্তিকরভাবে নৈরাজ্যবাদী চিন্তার সাথে শান্তিবাদকে গুলিয়ে ফেলে। যেকোন পরিস্থিতিতে সবসময়ই স্বৈরতন্ত্রকে (ডানপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী কিংবা একেবারে নিজস্ব গণ্ডিতে) এড়িয়ে যাওয়ার নিশ্চিত উপায় হলো ব্যক্তিগতভাবে স্বৈরাচারকে নির্মূল করা। এই কাজটা তখনই কেবল একটি প্রতীকী কার্যক্রমে পরিণত হয় যখন স্বৈরাচার ক্ষমতায় থাকলেও আদেশ প্রদানের সকল হাতিয়ার রাষ্ট্র প্রধানের হাতে রয়ে যায়। 

    সুযোগ পেলে যে কেউই ক্ষমতা দখল করতে চাইবে। নৈরাজ্যবাদীরা নিজেদের কোন সুবিধাভোগী অভিজাত হিসেবে দাবি করে না এবং কখনো এমনটাও বলতে পারবে না যে, তারা ক্ষমতার মোহ থেকে মুক্ত, কিংবা ক্ষমতা লাভ করলে তা অন্য যে কারও চেয়ে সুষ্ঠুভাবে তার প্রয়োগ করবে। 

    নেতৃত্ব

    নৈরাজ্যবাদীরা কি নেতৃত্বে বিশ্বাস করে? তারা সবসময়ই বলতে চায় যে তারা করে না, কিন্তু অনেক নৈরাজ্যবাদীই নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, কখনো কখনো সামরিক বাহিনীর নেতাও হয়েছেন (বুয়েনাভেঞ্চুরা দুরুতি কিংবা নেস্টর মাখনো এর উদাহরণ), কোন সংগঠন বা ভাবাদর্শের নেতা হিসেবেও তাদের উত্থান ঘটতে দেখা যায়। যেকোন দল বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই কিছু মানুষ সহজাতভাবেই নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তারা একেবারে ভিন্ন শ্রেণির মানূষ। নেতা হয়ে উঠলে অনেকেই নেতৃত্বের দায়ভারের কথা ভুলে যায়। অর্থাৎ, তাদের সমর্থকেরা হয়ে ওঠে তার অন্ধ ভক্ত এবং সেই নেতৃত্ব আর দৃষ্টান্তমূলক কোন বিষয় থাকে না, তা হয়ে হয়ে ওঠে চিন্তাবিহীন নতি স্বীকারের একটি বিষয়। 

    সঙ্গীতজ্ঞ, শিল্পী, বিজ্ঞানীরা উন্নাসিক হওয়া ছাড়াই এক ধরনের ‘অভিজাত’ হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকার রাখার অর্থ এটা হতে পারে না যে, জগতের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় অন্য মানুষের চেয়ে তার অধিকার বেশি থাকবে কিংবা যে বিষয়ে সে পারদর্শী নয় সে বিষয়ে তার অভিমতকে অন্যান্যদের অভিমতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, যুদ্ধ থামানো সম্ভব কি-না এই বিষয়ে আইনস্টাইন ও ফ্রয়েডের মধ্যেকার কথোপকথন; যেখানে আইনস্টাইন ফ্রয়েডের কাছ থেকে শান্তিবাদের একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন এবং ফ্রয়েড বলতে চেয়েছেন, সহিংসতা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের সহজাত বিষয়। শেষ পর্যন্ত যেসকল বিজ্ঞানীরা শান্তিবাদী ছিলেন কিংবা লীগ অফ নেশনসের সমর্থক ছিলেন, কিংবা আইনস্টাইনের মতো দুটোই ছিলেন, তারাই পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করেন। 

    একইভাবে একটি অফিসে কাজ করেও একজন ব্যক্তি আমলা না হয়ে থাকতে পারেন (একজন আমলা হচ্ছে সেই ব্যক্তি যার ক্ষমতা আসে কর্মক্ষেত্রে তার পদের মাধ্যমে)। একটা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানে কোন পদে অধিষ্ঠিত থাকা ব্যক্তি সবার উর্ধ্বতন হওয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন (যেমনটা জোসেফ স্টালিনের ক্ষেত্রে হয়েছিল)। সোজাসাপ্টা ভাষায় বললে ‘আমলা’ যেন একটা শব্দ যা সবচেয়ে কার্যকরী ব্যক্তির মুখে ছুঁড়ে মারা হয়, কিন্তু আমলা হওয়ার সাথে যোগ্যতা বা কার্যকরী হওয়ার কোন সম্পর্কই নেই। একইভাবে প্রকৃত অর্থেই নৈরাজ্যবাদী কোন ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের জায়গায় কখনো নিজেকে স্থাপন করবেন না। আবার নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষাও করবেন না, নিজেই দায়িত্ব তুলে নিবেন। নেতৃত্বের অভিশাপ মূলত অন্ধ ভক্ত হয়ে ওঠার অভিশাপ; যা নেতার দোষ নয়, বরং অনুসারীদের আজ্ঞাবহতার দোষ। হিটলার কতোটুকু ক্ষতি করতে পারতো যদি সবকিছু তার একার করতে হতো? 

    জনমত কি কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে?

    অবশ্যই পারে। এমনকি একটা মুক্ত সমাজেও তা ঘটা সম্ভব। কিন্তু এমনটা বলার অর্থ মুক্ত সমাজের বিরোঢিতা করা নয়। এর অর্থ জনমতকে কখনই বাইরের শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে দেওয়া যাবে না। অর্থনৈতিকভাবে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটা সমাজেও সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে কিছু বিদ্বেষ রয়ে যেতে পারে, প্রথাগত পারিবারিক মূল্যবোধ পুরোপুরি নির্মূল নাও হতে পারে, কিংবা ধর্মীয় গোঁড়ামিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এরকম সমাজ তখন কেবল অর্থনৈতিকভাবে মুক্ত সমাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। 

    কিন্তু যদি বিদ্বেষকে ন্যায্যতা দেওয়ার কোন কাঠামো না থাকে, প্রথাবিরোধী জীবনযাপন করা মানুষের বিরুদ্ধে অবদমন না থাকে, সর্বোপরি উপর থেকে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষকে প্ররোচিত করার মাধ্যমে অবদমিত করার কোন ব্যবস্থা না থাকে, তখনই জনমত তার অন্তর্গত নানা বিদ্বেষ বৈষম্যকে ছাড়িয়ে যেতে সমর্থ হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত মানেই তা যথাযথ নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে নিজের সুবিধামতো পরিচালিত করা শাসকগোষ্ঠীর কার্যক্রমের একটি অংশমাত্র। 

    ঐক্য

    নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ আনা হয় এবং এই অভিযোগটা সাধারণত তারাই এনে থাকে যারা নৈরাজ্যবাদী চিন্তার প্রতি প্রাথমিকভাবে আগ্রহী হয়েছেন। একই রকম আদর্শে বিশ্বাসীরা কেন ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেন? একটি একক মুক্তিকামী বামপন্থা কেন তৈরি হয় না? এতো বিভক্তিই বা কেন?

    আমরা যদি কার্যনির্বাহী কাউন্সিল গঠনের কাজ শুরু করি (যেমন শিল্প শ্রমিকদের প্রাক-ইউনিয়ন)—যেমনটা আমরা সুযোগ ও শ্রমিকদের সমর্থন পেলে করতে চাই—সেখানেও সামাজিক দল গঠনের প্রথম ধাপ হবে শিল্প কার্যক্রমের ভিত্তিতে তা করা। সেখানে আমরা কেবল মুক্তিকামী বামপন্থীদের সাথে সমবেত হবো না, একই সাথে (শ্রমিক কাউন্সিলের ক্ষেত্রে) সংস্কারপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, এমনকি কর্তৃত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিরাও সংযুক্ত হবেন। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নৈরাজ্যবাদী চিন্তা ও আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার অর্থ নির্জনবাসী হয়ে যাওয়া নয়। নৈরাজ্যবাদী দলকে নিজেদের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়, কিন্তু কেবল পার্টির মাধ্যমে সেই পরিচয় ব্যবহৃত হয় অপরকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য। 

    বর্তমানের নৈরাজ্যবাদী হওয়ার ভান করা মানুষেরাই (তারা লিবারেল হোক কিংবা নৈরাজ্যবাদকে একটি ‘লাইফস্টিল’ হিসেবে নিক) বামপন্থার ভেতরে নিজেদের আবদ্ধ ক্ষেত্র তৈরি করতে চান (অবশ্য বামপন্থা নিজেই যথেষ্ট আবদ্ধ হয়ে পড়েছে)। তারা মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ও আদর্শে বিশ্বাসী হওয়া বাধ্যতামূলক এবং তা না হলে কাউকে দলভুক্ত করা যাবে না। এ ধরনের ব্যধিসুলভ বিচ্ছিন্নতার (যা তারুণ্য, লিঙ্গ, বর্ণ, জাতীয়তা, বিকল্প সংস্কৃতি ইত্যাদির ভিত্তিতে ঘটতে পারে) সাথে নৈরাজ্যবাদের কোন সম্পর্ক নেই। বরং নৈরাজ্যবাদ বিরোধী প্রচারণাই এগুলোকে বেশি করে উসকে দেয়। 

    নৈরাজ্যবাদের মার্ক্সীয় সমালোচনা

    যারা নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থেই জানতে চায়, তারা প্রথমেই নৈরাজ্যবাদী চিন্তার এই সমালোচনার সাথে পরিচিত হন। এখান থেকেই মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ও সমাজ-গণতান্ত্রিক সমালচনাসমূহের সূচনা ঘটে। নৈরাজ্যবাদের মুখোমুখি হলে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা মনে করেন তা মার্ক্সবাদের মৌলিক চিন্তাগুলোর বিরোধী। মার্ক্সবাদকে মনে করা হয় মৌলিক শ্রমজীবী দর্শন (যে বিশ্বাস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে জর্জরিত করে ফেলেছে)। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে করা হয়, শিল্পে কর্মরত সর্বহারা শ্রেণি মুক্তির জন্য নিজেদের ছাড়া কারও ওপর নির্ভর করতে পারে না। এরূপ মতবাদে এমনটা বলার কোন জায়গাই নেই যে, শ্রমিক শ্রেণি হয়তো তাদের নিজের শ্রেণির বাইরের কারও চাপানো কর্তৃত্ব উৎখাত করতে প্রস্তুত নয়। 

    মার্ক্সবাদ সাধারণত নৈরাজ্যবাদের সমালোচনা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু যখন এর কর্তৃত্ববাদী মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়, তখন সে মুখ খুলতে বাধ্য হয় (“কোন ধরনের পরিচালনা—তথা কর্তৃত্ব—ছাড়া শ্রমিকেরা কীভাবে রেললাইন চালাবে?”) এবং নৈরাজ্যবাদের ওপর আক্রমণ না চালিয়ে নৈরাজ্যবাদীদের ওপর চড়াও হয়। এরূপ আক্রমণ বেশ সমস্যাজনক। ইতিহাসে কোন সময়ে কোন ব্যক্তি যদি যদি নিজেকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করে থাকে, সে মৃত হোক কিংবা জীবিত, তার সকল চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের ভার যেন অন্য একজন নৈরাজ্যবাদীকেই বহন করতে হবে। আবার কেউ যদি সাময়িকভাবেও নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বলে থাকে, কিংবা অন্য মানুষও যদি কাউকে (ভ্রান্তিকরভাবে হলেও) নৈরাজ্যবাদী বলে থাকে, তার দায়ও কোন একভাবে সকল নৈরাজ্যবাদীর ওপর এসে পড়ে। এমনকি যারা নৈরাজ্যবাদী নয় তারা যদি কোন কাজ বা চিন্তাকে (ভুল করে হলেও) নৈরাজ্যমূলক মনে করে থাকে, সেটাও যেন সকল নৈরাজ্যবাদীর দায়। কিন্তু মার্ক্সবাদীরা কেবল সেসকল ব্যক্তির দায় গ্রহণ করতে সম্মত হয়, যারা কোন নির্দিষ্ট মার্ক্সবাদী পার্টির কার্ডধারী সদস্য। 

    তবে মার্ক্সবাদ নৈরাজ্যবাদের জন্য একটি যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কীভাবে উপেক্ষা করে যাওয়া যায়? এবং এমনটা করা উচিত কি-না? এই প্রশ্নটা মার্ক্সবাদের দুটি ভিন্ন ধারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করে। যেহেতু মার্ক্সবাদীদের কেউ কেউ সামগ্রিক পুঁজিবাদী ক্ষমতা কাঠামোতে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছেন, আবার অনেকে অস্পষ্টভাবে ‘পার্লামেন্টকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের’ কথা বলেছেন। লেনিন মার্ক্সবাদের এই সংকটের ব্যাপারে অবগত ছিলেন এবং মনে করতেন যে মার্ক্সবাদ নিজের সুবিধার্থে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ব্যবহার করে এবং মনে করে পার্লামেন্টের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে পুঁজিবাদকে বিতাড়িত করা যাবে, সে ধরনের মার্ক্সবাদের যে সমালচনা নৈরাজ্যবাদীরা করে থাকে, তা অযৌক্তিক কিছু নয়। ফলে তিনি ভিন্ন একটি বিষয়ের ওপর মনোনিবেশ করেন, যা মূলত মার্ক্সই শুরু করেছিলেন। তা হলো, নির্দিষ্ট কিছু নৈরাজ্যবাদীদের সমালোচনা করা, যা আজও লেনিনবাদী চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। 

    যেহেতু নৈরাজ্যবাদের সমালোচনার কিছু তারা খুঁজে পায় না, লেনিনবাদীরা—বিশেষত ট্রটস্কিবাদীরা—এখনো ব্যক্তিকে আক্রমণের রাস্তা বেছে নেন। সমালোচনার জন্য লেনিন কেবল গুটিকয়েক ব্যক্তিকে আলাদা করেছিলেন যারা অল্প কিছু সময়ের জন্য তাদের আদর্শ থেকে সরে এসেছিল; কিন্তু পরবর্তী কালের লেনিনবাদীরা মনে করেন সকল নৈরাজ্যবাদীই অল্প কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী। যদিও রুশ সমাজতন্ত্রী বিপ্লবীদের মতো ব্যক্তিদের নৈরাজ্যবাদী হওয়ার তকমা অন্যেরাই দিয়েছিল। 

    লেনিনবাদের এই ধারা থেকে নৈরাজ্যবাদের আরেকটি সমালোচনার উদ্ভব ঘটেছে (যা মূলত ট্রটস্কিপন্থী ও মাওবাদীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ); নৈরাজ্যবাদীরা কেবল নৈরাজ্যবাদী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের জন্যই দায়ী নয়, একই সাথে তারা নৈরাজ্যবাদী চিন্তা প্রভাবিত সকল শ্রমিকের জন্যও দায়ী। সিএনটি-র (C.N.T. অর্থাৎ Confederacion Nacional del Trabajo বা National Confederation of Labor) কথা এখানে প্রায়ই উচ্চারিত হয়, কিন্তু গৃহযুদ্ধের আগে ও পরের এর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস কখনোই তুলে ধরা হয় না; খালি সরকারব্যবস্থায় এর অংশগ্রহণের কথাই বলা হতে থাকে। এজন্য নাকি সবসময়ই নৈরাজ্যবাদীদের দায়ভার গ্রহণ করা উচিত! কিন্তু ট্রটস্কিপন্থীরা আবার U.G.T.-র (Union General de Trabajadores বা General Union of Workers) মতো সংস্কারপন্থী ইউনিয়নকে এর ইতিহাসের কোন অংশ না মানে নিয়েই সমর্থন দিয়ে পারে। সকল দেশেই তারা সংস্কারপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সাথে যোগ দেয় (শ্রমিক হলে), নয়তো তাদের চিন্তা মেনে নেয় (ছাত্র হলে)। তাতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু একটি বৈপ্লবিক ট্রেড ইউনিয়নকে কোন একবারের আদর্শ চ্যুতির জন্য সবসময়ই জবাবদিহি করতে হবে। তদুপরি, যদি তা ভেঞে পড়ে সেটির পুনর্গঠনের কোন প্রয়োজন নেই; কিন্তু সংস্কারপন্থী ইউনিয়নকে সুবিধা অনুযায়ী নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। এটাই হলো স্পেন বা অন্য কোন দেশে বিদ্যমান অনুরূপ ইউনিয়ন সম্পর্কে ট্রটস্কিপন্থী চিন্তার রূপ। তারা মূলত এমন একটি সংস্কারপন্থী ইউনিয়নকে সমর্থন দিতে চায়  যেটার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রয়েছে যাকে তারা কব্জা করতে পারে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন ইউনিয়নগুলোকে (যেখানে তারা বুঝে উঠতে পারে না কী বা কাকে কব্জা করতে হবে) তারা এই মর্মে খারিজ করে দিতে চায়। 

    প্রটেস্ট;
    শিল্পী: অর্ডি;
    সূত্র: আর্টমাজিউর

    পেটি বুর্জোয়া

    অ-বিপ্লবী ইউনিয়নগুলোকে সহ্য করতে না পারা এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে ইউনিয়ন গড়ে তোলার জন্য নৈরাজ্যবাদীদের অপছন্দ করার মতো পরস্পরবিরোধী সমালোচনা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা তুলে ধরার পাশাপাশি তারা মনে করে সকল নৈরাজ্যবাদীই ‘পেটি বুর্জোয়া’। 

    এর ফলে আরেকটি জটিলতা দেখা দেয়। নৈরাজ্য-সিন্ডিকালবাদী ইউনিয়নের অস্তিত্বের সাথে কীভাবে সেটির ‘পেটি বুর্জোয়া’ উৎসের মেলবন্ধন ঘটানো যায় এবং বর্তমানের অধিকাংশ মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীই যে প্রথাগত কোন পেশায় যুক্ত বা সেটার জন্য পড়াশুনা করছে, এই ব্যাপারটার সাথেই বা কীভাবে বোঝাপড়া চালানো যায়? এর উত্তর সাধারণত হয়ে থাকে, যেহেতু নৈরাজ্যবাদ ‘পেটি বুর্জোয়া’ আদর্শ, তাই যারা এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে ‘তাদের পেশা বা সামাজিক প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন’, তারাও ‘পেটি বুর্জোয়া’; এবং যেহেতু মার্ক্সবাদী শ্রমজীবী শ্রেণির দর্শন, তাই এর সাথে সংযুক্ত প্রত্যেকেই শ্রমজীবী, ‘অন্তত বিষয়গতভাবে’। এমন চিন্তা এক ধরনের সমাজতাত্ত্বিক অযৌক্তিকতা, যেন ‘শ্রমিক শ্রেণি’ মানেই একটি ভাবাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি। একই সাথে এই চিন্তা তর্ক এড়িয়ে যাওয়ার জন্য মার্ক্সবাদীদের একটি সহজাত বক্তব্য।  

    মার্ক্স অবশ্য তাঁর অনুসারীদের মতো বুদ্ধিহীন ছিলেন না। তাঁর সময়ে ‘পেটি বুর্জোয়া’ বলতে আইনজীবী, হিসাবরক্ষক, কারখানার ম্যানেজার, বা কোন সমাজতাত্ত্বিককে বোঝানো হতো না (তারা ছিল বুর্জোয়া এবং শব্দটা ছিল ‘পেটিট’ (petit), যার অর্থ ক্ষুদ্র, ‘পেটি’ (petty তথা হীনচেতা) নয় এবং এর দ্বারা বোঝাতো যে এরা ঠিক বুর্জোয়া নয়)। সামান্য একজন নগরবাসীর সুযোগ সুবিধা ধনীদের তুলনায় ছিল কম, কিন্তু সে তার কাজের কারণে বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো। মার্ক্স মনে করতেন, নৈরাজ্যবাদ হচ্ছে কারিগর শ্রেণির আন্দোলন, যেই শ্রেণির কাজের পর চিন্তাভাবনা ও কথা বলার সময় রয়েছে এবং যারা কারখানার সার্বক্ষণিক কাজের চাপে পিষ্ট নয়। এই শ্রেণি ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাধীন, কৃষকদের মতো পিছিয়ে পড়া নয় এবং এদেরকে সহজে ভয় দেখানো যেতো না। ইংল্যান্ডে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে র‍্যাডিকাল রাজনৈতিক চিন্তার উন্মেষ ঘটতে দেখা গিয়েছিল; যার কারণ বোধ হয় তৎকালীন ইংল্যান্ডে রাষ্ট্র ছিল তুলনামূলক কম অবদমনমূলক এবং এর অপ্রয়োজনীয়তা ততোটাও স্পষ্ট ছিল না। অন্যান্য দেশে এই শ্রেণির মানুষ ছিল আরও বেশি র‍্যাডিকাল; সুইজারল্যান্ডের জুরা অঞ্চলের ঘড়ির কারিগরদের নৈরাজ্যবাদ যথেষ্ট সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। তা প্যারিসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্যারিস কমিউন আদতে ছিল রাজা তৃতীয় নেপোলিয়ন ও তার যুদ্ধের কারণে কারিগর থেকে নিতান্ত দরিদ্র মানুষে পরিণত হওয়া শ্রেণির মানূষের বিদ্রোহ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পৃথিবীব্যাপী যতোই ছড়িয়ে পড়তে থাকে, এই কারিগর শ্রেণি ততোই ধ্বংসের মুখোমুখি হতে থাকে এবং একটা সময়ে তারা কারখানা ব্যবস্থার অন্তর্গত হয়ে পড়ে। মার্ক্সবাদীরা দেখায়, শিল্পায়নের শিকার হওয়া এই কারিগরেরাই পরবর্তীতে নৈরাজ্যবাদী হয়ে ওঠে। তারা কারখানায় কাজ করার উপযোগী মানসিকতা পোষণ করতো না। সর্বহারা শ্রেণি যেভাবে নেতৃত্ব ও পার্টির কর্তৃত্ব মেনে নিতে স্বচ্ছন্দ ছিল এবং সারাজীবন একটা কারখানায় কাজ করে যেতে সম্মত ছিল, একজন স্বাধীনচেতা কারিগরের পক্ষে তা ছিল যথেষ্টই কঠিন। 

    এই বক্তব্য যে সঠিক তা বোঝা যায় স্পেন ও প্যারিসের পাশাপাশি ইতালি, বুলগেরিয়া, রাশিয়ায় ইহুদিদের নিবাস সহ বিভিন্ন জায়গার কমিউন ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনার মাধ্যমে। নৈরাজ্যবাদী ইউনিয়নের কাজ হবে কারখানার দখল নেওয়া এবং সেখানকার গণউৎপাদন কাঠামো ভেঙে ফেলে সে জায়গায় কারিগরি ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত করা। এটিকেই মার্ক্স বলতে চেয়েছিলেন ‘পেটিট বুর্জোয়া’ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময়ের সাথে এর অর্থও পুরোপুরি পালটে গেছে। মার্ক্সের অনুসারীরা তাঁর বক্তব্যকে পুরোপুরি ভুল বুঝেছে। 

    ভ্যানগার্ড

    মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীদের পরিবর্তনের প্রতি অনীহা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে পার্টি সম্পর্কে লেনিনের ধারণার মধ্য দিয়ে। লেনিন দেখেছিলেন সমসাময়িক রাশিয়া ছিল বৃহদাকার কিন্তু মন্থর সত্তা, যেখানে কৃষকেরা কোনভাবেই তাদের অবস্থার পরিবর্তনে আগ্রহী নয়, বরং তারা সকল কষ্ট সয়ে যেতে রাজি। তাই তিনি অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ‘সর্বহারা’ শ্রেণির দিকে দৃষ্টিপাত করেন। কিন্তু তাঁর সময়ের রাশিয়াতে ‘সর্বহারা’ শ্রেণি ছিল খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। তারপরেও তিনি দেখেন যে, এই শ্রেণির মধ্যেই প্রগতির ব্যাপারে খানিকটা আগ্রহ রয়েছে, যদিও তিনি খেয়াল করেন এই শ্রেণির মানুষের নেতৃত্বে রয়েছে একদল ধুর্ত, হিসেবি, নৃশংস ও উচ্চশিক্ষিত মানুষ (যারা কেবল সে সময়কার রাশিয়ার উচ্চবিত্ত শ্রেণি থেকে আসতো)। এই সর্বহারা শ্রেণি যে পার্টি তৈরি করবে তাকে হতে হবে যতোটা সম্ভব সর্বহারা শ্রেণির পার্টি, যেখানে সেই শ্রেণির মানুষ নিজেরাই নিজেদের সংঘবদ্ধ করে তুলবে এবং ক্ষমতা দখল করবে। তখনই এরা অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করে ফেলার দায়িত্ব ও অধিকার লাভ করবে। 

    বর্তমান যুগে কোন দেশে এমন প্রক্রিয়া পরিচালনার চিন্তা করা মুর্খতা ছাড়া কিছুই না। অসংখ্য রাজনৈতিক দল নিজেদের সর্বহারা শ্রেণির দল হিসেবে দাবি করে, কিন্তু প্রকৃত অর্থেই সেরকম রাজনৈতিক দল থাকার কথা কেবল একটি। অন্যদের সাথে এই দলগুলোর তুলনা করলে দেখা যাবে এই দলগুলোর সদস্যের না আছে কোন রাজনৈতিক বুদ্ধি না আছে যথাযথ বোঝাপড়া। এই দলগুলোর বেশিরভাগ লোকই অতি-উৎসাহী, তাদের জানার গণ্ডি অত্যন্ত সীমিত এবং একজন সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে তারা শ্রেণি সংঘাত সম্পর্কে যথেষ্ট কমই বোঝে। 

    রুশ বিপ্লবকে একটি পৌরাণিক কাহিনীতে পরিণত করে ফেলা হয়েছে এবং এই বিপ্লবের নেতাদের ওপর এতো বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে সকলেই মনে করে তারা রুশ বিপ্লবের নায়কদের মতো নেতৃত্বের গুণাবলি ধারণ করে। কিন্তু যেহেতু তাদের সেই গুণগুলো নেই, এর ফলে শ্রমিক শ্রেণি ও তথাকথিত নব্য বামপন্থীদের মধ্যে দেখা দেয় চরম বিভেদ। এর ফলে নব্য বামপন্থীরা ভারি ভারি শব্দ ব্যবহার করে এবং আশা করে তাদের কথাবার্তা জ্ঞান হিসেবে সবাই গ্রহণ করবে। বৃহত্তর ‘আন্দোলনে’ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের চিন্তাভাবনাগুলোকে তারা ফিরিয়ে আনতে চায় ও প্রতিনিয়ত রুশ কৃষকদের মতো একটি আর্থ-সামাজিক শ্রেণি খুঁজে বেড়াতে থাকে এবং পরিশেষে তারা ‘তৃতীয় বিশ্বের’ মিথে গিয়ে পতিত হয়। 

    নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীদের যে সমালচনা বা প্রশ্নটিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া যায় তা হলো, রাজনৈতিক কার্যক্রম বিবেচনা করা প্রয়োজন নাকি অপ্রয়োজনীয়। যখনই তাদের সমালোচনাকে নির্দিষ্ট শ্রেণির বাইরে প্রয়োগ করা হয়েছে, তখনই এর ফলে কেবল শ্রেণির বাইরের মানুষ লাভবান হয়েছে। 

    নৈরাজ্যবাদের সমাজ-গণতান্ত্রিক (Social-Democratic) পর্যালোচনা

    শুরুর দিককার সমাজতন্ত্রীরা বুঝতে পারেননি যে সমাজতন্ত্র ও নৈরাজ্যবাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে। দুটোই এক অর্থে ছিল সাম্যবাদী ও সমাজতন্ত্রী। কিন্তু সমাজতন্ত্র চেয়েছিল সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে, কিন্তু নৈরাজ্যোবাদীরা চেয়েছিল বৈপ্লবিক পন্থার মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। এ কারণে পূর্বেকার অনেক নৈরাজ্যবাদী ও সমাজতন্ত্রী দলেই (বিশেষত ব্রিটেনে) শ্রমিক শ্রেণি যোগ দিয়েছিল এবং প্রায়ই তারা সংঘ অদলবদল করতো। কিছু বিষয় হয়তো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে, কিছু বিষয় শিল্পায়নের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে, কিন্তু যতো দ্রুত সম্ভব বিপ্লবের আহ্বান জানানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফলে একটি ছিল অপরটির সম্পূরক বিষয়। যদিও এটাও সবাই উপলব্ধি করেছিল যে, একসময় হয়তো দুটো ধারাকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। অন্তত এমনটাই মনে করা হয়েছিল। 

    এই বিষয়টি পালতে যায় কারণ সমাজতন্ত্র নিজেই পালটে গিয়েছিল। তা নিজের উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বর্জন করে রাষ্ট্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ধীরে ধীরে ‘সমাজতন্ত্রের’ অর্থ হয়ে দাঁড়ায় সবকিছুর ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং এর ফলে নৈরাজ্যবাদের আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠার বদলে সমাজতন্ত্রীরা নৈরাজ্যবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত সত্তা হয়ে ওঠে। শুরুতে তারা বলতো ‘নৈরাজ্যবাদীরা একটু বেশিই অধৈর্য্য’; পরবর্তীতে সংসদীয় সমাজতন্ত্রীরা নৈরাজ্যবাদীদের দেখতো এমন মানুষ যারা সমাজকে একেবারেই পালটাতে চায় না, তা এখনই কিংবা পরে। তারা নৈরাজ্যবাদের কট্টরপন্থী সমালোচনাকেই তাদের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় এবং মনে করা শুরু করে রাষ্ট্রই সকল আইনের ধারক-বাহক এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক নকশাই একমাত্র প্রতিষ্ঠিত আইনি নকশা। একটি রাষ্ট্রবিহীন সমাজের ধারণা কিংবা এর পক্ষে কথা বলাকেই তারা গর্হিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করে। এরকম কোন আইন না থাকলেও, আজও কোর্টে একজন পুলিশ কিংবা সাংবাদিক নৈরাজ্যবাদের কথা বললে ধরেই নেয় কোন এক ধরনের অপরাধের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে। 

    সংসদীয় ব্যবস্থার অধিকাংশ সমর্থক ইচ্ছা করেই সংসদীয় ব্যবস্থার সাথে প্রতিনিধিত্বমূলক উৎকৃষ্ট ব্যবস্থাস্বরূপ গণতন্ত্রকে গুলিয়ে ফেলে, যেন যথাযথ প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই উপস্থিত রয়েছে। এ কারণেই কট্টর সংসদীয় দৃষ্টিভঙ্গি অগণতান্ত্রিক, যেহেতু সেখানে ধরে নেওয়া হয় কয়েকশ মানুষ সারা দেশের সকল মানুষের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে। 

    ‘সমাজতন্ত্রের’ ধারণার রুশিকরণ এবং সংসদীয় চর্চা ও গণতন্ত্র থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার ফলে সমাজ-গণতান্ত্রিকেরা মনে করার সুযোগ পেয়েছে যে, যারা বিপ্লবের কথা বলে তারা মূলত স্বৈরতন্ত্রের পক্ষেই কথা বলছে। নৈরাজ্যবাদীদের আর যাই হোক কোনভাবেই একনায়ক হয়ে ওঠার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না (যদিও মুর্খ কিছু সাংবাদিক তা মাঝেমধ্যেই করে থাকে), তাই একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদেরকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সে কারণে দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল গোটা শ্রম আন্দোলনগুলোকেই কলঙ্কিত করে ফেলতে পেরেছে। এমন চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ধার করে এবং তাদের রচিত ‘অপরাধী-সিন্ডিকালবাদ’ আইন রচনা করে যা ছিল ফ্যাসিবাদী দেশগুলো প্রণীত আইনের সদৃশ। 

    মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীদের মতো সমাজ-গণতন্ত্রীরাও মুখ ফুটে বলতে পারে না যে, নৈরাজ্যবাদের সাথে তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে, নৈরাজ্যবাদ ক্ষমতা ও শ্রেণি সুবিধার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন করা হলে তারা খালি বলে যায় নৈরাজ্যবাদ ‘অসম্ভব’। তা যদি অসম্ভবই হয়, তাহলে নৈরাজ্যোবাদকে ভয় পাওয়ারই বা কারণ কী? কেনই-বা পর্তুগাল ও স্পেনের মতো দেশগুলোতে যখন স্বৈরাচার প্রতিরোধ করার একমাত্র উপায় ছিল নৈরাজ্যবাদ, তখন তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন দিয়েছিল? স্পেনে, সোলাশিস্ট পার্টির উত্থানের আগ পর্যন্ত ব্রিটিশ লেবার পার্টি সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বাধীন অংশগুলোকে সমর্থন দিলেও নৈরাজ্যবাদীদের জন্য কিছুই করেনি। 

    সর্বহারার একনায়কত্ব ‘সম্ভব’, বরং একটু বেশিই সম্ভব। যদি এমনটা ঘটে তা হবে সমাজতন্ত্রীদের শেষ দিন। কিন্তু যদি নৈরাজ্যবাদীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে, তাহলে অন্ততসমাজতন্ত্রীরা তাদের বিকল্প তুলে ধরার সুযোগটুকু পাবে। তারা কেবল ভয় পায় যে, তাদের বিকল্প পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত হবে। কেই-বা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বেছে নিতে যাবে যদি তাদের রাষ্ট্রবিহীন সমাজতন্ত্রের সন্ধান দেওয়া হয়? 

    পুঁজিবাদী বিশ্বে একজন সমাজ-গণতন্ত্রী বৈপ্লবিক পদ্ধতি এবং নৈরাজ্যবাদীদের ‘অধৈর্য্য’ ও ‘অপরাধপ্রবণোতার’ বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কিন্তু একটি সমাজতান্ত্রিক জগতে, সমাজ-গণতন্ত্রও একই রকম ‘অপরাধপ্রবণ’ (হয়তো আরও বেশি), যেহেতু তারা এক সময়ে বিরোধী শক্তিগুলোর সাথে আঁতাত করেছিল, যা আজ প্রমাণিত। ‘অধৈর্য্য’ হওয়ার অভিযোগ মেনে নেওয়া একটু কঠিন হয়ে যায় যখন আইনিভাবে পরিবর্তন সাধনের কোন উপায় অবশিষ্ট থাকে না এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটানোর চিন্তা একটি স্বপন ছাড়া কিছুই না। সমাজ-গণতন্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করে যখন স্বৈরতন্ত্র বিজয় লাভ করে (যদি না তারা বিদেশি শক্তির কাছে সাহায্যের আবেদন জানাতে পারে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে যেমনটা হয়েছিল)। এই দৃষ্টিভঙ্গির দেওয়ার কিছু নেই। ফ্যাসিবাদ বা লেনিনবাদের বিরুদ্ধে তাদের কোন সংগ্রাম নেই কারণ এমনটা করার কোন সাংবিধানিক পদ্ধতি তাদের জানা নেই। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার তাঁবেদার রাষ্ট্রগুলোতে তারা কোনকিছুই ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছিল না এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল চাপ কমানোর জন্য খানিকটা উদারনৈতিকতাবাদের প্রচার করতে। এখন আমরা জানি এর প্রভাব কতোটা ভয়াবহ ছিল। তারপরেও নৈরাজ্যবাদ সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রগুলোর ওপর বৈপ্লবিক আক্রমণ পরিচালনার পদ্ধতির সন্ধান দিয়ে এসেছে যা কেবল সমাজ-গণতন্ত্রীরা প্রত্যাখ্যানই করে না, তারা পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর সাথে জোট বেঁধে সেই আক্রমণ প্রতিহত করারও চেষ্টা করে। 

    নৈরাজ্যবাদের প্রতি লিবারেল-গণতান্ত্রিক আপত্তি

    লিবারেল গণতন্ত্র কিংবা অ-ফ্যাসিবাদী কট্টরপন্থা, সরাসরি নৈরাজ্যবাদের সমালোচনা করতে ভয় পায় কারণ এমনটা করলে লিবারেল-গণতন্ত্রের পুরো পুরো যুক্তিটাই নস্যাৎ হয়ে যাবে। ফলে তারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয় এবং নৈরাজ্যবাদীদের মার্ক্সবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে (এর ফলে নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র মার্ক্সীয় সমালোচনাটাই তারা উপেক্ষা করে যায়)। তাদের আক্রমণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নৈরাজ্যবাদী মার্ক্সবাদের সহিংস একটি ধারা কিংবা কট্টর মার্ক্সবাদ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা। 

    প্রকৃত নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লিবারেল-গণতন্ত্রের কোন বক্তব্য নেই কারণ তারা নৈরাজ্যবাদের চিন্তাকে আত্মসমর্থনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে; তারা প্রতিনিয়ত ‘স্বাধীনতার’ কথা বললেও তাদের প্রায় সকল কাজই মানূষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে ব্যস্ত। তারা ভান করে যে সংসদীয় চর্চা গণতন্ত্রের একটি রূপ, কিন্তু চাপে পড়লে আবার মাঝেমধ্যে স্বীকার করে নেয় যে এটি কোন গণতন্ত্রই না এবং প্রায়ই সেটিকে গণতান্ত্রিক করে তোলার উপায়ের সন্ধান করে। এটি নিঃসন্দেহে একটি একনায়কতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যেখানে সুষ্ঠু কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে নির্বাচিত কিছু মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়; পুরো বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় সংবিধানের অজুহাত তুলে। 

    লিবারেল অর্থনীতি অনেকটা ডোডো পাখির মতোই বিলুপ্ত। যা দেখা যায় তা হয় বড় বড় ফার্মগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য, নয়তো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ। তবুও রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিয়ত মুক্তবাজার অর্থনীতির কতাহ বলে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক জগতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে না, কিন্তু ব্যবসায়ীদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার ব্যাপারটি আবার তারা সবসময় মানতে চায় না। যদি সত্যিই মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রচলন থাকে তাহলে মুদ্রা চলাচলে কোন ধরনের বাধা থাকারই কথা না। যদি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতা থাকতো যেকোন উদ্রা বেছে নেওয়ার, তাহলে মুক্ত সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের সাথেই টিকে থাকতে পারতো এবং একটা পর্যায়ে পুঁজিবাদকে হটিয়ে দিতো। 

    একবার যদি মুক্ত সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, অর্থাৎ যদি আমরা রাষ্ট্রের প্রতীকী মুদ্রা বর্জন করে নিজেদের মুদ্রা নির্ধারণ করা শুরু করি যেখানে শ্রমের প্রকৃত মুল্য বজায় থাকে, কে-ই বা শোষিত হতে চাইবে? কোন মুক্তবাজার অর্থনীতিবিদকে যদি একই সাথে রাজনীতিবিদের দায়িত্ব পালন করতে হতো তাহলে তিনি কোনভাবেই পরিস্থিতি এমন হতে দিতেন না। 

    নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লিবারেল-গণতন্ত্রের একটি সাধারণ অভিযোগ ডানপন্থী রাজনীতি থেকে ধার করা। তা শুরু হয় সমাজতন্ত্রের (এইখানে রাষ্ট্রতন্ত্র) বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার মাধ্যমে। কিন্তু যদি রাষ্ট্র-বিরোধী সমাজতন্ত্র থেকে থাকে যা তার চেয়ে বেশিই ‘লিবারেল’, তখন সেটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। যদি যদি সেরকম কোন সমাজতন্ত্র না থেকে থাকে, তাহলে নতুন আইন প্রণয়ন করে হলেও সেটিকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। 

    এই বক্তব্যটি অবজ্ঞারও অযোগ্য; কিন্তু এই বক্তব্যই আশ্চর্যজনকভাবে গণমাধ্যমে, পুলিশ ও আইনি কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নৈরাজ্যবাদকে (নৈরাজ্যবাদী সংগঠন বাদ দিয়ে শুধু যদি আমরা আদর্শটির কথা ভাবি) কখনই অবৈধ ঘোষণা করা সম্ভব নয়, কারণ কেউ কাউকে বাধ্য করতে পারে না রাষ্ট্রকে ভালোবাসতে। এমনটা করা হয় রাষ্ট্রকে ‘দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো ভাঁওতাবাজির মাধ্যমে। 

    লিবারেল-গণতন্ত্র নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কোন যথাযথ, পূর্বানুমানহীন আপত্তি না তোলার একটা কারণ হলো এমনটা করলে তার নিজের মুখোশ খুলে যাবে এবং তার অন্তঃস্থ রাষ্ট্রবাদ ও কর্তৃত্বপরায়ণতা উন্মোচিত হয়ে পড়বে। বর্তমানে কট্টরপন্থীড়া নিজেদের সমাজতন্ত্রীদের চেয়ে বেশি স্বাধীনতাকামী ও উদার প্রতিপন্ন করার জন্য ‘লিবারেল’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড থেকে রাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে রাখা। নৈরাজ্যবাদীরা যখন দেখাতে সমর্থ হয় যে, একই সাথে সামাজিক ন্যায্যতা অর্জন এবং রাষ্ট্রকে উৎখাত করা সম্ভব, তখনই তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে যে তারা স্বাধীনতাকামী, কিন্তু নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি শুনলে বোঝা যায় যে, তারা আসলে কর্তৃত্ববাদী। এ কারণেই তারা কটাক্ষ, অপবাদ ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়, যা তাদের নৈরাজ্যবাদ বিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ এবং যা বিশ্বস্ত ভৃত্যের মতো গণমাধ্যমগুলো সমর্থন করে যায়। 

    নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের আপত্তি

    আশ্চর্যজনকভাবে নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদী, লিবারেল কিংবা সমাজ-গণতান্ত্রিক আপত্তির চেয়ে ফ্যাসিবাদী আপত্তি তার বক্তব্যের জায়গায় তুলনামূলকভাবে সৎ। অন্যান্য দৃষ্টিভোংগিগুলো নৈরাজ্যের অধিকাংশ কিংবা কিছু চিন্তার সাথে একমত হলেও এর সম্ভাব্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলে; কিন্তু ফ্যাসিবাদ মনে করে নৈরাজ্যবাদ সম্ভব এবং তারা সরাসরি ঘোষণা দেয় যে, নৈরাজ্যবাদ অনাকাঙ্ক্ষিত। 

    ডানপন্থী কর্তৃত্ববাদ (যা ফ্যাসিবাদের থেকেও বিস্তৃত) সেসকল বিষয়েরই আরাধনা করে যেগুলো নৈরাজ্যবাদীরা ঘৃণা করে; বিশেষত রাষ্ট্র। ফ্যাসিবাদী তত্ত্বে রাষ্ট্রকে আদর্শায়িত করা হলেও অস্বীকার করা হয় না যে, একে ছাড়াও সবকিছু চালানো সম্ভব। কিন্তু সকল নাগরিকেরই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়া এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়া কিংবা একে নির্মূল করতে চাওয়ার দাবিকে ধরে নেওয়া হয় চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে। 

    মাঝেমধ্যে রাষ্ট্রকে ‘কর্পোরেট জনগণ’ কিংবা ‘দেশ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় এবং রাষ্ট্রকে তার আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর উর্ধ্বে একটি রহস্যাবৃত ধারণামণ্ডিত করার চেষ্টা করা হয়। সামরিক বাহিনীর শক্তি প্রদর্শন ও অবদমনকে আদর্শায়িত করা হয় (এমনটা ঘটে যখন জার্মান সম্রাট বলেছিলেন বৈশ্বিক শান্তি “কেবল একটি স্বপ্ন এবং তা ভালো কোন স্বপ্নও নয়”)। ডানপন্থী দেশপ্রেমের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ‘দেশ’ সম্পর্কিত একটি রসস্যমণ্ডিত অনুভূতি, যদিও নাৎসিদের মধ্যে প্রায়শই ‘জনগণের’ ধারণাকে আদর্শায়িত করার প্রবণতা দেখা গেছে (যদিও এই ‘জনগণের’ ধারণার সাথে জার্মান জাতীয়তাবাদের চেয়ে বর্ণবাদের প্রভাব বেশি), তারপরেও শেষ পর্যন্ত দেশের জমিকেই তারা পবিত্র মনে করে; এর ফলে উদ্ভটভাবে রাষ্ট্রের মিথ এক ধরনের যৌক্তিকতা খুঁজে পায়। একজন নৈরাজ্যবাদীর কাছে এর পুরোটাই আহাম্মকি ছাড়া কিছুই নয়। এই আহাম্মকির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় যখন গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও যখন ফ্রাংকোর সমর্থকেরা জিব্রালটারের মতো একটা অনুর্বর পাথর দখল করাকে কেন্দ্র করে বহু স্প্যানীয়কে হত্যা করে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে জেনারেল মিলান দ্য আস্ত্রে, যিনি সকল ‘খারাপ স্প্যানীয়কে’ মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন এবং একটি একতাবদ্ধ স্পেন নির্মাণের লক্ষ্যে সকল কাতালান ও বাস্ক জনগোষ্ঠীর সকল মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চেয়েছিলেন। এভাবে যেন তিনি (উনামুনোর ভাষায়) স্পেনকে “তার নিজের মতোই এক-চোখা, এক-হাতওয়ালা” বানিয়ে ফেলতে চেয়েছেন।  

    নৈরাজ্যবাদকে ফ্যাসিবাদীরা স্পষ্টতই একটি প্রত্যক্ষ বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে, কোন দার্শনিক বিপদ হিসেবে নয়। কেবল নৈরাজ্যবাদীদের ডাইরেক্ট অ্যাকশন নয়, বরং স্বয়ং নৈরাজ্যবাদী আদর্শই তাদের কাছে ভয়ংকর শঞকার বিষয়। ‘গণতান্ত্রিক’ সংবাদ মাধ্যমগুলো অবশেষে ফ্যাসিবাদী চিন্তার এই দিকগুলো নিজেদের করে নিতে পেরেছে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিভিন্ন বিষয়কে তারা ‘সংবাদ’ হিসেবে উপস্থাপন করে। হিটলার তার তৈরি করা রাষ্ট্রকে সহস্ব বর্ষজীবী ভাবতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি জানতেন এই রাষ্ট্রকে ধ্বংস কিংবা প্রত্যাখ্যানও করা যায়। তার এই চিরজীবীতার ধারণা ছিল একটি বিপদ এবং একদিকে যখন তিনি রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের মতো সর্বগ্রাসী প্রতিপক্ষের দিকে মনোযোগ দিচ্ছিলেন (যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলে একটি বিরাট সামরিক শক্তি), ‘বিশ্ব নাগরিকতার’ ধারণার ওপর তার আক্রমণ নৈরাজ্যবাদ-বিরোধী চিন্তারই প্রতিফলন ঘটায়। 

    ‘বিশ্ব নাগরিকতা’ ও ‘রাষ্ট্রহীনতা’ এই দুটি ধারণাকে নাৎসিরা ইহুদিদের সাথে সম্পর্কিত দুটি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল; যদিও হিটলার পরবর্তী সময়ে ইহুদিদেরই একটা অংশ জাতীয়তাবাদ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নাৎসিদের প্রণীত ‘ইহুদি কর্তৃত্বের’ ধারণার সাথে ‘নৈরাজ্যবাদ দ্বারা কর্তৃত্ব, নৈতিকতা ও নিয়মতান্ত্রিকতার ধ্বংসের’ ধারণার মধ্যে মিল ছিল। এর কারণ ফ্যাসিবাদ মনে করে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা একটি খারাপ জিনিস এবং কেবলমাত্র জাতীয় স্বাধীনতাই অনুমোদনযোগ্য। হিটলারের ভাষণের (যা মাঝেমধ্যেই ছিল বিভ্রান্তিকর, কারণ জনমতকে নিজের দিকে নেওয়ার জন্য সে কোন সঙ্গতি ছাড়াই এক কথা থেকে অন্য কথায় চলে যেতো) কোন অর্থ যদি কেউ উদ্ঘাটন করতে পারে, তাহলে দেখা যাবে হিটলার মনে করতো, একটা দেশ ‘নৈরাজ্যে ডুবে গেলে’ (অর্থাৎ রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হলে) তা বিশৃঙ্খলার রূপ নিবে, যা জনগণের স্বার্থ হাসিলের বদলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকেই সহজতর করে তুলবে। 

    প্রোপাগান্ডার স্বার্থে ও নৈরাজ্যবাদকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে হিটলার রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র এবং নৈরাজ্যবাদকে গুলিয়ে ফেলেননি (যা ফ্রাংকো ইচ্ছা করেই করেছিল)। তিনি সমাজতন্ত্রকে ‘ইহুদিদের কর্তৃত্বের’ সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন এবং (প্রাথমিক পর্যায়ের নাৎসি চিন্তায়) প্রতিনিয়ত বলার চেষ্টা করে গেছেন, জার্মানরা জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ এবং ইহুদিরা তাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে যেভাবে প্রাচীন স্পার্টায় ক্রীতদাসদের সাথে করা হতো। 

    একটি বিশুদ্ধ রক্তের ‘মনিব জাতি’ বা মাস্টার রেসকে জার্মানির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং তার মাধ্যমেই সম্ভব প্রতিপক্ষকে পদদলিত করা। যদি কোনভাবে স্বাধীনতা দেওয়া হয় তাহলে এই ক্রীতদাসসুলভ মানুষেরা নৈরাজ্যের দিকে ফিরে যাবে, ঠিক যেভাবে ফ্রান্সের বর্ণগতভাবে নিকৃষ্ট কেল্ট জাতি তাদের নর্ম্যান নর্ডিক মনিবদের হটিয়ে দিয়েছিল (এই বর্ণনা পাওয়া যায় হিউস্টন চেম্বারলেইন রচিত ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস থেকে)। পরবর্তীতে যখন নাৎসিবাদ একটি বৃহদাকার রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় তখন জার্মানদের জাতির উৎকৃষ্টতার চিন্তাটি সামনে নিয়ে আসা তাদের কাছে অধিক সমীচীন মনে হয়েছিল। কিন্তু এটি আসল নাৎসি দর্শন ছিল না, এমনকি নাৎসি নেতারাও ব্যক্তিগতভাবে তা বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু জনসমক্ষে এটা ার বলা সম্ভব হচ্ছিল না যে, তাদের অবস্থা প্রাচীন স্পার্টার ক্রীতদাসদের মতো। অন্তত যতোক্ষণ না তাদের ক্ষমতা গ্রহণ সম্পূর্ণ হচ্ছে। একটি পুরো জাতি যে ক্রীতদাস হয়ে জন্মাতে পারে এমন ধারণার মতো নৈরাজ্যবাদ বিরোধী চিন্তা আর কীই-বা  হতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে তা ছিল অসম্ভব।

    নাৎসি প্রোপাগান্ডা বর্তমানের সংবাদপত্রে নতুন রূপ ধারণ করেছে। এমনটাও বলতে শোনা যায় যে, দেশ যদি নৈরাজ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে তাহলে হয় সমাজতন্ত্রীদের উত্থান ঘটবে নয়তো ডানপন্থী একনায়কতন্ত্র আবির্ভূত হবে। 

    নৈরাজ্যবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদের আপত্তিকে যদি সংক্ষেপে বলা যায়: রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটানো অস্মভব কিছু নয়; কিন্তু যদি তা ঘটে এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়, তাহলে যারা ‘বৈশিষ্ট্যগতভাবেই’ উন্নত জাতির আজ্ঞাবহ হতে চায়, তারা পুনরায় মনিব খোঁজা শুরু করবে। তাদের মধ্যে ‘কঠোর শাসনের’ প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া কাজ করবে। 

    নাৎসি চিন্তায়, কঠোর শাসন আসতে পারে কেবল বিশুদ্ধ রক্তের উন্নত জাতি বা মাস্টার রেসের মাধ্যমে। সেই জাতির মনিবেরা হবে নির্মাণক্ষম (যেমন তথাকথিত আর্য জাতি) এবং যে জাতির ‘ভূমির’ সাথে কোন সংযোগ নেই তাদের ক্ষমতা গ্রহণ ধ্বংস ছাড়া কিছুই ডেকে আনবে না। 

    অন্যান্য ধরনের ফ্যাসিবাদী চিন্তায় বলা হয়, মানুষকে স্বাধীনতা দিলে সে তার দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ ভুলে যাবে এবং দেশের মাহাত্ম্য লঙ্ঘিত হবে। এমন চিন্তা ছিল মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের ভিত্তি। এক অর্থে তা সত্য কারণ তার কাছে দেশ হচ্ছে রাষ্ট্রের সমার্থক এবং মাহাত্ম্যের অর্থ হচ্ছে সামরিক শক্তির বিকাশ। ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে অকপট রূপ সম্ভবত স্পেনে দেখা দিয়েছিল যা স্পষ্টতই নৃশংসভাবে শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছিল এবং নৈরাজ্যবাদের সকল বিরোধিতার উদ্দেশ্যই ছিল শ্রমিক শ্রেণিকে অবদমিত করে রাখা। প্রয়োজন হলে শ্রমজীবী শ্রেণিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদকে দমন করা হয়েছিল। 

    এমনটা সকল রাজনৈতিক দর্শোনের ক্ষত্রেই সত্য, ফ্যাসিবাদ কেবল এই ব্যাপারে কোন রাখঢাক করে না। নৈরাজ্যবাদের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ বরং আরও স্পষ্টভাবে নিজের চরিত্র তুলে ধরে। 

    শিল্পী: আঁদ্রে মেসোঁ

    নৈরাজ্যবাদের ব্যাপারে একজন সাধারাণ মানুষের আপত্তি

    মোটাদাগে দেখতে গেলে, একজন সাধারণ মানুষ নৈরাজ্যবাদের ব্যাপারে তার আপত্তির খোরাক সংগ্রহ করে গণমাধ্যম থেকে, যেই গণমাধ্যমে সবসময়ই প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর নিয়ন্ত্রণাধীন। দীর্ঘ সময় যাবত গণমাধ্যমে নৈরাজ্যোবাদ সম্পর্কে কিছু বলাই নিষেধ ছিল এবং ১৯৬০ এর দশকে এসে মার্ক্সবাদের সাথে তাকে একত্রিত করে জনগণের সামনে তুলে ধরার একটা চেষ্টা চলেছিল, যাতে একটির আলোচনা উঠলে অপরটিও আলোচিত হয় এবং তা করতে গিয়ে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৬০ এর দশকের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদীদের মার্ক্সবাদী এবং মার্ক্সবাদীদের নৈরাজ্যবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। মাঝেমধ্যে জাতীয়তাবাদীদেরও নৈরাজ্যবাদী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হতো। গণমাধ্যমে কেউ যদি নিজেকে নৈরাজ্যবাদী বলতো তা সাধারাণত হতো কোন অপরাধের স্বীকারোক্তি প্রদানের সময়ে। আমরা দেখেছি, এমনটা ঘটা লিবারেল-গণতন্ত্রের একটি বৈশিষ্ট্য। তবে এর মধ্যে একটি তীব্র ফ্যাসিবাদী প্রবণতা প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান। এই কারণে সংবাদ মাধ্যোমগুলো ‘স্বঘোষিত নৈরাজ্যবাদী’ কথাটির প্রচলন করে যাতে একজন প্রকৃত নৈরাজ্যবাদী থেকে নৈরাজ্যবাদের তকমা চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তিকে আলাদা করা যায়। 

    অবস্থা খানিকটা পালটেছে; যার পেছনে রয়েছে নৈরাজ্যবাদের বাণিজ্যিকীকরণ, যা ঘটেছে সঙ্গীতের বাণিজ্যিকীকরণ এবং দর্শনশাস্ত্রের একাডেমিক অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এর ফলে উদ্ভব ঘটে নৈরাজ্যবাদীর একটি মধ্যবিত্ত লিবারেল সংস্করণের যাকে দেখা হয় একজন উদার দার্শনিক, নিরীহ খ্যাপাটে ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় ড্রপ-আউট, কিংবা উদ্ভট পোশাক পরা একজন মানুষ হিসেবে। 

    প্রতিনিয়ত জনপ্রিয় হতে থাকা এমন চিন্তার বিপরীতে একজন সাধারণ মানুষ নৈরাজ্যবাদের ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে থাকে, যা পুলিশবাহিনী ও অন্যান্যরাও করে। মাঝেমধ্যে তারা বিষয়টি ‘বিপ্লবী’ শব্দটির সাথে মিলিয়ে ফেলে এবং একটা পর্যায়ে ভাবা শুরু করে সকল প্রতিবাদীই বোধ হয় নৈরাজ্যবাদী। এমন অজ্ঞতা সাধারণ মানুষের চেয়ে সাংবাদিকদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। 

    যখন প্রকৃত নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার প্রসঙ্গ আসে, তখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তেমন মারাত্মক কোন আপত্তির সন্ধান পাওয়া যায় না। নৈরাজ্যবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর কথা বললে হয়তো তারা সেটার বাস্তবায়নযোগ্যতা অনুমান করতে পারে না, কিন্তু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (যেমন, রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর স্বৈরতন্ত্রের কথা) থেকে একই বক্তব্য উপস্থাপন করলে তারা তা সহজেই ধরতে পারে। আমরা কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক দল, অথর্ব রাজনীতিবিদদের হাত থেকে নিস্তার পেতে পারি এমন ধারণা সহজেই যে কাউকে আপ্লুত করে তুলবে। মূল আপত্তির জায়গাটা হলো সবাই নিজের জীবন নিয়ে ও জীবনের শান্তি নিয়ে চিন্তিত; তাই তারা সহজে একটি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের সাথে টক্কর দিতে চায় না কিংবা সে সংগ্রামটা করার যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে চায় না। তার ওপর পুঁজিবাদের চাকচিক্য ও মোহ তো আছেই। রাষ্ট্র যতোক্ষণ না মানুষের রক্তের শেষ বিন্দুটুকুও শুষে নিতে চায়, ততোক্ষণ অধিকাংশেরই বোধোদয় হয় না। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায় এবং ঘৃণার বদলে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রও ‘দেশ’ হয়ে ওঠার মুখোশ পরে ফেলে। 

    নৈরাজ্যবাদের প্রান্তিকীকরণ

    রাষ্ট্রীয় অপপ্রচার নৈরাজ্যবাদকে প্রান্তিক করে তুলতে তুলতে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার জন্য যতোটা শ্রম দিয়ে থাকে, অন্য কোন রাজনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে তা করে না। সাংবাদিক, অধ্যাপক, গবেষকসহ প্রায় সবাইই নৈরাজ্যবাদ ও নৈরাজ্যবাদী বলতে কী বোঝায় সে ব্যাপারে বিভ্রান্ত থাকে। নৈরাজ্যবাদী বলতে তারা বোঝে ড্রপ-আউট, নেশাগ্রস্ত, জাতীয়তাবাদী আততায়ী, নতুন যুগের পরিব্রাজক, রাজনৈতিক বিরুদ্ধ মতপোষণকারী, আগ্রাসী ট্রেড ইউনিয়নবাদী, তরুণ বিদ্রোহী, মধ্যবিত্ত তাত্ত্বিক, স্বপ্নবাজ মানুষ, কমেডিয়ান, হতাশাগ্রস্ত সংস্কারবাদী, কট্টর শান্তিবাদী, খুনী, অপরাধী ইত্যাদি। একজন নৈরাজ্যবাদী এর যেকোন একটা হতেই পারেন, কিন্তু কোনভাবেই এর সবগুলো নয়। ‘নৈরাজ্যবাদী’ শব্দটির অপব্যবহার, কিংবা এর সাথে ‘স্ব-ঘোষিত’ বা ‘তথাকথিত’ জাতীয় শব্দ জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে নৈরাজ্যবাদকে প্রতিনিয়তই প্রান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হতে থাকে। এর বিপরীতে রাষ্ট্র প্রণোদিত তত্ত্বসমূহকে স্বাভাবিক মনে হওয়া শুরু হয়। 

  • রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    রোজা লুক্সেমবার্গ ।। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সংগঠন প্রসঙ্গে

    × অনুবাদ: সহুল আহমদ

    [অনুবাদকের মন্তব্য: বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের জন্ম ১৮৭১ সালের ৫ মার্চে, পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারে। কৈশোরেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন রোজা। ১৮৮৬ সালে পোলিশ প্রলেতারিয়েত পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, কিন্তু তৎপরতার কারণে তৎকালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে রোজা দেশ ছাড়েন ১৮৮৯ সালে। পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৭ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, ‘দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অফ পোল্যান্ড’ শীর্ষক ডক্টোরাল থিসিস জমা দেন। কিন্তু ততদিনে তার তৎপরতা তাকে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিল। ১৮৯৩ সালে জুরিখে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।

    ১৯০৪ সালের দিকে, যখন বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন রোজা লুক্সেমবার্গ মোটাদাগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের জন্য পোলিশ ও রুশ বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে মেনশেভিক ও বলশেভিকদের যে বিভাজন হয়েছিল সেটা বিশ্লেষণ করতে ইস্ক্রার সম্পাদকরা তাকে অনুরোধ করেন। জার্মান ভাষায় ১৯০৪ সালে তিনি Neue Zeit পত্রিকায় ‘রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক প্রশ্নসমূহ’ শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধ হচ্ছে সংগঠন বিষয়ে লেনিনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের ভেতর পার্টি সংগঠন ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিষয়ে যে তর্ক চলছিল তাতে এই প্রবন্ধ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। রোজা এখানে বৈপ্লবিক পার্টির গঠন ও কেন্দ্রিকতা বিষয়ে লেনিনের অবস্থানের কড়া সমালোচনা হাজির করেন।

    রোজা এই প্রবন্ধে সংগঠন সংক্রান্ত তার ভাবনা তুলে ধরেন। আলাপ শুরু করেন লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদ দিয়ে, এবং এটাকে সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন। তৎকালে এক ধরনের নতুন সংগঠন, যা কিনা বিপ্লব সফল করবে, সে বিষয়ে প্রচুর আলাপ চলছিল। লেনিনের মতে, বিপ্লবী পার্টিকে আসলে শ্রমিকশ্রেণির ভ্যানগার্ড হতে হবে। তারাই নেতৃত্ব দিবে বিপ্লবে, শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালনে উদ্বুদ্ধ করবে। এই যে সংগঠন বা পার্টি হবে সেটাকে খুব কেন্দ্রীভূত হতে হবে, সামরিক বাহিনীর মতো এবং আমলাতান্ত্রিক। সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিই সবকিছুর পরিকল্পনা করবে, বাদবাকি সবাই, সংগঠনের শাখা–প্রশাখা সকলেই কেবল সেই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করবে। বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠন, বিলুপ্তকরণ, নেতা নির্বাচন বা অপসারণ ইত্যাদি সকল কাজের দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে। কেন্দ্রে যা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বাকিরা সেটাই বাস্তবায়িত করবেন, কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে আলাপ–আলোচনা করবেন। শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের এইসব নিয়া ভাবনার সময় নেই। বরঞ্চ সংগঠনের আমলাতান্ত্রিকতা ও কেন্দ্রিকতাবাদ আদতে বৈপ্লবিক। রোজা এই প্রবন্ধে প্রধানত এই প্রস্তাবনা ও এর সাথে জড়িত মনোভঙ্গির সমালোচনা করেন। রোজা বৈপ্লবিক পার্টির জরুরতকে অস্বীকার করেন না, বরঞ্চ তিনি মানেন সেটা লাগবেই। কিন্তু লেনিন যে কেন্দ্রিকতার কথা বলেন, রোজা সেটা মানতে পারেন না। কারণ, রোজার মতে, লেনিন জনগণের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে যান্ত্রিক বানিয়ে তুলতে চান। লেনিন যে ‘সুবিধাবাদে’র ব্যাপক নিন্দামন্দ করেন, রোজার মতে, সেটা কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে বরঞ্চ আরও ত্বরান্বিত হবে। রোজা তার দুই অধ্যায়ে এই অবস্থানকেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। তিনি বরঞ্চ সংগঠনে ব্যাপক অংশগ্রহণ চান। তাতে ভুল হতে পারে, সুবিধাবাদও প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেটাকে কোনো গঠনতন্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ভুল ঠেকানোর জন্য যদি কঠিন কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তোলা হয় তাহলে সেটা ভুল ঠেকানো দূরে থাক, উল্টো বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণির যে সজীবতা ও লড়াই করার যে স্পৃহা তাকেই গলা টিপে মেরে ফেলবে।

    রোজার এমন ভাবনা মোটেই অকস্মাৎ নয়। লেনিনের সাথে তার এই দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্য একেবারেই মৌলিক এবং সেটা আজীবন ছিল। এই প্রবন্ধে যেমন ছিল, তেমনি ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। রোজা বলশেভিক বিপ্লবের প্রশংসা করলেও সেখানেও তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটা বিষয়ে রোজার অগাধ বিশ্বাস ছিল, এগুলোই লেনিনের সাথে তার অবস্থানের ফারাক ঘটিয়েছে, এবং সারাজীবন সকল লেখাতেই বিষ্যগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিষয়গুলো হচ্ছে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা ও গণতন্ত্র। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর রোজা জোর দিতেন। সেখানে শ্রমিকশ্রেণির বা প্রলেতারিয়েতের বা আমজনতার সৃজনশীল সত্তা এই আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদের সমালোচনা করেন সেখানেও এই দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া। অর্থাৎ, কেন্দ্রিকতাবাদ জনগণের আন্দোলনের স্পৃহা, তাদের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা সবকিছুকে দমিয়ে দিয়ে, কাগজ ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কমিটির খপ্পরে তুলে দেয়। ফলে রোজার চোখে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র অবিচ্ছেদ্য। তিনি অবশ্যই সমাজতন্ত্র চাইতেন কিন্তু, তার মতে, যতদূর পর্যন্ত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে বিস্তৃত করা যায় ততদূর ছাড়া তার সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। সকল ধরনের স্বাধীনতা, অর্থাৎ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ব্যতীত সেই সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। তার চিন্তার এই কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো লেনিনের সাথে তার ফারাকটা গড়ে দিয়েছিল, এবং সেটা এই প্রবন্ধ থেকে শুরু করে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তৎকালে তর্কে জিত বোধহয় লেনিনেরই হয়েছিল, (যেহেতু লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়ে গিয়েছিল), কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী অভিজ্ঞতা, স্ট্যালিনবাদের আবির্ভাব, সোভিয়েতের পতন ইত্যাদিসহ আজ প্রায় ১০০ বছর পর আমাদের কাছে মনে হচ্ছে রোজাই বোধহয় সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, বিপদ টের পেয়েছিলেন।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগঠন বিষয়ক আলাপ–আলোচনা একদম অনুপস্থিত। থাকলেও সেটা অল্প। সংগঠন বিষয়ে যে সকল ধারণা প্রবলভাবে রাজনৈতিক মানসজগতে বিরাজ করছে সেখানে লেনিনের সংগঠন বিষয়ক ভাবনার একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু এই ধরনের সাংগঠনিক মডেল আজ আর কাজ করছে না। এই মুহূর্তে সংগঠন বিষয়ে আমাদের নতুন নতুন আলাপ তোলা জরুরি। এই কথা মাথায় রেখেই রোজা লুক্সেমবার্গের প্রবন্ধটির অনুবাদ করা হয়েছে।

    তৎকালে এই তর্কের আরও হদিস পাওয়া যেতে পারে লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান? এবং ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড, টু স্টেপস ব্যাক শীর্ষক রচনাতে। পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ট্রটস্কির আওয়ার পলিটিক্যাল টাস্ক।

    ১৯০৪ সালে এটি প্রকাশিত হয় “Organizational Questions of the Russian Social Democracy” শিরোনামে। প্রকাশিত হয় Iskra এবং Neue Zeit–এ। পরবর্তীতে Marxism vs. Leninism নামে একটি পুস্তিকা আকারেও প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে ইন্টেজারে প্রকাশিত হয় Revolutionary Socialist Organization শিরোনামে। ১৯৩৫ সালে Leninism or Marxism? শিরোনামে আরেকটি ফেডারেশন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে বার্ত্রাম উলফের ভূমিকাসহ The Russian Revolution and Leninism or Marxism? শিরোনামে প্রকাশিত হয়; ১৯৭০ সালে পাথফাইন্ডার প্রেস থেকে প্রকাশিত রোজা লুক্সেমবার্গের আরেকটা সংকলনে “Organizational Questions of Social Democracy” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

    এখানে যে সংস্করণটি অনুবাদ করা হয়েছে তার মূল সূত্র হচ্ছে মার্ক্সিস্ট আর্কাইভ। তবে ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিটার হুদিস এবং কেভিন বি এন্ডারসন সম্পাদিত দি রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার–এর সংস্করণটিকেও অনুসরণ করা হয়েছে। কখনো কখনো ফুটনোটে বা বন্ধনীর ভেতর পার্থক্যসূচক মন্তব্যও জুড়ে দেয়া হয়েছে। তবে, এই দুটো সংস্করণকে পাশাপাশির রেখে আরও সম্পাদনার জরুরত রয়েছে।

    রোজা লুক্সেমবার্গের এই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল দুই অধ্যায়ে। রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের জন্য রোজার প্রথম অধ্যায়ের একটি খসড়া অনুবাদ করেছিলেন অনুবাদক মাজহার জীবন; কিন্তু তিনি আর কাজটা শেষ করেননি। এই অনুবাদে বিভিন্ন সময়ে তার খসড়া থেকে আমি সাহায্য নিয়েছি। তার প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা। অনুবাদ করার সময় আরিফ রেজা মাহমুদ, সারোয়ার তুষার ও তানভীর আকন্দের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা নিয়েছি। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।]

    মূল অনুবাদ

    প্রথম অধ্যায়

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ওপর এক নজিরবিহীন দায়িত্ব বর্তেছে। যে দেশে এখনো চরম ক্ষমতাধর রাজতন্ত্র প্রভাবশালী, সেখানে সর্বোত্তম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশলগত নীতি [পলিসি] নির্ধারণ করাই হলো এর দায়িত্ব। [১৮৭৯–৯০ সালের দিকে জার্মানিতে যখন বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইন কার্যকর ছিল] জার্মানির তৎকালীন পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার পরিস্থিতিকে একই সমান্তরালে তুলনা করাটা ভুল হবে। দুই দেশেরই সাধারণ মিল হলো—পুলিশি শাসন। আর কোনো দিক থেকেই দু’দেশের তুলনা চলে না [বিশেষত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে]।

    গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতাগুলো গুরুত্বের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে গৌণ। এমনকি রাশিয়ায় জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত বাধাগুলো অতিক্রম করে সাফল্য লাভ করেছে। রাস্তায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে জনগণ তাদের ‘গঠনতন্ত্র’ (কনস্টিটিউশন) খুঁজে পেয়েছে (যদিও তা অনিশ্চিত)। এই অবস্থা বজায় রেখে একদিন রাশিয়ার জনগণ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করবে।

    রাশিয়াতে বুর্জোয়া আধিপত্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির আড়ালে কার্যকর; এই বাস্তবতাই রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপ পরিচালনার প্রধান সমস্যা। এই স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য শ্রেণিসংগ্রামের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের একটি বিমূর্ত প্রোপাগান্ডামূলক চেহারা প্রদান করে, এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অসন্তোষ বা বিক্ষোভকে একধরনের গণতান্ত্রিক–বৈপ্লবিক চেহারা প্রদান করে।

    বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইনগুলো১ শ্রমিক আন্দোলনকে অতি উন্নত বুর্জোয়া সমাজে সাংবিধানিক চৌহদ্দির বাইরে নিয়ে এসেছে; যে বুর্জোয়া সমাজে শ্রেণিদ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বোচ্চ বিরোধাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। [এখানেই বিসমার্কের পরিকল্পনার অর্থহীনতা নিহিত]। রাশিয়ার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ওখানকার সমস্যা হলো কীভাবে একটা সোস্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় যেখানে রাষ্ট্র এখনো বুর্জোয়াদের কব্জায় নেই।

    এই পরিস্থিতির সাথে কেবল বিক্ষোভ এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে রুশ মাটিতে রোপনের পদ্ধতিই জড়িত নয়; বরঞ্চ এর সাথে পার্টি সংগঠনের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে এবং সরাসরি সামনে চলে আসে।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনে এমনকি সংগঠনকেও [সমাজতন্ত্রের পূর্বেকার ইউটোপিয়ান পরীক্ষা–নিরীক্ষা থেকে স্বতন্ত্র] প্রোপাগান্ডা/প্রচারণার একটি কৃত্রিম ফসল হিসাবে না দেখে বরঞ্চ শ্রেণিসংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক ফসল হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে, যেখানে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব [ডমিনেশন] সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে অগ্রগামী থাকে, সেখানে খোদ বুর্জোয়ারাই শ্রমজীবী শ্রেণির মাঝে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংহতির সূত্রপাত ঘটান। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর মতে, ‘এই পর্যায়ে শ্রমজীবীদের সংহতি তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ফসল নয়, বরঞ্চ এটা বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ।’ […যা কিনা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রলিতারিয়েতদের বাধ্য করে…’]

    তদপুরি, রাশিয়াতে সোশ্যাল ডেমক্রেসিকে নিজের প্রচেষ্টাতেই একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক কালপর্ব মেরামত করতে হবে। রুশ প্রলেতারিয়েতদের বর্তমান যে ‘বিক্ষিপ্ত’ [atomized] অবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক জমানাকে দীর্ঘায়িত করছে সে অবস্থা থেকে তাদেরকে শ্রেণি সংগঠনে রূপান্তরিত করতে হবে। এটা তাদেরকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে এবং সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।

    একটি বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে ধরনের সুযোগ–সুবিধার নিশ্চিয়তা থাকে সেগুলো ছাড়াই রুশ সমাজতন্ত্রীদের এমন একটি সংগঠন নির্মাণের ভার গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যান্য দেশের বুর্জোয়া সমাজ যে রাজনৈতিক রসদ যোগায় তা সেখানে থাকবে না। এভাবে বলা যায় যে, সর্বশক্তিমান ইশ্বরের মতো তাদেরকেও শূন্য থেকে এধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।

    সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে সংগঠনগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠী/দল ও ক্লাব, এবং এদের প্রধান কর্মসূচি হচ্ছে প্রচারণা/প্রপাগান্ডা। প্রস্তুতি পর্যায়ের এই ধরনের সংগঠনগুলোকে কীভাবে এমন একটি বৃহৎ অখণ্ড জাতীয় কাঠামোতে রূপান্তর করা যায় যেগুলো কিনা রাশিয়া রাষ্ট্র শাসিত বিশাল অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত? এটাই হলো রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রোসির সুনির্দিষ্ট সমস্যা যা বেশ কিছুকাল ধরে আলোচিত হচ্ছে।

    পুরনো সংগঠন সক্রান্ত ধারণার সর্বাধিক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন [অটোনমি] এবং বিচ্ছিন্নতা [আইসোলেশন]। সুতরাং এটা বোধগম্য যে, যিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংগঠন দেখতে চান তাঁর শ্লোগান কেন হয়ে যাচ্ছে ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ [সেন্ট্রালিজম’]। গত পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্য ইস্ক্রা২ যে দারুণ প্রচারাভিযান চালিয়েছে সেখানে কেন্দ্রিকতা ধারণার প্রতি সম্মতি বারংবার প্রকাশিত হয়েছে; এই ধারণা রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটের পুরো তরুণ প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পার্টি কংগ্রেসে৩ এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ প্রত্যয়টি রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সংগঠন প্রশ্নকে পুরোপুরি আলাপে আনতে পারেনি। আমরা আবারও বুঝতে পারলাম যে, সামাজিক আন্দোলনে কোনো বাঁধাধরা নকশা [ফর্মূলা] যে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

    ইস্ক্রা গ্রুপের অন্যতম সদস্য কমরেড লেনিন রচিত এক কদম আগে, দুই কদম পিছে৪ শীর্ষক গ্রন্থটি রাশিয়ার আন্দোলনের “অতি–কেন্দ্রীকতাবাদীদের” ধারণাগুলোর পদ্ধতিগত বর্ণনা। এই গ্রন্থে অতুলনীয় বলিষ্ঠ ও যুক্তি সহকারে নির্মম কেন্দ্রিকতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূলনীতিগুলো হলো: ১) সকল সক্রিয় বিপ্লবীদের নিয়ে একটি আলাদা বাহিনী বাছাই ও গঠন করার জরুরত; এই অভিজাতদের [এলিট] চারপাশে থাকা অসংগঠিত কিন্তু বৈপ্লবিক সাধারণ জনগণ থেকে তারা আলাদা হবেন। ২) পার্টির সকল স্থানীয় কমিটিকে মনোনিত করার সুযোগ–সুবিধা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; সকল স্থানীয় কমিটির কার্যকর পদে নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটির থাকবে; পার্টি পরিচালনার তৈয়ারি নিয়মকানুন সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ারও কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; এমনকি, স্থানীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তকরণ ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে কোনো ধরনের আর্জির সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব থাকতে হবে। এভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রয়োজন অনুসারে পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্তর বিন্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে। পার্টির মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিই হবে একমাত্র চিন্তাশীল অংশ। বাকি সকল গ্রুপ হবে এর কার্যনিবাহী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

    লেনিনের যুক্তি হচ্ছে যে, এমন কেন্দ্রীভূত ধরনের সংগঠনের সাথে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গণআন্দোলনের সংমিশ্রণই বিপ্লবী মার্ক্সবাদের একটি নির্দিষ্ট নীতি। এই থিসিসের সমর্থনে তিনি একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এই ব্যাপারটা আরও একটু গভীরভাবে দেখা যাক।

    কোনো সন্দেহ নেই যে, সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রিকতাবাদের দিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একটি জোরালো ঝোঁক বা প্রবণতা রয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি যেহেতু তার এই ঝোঁকগুলো [কেন্দ্রিকতাবাদের ঝোঁক] সহ পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক জমিনে বেড়ে ওঠে এবং বৃহৎ কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর [ফ্রেমওয়ার্ক] ওপর তার সংগ্রাম ভর করে, সেহেতু সোশ্যাল ডেমোক্রেসি অন্তর্নিহিতভাবে সকল ধরনের স্থানিকতা বা জাতীয় ফেডারেলিজমের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সকল স্থানীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের সাধারণ স্বার্থগুলোর বিরোধিতা করা। এটি সকল শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনকে একটি একক দলে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে, তা তাদের মধ্যে যতই জাতিগত, ধর্মগত বা পেশাগত ভিন্নতা থাকুক। অস্ট্রিয়ার মতো কিছু বিশেষ ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটেছে।৫

    এটা পরিষ্কার যে, রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি নিজেকে অনেকগুলো জাতীয় গ্রুপ/দলের একত্রীভূত ফেডারেটিভ হিসাবে সংগঠিত করা উচিৎ নয়। বরঞ্চ তাকে পুরো সাম্রাজ্যের জন্য একটি একক পার্টি হয়ে উঠতে হবে। তদপুরি, এখানে বিবেচনাধীন প্রশ্ন এটি নয়। আমরা এখানে যা জিজ্ঞেস করছি তা হচ্ছে, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে একীভূত ও একক রুশ পার্টির অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয়করণের মাত্রা কদ্দূর পর্যন্ত জরুরি।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির যথাযথ কার্যক্রমের আঙ্গিক থেকে শ্রেণি সংগ্রামের একটি দল হিসাবে এর সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রতীয়মান হয় যে, পার্টির ক্ষমতা ও শক্তি সরাসরি পার্টির কেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিসমূহের প্রভাবের তুলনায় এগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি সমাজের ইতিহাসে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনই প্রথম যা প্রত্যেক পর্যায়ে এবং সকল ক্ষেত্রে জনগণের সংগঠন এবং প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন কার্যকলাপকে বিবেচনায় নেয়।

    এই কারণেই সোশাল ডেমোক্রেসি এমন এক ধরনের সংগঠন তৈরি করে যা পূর্বতন বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাধারণ সংগঠনের (যেমন জেকোবিন ও ব্লাঙ্কুইদের অনুসারী) চেয়ে পৃথক।

    লেনিন বোধহয় এই বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন যখন তিনি তার বইয়ে মন্তব্য করেন যে, বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট ‘শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের সাথে যুক্ত একজন জেকোবিন’–এর চাইতে বেশি কিছু নয়। লেনিনের কাছে সোশাল ডেমোক্রেসি এবং ব্লাঙ্কুইজিমের৬ পার্থক্য এই জায়গায় নেমে এসেছে যে, মুষ্টিমেয় ষড়যন্ত্রকারীর পরিবর্তে আমরা শ্রেণি–সচেতন প্রলেতেরিয়াত পেয়েছি। তিনি ভুলে যান যে, এই পার্থক্য সংগঠন প্রশ্নে আমাদের ধারণাগুলোর সম্যক পুনঃপাঠের ইশারা দিচ্ছে; কেন্দ্রিকতাবাদ নিয়ে একেবারে নতুন ধরনের ধারণার ইশারা দিচ্ছে; এবং পার্টি ও সংগ্রামের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক বিষয়ে একেবারে ভিন্ন ধারণার ইশারা দিচ্ছে।

    ব্লাঙ্কুইজম শ্রমিক শ্রেণির প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা অংশগ্রহণকে আমলে নেয় না। ফলে বিপ্লবের জন্য তাকে জনগণকে সংগঠিত করতে হয় না। বিপ্লবের মূহূর্তেই কেবল জনগণ তাদের ভূমিকা পালন করবে বলে ধরে নেয়া হয়। বিপ্লবের প্রস্তুতির ভার কেবল ছোট একটি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের, যারা ক্যু করবে। বস্তুত বৈপ্লবিক ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য ধরে নেয়া হয়েছিল যে ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে জনগণকে দূরে রাখাই শ্রেয়। এমন সম্পর্ক কেবল ব্লাংকুইবাদীরাই গ্রহণ করতে পারতেন, কেননা তাদের সংগঠনের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার সাথে জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রামের কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ নেই।

    ব্লাংকুইস্ট বিপ্লবীদের কৌশল ও তৎপরতার সাথে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রামের সংযোগ খুব কমই ছিল। তারা মুক্তভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কাজ করতে পারতেন। ফলে তারা আগ থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি রেডিমেড পরিকল্পনার রূপ নিতে পারেন। এর ফলে, সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা কেবল সাধারণ কার্যনিবাহী অঙ্গে পরিণত হন; তাদের কর্মকাণ্ডের পরিসরের বাইরে পূর্ব নির্ধারিত ইচ্ছা/সিদ্ধান্তের আদেশ পালন করাই হয়ে উঠে তাদের কাজ। তারা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতিয়ারে পরিণত হন। এখানে আমরা ষড়যন্ত্রমূলক কেন্দ্রিকতাবাদের দ্বিতীয় বিশেষত্ব খুঁজে পাই: কেন্দ্রের ইচ্ছার কাছে পার্টির বিভিন্ন অংশের চরম ও অন্ধ সমর্পণ, এবং সংগঠনের সকল অংশে এই কর্তৃত্বের সম্প্রসারণ।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে [র‍্যাডিক্যালি] আলাদা পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এর উত্থান ঘটে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রাম থেকে। এর বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত দ্বান্দ্বিক বিরোধের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে। অর্থাৎ, খোদ এই সংগ্রামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বাহিনী নিজেকে নিযুক্ত করেছে [রিক্রুট], এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। পার্টি গঠনের কার্যক্রম, সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রলেতারিয়েতদের সচেতনতা এবং খোদ সংগ্রাম, কোনোটাই কালানুক্রমিক ও যান্ত্রিকভাবে আলাদা আলাদা বিষয় নয়। এগুলো হলো একই সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন দিক। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির এমন কোনো একগুচ্ছ কৌশল নেই যা কিনা প্রশিক্ষণ শিবিরের সৈনিকদের শেখানোর মতো করে কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির সদস্যদের শেখাবে। বরঞ্চ, যে সংগ্রামের প্রক্রিয়া সংগঠন তৈয়ার করেছে সেটাই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির প্রভাবের পরিসরে একটি ক্রমাগত ওঠানামার প্রয়োজনীয় শর্ত তুলে ধরে।

    এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতা পার্টির কেন্দ্রের প্রতি সদস্যদের যান্ত্রিক অধীনতা ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর ভর করে হতে পারে না। এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন ইতোমধ্যে পার্টিতে থাকা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি সচেতন নিউক্লিয়াস এবং প্রলেতারিয়েতের পার্টিবিহীন অংশের মধ্যে কোনো বদ্ধ দেয়াল তৈরি অনুমোদন করে না।

    এখন লেনিনের কেন্দ্রিকতা যে দুটো নীতির ওপর নির্ভর করে আছে তা হলো:

    ১) পার্টির কেন্দ্রের কাছে পার্টির সকল অংশের অন্ধ আনুগত্য; কেবল কেন্দ্রই সকলের জন্য চিন্তা করবে, নির্দেশনা দিবে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

    ২) সামাজিক–বৈপ্লবিক প্রতিবেশ থেকে বিপ্লবীদের সংগঠিত নিউক্লিয়াসের কঠোর পৃথকীকরণ।

    এ ধরনের কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক শ্রেণির গণআন্দোলনের ওপর ব্লাঙ্কুইজমের সাংগঠনিক নীতিমালার একটি যান্ত্রিক প্রয়োগ।

    এই মতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেনিন তার ‘বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট’কে সজ্ঞায়ন করেছেন ‘শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের যুক্ত একজন জেকোবিন’ হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি প্রলেতারিয়েতের সংগঠনে সাথে যুক্ত নয়। এটা নিজেই প্রলেতারিয়েত; এটা শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের আন্দোলন। এই কারণেই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাবাদ মূলত ব্লাংকুইস্ট কেন্দ্রিকতাবাদ থেকে আলাদা। এটা কেবল মাত্র শ্রমিক শ্রেণির ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রতিনিধিদের পুঞ্জীভূত বা সম্মিলিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। বলা যেতে পারে, এটা প্রলেতারিয়েতের অগ্রসর অংশের [বা নেতৃত্বস্থানীয় স্তরের] ‘স্ব–কেন্দ্রিকতাবাদ’। এটা হলো নিজ পার্টির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাকে বাস্তবে পরিণত করার অপরিহার্য শর্তগুলো হচ্ছে:

    ১) শ্রেণি সংগ্রামে শিক্ষিত এক বিরাট বা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের শ্রমিকের উপস্থিতি

    ২) জনজীবন, পার্টি প্রেস, জনসমাবেশ ইত্যাদিতে প্রত্যক্ষ প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা বিকাশে শ্রমিকদের সম্ভাবনা।

    এই শর্তগুলো রাশিয়াতে এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। প্রথমটি, অর্থাৎ শ্রেণিস্বার্থ সচেতন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনায় সক্ষম একটি প্রলেতারিয়েত ভ্যানগার্ড, এখনো রাশিয়াতে কেবলমাত্র হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের সকল প্রচেষ্ঠা এমন ভ্যানগার্ড গঠনকে ত্বরান্বিত করা উচিৎ। দ্বিতীয় শর্তটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিস্থিতিতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    এই সিদ্ধান্তগুলোর সাথে লেনিন চরমভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিশ্চিত যে, একটি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রিভূত পার্টি গঠনের সকল প্রয়োজনীয় শর্তাবলী ইতোমধ্যে রাশিয়াতে বিদ্যমান। তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘প্রলেতারিয়েতদের নয়, বরঞ্চ সংগঠন ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আমাদের পার্টির কিছু বুদ্ধিজীবীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে’। তিনি কারখানার শিক্ষামূলক প্রভাবকে মহিমান্বিত করেন, যা তার ভাষায়, প্রলেতারিয়েতদেরকে ‘শৃঙ্খলা ও সংগঠনে’ অভ্যস্ত করে তুলবে। এতকিছু বলার পর লেনিন আবারও প্রমাণ করেন যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠন সম্পর্কে তার ধারণা যথেষ্ট যান্ত্রিক। লেনিনের চিন্তায় যে ‘শৃঙ্খলা’ [ডিসিপ্লিন] রয়েছে তা কেবল কারখানার মাধ্যমেই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে রোপণ করেন না, বরঞ্চ সামরিক ও বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বা [আধুনিক] আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেও সেটা করেন। অর্থাৎ, কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সকল কলকব্জা [মেকানিজম] দিয়ে এটা করা হয়।

    আমরা শব্দের অপব্যবহার করি এবং আত্ম–প্রবঞ্চনা চর্চা করি যখন একই শব্দ—যেমন শৃঙ্খলা [ডিসিপ্লিন]—নিম্নোক্ত বিপরীতমুখী ধারণাতে প্রয়োগ করি: ১) সয়ংক্রিয়ভাবে চলমান হাজারো হাত পা যুক্ত শরীরে চিন্তা ও ইচ্ছার অনুপস্থিতি, এবং ২) একদল মানুষের সচেতন রাজনৈতিক তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়। একটি নিপীড়িত শ্রেণির অন্ধ আনুগত্য এবং নিজের মুক্তির জন্য সংগ্রামরত একটি শ্রেণির সংগঠিত বিদ্রোহের মধ্যে কোন সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়?

    সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলা মানে বুর্জোয়া শাসকদের কর্তৃত্বকে একটি সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব দ্বারা নিছক প্রতিস্থাপন করা নয়। শ্রমিক শ্রেণি নতুন শৃঙ্খলার ধারণা অর্জন করবে, মুক্তভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলাকে গ্রহণ করবে; পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত শৃঙ্খলার ফসল হিসেবে নয়, বরঞ্চ আনুগত্য ও দাসত্বের পুরোনো অভ্যাসের শেষ শেকড় পর্যন্ত উৎপাটন করার মাধ্যমে এটা করবে।

    সমাজতান্ত্রিক [সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক–রিডার] ধারণায় কেন্দ্রিকতাবাদ শ্রমিক আন্দোলনের যে কোনো পর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য এমন কোনো চূড়ান্ত বিষয় নয়। বরঞ্চ এটা একটা প্রবণতা, যা শ্রমজীবীদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অর্জিত বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষার আলোকে মূর্ত হয়ে ওঠে। সন্দেহ নেই, রুশ আন্দোলনে এই ধরনের কেন্দ্রিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মূর্ত করে তুলতে প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর অনুপস্থিতিই একটি দুরূহ বাধা হাজির করেছে।

    এটা ভাবা ভুল হবে যে, যেখানে এখনো পার্টিতে সচেতন শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে সে শাসনকে একটা কেন্দ্রীয় কমিটির চূড়ান্ত ক্ষমতা দিয়ে ‘সাময়িকভাবে’ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে এবং এভাবেই পার্টি বা সংগঠনের ওপর শ্রমজীবী জনগণের উন্মুক্ত নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে বৈপ্লবিক প্রলেতারিয়েতের ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

    রুশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এমন ধরনের কেন্দ্রিকতার মূল্য সম্পর্কে বিবিধ সন্দেহের জন্ম দেয়। নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের সীমাহীন অধিকারসহ সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্র (অল–পাওয়ারফুল সেন্টার), যেমনটা লেনিন হয়তোবা চাইবেন, তা অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে যদি এই কর্তৃত্ব কেবল প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়, যেমন তহবিল পরিচালনা, প্রচারকারী [প্রপাগান্ডিস্ট] ও বিক্ষোভকারীদের কাজের দায়িত্ব বণ্টন, পার্টি পুস্তিকা বহন ও প্রচার। কেবলমাত্র যদি এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সংগ্রামের কৌশল অবলম্বন এবং রাশিয়াতে একটি বিরাট বৈপ্লবিক পদক্ষেপ শুরু করা হয় তবেই এর একটি বোধগম্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

    কিন্তু এখন পর্যন্ত রুশ আন্দোলন যে পরিবর্তনগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছে তার অভিজ্ঞতা কী? গত দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসূ পরিবর্তনগুলো আন্দোলনকারী কোনো নেতার ‘আবিষ্কার’ নয়, এমনকি নেতৃত্বস্থানীয় সংগঠনগুলোরও ফসল নয়, বরঞ্চ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা ছিল আন্দোলনের সক্রিয়তার স্বতঃস্ফূর্ত ফসল। এটা সত্য ছিল রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের জন্য; এটা শুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি ছিল রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রামের নবযুগের সূচনা। পরবর্তী সময়েও এটা কম সত্য ছিল না, ১৯০১ সালের মার্চে সেন্ট পিটার্সবার্গের শিক্ষার্থীরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তার আন্দোলনে নেমে আসে। ১৯০৩ সালের রোস্তভ অন ডনের সাধারণ ধর্মঘট ছিল রুশ প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের পরবর্তী বিশাল কৌশলগত মোড়, এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা। ‘অল বাই ইটসেলফ’, মানে নিজে নিজেই ধর্মঘট পরিণত হয় রাজনৈতিক সমাবেশে, রাস্তার বিক্ষোভে, বিশাল বিশাল সভা, যা কিনা কয়েকবছর পূর্বেই সবচেয়ে আশাবাদী বিপ্লবীও কল্পনা করতে পারেননি।

    প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘পহেলা ছিল কর্ম’; অর্থাৎ এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের কাজের যৌক্তিকতা আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ ও সচেতন নেতৃত্ব এই বিকাশে খুবই নগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এটা সত্য যে এই সংগঠনগুলোকে এমন ঘটনা প্রবাহের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না। তবু বিপ্লবীদের এই অগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে এই ফ্যাক্ট দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। লেনিন যে সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্রীয় পার্টির হাতিয়ারের কথা বলেছিলেন তার অনুপস্থিতি দিয়েও এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। এমন একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অস্তিত্ব সম্ভবত স্থানীয় কমিটিগুলোতে বিশৃঙ্খলা বা সিদ্ধান্তহীনতা বৃদ্ধি করতো; উত্তেজিত জনগণ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বিচক্ষণ অবস্থানের মধ্যে ফাটল ধরানোর মাধ্যমে এটা করা হতো। একই প্রপঞ্চ, মানে কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সচেতন উদ্যোগের গৌণ ভূমিকা, বর্তমানে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। সাধারণত, সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কৌশলগত নীতি এমন কিছু নয় যা আসলে ‘উদ্ভাবিত’ [ইনভেন্টেড] হতে পারে। বরঞ্চ বিভিন্ন পরীক্ষামূলক, এবং প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত, শ্রেণি সংগ্রামের দুর্দান্ত সব সৃজনশীল কর্মতৎপরতার ধাবাহিকতার ফসল।

    এখানেও চেতনের পূর্বে আসে অচেতন। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী মানবজাতির [বা, প্রক্রিয়ার এজেন্টদের] বিষয়ীগত যুক্তির পূর্বে আসে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার [অবজেক্টিভ বা বিষয়গত] যুক্তি। এইসমস্ত ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের ভূমিকা রক্ষণশীল চরিত্রের হয়ে থাকে, কারণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, যখন তারা লড়াইয়ের জন্য নতুন জমিন জিতে নেয় তখন তারা এটার ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা–নিরীক্ষা শুরু করে, এবং আরও বেশি মাত্রার অধিকতর উদ্ভাবনের বিপরীতে এটাকে শীঘ্রই কেল্লা বা দুর্গে পরিণত করে।

    জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বর্তমান কৌশল তাদের অসাধারণ বৈচিত্র্য, নমনীয়তা [ফ্লেক্সিবিলিটি], এবং একইসাথে দৃঢ়তার কারণে সবার কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার [রেজিম] আওতায় প্রতিদিনের ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিয়ে পার্টির খাপ খাওয়ানোর [এডাপটেশন] একটি চমৎকার আলামত। পার্টি তার আয়ত্বে থাকা সকল জিনিসপত্রের একটি পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করেছে; সে জানে তার নীতিগুলো পরিবর্তন না করেও কীভাবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হয়।

    তদপুরি, এই বিশেষ কৌশল, মানে এই এই নিখুঁত অভিযোজন, আমাদের পার্টির বিস্তীর্ণ দিগন্তকে এতই কার্যকরভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে যে, পার্লামেন্টারি কৌশলকে চিরস্থায়ী করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এটাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি জার্মানিতে সাধারণ ভোটাধিকার বিলুপ্ত হয় তখন কৌশলগত নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা (পারভাস৭ দ্বারা উত্থাপিত) বিবেচনা করতে লোকেরা অস্বীকার করেছিল; যদিও এমন একটি সম্ভাব্য ঘটনাকে [মানে ভোটাধিকারের বিলুপ্তি] জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসি একেবারে অবাস্তব মনে করেনি।

    মোটাদাগে এই ধরনের জড়তার কারণ হচ্ছে যে, বিমূর্ত হাইপোথিসিস সমূহের শূন্যতার মধ্যে, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির লাইন ও রূপগুলোকে সংজ্ঞায়ন করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ। স্পষ্টত ভবিষ্যত কৌশলের জন্য রেডি–মেড পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং আন্দাজ করাটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে: ১) প্রদত্ত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সংগ্রামের রুপগুলোর সঠিক ঐতিহাসিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা, এবং ২) বর্তমান পর্যায়ের আপেক্ষিকতা এবং শ্রেণি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্যের অবস্থান থেকে বৈপ্লবিক উত্তেজনার অনিবার্য বৃদ্ধি সম্পর্কে বোঝাপড়া অব্যাহত রাখা।

    লেনিনের চাওয়া মতে পার্টির শীর্ষে নেতিবাচক চরিত্রের এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হলে আমরা এমন অঙ্গের অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতাকে একটা বিপজ্জনক পরিমাণে শক্তিশালী করে তুলবো। সমাজতান্ত্রিক পার্টির কৌশল যদি একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন না হয়ে উল্টো পুরো পার্টি গঠন বা আরও ভালো হবে যদি পুরো শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে পার্টির বিভিন্ন অংশ [সেকশন] ও ফেডারেশনের কর্মের স্বাধীনতার জরুরত রয়েছে। এই স্বাধীনতা তাদেরকে বৈপ্লবিক উদ্যোগ গড়ে তোলার এবং পরিস্থিতি সকল উপাদানকে ব্যবহার করার অনুমতি দিবে। লেনিন কর্তৃক প্রস্তাবিত অতি–কেন্দ্রিকতা একজন প্রহরীর নিষ্ফলা চেতনায় ভরপুর। এটা কোনো ইতিবাচক এবং সৃজনশীল চেতনা নয়। পার্টির কর্মকাণ্ডকে আরও ফলপ্রসূ করার চাইতে লেনিনের তাগিদ হচ্ছে পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা—আন্দোলনকে বিকশিত করার পরিবর্তে আরও সঙ্কুচিত করা ফেলা, সমন্বয় করার পরিবর্তে বেঁধে ফেলা।

    বর্তমান পরিস্থিতিতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বিগুণ বিপজ্জনক হবে। জারের শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রান্তে এটি দাঁড়িয়ে আছে। এখন এটি তীব্র সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কালে প্রবেশের সময় এসেছে, অথবা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেই ফেলেছে; যখন কিনা এটি তার প্রভাবের পরিধিকে বিস্তৃত করে তুলবে [বৈপ্লবিক সময়ে যেমন সাধারণত হয়ে থাকে] এবং জোরেশোরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে পার্টির উদ্যোগকে বেঁধে রাখার চেষ্টা, কাঁটাতার দিয়ে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখার মানেই হচ্ছে এই মুহূর্তের যে অভাবনীয় দায়িত্ব বর্তেছে সেটা পালনে অক্ষম হয়ে পড়া।

    সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আমরা যে সাধারণ ধারণা হাজির করেছি সেগুলো রুশ পার্টির জন্য মানানসই গঠনতান্ত্রিক [কনস্টিটিউশনাল] পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। চূড়ান্ত মুহূর্তে, এই ধরণের বিধিবিধান নির্ধারণ করা যেতে পারে কেবল সেই বাস্তবতায়, যার অধীনে একটি প্রদত্ত যুগে সংগঠনের কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। রাশিয়ায় এই মুহূর্তের প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে একটি বৃহৎ প্রলেতারিয়েত সংগঠন চালু করা যায়। কোনো গঠনতান্ত্রিক প্রকল্পই অভ্রান্ততা দাবি করতে পারে না। অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

    কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা থেকে আমরা মনে করি, এর স্পিরিটের জন্য প্রয়োজন, বিশেষ করে গণপার্টির শুরুতেই, আন্দোলনের সমন্বয় ও একত্রীকরণ; একগুচ্ছ নিয়মকানুনের কাছে অন্ধ আনুগত্য নয়। যদি পার্টি রাজনৈতিক গতিশীলতার গুণ ধারণ করতে পারে, পাশাপাশি নীতির প্রতি অটল থাকে এবং ঐক্য নিয়ে ভাবনা থাকে তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, পার্টির গঠনতন্ত্রে যে কোনো ধরনের ত্রুটি চর্চার মাধ্যমে সংশোধিত হয়ে যাবে। আমাদের জন্য এক টুকরো দলিল নয়, বরঞ্চ সদস্যরা সংগঠনের ভেতর যে জীবন্ত চেতনা নিয়ে আসেন সেটাই সাংগঠনিক বিভিন্ন রূপের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।

    দ্বিতীয় অধ্যায়

    এতক্ষণ আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাধারণ দৃষ্টিকোণ এবং কিছুটা হলেও রাশিয়ার অভিনব পরিস্থিতির আলোকে কেন্দ্রিকতাবাদের সমস্যাকে পর্যালোচনা করলাম। তদপুরি, লেনিন ও তার কমরেডদের বহুল প্রচারিত সামরিক অতি–কেন্দ্রিকতাবাদ মতের আকস্মিক ভিন্নতার ফসল নয়। বলা হয় যে এটা সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযানের সাথে জড়িত যা লেনিন ক্ষুদ্রতর সাংগঠনিক বিবরণের মধ্যে ধারণ করেছেন।

    লেনিন বলছেন যে, ‘সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি কার্যকরী অস্ত্র দাগা জরুরি’। তিনি বিশ্বাস করেন যে, সুবিধাবাদ বিশেষত বিকেন্দ্রীকরণ ও বিশৃঙ্খলার প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ঝোঁক থেকে আসে, কঠোর শৃঙ্খলা ও ‘আমলাতন্ত্র’ এর প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা থেকে আসে; যদিওবা এগুলো পার্টির কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন।

    লেনিন বলছেন যে, বুদ্ধিজীবীরা সোশ্যালিস্ট/সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ার পরও ব্যক্তিবাদী রয়ে যান এবং নৈরাজ্যবাদের প্রতি ঝুঁকে থাকেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল বিরোধিতা কেবল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই দেখা যায়। তিনি বলেন, খাঁটি প্রলেতারিয়েত তার শ্রেণি–প্রবৃত্তির কারণে দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর/নির্দয় শৃঙ্খলার খপ্পরে নিজেকে সঁপে দিয়ে একধরনের ইন্দ্রিয়পরায়ণ সুখানুভূতি খুঁজে পায়। তিনি লেখেন, ‘আমলাতন্ত্রবাদ বনাম গণততন্ত্রবাদ হচ্ছে বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক নীতি বনাম সুবিধাবাদীর সাংগঠনিক নীতি’। তিনি ঘোষণা করেন যে, যেসব দেশে সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্র মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয়বাদী ও স্বায়ত্তশাসনবাদী প্রবণতার মধ্যে একধরনের সংঘাত বিরাজ করছে। আইনভায় সমাজতান্ত্রিক প্রতিনিধির কতটুকু স্বাধীনতা পার্টি অনুমোদন করবে—এই প্রশ্নে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে যে সাম্প্রতিক বিতর্ক চালু আছে সে দিকে লেনিন বিশেষভাবে ইঙ্গিত দেন।৮

    লেনিন উত্থাপিত সাদৃশ্যগুলোকে পরীক্ষা করা যাক।

    প্রথমত, এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের ব্যাপারে প্রলেতারিয়েতের অনুমিত প্রতিভার গুণকীর্তন এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সাধারণ অবিশ্বাস এগুলো ‘বিপ্লবী মার্ক্সবাদী’ মানসিকতার আবশ্যক লক্ষণ নয়। এটা খুব সহজেই দেখানো সম্ভব যে, এই ধরনের যুক্তি নিজেই আসলে সুবিধাবাদের বহিঃপ্রকাশ।

    শ্রমিক আন্দোলনে খাঁটি প্রলেতারিয়েত উপাদান ও অ–প্রলেতারিয়েত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যকার বিরোধকে মতাদর্শিক বিষয় হিসাবে উত্থাপিত করা হয় নিম্নোক্ত উপায়ে: ফরাসি সিন্ডিকালিস্টদের আধা–নৈরাজ্যবাদ, যার জিগির হচ্ছে, ‘রাজনীতিবিদ থেকে সাবধান!’; ইংরেজ ট্রেডইউনিয়বাদী, ‘সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্ট্রা’দের ব্যাপারে অবিশ্বাসী; এবং আমাদের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এরপরেই রয়েছে ‘খাঁটি অর্থনীতিবাদী’, রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে রাবচায়া মিসলে৯ কিছুদিন আগে এর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, সেন্ট পিটাসবার্গ–এ প্রকাশিত হয়েছিল।

    পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির মধ্যে সুবিধাবাদ ও ‘বুদ্ধিজীবী’দের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি যোগসূত্র রয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ ও বিকেন্দ্রীকরণ প্রবণতার মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক জমিন থেকে সামাজিক প্রপঞ্চগুলোকে আলাদা করা এবং প্রপঞ্চগুলোকে বিমূর্ত নীতি হিসাবে উপস্থাপন (যেন এগুলোর একটি চূড়ান্ত ও সর্বজনীন প্রয়োগ রয়েছে) করার চাইতে মার্ক্সবাদী চিন্তার ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিপরীত আর কিছুই হতে পারে না।

    ধরে নেয়া যাক, যে কেউ বলতে পারেন, বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে উঠে আসা একটি সামাজিক উপাদান হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ আদতে প্রলেতারিয়েত থেকে দূরবর্তী থাকেন; তিনি তাঁর শ্রেণি–পরিচয়ের বোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাজতন্ত্রে যোগ দেন না, বরঞ্চ মতাদর্শিক পথকে গ্রহণের মাধ্যমে সেই বোধকে মাড়িয়ে তিনি যোগ দেন। এই কারণে তার শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতের তুলনায় বেশি সুবিধাবাদী বিভ্রান্তে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। যেহেতু শ্রেণি–সচেতন প্রলেতারিয়েতের নিজস্ব সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জনতার সাথে যোগসূত্র হারিয়ে যায়নি, সেহেতু তার তাৎক্ষণিক শ্রেণি–প্রবৃত্তি তাকে বিপ্লবী মেরুদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু সুবিধাবাদের দিকে বুদ্ধিজীবীর ঝুঁকে থাকার এই পূর্বানুমানের দৃঢ় রূপ এবং সর্বোপরি সাংগঠনিক প্রশ্নে এই প্রবণতা যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করে তা সবসময়ই প্রদত্ত সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

    জার্মান, ফরাসি ও ইতালির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে লেনিন যে প্রপঞ্চ চিহ্নিত করেছেন সেখানে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজম বা সংসদীয় রীতি হচ্ছে সেই প্রপঞ্চের নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি। পশ্চিমা সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে বিদ্যমান সকল সুবিধাবাদী প্রবণতার উর্বর জমিন হচ্ছে এই পার্লামেন্টারিজম।

    ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিতে আমরা বর্তমান সুবিধাবাদের যেসকল বিভ্রান্তির বিষয় দেখতে পাচ্ছি, যেমন: সামাজিক সংস্কার, শ্রেণি ও পার্টির সহযোগিতা, সমাজতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ বিকাশের আশা ইত্যাদির অতি–মূল্যায়ন, পার্লামেন্টারিজম কেবল এগুলোকে সমর্থনই যোগাচ্ছে না, বরঞ্চ এটা সেই জমিন তৈরি করে দিচ্ছে যেখানে এই বিভ্রান্তিগুলোকে অনুশীলন করা যায়। কারণ, এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ভেতরেই, পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে বুদ্ধিজীবীদেরকে এটি প্রলেতারিয়েত থেকে আলাদা করে ফেলে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতদের ওপরে স্থান দিয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্লামেন্টারিজম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারবাদীদের উর্বর জমিন। এই কারণেই বুর্জোয়াদের এত বেশি উচ্চাভিলাষী ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক পার্টির ব্যানারে ভিড় জমিয়েছে।

    এইসকল কারণ পশ্চিম ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অরাজকতা ও শৃঙ্খলতার অভাবের দিকে একটি নির্দিষ্ট ঝোঁকের উত্থান ঘটিয়েছে। বর্তমান সুবিধাবাদী ঢেউয়ের দ্বিতীয় নির্দিষ্ট শর্ত হচ্ছে উচ্চ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এর ফলে একটি প্রভাবশালী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংগঠনের উপস্থিতি। বুর্জোয়া–পার্লামেন্টারি প্রবণতার বিরুদ্ধে এই পার্টি বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামের দুর্গ হিসাবে কাজ করবে। যদি প্রলেতারিয়েতদের সুদৃঢ় ও সক্রিয় প্রাণভোমরাকে ভেঙে একটি নিরাকার গণ ‘ভোটারে’ পরিণত করতে হয় তাহলে এই দুর্গকে ভেঙে ফেলতে হবে এবং অকার্যকর করে তুলতে হবে। এভাবেই আধুনিক সুবিধাবাদের ‘স্বায়ত্তশানবাদী’ ও বিকেন্দ্রীয়করণের প্রবণতাগুলোর জন্ম হয়। তারা ঐতিহাসিকভাবে সু–প্রতিষ্ঠিত এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এগুলোকে ‘বুদ্ধিজীবী’র অন্তর্নিহিত অস্থিরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যেমন করে লেনিন বলছেন; বরঞ্চ এগুলোকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বুদ্ধিজীবীদের ‘মনস্তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরঞ্চ সুবিধাবাদী ‘রাজনীতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

    তদপুরি জারের রাশিয়ার পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। সাধারণত রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ কোনোভাবেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির শক্তিশালী বিকাশ অথবা বুর্জোয়া সমাজের বিভাজনের ফসল নয়, বরঞ্চ এটি রুশ সমাজের পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল।

    এটা বোধগম্য যে, রাশিয়ার যে বিদ্বৎসমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা উঠে এসেছেন সেই সমাজের এখনো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিচরিত্র গড়ে ওঠেনি, এবং পশ্চিম ইউরোপের বিদ্বৎসমাজের চাইতে কিছুদূর অব্দি এখনো শ্রেণিচ্যুত বলা যায়; অর্থাৎ, তারা সে তুলনায় এখনো কম বুর্জোয়া। এটি রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের অপরিপক্বতার সাথে যুক্ত হয়ে তত্ত্বীয় অস্থিরতা ও সুবিধাবাদী দোদুল্যমানতার বিস্তর সুযোগ তৈরি করে দেয়; যা কখনো শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়, কখনো এর একদম বিপরীতে গিয়ে সন্ত্রাসকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসাবে বিশ্বাস করে, এবং পরিশেষে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে লিবারেলিজমের পঙ্কিলতায় অথবা দার্শনিক পরিমণ্ডলে কান্টের আদর্শবাদীতার খপ্পরে পড়ে।১০

    আমাদের মতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠনহীনতার দিকে একটি নির্দিষ্ট সক্রিয় প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্য বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজমের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কেবল অভাবই নয়, বরঞ্চ এটা সংশ্লিষ্ট সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে জড়িত। আধুনিক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের যারা এই সময়ে ‘ইগোর কাল্টে’ নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং এমনকি ‘প্রভু জাতের নৈতিকতা’কে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও সংগ্রামের জগতে টেনে নিয়ে আসছেন, তারা সাধারণত বুর্জোয়া বিদ্বৎসমাজের আদর্শ প্রতিনিধি নন, বরঞ্চ তারা তাদের সামাজিক বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্য ভাবে বলা যায়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু ও বিকৃত বুর্জোয়া সমাজের ফসল, যা কিনা ইতোমধ্যে তার নিজের শ্রেণি আধিপত্যের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে এবং সঙ্গত কারণেই, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির ইউটোপিয়ান ও সুবিধাবাদী কল্পনাগুলো বরঞ্চ আত্ম–অস্বীকৃতি ও আত্ম–অননুমোদনের বিপ্রতীপ তাত্ত্বিক রূপের গ্রহণ করার দিকে ঝোঁকে। নিশ্চিতভাবে পুরনো নারদনিকদের ‘জনতার কাছে যাওয়া’১১ নামক আন্দোলন, মানে বুদ্ধিজীবীকে বাধ্যতামূলকভাবে কৃষকের ছদ্মবেশ ধারণ ছিল একটি হতাশাজনক আবিষ্কার। একইভাবে সাম্প্রতিক খাঁটি ‘অর্থনীতিবাদে’র শীষ্যরা শ্রমিকের ‘মসৃণ হাত’–এর সামনে আমাদেরকে মাথা নত করাতে চায়।

    আমরা যদি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রশ্নটিকে সরাসির ইউরোপ থেকে রাশিয়াতে আমদানি না করে খোদ রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করতে চাই তাহলে আমরা একদম ভিন্ন ফলাফল পাবো। সংগঠনের কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো, যেমন বিকেন্দ্রীকরণ, এর প্রতি প্রবল উৎসাহের জন্য সুবিধাবাদকে দায়ী করার (যেমনটি লেনিন করেছেন) মানে হলো সুবিধাবাধের অন্তর্নিহিত নির্যাসকে ভুল বোঝা। সাংগঠনিক প্রশ্নে সুবিধাবাদের কেবল একটাই নীতি থাকে: নীতির অনুপস্থিতি। এটা সবসময়ই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে পদ্ধতি নির্বাচন করে, যতক্ষণ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু যদি লেনিনের মতো করে আমরা সুবিধাবাদকে একটি প্রবণতা বা আকাঙ্ক্ষা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করি যা কিনা প্রলেতারিয়েতদের স্বাধীন বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামকে অসাড় করে ফেলে এবং এটাকে উচ্চাভিলাষী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের একটি হাতিয়ারে পরিণত করে, তাহলে আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে, শ্রমিক আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফলাফল বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নয়, বরঞ্চ দৃঢ় কেন্দ্রিকতাবাদের মাধ্যমেই কায়েম হয়ে যায়। কঠোর কেন্দ্রিকরণের মাধ্যমেই একটি নব–বিকশিত ও অপরিষ্ফুটিত প্রলেতারিয়েত আন্দোলন একটি কেন্দ্রীয় কমিটির বুদ্ধিজীবী নেতাদের হাতের মুঠোয় চলে যায়।

    জার্মানিতেও আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, সচেতন প্রলেতারিয়েতদের একটি শক্তিশালী নিউক্লিয়াস এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশল হাজির হওয়ার পূর্বেই বিপরীতমুখী দুই সাংগঠনিক প্রবণতাই বিবাদে মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে রয়েছে লাসালের জেনারেল জার্মান ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কর্তৃক প্রচারিত উগ্র কেন্দ্রিকতাবাদ, এবং অন্যদিকে রয়েছে আইজেনাখার কর্তৃক প্রচারিত ‘স্বায়ত্বশাসনবাদ’। আইজেনাুখারদের কৌশলগত নীতি কিছুটা দিশেহারা হওয়া সত্ত্বেও এটি জার্মানের জনগণের মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা বৃদ্ধিতে লাসালিয়ানদের তুলনায় বেশি অবদান রেখেছিল। অতি শীঘ্রই শ্রমিকরা এই পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা শুরু করেছিল এবং আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটেছিল। একইসময়ে লাসালিয়ানরা তাদের ‘স্বৈরশাসক’দের নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা উল্টো বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করেছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডিজএপেয়ার্ড
    শিল্পী: স্যাগাল
    সূত্র: ফ্রিপিক্স

    সাধারণভাবে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী উপাদান এখনো অসংগঠিত এবং খোদ আন্দোলনই দোদুল্যমান, (সংক্ষেপে, এই পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার মিল রয়েছে) এমন পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা একটি কঠোর স্বৈরাচারী কেন্দ্রিকতাবাদী সাংগঠনিক প্রবণতাকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, একটি সংসদীয় শাসনামলে এবং একটি শক্তিশালী শ্রমিক দলের মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদী প্রবণতা তখন ‘বিকেন্দ্রীকরণে’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।

    শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে বিদ্বৎসমাজের বিপজ্জনক প্রভাব সম্পর্কে লেনিনের যে ভয় সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, সংগঠন প্রশ্নে তার নিজের ধারণা রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হাজির করছে। প্রকৃতপক্ষে, বিকাশমান প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে একটি আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের পকেটে ঢুকাতে পারলে এই আন্দোলন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী একদল বুদ্ধিজীবীদের কব্জায় খুব সহজে, এবং নিশ্চিতভাবেই চলে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সংগ্রামী শ্রমিকদের একটি ‘কমিটি’র অনুগত হাতিয়ারে পরিণত করে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অর্জন করেন, তা তাদেরকে উচ্চাভিলাষী বিদ্বৎসমাজ পরিচালিত কমিটির সুবিধাবাদী ব্যবহার থেকে রক্ষা করবে।

    লেনিন আজ যাকে অলীক ছায়া বা ভূত হিসাবে দেখছেন কাল তা সহজেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।

    আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে রাশিয়ার আশু বিপ্লব একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হতে যাচ্ছে, কোনো সর্বহারা বিপ্লব নয়। এটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের সকল পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন রুশ বুদ্ধিজীবীরা দ্রুতই বুর্জোয়া মতাদর্শে ডুব দিবে। যদি বর্তমানে রুশ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্রেসিই প্রধান ধারা হয়ে থাকে, তাহলে বুর্জোয়া বিপ্লবের পরপরই, সর্বোপরি এর বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে সংসদীয় হেজেমনির জন্য স্তম্ভমূল বানাতে চাইবে। স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড, স্বাধীন উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাধারী অংশ যত কম হবে, তত বেশি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক জবরদস্তির শিকার হবে, নতুন রাশিয়ার বুর্জোয়া বক্তৃতাবাজ নেতাদের খেলা তত সহজ হবে, এবং আজকের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক শ্রমিকদের ফসল তত বেশি বুর্জোয়াদের মাচায় উঠবে।

    সর্বোপরি, অতি–কেন্দ্রিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মূল অভিমুখ, অর্থাৎ সাংগঠনিক অবস্থা বা পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা–উপধারা দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদের হাত থেকে রক্ষা করার ধারণাটি, আসলে মিথ্যা। ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মাঝেও সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এলিয়েন বা বিজাতীয় উপাদান হিসাবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেন এটা কেবল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উপাদানের সাথে বাইরে থেকে এসেছে। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ধারা–উপাধারা এই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না। অর্থাৎ, সুবিধাবাদী উপাদানের চাপে এটা অকার্যকর হিসাবে প্রমাণিত হবে। প্রলেতারিয়েত সংগঠনে বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে নন–প্রলেতারিয়েত উপাদানের এই অন্তঃপ্রবাহ আসলে বিভিন ধরনের সামাজিক কারণের ফলাফল, যেমন পাতি–বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক পতন, বুর্জোয়া উদারবাদের দেউলিয়াপনা এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অবক্ষয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে লিখিত ফর্মুলা দিয়ে এই প্রবাহকে আটকানোর আশা করা বোকামিই। কয়েকটি অনুচ্ছেদ, বা বিধিবিধানের ম্যানুয়াল কেবল একটি ছোট উপদল বা গোপন (প্রাইভেট) চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ইতিহাসের প্রবাহ সবসময় এই অনুচ্ছেদকে মাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, বুর্জোয়া সমাজের ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া উপাদানগুলোকে ঠেকানোর মানে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করা—এও সত্য নয়। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি সর্বদাই দাবি করে এসেছে যে, এটি কেবল প্রলেতারিয়েতদের শ্রেণি স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে না, বরঞ্চ সমগ্র সমসাময়িক সমাজের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। বুর্জোয়া আধিপত্যের জুলুমের শিকার সবার স্বার্থকে এটা তুলে ধরে। এটাকে নিছক এই অর্থে বোঝা যাবে না যে, এইসমস্ত স্বার্থ আদর্শস্বরূপ সোশ্যালিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়াতেই এই ধারণাটি বাস্তবে হাজির হবে, যেখানে কিনা রাজনৈতিক পার্টি হিসাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের সকল অসন্তুষ্ট উপাদানগুলোর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। যার ফলে এটি গুটিকয়েক আধিপত্যকামী বুর্জোয়াদের পার্টি হওয়ার বিপরীতে জনতার পার্টি হয়ে উঠবে। এ জন্য জানতে হবে কীভাবে এই বিচিত্র সমষ্টির যন্ত্রণা, ক্রোধ ও আশাকে শ্রমিক শ্রেণির চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা যাবে। বিদ্যমান সমাজের বিরুদ্ধে অ–প্রলেতারিয়েতের বিক্ষোভকে প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সাথে একত্রে আবদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ, আগত উপাদানগুলোকে একীভূত করতে হবে। এটা কেবল তখনই সম্ভব যদি সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েত নিউক্লিয়াসের উপস্থিতি থাকে (যেমন এখন পর্যন্ত জার্মানি) যারা কিনা শ্রেণিচ্যুত ও পাতি–বুর্জোয়া উপাদানগুলোকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণের নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং দলীয় বিধি অনুসারে গঠিত কঠিন শৃঙ্খলা সুবিধাবাদের বিপদের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর সুরক্ষা হতে পারে। এভাবেই ফ্রান্সের বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন জ্যোরাসি১২ বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করেছিল। সেদিকে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির গঠনতন্ত্রের সংশোধন একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হবে। কিন্তু এমনকি এক্ষেত্রে কেবল দলীয় গঠনতন্ত্র বা বিধিকে সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার ভাবা উচিৎ নয়, বরঞ্চ এটাকে পার্টির মধ্যে বিদ্যমান বৈপ্লবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রলেতারিয়েত কর্তৃত্বমূলক প্রভাব প্রয়োগের একটি বাহ্যিক বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তিমূলক হাতিয়ার হিসাবে দেখা উচিৎ। যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব থাকে তাহলে সবচেয়ে ভয়ানক কাগুজে অনুমোদনও বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

    তদপুরি আমরা উল্লেখ করেছি যে, কেবল বুর্জোয়া উপাদানের অনুপ্রবেশই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবাহের একমাত্র উৎস নয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে খোদ সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের চরিত্র ও এর মধ্যে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য। সর্বমুক্তির দিকে প্রলেতারিয়েতদের আন্তর্জাতিক লড়াই বা বিজয়ের দিকে প্রলেতারিয়েতদের ঐতিহাসিক অগ্রগতি একটি অভূতপূর্ব প্রক্রিয়া। কারণ ইতিহাসের প্রথমবারের মতো জনগণ [পিপল] সচেতনভাবে নিজেদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, এবং সমস্ত শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু এই ইচ্ছা কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থা বা সমাজের উর্ধ্বে উঠে বা ছাড়িয়ে গিয়ে সিদ্ধ হতে পারে। তদপুরি অন্যদিকে, এই জনতা তাদের এই ইচ্ছাকে গঠিত বা বিকশিত করতে পারে কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে, অর্থাৎ কেবল বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই (অর্থাৎ, পুঁজিবাদী সমাজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে)। একদিকে রয়েছে জনতা [মাস] অন্যদিকে রয়েছে এর ঐতিহাসিক লক্ষ্য যা কিনা বিদ্যমান সমাজের বাইরে অবস্থিত। একদিকে রয়েছে দৈনন্দিন সংগ্রাম, অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বিপ্লব। এই দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের [সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক আন্দোলন] বিকাশ ঘটছে বা ঘটে। এই পথচলায় দুটো বিপদকে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করেই যেতে হয়, একদিকে রয়েছে গণচরিত্রের ক্ষতি, অন্যদিকে রয়েছে এর লক্ষ্যে পরিত্যাগ। একদিকে রয়েছে একটি উপদল বা সম্প্রদায়ের দশায় পুনঃপতিত হওয়ার বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে একটি বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হওয়ার বিপদ।

    এই কারণেই এটা চিন্তা করা অনৈতিহাসিক ভ্রান্তি যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক কৌশল পূর্ণরূপে সবার জন্য নির্ধারণ করা যাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তি থেকে একেবারেই মুক্ত করা সম্ভব। অবশ্যই, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব আমাদেরকে সুবিধাবাদী সাধারণ প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার সরবরাহ করে। কিন্তু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি গণ–আন্দোলন এবং এর বিপদগুলো ব্যক্তির মনন থেকে উদ্ভূত না হয়ে বরঞ্চ সামাজিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত হয়, ফলে আগ থেকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না। যখন এগুলো বাস্তবে মূর্ত আকার ধারণ কবে কেবল তখনই, খোদ আন্দোলনের মাধ্যমেই এটাকে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে; এবং অতি অবশ্যই মার্ক্সবাদ প্রদত্ত হাতিয়ার দিয়ে, মানে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সহায়তায়। এদিক থেকে দেখলে সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিকাশের অনিবার্য পর্যায় ও ফসল বলে মনে হবে। রাশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি এখনো অবিকশিত, এবং যেখানে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক, সেখানে সুবিধাবাদ মোটাদাগে এই উৎস থেকে উৎসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের কৌশলের ক্রমাগত পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান থেকে উৎসারিত হতে পারে, সমাজতান্ত্রিক মৌলিক নীতিগুলোর ব্যতিক্রমী ও অতুলনীয় পরিস্থিতিতে বর্তমান সংগ্রামকে নিয়ে আসার প্রয়োজন থেকে উৎসারিত হতে পারে।

    যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে কোনো একটা নির্দিষ্ট সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র দিয়ে রাশিয়ার আন্দোলনে সুবিধাবাদের উত্থান এড়ানোর ধারণাটা অদ্ভুত খেয়ালিপনায় পূর্ণ। এক টুকরা কাগজ দিয়ে সুবিধাবাদকে নিবৃত্ত করার প্রয়াস প্রচণ্ড ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে, সুবিধাবাদের জন্য নয় বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যই। কারণ একটি সুস্থ জীবনের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বন্ধ করার মাধ্যমে আপনি তার লড়াই করার স্পৃহাকেই দুর্বল ও দমন করে ফেলেন। যা কিনা কেবল সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরঞ্চ বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তার লড়াইর স্পৃহাকে দুর্বল করে দেয়। উপায় উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধেই চলে যায়।

    শিল্পী: পল স্নোডেন

    রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের একটা অংশের (বা লেনিনের) এই যে অতি–উদ্বিগ্নতা, অর্থাৎ একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন শ্রমিক আন্দোলনকে কোনো ধরনের ভুল–ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য একটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আমরা সেই একই সাবজেক্টিভিজমের আলামত দেখতে পাচ্ছি, যা কিনা রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার জগতে ইতোমধ্যে একের অধিক প্রতারণা করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক রাশিয়ার ইতিহাসে শ্রদ্ধেয় মানব ‘অহং’কে যে অদ্ভুত ডিগবাজিগুলো করতে হয়েছে তা আগ্রহোদ্দীপক। রুশ স্বৈরাচার কর্তৃক একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়ে এই ‘অহং’ নিজেকে, নিজস্ব চিন্তার পদ্ধতিতে, সিংহাসনে বসিয়ে এবং অস্তিত্বহীন ‘নারোদনায়া ভোলিয়া’র১৩ নামে ষড়যন্ত্রকারীদের একটি কমিটি হিসাবে নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসাবে ঘোষণা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ‘বিষয়’ [অবজেক্ট] শক্তিশালী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। এই কষাঘাত (knout/knot একেক স্থানে এককটা দেয়া আছে) বিজয়ী হয়েছিল, কারণ এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ‘বৈধ’ অভিব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করেছিল।

    সময়ে সময়ে আমরা দৃশ্যপটে ইতিহাসের আরও বেশি ‘বৈধসম্মত’ সন্তানকে দেখতে পেলাম, মানে রুশ শ্রমিক আন্দোলনকে। প্রথমবারের মতো একটি খাঁটি ‘পিপলস উইল’ বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ গঠনের ভিত্তি রাশিয়ার জমিনে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে আবারও রুশ বিপ্লবী ‘অহং’! মাথার উপর দাঁড়িয়ে এটা আরেকবার নিজেকে ইতিহাসের সর্বশক্তিমান পরিচালক হিসাবে ঘোষণা করছে; এইবার রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহামান্য কেন্দ্রীয় কমিটির নামে। এই তুখোড় কসরতবাজ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, আজ যে কর্তা বা সাবজেক্ট পরিচালকের ভূমিকা পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সমষ্টিগত ‘অহং’। শ্রমিক শ্রেণি তাদের ভূল করার এবং ইতিহাসের দ্বন্দ্ব শেখার অধিকার দাবি করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারি। ঐতিহাসিকভাবে, সবচেয়ে চতুর কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্রান্ততার চাইতে কোনো একটি সত্যিকারের বৈপ্লবিক আন্দোলনের ভুল বা ত্রুটিগুলো বহুগুণ উপকারী।

    টীকা:

    ১. জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৮৭৮ সালে জার্মানির রাইখস্ট্যাগে বিসমার্ক কর্তৃক উত্থাপিত সমাজতন্ত্র–বিরোধী আইনটি গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে এই আইন প্রত্যাহার করা হয়।

    ২. ইস্ক্রা হচ্ছে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি [RSDLP] কর্তৃক প্রকাশিত রুশ সংবাদপত্র। ভি আই লেনিনের তত্ত্বাবধানে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দমন পীড়নের জন্য এটি রাশিয়ার বাইরে প্রকাশ করতে হতো, এবং বিদেশে প্রকাশিত হয়ে গোপনে রাশিয়াতে প্রচার করা হতো। ১৯০৩ সালে RSDLP এর বিভাজনের পর পত্রিকাটি মেনশেভিকদের দখলে যায়।

    ৩. এখানে ১৯০৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত RSDLP এর দ্বিতীয় কংগ্রেসের কথা বলা হচ্ছে। এই কংগ্রেসেই মেনশেভিক ও বলশেভিকরা আলাদা হয়েছিল।

    ৪. লেনিনের এই গ্রন্থটি ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।

    ৫. এখানে অস্ট্রীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রীয়–হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বহুজাতিক চরিত্রের প্রতিক্রিয়ায় তারা যেভাবে একটি ফেডারেল পার্টি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে কিনা তাদের বিভিন্ন জাতির স্বায়ত্তশাসনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

    ৬. লুই অগাস্ট ব্লাঙ্কুই (১৮০৫–১৮৮১) কর্তৃক প্রচারিত বিপ্লবের ধারণাকে ব্লাংকুইজম বলা যায়। এর মতে, তুলনামূলক একটি ছোট ও খুব সঙ্ঘবদ্ধ গ্রুপ এবং গোপন ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালিত হওয়া উচিত। ক্ষমতা দখলের পর বিপ্লবীরা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্র চালু করবে। এটা মনে করে যে, রাজনৈতিক বিপ্লব আসলে একধরনের ক্যু’র মাধ্যমেই হতে হবে।

    ৭. পারভাস আলেক্সান্ডার হেলফান্ড (১৮৬৭–১৯২৪) এর ছদ্মনাম ছিল। তিনি ছিলেন রুশ বিপ্লবী; ১৮৯১ এর SPD এর সাথে সক্রিয় ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আগ পর্যন্ত তিনি লুক্সেমবার্গের সাথে কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালের পর তিনি যখন জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেন তখন রোজা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

    ৮. এস্পিডি এর সংস্কারপন্থীরা এসপিডির অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতাবাদের বিরুদ্ধে স্থানিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে যুক্তি দিতেন, তাদের সংস্কারপন্থী নীতিকে তুলে ধরার একটা উপায় হিসাবে।

    ৯. রবচায়া মিসলে (শ্রমিকদের চিন্তাধার) অর্থনীতিবাদীদের সংবাদপত্র। ১৮৯৭ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ১৬টি সংখ্যা বের হয়েছিল, ৩ থেকে ১১ সংখ্যা এবং ১৬তম সংখ্যা বের হয়েছিল বার্লিন থেকে, অন্যান্য সংখ্যা বেরিয়েছিল সেন্ট পিটাসবার্গ থেকে। – তথ্যসূত্র: ভি আই লেনিন, কী করিতে হইবে, পৃষ্ঠা. ১৮৭ [ফুটনোট]

    ১০. ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক্যাল ফিলোসফির উল্লেখ; রোজা তাঁর লেখাপত্রে ধ্রুপদী দার্শনিকদের কথা যে অল্প কয়বার উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে এটা অন্যতম। এসপিডির কয়েকজন সংস্কারপন্থী নেতা কান্টবাদী ছিলেন। – সম্পাদক, রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার

    ১১. ‘জনতার কাছে যাওয়া’ ছিল ১৮৭০–১৮৮০ সালের দিককার রুশ পপুলিস্ট বিদ্বৎসমাজের একটি শ্লোগান।

    ১২. জ্যা জ্যোরাসি (১৮৫৪–১৯১৪) একজন সংস্কারপন্থী ফরাসি সমাজতন্ত্রী নেতা, তিনি L Humanite নামক পত্রিকা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। লুক্সেমবার্গ অনেকবার তার সাথে বিতর্ক করেন। কিন্তু তার উচ্চকিত প্রশংসা করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের বিরোধীতা করার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন।

    ১৩. নারোদনায়া ভোলিয়া ১৮৭৯ এর আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল রুশ পপুলিস্ট সংগঠন, বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের চর্চা করতো। ১৮৮১ সালের মার্চে এই দলের সদস্যরা জার আলেক্সান্ডার দ্বিতীয়কে হত্যা করে। এরপরে রুশ সরকার এই গোষ্ঠীকে মারাত্মক দমন পীড়নের মাধ্যমে নিধন করেছিল।

  • নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    নোম চমস্কির সাক্ষাৎকার।। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মহাপ্রলয়ের কালকে ত্বরান্বিত করেছে

    • অনুবাদ: ইমন রায় 

    অনুবাদকের নোট: নোম চমস্কি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণবুদ্ধিজীবী ও আধুনিক ভাষাতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বর্তমানে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লরিয়েট অধ্যাপক এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভাষাতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের নাম কনসিক্যুয়েন্সেস অফ ক্যাপিটালিজম: ম্যানুফ্যাকচারিং ডিসকন্টেন্টস এন্ড রেজিস্ট্যান্স। নোম চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সি.জে. পলিক্রনিউ। তিনি একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, লেখক ও সাংবাদিক যিনি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করেছেন ও পড়িয়েছেন। বর্তমানে তাঁর গবেষণার আগ্রহের মধ্যে রয়েছে মার্কিন রাজনীতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক একীভবন, বিশ্বায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অর্থনীতি, এবং নব্য–উদারনৈতিকতার আর্থ–রাজনৈতিক প্রকল্পের বিনির্মাণ। তিনি ট্রুথ আউট এর একজন নিয়মিত প্রদায়কের পাশাপাশি ট্রুথ আউট এর পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রকল্পের একজন সদস্য। মূল লেখাটি ট্রুথআউটে Noam Chomsky: Russia’s War Against Ukraine Has Accelerated the Doomsday Clock শিরোনামে ৩০শে মার্চ ২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

    নোম চমস্কি; শিল্পী: সার্জ মেজেট; সূত্র: আর্টমেজেউর

    মূল সাক্ষাৎকার  

    ইউক্রেইন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার সামরিক কৌশল ও ভ্লাদিমির পুতিনের ভূ–কৌশলগত লক্ষ্যসমূহ নিয়ে অনেক জল্পনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, পুতিন কী চান সেটা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, এবং ইউক্রেইনীয় প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনেস্কির বারংবার মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো, যদিও এটি শীঘ্রই পরিবর্তিত হতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সম্ভাব্য স্পষ্টতম ইঙ্গিত দিয়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে তখন ইউক্রেইনের ধ্বংস অদ্যবধি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) তার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং ওয়াশিংটন থেকে এমন কোনো লক্ষণ নেই যে ইউক্রেইনে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাইডেন প্রশাসন গঠনমূলক কূটনীতিতে লিপ্ত হতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কার্যত রাশিয়ান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহার করে আগুনে ঘি ঢালছেন।

    নিচের সাক্ষাৎকারে বিশ্বখ্যাত স্কলার ও নেতৃস্থানীয় ভিন্নমতাবলম্বী নোম চমস্কি ইউক্রেইন যুদ্ধের সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনীয়তাকে আমাদের নিকট সুচারুভাবে উন্মোচন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সম্পর্কে তাঁর কিছু অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টির মতাদর্শিক জগতের পুনর্বিন্যাস, রাজনৈতিক উত্তাপ ও বই নিষিদ্ধকরণ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: নোম, ইউক্রেইনের যুদ্ধের সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কতিপয় ইউক্রেইনীয় কর্মকর্তার মতে, দেশটিকে “উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া”র মত ভাগ করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া তার কৌশল পরিবর্তন করছে। এর মধ্যে ন্যাটো তার পূর্ব ফ্রন্টে শক্তি বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেন রাশিয়ার বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও স্লোভেনিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউক্রেইনে শান্তির বিষয়ে ওয়াশিংটন কেবল নীরবই থাকছে না, বরং আমরা শুনেছি বাইডেন তাঁর সাম্প্রতিক পোল্যান্ড সফরে পুতিনের বিরুদ্ধে অনেকটা বিষাক্ত তেজোদ্দীপ্ত কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছেন। এর ফলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন জ্বালাময়ী ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করতে সচেষ্ট হয়েছেন কারণ তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। এমনকি আমেরিকান অভিজ্ঞ কূটনৈতিক রিচার্ড হাস বলেছেন যে বাইডেনের কথাগুলো একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। সমস্ত একাগ্রতার সাথে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবতে পারে যে ভীতিপ্রদর্শন ও নিরন্তর শক্তির ব্যবহার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে?

    নোম চমস্কি: কয়েকটি প্রশ্ন আছে, সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ, আমি এখানে যা বলার চেষ্টা করতে পারি তার চেয়েও বেশি আলোচনার যোগ্য। আমি মোটামুটি ক্রমানুসারে বলবো।

    চলমান সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দুটো গল্প আছে। পরিচিত গল্পটি দিয়েছেন ইউক্রেইনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল কিরিলো বুদানভ : ইউক্রেইনীয় সরকার উৎখাতের জন্য রাশিয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তাই রাশিয়া এখন একটি “কোরিয়ান দৃশ্যপট” পরিকল্পনা করার মাধ্যমে দেশটির দক্ষিণে ও পূর্বে, ডনবাস অঞ্চলে ও পূর্বাঞ্চলীয় আজভ সমুদ্র উপকূলের দিকে পিছু হটছে।

    রাশিয়ান ফেডারেশনের জেনারেল স্টাফ অফ দ্য আর্মড ফোর্সেস–এর প্রধান পরিচালন অধিদপ্তরের প্রধান কর্নেল জেনারেল সের্গেই রুদস্কয় একদম ভিন্ন একটি গল্প বলেছেন (২৫ মার্চ পর্যন্ত): ইরাকে জর্জ ডব্লিউ বুশের “মিশন সম্পন্ন” হওয়ার অনুরূপ, যদিও নাটকীয় কৃত্রিমতা নেই:

    বিগত আট বছর ধরে ইউক্রেইনীয় নাৎসিদের গণহত্যামূলক আক্রমণ থেকে ডনবাস পিপলস রিপাবলিককে রক্ষা করাই হচ্ছে “বিশেষ সামরিক অভিযান” এর মূল লক্ষ্য। ইউক্রেইন যেহেতু কূটনীতি প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই অসামরিকদের রেহাই দিয়ে খুব সতর্কতার সহিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে ইউক্রেইনের “বিসামরিকীকরণ ও বিনাৎসিকরণ” এর জন্য অভিযানটি বিস্তৃত করা প্রয়োজনীয় ছিলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাযথভাবে দক্ষতার সহিত প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে। যা অবশিষ্ট আছে তা হলো “ডনবাসের পূর্ণ মুক্তি।”

    দুটো গল্প, একই সমাপ্তি, যা আমি মনে করি নিখুঁত।

    পশ্চিম, বেশ স্বাভাবিকভাবে, প্রথম গল্পটি গ্রহণ করেছে। এটি সেই গল্পটি গ্রহণ করেছে যা আমাদের বলে যে রাশিয়ানরা তাদের সীমান্ত থেকে কয়েক মাইলের মধ্যে শহরগুলো দখল করতে সক্ষম নয়, যেগুলো বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসারে একটি নাগরিক সৈন্যবাহিনী সমর্থিত সীমিত সামরিক শক্তি দ্বারা রক্ষিত।

    অথবা পশ্চিম কি এই গল্পটি গ্রহণ করে? এর কার্যকলাপ ইঙ্গিত দেয় যে এটি জেনারেল রুদস্কয়ের সংস্করণটি বেশি পছন্দ করে—একটি অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষমতাধর ও সুদক্ষ রাশিয়ান সামরিক যন্ত্র ইউক্রেইনে তার লক্ষ্যসমূহ তাড়াতাড়ি অর্জন করার মাধ্যমে হয়ত দক্ষতার সহিত ন্যাটোকে গ্রাস করে এখন ইউরোপকে আক্রান্ত করার জন্য এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। যদি তাই হয়, তাহলে এই দানবীয় শক্তির আসন্ন আক্রমণকে ঠেকানোর করার জন্য ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে শক্তিবৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

    আরেকটি ভাবনা নিজেই প্রকাশিত হয়—এটা কি হতে পারে যে ইউরোপকে ওয়াশিংটনের খপ্পরে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে পুতিন তাকে যে দারুণ উপহার দিয়েছেন সেটাকে ওয়াশিংটন আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, এবং সেজন্য পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তার জানামতে আক্রমণের হুমকি না থাকার পরেও সেখানে শক্তিবৃদ্ধি করতে ইচ্ছুক?

    আমরা পূর্বে যে যৌথ বিবৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি সে অবস্থান থেকে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন সরে আসেনি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার বিবৃতির মাধ্যমে ওয়াশিংটন ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে ইউক্রেইনকে স্বাগত জানিয়েছে এবং “ন্যাটোর বর্ধিত সুবিধাদির একটি অংশীদার হিসেবে ইউক্রেইনের পদমর্যাদা টিকিয়ে রাখার জন্য বলিষ্ঠ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন কর্মসূচি”র পাশাপাশি ইউক্রেইনকে উন্নত এন্টি–ট্যাংক ও অন্যান্য অস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে “মার্কিন–ইউক্রেইন কৌশলগত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি ভিত্তি রচনা করে এমন একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামো চূড়ান্ত করেছে।”

    পুতিন কেন ইউক্রেইন আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুঁজে বের করার জন্য তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত মনের গভীর নিভৃতে পৌঁছানোর ব্যাপারে অনেক বিদগ্ধ আলোচনা রয়েছে। অপরাধমূলক আগ্রাসনের দিকে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি ইউক্রেইনের সীমান্তে বাৎসরিক সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনা করার জন্য তাঁর নিরুত্তর আহ্বানের বিষয়ে কিছুটা মনোযোগ আকর্ষণ করা। এটি অনেক উচ্চপদস্থ মার্কিন কূটনৈতিক, সিআইএ পরিচালক, এবং আরও অনেকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত যারা এসমস্ত উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করার বোকামি সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছেন।

    শিল্পী: এলেক্স উইলিয়ামসন; সূত্র: নিউস্টেটসম্যান

    ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুতিনের সিদ্ধান্তকে বোঝার সঠিক পন্থা হচ্ছে সম্ভবত পুতিনের মনের অনুসন্ধান করা। হয়ত আরেকটি সম্ভাবনা আছে। হয়ত ২৫ বছর আগে বরিস ইয়েলেৎসিন থেকে শুরু করে তিনি ও অন্যান্য রাশিয়ান নেতৃবৃন্দ ইউক্রেইনের নিরপেক্ষতার বিষয়ে যা বলে আসছিলেন সেটাই বুঝিয়েছেন; এবং সম্ভবত, অত্যন্ত উস্কানিমূলক যৌথ বিবৃতিটি যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাবিয়ে রাখা হয়েছে, পুতিন হয়ত এ বিষয়ে ভেবে থাকবেন এবং তাই সরাসরি সংঘর্ষের যে প্রচেষ্টাকে প্রতি বছর উপেক্ষিত রাখা হয় সেটিকে ত্বরান্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    হয়ত, এটি একটি সম্ভাবনা।

    সংবাদপত্রে বলা হয়েছে, “যদি রাশিয়া সেনা প্রত্যাহার করে নেয় এবং কিয়েভ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পায় তাহলে ইউক্রেইন নিরপেক্ষতা ঘোষণা করতে, ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছা ত্যাগ করতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিকশিত না করার জন্য প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত।”

    এটি একটি প্রশ্নকে তুলে ধরে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে ও গত সেপ্টেম্বরের নীতিমালা বিবৃতির অবস্থানকে বজায় রাখার মাধ্যমে এসব প্রচেষ্টায় বাগড়া দেওয়ার পরিবর্তে নমনীয় হবে, এবং ইউক্রেইনকে অধিকতর দুর্দশা থেকে রক্ষা করার চেষ্টাকে ত্বরান্বিত করতে যাবে?

    পুতিনকে পালাবার কোনো পথ না দিয়ে, তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বাইডেনের অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্যের দিকে এই প্রশ্নটি আমাদের নিয়ে যায়। বাইডেনের বক্তব্য কার্যত একটি যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে স্বীকৃত যার পরিণতি হতে পারতো ভয়াবহ, বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই আতঙ্ক তাঁর কর্মকর্তাদের মধ্যেও কম নয়, যারা ত্বরিত হয়ে বিশ্বকে আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি যা বলেছেন তাঁর কথায় সেটা বুঝায় না। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুগুলোতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের অবস্থানকে বিচার করলে এ ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া মুশকিল।

    বাইডেন তখন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে তাঁর বক্তব্য “নৈতিক ক্ষোভের” একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, রাশিয়াকে যে “কসাই” শাসন করে তাঁর অপরাধের প্রতি বিতৃষ্ণা। অন্য কোনো চলমান পরিস্থিতি আছে যা নৈতিক ক্ষোভকে অনুপ্রাণিত করতে পারে?

    ঘটনাগুলো ভেবে দেখা কঠিন কিছু নয়। সবচেয়ে ভয়াবহগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান। আক্ষরিকভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারের সম্মুখীন, একটি সুবিশাল ট্র্যাজেডি। বাজারে খাবার আছে, কিন্তু ব্যাংকে যাওয়ার সুযোগ না থাকার কারণে যাদের অল্প টাকা আছে তাদের সন্তানদের অনাহারে দেখতে হয়।

    কেন? একটি প্রধান কারণ হচ্ছে ওয়াশিংটনের ২০ বছরের যুদ্ধকে প্রতিরোধ করার সাহস দেখানোর কারণে দরিদ্র আফগানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নিউ ইয়র্কের ব্যাংকগুলোতে রক্ষিত আফগানিস্তানের তহবিলগুলো মুক্ত করতে ওয়াশিংটন অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সরকারি অজুহাত আরও বেশি লজ্জাজনকঃ আমেরিকানরা ৯/১১ এর অপরাধের ক্ষতিপূরণ চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই অনাহারী আফগানদের থেকে তহবিলগুলো আটকে রাখতে হবে, যার জন্য আফগানরা দায়ী নয়। মনে রাখুন তালেবানরা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিয়েছিলো, যার অর্থ দাঁড়ায় আল–কায়েদা সন্দেহভাজনদের ফিরিয়ে দেওয়া। (মার্কিন আক্রমণের সময়, আদতে তার অনেক পরে, যেটা এফবিআই নিশ্চিত করেছিলো, তারা কেবল সন্দেহভাজন ছিলো) তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘোষণার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছে যে, “যুক্তরাষ্ট্র আত্মসমর্পণের বিষয়ে দরকষাকষি করতে ইচ্ছুক নয়।” ডিফেন্স সেক্রেটারি ডোনাল্ড রামসফেল্ডের কথাটি জর্জ ডব্লিউ বুশের দ্বারা প্রতিধ্বনিত হয়েছিলো।

    এই চলমান অপরাধের ব্যাপারে যদি কোনো নৈতিক ক্ষোভ থাকে, সেটা শনাক্ত করা কঠিন। এটি একমাত্র ঘটনা নয়। কোনো শিক্ষণীয় কিছু আছে? হয়ত আছে, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট সাধারণ মনে হলেও এ বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার।

    ইউক্রেইনে রাশিয়ার অপরাধের ব্যাপারে নৈতিক ক্ষোভটি বোধগম্য এবং ন্যায়সঙ্গত। নৈতিক ক্ষোভের চরম নির্বাচনও বোধগম্য কিন্তু ন্যায়সঙ্গত নয়। এটি অনেক দেখা যায় বলে বোধগম্য।

    শ্রেষ্ঠ নিয়মের চেয়ে আরও বেশি প্রাথমিক মৌলিক নীতির কথা চিন্তা করা দুষ্কর—ইহুদী ঐতিহ্যে নিয়মটি হচ্ছে, “তোমার কাছে যা ঘৃণিত তা অন্যদের সাথে করো না।”

    এমন কোনো নিয়ম নেই যা এর চেয়ে বেশি মৌলিক, কিংবা নিয়মিতভাবে এর চেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়। একটি অনুসিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তা সত্য : উদ্যম ও মনোযোগ সেখানেই কেন্দ্রীভূত করা উচিত যেখানে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালো করতে পারি। আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে সাধারণত এর অর্থ হচ্ছে নিজ রাষ্ট্রের কাজে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা, বিশেষত কম–বেশি গণতান্ত্রিক সমাজগুলোতে যেখানে ফলাফল নির্ণয়ে নাগরিকদের কিছু ভূমিকা থাকে। আমরা মিয়ানমারের [বার্মা নামেও পরিচিত] অপরাধকে ঘৃণা করতে পারি, কিন্তু মিয়ানমারের ভেতরে কষ্ট ও দুর্ভোগ দূর করার জন্য আমরা বেশি কিছু করতে পারি না। যেসকল দুর্দশাগ্রস্ত ভুক্তভোগী পালিয়ে এসেছেন কিংবা উৎখাত হয়েছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা, তাদেরকে সাহায্য করার জন্য অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু আমরা করবো না।

    পর্যবেক্ষণটিকে সর্বজনীন করা হয়। নীতিটি প্রকৃতপক্ষে মৌলিক। প্রকৃত চর্চাটি নীতির সাথে সঙ্গতি রাখতে ব্যর্থ হয়, এটা বললে খুবই অবমূল্যায়ন হবে। 

    ওয়ার; কার্টুনিস্ট: ফ্রাগিস্কস; সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন নয় যে আমরা নীতিটি বুঝি না এবং সেটাকে সম্মান করি না। আমরা সত্যিকারের অনুরাগের সহিত তা করি যখন আনুষ্ঠানিক প্রতিপক্ষদের সমাজে এই নীতিটি পরিলক্ষিত হয়ঃ যেসকল রাশিয়ান সাহসিকতার সাথে কঠোর রাশিয়ান স্বৈরতন্ত্রকে অস্বীকার করছেন ও রাশিয়ান আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন তাঁদের প্রতি আমরা কুর্নিশ জানাই। এর একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা সবসময়ই সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বীদের গভীরভাবে সম্মানিত করেছি যারা তাঁদের নিজ রাষ্ট্রের অপরাধগুলোর নিন্দা জানিয়েছেন এবং এমনকি অন্যরা যখন প্রধান মার্কিন অপরাধগুলোকে প্রশংসিত করতেন, তাদের নিয়েও কথা বলতে একদমই কুণ্ঠিত হতেন না। চীনা ও ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও তা–ই। যখনই কেবল আমাদের ওপর নীতিটি প্রযোজ্য হয় তখন এটি একদমই অনুশীলন করা হয় না।

    ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ হচ্ছে আমাদের অনেক নাটকীয় নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। একে একটি “কৌশলগত সাংঘাতিক ভুল” (বারাক ওবামার মতে) হিসেবে সমালোচনা করা যেতে পারে এবং এটি যা ছিলো সে হিসেবে নয়ঃ অপ্ররোচিত ও খুনে আগ্রাসন, ন্যুরেমবার্গের দণ্ডাদেশ অনুসারে “সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ।”

    সে অনুযায়ী নৈতিক ক্ষোভের নাটকীয় নির্বাচনটি বোধগম্য এবং সেটি আরেকটি ক্ষোভ। অপরাধকে লঘু করার দুর্বল প্রয়াস হিসেবে আমরা আরও বলতে পারি যে এটি মার্কিন আবিষ্কার নয়। আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা, ব্রিটেন সহকারে, ভিন্ন কিছু ছিলেন না; তর্কসাপেক্ষে আরও খারাপ ছিলেন, যদিও শতাব্দীব্যাপী জঘন্য আচরণের পর এখন দায়স্বীকারের সূচনা হয়েছে।

    পরবর্তী প্রশ্নের দিকে গেলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি কখনো ভাবে যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসন করা যেতে পারে? কোনো সন্দেহ নেই। দৃষ্টান্ত রয়েছে যেগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার। আমরা চাইলে আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ব্যাপারে সেগুলো থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি।

    ঠিক এই মূহুর্তে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তকে উদযাপন করার জন্য আমাদের সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে—ইসরায়েল ও চার আরব স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে চলমান “নেগেভ সম্মেলন।” এই ঐতিহাসিক সভাতে ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি সেক্রেটারি অফ স্টেট অ্যান্থনি ব্লিংকেনের মতে, এটি “এই অঞ্চলে শান্তি ও সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনাকে বর্ধিত করবে।”

    সম্মেলনটি আব্রাহাম চুক্তির ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথের মধ্যে থাকা সর্বাধিক নিষ্ঠুর ও সহিংস রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করেছে। চুক্তিটি ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও মরক্কোর মধ্যকার মৌন সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকতা দিয়েছে, যেখানে সৌদি আরব তার মুখাপেক্ষী বাহরাইন একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে অন্তর্নিহিতভাবে উপস্থিত ছিলো। সম্মেলনে মিশর তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো, যেটি এখন প্রায় ৬০,০০০ রাজনৈতিক বন্দী ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তার কুৎসিত ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য একনায়কতন্ত্রের অধীনে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ইসরায়েলের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার সবচেয়ে বড় গ্রাহক হচ্ছে মিশর। সম্প্রতি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বর্ণবাদী রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া শীর্ষস্থানীয় গ্রাহকের জঘন্য রেকর্ড পর্যালোচনা করার দরকার নেই।

    বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানবিক সংকট হিসেবে জাতিসংঘ যাকে আখ্যা দিয়েছে, সেই ইয়েমেনের জন্য প্রাথমিক দায়ের ভাগীদার হচ্ছে ইউএই ও সৌদি আরব। গত বছর সরকারি হিসেবে মৃত্যু সংখ্যা তিন লাখ সত্তর হাজারে পৌঁছেছে। আসল সংখ্যা কেউ জানে না। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত একমাত্র বন্দরটির ওপর সৌদি আরব তার অবরোধ জোরদার করেছে। জাতিসংঘ চরম সতর্কবার্তা প্রচার করছে, লক্ষ লক্ষ শিশুর আসন্ন অনাহারের ঝুঁকির কথা বলছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা সাধারণ সতর্কবার্তার সাথে গলা মিলিয়েছেন। ব্রুকিং ইনস্টিটিউশনের ব্রুস রিডেলের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য, যিনি চার জন প্রেসিডেন্টের আমলে মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএ–এর সাবেক শীর্ষ বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, সৌদির “আক্রমণাত্মক কাজকে” একটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, খুচরা যন্ত্রাংশ ছাড়া সৌদি ও আমিরাতি বিমান বাহিনী কাজ চালাতে পারে না। অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সাথে ব্রিটেন এই অপরাধে অংশ নিচ্ছে, তবে নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগে মরক্কোর একনায়কতন্ত্রকেও স্বাগত জানানো হয়েছিলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনকি তাঁর ক্ষমতার শেষ দিনগুলোতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিরুদ্ধে গিয়ে মরক্কো কর্তৃক পশ্চিম সাহারার অন্তর্ভুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন—যা ঘটনাক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপূরণীয় সম্পদ পটাশিয়ামের ওপর মরক্কোর কার্যত একাধিপত্যকে জোরদার করেছে, যা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন।

    মরক্কোর অপরাধমূলক অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন দেওয়াকে আশ্চর্যজনক হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। এটি ইসরায়েল কর্তৃক গোলান উপত্যকা এবং বিশালাকারে বিস্তৃত বৃহৎ জেরুজালেমের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে অনুসরণ করেছে, উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিষদের আদেশগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই চমৎকার বিচ্ছিন্নতা, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই উপভোগ করে, তার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ট্রাম্পের সমর্থনটি গৃহীত হয়েছিলো, যেমনটা ৬০ বছর ধরে কিউবাকে তার অত্যাচারের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

    এগুলো কেবল “আইনের শাসন” ও সার্বভৌমত্বের অলঙ্ঘনীয়তার প্রতি অঙ্গীকারের আরও কিছু দৃষ্টান্ত, যা ওয়াশিংটন ৭০ বছর যাবত ইরান, গুয়াতেমালা, ব্রাজিল, চিলি, ইরান ও আরও অনেক দেশে দেখিয়েছে—ইউক্রেইনকে ন্যাটোতে যোগ দিতে স্বাগত জানানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন।

    আমরা এখন যে সম্মেলটিকে উদযাপন করছি সেটি আব্রাহাম চুক্তির একটি সরাসরি বিকাশ। এগুলো প্রণয়ন করার জন্য জেয়ারড কুশনারকে (হার্ভার্ডের আইনের অধ্যাপক অ্যালান দারশোভিচ কর্তৃক) নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

    সংঘাতের শান্তিপূর্ণ মীমাংসায় ওয়াশিংটন যে তার নিষ্ঠা প্রদর্শন করেছে সেটা আব্রাহাম চুক্তি ও আজকের নেগেভ সম্মেলনেই প্রথম নয়। সর্বোপরি, হেনরি কিসিঞ্জার কূটনৈতিক ইতিহাসে গণহত্যার অন্যতম অসাধারণ আহ্বানটি প্রচার করার পরপরই ভিয়েতনামে শান্তি আনয়নে তাঁর অর্জনের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেনঃ “কম্বোডিয়াতে এক ব্যাপক বোমা হামলা অভিযান। যা কিছু চলনশীল তার ওপর দিয়ে উড়তে হয়।” পরিণাম ছিলো ভয়াবহ, কিন্তু কোনো ব্যাপার নয়।

    কিসিঞ্জারের পুরস্কার মনে করিয়ে দিয়েছে যে [ইসরায়েলের লিকুদ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী] মেনাশিম বেগিনকে পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার প্রদানের জন্য একজন ইসরায়েলি পদার্থবিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “দেখুন, তাঁকে শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে, তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের পুরস্কার কেন নয়?”

    এই ঠাট্টা অনেক সময় অন্যায্য। জিমি কার্টার নিশ্চিতভাবে শান্তি পুরস্কারের যোগ্য ছিলেন যা তিনি প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর তাঁর প্রচেষ্টার জন্য লাভ করেছিলেন। পুরস্কার কমিটি অবশ্য জোর দিয়ে বলেছিলো যে ক্ষমতায় থাকার সময় প্রেসিডেন্ট কার্টারের “ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যকার ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানটি নোবেল পুরস্কারের জন্য যোগ্য হওয়ার একটি অতিশয় যথেষ্ট কৃতিত্ব ছিলো।”

    কার্টারের ১৯৭৮ সালের প্রচেষ্টাগুলো নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম নিয়তের সহিত গৃহীত হয়েছিলো। এটি পুরোপুরি সেরকম ফল লাভ করেনি। মেনাশিম বেগিন মিশরীয় সিনাইয়ে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রকল্পকে পরিত্যাগ করতে রাজি হয়েছিলেন কিন্তু চুক্তিগুলো থেকে ফিলিস্তিনিদের অধিকারসমূহকে বাদ দেওয়ার জন্য জোর করেছিলেন, এবং অ্যারিয়েল শ্যারনের পরিচালনায় সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সহায়তার সহিত ও নিরাপত্তা পরিষদের নিদের্শনাকে লঙ্ঘন করে অবৈধ স্থাপনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিলো। আর ইসরায়েলি কৌশলগত বিশ্লেষকরা দ্রুতই বের করেছিলেন যে, মিশরীয় প্রতিবন্ধকতাকে সরিয়ে ফেলার কারণে ইসরায়েল লেবাননে তার আক্রমণ বৃদ্ধি করতে পেরেছিলো, যার ফলে অবশেষে ১৯৮২ সালের মার্কিন সমর্থিত আক্রমণে প্রায় ২০,০০০ লেবানিজ ও ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং কোনো বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত ছাড়াই লেবাননের অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো।

    রাজধানী শহর বৈরুতের ওপর বোমাবর্ষণ যখন ওয়াশিংটনের জন্য আন্তর্জাতিক গ্লানি তৈরি করছিলো তখন রোনাল্ড রিগ্যান অবশেষে ইসরায়েলকে আক্রমণ বন্ধ করতে আদেশ দেন। ইসরায়েল অবশ্যই সম্মত হয়েছিলো কিন্তু তাদের ভাষায় যে “সন্ত্রাসবাদী গ্রামবাসীরা” নিষ্ঠুর দখলদারিত্বের প্রতিরোধ করেছে তাদের প্রতি ক্রমাগত অত্যাচারের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলো। এটি খিয়ামে–ও একটি জঘন্য নির্যাতন কক্ষ স্থাপন করেছিলো। হিজবুল্লাহ গেরিলা যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে শেষমেশ ইসরায়েলকে চলে যেতে বাধ্য করার পর একে একটি স্মৃতিস্থাপনা হিসেবে রাখা হয়েছিলো। ইসরায়েলি বোমা হামলার মাধ্যমে অপরাধের স্মৃতিকে ধ্বংস করার আগে আমাকে সেটা ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছিলো।

    অতএব, হ্যাঁ, কিছু ঘটনা আছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার পূর্বেকার অন্যান্য আধিপত্যকামী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মত, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেছে।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: দেশে রিপাবলিকানরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির জন্য মদদ দিচ্ছে, যদিও তাদের “মহান নেতা” চলমান ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাল মেলানোর জন্য পুতিনের ব্যাপারে তাঁর সুর পরিবর্তন করে চলেছেন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছেঃ এখনও জিওপি (রিপাবলিকান পার্টি) সদস্যদের মধ্যে, বিশেষত রাজনৈতিক বলয়ের অতি ডানপন্থীদের মধ্যে, রাশিয়া ও পুতিনের জন্য সমর্থন থাকার কারণ কী? দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত যখন ইউক্রেইনের পক্ষে তখন কোন জিনিসটি রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে রাশিয়ার বিষয়ে মতদ্বৈধতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অতি ডানপন্থীদের অনুপ্রাণিত করছে?

    নোম চমস্কি: এটি শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেইন নয়। ইউরোপ যখন হাংগেরিতে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের “সংকীর্ণ গণতন্ত্র”কে নিন্দা জানিয়েছে তখন এটি আমেরিকান ডানপন্থার অনেকাংশের প্রিয়ভাজন হয়েছে। ফক্স নিউজ ও তার প্রধান সম্প্রচারক টাকার কার্লসন এর নেতৃত্বে আছেন, কিন্তু অন্যান্য প্রখ্যাত “রক্ষণশীলরা” হাঙ্গেরির স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেওয়ার মাধ্যমে ওরবান কর্তৃক আরোপিত আদি–ফ্যাসিস্ট খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রশংসায় গা ভাসাচ্ছে।

    এসব কিছুই রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে একটি সংঘাতকে প্রতিফলিত করে—অথবা আরও সঠিকভাবে বললে, এক সময়কার একটি বৈধ রাজনৈতিক দলের যা অবশিষ্ট আছে তা এখন নব্য–ফ্যাসিবাদী উৎসের ইউরোপীয় দলগুলোর কাতারে অবস্থান করছে। ট্রাম্প যে প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছেন তার মূলে আছে ৩০ বছর আগে নিউট গ্যাংরিচ কর্তৃক পার্টির কর্তৃত্ব গ্রহণ। ট্রাম্প এখন ডানপন্থীদের কাছে পরাস্ত হচ্ছেন, খুব বেশি দিন আগেও এটা কল্পনা করা কঠিন ছিলো না। অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ তাদের সাথে ভক্তিপূর্ণ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ওরবান মডেলের দিকে ঝুঁকছেন অথবা তার চেয়েও বেশি কিছু। আমি মনে করি রাশিয়া ও ইউক্রেইনের বিষয়ে দলটির ভেতরের বিতর্ককে এই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: জিওপি আইনপ্রণেতারা বর্ণ বিষয়ক বইগুলোকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টাকে জোরদার করছেন, যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্ব ও বর্ণগত অত্যাচার ঐতিহাসিক সত্যের পরিবর্তে কারোর কল্পনাপ্রসূত উদ্ভাবন। বই নিষিদ্ধ করা ও ভোট দমন করার চেষ্টা কি সম্পর্কযুক্ত? এসব ঘটনাপ্রবাহ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ঘনীভূত হওয়ার ইঙ্গিতকে প্রতীয়মান করে?

    নোম চমস্কি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধকরণ নতুন কিছু নয় এবং গতানুগতিকভাবে বলা যায়, “ভুল” লোকদের ভোট দমন করা আপেল পাইয়ের মতই আমেরিকান। শীঘ্রই ক্ষমতা পুনঃদখল করতে উদ্যত রিপাবলিকান প্রতিষ্ঠান যখন এক ধরনের আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে তখন এগুলো শক্তি নিয়ে ফিরে আসছে। কতিপয় সাবধানী বিশ্লেষক গৃহযুদ্ধকে আঁচ করেন। অন্ততপক্ষে একটি গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকট রূপধারণ করছে। আমেরিকার অবক্ষয় নিয়ে অনেক দিন যাবত অনেক আলোচনা হচ্ছে। এর যতটুকু বাস্তব, তার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ। গভীরে তাকালে দেখা যাবে অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবক্ষয়ের বেশিরভাগই বিগত ৪০ বছরের নব্য–উদারনৈতিক কার্যক্রমের নিষ্ঠুর প্রভাব থেকে উদ্ভূত। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। হাঙ্গেরি যখন খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী আদি–ফ্যাসিবাদের দিকে যায় তখন এটি যথেষ্ট খারাপ। বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে যখন এটি ঘটে তখন এর পরিণাম হয় অশুভ।

    সি.জে. পলিক্রনিউ: যেসব দেশ ওয়াশিংটনের আদেশ মোতাবেক চলতে অস্বীকৃতি জানায় তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কৌশল। এমনকি নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা দেশগুলোতে বসবাসরত বিদগ্ধজনদের অবাঞ্ছিত হিসেবে গণ্য করা হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণপরিসরে ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠস্বরদের ব্যাপকভাবে শুনতে দেওয়ার অনুমোদন দিতে একদমই আগ্রহী নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে কিছু বলতে চান?

    নোম চমস্কি: এটি এত বড় বিষয় যে এখানে বলা যাবে না। আর এটি নৈমিত্তিক বক্তব্যের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি স্মরণ করা উচিত যে আবারও এটি নতুন কিছু নয়। আমরা সবাই স্মরণ করতে পারি যে ইরাকে ওয়াশিংটনের অপরাধমূলক হামলায় যোগ দিতে ফ্রান্সের দুর্বিনীত অস্বীকৃতির ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহান সিনেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে পরিবর্তিত করে “ফ্রিডম ফ্রাইজ” করেছিলো। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন, যিনি পাশ্চাত্য মহলের মুষ্টিমেয় কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কণ্ঠস্বরদের মধ্যে একজন, যদি কথায় ও কাজে পরিমিতির এবং কূটনৈতিক বিকল্পসমূহের খোঁজ করতে আহ্বান জানান তাহলে আমরা একই রকম কিছু দেখতে পারি। ভীতি প্রদর্শনের এই সহজ প্রবণতার ঝোঁক অনেক আগে থেকে চলে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো তখন এটি হাস্যকর গভীরতায় পৌঁছেছিলো এবং জার্মান সবকিছুই তৎক্ষণাৎ গর্হিত হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলো।

    যে রোগের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন তা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ব্যক্তিগত উদাহরণ দেই, আমি সম্প্রতি এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম যে ব্রিটেনের একটি অত্যন্ত সম্মানিত দর্শনের জার্নাল তাঁর একটি নিবন্ধ না পড়েই ফেরত দিয়েছে। তাঁকে নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছে নিবন্ধটি বিবেচনা করা যাবে না কারণ তিনি ইরানের নাগরিক, যা নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা একটি দেশ।

    নিষেধাজ্ঞাকে ইউরোপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেছে, কিন্তু বরাবরই প্রভুর কাছে নতি স্বীকার করেছে, এমনকি একজন ইরানি দার্শনিকের নিবন্ধটিও নিষিদ্ধ করেছে। ক্ষমতার প্রতি এই নতি স্বীকারকে জোরদার করাই হচ্ছে ওয়াশিংটনকে দেওয়া পুতিনের সেরা উপহার।

    আমার কিছু নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি এখানে অনেক উদাহরণ যোগ করতে পারি, কিন্তু বিদ্বেষ যে এর চেয়েও বেশি দূর যেতে পারে সেটা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

    আমরা বিপজ্জনক সময়ে বাস করি। আমরা হয়ত স্মরণ করতে পারি মহাপ্রলয়ের ঘড়িটি ট্রাম্পের আমলে মিনিট ত্যাগ করে সেকেন্ডে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং বর্তমানে মধ্যরাত—সমাপ্তি—থেকে ১০০ সেকেন্ড আগে স্থির করা হয়েছে। যেসকল বিশ্লেষক ঘড়িটিকে স্থির করেছেন তারা তিনটি কারণ দেখিয়েছেন—পারমাণবিক যুদ্ধ, পরিবেশগত ধ্বংস, এবং গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসরের পতন। এগুলো এই আশাকে ক্ষুণ্ণ করে যে অবগত ও জাগ্রত নাগরিকরা তাঁদের সরকারকে দুর্যোগের এই দ্বৈত প্রতিযোগিতাকে অতিক্রম করতে বাধ্য করবে।

    ইউক্রেইনের যুদ্ধ এই তিনটি দুর্যোগময় প্রবণতার সবগুলোকে খারাপের দিকে নিয়ে গেছে। পারমাণবিক হুমকি তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার হাত থেকে সভ্যতাকে রক্ষার জন্য পৃথিবীতে জীবনের ধ্বংসকারীদের প্রশংসিত করার মধ্য দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমশ কম ব্যবহারের গুরুতর প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করা হয়েছিলো। আর গণতন্ত্র ও একটি মুক্ত গণপরিসর ভয়ানক পতনের দিকে রয়েছে।

    এসব কিছু আমাদেরকে ৯০ বছর পেছনে নিয়ে যায়। অবশ্য ঝুঁকিগুলো আজ অনেক বেশি। তারপর, ব্যাপকভাবে পুনরুজ্জীবিত শ্রম আন্দোলনের প্রেরণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোশ্যাল ডেমোক্রেসির পথে অগ্রসর হয়ে এই সংকটের মোকাবেলা করেছিলো। ইউরোপ ফ্যাসিবাদী অন্ধকারের নিমজ্জিত হয়েছিলো।

    এখন কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। এটি যে আমাদের ওপর নির্ভর করছে সেটাই একমাত্র নিশ্চয়তা।

  • রিসেট।। বীজের কর্পোরেট বাণিজ্যিকীকরণ

    রিসেট।। বীজের কর্পোরেট বাণিজ্যিকীকরণ

    • অনুবাদ: রাহুল বিশ্বাস

    সম্পাদকীয় মন্তব্য:  RESET – Digital for Good স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি প্ল্যাটফর্ম; বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু/সমস্যা সমাধানের দিকে নজর দেয়াটাই তাদের মূল লক্ষ্য। ডিজিটাল পরিসরকে ব্যবহার করে তারা এমনসব প্রকল্প বা ব্যবসা-উদ্যোগকে সামনে নিয়ে আসেন যেগুলো ইতিবাচক প্রভাব রাখতে সক্ষম। বর্তমান জমানার দুটো প্রধান প্রবণতাকে- অর্থাৎ, ক্রমবর্ধমান ডিজিটালাইজেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তন- সামনে রেখে তারা কাজ করে যান। প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে তাদের পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়নের জন্য কীভাবে ডিজিটাল টুলসগুলো ব্যবহার করা যায়। নিচের প্রবন্ধটি ‘The Privatisation of Seeds’ শীর্ষক প্রবন্ধের অনুবাদ। প্রবন্ধে বীজের প্রাইভেটাইজেশন নিয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ জরুরি কিছু মন্তব্য করা হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: মাদার আর্থ
    শিল্পী: সুমিত দত্ত
    সূত্র: পিকটোরেম

    মূল প্রবন্ধ 

    বছরের পর বছর ধরে কৃষকরা তাদের নিজস্ব ফসল থেকে বীজের প্রাপ্তি হারাচ্ছে এবং বীজ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নতুনভাবে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। মনসান্টো বীজের বাজারকে একচেটিয়াভাবে দখল করেছে। ফলশ্রুতিতে বাজারে উদ্ভিদের জাত বৈচিত্র্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে। যার পরিণতি স্বরূপ আমাদের পরিবেশ এবং কৃষক, যারা বীজ থেকে ফসল ফলায়, উভয়ের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

    বীজ কারখানাগুলো আগের তুলনায় এখন আরো বেশি একীভূত। বাণিজ্যিক বীজ বাজারের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ দশটি বৃহত্তম বীজ কর্পোরেশনের আওতাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ তিনটি বীজ কর্পোরেশন মনসান্টো, ডুপন্ট এবং সিনজেন্টা বাজারের অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ ভাগ) দখল করে আছে। গ্রিনপিসের জিনগতভাবে পরিবর্তিত বীজের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মনসান্টো ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৯০ শতাংশ জিনগত পরিবর্তিত বীজ বিক্রি করেছে।

    তবে আঞ্চলিক পার্থক্য রয়েছে। যদিও শিল্পোন্নত দেশগুলিতে কৃষি প্রধানত বাণিজ্যিক বীজ সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল, তবে অনেক উন্নয়নশীল দেশ এখনও এগুলির থেকে তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র। ভারতীয় কৃষিতে বিদ্যমান বাণিজ্যিক বীজের অনুপাত আনুমানিক ৩০ শতাংশ, এবং সমগ্র আফ্রিকায় ১০ শতাংশের কম।

    যদিও এক তৃতীয়াংশ পটপরিবর্তনের মতো নাও শোনাতে পারে, বাণিজ্যিক বীজ বাজার এবং বিশেষ করে মনসান্টো ভারতীয় কৃষকদের উপর বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছে। তুলা চাষীরা বিশেষ করে চাপে পড়েছে কারণ মনসান্টো তার জিনগত পরিবর্তিত বীজের মাধ্যমে তুলার বীজের বাজারের ৯৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

    কিভাবে আমরা এই পর্যায়ে এলাম? খামার থেকে কর্পোরেশন

    উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বাণিজ্যিক বীজের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের পিছনে রয়েছে কৃষির পট–পরিবর্তনের ইতিহাস, টার্গেটেড কোম্পানগুলো একীভূত হয় এবং পেটেন্টিং প্রক্রিয়া এবং আইনি কাঠামোর ব্যবহারের মাধ্যমে বীজের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে।

    মুষ্টিমেয় কৃষি–ব্যবসা কীভাবে কৃষিতে বীজের মতো মৌলিক কিছুর উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল তা বোঝার জন্য আমাদের পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। ঐতিহ্যগতভাবে বীজ একটি পূর্ণ পরিমণ্ডল তথা চক্র তৈরি করে, ফসল তোলার পর বীজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পরের বছরের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং চক্রটি কখনই বিঘ্নিত হয় না।

    ১৯৫০–এর দশকে কৃষিকে শিল্পায়ত করা শুরু হয়েছিলো এবং ১৯৬০ এবং ১৯৭০’র দশকে এর রমরমা অবস্থা শুরু হয়েছিল। ফলস্বরূপ, উৎপাদন পদ্ধতি ক্রমবর্ধিতভাবে যান্ত্রিক এবং যুক্তিযুক্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ প্রবর্তিত হয়েছিল উল্লেখযোগ্যহারে ফসলের ফলন বৃদ্ধি এবং ব্যাপক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সংকট দূর করার লক্ষ্যে।

    রমরমা শিল্প কৃষির এই নতুন মডেল মেনে চলার জন্য, খামারগুলিকে আরও বড় হতে হবে এবং আরও বিশেষায়িত কাজগুলি করতে হবে। কৃষিকে যেমনটা আমরা জানি এটি আগের থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যেমন এর মধ্যে বাজার রয়েছে। কাণ্ড–প্রজনন, বীজ, পশু খাদ্য, সার এবং কীটনাশক প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা বাজার আবির্ভূত হয়েছে। এই ধরনের একটি ব্যবস্থায়, কৃষকরা নিছক একটি উৎপাদন শিকলের সদস্য হয়। তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ফসল উৎপাদন করতে পারে না।

    মনসান্টোসহ আরও কিছু সর্ববৃহৎ কৃষি কর্পোরেশন বাজারে প্রবেশ করায়, মাঝারি আকারের খামার এবং ব্যবসাগুলো নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এই বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলি অন্যদের কেনার মাধ্যমে বা অন্যদের ব্যবসা নিজের সাথে যুক্ত করে প্রসারিত হতে সক্ষম হয়েছিল। ফলস্বরূপ, কৃষি অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে শুরু করে। সেই সাথে বীজের প্রকরণ হ্রাস পায় এবং তা ন্যায্য মূল্যে পাওয়া যায় না। উপরন্তু, যে কর্পোরেশনগুলি বীজ উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত তারা অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশক সরবরাহকারীও, যা বিক্রি করা হয় তাদের বীজের সাথে সাথে। বীজ এবং কীটনাশক উভয়ই সম্ভাব্য সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যে যুক্ত থাকে এবং এই পদ্ধতিটি মনসান্টো দ্বারা সার্বিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

    মনসান্টোর মত বড় কর্পোরেশন কি অফার করছে? কৃষকরা এটা শুনে আঁতকে ওঠেন যে উচ্চ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন বীজের সাহায্যে তারা অনেক বেশি ফলন পাবে, যা শক্তপোক্তভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং কীটপতঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং সেই সাথে মেশিনের সাহায্যে দক্ষতার সাথে এবং অল্প খরচে ফসল কাটা হবে। সত্যিকার অর্থে ব্যবসাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে, ফলন আরও বাড়াতে এবং লাভ সর্বাধিক করতে, কর্পোরেশনগুলোর সংকর (হাইব্রিড) বীজের জাত রয়েছে।

    হাইব্রিড বীজ: যেমন গুণসম্পন্ন তেমন ক্ষতিকর

    কৃষির সূচনা লগ্ন থেকেই সর্বদা কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের একটা বাছাইকৃত অংশ আসন্ন বছরের চাষাবাদ বা ব্যবসার জন্য যত্ন সহকারে আলাদা করে রাখতো। বীজ হিসেবে ফসলের একটা অংশের এইরুপ পুনঃব্যবহার, বিশ্বব্যপী বিভিন্ন দেশে প্রচলিত রয়েছে। তবে বীজ প্রকৌশলী ও প্রদানকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে, বীজ হিসেবে ফসলের অংশের এই পুনঃরোপন কিংবা এই বীজ কেনাবেচার অর্থ হল সম্ভাব্য গ্রাহকদের হারানো। আর এজন্যই সংকরীকৃত বীজ গুণসম্পন্ন।

    সর্বোত্তম সেচ, সার এবং কীটনাশকসহ সংকর জাতের প্রথম ফসলের ফলন ১৫–৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। যাইহোক এই বীজগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্ম একইধরণের ফলন দেয়না, এর পরিবর্তে এটি বিভিন্নধরণের উদ্ভিদের জন্ম দেয়। তাই সংকরীকৃত বীজ পুনরায় রোপণ করা সম্ভব হয় না এবং কৃষকরা প্রতি মৌসুমে বীজ পুনরায় ক্রয় করতে বাধ্য হয়। বীজ পরিবেশকদের (ডিস্ট্রিবিউটর) জন্য এটি সত্যিই দারুণ, এই বীজ বিক্রির মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সুরক্ষিত এবং পরিচালিত হয়।

    এটা বলা হয় যে সংকরীকৃত বীজ উচ্চমাত্রায় ফলন প্রাপ্তির জন্য প্রযুক্ত করা হয়, পোকামাকড় ও রোগ প্রতিরোধী ফসল উৎপাদন করে, যা প্রযুক্তিগতভাবে বলতে গেলে, অনেক সহজে কাটা যায়। তবে প্রকৃত অনুসন্ধানকারীরা দেখতে পান যে এই ফলাফলগুলি প্রাকৃতিক বীজের জাতগুলির সাথেও উপলব্ধি করা যেতে পারে, এবং অপরদিকে সংকরীকৃত ফলনের ক্ষেত্রে উৎপাদিত ফসলের গুণমান, সেগুলি উত্পাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ ব্যয়, ফসলের বিরাজমান জাত বৈচিত্র্যতা হ্রাস এবং বড় বীজ কর্পোরেশনগুলির উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতার প্রশ্নগুলি যার সাথে সম্পর্কিত।

    ক্ষুধার পরিবর্তে ‘উন্নয়ন’

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ জুড়ে কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাজারে একটি শক্তপোক্ত দখল নিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অফ এগ্রিকালচারাল নলেজ, সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফর ডেভেলপমেন্ট (IAASTD)-এর তথ্যমতে, কর্পোরেশনগুলো যে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে তা নিম্নোক্ত কারণে সমস্যাযুক্ত:

    • একচেটিয়া শক্তি গবেষণা ও উন্নয়নের একীভূতকরনের দিকে পরিচালিত হয় যা শুধুমাত্র অল্প সংখ্যক বীজের জাতগুলিতে বিনিয়োগ করে।

    • কেন্দ্রীভূত বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অন্যান্য খামারগুলোকে (যা বিকল্প পণ্য ও ব্যবসায়িক মডেল প্রদানে সক্ষম হতে পারে) অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে বাধা দিতে পারে।

    • একটি অধিপত্যমূলক বাজারের প্রতিযোগীতা দমনকারী প্রভাব বীজের দামে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। জীবের জিনগত পরিবর্তন প্রবর্তনের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তুলার বীজের দাম তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। তুলার বীজের দামের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও দেখা যায়।

    বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, হাইব্রিড বীজ এবং বীজের কঠোর পেটেন্টিংয়ের প্রভাব বিশ্বের দক্ষিণে অবস্থিত দেশগুলোকে মারাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

    ভারতে মনসান্টো

    বন্দনা শিবা একজন ভারতীয় অ্যাকটিভিস্ট এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইকোলজি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (Research Foundation for Science, Technology and Ecology) প্রণেতা ও প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যুক্তি দেন যে ভারতে মনসান্টোর একচেটিয়া বীজ কৃষকদের আত্মহত্যা বৃদ্ধির মূল কারণ হয়ে উঠেছে। আলজাজিরাতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে শিবা যুক্তি দিয়েছেন যে “মনসান্টো এবং এর জনসংযোগকারীরা মরিয়া চেষ্টা করছে, তুলার বীজ সরবরাহে মনসান্টোর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলশ্রুতিতে ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার মহামারী যে পরস্পর সম্পর্কিত এই বিষয়টিকে আলাদা করার জন্য৷ আমাদের জন্য এটি বীজের উপর নিয়ন্ত্রণ, সর্বপ্রথম সম্পর্কটা খাদ্য শৃঙ্খলের ভিতরকার, যেটা আমাদের জীবনের উৎস সেটা আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। যখন একটি কর্পোরেশন বীজ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কৃষকদের জীবনও যার অন্তর্ভুক্ত।

    ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতে মনসান্টোর উপস্থিতি রয়েছে যখন কিনা বিশ্ব ব্যাংক একটি নতুন বীজ নীতি প্রবর্তন করেছিল যার জন্য সরকারকে বীজ খাতকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে, যা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস নীতিগুলির সাথে অনেকগুলি পদক্ষেপের মধ্যে একটি। শিবা পাঁচটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন যা মনসান্টো ভারতীয় বীজ বাজারে প্রবেশ করার পর থেকে শুরু হয়েছে:

    • ভারতীয় কোম্পানিগুলো যৌথ উদ্যোগ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মনসান্টোর সাথে সূত্রবদ্ধ হয়, যা এটিকে সেক্টরের উপর একটি শক্তিশালী দখল নিশ্চিত করতে সক্ষম করে।

    • মনসান্টোর বীজগুলিকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল, যার অর্থ হল মনসান্টো রয়্যালটি সংগ্রহ করতে পারতো–এগুলি অর্জিত মোট বিক্রয়লব্ধ আয় বা নেট আয়ের (gross or net revenues) একটি পার্সেন্টেজ বা ভাগ বা ফসলের একটি নির্ধারিত মূল্য।

    • উপরন্তু যে বীজগুলি একসময় নবায়নযোগ্য সম্পদ ছিল তা এখন নবায়নযোগ্য নয় কারণ পেটেন্টযুক্ত সংকর ও জিন পরিবর্তিত জাতগুলো দ্বারা প্রাকৃতিক, মুক্ত–পরাগায়িত তুলার বীজ প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।

    • তুলা, যা পূর্বে অন্যান্য ফসলের সাথে সমন্বয় বজায় রেখে জন্মানো যেত, তা একটি একক শস্যে পরিণত হয়েছে যেটি পোকামাকড়, রোগ, খরা ও শস্যক্ষয়ের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল কীটনাশক ও সারের উপর নির্ভরশীল।

    • এবং সবশেষে মনসান্টো সরকারি নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়াগুলিকে বিকল করতে শুরু করে। এমনকি ‘সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব’–এর মাধ্যমে অ–নবায়নযোগ্য সংকর এবং জিন পরিবর্তিত জাতগুলোকে বর্ধিত করার জন্য সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য সম্পদে প্রবেশাধিকার লাভ করে।

    শিবা আরও বলেন, “বীজে একচেটিয়া কর্তৃত্ব সৃষ্টি, বিকল্পের নিধন, রয়্যালটি আকারে অতিমুনাফা সংগ্রহ এবং এক–ফসলী চাষের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা ঋণগ্রস্ততা, আত্মহত্যা এবং কৃষি সংকটের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।”

    কয়েক বছর ধরে তিনি ভারতে মনসান্টোর একচেটিয়া ক্ষমতার বিরোধিতা করে আসছেন। উপদ্রব এবং অন্যদের প্রতিযোগিতা কিনে নেবার ফলে এটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে তুলা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ভারতীয় তুলা চাষীদের কাছে মনসান্টোর জিনগত পরিবর্তিত জাতের বিকল্প নেই।

    তবে অধিকাংশ কৃষকের কাছে এই বীজ তাদের সামর্থ্যের অধিক এবং ফলন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। পরিস্থিতিকে আরও সমস্যাজনক করে তুলেছে নতুন নতুন রোগ যার শস্য বোনা হয়েছে। যা তুলা গাছকে বিনষ্ট করছে কিংবা সম্পূর্ণরূপে তার ফলন ধ্বংস করছে।

    অপরদিকে বংশপরস্পরায় চলে আসা তুলা গাছগুলি সেই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির অবস্থার সাথে উপযোগী যেখানে তারা জন্মায়। জিনগতভাবে পরিবর্তিত উদ্ভিদগুলো জলবায়ুর সাথে অভিযোজিত (খাপ খাওয়ানো) হতে পারেনা। জিন পরিবর্তিত শস্যগুলোকে সুরক্ষা দিতে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল, স্বাস্থ্যবিনষ্টকারী এবং পরিবেশ অবান্ধব সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়।

    মনসান্টোর কারণে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কৃষক আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ঋণগ্রস্ত হয়েছে, কেউ কেউ অন্য উপায় না দেখে আত্মহত্যার দিকেও ঝুঁকছে। ভারত সরকারের মতে, প্রায় ৭৫% গ্রামীণ ঋণ নেওয়া হয় কৃষকদের মাঠ পর্যায়ের প্রয়োজনগুলো মেটাতে। কৃষকের ঋণ যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি মনসান্টোর লাভও বাড়ে এবং এটি এমন পদ্ধতি যে তাদের বীজের নাম দেওয়া হয়েছে “আত্মহত্যার বীজ”। শিবা নোট করেছেন, “প্রতি কেজি তুলার বীজের দাম ৭ থেকে ১৭০০০ রুপি…. মনসান্টো বছরে ১৫০০ কেজি ফলন হওয়ার প্রতারণামূলক দাবি করে তার জিনগতভাবে পরিবর্তিত বীজ বিক্রি করে, যখন কৃষক বছরে গড়ে ৩০০–৪০০ কেজি ফলন পেয়ে থাকে”।

    বছরের পর বছর ধরে বৃহৎ বীজ কর্পোরেশনগুলি উন্নয়নশীল দেশের বাজারগুলিতে প্রভাব বিস্তার করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক বীজ সরবরাহকারীদের উপস্থিতি নগণ্য ছিল। এই অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করার সময়, তারা এই আশা নিয়ে জুয়া খেলেছে যে বীজের ক্রমবিকাশ এবং জিনগত প্রযুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যার অলৌকিক সমাধান পাওয়া যাবে। যাইহোক, তথ্য–উপাত্ত একটি ভিন্ন গল্পকে সামনে আনে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর মতে, বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত ৮৬৮ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সম্পদ বঞ্চিত কৃষক যারা উর্বর জমির ছোট ছোট প্লটে চাষ করে।

    এতদসত্ত্বেও, বিশাল বীজ কর্পোরেশনগুলি তাদের গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ বীজে বিনিয়োগ করে যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত। একই সাথে, তারা চাপ এবং তাপ–প্রতিরোধী জিনগুলির উপর কঠোর পেটেন্ট অর্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের এই বাজারগুলিতে খাদ্য সরবরাহ করা থেকে আটকাতে সক্ষম হয়, যা ফলত নিশ্চিত করে যে বাজারে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক যেকোন কর্পোরেশনগুলিকে প্রথমে তাদের সাথে নিজেদের সন্ধি স্থাপন করতে হবে।

    অলিভিয়ার ডি শুটার, যিনি জাতিসংঘের খাদ্য অধিকার কর্মসূচির জন্য ‘বীজ নীতি এবং খাদ্যের অধিকার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছিলেন, বলেছেন যে বিশ্বের দক্ষিণ অঞ্চলে দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা মোকাবেলা করতে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে ক্ষুদ্র পরিসরের, জীবিকানির্বাহের উপায় অবলম্বনকারী কৃষকদের বীজে প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় কাঠামোগুলির মাধ্যমে এগুলো বিক্রি ও লেনদেন করা যেতে পারে এবং তা আবহাওয়া, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনের জন্য যথাযথভাবে বিকশিত করা দরকার।

    জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন

    একটি একচেটিয়া বীজ অর্থনীতি এবং বীজ জাতগুলোর উপর আরোপিত প্রকৌশলের ফলে, উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সামগ্রিক হ্রাস উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর মতে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় ৭৫% ফসলের জাত হারিয়ে গেছে। ভারতে সবুজ বিপ্লবের আগে প্রায় ৫০,০০০ ধানের জাত ছিল, এবং বিশ বছরের মধ্যে এই সংখ্যাটা মাত্র ৪০–৫০,০০০ থেকে ৪০। অনেকগুলো নতুন সংকর জাত সৃষ্টি হয়েছে যা সর্বপ্রকারের জিনগত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে সক্ষম হবেনা।

    এই পরিসংখ্যানগুলি দেখলে অনেকটা ক্ষয়ক্ষতির মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু ফসলের বৈচিত্র্য রক্ষা করা কি সত্যিই এতটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ জাত বৈচিত্র্যতা অগণিত জিনগত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিমুখে উদ্গত হওয়ার (জন্মানোর) কার্যকর বিকল্প হিসাবে কাজ করতে পারে। আসুন আমরা ভুলে না যাই যে আমাদের পরিবেশ তীব্রভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর সাথে আমাদের কৃষি পদ্ধতি বা অন্তত আমরা যা রোপণ করি, তারও পরিবর্তন হতে পারে। যদি জলবায়ু অবস্থার বদল ঘটে তবে এমনও হতে পারে যে একটি পুরানো জাতের উদ্ভিদ আরও উপযুক্ত হয়ে উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০–এর দশকে ভারতে একটি ভাইরাস দ্বারা প্রচুর পরিমাণে ধানের ফসল (জাত) নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যাইহোক, বাদবাকি ৬২৭৩ ধানের জাতগুলির মধ্যে একটি ছিল যা ভাইরাস প্রতিরোধী।

    জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি প্রথম সারির প্রতিবেদন যা ৪০০ জন বিজ্ঞানীর জ্ঞান সংকলন করেছে এবং ৫৮ টি দেশ দ্বারা সমর্থিত হয়েছে, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফসলগুলি দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা খুব কমই করে থাকে। উত্তম বিকল্প সুলভ–সহজলভ্য এবং রিপোর্টটি টেকসই উপায় হিসাবে জৈব (অর্গানিক) চাষকে বিজয়ী করেছে।

    এটি কার্যকর কিছু করার সময়

    এটি উদ্বেগের কারণ যে মুষ্টিমেয় কিছু বীজ কর্পোরেশন বীজের বাজারে, এবং পরবর্তীকালে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার বুনিয়াদগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে।

    আপনি যদি এই সমস্যার বিপরীতে অধিকতর সক্রিয় হতে চান তবে কেন কতক পিটিশনে স্বাক্ষর করে শুরু করবেন না?

    প্রয়াস ২, কৃষকের আত্মহত্যার সংকটে ঠেলে দেওয়ায় মনসান্টোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে একটি পিটিশন সাইট সাক্ষরের আহ্বান জানাচ্ছে, পক্ষান্তরে অনিবার্য ঋণে ভুগছেন এমন কৃষকদের মনসান্টোকর্তৃক আর্থিক সহায়তার তাগিদে, যদি আপনিও এটি করতে চান তবে স্বাক্ষর করুন৷

    অনলাইন অ্যাক্টিভিজম সংগঠন Avaaz মনসান্টোর পেটেন্ট অধিকার সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে একটি পিটিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, এটি সম্পর্কে এখানে আরও পড়ুন:

    যদি এই বিষয়টি আপনার আগ্রহের হয়, তাহলে আপনি লিয়া বোরোমিও (Leah Borromeo)-এর একটি ডকুমেন্টারি ডার্টি হোয়াইট গোল্ড দেখতে আগ্রহী হতে পারেন যার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন শিল্প ও আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের স্বভাব–প্রকৃতি ভারতীয় কৃষকদের জীবন ও মৃত্যুতে কতোটা অবদান রাখে তুলার সরবরাহ চেইন তদন্তের মাধ্যমে তার উপর আলোকপাত করা৷

    বিটার সীডস মিচা পেলেড পরিচালিত সিনেমা, যা একটি কিশোরী মেয়ের গল্প ধরে আগায় যার বাবা অনতিক্রম্য ঋণের বোঝা বইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলো৷ এটি মর্মস্পর্শীভাবে কৃষকদের সাথে মনসান্টোর প্রতারণাপূর্ণ আচরণ এবং তাদের পরিণতি দেখায়৷