এই রচনাটির পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে সাধারণভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতি আমার বিরক্তি থেকে। এমন নয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ সমরূপ বা অখণ্ড বৈশিষ্ট্যের ধারক। এমনও নয় যে আমার বিরক্তিটাও সমরূপ বা অটুট। কিন্তু মোটের উপর, টিভি-পত্রিকাতে যেসব বিশ্লেষণ অন্তত আমার চোখে পড়েছে; আর আমি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিরক্ত হতে থেকেছি। বিশ্লেষকদের সিংহভাগের উপর আমার এই বিরক্তি অবশ্য আগস্ট-২৪ পরবর্তীকালেরই নয়। এটা কমবেশি বহুকাল আগে থেকেই বিকশিত রয়েছে। যাহোক, এখানে রচনা লিখবার ক্ষেত্রে যে বিষয়টা না বললেই নয় তা হচ্ছে, বিদ্যাজগতে আর যাই হোক বিরক্তি থেকে রচনা লিখতে উৎসাহ দেয়া হয় না। তেমন কোনো পণ্ডিতই পাওয়া যাবে না যাঁরা অনুমোদন করবেন পেটভর্তি বিরক্তির কারণে কোনো রচনায় ব্রতী হতে। সাধারণত, জ্ঞানতৃষ্ণা ও জ্ঞানসাধনার জগতেই বিদ্যারচনার জন্মলাভ করাতে সুপারিশ করা হয়ে থাকে। হিসেবটা বেশ জটিল। কার যে জ্ঞানতৃষ্ণা আর কার জ্ঞানসাধনা তা আমার প্রায়শই গুলিয়ে যায়। অনেক হিসেব কষে দেখলে আন্দাজ করা যায় যে, লেখকের থাকবে জ্ঞানসাধনা আর পাঠকের থাকবার কথা জ্ঞানতৃষ্ণা। তবে পণ্ডিতেরা প্রায়শই বলেন যে লেখকের জ্ঞানতৃষ্ণাও অত্যন্ত জরুরি। যেসব লেখক কম পড়ালেখা করেন তাঁদেরকে ব্যাপক নিন্দা করা হয়। সেসব চিন্তা করলে লেখায় হাত দিতে ভয় হবার কথা আমার। খুব হয়ও বটে। সব মিলে খুবই পিচ্ছিল-বিপজ্জনক এক জগত এই বিদ্যাজগতের লেখালেখি। কিছুতেই বিতৃষ্ণা থেকে অন্তত লিখবার সুপারিশ নেই। অথচ আমার ক্ষেত্রে, অন্তত এই রচনাটি, বিশুদ্ধ বিতৃষ্ণাতেই জন্মলাভ করতে যাচ্ছে।
মানস চৌধুরী
আমার জিজ্ঞাসাও খুব সাধারণ ও স্পষ্ট। ছাত্রলীগে যোগ-দেওয়া বিপুল পরিমাণ নারীরা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক ভাষামালাতে হারিয়ে গেলেন কেন? ২৪-এর উত্থানের অন্যতম কারিগর যে আমি তাঁদের দেখতে পাই সেই অতি-সাধারণ দেখাদেখিটা গড়ে ওঠেনি কেন বিশ্লেষকদের মাঝে? যদি গড়ে উঠে থাকে, তাহলে তাঁরা সেই প্রসঙ্গসূত্র যুক্তি-আকারে হাজির করতে থাকেননি কেন? আর যদি দেখাটা গড়ে না-উঠেই থাকে, তাহলে এই কাঠামোগত আহাম্মকির কারণ বা হেতু কী? ইত্যাদি।
ঘটনাসূত্র
বলা বাহুল্য হতে পারে, তবে সূত্রের অভাব নেই। কিন্তু একটা ঘটনাপঞ্জি হিসেবে সাজিয়ে ইতিহাস-রচনার দায় আমি নিচ্ছি না। আমার যুক্তিকে গেঁথে-সাজানোর স্বার্থে আমি তিনটি ঘটনাকে সূত্রবদ্ধ করছি এখানে। ঘটনা তিনটা ঘটেছে কমবেশি দেড় বছরের মধ্যেই। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত। এগুলোকে প্রামাণ্য বা দালিলিক হিসেবে উপস্থাপন করছি না আমি। আমার আগ্রহ উপসর্গের চিহ্ন হিসেবে দেখানো। দালিলিক বা প্রামাণিক হিসেবে হাজির করবার জন্য আরও কিছু বিন্দুকে জোড়া দিতে হবে। তার জন্য বাড়তি আরও কিছু কাজ করা লাগবে। তাছাড়া, আমার তরফে এটা কোনো ইতিহাস রচনা-প্রচেষ্টা নয়। বড়জোর ইতিহাসের দিকে তাকানোতে নানান পক্ষের অপ্রস্তুতিতে বিরক্তির বোধ। বড়জোর একটা তাকানোর পদ্ধতি প্রস্তাব। উপরন্তু, পত্রিকাকে আমি আদালত ভ্রম করতে রাজি নই কিংবা পাঠককে বিচারকের জায়গা দিতেও নই। ঘটনা তিনটিকে অতীতকাল থেকে বর্তমানের দিকে না সাজিয়ে উল্টোটা করছি।
২৮ জুলাই ২০২৪: প্রধানমন্ত্রীর দরবারে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের হাজিরা ও পতনোন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ে বিলাপ।[১] যে তিনটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ‘মিডিয়া-কভার্ড’ ইস্যু। মানে অন্তত ওই সময়ে সাইবার পোর্টালের কথা বিবেচনা করলে তা বলা চলে। কারণ নিশ্চয়ই আন্দোলনের বেগ। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যেহেতু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল, ১৮ জুলাই থেকেই যেহেতু সড়কে শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালানো হয়েছে তাই পত্রপত্রিকা কিছুটা অধিক মূল্য দিয়ে থাকতে পারে। সরকারের নিন্দামন্দ হয় এমন পরিস্থিতিতে মিডিয়া-হাউজগুলো দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে থাকে তা আপনারা জানেন। বহুকাল ধরেই এই প্রবণতা। এর মধ্যে টিভিমাধ্যম সংবাদ-উৎস হিসেবে কাগজ-মাধ্যমের তুলনায় স্পষ্টত শ্লথগতিসম্পন্ন। মুদ্রণমাধ্যমে পর্যাপ্ত হৈচৈ শুরু হলেও টিভিমাধ্যমগুলো নিরোর-বাঁশিবাজানো মুডেই থাকে। একটা বিকল্প হিসেবেই সম্ভবত টিভিমাধ্যম কিছু লোককে টকশোতে বসিয়ে থাকে। আমি যে অঞ্চলটাকে বিশ্লেষক-অধ্যুষিত হিসেবে দেখছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছিলেন নারীপুরুষ উভয় ধরনের নেতাই। কিন্তু পত্রিকার (ওয়েবমাধ্যমে) খবর, বিশ্লেষণ করলে আপনাদের মনে হতে পারে যে কেবল বোধহয় নারীরাই গেছিলেন। তা নয়। বরং, উত্থিত আন্দোলনের মুখে পড়ে নিগৃহীত হবার অভিজ্ঞতা বর্ণনাতে ছাত্রলীগের নারীবৃন্দ অগ্রগামী ছিলেন।
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগের সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এবং ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের উপর ‘সাধারণ’ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ থেকে হঠিয়ে দেবার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে পেশ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী নেতৃবৃন্দ তা করেছেন, সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দও বিষয়টাকে সেভাবে সাজানোতে কোনো ওজর-আপত্তি করেননি; এবং সর্বোপরি, পত্রিকাগুলোও সেই ফর্মুলাতেই আগিয়েছে। এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। পাঠককে নিম্নরেখা দিয়ে পাঠ করতে সুপারিশ করি। যে ছাত্রলীগ এমনকি একটা ছাত্রী হলের কমিটি গঠনের সভার ‘প্রেস-আইটেম’ বানানোর বেলাতেও কেন্দ্রীয় সিংহপুরুষদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ ছাড়া অনুমোদন করেনি, তাঁরা ‘নিগৃহীত’ হবার পরিস্থিতিতে ছাত্রীদেরকেই সম্মুখে রাখবার কারণ খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি সফরকারী দলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুরুষ ছাত্রলীগ নেতা থাকবার পরও, বিভিন্ন জায়গা থেকে সমরূপ ধাওয়ার অভিজ্ঞতা আগের সপ্তাহে তাঁদেরও ঘটবার পরও। প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের দুর্গতি বলবার পাশাপাশি তাঁরা অনুরোধ করছিলেন যেন বাহিনিগুলোকে ছাত্রলীগের নিরাপত্তার জন্য হুকুম দেওয়া হয়। (এই অশনিসংকেত থেকে প্রধানমন্ত্রী কী পাঠ করেছিলেন আর তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন তা সম্পূর্ণ আরেকটা জিজ্ঞাসা। এই রচনা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা বিষয়ে নয়।)
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত গণধর্ষণের ঘটনায় র্যাবেরপ্রেস কনফারেন্স।[২] আমার হিসেবে এই ঘটনাটি তিনটির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ‘মিডিয়া-কভার্ড’ প্রসঙ্গ। কিন্তু সেটা হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনাটি। প্রেস কনফারেন্সটি নয়। এর আগে মানানসই মাপের একটা প্রেস কনফারেন্স আশুলিয়া থানার পুলিশও করেছিলেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখেই, সম্ভাব্য/উল্লিখিত আসামীদের একাংশকে ধরবার পরপরই। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা পর্যাপ্তহারে ঘটতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘটে না এরকমও কেউ মনে করেন না। তবে জাহাঙ্গীরনগরের এই ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে এখানে ভুক্তভোগী থানা পর্যন্ত গেছিলেন, এবং থানাতে এক বা একাধিক সংবেদনশীল পুলিশ তিনি পেয়েছিলেন। তাতেও থানার পুলিশদের সংবাদ-সম্মেলনের ৪দিন র্যাবের পর পক্ষ থেকে প্রায় ৩০ মিনিটের একটা সম্মেলনকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা প্রয়োজন। তবে যেমনটা বলছিলাম, পত্রিকা তরফে, কিংবা বিশ্লেষক তরফে, এই সংবাদ-সম্মেলনটির গুরুত্বটা যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। সমরূপ ক্ষেত্রে প্রায়শই যেমনটা ঘটে থাকে, i¨ve যে পুলিশের থেকে অধিক কার্যকর ও দক্ষ সেই ভঙ্গিগ্রহণ, এই সম্মেলনে সেটাও ঘটেনি। বরং, i¨ve পরিমিতভাবেই পুলিশের তারিফ করছিলেন।
এই সংবাদ-সম্মেলনটি চোখে পড়বার সাথে সাথেই আমি ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম। যদিও পরে সার্ফিংয়ে খুঁজবার অনিশ্চয়তার কারণেই আমি ডাউনলোড করেছিলাম, তবে পরে ভিডিওটা ডিলিটেড হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কা আমার যে ছিল তা স্বীকার করি। এমনও নয় যে এর আগে বাংলাদেশের কোনো বাহিনির কোনো সংবাদ-সম্মেলনের ভিডিও আমি ডাউনলোড করে রেখেছি। কোনো না কোনোভাবে ৩০ মিনিটের দৈর্ঘ্যই আমাকে প্রাথমিক কৌতূহলী করেছিল। সেই সময়ে আমি ভিডিওটা দুবার দেখি। এখন এই রচনাকালেও একাধিকবার দেখি। (এই অংশটিকে গবেষণামনস্ক, গবেষণা-কাতর, গবেষণা-উদ্বিগ্ন, গবেষণা-উল্লসিত এবং গবেষণা-গৌরবান্বিত লোকজন মেথডোলজি হিসেবে যেন পাঠ করেন। বলা বাহুল্য, কী নামে সেইভ করেছিলাম তা ভুলে যাওয়াতে কম্প্যুটারে খুঁজতে আমার সার্ফিংয়ের চেয়ে কম কষ্ট হয়নি। আমি অনুচ্চারিত কথা, যদি থেকে থাকে, বুঝবার জন্য বারবার দেখেছি।) এটা ঠিকই যে, র্যাবের কর্মকর্তাবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা সরকার কাউকেই দায়ী করেননি। এমনকি ছাত্রলীগকে দায় দিতেও কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং, একাধিকবার বলেছিলেন যে প্রধান আসামীর কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’র কথা জানা যায় না, যাকে পড়তে হবে তিনি ছাত্রলীগ করেন না এই দায়মুক্তি হিসেবে। কিন্তু সম্মেলনটিতে একটা প্রচেষ্টা ছিল যাতে মাদক ব্যবসার সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের অন্তত একটা খণ্ডচিত্র প্রকাশ পায়। সেই নেটওয়ার্কের কারক কারা হতে পারেন তা সম্মেলকরা উচ্চারণ করেননি, কিন্তু শ্রোতার অনুমানের কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। এমনকি ‘অনৈতিক’ বা ‘এই ধরনের’ কাজ ‘হয়ে থাকে’ উল্লেখ করে সম্মেলকেরা ইশারা করছিলেন যৌননিগ্রহ একটা নৈমিত্তিক বিষয় ক্যাম্পাসগুলোতে। এগুলো বলবার সময় ‘আমার কথা নয়, আসামীর কথা’ হিসেবেও একাধিকবার ডিসক্লেইমার দেবার সতর্কতা প্রধান সম্মেলকের ছিল। কোন বর্গ নিগৃহীত হয়ে থাকেন সে বিষয়ে কোনোরকম দিকনির্দেশনা তাঁরা এড়িয়ে গেছেন। আর আশা করেছেন ‘নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন’ নিজের মতো সব বের করবে। বোঝাই যাচ্ছে, এই সম্মেলনটি প্রধান আসামীকে একদফা জিজ্ঞাসাবাদের পরের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ধরনের কিছু ‘বের’ করেনি। ভীষণ রকমের নার্ভাস আমসত্ত্ব মুখে কদিন কাটিয়েছিলেন তাঁরা। একেবারেই ‘পার্টিসিপ্যান্ট ওবসার্ভেশন’ থেকে বলছি। এর দিন ১২ পরে, বের করেছিলেন আন্দোলনকারী দুই শিক্ষার্থীনেতাকে, বঙ্গবন্ধুর ছবি মোছার অভিযোগে।[৩] এই দুজন বামপন্থী ছাত্রনেতা আন্দোলনের মুখ্য চালিকাশক্তির অংশ ছিলেন। যা বলেনি, এমনকি বলবার ইশারাও করেনি, সেগুলোকে ‘রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনস’ করবার সামর্থ্য পাঠকের/শ্রোতার থাকলে ভাল হয়। তবে আমার মতো নিশ্চয়ই কেউ কেউ আছেন যাঁদের এসব প্রেস-কনফারেন্সের আবশ্যকতা নেই। ক্যাম্পাসগুলোতে কী চলে আসছিল, জাহাঙ্গীরনগরে কী চলছিল, তার একটা আন্দাজ করবার মতো ধীশক্তি, পর্যবেক্ষণগুণ এবং সরকার ও ছাত্রলীগের প্রতি আনুগত্যহীনতা সবই মজুত আছে (এবং ছিল)।
০৬ ডিসেম্বর ২০২২: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরের ‘বড়ভাই মেইনটেইন’ করবার বিষয়ে উষ্মাপ্রকাশ।[৪] এই তারিখটার একটা নির্দিষ্ট পূর্বসূত্রও আছে। ১৮ নভেম্বর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের একটা দপ্তর উপ-কমিটির সভায় তিনি এই কথাটা আরেকবার বলেছিলেন। সেবার বরং আরেকটু খোলাসা করেই তিনি লিঙ্গ-মাত্রাটি হাজির করেছিলেন। সেখানে ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় নারীরা যে বড় গলায় বলেন ‘আমি অমুক ভাইকে মেইনটেইন করি’ সেটাই তাঁর উষ্মার ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের মেয়েদের ইঙ্গিত করছিলেন। হয়তো পার্টি অফিসের মধ্যে বলে অধিক খোলতাই করেছেন। ফলে ৬ ডিসেম্বরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সট্যুটের সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যটিকে দেখতে হবে আগের দিনের বলা বিষয়বস্তুর পুনরুচ্চারণ হিসেবে। কিন্তু তারও আগে, সেপ্টেম্বর মাসে, ইডেন কলেজের খোদ ছাত্রলীগেরই কিছু নেতা কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটা অভিযোগ আনেন–সিটবাণিজ্য, চাঁদাবাজি, এবং সাধারণ ছাত্রীদের চাপ দিয়ে ‘অনৈতিক’ কাজে’ বাধ্য করা।[৫] পাঠকমাত্রই জানেন এখানে ‘অনৈতিক’ শব্দটাকে পাঠ করতে হবে যৌনকাজ হিসেবে। ইডেন কলেজের প্রশাসন, ক্রমাগত আন্দোলনের চাপের মুখে, একটা তদন্ত কমিটি করতেও বাধ্য হন। তাঁরা ‘তদন্ত’ করে জানান যে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার ‘সত্যতা’ পাওয়া যায়নি।[৬] ২০২২ সালের ইডেন কলেজ প্রশাসন যে এই সিদ্ধান্তে আসবেন তা তদন্তের আগেই সকলের আন্দাজ করতে পারার কথা। ইডেন কলেজে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেও ইডেন কলেজকে একমাত্র উৎপত্তিস্থল হিসেবে না দেখে দেখা দরকার অন্যতম উপসর্গস্থল হিসেবে। ফলত, ওবায়দুল কাদেরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মন্তব্য কমবেশি আগের মাসগুলোতে বেনাকাব কিছু ঘটনার উপর ‘দায়িত্বপালনসুলভ আলোকপাত’ হিসেবে।
‘মিডিয়া-কভার’ হিসেবে দেখলে, আমার মূল্যায়নটি হয়তো বিশেষ দুর্বল ঠেকবে যে এটা তিনটার মধ্যে সবচেয়ে কম চর্চিত হয়েছে। কারণ, পাঠক এখন গুগল করেও অনেকগুলো সংবাদ বের করে ফেলতে পারবেন। বেশি পারবেন ০৬ ডিসেম্বরের কাদের মন্তব্য নিয়ে। অনেকগুলো পত্রিকাই তাঁর বক্তব্যের ‘মেইনটেইন’ অংশটাকেই শিরোনাম বানিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত কম পাবেন ১৮ নভেম্বরের পার্টি অফিসে করা মন্তব্যের সংবাদ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে কম চর্চিত হয়েছে বলতে আমি বোঝাচ্ছি জনাব কাদেরের এই বাক্যমালা বলবার অন্তর্নিহিত অর্থকে যেভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় খোলাসা করবার দরকার ছিল তা সংবাদমাধ্যম তরফে করা হয়নি। যে চাপেই হোক, ওবায়দুল কাদের যতটুকু বলেছেন ততটুকুকে ‘প্যানডোরার বাক্স’ হিসেবে না-দেখার সুযোগ ছিল না। তার আগের মাসগুলোতে ইডেন কলেজের প্রকাশ্য অভিযোগ, এবং সেইসূত্রে জন-আলাপে গুজগুজ ধরনের চাপা-অভিযোগ বাতাসে ঘুরছিল। ফলে সংবাদমাধ্যমের খোলাসা করবার পর্যাপ্ত কারণ ও পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সংবাদমাধ্যমগুলোর উপর বেশুমার চাপ ছিল তা অবশ্যই মনে রাখছি। কিন্তু এই আলোচনাটার উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যমকে অভিযোগ করা বা দায়মোচন দেয়া কোনোটাই নয়। একটা পরিস্থিতির পর্যালোচনা হিসেবে অবশ্যই দাবি করছি আমি যে, কাদেরের সম্মেলনে উল্লেখের পর একটা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সংবাদমাধ্যম পালন করেছে। বরং, যে হৈচৈ দানা বেঁধে উঠছিল আগের মাসগুলোতে, সেটার সমাধি দিয়ে দেওয়া হয় খোদ কাদেরের বক্তব্যটির একটা লঘু পরিবেশনার মাধ্যমে। সেখানে এমনকি ‘মেইনটেইন’ কথাটার লিঙ্গমাত্রাকে বিচার করবার দায়িত্বও নেওয়া হয়নি। এটা উভপক্ষেই একটা উইন-উইন ব্যবস্থাপনা। আওয়ামী সরকার আগের বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান লৈঙ্গিক নিগ্রহের চাপা-গুঞ্জন এবং , বিশেষত আগের মাসগুলোতে প্রকাশ্য লিঙ্গনিগ্রহের অভিযোগকে পার্টির সেক্রেটারির মুখে-বলিয়ে একটা মৃদু কবুলিয়তনামা বানাল। আর সংবাদমাধ্যম সেটাকে নিছক শিরোনামেই যথাসম্ভব ধ্যাবসা আকারে হাজির করে গভীর অনুসন্ধানের রাস্তা পরিত্যাগ করবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপ্রদান করল। রাজনীতি-বিশ্লেষকরাও কমবেশি নিজ-নিজ কাজে ফেরৎ গেছেন। তাঁদের মুখস্থ বিশ্লেষকের চাকরিতে।
ভুক্তভোগী নারী, উত্থানপর্বের নারী
২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনেও ব্যাপকহারে ছাত্রলীগের কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। আরও বিশেষে, ব্যাপকহারে নারী ছাত্রলীগ কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। উপরন্তু, কোটা আন্দোলনে নিছক কোটাসংক্রান্ত সংক্ষোভই পুঞ্জীভূত হয়নি। সেখানে নানান ধরনের নিগ্রহ থেকে জন্মানো সংক্ষোভ জড়ো হয়েছিল। সেটা আর কেউ না জানলেও আওয়ামী হেডকোয়ার্টার স্পষ্টভাবে জানত। কিন্তু এগুলো এমন প্রসঙ্গ যে প্রমাণ করা যাবে না। ফলে ধরে নেওয়া যায়, আমার বলতে ইচ্ছা করল বলে বললাম। হাউশ মেটানো আরকি! এই প্রসঙ্গে বিশদে যাবার আগে আমি আরও একটা বিষয়ে, একাধিক জায়গায় বলা সত্ত্বেও, আপনাদের চোখে বা মনে না-পড়তে পারে এই আশঙ্কায়, আবারও বলতে ইচ্ছুক। আওয়ামী লীগের হেড কোয়ার্টার চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আন্দোলনকারীদের আপত্তি যেভাবেই হাজির/পরিবেশন করে থাকুক না কেন, আন্দোলনকারীরা যতটা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন যা করেননি তা সত্ত্বেও, আন্দোলনকারীদের যতটা আপত্তি ছিল ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে, তার থেকে অনেক বেশি সমস্যা হচ্ছিল এই ৩০ শতাংশের স্থানীয় অনুবাদ নিয়ে। আপনাদের কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ বা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটর হতে হবে না এটা জানতে যে এই ৩০ শতাংশ সোজাসাপ্টা বেচাবাট্টা হচ্ছিল।[৭] এই বেচাবাট্টা ননক্যাডার সরকারী চাকরিতে চরম আকার ধারণ করেছিল। আর বলা বাহুল্য যে, বেচাবাট্টার এই নেক্সাসটা স্থানীয় আওয়ামী ক্যাডারদের (এটা একটা যন্ত্রণা যে ক্যাডার মানে সম্পূর্ণ দুইটা জিনিস) সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ছিল।
ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের বড় অংশের রাজনৈতিক জীবনযাপন নিয়ে আমি আকস্মিকভাবে ভাবতে বসিনি। এটার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গবেষণা-কাতর সহকর্মী বন্ধুদের জন্য জানাতে চাই যে, গবেষণা পদ্ধতিতে আমি ফেইল করতে পারি। তবে তাঁরা যদি আমাকে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করেন তাহলে আমিও কুঁতেমুতে বলব যে আমার পদ্ধতি গুণগত দীর্ঘমেয়াদী বা কোয়ালিটেটিভ লংগিচুডিনাল; কিংবা আমার পদ্ধতিকে আমি ঠেলেঠুলে উপাত্ত ত্রিভূজীকরণ বা ডেটা ট্রায়াংগুলেশন নামে চালাব। এমনকি সবচেয়ে আরামে বলব সোশ্যাল বা রিচুয়্যাল ড্রামা পদ্ধতি হিসেবে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমার প্রচুর সংলাপ হয় ছাত্রলীগের নারীদের অনেকের সাথে। প্রধান মাধ্যম হিসেবে সাইবার যোগাযোগই ছিল অবলম্বন। কিন্তু আজকের রচনায় তাঁদেরকে ‘উত্তরদাতা’ বা রেস্পন্ডেন্ট মর্যাদায় পর্যবসন করব না; এমনকি ছদ্মনামেও। সেটা নিছক এই কারণে নয় যে, আমি অনুমতি নিইনি। মুখ্য কারণ, আমার পদ্ধতিতে এটা একটা টাইমবাউন্ড গবেষণাই নয় যেখানে প্রচলিত বিধিমালা বা মানদণ্ড কাজ করতে পারে। ফলে ওটা আমার রাস্তা হবে না। তবে এই বিষয়বস্তুতে আমার কৌতূহলের আকস্মিকতা নেই দাবি করেছি যেহেতু, আমি অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের দুইটা তৎপরতার বিষয়ে পাঠককে জানান দেব। প্রথমটা হলো, ২০১৪ নির্বাচনের পরপরই ছাত্রলীগে নারী কর্মী বাড়ানোর জন্য জোর-তৎপরতা। বিপণনের দুনিয়ায় এর নাম ‘এগ্রেসিভ মার্কেটিং’ বা ‘এগ্রেসিভ ক্যাম্পেইন’। বিপুল হারে নারী দলে সংযোজন একটা কেন্দ্রীয় উদ্যোগ হিসেবে পাঠ করবার কারণ পাই আমি। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, ২০১৩ সাল থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (NSI: National Security Intelligence) বাহিনিতে বিপুল পরিমাণে নিয়োগদান। আগ্রহীরা জানেন যে এই দপ্তরটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নবায়ন করা হয় যাতে আরও শিথিলশর্তে বা শিথিলবিধিতে এই নিয়োগগুলো দেয়া যায়।[৮] অন্যান্য পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় নারীদের নিযুক্তি লক্ষ্য করবার মতো বেশি ছিল। অবশ্যই নির্ভর করে যে কে কে লক্ষ্য করছেন। আমার উত্থাপিত দুইটা তৎপরতা যা আমাকে কৌতূহলী করেছে তার প্রথমটা কালের বিচারে ঘটেছে পরে, আর দ্বিতীয়টা ঘটেছে আগে। তবে আমি কাল উল্টে লিখবার কিছু সুবিধা পেয়েছি। এর মধ্যে একটা সংসদ নির্বাচন ঘটে গেছে বলে। অধিকন্তু, ম্যানিপ্যুলেটিভ নির্বাচন ঘটেছে সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে; এবং অতি-অবশ্যই ২০১৩ সালে শাহবাগ উত্থানের বিষয়টাকে আওয়ামী হেডকোয়ার্টার নারীকর্মী রিক্রুটের সময়ে বিবেচনায় রেখেছে চিন্তা করে। আজকে সাংস্কৃতিক-রাজনীতিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কিছু পক্ষ যতই ‘শাহবাগী’ পদটিকে জেনেরিক এবং অটুট-আওয়ামীমনস্ক পক্ষ হিসেবে দেখান না কেন, আওয়ামী হেডকোয়ার্টার এবং রাষ্ট্রপরিচালনার অক্ষশক্তি/নেক্সাস[৯] শাহবাগের জমায়েতকে যথেষ্ট অনুগত ভেবে কর্মপরিকল্পনা শুরু করেনি। এই দুটো তৎপরতা ঘটেছে যথেষ্ট আগে; দুটো ঘটনাকেই দেখা চলে পর্যাপ্ত লিঙ্গসচেতনতা হিসেবে; দুটোই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর তখনকার নারীকেন্দ্রিক ঢাকঢোলের সাথে মানানসই ছিল–এসব সত্ত্বেও আমি দেখতে শুরু করি রাজনীতিতে লিঙ্গ-ম্যানেজমেন্ট কৌশল হিসেবে। সেটা আমার জন্য একটা অনায়াস কৌতূহল সৃষ্টি করতে পেরেছিল। ফলে উত্তরকালে আমি ম্যানেজমেন্টের পরিধি বুঝতে গিয়েই সেসব নিগ্রহ আন্দাজ (ও পাঠ) করতে শুরু যা নিয়ে এই অংশটি ব্যাপৃত। বলা বাহুল্য যে, ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসবার ঢের আগেই আমার এই উপলব্ধি তৈরি হয়।
২০২২ সালে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের একাংশের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপন সকল অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অবশ্যই চমকে যাবার মতো ছিল। তবে এটাকে আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখার ভুল করা যাবে না। এই অভিযোগ বহুদিনের প্রস্তুতির একটা বহিঃপ্রকাশ। আমার প্রস্তাব হবে, এটাকে নিছক ইডেন কলেজের বিষয় হিসেবে দেখাও ত্রুটিপূর্ণ। ইডেন কলেজ তামাম বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ছাত্রলীগের কমিটির মধ্যকার কিংবা সমর্থক পর্যায়ের ‘একদা-এম্বিশাস’ নারীদের বড় একটা অংশের স্মারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইডেনের সেই ছাত্রলীগের নেত্রীবৃন্দ নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে, নিজেদের নিরাপত্তাকে বাজি রেখেছিলেন। আর তার প্রস্তুতি তাঁরাও নিচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। যাঁরা আরও গভীরে এসব অনুসন্ধান চালাবেন, তাঁরা অন্তত ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের কাল পর্যন্ত এই মানসিক প্রস্তুতির সূচনাবিন্দু খুঁজে পেতে পারবেন। ভোঁতামাথার পাঠক যাতে এরকম একটা অংক কষতে না বসেন যে ২০১৮র ইডেন ছাত্রীরা তো ২০২২-এ আর কলেজে নেই, সেই সতর্কতাতে বলি যে, ক্যাম্পাসগুলোর সামাজিক অভিব্যক্তি বা প্রক্রিয়া এরকম সরল সেশন-মেপে হয় না। এটা একটা নিরন্তর প্রবহমান এলাকা। অন্য যে অভিযোগগুলো তোলা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। সংশ্লিষ্ট বলতে আপাতত পত্রিকামাধ্যমের পাঠক এবং বহুমুখী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী বোঝাচ্ছি। পণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যসেবনকারীদের কথা আলাপে আনছি না আপাতত। সিটবাণিজ্য, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি বিষয়ে কমবেশি সকলেরই প্রস্তুতি ছিল। কিছুক্ষণ আগে চমকে-যাবার-মতো বলছিলাম এই অভিযোগ-উত্থাপনকে। ‘অনৈতিক কাজে বাধ্য করা’ তথা যৌননিগ্রহের অভিযোগটাকেও ঠিক ‘কেউ জানত না’ হিসেবে দেখা চলবে না। বরং, একটা কানাঘুষা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং আরও বিশেষে ছাত্রলীগের ছাত্রীকর্মীদের মধ্যে চলছিল অনেকদিন ধরেই। তারপরও, এই ধরনের প্রায় প্রশ্নাতীত ক্ষমতাকাঠামোর সামনে মারাত্মক রাজনৈতিক ও জীবন ঝুঁকি নিয়ে হাজির করবার একটা নাটকীয় নিস্তব্ধতা তৈরি হয়েছিল। আমার বিবেচনায়, উত্থাপনকারীদের দিক থেকে এটা ছিল এস্পার-ওস্পার একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ‘চাল’ পদটা ব্যবহার করলাম না এর সাথে অবধারিত নেতিবাচক দ্যোতনা সম্পর্কিত থাকবার কারণে। তবে দীর্ঘমেয়াদী, অন্তত কয়েক বছরের–যেমনটা বলছিলাম অন্তত ২০১৮ পর্যন্ত ছাত্রলীগের ছাত্রীদের এই প্রস্তুতিকে শনাক্ত করা যাবে–রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রদবদলের একটা আকাঙ্ক্ষাকে পাঠ করতে চাইলে একে ‘চাল’ বলা সম্ভব। খুবই উচ্চমূল্য চাল। টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট পরিভাষাতে যেটাকে বলা হয় ‘হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ডিং’।
সম্ভবত, উত্থাপনকারীদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। তাঁরা আর কোনো উপায়ে তাঁদের আপত্তি প্রকাশ করতে পারছিলেন না। সম্ভবত, তাঁরা ভাবছিলেন যদি এই হাইভোল্টেজ অভিযোগ চারপাশ নাড়া দিয়ে ফেলে তাহলে এভাবেই কেবল একটা বিহিত হতে পারে। মাত্র মাস দেড়েক পরেই, কাউন্সিলে ওবায়দুল কাদেরের একটা মাত্র ধমকভঙ্গির উচ্চারণের মধ্যেই সমস্ত যৌননিগ্রহ প্রসঙ্গের নিষ্পত্তি ও যবনিকাপাত হবার মাধ্যমে উত্থাপনকারী ছাত্রলীগের ছাত্রীদের সেই সম্ভাব্য আশঙ্কা অমূলক ছিল না যে সেটাই প্রমাণ হলো। ফলে, আমাদের অনুমান করে নিতে পারলে ভাল, যাঁরা বুঝবার চেষ্টা করেছেন বা করবেন তাঁরা তো অনুমানের বেশিই পারবেন যে, কোটাবিরোধী আন্দোলন আবার দানা বাঁধবার পরেই বিপুল সংখ্যক ছাত্রলীগের ছাত্রীরা হলে হলে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, কলেজে কলেজে দ্রুততার সাথে প্রতিরোধী স্রোতে শামিল হয়েছিলেন। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ঘটেছে সেরকমই। এই পর্যালোচনায় লিঙ্গপ্রশ্নে ওবায়দুল কাদেরকে কীভাবে বিবেচনা করা দরকার তা নিয়ে আমি একেবারেই ভাবনা দিইনি। মনে হয়নি যে আমার ভাবতে বসার কিছু আছে। পাঠকদের কেউ অতি-উৎসুক হয়ে পড়লে, নিজ পছন্দের নিষ্ঠাবান কোনো আওয়ামী কর্মীর সাথেই বরং আলোচনা করে নেবেন।
পৌরুষ-সংহতি বা নারীবিদ্বেষী মহাঐক্য
২০২৪ আগস্টের পর সাইবার আওয়ামী লীগ কর্মী/নেতাদের বিলাপ আর হুংকার আজকের আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক। আবার পুরোটা নয়, দুইটা দিক থেকে সম্পর্কিত। প্রথমটা হলো, ‘বিদেশী শক্তির ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বটা প্রধানত এঁদের সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো উত্থানকেই তাদের কৃতকর্ম ও প্রজেক্ট হিসেবে দেখানোর বাহাদুরি এই থিসিসটাতে মদদ দিয়েছে মাত্র। এখন আওয়ামী অনুসারী নয় এমন বহু মানুষেই এই থিসিসের অনুসারী। কোনো একটা উত্থানে নানান পক্ষ নানান স্বার্থ নিয়ে থাকেন, এবং মওকামতো বিকশিত হন এই সাধারণ জ্ঞানের থেকে এই ইঞ্জিনিয়ারিং তত্ত্বটা ভিন্ন। এই তত্ত্বে উত্থানটাকে একটা গাণিতিক ফর্মুলার মতো কল্পনা করা হয়। পাঠকের মনে পড়বে, ০৫ আগস্টের পর জয় প্রথম সাইবার-আত্মপ্রকাশেই জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের ভুল শুধরে তাঁরা রাজনীতি করবেন এরকম অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন। প্রথম সপ্তাহে ওটাকেই আওয়ামী লীগের স্বর ধরে নিতে হবে। তবে খুব দ্রুত, মোটামুটি ১৫ আগস্টের মধ্যেই, এই স্বর পরিহার করে ‘১০০-ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বে আওয়ামী লীগ বা এর হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ প্রবেশ করে।[১০] এবং, এরপর আর কখনো স্বরবদল করে না। দ্বিতীয় যেভাবে এই নেতৃ-কর্মীবৃন্দের হুংকার সম্পর্কিত তা পৌরুষ বা ম্যাস্কুলিনিটির, নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনির পাটাতনের অটুট-অখণ্ড সৈনিক হিসেবে। এখানে অটুট-অখণ্ড বলবার মাধ্যমে কেবল তাঁদের নিজেদের পৌরুষসংহতিই বোঝাইনি, বরং ২০২৪ উত্থানপর্বের বিজয়ী কয়েকটা পক্ষের সাথেও এই প্রশ্নে তাঁদের সংহত-অটুটভাব বোঝাচ্ছি। সিপিগ্যাংয়ের উদ্ভব ও বিকাশে মনোযোগ দিলে এই সংহতির জমিন বিষয়ে আমার বক্তব্য অনুধাবন সহজ হবে। বুঝবার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত আর নারীদের মধ্যে সিপিগ্যাংয়ের টার্গেটকরণ কৌশলের তুলনা যদি করেন তাহলে সহজেই সম্ভব। নারী বলতে এমনকি নন-আওয়ামী সেক্যুলার নারীও।
জন-আলাপে অনেককেই বিস্মিত হতে দেখেছি, এখনও দেখি। তাঁরা বুঝে পান না যে শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভাতে বিশেষ কিছু মন্ত্রীর সংযোজন হয়েছিল কেন। আমি আবার বুঝে পাই না, বিজ্ঞ মানুষজনও অবুঝ হন কীভাবে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে নানাবিধ কম্বিনেশনের মন্ত্রীসভা হয়েছিল তা তো সকলেই জানেন। যদি সেগুলোতে মনোযোগ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যায় যে একটা পর্যায়ে, বিশেষত ২০১৮ নির্বাচনের পর থেকে, সেখানে দুইটা কেন্দ্রীয় পলিসি কাজ করেছে। বণিক-সমরতন্ত্রের অলিগ্যার্কি থেকে নিয়োগদান এবং সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের ‘বন্ধু’ তালিকা থেকে নিয়োগদান। এখানে প্রথমটা এতটাই সাধারণ বোধবুদ্ধির বিষয় যে তা নিয়ে বিশদে আলোচনা না করলেও চলে। কেবল, যদি কেউ আপত্তি করে আমলাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অংশটাকে বিবেচনা করিনি ধরে নেন, তাঁকে বলবার আছে যে অলিগ্যার্কি শব্দটা ব্যবহার করেছি সকলের অংশগ্রহণে কোর নিউক্লিয়াসটাই বোঝাতে। বণিক-সমরতন্ত্র খোদ একটা যথাসম্ভব জাঁদরেল বর্গ বটে। দ্বিতীয় প্রবণতাটিও লক্ষ্য করবার মত। করেছেনও লোকজন। হয়তো বলবার সময় ঠিক ওভাবেই যুক্তিসজ্জা করেন না। অনেক লক্ষণ আছে যার থেকে মনে করা যেতে পারে যে শেখ হাসিনা নিজক্ষমতাবলয় প্রায় আমৃত্যু সুরক্ষিত মনে করবার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জয়ের জন্য অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক একটা মন্ত্রীসভার দিকে ধীরে ধীরে রওনা হচ্ছিলেন। এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অবধারিতভাবে উপেক্ষিত হতে থাকেন বর্ষীয়ান নিবেদিতপ্রাণ পাকাপোক্ত সাংসদ/পার্লামেন্টারিয়ান ও ঘাঘু নেতৃবৃন্দ। একদমই ধারাবাহিকভাবে। এর অন্যদিকটা আরও সূক্ষ্ম। ধারাবাহিকভাবেই পৌরুষভারাক্রান্ত গাদাগাদা মন্ত্রী হতে থাকেন। তবে তাঁদের অফিসিয়াল ক্যাটেগরি দাঁড়ায় ‘তরুণ নেতৃবৃন্দ’। এঁদের সামগ্রিক লিঙ্গদর্শন বা যৌনজীবনের খোঁজ নেবার জন্য আমরা অতি সাধারণ মানুষ। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের কীর্তি জনদরবারে হাজির হবার কারণে তাঁর নামটা সকলের মনে থাকতে পারে, কিন্তু শান্ত মাথার কোনো বিশ্লেষক নিশ্চয়ই সংখ্যাটা একেই সীমিত রেখে ভাবেন না।
ছাত্রলীগের, আওয়ামী লীগের নারীদের বড় বড় অংশ বিভিন্ন কলেজে-ক্যাম্পাসে ২০২৪-এর জুলাইয়েই পার্টি-আনুগত্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এখানে পার্টি-আনুগত্যকে দেখতে হবে স্ট্যাটাস-কো’র মধ্যকার পুরুষ নেতাদের চক্রের প্রতি নিরুপায় আনুগত্য হিসেবে। এই প্রত্যাহার বুঝবার জন্য সার্ভে করে আগাতে পারবেন না। এটা উপলব্ধির জন্য খুবই শান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদী নানাবিধ লক্ষণকে পুনর্তদন্ত করতে হবে আপনাদের। এমনকি অনেক বছর ধরে মনোযোগ অতীতে না দিয়ে থাকলে আজকে আমার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও বুঝে উঠতে না পারেন। সাধারণ ছাত্রীরা, মফস্বলের সাধারণ নারীরা, কিংবা কলেজে-ক্যাম্পাসে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ করতে-থাকা নারীদের ভূমিকা তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী’ সাধারণ ছাত্রী ও নেতৃবৃন্দের অবস্থানবদল বিশাল অনুঘটকের কাজ করেছে। কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই মীমাংসায় আসতে পারেন যে, নারীদের এই ঐক্য আপৎকালীন যেমন, শক্তিশালী লিঙ্গবন্ধনও বটে।
সমাপনী অনুচ্ছেদে আমি যা বলব তা বিদ্যাজগতে স্পেকুলেটিভ (বা আন্দাজে বলা) হিসেবে মহানিন্দিত। বিদ্যাজগত থেকে ডিডাক্টিভ-হারমিউনেটিক ধারাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিতে বিশাল কারখানা প্রস্তুত। আমার সহকর্মীরাও মানানসইভাবে প্রস্তুত। তা থাকুন। আমার আগের অনুচ্ছেদগুলোকেও এই গম্ভীরমুখো গবেষকবৃন্দ বিশেষ পাশ করতে দিতে না চাইতে পারেন। তাই আলাদা করে দুশ্চিন্তা করছি না। আমার বক্তব্য এই নয় যে, ০৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর পৌরুষসংহতির পুনর্জাগরণের জন্য এসব নারীরা প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন অন্তত এই কারণেও যে আগের ১০-১২ বছর ধরে দফায় দফায় নাগরিক পরিমণ্ডলে তাঁরা পাল্টা-প্রতিরোধ করেছিলেন, এবং বানানো-জমিন হারিয়েছেন। বড় মাপে এই অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়েছে ২০১৩’র শাহবাগ উত্থানোত্তর কালে, ২০১৮’র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরের কালে। কিন্তু তারপরও উত্থানপর্বের অধিনায়কদের কাছ থেকে এত দ্রুত লিঙ্গপ্রশ্নের প্রতি অবজ্ঞার জন্য নারীরা প্রস্তুত ছিলেন বলে আমি মনে করি না। কীভাবে ২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি লিঙ্গপ্রশ্নে আকাট-সাবেক মডেল অনুসরণ করেছে, এমনকি ক্ষেত্রে বিশেষে থিওক্রেটিক শাসনশক্তির সাথে আপোষের মাধ্যমে আরও কঠোর মডেল অনুসরণ করেছে তা সম্পূর্ণ আরেকটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয় হতে হবে। যাঁরা ভাবছেন, এনসিপির অগ্রগামী নারীরা জিনিসটা আগেভাগে বোঝেননি, তাঁদের সাথেও সহমত হবার সম্ভাবনা আমার কম। তাঁরা ন্যূনতম আলামতেই বুঝেছিলেন; তবে একটা সদ্যবদলকৃত পরিস্থিতিতে নিজেদের লিঙ্গরাজনীতির লেভারেজ খুঁজতে তাঁদের মনোযোগী হতে হয়েছিল। চতুষ্পার্শ্বে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার বিস্তর নজিরের মধ্যে সতর্কতামূলক কৈফিয়ৎ দেয়াই ভাল যে, যৌননিগ্রহ আর লিঙ্গবৈষম্যকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা চলবে না। একথা ঠিকই যে, আজকের আলোচনায় ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মধ্যকার উত্থাপিত যৌননিগ্রহের অভিযোগটিকে কেন্দ্রে রেখেছিলাম। সেটা বৃহত্তর লিঙ্গবৈষম্যের একটা উৎকট অংশ মাত্র। পক্ষান্তরে, শেষের অনুচ্ছেদে বলেছি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে লিঙ্গবৈষম্যের কোনো অবসান তো হয়ই নাই, বরং ক্ষেত্রেবিশেষে থিওক্রেটিক ইনডক্ট্রিনেশন কঠোর হয়েছে। আমার সাধারণ প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে, ছাত্রলীগের অগণিত নারীকর্মীর প্রারম্ভিক বিদ্রোহকে উধাও করে দেবার মাধ্যমেই এই পৌরুষসংহতির সূচনা ঘটেছিল।
টীকা:
১। এই ঘটনার সাইবার পদচিহ্ন খুব কম। সম্ভবত, কিছু পত্রিকা আন্দোলনের ওই পর্যায়ে কার্যত একটা ‘মিডিয়া-কভারেজ’মূলক সংবাদ এড়িয়ে গেছে। কিছু ‘মুখ্য’ পত্রিকা হয়তো ২০২৪-আগস্টের পরে নানাবিধ চাপে অনলাইন থেকে এরকম ছাত্রলীগের প্রমোশনাল খবর সরিয়ে থাকতে পারে। মানে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না। ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দ যে উপস্থিত ছিলেন, অন্তত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেই তথ্য দিচ্ছে আরও কম সংবাদমাধ্যম। সব মিলে দুটো অন্তত খবরের লিংক দিচ্ছি:
https://khaborerkagoj.com/politics/822913
https://www.dhakatimes24.com/2024/07/29/360532
২। এটার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনেক সুলভ, এখনও। তাও অন্তত দুই দফার খবর। ০৪ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার আসামী ধরবার পর। দ্বিতীবার র্যাবকর্তৃক অপর দুজন আসামী ধরা পড়বার পর, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। এই দিনেরই কার্যক্রম অসরাচর দৈর্ঘ্যের ও রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনের র্যাব সংবাদ সম্মেলন। একটা দৈবচয়নকৃত খবর:
৮। যা বুঝলাম ২০১৩-তে প্রথমবারের মতো “জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা ২০১৩” নামে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা প্রণীত হয়, এনএসআইয়ের জন্য। এর আগে ১৯৭৯ সালের “বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পরামর্শকরণ) প্রবিধিমালা, ১৯৭৯,” “প্রেষণ প্রবিধান ও সার্ভিস রুলস,” এবং ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রপতির বিশেষ নির্বাহী আদেশের আওতাভুক্ত “বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ ও অ্যাডহক নিয়োগ বিধি” দিয়ে নিয়োগগুলো পরিচালিত হতো। ২০১৩র বিধানে সুস্পষ্টভাবে এটাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আওতাভুক্ত করা হয়; মোটামুটি ৪৫টা বর্গে নিয়োগের বিধান রাখা হয়, একদম ক্লিনার সুইপারের মতো নিম্নস্তরের চাকরিগুলো সমেত। এর মধ্যে আমার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক হচ্ছে ৬ষ্ঠ ক্রমে থাকা সহকারী পরিচালক পদটি। এখানে শতকরা ২৫ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে, এবং বাকি ৭৫ ভাগ সরাসরি নিয়োগের বন্দোবস্ত রাখা হয়। এই বদলটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩তে প্রণীত হবার সাথে সাথেই প্রায় ২০১৪তে একটা সংশোধনী আসে। আপাত অগুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই সংশোধনীতেই আওয়ামী শাসনযন্ত্রের তদানীন্তন কোটানীতির সাথে মানানসই করে গড়ে তোলা হয়। নারীদের সম্পৃক্তি বাড়ানোর জন্যও কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইত্যাদি। ২০২২-এ আরেকটা সংশোধনী আসে যাতে সম্ভবত প্রযুক্তিতে কিছু গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আমার আন্দাজ হলো, এটুআই ইত্যাদির সাথে পেঁচায়ে-পুঁচায়ে কিছু করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এগুলোতে সময় দিলেই আরও বোঝা সম্ভব। আপাতত কারো কৌতূহল থাকলে, জ্যান্ত আছে বিধায়, ২০১৩র গেজেটখানা দেখে নিতে পারেন।
৯। অধুনা, মুখ্যত সাইবারালোচনা থেকে উদ্ভূত ও বিকশিত, ‘ডিপস্টেট’ পদটা দিয়ে যা বোঝানো হয় তাও বলতে পারতাম, তবে অধুনা এই শব্দটা প্রায় মিলিটারির সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাতে আমার অশান্তিই কেবল যে হয় তা নয়, চরম আপত্তি আছে, আমার জন্য ‘ডিপস্টেট’ বরং অক্ষশক্তি/নেক্সাসের দ্যোতনা বেশি বহন করে। মিলিটারির দায়মোচন ঘটিয়ে একটা ৯০-দশকের সিভিলসমাজের ভার সিন্দাবাদের ভূতের মতো বহন করলাম বৃদ্ধ বয়সাবধি। এখন আবার ‘মিলিটারি মিলিটারি’ জিকির তুলে অবধারিত ‘সিভিল’ মার্কা মানুষদের সাথে এদের অলিগ্যার্কের অর্থহ্রাস করবার বৌদ্ধিক অপরাধ করতে আমি রাজি নই।
১০। আওয়ামী লীগে হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ ইত্যাদি এখন কমবেশি একাকার, অটুট, অভিন্ন। তৃণমূল আওয়ামী লীগকর্মী কিংবা নিষ্ঠাবান আওয়ামী কর্মীদের কণ্ঠস্বর শ্রুত নয় একটুও। তাঁদের বিদঘুটে রকমের জীবনলড়াইও আলোচিত নয়, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের হেডকোয়ার্টারের কাছেও উপেক্ষিত বটে। অন্তত আমি তাই উপলব্ধি করি। একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় বলি বরং। যদিও সজীব জয়ের নিজের দিক থেকে প্রয়োজন ছিল না হয়তো, বা তিনি প্রয়োজন অনুভব করেননি, তবুও তিনি প্রথম ‘হুংকার’ মুড গ্রহণ করলে, তাঁর ইউট্যুব লিংকে আমি তাঁদেরকে রাজনৈতিক পরামর্শ দেবার প্রস্তাব করেছিলাম। সেটা আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে, ২০২৪ সালে। আমার তরফে এটা বিনামজুরির প্রস্তাবই ছিল, কিন্তু তিনি হয়তো দেখেননি।
[অনূদিত প্রবন্ধটি এমা গোল্ডম্যানের Anarchism and Other Essays গ্রন্থটি থেকে নেয়া হয়েছে। এটিই এমা গোল্পম্যানের প্রথম প্রকাশিত বই। বইয়ের প্রবন্ধগুলো প্রথমে বক্তৃতা আকারে দেয়া হয়, Mother Earth নামক জার্নালের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। মূল ইংরেজি লেখাটি “The Tragedy of Woman’s Emancipation” শিরোনামে। অরাজের জন লেখাটি অনুবাদ করেছেন তন্বী তরুণীমা চৈতী। – সম্পাদক]
একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে আমি আলোচনা শুরু করছি—আমার মতে শ্রেণী, জাতি কিংবা নারী এবং পুরুষ অধিকারের নামে কৃত্রিম বিভক্তি রেখা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো মানবজাতির পুর্ণাঙ্গ গল্পটি বলে না। এসব বিভাজনের ঊর্ধ্বে আছে এক অভিন্ন ভিত্তি, যা আমাদের সকলকে একীভূত করে—এমনটাই আমার বিশ্বাস।
এই বিশ্বাসের মাধ্যমে কোনোপ্রকার শান্তিচুক্তির প্রস্তাব উত্থাপনের অভিপ্রায় আমার নেই। আজকের সমাজ স্বার্থের সংঘাত আর বৈষম্যের বেড়াজালে জর্জরিত। তবে এই বৈরিতা চিরস্থায়ী নয়। অর্থনৈতিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্মিত নতুন সমাজব্যবস্থায় এসব বিভেদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত মানুষের উপরিগত অভিন্নতা কিংবা ব্যক্তির স্বকীয়তা মুছে ফেলা (superficial equalization of human beings) নয়। নিজস্বতা না খুইয়ে সকলের সাথে একাত্বতাবোধ করা, সবার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিড়ম্বনার মোকাবেলা দ্রুততার সাথে করা প্রয়োজন। কেননা এই জটিলতার সমাধা হলেই সমাজ এবং ব্যক্তি, নারী এবং পুরুষ, গণতন্ত্রবাদী এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা বা true individuality-র চর্চাকারীরা একত্রিত হতে পারবে। উপরিউক্ত সমস্যার সমাধানেই বিরোধ আর বিবাদের নিষ্পত্তি নিহিত। আমাদের লক্ষ্য সকলকে ক্ষমা করা নয়; আমাদের লক্ষ্য একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাদাম দে স্তালের (Madame de Staël) উদ্ধৃতি ‘সবকিছু বোঝার অর্থ সবকিছু ক্ষমা করা’–এর সাথে একমত নই। উদ্ধৃতিটি আমার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক শোনায়। পুরো বিষয়টির ভেতর একপ্রকার কপট অহমিকা প্রকাশ পায়—ক্ষমাকারী যেনো নিজের আত্মম্ভরিতা জাহির করতে ইচ্ছুক। প্রকৃতপক্ষে, আরেকজন ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থে বোঝাটাই যথেষ্ট। আমার এই বিশ্বাস নারী মুক্তি এবং সকল নারীর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির আংশিক প্রতিনিধিত্ব করে।
মুক্তি নারীকে মানুষ হিসেবে যথার্থ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। নারীরা যা বলতে এবং করতে চায়—তার সবটাই সে করতে পারবে। বাঁধার সকলপ্রকার কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে পরবে; শতাব্দীপ্রাচীন বশ্যতা আর দাস্যত্বের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে উন্মুক্ত হবে স্বাধীনতার পথ। বস্তুত তাঁর পূর্ণ স্বাধিকার নিশ্চিত হবে।
আর এটিই ছিলো নারীমুক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। তবে এই আন্দোলনের বাস্তবিক অর্জন (এখন পর্যন্ত) নারীর বিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এসব আন্দোলন নারীর সব আনন্দ এবং পরিপূর্ণতার উৎস কেড়ে নিয়েছে। নামেমাত্র অধিকার প্রাপ্তি আধুনিক নারীকে পরিণত করেছে কৃত্রিম সত্ত্বায়। তাদের দেখলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরাসি আর্বোরিকালচার (arboriculture) চর্চা; প্রত্যেকে যেনো পরিশীলিত উদ্যানের অদ্ভুত কায়দায় প্যাঁচানো পিরামিড বা চাকা আকৃতির গাছ। কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা পরে যায় স্বকীয়তা। আমাদের চারপাশে কৃত্রিমতার ধারক ও বাহক এমন নারীর অভাব নেই। কথাটি তথাকথিত বৌদ্ধিক পরিধির ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।
নারীর মুক্তি আর সমতা। আহা! সেসময়ের মহৎ ও সাহসী কিছু ব্যক্তির মুখে উচ্চারিত এসব কথা আমাদের মনে কী আশাই না জাগিয়েছিলো! নারী স্বাধিকারের সূর্যের পূর্ণ গৌরবে উদিত হওয়ার কথা ছিল, আমাদের উদ্ভাসিত করার কথা ছিলো। নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারপ্রাপ্তির এই লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বহু নারীপুরুষ তাদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলো। অজ্ঞতা আর কুসংস্কারকে তারা মোকাবেলা করেছিলো দৃঢ়তা আর সাহসের সাথে।
স্বাধীনতার এই লক্ষ্যে আমিও বিশ্বাস রাখি। কিন্তু আজকের দিনের নারী মুক্তি সম্পর্কিত বোঝাপড়া এবং এর চর্চা সেই মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সময়ের নারীরা এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে—প্রকৃত অর্থে স্বাধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত স্বাধীনতার আধুনিক ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত করা। পুরো বিষয়টি আপাতবিরোধী শোনালেও এটাই বাস্তবতা।
তথাকথিত এই মুক্তি থেকে নারীর অর্জন কী? গুটিকয়েক রাজ্যে ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ। কিন্তু তাতে কি হিতাকাঙ্ক্ষীদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের একাংশও বাস্তবায়িত হয়েছে? মোটেই না। অনেকের কথা শুনলে মনে হয় সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতির প্রাদুর্ভাবকে স্বীকার করতে তারা অপারগ। বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই যথাযথ সময়। দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদের নৈতিকতার অভাবের (laxity of morals) ফলাফল নয়; সমস্যাটির একটি বস্তুগত ভিত্তি রয়েছে। রাজনীতি মূলত ব্যবসা এবং শিল্প (industrial) জগতের প্রতিচ্ছবি। আর এই জগত তার কার্যক্রম চালায় ‘যত দেবে তার চেয়ে বেশি নাও’, ‘ব্যয়কৃত অর্থের সর্বোচ্চ ভোগ করো’, ‘এক অপরাধীই অন্য অপরাধীর দোষ আড়াল করতে পারে’ – এর মতো মন্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। শুধুমাত্র ভোটাধিকার দিয়েই নারী রাজনীতির এই কলুষতা দূর করতে পারবে—এমন ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।
আর্টওয়ার্ক: ফিয়ার সূত্র: জ্যাঁ কুইক
নারীর স্বাধিকার পুরুষের সাথে তার অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ নারী তার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পেশা ও কর্মজীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে নারীর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার প্রতিপালন (upbringing)। বেড়ে ওঠার সময় শারীরিক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির শিক্ষা তোলা থাকে ছেলেদের জন্য। মেয়েরা এই শিক্ষা বঞ্চিত। ফলত কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নারীরা প্রায়শই হিমশিম খায়। পুরুষ অধ্যুষিত কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপ হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। খুব অল্পসংখ্যক নারীই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলী—যত বর্ণাঢ্য পেশা হোক না কেন, একজন নারী কখনোই তার পুরুষ সহকর্মীর সমান মর্যাদা বা পারিশ্রমিক পান না। আর যে গুটিকয়েক নারীর কাছে সেই পরম আরাধ্য সাফল্য ধরা দেয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কিছুই আর তাদের জীবনে অবশিষ্ট থাকে না। বিপুলসংখ্যক এসব কর্মজীবী নারীদের কাছে আমার প্রশ্ন—ঘরের বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে এসে কারখানা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আপনাদের ঠিক কতটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে? সারাদিন নিদারুণ পরিশ্রমের পর অধিকাংশ নারীর কাঁধে এসে পরে ঘর সামলানোর দায়িত্ব। দিনশেষে ঘর নারীর জন্য আর সুখের আলোয় থাকে না, পরিণত হয় শীতল, অগোছালো, আর বিষণ্ণ এক অঙ্গনে। মহান স্বাধীনতা, আহা! কাউন্টারের পেছনে কিংবা সেলাই মেশিন বা টাইপরাইটারে সামনে কাজ করতে করতে শ্রান্ত নারী বিয়ের প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বাবা মায়ের আগল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী যতটা উন্মুখ, ঠিক ততটাই উন্মুখ কারখানার যাঁতাকলে পিষ্ট একজন যুবতী। জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু অর্থ ব্যতীত তথাকথিত স্বাধীনতা এমন কোনো প্রণোদনা সরবরাহ করে না যে একজন নারী এর জন্য সবকিছু ত্যাগ করবে। সর্বোপরি, অতি সমাদৃত এই স্বাধীনতা নারীর নিজের, প্রেমের এবং মাতৃত্বের সত্ত্বা বিলীন করে ফেলার এক ধীর প্রক্রিয়া।
তথাপি একজন কায়িক নারী শ্রমিকের জীবন পেশাগতভাবে যেকোনো ‘সম্ভ্রান্ত’ শিক্ষিকা কিংবা নারী চিকিৎসক, আইনজীবী আর প্রকৌশলীর চাইতে অনেক বেশি মানবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। বাইরে পরিশীলিত জীবন বজায় রাখলেও রিক্ততা আর শীতলতা এসব অভিজাত নারীর দৈনন্দিন সঙ্গী।
স্বাধীনতার আধুনিক ধারণাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ; প্রকৃতপক্ষে এগুলো নারীদের বেঁধে ফেলার ফাঁদ ছাড়া কিছুই না। অনেক পেশাজীবী নারীরা মনে করেন নিজের চেয়ে নিচু সামাজিক মর্যাদার কাউকে বিয়ে করা, প্রেম কিংবা মাতৃত্বের ‘বাঁধনে’ জড়ানো তাদের স্বাধীনতা এবং পেশাজীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সার্বক্ষণিক এই ভীতি আধুনিক স্বাধীন নারীদের একপ্রকার ব্রহ্মচর্য/ কুমারীত্ব পালনে বাধ্য করে। জীবনের অনেক গভীর অভিজ্ঞতা, হৃদয়ভাঙ্গন, আর অনিন্দ্য সুখের দর্শক হয়েই তার জীবন পার হয়ে যায়; সেগুলো উপভোগ করার সুযোগ আর তার হয়ে ওঠে না।
নারীমুক্তির বর্তমান ধারক ও বাহকেরা স্বাধীনতার মর্মার্থ সম্পূর্ণরূপে অনুধাবনে ব্যর্থ। নারীর জন্য উপলব্ধ সীমাহীন ভালোবাসা আর তীব্র আনন্দের স্থান সমসাময়িক নারীমুক্তির ধারণায় অনুপস্থিত।
স্বনির্ভর বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীদের জীবন ঘটনাবহুল নয়; এই জীবন আবর্তিত হয় একটি ছোটো পরিধিকে কেন্দ্র করে। আর এটাই তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি। সমকালীন নারীরা বিশ্বসংসার এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন—এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই সচেতনতার দরুন এসময়ের নারীরা জীবনের নির্যাস খুঁজে পেতে আকুল। প্রাণশক্তি জাগিয়ে তোলা এবং জীবনের সাথে গভীরতর সংযোগ স্থাপনকারী এই নির্যাসের ধরা পাওয়ার মতো আধ্যাত্মিক গভীরতা তার নেই; সে একজন পেশাজীবী কলের পুতুল (professional automatons) মাত্র।
এরূপ পরিস্থিতিই যে এসময়ের বাস্তবতা হবে—এমনটা অনুধাবন করা কঠিন কিছু না। বিশেষত ‘নারী পুরুষের অধস্তন’ –এর মতো মান্ধাতার ধারণা দ্বারা রূপায়িত আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে বিষয়টি বোঝা খুবই সহজ। পুরোনো হলেও সমাজ এরকম নারীবিদ্বেষী ধারণা সযত্নে ধারণ করে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক স্বাধীন, আধুনিক নারীও এসব বস্তাপচা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা প্রতিটি আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয় র্যাডিকাল ধারণায় বিশ্বাসী/দীক্ষিত কিছু মানুষ। রাজপথের পরিবর্তনকামী এসব ব্যক্তিরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এতটা র্যাডিকাল না। যেকোনো সাধারণ সংকীর্ণমনা মানুষের (average Philistine) মতোই তারা সম্ভ্রান্ত হওয়ার ভনিতা করে দিনাতিপাত করে। বিরোধী পক্ষের অনুমোদন তাদের পরম আরাধ্য। এমন অনেক সমাজতন্ত্রী আর নৈরাজ্যবাদীদের কথা আমরা জানি যারা ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণকে চুরি মানলেও নিজেদের হিস্যার এক পয়সাও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন।
এই একই সংকীর্ণমনা মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে নারীমুক্তির আন্দোলনে। ট্যাবলয়েড সাংবাদিক আর দুর্বলচিত্তের লেখকেরা স্বাধীনচেতা নারীর এমন এক চরিত্র রচনা করেছেন যা ছাপোষা ব্যক্তি আর তাদের সঙ্গীদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নারীদের বিতর্কিত বিদ্রোহী হিসেবে উপস্থাপন করতো গণমাধ্যমগুলো; আন্দোলনরত প্রত্যেক নারীই যেনো আলোচিত/সমালোচিত লেখিকা জর্জ সান্ড (George Sand)। কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি ভীত হতেন না। নারীপুরুষের মধ্যকার ‘আদর্শ’ সম্পর্কের ধারণাকেও খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না তিনি। মোটকথা, নারীর স্বাধীনতা চিত্রায়িত হয় কাম আর পাপে পূর্ণ সমাজ বিচ্ছিন্ন বেপরোয়া জীবনের কামনা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই এরকম উপস্থাপন আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। গম্ভীর আর রসবোধহীন এই নেতারা এসব ভ্রান্ত দাবিগুলো উপেক্ষা না করে আলিঙ্গন করেন; তাদের সংগ্রাম যে উল্লিখিত চিত্রায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত—সকল বিষয়টি বোঝাতে তারা উঠেপড়ে লাগেন।
‘পুরুষের হুকুমের দাস হয়ে থাকা নারী সত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে’—এই যুক্তিকে কেন্দ্র করে নারী আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। তবে বর্তমানের কথা ভিন্ন। নারীরা এখন অনেকটাই মুক্ত এবং স্বাধীন (অন্তত আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন)। সমাজ থেকে কলুষতা দূর করায় নারীর সক্ষমতা প্রমাণ করা সমসাময়িক নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে, নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল ভেঙে ফেললেও নতুন নতুন আগল সৃষ্টি করেছে। স্বাধিকারের এই সংগ্রাম এমন কোনো শক্তিশালী নারীর প্রজন্ম তৈরি করতে পারেনি যারা প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতা সামাল দিতে পারবে। সঙ্কীর্ণ ও গোঁড়া (Puritanical) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত স্বাধীনতাকামী নারীদের অনুভূতির জগতে পুরুষের কোনো স্থান নেই। তাদের এই বিশ্বদর্শন পুরুষকে দেখে অপ্রয়োজনীয় এবং অসহনীয় সত্তা হিসেবে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো কেবল বাবা হিসেবে পুরুষের ভূমিকা। সেটাও সম্পূর্ণ জৈবিক কারণে। আশার কথা এই যে, অতি কঠোর বিশুদ্ধতাবাদীরাও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। নারী স্বাধীনতার সাথে পুরুষের স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মুক্ত নতুন বিশ্বে ভূমিষ্ঠ শিশুর মায়ের ভালবাসা আর যত্নের যতখানি প্রয়োজন, ঠিক ততটাই দরকার বাবার উপস্থিতি। বিষয়টি মুক্তিকামী নারীরা অনেকসময় অগ্রাহ্য করেন। আধুনিক নারীপুরুষের জীবনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মানব সম্পর্কের এই সংকীর্ণ ধারণা।
আর্টওয়ার্ক: ওমেন ই এ আর্মচেয়ার শিল্পী: পাবলো পিকাসো সূত্র: আর্টসি
প্রায় পনেরো বছর আগে নরওয়েজীয় লেখিকা লরা মার্হোম (Laura Marholm) Woman, a Character Study নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তিনি নারী অধিকারের প্রচলিত ধারণার অগভীরতা ও সঙ্কীর্ণতা চিহ্নিত করা অগ্রদূতদের একজন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার প্রথাগত ধারণার সীমাবদ্ধতা নারীর অন্তর্জগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মার্হোমের লেখায় উঠে আসে অভিনেত্রী এলিওনোরা ডুসে (Eleonora Duse), গণিতবিদ সোনিয়া কোভালেভস্কি (Sonya Kovalevskaia), অকালে প্রাণ হারানো শিল্পী এবং কবি মারি বাশকির্টসেফের (Marie Bashkirtseff) মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ও প্রতিভাবান নারীর জীবন পর্যালোচনা। সাফল্যের জন্য তাদের সকলকেই বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো। অসাধারণ মেধাবী এবং সফল হলেও ব্যক্তিজীবনে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন নিসঙ্গ। জীবনরস এবং ব্যক্তিগত পূর্ণতা তাদের হাতে ধরা দেয়নি। একাকীত্ব আর অস্থিরতা ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। এই অসাধারণ চারিত্রিক পর্যালোচনাটি আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে—নারীর মেধা ও মননের বিকাশের সাথে তাঁর সংবেদনশীল জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যস্তানুপাতিক। পুরুষেরা নারীকে একজন সঙ্গী, কমরেড ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেনা; নারীর জৈবিক পরিচিতিই তাদের কাছে মুখ্য।
নিজেকে নারীর চেয়ে ঊর্ধ্বতন মনে করা দাম্ভিক পুরুষের পক্ষে লরা মার্হোমের বর্ণিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীদের বরদাস্ত করা অসম্ভব। ঠিক একইভাবে, নারী ব্যক্তিসত্ত্বাকে উপেক্ষা করে কেবল তার বিচক্ষণতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে—এমন পুরুষকে একজন নারীর পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
সাধারণত প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গভীর সংবেদনশীলতাকে প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তথাপি আধুনিক নারীর বাস্তবতা ভিন্ন—বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক গভীরতা জীবনকে উদ্ভাসিত করার বদলে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষ প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। আমৃত্যু একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞার (till death doth part) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় বিবাহব্যবস্থা নারীর উপর পুরুষ কর্তৃত্বকে সমর্থন করে। নিজের পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে স্বামীর আজ্ঞাবহ হয়ে নারী জীবন কাটাবে—এমনটাই আশা করা হয়। এটি বারংবার প্রমাণিত হয় যে, দাম্পত্যের চিরাচরিত সম্পর্কে নারীর ভূমিকা স্বামীর দাস এবং তাঁর সন্তানের ধারক হওয়াতেই সীমাবদ্ধ। এতো ত্রুটি আর অন্যায্যতা সত্ত্বেও বহু মুক্তমনা নারী অবিবাহিত থাকার চাইতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বেশি আগ্রহী; কেননা সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার বেড়াজালে একজন অবিবাহিত নারীর জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের বোঝা বহন করা সহজ নয়।
আধুনিক নারীদের আচরণের এমন অসঙ্গতির একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—স্বাধীনতার মর্মার্থ তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারেনি। অফিসের বস কিংবা স্বামীর মতো বাহ্যিক নিপীড়কের আগল ভেঙে ফেললেই মুক্তি অর্জিত হবে—এমনটাই তাদের ধারণা ছিলো। নিপীড়নের এই দেয়াল ভাঙতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবন এবং মননে সামাজিক ও নৈতিক রীতিনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করে। বহিস্থ নিপীড়কের সাথে সমঝোতা হলেও নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদাকে তারা ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়। ফলত তারা যেমন নারীমুক্তি আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে, ঠিক তেমনি প্রৌঢ়া এবং বৃদ্ধ নারীদের সাথে কোনোপ্রকার বাকবিতণ্ডা ছাড়াই সময় কাটাতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ নিপীড়কেরা একজন নারীর চারপাশের মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি—মা, বাবা, ভাই বা আত্মীয়রা কী বলবে? পাড়া প্রতিবেশী বা সমাজ কী বলবে? নৈতিকতার ঝান্ডাধারী, মানবীয় সত্ত্বাকে অবরুদ্ধকারীদের মতামতই বা কেমন হবে? অন্তরস্থ এসব কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সাথে নিজের অবস্থান জানান দিতে না পারলে একজন নারী নিজেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বলতে পারেনা। জীবনসঙ্গী নির্বাচন, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে ব্যক্তিগত অভিরুচি অনুসারে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভেতরই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত। নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা ভালোবাসার তীব্র দাবীকে গ্রাহ্য করার সাহস কতজন নারী দেখাতে পারে?
ফরাসি লেখন জঁ রিব্র্যাক (Jean Reibrach) তাঁর লেখা New Beauty গ্রন্থে একজন আদর্শ মুক্তিকামী নারীর বর্ণনা দেন। এই আদর্শ রূপটি একজন সদয় ও মেধাবী তরুণী চিকিৎসকের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে শিশুযত্ন এবং পুষ্টি বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন; দরিদ্র মায়েদের বিনামূল্যে ওষুধ দেন তিনি। প্রায়শই তিনি পরিচিত এক যুবকের সাথে উন্নত ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের বিষয়ে আলোচনা করেন। সামনের দিনগুলোতে পর্দা আর শতরঞ্জির পরিবর্তে পাথরের মেঝে আর দেয়ালের ব্যবহার কীভাবে জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখবে—সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি। তাঁর পোশাক অত্যন্ত সাদামাটা এবং পেশাদার; বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি কালো কাপড় পরিধান করেন। তরুণীর মুক্তমনা স্বভাব আর বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী যুবকের মনে প্রথমে ধাক্কা দেয়। তবে ধীরে ধীরে চিকিৎসক তরুণীকে বুঝতে শেখেন তিনি। তারপর আচমকা একদিন যুবক বুঝতে পারেন তিনি সেই তরুণী চিকিৎসকের প্রেমে পরেছেন। তারা দুজনেই তরুণ। পোশাকে কাঠিন্য ধরে রাখলেও তরুণীর কালো পোশাকের কলার আর আস্তিনে জায়গা করে নেয় ধবধবে সাদা রঙ। সবাই হয়তো আশা করবেন যে যুবকটি প্রেম নিবেদন করছিলো। কিন্তু প্রেমের বশবর্তী হয়ে নাটকীয় কিছু করার মতো মানুষ সে নয়। নিখুঁত মাধুর্যের অধিকারী তরুণীর সামনে কবিতাপাঠের মাধ্যমে প্রেম নিবেদন সামঞ্জস্যহীন। হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রেমকে যুবক অগ্রাহ্য করে এবং নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে। তরুণীও আত্মসংযমী ও যৌক্তিক; নিজের মনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সে। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় যে, যদি তারা কখনো একে অন্যকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো, তবে যুবকটির জীবন কাটতো কঠিন শীতলতায়। পুরো সম্পর্কটাই হতো শীতল ও নিষ্প্রাণ। স্বাধীনতার নতুন ধারণার ভেতর আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু যে আমি দেখতে বা কল্পনা করতে পারছি না—এটা স্বীকার করতে আমার কুণ্ঠা নেই। আধুনিক শীতল যথার্থতার (correctness) চাইতে পুরনো উন্মত্ত ভালোবাসা আমার বেশি প্রিয়; আমি ভালবাসি প্রেমের গান; আমার ভালো লাগে ডন হুয়ান (Don Juan) আর মাদাম ভেনাসের প্রেমের আখ্যান; আধুনিক ভালবাসার কাঠিন্যের চাইতে জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে পরিবারের অস্বীকার, তা প্রতিবেশীদের রটনা আমার কাছে শ্রেয়। নিঃস্বার্থ আদানপ্রদান না হলে তাকে ভালোবাসা বলা যায়না ; তা কেবল পারস্পরিক লেনদেনের হিসাব রাখার খাতা।
শিল্পী: গাজবিয়া শিরি
আজকের দিনের নারী স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর কৃত্রিম অটলতা ও সংকীর্ণতা। পেশাদারিত্ব আর কঠোর সামাজিক নিয়মনীতি মেনে চলতে গিয়ে নারীদের মন থেকে জীবনরস শুকিয়ে যায়, বিরাজ করে খাঁ খাঁ শূন্যতা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, সন্তানদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজের সত্তার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা সাবেকি মায়েরা হাল ফ্যাশনের মুক্ত নারীদের চাইতে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। মুক্তির সাধকেরা আমাকে মোটেই পছন্দ করেন না। তাদের বিশ্বাসের সাথে একমত না হওয়ার দরুন তারা আমার শাস্তি কামনা করতেন। অগ্রগতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপকারী এসব সমালোচকেরা আমার যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেন। অতীত নিখুঁত—এমনটা আমি কখনোই বলিনি। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে আমাদের দিদিমা ঠাকুমারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি জীবনীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তারা ছিলেন অনুরাগী, তীব্র রসবোধসম্পন্ন। সহজ সুন্দরের প্রতি তারা ছিলেন সহানুভূতিশীল। পেশাদারিত্ব আর কঠোরতা কলেজ আর অফিসগামী আধুনিক নারীদের মন থেকে স্ফূর্ততা শুষে নিয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমি চাই নারীরা তাদের আগের জীবনে ফিরে যাক, নিজেদের জীবনকে রান্নাঘর আর বাগানের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলুক।
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে উদ্যমী অগ্রযাত্রায় আমাদের মুক্তি নিহিত। আমাদের প্রয়োজন পুরনো ঐতিহ্য আর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে অবাধ বিকাশের প্রতি মনোনিবেশ করা। নারীর স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্য অর্জনে নারীমুক্তি আন্দোলনের এখন পর্যন্ত অর্জন অতি সামান্য। তবে এই অর্জন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই আশা করি। ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যালট বক্স কিংবা কোর্টরুম থেকে সত্যিকারের স্বাধীনতা আদায় হয় না; মুক্তির অর্জন শুরু হয় নারীর নিজের সত্তা থেকে। নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ স্বীয় প্রচেষ্টা। ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নারীদের অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতা কেউ কারো হাতে তুলে দেয় না; এর জন্য কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। একজন যতটা শক্তি আর উদ্যমের সাথে লড়াই করবে, সে ঠিক ততটাই স্বাধীনতা পাবে। সুতরাং, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন আবশ্যকীয়। রীতিনীতি, প্রথা আর সংস্কৃতির বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা নারীর অবশ্যকর্তব্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবী তোলা যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। তবে ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালবাসতে পারার অধিকার বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রেয়সী বা মায়ের ভূমিকা নারীকে পুরুষের অধস্তন করে’—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে নারীরা তাদের আংশিক স্বাধীনতায় পূর্ণতা খুঁজে পাবে। স্বাতন্ত্র্য অর্জনের জন্য নারী—পুরুষের দ্বৈততার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।
সংকীর্ণতা বিভক্ত করে, উদারতা ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা একত্রিত হই। তুচ্ছ বিষয়ের ভিড়ে আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যগুলো যেনো হারিয়ে না যায়। মানবসম্পর্কের সম্যক ধারণা লাভ করলে নারী পুরুষের ভেতর ‘কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করলো’ আর ‘কে নিয়ন্ত্রিত হলো’—এই প্রশ্নগুলো আমাদের আর বিচলিত করবে না। একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টার পরিবর্তে আমাদের উচিত সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। ভালবাসার ভেতরেই আমরা খুঁজে পাবো পরিপূর্ণতা। এই পূর্ণতাই আমাদের শূন্যতার অনুভূতি দূর করবে; নারীমুক্তির ট্রাজেডিকে পরিণত করবে অসীম সুখের উৎসে।
আমার নাম জামরাত মেসন এবং আমার একটি যোনি রয়েছে। আমি পূর্ব লন্ডন অ্যাক্টিভিজম কমিউনিটির একজন সক্রিয় সদস্য, কিন্তু আজ আমি কথা বলবো একজন ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামীর জায়গা থেকে। ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটি দ্বারা আদতে একটি বিস্তৃত পরিসরের জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা কোনো না কোনোভাবে তাদের জন্মসনদে লিপিবদ্ধ লিঙ্গপরিচয় হতে ব্যতিক্রমরূপে আত্মপ্রকাশ করে। কাজেই আমি কোনোভাবেই ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের প্রতিনিধি নই। আমি কেবল বলতে পারি একজন ট্রান্সেক্সুয়াল বা রূপান্তরকামী হিসেবে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান জগতটাকে কীভাবে দেখি। আজ সেটাই বলবো আপনাদের।
আমি বেশ সৌভাগ্যবান একজন রূপা। প্রথমত, কারণ আমি এখনও বেঁচে আছি। এবং দ্বিতীয়ত, কারণ আমার একটি পরিবার আছে যারা আমাকে ভালোবাসে। এগুলো এমন আহামরি সৌভাগ্যের ব্যাপার হবার কথা নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে এগুলোই অনেক বড় বিষয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতাই বেশ চমকপ্রদ। সংক্ষেপে বলছি। ৩ বছর বয়সে আমার উচ্চারিত প্রথম বাক্য ছিলো, ‘আমি একজন ছেলে’। ৭ বছর বয়সেও যখন আমি আমার বিশ্বাসে অনড় রইলাম, তখন বাবা-মা আমাকে একজন মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে গেলেন। সেই মনোবিজ্ঞানী রায় দিলেন, আমি খুব সম্ভবত ‘লিঙ্গ-অস্থিরতায়’ ভুগছি। বাবা-মা তখন আমার স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমাকে চুল ছোট রাখার এবং ছেলেদের ইউনিফর্ম পরার অনুমতি আদায় করে দেন। ৮ বছর বয়সে আমাকে লন্ডনের এনএইএসে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয় এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমি তার তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসা নিই। ১২ বছর বয়সে আমি আমার দাদি/নানির আর্থিক সহযোগিতায় আইনতভাবে আমার নাম পরিবর্তন করে একজন ছেলের নাম রাখি। তো মোটামুটিভাবে বলা যায়, আমি ৭-৮ বছর বয়স থেকেই একজন ছেলে বা পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন করে আসছি। তবে আমি দৈহিকভাবে পুরোপুরি একজন নারীর মতই কৈশোরে পদার্পণ এবং বয়ঃসন্ধি যাপন করি, এবং ২১ বছর বয়সে টেস্টোস্টেরন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হই। ২২ বছর বয়সে আমি একটি অস্ত্রোপচার করাই। আমার বয়স এখন ২৪,কাজেই আমি বিগত প্রায় ২ বছর ধরে আমার বর্তমান রূপে আছি।
কিন্তু আমার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র রূপান্তরকামীদের জন্য নিরঙ্কুশ গ্রহণযোগ্যতা প্রার্থনা নয়, অথবা আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিদ্বেষ দূর করাও নয়। আজ আমি সরাসরি ট্রান্সফোবিয়া বা রূপান্তরকামভীতি নিয়ে কথা বলতে চাই, কারণ এটি আমাদের সবাইকেই নানাভাবে প্রভাবিত করছে, এবং আমরা সকলেই এটা দূর করতে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে পারি। একটি সংঘবদ্ধ সমাজ হিসেবে লিঙ্গ প্রশ্নে আমাদের আরও সংবেদনশীল হওয়া আবশ্যক।
গর্ভে আমরা সবাই নারীই থাকি। যারা পুরুষ হিসেবে জন্ম নেয় তারা গর্ভকালীন সময়ে টেস্টোস্টেরোনের প্রভাবে পুরুষে পরিণত হয়। আমাদের ভগাঙ্কুর তখন বিবর্ধিত হয়ে পুংদণ্ডে পরিণত হয়, এবং ভগোষ্ঠ তখন পরিণত হয় অণ্ডকোষে। ইংরেজিতে women শব্দটার উৎপত্তিও men with womb বা womb-man থেকে, যার অর্থাৎ গর্ভ সম্বলিত পুরুষ। সেভাবে দেখতে গেলে, পুরুষেরা হলো বৃহদাকৃতির ভগাঙ্কুর সম্বলিত নারী,কিংবা বৃহদাঙ্গুর। অধিকাংশই একটি যোনি কিংবা পুংদণ্ড নিয়ে মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়, কিন্তু কেউ কেউ এই দুইয়ের মাঝে আটকে থাকে। তাদেরকে ‘আন্ত:লিঙ্গ’ বলা হয়। ছেলে কিংবা মেয়ে হিসেবে জন্ম নেয়ামাত্র আমাদের সাথে বেশ লক্ষণীয় রকমের আলাদা আচরণ করা হয়। যেমন ছেলেদেরকে খেলনা হিসেবে দেওয়া হয় লেগো, আর মেয়েদেরকে পুতুল। (এবং তারপর আবার সমাজে নারী প্রকৌশলীর অভাব নিয়ে হা-হুতাশও করা হয়!) মেয়েদেরকে কোমল হতে এবং নিজেদের অনুভূতির ব্যাপারে কথা বলতে উৎসাহিত করা হয়, অপরদিকে ছেলেদেরকে দেওয়া হয় কঠোরতার পাঠ। বড় হতে গিয়ে প্রতিটি ছেলেমেয়েকে তার নিজের পরিচয় কী, এবং আসল পুরুষ বা আসল নারী কাকে বলে তা নিয়ে অনেক বক্তৃতা শুনতে হয়। আমাদের প্রত্যেককেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব নিয়ে অনেক ভুগতে হয় বা হয়েছে। আমি নিজেকে এই দ্বন্দ্বের একজন চরম পর্যায়ের ভুক্তভোগী মনে করি। আমি নিজেকে পুরুষ মনে করি না, কিন্তু সেইসাথে আমি এটাও জানি যে আমি কোনোভাবেই সম্পূর্ণরূপে একজন নারীও নই। আমার মনে হয় সকল রূপান্তরকামীই এই দ্বন্দ্বের শিকার।
আমাদের সমাজটা নারী ও পুরুষ এই দুই ভাগে বিভক্ত এবং আমি এই দুই দলের কোনোটিতেই পড়ি না। এর ফলে আমি শুধু সভ্য সমাজে নয়, প্রতি পদে পদে, এমনকি কারাগারেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হবো। আমাকে যদি কোনো কারণে জেলে পাঠানো হয়, তাহলে হয় আমাকে একজন পুরুষ হিসেবে নারী সেলে রাখা হবে, কিংবা একজন যোনি সম্বলিত পুরুষ হিসেবে পুরুষ সেলে রাখা হবে, যেখানে আড়ালের কোনো বালাই নেই। আমাকে যদি কোনো কারণে গ্রেপ্তার করে আমার শরীরে তল্লাশি চালানো হয়, তাহলে হয় একজন নারী অথবা একজন পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তা কাজটি সম্পন্ন করবেন। কিন্তু আমি তো নারী-পুরুষ কোনোটিই নই। আমি একজন রূপান্তরকামী। রাষ্ট্রীয় কোনো লিঙ্গ নির্ধারক সনদপত্র নেই যার দ্বারা আমাকে সরকারিভাবে একজন নারী বা পুরুষ হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হবে। কেননা আমি নারী কিংবা পুরুষ কোনোটিই নই, আমি একজন ট্রান্সসেক্সুয়াল। হ্যাঁ, আমাকে একজন পুরুষ হিসেবে পুরুষ সেলে পাঠানো যায়, পুরুষ কর্মকর্তা দ্বারা আমার শরীরে তল্লাশি চালানো যায়, একজন নারীর সাথে আমাকে বিয়েও দেওয়া যায়। কিন্তু আমি তো বিয়ে করতে চাই না। আমি এমন কোনো সমাজে বাস করতে চাই না যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের শরীরে তল্লাশি চালিয়ে একে অপরকে জেলে পুরে দেয়। আমি এমন কোনো লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে চাই না যেখানে আমরা সরকারের কাছে আর্জি জানাবো আমাদের আরও সাবলীলভাবে,আরও কার্যকরভাবে শোষণ করার জন্য। আমি একটা পঁচে যাওয়া সমাজব্যবস্থায় কিঞ্চিৎ সুবিধা পেতে চাই না। আমি পুরো ব্যাপারটাতেই আমূল পরিবর্তন চাই। আমি একটি উন্নততর পৃথিবী বিনির্মাণে সক্রিয় অবদান রাখতে চাই।
শিল্পী: কালকি সুব্রামানিয়াম
ট্রান্স পুরুষ কিংবা রূপান্তরকামী পুরুষদের (মানে আমাদের) বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচার, কুসংস্কার, কিংবা ভ্রান্ত ধারণার একটি হলো যে, আমরা নাকি নিজেদেরকে পুরুষদের মত শক্ত-সমর্থ প্রমাণ করে সমাজে পুরুষের সেসকল সুযোগ-সুবিধা পেতে চাই,যা ভোগ করার অধিকার আমাদের নেই। আমরা নাকি অপর্যাপ্ত, অসম্পূর্ণ। কারণ আমাদের কোনো লিঙ্গ নেই, কিংবা থাকলেও তা কুৎসিত,ক্ষুদ্রাকার কিংবা অকেজো। আমরা বিশাল নিতম্ব এবং অকেজো লিঙ্গ সম্বলিত অপরিপূর্ণ পুরুষ।
অপরদিকে ট্রান্স নারীদের সম্পর্কে প্রচলিত অপবিশ্বাস হলো,তারা নিজেদের আত্মসম্মান হারাচ্ছে। তারা হাস্যকর,কৌতুকের খোরাক। যেচে পড়ে নারী হতে কে-ই বা চাইবে বলুন? শুধু শুধু তারা সমাজে নিজেদের সম্মান একধাপ নিচে নামিয়ে ফেলছে।
মোদ্দাকথা, ট্রান্সফোবিয়া বা রূপান্তরকামভীতির মূলে রয়েছে লিঙ্গবৈষম্য। অনেকে মনে করেন ট্রান্স নারীরা এই পুরুষশাসিত সমাজে নারী হবার যন্ত্রণা জানেন না, কারণ তাদের কখনো লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হতে হয় না। কিন্তু তারা এটা বোঝেন না যে, ট্রান্সফোবিয়াও লিঙ্গবৈষম্যেরই একটা রূপ। আরও শতগুণ বিভৎস্য একটা রূপ!
অনেকে বলেন, আমরা ট্রান্স পুরুষেরা এই লিঙ্গবৈষম্য থেকে বাঁচতেই পুরুষে রূপান্তরিত হই। কিন্তু সত্যিটা হলো, যে ট্রান্সেক্সুয়াল সে লিঙ্গবৈষম্য থেকে বেঁচে যাওয়া তো দূরে থাক বরং লিঙ্গবৈষম্যের এক অতল কূপে নিক্ষিপ্ত হয়। মূদ্রার দুই পিঠ, এবং এর কিনারটাকেও ভালোমত দেখে ফেললে, লিঙ্গবৈষম্যের আসল রূপটা দেখা যায়। তখন এই ব্যাপারে আপনার দৃষ্টি এতটাই সজাগ হয়ে যাবে, যে আপনি সেখানেও লিঙ্গবৈষম্যকে খুঁজে পাবেন যেখানে আর কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। লিঙ্গ বিষয়ে আপনি যত জানবেন,ক্ষমতার প্রবাহকে আপনি তত পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।
লিঙ্গবৈষম্য কিংবা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, মানুষের ব্যতিক্রমী লৈঙ্গিক আচরণের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লিঙ্গবৈষম্য, অর্থাৎ আসল পুরুষ বা আসল নারী না হতে পারার-এই ব্যাপারটা আলোচনায় প্রায় আসেই না বলতে গেলে। কিন্তু এই ব্যাপারটা সমকামভীতির পেছনেও একটি বড় কার্যকারণের ভূমিকা পালন করে। একটি সমকামী ছেলে যার আচার-আচরণ আর দশটা ছেলের মতই পুরুষালি,সে কিন্তু স্কুলে অন্য ছেলেদের দ্বারা বুলিয়িংয়ের শিকার হয় না। কারণ স্কুলের বাচ্চারা তাদের সহপাঠী কার প্রতি আকৃষ্ট তা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। বরং তারা তার আচরণ দেখে বিচার করে। অপরদিকে একটি বিষমকামী ছেলের আচরণ যদি কিছুটা মেয়েলি হয়, সে কিন্তু ঠিকই বন্ধুদের বিদ্রূপের বস্তুতে পরিণত হয়। এবং সেক্ষেত্রে তার সহপাঠীরা তাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য ছক্কা, সমকামী, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে থাকে। আদতে তারা কেবলমাত্র তাদের মেয়েলি আচরণের জন্যই বুলিংয়ের শিকার হয়,কারণ তারা ‘আসল পুরুষ’ এর মত নয়। এটাও কিন্তু লিঙ্গবৈষম্য, কিন্তু আমরা একে সমকামভীতি বা হোমোফোবিয়া বলে থাকি। কিন্তু এতে মুশকিলটা হয় কি, হোমোফোবিয়া হিসেবে ব্যাপারটার মোকাবেলা করতে গেলে এ বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন ভুরি ভুরি সংগঠন পেয়ে যাবেন,যারা আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু সেই ‘মেয়েলি’ আচরণের বিষমকামী ছেলেটাকে সাহায্য করার মত কোনো সংস্থা আছে কি? নেই। তাকে হয়তো বলা হচ্ছে যে সমকামী হওয়াটা দোষের কিছু নয়, যেটা সত্যি কথা। কিন্তু কেউ তাকে এটা বলছে না যে সমকামী না হয়েও একটা ছেলে মেয়েলি হতে পারে, এবং সেটাও দোষের কিছু নয়। আমরা ট্রান্সেক্সুয়ালরা হরদম এধরনের বুলিয়িংয়ের শিকার হই,এবং সেটা হয় আরও বিশ্রী। কিন্তু আমরা একা নই। সেই মেয়েলি স্বভাবের ছেলেটি কিংবা কিঞ্চিৎ পুরুষালি স্বভাবের মেয়েরাও কিন্তু আমাদের মতই এর ভুক্তভোগী।
ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের এই অভিজ্ঞতাগুলো লিঙ্গবৈষম্যের সবচেয়ে মারাত্মক নিদর্শনগুলোর মাঝে অন্যতম। ‘মারাত্মক’ শব্দটা এক্ষেত্রে মোটেও অত্যূক্তি নয়, কারণ ট্রান্সজেন্ডার ডে অফ রিমেম্বারেন্স এর ওয়েবসাইটের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০৯ সালে ১৩০ জন ট্রান্সজেন্ডার মানুষকে কেবলমাত্র ট্রান্সজেন্ডার হবার কারণে হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা যা আমাদের সকলকেই প্রভাবিত করছে এবং আমরা সকলেই এটা মোকাবেলায় অংশ নিতে পারি।
এই ‘আসল পুরুষ’ এবং ‘আসল নারী’র সমগ্র ধারণাটারই উৎপত্তি হয়েছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে। আরও সহজ করে বললে, একটা পরিবারের একজনকে সারা সপ্তাহ কাজ করে মাইনে পেতে হয়, আরেকজনকে সন্তানদের দেখাশোনা করতে হয়, যা করতে গিয়ে তাকে ঘরের কাজ করতে হয় এবং বিনা মাইনেতে বাচ্চাদেরকে মানুষ করতে হয়, এই সমগ্র ব্যবস্থাটার কারণে। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ পরিবারে পুরুষটি সারাদিন অর্থোপার্জনের জন্য কাজ করে, অপরদিকে নারীটি বিনা মাইনেতে বাড়ির কাজ করে। অর্থাৎ, নারীটির এই বিনা মাইনের পরিশ্রমটাই কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রেখেছে। এটা না থাকলে সমস্ত ব্যবস্থাটাই ভেঙ্গে পড়তো। কিন্তু এটাকে লিঙ্গ পরিবর্তন করে, কিংবা পুরুষ এবং নারীর কাজ অদলবদল করে, কিংবা পালা করে করলেও পাল্টানো সম্ভব না। এমনকি আরেকজন নারীকে সামান্য কিছু পয়সা দিয়ে এই কাজগুলো করিয়ে নিলেও এই ব্যবস্থাটায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ এই ব্যবস্থাটা যতদিন চলমান থাকবে, কাউকে না কাউকে বিনা মাইনেতে কাজ করতে হবে। এবং এই অসমতাই আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আমরা ট্রান্সজেন্ডাররা যতই নারী-পুরুষের কাজ ভাগ করে নেয়ার এই অসমতার নগ্ন স্বরূপটাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিই না কেন, কেবলমাত্র কাজের সমতার জন্য দাবী জানানোই এই সমস্যার সমাধান নয়।
শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু
এর সমাধান হিসেবে আমি আবারও আমার আগের কথাটারই পুনরাবৃত্তি করতে চাই। আমাদের একটি সমাজ হিসেবে, একটি সম্প্রদায় হিসেবে লিঙ্গ প্রশ্নে সংবেদনশীল হতে হবে। এক লিঙ্গপরিচয় থেকে আরেকটাতে রূপান্তর বিষয়টা কেবলমাত্র অস্ত্রোপচারেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই পুরো প্রক্রিয়ায় খুব ক্ষুদ্র একটা ভূমিকা পালন করে অস্ত্রোপচার। রূপান্তর ব্যাপারটা মূলত ঘটে থাকে সামাজিকভাবে, কারণ লিঙ্গপরিচয়ের সমগ্র ধারণাটাই সামাজিক একটা ধারণা। আগেই বলেছি,আমি প্রায় ১২ বছর কোনোরকম অস্ত্রোপচার কিংবা হরমোন থেরাপি ছাড়াই একজন পুরুষ হিসেবে জীবনযাপন করেছি। আমি এখন একজন পুরুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারি কারণ লোকে আমাকে পুরুষ হিসেবে জানে এবং সম্বোধন করে। ‘রূপান্তর একটি সামাজিক বিষয়’- এই কথাটা বেশিরভাগ মানুষই বোঝে না। কেউ ট্রান্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে লোকে সেই ব্যক্তির জন্মসূত্রে পাওয়া লিঙ্গপরিচয় অনুযায়ী তার মত পরিবর্তনের চেষ্টা করে। অর্থাৎ, সে পুরুষের শরীরে জন্মে নারী হতে চাইলে তাকে জোর করে পুরুষ বানানোর চেষ্টা করা হয়, আবার সে নারীর শরীরে জন্মে পুরুষ হতে চাইলে তাকে জোর করে নারী বানানো হয়। এক্ষেত্রে তার আচরণ কতটা নারীসুলভ কিংবা পুরুষসুলভ- এই বিষয়টা অনেক বড় ভূমিকা পালন কর। এর ফলে একজন ট্রান্স ব্যক্তিকে ‘মেয়েলি’ কিংবা ‘পুরুষালি’ আচরণ করে তবেই সমাজে সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার অর্জন করতে হয়। এর মানে হলো আমাদের মত ট্রান্স পুরুষেরা কঠোর, পুরুষালি বেকুবের মত আচরণ করি বলেই সবার কাছে সম্মানিত হই। কিন্তু আসলে তো আমাদের সকলেরই উচিৎ প্রত্যেককে তার নিজ নিজ পরিচয়ের জন্য নির্বিশেষে সম্মান করা, যাতে সকলে তাদের নিজের পরিচয়েই স্বাছন্দ্য বোধ করে।
আমরা আমাদের এই প্রাইড মার্চ এবং অ্যক্টিভিজমের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চাই?
কেবলই কি ক্ল্যাপ্টন, স্ট্র্যাটফোর্ড, কিংবা ইস্টহ্যামের মত পূর্ব লন্ডনের অভিজাত এলাকাগুলোয় ‘যেমন খুশি তেমন’ সাজে হেঁটে যাওয়ার, যাকে খুশি তাকে চুমু খাওয়ার স্বাধীনতা? কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষদের মাঝে, যেখানে আমরা আসলে বাস করি, সেখানে আমাদের স্বাধীনতার কী হবে? কবে আমরা আমাদের পরিচয়, প্রেম, লিঙ্গ, এবং শরীর নিয়ে সকলের সামনে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবো, একদল বখাটে কিশোরের হাতে গণপিটুনির শিকার হবার ভয় ছাড়াই? আর আমাদেরকে গণপিটুনি দিতে চাওয়া সেই ‘গণ’- দের কী হবে? তারাও তো আমাদেরই বন্ধু, পরিজন, প্রতিবেশী। সেই কিশোরদের মধ্যে কেউ কি চাইলেই তার প্রিয়তমকে চুমু খেতে পারবে? পারবে তার পছন্দমত ‘মেয়েলি’ পোশাকে সাজতে, সকলের কাছ থেকে বিতাড়িত হবার কিংবা নিজের স্বকীয়তা হারানোর ভয় ছাড়াই?
এগুলো শুনতে সেসকল মধ্যবিত্ত সমকামীদের কাছে লোভনীয় মনে হতেই পারে, যারা ইতমধ্যেই তাদের স্বাধীনতা অর্জন করে ফেলেছে। হ্যাম্পস্টেডের অভিজাত এলাকায় প্রেমিকের হাত ধরে হেঁটে বেড়ানো সেসকল সমকামীদের মনে হতেই পারে, “আমরা তো দিব্যি আছি। কী দরকার ওসব ঝামেলায় জড়ানোর?” তারা চাইতেই পারে হ্যাকনি’র মত হোমফোবিয়া, ট্রান্সফোবিয়া, লিঙ্গবৈষম্যে জর্জরিত স্বল্পশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত এলাকায় থাকা আমাদের মত রূপান্তরকামীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সহযোদ্ধা না হতে। বর্তমানে লন্ডনের প্রাইড আন্দোলনের চেহারা দেখে মনে হয় আমাদের সতীর্থদের মাঝে এই না চাওয়াদের সংখ্যাই বেশি। আর সেকারণেই, ঠিক এই কারণেই, এরকম তৃণমূল পর্যায়ে আন্দোলনটাকে জিইয়ে রাখতে এধরণের কর্মসূচীর আরও বেশি বেশি প্রয়োজন। এবং সর্বক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনটাকে সচল রাখা প্রয়োজন।
মূল লেখার লিংক: https://theanarchistlibrary.org/library/jamrat-mason-i-am-not-a-man-or-a-woman-i-am-a-transexual
অনুবাদকের ভূমিকা: এমা জীবনীভিত্তিক নাটক। এই নাটকের প্রধান চরিত্র এমা গোল্ডম্যান বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমেরিকা আর ইউরোপে অ্যানার্কিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রচারক। জন্ম বর্তমান ১৮৬৯ সালে লিথুনিয়ায় হলেও পরিবারের সাথে ১৮৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান। শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণের ঘটনার পর এমা অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনে আকৃষ্ট হন। বন্ধুত্ব ও ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে আরেক অ্যানার্কিস্ট আলেকজান্ডার বার্কম্যানের সাথে। ‘রেড এমা’ আর ‘বিদ্রোহী নারী’ নামে খ্যাত এমা নারীমুক্তি, মুক্তচিন্তা, মুক্তভালবাসা, বিবাহসম্পর্ক, হোমোসেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি প্রসঙ্গ সামনে এনে আমূল পরিবর্তনবাদী রাজনীতি এবং নারীর স্বার্থ তুলে ধরেছেন। পুঁজিবাদ, সামরিকায়ন, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি ইস্যুতে অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনে জড়িত থাকায় জেল খাটতে হয়েছে কয়েকবার। শেষে আমেরিকা থেকে বহিষ্কার করে রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ৭০ বছর বয়সে কানাডায় তাঁর মৃত্যু হয়। হাওয়ার্ড জিন এমা নাটকে এমা গোল্ডম্যানের বৈচিত্রময় জীবনের এক বড় অংশ তুলে এনেছেন সাহিত্যিক দক্ষতায়। হাওয়ার্ড জিন (১৯২২ – ২০১০) আমেরিকান ইতিহাসবিদ, নাট্যকার, দার্শনিক এবং সমাজচিন্তক। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। স্পেলম্যান কলেজ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। বই লিখেছেন ২০টির অধিক যার মধ্যে অন্যতম আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস। এখানেএমা নাটকের ভূমিকার অংশ বিশেষ প্রকাশিত হলো।
হাওয়ার্ড জিন
মূল ভূমিকা : এমা
আমার মতোই আরেক ইতিহাসবিদ রিচার্ড ড্রেনোনের মাধ্যমে এমা গোল্ডম্যানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় (যদিও ব্যক্তিগত না)। ষাটের দশকের প্রথমদিকে পেনসিলভেনিয়ার এক কনফারেন্সে ড্রেনোনের সাথে আমার পরিচয়। তিনি আমাকে জানান, রেভেল ইন প্যারাডাইস নামে এমা গোল্ডম্যানকে নিয়ে তিনি একটি জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। বাড়িতে ফিরে এসে আমি বইটি পাই এবং পড়ে ফেলি। আমার মুগ্ধতা বাড়তে থাকে আমেরিকার ইতিহাসের সাথে জড়িত এই বিস্ময়কর নারীর প্রতি। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম আমেরিকার ইতিহাসের সংক্রান্ত আমার যাবতীয় কাজে, তা সে স্নাতক কি স্নাতকোত্তর পর্যায়েই হোক না কেন, এমার নামটি কখনো উঠে আসেনি।
এই ধরনের অনেক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছাড়ার পর যে সকল ব্যক্তি ও ঘটনা সাধারণত ট্র্যাডিশনাল ইতিহাস কারিকুলামে কখনই অন্তর্ভুক্ত হয়নি সেগুলো পড়তে শুরু করি। যেমন: মাদার জোনস্, বিগ বিল হেইউড, জন রিড, লুডলো হত্যাযজ্ঞ, লরেন্স টেক্সটাইল ধর্মঘট, হে মার্কেটের ঘটনাবলী এমন আরও অনেক বিষয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্ট, শিল্পপতি, সমরনায়কদেরই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরে নেয়া হয়। শ্রমিকনেতা, বিপ্লবী, সমাজতন্ত্রী, অ্যানার্কিস্টদের উপেক্ষা করা হয়। এমা গোল্ডম্যানও এই উপেক্ষিতদের একজন।
এরপর আমি এমা গোল্ডম্যানের আত্মজীবনী লিভিং মাই লাইফ পড়তে উদ্বুদ্ধ হই। রাশিয়ার অ্যানার্কিস্ট পিটার ক্রপোটকিন ও মিখাইল বাকুনিনের লেখা পড়ি। এভাবে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে অ্যানার্কিজমের ওপর আমার আগ্রহ তৈরি হয়। আমি বুঝতে পারি, এটা একাডেমিক জগতের গতানুগতিক অর্থোডক্স রাজনৈতিক তত্তে¡র বাইরের বিষয়।
১৯৬৪ সালে শরৎকালীন সেশনে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দিয়ে দর্শনের একজন নতুন ফ্যাকাল্টির সাথে পরিচিত হই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেছি শুনে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-আপনার রাজনৈতিক দর্শন কী ?
আমি হালকাভাবে উত্তর দিলাম-অ্যানার্কিজম।
তিনি তীর্যকভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-অসম্ভব।
১৯৭৪ সালে প্যারিসে অধ্যাপনার সময় একবার আমস্টারডাম গিয়ে সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব সোস্যাল হিস্টোরিতে যাই। সেখানে এমা গোল্ডম্যান ও আলেকজান্ডার বার্কম্যানের চিঠিপত্রের এক বিশাল ধনভাণ্ডারের সন্ধান পাই- যেগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁরা আমেরিকা থেকে নির্বাসিত হয়ে ইউরোপে এসে পরস্পরকে লিখেছিলেন। চিঠিগুলো আমার সাধ্যমতো একটা অবিন্যস্ত নোটবইয়ে কপি করি কিন্তু ফেরত আসার পর দেখি রিচার্ড আর আনা মারিয়া ড্রেনোন একই বিষয়ে কাজ করেছেন। এবং তারা নো হোইয়ার এট হোম নামে গোল্ডম্যান-বার্কম্যানের চিঠিপত্রের একটা সংকলন প্রকাশ করেছেন।
যদিও ষাট ও সত্তরের দশকের প্রথম দিকে আমার জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় হয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে-বক্তৃতা দিয়ে, বিক্ষোভে অংশ নিয়ে, জাপান ও ভিয়েতনামে ভ্রমণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় আমেরিকান আগ্রাসনের ব্যাপারে লেখালেখি করে। ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলে এতদিন ধরে যা চাইছিলাম, এমা গোল্ডম্যানের ওপর অবশেষে একটা নাটক লেখার সুযোগ পাই।
এমা নাটকটিতে বাস্তবতার কারণেই গোল্ডম্যানের বৈচিত্র্যময় জীবনের একটা অংশ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ১৮৬৯ সালে লিথুনিয়ার কভনোতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন এটি রাশিয়ার অংশ ছিল। তাঁর স্মৃতিতে দরিদ্র ইহুদি জীবনের দুঃখের স্মৃতি আর সাথে সাথে জীবনকে আনন্দময় করে তোলে এমন ঘটনার দেখা পাওয়া যায়। আবেগপূর্ণ সম্পর্কে জড়ানোর ব্যাপারে তিনি খুব খোলামেলা ছিলেন। তাঁর জীবনের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। একটা ছোট মেয়ে হয়ে তিনি কীভাবে গ্রামের এক যুবকের কাছে বারবার ধরা দিয়েছেন। কোনিংসবার্গে তাঁর ধনী আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে অপেরা দেখার অভিজ্ঞতা বলেছেন। বলেছেন অপেরায় ভার্দির কনসার্ট দেখতে দেখতে হল ভর্তি মানুষের মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার কথা।
তাঁর পরিবার এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন গ্রহণ করে। তাঁরা রোচেস্টার আর নিউইয়র্কের ইহুদি বলয়ে বসবাস করতেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে এমা একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন। তিনি দ্রুততর সময়ের মধ্যে এক যুবককে বিয়ে করে ফেলেন, যার সাথে তাঁর কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না। বিয়েটাকে তিনি ফলপ্রসু করতে ব্যর্থ হন। এমার বাবা ছিলেন অত্যাচারী। তাই অল্প বয়সেই বাবা ও স্বামীর সুবাদে তিনি নারীদের অধীনস্ততার বিষয়টি অবগত হন। আর মাত্র সতেরো বছর বয়সে শিকাগো শহরের শ্রমিকদের দৈনিক আটঘন্টা কাজের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৮৮৬ সালের হে মার্কেট আন্দোলনের ঘটনাবলী এসব আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
এ আন্দোলনের উৎস ছিল ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার কোম্পানির বিরুদ্ধে ধর্মঘট, যেখানে পুলিশ বেশ কয়েকজন ধর্মঘটী শ্রমিককে হত্যা করে। শিকাগোর অ্যানার্কিস্ট আন্দোলন তখন তুঙ্গে। তারা হে মার্কেট স্কয়ারে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। সভাটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু কিছু পুলিশ সভাটি পণ্ড করার চেষ্টা করলে পুলিশের ওপর একটা বোমা ফাটানো হয়। এতে ৬৬ জন পুলিশ আহত হন, যার মধ্যে ৭ জন পরে মারা যান। এতে পুলিশ জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে, ফলে বেশ কয়েকজন মারা যায় আর আহত হয় দুশোর মতো।
সেই বোমাটি কে নিক্ষেপ করেছিল তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি (এটা আজ পর্যন্ত রহস্যই রয়ে গেছে)। কিন্তু পুলিশ শিকাগোতে আটজন অ্যানার্কিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করে। ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার কোম্পানির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে অ্যানার্কিস্টদের প্রচারিত সার্কুলার ‘রিভেঞ্জ’, যা বিচারকদের মতে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়েছে। ফলে ঐ বোমা বিস্ফোরণের দায় অ্যানার্কিস্টদের ওপর চাপিয়ে আটজনকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেয়া হয়।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সাজাপ্রাপ্তদের পক্ষে সারা ইউরোপজুড়েই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ইলিনয়ের সুপ্রিম কোর্টে তাদের আবেদন নাকচ হয়ে গেলে জর্জ বার্নাড শ লেখেন, ‘দুনিয়াকে যদি তার আটজন সদস্যকে হারাতেই হয়, তবে সেই আটজন ইলিনয়ের সুপ্রিম কোর্টের হলেই ভালো।’ তাদের মধ্যে একজন জেল প্রকোষ্ঠে নিজেকে উড়িয়ে দেয়। গর্ভনর জন পিটার আল্টগেল্ট তিনজনকে ক্ষমা করে দেন। (পরে তিনি হাওয়ার্ড ফাস্টের ঐতিহাসিক উপন্যাস দি আমেরিকান-এর একটি চরিত্র হন)। আর চার জনের ফাঁসি কার্যকর হয়।
এ সব ঘটনা তরুণ এমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি রোচেস্টারে তাঁর পরিবার ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে স্বামী, চাকরি ও পরিবার ছেড়ে তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল নতুন শহরে তিনি স্বাধীনভাবে বসবাস ও চলাফেরা করতে পারবেন। সেখানে তিনি একদল তরুণ অ্যানার্কিস্টের সংস্পর্শে আসেন। যাদের মধ্যে অন্যতম আলেকজান্ডার বার্কম্যান। বার্কম্যান নিজেও রাশিয়া থেকে অভিবাসিত হয়ে আমেরিকায় আসেন। নতুন সমাজ গড়ার এক নিবেদিতপ্রাণ পুরুষ ছিলেন তিনি। এমা ও সাশা (বার্কম্যান বন্ধুদের কাছে এই নামে পরিচিত ছিলেন) ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন।
জার্মান বিপ্লবী জোহান মোস্ট। তিনি রাইখস্ট্যাগের (জার্মান সংসদ) সদস্য ছিলেন এক সময়। দীর্ঘদিন জেলে কাটিয়েছেন। অ্যানার্কিজম প্রতিষ্ঠার পক্ষে বক্তৃতার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। এমা ও সাশা দুজনই এই বিপ্লবীর দ্বারা প্রভাবিত হন। মোস্টের সাথে এক পর্যায়ে এমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর ফলে এমা ও সাশার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়।
এমা ম্যানহাটনে একটা কারখানায় চাকরি জোগাড় করে সেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের (অধিকাংশ নারী) সংগঠিত করা শুরু করেন। ১৮৯২ সালে পেনসিলভেনিয়ার হোমস্টিড শহরে জনৈক এন্ড্রু কার্নেগির স্টিল মিলের বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা ধর্মঘটের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মিলগুলোর দায়িত্বে ছিলেন নিষ্ঠুর হেনরি ক্লে ফ্রিক (পরবর্তী কালে তিনি কার্নেগির মতোই একজন জনহিতৈষী)। ধর্মঘট দমনের জন্য ফ্রিক পিঙ্কারটন ডিটেকটিভ এজেন্সি ভাড়া করেন। এই এজেন্সি তখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ধর্মঘট দমনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। ধর্মঘটের এক পর্যায়ে তারা রাইফেল ও মেশিনগান দিয়ে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ করে যার ফলে সাত জন শ্রমিক মারা যায়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এমা, সাশা ও আরও কয়েকজন কমরেড প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের এই সাহসী প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে, বৃহৎ শিল্প কলকারখানাগুলোও নিরাপদ নয়। তাঁরা হেনরি ক্লে ফ্রিককে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। সাশা এ কাজ সম্পাদনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং তা একাই। সেজন্য তিনি পিটসবার্গে চলে আসেন। ফ্রিকের অফিসে জোর করে ঢুকে পড়েন। এবং গুলি করতে থাকেন। সাশা ঘাতক হিসেবে নিতান্তই অপটু ছিলেন। তাঁর ছোড়া গুলি ফ্রিককে কেবল আহত করতে সক্ষম হয়। তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর বিচারকার্য অতি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। তাঁর ২২ বছরের নির্বাসন হয় পেনসিলভানিয়ার স্টেট জেলে। জেল জীবনে তাঁর লেখা প্রিজন মেমোয়রস অব এন অ্যানার্কিস্ট একটা ক্লাসিক কারাসাহিত্য।
জেল জীবনে সাশা নানাভাবে কারাপ্রশাসনের আদেশ-নিষেধ অমান্য করতে থাকেন। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাঁকে এবং তাঁর শাস্তিও বেড়ে যায়। কারা কর্তৃপক্ষের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক কয়েদি আত্মহত্যা করে। সাশা নিশ্চিত ছিলেন না শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা। তাঁর এই হতাশার কথা এমা ও তাঁর বন্ধুদের জানান। তাঁরা সবাই মিলে সাশাকে জেল থেকে বের করে আনার এক অবাস্তব পরিকল্পনা করেন। জেলখানার খুব নিকটে একটা বাড়ি ভাড়া করেন তাঁরা। সেখান থেকে একটা টানেল খোঁড়া শুরু করেন যা জেলখানার উঠান পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা করা হয়। একজন কমরেড গর্ত খোঁড়ার শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে পিয়ানো বাজাতেন, যাতে টানেল খোঁড়ার শব্দ শোনা না যায়। কিন্তু টানেল খোঁড়া প্রায় শেষ হয়ে আসার এক পর্যায়ে তা কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে। সাশাকে এর জন্য চরম অত্যাচার করে কারা কর্তৃপক্ষ।
বার্কম্যান জেলে থাকার সময় এমা মানুষকে সংগঠিত করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। ১৮৯৩ সালে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। শহরগুলোতে শতশত শিশু না খেয়ে অসুস্থ হয় পড়ে ও অনেকে মারা যায়। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে এমা ইউনিয়ন স্কয়ারে কর্তৃপক্ষের কাছে আর্জি বা আইনের জন্য অপেক্ষা না করে খাদ্যের দোকান লুট করে খাবার সংগ্রহের আহ্বান জানান প্রতিবাদ সমাবেশে। এটা ছিল অ্যানার্কিস্টদের ‘ডাইরেক্ট একশন’ নীতির অন্যতম দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। এমাকে বক্তৃতা মঞ্চ থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁর ব্ল্যাকওয়েল আইল্যান্ডে দু’বছরের জন্য কারাদণ্ড হয়। কারাগারে এমা নার্সিং ও দাইয়ের কাজ শেখেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর বাকি জীবনে কাজে লেগেছিল। (ই. এল. ডকটোরোর র্যাগটাইম উপন্যাসে ঐ আমলের এক শোর্গালকে এমা চমৎকারভাবে বার্তা দিচ্ছেন এমন বর্ণনা রয়েছে)।
এদিকে সাশা যখন জেলে শাস্তি ভোগ করছিলেন এমা তখন দ্রুত শ্রমিক ও অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক ও বক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন।
১৯০১ সালে লিওন ক্লোগেজ প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলেকে গুলি করে হত্যা করার পর এমাকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়। ভুলবশত পুলিশের সন্দেহ গিয়ে পড়ে এমার ওপর যে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন।
বস্তুত এমা যেমনটি ফ্রিকের ঘটনার সময় মনে করতেন হত্যা অ্যানার্কিজমের জন্য যৌক্তিক কিন্তু তিনি এ সময় থেকে তা আর মনে করতেন না। আবার তিনি ক্লোগেজের শাস্তিরও বিপক্ষে ছিলেন। যেমনটি তাঁর অন্যান্য র্যাডিক্যাল বন্ধুরাও মনে করতেন। তাঁদের যুক্তি হলো হত্যাকাণ্ড অযৌক্তিক হলেও, মানুষকে বুঝতে হবে হত্যাকারীর ক্ষোভের পেছনে যৌক্তিক কারণ থাকে।
ভালোবাসার স্বাধীনতার দর্শনে বিশ্বাসী এমা এই সময়কালে অনেক প্রেমিকের সংস্পর্শে আসেন। যদিও তিনি আলেকজান্ডার বার্কম্যানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অব্যাহত রাখেন। ১৯০৬ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই অব্যাহত থাকে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যৌন সম্পর্কে ভাটা পড়ে। তাঁরা অ্যানার্কিজমের স্বার্থে পরস্পরের কমরেড হিসেবেই থাকেন এবং দু’জন মিলে মাদার আর্থ জার্নাল প্রকাশ করেন।
১৯০৮ সালে শিকাগোতে বক্তৃতা দেয়ার সময় এমা প্রথমবারের মতো আকর্ষণীয় বেন রেইটম্যানের সাক্ষাৎ পান। যার সাথে পরবর্তীকালে এমার জীবনে ঝঞ্চাবিক্ষুব্ধ আবেগের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ডা. বেন রেইটম্যান মেডিকেল স্কুলে কোনোরকমে পড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। তথাকথিত ডাক্তারদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ ছিলেন তিনি, যা ভাবাও যায় না। তাঁর চুল কালো এবং তিনি সুপুরুষ ছিলেন। কেতাদুরস্ত পোশাক পরতেন। শিকাগোতে একটা স্টোরফ্রন্ট ক্লিনিক খোলেন তিনি যেখানে সাধারণত যৌনকর্মী, ভবঘুরে আর দরিদ্ররা চিকিৎসাসেবা নিতে আসত। তিনি গর্ভপাত করাতেন আর এভাবেই চিকিৎসাসেবা ও সমাজকে বিদ্রুপ করতেন।
রেইটম্যানের যৌনক্ষুধা ছিল তীব্র। তিনি এমার সাথে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন। মাত্র কিছুকাল আগেই আবিষ্কৃত তাদের চিঠিপত্র- এযাবৎকাল লেখা সবচেয়ে উষ্ণ ও খোলামেলা চিঠিপত্রের নজির বহন করে। এমার বয়স ছিল ঊনচল্লিশ আর রেইটম্যানের ঊনত্রিশ বছর। কিন্তু তাঁদের এই বয়সের পার্থক্য ভালোবাসায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। লিভিং মাই লাইফ -এমা রেইটম্যানের সাথে সাক্ষাতের বর্ণনা করছেন:
‘ও বিকেলে এলো। যৌন আবেদনময়, চিত্রোপম চেহারার পুরুষ। মাথায় কালো কাউবয় হ্যাট। সিল্কের টাই বাধা, হাতে বড় বেতের ছড়ি-কণ্ঠ গম্ভীর, কমনীয় আর অকৃত্রিম-লম্বা আর সুন্দর গড়নের মাথা যা কোঁকড়ানো কালো চুলে ঢাকা। হয়তো বেশ কিছুদিন ধোয়া হয়নি। চোখ দুটো খয়েরি, বড় এবং স্বপ্নীল। ওর ঠোঁট যখন হেসে ওঠে-সুন্দর দাঁত বের হয়ে আসে: আকর্ষণীয় ও কমনীয়। ও দেখতে সুদর্শন, বুনো। -আমি তার হাতের দিকে তাকিয়ে চোখ ফেরাতে পারতাম না।’[1]
রেইটম্যানের সাথে সাক্ষাতের কিছুদিনের মধ্যে এমা তাঁকে লেখেন, ‘তুমি আমার নারীত্বের কারাদুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছ। জানা বোঝার জগত আর আমার শরীরের আগুন জ্বালানো বসন্তের মাঝে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বললে আমি বসন্তকেই বেছে নিতাম।’[2]
আর্ট: দি স্ট্রাইক আর্টিস্ট: রবার্ট কোয়েহলার
এমা শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য রেইটম্যানের ওপর দ্রুত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রেইটম্যান এমার সাথে সব জায়গাতেই সফরসঙ্গী হতে থাকেন। তাঁর বক্তৃতার ব্যবস্থাপনার কাজ করেন কিন্তু অন্য নারীর প্রতি তার আসক্তি অব্যাহত থাকে। তারপরও এমা রেইটম্যানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেননি। এক পর্যায়ে এমা তাঁকে লেখেন: ‘যদি কখনো আমাদের দু’জনের চিঠিপত্র প্রকাশিত হয় দুনিয়া এই ভেবে হতবুদ্ধি হয়ে যাবে যে, আমি, এমা গোল্ডম্যান, একজন পরাক্রমশালী বিপ্লবী, ডানপিটে যে আইন ও কনভেনশনকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে- সে কিনা ফেনিল সমুদ্রে ডুবে যাওয়া জাহাজের একজন অসহায় নাবিক।’[3]
তারপরও এমা গোল্ডম্যান তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন বক্তৃতা দেওয়া, বিক্ষোভে অংশগ্রহণ আর সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে কখনো বিরত থাকেননি। তিনি নিরলসভাবে সারা দেশের সর্বত্র চষে বেড়িয়েছেন, অসংখ্য মানুষের সামনে বক্তৃতা করেছেন-জন্মনিয়ন্ত্রণ (একজন নারীর তার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত), প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবাহের সমস্যাবলী (ভালোবাসার সাথে বিবাহের কোনো সম্পর্ক নেই), দেশপ্রেম (ধনীলোকের শেষ আশ্রয়স্থল), মুক্ত ভালোবাসা (যদি মুক্তই না হয় তাহলে কীসের ভালোবাসা) এবং স্ট্রিন্ডবার্গ, ইবসেন ও বানার্ড শ এর নাটক।
তিনি বারবার গ্রেফতার হয়েছেন কেবল বক্তৃতা করার অপরাধে। ১৯০৮ সালে শিকাগোতে তাঁকে মঞ্চ থেকে গ্রেফতার করা হয়। শিকাগো ট্রিবিউন এর এক সাংবাদিক এই ডায়লগ লিপিবদ্ধ করেন: ‘এখানে এসে ঝামেলা পাকাবেন ভেবেছেন?’ ক্যাপ্টেন বলেন। ‘ভদ্র ব্যবহার করুন’ এমা গোল্ডম্যান তীক্ষ্ণভাবে উত্তর দিলেন, ‘একজন পুরুষের মতো কথা বলুন, যদিও আপনি একজন পুলিশ।’[4]
১৯০৯ সালে পুলিশ এক মাসে এমার এগারোটি সভা পণ্ড করে দেয়। সান ফ্রান্সিসকোতে দেশপ্রেমের ওপর ৫ হাজার শ্রোতার সামনে তিনি বক্তৃতা করেন যেখানে জনতা পিছু না হটা পর্যন্ত পুলিশকে বাধা দিয়ে আটকে রাখে।[5] সানদিয়াগোতে উত্তেজিত জনতা বেন রেইটম্যানকে অপহরণ করে তাঁকে শহরের বাইরে নিয়ে যায়। নগ্ন করে আলকাতরা ও পালক লাগিয়ে দেয় তাঁর শরীরে। তাঁর পশ্চাৎদেশে আইডব্লিউব্লিউ [ইন্ডাসট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড] চিহ্ন এঁকে দেয়। (তাঁর সাহসের প্রশংসা করতে হয় সাথে সাথে এমারও) এ ঘটনার পরও তাঁরা তৎক্ষণাৎ সানদিয়াগোতে এমার বক্তৃতার জন্য ফেরত আসেন।
পেনসিলভেনিয়ার নিউ কেনসিংটনের এক নারীর সাথে এমার অল্পদিনের যৌন সম্পর্ক এমার যৌন স্বাধীনতার বিষয়টি লক্ষ করা যায়। সেই নারী আলমেদা স্পেরি। যদিও এমার আত্মজীবনীতে কোথাও আলমেদার উল্লেখ নেই, বোস্টন ইউনিভার্র্সিটি লাইব্রেরিতে রক্ষিত এমাকে লেখা আলমেদার অনেকগুলো চিঠি আমি পেয়েছি। আলমেদা একজন অসাধারণ নারী ছিলেন। একজন শ্রমজীবী নারী। যখন তাঁর অর্থের প্রয়োজন হতো তখন তিনি পুরুষদের দেহদান করতেন। থিয়েটার আর অপেরা ভালোবাসতেন তিনি। নিউ কেনসিংটনে তিনি সোস্যালিস্ট গ্রুপ তৈরি করেন।
এমাকে লেখা আলমেদা স্পেরির চিঠিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রণয়ের তীব্র আবেগীয় বহিঃপ্রকাশ, সমাজ সম্পর্কে গভীর সচেতনতা, বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত কোনো নারীর জীবন নিয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, অপেরা, থিয়েটার এবং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা-এর সব কিছুই চিঠিতে পাওয়া যায়। চিঠিগুলো পড়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, যে কোনোভাবে আলমেদার উপস্থিতি আমার নাটকে রাখব-এমনকি তাঁর একটা চিঠির ঘটনার মাধ্যমে হলেও। যে চিঠিটাতে তিনি বেন রেইটম্যানের সাথে তাঁর সাক্ষাতের বর্ণনা করেছেন। অন্য আরেকটি চিঠি থেকে একটি অনুচ্ছেদ তুলে দিচ্ছি: ‘আমি ভাবি, শো দেখার জন্য আমার মতো আর সবাই এমন পাগল কিনা-আমি প্রায় আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলাম, গতবার যখন সারা বার্নহাডার্স্ট এখানে এসেছিলেন, আমার হাতে তখন একদম টাকা-পয়সা ছিল না। অবশেষে ফ্রেড আমাকে এক ডলার দিয়েছিল, তাই সারার অপেরা দেখতে পেরেছিলাম। কী অসাধারণ কণ্ঠ সারার-কী সোনালি আর মধুর কণ্ঠস্বর আর কী চমৎকার উচ্চারণ! আয়নার সামনে আমি তাঁর লা টোসকা অপেরা প্র্যাকটিস করেছি।-এটা কি দারুণ হতো, এমা, যদি সরকার থিয়েটার পরিচালনা করত আর জনগণকে তা বিনে পয়সায় দেখতে দিত-আমি যদি প্রতি রাতে একটা ভালো শো দেখতে যেতে পারতাম তাহলে আমার শরীরের নগ্নতা ঢাকার জন্য কাপড় আর খাবারের জন্য কেবল কাজ করতাম। আমি সবার প্রতি দয়ালু হতাম।’[6]
এমা আর রেইটম্যান ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশ বছর একসাথে কাটিয়েছেন। এই সময়ে মানসিক অশান্তি থাকলেও এমা অসাধারণ রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে গেছেন, যা শেষপর্যন্ত ১৯১৭ সালে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা পর্যন্ত গড়ায়। এ ঘটনা তাঁদের মধ্যে সম্পর্কেরও পরিসমাপ্তি ঘটায়। যদিও অনেকক্ষেত্রেই ব্যক্তিগতভাবে বেশ সাহসের পরিচয় রেইটম্যান দেখিয়েছেন কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা করে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেবার সাহস দেখাননি।
এমা আর বার্কম্যান এতকিছুর পরও একে অপরের সহযোদ্ধা হিসেবে কনসক্রিপশন ও যুদ্ধকে ধিক্কার জানিয়ে আইন অমান্য করেছেন। ফলে তাঁরা দুজনই ১৯১৮ সালে জেলে যান। যুদ্ধ শেষ হলে তাঁদের মুক্তি দেয়া হয় অন্যান্য র্যাডিক্যালদের সাথে দেশ ত্যাগের শর্তে। যুদ্ধ শেষে ভয়াবহ অত্যাচার শুরু হয়। একজন ডানপন্থী ফ্যানাটিক হিসেবে তাঁর কুখ্যাত ক্যারিয়ার শুরুর প্রথম দিকে জে এডগার হুভার তাদের দেশত্যাগের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেন। তাঁদেরকে জন্মস্থান রাশিয়াতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
আর্ট: হে মার্কেট স্কয়ার রায়ট সূত্র: থটকো
তখন রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান হয়েছে। নতুন সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিন নানা রাজনৈতিক মতামতের প্রতিনিধিত্বকারী সংসদ ভেঙে দিয়ে বলশেভিকদের শাসন শুরু করেছেন। এমা ও সাশা লেনিন ও ট্রটস্কির সাথে সাক্ষাত করেন। ভিন্নমতালম্বীদের জেল, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করা, পেত্রগাদের বাইরে ক্রনস্টাডট্ এ নাবিকদের সহিংসভাবে দমন ইত্যাদি ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁদের অবস্থান করার ইচ্ছার মৃত্যু ঘটায়।
তাঁরা পরবর্তী বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে অতিবাহিত করেন। বিশেষ করে ফ্রান্সের মেডিটারিয়ান উপক~লে। এক অপরকে অসংখ্য চিঠি লেখেন (এসব চিঠির বড় অংশ রিচার্ড ও আনা মারিয়া ড্রেনোন সংগ্রহ করেন)। তাঁরা ইউরোপ ও আমেরিকার চলমান ঘটনাবলীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। মানুষের মুক্তির পক্ষের ঘটনাবলীর সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত ও সমর্থন অব্যাহত রাখেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় এমা স্পেনে ছুটে গেছেন। এবং ১৯৩৬ সালে বার্সেলোনায় বিশাল জনসমাবেশে বক্তৃতা করেছেন যেটা ছিল মূলত অ্যানার্কিস্টদের দখলে (জর্জ অরওয়েলের হোমেজ টু কাতালোনিয়া-তে বিস্তারিত বর্ণনা আছে)।
বার্কম্যান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অপরিসীম শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করে ১৯৩৬ সালে তিনি মারা যান। এমা ১৯৪০ সালে রুজভেল্টের প্রগতিশীল শ্রমমন্ত্রী ফ্রান্সেস পার্কিন্সের অফিসের মাধ্যমে আমেরিকায় এক বিরল সফরের সুযোগ পান। কিন্তু শর্ত ছিল তিনি কেবল নাটক নিয়ে বক্তৃতা করতে পারবেন। ফলে তিনি আমেরিকায় ইবসেন, বানার্ড শ, স্ট্রিন্ডবার্গ এবং চেখভের ওপর বক্তৃতা করেন। পরে সে বছরই কানাডায় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালীন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
১৯৬০ দশককে অ্যানার্কিজমের প্রতি আগ্রহের পুনর্জন্ম বলা যেতে পারে। এর একটা কারণ আমেরিকায় সরকারের প্রতি চরম অসন্তোষ। ফেডারেল সরকার প্রায় একশ বছর ধরে দক্ষিণের সাথে জাতিগত বিভেদে সহযোগী ছিল। এই সহযোগিতার সমাপ্তি হয় যখন জর্জিয়া, আলাবামা, মিসিসিপি এবং অন্যান্য দক্ষিণের রাজ্যগুলোর জনগণ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামে এবং জাতিকে সারা বিশ্বের সামনে নগ্নভাবে তুলে ধরে।
আর সেই একই সরকার দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় দানবীয় যুদ্ধ বাধিয়ে রাখে যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ছিল। এই যুদ্ধ থেকে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয় যখন ভিয়েতনামে প্রতিরোধ এবং আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।
১৯৩০ দশকের মতো ১৯৬০-এর দশকে র্যাডিক্যালরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক ছিল না। তারা নিজেদেরকে নিউ লেফ্ট হিসেবে পরিচয় দিত। এবং তাদের অ্যানার্কিজমের সাথে গভীর মানসিক ও আদর্শগত সম্পর্ক ছিল যদিও অ্যানার্কিজম শব্দটার সাথে সরাসরি তেমন পরিচয় ছিল না। এই যোগসূত্রে কেবল সরকারের প্রতি সন্দেহই ছিল না, স্টুডেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক সোসাইটি ও অন্যান্যদের ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ওপর বিশ্বাস ও ভূমিকা রেখেছিল। পুরাতন বামপন্থীদের পার্টি শৃঙ্খলার বিপরীতে অ্যানার্কিস্ট নীতি বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠনের ধারণা ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনে বিকশিত হতে থাকে। স্টুডেন্টস নন-ভায়োলেন্ট কোঅর্ডিনেটিং কমিটি যার অধিকাংশ সদস্য ছোট ছোট গ্রুপ, যুবক আর অধিকাংশই কৃষ্ণাঙ্গ। এই কমিটি ডিপ সাউথের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গায় কাজ করত। তারা স্থানীয় কমিটি গঠন করত এবং তাদের আটলান্টার প্রধান কার্যালয়ের সাথে কেবল মাঝে মাঝে যোগাযোগ রাখত।
এমা গ্রন্থের প্রচ্ছদ, গ্রন্থিক প্রকাশনী, ২০২১
এই সময়ের ফেমিনিস্ট আন্দোলনও, অ্যানার্কিজমের সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠন এই অ্যানার্কিস্ট নীতি অনুসরণ করত-ছোট ছোট নারী সংগঠনে তারা সারা দেশব্যাপী কাজ করত। সময়ে সময়ে যৌন-সমতার পক্ষে প্যারেড এবং জাতীয় আন্দোলন পরিচালিত হতো। নারী আন্দোলনকারীরা কোনো একক ক্যারিশমাটিক নেতার অধীনস্ত ছিল না।
অ্যানার্কিজমের ঐতিহাসিক দর্শন হলো ডাইরেক্ট একশন। এই ডাইরেক্ট একশনের আইডিয়া ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এর অর্থ হলো কোনো পার্টির রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব না। কিন্তু নাগরিকের সম্মিলিত ঐক্য এবং তাদের শোষণের উৎসের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে ডাইরেক্ট একশনের মাধ্যমে তা সম্ভব।
ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় নেতৃত্ব রক্ষণশীল না হলে শ্রমিক আন্দোলন নানামুখী কর্মসূচির মাধ্যমে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমঘণ্টা আদায় করতে সমর্থ হয়েছিল। এ ধরনের প্রতিবাদের একটা ধরন ছিল মালিকের বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্মঘট। সরকার শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনো কিছুই করেনি। শ্রম সেক্টর কর্পোরেট শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে পুরোপুরি ধনী ও ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাই শ্রমিকদের দাবি শ্রমিকদেরই আদায় করতে হতো।
দক্ষিণে সিভিল রাইটস আন্দোলন ‘নন-ভায়োলেন্ট ডাইরেক্ট একশন’ এই শ্লোগান ব্যবহার করতো তাদের ক্যাম্পেইনে। আর এসব ক্যাম্পেইন ছিল মূলত অবস্থান-ধর্মঘট ও মুক্তিযাত্রা। যুদ্ধবিরোধী একটিভিস্টরা ওয়াশিংটন ডিসির রাস্তা অবরোধ করতো, পেন্টাগন ঘেরাও করতো, দাবি আয়ের জন্য আন্দোলনে নামতো। উপরোক্ত কর্মসূচিগুলো ছিল ডাইরেক্ট একশন। ভিন্নমতালম্বীদের আইন ও সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে নানা ধরনের সিভিল আইন অমান্য আন্দোলন অ্যানার্কিস্ট দর্শনের পরিপূরক-আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা জানুক বা না জানুক।
দর্শন হিসেবে অ্যানার্কিজম ঊনিশ শতকের শেষদিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় কিন্তু ১৯১৬ সালের কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্কের কারণে এ দর্শন ম্লান হয়ে পড়ে।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নতুন রাষ্ট্রবিরোধী রাজনীতি সাথে সঙ্গীত, যৌনতা, যৌথ জীবনযাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্বাধীনতার সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি অ্যানার্কিজমের প্রতি আগ্রহের পুনর্জন্ম ঘটে। দশকের পর দশক অজ্ঞাত থাকার পর এমা গোল্ডম্যান এখন একজন স্মরণীয় নাম বিশেষ করে নারী আন্দোলনে। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলন ও নানামুখী আন্দোলনেও তিনি স্মরণীয়।
তথ্যসূত্র ও টীকানির্দেশ:
[1] বোস্টন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি স্পেশাল কালেকশনস, এমা গোল্ডম্যান পেপারস, কালেকশন # ২৪৩, বক্স ১, ২, ৩। আরো দেখুন দি এমা গোল্ডম্যান পেপারস: এ মাইক্রোফিল্ম এডিশন (অ্যান আরবার, এমআই: চাডউইক-হিলি, ১৯৯১), রিলস ৬,৭ এবং ৬৮; এমা গোল্ডম্যান: এ গাইড টু হার লাইফ অ্যান্ড ডকুমেন্টারি সোর্সেস (অ্যান আরবার, এমআই: চাডউইক-হিলি, ১৯৯৫); এমা গোল্ডম্যান: দি আমেরিকান ইয়ারস (বেকার্লি: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বেকার্লি;
[2] ক্যানডাস ফক, লাভ, অ্যানার্কি, এন্ড এমা গোল্ডম্যান (নিউইয়র্ক: হল্ট, রাইনহার্টম অ্যান্ড উইন্সটন, ১৯৮৪), ৪
রেহানা মারিয়াম নুর, একে যদি এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাহলে বলবো, এটি খুব বেশি বাস্তব। আপস যখন সমাজের স্বাভাবিক নর্ম, তখন রেহানা একজন একরোখা, জেদি আপসহীনতার দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মানুষ। কিন্তু সে সমাজের বাইরের কোন ব্যক্তি না, বরং চারপাশের সমস্ত সহিংসতা ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নিয়ে রূক্ষ, ক্ষুব্ধ রেহানা বাঁচে, আবার তা ছড়িয়েও দেয় কাছের জনদের। প্রায় সবগুলো দৃশ্যই দমবন্ধ করা এই চলচ্চিত্রে কোন চরিত্রকেই ভাল-খারাপ, উচিত-অনুচিতের মানদণ্ডে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব না। তাই সংজ্ঞায়িত করতে না পারা, সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে না পারাতেই আমাদের জাজমেন্টাল মন ধাক্কা খায়।
রেহানা মারিয়াম নুর’র পোস্টার
বাস্তবে আমাদের আশেপাশের চরিত্রগুলোকে যেমন আসলে ডিফাইন করতে পারি না, কিন্তু তবু একেকটা পকেটে ভরে ফেলেই আমাদের চলতে হয়, রেহানাও তাই। রেহানাকে আমাদের চেনা জানা পরিচিতির বক্সে ফেলা যায় না। আর সেখানেই আমাদের অস্বস্তি তৈরি হয়। আমার কাছে এই ফিল্মের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এইটি। চরিত্রগুলি বহুমুখি, আমাদের ভালোমন্দের মাপকাঠিতে আমরা এদেরকে মাপতে পারি না।
ফিল্ম বিশ্লেষণের অনেক রকম পদ্ধতি আছে, অনেক বিতর্কও আছে। চলচ্চিত্রের কলাকৌশল, জনরা ইত্যাদিতে ফেলে সিনেমা বোদ্ধারা আলাপ আলোচনা করছেন। সেই দিক থেকে রঙ, ক্যামেরা বা শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে অনেকের লেখায় ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে চলচ্চিত্রসহ যে কোন শিল্পমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর যোগাযোগের দিকটি, অর্থাৎ, দর্শকের সঙ্গে এর কী ধরনের যোগাযোগ বা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। অনুভূতির কী আবহ তৈরি করছে? দর্শকদের মধ্যে কী ধরনের চিন্তা ও অনুভূতির সৃষ্টি করছে? আমি নিজেকে একজন চলচ্চিত্রের গ্রাহক মনে করি, চলচ্চিত্র বিশ্লেষক না। ফলে একটি ফিল্মের খুঁটিনাটি নিয়ে আমি যতটা চিন্তা করি, তার থেকে অনেক বেশি আমাকে ভাবায়, ফিল্মটি আমার মধ্যে কী করছে। নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে সেই দিক থেকে এই ফিল্ম কে দুইভাবে দেখতে চেয়েছি। এই দুই ধরন সম্পূর্ণ আলাদা না, বলা যেতে পারে একই বস্তুকে দুই চশমা দিয়ে দেখা।
প্রথমটি হোল, দর্শক হিসেবে আমার সাথে এর যোগাযোগ। এই আমি কে? আমি আমার সত্তায় একজন ব্যক্তি মানুষ না, আমি আমার রাজনীতি, সংস্কৃতি, মতাদর্শ, অনুভূতি, চেতন, অবচেতনের একটা সঙ্কর। তো আমার এই সবগুলো সত্তার মিলে মিশে থাকা যে আমি, যে সমাজের অংশ হিসেবে আমি, যে কাঠামো আর তাঁর পীড়নে লড়াইরত এই আমি, তাঁর সাথে কোন চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতাটা খুব ইন্টিমেট মনে হলেও তা আসলে শুধুমাত্র ব্যক্তিক থাকে না। আমার আনুভূতি আমার ইতিহাস আর রাজনীতি থেকে ভিন্ন না, যাকে সারা আহমেদ (২০০৪) বলছেন ‘অনুভূতির সাংস্কৃতিক রাজনীতি‘।
রেহানা মারিয়াম নূরের একটি দৃশ্য
সংস্কৃতি আর রাজনীতির একটা অংশ হিসেবে, একজন দর্শক হিসেবে আমার সাথে ফিল্মের এই যোগাযোগের অভিজ্ঞতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার মনে হয়েছে রেহানা মারিয়াম নুর, দর্শক হিসেবে আমার উপস্থিতি, আমার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মজার দিকটি হোল, পরিচালক সাদ তাঁর কোন একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি দর্শকের কথা মাথায় রেখে চলচ্চিত্র বানাননি, তিনি একটা গল্প বলতে চেয়েছেন। এইটা শুনলে অনেকের মনে হতে পারে তিনি অহঙ্কারী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা আসলে উল্টো। তিনি দর্শকের কাছে তাঁর যা বলার তা শেয়ার করতে চেয়েছেন, এটি বরং দর্শককে সম্মান করে, তাঁর গল্প শোনার কান যে অপরপক্ষের আছে, তাঁর স্বীকৃতি দেয়। আমরা কিন্তু অনেক সময়ই সহজে সবকিছু শেয়ার করতে পারি না, আমাদের গল্পটা বলতে পারি না এই ভেবে যে অপর পক্ষ বুঝবে না। এই যে অপরপক্ষ বুঝবে না বলে পরিচালক দর্শককে একটা ছকে ফেলে সেই ছকে ছবিটা বানাননি, এতেই তিনি সবচেয়ে বেশি সম্মান করেছেন দর্শকদের। দর্শকরা খাবে কি খাবে না, সেই চিন্তাটাই দর্শককে একটি সমরূপী বর্গে সীমিত করে, এবং এটি দর্শককের জন্যে খুবই অসম্মানজনক এবং পেট্রোনাইজিং।
এখন আসি দর্শক হিসেবে আমার অস্তিত্ব কে স্বীকৃতি দেবার প্রসঙ্গে। এইটা কেন গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্যে? কারণ আমার বেড়ে উঠার কালে আমি বেশিরভাগ চলচ্চিত্র, নাটক, কবিতা বা যে কোন শিল্প মাধ্যমের সাথে সরাসরিভাবে যোগাযোগ করতে পারিনি। কেন?কারণ আমাকে কবি, পরিচালক বা নাট্যকাররা গণায় ধরেননি। আর এখানেই মেইল গেজ এর সমালোচনাটা আসে । সিনেমার নারীবাদী সমালোচকরা বলেন, নারী যে জীবন যাপন করেন, যে চোখে জীবনকে দেখেন সে চোখের পরিবেশন কালচারাল প্রোডাক্ট গুলোতে পাওয়া যায় না। কারণ, নারীকে দর্শক মনে করা হয় না, মনে করা হয় দর্শনের বস্তু, আর পুরুষ হচ্ছে দর্শক। তো এই বিষয়টা এই নয়া উদারনৈতিক পুঁজিবাদে বদলে যাচ্ছে, এখন নারীরাও ক্রেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন, ফলে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এমন চলচ্চিত্র বানানো হচ্ছে।
রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য
কিন্তু শিল্পমাধ্যম তো শুধু পণ্যবস্তু না, শিল্প আমাদের সত্তার খোরাক দেয়, আর সেখানেই আমি দেখি যে শুধুমাত্র ক্রেতা না, শিল্পের গ্রাহক হিসেবে এই চলচ্চিত্রটি আমার অস্তিত্বকে সম্মান দিচ্ছে। যে বাস্তবতায় আমি বাস করি, বেড়ে উঠি, যে বাস্তবতাকে আমার শরীর মনে ধারণ করি, যে ক্রোধ, অপমান, প্রতিদিনকার পরাজয় একটু একটু করে আমার সত্তাকে গ্রাস করে, যেভাবে প্রতিদিন নীতির সাথে সংঘর্ষ লাগে এই বাস্তবতার, দুমড়ে মুচড়ে পড়ে যাই আবার আহত হয়েই উঠে দাঁড়াই, এই সবকিছুর সাথে রেহানা মারিয়াম নুর যে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছে, বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এরকম অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। রেহানা মারিয়াম নুর আমার চলচিত্র ক্ষুধা মিটিয়েছে। আমি যা দেখে আলোড়িত হতে চাই, তার জোগান দিয়েছে। যে ধরনের শিল্প আমাকে নাড়া দেয়, তার জোগান দিয়েছে। এটি দর্শক হিসেবে আমাকে সম্মান করেছে। আমার মতো মানুষকে দর্শক হিসেবে গণ্য করেছে, আমার বুদ্ধিমত্তা আর আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করেনি। আমার মনে হয়নি, আরে পরিচালক কি আমাকে বোকা ভাবে, একটা কিছু বানিয়ে গিলিয়ে দেবার চেষ্টা করলেই হোল?
আমার দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি হোল, আমাদের সমাজের সাথে এই চলচ্চিত্রের যোগাযোগ। এইখানে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি শুধু সিনেমাটি না, বরং এই সিনেমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে। কে কী রিভিউ দিচ্ছে আমি পড়ি, আমি আমাদের সমাজের মানুষের পাঠ বুঝতে চাই। আবার এই সমাজের মানুষগুলো কিন্তু সমরূপী না। ফলে নানা রকমের বিশ্লেষণ চোখে পড়ে। আমি দেখি বেশিরভাগ বিশ্লেষণের সাথেই আমার ঠিক পুরোপুরি মেলে না। মেলার কথাও না। কারণ আমরা একই সমাজে বাস করলেও, একই সমাজের অংশ হলেও আমাদের পাঠ কিছুটা আলাদা হয়। এই মিল আর অমিলের মধ্য দিয়েই আমি এই চলচ্চিত্রটিকে বাংলাদেশের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে দেখি।
এই যোগাযোগে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে, প্রথমত অনেকেই আলোচনা করছেন যে, এইটি নারীবাদী চলচ্চিত্র কিনা। এই প্রসঙ্গে আমি বরং ঘুরে দেখতে চাই, নারীবাদী বলতে উনারা কি বুঝাচ্ছেন? একটা সহজ সংজ্ঞা তো হোল, নারীর বিরুদ্ধে নিপীড়ন বা সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীবাদ অবস্থান নেয়। যেহেতু এই ফিল্মে এই বিষয়টি আছে, ফলে অনেকেই একে নারীবাদী ফিল্ম হিসেবে দেখছেন, কিন্তু আবার দেখতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছেন। কারণ এখানে এমন কিছু বিষয়ও আছে, যা ঠিক নারীবাদ বলতে অনেকেই যা বুঝেন তার সাথে মেলে না।
কিন্তু আমার কাছে নারীবাদ আরও অনেক অনেক ব্যাপ্ত এবং জটিল একটি বিষয়। আমি নিজেকে একজন নারীবাদী হিসেবে পরিচিত করতে চাই। যদি আমার নারীবাদী সত্তাকে এই ফিল্ম তৃপ্ত করতে পারে তাহলে একে নারীবাদী ফিল্ম বলাই যায়। কিন্তু আমি আসলে এই চলচ্চিত্রকে নারীবাদের লেবেলে ফেলতে অস্বস্তি বোধ করি, কারণ আমার মনে হয় এতে একে সীমিত করে ফেলার ঝুঁকি থাকে। এই প্রসঙ্গে আমার কাছে একটা দৃশ্য খুব ইন্টেরেস্টিং লাগে, রেহানাকে দেখতে আসা আত্মীয়দের মধ্যে নারীবাদ সম্পর্কিত খুবই ক্লিশে আলাপ। বিষয়টি একটু অপ্রাসঙ্গিক এবং বিরক্তিকর লেগেছে প্রথমে আমার কাছে। পরে আমি ভাবছিলাম, পুরো দৃশ্যটাতে ঐ আলাপে রেহানার কোন অংশগ্রহণ তো থাকেই না, বরং সে তার ভাইয়ের সাথে ইশারায় অন্য আলাপ চালিয়ে যায়, তারই ফাঁকে ফাঁকে ইমু ক্রমাগত জানালার কাছে যায় আবার ফ্রেম থেকে বেরিয়ে যায়। এই যে একটি দৃশ্যে সমান্তরালে কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটে এটি আমাকে ভাবায়। পরে আমার মনে হয় হয়তো এটি এই সব ক্লিশে এবং অতি সরলীকৃত নারীবাদের বাহাসে ঢাকা পড়ে যাওয়া নারীর বাস্তব জীবন আর তার লড়াইকে দেখানোর একটা দৃশ্য। এইটা আমার পাঠ। এমনটা নাও হতে পারে। তাতে কিছু যায় আসে না। নারীবাদ বলতে অনেকেই যা বুঝে তার সাথে হয়তো এই ফিল্ম পুরোপুরি মেলে না। ফলে এই ফিল্মটিকে সেই লেবেল না দিয়ে বরং আমি বলতে চাই, এই ফিল্মটি কোন কোন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এবং অভ্যস্ত ধারণাগুলোকে ধাক্কা দেয়।
রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য
একটা তো খুব সহজভাবেই বলা যায় যে, এটি ভালো মেয়ে, ভালো মায়ের ইমেজকে ধাক্কা দেয়। মাতৃত্বের কারণে, বিশেষ করে একজন সিঙ্গেল মাকে যে সার্বক্ষণিক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, সেই কাঠগড়াকে ভালভাবেই ধাক্কা দেয় এই ফিল্মটি। কিন্তু তার থেকেও বড় যে, এটি এই একা মায়ের লড়াই, আর প্রতিদিনকার অসহনীয় চাপ আর প্রতিকূলতাকে দারুণভাবে দেখায়। তবে দেখতে পাবার বিষয়টাতো আসলে দর্শকের দেখার উপরে নির্ভর করে।
কিন্তু তার থেকেও বেশি যে বিষয়টি ফিল্মটি করে তা হোল আমাদের মনে জাস্টিস বা ন্যায়বিচারের যে ছকবাঁধা ধারণা বিদ্যমান তাকে দারুণভাবে ধাক্কা দেয়। রেহানা বলে,“কেউ দেখেনি বলে তো ঘটনাটি মিথ্যে হয়ে যায়নি।” যৌন সহিংসতার আইনি বিচার প্রক্রিয়ার এই যে একটা অসম্ভব লুপহোল, অপরাধ ‘প্রমাণ‘ করার যে অসম্ভব গোলকধাঁধা, এটি সেই গোলকধাঁধার দেয়ালে ধাক্কা দেয়। বারে বারে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়ার বিষয়টি আমাকে দেয়াল ঘেরা বন্দী মানুষের ক্রমাগত দেয়াল ভাঙ্গার আওয়াজকে মনে করিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, রেহানা এই জাস্টিসের জন্যে একটা ‘আপাত‘ মিথ্যা অভিযোগ দেয়। আপাত বলছি এই কারণে যে, নিপীড়নের ঘটনাটি রেহানার সাথে ঘটেনি, ফলে সাদা চোখে সেটা মিথ্যে। কিন্তু আসলে তো ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু রেহানার মাথায় যিনি অপরাধকারি, শাস্তিটা তাঁর দরকার, নইলে সে আবার এই কাজ অন্য মেয়ের সাথে করবে। ফলে কার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটছে, সেটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। এটা আমাকে জাহাঙ্গীরনগরের ৯৮ এর ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সময়কে মনে করিয়ে দেয়। আন্দোলনের সময় যখন প্রশাসন বারে বারে জানতে চাইছিল ধর্ষিতার পরিচয়, আন্দোলনকারী ছাত্রীরা সমস্বরে বলে উঠেছিল “আমরা সবাই ধর্ষিতা”। একইভাবে বেগমগঞ্জের ধর্ষিতা নারীও বলেছিলেন, তাঁর উপরে নিপীড়নের বিচার না হলে বাংলাদেশের সব নারীর পরাজয় হবে। আরেকজন নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতার পাশে দাঁড়ানো নারী প্রতিমুহূর্তে তাঁর নিজের সাথে নিপীড়িতকে সম্পর্কযুক্ত করেন। তখন ব্যক্তির নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে বড় হয়ে যায় যৌথ নিপীড়নের অভিজ্ঞতা। আরেকজন নারীর নিপীড়নের অভিজ্ঞতার পাশে দাঁড়ানো সংহতি থেকে আরেক ধাপ দুরে গিয়ে যখন তাঁর হয়ে লড়াইটি করতে চায় রেহানা, তখন সেটি সত্য থেকে বিচ্যুত হয় ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি কি মিথ্যে হয়ে যায়? নিপীড়িত নারী প্রতিরোধের লড়াই করতে না পারলে, বা না চাইলে, তাঁর হয়ে লড়াইটাকে করতে চাওয়া কি শুধুই সত্য আর মিথ্যের বাইনারি দিয়ে বোঝা সম্ভব? আমার মনে হয়েছে, ন্যায় বিচারের এই পজিটিভিস্ট এবং ব্যক্তিক ধারণাকে রেহানা ধাক্কা দেয়।
রেহানা একজন একরোখা চরিত্রের মানুষ, যে দরজা বন্ধ দেখলে ক্রমাগত দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে বের হতে চায়, শক্তি দিয়ে ঐ একটা পথেই হাঁটে, কিন্তু পথ ঘুরিয়ে অন্য পথে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেন না, জানেন না, বা চান না। আপাতভাবে মনে হতে পারে এইটা তো আসলে খুব দারুণ একটা বিষয়, কিন্তু আমরা দেখি এই একমুখি একরোখা স্বভাবের কারণেই তিনি বুঝতে পারেন না, কিভাবে ইমুর শৈশবের আনন্দকে নষ্ট না করে নিজের নীতির প্রশ্নে অটল থাকবেন। রেহানার এই একরোখা চরিত্র তাঁকে আরও বন্দী করে ফেলে, মেডিকেল কলেজের একটা করিডরের মতো ছোট্ট জায়গায় আটকে ফেলে। এর মধ্যে আর কোন পথ দেখায় না। তিনি বুঝতে পারেন না কিভাবে নিপীড়ন ছাড়াই ইমুকে তার সিদ্ধান্তকে বুঝিয়ে বলবেন। এই দ্বন্দ্ব তাঁকে ভয়াবহভাবে বন্দী করে। মা হিসেবে আমার তখন অস্থির লেগেছে, মনে হয়েছে তিনি তো মেয়েটাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেই পারতেন, একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত না ফেলে রেখে আরও দক্ষতার সাথে পুরো বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে পারতেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে হয়, রেহানা তো আসলে দর্শকের বিবেচনাবোধ দিয়ে চলা জীবন যাপন করছেন না, তিনি তাঁর নিজের জীবন যাপন করছেন। রেহানা আপনার আমার থেকে একটি ভিন্ন চরিত্র। সেই সাথে রেহানা এটি মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রতিমুহূর্তে কত শত ‘করা উচিত‘ কাজ জেনেও করতে পারি না, অন্য কিছু করি, এবং পরে অনুশোচনায় ভুগি। ফলে দেখা যাচ্ছে তিনি যাকে ঠিক মনে করছেন, সেই ঠিক কাজ করার জন্যে তিনি অন্যকে কষ্ট দিচ্ছেন। তাঁর এই অনমনীয়তা আরেকজনের নিপীড়নের কারণ হচ্ছে। এখানে আমি দেখতে পাই, ব্যক্তির সাথে আমাদের চারপাশের মানুষযে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে, তার ডিলেমা। অর্থাৎ রেহানা তাঁর নিজের নৈতিকতার বিষয়টাকে যত গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার প্রভাবে তাঁর কাছের মানুষগুলো কিভাবে ভুগছে তাকে আমলে নিতে পারছেন না। রেহানার তাঁর ব্যক্তিগত নীতির প্রশ্নে অবিচল থাকা যে অন্যের কাছে তাঁকে অনৈতিক করে তুলতে পারে তা বুঝতে পারছেন না। আমাদের খুবই চেনা ঘটনা এটি, আমরা চারপাশে, এবং নিজেদের মধ্যে সারাক্ষণ এই দ্বন্দ্ব দেখি।
রেহানা মারিয়াম নুরের একটি দৃশ্য
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আমাদের দেশি চলচ্চিত্র কান উৎসবে প্রদর্শিত হতে পারা নিশ্চয়ই অনেক বড় খবর। ফলে এর প্রতিক্রিয়াও এরকম। অনেকেই তাঁদের নানারকম প্রত্যাশা নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁদের দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো প্রত্যাশার সাথে মেলেনি। কান-এ প্রদর্শিত হওয়া, আলোচিত হওয়ার ফলে এর পাঠ প্রতিক্রিয়াও প্রভাবিত হচ্ছে। সামাজিক বিজ্ঞানী হিসেবে এগুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ফলে চলচ্চিত্রটি যেমন আমার সত্তাকে ঝাঁকুনি দেয়, তেমনি একে ঘিরে এতো আলোচনাও নৃবিজ্ঞানী হিসেবে সমাজ বিশ্লেষণের অনেক অনেক পথ খুলে দেয়। মনোবিজ্ঞানী রেহানাকে দেখছেন মানসিক রোগী হিসেবে। আইনজ্ঞ দেখছেন মিথ্যা অভিযোগকারী হিসেবে। কেউ কেউ তাঁকে দেখছেন নিপীড়ক মা, অযৌক্তিকভাবে ক্ষুব্ধ শিক্ষক, ইত্যাদি ইত্যাদি। রেহানা হয়তো সবগুলোই। তবে কিভাবে কে রেহানাকে পাঠ করছেন, সেটা যতটা না রেহানাকে দেখায়, তার থেকেও বেশি দেখায় যিনি দেখছেন তাঁকে এবং যে সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ তিনি সেটিকেও।
সবশেষে এই ফিল্মটিকে আমার কাছে মনে হয়েছে, একজন একগুয়ে মানুষকে কিভাবে আপাদমস্তক আপসকামী সমাজ ভেঙ্গেচুরে গুড়িয়ে দেয় তার দলিল। সেই সাথে এই ভাংচুর কিভাবে তাঁর আপনজনদের জীবনকেও একে একে চক্রাকারে ভাঙতে থাকে তারও চিত্রায়ন।
আমি নিশ্চিত রেহানাকে অনেকেই আয়নায় দেখতে পান, কিন্তু স্বীকার করেন না। বা দেখতে চান না।
তথ্যপঞ্জি
Ahmed, Sara (2004) The cultural politics of emotion; Edinborough University Press.
বন্দনাশিবাএকজনবিখ্যাতপরিবেশবাদীনেতাএবংপরিবেশনারীবাদেরগুরুত্বপূর্ণতাত্ত্বিক।পাশাপাশিতিনিResearch Foundation on Science, Technology, and Ecology-এরপরিচালকহিসেবেদায়িত্বপালনকরছেন।বন্দনারবীজসংরক্ষণআন্দোলনএগিয়েনিতেনবদানা(Navadanya) নামকএকটিবেসরকারিপ্রতিষ্ঠানগড়েতুলেছেন।পরিবেশসংরক্ষণেভূমিকারস্বীকৃতিস্বরূপতিনিAlternative Nobel Peace Prize এবংSydney Peace Prize-সহনানাসম্মাননায়ভূষিতহয়েছেন।তারগুরুত্বপূর্ণগ্রন্থসমূহহলThe Violence of the Green Revolution (1991), Biodiversity (1992), Monocultures of the Mind (1993), Biopolitics (1995) ইত্যাদি।বর্তমানপ্রবন্ধটিবন্দনাশিবাএবংমারিয়ামায়েসসম্পাদিতEco-feminism নামকগ্রন্থেরএকটিঅধ্যায়থেকেঅনূদিত। – লেখক
[মূল প্রবন্ধ]
জেন্ডারএবংবৈচিত্র্যনানাভাবেএকেঅন্যেরসাথেসম্পর্কিত। নারীকে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে নির্মাণ করা ও বিভিন্নতার সাথে খাপখাওয়ানোর অক্ষমতা একই সূত্রে গাঁথা। একইভাবে জৈবিক জগতে বৈচিত্র্যের বিচ্যুতি ও বিলুপ্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায় যেই উন্নয়নের নমুনা তাও এর সাথে জড়িত।পিতৃতান্ত্রিকদৃষ্টিভঙ্গিপুরুষকেইসকল গুণেরমানদণ্ডহিসেবেদেখে, যেখানেবৈচিত্র্যেরকোনোস্থাননেই।কেবল আছে কর্তৃত্বক্রমের স্থান।পুরুষেরথেকেভিন্নহওয়ায়নারীঅসমএবংঅধস্তনহিসেবেগণ্যহয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্যকেও স্বাভাবিকভাবে এর স্বকীয়তার জন্য মূল্যবান বিবেচনা করা হয় না, শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক শোষণের নিরিখেই এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যিক মূল্যায়ণের এই মানদণ্ড এভাবেই বৈচিত্র্যকে সমস্যা ও ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করে।বৈচিত্র্যকেধংসকরেমনোকালচারইউৎপাদনই পুঁজিতান্ত্রিক পিতৃতন্ত্রেরজন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
এইদুইধরনেররাজনীতিএকইবিন্দুতেপৌঁছায়যখননারীএবংজীববৈচিত্র্যের প্রান্তর ও অরণ্যে এসে মোলাকাত ঘটে। মোলাকাত ঘটে শুষ্ক অঞ্চল ও জলাভূমিতে।
নারীর দক্ষতা হিসেবে বৈচিত্র্য
বৈচিত্র্যইনারীরকাজএবংজ্ঞানেরমূলনীতি।একারণেইতারাপিতৃতান্ত্রিককাঠামোতেঅগ্রহণযোগ্যহয়েপড়ে।কিন্তুএইমূলনীতিরসাহায্যেইবিকল্প ‘উৎপাদনপদ্ধতি’ এবং ‘দক্ষতা’ গড়েতোলাসম্ভবযেটিবিধ্বংসীনয়বরংবৈচিত্র্যকেসম্মানদেয়।
যখন শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয় বা শ্রম ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে তখন শ্রমের বিকল্প হিসেবে প্রযুক্তির ব্যবহার ফলদায়ক ও কার্যকর হয় কিন্তু যখন শ্রমিকের প্রাচুর্য রয়েছে তখন শ্রমের বিকল্প অর্থহীন কারণ তা দারিদ্র্য, উৎখাত ও জীবিকার ধ্বংসসাধনের কারণ হয়ে ওঠে। তৃতীয় বিশ্বের পরিস্থিতিতে এ কারণে একই সাথে দুটি পর্যায়ে স্থায়িত্ব অর্জন করতে হবে: প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্ব এবং জীবিকার স্থায়িত্ব। ফলস্বরূপ, জীববৈচিত্র্যের থেকে উদ্ভূত জীবিকার সংরক্ষণের সাথে জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণকে যুক্ত করে দেখতে হবে।
প্রচলিতদৃষ্টিভঙ্গিতেবৈচিত্র্যকেবাস্তুসংস্থানগতনয়বরংএকটিসংখ্যাতাত্ত্বিকএবংগাণিতিকবিষয়হিসেবেদেখাযায়।এটি বীজগাণিতিক বৈচিত্র্যের সাথে ঐক্যপোষণ করে পারস্পরিকমিথোজীবিতাওজটিলতার সাথে নয়।জীববৈচিত্র্যরসংজ্ঞাদিতেগিয়েসংখ্যাএবংবাস্তুসংস্থানেরফ্রিকোয়েন্সি, প্রজাতিএবংজিনতাত্ত্বিকবিশ্লেষণইকেবলব্যবহৃতহয়।এরবিপরীতে, যেইসংস্কৃতিএবংঅর্থনীতিতেবৈচিত্র্যেরচর্চাকরাহয়, সেখানেজীববিচিত্র্যকেজালেরমতোবিভিন্নউপাদানেরসম্পর্কদিয়েব্যাখ্যাকরাহয়যেটিভারসাম্যএবংস্থায়িত্বউভয়ইনিশ্চিতকরে।ব্যাপকভাবেএটিগ্রহএবংউদ্ভিদ, কসমিকসঙ্গতিএবংকৃষিইত্যাদিরপারস্পরিকসম্পর্কনির্দেশকরে।
রেহনুমা আহমেদের ‘অসুখী বিয়ে’: বাম ধারা ও নারীবাদ প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, পাবলিক নৃবিজ্ঞান সিরিজের অংশ হিসেবে। ‘উপল’–এর আয়োজনে ‘লিঙ্গ, কর্তৃত্ব ও মুক্তি’ সিরিজের অংশ হিসেবে অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অরাজের সাইটে হুবহু তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক
অসুখী বিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ
ভূমিকা
এই পুস্তিকা–প্রবন্ধ তিনটি ভিন্ন–ভিন্ন অংশের সমন্বয়ে গঠিত, বলতে পারেন এটা একটা জোড়াতালি লেখা। বাম ধারা ও নারীবাদের সম্পর্ক অনুসন্ধানের প্রয়াস, আবার একইসঙ্গে এই প্রয়াসের পদ্ধতি কী হতে পারে, এ বিষয়গুলোকে ঘিরে এই প্রবন্ধ। পদ্ধতি–সংক্রান্ত আলোচনা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ১।
প্রবন্ধের একেক অংশ একেক সময় লেখা বা অনুবাদ করা, শেষের অংশটি সর্বপ্রথম লিখেছিলাম (২০০৭), দ্বিতীয় অংশটি তার পরের বছর (২০০৮), আর প্রথম অংশটি, যেটি কিনা অনুবাদ, সেটি ২০১৩–তে।
প্রথম অংশ হচ্ছে “নিউ লেফ্ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”। এটি লিডিয়া সার্জেন্ট সম্পাদিত উইমেন এন্ড রেভোলিউশন (১৯৮১) সংকলনের ভূমিকার অনুবাদ: “New Left Women and Men: The Honeymoon is Over”।২ এই সংকলনের প্রধান প্রবন্ধ লিখেছেন হাইডি হার্টমেন যার শিরোনাম হচ্ছে, “The Unhappy Marriage of Marxism and Feminism: Towards a More Progressive Union”। শিরোনামে উল্লেখিত Unhappy Marriage-এর সূত্র ধরেই উইমেন এন্ড রেভোলিউশন–এর সম্পাদক লিডিয়া সার্জেন্ট তাঁর ভূমিকার উপ–শিরোনামে ঘোষণা করেন: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের মধুচন্দ্রিমার অবসান ঘটেছে (The Honeymoon is Over)। হার্টমেনের শিরোনাম ধার করে এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছি:- ‘অসুখী বিয়ে’। বাম ধারা ও নারীবাদ।
দ্বিতীয় অংশটিও অনুবাদ— “পুরুষের লেখা স্ক্রিপ্টে নারীমুক্তি: মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতা”। এদেশের বাম নেতৃত্ব প্রসঙ্গে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি ও বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে নিউ এইজ–এর জন্য লেখা আমার একটি কলামের অনুবাদ। মিশুর সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলাম আগস্ট ২০০৮–এ; সেটি কলাম–আকারে কিছু দিন পরই ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল।৩
তৃতীয় অংশটি— “‘পেট’ বনাম ‘যোনি’ তত্ত্ব: একটি ক্রিটিক”— কয়েক বছর আগে হাতে নেওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণাকর্মের অংশবিশেষ। আমার এই গবেষণাটি চলমান, তবে তার অর্থ এই নয় যে আমি এই মুহূর্তে এ নিয়ে কাজ করছি। থেকে–থেকে যখনই সময় পাব তখন আবার ধরব, এই হচ্ছে পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি। গবেষণাটি হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে উছিলা হিসেবে কাজ করেছিল বুদ্ধিজীবী–বিষয়ে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে এমন একটি সংকলন। কিন্তু সংকলনের সম্পাদক পরে আর যোগাযোগ না করাতে প্রবন্ধটি অপ্রকাশিত থেকে যায়।৪ এদেশের বাম/প্রগতিশীল পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা প্রসঙ্গে গবেষণা করতে গিয়ে প্রথমেই হাত দিয়েছিলাম খ্যাতমান মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের লেখায়।৫ তাঁর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের ক্রিটিক করেছি আমি। মজহারের সাক্ষাৎকারটি দৈনিক আজকের কাগজ–এ প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ সালে, পুনঃপ্রকাশিত হয় “পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা” নামে সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা(২০০৪) বইয়ে।৬ মজহারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত ছোট্ট এই প্রবন্ধ, “‘পেট’ বনাম ‘যোনি’ তত্ত্ব: একটি ক্রিটিক”— এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শেষ অংশ। এটি লিখেছিলাম ২০০৭ সালে।
এই তিনটি ভিন্ন–ভিন্ন অংশ একইসূত্রে গাঁথা, যথা, মার্ক্সবাদ এবং নারীবাদ। তবে শুরুতেই একটি টীকা যোগ করছি সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর তাগিদ থেকে। উইমেন এন্ড রেভোলিউশন বইয়ের লেখকদের আত্মপরিচিতি “নারীবাদী” (এবং মার্ক্সবাদী/বাম–ও)। বইটি লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৬০–১৯৭০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ লেফ্ট/নব্য বাম৭ ধারার ভিতরে নারী–পুরুষের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। এই টানাপোড়েনের নিয়মানুবর্তিতা ও ধারাবাহিকতা নারীবাদীদের ভাবিয়ে তোলে; তা প্রশ্ন–আকারে প্রকাশ পায় এভাবে:-
এক. বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পুরুষদের দৃষ্টিতে নারীবাদী সহযোদ্ধারা কি তাদের সমান? দুই. মার্ক্সবাদী দর্শন ও অনুশীলনের ভিত্তিতে সমাজ গঠিত হলে নারীরা কি সমতা অর্জন করতে পারবে?
সংকট দেখা দেয় কারণ মার্ক্সবাদ ও নারীবাদকে একীভূত করার প্রচেষ্টার “অপর নাম [হয়ে ওঠে] মার্ক্সবাদ”; হাইডি হার্টমেন একে ব্যাখ্যা করেন এভাবে, নব্য বাম ধারার আন্দোলনে নারীবাদীদের আন্দোলন পুঁজির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সংগ্রামের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। এতে নারীবাদীরা শঙ্কিত হন; তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, যদি নব্য বামদের মধ্যেও— সনাতনী মার্ক্সবাদীদের মতোই— লিঙ্গীয় ভিন্নতা ও পুরুষ আধিপত্য তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক–অর্থে গুরুত্ব না পায় তাহলে সমস্যাটা কোথায়, এবং নারীবাদীদের কী করা উচিৎ? সমস্যা কি মার্ক্সবাদী তত্ত্বের নাকি আন্দোলনকারী [মার্ক্সবাদী] পুরুষদের? নাকি দুটোই? একই আন্দোলনে নারী ও পুরুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নারী আন্দোলনকারীরা নারীবাদী পরিচয় ও প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেন (তার উত্তরও অনুসন্ধান করেন) কিন্তু— এবং এতক্ষণে আমি ‘সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি’র জায়গাতে পৌঁছাচ্ছি— এই প্রবন্ধ–পুস্তিকার দ্বিতীয় অংশে স্পষ্ট যে, মিশু কিংবা নেপালের মাওবাদী কমরেড পার্বতী৮ নিজেদের একইসঙ্গে “বাম/কম্যুনিস্ট” ও “নারীবাদী” মনে করেন না। তাহলে কি তাঁদেরকে এই পুস্তিকা–প্রবন্ধ, যার উপ–শিরোনাম হচ্ছে “বাম ধারা ও নারীবাদ,” এতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ? কাজটা কি ঠিক করছি?
বিষয়টা জটিল, এটি ধরা পড়ে মিশুর কথা থেকে যখন তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে— পরিবারে, ব্যক্তিজীবনে, বিয়েতে— সমাজতান্ত্রিক আদর্শ চর্চিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা যখন আমি বলি তখন আমাকে “নব্য–মার্ক্সবাদী ডাকা হয়, নারীবাদী ডাকা হয়”। “নব্য–মার্ক্সবাদী”? তার অর্থ কি এই যে, এদেশের বাম পুরুষরা (পশ্চিমের) নিউ লেফ্ট ধারার পুরুষদের চিন্তাভাবনা ও আচার–আচরণের প্রতি তাদের সহযোদ্ধা নারীদের ক্রিটিকের কোনো খোঁজখবর রাখেন না? তা যদি সত্য হয়ে থাকে, এর থেকে কী বুঝব? এর থেকে আমরা নারীরা— ‘আমরা’ বলতে বোঝাচ্ছি যারা আনুষ্ঠানিকভাবে বাম আন্দোলনে আছেন (যেমন মিশু) এবং আমি/আমার মতো আরো–অনেকে যারা বাম–ঘেঁষা— আমাদের বাম পুরুষ কমরেডদের পড়াশোনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাব?
অপর দিকে কমরেড পার্বতী৯ বলেন, মার্ক্সবাদ কেবল নারী অধস্তনতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও গভীর বিশ্লেষণ–ই হাজির করে না, একইসঙ্গে তার সমাধানও প্রস্তাব করে, একারণে আমরা আশা করতে পারি যে কম্যুনিস্ট আন্দোলনে থাকবে শত–শত নারী নেতা। কিন্তু “অব্জেক্টিভ কন্ডিশন” এর১০ উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অবস্থায় দেখা যায় তার বিপরীত চিত্র। সেটি কেন ঘটে, তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মনে হয় এর কারণ হচ্ছে নারীবাদী আন্দোলন যেহেতু বুর্জোয়া বিপ্লবের ফলাফল তাই কম্যুনিস্ট দলগুলো নারীমুক্তির ব্যাপারে একমত হলেও তারা পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিকার। এটি নানাভাবে প্রকাশ পায়:- কম্যুনিস্ট আন্দোলনে নারীদের সম–অংশীদারত্ব স্বীকার না করে পার্টি তাদেরকে শুধু “সমর্থক” ভাবে। এর ফলে কম্যুনিস্ট দলগুলো শ্রেণী সংগ্রামের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে, তারা ভুলে যায় যে শ্রেণী সংগ্রাম ও নারী নিপীড়নের মধ্যকার সম্পর্ক হচ্ছে দ্বান্দ্বিক।১১ নারী কমরেডকে পুরুষ কমরেডের সমান না ভাববার কারণেই দেখা যায় যে পার্টি নারী–পুরুষের মধ্যে বিরাজমান সনাতনী শ্রমবিভাজনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। দেখা যায় যে, পার্টির পুরুষরা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেন আর নারীদের ভাগে পড়ে কায়িক শ্রম। কমরেড পার্বতী বলেন, এটি আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখি যে নারীর বিশেষ অবস্থার প্রতি (সন্তান ধারণ), তার বিশেষ চাহিদার প্রতি (মাসিক), পার্টি উদাসীন। “নারীর বেলায় নিপীড়ন দ্বৈত হওয়ার কারণে নারীর সংগ্রাম আরো দীর্ঘ।”১২
আমার কথা হচ্ছে, মোশরেফা মিশু বা কমরেড পার্বতী নিজেকে “নারীবাদী” বলুন আর নাই বলুন, তাঁরা নারীর অভিজ্ঞতার যেই বিশ্লেষণ ও যুক্তি/কাউন্টার–যুক্তি হাজির করেন, তা যে কোনো বিচারে নারীবাদী। আর সে কারণেই এই পুস্তিকা–প্রবন্ধে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝির পাট চুকিয়ে এখন আগের কথায় ফিরে আসি। নিউ লেফ্ট আন্দোলনের নারীবাদীদের শঙ্কায় ফিরে আসি। তাঁদের মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে: নারী অধস্তনতা বোঝার জন্য অর্থনৈতিক বর্গ (অর্থাৎ, শ্রেণী)- ই কি পর্যাপ্ত? নিউ লেফ্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাঁদের বলে, না। তাঁদের দৃষ্টিতে, লিঙ্গীয় শ্রমবিভাজন ও যৌনতা— নারী–পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। কেন এবং কীভাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা নিচে পাবেন (লিডিয়া সার্জেন্ট–এর লেখার অনুবাদ, “নিউ লেফ্ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”)। সমস্যা মূলত (১) আন্দোলনরত নারী ও পুরুষের মধ্যকার কাজের ভাগাভাগি নিয়ে— আপিস কে পরিষ্কার করবে, কে মিটিংএর মিনিটস টাইপ করবে, কে কাগজপত্র ফাইল করে গুছিয়ে রাখবে, কে টেলিফোন করে মিটিং ও কর্মসূচীর বার্তা জানান দেবে, কে বিপ্লবীদের খাওয়াবে, সেবা–যত্ন করবে ও ভালোবাসবে, কে তাদের সমর্থন যোগাবে; আর কে বা কারা বিপ্লবী তত্ত্ব নির্মাণ করবে, কর্মসূচী নির্ধারণ করবে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। এবং (২) যৌনতাকে ঘিরে। এ প্রসঙ্গে মাথায় রাখা জরুরি যে ১৯৬০–৭০ দশকে পশ্চিমা (খ্রিস্টান–প্রধান) সমাজে সনাতনী যৌন আচরণের ক্ষেত্রে যে ডবল স্ট্যান্ডার্ড বিরাজ করত— অর্থাৎ, বউয়ের কুমারী হতে হবে— নারীবাদীরা এই অধিপতি ধারণা ও প্র্যাক্টিসকে চ্যালেঞ্জ করেন যার ফলে, অন্তত প্রগতিশীল মহলে, কিছুটা হলেও বদল ঘটা শুরু হয়।
ডবল স্ট্যান্ডার্ডের কথা মোশরেফা মিশুও বলেন। পুরুষ নেতাদের বান্ধবী থাকলেও এতে তাদের রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। নারী নেতাদের সতী ইমেজ অপরিহার্য; কোনো কোনো বাম দলের ক্ষেত্রে নারী নেতারা পোষাক–পরিচ্ছেদের মাধ্যমে সতী ইমেজকে reinforce করেন। অন্যভাবে বললে, বিপ্লবী দলের মধ্যেও নারী নেতা/কর্মীর “চরিত্র” উৎকণ্ঠার বিষয় (বৃহত্তর সমাজের মতোই); বিপ্লবী নারীরও “সতী” হতে হবে (বৃহত্তর সমাজের অ–বিপ্লবী নারীদের মতোই)। মিশুর মতে বিয়ে, আর কমরেড পার্বতীর দৃষ্টিতে বিয়ে–পরবর্তী সন্তান–ধারণ, নারী কমরেডদের রাজনৈতিক অস্তিত্বে বড়সড় বদল ঘটায়:- তারা “গৃহের অন্তরালে হারিয়ে যান” (মিশু); “গৃহী দাসত্বের শৃঙ্খল আরো বেড়ে যায়, আরো প্রকট হয়” (পার্বতী)।১৩ এক্ষেত্রে পার্বতী এও উল্লেখ করেন যে, নিজের পছন্দের কমরেডকে বিয়ে করলেও এটি ঘটতে পারে। সন্তান লালনপালনের দায়ভার “একপেশে বোঝা” হয়ে দাঁড়ায় বিশেষ করে নেপালের সেই অঞ্চলগুলোতে যেখানে স্থানিক এলিটরা সনাতনী বা “traditional”।১৪ যৌনতার প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বাম মহলে “ট্যাবু”; অবিবাহিত নারী নেতাদের ক্ষেত্রে “স্যাক্রিফাইস” আশা করা হয় (মিশু); নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টিতে নারী–পুরুষ, উভয় কর্মীর ক্ষেত্রেই বিয়ে না করাটা “সন্দেহের চোখে” দেখা হয়;১৫যৌন নিয়মের লঙ্ঘন রাজনৈতিক নিয়ম লঙ্ঘনের চাইতে আরো বড় অপরাধ বলে বিবেচিত হয় (পার্বতী)।১৬ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: বাম আন্দোলনে ‘বাম সত্তা’ বা ‘বিপ্লবী সত্তা’ বলতে কি অনায়াসেই পুরুষকে বোঝায় (যার মাসিক হয় না, পেটে বাচ্চা আসে না, যিনি ধর্ষণের শিকার হন না, আর ধর্ষণের শিকার হলে তা হয় নারীর–ই দোষে…? অন্য কথায়, ‘বিপ্লবী সত্তা’ বলতে অনায়াসেই নারীকে বোঝায় না— কারণ তার সত্তার সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িত গৃহীপনার মতাদর্শ, নীতি–নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতি অবনত থাকার শর্ত?) পুরুষ চরিত্রই কি মানদণ্ড? ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার পড়ে (যার সমালোচনা এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের শেষভাগে পাবেন, ‘পেট’ ও ‘যোনি’ তত্ত্ব), আমার মনে হয়েছে তিনিও বিষয়গুলোকে একই (পিতৃতান্ত্রিক) ফ্রেমওয়ার্কে দেখেন।
সংক্ষেপে বললে, পিতৃতন্ত্র সর্বব্যাপী ও শক্তিশালী; বাংলাদেশ/দক্ষিণ এশিয়ার বাম মহলে সাচ্চা বা জেনুইন আত্ম–সমালোচনার অভাব, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করার ফলে প্রাপ্ত সুযোগ–সুবিধাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়ার ঐতিহ্য— আর পাঠক’মাত্রই জানেন যে ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে রাজনৈতিক বিষয়ের বিরাজনীতিকরণ (de-politicisation )— শ্রেণী শোষণ বাদে অপরাপর অধিপতি ব্যবস্থাকে (লিঙ্গ, জাতি, বর্ণ, নরবর্ণ ইত্যাদি) তাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্য দিয়ে বুঝতে না চাওয়া, মোকাবেলা না করা— বর্তমানের বৈষম্য–ব্যবস্থাকে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে। তাকে জোরদার করে ও জারি রাখে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নব্য বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে যারা সংগ্রামরত তাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা কীভাবে নারী ও পুরুষদের ভিন্ন কাতারে দাঁড় করায়, মুখোমুখি কাতারে দাঁড় করায় তারই বর্ণনা পাবেন এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে ( ১ নং অংশ, নিচের থেকে পৃ. ১১ পর্যন্ত)।
১. লিডিয়া সার্জেন্ট, “নিউ লেফ্ট ধারার নারী ও পুরুষ: মধুচন্দ্রিমার অবসান”
১.কঅসুখী বিয়ে
হাইডি হার্টমেন ‘মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ে’ নামক প্রবন্ধের প্রথম প্যারাতে লিখেছেন:
মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের বিয়ে ইংলিশ কমন ল’তে স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কের মতোই: মার্ক্সবাদ ও নারীবাদ এক ও অভিন্ন, যার অর্থ, এই ঐক্যের অপর নাম মার্ক্সবাদ। মার্ক্সবাদ ও নারীবাদকে একীভূত করার সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা নারীবাদী হিসেবে আমাদের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে কারণ নারীবাদী আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে পুঁজির বিরুদ্ধে “বৃহত্তর” সংগ্রামের অধীনে। উদাহরণটা যদি আরো এগিয়ে নিতে চাই তাহলে বলতে হয়, এই বিয়েকে হয় স্বাস্থ্যকর করে তুলতে হবে নতুবা তালাকের বন্দোবস্ত করতে হবে (হার্টম্যান, পৃ. ২)।
…বাম/প্রগতিশীল আন্দোলনে, যার প্রধান মতাদর্শ মার্ক্সবাদ,১৭আমরা যারা র্যাডিকাল,১৮সমাজতান্ত্রিক,১৯মার্ক্সিস্ট,২০লেসবিয়ান,২১এ্যানারকিস্ট,২২কৃষ্ণাঙ্গ২৩— ভিন্ন–ভিন্ন ধারার নারীবাদী— তারা কি সমতা অর্জন করতে পারব? মার্ক্সবাদী তত্ত্ব ও চর্চাকে ঘিরে ভবিষ্যতে যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে কি আমরা সমতা অর্জন করতে পারব?…
১.খঅসুখী বিয়ের কারণ
মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ে নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়ে ১৯৬০ ও ’৭০ দশকের কৃষ্ণাঙ্গ–অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নিউ লেফ্ট ও নারীবাদী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। নিউ লেফ্ট ঘরানার মধ্যে তর্ক–বিতর্ক, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ চলতে থাকে। তার–ই পরিসমাপ্তিতে মার্কিন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিশ্লেষণ করা হয়, যা স্পষ্ট করে যে নিউ লেফ্ট এ্যাক্টিভিস্টরা মার্ক্সবাদী, লেনিনবাদী চিন্তা ও বৈপ্লবিক অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত বোধ করেন। নিউ লেফ্ট ধারা ওল্ড লেফ্ট এবং কম্যুনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলোর সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঐতিহ্যকে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি লক্ষণীয় যে বিশ্বের কোনো না কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে, এবং যে দেশগুলো নয়া–ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে যেমন কিউবা, ভিয়েতনাম, জিম্বাবওয়ে, চিলি… নিউ লেফ্ট একাত্ব বোধ করে। মার্ক্সবাদী ধারার মধ্যে অবস্থিত নিউ লেফ্ট নিঃসন্দেহে একটি নয়া ধরনের মার্ক্সবাদের সূচনা করে যেহেতু এটি স্টুডেন্ট ও তরুণ সংস্কৃতির ধারণাকে— যথা, পুঁজিবাদী/সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শ জীবনের প্রতিটি পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে, কি স্কুল, কি কর্মক্ষেত্র, সঙ্গীত, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, কমিউনিটি, পরিবেশ, এবং বিশেষ করে যৌন/সামাজিক সম্পর্কে— তার বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু রাজনীতিকে “ব্যাপৃত” করার যে উদ্যোগ নিউ লেফ্ট গ্রহণ করে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের জন্য সীমিত ছিল কারণ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল: “পুরুষেরা বিপ্লব করবে আর ছেরিগুলোর সঙ্গে শোবে” [“men will make the revolution and make their chicks”]। নিউ লেফ্ট ও কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আদায়ের জন্য লড়াকু সংগঠনগুলোতে যে নারীরা সক্রিয় ছিলেন, তারা প্রধানত দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন: (১) দৈনন্দিন কাজকে ঘিরে উদ্ভূত সমস্যা (আপিস কে পরিষ্কার করবে/কে সেটাকে নোংরা করে, কে লিফলেট লিখবে/কে সেটা টাইপ করবে, কে সভায় কথা বলবে/কে তার মিনিটস লিখবে, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কার মর্যাদা বাড়ে/কারটা কমে) এবং; (২) তত্ত্বের সমস্যা (কে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে, কারা বিপ্লবী, বিপ্লব কাকে মুুক্ত করে, বিপ্লবচলাকালীন কে সংসার সামলে রাখবে)।
তত্ত্ব ও দৈনন্দিন কাজকে ঘিরে যে সমস্যা তৈরি হয় তার উত্তর খুঁজে পেতে নিউ লেফ্ট আন্দোলনে অংশীদার নারীদের খুব বেশি কসরত করতে হয়নি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর মার্ক্সবাদ–ই বাতলে দেয়, আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর মেলে যৌনবাদী পুরুষদের [sexist men] সাহায্যে। অর্থাৎ, যারা উৎপাদনের কেন্দ্রে (শ্বেতাঙ্গ, শ্রমিক–শ্রেণীর পুরুষেরা) তারা, বিপ্লবী রাজনৈতিক ক্যাডারের সাহায্যে (তার মানে, শ্বেতাঙ্গ–মধ্যবিত্ত–পুরুষ যারা মার্ক্সবাদী তত্ত্বে নিমজ্জিত) বিপ্লব করবেন। নারী (প্রধানত শ্বেতাঙ্গ) বিপ্লব–চলাকালে সংসার সামলে রাখবেন, তাদের কাজ হচ্ছে বিপ্লবকে লালন করা, সেক্রেটারির ভূমিকা পালন করা: টাইপ করা, কাগজপত্র ফাইল করে রাখা, টেলিফোন করা, বিপ্লবীদের খাওয়ানো, তাদের সেবা–যত্ন করা, সমর্থন যোগানো, ভালোবাসতে থাকা, এবং হয়তবা, কখনো–সখনো, আধা–বিপ্লবী উৎসাহদাতা হিসেবে বিপ্লবের সম্মুখসারীতে থাকা।
এই কল্পিত দৃশ্যের কারণে (যা আমাদের কাছে দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়) নারীদের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে নিজেদের নিপীড়িত দশার ধরন, এবং তা যে কত বিস্তৃত, তাকে চিহ্নিত করা, তার সংজ্ঞা প্রদান করা। কারণ তা নাহলে বিপ্লবী “ভাইদের” কাছে নারীরা যৌন বস্তু ছাড়া ভিন্ন কিছু হতে পারবে না।
১.গআপিস কে পরিষ্কার করে’র সমস্যা: আমাদের নিপীড়নের সমস্যাকে সংজ্ঞায়িত করা
বেটি ফ্রিইডান তাঁর দ্যা ফেমিনিন মিস্টিক বইয়ে ‘নামহীন সমস্যা’ [“the problem with no name ”] প্রসঙ্গে লেখেন:
আমেরিকান নারীদের মনের গভীরে একটি সমস্যা লুকিয়ে ছিল। এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতেন না। আচমকা জেগে ওঠা অসন্তোষের একটি তীব্র বোধ, একইসঙ্গে একটি আকাক্সক্ষাও, মিলে–মিশে একাকার হয়ে বিংশ শতকের আমেরিকান নারীদের ভোগায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে সুসজ্জিত এলাকাগুলোতে (suburbia) প্রত্যেক গৃহিণী এই সমস্যায় ভোগেন। সকালবেলা বিছানাপত্তর গুছানোর সময়, বাজার–সদাই করার সময় কিংবা বাচ্চাদের সঙ্গে পিনাট–বাটার স্যান্ডউইচ খাওয়ার সময়, বা হয়ত যখন তাদের কাব স্কাউট বা ব্রাউনি মিটিংয়ে নামিয়ে দিচ্ছেন, হয়তবা রাতে স্বামীর পাশে যখন শুয়ে, তখন বারে–বারে এই ভাবনাটি মাথায় আসে, একটি প্রশ্ন যা উচ্চারণ করতেও ভয় লাগে: ব্যাস, এটাই কি সব? এর জন্যই কি এতকিছু?২৪
ঠিক যেসময়টাতে সাবারবিয়ার নারীরা ফ্রিইডানের ‘নামহীন সমস্যা’ পড়ছিলেন, তার সঙ্গে একাত্ব বোধ করছিলেন, সেসময়ে নিউ লেফ্ট নারীরা আন্দোলনের আপিস পরিষ্কার করছিলেন, সেটাকে গুছিয়ে রাখছিলেন, আন্দোলেনের কর্মীদের জন্য রান্নাবান্না করছিলেন, বাচ্চাদের দিনের বেলা দেখে–শুনে রাখছিলেন, গাড়ি ড্রাইভ করে প্রতিবাদ সমাবেশে এ্যাক্টিভিস্টদের পৌঁছে দিচ্ছিলেন, চিঠি ও লিফলেট টাইপ করছিলেন, ফোন ধরছিলেন, আর রাতেরবেলা আন্দোলনের প্রেমিক কিংবা স্বামীর পাশে শুয়ে জিজ্ঞেস করতে ভয় পাচ্ছিলেন, এই কি সব?
যদিও সিমোন দ’ ব্যুভোয়ার নারীর বিচ্ছিন্নতাবোধ, সমাজে জারি থাকা নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন বোধের কোনো নামকরণ করেননি, কিন্তু দ্য সেকেন্ড সেক্স বইয়ে ১৯৪৯ সালে তিনি এটাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছিলেন:
সুতরাং, মানবতা [humanity] হচ্ছে পুরুষ, আর পুরুষ নারীকে নারী হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে তাকে পুরুষের সাপেক্ষে করে; নারীর কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই… পুরুষ নারীকে যা ভাবে নারী তাই; সুতরাং, নারী হচ্ছে ‘লিঙ্গ’, যার অর্থ, পুরুষের দৃষ্টিতে একমাত্র নারীর–ই আছে যৌন পরিচয়। পুরুষের কাছে নারী হচ্ছে যৌনতা, নিরেট যৌনতা, আর–কিছু নয়। নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে সংজ্ঞায়িত করা হয়, পুরুষের তুলনায় পৃথক ভাবা হয়, পুরুষকে নারীর সাপেক্ষে নয়। নারী হচ্ছে আনুষঙ্গিক এবং অকস্মাৎ। পুরুষ হচ্ছে অপরিহার্য। পুরুষ বিষয় (সাবজেক্ট), পুরুষ সর্বসর্বা। নারী তার ‘অপর’।
নিউ লেফ্ট রাজনৈতিক ধারায়, পুরুষ কর্তৃক নারীর “অপর” হওয়ার আছর দৈনন্দিন কাজের সবদিকেই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মূল কেন্দ্র হচ্ছে, যা ব্যুভোয়ার বহু আগেই তাঁর বিশ্লেষণে ইঙ্গিত করেছিলেন, যৌনতা। পারসোনাল পলিটিক্স বইয়ে সারা ইভান্স বিবৃত করেন,
চোদার২৫ মধ্য দিয়ে নারী কর্মীর অস্তিত্বকে স্বীকার করা বহুস্থানেই সাধারণ চর্চা হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও এটা ছিল [নারী কমরেডের প্রতি পুরুষ কমরেডের যৌনবাদী আচরণের] চরম বহিঃপ্রকাশ। একজন পুরুষ নারীর সাথে সঙ্গম করে তাকে সংগঠনের সদস্য করতে পারতেন, আবার তার সঙ্গে শোওয়াশুয়ির সম্পর্ক বন্ধ করে তাকে সংগঠন থেকে বাদ দিতে পারতেন। [সংগঠন থেকে] নারীর বহিষ্কার [নানা কারণে] ঘটতে পারত, পুরুষটির তাকে আর ভাল্ লাগছে না বলে, কিংবা সে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়েছে বলে, বা অন্য কারো প্রতি তার [পুরুষ কমরেডের] আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে। আন্দোলন থেকে নারীকে বহিষ্কার করাটা অবিচলিতভাবে মেনে নেওয়া হতো।
আর তাই আন্দোলনে–সক্রিয় নারীরা একটি কষ্টকর ও হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির শিকার হন। এক দিকে তারা বুঝতে পারেন যে আন্দোলনের ভিতরে থাকা আর বাইরে থাকার মধ্যে গুণগত পার্থক্য আছে। ভিতরে থাকার কারেণ তারা গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাজ করতে পারছেন: যুদ্ধের বিরোধিতা করা, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শামিল হওয়া। তারা ঝুঁকি নিচ্ছেন। শিখছেন। নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। ১৯৫০–এর দশকে নারীর ভূমিকা যেই কঠোরতা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল, তারা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু অপরদিকে নারীদের কাছে এটাও স্পষ্ট ছিল যে আন্দোলনে–সক্রিয় পুরুষদের কাছে (কোনো কোনো নারীর কাছেও) নারীর কার্যকলাপ ও আন্দোলনে থাকার বৈধতার ভিত্তি হচ্ছে প্রথাগত “নারীসুলভ” [feminine] ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে অংশগ্রহণ করা, যথা, স্ত্রী, মা, বোন, রক্ষিতা, সেক্রেটারি, পরিচারিকা, পরিবেশিকা, নার্স ও যৌন বস্তু।
যৌনবাদ [sexism] মোকাবেলা করার প্রথমদিকের প্রচেষ্টার প্রত্যুত্তরে নারীদের যৌন–ইঙ্গিতময় গালাগালি শুনতে হয়েছিল [পুরুষ কমরেডদের কাছে থেকে], “কুত্তি, লেসবিয়ান, পুরুষত্ব–হানি করার চক্রান্তকারী” [bitch, lesbian, castrator]। সভা–সমাবেশে নারীরা সেক্সিজম নিয়ে প্রশ্ন তুললে পুরুষরা হৈচৈ করে হাঙ্গামা বাধাতেন আর চিল্লাচিল্লি শুরু করতেন যাতে তারা [নারীরা] মঞ্চ ছেড়ে দেন, [পুরুষ কমরেডরা] শিষ দিয়ে তাদের “ভালো একটা চোদা” নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। নিজেদের আত্মপরিচয় গোপন করে নারীরা যখন যৌনবাদী আচরণ নিয়ে লেখেন তখন পুরুষরা তাদের উপেক্ষা করেন। পরে, যখন পুরুষদের পক্ষে উগ্র যৌনবাদী আচরণ করে পার পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে কারণ নারীরা বারে–বারে যৌনবাদ প্রসঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য চাপ দিতে থাকেন, এমনকি অসমতাকে ঘিরে কাঠামোগত সমাধানের প্রস্তাব হাজির করেন, তখন পুরুষরা আরো সূক্ষ্ম ধরনের যৌনবাদী আচরণে অবতীর্ণ হ’ন। তার ফলে, যৌনবাদ কী, এবং কী উপায়ে তা প্রতিরোধ করা যায়, এর পিছনে নারীদের অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। আবার একইসঙ্গে, যৌনবাদী আচরণ যে ঘটছে তা প্রমাণ করার পিছনেও তাদের অনেক সময় খরচ করতে হয়। নিচে, নারীরা কীভাবে যৌনবাদী আচরণকে চিহ্ণিত করেন, তার নামকরণ করেন ও তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন, তার বর্ণনা দেওয়া হলো।
১.গ.১নারী সম্মেলনের আয়োজন
যৌনবাদ, যৌনবাদী রাজনীতি এবং এ ধরনের বিষয়ে নিজেদের অনুভুতি প্রকাশ করার জন্য নারীরা সাধারণত কৌশল হিসেবে কনফারেন্স ও বড় সভা চলাকালীন ‘নারী সম্মেলন’–এর আয়োজন করেন কারণ এ ধরনের ফোরাম ছিল পুরুষের ক্ষমতাগিরি থেকে মুক্ত। নারীদের দৃষ্টিতে তাদের এ ধরনের উদ্যোগ স্বার্থক; পুরুষদের বিবেচনায় তা আলাদা–কিছু, তারা নিজেরা যা করছেন তার সঙ্গে তুলনীয় নয়, গুরুত্বের বিচারে লঘু। পুরুষরা যেহেতু যৌন নিপীড়ক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা আলোচনা করতেন না বরং মনোযোগী হতেন “গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়” এর প্রতি, নারীদের দোটানায় ভুগতে হতো: তারা কি একইসময়ে অনুষ্ঠিত–হওয়া নারী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন নাকি রাজনৈতিক বৈঠক কিংবা সভায় যাবেন।
১.গ.২সভাপতি হিসেবে নারী
বড় দলের সামনে নারীরা যাতে কথা বলার সুযোগ পান, তার সুবিধার্থে পরিকল্পিত হলেও নারী–সভাপত্বিতে আয়োজিত মিটিং বাস্তবে পুরুষকে সভার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করার সুযোগ তৈরি করে দিত। ক্ষমতাশালী পুরুষরা বিশেষ কোনো নারীকে বাছাই করতেন সভা পরিচালনা করার জন্য (প্রায়শই এমন কেউ যার সঙ্গে সঙ্গমে আগ্রহী কিংবা ইতোমধ্যেই সঙ্গমের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে), মিটিং এ তার পাশে বসতেন। মিটিং চলাকালীন পুরুষরা কি কি করতেন: এজেন্ডার বিষয় তার কানে ফিসফিস করে বলা, কাকে এর পরে ডাকতে হবে তা বলে দেওয়া, সিদ্ধান্ত তার [পুরুষটির] মন মতো পালিত না হলে তাকে [নারীকে] তিরষ্কার করা, মিটিং ঠিক মতো পরিচালিত হচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করা। অনেকসময় উপস্থিত অন্য পুরুষরা নানাধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে নারী সভাপতি যে সভা পরিচালনায় অক্ষম সেই বোধ তৈরিতে সাহায্য করতেন: সভা চলাকালীন কথা বলা, হাসি–ঠাট্টা করা, কথা বলার সিরিয়াল ভঙ্গ করা, সভাপতিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যাতে এটি স্পষ্ট হয় যে “সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ সভা”র জন্য পুরুষ সভাপতি (অর্থাৎ, “শক্তিশালী” সভাপতি) ছাড়া উপায়ন্তর নেই।
১.গ.৩অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে নারী
বড় ধরনের স্থানিক কিংবা জাতীয় প্রতিবাদ সমাবেশে মঞ্চে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠান পরিচালনা করার দায়িত্ব নারীদের দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে নারীর দায়িত্ব পর্যবসিত হয় পুরুষ–বক্তাদের লম্বা তালিকা ঘোষণা করায়। তার মানে, নারীরা পরিণত হয় আন্দোলনের আপ্যায়নকারীর [hostess] ভূমিকায়। তিরিশ বা তার অধিক পুরুষ বক্তাকে মহিমান্বিত ভাষায় পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে অনুষ্ঠান–পরিচালনাকারী নারী যাতে তারা একে–একে যুদ্ধ, দারিদ্র, বৈষম্য, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দেওয়ার বাধ্য–বাধ্যকতা [draft policy ]-র বিরুদ্ধে, সরকার, প্রতিবেশ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে নারীকণ্ঠ শুধু তখনই শোনা যাচ্ছে যখন পরবর্তী বক্তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পালা।
১.গ.৪বক্তা হিসেবে নারী
নারী বক্তার ব্যাপারে পুরুষদের আপত্তি ছিল না যতক্ষণ পর্যন্ত বক্তার বক্তব্য সেই বিশেষ অনুষ্ঠান কিংবা নারী–বিষয়ে সীমিত থাকত। তার অর্থ হচ্ছে যে কোনো বড় সভা কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশে ঘোষক হিসেবে নারী উপরোল্লিখিত ভূমিকা পালন করতেন আর (হয়তবা) ২২তম পুরুষ বক্তার পর নারী ইস্যু নিয়ে কথা বলতেন। ততক্ষণে দেখা যেত যে দর্শকদের বেশির ভাগ হয় চলে গেছেন কিংবা দর্শক–পুরুষরা ঘুমিয়ে পড়েছেন বা নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করেছেন।
১.গ.৫কৌশলপ্রণেতা হিসেবে নারী
এই কৌশল নানাভাবে ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো পুরুষ, নারী–কর্মী বা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যকে এই উদ্দেশ্যে বাছাই করতেন যাতে মিছিল কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশের পলিসি বা কৌশল বিষয়ে তার নিজের সিদ্ধান্ত কার্যকরি করা যায়। সাধারণত তারা বাছাই করতেন নতুন সদস্য কিংবা যারা অনভিজ্ঞ, তাদের। বন্ধুত্ব বা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার নামে (কখনো–কখনো আন্তরিক), পুরুষরা নারীদের সঙ্গে কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেন। তারপর তারা যাতে এই কৌশলের পক্ষে মিটিংয়ে কথা বলেন, এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। যার কারণে নারীরা পরিণত হতেন পুরুষের সিদ্ধান্তের ‘বাহক’–এ। কখনো–কখনো দেখা গেছে যে সেই বিশেষ মিটিংএ পুরুষটি হয়ত জড়িতও নয়। তার অর্থ, নারীর ভূমিকা হচ্ছে তার প্রক্সি হওয়া। আবার এও দেখা গেছে যে পুরুষটি উপস্থিত, ‘বাহক’ সম্পর্কের কারণে পুরুষটিই ভোট পাচ্ছেন কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে ডমিনেটিং না মনে হওয়ার কারণে তিনি নারীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন না। কখনো–কখনো বাহক সম্পর্ক যৌনসম্পর্ক স্থাপনের সূত্রপাত হিসেবেও কাজ করত।
১.গ.৬কর্মীবৃন্দের নেতা হিসেবে নারী
বহু আন্দোলনকারী–সংগঠন গঠিত হয় (ক) কর্মীবৃন্দ [staff] দ্বারা, যারা দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করেন এবং (খ) স্টিয়ারিং কমিটি দ্বারা, যাদের দায়িত্ব হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বহু ক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনকারী স্টাফ–এর বেশির ভাগই ছিল নারী আর স্টিয়ারিং কমিটিতে ছিল পুরুষরা। যার ফলে স্টাফ সদস্য হিসেবে নারীরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করলেও পুরুষ–প্রধান স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরাই ঠিক করতেন আন্দোলেনর দিকনির্দেশনা ও পলিসি। কিছু–কিছু ক্ষেত্রে এটি অপ্রাসঙ্গিক ছিল কারণ দেখা যেত যে যারা দৈনন্দিন কাজ করছেন তারা স্টিয়ারিং কমিটির তুলনায় বেশি পলিসি নির্ধারণ করছেন। কিন্তু অনক সময় কাজের গতিপ্রকৃতি বা ডাইন্যামিক সাধারণ আপিসের মতোই ছিল: অর্থাৎ, পুরুষ হচ্ছে বস্, আর নারী হচ্ছে তার সেক্রেটারি।
১.গ.৭ভাগাভাগি করে আপিস পরিষ্কার করা
মিশ্র সংগঠনে সম্ভবত এটাই ছিল সংঘাতের প্রধান কারণ। পুরুষরা যাতে আপিস পরিষ্কার করা, রান্না–বান্না করা, আন্দোলনের আপিস— যা একইসঙ্গে যূথবদ্ধ রাজনৈতিক সংসার [ঢ়political collective household ]— গুছিয়ে রাখার কাজে অংশগ্রহণ করেন, সে কারণে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণিত রোটেশান সিস্টেম চালু করা হয়। এই ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত স¦ার্থক হয়নি। প্রথমত, পুরুষরা ভাব দেখাতেন যে তারা জানেন না পরিষ্কার করার অর্থ কী। নারীরা পরিষ্কার করার নিয়মনীতি টাইপ করে দিলে’পর, এক সপ্তাহ অনুশীলন করার পর সেটি উপেক্ষিত হতো। পুরুষরা আরেকটা পন্থা অবলম্বন করতেন, “যখন তোমাদের (নারীদের) পরিষ্কার করার পালা, তখন তোমরা (নারীরা) পরিষ্কার করবে; আর যখন আমাদের (পুরুষদের) পরিষ্কার করার পালা আমরা ৫ মিনিটের মধ্যে পরিষ্কার করে ফেলব।” তাদের আরো একটা পন্থাও ছিল, “যখন তোমাদের পরিষ্কার করার পালা, তোমরা পরিষ্কার কোরো, যখন আমাদের পরিষ্কার করার পালা, আমরা করব না।” এরপর পুরুষরা এ নিয়েও অভিযোগ করেন যে পরিষ্কার–করা নিয়ে নারীরা ঘ্যানর–ঘ্যানর করলে তাদের নিজেদের মা’র ঘ্যান–ঘ্যানানির কথা মনে পড়ে যেটা তারা কোনোভাবেই মনে করতে চান না। অর্থাৎ, নারীর কারণে–ই পরুষরা পরিষ্কার করেন না। নারীরা–ই দোষী। তারই আরেক রূপ প্রকাশ পায় যখন দলীয় পরিষ্কার অভিযানে দেখা যায় যে নারীরা আপিসঘর পরিষ্কার করছেন আর পুরুষরা হঠাৎ করে ফোন ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। পুরুষদের চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা বলেন, দলীয় কাজে তাদের যেটুকুন অংশগ্রহণ করার কথা ছিল তা তারা ইতিমধ্যেই সেরে ফেলেছেন। আরো ঘটনাও ঘটত। যেমন, কোনো–এক–মাহেন্দ্রক্ষণে–বড়সড়–পরিষ্কার–অভিযানে–নেমে নারীদের খুশি করার কৌশল। এ সময় দেখা যেত যে পুরুষরা আসলেও পরিষ্কার করার বড় কোনো একটা কাজ হাতে নিয়েছে যেমন ধরেন জানালা পরিষ্কার করা, ঘর রঙ করা (এতে করে কাজ–শেষে ঘরদোর আরো অগুছালো হতো) কিন্তু তারা ময়লা বিনে [bin] ফেলছেন না। চারপাশে খাবারের বাক্স পড়ে থাকা বা সদর দরজার সামনে লিফলেটের বাক্স পড়ে থাকা, এসব তাদের চোখে পড়ছে না। কিন্তু তাতে কি? মাহেন্দ্রক্ষণের অভিযানের পর পুরুষদের মনে হতো তারা নারীদের দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা নারীদের মতোই, বা তাদের চাইতে আরো ভালোভাবে ঘরদোর পরিষ্কার করতে পারে।
১.গ.৮সভায় নারীদের কথা বলা
সভায় নারীরা যাতে পুরুষদের মতো সমানভাবে কথা বলতে পারে তার জন্য নানান পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল: সভা পরিচালনার দায়িত্বে যিনি তিনি যে নারীরা কোনো বিষয়ে কথা বলেননি তাদের কথা বলার জন্য উৎসাহ দিতেন; স্লিপ ব্যবস্থা; সময় বেধে দেওয়া, পুরুষদের আগে নারীদের কথা বলার জন্য আহ্বান করা ইত্যাদি। এই পন্থাগুলোর ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রতিক্রিয়াকে সবচাইতে ভালোভাবে এই বলে বর্ণনা করা যায়: “যেই বিরতি চাঙা করে তোলে” [“the pause that refreshes”]। অথবা, “মেয়েরা কথা বলতে পারে কিন্তু আমাদের যে শুনতেই হবে এমন তো নয়”। এর বাস্তব অর্থ ছিল যে নারীরা যখন সভায় কথা বলতেন তখন পুরুষরা হয় কাশতেন বা বিড়বিড় করতেন বা বই পড়তেন কিংবা নারীর কথার প্রতি মনোযোগী না হয়ে আগের পুরুষ বক্তার বক্তব্যকে কিভাবে খণ্ডন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেন। সভায় নারীদের কথা বলা ছিল পুরুষদের নিজেদেরকে চাঙা করে তোলার বিরতির সময়।
১.গ.৯সবটুকু কানে না–তোলা
উপরে যা উল্লেখ করেছি তার–ই আরেক রূপ: পুরুষরা তখন–ই নারীদের কথা শুনতেন যখন তাদের মন চাইত। অর্থাৎ, কোনো নারী ধরেন নকশা নিয়ে কথা বলছেন তখন পুরুষরা শুনছেন কিন্তু তিনি যখন রাজনীতি প্রসঙ্গে কথা বলছেন তখন পুরুষরা আর–শুনছেন না। কিংবা দেখা যায় যে পুরুষরা “মনোযোগ দিয়ে শুনছেন” তখনই যখন তারা সেই বিশেষ নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। সেক্ষেত্রে পুরুষদের হাঁ–সূচক ঢঙে মাথা নাড়তেও দেখা যেত। অথবা, নারীটি যদি দেখতে আকর্ষণীয় হয়, তাহলে দেখা যায় যে নারীটি যখন অফিস কিভাবে সাজিয়ে রাখলে ভালো এ নিয়ে কথা বলছেন তখন পুরুষরা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন কিন্তু যখন একই নারী সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে কথা বলছেন তখন পুরুষদের মনোযোগের ঘাটতি ঘটছে। আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের লেসবিয়ান বলে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেওয়া হতো। আর লেসবিয়ান নারীদের কথা কোনোভাবেই কানে তোলা হতো না।
আন্দোলনকারী–সংগঠনে নারীরা যখন সমতার জন্য লড়াই করতে থাকেন তখন পুরুষরা দমনের অন্তিম পথ বেছে নেন: “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই; পুঁজিবাদী শ্রেণীকে উৎখাত করার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম।” সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই তত্ত্বের সমস্যা দেখা দেয়। তার কারণ, দৈনন্দিন কাজের পরিসরে এতোসব উদ্যমের পরও যদি নারীদের মার্ক্স, লেনিন ও মাও–এর অধ্যায় বা উদ্ধৃতি পড়ে শোনানো হয়, যদি ভাই/বাবা–রা তাদের বলেন, যাও তোমাদের কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো, এইটিন্থ ব্রুমেয়ার, অন কন্ট্রাডিকশান, পুঁজি–র তিন ভলিউম, বা তোমাদের ইমপিরিয়ালিজম: দ্য হাইয়েস্ট স্টেজ অফ ক্যাপটিালিজম এর কপি নামিয়ে পড়ো, যদি বলা হয় পরবর্তীকালের মার্ক্সবাদীদের কাজ, হাবারমাস, মারকিউস, ওয়েবার, আলথুসার, সুইজি, ম্যাগডফ, ব্রেভারমেন–বাহিনীর কাজ পড়ো, তাইলে আপিস কে পরিষ্কার করবে’র প্রশ্নটি তত্ত্ব এবং বাস্তব— উভয় পর্যায়েই নারীর লড়াইয়ের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
১.ঘতত্ত্বের সমস্যা
নিউ লেফ্ট আন্দোলনের নারীরা যখন যৌনবাদকে একটি বৈধ তাত্ত্বিক ইস্যু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন তখন তাদের শুনতে হয় “নারীর জন্য সবচাইতে ভালো পজিশন হচ্ছে সমান্তরাল পজিশন [যৌনসঙ্গী/নিষ্ক্রিয় হিসেবে]” [“the best position for women is horizontal”]। নিউ লেফ্ট পুরুষদের যৌনবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নারীদের সামনে তিনটি পথ খোলা ছিল: (ক) আন্দোলনের ভিতরে থেকেই লড়াই করতে থাকা (খ) আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র নারী সংগঠনে লড়তে থাকা, কিংবা (গ) দুটোই করা: থেকে যাওয়া, চলে যাওয়া। থেকে যাওয়ার অর্থ যেমনটি শিলা রোবথ্যাম উইমেন, রেসিস্ট্যান্স এ্যান্ড রেভোলিউশান–এ বলেন, “যা একান্তভাবে নারী চৈতন্য [feminist consciousness তাকে বর্জন করে বরং ভান করা যে নারীরা সুনির্দিষ্টভাবে [অর্থাৎ, নারী হিসেবে] নিপীড়িত নন”। আর চলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে নারী চৈতন্যকে মুক্তির অপরাপর আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। একইসঙ্গে দুটো করার অর্থ হচ্ছে দ্বিখণ্ডিত ব্যক্তিসত্তা (পার্সোন্যালিটি), দ্বিখণ্ডিত আনুগত্য, সময়কে দুই ভাগে ভাগ করা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে দুই ভাগে ভাগ করা। নারীরা যেই পথ–ই বেছে নেন না কেন, এক পর্যায়ে দেখা যায় যে বেশির ভাগ নারী–ই পুরুষ–প্রধান নিউ লেফ্ট আন্দোলন থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তারা নিজেদের রাজনীতি, তত্ত্ব ও সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করা শুরু করেছেন। ১৯৬০–এর দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৭০–এর দশকের শুরুর দিকে এই নয়া স্বতন্ত্র নারী আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল তার কর্মপদ্ধতি যার বৈশিষ্ট্য ছিল: ছোট, স্তরবিহীন, সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য দল গঠন [consciousness raising group]; “দ্য পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল” (যা ব্যক্তিক তাহা রাজনৈতিক)-এর রাজনীতি; পিতৃতন্ত্রের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। শারলট বাঞ্চ পার্সেনাল পলিটিক্স–এ বলেন, “মানুষের জীবনে এমন কোনো পরিসর নেই যা রাজনৈতিক নয়, এমন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই যা ব্যক্তিগত নয়। পুরোনো প্রাচীরগুলো ভেঙে গেছে।” নারীদের তাত্ত্বিক কার্যক্রমকে এ্যান পপ্কিন এভাবে বর্ণনা করেন,
পুরুষ শ্রেষ্ঠত্ব বলতে আমরা বুঝি প্রাতিষ্ঠানিক, সর্বব্যাপী ক্ষমতা যা পুরুষের আছে নারীর ওপর। [আমরা বুঝি] নারীর সামাজিক ক্ষমতাহীনতা হচ্ছে ব্যবস্থাজনিত কারণে [ব্যক্তিক কারণে নয়; নারীকে নারী বলেই ক্ষমতা কাঠামো থেকে বর্জন করা হয়]। [আমরা বুঝি] নারীর সমাজ–নির্দিষ্ট ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য যা অবমূল্যায়িত হয় ব্যবস্থাজনিত কারণে। ধীরে–ধীরে আমরা এও বুঝি যে পুরুষ শ্রেষ্ঠত্বকে আমাদের মোকাবেলা ও আক্রমণ করতে হবে একটি সর্বাঙ্গীন ব্যবস্থা হিসেবে।
নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশ ও নারীর রাজনীতি কী সেটিকে সংজ্ঞায়িত করার এই পর্বে নারীদের তৎপরতা বিশাল ও বিস্তৃত ছিল। ক্যাম্পাস, কমিউনিটি ও কর্মপরিসরে সচেতনতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে হাজারো দল গঠিত হয়। নারী কেন্দ্র স্থাপনের দাবি ওঠে, তার জন্য লড়াই শুরু হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস দখল করাই ছিল নারীদের জন্য কাজ করার ও পড়াশোনার আলাদা জায়গা আদায়ের একমাত্র উপায়। শিশুদের জন্য ডে–কেয়ার সেন্টার, নারীদের জন্য সেল্ফ–হেল্প ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা ছিল প্রধান দাবি। এ্যাবরশনের পক্ষে ক্যামপেইন শুরু হয় যার লক্ষ্য ছিল নারী যাতে তার নিজের পুনরুৎপাদনমূলক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। চিকিৎসা পেশা যৌনবাদী হওয়ার কারণে চিকিৎসক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নারী দেহের নিয়ন্ত্রণ নারীর নিজের কাছে ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব বারবারা এহ্রেনরাইক ও ডেইড্রে ইংলিশ এভাবে ব্যাখ্যা করেন:
আমাদের সংস্কৃতিতে যৌনবাদী মতাদর্শের সবচাইতে শক্তিশালী সূত্রের একটি হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। যৌন পরিচিতির ভিত্তিতে প্রভেদ করা হয় শিক্ষা, চাকুরি ও পাবলিক পরিসরে। অন্তিম অর্থে এটি নির্ভর করে নারীদের পুরুষ থেকে ভিন্ন করে তোলার উপর: শারীরিক ভিন্নতার উপর। চূড়ান্ত অর্থে, পুরুষ উৎকৃষ্টতার সব তত্ত্ব নির্ভর করে জৈবিকতার উপর।
নারীর প্র্যাক্টিস এবং পুঁজির বিরুদ্ধে “বৃহত্তর” সংগ্রামে যৌনবাদকে বৈধ ইস্যু হিসেবে বোঝার জন্য তাত্ত্বিক ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে, নারীরা এক্ষেত্রেও সাংঘাতিকভাবে কাজ করেন। নারীদের তাত্ত্বিক কাজকে এই প্রশ্নগুলোর সাহায্যে সংজ্ঞায়িত করা হয়:- নারীর নির্দিষ্ট নিপীড়নকে কীভাবে বুঝলে নিউ লেফ্ট পুরুষের মার্ক্সবাদী পদাবলির [Marxist terminology] সংকীর্ণ বোঝাপড়ার মুখোমুখি হওয়া যাবে যেহেতু তারা শুধু শ্রম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন; কীভাবে নতুন তত্ত্ব তৈরি করা যাবে যা সমকালীন বিশ্লেষণ ও আগামী দিনের কল্পদৃশ্যে পুনরুৎপাদন, পরিবার ও যৌনতাকে তত্ত্বের কেন্দ্রে গুরুত্বসহকারে স্থাপন করতে পারবে?
এখন আসি এই বইয়ের প্রসঙ্গে, উইমেন এন্ড রেভোলিউশান। মার্ক্সবাদ ও নারীবাদের অসুখী বিয়ের আলোচনা। এই বইতে শুরুর দিকের সেই তাত্ত্বিক প্রশ্নগুলোকে বর্ণনা ও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। তার কারণ নারীবাদী তত্ত্ব বিকশিত হয় প্রধানত তিনটি ধারায়: (১) র্যাডিকাল (২) সমাজতান্ত্রিক (৩) মার্ক্সবাদী নারীবাদ। প্রতিটি ধারায় বিবিধতা ছিল, উপধারা ছিল। লেসবিয়ানবাদ উৎসারিত হয় র্যাডিকাল নারীবাদী বিশ্লেষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে, র্যাডিকাল নারীবাদী প্র্যাক্টিস থেকেই লেসবিয়ান ধারার নারীবাদ আলাদা ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এ্যানারকিজম প্রক্রিয়া ও কাঠামো, উভয়কেই প্রভাবান্বিত করে। বর্ণবাদ যদিও নারীবাদী আলাপ–আলোচনার অংশ ছিল কিন্তু নারীবাদী তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিস কখনোই বর্ণবাদ (এবং শ্রেণীবাদ)-কে স্বার্থকভাবে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। এর ফলে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা শ্বেতাঙ্গ নারীবাদী আন্দোলন— তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিসের— কড়া সমালোচনা করেন। শেষমেষ তারা নারীবাদী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বর্ণবাদ ও যৌনবাদকে একত্রিত করে বিশ্লেষণ করার গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করে নিজেদের পজিশন আলাদাভাবে ব্যক্ত করেন।
এই তিন ধারার নারীবাদী তত্ত্বায়নের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে কখনো–কখনো টানাপোড়েন ছিল, ক্ষেত্রবিশেষে তারা বিরুদ্ধভাবাপন্নও ছিল। বাদবাকি সময় তারা একে অপরকে প্রভাবান্বিত করে, চিন্তার রসদ যোগায়। পরস্পরের ভিতরে মিলও ছিল। মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রভাব প্রতিটি ধারায় সুস্পষ্ট ছিল। পুনরুৎপাদন ও যৌনতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন, এ বিষয়ে আগ্রহ ও মনোযোগ প্রতিটি ধারার ক্ষেত্রে লক্ষণীয়। তা সত্ত্বেও অনেকাংশেই মনে হয়েছে ধারাগুলোর মধ্যে তত্ত্ব ও কৌশল নিয়ে যে বিরোধ তা অতিক্রম হওয়ার মতো নয়।
র্যাডিকাল নারীবাদীদের চিন্তামতে, পিতৃতান্ত্রিক যৌনভিত্তিক নিপীড়ন–ই [patriarchal sex oppression প্রধান। তাদের দৃষ্টিতে যৌনতার ভিত্তিতে শ্রমবিভাজন শ্রেণীগত ও বর্ণভিত্তিক নিপীড়নের জন্ম দেয়। আর এই কারণে, কৌশলগতভাবে যৌনভিত্তিক নিপীড়নের অবসান ঘটালে অপরাপর নিপীড়নের অবসান ঘটবে। তারা মনে করেন, নারীরাই হচ্ছে প্রধান বিপ্লবী দল; অনেকের কাছে তার অর্থ হচ্ছে পুরুষ নিপীড়কদের থেকে আলাদাভাবে সংগঠিত হয়ে লড়াই করা।
মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা বিশ্বাস করেন যে পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীর গুরুত্ব “শ্রমিক” হিসেবে, “নারী” হিসেবে নয়। পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে (গৃহী শ্রম/domestic labour) মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা নারীর ভূমিকাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন যাতে মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণে নারী গুরুত্বলাভ করে, যাতে তার মাধ্যমে মার্ক্সবাদী বর্গের [categories] সম্প্রসারণ ঘটে। কৌশলের দিক থেকে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মিশ্র সংগঠনে কাজ করতে থাকেন, অনেকে আবার অন্য নারীদের সঙ্গে স্বতন্ত্র ইস্যুর লড়াইয়েও যোগ দেন।
সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা র্যাডিকাল নারীবাদীদের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত যে পিতৃতন্ত্র নামে নিপীড়নের একটি ব্যবস্থা বিদ্যমান; মার্ক্সবাদী নারীবাদীদের সঙ্গে তারা এ বিষয়ে একমত যে শ্রেণীভিত্তিক নিপীড়ন সব শ্রমিকদের অবস্থা নির্ধারণ করে। সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা তাদের সমাজ–বিশ্লেষণে এ দুটো পন্থাকে একীভূত করার চেষ্টা করেন। আর কৌশলের দিক থেকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা পুরুষ–প্রধান নিউ লেফ্ট এবং স্বতন্ত্র নারী সংগঠনে কাজ করতে থাকেন।
নারীবাদী তর্ক–বিতর্কের অবয়বকে নির্ধারণ করে এই তিনটি প্রধান ধারা। র্যাডিকাল ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের ব্যাপারে মার্ক্সবাদী নারীবাদীদের সমালোচনা হচ্ছে তারা যথেষ্ট বস্তুবাদী নন, আর এ কারণে শ্রেণী নিপীড়ন ও নারীবাদী আন্দোলনের শ্রেণী চরিত্রের ব্যাপারে তারা অবহিত নন। অন্যদিকে মার্ক্সবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের নিয়ে র্যাডিকাল নারীবাদীদের সমালোচনা হচ্ছে, তারা মানুষের চৈতন্য–গঠনে পিতৃতন্ত্রের গুরুত্বকে উপেক্ষা করেন, যৌনবাদী আচরণ বজায় রাখার মানসিক চাহিদাকে অবজ্ঞা করেন। অপরদিকে, সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা মার্ক্সবাদী ও র্যাডিকাল নারীবাদীদের এই বলে সমালোচনা করেন যে, প্রথম ঘরানা প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থনীতিবাদী [economistic], দ্বিতীয় ঘরানা খুব–বেশি সাব্জেক্টিভ (ব্যাক্তি–বিষয়ী) আর সে কারণে, অনৈতিহাসিক। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা তিনটি ঘরানাকেই বর্ণবাদী বলে সমালোচনা করেন, তারা এমন তত্ত্ব প্রস্তাব করেন যা নারীবাদী বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করবে নরবর্ণের [race] প্রসঙ্গকে । র্যাডিকাল, সমাজতান্ত্রিক ও মার্ক্সবাদী নারীবাদ— তিনটি ঘরানায় লেসবিয়ান নারীবাদীরা ছিলেন, তারা স্ব–স্ব ঘরানায় কনশাসনেস–রেইজিং–এর মাধ্যমে বিষমকামীতাকে [heterosexuality] একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোঝা ও বিশ্লেষণ করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন; অবার একইসঙ্গে সামগ্রিকভাবে নারীবাদী বিশ্লেষণ ও কৌশলের অংশ হিসেবে লেসবিয়ানবাদের গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করেন।
অধ্যয়ন, পড়াশোনা, আলাপচারিতা, মিছিল–সমাবেশ এবং সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন নারীরা, এর সাহায্যে নারীবাদী তত্ত্বের আলোচনার অবয়ব তাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়। কোন্ কোন্ প্রশ্নের তাত্ত্বিক উত্তর খুঁজতে হবে তা ধীরে–ধীরে আরও স্পষ্ট হয়: নারীরাই কি আসল বিপ্লবী শ্রেণী যাদের মুক্তি আর–সকল নিপীড়নের অবসান ঘটাবে? মার্ক্সবাদী ও নারীবাদী বিশ্লেষণ কি একইসঙ্গে করা যায়, এমনভাবে যাতে দুটোর গুরুত্বই সমান ওজনের হয়? নারী নিপীড়ন বোঝার জন্য অর্থনেতিক বর্গ–ই কি পর্যাপ্ত না–কি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এমনই মজ্জাগত যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পালটে গেলেও যৌনবাদী ধ্যান–ধারণার নড়চড় ঘটে না? চৈতন্য গঠনে যৌন/লিঙ্গ বা জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব কী? প্রায়–পুরো ইতিহাস জুড়ে নারীরা কেনই বা প্রায়–একই ভূমিকা পালন করেছেন তা বোঝার জন্য কোন্ কোন্ বিষয় অধ্যয়ন করা উচিৎ?
রাজনৈতিক এবং কৌশলগত ভিন্নতা সত্ত্বেও নারীবাদী আন্দোলনের বিবিধ ধারা একটি মিশাল [shared] সূত্রে গাঁথা। নারী চৈতন্য গড়ে ওঠে নারীদের অংশীদারী সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ঘিরে। আগের জমানায় যে নারীরা মিছিল–সমাবেশ করেছিলেন, লিখেছিলেন, সংগঠিত হয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে এই জমানার নারীবাদীরা উদ্দীপনা, চিন্তাভাবনা ও কৌশল ধার করেন। এই জমানার আন্দোলনের বিকাশের ক্ষেত্রে, নারীদের সর্বজন [common] ভাষা, অংশীদারী অতীত এবং অংশীদারী বর্তমান— সবই ছিল সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন কাল, ভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থার কথা, অন্য নারীদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা পড়ে নারীরা উপলব্ধি করেন যে বর্তমানে যা ঘটছে তা আগেও ঘটেছিল, বহুবার ঘটেছিল। এলেক্সান্দ্রা কোলনতাই, রুশ কমিউনিস্ট পার্টির অগ্রণী নেতা, ১৯২৬ সালে লিখেছিলেন:
আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধেও কিছু বলতে চাই। কাজ, পার্টি এসাইনমেন্টের মধ্যেও কতরকম উত্তেজনার মুহূর্ত, এতসবের মধ্যেও যে ঘনিষ্ঠ কিছু অভিজ্ঞতা, ভালোবাসার টানাপোড়েনের সময় মেলে! দুর্ভাগ্যবশত, হ্যাঁ! দুর্ভাগ্যবশত এ কারণে বলছি যে এ ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাধারণত অনেক বেশি মনোযোগ, কষ্ট, নিরাশা জড়িয়ে থাকে, অনেক বেশি এনার্জি অর্থহীনভাবে ব্যয় হয়। কিন্তু কোনো–এক পুরুষ আমার মনের গভীর পর্যন্ত পৌঁছুতে পারবে, আমাকে বুঝবে, পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে চিনবে, এসবের কারণেই এই সিদ্ধান্ত আপনাআপনি হয়ে যায়। আর প্রতিবার এ কারণেই দ্রুত হতাশ হই কারণ বন্ধুটি আমার মধ্যে দেখে শুধু নারী সত্তা যেটিকে সে নিজ অহম [বমড়] প্রচার করার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত করতে চায়। সুতরাং, বারে–বারে সেই অনিবার্য মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে যখন একাত্ববোধের শৃঙ্খল ঝেড়ে ফেলে, হৃদয়বেদনা সত্ত্বেও স্বতন্ত্র, অ– প্রভাবিত সত্তা নিয়ে আমি সরে দাঁড়াই। কিন্তু তখন আমি একা।
কিন্তু আমরা কোলনতাইয়ের মতো একা নই। আমাদের আন্দোলন আছে। তত্ত্ব ও প্র্যাক্টিস শুরু হয়েছে। আর–কখনোই “নারী প্রশ্ন”কে “নামহীন সমস্যা” বলে বর্ণনা করা হবে না। আমাদের নাম আছে।
(অনুবাদ শেষ)
পরের অংশে আছে এদেশের বাম নেতা মোশরেফা মিশুর সঙ্গে নারীমুক্তি ও বামদলগুলো কিভাবে পুরুষ আধিপত্যকে জারি রাখে সে প্রসঙ্গে আলাপচারিতা; ভাঁজে–ভাঁজে আছে কম্যুনিস্ট পার্টিগুলো কিভাবে ‘পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিকার’ সে প্রসঙ্গে নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড পার্বতীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ।
২. পুরুষের লেখা স্ক্রিপ্টে নারীমুক্তি: মোশরেফা মিশুর সঙ্গে আলাপচারিতা
[নারীমুক্তি ও শ্রেণী সংগ্রামের সম্পর্ক] খুবই ঘনিষ্ঠ। সবচাইতে আগে নিপীড়নের শিকার হয়েছে নারী। [কিন্তু] শ্রেণী শোষণ শেষ হওয়ার পর তাদের–ই মুক্তি সবচাইতে শেষে ঘটবে। আর এ কারণে শ্রেণী নিপীড়ন জারি আছে কি–না তা পরীক্ষা করার পথ হচ্ছে নারী নিপীড়ন টিকে আছে কি–না তা পরখ করে দেখা।২৬
– কমরেড পার্বতী, সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ও নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের নারী বিভাগের প্রধান
কম্যুনিস্ট পুরুষদের বোঝা উচিৎ যে বিপ্লব ও বিপ্লবের অর্জনগুলোকে তখনই টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যখন বিপ্লবে আরো এবং আরো নারী যোগ দেবে।২৭
– কমরেড পার্বতী
“নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রচেষ্টার দিকে যদি তুমি তাকাও, নারী ও পুরুষের মধ্যে যাতে সমতা গড়ে ওঠে, তাহলে তুমি দেখবে যে পার্টি নেতৃত্বের দৃষ্টিতে এটা হচ্ছে সময়ের অপচয়। তাঁরা মনে করেন যে নারীর কন্ট্রিবিউশান পুরুষের তুলনায় কম। আমি জানি না তাঁরা কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান। আর আমদেরকে দেখা হয়, আমরা ২–১ জন যারা নেতৃত্বের উঁচুতে পৌঁছেছি, আমাদরকে মনে করা হয় এক্সেপশনাল। কখনো–কখনো আমাদের প্রসংশা করা হয়, আবার অনেক সময়ই আমরা হয়ে উঠি নিন্দার পাত্র।”
কথা হচ্ছিল মোশরেফা মিশুর সঙ্গে, মিশু গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি, বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্টের আহ্বায়ক। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ওঁকে চিনি, খুব বেশি দেখা হয় না কিন্তু হলেই আমরা পরস্পরকে জাপটে ধরে অনর্গল কথা বলতে থাকি। দুনিয়া–জাহানের জিনিস নিয়ে আমাদের কথা হয়— গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি, কত নির্মমভাবে তাঁরা শোষণের শিকার, মিশুর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, ওঁর ব্যক্তিগত সংগ্রাম, সরকারের হয়রানি, ওঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ খানেক মামলা— আরো কতকিছু। মিশু সবসময়ই আমার কাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন, আমি কী লিখছি, কী পড়ছি, সবসময় আমাকে বলেন আমাদের একত্রে বসে চিন্তাভাবনা শেয়ার করা উচিৎ।
“বাম দলগুলোতে তুমি অনেক নারীকেই পাবে যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজকর্ম করছেন, যাঁরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত পার্টিকে উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু তাঁরা এখনও সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যও হতে পারেননি। কেন সিপিবিকে দেখো না, হেনা দাস সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হলেন ৮০ বছর বয়সে। বা কৃষ্ণা দি’কেই দেখো না, এই ক’দিন আগে উনি সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হলেন, তাঁর বয়স ৬০–এর বেশি। পুরুষরা? ওহ, তাঁরা তো আরো অনেক অল্প বয়সে, হয়তো আমারই বয়সে— আমার বয়স এখন ৪৫— বা আরো অল্প, ধরো তিরিশ পেরিয়ে চল্লিশে পা দেবার আগেই…।” আচ্ছা, নারীরা কী এ নিয়ে প্রশ্ন করেন? “কিছুটা, কখনো–সখনো,” মিশু বলেন। “কয়েক মাস আগে, আমার মনে পড়ে শিরিন আপা [শিরিন আক্তার, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সহ–সাধারণ সম্পাদক] জামান ভাইকে [বাসদের কমরেড খালেকুজ্জামান] এ নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। কারণ রুশো আপা, জলি আপা, তাঁরা এখনও পর্যন্ত সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হননি। যদিও তাঁরা সাংঘাতিক নিষ্ঠাবান, যদিও নেতা হিসেবে তাঁদের দুর্দান্ত সামর্থ্য, যদিও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। এমনকি তাঁরা তো সেন্ট্রাল কমিটির বিকল্প সদস্য পর্যন্ত হতে পারেননি। এখনও পর্যন্ত কোনো নারী বাসদের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য হতে পারেনি— ভাবো অবস্থা!”২৮
“আমি কিসের জোরে কথা বলি? আমি যেহেতু গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিটি ফোরামের সভাপতি, আমি যেহেতু মাঠ পর্যায়ে কাজ করি— এ কারণে তাঁরা আমাকে গ্রহণ করেন [করতে বাধ্য?]। আমার মনে হয় তুমি যদি অন্য বাম দলের নারী কমরেডদের জিজ্ঞেস করো ওরা তোমাকে ২–৪টা কথা নিশ্চয়ই বলবেন কিন্তু তা হবে আড়ালে। তুমি তাদের উদ্ধৃত করতে পারবে না।” আচ্ছা, এটা কী পার্টির প্রতি আনুগত্যের কারণে?— মিশুর কথার মধ্যে আমি ঢুকে পড়ি। “না, তা হবে কেন? আমিও তো পার্টির প্রতি অনুগত। আমি কথা বলি কারণ আমার মনে হয় এ নিয়ে কথা বলা জরুরি। আর তাঁরা বলেন না, কারণ তাহলে তাঁদেরকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হবে। হাজার হোক, কার ঘাঁড়ে কটাই বা মাথা আছে?”
মিশুর সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ করার এক ফাঁকে ব্রেক নেই, টেবিলে রাখা কমরেড পার্বতীর এই কথাগুলো চোখে পড়ে:- “দেখা গেছে যে বিপ্লবী কম্যুনিস্ট আন্দোলন সবসময়ই নারী দ্রোহের লাগামকে মুক্ত করতে পেরেছে, কিন্তু কখনোই এই শক্তিকে নারী কম্যুনিস্ট নেতা তৈরির কাজে লাগাতে পারেনি। কম্যুনিস্ট পার্টিতে নারী নেতার সংখ্যা এত অল্প কেন এ নিয়ে বারে–বারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে কারণ মার্ক্সবাদ নারী নিপীড়নের সাংঘাতিক গভীর বিশ্লেষণ উপস্থিত করতে সক্ষম। আর তার সমাধানও।”২৯
মিশুরও বলতে গেলে একই প্রশ্ন:- বাংলাদেশের বাম আন্দোলনে নারী নেতার সংখ্যা এত কম কেন? কম্যুনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নারী নেতা তৈরি করার ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রেখেছে?
এর উত্তর কোথায়–ই বা খুঁজব, আমি ভাবি।
মিশুর কথা শুনতে শুনতে মনে হয় তার মানে কি বাম আন্দোলন ধরে নেয় যে সামাজিক–অর্থে পুরুষদের কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় নেই? যে, যেহেতু তারা পুরুষ, তারা লৈঙ্গিক পরিচয় (gender identity)-এর উর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন? নারীদের বিপরীতে, যারা কিনা পদে–পদে তাদের লৈঙ্গিক পরিচয় দ্বারা বিপর্যস্ত? হতে না চাইলেও, তার উর্ধ্বে উঠতে চাইলেও, অন্তিম বিশ্লেষণে তারা এই পরিচয় দ্বারাই বিপর্যস্ত? বাম আন্দোলন কি ধরে নেয় যে পুরুষরা যখন আন্দোলন–সংগ্রাম করেন তারা সকলের হয়ে করেন কিন্তু যখন নারীরা করেন তখন তারা শুধু নারীজাতির–ই প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন? উপরন্ত, এই আন্দোলন কি ধরে নেয় যে, যৌন সত্তা নারী একা–ই বহন করে? পারিবারিক সত্তার বেলায়ও তাই?
“তোমাকে আরেকটা ঘটনার কথা বলি,” বললেন মিশু। “অনেক আগের ঘটনা, তখন আমার বয়স অনেক কম। আমি তখন ছাত্র ঐক্য ফোরামের সভাপতি, প্রায় চল্লিশখানেক ছাত্র সংগঠনের মধ্যে আমি একমাত্র নারী সভাপতি। আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, আমার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়, ব্যাংক ডাকাতি চেষ্টা করার অভিযোগ। আসলে হয়েছিল কি, সর্বহারা পার্টির একটি দল গাজীপুরের একটি পেট্রোল পাম্পে ডাকাতি করার সময় ধরা পড়ে, আমি যেহেতু সর্বহারার সমালোচনা করেছিলাম তাই তারা ধরা পড়ার সময় আমার নাম ঢুকিয়ে আমাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ওরা পুলিশকে বলে, ডাকাতিতে আমি নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, ধরা পড়ার ঠিক আগ– মুহূর্তে অন্য গাড়িতে পালিয়ে গেছি। আমার ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা, আর আমার দুই বোন যারা তখন পার্টিতে নতুন যোগ দিয়েছে, আমার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে একটি বিবৃতি নিয়ে বিভিন্ন বাম দলের নেতাদের কাছে যায়। তাঁদের স্বাক্ষর করতে অনুরোধ জানায়। তাঁরা অস্বীকৃতি জানান। তাঁরা বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক নয়। পরে জেনেছি নির্মল সেন নাকি তখন ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশে আর কিছু না থাকুক অন্তত একজন নারী ডাকাত তো আছে! আমার প্রশ্ন হলো: আমাকে গ্রেপ্তার করা, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া— এগুলো কিভাবে রাজনৈতিক না হতে পারে? যারা মামলায় আমার নাম ঢুকিয়েছিল তারা তো এ কারণেই করেছিল কারণ আমি রাজনীতি করি? ধরো আমি যদি গৃহবধু হতাম তাহলে তো আর আমার নাম দিত না, তাই না? কোনো কোনো বাম নেতা নাকি এও উচ্চারণ করেছিলেন— আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি কারণ তাঁদেরই একজন নারী নেতা পরে আমাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন— তোমার কি সর্বহারা পার্টির কারো সঙ্গে এফেয়ার ছিল? সেই কারণেই কি প্রতিহিংসা হিসেবে তোমার নাম মামলায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল?”
মিশুর কথা শুনতে শুনতে মনে পড়ে পাহাড়ি নেতা কল্পনা চাকমার কথা। ১২ বছর আগে,৩০কল্পনাকে তাঁর মারিষ্যার (খাগড়াছড়ি) বাসা থেকে আর্মি তুলে নিয়েছিল বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ। একই কিসিমের কেচ্ছা ফেঁদেছিল তারা যারা ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। এটা প্রেম–ঘটিত ব্যাপার, কল্পনা নাকি আর্মির লেফেটনেন্ট ফেরদৌসের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। একইধরনের ভাবনা যে বাম মহলের মধ্যেও বিরাজ করে, যাঁরা নিজেদের অপর প্রান্তের বলে দাবি করেন— এই বিষয়টা আমাকে বরাবরই হতবিহ্বল করে।
২.কবিয়ের সম্পর্কে কমরেড
কমরেড পার্বতী বলেন, যে নারীদের বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য আছে তাঁরা নেতা হতে পারেন না বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের কারণে। নেপালের গণযুদ্ধের কারণে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে ঠিকই কিন্তু গণযুদ্ধের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে নারী নেতৃত্ব গড়ে ওঠার জন্য নারীদের যেভাবে আন্দোলনে ধারাবাহিকভাবে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন, বিয়ে ও সন্তানধারনের কারণে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটে। বাচ্চা নেওয়াটা একটি “একপেশে বোঝা,” প্রতিটি নতুন শিশু জন্মানোর অর্থই হচ্ছে [নারী কমরেডের] গৃহী দাসত্বের শৃঙ্খল আরো বেড়ে যাওয়া, আরো প্রকট হওয়া। কম্যুনিস্ট নারীদের অভিযোগ হচ্ছে “বাচ্চা হওয়াটা [পার্টির] শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অধীনে থাকা”র মতোই কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পার্টির কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হয় তাদের। সম্ভানাময়ী ও উচ্চাকাক্সক্ষী নারী ক্যাডাররা হারিয়ে যান, নিজেদের পছন্দের কমরেডদের বিয়ে করা সত্ত্বেও। নারীর পুনরুৎপাদকালীন ও সন্তান লালনপালনের বছরগুলোতে সে বাস্তবিক–অর্থে খুব কমই সাহায্য পায়। নারী ক্যাডারদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিয়ে করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। যার এখনো বিয়ে হয় নাই, তাকে— কি পুরুষ কি নারী কমরেড, উভয়কেই “সন্দেহের চোখে” দেখা হয়। যৌন নিয়মের লঙ্ঘনকে রাজনৈতিক নিয়মের লঙ্ঘনের চাইতে আরো বেশি বড় অপরাধ মনে করা হয়।৩১
কমরেড পার্বতী (হিসিলা ইয়ামি) নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য ও নারী বিভাগের প্রধান ছবি: আলোকচিত্রীর নাম জানা যায়নি।
আমি মিশুকে জিজ্ঞেস করি, এদেশে প্রচলিত বিয়ে ও যৌনতার সামাজিক সম্পর্ক এখানকার বাম ধারার নারীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে? আর তুমি, তুমি তো সিঙ্গেল। আচ্ছা, বলো তো, বাম ধারার নারীরা বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার জন্য নারীমুক্তির আকাক্সক্ষাকে কর্মসূচীর মধ্যে কীভাবে আকার–আকৃতি দিয়েছে?
“বাম ছাত্র সংগঠন করার সময় থেকে এ পর্যন্ত আমি যা দেখেছি— বাম দলগুলোর কথা বলছি— যেই নারী বুদ্ধিমান আর দেখতে ভালো— বাম পুরুষদের ভাষায়, “সুন্দরী এ্যান্ড শার্প”— তাকে বিয়ের জন্য বাছাই করা হয়। বলা হয়ে থাকে বিয়ে করলে এই নারী কমরেড নিশ্চিতভাবে বাম রাজনীতিতে থাকবে। কিন্তু তা যে অনিবার্যভাবে ঘটে তা–না। অনেকেই গৃহের অন্তরালে হারিয়ে যান। বুদ্ধিমান বাম পুরুষদেরও আমি বলতে শুনেছি— যেসব ক্ষেত্রে দুজন কমরেড–ই সমানভাবে যোগ্য, দুজনা একইভাবে সম্ভাবনাময়ী— যেহেতু দুজনকে একইসঙ্গে গড়ে তোলা যাবে না, একজনের স্যাক্রিফাইস করতে হবে। একজনকে ক্রুশে চড়তে হবে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে পুরুষদের কখনোই ক্রুশে চড়তে দেখি নাই! বাম মহলে সবসময় জেনি মার্ক্সের৩২ অবদানের কথা, ক্রুপস্কায়ার৩৩ কথা স্মরণ করা হয়। লিও জোগিশের৩৪ কথাও বলা হয়। আমি নিজে আমার পুরুষ কমরেডদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি, তাঁরা কোনো অংশে কম স্যাক্রিফাইস করেননি, তাঁরা বহু বাধাবিপত্তি পার করেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো ঘাটতির কথা বলছি না। আমি শুধু বলছি তাঁদের আউটলুকের কথা। তাঁরা ভয়াবহ রকমের chauvinistic (উগ্র পুরুষবাদী)। আর নরবর্ণবাদীও (racist)। তুমি ভাবতে পারবে না “ফর্সা” বউ আর “কালো” বউ নিয়ে কত ধরনের কত কথা যে আমার কানে আসে।
“এখানকার প্রগতিশীল পুরুষ, কম্যুনিস্ট পুরুষ— আর কথাগুলো আমি একদম সিরিয়াসলি বলছি রেহনুমা, confidently বলছি— তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে সমতা চর্চা করেন না। নিজের স্ত্রীর প্রতি না, কন্যাদের প্রতি না, বোনদের প্রতিও না। তাঁরা হচ্ছেন কর্তা। আমি নামধাম উল্লেখ করতে চাই না কিন্তু এমন বাম নেতাদের আমি চিনি যাঁদের মেয়েদের “ভালো” পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছে। আর “ভালো” পাত্রের মানে হচ্ছে যার বিদেশী ডিগ্রি আছে। এ নিয়ে আমি অন্য নারী কমরেডদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরাও একই কথা বলেছেন।” আর পার্টির যেই নারীরা পুরুষ কমরেডদের বিয়ে করেন, পার্টি নেতাদের বিয়ে করেন, তাঁদের অবস্থা কেমন?— আমি জিজ্ঞেস করি। “অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় যে তাঁরা পার্টিতে নতুন। মার্ক্সবাদী দর্শনে নতুন। এমন পরিস্থিতিতে, অমূকের কাছ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাওয়াটা বড় ব্যাপার, যেহেতু তার স্ট্যাটাস আরো বেশি, তার প্রেস্টিজ আরো বেশি। তাঁরা নিজেরা একটি এলিট শ্রেণীর মতো।”
আচ্ছা, আর যৌনতার প্রসঙ্গে আলাপ করতে চাচ্ছি। তুমি তো সিঙ্গেল, বরাবর অবিবাহিতই থেকেছ— এই বলে আগের কথাসূত্রে ফিরে যাই। মিশু বলেন, “এই শব্দটি কখনো উচ্চারণ করা হয় না। এটা ট্যাবু। আমি পুরুষ কমরেডদের বসে আড্ডা দিতে দেখেছি, তাঁরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন, দেখেই বোঝা যায় তাঁরা এসব বিষয়ে কথা বলছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমার যদি ২–৪টা পুরুষ বন্ধু থাকত, রাজনীতিতে আমি ঠাঁই পেতাম না। কোনো জায়গাই থাকত না। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আশেপাশে ২–৪ জনকে ‘স্যাক্রিফাইস’ শব্দটা উচ্চারণ করতে শুনেছিলাম। আমি জানি, আমি যদি ভিন্নধরনের জীবন যাপন করতাম তাহলে আমার জন্য বাম রাজনীতিতে কোনো জায়গাই থাকত না। কিন্তু আমার যদি পুরুষ বন্ধু থাকত তাহলে আমার তো ভালোই লাগত।” পুরুষ কমরেডদের কী অবস্থা?— আমি জিজ্ঞেস করি। তাঁদেরও কি একই অবস্থা, নাকি ভিন্ন? “তাতো অবশ্যই। বহু সিঙ্গেল পুরুষ কমরেড ছিলেন কিন্তু মনে হয় তাঁদের নারী বন্ধু ছিল। কিন্তু এ নিয়ে কেউ খোশগল্প করে না।” তার মানে এর কারণে তাঁদের রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না? তাই কি?— আমি জানতে চাই। “ঠিক তাই,” মিশুর উত্তর। তার মানে তোমার বেলায় যদি এটা ঘটত তাহলে তোমাকে “চরিত্রহীন” বলা হতো? “তাতো বটোই। আমাকে ‘প্রস্টিটিউট’ ডাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না।” মিশুর কথা শুনে আমিও আশ্চর্য হইনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে, জাহাঙ্গীরনগরের ১৯৯৮ সালের ধর্ষণ–বিরোধী আন্দোলনের সময়, একজন প্রভাবশালী শিক্ষক যিনি আন্দোলনে আমার ভূমিকায় ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিলেন আরেকজন শিক্ষককে বলেছিলেন আমি একজন “বেশ্যা”। যাঁকে তিনি এ কথা বলেছিলেন তিনি শব্দটি উচ্চারণ করতে দ্বিধা বোধ করছিলেন দেখে আমি–ই মুখ ফুটে শব্দটি উচ্চারণ করেছিলাম। নারীদের নির্ঘাৎ একটি “বউ–বেশ্যা” বৈপরীত্যে আটকে ফেলা হয়। পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা করলে এই চাবুক দিয়েই তাদের বেত্রাঘাত করা হয়। প্রগতিশীল পুরুষরা এই শব্দকে উড়িয়ে দেন, তাঁদের মতে এটি “রুচির অভাব”কে প্রতিনিধিত্ব করে, এটি “নিম্ন শ্রেণী”র ভাষা। কিন্তু যাঁরা বাম মহলের, তাঁরাও যদি একইধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তাহলে কী বাম আন্দোলনের পোষায়?— আমি ভাবি। এই ডাইকোটোমি শ্রেণীগত ও লৈঙ্গিক, উভয়ই। এটি, এবং মধ্যবিত্তের প্রতিক্রিয়া— দুটোই, বুদ্ধিবৃত্তিক–অর্থে, অ–নিরিক্ষীত থেকে গেছে।
মিশু বলতে থাকেন, “এদেশের বাম রাজনৈতিক ধারা খুবই পুরুষালি। বাম ঐতিহ্যে নারীরা যে তাত্ত্বিক ও নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে অবদান রাখতে পারে, তা কিন্তু সিরিয়াসলি মনে করা হয় না। সাদামাটাভাবে ধরে নেয়া হয় যে নারীরা পুরুষ বিপ্লবীদের “অনুপ্রাণিত” করতে পারবে। কিন্তু বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। নারী নেতৃত্ব যে বিরাজমান ক্ষমতাসম্পর্কের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধন করতে পারে— এ বিষয়টাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না। ধরে নেয়া হয় যে পুরুষরা তাত্ত্বিকভাবে উৎকৃষ্ট। নারী তার সহযোগী’মাত্র। নারীর অংশগ্রহণ ও নারী নেতৃত্ব পুরুষালি ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন সাধন করতে পারে, এ বিষয়ে বাম পুরুষদের কোনো সিরিয়াস চিন্তাভাবনা নাই।
“আমরা যদি কমরেড হিসেবে একত্রে কাজ করার পরিসর তৈরি করতে না পারি, নারীর জন্য সমাজতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা যদি ‘ও হ্যাঁ, নারীদের জন্যও আমাদের কিছু করতে হবে’ এতে সীমাবদ্ধ থাকে, যদি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে চর্চিত না হয়, পরিবারে, ব্যক্তি জীবনে, বিয়েতে— তাহলে তো সমতা আপনাআপনি ঘটবে না। আমি যদি এই প্রসঙ্গগুলো তুলি তাহলে আমাকে নব্য–মার্ক্সবাদী ডাকা হয়, নারীবাদী ডাকা হয় কিন্তু আমার মার্ক্সবাদী কমরেডরা বুঝতে ব্যর্থ হন যে মার্ক্সবাদের সৃষ্টিশীল বিকাশের জন্য এসব বিষয়ে আলাপ–আলোচনা গড়ে তোলা, আত্মসমালোচনার প্র্যাক্টিস গড়ে তোলা একান্তভাবে জরুরি।” মিশু হঠাৎ হেসে উঠে আর বলে, “আমাকে অন্তত এখন আর শুনতে হয় না, সাধারণ মানুষ আপনাকে গ্রহণ করবে না। আমি মাঠ পর্যায়ে কাজ করি, অনেকেই তা করে না। আমাকে গ্রহণ করতে ম্যাস পিপেলের কোনো সমস্যা হয় না। ও হ্যাঁ, তোমাকে কি বলেছি যে নারী সদস্যদের সাধারণত সাদা শাড়ি পরার কথা…।” মানে…? বিধবাদের সাজ? কি কাণ্ড! কেন? দুজনেই হো হো করে হেসে উঠি।
মনে পড়ে, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনালের এ্যানারকিস্ট এমা গোল্ডমেন বলেছিলেন, আমি যদি নাচতেই না পারি তাহলে তোমার বিপ্লবে থাকতে চাই না।
২.খ নারীমুক্তি: পুরুষের স্ক্রিপ্ট
“বাম পুরুষরা একটি পরিকাঠামো তৈরি করেছে। সেই ফ্রেমওয়ার্কের ভিতর থেকে নারী মুক্তিকে ভাবতে হবে। সেই ফ্রেমওয়ার্ক অনুসারে জীবন যাপন করতে হবে। যদি সেটা করো তাহলে তুমি আগামী সভায় সভাপতিত্ব করতে পারবে। আর যদি তা না করো, তোমার যতই নেতৃত্বের গুণাবলী থাকুক না কেন, পারবা না। আমি আবারও বলছি, আমি আমার পুরুষ কমরেডদের খুব শ্রদ্ধা করি, তাঁদের সম্বন্ধে আমার অনেক উঁচু ধারণা, তাঁরা কিন্তু oppressiveনন। আমার সমস্যা তাঁদের চিন্তা–কাঠামো নিয়ে। অন্য দলের নেতারা আমার কাজের প্রশংসা করেন, কিন্তু তাঁরা এটাও আশা করেন যে আমি তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইব। যদিও এটা পার্টি ডিসিপ্লিনের পরিপন্থী। কিন্তু আমি যদি তাঁদের কাছ থেকে পরামর্শ চাই তাহলে আমি একজন ভালো মেয়ে, তার মানে আমি আদর্শ নারী নেতা। একজন আদর্শ নারী নেতা তিনি–ই যিনি অধিপতি সামাজিক মূল্যবোধ, নিয়ম–নীতি মেনে চলেন। আমাদের এখনো বিশ্বাস করার কথা যে একবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে নারী মুক্তি ঘটবে। আপনা–আপনিই নারী মুক্তি ঘটে যাবে। এটা অতি সরলীকরণ। এ অবস্থায় বিপ্লব ঘটলে আমরা নারীরা শুধু এক ধাপ এগিয়ে যাব। কিছু অধিকার অর্জন করব। কিন্তু যেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে সেটা পুরুষালি সমাজতন্ত্র ছাড়া আর কিছু–ই হবে না।”
আর নারী পার্টি সদস্যদের অবস্থা কী? “আমার মনে হয় না খুব–বেশি ভিন্ন। যাঁরা নতুন সদস্য তাঁদের মধ্যে কেউ–কেউ বিয়ের প্রস্তাব পান। এ ধরনের পরিস্থিতি খুব অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাঁর পছন্দ নাও হতে পারে। তিনি পার্টি ছেড়ে চলে যেতে পারেন। পার্টির তরফ থেকে বলা হতে পারে, এরকম পরিস্থিতি সামাল দিতে পারার কথা, দিতে শিখতে হবে কিন্তু এ ধরনের কথা তো পার্টির দায়িত্বকে এড়িয়ে যায়। পার্টির দায়িত্ব হচ্ছে নারী সদস্যদের জন্য একটি সৃষ্টিশীল কর্মপরিসর তৈরি করা। যারা [পুরুষালি] পার্টির ‘অপর’, তাদেরকে বাস্তবিক–অর্থে অন্তর্ভুক্ত করা। পার্টি ও ‘অপর’র বিভাজনকে ভেঙে ফেলা।”
আমাদের দীর্ঘ আলাপ শেষ হয়। রুশ বিপ্লবী এলেক্সান্ড্রা কোলোন্তাইয়ের কথা মনে পড়ে । নারী মুক্তির জন্য শুধু পুঁজিবাদের অবসান নয়, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বদল ঘটানো জরুরি।৩৫
যৌনতা, ভালবাসা ও কমরেডশিপের সম্পর্কের বদল ঘটানো জরুরি।
পরের অংশে প্রথমত আমি প্রস্তাব করছি যে এদেশের বাম/প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্স হচ্ছে পুরুষদের ডিসকোর্স; এই ডিসকোর্সে পুরুষ হচ্ছে মানদণ্ড, যার কারণে পুরুষের লৈঙ্গিক সত্তা— নারীর সঙ্গে লৈঙ্গিক ভিন্নতা–অর্থে বা পুরুষ হিসেবে পিতৃতন্ত্রের ধারক–বাহক অর্থে, অন্য কথায়, ক্রিটিকাল–অর্থে— বুদ্ধিবৃত্তিক বিচার–বিবেচনা বা নিরীক্ষণের বস্তু অর্থে, অনুপস্থিত। বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা–শেষে আমি এদেশের একজন প্রথিতযশা মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের একটি সাক্ষাৎকারের একাংশ বিশ্লেষণ করে পুরুষালি ডিসকোর্স প্রসঙ্গে আমার এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা তুলে ধরছি।
বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স বলতে আমি পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্স বোঝাচ্ছি। এদেশের নারী বুদ্ধিজীবীদের স্বতন্ত্র কোনো ডিসকোর্স আছে কি–না, সে প্রসঙ্গে আপাতত ঢুকছি না। ডিসকার্সিভ–অর্থে, এদেশের অন্যান্য জাতিসত্তার বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় বাঙালি পুরুষ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকাই প্রধান।
বাঙালি পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা কোনো প্রসঙ্গ নয়। প্রসঙ্গ হচ্ছে নারী। ‘পুরুষ’ সত্তাকে প্রসঙ্গ হিসেবে দেখা হয় না। সম্ভবত এ কারণে যে এটি–ই মানদণ্ড (norm)। অর্থাৎ, ধরে নেওয়া হয় যে লিঙ্গীয় পরিচিতি নারী একা–ই বহন করে। পুরুষের লিঙ্গীয় পরিচিতি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। সামাজিক ক্রিটিক অর্থে নয়। আত্ম–ক্রিটিক অর্থে– ও নয়। এটি হচ্ছে এদেশের পুরুষ বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্সের৩৬ কেন্দ্রীয় পূর্বানুমান। এই পূর্বানুমান— পুরুষ সত্তা বুদ্ধিজীবীতার মানদণ্ড— প্রশ্নাতীত। অন্তত আমার তাই মনে হয়।
এ অঞ্চলের বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স সুবিস্তৃত। সময় ও কাল, উভয় অর্থেই। এর ভিত্তিভূমি ও সীমানা অনেকটা তরল। অনেকটা প্রবাহমান। কোনো কোনো বিষেশ মুহূর্তে ‘বাম’ বা ‘প্রগতিশীল’— হয়ত এই নামপঞ্জি বদলে যায়। হয়ত সংজ্ঞা পালটানো হয়। বদল সত্ত্বেও, তরলতা সত্ত্বেও, কিছু ডিসকুন্টনুইটি সত্ত্বেও বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্স বলে কিছু–একটা চিহ্নিত করা যায়। এমন কিছু আছে বলে আমরা ধারণা। তবে এ নিয়ে খুব একটা গবেষণা হয়নি। হাল–আমলের নারীবাদী প্রত্যয়গত যন্ত্রপাতির (conceptual tools) সাহায্যে একদম হয়নি বললেই চলে। পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বাম/প্রগতিশীল বাদে আরো ধারা রয়েছে। যেমন, উদারনৈতিক/প্রগতিশীল (লিবারেল) ধারা। ইস্যুর ক্ষেত্রে, বা বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে, ধারার মধ্যকার ভিন্নতা ধরা পড়ে। সবসময় নয়।
বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্সে লিঙ্গীয় ভিন্নতা প্রসঙ্গে আলোচনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি এদেশের পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের কাজ টেক্সট হিসেবে বাছাই করেছি। এই প্রবন্ধটি ফরহাদ মজহারের একটি সাক্ষাৎকারকে ঘিরে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে, সেই সাক্ষাৎকারে তাঁকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন, এই প্রবন্ধ সেটিকে ঘিরে। আমার বিবেচনায় ফরহাদ মজহার এদেশের, একালের একজন মহাপুরুষ। মজহার প্রায় ৪০ বছর ধরে লেখালেখি করছেন। এ যাবৎকাল পর্যন্ত তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, সে কথা ভাবলে এ কথাটি কোনো ধরনের অত্যুক্তি বলে আমি মনে করি না। তাঁর আত্মপরিচিতি হচ্ছে তিনি মার্ক্সবাদী৩৭। তিনি বিপ্লবী। প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধুমাত্র একটি টেক্সট বাছাই করে তার ভিত্তিতে আলোচনা দাঁড় করিয়ে আমি তাঁর চিন্তাভাবনার প্রতি— সেটির ব্যাপ্তি, গভীরতার প্রতি সুবিচার করছি কি–না। আমার মনে হয়, মজহার লেখকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যা বলেছিলেন (১৯৯৭), তা আলোচ্য বিষয় প্রসঙ্গে— লিঙ্গীয় ভিন্নতা— খুব ইঙ্গিতবহ।
আমার মনে হয় বাম/প্রগতিশীল ডিসকোর্সে পুরুষ বুদ্ধিজীবীদের৩৮ আলাপচারিতা, আর তার ক্রিটিক, এখান থেকেই শুরু হতে পারে।
ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আজকের কাগজ–এর৩৯। মজহারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: “লেখালিখি করতে গিয়ে তো আপনাকে কারাবাসও করতে হয়েছে৪০। সেই আলোকে একজন লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে আপনার অভিমত জানাবেন কি?”।৪১
উত্তরে মজহার বলেন, গরিব আনসারদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি এর প্রতিবাদ করেছেন, তাই তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে। আনসাররা শুধু খেয়ে–পরে বাঁচার মতো বেতন চেয়েছে, অন্য কিছু নয়। তিনি আরো বলেন, তাঁর কারাবাসকে লেখকের স্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা করলে তাঁকে এমন কিছু লেখকরে কাতারে ফেলা হবে “যাদের কাজ হচ্ছে নোংরামি, বেলেল্লাগিরি এবং নিজেদের চরম বদমায়েশি”৪২–কে লেখকের স্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপন করা। তিনি বলেন, পেট এবং লিঙ্গের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শরীরে তাদের স্থানও ভিন্ন, “পেট ওপরে, লিঙ্গ নিচে”।৪৩ দুটোর জ্বালা একরকম নয়। সঙ্গম না করে বাঁচা যায়, যেমন করেন ব্রহ্মচারীরা, কিন্তু না খেয়ে বাঁচা সম্ভব নয়। পেটের ব্যবহার ছাড়া মানুষের চলে না। আর এ কারণে লিঙ্গ এবং পেটকে একই কাতারে ফেলা ঠিক নয়। “পেটের ক্ষুধা আর নুনু বা যোনির সুড়সুড়ানি এক জিনিস নয়”।৪৪
তিনি বলেন, পেট ও লিঙ্গের পার্থক্য করা শিখতে হবে। তার কারণ “সকল ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার এক রকম নয়, সকল অঙ্গের ভূমিকাও এক নয়”।৪৫ লেখকের ভূমিকার কথা তুললে, তাঁর দৃষ্টিতে, মূল প্রশ্ন হচ্ছে, “সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব জনগণ, শ্রমিক, মজুর, উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জন্য”৪৬ লেখক লড়তে, প্রয়োজনে মরতে প্রস্তুত কি–না। সংগ্রামকে দেহের প্রতীক দিয়ে বোঝার প্রস্তাব করে তিনি প্রশ্ন করেন, “পেটের দাবি আগে, নাকি লিঙ্গের দাবি আগে?”৪৭তিনি যোগ করেন, প্রথমটার কথা বলে দ্বিতীয়টার কথা তিনি অস্বীকার করতে চান না, যেহেতু “শ্রমিক ও কৃষকেরও যৌনজীবন আছে, নারীপুরুষের প্রেম ভালবাসা রতিমিলন আছে”।৪৮ কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, “এইসব খেটে খাওয়া মানুষ শরীর বললেই সবসময়ই পেট এবং সেবাশান্তি করা, পেটে মেহনত করার ক্ষমতা বোঝে”।৪৯ অপর পক্ষে, বুর্জোয়া শ্রেণী দেহ বলতে বোঝে নারীর শরীর উলঙ্গ করা। তাদের দৃষ্টিতে দেহ ও লিঙ্গ সমার্থক। মজহার বলেন, উভয় শ্রেণীর কাছে ঘাম দেহের প্রতীক, দুটোই দেহ থেকে নিসৃত, কিন্তু শ্রমিক, কৃষক শ্রেণীর ঘামের মানে যেখানে “মেহনতের ঘাম,”৫০অন্য শ্রেণীর কাছে ঘাম মানে “সঙ্গমের স্বেদ”।৫১
মজহারের কথার দুটো অর্থ হতে পারে। দুটোই গোলমেলে। যদি ধরে নেই যে শ্রমিক বলতে মজহার শুধু পুরুষদেরই বোঝেন (“পেট ওপরে, লিঙ্গ৫২ নিচে”), তাহলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, কেন? কোন যুক্তিতে? শ্রমের কোন্ সংজ্ঞার ভিত্তিতে কেবল পুরুষ শ্রমিক–ই সাচ্চা শ্রমিক? তাহলে কিষাণী, খেটে–খাওয়া নারীর অবস্থান কোথায়? সাধারণ নারীর অবস্থান কোথায়? তাদের শ্রম— তা ঘরের কাজ হতে পারে, যেমন কুটা–কাটা, মশলা বাটা, রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর লেপা, ঝাড় দেয়া, নিড়ানির কাজ, ধান সিদ্ধ, ধান শুকানো, সন্তান লালন–পালন, বয়ষ্কদের দেখাশোনা, পরিবারের রুগ্ন সদস্যদের সেবা–যত্ন, হাঁস–মুর্গি–গরু–ছাগল পালা— কী? নারীর শ্রম শ্রম না কারণ তারা এর বিনিময়ে মজুরি পান না, এই যদি হয় মজহারের সংজ্ঞা, তাহলে এটি সেকেলে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্রথাগত মার্ক্সবাদী ধারণা অনুসারে এ দেশের যে নারীরা পুরোদস্তুর শ্রমিক— অর্থাৎ, মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন (গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক)— মজহারের দৃষ্টিতে, তারাও শ্রমিক নন। কারণ মজহারের
প্রস্তাবনায় খেটে খাওয়া মানুষরা (“সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব জনগণ, শ্রমিক, মজুর, উন্মূল উদ্বাস্তু মানুষগুলো..”) শরীর বললে সবসময়ই পেট বোঝেন, আর পেটের অর্থ একটাই: আঁতের জ্বালা মেটানো, ক্ষুধা মেটানো, খেয়ে পরে বাঁচা।
কিন্তু নারী শ্রমিকের জন্য পেটের অর্থ কী শুধু তাই? এতোই কী একরৈখিক? শুধু নারী শ্রমিক কেন, সকল শ্রেণীর নারীর কাছে পেটের বিশেষ অর্থ রয়েছে: নারী তার পেটে সন্তান ধারণ করে, সন্তান মায়ের পেটের থেকে পুষ্টি পায়, পেটের মধ্যেই বড় হয়, দশ (কি নয়) মাস পর পেটের থেকে বেরোয়। আর এ কারণেই, কার সন্তান, কোন্ মায়ের সন্তান বোঝাতে চাইলে আমরা বলি, অমূকের পেটের সন্তান (পুরুষদের ক্ষেত্রে তা বলি না, বরং বলি, ‘ওর জন্মের সন্তান’)। আরো অনেক–কিছু বলি যা নারীর পেটকে, নারীর জন্মদানের ক্ষমতাকে, তার এই সামর্থ্যকে ঘিরে। যেমন নাড়ির টান, নাড়িছেঁড়া ধন ইত্যাদি, ইত্যাদি।
শ্রমিক শ্রেণী নিয়ে মজহারের কথাবার্তায় নারী–পুরুষের সম্পর্কের কোনো উল্লেখ নেই, তা না। আছে, তা অতি–সামান্য, “শ্রমিক ও কৃষকেরও যৌন জীবন আছে, নারীপুরুষের প্রেম ভালবাসা রতিমিলন আছে”। যৌন জীবন আছে, রতিমিলন আছে, কিন্তু মজহারের কথা শুনে মনে হয়, যৌন সম্পর্কের কোনো জৈবিক কনসিকোয়েনসেস নেই। কেন? রতিমিলনের খেসারত নারীর পেটেই প্রকাশ পায় বলে? পুরুষের পেট— তা শ্রমিক পুরুষের পেট হোক, কী বুর্জোয়া পুরুষের পেট— যৌনসংগমের কোনো চিহ্ন ধীরে–ধীরে বহন করা শুরু করে না বলে?
মজহার যদি নারী (বুদ্ধিজীবী) হতেন, তাঁর কাছে কী পেটের এমনই একপেশে অর্থ হতো?
এখন আসি যোনির কথায়।
মজহারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল লেখক, বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে। তিনি এই বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন যে, “আমার কারাবাসকে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন আকারে তুললে আপনি আমাকে এমন কিছু লেখকের কাতারে ফেলে দেবেন যাদের কাজ হচ্ছে নোংরামি, বেল্লোগিরি এবং নিজেদের চরম বদমায়েশিগুলোকে লেখকের স্বাধীনতা আকারে হাজির করা।”৫৩ এর ব্যাখ্যা হিসেবে মজহার বলেন, সঙ্গমের স্বাধীনতা আর লেখকের স্বাধীনতা এক জিনিস নয়। মানুষের শরীর যে সমাজে পুঁজির অধীন, যে সমাজে মানুষের শ্রম হচ্ছে পুঁজির স্ফীতি, অপরের জন্য খেটে মরা, সে সমাজে লেখকরা পেটের মুক্তি, মেহনতের মুক্তি দাবি না করে লিঙ্গের স্বাধীনতা চাইছেন। তারা বলে বেড়াচ্ছেন, “আমাদের আছে স্বাধীন ও সার্বভৌম লিঙ্গ।”৫৪ এটাকেই তারা লেখকের স্বাধীনতা হিসেবে প্রচার করছেন।
মজহার বলেন, লেখক হিসেবে সঙ্গমের স্বাধীনতা প্রচার করা আর পেটের দাবি প্রচার করা এক জিনিস নয়। তিনি বলেন, কোনো লেখকের হয়ত হস্তমৈথুন ভালো লাগে, সেটা তিনি বাথরুমে গিয়ে করলেই পারেন। এ কারণে যদি কেউ লেখককে গালমন্দ করে, তিনি তার পক্ষে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই লেখক যদি তার ভালো লাগাটা প্রচার করে, অন্যরা যদি রুচির কারণে তাতে বাধা দেয়, তখন যদি লেখক বলে বসেন যে তার স্বাধীনতায় বাধা দেয়া হচ্ছে, সেটা “মহা মুশকিলের ব্যাপার।”৫৫ এ প্রসঙ্গেই মজহার বলেন, “কোন মেয়ে যদি বলে ছেলেরা চারটা বৌ রাখতে পারে, অতএব আমিও চাই চারটা পুরুষ,”৫৬যদি পরুষতন্ত্রের এই যুগে মেয়েটি “চারটে পুরুষকে এক সঙ্গে”৫৭ বাগিয়ে নিতে পারে, তিনি তাকে “একখানা বাপের বেটি বটে”৫৮ বলবেন। মেয়েটির তারিফ করবেন, তার উদার পুরুষ সঙ্গীদেরও তারিফ করবেন। কিন্তু এই চারটি পুরুষ রাখাই নারী মুক্তি, এটিই লেখকের স্বাধীনতা, যদি লেখক এটা দাবি করে বসেন, সেটা খুবই সমস্যাজনক। এ সকল কারণে মজহার তাঁর নিজ কারাবাসকে “বিমূর্ত কায়দায় লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন আকারে”৫৯ দেখতে রাজি নন।
এখন, আমার কথা হচ্ছে, লেখকের স্বাধীনতার অর্থ কী, এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মজহার আবারও লিঙ্গীয় ভিন্নতা সৃষ্টি করেন; আর আবারও, তার খেসারত নারীকেই দিতে হয়। তিনি আবারও নারী–সাপেক্ষে পুরুষের ক্ষমতাকে অদৃশ্য করেন। বুর্জোয়া নারী–লেখকের তুলনায় বুর্জোয়া পুরুষ–লেখক যে সাধারণত বেশি ক্ষমতার অধিকারী, তা হাওয়া হয়ে যায়। পুরুষ ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আছে— রাষ্ট্রব্যবস্থায়, আইনে, সমাজ–সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে— তা হাওয়া হয়ে যায়। এর পরিবর্তে আমরা পাই বাস্তবিক সামাজিক সম্পর্কে অ–প্রোথিত নারী (ও পুরুষ) লেখক, যারা স্বেচ্ছাচারী যৌন তাড়না দ্বারা, অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের অনিয়ন্ত্রিত গতি দ্বারা, চালিত (“নুনু বা যোনির সুড়সুড়ানি”)। সমাজ চিন্তক হিসেবে মজহার থেকে আমরা আশা করি যে তিনি দেহের ব্যক্তিবাদী বয়ানকে হিস্টোরিসাইজ করবেন। স্বাধীন–স্বতন্ত্র–সার্বভৌম/autonomous শরীরের ধারণাকে ডিকনস্ট্রাক্ট করবেন। তার লিঙ্গীয় ও বর্ণবাদী রূপ উন্মোচন করবেন। কিন্তু এ ধরনের কোনো কিছু না করে, লেখকের স্বাধীনতার বুর্জোয়া ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করতে গিয়ে মজহার নিজেই ব্যক্তিবাদী বয়ান উৎপাদন করেন। স্বাধীন–স্বতন্ত্র দেহের বুর্জোয়া আদর্শকে ডিমোনাইজ (দানবীয়) করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেই সেটিকে পুনরুৎপাদন করেন। মজহারের উল্লিখিত নুনু, যোনি ইতিহাস–বিবর্জিত, সমাজ–বিচ্ছিন্ন। তাঁর সাক্ষাৎকারের এই অংশগুলো পড়লে উনবিংশ–বিংশ শতকে ‘ফ্রি সেক্স’ নিয়ে ভিক্টোরীয় উৎকণ্ঠার কথা মনে পড়ে যায়।
মজহারের ‘শ্রমিক’–এর ধারণা যেমন পুরুষ শ্রমিকের ছাঁচে গড়ে তোলা, মজহারের ‘লেখক’ও তাই। মনে হয়, পুরুষ লেখক ও নারী লেখক একই ক্ষমতা ও সামর্থ্যরে অধিকারী, বুর্জোয়া পুরুষ যা পারেন বুর্জোয়া নারীও তাই পারেন। করেনও। এখানেও যৌন মিলনের কোনো লিঙ্গীয় কনসিকোয়েনসেস নেই: পেটে বাচ্চা আসার দুর্ভাবনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার, এ্যাবরশন, এনেসথিশিয়া নিলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এ্যাবরশনের পরে হঠাৎ ভ্রুণের জন্য মায়া, কুৎসা রটনার ভয়, জারজ বনাম বৈধ সন্তান জন্মদানের সুবিধা–অসুবিধা ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমন কনসিকোয়েনসেস যার চাপ ও মুক্ত পরিসর, দুটোই— বুর্জোয়া নারীর বেলায়ও– বাস্তবিক ক্ষমতা কাঠামো দ্বারা গঠিত। আমার জানামতে রাইট–টু–ওয়ান্স–বডি’র পশ্চিমা বুর্জোয়া নারীবাদী ধারার প্রবক্তারা মজহারের মত এতো তাচ্ছিল্যের স্বরে কথা বলেন না। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির ক্ষতিকারক দিক নিয়ে, নারী দেহের মেডিকালাইজেশন৬০ নিয়ে, এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের নারীকে গিনিপিগে পরিণত করেছে, নানান সময়ে তারা এসব বিষয়ে দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করেছেন।
সচেতন কথাবার্তায় পুরুষের ক্ষমতাকে অদৃশ্য করলেও, বাস্তব চিত্র যে ভিন্ন, অবচেতন–মনে মজহার তা জানেন, বোঝেন। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। বুর্জোয়া পুরুষ ও নারীর ক্ষমতা যে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সমান্তরাল নয়, তা তাঁর মুখ–ফসকে–বেরিয়ে–যাওয়া কথা থেকে বোঝা যায়। “কোন মেয়ে যদি বলে ছেলেরা চারটা বৌ রাখতে পারে, অতএব আমিও চাই চারটা পুরুষ”— তাঁর এই কথা থেকে বেরিয়ে আসে। মুসলমান পুরুষের একসঙ্গে চারজন স্ত্রী থাকতে পারে, এটি এদেশে আইন–সমর্থিত। কিন্তু মুসলমান নারীর স্বামী সংখ্যা এক–এ সীমিত। লক্ষণীয় যে মজহার চারজন “বর” (বউ–এর জোড় শব্দ)-এর কথা বলেন না। চারজন স্বামীর কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। স্বামী শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ একে তো ঈশ্বর, প্রভু, রাজা, সম্রাট, মালিক ইত্যাদি, ইত্যাদি, আবার বর্তমান বাংলাদেশে, পশ্চিমা রূপান্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে স্বামী/বর/হাসবেন্ড৬১— পুরুষের এই ভূমিকা সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনি, মতাদর্শিক ও নৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। চারজন কর্তার মাধ্যমে নারীমুক্তি সাধিত হতে পারে, এটা বললে তাঁর ব্যঙ্গ ধোপে টিকবে না, কথার পিঠে কথার মধ্যেও মজহার মনে হয় তা টের পেয়েছিলেন। দ্রৌপদির পুরাণ পুরাণই।
মজহারের লেখকের স্বাধীনতার বয়ান বীরোচিত। এতে নারী ‘অপর’। শুধু তাই নয়, অপরকরণের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী, পুরুষ–লেখকের heroism রচিত। লেখকের স্বাধীনতার বয়ান ‘অনৈতিক বুর্জোয়া’ আর ‘পিউরিটান সর্বহারা,’ শ্রেণীগত বৈপরীত্য বা বাইনারি অপোজিশনের এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে নির্মিত। রুশ বিপ্লবের আগে ও পরে, সে দেশের নারীবাদী বিপ্লবীরা একই–ধরনের অপোজিশনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তর্ক–বিতর্কের মাধ্যমে, ঘাত–প্রতিঘাতের মাধ্যমে তারা আবিষ্কার করেন যে এই বৈপরীত্য নারী–স্বার্থ বিরোধী। তারা আবিষ্কার করেন যে প্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা প্রসঙ্গে ভিন্ন অভিজ্ঞতা, ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন আকাক্সক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলে পুরুষ কমরেডরা সর্বহারা শ্রেণীর বাস্তবে যাপিত জীবনের জটিলতার মধ্যে ঢোকেন না। সর্বহারার পিউরিটান চিত্রায়ন অক্ষত রেখে তারা সহজ পথটি বেছে নেন। তারা তাদের নারী কমরেডদের ‘বুর্জোয়া’ ডেকে গালি দেন।
সামনাসামনি–তে প্রকাশিত “পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা”–র সাক্ষাৎকারের পরের সাক্ষাৎকার “বাংলা, বাংলাদেশ ও পরিচয়ের রাজনীতি” (১৯৯৪)।৬২ সেখানে মজহার বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের ঐতিহ্য নিয়ে কথা প্রসঙ্গে বলেন, “[আমাদের বর্তমান লড়াইয়ে] শ্রেণীর ব্যাপার আছে, নারীপুরুষ ভেদ আছে।”৬৩ পরের পৃষ্ঠাতেই পাই একটি ভাওয়াইয়া গানের চমৎকার বিশ্লেষণ।৬৪ মজহার বলেন, গানের মর্মকথা হচ্ছে গাহর্স্থ্য শৃঙ্খল থেকে মার মুক্তির অর্থ হচ্ছে কন্যার বন্দীত্ব। মজহারের বক্তব্য হচ্ছে, মায়ের প্রতি মেয়ের সলিডারিটি প্রকাশ পায় গানটিতে, আবার একইসঙ্গে এটি মেয়ে(মানুষের) গাহর্স্থ্য নিয়তির গৌরবগাথা। বিশ্লেষণ চমৎকার, তা সত্ত্বেও, কিংবা সে কারণেই, দ্বিধান্বিত বোধ করি। কীভাবে বুঝব? তার মানে কি টেক্সচুয়াল রেপ্রিজেন্টেশনে মজহার নারী–পুরুষের মধ্যকার ভেদাভেদ বোঝেন, যাপিত জীবনেরটা, with all its complexities of `self’ and ‘other’— বুঝতে পারেন না, ধরতে পারেন না?
পরিশেষে যেই চিন্তাটি প্রসঙ্গ ও প্রশ্ন–আকারে পাঠকদের মধ্যে দানা বাঁধুক, তা উপস্থাপন করছি: বাম ধারা ও নারীবাদের বিয়ে কি শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই অসুখী?
—————————————————————————–
৩’য় অংশের কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সুদৃঢ় ভগিনি বন্ধনে লালিত না হলে বাম/প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী পুরুষ ডিসকোর্স, ও তার ক্রিটিক দাঁড় করানোর কাজ হাতে নেয়া সম্ভব হতো না। ভগিনি তালিকায় সবার আগে একসাথে বেড়ে ওঠা বন্ধু শামীম আক্তার–এর নাম। দিলারা বেগম জলি (চট্টগ্রাম), শিপ্রা বোস (কাবুল), উদিসা ইসলাম (রাজশাহী) ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে উষ্ণ সংহতিবোধের মাধ্যমে, আমাকে, আর ক্রিটিকের জরুরিত্বকে জিইয়ে রেখেছে। প্রাণসই সায়দিয়া গুলরুখ বরাবরের মতো আমাকে প্রেরণা যুগিয়েছে। তাদের সকলকে ধন্যবাদ, তবে ক্রিটিকের অপূর্ণতা, ভুলত্রুটির দায়ভার তাদের নয়। আমারই।
পূর্ণাঙ্গ লেখার কৃতজ্ঞতা স্বীকার: পাবলিক নৃবিজ্ঞান এর সাথীদের ধন্যবাদ জানাই, এই প্রবন্ধের নানান সংস্করণে তারা সহোৎসাহে পরামর্শ দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করেছেন। সময়–অসময় যদি দিকনির্দেশনা দিয়ে তারা পথ না দেখাতেন, এগোনো কঠিন হতো। বিশেষ ধন্যবাদ সাঈদ ফেরদৌস আর মির্জা তাসলিমা সুলতানার প্রাপ্য, ২০১৫–র পরিবর্তিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে কী ধরনের টীকা সংযোজন করে প্রবন্ধ প্রকাশযোগ্য করে তোলা সম্ভব সেই পরামর্শ দেয়ার জন্য। সাঈদকে বাড়তি ধন্যবাদ মূল্যবান কপি–এডিটিংয়ের জন্য।
পাদটীকা
১এই পুস্তিকা–প্রবন্ধের প্রথম অংশ, যেটি লিডিয়া সার্জেন্টের লেখার অনুবাদ, এই লেখাতেই নারী–পুরুষের মধ্যকার লিঙ্গীয় অসমতার দৈনন্দিন চর্চা কীভাবে ডক্যুমেন্ট করা সম্ভব, তার একটি পদ্ধতিগত নমুনা (methodological exercise ) পাওয়া যায়।
২Lydia Sargent (ed.), Women and Revolution. A Discussion of the Unhappy Marriage of Marxism and Feminism (Boston: South End Press, 1981)। এই সংকলন ‘রাজনৈতিক বিতর্ক’ নামক সিরিজের অংশ। উল্লেখ্য যে লিডিয়া সার্জেন্টের পুরো ভূমিকাটি (“New Left Women and Men: The Honeymoon is Over”) অনুবাদ করিনি। মোট ২০ পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধের (পৃ. xii-xxxii ) ১১ পৃষ্ঠা (xii-xxii)) অনুবাদ করেছি। বাকি ৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে উইমেন এন্ড রেভোলিউশন সংকলনের বিভিন্ন প্রবন্ধ সম্বন্ধে সম্পাদক হিসেবে লিডিয়া সার্জেন্টের পরিচিতিমূলক আলোচনা। এই পুস্তিকাপ্রবন্ধের জন্য পরবর্তী এই অংশটি প্রাসঙ্গিক না হওয়ার কারণে তা বাদ দিয়েছি।
উইমেন এন্ড রেভোলিউশন সংকলনে ১৩জন নারীবাদীর লেখা রয়েছে, তাঁরা হলেন: Iris Young, Christine Riddiough, Gloria Joseph, Sandra Harding, Azizah al-Hibri, Carol Ehrlich, Lise Vogel, Emily Hicks, Carol Brown, Katie Stewart, Ann Ferguson & Nancy Folbre, Zillah Eisenstein।
৩Rahnuma Ahmed, ÒCONVERSATIONS: BEING A WOMAN. Left Leadership in Bangladesh,Ó New Age, Tuesday, August 5, 2008|
৪সৈকত হাবিব সম্পাদিত সংকলনটি ২০০৭ সালের বইমেলা’তে বেরুনোর কথা ছিল। সংকলনটি বইমেলা ধরতে পারেনি লেখা দিতে দেরি হওয়ার কারণে, আমার জানামতে পরে সংকলনটি আর বেরোয়নি।
৫মানুষের রাজনীতি–দর্শন–আদর্শ বদলায়, ২০০৪ এর ফরহাদ মজহার যেভাবে নিজেকে পরিচিত করিয়েছিলেন একজন ‘মার্ক্সবাদী’ হিসেবে, সেই একই ফরহাদ মজহার ২০১৫ সালে নিজেকে একইভাবে পরিচিত করাবেন কি–না, আর করলেও, তিনি সেভাবেই recognisedহবেন কি–না, তা তর্কসাপেক্ষ।
৬সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা(সম্পাদকবৃন্দ), সাদ্দাম হোসেন, ইলিয়াস মিলন, মোহাম্মদ আজম, মোহাম্মেদ রোমেল ও এবাদুর রহমান (ঢাকা: সূচীপত্র, ২০০৪)।
৭ নিউ লেফ্ট নামটি প্রধানত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত, এটি ১৯৬০–৭০ দশকের শিক্ষক, এ্যাক্টিভিস্ট, প্রতিবাদকারীদের ইঙ্গিত করে যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী ওল্ড লেফ্টের রাজনীতির প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাম সংহতিতে ভাঙন ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরির বিপ্লব যেটি সোভিয়েত সেনাবাহিনী দমন করে। পশ্চিমা কম্যুনিস্ট পার্টি ও বয়োজেষ্ঠ নেতৃত্ব সোভিয়েত হস্তক্ষেপকে মেনে নিয়েছিল যার কারণে নতুন প্রজন্মের বহু পশ্চিমা মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট/বাম দলকে ত্যাগ করেন। তাঁরা পুঁজিবাদের বিরোধিতা’সহ বাম–স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। আর এ কারণেই এই ধারার নাম নিউ লেফ্ট। ব্রিটেনের নিউ লেফ্ট প্রাধান্য দেয় মানবতাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক মার্ক্সবাদের উপর; রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির মিশ্রণের উপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ লেফ্ট প্রভাবিত হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ (ও তার বিরোধিতা) এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন দ্বারা। আমেরিকা ও ব্রিটেন, উভয় দেশের নিউ লেফ্টই সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে সমালোচনামনষ্ক ছিলেন (ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দমন–পীড়ন নীতি), কিন্তু ব্রিটেনের নিউ লেফ্ট যেখানে ট্রটস্কিবাদ বা সামাজিক গণতন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, মার্কিন নিউ লেফ্ট নতুন বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে, যেমন, মাও সে তুঙ (চীন), হো চি মিন (ভিয়েতনাম), ফিদেল ক্যাস্ট্রো (কিউবা)।
৮এদেশের বাম দলের ঐতিহ্য প্রসঙ্গে মিশু যেই সমালোচনা করেন তা যে একান্তভাবে বাংলাদেশের বামদের সমস্যা নয়, সেটি তুলে ধরার জন্য আমি নেপালের মাওবাদী কম্যুনিস্ট দলের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য এবং নারী বিভাগের প্রধান, কমরেড পার্বতীর লেখালেখি ও সাক্ষাৎকারের সাহায্য গ্রহণ করেছি।
১০বৈজ্ঞানিক মার্ক্সবাদ সমাজ কাঠামোর উপর গুরুত্বারোপ করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে প্রথাগত চিন্তা যেখানে মানুষের ইচ্ছার (will) ওপর জোর দেয়, মার্ক্সের সমাজ কাঠামোর ধারণা’মতে ব্যক্তিগত ইচ্ছা–অনিচ্ছা যাই থাকুক না কেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একজন পুঁজিপতি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরন্তর উৎপাদন বৃদ্ধি করার কাজে নিয়োজিত থাকেন, নিরন্তর শ্রম–শোষণে নিজেকে লগ্নি করেন; সমাজ কাঠামোতে ভিন্ন–ভিন্ন অবস্থানে অবস্থিত হওয়ার কারণে, মার্ক্সের কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি মোতাবেক, বুর্জোয়া ও শ্রমিক নিজস্ব সামাজিক অবস্থান মোতাবেক তাদের যা যা করা উচিৎ— ব্যক্তিগত চিন্তা মন–মানসের ভিত্তিতে নয় বরং বস্তুনিষ্ঠ শর্তের (সামাজিক অবস্থান; উৎপাদন সম্পর্কে তার অবস্থান) পরিপ্রেক্ষিতে— তারা তাই করেন (কাজকর্মে, আচরণে)। মার্ক্সের কাঠামোবাদী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই পয়েন্টগুলো উল্লেখযোগ্য:- (ক) ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে মার্ক্স বস্তুগত শর্তের ধারণার ওপর জোর দেন (খ) দ্বিতীয়টির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন (গ) কাঠামোর ওপর গুরুত্বারোপ করার অর্থ হচ্ছে তিনি “ভালো” বা “মন্দ” ইচ্ছার বিষয়টিকে দূরে সরিয়ে রাখেন (ঘ) মার্ক্সের যুক্তি হচ্ছে, ব্যক্তিগত ইচ্ছার ধারণা (ও প্রয়োগ) সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী শর্তকে (উৎপাদনের সম্পর্ক: পুঁজিপতি–সর্বহারা; উৎপাদনের মাধ্যম: উৎপাদন করার জন্য যা যা লাগে যেমন কল–কারখানা, জমি, কাঁচা মাল) আড়াল করে (৫) তার অত্যাবশ্যকীয়তাকে উপেক্ষা করে (৬) প্রথাগত চিন্তাা পক্ষান্তরে, মার্ক্সবাদীদের মতে, বৈজ্ঞানিক মার্ক্সবাদের সাহায্যে বিষয়গুলোকে বোঝা ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
অব্জেক্টিভ কন্ডিশনের আলোচনা প্রসঙ্গে লেনিন বিপ্লবের যে ৪টি শর্তের কথা বলেছিলেন তা সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা যায়:- (ক) বিপ্লব–অনুকূল পরিস্থিতি তখনই সৃষ্ট হয় যখন শাসক শ্রেণী আগের মতো শাসন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে; শাসক শ্রেণীর মধ্যে একাধিক দল, উপদল দেখা দেয়, তার কারণে বিভক্তি ঘটে, প্রতিটি দল ভিন্ন–ভিন্ন সমাধান প্রস্তাব করে (খ) মধ্য(বিত্ত) শ্রেণীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় (গ) শ্রমিক শ্রেণী সমস্যার সমাধান খোঁজে কিন্তু পূর্বতন সমাজব্যবস্থার অধীনে নয়; বদলের জন্য শ্রমিক শ্রেণী যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত (ঘ) আর সর্বোপরি, শ্রমিকদের সাধারণ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় সুস্পষ্ট মার্ক্সবাদী ভাবধারার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি বিপ্লবী দল যার কৌশল, লক্ষ্য হাসিলের পন্থা ও সংগঠন— সবই প্রস্তুত।
১১দ্বান্দ্বিক চিন্তার মূলে রয়েছে আপাত দৃষ্টিতে যা মনে হবে সম্পর্ক–বিহীন, তার মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক অর্থাৎ, দৈবাৎ কোনো ঘটনা নয় বরং ব্যবস্থাজনিত কারণে (systematic interconnections) তা অনুসন্ধান করতে পারা, তার মাধ্যমে পূর্বতন অনগ্রসর ধাপ অতিক্রম করে আরো অগ্রসর ধাপে উন্নীত হওয়া। অর্থাৎ, শ্রেণী বৈষম্যের সঙ্গে লিঙ্গীয় বৈষম্যের আন্তঃসম্পর্ক অনুসন্ধান করে উপলব্ধি করতে পারা কেন বিপ্লব সাধন করতে হলে, তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে নারীমুক্তি অপরিহার্য।
১২“Women have to wage a longer struggle because of their double oppression.” দেখুন, Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত|
১৩“Added to this is the unilateral burden a woman has to carry when she becomes a mother. With the birth of every child she sinks deeper into domestic slavery,” উপরোক্ত। ৩১ নং টীকা–ও দেখুন।
১৪“…in white dominated areas [areas still dominated by the local traditional elite-ed.]…women seldom get support system from the mass as well as from the Party to sustain themselves in their reproductive years,” উপরোক্ত।
১৬এক্ষেত্রে কমরেড পার্বতীর অভিজ্ঞতা উল্লেখ্য, “But there is also a tendency to treat women differently than men, something I have experienced personally. When my husband Baburam Bhattarai was taken action against in 2005, this was given a political motivation, but when I was taken action against, the reasons given were my negative influence on him,” Interview with Comrade Parvati (Hisila Yami), Blog Sketchy Thoughts, উপরোক্ত। ৩১ নং টীকা–ও দেখুন।
১৭পাঠকদের মধ্যে যাঁরা মার্ক্সবাদ–এর সঙ্গে স্বল্প–পরিচিত, তাঁদের সাহায্যার্থে এই টীকা যোগ করছি। অন্যান্য দর্শনের সঙ্গে মার্ক্সবাদের ভিন্নতা কার্ল মার্ক্সের (১৮১৮–১৮৮৩) এই বিখ্যাত উক্তিতে ধরা পড়ে: এ যাবৎকাল পর্যন্ত দার্শনিকরা বিশ্ব–সংসারের নানা ধরনের ব্যাখ্যাই দিয়েছেন শুধু, কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে এই ব্যবস্থার বদল ঘটানো (“The philosophers have only interpreted the world, in various ways; the point is to change it”)। আর একারণেই মার্ক্সবাদ একটি বিপ্লবী দর্শন, যাঁরা মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী তাঁরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বদল ঘটাতে বদ্ধপরিকর, তাঁরা সাম্যবাদী সমাজ বাস্তবে প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেন; মার্ক্সবাদী দর্শনের ভিত্তিতে বিপ্লব সংগঠিত করেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনীতি ব্যক্তির মালিকানাধীন; মালিকরা সমাজের সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, সম্পদ তাদেরই নিয়ন্ত্রণে যাতে তারা নিরন্তর মুনাফালাভ করে আরো বিত্তবান, আরো শক্তিশালী হতে পারেন। এই উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাধারণীকৃত পণ্য উৎপাদন (generalised commodity production), অর্থাৎ, ব্যবস্থাটি এমনভাবে গঠিত যাতে সমাজ–জীবনের নানাবিধ দিক প্রতিনিয়ত এবং অবিরামভাবে বেচা–কেনা বা বাজারের চক্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ একটি সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা, এতোটাই যে, পারিবারিক সম্পর্ক পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় টাকার সম্পর্কে পরিণত হয়। শিল্পায়নের উত্থান সাধারণ মানুষকে সামন্তবাদী প্রভুর প্রজা থেকে মুক্ত করেছে ঠিকই কিন্তু এই স্বাধীনতা শুধু শ্রম–বিক্রির স্বাধীনতা যাতে শিল্প–শ্রমিক পুঁজিপতি দ্বারা শোষিত হতে পারে; যাতে শিল্পপতি/পুঁজিপতিরা মুনাফা অর্জন করতে পারে। পুঁজিবাদের এই অসম ও অন্যায় ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করতে হলে বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ভাঙতে হবে, সর্বহারা শ্রেণীর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে হবে যাতে সমাজতান্ত্রিক ধারায় সমাজের রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হয়।
১৮সনাতনী মার্ক্সবাদীদের দৃষ্টিতে পুরুষাধিপত্যের মূল কারণ হচ্ছে শ্রেণী বৈষম্য, এর বিপরীতে র্যাডিকাল নারীবাদীরা মনে করেন, মানুষের মধ্যে বিরাজমান সবধরনের বৈষম্য ও আধিপত্যের (এমনকি শ্রেণী ও নরবর্ণভিত্তিক আধিপত্যের–ও) মূল কারণ হচ্ছ লিঙ্গীয় বৈষম্য বা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দেখুন, Ann Ferguson and Nancy Folbre, ÒThe Unhappy Marriage of Patriarchy and Capitalism,Ó Women and Revolution,পৃ. ৩১৪। বিষয়গুলো এই অংশের ‘২খ. তত্ত্বের সমস্যা’–য় আরো বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে।
১৯সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা র্যাডিকাল নারীবাদীদের সঙ্গে পিতৃতন্ত্রের অস্তিত্বের ব্যাপারে একমত, কিন্তু তারা মনে করেন না যে সমাজে বিরাজমান সকল বৈষম্য একইসূত্রে গাঁথা। তারা নারীবাদকে অপরাপর বৈষম্য–বিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গে— শ্রেণী শোষণ, নরবর্ণভিত্তিক আধিপত্য ইত্যাদি— সম্পৃক্ত করার কথা বলেন।
২০মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মনে করেন, পুঁজিবাদের অবসান ঘটলে পিতৃতন্ত্রেরও বিলুপ্তি ঘটবে যেহেতু নারী নিপীড়নের প্রধান কারণ হচ্ছে সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানা। শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব ও কর্মসূচীতে নারী–শ্রমিকের অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে মার্ক্সবাদী নারীবাদীরা মার্ক্সবাদকে তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
২১সাধারণ ধারণা হচ্ছে লেসবিয়ান মানে সমকামী নারী— নারীদের মধ্যে প্রেম–ভালোবাসা–যৌন সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ও বিশ্বাসী। এ ধরনের প্রস্তাবনায় বাদ পড়ে যায় বিষমকামীতা কিভাবে পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে, তার তাত্ত্বিক সমালোচনা।
২২এ্যানার্কো–ফেমিনিস্টদের দৃষ্টিতে পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই রাষ্ট্রের বিলুপ্তির লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত। রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে এ্যনার্কিজম যেহেতু সবধরনের ক্ষমতা–সম্পর্কের বিরোধী, তাই স্বাভাবিকভাবে অনেক নারীবাদী এ্যানার্কিজমের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
২৩মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী আন্দোলন শুরু হয় ব্ল্যাক লিবারেশন মুভমেন্ট ও উইমেন্স মুভমেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা প্রথমটি থেকে বেরিয়ে আসেন কারণ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের দৃষ্টিতে নরবর্ণবাদী অত্যাচার ও নিপীড়ন সর্বসর্বা, বৈষম্য–ব্যবস্থা হিসেবে পিতৃতন্ত্র সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ না; দ্বিতীয়টি ছাড়ার কারণ শ্বেতাঙ্গ নারীদের কাছে নরবর্ণভিত্তিক বিভাজন, শত শত বছরের বর্ণবাদী ইতিহাস অবজ্ঞার পাত্র, আর এভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা আলাদা ও স্বতন্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী তাত্ত্বিক প্যাট্রিশিয়া হিল কলিন্স’মতে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদী হচ্ছেন তিনি যিনি সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অভিজ্ঞতা ও চিন্তার তত্ত্বায়ন ঘটান যা ব্যক্তিসত্তা, সম্প্রদায় ও সমাজের অবস্থাকে বিষেøষণ করতে সাহায্য করে।
২৪Betty Friedan, The Feminine Mystique (New York: Dell publishing Co., 1963), পৃ. 11|
২৫মূল টেক্সটের প্রতি সততার তাগিদ থেকে “fuck”-এর বঙ্গানুবাদে “চোদা” শব্দ ব্যবহার করেছি; ভদ্রসমাজের রীতি–নীতি অনুসারে, বিশেষ করে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত নারীর ওপর ভদ্রতা রক্ষার যেই দায়ভার বর্তায়, এটি হয়তবা একটি অমার্জনীয় অপরাধ।
২৬“[class struggle and women’s liberation] are very close. Women were the first to be oppressed, and will be the last to be liberated when class oppression ceases. So the test of whether class oppression still exists is if women’s oppression still exists or not,” Interview with Comrade Parvati (Hisila Yami), Blog Sketchy Thoughts, পূর্বোক্ত।
২৭“…communist men should know that the revolution and the gains of revolution can only be preserved and furthered when more and more women join and lead the revolution.” Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত|
২৯“…communist men should know that the revolution and the gains of revolution can only be preserved and furthered when more and more women join and lead the revolution.” Comrade Parvati, “Women’s Leadership and the Revolution in Nepal,” পূর্বোক্ত।
৩০নিউ এইজ–এর লেখাটি লিখেছিলাম সাড়ে ছয় বছর আগে; কল্পনাকে ১৯৯৬ সালে অপহরণ করা হয়, অর্থাৎ ১৮ বছর আগে।
৩১একদম হুবহু অনুবাদ নয়, যে অংশের ভিত্তিতে লেখা তা তুলে ধরছি, “One of the most apparent reasons is the institution of marriage, which has robbed us of promising women leaders. People’s War seems to be changing that pattern, however, even within PW the question of continuity of women’s leadership keeps coming up, especially when they get married and decide to have children.. Added to this is the unilateral burden a woman has to carry when she becomes a mother. With the birth of every child she sinks deeper into domestic slavery. In fact many women who have been active in People’s War in Nepal are found to complain that having babies is like being under disciplinary action, because they are cut off from the Party activities for a long period. In this way many bright aspiring communist women are at risk of being lost in oblivion, even after getting married to the comrades of their choice… [W]omen seldom get support system from the mass as well as from the Party to sustain themselves in their reproductive years…. There is also the tendency to create pressure on women cadres to get married covertly or overtly as unmarried women draw lots of suspicion from men as well as women for their unmarried status. This results in marriages against their wishes or before they are ready to get married. Also there is a tendency to take sexual offenses more seriously than political offenses.” উপরোক্ত।
৩২জেনি মার্ক্স (১৮১৪–১৮৮১) ছিলেন অত্যন্ত সুশিক্ষিত একজন নারী ও কার্ল মার্ক্সের স্ত্রী; ১৮৪৮ সালে ব্রাসেল্স পুলিশ জেনিকে আটক করে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়।
৩৩নাদেজদা ক্রুপস্কায়া (১৮৬৯–১৯৩৯), রুশ বিপ্লবী ও রাজনীতিবিদ লেনিনের স্ত্রী।
৩৫Teresa L. Ebert, “Alexandra Kollontai and Red Love,” July-August 1999, www.solidarity-us.org|
৩৬পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে আমি পুরুষ বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্স বলছি, পুরুষালি বুদ্ধিজীবী ডিসকোর্স বলছি না। আমার দৃষ্টিতে সেটি প্রমাণসাপেক্ষ, গবেষণাসাপেক্ষ।
৩৭“বলা বাহুল্য আমি মার্ক্সের অনুসারী…,” সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা। সাদ্দাম হোসেন, ইলিয়াস মিলন, মোহাম্মদ আজম, মোহাম্মদ রোমেল, এবাদুর রহমান (সম্পাদনা), ঢাকা: সূচীপত্র, ২০০৪, পৃ. ৬৮।
৩৮এটি একটি চলমান কাজ। বদরুদ্দীন উমর (সম্পাদিত) “নারী পশ্ন প্রসঙ্গে” (ঢাকা : শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৩) উমরের প্রবন্ধ (বইয়ের নামেই, “নারী পশ্ন প্রসঙ্গে”) নিয়ে কাজ শেষ হয়নি, তাই সৈকত হাবিব–এর সংকলনে এই প্রবন্ধে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি।
৩৯“পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা,” আজকের কাগজ, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭। সাক্ষাৎকারগ্রহণকারির নাম অনুল্লিখিত । পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে, সামনা সামনি। ফরহাদ মজহারের সঙ্গে কথাবার্তা। উপরোক্ত।
৪০‘আনসার বিদ্রোহ’ লেখার জন্য ফরহাদ মজহার ১৯৯৫ সালে, বিশেষ ক্ষমতা অধ্যাদেশ বলে, গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী হন। বিদ্রোহটি দমন করেছিল সেনাবাহিনী। কারাবন্দী আনসারদের যাতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে মুক্ত করা হয়, মজহার এটি লিখেছিলেন। হাই কোর্ট তাঁর বন্দীত্ব বেআইনী ঘোষণা করে। ২৮ দিন পরে তিনি মুক্তি পান।
৪১“পার্টি ব্যক্তি লেখকের স্বাধীনতা,” উপরোক্ত, পৃ. ৮০।
৬০Medicalisation: কোনো দশা বা আচরণকে চিহ্নিত করা, একটি বর্গ তৈরি করে তার মধ্যে সেটিকে ঢুকিয়ে দিয়ে বলা যে এটিকে স্বাভাবিক করতে হলে তার চিকিৎসা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ বা ঔষধপত্র প্রয়োজন।
৬১ এর জোড় শব্দ হচ্ছে “মিসেস,” এ দেশের নারীর আধুনিক বশ্যতার প্রতীক, ‘একজন’ স্বামীর প্রতি আনুুগত্যের সামাজিক চিহ্ন।
৬২ সাজ্জাদ শরিফ–এর গ্রহণ করা এই সাক্ষাৎকারটি দৈনিক বাংলা বাজার–এ প্রকাশিত হয়েছিল।
আব্দুল্লাহ্ ওজালান একজন চিন্তক, দার্শনিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী । তিনি কুর্দিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সসস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (PKK) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৮৪ সালে কুর্দি–তুর্কি সংঘাতের সময় এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন তিনি। যার ফলে ১৯৯৯ সালে তুরস্কের সরকার তাকে বন্দি করে ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে তুরস্কে মৃত্যুদণ্ডের প্রথা বাতিল হলে ওজালানকে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত তিনি তুরস্ক সরকারের হাতে বন্দি আছেন। বন্দি অবস্থায়ই তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন। ওজালানের রাজনৈতিক চিন্তা মারে বুকচিন, মিশেল ফুকো, হানাহ্ আরেন্ডট্, কার্ল মার্ক্সের মতো দার্শনিকদের পাশাপাশি নারীবাদী রাজনৈতিক চিন্তা ও মেসোপটেমিয়ার পূরাণ দ্বারাও প্রভাবিত। মূলত মারে বুকচিনের প্রভাবেই তিনি মার্ক্সিস্ট, লেনিনিস্ট ও স্তালিনীয় মতাদর্শ থেকে বের হয়ে এসে মুক্তিপরায়ণ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মারে বুকচিনের চিন্তাধারার প্রভাবেই তিনি কুর্দি প্রশ্নে হাজির করেছেন গণতান্ত্রিক কনফেডারেশনের সূত্র। ওজালানের চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এমন একটি নারীবাদী রাজনীতি যেখানে তিনি নারীদের দেখেন গণতান্ত্রিক স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলার কেন্দ্রস্বরূপ। ওজালানের এই দর্শনকে যিনিওলজি (Jineology) বা নারীদের বিজ্ঞান বলা হয়। উত্তর এবং পূর্ব সিরিয়ার স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল রোজাভায় কুর্দিরা যে মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার প্রয়াস সেখানে ওজালানের গণতান্ত্রিক ফেডারেলবাদ, নারীবাদ ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারণার প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে কুর্দিস্তান কমিউনিটিজ ইউনিয়ন (KCK) ওজালানের রাজনৈতিক চিন্তাকে বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে।- সম্পাদক
আব্দুল্লাহ্ ওজালান
নারী প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবা বা লিখতে যাওয়ার মানে হচ্ছে সমগ্র ইতিহাস ও সমাজকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা। এর কারণ হচ্ছে নারীর উপর নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়নের নজিরবিহীন এক ব্যাপ্তি।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সভ্যতার ইতিহাসকে নারীর লোকসানের ইতিহাস হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়। আর এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়—যেই ইতিহাস ঈশ্বর ও তার বান্দাদের, প্রভু আর তাদের ভৃত্যদের, কারখানার, বিজ্ঞান ও শিল্পের— সবখানেই পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। সামগ্রিকভাবে এটি পুরো সমাজেরই ক্ষতি; যার ফলস্বরুপ আমরা লিঙ্গবৈষম্যে জর্জরিত একটি সমাজ পেয়েছি।
লিঙ্গবাদ যেমন ক্ষমতার হাতিয়ার, তেমনি এটি একটি অস্ত্রের মতোও, যা ইতিহাসজুড়ে সভ্যতার সমস্ত ব্যবস্থার মাঝেই পাকাপোক্তভাবে আসন গেড়ে বসে আছে। আদতে কোনো সামাজিক গোষ্ঠীই নারীদের মতো শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে এতটা শোষণের শিকার হয়নি। নারী নিপীড়নের বিভিন্ন রূপের ধরনগুলোও বেশ স্পষ্ট। একজন নারী উত্তরাধিকারীর জন্ম দেয়। নারী বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম বিলায়। সবার অপছন্দের কাজগুলো তারই ঘাড়ে বর্তায়। নারী হচ্ছে একজন বাধ্যগত দাস। যৌনাকাঙ্ক্ষার চিরস্থায়ী এক বস্তু নারী। নারী বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। নারী মূল্যবান ভোগ্যপণ্য, আসলে নারীই হচ্ছে সকল পণ্যের রানি। নারীই সেই ভিত্তি তৈরি করে দেয় যার উপর সহিংসতার অবিচ্ছিন্ন হাতিয়ার হিসেবে পুরুষ তার ক্ষমতা উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করতে পারে। সভ্যতার ৫০০০ বছরের ইতিহাসকে আমরা প্রকৃত অর্থে ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ হিসেবে বর্ণনা করতে পারি।
পুঁজিবাদের যুগে লিঙ্গবাদকে খুব নিখুঁতভাবে ভাবাদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। লিঙ্গবৈষম্যময় সমাজের উত্তরসূরি হিসেবে পুঁজিবাদ নারীকে কেবল ঘরের ভেতরেই বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ে তৃপ্ত হয়নি, নারীকে সে পরিণত করেছে যৌন বস্তুতে, বাজারে বিকানোর উদ্দেশ্যে নারীকে পরিণত করেছে ভোগ্যপণ্যে। পুরুষ যেখানে শুধু তার শ্রমই বিক্র করতে পারে সেখানে একজন নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোটাই বিক্রির বস্তু। এভাবেই দাসত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠে। নারীর ওপর আধিপত্য আরোপের জন্য এই ব্যবস্থা একটি কৌশলগত ভূমিকা আরোপ করে, যা শোষণ ও ক্ষমতার বিস্তারের সাথে জড়িত। নারীর উপর প্রথাগত দমনপীড়নের প্রসার ঘটার সাথে সাথে প্রতিটি পুরুষই কর্তৃত্বশীল সঙ্গী হয়ে উঠতে থাকে। এভাবেই একটি সমাজ সামগ্রিক ক্ষমতা বিস্তারের লক্ষণ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান একই সাথে সীমাহীন আধিপত্যের বোধ ও ধারণা প্রদান করে।
নারীকে জৈবিকভাবে অসম্পূর্ণ লিঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করাটা নিখাঁদ ভাবাদর্শিক ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের ফসল। আর এই অবস্থাকে স্বাভাবিক প্রতিপন্ন করতে এই মতবাদ তাবৎ বৈজ্ঞানিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, নারী নিজেই এই অবস্থাকে স্বীকার করে নেয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই অধস্তন অবস্থানের স্বাভাবিকতা ও পবিত্র অলঙ্ঘনীয়তা, যাকে নানাবিধ মানুষই শত শত বছর ধরে মেনে আসছে, নারীদের মধ্যেও তা সমানভাবে গ্রহণীয়, এবং তা নারীর চিন্তা ও আচরণকেও গড়ে তুলে। এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, কোনো নৃগোষ্ঠী, শ্রেণি বা জাতিই নারীদের মতো এতটা কাঠামোগত দাসত্বের শিকার হয়নি। নারীর দাসত্বের ইতিহাস এখনো লেখা বাকি আর মানব–মুক্তির ইতিহাস এখনো নারীর হাতে রচিত হবার অপেক্ষায়।
শিল্পী: মারিয়া ব্লানচার্ড
নারী তার নিজের দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার মাধ্যমে একটি কর্তৃত্বক্রমের (হায়ারার্কি) উদ্ভব হয়, এবং এর ফলে সমাজের অপরাপর অংশকগুলোকেও দাসত্বের অধীনে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়।নারী দাসত্বের পরম্পরা হিসেবেই পুরুষের দাসত্ব এসেছে। জাতি বা শ্রেণিগত দাসত্ব আর লিঙ্গভিত্তিক দাসত্বের পার্থক্য হলো, একে তো তা অনেক সুদূরপ্রসারি এবং সূক্ষ্ম, তার উপর আবেগতাড়িত মিথ্যা বুলি আওড়ে এই নিপীড়ন নিশ্চিত করা হয়। সমাজের সর্বত্র নারীর দাসত্বই অন্য সকল প্রকার কর্তৃত্বক্রম (হায়ারার্কি) ও রাষ্ট্রকাঠামোর পথ সুগম করেছে। কর্তৃত্বক্রমিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ক্ষুদ্র একটি অংশের বাইরে, শুধু নারীর জন্যই নয় বরং সমগ্র সমাজের জন্যই তা সর্বনাশ ডেকে এনেছে।
এ কারণেই পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ ও এর উপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর যেকোনো প্রকার গভীর সমালোচনার পথই উপেক্ষা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হচ্ছে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠান। পরিবার হচ্ছে পুরুষের মানসজাত একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। সভ্যতার সামগ্রিক ইতিহাসজুড়েই পরিবারের অর্থ এই শক্তিবলেই বিস্তার লাভ করেছে যেই শক্তি শাসকগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রযন্ত্র একে প্রদান করেছে। পুরুষের আধিপত্যের দিকে পরিবার বিন্যাসের ধাবিত হওয়া, এবং এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রবাদী সমাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিবারের নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই নারীর সীমাহীন, মজুরিবিহীন কাজ চালিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সাথে তারা সন্তান লালনপালন করে, পর্যাপ্ত জনগোষ্ঠী তৈরিতে রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ করে আবার সমগ্র সমাজজুড়ে দাসত্ব ছড়িয়ে দেয়ার রোল মডেল হিসেবেও কাজ করে।
রাষ্ট্রের একটি মাইক্রোমডেল হিসেবে যদি পরিবারকে আমরা স্বীকার না করি তবে মধ্যপ্রাচ্যীয় সমাজের উপযুক্ত বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। আদিঅন্ত উপর্যুপরি মার খাওয়া মধ্যপ্রাচ্যীয় পুরুষ নারীর ওপরই তার প্রতিশোধ আরোপ করে। প্রকাশ্যে সে যত বেশি অপমানিত হয়, তত বেশি সে নারীর উপর তার আগ্রাসন আরোপ করে। আপন সমাজ থেকে নিজেকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে, অসহায় ও ক্ষুব্ধ পুরুষ পরিবারে একজন স্বৈরাচারের মতো আচরণ করে এবং স্ত্রী–সন্তানদের ওপর হিংস্র হয়ে উঠে। যে পুরুষ তার নিজের মূল্যবোধগুলোকে সমাজে পদদলিত হতে দেয়, তথাকথিত ‘অনার কিলিং‘-এর মাধ্যমে সে চেষ্টা করে তার সেই ক্রোধ নারীর উপর প্রয়োগ করতে।
মধ্যপ্রাচ্যের সমাজের ক্ষেত্রে এটা যোগ করা দরকার যে পুরুষতান্ত্রিক, রাষ্ট্রবাদী সমাজের প্রথাগত প্রভাবের সাথে কোনোভাবেই পশ্চিমা সভ্যতার অধিকতর আধুনিক রূপগুলোর প্রভাবের মেলবন্ধন ঘটেনি। বরং এগুলো এমন একটি সংঘবদ্ধতা তৈরি করে যার সাথে গর্ডিয়ান নটের তুলনা করা চলে।
দেখা যাচ্ছে, পুরুষের ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও আধিপত্যের ধারণাকে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন। নারী যতটা নয় তার চেয়ে পুরুষই যেকোনো প্রকার পরিবর্তনকে অস্বীকার করে। আধিপত্যশীল ভূমিকা ছেড়ে দিলে পুরুষ নিজেকে রাজ্যহারা রাজার মতো অবস্থানে দেখতে পায়। ফলে তাকে চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে যে, আধিপত্যের এই ফাঁপা রূপই তাকে স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলে।
এ ধরনের বিশ্লেষণ নিছক তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ না, তার থেকেও বেশি কিছু। কারণ এগুলোর মধ্য দিয়ে কুর্দি জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের অস্তিত্বের তাৎপর্য প্রকাশ পায়। কুর্দি জনগণের স্বাধীনতাকে নারী স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে দেখার উপায় নেই, এ কারণেই আমরা নিজেদের সেভাবেই সংগঠিত করেছি। সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা আর স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর আক্রমণ সত্ত্বরও যে আমাদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দমে যায়নি, তার সবচেয়ে বড় এবং অমূল্য অংশের কৃতিত্ব দিতে হয় নারীমুক্তির আন্দোলন আর এই আন্দোলন যে সচেতনতার সৃষ্টি করেছে তাকে। আমাদের মতে স্বাধীন নারী ব্যতীত কোনো স্বাধীন কুর্দিস্তান হতে পারে না।
এই দার্শনিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ কোনো অর্থেই নারীদের সংগ্রামে যুক্ত করার কৌশলগত রাজনৈতিক চাল নয়। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুরুষ একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, আজ অবধি আমাদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অধপতিত, আধিপত্যশীল, অত্যাচারী, শোষণকারী পুরুষকে বুঝতে সক্ষম হয়েছি। নারীর স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে যথাযথ যে উত্তর খুঁজে পেয়েছি তা হলো, পুরুষতান্ত্রিক পুরুষকে বুঝো, বিশ্লেষণ করো ও তাকে ‘মেরে’ ফেলো। আমি আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে চাই। আমি পুরুষকে শান্তিকামী এক ব্যক্তিত্বে বিনির্মাণের আহ্বান করব। ধ্রপদী পুরুষকে বিশ্লেষণ ও ‘হত্যা’র মাধ্যমে ভালোবাসা আর শান্তির পথকে সুগম করতে হবে। এদিক থেকে আমি নিজেকে নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন কর্মী বলে মনে করি।
শিল্পী: গাজবিয়া শিরি
বিপরীত লিঙ্গসমূহের মধ্যকার বিরোধের দীর্ঘ ৫০০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীর প্রধান সংগ্রাম হয়ে উঠেছে। নারীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এই সমস্যাকে দৃশ্যমান করে তোলার জন্য এই সংগ্রামকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কিছু অসাধারণ নারী তাদের পদচিহ্ন রেখে গেছে তাদের জীবন, তাদের চিন্তা আর কর্মের মাধ্যমে। নারীর এই বিরুদ্ধাচারণ আমাদের সামনে কিছু একটা তুলে ধরে— তা হলো পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধ, সমাজে এই মূল্যবোধগুলোর প্রভাব এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছাড়া আমরা না পারব আমাদের জীবনে স্বাধীনতা অর্জন করতে, না পারব একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে, সে কারণে সমাজতন্ত্রকেও কার্যকর করে তোলা যাবে না। জনগণ শুধুমাত্র গণতন্ত্রেরই কামনা করে না, তারা লিঙ্গবৈষম্যহীন একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রত্যাশা করে। লিঙ্গসমতা ছাড়া, স্বাধীনতা বা সাম্যের যে কোনো ডাক ভিত্তিহীন আর বিভ্রান্তিকর। জনগণের যেমন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে, তেমনি নারীরও উচিত তার নিজের ভাগ্য নিজেকেই নির্ধারণ করা। পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা ফেলে রাখার মতো কোনো বিষয় এটি নয়। অন্যদিকে, নতুন একটি সভ্যতা নির্মাণের পথে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে নারীর স্বাধীনতা অপরিহার্য হয়ে উঠবে। আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার জন্য প্রকৃত সমাজতন্ত্র এবং জাতীয় সংগ্রামের বিপরীতে, শ্রেণি বা জাতির স্বাধীনতার থেকে নারীর স্বাধীনতা অধিক গুরুত্ব বহন করে।
নিজেদের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, নারীর স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই তা রাজনৈতিক বলয়ে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তাকে চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠোর বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হবে। তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে বিজয় ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদী অর্জন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে বিজয় মানে এই নয় যে নারী ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। বরঞ্চ ঠিক উল্টোটা, রাষ্ট্রবাদী আর কর্তৃত্বক্রমিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে এমন একটি কাঠামোর সৃষ্টি করা যেটি রাষ্ট্রঅভিমুখী নয় বরং একটি গণতান্ত্রিক আর পরিবেশবাদী সমাজের দিকে অগ্রসর হওয়া যেখানে সকল ধরনের লিঙ্গই হবে স্বাধীন। আর এর ফলে শুধু নারীই নয় বরং সমগ্র মানবজাতিরই জয় হবে।
[“To Abolish Rape, Overthrow Male Desire” শীর্ষক রচনাটি ২০১৩ সালেfith estate ম্যাগাজিনের ৩৮৯তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান অনুবাদটি the anarchist libraryতে সংরক্ষিত সংস্করণ থেকে করা হয়েছে।– সম্পাদক]
শিল্পী: অ্যান ক্যামেরুন
অন্তত কিছু ক্ষেত্রে হলেও মানুষের সংস্কৃতিকে যৌন আচারের একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যায়, ফ্রয়েড যেভাবে দেখেন ঠিক সেভাবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সামাজিক মানুষ যা যা কার্যক্রম পালন করে তারই একটা অংশ হিসেবে সমাজ যৌনতাকে সংগঠিত ও যৌন আহ্বানকে প্রতীকিকরণ ও সংরক্ষণ করে; আনন্দ, প্রভাব এবং প্রজননের প্রয়োজনে। ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন নিপীড়নগুলো; বিশেষ করে নারী, শিশু এবং যাদের লিঙ্গ পরিচয় প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গ পরিচয়ের কাতারে পড়ে না, তাদের উপর হওয়া সহিংসতা সামাজের ওই একই দৃষ্টিভঙ্গির স্বাভাবিক বর্ধিতাংশ।
সমাজ একটা সংঘটন হিসেবে, তার যুক্তি ও উদ্দেশ্য এমনভাবে সংঘটিত হয়েছে যেন তা ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানিসহ যৌন সহিংসতার যত উপায় আছে সবকিছুকে উৎসাহিত এবং প্রচার করে। এভাবে যৌন সহিংসতা সমাজের কর্তৃত্বপরায়নতার অস্ত্র হিসেবে সেবা করে এবং সমাজ কখনো সরাসরি কখনো গোপনে এটাকে একটা রোজকার প্রাকৃতিক এবং স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে পরিচয় করাতে চায়।
মানব সংস্কৃতিতে যৌন নির্যাতন বিস্তারের মূলকারণ হলো পিতৃতন্ত্র অথবা ব্যাটাছেলেদের শাসন। পুরুষের চেতনাকে কেন্দ্র করে পুরুষালি যৌন–কামুকতার নিরবিচ্ছিন্ন রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুরুষের বাসনা ও চেতনা থেকে আসা সেইসব আজ্ঞা এবং আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ ও সিদ্ধির প্রয়োজনে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
পুরুষের নিপীড়নমূলক যৌন আকাঙ্ক্ষার মূলে রয়েছে লৈঙ্গিক বিশুদ্ধতার ভ্রান্ত ধারণা, আধিপত্যশীল বিষয়ী দৃষ্টিভঙ্গি, এবং চর্চিত যৌন রীতিনীতির প্রভাব যা বাস্তব ক্রিয়ার উপর পূর্ণ অধিপত্য বিস্তার করার ও নিয়ন্ত্রণ করার সাংস্কৃতিক বৈধতা তৈরি করে দেয়। এই পুরুষত্বের লৌঙ্গিক ও আধিপত্যশীল চৈতন্য মূলত একটা সমাজের সকল লৈঙ্গিক আচার এবং রীতিনীতি চর্চিত হওয়ার পেছনের গোপন প্রভাবক। এটি সংস্কৃতিকে দৃশ্যমান এবং তাকে গড়ে তোলে কাঠামোবদ্ধ সংকেতের মতো; যৌনতাকে আমাদের সামনে হাজির করা থেকে শুরু করে যৌনতার অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি সবই হয় এর কারণে।
মরদতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এই পূর্বানুমান ধরে নেওয়া হয় যে, পুরুষ ইচ্ছানুযায়ী তার আকাঙ্ক্ষা চাপিয়ে দিতে পারে যে কারও উপর। লৈঙ্গিক শ্রেষ্ঠত্বে সে সংস্কৃতিকে এমনভাবে গড়ে যেখানে শুধুমাত্র পুরুষ আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার দাবি রাখে আর অন্যান্য যৌনতার ও এর সম্ভাবনাগুলোর ভূমিকা হয় কেবল তাদের সন্তুষ্টি বিধান করা। এর ফলে কোনো পুরুষ যখন যৌনমিলনের তাড়না অনুভব করে, যে–কোনোভাবেই হোক তার সেই তাড়না নিবৃত্তির বস্তুগত উপকরণাদির যোগানের সুলভ বন্দোবস্ত সমাজ নিশ্চিত করে।
পুরুষ, নারী, শিশু কিংবা পশুসহ অন্যান্য যাদেরকে এই আকাঙ্ক্ষার অধীন মনে করা হয়, তাদেরকে বিভিন্নভাবে পুরুষের নিয়ন্ত্রণের শিকার হতে হয়। আর যদি তারা কোনোভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে পুরুষের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ পরিণতি দিতে, সামাজিক বৈষম্যমূলক স্তরায়নের রীতিতে, তাদেরকে নিপীড়ন করা হয়, শোষণ করা হয় এবং খারিজ করা হয়।
তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ‘অপর’ পুরুষের তৈরি করা আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে প্রথাগত স্বীকৃতি পেয়ে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখে (যেমন: বিয়ে), অন্তত প্রথাগতভাবে, নির্দিষ্ট কিছু যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে। যদিও তাদেরকে এর পরিবর্তে সমর্পিত হতে হয় আরেক ধরনের যৌন সহিংসতার কাছে, সেটা পরিবারের কাছে। এবং যারা তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে সমর্পন করেনি, তারা বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক কাজের শিকার হয় এবং এসব থেকে তাদের নিজেকে আত্মরক্ষার উপায়গুলো আরও ভয়াবহ ও জটিলতর হতে থাকে।
এই অংশটুকু, অন্তত কিছু ক্ষেত্রে, প্রমাণ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার অভাব রয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারীরা: বিশেষ করে অবিবাহিত ও কারও অধীনস্থ নয় এমন নারীদের যাদেরকে শুধু যৌন–সর্বস্ব সত্তা হিসেবে জ্ঞান করা হয়, তাদেরকে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের আকাঙ্ক্ষা নিবারণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করার রীতি বৈধতা পায়। এদিকে বিবাহিত নারীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যৌন সামগ্রী মনে করা হয়। আসলে এর ফলে ধর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যাটালোকদের সার্বভৌম কামুকতার কাছে নারীদের সহজ, প্রাকৃতিক ও ‘যৌক্তিক’ সহজলভ্য যৌন সামগ্রী হিসেবে বিরাজ করার মামলা।
পুরুষের প্রশ্নাতীত কামুকতা এই জটিল পরিস্থিতির জন্ম দেয় যেখানে ক্ষমতার অদ্ভুত বিকার এবং অসাম্যতার স্ফূরণ দেখা যায়। মারকুইস ডি সাদের গল্পের চরিত্রগুলোর মতো: বিচারক, রাষ্ট্রপতি, পুরোহিত, স্কুলের শিক্ষকসহ সমস্ত পুরুষ কর্তারা মানুষের উপর তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য যৌনতার একটি ধারা স্বাভাবিক করে ফেলছেন।
আধুনিক আমেরিকান সমাজে পেন স্টেট ফুটবল কোচ জেরি সানডুস্কি এবং ক্যাথলিক পাদ্রিদের ন্যায় অনেক গণ্যমান্য সদস্যদের মতো পুরুষতান্ত্রিক সিরিয়াল ধর্ষকদের দ্বারা আমরা পরিবেষ্টিত থাকি। পুরুষের কামুকতা পূরণের নির্বাহী ক্ষমতার ছায়ায় নিজেদের করা যৌন নিপীড়নকে একরকম লাইসেন্স দেয় এসব ব্যক্তিত্বরা এবং তারা তাদের যৌন বর্বরতাকে সম্পূর্ণ বৈধ ও বিধিসম্মত মনে করে। পারিপার্শিক সংস্কৃতিও একে বিধিসম্মতরূপে হাজির করে। যাই হোক, একজন ধনী বৃদ্ধ আট বছরের একটি গরিব ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে ধর্ষণ করছে, এটির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কেউ নৈতিক কারণে গোপনে ঐ বৃদ্ধকে খুন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু আমেরিকান সংস্কৃতিতে মর্দামিতে ঠাসা কামুকতার প্রতি বশ্যতা স্বীকার করা হয়, এগুলোকে পুরস্কৃত করা হয়, এসবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় এবং এ ধরনের ধর্ষকদের জন্ম দেয়া হয়।
শিল্পী: ডারউইন লিয়ন
পুরুষালি কামুকতাকে এক অলীক উচ্চতায় প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্বে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়েছে এটাকে একধরনের রহস্যকরণ করেই। আনুষ্ঠানিকভাবে যখন পুরুষের কামুকতার ছাঁচে শরীরকে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন এই কামুকতার পেছনের কলকব্জাগুলোতে গোপনীয়তা থাকে। এমনকি এই ধারণার প্রকৃত বাস্তবতা এড়াতে চাইলে, পুরুষের আকাঙ্ক্ষা তার কাছেও অজানা থাকে। তাদের কর্তৃত্বের অধীনে থাকা নারী, শিশু এবং অন্যান্য সকলের কাছে এর উপায়গুলো সম্পর্কে নিবিড় এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকে। শেতাঙ্গদের নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের যে বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়, এটি অনেকটাসেরকম। এটি এমন একধরনের পরীক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতা শেতাঙ্গরা যেটি কখনো অনুধাবন করতে পারবে না। অ–অনুসারী পুরুষদের পুরুষের আকাঙ্ক্ষার অভ্যন্তরীণ (circuitry) বর্তনী থেকে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা যখন প্রেমমূলক নাশকতার সাথে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়, তখন সেটি পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের জ্ঞান পুরুষকে তার সম্পূর্ণ কর্তৃত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে আপেক্ষিকভাবে সহমর্মিতার আচার এবং অনুষ্ঠান পালনের জায়গায় নিয়ে আসে যেখানে পুরুষের প্রশ্নাতীত কামুকতাকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা এবং পরাভূত করা যায়। যেসব রীতিভুক্ত প্রতীক এবং সাইকোম্যাটিক হাতিয়ার দিয়ে পুরুষ তার কামুকতার চরিতার্থকরণে সহিংসতার সংস্থা হিসেবে মূর্তিমান হয়েছে, পুরুষত্বের কিছু বিদ্রোহী সমালোচনা সেগুলোকে খোলসা করছে।
পিতৃতন্ত্রের অবসান এবং মর্দামির উচ্ছেদ করার এসব আলাপ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান যৌন সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক অসামঞ্জস্যতাকে অস্বীকার করে। এই অসামজ্ঞস্যতার মূলে রয়েছে যৌন অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত বিভিন্ন আচার, মিথস্ক্রিয়া (interaction) এবং শারীরিক কায়দা যা কিনা অটল (persistent) নির্বাহী কর্তৃপক্ষ এবং পুরুষের দ্বারা পরিচালিত। অন্যভাবে বলতে গেলে লিঙ্গ, মর্দামি এবং পুরুষতান্ত্রিকতার অজস্র সমালোচনাতে যেটি অনুপস্থিত সেটিই মূলত লিঙ্গ বৈষম্যের একটি সমাধান। মূলত কী করে এটি করা যায়, ঘটানো সম্ভব করা যায়, সে সম্পর্কিত সমাধান খুব জরুরি। আমাদের প্রজাতি আর যাই হোক অন্তত স্থায়ীভাবে একটি জায়গা আটকে থাকে না।
শিশুদের ক্ষমতায়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে তারা সহিংসতা, জবরদস্তি এবং নিপীড়নমূলক নিয়ন্ত্রণের মতো জটিলতা এড়িয়ে আনন্দ, আকর্ষণ এবং উত্তেজনা (arousal) উপভোগ করতে পারে।
নারীদেরকে শারীরিকভাবে অক্ষম এবং পরাধীন সত্তা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। নিজের দেহকে রক্ষা, পরিচালনা করা এবং উপভোগ করার মতো মৌলিক ক্ষমতা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। সহিংসতার (যৌন সহিংসতাসহ) সমস্ত নির্বাহী ক্ষমতা পুরুষের কাছে সমর্পণ করে নারীদেরকে যৌন সামগ্রীর মতো গুপ্ত এবং সজ্জিতভাবে নিজেদের কমনীয়তা ধরে রাখতে বাধ্য করা হয়। এমনকি স্টুবেনভিল, ওহিওতে যে নারী সংস্থা রয়েছে, পুরুষের ইচ্ছাধীন শাসনের অধীনে তাদের চৈতন্যও অস্তিত্বহীন। পুরুষ এবং নারীর যৌনসম্পর্ক এই ভ্রান্তির দ্বারা ক্রমাগত প্রতারিত হচ্ছে।
তাছাড়া, আরও বুনিয়াদি পর্যায়ে মরদ–প্রধান সমাজে যৌনমিলনের ক্ষেত্রে পুরুষের কাছে নারীর সমর্পনকে যৌনতার সাধারণ ধর্ম হিসেবে হাজির করা হয়। আন্দ্রেয়া ডওয়ার্কিন (যিনি মনে করেন, নারী–পুরুষের সমস্ত যৌন সম্পর্কই ধর্ষণ) এর মতো তাত্ত্বিকদের তত্ত্বকে বাদ দিলে, সহবাসের হিংস্র পেনিট্রেটিভ ধরন নারী–পুরুষের স্বাভাবিক সহজাত যৌন–সম্পর্কের প্রতিফলন নয়; এটি ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার মতোই মরদ–প্রধান সংস্কৃতিতে যৌনতা সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ধারণা প্রসূত আগ্রাসনের একটি চিহ্ন কেবল।
যৌনতার উর্দ্ধে গিয়ে লিঙ্গকে (sex) বুঝতে হলে, নারী–পুরুষের মধ্যেকার যৌন–শারীরিক সম্পর্কের ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। অবশ্যই এটি করতে গিয়ে মানুষের সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে অর্থাৎ জৈবিক ভিন্নতার ভিত্তিতে যেসব মরদ–প্রধান সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস (লিঙ্গ বৈষম্য)কাঠামো টিকে আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। ইতিবাচকভাবে বলতে গেলে নারী, শিশুসহ যারা পুরুষতান্ত্রিক যৌন সম্পর্ককে খারিজ করবে, তাদেরকে এমনভাবে ক্ষমতায়ন করতে হবে যাতে তারা যৌনতার পরমানন্দকে খুঁজতে, সন্ধান করতে এবং টিকিয়ে রাখতে যেসব রীতি, কৌশল ও নৈপুণ্য দরকার তাতে উদ্ভাবনী ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিলোপ করা সম্ভব, যা শেষতক মরদতন্ত্রকে এবং পুরুষালি কামুকতার সম্পূর্ণ জিঞ্জিরকেও ধ্বংস করে।
‘হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া কবিতা (ছদ্মনাম) ভালোবেসে বিয়ে করেন গোপাল কর্মকারকে (ছদ্মনাম)। তারা প্রথমে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিয়ে করেন। বিয়েটি আরও শক্ত হবে ভেবে পরদিন তারা নোটারি পাবলিকের কাছে এফিডেভিট করেন। বিয়ের পর তারা নারায়নগঞ্জে ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন। গোপাল বিয়ের সময় স্কুলে চাকরি করতেন। বিয়ের পর সরকারি কলেজে চাকরি নিয়ে সন্দ্বীপে চলে যান। তখন কবিতা ঐ বাসাতেই বসবাস করতে থাকেন, গোপাল আসা–যাওয়া করতেন। পরবর্তী সময়ে গোপাল ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন এবং তারা রাজাবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। কবিতা এ সময়ে একটা স্কুলে চাকরি করা শুরু করেন। কবিতার বিবাহিত জীবনের দীর্ঘসময় পার হয়ে গেলেও সন্তান না হওয়ায় অনেক চাপাচাপির পর গোপাল ডাক্তারের কাছে যেতে সম্মত হন। ডাক্তার তাদের পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে টেস্টটিউব বেবি নেয়ার পরামর্শ দেন। এতে সম্মত হয়ে অনেক খরচের কথা বলে গোপাল কবিতার জমানো সমস্ত টাকা নিয়ে নেন। কিন্তু গোপাল টেস্টটিউব বেবি নেয়ার ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি। কবিতা অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ সময় থেকে ধীরে ধীরে কবিতার প্রতি গোপালের আচরণ বদলাতে থাকে। গোপাল প্রায়ই কবিতার সাথে খারাপ আচরণ করা শুরু করেন। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ভাড়া বাসায় কবিতাকে একা রেখে গোপাল চেলে যান এবং ফোন করে জানান, তিনি কবিতার সঙ্গে আর সংসার করবেন না। অথচ কবিতা গোপালের কারণেই তার বাবা–মা ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। পরের মাসেই গোপাল দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এতে কবিতা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি আইনগত সহযোগিতার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রে (আসক) আসেন। আসক থেকে উভয়কে নিয়ে সালিশে বসা হলেও কোনো সমাধানে আসা সম্ভব হয় না। কবিতা আদালতের দ্বারস্থ হন। প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা হারে কবিতাকে আজীবন ভরণপোষণ প্রদান করবেন এবং দুজনে পৃথক বসবাস করবেন এবং কারও সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করবেন না মর্মে আদালতের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়।
গোপাল ঠিকই তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করছেন। কিন্তু কবিতা স্বামীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও বিবাহিতা হিসেবে শাঁখা–সিঁদুর পরে গোপালের স্ত্রী পরিচয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। (সূত্রঃ বাংলাদেশের আইনে নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পৃষ্ঠা ৬৮–৬৯)
বাংলাদেশে প্রচলিত সনাতনী হিন্দু আইনে বিয়ে কোনো চুক্তি নয়। সকল ধর্মীয় ও জাগতিক কার্যসাধনের উদ্দেশ্যে বিয়েকে স্বামী–স্ত্রীর অবিচ্ছেদ্য বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। সেকারণে হিন্দু নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমোদন নেই। হিন্দু নারী কিংবা পুরুষ কোনো পক্ষই কোনো পরিস্থিতেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে সক্ষম নয়। তবে একজন হিন্দু পুরুষ ইচ্ছে করলেই স্ত্রী বর্তমান থাকা সত্ত্বেও যতবার ইচ্ছে বিয়ে করার অধিকার রাখেন। সেজন্য বিশেষ কারণ বা আগের স্ত্রীর/স্ত্রীদের বা কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি–অনুমোদনের দরকার পড়ে না। প্রচলিত সনাতন হিন্দু আইনেই বহুবিবাহ অনুমোদিত। এর অর্থ হচ্ছে, বহুবিবাহ ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে অবৈধ বা অগ্রহণযোগ্য নয়, সেইসাথে হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ রাষ্ট্রীয় আইনেও শাস্তিযোগ্য নয়। অন্যদিকে একজন বিবাহিত হিন্দু নারী আদালতের মাধ্যমে বড়জোর স্বামী থেকে পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের অধিকার পেতে পারেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসকদের উদ্যোগে উনিশ শতকে এ অঞ্চলে বিধিবদ্ধ আইনের সূচনা হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক, দাপ্তরিক কাজের সুবিধার্থে ও আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও কর্তৃত্বে রাখার প্রয়োজনে মূলত আইনগুলো তৈরির উপলক্ষ্য সৃষ্টি হয়। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরি হলেও ব্রিটিশ শাসকগণ বিভিন্ন ধর্ম–জাতিগোষ্ঠী–সম্প্রদায়ের নিজ নিজ ধর্মীয় আইন তথা প্রচলিত প্রথাসিদ্ধ আইনের ব্যাপারে এবং সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে। অথচ ধর্ম ও প্রথা থেকে উৎসারিত ব্যক্তিগত আইনগুলো বৈষম্যপূর্ণ, পীড়নসহায়ক ও পিতৃতান্ত্রিক চেতনাজাত। বলাবাহুল্য, এইসব আইনের প্রধান শিকার হয়েছে নারী। ব্রিটিশের নীরবতার কারণ বোধগম্য। সাম্রাজ্যবাদী বেনিয়ার অনিবার্য লক্ষ্যই হলো মুনাফা সর্বোচ্চকরণ। উপনিবেশের মানুষের সুযোগ–সুবিধা বৃদ্ধি কিংবা সার্বিক মঙ্গলকরণ তাদের অভীষ্ট হতে পারে না। তাছাড়া ব্যক্তিগত আইনকে রাষ্ট্রীয় আইনের আকার দিয়ে আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে দেখা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিত করা ঝুকিপূর্ণ ছিল। সেটা করতে গেলে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের পিতৃতান্ত্রিকতার পাহারাদার পুরুষেরা ধর্মের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশের বিপক্ষেই দাঁড়িয়ে যেতেন। ব্যবসা–বাণিজ্য–মুনাফা করতে এসে অহেতুক ঝামেলা বাড়াবেন কেন তারা। সেকারণে ব্যক্তিগত আইনের (personal law) বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছে ব্রিটিশ শাসকগণ। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে সতীদাহ প্রথা বাতিল করে আইন ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়। এই দুটি আইন ছাড়াও ১৮৭২ সালে বিশেষ বিবাহ আইন প্রণীত হয়। এসব আইন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত হিন্দু সনাতন ধর্মশাস্ত্রের বিধিবিধানের সাথে সংঘর্ষ ও সমন্বয় করে মানুষের মাঝে স্থান পায়। তবে মোটাদাগে হিন্দুদের বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পুনর্বিবাহ, সম্পত্তি, উত্তরাধিকার, দত্তক ইত্যাদি ব্যক্তিগত অধিকার সংক্রান্ত আইন, শাস্ত্রের অনুসৃত বিধি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানকাল ও ১৯৭১–এ স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের জন্মের পঞ্চাশ বছর হলেও হিন্দুদের পারিবারিক আইনের সংস্কার সম্ভব হয়নি। হিন্দুদের বিবাহ বিচ্ছেদের আইনও তৈরি হয়নি। অথচ, দেশভাগের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতে সেই ১৯৫৫ সালে হিন্দু বিবাহ আইন পাশ হয়েছে। যার মাধ্যমে হিন্দুদের বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এমনকি একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র নেপালেও বিবাহ বিচ্ছেদের আইন আছে।
কিন্তু বাংলাদেশে অনুরূপ আইন তৈরির কার্যকর সরকারি উদ্যোগ অদ্যাবধি গ্রহণ করা হয়নি। ২০১২ সালে প্রণীত ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন’ রাষ্ট্র কর্তৃক হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য সর্বশেষ আইনি সুরক্ষা। যদিও শুভঙ্করের ফাঁকির মতো করে আইনটিকে ‘ঐচ্ছিক’ করে রাখা হয়েছে। মানে দাঁড়াচ্ছে, আইন না মানলেও অসুবিধা নেই। আইনের ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘উপধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন হিন্দু বিবাহ এই আইনের অধীনে নিবন্ধিত না হইলেও উহার কারণে কোনো হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী সম্পন্ন বিবাহের বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে না’। একইসাথে আইন মানা ও না মানার বিধান সংযুক্ত রাখা আইনের মোলিক উদ্দশ্যকেই ব্যহত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখার শামিল।
২০১২ সালে বাংলাদেশ আইন কমিশন সরকারের কাছে ‘হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ পেশ করে। আইন কমিশনের উক্ত গবেষণালব্ধ সুপারিশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশের জোরাল দাবি জানানো হয়। সেইসাথে বিবাহ নিবন্ধন (২০১২ সালে বিবাহ নিবন্ধন আইন পাশ হয়েছে, যদিও আইনটি ঐচ্ছিক), বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুণর্বিবাহ, বহুবিবাহ রোধ, অসবর্ণ বিবাহ, সম্পত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়ে আইন সংস্কারের ব্যাপারে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। আইন কমিশনের রিপোর্টে জনমত জরিপে কমিশনের প্রশ্ন ছিল, ‘হিন্দু আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুণর্বিবাহের সুযোগ থাকতে পারে কি? জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৮০% হ্যাঁ, ১৫% না ও ৫% মন্তব্য প্রদানে বিরত থাকেন।
আইন কমিশন সুপারিশে উল্লেখ করেন, ‘যে সমস্ত কারণে হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে তার অধিকাংশ কারণই বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য যুক্তিসংগত কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারণে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এই বিচ্ছেদ কার্যকর করা যেতে পারে। বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পর উভয় পক্ষ পুণর্বিবাহ করতে পারবে’। (সূত্রঃ হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারের সুপারিশ বিষয়ক আইন কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, ০৭ অগাস্ট, ২০১২)
১৯৪৬ সালে পাশ হয়, ‘The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act’ অর্থাৎ বিবাহিত হিন্দু নারীর পৃথক বাসস্থল ও ভরণপোষণ আইন। এই আইনের ২ ধারায় নিম্নলিখিত এক বা একাধিক কারণে একজন হিন্দু বিবাহিত নারী স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে বসবাস করতে পারবেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেন:
(১) যদি স্বামী কোন ‘ঘৃণ্য বা নিকৃষ্ট’ (loathsome) রোগে ভোগেন যা তার স্ত্রীর কাছ থেকে আসেনি; (২) যদি সে (স্বামী) তার (নারী) প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন যা কি না তার সাথে থাকাকে অনিরাপদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত করে তোলে; (৩) যদি স্বামী, স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে পরিত্যাগ করে; (৪) যদি স্বামী পুনরায় বিয়ে করে; (৫) যদি স্বামী ধর্মান্তরিত হয়; (৬) যদি তিনি (স্বামী) বাড়ীতে উপ–পত্নী রাখেন বা অভ্যাসগতভাবে উপপত্নীর সাথে বসবাস করেন; (৭) অন্যকোন যুক্তিসঙ্গত কারণে ।
হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসের বিধান আপাত দৃষ্টিতে একটি ভাল সমাধান মনে হলেও এটি আসলে একজন নারীর মৌলিক চাহিদা ও অধিকারের পরিপন্থী। এই আইন আসলে শাঁখা–সিঁদুর পরে বৈধব্যপালনের সমতুল্য। নারী ও পুরুষের স্বামী–স্ত্রী হিসেবে বা সঙ্গী (partner) হিসেবে একসাথে থাকা আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে যৌনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিন্দু নারীর পৃথক বসবাসের এই আইন নারীর যৌনতাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে।
আইনের ২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শর্ত থাকে যে একজন নারী পৃথক বসবাস ও ভরণপোষণের অধিকারী হবে না যদি সে ‘অসতী’ হয় অথবা সে যদি অন্য ধর্ম গ্রহণ করে অথবা দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পাওয়ার জন্য যুক্তিসঙ্গত কারণ দর্শাতে ব্যর্থ হয়।
সেইসাথে আমরা যদি ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনের ৪৯৪ ধারা পাঠ করি তাহলে নারীর যৌনতা ও পুনরায় নতুন জীবন শুরু করার প্রচেষ্টাকে কীভাবে দমন করা হয়েছে তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। ৪৯৪ ধারায় বলা হয়েছে,
‘যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি ৭ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন’।
বহুবিবাহরোধকল্পে ৪৯৪ ধারা তৈরি করা হলেও আইনটির কার্যকারিতা মূলত খ্রিস্টান সম্প্রদায় ও সব ধর্ম সম্প্রদায়ের নারীর জন্য কার্যকরী হয়ে আছে। কারণ, হিন্দু ও মুসলমান পুরুষের একাধিক বিয়ে যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম আইন অনুসারে অবৈধ নয়। কিন্তু একজন হিন্দু নারী আইনসঙ্গতভাবে আলাদা বসবাস করতে পারলেও যেহেতু বিয়েটি বাতিল হচ্ছে না এবং স্বামী জীবিত সেকারণে অন্যকারও সাথে আইনগত বৈধ সম্পর্ক স্থাপনে সে অপারগ।
হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদের পক্ষে আইন কমিশনের প্রতিবেদন ছাড়াও এনজিও সংস্থাগুলো হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন। এই দাবিতে হাইকোর্টে রিটও দায়ের করেন মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান।
‘হিন্দু আইনে ‘তালাক’ অন্তর্ভুক্ত না করার দাবি’ শিরোনামে জাগো নিউজ ২৪ ডট কম প্রকাশিত ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৬’র প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহিলা জোট ’শাশ্বত হিন্দু বিধি বিধান ধ্বংস করে ‘হিন্দু আইনে তালাক’ অন্তর্ভুক্ত না করার দাবিতে ব্যানার সহযোগে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করছেন।
হিন্দু বিবাহ আইনে তালাক ব্যবস্থা সংযুক্ত করতে মানবাধিকার কর্মী এলিনা খানের হাইকোর্টে রিট করার প্রতিবাদে এ মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, হাজার বছর ধরে অবিকৃতভাবে চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবার ব্যবস্থায় দুটি মানুষ একত্রিত হয়। হিন্দু পুরুষের জীবনে নারী আসে অর্ধাঙ্গিনী হিসাবে, তাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। এমনকি স্বামীর থেকে পৃথক থাকলেও নারীর ভরণ–পোষণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি ড. সেলিনা দত্তের সভাপতিত্বে মানবন্ধনে হিন্দু মহিলা জোটের নির্বাহী সভাপতি প্রীতিলতা বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রতিভা বাগচী, বিথী দত্ত, হিন্দু মহাজোটের সভাপতি দেবাশীষ মন্ডল, মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
ওদিকে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হিন্দু ধর্মীয় নেতাদেরকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে হিন্দু আইন সংস্কারের একটি খসড়া তৈরি করতে বলা হলেও তাদের ভেতরে কোনও উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।
এ ব্যাপারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, “এখনকার পরিস্থিতি হলো, সংখ্যালঘুদের ওপর সামগ্রিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। তারা অস্তিত্বের সংকটে আছে। ফলে এখন অস্তিত্ব রক্ষা করবে নাকি অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়ে কাজ করবে। এসব প্রশ্নে একটা বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেজন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না।”
অর্থাৎ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর ‘সামগ্রিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগের’ কথা বলে নারীদের অধিকার প্রশ্নে উদ্যোগের বিষয় এড়িয়ে যান তিনি। তাদের বেশিরভাগে নেতাই এখনো এমন আইনের বিপক্ষে রয়েছেন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক বলেন, বিয়ে বা পরিবার নিয়ে ধর্মের স্বীকৃত বিধান চলে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে। সেজন্য তাতে সংস্কারের ব্যাপারে তাদের সমাজে জড়তা আছে বলে তিনি মনে করেন। একইসাথে তিনি বলেছেন, বিবাহ বিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা হলে তখন ঠুনকো বিষয়েই পরিবারগুলোর বন্ধন ভেঙে যেতে পারে। সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমন ভয়ও তাদের অনেকের মধ্যে রয়েছে। (সূত্রঃ বিবাহ–বিচ্ছেদের অধিকার চান হিন্দু নারীরা, কাদির কল্লোল, বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬)
এদিকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ মনে করেন, ‘বিবাহ বিচ্ছেদ এবং সম্পত্তির মালিকানাসহ হিন্দু নারীদের অধিকারের প্রশ্নে আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নিলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগ তোলা হতে পারে, এমন ভয় সরকারের মধ্যে কাজ করে বলে তাঁর ধারণা’।(সূত্রঃ বিবাহ–বিচ্ছেদের অধিকার চান হিন্দু নারীরা, কাদির কল্লোল, বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ৮ ডিসেম্বর ২০১৬)
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কর্মকর্তা নীনা গোস্বামী বলেন, “হিন্দু নারীরা মূলত ঘরে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে স্বামী থেকে আলাদা থাকার আবেদন নিয়ে আসেন।”
“তখন সালিশ–সমঝোতার মাধ্যমে ভরনপোষণের অর্থ নিয়ে তারা আলাদা হচ্ছেন। বিয়ের কিন্তু সমাপ্তি ঘটছে না। সেখান থেকে তাদের বেরুবার কোনো পথ নেই। হিন্দু নারীরা এখন বিবাহ–বিচ্ছেদরে অধিকার চাইছেন”– বলেছেন নীনা গোস্বামী। (সূত্রঃ ঐ)
শিল্পী: সওলারাম হালদঙ্কর (১৮৮২-১৯৬৮)
এছাড়া বিবাহ বিচ্ছেদের বিরুদ্ধ পক্ষের যুক্তি হচ্ছে, ‘মুসলিম সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন থাকায় নারীরা নিরাপত্তাহীন জীবন বেছে নিচ্ছে। বিচ্ছেদের শিকার নারীরা পেশা হিসবে যৌনকর্ম বা অপরাধ জগতে যংযুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে তাঁদের শিশুরা পরিত্যাক্ত হয়ে অপরাধজগতে প্রবেশ করছে’। ( সূত্রঃ আইন কমিশনের প্রতিবেদন)
হিন্দু নেতৃবৃন্দের অনাগ্রহ ও হিন্দু সংগঠনের তৎপরতার কারণে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন না হওয়ার প্রধান অন্তরায়। বৈষম্যমূলক শ্রেণি ব্যবস্থার সুবিধাপ্রাপ্ত সমাজের এইসব উঁচুতলার হিন্দু এলিটদের কারণে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের মতো একটি বাস্তবসম্মত, অতি জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি আইন প্রণয়ন হতে পারছে না। হিন্দু পিতৃতন্ত্রের এইসব মোড়লেরা হিন্দু নারীদেরকে স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে তাঁদেরকে আধুনিক দাস হিসেবে অন্তরীণ করে রেখেছেন।
সনাতন ঋষিদের সংজ্ঞায় স্ত্রী স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তিই। মনুর [৯:৩] বিধানে নারী চিরস্বাধিকারহীন অসহায় শিশু:
‘নারীকে কুমারিকালে পিতা, যৌবনে স্বামী ও বার্ধক্যে পুত্ররা রক্ষা করবে। নারী কখনোই স্বাধীন থাকার যোগ্য নয়’।
হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের অবর্তমানে বিচ্ছেদের ভূয়া, অগ্রহণযোগ্য ও আইনি মূল্যহীন কাগজের কথা শোনা যায়। এইসব কাগজ আসলে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত এফিডেভিট বা হলফনামা। নন জুডিশিয়াল স্টাম্পে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে গিয়ে এই ধরণের হলফনামা করা হয়। হলফনামা একটি ঘোষণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটি বিবাহ কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদের আইনগত দলিল হিসেবেও স্বীকৃত নয়। আদালতে এই জাতীয় কাগজের মূল্য নেই।
জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের নারীরা বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সম্পত্তির ক্ষেত্রে সম অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ, সিডও সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে নারী–পুরুষের সমানাধিকারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী’। বিবাহ বিচ্ছেদ আইন হলে নারীরা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়বে, বিচ্ছেদের শিকার নারীরা যৌনকর্মী হয়ে অধঃপাতে যাবে, ঠুনকো বিষয় নিয়ে সংসার ভেঙ্গে যাবে, অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, ধর্ম ও জাত যাবে—এইসবই কর্তৃত্বপরায়ন হিন্দু পিতৃতন্ত্রের সুপ্রাচীন অজুহাত, যা হাজার বছর ধরে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠী সেই ১৯৫৫ সাল থেকে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের সুবিধা ভোগ করে আসছে। কই তাদের কাছ থেকে তো আমরা এসব অজুহাত শুনতে পাই না।
তাই সময় হয়েছে হিন্দু আইন সংস্কারের বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার। বিশেষ করে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ আইন প্রণয়ের পক্ষে সামাজিক–নাগরিক আন্দোলন শুরু করা সময়ের দাবি।
[এমিল আর্মান্ড (১৮৭২-১৯৬২) একজন ফরাসি এনার্কিস্ট মুক্তচিন্তক। ব্যক্তি, প্রেম, যৌনতা, নৈতিকতা নিয়ে লিখেছেন তিনি প্রচুর। তার On sexual liberty লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯১৬ সালে। বর্তমান অনুবাদটি এনার্কিস্ট লাইব্রেরিতে যেই সংস্করণটি তুলে দেয়া তা অনুসরণ করে করা হয়েছে। – সম্পাদক]
শিল্পী: এদগার দেগা
“যৌন স্বাধীনতা” বিষয়ে আমাদের ধারণাকে স্পষ্ট করার আগে, আমি মনে করি খোদ স্বাধীনতার সংজ্ঞায়ন করাটা জরুরি। আমরা জানি স্বাধীনতার কোনো শেষ বলে কিছু নেই, এ কারণে চূড়ান্ত স্বাধীনতা বলেও কিছু নেই, ঠিক যেমন সাধারণ সত্য বলে কিছু নেই। বাস্তবিক অর্থে, নির্দিষ্ট প্রত্যয়গুলোর মধ্যে যার অস্তিত্ব আছে সেই সাধারণ স্বাধীনতারও কোনো অস্তিত্ব নেই, আছে শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট, ব্যাক্তিক স্বাধীনতা। সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে আসলে এড়ানো সম্ভব হয় না। যেমন কেউ নিঃশ্বাস না নেয়া বা খাবার না খাওয়ার মতো স্বাধীন হতে পারে না। স্বাধীনতা হচ্ছে সত্য, বিশুদ্ধতা, সদ্গুণ, সমতার মতোই বিমূর্তায়ন। এবং এই বিমূর্তায়নের কোনো শেষ নেই।
এর পরিবর্তে বরং ধরে নেয়া যায়, কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিমূর্তায়নের বদলে একটি পন্থা ও একটি উপায় হিসেবে স্বাধীনতাকে বুঝা হচ্ছে। আর এজন্যই আমরা চিন্তার স্বাধীনতার কথা বলি। অর্থাৎ এর মানে হচ্ছে, কোনো বাহ্যিক বাধা ছাড়াই মনের ভেতর যেভাবে চিন্তা উপস্থিত হয় ঠিক সেভাবেই কথা বা লেখার মাধ্যমে তাদেরকে প্রকাশ করার ক্ষমতা। আর এটাই হচ্ছে চিন্তার পরিপূর্ণ প্রকাশ, যেই লক্ষ্যের পেছনে আমরা ছুটে চলি, কিন্তু তা স্বাধীনতা নয়। আর এর কারণ হচ্ছে এই যে, সুনির্দিষ্ট কিছু স্বাধীনতা রয়েছে যাদেরকে আমরা বিমূর্তায়নের এখতিয়ার থেকে সরিয়ে এনে একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পারি এবং ‘আমাদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে’ নিশ্চিত করতে পারি। এবং একে ‘আমাদের অধিকারগুলো’ থেকে আরও ভালোভাবেই এই শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই ‘আমাদের অধিকারগুলো’ হচ্ছে একটি বিমূর্ত ও যথেচ্ছা অভিব্যক্তি, যাকে কিনা নানা পদের কর্তৃত্বকারীরা শ্বাসরোধ করে মারে, ছিন্নভিন্ন করে বা বিকৃত করে দেয়।
ব্যক্তি হিসেবে ও ব্যক্তির স্বাধীনতা হিসেবে দেখেই, ধর্ম অথবা নাগরিক ব্যবস্থার আইনি ধারণা ও সংস্কার ছাড়াই বুদ্ধিজীবিতার জীবনের, শিল্পের জীবনের, অর্থনৈতিক জীবনের, যৌনতার জীবনের মুক্তভাবে স্বাধীন উদ্ভাসন চাই আমরা। মোরালিটিজমের আবদ্ধতা কিংবা ট্রেডিশনালিজমের বাঁধ যা কিনা আমাদের এই ছুটে চলাকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে এগুলোকে এড়িয়েই একটা বৃহৎ নদীতে, যেখানে মানবীয় ক্রিয়াকলাপগুলোর বাধাবিপত্তিহীন বিচরণ চাই আমরা। সর্বোপরি, এই কর্তৃত্ববাদিতা, অস্থায়ী মুখোশ, জমাটবদ্ধ গিরিপথ যার পূর্বে আমরা মুশড়িয়ে পড়ি এবং মরে যাই তা থেকে এই দুর্দমনীয় ত্রুটি, বিচলিত ধাক্কা, অচেতন দৃষ্টিভঙ্গির অভাবকে সাথে নিয়েই স্বাধীনতা উত্তম বলে প্রতীয়মান হয় । দরজার বাইরের জীবন এবং ভেতরের জীবনের মধ্যে আমরা তো বাইরের জীবনকেই বেছে নেই।
***
আমরা যখন ‘যৌন স্বাধীনতা’ দাবি জানাচ্ছি তখন আসলে কী বুঝাচ্ছি আমরা? আমরা এটা বলতে কি ‘ধর্ষণের স্বাধীনতা’ কিংবা বেলাল্লাপনাকে বুঝাচ্ছি? আমরা এটা কামনা করছি যে লাভ লাইফের মধ্য থেকে আবেগ উবে যাক; উবে যাক অনুরাগ, আবেগপ্রবণতা, বা প্রেম? আমরা কি যেকোনো স্থানে ও সময়ে অকল্পনীয় উগ্রতা বা পাশবিক যৌন পরিতৃপ্তিকে মহিমান্বিত করছি? কোনোভাবেই নয়। যৌন স্বাধীনতার দাবিতে, আমরা স্রেফ প্রতিটি ব্যক্তির মুক্তির সম্ভাবনার দাবি জানাচ্ছি। যাতে করে করে তারা তাদের ইচ্ছামতো, নিজেদের যৌন জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজ নিজ মেজাজ, আবেগ ও যুক্তি অনুসারে মুক্ত হতে পারে। যেগুলো কিনা তাদের কাছে উদ্ভট বলে মনে হয়। সুতরাং আমরা ‘ধর্ষণ’-এর স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছি না। লক্ষ্যণীয় যে, একজনের যৌন জীবন অন্য আরেকজনের যৌন জীবনের আভাস দেয় না। আমরা যৌন জীবনের এমন স্বাধীনতারও দাবি জানাচ্ছি না, যা কিনা কোনো প্রকার যৌন শিক্ষার উদ্ভব ঘটাতে পারে। আবার অন্যদিকে, আমরা মনে করি যে, বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে মানুষকে যৌন জীবন সংক্রান্ত পর্যায়ক্রমিক কোনো বিষয়েই অজ্ঞ রাখা উচিত নয়। যেমন, অনিবার্য যৌন আকর্ষণ, তা সে যৌন জীবনকে ভাবপ্রবণ, আবেগ বা শারীরিক যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করা হোক না কেন। আমরা বিশ্বাস করি যে, অগ্রসর চিন্তারই উচিত হবে এই শিক্ষার প্রতি সমর্থন দেয়া ও একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এর সাথে সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ হাতছাড়া না করা। আমরা মনে করি যে, যেই মুহূর্তের কথা আমরা বলছি সেই মুহূর্ত থেকেই মানুষের জানা উচিত পুলক সৃষ্টি হয় কীসে— তা সে ভাবপ্রবণতা, আবেগ এবং শারীরিক কারও যৌন জীবনে যাই মুখ্য হয়ে ওঠুক না কেন। এছাড়াও কী কী দায়বদ্ধতার তার নেয়া উচিত তাও তার জানা দরকার। উভয় লিঙ্গের মানুষদেরই এই বোঝাপড়ার দিকে যাওয়া উচিত। যেমন, গর্ভধারণের সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নারীর উপরই থাকা উচিত। এবং গর্ভনিরোধক এর উপায় সম্পর্কে নারী-পুরুষ কারও অজ্ঞ থাকা উচিত নয়। আমার চিন্তার একটি যৌক্তিক উপসংহারের দিকে গেলে, আমি বলব যে, যে সমাজ তার নারী সদস্যদের হাতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করতে অস্বীকৃতি জানানো অথবা তাকে ঠেকানোর অধিকার দেয়নি, সে সমাজে সেইসব সদস্যরা যদি সমষ্টির জিম্মায় তার সন্তানকে ছেড়ে দেয় তা পুরোপুরি ন্যায্য হবে।
আমরা “যৌন জীবনের স্বাধীনতা” থেকে “যৌন শিক্ষাকে” আলাদা করি না।
***
ধর্মীয় ও সমাজব্যবস্থার কুসংস্কারগুলোর বিপরীতে আমরা যৌনতার প্রশ্নকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন হিসেবেই দেখি। মনুষ্যকর্ম যে সমস্ত প্রশ্নের আমদানি করেছে সেগুলোর সাথে একে আলাদা করে দেখি না। সামগ্রিক জীবন-অভিজ্ঞতা যতটা প্রয়োজনীয় মনে হয়, যৌন জীবনের অভিজ্ঞতাও ঠিক একই রকম অপরিহার্য। ১৬ বছরের তরুণ ছেলে বা মেয়ের ক্ষেত্রে বিবাহিত জীবনের বাধ্যবাধকতাকে আমরা ‘অর্থহীন’ বলে ঘোষণা করছি আবার একই সাথে একে অপরের সহিত আবেগীয় বা শারীরিক যে প্রকারেই হোক যৌন সম্পর্ক বজায় রাখাকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছি। এছাড়াও, পনেরো থেকে বিশ বছর বয়সের মানুষের যৌন জীবন পয়ত্রিশ বা শেষ বয়সের মানুষের যৌনজীবন থেকে ভিন্ন। যৌন জীবন এতটাই জটিল বিষয় যে একই সাথে যৌন জীবনের একাধিক অভিজ্ঞতার অস্তিত্ব থাকার ব্যাপারটি সহজেই অনুধাবন করা যায়। কেননা, প্রতিটি অভিজ্ঞতায়ই, কখনো কখনো ভাবপ্রবণতা বা আবেগীয় দিকটা প্রধান হয়ে ওঠে, আবার কখনো কখনো আবেগ বা শারীরিক দিকটি প্রধান হয়ে ওঠে, আবার কখনো কখনো স্রেফ ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তির ব্যাপারটি। একটি অভিজ্ঞতা থেকে অন্য অভিজ্ঞতায়, নৈতিক, আবেগীয় বা ইন্দ্রিয়গত অনুভূতি এত অদ্ভূত ভিন্নতা পায় যে, আমরা বলতেই পারি কোনো অভিজ্ঞতাই এর পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।
আমরা সাধারণত অভিন্ন অভিজ্ঞতার পেছনে ছুটি না।
শিল্পী: রেনে কাপুনে
যেহেতু আমরা অভিজ্ঞতা থেকে তীব্র, শারীরিক, ইন্দ্রিয়গত সুখানুভূতিকে বাদ দিচ্ছি না, সেহেতু আমরা একে বুদ্ধিবৃত্তিক (শৈল্পিক, সাহিত্যিক ইত্যাদি), নৈতিক ও অর্থনৈতিক সুখানুভূতির সাথে একই পটভূমিতে স্থাপন করছি। আমরা হীন নৈতিকতাবাদী, নৈতিকভাবে বিধ্বস্ত যারা কিনা একে নিচু স্তরে স্থাপন করে তাদেরও বিবেচনায় রাখছি। জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই ছোট নয়, কেবলমাত্র জীবনভীতি বা ইচ্ছাশক্তির ভারসাম্যহীনতার ফলে জাত অভিজ্ঞতা বাদে। এখন, স্বাভাবিক শরীরবৃত্তিকতা, তা সে চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করাই হোক বা তীব্রভাবে যাপন করা ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই হোক, তা জীবনের প্রতি ভালোবাসা ও ইচ্ছাশক্তির অনুশীলনের জন্ম দেয়।
***
‘লাম্পট্য’ যাকে অন্যভাবে বলা যায় ‘নৈতিক সমবস্থার অবক্ষয়’ তা ‘যৌন জীবনের স্বাধীনতার’ সমার্থক নয়। যৌন স্বাধীনতা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত দিকই নির্দেশ করে।
এটি এমন এক ইচ্ছার শিক্ষাদানের প্রস্তাব করে, যা কিনা প্রত্যেককে নিজের জন্য এমন একটি মুহূর্তকে নির্ধারণ করার সুযোগ দেয় যখন তরা নিজেদের আসক্তি বা প্রবৃত্তির উপর খবরদারি বন্ধ করবে। হয়তো প্রথমে যেমনটা মনে হয় শিক্ষা এর থেকেও অনেক বেশি প্রবৃত্তিগত। অপরাপর সব স্বাধীনতার মতোই যৌন জীবনের সাথে প্রচেষ্টা জড়িত। এ প্রচেষ্টা সংযমের নয় (সত্যিকার অর্থে জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সংযম হচ্ছে নৈতিকতার ঘাটতির লক্ষণ, ঠিক যেমন লাম্পট্য হচ্ছে নৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ।) বরং তা বিচার, বিচক্ষণতা ও বর্গীকরণের প্রচেষ্টা। অন্যভাবে বললে, এটা নিরীক্ষার পরিমাণ বা সংখ্যার প্রশ্ন যতটা না তারচেয়ে বেশি নিরীক্ষকের গুণমানের প্রশ্ন। শেষ কথা হলো, আমাদের মনে যৌন জীবনের স্বাধীনতা শেষপর্যন্ত পূর্বপ্রস্তুতিমূলক যৌন শিক্ষা ও ব্যক্তির সংকল্পের সাথে একীভূত হয়ে থাকে।
সবরকম পরিস্থিতিতেই যৌন জীবনের স্বাধীনতা, অবশ্যই: সম্মিলনের ভেতরে এবং বাইরে… একের থেকে অন্যের যৌন অভিজ্ঞতায় পার্থক্য আছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে প্রেমের এক অসুস্থ আচরণ অর্থাৎ ঈর্ষা কীভাবে অস্তিত্বশীল? কোনো ব্যক্তি যে কিনা কোনো অভিজ্ঞতার বিষয় বা বিষয়ী হয়ে ওঠছে, সে কি কোনো সংগত কারণে প্রয়োজনীয় গুণাগুণের অভাবে, যার ফলে তার কোনো সঙ্গী অন্য কোনো অভিজ্ঞতার বিষয় বা বিষয়ী হয়ে ওঠছে তা নিয়ে আক্ষেপ করতে পারে? আবেগীয় অভিজ্ঞতা এক বিষয়, ইন্দ্রিয়গত অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন বিষয়, আবার জন্মদানকারীর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটা হতেই পারে যে কোনো নারী যাকে তার সন্তানের জন্মদাতা হিসেবে বেছে নিচ্ছে আর যার প্রতি সে সর্বোচ্চ পরিমাণ আকর্ষণ বোধ করে তারা দুজন ভিন্ন কেউ। এবং একজনের মাঝে সে যেই বিশেষ গুণাগুণের অনুসন্ধান করছে অন্যজনের ক্ষেত্রে সে ব্যাপারে সে উদাসীন। যৌক্তিকভাবে এর একজন কি অন্যজনের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে পারে?
***
আলাপ শেষ করা যাক। গতানুগতিক জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে আবেগীয় প্রপঞ্চগুলোকে প্রতিস্থাপিত করার মাধ্যমে আমরা আসলে আমরা কোনোভাবেই মানব অস্তিত্বে ‘প্রেম’ নামক উপাদানটির গুরুত্ব খর্ব করতে চাচ্ছি না। আমরা মনে করি গুরুতর, গভীর ও তীব্রভাবে কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব কিন্তু আমাদের বহু নৈরাশ্য ও কষ্টভোগ থেকে নিষ্কৃতি ঘটবে যদি জীবনের একাধিক উপাদান চূড়ান্ত না হয়ে বরং সাময়িক, রূপান্তরযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য হিসেবে হাজির হয়। এটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও গ্রহণ করে নেয়া হয়েছ, গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ বা সকল দৃষ্টিকোণ থেকেই— ভাবপ্রবণ, আবেগীয় বা যৌন দৃষ্টিকোণ থেকে এটা ভিন্ন কিছু কীভাবে হতে পারে, তা আমরা ভেবে পাই না। আর এই ধারণা লুকিয়ে লুকিয়ে সাথে ধারণ করা ও গোপনে গোপনে এর চর্চা করাটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের দাবি হচ্ছে যৌন স্বাধীনতার গবেষণা ও চর্চা হোক লোক চক্ষুর সম্মুখে যেভাবে অন্য সকল স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এর অগ্রগতি ও বির্বতন শুধুমাত্র যে ব্যক্তি ও সমষ্টির সুখের সাথেই জড়িত তাই নয়, বরং বর্তমান ব্যবস্থার একটা বড় অংশের বিলুপ্তির সাথেও জড়িত।
শিল্পী: বেটিনা সেমার
তাছাড়া, আমরা নিজেদের প্রেমের ক্ষেত্রে একত্ব বা বহুত্বের পক্ষপাতী বলে ঘোষণা করছি না বিরুদ্ধে বলেও ঘোষণা করছি না, দুক্ষেত্রেই আমাদের অবস্থান সমান। এবং এটাও হতে পারে যে কোনো নির্দিষ্ট দম্পতির মধ্যে একজন একত্বের চর্চা করছে আবার অন্যজন বহুত্বের চর্চা করছে। এবং কোনো একসময় বহুত্বের চেয়ে একত্বই বেশি পছন্দনীয় হয়ে উঠতে পারে বা উল্টোটাও হতে পারে। এগুলো ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। আমরা দাবি জানাচ্ছি যে, কোনো অভিজ্ঞতা কতটা সরল বা মৌলিক তার উপর ভিত্তি করে সে অভিজ্ঞতার গুণমান যাচাই করা বন্ধ করতে হবে। আমরা এটাও দাবি জানাচ্ছি যে, এই বিষয়ে সকল প্রাণিকেই নির্দেশনা দিতে হবে। এবং পিতা, মাতা বা সঙ্গী তাদের সুবিধাজনক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য যারা সেইসব বাধ্যগতদের কাছ থেকে এসমস্ত ব্যাপার লুকিয়ে রেখে কোনো ফায়দা লুটুক। প্রত্যেকের ইচ্ছামতো নিজের যৌন জীবন নির্ধারণ করা, এর অভিজ্ঞতাকে পরিবর্তন করা অথবা নিজেকে কেবলমাত্র একক কোনোকিছুতেই বেঁধে রাখার শিক্ষা পৌঁছে যাক প্রত্যেকের কাছেই। এক কথায় বললে ‘ইচ্ছাস্বাধীন’ হয়ে উঠার দিকে যাত্রা হোক।
[লিঙ্গ প্রশ্নে জ্ঞান/ক্ষমতা ও শাসকতা প্রসঙ্গে এই সাক্ষাৎকার। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আলোচিত হয়েছে যৌন নিপীড়ন ও বিচারের মানদণ্ড। যৌন নিপীড়নকে নিছক একটি ফৌজদারি ঘটনা হিসেবে পাঠ এবং বিচারিক স্বৈরতন্ত্রে যৌন নিপীড়নের প্রতিকার খোঁজা আদৌ সম্ভব কিনা তা আলোচিত হয়েছে এই সাক্ষাৎকারে। প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে দণ্ডবিধির বিপরীতে একটা সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে যৌন নিপীড়নের জন্য পুনর্গঠনমূলক বিচারব্যবস্থার কথা। অধ্যাপক মানস চৌধুরীকে আমরা একগুচ্ছ প্রশ্ন পাঠিয়েছিলাম। তিনি উত্তর দিয়েছেন। তাকে আর পাল্টা প্রশ্ন করা হয়নি। সাক্ষাৎকারটি চলমান। বর্তমান টেক্সট থেকে প্রশ্ন গঠন করে আবার আমরা তার সাক্ষাৎকার নেব। অরাজের পক্ষে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন, আরিফ রেজা মাহমুদ ও শ্রবণা শফিক দীপ্তি।– সম্পাদক]
ছবি: মানস চৌধুরী
যৌন নিপীড়ন: সম্মতি/অসম্মতি ও ধারণায়ন
১.আলাপটা একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনের সময় এর ধারণায়ন কেমন ছিল? এর সংজ্ঞায়ন এবং শনাক্তকরণ প্রশ্নটি আপনাদের বিবেচনায় ছিল নিশ্চয়…
মানস: আক্রান্ত মানুষজনের জন্য আসলে ধারণায়ন অজরুরি, বিহিত বা প্রতিবিধান বেশি জরুরি। এটা আমার বিবেচনায় বিদ্যাকর্মীদের একটা আত্মশ্লাঘা যে বেইনসাফের পরিবর্তনের (ইচ্ছার) জন্য ‘জ্ঞানার্জন’ বা ‘তত্ত্বপ্রস্তুতি’ আবশ্যক। আমি বিদ্যাকর্মীদের গড়ে কোনো আঘাত দেবার ইচ্ছা থেকে কথাটা বলছি না। অবশ্যই এ নিয়ে বিশদ তর্কের দরকার পড়তে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদী আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক লড়াই পরিচালনার জন্য ইতিহাসবিদ্যা, তত্ত্বালোচনা সহায়তা দিতে পারে সে বিষয়ে কোনো বিশেষ ওজর–আপত্তিও আমার নাই। আমার বলবার বিষয়টা খুবই সাধারণ: যিনি আক্রমণের শিকার, যাঁর উপর হামলা হচ্ছে, যিনি জবরদস্তিতে যৌনাত্মক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন, তাঁর জন্য বিহিত খুঁজতে চেষ্টা করাটা বিদ্যাকর্মীরা যে অর্থে ‘ধারণায়ন’ বলে থাকেন সেই অর্থে আবশ্যক থাকে না। তিনি ও তাঁরা এর থেকে পরিত্রাণ চেয়েছেন। প্রথমে হয়তো নিশ্চুপভাবে, তারপর কিছু মিত্র পেয়ে গেলে শোরগোল করেই মুক্তি চেয়েছেন। কিন্তু অবশ্যই আপনার এই প্রশ্নের মধ্যে অন্য একটি দিক আছে। তা হলো যাঁরা যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন, তাঁরা কীভাবে বিষয়গুলোকে দেখেন, দেখতে আরম্ভ করেন, দেখতে দেখতে বোঝাবুঝি পোক্ত করেন।
প্রথমেই মেনে নেয়া ভাল, বাংলাদেশ এমন একটা জায়গা, বিশেষত মধ্যবিত্তাঞ্চল যেখানে যৌনতা আর যৌনাক্রমণ প্রায় এক পাল্লায় পড়ে–যাওয়া অপরাধ। যৌনাক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য এই অঞ্চল খুবই অসুবিধাজনক জায়গা, যেহেতু যৌন কাজকর্ম প্রায় গুরুতর পর্যায়ের মুরুব্বিদের একান্ত ঘরের মধ্যকার গোপন তৎপরতা হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। বাস্তবে এই অঞ্চলে যৌনকাজকর্ম এভাবেই সাধিত হয়ে থাকে বলে আমি মনে করি না, তবে সমাজ–প্রপাগান্ডা বা সমাজ–আদর্শের–জয়গান এভাবে চলে। আবারো বলি যদি যৌনকাজ আর যৌনহিংস্রতা কাছাকাছি পাল্লায় প্রজারা রাখতে চেয়ে থাকেন, তাহলে ধারণায়ণের প্রশ্নটা খুবই গুরুতর বটে। যদি আপনার পাঠকেরা অপ্রাসঙ্গিক না মনে করেন, তাহলে আমি উত্তরটাতে কিছু তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত’ মাত্রাও যোগ করব। আমার ছাত্রজীবনের কথা বাদ দিলেও, এই আন্দোলনটির ঠিক প্রাক্কালেই প্রশাসনের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন এক সাংবাদিক (তখন ক্যাম্পাসে মাত্র দুই হালি সাংবাদিক থাকতেন) আমার যৌনজীবন নিয়ে ইন্টারভ্যু নিতে এসেছিলেন। নিজের যৌনজীবন ইন্টারভ্যু আকারে বলার ‘নুইস্যান্স’ বাদ দিলেও, এখানে অন্যান্য মানুষের ‘প্রিভেসি’ জড়িত থাকে। তার থেকেও বড় কথা ওই উদ্যোগটাকে আমি আসলে আরেকটা আক্রমণ ভাবছিলাম যাতে আমাকে ‘বিব্রত’ বোধ করানো যায়। আমার বলার জায়গা হলো, যৌন–আক্রান্ত এবং অনাক্রান্ত উভয়ের বেলাতেই কিন্তু বিব্রতি একটা লাগসই অস্ত্র যার প্রয়োগ বিধিব্যবস্থা করে থাকে। আন্দোলনটি শুরু হবার পর থেকেই, নানাবিধ আলাপচক্র, পাঠচক্র, সভাসমিতিতে এই বিষয়গুলোতে বিভিন্ন সংগঠকেরা জোর দিলেন যে শরম কিংবা লোকলজ্জা কিংবা বিব্রতির বাইরে আসা দরকার। যৌন আক্রমণকে প্রতিহত করতে গেলে আক্রমণকে অগ্রগুরুত্ব দিতে হবে। সেই অর্থে কিছু কর্মীর হয়তো স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশযোগ্য বোঝাবুঝি ছিল, বাকি আন্দোলনকর্মীরাও ক্রমাগত সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন।
২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধিতে ধর্ষণের সংজ্ঞায়নে সম্মতি/অসম্মতি ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধারণার শেকড়টা কোথায়? ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধ বা নৈতিকতার ছাপ এই ধারণায়নে পড়েছিল কি?
মানস: এসংক্রান্ত আইন নিয়ে আমার জানাশোনা আপনার মতো নয়। কিন্তু আমি সম্পর্কিত একটা জায়গা ধরে আগাতে চাইব। কোনো আইনকেই প্রয়োগকারী ও ভুক্তভোগীর নিয়তের থেকে সার্বভৌম করে আমি দেখি না। এটা বলার সময় চাইব সকল পক্ষ যাতে সতর্ক থাকি যে আমি ‘আধুনিক রাষ্ট্রের লিখিত আইন’সমূহের কথা বলছি। কারণ কথ্য ও তাৎক্ষণিক বিচারিককর্তৃত্বসম্পন্ন যে ‘আইন’, ধরা যাক, শালিসের মতো, সেগুলোকে অপরাধী–ভুক্তোভোগীর ইচ্ছানিরপেক্ষ জ্ঞান করা চলতে পারে। সেখানেও দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের ইচ্ছা বা নিয়তের উপর নির্ভর করে তথাকথিত ইনসাফ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা। কিন্তু পরিস্থিতিটার দশা একদম স্বতন্ত্র। আধুনিক আইন নানাবিধ ব্যাখ্যাসাপেক্ষই থাকে। এটা খোদ আধুনিক সমাজের লিবেরেল দার্শনিক পাটাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক সমস্যা।
শিল্পী: বেটিনা সেমার
ফলে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ বা নৈতিকতার ছাপ এখানে থাকতে পারে। কিন্তু আমার জন্য তুল্যবিচারে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এইটা যে ওখানে নির্দিষ্ট বয়সের এক নারীকে যৌনাকাঙ্ক্ষার মালিক বলে গণ্য করা হয়েছে। বয়সটা ছিল ১৪। এবং এখন ১৪ওয়ালারা অযৌন শিশু হিসাবে প্রপাগান্ডিত থাকেন। ‘পূর্ণবয়স্ক’/‘পরিণত’ নারী সম্মতি দিলেন কিনা এই প্রশ্নকে বিবেচনায় এনে এই আইন সামন্তসমাজে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে চর্চিত যৌনকাজ করার ক্ষেত্রে পুরুষের ইচ্ছার নিয়ামক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। আমার জন্য তাই ওই আইন ওই পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ ছিল। যেমন একটু আগে আইনের অনুধাবনের ক্ষেত্রে বললাম নিয়ত বা অভিপ্রায়ের কথা, ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণের গুরুত্বের কথা, এখন পরিপ্রেক্ষিতকেও আইন অনুধাবনে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রস্তাব করছি। নারী বলছেন তিনি চান না, সেখানে পুরুষের প্রচেষ্টা ধর্ষণ–অপরাধ বলে গণ্য হবে এরকম পাটাতন থাকার মাধ্যমে বিদ্যমান যৌনব্যবস্থাতে পুরুষের দখলদারিত্বের ইতিহাসকে স্বীকার করা হয়; বলপ্রয়োগে এই লিঙ্গের অনেক সদস্যের চর্চাকে আমলে আনা হয়; পরিশেষে নারী অন্তত হ্যাঁ–না’র মালিকানা দিয়ে তাঁর যৌন–কর্তাসত্তাকে জারি রাখার সুযোগ পান।
ভিক্টোরীয় নৈতিকতা নিয়ে নিন্দা করার জন্য বরং অন্য পরিপ্রেক্ষিত আমার জন্য প্রাসঙ্গিক হবে। বরং, আমরা ভাবার চেষ্টা করি যে ওই আইনপ্রণেতারা যদি জানতেন যে দিকে–দিকে, ইংলন্ডের গ্রামেগঞ্জে, ১৪ বছরের পরিণত নারীরা ১৪ ও অন্যান্য বয়সের নানান পুরুষের সঙ্গে (হেটারোসেক্সুয়াল আন্দাজে) লাগাতার যৌনসম্পর্ক করছেন, সম্মতি জানিয়ে জানিয়ে, তাহলে তাঁরা আনন্দিত হতে পারতেন কিনা। বাংলাদেশের সমাজে যেমন যৌনতা ও যৌনাক্রমণ মিলেমিশে আছে বলে উল্লেখ করেছিলাম; তেমনি, ইংলন্ডীয় তদীয় সমাজেও যৌনাচারের বিষয়ে গুরুতর ওজর–আপত্তি গড়ে উঠেছিল। শিশুদের যৌনজীবন নিয়ে ভাবা তো দূরের কথা, অশিশুদের যৌনজীবনও নানাবিধ রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার বিষয় হয়েছে। ধর্ষণের মতো আক্রমণাত্মক বিষয়কে উপলব্ধি করার জন্য প্রণীত আইনের প্রণেতাগণের অন্যান্য যৌনতা নিয়ে মনোভাব কল্পনা করা চিত্তাকর্ষক হবে বটে; কিন্তু ওই আইনটার পরিপ্রেক্ষিত ও অনুবর্তী বিবেচনা করে হলেও ওটার সঙ্গে যৌনাচার–নিয়ন্ত্রণ–করার আইন বা বিধিগুলোকে গুলিয়ে না ফেলতে চাইব আমি। যৌনাচার নিয়ন্ত্রণে ভিক্টোরীয় সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্রের মরিয়া চেষ্টা নিয়ে অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ আছে দুনিয়ায়। আমি আরো ভাল পড়ুয়া হলে এক্ষুনি হালিখানেক বইয়ের নাম বলে দিতে পারতাম।
এটা দুনিয়ার একটা আজব পরিহাস যে, লোকে যৌনকাজ করে যত খুশি থাকেন, কিছুতেই অন্যের যৌনকাজে তত খুশি হতে পারেন না। শিশুরা এই বিষয়ে সবচেয়ে বঞ্চিত, বৃদ্ধরাও। জৈবতারুণ্যের সঙ্গে যৌনতার অবধারিত সংযোগ ঘটানোও আইনপ্রণেতা ও বিজ্ঞানচর্চাকারদের আরেকটা উদ্ভট কাজ। মনুষ্য–যৌনতার কাজ যে নিছক বাচ্চা উৎপাদন নয়, সেটা বোঝার জন্য জীববিজ্ঞানের ডিগ্রিই বরং ঝামেলায় ফেলতে পারে, কমনসেন্সই যথেষ্ট হবার কথা। তাহলে জৈবতারুণ্য নিয়ে মাতামাতি যৌনতার ‘পুলক’/প্লেজার, উৎসবমুখরতা/ফেস্টিভিটি কিংবা অধিকল্পনা/ফ্যান্টাসি কিছুই বুঝতে সাহায্য করে না। ওটা তারুণ্যের বৈশ্বিক ডিসকোর্সের আরেকটা অগণতান্ত্রিক মেনিফেস্টো। ঈর্ষার তাত্ত্বিকেরা হয়তো বিশদ কিছু বলতে পারবেন এই বিস্ময়কর প্যারাডক্সটা নিয়ে। শেষের অনুচ্ছেদে আপনার প্রশ্নের কেন্দ্র থেকে সরে গেছি এই অভিযোগ তুলতে পারেন আপনি। কিন্তু আরেক প্রশ্নে এই কথাগুলো বলতে পারব তা নিশ্চিত তো নই এখনো।
৩. আপনার/আপনাদের (আন্দোলনকারী অর্থে) ধারণায়নের সঙ্গে দণ্ডবিধির এই বিষয়ক ধারণার সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যটা কোথায়?
মানস: যদি আপনার আগের প্রশ্নের ভিক্টোরীয় নৈতিকতার ধারণা সমেত এই প্রশ্নে এসে থাকেন, তাহলে সেটা মুলতবি রাখার পক্ষে আমি। কিন্তু সম্মতি অংশের সঙ্গে আগাগোড়াই সম্পর্কিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন। আমি প্রথমেই প্রায় বেয়াড়ার মতো বলে নিতে চাই যে যৌনতার নানাবিধ স্টিগমা একদম বৈশ্বিক; সেটার মাত্রা ও রূপভেদ যেমনই থাকুক না কেন। আপনি হলিউডের বলবান ধারার চলচ্চিত্রেও এই সতর্কতার অভাব দেখেন না যে সেখানকার প্রটাগনিস্টরা ‘এক সম্পর্কে’ থেকে আরেক (যৌন)সম্পর্কে ঢুকে পড়েছেন না কিছুতেই। ঢোকাটি মঙ্গলজনক কিনা, আমার আকাঙ্ক্ষিত কিনা, ঢুকে পড়লে পরে মেলা ভেজাল কিনা সেসব সম্পূর্ণ আরেক বিষয়; এবং এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু তাঁরা মেনে চলেন এই বিধান, এমনকি ছায়াছবিতে্ও। এই বিধানের লঙ্ঘন হবে কেবল ক্রাইমথ্রিলারে, যেখানে এরকম বিধানবহির্ভূত যৌন/প্রেম/কাম/আবেগাপ্লুত–সম্পর্কই খোদ খুনাখুনির কারণ বয়ে আনছে। ছায়াছবির প্যাটার্ন দেখাতে চাইছি কেন? এটা স্পষ্ট করতে যে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ, কিংবা শুচিতার ভোম্বাকাঠামো আলবৎ বলবৎ। এত বলবৎ যে চলচ্চিত্র কারখানাও বিধানচ্যুতি চায় না, যেমন সহজে চায় না নৈমিত্তিক ছায়াছবিতে সাদা আর কালো মানুষের মধ্যকার এমনকি বিষমলিঙ্গীয় জুটি বানাতেও। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে সম্মতির ধারণার রাজনৈতিক যে তুল্য গুরুত্ব আছে সেটাকে সমুন্নত রাখতে চাই আমি কোথাও কোথাও।
যৌনসম্পর্কে নারীর সম্মতি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কেন সেই প্রশ্নের মধ্যেই খোদ সম্মতির গুরুত্ব আছে। এত এত বছর ধরে এত অজস্র ধর্ষণ এবং বহুবিধ যৌন আক্রমণ নারীর উপর হয়েছে যে নারী কীসে অনিচ্ছুক ছিলেন বা আছেন সেই জিজ্ঞাসাটার রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। সেই হিসাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের এবং উনিশ শতকের ব্রিটেনের ধর্ষণ আইনের ধারণায়ন সাদৃশ্যমান ধরে আপনি আগাতে পারেন। তবে আর দুয়েকটি কথা বলতে চাইছি। এসব ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তীয় রাখঢাকে প্রায় কিছুই বলা সম্ভব নয়, আমি জরুরিও মনে করছি না। বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ সূক্ষ্ম, একটা বিষয়ে আমি আলোকপাত করতে চাই।
সম্মতির ধারণাটিকে আমি অন্য একটা শক্তিশালী লিগ্যাসির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ইচ্ছুক। যৌনতা, যৌনভাবনা, যৌনদশা, যৌনপ্রত্যঙ্গ বিষয়ে নিখিলবিশ্বে সব স্ফটিকস্বচ্ছ ‘বৈজ্ঞানিক’ ধারণা আছে বলে আমি মনে করি না। এমনকি খোদ বৈজ্ঞানিক ধারণা বলে যাসব চালু আছে তারও কতকের সঙ্গে আমি (এবং অনেকেই) টেবিলে বসে একটা একটা করে তর্ক করতে পারব। পুলক, সম্ভোগ, সন্তানধারণ, ঋতুচক্রোর্ধ্ব যৌনেচ্ছা এসব বিষয়ে নারীরা তো পারবেন শব্দে শব্দে। এই তর্কে নামতে চাইলে প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক বিজ্ঞানীদের সতর্ক হওয়াই ভাল হবে। তবে তাঁরা জিতবেন ক্ষমতা দিয়ে, যা হয়ে আসছে। যাহোক, বলছিলাম লিগ্যাসির কথা। ‘যৌনকাজকর্ম হয় জৈবতাড়নায়’—এই আকাট ধারণা কেবল স্থানিক কোনো চর্চা নয়; এটি বৈশ্বিক। এর সঙ্গে যোগ হয়ে আছে ‘পুরুষের তাড়না, জাগলে আর থামে না’ ধারণা। এটাও বৈশ্বিক। বিদ্যাজগতে, নারীবাদী আলাপে এটার নাম হলো ‘মেইল সেক্সুয়াল ড্রাইভ’। বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে আরো যুৎসই অর্থবোধক ভাষাতে এসব বলা হয়ে থাকে। বলাই বাহুল্য, যদি কারো মনে হয় স্পষ্ট করে বলিনি, এগুলো সব মিথ, প্রপাগান্ডা, পুরুষের বাহানা। ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজে বসে থাকার ইচ্ছা থেকে পর্যন্ত সরানো গেছে, যৌনকাজ করার ইচ্ছা সরবে না কেন! অন্যত্র আবার এই ধারণাও অত্যন্ত শক্তিশালী যে ‘নারীকে জাগাতে হয়’। এই ধারণাটিকেও কেবল দেশজ ভেবে ভুল করবেন না। সমকালীন যৌনতা–অধ্যয়ন শাস্ত্রে সক্রিয়তা–নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিশদ সব আলাপ–চালু আছে। তাহলে এতক্ষণ যেসব প্রবল চলমান ধারণা সামনে হাজির করলাম, সেখানে জৈবযন্ত্র হিসাবে পুরুষ ও নারীর অবধারিত সব কর্মকাণ্ড পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে তা দিব্যি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমি জানি বহু পুরুষ এ যাবৎ কালে জেনে আসছেন যৌনকাজ করার উপায় কেবল মাত্র ‘ছলে–বলে–কৌশলে’ নারীকে ‘বাগানো’। সমাজে যৌনদর্শনের এই বিচিত্র অগণতান্ত্রিক পাটাতনকে বিবেচনা করে ভাবুন। সম্ভবত, এখন যে বিষয়ে কথা বলছি (লিখছি), যেটাকে আমি সূক্ষ্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় বললাম, তা নিয়ে বিশদ করা লাগতে পারে আপনার অন্যান্য প্রশ্নগুলোর কোনোটার উত্তরে। আমি একবারেই সব প্রশ্ন পড়ে উত্তর করছি না।
৪. ‘সম্মতি‘ বা ‘অসম্মতি‘র জন্য ব্যক্তির কর্তাসত্তা/স্বীয়তা গুরুত্বপূর্ণ। কর্তাসত্তা বা স্বীয়তার বোধন না হলে সম্মতি বা অসম্মতি দেয়ার প্রশ্ন থাকে না। অনেক সামন্ত সমাজে নারীর বিয়ের প্রশ্নে সম্মতির ধারণা নেই বল্লেই চলে। অভিভাবকই সিদ্ধান্ত নেন। বা এবিষয়ে নিজেট মতামত থাকতে পারে এই উপলব্ধিও নারীর থাকে না অনেক ক্ষেত্রেই। সম্পর্ক গঠনকেই যখন যৌনতার সম্মতি বলে বিবেচনা করা হয় তখন এক্ষেত্রে সম্মত বা অসম্মত হতে তার কোন কর্তাসত্তা/স্বীয়তা থাকে কি?
মানস: এই বিষয়টা গভীরভাবে ইতিহাস ও শ্রেণীসাপেক্ষ। এমনকি দর্শনসাপেক্ষ। আমি প্রগতির ধারণার বশীভূত হয়ে তা বলছি না। এই অর্থে নয় যে কখনো এসব চেতনার অভাব ছিল, অন্য এক সময়ে মন্ত্রবলে দেখা দেবে; আর তখনই এই কর্তাসত্তা জাগ্রত হবে (ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে)। এমনকি আমি এই সম্মতি–আপত্তি চর্চার প্রসঙ্গটাকে কেবল যৌনতা ও যৌনাক্রমণের মধ্যেই সীমিত রেখেও সাপেক্ষতার বিষয়টা বলিনি। বরং, সম্মতি–আপত্তির চর্চা ঘোরতরভাবে নানান পরিমণ্ডলেই শ্রেণী–ইতিহাস–দর্শনসাপেক্ষ। যৌনতার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ যদি বাদও দিই, কজন ছেলে (নিজ) বাবার অগণতান্ত্রিক কিংবা ক্রুদ্ধ কিংবা হিংস্র কিংবা শোষণকারী আচরণের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় বলে ভাবতে পারেন? কেবল সামন্ত পরিসরের বাবাদের কথা হচ্ছে না। শহুরে–শিক্ষিত–মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বেলাতেও কমবেশি বাবা ও ছেলের সম্পর্ক মৌলিক সামাজিক প্রশ্নগুলোতে একপক্ষীয়। সেটা গৃহকর্মীর বেতন হোক, ড্রাইভারের কর্মঘণ্টা হোক, দারোয়ানকে সম্বোধন হোক। আমি খুব স্থূল উদাহরণেই থাকলাম তা সত্য। এখন চুপ–থাকা সকল ছেলেই বাবার স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক তা আমার বক্তব্য নয়। যৌনতার বেলাতেও মানা না–করা আর মেনে নেয়া বা সম্মতি একাকার করার পক্ষে থাকব না আমি। এই অংশে আমার বলবার বিষয় ছিল, নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে, নির্দিষ্ট শ্রেণীতে বিষয়গুলো অভিন্ন থাকে না। আবার তার উপরে দর্শনগত বিষয় থাকতে পারে। যেমন, উদাহরণের ছেলেটি মুরুব্বিদের আচরণের সমালোচনা না–করার মূল্যবোধে বিকশিত হয়ে থাকতে পারেন। আর সেই বিকাশ তাঁর চিন্তাপ্রবাহে বাধা দিতে পারে।
এই পর্যন্ত এসে আপনি আমার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে করা আলাপের প্রসঙ্গ টানতে পারেন এবং বলতে পারেন আমি যে ধারণায়নকে তেমন গুরুত্ব দিলাম না তখন। যখন আক্রান্ত আপত্তি করেন, প্রতিবাদ করেন; কিংবা অন্তত আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ চাইতে থাকেন আর যখন আক্রমণকারী আর আক্রান্তের বাইরে তৃতীয় পক্ষ সেটার সাথে সম্পর্ক নির্ধারণ করেন তখন বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখি আমি। এই দেখাদেখি মাইক্রোমনস্ক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ম্যাক্রো ইতিহাস ও আন্দোলনের চর্চা তো আমরা অনেক বছর অবলোকন করলামই। আমি ছোট ছোট পরিসরের এই কর্তাসত্তামূলক অনুধাবনকে যত্ন করে করতে চেয়েছি। সেজন্য বলতে পারি, আমার প্রথম আলাপ আর এখনকার আলাপ সাংঘর্ষিক নয়। এখন মনোযৌনজ প্রশ্নে নারীর কর্তাসত্তার বিষয়টাও নানাবিধ জটিল সব পরিপ্রেক্ষিতের উপর দাঁড়ানো। যদি আলোচ্য নারীটির মনোগড়ন, বিচারবুদ্ধি এইভাবে গড়ে ওঠে যে স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিতেই হবে তাহলে তাঁর পীড়িত হবার বোধ একই থাকবে না যে নারী যৌনজাগ্রত হবার কারিগরি বিষয়ে ভিন্নভাবে ভাবেন। এই উদাহরণটা সহজ হলো। কিন্তু যেমন আগের প্রশ্নের উত্তরে বললাম যে প্রচুর পুরুষ এই ধারণা নিয়ে বড় হয়েছেন, হয়তো মারাও যাবেন এই ধারণা সমেত যে ‘নারীকে জাগাতে হয়’ সেই মনোভাব (দর্শনই বলছি) যদি কোনো নারীরও থাকে তাহলে ইতোমধ্যেই আমরা খুব সঙ্কটাপন্ন লিঙ্গ–রাজনৈতিক বাস্তবতাতে পড়ে গেলাম। কিন্তু কোনো নারীর মধ্যেই এই ভাবনা কাজ করে না এমনভাবে ভেবে নেবার কোনো কারণ আমি পাই না। শর্তসাপেক্ষে তাই একথা বলা যায় যে অসম্মত হওয়া বা অসম্মতি জ্ঞাপনের কর্তৃত্ব বোধ একটা নির্দিষ্ট মনোযৌনজ বোঝাবুঝি থেকে আসে।
এই প্রশ্নটাকে আরেকটা সূক্ষ্ম দিকেও নিতে চাই আমি। “সম্পর্ক গঠনকেই যখন যৌনতার সম্মতি বলে বিবেচনা করা হয়” এই বাক্যাংশটিতে মনোযোগ দেয়া দরকার। প্রেমের সম্পর্ক কমবেশি হবুবিয়ের প্রস্তাব হিসাবে প্রচল হয়ে আসছে। হয়তো আমাদের চারপাশে বেশি, হয়তো গ্রামদেশে কিছু কম, হয়তো পাশ্চাত্যে ভিন্ন। এসব ভিন্নতাকে আমলে এনেও বলছি, যেসব সম্পর্কের নাম কমবেশি ‘প্রেম’, এবং যেসব সম্পর্ক সাধারণত একজন নারী ও একজন পুরুষকে ঘিরে আবর্তিত হয় সেগুলোর মধ্যে বিয়ে একটা সম্ভাব্য পরিণতি হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মুখে বলে বা খাতাকলমে লিখে কতখানি চর্চিত সেটা আলাদা প্রসঙ্গ। ধারণা করা যায় প্রেমিক–প্রেমিকারা মুখে বলেন অধিক, লিখে হবুবিয়ের চুক্তি করে আগান কম, বা একদমই করেন না। কিন্তু কথ্য বা লেখ্য সেই প্রতিশ্রুতি না থাকলেও এটা আছে সমাজ–পাটাতনে। এই অর্থে এটা ডিসকার্সিভ একটা শক্তি। এর মধ্যে ‘প্রেমে’ যৌনতা আসতেই পারে একটা প্রিমাইজ বা পূর্বধারণা। কিন্তু আমাদের আলোচ্য জুটিটির মধ্যে দুজনেরই এই পূর্বধারণার প্রজা থাকার সম্ভাবনা নাও থাকতে পারে। একজন ভাবতেই পারেন, ‘বিয়ের আগে কক্ষণো না’। এই একজন আমাদের চলতি বিচারে মনে হবে নারীটি হতে পারেন, বা কিছু নারী হতে পারেন। তবে আমার সমাজ–বিচরণ থেকে জানা হয়েছে যে পুরুষটিও এই ভূমিকায় থাকতে পারেন। তাহলে ‘প্রেম’ মাত্রই শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের ম্যান্ডেট – এরকম ধরে নেয়া পাত্র যদি ধরে না–নেয়া পাত্রের সঙ্গে লিপ্ত হন তাহলে সাংঘর্ষিক বিষয় দেখা দিতে পারে। ফলে কর্তাসত্তার প্রশ্নটা গুরুতর বটে। এই বিষয়ে এত ঘন আলাপ করে আমি কিছুতেই ধর্ষণের গুরুত্ব থেকে পাঠককে সরাতে চাইনি। উল্টো, ধর্ষণের মতো বিষয় যে ‘প্রেমে’র মতো আপাত–নিরীহ হবুবিয়েমণ্ডিত কাজকর্মের মধ্যেও হতে পারে সেটারই প্রেক্ষাপট বিশদ করলাম।
৫. বিভিন্ন সময়ে যৌন নিপীড়ন শনাক্ত করণে সম্মতি/অসম্মতির প্রশ্নে কনটেক্সটকে বিবেচনায় নেয়া হয় না। সম্মতি/অসম্মতির ধারণা নিশ্চয় রোবটিক নয়?
মানস: লিঙ্গীয় বৈষম্য যখন এক গভীর বাস্তবতা তখন এ নিয়ে সংশয়ী ভূমিকা নেয়া খুবই কঠিন, রাজনৈতিকভাবে। কিন্তু সাধারণভাবেই বলতে চাই, বিবেচনা কী করা হয়েছে বা হয়নি তা কেবলই তৃতীয় পক্ষের কাছে গেলেই প্রশ্ন ওঠে। যতক্ষণ যৌনতা দুই পক্ষের মধ্যকার মীমাংসিত বিষয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মতি–অসম্মতির পাটাতন ভাবার দরকার পড়ে না। দুইজন এক পক্ষে আছেন কিন্তু তাঁদের মধ্যে অসম্মত যৌনকাজ সাধিত হয়েছে এরকম একটা প্রসঙ্গ ফ্যালাসি হতে বাধ্য, যদি না আমরা বিয়ের মধ্যকার যৌন নিপীড়ন নিয়ে ভাবতে বসি। সাধারণভাবে, আমি সকল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, লিঙ্গসমেত, গরু এঁকে নিচে গরু লিখে দেবার পক্ষপাতী। অন্তত ইসলামী বিয়েতে কাজী এই কাজটা করে থাকেন ‘কবুল’ শোনার আনুষ্ঠানিকতায়। সেটা প্রতিবার যৌনাত্মক যোগাযোগে করতে–থাকা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরুষের জন্য আরো বেশি সুবিধাজনক। কিন্তু এটাও সত্য যে এতে মনোযৌনজের যে রহস্যময়তা বা মায়াবী বৈশিষ্ট্য আন্দাজ করা হয়ে থাকে, কিংবা কাব্যিক, সেসব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এগুলো সবই কিছু হারিয়ে কিছু পাবার পরিস্থিতি।
কেন আমি গরু এঁকে গরু লেখার পক্ষপাতী সেটা বরং খোলাসা করি। সেটা এমনকি নিছক যৌনসম্পর্কের বেলাতেই নয়। ধরুন, আপনার আর আমার ভিতর কোনো যৌনসম্পর্ক নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত। আমাদের দেখাসাক্ষাৎও যৎসামান্য হয়েছে জীবনে। কিন্তু সাইবার যোগাযোগে ধরুন আমি একটা উচ্ছ্বাসে, বা অন্য কোনো বজ্জাতিমূলক তৎপরতায় একটা চুমা–ইমো পাঠালাম আপনাকে। যদি দ্বিপাক্ষিক চ্যাট হয় আপনি হয়তো একটা ফোন দিয়ে বসলেন ‘মানসদা, ইমোটা কি ভুলে পাঠাইলেন?’ কিংবা হয়তো চুপ থাকলেন, কিছুই আর লিখলেন না। কিন্তু বহুজনীয় ফোরাম হলে সেসব করাও কঠিন হয়ে যাবে আপনার, যেহেতু আমার চুমা–ইমোর দর্শক তথা তৃতীয় পক্ষ তৈরি হয়ে আছে। তাহলে যদি একটা ইমোচুমাও আপনি না নিতে চান, আপনার বলতে হয় যে ‘এই ইমো আমাকে আর দিবেন না’। যদি আমার বজ্জাতি ভাবনা থাকে, আপনার নিশ্চুপতাকে অস্বস্তি হিসাবে পাঠ করেও কিন্তু আমি ওরকম ইমোবাণ নিক্ষেপ করতে পারি। ফলে আপত্তি বা অসম্মতির একটা প্রকাশ্যরূপ এখানে জরুরি হয়ে পড়ছে। আপনার–আমার এরকম আপাতত অযৌন সমলিঙ্গীয় প্রায়–পেশাগত যোগাযোগেও। যে অর্থে আপনি রোবটিক বললেন, আমি যদি সুবিধার্থে একটা অনুবাদ এরকম করে নিই ‘অটুট নীতিমালা’, তাহলে সেটার জরুরিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। নারীবাদী যে শ্লোগান – ‘নো মিনস নো’ – এটাও একটা কথ্য বা ভার্বাল ‘নো’। এই উচ্চারিত না–টির সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে কিনা সেটা একটা আইনী–প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন; কিন্তু নৈতিক মীমাংসার জন্য ওই না–টি উচ্চারিত হওয়া ধন্বন্তরীর মতো। তাহলে তুল্যবিচারে রোবটিক অসম্মতিকে আমি গুরুত্ব দেব। এতে ছায়াছবির বা আধুনিক গানের বা কবিতারও হয়তো ‘না ছুঁয়ো না’ ধরনের দ্ব্যর্থক ‘না’গুলো মাঠেমারা যেতে বাধ্য। কিন্তু উত্তুঙ্গ বৈষম্যের ভিতর কাব্যের ধ্বজা ধরে পার পাব না বলে আমি মনে করি।
তবে আপনার প্রশ্নে পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করতে গিয়ে আসলে উল্টাদৃশ্যের কথাও ভাবা হয়েছে। হতে পারে, সেটাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়েছে। তা হলো, একটা বাস্তবতায় কোনো পক্ষ, নারীপক্ষই প্রাসঙ্গিক, যৌনসম্পর্কে ‘সম্মতি’ দিয়েছেন, সেই সম্মতিটাকে ওই সময়কার চাপের বাস্তবতায় পাঠ করা লাগতে পারে। যেমনটা, আমাদের অঞ্চলে ‘বাসর রাতে নারীর কর্তব্য’ বিষয়ক মর্যালগুলোতে জোরেসোরে প্রচারিত হতে থাকে। ঠিক ওরকম ক্ষেত্রগুলোতে রাজনৈতিক তৃতীয়পক্ষীয় এজেন্সি নিয়ে আমাদের বিশেষ কিছু করার আছে বলে আমার মনে হয় না। এক ধরনের বুর্জোয়া–লিবেরেল ন্যায়বিচারও যেখানে সুলভ, সেখানে প্রশ্নগুলোর সূক্ষ্মতার গুরুত্ব আছে। আমাদের পরিমণ্ডলে যৌনাক্রমণ বিষয়ক কোনো অভিযোগ কাঠামোগতভাবেই লঘু হয়ে থাকে – প্রথমত নৈতিক শাসনের দৃষ্টিতে, দ্বিতীয়ত ও মুখ্যত আইনী দীর্ঘসূত্রিতার পদ্ধতিতে, তৃতীয়ত হয়রানির নতুন নতুন আশঙ্কার বাস্তবতায়। সম্মতি–অসম্মতি ধারণা হিসাবে কাজে লাগতে পারে এমন ‘ন্যায়বিচারের’ সম্ভাবনা থেকে ঢের ঢের দূরে আছি আমরা।
হাইকোর্টের নীতিমালা: যৌন নিপীড়ন ও ভিক্টোরিয়ান ভাবালুতা
৬. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ন বিরোধী আন্দোলন থেকে এবিষয়ে হাইকোর্টের নীতিমালা প্রণয়ন, একটা লম্বা সময়। বিভিন্নখানে আলাপ আলোচনায় হাইকোর্টের নীতিমালার ভিত্তি হিসেবে এই আন্দোলনকেই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু রিট দায়ের করেছিল উন্নয়ন সংস্থা— বিএনডব্লিউএলএ। একটি র্যাডিকেল আন্দোলন, মাঝে একটি এনজিও–প্রক্রিয়া। এতে কোন ফিল্টার লক্ষ্য করেন কিনা? দুটো স্বরের পার্থক্য নিশ্চয় ছিল?
মানস: এখানে কয়েকটা সম্পর্কিত অথচ স্বতন্ত্র বিষয় নিয়ে আলাপ করার দরকার আছে বলে আমার মনে হয়। দীর্ঘ হবে সম্ভবত, কিন্তু আমি নিরুপায়। প্রথম বিষয়টি হলো, লিঙ্গীয় সম্পর্কভিত্তিক আলাপ–আলোচনা ও আন্দোলনের পূর্বসূত্রের অভাব। বাস্তবতা হলো, যেভাবেই হোক ১৯৯৮ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনটির তেমন কোনো পূর্বসূরী তামাম বিশ্বেই অতি বিরল; খোদ দক্ষিণ এশিয়া বলতে যা একাডেমিক–রাজনীতিকরা বুঝিয়ে থাকেন সেখানেও বটে। আবার, কোনো কোনো পাঠকের পড়তে যেমনই গা–চিড়বিড় লাগুক না কেন, গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্মতর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রশ্নে উত্তর–ঔপনিবেশিক পাটাতনে ভারত সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ আলাপসূত্র সরবরাহ করে এসেছে। সেটা ভারত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বৈষম্য–রহিত দশার প্রশ্ন নয়, আইনী লড়াইয়ে ভারতের বিচারালয়ের দীর্ঘকালীন ‘জন–ইনসাফ’কেন্দ্রিক পদক্ষেপ/হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ। বিচারালয়ের প্রসঙ্গ এলে, ইতিহাস সাক্ষী, পাকিস্তানের অবস্থাও বাংলাদেশের থেকে গুরুত্বপূর্ণভাবে উজ্জ্বল। তো, ভারতের বিশাখা রূপরেখাও কিন্তু ১৯৯৮ সালের আন্দোলনের আগের রূপরেখা; সম্ভবত ১৯৯৭’র দিকে এসেছে, পরে যেটা একটা আইন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, ঘটনাচক্রে বাংলাদেশের আদালতের হস্তক্ষেপের পরে। এটা নিয়ে আমরা ভাবতে পারি যে, কীভাবে পাশের দেশে গুরুতর ক্যাম্পাস–আন্দোলন ব্যতিরেকেই রূপরেখা প্রণীত হয়, আবার আমাদের দেশে গুরুতর ক্যাম্পাস আন্দোলনের পর কমবেশি ১১ বছর লেগে গেল আদালতের একটা স্বর প্রক্ষেপণে। তবে এসব ভাবনা দুর্ভাবনা ও বিলাপ না হয়ে ঘটনাপরম্পরা ও কারকদের তৎপরতার বিশ্লেষণ হলেই ভাল হবে।
শিল্পী: গিনি নাগি
এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে বিষয়টা উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে এনজিও নিয়ে মোটের উপর, বিশেষত বামমহলে, একটা গড়গড়া ধ্যাবসা (বা আনক্রিটিক্যাল) অবস্থান। বিএনডব্লিউএলএ–ই যে আদেশপত্র বা রিটের আবেদন করেছিলেন সেটা আমার স্মৃতিতে ছিল না। কিন্তু কোনো একটা ‘এনজিও’ই যে তা আমার স্মরণে ছিল। এটা আলাদা করে বলতে চাই আরেকটা বিষয় হিসাবে ঠিক এর পরের অনুচ্ছেদেই। এনজিও বিষয়ক গড়গড়া বিদ্বেষ গুরুতর ক্ষতি করেছে বাংলাদেশে। প্রথম ও প্রধান যে ক্ষতিটা করেছে তা হলো মহাধিপতি এনজিও–এম্পায়ারের সঙ্গে টিঁকে–থাকা, মামলা–মোকদ্দমা করে রাষ্ট্রের সাথে দেনদরবারে পেরেশান সংস্থাগুলোর ফারাক পুরা উধাও হয়ে গেছে। এতটাই যে, এমনকি ঢাকার ডাকসাইটে বাম মিত্রকে আপনার মনে করিয়ে দিতে হয় যে অমুক থানার তমুক এনজিওটা বরং চিংড়ি ঘেরের নির্যাতিত মজুরের স্বার্থরক্ষার আইনী কাজটুকু করে থাকে। এটা কি আপনার মনে করানোর কথা ছিল? আমার মুখে ‘সিনেমায় কাজ করছি’ শুনলেই যদি আমাকে আপনার ৫২ ইঞ্চি বুকের ছাতির এবং হাজার কয়েক নতুন তারকা বানিয়ে–দিতে–পারা সালমান খান মনে হয়, তাহলে আপনার আক্কেল–আন্দাজ বাদ দিলেও, মাঠ–পর্যায়ের–বিদ্যার হালহকিকতও তো গুরুতর বিপজ্জনক সাব্যস্ত করতেই হবে। ১৯৯৮ সালের আন্দোলনকালীন, এবং পরেও, ‘এনজিও’কে একটা নৈতিকতাশ্রয়ী গালাগালির বিশেষণ হিসাবে সামলাতে হয়েছে আমাদের/আমার খোদ বামমহলের কাছ থেকে। কিছু অভিজ্ঞতা টীকা আকারে না বলে বরং, কখনো প্রয়োজন পড়লে, জীবন ও সংগঠনের ইতিহাস হিসাবে উল্লেখ করতে পছন্দ করব। সারাংশেও যদি বলি, পদ হিসাবে ‘এনজিও’র একটা লেজিসলেটিভ বর্গ হবার কথা ছিল; দীর্ঘদিনের বামদলগুলো এটাকে একটা নৈতিকতাময়/মর্যাল বর্গ বানিয়ে সাংগঠনিকতার ক্ষতি করেছেন। কিছু সংগঠন ‘আপনার’ না হতে পারে, কিন্তু নানান সংগঠনের বিচার করার সময় মিত্রপক্ষ নীতিবোধে আক্রান্ত হলে, রাজনীতিবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। রাষ্ট্র–নিবন্ধিত হতে গেলে এনজিও হওয়া এখন অনেকের জন্য ‘চয়েস’ নয়, বিশুদ্ধ ‘হকিকত’। কিছু ‘রাগি’ অগ্রজ কম্যুনিস্টের ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমার মাঝেমধ্যে ঈর্ষা জন্মে। তাঁদের কারো মতো হলে এখন ওইসব ২০ বছর আগের শুচিতাক্রান্ত প্রশাসনস্নেহধন্য খারিজপ্রবণ বামবন্ধুদের বলতে পারতাম: “বুঝো না তো কিছু, কাঁঠাল ঝুলায়ে কও লিচু”।
তৃতীয় যে প্রসঙ্গটি বলতে চাইছিলাম, এখনো বিভিন্ন প্রসঙ্গে ‘ব্যক্তিসমূহ’ সংগঠনের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে হয় চান না, না হয় সুবিধাজনক মনে করেন না। এটা বিশদ না–করতে চেয়ে বলি, গত ৮–১০ বছরেও আমি একাধিকবার বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রশাসনের হিংস্রতায় কিংবা প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় ঘটা হিংস্রতায় যেসব শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগযোগের চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যোগাযোগই বিশেষ আগায়নি। যেসব ক্ষেত্রে যোগাযোগ কিছুটা আগিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনী পদক্ষেপে সেসব পরিবার উৎসাহী হয়নি, যদিও কাগজে–কলমে বাংলাদেশের আইন স্পষ্টত ভুক্তভোগীর পক্ষে রয়েছে। কেন আইনী পদক্ষেপ ব্যক্তিসমূহের তুলনায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অপেক্ষাকৃত (জ্বি একেবারেই তুলনামূলকভাবে) সুবিধাজনক, সেটা গুরুতর কঠিন প্রসঙ্গ নয় বুঝবার জন্য।
শেষত এটা বলব, অন্তত আপনার প্রশ্নের ফিল্টার অংশকে বিবেচনায় রেখে, হাইকোর্টের নীতিমালাটি যে সংগঠনের আবেদনেই হোক না কেন, এর বাণী, ধারণায়ন ও রাজনৈতিক উপলব্ধি গুরুতরভাবে ভিন্ন কিছু হয়নি আন্দোলনকারীদের চেতনার দিক থেকে। মাঝে যে এক দশক কেটে গেছে সেটার প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র। কিন্তু আসলে ফিল্টার হয়নি। তথ্য আকারে এগুলো বেশ সংবেদনময় যে, হাইকোর্টের নীতিমালা আর তার দশ বছর আগে আন্দোলনকারীদের দাবিনামার মধ্যে অমিল সামান্যই। আন্দোলনের অপেক্ষাকৃত পরিণত পর্যায়ে, দাবিনামার আনুষ্ঠানিক বাণী বানানোর সময়কালে, ঝানু কম্যুনিস্ট আর মানবাধিকার আইনজীবী, (ছোটো) এনজিওর ডিরেক্টর আর (এনজিও নিয়ে মর্যাল সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা) বামদলের সভাপ্রধান, মুখর ছাত্রী আর চৌকষ শব্দধারী লেখক সকলে একত্রে কাজ করেছিলেন। বরং, যেসব সংগঠন লাগাতার সমাজ–পরিসরে দেনদরবার দরকষাকষি জারি রেখে হাইকোর্টের স্পৃহাকে মূর্ত করেছে, ১০ বছর পরে হলেও, সেসব সংগঠনের ‘সংগ্রাম’টাকে লক্ষ্য করা দরকার, বিএনডব্লিউএলএ’র তো বটেই। পরন্তু, এই সংস্থাটি সংগঠনের থেকেও অধিক মোর্চা।
৭. হাইকোর্টের নীতিমালাটিতে যৌন নিপীড়নকে সম্মতি/অসম্মতির নিরীখে দেখা হয়নি। এই শব্দবন্ধর উপস্থিতিই নেই! এটিকে কিভাবে ব্যাখা করবেন?
মানস: সম্মতি–অসম্মতির ধারণায়ন এমনকি আন্দোলনের কালেও যতটা অনুধাবিত ছিল, ততটা উচ্চারিত ছিল না। এর একটা সমাজ–মনোজাগতিক ব্যাখ্যা করা যায়। সেটা হলো সম্মতির ধারণা যত উচ্চারিত হবে, ততই কিন্তু যৌনতাকে একটা চর্চা হিসাবে মূর্ত গণ্য করা হয়, বা ইঙ্গিতময় হয়। এই মূর্তকরণের সামগ্রিক ট্যাবুর দিকে আমি মনোযোগ দিতে চাইব। হাইকোর্টের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটে থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে লাগসই উদাহরণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রক্টরিয়াল নীতিমালা। যদিও এখানে দীর্ঘকাল ১৯২১ সালের প্রক্টরিয়াল নীতিমালাই বলবৎ ছিল, অতি সম্প্রতি সেটার রদবদল হতে শুরু করেছে। মোটের উপর পূর্বানুমান আর বিচারবোধ গুরুতর বদলায়নি তাতে।
১৯২১ এর প্রক্টরিয়াল বিধিমালার যেসব বিষয়ে এখন অপেক্ষাকৃত কৌতুকের সঙ্গে তাকানো যাবে তার একটা অন্তত শাস্তির মুদ্রামান। যেমন, যতদূর মনে পড়ে, কোনো শিক্ষকের প্রতি যদি কোনো শিক্ষার্থী ‘প্রেমে’ পড়েন তাহলে উক্ত শিক্ষার্থীর ২৫ পয়সা দণ্ড হবে। লক্ষ্য করবেন, বিধিতে শিক্ষার্থীর উপলব্ধি লিঙ্গনিরপেক্ষ নয়; শিক্ষকের উপলব্ধিও নয়। বরং, আন্দাজ করা হয়েছে, ‘প্রেমে পড়া’ শিক্ষার্থী অবধারিতভাবেই নারী, আর শিক্ষকটি পুরুষ। কিন্তু এহেন ‘পতনে’ শিক্ষার্থী ২৫ পয়সায় যদি পার পেয়ে যানও, এটা অনেক পরিষ্কার নয় যে বারংবার ২৫ পয়সা খরচ করে তাঁর ‘প্রেমনিপতনের’ লাগাতার সুযোগ থাকছে কিনা। আন্দাজ করে নিতে হবে, তা থাকছে না। পক্ষান্তরে, শিক্ষকের এরূপ ‘প্রেমে পড়া’র শাস্তি চাকুরি থেকে বরখাস্ত। এখন আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়বার অধিকার রাখেন যে, যেসব অন্তত পুরুষ শিক্ষক তাঁদের হবুস্ত্রীকে শিক্ষার্থী বর্গ থেকে বাছাই করলেন, এবং পরিশেষে স্ত্রী হিসাবে রাষ্ট্র ও ঈশ্বরের অফিসে নিবন্ধিত করলেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডে ‘প্রেমপতন’ না–ঘটে ছিল কিনা; থাকলে কীভাবে না–ঘটন সম্ভব। কিংবা ঘটে থাকলে কীভাবে (পুরুষ) শিক্ষকটি চাকুরিতে বলবৎ থাকা অবস্থায় সহকর্মীদের মুরগির রোস্ট খাইয়ে তিনি বিয়েতে শামিল হতে পারলেন। ইত্যাদি। বিষয়টা আরো ঘোরতর দুশ্চিন্তার হয়ে পড়ে যেহেতু এই অঞ্চলের প্রেমট্রেম মোটের উপর হবুবিয়ের একটা অলিখিত দলিলই বড়জোর। কিন্তু অধিকাংশ আইনের মত এই প্রক্টরিয়াল বিধানও এরকম রহস্যময়তাসমেতই বিদ্যমান ছিল। এখানে তার থেকে অনেক গুরুতর হলো ‘প্রেম’ পদটার অন্তর্গত অর্থসমেত উপলব্ধি করতে পারা। কোথাও ফুটনোটে বলে দেয়া নেই, কিন্তু আপনারই ক্রিটিক্যাল পাঠক হিসাবে বুঝতে হবে যে শব্দটির প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে যাতে বাণীকারদের কোথাও যৌন শব্দটা লিখতে না হয়। ফলে আদি প্রক্টরিয়াল বিধির ‘প্রেম’ হলো যৌনতা। এই অনুবাদ ছাড়া কোনো মাথামুণ্ডই উদ্ধার হবে না। এটা ইংরাজি–বাংলা ভাষার প্রসঙ্গ নয়। ১৯২১ সালে অন্তত ইংরাজিতেই লিখিত ছিল। তারপরও ‘যৌনতা’র মতো গুরুভার শব্দের আমদানি ব্রিটিশরাজও করতে চাননি।
এইসব বলে আমি আপনার প্রশ্নের অমর্যাদা করিনি, বরং প্রশ্নটার গুরুত্বকে সামাজিক–মনোযৌনজ পাটাতনে স্থাপন করতে চাইলাম। আমি দুটো অন্তত স্পষ্ট কারণ পাই হাইকোর্টের বাণীমালাতে সম্মতি–অসম্মতির ধারণা না থাকার পিছনে। প্রথমত, এখন সাইবারস্পেসের কিছু উত্তুঙ্গতায় যতটা পরিচিত, প্রাসঙ্গিক ও নির্ধারণী সামর্থ্য এই ভাবনা–জোড়ের আছে বলে মনে করা যাচ্ছে, ততটা কিছুতেই হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের কালে ছিল না। পরিপার্শ্বের ভাষা–ভাবনা–পদ–প্রত্যয় নিরন্তর বদলাতে থাকে; তার ওজনের তারতম্য হয়। সেই বাস্তবতাটা আমি স্মরণ করতে চাই। কিন্তু মুখ্য কারণ সম্ভবত এই মনোগড়ন যে, সম্মতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেই একটি প্রতিষ্ঠান হামলাকে হয়তো শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু যৌনকাজকর্মকে উৎসাহপ্রদান করেছে বলে প্রতীয়মান হয়ে থাকতে পারে। আমি এমন কিছু নারী অভিভাবককে চিনি যাঁরা তাঁদের তত্ত্বাবধানে বা আধা–তত্ত্বাবধানে থাকা বালিকাদের, ১৮ ঊর্ধ্ব বা নিম্ন, বাইরে নড়াচড়ার জীবন শুরুর প্রাক্কালেই জন্মশাসন ও যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ক তালিম দিতে পছন্দ করেন। তাঁদের এই তালিম–ইচ্ছাকে আমার অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ মনে হয়। কিন্তু প্রায়শই বৃহত্তর পরিবারের অপর সদস্যরা এসকল নারীদের উপর অতিশয় বিরক্ত হন; কখনো সাংঘর্ষিক সম্পর্কও তৈরি হয়। তালিমকারী নারীদের দেখা হয় ওইসকল অল্পবয়স্কা নারী, বা জাতিসংঘীয় নারী শিশুদের, যৌনজীবনে উৎসাহপ্রদান হিসাবে। আমার এই উদাহরণে এটা দেখাতে চাইলাম যে কতিপয় ভাষামালা কিংবা কার্যক্রম নৈতিক বিচারে দুষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত হবার ঝুঁকিতে থাকে। সম্মতি–অসম্মতি যুগল আলাপ জগতে এখন আপনার যতই প্রাসঙ্গিক লাগুক না কেন, অভিভাবকসুলভ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে এটা যৌনকাজের মতো ‘নিন্দনীয়’ একটা কাজের প্রতি সমর্থনসূচক বিবেচিত হবার পরিস্থিতিতে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সেজন্য এমন ভাষায় আগাতে পারেন যা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, নিশ্চুপ।
৮. আমরা একটু আগেই দণ্ডবিধির কথা বলছিলাম। তো ঔপনিবেশিক এবং ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধের দ্বারা তাড়িত এই আইনে যৌনতার নানা ফর্মকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। হাইকোর্টের নীতিমালাতেও আমরা কতকগুলো আচরণকে যৌননিপীড়ন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে দেখি। সম্মতি/অসম্মতির প্রশ্নহীন এবং কতকগুলো আচরণ দ্বারা যৌন নিপীড়নকে চিহ্নিত করার এই পদ্ধতিও কি ভিক্টোরিয়ান মূল্যবোধ তাড়িত? এই আচরণগুলো মিউচুয়াল হতে পারে, কিন্তু তা স্বীকার না করাটা খোদ যৌনতার উপরেই ঔপনিবেশিক ধাঁচের নিষেধাজ্ঞা নয় কি?
মানস: আমার আশঙ্কা এই প্রশ্নটিতে দুই নম্বর প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি আছে। তাছাড়া আমি এও মনে করি এই প্রশ্নটির আসলে শেষাংশটাই কেবল লিপিবদ্ধ থাকলে প্রশ্ন হিসাবে তীব্র লক্ষ্যমুখ থাকত। মানুষসমূহের পরস্পরের ইচ্ছানুযায়ী সম্মিলনের ক্ষেত্রে আদালতের আইনগুলো যথেষ্ট উন্মুক্ত নয় কেন এই প্রশ্নটা নিজগুণে গভীরভাবে পর্যালোচিত হবার মতো। ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ আইনকানুনকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে সেটাও আমি না–মানার জায়গায় নেই। বরং, আমার আগ্রহ হবে একদম বিদ্যাগত তর্কলড়াইয়ের বাইরে বারংবার ভিক্টোরীয় মূল্যবোধ না বলারও। কারণ কখনো কখনো আমরা একটা পদপ্রত্যয়ে বন্দি করতে চাইলেও আসলে এই মনোজগতে বিরাজ করে অনেকগুলো সম্পর্কিত অনুভূতি – যৌনশুচিতাবোধ, পাপপুণ্যবোধ, রুচিবোধ, ভালমন্দের বোধ, ন্যায়–অন্যায়ের বোধ, কর্তৃত্ব–নিয়ন্ত্রণের বোধ, ঈর্ষার বোধ। যদি ‘বৈজ্ঞানিক’ প্রমাণ করতে আমাদের অসুবিধাও হয়, আমার তো ধারণা আমার এই রচিত বাক্যটি পঠিত হবার সাথে–সাথেই মূর্ত হয়ে গেল যে কতরকমের জটিল অনুভূতি–পাটাতনের মধ্যে কখনো ব্যক্তি কখনো প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে। ফলে আদালত কিংবা আর কোনো প্রতিষ্ঠান যে মূল্যবোধে ‘তাড়িত’ থাকেন তার নাম ভিক্টোরীয় হবে নাকি ঔপনিবেশিক নাকি আর কিছু এসবের আগ্রহের থেকেও আমার আগ্রহ সেগুলোর বৈশিষ্ট্যকে শনাক্ত করা। আমি বরং একটা ব্যানারে বোঝার চেষ্টাকেই বিপজ্জনক মনে করি।
এই প্রশ্নটির একটা পূর্বানুমানঘটিত, বা আশাবাদঘটিত, সঙ্কট আছে। নিপীড়নকে প্রতিহত করার আইন বা বিধিমালার কাছে যৌনচর্চার দিকনির্দেশনা আশা করার সঙ্কট সেটা। আমি সেটা করতে চাই না; আমার মাথা ওভাবে কাজ করে না। করে না কেন ভেঙে বলি। বাংলাদেশ এবং নানান দেশে করোনা–কোভিডকালে আইসোলেশন–কোয়ারেন্টাইনের যে বিধিগুলো এসেছে সেগুলো প্রায় আইনেরই শামিল। কোনো কোনো রাষ্ট্রে প্রকৃতই সংসদসিদ্ধ, বা রাষ্ট্রপ্রধানসিদ্ধ আইনও হয়েছে (আইন, বিধি, অধ্যাদেশ, কানুন, হুকুম, পরিপত্র, জনস্বার্থে–ঘোষণা এগুলোর পৃথক সব শক্ত আইনগত/লিগ্যাল সংজ্ঞা আছে; আমার মুখস্ত নয় সেসব; এই আলাপে জরুরিও লাগছে না)। তো সেসব আইন পড়ে যদি আমরা বলতে থাকি যে এই করোনা–আইন এমনকি বৈধ জুটিসমূহের মধ্যকার চুম্বনচর্চার জন্য জায়গা রাখেনি, তাহলে আমাদের সেই দাবি চূড়ান্ত বিচারে মিথ্যা হয়তো নয়, কিন্তু অস্থানে প্রোথিত হতে বাধ্য। করোনা–বিধিগুলোর গুণগত মানই এমন যে দ্বৈত–কোয়ারেন্টাইনে থাকা ছাড়া এমনকি ঈশ্বরকে সাক্ষী–মানা জুটিগুলোও চুম্বন ও অন্যান্য চর্চা করতে পারেন না। কিন্তু আমার আন্দাজ যে ঠিক সেই আশঙ্কার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে গত বছর সারা দুনিয়ার মানুষ চুম্বনরহিত ছিলেন না। আদালত পরিচালকবর্গের মাথায়, রাষ্ট্র পরিচালকবর্গের মাথায়, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকবর্গের মাথায় যৌনশাসন ও যৌনশুচিতার নানান কিছু কিলবিল করছিল কিনা সেটা আরেক জিজ্ঞাসা। যৌন নিপীড়ন বিরোধী বিধিমালা বুঝবার সময় সেই মনোভাব আমি রাজনৈতিক কারণেই না–ভাবতে চাইব। চাইব ঠিক প্রসঙ্গটার বাঁক ঘুরিয়ে। তখন শুচিতার পরাকাষ্ঠার জন্য কেবল আইন–আদালতের দিকেই আঙুল তুলতে চাইব না।
বরং, আমরা কিছু ‘বৈজ্ঞানিক’ শাস্ত্রের দিকে তাকাই। এমনকি তেমন কখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল না এমন রাষ্ট্র–সমাজের দিকেও তাকাতে পারি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সমরতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে কথা তুললেই মেলা কথা খরচ করা লাগে। কিন্তু আমার ভরসা আছে যে এর সঙ্গে আইন ও বিচারশাস্ত্র, মনোবিদ্যা, মনোচিকিৎসা, অপরাধবিদ্যা ইত্যাদির সম্পর্ক বুঝতে অত সমস্যা লোকজনের হবে না। তো, চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত কিতাবগুলোতেই বা ‘যৌনতার নানা ফর্ম’ নিয়ে কী এমন সুবিধাজনক আলাপ পাওয়া যায়? বাংলাদেশের পাঠ্যসূচি হয়তো আপনাকে একটু বেশি চমকে দিতে পারে, হয়তো; কিন্তু ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ্যসূচিও ‘স্বাস্থ্যকর যৌনতার’ যেসব ধারণা বা ব্যাখ্যা হাজির করে তাও রীতিমত ঐশী পর্যায়ের। মনুষ্য নানাবিধ কল্পনা, অধিকল্পনার জায়গা অতিশয় সীমিত। এর উপরে ভিত্তি করেই সেক্সোলজি, সাইক্রিয়াট্রি, সাইকোলজি কাজ করে চলেছে। এমন এমন লোককে ‘চিকিৎসাযোগ্য’ বলে সাব্যস্ত করছেন যাঁরা বড়জোর ‘মিচ্যুয়েল’ কিছু যৌনচর্চা করছেন যা ওইসব চিকিৎসাবিজ্ঞানীর কল্পনাতীত। অথবা তাঁরা কাগজে–কলমে দাবি করেন তা ‘অস্বাভাবিক’। পর্ন কারখানার মাত্রাতিরিক্ত উত্থান সমস্যাটিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। এখানে অনেকগুলো শাস্ত্রের প্রহরীরা ‘স্বাভাবিক’–এর দুনিয়াকে আরো খর্ব করে বিরাট প্রশস্ত ‘অস্বাভাবিক’–এর উপর পর্ন–কারখানার একচ্ছত্র শাসন কায়েম করতে মদদ দিচ্ছেন। সজ্ঞানে তা তাঁরা করছেন কিনা তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এটা ঘটছে। যৌনতার সার্বভৌম গণতান্ত্রিক কল্পনাময় চর্চার ক্ষেত্রে এটা বিরাট এক জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপর্যয়। এখানে আদালত একটা অত্যন্ত ছোট অনুষঙ্গ মাত্র।
৯. হাইকোর্টের নীতিমালাটিতে বলা হয়েছে তা কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। একটি কর্পোরেট বা কর্পোরেট সংস্কৃতির চর্চাকারী প্রতিষ্ঠানে যৌনতা সংক্রান্ত যে যে নিষেধাজ্ঞা গড়ে ওঠে তাকে যৌন নিপীড়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পুঁজি ও তার ত্রাসের সংস্কৃতি খোদ যৌনতার বিশেষ বিশেষ ধরনকে অপছন্দ ও অপরাধীকরণ করে কেন?
মানস: এই প্রশ্নটি আমার জন্য অস্পষ্ট। আমি তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করি। কিন্তু আমি দুই তিনটা অংশে ভেঙে উত্তর করি। তাতে আপনার প্রশ্নের আদিগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে অবশ্য। প্রথমেই আমি স্পষ্ট করি যে, হাইকোর্টের নীতিমালাটি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানই যারপরই নাই ঢিলেমি দেখিয়েছে এটার প্রতিক্রিয়া হিসাবে একটা কাঠামো দাঁড় করাতে। ঠিক এই মুহূর্তে যে বাক্যটি লিখলাম তাতেই ঝইঝগড়া বাধতে পারে, প্রমাণ হাজির করানোর চাপও কেউ দিতে পারেন। কিন্তু বিষয়টা কেবল খাতাকলমে কী কী করা হয়েছে তার নয়, বরং কী কী গররাজিময় আচরণ আপনি নথিভুক্ত না করতে পারলেও উপলব্ধি করতে পেরেছেন তার প্রশ্ন। সাধারণ বোধবুদ্ধি থেকে ভাবলে, অন্তত ১৯৯৮–এর আন্দোলন এবং একাধিক ক্যাম্পাসে গুণ্ডাবাহিনী ও (পুরুষ) শিক্ষকদের একাংশের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনগুলোর কারণেও, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে হাইকোর্টের নীতিমালা আসার সঙ্গে সঙ্গে চটজলদি তার ‘প্রয়োগ’ ঘটবার কথা। কিন্তু বাস্তবে এভাবে ঘটেনি বিষয়গুলো। একাধিক ক্যাম্পাসেই প্রশাসন এই সেলটি গঠনের সময় গভীর অনুধ্যান দিয়েছেন যাতে ক্যাম্পাসে নারীবাদী বলে পরিচিত কোনো শিক্ষক–শিক্ষিকা এই সেলের দায়িত্ব না পান। কিংবা, অত্যন্ত নৈতিকতার ঘ্যানঘ্যানানি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচালন করেন এমন শিক্ষক–শিক্ষিকারা এই পদে ন্যস্ত হন। উপরন্তু, ওইসব সেলে যেসব নারীরা তাঁদের অভিযোগ নিয়ে গেছেন তাঁদের অনেকেরই বিশদ সব হেনস্তা হবার গল্প ক্যাম্পাসগুলোতে কান পাতলেই শুনতে পাবেন। একটা নয়া নীতিমালার সুযোগ নিয়ে দুচারজন পাল্টা চালিয়াতি/ম্যানিপুলেটিভ আচরণ করার উদ্যোগ নেননি এরকম কোনো দাবি প্রতিষ্ঠা আমার লক্ষ্য নয়। কিন্তু সাধারণভাবেই সেলগুলো অনেকাংশে অভিযোগকারিণীর দুঃস্বপ্নের জায়গা হয়ে পড়েছিল।
শিল্পি: হিথার বুচলার
ক্যাম্পাসের বাইরে কর্মক্ষেত্রগুলোতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী এই সেলগুলোর কাগুজে অস্তিত্বের বাইরে আর কোনো কিছুর প্রমাণ করা মুস্কিল হবে। এ কথা বলার সময় আমি সতর্ক আছি যে কর্মক্ষেত্রের মতো একটা ঢিলেঢালা বর্গের মধ্যে সকল ধরনের অবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান আমি রাখতে চাইব না। কিছু উন্নয়ন সংস্থাতে কার্যকরী সেল চালু ছিল। আবার যৌন হয়রানির অভিযোগ আসার পর খোদ সংস্থাটিই ‘পরিচালক’ বর্গ ভেঙে দিয়ে আন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করলেন এরকম নজিরও আছে (যদিও গণ সাহায্য সংস্থার এই উদাহরণটা হাইকোর্ট নীতিমালা প্রণীত হবার আগে)। পত্রিকা–টেলিভিশন কোম্পানিগুলোতে বিশেষ সুবিধাজনক কর্মদশা ছিল এরকম নজির আমার নজরে আসেনি। আপনার বা অরাজের মাধ্যমে জানতে পারলে খুশি হব। তবে আমার চোখে আপনার পরের একটা প্রশ্নে মী–টু বিষয়ক আলাপ চোখে পড়ল। ঢাকার অতিসংক্ষিপ্ত কালের সাইবার–মীটু আন্দোলনই প্রমাণ করে খুব কার্যকরী সেল বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ছিল না। কিন্তু আপনার প্রশ্নের যৌন নিষেধাজ্ঞা ও যৌন নিপীড়নের সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে দুয়েকটা কথা বলার আগে ‘কর্পোরেট’ সংজ্ঞায়ন নিয়ে আমার অস্বস্তি জানিয়ে নিতে চাই। আমি আসলে এই মুহূর্তের বাংলাদেশে এই বর্গটার অনায়াস প্রয়োগের আর সুযোগ দেখি না। বাণিজ্য ও শিল্প আইনগত দিক থেকে হাজারে–বিজারে কর্পোরেট। যাকিছু কয় বছর আগেই লিমিটেড কোম্পানি, তাকিছুই কর্পোরেট সংজ্ঞাযোগ্য। আবার যখন (বাম) রাজনৈতিক কর্মীরা এটা উচ্চারণ করেন তখন অন্তত দুইটা, প্রায়শই অমিশ্রিত অর্থে প্রয়োগকৃত হয় বলে আমি অনুভব করি। একটা হয় সরাসরি পুঁজিবাদী বিশেষণটির বিকল্প হিসাবে; আরেকটা হয় কল্পিত একটা বিলাতি/বিদেশী সংস্কৃতির ধারক হিসাবে। শেষোক্ত অর্থে আবার অফিসের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্য, কর্মচারিদের উর্দি বা পোশাকও উঁকি মেরে বিরাজ করে। যতক্ষণ না আমি নিশ্চিত হই যে একটা সাংস্কৃতিক–মর্যাল জমিনের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে থেকে এই প্রত্যয় উচ্চারিত হয়েছে ততক্ষণ এর সঙ্গে সম্পৃক্তি করা অসম্ভব লাগে। অন্তত চাকুরিচুক্তির অনিশ্চয়তা, বৃহৎ মুনাফা, সদাছাঁটাইয়ের সন্ত্রস্ততা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন, বহুরাষ্ট্রীক ‘ব্র্যান্ড’ ভ্যালু এগুলোর কিছু কিছু অনুধাবনে না দেখি ততক্ষণ মুলতবি রাখার পক্ষে।
যৌন নিষেধাজ্ঞা আর যৌন নিপীড়নের সংযোগস্থাপন করে ভাল করলেন; আপনার আগের প্রশ্নের সঙ্গে বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি আবারো বলব, বিধানপ্রণেতার মাথার মধ্যে কী আছে তা নিয়ে টানাটানি না–করে লিপিবদ্ধ বিধানের কার্যকরী প্রয়োগ লিঙ্গ রাজনীতির জন্য আরো আশু জরুরি। কিন্তু পুঁজি (ও তার ত্রাসের সংস্কৃতি?!) কিছু কিছু যৌনাচরণকে অপছন্দ করে বা অপরাধীকরণ করে এ বিষয়ে আমি একমত হতে চাইব না। আমার ধারণা সঙ্কটটি কর্তার, সাবজেক্টের। ধরুন, আমাদের কল্পিত কর্মক্ষেত্রটির প্রধান একজন পুরুষ; বা প্রধানসমূহ পুরুষেরা। তিনি বা তাঁরা এক বা একাধিক বিশাল অফিসে বসেন। এর বাইরেও নানাবিধ ‘স্পেস’ রয়েছে তাঁর/তাঁদের দখলে। (এই কল্পনাগুলো করতে গেলে কিছু ছায়াছবি আসবেই মাথায়; কিন্তু সেগুলোতে কোলবালিশ আর জরিটরি ঝুলিয়ে এমন পাকিজা–ধরনের ইন্টেরিয়র বানায় যে সিরিয়াসলি নেয়া মুস্কিল; কিন্তু এরকম ‘শিল্পপতি’ ‘ভিলেইন’ সিনেমাতে সুলভ)। সেই দখলকৃত পরিসরে নানান ধরনের পদকনিষ্ঠ নারীদের তিনি আসতে ‘বাধ্য’ করছেন। এইরকম একটা ব্যবস্থাতে সংস্থার প্রধান পুরুষের/পুরুষমণ্ডলীর কোনো ধরনের যৌনাচরণকে পুঁজি বা (তার ত্রাস) কোনোরকম অপছন্দ করে এসেছে বলে আমি মনে করি না। বরং, এই ব্যবস্থায় আপত্তিকারদেরই ওই সংস্থার পুঁজির–পোঁটলা পরের মাসগুলোতে বেতন না দিতে চাইতে পারে।
আমি বিনীতভাবে মনে করি, এখানে আপনার প্রশ্নটি আসলে অন্যত্র দিকনির্দেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এত সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে আমরা রয়েছি যে আমি দিকনির্দেশনা উদ্ঘাটন করতে চাইনি এই প্রশ্নে। বেঁচে থাকলে, নিশ্চয়ই আবার প্রশ্নগুলো সাজাতে পারব আমরা।
১০. যৌন নিপীড়নের সাক্ষ্য প্রমাণ হাজিরে অভিযোগকারীর জন্য কতকগুলো এফারমেটিভ একশনের বেনিফিটের প্রশ্ন আলোচিত হয়। এই বিশেষাধিকারকে প্রযোজ্য করা হলে যৌন নিপীড়নের শনাক্তকরণ কতটা নির্মোহ থাকতে পারে?
মানস: আশা করি এটা বলা কোনো দপ্তরের অবমাননা হবে না যে, লাগাতার ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে কোনো নিপীড়ন শনাক্তকেই নির্মোহ হিসাবে দেখতে পাওয়া মুস্কিল। তাছাড়া আদালতের, কিংবা বিচারিক কার্যক্রমের নির্মোহতাকে আমি মিথ বা প্রপাগান্ডা হিসাবে মানি। তা নাহলে রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার একাধিক বিচারককে সরানো–বসানোর মতো ঘটনাগুলো বোধগম্য হবে না। বাংলাদেশের নিকট অতীতের কোনো উদাহরণ না দেয়াই মঙ্গলময় মনে হলো। তবে শহিদুল আলমের মুক্তিকালে আদালতে ওঁর ‘গুম’ না–হবার বাস্তবতায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিচারকের সরস মন্তব্যটি বাংলাদেশের পাঠকেরা লক্ষ্য করেছেন। নিপীড়নকে নির্মোহ যদি শনাক্ত করা যায়ই ধরে নিই, তাহলে তা জনসমাজে চর্চিত ‘ইনসাফ’–এর ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে পাই আমি। আর এক্ষেত্রে কোন ইনসাফ–কার ইনসাফ–কে ঠিক করবে ধরনের বিনির্মাণকারী কলাকৌশলকে কূটকৌশলের সন্দেহেও দেখতে চাইব। কিন্তু আইনী প্রক্রিয়ার নির্মোহতা নিয়ে অনেক উৎসাহ নাই আমার। আমি গণতন্ত্রকে যেমন দশার অধিক, পদ্ধতিগত আকাঙ্ক্ষার চর্চা হিসাবে দেখতে চাই, তেমনি বিপ্লবকেও তাই চাই; আবার আদালতের কাছে নির্মোহ–নিপীড়ন–শনাক্তকরণের বেলাতেও এটাকে স্থিরদশা হিসাবে দেখতে চাই না।
কিন্তু এফারমেটিভ একশন বেনেফিট খোদ একটা গোলমেলে প্রসঙ্গ। যৌনতার ক্ষেত্রে সেটা মহাগোলমেলে, এর নৈতিকতাশ্রয়ী বা মূল্যবোধাশ্রয়ী সমাজ–বিচারিক দশার কারণেই। প্রথমেই আমি পদ্ধতিগত গোলমালটার দিকে নজর দিতে সুপারিশ করব। এফারমেটিভ একশন নিরঙ্কুশভাবে বর্গকে অনুধাবন করে বিকশিত ধারণা। কোর্টকাচারি, পক্ষান্তরে সামলায় ব্যক্তির মামলা। ওদিকে বর্গকে অনুধাবন করে যে গঁৎবাঁধা ধারণাগুলো বা স্টিরিওটাইপগুলো চালু আছে সেগুলোও সক্রিয় থাকে; বিচারকের মাথায় যদি নাও থাকে, আইনজীবীর মাথায় থাকতে পারে, মিডিয়ার মাথায় থাকতে পারে, একটা রায়ের বেনেফিশিয়ারি ও প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রবাসীদের মাথায় থাকতে পারে যেগুলো সব সক্রিয় অবস্থাতেই মোকদ্দমাটি চলতে থাকে। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠীর ‘কোটা’ সুবিধা নিয়ে নিশ্চয়ই কয়েকবার শুনে থেকেছেন যে ‘হ্যাগো এখন আর কোটা দেয়া ঠিক না; হ্যাগো পোলাপাইন তো আইজকাল বিদেশ থাকে’। এই স্টিরিওটাইপটা যতটা একটা নির্দিষ্ট জাতিকে কোটাবঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হয় ততটাই হয়ে থাকে খোদ এই সামান্য কয়টা আসনের (এফারমেটিভ একশন হিসাবে) দাবিদার হিসাবে অনেকগুলো জাতিকেই উৎখাত করার ইচ্ছায়। বাসে নারীদের সংরক্ষিত আসনের বেলাতে এই অভিজ্ঞতা বোধহয় আপনার আরো নিকট অতীতেই হয়ে থাকছে। ফলে এফারমেটিভ একশন চালু থাকে খোদ একটা বিশাল গণ–প্রতিপক্ষতার মধ্য দিয়ে, প্রায়শই।
অন্য কিছু উদাহরণ দেখাতে চাইব যেখানে বর্গকেন্দ্রিক স্টিরিওটাইপ অতিশয় ক্রিয়াশীল। কোনো মন্ত্রীকে যখন ‘সৎ মন্ত্রী’ হিসাবে পরিচিত করানো হয়ে থাকে, কোনো শিক্ষককে যখন ‘শিক্ষার্থী বান্ধব’ শিক্ষক হিসাবে পরিচিত করানো হয়ে থাকে, তখন ঐ মন্ত্রী বা শিক্ষককে যতটা ‘প্রশংসা’ করা হলো, তার থেকে অনেক স্পষ্ট করে মন্ত্রী বা শিক্ষকবর্গ নিয়ে সামাজিক–ধারণা প্রকাশিত হলো। শ্রোতারা প্রায়শই চিন্তার আলসেমিতে সেটা লক্ষ্য না করে প্রশংসাটা নিয়ে মাতামাতি করেন। ব্যক্তি প্রশংসাগ্রহীতার এই ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো দোষ যদি নাও ধরি, তৃতীয় পক্ষ হিসাবে আমরা অন্যরা গুরুতর সব ক্ষয়ক্ষতির পরোক্ষ কারক থাকছি। উদাহরণটা যদি প্রাসঙ্গিক না মনে হয়ে থাকে, আমি এভাবে আগাতে চাই যে, যৌন হয়রানিমূলক কোনো অভিযোগ উত্থাপনকারীর সচ্চরিত্রতা বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়ে থাকে। সংবাদকর্মী থেকে শিক্ষাকর্মচারী, সাধারণ আলাপকারীরা ‘সমতাবিধানকারী কর্মকাণ্ড’ (এফারমেটিভ একশন) জারি রাখার লক্ষ্যে আক্রান্ত নারী যে ‘কত ভাল’, ‘নিরীহ’, ‘সঠিক পোশাকধারী’, ‘নম্র’ ইত্যাদি আলাপমালায় ঢুকতে থাকেন (বা বিপরীত উদ্দেশ্যে বিপরীত চিত্রণ)। আমি বলবার সাথে–সাথেই এই ধরনের ঘটনাগুলো আপনার মনে পড়ার কথা। তাহলে নির্মোহতা তো দূরের কথা, বিদ্যমান আইনী ব্যবস্থার গ্রাহক হবার জন্যও যৌনাক্রান্ত নারীর অন্য অনেকগুলো সামাজিক সনদপত্রের ছাতার তলে আসতে হয়। ওই নির্দিষ্ট নারী তা চান কিনা তার প্রসঙ্গও থাকে না। নির্মোহতা বিষয়ক আলাপটাই তাই মুলতবি রাখলাম গোড়াতে।
বরং, যদি প্রশ্ন করার কালে আপনার মাথায় কোথাও অভিযোগকারীর বদনিয়ত বিষয়ক দুর্ভাবনা থেকে থাকে, তাহলে বুঝতে আরো সহজ হয়। সেটা বাস্তবে যে কোনো ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। নিজের মাথা ফাটিয়ে আদালতে গিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু করার উদাহরণ দুয়েকটা মাত্র নয়। এই ধরনের পরিস্থিতি যদি বিবেচনায় থেকে থাকে, তাহলে তা যৌন হয়রানিমূলক পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট করে দেখতে চেষ্টা করা লিঙ্গীয় রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।
ভিক্টমের বয়ান: ডিজিটাল প্লাটফরম ও নর্মেটিভ ১১. সাম্প্রতিক সময়ে ‘মি–টু’ বেশ আলোচিত। অনেকেই মনে করেন মি–টুর মাধ্যমে ভিক্টিম/সার্ভাইভারের স্বর হাজির হয়। কিন্তু ডিজিটাল প্লাটফরমে এই স্বর উপস্থিত হওয়া মাত্রই আমরা পক্ষ–বিপক্ষ দলবদ্ধতা হাজির হতে দেখি। এতে করে কি পক্ষ, কি বিপক্ষ মিলে যে ডিসকোর্স দাঁড় হয় তাতে অভিযোগকারীর স্বরটি তার পরিপ্রেক্ষিত সমেত আর স্বতন্ত্র থাকতে পারে কি? ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ এই স্বরকে কি কোনভাবে ছাঁচীকরণ করে?
মানস: ডিজিটাল তৎপরতা ও তার ভাষামালা এর বাইরের বস্তুজগতের মতোই একটা অসংবদ্ধ–কোলাহলে পরিণত হয়। যে হারে একাডেমিতে উৎপাদন হচ্ছে তাতে হয়তো যাকে আমি অসংবদ্ধ–কোলাহল বললাম তারও একটা পদমালা দাঁড়িয়ে আছে; তবে আমার জানা নেই। যদিও আমি ডিজিটাল জগত ও বাইরের কোলাহলকে এক কাতারে রাখলাম, বাস্তবে এর গুণাগুণ বা প্রভাব কিছুতেই এক নয়। যে কোনো বিষয়েই অসীম মতামত তৈরি হতে থাকা, সেগুলোর একটা প্রণালীবদ্ধতা, যতই খাপছাড়া ও সাংঘর্ষিক হোক না কেন, তার জন্য ভাষাসংযোগের সুযোগসুবিধাগুলো বস্তুজগতে গুরুত্বপূর্ণ হারে কম থাকে। এটা পরিপূর্ণভাবে, আমার বিবেচনায়, পাটাতন/প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গ, ডিভাইস/যন্ত্রপাতির প্রসঙ্গ। কেবল কথা বলে বলে একটা হৈচৈ বাধানো সহজ কাজ নয়। আরো নির্দিষ্টে উদাহরণ দিলে, গণপিটুনির ঠিক পূর্বকালটাতে, কিংবা দুই দল (তরুণ) পেটোয়াদের মধ্যকার একটা হাতাহাতি বেধে যাবার আগের সময়কালটাতে ভাষা যেভাবে বহুবিধ, নানা–উৎসে, আর শ্রোতাহীনতায় উৎক্ষেপ হতে থাকে সেটা কিছুতেই দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রসঙ্গ নয়। তারপর পেটাই শুরু হয়ে গেলে হয়তো ভাষামালার আপৎকালীন, বা পেটাইকালীন, বিরতি চলে; অল্প কিছু সহগ খিস্তিখেউড় ছাড়া। পক্ষান্তরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই কালটা, যদি এর নাম দিই তাতানো–কাল, একটা স্বাভাবিক দশা। অন্যভাবে বললে, বস্তুজগতে যেটা কিনা একটা বিশেষ সংঘটন, তা ডিজিটাল রাজ্যে দৈনন্দিন। এখানে লোকে লাগাতার ভাষা উৎপাদন করতে পারেন, করতে থাকেন, দিশা–বেদিশা নিরপেক্ষভাবে সেগুলো প্রযুক্ত হতে থাকে; উপরন্তু বস্তুজগতের আর্কাইভহীনতার বাড়তি নিরবতাটা এখানে নেই। এখানে ১৪ ঘণ্টা ঘুম থেকে উঠে আপনি কম্পুটার খুলে ১২ ঘণ্টা আগে মোটামুটি স্থিত মুডে আবার তাতিয়ে দিতে পারেন। সাইবাররাজ্যের এই বিশেষ ভাষাবৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় রাখাটা আমার জন্য জরুরি ছিল এই প্রসঙ্গে।
‘মি–টু’র ক্ষেত্রে যা–যা ঘটেছে তাও এই পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যেই ঘটেছে। হ্যাঁ, হৈচৈয়ের মধ্যে অভিযোগকারীর স্বরটি তার পরিপ্রেক্ষিতসমেত আর স্বতন্ত্র থাকতে পারে না। কিন্তু ‘মি–টু’ প্রসঙ্গে আমি অন্য কিছু প্রসঙ্গের সূত্রপাত করতে চাই যা, আমার আশঙ্কা, আপনার প্রশ্নের পরিসরের বাইরে মনে হতে পারে। কিন্তু আমার জিজ্ঞাসার পরিক্ষেত্রেরই মধ্যে। আমি প্রশ্নের পরিসরের মধ্যে আনতে বরং চেষ্টা করতে পারি। চলুন, আমরা এই জিজ্ঞাসাটির মীমাংসা করি যে বাংলাদেশে ‘মি–টু’ ‘সফল’ হলো না কেন, যদি ধরে নিই যে পাশ্চাত্যের যেসব দেশে, মুখ্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যা হয়েছে তাকে সাফল্য বলা চলে। যদি শর্তসাপেক্ষে পাশ্চাত্যে এর সফলতা আর বাংলাদেশে বিফলতা গ্রাহ্য করে আমরা আলাপটা করি, তাহলে এখানকার বিফলতার কারণ অন্যত্র বলে আমি মনে করি। যেভাবে আপনি প্রশ্নের মধ্যে পক্ষ–বিপক্ষের দলবদ্ধতা রেখেছেন, কিংবা যেভাবে আমি অসংবদ্ধ–কোলাহলকে উত্তরে রেখেছি সেগুলো এই ব্যর্থতার কারণ নয়। বরং, সাইবার ও ভৌত দুনিয়ার হৈচৈ বা দলবদ্ধতা বিভিন্ন রাষ্ট্রে নানান ধরনের আইনি মোকদ্দমাতে সহায়তাও করেছে। নিকটবর্তী দুটো উদাহরণ ভারতেই আছে – যথাক্রমে নির্ভয়া ধর্ষণ ও সুশান্ত’র কথিত আত্মহত্যা বা খুন নিয়ে। বাংলাদেশে কমবেশি পাঁচটি ‘মি–টু’ কেইস/ঘটনার উল্লেখ পাওয়া গেছিল। এর মধ্যে অন্তত তিনজনকে আমি কমবেশি চিনতাম। আর জনা দুয়েকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল এই অভিযোগ উত্থাপনের প্রাক্কালে বা পরপরই। বাস্তবে, এমনকি তিনি না করুন ‘মি–টু’ তা মনে মনে চাইছিলামও একটি ক্ষেত্রে। তাঁকে বিশদ পরে বলেওছি।
বাংলাদেশে এটির ব্যর্থতা মুখ্যত আইনি (লেজিসলেটিভ অর্থে) ও নৈতিকতা (মর্যালিটি অর্থে) রাজ্যের মধ্যে প্রজাদের নির্বিচার আউলে যাবার দশার কারণে। এটা সংক্ষেপে বললাম, বিশদ করতে পারি। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত, বিশেষত ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত – তাঁরা বাম হোন, জাতীয়তাবাদী হোন, রাষ্ট্রবাদী হোন বা ‘র্যাডিক্যাল‘ হোন – সমালোচনাকে বহুকাল ধরেই দ্রুত নিন্দাতে পর্যবসন করতে অভ্যস্ত, আর নিন্দা মোটের উপর আদর্শবাদী এবং/বা মর্যাল। এখন, ‘আদর্শবাদ’ বলতে গিয়েও এত উৎকণ্ঠা হচ্ছে যে মনে না পড়ে থাকছে না এখানকার বহু বামচিন্তক দশকের পর দশক আবেগ ভারাক্রান্ত গলায় ও রচনায় ‘আদর্শবাদ’ বলতে বিপ্লবীর ঈমান বুঝিয়েছেন। ফলে আগামীকাল এই সাক্ষাৎকার পড়েই ‘আদর্শচ্যুত প্রতিবিপ্লবী’ ফরমান জারি করে বসতে পারেন তাঁরা আমার বিরুদ্ধে। আমি আদর্শবাদ বলতে আইডিয়ালিস্ট এবং/বা মর্যালিস্ট এবং/বা নরমেটিভই বোঝাচ্ছি। আমার তাই বোঝানোর কথা। ধরুন, কালকে আপনার সমালোচনা করতে গিয়ে আমি নিন্দা করলাম এই বলে যে আরিফ তো ব্যবসা পাতায়া বসছে। তার থেকে শ্রোতা হিসাবে কেউ যদি ভাববার চেষ্টা করেন যে আমি বলতে চাইছি আরিফ একটি মুনাফামূলক প্রকল্পের সূচনা করেছেন তাহলে তাঁর বোঝাবুঝির কপাল পুড়ল। তাঁর বুঝতে হবে যে আমি আসলে এই বলে নিন্দা করলাম যে আরিফের যখন কবিতা–গান–শিল্প–নন্দন–চলচ্চিত্র ও ইত্যাদি ভুজুংভাজুং করার কথা তখন ব্যবসার মতো একটা ‘নিন্দনীয়’ পেশাজগতে তিনি পা রেখেছেন। এই দুয়ের পার্থক্য অসীম, আমার বিবেচনায়। সেটা আরো বিশাল যৌনতার মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে। সেখানে ‘মি–টু’ হাজির হয়েছে এমন একটা পাটাতনে যেখানে নেটিজেন পক্ষ বা জ্ঞাতপক্ষের দুনিয়ায় বিষয়টা দাঁড়িয়েছে ‘তোমার ইয়া আমরা জাইনা ফেলছি’।
শেমিংয়ের এই পাটাতন পাশ্চাত্যেও কার্যকর (ছিল)। কিন্তু লেজিসলেশনের প্রসঙ্গটা এখানে আনছি একারণে যে, যত কম মাত্রাতেই হোক, প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের জন্য এই অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট অপরাধী ব্যক্তিদেরকে শাস্তিপ্রদানের ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। বাংলাদেশে এটা প্রথম অভিযোগের আগেই প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছিল যে তা হতে যাচ্ছে না। অর্থাৎ ‘মি–টু’ অভিযোগ দায়েরের কারণে কোনো পুরুষ অপরাধী কর্মজগতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেসারত দিতে যাচ্ছেন না। ফলে এখানকার অভিযোগকারীরা আইনি সুরক্ষাবলয়বিহীনভাবে কেবল শরমপ্রদানের অস্ত্রপ্রয়োগের চাপে থেকেছেন। পক্ষান্তরে, ‘মি–টু’র সুযোগে নারীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে কিছুমাত্র ভাবিত নন এমন লোকজনও পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘হ জানি জানি’ ধরনের শোরগোল করতে থাকলেন। পাঁচজনের পরে যে আর কোনো নারী অভিযোগ করতে আগালেন না সেটারও একটা মানে এই যে তাঁরা বিশাল ক্ষমতাধর পিতৃতান্ত্রিক বাংলাদেশের অফিস–সংস্কৃতির মধ্যে নিছক শরমপ্রদানের রাজনীতি আর করতে চাননি।
১২. একজনের যৌনতার নরমেটিভিটি দিয়ে ডিজিটাল প্লাটফরমে আরেকজননের যৌনতার ধরন ও চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং অতঃপর নিপীড়ক হিসেবে রায় দেয়ার প্রবণতা আমরা দেখি। বিশেষত একগামি/বহুগামি বা ‘পরকীয়া’র মত সম্পর্ক’র ক্ষেত্রে…। মি–টু এই সংকটকে কিভাবে মোকাবেলা করে?
মানস: একদম পারে না। ‘মি–টু’ এই সঙ্কট মোকাবিলা করতে পারে না। এমনকি যৌনতার প্রবল ভাবনার কোনোকিছুই মোকাবিলা করতে ‘মি–টু’ পারে না। এই অপারগতাতে ‘মি–টু’ আন্দোলনকেই বরং ছাড় দিয়ে দেখতে চাইব আমি। আর কোনো কারণ না থাকলেও, যে আন্দোলন মাত্র ৫জন (নারী) কণ্ঠস্বরকে আত্মপ্রকাশ করতে দিয়েছে (সঠিক সংখ্যা ভুল হতে পারে আমার) সেই আন্দোলনের উপর, অন্তত বাংলাদেশে, এতবড় দুর্ভার চাপ দেবার কোনো কারণ নেই। বরং, সাধারণভাবেই, এমনকি বাংলাদেশের বিপ্লবী এবং/বা র্যাডিক্যাল কিংবা অন্তত শিথিল বাম সংগঠনগুলো, প্রকাশ্যে না হলেও সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরে, যৌনতার প্রশ্নে কোনোরকম স্বচ্ছ ও কার্যকরী ধারণায়ন হাজির করতে যে পারেনি সেই বাস্তবতার উপর জোর দিতে চাইব আমি। যৌনতার প্রশ্নে এসব সংগঠন এমনকি সোয়া শ’ বছর আগের এঙ্গেলসের স্ফটিকস্বচ্ছ অবস্থানের প্রতিও কোনোরকম সুবিচার করেনি। যৌনতার প্রশ্নে স্বশ্রেণীর চিহ্নিত ‘রক্ষণশীল’দের সাথে এক কাতারে থেকেছেন এঁরা। কমবেশি রাখঢাক ও ‘চালায়া নেয়া’ পলিসির বাইরে দৃশ্যমান/ট্যানজিবল যে কর্মকাণ্ড করতে এসব সংগঠনকে দেখা গেছে তা হলো মৃদু–বিয়ার ঘটকালি, কিংবা বিয়ার মৃদু–ঘটকালি – অবশ্যই দু’জন সম্ভাব্য কমরেডের মধ্যে।
এত স্পষ্ট যে আমার মনে পড়ছে তার একটা সাহিত্যপাঠ–আত্মজৈবনিক দিক আছে। আমি কথাসাহিত্য বিষয়ে আপনার দূরত্ববোধ জানা সত্ত্বেও সবিনয়ে দুয়েকটা জিনিস অবতারণা করছি। দাম্পত্যদর্শনের আরামদায়ক মধ্যবিত্তীয় ফয়সালার বাইরে রবীন্দ্রনাথ গেছিলেন ঘরে–বাইরে ও চারুলতার মাধ্যমে; শরৎচন্দ্র গেছিলেন গৃহদাহ কিংবা চরিত্রহীন–এর মাধ্যমে, ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। বুদ্ধদেব বসু রাত ভ’রে বৃষ্টির মাধ্যমে। এর পরে সমরেশ বসু’র বিবর কিংবা প্রজাপতি’র মতো কাজ থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের আরব গেরিলা..ইত্যাদিসময়কাল ও কুলমান (সাহিত্যমান নয়, যৌনতার ধরন) বিচারে স্বতন্ত্রই রাখছি। যতই না কেন এসব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা আধুনিক বাংলা সাহিত্যনমুনা থাকুক, রাজনৈতিক চেতনার কারণে প্রথমত আপনি খুঁজতে থাকবেন স্থানীয় প্রবন্ধের জগত এবং স্থানীয় সেসব কথাসাহিত্যের জগত যেখানে প্রটাগনিস্ট বা নায়ক–নায়িকাপ্রমুখ নিজেরা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত। আমার পড়ালেখা গুরুতরভাবে কম, অন্তত আমি পড়ুয়া বলে এত বছরে যাঁদের চিনি তাঁদের তুলনায়। তারপরও যখন খোঁজাখুঁজি করতাম, অত্র অঞ্চলের বৃহত্তর বাম বলয়ে যৌনতার প্রশ্নে পারলৌকিক নিস্তব্ধতার খোঁজ পেয়েছি। এমনকি অন্নদাশঙ্কর রায় যা ও যতটুকু প্রকাশ্য ও স্পষ্ট ছিলেন তা এই মহলের কাজে পাইনি। প্রবন্ধের বাইরে থাকে কথ্যজগত আর কথাসাহিত্য জগত। সেখানে কেবল নিস্তব্ধতা দিয়েও বোঝা যাবে না, বরং বুঝতে হবে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। সমরেশ বসু থেকে আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন পর্যন্ত সবাই সম্ভবত বিবেচিত হতেন ‘অশ্লীল’ হিসাবে। আমার বিচার–বিশ্লেষণ ভুল হতে পারে, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, অন্যরা দেখালে খুশি হব এসব নিছক কথাসাহিত্য নিয়েই বা সংগঠনসমূহের অবস্থান কী ছিল। আশা করি আমি এটুকু নিশ্চিত করতে পারছি যে প্রশ্নটাকে নিয়ে বিপ্লবী সংগঠনের দিকে আসা আমার তরফে অন্তত এই কারণে ছিল যে অপেক্ষাকৃত বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তাঁরা নিতে পারবেন তা আমি ধরে নিয়েই থাকি। বৃহত্তর মধ্যবিত্ত সমাজ কিংবা রাষ্ট্রসমাজের প্রসঙ্গ তো তাহলে বলাই বাহুল্য।
এর মধ্যে তাহলে এরকম জিজ্ঞাসু সাহিত্যকর্মের দিকে সপ্রশ্ন তাকানো খুবই সঙ্গত হবার কথা। যৌনতা বা সাধারণভাবে মিত্রকর্মীদের বিষমলিঙ্গীয় সম্পর্ক কী হবে এই প্রশ্নে দুটো উপন্যাসের বিশাল প্রভাব ছিল। আমি অন্তত তাই মনে করি। বিস্ময়ের না যে দুটোই কোনো না কোনো ভাবে একদা–বামের লিখিত, এবং তাঁদের স্বীয় স্বীয় বামকালে লিখিত। যথাক্রমে, গর্ভধারিণী এবং ওদের জানিয়ে দাও। পটভূমি, পাত্রপাত্রী ও গল্পপ্রবাহে দুটো উপন্যাসের বিস্ময়কর মিলের কারণে পাঠকের জন্য চমকপ্রদ দুটো কাজও বটে। তুলনায় আমার অনেক পছন্দের কাজ শাহরিয়ার কবিরের ওদের জানিয়ে দাও। সেটা কথাসূত্রেই বলা, কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। বরং যে প্রসঙ্গে বলা, সেটাও আপনার প্রশ্নের ওই নর্মেটিভিটির পুনঃ পুনঃ শক্তি আহরণের প্রেক্ষিতে। উপন্যাস দুটোতে নানাবিধ ফ্যান্টাসির সমাহার আছে, রাজনৈতিক স্বপ্নদর্শন আছে, সমাজ বদলের বাসনা আছে, সম্পর্ক রূপান্তরের ডাক আছে। তবে হেটারোসেক্সুয়াল–মনোগ্যামাস দাম্পত্যমুখী প্রচলিত সম্পর্কের কিছুমাত্র গুরুতর রদবদল নাই। এই নাইয়ের দায়দায়িত্ব দুজন উপন্যাসকারের মাত্র নয়, সেটা একটা বলার জায়গা আমার। ‘মি–টু’র পাঁচ বংশীবাদকদের তুলনায় অনেক ভারী ভারী জাতীয় (এবং পুরুষ) ‘ফিগার’ এনে সেটা বলার চেষ্টা করলাম। বরং, যদি আমার স্মৃতি প্রতারণা না করে থাকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর আগামীকাল ও মহাপৃথিবী গল্পগ্রন্থ দুটোতে লক্ষ্যণীয় ধরনের ভিন্ন ছিলেন। তবে তিনিও কোলকাতায় সমাদৃত হননি, বামরাও অস্বস্তিতে ছিলেন। প্রমাণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব, কিন্তু আমি সুনিশ্চিত জানি। অবশ্যই সুনীল মহাতারকা হবার আগের অধ্যায় এটি।
শিল্পী: রিথিকা মার্চেন্ট
উত্তরের দৈর্ঘ্যে পাঠকের বিরক্তি ধরতে পারে কিন্তু এটুকু বলতে চাই যে যৌনতার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সীমানা এখন পর্যন্ত যা দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে প্রবল আদর্শমানওয়ালা/নর্মেটিভ বিষমলিঙ্গীয় একগামি যৌনতার বুর্জোয়া স্বাধীনতা অর্জনের ‘আন্দোলন’। এমনকি সেই আদর্শ সম্পর্কটির মধ্যেও দুই পক্ষ (যেহেতু ততোধিক পক্ষ যৌনতায় যুক্ত হবেন এটা ভাবার কারণে আবার আন্দোলন থেকে বের করে দিতে পারেন কেউ) অনেকের কল্পনার বাইরে কোনোরকম (যৌন) কর্মকাণ্ড যদি করে বসেন বা করে বসেছেন বলে জানা যায় কিংবা কখনো বসতে পারেন এমত আশঙ্কা হয় তাহলেও তাঁরা যৌনতার গ্রহণযোগ্য বুর্জোয়া আন্দোলনের মৈত্রী হারাবার ঝুঁকি রাখেন। এই প্রসঙ্গে আরো নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকলেই কেবল আমি আমার ভাবনা বিশদ করতে পারব।
১৩. অনেক সময়ই অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রাইভেসি চান। একটি পাবলিক স্টেটমেন্টের বিপক্ষে একটি প্রাইভেট স্টেটমেন্ট। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি প্রদানের কাঠামো অনুপস্থিত। সেক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগহীনতা কি অধিকারের খর্ব হওয়া?
মানস: বিরাট প্রসঙ্গ তুলেছেন – ‘আত্মপক্ষ সমর্থন’। সকল কিছুতে সাধারণ বুর্জোয়া অধিকারের সীমানাতেও, সীমানাতেই, এইটুকু না–থাকা আর অত্যাচারের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই তা যে লিঙ্গের প্রতিই আচরিত হোক না কেন। এখানে আমার মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়লো জায়োনিস্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের কথা। সংখ্যায় অল্প হলেও বর্তমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের ফিলিস্তিন বিরোধী হিংস্রতাকে জায়েজ করার জন্য তামাম বিশ্বে কিছু মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইহুদীদের নিপীড়িত হবার অভিজ্ঞতাকে সামনে আনেন। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে এটা একটা দুরূহ ধরনের যুক্তিপ্রস্তাব যেখানে আপনার পক্ষে প্রথমেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন, প্রধানত জার্মানির, আরো বিশেষে হিটলারশাসিত পক্ষের কৃত, নির্যাতনকে নিয়ে মাথা না–ঘামিয়ে আলাপ আগানো যায় না। এমনকি মাথা ঘামানোই যথেষ্ট নয়, গোড়াতেই নিন্দা জানিয়ে কথা শুরু করতে হবে। এমনিতে আপনার বা আমার হিটলারের শাসনব্যবস্থা আর ইহুদীনিধন নিয়ে যে কঠোর অবস্থানই থাকুক না কেন, ওই আলাপে এর শর্তযুক্তি একটা অশান্তিই কেবল নয়, বরং মারাত্মক ফাঁদ। আমার কথা বললে, আমি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লাগাতার আক্রমণকে নিছক ধর্ম–পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা হিসাবে দেখারও চেষ্টা করি না, যেমনটা করি না ভারতে মণিপুরী বা কাশ্মীরী নিয়ন্ত্রণকে, মিজো বা নাগা নিয়ন্ত্রণকে, মুসলিম বা মাওবাদীদের নির্যাতনকে নিছক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক তৎপরতা হিসাবে বুঝতে। যাঁরা বুঝতে চান নিজ দায়িত্বে বুঝবেন, বোঝানোর চেষ্টা করে যে ক্ষতিটা করেন তা ভয়াবহ। অত্যন্ত ভিন্ন পরিসর হলেও এখানে মনে পড়ার কারণ আছে। অভিযুক্ত পুরুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রসঙ্গ এলেই মনে না পড়ার সুযোগ নেই যে নারীদের লাগাতার সিস্টেম্যাটিক শেমিংয়ের মধ্যে থাকতে হয় – বছরের পর বছর, দশকের পর দশক, প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে, ঘরে ও বাইরে; এবং কোনোরকম আত্মপক্ষের সুযোগ ছাড়াই।
নারী তুলনামূলক কম পোশাক পরলে পুরুষচক্ষু মনোরঞ্জনের জন্য তা করছেন এবং যাবতীয় ‘ছেনালপনা’র অভিযোগে অভিযুক্ত, সকালবিকাল পাবলিকলি বিচারকৃত। অপেক্ষাকৃত বেশি পোশাক পরলে তিনি সেকেলে, রক্ষণশীল এবং ‘আধুনিক’ কর্মজগতে মানিয়ে নেবার মতো আত্মবিশ্বাসী নন! তিনি হাসিমুখে লাঞ্চবিরতিতে কথা বললে অবশ্যই আপনার আমার সঙ্গে শুতে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে আছেন – পুরুষেরা প্রায়শই সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। আর তিনি যদি গম্ভীরভাবে সময়টা কাটান তাহলে তিনি হয় অহেতু একটা ভাবভঙ্গির চেষ্টা করে যাচ্ছেন, ‘হীনম্মন্যতার’ কারণে কিংবা একটা প্র্যাংকমূলক অফিস সংস্কৃতিতে বড়ই বেমানান! তিনি ‘রূপসী’ বলে সাব্যস্ত হয়ে থাকলে তাঁর বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে পুরুষদের রায় বৈশ্বিকভাবে কাছাকাছি। আর যদি তার উল্টোটা পুরুষদের দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর ঠাট্টাতামাশার শিকার হওয়া নৈমিত্তিক, ও আবারও বৈশ্বিক। হিংস্র পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ও পুরুষাধিপত্যমূলক ‘আধুনিক’ কর্মক্ষেত্রে আসলে এই তালিকাটা কুৎসিত রকমের বড়। আমার মনে পড়ে গেল একটা কবিতা পড়েছিলাম, অনাম্নী কোনো কবির, রেহনুমা আহমেদ পড়তে দিয়েছিলেন। সম্ভবত ১৯৯৭ সালের দিকে। পরে সেটার অনুবাদ আমি করেছিলাম এবং অশুচি’র ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রামাণ্য–বইটার গোড়ার দিকে সংযোজিত আছে। আমি সেটা আপনাদের পড়তে দেব – ‘যে যে কারণে আমরা নারীবাদী আন্দোলনের অংশ’ বা এরকম কাছাকাছি নাম। কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগবঞ্চিত নারীদের একাংশ যখন আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গে অভিযুক্ত পুরুষদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে খুব একটা ইচ্ছুক থাকেন না, তখন সেটাকে পাঠ করতে আমার সমস্যা হয় না। কিন্তু, আবারো, সেটা চর্চা হিসাবে অসম্ভব একটা প্রস্তাব।
আপনার প্রশ্নের ভরকেন্দ্র বিবেচনা করলে, প্রাইভেট পরিসরের বিষয়টি কেন্দ্রীয়। যৌনতার ক্ষেত্রে পরিসরের দ্বিবিভাজন আরো গভীরভাবে গুরুত্ব দেবার দরকার বলে আমি বিবেচনা করি, এর ইতিহাসের মধ্যেই পরিসর গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে বলে। এটা বলার সময়ে আমার আবার সেসব সহকর্মীদের কথা মনে পড়ছে যাঁরা যৌন আক্রমণকে যৌনতার মুখ্য প্রসঙ্গে রাখতে চান না। গণতান্ত্রিক যৌনতাকে আকাঙ্ক্ষা করতে–থেকে আমি আবার নারীর জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত যৌনতাকে অযৌন–প্রসঙ্গ হিসাবে দেখতে ইচ্ছুক নই। একান্ত পরিসর বা প্রাইভেট স্পেসের প্রসঙ্গটা গণতন্ত্রী–স্বৈরতন্ত্রী সকল ধরনের যৌনসম্পর্কের জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বরং প্রাইভেট আর পাবলিকের বিভাজনের মধ্যেই যৌন–রাজনীতির সবচেয়ে বড় উপাদানগুলোর একটা। এটা বুঝবার জন্য যে কোনো সাবেক প্রেমিকের পক্ষ থেকে নাখোশ অবস্থায় প্রেমিকার–সাথে–যৌনদৃশ্য সম্প্রচারের দিকে লক্ষ্য করা যায়। ফলে দায়স্বীকারের জন্য প্রাইভেট পরিসর কোনো পুরুষ চাইলে সেটাকেও পরিসর–রাজনীতির সম্প্রসারিত অংশ হিসাবে আমি দেখব। এক্ষেত্রে এই একান্ত পরিসর প্রদানের পক্ষে না বিপক্ষে থাকছি আমি তাও খুব পূর্বনির্দিষ্ট থাকার সুযোগ নেই। যদি কোনো একটা তৎপরতার লক্ষ্য হয়ে থাকে আক্রমণকারী পুরুষকে শরম–প্রদান বা শেমিং তাহলে অভিযোগকারী পক্ষ বা তাঁর মিত্রপক্ষ প্রাইভেট পরিসরের সুযোগটা না দেবার রাস্তা কৌশলগতভাবেই নিতে থাকবেন। প্রসঙ্গটা রাজনীতির। তবে সকল অভিযোগকারী আক্রান্ত নারীই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অভিযোগ দায়ের করেননি। সেটা বাংলাদেশ হোক বা বহির্বিশ্ব, অভিযোগকারীদের অনেকেই হয়তো কেবল আক্রমণকারীর দুঃখপ্রকাশ আশা করেছেন। কিংবা আশা করেছেন যাতে অন্যান্য অপুরুষ পেশাজীবী পরিস্থিতির আন্দাজ করেন এবং একা বোধ না করেন। রাজনৈতিক লক্ষ্য নানাবিধ হয়ে থাকে, হতে পারে। সঙ্গত কারণেই কোনো কোনো পক্ষ ব্যক্তিগত দায়স্বীকারের, দুঃখপ্রকাশের পথ রুদ্ধ করে আগাতে চেয়েছেন।
পরিসর ও যৌনতার প্রসঙ্গের প্যাঁচ লেগে থাকা নানানভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ আছে। কর্মক্ষেত্রে হয়রানিগুলো, কিংবা নিছক হয়রানিহীন যৌনাত্মক মেলামেশাগুলোকে এক কাতারে রাখলে দেখা যায় প্রাইভেট পরিসরের জটিল ও ঘোরালো পেঁচালো অর্থ আছে। বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত যে কলেজ–করিডোর পাবলিক পরিসর বলে সাব্যস্ত, সেটাই আধা ঘণ্টা পরে প্রাইভেট বলে সাব্যস্ত হতে পারে। বা অন্তত ‘গোপন’। বাংলায় প্রাইভেটকে গোপন হিসাবেই অনুধাবন করা হয়ে আসছে, যৌন পরিমণ্ডলে তো বটেই। আবার ভৌত এলাকা যেমনই হোক, প্রাইভেট বলে তা অনুধাবিত হলে কোনোভাবেই দুই লিঙ্গের একজন করে থাকার পক্ষে সাধারণ রায় থাকে না। সেটারও বহুবিধ অর্থ। একজন পুরুষ সন্ধ্যা ৭টায় ওইরকম একটা খোলা করিডোরেও একজন নারীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে এসে নিজ লিঙ্গশ্রোতাদের কাছে ঘোষণা দিতে পারেন ‘চুমা খায়া আসলাম’। এটা সর্বৈব মিথ্যা হলেও সত্য বলে গণ্য ও কিছুকাল উদযাপিত হবে। পক্ষান্তরে, নারী যদি এসে ঘোষণা করেন যে তাঁকে জোর করা হয়েছে, তাহলে আদ্যোপান্ত সত্যি হলেও জনজবানে খারিজ হয়ে যাবে ওই পরিসরের প্রাইভেট বৈশিষ্ট্যের কারণে। কারোরই বিশেষ কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই; আবার কাঠামোগতভাবেই নারী উভয় উদাহরণেই ‘ক্ষতিগ্রস্ত’। এই পরিস্থিতিটা জটিল। কিন্তু সকল অভিযোগের উত্তরেই অভিযুক্ত অভিযোগকারীর সঙ্গে মুখোমুখি বসতে চাইলে সেটার ব্যবস্থা করতে পারা সংগঠকদের জন্য দারুণ ব্যাপার বলে আমি মনে করি। শেমিং ছাড়াও অন্য রাজনৈতিক অবস্থান ও পদ্ধতি অভিযোগকারীর থাকতে পারে।
১৪. ভিক্টিম বা সার্ভাইভারের সুরক্ষা পাবার অধিকার প্রশ্নে সামাজিক সংবেদনশীলতা দরকারি। বিশেষত ভিক্টিমকে ব্লেম করার প্রবণতা যখন প্রকট। কিন্তু এই সমাজে আমরা অভিযুক্তর অধিকার প্রশ্নে একধরনের নীরবতা দেখি। কখনো কখনো অধিকার খারিজ করতেও দেখি। ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযোগ হওয়া মাত্র একজন অভিযুক্ত যৌন নিপীড়নকারীর লেখা না ছাপানো বা তার আঁকা বা তোলা ছবি নামিয়ে ফেলার চাপ আসে। কোন আদালত যৌন নিপীড়ন প্রমাণিত হলেও আসামির ‘প্রকাশের স্বাধীনতা’ খর্ব করে না। তো,একজন অভিযুক্ত বা প্রমাণিত যৌন নিপীড়কের লেখা বা ছবি প্রকাশ কে আপনি কিভাবে দেখেন? তার এই অধিকার হরণযোগ্য কি না?
মানস: দেখুন বাংলাদেশ নানান প্রশ্নে গুরুতর জটিল একটা জায়গা। যৌনতার প্রশ্নে ঢাকা মহানগরী আরো এককাঠি উপরে। তবে কমবেশি কোলকাতাও সম্ভবত কাছাকাছিই এই প্রশ্নে। শেমিংয়ের কেন্দ্রীয় গুরুত্বের বিষয়টা বলেছি আগেই। কিন্তু এই প্রশ্নের ক্ষেত্রে বয়কটের শাস্তিবিধান প্রসঙ্গ টানতে হবে। অধিকাংশ লোকেই যেমনটা ভেবে থাকেন যে একঘরে করে দেবার শাস্তিবিধান সাবেক কালের প্রসঙ্গ কিংবা যাকে তাঁরা গ্রাম বলে সাব্যস্ত করে থাকেন সেসব এলাকার চর্চা ইত্যাদি, বাস্তব পরিস্থিতি একেবারেই তা নয়। ‘আধুনিক’ প্রতিষ্ঠানে একঘরে করে দেবার কিংবা বয়কট করবার শাস্তিবিধান বরং আরো নিবিড়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আরো তীব্র। একঘরে করা আর বয়কটকে সঙ্গত কারণেই আমি কাছাকাছি জায়গায় রাখতে চাইছি। মার্কিন সমাজে, এবং ক্ষেত্রবিশেষে ইউরোপীয় সমাজে হলোকাস্ট–সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাছাকাছি আচরণগুলো ঘটে থাকে। যদি বৃহত্তর মিডিয়াস্কেপিক দুনিয়ার বাস্তবতা হয়ে থাকে এটা তাহলে রাজনীতির দুনিয়ার একঘরে করার গুরুতর ওজর–উছিলাও আছে। যেমন ‘ওয়ার–ক্রাইম’। যদি একবার ‘ওয়ার–ক্রাইম’ করবার তকমা যদি কারো গায়ে লেগে থাকে, তাহলে তাঁর পক্ষে সাধারণভাবে রাজনীতির খোলা মঞ্চে তাঁর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারার সুবিধা প্রায় নাই বললেই চলে। এসব প্রস্তাব ধরে আগানোও খুব বিপজ্জনক। অনেকগুলো ডিসক্লেইমার দেয়া লাগতে পারে। যেমন ধরুন, এসব কথার মানে যে আমার তরফে যুদ্ধাপরাধ কিংবা হলোকাস্টের প্রতি কোনো সমর্থন নয় সেটাও আবার আগ বাড়িয়ে বলে দেয়া লাগতে পারে; বলার পরও কিছু লোকের সন্দেহ দীর্ঘকালীন বলবৎ থাকতে পারে। আবার হলোকাস্ট বা যুদ্ধাপরাধের তকমা মাথায় লাগলে রাজনৈতিক দুনিয়াতে তৎপর থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে বলার সাথে সাথেই এটাও বলার দরকার পড়ছে যে এসব তকমা লাগার পরও কারো কারো রাজনৈতিক সাফল্যের নজির পাওয়া সম্ভব। এসব ব্যাখ্যা বা কৈফিয়ৎ এক হিসাবে বাহুল্য আমার তরফে। কিন্তু ভুলভাল জায়গায় ওজন পড়ার চেয়ে বাহুল্য কথাও কখনো কখনো পদ্ধতিগত পদক্ষেপ।
বয়কটের আধুনিক প্রবণতাগুলো কমবেশি নৈতিকাশ্রয়ী বা মর্যালিস্ট; আর পরিচালিত হয় কমবেশি ঘৃণার ফ্রেইমওয়ার্ক দিয়ে। এখানে আদর্শ–ফাদর্শের আলাপ লোকে তুলতে পারেন, কিন্তু আদর্শ শব্দের প্রয়োগের কারণেই আমি ঘাবড়ে গিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা খুঁজতে বসব না। আদর্শ মূলগত ও গুণগতভাবেই মর্যালিস্ট। ন্যায্যতার ধারণাও লোকে আমদানি করতে পারেন। আমার জন্য সেটাও খুব বেশি মনোগ্রাহী হবে না। আমার এটাও বক্তব্য নয় যে, ‘সাবেকী’ সমাজে একঘরে করে দেয়া আধুনিক অনুশীলনগুলো থেকে মহত্তর ছিল। উল্টো, এরকম বহু নজিরই বরং পাওয়া যেতে পারে যেখানে একঘরে করা হচ্ছিল একদমই সমাজপতিদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করার জন্য এবং করা হচ্ছিল এমনসব মানুষদের যাঁরা বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিলেন কখনো। বিবরণী বা ঘোষণা তৈরি করার সময়ে অবশ্যই শাস্তিপ্রাপ্তকে দোষী বা অপরাধী বা হিংস্র বা যাকিছু বলা হয়ে থাকতে পারে। আরো বলা হয়ে থাকতে পারে সমাজবিরোধী বা কাছাকাছি কিছু। এই শেষোক্তটি কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্রের মতো। এখানে থাকবেন অবশ্যই তাঁরা যাঁদের কর্মকাণ্ড সমাজপতিদের জন্য হুমকির অথবা মর্যাদানাশের হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যাঁরা বিদ্রোহ করেছিলেন। সারাংশ হচ্ছে, একঘরে শাস্তিপ্রদানের লক্ষ্য হতে পারেন প্রকৃত ‘চোর’ থেকে ‘প্রকৃত’ বিদ্রোহী – একত্রেই, যুগপৎ, অভিন্ন – এমনকি তাঁরা থাকতে পারেন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে, পাশাপাশি। তো, বয়কটের যে আধুনিক সমাজপ্রণালী তা কি গুরুতরভাবে ভিন্ন? এখানে বিপ্লবী ও বিদ্যুৎচোর, রাষ্ট্র–সমালোচক ও ভাড়াটেখুনি, সর্বহারা ও পাকিস্তানপন্থী কাছাকাছি পদ্ধতিতে বিবেচিত হয়ে থাকেন, অন্তত সামাজিক পরিসর ব্যবহার প্রশ্নে; খোদ বিচারিক শাস্তিপ্রাপ্তির ঢের আগে থেকেই। এমনকি মার্জিন অব ইরর, প্রমাণ করা সম্ভব, কখনো কখনো আরো সূক্ষ্ম আরো ক্ষীণকায় আধুনিক ব্যবস্থাদিতে।
গোলাম আজম যে পাড়ায় থাকতেন সেখানে আমার একজন পরিচিত–বান্ধব থাকতেন। একজন শাস্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী হবার আগেও তিনি আমার প্রতিপক্ষ হিসাবেই ছিলেন বহুবছর, এমনকি সেই সময়কালেও যখন খোদ তখনকার সরকার তাঁর প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আবার শাস্তিপ্রাপ্ত হবার পর তাঁর সামাজিক–মানসিক–পারিবারিক দশা নিয়ে আগ্রহ জন্মাতেও আমার কোনো সমস্যা হয়নি। এটার কারণ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর ছোট ছেলের সঙ্গে আমার নৈকট্য ছিল। তাঁর ছোট ছেলে জাহাঙ্গীরনগরে ইংরাজি সাহিত্য পড়তে ভরতি হয়েছিলেন আমার এক ব্যাচ পরে। যদিও ক্যাম্পাসে রাত কাটানো কম হতো তাঁর, তবুও সম্ভবত তাঁর নানাবিধ আগ্রহ ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারণে আমাদের জানাশোনা হয়ে গেছিল, তাঁর বাবার প্রতি আমার ওইসব প্রতিপক্ষতা সমেতই। গোলাম আজমের সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি অবশ্যই, কিন্তু সেটা হয়তো তখনো আমার ঘরকুণো দশার কারণে। নাহলে সালমান, নানান ধরনের দ্বিধাসমেতই, বাসায় যাবার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সালমান বছরখানেকের বেশি জাহাঙ্গীরগরে টিঁকতে পারেননি, এবং সেই সময়টাও যথাসম্ভব নিগৃহীতভাবে ছিলেন। এরশাদের শাসনামল হলেও ক্যাম্পাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভাষামালার মধ্যে ওর পক্ষে নিঃশ্বাস নেয়া কঠিন ছিল। এই ঘৃণাময়তার আমি অনুগ্রাহী নই। এবং আপনি জানেন এই উচ্চারণের জন্যও, সালমানের মতো তীব্র না হলেও, আমি নিজেই হয়ে পড়তে পারি বয়কটের বা ঘৃণার টার্গেট। শাস্তিপ্রাপ্ত হবার পর বিস্মৃতপ্রায় সালমানের বাবা হিসাবে নয়, নিছকই একজন যেকোনো বৃদ্ধ রাজনীতিবিদের পারিবারিক–মনোজাগতিক দশা নিয়ে আগ্রহ জন্মেছিল। আমার সৌভাগ্য, তাঁর প্রতিবেশী, আমার বান্ধবজন, একটা আন্তরিক উত্তর দিয়েছিলেন। এখন কেউ চাইলে আমার এই মনোভাবকে ‘দয়ালুতা’, ‘ভাবালুতা’, ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ যা কিছু নাম দিতে পারেন। কিন্তু যৌথচর্চার প্রস্তাবিত ঘৃণার পরিকাঠামো যদি আমার গ্রহণযোগ্য না লাগে, তাহলে তো কেবল তিনি বা তাঁরা নন, খোদ আমিও এই ব্যবস্থার শিকার হয়ে পড়বার জায়গায় আছি।
অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিব্যক্তির সামর্থ্য হরণ করার প্রশ্নটি আপনি তুলেছিলেন যৌনতার পরিপ্রেক্ষিতে। আমি নিছক যৌনতায় পরিসীমিত থাকিনি উত্তর দেবার বেলায়। আশা করি আমার উত্তরকে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছেন না। বয়কট বা ঘৃণার শাসনাধীন বানানো নিয়ে আমার কোনো উৎসাহ নেই, কোনো প্রশ্নেই।
যৌন নিপীড়নের শাসকতা: দণ্ডনীতি ও ধর্ষণের পুনরুৎপাদন
১৫. যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শাসকতা পর্যবেক্ষণ করলে একটা বিষয় পষ্ট যে,পুলিশ–উকিল–চিকিৎসক–সাক্ষ্য–প্রমাণ–বিচারক মিলে গড়ে ওঠা আগাপাছতলা প্রণালীতে ভিক্টিম/সার্ভাইভারের স্বর থাকে না। এই স্বর হারিয়ে যায়। ফিল্টার হয়। অভিযোগের বয়ানকে ‘আইনানুগ’ করে তোলা হয়। সাক্ষীর সাক্ষ্যকে ‘আইনানুগ’ করে গ্রহন/ বর্জনের মুখে পড়তে হয়। ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ‘প্রপঞ্চটিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে এই প্রক্রিয়ায় কনস্ট্রাক্ট হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তো,আমার প্রশ্ন হল: যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের শাসকতা এবং একে ‘আইনানুগ’ করে তোলার সিস্টেমেটিক একশন খোদ ধর্ষণ নামের রাজনৈতিক ঘটনাটিকেই অনুপস্থিত করে তোলে কিনা?
মানস:তোলে, আলবৎ তোলে। রাজনৈতিক ঘটনাটিকে অনুপস্থিত করে তোলে বা ফেলে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে যৌন–লিঙ্গীয় রাজনৈতিক ঘটনা বা হামলার কথা আলাপ করছি আমরা। কিছুটা ঝুঁকিসমেতই বলি সকল বিচারের প্রক্রিয়ায় সকল ক্ষতিগ্রস্তের সকল ধরনের বয়ান (স্বর, আর্তনাদ, ফরিয়াদ, বিবরণী, অনুভব, সংক্ষোভ, সংবেদ ইত্যাদি সকল কিছু সমেত যা যা হতে পারে তার একটা পোঁটলা যদি বলি) অনুপস্থিত হবার সম্ভাবনাসমেত বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। যাকে ইনসেপশন বলে। মামলা হিসাবে অনুধাবিত হবার মধ্যেই ব্যক্তিসমূহ কেইসে, বা বাদীতে (বা বিবাদীতে) , পর্যবসিত হন। তাঁর বাণীমালা আইনানুগ হতে হতে তিনি সেগুলোকে আর না–চিনতে শুরু করতে পারেন। আবার একটা রিয়েলিটি শোয়ের মাঝপথে আপনি যেমন আর বের হয়ে আসতে পারেন না, মামলাকারী বা অভিযোগকারী এই অচেনা পথে, খোদ নিজের অভিজ্ঞতার অচেনা লিপিরূপের অত্যাচার থেকে খুব একটা বের হয়ে আসার সুযোগও পান না।
রবীন্দ্রনাথ সাহা। মনে হয় এটাই নাম। হয় আমি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিংবা কোনো এক সাংবাদিকের বিবরণীতে তাঁর অস্তিত্ব এত জাগরুক লেগেছিল আমার যে আমার মাথায় এরকম চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে যে আমি রবীন্দ্রনাথের পাশে দাঁড়িয়েই তাঁর বিহ্বল অন্তর্গত বিলাপ শুনছি। রানা প্লাজার করুণ ও দুর্বৃত্তায়নগত দুর্ঘটনার পর তিনি একাধিক দিন এই ধ্বংসস্তূপের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বিলাপকে যদি সূত্র ধরা যায় তাহলে ওই জমিখানা, যেখানে জনৈক ক্ষমতাবান ও রাজনীতিবিদদের চ্যালাচামুণ্ডা রানা একটা প্লাজা বানিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের মালিকানাধীন ছিল এবং রানা সেটাকে জবরদখল করে। যেহেতু আমি চাকরি করি জাহাঙ্গীরনগরে সেজন্য রবীন্দ্রনাথ সাহার পাশে আমার কোনো একটা দুপুরে দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। রানার কীর্তির জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি এটা যদি আমরা দাবি করি তাহলে নিশ্চয়ই মিথ্যাচার হবে। আবার রানার কীর্তির ‘ন্যায়বিচার’ হয়েছে তা আদৌ সরকারের মধ্যকারও কেউ বলতে রাজি থাকবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। তাঁরা বড়জোর বলবেন ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে..’। এগুলো বারবার শুনতেও আমাদের ভাবগাম্ভীর্যের মৌলিক ক্ষতি হতে পারে। এখন আপনি বা আমি তো দূরের কথা, রবীন্দ্রনাথ নিজেই তো জানেন না যে ওই ধ্বংস্তস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক বছর আগে তাঁর বেহাত হওয়া জমির জন্য কী ধরনের শোক প্রকাশ মানানসই; কিংবা শোকের অধিক সেই কৃত ‘অন্যায়’–এর বিপরীতে ঠিক কী ধরনের ‘ন্যায়বিচার’ পেতে তিনি আদালতে যেতে পারেন। আদৌ এই দুই হাজার মৃতদেহের পরিবেশে আদালতে যাবার স্থৈর্য ও সংকল্পই বা তিনি কীভাবে সংগঠন করবেন! কিংবা সেই বিচারিক প্রক্রিয়াটিই বা কী হতে পারে! আবার তিনি নেহায়েৎ রবীন্দ্রনাথ বলে ‘শুধু বিঘে দুই’ লিখেও তাঁর অনুভূতিরাজ্যের একটা আশু নিষ্পত্তি ঘটাতে পারছেন না। ফলে, আমি তাঁর অসীম বিহ্বলতা প্রায় অনুভব করতে পারি। হতে পারে, সাভার বাজারের ওই অজস্র মানুষের ভিড়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সঠিক কী বা কী–কী কারণে তা তিনি নিজেও জানতেন না। যেমন, বাস থেকে আমি বা আপনি নেমে ওইদিকে চেয়ে থাকতাম যে তারও কোনো সঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। কিছু কিছু সময়ে কিছু কিছু জন অবশ্যই ত্রাণকর্মী থেকেছেন। তার থেকে বিশাল বাহিনী ছিলেন দর্শক, আবার তাঁদের নিস্পৃহ বা অকরুণ/এপেথেটিক ভাবার কোনো কারণ নেই। হতে পারে, ওই জমায়েতে, নিহতদের আত্মীয়দের বাইরে রবীন্দ্রনাথই সবচেয়ে বিহ্বল ছিলেন। হতে পারে, তিনি বিড়বিড় স্বগতোক্তির মধ্যে, এই বিশাল মৃত্যুরাজির মধ্যেও চাইছিলেন ওই জমির সঙ্গে তাঁর পুরান সম্পর্কটির একটা জনস্বীকৃতি; এমনকি জনস্বীকৃতিও নয়, নেহায়েৎ সামনে–থাকা লোকটির মুহূর্তের স্বীকৃতি ও সমবেদনা। তিনি মোকদ্দমা একদমই না–চেয়ে থাকতে পারেন।
আদালতের কাঠগড়া থেকে ঢের ঢের দূরে থাকা এই রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনা আমার তরফে খুবই প্রাসঙ্গিক। আদালতে ‘ন্যায়বিচার’ প্রত্যাশী ধর্ষিতের অভিজ্ঞতা তাঁর নিজেরই কাছে কোনো একটা সময়ে কোনো এক সুদূর অপ্রাসঙ্গিক অন্য মানুষের জীবনের এক নিস্পৃহ–অকরুণ কাহিনি লাগতে পারে। এমন এক কাহিনি যা আর পুনঃ পুনঃ বিবরিত হোক তা তিনি না চাইতে পারেন; পুনঃ পুনঃ বিশ্লেষিত হোক তা তিনি না চাইতে পারেন। শোক কিংবা লজ্জার অধিক তা এমন এক বিবরণী–বিশ্লেষণে পরিণত হয়ে থাকতে পারে যা আর তাঁকে সম্পৃক্ত করছে না। তিনি এই অধ্যায়ের ‘বেকসুর’ খারিজ চাইতে পারেন। রাজনৈতিকতার অনুপস্থিতি তাঁকে খোদ রাজনৈতিক প্লেয়ার/অংশীদার হিসাবে মিউটেড/নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আমি প্রশ্নটির মধ্যকার পাত্রীপাত্রের মনোজাগতিক দিকটাতেও তাকাতে চেষ্টা করলাম।
১৬. একটি আদালত কক্ষ, উকিলের জেরা, ভিক্টিমের আইনিভাবে চরিত্র হনন ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন পুণরুৎপাদন হয়। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিচারের দাবি আসলে কোন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে কি? নাকি এটি ভিক্টিমকে একটি বিচারিক স্বৈরতন্ত্রর মুখোমুখি করে?
মানস: বাহ। বিচারিক স্বৈরতন্ত্র! এটা দুর্দান্ত পদবাচ্য। তবে আমি আশঙ্কা করি যে বিচারিক ও স্বৈরতন্ত্র শব্দদুটো পাশাপাশি বসিয়েই প্রথমে আপনি, ও আপত্তি না করে পরেরবার আমি ‘আদালত অবমাননা’র ফাঁদে পড়ার উপযুক্ত হয়ে আছি। তাই চাইলে এখন থেকে আমরা স্বৈরতন্ত্রকে অন্য কোনো কোডেড একটা নামে ডাকতে পারি। ধরা যাক, স্বরতন্ত্র, অর্থাৎ যেসব প্রত্যঙ্গের ব্যবহারে আমাদের আওয়াজ উৎপন্ন হয়ে থাকে। আদালত কিছু নির্দিষ্ট আওয়াজ তৈরি করে থাকে তা বলাই যায়। বিচারিক স্বরতন্ত্র! আমি চাইব, আগের প্রশ্নেও বলেছি, আদালত ও ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আমাদের বোঝাবুঝির ইতিহাস ও আকাঙ্ক্ষিত দাবিনামাকে দুই বাক্সে সতর্কভাবে রাখার অভ্যাস করতে। একটার সঙ্গে আরেকটার অন্যমনস্ক, কিংবা সচেতন, গুলিয়ে ফেলার অহরহ নিয়মিত ঘটনা ঘটে। এরপর যে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়টা আমি উচ্চারণ করব তা হচ্ছে ন্যায়বিচারের দাবি মুখ্যত দুইটা অনুপ্রেরণা বা ইনটেন্ট ধারণ করে: প্রতিশোধপরায়ণতা এবং/বা অক্ষম–আক্রোশ। এই ভয়ানক দাবিটা আমি কেবল যৌনতার বিচারিক বিষয় নিয়েই করছি না, বরং করছি সাধারণভাবে রাষ্ট্রানুগ বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সকল আর্তনাদ–ফরিয়াদ নিয়েই। ন্যায়বিচারের আওয়াজটা ক্ষতিগ্রস্তরা তোলেন সাধারণত ওটা রাষ্ট্রের ভাষামালা বা ডিসকোর্সের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে।
শিল্পী: সায়েদা ইশরাত
যৌন নিপীড়ন এবং বিশেষভাবে ধর্ষণের বিষয় আদালতে যাবার পর ঘটনাপ্রবাহ বা বিস্তারের একদম সুনির্দিষ্ট কয়েকটা মাত্রা আছে যার মধ্যে দুইটার দিকে, বা আড়াইটাও বলা যায়, আমি আলোকপাত করতে চাই। প্রথম বিষয় হলো, প্রাইভেট পরিসরের মধ্য থেকে যৌনক্রিয়াদি এবং মনুষ্যদেহের বিশদ বিবরণী পাবলিককরণের আবশ্যিক শরমের পাটাতন। আক্রান্তের একান্ত অনুভূতি বাদ দিলেও, যদি আনন্দদায়ক তথাকথিত সম্মতিভিত্তিক যৌনাচারের প্রসঙ্গও হতো তার বিবরণী জনদরবারের চর্চার বিষয়বস্তু হয়ে পড়বার আবশ্যিক অস্বস্তি বা উৎপীড়ন বা হয়রানির প্রসঙ্গ সেটা। কিছু বিরল উদাহরণ বাদ দিলে, এই পরিস্থিতিটা লিঙ্গ নির্বিশেষেই পাত্রপাত্রীদের পরম বিব্রতির বিষয় হবার কথা। যদি আধুনিক বিচারব্যবস্থার বাইরে আমাদের কল্পনার পল্লী অঞ্চলকে, কিংবা ইতিহাসগ্রন্থাদির ‘সাবেক’কালীন সমাজভিত্তিক শালিসব্যবস্থার কথাও আন্দাজ করি, এইসব বিবরণীতে সংশ্লিষ্ট পাত্রপাত্রীদের হর্ষ–আনন্দের কোনো কারণ নাই। তবে মোটের উপর পার্থক্য থাকতে পারে ওটুকুই যতটুকু যৌনতার লজ্জা পুনর্গঠিত হয়েছে আধুনিক কালে। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো, আরো সূক্ষ্ম প্রসঙ্গ, ধর্ষণ বা যৌনাক্রমণকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে কীসব প্রিমাইজ/পূর্বশর্ত বিভিন্ন কারকের মাথায় কাজ করছে। এখানে আমাদের বাহ্যত মনে হতে পারে যে আদালত মানেই তো বিমূর্ত একটা ব্যবস্থা। কোনো বিমূর্ত ব্যবস্থাকেই এর মধ্যকার ও পার্শ্ববর্তী কারকদের বাইরে স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব হিসাবে আমি দেখি না। বহুদিন ধরে দেখি না। প্রায় শিশুকাল থেকে দেখি না। এই বিশেষ ক্ষেত্রে কারকদের প্রায় শতভাগ, অন্তত আমাদের মতো দেশগুলোতে, পুরুষও বটে। আমি অবশ্য যৌনতা অনুধাবনের বেলায় লিঙ্গনির্দিষ্ট ভিন্নতা যে থাকবেই তা মনে করি না। পুরুষের বা পুরুষালি বা অধিপতি যৌন অনুধাবন খোদ নারী বা অন্যান্য লিঙ্গের মানুষজনও ধারণ করতে পারেন। তো সেখানে, ধর্ষণ কীভাবে ‘সাধিত’ হয় এটা অনুধাবন করতে গিয়ে কারকেরা নিজেদের যৌনতাবিষয়ক বোঝাবুঝির দুনিয়ার সঙ্গেও নানাবিধ কুস্তি লড়তে থাকেন। অন্তত যেসব সম্ভাব্য অমীমাংসিত মনোভঙ্গি তাঁরা কুস্তি লড়েন বলে আমি মনে করি তার মধ্যে আছে: উস্কানিমূলক পরিবেশ, ‘সঠিক’ নৈতিক আচরণ বা তার অভাব, ‘যৌনতা সতত অনৈতিক’, ‘নারীর স্বভাব পুরুষকে উদ্দীপ্ত করে’, পুরুষ নারীটিকে একান্তে পাবার মানে নিশ্চয়ই নারী আগ্রহী ছিল ‘কিছু করতে’, পুরুষটির বদমতলব যদি তাই হয়ে থাকে অবশ্যই নারীটির আগে বুঝতে পারা উচিত ছিল; এমনকি ‘নারীরা আগেভাগেই বিপদের আলামত বুঝে ফেলে উঁইপোকার মতো’। এরকম রাজ্যের সব অনুমান নিয়ে ওইসব কারকেরা দিনের ২৪ ঘণ্টা বসবাস করেন। হঠাৎ আদালতে আলখাল্লা পরে যাবার সময়েই সেসব ভোজভাজির মতো মাথা থেকে উধাও হয়ে যাবার কোনো ন্যায্য কারণ আমি দেখি না।
ফলে, ধর্ষক বা যৌন–আক্রমককে বাঁচানোর ইচ্ছা ছাড়াও, এইসব নিজের মাথার থিসিসের সঙ্গে কুস্তি লড়তে–লড়তে আদালত–আচারগুলো সারেন তাঁরা। এর মধ্যে আক্রান্ত নারীর যৌন বিষয়ক জগদ্দর্শনও বিপজ্জনক হতে পারে। কিন্তু এখানে তাঁর ভাবনা নতুন করে কোনো বিপদ ঘটাচ্ছে না। ওদিকে আক্রমণকারী এবং বিচারক দীর্ঘকাল চুপচাপ থাকার সুযোগ পান। তাই বলে তাঁদের মাথা সক্রিয় থাকছে না তা তো নয়, নেহায়েৎ একঘেঁয়েমিতে ঘুম পেয়ে যাবার সময়টুকু বাদ দিলে। এই জাগরুক মাথার যৌনবোধকে আমি বিপজ্জনক মোকদ্দমা–পাটাতন গড়ে দেয় বলেও মনে করি। আড়াইতম বিষয়টা হলো, মিডিয়ার ব্যস্ততা বা সম্প্রচারগুণ। অন্তত কিছু কিছু ধর্ষণের বিচারকার্য চলাকালীন ব্যাপক ধরনের মিডিয়া–শোরগোল হয়ে থাকে। এসব শোরগোলের আয়ু যতটুকুই হোক, এর ফ্রেইমওয়ার্ক প্রদান করার সামর্থ্য প্রচুর। আপনার প্রশ্নে যে দৃশ্যরূপ হাজির করা হয়েছে সেখানে নিজগুণেই আক্রান্ত নারীর পরিস্থিতি বিবরিত হয়েছে। আমি এই সুযোগটা নিয়ে তাকে বিশদ করলাম মাত্র। আর আমার বিবরণীতে যৌন–রাজনীতির আরো বিশদ মনোজাগতিক পরিমণ্ডলটাকে আনার তাগিদ আমার ছিল। ‘চরিত্র হনন’ এখানে যতটা অপরাধীকে বাঁচানোর নৈতিক হাতিয়ার, ততটাই যৌনতাকে অনুধাবন করার হাতুড়ে উপায়। ‘ন্যায়বিচার’ এখানে সুদূরপরাহত। বিচারের দাবি, আমি আগেই বলেছি, ‘ন্যায়বিচার’ সংক্রান্ত তাগিদ হিসাবে আমি দেখতেই পাই না। ওটা তীব্র আর্তনাদ হতে পারে, প্রতিশোধ হতে পারে, রিরংসা হতে পারে, অক্ষম–গোঙানি হতে পারে। বেইনসাফকে শনাক্ত করার আওয়াজ বললে আমি মানব।
দণ্ডমূলক বনাম পুনর্গঠনমূলক ন্যায় বিচারব্যবস্থা
১৭. ফৌজদারি বা দণ্ডনীতি কি সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের প্রতিহিংসাকেই অবশেষে নিরুঙ্কুশ করে তোলে না? একটা পিউনিটিভ জাস্টিস সিস্টেম ন্যায়বিচার ধারণাকে যেভাবে শাস্তিমূলক এবং কারাগারকে সামাজিক ভয়ের ক্ষেত্রে পরিণত করে;সমাজের কথিত পঙ্কিলতাকে বন্দী করার নামে খোদ সমাজের গায়ে কারাগার নামক বিমানবিকীকরণ প্রকল্পের জন্ম দেয়,তাতে আদতে দণ্ডনীতি তো সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের ত্রাসই…
মানস: আমি আপনার বা অরাজের প্রশ্নের তারিফ করতে চাই। আশা করি আমার এই প্রশংসা মোড়লীপনা কিংবা প্যাটার্নালিজম হিসেবে পঠিত হবে না। গড়ে যেভাবে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হই আমি, বা আমরা, তাতে এই পর্যায়ের সূক্ষ্ম ও জটিলভাবে উপলব্ধি করতে থাকা মানুষদের প্রশ্ন কমই মুখোমুখি হয়েছি আমি। এই প্রশ্নের মুখোমুখি হবার আগেই আমি প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণতাকে (অক্ষম আর্তনাদসমেত) ‘ন্যায়বিচার’সংক্রান্ত আলাপের কেন্দ্রে এনে কথা তুলেছিলাম। সাক্ষাৎকারে সকল প্রশ্ন একত্রে পড়ে নিয়ে উত্তর শুরু করবার পদ্ধতির পক্ষে অনেকেই থাকেন। তাঁদের পদ্ধতির পক্ষে সঙ্গত সব ব্যাখ্যাও আছে। কিন্তু জটিল ও আগ্রহের বিষয়বস্তুতে অন্তত, আমি পরের প্রশ্ন আগে না পাঠ করে উত্তর করতে পছন্দ করি। আশা করি আমার পদ্ধতির শক্তিটাও স্পষ্ট হলো। নিরঙ্কুশ যদি একটু ঝুঁকিপূর্ণ ভাষাপ্রস্তাব হয়েও থাকে, সংঘবদ্ধ ‘ন্যায়বিচার’ অবশ্যই প্রতিহিংসাকে সংগঠিত করতে সমর্থ, করে থাকে লাগাতার; যতই এর আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য এটি না হয়ে থাকুক না কেন।
আমি ‘ন্যায়বিচার’ ধারণার গুণগ্রাহী নই, এতে আমার আস্থা নাই। আমি একে বাগাড়ম্বর মনে করি। এর আকাঙ্ক্ষাকে অবাস্তব মনে করি। এর প্রতিষ্ঠাপ্রচেষ্টাকে মিথ্যাচার, বা অন্তত অতিকথন, গণ্য করি। সম্ভবত আমার আগের কিছু আলাপে তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পক্ষান্তরে, ন্যায়বিচার বা ইনসাফের অভাবকে লাগাতার উপলব্ধি করতে থাকার অনুশীলনকে আমি রাজনৈতিক ও দার্শনিক উভয় বিচারেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ইনসাফের অভাবের উপলব্ধিকে ন্যায়বিচার আকাঙ্ক্ষা হিসাবে পাঠ করা যেতে পারে নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি এই পর্যায়ে আকাঙ্ক্ষাকে প্রায় কাল্পনিক ঐশী রাজ্যের বাসনা হিসাবে দেখতে পাই; আর অভাবের উপলব্ধি অতি–অবশ্যই দার্শনিক পটভূমি হিসাবে দেখতে পাই। ফলে ‘ন্যায়বিচার নাই’ উপলব্ধির সাধারণ গড়পরতা প্রতিক্রিয়া আর ‘ন্যায়বিচার’–এর জাগতিক অনস্তিত্ববিষয়ক উপলব্ধির উচ্চারণ ঠিক এক কাতারে আমি না–রাখতে চাইব। কিন্তু এত সহজে এই আলাপে পার পেয়ে যাওয়া যাবে না মনে হয়। লোকজন ঠেসে ধরতে পারেন এই বলে যে ‘ন্যায়বিচার তুমি মানো না, মানে তুমি হইলা গিয়া স্বৈরাচারের দোসর’। কিংবা ‘তুমি আসলে জালিম’। আমি কোনোটাই নই। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় অবধারিত ইচ্ছানিরপেক্ষ রাষ্ট্রবাসী হিসাবে আমি বিচারিক প্রক্রিয়ার অত্যাবশ্যকতা গাঢ়ভাবে টের পাই। এমনকি, কিছুক্ষণ আগে যেমন বললাম, খুনি আর বিপ্লবীর সমান্তরালে অবস্থানের বাস্তবতা সত্ত্বেও, বিচারিক প্রক্রিয়া ও তার আশা করতে থাকা সাধারণ নাগরিক নিঃশ্বাস–প্রশ্বাসের মতো একটা বিষয়। আমি বড়জোর ‘ন্যায়ের’ ধারণা প্রত্যাহার করে ভাবতে চাইছি মাত্র।
সংঘবদ্ধ ন্যায়বিচারের দাবিনামা বা চিৎকার যে ত্রাসের ব্যাকরণ তৈরি করে তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। শৃঙ্খলা, শাস্তি ও কারাগার বিষয়ে বিস্তর সব বিদ্যাজগতীয় আলাপ–আলোচনা হয়ে আছে। ফুকো নেতৃস্থানীয় বলে বিবেচিত। আমার সেসব মুখস্ত থাকলে, বা অন্তত গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাঠ করা থাকলে এখানে উদ্ধৃতি দিয়েও আগানো যেতো। কিন্তু সেসব উদ্ধৃতির অভাবে মূল বক্তব্য, ভাব, যুক্তি কিংবা অনুভব হীনবল হয়ে যাবে না। অন্তত এ কারণেও যে এসব তত্ত্বের উদ্ভবেরও বহু আগে আর কেউ না হলেও শাস্তিপ্রাপ্ত মানুষজন, মরতে মরতে, নিজেরা জানতেন কোন ধরনের শাস্তি ঠিক কার কার স্বার্থে তাঁকে দেয়া হচ্ছে। কিংবা সকলের সম্মিলিত উল্লাস আর চিৎকারের মধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর শাস্তি কার্যকর করার মুহূর্তগুলো তাঁর জন্য যতখানি ভীতি বয়ে আনতো, ততোই তীব্রভাবে তিনি সকলের উল্লাস শুনতে পেতেন, মৃত্যুকালে। সেগুলো বেঁচে থাকলে তিনি লিখতেন কিনা বা তত্ত্বায়ন হতো কিনা তাতে এই পরিস্থিতির পাঠ বদলায় না। তবে এই আলাপটি শুরু থেকেই যৌন নিপীড়নকে কেন্দ্র করে হবার কারণে আমার আলাপ, এমনকি আপনার প্রশ্নও, পুরুষ–এপলজিস্টের দোষারোপ খেতে পারে। বাস্তবে যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণ প্রসঙ্গেই সীমিত করে আমি ভাবিনি। ন্যায়বিচারের চিৎকারের মধ্যে সংঘবদ্ধ প্রতিহিংসাকে চিনবার জন্য যেকোনো ‘সন্দেহাতীত’ (ছোট) চোর বা ছিনতাইকারীর উপর উপর্যুপরি সংঘবদ্ধ শক্তিপ্রয়োগের দৃশ্যের দিকে মনোযোগ দেয়াই যথেষ্ট। প্রায়শই এসব হামলা থেকে ‘অপরাধী’ জীবিত আসতে, বা হাসপাতালে যেতে, পারেন কেবল পুলিশের হস্তক্ষেপে। মব–লিঞ্চিংয়ের গড়পরতা যেকোনো পরিস্থিতিরই কাছাকাছি চিত্র।
তবে যৌনাচার ও যৌনাক্রমণের সীমানার মধ্যে বিবেচনা করলেও বিশেষ ভিন্ন পরিস্থিতি নয়। আমাদের শৈশবে সবচেয়ে বড় ‘জাতীয়’ যৌনবিষয়ক ‘অপরাধ’ ছিল রিমা হত্যাকাণ্ড। কথিত ‘পারকীয়’ প্রেমের মীমাংসা করতে গিয়ে রিমার স্বামী মুনীর রিমাকে খুন করে ফেলেছেন বলে জানা গেছিল। মুনীরের ফাঁসির রায় হয়েছিল পরে। কিন্তু তামাম বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যক নারী আন্দোলনের কর্মীরা মুনীরের যৌনসাথি (বা বান্ধবী বা প্রেমিকা) খুকুরও ফাঁসি চাইছিলেন। কেবল মুনীরের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করার কারণে ফাঁসিযোগ্য বিবেচিত হওয়া বিস্ময়কর কম, কিন্তু বীভৎস তো বটেই। উত্তরকালে এরকম একাধিক ঘটনার নিদর্শন আছে যেখানে নারী সংগঠকদের একাংশ কাছাকাছি আওয়াজ তুলেছিলেন। একবার জাতীয় পর্যায়ের একজন নেত্রীর সঙ্গে আমার প্রকাশ্য মতবিরোধও তীব্র আকার পেয়েছিল। মুখ্য প্রবণতা হিসাবে চিন্তা করলে, খুকু বা এরকম কারো শাস্তিকামনা হতে পারে কেবল নৈতিকাশ্রয়ী তীব্র ঘৃণা থেকে, যাকে মর্যালিস্ট বলছিলাম। ন্যূনতম চেতনাটি এরকম যে, যে যৌন–নৈতিকতার শাসনব্যবস্থা কায়েম করে রেখেছি আমরা, তার বাইরে যাবি যখন তখন দেখ আমরা কী করি! একে প্রতিহিংসা বলার যথাযোগ্য কারণ আছে। এখানে গোপন আর প্রকাশ্য, পাবলিক আর প্রাইভেটের প্রসঙ্গটাও আবার চলে আসে।
১৮. ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন কি আদতে ফৌজদারির বিষয় নাকি রাজনৈতিক? মানে পুরুষতান্ত্রিকতা, নারীকে অধঃস্তনীকরণের ধারকবাহক রাষ্ট্র–পুঁজিসহ বলপ্রয়োগের যেকোন প্রথা–প্রতিষ্ঠানের বিলোপ ছাড়া কি এর নিরসন সম্ভব?
মানস: না সম্ভব নয়। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা একটা বাস্তবতা, অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা রীতিমত। হকিকত, এই মুহূর্তে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপ্রজা হিসাবে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নকে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে না দেখার সুযোগ আমাদের বিশেষ নেই। তাছাড়া এগুলোকে সাপেক্ষিকভাবে দেখতেই হবে। এমনিতেই আদালতের বাইরে জনসমাজে সালিশের নামে যেভাবে যৌনাপরাধগুলোকে সামলানোর চেষ্টা করে সেটা অতিশয় বিপজ্জনক। উপরন্তু, সেখানে ‘বিধিবহির্ভূত’ যৌনতা আর যৌন–আক্রমণ একই কাতারের ‘অপরাধ’। অবশ্যই গোপনে কিছু করে গিলে ফেলতে পারলে আরেক কথা। না পারলে ব্যভিচারও যা, ধর্ষণও তাই। পুরা ব্যবস্থাটা গড়ে অতিশয় ক্রুদ্ধ, যৌননিয়ন্ত্রণকামী, পুরুষালি ঈর্ষাপরায়ণ ও লিঙ্গবিদ্বেষী। আদালত সেখানে ওরকম শাসনব্যবস্থার প্রতি একটা চ্যালেঞ্জ, যত মৃদু যত কমজোর আর যত অনীহই তা হয়ে থাকুক না কেন। তাছাড়া প্রশ্নটার আরেকটা দিক আছে যা অসতর্ক থাকলে এই মর্মে পর্যবসন ঘটাতে পারে যে আপনি বলতে চাইছেন পুঁজিবাদের বিলোপে এমনকি লিঙ্গীয় সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে; কিংবা লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। আপনাকে চিনি বিধায় আপনার প্রশ্নের এই মানে আমি করব না। তাছাড়া প্রশ্নটিও তার থেকে সূক্ষ্মভাবে বিন্যস্ত। প্রসঙ্গটা আসছে এই কারণে যে দীর্ঘকাল বাংলাদেশের বাম আন্দোলনগুলোতে নারীবাদী চিন্তন নিয়ে একটা কাঠামোগত ডিনায়াল ছিল। ডিনায়ালটা প্রথমত ছিল নারীবাদী চৈতন্য মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলে যে দানা বাঁধছিল সেটার বিষয়ে আনদেখা করা। দ্বিতীয়ত ছিল, মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতন্ত্রভাবে লিঙ্গপ্রশ্নকে বিবেচনা করার প্রয়োজন নাই। দুইটাই যে আত্মঘাতী মাথা–নাড়ানি ছিল তা আশা করি আর নতুন করে প্রমাণ দিতে হবে না। তারপরও যাঁদের সংশয় আছে, জানিয়ে রাখি আমি মনে করি ওগুলো বিপজ্জনক সব ফয়সালা ছিল। এতটাই যে পরে একটা একটা করে নারী শাখা খুলে এই লিঙ্গ–উৎকণ্ঠাগুলোর যথেষ্ট মীমাংসা করবার মতো খুঁটি দেয়া যায়নি, এমনকি কম্যুনিস্ট পার্টির মহিলা পরিষদের মতো জাতীয় পর্যায়ের বৃহদায়তন সংগঠন দিয়েও। সঙ্কটটি বাংলাদেশের মার্ক্সবাদী দলগুলোতেই প্রথম আমদানি হয়নি সবাই জানেন। সোভিয়েত বিপ্লবেরই সমান বয়সী লিঙ্গীয় বিতর্ক। এটা আমার খুবই মনে হয় যে পার্টিগুলোর মধ্যে লিঙ্গচৈতন্য জাগরুক থাকলে রাষ্ট্রের ম্যানিপুলেটিভ আচরণগুলো সতর্ক হতো। আরো সহজ করে বললে, নারীবাদকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করার সময় সকল প্রতিষ্ঠানেরই মনে পড়ে যে এমনকি মার্ক্সবাদী দলগুলোতেও নারীবাদীরা কোণঠাসা। আশা করি আমার বক্তব্যটা স্পষ্ট হলো।
আবার আরেকদিক থেকেও দেখা দরকার। সমাজতন্ত্রী বিপ্লব কোনো না কোনোভাবে সাধিত হয়েছে এসব রাষ্ট্রে যৌন নিপীড়ন গুরুত্বপূর্ণ মাত্রায় কম ইত্যাদি হিসাব পাওয়া যায়। সেটা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন হোক, কিউবা হোক কিংবা বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি। এমনকি সমাজতন্ত্রী নয় এমন বিপ্লবসম্পন্ন রাষ্ট্রেও যৌন সহিংসতার মাত্রা কম থাকার, নারীর অধিকতর নিরাপদ যৌন জীবনের আলাপ চালু ছিল। এই তালিকায় ইরান থাকবে, সাবেক লিবিয়া থাকতো, কিংবা ইরাকও। কারো কারো মন খারাপ হলেও তালিবানশাসিত আফগানিস্তানও থাকতে পারত। লিঙ্গীয় বৈষম্যের সঙ্গে যৌন নিরাপত্তার প্রশ্ন যে জড়িত তা একদম সাধারণ বোধবুদ্ধির আলাপ। কিন্তু লিঙ্গীয় বৃহত্তর বৈষম্যের মধ্যেও কিছু রাষ্ট্রে নারীর যৌন নিরাপত্তার অধিকতর প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার সঙ্গে নারীবাদের বিবিধ স্পন্দনকে মেলানোর চেষ্টা যারা করে চলেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই করতে থাকবেন। কিন্তু ওই তৎপরতাগুলোর পাশাপাশি এই মুহূর্তের রাষ্ট্রতে এই মুহূর্তের বিচারিক ব্যবস্থায় যৌনহামলা ও হয়রানিগুলোর বিচার চাইতে থাকার দরকার পড়বে। অনেকটা ন্যাশনাল আইডি বা এসএসসির ফর্ম পূরণের মতো নৈমিত্তিক কর্মসূচি হিসাবে।
১৯. দণ্ডমূলক বিচার ব্যবস্থার বিপরীতে রেস্টোরেটিভ বা পুনর্গঠনমূলক ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কথা আমরা শুনতে পাই। এই ধারণাটি সম্পর্কে কিছু বলবেন…। কিভাবে এটি গড়ে উঠতে পারে?
মানস: খুব অপ্রাসঙ্গিক না শোনালে বলব জনপদীয় সালিশ ব্যবস্থা কিংবা ভারতে যাকে গ্রাম পঞ্চায়েত বলা হয়ে আসছে, সেগুলোর ধারণায়ন কিন্তু এইরকম সমন্বয়মূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক, কিছুটা মোটাদাগে বললে। এটা গড়ে উঠতে পারে যেখানে শক্তিশালী সমাজব্যবস্থা বা ইংরাজিতে বললে কম্যুনিটি আছে। আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে এই অনুবাদগুলো একদম নাট আর বল্টুর মতো মাপ করে করে হয়নি। বাংলায় দেশ বা সমাজ প্রায়ই ইংরাজি সনাতনী কম্যুনিটির কাছাকাছি। অন্যদিকে, আমরা লাগাতার সামাজিক অনুশাসনের নিন্দা করছি। অন্তত আমাকে সমাজের একজন অনুগত প্রজা হিসাবে ভাবার বিশেষ কোনো ঐতিহ্য নাই। আমার মনে হয় না, আপনারাও সেই দলে পড়বেন। যেখানে সারাক্ষণ সমাজের কঠোর নৈতিকতাধর্মি বলবানপক্ষীয় বজ্জাতিগুলোর আমরা নিন্দুক, সেখানে ‘শক্তিশালী’ সমাজের প্রস্তাব করার মাথামুণ্ড পাওয়া শ্রোতার জন্য দুরূহ। ফলে এইসব আলাপকে একদম নির্দিষ্ট পরিপ্রেক্ষিতেই কেবল কিছুটা অর্থবহ করে বলা সম্ভব। সমাজ বা কম্যুনিটি বলতে তাহলে সেই অংশের কথা বলা হচ্ছে যেখানে গণতন্ত্র অধিক সুলভ; যেটা গুণগতভাবে ম্যানিপুলেটিভ নয়। আবার অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্রের অনেকগুলোতে কম্যুনিটি পুনর্গঠিত হয়েছে একটা ধারাবাহিক বিন্যস্ত প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। আরো নিশ্চিত করে বললে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, নরম আমলাতন্ত্র দিয়েই জনপদগুলোর কম্যুনিটিরূপ তৈরি করা হচ্ছে; ঠিক ঈশ্বরের ‘প্রাকৃতিক পল্লী’ এগুলো নয়। এসব প্রচেষ্টায় সেসব রাষ্ট্রে বৃহদায়তন শহর কিংবা শিল্পনগরগুলোকে না পারলেও অপেক্ষাকৃত অল্পব্যস্ত লোকালয়গুলোকে ‘কম্যুনিটি’ বানিয়ে ফেলতে পেরেছে; কিংবা সেরকম একটা সন্তোষময়তা আছে।
শিল্পী: ক্রিস্টিনা কোয়ার্লস
যদি ভাবতেই হয় যে, পুনর্গঠনমূলক বা সঞ্জীবনী বিচারব্যবস্থা বলে কিছু একটা আমরা ভাবতে পারি, সেটা ন্যায়বিচার হোক বা নাহোক অহিংস বিচারব্যবস্থা হওয়া সম্ভব, বা অন্তত কম–হিংস্র। তবে গোড়াতেই স্পষ্ট করার দরকার যে, অন্তত বুর্জোয়া অর্থেও যাকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বলে সেসবের নিশ্চয়তা হচ্ছে এইরকম শাস্তিব্যবস্থা (বা আপনি বলছিলেন বিচারব্যবস্থা) গড়ে তোলার একদম প্রথম দিকের শর্ত। উপরন্তু, দুর্নীতি বলতে মোটামুটি যাকে চেনা হচ্ছে, এবং যেগুলো দুঃখজনকভাবে দক্ষিণের সমাজে ঐতিহাসিকভাবেই বেশি, সেগুলোও এই ধরনের সৃজনশীল বিচারব্যবস্থাকে দাঁড়াতে দেবে না। তবে এই ধরনের বিচারব্যবস্থার সমর্থকদের একটা অংশ মনুষ্য–মহত্ত্বের উপর অনেক আস্থা রেখে ব্যবস্থাটাকে কল্পনা করেন। আমার মনুষ্য–মহত্ত্ব বা মনুষ্য–ক্রূরতা নিয়ে আলাদা করে কোনো আস্থা বা হতাশা নেই। এসব মিলেমিশে মনুষ্যচরিত্র গঠিত। পাহারাদারিত্বে আমার তীব্র আপত্তি হলেও, আমি মনে করি না যে মনুষ্য–ক্রূরতা কেবল জগাই–মাধাই কোলাকুলিতে পানি হয়ে যাবে। বরং, একটা সামাজিক/কম্যুনিটি পাহারাদারিত্ব থাকবে বলেই আক্রান্ত ও আক্রমণকারী একত্রে একটা পরিসরে গাঠনিক ভূমিকা নিতে পারবেন। এখন ওই কম্যুনিটির ‘শাসনপ্রণালী’ মৃদু বা কোমল হতে পারে, এর প্রজা ও প্রশাসকের সম্পর্ক হাস্যরসের হতে পারে, কিন্তু ব্যবস্থাটির মাজার জোর প্রগাঢ় না হলে কিছুতেই দুই পক্ষের সংমিশ্রণে ‘সম্ভ্রম’ উৎপন্ন করা সম্ভব নয়। এটা একটা গাঢ় ব্যবস্থাপনাগত বিচারব্যবস্থা হিসাবে আমি দেখি। অন্তত এই মুহূর্তে আমাদের এদিকে এই ধরনের দূরবর্তী কোনো কল্পনার জন্যও সবই অপ্রস্তুত – রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা, জনসমাজ।
মানস:বর্গমূলক পরিচয় অত্যন্ত বিপজ্জনক ও পিচ্ছিল, সেটা মানুষের বেলায় যেমন, প্রবণতার বেলাতেও। ‘নারীবাদী’ কে কিংবা ‘রাজনৈতিক’ কী এই ধরনের প্রশ্নগুলোতে হাজার লোকের প্রায় হাজারখানেক উত্তর বা আউটলেট থাকতে পারে। আজকে আমরা আলাপ চালানোর স্বার্থে উভয়পক্ষই কিছু লক্ষণ থেকে নারীবাদী বর্গকে আন্দাজ করে নিয়েছি। তবে যাবতীয় ক্ষমতা–সংঘাতকে রাজনৈতিক না–ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এখানে অবশ্যই নানান ধরনের উত্তরকাঠামোবাদী জিজ্ঞাসার বিপদ যে আছে তা তো আমরা জানিই। ‘সবকিছু রাজনৈতিক, মানে কোনোকিছুরই তাহলে আর বিশেষত্ব নাই’! এরকম একটা বিপদ থাকেই। নারী আন্দোলন তার থেকে ব্যাপকতর প্রসঙ্গ। একে রাজনৈতিক দেখতে না–পারা আসলে অজ্ঞতামূলক নয়, প্রতিপক্ষতামূলক। এখানে আমি এই বিষয়টা স্পষ্ট করতে চাই, আশা করি কোনো আলাপের পুনরাবর্তন হচ্ছে না, আমি সংঘর্ষ বুঝবার ক্ষেত্রে চারপাশের বিদ্বান ও রাজনীতিকর্মীদের লাগাতার জ্ঞানের ঘাড়ে চড়ার ঘোরতর বিরোধী। এমনকি বিরক্ত। ‘মানুষ অজ্ঞ, তাই উহা করিছে’ – এইটা কিছু ব্যতিক্রম বাদে আগাপাছতলা একটা ভুল থিসিস। ‘মানুষ উহা করিছে, কারণ তাই তিনি চান’! ফলে জ্ঞানের ‘আলো’ দিয়ে সংঘর্ষের প্রাথমিক ক্ষেত্রগুলো যাঁরা সারাই করতে চান তাঁদেরকে আমি দূর থেকে সালাম জানাই, এবং দূর থেকেই জানাই। ইন্টেন্ট বা নিয়ত বদলের কার্যক্রম ভিন্ন হবে। আমার না–জানা থাকতে পারে, পরিশেষে আমি একজন মাস্টারির চাকুরিজীবী মাত্র, কিন্তু সেটা ‘জ্ঞানের–আলো’ কার্যক্রম নয় তা বুঝি।
একটা প্রশ্নে এফারমেটিভ একশনের আলাপ চলছিল। সমাজে বৈষম্য থাকলে সেগুলোকে সামলানোর একটা আধুনিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এটি। কিন্তু আপনি যে বাস্তবতাটার কথা বললেন সেটা সর্বৈব ভিন্ন একটা পরিস্থিতি। অনেকটা কৃষকদের সমবায় সমিতি আর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মধ্যকার তুলনার মতো। বিগত বছরগুলোতে সারা পৃথিবীর নারীবাদীদের মধ্যেই এই সতর্কতাটা তৈরি হয়েছে যে সাম্রাজ্যবাদ, বহুজাতিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ, সমরতন্ত্র ইত্যাদির গুরুতর সমর্থক নারীবাদী স্বর ময়দানে আছে। আরো স্পষ্টভাবে তাকালে, এমনকি তার আগেই কড়া জাতীয়তাবাদ কিংবা পুঁজিবাদের সমর্থক নারীবাদী স্বর বিরাজমান ছিল। এই ধরনের আধিপত্যমূলক নারীবাদকে চাইলে রাগ করে আমরা সিউডো বা ভ্রান্ত নারীবাদ নামে ডাকতেই পারি। কিন্তু তাতে সমস্যা গুরুতরভাবে কমছে না, কারণ সেসব স্বর নিজস্ব দাবিনামা থেকে সরছেন না। বরং, নানাবিধ বৈষম্য নিয়ে চিন্তা করছেন এমন নারীবাদীরা যে সতর্ক হয়েছেন সেটার দিকে আশা নিয়ে তাকানো কাজের বলে আমি মনে করি। ‘সাম্রাজ্যবাদী নারীবাদ’ ঠিক বিদ্যাগত একটা বর্গ হিসাবে না প্রতিষ্ঠা পেলেও পলেমিকের দুনিয়ায় কমবেশি আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্টের হামলার সময় থেকেই গ্রাহ্য হয়ে আসছে। একটা মুখ্য কারণ হলো আমেরিকার হামলা করবার নানান রকমের সাফাই–গাওয়া পক্ষ দেখা দিয়েছিল যাঁরা তালিবান শাসনে নারীদের দুরাবস্থার চিত্র হাজির করেছেন। বাহ্যত, তাতে মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড নারীদের দুরাবস্থা থেকে ‘মুক্ত’ করার ‘স্যালভেশন মিশন’ হিসাবে চিত্রিত হতে পেরেছে। সকলেরই মনে পড়বে যে এই কাজটা নিছক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক নারীদের ছিল না, এমনকি সাধারণভাবে পাশ্চাত্যীয় নারীদেরও নয়, এটা আমাদের চারপাশে বহু নারী–অধিকার বিষয়ে সরবরাও করেছেন। এখন নিজের মনকে আপনি যেভাবেই বুঝ দেন না কেন যে এঁরা ‘প্রকৃত’ নারীবাদী নন, তাতে ওই মতপ্রকাশক বা সংগঠকের আগের বছরগুলোর নারীবাদী পরিচয়ের লিগ্যাসি সরানো সম্ভব নয়। এটা প্রচলিত বামপন্থীদের অনেকের বেলাতেও সত্য। তাঁদের অনেকেই তালিবানবিদ্বেষে আটকা পড়ে মার্কিন সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বরের সঠিক তীব্রতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না; কিংবা ‘যদিও–তথাপি’ দিয়ে সাজাচ্ছিলেন।
এই মুহূর্তের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক কঠিন, বিপজ্জনক এবং পিচ্ছিল। বৈশ্বিক পুরুষাধিপত্যের কাঠামো নিবিড়ভাবে নিও–লিবেরেল মতাদর্শকে আশ্রয় করেছে যেমন, নারীবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও করেছেন। ব্যক্তিসমূহের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখানে সুতীব্র, আর এক্সেলেন্সের ধারণাকে অধিকারের ধারণার উপর চড়াও হতে দেয়া হচ্ছে। সেই লজিকের গ্রাহক ও বেনেফিশিয়ারি দুই ভাবেই নারী আবির্ভূত হচ্ছেন। তবে এগুলো অন্তর্প্রবিষ্ট পরিক্ষেত্র বা ওভারল্যাপিং কন্টেস্টিং জোন। বিদ্যাজগতের ও রাজনীতি জগতে মোটামুটি নিও–লিবেরেল অভিধাটি যেহেতু পরিচিত, বোঝাবুঝিতেও তেমন সমস্যা হবে না। ক্রিটিক্যাল কিংবা সমাজতন্ত্রী কিংবা র্যাডিক্যাল কিংবা দক্ষিণের নারীবাদীদের পক্ষে আসলে অগ্রাহ্য/উপেক্ষা করতে থাকাই কাজ। সমতার জন্য লড়াইয়ে আছেন যাঁরা তাঁদের নানান কিছু ডিজওউন করতে থাকার অভ্যাস আছে। কেবল নামটা কম্যুনিস্ট পার্টি বলেই তো আর নিশ্চয়ই নিখিল বিশ্বের শ্রমিকপক্ষীয়রা চীনের পার্টিটাকে নিজপক্ষীয় মনে করতে থাকেন না।
মানস:সাইবার পরিমণ্ডল প্রসঙ্গে ভাবতে গিয়ে আমি নারীবাদী বা সম্ভাব্য নারীবাদী নড়াচড়াগুলোকে আলাদা করে কোনো দায় দেবার পক্ষে নই। একটা প্রশ্নের উত্তরে আমি বলছিলাম সাইবার পরিমণ্ডলকে দেখতে হবে নিরন্তর ভাষা ও ভঙ্গি উৎপাদনের একটা উৎপাদনক্ষেত্র হিসাবে। প্রাক–সাইবার কালে ভাষা, তাই বার্তা, তাই অভিব্যক্তি, প্রকাশের জন্য সকলেরই যথেষ্ট সাংগঠনিক প্রস্তুতি লাগত। এখানে আমি সংগঠনের প্রচলিত অর্থে বলিনি, বলেছি কোনো একজন ব্যক্তির চিন্তার সংগঠন বা সংবদ্ধতার কথা বলছি। আট জন সখাসখীর একটা দল নিছক ক্যাম্পাসের মাঠে চা–খাবার কালেও যদি একজন কিছু একটা বলতে চান অন্য অন্তত ছয়জনের নৈঃশব্দ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় তাঁকে। হাত–পা নাড়িয়ে তাঁদেরকে থামাতে চাইবেন আপনি, আপনার কথাটুকু বলার জন্য। মুদ্রিত মতামত বা অভিব্যক্তির বিষয়ে তো আরো সব পদক্ষেপ নিতে হতো। একটা পোস্টকার্ড কাউকে লিখে পাঠানোর আগেও আপনার কতগুলো ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। তার মানে যেকোনো মানুষেরই অভিব্যক্তি প্রকাশের অনেকগুলো পর্যালোকীয় বা সম্পাদকীয় পর্যায় থাকতো। এটা ইচ্ছাসাপেক্ষ কোনো পরিস্থিতি নয়। সাইবার পরিমণ্ডলে রচয়িতা তাঁর সকল অভিব্যক্তিরই তাৎক্ষণিক সম্প্রচারের সুযোগ পান, তার পাঠক যতজনই হোন না কেন। অভিব্যক্তি প্রকাশের সম্পাদকীয় পর্যালোচনাহীন এই তাৎক্ষণিকতার বিষয়ে আমি সতর্ক থাকতে চাইব। ফলে নারীবাদীদের কারো কারো অভিব্যক্তিই কেবল নয় জাতীয়তাবাদী, পুঁজিবাদী, পিতৃতন্ত্রবাদী, নারীবিদ্বেষী, অন্যজাতিবিদ্বেষী কিংবা বামপন্থী সকলেরই উত্তুঙ্গ–উত্তেজিত অভিব্যক্তি প্রকাশিত হতে থাকে।
আমার সাক্ষাৎকারটি আপনি লক্ষ্য করেছেন বলে ধন্যবাদ জানাই। তবে একটা আলাপের মধ্য থেকে একটা শিরোনাম আলাদা করে পড়তে অত স্বস্তিকর লাগছে না। আমার সামান্য ওই আলাপটার ভিতরে লক্ষ্য করবেন যে আমি ‘নৈতিকতার শাসন’ জারি রাখার প্রবণতা নিয়ে বেশি দুর্ভাবিত ছিলাম। এখনও তাই আছি। অনলাইন জগতের তৎপরতাতে নারীবাদী প্রবণতাগুলো কেবল যে ক্ষতিই করেছে তা আমি মনে করি না অবশ্য, যেটা আগেও বলেছি। নানান রকমের আপত্তির কারণে পুরুষদের একাংশ নানাবিধ অভিব্যক্তি প্রকাশে সতর্ক হয়েছেন, সংযমী হয়েছেন। সেগুলো অবশ্যই লাভ, তাতে পেটের মধ্যে যার যাই থাকুক না কেন। কিন্তু সত্যি সত্যিই আমি অনলাইনের হৈচৈমূলক নানান নড়াচড়াতে অতটা বিচলিত নই। আচরণবিধি একটা নিরন্তর অনুশীলনসাপেক্ষ বিষয়; এমনকি দরকার মতো নির্দেশনারও (যাকে চাইলে বুর্জোয়া সমাজের কারেকটিভ মেজার বলতে পারেন)। ধরুন একটা খেলার ময়দানে আপনি–আমি গেছি একটা দলকে সমর্থন করতে। যতক্ষণ নাচানাচি, পটকা ফোটানো, ঢোলবাজানো ছিল আমাদের হয়তো সমস্যা হয়নি; কিন্তু একটা পর্যায়ে আমাদের সহ–সমর্থকেরা ব্যাপক পিটানি দিতে শুরু করলেন প্রতিপক্ষকে। এই পর্যায়ে আপনি–আমি ব্যথিত হতে পারি তাঁদের আচরণে, কিন্তু ওই দলটিকে সমর্থন করার কারণে আপনার আমার আলাদা করে বিচলিত হবার দরকার পড়ে না। ওই পিটানিওয়ালাদের নিজপক্ষীয় ভেবে পদ্ধতিগত সমস্যাতেও পড়ার দরকার নেই। এখন মনে হতে পারে, যে খেলার উদাহরণ লঘু হয়ে গেল। কিন্তু আমি তা মনে করি না; বিভিন্ন মতের পক্ষাবলম্বনকারীরা ধারাবাহিক ও অটুট সব বৈশিষ্ট্যের মানুষ ধরে নেবার সমস্যা সেটা। চূড়ান্ত বিচারে আদর্শবাদের সমস্যা। আমি বিবিধ রাজনৈতিক পক্ষকে আদর্শমানসিদ্ধ অটুট পক্ষ হিসাবে দেখি না। ফলে এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া যে কোন কোন বিষয়ে আমি–আপনি দূরত্ব বোধ করছি; দরকার মতো ঘোষণা করছি। যদি সংশ্লেষ/সংশ্লেষণ পদ্ধতিগত হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্লেষ/বিযোজনও তাই। এটার ধ্রুব এবং প্রসঙ্গ–নিরপেক্ষ কোনো দশা নেই। স্পষ্ট করি যে, আমার বক্তব্য এই নয় যে সাইবারের অনেক নারীবাদী দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি করছেন না, আমার বক্তব্য হলো নতুন অভিব্যক্তি–পাটাতনে নতুন নতুন ক্ষয়ক্ষতি হবে এবং সেগুলো নেতিকরণের রাস্তা বের করাও একটা কাজ অন্যদের। সাইবারের অভিব্যক্তির ইনফ্লেশনের দুইটা সুবিধা মাথায় রাখা খুবই কাজের হবে। প্রথমত, এখানে বানের পানির মতো চলমান ভাষামালায় কোনো কিছু স্থির–অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ পায় না। দ্বিতীয়ত, একটা বিশেষ সময়ে কত রকমের বিদ্বেষ ও চিন্তাকল্প/প্রিমাইজ ক্রিয়াশীল আছে চারপাশের সমাজে তা আপনি অল্প আয়াসে সাইবার পরিমণ্ডল থেকে জেনে যেতে পারছেন।
মানস:দুর্দান্ত পর্যবেক্ষণ। ট্রানজিশন বা রূপান্তরশীলতার ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটার অপেক্ষাকৃত সহজ উদাহরণ সম্ভবত মধ্যবিত্ত নারীদের পোশাক–বাছাই আর গৃহিণী–জীবন নিয়ে পাওয়া যায়। ডিজায়ার্ড/কাঙ্ক্ষিত জীবন চিনতে ‘শেখেননি’ যে বর্গ, সেই বর্গ বরং তুলনামূলকভাবে সাদরে গৃহীত হন। অন্তত এই কারণেও যে তাঁদের চিনানির দায়িত্বটা তখন আঁভাগাদে বা ‘অগ্রসর’রা নিতে পারেন। সমস্যাটা বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বেশি সেসব মধ্যবিত্ত নারীদের যাঁরা সম্প্রচারিত-‘কাঙ্ক্ষিত’ জীবনযাপনটা চিনেছেন এবং সেটা অবলম্বন না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থেকেছেন। মোটের উপর তাঁদের অভিজ্ঞতা ‘এবিউজিভ’ বা জবরদস্তির আচরণ সামলানো। এর মধ্যে একটা বর্গকে না–বিবেচনা করার সুযোগ নেই যে বর্গের মধ্যবিত্ত–শিক্ষিত নারীরা আকাঙ্ক্ষিত জীবনাচরণ চিনেছেন, তা পালন করতে চান, কিন্তু পরিপার্শ্বের পৌরুষময় ব্যবস্থা তা পালন করতে বাধা দেন তাঁদের। এই বর্গের জন্যও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা প্রকাশ্য নারীবাদীরা নিতে পারেন, নিয়ে থাকছেন। আর এটা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেইও। কিন্তু অন্য যাঁদের কথা ভাবলাম তাঁরা আসলেই একটা টানাহেঁচড়ার মধ্যে থাকেন – একপক্ষের জন্য শেখার টানাহেঁচড়া, আরেক পক্ষের জন্য বদলানোর টানাহেঁচড়া।
অন্যকে তালিম দেয়া বা রূপান্তরের এই আচরণগুলোর বা হৈচৈগুলোর ক্ষমতাদর্পিতা বা বুলিইং দেখতে পাওয়াটা সাধারণ বুদ্ধির বিষয়। আমি বরং আলাপ করি আচরণগুলো তৈরি হবার চিন্তাপাটাতন বা প্রিমাইজ নিয়ে। আমার বিবেচনায় কমবেশি প্রগতিবাদিতার স্থূল মডেলকে আত্মসাৎ করা থেকে এইসব আচরণ আসে। আরো নির্দিষ্টে আসে ধর্মকে পিতৃতন্ত্রের নিরঙ্কুশ কারণ হিসাবে দেখার মাধ্যমে। প্রধান ধর্মগুলোর চর্চিত ফর্মগুলো পিতৃতন্ত্রের আকর। এটা নিয়ে এই মুহূর্তে বিশদ করার কিছু দেখি না। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের মুখ্য বা একমাত্র রূপকার ধর্মকে ভাবা বাস্তবানুগ নয়। এমনকি এভাবে ভাবা পিতৃতন্ত্রকে দীর্ঘকালীন মোকাবিলার রাস্তা বের করতে অন্তরায় করবে মাত্র। মাস্টারি করি বলে প্রগতিবাদিতার স্থূল মডেলের কিছু উদাহরণ একদম সহজেই ক্লাসে পাওয়া যায়। বহুবছর ক্যাম্পাসে ‘স্মার্ট বনাম খ্যাত’ মাপামাপির একটা চল আছে। এখানে স্মার্টবর্গ অবধারিতভাবে আরবান–মিডলক্লাস, প্রায়শই হালের সাহিত্য–ছায়াছবির খোঁজ রাখা, ইংরাজি জানা, এবং অবশ্যই পোশাকে নির্দিষ্ট ফর্ম বা ব্র্যান্ডসচেতন। ‘খ্যাত’বর্গ এর বিপরীতগুলো। হালের সাংস্কৃতিক প্রডাকশন নিয়ে অজ্ঞ, ইংরাজি না–জানা বা কম–জানা ইত্যাদি। মোটের উপর ‘শহুরে–গ্রাম্য’ যে জোড়টা সাহিত্যে–চলচ্চিত্রে সুলভ সেটারই একটা সংস্করণ। এই বিভাজন কিন্তু কমবেশি লিঙ্গনিরপেক্ষ (ছিল)। এখন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (বা তার মধ্যকার বনেদীগুলোর) একটা স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক–পরিচয় তৈরি হবার কারণে, এবং অন্যান্য কারণেও, পাবলিক ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যকার এই বিভাজন অতটা তীক্ষ্ণ নয়। অন্তত আমি দেখি না। বিশেষত পোশাক–প্রবণতা বা ফ্যাশনের একটা অবধারিত বৈশ্বিক রূপান্তর ঘটেছে সাইবার–বিকাশে আর গার্মেন্টশিল্পের কারণে। এখন একজন আর্থিকভাবে টানাপড়েনে থাকা শিক্ষার্থীও একটা টি–শার্ট পরার ‘স্মার্টনেস’ দেখাতে পারেন। কিন্তু, যেসব পোশাক ধর্মীয় কোড বহন করে বলে ভাবা হয়, সেসব পোশাকধারীরা লাগাতার চাপের মধ্যে থাকেন। এবং দশাটা অতটা লিঙ্গনিরপেক্ষও নয়। মোটের উপর নারীদের চাপটা গুরুত্বপূর্ণভাবে বেশি। সহপাঠী বা ক্যাম্পাসবাসীদের চাপ তো আছেই, অধ্যাপকদের একাংশও ঠাট্টাতামাশা যে করেন তার অজস্র ঘটনা আছে, হয়তো প্রামাণ্য নেই। এখন কেউ উল্টাদৃশ্যের কথা বলতে পারেন যেখানে ‘পাশ্চাত্যীয়’ পোশাকধারী নারীর ভোগান্তিও আছে। আমি সেটাকে খাট করার জায়গায় নেই। কিন্তু প্রগতিবাদিতার এই আলাপে ওই ঘটনাগুলো অধিক প্রাসঙ্গিক যেখানে হিজাবী কিংবা সম্পূর্ণ শরীরঢাকা পোশাকধারীকে সাব্যস্ত করা হচ্ছে ‘অনগ্রসর’ (তাই মেরামতসাপেক্ষ) হিসাবে।‘
শিক্ষিত নারীদের নিজেচ্ছাতে অচাকুরিজীবী গৃহিণী থাকা কিংবা শ্বশুরকুলের শাসনব্যবস্থায় থাকা কিংবা অবগুণ্ঠনে থাকার সুবন্দোবস্ত নাই। মানে এই থাকাথাকি তাঁর পক্ষে ‘বন্ধুবান্ধব’ (পিয়ারগ্রুপ) থেকে ব্যাপক চাপের হবে। বিপজ্জনক হচ্ছে যে নারীবাদীদের কেউ কেউও চাপটা দিয়ে বসতে পারেন। সঙ্কটটা আপনার প্রশ্নেই দিকনির্দেশ করে। এটা জীবনযাপনের আদর্শমান (স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইল কিংবা আপনার ভাষায় কাঙ্ক্ষিত জীবন) বলবৎ রাখার আধিপত্য। এগুলো সূক্ষ্মভাবে অজস্র বিষয়ে ক্রিয়াশীল থাকে, নারীবাদী তৎপরতাতেও আছে মাত্র। আপনার পরিবারের কোনো বিপদের মধ্যে আপনি শান্তভাবে কাজকর্ম করলেও আপনার ‘সংবেদনহীনতা’র অভিযোগ নিতে হতে পারে, আর পাঁচজন বিলাপরতদের সমরূপ আচরণ করার টানাহেঁচড়া চলতে পারে।
মানস: ‘যৌন স্বাধীনতা’ আর অনুশাসন যে সম্পর্কিত ধারণা তা একদম গোড়াতেই কবুল করে বলছি। স্বাধীনতার প্রসঙ্গ গুণগতভাবেই শাসনের প্রসঙ্গের সাথে সম্পর্কিত সেই অর্থে। আমি গোড়াতেই সতর্ক করতে চাইব যে ‘যৌন স্বাধীনতা’ বলতে লোকে অভিন্ন জিনিস বোঝেন না, এবং সম্ভবত সাংঘর্ষিক জিনিসপত্রও বোঝেন। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেব যে পাশাপাশি কয়েকটা ভাষামালা আছে যেগুলোর ভারে বা অর্থময়তার মধ্যে এই ধারণাটাও জুড়ে যায়। যেমন: ‘অবাধ যৌনাচার’, ‘ফ্রি–সেক্স’, ‘যত্রতত্র বা যার তার সাথে’, ‘বাছবিচার নাই’, ‘পশুর সাথে পার্থক্য নাই’, ‘অজাচার’, ‘লুজ’, ‘চরিত্রের ঠিক নাই’ ইত্যাদি। এরকম আরো দীর্ঘ তালিকা বানানো সম্ভব; আর এগুলো, ভাষানির্দিষ্ট অর্থ রাখলেও, মোটামুটি বৈশ্বিক। আপনি যে ভাবনা মাথায় রেখেই ‘যৌন স্বাধীনতা’ শব্দমালা প্রয়োগ করেন না কেন, যেসব ডিসকার্সিভ পরিমণ্ডলে তার অর্থ নির্ধারিত হবে সেগুলো সমূহ ঘোরালো–প্যাঁচালো এবং নৈতিকতার ধ্বজাধারী। এর প্রথম মানেই দাঁড়ায় বহুগামিতা। ফলে খুবই মুস্কিলের প্রসঙ্গ।
অন্যদিকে, ‘প্রেসের স্বাধীনতা’র মতোই, এটা একটা অতিকথন বা মিথও। যেসব রাষ্ট্রসমাজে যৌন স্বাধীনতা আছে বলে ধরে নেয়া হয় সেখানেও নানান মাত্রার ও প্রকারের অনুশাসনের পদ্ধতি চালু আছে, যদি, অবশ্যই, অনুশাসনকে স্বাধীনতার বিপরীত ধরে নিই। আপনার প্রশ্নেও সেটাই আছে। কাজ চালানোর জন্য অনুশাসনের অর্থ করছি নানাবিধ নৈতিকতাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধিনিষেধ। একটা উদাহরণ মনে পড়ল। ২০০৪–এ দিকে জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা ফাতিহ্ আকিন তুর্কী–জার্মান–ইংরাজি ভাষার একটা ছবি বানান, ইংরাজিতে যার নাম হেড–অন। ছবির মুখ্য চরিত্রে নেয়া হয়েছিল সিবেল কেকিলি নামের তুর্কী–জার্মান এক অভিনেত্রীকে। ছবিটি জনপ্রিয় হয়, আবার চিন্তকদের মনোযোগও পেয়েছিল। ছবিটা বেশ কিছু পুরস্কারও পায় গোল্ডেন গ্লোবসমেত। কিন্তু সিবেক কেকিলিকে এই ছবিতে নেবার কারণে জার্মান মধ্যবিত্ত আলাপ–আলোচনায় নির্মাতা অত্যন্ত নিন্দিত হন। কারণ সিবেল পর্নছবিতে কাজ করতেন এই ছবির আগে পর্যন্ত। আমি এই ঘটনা টাটকা জেনেছিলাম জার্মান এক বন্ধুনির কাছ থেকে যিনি এই ছবিতে আলোকচিত্রীদের একজন হিসাবে কাজ করেছেন। ফাতিহ্ আকিন ও নির্মাতাদলের নিন্দিত হবার মাধ্যমে অনুশাসনের বিষয়ে পাশ্চাত্যীয় সমাজের পরিস্থিতি বোঝার বিরাট সুযোগ তৈরি হয় আমাদের। জার্মানিতে পর্ন কারখানা আইনসিদ্ধ, ফলে সেবিলের নিয়োগ আইনগত কোনো সমস্যা ছিল না; ছিল নৈতিকতার আপত্তির বিষয়। বেশ আয়রনিক যে, এর কয়েক বছর পরে, ‘রক্ষণশীল’ বলে পরিচিত ভারতে আরেক পর্নতারকা সানি লিওন অপেক্ষাকৃত সহজে মধ্যবিত্ত মননে ‘গৃহীত’ হয়েছেন। লক্ষ্য রাখতে অনুরোধ করি, পর্ন–কারখানা বিষয়ে পক্ষ–বিপক্ষের আলাপের জন্য এই উদাহরণ আমি আনিনি। আমার বলার জায়গা, যৌন–স্বাধীনতা কিংবা যৌন–অনুশাসনের যে আন্দাজগুলো চালু আছে তা প্রায়শই ত্রুটিপূর্ণ। সম্ভবত আপনার, বা অনেকেরই, দুর্ভাবনার জায়গা হতে পারে কোথায় অনুশাসন নিছক নিন্দামন্দেই সীমিত, কোথায় তা হিংস্রতায় মদদ দিতে পারে।
আপনার প্রশ্নের শেষাংশটি বরং আমি খানিকটা অভিমানাত্মক মনে করি। হয়তো এটা বিরক্তির মরিয়াপনা থেকে এসেছে। কিন্তু ‘জৈবিক’ বিষয় কেন অনুশাসনে পড়বে এই জিজ্ঞাসা আমার জন্য নিরর্থক। প্রথমত, যৌনতাকে জৈবিক–মাত্র বলার বিপদ নতুন করে বাধানোর কোনো কারণ নেই। নারীবাদীরা বছরের পর বছর লিঙ্গকে সমাজ–সংস্কৃতির প্রসঙ্গ হিসাবে দেখিয়ে এসেছেন। যৌনাচরণও নিছক ‘জৈবিক’ নয়। দ্বিতীয়ত, যদি ‘জৈবিক’ ধরেও আমরা আগাতে চাই, তাহলেও অন্তত কয়েক শ’ বছর ধরে শ্রমিকদের বড় অংশের বিশ্রামহীনতা নিয়ে আগে ‘অভিমান’ করা দরকার। ঠিক আমরা যখন এই আলাপ লিখছি, পৃথিবীর পেটের মধ্যে কোটি কোটি খনিশ্রমিক দিনরাত্র অন্ধকারে ‘সম্পদ আহরণ’ করছেন। অন্য আরো কোটি কোটি শ্রমিক ভূতলে থাকলেও ন্যায্য মজুরি বা বিশ্রাম কোনোটাই পাচ্ছেন না, যেখানে ‘ন্যায্য’কে বড়জোর বুর্জোয়া ব্যবস্থার ন্যায্য বোঝাচ্ছি। খাদ্য বা বিশ্রামকে বরং ‘জৈবিক’ হিসাবে দেখা দরকার; আর সেখানে চলে কঠোর ধরনের শোষণ, অনুশাসনের থেকে যা নিশ্চয়ই তীব্র। যাহোক, অবশ্যই আমি সরল সমাধান জানি না। আর কেবল আমি নই, গাঢ় সব চিন্তকেরা, তীক্ষ্ণ নারীবাদীরাও রাস্তা বা উত্তর খুঁজছেন। কিন্তু যৌনতার বিষয়ে তামাম দুনিয়াতেই মারাত্মক লজ্জাশরমের যে কাঠামোটা আছে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন হতে পারে, সেই কাঠামোটার সঙ্গে বোঝাপড়া করা দরকার। অন্তত যেসব এলাকায় শারীরিক আক্রমণমূলক হিংস্রতার মুখোমুখি হবার সম্ভাবনা কম, কেবল কলঙ্ক হবে, সেসব এলাকায় যৌনশুচিতার চাপ বহন না করার ঘোষণা আসা দরকার। ঝুঁকি সত্ত্বেও, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যৌনশুচিতার চাপ নারীর জন্য স্বতন্ত্র হতে পারে, কিন্তু চাপমুক্তির ঘোষণাটা নারীপুরুষসমেত সকল লিঙ্গের যৌথ পাটাতন হওয়া দরকার। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, এমনকি নারীবাদীদের মধ্যেও যৌনশুচিতার বা পিউরিটির গুরুতর সব প্রবক্তা রয়েছেন, বা তার আলামত আছে। সবই অত্যন্ত ওভারল্যাপিং পরিস্থিতি।