Category: তত্ত্ব

  • মিখাইল বাকুনিন।। আন্তর্জাতিকের সংগঠন

    মিখাইল বাকুনিন।। আন্তর্জাতিকের সংগঠন

    অনুবাদ : খোইরোম রুধির

    জনগণই সামাজিক শক্তি, বা অন্তত সেই শক্তির সারসত্তা। কিন্তু সেই জঘন্য শর্তগুলো যা তাদের নিপীড়ন-নিগ্রহ করে তা থেকে মুক্তির জন্য তাদের দুটো জিনিসের কমতি আছে— শিক্ষা ও সংগঠন। এই দুটো জিনিসই বর্তমানে সকল সরকারের ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি।

    মিখাইল বাকুনিন

    রাষ্ট্রের সামরিক ও শাসন ক্ষমতার বিলুপ্তি ঘটাতে প্রলেতারিয়েতদের অবশ্যই সংগঠিত হতে হবে। কিন্তু যেহেতু জ্ঞান ব্যতীত সংগঠনের অস্তিত্ব থাকে না সেহেতু জনসাধারণের মধ্যে প্রকৃত সামাজিক শিক্ষার বিস্তার জরুরি।

    আন্তর্জাতিকের লক্ষ্যই হচ্ছে এই প্রকৃত সামাজিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো। যেদিন আন্তর্জাতিক ইউরোপের শ্রমীজীবী মানুষের অর্ধেক,এক চতুর্থাংশ কিংবা অন্তত এক দশমাংশকে একত্রিত করতে সক্ষম হবে সেদিন থেকেই রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্রসমূহের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠবে। যেহেতু আন্তর্জাতিকের লক্ষ্য নতুন রাষ্ট্র গঠন নয় বরং বিদ্যমান সকল শাসনব্যবস্থার বিলোপ সাধন, সেহেতু আন্তর্জাতিকের সংগঠন সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সংগঠন থেকে ভিন্ন ধাঁচের হবে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যতই মেকি, বর্বর ও কর্তৃত্বপরায়নণ হবে ততই জনগণের স্বাভাবিক বিকাশ, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উদাসীন ও বিরোধপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিকের সংগঠন হতে হবে আরও বেশি স্বাধীন ও স্বাভাবিক। জনগণের সহজাত প্রবৃত্তি ও আদর্শগুলোকে নিজের মধ্যে ধারণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।

    কিন্তু জনসাধারণের স্বাভাবিক সংগঠন বলতে আমরা কী বুঝাচ্ছি? এর দ্বারা আমরা জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনযাপন ও পেশাবৈচিত্রের অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে গড়ে উঠা সংগঠনকে বুঝাচ্ছি, যেমন জনগণের শিল্প-কারখানাভিত্তিক সংগঠন। জনসাধারণের সংগঠন তখনই পরিপূর্ণভাবে আত্মপ্রকাশ করবে যখন উৎপাদন-শিল্পের সকল শাখার প্রতিনিধিত্ব তৈরি হবে তাদের আন্তর্জাতিকে।

    কিন্তু এটা হয়তো বলা চলে যে, যেহেতু আমরা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিরাজমান রয়েছে, এবং জনসাধারণের উপর আমরা সুসংহত প্রভাব বিস্তার করছি: ফলে পুরাতন রাজনীতিবিদদের সমকক্ষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠাই আসলে আমাদের লক্ষ্য। এমন ধারণা আসলে মস্ত বড় ভুল। জনগণের মাঝে ক্রিয়াশীল যেকোনো প্রকার সরকারি ক্ষমতার সাথে জনসাধারণের উপর আন্তর্জাতিকের প্রভাবের পার্থক্য রয়েছে। কোনোপ্রকার কর্তৃত্ব ছাড়াই, সাধারণ চিন্তাগুলোর স্বাভাবিক, অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ছাড়া এটি আর কিছুই নয়।

    রাষ্ট্র মানেই জনসাধারণের জীবন ও স্বাধীনতার উপর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শ্রেণি ও বিশেষজ্ঞের ভান করা পণ্ডিতদের কর্তৃত্ব, শাসন ও সংগঠিত ক্ষমতার বিস্তার। রাষ্ট্র জনসাধারণের দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই চায় না, আবার একই সঙ্গে তাদের বশ্যতাও দাবি করে।

    অন্যদিকে, জনসাধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন ব্যতীত আন্তর্জাতিকের ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই। যার ফলে এটি বিদ্রোহী সত্তাকে আহ্বান জানায়। রাষ্ট্র ও অগ্রাধিকারী শ্রেণির শাসনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বিদ্রোহী সত্তাকে যথেষ্ট শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে হবে এবং আর এজন্যই আন্তর্জাতিককে সংগঠিত হতে হবে।

    এই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে আন্তর্জাতিককে দুটো মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে-

    ১। আন্তর্জাতিকের চিন্তা-ভাবনাগুলোর প্রচার

    ২। জনগণের মাঝে এর সমর্থকদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এর ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে স্বাভাবিকভাবে সংগঠিত করা।

    প্রথম আন্তর্জাতিকে বাকুনিন

    সংঘবদ্ধ কর্মপন্থাকে যে ব্যক্তি সর্বসাধারণের স্বাধীনতার উপর আঘাত কিংবা নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাঁয়তারা বলে দাবি করে, সেই ব্যক্তি হয় কুতার্কিক নয় নির্বোধ। তাদের জন্য করুণা হয় যারা মানব সংহতির কার্যকারণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় এবং মনে করে যে, সমাজবিচ্ছিন্ন পূর্ণ ব্যক্তি-স্বাধীনতা সম্ভব কিংবা সেটাই কাম্য। এমন পরিস্থিতির মানে হলো সকল মানব সমাজের বিলুপ্তি ঘটা,  কেননা ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যেকার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উপরই মানুষের সমগ্র সামাজিক অস্তিত্ব নির্ভর করে। প্রতিটি ব্যক্তিই, এমনকি সবচাইতে চালাক ও শক্তিশালীরাও, অথবা বলে চলে সবচেয়ে চালাক ও শক্তিশালীরাই বিশেষ করে একই সাথে এই প্রভাবের সৃষ্টি ও স্রষ্টা। কোনো ব্যক্তি যে সমাজে বাস করে, বিকশিত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে সেই সমাজে তাকে ঘিরে থাকা সকল ব্যক্তির বস্তুগত, মানসিক ও নৈতিক সংস্পর্শের সরাসরি ফল হচ্ছে সেই ব্যক্তির ব্যক্তি-স্বাধীনতা। যে ব্যক্তি অধ্যাত্মিক, অতিমানবীয় ও পুরোপুরি স্বার্থপর “মুক্তি”র দোহাই দিয়ে এই সকল সংস্পর্শ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চায়, সে মানব সত্তা হিসেবে নিজের অস্তিত্বের বিনাশ নিজেই ডেকে আনে। যারা অন্যের উপর এই প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকে, তারা আসলে সমস্ত সামাজিক জীবন থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এবং নিজের চিন্তা ও অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়া থেকে বিরত থেকে সে বরং নিজের ধ্বংসের পথই সুগম করে। কাজেই, এই তথাকথিত “স্বাধীনতা” যা সচরাচর ভাববাদী ও অধ্যাত্মবাদীর দল প্রচার করে, এই তথাকথিত ব্যক্তি-স্বাধীনতাই অস্তিত্বের বিনাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

    প্রকৃতিতে এবং মানব সমাজে যা আসলে এই প্রকৃতিরই অংশ, প্রত্যেক জীবই এই শর্তের উপর বেঁচে থাকে যে— সে ততটুকুই অন্যদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করবে যতটুকু তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তাকে অনুমোদন করে। পরোক্ষ এই প্রভাব বিস্তারের বিনাশ মানেই মৃত্যু। যখন আমরা সর্বসাধারণের মুক্তির কথা বলি তখন আসলে কোনো অর্থেই এটা বলি না যে, ব্যক্তি বা ব্যক্তির সমষ্টি তাদের নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে যেই স্বাভাবিক প্রভাব গড়ে তুলেছে তাকে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

    আমরা যা চাই তা হলো এই মেকি, সুবিধাবাদী, আইনানুগ ও দাপ্তরিক প্রভাবের বিলুপ্তি। যদি চার্চ ও রাষ্ট্র ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হতো তখনো আমরা অবশ্যই তাদের প্রতিপক্ষ হতাম বলে আমি মনে করি। তাদের টিকে থাকার অধিকারের বিরুদ্ধে হয়তো প্রতিবাদ করতাম না। এক অর্থে যদিও এটা সত্য যে বর্তমানে এগুলো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানই কারণ এগুলো বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির স্বার্থের জন্য একচেটিয়াভাবে কাজ করে। তবুও, আমরা তাদের বিরোধিতা করি কারণ তারা জনগণের সকল শক্তিকে ব্যবহার করে জনগণের উপরই নিজের কর্তৃত্ববাদী, দাপ্তরিক ও বর্বরোচিত কায়দার শাসন কায়েম করে। আন্তর্জাতিক যদি কখনো নিজেকে রাষ্ট্রীয় কায়দায় সংগঠিত করত তবে আমরা যারা এটির সবচেয়ে উদ্যমী বন্ধু তারাই এটির ঘোর শত্রু হয়ে উঠতাম। কিন্তু সম্ভবত এটি এমন ছাঁচে নিজেকে তৈরি করতে সক্ষম হবে না। আন্তর্জাতিক মানুষের মৈত্রীবন্ধনের কোনো সীমা বেঁধে দেয় না, কিন্তু রাষ্ট্র এই মৈত্রীবন্ধন  ও সাম্যেকে ভৌগোলিক ধারণায় সীমাবদ্ধ করা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস আমাদেরকে দেখিয়েছে যে, বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি সংঘ গঠন, সকল স্বৈরশাসকদের যা স্বপ্নের বস্তু তা অসম্ভব। সুতরাং যারাই রাষ্ট্রের কথা প্রচার করে তারা অবধারিতভাবে নানাবিধ রাষ্ট্রে বিভক্ত একটি বিশ্বের কথা চিন্তা করে এবং প্রচার করে। যেই রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণভাবে অত্যাচারী এবং বাহ্যিকভাবে লুণ্ঠনকারী, অর্থাৎ তারা একে অপরের শত্রু। রাষ্ট্র যেহেতু মনুষ্যত্বের বিভাজন, নিপীড়ন ও লুণ্ঠনে জড়িত সুতরাং এটি অবশ্যই মন্যুষত্বের অস্বীকৃতি এবং মানব সমাজের ধ্বংসকেই চিত্রিত করে।

    প্রথম আন্তর্জাতিক

    শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠনের আদৌ কোনো মানে থাকত না, যদি রাষ্ট্রের উৎখাত তাদের লক্ষ্য না হতো। আন্তর্জাতিক এই লক্ষ্য সামনে রেখেই জনসাধারণকে সংগঠিত করেছে এবং শেষমুহূর্ত পর্যন্তও একে স্মরণ করে যেতে পারে। এবং এটি তাদেরকে কীভাবে সংগঠিত করে?

    অবশ্যই উপর থেকে নিচ এই ক্রমে নয়, যেমনটা রাষ্ট্র পেশাভেদে উদ্ভূত আশা-আকাঙ্ক্ষার পার্থক্যের কথা আমলে না নিয়েই কোনো একপ্রকার বাহ্যিক একতা ও শৃঙ্খলা মানবসমাজের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা করে নিচ থেকে, জনগণের সামাজিক জীবনকে ধারণ করে, তাদের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই প্রারম্ভবিন্দু হিসেবে ধরে নিয়ে, সমাজে তাদের প্রকৃত স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে সংগঠিত হওয়ার জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করে। আন্তর্জাতিক তাদের জীবন ও কর্মের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতেই উদ্দেশ্যের ঐক্য গড়ে তুলে, এবং  লক্ষ্যবস্তু ও কল্যাণের একটি সত্যিকারের সাম্যাবস্থা নির্মাণ করে।

    শুধুমাত্র এই প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হওয়ার কারণেই আন্তর্জাতিক প্রকৃত শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেছে। সুতরাং প্রত্যেক গোষ্ঠীর সকল সদস্যের আন্তর্জাতিকের সকল মূলনীতি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবগত থাকা অত্যাবশ্যক। শুধুমাত্র এই উপায়েই সে শান্তির সময় ভালো প্রচারক এবং যুদ্ধের সময় প্রকৃত বিপ্লবী হয়ে ওঠবে।

    আমরা সবাই জানি যে আমাদের কর্মসূচি ন্যায়সঙ্গত। এটি কতিপয় সত্য উচ্চারণে প্রলেতারিয়েতদের ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক দাবিকে ব্যক্ত করে। শুধুমাত্র পুরোপুরিভাবে মানবিক কর্মসূচি হওয়ার কারণেই এটি সামাজিক বিপ্লবের সকল প্রকার লক্ষণ বহন করে। এটি পুরাতনের ধ্বংস এবং নতুন বিশ্ব নির্মাণের ঘোষণা দেয়।

    এইটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় যা আমাদেরকে আন্তর্জাতিকের সকল সদস্যদের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। এই কর্মসূচি পুরাতন ধর্মাচরণের প্রতিকল্প হিসেবে একটি নয়া বিজ্ঞান, নয়া দর্শন হাজির করে। এটি পুরাতন কূটনীতির বদৌলতে একটি নয়া আন্তর্জাতিক কর্মপন্থাকে সংজ্ঞায়িত করে। রাষ্ট্রের উৎখাত ব্যতীত এটির ভিন্ন কোনো লক্ষ্য নেই।

    আন্তর্জাতিকের সদস্যদরা যাতে বিপ্লবী প্রচারক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব বৈজ্ঞানিকভাব পালন করে সে জন্য তাদের প্রত্যেকের এই নয়া বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া আবশ্যক; আন্তর্জাতিকের নতুন সঞ্জীবনী এগুলোই। এটা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয় যে আমরা শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চাই; চাই আমাদের শ্রমের পূর্ণ মূল্যায়ন, শ্রেণির বিলুপ্তি, রাজনৈতিক দাসত্বের সমাপ্তি, মানবাধিকারহীনতার উপলব্ধি, সকলের জন্য সমান দায়িত্ব ও ন্যায়বিচার; এক কথায় বললে, অখণ্ড মানবতা। নিঃসন্দেহে, এইসব দাবি বেশ ভালো ও ন্যায্য। কিন্তু আন্তর্জাতিকের কর্মীরা যখন এইসব দাবির যথার্থতা ও তাৎপর্য অনুধাবন না করেই শুধুমাত্র বারংবার এইসব বুলি আওড়াতে থাকে তখন তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া ফাঁপা বুলিতে পর্যবসিত হয়। আর বুঝতে না পারলে এই কথাগুলোর আদতে কোনো মূল্যই থাকে না।

    আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন
    সংগ্রহ: গেটি ইমেজ

    হয়তো বলা হবে যে, সকল শ্রমজীমী মানুষকে শিক্ষিত করা সম্ভব না, এমনকি যখন তারা আন্তর্জাতিকের সদস্যও হয়। সংগঠনের মধ্যেই একদল লোক যতদূর সম্ভব সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থা সম্পর্কে পুনর্পাঠ নিচ্ছে, এইটাই কি যথেষ্ট নয়? সঠিক পথ থেকে সরে না আসার জন্য তাদের  যে ‘ভ্রাতৃবৎসল উপদেশ’ সেগুলো কি বিশাল জনতা অনুসরণ করতে পারে না, যা অবশেষে প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে?

    আন্তর্জাতিকের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী কমিউনিস্টরা প্রায়ই এইসব যুক্তি ব্যবহার করত, যদিও প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে বলার মতো সাহস তারা সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। সাধারণ জনতার বুদ্ধিমত্তা ও সর্বময় ক্ষমতার লোকভুলানো প্রশংসা অন্তরালে তাদের আসল অভিমত লুকানোর চেষ্টা করত। আমরা সর্বদা এসকল অভিমতের ঘোর বিরোধী ছিলাম। আমরা বিশ্বাস করি যে, আন্তর্জাতিক যদি বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও দশ, বিশ ও ততোধিক লোক নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী— এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং বৃহৎ অংশ যদি ক্ষুদ্র অংশের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞানকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে থাকে তাহলে এই আন্তর্জাতিক শেষমেশ অভিজাততন্ত্রের মধ্যেই বিনষ্ট হবে, যা আদতে রাষ্ট্রেরই চরম বিকৃত একটি রূপ। শিক্ষিত ও সক্ষম ক্ষুদ্র অংশ তাদের গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি একটি পরিচালনা পর্ষদের দাবি করে বসবে। এবং এই পরিচালনা পর্ষদ স্বীকৃত স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও অধিক স্বৈরাচারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ এর এই স্বৈরাচারী মনোভাব জনগণের ইচ্ছার প্রতি আনুগত্যশীল সম্মানপ্রদর্শনের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকবে। ক্ষুদ্রাংশটি জনগণের উপর সংকল্পের অস্ত্র চাপিয়ে দিয়ে তাদের শাসন করবে, এবং পরবর্তীতে একে ‘জনগণের ইচ্ছা’ নাম দিয়ে প্রচার করবে। আর এভাবেই শিক্ষিত ক্ষুদ্রাংশটি একটি শাসকবর্গে পরিণত হবে, এবং অপরাপর সকল শাসকবর্গের মতোই দিনে দিনে আরও বেশি স্বৈরাচারী ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠবে।

    আন্তর্জাতিক তখনই জনসাধারণের মুক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠবে যখন এটি নিজে মুক্ত হয়ে উঠতে পারবে; যখন এটি আর নিজেকে দুটি দলে ভাগ হয়ে থাকতে দেবে না, যার বৃহৎ অংশটি ক্ষুদ্রাংশের অন্ধ অস্ত্রমাত্র। সেইজন্যেই এর প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে সদস্যদের মনে সমাজতন্ত্রের বিজ্ঞান, দর্শন ও কর্মপন্থাকে আত্মস্থ করে তোলা।

     

     

     

  • মিখাইল বাকুনিন।। ন্যাশনাল ক্যাটেকিজম

    মিখাইল বাকুনিন।। ন্যাশনাল ক্যাটেকিজম

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    ১৮৪৮ সালের মহাবিদ্রোহের পর শ্রমজীবী মানুষের বৈপ্লবিক সংগঠন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে বিপ্লবীদের পিছে ফেউয়ের মতো লেগে ছিল ইউরোপের সরকারগুলো। বিপ্লব তৎপরতা থেমে থাকেনি। নানাস্থানে গোপনে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন রকমের বিপ্লবী সংগঠন।১৮৪৮ সালের মহাবিদ্রোহের সময় রুশ বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিন মুক্তিবাদী ছিলেন। স্বাধীনতার প্রাণস্পৃহা ছিল তার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মর্মে। বাকুনিন রচনা সংকলনের সম্পাদক ও অনুবাদক স্যাম ডলগফ মনে করেন, ১৮৬৬ থেকে রুশ বিপ্লবী বাকুনিন নৈরাজ্যবাদী ধ্যান-ধারণার জগতে প্রবেশ করেন। National Catechism বাকুনিনের নৈরাজ্যবাদ আলিঙ্গনের স্মারক রচনা। বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা আন্দোলনের জন্য মৌলিক সংকল্প’র ধারণায়ন করেন। কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক রাষ্ট্রকে একটা ফেডারেল সংগঠন দ্বারা প্রতিস্থাপনের সংকল্প এতে পষ্ট হয়। ফেডারেল সংগঠনের মৌলিক নীতিই হল: উপর থেকে নিচে নয়, নিচ থেকে উপরে। সংগঠন প্রশ্নে বাকুনিনের ফেডারেল পদ্ধতিই পরবর্তীকালে প্যারী কমিউনেরও সংগঠন প্রণালী ছিল। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন সামাজিক বিপ্লবে। National Catechism লেখা হয় ১৮৬৬ সালে। স্যাম ডলগফ অনূদিত ও সম্পাদিত Bakunin on Anarchy গ্রন্থে রচনাটি সংকলিত হয়েছে। বইটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়।-সম্পা

     

    ভূমিকা

    বিভিন্ন দেশের জাতীয় ক্যাটেকিজমে১ কিছু কিছু গৌণ বিষয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু এমন কিছু নির্দিষ্ট মৌলিক বিষয় রয়েছে যা সকল দেশের জাতীয় সংগঠন বা সংস্থাগুলোকে স্ব-স্ব-ক্যাটেকিজমের ভিত্তি হিসেবে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে:

    ১) যে কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ জরুরি বিষয় হচ্ছে, জনগণের মুক্ত ফেডারেশনে যোগদানের ইচ্ছা যা কেন্দ্রীভূত, আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক সংস্থাগুলোকে একটা ফেডারেল সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করে। এই ফেডারেল সংগঠনের ভিত্তি হবে অঞ্চল, প্রদেশ, কমিউন, সমিতি এবং ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসন। এই ফেডারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য; এটি এমন কোনো সংগঠন২ হবে না যা উপর থেকে নিচে বা কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত সংগঠিত। আরোপিত বা কঠোরভাবে ছত্রবদ্ধ ঐক্যের নীতি খারিজ করে এটি মুক্ত ফেডারেশনের নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে  নিচ থেকে উপরে দিকে বা পরিধি থেকে কেন্দ্রের দিকে। এর মুক্ত বা স্বাধীন ব্যক্তিরা বহু স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত সংঘ বা সমিতি গড়ে তুলবেন। এই সংঘ বা সমিতিগুলো গঠন করবে স্বায়ত্বশাসিত কমিউন, এর কমিউনগুলো গঠন করবে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ, এর প্রদেশগুলো গঠন করবে অঞ্চল এবং এই অঞ্চলগুলো স্বাধীনভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে দেশ তৈরি করবে,পালাক্রমে আজ না হোক কাল এগুলোই সৃষ্টি করবে সর্বজনীন বিশ্ব ফেডারেশন।

    ২) প্রত্যেক ব্যক্তি, কমিউন, সংঘ [বা সমিতি], প্রদেশ এবং দেশের সংশ্লিষ্ট যে কোনো কাঠামো  থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্ণ অধিকারের স্বীকৃতি।৩

    ৩) রাজনৈতিক সমতা ব্যতীত রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা ব্যতীত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সমতা অসম্ভব।

    সামাজিক বিপ্লবের জরুরত

    প্রত্যেকটি দেশেই নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং বৈপ্লবিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী এই বিপ্লবের বিস্তার ও গভীরতা কমবেশি ভিন্ন হবে। তদপুরি এমন কিছু নির্দিষ্ট নীতি আছে যেগুলো বর্তমানে জাতীয়তা বা পরিস্থিতি নির্বিশেষে জনগণকে বিপ্লবের দিকে আকৃষ্ট ও উৎসাহ করতে পারে। এই নীতিগুলো হলো:

    ১)  ভূমি সমাজের সাধারণ সম্পত্তি, কিন্তু এর সুফল ও ব্যবহার কেবল তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে যারা এই ভূমিতে শ্রমের দ্বারা চাষাবাদ করবে। সে অনুসারে, ভূমি বর্গাও উচ্ছেদ করতে হবে।

    ২) যেহেতু সমস্ত সামাজিক সম্পত্তি শ্রমের দ্বারা উৎপাদিত, সেহেতু কাজ করতে সক্ষম ব্যক্তি যদি কাজ না করে খায় তবে সে চোর।

    ৩) কেবল সৎ লোকদেরই রাজনৈতিক অধিকারের অধিকারী হওয়া উচিৎ। এমন অধিকার কেবল শ্রমিকদেরই থাকবে।

    ৪) রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব একই সময়ে না হলে আজ কোনো দেশেই বিপ্লব সফল হবে না। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক বিপ্লব, তা সেটা জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার্থে বা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের জন্য বা এমনকি একটি রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য হলেও, যদি জনগণের আশু ও বাস্তবিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সাধিত না হয় তাহলে সেটা ঝুটা বিপ্লব হবে। এর উদ্দেশ্যগুলো কায়েম হবে না এবং এর পরিণতি হবে প্রতিক্রিয়াশীল।

    ৫) বিপ্লব অবশ্যই জনগণের জন্য না করে বরঞ্চ জনগণের দ্বারা করতে হবে। গ্রাম ও শহরের সকল জনগণকে প্রবল উৎসাহের সহিত যদি যুক্ত না করা যায় তাহলে বিপ্লব কখনোই সফল হবে না।

    আর্টওয়ার্ক: ওয়ার্কার্স আপরাইজিং
    শিল্পী: জ্যাকোব স্টেইনহাট
    সূত্র: ওয়েমিয়ার

    ৬) সকল দেশের জন্য একটি সাধারণ কর্মসূচির ধারণা ও পরিচয় দ্বারা সংগঠিত হয়ে, গুটিকয়েকজনকে জড়ো না করে বরঞ্চ সকল দেশকে একটি একক কর্মপরিকল্পনায় জড়ো করবে এমন একটি গোপন সংস্থার সমন্বয়ে, অধিকাংশ গ্রামে ও শহরে একযোগে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, এই বিপ্লব শুরু থেকেই একটা স্থানিক চেহারা ধারণ করবে। আর এর মর্ম হল এই যে,একটা দেশের কোনো একটি একক বিন্দু বা কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়া বৈপ্লবিক বাহিনীর সংখ্যাধিক্য এর উদ্ভব ঘটাবে না, অথবা এমনকি রোমান সাম্রাজ্য ধরনের৪ বুর্জোয়া আপাত-বৈপ্লবিক যুদ্ধাভিযানের চরিত্র গ্রহণ করবে না। এর বিপরীতে, দেশের সকল অংশ থেকে বিপ্লব শুরু হবে। এভাবে এটি পুরুষ, নারী ও শিশু সকলের অংশগ্রহণে প্রকৃত অর্থেই গণবিপ্লব হয়ে উঠবে এবং এটিই বিপ্লবকে অপরাজেয় করে তুলবে।

    ৭) শুরুতে (যুক্তির খাতিরে, যখন জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে তার নিপীড়কদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে)এই বিপ্লব খুব সম্ভব রক্তাক্ত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে। কিন্তু এই পর্বটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং কখনোই কাঠামোগত সন্ত্রাসবাদে পর্যবসিত হবে না।… এটি একটি যুদ্ধ হবে, বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে নয়, বরঞ্চ যুদ্ধ হবে মূলত সেই সমাজবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যার উপর তাদের ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ভর করে।

    ৮) সুতরাং এই বিপ্লব শুরু হবে সর্বোপরি সকল প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, চার্চ, পার্লামেন্ট, ট্রাইব্যুনাল, প্রশাসন, ব্যাঙ্ক, বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের মাধ্যমে, যেগুলো কিনা রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি গঠন করে। রাষ্ট্রকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে হবে এবং দেউয়ালিয়া ঘোষণা করতে হবে; সেটা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই নয় বরঞ্চ আরো রাজনৈতিকভাবে, আমলাতান্ত্রিকভাবে ও সামরিকভাবে (এর পুলিশ বাহিনী সহ) দেউলিয়া ঘোষণা করতে হবে। একই সাথে গ্রামীন ও শহুরে জনগণ বিপ্লবের সুবিধার্থে সকল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিবে। তারা প্রতিক্রিয়াশীলদের দখলে থাকা সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে এবং সকল দেওয়ানি, ফৌজদারি, বিচারিক ও সরকারি নথিপত্রকে বাতিল ঘোষণা করে সম্পত্তি ও ঋণের সকল দলিলাদি পুড়িয়ে ফেলবে, দখলি [সম্পত্তির] স্থিতাবস্থা অবস্থা বজায় রাখবে। এই পদ্ধতিতে সামাজিক বিপ্লব সাধিত হবে, এবং একবার যখন বিপ্লবের শত্রুরা তাদের সমস্ত সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে তখন আর তাদের বিরুদ্ধে কোনো রক্তাক্ত পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। উপরন্তু, এমনতর দুর্ভাগ্যজনক পদেক্ষেপের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার অবধারিতভাবে ভয়াবহ ও ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাবে।

    ৯) বিপ্লবকে যেহেতু স্থানীয়করণ করা হচ্ছে, সেহেতু এটি অগত্যা ফেডারেলিস্ট চরিত্র ধারণ করবে। ফলে প্রতিষ্ঠিত সরকারব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে কমিউনগুলো অবশ্যই একটি বৈপ্লবিক পদ্ধতিতে নিজেদেরকে স্বীকৃতি দিবে: সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল নির্বাহককে জনগণের কাছে প্রত্যক্ষ ও কার্যকরভাবে দায়বদ্ধ থাকতে হবে এমন নীতির উপর দাঁড়িয়ে প্রশাসক ও বৈপ্লবিক ট্রাইব্যুনাল নির্বাচিত করতে হবে।

    ১০) এই বিপ্লবের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে একটি আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়াসের সমন্বয়ে চক্রান্ত করা ও একটি শক্তিশালী গোপন সংগঠন বা সমিতি গড়ে তোলা জরুরি।

    টীকা

    ১. ক্যাটেকিজমের (Catechism) শাব্দিক অর্থ ‘বিশেষত ধর্ম বিষয়ে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষাদান’। গ্রীক ভাষা থেকে অনূদিত শব্দের অর্থের দ্বারা শিক্ষণ বা নির্দেশনা বা ম্যানুয়াল বোঝানো হয়। তবে শব্দটা খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে বেশি জড়িত। এটি ধর্মের শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহৃত কোনো একটি মতাদর্শের একটি সংক্ষিপ্তরূপ বা ব্যাখ্যান বা বই। খ্রিষ্টান শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ধর্মান্তরিতদের শিক্ষাপ্রদানে এটি ভূমিকা পালন করে। ক্যাটাকিজমকে মতাদর্শিক ম্যানুয়াল হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়; প্রশ্নোত্তরের আকারে সেটা সাজানো হয়ে থাকে। শিক্ষণ বা নির্দেশনার এই ফরম্যাটটি কেবল ধর্মীয় পাঠেই যে ব্যবহৃত হয় তা নয়, সেকুলার পাঠেও এটি ব্যবহৃত হয়।- অনুবাদক

    ২. প্রবন্ধে নেশন শব্দটি ঠিক জাতি বা জাত অর্থে ব্যবহৃত হয় নি। রাষ্ট্র, জাতি, সংগঠন, সংস্থা ইত্যাদি অর্থে খানিক শিথিলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে- অনুবাদক

    ৩. বাকুনিন বিশ্বাস করতেন যে, সাধারণ জরুরত দ্বারা তাড়িত স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত সংগঠনগুলো উপর থেকে আরোপিত বাধ্যতামূলক ঐক্যের চেয়ে বেশি টেকসই। বাকুনিনের মতে, স্বতঃস্ফুর্ত একতা ‘আসলেই পোক্ত, ফলপ্রসু এবং দৃঢ় হবে’।- ইংরেজি অনুবাদকের ফুটনোট

    ৪.‘পার্টি লাইন’ আরোপ করার জন্য স্বৈরশাসকের প্রতিনিধি পাঠানো।- ইংরেজি অনুবাদকের ফুটনোট

     

  • মিখাইল বাকুনিন।। অরাজ : রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্র

    মিখাইল বাকুনিন।। অরাজ : রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্র

    অনুবাদ: নুরে আলম দুর্জয়

    মিখাইল বাকুনিন উনিশ শতকের রুশ নৈরাজ্যবাদী। সমাজতন্ত্রকে তিনি ফরাসি বিপ্লবের বিকশিত রূপ হিসেবে দেখেছেন। বাকুনিন মনে করতেন, সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা বেইনসাফি আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র স্বেচ্ছাচার-নির্মমতা।

    বর্তমান রচনাটি বাকুনিনের Stateless Socialism: Anarchism’র বঙ্গানুবাদ। রুশ নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের অন্যতম চিন্তক গ্রেগরি ম্যাক্সিমফ সম্পাদিত The Political Philosophy of  Bakunin বইয়ে রচনাটি সংকলিত হয়। নিউইয়র্কের ফ্রি প্রেস থেকে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় বইটি।

    মূলপ্রবন্ধ

    মিখাইল বাকুনিন

    ফরাসি বিপ্লবে ঘোষিত মহাননীতির প্রভাব

    বিপ্লব অস্পষ্ট নয় বরং যৌক্তিক। স্বর্গীয় নয় বরং পার্থিব। অতিমানবিক কেচ্ছাকাহিনী নয় বরং মানুষের গল্প, মানুষের স্বাধীকারেরই ন্যায্যতা। ফরাসি বিপ্লব যখন এই নিদারুণ সত্য নিয়ে উপস্থিত, তখন দাবি করা হলো সব মানুষই সমান, সব মানুষই স্বাধীনতা-সাম্যের হকদার। এতে করে, এতদিন ধর্মীয় শাসনের ঘোরতর আফিমে বুঁদ হয়ে ছিল যে ইউরোপ এবং বিশ্বের সব সভ্য দেশ, তাদের জনগণের ঘুম ভেঙ্গে গেল। এবার তারা নিজেরাই প্রশ্ন করতে শুরু করল, তাদেরও কি সমতা, স্বাধীনতা এবং মানবতার হক আছে?

    সহজাত জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধি দ্বারা যারা চালিত হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবে, সমতার এই প্রশ্ন সামনে আসতে না আসতেই তারা বুঝতে পারল যে, অর্থনৈতিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবতর্নই তাদের সত্যিকারের এবং মানবিক মুক্তির প্রথম শর্ত। রোজকার রুটি-রুজির প্রশ্নই তাদের কাছে প্রথম প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়াল। যেমনটা অ্যারিস্টটল১ বলেছিলেন, মুক্ত চিন্তার জন্য, মুক্তি অনুভবের জন্য এমনকি খোদ মানুষ হওয়ার জন্য অবশ্যই প্রতিদিনের রুটি-রুজির প্রশ্ন থেকে মুক্ত হতে হবে।

    এই জন্য বুর্জোয়ারা যারা এতদিন জনমানুষের সহজাত জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধির বাইরে অবস্থান করতো, জনতার বস্তুগত অস্তিত্বর বিরুদ্ধে গলা খেকিয়ে সবচেয়ে বেশি হাউকাউ করত, জাত গেল জাত গেল বলে ফাল পাড়ত; সেই কুলীনরাই সাম্য-স্বাধীনতার ব্যাপারটা কোন ধরনের গাইগুই ছাড়াই, বাড়তি প্যাঁচাল ছাড়াই একবাক্যে স্বীকার করে নিল। কিন্তু তারা নিজেরাই জানতো, এই স্বীকারোক্তি শুধু মুখে, বাস্তবে এর কোন উদাহরণ প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য নয়।

    এরপর, জনতার সামনে এলো দ্বিতীয় প্রশ্ন- শ্রমের পরে অবসর, যা কিনা মানবতার অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর ছাড়া কখনোই সেই রুটি-রুজি কিম্বা অবসর অধিকার সম্ভব না। আর তাই যেসব মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল, তা থেকেই অনিবার্যরূপে জন্ম নেয় সমাজতন্ত্র।

    সমাজতন্ত্রই ন্যায়বিচার

    সমাজতন্ত্র হলো ন্যায়বিচার। যখন আমরা ন্যায়বিচারের কথা বলি তখন আমরা আসলে রোমান আইনশাস্ত্রের বিচার বুঝি না, যা মূলত প্রতিষ্ঠিত ছিল বলপ্রয়োগ এবং সহিংসতার উপর ভিত্তি করে। কালের ব্যবধানে এবং ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ঝাঁড়ফুঁকে বা কলকাঠিতে এই সহিংসতাকে পবিত্র বলে জপ করতে করতে ঢুকিয়ে দেয়া হয় মানুষের মগজে। করে তোলা হয় সর্বমান্য এবং পরিণতিতে তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় চূড়ান্ত নীতি হিসেবে।

    না, আমরা সেই ন্যায়বিচারের কথা বলছি, যা মানুষের বিবেকবোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, সেই ন্যায়বিচার যা সব মানুষের মননে বিকশিত, সেই ন্যায়বিচার যা শিশুদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে। এটা সেই ন্যায়বিচার, এক কথায় যার নাম- সমতা।

    এই ন্যায়বিচারই নতুন দুনিয়ার ভিত্তি যা এখন পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক, বিচারিক বা অর্থনৈতিক বিশ্বে দেখা যায়নি। এই ন্যায়বিচার ছাড়া স্বাধীনতা, জনতন্ত্র, সমৃদ্ধি, শান্তি কোনোটাই থাকতে পারে না বা থাকে না। কার্যকর শান্তিপ্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যেতে এই ন্যায়বিচারই আমাদের পথ দেখাবে। ভয়ঙ্করভাবে নিপীড়নের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি জোরালো করতে আমাদের চালিত করে এই ন্যায়বিচার।

    সমাজতন্ত্রের মূলনীতি

    সুধীগণ, আমরা এখানে আকাশ থেকে পড়া কোনো সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলছি না। আমরা যা চাই তা হলো, নতুনভাবে ফরাসি বিপ্লবের সেই মহান নীতির ঘোষণা: মনুষ্যত্বর বিকাশের সব ধরনের বস্তুগত ও নৈতিক পন্থা মানুষের হাতেই থাকবে।

    এই মৌলিক নীতিকে আমরা প্রকাশ করতে পারি এভাবে :

    জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই বিচিত্র সৃজনশীলতার বিকাশ ও প্রয়োগের সমান সুযোগ থাকবে।  এমন একটি সমাজ গঠন করতে হবে, যেখানে অসম্ভব হয়ে পড়বে অন্তহীন শ্রম-শোষণ। প্রত্যেকেই সামাজিক সম্পদ ভোগ করবে যা বাস্তবে উৎপাদিত হবে সমাজেরই যৌথ শ্রমের মাধ্যমে। কিন্তু ততক্ষণই কেবল ওই সম্পদ ভোগ করবে যতক্ষণ সে সম্পদ সৃষ্টিতে সরাসরি অবদান রাখবে।

    রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বাদ

    সমাজতন্ত্রের জন্য আমাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়াই করতে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস এরই মধ্যে এই গুরুতর প্রশ্নকে আমাদের সামনে হাজির করেছে। আমরা তাকে উপেক্ষা করতে পারি না। যদি করি তবে তা হবে আত্মপ্রতারণা। নিজের কাছে আজীবন ঘৃণ্য হিসেবেই বিবেচিত হব।

    আমরা খুব জোরালোভাবে যেকোনো ধরনের সমাজসংস্থাকে প্রত্যাখান করছি যা অস্বীকার করে ব্যক্তি এবং সংগঠনের পূর্ণ স্বাধীনতা। আমরা তীব্রভাবে প্রত্যাখান করছি যে কোন ধরনের ক্ষমতার সংস্থাপণকে যা রেজিমেন্টেড, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণমূলক ।

    স্বাধীনতাই আমাদের মূলভিত্তি। এমনকি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংগঠনেরও একমাত্র সৃজনশীল নীতি। তাই মুক্তির নামে নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রীয় সাম্যবাদ বা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রর প্রাদুর্ভাব হলে তাকে প্রতিরোধ করা আমাদের কর্তব্য।

    উত্তরাধিকার আইনের বিলোপ

    উত্তরাধিকার আইন রাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। কর্তৃত্বপরায়ণ ও ঐশি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ন্যায়ভিত্তিক মুক্ত সমাজে রূপান্তরের জন্য এই রাষ্ট্রের বিলোপ করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই বিলোপ না হচ্ছে, রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার আইনের মাত্রা একটু একটু করে কমিয়ে আনতে হবে যাতে তার উচ্ছেদ ঘটে। আর তা সম্ভব কেবল স্বাধীনতার মাধ্যমেই।

    আমরা মনে করি, সব ধরনের উত্তারাধিকার বিলোপ ঘটনো দরকার। যতক্ষণ এই অধিকার থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বংশানুক্রমিকভাবে অর্থনৈতিক অসমতা বিরাজ করবে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এই অসমতা প্রাকৃতিক নয় বরং শ্রেণীগত এবং কৃত্রিম, মানুষের বানানো।  এতে করে পুনপৌনিকভাবে মানবীয় বিকাশ অসম হয়ে হয়ে পড়ে এবং চৈতন্য গঠনকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বেঁধে ফেলে।  আদতে যা কিনা অন্যান্য সব ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসমতার পুতঃপবিত্র উৎস হিসেবে কাজ করে।

    ন্যায়বিচার কায়েমে প্রধান কাজ হল সমতা প্রতিষ্ঠা। যা কিনা আদতে নির্ভর করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমাজ-সংগঠনের উপর।  এই সমতা এমন ধরনের, যাতে মানুষ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জীবন শুরু করতে পারে এবং প্রত্যেকে হয়ে ওঠে তার নিজস্ব কর্মরেই প্রতিরূপ।

    আমাদের মতে, সদ্য মৃতদের সম্পত্তি সামাজিক তহবিলে জমা করতে হবে। জন্মের পর থেকে সাবালক না হওয়া পর্যন্ত জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে তা ব্যয় হবে সবার শিক্ষা-দীক্ষার জন্য।

    জনগণের সব সম্পত্তি শুধু তাদের অধিকারেই যাবে, যারা নিজ হাতে এর চাষ করে। আর এই মৌলিক ধারণাটি স্লাভ বা রাশিয়ান হিসেবে আমাদের জনগণের ঐতিহ্যগত সাধারণ প্রবৃত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত।

    আমরা মনে করি, এসব মৌলিক নীতি ন্যায্য এবং সব ধরনের গুরুতর সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজনীয় ও  অপরিহার্য শর্ত। কাজেই পশ্চিম ইউরোপ এই নীতি বুঝতে এবং গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে না। দেশে দেশে এই বোঝাপড়ার ভিন্নতা থাকতে পারে। যেমন, ফ্রান্সে অধিকাংশ কৃষক যে ভূমি চাষ করেন তারা সেটার মালিক। কিন্তু শিগগিরই তাদের বেশিরভাগই ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে এবং মালিকানা শুন্য হয়ে পড়বে। এটা ফ্রান্সে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জারি আছে তারই অপরিহার্য ফল। তো, যায় হোক, ভূমির প্রশ্নে যে কোনো ধরনের প্রলোভন থেকে আমরা বিরত থাকব।  আমাদের উচিত নিজস্ব ঘোষণার উপর দাঁড়ানো।

    সমাজতন্ত্রের ঘোষণা

    যতক্ষণ আমজনতা মৌলিক অধিকার বিচ্যুত,  শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে অচ্ছুত ও দাস হতে বাধ্য হবে ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং শান্তির সুস্পষ্ট বোঝাপড়া অসম্ভব। এই দাসত্ব আইনগত নাও হতে পারে। দরিদ্রতা, রুটিরুজির প্রয়োজনে অবসর-বিশ্রাম ছাড়া বাধ্য-শ্রমের মাধ্যমেও আরোপ হতে পারে। দুনিয়া যে সম্পদের উপর গর্ব করে,  শ্রমে-ঘামে তার সবটা উৎপাদন করেও যখন রুটির এতটুকু একটা টুকরো জোটে না, পরদিনের জীবিকার নিশ্চয়তা থাকে না, তখন তা দাসত্বই।

    শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ভয়ঙ্করভাবে দমন-পীড়নের শিকার। মানুষের মুক্তির সমস্যা আদতে রুটি-রুজির সমস্যা। রুটি-রুজির সমস্যা মানে মানসিক মুক্তির সমস্যা। রুটি-রুজির সমস্যা মানে স্বাধীনতার সমস্যা। এমনকি মানবতার সমস্যাও বটে।

    সমাজতন্ত্র ছাড়া স্বাধীনতা বিশেষ সুবিধা এবং অন্যায্য। আর স্বাধীনতা ছাড়া সমাজতন্ত্র দাসত্ব, হিংস্রতা।

    লীগ [দ্য লিগ ফর পিস এন্ড ফ্রিডম২] ঘোষণা করছে যে, পুঁজি ও সম্পত্তির গোলামি থেকে জনগণের শ্রম-মুক্তির লক্ষ্যে বৈপ্লবিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। সত্যিকারের ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে এমন পুনর্গঠন, যা কল্যাণমুখি বিজ্ঞান ও সদা বিকাশমান স্বাধীনতার উপর প্রতিষ্ঠিত।  মোদ্দা কথায়, দরকার মানুষের ন্যায়বিচার; যা আদতে বিচারসংস্থা-ধর্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মবাদ ভিত্তিক কোন ন্যায়বিচার বা তার ভ্রম নয়।

    রাজনৈতিক ক্ষমতার বদলে উৎপাদনভিত্তিক সংগঠন

    সবধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্ছেদ দরকারি।  নীতিতে থাকুক কিম্বা বাস্তবে, রাজনৈতিক ক্ষমতা মাত্রই তাতে থাকবে শাসক ও শাসিত, মালিক ও দাস এবং শোষক ও শোষিত ।  একবার এই রাজনৈতিক ক্ষমতার বিলোপ ঘটলে তার স্থলে প্রতিষ্ঠা করতে হবে উৎপাদনী শক্তি ও অর্থনৈতিক সেবার সংগঠন।

    আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপক উন্নতি হলেও এর চূড়ান্ত এবং যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে অর্থহীন হয়ে পড়া। ধীরে ধীরে পরিস্কার হচ্ছে যে, যাবতীয় রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দিনক্ষণ ফুরিয়ে আসছে।

    আমরা দেখতে পাচ্ছি, আম জনতা তাদের মুক্তির চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দিক-দিগন্তে দাবি তুলছে। জেগে উঠছে মানুষ ও তাদের মুক্ত সামাজিক সংগঠন। সরকারি হস্তক্ষেপের বাইরে মুক্ত অর্থনৈতিক সংগঠনের ছায়াতলে একত্রিত হচ্ছে তারা।  সাবেকী যত রাষ্ট্রীয় উচ্ছিষ্টভোগী এবং জাতিবাদী নীতিকে একপেশে করে শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী ও মানবীয় শ্রমের ভিত্তিতে এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ।

    জনতার আর্দশ

    জনতার সামনে এক অভিনব আদর্শ হাজির।  যার লক্ষ্য হচ্ছে সব ধরনের অভাব ও দারিদ্রের সমাপ্তি।  যৌথ শ্রমের মাধ্যমে বস্তুগত সকল চাহিদার পূর্ণতুষ্টি। যা সবার জন্য সমান এবং সবার জন্যই প্রযোজ্য। এরপর যখনই আধিপত্য বিলুপ্ত হবে জনগণের চাহিদা পুরণে জনতারই মুক্ত সংগঠন কার্যকরী হয়ে উঠবে। এই সংগঠনের কাঠামো রাষ্ট্রের মতো উপর থেকে নিচে নয় বরং তার গঠন হবে গোড়া থেকে উপরের দিকে। যা সরকার-আইনসভার স্থলে কাজ করবে বিভিন্ন সমিতির মুক্ত ইউনিয়ন হিসেবে। কৃষি সমিতি, কারখানা-শ্রমিক সমিতি, সম্প্রদায়-সমিতি, আঞ্চলিক এবং জাতীয় সমিতির মেলবন্ধন এই মুক্ত ইউনিয়ন। আর এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের উপর চূড়ান্তভাবে  প্রতিষ্ঠিত হবে বৈশ্বিক মানব সংহতি।

    মুক্ত সমাজের কর্মসূচি

    মাজিনিয়ান সিস্টেম৩ মাত্রই রাষ্ট্ররূপে রিপাবলিক সিস্টেম। এর বাইরে কমিউন রূপে, ফেডারেশন হিসেবে একটি সমাজতান্ত্রিক ও  জনগণের সত্যিকারের রিপাবলিক হিসেবে নৈরাজ্যবাদ ছাড়া আর কোন পথ নেই। এটাই হচ্ছে সামাজিক বিপ্লবের রাজনীতি যার লক্ষ্য রাষ্ট্রের বিলোপ।  আর তার স্থলে জনতার অর্থনৈতিক মুক্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা। এই মুক্ত সংগঠনগুলো ফেডারেশনের মাধ্যমে নিচ থেকে উপরের দিকে পরিচালিত হবে।

    … কোন রাজনৈতিক সরকারের অস্তিত্বের সম্ভাবনা থাকবে না। তার বদলে সরকার রূপান্তরিত হবে সাধারণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সরল কাঠামো।

    মোদ্দা কথায় আমাদের কর্মসূচি হল:
    – সকল নিপীড়িতের জন্য শান্তি, স্বাধীনতা এবং খুশালি
    – সকল নিপীড়ক ও লুটেরার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
    – শ্রমজীবীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সমস্ত পুঁজি, কারখানা, যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল যাবে শ্রমজীবীদের সমিতিতে। সম্মিলিতভাবে ভূমি থাকবে তাদের হাতে যারা নিজের হাতে ফসল ফলায়।
    –  পৃথিবীর সকলের জন্য ন্যায়বিচার এবং মৈত্রী
    – সকলের জন্য সমতা
    – সবার জন্য বৈষম্যহীন সমৃদ্ধি। শিক্ষা, অগ্রগতি এবং কাজের মাধ্যমে জীবন ধারণের সমান সম্ভাবনা।
    -মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে সমাজ গঠন। নিচ থেকে উপরে। কারখানা শ্রমিকের সংগঠন, কৃষকের সংগঠন, বিজ্ঞানীদের সংগঠন, সাহিত্যিকদের সংগঠন। প্রথমে একটা কমিউনে, তারপর কমিউনের ফেডারেশন; কমিউনের ফেডারেশন থেকে আঞ্চলিক, আঞ্চলিক থেকে জাতীয়; এরপর আন্তর্জাতিক সর্বজনীন সংগঠনে সংগঠিত হওয়া।

    আর্টওয়ার্ক: প্যারিস কমিউন
    সংগঠন: গ্রাঞ্জার

    বৈপ্লবিক সময়ের সঠিক কর্মকৌশল

    সামাজিক বিপ্লব সবসময়ই রাজনৈতিক বিপ্লবের পুরোপুরি বিপরীত। একক ব্যক্তি-কৃতিত্বর স্থলে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনই তার চালিকাশক্তি। সামাজিক বিপ্লবে ব্যক্তির ভূমিকা হল, আমজনতার সহজাত জ্ঞানকে আরও বিকশিত, আরও স্পষ্ট করার পাশাপাশি সে অনুযায়ী তৎপরতা চালানো। একই সঙ্গে জনগণে স্বাভাবিক ক্ষমতার বৈপ্লবিক সংগঠন-প্রচেষ্টায় লাগাতার অবদান রাখা। এর বাইরে আর কিছু নয়; বাকিটা জনগণ নিজেরাই ঠিক করবে। এর বাইরে রাষ্ট্রীয় পুনরুজ্জীবনের অন্য যেকোনো তরিকা হবে রাজনৈতিক স্বৈরাচার। সামাজিক আন্দোলন রূপ নেবে রাজনৈতিক স্বৈর-আন্দোলনে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে উত্থান ঘটাবে নিপীড়ন এবং অসমতা তথা বিশেষ অধিকারের। রাষ্ট্রপন্থী তরিকার গতিমুখ গিয়ে ঠেকবে সাতরাস্তার মোহনায়,যেখানে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্বের অবধারিত পথই হয়ে উঠবে যৌক্তিক।

    ফরমান দিয়ে বিপ্লব হয় না

    কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদীদের ধ্যান-ধারণা আমার মতে, একটা চূড়ান্ত প্রতারণা। তারা মনে করে, স্বৈরক্ষমতা বা প্রতিনিধিত্বশীল গণপরিষদের মাধ্যমে ফরমান দিয়ে সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত করা যায়। অন্যদিকে প্যারি-সমাজতন্ত্রীরা৪ মনে করতেন, একমাত্র জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিকাশমান বিভিন্ন গোষ্ঠী ও জনসমিতির বিপুল কর্মযজ্ঞর মাধ্যমেই বিপ্লবকে চূড়ান্ত রূপ দেয়া সম্ভব।

    বিপ্লব প্রশ্নে, প্যারি-সমাজতন্ত্রী বন্ধুরাই হাজারগুণ ঠিক ছিলেন। আসলে, এমন কোন চৈতন্য নেই, যা মেধা আর সর্বগুণে গুণান্বিত।  আর তাই আমরা যদি কয়েকশ অতিমানবের সম্মিলিত একনায়কত্বের কথা বলি, তাতে মেধার এমন কোন তেলেসমাতি থাকবে না, যা জনগণের সাধারণ সংকল্প তথা এর মধ্যে বিকশিত আশা, আকাঙ্ক্ষা বা সত্যিকারের স্বার্থের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় বহুত্বকে ধারণ করতে পারে।  আসলে মেধার এমন কোন সক্ষমতাই নেই যা প্রত্যেকের এবং সকলের পুর্ণাঙ্গ তুষ্টির জন্য একটা সামাজিক সংগঠন নির্মাণ করতে পারে।

    তারা শুধু পারে এমন একটা সংগঠন বানাতে যার মাধ্যমে হতভাগ্য সমাজের উপর জোরপুর্বক, সহিংস ও রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের মতলব আঁটা যায়। আর এই সেই সেকেলে সংগঠন পদ্ধতি যা বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। গণমানুষ ও তার বিভিন্ন গোষ্ঠী, সমবায়, সমিতি, এমনকি ব্যক্তির পুর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই উচ্ছেদ করতে হবে সব ধরনের সহিংসতার ঐতিহাসিক ভিত্তিকে; বিনাশ করতে হবে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে। এই পতনেই ধ্বংস হবে সব ধরনের বিচারিক অধিকারের অসমতা এবং যাজকতন্ত্রের মিথ্যাচার যা এতদিন একেবারে পূত-পবিত্র, আর্দশিক ও বাস্তবিক বলে বিবেচিত ছিল। বিলোপ ঘটবে সেইসব সহিংসতার যা এতকাল রাষ্ট্র কর্তৃক উপস্থাপিত-অনুমোদিত ও রক্ষিত ছিল।

    তবে এটা খুব পরিষ্কার যে, রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব হারাতে শুরু করলে মানুষও স্বাধীনতা অর্জন করতে শুরু করবে। সংগঠিত হবে সত্যিকারের সমাজস্বার্থের ভিত্তিতে। আর এভাবে সংগঠিত ব্যক্তি- গোষ্ঠী-সমিতি খুঁজে পাবে বাস্তবিক মুক্তির পথ।

    রাষ্ট্র বিলোপের পথে যাবে মুক্ত সংগঠন

    রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় সংগঠনের পতনই হবে সমাজের সত্যিকারের মুক্তির জন্য  প্রথম এবং অপরিহার্য শর্ত।  আর এরপরই সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে তার নিজস্ব সংগঠন। এই সংগঠন কখনোই ‘উপর থেকে নিচ’ কাঠামোবিশিষ্ট হবে না। এমনকি গুটিকতক মহাজ্ঞানী-মহাপণ্ডিতের তৈরি করা আর্দশও অনুসরণ করবে না। স্বৈরক্ষমতা বা সার্বজনীন ভোটে নির্বাচিত কোন গণপরিষদের ফরমান দিয়েও চলবে না এই সমাজ-সংগঠন।

    তবে এর ব্যাত্যয় ঘটলে, আমি আগেই বলেছি, এমন এক ব্যবস্থা কায়েম হবে যা অবধারিতভাবে নিয়ে যাবে  সরকারি অভিজাততন্ত্রের পথে। সৃষ্টি করবে এমন একটা নতুন শ্রেণি যার সঙ্গে জনগণের কোন সমস্বার্থ থাকবে না। ফলে জনকল্যাণের অজুহাতে কিংবা রাজকীয় মুক্তির নামে নিশ্চতভাবে এই শ্রেণী শোষণ শুরু করবে এবং ফিরে আসবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার সেই পুরনো রীতি।

    সমতার হাতে হাত রেখেই হাঁটবে মুক্তি

    আমি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমতার পক্ষপাতী।  আমারা জানি, সমতার বাইরে মুক্তি, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, নৈতিকতা, ব্যক্তির কল্যাণ বা জাতির অগ্রগতি আদতে মিথ্যের ফুলঝুরি ছাড়া আর কিছুই নয়। মুক্তির পথে- মানবতার পথে প্রথম শর্ত হল সমতা প্রতিষ্ঠা। দুনিয়াব্যাপী,  শ্রম এবং সম্পত্তির যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মুক্ত স্বাধীন সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমতা। সমতা আসবে, পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উৎপাদকদের মুক্ত সংগঠনের সমবায় এবং তার মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে। কেন্দ্র-কর্তৃত্বের এক-অদ্বিতীয় ত্রাণকর্তা রাষ্ট্রর পথ ধরে নয়।

    কর্তৃত্বপরায়ণ ও মুক্তিপরায়ণ বিপ্লবের পার্থক্য

    বিপ্লব প্রশ্নে দুই ধারা। এর একটা হল- সমাজতন্ত্রী বা বিপ্লবী সংঘ। আর আরেকটা হল- কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদী, যারা রাষ্ট্রের মাধ্যমে সবকিছু হাসিল করতে চায়। দুই ধারার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। যদিও উভয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক। যৌথ শ্রম, অর্থনৈতিক সমতা এবং উৎপাদনের উপায়ের উপর সামষ্টিক মালিকানার ভিত্তিতে উভয়েই একটা নতুন সমাজ নির্মাণ করতে চায়।

    সাম্যবাদীরা মনে করেন,  শ্রমজীবী শ্রেণীর বিকাশ এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে, বিশেষত শহুরে সর্বহারা শ্রেণী ও বুর্জোয়া চরমপন্থার সহযোগিতায় এই লক্ষ্য হাসিল সম্ভব। অন্যদিকে  বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা সবধরনের অস্পষ্ট জোটকে শত্রু মনে করে।  রাজনৈতিক ক্ষমতা নয় বরং সামাজিক সংগঠন (যা আদতে রাজনীতি-বিরোধী) এবং গ্রাম-শহরের শ্রমজীবী জনতার শক্তির মাধ্যমে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা এই সাধারণ লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। এমনকি যারা উচ্চকোটিতে জন্মেছে কিন্তু নিজেদের অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং প্রকাশ্যে সর্বহারার সঙ্গে যোগ দিয়ে এর কর্মসূচি মেনে নিয়েছে তারাও এর অর্ন্তভুক্ত হতে পারে।

    সাম্যবাদী ও নৈরাজ্যবাদী কর্মসূচির পদ্ধতি

    সাম্যবাদী এবং নৈরাজ্যবাদী দুটি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি। সাম্যবাদীরা মনে করেন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রন নিতে শ্রমিক-শক্তিকে সংগঠিত করা জরুরি। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রীদের লক্ষ্য খোদ রাষ্ট্রকে বিনাশ করা। একটু পরিশীলিত করে বললে, রাষ্ট্রকেই বিলোপ করে দেয়া। সাম্যবাদীরা কর্তৃত্বের নীতি ও চর্চার দলভুক্ত। অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।

    উভয়েই সমানভাবে বিজ্ঞানের পক্ষপাতি, যা কুসংস্কার দূর করবে এবং অন্ধবিশ্বাসকে প্রতিস্থাপন করবে। কিন্তু সাম্যবাদীরা বিজ্ঞানকে মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। আর বিপ্লবী সংঘ চেষ্টা করে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে মানুষের মাঝে ব্যপৃত করতে যাতে মানব সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের প্রচারে সহমত হলে নিজেরা সংগঠিত হতে পারে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিতে পারে ফেডারেশনে, বাস্তব স্বার্থ এবং স্বাভাবিক প্রবণতার ভিত্তিতে। এমন কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে নয়, যা মুর্খ মানবগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগের  জন্য গুটিকতক ‘উর্বর’ মস্তিস্ক প্রসূত। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রীরা বিশ্বাস করে, আমজনতার সহজাত আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যেই নিহিত থাকে কাণ্ডজ্ঞান এবং সত্যিকারের করণ-কারণ যা কিনা, সমাজের সর্বরোগের বিজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা মনবজাতির ঘাড়ে জুড়ে বসা সবকদাতাদের চৈতন্যে নেই। মানবজাতির উদ্ধারে হতাশাব্যাঞ্জক অসংখ্য ব্যর্থ চেষ্টাই কেবল তাদের উদাহরণ এবং আজও তা একই কায়দায় চলমান। বিপরীতে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা মনে করে, মানবসমাজের আসল রোগটা হল, যোজন যোজন বছর ধরে শাসিত হতে থাকা, যার গোড়া আদতে দুর্ভাগ্য বা বিশেষ ধরনের কোন সরকার ব্যবস্থা নয় বরং খোদ সরকারের অস্তিত্বের মধ্যেই নিহিত।  তাতে সরকারের চরিত্র যাই হোক না কেন।

    মতামতের এসব পার্থক্য এখন ঐতিহাসিকও বটে। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ আর প্রুঁধোবাদের মধ্যে তা বিদ্যমানও। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ জার্মান ঘরানা থেকে উদ্ভূত এবং আমেরিকান ও ইংরেজ সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে আংশিকভাবে গৃহীত। আর প্রুঁধোবাদের সৃষ্টি সমাজতন্ত্রীদের বিকাশমান ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তর উপর ভিত্তি করে এবং তা বিস্তৃত ল্যাতিন দেশগুলোর শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্র প্রথমবারের মতো এর সবচেয়ে উজ্জল ও বাস্তব রূপায়ন ঘটায় প্যারি কমিউনে।

    সর্বজার্মান ব্যানারে লেখা: যেকোন মূল্যে রাষ্ট্রকে রক্ষা ও তার শক্তিবৃদ্ধি। বিপরীতে আমাদের সামাজিক-বৈপ্লবিক ব্যানারে আগুন আর রক্তের আখরে লেখা: সব রাষ্ট্রের ধ্বংস; বুর্জোয়া সভ্যতার বিনাশ। নিচ থেকে উপর ভিত্তিতে স্বতস্ফূর্ত মুক্ত সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিকামী জনতার অবাধ-স্বাধীন শ্রম সংগঠনের মাধ্যমে মুক্ত সমতি গঠন।

    অতঃপর বিশ্বজুড়ে নয়া মানবিক দুনিয়া সৃষ্টি!

    তথ্যপঞ্জি

    ১. গ্রীক দার্শনিক। তাকে পশ্চিমা দর্শনের জনক হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। রাজনীতি, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্যার পুরোধা তিনি। নির্মোহ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জনকে পথ মনে করতেন। তার বিখ্যাত উক্তি: Man is by nature  a political animal . মানবীয় প্রকৃতি যুক্তিশীল এবং এটাই তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে।

    ২. লুক্সেমবার্গ নিয়ে ফ্রান্স এবং প্রুশিয়ার যুদ্ধের সময় লিগ অব পিস এন্ড ফ্রিডম প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৬৭ সালের সেপ্টম্বরে এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। মিখাইল বাকুনিন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। লিগে জনস্টুয়ার্ট মিল, ভিক্টর হুগো, লুইস ব্লাঙ্ক, গ্যারিবাল্ডির মত প্রভাবশালী চিন্তক ও রাজনীতিবিদরাও ছিলেন। কংগ্রেসে প্রায় ৬ হাজার প্রতিনিধি যোগ দেয়।

    ৩. ম্যাজিনি ইতালীয় রাজনীতিবিদ। ঐক্যবদ্ধ ইতালি গঠনে তাঁর ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। ম্যাজিনি রিপাবলিকান ছিলেন। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ সম্পর্কে তার ছিল বিরূপ মনোভাব। তিনি শ্রেণী সংগ্রামের বিরোধিতা করেন এবং শ্রেণী-সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে প্রচার করেন। রাষ্ট্র সম্পর্কে তার ধ্যান-ধারণাই ম্যাজিনয়িাম ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। ইউনাইটেড স্টেটস অব ইউরোপ ধারণারও প্রবক্তা তিনি।

    ৪. ১৮৭১ সালে প্যারিসে শ্রমজীবীরা সমাজ বিপ্লব সংগঠিত করে। এই বিপ্লব ‘প্যারি কমিউন’ নামে পরিচিত। কমিউন একটি যৌথ সমাজ ব্যবস্থা। মুক্ত শ্রম এবং এবং সামাজিক মালিকানা এবং সমতাই ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ঠ্য। স্ব-প্রতিনিধিত্বমূলক এই ব্যবস্থায় স্থায়ী সেনা বাহিনীর বদলে জনগণকে সশস্ত্র করা হয়। এছাড়া স্থায়ী আমলাতন্ত্র-পুলিশ ও বিচারকের বদলে সর্বস্তরে চালু হয় স্ব-প্রতিনিধিত্ব।

  • মিখাইল বাকুনিন।। মানুষ, সমাজ এবং স্বাধীনতা

    মিখাইল বাকুনিন।। মানুষ, সমাজ এবং স্বাধীনতা

    • সহুল আহমদ

    ভূমিকা:

    মিখাইল বাকুনিনের জন্ম রাশিয়ায়, ১৮১৪ সালে। বাকুনিন ছিলেন একজন অ্যানার্কিস্ট, একজন দৃঢ়চেতা বিপ্লবী। বিপ্লবে তাঁর ছিল প্রগাঢ় আস্থা, বিশ্বাস করতেন ঘুরানো-পেঁচানো ঠুনকো কোনো নীতি দিয়ে বিদ্যমান শ্রেণি সংঘাতের প্রশ্নের সমাধান হবে না। এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর জীবনের বিপুল কর্মশক্তির সমস্তটাই নিয়োজিত করেছিলেন বিপ্লবের কাজে। রুডলফ রকার এক মন্তব্যে বাকুনিনকে আধুনিক অ্যানার্কিস্ট আন্দোলনের স্রষ্টা বলে অভিহিত করেছিলেন। সকল অ্যানার্কিস্টের মতো তারও ছিল ‘সকল জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে মুক্ত একটা সমাজের আকাঙ্ক্ষা’। সমাজকে তাঁরা দিয়েছেন সর্বোচ্চ প্রাধান্য। নিচের প্রবন্ধটি বাকুনিন লিখেছিলেন ১৮৭১ সালে। সমাজের মধ্যে ব্যক্তির স্বাধীনতার স্বরূপ কি হবে তা-ই মূল বিষয়। বাকুনিন লিবারেল তাত্ত্বিকদের যুক্তি খণ্ডনের মাধ্যমে এগিয়েছেন। লিবারেল তাত্ত্বিকরা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ব্যক্তিকে সমাজের পূর্ববর্তী ধরে নিয়েছিলেন, আর, বাকুনিন বলছেন যে, ব্যক্তি মূলত সমাজেরই সৃষ্টি। বাকুনিনের মতে, এই চিন্তাধারাই লিবারেল তাত্ত্বিকদের দিনশেষে রাষ্ট্রের রক্ষক বানিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের খবরদারি সীমিত রাখার ব্যাপারে লিবারেলরা খানিকটা অ্যানার্কিস্টদের পাশে অবস্থান নিলেও, বাকুনিনসহ অন্য অ্যানার্কিস্টরা  এটিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁরা চান সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার সকল প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি। তাই, লিবারেলরা যখন বলেন, সেই সরকারই ভালো যে সরকার শাসন করে কম, বিপরীতে অ্যানার্কিস্টরা বলেন, সেই সরকারই ভালো যে সরকার কোনো শাসনই করে না।

    মিখাইল বাকুনিন
    (১৯১৪-১৮৭৬)

    বাকুনিন বলেন, ব্যক্তি যেহেতু সমাজেরই সৃষ্টি, সেহেতু মানুষ ব্যক্তিস্বাধীনতা উপলধ্বি করতে পারে কেবল সমাজের মধ্যে থেকেই। সমাজের তাঁর মতো অন্যান্যদের স্বীকৃতির মাধ্যমেই সে পাবে চূড়ান্ত স্বাধীনতা। সমাজের একটা বিরাট অংশকে পদানত ও দাসত্বের মধ্যে রেখে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব না।  সমাজে বসবাস করার মাধ্যমেই মানুষ তাঁর নিজের ও মানবিকতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। সমাজের বাদবাকি সকলের উপস্থিতিতে ও পারষ্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমেই ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়। এই যে স্বাধীনতার কথা বলা হচ্ছে সেটির মধ্যে বাকুনিন দুইটা উপাদানের কথা উল্লেখ করেন। প্রথম উপাদান হচ্ছে, এটি সম্পূর্ণ সামাজিক, আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, এই স্বাধীনতা নেতিবাচক। নেতিবাচক হচ্ছে এই অর্থে যে, এটি সকল ধরনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সকল রকম কর্তৃত্বকে নাকচ করে দেয়। এই কর্তৃত্ব যেমন ধর্মের, মানে ঈশ্বরের স্বৈরশাসনের , তেমনি মানুষের স্বৈরশাসনের। চার্চকে যেমন বাতিল করে দেয়, তেমনি রাষ্ট্রকেও। অ্যানার্কিস্টদের মতে, রাষ্ট্র তা সে যে তন্ত্রীই হোক না কেনো, স্বৈরতন্ত্রকে আঁকড়ে থাকুক বা সংবিধানকে বুকে রাখুক, তবু তার কার্যাবলী সর্বদা একই থেকে যায়। খারাপ মানুষের স্থলে ভালো মানুষ চলে এলেই রাষ্ট্র বিষয়টা ‘নিপাট ভদ্রলোক’ হয়ে যায় না। রাষ্ট্র সবসময় টিকে থাকে গণশোষণ ও অল্প কিছু মানুষের বিশেষাধিকারের মাধ্যমেই।

    আলোচ্য প্রবন্ধে বাকুনিন সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটা ফারাক করেন, একটিকে তিনি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক হিসেবে হাজির করেন, অন্যটিকে রাজনৈতিক ও আরোপিত রূপে। তবে এই প্রবন্ধে তাঁর আলোচনা যতটা না এই ভেদকে কেন্দ্র করে ছিল, তাঁর চেয়ে বেশি ছিল সমাজ কীভাবে ব্যক্তির ওপর তাঁর স্বাভাবিক ও সহজাত প্রভাব বিস্তার করে সে দিকে। একেবারে সহজ-সরল ভাষায় সমাজের গতিপথ নির্ণয় করেছেন। বাকুনিন বলেন, রাষ্ট্র যেখানে কাজ করে জোরজবরদস্তি ও একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে, সমাজ সেখানে কাজ করে মমত্ববোধ ও পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। এমনকি রাষ্ট্র যখন ভালো কিছু করার জন্যে আইনত বাধ্য করে সেটার ফলও খারাপই হয়, কেননা, মানুষ কোনো ধরনের চাপে ভালো কাজ করে না, বরং, সে ভালো কাজ করে কারণ সে তা স্বাধীনভাবেই পছন্দ করে, সে তা চায় বলেই, সে তা ভালোবাসে বলেই। বাকুনিনের মতে, ব্যক্তির বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সকল ধরনের উন্নতির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে সমাজের মধ্যে। ব্যক্তির স্বাধীনতার মূল জমিনই হচ্ছে সমাজ।

    দুনিয়াজুড়ে যে পরিস্থিতি বর্তমান সেটাই বোধহয় রাষ্ট্র-সমাজ-স্বাধীনতা বিষয়ে অ্যানার্কিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করতে আমাদের উৎসাহ দিচ্ছে। বাকুনিনের এই  প্রবন্ধের অনুবাদ খুব সম্ভব সেই তাগিদ থেকেই। প্রবন্ধের হদিস পেয়েছি মার্ক্সিস্ট অনলাইন আর্কাইভ থেকে। অনুবাদ বিষয়ক যে কোনো মতামত কাম্য।

    মূল প্রবন্ধ 

    লিবারেল তাত্ত্বিকরা, যারা ব্যক্তিস্বাধীনতার জমিনে দাঁড়িয়ে যুক্তি দেখিয়ে থাকেন, তারা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে জাহির করেন। তাদের মধ্যে যারা মানেন যে সরকার, মানে, রাষ্ট্রের কাজ সম্পাদনের জন্যে মনোনীত এবং সুসংগঠিত একটি কার্যনির্বাহী দেহ হচ্ছে প্রয়োজনীয় মন্দ (necessary evil), এবং মানেন যে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যাবলী ও অধিকারগুলোকে ক্রমাগত কমানোর মধ্যেই সভ্যতার অগ্রগতি নিহিত, তাদের মধ্যে অসংগতি আছে। তত্ত্ব তো এমন, কিন্তু চর্চার ক্ষেত্রে এই একই লিবারেল তাত্ত্বিকরা যখন দেখেন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা স্থিতিশীলতা মারাত্মক হুমকির মুখে, তখন তারা রাজতন্ত্রী এবং জ্যাকোবিনদের মতো রাষ্ট্রের গোঁড়া রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হোন।

    রাষ্ট্রের প্রতি তাদের এই যে আনুগত্য, যা তাদের লিবারেল নীতির সাথে সুনির্দিষ্ট-রূপে সাংঘর্ষিক, তা দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বাস্তবে,  তাদের শ্রেণি স্বার্থগুলি  প্রচুর সংখ্যক লিবারেল তাত্ত্বিককে বুর্জোয়া দলের সদস্যে পরিণত করে। এই শ্রেণি শুধু নিজেদের জন্যেই একচেটিয়া অধিকার এবং পূর্ণ ক্ষমতার বিশেষাধিকার দাবি করে। তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের আর্থসামাজিক ভিত্তি laissez faire এবং  laissez aller – এই দুই বিখ্যাত বাক্যাংশে প্রকাশিত অবারিত স্বাধীনতার যে নীতি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। কিন্তু তারা এই নৈরাজ্য শুধু তাদের জন্যেই চায়, জনগণের জন্যে নয়। কেননা, তাদের মতে জনগণকে রাষ্ট্রের কঠোর শৃঙ্খলার অধীনেই রাখা উচিৎ কারণ অপব্যবহার না করে এই নৈরাজ্য উপভোগ করতে জনগণ একেবারেই অজ্ঞ। এটি বলা হয় কারণ, যদি জনসাধারণ অন্যের জন্যে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ করে, তাহলে সমগ্র বুর্জোয়া কাঠামোই ভেঙ্গে পড়বে। সবসময় এবং সবজায়গাতেই, যখন জনসাধারণ অস্থির হয়ে ওঠে, তখন এমনকি সবচেয়ে উৎসাহী লিবারেলও অবিলম্বে বিপরীত দিকে  হাটা শুরু করেন এবং সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের সবচেয়ে গোঁড়া রক্ষক বনে যান।

    এই বাস্তবিক কারণের পাশাপাশি, এখানে আরেকটা তাত্ত্বিক দিকও আছে যা কিনা সবচেয়ে আন্তরিক লিবারেলকে রাষ্ট্র-পূজার দিকে ঠেলে দেয়। তারা নিজেদেরকে লিবারেল দাবি করেন কারণ সমাজ উদ্ভবের তাদের তত্ত্ব ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ঠিক এই কারণেই তারা অবধারিতভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন।

    তাদের মতে ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজের ঐতিহাসিক ফসল নয়। বিপরীতে তারা মনে করেন যে, ব্যক্তিস্বাধীনতা সকল সমাজের পূর্ববর্তী এবং সবাই   ঈশ্বর প্রদত্ত এক অমর আত্মা দ্বারা অধিষ্ঠিত। তদনুসারে মানুষ সমাজ থেকে আলাদা এবং সমাজের বাইরের এক সম্পূর্ণ সত্ত্বা, একেবারেই স্বাধীন। একজন  মুক্ত প্রতিনিধি (agent)  হিসেবে এবং সমাজের পূর্ববর্তী ও সমাজ থেকে আলাদা একজন হিসেবে মানুষ নিজের সমাজ গঠন করে একধরনের চুক্তির মাধ্যমে; তা সেই চুক্তি স্বতঃস্ফূর্ত হোক বা সচেতনই হোক, মৌনসম্মতিতে হোক বা আনুষ্ঠানিকই হোক। সংক্ষেপে, এই তত্ত্বানুসারে, ব্যক্তি সমাজের ফসল নয়, বরং উল্টো ব্যক্তিই বিভিন্ন কাজ বা যুদ্ধের মতো কিছু প্রয়োজনীয়তার খাতিরে এই সমাজ তৈরি করেছে।

    এই তত্ত্ব অনুযায়ী এও মেনে নেয়া হয় যে, সমাজের অস্তিত্ব নেই। স্বাভাবিক মানব সমাজ, সকল সভ্যতার সূতিকাগার ও একমাত্র প্রতিবেশ হিসেবে যেখানে ব্যক্তিত্ব এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা গড়ে ওঠে ও বিকশিত হয় তা তাদের জন্যে অস্তিত্ব-মান নয়।  একদিকে, এই তত্ত্ব শুধু বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তিকেই স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে এই তত্ত্ব ব্যক্তির ইচ্ছায়, এবং আনুষ্ঠানিক অথবা মৌনসম্মতির ভিত্তিতে সৃষ্ট সমাজকে, অর্থাৎ, রাষ্ট্রকেই স্বীকৃতি দেয়। (তারা খুব ভালো করেই জানে যে ইতিহাসে এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যা চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, এবং তারা এও জানে যে সকল রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দখলবাজি ও সহিংসতার মাধ্যমে।)

    যেসব ব্যক্তিদের নিয়ে এই রাষ্ট্র গঠিত তাদেরকে এই তত্ত্ব যেভাবে দেখে তা পুরোপুরি পরষ্পরবিরোধিতায় ভর্তি। একদিকে বিবেচনা করা হয় যে, প্রত্যেকের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছার (free will) একটি অমর আত্মা প্রোথিত আছে। সবাই স্বয়ংসম্পূর্ণ অ-শৃঙ্খলিত সত্ত্বা এবং তাদের কারো দরকার নেই, এমনকি ঈশ্বরেরও দরকার নেই। আত্মার অমরত্বের জন্যে তারা নিজেরাই নিজেদের ঈশ্বর। অন্যদিকে, তারা নিষ্ঠুর, দুর্বল, অসম্পূর্ণ, সীমাবদ্ধ, এবং প্রকৃতির শক্তির সম্পূর্ণ অধীন যা তাদের পরিবেষ্টন করে এবং ধীরে ধীরে তাদেরকে কবরের দিকে নিয়ে যায় …

    জনসাধারণের পার্থিব অস্তিত্ব তাদের এতো হীন ও দুর্দশাগ্রস্থরূপে হাজির করে, উদ্দীপনায়, ইচ্ছায় এবং উদ্যোগে এতো দুর্বলরুপে হাজির করে যে তাদের মধ্যে কোনো অমর আত্মা বা স্বাধীন ইচ্ছার ন্যূনতম কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারা সম্পূর্ণ নির্ধারিত (determined) রূপে হাজির হয়। তারা বহিরাগত শক্তি, নক্ষত্র, এবং তাদের জীবনের সকল বস্তুগত শর্ত দ্বারা নির্ধারিত; তারা আইন দ্বারা এবং বিগত শতাব্দীর যাবতীয় চিন্তা ও কুসংস্কার দ্বারা নির্ধারিত; এসব তার জন্মের পরপরই তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রস্তুত থাকে। এই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি, শুধু অজ্ঞ জনসাধারণই নয় বরং তাদের মধ্যে সবচেয়ে সভ্য ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির ব্যক্তিও ঠিক তাই চিন্তা করে ও চায় যা তাদের চারপাশের সবাই চিন্তা করে ও চায়। তারা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে যে তারা তাদের জন্যে চিন্তা করছে, কিন্তু তারা আসলে অন্যান্য অনুগামীদের যে চিন্তা ও লক্ষ্য যা তারা ক্রমশ গ্রহণ করেছে তা-ই হালকা অদলবদল করে দাসোচিত পুনরাবৃত্তিই করছে। এই গোলামি, এই নিত্যকর্ম, বিদ্রোহ করার ইচ্ছার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং উদ্যোগ ও স্বাধীন চিন্তার অভাবই হচ্ছে মানবতার মন্তর ঐতিহাসিক বিকাশের মূল কারণ। আমরা যারা বস্তুবাদী (materialists) এবং বাস্তববাদী (realists), যারা কোনো আত্মার অমরত্ব বা স্বাধীন ইচ্ছার উপর বিশ্বাস রাখি না, আমাদের জন্যে এই মন্থরতা – তা যতোই ধ্বংসাত্মক হোক – একটা প্রাকৃতিক বাস্তবতা (natural fact)। গরিলা অবস্থা থেকে উত্থানে মানুষ প্রচুর বাধা ডিঙিয়ে তার মানবতার চেতনা এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছে। … তার জন্ম হয় একটি বন্য পশু ও দাসরূপে, এবং ক্রমান্বয়ে সে নিজেকে মানবিক (humanized) এবং মুক্ত (emancipated) করে কেবল সমাজের মধ্যেই যা অপরিহার্যভাবে তার চিন্তা, ভাষা এবং ইচ্ছারও পূর্ববর্তী। সে এই মুক্তি অর্জন করতে পারে কেবল সমাজের বর্তমান ও অতীতের সকল সদস্যের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে। এই সমাজই তার মানব অস্তিত্বের সহজাত সূচনার উৎস।

    আর্টওয়ার্ক: ম্যান
    শিল্পী: মকবুল ফিদা হুসেন
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    মানুষ তার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে কেবল তার চারপাশের ব্যক্তিদের মাধ্যমে, এবং সেটা শ্রম ও সমাজের যৌথ ক্ষমতার কারণেই। সমাজ না থাকলে সে সকল বন্য পশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকুব ও দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকতো … সমাজ, তার স্বাধীনতা কমানো দূরে থাক, বরং উল্টো সমস্ত মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা তৈরি করে দেয়। সমাজ হচ্ছে মূল, গাছ। স্বাধীনতা হচ্ছে তার ফল। তাই, প্রত্যেক যুগেই, মানুষকে তার স্বাধীনতা খুঁজতে হয়েছে শুরুতেই নয়, বরং, ইতিহাসের শেষে। এটা বলা যায়, ইতিহাসের প্রকৃত, মহান, সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পূর্ণ মুক্তি …

    আদর্শবাদীদের ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার বস্তুবাদী (materialistic), বাস্তববাদী (realistic) এবং যৌথতাবাদী (collectivist) মতটি হচ্ছে এই: মানুষ নিজের ও তার মানবতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে কেবল সমাজের মধ্যেই এবং কেবল সমগ্র সমাজের যৌথ কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে। সে নিজেকে বহিরাগত প্রকৃতির জোয়াল থেকে মুক্ত করে কেবল যৌথ এবং সামাজিক শ্রমের মাধ্যমে, যা একাই পৃথিবীটাকে মানবতা  বিকাশের উপযোগী আবাসস্থলে রূপান্তর করতে পারে। এমন বস্তুগত মুক্তি ব্যতীত ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক মুক্তি অসম্ভব। সে নিজেকে তার নিজ-স্বভাবের জোয়াল থেকে মুক্ত করতে পারে, যেমন, মনের ইচ্ছানুযায়ী  নিজের সহজাতপ্রবৃত্তি ও নিজ শরীরে গতিবিধিকে অধীন করতে পারবে; এই মনের  বিকাশ আবার প্রতিপালিত হয় কেবল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই। কিন্তু, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রধানত এবং একচেটিয়াভাবে সামাজিক… তাই বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি সম্ভবত তার স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারেনা।

    মুক্ত হওয়া… মানে সহকর্মীদের দ্বারা অনুরূপ স্বীকৃতি এবং আচরণ পাওয়া। প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতা কেবল তার নিজস্ব মানবতার প্রতিফলন, অথবা তার ভাই ও তার মতো সমান সকল মুক্ত মানুষের চেতনার মাধ্যমে অর্জিত নিজস্ব মানবিক অধিকারের প্রতিফলন।

    আমি স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারব কেবল অন্যান্য মানুষের উপস্থিতি ও তাদের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে। নিকৃষ্ট প্রজাতির কোনো প্রাণীর উপস্থিতিতে আমি না নিজেকে মুক্ত বলতে পারব না মানুষ বলতে পারব, কারণ এই প্রাণী আমার মানবতা চিনতে এবং স্বীকৃতি দিতে অক্ষম। আমি নিজে মুক্ত হতে পারবো না যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার সকল সহকর্মীর স্বাধীনতা ও মানবতাকে স্বীকার করতে পারি।

    তাদের মানবিক চরিত্রকে সম্মান জানিয়েই কেবল আমি আমাকে সম্মান জানাই। যে রাক্ষস তার বন্দিকে খেয়ে ফেলে … সে মানুষ নয়, পশু। একজন দাস-মালিক মানুষ নয়, বরং প্রভু। দাসের মানবতাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সে আসলে নিজের মানবিকতাকেই বাতিল করে দেয়, যেমন সকল প্রাচীন সমাজের ইতিহাস তাই প্রমাণ করে। গ্রীক এবং রোমানরা স্বাধীন মানুষের মতো অনুভব করতে পারে নাই। তারা মানবিক অধিকারের দ্বারা নিজেদের এমনভাবে চিন্তা করে নাই। গ্রীক ও রোমানরা যখন অপরাজেয় ছিল এবং অন্যান্য দেশ জয় করছিল তখন তারা বিশ্বাস করতো তাদের এবং তাদের নিজেদের দেশের বিশেষাধিকারে ।  কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল তারা নিজেদের জাতীয় দেবতার বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আছে। তারা ভাবতেই পারেনি যে তাদের বিদ্রোহ করার অধিকার ছিল … এবং নিজেদেরকে দাসত্বের মধ্যেই ফেলেছিল…

    আমি প্রকৃতপক্ষে তখনই মুক্ত হবো যখন সকল মানুষ, পুরুষ ও নারী, সমানভাবে মুক্ত হবে। অন্য মানুষের স্বাধীনতা, আমার স্বাধীনতাকে বাতিল করা বা সীমিত করা দূরে থাক, উল্টো বরং এটাই আমার স্বাধীনতার আবশ্যিক পূর্বানুমান এবং নিশ্চিতকরণ। অন্যের দাসত্ব আমার স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা প্রতিষ্ঠা করে, অথবা সমানভাবে বলা যায়, অন্যের পাশবিকতা আমার মানবিকতাকে বাতিল করে দেয়।  আমার মানবিক অধিকার অন্যের গোলামি করাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে এবং দৃঢ়তার সাথে নিজের কাজ নির্ধারণ করার মধ্যে নিহিত।  তাই, আমার মানবিক মর্যাদা  সকলের অবিশেষ মুক্ত চেতনা ও সকল মানুষের সম্মতিক্রমে নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। সবার স্বাধীনতার দ্বারা স্বীকৃত আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অনন্ত প্রসারিত।

    সুতরাং, মুক্তির বস্তুগত ধারণাটি খুবই ইতিবাচক, অনেক বেশি জটিল এবং সবচেয়ে বড় কথা, অতিরিক্ত পরিমাণে সামাজিক, কারণ একে শুধুমাত্র সমাজের মধ্যে থেকেই মানুষের মাঝে বিরাজমান কঠোর সাম্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে বুঝা সম্ভব। মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে মূল উপাদানগুলোকে পৃথক করা সম্ভব। প্রথমটি অতিরিক্ত সামাজিক। আর তা হচ্ছে শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ, এবং বস্তুগত উন্নতির মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ। যেই জিনিসগুলো সাধারণত সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি-মানুষ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব কেবল সমাজের সামষ্টিক, বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও অদৈহিক শ্রমের দ্বারা।

    স্বাধীনতার দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে নেতিবাচক। এটি সকল প্রকার ঐশ্বরিক, যৌথ ও একক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ।

    প্রথম বিদ্রোহ হচ্ছে ধর্মতত্ত্বের সর্বোচ্চ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, ঈশ্বরের অলীক ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। যতক্ষণ বেহেশতে আমাদের একজন প্রভু থাকবেন, ততক্ষণ আমরা দুনিয়াতে তার দাস থাকবো। আমাদের যুক্তি এবং আমাদের ইচ্ছা সমানভাবে বাতিল হয়ে যাবে। যতক্ষণ আমরা বিশ্বাস করবো যে আমাদের নিঃশর্ত গোলামি করতে হবে – এবং,  ঈশ্বরের  মতো আর কারো আনুগত্য সম্ভব নয় – ততক্ষণ আমাদের কোনো ন্যূনতম সংরক্ষণ ছাড়াই তার পবিত্র ও অপবিত্র  এজেন্ট, মসিহ, পয়গম্বরগণ, ঐশ্বরিক আইন-প্রণেতা, সম্রাট এবং রাজাদের পবিত্র কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে সপে দিতে হবে। নিজেকে সপে দিতে হবে চার্চ ও রাষ্ট্র নামক দুইটা বিশাল প্রতিষ্ঠানের সকল মিনিস্টার, প্রতিনিধি  এবং পবিত্র পরিচারকদের কাছে, যা ঈশ্বরকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষকে শাসন করার নামে এবং আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সমস্ত সাময়িক অথবা মানব কর্তৃত্বের ডালপালা সরাসরি আধ্যাত্মিক এবং/অথবা ঐশ্বরিক কর্তৃত্ব থেকে গজায়। কিন্তু, কর্তৃত্ব মানেই স্বাধীনতার অস্বীকৃতি। ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের কল্পনাই হচ্ছে পৃথিবীর সকল দাসত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক এবং জায়েজীকরণের উৎস। মানবজাতির স্বাধীনতা কখনোই সম্পূর্ণ হবে না যদি না এই ধ্বংসাত্মক ও ছলনাপূর্ণ প্রভুকে বিলুপ্ত করা হয়।

    এই বিদ্রোহ স্বাভাবিকভাবে অনুসৃত হয় মানুষের-স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দ্বারা; সেই স্বৈরশাসন যেমন ব্যক্তির হতে পারে, তেমনি হতে পারে সমাজের, হতে পারে রাষ্ট্র কর্তৃক বৈধ প্রতিনিধিত্বকারীর। এই স্থলে, রাষ্ট্র হিসেবে সংগঠিত সমাজের অফিসিয়াল ও  স্বৈরাচারী বিশেষ ক্ষমতা এবং নন-অফিসিয়াল, অকৃত্রিম সমাজের সদস্যদের সহজাত প্রভাব ও ক্রিয়া –  এই দুয়ের মধ্যে একটা সুনির্দিষ্ট পার্থক্য তৈরি করতে হবে।

    রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার তুলনায় এই প্রাকৃতিক সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ব্যক্তির পক্ষে অনেক বেশি কঠিন।  সামাজিক স্বৈরশাসন প্রায়শই অপ্রতিরোধ্য ও সর্বনাশা হলেও সে আইনসম্মত ও  বৈধ স্বৈরতন্ত্রের সহিংস বাধ্যতামূলক চরিত্র গ্রহণ করে না, যা মূলত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের চিহ্ন বহন করে। এটি আইনের রূপে আরোপিত হয় না যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি বিচার-বিহিত দণ্ডের যন্ত্রণায় নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। সামাজিক স্বৈরশাসনের কর্মকাণ্ড তুলনামূলক-ভাবে নমনীয়, আরো বেশি কুটিল এবং সূক্ষ্ম হলেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের চেয়ে কোন অংশে কম শক্তিশালী ও ব্যাপক নয়।  এটি মানুষকে শাসন করে প্রথা, আচার-আচরণ, জনসাধারণের পূর্বধারণা, প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যাস দ্বারা, যাকে একসাথে জনমত (Public Opinion) বলে অভিহিত করা হয়।

    এটি ব্যক্তিকে জন্ম থেকেই আচ্ছন্ন করে রাখে,  জীবনের প্রতিটি দিকে প্রবেশ করে, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তিই প্রায় অজ্ঞাতসারেই নিজের বিরুদ্ধেই একধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এর থেকে এটাই বোঝা যায় যে, সমাজ প্রাকৃতিক-ভাবে যে প্রভাব ব্যক্তির উপর বিস্তার করে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হলে তাকে অন্তত কিছুটা হলেও নিজের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করতে হবে। তার সকল সহজাত প্রবণতা এবং বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক আকাঙ্ক্ষার কারণেই সে সমাজের ফসল ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজ যে ব্যক্তির উপর অপরিমেয় ক্ষমতা খাটায় তা এতেই নিহিত থাকে।

    পরম নৈতিকতার  দৃষ্টিকোণ থেকে, যেমন মানব মর্যাদা, সমাজের এই ক্ষমতা যেমন হিতকর হতে পারে তেমনি ক্ষতিকরও হতে পারে। এটি তখনই উপকারী যখন তার ঝোঁক বিজ্ঞান, বস্তুগত সমৃদ্ধি, স্বাধীনতা, সাম্য ও সংহতির ক্রমবিকাশের প্রতি থাকে। এটা ক্ষতিকর তখনই যখন তার ঝোঁক বিপরীত দিকে থাকে। যে ব্যক্তি বর্বর জন্তুদের মাঝে জন্মায় তার ঝোঁক থাকে বর্বরতার দিকেই; যে যাজক শাসিত সমাজে জন্মায় সে নির্বোধ ভণ্ড ধর্মধ্বজীই হয়; যে চোরদের দলে জন্মায় সে বোধহয় চোরই হয়ে থাকে; এবং যদি দূর্ভাগ্যবশতভাবে সে রাজা-বাদশাহর মতো উপদেবতার (demigods) সমাজে জন্মে যারা পৃথিবীকে শাসন করে, তাহলে সে সমাজের ঘৃণ্য অত্যাচারী শাসকই হবে। এই সকল ক্ষেত্রেই যে সমাজে তার জন্ম হয়েছে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটা ব্যক্তির মানবীকরণের জন্যে অপরিহার্য।

    কিন্তু, আমি আবারো বলছি, সমাজের বিরুদ্ধে ব্যক্তির বিদ্রোহ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেয়েও কঠিন। রাষ্ট্র তার ভাতৃপ্রতিম সংগঠন চার্চের মতো একটি ক্ষণস্থায়ী, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান যে একটি সংখ্যালঘুর বিশেষাধিকারের নিয়ন্ত্রক এবং অধিকাংশের গোলামীর জন্যে দায়ী।

    রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অনেক কম কঠিন কারণ রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যেই এমন কিছু আছে যা বিদ্রোহে প্ররোচিত করে। রাষ্ট্র হচ্ছে কর্তৃত্ব, শক্তি। শক্তির সাথে থাকে দম্ভ এবং প্রমত্ততা। এটি নিজেকে ধীরে ধীরে সুকৌশলে প্রবেশ করায় না। এটি পরিবর্তিত হতে চায় না। সময়ে সময়ে এটি যদি নিজের শাসনের উন্নতি ঘটাতে চায় তাহলে সেটা খারাপভাবেই করে। পটানো তার চরিত্রে নেই, বরং, সে নিজেকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই চাপিয়ে দেয়। নিজেকে মুখোশ পরাতে যতই কষ্ট হোক না কেনো, এটি স্বভাবতই মানুষের ইচ্ছার বৈধ লঙ্ঘনকারী. তাদের স্বাধীনতাকে স্থায়ীভাবে নাকচ করে দেয়। এমনকি যখন রাষ্ট্র ভালো কিছু আদেশ দেয়, সে আসলে খারাপকে নিয়ে আসে। এর প্রতিটি আদেশ স্বাধীনতার গালে চপেটাঘাত-স্বরূপ। কারণ যখন ভালোকে আইন জারি করে আদেশ দেয়া হয়, তখন মানবিক নৈতিকতা ও স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে এটি খারাপে পরিণত হয়।  ব্যক্তির স্বাধীনতা, নৈতিকতা এবং মানবিক মর্যাদা এর মধ্যে নিহিত থাকে যে, সে ভালো কাজ করে এই জন্যে না যে সে এটি করতে বাধ্য, বরং এই জন্যে করে যে সে স্বাধীনভাবে এটি ধারণ করে, এটি চায় এবং এটিকে ভালোবাসে।

    সমাজের কর্তৃত্ব ইচ্ছামত বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ হয় না, বরং স্বাভাবিকভাবে হয়। এবং এই বাস্তবতার কারণে ব্যক্তির উপর এটির প্রভাব রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এটি তার মধ্যেই সকল ব্যক্তিকে তৈরি করে এবং তার ছাঁচে গড়ে তোলে। ব্যক্তির জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সমাজ তার সকল বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। সুতরাং, একরকমভাবে বলতে গেলে প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে সমাজ তার নিজেকেই স্বতন্ত্র-রূপে প্রকাশ করে।

    ব্যক্তি তার মায়ের গর্ভে থাকাকালীন অবস্থা থেকেই ভৌগলিক, জলবায়ু, জাতিগত, স্বাস্থ্যগত এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের মিলনের ফলে পূর্বনির্ধারিত ও বিশেষায়িত হয়ে যায় যেগুলো তার পরিবার, তার শ্রেণি, তার জাতি, তার বর্ণ গঠন করে। এসব বহিরাগত ও ভৌত প্রভাবের মিলনের ফলে সৃষ্ট তাঁর প্রবণতা অনুসারে সে গঠিত হয়।

    তাছাড়া, মানব মস্তিষ্কের তুলনামূলক-ভাবে  উচ্চতর গঠনের ফলে, প্রতিটি ব্যক্তি জন্ম থেকেই বিভিন্ন মাত্রায় কিছু বিষয় উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন। সেটা কোনো চিন্তা ও সহজাত অনুভূতি নয় যেমন আদর্শবাদীরা দাবি করে থাকেন, বরং ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকেন অনুভব করার শক্তি, ইচ্ছাশক্তি, চিন্তা করার শক্তি এবং কথা বলার শক্তি। কোনো সারবস্তু ছাড়াই অবিকশিত ব্যক্তি থাকে । তাদের সারবস্তু কোথা হতে আসে? সমাজ থেকে … চিন্তার প্যাটার্নে সমবেত হওয়া ধারণাসমূহ, তথ্যাবলি এবং ঘটনাসমূহ, ভালো অথবা মন্দ, এইসব এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির মধ্যে প্রেরিত হয়। সমাজের সকল ব্যক্তি সদস্য ও গোষ্ঠী দ্বারা এইসব সংশোধিত, সম্প্রসারিত, পারষ্পরিকভাবে প্রশংসিত ও সংহত হয়ে এমন একটা অনন্য ব্যবস্থা গড়ে উঠে যা পরিশেষে একটি সমাজের সাধারণ চেতনা ও যৌথ চিন্তাকে গঠন করে।  এই সব কিছু চিরায়ত উপায়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রেরিত হয়ে, শত বর্ষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দ্বারা বিকশিত ও বর্ধিত হয়ে একটা জাতির, একটা শ্রেণির এবং একটা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক পরম্পরা গঠিত হয়।

    আর্টওয়ার্ক: আইডিওলজি
    শিল্পী: ভ্লাদেমির কাজানেভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রত্যেক প্রজন্মই চিন্তার পরিপক্বতায় পৌঁছানোর পর নিজের ও নিজের সমাজের মধ্যে প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠিত ধারণা ও চিন্তাসমুহ এটির যাত্রাবিন্দু হিসেবে কাজ করে থাকে, যেন এটি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শ্রমের কাঁচামাল … এগুলো হচ্ছে প্রকৃতি সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে, ন্যায্যতা সম্পর্কে, ব্যক্তি ও শ্রেণির দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে, সামাজিক সম্মেলন সম্পর্কে, পরিবার সম্পর্কে, সম্পত্তি সম্পর্কে এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা সমূহ এবং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক প্রভাবিত করে এমন আরো অনেক ফ্যাক্টর সমূহ। এসব ধারণাসমূহ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দ্বারা শর্তায়িত হয়ে ব্যক্তির মনে অঙ্কিত হয়ে যায় যা ব্যক্তি নিজেকে একটা সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করার পূর্বেই গ্রহণ করে ফেলেন ।  অনেক পরে তিনি এগুলো পুনরাবিষ্কার করেন, প্রতিষ্ঠাপিত করেন, ব্যাখ্যা করেন, এবং তত্ত্ব দ্বারা বিস্তৃত করেন। এগুলোই তিনি যে সমাজে বসবাস করেন সে সমাজের ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সর্বজনীন চেতনা বা সমষ্টিগত পূর্বানুভূতি (Prejudice) প্রকাশ করে। এইসব পূর্বানুভূতিতে (Prejudice)  তিনি এতই সিক্ত থাকেন যে তিনি তার সকল বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক অভ্যাসের কারণেই, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও, এইসব পাপাচারের সমর্থক হয়ে উঠেন; এমনকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে এগুলো রক্ষা করতে আগ্রহী না হলেও।

    এটি মোটেও বিস্ময়কর নয় যে, যে ধারণাসমূহ সমাজ সমষ্টিগতভাবে জারি রাখে জনসাধারণের ওপর সেগুলোর প্রভাব এত দৃঢ়। বরং বিস্ময়কর এটি যে, এই জনসাধারণের মধ্যেও এমন কিছু ব্যক্তি থাকেন যাদের প্রথার স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো চিন্তা, ইচ্ছা এবং সাহস থাকে। ব্যক্তির ওপর সমাজের চাপ এত দৃঢ় যে এর কারণে কেউই, তিনি যতই দৃঢ় চরিত্রের বা যতই প্রগাঢ় বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হোন না কেনো, সমাজের এই স্বৈরচারী ও দুর্নিবার প্রভাব থেকে পুরোপুরি রেহাই পাবেন না।

    এই প্রভাবের চাইতে ভালো করে করে আর কিছুই মানুষের সামাজিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে না। বলা যেতে পারে যে, সমাজের সমষ্টিগত চেতনাই, যা কিছুই বড়ো বড়ো পাবলিক প্রতিষ্ঠানসমূহে এবং ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটিতে খোদাই করা আছে, সকল তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক  আবহ গড়ে তোলে। এই আবহ খারাপ হতে পারে, তবু তার সকল সদস্যের অস্তিত্বের জন্যে পুরোপুরি আবশ্যক। এই আবহ তাকে শাসন করলেও ধরে রাখে, এবং গতানুগতিকতা ও রুটিনকে জোরদার করে যা বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণকে একত্রিত করে।

    অধিকাংশ মানুষ, শুধু সাধারণ মানুষই না বরং বিশেষাধিকার প্রাপ্ত ও আলোকিত শ্রেণির মানুষরাও আরো বেশি অস্বস্তি-বোধ করেন যদি না তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথা ও রুটিন বিশ্বস্তভাবে মেনে চলেন ও  অনুসরণ করেন । তারা যুক্তি দেখান যে, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা এইভাবে চিন্তা ও কাজ করেছেন, তাই আমরাও একইভাবে চিন্তা ও কাজ করবো। প্রত্যেকেই একইভাবে চিন্তা ও কাজ করে। আমরা কেনো আলাদাভাবে চিন্তা ও কাজ করবো?’

    বইপত্রের হদিস
    ১) মিখাইল বাকুনিন, অরাজ রাষ্ট্রহীন সমাজতন্ত্র, অনুবাদ: নুরে আলম দুর্জয়, স্বাধীনতা প্রকাশন।
    ২) রুডলফ রকার, নৈরাজ্যবাদ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, অনুবাদ: সেলিম রেজা নিউটন, স্বাধীনতা প্রকাশন।

    সম্পাদকীয় নোট: রচনাটি অরাজের বাকুনিন রচনা সংকলনের জন্য অনুবাদ করা হয়। এরই মধ্যে অনুবাদটি রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

  • মর্গান ও লেনিন প্রসঙ্গে

    মর্গান ও লেনিন প্রসঙ্গে

    শহিদুল ইসলাম

    উনিশ শতক বিশ্বের পাঁচজন মহামানবের জন্ম দেয়। তাঁরা হলেন চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২), কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩), লুইস হেনরি মর্গান (১৮১৮-১৮৮১) ফ্রেডারিক এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫) এবং  ভি. আই. লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)। আমার মনে প্রশ্ন দেখা দেয় অনেক আগে যে, ডারউইন, মার্কস ও এঙ্গেলস এই তিনজন যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের পাঠ্যসূচিভূক্ত করা হয়েছে, মর্গান ও লেনিনের ক্ষেত্রে তা হল না কেন? ১৮৭৭ সালে মর্গানের সাড়া জাগানো Ancient Society  প্রকাশিত হয়। তাঁকে আমেরিকার নৃতত্ত্বের জনক বলা হয়। অথচ নৃতাত্বিক বিভাগের বাইরে সাধারণ সাংস্কৃতিক জগতে তিনি আজও অনালোচিতই রয়ে গেলেন। কেন? ১৯৭৫ সালে বুলবন ওসমান বইটির বাংলা অনুবাদ করেন। বাংলা একাডেমি  বইটি প্রকাশ করে। বুলবন ওসমান বইটির ‘পূর্বাপরে’ আমাদের জানান যে, আদিম সমাজ  প্রকাশিত হবার পর কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলস বইটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁরা উক্ত বইয়ের দ্বারা সমাজ বিবর্তনের ‘প্রতি বেশি আকৃষ্ট’ হন। তাই বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বের সমাজ ও নৃবিজ্ঞানীরা মর্গানের অবদানকে যথাযথ মূল্য না দিয়ে তাঁর তথ্যসমূহের ভুলভ্রান্তি খোঁজায় নিযুক্ত হয়ে পড়েন। মর্গান মার্কসবাদী ছিলেন না। বরং ওসমান বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন পুঁজিবাদই হল সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রই হল সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র এবং খৃষ্টধর্মই হল একমাত্র সত্য ধর্ম। তাহলে কি মার্কস-এঙ্গেলসের প্রশংসা করাই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়ালো? সেটাই কি তাঁর জীবনে অভিশাপ হয়ে দেখা দিল? বুলবন ওসমান তাই মনে করেন। (ওসমান, ২০০০:৯)

    লুইস হেনরি মর্গান

    সম্প্রতি ড. ক্রিস্টোফার রায়ান ও ক্যাসিলডা জেথার Sex At Down বইতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মর্গানের বক্তব্য বিবেচনা করেছেন। সেই সঙ্গে যৌনতা সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল ডারউইনের চেয়ে অনেক বেশি সত্যের কাছাকাছি। সেই বইতে তাঁরা মর্গান সম্পর্কে লেখেন,

    The Only American scholar to have been cited by each of the other intellectual giant of his century Darwin, Freud and Marx, many consider Morgan the most influential social scientist Of his era and the father of American anthropology. Ironically, it may Marx and Engels’s admiration that explains why Morgan’s work is not better known today. Though he is was no Marxist…. (Ryan, Jetha 2100: 64)

    এতে প্রমাণ হয় যে, ভলতেয়ারের শখের গণতন্ত্রের আজ কি পরিণতি? যে সমাজ ভিন্ন মতাবলম্বিদের যথাযথ সম্মান দিতে জানে না সে সমাজ কি গণতান্ত্রিক? সমাজের শাসক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণী কতটা রাজনৈতিক ভাবাদর্শ দ্বারা অন্ধ তার বড় প্রমাণ। কেবল সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা অন্ধেত্বের কথা বিশ্বময় প্রচার করা হয়। এটা কি পুঁজিবাদী সমাজের বুর্জোয়া শাসক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মতান্ধতা নয়?

    দুই.

    এবার লেনিন প্রসঙ্গে। লেনিন একটি রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী এবং ১৯১৭ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্ব তাঁকে ত্যাগ করবে, এতে আমি আশ্চর্য হই না। তাঁর রাজনৈতিক মতবাদের বিরোধিতা আমি করতেই পারি, তাঁর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিরোধিতা আমি করতেই পারি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, লেনিনের নাম যদি উক্ত মতাদর্শের সঙ্গে মিশে না যেত, তাহলে প্লেটো, অ্যারিস্টেটল, কান্ট, হিউম, হবস, স্পিনোজা, হেগেলের সঙ্গে তাঁরও নাম একজন দার্শনিক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিভূক্ত হত।

    ভি আেই লেনিন

    পাণ্ডিত্যের বিচারে সমসাময়িক দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের চেয়ে তিনি কোনভাবে কম ছিলেন না। রাজনীতি, আন্দোলন, বিপ্লবের সাফল্য ও ব্যর্থতার পাশাপাশি তিনি দুহাতে কেবল সমসাময়িক ঘটনাই নয়, পৃথিবীর সমাজ, সভ্যতা ও অর্থনীতি নিয়ে লিখে গেছেন। সম্ভবত তাঁর রচনার ৯৭ খণ্ডের মধ্যে আমার কাছে আছে ৬২ খণ্ড। তাঁর Philosophical Notebook বইটি পৃথিবরি ইতিহাসে এক জীবন্ত দলিল। সেই সঙ্গে সমসাময়িক ঘটনার উপর তাঁর ব্যক্তিগত মতের চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু আমি যে খণ্ডটি নিয়ে আজ লিখতে বসেছি, সেটি তাঁর তৎকালীন বস্তুবাদের আড়ালে ভাববাদী দার্শনিক আধিপত্যের মুখোশ উন্মোচনকারী। সেটি ১৪ নম্বর খণ্ড। নাম Materialism And Empirio Criticism: Critical Comments On A Reactionary Philosophy । বইটি প্রকাশ করেছে মস্কোর প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, লেখা ১৯০৮ সালে। ১৯৭২ সালে বইটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। লেনিন যদি রাজনীতি বিপ্লব না করে কেবল এই একটি বই লিখতেন, তাহলে আমার বিশ্বাস বিশ্বের একাডেমিক মহল তাঁকে এভাবে দর্শনের বাইরে রাখতে পারতেন না। এই বইটি সামনে রেখে দেবীপ্রসাদ চট্টপাধ্যায় লিখেছেন দার্শনিক লেনিন । (চট্টপাধ্যায় ১৯৮০)। এখানে তিনি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানের ইতিহাসকার ও দার্শনিক জে. ডি. বার্নালের একটি উক্তির উল্লেখ করেছেন। ‘লেনিন যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম না’ও হতেন, তাহলেও নিছক অর্থনীতি ও দর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর বুদ্ধিবিদ্যার অবশ্যই স্বীকৃতি হত। বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ বিচারবাদ গ্রন্থে মাখের দৃষ্টবাদ (Positivism) প্রবণতা এবং এই প্রবণতার বশবর্তী হয়ে তাঁর অনুগামীরা রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছিলেন তা বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান যে, বস্তুনিষ্ট বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্ত দাবি সত্বেও সকলে যে পথে এগুচ্ছিলেন তা বার্কলে ও প্লেটোর ভাববাদে প্রত্যাবর্তনের পথ ছাড়া আর কিছু না; অতএব এ মত প্রতিক্রিয়াকেই সমর্থন করে। (চট্টপাধ্যায়: ২৫; Bernal, J. D: 1969 : 1169)

    আর্নেস্ট মাখ

    উনিশ শতকের শেষের দিকে আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের যাত্রাপথটা নির্বিঘ্ন ছিল না। তৎকালীন দৃষ্টবাদ (Positivism) শক্তিবাদ (Energitivism) প্রভৃতি পরাক্রমশালী দর্শনের বিরুদ্ধে কঠিন এক লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল নবজাতক আধুনিক বিজ্ঞানকে এবং সেইসব ভাববাদী দর্শনকে পরাজিত করে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছিল। সেই নবজাত বিজ্ঞানের প্রতি দর্শন ও জ্ঞানতত্ত্বের সামান্যই সমর্থন ছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনাকারীরা অষ্ট্রীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও দার্শনিক  আর্নেস্ট মাখের (১৮৩৮-১৯১৬) দৃষ্টবাদের সুনামিতে ভেসে গিয়েছিলেন। আইনস্টাইন, ম্যাক্স প্লাঙ্কও বাদ যাননি। ১৮৮০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে দৃষ্টবাদ ছিল ইউরোপের প্রতিনিধিত্বশীল দার্শনিক মতবাদ। নবজাত পদার্থবিজ্ঞানীরা দৃষ্টবাদকে বিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত অংশ বলেই মনে করতেন। তাঁরা তখন বুঝতে পারেননি যে, এটা বস্তুগত পৃথিবীর বিষয়নিষ্ঠ (Objective) ব্যাখ্যার জায়গায় বিষয়ীগত (Subjective) ব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়। ম্যাক্স প্লাঙ্ক পরে বলেন যে, ‘আমি ১৮৮৫ সাল থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে মাখবাদের কড়া সমর্থক ছিলাম’। (Blackmore, J.T: 216; চট্টপাধ্যায় ১৯৮০:২৩২)

    কিন্তু তিনি ১৯১১ সালের ৯ ডিসেম্বর রাইডেন বক্তৃতায় মাখবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সে সময় মাখবাদের ভাববাদে বন্দী আইনস্টাইন সহজভাবে সে বিতর্ক মেনে নিতে পারেননি। ১৯১১ সালে এক চিঠিতে আইনস্টাইন মাখকে বলেন, ‘আপনার প্রয়াসের তাৎপর্য প্লাঙ্ক কেন বুঝতে পারেন না, আমি তা ঠিক বুঝতে পারি না।’ ১৯১৩ সালে মাখের কাছে লেখা আর এক চিঠিতে তিনি প্লাঙ্কের অবিবেচনাপ্রসূত সমালোচনা খণ্ডন করেন। লেখেন, ‘এমন কি যাঁরা নিজেদের মাখ-বিরোধী বলে মনে করেন তাঁদেরও হুঁশ থাকে না যে মাতৃদুগ্ধ পানের মতই তাঁরা নিজেরা মাখের মত থেকে কতটা পুষ্টি সংগ্রহ করেছেন।’ (চট্টপাধ্যায় ১৯৮০: ২৭, Holton: 1973:222) মাখবাদের মোহ থেকে মুক্ত হতে আইনস্টাইনের আরও প্রায় দশ বছর সময় লাগে। ১৯২১ সালে আইস্টাইন তখনই মাখবাদের মোহ থেকে মুক্ত যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে ১৯১৬ সালে মৃত্যুর পূর্বে মাখ আপেক্ষিকতাবাদ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে আক্রমন করার জন্য নিজকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন। প্লাঙ্কের মত তিনিও ১৯২২ সালে প্যারিসের এক সভায় মাখের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘মাখ একজন উৎকৃষ্ট বিজ্ঞানী কিন্তু একজন নিকৃষ্ট দার্শনিক।’ (Clark:1972:205)| ৬৮ বছর বয়সে লেখা তাঁর আত্মজীবনীতে ভুল স্বীকার করে লেখেন, ‘যাহোক অল্প বয়সে মাখের জ্ঞানবাদী অবস্থান আমাকেও ভীষণ প্রভাবিত করেছিল, সে অবস্থান এখন আমার কাছে অপরিহার্য ভুল বলে মনে হয়।’ (Schilpp, P.A : 1949:11)

    আইনস্টাইন
    (১৮৭৯-১৯৫৫)

    এই ছোট আলোচনায় আমরা দেখলাম প্রথম জীবনে আর্নেস্ট মাখের ভাববাদী দর্শনের জোয়ারে ভেসে গেলেও প্লাঙ্ক ও আইনস্টাইন আগে-পরে তাঁদের ভুল বুঝতে পারেন এবং মাখের দৃষ্টবাদকে মারাত্মকভাবে আক্রমন করেন।

    তাহলে আমার প্রশ্ন তাঁরা যখন মাখবাদে সাঁতার কাটছেন তখন লেনিন ১৯০৮ সালে আর্নেস্ট মাখ, অসওয়ার্ল্ড প্রচ্ছন্ন ভাববাদী দর্শনের কঠোর সমালোচনা করে Materialism And Empirio Criticism  বইটা লিখে কি অন্যায় করলেন। এতে কি প্রমাণ হয় না যে, মাখবাদী ভুত যখন আইস্টাইনের মতো বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীর কাঁধে ভর করে আছে, লেনিন তখন উক্ত বইটা লিখছেন। দার্শনিক হিসেবে এটা কি লেনিনের বিরাটত্ব নয়? প্রমাণ হয় না কি দার্শনিক হিসেবে লেনিন তাঁদের চেয়ে অনেক উঁচুতে বসেছিলেন?

    মাখের প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে আইনস্টাইন অনেক সময় নেন। তাঁর বয়স তখন ৩২। তাই আমার মনে হয় তিনি প্যারিস সভায় মাখ সম্পর্কে যা বলেছিলেন, সেটা তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাছাড়া সাধারণভাবে সম্ভবত বলা যায় যে, অধিকাংশ বিজ্ঞানীর জন্য তা সত্য। বিজ্ঞানী হিসেবে উৎকৃষ্ট হলেও দার্শনিক হিসেবে নিকৃষ্টতর। তার আরেকটি প্রমাণ এখানে উপস্থিত করবো।

    স্টেভেন ওয়েনবার্গ

    স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ১৯৭৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পান। তিনি ১৯৯৪ সালে একখানা বই লেখেন। নাম Dreams Of A Final Theory। বইটির সাত নম্বর অধ্যায়ের নাম Against Philosophy। বইতে তিনি দর্শন বিশেষ করে মাখের দৃষ্টবাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। ভাল কথা। কিন্তু তিনি সেই সাথে লেনিনের Materialism And Empirio Criticism বইটির বিরুদ্ধেও তাঁর মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ কেমন পরস্পর বিরোধী অবস্থান। তিনি দৃষ্টবাদের সমালোচনা করেছেন অথচ দৃষ্টবাদের প্রথম সমালোচক লেনিনেরও বিরোধিতা করেছেন। তাঁর কি লেনিনের প্রশংসা করা উচিত ছিল না? ওয়ানবার্গ ১৯২২ সালের আইনস্টাইনের উক্তিরও উল্লেখ করেছেন,  Mach as unborn mechanician but a deplorable philosopher। ( Weinberg 1994:180)

    আলোচনা আর দীর্ঘ করবো না। বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে মার্কস ও এঙ্গেলস কত ভয়ঙ্কর নাম, তার প্রমাণ আমরা পেলাম। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃবিজ্ঞানী হেনরি লুইস মর্গানের তাঁরা প্রশংসা করেছিলেন। সেই সাংঘাতিক অপরাধের জন্য মর্গান নিশ্চিহ্ন প্রায়। আর লেনিন মাখবাদী ভাববাদ খণ্ডন করা সত্বেও বুর্জোয়া সমাজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরোপুরি নির্বাসিত। বিজ্ঞান বলতে আমরা কি বুঝি এই প্রশ্নের উত্তর আর্নেস্ট দিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয় লেনিন বিজ্ঞানের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা সর্বশ্রেষ্ঠ। লেখাটি শেষ করবো তাঁর সে সংজ্ঞা উল্লেখ করে। এ সংজ্ঞা ভাববাদী বা প্রচ্ছন্ন ভাববাদী সমাজ–দর্শনকে অস্বীকার করে। সংজ্ঞাটি হল:

    The “essence” of things, or “substance,” is also relative; it expresses only the degree of profundity of man’s knowledge of objects; and while yesterday the profundity of this knowledge did not go beyond the atom, and today does not go beyond the electron and ether, dialectical materialism insists on the temporary, relative, approximate character of all these milestones in the knowledge of nature gained by the progressing science of man. The electron is as inexhaustible as the atom, nature is infinite, but it infinitely exists.

    দেবী প্রসাদ চট্টপাধ্যায় এর বাংলা করেছেন নিম্নরূপ:

    … বস্তু বা দ্রব্যের সারসত্তার কথাও আপেক্ষিক, তা থেকে মানুষের বস্তুজ্ঞান সংক্রান্ত মাত্রাটুকুই ব্যক্ত হয়। গতকাল জ্ঞানের এই গভীরতা পরমাণুর চেয়ে মৌলিক কিছুর হদিস না পেলেও এবং আজ তা ইলেক্ট্রন ও ইথারের কথা পেরিয়ে যেতে না পারলেও ডায়ালেক্টিক্যাল বস্তুবাদ দৃঢ়ভাবে দাবি করে যে, প্রকৃতি প্রসঙ্গে মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে এই সমস্ত হল এক একটা মাইলস্টোনের মতো- অর্থাৎ সাময়িক-আপেক্ষিক-যথার্থ অভিলাষী মাত্র। পরমাণু যেমন অফুরন্ত, ইলেক্ট্রনও সেইরকম অফুরন্ত। প্রকৃতির সীমা নেই, কিন্তু অসীম অর্থ তার অস্তিত্ব অবশ্যই স্বীকার্য। (চট্টপাধ্যায়: ১৯৮০:২১৪)

    উদারনৈতিক পুঁজিবাদ কতটা অনুদার হতে পারে,আশা করি এই ছোট্ট প্রবন্ধে সেটা স্পষ্টতর হয়েছে।

    তথ্যপঞ্জি

    ওসমান, বুলবন: আদিম সমাজ, লুইস হেনরী মর্গান, অবসর, ২০০০

    Bernal, J.D. : Science In History, pelican Book, 1969

    Clarck, Ronald W: Einstein: The life And Times, Arnas Book, 1972

    চট্টপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ:দার্শিনিক লেনিন, মনীষা, কলকাতা, ১৯৮০

    Hotton, G: Thematic Origins Of Scientific Thought, Cambridge, Massachusetts:1973

    Lenin, V.I. : Materialism And Emprio Criticism: Critical Comments On A Reactionary Philosophy, Progressive Press. Moscow 1908

    Ryan, Cristopher And Jetha, Cacilda: Sex At Down: The Prehistoric Origins Of Modern Sexuality; Harper, 2010

    Schilpp, P.A : Albert Einstein: Philosopher-Scientist: The Library of Living Philosophers, Everstone, Illinois, 1949

    Weinberg, Steven: Dreams Of A Final Theory, Vintage Book, Newyork, 1994

    ২৮শে আগস্ট, ২০২০
    মহম্মদপুর, ঢাকা

  • জন ডব্লিউ হোয়াইটহেড।। নিপীড়ক নজরদারির যুগ

    জন ডব্লিউ হোয়াইটহেড।। নিপীড়ক নজরদারির যুগ

    অনুবাদ: মৌলি ইসলাম

    আমরা জানি এইমুহূর্তে আপনি কোথায়; বাড়ির ঠিকানাও অজানা নয়। এমনকি, চিন্তাভাবনার বিষয়গুলোও আন্দাজ করা সম্ভব। কারণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার পরিচয় সবসময় জীবন্ত… যা মুছে ফেলার বোতামও নেই। —গুগলের সাবেক সিইও এরিক স্মিথ

    আঙ্কেল স্যাম তোমাকে খুঁজছে।
    সংশোধন: বিগ ব্রাদার তোমাকে খুঁজছে।

    যদি কৌশলগতভাবে দেখা যায়, তাহলে পুঁজিবাদের রাঘব বোয়ালরা আমাকে বা আপনাকে নয়; বরং আমাদের তথ্য জানতে চায়। ‘তথ্য’ আমেরিকার বাজার বা মার্কিন সরকারের কাছে আমাদের মূল পরিচয়। সেখানে, প্রত্যেক তথ্য বিনিময় হয়; সর্বোচ্চ মূল্য হাঁকানো ক্রেতার সাথে হয় বিকিকিনি।

    আর্টওয়ার্ক: ইন্টারসেকশন
    মিল্পী: ওলেস্কে কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এসব নিলামির বেশিরভাগই মার্কিন রাজনীতির জনপ্রিয় মুখ। নির্বাচনে জয় পেতে বা পুনরায় ক্ষমতায় বসতেই তাদের এ অপকৌশল। লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস বলছে, “একজন ব্যক্তি কখনো কোন রাজনৈতিক সমাবেশ বা প্রচারণায় যোগ দিলেই, ধড়িবাজ তথ্য পাচারকারীর নজরে চলে আসেন। অনুসরণ করা হয় তার প্রতি পদক্ষেপ।”

    ভোটপ্রার্থী রাজনীতিকের কাছে বিক্রি হয় আমাদের ফোন, টেলিভিশন আর নিয়মিত ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির তথ্য।

    কখনো কি মার্কিন বহুজাতিক চেইনশপ ‘হোল ফুডস’ থেকে অনলাইনে খাবার কিনেছেন? বা, কোন শ্যুটিং ক্লাবে অস্ত্রচালনা পরীক্ষা দিয়েছেন? মনে করে দেখুন তো, স্টারবাকসে বসে কফির মগে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছেন আর ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইন্টারনেটের দুনিয়ায়। হয়তো, নিতান্ত প্রয়োজনে গেছেন কোন গর্ভপাত করানোর চিকিৎসা কেন্দ্রে। কিংবা, ঘরে বসেই দেখছেন ফক্স নিউজ বা MSNBC। অবসর সময়ে হয়তো মোবাইলে খেলছেন ক্যান্ডি ক্র্যাশ বা ঘুরে বেড়াচ্ছেন শপিং মলে। তাহলে, নিশ্চিতভাবে আপনাকে অনুসরণ করা হচ্ছে। আর, এসব কাজের মাধ্যমেই শুষে নেয়া হচ্ছে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য। যা, অর্থের বিনিময়ে হবে হাতবদল। এটাই, পুঁজিবাদী নজরদারির যুগ।

    অবিশ্বাস্য হলেও, একবার কোন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হলে, দালালরা তার পিছু নিবেই। প্রযুক্তির সহায়তায় যোগাযোগ করবে। কোথায় যাচ্ছেন, কি করছেন, কার সাথে বন্ধুত্ব-শত্রুতা, পড়ালেখা-মতাদর্শ সবকিছুই থাকবে তথ্য পাচারকারীদের নখদর্পনে।

    ভয়াবহ বিষয় একবার এই ঘেরাটোপে পড়লে, আজীবন আপনাকে অনুসরণ করা হবে।

    প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার যুগে স্বাগতম। শিথিল নীতিমালার এই সময়ে আবহাওয়া বা খেলার অ্যাপ ডাউনলোড করলে বা কফিশপের ওয়াইফাইয়ে যুক্ত হলেই… তথ্য পাচারকারী চক্র পিছু নিবে। ঘরের রাউটার দিয়েও তারা ব্যক্তিকে রাখতে পারে নজরদারিতে। এরপর- সব তথ্যের তালিকা বানিয়ে আপনার এলাকারই রাজনীতিকের হাতে পাচার করবে। বিনিময়ে নিবে মোটা অংকের অর্থ। এই বাণিজ্যে কেউ পাবে না ছাড়।— সাংবাদিক ইভান হাল্পার।

    সেই বিবেচনায়, আমরা সবাই প্রায় সমান। গোপনীয়তা লঙ্ঘনের কারণে কমবেশি ভুক্তভোগী। বাজারু আর মুনাফাখোরদের সামনে ব্যাক্তির অন্তরঙ্গ মুহুর্তও হয়ে পড়ে গবাদি পশুর খাবারের আঁটি (ঘাস-বিচালি)। সরকার বা পুঁজিবাদী গুপ্তচরবৃত্তির এই ক্ষ্যাপাটে যুগে আমাদের শুধু চোখে-চোখেই রাখা হয় না; রীতিমতো অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়, টার্গেটে পরিণত করে হয় বেচাকেনার। এর কাছে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা দফতর NSA’র নজরদারিও সেকেলে।

    সবচেয়ে বাজে বিষয়টি হলো, আমাদের স্বেচ্ছা অংশগ্রহণের কারণেই সম্ভব হচ্ছে এই নজরদারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন সফটওয়্যার বা অ্যাপ ডাউনলোডের সময়, তাড়াহুড়ায় সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ বার্তা না পড়েই চলে যাই ‘শেষ বোতামে’। তা, মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায় হয়তো নতুন লোগো জুড়ে দিচ্ছে। একইসাথে, সেটা আপনার গতিবিধি, কার্যক্রম সবই নিয়ে আসে নজরদারির আওতায়। তাই, দু’দণ্ড ভাবুন।

    ব্যক্তির প্রত্যক পদক্ষেপ খুটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়, সাজানো হয় তথ্য, ভেঙ্গে গড়ে বসানো হয় ছকে। ব্যক্তিকে প্রভাবনের জন্য সামনে ধরা হয় অদৃশ্য এক আয়না। যাতে, আধুনিক-পরিবর্তিত নিজেকে দেখতে পান তিনি।

    স্বাভাবিক যেকোন দিনে একজন মার্কিনিকে তার সরকার এবং পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত ২০ উপায়ে নজরবন্দি রাখে। আধুনিকতার এই যুগে কোথায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন, গাড়ি চালাচ্ছেন, ইমেইল চেক থেকে শুরু করে পরিবার-বন্ধুদের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলা— সবকিছুতে আড়ি পাতছে সরকার। স্মার্টফোন কেনা, জিপিএস ডিভাইস ডাউনলোড, টুইটার-ফেসবুক-গুগল অ্যাকাউন্ট খোলা, মুদি সদাই থেকে বিমানের টিকেট কাটার জন্য ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আসলে পুঁজিবাদী আমেরিকাকে সহায়তা করা হচ্ছে। তারা কৌশলে সরকারের হাতে আমাদের সময় ও টাকা ব্যয়ের দলিল তুলে দিচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: সার্ভিল্যান্স
    শিল্পী: হামফ্রে কিং
    সূত্র: রকফেলার

    প্রযুক্তি এতোটাই এগিয়েছে যে, পুঁজিপতিরা অদৃশ্য বেড়া দিয়ে আমাদের বাসা-কর্মক্ষেত্র-বন্ধু ও পরিবারের বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। যেকোন সময় মনভুলানো বার্তারূপী বোমা মারতে তারা প্রস্তুত। এরমাধ্যমে, খুব সহজেই তাদের কার্যোদ্ধার হচ্ছে আর, ব্যবহারকারীও টের পাচ্ছে না। একবার ভাবুন তো- দৃশ্যত কেউ যদি সবসময় আমাদের পিছু নেয়, টেলিফোনে আঁড়ি পাতে, গোপন কাগজপত্র পড়ে, লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে তাহলে, নিঃসন্দেহে আমরা পুলিশ ডাকতাম। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিরাপত্তা বাহিনীও এ ঘৃণ্য কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত।

    এটা শুধু নজরদারি বা তথ্য কেনাবেচার বিষয় না, চরম বিরক্তির কারণও। সরকারি পদক্ষেপ- আজ্ঞে যেকোন সরকারের- ক্রমাগত লাগামছাড়া ও জবাবদিহিহীন হয়ে উঠছে, নাগরিককে লক্ষ- অনুসরণ-বৃত্তাবদ্ধ এমনকি তাদের হাজতে পুরতেও পিছপা হচ্ছে না। চিন্তা করুন তো, নাৎসী জার্মানির মতো সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের হাতে এধরনের কৌশলী অস্ত্র পড়লে, কি ঘটতো? অথবা, পুলিশী রাষ্ট্রগুলো যদি পরে হিটলারের পদাঙ্ক অনুসরণ করতো… কি ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি দেখতো বিশ্ব!! অথচ, সব জেনেশুনেও সরকারের নজরদারির বিষয়টি আমরা কতো সহজ করে দিয়েছি।

    সরকারি চোখগুলোর সামনে ব্যক্তি বরাবর নজরবন্দি। কোথায় যাচ্ছি, কাদের সাথে যোগাযোগ, অর্থব্যয়ের পরিমাণ, কি লিখছি-কি পড়ছি, কখন ঘুমাতে যাচ্ছি বিছানায়-কখন উঠছি, টিভি দেখা বা ইন্টারনেট ব্রাউজিং সবই রাষ্ট্রের ঝান্ডাধারীদের নখদর্পণে। ব্যক্তির প্রত্যক গতিবিধি নতুনভাবে তথ্য হালনাগাদে সহায়তা করে। এর মাধ্যমেই, কারো চরিত্র বা গোটা ছবিটা স্পষ্ট হয়। দেয়া হয় নামের পাশে টিকচিহ্ন। যাতে, প্রয়োজনে আপনাকে সঠিক পথে আনতে বেগ পেতে না হয়।

    যদি মানবাধিকারকর্মী হন আর সে বিষয়ক লেখা তথ্য ফেসবুক বা টুইটারে শেয়ার করেন; তাহলে দলত্যাগী, বিপ্লবী, সরকার বিরোধী কট্টরপন্থী বা তথাকথিত সন্ত্রাসী হিসেবে নিজের গায়েই লাগালেন তকমা। লাইক বা শেয়ার না করেও; সরকারের নিপীড়ন, অন্যায় আচরণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পড়তে থাকলে, অন্তর্ভুক্ত হবেন পুলিশের তালিকায়। ফেলা হবে বিশেষ কোন গোষ্ঠীর কাতারে। ব্যক্তি লাইনচ্যুত হলেই, পুঁজিপতিরা করবেন সঠিক পথে ফেরানোর মহান কাজটি।

    ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, ঝুঁকির মাত্রা অনুসারে সবুজ-হলুদ-লাল রংয়ের কোডের আওতায় রয়েছি সবাই। যার মাধ্যমে, সম্ভাব্য সংকট তেরীর আগেই আন্দাজ করা সম্ভব। নগণ্য কোন ফেসবুক পোস্টের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে সেনাবাহিনীর মতো সম্মানজনক ক্যারিয়ার। চিকিৎসা সেবা নেয়ার সময় পড়তে পারেন অসুবিধায়। আপনার ঘনিষ্ঠ বা স্বল্পপরিচিত কেউ অপরাধের সাথে জড়িত থাকলেও, সেটা ফেলবে বিপত্তিতে। একশব্দে বললে, ব্যক্তি কোন না কোনভাবে রয়েছেন পুলিশের তালিকায়। শুধু, সরকার বিরোধী কোন কর্মকাণ্ডে জড়ালেই, সোজা ১৪ শিকের ভেতরে। সরকারই ভালো জানে, কিভাবে সাজানো হবে গোটা পরিকল্পনা, ফাঁসানো যাবে ব্যক্তিকে।

    ইন্টারসেপ্টের প্রতিবেদন অনুসারে, FBI-CIA-NSA এবং অন্যান্য সরকারি এজেন্সিগুলো অনেকাংশেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। যার শীর্ষে গুগল-ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রাম। এরইমাঝে, ধারণাটিকে কার্যকারী উপায়ে ব্যবহার করছে চীন।

    চীনের লাখো নাগরিক এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছাঁটাই-বাছাইয়ের কল্যাণে ‘অযোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সুনাগরিক কিনা-সেটাও নির্ণয় করছে সোশ্যাল মিডিয়া। এর ফলে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, সহায়-সম্পত্তি ক্রয় থেকে বিমান-ট্রেনের টিকেট কাটার সময়ও কালো তালিকাভুক্ত চৈনিকরা ভুগছেন।

    ভীতিকর ভবিষ্যৎ থেকে আমরা খুব বেশি দূরে নই; যেখানে চীন সবার পথপ্রদর্শক। দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো বা সরকারি আলামতও দেয় সেই ইঙ্গিত। যখন সরকার সবকিছুই দেখছে-জানছে এবং আপাতদৃষ্টিতে স্পষ্টবাদী বা আইনভঙ্গকারী নাগরিকের জন্য রেখেছে কড়া আইন, সেসময় পুরানো প্রবাদই খাটে “লুকানোর কিছুই না থাকলে… চিন্তারও কারণ নেই”

    নাগরিকদের ওপর গোয়েন্দাগিরি বা প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জীবনে আড়িপাতার মতো সরকারের প্রকাশ্য ঝুঁকিতে রয়েছেই। সাথে কৌশলগুলোর প্রায়োগিক ব্যবহারে আচরণ বা মতাদর্শিক পরিবর্তন ঘটানোও সম্ভব।

    এমনকি, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আমলাতন্ত্র এবং সরকারি প্রকল্পগুলোর প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়া হ্রাসের জন্য সরকারি সংস্থাগুলোকে ‘আচরণগত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ ব্যবহারের নির্বাহী আদেশ দিয়েছিলেন। সরকারি কাজগুলোর ব্যাপারে জনমত জানতে এটা আসলে একটি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি। যারমাধ্যমে, আনুষাঙ্গিক বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

    সরকার বা পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণদের (!) মাকড়সার জালে আটকাতে প্রাক-অপরাধের মতো নাটক সাজায়। স্বয়ংক্রিয় চোখ-কান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যক্তির গায়ে সেঁটে দেয়া হয় ‘সন্দেহভাজন’ বা ‘চরমপন্থি’র মতো শব্দগুলো। যা, নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিঁখুত ডিস্টোপিয়ান দুঃস্বপ্নের দিকে ঠেলে দেয়।

    আর্টওয়ার্ক: মাইন্ড কন্ট্রোল
    শিল্পী: সিমন নস্কা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    জর্জ অরওয়েল, আলদোস হাক্সলে এবং ফিলিপ কে ডিকে’র মতো সাহিত্যকদের লেখায় অনেক আগেই এসেছিলো ‘পীড়াদায়ক প্রাক-অপরাধে’র মতো চিন্তাভাবনা। ভুলে যাবেন না, যতো ভালো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরকারি আইন বা কর্মসূচিই থাকুক না কেনো, এর পেছনে রয়েছে বিকৃত-দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অবৈধ মতলব। যেখানে, ক্ষমতা আর মুনাফার সমীকরণটা মিলে যায়। সন্ত্রাসবাদ-মাদক-অনুপ্রবেশ বিরোধী যুদ্ধ, সম্পদ জব্দকরণ-সড়ক ও বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো ইস্যুগুলো জনকল্যাণে শুরু হলেও, সেটা তথাকথিত পুলিশী রাষ্ট্রেরই হাতিয়ার।

    ভুল বা সঠিক হাতে পরে, হিতৈষী পরিকল্পনাও অমঙ্গলে পাল্টে যেতে পারে। মার্কিনীদের ওপর নজরদারি, ডিজিটাল উঁকিঝুঁকি বা তথ্য তালিকাভুক্তির পুরোটাই সরকারের হাতে। বিশেষভাবে, যখন সরকার কোন ব্যক্তির ফোনালাপ শোনে, গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করে, সেটা মোটাদাগে ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ।

    এদিক থেকে, আমেরিকার মতো পুলিশী রাষ্ট্র ক্ষ্যাপাটে-হিসাবী আর নারকীয় প্রতিভার অধিকারী। সাদা চোখে যে প্রযুক্তিগুলোকে আমরা সামাজিকভাবে বৈপ্লবিক এবং মুক্তিদানকারী হিসেবে চিহ্নিত করছি, তা আদতে ভ্রাম্যমান হাজত, জেলার আর নজরদারি সংস্থাগুলো।

    এরমাধ্যমে, একটা সময়ে ‘সোয়লেন্ট গ্রিন’ বা ঘনবসতিপূর্ণ বুভুক্ষু জাতিতে পরিণত হবো। (মার্কিন কল্পবিজ্ঞান লেখক হ্যারি ম্যাক্সওয়েল হ্যারিসনের বই) ১৯৭৩ সালে একইনামের চলচ্চিত্রে মূখ্য ভূমিকায় ছিলেন শার্লটন হেস্টন এবং এডওয়ার্ড জি. রবিনসন। সিনেমাটিতে, ২০২২ সালের ভবিষ্যৎ পৃথিবী চিত্রিত হয়েছে। যেখানে জনাকীর্ণ, দূষিত, অনাহারে ভুগতে থাকা নিউইয়র্কবাসী ‘সোয়লেন্ট গ্রিন কর্পোরেশন’ নামের কারখানায় বানানো সিনথেটিক খাবারের ওপর নির্ভরশীল। একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ঘিরে শুরু দৃশ্যপট। একপর্যায়ে, পুলিশ হেস্টন বের করে আনেন বিস্কুট তৈরীর উপাদান সম্পর্কে ভয়াবহ তথ্য। যা, ক্ষুধার্ত জাতির মূল পুষ্টি উপাদান ছিলো। জানান “বিশ্বকে মনুষ্যহীন করাই সোয়লেন্ট গ্রিনের উদ্দেশ্য। মানবজাতিকে নিশ্চিহ্নের জন্যই এ খাবার। এমনকি, ভবিষ্যতের খাদ্যর জন্য মানুষকেও গবাদিপশুর মতো প্রজনন-প্রতিপালন করা হচ্ছে।”

    আক্ষরিক অর্থেই, ঔপন্যাসিকের সেই চিন্তা সত্য ছিলো। কিন্তু, বর্তমানে সোয়লেন্ট গ্রিন হলো ব্যক্তিগত তথ্য। যা, সরকার আর পুঁজিপতিদের জন্য ঘষেমেজে সামনে সাজিয়ে দেয়া হয়। আমরাও গবাদি পশুর মতোই প্রতিপালিত। পার্থক্যটা শুধু খাবারের জন্য নয়— এটাই রক্ষে!

    আমার বই ‘ব্যাটেলফিল্ড আমেরিকা: দি ওয়ার অন দ্যা আমেরিকান পিপল’-এও লিখেছি- শুধু তথ্যর জন্যই আমাদের হৃষ্টপুষ্ট-লেবেল সেঁটে-বেচাকেনা করা হয়। মার্কিন সরকার আর পুঁজিপতিদের মধ্যে যতো প্রতারণামূলক সম্পর্ক বাড়ছে; ততোই আমরা ডিজিটাল লাঞ্ছনার ঘেরাটোপে আটকা পড়ছি। সেই জাল ছিড়ে বেরুনোর মানে হলো গোটা বিশ্ব থেকে জনবিচ্ছিন্ন হওয়া।

    ১৯৮৪ সালে, জর্জ অরওয়েল পক্ষান্তরেই বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক বণর্না দিয়েছিলেন। “আপনাকে এটা মেনেই জীবনযাপন করতে হবে— অভ্যাসগুলো পরিবর্তিত হবে প্রয়োজনীয়তায়, আড়িপাতা হবে প্রত্যেক আলাপনে, খুঁটিয়ে দেখা হবে গতিবিধি”

    জরুরি ভিত্তিতে নিজেদের যন্ত্র নয় বরং মানুষ প্রমাণের জন্য ‘ইলেকট্রনিকস বিল অব রাইটস’ প্রয়োজন। সাংবিধানিক সুরক্ষা ছাড়া যন্ত্ররাজত্বে অনধিকার প্রবেশ ঠেকানো আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য। আর, সেটা করা না গেলে…খুব শিগগিরই স্টলেন গ্রিনের চরিত্রে পরিণত হবে আজকের মানুষ। কারামুক্ত হতে মানুষকে ফিরতে হবে অতীতে। যেখানে, নিজের ইচ্ছামাফিক কথা বলা, খাওয়া, কেনাকাটার স্বাধীনতা মিলবে। গুগল দেখাবে না রোয়াব, গোপন তথ্য বেঁচবে না CIA বা NSA’র কাছে। সর্বোপরি, সেনাবাহিনী বা আধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবো না আমরা।

  • সভ্যতার অর্থ কি কেউ জানে?

    সভ্যতার অর্থ কি কেউ জানে?

    শহিদুল ইসলাম

    এক
    সভ্যতা নিয়ে বিতর্কের আর শেষ হল না। নতুন করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্প্রতি আবার সে বির্তক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে মানবস্বার্থ-কেন্দ্রিক বিশ্বভাবনা নিয়ে, যা মানুষকে করে তুলছে যান্ত্রিক, যুদ্ধবাজ এবং প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন। সভ্যতার উষালগ্নে রোমান কবি ওভিড ( ৪৩ খৃষ্টপূর্ব-১৭ খৃষ্টাব্দ) সভ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ১২,০০০ লাইনের Metamorphosis কবিতায়—

    Earth…had better things to offer…crops without cultivation,
    fruit on the bough,honey in the hollow oak.
    No one tore the ground with ploughshares
    or parcelled out the land
    or swept the sea with dipping oars—
    the shore was the world’s end.
    Clever human nature, victim of your inventions,
    disastrously creative,
    why cordon cities with towered walls?
    Why arm for war?”

    জে. বি. বিউরি
    (১৮৬১-১৯২৭)

    ১৮৬০ সালে মাইকেল মধুসূধন দত্ত কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষিত বাবু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা লক্ষ্য করে লিখেছিলেন একটি ব্যঙ্গ নাটক একেই কি বলে সভ্যতা?। মানুষের স্বভাবগত সত্তার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা সভ্যতার অন্যতম একটি পদক্ষেপ। তাই ১৯১৪ সালে প্রখ্যাত ইতিহাসবিজ্ঞানী জে. বি. বিউরি বলেন—

    যদি মানুষের কোন প্রাকৃতিক অধিকার বলে কিছু থেকে থাকে তাহলে নিজের জীবন বাঁচানো এবং সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অবশ্যই তার মধ্যে পড়ে। তবু মানবসমাজ তার সদস্যদের এই উভয় অধিকারের ওপর বাধানিষেধ আরোপ করেছে। অন্যের অধিকারে থাকা খাবার না খাওয়ার জন্য একজন অভুক্ত মানুষের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিভিন্ন আইন ও প্রসার সাহায্যে অবাধ যৌনসম্ভোগের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। (জে.বি. বিউরি, ১৯১৩:১২)

    ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ লেখেন সভ্যতার সংকট । ইংরেজ সভ্যতার ওপর তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন ইংরেজি সভ্যতা একদিন সারাবিশ্বকে আলোচিত করবে। কিন্তু তাঁর সে বিশ্বাস কি করে হারালেন সে কথা তিনি আমাদের জানালেন উক্ত প্রবন্ধে। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৪১:৭৩-৭৩৮)। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় সিগমন্ড ফ্রয়েডের বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন Civilization and Its Discontents। তাঁর মতে মানুষের কিছু প্রবৃত্তি পরিবর্তনের অতীত। যেমন যৌনতা ও কর্তৃত্বের  বিরুদ্ধে তার ‘না’ বলার প্রবণতা। ব্যক্তি স্বাধীনতা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষের তৈরি অপ্রাকৃতিক আইন-কানুনের সঙ্গে তার বিরোধ উপস্থিত হয়। উপর্যুক্ত দুটি আদিম প্রবৃত্তি সভ্যতা আইন তৈরি করে দমন করার চেষ্টা করে। এতে মানুষের সহজাত ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্বিত হয়। তিনি বলেন, “Civilization is built on erotic energy that has been blocked, concentrated, accumulated and reduced human freedom.”

    বইটির ভূমিকায় বলা হয়—

    …This process, argues Freud, is an inherent quality of civilization that gives rise the perpetual feelings of discontents among its citizens.” (Freud:1930:1)

    আজকের নবীন নৃতত্ত্ববিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন “সভ্যতার অর্থ কি?” বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা চলছে। আমরা এতদিন জেনে এসেছি যে, মানুষ যেদিন নিজের খাদ্য নিজেই উৎপন্ন করতে এবং কতিপয় পশুকে গৃহপালন করতে শিখল, সেদিনই বর্তমান সভ্যতার সূচনা। কিন্তু এ বিশ্বকে চরমভাবে আঘাত করে ১৯৯৯ সালের  প্রথমে Discover Magazine-এ বিশ্ববিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ও ক্রমবিকাশ উদ্ভিদতত্ত্ববিদ জারেড ডাইমন্ড যে লেখাটি প্রকাশ করেন, তা সারা বিশ্বে প্রবল আলোড়ন তোলে। প্রবন্ধটির নাম,  Agriculture: The worst Mistake in the History of Man. তিনি বলেন যে কৃষি আবিষ্কার ও পশুর গৃহপালন মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল, সেখান থেকে মানুষ কোনদিনই মুক্তি পাবে না। ২০১০ সালে তাঁর লেখা, Guns, Germs and Steel: The Fate of Human Society বইটি পুলিংকার পুরঙ্কার পায়। বইতে তিনি বলেন—

    Human gatherer practiced the most successful and largest lasting life style in human history….. In contrast, we are still struggling with the mess into which agriculture has trumbled us and it is unclear whether we can solve it.Ó (Christopher Ryan and Cakilda Jetha (2010:228)

    কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো রচনা এবং ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ সংক্রান্ত গ্রন্থে সভ্যতার সূচনার ওপর আমাদের সৃষ্টি ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আমরা আজ কিভাবে পুঁজিবাদী সমাজে পৌঁছলাম, তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। মানুষ কতটা সামাজিক ও কতটা প্রাকৃতিক এ নিয়ে বেশ মতবিরোধ আছে। এরিস্টটল বলেছিলেন যে, মানুষ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রাণী। মানুষ যে একটি সামাজিক প্রাণী এ নিয়ে আজ কোনো সন্দেহ নেই। এটাতো সমাজ সৃষ্টির পরের কথা। তার আগে যখন সভ্যতার সূচনা হয়নি, তখনকার মানুষকে কি সামাজিক বলা যাবে? তাহলে প্রশ্ন আসে সমাজ কখন, কবে ও কেন গড়ে উঠেছিল? তাই জারেড ডাইমল্ড প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলল কে?” সেই সঙ্গে তাঁর কথায়, “মানুষ একই সঙ্গে একটি প্রাণী: a species of big mammal”। এই পার্থক্য অত্যন্ত আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা। এটা উপলব্ধি করতে আমাদের দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম করতে হয়েছে। মানুষও অন্যান্য প্রাণীর মতো একটা প্রাণী। কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণীর পার্থক্য রচিত হল কি করে? নিশ্চয়ই মানুষের এমন কিছু গুণ আছে, যা তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে এবং আমরা

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    অন্যান্য পশুপ্রাণীকে আমাদের থেকে আলাদা করতে শিখেছি। আমরা শিখেছি পশুর ‘পশুত্ব’ এবং মানুষের ‘মনুষ্যত্ব’ আলাদা। মানুষের মধ্যে যেমন পশুত্ব নাই, তেমনি পশুর মধ্যে কোন মানবীয় গুণাবলী নাই। যে পার্থক্য মানুষ ও পশুর মধ্যে এই বিভাজন সৃষ্টি করেছে, তা হল মানুষের বুদ্ধি আছে, চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, পশুর তা নেই। সেই চিন্তা ও বুদ্ধির শক্তিতে মানুষ কৃষি সভ্যতার পর নিজেকে অন্যান্য পশুর থেকে পার্থক্য বৃদ্ধি করে চলেছে। আমাদের ‘উন্নতি’ আজ এতদূরে পৌঁছেছে যে, মানুষ আজ নিজেকে একটা প্রাণী ভাবতে পারে না। ভাবতে পারে না যে, সে প্রকৃতিরই এক সামান্য অংশ মাত্র। তাছাড়া বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন অন্যান্য প্রাণীর অনু-পরমাণু ও জিনস মানুষের মতই। আঠারো শতকেই প্রমাণিত হয়েছিল যে, শিম্পাঞ্জীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্য খুবই কম। কিন্তু সেই সামান্য পার্থক্যই মানুষকে এক বিশেষ প্রাণীতে পরিণত করেছে। হাতিয়ার তৈরি, ভাষার সৃষ্টি, সংস্কৃতি নির্মাণ, পরিধীয় বস্ত্রাদির সঙ্গে মানুষসহ অন্যান্য প্রজাতির গণহত্যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে এক আলাদা বিশেষ প্রাণীতে পরিণত করতে পেরেছি।

    দুই
    ভূতাত্ত্বিক টাইম স্কেল অনুযায়ী আমরা ‘মানুষ’, ক্রোম্যাগনন ‘মানুষ’ যে সময়ে বাস করছি, তার নাম ‘হলোসিন’ যুগ। প্যালিওলিথিক বরফ যুগ শেষ হয় ১২,০০০ বছর আগে। সেটা সর্বশেষ বরফ যুগ। তারপর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বর্তমানের ‘হলোসিন’ যুগের শুরু হয়, যেটা ছিল পঞ্চম বরফ যুগ। আমরা ষষ্ঠ বরফ যুগের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সভ্যতার শুরু হয় আজ থেকে ১০,০০০ বছর আগে। অনেক স্থানে পুরনো শিকারি যুগের সমাজ কাঠামো বিদ্যমান থাকে। এমনকি আজও পৃথিবীর অনেক স্থানে মানুষ শিকারি যুগে বাস করছে। তারা কৃষিকাজ ও পশুর গৃহপালনের মত কষ্টকর কাজে লিপ্ত হতে রাজী নয়। প্রকৃতির দান দু’হাত ভরে গ্রহণ করে তারা মহাসুখে আছে। ১৮ ও ১৯ শতকের মাঝামাঝি শিল্প বিপ্লব যখন শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে, তখন পৃথিবীর লোক সংখ্যা ছিল এক বিলিয়ন। হোমো স্যাপিয়ান্সের আবির্ভাব প্রায় ৭০/৮০ হাজার বছর আগে। তখন থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে মানুষের সংখ্যা এক বিলিয়নে পৌঁছেছিল। ২০০০ সালে সে সংখ্যা ছয় বিলিয়ন অতিক্রম করে। শিল্প বিপ্লব মানুষের উৎপাদন শক্তি এতটা বৃদ্ধি করে যে মাত্র ১৭০ বছরে পৃথিবীর লোকসংখ্যা ৫ বিলিয়ন স্পর্শ করে। মাত্র ১১ বছরে পৃথিবীর লোক সংখ্যা এক বিলিয়ন বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর জনসংখ্যার ঘড়ি অনুযায়ী ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ৭.৫ বিলিয়নে পৌঁছে।

    প্রবন্ধ পাঠের সময়ে লেখক

    জনসংখ্যার ঘড়ি অনুযায়ী ২০১৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে প্রতিদিন ৮৬,৫০০ শিশু জন্মগ্রহণ করছে যা ক্রমবর্ধমান। সে বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৬০ লক্ষেরও বেশি যা ক্রমবর্ধমান। ফলে এই বর্ধিত মানুষের জীবন ধারণের প্রয়োজনে প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়তেই আছে— বাড়তেই থাকবে। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের পর। কারণ প্রযুক্তির উন্নয়ন রকেটের গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক সোসাইটি একটি নতুন যুগের শুরু বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাহল ‘অ্যানথ্রোপোসিন যুগ’ (Anthropocene Age)- মানুষের যুগ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাওয়া-পরা ও জীবন ধারণের ব্যবস্থা মানুষকেই করতে হবে। শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তার চেয়েও বেশি বেড়েছে অপ্রয়োজনীয় বিলাস দ্রব্যের উৎপাদন। সেই সঙ্গে বাড়ছে মেগাসিটির সংখ্যা ও শিল্পকলকারখানা। সেসব কলকারখানা সচল রাখতে বাড়ছে শক্তির প্রয়োজন। সে শক্তিও আসছে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতির ওপর আমাদের নির্ভরতা যেমন বাড়ছে, প্রকৃতির ভান্ডারও তেমনি শূণ্য হয়ে পড়ছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠির মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। তার জন্য দরকার জমি। জঙ্গল কাটো, নদ-নদী-খাল-বিল ভরাট করো। একই পরিমাণ জমিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। মাটিতে মেশাও নাইট্রোজেন, ফসফরাস। কীট পতঙ্গের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে হবে। কীটনাশক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করো। আমাদের লজ্জা নিবারণ করতে হবে। প্রাকৃতিক সূতো দিয়ে তা সম্ভব নয়। তাই মানুষের তৈরি অপ্রাকৃতিক সূতোর ব্যবহার বাড়াও। পৃথিবীর শপিং মলগুলিতে সে কাপড় উপছে পড়ছে।

    তিন
    সব ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মানুষ স্রষ্ঠার শ্রেষ্ঠ প্রাণী এবং পৃথিবীর মালিক তারাই। সতেরো শতকে ফ্রান্সিস বেকন ও রেনে দেকার্ত বলেছিলেন যে, মানুষ তার বুদ্ধিশক্তি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির মালিকে পরিণত হতে পারে। তাদের পথ অনুসরণ করে মানুষ আজ প্রকৃতির ওপর এতটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে যে, মানুষ ভাবতেই পারে সে প্রকৃতির মালিক। কিন্তু সত্য হল যে, মানুষ কখনই প্রকৃতির মালিক হতে পারে না। মানুষের নির্দেশে সূর্য প্রতিদিন পশ্চিম দিগন্তে উঠবে না এবং পূর্ব দিগন্তে ডুববে না। মানুষ কি কখনও Law of Conservation of Energy ও Mass এর বিরুদ্ধে গিয়ে এক মিলিগ্রাম শক্তি ও বস্তু উৎপাদন করতে পারবে? মানুষ কি প্রাকৃতিক ক্রমবিকাশের ধারা বন্ধ করতে পারবে? প্রকৃতির যে বিশাল ব্যাপ্তি মানুষ তার একটা ক্ষুদ্র যোগসূত্র মাত্র। তার বেশি নয়। সতের শতকেই ব্লেইস পাসকেল (১৬২৩-১৬৬২) বলেছিলেন, ‘‘Humankind is a very small link in the immense web of nature, it is the only one that through for the earth and will be able to transform it for the better or for worse.’’। আজ বোধহয় এ প্রশ্ন তোলার সময় হয়ে গেছে: মানুষ কি পৃথিবীকে ভালো পথে নিয়ে চলেছে, না অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে?

    দ্বিতীয় প্রধান পরিবর্তন ঘটে মাত্র সেদিন, যখন পেটুক ধনী ও মধ্যবিত্তশ্রেনীর বিস্ফোরণ ঘটে। তাদের অন্তহীন ক্ষুধা, ভোগবাদ ও বিলাসিতা বাজারের বিকাশ ত্বরান্বিত করেছে। উদাহরণ, শিল্প-বিপ্লবের মাঝামাঝি সময়ে একজন আমেরিকান যখন বাজারে যেত, বাজারের আয়তন ছিল ১৫০ বর্গমিটার এবং তার সামনে সর্বোচ্চ ৩০০ টি দ্রব্যের সম্ভার সাজানো থাকতো। কিন্তু ২০০০ সালে সে বাজারের (শপিং মল) আয়তন দাঁড়ায় ১.৫ মিলিয়ন বর্গমিটার এবং তার সামনে সাজানো থাকে এক মিলিয়ন মনোহারি জিনিসের ভান্ডার। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সেগুলি অপ্রয়োজীয়। মার্ক টোয়াইন (১৮৩৫-১৯১০) লিখেছিলেন, ‘‘Civilization is a limitless multiplication of unnecessary necessities’’। অপ্রয়োজীয় জিনিসের পুনরুৎপাদনের বাসই হল সভ্যতা।

    আর্টওয়ার্ক: বার্নিং আর্থ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    এই সীমাহীন অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উৎপাদন প্রকৃতির ওপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে। যাদের লোভ-লালসার সীমা নেই, যাদের ক্ষুধা কখনো পূর্ণ হয় না, হবে না। সেই মুষ্টিমেয় ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসীম ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য পৃথিবী অতি দ্রুত তার উৎপাদনশীল জমি, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ, বৈচিত্র্যময় জলবায়ু, পানি ও বিশুদ্ধ বায়ু হারাচ্ছে। একদিকে যেমন মেরুপ্রান্তের হিমবাহগুলো গলতে শুরু করেছে, অন্যদিকে তেমনি বৃষ্টির অভাবে বিশ্বের উর্বর জমিগুলো ক্রমশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবছর শক্তির চাহিদা শতকরা ২ভাগ বাড়ছে। মানুষ মরিয়া হয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ভান্ডার শেষ করে দিচ্ছে। সেই জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর মিলিয়ন টন CO2 বাতাসে মিশে যাচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। ১৯৬২ সালে র‌্যাচেল ভারসন ভয়ঙ্কর জলবায়ু সংক্রান্ত বিপদ সম্পর্কে পৃথিবীকে সাবধান করে দেন। তারপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গ্রিন হাউজ গ্যাস কমানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে আসছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং লল্ডন যাদুঘরের পরিচালক প্রফেসর ক্রিস রিপ্লে বলেন, “আমরা আগুন নিয়ে খেলছি। আমরা যে প্রবল বেপরোয়া জীবনযাপন করছি, এর জন্য হয়তো আমাদের অনুশোচনা করতে হবে যদি অবস্থার ওপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রন না থাকে”। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতবাণী করেছেন যে মানুষ যদি তাদের জীবনযাত্রা প্রণালী পরিবর্তন না করে, তাহলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২১ শতকের শেষে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। স্টানফোর্ড, ক্রিস্টন ও বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, জীবনবিনাশী যুগ আসছে এবং সে পর্বে প্রথম বিলুপ্ত হবে মানুষ। ৬.৫ কোটি বছর আগে পঞ্চম জীবনবিধ্বংসী পটে অন্যসব প্রাণীর সঙ্গে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল।

    চার
    জারেড ডাইমন্ডের উপর্যুক্ত প্রবন্ধের কথায় আসি। ডায়মন্ড বলেন, “না, আমরা কতিপয় উদ্ভিদ ও পশুকে পোষ মানাই নি। বরং আমরাই উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের সঙ্গে নিজেকে পোষ মানিয়েছি।” ফলে মানুষ অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর সঙ্গে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। কৃষি আবিষ্কারের আগের মানুষের সঙ্গে অন্যান্য পশুর কোন প্রভেদ ছিল না। নিজেদের মধ্যেও কোনো ভেদাভেদ ছিল না। কৃষি ও উদ্ভিদ পোষ মানানোর সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের সেই প্রাকৃতিক সাম্য বিনষ্ট হতে শুরু হয়। কৃষি আদিম সাম্যবাদী সমাজ ধ্বংস করে এবং কৃষি জমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সমাজ। সে সমাজে গভীর শ্রেণীর বিভাজন সৃষ্টি হয়, কৃষি জমি রক্ষনাবেক্ষণে এবং পশুর সেবা যত্নের ফলে মানুষের জীবনে অবসর হারিয়ে যেতে থাকে এবং পূর্বে যে উদ্ভিদ আপনিই জন্মাত (বন্য) এবং তা খেয়ে মানুষ প্রানে বেঁচে থাকতো, সেগুলো যখন মানুষ যত্ন সহকারে রোপন করতে শুরু করে, তার পিছনে মানুষকে সারাক্ষণ সজাগ থাকতে হয় যা আগে হতো না। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সে ফসলক্ষেত বাঁচাতে মানুষকে আজকের মতই প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে হয়। ফলে মানুষের পরিশ্রম বেড়ে যায়। অবসর কমে যায়। পুষ্টিহীনতা, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির আঘাতে অসুখ-বিসুখে মানুষের শরীর জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। শিকারি যুগে মানুষ খাদ্য মজুদ করার চিন্তাও করতো না। তার কোনো উপায়ও ছিল না। গুদাম ছিল না। প্রতিদিন তিন/চার ঘন্টা পরিশ্রম করে যা খাবার সংগ্রহ করতো, সেই দিনই সবাই মিলে তা খেয়ে শেষ করতো। সেখানে রাজা-বাদশা-জমিদার-সুদখোর, ব্যবসায়ী-ব্যাংক-লুটেরা ধনি শ্রেণী ছিল না। অন্যের উৎপাদিত খাদ্য খেয়ে পেট মোটা সামাজিক পরাশ্রয়ী বা পরজীবী মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। শ্রেণী-বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজ ছিল। পুঁজিবাদী অর্থনীতির পয়গম্বর এডাম স্মীথ (১৭২৩-১৭৯০) তাঁর Lectures on Jurisprudence বইতে লেখেন, ‘In a nation of hunters there is properly no goverment at all… [They] have agreed among themselves to keep together for their mutual safety, but they have no authority one over another.” (Christopher Rayan and Carilda Jetha (2010:230)। কৃষির আবিষ্কার এরকম পরজীবী শ্রেণীর জন্ম দেয়। তারা অর্ধভুক্ত ও রোগাক্রান্ত উৎপাদক শ্রেণীর ওপর অধিপত্য বিস্তার করে। পুষ্টিবৈষম্য কৃষি সমাজের সৃষ্টি যা আজ ভয়স্কর বৈশ্বিক আকার ধারণ করেছে।

    জারেড ডায়ামন্ড

    কৃষি আবিষ্কার নারীর ওপর পুরুষতন্ত্রের জোয়াল চাপিয়ে দেয়, যা শিকারি যুগে ছিল না। কৃষি কাজের জন্য বেশি মানুষের প্রয়োজন। সেই বেশি বেশি মানুষ সরবরাহ করতে নারীর শরীর অকালেই ভেঙ্গে পড়ে— তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সমাজে তারা অপাঙ্গশ্রেয় হয়ে পড়ে। ক্রিস্টেফার রায়ান ও ক্যাসিলডা জেথা তাঁদের Sex at Dawn (২০১০) বইতে এক বিবাহ প্রথার উন্মেষের কারণ নির্দেশ করেছেন। কৃষি সমাজের উন্মেষের সাথে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উন্মেষ ঘটে এবং নারীও পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এর পিছনে কৃষি অর্থনীতির চাপ কাজ করে। শিকারি যুগে অন্যান্য পশুপ্রাণীর মত মানুষও ছিল বহুগামী। সেটাই প্রাকৃতিক। এতে সন্তানের পিতৃত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না। তাই যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হয়, তখন সে সম্পত্তি প্রকৃত উত্তরাধিকারের হাতে অর্পণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে একগামী (Monogamous) বিবাহ কাঠামোর সৃষ্টি হয়। এভাবে কৃষি আবিস্কার শ্রেণীবিভক্তির সৃষ্টি করে; নারীকে পুরুষের অধীনস্ত করে।

    কৃষির উদ্ভব মানুষের স্বাধীনতা ও অবসর সময় কেড়ে নেয়। কৃষি ফার্ম, শিল্পকারকানা এমনকি ওয়াল স্ট্রিটের ভদ্রলোকদের চেয়ে শিকারি যুগের মানুষ অনেক বেশি স্বাধীনতা ও অবসর সময় উপভোগ করতো।

    শিকারি যুগে মানুষের মুখে ‘কাজ’ বলে কোনো শব্দ ছিল না। যেমন ছিল না ‘সুখ’ বা অসুখের’ কথা। শিকার তাদের কাছে ছিল একটা খেলা। জীবন বাঁচানোর খেলা। শিকার করতে তাদের বেশি শ্রমের প্রয়োজন পড়ত না। সবাই মিলে দক্ষতার সঙ্গে সে খেলায় মেতে উঠতো। খিধে পেলেই শিকারের প্রয়োজন দেখা দেয়। পেট ভর্তি থাকলে তাদের অফুরন্ত সময়। বুশম্যানকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, “কৃষিকাজ করবো কেন? বন্য ফলমূল এত যে কৃষিকাজ করার জন্য সময়ের অপচয় করার কোনো অর্থ হয় না।”

    কৃষিকাজ আবিষ্কারের পর কৃষি জমির দেখভালের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়ে। ফসল পাহারা দেয়া, পোকামাকড় থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য মানুষকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে মারামারি শুরু হয়। কিন্তু প্রাক-কৃষি যুগের মানুষ জমির জন্য লড়াই করতো না। কারণ তখন জমির কোনো মালিক ছিল না। তাদের সুখের সীমা ছিল না।

    কম করে হলেও ১৯০ হাজার বছর মানুষ কৃষিকাজ ছাড়াই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। নৃতত্ত্ববিদ ভ্যানিয়েল কুইনের মতে ‘শিকারি সংগ্রহকারী অর্থনীতি’ অনেক বেশি শক্তিশালী ((Sustainable)। কিন্তু গত মাত্র ১০ হাজার বছরে সেই কৃষিনির্ভর সভ্যতা বিভিন্ন স্তর পার হয়ে আজ অমানবিক গণতান্ত্রিক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। এই সভ্যতার আগে মানববান্ধব পরিবেশ আজ ধ্বংসের সম্মুখীন।

    পাঁচ
    বিগত সত্তর হাজার বছরের মানবজাতির ইতিহাস তুলে ধরার পর য়ুভাল নোয়া হারারি তাঁর বিখ্যাত বই Sapiens: A Short History of Mankind এর উপসংহারটি উদ্ধৃত না করে পারলাম না। সত্তর হাজার বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশের এক প্রান্তে হোমো স্যাপিয়েন্স কোনোভাবে জীবনযাপন করছিল। গত দশ হাজার বছরে তারা সমগ্র পৃথিবীর মালিকে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে জলবায়ু ও পরিবেশের জন্য ভয়ঙ্কর এক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। তারা অমরত্ব লাভ করতে চলেছে। ঈশ্বরের স্থানটি তাদের প্রায় দখলে চলে এসেছে। একই সঙ্গে সৃষ্টি ও ধ্বংসের ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাভ করতে চলেছে। দুঃখের বিষয় স্যাপিয়েন্সদের রাজত্ব খর্ব করার মত কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। আমরা আমাদের পারিপার্শিকতার ওপর আধিপত্য স্থাপন করেছি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেছি, শহর-নগর-বন্দর-সাম্রাজ্য স্থাপন করেছি এবং বিশ্বময় এক বাজার গড়ে তুলেছি। কিন্তু আমরা কি পৃথিবী থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করতে পেরেছি। মানুষের শক্তি বেড়েছে একথা ঠিক। কিন্তু ব্যক্তি মানুষের প্রাকৃতিক চরিত্র উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়েছি এবং অন্য প্রাণীর দুঃখ-দুর্দশা বাড়িয়ে তুলেছি।

    হারারি

    বিগত কয়েক দশকে দুর্ভিক্ষ, প্লেগ ও যুদ্ধ কমিয়ে এনেছি। এতে মানুষের কিছু বৈষয়িক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য প্রাণ ও পরিবেশ দ্রুত আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। মানুষের অসীম সৃজনশীলতা সত্ত্বেও আমরা আজও আমাদের গন্তব্যস্থান নির্ণয় করতে পারিনি। আমরা আগের মতই অতৃপ্ত রয়ে গেছি। আমরা শালতি নৌকা থেকে রকেটের যুগে প্রবেশ করেছি। কিন্তু কেউ জানে না আমরা কোথায় চলেছি। আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী কিন্তু সেই শক্তি নিয়ে আমরা কি করবো, সে সম্পর্কে আমাদের সামান্যই ধারণা আছে। তার চেয়েও খারাপ হল মানুষ আজ অনেক বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন। পদার্থ বিজ্ঞানের কতিপয় সূত্রের সাহায্যে আমরা নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেছি। কিন্তু আমরা কারো কাছে দায়বদ্ধ নই। তার ফলে আমরা পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছি। আমরা নিজের আরাম-আয়েশ ও বিনোদন ছাড়া আর কিছু বুঝি না। তবুও আমরা তৃপ্ত নই।

    এমনি অতৃপ্ত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ঈশ্বরের চাইতে আর কিছু কি বেশি ভয়ঙ্কর হতে পারে? সে জানে না সে কি চায়? (Harari, 2011:465)

    লেখাটি শেষ করেছি। কিন্তু আজ ১৯ অক্টোবর, ২০১৮ সকালে ইন্টারনেটে হঠাৎ একটি লেখার প্রতি চোখ আঁটকে গেল। গত ১৫ অক্টোবর দি ডেইলি মেইল পত্রিকায় মার্ক প্রিগের লেখা There is no God and there are forms of intelligent life out there: Stephen Hawking’s final book reveals his answers to the big ‘Questions’ তিনি সদ্য প্রকাশিত স্টিফেন হকিং- Brief Answers to the Big Questions বইটির ওপর আলোকপাত করেছেন। সেখানে দশটি প্রশ্নের একটি হল “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” (Artifical intelligent) কি আমাদের কর্মক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে না? হকিং সাবধান করে বলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা DNA’র সামান্য রদবদল আমাদের আয়ু বৃদ্ধি করবে; বুদ্ধি বাড়বে এবং অসুখ-বিসুখ হবে না। সৃষ্টি হবে নতুন এক ধরনের মানুষ ‘সুপারহিউম্যান’। সেই কৃত্রিম ‘সুপারহিউম্যান’ হয়তো একদিন পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে হোমো স্যাপিয়েন্সকে বিলুপ্ত করবে। তিনি আরো বলেন যে আইনের দ্বারা এই গবেষণা বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু তা ফলপ্রসু হবে বলে তিনি মনে করেন না। কারণ মানুষের কৌতূহলের সীমা নেই। বিজ্ঞান মানুষের মৃত্যুকে জয় করার পথে অনেকটা এগিয়েছে। তাই যদি কখনও হয় তাহলে পৃথিবীর সব প্রাণী, মানুষসহ সকল উদ্ভিদ জন্মগ্রহণ করবে আর মারা যাবে। কেবল ‘সুপারহিউম্যান’ জন্ম গ্রহণ করবে কিন্তু মারা যাবে না। তাহলে কিছুকাল পরে পৃথিবীর অবস্থা কি হবে?

    চারিদিক থেকে সব সংবাদ আসছে, তাতে কেবল মানুষ নয়, সকল প্রাণ সম্পর্কেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বুদ্ধিমান মানুষ সভ্যতার সেই উষালগ্নে যে কৃষি সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল, তা আজ তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বুদ্ধি ও যুক্তির শক্তিতে মানুষ আজ পৃথিবীর জন্য ভয়ঙ্কর এক প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

    মানুষ আজ দায়িত্বজ্ঞানহীন এক ঈশ্বরে পরিণত হতে চায়। আমার মনে হয় এটাই ‘সভ্যতার অর্থ’। সভ্যতা কেবল বাইরের খোলস, মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার কোন সদর্থক পরিবর্তন হয়নি। বরং শিকারি যুগের চাইতে মানুষ আজ অনেক মারমুখী, লোভী ও দানবীয়। কৃষি আবিষ্কার ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি করে। ফলে মানুষের চরিত্রের ষড়রিপুর দু’টি ‘লোভ’ ও ‘মোহ’ সম্ভবত তার ওপরেই মানুষের চরিত্রে স্থান করে নেয়। লোভ ও মোহের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। কাজেই সভ্যতার অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর সময়ের সাথে পাল্টে যেতে পারে। এতক্ষণ আমি যেসব অর্থহীন কথা বললাম, তা বিগত দশ হাজার বছরের সমাজ পরিবর্তন ও বর্তমান বৈশ্বিক আস্থাকে সামনে রেখে; যেসব কথা কলমের ডগায় চলে এল। জানি না, এতে সভ্যতার অর্থের কোনো সুরাহা হল কি না?

    তথ্যসূচী

    Ovid, Amores, Book3, Translation—Ronald Wright in the book’ a short history of progress

    Christopher Ryan and Cacilda Jetha, Sex at Dawn; The Prehistoric Origins of Modern Sexuality, Harpur, 2010.

    Dawkins, R. The Selfish Genes, New York, Oxford University Press, 1976

    Gowdy, J. (Edn.), Limited Wants, Unlimited Means: A Reader on Hunter Gatherer Economics and Environment, Island Press, Washington DC, 1998.

    Harris, M. Cutural Materialism: The struggle for a Science of Culture, Vintage Books, New York, 1980.

    Harari, Yuval Noah, Sapiens: A Brief History fo Mankind, Vintage Books, London, 2011.

    Jarred, Diamond, Guns, Germs and Steel: The Fate of Human Society, W.W. Norton and Company, N. York, London, 1999,1997.

    Jarred, Diamond. The Third Chimpanzee, A Seven stories press, 2014

    Bury, J. B. A History of Freedom of Thought, Henry Holt & Company, New York and Williums and Norgali, London, 1913.

    মাইকেল মধুসূধন দত্ত, ‘একেই কি বলে সভ্যতা’

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভ্যতার সংকট, রবীন্দ্র রচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ত্রয়োদশ খণ্ড, ১৯৯২।

    Sigmund Freud (1930), Civilization and Its Discontents, Published by General Book

    ২০ অক্টোবর,২০১৮
    মোহম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

    সম্পাদকীয় নোট: বিশ্ব দর্শন দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের আমন্ত্রণে ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর সিনেট ভবনে উপস্থাপিত প্রবন্ধ । অরাজে ঈষৎ পরিবর্ধিত রূপ প্রকাশিত হল।

     

  • নোয়াহ হারারির ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপরেখা

    নোয়াহ হারারির ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপরেখা

    • রাকিবুল রাকিব

    আমরা আজ প্লেগের কবলে নেই, কলেরা আর স্কার্ভিতে কাবু হই না কিন্তু ভাইরাস মানব শরীরকে এ পর্যন্ত মুক্তি দেয়নি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, এ সংখ্যাটা দিন দিন বাড়তে থাকবে। একশো দিন ধরে বিশ্ব থমকে আছে, ঘরবন্দী বিলিয়ন মানুষ। এ সময় অপ্রত্যাশিত মেদ আর অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণের হার দুই-ই বাড়বে, গৃহে নারী নির্যাতনের পরিমাণ থেমে থাকবে না। এরই মধ্যে বাংলাদেশে এক কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে, আমরিকায় সেই সংখ্যাটা দেড় কোটি, চীনে আট কোটি, ভারতে বার কোটি। যেখানে বত্রিশ জন ধনীর হাতে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ, দৈনিক একশো কোটি মানুষ এক ডলারের কম আয় করে আর দেড়শ কোটি মানুষের আয় এক থেকে দুই ডলারের মধ্যে সীমিত- ভাবুন তো আজ থেকে দুশো বছর পর পৃথিবীটা কেমন হবে? হিন্দু ধর্ম মতে, আমরা কলিযুগে আছি, হুজুররা হয়তো বলবে কেয়ামত খুব সন্নিকটে, পরিবেশবাদীরা অনুমান করবে পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে, বিজ্ঞানীরা যুক্তি সহকারে দেখাবে মানবজাতি পৃথিবীর বাইরে বসতি গড়তে সক্ষম হবে, ইতিহাসবিদরা আরও কয়েকটা প্রক্সি যুদ্ধের আলামত হাজির করবে- সেসব ভাবনা থেকে ইউভাল নোয়া হারারির ভাবনা গভীর আর বিচক্ষণ। তার তৈরি করা ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপরেখা আমাদের বিস্মিত করে, নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়। এর মানে আমরা ধরে নিব না তার ভাবনা পয়গম্বরের ভাবনার মতো শুদ্ধ আর সমালোচনাহীন।

    ইউভাল নোয়াহ হারারি

    হারারি ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপরেখায় প্রযুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের জৈববিবর্তন তার আলোচনার প্রধান কেন্দ্র, মানুষকে নিছক প্রাণী হিসেবে দেখার প্রবণতা তার লেখায় ঢের আছে। এখানে আমরা হোমো ডিউস: অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টুমোরো (২০১৬) ও টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস ফর দ্যা টুয়েন্টি ওয়ান সেঞ্চুরি (২০১৮) বই দুটির সাহায্য নিয়ে হারারির ভবিষ্যত পৃথিবীর রূপরেখা তুলে ধরবো।

    ভবিষ্যত মানুষ

    The fox economy cannot grow, because fox don’t know how to produce rabbits. (Homo Deus, 2016)

    মনুষ্যজাতির আছে অর্থ আর পুঁজি, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্র  নামক কতগুলো ধারণা, যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। অন্যপ্রাণীরা সারাজীবনের সঞ্চয় কোনোভাবেই একদিনে করতে পারে না কিন্তু মানুষ পারে। অন্য প্রাণীর জিডিপি নামক কোনো ধারণা নেই, মানুষের আছে। মানুষ তার চিন্তা কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার টন চাল আর গম উৎপন্ন করতে পারে। আধুনিক পুঁজি গতিশীল, এ পুঁজি স্থির  হলে পুঁজিজগতে ধাক্কা লেগে যায়। ফলে পুঁজি তার টিকে থাকার শর্তে নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করে আর বিনিয়োগে মনোযোগী হয়। পুঁজি নিজ স্বার্থে এগিয়ে চলে, নিত্য উৎপাদন করে গতিশীলতা রক্ষা করে। আঠারো শতকের শিল্প বিপ্লব সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। গ্রামের কৃষক শহরের দিকে ধাবিত হয়, নতুন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। হারারির ভাবনায়, আগামী দিনেও মানবজাতি প্রযুক্তির কল্যাণে অন্যরকম এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। যে বাস্তবতায় মানুষ সুপার হিউম্যানে রূপান্তরিত হবে, বিশেষ সুবিধা ভোগ করবে। সামনের দিনগুলোতে প্রযুক্তির কল্যাণে তিন ধরনের মানুষ দেখা যাবে:

    এক. বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং: মানুষ আদিদশা থেকে অ্যামিবা, রেপটাইল ধাপ পেরিয়ে হোমো স্যাপিয়েন্সে রূপান্তরিত হয়েছে। মানুষ হোমো স্যাপিয়েন্সেও আর আটকে থাকবে না। বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মানুষের দীর্ঘ বিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করবে না বরং বিশেষ সুবিধা ভোগ করার স্বার্থে ব্রেন সার্কিট, জেনেটিক কোড, বায়োলজিক্যাল ভারসাম্য রক্ষা করে নতুন স্যাপিয়েন্স তৈরি করবে। যা এখনকার স্যাপিয়েন্সের মতো হবে না, যার আয়ু আরও দীর্ঘ হবে, কাজ করার সক্ষমতা বাড়বে।

    দুই. সাইবর্গ ইঞ্জিনিয়ারিং: মানুষ তার শরীরে নন অর্গানিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করবে। আর্টিফিশিয়াল চোখ, বায়োনিক হাত আর পা লাগাতে শুরু করবে। এসব যন্ত্র স্থাপনের কারনে মানুষ পূর্বের চেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করবে আর ভারী কাজ সম্পাদন করতে পারবে। সাইবর্গ শুধু যে ফিল্মেই দেখা যায়, তা নয়। বাস্তবে প্যারালাইসিস বা হার্টের সমস্যায় একে কাজে লাগানো হয়, সেই সক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও বহুগুণে বাড়বে।

    তিন. ইঞ্জিনিয়ারিং নন-অর্গানিক বিং:  উপরের দুই প্রজেক্টের সাথে এটা সম্পর্কিত। এটা মানুষকে একবারে নন-অর্গানিক করে তুলবে। যদিও এর ফলাফল সম্পর্কে মানবজাতি এখনো পুরোপুরি অবগত নয়। বলা যায় এটা যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহণ ব্যবস্থা আর জীবন ব্যবস্থার নানান ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন আনবে। এমনও হবে এটা মানুষের যেকোনো আকাঙ্ক্ষাকে মুহুর্তে সাধন করবে। তবে মানুষের চৈতন্যে তেমন পরিবর্তন আসবে না। যেমন ধরা যাক, সফোক্লিস বা ইউরিপিদিসের নাটকের মমার্থ মানুষ ঠিকই বুঝবে কিন্তু প্রদর্শনের সময় এদের সাজগোজে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। হয়তো দেখা যাবে রাজা ঈদিপাসের পরনে জিন্স প্যান্ট, যোগাযোগের জন্য ফেসবুক থাকবে কিন্তু নিষিদ্ধ ব্যাপারটির মর্মার্থ ঠিকই মানুষ অনুধাবন করতে পারবে। রোমিও-জুলিয়েটের প্রেমের বেলায়ও একই কথা খাটে।

    মানুষের গড় আয়ু এতদিন চল্লিশের আশেপাশে ছিল, বর্তমানে সত্তর। যদি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের পর্যাপ্ত ওষুধ আবিষ্কার হয় আর মানুষ তার বেপারোয়া জীবনযাপনে নিয়ন্ত্রণ আনে; মানুষের গড় আয়ু নব্বই হবে। সামনের দিনগুলোতে প্রযুক্তির কল্যাণে গড় আয়ু একশো বিশ থেকে একশো পঞ্চাশ করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা উদঘাটন করেছে, শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে, ফুসফুস কাজ না করলে বা নানান সংক্রামক জীবাণুর আক্রমনে মানুষের মৃত্যু হয়। মানুষ একটা সময় কোয়ান্টাম বিদ্যা কাজে লাগিয়ে নিজ জীবনকে স্বাভাবিক মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে।

    পৃথিবীর পুরো ইতিহাস জুড়ে অভিজাতরা বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছে। কিন্ত কোনো সময়ই তাদের সাথে নিচু শ্রেনীর মানুষের জৈবিক অমিল ছিল না। মধ্যযুগের অভিজাতরা বলতো তাদের শরীরে অভিজাত রক্তের ধারা বইছে, ব্রাহ্মণরা বলতো তারা দেখতে উজ্জ্বল, নাইটরা বলতো তারা বীর যোদ্ধা- আদতে সেগুলো ছিল ফিকশন। হারারির ভাবনায়, ভবিষ্যতে আমরা ধনী আর গরীবের মধ্যে সত্যিকারের জৈবিক পার্থক্য দেখতে পাবো। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এই কাজ সম্পূর্ণ করবে, কিছু মানুষ সুপার হিউম্যানে পরিণত হয়ে মানবজাতিকে বিভক্ত করবে।

    ভবিষ্যত ধর্মীয় বিশ্বাস

    Google won’t have to be perfect. It won’t have to be correct all the time. It will just have to be better on average than me. (Homo Deus, 2016)

    হারারি প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইতিহাস দিয়ে বুঝতে চেয়েছেন, বিভিন্ন ঘটনা আর পরম্পরা বিশ্লেষণ করে তিনি ভবিষ্যতের মনুষ্য ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অনেক আগে কিছু মানুষ বিশ্বাস করতো পৃথিবীর সব জায়গায় প্রাণ আছে। এরা ভাবতো গাছ, পাথর, নদী, পাহাড়, পর্বত, বিভিন্ন প্রাণী তাদের পূর্ব পুরুষ। তাই এগুলোর পূজা করতো। এই ধারণাকে বলা হয় অ্যানিমিজম। দীর্ঘদিন এই ধারণা প্রচলিত ছিল, এখনও কয়েক লক্ষ মানুষ এই ধারণার অনুসারী। দুনিয়াব্যাপি কৃষি বিপ্লবের সময়ে কিছু মানুষ বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাস করতে শুরু করে, মানুষ আর মানুষের সংস্কৃতি সৃষ্টির পেছনে এসবের হাত আছে বলে এরা মনে করে- এই ধারণাকে বলে পলিথেইজম। তৃতীয় আরেকটি ঘরানার ধর্ম আমরা দেখতে পাই, যারা বিশ্বাস করে পৃথিবী সৃষ্টির নৈপথ্যে একজন ঈশ্বর আছে। যিনি সব ভালো-মন্দের দেখভাল করে। হারারি বলছেন, এই তিন ধর্মের বাইরে মানবতাবাদ নামক আরেক প্রকার ধর্ম আছে। শিল্প বিপ্লবের সমসাময়িক সময়ে এ ধর্মের উদ্ভব। এ ধর্মে ঈশ্বর নেই, মানুষ-ই প্রধান। কিন্তু ভবিষ্যতে ধর্মের রূপ এমন থাকবে না। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা সর্বদা অ্যালগরিদমের সাফল্যের কথা শুনি- যত দিন গত হবে, ধীরে ধীরে জৈবিক অ্যালগরিদম ধারণাটি বিকশিত হবে। জৈবিক অ্যালগরিদম কাজে লাগিয়ে মানুষ তার শরীরের ওপর সবরকমের নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবে। মানুষ একসময় ঈশ্বর ধারণাকে ধ্বংস করবে আর হোমো স্যাপিয়েন্স পরিবর্তিত হয়ে হোমো ডিউসে রূপান্তরিত হবে।

    আর্টওয়ার্ক: বিগ ডাটা
    শিল্পী: জাজা গানবল্ট
    সূত্র: সাৎসি আর্ট

    মানুষ সচরাচর তাদের প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের পরিবর্তন সম্পর্কে ভয় পায়। কিন্তু মানুষ না চাইলেও তাদের বিশ্বাসগুলোর পরিবর্তন ঘটবে, নতুন বিশ্বাসের জন্ম হবে। মিশরে তিন হাজার বছর ধরে ফারাও দেবতার পূজা করা হত, সে সেময় তারা ভাবতো ফারাও না থাকলে কে তাদের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করবে আর কে তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে? অথচ আজকে ফারাও দেবতা নেই, কিন্তু মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে আছে, পূর্বের চেয়ে মানুষ বেশি ন্যায়বিচার পায়, বেশি খেতে পারে আর শৃঙ্খল সহযোগে বাস করে। তিনশো বছর ধরে মানবতাবাদ পৃথিবীতে জায়গা করে নিয়েছে, মানবতাবাদ কিছু সময় আলোড়ন তুললেও বর্তমানে এটি সমালোচনার কাঠগোড়ায়। হারারির মতে, হয়তো মানবতাবাদও একসময় থাকবে না, নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটবে। ইতিমধ্যে তিনি ভবিষ্যত ধর্মকে দেখতে পাচ্ছেন। সেটি বিগ ডেটা, যাকে হারারি রিলিজিয়ন ডেটা হিসেবেও ডাকতে চান। ডেটার ধর্ম প্রবাহিত হওয়া, এক হাত থেকে বহুহাতে ছড়িয়ে পড়া। এমন না যে পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের চেয়ে বেশি নৈতিক ছিল, কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধে পুঁজিবাদ জিতে যায় কেননা পুঁজিবাদীরা ডেটার প্রবাহ বৃদ্ধি করে জনগণকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল।

    ডেটার সাহায্য নিয়ে অ্যালগরিদম মানুষের ইচ্ছা আর বাসনার প্রবণতা ধরে দিতে পারে, মানুষের বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেকেন্ডে মানুষের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে, মানুষকে জানাতে পারে কোন পথে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ আর নিরাপদ। কোন হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা আছে, কোন শহরে আর কোন দেশে বিনোদন ব্যবস্থা বিলাসী, কোন বই কাজের, কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষা ভালো দেয়া হয় তা মুহুর্তে জানায়। নতুন কোন পণ্য বাজারে ভালো চলছে, কোন পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালু সবচেয়ে বেশি, ঘর কীভাবে সাজাতে হয়, বিয়েতে বর পক্ষ কোন জিনিসটা বেশি পছন্দ করে- তাও জানাতে বাকি থাকে না। হারারির ভাবনায়, সামনের দিনে হেরা গুহা বা সিন পর্বত থেকে ধর্ম আসবে না, ধর্ম আসবে ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির মতো জায়গা থেকেও। যেখানে গুগলের অফিস, যেখানে পুরো পৃথিবীর তথ্য জমা হচ্ছে। মানুষের সুখ-দুঃখের ধরন, কান্না আর বেদনা, বিপ্লব আর আন্দোলনের তথ্য সেখানে নিত্য আপডেট হচ্ছে। পৃথিবীর কেন্দ্র হবে ফেসবুক, অ্যাপেল আর অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। আমেরিকা আর রাশিয়া নয়, পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ থাকবে এদেরই হাতে।

    সামনের দিনে বিগ ডেটা নৈতিকতার সবক দিবে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ তা মুহুর্তে জানাবে। ধর্মের মিথের মতো এরাও মিথ ছড়িয়ে দিবে। মানুষ সে মিথ অনুসারে সিদ্ধান্ত নিবে, সে মিথ অনুসারে সঞ্চিত অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবে। বিগ ডেটা মানুষের ভাগ্য ঈশ্বরের মতো নির্ধারণ করে দিবে। হয়তো বিগ ডেটা কাজে লাগিয়ে অ্যালগরিদম পুরোপুরি নির্ভুল কাজ করতে পারবে না, কিন্তু মানুষের চেয়ে বেশি শুদ্ধ কাজ করবে। মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখবে, দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়েও কম দুর্ঘটনা ঘটাবে। আবার ধর্মের মতোই বিগ ডেটার অপব্যবহার হবে। রাজনীতিবিদ আর পুঁজিপতিরা একে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত করবে। যেমন বাজারে চালু আছে, ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় বিগ ডেটার ব্যবহার করেছিলেন, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে তাকে প্রচুর সাহায্য করেছিল। এমনকি ব্রেক্সিটেও একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিলো। হারারি বলছেন, এই অপব্যবহার থেকে মানুষকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই নতুন আদর্শের প্রয়োজন হবে।

    ভবিষ্যত চাকুরীর বাজার 

    Some believe that within a mere decade or two billions of people will become economically redundant. (21 lessons for the 21st Century, 2018)

    পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের দুই ধরনের কাজের সক্ষমতা দেখা গেছে। মানুষ হয় কায়িক শ্রম করে, না হয় মানসিক শ্রম দেয়। পৃথিবীর ইতিহাস জুড়ে মানুষ কায়িক শ্রম বেশি দিয়েছে, মানসিক শ্রম দেয়নি তা বলা উদ্দেশ্য নয়। সভ্যতার যা কিছু, তা ওই দুইয়ের-ই যোগসাজস। মানুষ খাদ্য সংগ্রহ, কৃষিকাজ আর দাসত্ব করে বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে। সম্ভবত গত দুশো বছর ধরে মানসিক শ্রমের মূল্য মানুষ গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে। পূর্বে বেঁচে থাকার স্বার্র্থে কায়িক শ্রম ব্যতিত মানুষের আর কোনো উপায় ছিলনা, ভবিষ্যতে মানসিক শ্রম ব্যতিত মানুষ টিকে থাকতে পারবে না।

    খাদ্য যোগানের জন্য মিশরে দীর্ঘসময় দাস ব্যবসার কারবার ছিল, ভারতীয় সভ্যতায় ছিল কৃষিকাজ, রোমানদের ছিল দেশ দখল- এসবের মূল কারন মানুষের অবিরাম টিকে থাকার সংগ্রাম। মানুষ হয় দাস হবে, না হয় দাসে পরিণত হবে। সামন্তসমাজে যে কৃষক ফার্মে কাজ করতো শিল্প বিপ্লবের ফলে সে হয়ে যায় শ্রমিক আর স্নায়ু যুদ্ধের শেষদিকে বেশিরভাগ শ্রমিক সুপার শপে চাকরি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ভারতে তখনও কৃষিব্যবস্থাই জীবিকার উৎস, দখলবাজ রোমান আর মিশরের দাশ কারবার ইতিহাসে অতীত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে আগমন ঘটেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার; হারারি ধারণা করেছেন, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আগামী দিনে দুশো কোটির বেশি মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বানিয়ে ফেলবে। বেশিরভাগ কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একাই সম্পাদন করবে। তখন মানুষের পারিশ্রমিক কমে যাবে, কায়িক শ্রম অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়তে থাকবে।

    গাড়ি চালকের পদগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখল করবে, হাসপাতালের নার্স আর ডাক্তার, আইনজীবী, বিমানের পাইলট, সেনাবাহিনীর পদগুলোতে এদের দেখা যাবে। এরা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে কাজ করবে, এমনকি মানুষের চেয়েও এদের কাজ বেশি নিখুঁত হবে। পৃথিবীতে প্রতিবছর পনের লাখ মানুষ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়; যার নব্বই ভাগ দূর্ঘটনা অসাবধানতাবশত ঘটে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই জায়গায় একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বড় বড় হাসপাতাল বা ক্লিনিকে এরা নিখুঁত কাজ করবে। নিমিষেই পৃথিবীর প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারবে। এরা মানুষের জীবনকে সহজ করবে, মানুষের ভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে। চিকিৎসা সেবায় একটুও কার্পণ্য করবে না, মহামারির সময় এরাই মানুষকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর এরা যখন ব্যাপকভাবে সফলতা লাভ করবে, তখন বেশিরভাগ চাকরিতে মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে, মানুষ সমাজের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেহেতু নতুন চিন্তা করতে পারে না, শুধুমাত্র চিন্তা ধরতে পারে। তাই মানসিক শ্রমে দক্ষ মানুষেরাই ভবিষ্যতে বাজিমাত করবে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষকে সে ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে মানসিক শ্রমের দিকে ঝুঁকতে হবে।

    দীর্ঘ আঠারো বছর নেলসন ম্যান্ডেলা রবেন দ্বীপে বন্দী ছিল। সেখানে তাকে দৈনিক তের ঘন্টা শ্রম দিতে হত; রেল লাইন তৈরি করতে, পাথর ভাঙ্গতে, জঙ্গল পরিষ্কার করতে তার দিন কেটে যেত। নোবেল বিজয়ী লেখক সলঝেনিৎসেনকে স্টালিনের গুলাগে অমানুষিক শ্রম দিতে হয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনো মানুষের সেই হাড় ভাঙ্গা খাঁটুনির সম্ভাবনা থাকবে না, অ্যালগরিদম কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেসব কাজ নিজেই সম্পাদন করে দিবে। বিপরীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে মানুষের নতুন কায়দা-কানুন শিখতে হবে আর প্রযুক্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

    ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বৈষম্য ব্যাপক হাড়ে বেড়ে যাবে। এর জবাবে হারারি হয়তো বলবেন, স্যাপিয়েন্স তার আদি অবস্থা থেকেই বৈষম্যে বিশ্বাসী প্রাণী।

    ভবিষ্যত উদারনীতিবাদ

    Science fiction tends to confuse intelligence with consciousness, and assume that in order to match or surpass human intelligence, computers will have to develop consciousness. (21 lessons for the 21st Century, 2018)

    পুরো পৃথিবী চলছে একে অপরের দোষ খুঁজে। জাতিসংঘের চুয়াত্তর তম সাধারন অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান অভিযোগ করেছিলন, নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান বিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে, কিন্তু তিনিও সুযোগ পেলে পাকিস্তানের সংসদ আর জনতার মঞ্চে ভারত বিরোধী বক্তব্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেবার অঙ্গীকার করে, চীনাদের চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের প্রচারণা চালান আর সবসময় তার বক্তব্যের মূল কেন্দ্র ছিল হিলারির ইমেইল ফাঁসের ঘটনা। ট্রাম্প আমেরিকানদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আমেরিকাকে আবার  শ্বেতাঙ্গময় করে তুলবেন, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে পৃথিবীর অর্থনীতি একে অপরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যার নতুন সংস্কার ছাড়া আমেরিকাকে শ্বেতাঙ্গময় করা সম্ভব নয়। কাছাকাছি ব্যাপার আমরা রাশিয়া, আর তুরস্কের শাসকদের বেলায়ও দেখি, চীনারাও এ বিষয়ে কম পিছিয়ে নেই। অথচ সামনের দিনগুলোতে মানবজাতি নতুন সংকটের মুখোমুখি হবে। তথ্য প্রযুক্তি ও জৈব প্রযুক্তি বর্তমানে শিশু অবস্থায় আছে, ভবিষ্যতে এ দুই বস্তু বিধ্বংসী হয়ে উঠবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে আছে, ভবিষ্যতে এর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়বে।

    প্রত্যেক শাসকের কাজ নিজ দেশের কল্যাণে পরিকল্পনা গ্রহণ করা, দিন দিন অসমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা নিরসন করা। বেশিরভাগ দেশে গুটি কয়েক মানুষের শাসন দেখা যাচ্ছে, তা বন্ধ করা। দিন দিন বেকার মানুষের হার বেড়ে যাচ্ছে, নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির ফলে নদী ও সাগরের বাস্তুসংস্থানে বিপর্যয় ঘটছে আর বন ধ্বংস থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা। অথচ আজকের সময়ে নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাবু করাই যেকোনো গাজোয়ারি নেতার মূল কাজ। হারারি হয়তো এগুলোকে মানুষের নির্বুদ্ধিতা আর মূর্খতা বলবেন। চীনারা আমেরিকান বাজার দখল করছে তাতে ট্রাম্পের ঘুম হারাম, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে কর্মহীনকে করে ফেলছে তা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই।

    উদারনীতিবাদ গত একশো বছর ধরে স্বপ্ন দেখিয়েছিলো একটি বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর। যেখানে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে, ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছাকে সম্মান জানানো হবে। গণতন্ত্র সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে; এখানে ব্যক্তির যৌক্তিকতা নয়, বরং ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হবে। হারারি বলেছেন, বিশ শতকে কিছু সময় মানুষ উদারনীতিবাদের চর্চা করতে পেরেছে। এসময় ভোক্তা তার পছন্দমত পণ্য ক্রয় করেছে, ভোটার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু আধুনিক সময়ে অ্যালগরিদম ব্যক্তির উদারনীতিকে প্রভাবিত করছে। অ্যালগরিদম বিগ ডেটা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তির প্রবণতাকে ভিন্ন আবহে রূপান্তরিত করছে। তবে মানুষের ইচ্ছা আর বাসনাকে ধরতে পারেনি, মানুষের চৈতন্যকে বুঝতে পারেনি। অ্যালগরিদম কাজ করে যান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসারে, মানুষের চৈতন্যকে হয়তো এটা পুরোপুরি বুঝতে পারবে না। যদি কখনো মানুষের ইচ্ছা আর বাসনা বুঝতে পারে, তবে সিনেমার কাহিনী সত্যিই বাস্তব হয়ে যাবে, অ্যালগরিদম মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে মানুষের সংঘর্ষ বাঁধবে। চীন, আমেরিকা, জাপান আর রাশিয়ার মতো দেশগুলোর কাছে মানুষ খেলনা পুতুল হয়ে যাবে, গুগল আর ফেসবুক পৃথিবীর প্রধান কেন্দ্র হবে। ধনীরা হবে দৈত্য আর সুপার হিউম্যান, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অসমতা দেখা দিবে।

    হারারির মতে, উদারনীতিবাদ গত শতকে হিটলার, স্ট্যালিন আর কমিউনিজমকে মোকাবেলা করেছে।  স্নায়ু যুদ্ধের সময় উদারনীতিবাদ শক্ত অবস্থান থাকলেও সোভিয়েতের পতনের পর ধীরে ধীরে নিজ অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে। আজকের দিনে উদারনীতিবাদ বলতে নিছক সমকামী অধিকারের মতো ব্যাপারগুলো বুঝায়। ব্রেক্সিট আন্দোলনের নেতা মাইকেল গভ প্রথমদিকে বরিস জনসনকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন করেছিলেন, পরে সমর্থন সরিয়ে নিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, তার যৌক্তিক মন চেয়েছিলো ব্রেক্সিট সমর্থন করতে, তিনি তা করেছিলেন; তার যৌক্তিক মন চেয়েছে বরিসের দিক থেকে সমর্থন উঠিয়ে নিতে, আর তাই তিনি সেটা করেছেন। ডেভিড ক্যামেরুন ব্রেক্সিট বিষয়ে রাণীর কাছ থেকে অনুমোদন নেয়নি। বরং নিজে পরিকল্পনা করেছেন আর সেটা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন- এটাই হয়তো উদারনীতিবাদের প্রকৃত চেহারা। ধনীদের এরকম দুয়েকটা উদাহরণ ছাড়া উদারনীতিবাদ তেমন সুরক্ষিত হচ্ছে না বরং ধর্ম আর জাতীয়তাবাদ উদারনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলছে। কিন্তু ক্রমেই অ্যালগরিদম পৃথিবীকে সম্পূর্র্ণভাবে পরিচালিত করবে আর মানুষও সেই ফাঁদে আটকে পড়বে। হয়তো আর কখনোই মানবজাতি এ ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে যে ধর্মীয়, সম্প্রদায়, বর্ণগত, জাতিগত বিভাজন তা মানুষকে প্রকৃত সমস্যা বুঝতে সাহায্য করবে না। আর ততদিনে উদারনীতিবাদ হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে।

    ফেসিয়াল রিকগনিশন

    ভবিষ্যত সমাজ

    Our sense of justice might be out of date.
    (21 lessons for the 21st Century, 2018)

    একহাজার পঞ্চাশ সালের সমাজের সাথে এক হাজার একশোয় পঞ্চাশ সালের সমাজের তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। খুব সহজেই অনুমান করা যেত, পরবর্তী একশো বছরে কি কি ঘটবে। ভবিষ্যত বাণীতেও তেমন হেরফের হত না। রোমান সভ্যতার সাথে ভারতীয় সভ্যতার জীবনযাপনে তেমন পার্থক্য ছিল না। পৃথিবীর সবগুলো সভ্যতাই মোটামুটি হয় দাস ব্যবসা, না হয় কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও কাছাকাছি ছিল। বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো চোখে পড়ে শিল্প বিপ্লব চলাকালীন সময়ে। পাশ্চাত্যের শাসকেরা একদিকে উপনিবেশ স্থাপন করে, অন্যদিকে জ্ঞান বিজ্ঞানে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। বিভিন্ন রয়েল সোসাইটি গড়ে তোলে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক লাগে। দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য চর্চার জোয়ার শুরু হয়। হারারি বলেছেন, আগামীতে শিক্ষাক্ষেত্রে এসব বিষয় কম গুরুত্বপূর্ণ হবে। বরং আগামীতে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে মানুষকে বেশি বেশি তথ্য মুখস্থ রাখতে হবে। যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে হবে, পৃথিবী সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা থাকতে হবে। দেখা যাবে, সে সময় মানুষকে মানসিক কাজের দিকেই বেশি নজর দিতে হবে।

    আজকের সময়ে সমাজ দ্রুত বিকশিত হচ্ছে; এই বিকাশে ইতি আর নেতি দুই-ই আছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন একে অপরের খুব কাছাকাছি, মুহুর্তে যেকোনো প্রান্তে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে।  স্নায়ু যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জন এফ কেনেডি ঘোষণা দিয়েছিল মানুষ চাঁদে যাবে, এরপর মানুষ শুধু চাঁদেই নয় মঙ্গল গ্রহেও গিয়েছে। পৃথিবীর বাইরে বসবাসের জন্য ইদানিং তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। এরপরেও পৃথিবীতে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ জেঁকে বসে আছে। সিলেটের চা বাগানে কাজ করা লোকটি দিনে একশো টাকার কম মজুরি পায়, এখনও আসামের চা বাগানে কাজ করা লোকটি অমানবিক জীবনযাপন করে। গাজীপুরে কাজ করা গার্মেন্টস শ্রমিক দৈনিক তের ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য হয়, বেঙ্গালুরুতে হয়তো কাছাকাছি অবস্থা; শ্রমিকদের বিনোদনের সামান্য সময় নেই। এরপরেও পৃথিবী থেমে নেই; দুবাইয়ে বিশাল টাওয়ারের পাশে সামান্য বেতনের শ্রমিক বসবাস করলে বা সৌদি আরবের শহরগুলোতে সস্তায় শ্রম পাওয়া গেলে পৃথিবীর ধনীদের তাতে কিছু আসে যায় না। বরং পৃথিবীতে ধনীর পরিমাণ নিত্য বেড়েই চলছে; গুগল, ফেসবুক, আলিবাবা, অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা করছে। এমনকি ফোর্বসের প্রতিবেদনে করোনা কালেও তাদের মুনাফা করা থেমে নেই। হারারি বলেছেন, এ শতাব্দীর শেষদিকে হয়তো অসমতা আরও বেড়ে যাবে, তবে বেশিরভাগ মানুষ পূর্বের চেয়ে ভালো চিকিৎসা সেবা পাবে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামে থাকা মানুষটিও মুহুর্তে চিকিৎসা সেবা পাবে আর ক্যান্সারের মতো রোগগুলোর চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমে যাবে।

    বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর পনের হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়, ভারতে হয় দেড় কোটি, আমেরিকায় সেটা আড়াই কোটির ওপরে। স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির তিনহাজার ডলার খরচ হয়েছিল যা সিলেটের চা বাগানে কাজ করা শ্রমিকের আয়ের অনেকগুন কম। হয়তো সারাজীবন কাজ করেও সে শ্রমিক নিজের স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা সঠিকভাবে করাতে পারবে না। পৃথিবীর এক বিলিয়ন মানুষের আয় যেখানে এক ডলারের কম, সেখানে এরকম ব্যয়বহুল চিকিৎসা না পাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর জৈবিক প্রযুক্তির বদৌলতে এই শতাব্দীর শেষদিকে এসব মানুষ আরও উন্নতধরনের চিকিৎসা সেবা পাবে। পৃথিবীতে মহামারী নামক ব্যাপারটিকে হয়তো ভালোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে। হয়তো যুদ্ধ ক্ষেত্রেও ব্যাপক একটা পরিবর্তন আসবে। ঊনিশশো আটষট্টি সালে ভিয়েতনামে এক লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো, পল পটের কম্বোডিয়ায় সে সংখ্যাটা প্রায় বিশ লক্ষ, স্টালিনের গ্রেট বার্জের সময়, ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালে বা ইরাক আর আফগানিস্তান যুদ্ধেও প্রচুর সৈন্য এবং সাধারণ মানুষ মারা পড়েছিল। ভবিষ্যতে সেই যুদ্ধটা স্থানান্তরিত হবে হ্যাকিংয়ে, সার্ভারে সার্ভারে তথা অনলাইনে। ইতিমধ্যে সে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, হয়তো কোনো একসময় রোবোটে রোবোটে যুদ্ধ হবে।

    হারারি বলেছেন, ভবিষ্যত মানবাধিকার নামক ব্যাপারটি থাকবে না, একে আমরা মিথ আকারে পাবো। ন্যায়বিচার ব্যাপক আকারে লঙ্ঘিত হবে; বলা যায় সিলিকন ভ্যালি থেকে এর আগমন ঘটবে। সত্য ব্যাপারটি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অ্যালগরিদম আমাদের সত্যের ভিত গড়ে দিবে, তথ্য প্রযুক্তি আর জৈবিক প্রযুক্তি মিলে সত্যের নানান মাপকাঠি নির্ধারণ করে দিবে। হয়তো আরও বাড়িয়ে বলা যাবে যে, এসবের কল্যাণে বিশ শতকের মতো দূর্দান্ত প্রতাপশালী দার্শনিক তত্ত্ব আর সমাজ বিপ্লবের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  পুঁজিপতিরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করবে- এজন্যই হয়তো এখনকার রাষ্ট্রগুলো মানুষের বায়োমেট্রিক্স নিয়ে খুবই সচেতন, সমস্তরকম জৈবিক পরিচয় টুকে রাখে আর সিসি টিভিতে নজরদারি বৃদ্ধি করে। হারারি এজন্যই বলেছেন, মানুষ একসময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী না থাকা সত্ত্বেও নিজের বুদ্ধি খাঁটিয়ে এ গ্রহ দখল করেছিলো, এরপর একজন কাল্পনিক ঈশ্বরের হাতে সে দখল বজায় ছিল; অদূর ভবিষ্যতে মানুষ নিজে ঈশ্বর হয়ে উঠবে আর ঠিক তখনই পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য হবে।

    যদি মনুষ্যজাতির কারণেই পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য হয়, এ জাতির দায়িত্ব হবে পৃথিবী নামক গ্রহটিকে রক্ষা করা। একসময় সামন্তবাদ ছিল, মানুষ সে জায়গায় পুঁজিবাদ বসিয়েছে। একসময় ষোড়স লুই আর দ্বিতীয় নিকোলাসের জবরদস্ত শাসন ছিল, মানুষ নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। গ্রীকরা বারবার নিজেদের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করত, আজ তারা বিলীন। বৃটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য্য দিগন্তে মিলিয়ে যেত না, এখন ঢেড় যায়। একদিন পুঁজিবাদও শূন্যে মিলিয়ে যাবে, হয়তো সাথে এ গ্রহটিকেও ধ্বংস করবে- আটল্যান্টিকের বরফ গলতে থাকা আর প্রযুক্তির অবক্ষয় সে বার্তাই দেয়। যদি পুঁজিবাদেই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার বৈশিষ্ট্য থাকে, মনুষ্যজাতির উচিত স্বয়ং পুঁজিবাদকেই শিকড়সহ উৎপাটন করার তত্ত্ব সন্ধান করা।

  • ‘সুপার কপ’ কিংবা ‘ডার্ক জাস্টিস’: রাষ্ট্রীয় খুন ও জনমনের রাজনৈতিক বাসনা

    ‘সুপার কপ’ কিংবা ‘ডার্ক জাস্টিস’: রাষ্ট্রীয় খুন ও জনমনের রাজনৈতিক বাসনা

    • বখতিয়ার আহমেদ

    নানা পাটেকারের ‘আব তাক ছাপ্পান’ (২০০৪) আমার দেখা প্রথম বলিউডি ‘সুপার কপ’ মুভি। বেশ কয়েকবার দেখছি। প্রায়ই কানে ভাসে ৫৬ এনকাউন্টার করা পুলিশ অফিসার সাধু আগাশের অমোঘ ডায়লগ: ‘সোসাইটিকে জামাদার হ্যায় হাম’। গ্লোবাল সাউথের এই ‘সুপার কপ’ সমাজের সুইপার, খুনে-অপরাধীদের সাফ করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেও খুন করেন। কিন্তু তার খুন আইনেরই স্বার্থে, সমাজেরই বৃহত্তর স্বার্থে। ফলে চাকরিসূত্রে তিনি ঠিক মানুষ নন, কিলিং মেশিন। বড়কর্তার গোপন অলিখিত নির্দেশে সকালের ফ্লাইটে শাদা পোশাকে ভারতের আরেক শহরে গিয়ে অচেনা কোন লোককে অবলীলায় গুলি করেন। বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে বাজার থেকে সব্জী কিনে নিয়ে মমতাময়ী স্ত্রী আর আদরের সন্তানের সাথে আটপৌরে জীবন কাটান। মানুষ আর মিডিয়া তাকে নিয়ে ভাবে কিন্তু ঠিক বোঝে না। তিনি নিজের কাজ নিয়ে খুব বিচলিত নন, কারণ ‘যো কারনা হ্যায়, ও কারনা হ্যায়, ঠোক না হ্যায় তো ঠোকনা হ্যায়… সোচনে কা এলাউ নেহি হ্যায়’। খুনাখুনি করা ছাড়া রাষ্ট্র চালানো যায় না, এবং খুনাখুনি নিয়ে ভাবার অনুমতি নাই, এই হচ্ছে ‘আব তাক ছাপ্পান’ খুনের মোরাল অব দি স্টোরি।

    আবতক ছাপ্পান পোস্টার

    বলিউড ছবি আমি পারতপক্ষে মিস করি না। ‘কোম্পানি’ বা ‘দাবাং’ থেকে শুরু করে ‘সিংঘম’ পর্যন্ত সব ‘সুপার কপ’ বা গ্যাংস্টার মুভিই মন দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। কোন চ্যানেলে ‘সিংঘম’ দেখালে আমার ‘বলিউড প্রীতি’তে বিরক্ত ছেলে পর্যন্ত টিটকারি দেয় ‘তোমার ফেভারিট মুভি’ হচ্ছে বলে। শুধু বলিউড না, আমি শার্লক হোমস থেকে শুরু করে জেমস বন্ড টাইপ সব মুভিই দেখার চেষ্টা করি, ‘ডার্ক-জাস্টিস’ বোঝার জন্য ‘সুপার হিরো’ মুভিও। ঢালিউড মৃভিও দেখি যথাসম্ভব। এসব প্রায় পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কারণ অ্যাকশন বা থ্রিলার মুভি আমার জন্য মিথ বা ভাষার মতই মানুষের মন বোঝার উপাত্ত। রাষ্ট্র ব্যবস্থার দৈনন্দিন চেহারা ও চর্চা বিশ্লেষণ যেমন নৃবিজ্ঞানের ধ্রুপদী কাজ, প্রতীকি ব্যবস্থায় সামাজিক সত্য আবিষ্কার তেমনি তার ধ্রুপদী বিশ্লেষণ পদ্ধতিগুলোর মূল একটি।

    নৃবিজ্ঞানের চোখ দিয়ে বুঝতে গেলে, বাংলাদেশসহ বহু আধুনিক রাষ্ট্রে চলমান খুনাখুনি শাসিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশের সম্মতি, ‘সহমত’ অথবা সংশয়ী অবস্থান ছাড়া ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সিস্টেমিক ম্যানেজমেন্ট প্রাকটিসে’ পরিণত হতে পারে না। কেন? সেটা আমি ২০১৪ সালের এক আলাপে যতদূর সম্ভব বলার চেষ্টা করছি (আহমেদ ২০১৪-ক)। কিন্তু এই সম্মতি আর সংশয় কিভাবে তৈয়ার হয় সেটা ব্যাখ্যা করতে গেলে ‘হাইপার রিয়েল’ সমাজ বাস্তবতায় ‘ফ্যাক্ট’ আর ‘ফিকশন’ দুটাকেই বিশ্লেষণের আওতায় আনতে হয়। ফলে ‘আইনী’ বাহিনীর ‘বেআইনী’ হত্যা প্রবৃত্তির ‘স্বাভাবিকায়ন’ বোঝার জন্য গণমানসে ‘সুপার কপ’ আর ‘ডার্ক-জাস্টিস’ ধারণার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রডাকশন আর রিপ্রোডাকশন প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ খুব জরুরী হয়ে পড়ে।

    লিবারেল রাষ্ট্র-কল্পনায় বিভোর আধুনিক নাগরিক মনের কল্পনায় ‘পুলিশ’ আসলে দুইটা জোড়-বিপ্রতীপ বা বা্ইনারি চরিত্রের সংমিশ্রণ; আধুনিক অ্যাংলো-স্যাক্সন সাংস্কৃতিক বলয়ে যার মোক্ষম উদাহারণ হবেন শার্লক হোমস আর জেমস বন্ড, বলছেন নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেয়বার (২০১৫)। এই দুই চরিত্রই আসলে অভিন্ন সত্তা এই অর্থে যে দুজনের মধ্য দিয়েই ‘অপরাধ’, ‘পুলিশ’ বা আইন-প্রয়োগ নিয়ে পাবলিকের রাজনৈতিক চেতনা বা বাসনার স্ববিরোধিতাই প্রতীকায়িত হয়। বেশি জটিল শোনালে বিশ্লেষণ পদ্ধতিটাই একটু খুলে বলি।

    লেভি-স্ত্রস প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাকচারাল নৃবিজ্ঞানের বিশ্লেষণ পদ্ধতি মোতাবেক, কোন প্রতীকের অর্থই স্বতঃসিদ্ধ নয়, অন্য প্রতীকের সাথে সম্পর্কসূত্রেই তার অর্থ নির্ধারিত হতে থাকে। নৃবিজ্ঞানী মাত্রই সংস্কৃতির জটিল জালে ক্রিয়াশীল প্রতীকগুলোর অর্থময়তার আন্তঃসম্পর্কের কাঠামো বা বিন্যাস চিহ্নিত করেই মানুষের মনকে বোঝার চেষ্টা করেন। নৃবিজ্ঞানের এই ‘কাঠামো-প্রত্যাশী’ (মজহার ১৯৭৭) পদ্ধতির প্রথম ধাপ হচ্ছে ভাষায়, কাব্যে, প্রতীকে, মিথে, টোটেমে, বিশ্বাসে, বয়ানে বা জনমানুষের মনের আর সব অলি-গলি-সন্ধিতে থাকা প্রতীকগুলোর জোড়-বিপরীত সম্পর্কগুলো আবিষ্কার করা।

    এই বিশ্লেষণ খুব কঠিন কোন কাজ না, কোন থিওরি তো না-ই। এই সম্পর্কের প্রথম সূত্রই হচ্ছে জোড়-বৈপরীত্য বা বাইনারি। সহজ অর্থে এর মূল সূত্র হচ্ছে কোন প্রতীকি ব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে, কোন প্রতীককে তার জন্য সাংস্কৃতিক অভিধানে নির্দিষ্ট করা অর্থ দিয়ে না বুঝে আর সব প্রতীকের সাথে সম্পর্কসূত্রে বুঝতে হবে। একটা বাক্যে যেমন কোন পদের অর্থ অন্য পদের সাথে তার সম্পর্কের নিরীক্ষে নির্ধারিত হয়। এজন্য প্রথমে একটা নির্দিষ্ট পরিসর লাগবে, সেখানে ক্রিয়াশীল উপাদানগুলো চিহ্নিত করতে হবে, তারপর একটার সাথে অন্যটার বিপ্রতীপ আন্তঃসম্পর্ক আবিষ্কার করতে হবে। যেমন জনমানসের ভয় যদি পরিসর হয়, হরর মুভির ক্ষেত্রে ড্রাকুলা বা কোন ভ্যাম্পায়ার চরিত্রকে বুঝতে হবে তার প্রতি-চরিত্র ওয়্যার-উলফ দিয়ে। কারণ একজনকে ছাড়া অন্যজনের কল্পকথা পূর্ণ হয় না।

    লেভিস্ত্রস

    ফেভারিট কোন ‘সুপার কপ’ বা ‘সুপার হিরো’ থাকার বয়স পেরিয়ে গেলেও লেভি-স্ত্রস এখনো আমার ইন্টেলেকচুয়াল হিরোদের একজন। কারণ উনার আগের সমাজবিদ্যার কাছে ব্যাখ্যাতীত বিমূর্ত বাস্তবতাকে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসবার, উপাত্তে পরিণত করবার, এবং তার অন্তর্লীন আদল ‘আবিষ্কার’ (খান ২০১১) করবার একটা সহজ ও সাহসী পদ্ধতি তিনি আধুনিক নৃবিদ্যাকে দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ পরিস্থিতির সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের জন্যও আমি তাঁর এই ‘অন্তর্লীন-কাঠামো-সন্ধানী’ পদ্ধতি (আহমেদ ২০১৪-খ) অকাতরে ব্যবহার করি।

    যা হোক, গ্লোবাল নর্থের লিবারেল ও পপুলার রাষ্ট্র কল্পনায় হোমস আর বন্ড এমনই জোড়-বিপরীত সম্পর্কে আবদ্ধ দুই প্রতীক। ইনাদের একজনকে ছাড়া আরেকজনকে বোঝা যাবে না। কারণ উনারা জনমনে মিশে থাকা দুই বিপরীত বাসনার প্রতীক যা দিয়ে তারা বাস্তবের ‘পুলিশ’ নিয়ে ভাবে। এই বৈপরীত্যেরই হাজারো প্রকাশ আছে আমাদের রাজনৈতিক জীবন আর কথকতার দৈনন্দিন চর্চায়, ‘সুপার কপে’র বিপরীতে ‘মনস্টার কপে’র মত বাইনারি আছে আরো অসংখ্য। আমার ধারণা বাংলাভাষী সাংস্কৃতিক বলয়ে ‘হোমস-বন্ড’ জুটির লোকাল বা পোস্টকলোনিয়াল উত্তরাধিকার হচ্ছেন ফেলুদা (বা মিসির আলী) আর ‘অবসরপ্রাপ্ত মেজর’ মাসুদ রানা। যাই হোক, আপাতত ‘হোমস-বন্ড’ বাইনারি দিয়েই আরেকটু বোঝা যাক ‘পুলিশ’ নিয়ে লিবারেল নাগরিক কল্পনার কায়-কারবার।

    জেমস বন্ড পোস্টার

    হোমস আর বন্ড, দু’জনেই লন্ডননিবাসী ‘অপরাধ-নিরোধকারী’ হলেও স্বভাব ও কাজেকর্মে পুরাই বিপরীত। প্রথম জন অ্যামেচার, পরের জন পেশাদার। প্রথম জন একটু নেশা-ভাঙ করলেও যৌনতা উদযাপনে তেমন আগ্রহী নন, দ্বিতীয় জনের মদিরা ও যৌনতা, দুইয়েই আগ্রহ আছে। অ্যামেচার আর খেয়ালি হলেও হোমস নিজের কাজে সাংঘাতিক দক্ষ ও দায়িত্বশীল। ওদিকে পেশাদার হলেও বন্ড মৌজ করতে গিয়ে প্রায়ই নিয়ম, দায়িত্ব বা ছদ্মবেশ ভুলে বিপদে পড়েন। হোমস পুলিশের লোক না হলেও অপরাধ তদন্তে পুলিশের চেয়ে দক্ষ, প্রধানত আইনের সীমার মধ্যেই কাজ করেন। বন্ড রাষ্ট্রীয় সিক্রেট এজেন্ট হলেও শুধু ‘লাইসেন্সড টু চিল’ই না, ‘লাইসেন্সড টু কিল’ও বটেন। তিনি প্রায় সব কাজই করেন আইনের সীমার বাইরে। এমনকি প্রায়শই নিজ দেশের ‘পুলিশ’ই তাকে ধাওয়া করে, নিজের বসই তাকে গ্রেপ্তার বা গুলির নির্দেশ দেয়। প্রায়শই ‘হি ইজ আউট অন হিজ ওউন’।  একটু খেয়াল করলে দেখবেন স্পাই থ্রিলার ‘মিশন ইম্পসিবলে’র ইথান চরিত্রটিও তাই।

    কিন্তু এতসব বিপরীত-বৈশিষ্ট্য ছাপিয়েও দুইজনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হচ্ছে হোমস অতীতে ঘটে যাওয়া অপরাধ সম্পর্কে ‘সত্য’ উদঘাটন করে আইনের হাতে তুলে দেন, অন্যদিকে বন্ড গোপন গোয়েন্দা ‘তথ্যে’র ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন ‘অপরাধ’ আগেই দমন করে ফেলেন। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুনিয়ার সর্বত্রই পুলিশের মূল দুইটা কাজ, অতীত ‘অপরাধ তদন্ত’ এবং ভবিষ্যত ‘অপরাধ দমন’, এই দুই ‘সুপার কপ’ আখ্যানেই চিত্রিত আছে। জনমানস এই কল্পনা দিয়েই বাস্তবের পুলিশ নিয়ে ভাবে বা বাসনা সাজায়।

    ওয়ার ওলফ

    ‘সুপার কপ’কে জনমানসের বাসনার অন্তর্গত করে তোলার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞানী গ্রেয়বার দেখান যে ইউরোপের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে জন-মানসে এই চিন্তনভঙ্গীর একটা সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতা আছে। কল্পিত ড্রাকুলা চরিত্র যেমন আছে, তেমনি বাস্তবের চরিত্র এলিয়ট নেস বা ফিলিপ মারলোকে নিয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি আছে। ভ্যাম্পায়ার আর ওয়্যার-উলফ, গ্রেয়বার দেখাচ্ছেন, আজকের জন-মানসে ‘সুপার কপ’ বা ‘ডার্ক জাস্টিস’ ধারণারই প্রত্নতাত্ত্বিক রূপ। দুই চরিত্রই দানব, ভ্যাম্পায়াররা ছিলেন ধনী আর অভিজাত, থাকতেন ক্যাসল বা ম্যানশনে। ওয়্যার-উলফরা ছিলেন গরিব ও ভবঘুরে, প্রায়শই জেমস বন্ডের মত ফেরারী, লড়তেন ভ্যাম্পয়ারদের সাথে, দানব হয়ে। শুভ আর অশুভ, দুই শক্তিই তখন দানব, একে অপরের সাথে লড়াই করে প্রতীকি সম্পর্কে আবদ্ধ থাকার কারণেই তারা আবির্ভূত হন জনমানসের কল্পনায়।

    মেরিন ড্রাইভের সর্বশেষ খুনে উদ্বেলিত পাঠকের মনে হয়তো ইতিমধ্যেই ‘সুপার কপ=মেজর সিনহা’ এবং ‘মনস্টার-কপ=ওসি প্রদীপ’ ধরনের একটা স্ট্রাকচারাল বিশ্লেষণ পাওয়ার আশা জেঁকে বসেছে। কিন্তু সেই পথ আমি মাড়াবো না। কারণ আমার কারেন্ট হিরো নৃবিজ্ঞানী গ্রেয়বার আরো শিখিয়েছেন, খুনি রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু ‘জেমস বন্ড’ বা ‘নয়ন বন্ডে’র ফিকশনই বানায় না, শাসিত বুদ্ধিজীবিতার জন্য দুইটা সিরিয়াস ওয়ার্নিংও ইস্যু করে। প্রথমটা হচ্ছে, অতীত ঘটনা নিয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করতে গেলে বাটে পড়তে হয় (এই গণপ্রজ্ঞা অর্জনের জন্য ‘দি মামি’ দেখতে পারেন)। দ্বিতীয়টা হচ্ছে ভবিষ্যত নিয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলেও বিপদ হয় (উদাহারণ: ফ্রাংকেনস্টাইন চরিত্র)। কাজেই প্রতীকে পরিণত হতে থাকা বাস্তব চরিত্র দিয়ে চলমান খুনাখুনির ভূত-ভবিষ্যত বিশ্লেষণের ঝুঁকি আপাতত এড়িয়েই যাব। তাছাড়া, স্ট্রাকচারাল পদ্ধতিরও একটা পরিসীমা আছে। এটা পরাবাস্তবিক দৃশ্য আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক আনন্দে যতদূর আগায় তারচে বেশি ঠেলতে গেলে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ না হয়ে বৈজ্ঞানিক কুসংস্কারে পর্যবসিত হতে পারে।

    যা হোক, নৃজ্ঞৈানিক বিচার বিশ্লেষণের জন্য ‘জনমানস’ খুব অদ্ভূত একটা পরিসর কারণ তা সর্বদা এরকম অদ্ভূত সব বৈপরীত্যে ঠাসা থাকে। সমাজের মূলধারার চিন্তা-স্রোত, ক্লিফোর্ড গিয়ার্টয (১৯৭৩) দেখিয়েছেন, মতাদর্শ বা আইনের মত এক-রৈখিক বা একমাত্রিক না। এখানে বহুমাত্রিক ও বিরোধাত্মক বহু ধারণাই একই সাথে একই মনে ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন এই পরিসরে ব্যক্তি মানুষ একই সাথে ধার্মিক এবং সেকুলার বা লিবারেল হতে পারেন এবং তাতে তার সমাজ জীবনে বিশেষ কোন বিড়ম্বনা পোহাতে হয় না। কিন্তু মতাদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কল্পনায় বৈপরীত্য বা বহুমাত্রিক সম্ভবনা বা সত্যের জায়গা নেই। এজন্যই ক্ষমতা, খুন, মতাদর্শ, বা ধর্মের মত সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা বোঝার জন্য জনজীবন ও মানসের বহুমাত্রিক বৈপরীত্যকে প্রতীকি ব্যবস্থার ‘থিক ডেসক্রিপশন’ তৈরি করে ব্যাখ্যা করবার প্রেস্ক্রিপশন দেন আমার আরেক একাডেমিক হিরো, ‘ব্যাখ্যানমূলক নৃবিদ্যা’র অগ্রদূত ক্লিফোর্ড গিয়ার্টয। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপবাসীদের মোরগ লড়াইয়ে প্রতীকাবদ্ধ রাজনৈতিক মনের গড়ন ব্যাখ্যা করে নিজের পদ্ধতি তিনি হাতে কলমে দেখিয়েছেন।

    ডেভিড গ্রেয়বর

    এসব প্রেসক্রিপশন বা পদ্ধতি দিয়ে পাবলিক ডিসকোর্সে ক্রিয়াশীল অযুত-নিযুত সব প্রতীকের মাঝে এরকম শত-সহস্র জোড়-বিপ্রতীপ সম্পর্ক আবিষ্কার করে, তাদের সম্পর্ক সূত্র বিশ্লেষণ করে জনমানসে ‘সুপারকপ’ বা ‘ডার্ক-জাস্টিসে’র বাসনাকে যেমন ব্যাখ্যা করা যায়, তেমনি ব্যাখ্যা করা যায় রাষ্ট্রীয় প্রযোজনায় ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ এর মত একক-উর্ধ্ব-কমা-বন্দী শব্দের প্রতীকে প্রতিভাত চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে। ব্যাখ্যা করা যায় মেট্রোপলিটান হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ক্রমশ নেক্রোপলিটান হতে থাকা রাষ্ট্রের গুপ্ত ও প্রকাশ্য খুনাখুনির প্রবৃত্তিকে। শাসন-প্রণালীর অঙ্গীভূত চর্চা হিসেবে খুনাখুনিকে বুঝতে হলে, রাজনৈতিক ক্ষমতার এই খুনে প্রবৃত্তির কায়-কারবার ব্যাখ্যা করতে গেলে, নৃবিজ্ঞানের কাছে এই পদ্ধতির বিকল্প নাই।

    রাষ্ট্রের হাতে একেকটা খুনের পরে কি কি দেখা গেল, কি কি জানা গেল, কি কি বলা/লেখা/ভাবা গেল, সেটা খুনের ঘটনার মতই তীব্র বাস্তবতা কারণ এসবের মধ্য দিয়েই পরের খুনের প্লট তৈরী হয়। এই ছিল আমার ২০১১ সালে লেখা নৃবৈজ্ঞানিক উপলব্ধি। এখন আরো স্পষ্ট হচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় খুন প্রশ্নে জনমানসে বিরাজমান যে সম্মতি বা স্ববিরোধ, তার মূলে আছে সরল ও ‘নির্বোধ’ এক রাষ্ট্র-কল্পনা, যার ম্যানুফ্যাকচার আর ডিসট্রিবিউশন আধুনিক রাষ্ট্র নিজেই তদারকি করে, খুনাখুনিকেই ‘স্বাভাবিক’ শাসন দশা হিসেবে চালানোর মতলবে।

    আর্টওয়ার্ক: ওরেগন লাইভ
    শিল্পী: আলেন ব্রেটম্যান
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এই পুরো প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আওতায় নিয়ে আসা গেলে ‘ভাল ক্রসফায়ার বনাম খারাপ ক্রসফায়ার’ ধরনের নির্বুদ্ধিতা কেন ও কীভাবে জনমানসে দানা বেঁধে অবস্থান করে, তার ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিগঠনে নির্বুদ্ধিতার ভূমিকা, এমনকি এই নির্বুদ্ধিতা উৎপাদন প্রণালীকেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব এই পদ্ধতি অবলম্বনে। ‘ডার্ক’ বা ‘ডাইরেক্ট’ জাস্টিসের বাসনা, কিংবা সুপার বা মনস্টার কপের আখ্যান কীভাবে ন্যায়হীন বন্দোবস্ত আর খুনাখুনির রাজনৈতিক বাস্তবে বোকামিকে সম্বল করে বাঁচতে শেখায় নাগরিককে, তার রাজনৈতিক বাসনার বিন্যাসকে কীভাবে বদলে দেয়, আর এসবের মধ্য দিয়ে তার মুক্তির স্পৃহা, তার সামাজিক সত্তা, কীভাবে প্রতিদিন খুন হয় সেই বিবরণ ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে। হাইপার রিয়াল সময়ে ফ্যাক্ট আর ফিকশনের প্যারালাল ইউনিভার্সে আটকা পড়া বিহব্বল নাগরিক মন, কিম্বা ‘ফরেস্ট গাম্পে’র মত হুদাই দৌড়াইতে থাকা নাগরিক মনের অন্তর্লীন আদল আরো স্পষ্ট হতে থাকে।

    খুব বোরিং না আসলে নৃবিজ্ঞান।

    উল্লেখিত পূর্বসূত্র

    আহমেদ, বখতিয়ার ২০১৪ (ক), ‘গুম-খুন-আতঙ্ক : শাসন প্রণালী ও হত্যার কথকতা’, বাধন অধিকারী সম্পাদিত বাংলাদেশ পরিস্থিতি: নয়া উদারবাদী যুগে শাসনপ্রণালী ও কথকতা।

    আহমেদ, বখতিয়ার ২০১৪ (খ), ‘ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবসত্তা: একটা নৃবৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা’, আলী আফজাল খান (সম্পাদিত), ভিন্নচোখ, ভাষা সংখ্যা ২০১৪, ঢাকা।

    খান, সলিমুল্লাহ ২০১১, ‘লেবিস্ত্রোসের আবিষ্কার’, তাঁর স্বাধীনতা ব্যবসায়, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ১৪৫-১৫৭।

    মজহার, ফরহাদ ১৯৭৭, প্রস্তাব, বুক সোসাইটি, ঢাকা।

    Geertz, Clifford 1973, The Interpretation of Cultures, Basic Books Inc., New York.

    Graeber, David 2015, ‘Dead Zones of the Imagination: An Essay on Structural Stupidity’ in his The Utopia of Rules: On Technology, Stupidity, and the Secret Joys of Bureaucracy, Melville House, London.

  • সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    • জাহিদুল ইসলাম

    প্রখ্যাত তাত্ত্বিক তালাল আসাদের মতে সেক্যুলারিজম শব্দটি উনিশ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিমা মুক্তচিন্তরকরা ব্যবহার করেন। এ শব্দটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিলো তাদের যেন নাস্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা না হয় এবং সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সমাজের সাথে একধরনের স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় থাকে। এ কৌশলটি তাঁরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে নয় বরং তাদের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেন।১ সেক্যুলার সমাজ বিভিন্ন সময় তার নিজস্ব ধর্ম থেকে বিভিন্ন উপাদান নিয়েছে। লকের প্রাকৃতিক আইনের ধারণাও ধর্মতত্ত্ব থেকে এসেছে। লক মনে করতেন জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি এই তিনটি প্রাকৃতিক অধিকার নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। যে অধিকার আদম পেয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছ থেকে। আমেরিকার সংবিধানে লকের এ ধারণাটি গ্রহণ করা হয়। দার্শনিক জার্গেন হেবারমাসের মতে ‘মানবাধিকার’ ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ ‘গণতন্ত্রের’ মতো বিষয়গুলো সরাসরি ইহুদি ও খ্রিস্টান মূল্যবোধ থেকে নেওয়া হয়েছে।২ এক্ষেত্রে ধর্মের সাথে সেক্যুলারিজমের একদম বিপরীতধর্মী (বাইনারি অপজিশন) সম্পর্ক নেই। সেক্যুলারিজম যৌক্তিক, ধর্ম অযৌক্তক, সেক্যুলারিজম উদার, ধর্ম অনুদার এভাবে দুটি বাইনারিতে ভাগ করাই হচ্ছে বিপজ্জনক কাজ। যে কাজটি পশ্চিমা আলোকায়নের সময় হেগেল বা কান্টের মতো দার্শনিকরা করে গিয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে। এবং এ নির্মাণের মাধ্যমে প্রাচ্যের উপর তাদের আধিপত্য যৌক্তিক করে তোলেন। পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ড ধর্মকে যেভাবে নির্মাণ করে তা হচ্ছে ধর্ম একটি প্রাচীন ধারণা। ধর্মের তুলনায় সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি অত্যন্ত প্রগতিশীল। ধর্মের সাথে সেক্যুলার সমাজের বাইনারি সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা আধিপত্যের বিস্তার ঘটে।

    লেভিয়ান্থ

    আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব চর্চার মধ্য থেকে এসেছে। কার্ল স্মিট রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে দুই ধরনের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের কথা বলেছেন: প্রাচীন ও আধুনিক ধর্মতত্ত্ব। প্রাচীন রাষ্ট্রতত্ত্বে ঈশ্বরের হাতে যে সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ধারণায় সেটি রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বকে ‘সেক্যুলারাইজড থিওলজিকাল কনসেপ্ট’ অভিহিত করেন।৩ পূর্বে যেখানে ঈশ্বর ছিলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বর্তমানে রাষ্ট্র সে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ সার্বভৌম ক্ষমতার বলে রাষ্ট্র তার নিজের জনগণের উপর ক্ষমতার চর্চার করে,আবার অন্য রাষ্ট্রর সার্বভৌমত্বও বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

    সেক্যুলার সমাজ ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় ভৌগলিকভাবে অপরের নির্মাণ করেছে। মধ্যযুগে আরব স্পেনকে ইউরোপের বাহিরে হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আধুনিক স্পেনকে ইউরোপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেহেতু এটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্র।৪ আধুনিক যুগে বসনিয়া এবং চেচনিয়া নামক দুটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা পশ্চিমা মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত। তারা আবার বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণহত্যার শিকার হয়েছেন। আজফার হোসেন তাঁর দর্শনাখ্যান বইতে গ্রিসকে প্রাচ্যের অংশ হিসেবে দাবি করেন। এটি পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের অংশ হিসেবেই তাদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

    সেক্যুলার সমাজ মিথকে বাতিল করতে চেয়েছিলো। বিপরীতে মিথকে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে যে জ্ঞান, বিশ্বাস ও চেতনার জন্ম দিয়েছে তালাল আসাদের মতে তাই হচ্ছে সেক্যুলার। সেক্যুলার যুগে মিথকে আধুনিক ফিকশনে টি এস ইলিয়ট, জেমস জয়েস, কোলরিজের মতো সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে পার্সি বিশি শেলি একজন নাস্তিক হয়েও গ্রীক মিথের উপর ভিত্তি করে নাটক লিখেছেন। আধুনিক যুগে সেক্যুলার মানসিকতার সাথে মিথ মিশে আছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক এডর্নো এবং হরখেইমার আধুনিকতার প্রকল্প হিসেবে এনলাইটেনমেন্টকে মিথ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

    ইউরোপীয় সমাজে সেক্যুলারিজম ধারণা বিকাশের পাশাপাশি এন্টি-সেমেটিজমের উপাদানসমূহকে লালন করে। যার ফলে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইহুদিদের উপর ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদিরা ইউরোপে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। এনলাইটেনমেন্টের বিকাশও তাদের সেই অবস্থান থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারেনি। বরং এনলাইটেনমেন্ট নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কিছু কল্পিত ধারণার নির্মাণ করে। এই নির্মাণই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপক গণহত্যা ঘটায়। এনলাইটেনমেন্ট তার যে যৌক্তিক বা সার্বভৌম চিন্তা চর্চা করত সেই যৌক্তিক চিন্তাই ইউরোপের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও এন্টি-সেমেটিজমের জন্ম দেয়। এনলাইটেনমেন্ট তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে চাপা দেওয়ার জন্যেই গণহত্যায় মেতে উঠে। হিটলারের জার্মানি ইহুদিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনে তার মধ্যে ছিলো,ইহুদিরা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্ররোচক। যারা একটি সমসত্ত্ব সমাজ ব্যবস্থায় চায়। এছাড়া হিটলার তাঁর বর্ণের ভিত্তিতে ইউরোপে আর্যদের অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান করতেন। ইহুদিদের তিনি ইউরোপীয়দের জন্য অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ মনে করতেন। এটি আত্নরক্ষার ধারণাকে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত করে।

    এডর্নো ও হরখেইমারের মতে ইউরোপীয় বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় এন্টি-সেমেটিজমির অর্থনৈতিক কারণ ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার উপর তাদের আধিপত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।৫ ধামাচাপা দেওয়ার স্বার্থেই তারা ইহুদিদেরকে নিজেদের প্রধান শক্র হিসেবে উপস্থাপন করে। ইহুদিদের ভাবা হতো পুঁজিবাদের বিকাশ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রগতির অন্তরায় হিসেবে।

    সেক্যুলার রাষ্ট্রে সহিষ্ণুতার তত্ত্বটির ভিত গড়ে উঠেছে পরস্পর বিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে। উদারবাদী এলিটরা ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংখ্যালগিষ্ঠদের উপর আধিপত্যের বৈধতা দেয়। সেক্যুলারিজমের প্যারাডক্স হচ্ছে এটি ব্যক্তির ধর্মীয় আচরণকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আসে, আবার রাষ্ট্র নিজেই সেই ব্যক্তিগত আচরণকে হস্তক্ষেপ করে। সুইজারল্যান্ডের কাছে হিজাব হচ্ছে বহিরাগত সংস্কৃতি ও লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতীক।৬ এ প্রতীকগুলোকে দমিয়ে রাখার জন্য ফ্রান্সে আইন করে পাবলিক স্কুলগুলোতে হিজাব বা অন্যান্য ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। সেক্যুলার সমাজে সংখ্যালঘুদের অবস্থান অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে বিবেচনা করা থেকেই তাদের উপর নির্যাতন বা প্রান্তিকীকরণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি কখনোই বহুত্ববাদী সমাজ তৈরিতে সহায়ক নয়। পশ্চিমা সেক্যুলার সমাজের নিকট একসময় ইহুদিদের হুমকিস্বরূপ মনে করা হতো, যার ফলে এন্টি সেমেটিজমের বিকাশ ঘটে। এখন ইহুদিদের ইউরোপীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের তাদের সাংস্কৃতিক হুমকিস্বরূপ মনে করা হয়।

    ইসলামি ধর্মতত্ত্বের মধ্যে মৌলবাদের বীজ নিহিত এ মতটিই বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত। পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীনতা ব্যবসার নামে এ মতটি ভালোভাবেই প্রচার করেছে। তালাল আসাদের মতে খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে যেমন গণতন্ত্র, উদারতাবাদ ইত্যাদি ধারণা বিকাশ ঘটেছে ইসলাম বা  অ-ইউরোপীয় অন্যান্য ধর্মতত্ত্বেও এসব উপাদান রয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ বা নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শিক আধিপত্যের কারণে তার বিস্তার ঘটেনি।৭

    কোন রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী যখন মানসিক, সাংস্কৃতিক বা আর্থ-রাজনৈতিকভাবে পরাধীন তখন সেসব লোকদের আত্মগ্লানি কাজ করে। তারা তখন তাদের অতীতে ফিরে যেতে যায়। অতীতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদের সৃষ্টি হয়। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী,ইজরাইলি জায়নবাদী,বিন লাদেন বা ওমর আল-বাগদাদীর উদ্দেশ্য ও একইরকম ছিল। লাদেনের উগ্রতার বিকাশ ঘটে সৌদি আরবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকায়নের প্রেক্ষিতে। বাগগাদী প্রেরণা ছিলো নিজেকে মাসিহা হিসেবে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থাপন করা এবং দুনিয়ার অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া। এজন্য তিনি সিরিয়া এবং ইরাকের কিছু অংশ দখল করে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করলেন। একইসাথে ধর্মকে ব্যবহার করে সহিংসতার জন্ম দেন। তারা যে সত্তাকে নির্মাণ করে সেটি আত্মকেন্দ্রিক। এর বাইরে যারা আছে সবাইকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অধীনতার গ্লানি ও সার্বভৌম ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি তার নির্মিত ‘অপরের’বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে সহিংসতা ঘটায়। অন্যদিকে সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় সহিংসতার রুখতে ধর্মকেই ব্যবহার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেকে মনে করতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ঈশ্বরের নির্দেশেই তিনি আফগানিস্তান এবং ইরাকে হামলা চালান।৮

    অলিভার রয় সেক্যুলারিজম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পশ্চিমা সেক্যুলারিজম নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদারপন্থী সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মকে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত ফ্রান্সে অভিবাসী মুসলমান সম্প্রদায়ের সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রান্তিকীকরণ করা হচ্ছে। অলিভার রয়ের মতে যখন কোন সম্প্রদায়কে তাঁর ধর্ম এবং সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং তার মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে তখনই উগ্রবাদের জন্ম দেয়।৯ সেক্যুলার সমাজের সম্যাটি হচ্ছে এটি নিরপেক্ষতার কথা বলে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করে। একটি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে নিরপেক্ষতার মাত্রায় ফেলে এমনভাবে নির্মাণ করে যেন অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটিকে সচেতন বা অবচেতনভাবে গ্রহণ করে। এর ফলে ধর্মীয় চর্চার সমতা বা স্বাধীনতা সার্বজনীনভাবে কাজ করতে পারেনা।২

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রিসারেকশন অব ক্রাইস্ট
    শিল্পী: জিওভান্নি এন্টনিও
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    পাশ্চাত্য সমাজে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তারা তাদের ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার চালায়। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনামলে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের পর উইলিয়াম কেরি এবং টমাস নামে দুজন ব্যক্তি ধর্মপ্রচারের জন্য কলকাতায় আসেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বিরোধের ফলে তারা ১৮০০ সালে কলকাতা থেকে অদূরে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা। ভারতবর্ষে বা আফ্রিকার উপনিবেশিত দেশগুলোর প্রতিটি অঞ্চলের ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করা হয়। ভারতবর্ষে শ্রীরামপুর মিশন থেকে উইলিয়াম কেরি,জন মার্শম্যান এদের নেতৃত্বে বাইবেল বাংলাসহ বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৮০৯ সালে শ্রীরামপুর মিশনের নেতৃত্বে সমগ্র বাইবেল ‘ধর্মপুস্তক’ নামে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়।

    ১৯৩০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের ব্যাপক জনসংখ্যার দুই শতাংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এসব ধর্মপ্রচারকরা ভারতীয় সমাজে ‘পশ্চিমায়ন’ ও ‘আধুনিকায়নে’ ভূমিকা রাখেন। প্রাচ্যতাত্ত্বিকরা ভারতবর্ষের হিন্দুদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন। হেগেল মনে করতেন হিন্দুদের কোন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই,এবং তাঁদের ইতিহাস রচনার সামর্থ্য নেই। এক্ষেত্রে তাদের নিয়তি হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনকে মেনে নেওয়া।১০
    উপনিবেশিত কলকাতায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রাহ্মধর্মের প্রসার ঘটে। এ ধর্ম ছিল ভারতীয় ধর্মের সাথে খ্রিস্টান ধর্মের একপ্রকার সেতুবন্ধন।

    তখনকার সময়ে বাঙালি রেনেসাঁসের বিকাশ যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তা হচ্ছে সতীদাহ প্রথা নিবারণ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলন। রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন এসব সংস্কারের জন্য তর্ক বির্তকে লিপ্ত হন, তখন তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যের ভিতর থেকেই এ কাজটি করেন। এ সংস্কারের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য তারা ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকেই যুক্তি প্রদর্শন করেন। সতীদাহ নিয়ে কাজ করা লতা মনি তাঁর Contentious traditions বইতে দেখান যে সতীদাহ প্রথাটি যে হিন্দুদের ধর্মীয় প্রথা এটি ব্রিটিশ শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এ প্রথাটির সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের স্বার্থ জড়িত ছিল।

    স্বপন বসু তাঁর ‘বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস’ বইতে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। কোন স্বামী মারা গেলে তার সাথে তার স্ত্রীকে যখন দাহ করা হতো তখন ধনীদের পরিবার থেকে দুইশত টাকা পর্যন্ত বখশিশ পাওয়া যেত। এই অর্থের লোভে ব্রাহ্মণরা মেয়েদেরকে সতী হতে উৎসাহ দিত। আর সতীদাহপ্রথা ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকার তুলনায় কলকাতায় বেশি প্রচলিত ছিলো। ব্রিটিশ শাসকরা যেহেতু ভারতবর্ষ সম্পর্কে পূর্বানুমান ছিলো যে তারা ধর্মান্ধ, তাই তারা এটিকে প্রথম দিকে ধর্মীয় প্রথা হিসেবে মেনে নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের নারীমুক্তির চেয়ে স্থানীয় হিন্দুদের বিরাগভাজন হওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিলো। এর সাথে তাদের ভারতবর্ষকে পাকাপোক্তভাবে শাসন করার বিষয়টি জড়িত ছিলো। এজন্য তারা ধর্মগুরুদের কাছ থেকে সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে মতামত নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে সতী বা নারীর বিষয়টি গুরুত্ব ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসনের বৈধতার জন্য সভ্যকরণ,মানবমুক্তি বিষয়টি উপস্থাপন করে, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এটি আধুনিকতা নামক ডিসকোর্সের সাথে সম্পর্কিত নয়।

    উপনিবেশ স্থাপনের পরবর্তীতে ভারতবর্ষ শাসনের সুবিধার্তে ব্রিটিশরা বিভিন্ন আইন চালু করে। ভারববর্ষে ধর্মীয় আইনের বিধিবদ্ধকরণের কাজটি ব্রিটিশরাই প্রথমে করে। ১৭৭২ সালে হেস্টিংসের নেতৃত্বে কোরআন থেকে মোহামেডান আইন এবং ব্রাহ্মণ শাস্ত্র থেকে হিন্দু আইনের বিধিবদ্ধকরণ করা হয়।১১ ব্রিটিশ শাসকরা তাদের পূর্বানুমান থেকে এই কাজটি করে। তাদের ধারণা ছিলো ভারতবর্ষের লোকেরা অন্ধবিশ্বাসী,তাদের কাজকর্ম,চিন্তাভাবনা শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্রিটিশদের নিকট ধর্ম বলতেই ছিলো ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এন্ডারসনের মতে মুঘল শাসনামলে বিচারব্যবস্থা ও আইনের ক্ষেত্রে কাজীর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা ছিলো। কাজী তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় কার্যক্রম চালিয়ে যেতেন।১২

    ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্বে মুসলমানদের জন্য ছিল মাদ্রাসা এবং হিন্দুদের জন্য ছিল টোল ও পাঠশালাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব ধর্ম এবং সেক্যুলার উভয় বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিলো। মাদ্রাসায় যেসব প্রধান বিষয় পড়াশোনার অন্তর্ভুক্ত ছিলো এগুলো হলো ১.ব্যাকরণ ২. সাহিত্য, ৩. যুক্তিবিদ্যা, ৪.ইসলামিক আইন এবং এর মূলনীতিসমূহ ৫. কোরআনের ব্যাখ্যা ৬. হাদিস ৭. অতীন্দ্রিয়বাদ, ৮. স্কলাস্টিসিজম (ধর্মীয় দর্শন) ইত্যাদি । হিন্দুদের টোলে ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আর পাঠশালাতে ছিলো সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। পাঠশালাতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ছিলো ভাষা, মৌলিক গণিত, কৃষি ও নৌকা নির্মাণ দক্ষতা ইত্যাদি। মোঘল শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্রাট শাহজাহান তাঁর শাসনামলে দিল্লিতে ইম্পেরিয়াল কলেজ স্থাপন করেন।১৩ কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে এসে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার স্থলে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে তা একদম স্থবির হয়ে যায়নি।

    ঔপনিবেশিক শাসনামলের শুরুতে ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেনি। এসময় খ্রিস্টান মিশনারীরা বিভিন্ন মিশনারি বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতেন। ১৮১৩ সাল চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে শাসকদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দুটিভাগে করেন। সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার ফলে মাদ্রাসা এবং টোল ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রান্তিকীকরণ ঘটে। অন্যদিকে মিশনারি বিদ্যালয়গুলো তখনও ব্রিটিশদের নিকট থেকে অনুদান পেত।১৪

    বাংলায় যখন উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন বাংলার মুসলমানরা বিভিন্ন কারণে এ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। মুসলমানদের প্রশাসনিক কাজের সংযুক্তের জন্য ব্রিটিশরা সরকার নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৮০ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে তখন সেখানে কোন বাঙ্গালী মুসলমান শিক্ষক ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন বাংলার বাইরে থেকে আসা উর্দুভাষী।১৫

    ব্রিটিশরা মুসলমানদের নিকট থেকে ভারতবর্ষে ক্ষমতা দখলের পর তাদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি চালু করে। মুসলমানদের নিকট থেকে ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকে তারা একটি সাম্প্রদায়িক মাত্রায় রূপ দেয়। দার্শনিক জেমস মিল তাঁর ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকতার সূচনা করেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাসকে তিনটি যুগ বা সভ্যতায় ভাগ করেন। এ তিনটি যুগ হচ্ছে যথাক্রমে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ যুগ৷ মিলের এ লেখাটি তৎকালীন সময়ে অসাধারণ স্বীকৃতি লাভ করে ও প্রভাব বিস্তার করে৷ মিলে পরবর্তী অনেক ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে ইতিহাস রচনায় তার যুগ বিভাজন দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হন।

    ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে অধ্যায়কে মিল হিন্দু যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে তখন উপমহাদেশের সব শাসক-বংশগুলি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলো এমন নয়। রাজবংশের হিন্দু ধর্মের প্রাধান্যের ভিত্তিতে এ যুগকে হিন্দুযুগ মনে করা ভ্রান্ত,কারণ মৌর্য,ইন্দো-গ্রীক,শক,কুষাণ প্রভৃতি বহু প্রধান রাজবংশই অহিন্দু ছিলো। অনেক প্রভাবশালী বৌদ্ধ রাজারাও তখন শাসন করেন। লানন্দা, তক্ষশীলার মত বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বৌদ্ধ শাসনামলে সর্বাধিক প্রচার ঘটে। মিল তার যুগ বিভাজনের দ্বিতীয় পর্বে আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই একসঙ্গে “মুসলমান” বলে অভিহিত করেন। মিল পূর্ব ঐতিহাসিকরা এদের ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতেন। এককভাবে মুসলমান শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে এদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হয় যা তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলে। তুর্কী, পার্সী এবং আরবরা ধর্মের দিক থেকে এক হলেও রাজনৈতিক ও জাতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে তৎকালীন সময় তারা ছিল ভিন্ন। এ ভিন্ন ভিন্ন জাতি দ্বারা ভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান হয়।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    মিল তার তৃতীয় যুগবিভাজনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভিত্তিক যুগবিভাজন থেকে সরে আসেন। তিনি একে খ্রিস্টান যুগ না বলে ব্রিটিশ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যেন এযুগের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ সুশৃঙ্খল,সভ্য,ধর্মনিরপেক্ষ যুগে প্রবেশ করে। এ তিনটি যুগের দ্বারা মিল বুঝিয়েছেন প্রথম যুগ ছিলো হিন্দুদের জন্য গৌরবময় যুগ,দ্বিতীয় যুগ ছিল ‘মুসলিম স্বৈরশাসনের’, তৃতীয় যুগ হচ্ছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার যুগ। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধুনিকায়নের পাশাপাশি মুসলমানদের অপর হিসেবে নির্মাণের কাজটিও একসাথে চলে। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতবর্ষের ধর্ম ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিলো। এটি শুধু হিন্দু মুসলিম বাইনারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুসলমান ধর্মের মধ্যে তখন বিভিন্ন বৈচিত্র্য ধারা (শিয়া, সুন্নি, হমেদিয়া)ছিলো। হিন্দুদের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ এবং এ বর্ণের বাইরেরও ছিলো প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠী। বৌদ্ধ, জৈনসহ ভারতবর্ষে তখন বহুবিধ ধর্ম ও বর্ণের লোক বাস করত। ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষে মধ্যযুগ সম্পর্কে যে ইতিহাস নির্মাণ করে রোমেলা থাপার একে মিথ বলে অভিহিত করেন।১৬ আরসি মজুমদার থেকে যদুনাথ সরকার পর্যন্ত সকলেই এই মিথকে অনুসরণ করেছেন।

    ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে যে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের নির্মাণ করে সে নির্মাণের ভিত্তিতেই ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্য হারায়। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে তখন দুটি সম্প্রদায় জন্য দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।

    ব্রিটিশ ভারতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে গুরুতর ছিলো সেটি হচ্ছে হরিজন বা দলিত সমস্যা৷ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতারা এবং শাসক গোষ্ঠীরা নিজেদের স্বার্থে সম্যাটিকে ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করেছেন। যার ফলে এ সমস্যাটি এখনও ভারতে রয়ে গেছে। তাদেরকে এমনভাবে বিমানবীকরণ করা হয় যে তাঁরা ভারতবর্ষকে নিজেদের জন্মভূমি হিসেবে মনে করতেন না। ১৯৩১ সালে আম্বেদকরের সাথে মহাত্মা গান্ধীর যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি বলেছিলেন ‘গান্ধীজি, আমার কোন মাতৃভূমি নেই। আপনি এমন কোন অস্পৃশ্যকে পাবেন না যে এই ভূখণ্ডের জন্য কোনরকম গর্ববোধ করে।’১৭ ১৯১৯ সালে আম্বেদকর ব্রিটিশদের নিকট দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি দলিত সম্প্রদায়কে পৃথক সামাজিক বর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্রিটিশ শাসকরা কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে এ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যায়।

    ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের ডাকা লন্ডন সম্মেলনে আম্বেদকর অংশগ্রহণ করেন। তিনি দলিতদের প্রধান হিসেবে এ সম্মেলন কমিটির নিকট তাঁর প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিলো দলিতদের অন্যায়ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তাদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ব্রিটিশরা তাঁর এ দাবি মেনে নেয়। কিন্তু গান্ধী নিজেকে অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবী করেন এবং এর বিরোধিতা করেন। গান্ধীর আমরণ অনশনের প্রতিজ্ঞা ও জাতিয়তাবাদী নেতাদের চাপের ফলে আম্বেদকর তাঁর দাবী প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। দলিতদের সমস্যাকে প্রান্তে রেখে ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করল। কিন্তু আম্বেদকর বা যোগেন মন্ডলের মতো দলিতদের প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ হলো না। হতাশার একপর্যায়ে স্বাধীন ভারতে আম্বেদকর তার অনুসারীদের নিয়ে স্বধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষও পরবর্তী সময় সেক্যুলার ভারতে সংখ্যালঘু প্রশ্নে দলিত সমস্যার মীমাংসা না করে বরং এটিকে আরো সমস্যা সংকুল করা হয়েছে।৩

    বাঙালিরা একসময় ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছে আবার বাঙালি জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করেছে। এ দুটি রাষ্ট্র গঠনের মূলে যে প্রেরণাটি কাজ করে তা হল, দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যবোধ। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরির পিছনে যে কারণটির কথা বলতেন সেটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের উপস্থাপনের বিষয়টির কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে তখন মুসলমান চরিত্র অর্থাৎ মুসলমানদের উপস্থানের অবস্থান ছিলো সীমিত। তাদের প্রান্তিকীকরণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। এ সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ যোগেল মন্ডলের মতো দলিতদেরও ছিলো। তাই তিনি দলিতদের নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে এ বৈষম্যব্যবস্থা আরো জেঁকে বসে। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের তুলনায় তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন অধ্যাপক রেহমান সোবহান,অধ্যাপক আনিসুল হক,অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকরা দুই অর্থনীতি তত্ত্বকে তোলে ধরেন। যার উপর ভিত্তি করে ছয় দফা দাবি পেশ করেন।

    পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আন্দোলনের সাথে বৈষম্যের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ বৈষম্যের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না করে অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ আন্দোলনকে প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করেন৷ তাদের বক্তব্য হচ্ছে মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্য বাঙালি নামক জাতি প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে প্রগতিশীল হয়ে উঠে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলে। শোষণ,বৈষম্যবোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়টি আড়াল রেখে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিশীলতার বাইনারি হাজির করার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সে প্রক্রিয়া বহাল রাখা।

    আর্টোয়ার্ক: স্বাধীনতা তুমি
    সূত্র: অন্য আলো

    ১৯৭১ হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর সেই রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এ রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়বিচারের অভাব। দীপন হত্যার পর তার পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি। কারণ তিনি নিশ্চিত আমাদের রা্ষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই। আরেকটি কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের জনগণ ফলস কনসাসনেসের মধ্যে বাস করছে। অপরের মুক্তির মধ্যেই যে তার নিজের মুক্তির এটি সে কল্পনাই করতে পারে না। যার ফলে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় সহিংসতার জন্ম দেয়।

    প্রাচ্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ সবসময়ই তার সমাজ কাঠামোর উপর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ধর্ম অথবা সেক্যুলারিজম দু’টির একটিকেই চূড়ান্ত ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ধর্ম এবং সেক্যুলারিজমের মধ্যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান নির্মাণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে এধরনের কৌশল স্পষ্টভাবে কাজ করে। আমাদের দেশে ‘আস্তিক’ ‘নাস্তিক’ ‘প্রগতিশীল’ ‘প্রক্রিয়াশীল’ ‘হেফাজতি’ ‘শাহবাগী’ এরকম বর্গ রয়েছে। এ বর্গকরণের মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। তারা এসব দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কৌশলে নিজেদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

    আমাদের দেশে প্রগতিশীল চিন্তকরা প্রগতিশীলতা চর্চার বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতা নামক ডিসকোর্সটি তৈরি করেছেন তা অত্যন্ত কৌশলী। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামক ডিসকোর্সটি মূলত ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড থেকে পাওয়া। আমাদের দেশে সম্প্রদায়িকতা শব্দটি দ্বারা শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিম বিদ্বেষকেই বোঝায়। আমাদের দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এটিকে শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। এর ফলে আমাদের দেশের আদিবাসীদের সমস্যা ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করা হয়;বিশেষত আদিবাসীদের ভাষা এবং জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা দিকটি।

    বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, যাদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের অধিকাংশই সমাজে বিশেষ সুযোগ গ্রহণকারী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন শ্রেণির লোকেদেকে তাদের সৃজনীশলতা বা জ্ঞানচর্চা দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে থাকে। বিভিন্ন ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলেও রাজনৈতিকীকরণের স্বার্থে তারা তাকে চেপে রাখেন। প্রগতিশীলতা চর্চার বিষয়টি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আধিপত্য বিস্তারের কৌশলে। রাষ্ট্র তার জনগণের উপর ক্ষমতা চর্চার সম্মতি উৎপাদানের কাজটিই তারা বিশেষভাবে করে থাকেন। এখানকার প্রগতিশীলরা চিন্তকরা সমাজ বিকাশের খাতিরে পশ্চিমা আলোকায়িত জ্ঞানের চর্বিতচর্বন দ্বারা আমাদেরকে আলোকিত করতে চান। কিন্তু একটি সমাজ প্রগতির জন্য শুধু ধার করা জ্ঞান দিয়ে চলে না। সমাজের ভিতর থেকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয়। যে সমাজ সৃষ্টিহীন সে সমাজ বন্ধ্যা এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়।

    এদেশে হিন্দু মুসলমানরা নৃ-তাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হলে আদিবাসীরা তা নয়। তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন। এ অর্থে তারাই প্রকৃত সংখ্যালঘু। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমরা হচ্ছি বাঙালি জাতি। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতরে অন্যান্য জাতিও রয়েছে। ধর্মীয় রাষ্ট্র যদি সাম্প্রদায়িক হয় তাহলে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র কতটুকু অসাম্প্রদায়িক তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

    বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি হয়ে যায়। তখন থেকেই সমস্যার সূচনা। মানবেন্দ্র লারমা সংবিধান প্রণয়নের সময় তীব্রভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন। ১৯৭২ সালের ২৫ ও ৩১ অক্টোবর গণপরিষদের খসড়া সংবিধানের উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে তর্ক বিতর্কের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত দেওয়া হলো-

    মানবেন্দ্র লারমা: আমরা করুণার পাত্র হিসেবে আসিনি। আমরা এসেছি মানুষ হিসেবে। তাই মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।
    মিসেস সাজেদা চৌধুরী: বৈধতার প্রশ্ন, জনাব স্পিকার, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলতে চেয়েছেন যে এই সংবিধানে তাঁদের উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমি বলব, তাঁরাও আজকে স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে তাঁদেরও একটা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
    একটি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেয়ে একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিক মর্যাদাজনক নয়?

    মানবেন্দ্র লারমা: আমি একজন মানুষ, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছি, যে জন্মভূমিতে আজন্ম লালিত-পালিত হয়েছি, সেই জন্মভূমির জন্য আমার যে কথা বলার রয়েছে, সে কথা যদি প্রকাশ করতে না পারি, যদি এই সংবিধানে তার কোনো ব্যবস্থাই দেখতে না পাই, তাহলে আমাকে বলতে হবে যে বঞ্চিত মানুষের জন্য সংবিধানে কিছুই রাখা হয়নি।

    আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া: মাননীয় স্পিকার, আমি প্রস্তাব করছি যে সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক।
    ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’

    মানবেন্দ্র লারমা: আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা চৌদ্দ পুরুষ—কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি। আমি জানি না, এই সংবিধানে আমাদের কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়।

    স্পিকার: আপনি কি বাঙালি হতে চান না?

    মানবেন্দ্র লারমা: মাননীয় স্পিকার, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় না। আমরা কোনো দিনই নিজেদের বাঙালি মনে করি না। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।

    আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সদস্য আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তির প্রতি, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবৈধ ভাষায় বক্তৃতা করেন।… ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বদলে যে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তারই প্রতি ষড়যন্ত্রমূলক এ বক্তব্য।”১৮

    পাকিস্তান শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা বাঙ্গালীদের উপর সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদি বিষয় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো। বাঙ্গালী জাতি তার জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য তা মেনে নেয়নি। তাঁরা নিজেদের বাঙ্গালী পরিচয়কে রক্ষার খাতিরেই দেশকে স্বাধীন করে।সেই বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার করে অন্যের উপর তা চাপিয়ে দেওয়ায় বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা বিরোধী।

    অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন ‘পাহাড়িরা তাদের দাবীগুলোকে গৃহীত ও বাঙলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ক’রে নিতে চান,যা সংবিধানের মূল চেতনার বিরোধী।’১৯ অধ্যাপক আজাদ হয়ত এ বিষয়টি লক্ষ করেননি যে স্বয়ং বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার উপর গুরুত্বারোপ দেওয়া হয়নি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রে সংবিধানে প্রণয়নে গণপরিষদকে কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। বাংলাদেশের গণপরিষদ একত্রে নিষ্ক্রিয় ছিল,তাঁর হাতে কোন নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। নির্বাহী ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রেপতি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিকট। গণপরিষদ তার কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। এজন্য দেখা যায় গণপরিষদে সংবিধান বিল আকারে উত্তাপিত হওয়ার পর যেসব সংশোধনী প্রস্তাব আছে তার অধিকাংশই বাতিল হয়ে যায়। আর এই বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা বিরোধী।

    আর্টওয়ার্ক: ইনডিজিনার পিপল

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত আদিবাসীদের উপর কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে কিভাবে আদিবাসীদের উপর বৈষম্যমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদেরকে বিমানবিকীকরণ করা হয়। আদিবাসীদের ক্রমাগতভাবে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। গারো, হাজং, ওরাও, রাখাইন, খাসিয়া ও সাঁওতালদের মধ্যে গড়ে ৬৮.৮ ভাগ লোকের নিজস্ব জমি নেই।২০

    অধ্যাপক আবুল বারাকাতের ভাষায় ‘আদিবাসী মানুষের ভূমির অধিকার স্বীকৃত নয় অথবা যতটুকু আছে তাও সহজে হরণযোগ্য।…. সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ এখন ভূমিহীন।….পঞ্চাশ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষের আনুপাতিক হার ছিলো ৭৫ শতাংশ,আর এখন তা ৪৭ শতাংশ’।২১ আদিবাসীদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যা নিয়ে ভাবতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, সমাধান আরো বহুদূরের বিষয়।

    বাংলাদেশে আদিবাসীদের উপর বিভিন্ন সময় যে শারিরীক বা সাংস্কৃতিক সহিংসতা ঘটানো হয় এসব বিষয়কে মুছে ফেলার জন্য তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

    আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্যে তাদের সমস্যা খুব একটা ফুটে উঠে না। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ‘The Ugly Asian’ উপন্যাসে যেভাবে আদিবাসীদের জীবনের রাজনৈতিক জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন আমাদের দেশে তা খুবই বিরল। আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত ফরাসি উপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামু তাঁর সাহিত্যিক নীরবতার জন্য বিশেষভাবে সমালোচিত। তাঁর উপন্যাসের অধিকাংশ ঘটনা ঘটে আলেজেরিয়াকে কেন্দ্র করে। আর আলজেরিয়া তখন ফ্রান্সের উপনিবেশ। কিন্তু তাঁর গল্পে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলিত স্থানীয়দের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা অনুপস্থিত। অথচ ক্যামু একই সময়ে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা,লেখক ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরব। ক্যামুর লেখায় স্থানীয়দের সমস্যার বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। আমাদের দেশে শিল্প, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও আদিবাসীদের উপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একই কাজ করে থাকেন।

    সত্যিকার অর্থকে বাংলাদেশেকে অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বাইনারি ডিসকোর্স থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সহনশীলতার ভিত্তিতে একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলতে। যে সমাজে মুক্তি ঘটবে আপামর জনসাধারণের ।

    তথ্যসূত্র
    ১)Talal Asad, Formation of The Secularism: Christianity Islam Modernity, California 2003, page 23
    ২) Saba Mahmood,Religious Difference in a Secular Age: A Minority Report,Princeton University Press, page 8
    ৩)Carl Schmitt, Political Theology, Four Chapter on The Sovereignty, Chicago 2005, page 36
    ৪)Talal Asad, Ibd, page 168
    ৫) Max Horkheimer and Theodor W. Adorno,Dialectic of Enlightenment,Philosophical Fragment, California, 2002 page 142
    ৬)Saba Mahmood, Ibd, page 170
    ৭)Talal Asad, Modern power and the reconfiguration of religious tradition interview with Saba Mahmood (1996)
    ৮) Ewen MacAskill,
    George Bush: ‘God told me to end the tyranny in Iraq,The gurdian
    ৯)Olivier Roy, Secularism Confronts Islam,Colombia University Press, 2007
    page 74-75
    ১০)Theshale Tibebu,Hegel and the Third World : The Making of Eurocentrism in World History, Syracuse University Press page 256-57
    ১১)Michael R Anderson,Islamic Law and the Colonial Encounter in British India WLUML occasional paper no.7 – June 1996 page 5
    ১২) Ibd page 11
    ১৩)আলী রিয়াজ, দক্ষিণ এশিয়ায় মাদ্রাসাশিক্ষা: প্রাক-ঔপনিবেশিক এবং ঔপনিবেশিক আমল,প্রতিচিন্তা, প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৭(ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)
    ১৪)প্রাগুক্ত
    ১৫)আহমদ শরীফ,বাঙলা বাঙালী ও বাঙালীত্ব,১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৭৪
    ১৬)Romila Thapar,What Secularism is and Where It Needs to Be Headed,The Wire,
    Oct 18, 2015
    ১৭) Arundhati Roy,The Doctor and the Saint,2014 page 43
    ১৮)মহিউদ্দিন আহমদ, বাঙালি-আদিবাসী জাতীয়তাবাদ বিতর্ক,প্রথম আলো, ১৯-০৮-২০১১
    ১৯) উদ্ধৃতিটি হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা’ বইয়ের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।
    ২০) Abul Barakat, Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh, page 27
    https://bea-bd.org › site › pdfPDF
    Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh/Abul Barkat
    ২১)আবুল বারাকাত, বাংলাদেশ কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭।

  • এমা গোল্ডম্যান।। বিয়ে

    এমা গোল্ডম্যান।। বিয়ে

    • অনুবাদ: ফাতিন ইশরাক

    বিবাহ। কত দুঃখ, দুর্দশা, অপমান; কত অশ্রু এবং অভিশাপ; কত যন্ত্রণা ও কষ্ট; এই শব্দটি মনুষ্য জাতিতে নিয়ে এসেছে। এর জন্ম থেকেই, আজ অবধি, আমাদের বিবাহ প্রতিষ্ঠানের লোহার জোয়ালের নিচে বেড়ে উঠেছে পুরুষ এবং নারী, এবং এ থেকে বেরোনোর ​​কোনও উপায় নেই বলে মনে হয়। সর্বকাল এবং সর্ব যুগে নিরুদ্ধ গোষ্ঠী মানসিক ও শারীরিক দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার চেষ্টা করেছে। ঐসব সাহসী বীরদের চিন্তাচেতনা গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজারো মূল্যবান জীবনের আত্মত্যাগ এবং ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর মাধ্যমে এবং বাকিরা মৃত্যুবরণ করেছে কারাগারে অথবা আইনের নির্দয় হাতে। এভাবে ধর্মীয় দাসত্ব, সামন্তবাদ এবং কৃষ্ণাঙ্গ দাসত্ব বিলোপ হয়েছে, এবং নতুন মতাদর্শ, আরও প্রগতিশীল, বিস্তৃত এবং স্পষ্টতর, সামনে এসেছে, এবং আবারও আমরা দেখি নিষ্পিষ্ট মানবতা তার অধিকার এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মৌলিক, সর্বাপেক্ষা স্বৈরাচারী প্রতিষ্ঠান- বিবাহ, চিরকালের মতই দৃঢ় এবং বিপদ নিয়ে আসে তাদের ওপর, যারা এর পবিত্রতা সন্দেহ করার ও স্পর্ধা করে। এমন কি আছে যা এদেরকে বিবাহ রক্ষা করতে প্রভাবিত করে? এমন কি আছে যা এদেরকে এই কুসংস্কার আঁকড়ে ধরায়? (এটা কুসংস্কার বৈকি কিছুই নয়) এর কারণ, বৈবাহিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তি, তথা, আমাদের নিষ্ঠুর এবং অমানবিক সিস্টেমের ভিত্তি। একদিকে সম্পত্তি এবং উদ্বৃত্ত, অপর দিকে অপরাধ; এজন্য বিবাহ প্রথার বিলোপ এর অর্থ উল্লেখ্য সবকিছুর বিলোপ।

    এমা গোল্ডম্যান
    (১৮৬৯-১৯৪০)
    আর্টওয়ার্ক: এলিয়া-ইলাস্ট্রেশন
    সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট

    কিছু প্রগতিশীল মানুষ আমাদের বিবাহ সংক্রান্ত আইন গুলো উন্নত করার চেষ্টা করছে। তারা চার্চকে আর বৈবাহিক সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করতে দেয় না; অনেকে আরও অগ্রসর হয়, তারা মুক্ত বিবাহ করে, যেটা আইনের সম্মতি ব্যতিরেকে হয়; কিন্তু, তবুও বিবাহের ধারণা আত্মসমর্পণমূলক, ঠিক যেমনটা “পবিত্র”, আদি ধারণা হিসেবে, কারণ এটা আমাদের মধ্যে প্রচলিত বৈবাহিক সম্পর্কের মত নয়; কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, প্রথাটি আপত্তিকর, ক্ষতিকর এবং অবমাননাকর। এটা সর্বদা পুরুষকে তার স্ত্রীর ওপর অধিকার এবং ক্ষমতা দেয়, শুধুমাত্র তার শরীরের ওপর না, বরং তার কর্ম, তার ইচ্ছা; এমনকি তার সমগ্র জীবনের ওপর। এবং এছাড়া আর কিভাবে হতে পারে? স্বতন্ত্র পুরুষ এবং নারীর যেকোনো সম্পর্কের পেছনে কাজ করে সাধারণত ঐতিহাসিক ভাবে বিবর্তিত হয়ে আসা দুই লিঙ্গের মধ্যকার সম্পর্কের, যা বর্তমানে তাদের অবস্থান এবং সুযোগ সুবিধার মধ্যকার ফারাক তৈরি করেছে। দুইজন অল্পবয়সী মানুষ একত্রে আসে, কিন্তু তাদের সম্পর্ক বৃহত্তরভাবে এমনসব কারণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যার ওপর তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা নিজেদের সম্পর্কে অল্প জানে, সমাজ এই লিঙ্গদ্বয়কে আলাদা রেখেছে, ছেলে এবং মেয়ে বড় হয়েছে ভিন্ন পন্থায়। অলিভ স্ক্রাইনার তার আফ্রিকান ফার্মের গল্পে যেমনটা বলেছেন, “ ছেলেকে ছেলে হতে শেখানো হয়েছে, মেয়েকে মেয়ে মনে হতে।’’ ঠিক তেমনটাই, ছেলেকে শেখানো হয়েছে বুদ্ধিমান, উজ্জ্বল, চালাক, শক্তিশালী, পালোয়ান, স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল হতে; স্বীয় প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত দক্ষতা উন্নত করতে, স্বীয় আবেগ এবং ইচ্ছার অনুসরণ করতে। মেয়েকে শেখানো হয়েছে পোশাক পরতে, আয়নার সামনে দাড়িয়ে আত্মপ্রশংসা করতে, স্বীয় অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে, মানসিক ত্রুটি লুকাতে এবং স্বীয় ক্ষুদ্র বুদ্ধিমত্তা এবং যোগ্যতার সাথে সমন্বয় করতে একদিকে, এবং তাই হল স্বামী আকৃষ্ট করার, লাভজনকভাবে বিয়ে করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায়। এবং এজন্যই দুই লিঙ্গ একে অপরের প্রকৃতি বুঝে না, তাদের মানসিক চাহিদা এবং বৃত্তির ফারাক বুঝে না। জনমত তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব, তাদের সম্মান এবং অসম্মান খুব কঠোরভাবে একে অপর থেকে পৃথক করে। যৌন বিষয় নারীর কাছে নিষিদ্ধ, কারণ তাকে বোঝানো হয় যে, যৌন বিষয়ে প্রশ্ন করাও অপবিত্র, অনৈতিক এবং অশ্লীল। পুরুষের কাছে তা এমন এক বিষয়, যা অসুখ এবং কলঙ্ক নিয়ে আসবে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ধ্বংস এবং মৃত্যু। বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে প্রেমে পড়া হালের চল না। সমাজের পুরুষেরা বিবাহ করে লাম্পট্য এবং কামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করার পরে, তাদের নষ্ট গড়ন বিনির্মাণ করতে। বাকিরা জুয়া খেলা বা ফটকা ব্যবসায় নিজেদের পুঁজি হারিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তরাধিকারী একমাত্র বস্তু যা তাদের দরকার; তারা একথা ভালমতই জানে যে তাদের বিত্তশালী স্ত্রী দের উপার্জন আত্মসাৎ করতে তাদের বৈবাহিক বন্ধন কোন বাধার কারণ হবে না। যে বুর্জোয়া নারীকে শেখানো হয়েছে জীবনমুখী এবং বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হতে, এবং শেখানো হয়েছে বেঁচে থাকতে, শ্বাস নিতে, খেতে, হাসতে, হাঁটতে এবং পোশাক পরিধান করতে কেবলমাত্র হালের চল অনুযায়ী; সে তার প্রাচুর্যকে বিক্রি করে কোন পদবীর কাছে, বা সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন পুরুষের কাছে। তার একমাত্র সান্ত্বনা হল সমাজ বিবাহিত নারী কে অধিক স্বাধীনতা দেয় এবং বিবাহে অসন্তুষ্ট হলে তাকে অন্য উপায়ে তার ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। আমরা জানি যে নারীর খাসকামরা এবং বৈঠক খানার দেয়াল মূক এবং বধির, এবং এই দেয়ালের আড়ালে ক্ষুদ্র সুখানুভূতি কোন অপরাধ না।

    প্রলেতারিয়েত শ্রেণির নারী পুরুষে বিবাহ ভিন্ন জিনিস। উঁচু শ্রেণির মধ্যকার প্রেম অতটা বিরল না এবং বেশিরভাগ সময়েই উভয়কে সাহায্য করে জীবনের হতাশা এবং দুঃখ সহ্য করতে, কিন্তু এমনকি এখানেও বেশিরভাগ বিবাহ প্রত্যহ জীবনের একঘেয়েমি এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে স্বল্পকালীন সময়ে ভেঙে যায়। আবার, শ্রমিক শ্রেণির পুরুষ বিবাহ করে কারণ সে তার পেনসিত্তন জীবনে পরিশ্রান্ত এবং তার নিজের ঘর বানানোর মনবাসনা আছে, যেখানে সে স্বস্তি খুঁজে পাবে। তার মূল উদ্দেশ্য এমন নারী খোঁজা যে তার জন্য ভাল রাঁধুনি এবং গৃহিণী হবে; যাকে দিয়ে সে নিজের সুখ এবং কামের চাহিদা পূরণ করতে পারবে; যে তাকে নিজের ঈশ্বর, মালিক, রক্ষক এবং পৃষ্ঠ পোষক  প্রতিপন্ন করবে; একমাত্র উদ্দেশ্য যাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকা যায়। অন্য পুরুষ আশা করে সে যেই নারী কে বিয়ে করবে, সে কাজ করতে পারবে এবং বৃষ্টির দিনে কয়েক সেন্ট উপার্জনে সাহায্য করতে পারবে কিন্তু কয়েক মাসের তথাকথিত সুখের পরে সে তিক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, সে জানতে পারে তার স্ত্রী মা হতে চলেছে এবং সে কাজ করতে পারবে না; এতে করে বুঝতে পারে সেই নারী এবং তার “দয়ালু” মালিক মিলেমিশে যে ক্ষুদ্র উপার্জন করেছে এযাবতকালে , তা পরিবার চালাতে যথেষ্ট না।

    যেই মেয়ে তার শৈশব এবং যৌবনের একটা অংশ ফ্যাক্টরি তে কাটিয়েছে, সে অনুভব করে তার শক্তি কমে যাচ্ছে এবং সে নিজেকে আবিষ্কার করে এমন একটা ভয়ংকর অবস্থায়, যেখানে তার কর্মচারী হয়ে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে, কাজের ব্যাপারেও নিশ্চিত না এবং এজন্য সে বাধ্য হয় পুরুষ খুঁজতে, ভাল স্বামী খুঁজতে, যে তাকে সাহায্য করতে এবং তাকে ভাল বাসস্থান দিতে পারবে। নারী পুরুষ উভয়ই একই উদ্দেশ্যে বিয়ে করে, একমাত্র বিশেষত্ব হচ্ছে, পুরুষ তার স্বাতন্ত্র্য, তার নাম, তার স্বাধীনতা ত্যাগ করবে এটা আশা করা না হলেও নারীকে তার নিজকে বিক্রি করতে হয়, নিজের শরীর ও আত্মা বিক্রি করতে হয় কারও স্ত্রী হওয়ার সুখের জন্য; অতএব তারা সমান অবস্থানে থাকে না, এবং যেখানে সমতা নেই, সেখানে কোন ঐকতান থাকতে পারে না। ফলাফল হল প্রথম কয়েক মাসের পরে বা সমস্ত ভাতা আত্মসাৎ করার জন্য এক বছর পরেই উভয় এই সিদ্ধান্তে আসে যে বিবাহ ব্যর্থ হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রেসকিউ
    শিল্পী: পাবলো পিকাসো
    সূত্র: পিকাসো আর্ট

    যেহেতু তাদের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হতে থাকে, এবং সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে উক্ত নারী  নিরাশ, করুণ, অসন্তুষ্ট এবং দুর্বল হতে থাকে, তার সৌন্দর্য তাকে ছেড়ে যায়, এবং কঠোর পরিশ্রম, নির্ঘুম রাত, ছোটদের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা এবং স্বামীর সাথে মতানৈক্য এবং ঝগড়া বিবাদে, সে শারীরিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যায় এবং যেই মুহূর্ত তাকে এই গরিব পুরুষের স্ত্রী বানিয়েছে, সেই মুহূর্তকে অভিশাপ দিতে থাকে। এরকম বিষণ্ণ এবং করুণ জীবন নিশ্চিতভাবে একে অপরের প্রতি ভালবাসা বা সম্মান টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। উক্ত পুরুষ নিজের দুর্দশা বন্ধুদের সঙ্গে ভুলতে পারে অন্তত; সে নিজেকে রাজনীতি তে ব্যস্ত রাখতে পারে, বা সে তার দুর্ভাগ্য কে মদের গ্লাসে ডুবাতে পারে।  নারীটি তার গৃহস্থের হাজারো দায়িত্ব এর দ্বারা গৃহের শেকলে আবদ্ধ; সে পারে না তার স্বামী কে পছন্দ করতে, বিনোদন উপভোগ করতে কারণ হয় তার কোন পুঁজি নেই এর জন্য, নতুবা জনমত তাকে তার স্বামীর সমান অধিকার দেয় না। এই ক্রুশ তাকে বহন করতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত কারণ আমাদের বৈবাহিক আইনে কোন দয়া নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার বৈবাহিক জীবন মিসেস গ্রানডির সমালোচনা মুলক চোখ এর সামনে উলঙ্গ করতে চায়, এবং এমনকি তখনও সে শুধুমাত্র তখনই তার ঘৃণার পুরুষের সাথে শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে যদি সে সমস্ত দোষ নিজের কাঁধে নেয়, এবং যে পৃথিবী তার বাকি জীবন তাকে লাঞ্ছনা করবে, তার সামনে দাঁড়ানোর মত পর্যাপ্ত শক্তি যদি তার থাকে। এরূপ করার মত সাহস কয়জনের আছে? খুবই অল্প সংখ্যকের। এরকম বজ্রপাত কালে ভদ্রে দেখা যায়, যেমন, প্রিন্সেস ডি চিমেই এর স্পর্ধা ছিল প্রচলিত বাধা উপেক্ষা করার এবং হৃদয়ের ইচ্ছার অনুসরণ করার। কিন্তু এই ব্যতিক্রম হল পুঁজিপতি নারী, যে স্বনির্ভর। দরিদ্র নারীর তার সন্তানদের কথা চিন্তা করতে হয়; সে তার ধনী বোনের তুলনায় কম ভাগ্যবান, এবং তারপরও যে নারী দাসত্ব এর বন্ধনে থাকে, তাকে মর্যাদা সম্পন্ন বলা হয়ঃ যদিও বা তার সমগ্র জীবন বিভিন্ন মিথ্যা, প্রতারণা এবং বিশ্বাস ঘাতকতার লম্বা শিকল, সে তার বোন দের দিকে নিচু দৃষ্টি তে তাকায়, যারা সমাজের দ্বারা বাধ্য হয়ে নিজ মোহ এবং প্রণয় রাস্তায় বিক্রি করেছে। একজন বিবাহিত নারী যতই দরিদ্র, যতই করুণ হোক না কেন, সে অন্যদের থেকে নিজেকে উপরে ভাববে, যাদেরকে সে নিশিকন্যা ডাকে, যারা সকলের দ্বারা নির্বাসিত, ঘৃণিত এবং অপমানিত, এমনকি যারা তাদের পরিরম্ভ ক্রয় করতে দ্বিধা বোধ করে না, তারাও গরিব নরাধম কে প্রয়োজনীয় মন্দ হিসেবে দেখে, এবং তথাকথিত ভাল মানুষেরা পরামর্শ দেয় এই কু নারী দের নিউ ইয়র্কের একটা ডিসট্রিক্টে নির্বাসিত করতে, যাতে বাকি ডিসট্রিক্ট “পবিত্র” থাকে। কি এক প্রহসন! সংস্কারক রা এও দাবি করতে পারে যে নিউ ইয়র্কের বিবাহিত মানুষদের যাতে বের করে দেয়া হয় কারণ তারা রাস্তার নারীদের চেয়ে নৈতিক ভাবে উচ্চ না।  রাস্তার নারী এবং বিবাহিত নারীর একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে, একজন নিজেকে বাসস্থান বা পদবীর জন্য দাসী হিসেবে বিক্রি করে নাই,  এবং আরেকজন নিজেকে বিক্রি করেছে নিজের সাময়িক বাসনার জন্য; একজনের অধিকার আছে নিজের প্রেমের পুরুষকে বেছে নেয়ার, যেখানে বিবাহিত নারীর এরূপ কোন অধিকার নেই; উপরন্তু তাকে তার মালিকের কাম বাসনার কাছে আত্ম সমর্পণ করতে হবে, এই পরিরম্ভ তার কাছে যতই জঘন্য মনে হোক না কেন, তাকে তার মালিকের সকল আদেশ মান্য করতে হবে; মালিককে সন্তান উপহার দিতে হবে, নিজের শক্তি এবং স্বাস্থ্যের বিনিময়ে হলেও; এক কথায়, সে তার জীবনের প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি দিন বেশ্যাবৃত্তি করে। আমি আমার বিবাহিত বোনদের এরকম জঘন্য, আবমাননাকর এবং অধঃপতিত অবস্থার জন্য জঘন্য রকমের বেশ্যাবৃত্তি ব্যতিত আর কোন শব্দ পেলাম না, একমাত্র বিশেষত্ব হচ্ছে একটা বৈধ, আরেকটা অবৈধ।

    শুধুমাত্র যেসব ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে বিবাহ প্রেম এবং সম্মানের ওপর দাড়িয়ে আছে, সেগুলো বিবাহকে যথার্থতা দেয়। কিন্তু বৈধ হোক বা অবৈধ, যেকোনো ধরণের পতিতাবৃত্তি অস্বাভাবিক, ক্ষতিকর এবং জঘন্য, এবং আমি এও ভালভাবে জানি যে এই পরিস্থিতি বদলাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এই নারকীয় প্রথা বিলোপ করা না হয়, কিন্তু আমি এও জানি যে শুধু মাত্র অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাই নারীর দাসত্ব এর জন্য দায়ী না, তার অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারও দায়ী, এবং আমি জানি আমার অনেক বোনকে এমনকি এখনই স্বাধীন করা যেত, যদি না বৈবাহিক প্রতিষ্ঠান সমূহ তাদেরকে অজ্ঞতা, নির্বুদ্ধিতা এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন করে  রাখত। এজন্য বিবাহ প্রথা বিলোপ করা আমি দায়িত্ব বলে মনে করি, শুধু মাত্র আদি প্রথার নয়, এমনকি তথাকথিত আধুনিক বিবাহেরও, যার অর্থ হল একজন স্ত্রী এবং বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক অধিকৃত করা, যার অর্থ হল এক লিঙ্গকে অপর লিঙ্গ দ্বারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অধিকৃত করা। আমি নারীর স্বাধীনতা দাবি করছি; তার নিজেকে সাহায্য করার স্বাধীনতা, নিজের জন্য বাঁচার স্বাধীনতা, যাকে খুশি ভালবাসার স্বাধীনতা, বা যতজনকে খুশি ভালবাসার স্বাধীনতা। উভয় লিঙ্গের স্বাধীনতা দাবি করছি, ভালবাসার স্বাধীনতা এবং মাতৃত্ব এর স্বাধীনতাও।

    আমাকে এ কথা বলবেন না যে শুধুমাত্র নৈরাজ্যের অধীনেই এসব সম্ভব; এটা সম্পূর্ণ ভুল। আমরা যদি নৈরাজ্য অর্জন করতে চাই, আমাদের প্রথমে নারীদের মুক্ত করতে হবে, ওইসব নারীদের কে যারা তাদের ভাই দের মত স্বাধীন এবং যতক্ষণ না আমাদের স্বাধীন নারী আছে, আমরা স্বাধীন মা পেতে পারব না, এবং মা রা যদি স্বাধীন না হয়, আমরা তরুণ প্রজন্ম কে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্যকারী হিসেবে পাব না, যেটা হচ্ছে নৈরাজ্যবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।

    আর্টওয়ার্ক: লাভার্স
    শিল্পী: আর্নেস্ট কার্নাশর
    সূত্র: ফজ ওয়ার্ল্ড

    আপনাদের যারা মুক্তমনা এবং উদার বাদী, যারা এক ঈশ্বর কে বিলোপ করেছেন এবং বহু তৈরি করেছেন, যাদের আপনারা পূজা করেন; আপনাদের যারা রক্ষণশীল এবং সমাজতন্ত্রী, যারা এখনও নিজেদের সন্তানদের সানডে স্কুলে পাঠান এবং যারা প্রত্যেকে নৈতিক মানদণ্ডের অনুমোদন দেন; তাদের প্রত্যেককে আমি বলব এটা আপনাদের সৎসাহসের অভাব যা আপনাদের বিবাহ কে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করে, এবং যদিও আপনারা তাত্ত্বিকভাবে এর অর্থহীনতা কে স্বীকার করেন, আপনাদের জনমত খণ্ডানোর এবং নিজের জীবনে বাস্তবিক অর্থেই বেচে থাকার শক্তি নাই। আপনারা লিঙ্গের সমতা ভবিষ্যতের জন্য মনে করেন কিন্তু আপনারা নারীর ভোগান্তি কে প্রয়োজনীয় মন্দ মনে করেন। আপনারা বলেন নারীরা দুর্বল এবং অধীনস্থ, এবং তাদের কে শক্তিশালী হতে সাহায্য করার পরিবর্তে আপনারা তাদের কে নিচু অবস্থানে রাখতে সাহায্য করেন। আপনারা আমাদের জন্য স্বাতন্ত্র্য দাবি করেন কিন্তু নিজেরা বৈচিত্র্য ভালবাসেন এবং উপভোগ করেন যখনই সুযোগ পান।

    বিবাহ, বহু শতাব্দীর অভিশাপ, ঈর্ষা, আত্মহত্যা এবং অপরাধের কারণ, বিলোপ করতে হবে যদি আমরা চাই তরুণ প্রজন্ম স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী এবং স্বাধীন পুরুষ ও নারী হিসেবে বড় হোক।

  • সম্পর্ক স্বাধীনতা রবীন্দ্রনাথ

    সম্পর্ক স্বাধীনতা রবীন্দ্রনাথ

    • সেলিম রেজা নিউটন

    মুখস্থ সম্পর্কে ছিলাম না কোনো দিন। মুখস্থের মুখ চোখে পড়া মাত্র মুখ ফিরিয়েছি। শিরোনামের ‘সম্পর্ক’টাও আমার অজানা সম্পর্ক বটে। সম্পর্ক মাত্রই আমার কাছে প্রেম। প্রেমে পড়েছি তাঁর। এ রচনা লিখতে বসে তাঁর সাথে আমার প্রেমের দাগগুলোকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি মাত্র। খেয়াল করছি, বিশ্বপ্রকৃতিতে অবস্থিত ব্যক্তি-মানুষের “স্বাধীনতার নিয়ম”গুলোকে ক্রম-আত্মস্থ করার সূত্র ধরেই সম্পর্ক আমার তাঁর সাথে। রবীন্দ্রনাথের সাথে। যুক্তি আর মুক্তিকে কেন্দ্র করেই আমার রবীন্দ্রনাথ। যুক্ত তিনি সকলের সাথে। সর্বময় যুক্ততার সর্বজনীন উপলব্ধিই তাঁর মুক্তি-আকাঙ্ক্ষার সারসত্তা। যাবতীয় বদ্ধতাকে মুক্ত করার সাধনাই তাঁর সাধনা। “যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ” তাঁর মূলমন্ত্র।১ আবিশ্ব যুক্ততার “বিশ্বধর্ম” তাঁর একান্ত উপলব্ধি। যুক্ততার যুক্তি তাই বন্ধন হয়ে ওঠে না তাঁর জন্য। বিশ্বধর্ম হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন মুক্তিধর্ম। “বিশ্বধর্মের সঙ্গে আমাদের ইচ্ছাকে মেলাতে পারলেই আমরা বস্তুত স্বাধীন হই। স্বাধীনতার নিয়মই তাই।”২

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    আমার যুক্তিবোধ কোনো গুরুজনের কাছ থেকে আয়ত্ত-বস্তু নয়। বই পড়েও শেখা নয়। আগুনের সাথে কয়লার সংযুক্তির শিখায়ই কেবল শিক্ষা করা যায় এ যুক্তিবোধ। নিছক মনুষ্যস্বভাবে। নিতান্তই জন্মসূত্রে। কোনোকিছু সহকারে যা জন্মায়, তা-ই সহজ। আমার যুক্তিবোধ আমার সাথেই জন্মেছে। তাই আমার যুক্তিবোধ সহজ। সহজাত। সহজ যুক্তি এই যে: যুক্তি কোনো তর্কযুক্তি নয়। মতবিরোধের যুক্তিও নয়। ওসব নিছক গালাগালির যুক্তি। (স্মর্তব্য: “মতবিরোধ নিয়ে তোমরা যাকে যুক্তি বলো আমরা তাকে বলি গাল”।৩)। গালাগালির যুক্তির কথা এখানে হচ্ছে না। লজিকবিদ্যার যুক্তির কথাও নয়। আমার যুক্তিবোধ সম্পর্কের। ভালোবাসার। প্রেমের। এবং অবশ্য-অবশ্যই মুক্তির আর স্বাধীনতার।

    যুক্তি বলতে যুক্ততা বোঝায়। আমার যুক্তিবোধ হলো যুক্ততার বোধ। একটা কিছু অন্য কিছুর সাথে যেভাবে সম্পর্কিত, যেভাবে যুক্ত, যেভাবে পার্থক্যযুক্ত, সেটাই তাদের মধ্যকার যুক্তি। ঐ যুক্তিতেই তারা পরস্পর-সম্পর্কিত। এই অর্থে যুক্তিবোধ লজিকবিদ্যা-বিবর্জিত কিছুও নয়। সম্পর্কই যুক্তি – যুক্ততা। আর প্রেমও এক প্রকার সম্পর্ক। যুক্তিই তাহলে প্রেম। যুক্তিবোধই প্রেমবোধ। যুক্তির অনুভূতি তথা যুক্ততার অনুভূতিই তাহলে প্রেমের অনুভূতি। উপরন্তু প্রেম স্রেফ এক প্রকার সম্পর্কই নয় – সর্ব প্রকার সম্পর্কই প্রেম। যাবতীয় সম্পর্কই একেক ধরনের প্রেম। প্রেম তাহলে নিছকই সম্পর্ক। টান। কীভাবে একে অন্যকে টানে, টানাটানি হয়, সেটাই তাদের মধ্যকার যুক্ততা, সম্পর্ক, প্রেম। প্রেম তাই টানাপোড়েনমুক্ত হয় না। হতে পারে না। টানাটানিতে অন্তর পোড়ে। না পুড়লে প্রেম হয় না। আলো হয় না। সম্পর্ক হয় না। যে সম্পর্ক এমনকি নষ্ট হয়ে যায় বলে মনে হয়, সেও এক প্রকার সম্পর্কই। তাতে দূরত্ব বেশি। টান কম। তাই টানাটানি কম। দহনও কম। তবু সেটা সম্পর্ক। দুর্বল সম্পর্ক। দুর্বল সম্পর্ক মানেই খারাপ সম্পর্ক না। প্রবল সম্পর্কও খারাপ হতে পারে। টানাপোড়েন তাহলে সমস্যা না। টানাপোড়েনই সম্পর্ক বরং। কোনো না কোনো প্রকার টানাপোড়েন। টান ছাড়া সচলতা নাই। আর এই মহাবিশ্বে কিছুই স্থির নয়। অনড় নয়। সচল। সম্পর্ক তাই অনড় নয়। সদাপরিবর্তমান। “পাল্টায় মন, পাল্টায় চারপাশ, রাস্তায় আসে নতুন রুটের বাস; পাল্টায় চেনা মুখের দেখন-হাসি, পাল্টাও তুমি তোমায় দেখতে আসি” (কবীর সুমনের গান)।

    অনেকেই এই অপরিহার্য পরিবর্তন মানতে চান না। নিজেরা বদলান। কিন্তু বদলটাকে খেয়াল করতে চান না। স্বীকার করেন না। যাঁরা স্বীকার করেন, তাঁদেরকে উল্টো বলেন পাল্টি-খাওয়া লোক। পাল্টে যাওয়া প্রেমিকের মুখ দেখতে চান না কেউ। মান্নাদের মতো তাঁদের অন্যতম ‘সিগনেচার সং’ হয়: “তুমি কি সেই আগের মতোই আছ? নাকি অনেকখানি বদলে গেছ? খুব জানতে ইচ্ছে করে।” জানতে আসলে ইচ্ছা করে ‘তুমি’ বদলাও নি। কেউ বদলাবে না। সব আগের মতো থাকবে।

    কৃষি-কেন্দ্রিক, ভূমি-মালিকানাভিত্তিক এই সামন্ত মনন ভারতবর্ষকে ভাষায় গাছের মতো অনড় করে রেখেছিল সহস্র বছর (কার্ল মার্ক্স, “ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসনের ভবিষ্যত ফলাফল”)। আমাদের মন এখনও সেই অচলায়তনে স্থির হয়ে থাকতে চায়। একেবারে কালাপাহাড়ি আইকনোক্লাস্টের মতো করে সেই “অচলায়তন“কে আক্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। বাঁধ ভেঙে “মুক্তধারা” বওয়ানোর সাধনায় অনির্লিপ্ত থাকেন জীবনভর।

    জীবন তো আর থেমে থাকে না। “রাস্তার নাম পাল্টায় একদিন, ধারা পাল্টায় মাও সে তুং-এর চীন; প্রেম পাল্টায়, শরীরও পাল্টে যায়, ডাকছে জীবন: আয় পাল্টাবি আয়” – এ ডাক কবীর সুমনের নয় আসলে। এ ডাক শুষ্ক-সজল জীবনের। এ ডাকে সাড়া দেয়া সহজ নয়। তার জন্য নিজেকে সহজ করে তুলতে হয়। স্বরচিত মুখোশের আড়ালে, আর কল্পখোলসের ভেতরে নিজেকে বন্দি করে রাখলে চলে না। নিজের দায়িত্বটুকু অন্তত নিতে হয়। নিজের অধীন হতে হয়। স্বাধীন হতে হয়। তবেই জীবনপ্রবাহের গতিধর্ম-স্থিতিধর্মের স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। পরিবর্তনকে ভয় লাগে না। অনেকে সেটা মানতে পারেন না। অনড় স্থিরতা চান তাঁরা। ধ্রুব প্রেম চান। তাঁদের প্রেমও পাল্টায় না, শরীরও পাল্টায় না। ওগুলো পাল্টালেও মনটা পাল্টায় না। রবীন্দ্রনাথের ‘পুরাতন হৃদয়’ পর্যন্ত ‘পুলকে দুলিয়া’ ওঠে অথচ আমাদের নতুন হৃদয়ের ভদ্রলোকেরা সুস্থির, গৃহপালিত, গেরস্থালি প্রেম চান।

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    সম্পর্কের স্থিরতা চাওয়া কেন? ভয়ে। পরিবর্তনের ভয়। নতুনের ভয়। তা ছাড়া, সম্পর্ক সুস্থির হলে, তাকে নিজের দরকার মতো ব্যবহার করতে সুবিধা হয়। সুস্থির সম্পর্ক হলো কেজো সম্পর্ক। প্রয়োজন পূরণের সম্পর্ক। দরকারের সম্পর্ক। উদ্দেশ্য হাসিলের সম্পর্ক। উদ্দেশ্য: নিজের স্থূল কামনা বাসনা প্রলোভনকে চরিতার্থ করা। এ হলো স্থূল সম্পর্ক। স্থূল সম্পর্ক কামপরায়ণ। স্থূল প্রেমিক আসলে প্রেমিকই নন। সম্পর্ক-সন্ধানী তিনি – সুযোগসন্ধানী। ধান্দাবাজ। কামুক তিনি। তিনি শুধু নিজের ইন্দ্রিয়বাসনা চরিতার্থ করতে চান। ষড়রিপুর কাছে নিজেকে সঁপে দেন তিনি। রিপু আর ইন্দ্রিয়ই তার সুখ। নিজেকে সুখী করতে চান তিনি। কিন্তু তাঁর আনন্দ হয় না। কেননা কামনা কোনোদিন পরিতৃপ্ত হয় না। এই অপরিতৃপ্তি তাঁকে ব্যর্থতার অনুভব দেয়। ব্যর্থতা তাঁর কাছে অসহনীয়। তিনি চান সফলতা। সফলতার তাড়না থামতে দেয় না। আরো চাই আরো চাই স্পৃহা কেড়ে নেয় স্বাধ-আহ্লাদ-সাধনার স্বাদ। প্রয়োজনের সম্পর্ক তাই আনন্দহীন। কেননা তা উদ্দেশ্যপরায়ণ।

    প্রেম অবসরের ঘটনা। প্রেম কোনো ব্যস্ত কাহিনী নয়। ব্যস্ততা অফিসের প্রসঙ্গ। বাণিজ্যের প্রসঙ্গ। অবকাশ নিজেই প্রেম। উদ্দেশ্যহীন অবকাশ। এর সম্পর্ক রিক্ততার সাথে। রবীন্দ্রনাথের দেখা সেই রিক্ত একটা ঘরের মধ্যে এর বাস:

    ঘরের মধ্যে একেবারে কোনো আসবাব নেই। একটি দেয়ালে একখানি ছবি ঝুলছে। ওই ছবি আমার সমস্ত চোখ একা অধিকার করে; চারি পাশে কোথাও চিত্তবিক্ষেপ করবার মতো কিছুই নেই। রিক্ততার আকাশে তার সমস্ত অর্থটি জ্যোতির্ময় হয়ে প্রকাশ পায়। ঘরে যদি নানা জিনিস ভিড় করত তবে তাদের মধ্যে এই ছবি থাকত একটি আসবাবমাত্র হয়ে, তার ছবির মাহাত্ম্য ম্লান হত, সে আপনার সব কথা বলতে পারত না।

    কাব্য সংগীত প্রভৃতি অন্য-সমস্ত রসসৃষ্টিও এইরকম বস্তুবাহুল্যবিরল রিক্ততার অপেক্ষা রাখে। তাদের চারিদিকে যদি অবকাশ না থাকে তা হলে সম্পূর্ণ মূর্তিতে তাদের দেখা যায় না। আজকালকার দিনে সেই অবকাশ নেই, তাই এখনকার লোকে সাহিত্য বা কলাসৃষ্টির সম্পূর্ণতা থেকে বঞ্চিত। তারা রস চায় না, মদ চায়; আনন্দ চায় না, আমোদ চায়। চিত্তের জাগরণটা তাদের কাছে শূন্য, তারা চায় চমকলাগা। (রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    চিত্তের এ জাগরণই প্রেম। আত্মজাগরণ। হেনরি ম্যাকে-এর “নৈরাজ্য” কবিতার মতো “যখন প্রত্যেকে জেগে উঠবে অন্ততপক্ষে নিজের নিকটে” তখন আমরা প্রেমময় সমাজ পাব। আত্মজাগরণই আত্মবিকাশ। আত্মপরিচয়। আত্ম-অধীনতা। স্ব-অধীনতা। স্বরাজ। এ বস্তুর নামই প্রেম। প্রেম ছাড়া স্বাধীনতা নাই। আত্মপরিচয়ের বিকাশ যার মধ্যে ঘটে নি, যার আত্মা এখনও সুপ্তিকাতর, প্রেম তার কাছে অনুষ্ঠান। নায়কনায়িকার হাত-ধরাধরি করে সিনেমা দেখতে যাওয়ার অনুষ্ঠান। মিডিয়া-ম্যানুয়ালে সূচিবদ্ধ অনুষ্ঠান। প্রেম কোনো ভিড়ের গল্প নয়–

    ভিড়ের ঠেলাঠেলির মধ্যে অন্যমনস্কের মন যদি কাব্যকে গানকে পেতে হয় তা হলে তার খুব আড়ম্বরের ঘটা করা দরকার। কিন্তু সে-আড়ম্বরে শ্রোতার কানটাকেই পাওয়া যায় মাত্র, ভিতরের রসের কথাটা আরো বেশি করে ঢাকাই পড়ে। কারণ, সরলতা স্বচ্ছতা আর্টের যথার্থ আভরণ। যেখানে কোলাহল বেশি, ভিড় বৃহৎ, মন নানা কিছুতে বিক্ষিপ্ত, আর্ট সেখানে কসরত দেখাবার প্রলোভনে মজে, আপনাকে দেখাতে ভুলে যায়। আড়ম্বর জিনিসটা একটা চিৎকার; যেখানে গোলমালের অন্ত নেই সেখানে তাকে গোচর হয়ে ওঠবার জন্যে চীৎকার করতে হয়; সেই চীৎকারটাকেই ভিড়ের লোক শক্তির লক্ষণ জেনে পুলকিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আর্ট তো চীৎকার নয়, তার গভীরতম পরিচয়ে হচ্ছে তার আত্মসংবরণে। আর্ট বরঞ্চ ঠেলা খেয়ে চুপ করে যেতে রাজি আছে, কিন্তু ঠেলা মেরে পালোয়ানি করার মতো লজ্জা তার আর নেই। হায় রে লোকের মন, তোমাকে খুশি করবার জন্যে রামচন্দ্র একদিন সীতাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন…। (রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    দেশ-দশ-সমাজের বাইরে নয় প্রেম। যে নিজেকে চেনে, পরিবেষ্টনী-প্রকৃতিপুঞ্জকে সহকারেই নিজেকে চেনে সে। যে নিজেকে ভালোবাসে, সে ভালোবাসে সবাইকে। কিন্তু তাই বলে প্রেম চিৎকার নয়। আড়ম্বর নয়। কোলাহল নয়। গোলমাল নয়। ক্রমাগত ভিড় ঠেলাঠেলি করে সিনেমা হলের টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট জোটানোর সফলতা নয়। প্রেম অপ্রয়োজনের। অকারণের। অকারণই তো কাব্য, কলা, সাহিত্য, গান, আর্ট। অকারণেই আনন্দ। “তাসের দেশ“-এর “বসন্তে যারা ঝাঁকে ঝাঁকে চলেছে হিমালয়ের দিকে”, সেই হাঁসের দলের অকারণ আনন্দের মতো। রবীন্দ্রনাথ জানেন: “ওড়বার আনন্দ [হলো] অকারণের আনন্দ”।

    বৃথা ওড়ার আনন্দের নাম প্রেম। বৃথা-সম্পর্কের নাম প্রেম। উদ্দেশ্যহীন, কামনাহীন, প্রত্যাশাহীন সম্পর্কের নাম প্রেম। প্রেম শুধু প্রেমকেই চায়। প্রেমের কোনো পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নাই। পূরণ করার মতো বিশেষ কোনো ধান্দা নাই। সম্পর্কিত সত্তাকে সুখী করার সাধনার নাম প্রেম। সম্পর্কিত সত্তা সুখী হলেই প্রেমিকের সুখ। এ হলো কামনা মোচনের সাধনা। রিপু, ইন্দ্রিয়, আর কামনাকে অতিক্রম করে প্রেম। নিষ্কাম কর্মযোগের নাম প্রেম। প্রেমে তাই সবই পাওয়া যায়। কোনো অভাবই থাকে না প্রেমে। মন মলিন হয় না। ভাব থাকে শুধু। আনন্দ থাকে। মিলনের আনন্দ। রক্ত-ক্ষরণের আনন্দ। পোড়ার আনন্দ। আলোর আনন্দ। অকারণ আনন্দ।

    প্রেম এতই অকারণ যে এমনকি দায়িত্বহীনও বটে। কর্তব্যবোধতাড়িত সম্পর্কের নাম প্রেম নয়। চুক্তি। বিবাহ। তার সম্পর্ক দায়-দায়িত্ব-অধিকারের সাথে। প্রেমের সাথে নয়। আনন্দের সাথে নয়। আনন্দ তো বন্ধুকে সুখী করাতেই। কিন্তু তা কর্তব্য নয়। কর্তব্য সংবিধানের অংশ। প্রেম বেআইনী। আইন-অতিক্রমী। সংবিধান-বহির্ভূত। তার আইন তার নিজের রচিত। তা সে বদলায়ও নিজে। প্রেম এক্ষেত্রে আর্টের মতোই। “তার মধ্যে কোনো দায়ই নেই, কর্তব্যের দায়ও না।” রবীন্দ্রনাথের কাছে শিখি উপনিষদের গল্প:

    উপনিষদে লিখছে, এক ডালে দুই পাখি আছে, তার মধ্যে এক পাখি খায় আর এক পাখি দেখে। যে পাখি দেখছে তারই আনন্দ বড়ো আনন্দ। কেননা তার সে বিশুদ্ধ আনন্দ, মুক্ত আনন্দ। মানুষের নিজের মধ্যেই এই দুই পাখি আছে। এক পাখির প্রয়োজন আছে, আর-এক পাখির প্রয়োজন নেই। এক পাখি ভোগ করে, আর-এক পাখি দেখে। যে পাখি ভোগ করে সে নির্মাণ করে, যে পাখি দেখে সে সৃষ্টি করে। নির্মাণ করা মানে মাপে তৈরি করা, অর্থাৎ যেটা তৈরি হচ্ছে সেইটেই চরম নয়, সেইটেকে অন্য কিছুর মাপে তৈরি করা — নিজের প্রয়োজনের মাপে বা অন্যের প্রয়োজনের মাপে। আর সৃষ্টি করা অন্য কোনো-কিছুর মাপের অপেক্ষা করে না, সে হচ্ছে নিজেকে সৃজন করা, নিজেকেই প্রকাশ করা। এইজন্য ভোগী পাখি যে সমস্ত উপকরণ নিয়ে কাজ করছে তা প্রধানত বাইরের উপকরণ, আর দ্রষ্টা পাখির উপকরণ হচ্ছে আমি-পদার্থ। এই আমির প্রকাশই সাহিত্য, আর্ট। তার মধ্যে কোনো দায়ই নেই, কর্তব্যের দায়ও না। (রবীন্দ্রনাথ, “জাপান যাত্রী“, দ্বিতীয় অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।)

    এই আমির প্রকাশই সত্তার প্রকাশ। সর্বসত্তার। এই আমির প্রকাশই ব্যক্তি-মানুষের স্বাধীনতার সম্ভাব্য চূড়ান্ত বাস্তব রূপ। কেননা স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। আমার প্রকাশের সীমাই আমার স্বাধীনতার সীমা। তাই বলে কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য-আইন-কানুন-আদালত আমার প্রকাশের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। এই সীমা নির্ধারণ করতে পারি শুধু আমি। তা আমি নির্ধারণ করি আমার প্রকাশের সীমা অনুভব করার মধ্য দিয়ে। এ সীমাবদ্ধতা আরোপিত নয়, অন্তর্জাত নয়, অন্তঃনিবিষ্ট। আমার ভেতরের এ সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রমও করতে পারি আমি। নবরূপ নবপ্রকাশের কর্তব্য-ঊর্ধ্ব আনন্দে। আবার, রূপ সৃষ্টির এ স্বাধীনতা যেহেতু আমার, এ তাই বন্ধুরও (সবার)। তাঁর স্বাধীনতাই তো আমার স্বাধীনতার মানদণ্ড। জিম মরিসনের গানের মতো: “বন্ধু তো সে যে তোমাকে পেতে দেয় পূর্ণ স্বাধীনতা যেন তুমি হয়ে ওঠো তুমিই নিজে”। প্রেম তাই স্বাধীন। সে জন্যই সীমাহীন।

    ধ্রুব প্রেম বলে কিছু নাই। প্রেমকে যাঁরা নিটোল, গতিহীন সত্তা বলে চাউর করে চলেছেন হাজার বছর ধরে, তাঁরা প্রেমের নিজস্ব যুক্তির দিকে তাকান না। তাঁরা যুক্তিবোধহীন। আর সেকারণেই তাঁরা আবেগবোধবর্জিত। প্রেমের চাইতে প্রবল আবেগ কী আছে? অন্যের সাথে যুক্ত হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা আর কী আছে? এ জন্যই যুক্তিবোধহীন যিনি, তিনি আবেগবোধহীনও বটে। (দেখার বিষয়: যুক্তিহীন বলি নি, আবেগহীন বলি নি।) যুক্তি তাহলে আবেগই বটে। যুক্তি আর আবেগ পরস্পর-বিপরীত কিছু নয়। এরা একই জিনিসের দুই নাম। একই জিনিসকে দুইভাবে দেখার জন্য দুইটা নাম মাত্র।

    জ্ঞান-ইন্ডাস্ট্রি যে বস্তুকে যুক্তি বলে চালায় তা আসলে অস্ত্র। হাতিয়ার। অন্যকে ঘায়েল করার হাতিয়ার। এই যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। করা হয়ে থাকে। এই যুক্তি হলো ব্যক্তির অন্ধ বাসনার শার্টের হাতায় লুকানো ছুরি। চক্ষুহীন কামনার আঁচলে লুকানো বল্লমের ফালা। আমার বাসনা পূরণে যা কিছু প্রবল বাধা, এ দিয়ে সে সবকে বধ করা যায়। বিচারবুদ্ধিহীন কামনাবাসনা পূরণের পথ পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার্য কাস্তে এই প্রচলিত যুক্তি। এর সাথে প্রেম নেই। সম্পর্ক নেই। আছে জোরাজুরি। আছে জবরদস্তি। অর্থাৎ বলপ্রয়োগ। যুক্তির এই অর্থে বলপ্রয়োগ আর যুক্তিপ্রয়োগ একই কথা। এ যুক্তি তাই প্রেমের নয়। প্রভুত্বের। এ যুক্তি মালিকের যুক্তি। মালিকানার যুক্তি। অন্যকে নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-কামনাবাসনা অনুসারে পরিচালিত করার যুক্তি। “যদি দেখি যে মনের মতো ফল হচ্ছে না তাহলে জবরদস্তি করতে ইচ্ছা করে, তখন, নিজের শক্তি ও অধিকারকে নয়, অন্যেরই বুদ্ধি ও স্বভাবকে ধিক্কার দিতে প্রবৃত্তি জন্মে।”৪ জবরদস্তির যুক্তিবোধ রবীন্দ্রনাথের নয়। তাঁর যুক্তি “স্বাভাবিক” যুক্তি। ছন্দের লয় যেমন স্বাভাবিক, সে রকম স্বাভাবিক এ যুক্তিবোধ। এ যুক্তিতে জবরদস্তি নিতান্তই অচল। “আমাদের প্রাণের, আমাদের হৃদয়ের ছন্দের একটা স্বাভাবিক লয় আছে; তার উপরে দ্রুত প্রয়োজনের জবরদস্তি খাটে না”।৫

    জবরদস্তির প্রবৃত্তি-যুক্তির সাথে প্রেম-ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই। এ হলো ভালোবাসার নামে, প্রেমের নামে, পিতৃত্বের নামে, মাতৃত্বের নামে, ধর্মের নামে, অন্যকে নিজের দাসত্ব করানোর যুক্তি। এ যুক্তি রবীন্দ্রনাথের না। রবীন্দ্রনাথ জানেন, মানুষ নিজেই নিজের প্রভু হতে চায়। “সমস্ত প্রলোভনসত্ত্বেও দাসত্ব তাহার পক্ষে স্বাভাবিক নয়”; কেননা “সে জানে তাহার [নিজেরই] মধ্যে প্রভুত্বের একটি স্বাধীন সম্পদ আছে”; “স্বভাবতই সে প্রভু; সে বলে আমি নিজের আনন্দে চলিব, আমার নিজের কাজের বেতন আমার নিজেরই মধ্যে— বাহিরের স্তুতি বা লাভ, বা প্রবৃত্তি-চরিতার্থতার মধ্যে নহে। যেখানে সে প্রভু যেখানে সে আপনার আনন্দে আপনি বিরাজমান, সেইখানেই সে আপনাকে দেখিতে চায়; সেজন্য সে দুঃখ কষ্ট ত্যাগ মৃত্যুকেও স্বীকার করিতে পারে। সেজন্য রাজপুত্র রাজ্য ছাড়িয়া বনে যায়— পণ্ডিত আপনার ন্যায়শাস্ত্রের বোঝা ফেলিয়া দিয়া শিশুর মতো সরল হইয়া পথে পথে নৃত্য করিয়া বেড়ায়।” আর “এই জন্যই মানুষ এই একটি আশ্চর্য কথা বলে, আমি মুক্তি চাই”। (রবীন্দ্রনাথ, “ধর্মের অর্থ“, প্রবন্ধ-সংকলন: “সঞ্চয়“, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।) মুক্তি ছাড়া তাই যুক্তি নাই। মুক্তি-যুক্তির সম্পর্ককে আবিষ্কার করাই আমার রবীন্দ্রনাথকে দেখার আনন্দ।

    সম্পর্ক ঘরে থাকে। সম্পর্ক থাকে বাইরেও। ঘর আর পথ শেষ পর্যন্ত আলাদা কিছু নয়। মুসাফির-রাস্তাই তো ঢোকে ঘরে। আবার, ঘর থেকেই পথে বেরোয় মানুষ। ঘর যাঁর নাই কিংবা ছিল না, পথ নামক বস্তুটার কোনো ধারণাও তাঁর নাই। ঘরে ছিলেন বলেই তিনি পথে নেমেছেন। ঘর মানে যেকোনো আশ্রয়। সকল আশ্রয়ই অস্থায়ী আশ্রয়। সম্পর্ক তাই সরাইখানা বটে। সরে সরে যায় সে সারাক্ষণ। তার ওপরকার সামিয়ানা কখনও দূরের আকাশ। কখনও তা কাছের ছাউনি, গাছতলা, ছাদ, চাতাল। সম্পর্ক তাহলে যেমন আশ্রয়ের— বিশ্রামের, সম্পর্ক তেমনই আবার অবিশ্রাম পথচলারও। কেননা পথই ঘর অনেকের। উপরন্তু, অনেকের জন্য এমনও হতে পারে: ঘরই পথ তাঁদের। ঘটনা তাহলে পথ কিংবা ঘর নয়। ঘটনা হচ্ছে হাঁটা।

    রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম

    সম্পর্ক হচ্ছে আত্মার আশ্রয়। আশ্রয় দরকার তার। কেননা তা হাঁটে। পথ চলে। হাঁটে, অনুসন্ধান করে, আস্বাদন করে। আস্বাদন করে একাধারে অমৃত এবং গরল। যখন সে অবিরাম হাঁটে, তখনও কিন্তু শান্ত নিষ্ঠার সাথে অস্তিত্বে একাগ্র থাকে তার আত্মা। আবার, আশ্রয় তাঁর ঘরও। কেননা সে থামেও। থামে, অনুসন্ধান করে, আস্বাদন করে। আস্বাদন করে একাধারে অমৃত এবং গরলের মধ্যবর্তী আনকা নহর। যখন সে থেমে থাকে, তখনও কিন্তু অশান্ত পরিভ্রমণে বহু-অগ্রে রত থাকে আত্মা তাহার। গৃহক্লান্ত-গৃহত্যক্ত মানুষের কাছে পথই অবিকল্প আশ্রয়। পথ হচ্ছে ঘরের সাথে তার সম্পর্ক অনুধাবনের অবসর। আবার, মরুপথে দিশাহারা মুসাফিরের আশ্রয় হচ্ছে মরুদ্যান— এক চিলতে ঘর। মরুদ্যানই মরুভূমির সাথে তার সম্পর্ক উপলব্ধি করার অবকাশ।

    রবীন্দ্রনাথ আমার অবসর। আলো আনন্দ আর গানের এই অবসরটুকু আছে বলেই হাঁটতে পারি আমি। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পাই: “আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে; আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।” আমার নশ্বর দেহ তখন আর জৈবযান্ত্রিক সায়েন্স-সম্মত জড়দেহমাত্র নয়, সদামুক্ত অবিনশ্বর আত্মার সশরীর সামাজিক অস্তিত্ব। “শরীরকে হত্যা করিলেও ইনি নিহত হন না” (শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা, দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ২০)। আমি তখন উপলব্ধি করতে পারি সমুদয় প্রপঞ্চের সাথে আমার সমুচয় সম্পর্কের মুক্ততার সারসত্তা। অনুধাবন করতে পারি অন্তহীন সম্পর্করাশির পারস্পরিক মুক্ততার নিত্যস্বভাবটাকে। টের পাই: অনতিক্রম্য যুক্ততার স্বরূপ উপলব্ধি করার মধ্যেই আছে মুক্তির অভিজ্ঞান। টের পাই অস্তিত্বজোড়া অবিণাশী মুক্ত সম্পর্কের স্বাদ। পারস্পরিক দাসত্বের অচলায়তনে জবুথবু আমাদের প্রেম-পরিবার-রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ আইনী সম্পর্কের সীমা তখন অনন্ত স্বাধীন সম্পর্কের অভিসারী হয়ে ওঠে।

    আরো অনেক কিছুর মতো, রবীন্দ্রনাথ আমার অবকাশ। নিরাকার আঁধার আর বিশেষণ-অযোগ্য বিষণ্ণতার এই অবকাশটুকু আছে বলেই আমি অনুধাবন করতে পারি এ মহাবিশ্বের সাথে আমার বন্ধনহীন যুক্ততার স্বরূপ। টের পাই বাঁচার যুক্তি। এই যুক্তিবোধ আমাকে মুক্তি দেয় যুক্তিহীন সম্পর্কের গতিহীন গ্লানি থেকে। বদ্ধ ও বাধ্যতামূলক সম্পর্করাজির যাবতীয় রাষ্ট্র-সামাজিক জবরদস্তি থেকে।

    রচনা: রাবি, জুলাই-আগস্ট ২০১৩
    প্রকাশ: দৈনিক বণিক বার্তা, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৩

    প্রাসঙ্গিক তথ্য
    পত্রিকায় প্রকাশের সময় রচনাটা আমি উৎসর্গ করেছি আমার বন্ধু “চিহ্ন-সম্পাদক প্রফেসর শহীদ ইকবালের প্রীতিকমলে”। ইকবালদের পত্রিকা “চিহ্ন”-র সাম্প্রতিক কোনো একটা রবীন্দ্রবিষয়ক সংখ্যার জন্য তিনি আমাকে “আমার রবীন্দ্রনাথ” নামে একটা লেখার জন্য বলেছিলেন। এটাই সেই রচনা। কিন্তু একটুর জন্য এটা আমি তাঁর হাতে সময়মতো পৌঁছাতে পারি নি বলে চিহ্ন-তে এটা ছাপা হয় নি। এখানেও রইল এটা প্রফেসর ইকবালের প্রীতিকমলে।

    পাদটীকা

    ১. রবীন্দ্রনাথ, গীতবিতান, পূজাপর্ব, ১১১ সংখ্যক গান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভাষা-প্রযুক্তি-গবেষণা পরিষদ পরিবেশিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ, রবীন্দ্র-রচনাবলী ডট এনএলটিআর ডট অর্গ। এর পর থেকে শুধু “রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ” হিসেবে উল্লেখিত।

    ২. রবীন্দ্রনাথ, “শান্তিনিকেতন” গ্রন্থের ১ম পর্বের “ত্যাগ” নামাঙ্কিত অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৩. রবীন্দ্রনাথ, “সংগীতচিন্তা” বইয়ের “সংযোজন” অংশে “কল্যাণীয় ধূর্জটি”প্রসাদকে লেখা চিঠি, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৪. রবীন্দ্রনাথ, “শান্তিনিকেতন” গ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বের “সঞ্চয়তৃষ্ণা” অংশ, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।

    ৫. রবীন্দ্রনাথ, “পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি”, রবীন্দ্র-রচনাবলীর বৈদ্যুতীন সংস্করণ।