Category: সাম্রাজ্য-নৈরাজ্য

  • গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    • নাজমুল আরেফিন

    আজকে আমরা ‘ক্রিটিকাল থিওরি’ বলতে যা বুঝি তার আধুনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। ‘নয়া বামধারার পিতা’ নামে পরিচিত হার্বাট মারকুস (১৮৯৮-১৯৭৯) এই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন। মারকুসের ‘ওয়ান ডাইমেনশনাল ম্যান’(১৯৬৪) আমার জীবনে পড়া গুরুত্বপূর্ণ ফরমেটিভ টেক্সটের একটা। আমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সময়ে মারকুস এক সপ্তাহের জন্য ইসরায়েলে যান। মারকুসের বয়স তখন ৭২। তিনি ফিরে এসে ৪ পাতার একটা বিবৃতি লিখলেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের মিলিটারি অকুপেশনকে যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে বললেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে দেখিয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করলেন যে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারী নীতি তাদের নাৎসি ঘটনার পুনরাবৃত্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।[1] তিনি ইহুদিদের অস্তিত্বের অধিকারের স্বার্থে ইসরায়েল রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বটে কিন্তু স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতি ঘোর সমর্থন জানিয়েছিলেন। একজন ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ গালি খেতে হয়েছে বহুবার। তাকে মুন্নী সাহা কায়দায় একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘Jewishness’ নিয়ে আপনার নিজের অনুভূতি কি? তিনি বলেছিলেন, ইহুদিরা যতদিন আন্ডারডগ ছিল ততদিন আমি এই পরিচয়ের সাথে একত্বতা ঘোষণা করতাম। কিন্তু এখন ইহুদিরা এমন জাতিতে পরিণত হয়েছে যারা নিজেরাই অন্য আন্ডারডগদের উপর চড়াও। তাই আমার জন্য নিজেকে এই পরিচয়ে পরিচিত করা আরও কঠিন।[2]

    হেবারমাস, এআই জেনারেটেড

    সেই হার্বাট মারকুসের পিএইচডি ছাত্রী ছিলেন আমেরিকান বামপন্থী নারীবাদের পোস্টার গার্ল, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, দার্শনিক অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। আমেরিকার আধুনিক বর্ণবাদের একজন জলজ্যান্ত স্বাক্ষী এই অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। ডেভিস সম্প্রতি আলজাজিরার আপফ্রন্টে বলেছেন ব্ল্যাকদের মুক্তি আন্দোলন আর ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। আমেরিকায় ব্ল্যাকদের প্রতি যে বর্ণবাদ, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে বর্ণবাদ, আর ইসরায়েলি বর্ণবাদ তা নানানভাবে সংযুক্ত। তাই “প্যালেস্টাইন বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক লিটমাস টেস্ট”।

    অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে আমি পুরোপুরি একমত। এই লিটমাস টেস্ট দিয়ে আমরা এখন পশ্চিমা চিন্তাবিদদের হিপোক্রেসি বা ভন্ডামিগুলো আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারি। যাচাই করতে পারি। আজকের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের রাজনীতি-চিন্তার ভন্ডামি ঠিক যেমনটি যাচাই করেছেন প্রফেসর আসেফ বায়াত। আসেফ বায়াত সম্পর্কে হয়তো অনেকের ধারণা নাও থাকতে পারে। তাই উনার সম্পর্কে দুলাইন খরচ করি। আসেফ বায়াত ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরবানা-শ্যাম্পেইনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গ্লোবাল এবং ট্রান্সন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি “post-Islamism” তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৯ সালে প্রকাশিত “Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East” (Stanford University Press), এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত “Post-Islamism: The Changing Faces of Political Islam” (Oxford University Press) বই দুটি তাকে একাডেমিক দুনিয়ায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘আরব বসন্ত’কে ক্রিটিকাল ডিল করে তাত্ত্বিক রুপ দিতেও তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।

    ছবি: টুরিং অব গোয়ের্নিকা গাজা উৎস: আরব কালচারাল ফান্ড

    গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩, Goethe University Frankfurt-এর “Normative Orders” গবেষণা সেন্টার থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মহারথী দার্শনিক য়ুর্গেন হ্যাবারমাসের একটি বিবৃতি ছাপানো হয়। যার জার্মান শিরোনাম “Grundsätze der Solidarität. Eine Stellungnahme”। ইংরেজিতে মানে দাঁড়ায় “Principles of solidarity. A statement”। হ্যাবারমাসের সাথে ফ্রাঙ্কফুর্ট ভিত্তিক আরও তিনজন প্রথিতযশা একাডেমিক এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। নিকোল ডাইটেলহফ, রেইনার ফার্স্ট, এবং ক্লাউস গুন্টার। সন্দেহ নাই যে হ্যাবারমাসের নাম থাকাতেই এই বিবৃতি পুরো ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হয়। কি আছে এই বিবৃতিতে? যদি সংক্ষেপে বলতে হয় এর মূল কথা হল, ৭ই অক্টোবরের হামাসের সন্ত্রাসী হামলা ইহুদি জীবনকে নির্মূল করার ঘোষিত অভিপ্রায় নিয়েই করা হয়েছে। এই ঘটনাই মূলত ইসরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছে। এবং ইসরায়েলের এই রিটালিয়েশন বা পাল্টা আক্রমণ ন্যায়সঙ্গত (“justified in principle”)। বেসামরিক মানুষ যাতে না মরে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে—এই মুখস্থ সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দেবার পর হ্যাবারমাসরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানিতে ইসরায়েলের এই কর্মকান্ড কোনওভাবেই এন্টি-সেমেটিক প্রতিক্রিয়ার ন্যায্যতা দেয় না। বিশেষ করে জার্মানিতে তা সহ্য করা হবে না। হ্যাবারমাস গং জার্মানবাসীকে আরও মনে করিয়ে দেন যে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানির গণতান্ত্রিক নৈতিকতা হলো “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা”। কিন্তু এখানে হ্যাবারমাসদের কাছে মানুষ মানে শুধু হলো ‘ইহুদি’ পরিচয়। জীবন মানে শুধু হলো ‘ইহুদি জীবন’। ৭০ দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি মানুষের অমানবিক মর্যাদাহীনতা, কিংবা হাজারো লাশ উনাদের কাছে ম্যাটার করে না। তাই এই বিবৃতিতে উনারা জার্মানবাসীদের নাৎসি হলোকাস্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত রাখার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম মৌলিক নৈতিকতা।

    আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের অনেক তাত্ত্বিক চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। হ্যাবারমাসের “পাবলিক স্ফিয়ার” ধারণাকে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য প্রেক্ষিতে নানানভাবে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। এই বিবৃতি আসেফকে স্বাভাবিকভাবেই খুবই আহত করে। গত ডিসেম্বরের ৮ তারিখ তিনি সেই ক্ষোভ থেকে হ্যাবারমাসকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিটা শুধু হ্যাবারমাসদের ভন্ডামিকে বুঝতেই সাহায্য করেনা বরং ইউরোপের ক্রিটিকাল চিন্তার রাজনীতি বোঝার জন্য নানান দিক থেকে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের ফিলিস্তিনি গণহত্যা শুধু আজকের ক্রাইসিস না। শুধু ‘পোস্ট-অক্টোবর ৭’ সিজন থেকে এই ক্রাইসিস বোঝার কোন সুযোগ নেই। পঞ্চাশের দশক থেকে যে সেটলার কলোনিয়াল ড্রামা দিনে দিনে এতদূর এসেছে তা বোঝার জন্য আগের প্রতিটি সিজন, প্রতিটি এপিসোড গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এবং তা দেখা শুরু করলেই বোঝা যায় ইউরোপের কতখানি হাত এই ক্রাইসিসের মূলে। গ্রীসের ক্রিটিকাল অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারোফাকিসের তাই সরল স্বীকারোক্তি—“আমাদের ইউরোপীয়ানদের লজ্জায় মাথা নিচু করে হাটা উচিত…আমরা ইউরোপীয়রা এটি (আজকের ক্রাইসিস) তৈরি করেছি…[প্রথমে] আমরা শত বছর ধরে ইহুদি-বিদ্বেষি প্রোগ্রাম বানিয়েছি, তারপর ইহুদিদের হলোকাস্টে ঢুকিয়েছি…আবার তারপর ‘আ ল্যান্ড উইদাউট আ পিপল ফর আ পিপল উইদআউট আ ল্যান্ড’ এর মত জঘন্য একটা মতবাদ বা নীতিকে সাপোর্ট করেছি। মনে হয় যেন প্যালেস্টাইন জনমানব শূন্য ছিল। মূলত এটি দখলদার হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্ট ভাষা যা ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের গণহত্যার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে একটি ‘জনশুন্য খালি জমি’ হিসাবে ঘোষণা করতে ব্যবহার করেছিল।”[3]

    উৎস: ফ্রিপিকস

    হ্যাবারমাসরা এই পুরো ইতিহাসকে মুছে ফেলে জার্মান নাৎসিদের করা অন্যায়ের খেসারত দিতে সবাইকে চুপ থাকতে বলছেন। যারা কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন তাদেরকে ঢালাওভাবে ইহুদি-বিদ্বেষি ট্যাগ দিচ্ছেন। এই ইন্টেলেকচুয়াল হিপোক্রেটিক পজিশন হ্যাবারমাসের নিজের দেওয়া বড় বড় তত্ত্বের সাথে কতখানি সাংঘর্ষিক তা আসেফ বায়াত তার চিঠিতে দারুণভাবে দেখিয়েছেন। জার্মানিতে গাজা নিয়ে কথা বললে কিভাবে ‘এন্টিসেমেটিক’ তকমা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের মত শহরে যা কিনা ক্রিটিকাল চিন্তার সূতিকাঘর হিসেবে পরিচিত সেখানেও ফিলিস্তিনিদের পুরস্কার-সম্মাননা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সেসব ব্যাপারে হ্যাবারমাসদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বায়াত।

    হ্যাবারমাস “public sphere,” “rational dialogue”, “deliberative democracy” ইত্যাদি ধারণাগুলোর আধুনিক প্রবক্তা। অথচ বর্তমান জার্মানিতে (পড়ুন ‘পোস্ট-সেক্যুলার’ ইউরোপে) এই ধারণাগুলোর কি করুণ অবস্থা; এবং খোদ হ্যাবারমাস এই ধারণাগুলোর প্র্যাক্টিসের সময় কতখানি বিপরীতে অবস্থান করেন তা গাজা ‘লিটমাস টেস্ট’ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কি? আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের মত রকস্টার তাত্ত্বিকদের স্ববিরোধিতা সম্পর্কে সেই উদ্বেগ বার বার প্রকাশ করেছেন তার চিঠিতে। চলুন একটু ধৈর্য নিয়ে উনার পুরো চিঠিটা পড়া যাক (চিঠিটা খুবই অল্প সময়ে যতটা সম্ভব মূলের সাথে মিল রেখে প্রফেসর বায়াতের কাছে অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়):

    প্রিয় অধ্যাপক হ্যাবারমাস,

    আপনি হয়তো আমাকে মনে করতে পারবেন না, কিন্তু ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে মিশরে আমাদের দেখা হয়েছিল। আপনি কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে distinguished Visiting Professor হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাবলিকের সাথে সংযুক্ত হতে এসেছিলেন। সবাই আপনাকে শোনার জন্য উৎসুক ছিল। যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থী এবং স্বৈরাচারীরা “ইসলামকে রক্ষা করার” ছদ্মবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছিল, সেই দমবন্ধ সময়ে “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং গণতান্ত্রিক জীবন সম্পর্কে আপনার [তাত্ত্বিক] চিন্তাগুলি তাজা বাতাসের মত হাজির হলো। এক সহকর্মীর বাড়িতে রাতের খাবারের সময় ইরান ও ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে যে দারুণ কথোপকথন হয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে। আমি আপনাকে ইরানে “ইসলাম-পরবর্তী” (post-Islamist)  সমাজের উত্থান সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেটা আপনি ২০০২ সালে যখন আবার তেহরান ভ্রমণে আসেন অনুভবও করেছিলেন বলে মনে হয়। তখনও আপনি ইউরোপের “ধর্মনিরপেক্ষ-পরবর্তী” (post-secular) সমাজ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন নি। আমরা আপনার মূল তাত্ত্বিক ধারণাগুলির মাধ্যমে কায়রোতে একটি আন্তঃদেশীয় পাবলিক স্ফিয়ার এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তোলার এক বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে কীভাবে ঐক্যমতের-সত্যে পৌঁছানো যায় সে সম্পর্কে ধারণা পেতে আপনার কমিউনিকেটিভ ফিলোসফির মূল বিষয়বস্তুকে আমরা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম।

    আর এখন, প্রায় ২৫ বছর পর, বার্লিনে বসে গাজা যুদ্ধের উপর আপনার যৌথ-লিখিত “Principles of Solidarity”  বিবৃতিটি যথেষ্ট উদ্বেগ এবং শংকা নিয়ে পড়লাম। বিবৃতিটি মূলত জার্মানিতে যারা ৭ই অক্টোবর হামাসের ভয়ঙ্কর হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরায়েলের নিরলস বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে বিবৃতি বা প্রতিবাদের মাধ্যমে স্বরব তাদেরকে তিরস্কার করার জন্যই লেখা। এর থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের এই সমালোচনাগুলি [আপনাদের কাছে] অসহনীয়। কারণ ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক—“যার মূল আলাপ হলো ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার”। এই “বিশেষ সুরক্ষা” নীতির যে বয়ান তার বীজ মূলত জার্মানির ব্যতিক্রমী ইতিহাসের “নাৎসি যুগের গণ-অপরাধের” মধ্যে নিহিত।

    এটা প্রশংসনীয় যে আপনি এবং আপনার দেশের রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সেই ঐতিহাসিক ভয়াবহতার স্মৃতি ধরে রাখতে অনড়, যাতে ইহুদিদের (এবং আমি অনুমান ও আশা করি অন্যান্য মানুষদের) উপর একই ধরনের ভয়াবহতার প্রভাব না পড়ে। কিন্তু আপনার জার্মান ব্যতিক্রমবাদের উপর ভিত্তি করে বানানো ফর্মুলা এবং অনড়তা ইসরায়েলের নীতি এবং ফিলিস্তিনি অধিকার সম্পর্কে আলাপের জন্য কার্যত কোন পথই খোলা রাখেনা। আপনি যখন “ইসরায়েলের কর্মকান্ডের” সমালোচনাকে “ইহুদি বিরোধী প্রতিক্রিয়া” বলে বানচাল করছেন, তখন আপনি [আসলে] চুপ থাকতে এবং বিতর্ককে দমন করতে উৎসাহিত করছেন।

    একজন একাডেমিক হিসেবে আমি এটা জেনে হতভম্ব হয়েছি যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে-এমনকি শ্রেণিকক্ষের মধ্যেও, যা কিনা আলোচনা ও অনুসন্ধানের জন্য মুক্ত স্থান হওয়া উচিত-সেখানে প্যালেস্টাইনের বিষয়টি সামনে এলে প্রায় সবাই চুপ থাকে। সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন এই বিষয়ে খোলামেলা এবং অর্থপূর্ণ বিতর্ক থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো ইহুদি সহ বহু লোককে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের অনুষ্ঠান এবং পুরষ্কার বাতিল করা হয়েছে এবং “ইহুদি বিদ্বেষের” অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে কথা বলতে না দিলে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল সে বিষয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করে কীভাবে? “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং “সুচিন্তিত গণতন্ত্র” (deliberative democracy) আপনার এইসব বিখ্যাত [তাত্ত্বিক] ধারণাগুলো এখন তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?বাস্তবতা হলো, আপনি যে সমালোচক ও প্রতিবাদগুলোকে তিরস্কার করছেন, তাদের অধিকাংশই কখনোই ইহুদিদের জীবন রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। এবং দয়া করে ইসরায়েলি সরকারের এই যুক্তিসঙ্গত সমালোচকদের সাথে ফালতু চরম-ডানপন্থী নব্য-নাৎসি বা অন্যান্য ইহুদি বিরোধীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না, তাদের জন্য অবশ্যই [আলাদাভাবে] তীব্র নিন্দা ও মোকাবিলা জারি রাখতে হবে।

    আমার পড়া প্রায় প্রতিটি বিবৃতিই ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামাসের নৃশংসতা এবং ইহুদি বিদ্বেষ উভয়কেই নিন্দা করেছে। এই সমালোচকরা ইহুদিদের জীবন রক্ষা বা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে মোটেও কোন বিতর্ক করছেন না। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবন এবং প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে যে ডিনায়াল তা নিয়ে বিতর্ক করছেন। অথচ (ডিনায়ালের) এই দিকটা নিয়ে আপনাদের দেওয়া বিবৃতি দুঃখজনকভাবে নীরব।

    (আপনাদের) বিবৃতিতে এক বারের জন্যেও ইসরায়েলকে একটি দখলদার শক্তি বা গাজাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। না আছে (ইসরায়েলের) বিকৃত বৈষম্য সম্পর্কে কোন কথা। এটি দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি জীবনের দৈনন্দিন ধ্বংসের কথা বলার জন্য লেখা হয়নি। “ইসরায়েলের কর্মকান্ড”—যা আপনি “নীতিগতভাবে ন্যায়সঙ্গত” বলে মনে করেন—একটি প্রতিরক্ষাহীন জনসংখ্যার উপর ছয় দিনের মধ্যে ৬০০০ বোমা ফেলেছে; ১৫০০০ এরও বেশি মানুষ মেরেছে (তাদের মধ্যে ৭০% মহিলা ও শিশু), ৩৫০০০ আহত করেছে; ৭০০০ মানুষকে নিখোঁজ বানিয়েছে; এবং ১.৭ মিলিয়নকে করেছে বাস্তুচ্যুত। পুরো একটা জনসংখ্যাকে খাদ্য, জল, আবাসন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার নিষ্ঠুরতার কথা তো বাদই থাকলো। (গোটা ফিলিস্তিনি) জীবনের মূল পরিকাঠামোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    যেখানে আপনার বিবৃতিতে আপনি বোঝাচ্ছেন যে, এগুলি প্রযুক্তিগতভাবে “গণহত্যার অভিপ্রায়” নাও হতে পারে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে এগুলিকে “যুদ্ধাপরাধ”, “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি” এবং “জাতিগত নির্মূলকরণ” নামে অভিহিত করেছেন। এখানে আমার উদ্বেগ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে “ইসরায়েলের কর্মকান্ড” কীভাবে বিচার করা যায় তা নিয়ে নয়, বরং এই ধরনের বিস্ময়কর ধ্বংসযজ্ঞের মুখে আপনি যে নৈতিক শীতলতা এবং উদাসীনতা দেখাচ্ছেন তার গভীরতা কীভাবে নির্ণয় করবো তা নিয়ে। (আপনার) মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য আর কত কত জীবন বিলীন হতে হবে? আপনার বিবৃতির শেষে জোরালোভাবে আন্ডারলাইন করা “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা” কথাটার কি মানে দাঁড়ায় আসলে? এটা এমন যেন আপনি আশঙ্কা করছেন যে, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বললে ইহুদি জীবনের প্রতি আপনার নৈতিক অঙ্গীকার হ্রাস পাবে। যদি তা-ই হয়, অতীতে করা এক বিশাল অন্যায়ের সংশোধনকে বর্তমানের আরেকটা ভয়ানক অন্যায়কে পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্যানা প্যাঁচানো কতই না দুঃখজনক!

    আমি আশঙ্কা করি যে এই প্যাঁচানো নৈতিক কম্পাস জার্মান ব্যতিক্রমীতার যুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যার আপনি ধারক-বাহক। সংজ্ঞানুসারে, ব্যতিক্রমীতা কোন সর্বজনীন মান নয় বরং ইহা বিশেষ কোন মানকে মানিয়া লয়। (ব্যতিক্রমবাদের নিক্তিতে) কিছু লোক অধিকতর যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে, অন্যরা কম যোগ্য, এবং আর বাকীরা অযোগ্য। এই [বিশেষ] যুক্তি যৌক্তিক সংলাপকে রুদ্ধ করে এবং নৈতিক চেতনাকে অসংবেদনশীল করে তোলে। এমন এক কগনিটিভ ব্লক নির্মান করে যা আমাদের অন্যের দুর্দশা-আহাজারি দেখতে দেয় না, সহানুভূতিকে আটকে দেয়।

    কিন্তু সবাই এই কগনিটিভ ব্লক এবং নৈতিক অসাড়তার কাছে নতিস্বীকার করে না। আমি বুঝতে পারি যে অনেক তরুণ জার্মান তাদের ব্যক্তিগত দুনিয়ায় ইসরায়েলি-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণীর থেকে একদম ভিন্ন মতামত প্রকাশ করে। এমনকি কেউ কেউ জনসাধারণের বিক্ষোভেও অংশ নেয়। তরুণ প্রজন্ম এখন বিকল্প মিডিয়া এবং জ্ঞানের উৎসের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের কগনিটিভ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা পুরানো প্রজন্মের থেকে আলাদা। কিন্তু বেশিরভাগই [রাষ্ট্রীয়] প্রতিহিংসার ভয়ে পাবলিক দুনিয়াতে নীরবতা বজায় রাখে।

    পরিহাসমূলকভাবে গণতান্ত্রিক জার্মানিতে, প্রাক-১৯৮৯ ইউরোপের মতো বা হাল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনস্থতার মত, এক ধরনের “হিডেন স্ফিয়ার” আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে হয়। যখন ভীতি-ত্রাস জনসাধারণের অভিব্যক্তি বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষ পাবলিকলি সরকার অনুমোদিত বয়ানের সাথে তাল মেলালেও, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়-আষয়ে ব্যক্তিগত [গোপন] দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করার প্রবণতা দেখায়। সুযোগ এলে এসব হিডেন স্ফিয়ার বিস্ফোরিত হতে পারে।

    এটা খুবই অস্থির সময়, অধ্যাপক হ্যাবারমাস। এটা ঠিক সেই সময় যখন আপনার মতো চিন্তাবিদদের প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সর্বোপরি নৈতিক সাহস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সত্য ও সংযোগমূলক পদক্ষেপ, বিশ্বজনীনতা, নাগরিকত্ব-সমতা, সুচিন্তিত গণতন্ত্র এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে আপনার মৌলিক ধারণাগুলি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও আপনার ইউরোসেন্ট্রিজম, জার্মান এক্সেপশনালিজম এবং ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আপনার তর্ক-বন্ধ-করা তৎপরতার সঙ্গে এই ধারণাগুলি সাংঘর্ষিক হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

    আমি আশঙ্কা করি যে নিছক জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সচেতনতা বোধহয় যথেষ্ট না। আন্তোনিও গ্রামসি যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন, একজন বুদ্ধিজীবী কীভাবে “না বুঝেই” “জানতে” এবং “অনুভূতি” ছাড়া বুঝতে পারেন? যখন আমরা সহানুভূতির মাধ্যমে একে অপরের দুর্দশা-আহাজারি “অনুভব” করি, কেবলমাত্র তখনই আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর জন্য আশা থাকতে পারে।

    চলেন আমরা ত্রয়োদশ শতাব্দীর ফার্সি কবি সাদি শিরাজির আভাসকে স্মরণ করিঃ

    পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ আদতে পরস্পর একাকার,
    এক নির্যাসে তৈরি সবাই আত্মীয় আত্মার।
    একজন যখন ব্যথায় কাতর, অস্বস্তিতে রয় সকল অন্তর।
    যদি অপরের ব্যথা তোমার মনে আদৌ দাগ না কাটে,
    মানুষের নাম পরিচয় তবে রাখো কোন অজুহাতে!

    সম্মানের সঙ্গে,
    আসেফ বায়াত
    ডিসেম্বর ৮, ২০২৩

    ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠাবাদী দর্শনকে একটি মুক্ত সমাজ নির্মানের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে বিবেচনা করত। সেটা যে হ্যাবারমাস ভুলে গেছেন বায়াতের এই চিঠি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয় বৈকি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, গাজা নিয়ে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-বিবৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এই বিবৃতিগুলো প্রকাশ করে পশ্চিমা ক্রিটিকাল চিন্তাবিদরা কি নিয়ে টেনশন করছে। আর কি তাদের চিন্তাতে নেই।  ইউনিভার্সিটিতে কাগজসর্বস্ব জ্ঞান উৎপাদনের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে। বাস্তব দুনিয়া। ক্রিটিকাল চিন্তা এবং জ্ঞানকে যখন সেই বাস্তব দুনিয়ায় অনুশীলন করার সময় আসে তাদের মোরাল কম্পাস তখন কোন দিকে ঝুলে থাকে? আসেফ বায়াত যাকে ‘জার্মান এক্সেপশনালিজম’ বা ‘জার্মান ব্যতিক্রমীতা’ বলছেন তাকি আসলেই শুধু জার্মান চিন্তা, নাকি গোটা ইউরোপের বা পশ্চিমা দুনিয়ার? মরোক্কোর নৃতত্ত্ববিদ এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আল-মাজোজে মনে করেন হ্যাবারমাসদের এই অবস্থানকে মূলত পশ্চিমা চিন্তাবিদদের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।[4] আমার বর্তমান পশ্চিমা পিএইচডি জীবনের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা এবং অব্জার্ভেশনও সেটাই বলে। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দুনিয়ায় একাডেমিক ফ্রিডম চর্চায় সবচেয়ে অগ্রগণ্য হিসেবে সুনাম থাকা সত্ত্বেও গাজা গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হতে কিংবা কথা বলতে যাদের দেখেছি তাদের সংখ্যা একদম হাতে গোণা যায়। আর আমেরিকার কথা নাই বা বললাম। প্যালেস্টাইন ‘লিটমাস টেস্ট’ হার্ভাড কিংবা অন্যান্য আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নর্থ আমেরিকান একাডেমিয়ার মোরাল পজিশনের ভিতরের চেহারাটাকে খুব ভালভাবেই উন্মুক্ত করেছে।

    থিয়েটার গাজা ২০২৪
    শিল্পী: ওসামা দিয়াব
    উৎস: আর্টসি

    তাহলে কি ব্যতিক্রম নাই? সেটাও অনেক আছে। গাজা নিয়ে যারা একাডেমিক দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের মধ্যে পশ্চিমা ইহুদিদের কাজ এবং সোচ্চারতা অগ্রগণ্য। কিন্তু তাদেরকেও নানাভাবে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করেছে এবং করছে পশ্চিমা একাডেমিয়া। একটা উদাহরণ দেওয়া জরুরি। জুডিথ বাটলারকে বাংলাদেশে অনেকে প্যাথেটিকভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে ‘রেইনবো স্কলার’ হিসেবে পরিচিত করান। উনার সমকামী ব্যক্তিগত জীবনকে সামনে এনেও অনেকে অনেক কিছু উস্কে দিতে চান। এই জুডিথ বাটলার গতমাসের ৩ তারিখ (মার্চ, ২০২৪) প্যারিসে এক প্যানেল ডিসকাশনে হামাসের ৭ই অক্টোবরের হামলাকে “আপরাইজিং” এবং “সশস্ত্র প্রতিরোধ” (armed resistance) বলেছেন।[5] বাটলারের বক্তব্যের মূল কথা হলো—”রাজনৈতিক দল হিসেবে হামাস সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এটা বলা অনেক বেশি সততার এবং ঐতিহাসিকভাবে সঠিক যে ৭ই অক্টোবরের আপরাইজিং একটা সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল। এটি কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা নয় এবং এটি কোনও ইহুদি বিরোধী হামলাও নয়। এটি ছিল ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ।”[6] বাংলাদেশ কিংবা মুসলিম বিশ্বের কয়জন স্কলার পাবলিকলি এটা বলতে পেরেছেন?

    এবারই প্রথম না। ২০০৬ সালেও তিনি হামাস ও হিজবুল্লাহকে “গ্লোবাল লেফট” হিসেবে চিহ্নিত বা বর্গীকরণ করেছিলেন। অক্টোবর, ২০২৩-এও যখন হ্যাবারমাসরা ইসরায়েলের ক্রমাগত বোমাহামলাকে ন্যায্যতা দেবার জন্য কলম ধরছেন তখন বাটলার এই কর্মকান্ডকে “বারবারিক” ও “জেনোসাইড” হিসেবে  ঘোর নিন্দা জানিয়েছেন, আমেরিকান সরকার এবং মিডিয়া কিভাবে এই জেনোসাইডকে মদদ দিচ্ছে সে ব্যাপারে সবাই মিলে কথা বলার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।[7] তখনই তাকে শুনতে হয়েছে—বাটলারের কাছে হামাসের হামলা ‘বারবারিক’ না অথচ ইসরায়েলিরা সাদা বলে তাদের হামলাকে ‘বারবারিক’, কারণ ইহুদি হলেও বাটলারকে ইসরায়েলে থাকতে হয় না, তাই সে জানেনা হামাস একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যা ইহুদিত্বের কারণে ইসরায়েলিদের পৃথিবীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।[8] অবিরত সমালোচনা, ফ্রেমিং তাকে তাকে সত্য প্রকাশ থেকে দমাতে পারেনি। প্যারিসে মার্চের ৩ তারিখের উপর্যুক্ত বক্তব্যের পর ফরাসি তথা পশ্চিমা একাডেমিয়া আরও কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতে থাকে। এখনও তাকে মিডিয়ায় খোলা চিঠিসহ বিভিন্নভাবে ভৎসনা করা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের নানান পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন বাটলার। কিন্তু নিজের মোরাল পজিশন থেকে সরে আসেন নি।

    উৎস: পিলগ্রিমেজ আর্ট, পিন্টারেস্ট

    হার্বাট মারকুস এবং তার ছাত্রীকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। মারকুসের শিক্ষক সম্পর্কে আলাপ করেই না হয় শেষ করি। তার শিক্ষক ছিলেন ২০ শতকের প্রধানতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার। হাইডেগারের সাথে মারকুসের গুরুশিষ্য সম্পর্ক অসাধারণ ছিল। কিন্তু ১৯৩২ সালে মারকুস হাইডেগারের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করেন। এর কারণ হাইডেগার নাজি পার্টির দিকে ঝুঁকে যান। ১৯৩৩ সালে হাইডেগারকে ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাৎসি রেক্টর বানানো হয়।[9] হাইডেগার যত বড় দার্শনিকই হোক না কেন, নাৎসিদের নৈতিক সমর্থন দেবার জন্য একাডেমিক দুনিয়া আজও তাকে ক্ষমা করে নি। ইউরোপীয় দর্শনের গভীর বর্ণবাদ, চুপ থাকা ও ফ্যাসিস্ট শেকড় বোঝার জন্য হাইডেগারকে আজও অনেকে একটি প্রবেশদ্বার হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।[10] ঠিক একই ভাবে হ্যাবারমাসদের দর্শন, তত্ত্বচিন্তা তাদের বর্ণবাদী কারণে চুপ থাকা, ইসরায়েলের সেটলার কলোনিয়াল চরিত্রকে প্রশ্ন করতে না পারা এবং গাজায় চলমান গণহত্যাকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য দিনকে দিন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাদের ক্রিটিকাল চিন্তাগুলি আরও বেশি হিপোক্রেটিকালি অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে। আসেফ বায়াত বোধহয় তার চিঠিতে সেই সিগনালই দিয়েছেন।

     

    তথ্যনির্দেশ: 

    [1] Jack Jacobs. (2014). The Frankfurt School, Jewish Lives, and Antisemitism.

    Cambridge University Press. P. 121. pp.119-122

    [2] Marcuse’s View of Israel is That She Lacks Eros and Civilization. (1972). Jewish Telegraphic Agency. https://www.jta.org/archive/marcuses-view-of-israel-is-that-she-lacks-eros-and-civilization

    [3] Yanis Varoufakis on Israel-Gaza: ‘We Europeans have created this’ | UpFront. (2023, Nov 14). Al Jazeera English. https://www.youtube.com/watch?v=_OAniUDMA1Y

    [4] Alieddien Hilal. (2014, Jan 09). Challenging Habermas on Israel. Ahram Online. https://english.ahram.org.eg/NewsContent/50/1204/515359/AlAhram-Weekly/Opinion/Challenging-Habermas-on-Israel-.aspx

    [5] Michael Starr. (2014, March 14). Judith Butler defends calling October 7 Massacre ‘armed resistance’. The Jerusalem Post. https://www.jpost.com/diaspora/antisemitism/article-791928

    [6] Laurel Duggan. (2024, March 5). Judith Butler: 7 October was armed resistance, not terrorism. Unherd. https://unherd.com/newsroom/judith-butler-7-october-was-armed-resistance-not-a-terrorist-attack/

    [7] Palestinian Lives Matter Too: Jewish Scholar Judith Butler Condemns Israel’s “Genocide” in Gaza. (2023, Oct 26). Democracy Now. https://www.youtube.com/watch?v=CAbzV40T6yk

    [8] Hamutal Gouri. (2023, Nov 03). An Open Letter to Prof. Judith Butler. The Times of Israel. https://blogs.timesofisrael.com/an-open-letter-to-prof-judith-butler/

    [9] See: Andrew Feenberg. (2005). Heidegger and Marcuse: The Catastrophe and Redemption of History. Routledge.

    [10] See: Adam Knowles. (2019). Heidegger’s Fascist Affinities: A Politics of Silence. Stanford University Press.

  • হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    [পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভির প্রবন্ধ The State in Post-Colonial Societies : Pakistan and Bangladesh১৯৭২ সালে New Left Review জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই লেখাটি আলাভির প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। প্রবন্ধটির শুরুতে আলাভি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যেখানে রাষ্ট্রকে কেবল বুর্জোয়া শ্রেণির একটি হাতিয়ার ভাবা হয়। এর বিপরীতে তিনি একটি অতি-বিকশিত রাষ্ট্রের তত্ত্বায়ন প্রদান করেন, যেখানে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়াদের থেকে আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। প্রবন্ধের শেষার্ধে তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে এর বাস্তবতা খতিয়ে দেখেন। প্রবন্ধটির দৈর্ঘ্য বিবেচনায় অনুবাদের জন্য এর প্রথমাংশকে নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে অতি-বিকশিত রাষ্ট্র ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির একটি সাধারণ তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান। নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের মুখে একুশ শতকে এসে রাষ্ট্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন আদৌ অক্ষত আছে কিনা তা প্রশ্নের দাবি রাখে; তবে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়মিত হস্তক্ষেপের বংশনামা বুঝতে হলে আলাভির এই লেখাটি এখনও অত্যাবশ্যক। – অনুবাদকের ভূমিকা]

    ছবি: হামজা আলাভি

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্রমবিকাশে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বিশেষ করে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বের নিরিখে। মিলিব্যান্ড১ যাকে রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রধান মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলছে তার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিতে :“আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার একটি কমিটি মাত্র,” এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো “মূলত এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে দমন করার জন্য একটি সংগঠিত শক্তি।“

    …উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে এই সনাতনী মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেবল একটি একক শাসক গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবেনা। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দিষ্ট কাঠামোগত বিন্যাস ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আমলে বিকশিত পুনর্বিন্যাস রাষ্ট্র ও সামাজিক শ্রেণিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জটিল করে তুলেছে। এ দুটি ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ধারা সম্পূর্ন ভিন্ন। পশ্চিমা সমাজে আমরা দেশীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা তাদের উদীয়মান ক্ষমতার প্রেক্ষিতে জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব হতে দেখি, যা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় আইনী কাঠামো ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে এই প্রক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা।

    উপনিবেশে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয় কেন্দ্রস্থ২ (Metropolitan) বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক শাসন আরোপের মাধ্যমে, যেখানে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও এর আনুষাঙ্গিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু উপনিবেশে এই বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করতে কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি বাড়তি লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। উপনিবেশে তাদের কাজ কেবল নিজ দেশে প্রতিষ্ঠিত উপরি-কাঠামোকে৩ নকল করা নয়। অধিকন্তু, তাদের এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করতে হয় যার মাধ্যমে তারা উপনিবেশের সকল স্থানীয় সামাজিক শ্রেণির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। সুতরাং, এই মর্মে উপনিবেশের (অব)কাঠামোর তুলনায় এর ‘উপরি-কাঠামো’কে ‘অতি-বিকশিত’(Over-developed) বলা যেতে পারে। কেননা, এর ভিত্তি খোদ কেন্দ্রের কাঠামোতেই নিহিত, যা থেকে পরবর্তীতে এটি স্বাধীনতার সময় আলাদা হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাই একটি শক্তিশালী সামরিক-আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র ও সরকারি কলকব্জা দ্বারা সজ্জিত, যা তাদের নিয়মমাফিক কার্যাবলির মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণিসমূহকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করতে সাহায্য করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজ এই অতি-বিকশিত রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর কার্যবিধির উত্তরাধিকার বহন করে, যার মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণি-সমূহকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা হতো। স্বাধীনতার সময়ে দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের এমন এক আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আবদ্ধ খুঁজে পায়, যার মাধ্যমে কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ায় থাকা ব্যক্তিরা সমাজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং এমনকি বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্রের আসল সমস্যা হলো যে এটি কোনো উদীয়মান দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় বরং একে প্রতিষ্ঠা করে একটি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি। স্বাধীনতার মাধ্যমে কাগজে কলমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে বিদেশি বুর্জোয়াদের হুকুম রদ হলেও এর ওপর তাদের প্রভাব কোনো অংশেই শেষ হয়ে যায় না। কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারা এখন নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের সাথে একাট্টা হয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে অবস্থান করে। একসাথে তারা সমাজগুলোর শ্রেণি কাঠামোতে একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে হাজির হয়। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্পষ্টতই ভিন্ন। ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শ্রেণি বৈশিষ্ট্য বেশ জটিল। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ও প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, একে ঠিক দেশীয় বুর্জোয়াদের অধীনস্থ বলা যাবেনা। আবার এটি এদের কারো কেবলমাত্র একটি হাতিয়ারও নয়, যার অর্থ দাঁড়াতো যে, স্বাধীনতা কেবলই একটি প্রহসন। উভয় বুর্জোয়া শ্রেণিই একে অপরের প্রভাব নাকচ করতে পারেনা এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। যে মূল প্রস্তাবনার উপর আমি গুরুত্বারোপ করতে চাই তা হলো যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র কোনো একক শ্রেণির হাতিয়ার নয়। এটি আপেক্ষিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত (relatively autonomous) এবং এটি তিনটি মালিক শ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে, অর্থাৎ কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া, দেশীয় বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণি। একইসাথে এটি সেই সামাজিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে তাদের সকলের হয়ে কাজ করে, যার মধ্যে তাদের স্বার্থ নিহিত আছে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থা ও প্রধান উৎপাদন প্রক্রিয়া হিসেবে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া।

    … এই পরিস্থিতিতে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি৪, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র ফলত একটি নতুন ও আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন অর্থনৈতিক ভূমিকা লাভ করে, যা ধ্রুপদি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নজিরবিহীন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ সরাসরি আত্মসাৎ করে এবং তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার নামে আমলাতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে। এসকল শর্তাবলি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বে বিশ্লেষিত রাষ্ট্র থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে।

    তবে, রাষ্ট্রযন্ত্র স্রেফ সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি দিয়েই গঠিত নয়। যেখানে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলসমূহও এর অংশ হিসেবে কাজ করে। যেখানে, রাজনৈতিক নেতারা আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব সহকারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং তাদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমাবদ্ধতাসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ব্যতীত সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির ভূমিকা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদেরা ও রাজনৈতিক দলসমূহ একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কীয় কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। একদিকে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে (আদর্শগতভাবে) তারা যাদের সমর্থন প্রত্যাশী, তাদের দাবিদাওয়াগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, যারা আসলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন, তাদের হয়ে জনমত প্রভাবিত করতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়; যাতে সেই নীতিগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। সেজন্য, তারা জনগণের ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে এমন এক ‘বোঝাপড়া’ তৈরি করতে চায়, যা সম্ভাব্য বিরোধিতাকে প্রশমিত করে ফেলবে। ফলে, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির সাথে তাদের সম্পর্ক দোদুল্যমান; এটি একই সাথে প্রতিযোগিতামূলক আবার পরিপূরক। এই দোদুল্যমানতা আরো গভীর যেখানে উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন রাজনীতিবিদেরা আমলাতন্ত্রের কিংবা সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যের ক্যারিয়ারের উপর প্রভাব রাখতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস ও ভাগ-বাটোয়ারার অনেক ধরণের রূপভেদ বিদ্যমান। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড হিসেবে রাজনৈতিক দলের উপর বৈধতার মোড়ক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জৌলুস অর্পিত হয়। তা সত্ত্বেও, বিপুল সংখ্যক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতার এক ক্রমবর্ধমান লঘুকরণ দেখা যাচ্ছে; এবং এর বিপরীতে, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ক্ষমতা বিস্তারলাভ করেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকাশ্য ‘দখল‘ সংঘটিত হয়েছে। তবুও, মোটা দাগে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে সমঝোতা ও একই সাথে টানাপোড়েন বিদ্যমান। পূর্বোক্ত পক্ষটি (রাজনৈতিক দল) পরোক্ত পক্ষটির (আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি) জন্য একটি কার্যকরী উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। তারা সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক দান করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নাটকের মাধ্যমে তারা জনঅসন্তোষ প্রশমিত করে এবং তাদের ক্ষোভ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। রাজনৈতিক দলের ভূমিকা থাকলেই তা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন নাকচ করে দেয় না। মূল বিষয়টি হলো সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন এবং তিনটি মালিক শ্রেণির মধ্যকার প্রতিযোগী স্বার্থের মধ্যে এর মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা, অর্থাৎ দেশীয় বুর্জোয়া, কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া এবং জমিদার শ্রেণি। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির স্বার্থ হাসিলে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তারা অলিগার্কির তৃতীয় অংশ হিসেবে শরিক হয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল সেই আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসনকে ও আমলতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কেবল তখনই তাদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, যেখানে এখন পর্যন্ত পরোক্ত পক্ষই জয়ী হয়েছে। কোনো পুঁজিবাদী উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট উদাহরণ আমরা আজ অবধি দেখতে পাইনি। ভারতের উদাহরণ এর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু এমনকি ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটি ঘোলাটে। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি কোনোভাবেই একটি একক শ্রেণির দল নয়; বরং এটি আমলাতন্ত্রের সাথে মিলিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগী মালিক শ্রেণির দাবিদাওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা করার কাজে অংশগ্রহণ করে। একইসঙ্গে, তাদের সমাজতান্ত্রিক বক্তৃতাবাজি সত্ত্বেও তারা আমলাতন্ত্রের সাথে মিলেমিশে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে সেই সামাজিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট, যা ওই মালিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখে। এমনকি বিদেশী পুঁজির ব্যাপারেও ভারত সরকারের প্রকৃত কর্মকাণ্ড কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতাবাজির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিশ্লেষণের জন্য যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যে, কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অন্তরালে ভারতীয় আমলাতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে বিশাল পরিধির স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে থাকে, যার ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো নতুন করে আলোকপাত করেছে।

    ভারত ও পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তন বুঝতে হলে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বিশেষ করে সুদূরপ্রসারী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক স্বায়ত্তশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার আগে, আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ার। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন স্থানীয় শ্রেণিকে অধীনস্থ রাখা এবং তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষ হয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা। মুক্তি সংগ্রামের সময়, তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে রাজনৈতিক ব্যারিকেডের উল্টো দিকে অবস্থান করেছিল। স্বাধীনতার পর, সেই একই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যাদের দমন করা ছিল তাদের কাজ, ক্ষমতার মসনদে আসীন হলেন এবং কাগজে কলমে তাদের (আমলা ও সামরিক বাহিনী) ওপর কর্তৃত্ব লাভ করলেন। ফলে, পারস্পরিক সমঝোতার একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে বিশ ও ত্রিশের দশকে পর্যায়ক্রমে আংশিক ক্ষমতা হস্তান্তরের৫ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিপূর্বেই এমন কিছু পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যার সাহায্যে আমলাতন্ত্র সেইসব রাজনৈতিক নেতাদের এড়িয়ে যেতে পারত, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতার ছাড়াই আমলাতন্ত্রের সাথে ব্যাপক হারে সরাসরি ও নিয়মিত লেনদেনের বাস্তবতার ফলে এসকল প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগুলো আরও প্রসারিত ও সুসংহত হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম কেবল তখনই ঘটে যখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনীতিবিদ তার সমর্থকদের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চান; যেক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার বদলে বরং আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদরা তখন সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দালালে পরিণত হন। জনগণের সাথে আমলাতন্ত্রের এই মধ্যস্থতা করা হলো, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তবে, রাজনীতিবিদরা কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তার সুনজর হারানোর ঝুঁকি নিতে পারেন না, যা তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। আমলাতন্ত্রের শক্তি মূলত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক বিস্তার এবং নানাবিধ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বিশাল সংখ্যক সরকারি সংস্থাসমূহের পরিচালনার ওপর নির্ভর করে।

    রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তনের প্রকৃত ধরণ ঐতিহাসিক পটভুমির বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বিবর্তনের ভিত্তিতে এক এক দেশে এক এক রকম। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে, সুকর্ণর উৎখাতের মধ্য দিয়ে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকাশ্য ক্ষমতার আবির্ভাব হতে হতে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এর পিছনে অন্তর্নিহিত কারণগুলো বেশ জটিল; তবে ইন্দোনেশিয়ায় আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী আপাদ-মস্তক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অলিগার্কি সুসংহতকরণে কিছুটা সময় লাগা নিশ্চই সেই কারণগুলোর একটি। এর বিপরীতে, ভারত ও পাকিস্তান শক্তিশালীভাবে সংগঠিত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো উত্তরাধিকারসুত্রে লাভ করে। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার সময়ে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী বেশ নাজুক অবস্থায় ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক দলসমূহের সংগঠন ও জনভিত্তি ছিল আরও বেশি নাজুক। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ, তাদের নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব ও কর্তৃত্বের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতো, যিনি স্বাধীনতার অল্প কিছুদিনের মাথায় মৃত্যবরণ করেন। ততক্ষণে মুসলিম লীগ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এর নেতৃত্ব তাদের জনভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

    পাকিস্তানের ২৫ বছরের ইতিহাসে দুটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রথমটি হলো আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যশীল অবস্থান। তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আসে, অক্টোবর ১৯৫৮ এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নয়, যেমনটা সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে; বরং নয়া রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রথম পর্যায়ে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থার লেবাস প্রদানকারী রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি হাতের পুতুল বানানো হয় এবং সেই অলিগার্কির সুবিধামতো তাদের ক্ষমতায় বসানো বা বহিষ্কার করা হতো। ১৯৫৮ সালে যখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যের জন্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল, তখন যারা ইতিমধ্যে ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছিল, তারা সংসদীয় সরকারব্যবস্থার যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জটি উত্থাপিত হচ্ছিল তা বিলুপ্ত করে দিয়ে ‘ক্ষমতা দখল’ করে। তবে তা সত্ত্বেও, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কিছু রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল যারা একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে; এবং ১৯৬২ সালের মধ্যে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’৬(Basic Democracy) ব্যবস্থার অধীনে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক প্যারোডির মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো হয়। ১৯৬৯ সালে একটি বিশাল জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তবুও ক্ষমতার লাগাম আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির হাতেই সুরক্ষিত ছিল। সরকারের ভেতরে পরিপূরক ভূমিকা পালনের জন্য তাদের তখনও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার নিজের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা বজায় রেখে ‘সাংবিধানিক সরকার’ পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা একটি রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এটি একটি জটিল ইতিহাস, যা আমি অন্যত্র বিস্তারিতভাবে নিরীক্ষা করেছি। এর প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘সংসদীয় সরকার’-এর আমলে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকৃত ভূমিকাটি একটি রাজনৈতিক কল্পকাহিনীর আড়ালে অস্পষ্ট ছিল, যার অধীনে এটি পরিচালিত হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধিপত্যশীল এবং নির্ণায়ক ভূমিকাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো পাকিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষিতে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি কিংবা এর বিভিন্ন অংশের সামাজিক চরিত্র, সম্পৃক্ততা এবং দায়িত্বসমূহ; যার মধ্যে সেই কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারাও অন্তর্ভুক্ত, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বহুবচনে পুনরায় হাজির হয়েছে।

    পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কর্তৃত্বের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জগুলো আসে প্রধানত সেইসকল রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে যেগুলো তাদের শক্তি জড়ো করে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোর মানুষদের থেকে; যেগুলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভৌত সম্পদের বণ্টন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই অঞ্চলগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিস্যার সপক্ষে সোচ্চার ছিল। কেবল পূর্ববঙ্গ থেকেই নয়, বরং সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং পাঠানদের দেশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (NWFP) থেকেও এই ধরণের চ্যালেঞ্জগুলো উত্থাপিত হয়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সমর্থন র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইমানের অংশ হয়ে ওঠে। সত্যিকার অর্থেই, তাদের অধিকাংশই আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলনগুলোতে গভীরভাবে জড়িত ছিল । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল যে, পাকিস্তানের র‍্যাডিকাল রাজনীতি আঞ্চলিক সীমানা ভেদকারী শ্রেণি সংহতির পরিবর্তে প্রধানত জাতিগত বা ভাষাগত সংহতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আসলে র‍্যাডিকাল চ্যালেঞ্জগুলো শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধেই পরিচালিত ছিল। কিন্তু এই সুবিধাগুলোকে তারা মূলত আঞ্চলিক মানদণ্ডেই চিহ্নিত করে। রাজনৈতিকভাবে, এই র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর দাবি ছিল একটি যুক্তরাষ্ট্ৰীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক (ও সামরিক) নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী পদগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পাকিস্তানের রাজনীতির এই দুটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্য এবং এর বিরুদ্ধে পরিচালিত চ্যালেঞ্জের আঞ্চলিক ভিত্তি, মূলত পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি একক বাস্তবতারই দুটি দিক, যা এই আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

    ১৯৫৮ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সরকার’ গঠন এবং পতন ঘটিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে তারা এমনকি ‘রিপাবলিকান পার্টি’৭ গঠনেও উস্কানি দেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ‘ক্ষমতা দখল’-এর পর ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান একটি নতুন ধরণের সংবিধান প্রণয়ন করেন। রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো শুরু হয়; আইয়ুব খানের আমলে তাদের ছলচাতুরি একটি নিখুঁত শিল্পে পরিণত হয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক সরকারের একটি বহিরাবরণ বজায় রাখার ব্যাপারেও সামরিক নেতাদের প্রবল উদ্বেগ দেখা দেয়। ফলে, ১৯৬৯ সালে পুনরায় সামরিক আইন জারি করার পর প্রেসিডেন্ট জেনারাল ইয়াহিয়া খান আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির অধীনে যত দ্রুত সম্ভব একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসাতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই লক্ষ্যে তিনি নির্বাচনের আশ্বাস দেন এবং তৎক্ষণাৎ একদল মনোনীত বেসামরিক ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় না থাকলে সামরিক বাহিনী সরাসরি জনঅসন্তোষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এটি তার রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক হারাবে এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি সংকটের মুহূর্তে তাদের হস্তক্ষেপ করার স্বঘোষিত অধিকার সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি সর্বদা সরাসরি নিজেদের নামেই শাসন করতে পছন্দ করে, এমনটি ধরে নেওয়া একটি অতিসরলীকরণ হবে। তারা প্রায়শই রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে শাসন করতে পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই রাজনীতিবিদরা তাদের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করে । কিন্তু পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল ছিল অস্বস্তিকর; এবং ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের সংকটের সূত্রপাত ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

    ১. র‍্যালফ মিলিব্যান্ড একজন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও তার আমলের অন্যতম প্রভাবশালী ইন্সট্রুমেন্টাল মার্ক্সবাদী চিন্তক।

    ২. কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া বলতে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমকারি দেশের পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায়।

    ৩. অবকাঠামো ও উপরি-কাঠামো মার্ক্সীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। অবকাঠামো বা বুনিয়াদ বলতে বোঝানো হয় একটি সমাজের উৎপাদিকা শক্তিসমূহ ও উৎপাদন সম্পর্কসমূহকে। আইন, রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ মিলে গঠিত হয় সমাজের উপরি-কাঠামো। ফরাসি চিন্তক লুই আলথুসের মতে উপরি-কাঠামোর আবার দুটি স্তর রয়েছে; রাষ্ট্র হলো প্রথম স্তর ও দ্বিতীয় স্তর হলো ভাবাদর্শ, যার অন্তর্ভুক্ত ধর্মীয়, নৈতিক, ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। তবে, আলাভি তার লেখায় উপরি-কাঠামো মূলত রাষ্ট্র অর্থেই ব্যবহার করেছেন।

    ৪. অলিগার্কি হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। পাকিস্তানে এই কেন্দ্রীভবন ঘটে আর্মি জেনারেল ও কিছু উচ্চপদস্থ আমলাদের ঘিরে।

    ৫. ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হলে ভাইসরয়ের অধীনে আমলাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ চালানো হয়। এই পর্যায়ে ক্ষমতা ছিল অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক ও এককেন্দ্রিক। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দাবির মুখে ১৯১৯ সালে ‘মর্লে-মিন্টো সংস্কার’-এর মাধ্যমে আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয় এবং এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। পুলিশ, অর্থ, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাইসরয় এবং তাঁর মনোনীত পরিষদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি বিষয় নির্বাচিত ভারতীয় মন্ত্রীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়তশাসন প্রদান করা হয়, ভাইস-রয়ের নির্বাহী কাউন্সিলের পরিবর্তে মন্ত্রীপরিষদ গঠন করা হয় এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার পারদ আমলাদের থেকে রাজনীতিবিদদের দিকে খানিকটা ঝোকে।

    ৬. আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরোক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তিনি তার সামরিক শাসনকে একটি বেসামরিক খোলস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারতেন না; তারা কেবল তৃণমূল পর্যায়ের ৮০,০০০ স্থানীয় প্রতিনিধি (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত করতেন, যারা পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি ইলেক্টোরাল কলেজ হিসেবে কাজ করত।

    ৭. ১৯৫৬ সালে ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’ অর্থাৎ, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে একত্র করে একক পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ করার দাবিতে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে পাকিস্তান রিপাবলিকান পার্টি গঠিত হয়। এর গঠনের পেছনে কলকাঠি নাড়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ডা. খান সাহিব। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করলে ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে দলটি বিলুপ্ত করা হয়। আলাভি মূলত ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে রিপাবলিকান পার্টির প্রসঙ্গ টানেন।

  • উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ বুবুন

    [বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্বেই বুদ্ধিত্তিক ও একাডেমিক অঙ্গনে ফরাসি উত্তর–আধুনিক বা আরও স্পষ্ট করে বললে উত্তর–কাঠামোবাদি চিন্তার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্যণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গোটা বিশ্ব দুটি সুপার পাওয়ারে ভাগ হয়ে যখন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তার প্রভাব পড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী শক্তি, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র। এই দুই শক্তিকে কেন্দ্র করেই সম্রাজ্যের প্রয়োজনেই বিকাশ লাভ করতে থাকে নানা বুদ্ধিবৃ্ত্তিক ও ভাবাদর্শিক চিন্তাধারা। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা দেখতে পাই ফরাসি বামপন্থী দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটা নতুন বাঁকবদলের। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীদের এখন প্রায়শই উত্তর–কাঠামোবাদী, উত্তর–আধুনিকতাবাদী নানা তকমায় চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা একদিকে যেমন দেখতে পাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি ভরসা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি, অন্যদিকে জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রতি অনাগ্রহ। বিপ্লবী রাজনীতির কৌশল, কর্মপন্থার বদলে তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে চলে আসে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, ভাষা ও সংস্কৃতি। এই দার্শনিক গোষ্ঠী এসে আধুনিকতাবাদের যাবতীয় মেটান্যারেটিভ বা মহাবয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মার্ক্সবাদকেও তারা দেখেন এক মহাবয়ান হিসেবে। ফলে স্বভাবতই মার্ক্সবাদের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তাদের ব্যবচ্ছেদের লক্ষ্য হয়ে উঠে। ১৯৮৫ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করে ফরাসি এই নতুন দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীদের নিয়ে। সিআইএর মূল্যায়নে এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বাঁকবদল একদিকে যেমন ফ্রান্সে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে সাহায্য করবে একই সাথে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও কাজ করবে। ২০১১ সালে সিআইএ এই প্রতিবেদনটির একটি সেন্সরড ভার্শন প্রকাশ করে তথ্য অধিকার আইনের আওতায়। মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন। ২০১৭ সালে ওপেন কালচার নামক একটি অনলাইন পোর্টাল সিআইএর এই প্রতিবেদনটির উপর একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করে। বর্তমান নিবন্ধটি সেই পর্যালোচনারই অনুবাদ। – সম্পাদক]


    ছবি: সিআইএর প্রতিবেদনের একটি পাতা

    দর্শনের মতো একটি শাস্ত্রের সরকারি নীতি–নির্ধারণ তথা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তেমন কোন প্রভাব থাকতে পারে, তা আমরা সাধারণত মনে করি না৷ কেননা, সরকারের কার্যক্রমকে সদা প্রভাবিত করা নির্ধারকগুলোর (মধ্যবিত্তের টিকে থাকার উদ্বিগ্নতা বা উচ্চবিত্তের স্টক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা কিংবা দারিদ্র‍্যের সদা উপস্থিতি) অবস্থান দর্শনের আলোচ্য বিষয় থেকে অনেক দূরে। তবে আমাদের এই অনুমান সবসময় সত্য নাও হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে যখন চিন্তাশীল ও পড়ুয়া ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী কিংবা সিনেটর হয়েছেন, তখন ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, লিও স্ট্রস, জার্গেন হাবারমাস কিংবা জন রলসের (যিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন) মতো দার্শনিকদের ধ্যানধারণা রাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে খুব কম দার্শনিকই জার্মান চিন্তক কার্ল স্মিটের মতো প্রভাবশালী ছিলেন; যদিও তার প্রভাবের স্বরূপ ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক৷ এছাড়া রয়েছে জন লক, জাঁ জ্যাক রুশো, থমাস হবস, অ্যারিস্টল এবং সক্রেটিস, যারা রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী প্রভাব রাখা দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    তবে যখন আমরা উত্তর–আধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের (যার কেন্দ্রে ছিলেন মিশেল ফুকো, রোলা বার্থ, জাক লাকাঁ, দেরিদাসহ আরও অনেকে) দিকে তাকাই, তখন রাষ্ট্রনীতিতে তাদের তেমন সরাসরি প্রভাব দেখা যায় না। অধিকাংশ সময়ই এইসব লেখকরা গুরুত্বহীন ও প্রভাবশূন্য বলে বিবেচিত হয়। দায়ী করা হয় তাদের ভাষাকে, যা বামঘেষা একটি অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। এই বক্তব্য সম্ভবত কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেখানে ক্ষমতাকে প্রায়শই তত্ত্বায়িত করা হলেও খুব কম সময়ই মূলধারার প্রকাশনায় ক্রিটিক করা হয়৷ তবে এই আলাপ ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সত্য নয়। অন্তত সিআইএ তা–ই মনে করে। কমিউনিজম ও অ্যান্টি–আমেরিকানিজমের বিরুদ্ধে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ফরাসি দর্শনের প্রভাবকে এই সংগঠনটি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধান নথিবদ্ধ করতে ১৯৮৫ সালে তারা একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে৷

    সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নথির একটি পরিশোধিত অনুলিপি “ফ্রান্স: ডিফেকশন অব লেফটিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল” নামে প্রকাশিত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে, এই নথি উত্তর–কাঠামোবাদী চিন্তকদের রাজনৈতিক অভিমুখকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। ইয়ানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রফেসর ও র‍্যাডিকেল হিস্ট্রি ও দি পলিটিক্স অব আর্ট–এর লেখক গ্যাব্রিয়েল রকহিল ফরাসি উত্তর–কাঠামোবাদ সম্পর্কিত সিআইএর মূল্যায়নকে এল এ রিভিউ অব বুকের জন্য সামারাইজ করেছেন এভাবে:

    “…গুপ্ত সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা (সিআইএ) মূলত প্রশংসা করেছে দুটি পরিবর্তনকে৷ এক, উত্তর–কাঠামোবাদী বাঁকবদলের মাধ্যমে ফরাসি বুদ্ধিজীবী মহলের সমালোচনার মূখ্য লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে চলে যায়। বৃহত্তর বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় ধীরে ধীরে স্ট্যালিনবাদ ও মার্ক্সবাদ নিয়ে অনাগ্রহ দেখা যায়; র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের বিতর্ক থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসে; এবং তাত্ত্বিক অবস্থানের জায়গা থেকে সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক দল থেকে দূরে সরে আসতে থাকে। অপরদিকে ডানপন্থীদের মধ্যে মতাদর্শগত সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত “নিউ ফিলসফারস” ও “নিউ রাইট” বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমে মার্ক্সবাদ বিরোধী একটি হাইপ্রোফাইল স্মিয়ার ক্যাম্পেইন শুরু করে।“

    সিআইএ এজেন্টরা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত বিরোধিতার এই উদ্দীপনা ফ্রান্সে কারও পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মার্কিন নীতির কোনো বিরোধিতা গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলবে।” ফরাসি সংস্কৃতি ও সরকারের ওপর “নিউ লেফট বুদ্ধিজীবীদের” প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা ধারণা করেছিল, “প্রেসিডেন্ট [ফ্রাঁসোয়া] মিতেরঁ সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর প্রতি যে তাৎপর্যপূর্ণ শীতলতা দেখিয়েছেন, তার পেছনে কিছুটা হলেও এই সর্বব্যাপী বৌদ্ধিক মনোভাব ভূমিকা রেখেছে।“

    ছবি: লিওতার, ফুকো ও দেরিদা

    রকহিল লিখেছেন, এই গবেষণায় ফ্রান্সের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রভাব সম্পর্কিত (সিআইএর অভিমত অনুযায়ী) যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আগের প্রজন্মের “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ের বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের” থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন“। ওই প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীরা “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতো” এবং আমেরিকান গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল। জঁ–পল সার্ত্রে এমনকি “প্যারিসে সিআইএ স্টেশন অফিসার এবং ডজনখানেক আন্ডারকভার এজেন্টের পরিচয় ফাঁস” করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলে এবং এই কারণে তিনি সিআইএ এর “নিবিড় নজরদারি“-তে ছিলেন। সার্ত্রে সিআইএর কাছে একটি গুরুতর সমস্যারূপে বিবেচিত ছিলেন। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একই সংস্থা বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করেছিল, “এখন আর কোনো সার্ত্রে নেই, নেই কোন গিদে।” তারা লিখেছিল, “কমিউনিস্ট পণ্ডিতদের সর্বশেষ গোষ্ঠী নিজেদের শিষ্যদের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কিন্তু তখন কারোরই আর মার্ক্সবাদের পক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল না।” এ কারণে স্নায়ু যুদ্ধের শেষ পর্বে “সব রাজনৈতিক ধারার বুদ্ধিজীবীদের মাঝেই মতাদর্শ থেকে সরে আসার একটি বড় প্রবণতা” লক্ষ করা যায়।

    “স্ট্যালিনবাদী কাল্ট”–এর একেবারেই অসমর্থনযোগ্য একনায়কতান্ত্রিক দমন–পীড়ন এবং ওয়াশিংটন কনসেনসাস ও তার দ্বারা সৃষ্ট বহুজাতিক কর্পোরেটবাদের অবশ্যম্ভাবী হিসেবে হাজির হওয়ার বাস্তবতা এক ধরনের ক্লান্তিতেই যেন আচ্ছাদিত করেছিল চারদিক। কমিউনিজমের পতনের সময়ে মার্কিন দার্শনিকরা প্রলয় তথা কিয়ামতের ভাষা ব্যবহার করছিল—এন্ড অব হিস্ট্রি। একইসাথে, তারা উদযাপন করছিলেন ওই যুগান্তকারী ঘটনাকে যাকে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আখ্যায়িত করেছিল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে “উদার গণতন্ত্রের” জয় হিসেবে। ফুকুয়ামার বই দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান শিরোনামের মাধ্যমেই এই বিস্ময়কর তত্ত্বকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। অর্থ্যাৎ, আর কোনো বিপ্লব হবে না। হার্ভার্ডের চিন্তক স্যামুয়েল হান্টিংটন এই সময়কে তাই “সমাপ্তির যুগ” বলে ঘোষণা করেছিলেন ঠিক যেই সময়ে “শিল্পের সমাপ্তি,” “প্রকৃতির সমাপ্তি,” ইত্যাদি নানা অতিরঞ্জিত তর্কের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। আর সিআইএ–র মতে, বার্লিন প্রাচীর পতনের ঠিক আগের কয়েক বছরে ফ্রান্সের অতীতে শক্তিশালী দার্শনিক বামপন্থীরা “এক ধরণের ঔদাসীন্যে আক্রান্ত” হয়েছিল৷

    এই প্রতিবেদনে সিআইএ উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের জনমতকে সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া এবং “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি জনসাধারণের মনোভাবকে কঠোরতর করে তোলার” জন্য কৃতিত্ব দেয়ার পাশাপাশি আরও লিখেছিল যে “উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বড় কোন প্রভাব রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।” তাদের এই বক্তব্য কি সঠিক ছিল? যদি আমরা বহু–কথিত “পরিচয়বাদী রাজনীতি”–র সমালোচকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখি, তবে এই প্রশ্নের উত্তর হবে: একেবারেই না। আবার, যারা উত্তর–আধুনিক দর্শন এবং সাম্প্রতিক কালের কয়েকটি প্রভাবশালী বামপন্থী চিন্তাধারা ও আন্দোলনকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তারা যুক্তি দিতে পারেন যে, সিআইএ তাদের সিদ্ধান্তে অদূরদর্শী ছিল। হয়তো স্নায়ু যুদ্ধের কয়েক দশকের কূটকৌশলে গড়ে ওঠা দ্বৈততাবাদী (Manichean) দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ থাকায় তারা এমন এক রাজনীতির কথা কল্পনা–ই করতে পারেননি, যা একইসঙ্গে আমেরিকান ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে পারে।

    শিল্পী: রিচার্ড প্রিন্স

    তবুও মতাদর্শ থেকে সরে আসার অর্থ মোটেও রাজনীতি থেকে সরে আসা নয়। বলা যেতে পারে, গোয়েন্দাদের মাঝে এই অদ্ভুত গবেষণা প্রবন্ধটি প্রচারিত হওয়ার তিরিশ বছর পর ফুকোর “বায়োপাওয়ার” কিংবা দেরিদার পরিচয় (আইডেন্টিটি)-কে প্রবলেম্যাটাইজ করা ধারণাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর (যদিও আমরা সবসময় তাদের কাজ পড়ি না বা পুরোপুরি বুঝি না)। তবে সংস্থাটি উত্তরাধুনিক চিন্তার সর্বব্যাপী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে না পারলেও তারা এই দার্শনিক ঐতিহ্যকে কখনোই অস্পষ্ট কিংবা তুচ্ছ জটিল বাক্যবিন্যাস হিসেবে বাতিল করে দেয়নি। রকহিল লিখেছেন, “যদি কেউ ধরে নেয় যে, বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাহীন কিংবা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তবে মনে রাখবেন, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ক্রীড়ানক আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নয়। এই সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতার একটি স্মারক হয়ে থাকবে।“

  • আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    • তৌহিদুল ইসলাম

    [ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life বইটি ইতোমধ্যেই আমাদের পাঠকের কাছে পরিচিত। বইটিতে আগামবেন তার হোমো সাকের ধারণার একটি বিস্তর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা কীভাবে আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো যেখানে জৈবক্ষমতার ধারণা হাজির করে আমাদের দেখান আধুনিক রাষ্ট্র জৈবক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের দ্বারা আমাদের কীভাবে আমাদের জীবন রক্ষা করে চলে, আগামবেন সেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার একটা বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা তার নিজের প্রয়োজনেই তার ব্যতিক্রমী অবস্থার তৈরি করে, যেই ব্যতিক্রমী অবস্থার মধ্য দিয়ে কাউকে ঠেলে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় ও আইনি সুরক্ষার বাইরে। পরিণত করা হয় হোমো স্যাকারে। আগামবেনের মতে হোমো স্যাকার হলো সেই জীবন যাকে যে কেউই হত্যা করতে পারে, এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন তাকে হতে হয় না। তৌহিদুল ইসলাম তার এই লেখায় আগামবেনের এই বইটির উপর কিছু নোক্তা হাজির করেন, যা আগামবেনের মূল ধারণার একটা সংক্ষিপ্ত টীকা আকারে দেখা যেতে পারে – সম্পাদক]

    দেয়ালচিত্রে আগামবেন

    ১.

    গ্রিক zoe এবং bios দুইটাই প্রাণ বা জীবন অর্থে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। প্রথমটা ব্যবহৃত হতো জীবের জীবন অর্থে। অর্থাৎ, যেখানে জীবন তার খুৎনিবৃত্তির স্তর অতিক্রম করে নাই। খাওয়া, পড়া, বেঁচে থাকার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, থাকে বায়োস। যার অর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন। বাংলার তন্ত্রে একটা কথা প্রচলিত আছে– “পাশবদ্ধ ভবেৎ জীব, পাশমুক্ত ভবেৎ শিব“। গ্রিক জো’কে আমরা বলতে পারি এই জীব। যে নানা পাশে বদ্ধ আছে বলে কল্পনা করা হয়। গ্রিক জো বা জীবের এই বায়োসে রূপান্তর তখনই সম্ভব যখন সে সমাজে প্রবেশ করে, রাজনৈতিকতায় অভিষিক্ত হয়। নিজের অধিকার, ভালো মন্দের নৈতিক ধারণা, আইন সম্পর্কে সচেতন না হয়ে জীবন ধারণ করতে পারে না। জো আর বায়োস জীবনের দুই প্রান্ত মনে হলেও এখানে একটা সরলরৈখিক রূপান্তরের ধারণা আছে। সেই রূপান্তর ঘটে জো বা জীবের। জীব থেকে সে নাগরিক হয়ে ওঠে।

    ২.

    এরিস্টটলের “Politics” থেকে জো এবং বায়োসের এই আলোচনায় আগামবেন মিশেল ফুকোর হিস্টরি অব সেক্সুয়ালিটিতে এ বিষয়ে একটা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন, যেখানে ফুকো দেখান, আধুনিক সময়ে রাষ্ট্র কীভাবে তার যন্তরমন্তর আর হিসাবনিকাশের মাধ্যমে এই জো বা জীবের জীবন একটা কাঁচামাল হিসেবে হাজির হয় যার থেকে জন্ম আধুনিক বায়োপলিটিক্সের বা জৈবরাজনীতির। ফুকো বলেন, “For millennia man remained what he was for Aristotle: a living animal with the additional capacity for political existence; modern man is an animal whose politics calls his existence as a living being into question.”

    ৩.

    ফুকো এখানে চিহ্নিত করেন আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে তার প্রক্রিয়াটিকে। যে প্রক্রিয়ার গোঁড়ায় আমরা দেখতে পাবো ইউরোপীয় জ্ঞানকাণ্ডের চালানো ভায়োলেন্স যা এই জীবের রক্তমাংসে নানাবিধ নামচিহ্নের টোকেন গেঁথে দিচ্ছে। তাকে নানা বর্গে ভাগ করে রেখে দেয়া হচ্ছে নানাবিধ খোপে, খাঁচায়। আর পুরো প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে এমন একটা সর্বব্যাপী আয়োজনের ভিতর দিয়ে যে মানুষ সজ্ঞানেই নিজেকে সঁপে দিচ্ছে সেই জ্ঞানের বেদিতলে। ফুকো এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেন ইউরোপীয় রাষ্ট্র কাঠামোর টেরিটরিয়াল স্টেট থেকে পপুলেশন স্টেটে রূপান্তর হিসেবে। আগে যেখানে রাষ্ট্র কিছু কাল্পনিক রেখার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং সার্বভৌমত্বকে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করতো টেরিটরি ধারণা, সেই রাষ্ট্রের নতুন কেন্দ্র হয়ে হাজির হলো জনগণ নামের নতুন বর্গ যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা চর্চার এবং ক্ষমতাকে পুনরুৎপাদন করার নতুন উপকরণ। এই ক্ষমতা ক্রমেই এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছালো যা একই সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্রের বিকাশের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো, আবার একই সঙ্গে হলোকাস্টের মত নারকীয় ঘটনারও জন্ম দিলো।

    ৪.

    আগামবেন বলেন, এই জৈবক্ষমতার উদ্বোধনের মাধ্যমে মানুষের আচার–আচরণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ক্যাপিটালিজমের বিকাশও সম্ভবপর হতো না।

    আগামবেন হানা আরেণ্ডের হোমো লেবারানের উল্লেখ করে দেখান যে ফুকোর আগেই আরেন্ডের চিন্তায় বায়োপাওয়ারের ডিসিপ্লিনারি প্রক্রিয়া এবং আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর তার প্রভাবের নজির থাকলেও সেইটার সঙ্গে টোটালিটারিয়ান ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আরেন্ড তেমন সচেতন ছিলেন না। আবার ফুকোও তার জৈবক্ষমতার বিশ্লেষণে তার সমসাময়িক সময়ের উদাহরণগুলি খুব বেশি টানেননি। এর মাধ্যমে আগামবেন দেখাতে চান যে জৈবক্ষমতা এবং বেয়ার লাইফের সম্পর্ক এতই আচ্ছাদিত যে পশ্চিমা চিন্তকরা খুব রেয়ারলি তার টিকি ধরে টান দিতে পেরেছেন।

    ৫.

    এই আচ্ছাদিত বিষয়টিকে নিরাবরণ করতে আগামবেন বলেন, হোমো সাকেরে তার কাজ হলো ক্ষমতার আইনি–প্রতিষ্ঠানগত এবং জৈবরাজনৈতিক মডেলের ছেদবিন্দুটির ব্যবচ্ছেদ। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতা গঠিতই হয় বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক জগতে অন্তর্ভূক্ত করার ভিতর দিয়ে। অথবা, সার্বভৌম ক্ষমতার আদি কাজটিই হলো এই জৈবরাজনৈতিক দেহের নির্মাণ। আগামবেনের মতে, এই অর্থে সার্বভৌম ব্যতিক্রম আর জৈবরাজনীতি সমান বয়সী। arcana imperii.

    তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন পশ্চিমা রাজনীতি নিজেকে গঠনই করে বেয়ার লাইফকে বর্জনের (যা একই সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণও বটে, বর্জনের অন্তর্ভূক্তিকরণ!) ভিতর দিয়ে।

    ৬.

    এরপর আগামবেন একটা দুর্দান্ত কাজ করেন। জো এবং বায়োসের দ্বৈততা থেকে তিনি পশ্চিমা চিন্তার একটা কেন্দ্রীয় অধিবিদ্যক প্রবণতার সঙ্গে একে মিলিয়ে দেখেন। এরিস্টটল যেইভাবে জো থেকে বায়োসে রূপান্তরকে জীবের রাজনৈতিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া হিসেবে হাজির করেন, একইভাবে আগামবেন দেখান, পশ্চিমা অধিবিদ্যার খুব কেন্দ্রীয় প্রবণতা হলো কণ্ঠস্বর থেকে ভাষায় পৌঁছানো। যেখানে ভাষা হলো সেই এলাকা যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষ একই সঙ্গে মানুষ হয়ে ওঠে ভাষা ও রাজনৈতিকতায়। আগামবেন বলেন: The question “In what way does the living being have language?” corresponds exactly to the question “In what way does bare life dwell in the polis?” তার মতে, পশ্চিমা অধিবিদ্যার সহি বড় আদি ও আসল সুরত হইলো রাজনীতি যার মারেফতে জীব ও ভাষার (logos) সম্পর্কে মুসাবিদা হয়। জীব বা বেয়ার লাইফের রাজনীতিকরণের মাধ্যমেই মানবের চূড়ান্ত অধিবিদ্যক গন্তব্য নিহিত। যেহেতু আধুনিক জমানায় ক্ষমতা নিজেকে জাহির করে বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক স্ফিয়ারে নিয়ে আসার মাধ্যমে, তাই এর মাধ্যমে আধুনিকতা পশ্চিমা অধিবিদ্যার গোপন পারপাসই সার্ভ করে। জার্মান জুরিস্ট কার্ল শ্মিটের বিপরীতে তিনি বলেন, পশ্চিমা রাজনীতির মৌলিক ক্যাটাগরি বন্ধু/শত্রু দ্বৈততা না, বরং বেয়ার লাইফ/ রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জো/বায়োস, এক্সক্লুশন/ইনক্লুশনের স্ট্রাকচারে নিহিত। আগামবেন বলেন, রাজনীতি আছে কারণ মানুষ হইলো সেই জীবিত জন্তু যে ভাষার ভিতরে ঢুকে নিজেকে তার বেয়ার লাইফ থেকে আলাদা করে, তার বিপরীতে দাঁড় করায় এবং একই সাথে, নিজেকে নির্ণয় করে সেই বেয়ার লাইফের সাপেক্ষে একটা অন্তর্ভূক্তিমূলক এক্সক্লুশনের মাধ্যমে।

    ৭.

    এই যে বেয়ার লাইফ, যারে নিয়ে এত কাহিনি, সেই হইলো আগামবেনের এই বইয়ের নায়ক। তথা প্রটাগনিস্ট। এই বেয়ার লাইফই হলো হোমো সাকের (পবিত্র মানব), যাকে হত্যা করা জায়েজ কিন্তু কুরবানি দেয়া জায়েজ না। আধুনিক রাজনীতিতে এই প্রটাগনিস্টকে কীভাবে ব্যবহার করা হয় সেটাই, আগামবেন বলেন, এই বইয়ের মূল কাজ। রাষ্ট্রে যেমন সব মানুষের একটা আইনি অস্তিত্ব থাকে যার ভিত্তিতে সে কিছু অধিকার ভোগ করে কিন্তু হোমো সাকেরের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাকে হত্যা করা জায়েজ।

    ৮.

    আগামবেনের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে এই জৈবরাজনীতির ট্রান্সফর্মেশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যে এখানে বেয়ার লাইফ বা হোমো সাকের আর কেবলমাত্র একটা ব্যতিক্রম হিসেবে থাকে না, বরং এটা নিজেই একটা নিয়ম হয়ে ওঠে। যেইটাকে আগামবেন বলেন, ইরিডিউসিবল ইনডিসটিঙ্কশন। অর্থাৎ, যে কারো যেকোনো সময়ে হোমো সাকের হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটা কেবলমাত্র আর প্রান্তের একটা বিষয় না, বরং আধুনিক রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বিষয়।

    ৯.

    আগামবেন আধুনিক গণতন্ত্রকে দেখেন এই বেয়ার লাইফকে তাঁর রাজনৈতিক বলয়ে ইন্টিগ্রেশনের দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামী প্রক্রিয়া হিসেবে। যার মাধ্যমে বেয়ার লাইফের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের পক্ষেও তার যে অন্তর্গত এপোরিয়া সেটাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না। বরং, বেয়ার লাইফ একটা বধযোগ্য ক্যাটাগরি হিসেবে বর্তমান থাকে। আধুনিক গণতন্ত্রের টোটালিটারিয়ানিজমের সঙ্গে সহবতে এটা প্রমাণিত হয়েছে নাজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের সময়ে, বিশেষ করে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, যেখানে মানুষকে তার সকল মানবিক মর্যাদা থেকে ছিন্ন করে একেবারে আক্ষরিক বেয়ার লাইফে পরিণত করা হয়েছিল।

    শিল্পী: তাদিউস সোবেস্তো (১৯৮৯)

    ১০.

    আগামবেনের মতে, গণতন্ত্র এবং টোটালিটারিয়ানিজমের মধ্যে একটা সলিডারিটি আছে, এই দুই ব্যবস্থার সকল ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পার্থক্যসমেতই। এই ব্যর্থতা আগামবেনের মতে পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসের ব্যর্থতা যেখানে জো আর বায়োস, কণ্ঠ এবং লোগোসের মধ্যে রূপান্তরের কোন সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি, যা এই ক্ষতকে নিরাময় করতে পারে। বেয়ার লাইফের এক্সক্লুশনারি ইনক্লুশনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি থেকে বের হতে না পারলে এর কোন সমাধান নেই।

    ১১.

    কার্ল শ্মিটের– সার্বভৌম হলো সেই যে ব্যতিক্রম কী হবে সেটাকে ঠিক করে–এই কথা, আগামবেনের মতে নতুন না। তার মতে, সার্বভৌম কে কিংবা কীভাবে সে সার্বভৌম হয়ে ওঠে এটা নিয়ে চিন্তা করা যথেষ্ট না, বরং পুরো রাজনৈতিক পরিসরের বিষয়টিকেই আমলে নিতে হবে। যা সার্বভৌমত্বের জুরিডিকাল, ইন্সটিটিউশনাল ধারার চিন্তায় করা হয় না।

    ১২.

    ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বুঝেছিলেন কীভাবে ব্যতিক্রম নিজেই নিয়ম হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি আমলে নিতে আগামবেন রাষ্ট্রের গঠনের আদি উৎপত্তির যে কাঠামো সেটার দিকে নতুনভাবে নজর দিতে বলেন। নৈরাজ্যবাদী ও মার্ক্সবাদীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা এই কাঠামোটিকে গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার যে গোপন সূত্র (acranum iperiii) তাকে অবজ্ঞা করে, যেন সিমুলাক্‌রা এবং আইডিওলজির বাইরে রাষ্ট্রের আর কোন সাবসট্যান্স নাই। বরং, তারা এমন এক শত্রুকে সনাক্ত করে যার কাঠামো নিজেরাই বুঝতে পারে না, এবং তাদের রাষ্ট্রতত্ত্ব এমন একটা ডুবোচর যেখানে বিপ্লবের জাহাজডুবি ঘটে। এই ডুবোচরকে আগামবেন বলেন, যা মার্ক্সিস্ট রাষ্ট্রতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দ্য স্টেট অব এক্সসেপশন বা প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র, যাকে দেখা হয় রাষ্ট্রহীন সমাজে অভিযাত্রার একটা ট্রান্সিশনাল পর্ব হিসেবে।

    শেষে এসে আগামবেন বলেন বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান কিংবা নৃবিজ্ঞানের যে সকল চিন্তার ক্যাটাগরি আছে সেগুলো নতুন ভাবে পর্যালোচনা ছাড়া, ক্ষমতার সঙ্গে বেয়ার লাইফের সম্পর্কের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বোঝা আমাদের জন্য সম্ভব হবে না।

  • জোভান্নি জেন্তিলে।। ফ্যাসিবাদ: স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও ধর্ম

    জোভান্নি জেন্তিলে।। ফ্যাসিবাদ: স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও ধর্ম

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [সম্পাদকীয় ভূমিকা: জোভান্নি জেন্তিলে (১৮৭৫–১৯৪৪) ছিলেনে ইতালীয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। ১৯২০ এর দশকে তিনি পরিণত হন ফ্যাসিবাদের কর্তৃপক্ষীয় দার্শনিকে। এর আগে ইতালীয় দার্শনিক বেনেদিত্তো ক্রোচের সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন La Critica পত্রিকা। জেন্তিলের ফ্যাসিবাদ বিষয়ক প্রধান গ্রন্থ Origini e dottrina del fascismo ১৯২০–এর দশকের শেষভাগে রচিত। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে Libreria del Littorio প্রকাশনা সংস্থা থেকে। গ্রন্থটির প্রথম ইংরেজি অনুবাদ, টীকা ও সম্পাদনা করেন ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্থনি জেমস গ্রেগর। Origins and Doctrine of Fascism ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে Transaction Publishers থেকে। বর্তমান রচনাটি গ্রন্থের প্রচ্ছদ প্রবন্ধটিরই (একই শিরোনাম) সর্বশেষ অংশ।

    ফ্যাসিবাদ বিষয়ক বিপুল সমালোচনা সত্ত্বেও বারংবার এর পুনর্জন্ম ও উত্থান ঘটেছে, এমনকি সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোতে। এর প্রধান কারণ বিংশ শতকেই ফ্যাসিবাদ নিয়ে মহীরূহ দার্শনিক ও চিন্তকদের বিভ্রম। নিজ সমাজ ও রাজনীতির সংকট থেকে উদ্ভূত ক্লেদকেই ফ্যাসিবাদের সমরূপ হিসেবে হাজির করার প্রবণতা বিদ্যমান থেকেছে দশকের পর দশক। ফ্যাসিবাদ মাত্রই ‘ উগ্র জাতিবাদ‘ ‘একনায়কত্ব‘ আর সামরিকতাপূর্ণ রাষ্ট্রকেই বোঝানো হয়েছে। খুব কম বিদগ্ধজনই ফ্যাসিবাদের চিন্তার পাটাতনে প্রবেশ করে এর সমালোচনা করেছেন। অনেকে এমনকি এর চিন্তাগত স্বীকৃতিটুকুও স্বীকার না করে কেবল ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। বি–ফ্যাসিকরণ প্রশ্নটি হাজির হয়েছে উদারবাদী সংসদীয় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্ন হিসেবেই। কিন্তু নব্য উদারবাদের বাড়বাড়ন্তর সঙ্গে একই সঙ্গে প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছে এক নব্য ফ্যাসিবাদ। আর তা ঘটেছে বিপুল উদারবাদী সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোতেও। যুদ্ধ সহিংসতার যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে খোদ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিরপত্তা নিজেই। যেন, নব্য উদারবাদ আর নব্য ফ্যাসিবাদ একাকার। তাহলে সংকট কোথায়? এই প্রশ্ন থেকেই ফ্যাসিবাদের চিন্তার পাটাতনে প্রবেশ করতে চায় অরাজ। ফ্যাসিবাদী সাহিত্যর ধ্রুপদী রচনাকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও এর অনুবাদ জরুরি যাতে মোকাবিলার পথ তৈরি হয়।]

    মূল লেখা

    একবার ফ্যাসিবাদের মহান দ্যুচে আলোচনা করেছিলেন: ‘বল নাকি ঐকমত্য?’ শিরোনামে এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, এই দুই পরিভাষা অবিচ্ছেদ্য; একটিকে স্বীকার করলে অন্যটিকেও স্বীকার করতে হয়, কারণ একটির অস্তিত্ব অন্যটির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও নাগরিকের স্বাধীনতা এক অটুট বৃত্তে আবদ্ধ, যেখানে কর্তৃত্ব স্বাধীনতাকে পূর্বানুমান করে, আর স্বাধীনতা কর্তৃত্বকে। স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রের মধ্যেই পাওয়া যায়, আর রাষ্ট্র মানেই কর্তৃত্ব। রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়, যা আকাশ থেকে নেমে এসে নাগরিকদের মাথার ওপর ভেসে থাকে। বরং রাষ্ট্র ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই একাত্ম; সেই কারণেই ব্যক্তিকে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়, খুঁজে বের করতে হয়, এবং তাকে স্বীকৃতি দিতে হয়। কারণ সেটি শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই সৃষ্ট।

    ফ্যাসিবাদ আসলে উদারনীতির বিপরীতে নিজকে এমনভাবে দাঁড় করায় না যে, একদিকে কর্তৃত্বের ব্যবস্থা আর অন্যদিকে স্বাধীনতার ব্যবস্থা। বরং ফ্যাসিবাদ নিজেকে দেখে এক বাস্তব ও সুস্পষ্ট স্বাধীনতার ব্যবস্থা হিসেবে, যা উদারনীতির বিমূর্ত ও ভ্রান্ত স্বাধীনতার বিপরীতে অবস্থান করে। উদারনীতি শুরু হয়েছিল আগের উল্লিখিত বৃত্তটিকে ভেঙে দিয়ে—অর্থাৎ ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে, স্বাধীনতাকে কর্তৃত্বের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে। উদারনীতি এমন এক স্বাধীনতা খুঁজেছে, যা রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়; এমন এক স্বাধীনতা, যা রাষ্ট্রকে সীমারেখা হিসেবে ধরে নেয়, আর রাষ্ট্রকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার অনিবার্য সীমা হিসেবে মেনে নেয়। এগুলো ছিল বিমূর্ত ধারণা ও শূন্য কল্পনা, যেগুলো উনবিংশ শতকের সেই উদারপন্থীদের কাছেই সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যারা স্বাধীনতার স্বার্থে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন ও আগাম অনুমান করেছিলেন।

    ফ্যাসিবাদের কৃতিত্ব হলো, এটি সমসাময়িক উদারনীতির এই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অবস্থান নিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল, উদারনীতি যে স্বাধীনতার কথা বলে, তা জনগণেরও নয়, ব্যক্তিরও নয়। তদুপরি, যেহেতু সর্বাঙ্গ রাষ্ট্র সবচেয়ে সুসংগত ও মৌলিক উপায়ে কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার ঐক্য ও সম্পূর্ণতা বাস্তবায়িত করতে চায়। আরও বেশি সত্যনিষ্ঠ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। তাই নতুন রাষ্ট্র পুরনো রাষ্ট্রের তুলনায় আরও ‘উদার’।

    কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার এই বৃত্ত কেবল ব্যক্তির চেতনার মধ্যেই বাস্তবায়নযোগ্য। সেই চেতনা ঐতিহাসিকভাবে উৎপাদনশীল কাজের সঙ্গে এবং বৌদ্ধিক ও নৈতিক অর্জনের ঐতিহ্যের সঙ্গে গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র তার কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতায় পৌঁছাতে পারত না যদি এটি তার সমস্ত চেতনাকে একটি সার্বভৌম শক্তি হিসেবে সেই ক্ষেত্রে ব্যবহার না করত। এটি সেই শক্তি যা কোনো শর্ত বা সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। অন্যথা, রাষ্ট্র তার অন্তরের গভীরে শুধু বাতাসে ভেসে থাকত। কেবল সেই মূল্যবান এবং জীবন্ত আত্মিক চেতনাই সম্পূর্ণ যা কোন কিছুই বর্জন করে না।

    ছবি: জোভান্নি জেন্তিলে

    রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আলোচনা বা সমঝোতার বিষয় নয়, বা এর নিজ ক্ষেত্রকে অন্য নৈতিক বা ধর্মীয় নিয়মের সঙ্গে ভাগ করার ব্যাপারও নয়, যা এর সচেতনতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব শক্তিশালী এবং সত্যিকারের, যদি চেতনায় তা সম্পূর্ণভাবে অবাধ থাকে। রাষ্ট্রকে সচল করার চেতনা হলো চেতনার পূর্ণতা, যার সব উপাদানই তার উৎপাদন।

    নৈতিকতা ও ধর্ম, যা প্রতিটি চেতনার অপরিহার্য উপাদান, রাষ্ট্রের মধ্যে থাকা আবশ্যক। তবে রাষ্ট্রের আইনকে প্রাধান্য দিয়ে তার সঙ্গে একীভূত ও দ্রবীভূত হতে হবে। মানুষ, যে তার সংকল্প গভীরে রাষ্ট্রের সংকল্পের প্রতিফলন—কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার সংশ্লেষ—হিসেবে কাজ করে, সেই মানুষই ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও নৈতিক সমস্যার সমাধান করে। এসব দেশনা ও মূল্যবোধ ছাড়া রাষ্ট্র কেবল একটি যান্ত্রিক সত্তা হয়ে যেত এবং রাজনৈতিকভাবে যে মান অর্জনের দাবি করে তা হারাত। ‘হয় সিজার, নয়তো কিছুই নয়।’ এ থেকেই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ও রোমান ক্যাথলিক গির্জার সম্পর্কের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চরিত্র উদ্ভূত হয়। একই যুক্তিতে, ইতালীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র, যা ইতালীয় জনগণেরই একাকার রূপ, তা হয় ধার্মিক নয়, নয়তো রোমান ক্যাথলিক।

    রাষ্ট্র অধর্মী হতে পারে না, কারণ রাষ্ট্র নিজের ওপর যে চূড়ান্ত মূল্যবোধ ও কর্তৃত্ব আরোপ করে, তা ঐশি পরমত্বর সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া বোঝা যায় না। এটি এমন একটি ধর্ম হবে, যার ভিত্তি জনগণের মধ্যে থাকবে, জনগণের সঙ্গে মেলাবে এবং অর্থ বোধগম্য হবে। এর মাধ্যমে পিতৃভূমির একমাত্র চূড়ান্ত সংকল্প ধর্মীয় অনুভূতিতে প্রকাশ পাবে। বিকল্প হলো চেতনায় ইতিমধ্যেই থাকা বিষয়গুলো বিকশিত না করা, বা যা চেতনায় নেই তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া।

    ক্যাথলিক হওয়া মানে গীর্জাকে অনুসরণ এবং তার শৃঙ্খলার অধীনে থাকা। তাই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের জন্য গীর্জার ধর্মীয় কর্তৃত্বকে স্বীকার করা ছিল রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য—রাষ্ট্রকে নিজের উদ্দেশ্যে কার্যকর করতে। ইতালীয় রাষ্ট্রের গীর্জা সম্পর্কিত নীতিকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ ও চূড়ান্ত থাকে, কিন্তু এটি ইতালীয়দের ক্যাথলিক চেতনার সঙ্গে সংঘাত তৈরি না করে, এবং গীর্জার অধীনে থাকা সেই চেতনার বিরোধও সৃষ্টি না করে।

    এটি একটি গুরুতর সমস্যা, কারণ ক্যাথলিক গির্জার শীর্ষতাত্ত্বিক ধারণা ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ধারণার অন্তর্নিহিত স্বভাবের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে। যেমন বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ উদারনীতি ও গণতন্ত্রের অস্বীকার নয়—এটি এমনকি ফ্যাসিবাদের নেতারাও প্রায়শই রাজনৈতিক কারণে উল্লেখ করেছেন। বরং ফ্যাসিবাদ মাৎসিনির মতাদর্শ অনুযায়ী উদারনীতি ও গণতন্ত্রের সবচেয়ে নিখুঁত রূপ হওয়ার চেষ্টা করে। এটি একটি দীর্ঘ, কঠিন ও উঁচু পথ।

    ইতালীয় জনগণ সেই পথে বিশ্বাস ও উন্মাদনার সঙ্গে এগোচ্ছে, যা তাদের ইতিহাসে কোনো উদাহরণের সাথে মেলেনি। তারা এই যাত্রা সম্পন্ন করছে এমন এক শৃঙ্খলার সঙ্গে যা আগে কখনো দেখা যায়নি—কোনও দ্বিধা ছাড়া, কোনও আলোচনা ছাড়া, শুধুমাত্র সেই বীরত্বের মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ রেখে, যার মধ্যে মহান নেতা হওয়ার অসাধারণ ও প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেই নেতা এগোচ্ছে নিশ্চিতভাবে, কিংবদন্তির আবহে আবৃত, প্রায় ঈশ্বর নির্বাচিত ব্যক্তির মতো, অবিরাম ও মর্যাদাপূর্ণ, যিনি প্রদত্ত উদ্যোগের একটি হাতিয়ার হিসেবে নতুন সভ্যতা গড়ছেন।

    সেই সভ্যতার মধ্যে আমরা দেখতে পারি দুটি দিক—একটি যা ইতালির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এবং সংক্ষিপ্ত মেয়াদী মূল্য বহন করে, আর একটি যা স্থায়ী এবং সার্বজনীন মূল্য বহন করে।

  • মিখাইল বাকুনিন ।। রুশোর রাষ্ট্রতত্ত্ব

    মিখাইল বাকুনিন ।। রুশোর রাষ্ট্রতত্ত্ব

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [মিখাইল বাকুনিন ১৯৬৭ সালে এই লেখাটি বক্তৃতা আকারে পেশ করেন জেনেভায়। পূর্ণাঙ্গ লেখাটির শিরোনাম Federalism, Socialism, Anti-Theologism, যার একটি অংশ অনূদিত লেখাটি। এখানে বাকুনিন রুশের রাষ্ট্রতত্ত্বের একটি সমালোচনা হাজির করেন। রুশের সামাজিক চুক্তি ধারণার বিশ্লেষণ করে বাকুনিন মানব মুক্তি ও মানব চরিত্র নিয়ে তার নিজস্ব ধারণা উপস্থাপন করেন। বাকুনিন তার বিশ্লেষণে রাষ্ট্র ও সমাজকে পৃথক করে দেখেন, যার ভিত্তিতে তিনি আলোচনা করেন ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের সম্পর্ক নিয়ে। অনূদিত অংশটির ইংরেজি সংস্করণ Rousseau’s Theory of the State নামে বিভিন্নস্থানে সংকলিত হয়েছে- সম্পাদক]

    • মিখাইল বাকুনিন (২০২০)
      শিল্পী: লতির

    আমরা বলেছি, মানুষ শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যক্তি–স্বাতন্ত্রিক প্রাণীই নয়—একই সঙ্গে সবচেয়ে সামাজিক প্রাণীও বটে। জাঁ–জাক রুশো ভেবেছিলেন যে, আদিম সমাজ গড়ে উঠেছিল অসভ্য মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছা–সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু এই ধারণা ছিল একটি মস্ত ভুল। তবে শুধু রুশো নন, অধিকাংশ আইনতত্ত্ববিদ ও আধুনিক চিন্তা–প্রচারকগণ অনেকেই এ ধরনের ধারণা পোষণ করেছেন।

    কান্টীয় ধারা হোক বা অন্য কোনো ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী ও উদারপন্থী ধারা, যাঁরা সমাজকে ধর্মতাত্ত্বিকদের মতো “ঐশি অধিকারের’ ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেন না, কিংবা হেগেলীয়দের মতো সমাজকে “বস্তুগত নৈতিকতার আধ্যাত্মিক উপলব্ধি” হিসেবে দেখেন না, কিংবা প্রকৃতিবাদীদের মতো সমাজকে কেবলমাত্র “প্রাণীবৎ জীবনের আদিম রূপ” বলে মনে করেন না, তাঁরা সকলেই চান বা না চান, অন্য কোনো ভিত্তি না পেয়ে, অলিখিত চুক্তি বা সমঝোতাকেই সমাজের সূচনা–বিন্দু হিসেবে ধরে নিয়েছেন।

    সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, আদিম মানুষ কেবলমাত্র একাকী অবস্থায়ই পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত, আর সেই অবস্থায় তার প্রকৃতি ছিল মূলত অসামাজিক। কিন্তু মানুষ যখন একত্র হতে বাধ্য হয়, তখন তারা একে অপরের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে। এই সংঘাত যদি নিয়ন্ত্রণহীন থেকে যায়, তবে তা পরস্পর বিনাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

    এই সর্বনাশ এড়াতে মানুষ এক ধরনের চুক্তিতে উপনীত হয়। কখনও তা আনুষ্ঠানিক, কখনও বা অনানুষ্ঠানিক। যেখানে তারা নিজেদের কিছু স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে, বাকিটা সুরক্ষিত রাখার জন্য। এই চুক্তিই সমাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে। অথবা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্রের ভিত্তি। কারণ এই তত্ত্বে “সমাজ” বলতে আলাদা কোনো সত্তার অস্তিত্ব ধরা হয়নি; এখানে কেবল রাষ্ট্রই বিদ্যমান। বরং বলা যায়, সমাজকে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের মধ্যেই বিলীন করে দেওয়া হয়েছে।

    সমাজ হলো মানব সামষ্টিকতার প্রাকৃতিক অস্তিত্ব রূপ, যা কোনো চুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। সমাজ নিজেকে পরিচালিত করে প্রথাভিত্তিক বা ঐতিহ্যগত অভ্যাসের মাধ্যমে, কখনোই আইন দ্বারা নয়। এর অগ্রগতি ঘটে ধীরে ধীরে। আইনপ্রণেতার চিন্তা বা ইচ্ছার দ্বারা নয়, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে আসা প্রেরণার দ্বারা।

    সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে বহু আইন, যদিও সমাজ নিজে সেগুলোর বিষয়ে সচেতন নয়। কিন্তু এগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিক আইন। যেমন বস্তুর ভেতর ভৌতধর্মের আইন নিহিত থাকে, তেমনি সমাজদেহের ভেতরেও এ ধরনের আইন নিহিত থাকে। এইসব প্রাকৃতিক আইনের অধিকাংশই আজও আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তবুও, মানবসমাজের জন্মলগ্ন থেকে এগুলো সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, সমাজের সদস্যদের চিন্তা ও ইচ্ছার বাইরে এবং স্বাধীনভাবে।

    সুতরাং এই প্রাকৃতিক আইনগুলোকে রাজনৈতিক বা আইনগত বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়। রাজনৈতিক বা আইনগত বিধান হলো সেইসব নিয়ম, যেগুলো কোনো আইনসভা প্রণয়ন করে এবং যেগুলোকে মানবজাতির প্রথম সামাজিক চুক্তি থেকে যৌক্তিকভাবে উদ্ভূত বলে ধরা হয়।

    রাষ্ট্র কোনোভাবেই প্রকৃতির সরাসরি উৎপন্ন বস্তু নয়। সমাজের মতো রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ জাগরণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল না। উদারপন্থীদের মতে, প্রথম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল মানুষের স্বাধীন ও যুক্তিসম্মত অভিপ্রায় দ্বারা; আর দক্ষিণপন্থীদের মতে, রাষ্ট্র হলো ঈশ্বরের সৃষ্টি। কিন্তু যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, রাষ্ট্র সর্বদা সমাজের উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং ক্রমে তাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করার প্রবণতা প্রদর্শন করে।

    যে কেউ আপত্তি করতে পারেন যে, রাষ্ট্র যেহেতু জনকল্যাণ বা সবার সাধারণ স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে বলে বিবেচিত, তাই তা প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতার একটি অংশ সীমিত করে কেবল বাকি অংশটুকু নিশ্চিত করার জন্য। তবে এই অবশিষ্ট অংশটুকু একধরনের নিরাপত্তা হতে পারে, কিন্তু কখনোই তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। কারণ স্বাধীনতা অবিভাজ্য; এর সামান্য অংশকেও সংকুচিত করা মানে আসলে সমগ্র স্বাধীনতাকেই হত্যা করা। যে সামান্য অংশ আপনি কেটে নেন, সেটিই আমার স্বাধীনতার মূল সারবস্তু— অর্থাৎ পুরো স্বাধীনতাই। প্রাকৃতিক অপরিহার্য এবং অনিবার্য এক প্রবণতায় আমার সমগ্র স্বাধীনতা ঠিক সেই ক্ষুদ্র অংশে এসে কেন্দ্রীভূত হয়, যেটুকু আপনি সংকুচিত করেন।

    এটি ব্লুবিয়ার্ডের স্ত্রীর গল্পের মতো: একটি প্রাসাদের সব কক্ষ ঘুরে দেখার পূর্ণ স্বাধীনতা তাকে দেওয়া হয়েছিল। সবকিছু দেখা ও স্পর্শ করার অনুমতি ছিল। শুধুমাত্র একটি ভয়ঙ্কর ছোট কক্ষ ছাড়া। তাঁর স্বামীর সর্বময় ইচ্ছা অনুযায়ী সেই দরজা খোলা ছিল নিষিদ্ধ, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। ফলে তিনি প্রাসাদের সব জাঁকজমক থেকে বিমুখ হলেন, আর তাঁর সমগ্র মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো সেই নিষিদ্ধ ছোট ঘরটির দিকে। আর তিনি সেটি খুললেন, যথার্থ কারণেই। কারণ তাঁর স্বাধীনতা নির্ভর করছিল সেই দরজা খোলার উপর, আর প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তাঁর স্বাধীনতার সরাসরি লঙ্ঘন।

    এটি আদম ও ইভের পতনের কাহিনির মতোও বটে। জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। কোনো যৌক্তিক কারণে নয়, কেবল প্রভুর ইচ্ছা বলে। এটি তথাকথিত সদয় প্রভুর পক্ষ থেকে ছিল ভীষণ স্বৈরাচার। আমাদের আদিপিতা–আদিমাতা যদি সে নিষেধ মেনে নিতেন, তবে মানবজাতি চিরকালই সবচেয়ে লাঞ্ছনাকর দাসত্বে নিমজ্জিত থাকত। কিন্তু তাঁদের অবাধ্যতাই আমাদের মুক্তি দিয়েছে ও রক্ষা করেছে। পৌরাণিক ভাষায় বললে, তাঁদের এই অবাধ্যতাই ছিল মানব স্বাধীনতার প্রথম ঐতিহাসিক প্রকাশ।

    কেউ বলতে পারে: রাষ্ট্র বিশেষত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যা সমস্ত নাগরিকের মুক্ত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তা কি করে তাদের স্বাধীনতার নস্যাত করতে পারে? কেন নয়? এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে নাগরিকেরা রাষ্ট্রকে কোন দায়িত্ব ও কতখানি ক্ষমতা অর্পণ করছে তার উপর। একটি জনতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত হলেও, অত্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে, এমনকি রাজতন্ত্রের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী, যদি তা সবার অভিপ্রায়ের প্রতিনিধি হওয়ার অজুহাতে সামষ্টিক ক্ষমতার সমস্ত ভার প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বাধীন চলাচলের উপর চাপিয়ে দেয়।

    তবে ধরা যাক কেউ যুক্তি দেখাল যে, রাষ্ট্র তার সদস্যদের স্বাধীনতা কেবল তখনই সীমিত করে, যখন তারা অন্যায় বা মন্দের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাষ্ট্র মানুষকে একে অপরকে হত্যা, লুটপাট, অপমান করা কিংবা সাধারণভাবে একে অপরকে ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখে, অথচ তাদের ভালো কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা রেখে দেয়। কিন্তু এখানেই আবার ফিরে আসতে হয় ব্লুবিয়ার্ডের স্ত্রীর গল্পে, কিংবা নিষিদ্ধ ফলের কাহিনিতে: আসলে ‘শুভ’ কী? আর ‘মন্দ’ কী?

    আমরা যে তত্ত্বটি পর্যালোচনা করছি তার দৃষ্টিকোণ থেকে, শুভ ও মন্দের মধ্যে কোনো পার্থক্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে বিদ্যমান ছিল না। তখন প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বাধীনতা বা পূর্ণ অধিকারের ভেতরে স্বতন্ত্র অবস্থান করত এবং সহজনদের প্রতি তার বিবেচনা ছিল সীমিত। ব্যতিক্রম শুধু তুলনামূলক নিজের দুর্বলতা বা সবলতা যা তাকে বাধ্য করতো। তার মানে, মামলা কেবল ব্যক্তিগত ঝুঁকিরোধ ও স্বার্থসিদ্ধির। সেই সময়, এই একই তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মকেন্দ্রিকতা ছিল সর্বোচ্চ আইন, একমাত্র অধিকার। তখন ‘শুভ’ নির্ধারিত হতো সাফল্যের মাধ্যমে, আর ব্যর্থতাই ছিল একমাত্র ‘মন্দ’। ন্যায়বিচার ছিল যাবতীয় অঘটনঘটনের পবিত্রীকরণ, তা যত ভয়াবহ, নিষ্ঠুর বা কুখ্যাত হোক না কেন। আজকের ইউরোপে যে রাজনৈতিক নৈতিকতা বিদ্যমান, সেখানের বাস্তবতাও প্রায় একই রকম।

    এই তত্ত্ব অনুযায়ী শুভ ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য কেবল সামাজিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হয়। অতঃপর, যা গঠনকৃত সাধারণ স্বার্থের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়, তা ‘শুভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, আর যা এর বিরোধী, তা ‘মন্দ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

    চুক্তিবদ্ধ সদস্যরা নাগরিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি আংশিক বা পূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করে: তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে সাধারণ শুভের চেয়ে এগিয়ে না রাখার, অর্থাৎ এমন একটি স্বার্থের প্রতি বাধ্যতা প্রদর্শন করার, যা সকলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তাঁদের নিজস্ব অধিকারগুলো আলাদা করা হয় জনসাধারণের অধিকার থেকে। আর সেই জনসাধারণের একমাত্র প্রতিনিধি রাষ্ট্র, পায় ক্ষমতা, যেকোনো ব্যক্তিগত অবৈধ বিদ্রোহ দমন করার। একই সঙ্গে, যেকোনো সদস্যর ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার, যতদূর অবধি তা সাধরণ অধিকারেরর বরখেলাপ না করে।

    এখন আমরা পরীক্ষা করে দেখব, এইভাবে গঠিত রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত? একদিকে অপরাপর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আরেকদিকে তার নিজস্ব জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এই পরীক্ষণ আমাদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়, কারণ এখানে যে রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, সেটিই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক রাষ্ট্র— যতদূর পর্যন্ত সে ধর্মীয় ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে; অর্থাৎ আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তকদের ঘোষিত সর্বজাগতিক বা নাস্তিক রাষ্ট্র।

    তাহলে দেখা যাক, এর নৈতিকতা আসলে কী দিয়ে গঠিত? এটি সেই আধুনিক রাষ্ট্র, যে গির্জার জোয়াল থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে, এবং ফলত খৃষ্টধর্মীয় সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন নৈতিকতার জোয়াল থেকেও মুক্তি লাভ করেছে। একই সঙ্গে, এটি তখনও মানবতাবাদী নৈতিকতা বা ভাবনায় পরিপূর্ণ হয়নি, কেননা নিজের অস্তিত্ব নিজে ধ্বংস না করে উক্ত রাষ্ট্র কখনোই তা আত্মস্থ করতে পারে না। রাষ্ট্র তার পৃথক সত্তা ও বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীভবনে এতটাই সংকীর্ণ যে, সমগ্র মানবজাতির স্বার্থ ও সেই স্বার্থজাত নৈতিকতাকে ধারণ বা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

    ইতোমধ্যেই আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ ঠিক এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। খৃষ্টধর্ম তাদের কাছে কেবল অজুহাত, শ্লোগান কিংবা অলস জনতার পালকে প্রতারিত করার একটি হাতিয়ার মাত্র। কেননা কার্যত রাষ্ট্রের অনুসৃত লক্ষ্যসমূহের সাথে ধর্মীয় অনুভূতির কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের সময়ের প্রকাণ্ড রাষ্ট্রনেতা পালমারস্টন, মুরাভিয়েভ, কাভুর, বিসমার্ক কিংবা নেপোলিয়নদের ধর্মীয় ঘোষণাসমূহকে মানুষ যখন গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করত, তখন তারা মনে মনে পরিহাস করতেন। আর যখন মানবতাবাদী আবেগ, বিবেচনা বা উদ্দেশ্য সেসবের প্রতি আরোপ করা হতো, তখন তো তারা আরও প্রবলভাবে হাসতেন। তথাপি, এই ধারণাগুলোকে প্রকাশ্যে নিছক অর্থহীন বলে অস্বীকার করার মতো ভুল তারা কখনো করেননি।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে: তাদের নৈতিকতা আসলে কি দিয়ে গঠিত? উত্তর হলো— কেবলমাত্র রাষ্ট্রের স্বার্থ, আর কিছু নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, খুব সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ইতিহাসের সব যুগের সব দেশের রাষ্ট্রনেতা তথা শক্তিমান ব্যক্তিদের নীতি ছিল—রাষ্ট্রের সংরক্ষণ, মহিমা ও শক্তিবৃদ্ধিতে যা কিছু অবদান রাখে, তা যতই ধর্মবিদ্বেষী বা নৈতিকভাবে ঘৃণ্য মনে হোক না কেন, সেটিই ‘সুন্দর’ বা ‘কল্যাণকর’। বিপরীতে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে যা কিছু ব্যাহত করে, তা যতই পবিত্র বা ন্যায়সঙ্গত হোক না কেন, সেটি ‘অসৎ’ বা ‘অকল্যাণকর’। এটাই প্রতিটি রাষ্ট্রের সর্বজাগতিক নৈতিকতা এবং চর্চার প্রকৃত রূপ।

    জ্যাঁ জ্যাক রুশোর পোর্ট্রেট
    শিল্পী:

    একই অবস্থা দেখা যায়, এমনসব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও, যা সামাজিক চুক্তির তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই নীতি অনুসারে, শুভ ও ন্যায় কেবলমাত্র চুক্তির মাধ্যমেই সূচিত হয়; প্রকৃতপক্ষে এগুলি বরং চুক্তির অন্তর্বস্তু ও উদ্দেশ্য বৈ কিছু নয়। অর্থাৎ সেই সাধারণ স্বার্থ ও সর্বজনীন অধিকার, যা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ব্যক্তিসমষ্টি নিজেদের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, আর বাদ দিয়েছে তাদেরকে যারা এই চুক্তির বাইরে। অতএব, রাষ্ট্রটি মূলত সীমিত ও বিশেষ এক সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর সমষ্টিগত স্বার্থপরতার সর্বাধিক পরিতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা, এ রাষ্ট্র গঠিত হয় প্রত্যেক সদস্যের ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার আংশিক ত্যাগের ভিত্তিতে। ফলে এটি তার বৃত্তের বাইরে অবস্থানকারী, মানবজাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে “অপর” বা “প্রাকৃতিক শত্রু” হিসেবে বর্জন করে। তাতে তারা সংগঠিত হোক বা অনুরূপ অন্য কোনো সমিতির অন্তর্গত থাকুক না কেন।

    একটি সার্বভৌম ও বহির্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র অনিবার্যভাবে অন্য অনুরূপ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং প্রয়োজনে সেগুলো গঠনের প্রক্রিয়াকেও উদ্দীপিত করে। কারণ, যে সকল ব্যক্তি উক্ত রাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করছে এবং তার দ্বারা নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতায় হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের রক্ষার্থে পাল্টা সংযুক্ত হওয়া আবশ্যক হয়ে ওঠে। এভাবে মানবজাতি অনির্দিষ্ট সংখ্যক ভিন্নতর রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেখানে প্রত্যেক রাষ্ট্রই অপর রাষ্ট্রের প্রতি বৈরী এবং পরস্পরের জন্য হুমকিস্বরূপ অবস্থায় থাকে। তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ অধিকার নেই, কোনো প্রকার সামাজিক চুক্তিও নেই; কেননা, যদি তা থাকত, তবে তারা আর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারত না, বরং এক বৃহৎরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সংঘবদ্ধ সদস্যে পরিণত হত। কিন্তু, এই বৃহৎরাষ্ট্র যদি সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তার মুখোমুখি দাঁড়াবে অন্যান্য বৃহৎরাষ্ট্র, যেগুলো নিজের ভেতরে সংঘ গঠন করলেও একে অপরের প্রতি অনিবার্য শত্রুতার অবস্থান বজায় রাখবে। ফলে, যুদ্ধ মানব–অস্তিত্বের এক অবশ্যম্ভাবী শর্ত এবং ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবেই থেকে যাবে।

    অতএব, প্রত্যেক রাষ্ট্র, তা সংঘভুক্ত হোক বা না হোক, অপরিহার্যভাবে সর্বাধিক শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ, তাকে গ্রাস করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই গ্রাসে পরিণত হবে; তাকে জয় করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই পরাজিত হবে; তাকে প্রভুত্ব করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই দাসে পরিণত হবে। কেননা, দুটি শক্তি প্রকৃতিগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়েও পরস্পরের কাছে ভিন্ন ও অপরিচিত হলে পারস্পরিক ধ্বংস ব্যতীত সহাবস্থান করতে পারে না।

    রাষ্ট্র তাই মানবতার সর্বাধিক গর্হিত, সর্বাধিক, বিদ্রুপাত্মক এবং সর্বাধিক পরিপূর্ণ অস্বীকৃতি। এটি পৃথিবীর সকল মানুষের সার্বজনীন সংহতিকে চূর্ণ করে, এবং কেবলমাত্র ধ্বংস, জয় ও দাস বানানোর উদ্দেশ্যে তাদের কতককে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। রাষ্ট্র কেবল তার নিজস্ব নাগরিকদেরই রক্ষা করে; মানবাধিকার, মানবতা ও সভ্যতাকে কেবল তার নিজস্ব সীমার মধ্যেই স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্র তার বাইরে যেহেতু কোনো অধিকারকে স্বীকার করে না, স্বভাবতই তা গাজোয়ারিতে সমস্ত ভীনদেশি জনগোষ্ঠীর প্রতি সর্বাধিক হিংস্র অমানবিকতার চর্চাকে নিজের অধিকার বলে প্রতিপন্ন করে, যাতে ইচ্ছামতো লুণ্ঠন, ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে কিংবা দাসে পরিণত করে পারে। রাষ্ট্র যদি কখনো তাদের প্রতি উদারতা বা মানবিকতা প্রদর্শন করে, তবে তা কোনো কর্তব্যবোধ থেকে নয়; কারণ রাষ্ট্রের একমাত্র কর্তব্য তার নিজের প্রতি এবং এরপর কেবল সেই সদস্যদের প্রতি, যারা স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র গঠন করেছে, বা স্বেচ্ছায় তাকে টিকিয়ে রেখেছে, কিংবা এমনকি, যারা পরিণামে তার অনুগত ‘প্রজায়’ পরিণত হয়েছে। যেহেতু কোনো আন্তর্জাতিক আইন কার্যত বিদ্যমান নেই, এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকে গোড়া থেকে বিনষ্ট না করে থাকতেও পারে না, তাই বিদেশী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের কোনো কর্তব্য থাকতে পারে না। সুতরাং রাষ্ট্র যদি কোনো পরাজিত জনগোষ্ঠীকে মানবিকভাবে আচরণ করে, যদি তাদের আংশিকভাবে লুণ্ঠন বা ধ্বংস করে, অথবা তাদের সর্বনিম্ন মাত্রার দাসত্বে নামিয়ে না আনে, তবে তা রাজনৈতিক বিচক্ষণতা কিংবা নিছক মহানুভবতা থেকে অনুপ্রাণিত একটি পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তা কখনোই কর্তব্যবোধ থেকে আসে না। কারণ রাষ্ট্র একটি পরাজিত জনগোষ্ঠীকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার একচেটিয়া ও পূর্ণ অধিকার দাবি করে।

    রাষ্ট্র মূলত মানবতার প্রকাশ্য অস্বীকৃতি। অথচ রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই অস্বীকৃতিই সর্বোচ্চ কর্তব্য, আবার সেটাই তার শ্রেষ্ঠগুণ যা রাষ্ট্রের প্রকৃত সত্তা গঠন করে। রাষ্ট্র একে বলে ‘দেশপ্রেম’। এই দেশপ্রেমই রাষ্ট্রের সেই নৈতিকতা, যা সাধারণ মানবিক নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে যায়। আমরা একে বলি ‘অতীন্দ্রিয় নৈতিকতা’, কারণ এটি প্রায়ই ব্যক্তিগত বা সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সাধারণভাবে অন্যকে অপমান করা, নিপীড়ন করা, লুণ্ঠন করা, হত্যা করা বা দাসে পরিণত করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন বলে, দেশপ্রেমের খাতিরে—রাষ্ট্রের মহিমা রক্ষার জন্য, তার শক্তি বজায় রাখার জন্য কিংবা তার ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে—এসব কাজ অপরাধ নয়, বরং কর্তব্য ও গুণ, তখন সেগুলো নৈতিকতার আসনে বসে যায়। আর এই কর্তব্য, এই গুণ, প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন দাবি করে, তখন তাকে কেবল বিদেশিদের বিরুদ্ধেই নয়, প্রয়োজনে নিজের সহনাগরিকদের বিরুদ্ধেও, যারা তার মতোই রাষ্ট্রের সদস্য বা প্রজা।

    এ কারণেই রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতির মঞ্চ হয়ে উঠেছে সীমাহীন দুষ্কর্ম ও দস্যুবৃত্তির ক্ষেত্র। এই দস্যুবৃত্তি ও দুষ্কর্মকেই আবার উচ্চমর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কারণ তা দেশপ্রেম, অতিরাষ্ট্রীয় নীতি এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থের নামে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণেই প্রাচীন ও আধুনিক রাষ্ট্রের সমগ্র ইতিহাস আসলে জঘন্য অপরাধের ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, অতীত ও বর্তমানের রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক, আমলা ও যোদ্ধারা, যদি সরল নৈতিকতা ও মানবিক ন্যায়ের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তবে তারা প্রত্যেকেই শতবার, হাজারবার কারাবাস বা ফাঁসির শাস্তির যোগ্য। এমন কোনো বিভীষিকা, নিষ্ঠুরতা, ধর্মদ্রোহ বা শপথভঙ্গ, প্রতারণা, কলঙ্কজন লেনদেন, নির্লজ্জ ডাকাতি, প্রকাশ্য লুণ্ঠন বা হীন বিশ্বাসঘাতকতা নেই যা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অতীতে ঘটায়নি, কিংবা প্রতিদিন ঘটাচ্ছে না। আর এর সবই সংঘটিত হয়েছে কেবলমাত্র সেই ভাসা–ভাসা অথচ গালভারী শব্দবন্ধের আড়ালে: “রাষ্ট্রীয় কারণে।”

    এ শব্দগুলো সত্যিই ভয়ঙ্কর। কারণ এগুলো রাষ্ট্রের পদস্থ ও সমাজের শাসকশ্রেণির মধ্যে বিপুলসংখ্যককে এতটাই কলুষিত ও কলঙ্কিত করেছে যতটা এমনকি খ্রিষ্টধর্মও কখনো করতে পারেনি। এই শব্দগুলো উচ্চারিত হতেই সঙ্গে সঙ্গে সব স্তব্ধ হয়ে যায়, সবকিছু থেমে যায়। সততা, মর্যাদা ন্যায় ও অধিকার লুপ্ত হয়। এমনকি করুণা পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়। আর তার সঙ্গেই হারিয়ে যায় যুক্তি ও সুস্থ চেতনা। কালো হয়ে ওঠে সাদা, আর সাদা হয়ে যায় কালো। মানুষের হীন কর্ম, ঘৃণ্যতম ও সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধও তখন রূপান্তরিত হয় প্রশংসার কৃত্যে।

    মহান ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক ম্যাকিয়াভেলি প্রথম ব্যক্তি যিনি এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন, অথবা অন্ততপক্ষে প্রথম ব্যক্তি যিনি একে প্রকৃতভাবে অর্থপূর্ণ ও জনপ্রিয় করেছিলেন, যাঁর ফল আজও আমাদের শাসকগোষ্ঠী সানন্দে ভোগ করছে। তিনি ছিলেন এক বাস্তববাদী ও দৃষ্টিবাদী চিন্তক; তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেন যে, মহান ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং টিকে থাকতে পারে কেবল অপরাধের দ্বারা। অসংখ্য গুরুতর অপরাধের দ্বারা এবং সততার নামে যা কিছু পরিচিত তার প্রতি মৌলিক অবজ্ঞার দ্বারা। তিনি এই সত্যগুলো ভয়ঙ্কর স্পষ্টতায় লিখেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন।

    তাঁর সময়ে মানবতার ধারণা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। ‘ভ্রাতৃত্ব’ ছিল কেবল ধর্মীয়, মানবিক নয়, যা ক্যাথলিক গীর্জা প্রচার করত । কিন্তু সেই ভ্রাতৃত্ব সর্বদাই ছিল ভয়াবহ নিছক এক বিদ্রূপ। পদে পদে গীর্জার নিজস্ব কার্যকলাপ ভাতৃত্বের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। তাঁর সময়ে কেউ এমনকি কল্পনাও করেনি যে, ‘জন অধিকার’ বলে কোনো কিছু বিদ্যমান। বরং জনগণ সর্বদাই বিবেচিত হয়েছে এক নিষ্ক্রিয় ও অক্ষম জনসমষ্টি হিসেবে। যেন রাষ্ট্রের মাংস, যাকে শাসকের ইচ্ছামতো দলন ও শোষণ করা যায় এবং পদানত রাখা যায় চির আনুগত্যে।

    এই সমস্ত সত্য থেকে যুক্তিবিদ্যা ঘেঁটে ম্যাকিয়াভেলি উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে রাষ্ট্রই মানব অস্তিত্বের সর্বোচ্চ লক্ষ্য, রাষ্ট্রকেই যেকোনো মূল্যে সেবা করতে হবে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ যেহেতু সর্বকিছুর ঊর্ধ্বে, তাই এক সৎ দেশপ্রেমিকের, রাষ্ট্রের সেবায় কোনো অপরাধ করতেও পিছপা হওয়া উচিত নয়। তিনি অপরাধকে সমর্থন করেছেন, অপরাধে আহ্বান জানিয়েছেন, এবং সেটিকে রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার অনিবার্য শর্ত তথা প্রকৃত দেশপ্রেমের শর্তে পরিণত করেছেন। রাষ্ট্রের নাম রাজতন্ত্র হোক বা জনতন্ত্র, রাষ্ট্রের সংরক্ষণ ও বিজয়ের জন্য অপরাধ সর্বদাই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র হয়তো তার লক্ষ্য ও দিক পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু তার স্বভাব ন্যায়, করুণা ও সততার নিরন্তর এবং সক্রিয় লঙ্ঘন অপরিবর্তিত থাকে। রাষ্ট্রেরই কল্যাণের নামে।

    .হ্যাঁ, ম্যাকিয়াভেলি সঠিক ছিলেন। সাড়ে তিন শতাধিক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। এনিয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাসও একই সত্য আমাদের জানায়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো নৈতিক বলে মনে হয় কেবল তাদের দুর্বলতার কারণে; অথচ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকে কেবল অপরাধের দ্বারা।

    কিন্তু এখানেই আমাদের সিদ্ধান্ত তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণটি সহজ। আমরা বিপ্লবের সন্তান। সেই বিপ্লব থেকেই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি “মানবতার ধর্ম“। আর আমাদের তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে “দেবত্বের ধর্মের” ধ্বংসাবশেষের উপর।

    আমরা বিশ্বাস করি মানবাধিকারে। আমরা বিশ্বাস করি মানবজাতির মর্যাদা ও তার অপরিহার্য মুক্তিতে। আমরা বিশ্বাস করি ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মানবিক স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বে। এক কথায়, আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীতে মানবতার বিজয়ে।

    কিন্তু এই বিজয়ের জন্য আমাদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা নিবেদিত। এই বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিবিষ্ট। স্বভাবতই এই বিজয় অপরাধকে অস্বীকার করে, কারণ অপরাধ নিজেই মানবতার অস্বীকার। তাই বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণার দ্বারা চালিত জাতিগুলোর ক্ষেত্রে যতক্ষণ এই অপরাধ রাজনৈতিক অস্তিত্বের মৌলভিত্তি হিসেবে টিকে আছে, এই বিজয় সম্ভব নয়।

    আর এখন প্রমাণিত যে, কোনো রাষ্ট্র অপরাধ ব্যতিরেকে টিকে থাকতে পারে না। অন্তত অপরাধ সংকল্প ও পরিকল্পনা ব্যতিরেকে তো নয়ই। যদিও অনেক সময় তার অক্ষমতা তাকে অপরাধ বাস্তবায়নে বাধা দেয়। তাই আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত হল: রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা একেবারে অপরিহার্য।

    অথবা, যদি অন্যভাবে বলা হয়, রাষ্ট্রের আমূল ও পূর্ণ রূপান্তর প্রয়োজন। এমন এক রূপান্তর, যেখানে রাষ্ট্র আর কেন্দ্রীভূত ও ‘উপর থেকে নিচে’ চাপানো কোনো ক্ষমতা হবে না। প্রতিষ্ঠিত হবে না সহিংসতা বা কোনো কর্তৃত্ববাদী নীতির দ্বারা । বরং তা হবে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার ভিত্তিতে। প্রত্যক পক্ষের থাকবে যুক্ত হবার কিংবা না হবার স্বাধীনতা। এমনকি যুক্ত হলেও তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা। এর বিন্যাস হবে ‘নিচ থেকে উপরে’। বাস্তব চাহিদা ও স্বাভাবিক প্রবণতার ভিত্তিতে, ব্যক্তি, সংঘ, কমিউন, জেলা, প্রদেশ এবং জাতির স্বাধীন সমিতি ও সংঘ, যা গড়ে উঠবে মানবতার বৃহত্তর পরিসরে।

    তথাকথিত মুক্ত রাষ্ট্রসমূহ যখন অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, সেই সম্পর্কের বাস্তবতা বিচার করলেই আমরা নিশ্চিতভাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। এবার দেখা যাক, রাষ্ট্র যদি নিজ নাগরিক বা প্রজাদের পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার ভেতরে সম্পর্কগুলির প্রকৃতি কী দাঁড়ায়।

    আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখতে মানবসমাজের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বাইরে ঠেলে দেয়। তাদের বাদ দেয় পারস্পরিক ঐক্য এবং নৈতিকতা, ন্যায়, অধিকারের কর্তব্যের ক্ষেত্র থেকে। এর ফলে রাষ্ট্র আসলে মানবতাকেই অস্বীকার করে। আর “দেশপ্রেম” নামক সেই মোহনীয় শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর অন্যায় ও নিষ্ঠুরতাকে সর্বোচ্চ কর্তব্য হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এতে মানুষের ভেতরের মানবতা সংকুচিত, বিকৃত ও ধ্বংস হয়। ফলে তারা মানুষ হিসেবে নয়, কেবলমাত্র নাগরিক হিসেবে থেকে যায়। ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে তারা যেন কখনো নাগরিক পরিচয়ের ঊর্ধে উঠে পূর্ণ মানুষে পরিণত না হতে পারে, রাষ্ট্র তা এভাবেই নিশ্চিত করে।

    আমরা আরও দেখেছি যে, প্রতিটি রাষ্ট্র, ধ্বংসের আশঙ্কায় এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রসনের ভয়ে, সর্বশক্তিমান হওয়ার পথে ধাবিত হয়। আর একবার শক্তিশালী হয়ে উঠলে, তাকে অবশ্যই যুদ্ধ জয়ে নামতে হয়। কিন্তু জয় মানেই অন্য জাতির পরাজয়, তাদের দমন এবং কোনো না কোনো রূপে দাসত্বে আবদ্ধ করা। সুতরাং, দাসত্ব রাষ্ট্রের অস্তিত্বেরই একটি অবশ্যম্ভাবী ফল।

    দাসত্ব তার রূপ বা নাম বদলাতে পারে, কিন্তু তার আসল স্বভাব একই থাকে। এর স্বরূপ হলো: দাস মানে অন্যের জন্য কাজ করতে বাধ্য হওয়া, আর প্রভু মানে অন্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা। প্রাচীন যুগে যেমন, আজও এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক জায়গায়, এমনকি আমেরিকার কিছু অংশেও, দাসদের সরাসরি দাসই বলা হয়েছে। মধ্যযুগে তাদের নাম হয়েছিল সার্ফ বা ভূমিদাস । আর আধুনিক যুগে তাদের বলা হয় ‘মজুরি উপার্জক’। এই শেষোক্ত অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা মর্যাদাপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে কম কঠোর। কিন্তু বাস্তবে তারা এখনও ক্ষুধা এবং রাজনৈতিক–সামাজিক কাঠামোর চাপে বাধ্য অন্যদের নিরঙ্কুশ বা আপেক্ষিক কুঁড়েমিকে নিজের কঠোর শ্রম দিয়ে টিকিয়ে রাখতে। তাই তারা দাসই থেকে যায়।

    সাধারণভাবে দেখা যায়, কোনো রাষ্ট্রই হোক তা প্রাচীন বা আধুনিক, কখনো এমনকি ভবিষ্যতেও, গণমানুষের জোরপূর্বক শ্রম ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। মজুর বা দাসের সেই শ্রমই হলো রাজনৈতিক শ্রেণি অর্থাৎ নাগরিকদের অবসর, স্বাধীনতা ও সভ্যতার প্রধান এবং অপরিহার্য ভিত্তি। এমনকি উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।

    রাষ্ট্রের এই অন্তর্নিহিত শর্তগুলি অবশ্যম্ভাবীভাবে গড়ে ওঠে তার বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান থেকে। অর্থাৎ অন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি তার স্বাভাবিক, স্থায়ী এবং অবশ্যম্ভাবী বৈরিতার ফলস্বরূপ। এখন আমরা লক্ষ করব, সেই তথাকথিত ‘মুক্ত চুক্তি’র ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর সরাসরি কী কী শর্ত আরোপিত হয়েছে, যে চুক্তির ভিত্তিতে তারা নাকি নিজেদেরকে রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছে।

    রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা নয়; নিজস্ব সীমানার ভেতরও তাকে রক্ষা করতে হয় তার সদস্যদের। একদলকে অপর দলের হাত থেকে এমনকি প্রত্যেককে তার নিজের কাছ থেকেও। কারণ ধর্মতত্ত্বের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষকে স্বভাবতই মন্দ ও দুষ্ট ধরে নেওয়া।

    আমরা যে রাষ্ট্র পর্যালোচনা করছি, সেখানে শুভের শুরু হয় কেবল সামাজিক চুক্তি গঠনে মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, শুভ কোনো স্বাধীনতার ফল নয়; বরং তা পুরোপুরি ওই চুক্তির সৃষ্টি ও তারই অন্তর্বস্তু। বিপরীতে, মানুষ যখন নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভেতর একাকী অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক স্বাধীনতা উপভোগ করছিল, তখন তারা এর কোন সীমা টানেনি। কোনো আইন নয়, মেনে চলেছ ওই বাস্তবতার সীমা। অনুসরণ করেছ কেবল একটি বিধি: স্বভাবজাত আত্মকেন্দ্রিকতা। তখন তারা একে অপরের প্রতি আঘাত করে, শোষণ করে এবং লুটপাট চালায়। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে দমন ও ধ্বংস করে, যতটা তাদের বুদ্ধি, কৌশল ও শক্তিতে কুলায়। ঠিক যেমন রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে আচরণ করে থাকে।

    এই যুক্তিধারায়, মানব স্বাধীনতা শুভ নয়, বরং মন্দ উৎপন্ন করে; মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই মন্দ। মানুষ কীভাবে মন্দ? তার উত্তর আবার দেয় ধর্মতত্ত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, জন্মের পর থেকেই গির্জা মানুষকে মন্দ রূপে গণ্য করে, আর তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে সৎ করে তোলা। অর্থাৎ প্রাকৃতিক মানুষকে রূপান্তরিত করে নাগরিকে পরিণত করা।

    কেউ বলতে পারে, যেহেতু রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীন চুক্তির ফল, আর শুভ রাষ্ট্র থেকেই জন্ম নেয়, তাই শুভও স্বাধীনতারই ফল। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। রাষ্ট্র মোটেও স্বাধীনতার ফল নয়; বরং এটি স্বাধীনতার স্বেচ্ছা–ত্যাগ ও অস্বীকারের ফল।

    প্রাকৃতিক মানুষ প্রথমে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল, তবে ন্যায়ের কোনো ধারণা তার মধ্যে ছিল না। কিন্তু এই স্বাধীন মানুষ সর্বক্ষণ নানা বিপদের মুখোমুখি হতো, তার নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত। তাই নিরাপত্তা অর্জনের জন্য তারা নিজেদের স্বাধীনতার একটি অংশ ত্যাগ করল। স্বাধীনতার যতটুকু তারা ত্যাগ করল, ঠিক ততটুকুই তারা নাগরিক হলো, এবং একইসঙ্গে রাষ্ট্রের অধীনতা বা দাসত্বে আবদ্ধ হলো। সুতরাং রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে শুভর জন্ম স্বাধীনতা থেকে নয়; বরং স্বাধীনতার অস্বীকার থেকেই।

    একি বিস্ময়কর নয় যে, গীর্জার বিদ্যা হিসেবে ধর্মতত্ত্ব এবং রাষ্ট্রের বিদ্যা হিসেবে রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রের ভাবনা ও বাস্তবতা বাহ্যত ভিন্ন হলেও প্রায় একই বিশ্বাসে মিলিত হয়? উভয়েই মনে করে, মানুষকে নৈতিক হতে হলে, তাকে সাধু (গীর্জার দৃষ্টিতে) বা সুনাগরিকে (রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে) রূপান্তরিত করতে হলে, তার স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হবে।

    তবে এ অদ্ভুত সামঞ্জস্যে আমরা বিস্মিত হই না, কারণ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি (এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করব) যে রাজনীতি ও ধর্মতত্ত্ব একই উৎস থেকে উৎপন্ন দুই সহোদরা। যারা ভিন্ন নামে একই লক্ষ্য অনুসরণ করে। প্রত্যেক রাষ্ট্রই মূলত একটি পার্থিব গির্জা এবং প্রত্যেক গির্জা, যার নিজস্ব স্বর্গ রয়েছে, যেখানে পরমধন্য ও অমর ঈশ্বরের আবাস, আসলে এক একটি স্বর্গীয় রাষ্ট্র মাত্র।

    অতএব রাষ্ট্রও, গির্জার মতোই, এক মৌলিক ধারণা থেকে শুরু করে— মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মন্দ। যদি তাদের প্রাকৃতিক স্বাধীনতার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা একে অপরকে ছিঁড়ে খাবে এবং ভয়াবহ নৈরাজ্য প্রদর্শন করবে, যেখানে সবল, দুর্বলকে শোষণ ও হত্যা করবে, যা অবশ্যই আজকের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতার বিপরীত!

    রাষ্ট্র এই নীতিই স্থাপন করে যে, জনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি উচ্চতর কর্তৃত্ব প্রয়োজন; আর মানুষের মন্দ প্রবৃত্তিকে দমন করতে হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও পথপ্রদর্শনের জন্য একজন অভিভাবক তথা নিয়ন্ত্রক প্রয়োজন।

    যে কোনো মানবসমাজে নীতিসমূহের পালন এবং আইনসমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের শীর্ষে একটি সতর্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং প্রয়োজনে দমনমূলক ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকা আবশ্যক। এখন আমাদের নির্ধারণ করতে হবে, এমন ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত এবং কার দ্বারা তা কার্যকর হতে পারে।

    যে রাষ্ট্র কোনো ঐশী অধিকার ও ঈশ্বরের ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উত্তরটি তুলনামূলকভাবে সহজ। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে প্রধানত পুরোহিতেরা আর গৌণভাবে ধর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিষিক্ত রাজকীয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যে রাষ্ট্র স্বাধীন সামাজিক চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, একেবারে বিশুদ্ধ গণতন্ত্রে, যেখানে সবাই সমান সেখানেও প্রত্যেককেই সাধারণ কল্যাণের জন্য আত্মসংযমে অক্ষম বলে ধরা হয়। আর তাদের স্বাধীনতা স্বভাবতই অশুভের দিকে ঝুঁকে থাকে। ফলে কে হবে প্রকৃত অর্থে আইনসমূহের রক্ষক ও প্রশাসক? কে হবে ন্যায়বিচার ও জনশৃঙ্খলার রক্ষাকারী, যে সবার মন্দ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? সংক্ষেপে বললে, রাষ্ট্রের সেই কার্যাবলি পূর্ণ করবে কে?.

    এর উত্তর হতে পারতো, সর্বোত্তম নাগরিকেরা। যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং সবচেয়ে নৈতিক, যারা অন্যদের তুলনায় সমাজের সাধারণ স্বার্থ, প্রয়োজন ও কর্তব্য ভালোভাবে বোঝে এবং নিজের স্বার্থকে সাধারণ স্বার্থের অধীনস্ত করতে সক্ষম।

    প্রকৃতপক্ষে, এই মানুষদের জন্য বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা বুদ্ধিমান হন কিন্তু নৈতিক না হন, তবে সাধারণ কল্যাণকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। আর যদি তারা নৈতিক হন কিন্তু বুদ্ধিমত্তা কম থাকে, তবে তাদের সদিচ্ছা সাধারণ স্বার্থকে তাদের ভুল থেকে রক্ষা করতে যথেষ্ট হবে না।

    অতএব একটি জনতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সব সময় সেখানে এমন নাগরিকদের ধারাবাহিক প্রজন্ম থাকতে হবে, যারা একই সঙ্গে বুদ্ধিমান এবং নৈতিক।

    কিন্তু এই শর্তটি সহজে বা সর্বদা পূরণ করা যায় না। প্রতিটি দেশের ইতিহাসে সেই যুগগুলোই ব্যতিক্রমী, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশিষ্টজন উপস্থিতি থাকেন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের খ্যাতি বহমান থাকে।

    সাধারণভাবে, ক্ষমতার পরিধিতে অনুজ্জল, মধ্যমানের ব্যক্তিরা আধিপত্য বিস্তার করে। আর প্রায়শ ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, অনাচারী এবং রক্তক্ষয়ী সংহিসতার বিজয়। তাই আমরা বলতে পারি, তথাকথিত যুক্তিবাদী বা উদারপন্থী রাষ্ট্রের তত্ত্ব যা বলছে তা যদি সত্যিও হয়, অর্থাৎ প্রতিটি রাজনৈতিক সমাজের টিকে থাকা নির্ভর করে এমন ব্যক্তিদের ধারাবাহিকতার উপর, যারা একইসাথে বুদ্ধিমান এবং নৈতিক; তাহলে এমন কোন সমাজের অতিত্বও আজ বিদ্যমান থাকতো না। বহুকাল পূর্বেই বিলুপ্ত হত।

    বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই সমস্যাটি আরও জটিল হয়, যদি আমরা ক্ষমতাশ্রয়ী ও এ থেকে উদ্ভূত নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাবগুলো বিবেচনা করি। যখন ক্ষমতা কারো করায়ত্ব হয়, সে ক্রমাগত বিচিত্র প্রলোভনের মুখে পড়ে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসা এবং প্রচণ্ড লালসা দিন–রাত আক্রান্ত করে পদস্থ শীর্ষ কর্তাদের। এই প্রলোভনগুলির বিরুদ্ধে কেবল বুদ্ধিমত্তা নয়, নৈতিকতাও ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে প্রবলভাবে অরক্ষিত কোনো বিচ্ছিন্ন মানুষের নৈতিকতা, যা সহজেই ভেঙে পড়ে। এই সব সত্ত্বেও এত সমাজ টিকে আছে, সেটাই আসলে বিস্ময়কর। তবে এ প্রসঙ্গ ছেড়ে আমরা এগোই।

    ধরা যাক, একটি আদর্শ সমাজে প্রতিটি সময়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষ পাওয়া যায়, যারা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের খুঁজে বের করবে কে, নির্বাচন করবে কে, এবং ক্ষমতার ভার তাদের হাতে তুলে দেবে কে? তারা কি নিজেরাই, নিজেদের বুদ্ধি ও নৈতিকতার প্রশ্নে সচেতন হয়ে, ক্ষমতা দখল করবে?

    প্রাচীন গ্রিসে দুই জ্ঞানী—ক্লেওবুলাস ও পেরিআন্ডার—এমনটি করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের কথিত প্রজ্ঞা সত্ত্বেও, গ্রিকরা তাঁদেরকে ‘স্বৈরাচারী’ নামেই ডাকত।

    এখন প্রশ্ন আসে—এই ধরনের মানুষরা কীভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করবে? প্ররোচনা দিয়ে, না কি শক্তি প্রয়োগ করে?

    যদি তারা প্ররোচনার পথ বেছে নেয়, তবে মনে রাখা দরকার যে, সবচেয়ে ভালো প্ররোচিত করতে পারে সেই ব্যক্তি, যে নিজেই নিজের যোগ্যতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। অথচ প্রকৃত জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষ সাধারণত নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে অতটা দৃঢ় নন; এমনকি জানলেও তাঁরা সেটি অন্যদের সামনে জাহির করতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিপরীতে, খারাপ ও মাঝারি মানের মানুষ সবসময় নিজেদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাই নিজেদের মহিমান্বিত করতে তাদের কোনো দ্বিধা থাকে না।

    তবুও যদি ধরা যাক, প্রকৃত যোগ্য ও সৎ মানুষরা দেশের সেবা করার আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের স্বাভাবিক লজ্জা বা বিনয় কাটিয়ে উঠে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাহলে কি জনগণ অবশ্যই তাঁদেরকে বেছে নেবে? নাকি তারা চতুর, চতুরভাষী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতারকদের হাতেই বিভ্রান্ত হবে?

    অন্যদিকে, যদি তারা শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা নিতে চান, তবে তাদের প্রথমেই এমন এক বলশক্তি প্রয়োজন হবে, যা বিরোধী দলের প্রতিরোধকে পরাজিত করতে সক্ষম। এর ফলে গৃহযুদ্ধ বাধবে। শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় এলেও পরাজিত দল অসন্তুষ্ট থেকে যাবে এবং বিরোধিতা চালিয়ে যাবে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিজয়ীদের তখন ক্রমাগত শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

    এভাবে যে সমাজটি শুরুতে ছিল স্বাধীন, সেটি পরিণত হবে এক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে, যার ভিত্তি ও ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে কেবলমাত্র বলপ্রয়োগের ওপর। সেখানে হয়তো অনেক ভালো দিক পাওয়া যেতে পারে—কিন্তু কখনোই স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না।

    যদি আমরা সামাজিক চুক্তি থেকে উদ্ভূত এক স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণাকে টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে ধরে নিতে হবে যে অধিকাংশ নাগরিকের মধ্যে যথেষ্ট দূরদর্শিতা, বিবেচনাশক্তি এবং ন্যায়বোধ রয়েছে, যাতে তারা সবচেয়ে যোগ্য ও সক্ষম ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে রাষ্ট্রর শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

    কিন্তু যদি কোনো জনগোষ্ঠী কেবল একবার নয়, বরং তাদের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে, প্রতিটি নির্বাচনে, সর্বদা এই গুণাবলি প্রদর্শন করে, তাহলে তার মানে কি দাঁড়ায়? তার মানে কি এই নয় যে, জনগণ সমষ্টিগতভাবে এমন উচ্চ নৈতিকতা ও সংস্কৃতির স্তরে পৌঁছে গেছে যে, আর তাদের রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নেই? এমন জনগণ অর্থহীন অস্তিত্বে ভেসে না গিয়ে বরং তারা নিজের সমস্ত প্রবৃত্তি পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রকাশ করবে এবং তাদের জীবন থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলা উদ্ভূত হবে। তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আর সমাজের অভিভাবক, শিক্ষক বা নিয়ন্ত্রক থাকবে না। রাষ্ট্র তার দমনমূলক ক্ষমতা ত্যাগ করবে এবং প্রুধোঁ যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন, সেই অধস্তন অবস্থানে নেমে আসবে। তখন রাষ্ট্র কেবল একটি কর্মবিভাগে পরিণত হবে, অনেকটা সমাজের সেবায় নিয়োজিত একপ্রকার কেন্দ্রীয় হিসাবরক্ষণ দপ্তর মাত্র।

    এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সামাজিক জীবনে স্বাধীনতার পক্ষে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্থা কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সীমিতকরণ সমাজের জন্য বড় উপকার বয়ে আনতে পারে। তবে এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থকদের সন্তুষ্ট করবে না। তাদের জন্য রাষ্ট্র হলো সমাজের অভিভাবক, ন্যায়বিচার প্রদানকারী, সামাজিক জীবনের নির্দেশক এবং শৃঙ্খলার রক্ষক—এক ধরনের অপরিহার্যতা। অন্য কথায়, তারা স্বীকার করুক বা না করুক, নিজেকে গণতান্ত্রিক, জনতান্ত্রিক এমনকি সমাজতান্ত্রিক যাই বলুক না কেন, তাদের সবসময় শাসনের জন্য দরকার পড়ে অজ্ঞ, অপূর্ণ, অযোগ্য বা অকপটে বলতে গেলে, একেবারে নিম্নশ্রেণীর মানুষ। কোন সহিংসতা ছাড়াই, এটি তাদেরকে, নিজেদের মহাননুভবতা ও বিনয়কে ক্ষুণ্ণ না করে, সর্বোচ্চ পদে থাকতে সক্ষম করে, যাতে তারা সর্বদা সাধারণ কল্যাণের প্রতি নিবেদিত থাকতে পারে। মানবগোষ্ঠীর সুবিধাপ্রাপ্ত রক্ষক হিসেবে নৈতিক অঙ্গীকার ও উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর করে তারা যখন জনগণকে তার নিজের কল্যাণ ও মঙ্গলার্থে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করে তখন তারা আসলে নিজেদের স্বার্থে জনগণের অগোচরে প্রতারণা করে সম্পদ হরণ করে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাষ্ট্র সম্পর্কিত যে কোনো যৌক্তিক ও সরল তত্ত্ব মূলত কর্তৃত্বের নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ, এটি সেই ধর্মতাত্ত্বিক, অধিবিদ্যাগত রাজনৈতিক ধারণা যে, সাধারণ মানুষ সর্বদা আত্মশাসনে অক্ষম, তাই তাদেরকে সবসময়ই উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের কল্যাণকর শাসনের অধীনে থাকতে হবে।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কর্তৃত্ব কিসের নামে এবং কার দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া হয়? জনগণের চোখে কর্তৃত্বকে বৈধ ও সম্মানযোগ্য করে তোলার উৎস মাত্র তিনটি হতে পারে: বলপ্রয়োগ, ধর্ম, অথবা কোনো উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা।

    আমরা যেহেতু এখানে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছি, তাই ধর্ম ও বলপ্রয়োগের দ্বৈত কর্তৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনাকে আপাতত স্থগিত রাখতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কর্তৃত্বের দিকে, যা সর্বদাই সংখ্যালঘিষ্ট (শাসক)গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

    অতীত ও বর্তমানের সমস্ত রাষ্ট্রে, এমনকি যেসব রাষ্ট্রকে সর্বাধিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসম্পন্ন বলা হয়, যেমন উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ড, আমরা আসলে কী দেখতে পাই? “জনগণের হাতে সব ক্ষমতা ন্যস্ত” এই ছদ্ম দাবি থাকলেও, বাস্তবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আত্মশাসন বেশিরভাগ কালজুড়েই কেবল গালগল্প হয়ে থেকে গেছে। সবসময়ই সত্যিকারের অর্থে শাসনক্ষমতা থাকে সংখ্যালঘিষ্টদের হাতে।

    যুক্তরাষ্ট্রে, সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত, এমনকি আংশিকভাবে এখনও, রাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রু জনসনের বর্তমান শাসকদলে এই সংখ্যালঘিষ্টরা ছিল তথাকথিত ডেমোক্র্যাট। তারা দাসপ্রথার সমর্থক এবং দক্ষিণী জমিদার শ্রেণির নিষ্ঠুর অলিগার্কির ধারক। এরা ছিল আস্থাহীন ও বিবেকবর্জিত জনমত্ততার নেতা, যারা নিজেদের লোভ ও বিদ্বেষপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল। তাদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ও প্রভাব, যা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলেছিল, উত্তর আমেরিকায় রাজনৈতিক নৈতিকতার গভীর অবক্ষয়ের জন্য বড় ধরনের অবদান রেখেছে।

    বর্তমানে, তাদের ক্ষতিকর নীতি সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করছে রিপালিকান দল বাস্তবে যারা বুদ্ধিমান ও উদার সংখ্যালঘিষ্ট। আদতে এই সংখ্যালঘিষ্টতা সর্বদা বিদ্যমান। আশা করি এই দলের বিজয় সম্পূর্ণ হোক; মানবজাতির জন্য এটাই কাম্য। কিন্তু যতই উদার ও স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহী হোক এই দল, যতই মহান ও উদার তাদের নীতি হোক, আমরা আশা করতে পারি না যে, ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তারা তাদের একচেটিয়া শাসনক্ষম সংখ্যালঘিষ্ট অবস্থান ত্যাগ করবে এবং সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে যাবে, যাতে জনগণের আত্মশাসন অবশেষে বাস্তব হতে পারে। আদতে তা সম্ভব করতে হলে একটি বিপ্লবের প্রয়োজন, যা এর আগে প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্বের সব বিপ্লবের চেয়ে গভীর এবং মৌলিক হতে হবে।

    সুইজারল্যান্ডে, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সত্ত্বেও সরকার এখনও সচ্ছল ও মধ্যবিত্তের হাতে। সেই অল্প সংখ্যক সুবিধাপ্রাপ্ত যারা ধনী, শ্রান্তিময় ও শিক্ষিত। প্রসঙ্গক্রমে “জনগণের সার্বভৌমত্ব” প্রত্যয়টি আমরা ঘৃণা করি। আমাদের কাছে সব ধরনের সার্বভৌমত্বই আসলে অগ্রহণযোগ্য। জনগণের দ্বারা জনগণের সরকার আদতে কথকতা মাত্র। আইনগতভাবে মানুষকে সার্বভৌম ধরা হলেও, বাস্তবে তা নয়। কারণ তারা দৈনন্দিন শ্রমে এতটা ক্লিষ্ট যে অবসর নেই। মুর্খ না হলেও শিক্ষায় সম্পদশালী মধ্যবিত্তের তুলনায় কম সক্ষম। তাই তাদের তথাকথিত সার্বভৌমত্ব বাস্তবে মধ্যবিত্তের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।

    সুইজারল্যান্ড হোক বা যুক্তরাষ্ট্র, এই পরিস্থিতির একমাত্র সুবিধা হলো, উচ্চাঙ্ক্ষী সংখ্যালঘিষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রার্থী নেতারা জনগণকে প্রলুব্ধ না করে, ক্ষমতায় আসীন হতে পারে না। তারা ক্ষমতা করায়ত্ত করেন, তাদের ক্ষণ–আবেগের প্রতি গদগদ হয়ে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছলনার মাধ্যমে, যা কখনও অশুভ হয়ে উঠতে পারে।

    কারো যেন ভুল ধারণা না হয় যে আমরা গণতান্ত্রিক সরকারের সমালোচনা করে রাজতন্ত্রের পক্ষ ধরেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সবচেয়ে অপূর্ণাঙ্গ জনতন্ত্রও সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান রাজতন্ত্রের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। জনতন্ত্রে বারবার শোষিত হলেও অন্তত একটা পর্যায়ের জন্য মানুষ, অত্যাচারিত থাকে না। রাজতন্ত্রে যা একটি নিরবিচ্ছিন্ন বাস্তবতা। গণতান্ত্রিক শাসনও ধীরে ধীরে জনগণকে রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, যা রাজতন্ত্র কখনও দেয় না। তারপরও, আমরা জনতন্ত্রকে যতই অগ্রাধিকার দিই, এটা স্বীকার করতে হবে এবং ঘোষণা করতে হবে যে, শাসনরূপ যাই হোক না কেন, মানুষের সমাজ যদি বংশানুক্রমিকভাবে পেশা, সম্পদ, শিক্ষা এবং অধিকারের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে, তবে সর্বদা শ্রেণিভিত্তিক সরকার থাকবে। সংখ্যালঘিষ্টদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের শোষণ চলবে।

    রাষ্ট্র আদতে এই আধিপত্য এবং শোষণ, ছাড়া আর কিছু নয়, যা সুনিয়ন্ত্রিত ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালিত। আমরা এটি প্রমাণ করবো জনগণের সরকারের পরিনাম পর্যালোচনার মাধ্যমে। আপনাদের আকাঙ্ক্ষা মতো, একটি আদর্শ রাষ্ট্রে, যা স্বাধীন চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সংখ্যালঘিষ্ট, প্রাজ্ঞ এবং কর্তব্যনিষ্ঠদের দ্বারা গঠিত।

    চুক্তির শর্তগুলো একবার গ্রহণ করা হলে, তখন কেবল সেগুলো কার্যকর করা বাকি থাকে। ধরা যাক, কোনো জাতি নিজেদের শাসন করার অক্ষমতা স্বীকার করল। তবুও তাদের যথেষ্ট বিচারবোধ রইল যাতে তারা জনসাধারণের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের সেরা নাগরিকদের হাতে সমর্পণ করতে পারে। প্রথম দিকে এই ব্যক্তিদের সম্মান করা হয় তাদের সরকারি পদমর্যাদার কারণে নয়, বরং তাদের উত্তম গুণাবলির জন্য। জনগণ তাদের নির্বাচন করেছে কারণ তারা ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে সক্ষম, জ্ঞানী, সাহসী এবং নিবেদিতপ্রাণ। তারা এসেছে জনগণের ভেতর থেকে, যেখানে সবাইকে সমান ধরা হয়। তাই তারা তখনও কোনো আলাদা শ্রেণি গঠন করে না; তারা কেবল প্রকৃতিগত গুণের কারণে বিশেষ হয়ে ওঠে। আর সেই কারণেই জনগণ তাদের নির্বাচন করেছে। তাদের সংখ্যা অবশ্যই খুব সীমিত। কারণ সব যুগে এবং সব জাতির ইতিহাসে অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে, এমন অসাধারণ গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা, যারা একটি সমগ্র জাতির সর্বসম্মত শ্রদ্ধা আদায় করতে পারে, অত্যন্ত সামান্য। অতএব, ভুল নির্বাচনের ঝুঁকি এড়াতে জনগণ এই অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্য থেকেই শাসক নির্বাচন করতে বাধ্য হবে।

    এখানেই আমরা দেখি যে, সমাজ ইতিমধ্যেই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, যদিও তা ঠিক দুই শ্রেণী নয়। এক ভাগ গঠিত বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের দ্বারা, যারা স্বাধীনভাবে নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে শাসন মেনে নেয়। অন্য ভাগ গঠিত অল্পসংখ্যক মানুষের দ্বারা, যাদের অসাধারণ গুণাবলি আছে এবং যাদের জনগণ সেই বিশেষ গুণের কারণে স্বীকৃতি দিয়েছে ও শাসনের দায়িত্ব তাদের হাতে অর্পণ করেছে। এই ব্যক্তিরা যদিও জননির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল, প্রথমে তারা সাধারণ নাগরিকদের থেকে ভিন্ন নয়। শুধুমাত্র সেই গুণাবলির মাধ্যমেই তারা আলাদা হয়ে ওঠে, যেগুলো তাদের নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য করে তুলেছে। প্রকৃতপক্ষে তারা সবচেয়ে কার্যকরী এবং সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক। এই সময়ে তারা কোনো বিশেষ অধিকার বা সুবিধা দাবি করে না। শুধু সেই দায়িত্ব পালন করে, যা জনগণ তাদের ওপর ন্যস্ত করেছে। তাদের জীবনযাপন বা জীবিকা নির্বাহের ধরনও অন্য নাগরিকদের থেকে ভিন্ন নয়। তাই তখনও সবার মধ্যে এক ধরনের পূর্ণ সমতা বজায় থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই সমতা কি দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে? আমাদের দাবি হলো, তা কখনোই সম্ভব নয়। আর এই দাবিকে প্রমাণ করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

    মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস হলো অন্যকে আদেশ করার অভ্যাস। সবচেয়ে ভালো মানুষ—যারা বুদ্ধিমান, নিঃস্বার্থ, উদার ও নির্মল—তারাও এই অভ্যাসে লিপ্ত হলে অবধারিতভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত দুটি অনুভূতি সবসময় এই নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে। প্রথমত, সাধারণ জনগণের প্রতি অবজ্ঞা। দ্বিতীয়ত, শাসনকর্তার নিজের মূল্য সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা।

    “জনগণ যখন নিজেরাই স্বীকার করে যে তারা নিজেদের শাসন করতে অক্ষম, তখন তারা আমাকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এভাবে তারাই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা আমার তুলনায় অধম এবং আমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। মানুষের এই বিশাল ভিড়ে আমি খুব কম লোককেই আমার সমান বলে মনে করি। জনগণের কাজকর্ম পরিচালনা করতে সক্ষম একমাত্র আমিই। জনগণের আমার প্রয়োজন আছে; তারা আমার সেবা ছাড়া চলতে পারে না, অথচ আমি নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট। তাই তাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য আমাকে মানতে হবে। আর আমি যখন তাদের শাসন করতে রাজি হই, তখনই আমি তাদের সুখ ও কল্যাণ সৃষ্টি করি।’’

    এমন ধারণাই সহজে যে কারো মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে, হৃদয়কে কলুষিত করতে পারে এবং অহংকারে ভরিয়ে তুলতে পারে, তাই না? ঠিক এভাবেই ক্ষমতা এবং শাসনের অভ্যাস জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষকেও ধীরে ধীরে বিকৃত করে ফেলে, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিমিং অব ফ্রিডম
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মানবনৈতিকতার সমস্ত ভিত্তি মূলত মানবতার প্রতি সম্মানের উপর দাঁড়িয়ে আছে। মানবতার প্রতি সম্মান বলতে আমরা কী বুঝি? আমরা বুঝি, প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার এবং মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া। সে যে জাতির হোক, যে রঙের হোক, তার বুদ্ধিবৃত্তির স্তর বা নৈতিক অবস্থাই যাই হোক না কেন। কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, যদি কেউ নির্বোধ, দুষ্ট বা ঘৃণিত হয়, তবে কি আমি তাকে সম্মান করতে পারি? অবশ্যই নয়। আমি তার দুষ্টতা, নির্বুদ্ধিতা বা নৃশংসতাকে সম্মান করতে পারি না। বরং সেগুলো আমাকে ঘৃণায় ভরিয়ে তোলে এবং প্রতিবাদে উত্তেজিত করে। প্রয়োজনে আমি তার বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নেবো, এমনকি যদি আমার জীবন, অধিকার এবং মূল্যবান কিছু রক্ষার অন্য কোনো উপায় না থাকে, তবে আমি তাকে হত্যা করতেও বাধ্য হতে পারি। কিন্তু তবুও, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ও তীব্র, এমনকি প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যেও, আমাকে তার মানবীয় চরিত্রকে সম্মান জানাতে হবে। আমার নিজের মানবমর্যাদা এর উপরই নির্ভর করে। তবুও প্রশ্ন ওঠে, যদি সে নিজেই অন্যের মর্যাদাকে স্বীকার না করে, তবে কি আমরাও তার মর্যাদা স্বীকার করব? যদি সে কোনো হিংস্র পশুর মতো হয়ে যায়, কিংবা কখনও কখনও পশুর চেয়েও অধঃপতিত হয়, তবে কি আমরা তার মানবতাকে স্বীকার করে কেবলমাত্র এক কল্পকথার সমর্থন করছি না?

    উত্তর হলো—না। কারণ, তার বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক বা নৈতিক অধঃপতন যতই ভয়াবহ হোক না কেন, যদি সে জৈবিকভাবে কোনো মূর্খ বা পাগল না হয়, যদি সে স্বাভাবিক বোধশক্তি এবং প্রকৃতি প্রদত্ত সামান্য বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত ধরে রাখে, তবে তার মানবতা সত্যিই বিদ্যমান। আর মুর্খ বা পাগলকে অপরাধী নয়, বরং অসুস্থ হিসেবে দেখা উচিত। মানবতা একটি জীবনব্যাপী সম্ভাবনা, যে সম্ভাবনা তাকে নিজের মানবসত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি যে সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তার এই হাল সে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে, এমন সম্ভাবনা যত ক্ষীণই হোক।

    সবচেয়ে বুদ্ধিমান বানরকে নিন, যার স্বভাব সবচেয়ে শান্ত ও উন্নত। তাকে আপনি যতই উন্নত ও মানবিক পরিবেশে রাখুন না কেন, তাকে কখনও মানুষ বানানো যাবে না। অন্যদিকে, সবচেয়ে দাগি অপরাধীকে নিন, কিংবা সবচেয়ে দুর্বল মস্তিষ্কের মানুষকে নিন, যদি তাদের কারোরই কোনো জৈবিক অসুখ না থাকে যা তাদের নির্বোধ বা উন্মাদ করে তোলে, তাহলে একজনের অপরাধপ্রবণতা কিংবা অন্যজনের মানবতা ও মানবিক কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে ব্যর্থ হওয়া, এ দুটোর কোনোটাই তাদের ব্যক্তিগত দোষ নয়, আবার তাদের স্বভাবজাত প্রকৃতিও নয়। এর একমাত্র কারণ হলো সেই সামাজিক পরিবেশ, যেখানে তারা জন্মগ্রহণ করেছে এবং বেড়ে উঠেছে।

  • এমএন রায়।। ফ্যাসিবাদ: অতিমানবের কৌলিকতা

    এমএন রায়।। ফ্যাসিবাদ: অতিমানবের কৌলিকতা

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ হেল বুবন

    ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি নির্দেশক সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘অতিমানবের কূলভক্তি’। এই কূলভক্তির জনক ছিল নিৎসে, যিনি ছিলেন আবার শোপেনহাওয়ারের শিষ্য; এবং শোপেনহাওয়ার  ‘উপনিষদের দর্শনে স্বান্তনা’ খুঁজে পেয়েছিলেন। একারণেই সম্ভবত স্থূল বস্তুবাদের এর নিরেট অভিব্যক্তি ও রক্ষণশীল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আধাত্মবাদী ভাবাদর্শের মাঝে ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতিত্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদ আসলে পুনরূজ্জীবনবাদী ধ্যানধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত জাতীয়তাবাদ। পুনরূজ্জীবন বাদের পরিণতি কী, তা দেখায় ফ্যাসিবাদের অনুশীলন। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক পটভূমি প্রকাশ করে যে, পুনর্জাগরণবাদ সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার আত্মাস্বরূপ; ফ্যাসিবাদ একটি ভাবাদর্শিক অস্ত্র যা প্রগতির (যে প্রগতির একটি পূর্বশর্ত বিপ্লব) বিরুদ্ধে লড়াই করে।

    ফ্যাসিবাদের পিতামহ শোপেনহাওয়ার ছিলেন নৈরাশ্যবাদের প্রচারক৷ উপনিষদের “ঐশ্বরিক দর্শন” এর একজন প্রশংসক হিসেবে তিনি সারাজীবন হেগেলীয় দর্শনের বিপ্লবী সত্তার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। তবে হেগেলীয় দর্শনকে দার্শনিকভাবে মোকাবেলা করা ছিল তার চিন্তাশক্তির বাইরে৷ একারণে প্রতিক্রিয়াশীলতার অক্ষম ক্রোধ অভিব্যক্ত হয় কুকথায়। প্রকৃতপক্ষে, শোপেনহাওয়ারের দর্শন ছিল ১৮৪৮ সালের বিপ্লবে পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার ভাবাদর্শ। পরাজয় থেকে তৈরি হতাশা প্রকাশিত হয়েছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে পালানোর আকুলতায়।

    শোপেনহাওয়ারের মতে, প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় ও নিত্য নীতির কারণেই মানুষ বাস করছে সবথেকে নিকৃষ্ট এক দুনিয়াতে। যেহেতু জীবনের এই অসহনীয় পরিস্থিতি গুলোকে পরিবর্তন করা যায় না, তাই এই ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতি দ্বারা পূর্ণ এই পৃথিবী থেকে পালানোর আকুলতা অপ্রতিরোধ্য। স্বাভাবিকভাবেই, শোপেনহাওয়ারের পীড়িত আত্মা—যা পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার হতাশাকেই প্রতীকায়িত করতো—উপনিষদের দর্শনে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। উপনিষদের দর্শন যুগের পর যুগ ধরে ভারতীয় জনগণকে জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সেগুলো পরিবর্তনের সাহসী প্রয়াস থেকে বিরত রেখেছে। শোপেনহাওয়ারের দর্শনের সারবত্তা হলো মানব ইচ্ছাশক্তিকে অবমূল্যায়ন—যে ইচ্ছাশক্তিকে তিনি বর্ণিত করেছেন “সম্পূর্ণরূপে অশুভ ও হীন” হিসেবে। এই দর্শনের তাৎপর্য হলো সকল ধরনের প্রগতির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব৷ কেননা, প্রগতির বস্তুগত উপাদান সমূহ তাদের বিষষী অভিব্যক্তি খুঁজে পায় ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিতে৷ এই মতবাদ ধারণ করার মাধ্যমে শোপেনহাওয়ার হিন্দু দর্শনের সাথে একই ভূমিতে দাঁড়ায়; হিন্দু দর্শনও আকাঙ্ক্ষাকে আত্ম-উপলব্ধির (যা প্রকৃত জ্ঞানের উৎস) পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করে। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই অন্তঃদ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ যে দর্শনের একজন ক্রিটিকাল দার্শনিক এই মন্তব্যটি করতে বাধ্য হন:

    যদি বিশ্ব এমন এক সত্তা হয়, যার অস্তিত্ব না থাকাই শ্রেয়, তবে দার্শনিকের চিন্তাও—যিনি নিজেও সেই বিশ্বের একটি অংশ—চিন্তা না হয়ে ওঠাই অধিকতর শ্রেয়। (ফ্রাঞ্জ মেহেরিং: অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি”)

    কিন্তু, একজন দার্শনিকের চিন্তা তার সময়ের প্রয়োজনীয়তা এবং যে সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবস্থায় সে জীবন যাপন করেছে, তা দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তিনি প্রতিক্রিয়াশীলতার দার্শনিক ছিলেন এবং অবস্থানগত কারণেই তিনি এর বাইরে যেতে পারেননি। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল ছিল যে, ফ্যাসিস্টদের ঘৃণাপূর্ণ ইহুদিবিদ্বেষ ও নারী প্রশ্নে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গির উৎস তার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।

    নিৎসে তার শিক্ষকের দর্শনকে আরো শাণিত করেন এবং ঘোষণা করেন যে, নিজেদের সহজাত “শয়তানি ও হীনতা” নিয়ে মানুষের লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই। যেহেতু, মানব ইচ্ছাশক্তি এরকমই, মানুষের উচিত তা অকপটে গ্রহণ করে নেয়া এবং তা নিয়ে গর্বিত হওয়া। শোপেনহাওয়ার জীবনকে দেখতো একটি অপরাধ হিসেবে। নিৎসে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন “ভোগপরায়ণতা, রূঢ়তা, নিষ্ঠুরতা এবং অপরিচিত ও দুর্বলকে পরাভূত করা, অত্যাচার ও শোষণ করার আকাঙ্ক্ষা”-র অভিব্যক্তি হিসেবে। এগুলোই ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নিজের শিক্ষকের নৈরাশ্যবাদ থেকে নিৎসে এরকম রণতান্ত্রিক মতবাদ তৈরী করতে পারলেন কিভাবে? প্রতিক্রিয়াশীলতার দর্শনের এরকম পুনঃসংগঠন সম্ভব হয়েছিল জার্মান সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে বুর্জোয়াদের অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে।

    শোপেনহাওয়ার নৈরাশ্যবাদ প্রচারের পরে জার্মানিতে বহুবিধ ঘটনা ঘটেছিল, যা সেখানকার বুর্জোয়াদের শক্তিশালী করে৷ তখন জার্মান বুর্জোয়ারা নিজেদের মনোভাবকে একটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করতে শেখে। নৈরাশ্যবাদ রূপান্তরিত হয় কৌপদর্শনে। জার্মান বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হয়, কারণ তারা বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কিন্তু, এই বিপ্লব ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা; এটা হওয়ার কথাই ছিল। বুর্জোয়ারা বিপ্লবকে সফল করতে ব্যর্থ হলেও এটা পরবর্তীতে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল—বিসমার্কের শ্রেষ্ঠ কৃতি হলো একটি দুর্বল ও হতোদ্যম বুর্জোয়া শ্রেণিকে প্রুশীয় ভূমি অভিজাতন্ত্রের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির অবস্থানে নিয়ে যাওয়া (যদিও এই সম্পর্কে জার্মান বুর্জোয়াদের অবস্থান ছিল অধীনস্ত)। সামাজিক অবস্থানে জার্মান বুর্জোয়াদের এই পরিবর্তন তাদের দর্শনকেও প্রভাবিত করেছিল।

    পুঁজিবাদী বিকাশের পথ এখন আর বন্ধ নয়। একই কারণে, নৈরাশ্যবাদের কারণও রইলো না। কিন্তু এই নৈরাশ্যবাদ কোন স্বাস্থ্যকর আশাবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি। কারণ, স্বাস্থ্যকর আশাবাদ বিজয় দ্বারা অর্জিত আত্মবিশ্বাসের ফসল। প্রকৃতপক্ষে, জার্মান বুর্জোয়াদের জীবন তখনও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সামরিক গোষ্ঠী ও ভূমি অভিজাতদের অধীনস্ত ছিল। জীবন তখনও ছিল “অশুভ ও হীন”। তাই, তারা ভাগ্যে যা আছে, সেটার সর্বোত্তম ব্যবহারে মনোনিবেশ করেন। এটার প্রতিফলন আমরা পাই নিৎশের কৌপকেন্দ্রিক দর্শনে।

    জীবন একটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনা; তাই, জীবন থেকে যতটা সম্ভব আদায় করে নেয়া উচিত। জীবনকে দেখার এই পুনপৌনিক আবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিকেও—যেখানে প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে, পাশেরজন গোল্লায় যাক— একটি আধাত্মিক বাঁক দেয়া সম্ভব। যদি আমরা হিন্দু দার্শনিক মানদণ্ড গ্রহণ করি: “জীবন আমাকে গ্রাস করছে না, বরং আমি এর অধিপতি”। আধুনিক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের আধ্যাত্মিক গুরু বিবেকানন্দ নিৎসেকেই প্রতিনিধিত্ব করেন, যখন তিনি সগৌরবে বলেন, “আমি মদ পান করি, কিন্তু আমি তা দ্বারা আচ্ছন্ন হই না।” তিনি সম্ভবত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনের সেই নৈরাশ্যবাদী দার্শনিকের (নিৎশে) কাছ থেকে শিক্ষা নেননি। কারণ, বিবেকানন্দ তা শিখেছেন তার পবিত্র, ভারতীয় গুরুর থেকে। নিজস্ব খেয়ালি ভাষায় রামকৃষ্ণ প্রচার করেছেন, “শুকর খাওয়া ব্যক্তি ঈশ্বরের প্রতি অনুগত হতে পারেন। আবার, হবিষ্যি গ্রহণ করা ব্যক্তি হতে পারেন কামিনী-কাঞ্চনের দাস।” এটার মানে হলো, যদি কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিকতার পোশাক পরিধান করতে সক্ষম হয়, তবে স্থুল বস্তুবাদী জীবন যাপনে তার আর কোন বাঁধা নেই৷ বিংশ শতকের এই অবতারের শিক্ষা নিৎশের নৈরাশ্যবাদ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। আসলে, রামকৃষ্ণের সমগ্র শিক্ষণী (যা বিবেকানন্দ যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেয়েছে) এই ধারারই অংশ, যা আবার হিন্দুধর্মের মর্মকে প্রতিফলিত করে। যেহেতু, কলিযুগে আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছানো সম্ভব নয়, তাই এ সময়ে মানুষের উচিত সংসারী হওয়া; সংসারী হওয়া কোন পাপ বা অন্যায় নয়, যদি তা ঈশ্বর আরাধনার উদ্দেশ্যে কোন মায়া ছাড়া করা হয়। বাস্তব জীবনে এই আধ্যাত্মিক আদর্শ ও মূল্যবোধ সাধারণত উপেক্ষিত হয়। এটা অবশ্য কখনোই বাস্তবতা ছিল না। সুদীর্ঘ কাল ধরে চলা এই বিভ্রমকে শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হয়েছে; তবে তা বিপ্লবী সাহসিকতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মধ্বজার মাধ্যমে। ইতিমধ্যে, পোশাকি আধ্যাত্মিকতাহীন স্থুল বস্তুবাদ ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে ফেলেছে। (কিন্তু বস্তুবাদী দর্শন এখনো ট্যাবু হিসেবে রয়ে গেছে।) অনেক পূর্বেই নিজস্ব সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় (জীবন সম্পর্কিত) ধর্মীয় দর্শন তার অসততা ও দ্বিভাব থেকে বের হতে পারে না।

    পূঁজিবাদ সম্পর্কে নিৎশের দর্শন ভাবনা এই ভারতীয় পন্থাকেই অনুসরণ করে। নিৎশের গুরু শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, মানবজীবন একটি অপরাধ ও (মানব) ইচ্ছাশক্তি “অশুভ ও হীন”। নিৎশে দ্বিমত না করে যুক্ত করলেন, যদি মানব জীবন অপরাধই হয়, তবে নিজের আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে দুষিত না করেই আপনি এই অপরাধে নিমজ্জিত হতে পারবেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজের ইচ্ছা শক্তির অধিপতি, ততোক্ষণ পর্যন্ত এই ইচ্ছাশক্তির হীনতা আপনার সত্ত্বার পবিত্রতাকে দূষিত করতে পারে না। সুতরাং, আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন—লাগামহীন ভোগ-লালসার পেছনে ছোটা, দুর্বলকে নিপীড়ন, পরাভূত ও আঘাত করা; বিবেকের কোন তাড়না ছাড়া নৈতিক বল নিয়েই আপনি তা করতে পারবেন; কেননা, এই দুনিয়াটাই সবথেকে নিকৃষ্ট দুনিয়া, আপনি যা-ই করেন না কেনো, তা এই দুনিয়াকে অধিক নিকৃষ্ট বানাবে না। নিৎশে শোপেনহাওয়ারের উপনিষদীয় দর্শন থেকে যৌক্তিকভাবে এই সিদ্ধান্ত গুলোতে পৌঁছেছেন। জীবনের সংকল্পের নেতিকরণ থেকে জন্ম নিয়েছে ক্ষমতার সংকল্প। জীবনের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে সহানুভূতি রূপান্তরিত হয়েছে তার প্রতি তীব্র ঘৃণায়। এভাবেই জন্ম গ্রহণ করেছে অতিমানবের কৌল। এবং এই অতিমান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছিল আধুনিক শিল্পের কাপ্তানরা।

    অতিমানবরা “মুক্ত আত্মা”, “ভালো ইউরোপীয়ান”—দুনিয়ার জার্মান রক্ষাকর্তা এবং ‘আর্য আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি’-র গর্বিত অভিভাবক। ব্রিটিশদের সাথে ‘সাদাদের দায়’ বহন করার সভ্যকরণের মিশন গ্রহণে তারা প্রস্তুত। আসলে নিৎশের দর্শনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল জার্মান সাম্রাজ্যবাদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরী—যার অর্থ ছিল উপনিবেশবাদী সম্প্রসারণ। ক্ষমতা ও লুণ্ঠন কেন্দ্রিক এই দর্শনের সবথেকে স্থুল অভিব্যক্তি হলো ফ্যাসিবাদ। (ফ্যাসিবাদের সবথেকে মৌলিক মতবাদ) অতিমানবের নিৎশীয় কৌলকে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে “এটা সেই দর্শন যা বৃহৎ পুঁজিকে মহিমান্বিত করে এবং এভাবেই জনতার মাঝে তার জন্য আবেদন সৃষ্টি করে।” (মেহেরিং, ‘অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি’)

    ছবি: নাৎসী ভোটিং ক্যাম্পেইনের পোস্টার

    উপনিষদের স্বর্গীয় দর্শন থেকে জার্মান সাম্রাজ্যবাদ এবং পরবর্তীতে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শ নির্মিত হয়। এই ভাবাদর্শ উপনিষদের অপব্যবহার কিংবা দূষিত রূপ ছিল না। দুনিয়াতে স্বীয়-ইচ্ছা অনুযায়ী অবাধ ক্ষমতা আরোপের বৈধতা সর্বদাই অধিবিদ্যক প্রাথমিক নীতি থেকে আসে, যে প্রাথমিক নীতি অন্য কোন নীতির অধীনস্ত নয়। এই অনুমিতির উপর নির্মিত ভারতীয় দর্শনও একসময় স্থুল বস্তুবাদের ভাবাদর্শে পরিণত হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে শ্রেণি সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, যা বুর্জোয়াদের বল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতায় সজ্জিত করতে হবে। ক্ষমতার ভাগ দিলেই দেখা যাবে যে, বুর্জোয়ারা আমাদের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সুপ্রাচীন রূপ ও পরিভাষা ঝেড়ে ফেলে নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের স্বর্গীয় আধ্যাত্মিক দর্শন উঁচু শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা ছাড়া কখনোই অন্য কিছু করেনি। তবে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের শাসক শ্রেণির সামাজিক গঠন অনুযায়ী এই দর্শনকে তার রূপ ও পরিভাষা পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এমনকি আজও ‘সত্য ও অহিংসা’-র স্বর্গীয় মতবাদ সামাজিক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের গতিকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ প্রদত্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতার স্বাদ এখনি আমাদের আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদীদের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে দেশের দর্শন (জার্মান) ফ্যাসিবাদের অগ্রদূতদের অনুপ্রাণিত করেছে, সে দেশে সম্ভবত এটা ঘটারই ছিল।

    নিৎসের নির্মিত “মুক্ত আত্মা”-দের মাঝে ঈশ্বরের ‘বিভূতি’ রয়েছে। একারণেই স্বভাবতই তারা ‘শাসক’ ও ‘অধিপতি’ হবে; তাদের জন্মগত ‘অধিকার রয়েছে মানব পালকে শাসন ও অধীনস্ত করার’; যে মানুষরা ‘সহজাতভাবেই ক্ষমতাহীন এবং যাদের ভাগ্যই অন্যায্য আচরণের শিকার হওয়া’। মানুষের স্বভাবগত শয়তানি ও হীনতা সম্পর্কে শোপেনহাওয়ারের মতবাদ থেকে যৌক্তিকভাবে উদ্ভুত হয়েছে মানব সম্পর্ক নিয়ে নৈরাশ্যবাদী এই নিৎশীয় দর্শন৷ এই দর্শনের কারণেই নিৎশে ছিল সমাজতন্ত্রের উগ্র বিরোধী। একারণেই মার্ক্সবাদ বিরোধী ফ্যাসিবাদী ক্রুসেডের প্রাথমিক ভাবাদর্শিক গুরু হিসেবে ইতিহাসে আমরা নিৎশেকে খুঁজে পাই।

    আর্য-ভারতীয় আধ্যাত্মিক জীবন-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হলো আনন্দের সহিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও দূর্দশাকে গ্রহণ করে নেয়া। নিৎশে এই নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি ধারণা করতেন, শ্রমিক শ্রেণির অবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন, কেবল তাদেরকে আনন্দের সহিত দুর্দশাকে মোকাবেলার শিক্ষাদানের মাধ্যমেই আনা সম্ভব। এটা খুব সহজেই বোঝা যায় যে, নিৎশের সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রোপাগান্ডা আসলে ছিল গান্ধীবাদের আগাম ছায়া। সুতরাং, যদি গান্ধীবাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ধর্মীয়-নৈতিক মতবাদের একটি সুসংগঠিত আকর হিসেবে—যা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সারমর্ম—তবে বলা চলে যে, এর আধুনিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। একটি দার্শনিক ঐতিহ্য হিসেবে গান্ধীবাদ আমাদেরকে চালিত করেছে হিটলারবাদের অভিমুখে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই সত্যটা মাথায় রাখা উচিত৷ কেননা, ইতিহাসের যুক্তি ভারতেও ততটাই প্রয়োগযোগ্য, যতটা ছিল জার্মানিতে।

    ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক গুরু (নিৎশে) বিশ্বাস করতেন যে, যা ধনীদের জন্য অসহনীয়, তা গরীবরা (শ্রমিক) বহন করতে সক্ষম; একারণে, তিনি মনে করতেন যে, শ্রমিকদের খুব সহজেই কষ্টভোগের (যা একটি পুণ্যকর্ম) শিক্ষা দেয়া যাবে। গান্ধীবাদও একই স্বরে বলছে, পুঁজিপতি ও শ্রমিক উভয়ই ঈশ্বরের সন্তান; এবং দরিদ্রদের উচিত না তাদের ধনী ভাইদের হিংসা করা। গান্ধীবাদ ত্যাগ ও দুর্দশাকে পূণ্য কর্ম হিসেবে মহামান্বিত করে। যদি এই গান্ধীবাদী মতবাদকে গ্রহণ করেই নেয়া হয়, তবে এই “পূণ্য” গুলোকে (ত্যাগ ও দুঃখ-দুর্দশা) বাস্তব করে তোলার জন্য গৃহীত সকল পদক্ষেপকে নীতি (নৈতিকতা) ও যুক্তি উভয় দিক থেকে বৈধতা দিতে হবে। একটি আদর্শ ধারণ করে লাভই বা কি, যদি না ব্যক্তি সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত না থাকে? সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনায় দায়িত্বরত গান্ধীবাদীরা প্রমাণ করছে যে, তারা এই পূণ্য কর্মগুলোর অনুশীলন নিশ্চিতকরণে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত। কেননা, তাদের বিকৃত দর্শন অনুযায়ী, এই পূণ্যগুলোর অনুশীলনই সক্ষম হবে ভারতীয়দের উন্নত করতে।

    শ্রেণি শোষণকে বৈধতা দানকারী নিৎসের দর্শনের সাথে হিন্দু দর্শনে বিদ্যমান ‘কর্ম’ ধারণার লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। প্রকৃতিপক্ষে, নিৎশের দর্শন যেন ভারতীয় ঈশ্বরেরই প্রতিধ্বনি: “গুন ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমি চারটি বর্ণ তৈরী করেছি” (গীতা)। এই বর্ণ প্রথা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থায় স্থাপন করেছে। এই প্রথা যদি ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তবে নিম্নকোটির চিরতরে এই অবস্থানে মানিয়ে নিতে হবে। স্বর্গীয় ইচ্ছা সামাজিক অসমতাকে চিরস্থায়ীত্ব প্রদান করেছে। দাসকে চিরদিনের জন্যই দাস হতে হবে! শাসক শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা ও ক্ষমতা থেকে লব্ধ সুযোগ-সুবিধাকে দেখে ঈশ্বরের উপহার হিসেবে, যা কেবল পাপীরাই তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইবে। গীতায় ঈশ্বর আরো ঘোষণা করেন যে, সকল পার্থিব ক্ষমতা তার নিজস্ব ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। ব্রাহ্মণদের যাজকীয় কর্তৃত্বকে ঈশ্বরের ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখানো হতো; অতীতের রাজা-বাদশাহরাও ঈশ্বরের অবতার হিসেবে শাসন করতেন; এমনকি আজকের দিনের পরজীবী ভূস্বামীরা নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন কৃষক জনতার “সহজাত নেতা” বলে (যদিও তারা নিজেরাই এই কৃষক জনতার শোষক)। আবার, দেশীয় রাজারা ঐ সব সনাতনী জাতীয়তাবাদীদের সহায়তায় (নিজ রাজত্বে) স্বৈরতান্ত্রিক বল প্রয়োগ করে, যারা নিজেরা আবার ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে প্রতিনিধিত্ব সূচক গণতন্ত্রের জন্য গোলমাল করছে।

    “মানব পাল”-এর ভাগ্যে কেবল ক্ষমতাহীনতা ও অধীনস্ততা আরোপ করে নিৎশে বলেন: “প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন দ্বারা পৃথিবীতে সুখ আসবে না। সুখ আসবে কেবল দুখি, বিষাদগ্রস্ত, করুণা প্রার্থী ও (সবসময় যারা অভিযোগ করায় ব্যস্ত) অভিযোগকারীদের অনুপস্থিতির মাধ্যমে।” এখানে আমরা আবারো খুঁজে পাই ভারতীয় দর্শনের প্রতিধ্বনি—যে ভারতীয় দর্শন আসলে ফ্যাসিবাদেরই দর্শন। পার্থিব বিষয়বস্তু মানুষকে সুখি করতে পারে না: সুখ একটি মানসিক অবস্থা, এবং তা বস্তুগত অবস্থার উপর নির্ভর করে না। সুখ মনন নির্ভর। অর্থ্যাৎ, কেবল নিজেকে সুখি ভেবেই আপনি সুখি হতে পারবেন।

    যখন ভারতীয় জনগণকে সামাজিক অসাম্যের কথা বলা হয়, তখন তারা একই হাতে থাকা পাঁচ আঙুলের ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের (অর্থ্যাৎ হাতের পাঁচ আঙুল তথা সবাই সমান হয় না) দিকে লক্ষ্য করতে বলেন। এটা তাদেরকে শিখিয়েছে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও দর্শন। আরো শেখানো হয়েছে—নিজেদের সামাজিক অবস্থানকে নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করে নিতে। অবশ্য কেবল নিজেদের নিষ্ঠুর ভাগ্যকে মেনে নেওয়ার শিক্ষাই তাদের দেওয়া হয়নি, একইসাথে তাদেরকে শেখানো হয়েছে — প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যাবস্থাকে স্বর্গীয় ইচ্ছার অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে। নিৎশে আরো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “এতো এতো কঠিন ও কষ্টকর কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তাই, কিছু কিছু মানুষকে এমন অবস্থায় রাখা উচিত, যা তাদেরকে এইসব কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে।” ভারতীয় প্রতিভার বিশেষ সৃষ্টি—বর্ণ প্রথা, পুরোপুরি এই নীতির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক (নিৎশে) বর্ণপ্রথা সম্পর্কিত আর্য চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই সম্ভবত লিখেছিলেন, “এশীয় ও আফ্রিকার বর্বরদের এখানে নিয়ে আসা যেতে পারে, যাতে করে অ-সভ্যরা সর্বদাই সভ্য পৃথিবীর সেবা ও কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে।” কেন নয়? আর্য ব্রাহ্মণরা কি তাদের ক্ষত্রীয় মিত্রদের সহায়তা নিয়ে ভারতীয় আদিবাসীদের শূদ্র হওয়ার চিরস্থায়ী দাসত্বে বন্দী করেননি? আপনি (অন্যের সাথে) যেমন আচরণ করেছেন, কেউ যদি আপনার সঙ্গে ঠিক তেমনটাই করে, তবে সেটা নিয়ে অভিযোগ করা ভণ্ডামি বা অন্যায়। কৌল সেবাধর্ম ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি অংশ। এটা গান্ধীবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, আর গান্ধীবাদ সনাতনী জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ। সেবাকে অধিবিদ্যক গুনের মোড়ক পড়ানো গেলে, দাসত্বকেও সম্মানের মর্যাদায় উন্নীত করা সম্ভব এবং এর পরিসরের উপর কোন যৌক্তিক সীমা আরোপ করা যায় না। তোমার উচিত সেবা করা, যখন কিনা তুমি ঈশ্বরের কৃপায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত, যা তাঁর অধিক সৌভাগ্যবান শ্বেতাঙ্গ সন্তানদের মাধ্যমে কার্যকর থাকে।

    নিৎশে মুক্ত-আত্মাদের ভালো ও মন্দ সম্পর্কিত নৈতিকতার উপরে স্থাপন করেন। কেননা, নিৎশের মতে, খ্রিস্টধর্মের জন্মলগ্ন থেকে ভালো-মন্দের এই নৈতিকতাকে দুর্বল মানব-পালরা ব্যবহার করেছে মুক্ত-আত্মাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার হিসেবে। অতিমানবের নৈতিকতা নিয়ে নিৎশের কাজ ফ্যাসিবাদের বাইবেলে রূপান্তরিত হয়েছে। নিৎশে থেকে উদ্ধৃত এই অনুচ্ছেদ তার পরিচয় বহন করে: “ধর্ম শক্তিশালী ও স্বাধীন সত্ত্বাদের জন্য সর্বদাই একটি অস্ত্র। যারা শাসন করতে প্রস্তুত এবং যাদের নিয়তিই শাসন করা; বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পের মিশ্রণ যাদেরকে গড়ে তোলে একটি শাসক জাতি হিসেবে, তারাই ধর্মকে ব্যবহার করতে পারবে। শাসন করার ক্ষেত্রে তারা যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তা দূর করার হাতিয়ার ধর্ম। ধর্ম অধীনস্তদের শাসকদের সাথে বেঁধে রাখে, তাদের ভিতরের সেই লুকায়িত ও সুপ্ত বিবেককে দমিয়ে দেয়—যা তাদের শাসকদের অমান্য করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারত।

    ধর্ম যখন সর্বময় ক্ষমতা অধিকার করতে চায়, নিজেকে একটি লক্ষ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে একটি উপায় হিসেবে না থেকে, তখন এর পরিণতি সর্বদা অকল্যাণকর হয়। ধর্ম যদি দার্শনিকদের হাতে গঠন ও লালনের একটি উপায় না হয়ে নিজেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তবে তা বিপর্যয় ডেকে আনে।

    একটি সত্যিকারের সুস্থ ও উৎকৃষ্ট অভিজাত শ্রেণির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা পরিস্কার বিবেক নিয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে যে, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থে নিপীড়িত হতে হবে, মানবিক মর্যাদার নিচে নামিয়ে আনতে হবে, দাসত্বে পরিণত করতে হবে—শুধুমাত্র শ্রমের যন্ত্ররূপে।

    অহমভাব হলো উচ্চ আত্মাদের স্বভাব। আমি ‘ঈগোবাদ’ বলতে বুঝি সেই দৃঢ় বিশ্বাস, যেখানে স্বভাবতই ধরে নেওয়া হয় যে, অপরেরা আমাদের মতো সত্তাদের অধীন হবে, নিজেদের উৎসর্গ করবে। এই ধরণের অহমবোধ উচ্চ আত্মাদের অন্তর্গত; এর মধ্যে কঠোরতা, জোরজবরদস্তি কিংবা খামখেয়ালিপনা নেই। বরং এটি হলো জগতের মৌলিক বিধান।

    এর জন্য যদি আমি একটি নাম খুঁজতে চাই, তবে একে আমি বলব—ধার্মিকতা। (নিৎশে “Beyond Good and Evil”)

    ফ্যাসিবাদের সকল মৌলিক নীতি নিৎশে দ্বারা নির্মিত হলেও, এই রক্তাক্ত আন্দোলনের ভাবাদর্শ উৎপাদনকারী হিসেবে আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এদের মধ্যে বার্গসন ও জর্জ সোরেলের অনুসারীরা উল্লেখযোগ্য। এই আধ্যাত্মিক সিলসিলার তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এটা মনে রাখা জরুরী যে, বার্গসন তার অধিবিদ্যাগত মতবাদের সাথে বস্তুর বিষয়গত বাস্তবতার সামঞ্জস্যবিধান করতে চেয়েছেন। বস্তুবাদী দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করলেও, আধ্যাত্মিকতার মোড়কে স্থুল বস্তুবাদের চর্চা করেছেন তিনি। আধ্যাত্মবাদ তথা ভাববাদের প্রাথমিকতা স্বীকার করে তিনি বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মিকতার একটি সংযুক্তি নির্মাণ করতে চেয়েছেন। এই প্রচেষ্টা দর্শনকে আবারো দ্বৈতবাদের দুষ্টচক্রে স্থাপন করেছে। অতীতে দ্বৈতবাদী দর্শনের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল সামন্তীয় রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার; আজকের দিনে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ও ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। দ্বৈতবাদী দর্শন ধর্মীয় মৌলবাদকে পুনরুত্থিত করে—যে ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষ স্বরূপ ঈশ্বর ও তার দ্বারা সৃষ্ট জগতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই আদিম ধর্মীয় ভাবনা নিজেই অবাধ (রাষ্ট্রীয়) ক্ষমতা প্রয়োগের একটি ভাবাদর্শিক প্রতিফলন—যা বর্তমান সময়ে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের (তথা বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্রের) রূপ গ্রহণ করেছে। একটি বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে অতীতে বুর্জোয়ারা রাজাদের ঐশি অধিকারকে অস্বীকার করেছে; বর্তমানে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি হিসেবে তারাই আবার ঐ কল্পিত-ঐশি অধিকারের দিকে ঝুঁকছে; নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অতীতে তারা যেসব সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে লড়েছেন, এখন তারা সেগুলোকেই সমর্থন করছে; রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র, জনগণের উপর বলপ্রয়োগ, অর্থনৈতিক তাণ্ডব ও সামাজিক বর্বরতা সহ যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণে তারা রাজি।

    অবাধ ক্ষমতার প্রয়োগ এবং সর্বশক্তিমান ইচ্ছার সমর্থনে দার্শনিক-নৈতিক সম্মতি অতিমানবের কৌলিকতার ভিত্তি—এই কৌল অনিবার্যরূপে নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বল প্রয়োগ ও নিপীড়নের জন্ম দেয় (সবগুলোই ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য)। একজন মুসোলিনি বা হিটলার, এই অতিমানব কৌলিলতারই মূর্তায়ন। অতিমানব হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিক ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পার্থিব বিষয়ে স্বাধীনতা, অধিকার, ন্যায্যতা অথবা নৈতিকতার মতো মানবীয় ধারণা দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। একারণে পৃথিবীর এই রক্ষাকর্তা ও পুনর্জীবনদানকারী, কোন রাখডাক না রেখেই ঘোষণা করেন যে— স্বাধীনতা নাগরিকত্বের কোন অপরিহার্য উপাদান নয়; ব্যক্তি নাগরিক কেবল রাষ্ট্রের অবাধ ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাঝেই প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে৷ একইভাবে, বুর্জোয়া স্বার্থ রক্ষাকারী আধুনিক একনায়ক অতীতের সামন্ত প্রভুর মতো ঘোষণা করেন “L’État c’est moi”—”আমি নিজেই রাষ্ট্র”। সামন্ত প্রভুর মতো তিনিও ঐশি অধিকারের দাবি করেন। প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণকালে গোয়েরিং নিজেকে ঐ সব প্রুশীয় রাজাদের “সরাসরি উত্তরাধিকারী” বলে ঘোষণা করেন, যারা একইসাথে ছিলেন সর্বশক্তিমান বিশপ। এই সর্বশক্তিমানরা “পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি” হিসেবে শাসন করতেন; তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে ফ্যাসিবাদী একনায়করাও এই ঐশি অধিকার লাভ করেছেন।

    হিটলারের মতে, রাষ্ট্রই সবকিছু এবং সার্বভৌম শক্তি রাষ্ট্রের গুটি হিসেবে বেঁচে থাকা ছাড়া ব্যক্তি নাগরিকের অন্য কোন অধিকার নেই। সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজ খেয়াল খুশি অনুযায়ী যেকোন মুহুর্তে তার জীবন নিয়ে বাজি ধরতে প্রস্তুত। সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যযুগীয়-আধ্যাত্মবাদী রাজনৈতিক দর্শন যৌক্তিকভাবেই ফ্যাসিবাদীদের দায়িত্ব-জ্ঞানশূন্য যুদ্ধ-প্রোপাগান্ডার দিকে বাঁক নেয়। সার্বভৌম-সর্বশক্তিমান শাসকের অহমিকা অথবা খাম-খেয়ালিতা যেকোন সময় জনগণকে আহবান কর‍তে পারে মলোখের (কাননবাসীদের ঈশ্বর, যার বেদীতে শিশুদের উৎসর্গ করা হতো) বেদীতে আত্মো-উৎসর্গ করতে। জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগুক বা না লাগুক, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য অথবা দেশপ্রেমের কর্তব্যের কারণে নিজেদেরকে উৎসর্গের জন্য জনগণকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে৷ জার্মান বুর্জোয়াদের মাঝে হিটলারের (ক্ষমতা গ্রহণের) পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করা ভ্যান পাপেন, ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের এই ব্যবহারিক তাৎপর্য অত্যন্ত অকপটে ঘোষণা করেছেন। তার মতে: “নারীদের কাজ হলো ভবিষ্যৎ যোদ্ধা তৈরির জন্য সন্তান জন্ম দেয়া৷ যুদ্ধ ময়দানে প্রাণদানের থেকে উত্তম কোন জীবন-আদর্শ পৃথিবীতে নেই।” রক্তদানের এই ফ্যাসিবাদী কৌলিকতা মাতৃত্বকে অবমূল্যায়িত করে এবং ঠিক এ কারণেই তারা বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীদের সমালোচনা ও বাধার শিকার হয়৷ তখন ফ্যাসিস্টরা ধর্মধ্বজধারী ভন্ডামির পথ গ্রহণ করে। তাদের অভিযোগ বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীরা পবিত্র পরিবারকে ভেঙে ফেলতে চায়। অবশ্য, সনাতনী ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের কানে আত্মউৎসর্গের এই ফ্যাসিবাদী আহবান পরিচিতই শোনাবে—তারা ক্ষত্রীয় গুণাবলির এক মনোরম প্রতিধ্বনিই শুনতে পাবে এই ফ্যাসিবাদী আহবানে।

    “জাতীয় সমাজতন্ত্র” বা “হিটলার” উভয়ই মধ্যযুগীয় প্রুশীয়বাদের বিভৎস ভূত। ভারতে এখনো যা ক্ষত্রীয় গুন বলে মহিমান্বিত হয়, তারই প্রতিনিধিত্ব করে প্রুশীয়বাদ। যখন জনগণ ভূমিদাসত্বে বন্দি ছিল, তখন তাদের কাছে এই ক্ষত্রীয় ‘গুন’ প্রচার করা হতো। সামন্ত প্রভুর ভূমিদাসদের (ভারতীয় ও প্রুশিয় উভয়ই) অনেক সময়ই চাষের ক্ষেত ছেড়ে তরবারি ধর‍তে হতো। এই পেশাগত পরিবর্তন যেহেতু তাদের নয়, বরং সামন্ত প্রভুদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল (ঐ সময়ে ক্ষেতে খাটার থেকে ডাকাতি বেশী লোভনীয় পেশা ছিল), সেহেতু, ক্ষত্রীয় গুনের ভাবাদর্শ তথা মহিমা তাদের মাঝে স্থাপন করা প্রয়োজনীয় ছিল। একারণেই, যুদ্ধ ক্ষেত্রে মৃত্যুর আদর্শ মহাকাব্যে মহামান্বিত হয়েছে এবং প্রচারিত হয়েছে বহুবিধ কিংবদন্তি আখ্যানে। প্রকৃতপক্ষে, জনগণের মাঝে বীরত্ব সম্পর্কে এক বিকৃত ধারণা নির্মাণের জন্য এই মহাকাব্য গুলো রচিত হয়েছে; প্রুশীয় জাতীয়তাবাদের মতোই ক্ষত্রীয় বীরত্ববাদের ব্যবহারিক মূল্য ছিল সামন্ত প্রভুর ক্ষমতার সম্প্রসারণ। যদিও কখনো কখনো প্রভুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে একে দেখতে হবে এই খেলার অংশ হিসেবে। ফটকাবাজি ও রোমাঞ্চের লাভ-ক্ষতি উভয়ই রয়েছে।

    “এটা আমাদের সমাধি ফলকে লেখা হোক: আমরা কঠোর ছিলাম, আমরা নিষ্ঠুর ছিলাম; কিন্তু আমরা ভালো জার্মান ছিলাম” (হিটলার)। অতিমানবের কৌলিকতা হিটলারবাদের আরেকজন নায়ককে সক্ষম করেছিল এটা ঘোষণা করতে: “নিজের তৈরী আইন ভাঙার সাহস রাষ্ট্রের থাকতে হবে”। দুনিয়াতে এই ধরনের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা চর্চার নৈতিক সম্মতি কেবল এমন একটি অতিপ্রাকৃতিক আধ্যাত্মবাদী শক্তি তথা সর্বশক্তিমান স্বর্গীয় ইচ্ছার ছদ্ম-দার্শনিক ধারণার মাঝেই পাওয়া সম্ভব, যা কোন ধরনের প্রাকৃতিক আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না, কিন্তু তার ভূমিকা হবে সকল মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণকারী এক সার্বভৌম শক্তির। এটাই ফ্যাসিবাদের দর্শন, যার সারবত্তা হলো অতিমানবের কৌলিকতা । এটা এমন একটি দর্শন, যার সাথে বেদান্ত দর্শনে বিদ্যমান ভারতীয় আধাত্মবাদের লক্ষণীয় মিল পাওয়া যায়। দুনিয়াকে ঈশ্বরের লীলা হিসেবে দেখা ভারতীয় দ্বৈতবাদী দর্শনের সাথেও এর সাদৃশ্য রয়েছে। ঠিক এই দার্শনিক জ্ঞাতিত্বের কারণেই স্পেঙ্গলার, স্প্যান, কেইজারলিং সহ জার্মান ফ্যাসিবাদের অনেক ভাবাদর্শিক নির্মাতা প্রাচ্যের আধ্যাত্মবাদী দর্শনকে প্রশংসা করে—তাদের মতে, প্রাচ্যের বার্তাই পারবে আধুনিক পাশ্চাত্যকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে।

    ফ্যাসিবাদের দর্শন ও ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ সারগত ভাবে অভিন্ন। যদি ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদী সভ্যতাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়, তখন ভারতের আধ্যাত্ম সম্ভবত একটি প্রতিরূপ গৌরবের দাবি করতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে বস্তুবাদের দুনিয়া মুক্ত হবে না। বরং, তা স্থুল বস্তুবাদের প্রভুত্বে মানবতাকে বন্দী রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে। এই ধরনের ‘গৌরব’ আনা দর্শন নিয়ে আমরা কি গর্বিত হতে পারি? যুগের পর যুগ ধরে একটি মিথ্যা আদর্শ লালন করার জন্য এই গৌরব কি আমাদের লজ্জিত করবে না? এই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এবং সেই সকল ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবা উচিত, যারা চিন্তা করতে জানেন, যারা পূর্ব সংস্কার দ্বারা চালিত নন অথবা যারা সচেতন প্রতিক্রিয়াশীল নন—অর্থাৎ, সম্ভাব্য ফ্যাসিস্ট নন।

  • এম এন রায়।। ফ্যাসিবাদের দর্শন

    এম এন রায়।। ফ্যাসিবাদের দর্শন

    • অনুবাদ: বাধন অধিকারী

    ছবি: মুসোলিনি ও হিটলার, ১৯৩৭

    ফ্যাসিবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা। এর আবির্ভাব ১৯১৯ সালে ইতালিতে। তারপর থেকে এটি ইউরোপের সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে ফ্যাসিবাদ পূর্ণ বিজয় অর্জন করেছে। আকস্মিক উপস্থিতি এবং দর্শনীয় অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই ফ্যাসিবাদকে হাল আমলের অসামান্য আলোচ্য বিষয় করে তুলেছে। এর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী বিশ্বকে হতবাক করেছিল। এর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। কৈফিয়তবাদী আর স্তাবকেরা না চাইলেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করার জন্য হিংসাত্মক প্রচেষ্টা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে একে। মহাযুদ্ধের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের) ধ্বংসাত্মক পরিণতি দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এর বাড়বাড়ন্ত শনাক্ত করা যায়। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের সাফল্যের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাদের সময়ের এই দানবীয়তা নিয়ে অনুসন্ধান এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে তীক্ষ্ণ নয়। ঐতিহাসিকভাবে, এটি যুদ্ধ-পরবর্তী বিকাশ নয়। এমন ব্যাপক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হঠাৎ করে ঘটতে পারে না। ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ সময়ব্যাপী দার্শনিক চিন্তাধারার বিকাশের যৌক্তিক পরিণতি এই ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে যা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।

    ফ্যাসিবাদের দর্শন হেগেল-পরবর্তী অতি-আধুনিক দৃষ্টবাদ, নয়া-বাস্তববাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক স্কুলগুলোর [চর্চিত] ভাববাদের যৌক্তিক পরিণতি। এই দর্শন ভাববাদকে প্রত্যাখ্যান করার ভান করলেও এক নতুন ধরনের অধিবিদ্যক রহস্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ছদ্ম অথবা অসৎ আদর্শবাদের ওই স্কুলগুলি প্রয়োগবাদ এবং নব্য-হেগেলবাদে এসে তাদের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। প্রথমটি (প্রয়োগবাদ) “অর্বাচীন বস্তুবাদের ইন্দ্রীয়সুখ নির্ভর উদরপূর্তির দর্শন” (অধ্যয়ন) কে “ধর্মীয় অভিজ্ঞতার” সাথে সমন্বয় করে; অন্যদিকে দ্বিতীয়টি (নব্য হেগেলবাদ) জঙ্গি প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্যে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার বিপ্লবী অস্ত্রকে বিকৃত করে। নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার সমস্ত পার্থিব মান লঙ্ঘন করে, ফ্যাসিবাদ দাবি করে, তারা ঈশ্বর-মনোনীত।

    ইতালীয় ফ্যাসিবাদের সরকারি দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিলে সর্বপ্রথম এই দাবি তোলেন। তিনি লিখেছেন: “মানুষ স্বভাবতই ধর্মীয়। চিন্তা করার মানে ঈশ্বরের আরাধনা করা। যত বেশি চিন্তা করা হয়, তত বেশি মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের উপস্থিতিতে অনুভব করে। মানুষের সাপেক্ষে ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়।” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক বর্বরতাকে ন্যায্যতা দিতে ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক আধুনিক ইউরোপীয় সংস্কৃতির অন্যতম মৌলিক নীতি মানবতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। মানুষকে তার ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পেতে হয়েছিল পার্থিব স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করার আগে। আর মানুষের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে হলে, তাকে রেনেসাঁ যুগ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আত্মিক মুক্তি থেকে বঞ্চিত করতে হয়।

    ফ্যাসিবাদী দর্শনের প্রচারিত মানুষের অতিধার্মিক আত্মবিলোপ অর্বাচীন বস্তুবাদেরই একটি প্রকাশ যা দার্শনিক বস্তুবাদের বিপ্লবী মতবাদগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আকারে জেগে ওঠে। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাসে বিশ্বাসী মরণশীল মানুষ নিজেকে প্রতীকীভাবে সর্বব্যাপী ঈশ্বরত্বে বিলীন করে, যেন সে সর্বশক্তিমানের একটি যন্ত্ররূপে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে—যার (সর্বশক্তিমানের) ইচ্ছা ও কার্যকলাপ পৃথিবীর সকল নীতিনিয়মের ঊর্ধ্বে। বর্বরতা ও হিংসার কার্যাবলীকে যেন একটি সর্বজনীন ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য পূরণে সংঘটিত বলে ন্যায়সঙ্গত প্রতিপন্ন করা যায়, সেজন্য যে চিন্তার প্রক্রিয়ায় এইসব কাজ সংঘটিত হয়, তাকে ভণ্ডামিপূর্ণভাবে ‘ঈশ্বরচিন্তা’ হিসেবে কল্পনা করা হয়।”

    “এই সকল কার্যকলাপ ঈশ্বরপ্রণোদিত। ঈশ্বর পচে যাওয়া ও বিপর্যস্ত পুঁজিবাদকে তাঁর আশ্রয়ে গ্রহণ করেন, এবং অশালীন বস্তুবাদের এই পরিত্যক্ত ব্যবস্থার প্রতিটি উগ্র রক্ষক হয়ে ওঠে এক এক জন ঈশ্বরপ্রণোদিত, অলৌকিক যন্ত্র। আত্মবিলোপের এই কূটকৌশলের মাধ্যমে সে নিজের জন্য সংরক্ষণ করে সীমাহীন ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা—যা অন্যদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী হলো অতিমানব। তবুও, আত্মবিসর্জনের অতির্ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের বহুরূপী দার্শনিককে “মানবের অনন্ত ও অমর সারবস্তু” আবিষ্কার করতে বাধা দেয় না।

    একটি জীর্ণ-শীর্ণ সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব কাজের জন্য, এই “পবিত্র মিশনে” নিয়োজিত মানুষের সম্ভাবনাকে “অসীম, শর্তহীন এবং স্বাধীন” হতে হবে। আত্মবিসর্জনের মতবাদ এবং ফ্যাসিবাদের সর্বশক্তিমানতাবাদের আরাধনার এই নির্লজ্জ বৈপরীত্যকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে জেনতিলের কোনো অসুবিধা হয় না। তিনি একজন নব্য-হেগেললীয় এবং জানেন কিভাবে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির অপব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করতে হয়। প্রয়োগবাদ, অর্থাৎ সুবিধাবাদী “আধ্যাত্মিক” দর্শনও তাকে সাহায্য করে। তিনি যেহেতু শেখান “ভাবনা মানেই ঈশ্বরের ধ্যান”, সেহেতু তিনি যা করেন, তা তিনি সম্ভবত এক অসাধারণ দ্বান্দ্বিক দক্ষতার কৃতিত্ব বলে মনে করেন।

    “ঈশ্বর এবং চিন্তা (যথাক্রমে) জীবনের দুটি বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে; উভয়ই প্রয়োজনীয় এবং উভয়ই অপরিহার্য, তবুও একে অপরের বিরোধী এবং বিরোধিতাকারী” (“ফ্যাসিবাদ এবং সংস্কৃতি”)। আবার ঈশ্বর ও মানুষকে বলা হয়েছে একটি “নমনীয় ঐক্য, যা আত্ম-উপলব্ধির চিরন্তন গতিতে চলে—একটি জীবন্ত এবং সে কারণেই অস্থির ঐক্য, যা সর্বদা নিজের প্রতি অসন্তুষ্ট” (ঊহ্য)। এই হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার তদ্ভবরূপে এই নব্য-স্কলাস্টিক দর্শন হিন্দু আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আধ্যাত্মবাদ তো শেষমেষ মানসিক বিভ্রান্তিই, যা পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শিত বৈজ্ঞানিক সত্য এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য অস্পষ্টতার আশ্রয় নেয়। “চিন্তা হলো ঈশ্বরের ধ্যান, অথচ চিন্তার সঙ্গে ধ্যানের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক বিরোধের ও বৈপরীত্যের!” ধ্যান যদি হয় নিষ্ক্রিয় অবস্থা, আর বিরোধিতা হয় সক্রিয় কার্যকলাপ—তবে একই বস্তুকে ঘিরে এই দুটি বিপরীত সম্পর্ক কিভাবে একসাথে যুক্ত হতে পারে, তা যুক্তিবোধসম্পন্ন মানসের বোধগম্য নয়।

    কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাগুলি যুক্তির পরিধির বাইরের বিষয়। সুতরাং, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা তা নিয়ে জ্ঞান অর্জন করি। ধ্যান আমাদের এমন কোনো ফলাফল দেয় না। ধ্যানের অর্থ হলো—যা ইতিমধ্যে জানা, তাতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। যদি কেউ ধর্মীয় পূর্বধারণা নিয়ে শুরু করে, তবে সে ঈশ্বরকে আরোপ করা গুণাবলী নিয়ে ধ্যান করতে পারে। কিন্তু তার নিজের পূর্বধারণাগুলিই ধ্যানের বিষয়কে এমন এক স্থানে স্থাপন করে, যা ‘চিন্তা’ নামে পরিচিত মানসিক কার্যকলাপের নাগালের বাইরে। অতএব, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে এক করে দেখা, হয় চিন্তার নিছক বিভ্রান্তি, নয় তো ইচ্ছাকৃতভাবে জ্ঞানতত্ত্বের মূল নীতিকে বিকৃত করা।

    দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আধ্যাত্মবাদ যতই বিভ্রান্তিকর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, তার বাস্তব পরিণতি অত্যন্ত স্পষ্ট। এগুলি সবচেয়ে নিম্নমানের অর্থে বিশুদ্ধ বস্তুবাদী। হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, জেনতিলে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের জন্য ধর্মতাত্ত্বিক অনুমোদন উদ্ভাবন করেন। “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ধর্মসহ সমস্ত আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত ও ধারণ করে… রাষ্ট্র যদি অন্য কোনো সার্বভৌম শক্তিকে সহ্য করে, তবে তা আত্মহত্যার সামিল। যা কিছু আধ্যাত্মিক/ধর্মীয় তা স্বাধীন—কিন্তু সেই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষমতার (যে রাষ্ট্র নিজেই আধ্যাত্মিক) পরিধির মধ্যে।” (ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি ) ফ্যাসিবাদের যে চর্চা, তা অন্য অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। সেখানে দেখা যাবে—এই আধ্যাত্মবাদী ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা কতটা নীচু স্তরের বস্তুগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

    “বুর্জোয়া শ্রেণি, তাদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাকে রক্ষা করতে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের রক্তাক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে। তারা রাজাদের ‘ঈশ্বর-প্রদত্ত অধিকার’ উত্তরাধিকারসূত্রে দাবি করে বসে। রাজারা ইতিহাসের অতীত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত এই ‘ঈশ্বরতাত্ত্বিক অনুমোদনের অধিকার’ রাষ্ট্রের জন্য সংরক্ষিত থাকে—একটি বিমূর্ত হেগেলীয় দর্শনে রাষ্ট্রকে কল্পনা করে—ততদিন তা দাবি করতে পারবে সেই শ্রেণি, যারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। মধ্যযুগের প্রবাদ—”রাজা কখনো ভুল করেন না”—কে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকরা বানিয়ে ফেলেছে আধুনিক প্রবাদ—“রাষ্ট্র কখনো ভুল করে না।”

    প্রসঙ্গত, এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের দর্শনের মূল গীতার ঐশ্বরিক দর্শনেও খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি (বিভূতি) ঈশ্বরের শক্তি। সুতরাং, দার্শনিকভাবে, ফ্যাসিবাদ কোনও নতুন ঘটনা নয়; এবং এটা বলাও সঠিক নয় যে ফ্যাসিবাদের কোনও দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদী দর্শন জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিক ফলাফল। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী নব্য-হেগেলীয় আধিবিদ্যামূলক ধারণার মধ্যে যৌক্তিক সংযোগ সহজেই অনুমেয়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের দর্শন সরাসরি আধুনিক রহস্যবাদ/অতিন্দ্রীয়বাদ এবং আধ্যাত্মিকতার স্কুল থেকে উদ্ভূত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ভারতীয় বংশপরিচয় শনাক্ত করা যায় শোপেনহাওয়ারের মাধ্যমে, যার শিষ্য নিৎশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। এর বংশপরিচয় অনুসন্ধানে এগোনোর আগে, চলুন এই আধ্যাত্মিক বিলাসিতার বিভীষিকাময় প্রকাশের সাথে একটু ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হই। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলন একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণায় চালিত। ফ্যাসিবাদের দর্শন হলো তার কার্যকলাপ। এটি কোনো অনড় মতাদর্শ নয়। এটি চিন্তার একটি নতুন রূপ, জীবনের একটি নতুন পদ্ধতি। ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো এর ধর্মীয় অনুভূতি।”— জিওভান্নি জেনতিলে, “ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”। ফ্যাসিবাদের প্রেরণা তার কার্যকলাপের মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা এর দার্শনিকের মতে, তার দর্শনেরই সংক্ষিপ্ত রূপ।

    “ফ্যাসিবাদী আন্দোলন হতাশ ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত জনগণকে এক উন্মত্ত বাহিনী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করে। তারা তাদের নিজস্ব দাসত্বের শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করার জন্য বিপরীতধর্মী ধর্মযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়। দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস কায়দায় দমন করার ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ হল পুঁজিবাদ, এবং সেই লজ্জাজনক ভূমিকা পালন করার জন্য; পুজিবাদকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় যাদের একনায়কতন্ত্র ক্ষমতা গ্রহণের প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদের “গভীরভাবে প্রোথিত” আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় অসংখ্য সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, যা বহু বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে পুঁজিবাদকে রক্ষা করার পবিত্র উদ্দেশ্যে। বাস্তবে এটি অশ্লীল বস্তুবাদ। “গভীরভাবে প্রোথিত আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য”-এর সাথে এই ধরনের কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যুক্তিসঙ্গত মতাদর্শের ব্যবস্থায় আবদ্ধ নয়। আধ্যাত্মিকতা কোন কারণ জানে না, এতে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক চরিত্র তার স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে প্রকাশ পায়।

    ফ্যাসিবাদের তথাকথিত “গভীর আত্মিক প্রেরণা” প্রকাশ পায় বহু বছর ধরে সংঘটিত নির্মম সহিংসতার মধ্য দিয়ে। এই সহিংসতার সবটাই পুঁজিবাদকে রক্ষা করার “পবিত্র উদ্দেশ্যে”, যার প্রকৃত রূপ (পুঁজিবাদের) কিন্তু আসলে নিতান্তই জড়বাদী ও লোভনীয়। তাহলে এই ধারার নিষ্ঠুরতা কীভাবে ফ্যাসিবাদের ‘গভীর আত্মিক প্রেরণার’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোনো নীতি নেই। এটি কোনো যুক্তিবদ্ধ মতাদর্শের ভারে ভারাক্রান্ত নয়। আধ্যাত্মিকতায় যুক্তির স্থান নেই—তাতে কোনো নিয়ম নেই, নেই কোনো কাঠামো । ফ্যাসিবাদের এই তথাকথিত আত্মিক প্রকৃতি প্রকাশ পায় এর স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে। এখানে একমাত্র নীতি হলো উপযোগিতা—পুঁজিবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার উপযোগিতা। ফ্যাসিবাদ আসলে কোনো সত্যিকারের দার্শনিক তত্ত্ব কিংবা যুক্তিনিষ্ঠ নীতিকে নিজের উপর আরোপ করতে চায় না—কারণ সে তার হাত মুক্ত রাখতে চায়, যেন যেকোনো অস্ত্র ব্যবহার করে সে তার রক্তাক্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এই যুদ্ধ সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে যারা সমাজকে পুঁজিবাদী সভ্যতার জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করতে চায়। ঈশ্বরের রহস্যময় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আত্মিক প্রেরণা, ধর্মীয় অনুভূতির মতো ধারণাগুলি এই সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য খুবই সুবিধাজনক—সবই যেন এক অলৌকিক উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন, যার জন্য মানুষের তৈরি আইন কোনো গুরুত্বই রাখে না।

    এমনকী, জিওভান্নি জেনতিলের মতে, ফ্যাসিবাদ হল এমন এক আদর্শ যা “প্রত্যেক ধরনের যুক্তিনিষ্ঠ, ধর্মহীন, বিমূর্ত চিন্তাধারার শত্রু—এমনকি ‘অস্বাভাবিক’ উদারতন্ত্র ও মৌলিকভাবে বস্তুবাদী গুপ্ত ভাতৃসংঘের।” এখানেই আমরা ফ্যাসিবাদের আসল রূপ দেখি। এখানে আধ্যাত্মিকতার উন্মোচন হয় তার প্রকৃত তাৎপর্যে। ফ্যাসিবাদ ধর্মীয়, তাই তা যুক্তিবাদকে বিপজ্জনক ঘোষণা করে এবং উদারতন্ত্রকে অস্বাভাবিক বলে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরোধিতা করে, কারণ সেটিই প্রকৃতপক্ষে সেই বস্তুবাদী পুঁজিবাদী বাস্তবতার বিপরীত ধারা। এটি ধর্মের পক্ষে অবস্থান নেয়, কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতাকে উৎসাহিত করে, যা সাধারণ মানুষকে শোষণের পথ সহজ করে তোলে।

  • এম এন রায়।। জাতীয় সমাজতন্ত্র

    এম এন রায়।। জাতীয় সমাজতন্ত্র

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    ছবি: নাজি পোস্টার

    জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ প্রতারণা ও জনমত্ততাকে ভিত্তি করে “জাতীয় সমাজতন্ত্র” নামটি গ্রহণ করেছে। বাস্তবে, এটি না সমাজতান্ত্রিক, না জাতীয়তাবাদী। রাজনৈতিকভাবে, এটি মূলত পুঁজিবাদী সমাজের অবক্ষয়কালীন শাসনব্যবস্থা। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র ইতালির তুলনায় আরও বেশি সহিংসতা ও বর্বরতা সংঘটিত করেছে, কারণ ফ্যাসিবাদের বিজয়ের পর পুঁজিবাদ আরও তীব্রভাবে অবনমিত হয়েছে এবং তার রক্ষকদের ঠেলে দিয়েছে নৈরাশ্যের উন্মাদনায়।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল এমন এক যন্ত্র যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ভান বর্জিত পুঁজিপতিশ্রেণির একনায়কতন্ত্রের হাতিয়ার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ও রাষ্ট্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, হিংস্র ও রক্তক্ষয়ী উপায়ে শ্রমজীবী শ্রেণি এবং সেইসব সমাজ-সচেতন শক্তিকে দমন করা, যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের উপর নতুনতর এক মানবিক সভ্যতা নির্মাণে নিযুক্ত।

    ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে করুণ দিক হলো, সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তা গঠিত হয়েছে সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে, যা পুঁজিবাদ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত। কী এক প্রহসনমূলক বাস্তবতা, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম শিকার, পুঁজিবাদের লালসার বলি মানুষরাই উন্মত্ত সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নিরর্থক প্রয়াসে আত্মনিয়োগ করছে, যা তাদের বিনাশের কারণ। এমন একটি আন্দোলনের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতার জন্য স্বাভাবিকভাবেই কোনো স্থান থাকে না। এমনকি ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধেরও না।

    ফ্যাসিবাদ অবশ্যম্ভাবীভাবে মিথ্যা, প্রতারণা ও ভণ্ডামির উপর প্রতিষ্ঠিত। হিটলারের আত্মজীবনীকে জার্মান লেখক লিওন ফয়েখটভাঙ্গার ব্যঙ্গ করে বর্ণনা করেছেন, একটি এক লক্ষ চল্লিশ হাজার শব্দের গ্রন্থ, যাতে এক লক্ষ ঊনচল্লিশ হাজার ভুল রয়েছে। এই মহান জার্মান সাহিত্যিককে হিটলারের জার্মানি ত্যাগ করতে হয়েছিল, “জার্মান-বিরোধী” মতাদর্শ বহনকারী বলে দাহ করা হয় তাঁর রচনাসমূহকে। বস্তুত, ফ্যাসিবাদের প্রধান অস্ত্রই হলো জনমত্ততা।

    পুঁজিবাদী লুন্ঠনের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এবং সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত নির্মম শিকার মানুষদের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয় এক প্রতারণাধর্মী পুঁজিবাদ-বিরোধী উন্মাদনার মাধ্যমে। ছদ্ম-সমাজতন্ত্রের পতাকার অধীনে, তাদের সংগঠিত করা হয় সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদকে রক্ষার্থে ঝটিকা-সেনারূপে। এই ‘অলৌকিকতা’ সাধিত হতে পারে কেবলই নিরঙ্কুশভাবে নির্লজ্জ মিথ্যাচার, নির্লজ্জ প্রতারণা এবং চরম মাত্রার জনমত্ততাপূর্ণ ধোঁকাবাজির মাধ্যমে।

    যে আন্দোলন আপাতভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে প্রতিভাত, প্রকৃতপক্ষে তা নিশানা করেছিল রাজনৈতিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে, ঐতিহাসিকভাবে যা সংশ্লিষ্ট পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সঙ্গে। অর্থাৎ সেই রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, যা পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল তার প্রগতিশীল পর্বে।

    সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুঁজিবাদেরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে ঘোষণা করা হয় যে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সমস্ত দুর্বিপাকের একমাত্র নিরাময় হলো এর বিলুপ্তি।

    ফ্যাসিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ বিদ্যমান থেকেছে, পূর্বের তুলনায় অধিকতর ক্ষমতা সহকারে, এবং শ্রমিক শ্রেণিকে আরও নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে চলেছে। বস্তুত, এই বৈপ্লবিক অস্থিরতার যুগে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি পুঁজিবাদী শাসন রক্ষায় বাড়তি নিশ্চয়তা প্রদান করে।

    সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দ্বারা প্রাপ্ত আপেক্ষিক স্বাধীনতা শ্রমজীবী শ্রেণিকে সংগঠিত হওয়ার এবং পুঁজিবাদ উৎখাত ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সুতরাং, নিজেদের গৃহীত অর্জনসমূহ বিলুপ্ত করাই পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষে তাদের ক্ষমতা ও উপরি সুবিধাসমূহ রক্ষার সংগ্রামে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই নিকৃষ্ট কর্মটি সম্পাদনের উদ্দেশ্যেই ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়, পুঁজিবাদকে রক্ষার জন্য।

    বুর্জোয়া দার্শনিকেরা এই আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি রচনা করে দেয়। যে টাকাওয়ালা ও শিল্পপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনালগ্নে প্রচণ্ড ভাষায় আক্রমণ চালানো হয়, তারাই এই আন্দোলনের জন্য উদারভাবে অর্থসাহায্য প্রদান করে। বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার ধ্বংস আহ্বান করে এই আন্দোলন, সেই রাষ্ট্রই একে সহ্য করে। বরং গোপনে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করে।

    বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গোপনে এই আন্দোলনের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে। চতুর জনমত্তকরণ, সস্তা আবেগ, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি (যার বাস্তবায়নের কোনো ইচ্ছা থাকে না), বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অপবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদের উসকানি, জাতিগত ঘৃণার উত্তেজনা—এই সব কৌশল এবং অনুরূপ আরও বহু উপায় ব্যবহৃত হয়, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণকে বশীকরণের জন্য।

    এভাবে জনগণকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাটকীয় এক রাষ্ট্রক্ষমতা-দখল (coup d’État)-এর মাধ্যমে, যেমন ইতালিতে হয়েছে; কিংবা “সংবিধানসম্মত” ও “রক্তপাতহীন” পন্থায়, ঘটেছে জার্মানিতে।

    যেসব ব্যাঙ্কার ও শিল্পপতি গোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততায় প্ররোচিত করার জন্য অর্থ সরবরাহ করেছিল, তারাই জার্মানির পরাজয় ও অপমান থেকে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছিল। প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে ১৯২৩-২৪ সালের নিরঙ্কুশ মুদ্রাস্ফীতিতে বাধ্য করেছিল তারা, যার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকালীন সময়ে সৃষ্ট বিপুল অভ্যন্তরীণ ঋণ অবলুপ্ত করা।

    “দেশবাদ” যাকে তারা ধারণ করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দেয়। যদি এই অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতারণামূলক উপায়ে লোপ না করা হতো, তাহলে তার সুদ ও পরিশোধ বাবদ সরকার বাধ্য হতো উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর উপর ব্যাপক কর আরোপ করতে। যুদ্ধকালীন কালাবাজারি ও মুনাফাখোরদের ন্যায্য করের বোঝা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সরকার একপ্রকারভাবে সেই বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় বাজেয়াপ্ত করে নেয়, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশবাদী দায়িত্ববোধ থেকে যুদ্ধ-ঋণে বিনিয়োগ করেছিল।

    এই বাজেয়াপ্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ধ্বংস করে এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করে দেয়। শেষপর্যন্ত, এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্তরসূরিরাই গায়ে চাপায় ব্রাউন শার্ট, ধারণ করে রহস্যময় স্বস্তিকা চিহ্ন এবং নিজেদের সঁপে দেয় সেইসব শক্তির হাতে, যারা তাদের লুণ্ঠন ও বঞ্চনার মাধ্যমে নিঃস্ব করে দিয়েছিল।

    মোটা পুঁজিপতিরা—যারা যুদ্ধকালীন কালোবাজারি ও মুনাফাবাণিজ্যের মাধ্যমে আরও স্ফীত ও বিত্তবান হয়ে উঠেছিল—প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সহযোগিতা ও নীরব মদতে কর প্রদান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর ফলে ভার্সাই চুক্তিজনিত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বোঝা গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীল জনসাধারণের উপর। এর প্রত্যক্ষ ফল ছিল, জনসংখ্যার বৃহৎ অংশের ক্রমাগত দারিদ্র্যকরণ। অপরদিকে, সমাজের একটি ক্ষুদ্র উচ্চবিত্ত গোষ্ঠী ক্রমাগত আরও ধনী হয়ে ওঠে।

    এই দারিদ্র্যকরণের ফলে সাধারণ জনগণের কর পরিশোধের সামর্থ্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা চরম ভারসাম্যহীনতায় পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে জার্মান সরকার কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় ছিল। দৈনন্দিন ব্যয় হ্রাস করার একটি উপায় ছিল, সমাজকল্যাণ খাতের বরাদ্দ এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ও আহত সৈনিকদের পেনশন কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিকে যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতেই হতো।

    যারা যুদ্ধ থেকে বিপুল সম্পদ উপার্জন করেছিল এবং পরাজয়ের দায় এড়াতে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিঃস্ব করেছিল, বিজয়ী শক্তিসমূহের দাবিগুলো পূরণ করা যেত কেবল তাদের কাছ থেকেই অর্থ আদায় করে। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের—যার অর্থায়ন করছিল সেই বিত্তশালী শ্রেণি—এমন প্রচার যে “ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে ধ্বংস করছে”, খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

    কারণ, প্রজাতান্ত্রিক সরকারই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং এর আওতায় উত্থাপিত দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করছিল। তাই এই সরকার জার্মান জনগণের শত্রু— একেঅবশ্যই উৎখাত করতে হবে। এইভাবেই তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” শুরু হয়, একটি প্রতিবিপ্লব হিসেবে।

    শ্রমিক শ্রেণি এবং নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক ধ্বংস জার্মানিতে এক চরম বৈপ্লবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। জনসাধারণ আরও কোনো অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে প্রস্তুত ছিল না। অপরদিকে, উচ্চবিত্ত শ্রেণিও তাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের সামান্য অংশ ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে জার্মানি পড়েছিল দ্বিমুখি সংকটে—অভ্যন্তরে বিপ্লবের ভূত এবং বাইরে থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা।

    এই দ্বৈত সংকটের মোকাবিলায় শাসক শ্রেণিই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের রচনা করে—যাকে তারা উভয় বিপদের বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে স্থাপন করতে চেয়েছিল। ছলনাপূর্ণ “সমাজতন্ত্র” কথনের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির পশ্চাৎপদ অংশকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব ছিল; অপরদিকে, ভার্সাই চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধান্মদনাl জাগিয়ে তুলে একটি কার্যকর প্রতিরোধও গড়ে তোলা যেত।

    গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পর, তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” পুঁজিবাদকে বিন্দুমাত্র আঘাত করেনি। যদিও ক্ষমতায় আসার পূর্বপর্যন্ত জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল পুঁজিবাদের বিনাশ। নাৎসি রাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপই ছিল শ্রমিক শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহের দমন, যা সাময়িকভাবে বিপ্লব বিরোধী বিপদ থেকে একপ্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই কাজটি সম্পন্ন করার পর, নাৎসি সরকার বেপরোয়া জাতীয়তাবাদী উন্মত্ত অভিযানে নেমে পড়ে। জার্মান জনগণের কল্যাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, বরং শিল্পপতি শ্রেণিকে ভার্সাই চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে।

    যদি বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চাইতো, তা আসতে পারত কেবল তাদের কাছ থেকেই, যাদের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব ছিল। জার্মান জনগণের ইতোমধ্যেই শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল । “ভার্সাইয়ের দাসত্ব” থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ছিল সামরিক প্রতিরোধ প্রদর্শন, যদি মিত্রশক্তিরা দাবির ব্যাপারে কঠোর হতো। এমন উদ্যোগ পাগলামির শামিল, কিন্তু তা কার্যত সফল হয়, কারণ মিত্রশক্তিগুলো তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিল যে, সামরিক হস্তক্ষেপ লাভজনক নয়।

    তদুপরি, তারাও জার্মানিতে বিপ্লবের ভূতের ভয়ে কাঁপছিল। ফলস্বরূপ, নাৎসি জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এগুতে থাকে। পুঁজিবাদীদের কোনো ক্ষতি তো করেইনি বরং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এই জাতীয়তাবাদই তাদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ করে দেয়। “জাতীয় সম্মান রক্ষার্থে পুনঃসামরিকায়নের” যে কর্মসূচি গৃহীত হয়, তা শিল্প খাতে এক নতুন বাড়বাড়ন্তর সূচনা করে; যার সমস্ত মুনাফা যায় পুঁজিপতিদের পকেটে।

    কিন্তু, একেবারে ফাঁকা কোষাগার নিয়ে সেই অলৌকিক-বাচনধর্মী “মসিহা”র পক্ষেও পুনঃসামরিকায়ন কর্মসূচির ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তখন শিল্পপতি ও অর্থলগ্নিকারকগণ নতুন সরকারের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিপুল অর্ডারের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে। এর ফলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কার্যত তাদের কাছে বন্ধক হয়ে পড়ে।

    এই পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের কোনো কথাই বলা সম্ভব ছিল না। হিটলারবাদের তাত্ত্বিক পরিণতি ছিল— প্রারম্ভিক পর্যায়ের ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক মুখোশ ত্যাগ এবং জাতীয়তাবাদকে নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের কার্যকর হাতিয়ারে রূপান্তর।

    জাতীয় সমাজতন্ত্র শব্দযুগল একধারে বিভ্রান্তিকর এবং পরস্পরবিরোধী। সমাজতন্ত্র কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা চেনে না; তা জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আর ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এর সংশ্লেষের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। “জাতীয় সমাজতন্ত্র” আসলে একটি প্রতারণাপূর্ণ শিরোনাম, যার আড়ালে আদতে গভীরভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী, শ্রমজীবী শ্রেণিবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন লুকায়িত।

    মার্কসবাদকে ধ্বংস করা হলো ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের প্রকাশ্য লক্ষ্য। আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন—অর্থাৎ পুঁজিবাদী শোষণ থেকে সমাজকে মুক্ত করার সংগ্রাম—কার্ল মার্কস প্রদত্ত দার্শনিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক নীতিমালার ভিত্তি ব্যতীত কল্পনাও করা যায় না। যেমনটি বলা হয়েছে:

    নিশ্চয়ই, মার্কসবাদ ব্যতীত সমাজতন্ত্র বলে কিছু নেই এবং বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রনায়কদের তা বিবেচনায় নিতেই হয়।

    এই মত শুধু উদারনৈতিক অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রক্ষণশীল পণ্ডিতদের পক্ষ থেকেও একে অকপটে স্বীকার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, খ্যাতনামা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুলার লায়ার লিখেছেন:

    “অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের মার্কসীয় তত্ত্ব আজ সামাজিক বিজ্ঞানের এক অক্ষয় সূত্রে পরিণত হয়েছে।”

    এই প্রসঙ্গ থেকে এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যে আন্দোলন নিজেকে সমাজ সংস্কারের ন্যূনতম রূপের সঙ্গেও সংযুক্ত রাখে না, এবং যা সমাজ অগ্রগতির যেকোনো ধারণার বিরুদ্ধাচরণ করে, সেই আন্দোলনের প্রকৃতি কী ভয়ানকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, যা কিনা আবার মার্কসবাদকে তার প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।

    মার্কসবাদের প্রতি উগ্র ঘৃণাই এই সত্য প্রমাণে যথেষ্ঠ যে, ফ্যাসিবাদের সমাজতান্ত্রিক পরিচয় কেবলই এক ছলনাপূর্ণ মুখোশ। ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের বহু পূর্ব থেকেই তার প্রধান কার্য ছিল শ্রমিক শ্রেণিকে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস ও হিংসার মাধ্যমে আতঙ্কিত করা। লক্ষণীয় যে, এই সমস্ত সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন করেছিল ঠিক তারাই, যাদের সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক মনে করার কথা।

    ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, ফ্যাসিবাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল রক্তক্ষয়ী নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে কেবল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকেই দমন করা নয়, বরং যারা বিপ্লববিরোধী, তেমন সমাজিক-গণতন্ত্রী দলগুলোকেও নির্মমভাবে দমন করা, এমনকি সর্বাধিক সংশোধনবাদী ধাঁচের ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই পায়নি।

    ফ্যাসিবাদ তার দমন-পীড়নের ভারী হাত তুলে দিয়েছিল সেই উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ওপরও, যারা শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতি সহানুভূতি পোষণ করত এবং তাদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানাতো।

    পুঁজিবাদকে আধ্যাত্মিকীকরণ করার প্রত্যয় ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির অন্যতম স্পষ্ট ভণ্ডামি। ধ্বংসপ্রাপ্ত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পশ্চাৎপদ শ্রমজীবী জনগণের কল্পনা জয় করার উদ্দেশ্যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন লিপ্ত হয় এক ধরনের ছলনাপূর্ণ পুঁজিবাদ-বিরোধী জনমত্ততায়।

    কিন্তু বাস্তবে, পুঁজিবাদের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈরী এমন সকল শক্তিকে দমন করার পর, নাৎসিরা ঘোষণা করে যে তাদের তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” সম্পন্ন হয়েছে।

    পুঁজিবাদের সুবিধাসমূহে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ না করেই, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নাৎসি একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে—এই ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি। প্রতারিত জনসাধারণের প্রতি এই নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতাকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে, ফ্যাসিবাদী তাত্ত্বিকরা পুঁজিবাদের দুটি শ্রেণিবিন্যাস আবিষ্কার করে: “শোষণকারী পুঁজিবাদ” এবং “গঠনমূলক পুঁজিবাদ”। প্রথমটিকে দমন করা হবে, আর পরেরটি রক্ষা ও উৎসাহিত করা হবে।

    এই শ্রেণিবিন্যাস অর্থনৈতিক তত্ত্বের এক নির্লজ্জ বিকৃতি। অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞানই দেখায় যে, শোষণ ব্যতীত পুঁজিবাদ কল্পনাতীত। পুঁজিবাদের যেকোনো “গঠনমূলক” সাফল্য শ্রমিকশ্রেণির শ্রমের মূল্য থেকে একটি অংশ ছিনিয়ে নিয়ে নির্মিত হয়। অর্থনৈতিক তত্ত্বকে বিকৃত করে ব্যবহার করা হয়, যাতে পুঁজিবাদ জাতীয় সমাজতন্ত্রের আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বিঘ্নে বিকাশ লাভ করতে পারে।

    পুঁজিবাদী শোষণের পুরোধা ব্যক্তি, যেমন: ক্রুপ ফন বোলেন (তার বৃহৎ অস্ত্রকারখানাসমূহসহ), থিসেন (তার বিশাল লোহা ও ইস্পাত শিল্পসমূহসহ), ফ্যোগলার (তার কয়লা-রাজ্যসহ) প্রমুখকে “গঠনমূলক পুঁজি”র প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাঁদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রের দৃঢ় স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়।

    বাস্তবত, বৃহৎ শিল্প ও আর্থিক স্বার্থসমূহকে সর্বাত্মক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়, যে রাষ্ট্র অন্যদিকে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার রক্তাক্ত শুঁড় প্রবিষ্ট করেছে, এক সর্বগ্রাসী অক্টোপাসের মতো। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, যার সভাপতি ক্রুপ ফন বোলেন এবং যার সদস্যরা সবাই প্রধান শিল্পপতি এমন এক “অতি-রাষ্ট্র” হিসেবে কাজ করে, যার উপরে এমনকি নাৎসি রাষ্ট্রেরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।

    এই নবরূপী সমাজতন্ত্রে, “ব্যক্তি নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা প্রয়োজনীয় নয়, এবং মুক্তিও অপরিহার্য নয়।” এই ভাবেই উচ্চারণ করেছিল আধুনিক জরথুস্ত্র—হিটলার। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি পরিণত হয় জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণির একমাত্র রাজনৈতিক শক্তিতে, এবং নাৎসি রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জার্মান পুঁজিবাদের বিশ্বস্ত রক্ষক।

    হিটলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই, জার্মান পিপলস পার্টি— যা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারী শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি প্রধান দল হিসেবে কাজ করেছিল—নিজেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং তাদের সদস্যদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে যোগ দিতে আহ্বান জানায়।

    এমনকি রাজতন্ত্রবাদীরাও জাতীয় সমাজতন্ত্রকে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে। তারাও তাদের প্রভাবশালী আধাসামরিক সংগঠন দ্য স্টিল হেলমেট কে নাৎসি স্টর্ম ট্রুপসে সঙ্গে একীভূত করে দেয়।

    জাতীয় সমাজতন্ত্রের সামাজিক চরিত্র ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তখনই ভণ্ডামি ও জনমত্ততার মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে, যখন ১৯৩৩ সালের মার্চে হিটলারের নিয়ন্ত্রিত সংসদ “ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট”-এর সমাধিস্থলে সমবেত হয় প্রজাতন্ত্রকে সমাহিত করতে এবং প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক সামরিকতন্ত্রের ভূতকে পুনরুজ্জীবিত করতে।

    পটসডামের রাজতন্ত্রীয় আবহে, যেখানে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতার সমস্ত আনুষ্ঠানিক উপকরণ উপস্থিত ছিল, সেখানে হিটলার বিস্মৃত হন তাঁর প্রতারিত অনুসারীদের—ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পশ্চাৎপদ শ্রমিকদের। নাৎসি সংসদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তৃতায়, যেখানে তিনি একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দাবি করেন, হিটলার আবেগঘনভাবে প্রশংসা করেন হোহেনৎসোলার্ন রাজবংশের “গুণাবলীর”, যার অবক্ষয়িত বংশধরগণ ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এই উপলব্ধি করেন যে, তারা স্বস্তিকা চিহ্ন ধারণ করে বৃথা যাননি।

    হিটলার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা লাভ করেন জার্মান জনগণের ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে নয়, বরং সেই সমস্ত ঐতিহাসিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনগণকে শোষণ ও নিপীড়নের মাধ্যমে অবদমিত করেছে।

    অন্যদিকে, কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মমভাবে দমন করে এবং নিরীহ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রী দলকেও বিলুপ্ত করে, নাৎসিরা এমনকি সংশোধনবাদী ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। এসব ইউনিয়নকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তাদের অর্থসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। কার্যত, শ্রমিক আন্দোলনের প্রায় সমস্ত নেতা ও সক্রিয় কর্মী—যারা সময়মতো দেশত্যাগ করতে পারেননি—গ্রেপ্তার হন এবং কোনো বিচার তো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও গঠন করা হয়নি।

    তাদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং প্রায় সকলেই কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই নিষ্ঠুর আক্রমণের পর, একটি সরকারি ঘোষণা প্রকাশিত হয়, যাতে বলা হয়:

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারের তিন মাস তোমাদের শ্রমিকদের কাছে প্রমাণ করেছে যে হিটলার তোমাদের বন্ধু, হিটলার তোমাদের স্বাধীনতার সমস্যা নিয়ে লড়াই করছে, এবং হিটলার তোমাদের কাজ ও রুটি দেবে।

    জার্মানিতে যখন ফ্যাসিবাদ প্রতারিত ও বিভ্রান্ত জনতার উদ্দেশে ধোঁকাবাজিমূলক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, তখন ক্ষমতা গ্রহণের বারো বছর পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একেবারেই ভিন্ন ভাষায় কথা বলছিল।

    ১৯৩৪ সালের শেষদিকে ফ্যাসিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আখিলিস স্তারাচে (Achilles Starace), মূলত বেকার শ্রমিকদের এক সমাবেশে ভাষণ দিয়ে ঘোষণা করেন:

    মনে রাখো, ফ্যাসিবাদ তোমাদের সম্মান, চাকরি বা মুনাফা প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং কেবল কর্তব্য ও সংগ্রামের আহ্বান জানায়।

    এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, দলের সর্বোচ্চ নেতা (মুসোলিনি) মিলানে এক অন্য শ্রমিক সমাবেশে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির এক ধরনের “আদর্শবাদ” ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:

    একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা একমাত্র ব্যক্তিগত লাভ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তা এখন প্রতিস্থাপিত হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র সমাজের স্বার্থ রক্ষা করা। শ্রমিকদের উচিৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়া এবং এর অপরিহার্য শৃঙ্খলায় অংশগ্রহণ করা। যদি গত শতাব্দী ছিল পুঁজিবাদের শক্তির শতাব্দী, তবে বর্তমান শতাব্দী শ্রমের মহিমা ও গৌরব।

    এইরকম একটি ব্যবস্থা, যেখানে সরকারি মুখপাত্ররা একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, তার কোন নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। এটা শুধুই এক ধরনের কূটাভাস এবং নির্লজ্জতা।

    শ্রমিকদের সমস্ত স্বাধীন সংগঠনকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে, ধর্মঘটের অধিকার বাতিল করে এবং জাতীয় প্রয়োজনের অজুহাতে মজুরি হ্রাস করে মুসোলিনি শ্রমের মহিমা ও গৌরব নিয়ে দম্ভ করে বক্তৃতা দেন!

    ছবি: মুসোলিনির সময়কার প্রোপাগান্ডা পোস্টার

    বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী, যাঁরা আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন কমিউনিজম ও সিন্ডিকালিজমের ভূতের দ্বারা, তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় আরোহণকারী মুসোলিনি কখনোই শ্রমিকদের কল্যাণ সংক্রান্ত তাঁর ঘোষণাগুলোর প্রতি আন্তরিক ছিলেন না। তাঁর ফ্যাসিস্ট পার্টির প্রাথমিক কর্মসূচি ছিল সিন্ডিকালিজম ও জাতীয়তাবাদী যুদ্ধবাজ চেতনার একটি অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কর্মসূচি রূপান্তরিত হয় বিপ্লবের উত্থানরোধে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচে।

    “জাতীয় সংহতির তত্ত্ব” ছিল এই ছদ্ম-বামপন্থা থেকে চরম ডানপন্থায় সরে যাওয়ার আদর্শিক অজুহাত। মুসোলিনির কালো-শার্ট পরিহিত বাহিনী মূলত গঠিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত দাঙ্গাবাজদের দ্বারা; যাঁদের মাসোহারা ও অস্ত্রসজ্জার জন্য অর্থ প্রদান করত বৃহৎ শিল্পপতিরা।

    মুসোলিনি ক্ষমতায় আসার আগেই তাঁর ভাড়াটে বাহিনীকে সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতা দখলের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনী শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা চালায়, এবং প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক নেতাকে হত্যা, কারাবন্দি কিংবা নির্বাসনে বাধ্য করা হয়।

    ফ্যাসিবাদী শাসনের পনেরো বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইতালির শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে এক ফ্যাসিবাদপন্থী অর্থনীতিবিদের রচিত গ্রন্থে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ইতালীয় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি অর্ধেকে নেমে আসে। ১৯১৯-২১ সালের মধ্যে সেই মজুরি যুদ্ধপূর্ব স্তরে ফিরে আসে। এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবাত্মক কর্মযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ফল, যার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের রক্তাক্ত হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

    বর্তমানে, প্রকৃত মজুরি পুনরায় যুদ্ধকালীন নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। (দ্রষ্টব্য: ড. পাওলা আর্কারি, Wages and Cost of Living)।

    শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই বাড়তি শোষণের বিপরীতে, ধনীক শ্রেণির ওপর করের বোঝা ফ্যাসিবাদী নীতির দ্বারা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। উত্তরাধিকার কর উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, অপরদিকে পরোক্ষ কর ব্যবস্থার পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় আয়ের ষাট শতাংশেরও বেশি এখন সংগৃহীত হয় সেইসব কর থেকে, যা প্রধানত শ্রমজীবী ও শ্রমনির্ভর জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

    ফ্যাসিবাদী সরকারের ভূস্বামী অভিজাত শ্রেণির প্রতি মনোভাবও ছিল সমানভাবে সদয় ও পক্ষপাতদুষ্ট। সরকার সহিংসভাবে দমন করে ক্যাথলিক পপুলার পার্টিকে, যারা দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে ভূমি পুনর্বণ্টনের দাবি তুলেছিল।

    আজও, ইতালির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি মাত্র অর্ধ শতাংশ কৃষিজনসংখ্যার হাতে কেন্দ্রীভূত। বাকি ভূমি পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি কৃষক পরিবারে বিভক্ত, যাদের মধ্যে প্রায় দুই মিলিয়ন পরিবারই ভাগচাষি বা ইজারাদার। একটি কৃষক পরিবারের গড় জমির পরিমাণ সামান্য দুই একরেরও কিছু বেশি।

    কৃষি উৎপাদনের মোট ফসলের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশই চলে যায় জমিদারদের ভাড়ার খাতে। এর চেয়েও বড় একটি অংশরাজস্ব আকারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকার আদায় করে৷

    জার্মানিতে, ফ্যাসিবাদ যা আবির্ভূত হয় “জাতীয় সমাজতন্ত্রের’’ ভ্রান্ত মুখোশ পরে, তার শাসনকালের অন্ধকার খতিয়ানও কোনও অংশে কম নয়। স্বনির্ভরতার অতিজাতীয়তাবাদী নীতির ফলে জীবন-যাপন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

    অন্যদিকে, রপ্তানি বাণিজ্য কৃত্রিমভাবে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে শ্রমিকদের মজুরি কাটছাঁট করা হয়েছে।

    বেকারত্ব সমস্যারব বহুল প্রচারিত “সমাধান” বাস্তবে ছিল, মজুরি অতি নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা এবং বেকারদের বলপূর্বকভাবে কুখ্যাত শ্রম শিবিরে পাঠানো, যেখানে কার্যত বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম আদায় করা হতো।

    “জার্মান জনগণ নিম্ন মজুরি, খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের ভারে প্রায় বিপর্যস্ত; এবং সেই নাৎসি শ্রম ফ্রন্ট, যার উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিসংঘর্ষ বিলুপ্ত করে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন রচনা, সেটিও দ্রুত ভেঙে পড়ছে।”( The New Statesman and Nation, লন্ডন, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪)

    এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে শ্রম ফ্রন্টের এই পতনকে রোধ করা হয়েছে, শ্রমিকদের জন্য দাসত্বের এক নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করে। জাতীয় স্বার্থের নামে ঘোষিত শ্রেণি-সহযোগিতার এই কাঠামোয় শ্রমিকদের ভাগে পড়েছে “শৃঙ্খলা ও আত্মবলি”— অধিকার নয়।

    এই রকম এক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় পার্টি নেতৃবৃন্দ, অর্থাৎ তথাকথিত “বিপ্লবের” প্রকৃত বিজয়ী শ্রেণির উদ্দেশ্যে, হিটলার ঘোষণা করেন:

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব জার্মানির সামাজিক কাঠামোকে হাজার বছরের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত করেছে।

    অতএব, জনগণের জীবনযাত্রার দুর্দশাকে কোনো আমূল পুনর্গঠনের সাময়িক ফল হিসেবে দেখা চলবে না; বরং এটি কমপক্ষে এক হাজার বছর স্থায়ী হওয়ার জন্য নির্ধারিত।

    হিটলার আরও উপদেশ দেন:

    জনগণকে শিখতে হবে যে বিপ্লবের কাছে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করা অনুচিত এবং কী সম্ভব আর কী অসম্ভব—এই পার্থক্যটা বুঝে নিতে হবে।

    এই চমকপ্রদ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: নাৎসি কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক অংশে যে তথাকথিত “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর আকাঙ্ক্ষা লালন করা হচ্ছিল, তাকে একবারে কবর দেওয়া।

    এক বিশ্লেষকের ভাষায়:

    ফ্যাসিবাদের যা কিছু ‘সম্ভব ও বাস্তব’ অর্জন, তা হলো: বন্দিশিবির, চাবুক, স্বাধীনতার ধ্বংস, জনমতের বিকৃতি, সামরিক অনুশীলন, সেনাবাহিনী এবং বর্বরতায় প্রত্যাবর্তন। (প্রাগুপ্ত)

    নিজেরই কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক দিকগুলোর প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানে হিটলারের উৎসাহে, তৃতীয় রাইখের তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্‌ট (Dr. Hjalmar Schacht) জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। তিনি ‘’অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকতা’’ কে অবজ্ঞাভরে খারিজ করে বলেন,

    আমরা অতীতে সংগৃহীত অভিজ্ঞতাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।

    এখানে “অতীত অভিজ্ঞতা” বলতে মূলত পুঁজিবাদকেই বোঝানো হচ্ছে, যা এখন থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মানির অর্থনৈতিক জীবনে আধিপত্যশীল ভূমিকা পালন করবে—এই মতই প্রকাশ করেন তিনি।

    ড. শাখ্‌ট আরও যুক্তি দেন,

    আমাদের সময়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে কোনও কৃত্রিম কাঠামো নির্মাণ করা সমীচীন নয়। জাতীয় সমাজতন্ত্র কেবল ‘কর্ম’ চেনে, পরিকল্পনা নয়। আমরা কোনও অস্পষ্ট তত্ত্বের দ্বারা নিজেদের পরিচালিত হতে দেব না।

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder) ঠিক সেই সময়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি পার্টির অর্থনৈতিক কর্মসূচির বিভিন্ন ধারার পুনর্বিবেচনা করেন। ক্ষমতায় আসার আগে পার্টির একটি প্রধান অর্থনৈতিক দাবি ছিল— “সুদ দাসত্বের বিলুপ্তি”

    ফেডার এই দাবিকে আবার মনে করিয়ে দেন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারকে অনুরোধ করেন যেন তারা ব্যাঙ্কের ডিসকাউন্ট রেট এবং বন্ধকি সুদের হার হ্রাস করার নির্দেশ দেয়।

    তিনি জোর দিয়ে বলেন:

    জার্মান অর্থনীতি আগের চেয়েও বেশি পরিমাণে উচ্চ পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদেরকে সুদের দাসত্বে আবদ্ধ রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, এই শ্রেণির কর্মপ্রয়াস কেবল ঋণের সুদ শোধ করতেই নিঃশেষ হচ্ছে।

    ড. শাখ্‌টের এই প্রচণ্ড আক্রমণ সম্ভবত ফেডারের এই দুর্বল “ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক” কণ্ঠস্বরের বিরোধি থেকেই উদ্ভূত। কারণ, শ্রেষ্ঠ পুঁজিপতিদের আশীর্বাদেই ক্ষমতায় আসা হিটলার আর মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদের দুশ্চিন্তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন না।

    জাতীয় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূল দর্শন ছিল যে, “সুদের দাসত্বই’’ জার্মান জনগণের সব দুর্ভোগের মূল কারণ। নাৎসি সামাজিক কর্মসূচির কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার ছিল, সুদের দায় বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় ঋণ ব্যবস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।

    এই তত্ত্বের জনক ছিলেন গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder), যিনি হিটলারকে শিখিয়েছেন— “জাতীয় বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যা কিছু আমি শিখেছি, সবই তাঁর কাছ থেকে।”( হিটলারের আত্মজীবনী অনুসারে)

    কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অচিরেই হিটলার তাঁর এই অর্থনৈতিক গুরু ফেডারকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব পদ ও প্রভাব থেকে সরিয়ে দেন। এরপর উচ্চ পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি ড. শাখ্‌ট হয়ে ওঠেন জার্মান অর্থনীতির প্রকৃত স্বৈরশাসক।

    ১৯৩৪ সালের শেষ নাগাদ, সুদের দাসত্বের জন্য এক ‘নির্দ্বন্দ্ব ও বেদনাহীন সমাধান’ আবিষ্কৃত হলো। এই সমাধানের প্রস্তাবক ছিলেন নতুন এক তথাকথিত অর্থনৈতিক ওঝা—ক্যোহলার (Köhler), যিনি পার্টির অর্থনৈতিক কমিশনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।

    তাঁর “ঔষধি পরামর্শ” ছিল:

    আপনার ঋণ পরিশোধ করুন, নতুন ঋণ গ্রহণ করবেন না। ঋণ না থাকলে, সুদের দাসত্বও থাকবে না।

    রিশার্ড দারে (Richard Darré) ছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্রের শেষ “আদর্শবাদী মোহিকান”।

    হিটলারের ক্ষমতায় আসার দুই বছর পরও তিনি এখনো মনে রেখেছিলেন পার্টির কৃষকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ ভূমি বিতরণ।

    এমন “স্মরণশক্তি” জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ছিল গুরুতর অপরাধ।

    তবে রিশার্ড দারেকে কৃষিমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় তুলনামূলকভাবে আরও লঘু অপরাধে। তিনি কেবলমাত্র এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে—মার্ক মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো উচিত।

    কিন্তু এই অর্থনৈতিক মতাদর্শ, যা ছিল শিল্পপুঁজিপতিদের স্বার্থের পরিপন্থী, চিহ্নিত হয়—একটি আর্থিক ধর্মদ্রোহ হিসেবে।

    ফলে তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্‌ট তাঁর অপসারণ দাবি করেন, এবং হিটলার তাঁর অনুগত শিল্পপতিশ্রেণিকে সন্তুষ্ট করতে দ্রুতই সেই দাবিতে সাড়া দেন।

    ১৯৩৪ সালের শেষদিকে হিটলারের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:

    ফিরার হিসেবে হিটলার নিঃসন্দেহে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন, কিন্তু তিনি সর্বশক্তিমান নন। তাঁকেও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে হয় এবং জনমতকে দমন করার পরেও জনগণের যে অপ্রতিরোধ্য প্রবৃত্তিগত আবেগ বেঁচে থাকে, সেগুলোর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁকেও সতর্ক থাকতে হয়।

    সাধারণ জনগণের আবেগ এখনো তাঁকে বিশেষভাবে চিন্তিত করে না; কারণ, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, প্রচারের মাধ্যমে তিনি এখনো তা সামাল দিতে পারবেন, এবং আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের মনোরঞ্জনও করতে পারবেন। সর্বশেষ উপায় হিসেবে, তিনি সেই আবেগকে পিষে ফেলবেন এবং আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দমন করবেন, যেমন তিনি ইতোমধ্যেই নাৎসি ব্রাউন আর্মির ‘কম নির্ভরযোগ্য অংশ’কে নির্মমভাবে দমন করেছেন।

    কিন্তু তাঁর প্রাক্তন অর্থদাতারা, যাঁরা বৃহৎ শিল্পপুঁজির অধিপতি, তাঁদের প্রতি হিটলারের দহরম-মহরম অনেক বেশি।

    তাঁর সেই পুঁজিপতি অভিভাবকেরা তাঁকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি পার্টির ছদ্ম-বিপ্লবী বামপন্থীদের ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ করেন। হিটলার নিজেকে সেই নির্দেশের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন বলে ভেবে আত্মতুষ্ট হন, এবং তাঁদের আদেশ পালন করেন বিনা দ্বিধায়। এবং সম্ভবত, ভবিষ্যতেও তিনি এই পুঁজিবাদী শ্রেণির আদেশ মান্য করে যাবেন।

    — (“The New Statesman and Nation”, লন্ডন, ১১ আগস্ট ১৯৩৪)

    বারবার, হিটলার এবং তাঁর পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই দাবি করেছেন যে, জার্মানিতে জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিজয় ইউরোপকে বলশেভিক বিপ্লব থেকে রক্ষা করেছে। তাঁদের ভাষায়:

    যদি নাৎসিরা বিজয়ী না হতো, তবে বলশেভিকবাদের কবলে পড়ত শুধু জার্মানি নয়, সমগ্র ইউরোপ। নাৎসি সাফল্যই আমাদের পরিত্রাণ এনেছে বলশেভিক বর্বরতার হাত থেকে।

    বাস্তবতা হলো, প্রারম্ভিক পর্যায়ে জার্মান ফ্যাসিবাদ কখনোই নিজেদের সমাজতান্ত্রিক দাবি করেনি। ১৯১৯ থেকে ১৯২০ সালের বিপ্লবী দিনগুলোতেই তারা ঘোষণা করেছিল, তাদের লক্ষ্য হলো—

    লাল বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম (Fight against the Red Peril)।

    হিটলার ১৯২২ সাল থেকেই নিয়োগকর্তা সংগঠনগুলোর নিকট থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে আসছিলেন এই যুক্তিতে যে—তার পার্টি একটি স্পষ্টভাবে শ্রমিকবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে।

    ক্ষমতায় এসে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি; বরং শুরু থেকেই তিনি তাঁদের বিরোধী ছিলেন।”—(কনরাড হেইডেন, “History of National Socialism”)

    শুধুমাত্র ১৯২৬ সালে হিটলারের দল তথাকথিত পুঁজিবাদবিরোধী প্রচারে লিপ্ত হয়। পার্টির কর্মসূচিতে যে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটি হিটলারের নিজস্ব উদ্যোগে নয়, বরং তাঁর বিরোধিতা সত্ত্বেও স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়ের (Gregor এবং Otto Strasser) উদ্যোগে সংযোজিত হয়।

    কিন্তু, যখন নাৎসি পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তখনই স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়কে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরিণামে, একজনকে হত্যা করা হয় এবং অপরজন দেশত্যাগে বাধ্য হন।

    হিটলার শাসনের দ্বিতীয় বছরে, পার্টির বামপন্থী অংশ স্পষ্টভাবে ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে।

    পার্টির অভ্যন্তরে এক বৃহৎ শ্রমজীবী অংশ সক্রিয় ছিল। নাৎসি ব্রাউন আর্মির সাধারণ সদস্যরা ছিল মূলত বেকার তরুণ শ্রমিকদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।

    তাঁরা আশা করেছিল যে পার্টির অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতিগুলোর কিছু অন্তত বাস্তবায়িত হবে। এই পটভূমিতে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠেছিল— “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর দাবি।

    কিন্তু হিটলারের মঞ্চের নেপথ্যের শক্তিগুলো, বিশেষত জমিদার ও সামরিকপন্থীরা, এই দাবি দেখে ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত হয়ে ওঠে। জমিদার ও সামরিক অভিজাতদের পক্ষ থেকে ভন পাপেন (von Papen) একটি হুঁশিয়ারিমূলক ভাষণে বলেন:

    হিটলার যেভাবে তাঁর প্রচেষ্টায় জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন, তাতে তার বোঝা উচিত, যদি পাপেট তার পোষকের ইচ্ছামতো আচরণ না করে, তবে তাকে সরিয়েও ফেলা যেতে পারে।

    একইভাবে, ক্রুপ ভন বোলেন (Krupp von Bohlen), জার্মান শিল্পপতিদের অন্যতম মুখপাত্র,জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দেন।

    এই হুমকি ছিল একপ্রকার ভারী শিল্পপুঁজির পক্ষ থেকে হিটলার সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত। অবশেষে আদেশ আসে এবং হিটলার বাধ্য হন তা পালন করতে।

    ফলে, ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন তিনি নাৎসি পার্টির অভ্যন্তরে নৃশংস “রক্তপাত’’ পরিচালনা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল “দ্বিতীয় বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা”।

    (গেরিং-এর ভাষায়—“destroy the danger of a second revolution”)।

    ভূস্বামী, সামরিকতন্ত্রী এবং পুঁজিপতিদের নির্দেশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করার মধ্যেই, হিটলার ঘোষণা করেন:

    “আমাদের কর্মসূচি তাৎক্ষণিক নয়, এটি এক যুগান্তকারী অধ্যায়। আমাদের ব্যবস্থা এক হাজার বছর টিকে থাকবে। আমরা সহস্রাব্দের জন্য কাজ করছি। ধৈর্য ধরো! অপেক্ষা করো!”

    শিল্পের সমাজিক মালিকানা, যা তাঁর প্রতারিত অনুসারীরা দাবি করেছিল, সে বিষয়ে হিটলার তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিরোধিতা করেন।

    তাঁর ভাষ্যে, এই ধরনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ “বিপজ্জনক”, কারণ এগুলো “শিল্প প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্টিশীল উপাদান এবং ব্যক্তিত্বের শক্তিকে নির্মূল করে দেয়”।

    একইভাবে, তাঁর পার্টির প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে বৃহৎ জমিদারির অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে হিটলার মত প্রকাশ করেন যে, “দক্ষ উৎপাদন বজায় রাখতে হলে বৃহৎ জমিদারির কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক”।

    ‘’নতুন জার্মানিতে প্রকৃত ক্ষমতার নাটাই ঘোরান যারা, তারা হলো—ভারী শিল্পপতি, বৃহৎ অর্থিক খাতের পুঁজিপতি এবং জমিদার শ্রেণি। তাঁদের নির্দেশেই হিটলার জাতীয় বিপ্লবের ঘোষিত কর্মসূচি থেকে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক উপাদানসমূহ বাদ দেন।

    পুঁজিবাদ তার অনুচরকে নির্দেশ দেয়—লাভে হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। হিটলার সেই আদেশ পালন করে; বিপ্লব শেষ।’’

    — (“Hitler Over Europe” থেকে উদ্ধৃত)

    এটি হিটলার শাসনামলে জার্মানির বাস্তব পরিস্থিতির একটি যথার্থ বিবরণ। ফ্যাসিবাদের সমাজতন্ত্রের দাবি ছিল একটি ছলনা।

    শাসক শ্রেণির দ্বারা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত নাৎসিরা, তাদের প্রভুদের লোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে জার্মানিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

    ফ্যাসিবাদের জাতীয়তাবাদ যেমন ছলনাপূর্ণ, তেমনি তাদের সমাজতন্ত্রের দাবিও প্রতারণামূলক। জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে প্রকৃত জাতীয় কল্যাণ সম্ভব নয় শ্রমজীবী শ্রেণির অবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত; কারণ, সেখানে শ্রমজীবী জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ধারিত হওয়া উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণের ভিত্তিতে।

    তাই শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের বিরোধী হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমিক শ্রেণির প্রতি ফ্যাসিবাদীদের তীব্র শত্রুভাবাপন্নতা তাদের তথাকথিত জাতীয় কল্যাণচিন্তার সাথে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ।

     

    ছবি: ফিল্ম পোস্টার (১৯৩৯)

    নাৎসিরা ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন অর্জন করেছিল। তাদের মূল স্লোগান ছিল: জার্মান জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধার। যাঁরা এই অপমানজনক চুক্তি জার্মানির ওপর চাপিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধের আহ্বান।

    কিন্তু ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই, হিটলার এক বক্তৃতায় এই ঘোষণা দেন:

    আমাদের জাতির সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সেখানে কেউ আমাদের সম্মান ছিনিয়ে নেয়নি।

    আমাদের কেবল একটিই অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তা ছিল না পশ্চিমে, না পূর্বে, তা ঘটেছিল আমাদের নিজ গৃহে। আর এই অপমান আমরা কাটিয়ে উঠেছি।”

    (নুরেমবার্গ উৎসবে প্রদত্ত ভাষণ, সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)

    এখানে হিটলার যে “অপমান”-এর কথা বলছেন, সেটি জার্মান বিপ্লব (নভেম্বর বিপ্লব)— যার সাফল্যই কেবল জার্মান জাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারত।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যতিক্রম ছাড়া, ফ্যাসিবাদের যুদ্ধবাজ মনোভাব মূলত জনতাকে প্রতারণা করার কৌশলমাত্র। একটি জনমত্তকরণে ধাপ্পাবাজি ও দম্ভ। ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলিকে যে নাটকীয়ভাবে হিটলার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা মিত্রশক্তিগুলোর নিঃশব্দ সম্মতির সহায়তা ব্যতিরেকে সফল হতো না।

    আজ জার্মানি আবারও একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছে। কিন্তু চার বছর আগে, যখন ফ্যাসিস্ট সরকার ঘোষণা করল যে তারা ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে জার্মানিকে পুনরায় সশস্ত্র করবে, তখন ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য এমন ছিল যে যদি মিত্রশক্তিরা চাইত, এই ধাপ্পাবাজিকে যেকোনো সময় প্রতিহত করা যেত।

    ফ্রান্সে বহুল উচ্চারিত ও সমর্থিত মত ছিল, একটা প্রতিরোধক যুদ্ধ উদ্ধত নাৎসিদেরকে তাদের পদানত করতে সক্ষম। জার্মান ভূখণ্ডেই যুদ্ধ হতো, এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ফ্রাঙ্কো-পোলিশ মৈত্রী বাহিনী বার্লিন দখল করে ফেলত। এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিম জার্মানির শিল্পাঞ্চলগুলো অবিলম্বে ফরাসিদের দ্বারা অধিকৃত হতো এবং প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে ধ্বংস করা হতো।

    স্বাভাবিকভাবেই, নাৎসিদের পৃষ্ঠপোষকেরা এই ধরনের পরিস্থিতি চাননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, নাৎসি সরকারের যুদ্ধোন্মাদ নাটকীয়তাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্যে বিপুল মুনাফা অর্জন। তাঁরা এই বিপজ্জনক খেলা খেলতে সাহস করেছিল, কারণ তাঁরা জানত, ফ্রান্স আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

    সুতরাং, পরাজয়ের পর জার্মানির পুনরায় সশস্ত্র হয়ে ‘সূর্যের নীচে’ নিজের স্থান দাবি করে ফিরে আসাটা ফ্যাসিবাদের দর্শনে উজ্জীবিত “জার্মান পৌরষের দুর্জয় চেতনার” কৃতিত্ব নয়। বরং, এই তথাকথিত ‘নবজার্মান সাম্রাজ্যবাদ’ আসলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের বিপ্লব-ভীতির বিকৃত সন্তান।

    জার্মানিতে বিপ্লবী শক্তিকে দমন করার মাধ্যমে, নাৎসিরা আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের পক্ষে একটি “সেবা” প্রদান করছিল। ফলে, এই কাজে তাঁদের সাহায্য করা উপযুক্ত বিবেচিত হয়।

    ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার গৌরব হিটলারকে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য প্রদান করে, যার মাধ্যমে তিনি অন্তত সাময়িকভাবে বিপ্লবের গতি রোধ করতে সক্ষম হন।

    যাঁরা জার্মানির সামরিক শক্তির অলৌকিক পুনরুত্থানে মুগ্ধ, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে জানেন না, এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে মিত্রশক্তির সহযোগিতা ও সম্মতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল, যারা সে সময় জার্মানিতে বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিল।

    কথিত ‘জাতীয় সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ অভিপ্রায় নিয়ে হিটলারের আবির্ভাবের আগেই, ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলোর ব্যাপকভাবে রদ হয়েছি লোকার্নো চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে জার্মানির প্রজাতন্ত্রী সরকার, যাদেরকে নাৎসিরা জার্মানিকে মিত্রশক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।

    লোকার্নো চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল, জার্মান অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে মিত্রশক্তির পূর্বনির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সেনা প্রত্যাহার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় ছিল, মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার, যার দায়িত্ব ছিল জার্মানিকে নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং বিশেষত রাইন নদীর বাম তীরের সামরিকীকরণ প্রতিরোধ।

    ব্রিটেন ও ফ্রান্স, সেই সময় চেম্বারলেইনের নেতৃত্বাধীন এক সোভিয়েত-বিরোধী বলয় গঠনের কৌশলে বিভোর ছিল। ফলে, তারা জার্মানিকে যে ছাড় দিয়েছিল, তা ব্যবহারিকভাবে পুনঃসশস্ত্রীকরণের অনুমতি প্রদান করে। এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল বহু বছর আগে, যখন হিটলারের ধামাকা-ভাষণের মাধ্যমে ‘জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারে’ জার্মান পৌরষ উদ্দীপ্ত করার প্রচেষ্টা শুরুই হয়নি।

    ব্রিটিশ কূটনীতি, চেম্বারলেইনের নেতৃত্বে, চেয়েছিল একটি শক্তিশালী জার্মানি— “বলশেভিক বিপদ” প্রতিরোধের একটি দুর্গ। অন্যদিকে, জার্মানিতে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা, যা সহজেই রাইন নদী অতিক্রম করতে পারত, ফ্রান্সকে আতঙ্কিত করে তোলে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিয়াঁর ভুলভাবে প্রয়োগকৃত উদারনীতিই ছিল সেই প্রধান কারণ, যার ফলে ভার্সাই চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ফ্রান্সের নিরাপত্তা কাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে।

    যুক্তরাজ্যের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ, জে. এইচ. মরগান, কে.সি., যিনি মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি লেখেন:

    এই উভয় চুক্তি (অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার) যথাযথভাবে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই দেশে (যুক্তরাজ্যে) খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ জানেন যে, ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার এই চুক্তিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কত দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, এমনকি চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু সম্পাদন করেছিল।

    এটা শুধু এমন নয় যে, জার্মান সরকার প্রদত্ত অঙ্গীকারেট ওপর আস্থা রেখে নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এই বিশ্বাসে যে, জার্মানির অব্যাহত বিচ্যূতি সংশোধন করবে। বরং রাইনল্যান্ডকে নিরস্ত্রীকরণের কাজ, অর্থাৎ ভেরসাই চুক্তির ৪৩ এবং ১৮০ অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন, কার্যত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

    (“ডেইলি টেলিগ্রাফ”, লন্ডন, এপ্রিল ১৯৩৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত।)

    এই বিচক্ষণ ও দক্ষ পর্যবেক্ষক আরও সাক্ষ্য দেন যে, এর আগেও নিয়ন্ত্রণ কমিশন জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণের ব্যাপারে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল, বেসামরিকায়িত অঞ্চলে কৌশলগত স্থাপনা অক্ষুণ্ণ রেখে। জার্মান পক্ষের তথাকথিত ‘বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা’র যুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুদ্ধোপযোগী স্থাপনাগুলিকে অক্ষত রাখা হয়েছিল। এমনকি রাইন নদীর বাম তীরে অবস্থিত দুর্গ, পরিবহনব্যবস্থা এবং অন্যান্য “স্থায়ী সামরিক অভিযান কাঠামো” মিত্রশক্তির সেনা প্রত্যাহারের সময়ও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, লোকার্নো চুক্তির মর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

    বহু বছর ধরেই জানা যাচ্ছিল যে, অধিকৃত অঞ্চলসমূহে জার্মান ‘নিরাপত্তা পুলিশ’ মূলত ছদ্মবেশী রাইখসভেয়ার। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও, “জার্মান সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে,” ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার ১৯২৭ সালে সম্মত হয় যে, এই বাহিনী রাইনল্যান্ডে টিকে থাকবে, এই শর্তে যে তাদের চরিত্র ‘নিরস্ত্রীকৃত’ থাকবে। (প্রাগুক্ত)

    আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল—”ছায়া সেনাবাহিনী” গঠন—যা ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার লোকার্নো চুক্তি স্বাক্ষরের পর কার্যত উপেক্ষা করে। নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উপস্থিতিতেই, ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে, জেনারেল ফন সেক্ট প্রাক্তন সেনাবাহিনীর পুরানো ক্যাডার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সাধারণ সামরিক নিয়োগ পুনর্বহালের প্রস্তুতি নেন।

    ফলে, লোকার্নো চুক্তি, যা অন্তত জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এই গোপন প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়।

    সুতরাং, জার্মানির পুনঃসশস্ত্রীকরণের তথাকথিত গৌরবময় বিজয়, যা নাৎসি প্রচারযন্ত্রে হিটলারের কৃতিত্ব হিসেবে উদযাপিত হয়, বাস্তবিক অর্থে হিটলারের অর্জন নয়। এই অধিকার জার্মানিকে প্রদান করা হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে, এবং তা ছিল একটি উপহার— জার্মান জনগণের জন্য নয়। বরং তাদের জন্য, যারা জার্মানিকে প্রথম মহাযুদ্ধের বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছিল এবং সেই লজ্জাজনক বিপর্যয় থেকেই বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। এবার তারা সেই “গৌরব” থেকেই নতুন করে মুনাফা অর্জনের কাজে লিপ্ত।

    নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রত্যাহারের এক বছরের মধ্যেই জার্মান সরকারের সামরিক বাজেট দশগুণ বৃদ্ধি পায়, যার অর্থ হলো ভারী শিল্পক্ষেত্রে বিপুল সামরিক সরঞ্জামের অর্ডার। নাৎসি উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল মূলত একটি অজুহাত—পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার, যাতে বড় পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত হয়।

    হিটলার ক্ষমতায় আসার পরপরই, মাসিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়েও এই ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পার্লামেন্টারি পদ্ধতিকে বাতিল করে বাজেট প্রকাশের নিয়মও বাদ দেয়, ফলে সামরিক খাতে আসল ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

    তবে দক্ষ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৩৪ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছিল ১,০০০ মিলিয়নেরও বেশি মার্ক, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। পরের বছর বাজেট আবার দ্বিগুণ হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, হিটলার শাসনের প্রথম চার বছরে শুধুমাত্র পুনঃসশস্ত্রীকরণে ব্যয় হয়েছিল ১৬,০০০ মিলিয়ন মার্ক। একই সময়কালে গণপূর্ত খাতে খরচ করা হয় আরও ৪,০০০ মিলিয়ন মার্ক, যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ছদ্মবেশী সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ।

    অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকার প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির মোট ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে পুনঃসশস্ত্রীকরণে।

    এই বিপুল অর্থের অধিকাংশ, যা কার্যত ভারী শিল্পক্ষেত্রের জন্য একটি ভর্তুকি, সংগ্রহ করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে। জনগণকে এই ঋণে অবদান রাখতে বাধ্য করা হয়।

    ১৯৩৫ সালে, জার্মানির অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। যেহেতু পুনঃসশস্ত্রীকরণ কর্মসূচির ব্যয় চলতি আয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই তা পূরণ করতে হবে ভবিষ্যৎ আয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ, জাতির ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা হয়েছে অস্ত্র উৎপাদনকারীদের হাতে।

    কর আদায়ের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হলো—জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।

    অন্যদিকে, যারা সহজে পরিশোধ করতে পারতেন, তারা কৌশলে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন।

    ১৯৩৪ সালে এক সরকারি ফরমান জারি হয়, যেখানে বলা হয় যে, সব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ছয় শতাংশের বেশি লভ্যাংশ সরকারের কাছে জমা রাখতে হবে।

    তারপরপরই, বড় বড় শিল্পট্রাস্টের (যেমন: ক্রুপ, টাইসেন, আই.জি. ফারবেন, এ.ই.জি. ইত্যাদি) ব্যালান্স শিটে দেখা গেল, যারা জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা থেকে বিপুল মুনাফা করছিল, তারা দেখাচ্ছে—তাদের মুনাফা ছয় শতাংশের কম।

    অন্যদিকে, সঞ্চয় ব্যাংক, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় ও অন্যান্য সামাজিক বীমা প্রতিষ্ঠানের সকল তহবিল সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার বিনিময়ে প্রদান করা হয়েছে তথাকথিত “পুনঃসশস্ত্রীকরণ বন্ড”।

    এর ফলে সম্পূর্ণ আর্থিক বোঝা বর্তেছে দরিদ্র মধ্যবিত্ত ও প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ওপর, যাদেরকে ভবিষ্যতে “জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে’’ নিজের জীবন দিয়ে চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে।

    এই সময়ে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, জাতির মূল খরচের ভার বহন করিয়ে। গরিবদের রক্ত চুষে নেওয়ার সর্বশেষ কৌশল হলো বিক্রয় কর। এটি এক ধরনের মোট আয় ভিত্তিক কর, যা উপার্জনের বিপরীত অনুপাতে করদাতার ওপর বোঝা চাপায়।

    উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি যার মাসিক আয় শত একক, তিনি প্রায় সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে—ফলে তাঁর পুরো আয় করযোগ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, যার আয় হাজার একক, তিনি এই একই প্রয়োজনের জন্য ব্যয় করেন মাত্র একটি অংশ—ফলে তাঁর আয়ের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ করযোগ্য হয়। আয় যত বেশি, করের বোঝা অনুপাতে তত কম।

    এটাই হলো “জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনীতির’’ বাস্তব প্রয়োগ।

    একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, যিনি পূর্বে জার্মান সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন, লিখেছেন:

    হিটলারের শাসনকালের গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে, একমাত্র লাভবান হবে অস্ত্রশিল্পের উৎপাদকরা। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না, কারণ সরকারের আমদানি নীতি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তুলনায় সামরিক প্রয়োজনীয় কাঁচামালের আমদানিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

    — (পল ক্রসার, দ্য নিউ রিপাবলিক, নিউ ইয়র্ক, ৬ মার্চ ১৯৩৫)

    ফলস্বরূপ, জনগণের ভোগের মাত্রা জোরপূর্বক হ্রাস করা হয়েছে।

    ভোগের মান নির্ধারণ করে সরকার। খাদ্যপণ্যের সকল মৌলিক উপাদানের মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। পোশাক-পরিধানের ক্ষেত্রে এই মান অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। জোরপূর্বকভাবে ভোগের এই হ্রাসকৃত মানকে মজুরি নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও কৃষকরা শ্রমজীবী জনগণের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

    ছবি: নাজি পোস্টার

    নাৎসি নেতারা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না; বরং তার পরিবর্তে জাতীয় সম্মানের নামে আত্মত্যাগ ও আরও আত্মত্যাগের আহ্বান জানান। গোয়েবলস চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন যে, “মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয়”। স্বভাবতই, এর কারণ রয়েছে। নাৎসী অর্থনীতিবিদ উইন্ডশু এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান মজুরি হার অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হবে জীবনের মান আরও নিম্নগামী হওয়া; তথাপি, তিনি অস্ত্রশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির খরচ বহনের প্রয়োজনে রপ্তানি বৃদ্ধির আহ্বান জানান এবং নির্দয়ভাবে বলেন, “জীবনের মান সেই লক্ষ্যর অধীন হতে হবে।”

    এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয়। নাৎসি শাসনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বারবার জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই স্লোগান উচ্চারণ করেছেন:

    যদি জার্মানি স্বাধীন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয় এবং যথেষ্ট বন্দুক থাকে, তবে মাখন, ডিম ও কাপড়ের মতো তুচ্ছ বিষয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।

    এইভাবে জার্মান জনগণের অর্থনৈতিক ধ্বংস সাধন করা হচ্ছে তথাকথিত ‘জাতীয় সম্মান’ পুনরুদ্ধারের নামে। মানুষ যখন রুটির জন্য হাহাকার করছে, তখন তাদের বিনোদনের জন্য সার্কাস পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু এমনকি এই সার্কাসও একদিন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যদি নাৎসি যুদ্ধোন্মত্ততা সত্যিই জার্মানির প্রাক্তন শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।

    শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেই, নাৎসি যুদ্ধোন্মাদরা যা বলে তা-ই বোঝায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় বিসমার্কের সূত্র—“ড্রাং নাখ্ অস্টেন” —পূর্বাভিমুখে আগ্রাসন—অনুযায়ী। বলশেভিজম ধ্বংস করা এবং রাশিয়ার উর্বর ভূমি জয় করা হল নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই হিটলার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন, যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ।

    এই তথাকথিত বলশেভিকবিরোধী ‘পবিত্র ক্রুসেডে’ অংশ নিতে নাৎসিরা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো জার্মান জাতীয় শত্রুদের সঙ্গেও জোট বাঁধতে প্রস্তুত ছিল। ভার্সাই চুক্তির অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার নামে যুদ্ধের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল নিছক ভণ্ডামি।

    ১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে হিটলার বার্লিনে পোলিশ মন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব দেন। পোল্যান্ডও জার্মান জাতীয় শত্রুদের অন্যতম ছিল, তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হিটলার পুরোনো বিদ্বেষ ভুলে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। জানা যায়, তিনি পোল্যান্ডের সঙ্গে রুশ ভূখণ্ড বিভাজনের প্রস্তাবও দেন।

    পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে হিটলার রোজেনবার্গকে বিশেষ দূত হিসেবে লন্ডনে পাঠান, যার মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটেনকে একটি সোভিয়েতবিরোধী জোটে যুক্ত করা। লক্ষ্যণীয় যে, জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই প্রধান মতাদর্শিক নেতা লন্ডন সফরকালে রয়্যাল ডাচ পেট্রোলিয়াম কম্বাইনের প্রধান ডেটারডিং-এর আতিথ্য গ্রহণ করেন, যিনি সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্তে বরাবরই সক্রিয় ছিলেন।

    হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজের প্রিয় ‘রাশিয়া-বিরোধী যুদ্ধের’’ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন, কারণ এই প্রস্তাব লন্ডন ও প্যারিস, কোনো দিক থেকেই ইতিবাচক সাড়া পায়নি। এটা অবশ্য এমন নয় যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শাসকরা এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন; বরং তারা হিটলারের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও অভিজ্ঞ ছিলেন, এবং তাই এই বিপজ্জনক অভিযানে হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি হননি।

    বাস্তবিক অর্থেই, নাৎসিরা শুধু ইংল্যান্ডের সঙ্গেই নয়, বরং এমনকি ফ্রান্সের সঙ্গেও আপস করার চেষ্টা করে এসেছে, যাকে তারা বাহ্যত সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে দেখায়। জার্মান সেনাবাহিনী যখন নাটকীয়ভাবে রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘন করে, তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই হিটলার একজন গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি সাংবাদিককে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন।

    সেই সাক্ষাৎকারে হিটলার ফ্রান্সের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করেন। যখন ওই সাংবাদিক তাঁর আত্মজীবনীতে প্রকাশিত ফ্রান্স-বিরোধী মন্তব্যগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখন হিটলার ব্যাখ্যা দেন যে, এসব ছিল কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলা।

    যেহেতু রাইনল্যান্ডে সেনা-প্রবেশ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না এবং তার আগেই ফ্রান্সকে সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, তাই ফ্রান্স এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ যদি ফ্রান্স সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলত, তাহলে নাৎসিদের এই পদক্ষেপ সহজেই থামানো যেত। কারণ তখনো জার্মানি একটি বৃহৎ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে সক্ষম ছিল না। এমনকি জার্মান জেনারেল স্টাফও এই উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিল বলে জানা যায়।

    কিন্তু ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড, কেউই এমন কিছু করতে চায়নি যা হিটলারের অভ্যন্তরীণ মর্যাদাকে হানি করতে পারে। কারণ, তা হলে নাৎসি শাসনের পতন ত্বরান্বিত হতো এবং রাইনের পশ্চিম তীরে আবারও বিপ্লবের আশঙ্কা দেখা দিত। তদুপরি, ফ্রান্স পূর্বেই নিশ্চিত হয়েছিল যে জার্মানির এই পদক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার উদ্দেশ্যে নয়।

    নাৎসি পার্টির “রকশুদ্ধি’র ঘটনার কিছুদিন পরেই, হিটলারের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী রুডলফ হেস ফরাসি চরম-জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ বীর সমিতির (French War Veteran Association) উদ্দেশ্যে “শান্তি ও শুভেচ্ছা” বার্তা প্রেরণ করেন।

    তিনি ফরাসি সৈন্যদের সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করেন, এমনকি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্তুকে শ্রদ্ধা জানান। বার্তু ছিলেন সেই ক্লেমঁসোর অনুসারী, যিনি কুখ্যাত ভার্সাই চুক্তি রচনা করেছিলেন। অথচ সেই চুক্তি ছিন্নভিন্ন করাই ছিল নাৎসি আদর্শের ঘোষিত লক্ষ্য।

    হেস অত্যন্ত মোলায়েম ভাষায় শান্তির কথা বলেন। তিনি ফরাসি জাতিকে, যাদের নাৎসিরা এতদিন শত্রু হিসেবে তুলে ধরেছিল, এই ভাষায় সম্বোধন করেন:

    একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে আরেকজন গর্বিত সৈনিককে বলছি, যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী? আমরা কি একসাথে বসে আলোচনা করতে পারি না? আমরা কি সদিচ্ছার মাধ্যমে মানবজাতিকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করতে পারি না?

    নাৎসি যুদ্ধোন্মাদনার ফাঁপা প্রচারণা তখনই উদ্ঘাটিত হয়, যখন জানা যায় যে ১৯২৪ সাল থেকে ফ্রান্সবিরোধী ঘৃণা-প্রচারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন রুডলফ হেস নিজেই। তাঁর অশ্লীল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছিল একটি কবিতার চরণে:

    এই যে ফ্রাঁসি, তোদের মরতেই হবে, যেন আমরা বাঁচতে পারি।

    এসব ছিল নিছক জনতাকে উন্মত্ত জাতীয়তাবাদে উসকে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা ভণ্ডামি ও লোকদেখানো প্রচারণা। যার একমাত্র উপকারভোগী ছিল বৃহৎ শিল্পপতিরা, যারা যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্য থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। আর এই তথাকথিত ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদের এটুকুই ছিল একমাত্র “অর্জন”।

  • এম এন রায়।। “রক্তপাতহীন” বিপ্লব

    এম এন রায়।। “রক্তপাতহীন” বিপ্লব

    • অনুবাদ: তানিয়াহ্‌ মাহমুদা তিন্নি

    ফ্যাসিবাদীরা ইতালি এবং জার্মানিতে রক্তপাতহীনভাবে বিপ্লবের দাবি করে। তবে প্রাপ্ত নথি কেবল এ দুটি দেশের নয় বরং আরও অনেকগুলো দেশের ক্ষেত্রেই তাদের এই ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করে। তবে যাই হোক, এই দেশগুলোতে ‘অতিমানবের’’ উত্থানের পেছনের গল্প পাঠকদের জন্য চিন্তা উদ্রেগকারী হতে পারে।

    ইতালিতে মুসোলিনি বিজয়ী জনপ্রিয় সৈন্যদলের প্রধান সেনাপতি হিসেবে রোম দখলের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে নি। রোম দখলের যাত্রা মঞ্চস্থ হওয়ার সময় ইতিহাসের এই ‘নায়ক’ নিজেকে অনেক দূরে সুরক্ষিত রেখেছিল। তার অর্থের জোগানদার ছিল সেসময়ের পুঁজিবাদীরা। পুঁজিবাদীদের অফুরন্ত অর্থের সাহায্যে সে ভাড়াটে কালো শার্ট বাহিনী জড় করে যারা বিপ্লবী মজুর এবং কৃষকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছিল। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক, কিন্তু দুর্বল ও আতঙ্কিত বুর্জোয়া সরকারের হাত থেকে কালো-শার্টধারী ভাড়াটে সৈন্যরা ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। বরং নিয়মিত সৈন্যরাই, মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কারণ মুসলিনিই নিজেকে বিপ্লবী গণআন্দোলনের সবথেকে ভয়ঙ্কর এবং নির্মম শত্রু হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। নিয়মিত সেনাদের কাছ থেকে সম্মতি লাভের পরই কেবল রোমের উদ্দেশ্যে ফ্যাসিবাদীদের পদযাত্রা শুরু হয়। নিয়মিত সেনারা যদি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করত তাহলে হয়ত কখনোই এই ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ সংঘটিত হত না। ইতালির জনগনকেও মুসলিনির মতো একনায়কের শাসনের মত দুর্ভাগ্য সহ্য করতে হত না।

    উদারনৈতিক বুর্জোয়া সরকার বিপ্লবী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ ছিল। ফলে শোষক শ্রেণি—বিশেষত ভূস্বামী এবং পুঁজিবাদী—এই দুই দল বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করতে পুরাতন সরকারকে নতুন আরেকটি দক্ষ সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একইসাথে তারা এমন একটি সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল যারা শাসক শ্রেণির আরও বেশি অধীনস্ত হয়। নিয়মিত সৈন্যরা তাদের নিজেদের লোকের তত্ত্বাবধানেই ছিল। কিন্তু একটি বিপ্লবী পরিস্থিতিতে সাধারণ সৈনিকদের উপর ভরসা করা যায় না। এ কারণেই নিয়মিত সৈনিকদের উপর একটি জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন দমনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ নির্ভরযোগ্য ছিল না। জনগনের কিছু অংশ অবশ্যই প্রতিবিপ্লবী হয়ে উঠতে পারে। ছদ্ম-সিন্ডিকালিস্ট প্রোপাগাণ্ডা এবং জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্যই পূরণ করছিল। মধ্যবিত্ত বিদ্রোহী এবং প্রান্তিক শ্রমিকেরা মুসলিনির ভাড়াটে কালো-পোশাকের সৈন্যদের তালিকাভুক্ত ছিল। মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল কারণ প্রতি-বিপ্লব জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভবনা ছিল। অবশ্যই, সে তার ‘সুপারম্যান’ ইমেজ দ্বারা কোন নোংরা কাজ করাতে আগ্রহী ছিল না। এই কাজের জন্য তো নিয়মিত সৈন্যদেরকেই মজুত রাখা হয়েছিল।

    সেই পরিস্থিতিতেই মুসোলিনির পক্ষে ‘ক্ষমতা দখল’ করা সম্ভব হয়েছিল। তখন থেকেই নিয়মিত সেনারা তার রক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, কখনও কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় নি। ক্ষমতা তাঁর পায়ে এসে লুটিয়ে পড়েছে। তবুও শেষ সময়ে এসে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল। রোমের পথে পদযাত্রার সময়ও সে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব প্রদানের ঝুঁকি নেয়নি। যখন মহানায়কের বীরত্বগাঁথা মঞ্চস্থ হচ্ছিল তখনও নায়ক মিলানে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন। রোম দখলের পর, তাঁর বিশ্বস্ত কিছু লেফটেন্যান্ট টেলিফোনে তাকে সুসংবাদ দেয় এবং দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে বলে। এমনকি তখনও সে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলতে আগ্রহী ছিল না। আসলে সে কোন অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিল না। অবশেষে, জেনারেল স্টাফের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পরই কেবল সে রোমজয়ী হিসেবে একটি ঘুমন্ত গাড়িতে করে পদযাত্রায় অংশ নেয়।

    তখন পর্যন্ত বিপ্লব রক্তপাতহীন ছিল। কিন্তু এই করুণ-কৌতুকের পটভূমি যথেষ্ট রক্তাক্ত ছিল। হাজারো শ্রমিক গণহত্যার সম্মুখীন হয়েছিল। শ্রমিকরা সহিংসতা শুরু করেনি। তারা কেবল কাজ হারিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছিল। কারণ পর্যাপ্ত লাভ করতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যাক্টরি মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে দেয়। শান্তিপূর্ণভাবে ফ্যাক্টরি চালাতে দিলেই বরং সত্যিকারের রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হত। সেটা করতে দেওয়া হয়নি। বরং শ্রমিকদের উপর সংঘটিত সহিংসতা চালানো হচ্ছিলো যা এমনকি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইন কানুনের খেলাপ। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাঁধা দেওয়া হচ্ছিল, যা কিনা পুঁজিবাদীরাও করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা দেশের কারখানার চাকা চলমান রাখতে চেয়েছিল যাতে শ্রমিকদের জীবিকা অর্জনের উপায় থাকে। তাহলে হয়ত দেশের অর্থনীতিও পঙ্গু হয়ে পড়বে না।

     

    ক্ষমতা গ্রহণের পর মুসোলিনি নতুন রাজত্বে সকল ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে গণহারে সহিংসতা চালায়। ফ্যাসিবাদের বিজয়কে কোনভাবেই বিপ্লব তো বলা যাবেই না, এমনকি তা রক্তপাতহীনও নয়। এটি পূর্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত শাসন ব্যবস্থার থেকে কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। সেকারণেই সব সময় রক্ত ঝরানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিপ্লবী জনগণের প্রতিরোধ ছিল নিরস্ত্র। ফলে সহিংসতা ঘটানোর জন্য অনেক রক্তপাতের প্রয়োজনই হয়নি। কিন্তু অসংখ্য নারী-পুরুষকে সারা জীবনের জন্য জেলে বন্দী করা তলোয়ারের আঘাতে রক্তাক্ত করার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। পাশাপাশি, জনসাধারণের একটি অংশের কথাও মাথায় রাখা জরুরি যারা হত্যা এবং গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

    ছবি: মুসোলিনির প্রোপাগান্ডা পোস্টার

    এবার জার্মানির প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। হিটলার ‘সাংবিধানিকভাবে’ ক্ষমতায় এসেছেন এই ভ্রান্তি দূর করা দরকার। কিংবদন্তি চরিত্র সম্পর্কে এ ধরনের বয়ান স্বাভাবিক। প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে হিটলারের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। সে সংবিধান লঙ্ঘন করেনি। তার কর্মচারী এবং পৃষ্ঠপোষকেরা তার জন্য এ কাজটি করেছিল। সে ওয়েইমার সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ক্ষমতা গ্রহণকে উদযাপন করেছিল। যা কিনা ইতোমধ্যেই জুনকার-মিলিটারিস্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ পরিচালিত ‘রিপাবলিকান সরকার’ ধ্বংস করেছিল। জার্মানিতেই ইতালির মতোই পুঁজিবাদীদের মদদপুষ্ট অর্থপ্রাপ্ত এজেন্টদের দ্বারা ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের বিনা প্রতিরোধেই তারা সফল হয়। তারা যে জনপ্রিয় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল তা রাষ্ট্রীয় দমননীতির দ্বারা মুখ থুবড়ে পড়ে এবং এর মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। ক্ষমতায় যাওয়ার এই পন্থার সঙ্গে সহিংসতার গল্প জড়িয়ে রয়েছে। এই সহিংসতা তারা ঘটিয়েছে যারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের শত্রু হিসেবে স্বীকৃত, শুধুমাত্র তাদের সাথে যোগসাজশই নয়, বরং তাদের থেকে প্রকৃত সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

    হিটলার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিজয়ী হয়ে সরকার প্রধান হয়। ফলে, সে ছিল জনগণের পছন্দ। সে ক্ষমতায় এসেছে ‘জনপ্রিয় সমর্থন’ পেয়ে। এই সত্য কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? এর ব্যাখ্যা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই রয়েছে। হিটলারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে ১৯৩৩ সালে যে নির্বাচন হয়েছে তা লজ্জাজনক একটি ঘটনা। সে ইতোমধ্যেই হিন্ডেনবার্গের অনুগ্রহে চ্যান্সেলর হয়েছিল, যা কিনা জার্মানির সামরিকতন্ত্রী শাসকের প্রতিনিধিত্বকারী। ফলে এই মহানায়ক এমন সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন যেখান থেকে তিনি সুকৌশলে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পথ তৈরি করতে সক্ষম ছিলেন। তারপরেও সে পরাজিত হয়েছিল।

    একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল দুটো শ্রমিক পার্টি। এই দুই পার্টি সম্মিলিতভাবে আগের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এই দুই দলকেই ‘আইনি’ দমন এবং বেআইনি সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে উধাও করার পরই নতুনভাবে আবার নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তখনও ‘সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক’ পার্টিকে নামেমাত্র টিকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং কাজ করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিকে পুরোপুরি দমন করা হয়েছিল। এটা সে সময় ঐ দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পার্টি যাদের সংসদে ১০০টির মত সিট ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির উপর দমনপীড়ন এটাই প্রমাণ করে যে ফ্যাসিস্টদের ‘গণতান্ত্রিক বিজয়’ মঞ্চস্থ করতে গেলে তার পূর্বেই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে হবে। সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট নেতাদের প্রত্যেকে ছিলেন হয় জেলে, নয়তো লুকিয়ে। এই দলের সদস্যরা ফ্যাসিবাদীদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের সম্মুখীন হয়েছিল। এমনকি সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরাও সমান আতঙ্কিত ছিল। পোলিং বুথগুলো ফ্যাসিবাদী গুণ্ডাদের নজরদারির আওতায় ছিল। ফলে, সাধারণ মানুষের জন্য কমিউনিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট যে কোন পার্টিকে ভোট প্রদানই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অনেকে ভোটই দেন নি; অনেকে নিজের পছন্দের দলকে ভোট দিতে পারেন নি। যারা ফ্যাসিবাদিদের ভোট দিয়েছেন তাদের অনেকেই চাপের মুখে বা ভয়ে ভোট দিয়েছেন। অসংখ্য কমিউনিস্ট ভোট দিতে যেতে পারেন নি কারণ তারা লুকিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে যারা হিটলারকে ভোট দিতে চাচ্ছিলেন না তাদেরকে নাৎসি সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বিরোধীদলীয় পত্রিকাগুলোকে দমন করা হচ্ছিল, তাদের প্রচারমূলক লেখাপত্র বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল, তাদের সভাগুলো ভাড়াটে গুন্ডার দ্বারা পণ্ড করে দেওয়া হচ্ছিল, তাদের সমর্থকদের নিজের পছন্দে ভোট দেওয়া আটকানো হচ্ছিল অথবা ভোটে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই যেন ফ্যাসিবাদের প্রচারণা যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

    এমতাবস্থায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। এই পরিবেশে অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচনের’ ফলাফল কোনভাবেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় না। এরকম লজ্জাজনক নির্বাচনও হিটলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। ফ্যাসিবাদীরা ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পায় নি। এই ফলাফল আবারও সকল ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশেরই কেবল প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভোটারদের একটি বড় অংশই কেন ভোট দিতে পারে নি।

    অন্যদিকে সীমাহীন নিপীড়ন, কঠোর পরিশ্রম, নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেও কমিউনিস্ট পার্টি সংসদে পূর্বের ১০০টির থেকে ৮০টি সিটে বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে, এই বিজয়কে প্রকৃত বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ভোট হলে তারা অনেক বেশি ভোট পেতে পারত। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হিটলারের ভাগ্যে অসম্মানজনক পরাজয়েরই সম্ভবনা বেশি। তুলনামূলক স্বাধীনতায়ও কমিউনিস্ট পার্টি যে অসাধ্য সাধন করেছে তা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, এই অসম প্রতিযোগিতায় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও আগের থেকে ভাল ফল করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি, সোশ্যাল-ডেমক্র্যাট এবং অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছোট কতক দল মিলে নতুন সংসদের প্রায় অর্ধেক আসনে বিজয়ী হয়। বিজয়ীরা এরকম সংসদের মুখোমুখি হতে চায়নি। ফলে নতুন উদ্যমে আরও সহিংস পথ তারা বেছে নেয় ভিন্নমত দমন করতে। গণতন্ত্রের সর্বশেষ চিহ্ন বাতিল করে ‘সাংবিধানিক একনায়কত্বের’ পথ বেছে নেয়। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত ৮০ জন জনপ্রতিনিধিকে সংসদে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই ৮০ জন জনপ্রতিনিধি এমন ৪০ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিল যারা সংগঠিত সন্ত্রাস মোকাবিলা করেও ভোট দিয়েছিল। আরও অনেকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিনিধিদের ভোট দিতে পারেন নি। সোশ্যাল ডেমক্র্যাটদের একটা বড় অংশের প্রতিনিধিরাও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিজেদের সংসদে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। ফলে যে সংসদ হিটলারকে একনায়ক ক্ষমতা প্রদান করেছিল তা ৭০ শতাংশেরও বেশি নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিনিধিত্ব করে না। এমনকি নির্বাচকমণ্ডলীর যে একটি অংশ ফিরে এসেছিল তাদের অনেকেই হিটলারকে ভোট দেয়নি। ফলে, ফ্যাসিস্টরা তখনই ক্ষমতায় এসেছিল যখন কিনা তারা কোনভাবেই ৩৫ শতাংশ নির্বাচক মণ্ডলীর ভোট পায়নি। এটিই হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’-ভাবে ক্ষমতায় আসার সত্য উদঘাটন করে।

    হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’ বিজয়ের সত্য আরও একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে। ১৯২৮ সালের পর থেকেই নির্বাচনে ফ্যাসিস্টদের ভোট ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু হিটলারের ‘সাংবিধানিক একনায়কত্ব’ লাভের মাত্র কয়েক মাস আগের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা একটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হন। হঠাৎ করেই নাৎসিরা প্রায় বিশ লাখ কম ভোট পায়। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী করা আন্দোলন তার চূড়ান্তে রূপ লাভ করেছে এবং খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে। অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণিও ফ্যাসিস্টদের প্রতি তাদের বিশ্বাস হারানো শুরু করেছে। তারা নাৎসিদের মিথ্যাচার এবং ধাপ্পাবাজি ধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। পূর্ববর্তী নির্বাচনে নাৎসিরা বেশ কিছু প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে। তারা মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটারদের প্রতিশ্রুত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনুসরণীয় নেতাদের আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েছে, পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা না পেলে চলমান আন্দোলন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তারা এবং তাদের বেশি কথা বলা লেফট্যান্যান্টরা সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নিতে পারছে না, অন্যদিকে বিপ্লবী শ্রমজীবীরা রাস্তায়। ফলে বুর্জোয়া বুঝতে পারে এখনি সময় তাদের নায়কদের ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলার।

    বৃদ্ধ হিন্ডেনবার্গকে নির্দেশনা দেওয়া হয় তাঁর সমস্ত বংশ মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এমন একজনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যে কিনা নির্বাচনে খুব বেশি ভাল করতে পারেনি, এমনকি সংসদেও খুব অল্প সংখ্যক আসনের প্রতিনিধিত্ব করছে। হিটলারের ক্ষমতায় আবির্ভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের সমর্থনের মধ্য দিয়ে ঘটেনি, বরং একজন উদ্ধত ফিল্ড মার্শালের ইচ্ছায় ‘শঠ বোহেমিয়ান ড্রিল সার্জেন্টের’ অনিচ্ছাকৃত অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে ঘটেছে। অতঃপর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে অধিকাংশের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সে ক্ষমতায় গিয়েছে। হিটলার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নাটক মঞ্চস্থ করতে সকল ধরনের বৈধ এবং অবৈধ নিপীড়ন কৌশল ব্যবহার করেছেন। সভ্যতার ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ কাজ রাজনৈতিক কারণে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছে সে। এই অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মূল করার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করতে। কারণ সেসময় কমিউনিস্ট পার্টিই একমাত্র সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম ছিল। নাৎসিরা রাইখস্টয়াগ ভবন পুড়িয়ে দেয়।১ অগ্নিসংযোগের এই ঘটনাটিই ছিল ‘রক্তপাতহীন বিপ্লবের’ সূচনা সংকেত।

    হিটলার রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর ঘটনাকে ঈশ্বরের ইশারা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। ঐশ্বরিক অনুমোদনের মাধ্যমে সকল ভিন্নমত দমন করেছিল। তারপরেও, অধিকাংশ মানুষ তাকে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ঈশ্বর হয়ত এই আধুনিক মোজেসকে সাহায্য না করতেও পারতেন, কিন্তু বুর্জোয়ারা তাদের নায়ককে মহিমান্বিত করতে পাশে ছিল। তাদের কৌশল হিসেবে যে কোন উপায়ে হিটলারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করতে চেয়েছিল যাতে করে সে তার প্রতি অর্পিত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার মধ্য দিয়ে ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ আনা হয়েছিল এবং তার ফলাফল ছিল সবথেকে রক্তক্ষয়ী। বুর্জোয়া পৃষ্ঠপোষকতায় স্বৈরাচারী ক্ষমতা বাড়িয়ে পূর্বসূরি ইতালির মুসলিনির মতোই হিটলার তার প্রভুদের মর্জিমত চলা শুরু করে।

    ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ মানবজাতির মহৎ অর্জন ধ্বংস করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল। “জার্মানি একটি দুর্দান্ত এবং অবিশ্বাস্য মাত্রায় একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি করছে। বিংশ শতাব্দীর জার্মানির জাতীয় সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত শিক্ষামূলক পরিবেশনার সমান্তরাল হিসেবে প্রাথমিক মধ্যযুগীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করতে হবে”। (Robert Briffault, “The Nationalist Crazee in Culture” in the Curent History”, New York, August 1933)। একইরকমভাবে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেকজন বিশিষ্ট চিন্তক লিখেছেন: “সকল বিদেশি সমালোচক ফ্যাসিস্ট ইতালির অনন্য শিল্পকর্ম এবং সাহিত্যের বন্ধাত্ব নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন”।

    আধুনিক সংস্কৃতির প্রতি ফ্যাসিবাদের শ্ত্রুতা এক কথায় হিংস্র। এটি নিছক বর্বরতার দিকে ধাবিত হওয়াকেই প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্যাসিবাদের এই চরিত্র সভ্য সমাজে চরম বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। এটি এমনকি তাদেরকেও হতবাক করে যারা কিনা ফ্যাসিবাদের মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারেও আপত্তি জানায় না, যেমন- শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সীমাহীন সহিংসতা ঘটানো। পুঁজিবাদের নড়বড়ে কাঠামোকে মজবুত করতে এই সহিংসতাগুলোই ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

    যারা নিজেদের ‘অতিমানব’ রূপে উপস্থাপন করে রক্তপাতহীন বিপ্লব সাধনের অলৌকিক কৃতিত্বের দাবি করে, তাদের প্রসঙ্গে পক্ষপাতহীন প্রামাণ্য উদারপন্থী মতামত উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট।

    “জার্মানি বর্তমানে মাদকাসক্ত, খুনি, চোর, জালিয়াত এবং নৈতিক স্খলনযুক্ত মানুষ দ্বারা শাসিত হচ্ছে। নিছক গালাগাল করার জন্য এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না; এগুলো বরং নাৎসি আন্দোলনের বেশিরভাগ নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা দিতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত শব্দ।” (“The Nation”, New York, August 2, 1933).

    “অপরাধের মাত্রা এত বেড়ে গিয়েছিল যে প্রতিরোধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। সভ্য মানুষ অবিশ্বাসে হতবাক হয়ে পড়েছিল। লাখো জার্মানির পরিণতি কল্পনা করাও দুষ্কর, যারা কিনা এই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্মাদনার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অতি সভ্য ও অতি বুদ্ধিমান ছিলেন।” (Harrison Brown, “Six Month of Hitlerism”, Ibid)। এই ইংরেজ সাংবাদিক জার্মানিতে প্রায় চার বছর বসবাস করেছেন। তাঁর মতে, নাৎসিদের যুদ্ধ প্রচারণা মাত্রা ছাড়িয়ে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, বৈধভাবে কোন শান্তিবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়াও (!) শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়েছিল—যেমন, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড। জার্মানির বিখ্যাত লেখক কার্ল ভন ওসিয়েটজ্‌কি কেবল শান্তিকামী হওয়ার কারণেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কারাভোগ করেছেন। এইতো গেল বছর তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার লাভের পরেও তিনি কারান্তরীণ, প্রকাশ্য আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত।

    একজন উদারপন্থী আমেরিকান সাংবাদিক ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মানির সাধারণ জনগণের উপর চলা অন্যায় এবং দুর্দশা দেখে, সাধারণ জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে লিখেছেন: “রাইখস্ট্যাগ ঘিরে ধর্মের মত যুদ্ধ-পূর্ব সামরিকবাদ এবং নৃশংসতার উত্থান ঘটতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি একটি জাতিকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে আধা-ভৌতিকভাবে মিলিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠী অতিমানবের কাছে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়। অতিমানবদের কাছে এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অপ্রতিরোধ্য হিসেবে প্রতীয়মান এবং এদের কাছে ইহুদি, অধ্যাপক, শান্তিবাদী, সমাজতান্ত্রিক, র‍্যাডিকাল, উদারপন্থী, এবং গণতন্ত্রী প্রত্যেকেই ঊন-মানুষ।” (John Gunther, “The Nation”, New York, June 7, 1933)।

    ব্যাভারিয়ার প্রাদেশিক সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ফ্রিটজ শেয়ের, যিনি কিনা বর্তমানে একজন ফ্যাসিস্ট প্রো-কন্সুলের দ্বারা স্থানান্তরিত হয়েছেন, তিনি একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে তাঁর সাবেক সহকর্মী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বরাবর লিখেছেন: “অধিকার এবং ন্যায়ের কিংবা আইনশৃঙ্খলার কোন চিহ্নই রাখা হয়নি। ঐশ্বরিক এবং মানবিক সকল ধরনের অধিকার পদদলিত হচ্ছে। অধঃপতিতরা নিজেদের জার্মানির নৈতিকতার পুনর্জন্মদাতা বলে দাবি করে, অথচ বাস্তবে তারা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে এবং বন্য প্রাণীর মতো তাদের অহংকারী প্রবৃত্তি চরিতার্থ করেছে।” ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে দৈনন্দিন ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে মত প্রকাশের জন্য, ড. শেয়েরের বিচার করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

    “এটি একেবারেই স্পষ্ট যে, বর্তমান জার্মান সরকার পাশবিক এবং প্রগতিবিরোধী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগাতে প্রস্তত যা কিনা জার্মান সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক এবং মূল্যবান।” (The New Republic”, New York, April 26, 1933)। এই উদ্ধৃতিটি একটি বেনামে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে। লেখক ভয়ে তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। সত্য বলার অপরাধে বর্বর ফ্যাসিস্টদের প্রতিশোধের মুখে পড়তে পারেন এই ভয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপক নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন। সত্যকে এমন সন্ত্রাসী কায়দায় ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছিল যে সিস্টেমের নাগালের বাইরে পালিয়ে যাওয়া জার্মানরা পর্যন্ত সত্য বলতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ তাদের অনেকের বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজন তখনও জার্মানিতে বসবাস করছে। প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তারা এই মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করত। সাধারণত ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনকে জিম্মি করে দেশের বাইরেও তাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করত।

    ছবি: মুসোলিনি ও হিটলার, ১৯৩৭

    রক্তপাতহীন বিপ্লবের বর্বর সহিংস অনুশীলন এতটাই তীব্র ছিল যে, ‘অতিমানবদের’ মধ্যেও ব্যতিক্রমী কিছু ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ উস্কে দিচ্ছিল। এদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভদ্রতা অবশিষ্ট ছিল। কাউন্ট ভন রিভেন্টলো নামের একজন ব্যক্তিকে হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় “ট্রেড ইউনিয়নের কর্মচারীদের টেনে হিছড়ে নাৎসিদের প্রধান কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এই কর্মচারীদের ভেতরে নারীও ছিলেন। তাদের মারধর করা হয় এবং নারীদের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করা হয় যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।”

    আধুনালুপ্ত প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এটির প্রথম চ্যান্সেলর, ফিলিপ শেইডম্যান প্রাগে নির্বাসিত অবস্থায় লিখেছিলেন, “হিটলারের বার্লিন হল অগ্নিসংযোগকারী টর্চের মত যেখানে অপরাধী এবং একদল উন্মাদ গানপাওডারের পিপা নিয়ে খেলছে।” (“The Times”, London, end of June 1933)। এই মত প্রকাশের অপরাধে বেশ কয়েকজন নারীসহ শেইডেনের পরিবারের যারা তখনও জার্মানিতে অবস্থান করছিল তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে কমিউনিকেডো নামের বন্দি শিবিরে রেখে তাদের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যাচার চালানো হয়। বয়স কিংবা লিঙ্গের বাছ- বিচার ছাড়াই ‘অপরাধী এবং মানসিকভবে উন্মাদ’ ব্যক্তিদের দ্বারা হিটলারীয় কায়দায় এই বর্বরতা চালানো হয়েছিল।

    এডলফ হিটলার জীবনীকারদের জন্য হতাশা উদ্রেককারী। একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতার জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করা সবথেকে কঠিন। কিন্তু সেই নেতা যখন আধা-উন্মাদ, ক্ষমতাধর, সেই ক্ষমতা যখন সে অন্ধ উন্মাদনার দ্বারা আরও বাড়াতে চেষ্টা করে; যখন সে একইসাথে অস্তিত্বহীন এবং ত্রাণকর্তা; তার আচরণ যখন সাধারণ থেকে শুরু করে ভয়ঙ্কর পর্যন্ত বিস্তৃত, একইসাথে বিরক্তিকর এবং মহৎ, অর্বাচীন থেকে শুরু করে আবেগপূর্ণ; যখন সে বাইরের অন্ধকার থেকে উঠে আসা ভুতুড়ে কণ্ঠস্বর শুনতে পায় এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তখন জীবনীকারদের কাজ শুধু কঠিন নয় অসম্ভব হয়ে ওঠে।” (The New Republic”, New York, June 10, 1936)।

    “যখন কেউ একজন নেতার বক্তব্য শোনে, সে বুঝতে পারে যে রোগাক্রান্ত মনের সান্নিধ্য অনুধাবন করতে পারে। গত জুনের ঘটনা (তাঁর একসময়ের বিশ্বস্ত লেফট্যান্যান্টদের হত্যাকাণ্ড) আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে সে নিপীড়নকারী এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ একজন মানুষ। একটি মহান এবং অতি সভ্য একটি জাতি এমন একজন ব্যক্তির করুণা প্রার্থী যে কিনা স্নায়বিক অস্থিরতাক্রান্ত, পরিকল্পিতভাবে ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। পরামর্শদাতা হিসেবে একজন ব্যক্তিই তার পাশে থেকে তাকে পরিচালিত করতে পারে, সে হল গোয়ারিং। গোয়ারিং তার নিজের রেকর্ডেই হিটলারের থেকে বেশি নিষ্ঠুর এবং আরও বেশি বেপরোয়া।” (The New Statesman and Nation”, London, August 14, 1934)।

    “ফ্যাসিবাদ হল যুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; সহিংসতা, আবেগ এবং গভীর আসক্তির প্রতি আহবান। এর ফলাফল অতি আবশ্যকভাবে নিষ্ঠুরতা, উন্মাদনা এবং গুন্ডাগিরি।” (Robert Dell, “Germany Unmasked”)। বিভিন্ন অফিশিয়াল প্রকাশনার উদ্ধৃতিসমূহ ঘেঁটে লেখক এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মি. ডেল দেখিয়েছেন কিভাবে নাৎসিরা অনেক সময় নিষ্ঠুরতাকে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করত এবং কখনও কখনও ‘ইহুদি মিথ্যাচার’ হিসেবে নিন্দা করত। সত্যিকার অর্থে নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো কোন দূর্ঘটনা তো নয়ই বরং যুক্তিসঙ্গত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত নাৎসি নীতিরৈ অংশ। রক্তপাতহীন বিপ্লবের সবথেকে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গান হল: “ছুরি থেকে যদি ইহুদির রক্ত পড়ে, তাহলে আমরা দুইবার করে মার্চ করব”।

    হিটলারের জীবনীগ্রন্থে কর্তৃত্বমূলকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফ্যাসিবাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হল দূর্বলের ধবংস এবং সবলের জয়। সামাজিক ব্যাধির ফ্যাসিবাদী ঔষধ হল ইহুদিদের ধ্বংস এবং জোরপূর্বক পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখা। এর রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো অস্ত্রশস্ত্র বৃদ্ধি এবং বিজয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। “উপনিবেশগুলো ক্ষমতার অধিকারে অধিগ্রহন করা হয়েছিল। ইউরোপের দরকার ছিল কাঁচামাল এবং উপনিবেশ। যেখানে জীবনের এক বীরত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে শ্বেতাঙ্গরাই শাসন করার জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শাসক জাতি যদিশান্তির ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, উপনিবেশগুলোকে নিজেদের শাসন করতে অনুমতি দেয়, তাহলে তারা বলতে পারে ‘আমাদের এখানে ইউরোপের আর কোন দরকার নেই’।’’ (Hitler at the Conference of university Students, Munich, January 26, 1936)।

    নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে, হিটলার ইতিহাসে একজন দক্ষ বাগ্মী জননেতা এবং একজন সুযোগসন্ধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করবেন, যিনি কোন নীতি জানেন না। তার মতে, জনগনকে শাসন করার সবথেকে কার্যকর পদ্ধতি হল তাদের প্রতারিত করা। তার শাসনের নীতি হল একই স্লোগান বারবার উচ্চারণ করতে থাকা ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণে জনগণ তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। “তার জীবনের দর্শন যুদ্ধের পূর্বে ভিয়েনায় কাটানো তার ভবঘুরে জীবনের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত। তারপর আর কোন বিকাশ হয়নি; কেবল নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছে। প্রায় বিশ বছর ধরে তার কোন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যা হয়নি। তার রাজনীতি করার ধরন খুবই অদ্ভুত। অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা, শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের বোকা জ্ঞান করা, তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করাটাই যেন স্বাভাবিক তার কাছে। সাধারণ রাজনীতিবিদদের যে জিনিসগুলো আক্রান্ত করে হিটলারকে তা করে না। অন্যায় কিংবা বৈষম্য নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই। সেনাবাহিনী, পুঁজিবাদী এবং সামন্তপ্রভু এই তিন গোত্রের কাছে সে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। দুর্বল এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এরকম প্রতিটি কাঠামো সে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। গণতান্ত্রিক সভ্যতার মৌলিক নীতিসমুহ প্রত্যাখ্যান করে সে জার্মানির আদি গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল যেখানে সবলেরা শাসক আর দুর্বলেরা প্রজা।” (Rudolf Olden, “Hitler”)।

    পরিশেষে একটি সাম্প্রতিক বই থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হল। বইটির লেখক ষোল মাস জার্মানিতে অবস্থান করে ‘নিরপেক্ষভাবে’ পরিস্থিতি তদন্ত করেছেন। হিটলারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে সে ব্যাপারে সতর্ক করে তিনি লিখেছেন: “সে নিজেকে একজন ক্রুসেডার মনে করে যে কিনা গোটা মানব জাতিকে রক্ষা করতে এসেছে। ফলে সে যখন বলশেভিকদের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষার ব্যাপার নিয়ে কথা বলে নিজেকে মহিমান্বিত মানুষ ভেবে আত্মতুষ্টি পায়।” (Stephen H. Roberts. “The House that Hitler Built”)। হিটলার জনসম্মুখে বক্তৃতা দেওয়ার সময় পাগলের মত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ত, কাঁদত অথবা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এ ব্যাপারে বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক রবার্ট, হিটলার সম্পর্কে গোয়ারিং এর করা মন্তব্য উদ্ধৃত করেন: “কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই আমরা হিটলারকে কাঁদতে দেখেছি।” সব ধরনের অসংযত আচরণের কথা মাথায় রেখে রবার্ট গোয়েবলসকে ইউরোপের সবথেকে বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। “কারণ এই লোকটি মানবিকতাকে অগ্রাহ্য করেও সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দায়িত্বপ্রাপ্ত। শারীরিক ত্রুটি থেকে সৃষ্ট তীব্র বিরক্তি এবং নির্যাতনের শিকার স্নায়ুতন্ত্রের অসুবিধার কারণেই হয়ত মানবতার প্রতি তার এক ধরনের অবজ্ঞা রয়েছে। সব সময়ই তার মধ্যে তিক্ততা ভর করে থাকত। পুরো জার্মানি জুড়ে কাউকেই তার ব্যাপারে মমতা নিয়ে কথা বলতে শুনিনি”। (প্রাগুক্ত)

     এমন ‘অতিমানবেরাই’ আজ জার্মানির ভাগ্য বিধাতা। তাদের মত ইতালি এবং অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতেও শাসন চলছে। সমগ্র ইউরোপ এই বর্বর উন্মাদ ধর্মপ্রচারকদের অধীনে আসবে না, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। আজকের দিনে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা ইউরোপীয় সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হিটলার সেই জঘন্য প্রেতাত্মার প্রতিনিধি। “হিটলার এমন একটি প্রপঞ্চ যাকে কেউ হত্যা করে অথবা যার দ্বারা কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।” (Konard Heiden, “Hitler”)।

  • এম এন রায়  || ফ্যাসিবাদ

    এম এন রায় || ফ্যাসিবাদ

     

    ফ্যাসিবাদ আচানক আবির্ভূত হয়নি।

    ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ চিন্তাচর্চারই ফল এই মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।

    ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে, যে দর্শন অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।

    প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এম এন রায় ফ্যাসিবাদের দর্শন ও অনুশীলনেরই আকর অনুসন্ধানই করেছেন। গেল শতকের তিরিশের দশকে ভারতে ফেরার পর গ্রেপ্তার হন এম এম রায়। কারাগারেই লেখেন ফ্যাসিবাদ নিয়ে লেখেন ‘ফ্যাসিবাদ: প্রতীতি, প্রতিজ্ঞা, প্রয়োগ’ গ্রন্থটি। ১৯৩৮ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি থেকে।

    গ্রন্থটিতে সাতটি অধ্যায়। পুরো গ্রন্থটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয় অরাজ। এরই মধ্যে অনুবাদ শেষ পর্ষায়ে। গ্রন্থটির চারটি অধ্যায় অরাজের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত করা হল।

    লেখাগুলো পড়তে লিংকে ক্লিক করুন:

    ১৷ ফ্যাসিবাদের দর্শন

    ২. অতিমানবের কৌলিকতা

    ৩. জাতীয় সমাজতন্ত্র

    ৪. রক্তপাতহীন বিপ্লব

  • সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রের ধারণা একটি কর্তৃত্ববাদী ভাবাদর্শ ছাড়া কিছুই না

    সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রের ধারণা একটি কর্তৃত্ববাদী ভাবাদর্শ ছাড়া কিছুই না

    • আব্দুল্লাহ হেল বুবুন

    সভ্যতা কেন্দ্রিক বয়ান আবারো বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। চায়না, ভারত, রাশিয়া, তুরস্কসহ বেশ কিছু কর্তৃত্ববাদী দেশের সরকার নিজেদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিসিকে বৈধতা প্রদানে সভ্যতাবাদী পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসছে। যেমন, ২০১৯ সালে ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর এক বার্তায় এরদোগান জানায়, “ক্রুসেডারদের অবশিষ্ট অংশ তুরস্কের উত্থান থামাতে পারবে না। ইস্তাম্বুল কখনো কন্সটান্টিনোপল হবে না।” পুতিন কখনোই এটা জানাতে ভোলেন না যে, রাশিয়া একটি সভ্যতা, কোন জাতি রাষ্ট্র নয়। এই প্রবণতার বাইরে নয় উদারবাদী গণতন্ত্রের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যে সভ্যতা কেন্দ্রিক বয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মার্চ মাসের চার তারিখে কংগ্রেসে দেয়া একটি ভাষণে ট্রাম্প পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে শক্তিশালী “সভ্যতা” তৈরি করার ঘোষণা দেন। এতোসব সভ্যতা কেন্দ্রিক বাগড়ম্বরের মুখে অনেকেই ধারণা করছে, জাতি–রাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্ব ব্যাবস্থার দিন শেষ হয়ে আসছে, সভ্যতাগত রাষ্ট্রই ভবিষ্যত।

    আদতে সভ্যতাগত রাষ্ট্রের ধারণাটি যতোটা না বাস্তবতা, তার থেকে বড় মিথ। সভ্যতাবাদের রেটোরিক ব্যবহার করা চীন, রাশিয়া, ভার‍ত ও তুরস্কের ক্ষমতাসীনদের (এবং তাদের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের) জন্য সভ্যতাবাদ একটি ‘‘লেজিটিমাইজিং ডিস্কোর্স”, তার বেশি কিছু নয়।

    অবশ্য ওই আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক সভ্যতাগত রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যগুলো।

    An illustration from Le Cri Du Peuple by Jacques Tardi

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র কী?

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র মূলত এমন একটি দেশ, যা নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড, ভাষা বা এথনিক গোষ্ঠীর বদলে একটি সামগ্রিক সভ্যতাকে প্রতিনিধিত্ব করার দাবি জানায়। সভ্যতাগত রাষ্ট্রের ধারণা কিছু পূর্বানুমানের উপর দাঁড়ানো।

    এক, পৃথিবীতে বিভিন্ন সভ্যতা রয়েছে। এবং বিভিন্ন সভ্যতার মূল্যবোধ র‍্যাডিকালি ভিন্ন ও বিপরীত।

    দুই, একটি দেশ তখনি সফল হতে পারে, যখন সেই দেশ নিজের সভ্যতাগত পরিচয়কে ধারণ করে।

    তিন, লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিরপেক্ষ কোন সর্বজনীন মূল্যবোধকে ধারণ করে না। নিজেদের সুবিধার্থে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার নানাবিধ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার (যেমনঃ আলোকায়ন) ফসল এসব মূল্যবোধকে “সর্বজনিনতা“-র নামে সারা দুনিয়ার উপর চাপিয়ে দিয়েছে পশ্চিমা এলিটরা।

    তুরস্ক, ইরান, ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র— কোন না কোন সময় এরা “সভ্যতাগত রাষ্ট্র” বলে চিহ্নিত হয়েছে৷ তবে, চীন–রাশিয়া–তুরস্ক–ভারত এর সভ্যতাগত পরিচয় অ্যাকাডেমিয়ায় বেশ আলোড়ন তুলেছে এবং আমার আলোচনা এদেরকে নিয়েই হবে। এই চারটি রাষ্ট্রের মাঝে কেবল রাশিয়াই ন্যাশন স্টেট পরিচয়কে অস্বীকার করে নিজেকে সভ্যতাগত রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ অন্যরা সভ্যতা ও রাষ্ট্র এর মাঝে ফারাক না টেনে—উভয় শব্দকে একটি অপরটির বদলে ব্যবহার করে।

    “সভ্যতাবাদ“: লেজিটিমাইজিং ডিস্কোর্স

    পৃথিবীকে যে বেশ কয়টি সভ্যতায় বিভক্ত করা যায় এবং এই সভ্যতাগুলো বহুবিধ অসংগতিপূর্ণ মূল্যবোধের কারণে একে অপরের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়—এই ধারণাটি চীন ও রাশিয়ার অ–গণতান্ত্রিক সরকার এবং তুরস্ক ও ভারতের নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের বয়ানে বেশ জোড়ালোভাবে উপস্থিত৷ জনতুষ্টিবাদ ও কর্তৃত্ববাদ এই চার‍টি রাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এসব রাষ্ট্রে সভ্যতাবাদের বয়ান দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    প্রথমত, সভ্যতাবাদ কর্তৃত্ববাদী–জনতুষ্টিবাদী সরকারকে সহজেই “জনতা“, “অভিজাত” শত্রু এবং “বিপদজনক অপর” নির্মাণে সাহায্য করে। এই সভ্যতাবাদী পরিচয় নির্মাণে ধর্ম সর্বত্র একই প্রভাব না রাখলেও তার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ক ও ভারতে ধর্ম কেবল ‘অপর‘ থেকে জনতাকে আলাদাই করে না; তা দেশীয় সেকুলার অভিজাতদেরও চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, যারা নিজেদের সভ্যতার পবিত্র ধর্মকে ত্যাগ করে বিদেশীদের সাথে আতাঁত করেছে। উভয় দেশেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আধুনিকতা ও সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করেছে জনতার প্রধান শত্রু হিসেবে। এছাড়া, রাশিয়া ও চীনে খ্রিস্টান অর্থোডক্সি ও কনফুসিয়ানিজম সভ্যতা পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

    সভ্যতাগত পরিচয়কে উদযাপন করা এই চারটি দেশের ক্ষমতাসীন সরকারই পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও এর সর্বজনীন মূল্যবোধগুলোকে (যেমন: মানবাধিকার) সাম্রাজ্যবাদের অভিব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের বিভিন্ন সময়ে অস্বীকার করেছে। একইসাথে, এই বয়ানে দেশের বিভিন্ন সমস্যার (বর্তমান বা ঐতিহাসিক) জন্য দায়ী করা হচ্ছে আধুনিকতা প্রভাবিত পশ্চিমা এলিটদের।

    দ্বিতীয়ত, এসব দেশের কর্তৃত্ববাদী সরকার নিজেদের নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদকে বৈধতা প্রদান করতে অনেক সময়ই সভ্যতাবাদী রেটোরিকের দারস্থ হন। মোদির ভারতে মুসলিমদের উপর সংঘটিত নিপীড়নকে ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক হেজেমোনি রক্ষার বয়ান দ্বারা বৈধতা প্রদান করা হয়৷ পুতিন লৈঙ্গিক সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন এবং ইউক্রেন আক্রমণকে উপস্থাপন করেছে পশ্চিম ও এর অবক্ষয়মূলক উদারবাদী ভাবাদর্শ থেকে রাশিয়াকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে৷ তুরস্কের ক্ষমতাসীন একেপি পার্টিবিরোধী ও গুলেন আন্দোলনের সাথে জড়িতদের দমন এবং অ–সুন্নি মুসলিম, সুন্নি মুসলিম ও কেমালপন্থী সেকুলারদের প্রান্তিকীকরণকে তুলে ধরছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র থেকে তুরস্ককে মুক্ত করার উপায় হিসেবে (এরদোগানের ভাষ্য অনুযায়ী, যা তুরস্ককে তার অতীত সমৃদ্ধিতে পৌঁছাতে সাহায্য করবে)। উল্লেখ্য, সরকারের জনপ্রিয়তা কমলে কিংবা কোন অজনপ্রিয় পলিসির জাস্টিফিকেশনে প্রায়ই সভ্যতাবাদী বয়ানকে সামনে নিয়ে আসা হয়।

    উপরের আলোচনাটা থেকে এটা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত চারটি দেশের সরকারের জন্য সভ্যতাবাদ রূপান্তরিত হয়েছে শক্তিশালী একটি ভাবাদর্শিক অস্ত্রে। তবে, ভাবাদর্শিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার মানে এই না যে, এইসব রাষ্ট্র বর্তমানে জাতি–রাষ্ট্র প্যারাডাইমের বাইরে অবস্থান করছে। কেননা, কোন সরকারই চিরস্থায়ী নয়; বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারগুলো বিভিন্নভাবে বিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং যারা বিরোধিতা করছে তারা অধিকাংশ সময়ই কোন সভ্যতাগত মূল্যবোধ ধারণ করে না। উদাহরণস্বরূপ, ভার‍তের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসের কথা বলা যেতে পারে। সুতরাং, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও ভারতকে সভ্যতাগত রাষ্ট্র না বলে সভ্যতাগত শাসন বা সরকার (রেজিম) বলাই বোধহয় বেশি যৌক্তিক হবে।

    নব্য উদারবাদ ও সভ্যতাবাদ: দি ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স‘

    উপরে আলোচিত তথাকথিত সভ্যতাগত রাষ্ট্রের সরকার নিজেদেরকে জনতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে (যারা বিদেশি অভিজাত ও বিদেশ প্রভাবিত দেশীয় অভিজাতদের বিপক্ষে জনতার হয়ে লড়াই করে) দাবি করলেও তাদের অর্থনৈতিক নীতিকে কোনভাবেই জনবান্ধব বলা যাবে না। চারটি দেশের সরকারই কম বেশি নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে, যা সবগুলো দেশেই অর্থনৈতিক অসমতার ট্রেন্ডকে বৃদ্ধি করেছে। প্রচুর মানুষকে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক অসমতার অবস্থা থেকে আমরা এ বিষয়ে ধারণা পেতে পারি। উল্লেখ্য, তুরস্কের সবথেকে ধনী ২০ শতাংশ ব্যক্তি তুরস্কের ৪৮ শতাংশ সম্পদের মালিক। ভারতের অবস্থা আরো খারাপ, সেখানকার সবথেকে ধনী ১ শতাংশ ধনী ভারতের ৪০ ভাগের বেশি সম্পদের মালিক, অন্যদিকে নিচের ৫০ শতাংশ ব্যক্তি কেবল ৩ ভাগ সম্পদের মালিক (ইনকাম অ্যান্ড ওয়েলথ ইনইকুয়ালিটি ইন ইন্ডিয়া, ২০২২–২৩: দি রাইজ অব বিলিওনেয়ার রাজ)। চীনের টপ ১০ শতাংশ ব্যক্তি সেখানকার ৬৮ ভাগ সম্পদের মালিক এবং ওয়ার্ল্ড ইকুইটি ডেটাবেজ অনুযায়ী বর্তমানে চীনে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিলিওনেয়ার রয়েছে।

    আশির দশকে খ্রিস্টান ডানপন্থা ও নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক ডানপন্থা রোনাল্ড রিগানের মধ্য দিয়ে মিলিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ডিল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। জনবান্ধব ইমেজধারণকারী রিগানের হাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলফেয়ার অর্থনীতি পরাজিত হয়। ঠিক একইরূপে, অভিজাত শত্রুদের বিরুদ্ধে জনতার সরকার হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করা রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কের ডানপন্থী ‘সভ্যতাগত‘ সরকারও নব্য উদারবাদকে নিজ নিজ দেশে আরো শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি, ট্রাম্পের বিভিন্ন সংরক্ষণবাদী (প্রটেকশনিস্ট) অর্থনৈতিক পলিসির প্রতিক্রিয়ায় তারাও বেশ কিছু সমরূপ নীতি নির্ধারণ করেছে। আসলে, অর্থনীতির জায়গা থেকে চিন্তা করলে, তথাকথিত সভ্যতাগত রাষ্ট্রগুলো কোন নতুন কিছু প্রদান করছে না। তারা পুরনো অর্থনৈতিক ব্যাবস্থারই অংশ।

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র ধারণাটির সাথে আমি সর্বপ্রথম পরিচিত হই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তার আরো ভিন্ন ভিন্ন পোস্টে সভ্যতাগত রূপান্তরের ব্যাপারটি এসেছে। সম্প্রতি করা একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, দুটি সভ্যতাগত রাষ্ট্রের (ভারত ও চীন) মাঝে টিকে থাকতে হলে সভ্যতাগত রাষ্ট্র নির্মাণ অপরিহার্য। নাহিদ ইসলামের মন্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক: “‘আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, জাতীয়তাবাদের যুগ শেষ হয়ে আসছে। আমাদের জাতীয়তাবাদের নানা ধরনের সমালোচনা ও দুর্বলতা আছে।…গোটা পৃথিবীই এখন সভ্যতাগত রাজনীতির দিকে আগাচ্ছে। ভারত ও চীনও কিন্তু সভ্যতাগত পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পৃথিবীর বুকে দাঁড়াচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমাদেরও সভ্যতাগত পরিচয় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন (সমকাল, ২০ আগস্ট ২০২৪)।”

    আমাদের উপরের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, “সভ্যতাগত রাষ্ট্র” এর ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজন স্বীকৃত কোন বিষয় নয়। বরং, অনেক প্রভাবশালী পণ্ডিতদের মতে, বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী–জনতুষ্টিবাদী রাষ্ট্র সভ্যতাবাদের বয়ান তাদের শাসন ও নানাবিধ পলিসিকে বৈধতা প্রদানে ব্যবহার করছে।

    শিল্পী: মারিয়া ব্ল্যানকার্ড
    শিল্পী: মারিয়া ব্লানচার্ড

    যদি আমরা তর্কের সাপেক্ষে ধরেও নেই যে, চীন ও ভারত সভ্যতাগত রাষ্ট্র। তারপরও, পার্শবর্তী চীন ও ভারত বা তুরস্ক ও রাশিয়া বাংলাদেশের জন্য আদৌ কোন রোল মডেল হতে পারে? তথাকথিত এসব “সভ্যতাবাদী রাষ্ট্র”–এর মানবাধিকার রেকর্ড অত্যন্ত বাজে এবং সরকার অনেকটাই অগণতান্ত্রিক। সংখ্যালঘু নিপীড়ন এসব রাষ্ট্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

    দ্বিতীয়ত, মাহফুজ আলম ও নাহিদের সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রপ্রকল্পের অর্থনৈতিক নীতি কী হবে? সেটা কি নব্যউদারবাদ থেকে ভিন্ন কিছু হবে?

    তৃতীয়ত, বহুত্ববাদ জুলাই ২৪–এর অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। মাহফুজ আলম একটি বহুত্ববাদী বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বারবার বলেছেনও। তবে, সভ্যতাবাদ কি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য একটি যথার্থ পন্থা হতে পারে? কেননা, আমাদের আলোচিত সকল তথাকথিত “সভ্যতাগত রাষ্ট্র”–ই এক্সক্লুশোনারি রাজনীতির ধারক।

    মাহফুজ আলম কিংবা নাহিদ, উভয়ই কখনো কখনো সভ্যতাগত রাষ্ট্রপ্রকল্পের কথা বললেও, তারা কোন বিশদ পরিকল্পনা ও এর তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেননি। তাদের যদি প্রকৃত অর্থেই সভ্যতাবাদী কোন রাষ্ট্রপ্রকল্প থেকে থাকে, তাহলেই অবশ্যই তাদেরক এই রাষ্ট্রের প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সংখ্যালঘু অধিকার কেমন হবে, তার রূপরেখা নিয়ে সামনে আসা উচিত।