Category: তত্ত্ব

  • রবীন্দ্রনাথের বৈচিত্র্যময় শিক্ষা দর্শন

    রবীন্দ্রনাথের বৈচিত্র্যময় শিক্ষা দর্শন

    শহিদুল ইসলাম

    রবীন্দ্র বিশ্বে ঢুকতে আমি ভয় পাই। তাই তাঁকে নিয়ে আমি কোন লেখা আজও লিখিনি। আগামি ২২ শ্রাবণ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা নিয়ে একটা কিছু লেখার তাগিদ এসেছে। লিখতে সাহস পেলাম এজন্য যে উপমহাদেশ ও পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সামন্য চিন্তা-ভাবনা করেছি এবং কিছু লিখেওছি। তখন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শন আমার ওপর প্রবল প্রভাব ফেলে। তাঁর কেবল ‘শিক্ষা’ নামের বই-ই নয়; তাঁর অনেক লেখা, বক্তৃতা ও চিঠিপত্রে শিক্ষা নিয়ে অনেক চিন্তার কথা আমাদের জানিয়েছেন। আমার লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অতি স্পষ্ট। তাঁর অনেক উদ্ধৃতি আমি ব্যবহার করেছি। ভাব প্রকাশ করতে যখন ভাষা খুঁজে পাই না, তখন তাঁর স্মরণাপন্ন হয়েছি। তিনি আমাকে পথ দেখিয়েছেন।

    আর্টওয়ার্ক: রবীন্দ্রনাথ
    শিল্পী: হোসেন শেখ আফজাল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    তবে শিশু শিক্ষার ওপর তাঁর গুরুত্ব দেবার বিষয়টি কারো দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি এক থেকে পাঁচ বছর শিশুদের শিক্ষা নিয়ে বেশি ভেবেছেন। অত্যন্ত সাধারণ ভাষায় আমাদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিশুদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছেন এবং তিনি নিজেও শহরের ইট-পাথর-সুরকি ও যানবাহনের উৎকট আওয়াজ, মানুষের হইহুল্লোড় থেকে দূরে এক মনোরম ছায়াঘেরা গ্রামে তেমনি একটি আশ্রম গড়ে তুলে নিজের চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। চারধারে আদিবাসী সাঁওতাল গ্রাম। পায়ে চলা ধুলো ভর্তি রাস্তা। পাখির কিচির মিচির শব্দ। বিভিন্ন ঋতুতে রঙ বদলানো পরিবেশের মধ্য তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর আশ্রম। তিনি লিখেছেন ‘কেজো শিক্ষা’ দেয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন এবং তাদের হাতে-কলমে শিক্ষার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাদের মতই ‘কেজো শিক্ষা’ প্রচলনের চেষ্টা করেছেন। কেজো শিক্ষা বলতে তিনি শিশুদের দৈনন্দিন কাজ, যেমন নিজের জামাকাপড় নিজে পরা ও পরিস্কার রাখা, রুটি বানানো, ঘরদোর পরিস্কার রাখা, যেখানে-সেখানে কফ বা থুতু না ফেলা ইত্যাদি। কিন্তু  তিনি তা পারেননি। কারণ ‘পুঁথিগত বিদ্যায় আমাদিগকে কেবল যে অকর্মণ্য করিয়া দিয়েছে তাহা পুঁথির বাহিরে যাহা-কিছু আছে তাঁহার প্রতি আমাদের ঔৎসুক্য চলিয়া গেছে।’ (উদ্যোগশিক্ষা, রবীন্দ্র-রচনাবলী, পঞ্চদশ খণ্ড: ক, বিবিধ, পৃষ্ঠা-৮৬৫)।

    রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ প্রবর্তিত তথাকথিত আধুনিক শিক্ষা কাঠামোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘যতটুকু অত্যাবশ্যক কেবল তাঁহার মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নয়।… আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না। স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে।’ (শিক্ষার হেরফের, রবীন্দ্ররচনাবলী-চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩১১)

    এর  মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মূল শিক্ষা দর্শন নিহিত আছে। শিক্ষার উদ্দেশ্য ‘সুদক্ষ উৎসাহী চোখ-কান খোলা মানুষ পাওয়া।’ কিন্তু ‘মুখস্তবিদ্যার নীচে তাদের [ছাত্র] সব শিক্ষা সমাধিস্থ হয়ে যায়।’ ‘বিদ্যায়তনগুলি সংসারক্ষেত্রের বাইরে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে মানুষকে তার স্বস্থান থেকে উৎপাটিত করে এনে খাঁচার মধ্যে পাখিকে যেমন করে রাখা হয় তেমনি করে রেখে শিক্ষার বাঁধা খোরাক দেওয়া হয়। এই যে বাল্যকাল থেকেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হওয়া, এ দৈন্য আর কিছুতেই কখনো দূর হয় না।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৮৭৯)।

    মুখস্তবিদ্যার পরিণতি সম্পর্কে তাঁর মজাদার উক্তি হল, ‘আমরা যতই বি.এ. এম.এ. পাশ করিতেছি, রাশি রাশি বই গিলিতেছি, বুদ্ধিবৃত্তিটা তেমন বেশ বলিষ্ঠ এবং পরিপক্ক হইতেছে না।… ইহার প্রধান কারণ, বাল্যকাল হইতে আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা-কিছু নিতান্ত আবশ্যক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি। তেমন করিয়া কোনোমতে কাজ চলে যায় মাত্র, কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমত হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়া দরকার। তেমনি একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমত হজম করিতে অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক’ (শিক্ষার হেরফের, প্রাগুক্ত)।

    নতুনের প্রতি আমাদের ভয়ের শেষ নাই। আমেরিকা প্রভৃতি উন্নত দেশে খাদ্যের অভাব না থাকলেও তারা নিত্য নতুন খাদ্য প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ চির অভাবের আমাদের দেশে তা সম্ভব হয় না। কেন? উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘যাহা চলিয়া আসিতেছে, তাহা নিঃসন্দেহেই ভালো বলিয়াই চলিয়া আসিতেছে এই জড় বিশ্বাস আমাদের শিক্ষিত লোকদের মন হইতেও কিছুতেই তাড়ানো যায় না।… ইহা আমাদের অন্তরতম দাসত্বের লক্ষণ।’ (উদ্যোগশিক্ষা, পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৬৫)। দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ বরাবর কর্মমুখি শিক্ষার জন্য সারা জীবন লিখে গেছেন। ১৯৪০ সালের ২৩ জুলাই শান্তিনিকেতনে শিক্ষাভবনের ছাত্রাবাসে প্রদত্ত রবীন্দ্রনাথ শেষ ভাষণে বলেন, ‘বন্ধ স্কুল গৃহের কঠোর শিক্ষাব্যবস্থা আমার মনকে দারুণভাবে পীড়িত করেছিল— আমি স্কুল পালাতে বাধ্য হয়েছিলাম।’ (পঞ্চদশ খণ্ড-পৃষ্ঠা-৮৯৬)।

    আধুনিক শিক্ষা প্রসঙ্গে

    শিল্প বিপ্লব সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। তা ক্রমশ সমস্ত পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। সম্পদের অতি দ্রুত বৃদ্ধি মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে প্রাচুর্য। সেই স্রোতে গা ঢেলে না দিয়ে কোন জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। সে কথাটি রবীন্দ্রনাথ ভাল ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সেইসাথে মানুষের কাছ থেকে কী কেড়ে নিচ্ছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল তাঁর। সেকথা তিনি তাঁর বহু লেখায় লিখে রেখে গেছেন। আমরা যারা আধুনিক সভ্যতার তীব্র আলোকে চোখে কম দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথ তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দিয়েছেন আধুনিক সভ্যতা আমাদের কি কেড়ে নিয়েছে। জীবনের শেষ বছরে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে অতি স্পষ্টভাবে তা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। বহুল আলোচিত সে প্রবন্ধ সম্পর্কে আজ আর কিছু লিখবো না। ১৩২৬ সনের অগ্রহায়ণ মাসে ‘কলাবিদ্যা’ নামের শান্তিনিকেতনের পত্রে সে সম্পর্কে আমাদের জানান যে ‘বর্তমান যুগ য়ুরোপীয় সভ্যতার যুগ। ইহাই হয়, গায়ের জোরে নয়, সম্মোহনের দ্বারা সমস্ত পৃথিবীকে বশ করিতেছে। এই সভ্যতা পৃথিবীর যে জাতিকে স্পর্শ করিতেছে তাঁহারই আকৃতি ও প্রকৃতি হইতে নিজের বিশেষত্ব ঘুচিয়া যাইতেছে।’ তিনি জাপানের কথা উল্লেখ করেন। আধুনিক সভ্যতা পৃথিবীর সকল দেশের মানুষের কি ক্ষতি করছে, সে সম্বন্ধে বলছেন, ‘যুদ্ধপ্রণালী ব্যবসায়প্রণালী আজ পৃথিবীতে সকল দেশেই একাকার হইতেছে, ইহাতে আশ্চর্য নাই কেননা ও দুটো যন্ত্রমাত্র এবং যন্ত্রের রূপ সকল দেশে একই রকম হইবে বৈকি? কিন্তু মানুষের মন তো যন্ত্র নহে; … সে সমস্তই আপনার করিয়া লয়— মোটের উপর কাঠামোটা ঠিক থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বাল্যকালের শিক্ষায় আমরা ভাষার সাথে ভাব পাই না। আবার বয়স হইলে ঠিক তাঁহার বিপরীত ঘটে; যখন ভাব জুটিতে থাকে, তখন ভাষা পাওয়া যায় না।’

    আর্টওয়ার্ক: ম্যান
    শিল্পী: মকবুল ফিদা হুসেন
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    ‘কিন্তু আজ পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষের নিজের মনের সঙ্গে তার নিজের তৈরি কলের সাংঘাতিক লড়াই বাধিয়া গেছে। মানুষের ব্যবহার্য দ্রব্যে তাঁহার মনের স্বাক্ষর কোথাও আর দেখাবার জো নাই, সর্বত্রই কলের ছাপ। এই কলের সন্ততিগণের মধ্যে কোথাও আর রূপভেদ নাই। সুলভতা ও সুবিধার প্রলোভনে মানুষ ইহা স্বীকার করিয়া লইয়াছে— সেই প্রলোভনে মানুষ নিজের মনের কর্তৃত্বকে নিজের সৃষ্টিশক্তিকে অস্বীকার করিতেছে।’ ‘য়ুরোপের সভ্যতার সেই রুচিস্বাতন্ত্র্যনাশক মরু হাওয়া ভারতবর্ষীয় শিল্পগুলিকে সবই প্রায় নষ্ট করিয়াছে।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৮৭০)। উদাহরণ স্বরূপ তিনি আইরিশ শিক্ষা ব্যবস্থার উল্লেখ করেন। ‘য়ুরোপের যে যুগকে অন্ধকার যুগ বলে, যখন বর্বর-আক্রমণের ঝড়ে রোমের বাতি নিবিয়া গেল, সেই সময়ে য়ুরোপের সকল দেশের মধ্যে কেবলমাত্র আয়র্লন্ডেই বিদ্যার চর্চা জাগিয়া রইল। কিন্তু যখন ইংলন্ড আয়র্লন্ড দখল করিয়া উনবিংশ শতাব্দীতে ‘ন্যাশনাল স্কুল’ প্রণালীর সুত্রপাত করিল তখন আয়র্লন্ডের স্বদেশী উন্নত শিক্ষা কাঠামো ভাঙ্গিয়া পড়িল। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘আইরিশদিগকে জোর করিয়া স্যাকসনের ছাঁচে ঢালা এবং ইংরেজ করিয়া তোলাই ন্যাশনাল স্কুল-প্রণালীর মতলব ছিল। ফলে এই চেষ্টার ব্যর্থতা প্রমাণ হল। ভালোই বল আর মন্দই বল, প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে এমন ভিন্ন করিয়া গডিয়াছেন যে এক জাতকে ভিন্ন জাতের কাঠামোর মধ্যে পুরিতে গেলে সমস্ত খাঁপছাড়া হইয়া যায়।’ ফলে যা হবার তাই হল। ‘আইরিশভাষী ছেলেরা বুদ্ধি এবং জিজ্ঞাসা লইয়া বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিল, আর বাহির হইল পঙ্গু মন এবং জ্ঞানের প্রতি বিতৃষ্ণা লইয়া।’

    জাতীয় শিক্ষাপরিষদের সদস্যরা তাঁকে স্কুল-বিভাগের একটি গঠনপত্রিকা তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছিল। ‘শিক্ষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন যে কাজটি সহজ নয়। ‘জাতীয়’ বলতে কী বোঝায়, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা চাই, কিন্তু কী চাই, তাহা বাহির করা যে সহজ তাহা মনে করি না। এই সম্বন্ধে সত্য-আবিষ্কারের ‘পরেই আমাদের উদ্ধার  নির্ভর করে। যদি ভুল করি— যেটা হাতের কাছেই  আছে, আমরা যেটাতে অভ্যস্ত, জড়ত্ববশত যদি সেইটাকেই সত্য মনে করি, তবে বড়ো বড়ো নাম আমাদিগকে বিফলতা থেকে রক্ষা করিতে পারিবে না।’ তারপরেই বলছেন, ‘যদি শিক্ষিত সমাজের প্রচলিত সংস্কারের সঙ্গে ইহার বিরোধ বাঁধে তবে ইহা গ্রাহ্য হইবে না, জানি।’ ইস্কুল বলতে তিনি মনে করেন ‘একটা শিক্ষা দিবার কল। মাস্টার এই কারখানার একটা অংশ। সাড়ে দশটার সময় ঘণ্টা বাজাইয়া কারখানা খোলে। কল চলিতে আরম্ভ হয়, মাস্টারেরও মুখ চলিতে থাকে। চারটের সময় কারখানা বন্ধ হয়, মাস্টার-কলও তখন মুখ বন্ধ করেন; ছাত্ররা দুই-চার পাতা কলে-ছাঁটা বিদ্যা লইয়া বাড়ি ফেরে।… কলের একটা সুবিধা, ঠিক মাপে, ঠিক ফর্মাশ-দেওয়া জিনিষটা পাওয়া যায়; এক কলের সঙ্গে আর-এক কলের উৎপন্ন সামগ্রীর বড়ো একটা তফাত থাকে না, মার্কা দিবার সুবিধা হয়।’

    ‘কিন্তু এক মানুষের সঙ্গে আর-এক মানুষের অনেক তফাত। তবু মানুষের কাছ হইতে মানুষ যাহা পায় কলের কাছ হইতে তাহা পাইতে পারে না।’ কল ‘তেল দিতে পারে, কিন্তু আলো জ্বালাইবার সাধ্য তাঁহার নাই।’ স্কুলে আমরা যা শিখি, তার সঙ্গে জীবনের, আশেপাশের, বাড়ীঘরের ও মানুষের সঙ্গে কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই স্কুল বলতে রবীন্দ্রনাথের চোখে ভেসে ওঠে যা মনোহর নয়, তা ‘বারিক, পাগলাগারদ, হাসপাতাল বা জেলেরই এক গোষ্ঠিভুক্ত।’ তাই তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকদিন হইল একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করিয়াছি; তাঁহার পরে বৎসরে বৎসরে বিলাপ করিয়া আসিতেছি দেশের লোক বিজ্ঞানশিক্ষায় উদাসীন। কিন্তু  একটা বিজ্ঞানসভা স্থাপন করা এক, আর দেশের লোকের চিত্তকে বিজ্ঞানশিক্ষায় নিবিষ্ট করা আর। সভা ফাঁদিলেই তাঁহার পরে দেশের লোক বিজ্ঞানী হইয়া উঠিবে, এরূপ মনে করা ঘোর কলিযুগের কল-নিষ্ঠার পরিচয়।’ (চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩২৫)।

    শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ

    তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের বলিষ্ঠ কণ্ঠ ছিলেন। তিনি পাদ্রী এডাম সাহেবের তিনটি শিক্ষা রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেন। মেকলে যখন ইংরেজি ভাষার সিঁডিভাঙ্গা শিক্ষা কাঠামোর প্রস্তাব করছেন, তখন বড় লাট উইলিয়াম বেন্টিকের নির্দেশে এডাম সাহেব তিনটি বড় রিপোর্ট পেশ করেন ১৮৩৫-৩৮ সালের মধ্যে। সেখানে তিনি দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছিলেন যে জনগণকে যদি শিক্ষিত করে তুলতে হয়, তাহলে তা কেবল জনগণের মুখের ভাষার মাধ্যমেই তা সম্ভব। ইংরেজ আসার আগে এদেশের প্রতিটি গ্রামে সাধারণ জ্ঞান দেবার জন্য একলক্ষ পাঠশালা ছিল। কিন্তু মেকলের চাপে পড়ে বেন্টিক এডামের রিপোর্টটি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে নিক্ষেপ করেন। শুরু হয় এদেশের শিল্প-কারখনার মত শিক্ষা ব্যাবস্থার ধ্বংসসাধন।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিম
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    অনেকেই অবশ্য বাংলাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আশুতোষ মুখার্জি। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘বাঙালির ছেলে ইংরেজিবিদ্যায় যতই পাকা হোক, তবু শিক্ষা পুরো করবার জন্যে বাংলা শিখতেই হবে, ঠেলা দিয়ে মুখুজ্জেমশাই বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়কে এতটা দূর পর্যন্ত বিচলিত করেছিলেন।’ (পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্টা, ৪২৩)। বাংলা ভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন, ‘একদা মধুসূদনের মতো ইংরেজি-বিদ্যায় অসামান্য পণ্ডিত এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিজাতীয় বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র এই মুখোশের ভিতর দিয়ে ভাব বাৎলাতে চেষ্টা করেছিলেন; শেষকালে হতাশ হয়ে সেটা টেনে ফেলে দিতে হল।’ (ত্বদেব, পৃ-৪২৭)। লেখাটা তিনি লিখেছিলেন ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

    আজ বাংলাদেশের  শিক্ষা  ব্যবস্থার দিকে তাকালে মনে হয় আমাদের রাষ্ট্র যদি রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শনের দিকে ফিরে তাকাতো, তাহলে হয়তো আমাদের শিক্ষার এই করুণ অবস্থা হত না। রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের দেশে যতটা জনপ্রিয়, রবীন্দ্র-চর্চা ততটাই অবহেলিত। রবীন্দ্রনাথ যা চাননি, আমরা তাই করেছি। রবীন্দ্রনাথকে আমরা কেবল পাঠ্য পুস্তকভুক্ত করে জাতীয় জীবন থেকে তাঁকে বিসর্জন দিয়েছি।

    এতে রবীন্দ্রনাথের কোন ক্ষতি হয়নি। হয়েছে আমাদের।

    মোহম্মদপুর, ঢাকা
    ৫ আগস্ট, ২০২০

  • রবীন্দ্রনাথ এবং রাষ্ট্রতন্ত্র, নেশন ও জাতীয়তাবাদ

    রবীন্দ্রনাথ এবং রাষ্ট্রতন্ত্র, নেশন ও জাতীয়তাবাদ

    • আলী রীয়াজ

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান, এমনকি তার উপন্যাসের তুলনায় তাঁর সমাজ ও সভ্যতা বিষয়ক নিবন্ধসমূহ কম আলোচিত হয়ে থাকে। কিন্ত রবীন্দ্রনাথের অন্যসব সৃষ্টির মতোই এখনও সেগুলো প্রাসঙ্গিক এবং সম্ভবত আজকের দিনে তার প্রাসঙ্গিকতা আরো বেশি। রবীন্দ্রনাথের সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তার একটি বড় দিক হচ্ছে যে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সভ্যতা বিষয়ক রচনাগুলো।

    ১৮৭৮-৮০ সালে তার প্রথম বিলেতবাসের সময় রচিত পত্রগুচ্ছ যা ভারতী সাময়িকীতে ‘য়ুরোপ প্রবাসী কোনো বঙ্গীয় যুবকের পত্র’ বলে প্রকাশিত হয় এবং যা ১৮৮১ সালে ‘য়ুরোপপ্রবাসীর পত্র’ হিসবে গ্রন্থাকারে ছাপা হয় সেখানেই আমরা পাশ্চাত্য সভ্যতা বিষয়ে তাঁর প্রথম ধারণা ও প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হই। সেই থেকে ১৯৪১ সালে মৃত্যুর অব্যবহিত আগে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ পর্যন্ত ৬০ বছরে তিনি এই এই বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। এই সময়ে পাশ্চাত্যের দেশগুলো যেমন অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত হয়েছে, তেমনি সারা পৃথিবী জুড়ে তাঁদের উপনিবেশিক শাসনের বিস্তার ঘটিয়েছে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা।

    আর্টওয়ার্ক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    শিল্পী: দেবরাজ জানা
    সূত্র পিন্টারেস্ট

    রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার ইউরোপ সফরের সূচনায় – ১৮৯০ সালে – যদিও বিনয় করে বলেছিলেন যে, ‘আমার মতো অভাজনের পক্ষে য়ুরোপীয় সভ্যতার পরিণাম অন্বেষণের চেষ্টা অনেকটা আদার ব্যাপারীর জাহাজের তত্ত্ব নেয়ার মতো’ তথাপি এই বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি এতটা গভীর, এতটাই কৌতুহলদ্দীপক যে এতদিন পরেও আমাদের তা পাঠ করা দরকার। দীর্ঘ ৬০ বছরে বিভিন্ন সময়ে তিনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন তাতে আমরা যে বিবর্তন দেখতে পাই তা হচ্ছে প্রবল আশবাদ থেকে হতাশা, গভীর বিশ্বাস থেকে প্রবল অবিশ্বাস।

    রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন রাষ্ট্র ও নেশনকে, প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন রাষ্ট্রতন্ত্র, ন্যাশনালইজম এবং ইমপীরিয়ালইজমকে। লক্ষ্যনীয় যে, তিনি এগুলোকে চিহ্নিত করেছিলেন ক্ষতিকারক এবং ভয়াবহ বলে। এখন সারা পৃথিবী জুড়ে যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালইজমের বিস্তার ঘটেছে এবং তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় সহিংসতা এখন প্রাত্যহিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথের চোখে এই প্রবণতাগুলোর যে বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়েছিলো সেই দিকে আমরা মনোনিবেশ করতে পারি। সম্ভবত তা করা জরুরিও। এতে করে আমরা দেখতে পাবো যে সমসাময়িক কালের এই প্রবণতার উৎস কোথায় এবং তাঁর ভয়াবহতা কতটুকু।

    রবীন্দ্রনাথ যখন জাতীয়তাবাদের ত্রুটি গুলো চিহ্নিত করেন তখন রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশের সময় এবং সেই ন্যাশনালইজমের ভিত্তিতেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো। ইউরোপের দেশে দেশে এখন আবার যে চিন্তা বিকশিত হচ্ছে তা হচ্ছে তার মর্মমূলে যে এক ধরনের জাতীয়তাবাদের চিন্তাই উপস্থিত তা সহজেই চোখে পড়ে। আজকের যুগে কেবল যে রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদেরই পুনর্জীবন ঘটছে তা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদও। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ। হুমকি কেবল নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে আটকে নেই, তা বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। জাতীয়তাবাদের ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে এর উদ্ভব হয়েছিলো নিজস্বতাকে অন্যের চেয়ে বড় করে, তুলামূলকভাবে শ্রেষ্ঠ বলে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা থেকেই। পশ্চিমের এই ধারণা যখন প্রাচ্যে বিকশিত হয়েছে তখন তা বিবেচিত হয়েছে মুক্তির একটি পথ হিসেবে। ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মুক্তচিন্তার যে আদর্শ তা রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিলো, এই বিষয়ে ১৯০১ সালের আগের রচনাগুলোতে তিনি সেই কথাই বলেছেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী রচনায়ও আমরা দেখতে পাই যে তিনি পশ্চিমা সভ্যতার কিছু দিককে ইতিবাচক বলেই বিবেচনা করেছেন। ‘সফলতার সদুপায়’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন–

    ভারতবর্ষে একচ্ছত্র ইংরেজ-রাজত্বের প্রধান কল্যাণই এই যে, তাহা ভারতবর্ষের নানা জাতিকে এক করিয়া তুলিতেছে। ইংরেজ ইচ্ছা না করিলেও এই ঐক্যসাধন-প্রক্রিয়া আপনা-আপনি কাজ করিতে থাকিবে। নদী যদি মনেও করে যে, সে দেশকে বিভক্ত করিবে, তবু সে এক দেশের সহিত আর-এক দেশের যোগসাধন করিয়া দেয়, বাণিজ্য বহন করে, তীরে তীরে হাট-বাজারের সৃষ্টি করে, যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত না করিয়া থাকিতে পারে না। ঐক্যহীন দেশে এক বিদেশী রাজার শাসনও সেইরূপ যোগের বন্ধন। বিধাতার এই মঙ্গল অভিপ্রায়ই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকে মহিমা অর্পণ করিয়াছে।

    একার্থে রবীন্দ্রনাথ কার্ল মার্ক্সের মতোই ইংরেজকে ভারতে উজ্জীবনের শক্তি এবং ইতিহাসের অচেতন শক্তি বলে বিবেচনা করেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৬ সালে তিনি যখন ন্যাশনালইজম-এর সমালোচনায় মুখর, সেই সময়ে জাপানে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন–

    I must not hesitate to acknowledge where Europe is great, for great she is without doubt. We cannot help loving her with all our heart, and paying her the best homage of our admiration,—the Europe who, in her literature and art, pours out an inexhaustible cascade of beauty and truth fertilizing all countries and all time; the Europe who, with a mind which is titanic in its untiring power, is sweeping the height and the depth of the universe, winning her homage of knowledge from the infinitely great and the infinitely small, applying all the resources of her great intellect and heart in healing the sick and alleviating those miseries of man which up till now we were contented to accept in a spirit of hopeless resignation; the Europe who is making the earth yield more fruit than seemed possible, coaxing and compelling the great forces of nature into man’s service. Such true greatness must have its motive power in spiritual strength.

    কিন্ত রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের এই শক্তিকে রাষ্ট্রতন্ত্র বা ন্যাশনালইজমের মধ্যে নয়, দেখেছেন তাঁর আত্মার শক্তির ভেতরে। ‘সমাজভেদ’ প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতা বিষয়ে তাঁর ধারণাগুলো আরো সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। পাশ্চাত্য এবং প্রাচ্য সভ্যতার পার্থক্য চিহ্নিত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে বিষয়ের ওপরে জোর দিয়েছেন তা হচ্ছে রাষ্ট্র প্রসঙ্গ। তিনি লিখেছেন যে, ‘রাষ্ট্রতন্ত্রই য়ুরোপীয় সভ্যতার কলেবর; এই কলেবরটিকে আঘাত হইতে রক্ষা না করিলে তাহার প্রাণ বাঁচে না। … পূর্বদেশে তাহার বিপরীত। প্রাচ্যসভ্যতার কলেবর ধর্ম। ধর্ম বলিতে রিলিজন নহে, সামাজিক কর্তব্যতন্ত্র; তাহার মধ্যে যথাযোগ্যভাবে রিলিজন পলিটিক্স সমস্তই আছে।” তাঁর এই ধারণাটি তিনি আরো বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেন ‘প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য সভ্যতা’ প্রবন্ধে। ফরাসী মনীষী গিজর মত অনুসরণ করে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার ‘মূল প্রকৃতি ও শ্রেষ্ঠত্ব’ হিসবে যাকে চিহ্নিত করেন তা হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’। আর প্রাসঙ্গিকভাবে এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন যে ভারতে ইংরেজের আগমনে ‘জ্ঞানের বন্ধনমুক্তি’ ঘটেছে। তিন মহাদেশ ব্যাপৃত যে সভ্যতা তাঁকে তিনি বলেছেন ‘মহাসভ্যতা’ “পৃথিবীতে এমন আশ্চর্য বৃহদ্‌ব্যাপার ইতিপূর্বে আর ঘটে নাই।” কিন্ত এই অভূতপূর্ব মহাসভ্যতার ঐক্যসূত্রটি হলো – রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’। “ইংলন্ডে বল, ফ্রান্সে বল, আর সকল বিষয়েই জনসাধারণের মধ্যে মতবিশ্বাসের প্রভেদ থাকিতে পারে, কিন্তু স্ব স্ব রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রাণপণে রক্ষা ও পোষণ করিতে হইবে এ সম্বন্ধে মতভেদ নাই। সেইখানে তাহারা একাগ্র, তাহারা প্রবল, তাহারা নিষ্ঠুর, সেইখানে আঘাত লাগিলেই সমস্ত দেশ একমূর্তি ধারণ করিয়া দণ্ডায়মান হয়। জাতিরক্ষা আমাদের যেমন একটা গভীর সংস্কারের মতো হইয়া গেছে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষা য়ুরোপের সর্বসাধরণের তেমনি একটি অন্তর্নিহিত সংস্কার”। আর এই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, রবীন্দ্রনাথ অনুমান করলেন, ‘তাহার অপেক্ষা উচ্চতর ভাবকে হনন’ করতে উদ্যত হয়েছে। সেই উচ্চতর ভাবটি হচ্ছে মানবধর্ম – “রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে য়ুরোপীয় সভ্যতা এতই আত্যন্তিক প্রাধান্য দিতেছে যে, সে ক্রমশই স্পর্ধিত হইয়া ধ্রুবধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করিতে উদ্যত হইয়াছে।” রবীন্দ্রনাথ আশংকা প্রকাশ করলেন যে, “য়ুরোপীয় সভ্যতার মূলভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ যদি এত অধিক স্ফীতিলাভ করে যে, ধর্মের সীমাকে অতিক্রম করিতে থাকে, তবে বিনাশের ছিদ্র দেখা দিবে এবং সেই পথে শনি প্রবেশ করিবে।”

    এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতার আরেকটি মৌলিক ধারণা বিষয়ে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন, তা হচ্ছে ‘নেশন’। রবীন্দ্রনাথ নেশন শব্দটির কোনো বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করেননি, ইচ্ছে করেই। কেননা ‘নেশন’-এর ধারণাটি পাশ্চাত্য থেকে আহরিত; রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “‘নেশন’ শব্দ আমাদের ভাষায় নাই, আমাদের দেশে ছিল না। সম্প্রতি য়ুরোপীয় শিক্ষাগুণে ন্যাশনাল মহত্বকে আমরা অত্যাধিক আদর দিতে শিখিয়াছি। অথচ তাহার আদর্শ আমাদের অন্তঃকরণের মধ্যে নাই। আমাদের ইতিহাস, আমাদের ধর্ম, আমাদের সমাজ, আমাদের গৃহ, কিছুই নেশন-গঠনের প্রাধান্য স্বীকার করে না”। শুধু তাই নয় রবীন্দ্রনাথ নেশন-এর চেতনার মধ্যে আবিষ্কার করলেন এক ধরনের নিষ্ঠুরতা – “পনেরো-ষোলো শতাব্দী খুব দীর্ঘকাল নহে। নেশনই যে সভ্যতার অভিব্যক্তি তাহার চরম পরীক্ষা হয় নাই। কিন্তু ইহা দেখিতেছি, তাহার চারিত্র-আদর্শ উচ্চতম নহে। তাহা অন্যায় অবিচার ও মিথ্যার দ্বারা আকীর্ণ এবং তাহার মজ্জার মধ্যে একটি ভীষণ নিষ্ঠুরতা আছে”।

    নেশন বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ধারণার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা আমরা পাই তাঁর ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে। যদিও ফরাসী ভাবুক আর্নেস্ট রেনা’র আদর্শে লেখা এই প্রবন্ধ ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’ ব্যাখ্যার ভূমিকা মাত্র, তথাপি সেখানে রবীন্দ্রনাথ নেশনকে যে ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন সেখানে আমরা পশ্চিমা সভ্যতার এই উপাদান বিষয়ে তাঁর অবস্থান বুঝতে সক্ষম হই। রবীন্দ্রনাথ দেখালেন যে, “জাতি ভাষা বৈষয়িক স্বার্থ ধর্মের ঐক্য ও ভৌগোলিক সংস্থান নেশন-নামক মানস পদার্থ সৃজনের মূল উপাদান নহে”। তাঁর মতে এই মানস-পদার্থের উপাদান দুটি – “অতীতে সকলে মিলিয়া ত্যাগ দুঃখ-স্বীকার এবং পুনর্বার সেইজন্য সকলে মিলিয়া প্রস্তুত থাকিবার ভাব হইতে জনসাধারণকে যে একটি একীভূত নিবিড় অভিব্যক্তি দান করে তাহাই নেশন”। নেশন বিষয়ে তাঁর এই ধারণার আলোকেই তিনি ভারতের সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যদিকে তিনি দেখিয়েছেন যে, পাশ্চাত্যে নেশনতন্ত্র কি করে এক ভয়াবহ উদগ্র রূপ লাভ করছে। ‘বিরোধমূলক আদর্শ’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন পাশ্চাত্যে এই নেশনতন্ত্র তৈরি করেছে অন্ধত্ব, অবিচার ও নিষ্ঠুরতা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–

    অন্ধতা নেশনতন্ত্রেরই মূলগত ব্যাধি। মিথ্যা দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হউক, নিজেদের কাছে নিজেকে বড়ো করিয়া প্রমাণ করিতেই হইবে এবং সেই উপলক্ষে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতে হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা প্যাট্রিয়টিজ্‌মের প্রধান অবলম্বন। গায়ের জোর, ঠেলাঠেলি, অন্যায় ও সর্বপ্রকার মিথ্যাচারের হাত হইতে নেশনতন্ত্রকে উপরে তুলিতে পারে, এমন সভ্যতার নিদর্শন তো আমরা এখনো য়ুরোপে দেখিতে পাই না।পরস্পরকে যথার্থরূপ জানাশুনা কেমন করিয়া সম্ভব হইবে। নেশনের মেরুদণ্ডই যে স্বার্থ। স্বার্থের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী, এবং স্বার্থের সংঘাতে মানুষকে অন্ধ করিবেই। ইংরাজ যদি সুদূর এশিয়ায় কোনোপ্রকার সুযোগ ঘটাইতে পারে ফ্রান্স্ তখনই সচকিত হইয়া ভাবিতে থাকিবে, ইংরাজের বলবৃদ্ধি হইতেছে। প্রত্যক্ষ সংঘাত না হইলেও পরস্পরের সমৃদ্ধিতেও পরস্পরের চিত্তকে বিষাক্ত করে। এক নেশনের প্রবলত্ব অন্য নেশনের পক্ষে সর্বদাই আশঙ্কাজনক। এ স্থলে বিরোধ, বিদ্বেষ, অন্ধতা, মিথ্যাপবাদ, সত্যগোপন, এ-সমস্ত না ঘটিয়া থাকিতে পারে না।

    বিংশ শতাব্দীর সূচনায় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছিলেন যে, ইউরোপকে “তাহার ন্যাশনালত্বের ব্যাধি, অতিমেদস্ফীতির স্থায় তাহার হৃদয়কে, তাহার মর্মস্থানকে, তাহার ধর্মনীতিকে আক্রমণ করিতেছে”।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কাছে এই বিষয় মোটেই অস্পষ্ট ছিলো না যে তার সূচনা হয়েছে পাশ্চাত্যের নেশন তন্ত্র বা ন্যাশনালইজম থেকে। ভয়াবহ যুদ্ধের বিভীষিকার এই সময়েই তিনি এই কথাটি বলতে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানে। ১৯১৬ সালে জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে তিনি যে সব বক্তৃতা দেন তা প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে Nationalism শিরোনামের গ্রন্থে। এই সব বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিলো একটাই– ন্যাশনালইজমের যে একটি ভয়াবহ রূপ আছে তা তুলে ধরা, এর ভেতরেই যে সভ্যতার অবমাননার, ধ্বংসের বীজ আছে সেই বিষয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। এই গ্রন্থে আছে তিনটি নিবন্ধ– Nationalism in the West, Nationalism in Japan, Nationalism in India। তৃতীয় লেখাটি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়েই লেখা।

    এই শতকের শুরু থেকে নেশনতন্ত্র বিষয়ে তিনি যে সব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন তাঁর সমন্বিত রূপ হচ্ছে তাঁর এই নিবন্ধগুলো। তাঁর এই সব লেখায় তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার ইতিবাচক দিক বা অবদানকে অস্বীকার করলেন না, কিন্ত সুস্পষ্টভাবেই বললেন যে ইউরোপের মহত্ব যেমন আছে তেমনি আছে তাঁর ক্ষুদ্রতা – ‘Europe is supremely good in her beneficence where her face is turned to all humanity; and Europe is supremely evil in her malefic aspect where her face is turned only upon her own interest, using all her power of greatness for ends which are against the infinite and the eternal in Man.’

    কিন্ত তাঁর প্রধান বক্তব্যই হল ন্যাশনালইজমের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, “The Nation, with all its paraphernalia of power and prosperity, its flags and pious hymns, its blasphemous prayers, in the churches and its literary mock thunders of its patriotic bragging, cannot hide the fact the Nation is the greatest evil of the Nation, that all of its precautions are against it… its one wish is to trade on the feebleness of the rest of the world.” যুদ্ধের দিকে অঙ্গুলি সংকটে করে তাঁর বক্তব্য ছিলো –This European war of Nations is the war of retribution. Man, the person, must protest for his very life against the heaping up of things where there should be the heart, and systems and policies where there should flow living human relationship. The time has come when, for the sake of the whole outraged world, Europe should fully know in her own person the terrible absurdity of the thing called the Nation. … The Nation has thriven long upon mutilated humanity.”

    ভারতে ন্যাশনালইজমের প্রসঙ্গ আলোচনায় তিনি একে ভয়াবহ বলেই চিহ্নিত করলেন – “Nationalism is a great menace, it is the particular thing which for years has been at the bottom of India’s troubles. And in as much as we have been ruled and dominated by a nation that is strictly political in its attitude, we have tried to develop within ourselves, despite our inheritance from the past, a belief in our eventual political destiny.” রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে তাঁর এই বক্তব্য কোনো বিশেষ জাতির বিরুদ্ধে নয়, বরঞ্চ জাতির ধারণার বিরুদ্ধেই – “I am not against one nation in particular, but against the general idea of all nations.”

    রবীন্দ্রনাথ নেশন এবং ন্যাশনালইজম বা জাতীয়তাবাদের যে অন্ধত্বের কথা বলেন সেখানে এই সব ধারণা এবং আদর্শ একটি দেশের ভেতরেই কীভাবে বিভক্তি এবং অসহিষ্ণুতার জন্ম দিতে পারে তার ইঙ্গিত থাকলেও তা বিস্তারিত ভাবে আলোচিত নয়। কিন্ত যদি নেশন এবং জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের মর্মবাণী আমরা উপলব্ধি করতে পারি তবে সেটা বুঝতে অপারগ হবারও কোনো কারণ নেই।

    আজকের দিনে, সারা বিশ্বেই যখন উগ্র জাতীয়তাবাদের লেলিহান শিখার বিস্তার দেখতে পাই, যখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে – ভারতে, বাংলাদেশে, শ্রীলংকায় – আমরা দেখতে পাই নেশনের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে এমন সব শক্তির উত্থান ঘটছে যা মানবিক মর্যাদাকে পদদলিত করছে সেই সময়ে আমাদের এই বিষয়ে কেবল উপলব্ধি করাই যথেষ্ট নয়। আমাদের করণীয় কী তাও রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই জানতে পারি ‘for the sake of humanity we must stand up and give warning to all, that this nationalism is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age, eating into its moral vitality.’

    বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন, এক শতাব্দী পরে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তা আমাদের স্মরণ করা দরকার, আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা সেইখানেই।

    সম্পাদকীয় নোট: হৃদবাংলা: বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সমাবেশ ২০১৯ স্মারক সংকলনে প্রথমে প্রকাশিত।

  • অরুন্ধতী রায়।। প্রতিরোধের এনজিওকরণ

    অরুন্ধতী রায়।। প্রতিরোধের এনজিওকরণ

    • অনুবাদ: পূজা রায়

    গণআন্দোলনের সম্মুখে যে বিপত্তি উপস্থিত তা হচ্ছে প্রতিরোধের এনজিওকরণ। আমি যা বলতে যাচ্ছি তাকে সমস্ত এনজিওর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক একটা অভিযোগনামা হিসেবে পেঁচিয়ে ভিন্ন অর্থ করা সহজ হবে। আর তেমনটি করা হলে এটা মিথ্যাচার হবে। ভূয়া এনজিও স্থাপন বা অনুদানের অর্থ মেরে দেয়া বা কর ফাঁকি দেয়ার মতন ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে অবশ্যই কিছু কিছু এনজিও মূল্যবান কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু, এনজিও প্রপঞ্চটিকে একটা বৃহৎ রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

    অরুন্ধতী রায়

    ১৯৮০-১৯৯০ এর দশকের শেষদিকে ভারতে অনুদানপ্রাপ্ত এনজিও’র উত্থান হয়েছিল। একই সাথে ভারতের বাজারে নিওলিবারিজমও চালু হয়েছিলো। সেই সময়ে, কাঠামোগত সামঞ্জস্যতা (structural adjustment) বজায় রাখতে ভারত রাষ্ট্র গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি, জ্বালানি, পরিবহণ এবং জনস্বাস্থ্য খাত থেকে অনুদান প্রত্যাহার করা শুরু করেছিল। আর রাষ্ট্র যেহেতু চিরাচরিত ভূমিকা পরিত্যাগ করেছিল, এনজিও তখন সেই জায়গাগুলোতে কাজ করা শুরু করেছিল। তবে এখানে তফাৎ হল, জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় তাদের বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ খুবই নগণ্য ছিল।

    বেশিরভাগ বড় বড়ো এনজিও পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে এমন কিছু সংস্থা যারা ঘুরেফিরে পশ্চিমা সরকারগুলো, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং কয়েকটি বহুজাতিক কর্পোরেশন দ্বারা অর্থায়িত হয়। এগুলো হুবুহু একই ধরনের এজেন্সি নাও হতে পারে, তবে অবশ্যই এগুলো একই আলগা রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ যা কিনা নয়া-উদারবাদী প্রকল্পের তদারকি করে এবং শুরুতেই সরকারি ব্যয় কমানোর তাগদা দেয়।

    আর্টওয়ার্ক: নিও-ইকোনোমি
    শিল্পী: তিয়াগো হোসেল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এখন কথা হলো, এই সংস্থাগুলি কেন এনজিওগুলোকে অর্থায়ন দেয়? এটি কি কেবল পুরানো ধাঁচের মিশনারি উদ্দীপনা? নাকি অপরাধবোধ? এটি আসলে তার চেয়েও কিছুটা বেশি। এনজিওগুলো ধারণা দেয় যে, তারা পশ্চাদপসরণকারী রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করছে। তারা তা করছেও কিন্তু সেটি আদতে নিষ্ফল পদ্ধতিতে। তাদের আসল অবদান হলো তারা রাজনৈতিক ক্ষোভকে হ্রাস করছে এবং জনগণের প্রাপ্য অধিকারগুলোকে সহায়তা বা দানশীলতা হিসাবে বণ্টন করছে। তারা জনসাধারণের মানসিকতা পরিবর্তন করছে, যা কিনা জনগণকে নির্ভরশীল শিকারে পরিণত করে এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের তীব্রতাকে ভোঁতা করে দেয়। এনজিওগুলো সরকার এবং জনসাধারণের, সাম্রাজ্য এবং তার প্রজাদের মধ্যে নিরপেক্ষ একধরনের অবস্থান তৈরি করেছে। তারা হয়ে উঠেছে সালিশকারী, ব্যাখাদানকারী এবং সুবিধাদাতা।

    শেষ পর্যন্ত এনজিওগুলি যাদের জন্য কাজ করে তাদের কাছে নয় বরং তাদের অনুদানকারীদের কাছে দায়বদ্ধ। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের ভাষায় তাদেরকে “ইনডিকেটর স্পেসিস” বলা যায়। আসলে নিওলিবারেলিজম দ্বারা সৃষ্ট বিপর্যয় যত বেশি, এনজিওগুলির প্রাদুর্ভাব ততো বেশি। এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দেশকে আক্রমণ করা এবং বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে  সেই দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য এনজিও তৈরি করার প্রস্তুতি একই সাথে চলে। এনজিওগুলোর অর্থায়ন যেন ঝুঁকিতে না পড়ে এবং যে দেশেগুলোতে তারা কাজ করতে চায় সেখানকার সরকার যেন তাদেরকে কাজ করার অনুমতি দেয়, সেজন্য এনজিওগুলোকে তাদের কাজকারবারকে সংকীর্ণ পরিসরে এবং কমবেশি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করেই উপস্থান করতে হয়।

    দরিদ্র দেশ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলির অরাজনৈতিক (এবং, তাই চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক) প্রতিবেদনগুলো [অন্ধকারচ্ছন্ন] দেশগুলোর [অন্ধকারচ্ছন্ন] জনগণকে এমন অসহায় রূপে প্রকাশ করে যেন মনে হবে, আরো একজন অপুষ্ট ভারতীয়, আরো একজন অনাহারী ইথিওপিয়ান, আরো একজন আফগান শরণার্থী, আরো একজন হতাশ সুদানিয়ান… সকলেই শ্বেতাঙ্গ মানুষের সহায়তার জন্য বসে আছে। তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপগুলোকে শক্তিশালী করে এবং পশ্চিমা সভ্যতার কৃতিত্ব, স্বাচ্ছন্দ্য এবং মমত্ববোধ প্রচার করে। এদেরকে আসলে বলা যায় আধুনিক বিশ্বের সেকুলার মিশনারি।

    আর্টওয়ার্ক: কিসান মার্চ
    শিল্পী: মলি ক্রবাপেল
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    অবশেষে, যেহেতু দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থনীতিতে ফটকা পুঁজি যুক্ত রয়েছে, এনজিও-র পুঁজি স্বল্প পরিসরে হলেও খুব সুদূরপ্রসারী সমান রাজনৈতিক ভূমিকা রাখছে। এটি এজেন্ডা নির্দেশ শুরু করে, লড়াইকে আপসে পরিণত করে, এবং প্রতিরোদের বি-রাজনীতিকরণ করে। এনজিওগুলো ঐতিহ্যগতভাবে স্ব-নির্ভর স্থানীয় জনগণের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করে। তাদের তহবিল স্থানীয় লোকজনকে বিভিন্ন কাজ যোগাড় করে দেয় যারা কিনা প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মী হতে পারতো। কিন্তু এখন তারা অনুভব করেন যে, তারা তাৎক্ষণিক সৃজনশীল কিছু একটা করছেন (এবং, এটা করতে গিয়ে তারা কিছুটা উপার্জনও করছেন)।

    বাস্তবিক রাজনৈতিক প্রতিরোধের এ জাতীয় কোনও সহজ পথ নেই। রাজনীতির এনজিওকরণ প্রতিরোধকে একটি ভদ্রস্থ, সুবিধাজনক, বেতনভুক্ত ৯টা-৫টা চাকরিতে পরিণত করার হুমকি দিচ্ছে। বোনাস হিসাবে রয়েছে কিছু সুযোগ-সুবিধা। প্রকৃত প্রতিরোধের কার্যকর পরিণতি থাকে, এবং কোনো বেতন থাকে না।

    লেখার মূল লিঙ্ক: The NGO-ization of resistance, 2014

     

  • হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    আর্টওয়ার্ক: হাগিয়া সাফিয়া
    শিল্পী: রাফায়ে জাফের
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    গেল ১৫ই জুলাই ছিল ২০১৬ সালে তুরষ্কে যে ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থানটি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল তার চতুর্থ বছর। ঐ দিনটি তুরষ্কের নিওলিবারেল রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনের বেদিতে বলীকৃত অপরিহার্য সমাপ্তি হিসেবেই গণ্য স্মরিত হবে। তুরষ্কের এই নব্যগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালের ক্যু-এর সাথে যা ১৯৯০ সালে আরো কিছুটা ভিত্তি পায়, এবং প্রক্রিয়াটি অবশেষে বড় পরিসরে হলেও শেষ হয় ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)’র মাধ্যমে।

    তুরষ্কের বুর্জোয়া ও অভিজাত শ্রেণি যারা রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রাথমিক ভাবে সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব বা প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাদের ভেতর ১৯৮০’র দশকে একটি আমূল রূপান্তর ঘটে যা আন্তর্জাতিক পুঁজির সাথে সঙ্গতি রেখেই সাধিত হয়েছিল। এই রূপান্তর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পতন ঘটায় যা কিনা লাঠির গায়ে লাগানো ললিপপের মতই ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। চার বছর আগের ঐ দিনটি সেদিন ঘটে থাকা নানা ঘটনার ঘটনা শৃঙ্খলের থেকেও বেশি কিছু, যার অনেকটাই দ্ব্যর্থবোধক থেকে যাবে।

    এটা সেই সব ঘটনাবলীর একটি যা কিনা জোরালোভাবেই প্রতীকী এবং তুরষ্কের গত ৪০ বছরের অতীতকে প্রতিফলিত করে। অপরাধের দায়ে অভিযুক্তরা দাবি করছেন যে তারা ভুক্তভোগী। তারপর আছেন তাঁরাও যারা নিজেদের ঘটনাপ্রবাহের ধারায় নিজেদের জয়ী হিসেবে দেখাচ্ছেন। এই উভয়পক্ষেরই আছে সমাজে ধর্মকে উত্তরণের কাজের সাথে প্রত্যক্ষ সংযুক্তি- গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান ও সুস্পষ্ট ঘটনা।

    তবু জুলাই ১৫ নিছকই একটা দিন নয় যা মিল্লি গোরাস-ভিত্তিক নব্য-ইসলামী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এবং গুলেন আন্দোলনের ভেতরকার উত্তেজনার সমন্বিত রূপ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। সমাজে ধর্মের বৃদ্ধি গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কৌশলগত প্রপঞ্চগুলোর একটি। ধর্মের এই প্রসার অনেক ধ্বংস ডেকে এনেছে এবং বিদ্যমান, অন্ধকার পরিস্থিতির পরিসর বাড়িয়েছে। তবে ধর্ম শুধুই একটি ভাবাদর্শগত খোলস নয়, বরং গত ৪০বছর ধরে তুরষ্কের যে পুঁজিবাদী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তারই এক সতীর্থ যাত্রী হলো এই ধর্ম।

    আর্টওয়ার্ক: নুসায়বিন
    শিল্পী: জেহরা দোগান
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    কেনান এভরেন, ১৯৮০ সালের ক্যু’য়ের নেতা, ক্যু-উত্তর সংবিধানের অনুসমর্থন লাভের আশায় সংগঠিত র‌্যালিগুলোয় কোরান হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন ও জনতার কাছে ভোট চেয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোগান নির্বাচন এবং সাংবিধানিক গণভোট আদায়ের লক্ষ্যে কোরান হাতে বড় বড় র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন। এভরেন এবং এরদোগান তুরষ্কের অর্থনৈতিক কর্মসূচীর উত্তরণে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা সেই অর্থনৈতিক কর্মসূচী যা একই কাঠামোর ভেতরে একজন জান্তা সামরিক নেতা ও একজন নির্বাচিত নব্য-ইসলামী নেতার যুগলবন্দী উপস্থাপন করে। এই অর্থনৈতিক কর্মসূচীই একইসাথে নির্বাচিত, অনির্বাচিত এবং বলবৎকৃত অনুশীলনসমূহ একত্রিত করার সুযোগ দিয়েছে।

    বস্তুত, ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি তার নিজস্ব যাত্রাপথই অনুসরণ করেছে, মধ্যখানে ২০১৬-এর জুলাই ১৫-ও ছিল একটি আত্তীকৃত যাত্রাবিরতি মাত্র। এক নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে একটি সামরিক উত্থানকে সুকৌশলে একটি পরিপূর্ণ গণতন্ত্র-বিরোধী পাল্টা অভ্যুত্থানের চেহারা দেয়া হয়। তবু গোটা ঘটনার পরবর্তী অভিঘাতকে শুধুই নিও লিবারেল যুগের ইসলামপন্থীদের প্রবণতার মাপে মিলিায়ে নেওয়াটাও ভুল হবে।

    ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই তুরষ্কে যা ঘটেছিল তা’ সেইসব রাজনীতিবিদের ঐতিহাসিক ও ভাবাদর্শগত প্রবণতাসমূহের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ যারা এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ‘ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ’ বলেছিলেন। যাহোক, এই সঙ্গতি বা একতা কোন একতরফা প্রবণতার বিষয় নয়। তথাকথিত ‘তুর্কী-পদ্ধতির রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা’ই এই ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর শাসনামলেরও জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসের সেসব পর্বের রাজনৈতিক অনুঘটকদের ব্যক্তিগত চারিত্র্যও এই ঘটনাবলী বিশ্লেষণে যথেষ্ট নয়।

    ১৯৮০-র দশক থেকে শাসক শ্রেণি যারা এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছে এবং তুরষ্কের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বা বহি:স্থ পুঁজিবাদের ভেতরে মাঝে মাঝে বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দিয়েছে। তবে এটা বিভ্রান্তিকরও বটে। ভেহবি কোচের মুখে কেনান এভরেনের প্রশংসা থেকে তুরষ্ক ইউএসএইডের আজকের নৈ:শব্দ্য একাধারে যেমন পুরণো কাঠামোর ধীর পতনের ইঙ্গিতবাহী, একইসাথে তুরষ্কের মূল ক্ষমতাকাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলো একই রয়েছে।

    ১৯৮০-এর সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী শাসনামল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ‘সন্ত্রাস দমন’ নাম্নী ডিসকোর্সের মাধ্যমে পরিচালিত করেছে। ‘পাল্টা-অভ্যুত্থান’-এর ডিসকোর্স আজকের শাসনামলকে বৈধতার পাটাতন দিয়েছে। তবু এই শাসনামল আইন ও গণতন্ত্রের একটি সত্যিকারের শুদ্ধি অভিযান চালাতে অক্ষম যা বরং প্রকৃত ক্যু-এর পরিকল্পনাকারীদের ঈর্ষান্বিত করতে পারে।

    শুধুমাত্র একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তুরষ্কের পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থা ও অন্তর্গত অসঙ্গতির সাথে যুঝতে পারে। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র শুধুই বর্তমানের বদলগুলোর পেছনের মৌন অপরাধী নয়, অনেকসময় এটি সহায়কের কাজও করে। অতীতেও যেমন করেছে।

    আর্টওয়ার্ক: এরদোগানিজম
    শিল্পী: অ্যান্তোনিও রদ্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বর্তমানের মূল সমস্যা হলো যে তুরষ্কে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সঙ্ঘাতগুলো নানা ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে যেখানে আমাদের ‘সীমিত/নিয়ন্ত্রিত’ বুর্জোয়া গণতন্ত্র এমনকি এই পুঁজিবাদকে পরিচালনা করারও ক্ষমতা রাখে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের উদাহরণের থেকে একদম উল্টো মুখে দাঁড়িয়ে, তুরষ্কে বরং পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র পরষ্পরের সহযোগী না হয়ে বরং একে অপরের সাথে বেমানান ও বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। এরদোগান-বাহচেলী কোয়ালিশনকে সমর্থনের বদলে, তুরষ্কের পুঁজি কাঠামো তাই এই দুই নেতাকে তাদের বিদ্যমান মেরু দূরত্বে ঠেলে নিয়ে গেছে।

    মুদ্রাস্ফীতির হার গণনার ক্ষেত্রে এরদোগান সরকারের নয়া উদ্ভাবন এবং সরকারের প্রচারিত নানা অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত এমন এক স্তরে গেছে যা এই সরকারের নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠির বড় অংশটিই আর বিশ্বাস করেনা। তার সাথে চাড়া দিয়ে উঠছে প্রবল বেকারত্ব ও সর্বনাশা নানা অর্থনৈতিক নীতিমালা যা তুরষ্কের সাম্প্রতিক অতীতের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শর্তমালার অধীনে সম্ভব হতো না।

    তুরষ্কের লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্র একটি শুণ্যতা রেখে যায় যা ১৯৮০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে। একেপি এই শুণ্যতাকে ‘দাতব্য’-এর মোড়কে ভরাট করতে থাকে যা সাধারণত: ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী বিভায় আচ্ছাদিত থাকে এবং আত্ম-স্বীকৃত রাজনৈতিক বিষয়ের ক্রমাগত বেড়ে চলা ব্যক্তিগত অভয়দানের ভিত্তিতে টিঁকে থাকে। এই অনুরোধ/যোগান গতিশীলতা যা কিনা সমাজের দরিদ্রতম অংশের ভিত্তি গঠন করেছিল, বর্তমানে এর অতীত সম্ভাব্যতা এবং সক্রিয়তা থেকে বহু দূরে সরে গেছে এবং আজ এত দশক পর একেপি-র সদস্যরা নিজেরাই বুর্জোয়া হয়ে গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    অর্থনৈতিক ধসের ভেতরে সামনে তুর্কী সমাজের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করার মত যা যা আসছে, তাতে দরিদ্রদের জন্য দাতব্য সহায়তার মাধ্যমে একেপি’র অতীত গতিশীলতা অর্জনের বিষয়টি আর কাজে আসবে না।

    জনতার অধিকতর অংশকে কাজে লাগানো একেপির পক্ষে দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তাদের ‘ভোট কমে আসা’ বা ‘ভোট ক্ষয়ে’র বিষয়টি এই আলোকেই বিচার করতে হবে।

    এই প্রেক্ষিতে, সরকার তার মূল সমর্থক গোষ্ঠির জন্য কোন পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেবার মত খরুচে ও কল্পনাবিলাসী কাজে সময়ের বদলে, সম্ভাব্য সব সমালোচকের উপর খড়গ হস্তে দমন-পীড়ন শুরু করেছে। এর একটি উদাহরণ হলো দেশের আইন সমিতিগুলো বিকেন্দ্রীভূত করার একটি বিল আনা যা সম্প্রতি তুর্কী সংসদে পাশ হয়েছে। অন্য পেশাজীবী পরিষদগুলো যারা প্রস্তুত হচ্ছেন তাদের আর একটি আঘাত করার জন্য প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক বিল এরডোগান সরকারের এজেন্ডায় রয়েছে। এভাবেই নিয়োজিত অছি সরকার লাগামহীন ভাবে দেশ চালাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আইন ও নির্বাচন সংস্কারের পরিকল্পনাও চলছে।

    সামাজিক রণাঙ্গনে, সরকার কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছে যার মাধ্যমে সে তার সমর্থক ভিত্তির সবচেয়ে সক্রিয় উপাদানসমূহকে নিরাপদ রাখতে পারে। এই সক্রিয় সমর্থকরা ‘রাস্তার কাজের’ ডাকে সবচেয়ে দরকারি।  সরকারের ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ এই পরিসরের ভেতরেই মূল্যায়িত হতে পারে, একটি পদক্ষেপ যা কিনা একটি বয়সের উপরে ডানপন্থী মানসের সবার কাছে একটি ‘বিশাল অর্থ’ বহন করে এবং এই ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ সমাজের আরো জঙ্গি অংশের চোখ ভিজিয়ে দেবে। এবং সরকারের ‘পরিবার’ নীতিকে ‘উন্নততর’ করতে সরকার ইস্তাম্বুল চুক্তি বাতিল করার অভিপ্রায় পোষন রাখছে যার মাধ্যমে নারীকে পুরুষের একটি হাতের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছুই মনে হবার অবকাশ থাকবে না।

    এই সরকার আরো দাবি করতে থাকবে যে এটি সব নিয়মকানুন ও শর্তাদি বাতিল করছে যেন বর্তমান যে কঠিন সময় আমরা পার করছি সেটা ঠিক মত পার হতে পারি।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    মূলত, এই প্রবণতা থেকেই এই সরকার সময়ে সময়ে নিল্লর্জ্জ আচরণ করে এবং ‘আয়া সোফিয়া’র মত তাসগুলো পকেট থেকে বের করে। অন্য সময়ে, তারা মানুষকে ভয় দেখানো জুয়াড়ির মত ‘খিলাফত’ শব্দটি নিয়ে পড়ে থাকে। লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে সরিয়ে ফেলার ঐতিহাসিক পথ- ইতোমধ্যেই এর সঙ্কুচিত আয়তন সত্ত্বেও- মূলত প্রশস্ত করা হয়েছিল ১৫ই জুলাইয়ের পর। ১৫ই জুলাইয়ে প্রদত্ত সব বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা যা কিনা ‘গণতন্ত্র এবং জাতীয় অভিপ্রায়’কে উদযাপন করেছে- সেই যাবতীয় বক্তৃতার আড়ালে ছিল বর্তমান তুরষ্কের রাষ্ট্রচালকদের রাষ্ট্রচালনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সঙ্কট। আর এটি এখন এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।

    তুরষ্কের বিদ্যমান ইসলামি-জাতীয়তাবাদী জোট বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হুট করে ঘাড়ের উপর এসে বসা কোন রাজনৈতিক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নয়। বরঞ্চ এটা গত ৪০ বছর ধরে তুরষ্কের পুঁজিবাদের একটি জৈব ফসলই বলা যায়। একটি কার্যকারণমূলক সম্বন্ধ যা থেকে এই ইসলামী-জাতীয়তাবাদী জোট অনেক সুবিধা এবং তার জনসমর্থনের বিপুল অংশটি লাভ করে, একইসাথে এর ‘একিলিসের গোড়ালি’ও বটে।

    মূল লেখা দেখুন এখানে

  • কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    অনুবাদ: জাকির হোসেন

    প্রথম কিস্তি

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বতন্ত্র ও বিকশিত শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: লিবার্টি লিডিং দ্য পিপিল
    শিল্পী: ইউজিন ডেলাক্রইক্স
    সূত্র: উইকিআর্ট

    গণতন্ত্রের সমস্যা    

    ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে কিছু মানুষ যে শাসন করার জন্যই জন্মায় এমনতর  ধারণাটির বিলোপ সাধিত হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং শক্তিশালী রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তার জায়গা দখল করে ‘মানুষ এবং নাগরিকের অধিকারসমূহের ঘোষণা’য় বর্ণিত আইনগত  সাম্য এবং ব্যক্তি মানুষের কতিপয় অধিকার।

    নতুন এই অধিকারগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল একটি বৃহৎ সামাজিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। গ্রহণযোগ্যতা পাবার পর এই অধিকারগুলোই ছিল ফরাসি বিপ্লবের সত্যিকারের ছাপ। সে সময় থেকে উক্ত আইনসমূহ এবং আইন তৈরির প্রক্রিয়ার পুরোটাই ছিল সেই ‘সাধারণ ইচ্ছা’র বহিঃপ্রকাশ। বিষয়টি এমন যেন, কথিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ মাফিক সেই আইনগুলো অনুমোদিত বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। সে সময়ের এই বৈশিষ্ট্যটিই তাকে অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে আলাদা করে ফেলে।

    ফরাসি বিপ্লবের সময়েও ‘সাধারণ ইচ্ছার’ ধারণাটি রাজনীতিতে নতুন ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারপরেও ভবিষ্যতের জন্য এর প্রভাব নির্ণয় করা মোটেই কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। ষাট বছর পূর্বের ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ঠিক এই বিতর্কগুলোই সামনে এসেছিল। রাজতন্ত্রকে যদি বিদায় দেওয়া হয়, তবে কোন ধরণের সমাজ এর জায়গা দখল করবে? ঠিক কোন উপাদানগুলো নিয়ে ‘সাধারণ ইচ্ছা’ গঠিত হয়? এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কে বা কারা ‘সাধারণ ইচ্ছা’র আইন প্রয়োগ করবে?

    পুৎনি বিতর্কের সময় রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে সিংহাসনচ্যুত করতে লড়াই করা শক্তিগুলোর মধ্যে ঠিক এই বিষয়গুলো নিয়েই তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা অলিভার ক্রমওয়েল এবং অন্যান্যরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটানো উচিত। কিন্তু তারা একইসাথে এটিও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজ পরিচালনার ভার কোনো একজন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। একজন রাজার ক্ষমতা তার জন্মগত অধিকার বলে মনে করা হতো। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় তারা একটি নতুন কাঠামোগত উপাধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন; পাছে সমাজের শাসমক্ষমতা সাধারণ মানুষের হস্তগত হয়ে যায়। সম্পদকেই হতে হতো সেই নতুন কাঠামোগত ‍উপাধির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ক্রমওয়েলের সেনাপ্রধান (হেনরি আইরিটন – অনুবাদক) যেমনটা লিখেছেন:

    আমার মতে, সাম্রাজ্যের স্থায়ী কোনো স্বার্থ জড়িত নেই এমন বিষয়গুলোতে কোনো ব্যক্তির সাম্রাজ্যের কোনো স্বার্থ ও সুবিধাদির ব্যাপারে মীমাংসা করার কোনো অধিকার নেই। ১

    তবে রাজার বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্যান্য দলগুলো এই চিন্তাকে সমর্থন করে নি। গৃহযুদ্ধের ফলে অনেকগুলো দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। লেভেলারদের মতো কিছু দল সে সময়ের বিদ্যমান সামাজিক শর্তসমূহ সম্পর্কে সচেতন ছিল। ডিগারদের মতো অন্য কিছু দল পতিত জমিগুলো দখল করে নেয় এবং সেগুলোতে গাছ রোপন করার পর সেই গাছগুলোর জন্য এবং সেখানে তাদের নিয়োগকৃত শ্রমশক্তির জন্য সেগুলোকে নিজেদের বলে দাবি করে। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংগ্রাম এই দলাদলিকে ভেতর থেকে উসকিয়ে দেয়। সে দলগুলো ছিল কর্তৃত্ববাদবিরোধী এবং তারা বেশ কিছু বিষয়ে ক্রমওয়েল এবং তার অনুগামীদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করত। প্রখ্যাত লেভেলার থমাস রেইনসবোরঘ আইরিটনের বক্তব্য খন্ডন করেন এভাবে:

    আমার মতে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্রতম ব্যক্তিরটিরও সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তির মতো যাপনযোগ্য একটি জীবন রয়েছে। এবং সে কারণে কোনো একটি সরকারের অধীনে বসবাস করতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তির সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো নিজেকেই সে সরকারের অধীনে পেশ করা। ২

    কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত দেওয়ার অধিকার থাকবে, এমন একটি ধারণার কিছু বিপজ্জনক প্রভাব ছিল। এর ফলে ‘সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ’ এবং ধনীদের স্বার্থ সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। আইরিটন আবারো বলেন:

    কোনো একজন ব্যক্তির নিজস্ব সরকার নিজেই নির্ধারণ করার যে প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন, সে অধিকার বলেই তার চোখের সামনে দৃশ্যমান যে-কোনো দ্রব্যসামগ্রীর উপর তার অধিকার বর্তায়। ৩

    কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ছিল ‘দ্রব্যসামগ্রী’। গৃহযুদ্ধকালীন ইংরেজ সমাজ ছিল বর্তমান সমাজের তুলনায় ‍অনেক বেশি দরিদ্র। তবে সে সময়ের জনসংখ্যার অনুপাতে সেখানে তারপরেও প্রচুর পরিমাণে সম্পদ মজুত ছিল। সম্পদগুলো সমানভাবে বন্টিত হয় নি। কে কোন সম্পদের মালিকানা ভোগ করছে সে বিষয়ে বিরাট অসমতা বিরাজ করছিল। উইন্সট্যানলির মতো ডিগারদের জন্য এটিই ছিল বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি লিখেন:

    … এবং গরীব মানুষেরা এই দাসত্ববন্ধনের ব্যাপারটিতেই অভিযোগ করে থাকে। তাদের ধনী ভ্রাতৃবৃন্দেরা সে সব জমি নিয়ে তাদেরকে দরিদ্র করে রেখেছে যেখানে সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত রয়েছে। ৪

    সুতরাং, ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধে রাজার শাসন বাতিল হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই অপর একটি অধিকতর একগুঁয়ে সমস্যার উৎপত্তি ঘটে। পুরোপুরি সমানাধিকার-কে স্বীকার করে নেওয়া হলে কি বিত্তবানদের সুবিধাভোগের অবসান ঘটবে না? যাইহোক, হাজার বছর আগে অ্যারিষ্টটল একটি জাজ্বল্যমান সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, “বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ।” যে-কোনো সরাসরি গণনা কিংবা গণভোটে অসংখ্য দরিদ্রের অগ্রাধিকারের সামনে কতিপয় বিত্তবানের স্বার্থ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। ঠিক এভাবেই জন্ম নেয় ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’।

    এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে বিত্তবানেরা স্বাভাবিকভাবেই পেশিশক্তির ব্যবহার করেছিল। ডিগার এবং লেভেলারদের মতো গণতন্ত্রবাদীরা এই নিয়তি বরণ করেছিল যখন তাদেরকে সামরিক কায়দায় বিক্ষিপ্ত করে ফেলা হয়েছিল। ক্রমওয়েল এবং আইরিটনের মতো ‘বিত্তায়িত’ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল। তারা একটি নতুন আইনসভার মাধ্যমে শাসনকাজ পরিচালনা করেছিল এবং বিপুল পরিমাণে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। একই সময়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল দরিদ্ররা। ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডে ভ্রমণকালে একজন পর্যবেক্ষক লিখেছেন:

    এই দ্বীপটি শাসিত হয় এমন সকল ব্যক্তির প্রভাবের ছায়ায়, যারা বাস করে প্রাচুর্যের মধ্যে। তাদের ভাড়াটিয়া এবং পরিচারকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিশোধ করা ভাড়ার উপর তারা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করে। প্রত্যেকেই নিজেদের ভূ-সম্পদের সীমানার মধ্যে রাজপুত্রের মতো আচরণ করে। তারা সকলেই সেখানে পুরোপুরি সার্বভৌম। তাদের সেবায় নিয়োজিত পরিচারক এবং শ্রমিকেরা ছিল ক্রীতদাসের সমজাতীয়। তাদের ভাড়াটিয়ারা মূলত স্বাধীন হলেও তারা প্রজা শ্রেণির মধ্যে পড়ে। ৫

    ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মতো ফরাসি বিপ্লবও স্বল্প মেয়াদে সামাজিক গঠন প্রক্রিয়ার উপর সীমিত আকারের প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফরাসি রাজতন্ত্র মারাত্মকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণি। বণিক এবং ব্যাংকারেরা ছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তারা বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় বেশকিছু ধারণা এবং বুদ্ধিবৃত্তির যোগান দিয়েছিল। বহুদিন ধরে তারা দুর্নীতিবাজ রাজার চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য করের বোঝা বহন করে যাচ্ছিল। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল হিসেবে তাদের হাতে ক্ষমতার লাগাম চলে আসে। তারা আইনকে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থানুযায়ী পরিবর্তিত করে ফেলে।

    আর্টওয়ার্ক: স্টর্মিং দ্য বাস্তিল
    শিল্পী: জ্যা পিয়েরে হোউয়েল
    সূত্র: উইকিআর্ট

    তবে ফরাসি বিপ্লব চূড়ান্তভাবে অন্যান্য বিপ্লব হতে আলাদাও ছিল। একটি দিক দিয়ে এর সামগ্রিক কিছু ফলাফল রয়েছে। প্রথমত, ‘এটিই হলো একমাত্র বিপ্লব যার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে একটি করে সামাজিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।’ ৬ জনগণই ছিল এই বিপ্লবের সফলতার প্রাথমিক চালিকাশক্তি। ক্ষমতার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপস্থিত থেকে তারা একে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এটি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিপীড়িতদেরকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছিল। তবে এই বিপ্লব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দিয়েছিল। সেটি হলো, যখন উপরমহল থেকে সংস্কারকার্য ব্যর্থ হয়, তখন নিচে থেকে বিপ্লব উপকারী বলে বিবেচিত হতে পারে। অংশত এই বিপ্লবের ফল হিসেবে পুরো ইউরোপ জুড়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

    ফরাসি বিপ্লব নির্দিষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় আরেকটি কারণে। এটি সংঘটিত হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। সার্বিকভাবে সমাজে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আঠারো শতকের ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে আনুমানিকভাবে সম্পদের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। যন্ত্রপাতি এবং শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে সম্পদের বৃদ্ধি খুব দ্রুতগতিতে ত্বরান্বিত হয়।

    ইংল্যান্ডের উপযুক্ত পরিবেশে শিল্পবিপ্লব সূচিত হয়ে ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলক দ্রুততার সাথে তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ‘ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে প্রকৃতঅর্থে শিল্প-কারখানার রূপান্তরের পরিমাণ ছিল অল্প। স্পেন, পর্তুগাল, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং পুরো বলকান ‍উপদ্বীপজুড়ে একশ মাইলের কিছু বেশি রেললাইন দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল…।৭ কিন্তু ‘তারপরেও প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।’৮

    এর অর্থ দাঁড়ায় ‘বিত্তবান এবং সুবিধাভোগীদের’ সম্পদ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বৃদ্ধির পরিমাণ কেমন ছিল তা প্রায়ই সঠিকভাবে বোঝা যায় না। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম সেই সময়ের ব্রিটেনে রেলপথ নির্মাণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমাদের সে সংক্রান্ত একটি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। দুই দশকের ব্যবধানে কয়েক মাইল হতে (১৮২০ সালে) ৪,৫০০ মাইল (১৮৪০ সালে) এবং পরবর্তী সময়ে ২৩,৫৫০ মাইল (১৮৫০ সালে) রেলপথ নির্মিত হয়। তিনি এই বিশালাকার উদ্যোগের পেছনে লগ্নি করা অর্থের উৎসের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ’‘ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব চলাকালীন প্রথম কয়েকটি প্রজন্ম সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক সত্যটি হলো তারা খুব দ্রুততার সাথে এতো বিপুল পরিমাণে অর্থ উপার্জন করেছিল যে সেগুলো ব্যয় এবং লগ্নি করার ক্ষেত্রে তা সম্ভাব্য সবধরণের অনুমানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।৯  তারপর যখন ১৮৩৫-৩৭ সালে এবং ১৮৪৪-৪৭ সালে দুই দফায় কথিত ‘উন্মক্ত রেলশিল্প’ ইংল্যান্ডে আঘাত হানে, তখন ‘কল্পনাবিলাসী উন্মাদেরা’ রেলশিল্পের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগে মনোনিবেশ করে ।

    উক্ত বাঞ্চনীয় পরিস্থিতি অসংখ্য শ্রমিক জনতার অবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। তাদের কাজ ছিল মূলত এই ধরণের ‍উদ্যোগের পেছনে শ্রম ব্যয় করা। তাদের জন্য ‘অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নতুন রূপান্তর দুর্ভোগ এবং অসন্তোষের সৃষ্টি করে।’১০ বিত্তহীনেরা তাদের অবস্থার কারণে প্রলেতারিয়েত হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রলেতারিয়েতরা তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে নি। ‘শ্রমিকদেরকে কারখানার উপযোগী পন্থায় কাজ করা শিখতে হয়েছিল। তাদেরকে অর্থনৈতিক প্ররোচনার প্রতি সংবেদনশীল হতেও শিখতে হয়েছিল।১১  শুরুর কয়েকটি প্রজন্মের শ্রমিকদেরকে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তারা এই ব্যবস্থা পছন্দও করে নি। শ্রমিকদের পক্ষ ‍থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রতিরোধের খবর পাওয়া যায়।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রেভ্যুলিউশন অব ১৮৪৮
    সূত্র: প্রিজমা আর্কাইভ

    হবসবম উল্লেখ করেন, ‘এই পরিস্থিতির সমাধান খোঁজা হয় শ্রমিকদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালনের মধ্যে। সর্বোপরি এমন একটি চর্চা শুরু হয় যেখানে শ্রমিকদের এতোই স্বল্প পরিমাণে মজুরি দেওয়া হয় যে তাদের কোনোমতে টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম উপার্জন নিশ্চিত করতে ক্রমান্বয়ে পুরো সপ্তাহজুড়ে পরিশ্রম করতে হয়।’১২  তাতে করে কোনো একজন শ্রমিকের পুরো পরিবারকেই কাজ করতে হয়। ১৮৩৪-৩৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের তুলা কারখানাগুলোতে সবগুলো শ্রমিকের মধ্যে ‘চারভাগের একভাগ ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, অর্ধেকই ছিল নারী, বালিকা এবং আঠারো বছরের নীচে থাকা বালকেরা’১৩ ১৮৪০ সালের পশ্চিম ইউরোপে‘শিল্পায়নের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সামাজিক সমস্যাসমূহ এবং বিপদজনক নগরায়নের দুঃস্বপ্নগুলো উপস্থিত ছিল ভয়াবহ মাত্রায়। সেগুলো মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।’ ১৪

    একটু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে সময়ের ইউরোপ ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের দ্বারা প্রকম্পিত হয়েছিল। ইতালি, ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরিতে উদারনীতিবাদীরা নিজেদের দেশের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। ‘প্যারিস ও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের শ্রমিক’দের পক্ষ থেকে গুরুতর প্রকৃতির স্বাধীন দাবি-দাওয়া ‍উঠতে থাকে। ‘সামাজিক বিপ্লব’ এবং ‘লাল প্রজাতন্ত্র’ এর জন্য তীব্র দাবি ‍উঠতে থাকে। ‘তাদের এ জাতীয় দাবিগুলো সম্পত্তি এবং বাজারের নিয়মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে
    থাকে।’
    ১৫

    একটি উপযুক্ত সমাধান

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বাধীন ও বিকশিত  শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    উক্ত বিষয়টি নিয়ে সে সময় থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগীদের’ কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়। একদিকে ওজোন সম্প্রদায়, যাদের মুখপাত্র থমাস বেবিংটন ম্যাকৌলি বিশ্বাস করতেন, ‘মানবসম্প্রদায়ের মধ্যে উঁচু ও মধ্যম সারির লোকেরা প্রাকৃতিকভাবেই পুরো মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।১৬ তিনি দরিদ্র ও বিত্তহীনদেরকে ভোটাধিকার প্রদানের বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। ১৮৩০ এর দশকে চার্টিস্ট আন্দোলনের উত্থানের সাথে সাথে ব্রিটেনে এই বিতর্কটি ইতিমধ্যেই সামনে চলে আসে। এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কোবেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তার মতে, মানুষ ভোটাধিকার চেয়েছিল ‘যাতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়, যাতে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়। এবং তা কোনো বিমূর্ত খেয়ালের পরিতৃপ্তি সাধনের জন্য নয়।১৭  ম্যাকৌলি এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক ভোটাধিকারের ধারণাকে আক্রমণ করেছেন। তার মতে, এর ফলস্বরূপ ‘বিত্তবানেরা ‘লুন্ঠিত’ হতে পারে… তাতে করে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং মানুষ বর্বরতার দিকে ফিরে যেতে পারে।’১৮

    অন্যেরা অবশ্য এতোটা অনুভূতিহীন ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক জে. এস. মিল ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। সময় যে পাল্টে গেছে, তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। তিনি লিখেন, ‘অশিক্ষিতেরা শিক্ষিতদের উপর আস্থা রাখে।১৯ এমন একটি সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। তার পরিবর্তে এমন একটি সময় এসেছে যখন ‘জনগণ দিশাহীন অবস্থায় রয়েছে এবং সমাজ সবরকমের ভূল-ত্রুটি এবং সমূহ বিপদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।২০ আলোচ্য বিপদসমূহের মধ্যে একটি ছিল সামাজিক বিপ্লব। মিল ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে কিছু একটা করার দরকার। তবে তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘুরে যাবে না।

    জেমস স্টুয়ার্ট মিল

    তিনি নিজে কোনো বিভ্রমের মধ্যেও ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের অজ্ঞতা বিশেষত তাদের স্বার্থপরতা এবং বর্বরতার ব্যাপারে আতঙ্কিত।২১ তার চোখে নিম্নবর্গ ছিল ‘নির্বোধ অজ্ঞ জনসমষ্টি’, ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ অথবা ‘অসভ্যের দল’।২২ বিপরীতে তিনি নিজেকে এবং তার অনুসারীদেরকে ভাবতেন ‘বুদ্ধিমান শ্রেণি যারা শিক্ষার চর্চা করবে এবং তার সুফল ছড়িয়ে দেবে পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে।২৩ এই ধরণের সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। তিনি বলেন: ‘তুলনামূলক ‍উচ্চশিক্ষিত একজন বা কতিপয় ব্যক্তির প্রভাব এবং পরামর্শ সভা ব্যতীত গড়পড়তাদের মধ্যে থেকে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হতে পারে না।২৪  বিকল্প হিসেবে তিনি ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ সম্পর্কে যে অর্থপূর্ণ বয়ান দেন তা বোধগম্য ছিল না। তার মতে: ‘দেশের সংবিধান যদি অজ্ঞতাকে সচেতনতার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তা উপকারী নয় বরং ক্ষতিকর।২৫ মিলের মতে এমনতর সমস্যার একটি ‍উপযুক্ত সমাধান হলো: ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণিগুলোর উচিত সরকারকে পরিচালিত করা ‍এবং সরকারের উচিত বেকুব শ্রেণিগুলোকে পরিচালিত করা।২৬

    সময়ের সাথে সাথে সবখানেই যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কার্যপ্রণালিতে পরিণত হবে, ১৮৫০ এর দশকে তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকরী ছিল না। ‘উঁচু এবং মধ্যম সারির লোকেরা’ প্রাকৃতিকভাবেই সংখ্যার লড়াইয়ে (“বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ”) ‘বর্বর জনতার’ তুলনায় অসুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। উক্ত পরিস্থিতি আলোচ্য সমস্যার একটি অংশ ছিল। সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি ছিল ভোটাধিকার এবং এ সংক্রান্ত আরো বেশ কিছু বিষয়ে ধনী এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যাশার ভিন্নতা।

    এ সংক্রান্ত আলাপে মিল আরো একবার পরিষ্কার ছিলেন। তার মতে, গণতন্ত্র এমন নয় যে ‘জনগণ নিজেরাই নিজেদের শাসন করে। বরং তারা একটি ভাল সরকারের নিশ্চয়তা পায়।’ তার চোখে সেই ‘ভাল সরকার’ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। আইনসভা ছিল সেই ‘ভাল সরকার’ এর নমুনা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপের অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে হবসবম লিপিবদ্ধ করেছেন:

    রাশিয়া ব্যতীত গুণগতভাবে ইউরোপের সবগুলো দেশেই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহ্য কায়েম হয়ে গিয়েছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ঐতিহ্যগতভাবে সম্ভ্রান্ত শ্রেণির ক্ষমতা পুরোপুরি অবিতর্কিত না হলেও নিরাপদেই ছিল। কারণ নির্বাহী বিভাগের উপর আইনসভার ক্ষমতা ছিল নামেমাত্র। তাতে করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে আইনসভার দূর্বল প্রভাব বিদ্যমান ছিল।’২৭ 

    আইনসভা সম্পর্কে এসব খোলাখুলি সত্য ঘটনা এবং তার অসঙ্গতি সে সময়ের মানুষজনের নিকট পরিষ্কার ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনসভায় যারা যোগ দিতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন ইউরোপজুড়ে ক্ষমতাসীন সম্ভ্রান্ত শ্রেণির নিয়োগপ্রাপ্ত লোকজন। তারা ছিলেন বিত্তবান শ্রেণিগুলোর বিভিন্ন কিসিমের ওয়ারিশ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং আরো বিভিন্ন পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন। এমনতর গণতন্ত্রের চিন্তা অন্তত ‘বেকুব শ্রেণির’ মানুষদের মাথায় ছিল না। বিপরীতে ‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে উপরোক্ত পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা-ই বুঝতে হবে, এমন চিন্তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ঠিক সে কারণেই ইতিহাসের সে নির্দিষ্ট সময়জুড়ে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির এমনতর বিপজ্জনক সংজ্ঞায়ন চালু ছিল।

    মিল এবং অন্যান্যরা ধনী ও গরীবদের মাঝে গণতন্ত্র সম্পর্কে ‘বোঝাপড়ার’ যে পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। এটি ছিল একটি প্রধান সমস্যা। এক অর্থে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ বা ‘শাসক এবং শাসিতের বোঝাপড়ার সাধারণ ক্ষেত্র’ বলে কিছু ছিল না যেখানে দুই পক্ষই তাদের নিজেদের অবস্থান এবং নিয়তি সম্পর্কে অবগত থাকবে। এই ধরণের ঐতিহ্য চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ভোটাভুটির প্রক্রিয়াটি ঠেকিয়ে রাখা বা তাকে অকার্যকর করে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।

    ‘গুণসম্পন্ন ভোটের’ মাধ্যমে উক্ত উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছিল। যদিও তার পূর্বেই ‘ভরযুক্ত ভোটের’ ধারণা দিয়ে তারা হাত মশকো করেছিল। মিলের ‍উদ্ভাবিত এই ধারণাটি ছিল অভিনব।

    যদি কোনো সাধারণ অদক্ষ শ্রমিক একটি ভোট দিতে পায়, তাহলে একজন দক্ষ শ্রমিকের দুইটি ভোট থাকা উচিত। স্থানীয় কোনো মোড়ল-মাতবরের থাকা উচিত তিনটি ভোট। কারণ হিসেবে বলা যায়, তার পেশা তার কাছে থেকে সাধারণ সংস্কৃতির চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। এছাড়াও তার কিছু নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ থাকার প্রয়োজন হয়। একজন কৃষক, নির্মাণকর্মী অথবা ব্যবসায়ীর তিনটি বা চারটি করে ভোট থাকা উচিত। নিয়মতান্ত্রিক মানসিক সংস্কৃতির প্রয়োজন হয় এমন যে-কোনো পেশার ব্যক্তির জন্য পাঁচটি বা ছয়টি করে ভোট বরাদ্দ থাকা উচিত। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের জন্যেও কমপক্ষে একই পরিমাণে ভোট বরাদ্দ থাকতে
    হবে।
    ২৮

    উক্ত ‍উপায়ে বিত্তবানদের সংখ্যাবাচক অসুবিধার নিরসন করা যায়; অন্তত যতদিন পর্যন্ত না দরিদ্রেরা তাদের নিয়তিকে স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াল অব স্ট্রাফোর্ড
    শিল্পী: থমাস আলফ্রেড উলনথ
    সূত্র: ইউকে পার্লামেন্ট

    কিন্তু এমনটা হওয়ার ছিল না। ‘গুণসম্পন্ন ভোট’ ছিল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। শিক্ষাগত যোগ্যতা, সম্পদের পরিমাণ, ধর্ম, জাতি, চামড়ার রঙ, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি মনগড়া পার্থক্যের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকারকে সংকুচিত করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া চলেছিল যতদিন পর্যন্ত না জনগণ যথাযথভাবে ‘পরিপক্বতা’ অর্জন করেছিল। ১৮৬৪ সালে ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% ভোটাধিকার ভোগ করত। সে সময়ে ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকের হার ৪% থেকে ৮% এ নিয়ে যাওয়া যায় কিনা এমন একটি বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোন ‘পরিপক্কতা’ বলতে কী বোঝানো হয় তার বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। গ্ল্যাডস্টোনের মতে, ভোটারকে হতে হবে এমন একজন ব্যক্তি যার থাকবে ‘আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, সংযম, শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান, দুর্ভোগের মধ্যে সহনশীলতা, আইনের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং ঊর্দ্ধতনের প্রতি সমীহ।’২৯

    ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সালের এক শতাব্দীর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে মূলধারার আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। পূর্বে এইসব দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার ১-৫% পূর্ণবয়ষ্ক ব্যক্তির ভোটে নির্বাচিত সংসদ বা আইনসভা থেকে পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০০% পূর্ণবয়ষ্ক জনগণের অংশগ্রহণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং চলমান তীব্র অসাম্যকে আমলে নিয়েও পরিবর্তনের এই ধীর গতি মূলত শাসকশ্রেণি (‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণি) এবং শাসিতশ্রেণির (শ্রমিকশ্রেণি) মধ্যে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সার্বিক সমস্যাগুলোকেই তুলে ধরে। দমন-পীড়নের গতানুগতিক তরিকা বাদ দিয়েও এবং ধীরগতিসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে সফল এই প্রক্রিয়াটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করেছিল:

    ১) একটি অনুবর্তী সংসদীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ‍উত্থান।
    ২) শুরু থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থের সেবক হিসেবে গণমাধ্যমের বিকাশ ও প্রভাব।

    (চলবে)                     

    তথ্যপঞ্জি   

    ১ S. Bowles and H. Gintis, Democracy and Capitalism (Routledge Keegan Paul, 1986), p28.

    ২ ibid., p28.

    ৩ibid., p28.

    ৪ A. Arblaster, The Rise And Decline Of Western Liberalism (Basil Blackwell, 1984), p160.

    ৫ ibid., p160.

    ৬ E. Hobsbawm, The Age Of Revolution (Mentor, 1962), p54.

    ৭ ibid., p168.

    ৮ ibid., p42.

    ৯ ibid., p45.

    ১০ ibid., p38.

    ১১ ibid., p49.

    ১২ ibid., p49.

    ১৩ ibid., p49.

    ১৪ ibid., p173

    ১৫ A. Arblaster, op. cit., p267.

    ১৬ ibid., p265.

    ১৭ ibid., p264.

    ১৮ ibid., p265.

    ১৯ ibid., p278.

    ২০ ibid., p278.

    ২১ ibid., p279.

    ২২ ibid., p280.

    ২৩ ibid., p279.

    ২৪ ibid., p279.

    ২৫ ibid., p280.

    ২৬ ibid., p278.

    ২৭ E. Hobsbawm, The Age of Capital (Mentor, 1975), p102.

    ২৮ Norman Wintrop ed., Liberal Democratic Theory and Its Critics, (Croom Helm, 1983) p33.

    ২৯ A. Arblaster, op. cit., p273.

     

  • সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

    সরকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন

    • আসিফ আযহার

    এটা হয়তো সম্ভব যে, আমরা সরকারকে সরিয়ে দিতে পারব। কিন্তু যদি সরকার না থাকে তাহলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দিবে কে? সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজ অর্থাৎ রাজনৈতিক সমাজের জীবনে আমরা এতোটাই অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি যে, সরকার ছাড়া আমরা কোন সমাজের কথা কল্পনাই করতে পারি না। রাজনৈতিক সমাজের সরকার এবং ক্ষমতাধরদের হাতে আমরা নিজেদেরকে এমনভাবে সঁপে দিয়েছি যে, এদের অনুপস্থিতির কথা ভাবতেও আমরা ভয় পাই।

    আমরা ধরে নিয়েছি সরকার-রাষ্ট্র ও রাজনীতিই আমাদের নিরাপত্তার উৎস। এসব না থাকলে অর্থাৎ সরকারবিহীন অরাজনৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে আমাদের নিরাপত্তা কে দিবে- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদেরকে আমাদের জীবনের দিকে তাকাতে হবে। আমরা আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই এ প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর খুঁজে পাব।

    আর্টওয়ার্ক: কন্ট্রোল
    শিল্পী: লরা বারবোসা
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    সরকার আমাদের জীবনে কী ভূমিকা পালন করে? আমাদেরকে কি সরকারই বাঁচিয়ে রাখে? বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন কি আমরা সরকারের কাছ থেকে পাই? সরকার না থাকলে কি প্রকৃতি আমাদেরকে আলো-বাতাস ও খাবার থেকে বঞ্চিত করত? আপনার জীবনে সরকারের কী প্রয়োজন পড়ে? প্রকৃতির বুকে আপনার বেঁচে থাকার সাথে সরকারের কী সম্পর্ক? প্রকৃতির কোলে বেঁচে থাকার জন্য আপনার যে শারীরিক সামর্থ্য প্রয়োজন তা কি সরকার আপনাকে দিয়েছে?

    সরকার কি আপনাকে বার্ধক্য ও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে? রোগজীবাণু কি সরকারের কথা শুনবে? আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও কি সরকারের আদেশ অনুযায়ী কাজ করে? যদি এসব প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপর সরকারের কোন হাত না থাকে এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই থেকে যায় তাহলে সরকারের ওপর ভরসা কীসের? সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবনের নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতির হাতেই- এটা হল ধ্রুব সত্য।

    মানুষ ছাড়াও অসংখ্য প্রজাতিকে প্রকৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে যাদের কোন সরকার নেই। মানুষের মধ্যেও এমন অসংখ্য গোত্র ছিল যাদের কোন সরকার ছিল না। প্রকৃতিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। এমনকি আজও অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেশ শিথিল। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে নেই। চরম সত্য হল, সরকার থাকুক কিংবা না থাকুক জীবন কোথাও থেমে থাকে না। জীবন জীবনের নিয়মেই চলতে থাকে।

    পৃথিবীতে জীবন এসেছে প্রাকৃতিক নিয়মের পথ ধরেই, কোন সরকারের কথায় আসেনি। কোন সরকার না থাকলেও যে জীবন প্রকৃতির নিয়মেই চলতে থাকবে তাতে কোন সংশয় নেই। বেশীদিন আগে নয়, মাত্র কয়েক শতক পূর্বেই পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে কোন সরকার ছিল না। আফ্রিকা মহাদেশের সিংহভাগ এলাকা, উত্তর আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়া মহাদেশের পুরো অঞ্চল এবং এশিয়া মহাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন সরকারের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু জীবন কোথাও থেমে ছিল না।

    এসব এলাকা ছিল অসংখ্য মানুষে পরিপূর্ণ। কোটি কোটি মানুষের বসবাস ছিল এসব এলাকায়। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান জাতির লোকজন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন গোষ্ঠীসমূহ, আফ্রিকার অসংখ্য নিগ্রো জাতির লোকজন, মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়, পাহাড়ী আদিবাসী গোষ্ঠী, বরফ অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়- প্রভৃতি নৃ-গোষ্ঠী পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিল সরকারবিহীন সমাজব্যবস্থা নিয়ে।

    ১৪৯২ সালে জলদস্যু কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পথ ধরে এসব অঞ্চলে ইউরোপীয়দের আগমন শুরু হয়। সেই সাথে এসব অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনের ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রবাদী সভ্যতার চরম অভিশাপ! ইউরোপীয় সরকারগুলো চারটি মহাদেশকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। স্থানীয় মানুষদেরকে তারা হয় মেরে ফেলে অথবা তাদের ক্রীতদাস বানায়।

    ইউরোপীয়রা নতুন মহাদেশগুলোর যেখানেই যায় সেখানেই ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠা করে। এসব সরকারের প্রধান কাজই ছিল স্থানীয় আধিবাসীদেরকে খতম করা কিংবা ক্রীতদাসে পরিণত করা। কেবল আমেরিকার উদাহরণ দেওয়া যাক। রেড ইন্ডিয়ানদের হাত থেকে আমেরিকা দখল করতে গিয়ে আমেরিকান সরকার কম-বেশী ১৫০০টি যুদ্ধ পরিচালনা করে।

    যখন এসব যুদ্ধ শেষ হয় তখন দেখা গেল উত্তর আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি থেকে মাত্র দুই লক্ষ আটত্রিশ হাজারে নেমে এসেছে। আফ্রিকানদের যেভাবে ক্রীতদাস বানানো হয়েছে তা পৌরাণিক নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। পৃথিবীর বড়ো অংশ জুড়ে ‘সরকার’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এমন অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতায় ভরপুর।

    চারটি দুর্বল মহাদেশে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা ‘সরকার’ কায়েম করেছিল নৃশংস গণহত্যা, জাতিগত নিধন, অন্যায় আগ্রাসন আর দাসতন্ত্র কায়েমের মধ্য দিয়ে। যদি ঐ দেশসমূহে এভাবে ‘সরকারের’ আগমন না ঘটতো তাহলে কী হতো? নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পরাজিত কিংবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া জাতিগুলো এখনও পৃথিবীর বুকে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারত।

    আর্টওয়ার্ক: ইউএসএ ফর আফ্রিকা
    শিল্পী: মিশেল বাসকুয়াত
    সূত্র: কেথ হারি ফাউন্ডেশন

    সরকারগুলো এভাবেই হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে শক্তি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। আসলে সরকার কোনভাবেই মানুষের সহায় নয়। মানুষের সহায় হল তাদের সমাজ। অনেকেই সরকার আর সমাজের পার্থক্য বুঝে না। সরকার আর সমাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। সরকার হল সমাজে একটি বাড়তি সংযোজন। এটা না থাকলেও সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবেই চলতে পারবে।

    যদি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, আমরা নিজেদের জীবনের তাড়নায় এবং নিজেদের জীবনের তাগিদেই অনেক কিছু ভাবি, অনেক কিছু করি, অনেক কিছু শিখি এবং একটি সমাজজীবন গড়ে তুলি। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে মাত্র। সমাজেরই কিছু লোক নিজেদেরকে ‘সরকার’ ঘোষণা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ‘সম্মতি’ আদায় করে নেয় এবং কতকগুলো নিয়ম-কানুন চালু করে দেয়।

    যদি এ সরকার বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে আমাদের জীবনের তাগিদে যেসব কাজ করা দরকার তা আমরা করবই। আসলে আমাদের জীবন, আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের কাজ এবং আমাদের সমাজ কোন সরকারী আদেশের ফলাফল নয় বরং   জীবনের তাগিদে, বেঁচে থাকার স্বার্থে, অস্তিত্বের প্রয়োজনে আমরা যে সমাজের জন্ম দিয়েছি সে সমাজেরই একটি বাড়তি অংশ হল সরকার।

    বেঁচে থাকার জন্য সরকার নামক একটি বস্তুর প্রয়োজন- এই ভুল বিশ্বাস সরকারই আমাদেরকে শিখায়। আসলে বেঁচে থাকার সাথে সরকারে কোন সম্পর্কই নেই এবং সরকার আমাদের জীবনে হস্তক্ষেপ না করলে আমরা এর কথা ভুলেই যেতাম। যতক্ষণ না সরকার আমাদের জীবনে ঢুকে পড়ছে, কোন কিছু করতে বাধ্য করছে কিংবা কোনকিছু করতে নিষেধ করছে ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের কথা আমাদের মাথায় আসার কোন কারণ নেই।

    এটি অদ্ভূত নয় যে, অধিকাংশ মানুষই মনে করে- আমরা সরকার ছাড়া চলতে পারব না যদিও বাস্তবিক অর্থে মানুষের জীবন সরকার ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সমাজ জীবনে সরকার কেবলই একটি ‘বাড়তি সংযোজন’ মাত্র। সমাজের কিছু লোক ‘সরকার’ হয়ে বাকীদের জীবনে ‘হস্তক্ষেপ’ করে মাত্র। এখন প্রশ্ন হল, সরকার না থাকলে আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে কে? অপরাধীদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে?

    এ প্রশ্নের উত্তরে একটি পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। যদি সরকারই অপরাধী হয়ে বসে তাহলে সরকারের অপরাধ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করবে কে? চোর-ডাকাত ও ছিনতাইকারিদের হাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করার জন্য আমরা কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসাই। তারাই হল সরকার। এই বাড়তি ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষগুলি অর্থাৎ সরকারের লোকজন যখন সীমাহীন দূর্নীতিগ্রস্থ হয়ে ওঠে এবং জনগণের সম্পদ লুট করতে শুরু করে তখন আমরা কী করি?

    তখন আমরা সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন শুরু করি। ছোটখাটো আন্দোলনে সরকারের কিছুই হয় না। বড় বড় আন্দোলনে অনেক সময় সরকারের পতন ঘটে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন ভালো থাকে। তারপর আগের সরকারের মতোই দূর্নীতিগ্রস্থ ও লুটেরা হয়ে ওঠে। জনগণ আবারও আন্দোলন শুরু করে। এভাবে ক্ষমতার পালাবদল চলতে থাকে কিন্তু জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না।

    সারা দেশে যতো চোর-ডাকাত রয়েছে তারা সারা জীবনে যে পরিমাণ সম্পদ আয় করে- একটি দূর্নীতিবাজ সরকার একদিনেই তার চেয়ে অনেকগুণ বেশী সম্পদ লুট করে। দূর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, গণহত্যা, পুলিশী অত্যাচার- এ সবই হল সরকারের কাজ। তাহলে সরকারের সাথে জনগণের নিরাপত্তার কী সম্পর্ক থাকল?

    যে সরকার মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা সেই সরকারের বিরুদ্ধে যদি জনগণকে আন্দোলন করতে হয় তাহলে সরকারকে দিয়ে লাভটা কী হল? সরকারের দূর্নীতি ও অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে পারি তাহলে চোর-ডাকাতের মতো মামুলী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেন আমরা নিজেরাই ব্যবস্থা নিতে পারব না? এ কাজের জন্য কি আদৌ সরকারের প্রয়োজন আছে? একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক।

    ধরুন, আপনি আপনার প্রতিবেশীকে বিশ্বাস করেন না এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনাকে বিশ্বাস করে না। আপনি সবসময়ই আপনার প্রতিবেশীর তরফ থেকে যেকোন অনাচারের আশংকা করেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার তরফ থেকে বিপদের ভয় করে। এমতাবস্থায় মুগুরভাজা শরীর নিয়ে দুজন লোক এসে প্রস্তাব দিল যে, তারা আপনাদের উভয়ের মধ্যে অবস্থান করে আপনাদেরকে নিরাপদে রাখতে রাজী আছে।

    তারা উভয়ের ব্যাপারেই নিরপেক্ষ থাকবে এবং কাউকেই অন্যের ক্ষতি করার সুযোগ দিবে না। বিনিময়ে তাদেরকে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। আপনারা উভয়েই এ প্রস্তাবে সানন্দে রাজী হয়ে গেলেন এবং উভয়ের মধ্যবর্তী কিছু জায়গা তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। কিছুদিন পর দেখা গেল, আপনারা উভয়েই ঐ লোক দুটোর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এবং তারা যেভাবে খুশী সেভাবে আপনাদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে।

    এই পরিস্থিতিতে আপনি আপনার প্রতিবেশীর সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে লাগলেন এবং আপনার প্রতিবেশীও আপনার সাথে সম্প্রীতি স্থাপনের কথা ভাবতে শুরু করল। কিন্তু দেখা গেল, মাঝখানের লোক দুটো কোনভাবেই চায় না যে, আপনাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপিত হোক। তারা সম্প্রীতির সকল চেষ্টাই বানচাল করে দিতে শুরু করল।

    শেষ পর্যন্ত আপনারা উপলব্ধি করতে পারলেন যে, আপনাদের উভয়ের বড়ো শত্রু হল ঐ বাড়তি লোক দুটো। এবার আপনাদের বিশ্বাস হলো যে, আপনাদের সমস্যা সমাধানে আপনারা নিজেরাই স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাড়তি কোন লোকর প্রয়োজন নেই। বাড়তি লোক দুটোর ভূমিকা আপনাদের সমস্যায় কেবলই একটি বাড়তি ‘হস্তক্ষেপ’ মাত্র। আপনাদের নিরাপত্তার মালিক আপনারাই।

    আপনাদের উভয়ের মধ্যে একটি ‘আন্তরিক সমঝোতাই’ আপনাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারে। বাড়তি লোকের হাতে নিজেদের নিরাপত্তা তোলে দেওয়ার নাম ‘জিম্মি অবস্থা’। এভাবে নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না। এসব উপলব্ধি আপনাদেরকে একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্য করল। আপনারা উভয়েই সম্মত হলেন যে, আপনাকে নিজের নিরাপত্তার খাতিরে অন্যের নিরাপত্তার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে হবে।

    বাস্তব প্রয়োজনই এভাবে আপনাদেরকে একটি ‘যৌথ অঙ্গীকারে’ আবদ্ধ করল যা একসময় আপনাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এই অসম্ভব সম্ভব হয়ে যাওয়ায় আপনাদের আর বাড়তি লোক দুটোর প্রয়োজন হল না। নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারায় ঐ বাড়তি লোক দুটোকে আর কোন সুবিধা দিতে আপনারা উভয়েই অস্বীকার করলেন এবং উভয়ে মিলেই তাদেরকে তাড়িয়ে দিলেন। সরকারকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটাও একইরকম।

    পারস্পরিক নিরাপত্তার অঙ্গীকার বা চুক্তিই যদি আমাদের নিরাপত্তার উৎস হয় তাহলে সরকারের কোন প্রয়োজন পড়ে না। যদি সরকার না থাকে আর আপনি যদি কারও গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন তাহলে সেও আপনার গালে পাল্টা চড় বসিয়ে দিবে। আর যদি সে দুর্বল হয় তাহলে কি আপনি বেঁচে যাবেন? না, তা নয়। আপনার চেয়ে সবল কেউ এসে আপনার গালে চড় বসিয়ে দিলে আপনি কি করবেন? তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই সবাইকে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

    মৎস নীতি ব্যাপারটা কী? আপনারা দেখবেন, একেবারে ছোট ছোট মাছগুলোকে তাদের চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। সেই বড়ো মাছকে তার চেয়ে বড়ো মাছ এসে টুপ করে খেয়ে ফেলে। আর সবচেয়ে বড়ো মাছটির কী হয়? তাকেও বাগে পেলে অন্য কোন প্রাণী খেয়ে ফেলে। মানুষের যেহেতু মাথা এবং বুদ্ধি আছে সেহেতু তারা নিজেদের নিরাপত্তার খাতিরে এই মৎস নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য।

    ‘পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা নীতি’ কতোটা স্বাভাবিক এবং কতোটা যৌক্তিক কারণেই অনিবার্য তা বুঝতে নিশ্চয়ই আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না। সরকার নামক একটি বাড়তি উপদ্রব যা কেবল বেইমানী এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মধ্যেই নিমজ্জিত তার হাতে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সহায়তা চুক্তি করে নেওয়াটা কি অনেক বেশী বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

    তাহলে দেখা গেল, আমাদের নিরাপত্তা আসলে আমাদের হাতেই। অন্য কারও হাতে সেটা তুলে দিলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরকারের হাতে আমরা যেভাবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দেই তাতে আমরা সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ি। নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতির কুফল এটা। নিরাপত্তার একতরফা নীতি হল- জনগণের নিরাপত্তা থাকবে সরকারের হাতে কিন্তু সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকবে না।

    এর ফলে যদি সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বসে তাহলে জনগণের করার কিছু থাকে না। কারণ- জনগণের হাতে ভঙ্গ করার মতো কোন প্রতিশ্রতি নেই; সরকারের নিরাপত্তা জনগণের হাতে থাকে না। সরকারের নিরাপত্তা থাকে সরকারের হাতেই। সরকারী লোকজনের নিজেদের হাতেই নিজেদের নিরাপত্তা থাকায় তারা সংখ্যালঘু হয়েও শক্তিশালী। অন্যদিকে জনগণের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে না থাকায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও দুর্বল।

    সরকারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আসল রহস্য এটাই। এখন আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন সরকারই সবসময় শক্তিশালী হয়ে থাকে! নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে একতরফা নীতিই এর কারণ। কিন্তু যদি ব্যাপারটা একতরফা না হয়ে দ্বিপক্ষীয় হতো তাহলে কেমন হতো? সেক্ষেত্রে সরকারের কোন ক্ষমতাই থাকত না; সরকারের সকল কর্তৃত্বই লোপ পেয়ে যেতো। কিন্তু এরকম কোন সরকারের অস্তিত্ব সম্ভবই নয়।

    কারণ- সরকার মানেই হল: জনগণের চেয়ে এর ক্ষমতা বেশী হবে। জনগণের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে কিন্তু সরকারের ওপর জনগণের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। পুলিশ, সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনীকে সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, জনগণ নয়। এসব বাহিনীর প্রধান কাজই হবে সরকারকে টিকিয়ে রাখা, জনগণ কিংবা বহিরাগত শক্তির হাত থেকে সরকারকে রক্ষা করা। বিদ্রোহী জনগণের কোন বাহিনীকে সরকার কখনোই মাথা তোলে দাঁড়াতে দেবে না। জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে সরকার সমসময়ই শক্তি দিয়ে দমন করবে।

    যদি এসব শর্তের ওপর কোন সরকার প্রতিষ্ঠিত না থাকে তাহলে সেটাকে আর সরকারই বলা যাবে না। সেটাকে বলতে হবে সামাজিক সংগঠন। ঐ সমাজটিও আর রাজনৈতিক সমাজ থাকবে না। সেটি হয়ে যাবে অরাজনৈতিক সমাজ। সামাজিক প্রয়াসে ‘সামাজিক সংগঠন’ এবং ‘সামাজিক ব্যবস্থাপনা’ দ্বারাই সে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হবে। এর প্রতিরক্ষাও নিশ্চিত হবে ‘সামাজিক শক্তি’ দ্বারা।

    বিশেষ কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং পারস্পরিক সহায়তা নীতির ভিত্তিতে সে সমাজ চলবে এবং এর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে। সে সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হবে ‘মিউচুয়াল’ অর্থাৎ যারা নিরাপত্তার কাজ করবে তাদের অস্তিত্বও নির্ভর করবে জনগণের সমর্থনের ওপর। সরকারী কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা সে সমাজে থাকবে না।

    আসলে পৃথিবীতে সমাজের উৎপত্তি এবং সামাজিক জীবনের বিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, মানুষের সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে মূল বিষয় হিসেবে কাজ করেছে ‘যৌথ স্বার্থ’ এবং ‘পারস্পরিক সহায়তা’ ও ‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’। ‘কর্তৃত্ব’ ব্যাপারটা এসেছে অনেক পরে, সমাজ গঠনের জন্য এটা কোন অনিবার্য শর্ত নয়। এটা হল মানুষের সমাজে একটি ‘বাড়তি সংযোজন’।

    মানুষকে তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই সমাজ গড়ে তোলতে হয়েছে। যেসব যৌথ প্রয়োজন এবং স্বার্থে মানুষ সমাজের জন্ম দিয়েছে সেগুলো পূরণের জন্য সরকারের অস্তিত্ব মোটেও জরুরি নয়। যদি সরকার না-ও থাকে, মানুষ যেসব প্রয়োজনে সমাজ গড়ে তোলেছিল সেসব প্রয়োজনেই সমাজকে টিকিয়ে রাখবে। যদি আপনি মনে করেন, সমাজ থেকে সরকারী কর্তৃত্ব দূর হলে সমাজ ভেঙ্গে পড়বে তাহলে আপনি এস্কিমো ও বেদূইনদের সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

    ওদের সমাজে তো সরকার নেই। তাহলে ওদের সমাজ ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? সারা দুনিয়াজুড়ে অসংখ্য আদিবাসী, পাহাড়ী, মরুবাসী, বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী এবং এশিয়া ও আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে বসবাসকারী গ্রামীন সমাজগুলো- যাদের মধ্যে সরকারের অস্তিত্ব খুবই দুর্বল কিংবা প্রায় নেই বললেই চলে- তাদের সমাজগুলো ভেঙ্গে পড়ছে না কেন? কৃষিকাজ, আয়-অর্থনীতি, বিচার, লেনদেন, কলহ নিষ্পত্তি- সবকিছুই তো তাদের সমাজে আছে। সরকার ছাড়াই এতকিছু কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা একবার ভেবে দেখুন।

    আর্টওয়ার্ক: কো-অপারেশন
    শিল্পী: রাফায়েল লোপেজ
    সূত্র: পিন্টারেস্ট

    হ্যাঁ, আপনার কাছে মনে হতে পারে এসব সমাজ তো খুবই অনুন্নত। কিন্তু এই অনুন্নত হওয়াটা কারণটা তো মোটেই সরকারের অনুপস্থিতি নয়। আপনি যদি সমাজ সম্পর্কে নূন্যতমও ধারণা রাখেন তাহলে বুঝতে পারবেন যে, তাদের অনুন্নতির কারণটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়। ঐ সমাজগুলোতে সরকার ও রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়ার অর্থ হবে তাদের মাথায় একটি বাড়তি অপচয় ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। উন্নতির জন্য তাদের প্রয়োজন হল- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করা।

    যেসব সমাজে সরকারের অস্তিত্ব দূর্বল কিংবা সরকারের উপস্থিতি নেই সেসব সমাজেও মানুষ নিজেদের প্রয়োজনেই বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এসব বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুন্নত হলেও এটুকু প্রমাণের জন্য যথেষ্ট যে, যেখানেই সমাজ থাকবে সেখানেই বিচার ও নিরাপত্তা থাকবে, এর জন্য সরকার গঠনের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

    আপনি আপনার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা জড়ো করলে দেখতে পাবেন যে, মানুষ তাদের বাস্তব প্রয়োজনেই সমাজের সাথে এমনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলে যাতে সমাজের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সহায়তা পাওয়া যায়। সরকার থাকুক বা না থাকুক, সমাজের সকল মানুষ সবসময়ই সামাজিক সম্পর্কের জালে আবদ্ধ থাকে। এই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই পারস্পরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিহিত।

    সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনে। মানুষ তাদের বস্তুগত এবং মনোজাগতিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। সরকার সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে। সরকার সমাজ সৃষ্টি করেনি, সমাজ সৃষ্টি হওয়ার বহু পরেই সরকারের সৃষ্টি হয়েছে। সমাজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে মানুষের প্রয়োজন ও স্বাধীন ইচ্ছার ভিত্তিতে। অন্যদিকে সরকার বা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সমাজে জোর-জুলুম, ক্ষমতা ও শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

    সরকারবিহীন সমাজের সাথে সরকার নিয়ন্ত্রিত সমাজের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া ব্যবস্থাপনা দ্বারাই সরকারবিহীন সমাজ পরিচালিত হবে, সমাজকে পরিচালনার জন্য কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়া হবে না। আরও দশটি বিষয়ের মতোই বিচারকাজ ও অপরাধ দূরীকরণের কাজটিও সরকারবিহীন সমাজের স্বাধীন ব্যবস্থাপনা দ্বারাই নিশ্চিত করা সম্ভব।

    যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের মানুষের ওপর ভরসা না করেন একারণেই যে, তাদের ওপর কোন কর্তৃত্ব ও খবরদারী না থাকায় তারা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে তাহলে তো বর্তমান সরকারের ওপরেও আপনার ভরসা থাকার কথা নয়। সরকার বলতে তো কিছু মানুষকেই বোঝায়। সেই ক্ষমতাবান মানুষগুলোর ওপরে তো কর্তৃত্ব ও খবরদারী করার কেউ নেই। এদের ওপর কীভাবে আপনি ভরসা রাখতে পারেন?

    এবার আপনি ভেবেচিন্তে বলুন তো, মানুষের হাতে ক্ষমতা না থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী নাকি হাতে ক্ষমতা থাকলে তার অপরাধী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে? অপরাধ করেও পার পেয়ে যায় কারা? ক্ষমতাবানরা নাকি ক্ষমতাহীনরা? এবার আপনি বলুন তো, সরকারবিহীন সমাজ অর্থাৎ যে সমাজের মানুষের হাতে কোনরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকবে না সে সমাজের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার ভয় কি আপনি এখনও করেন?

    সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে যদি আপনার সংশয় থাকে তাহলে বর্তমান সমাজের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কি আপনার দ্বিগুণ সংশয় থাকা উচিত নয়? আপনি যদি সরকারবিহীন সমাজের কর্তৃত্বহীন মানুষের তরফ থেকে অপরাধের ভয় করেন তাহলে বর্তমান সমাজের ক্ষমতাবানদের তরফ থেকে কি আরও বেশী অপরাধের ভয় করা উচিত নয়?

    যদি আপনি প্রশ্ন তোলেন যে, সরকারবিহীন সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে কি না তাহলে বর্তমান সমাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলুন যে, এই সমাজের বিচারব্যবস্থা আপনাকে ক্ষমতাবানদের অপরাধ থেকে রক্ষা করতে পারবে কিনা। যদি আপনি সরকারবিহীন সমাজের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দাবী করেন তাহলে আপনি বর্তমান সমাজের কাছ থেকেও নিশ্চয়তা দাবী করুন। বর্তমান সমাজ কি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে, এই সমাজের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত সরকার কখনও দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী হয়ে উঠবে না?

    সরকারবিহীন সমাজে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তোলে দেওয়া হবে না। সে সমাজের একজন কর্তৃত্ববিহীন মানুষ যদি কোন অপরাধ করেও বসে তাহলে কি সেটা খুব বড় অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারবে? হাতে ক্ষমতা না থাকলে একজন মানুষ কতটুকু অপরাধ করতে পারে? সরকারবিহীন সমাজের অপরাধের মাত্রা কি বেশ সঙ্গত কারণেই সীমিত হয়ে পড়ে না?

    বর্তমান সমাজে যেভাবে মানুষের হাতে বিপুল ক্ষমতা তোলে দেওয়া হচ্ছে তাতে কি বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে না? হাতে বিপুল ক্ষমতা না থাকলে কি কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করে? হাতে ক্ষমতা থাকায় বর্তমান সমাজের অনেকেই বড় ধরণের অপরাধ ও দুর্নীতি করেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে ধরার কেউ নেই। বর্তমান সমাজে কি এই মৎস নীতিই চলছে না? আমাদের কি বর্তমান সমাজ নিয়েই সবচেয়ে বেশী শঙ্কিত থাকার কথা নয়?

    আর্টওয়ার্ক: স্টপ পোলিস
    গ্রাফিতি
    সূত্র: কোপওয়াচ

    বর্তমান সমাজে কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেকেই বলেন যে, সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনের জন্য কিছু মানুষকে ক্ষমতায় বসানো আবশ্যক। কিন্তু এ ধরণের যুক্তি যে কতোটা অসার ও খোঁড়া তা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আপনি পেয়ে যাবেন। সমাজের মানুষকে অপরাধ থেকে নিরস্ত করার জন্য যদি ক্ষমতাবান পাহারাদার গোষ্ঠী নিযুক্ত করতে হয় তাহলে সেই পাহারাদার গোষ্ঠীর ওপরেও তো পাহারা বসাতে হবে। কারণ- তারাও তো মানুষ এবং ক্ষমতায় বসে তারাও তো অপরাধ করতে পারে।

    কিন্তু বর্তমান সমাজে পাহারাদারদের ওপরে পাহারাদারীর কেউ নেই। তাই তারা ভয়ানক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। একটা বিষয় মনে রাখবেন, চোরের ভয়ে যদি আপনি ডাকাতকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসেন তাহলে আপনার বাড়িটাই বেদখল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার বাড়িতে চুরি হলে বাড়িটা অন্ততঃ বেঁচে যাবে। তাই ডাকাতকে ডেকে আনার চেয়ে অরক্ষিত থাকাই ভালো। ডাকাত দিয়ে প্রতিরক্ষা হয় না।

    এই সহজ উপমাটা আপনাকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে, সরকারবিহীন সমাজ নিয়ে আপনার মনে যতোই অনিশ্চয়তা থাকুক- বর্তমান সমাজের চেয়ে খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনা সে সমাজে নেই। এই প্রবন্ধের প্রথম দিকে বিভিন্ন মহাদেশে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আগ্রাসনের যে নামমাত্র উল্লেখ করা হয়েছে তা যদি বিস্তারিতভাবে আপনার সামনে তোলে ধরা হয় তাহলে আপনি সহজেই স্বীকার করবেন যে, সরকার ছাড়া এতো ভয়ংকর অপরাধ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

    এতক্ষণে আপনি হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, সমাজ থেকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দূর হলে অপরাধও দূর হয়ে যাবে। বৃহৎ অপরাধ সরকারের হাতেই সংঘটিত হয়। সরকারকে বিশ্বাস করার অর্থ হল, সমাজকে অবিশ্বাস করা। আর সমাজকে অবিশ্বাস করার অর্থ হল নিজেই নিজেকে অবিশ্বাস করা। আপনিই সমাজ, আপনারা মিলেই সমাজ। সরকারের হাতেই সমাজ সবচেয়ে বেশী অরক্ষিত।

    সরকারবিহীন সমাজকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকার মানে হল, নিজেই নিজেকে নিয়ে সন্দেহ ও আশংকা করা। তার চেয়ে বরং সরকারকে নিয়েই আশংকা করুন। সরকার মানেই হল ধোঁকাবাজ, লুটেরা ও নিপীড়ক শক্তি। তাই সরকারের হাতে ক্ষমতা তোলে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন যে, আমরা এর হাতে কতোটা নিরাপদ। আসুন, কর্তৃত্ববিহীন সমাজের ক্ষমতাবিহীন মানুষকে নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার আগে ক্ষমতাবান ও বেপরোয়া সরকারকে নিয়ে শঙ্কিত হই।

     

  • স্ল্যাভয় জিজেক।। দূষিত মরুতে স্বাগতম

    স্ল্যাভয় জিজেক।। দূষিত মরুতে স্বাগতম

    • অনুবাদ: মোস্তাকিম হায়দার  

    চলমান করোনা মহামারীটির সংক্রমণ সমাজে সুপ্ত আরো কিছু ভাবাদর্শের ভাইরাসকে উসকে দিয়েছে যেমন- ভুয়ো খবর, ভ্রম-বাতুল ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, বর্ণবাদের বিস্ফোরণ ইত্যাদি। কোয়ারেন্টাইনের সুপ্রতিষ্ঠিত ডাক্তারি প্রয়োজনের মাঝে ভাবাদর্শের পেষণে অঙ্কিত সীমানায় আমাদের পরিচয়কে হুমকিদানকারী শত্রুদের কোয়ারেন্টাইন করার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়।

    স্ল্যাভয় জিজেক

    হয়তো আরো একটি হিতকারী ভাবাদর্শের ভাইরাস ছড়াবে এবং আশা করা যায় তা আমাদের সংক্রমিত করবে। যে ভাইরাসটি হবে বিকল্প এক সমাজ চিন্তার, জাতিরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বের এক সমাজ, এমন এক সমাজ যা নিজেকে বাস্তবায়িত করে বৈশ্বিক সংহতি এবং সহযোগিতায়। গর্ভাচেভের মতে চেরনবিল বিপর্যয় যেভাবে সোভিয়েত সাম্যবাদের পতনের সূত্রপাত করেছিল, সেভাবে করোনা মহামারীও চীনে সাম্যবাদী শাসনের পতন ঘটাতে পারে। এমন নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এইখানে একটি প্যারাডক্স আছে। করোনা ভাইরাস আমাদের তাড়িত করবে সাম্যবাদের পুনরাবিষ্কারে; যার আস্থার ভীত প্রোথিত জনগণ ও বিজ্ঞানে ।

    কুয়েন্টিন টারান্টিনোর কিল বিল-২ মুভির শেষ দৃশ্যে বেয়াট্রিক্স খলনায়ক বিলকে পরাহত করে মার্শাল আর্টের সবচেয়ে প্রাণঘাতী কৌশল ‘Five Point Plam Exploding Heart’ প্রয়োগ করে। এই কৌশলে লক্ষ্যবস্তুর শরীরের পাঁচটি স্পর্শকাতর স্থানে হাতের আঙ্গুলের শীর্ষ দ্বারা পাঁচটি আঘাত করা হয়। তার পরের পাঁচটি পদক্ষেপেই হৃদপিণ্ড শরীরের ভেতরেই বিদীর্ণ হয়ে লক্ষ্যবস্তু মেঝেতে ঢলে পড়ে। এমন কিছু কেবল মার্শাল আর্টের পুরাণেই ঘটা সম্ভব,বাস্তব হাতাহাতিতে মোটেই নয়। মুভিতে বেয়াট্রিক্সের অমন আঘাতের পর বিল স্থিরচিত্তে তার সাথে সমঝোতায় আসে এবং পাঁচটি পদেক্ষেপের পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

    এই কৌশলের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপারটা হলো আঘাত এবং মৃত্যু-মুহূর্তের মাঝের সময়টুকু। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থিরচিত্তে বসে আছি আমি চাইলেই যে কারো সাথে বাক্যালাপ জুড়ে দিতে পারি। তবে পুরো মুহূর্তেই আমার চেতনে আছে যে, যেই না আমি হাঁটতে আরম্ভ করবো হৃদপিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে যাবে। যারা কল্পনা করছে যে এই ভাইরাস চীনা সাম্যবাদের পতন ঘটাবে তাদের চিন্তায় করোনা ভাইরাস চীনা সাম্যবাদী শাসনের উপর অনেকটা সামাজিক ‘Five Point Palm Exploding Heart Technique’ এর প্রয়োগ। চীনা নেতারা বসে,পর্যবেক্ষণ করে কোয়ারেন্টাইনের নৈমিত্তিক কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থার (social order) যেকোনো লক্ষণীয় পরিবর্তন (যেমন-প্রকৃত অর্থেই জনগণে আস্থা) তাঁদের পতনের কারণ হতে পারে। আমার বিনয়ী অভিমতটি বেশ খানিকটা র‌্যাডিকাল শোনাবে। এই মহামারীটি আদতে আমাদের বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপর ‘Five Point Palm Exploding Heart Technique’ এর প্রয়োগ। সবকিছু যে তালে চলছিল, তা যে আর সম্ভব নয়, এ তারই আভাস অর্থাৎ একটি মৌলিক পরিবর্তন এখন আবশ্যক।

    বেশ কয়েক বছর আগে, ফ্রেড্রিখ জেমিসন চলচিত্রে মহাজাগতিক কোন প্রলয়ের অসম্ভব্য সম্ভাবনায় প্রতি আমাদের নজর কেড়েছিলেন। যেমন- কোন উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়া কিংবা কোন ভাইরাস কর্তৃক মানব প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। এমন যেকোনো বৈশ্বিক বিপর্যয় প্রসব করে বৈশ্বিক সংহতির;যেখানে আমাদের তুচ্ছ পার্থক্যগুলো তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এর সমাধান খুঁজতে থাকি। আজ বাস্তবেই আমরা এমন কিছুর সামনে দাড়িয়ে। এটা আসলে যতক্ষণ আমাদের কাজে না আসছে ততক্ষণ বিকারগ্রস্ত ভাবে দুর্ভোগ উপভোগের কোনো আহ্বান নয়। বরং যে সমাজে আমরা বেঁচে থাকি তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে পুনঃচিন্তার জন্য, একটি মহা-বিপর্যয় যে জরুরী সেই পীড়াদায়ক সত্যেরই এক প্রতিফলন।

    আর্টওয়ার্ক: স্পিরিট
    শিল্পী: মোস্তাক আহমেদ
    সূত্র: এজ ফাউন্ডেশন

    বৈশ্বিক সমন্বয়ের প্রথম ঊন নজির হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যার কাছ হতে সারশূন্য কূটনৈতিক প্রলাপ শুনা না গেলেও উদ্বেগহীন সুস্পষ্ট সতর্কতা শুনতে পাচ্ছি। এমন সংস্থাকে আরো কার্যনির্বাহী ক্ষমতা দেয়া উচিত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডারস সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সমর্থন করায় সংশয়বাদীদের বিদ্রুপের শিকার হয়েছিলেন। অথচ করোনা মহামারীটি আমাদের এই শিক্ষাই কি দিচ্ছে না যে আরো বেশি কিছু করা প্রয়োজন? আমাদের কি উচিত না একধরণের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার নেটওয়ার্কের কথা বিবেচনা করা? এক সংবাদ সম্মেলনে করোনার ব্যাপক বিস্তার এবং গণ কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করার পরদিনই ইরানের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ইরাজ হারিরছি একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে স্বীকার করেন যে,তিনি করোনা সংক্রমিত হয়েছেন এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন (Isolation) রেখেছেন (এমনকি টিভিতে তার জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতার লক্ষণ বোঝা যাচ্ছিল)। হারিরছি আরো বলেছিলেন, “এই ভাইরাস ভীষণ গণতান্ত্রিক; এ ধনী-গরীব কিংবা কূটনীতিজ্ঞ-সাধারণ জনগণের মধ্যে কোন ভেদ-বিভেদ করে না”।   এই বিষয়ে তিনি আসলে আগাগোড়াই সঠিক-আমরা সবাই এখন আসলে একই তরীর যাত্রী। অথচ যে বিষয়টি আমাদের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে বৈশ্বিক সংহতির নিশান উড়াচ্ছে সে বিষয়টিই প্রাত্যহিক জীবনে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে এমনকি স্ব-বিচ্ছিনতার কথাও বলছে। এমন চূড়ান্ত বিদ্রূপ মিস করা কঠিন।

    আমরা কেবলই এই ভাইরাল সঙ্কটের মোকাবেলা করছি না আরো মহাবিপর্যয় দিগন্ত হতে ধেয়ে আসছে অথবা বর্তমানেই নানা স্থানে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে। খরা, তাপদাহ, প্রলয়ংকারি ঝড়- এই তালিকাটি আসলেই বেশ দীর্ঘ। এই সবক্ষেত্রেই জবাবটি উদ্বেগ বা আতঙ্কে নয় বরং কার্যকর বৈশ্বিক সমন্বয়ের জন্য দরকারি কঠিন এবং জরুরী কাজের মাধ্যমে দিতে হবে।

    “এই মহামারীটি অতি দ্রুতই দমে যাবে। আমাদের অপেক্ষা করা উচিত এর চূড়ার (Peak) জন্য, তারপর জীবন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।” ট্রাম্প কর্তৃক সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময়ে প্রচারিত এই প্রচারের ফাঁদে হতে বেরিয়ে আসতে হবে। চীন অবশ্য এখনই তার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। তাঁদের সংবাদ-মাধ্যমগুলোতে এমন খবরও ভেসে বেড়াচ্ছে যে, মহামারী শেষ হয়ে গেলে পুষিয়ে নিতে সবাইকে শনিবার ও রবিবার কাজ করতে হবে। কিন্তু এইসব সরল আশার বিপরীতে দাড়িয়ে, এই সবকটি নেয়া জরুরী যে এই ভাইরাসটি এখানে থাকছেই। এই ধাক্কার ঢেউ মিলিয়ে গেলেও আরো নতুন ঢেউ আসতে পারে, হয়ত আরো ভয়াল মূর্তি ধারণ করে। সত্য হলো যে, যারা করোনার ভয়াল থাবা থেকে বেঁচে গিয়ে আরোগ্য  লাভ করেছিলেন তারাই আবার করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা আসলেই এক অশনিসংকেত।

    ঠিক এই কারণেই আমরা ধরে নিতে পারি যে এই ভাইরাল মহামারীটি আমাদের আশেপাশের মানুষ ও বস্তু, এমনকি আমাদের স্ব-শরীরের সাথের অনেক মিথস্ক্রিয়াতে প্রভাব ফেলবে। এসব থেকে পরিত্রান পাবার অনুশাসনের অভাব নেই। নোংরা জিনিস স্পর্শ করা হতে বিরত থাকা, কোন হুক স্পর্শ না করা, গণ শৌচাগার ব্যবহার না করা বা উন্মুক্ত কোন বেঞ্চে না বসা, আলিঙ্গন ও করমর্দন এড়িয়ে চলা… এবং বিশেষভাবে নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ ও স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গচালনার ব্যাপারে সচেতন থাকা। নাক স্পর্শ করা বা চোখ রগড়ানো হতে বিরত থাকা… এক কথায় নিজের সাথে কোন খেলা না করা। অর্থাৎ কেবল রাষ্ট্র ও অন্যান্য এজেন্সিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে তৎপর নয়, আমাদের নিজেরও শেখা জরুরী কীভাবে নিজেদের আরো নিয়ন্ত্রিত ও সংযত রাখা যায়। সম্ভবত ভার্চুয়াল রিয়েলিটিই কেবল নিরাপদ বলে গণ্য হবে এবং উন্মুক্ত স্থানে অবাধে চলাচল অতি-ধনীদের অধিকারে থাকা দ্বীপগুলোর জন্যই সংরক্ষিত থাকবে।২

    তবে আমাদের স্মরণ রাখা দরকার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও ইন্টারনেটের স্তরে “ভাইরাস” এবং “ভাইরাল” শব্দগুলি বিগত দশকেও ওয়েব-স্পেসে ডিজিটাল ভাইরাসের সংক্রমণ বুঝাতেই ব্যবহৃত হত। যার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা (যেমন আমাদের প্রয়োজনীয় উপাত্ত ও হার্ড ড্রাইভের ক্ষতি করা) প্রায়শ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বে আমাদের অজ্ঞাত থাকে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা আসলে আমূলে ঐ শব্দ যুগলের আক্ষরিক অর্থের প্রত্যাবর্তন। ভাইরাল সংক্রমণ আসলে ভার্চুয়াল ও বাস্তব দুই মাত্রায় হাতে হাত রেখে চলে।

    আর্টওয়ার্ক: এক্সট্রাকশন এন্ড প্যানডেমিক
    শিল্পী: ব্রিগেট ম্যাককেনজি
    সূত্র: মিডিয়াম

    আরেকটি উদ্ভট ঘটনা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা হলো পুঁজিবাদী  সর্বপ্রাণবাদের উচ্ছ্বসিত প্রত্যাবর্তন। যেখানে বাজার ও আর্থিক মূলধনের মতো সামাজিক ব্যাপারকে জীবিত সত্তা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের প্রধান মিডিয়াগুলোতে চোখ বুলালে যে কেউ এই ধারণা পোষণ করতে পারে যে আমাদের আসলে যে বিষয়টি নিয়ে বিচলিত হওয়া উচিত তা হলো- “আমাদের বাজারে চলমান সঙ্কট”। কোনও ভাবেই যে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে বা সামনে আরো যারা মারা যাবে তাঁদের নিয়ে নয়। করোনাভাইরাস আমাদের বিশ্ব বাজারের মসৃণ পথচলাকে সার্বিকভাবেই বিঘ্নিত করেছে। এইসবই কি বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনর্গঠনের অপরিহার্যতার বার্তা দেয় না, যা আর বাজার ব্যবস্থার করুণার উপর ভর করবে না ? অবশ্য তাই বলে এখানে পুরানা ধাঁচের সাম্যবাদের কোন ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে না। শুধুমাত্র এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার কথা ভাবা কি যায় যা অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রিত ও নিয়মাধীন রাখবে, সেই সাথে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লাগাম টেনে ধরবে। রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধকালীন সময়ে এটি করতে সফল হয়েছিল এবং কার্যতই আমরা এখন এক চিকিৎসা যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হচ্ছি।

    এই মহামারীটির কিছু ভালো দিক আমাদের নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করা উচিত। এই মহামারীটির মনে রাখার মতো এক প্রতীকী মুহূর্ত হলো প্রমোদতরীতে আটকে পড়া যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইন। আমার মতে প্রমোদতরীর এমন বেহায়াপনা হতে উৎকৃষ্ট অব্যাহতি। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে নিঃসঙ্গ দ্বীপ বা রিসোর্টসমূহ যেন ধনীদের একচেটিয়া বিলাসে পরিণত না হয়; ঠিক কয়েক দশক পূর্বে উড়োজাহাজ ভ্রমণ যেমনটি ছিল। বিনোদনের নানা পার্কগুলো ভূতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে… চমৎকার! ডিজনিল্যান্ড থেকে বিরক্তিকর ও নীরস কোন স্থানের নাম আমার মাথায় আসে না। ব্যক্তিগত গাড়ির উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে- অসাধারণ! এই পরিস্থিতি হয়তো ব্যাক্তিগত পরিবহণ নিয়ে আমাদের অতিউচ্ছ্বাসের বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য করবে। এই তালিকা আসলে বাড়তেই থাকবে।

    আর্টওয়ার্ক: স্টে হোম
    শিল্পী: সৈয়দা সুলতানা
    সূত্র: এজ ফাউন্ডেশন

    সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় ভিক্টর ওরবান বলেছিলেন, “উদারপন্থী বলে আসলে কিছু নেই। একজন উদারপন্থী ডিপ্লোমাধারী এক সাম্যবাদী ভিন্ন আর কিছু নয়”। এর বিপরীত নির্বচনটি সত্য হলে কেমন হবে? আমাদের স্বাধীনতার প্রতি যত্নশীলদের যদি আমরা “উদারপন্থী” হিসেবে অভিহিত করি এবং “সাম্যবাদী” হিসেবে তাদের যারা জানে (এই বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সঙ্কটের মাঝে) কেবলমাত্র কিছু মৌলিক পরিবর্তনেই ঐসব স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব। যেহেতু বৈশ্বিক পুঁজিবাদ একটি সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তখন আমাদের মধ্যে যারা এখনও নিজেদের “সাম্যবাদী”  হিসেবে পরিচয় দেয়, তারা আসলে ডিপ্লোমাধারী “উদারপন্থী” ভিন্ন কিছু নয়। এমন ধাঁচের “উদারপন্থী” যারা গুরুত্তের সাথে অধ্যয়ন করেন কেন তাদের উদারনৈতিক মূল্যবোধগুলো সঙ্কটের মুখে এবং বুঝতে পারেন একটি আমূল পরিবর্তনই কেবল তাদের বাঁচাতে পারে।

  • ভিত্তোরিও বুফাচ্চি।। করোনা ভাইরাস: বিশৃঙ্খলা ও আশা জাগানিয়া রাজনৈতিক দর্শন

    ভিত্তোরিও বুফাচ্চি।। করোনা ভাইরাস: বিশৃঙ্খলা ও আশা জাগানিয়া রাজনৈতিক দর্শন

    • অনুবাদ : রাগিব শাহরিয়ার

    কোনোকিছুই আগেরমত হবে না, এবং সম্ভবত এটা একটা ভালো বিষয়। বিশ্ব অর্থনীতির ওপর কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য বিধ্বংসী প্রভাব আদতে পরিমাপ-সুযোগের বাইরে। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে বিশ্বজুড়ে এই মহামারী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়াতে পারে।

    করোনা-সঙ্কটের শুরুতে ইতালিয়ানদের বাড়ির ব্যালকনি থেকে গাওয়া হৃদয়গ্রাহী গানের দৃশ্যপটে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক অস্থিরতা । একইসাথে খাবারের দোকানে লাইন বেড়েই চলেছে। যদি অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তবে তা নাগরিক সমাজকেও ভাঙবে। ঝুঁকিটা এখানেই। রাজনৈতিক দার্শনিকদের মতে, আমরা ‘প্রকৃতিরাজ্যে’র দিকে চালিত হচ্ছি।

    থমাস হবস

    ‘দি লেভিয়াথান’ বইতে থমাস হবস ‘স্টেট অফ নেচার’ বা প্রকৃতিরাজ্যের ধারণা প্রদান করেন। তিনি স্পষ্টই বলেছেন যে, প্রকৃতিরাজ্য- সময়ের দুর্গম অঞ্চলে ঘটে যাওয়া প্রাচীন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু এমনকিছু- যা যেকোনো সময়েই ঘটতে পারে।

    রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়লে তার জায়গা দখল করে বিশৃঙ্খলা। হবসের কাছে অবশ্যই এই ‘স্টেট অফ নেচার’ কোনো আকর্ষণীয় জায়গা ছিল না।

    উক্ত অবস্থায়- শ্রমশিল্পের জন্য কোনো জায়গা নেই, কারণ এটা থেকে ফলাফল অনিশ্চিত; অতএব পৃথিবীতে কোনো সংস্কৃতি নেই; কোনো নৌচালনা বা সমুদ্রপথে পণ্যের আমদানি নেই, ব্যবহার উপযোগী কোনো স্থাপনা নেই; গতিশীলতার জন্যেও নেই কোনো উপাদান।

    হবসের এরূপ ‘স্টেট অফ নেচারে’ আমরা এখনো আসিনি। তাঁর ভাষায় যাকে বলে ‘সময়ের কোনো হিসেব নেই; শিল্প নেই; চিঠিপত্র নেই; কোনো সমাজ নেই’- এরূপ অবস্থা এখনও আমরা অনুমান কিংবা আশা করি না। যদিও বর্তমানে এখন কোনো কনসার্ট, থিয়েটার, ভ্রমণ কিংবা খেলাধুলার আয়োজন নেই। হবস যাকে বলছেন “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ”, ঠিক তা-ই আমরা দেখতে শুরু করেছি; যেমন- বিশ্বমার্কেটে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সামগ্রীর জন্য এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে মারমুখী নিলামে অংশ নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এন্টি-লকডাউন বিরোধী আন্দোলন চলছে, একইসাথে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত ভারী-অস্ত্রে সজ্জিত র‍্যালিও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

    হবস কতিপয় শীতল ও স্মরণীয় শব্দে ‘স্টেট অফ নেচারের’ সারমর্ম তুলে ধরেছেন: ‘ক্রমাগত ভয় এবং ভয়ংকর মৃত্যুই সবচাইতে ভয়াবহ; মানুষের জীবন নির্জন, দরিদ্র, কদর্য, বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত।’ কোভিড-১৯ আমাদের সকলের ভেতর সঞ্চার করেছে- ক্রমাগত ভয়।

    সবকিছু হারিয়ে যায়নি

    সৌভাগ্যক্রমে, হবস আমাদের শেখায় যে আমরা উচ্ছন্নে যাইনি, ‘স্টেট অফ নেচার’ অতিক্রম করা সম্ভব। কিন্তু টিকে থাকার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতা।

    সকল দুর্ভাগ্য এবং হীনাবস্থা সত্ত্বেও এই ‘স্টেট অফ নেচার’ একটি ‘স্টেট অফ ইকুয়ালিটি’ কিংবা সাম্যাবস্থাও। আমরা সবাই মরণশীল এবং সমানভাবে দুর্বল। কোভিড-১৯ এর অধীনে এটাই এখন জীবনের সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভাইরাস প্রকৃতপক্ষেই একটা মহৎ সমতাসাধক, কারণ তা জাতীয়তা অথবা জাতিগত, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক শ্রেণি, ধর্ম বা ভাষাভেদে পার্থক্য করে না। আজ আমরা সবাই সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই মৌলিক সাম্যাবস্থা থেকে আরেক ধরনের বাস্তবতা উঠে আসে: কেবল একতা, দলগত কাজ এবং সংহতিই উক্ত অদৃশ্য শত্রুকে রুখতে পারে।

    হবসের ‘স্টেট অফ নেচার’ অতিক্রম করতে হলে আমাদের একটি নতুন সামাজিক চুক্তি জারি করতে হবে। একটি পারস্পরিক-লাভের চুক্তি যেখানে প্রত্যেকে একটি দীর্ঘমেয়াদী লাভের স্বার্থে অল্প সময়ের জন্য বিসর্জন দিতে সম্মত হবে। অথবা, এই বোঝাপড়াটুকু তাদের ভেতর কাজ করবে।

    একইভাবে, কোভিড-১৯ কাটিয়ে উঠবার লক্ষ্যে আমাদের একটি অভূতপূর্ব মাত্রার বিসর্জন, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। অস্থায়ী লকডাউনে জীবনযাপন করা এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা অনেক মানুষের জন্য একটি বড় বিসর্জন, বিশেষত যেহেতু বেকারত্ব বাড়ছে এবং অনেক ব্যবসায়ে ধ্বস নেমেছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ওপর আমাদের আস্থা রাখাটা জরুরি, যেহেতু (ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে) সবার মেনে চলার ভেতর দিয়েই জরুরি অবস্থাগুলো কার্যকর হবে।

    আর্টওয়ার্ক: টুগেদার
    শিল্পী: আমাদ রাহমা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতা ভঙ্গুর এবং অনিশ্চিত, বিশেষত একটি পুঁজিবাদী বিশ্বে, যেখানে স্বার্থপরতা একটি গুন এবং লোভীরা পুরষ্কৃত হয়। এই সংকট আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে ধরে নেয়া অনেক অনুমান নতুন করে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। যেমন: ব্যক্তিগত স্বার্থের সাধনা এই মুহুর্তে অকার্যকর এবং কোনো ট্রিকল-ডাউন প্রভাব থাকবে না (ট্রিকল ডাউন তত্ত্বানুযায়ী- বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলিকে দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা একপর্যায়ে ছোট ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের নিকট অর্পিত হবে)। একইসাথে অর্থহীন এবং অপব্যয়ী বস্তুবাদী মনোভাব আর টেকসই নয়।

    নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেবেন না

    পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি হচ্ছে বিনা পরিশ্রমে সুবিধা অর্জনকারী ব্যক্তিত্বরা। এরা জনমানুষের কষ্টার্জিত অর্জনে বিন্দুমাত্র অবদান না রেখে তাদের সহযোগিতা থেকে উপকৃত হতে চায়। এই প্রকৃতির ব্যক্তিত্বকে হবস ‘নির্বোধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    হবস ব্যাখ্যা করেন, নির্বোধেরা বিশ্বাস করে ন্যায় বলতে কোনোকিছু নেই এবং ব্যক্তি-স্বার্থের খাতিরে যেকোনো চুক্তি ভাঙা বৈধ। এই পৃথিবী নির্বোধে ভর্তি, কেবল সংকটের সময়েই তাদের ভেতরকার চরিত্র প্রকাশ পায়। লকডাউনের নিয়ম-নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এরা স্বার্থপরের মত পণ্যদ্রব্য মজুদ করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে ব্যবসায়ীরাও পড়ে যারা মানুষের ভয়কে কাজে লাগিয়ে খাদ্যদ্রব্য, ফেসমাস্ক অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মূল্যবৃদ্ধি করে যাচ্ছে। নির্বুদ্ধিতার পরিচয় এড়ানোর জন্য ব্যক্তি-স্বার্থ অথবা ব্যক্তিগত লাভের ঊর্ধ্বে গিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার উপর গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।

    হবসের ‘স্টেট অফ নেচার’ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ এর সাথে বসবাস আসলে পারস্পরিক সামাজিক সহযোগিতার রাজনীতির মুক্তিপরায়ণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে আমরা এমন সামাজিক বন্দোবস্তে প্রবেশ করতে যাচ্ছি যা একটি নতুন নাগরিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে তুলবে।

    সম্পাদকীয় নোট: ভিত্তোরিও বুফাচ্চি, ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক এর দর্শন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার। তার এই লেখাটি প্রকাশিত হয় The conversation পত্রিকায়।

  • সাম্রাজ্য স্বাধীনতা ইন্টারনেট

    সাম্রাজ্য স্বাধীনতা ইন্টারনেট

    • সেলিম রেজা নিউটন

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ একগুচ্ছ আইন রাষ্ট্রকে দিয়েছে নাগরিকের প্রাইভেসিতে হানা দেয়ার ক্ষমতা। সার্বক্ষণিক নজরদারিকে দেয়া হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। সেলিম রেজা নিউটন  বিশ্বব্যাপী চলতে থাকা গণনজরদারির রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করেছেন বর্তমান প্রবন্ধে। একই সঙ্গে হাজির করেছেন প্রাইভেসি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে চলতে থাকা নানা তৎপরতা ও আন্দোলনের পর্যালোচনা। লেখাটি প্রথমে অচেনা দাগ গ্রন্থে সংকলিত হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: ইন্টারসেকশন
    মিল্পী: ওলেস্কে কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রাইভেসি, সিক্রেসি, ট্রান্সপারেন্সি, ট্রাস্ট

    নিজেকে আমরা কার সামনে কতটুকু উন্মুক্ত করব, কতটুকু উলঙ্গ করব, সেটা আমাদের যার যার নিজস্ব ব্যাপার। এই নিজস্বতাটুকুর নাম প্রাইভেসি। উলঙ্গ হতে কি কেউ চায়? সদর রাস্তায়? প্রাইভেসি মানে তাই আব্রু। ব্যক্তিগত আব্রু। ব্যক্তির আব্রু। প্রাইভেসিকে সাধারণত ‘গোপনীয়তা’র সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। ‘গোপন’ শব্দটার সাথে প্রাইভেসির ধারণা মেলে না। ‘গোপন’ কথাটার মধ্যে কেমন জানি লুকানো লুকানো একটা ব্যাপার আছে। যেন কিছু একটা অকাজ-অপরাধ করে লুকাতে চাওয়া হচ্ছে। কেমন এক ধরনের চোর চোর ভাব। প্রাইভেসি জিনিসটা মোটেও তা নয়। একদমই না।

    প্রাইভেসির প্রকৃত অর্থ আসলে ‘আব্রু’। প্রাইভেসি হলো এমন একটা অবস্থা যেখানে একটা মানুষকে অন্যরা পর্যবেক্ষণ করে না, বিরক্ত করে না (অক্সফোর্ড ডিকশনারিজ ডট কম)। এটা একটা মানুষের একা থাকার অবস্থা (কেম্ব্রিজ ডিকশনারিজ অনলাইন: ডিকশনারি ডট কেম্ব্রিজ ডট অর্গ)। এটা এমন একটা অবস্থা যেখানে একটা মানুষ একা থাকতে সক্ষম হয়। অন্যে তাকে দেখে না। তার কথা শোনে না। গণমনোযোগের হাত থেকে মুক্ত এরকম একটা অবস্থার নাম প্রাইভেসি (লংম্যান ডিকশনারি অফ কনটেম্পোরারি ইংলিশ: এলডিওসিই অনলাইন ডট কম।) প্রাইভেসি হলো স্বাধীনতা। অন্য লোকের নজরদারির বাইরে, জানার বাইরে, কাজকর্ম করার স্বাধীনতা। (ম্যাকমিলান ডিকশনারি ডট কম)

    কথা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতার কথাও আসতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা আবশ্যক। প্রতিষ্ঠান বলতে এখানে এমনসব রাষ্ট্রীয়-আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হবে যাদের সিদ্ধান্তে-কর্মকাণ্ডে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তথা জনসাধারণ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্তৃত্বতান্ত্রিক এসব প্রতিষ্ঠান অন্যদের ওপর, অন্তত নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর, শাস্তি-পুরষ্কার ইত্যাদি চাপানোর ক্ষমতাও রাখে। যেমন রাষ্ট্র, নানান রাষ্ট্রীয় সংস্থা-সংগঠন-প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, বৃহৎ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ইত্যাদি। এইসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জরুরি।

    পরিবারও একটা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পরিবারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অর্থ আলাদা। এখানে স্বচ্ছতা মানে সবার সামনে উদোম হওয়া না। বেআব্রু হওয়া না। ব্যক্তির বেলায়ও তাই। ব্যক্তির স্বচ্ছতা বলতে সদর সড়কে উলঙ্গ হয়ে হাঁটা বোঝায় না। তবে হ্যাঁ, প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানগত কর্মকাণ্ডসমূহের স্বচ্ছতা আবশ্যক তো বটেই বটে। সেটা আদতে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতারই প্রশ্ন।

    তার মানে, স্বচ্ছতা দরকার প্রতিষ্ঠানের। আর ব্যক্তির দরকার ট্রান্সপারেন্সি নয়, ট্রাস্ট। বিশ্বস্ততা। নিজের প্রতি বিশ্বস্ততা। অন্যের প্রতি বিশ্বস্ততা। বিশ্বস্ততা হলো পারস্পরিক বোঝাপড়া। পারস্পরিক স্বাধীনতা। পারস্পরিক স্বরাজ। প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রাইভেসির প্রশ্ন নাই। প্রতিষ্ঠানের দরকার জবাবদিহিতা। ব্যক্তি-মানুষের কোনো ট্রান্সপারেন্সির প্রশ্ন নাই। ব্যক্তি-মানুষের দরকার প্রাইভেসি। ব্যক্তিগত আব্রু।

    ইন্টারনেটের স্বাধীনতা রক্ষায় তৎপর মানুষজনকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কেননা তাঁরা ‘সিক্রেসি’র সাথে ‘প্রাইভেসি’র পার্থক্য বিবেচনায় নিয়েছেন। প্রাইভেসি হলো আব্রু। প্রাইভেসি তাঁদেরই দরকার, যাঁরা বেআব্রু হতে চান না। আর গোপনীয়তা দরকার ক্রিমিন্যাল কর্মকাণ্ডের জন্য। গোপনীয়তা দরকার অপরাধীচক্রের। ক্রিমিন্যাল লোকজনের। যারা অন্যের ক্ষতি করে করতে চায়। সবাই জেনে গেলে তাদের কর্মকাণ্ড চালানো অসম্ভব। এই গোপনীয়তাই হলো ‘সিক্রেসি’। প্রাইভেসিকে যাঁরা গোপনীয়তা বলেন তাঁরা আসলে সিক্রেসির সাথে প্রাইভেসির পার্থক্য খেয়াল করেন না। কিংবা করতে চান না। না করলে তাঁদের সুবিধা হয়।

    গোপনীয়তার সাথে নিতান্ত যদি মেলাতেই হয়, প্রাইভেসিকে তাহলে বড়জোর ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ বলা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সিক্রেসি হলো প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তা। গোপনীয়তা ছাড়া প্রতিষ্ঠান বাঁচে না। কোকাকোলার ফর্মুলা মাত্রেই গোপন। প্রতিটা প্রতিষ্ঠান গোপনীয় সিদ্ধান্ত, আচরণ, তথ্যের আস্ত একেকটা স্তূপ।

    সুতরাং সর্বপ্রথম, গোপনীয়তা দরকার রাষ্ট্রের। সরকারের। রাষ্ট্র-প্রধান, সরকার-প্রধান আর মন্ত্রী-বাহাদুরদের তাই ‘গোপনীয়তার শপথ’ই নিতে হয়। সাংবিধানিকভাবে। সরকারের কর্মকর্তাদেরকেও নিতে হয় গোপনীয়তার এই শপথ। অনেক সময় গোপন চুক্তিও করতে হয় সরকারকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে। সরকার এমন আরো অনেক কাজ করে, যা সবাই জানলে ঐসব কাজ করা মুশকিল হয়ে যাবে। অসম্ভব হয়ে যাবে। জানাজানি হয়ে গেলে মানুষ বাধা দেবে। করতে দেবে না ঐসব কাজ। বিক্ষোভ হবে। প্রতিবাদ হবে। নানা কিছু হবে। সরকার অচল হয়ে যাবে। তাই তাদেরকে কাজ করতে হয় গোপনে। গোপনীয়তা দরকার তাই সরকারের।

    একই কারণে গোপনীয়তা দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর। সেনাবাহিনীর। বিশ্ববিদ্যালয়-সিন্ডিকেটের। রাষ্ট্রের মতোই, যেকোনো আমলাতন্ত্রের মতোই, তারা তাদের সিদ্ধান্তগ্রহণপ্রক্রিয়া ও বিশেষ বিশেষ সিদ্ধান্ত গোপন রাখে। হ্যাঁ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েরও একটা ‘গোপনীয় শাখা’ আছে। এবং এভাবে গোপনীয়তা দরকার কর্পোরেট বাণিজ্যগোষ্ঠীগুলোর। বড় বড় বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানগুলোর। এসবের মধ্যে মিডিয়াও পড়ে। গোপনীয়তা দরকার মিডিয়ারও। রাষ্ট্র-পার্টি-কর্পোরেট ও মিডিয়া কী প্রকাশ করে তার চেয়ে জরুরি হলো এরা কী গোপন রাখে। কী এরা প্রকাশ করে না। অন্যের কিছু না কিছু ক্ষতি না করে এরা নিজেদের মঙ্গল সাধন করতে পারে না।

    গোপনীয়তা আমাদের দরকার নাই। আমরা যারা সাধারণ মানুষ। নাগরিক মাত্র। আমরা অপরাধী নই। ক্রিমিন্যাল নই। অন্যের ক্ষতি করার কাজে আমরা নিয়োজিত নই। আমাদের গোপন করার কিছুই নাই। আমাদের লুকানোর কিছু নাই। কিন্তু আমাদের আড়ালের দরকার আছে। কখনও কখনও। কম অথবা বেশি। যার যার বিবেচনা মতো। সবার সামনে আমরা আমাদের জামাকাপড় ছাড়ি না। সবার সামনে আমরা মলত্যাগ করে আরাম পাই না। সবার সামনে আমরা সঙ্গম করি না। এসব কাজ ষড়যন্ত্রমূলক নয়। অপরাধমূলক নয়। বৈধ। স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক। তবু এগুলোর জন্য আমাদের একটু আড়াল দরকার হয়। ব্যক্তির এই আড়ালটুকুর নাম আব্রু। আমরা একটু আড়াল চাই। আব্রু চাই। প্রাইভেসি চাই। সবাই।

    আব্রু একটা পুরাতন ব্যাপার। স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, চিরন্তন ঘটনা। প্রাইভেসি বা আব্রু বলতে বোঝায় মর্যাদা, মানসম্ভ্রম, সম্মান, ইজ্জত, আবরণ, পর্দা, অন্তরাল, এবং আড়াল[১]। আব্রুই প্রাইভেসি। প্রাইভেসি হচ্ছে একটা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত আড়াল। ইন্টারনেট-পরিসরের জন্য প্রাইভেসি যা, অন্যান্য পরিসরের জন্যও তাই।

    দোকান থেকে আলু-পটল-ডিম-কনডম-অন্তর্বাস কিনে আমরা বাসায় নিয়ে আসি ব্যাগে করে। প্যাকেটে করে। ব্যাগে আমরা বোমা-অস্ত্র-মাদ্রকদ্রব্য বহন করছি, তা কিন্তু নয়। তবু ব্যাগটা ব্যবহার করি কেন? কারণ আমরা আব্রু চাই। স্বভাবত। আমরা প্রাইভেসি চাই। নিজ নিজ বিবেচনা মতো। কেন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ব্যাগে করে বহন করি, এই অভিযোগে কি রাষ্ট্র আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারে? আমাদেরকে আটক করতে পারে? অপরাধী বানাতে পারে? পারে না। কারণ প্রাইভেসি চিরবৈধ একটা ঘটনা। ব্যাগটা আর প্যাকেটটা আমাদের আড়ালের নিশ্চয়তা দেয়। প্রাইভেসির নিশ্চয়তা দেয়। এই নিশ্চয়তাটুকু আমাদের স্বাভাবিক অধিকার।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য কাইট
    শিল্পী: ক্যান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অনলাইন প্রাইভেসি এবং ক্রিপ্টোগ্রাফি

    সনাতন ডাকযোগাযোগের বেলায় ব্যক্তিগত আব্রুর এই নিশ্চয়তাটুকু অক্ষুণ্ণ ছিল। এখনও আছে। ডাকঘরের মাধ্যমে যোগাযোগ করার সময় এতকাল ধরে আমরা খাম ব্যবহার করেছি কেন? শুধুমাত্র পোস্টকার্ড ব্যবহার করি নি কেন? সব সময় করি না কেন? কারণ আমরা চাই না আমাদের চিঠি সবাই পড়ুক। আমরা চাই না আমাদের কথা যেকেউ তাদের খেয়ালখুশি মতো জানুক। আমরা নিজেদের আব্রু চাই। প্রাইভেসি চাই। আমরা তাই আমাদের চিঠিটাকে একটা খামের মধ্যে ভরে পাঠাই। তার মানে এই না যে আমাদের ঐ সব চিঠির মধ্যে মারাত্মক সব অপরাধের পরিকল্পনা লেখা ছিল। ইন্টারনেট-পরিসরে তাহলে কেন আমি আমার ইমেইল ন্যাংটা করে পাঠাতে বাধ্য হবো?

    প্রশ্ন হলো: ইন্টারনেট-পরিসরে আমার ইমেইলটাকে আমি একটা খামে বা এনভেলপে ঢোকাবো কীভাবে? আমার চিঠির এবং যাবতীয় যোগাযোগের প্রাইভেসির ব্যবস্থা করব কীভাবে? উত্তর হলো: ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে। ক্রিপ্টোগ্রাফি কথা এসেছে গ্রীক থেকে। গ্রীক ভাষায় ‘ক্রিপ্টো’ মানে লুকানো, গুপ্ত। আর ‘গ্রাফি’ অর্থ লিখন। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে দুজন ব্যক্তির মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের কলাকৌশল নিশ্চিত করার বিদ্যার নাম ক্রিপ্টোগ্রাফি।

    কম্পিউটার-প্রযুক্তির যুগে ক্রিপ্টোগ্রাফি আবির্ভূত হয়েছে সফটওয়ার হিসেবে। পিজিপি, টর, পিজিন, ওটিআর অরবট, গিবারবট, বিটকয়েন ইত্যাদি প্রভৃতি সফট-ওয়ারের সামনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলো রীতিমতো অসহায় বোধ করছে। এইসব সফটওয়ার নিজেরা কিন্তু কোনো গুপ্তলিপি নয়। এগুলো সব ওপেনসোর্স সফটওয়ার। এদের নিজেদের পূর্ণাঙ্গ সফটওয়ার কোড বা সংকেতলিপি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে।

    এইসব সফটওয়ার রচনা করেছে সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের সফটওয়ার-রচনাকারীরা। এবং তাঁরা এগুলো বিতরণ করেছে বিনামূল্যে। ইন্টারনেট-পরিসরে। সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের জন্ম খোদ ইন্টারনেটের জন্মের যুগে। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে। ইন্টারনেটের তখন সূচনা ঘটছে মাত্র। ইন্টারনেট তখন সামরিকবাহিনীর এবং তাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একচেটিয়া প্রযুক্তি। ঠিক তখনই জন্ম নেয় সাইফারপাঙ্কস। নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে শুরু করে ইন্টারনেট-যোগাযোগ। শুরুতে নিজস্ব ইমেইল-লিস্টের মাধ্যমে। সেই ইমেইল-যোগাযোগ শুরু থেকেই ছিল ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ারকে ভিত্তি করে আত্মসংগঠনে গড়ে ওঠা।

    সাইফারপাঙ্কসদের আন্দোলন আদতে ক্যালিফোর্নিয়া কেন্দ্রিক লিবার্টারিয়ান অ্যানার্কির একটা ধারা। মধ্য আশিতে প্রকাশিত হয় এঁদের ‘ক্রিপ্টোঅ্যানার্কিস্ট ম্যানিফেস্টো’ (টিমোথি মে, ‘ক্রিপ্টোঅ্যানার্কিস্ট ম্যানিফেস্টো’– পিটার লাডলো, ২০০১)। সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলন মনে করে, অপ্রতিরোধ্য ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার রচনা এবং ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আগ্রাসনকে প্রতিহত করা সম্ভব। সম্ভব ব্যক্তির প্রাইভেসি ও স্বাধীনতার সীমাকে বাড়িয়ে দেওয়া। সম্ভব ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়া।

    বইয়ের মলাটে গুস্তাভের পোট্রেট

    ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার কথাটাই অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে তুলেছিলেন জার্মান নৈরাজ্যপথিক গুস্তাভ ল্যানডাওয়া[২]। গুস্তাভ দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র কোনো চেয়ারটেবিল-স্থাপনা নয় যে একে ভেঙে ফেলা যাবে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা সম্পর্ক। বিশেষ ধরনের সম্পর্ক। রাষ্ট্রকে আমরা বদলাতে পারি, যদি আমরা রাষ্ট্র-সম্পর্কের বাইরে অন্য ধরনের (আন্তঃব্যক্তিক-সামাজিক) সম্পর্ক-প্রণালীতে পরস্পরের সাথে লিপ্ত হতে পারি। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যখন ২০০৬ সালে তার আইকিউ ডট অর্গ নামের ব্লগ লিখছিলেন, তখন তাঁর ব্লগে সবার ওপরে, নিজের ছবিটার নিচে, ছিল গুস্তাভের এ বিষয়ক উদ্ধৃতি:

    The State is a condition, a certain relationship between human beings, a mode of behavior; we destroy it by contracting other relationships, by behaving differently toward one another. … We are the state, and we shall continue to be the state until we have created the institutions that form a real community and society of men.

    আমি যতটা দেখতে পাই, আজকের সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের মূলমন্ত্র এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই। এবং তাঁরা হাতেকলমে দেখাচ্ছেন। কেমন করে বদলে দিতে হয় রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যকার সম্পর্ক, পুরো আর্থসামাজিক সম্পর্কপ্রণালী।

    রাষ্ট্র-কর্পোরেট নজরদারি বনাম ব্যক্তি-মানুষের প্রতিরোধ

    ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার আপনি-আমি ব্যবহার করব কেন? আমাদের সবার ভালো করে জানাও নেই, এনভেলপের চিঠির সাথে তুলনীয় সামান্য কোনো নিশ্চয়তাও ইন্টারনেটে নাই। স্মার্টফোনে নাই। ইয়াহু জিমেইল হটমেইল ওয়াই মেইল গুগল মেইল – এগুলো সবই একেবারে ন্যাংটা। একদম উলঙ্গ ইমেইল সার্ভিস এগুলো। স্কাইপ ফেসবুক টুইটার গুগল প্লাস – এসব সার্ভিসে আমাদের ইমেইল চ্যাট মেসেজ ছবি তথ্য – যাবতীয় কিছু ঠিক যেন খোলা পোস্টকার্ডের মতো। যেকেউ চাইলে আমাদের সমস্ত ইমেইল ইত্যাদি পড়ে ফেলতে পারেন। ব্যক্তিগত সব কিছু জেনে ফেলতে পারেন। তাঁর শুধু সামান্য একটু কারিগরি জ্ঞান থাকলেই হলো। গুগল এবং গ্রামীণ ফোন এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এবং অন্যসব কর্পোরেট-প্রতিষ্ঠানের আইন-অনুগত ও বাণিজ্য-অনুগত পার্টনার মাত্র। আমাদের যাবতীয় ব্যক্তিগত তথ্য যাচ্ছে রাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের হাতে। বিজ্ঞাপনী-বিপণনী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। শুধু ইমেইল চ্যাট এবং এসএমএস-ই নয়, আমাদের সমস্ত ধরনের অনলাইন-কর্মকাণ্ড এবং স্মার্টফোন-তৎপরতা তৃতীয় পক্ষের কাছে উদোম হয়ে থাকছে সার্বক্ষণিকভাবে। এবং সেগুলো নির্বিশেষে রেকর্ড করে রাখা হচ্ছে। পাইকারি হারে। গণহারে।

    এখন আমাকে-আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি কি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে সর্বপ্রকার হস্তক্ষেপমুক্ত এবং স্বাধীন (স্ব+অধীন) ইন্টারনেট চান? নাকি সিকিউরিটি-নজরদারি-নিষেধাজ্ঞার ইলেকট্রনিক দাসপ্রথা চান? সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সময় নাই। ভয়ংকর প্রত্যক্ষ হামলা শুরু হয়ে গেছে। আপনার যাবতীয় ইলেকট্রনিক যোগাযোগের চ্যানেলগুলোতে গোপন চোখ বসানো হচ্ছে। দৃশ্যমান সিসি-ক্যামেরা অথবা অদৃশ্যমান সফটওয়ার-চোখ। স্মার্টফোন ইমেইল চ্যাটিং নেট-ব্রাউজিং রাস্তাঘাট স্টেডিয়াম – কোনো জায়গায় আপনার-আমার কোনো প্রাইভেসি নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপে। সর্বত্র। মাইক্রোসফট ইয়াহু গুগল ফেসবুক ইউটিউব অ্যামেরিকান অনলাইন (এ.ও.ল.) অ্যাপল – কোথাও আপনার কোনো আব্রু নাই।

    গুগল আমাদের প্রত্যেকটা ক্লিক রেকর্ড করে। চাহিবা-মাত্র সরকারকে, সরকারি এজেন্সিকে দিয়ে দেয়। সিএআইএ-প্রধানের জিমেইল অ্যাকাউন্টও এফবিআইয়ের কাছে উলঙ্গ করে দেওয়ার ব্যবস্থা গুগলে আছে। (এ ঘটনাও ঘটেছে সাম্প্রতিক কালে।) বাকিদেরও একই অবস্থা। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সবই ন্যাংটা। সেখানে কোন তথ্য কোন পিসি থেকে, কোন ল্যাপটপ থেকে, কোন স্মার্টফোন থেকে, কোন সাইবার-ক্যাফে থেকে কোন আইপি-ঠিকানা হয়ে কোন দিক দিয়ে কোন পথ হয়ে কোথায় গেল সবই ফকফকা পরিষ্কার পদ্ধতিতে নথিভুক্ত থাকে। এমনকি ছদ্মনামেও যদি আপনি কোনো মতপ্রকাশ করেন, যোগাযোগ করেন— নিস্তার নাই। আপনি কোমলমতি প্রেমিক হতে পারেন, সৎ ও আন্তরিক সমাজকর্মী হতে পারেন, কঠিন মনের রাজনৈতিক পরিবর্তনকামী যোদ্ধা হতে পারেন, ব্লগার হতে পারেন, অনলাইন-অ্যাকটিভিস্ট হতে পারেন, বুয়েটের বা জাহাঙ্গীরনগরের কোনো আবেগপ্রবণ শিক্ষক হতে পারেন, সেনাবাহিনীর সদস্য হতে পারেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারক হতে পারেন — রেহাই নাই আপনার। উপযুক্ত ধরনের কোনো ক্ষমতাশালী মহলের একটুখানি নেকনজর আপনার প্রতি পড়লেই হলো। আপনার ঘাড়ের ওপর পড়তে থাকবে পুলিশী নিঃশ্বাস। গ্রেপ্তার। রিম্যান্ড। কারাগার।

    এটুকুই সব নয়। বিপদ আসলে অকল্পনীয় মাত্রায় ভয়াবহ। উদোম পোস্টকার্ডের সাথে উদোম ইন্টারনেটের পার্থক্য বিপুল। পার্থক্য মারাত্মক। পোস্টকার্ড অ্যানালগ। পোস্টকার্ডের আমলে বিশালতম কোনো গোয়েন্দা-প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও প্রত্যেকটা পোস্টকার্ডের বক্তব্য পড়া সম্ভব ছিল না। দরকারও ছিল না। সনাতন গোয়েন্দাগিরি ছিল নির্দিষ্ট নজরদারির কাল। ছিপ ফেলে মাছ ধরার মতো। নির্দিষ্ট কোনো ‘সন্দেহভাজন’ ব্যক্তিকে, বা তার সম্পর্কে বিশেষ কোনো তথ্যকে, বড়শিতে আটকাতে পারলেই কাজ হাসিল হতো। এখন চলছে পাইকারি নজরদারির যুগ।

    এখন পাইকারি হারে, যেন ‘কারেন্ট জাল’ দিয়ে, সমস্ত মাছ আটক করার প্রচলন ঘটেছে কম্পিউটার-প্রযুক্তির কল্যাণে। এখন আর বিশেষ কোনো সন্দেহ-ভাজনকেই যে খুঁজতে হবে তা নয়। এখন সবাই সম্ভাব্য সন্দেহভাজন। সবাই এখন সম্ভাব্য আলকায়দা। সবাই এখন মনে মনে মাওবাদী। আইনের চোখে এখন সকলেই হতে-পারে-অপরাধী। সুতরাং সবার সম্পর্কে তথ্য চাই। সম্ভব-অসম্ভব সব কিছু হাতে থাকা চাই। কখন কাকে লাগে ঠিক নাই। কখন কোনটা লাগে ঠিক নাই। কাজেই পাইকারিভাবে তথ্যসংরক্ষণ করা চাই। চাই গণনজরদারি। আজ থেকে ১৫ বছর পরে কাউকে বিশেষ সন্দেভাজন মনে হলে তার বিগত ১৫ বছরের অনলাইন-স্মার্টফোন-কর্মকাণ্ডের সুবিস্তারিত রেকর্ড চেক করা চাই। চেক করে দেবে সফটওয়ার। চোখের পলকে। এই হলো গণনজরদারির আদত কথা। (দ্রষ্টব্য: জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, ২০১২)

    ইঙ্গমার্কিন রাষ্ট্র এবং তাদের তাঁবেদার সরকারগুলো নানারকম আইন-কানুন-ফন্দিফিকির করে ইন্টারনেটকে উলঙ্গ করে ফেলার পথে নিয়ে এসেছে বলতে গেলে। ইন্টারনেটের সেবাদানকারী কর্পোরেট সংস্থাগুলো পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা-প্রতিষ্ঠানে। সর্বগ্রাসী নজরদারির রাষ্ট্রীয় প্রকল্প তো আছেই। সাথে আছে সরকার-নিয়োজিত প্রাইভেট গোয়েন্দা কর্পোরেট-সংস্থাসমূহ। অরওয়েলের সেই কিংবদন্তীর সতর্কবাণী এখন ইন্টারনেটের জন্য ডালভাত। বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ। এভরিহোয়ার। এভরি মোমেন্ট।

    কিন্তু বিগ ব্রাদারের ভয়ে দাসের জীবন যাপন করতে পারে না মানুষ। শেকল-বাঁধা ক্রীতদাসও নিজেকে মুক্ত করার জন্য ঝুঁকি নেয়। আজকের যুগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, চাকরি-পরিবার-প্রেম হারানোর ঝুঁকি নিয়ে, পাইকারি নেট-নজরদারির আশঙ্কা ও দাবির সত্যতার সাক্ষাৎ প্রমাণ দিয়েছেন তরুণ মার্কিন কম্পিউটার-বিশ্লেষক এডওয়ার্ড স্নোডেন। সেটা তিনি করেছেন ক্রিপ্টোগ্রাফিক-যোগাযোগের মাধ্যমেই বটে। সিআইএর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে কর্মরত এই ৩০ বছরের তরুণ যা জানিয়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে: এক ডজনের বেশি দেশের এক বিলিয়ন মতো গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহে লিপ্ত আছে মার্কিন সংস্থাগুলো। কোন কোন আইনের অধীনে, কী কী প্রকল্পের অধীনে, কোন কোন সফটওয়ারের মাধ্যমে এই পাইকারি গোয়েন্দা নজরদারি চলছে তার বিস্তারিত বিবরণ স্নোডেনের দেওয়া তথ্য মোতাবেক মাস খানেক ধরে ছেপেছে বৃটেনের গাডির্য়ান পত্রিকা। (দ্রষ্টব্য উইকিপিডিয়া: এডওয়ার্ড স্নোডেন।) অ্যাসাঞ্জ স্বয়ং জানিয়েছেন, স্নোডেনের কাছে আছে অনেক মহাজরুরি তথ্য, যার প্রকাশ অচিরেই ঘটবে। আটকাতে পারবে না কেউ।

    আর্টওয়ার্ক: আইএম আন্ডার সার্ভিল্যান্স
    শিল্পী: জোয়াও কর্ডোসো
    সূত্র: আর্টস্পার

    এভাবে এক দিকে চলছে সর্বগ্রাসী নজরদারি। রাষ্ট্র-কর্পোরেট-সেনাবাহিনীর দিক থেকে। গোটা ইন্টারনেট স্বাধীনতা ও ভবিষ্যত হয়ে পড়ছে বিপন্ন। অন্য দিকে চলছে, প্রাইভেসি রক্ষার লক্ষ্যে অজস্রমুখী সামাজিক নড়াচড়া। নানামুখি আন্দোলন। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের গণডিজিটাল দস্তখতের চাপে এ পর্যন্ত থমকে গেছে বেশ কয়টা মারাত্মক মার্কিন আইন। প্রাইভেসিবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী আইন। পাশাপাশি চলছে সাইফারপাঙ্কস-আন্দোলনের ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার লেখার অপ্রতিরোধ্য বাস্তব তৎপরতা। এমন সব সফটওয়ার, যা ইন্টারনেট- প্রাইভেসিকে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য করে তুলছে দিনকে দিন।

    কেন আমি খামে ভরে চিঠি পাঠাচ্ছি, এই অভিযোগ রাষ্ট্র কখনও আমার বিরুদ্ধে তোলে নি। তুলতে পারে নি। তোলাটা নিতান্তই অবান্তর বটে। এ নিয়ে যুক্তিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু আমার ইমেইলকে ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ার দিয়ে খামের মতো করে আড়াল করার প্রাইভেসি-প্রচেষ্টার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্র। প্রাইভেসি রক্ষার জন্য নিবেদিত এসব ওপেনসোর্স-সফটওয়ারকে অবৈধ, অপরাধমূলক বলে প্রতিপন্ন করার সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারা। সফল হচ্ছে কখনো, কখনো-বা ব্যর্থও হয়েছে। সেসবের বিস্তারিত কাহিনী এখন নয়।

    আজ শুধু এটুকুই বলার যে: ক্রিপ্টোগ্রাফিক সফটওয়ারের ব্যবহারই পারে ইন্টারনেট-পরিসরে আমাদের প্রাইভেসিকে রক্ষা করতে। এইসব সফটওয়ার ব্যবহারের বিপুল বিস্তৃতি ঘটানোর মধ্য দিয়ে আমরাই পারি ইন্টারনেটের স্বাধীনতা এবং আমাদের প্রাইভেসি নিশ্চিত করতে। ভয়ংকর নিপীড়নমূলক এবং গণনজরদারিমূলক রাষ্ট্র-কর্পোরেট-গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করতে। ব্যক্তির ও সমাজের স্বাধীনতার সীমাকে অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তৃত করতে।

    লাভাবিট এবং সাইলেন্ট মেইল বন্ধের ঘটনা

    সবর্গ্রাসী রাষ্ট্রকর্পোরেট-নজরদারি তো আছেই। এবার, আস্ত একটা ইমেইল সার্ভিস ‘লাভাবিট’ বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে মার্কিন সরকার। অভিযোগ: মস্কোর শেরেমেতেভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে-পড়া অবস্থায় এডওয়ার্ড স্নোডেন একটি লাভাবিট-অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ইমেইল করেছিলেন মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ও কর্মীদের কাছে। ইমেইল করেছিলেন তাঁর সংবাদ-সম্মেলনে আসার জন্য। এই ইএমইলের অভিযোগে দশ বছরের পুরানো, চার লক্ষাধিক গ্রাহকের একটা বৈধ, মার্কিন কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় চাপে।

    লাভাবিট গড়ে ওঠে ২০০৪ সালে। ১০ বছর ধরে লাভাবিট ছিল একটা জনপ্রিয় ইমেইল সার্ভিস। ২০১৩ সালে এর গ্রাহক ছিল ৪,১০,০০০। এঁরা ফ্রি সার্ভিস দিতেন। ১২৮ মেগাবাইট পর্যন্ত। আবার পেইড সার্ভিসও দিতেন। ৮ গিগাবাইট পর্যন্ত। টেক্সাসের সফটওয়ার-প্রোগামাররা এটা গড়ে তুলেছিলেন। জিমেইল গুগল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের তথ্য গোপনে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন এবং মার্কেটিং ডাটা প্রস্তুত করে থাকে। গ্রাহকদের কোনো প্রাইভেসি থাকে না। প্রাইভেসির ব্যাপারটা নিয়ে এই উদ্বেগের কারণে লাভাবিট বানান তাঁরা। এতে তাঁরা গ্রাহকদের প্রাইভেসির পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে পেরেছিলেন ‘অ্যাসিমেট্রিক এনক্রিপশন’ তথা ‘পাবলিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি’র দুর্ভেদ্যতা দিয়ে। কোনো নিরাপত্তা এজেন্সির পক্ষেই লাভাবিটের প্রাইভেসি-প্রতিরক্ষা ভাঙা সম্ভব ছিল না। দশটা বছর ধরে তিল তিল করে নিজের হাতে গড়া এই লাভাবিটের মালিক ল্যাডার লেভিসন গত ৮ই আগস্ট লাভাবিটের হোমপেজে লিখেছেন:

    আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছে। হয় আমাকে মার্কিন জনসাধারণের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে হবে, না হয় আমাকে প্রায় ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা লাভাবিট বন্ধ করে চলে যেতে হবে। বিপুল পরিমাণে আত্ম-অনুসন্ধানের পরে আমি এটা আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই নিয়েছি।

    ‌যা আমাকে এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিল আইনসম্মতভাবে তা যদি আমি আপনাদের জানাতে পারতাম! আমি পারছি না। কী ঘটে চলেছে তা আপনাদের জানা দরকার বলে আমার মনে হয়। [মার্কিন সংবিধানের] প্রথম সংশোধনীর দিক থেকে এই ধরনের পরিস্থিতিতে মুখ খোলার স্বাধীনতার গ্যারান্টি মনে হয় আমার পাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কংগ্রেস এমন সব আইন পাশ করেছে যা অন্য কথা বলে।

    এখন অবস্থা যা, আমার গত ছয় সপ্তাহের অভিজ্ঞতা আমি জানাতে পারছি না, যদিও আমি দুই-দুইবার যথাযথভাবে অনুরোধ জানিয়েছি মুখ-
    খোলার অনুমতি পাওয়ার জন্য।

    এখন কী ঘটতে যাচ্ছে? ফোর্থ সার্কিট আপিল আদালতে সংবিধানের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো কাগজপত্র আমরা তৈরি করতে শুরু করেছি। মার্কিন কোম্পানি হিসেবে লাভাবিটকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমাকে অনুমোদন দিতে পারে এই আদালতের অনুকুল একটা সিদ্ধান্ত।

    এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছে। … আমি খুব শক্তভাবে বলে রাখতে চাই। বিশ্বস্ততার গ্যারান্টিসহকারে ব্যক্তিগত তথ্য গচ্ছিত রাখার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত কোনো কোম্পানিকে কেউ যেন বিশ্বাস না করে।

    লাভাবিট একটা ছোট-কিন্তু-স্বনামধন্য কোম্পানি। এর মালিক লেভিসন একা হাতে এই প্রতিষ্ঠানটা চালান। একজন মাত্র পূর্ণকালীন কর্মচারি আছেন তাঁর, যিনি ইউরোপের একজন গ্রাজুয়েট-ছাত্র। বার্ষিক কমবেশি এক লক্ষ ডলারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল একটা মানুষের। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। মার্কিন মিডিয়া হাফিংটন পোস্টের সাথে একটা ভিডিও-সাক্ষাৎকারে লেভিসন বলেছেন: ‘তোমার সমস্ত টাকাপয়সা এবং স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা [মার্কিন] সরকারের আছে।’ মনের দুঃখে লাডার লেভিসন নিজের ইমেইল-অ্যাকাউন্টটা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে বলেছেন: ‘আমি আর ইমেইল ব্যবহার করছি না। ইমেইল সম্পর্কে আমি যা জানি, তা যদি আপনিও জানতেন তাহলে আপনিও ইমেইল ব্যবহার করতেন না।’

    যে পদ্ধতিতে লাভাবিট বন্ধ করে দিল মার্কিন সরকার তা অকল্পনীয় ধরনের বিপজ্জনক। সরকার নিজে ঘোষণা দিয়ে এটা বন্ধ করে দেয় নি। মালিককে বাধ্য করেছে বন্ধ করে দিতে। এবং মালিক লেভিসন যেন এ ব্যাপারে প্রকৃত ঘটনা কাউকে না জানান সে ব্যাপারে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে মহান আদালত। কী সেই নিষেধাজ্ঞা, তার শর্তাবলী কী, সেগুলো বলার অনুমোদনটুকুও লেভিসনের নাই। গণতান্ত্রিক দেশ বটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

    তবে ‘গাডির্য়ান’ পত্রিকার রিপোর্টার স্পেন্সার অ্যাকারম্যান তাঁর ৯ই আগস্টের (২০১৩) রিপোর্টে একটা ধারণা দিয়েছেন। সেটা হলো: গোপন মার্কিন আদালত লাভাবিটকে হুকুম দিয়েছিল যেন তাঁরা তাঁদের গ্রাহকদেরকে রাষ্ট্রীয় নজরদারির আওতায় আনার ব্যাপারে মার্কিন সরকারের সাথে সহযোগিতা করে। কিন্তু সরকারি নজরদারিতে অংশ নিতে রাজি হয় নি লাভাবিট। গ্রাহকদের প্রাইভেসির ব্যাপারে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবিধানবিরোধী হুকুম তামিল করে ব্যবসা করতে চান না তাঁরা। রাষ্ট্রীয় নজরদারির প্রকল্পে দালালি করার হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর কৌশল হিসেবে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের লাভাবিট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

    লাভাবিটের পর আরো একটা নিরাপদ ইমেইল কোম্পানি ‘সাইলেন্ট সার্কেল’ও মার্কিন নজরদারি প্রতিষ্ঠান এনএসএ-এর ভয়ে বন্ধ করে দিয়েছে নিজেদের ইমেইল সার্ভিস ‘সাইলেন্ট মেইল’। সাইলেন্ট সার্কেলের অন্যতম মালিক ‘ইন্টারনেট সিকিউরিটি গুরু’ ফিল জিমারম্যান। ‘পিজিপি’ (প্রেটি গুড প্রাইভেসি) নামের দুর্দান্ত সিকিউরিটি-প্রাইভেসি সফটওয়ারের উদ্ভাবক তিনি। ওপেনসোর্স এই সফটওয়ার উদ্ভাবন এবং সেটা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রায় জেলে যেতে বসেছিলেন তিনি। জিমআরম্যানরা বলেছেন, তাঁরা কোনো সরকারি আদেশ পান নি বটে, কিন্তু ‘দেওয়ালেই তো সব লেখা আছে’। গোপন আদালতের গোপন আদেশ আসার আগেই, লাভাবিট বন্ধের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, তাড়াহুড়া করে তাঁরা তাই তাঁদের সাইলেন্ট মেইল সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়। তাঁরা তাঁদের সার্ভার থেকে গ্রাহকদের যাবতীয় তথ্য মুছে ফেলেছেন। জিমারম্যান বলেছেন, লাভাবিটের লেভিসনের মতো তিনিও এখন ইমেইল কম ব্যবহার করছেন। এর আব্রু-নিরাপত্তা কম। তিনি বরং এনক্রিপ্টেড মোবাইল মেসেজিঙের ওপর নির্ভর করেন বেশি। সাইলেন্ট সার্কেলের মোবাইল সার্ভিস ‘সাইলেন্ট ফোন’ এবং ‘সাইলেন্ট টেক্সট’ অবশ্য পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে চালু আছে। এই সার্ভিস দুটো বন্ধ না করার কারণ আছে। এগুলোর গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে ঢোকার পাসওয়ার্ড গ্রাহকদের কাছেই থাকে। সাইলেন্ট সার্কেলের কাছে থাকে না। কাজেই আদালত হুকুম করলেও তারা গ্রাহকদের কোনো তথ্য আদালত বা সরকারকে দিতে সক্ষম নন। ইমেইলের বেলায় ব্যাপারটা এরকম করা সম্ভব হয় না। সেখানে বিশাল বিশাল পাসফ্রেজ গ্রাহকরা সার্ভারেই গচ্ছিত রাখেন। সেই পাসফ্রেজটা জানার জন্য তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত অন্য একটা পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করেন। ফলে সার্ভারের মালিককে চাপ দিয়ে গোট সার্ভার-সফটওয়ারটাকে কমবেশি বদলে ফেলার সুযোগ বা গ্রাহকদের সম্পর্কে তথ্য জানার সুযোগ আদালতের বা রাষ্ট্রের থাকে।

    ফিসা-আদালত, এনএসএ এবং এডওয়ার্ড স্নোডেন

    সংগুপ্ত ‘ফিসা’-আদালতের আদেশ একবার এসে গেলে আপনি তা তামিল করতে বাধ্য। কী আদেশ এসেছে তা নিয়ে আপনি কাউকে কিছু বলতেও পারবেন না। এই হচ্ছে ফিসা-আইন বা ফরেন ইন্টেলিজেন্স সারভেইল্যান্স আক্টের মাহাত্ম্য। এই আদালতের গোপন হুকুমে এনএসএ-এফবিআই এখন প্রায় যাবতীয় ইলেকট্রনিক যোগাযোগ কোম্পানির সার্ভারে সরাসরি ঢুকতে পারে। পাইকারি হারে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কোম্পানি গররাজি হতে তো করতে পারবেই না, কাউকে কিছু জানাতেও পারবে না। এই মুহূর্তে, এনএসএ-এফবিআই প্রতিদিন ২০ টেরাবাইট করে গ্রাহক-ডাটা সংগ্রহ করে। গোপনে।

    ‘গোপন কথা সব গোপনই ছিল’। কিন্তু এনএসএ এবং সিআইএর এক স্বাধীনতাপিপাসু কম্পিউটার-বিশ্লেষক এডওয়ার্ড স্নোডেন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন সাম্রাজ্যের সাধ। কাছাখোলা, পাইকারি, রাষ্ট্রীয় নজরদারির বেশ কয়েকটা ভয়ংকর নথি তিনি তুলে দিয়েছেন বৃটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ডের হাতে। এসব নথি খোদ এনএসএর ‘টপ সিক্রেট’ নথি।

    গার্ডিয়ান তা পরীক্ষানিরীক্ষা করে একের পর এক ধারাক্রমিক রিপোর্ট ছেপেছে গত জুন মাসে। সেসব রিপোর্ট যদি আপনি পড়ে থাকেন তাহলে এরই মধ্যে নিশ্চয়ই আপনার ‘দ্য হেড মুভস রাউন্ড দ্য সান’ অবস্থা। ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে হৈচৈ লেগে গেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। একাধিক জার্মান মন্ত্রী বলেছেন, ব্যক্তিগত আব্রু যাঁরা চান, তাঁরা যেন কেউ কোনো মার্কিন সার্ভারের সার্ভিস গ্রহন না করেন। সাইলেন্ট সার্কেলও তাঁদের সার্ভার সুইজারল্যান্ডে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করছে। এবং এরই মধ্যে গ্রাহকদের সচেতনতার কারণে মার্কিন ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় মারাত্মক ধ্বস নামতে শুরু করেছে। মার্কিন সার্ভারগুলোকে কেউ বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না।

    উল্লেখ্য, এইসব মার্কিন সার্ভারের মূল সফটওয়ারের ভেতরে এনএসএ-এফবিআই এখন বসিয়ে দিচ্ছে চোরা সফটওয়ার। ফিসা-আইনের বদৌলতে। সিকিউরিটি-ভাষ্যকাররা বলছেন, লাভাবিটকেও এই একই আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা সেটা তামিল করার বদলে খোদ কোম্পানিটাই বন্ধ করে দিয়েছেন, যেন তাঁদেরকে গ্রাহকদের সাথে বেঈমানি করতে না হয়। স্বভাবতই লাভাবিটকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। স্নোডেন বলেছেন, অন্যসব বড় বড় কোম্পানিও লাভাবিটের পথ অনুসরণ করছে না কেন?

    গোপন আদালতের গণতন্ত্র

    লাভাবিট বন্ধ হয়ে যাওয়া বিষয়ক একটা রিপোর্টে বিশেষ জরুরি একটা কথা মনে করিয়ে দিয়েছে গার্ডিয়ান পত্রিকা। লাভাবিটই প্রথম কোম্পানি যাঁরা সরকারি নজরদারির অংশীদার না হয়ে নিজেদের কোম্পানি নিজেরা বন্ধ করে দিলেন। তাহলে এরকম কোম্পানি নিশ্চয়ই আরো আছে, যারা কোম্পানির ব্যবসা বাঁচানোর স্বার্থে গ্রাহকদের প্রাইভেসি উদোম করে দিয়েছে ‘এনএসএ’র কাছে? গ্রাহকদের আব্রু যায় যাক, কোম্পানির ডলার বাঁচুক।

    আর্টওয়ার্ক: ইন্সপেকশন এন্ড সেন্সুর
    শিল্পী: মোহসেন জারিফিয়ান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    হ্যাঁ, এরকম কোম্পানি আছে। এক গাদা আছে। আপনার-আমার প্রিয় এবং বিশ্বস্ত সব খ্যাতিমান কোম্পানি। এঁরা হলেন: ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগল এবং ইত্যাদি এবং প্রভৃতি। পাইকারি নজরদারি প্রকল্পের তাঁরা আইনসঙ্গত রাষ্ট্রীয় পার্টনার। নোম চমস্কির ‘দ্য স্টেট-কর্পোরেট কমপ্লেক্স’-এরই এ আরেক রূপ বটে।

    এইসব নামজাদা কোম্পানি আপনার-আমার যাবতীয় একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য দৈনিক-ভিত্তিতে কাছা খুলে তুলে দেয় ‘মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি’ বা এনএসএ-র কাছে। সুতরাং ল্যাডার লেভিসনের কথা সিরিয়াসলি আমলে না নেওয়া অসম্ভব। কেউ যেন ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগলকে সামান্য বিশ্বাসও না করেন।

    এই হলো মার্কিনী ‘গোপন আদালতের গণতন্ত্র’। ফিল জিমারম্যান ঠিকই বলেছেন, এই আদালতের আদেশ আর খামে করে পাঠাতে হয় না। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রিত থাকে তা। নিতান্ত অন্ধ না হলে পড়তে সমস্যা হয় না। এগুলো সব ‌‘আইনী প্রক্রিয়া’! আইনের শাসন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গোপন আদালতের গণতন্ত্র’ এই হাল করেছে বিশ্ববন্দিত আইনের শাসনের। এ যেন সত্যিকারের হরর সিনেমা। জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের বিগ ব্রাদারের সর্বগ্রাসী নজরদারি-সাম্রাজ্যের কল্পনাকেও হার মানাতে যাচ্ছে আজকের ওয়াশিংটনের সাইন্স ফিকশন হরর মুভি।

    সেনা রাষ্ট্র-কর্পোরেট নজরদারি ঠেকানোর পথ কী?

    এখানে উপস্থাপিত সার্বিক আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে এবং সমাজ-সচেতন প্রাণী হিসেবে আমাদের নিজেদের কর্তব্যের প্রশ্নটাও এসে যায়। প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, আলোচ্য প্রসঙ্গ সম্পর্কে যথাসম্ভব পড়াশোনা করা, জানা-বোঝার চেষ্টা করা, এগুলো নিয়ে বন্ধু-বান্ধব-সহকর্মী-সাথী-পরিবারের সাথে শেয়ার করা। এইসব কথাবার্তা আপনি নামজাদা-খ্যাতিবাহাদুর অধিপতি মিডিয়ায় পাবেন না। যদিও বা পান, পাবেন টুকরা-টাকরা-বিক্ষিপ্ত-এলোমেলো সংবাদ-কণিকা, যা থেকে সার্বিক কোনো ধারণা পাওয়ার সামান্য উপায়ও নেই। সুতরাং আমাদের নিজেদের দিক থেকে জ্ঞান-কর্ম-সক্রিয়তার কোনো বিকল্প নেই। অন্যরা কী করছেন না করছেন সেদিকে তাকিয়ে বসে থাকার অবকাশও নেই। হাতে সময় নেই একেবারেই।

    যে বিপদের কথা এখানে আলোচিত হচ্ছে তা কিন্তু স্রেফ ইউরোমার্কিন বিপদ নয়। এ বিপদ রওনা দিয়েছে আমাদের ধনলুণ্ঠিত তৃতীয় বিশ্বের দিকেও। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম আশু টার্গেট। ইঙ্গমার্কিন সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের কাছে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। তথাকথিত মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ এবং আফগানিস্তান-ইরাক-পাকিস্তান-সিরিয়ার কথা মনে রাখলে এই বিপদের গন্ধ সুনিশ্চিভাবে আপনার সুনিদ্রা ব্যাহত করবে। উইকিলিকসের উন্মোচনসমূহের মধ্যে যদি আপনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের গোপন দলিলপত্র নাড়াচাড়া করে দেখেন তাহলে শিউরে উঠবেন। বাংলাদেশের যাবতীয় সামরিক সংস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-প্রণালীর ওপরে মার্কিন প্রভাবের যে ইশারা সেগুলোতে আছে তা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র-সরকার-সংসদ ও সামরিক বাহিনী-সমূহের সম্যক আন্দাজ আছে কিনা আমি জানি না। আমার সংশয় আছে।

    সম্প্রতি, বিডিআর-বিদ্রোহ নিয়ে আমার বইটার (‘বিদ্রোহের সপ্তস্ব: বিডিআর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়) বিস্তারিত-পরিমার্জিত-পরিলিখিত দ্বিতীয় সংস্করণের কাজ করতে গিয়ে ঐসব দলিলপত্র আমাকে নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কথাগুলো তোলা। এখানে আপাত বড়ো পরিসরের আলাপে ঢোকার অবকাশ নাই। শুধু মনে রাখলেই চলে যে মূলত ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ দমনের নামে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানারকম গোপন চুক্তি চলছে যা আমরা জানি না। এসব চুক্তির বিষয়বস্তু কী তাও আমরা জানি না। উপরোক্ত মার্কিন দলিলগুলোতে দেখেছি বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন আগ্রহের প্রধান জায়গা হচ্ছে নিরাপত্তা আর কর্পোরেট ব্যবসা।

    সুতরাং নিরাপত্তা চুক্তির নামে যে বাংলাদেশকে মার্কিন এনএসএ-নজরদারি-প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করবে তা ধারণা করাটা অমূলক নয়। জানি না এতদিনে এ কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে কিনা। সুতরাং এ ইন্টারনেটের স্বাধীনতা এবং নজরদারিমুক্ত নাগরিক-স্বাধীনতার প্রসঙ্গগুলো জানা এবং প্রচার করার কর্তব্য আমাদের থাকে। আমাদের দ্বিতীয় কর্তব্য, আমার ধারণা, মার্কিন নজরদারির পার্টনার-কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে নীতিগত কারণে যথাসম্ভব পরিত্যাগ করা এবং বিকল্প-স্বাধীনতার পথে ইন্টারনেট ব্যবহার করার অভ্যাস করা। দ্বিতীয় এই দিকটা নিয়ে এখানে অতি সামান্য দুই-একটা উপায়ের কথা বলে রাখার অবকাশ আছে। নিজের ক্ষেত্রে আমি বহুল ব্যবহৃত সার্চইঞ্জিন ‘গুগল’ বিদায় দিয়েছি। গ্রহণ করেছি নতুন, দুর্দান্ত একটা সার্চইঞ্জিন ‘ডাকডাকগো’। এটা অতি অ-সাধারণ একটা সার্চ ইঞ্জিন। অধিকন্তু, এটা একটা প্রাইভেসি- সার্চইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন আপনার ব্যক্তিগত তথ্য-পরিচয়-স্থান ইত্যাদি অনুসরণ করে না। রেকর্ড করে রাখে না। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বেচে না। রাষ্ট্রীয় এজেন্সিকে দেয় না। এদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য চাইলে কয়েকটা লিংকে ঢুকে দেখা যাতে পারে। গুগল কীভাবে আপনার বারোটা বাজায়, ‘ডাকডাকগো’ কীভাবে বাজায় না সে সম্পর্কে জানার জন্য দ্রষ্টব্য: http://donttrack.us/। বাবল প্রযুক্তি কীভাবে টিকটিকিগিরি করে আমাদের ব্রাউজারে, সে সম্পর্কে জানার জন্য দ্রষ্টব্য: http://dontbubble.us/। আপনার ব্রাউজারের প্রাইভেসির জন্য দারুণ কিছু টিপস পাওয়া যাবে এখানে: http://fixtracking.com/। ‘ডাকডাকগো’ নিয়ে একটা ছোট অ্যানিমেশন দেখা যাবে এখানে: https://duckduckgo.com/about।

    এখানে যে লিংকগুলো দিয়েছি সেগুলোতে কয়েকটা প্রাইভেসি- অ্যাডঅন আছে। সেগুলো ইন্সটল করলে হাতেনাতে ফল পাবেন। হাতেনাতে দেখতে পাবেন। নিজের চোখে। দেখবেন কারা আপনাকে ট্র্যাক/ফলো করছে। এবং তাদের কীভাবে থামানো হচ্ছে। রাষ্ট্র- কর্পোরেট নজরদারি তো মানি না মানব না দিয়ে থামানো যাবে না। আপনাকে আপনার নিজের ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আপনার-আমার অভ্যাস বদলাতে হবে। সফটওয়ার বদলাতে হবে। গুগল ছাড়তে হবে। ফেসবুক ছাড়তে হবে। তবেই এই রাষ্ট্র-কর্পোরেট সিস্টেমের আক্কেল হবে। সুতরাং নিজেকে তৈরি করুন। প্রস্তুত হোন। রাষ্ট্র-কর্পোরেট সফটওয়ার ব্যবহারের চিরঅভ্যাসের চিন্তাদাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন।

    তথ্যচোর, প্রাইভেসি-চোর গুগল তো ছেড়ে দিয়েছি। এবার ফেসবুকের বন্ধুদেরকে ফেসবুকের বিপদআপদগুলো বলা দরকার। এবং ফেসবুকের তাদেরকে ডায়াস্পোরে আসার দাওয়াত দেওয়াও দরকার। এটা নিতান্ত আমার-আপনার নিতান্ত ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপার না। এমন কোনো আকামকুকাম আমি-আমরা করি না যে, আমাকে-আমাদেরকে মুখোশ পরে লুকিয়ে ঘুরতে হবে। আসলে এটা একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত। কী ধরনের রাষ্ট্র আমি চাই? যে রাষ্ট্র ৩৬৫ দিন ২৪ ঘণ্টা আমাকে অপরাধী জ্ঞান করে নজরদারি করতে থাকবে? কেমন ইন্টারনেট চাই আমি? যে ইন্টারনেট হাজারটা গোয়েন্দা নজরদারিতে আমার প্রত্যেকটা ক্লিক রেকর্ড করবে? গোটা ইন্টারনেটের সমস্ত মানুষ সন্দেহভাজন মারাত্মক অপরাধী, আর রাষ্ট্র-কর্পোরেট-আমলা-গোয়েন্দারা সব ফেরেশতা? তামাশার সত্যি সীমা আছে।

    ফেসবুকে আপনি সম্পূর্ণ বেআব্রু। এখানে প্রাইভেসি বলতে কিছু নাই। ফেসবুক আপনার যাবতীয় তথ্য বিক্রি করে। চাওয়া মাত্র সরকারকে দিয়ে দেয়। সারা দুনিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপনাকে নজরদারি করে। প্রত্যেকটা ক্লিক এখানে রেকর্ডেড থাকে চিরদিনের জন্য। ফেসবুক রাষ্ট্র-বাণিজ্য-কর্পোরেটের কাছে আমার ‘প্রাইভেট পার্টস’ চুরি কোরে বেচে দেয়, আমাকে নাঙ্গা করে দেয়।

    এছাড়া, ফেসবুক-কর্তৃপক্ষের বানানো স্বৈরতন্ত্রী কিছু নিয়ম মেনে চলতে ফেসবুকে আপনাকে বাধ্য করা হয়। আপনি অন্যের বানানো নিয়মের দাস মাত্র। পুতুল মাত্র। শুধু তা-ই নয়, ফেসবুক বিজ্ঞাপনে ভরা। বিরাট এক বাজার। এখানে সামাজিক সম্পর্ক বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়। ফেসবুক তাহলে কীভাবে ‘সামাজিক’ নেটওয়ার্ক হলো? এটা আসলে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। আপনাকে বিক্রি করে ফেসবুক।

    একটা প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকে। এই আমি ফেসবুকে বসেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছি, নীতিগত দিক থেকে সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য? আমার বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য না হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পরিবারের মধ্যে থেকেই কি আমরা পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে কথা বলি না? নতুন ধারার পরিবার গঠনের কথা বলি না? এ ছাড়া উপায় কী? পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে কি তাহলে আমাকে পরিবারের বাইরে জন্মগ্রহণ করতে হবে? তা তো সম্ভব না? তাহলে কি পরিবার যা তা-ই আমাকে বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হবে? তাজ্জব কিসিমের যুক্তি বটে। আমি তো একটা রাষ্ট্রের মধ্যে জন্মেছি। বসবাসও করি রাষ্ট্রেরই মধ্যে। আমার জীবন-মরণের মালিক আইনত রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সংবিধান-আইনকানুন মানতে আমি আইনত বাধ্য। তাই বলে কি আমি আমার রাষ্ট্র-সংবিধান-আইনকানুনের ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতে পারব না? রাষ্ট্রের অন্যায় আচরণের বিরোধিতা করতে পারব না? তার জন্য কি আমাকে রাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে অবস্থান করতে হবে। রাষ্ট্রের বাইরে তো পৃথিবীতে কোনো জায়গায় নাই। তার মানে কি সমালোচনা পর্যালোনা বিরোধিতা-প্রতিবাদ-রূপান্তর অসম্ভব? এ হলো বিদ্যমান অচলায়তনকে প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেওয়ার যুক্তি। রাষ্ট্রের-পরিবারের-বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাডিক্যাল রূপান্তরের কথা আমরা বলতে পারি। আইনে বাধে না। নীতিতে বাধে না।

    কিন্তু ফেসবুক তো আর আমার কথায় রূপান্তরিত হবে না। উল্টো ফেসবুকই আমার বিরুদ্ধে বহিষ্কারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার রাখে। এটাই ফেসবুকের আইন। তাদের ইন্সট্রাকশানের বাইরে যাওয়ার উপায় আমাদের নাই। আমরা তো আর ফেসবুকের মালিক না। ফেসবুকের মালিক একচ্ছত্র জাকারবার্গ। এখানে মালিকের সাথে ফেস-টু-ফেস হওয়ার কোনো উপায়ই নাই বলা চলে। তাঁর এবং তাঁর পছন্দের লোকজনের তৈরি করা যেকোনো ‘আইন’ আমাকে মেনে চলতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে। এর বিরুদ্ধে কিছুই করার থাকবে না কারো। আমরা ফেসবুকের গোলাম। একেই সম্ভবত একনায়কতন্ত্র বলে।

    ফেসবুক একটা একনায়কতন্ত্রী সামাজিক নেটওয়ার্ক। যা ‘একনায়কতান্ত্রিক’ তা আবার ‘সামাজিক’ হয় কীভাবে? সোনার পাথর-বাটির মতো অবস্থা। যে ফেসবুক আমাকে এবং আমার মতো কোটি গ্রাহকের প্রাইভেসি বিক্রি করে বিলিয়ন ডলার কামাচ্ছে, তার নীতিবোধই বা কোথায় থাকে। সুতরাং ফেসবুক ব্যবহার করে ডায়াস্পোরার প্রচার করার মধ্যে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। এই ধরনের সমস্যায় যারা ভোগেন বা ভুগতে আগ্রহী, একনায়কপ্রীতি, কর্তৃত্ববান্ধব দাসমনোবৃত্তি, অতিরিক্ত ফেসবুক-আসক্তি এবং পরিবর্তন-বিমুখতার চিরপুরাতন ব্যাধিই তাদের আদি অসুখ কিনা তা ভেবে দেখতে প্রলোভন জাগে। যেকোনো প্রলোভনই অবশ্য পরিত্যাজ্য বটে।

    ডায়াস্পোরা ট্রাই করে দেখা যেতে পারে। একটা সত্যিকারের সামাজিক নেটওয়ার্ক। এটা বিজ্ঞাপনমুক্ত। অবাণিজ্যিক। ব্যবহারকারীরাই ডায়াস্পোরা নেটওয়ার্কের আইনানুগ মালিক। ভাবতে পারেন? এটা করা হয়েছে এইজন্য যেন কর্পোরেট পুঁজি একে কোনোদিন কিনে ফেলতে না পারেন। অসাধারণ। ‘ডায়াস্পোরা’য় আপনার প্রাইভেসি সম্পূর্ণ গ্যারান্টিড। ডায়াস্পোরা আপনার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করতে চায় না। জানতেই চায় না। নিজের সম্পর্কে কতটুকু তথ্য আপনি দেবেন, না দেবেন সেটা পুরোপুরি আপনার ব্যাপার। ডায়াস্পোরা থেকে আপনার একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য চাইলেও গোয়েন্দারা পাবেন না। ডায়াস্পোরার সফটওয়ার আপনার কোনো ব্যক্তিগত তথ্য জমাই রাখে না। গোয়েন্দারা পাবে কীভাবে? এই সফটওয়ারটা ওপেনসোর্স। কারিগরি জ্ঞান থাকা সাপেক্ষে চাইলে আপনি নিজেই পরীক্ষা দেখতে পারেন এইসব দাবি সত্য কিনা, এবং এটা কীভাবে কাজ করে।

    ডায়াস্পোরা আপনার প্রকৃত নাম-জন্ম-দেশ-লিঙ্গ-পরিচয় কিছুই জানতে চায় না। স্রেফ আপনার ইমেইল ঠিকানা, ছদ্মনাম আর পাসওয়ার্ড দিলেই আপনার অ্যাকাউন্ট খুলে যাবে। আপনার ইমেইল ঠিকানাটা সঠিক কিনা এবং আপনি নিজেই সেটা স্বেচ্ছায় ডায়াস্পোরায় দিয়েছেন কিনা সেটাও পরীক্ষা করে দেখে না ডায়াস্পোরা। অথচ ফেসবুকে আইনত আপনার যাবতীয় প্রকৃত তথ্য দিতে আপনি বাধ্য। যারা সেখানে নিক নেম দিয়ে আছেন, আইনত তারা অপরাধী। শুধু এই কারণেই আপনার শাস্তি হতে পারে। ডায়াস্পোরা নিক নামকেই উৎসাহিত করে।

    আপনি নিজে একজন ব্যবহারকারী হিসেবে কী পদ্ধতিতে নিজেকে চালনা করবেন তা ডায়াস্পোরার মাথাব্যথার বিষয়ই না। তার মানে, কীভাবে আপনি ডায়াস্পোরা ব্যবহার করবেন সেটা আপনার নিজের ব্যাপার। এ ব্যাপারে ডায়াস্পোরা আপনার ওপর ফেসবুকের মতো করে কোনো প্রকার আইনকানুন-নিয়মনীতি চাপিয়ে দেয় না। আপনার বিবেকবুদ্ধি-চিন্তাভাবনা যুক্তিবোধের ওপরই তার আস্থা। ডায়াস্পোরার প্রণয়ন করা একটা ‘কমিউনিট গাইডলাইন’ আছে বটে। কিন্তু মেনে চলা বা না চলাটা আপনার ইচ্ছা। এটা বাধ্যতামূলক কিছু না। নীতিমালা ভাঙার দায়ে আপনাকে ডায়াস্পোরা থেকে বের করে দেওয়ার মতো কোনো ‘কর্তৃপক্ষ’ ডায়াস্পোরায় নেই। এটা কর্তৃত্বতন্ত্রমুক্ত একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

    আর্টওয়ার্ক: অব ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন
    শিল্পী: নাজি বেনাজি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    ডায়াস্পোরায় ফেসবুকের মতো ‘স্ট্যাটাস’ বলা হয় না, ‘কনভার্সেশন’ বা ‘আলাপ’ বলা হয়। সুন্দর আইডিয়া। স্ট্যাটাস শব্দটা অনেক বেশি অন্তর্মুখীন, নিষ্ক্রিয়, আত্মকেন্দ্রিক। আলাপ তা নয়। আলাপ সক্রিয়, নিজের গুরুত্বের হানি না ঘটিয়েও অপরের সাথে যোগাযোগে আগ্রহী। উপরন্তু, ডায়াস্পোরা’র ‘স্ট্রিম’ পাতায় ফেসবুকের হোমপেজের মতো আবর্জনা জঙ্গল হয়ে থাকে না। এখানে আপনি যা দেখতে চান শুধু সেই বিষয়ের জিনিসপত্রই আপনার ‘স্ট্রিম’ পাতায় দেখায়। সেটা আপনিই নির্ধারণ করবেন। করবেন নতুন নতুন হ্যাশট্যাগ যোগ করে করে। যেমন #art বা #assange ইত্যাদি। এই সব ট্যাগওয়ালা পোস্টই আপনার ‘স্ট্রিম’ পাতায় দেখায় ডায়াস্পোরা। ফলে ডায়াস্পোরার সামাজিক আলাপ অনেক বেশি ফোকাসড্ বা নির্দিষ্ট আগ্রহকেন্দ্রিক। আর অ্যানোনিমিটিই যেহেতু ডায়াস্পোরার মূল ধারা, তাই ফেসবুকের মতো এটা ‘আমাকে দেখো’ টাইপের মঞ্চ মঞ্চ খেলার মাঠ প্রস্তত করে না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির কারিশমার চেয়ে এখানে বিষয়বস্তুকেন্দ্রিক সামাজিক আলাপ-আলোচনা ডিসকোর্সই মূল ঘটনা হয়ে ওঠে। আবার, ডায়াস্পোরায় সামাজিকতা বজায় থাকে পূর্ণ প্রাইভেসি-আব্রু-ইজ্জত সহকারেই। সুতরাং ডায়াস্পোরায় আসুন। সেখানে আমরা ‘মুক্তধারা’ নামে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করি। এটা একটা খোলা নেটওয়ার্ক। মুক্তধারা নেটওয়ার্ক। আপনিও আসুন। আমাদের যোগাযোগ হোক। তখন আরো শেয়ার করা যাবে। পরস্পরের থেকে শেখা যাবে।

    ডায়াস্পোরা প্রকৃতপক্ষে ফেসবুকের মুনাফাগন্ধী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের কোনো বিকল্প না। ডায়াস্পোরা আমূল পৃথক ধারার সামাজিক নেটওয়ার্ক। ‘সামাজিক’ শব্দটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এটা রাষ্ট্রের পার্টনার না। এটা কর্পোরেট হাউস না। ডায়াস্পোরা স্বতন্ত্র একটা ধারা, বা পরিপ্রেক্ষিত, বা দৃষ্টিকোণ বা প্যারাডাইম বটে। ফেসবুকের ধরণ-ধারণ থেকে এ এক বিরাট বাঁকবদল। নেট-সমাজকে দেখার-বোঝায়-মিথষ্ক্রিয়ার একেবারে আলাদা একটা মনোভঙ্গি বা অ্যাপ্রোচ। সমাজবিজ্ঞানে এই ধরনের ঘটনাকে প্যারাডাইম শিফট বলা হয়ে থাকে।

    ডাকডাকগো কিংবা ডায়াস্পোরা ছাড়াও ইতোপূর্বে উল্লিখিত পিজিপি, টর, পিজিন, ওটিআর অরবট, গিবারবট, বিটকয়েন প্রভৃতি সফটওয়ারগুলো আমাদের আয়ত্ত করা দরকার। এই সফটওয়ারগুলো প্রাইভেসি বা স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। একই সাথে এগুলো ব্যবহারকারীর অনলাইন অ্যানোনিমিটির দিকটাও নিশ্চিত করে। প্রাইভেসি, স্বাধীনতা আর অ্যানোনিমিটির বিষয়গুলো ঘনিষ্টভাবে পরস্পর বিজড়িত প্রসঙ্গ যে সে কথা বলা বাহুল্য বটে।

    অনলাইন অ্যানোনিমিটি অথবা পরিচয়ের রাজনীতি

    আমাদের আজকের নিওলিবারাল পৃথিবীতে ব্যক্তি-মানুষ এবং তার পরিবার-বন্ধুবান্ধব-গোষ্ঠী-পাড়া-গ্রাম-সমাজের ওপরে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রশক্তির দাপট এমনই বেড়েছে যে রাষ্ট্রীয় আইনের অভ্যাসের বাইরে আমরা নিজেদের মতো করে চিন্তা করতেই ভুলে গেছি। আমরা যেন রাষ্ট্র এবং তার পার্টনার-প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনের অবৈতনিক দালাল। হুকুমের গোলাম। সবাই আমরা এখন ইউরো-আমেরিকান পোষা কুকুর। গলায় পরিচয়ের বেল্ট ঝুলিয়ে নিজের অস্তিত্বের প্রামাণিকতা জাহির করতে হবে।

    আমি বেঁচে আছি অথবা মরে গেছি – এর যেকোনোটা প্রমাণ করতে চাইলে আমাকে আদালতে যেতে হবে। উকিল ধরতে হবে। কাগজ লাগবে। টাকা লাগবে। মানুষের চেয়ে কাগজ বড়। মানুষের চেয়ে আইন বড়। দারোগা বড়। রাষ্ট্র বড়। রাষ্ট্র মাত্রেই এখন ‘হীরক রাজার দেশ’: ‘যার নাম নেই, তার কথার কোনো দাম নেই’। অথচ পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ চিরকালই, নমস্য হাসান আজিজুল হকের ভাষায়, ‘নামহীন গোত্রহীন’ ছিল।

    আজ পরিবার-স্কুল-মিডিয়া-রাষ্ট্র সবাই মিলে আমাদেরকে এবং তাদের নিজে-দেরকেও তোতা পাখির বিদ্যা মুখস্ত করিয়ে শেষ করেছে। যা খবরের কাগজে লেখে না, তা চিন্তা করাও কঠিন। যা টিভিতে দেখায় না, এ জগতে তার অস্তিত্বই নাই। নাম-পরিচয়ের রাষ্ট্রচিন্তাই আজ আমাদের ব্যক্তি-চিন্তা। এখন আমরা অ্যানোনিমিটির কথা শুনলে আঁতকে উঠি। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, আমি তো অপরাধী নই, আমার তো লুকানোর কিছু নেই, তাহলে আমি মিথ্যা-মিথ্যা ‘দুই-নম্বরি’ একটা নিক নাম গ্রহণ করতে যাব কেন? অপরাধচিন্তাই একমাত্র চিন্তা আমাদের। হয় তুমি অপরাধী, নয় তুমি পুলিশ। আমারা আমাদের সমাজকে অপরাধীদের সমাজে পর্যবসিত করেছি। এখানে সকলেই অপরাধী বা সম্ভাব্য অপরাধী।

    অ্যানোনিমিটি জিনিসটা প্রাইেভসিরই বিশেষ একটা রূপ। ‘অ্যানোনিমিটি’ কথাটার গোড়ায় আছে গ্রীক শব্দ ‘অ্যানোনিমিয়া’, যার অর্থ ‘নামহীন’, তথা ‘নামহীনতা’। যেকোনো যোগাযোগ-পরিস্থিতিতে অ্যানোনিমিটি বা ‘নামহীনতা’ বলতে বোঝায় যোগাযোগকারীর নাম অপ্রদর্শিত থাকা। সফটওয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে নামহীনতার প্রয়োগ এমনভাবেও করা হতে পারে যাতে করে বার্তার উৎস ব্যক্তিকে শনাক্ত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব হয়ে ওঠে। নামহীনতার বিশেষ একটা রূপ হচ্ছে ছদ্মনাম গ্রহণ। এক বা একাধিক ছদ্মনাম গ্রহণ করার রেওয়াজ কবি-সাহিত্যিক আর বিপ্লবী লেখকদের মধ্যে বহু পুরোনো। অনেকের একাধিক ছদ্মনাম থাকতে পারে। একেক ধরনের যোগাযোগের জন্য একেকটা ছদ্মনাম ব্যবহৃত হতে পারে। সম্প্রতি মাইক্রোসফটের ইমেইল সার্ভিস আউটলুক বা হটমেইল গ্রাহকদেরকে অনেকগুলো করে ছদ্মনাম গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। একই ইমেইল অ্যাকাউন্ট আমি ব্যবহার করছি। কিন্তু একক জনের কাছে আমার ইমেইল ঠিকানাটা একেক নামে প্রদর্শিত হচ্ছে। এখনই আমি ‘মিনাজেল-উসিটেরন অ্যাট হটমেইল ডট কম’। আবার এখনই আমি ‘সেলিমরেজানিউটন অ্যাট হটমেইল ডট কম’। আবার এখনই ‘ইটইজফরবিডেনটুফরবিড অ্যাট হটমেইল ডট কম’।

    এভাবে অনলাইন অ্যানোনিমিটির ক্রমবর্ধমান সামাজিক দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে মাইক্রোসফট। মাইক্রোসফটের এই অ্যানোনিমিটি অবশ্য লোকদেখানো-লোকঠকানো টাইপের দুধভাত-অ্যানোনিমিটি। কারণ, কম্পিউটার-কারিগরির দিক থেকে এই ধরনের ছদ্মনাম মোটেও কোনো নামহীনতার নিশ্চয়তা দেয় না। আপনার প্রকৃত পরিচয় এক্ষেত্রে কারিগরিভাবে শনাক্ত করাটা ডালভাত মাত্র। সত্যিকারের নামহীনতার জন্য দরকার টর, পিজিন, ওটিআর জ্যাবার, কে-মেইল, এপিজি প্রভৃতি সফটওয়ার। তাহলেও তারপরও মাইক্রোসফটের এই সেবা বলে দিচ্ছে, নামহীনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করাটা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

    নীতিবোধগত-শ্রেয়োবোধগত বিচারে অ্যানোনিমিটি আদৌ কোনো অপরাধকর্ম নয়। নামহীনতার ধারণা ইন্টারনেটের আবিষ্কৃত কোনো ধারণা নয়। এ বস্তু বহু পুরাতন বস্তু। যেমন মহাভারত-রামায়ন-বেদ-পুরাণ-উপনিষদ কোন ব্যক্তির বা ব্যক্তিবর্গের লেখা তা তাঁরা জানিয়ে যান নি। সাহিত্যিক ‘উইলিয়াম শেক্সপিয়ার’ও সম্ভবত কোনো ছদ্মনাম। এ ব্যক্তির আসল নাম কী তা আজ আর জানার উপায় নেই (people.dsv.su.se/~jpalme/society/anonymity.html)। সমাজে-রাষ্ট্রে বহুকাল ধরে পরিচয়ের-অপরিচয়ের অনুশীলন স্বীকৃত। মানে নিজের পরিচয় নিজের বিবেচনাবোধ ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানোর বা না জানানোর অধিকার। এই অধিকার-অনুশীলন-দাবির বিরাট রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে।

    আর্টওয়ার্ক: প্রাইভেসি ২০৩০ শিল্পী: লুইস বুয়েনাভেঞ্চুরা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    নামহীনতার ব্যবহার ঘটতে পারে অনেক ধরনের প্রয়োজন পূরণের জন্য। সুপরিজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি ছদ্মনামে বার্তা পাঠানোর প্রয়োজন বোধ করতে পারেন। তিনি হয়ত চান না যে ঐ বার্তা আগে থাকতেই তার নাম নিয়ে চাউর হোক। তাতে করে জনমনে নানা রকম ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। আমি যদি শিবিরকর্মী হই তাহলে ছাত্রলীগের ডেরায় গিয়ে বলি না যে আমি শিবিরের একনিষ্ঠ কর্মী। আমার পরিচয় এখানে জীবনের নিরাপত্তার সাথে জড়িত। রাবি’র নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, বন্ধু বখতিয়ার আহমদ, পাহাড়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছে অনেক পাহাড়ী সম্প্রদায় বাংলাদেশ, বার্মা, ভারত রাষ্ট্রসমূহের নানান সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীসমূহের হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে একাধারে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও বর্মী পরিচয় বহন করে। যেখানে যেটা প্রয়োজন সেখানে সেটা ব্যবহার করে। সমাজবিজ্ঞানীরা বা ব্যবসায়িক-বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানসমূহ বা সরকার বা এনজিওরা যখন সামাজিক জরিপ পরিচালনা করেন তখন তাঁরা উত্তরদাতাদের নাম-পরিচয় অজ্ঞাত রাখার সুযোগ দেন অবারিতভাবে। এই নামহীনতা বা অ্যানোনিমিটি ছাড়া তাদের জরিপের উদ্দেশ্য বৃথা যাওয়ার সম্ভাবনা। এ ছাড়া সাংবাদিকদেরকে বা পুলিশকে স্বেচ্ছায় গোপন তথ্য-সূত্র-ইশারা প্রদানকারী অনেক মানুষ নিজেরা নামহীন বা অ্যানোনিমাস থাকতে চান। পুলিশ এবং সাংবাদিকদেরকে সেটা মেনে নিতে হয় তো বটেই, সেই নামহীনতাকে রক্ষা করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হয়।

    ডাক্তার-উকিল-বিচারক-ধর্মযাজকদেরকে অনেক মানুষের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য ও নাম-পরিচয় গোপন রাখতে হয় পেশাগত সততার স্বার্থেই। অনেক দেশেই এইসব তথ্য-পরিচয় গোপন রাখাটা আইনের চোখে আবশ্যক শর্ত। অনেক চার্চে যাজকের সামনে ব্যক্তির ‘পাপের স্বীকারোক্তি’ বা কনফেশনের জন্য আলাদা বুথ বা কাউন্টার থাকে। সেখানে যাজক ব্যক্তিটিকে সরাসরি দেখতে পান না। এও তো নামহীনতাই বটে। আর সংবাদপত্রে বক্তিগত বিজ্ঞাপনের কলামে বা এমনকি চিঠিপত্রে বা এমনকি সম্পাদকীয় নিবন্ধে বা এমনকি খোদ সম্পাদকীয়তে নামহীনতার চর্চা অথবা ছদ্মনামের চর্চা তো রীতিমতো পুরোনো প্রথা।

    আবার আমাদের সুমহান সংসদীয় গণতন্ত্রেও ভোটাররা ভোট দেন নিজেদেরকে নামহীন রেখেই। এই নামহীনতা তাদের মতের নির্ভিক ও নিরাপদ প্রকাশের নিশ্চয়তা দেয়। অন্য দিকে, সুপ্রাচীন কাল থেকে যারা দানখয়রাত-পরোপকার করে আসছেন, সেইসব হিতৈষী ব্যক্তিরা প্রায়শই নামহীনতার নিশ্চয়তা চান। পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও আছে: ‘ডান হাত দান করলে যেন বাম হাত জানতে না পারে’। অ্যানোনিমিটি এসব ক্ষেত্রে অনিবার্য শর্ত প্রায়। বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের বা মাফিয়াদের বা রাষ্ট্রের বা সামরিক বাহিনীর বা কোনো কর্পোরেট-গোষ্ঠীর গুরুতর দুর্নীতির কথা উন্মোচন করে দিতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই নামহীনতার আশ্রয় নিতে হয়। হুইসল ব্লোয়ারদের জন্য অ্যানোনিমিটি তাই অপরিহার্য। এজন্যই উইকিলিকস তাদের সংবাদ-সূত্রদের অ্যানোনিমিটির পূর্ণাঙ্গ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা করেছে এনক্রিপ্টেড সফটওয়ারের সাহায্যে। কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই কোনো ক্ষমতাহীন ব্যক্তির পক্ষে সবসময় স্বনামে সমালোচনা করা সম্ভব হয় না। এসব ক্ষেত্রে নামহীনতার প্রযুক্তির কোনো বিকল্পই নেই।

    অনেক দেশ আছে যেখানে বাকস্বাধীনতা নেই। মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নেই। সত্য প্রকাশের অধিকার নেই। সেই সব দেশের বিবেকবান মানুষদেরকে মতপ্রকাশ, সত্যপ্রকাশ, বাকপ্রকাশের কারণে নিগৃহীত হতে হয়। কারাগারে যেতে হয়। চাকরি হারাতে হয়। নির্বাসিত হতে হয়। এমনকি মৃত্যুবরণও করতে হয়। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, ইসরায়েল, বাংলাদেশ প্রভৃতি রাষ্ট্র। এসব রাষ্ট্রে আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে নামহীনতার গুরুত্ব অপরিসীম।

    নামহীনতা বা প্রাইভেসির ব্যাপারগুলো এসব ক্ষেত্রে লজ্জাজনক গোপনীয়তা লুকানোর আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটায় না। নামহীনতার ধারণা এখানে সবসময়ই মতামতের মুক্তপ্রকাশ এবং অধিকতর গণতন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে অনেক দেশের মানবাধিকার কর্মীদেরকে, বার্মার ভিন্নমতাবলম্বী গেরিলাদেরকে, অথবা ভারতের আদিবাসী মাওবাদী গেরিলাদেরকে, কিংবা মেক্সিকোর জাপাতিস্তা-আন্দোলনের কর্মীদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয় পুরোপুরি নামহীন প্রযুক্তিসমূহের সাহায্যে। এ ছাড়া অত্যাচার-বিভীষিকার হাত থেকে বাঁচার উপায় নেই।

    নামহীনতার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত, ডায়াস্পোরার মতো, অনলাইন সামাজিক ফোরামে মানুষ অনেক বেশি মন খুলে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে আলোচনাকারী সহজেই এক ধরনের পারস্পরিক সমতা অনুভব করতে পারে। নামহীন বার্তার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়নকারীকে অনেক স্বচ্ছন্দে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ব্যাপারটিও এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রকৃত নাম লিখতে পারেন না। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীনতা বজায় রাখার জন্য এখানে অ্যানোনিমিটি বা নামহীনতার ব্যবহার।

    কাউকে উপদেশ দেওয়া আমার খাসলতের মধ্যে পড়ে না। সকলেই নিজের নিজের কাজ বোঝেন। কিন্তু আমি নিজে নিজে ভাবি। আমার মনে হয়, টর ব্রাউজারের সাহায্যে ডায়াস্পোরা জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কে সত্যিকারের অ্যানোনিমিটির সাহায্যে মতপ্রকাশ করলে রাজীব হায়দার, আসিফ মহিউদ্দিন, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, সুব্রত অধিকারী শুভ এবং শফিউর রহমান ফারাবীদের মতো তরুণ ব্লগারদেরকে হয়ত রাষ্ট্রীয়-বিরাষ্ট্রীয় হত্যা-জেল-জুলুম- নিপীড়নের স্বীকার হতে হতো না।

    এঁরা কে কোন পক্ষের মতাদর্শ অনুসরণ করেন, না করেন। তা এখানে আমার বিবেচ্য না। আমার কাছে মতাদর্শের চেয়ে মানুষ বড়। এঁরা ব্লগে ভালো কথা লিখেছেন, না খারাপ কথা লিখেছেন, সেগুলোর সাথে আমি একমত, নাকি একমত নই, তা অবশ্য এখানে আলোচ্য নয়। তা নিয়ে আমি অন্যত্র[3] লিখেছি। আমার কাছে প্রধান প্রশ্নটা হলো, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অবাধ ও নিরাপদ করার ক্ষেত্রে অ্যানোনিমিটির কোনো শক্তিশালী ভূমিকা আছে কিনা তা বিবেচনা করা।

    এই ধরনের ক্ষেত্রে নামহীনতার অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। ইতোমধ্যে যে নিপীড়নধর্মী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী তথ্য-প্রযুক্তি-আইন সরকার পাশ করতে যাচ্ছে তা পার পেয়ে গেলে আমাদের অনেককেই নামহীনতার আশ্রয় নিতে হবে যে তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

    নামহীনতা ব্যক্তিমানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত তো করেই। এ ছাড়াও তা সার্বক্ষণিক রাষ্ট্রীয়-প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির হাত থেকে নাগরিকদেরকে রক্ষা করতে পারে। আবার ইন্টারনেটে ব্যবহারীকারীদের আচার ব্যবহার প্রয়োজন অপ্রয়োজন ইত্যাদি প্রভৃতিকে মনিটর করতে থাকে বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানগুলো। এদের হাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ারও একটা অ্যানোনিমিটি বৈকি।

    মোট কথা হলো: গুলি-বন্দুক-ছুরি-ফরসেপ-বটি-কাঁচি-ক্ষুরের মতো, কিংবা রাসায়নিক দ্রব্যাদির মতো, এবং এমনকি ওষুধপত্রের মতো অ্যানোনিমিটি বা নামহীনতারও সুপ্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ থাকতে পারে। সেটা যার যার বিবেচনার ব্যাপার। তার জন্য তো খোদ ডাক্তারিবিদ্যা-ছুরি-ফরসেপ-বটি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ওষুধপত্র, অথবা খোদ নামহীনতার ধারণাকে দোষারোপ করার বা অবৈধ প্রতিপন্ন করার বা অপরাধকর্মে পর্যবসিত করার কোনো সুযোগ নেই।

    প্রাইভেসি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একেবারে প্রাথমিক বা মৌলিক মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। যাবতীয় প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চুক্তি ও মুসাবিদায় এইসব অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’র আর্টিকেল ১২ এবং আর্টিকেল ১৯ এর কথা। বলা যায় ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ এর ১৭ এবং ১৯ নম্বর আর্টিকেলের কথা। এ ছাড়া, ‘ইউরোপিয়ান কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস’ এর ৮ম ও ১০ম অনুচ্ছেদের কথাও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। (দ্রষ্টব্য: ইয়ামান অ্যাকডেনিজ, ‘অ্যানোনিমিটি, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড সাইবারস্পেস’, সোশ্যাল রিসার্চ, খণ্ড ৬৯, সংখ্যা ১, বসন্ত ২০০২।)

    এক দিক থেকে দেখলে, নামহীনতা সবসময়ই যোগাযোগের ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ তৈরি করে। আবার নামহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ-বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আইনের দ্বারা অনলাইন নামহীনতাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা এই মুশকিলের ভালো সমাধান হতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানে এরই মধ্যে ‘অনলাইন রেপুটেশন’ নামে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে। অনলাইন রেপুটেশন কোনো একটি ছদ্মনামের বিশ্বস্ততা পরিমাপের একটি পদ্ধতি। এর জন্য নানারকম সফটওয়ার-প্রযুক্তির অবতারণাও ঘটছে। (নামহীনতার প্রয়োজনের ও বিপদের দিক নিয়ে, এবং প্রাইভেসি ও নামহীনতা সংক্রান্ত মৌলিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন নিয়ে, বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: ইয়ামান অ্যাকডেনিজ, ‘অ্যানোনিমিটি, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড সাইবারস্পেস’, সোশ্যাল রিসার্চ, খণ্ড ৬৯, সংখ্যা ১, বসন্ত ২০০২।)

    নামহীনতা ব্যাপারটা আসলে আর কিছু না। বাধ্যতামূলক পরিচয় প্রকাশের রাষ্ট্রীয়-কর্তৃত্বতান্ত্রিক বন্দোবস্তকে মোক্ষমভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসে এই ধারণাটা। এটাই আসলে কর্তৃত্বতন্ত্রের চোখে ‘নামহীনতা’ নামক ধারণাটিকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। মহাকেন্দ্রীভূত, অতি-শক্তিশালী রাষ্ট্র-কর্পোরেট ক্ষমতাকাঠামোর মুখে ব্যক্তিমানুষকে নিতান্তই বিপন্ন করে তুলতে পারে বাধ্যতামূলক পরিচয় প্রকাশের এই রাষ্ট্র-কর্পোরেট বন্দোবস্ত ।

    প্রসঙ্গত, প্রাইভেসি বা অ্যানোনিমিটি মানে কিন্তু শুধু অপ্রকাশের স্বাধীনতাই নয়। প্রকাশের স্বাধীনতাও বটে। প্রাইভেসি বা অ্যানোনিমিটি মানে আমার সম্পর্কে আমি নিজে কতটা প্রকাশ করতে চাই, এবং কতটা প্রকাশ না করতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। খোদ স্বাধীনতা মানে কিছু করার স্বাধীনতা তো বটেই, চাইলে কিছু না করারও স্বাধীনতা। সুতরাং কোথায় কতটা আমি আমার পরিচয় প্রকাশ করব অথবা করব না, তাকে নিতান্তই আমার নিজের এখতিয়ারভূক্ত ব্যাপার বলে ভাবার গুরুত্ব আছে।

    মার্কিন সাম্রাজের পতনের শব্দ

    ফিসা-আদালতের আদেশের কপি ছাড়াই যেমন তা দেওয়ালে পড়তে পারা যাচ্ছে বলে জিমারম্যান জানালেন, তেমনি আরও একটা ভবিষ্যতলিপি স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। সে লিপি ফুটে উঠছে ইতিহাসের দেওয়ালে। সেখানে লেখা আছে: যুক্তরাষ্ট্রকে বন্দি করছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। বলশেভিক রাশিয়ার মতো আত্ম-অবরুদ্ধ দেশ হয়ে পড়ছে আজকের যুক্তরাষ্ট্র। এটা আরেকটা উত্তর কোরিয়া, আরেকটা চীনে পরিণত হচ্ছে। নিজের নাগরিকদেরকেই নজরবন্দি করতে হচ্ছে তাকে। নাগরিকদের জামাকাপড়-অন্তর্বাস-মোজা খুলে তল্লাশি করতে হচ্ছে তাদেরকে। নিজের দেশের প্রতিটা নাগরিকই সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য শত্রু আজ। নিজ দেশের হুইসলব্লোয়ারদের ভয়ে প্রকারান্তরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের অভ্যন্তরিন যোগাযোগ-পরিধি, কর্তৃত্ব প্রয়োগের সক্ষমতা।

    মনে পড়ছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ২০০৬ সালে লেখা ‘কন্সপিরেসি অ্যাজ গভর্ন্যান্স’ নামের ছয় পাতার প্রফেটিক থিসিস। সেখানে তিনি নেটওয়ার্ক-বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, হুইসল ব্লোয়ারদের সম্ভাব্য ‘উন্মোচন’গুলো কীভাবে আতঙ্কিত করে ফেলবে সাম্রাজ্যের শাসকদেরকে। ‘লিক’ বা উন্মোচনের ভয়ে কমে যাবে তাদের যোগাযোগের পরিসীমা, সেই সাথে কর্মপরিধি। ক্রমাগত অক্ষম হয়ে পড়তে থাকবে সাম্রাজ্য। মাত্র সাত বছরের মধ্যেই বাস্তবায়িত হতে চলেছে অ্যাসাঞ্জের সেই প্রফেটিক থিসিস। ফুরিয়ে আসছে সাম্রাজ্যের অবাধ, অসীম সক্ষমতা। ফুরিয়ে আসছে সাম্রাজ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিন। এসব তারই লক্ষণ।

    আরো মনে পড়ছে, তাঁর নিজের ব্লগে (‘আইকিউ ডট অর্গ’) সম্ভবত ঐ বছরই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ লিখেছিলেন ছোট্ট একটা নোট: ‘ইউনাইটেড স্টেটস অফ হোয়াট?’ মার্কিন বাণিজ্য-কর্পোরেটগুলোর সাথে বলশেভিক রাশিয়ার বেশ কিছু তাক লাগানোর মতো সাদৃশ্য নির্দেশ করে সেখানে তিনি বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-কর্পোরেটগুলো আসলে একেকটা ছোট ছোট বলশেভিক সোভিয়েত। ‘ইউএসএ’ নামটার অর্থ তাই ‘ইউনাইটেড সোভিয়েটস অফ আমেরিকা’। এখন এই ২০১৩ সালে এসে বোঝা যাচ্ছে, জার- বলশেভিক রাশিয়ার পরিণতিই বরণ করতে চলেছে ইউএসএ।

    সাম্রাজ্য নয়, স্বাধীনতা

    সার্বিক পরিস্থিতি আতঙ্কজনক। লাভাবিট, সাইলেন্ট সার্কেল এনএসএ, এবং এডওয়ার্ডের স্নোডেনের ঘটনাক্রম এক মারাত্মক হুঁশিয়ারি-সংকেত। ইন্টারনেটের ওপর নেমে আসছে ভয়ংকর প্রত্যক্ষ আঘাত। কেউ রেহাই পাবেন না। কোনো প্রকার ভিন্নমত সহ্য করবে রাষ্ট্রকর্পোরেট সাম্রাজ্য। কেননা ইন্টারনেট বাঁচলে এবং স্বাধীন থাকলে রাষ্ট্র, কর্পোরেশন, আইন- আদালত, আমলাতন্ত্র, আর্মি— তথা খোদ ‘এম্পায়ার’ বর্তমান কাঠামোকে মৌলিকভাবে সংস্কার না করে কিছুতেই টিকে থাকতে পারবে না। স্বাধীন ইন্টারনেট থাকলে সাম্রাজ্য থাকবে না। টিকবে না বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো। সুতরাং ইন্টারনেটকে তারা নজরবন্দি করবে। খোঁয়াড়ে ঢোকাবে। যেভাবে সম্ভব।

    সাম্রাজ্যিক শাসকরা আতঙ্কিত। অন্যের রক্ত চুষে আরামে বসে ভোগবিলাসের দিন তাদের বিগতপ্রায়। এটা তারা টের পাচ্ছেন হাড়ে হাড়ে। তাই তারা ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইনের দোহাই দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জ্ঞান-প্রাইভেসি-প্রকাশ- সৃজন-যোগাযোগের সহজাত স্বাধীন স্পৃহাকে ধ্বংস করে দেওয়া যায় না। এটা জ্ঞান-বিজ্ঞান-অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান-উপলব্ধি-প্রকাশ ও শেয়ারিং থেকে বঞ্চিত করবে গোটা মানবজাতিকে। এ হবে আত্মিক-সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক গণআত্মহত্যার শামিল। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট হবে ডিজিটাল দাসদের জন্য আইনসঙ্গতভাবে নির্ধারিত একটা সংকীর্ণ খোঁয়ার। কর্পোরেট-বাজারের খোঁয়ার। রাষ্ট্রীয় আমলাদের কাছে বাধ্যতামূলক বশ্যতার খোঁয়ার। থাকবে না আপনার যোগাযোগের স্বাধীনতা। থাকবে না পছন্দের স্বাধীনতা। থাকবে না নিজের মতো করে নিজেকে প্রকাশের বা অপ্রকাশের স্বাধীনতা।

    তাই ইন্টারনেটের স্বাধীনতাকে, যোগাযোগের স্বাধীনতাকে বাঁচাতে না পারলে দমে যাবে কোটি মানুষের আত্মকর্তৃত্বের জায়মান চাকা। আমরা একটা নিখুঁত টাইপের ডিজিটাল দাসপ্রথায় প্রবেশ করতে শুরু করব। ধীরে ধীরে। অবধারিত-ভাবে। আমরা অনেকে আমাদের স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে নিরাপদ এবং অনিশ্চয়তাহীন সামাজিক দাসত্বকে ভালোবেসে মেনে নিতে পারি বৈকি। তবে, সবাই তাতে রাজি হবে না। ফেসবুক ইয়াহু জিমেইল হটমেইল লাইভ আউটলুক ইউটিউব স্কাইপ মাইক্রোসফট অ্যাপল এবং গুগল মেনে নিয়েছে গোপন আদালতের আদেশ। কিন্তু লাভাবিট মানে নি। সাইলেন্ট সার্কেল মানে নি। আরো অনেকেই মানবে না।

    ইতোমধ্যে ফুটে উঠছে খোদ মার্কিন জনসাধারণের গণপ্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট সব লক্ষণ। ফিসা-আদালতের বিরুদ্ধে লাভাবিট লড়তে যাচ্ছে ফোর্থ সার্কিট আপিল আদালতে। অত্যন্ত শক্তিশালী এই ফেডালের কোর্ট ১৩টা মার্কিন আপিল আদালতের মধ্যে অন্যতম। আদালতে লড়াইয়ের জন্য লাভাবিটের আইনী তহবিলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন জনসাধারণ জমা দিয়েছেন ৯০,০০০ মার্কিন ডলার। লাভাবিট জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। লাভাবিট জয়ী হলে সেটা হবে যোগাযোগের স্বাধীনতার জয়।

    একের পর এক নিরাপদ ইমেইল সার্ভিস বন্ধ করে দিয়ে শেষ রক্ষা করতে পারবে না সাম্রাজ্য। রাষ্ট্র-ডেভিলের রক্তচক্ষুকে কলা দেখিয়ে নিরাপদ যোগাযোগের পথ আছে আরো। আছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, ফিল জিমারম্যানদের টিমোথি মে, এডওয়ার্ড পি. বার্লোদের গড়ে তোলা ‘সাইফারপাঙ্কস’দের পথ – ক্রিপ্টো অ্যানার্কির পথ (ক্রিপ্টো অ্যানার্কি সম্পর্কে দ্রষ্টব্য: পিটার লাডলো, ২০০১)। সাইলেন্ট মেইলবন্ধ করে দেওয়ার পর সিকিউরিটি-গুরু ফিল জিমারম্যান বলেছেন, ভবিষ্যতের তাঁরা গ্রাহকদের জন্য আরো সফিস্টিকেটেড সার্ভিস নিয়ে আসবেন। নতুন নতুন পথ বেরুবে। বোঝা যাচ্ছে।

    ইন্টারনেটের কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নাই। এটা কোনো রাষ্ট্রের সম্পত্তি না। এটা কোনো বাদশাহর সাম্রাজ্য না। এটা চলে স্বাধীনতা, স্বনিয়ন্ত্রণ এবং পরস্পর সহযোগিতার নীতিতে। সাম্রাজ্যিক আমলাদের মুসাবিদা করা আইনের হুকুমে ইন্টারনেট চলতে পারে না। ইন্টারনেট মানবজাতির সম্পদ। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মতো এটা মানবজ্ঞানের অসীম ভাণ্ডারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। দেশ-রাষ্ট্র-জাতি-ধর্ম-ভাষা ও কালের ক্ষুদ্র গণ্ডীকে ছাড়িয়ে এই প্রথম স্বাধীন বিশ্বমানব হয়ে উঠছে হোমো স্যাপিয়েন্স। তার আর কোনো মোল্লা-মোড়ল-মুরুব্বি দরকার নাই। ভবিষ্যত সাম্রাজ্যের নয়, মনুষ্য-স্বাধীনতার।

    অন্তটীকা

    [১] দ্রষ্টব্য: বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান; হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, ১৯৯৬-খ: ১৯০৭।

    [২] গুস্তাভ ল্যানডাওয়া’র বই রেভোল্যুশন অ্যান্ড আদার রাইটংস (গুস্তাভ ল্যান্ডাওয়া, ২০১০)-এর অন্যতম প্রবন্ধ ‘উইক স্টেটসমেন, উইকার পিপল’-এ এই সংক্রান্ত আলোচনার অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ ঈঙ্গিত আছে।

    [৩] এই বইয়ের ‘স্বাধীনতা সহিষ্ণুতা সংগঠন’ নামের ২৬-সংখ্যক রচনার কথা বলা হচ্ছে।

  • বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জনগণের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’

    বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জনগণের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’

    • সহুল আহমদ ও সারোয়ার তুষার

    সারা দুনিয়া যেখানে করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, করোনার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করছে, সেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার যেন তার জনগণের বিরুদ্ধেই অঘোষিত এক ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। দুই উপায়ে এই ‘যুদ্ধের’ বাস্তবতা উৎপাদন করা হচ্ছে। একদিকে, নজিরবিহীন বিপদজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তহীনতার মাধ্যমে জনগণের একটা বড়ো অংশের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যারা এমনতর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছেন রাষ্ট্র বিভিন্ন আইনী মারপ্যাঁচের মাধ্যমে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা শুরু করেছে। তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া-দীর্ঘদিন ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গ্রেফতার দেখানো-মামলা দায়ের করা সহ নানাবিধ হয়রানি ও নিপীড়ন করা হচ্ছে।

    অরাজ ই-পোস্টার

    গত ৫ মে ইফতারের আগেই বাড্ডা থেকে র‍্যাব পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দিদারুল ভূঁইয়াকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। দিদারুলের স্ত্রী জানান, ‘ইফতারের কিছুক্ষণ আগে দুইটা মাইক্রো নিয়ে ১১-১২ জন লোক আসে বাসায়। তারা র্যা ব পরিচয় দেয়। আমাদের কোনো কিছু বলতে না দিয়ে ইফতারের ঠিক দুই মিনিট আগে তারা দিদারকে তুলে নিয়ে যায়।’ এসময় তারা দিদারের দুটো সিপিউ, ল্যাপটপ, ওনার ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়ে যায়; তার স্ত্রীকে বলা হয়, কিছু কথাবার্তা বলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।

    মিডিয়ার তরফ থেকে র‍্যাবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে, এই নামে কাউকে তারা তুলে আনেন নি, এমন কোনো অভিযানও তারা চালান নি। পরিবার ও স্বজনদের তরফ থেকে র‍্যাবের অফিসে যোগাযোগ করা হলেও তারা অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণ পর মিডিয়ার মারফতে জানতে পারি লেখক মোশতাক আহমদকেও একই কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন (৬ মার্চ) সকালে দিদারুলকে থানায় হস্তান্তরের একটা সংবাদ পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে থানা থেকে সেটা অস্বীকার করা হয়।। দেখা যায়, মোশতাক আহমেদের সাথে কার্টুনিস্ট কিশোর আহমেদকেও গ্রেফতার করা হয়েছে একই অভিযোগে।

    দিদারুলের পরিচিতজন রমনা থানায় গেলে জানানো হয়ে যে, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে র‌্যাব-৩ সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, এক্টিভিস্টসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় মামলা করেছে। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে, কার্টুনিস্ট আহম্মেদ কবির কিশোর, ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য মো দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, মিনহাজ মান্নান, প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও সাহেদ আলম, সায়ের জুলকারনাইন, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে। কিন্তু দিদারুলকে তখনো রমনা থানায় হস্তান্তর করা হয়নি, র‍্যাব-৩ থেকেও দিদারুল কোন কাস্টোডি স্বীকার করা হয়নি। দিদারুল কোথায় আছেন জানতে চাইলে ইনভেস্টিগেশন অফিসার বলেন, দিদারুল ভূঁইয়াকে রমনা থানায় না পাওয়া গেলে আমরা তাকে ‘পলাতক’ ধরে নিব। অবশেষে, সন্ধ্যায় দিদারুলকে রমনা থানায় হস্তান্তর করার সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু জানানো হয়, দিদারুল সহ চারজনকে নাকি ‘সকালে’ই থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

    বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিকদের জীবন কতটা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে তার একটা নজির হিসেবে দিদারুলের ঘটনাকে তুলে ধরা হলো। দিদারুল কি করেছেন তার চেয়ে জরুরি বিষয় হলো তার সাথে ঘটে যাওয়া এই পুরো ঘটনা বা প্রক্রিয়াটা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে কোনো সময় যেকোনো ধরণের পরোয়ানা বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, এবং বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে থানায় হাজির করার আগ পর্যন্ত (দিদারের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ ঘন্টা, সাংবাদিক কাজলের ক্ষেত্রে ৫৪ দিন!) একটা বড়সড় সময় একজন নাগরিককে স্রেফ ‘উধাও’ করে দিতে পারে। দিদারের ভাগ্য ‘সুপ্রসন্ন’ হওয়ায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিনি আবার ‘আসামী’ হিশেবে জনসম্মুখে হাজির হতে পেরেছেন, কিন্তু সাংবাদিক কাজলসহ অনেকের উদাহরণ আমাদের সামনে জ্যন্ত রয়েছে যারা আরো অনেক লম্বা সময় ‘উধাও’ ছিলেন, অনেকেই এখনো ‘উধাও’ আছেন। পাঠক লক্ষ্য করুন, র‍্যাব তথা আলোচ্য মামালার ‘বাদী’ কয়েকজন নাগরিককে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করা হলো, তারপর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পরে থানায় হস্তান্তর করার পর আটকের কথা স্বীকার করা হলো, অথচ মামলার এজহারে ঊল্লেখ আছে আটকের দিন অর্থাৎ ৫ মে রাত ১১ টায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নগুলো হাজির হয়, আটকের দিনই যদি মামলা করা হবে তাহলে আটকের পরেরদিন পর্যন্ত কাস্টোডি অস্বীকার করা হলো কেন? খোদ মামলার ‘বাদী’ কেবলমাত্র রাষ্ট্রের একটি বাহিনী হওয়ার এখতিয়ারেই কি অভিযুক্তকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? মামলা দায়ের করার সাথে সাথেই কি কেউ ‘আসামী’(এজহারে ঠিক এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে) হয়ে যায়? তাহলে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরুই হয় কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাস্টডি অস্বীকার করার মাধ্যমে এবং অভিযুক্তকে ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে, সেই আইনি প্রক্রিয়ার আদৌ কি কোন নৈতিক ভিত্তি আছে? সেই আইনি প্রক্রিয়া ন্যায়বিচার তো দূরে থাক, এমনকি প্রতিশ্রুত ‘স্বচ্ছ’ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেও কি সক্ষম? এখানে এটাও উল্লেখ করা জরুরি যে, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত কাউকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আটকের ৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই আটকের কারণ জানাতে বলেছেন। তাহলে খোদ রাষ্ট্রপক্ষ যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে আদালত অবমাননার মাধ্যমে, সেই রাষ্ট্রপক্ষই কোন এখতিয়ারে কারো বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র’ এর অভিযোগ তুলতে পারে? অন্যত্র আমরা দেখিয়েছি, নির্বাহী ক্ষমতার দ্বারা এই আদালত ‘অবমাননা’র উৎস আসলে একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো।

    আর্টওয়ার্ক: পলিটিক্যাল প্রিজনার
    শিল্পী: মোরো
    সুত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে ছাত্রলীগ নেতার করা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদ ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে  ফেসবুকে লিখেছিলেন: ‘গ্রেফতার বিচার ব্যবস্থার খুব আপৎকালিন প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। কোনো অভিযুক্ত যখন মুক্ত অবস্থায় ভিকটিমের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিত হুমকি হতে পারেন, কোনোভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করতে পারেন, কিম্বা বিচার এড়ানোর জন্য পালিয়ে যেতে পারেন, সেক্ষেত্রেই কেবলমাত্র আদালতে মামলা হওয়া কাউকে বিচার চলাকালিন সময়ে গ্রেফতার করে কারাগারে রাখবার কথা। এসব কারণ ছাড়াই মামলা হওয়া মাত্রই কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালে বিচার নিজেই শাস্তি হয়ে যায়, কাউকে শায়েস্তা করবার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বিচারে শেষমেষ নির্দোষ প্রমাণ হলে তার কারাগারে যাওয়ার ভোগান্তি কিম্বা ক্ষয়ক্ষতির দায় আমাদের বিচার ব্যবস্থা নেয় না।’

    বছর দুয়েক আগে ভারতের পাঁচজন অ্যাক্টিভিস্টকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপটে রোমিলা থাপার সহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন; যার শুরুর কথাটাই ছিল: ‘arrest should be the last step of an investigation, not the starting point for one…’

    দিদার, কিশোর এবং অন্যান্যদের বেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে একেবারে বিপরীত। রাষ্ট্র এখানে প্রক্রিয়া শুরু করেছে এমনকি ‘গ্রেফাতার’ এর মাধযমেও নয়, বরং ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে, এবং রাষ্ট্রীয় খোলা ময়দান থেকে কিছু সময়ের জন্য ‘উধাও’ করে দিয়ে। করোনার এই মহাবিপর্যয়ের সময় যখন আগে থেকেই আটক থাকা বিভিন্ন মামলার আসামীদের জামিনে কিংবা স্থায়ী মুক্তি দেয়া হচ্ছে, সেখানে কেবলমাত্র মত প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনার মত যৌক্তিক কাজকে ‘অপরাধ’ সাব্যস্ত করে লেখক-সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট-কার্টুনিস্টদের মামলা দায়ের করার শুরুতেই ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে কারাগারে প্রেরণে করা হয়েছে। এহেন চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জিঘাংসা সম্পর্কে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)এর এশিয়া পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস যথার্থই বলেছেন:

    ‘কেবল একটি অনিরাপদ ও স্বৈরাচারী সরকার কার্টুনিস্ট, সাংবাদিক এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য মহামারিকে ব্যবহার করে। কেবল ব্যাঙ্গো-বিদ্রূপ পোস্ট করার কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন মামলা দায়ের না করে বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনাগুলো গ্রহণ করা উচিত এবং কোভিড -১৯-এর বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াতে যেকোনো ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত।’

    আর্টওয়ার্ক: থট ফরবিডেন
    শিল্পী: ওগুজ গুরেল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    দিদারুল বা কিশোরদের কোন কাজের জন্য তুলে নেয়া হয়েছে বা গ্রেফতার করা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। তারা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের মত প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন; ভেড়ার পালের মত রাষ্ট্র বা সরকারকে অনুসরণ না করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সমূহের সাথে নিজেদেরকে ক্রিটিক্যালি অ্যাংগেজ করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। দিদারুল ফেসবুকে একটিভিজম করতেন, কিশোর কার্টুন আঁকতেন। কিন্তু নাগরিক হিসেবে এই ‘স্বাভাবিক’ কাজগুলোকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে ভাষায় চিহ্নিত করা হলো, সেটাই রাষ্ট্রের সাথে এখানকার নাগরিকের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে। কোনো সন্দেহ নেই সেই সম্পর্ক ঔপনিবেশিক।

    একেবারে মূলধারায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতির জনক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মহামারী সম্পর্কে গুজব’, ‘রাষ্ট্র/সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিপ্রায়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় এমপির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় ‘মানহানি হয়েছে’ অভিযোগ তুলে সুনামগঞ্জের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। ‘সবুজ ধান’ কাটার ভিডিও শেয়ার করার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে, অভিযোগ ‘সরকার বিরোধী প্রচারণা’ এবং ‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়’। কিছুদিন পূর্বে সাংবাদিক তাসনীম খলিলের বাসায় গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা হুমকি দিয়ে এসেছেন, তিনি নাকি বিদেশে বসে রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করছেন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মহামারী নিয়ে বিবিধ লেখালেখির কারণে কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে। ১০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দায়ের করা হয়েছে; গত এক সপ্তাহে ৮ জন সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছে। মহামারী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখার কারণে তিনজন সরকারি কলেজের শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে, বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে করোনা সংক্রান্ত গবেষণা করবার কারণে তদন্ত চলছে।

    অর্থ্যাৎ, দেখা যাচ্ছে দিদারুল, কিশোরদের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, করোনা সংক্রান্ত আলাপ আলোচনার শুরু হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র/ সরকার ভাবের ‘মূর্তি’ উদ্ধার করার চেষ্টা নিয়োজিত আছেন। মহামারীর সঙ্কট মোকাবিলা করার চেয়ে তাদের মূল নজর হচ্ছে অন্যকিছু মোকাবিলা করা: এখানে যে সঙ্কট আছে এবং ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে সেই সত্য বচন কেউ উচ্চারণ করতে না পারে সেইজন্য নাগরিকের মুখে তালা মারা। সহিংস সার্বভৌম ক্ষমতার সম্মুখে নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকারহীন শুদ্ধ ‘বেয়ার লাইফ’ তথা বধযোগ্য প্রাণ হিশেবে উন্মোচন করা। ফলে আমরা মোটেও অবাক হই না যখন দেখি, বাংলাদেশে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়, ৮ মার্চ ২০২০, ঠিক সেই দিনই নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর আইনবলে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালা-২০২০ জারি করে। শুরু হয় ব্যক্তি ও সমাজকে স্থায়ী ‘কোয়ারেন্টাইন’ করার নয়া বাস্তবতা।

    সরকারী বয়ানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বর্তমানে আসলে কোনো ফারাক নেই, তিনে মিলে একাকার। এবং, একের ভাবমূর্তি তাই অন্যেরও ভাবমূর্তি, একের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া মানে অন্যেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। এসবের যুগপৎ সম্মিলন ঘটেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেলায়। অন্যত্র আমরা ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন ও রাষ্ট্রের সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছি।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘নিরাপত্তা’ আসলে কার নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে? যে কেউই এই আইনে চোখ বুলালে টের পাবেন এই আইন মূলত সরকার, রাষ্ট্র আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ফারাক ঘুচিয়ে এই তিনটি পৃথক সত্তাকে একক সত্তায় পরিণত করেছে। যেকোনো একটির যৌক্তিক সমালোচনা করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ নেমে আসতে পারে।

    এই আইনে ব্যবহৃত ‘রাষ্ট্রের সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা’, ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এই আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ আমাদের এটাই ভাবতে বাধ্য করছে যে, এসব শব্দবন্ধ অস্পষ্ট রাখাই এই আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সরকারের সমালোচনা করলেই এই শব্দবন্ধসমূহের অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে গণ্য করে এই আইন প্রয়োগ করা হতে পারে। ফলে, এ আইন আসলে শুদ্ধ নিপীড়নমূলক ক্ষমতার উপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থেই প্রণীত।

    আইনের ‘ডিজিটাল’ শব্দকে আধুনিক বলে মনে হলেও, সত্য হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টস’ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্র তার ঔপনিবেশিক চরিত্রই উন্মোচন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ অঞ্চলের মানুষকে প্রজা জ্ঞান করতো, তাই তাদের যাবতীয় লুটপাট-দুর্নীতিকে নিরঙ্কুশ, জবাবদিহির ঊর্ধে নেয়ার স্বার্থে তারা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন’ প্রণয়ন করেছিল। আমাদের রাষ্ট্র ও তার কলকব্জাগুলো যে ঔপনিবেশিক এবং সে যে ক্রমাগত আরো বেশি ঔপনিবেশি্ক হয়ে উঠতে চায় (কারণ, এতেই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ফায়দা) তার চরমতম নমুনা হচ্ছে ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন।

    এই যে দিদারুলদের ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, আমাদের কাছে এটা ‘অন্যায়’ বলে মনে হলেও ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের বরাতে এই তুলে নিয়ে যাওয়া ‘আইনত’ সঠিক। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যদি মনে হয় তার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ বা ‘মান-সম্মান’ হুমকির সম্মুখীন তাহলে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে। অর্থাৎ, দিদারুলদেরকে এইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার যাবতীয় রাস্তা এখানে করে দেয়া আছে। ফলে, কোনো ধরণের তত্ত্বের মধ্যে না গিয়েই, একেবারে বাস্তবিক নজির আমাদেরকে দেখাচ্ছে যে, যাবতীয় ভিন্নমতকে ক্রিমিনালাইজ ও অসম্ভব করে তোলাই এই আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সকল নাগরিকের চিন্তার উপর আইনীয় সেন্সরশিপ হাজির করার মাধ্যমে একটা ভিন্নমতহীন ‘জ্বী হুজুর’ ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার নিয়ামক এই আইন। এই আইন এক অন্তহীন ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি করে। রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার তাত্ত্বিকদের তত্ত্বের এমন বাস্তব রূপে হাজির হওয়ার নজির বোধহয় খুব অল্পই আছে।

    দিদারুল, কিশোর, মুশতাক আহমেদ, তাসনীম খলিলসহ এই মামলার শিকার আরো অসংখ্য ব্যক্তির সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা হতে পারতো বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে। কিন্তু, যে ভূখণ্ডের মানুষ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষায় এতো রক্ত ঝরালো, এতো লড়াই-সংগ্রাম করলো, তার কাছে গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরার কিছু নেই। বরঞ্চ, এটা উন্মোচন করা দরকার যে, এতো কাঙ্ক্ষিত একটা রাষ্ট্রে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কীভাবে ও কোন ধরণের আইনি-প্রক্রিয়ায় ব্যহত হচ্ছে, কেনো এখানে গণতান্ত্রিক কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারছে না।

    আর্টওয়ার্ক: মাইন্ড কন্ট্রোল
    শিল্পী: সিমন নস্কা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপরোক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘গুজব’ প্রচারের কথা বলা হচ্ছে; উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ‘গুজব’ বা ‘মিথ্যা’ কি না সেটা প্রায় সকলেই জানেন। এও জানেন যে, ‘গুজব’ রেটরিক বর্তমান রেজিমের নিপীড়নের নয়া হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সরকার বিরোধী যেকোন বক্তব্য-বিশ্লেষণকে ‘গুজব’ বলে সাব্যস্ত করা হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো গণবিরোধী, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা প্রথমত এবং প্রধানত ‘সত্য’ , ‘মিথ্যা’ , ‘গুজব’ এর এক একচেটিয়া বাস্তবতা উৎপাদন করে; যেখানে সরকারি বয়ান মাত্রই ‘সত্য’, সরকারবিরোধী যে কোন বয়ানই ‘মিথ্যা’। এরকম স্বৈর-বাস্তবতায় ‘গুজব’ তথা অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস হয়ে ওঠে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের একমাত্র হাতিয়ার। ‘গুজব’ এর জয় হোক!

    স্পষ্ট করে বলা দরকার, পদ্ধতিগত ‘গুজব’ তৈরির কারখানা আসলে খোদ রাষ্ট্রই; রাষ্ট্র যখন অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত না করবে কিংবা নিজদের অনুকূল একপেশে, জবাবদিহিতাহীন তথ্যের বাস্তবতা তৈরি করবে এবং জনগণ যখন তথ্যের অভাব বোধ করবে, কেবল তখনই ‘গুজবে’র উর্বর জমিন তৈরি হয়। করোনার শুরুতেই বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া মনিটরিং কমিটি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা আমাদের মনে আছে। বিশেষ করে, রাজনীতিবিদরা সত্য গোপন করছেন এই সন্দেহের চেয়ে বেশি আর কোনো কিছুই গুজব ও ভয়ে ইন্ধন জোগায় না। ভয় ও আতঙ্ক গুজবের পালে হাওয়া দেয়। একদিকে করোনার মতো এমন মহামারী সময়ে জীবন ও জীবিকা নিয়ে আতঙ্ক ও ভয়, অন্যদিকে কর্তব্যক্তিদের পক্ষ থেকে লাগামহীন মিথ্যার ফুলঝুরি- উভয়ে মিলে গুজবের জমিন তৈরি করছে। কিন্তু, মুশকিল হলো, যারা রাষ্ট্রের এই ‘গুজব’ তৈরির প্রক্রিয়ার সমালোচনা করছিলেন, রাষ্ট্রের চোখে তারাই ‘গুজব’ সৃষ্টিকারী বলে চিহ্নিত হন। এমনকি কেউ ‘গুজব’ ছড়ালে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা, কেউ ‘কটূক্তি’ করলে, ‘সঠিক’ উক্তি হাজির করা সরকারের দায়িত্ব (তা নাহলে আর সমস্ত কিছুর উপর ‘বৈধতা’ আরোপের ভিত্তিটাই বা কী?); মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতার সীমাকে আমরা এতদূর পর্যন্ত বুঝি।

    সরকারের সমালোচনা করা যাবে না কেন? রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না কেন? সমাজে কি ভিন্নমত থাকবে না? মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি থাকবে না? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এমন মৌলিক বোঝপড়াগুলোকেও ‘আইনি’ প্রক্রিয়ায় রদ করা হচ্ছে। ফলে, আমাদের চোখের সামনেই আমরা ফ্যাসিবাদী ও একচেটিয়াতন্ত্রের উলঙ্গ আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যে অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে, করোনাকালে সেটার নগ্নরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ফলে, এখানে রাষ্ট্রের কাছে করোনা মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা, অন্য অর্থে খোদ জনগণের বিরুদ্ধে অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। মজলুম জনতার এত রক্ত, এত ‘দাম’ দিয়ে ‘কেনা’ এই বাংলা আজ এ কোন লেবিয়াথানের খপ্পরে? এ কোন মহাদানবীয় ‘রাষ্ট্রসোরাস’ আজ আমাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে?

    ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের মত কুখ্যাত নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণক্ষমতাতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপনের, যে গণক্ষমতাতন্ত্র হবে: ‘রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাণহীন যন্ত্রপাতিওয়ালা বর্তমান রাষ্ট্র-সংগঠনের জায়গায় স্বাধীন মানব-সম্প্রদায়সমূহের একটা সঙ্ঘ’; গঠনের দিকে থেকে হায়ারার্কিমুক্ত, আনুভুমিক ও ফেডারেটিভ। আর তা কেবল সম্ভব, ‘যাবতীয় অর্থনৈতিক একচেটিয়া এবং সমাজের মধ্যকার যাবতীয় জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তির মাধ্যমে।’

    সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য বলার দায়ে দিদারুল, কিশোররা দণ্ডিত। কিন্তু আমরা তো জানি: In a time of universal deceit, telling the truth is a revolutionary act…

  • বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয়

    বাংলাদেশে মতপ্রকাশ: স্বাধীন অথবা শোচনীয়

    • ফাহমিদুল হক

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক  স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। প্রবাহমান প্রবন্ধে  ফাহমিদুল হক মত প্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতিকে খোলাসা করেছেন, শাসকতার নানা ধারা- প্রবণতা- চর্চাকে সমালোচনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোকপাত করে। প্রবন্ধটির বর্তমান সংস্করণটি শুদ্ধস্বর থেকে পুন:প্রকাশ করা হল। — সম্পাদক 

    ভূমিকা
    মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা বাকস্বাধীনতা একটি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নির্মাণ ও সার্বিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অবকাশ রাখে না। বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ হয়েছে, নিশ্চয়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ধারণাকে বাদ দিয়ে নয়। “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়” – ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত এই জনপ্রিয় গান কিংবা স্লোগানটি কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারের বয়ান করে না, সার্বিকভাবে চিন্তার স্বাধীনতার কথাও বলে। বাংলাদেশের সংবিধানেও মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে কিছু ‘যুক্তিসঙ্গত বাধা’ ব্যতিরেকে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই রচনায় স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হবে। তাতে আমরা দেখতে পাবো, স্বাধীনতার পর নানান সরকারের সময়ে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কমবেশি লঙ্ঘিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

    ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা জনপরিসরে বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ভাবনা প্রকাশের অধিকার হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (ড্যানেসি, ২০০৯: ১২৮)। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা চিন্তার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে একত্রে মিলিয়ে আলোচনা করে থাকি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচক হিসেবে পাঠ করা হয়। একটি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে কি নেই, এবং নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতার আছে কি নেই, তা দিয়ে সহজেই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পরিমাপ করা সম্ভব। সে হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে গত এক দশকে সরকারব্যবস্থা যেমন গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে ক্রমশ একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: অক্টোপাস
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রেক্ষাপট
    স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই আদর্শ পরিস্থিতিতে ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা সরাসরি মত প্রকাশ করতে পারছেন। এর আগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যেই সীমিত ছিল, কারণ ব্যক্তি নাগরিকের মত প্রকাশের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। সেই বিবেচনায় বলা যায়, স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় চারটি পত্রিকা ছাড়া বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৭০-র দশকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে জিয়াউর রহমান সরকারের সময়ে ও ১৯৮০-র দশকে এরশাদ আমলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন চলাকালে সংবাদপত্রের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। সাংবাদিকরা একটি নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি সবসময়ই টের পেতেন, তবুও অনেকে নির্ভিকভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করেছেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর নব্বই দশকে অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে দেশে মুক্তবাজার নীতি গৃহীত হলে বেসরকারি পর্যায়ে নতুন নতুন অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হতে থাকে এবং সাংবাদিকরা অনেকখানি স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ পান। আর নতুন শতকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমের বিস্ফোরণে অনেক টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলের আগমণ ঘটে। তবে এসব ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম চালু করবার লাইসেন্স কেবল সরকারঘনিষ্ঠ লোকজনই পেয়ে থাকেন। ফলে সরকার পরিবর্তনে বেশ কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায় অথবা মামলার মুখোমুখি হয়। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে যেহেতু একটি দলই ক্ষমতাসীন রয়েছে এবং লাইসেন্স প্রদানের নীতি যেহেতু একই থেকে গিয়েছে, তাতে দেশে বহু সংবাদপত্র, প্রায় চল্লিশটি টেলিভিশন, প্রায় ২০টি এফএম রেডিও থাকার পরও সরকারপসন্দ মতই ‘স্বাধীনভাবে’প্রকাশিত হচ্ছে, এবং সরকারবিরোধী মত প্রকাশিত হচ্ছে স্বনিয়ন্ত্রণের (সেলফ-সেন্সরশিপ) মধ্য দিয়ে ও সীমারেখা মধ্যে থেকে। সাম্প্রতিক সময়েই যুক্ত হয়েছে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি মতপ্রকাশের মাধ্যম সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক ইউটিউব) ও ব্লগ। প্রাথমিকভাবে এই পাটাতনগুলোর ব্যবহারকারীরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারলেও, আইনী বেড়াজাল এবং হত্যা-হামলা-মামলা ইত্যাদির মুখে তারাও স্বনিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছেন। আবার স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে, মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের অংশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহারের চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। আবার বেসরকারি সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণের ফলে, আধেয় নির্বাচন অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকদের পরিবর্তে মিডিয় প্রতিষ্ঠানের পুঁজিপতি মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। অর্থাৎ মালিক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রভাবও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

    মতপ্রকাশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
    প্যারিসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স স্যান্স ফ্রন্ট্রিয়ার (আরএসএফ) প্রতিবছর সারাবিশ্বের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম ১। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল ১৩৮তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৯তম। আরএসএফ যেসব সূচকের ভিত্তিতে এই র‌্যাংকিং করে সেগুলো হলো – বহুত্ববাদ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পরিবেশ ও স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনী কাঠামো, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, অবকাঠামো, সহিংসতা২। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যেকয়েকটি স্থানের পিছিয়ে পড়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো – স্বনিয়ন্ত্রণ, আইনী কাঠামো ও সহিংসতা। বহু মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সত্ত্বেও, স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ সেন্সরশিপ খুব স্পষ্ট, পূর্বেকার আইসিটি আইন ও হালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে খুবই কঠোর এক আইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং অনলাইন ব্যবহারকারী ও সাংবিাদকদের ওপর মামলা ও প্রত্যক্ষ হামলা অব্যাহত রয়েছে।

    সর্বোপরি, দেশব্যাপী এক ভয়ের পরিবেশ রয়েছে যা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম এক বাধা। গুম, ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টারের  নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধীদলের ও বিরোধীমতের ব্যক্তিদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার ও হয়রানি, ফোনে আড়িপাতা ও সুবিধামতো সেগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ, ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের দুই আন্দোলন – শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন – নিষ্ঠুরভাবে দমন এবং প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলমকে গ্রেফতার ও কারাগারে প্রেরণের মতো ঘটনা সার্বিকভাবে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে, যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ থেকে নিজেকে বিরত রাখছে। ২০১৮ সালের সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে একতরফাভাবে শতকরা ৯৬ ভাগ আসন বর্তমান সরকার নিজের করে নেবার মাধ্যমে দেশে একদলীয় কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী হয়েছে যা এক ভীতিকর, হতাশাজনক ও চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। এই পরিবেশ প্রকারান্তরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসরকে একেবারে সঙ্কুচিত করে ফেলেছে।

    আইনী কাঠামো
    বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করেছে, নীতিমালা গ্রহণ করেছে। এর কিছু খসড়া আকারে এখনও আছে, কিছু চূড়ান্ত  হয়েছে। এসবকিছুর মধ্যে একমাত্র ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয় নি। নয়তো প্রায় সব আইন ও নীতিমালা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। এসব আইন ও নীতিমালাকে বিশ্লেষক-সাংবাদিক-অনলাইন ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ‘নিবর্তনমূলক’হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ‘সম্প্রচার নীতিমালা ২০১৪’ প্রচুর বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সবচেয়ে বেশি বির্তক হয় আইসিটি আইনকে (২০০৬ সালে প্রণীত, ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়) নিয়ে। বিশেষত এর ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনের ৫৭ ধারাটি নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়। এটি বিশেষত ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানিকর কিছু বলা হলে তার বিরুদ্ধে যে শাস্তির বিধান রাখা হয় তা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক পরিকাঠোমের বিরোধী। একই ধরনের মানহানিকর বক্তব্য মুদ্রণ মাধ্যমে দেয়া হলে, তার জন্য যদি ২ মাসের কারাদণ্ড বরাদ্দ হয়, তবে কেবল ডিজিটাল মাধ্যম বা অনলাইনে তা প্রকাশ করলে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এবং যেকোনো মামলা জামিন-অযোগ্য, যেকোনো কিছু পুলিশ আমলে নিতে পারবে এবং ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করতে পারবে। অর্থাৎ অভিযুক্তের নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনো ফাঁকই রাখা হয় নি। ফলে এটা ছিল প্রচলিত অর্থে এক ‘কালো আইন’এবং এর ভয়ঙ্কর দিকটির কথা সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং তারা বলতে থাকেন যে, নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৫৭ ধারার মতো কিছু থাকবে না৩। কিন্তু নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাশ হবার দেখা যায়, তা আইসিটি আইনের তুলনায় আরো ভয়ঙ্কর। আইসিটি আইন ছিল অনলাইনের ব্যবহারকারীদের জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার কারণে সাংবাদিকতাকে নিগড়ে বেঁধে ফেলা হয়।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে পুনরায় বিতর্ক শুরু হয় এবং এপর্যায়ে সাংবাদিকরা এবং বিশেষত ‘সম্পাদক পরিষদ’আইনের আপত্তিকর দিকগুলো নিয়ে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করে সংবাদপত্রে পূর্ণপৃষ্ঠাব্যাপী প্রতিবেদন ছাপেন এবং স্পষ্টভাবে বলেন এই আইনের কয়েকটা ধারায় পরিবর্তন আনতে হবে। সম্পাদকরা এমনকি প্রেসক্লাবের সামনে এবিষয়ে প্রতিবাদী মানববন্ধনও করেন। কিন্তু সরকার যেহেতু কর্তৃত্ববাদী আচরণে পূর্বের তুলনায় আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাই তারা কোনো আপত্তিই কর্ণপাত করেন নি। ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে সংসদে আইনটি পাশ হয়ে যায়। সারা দেশের মানুষের আপত্তি আমলে না আনা হলেও, পুলিশের আপত্তির মুখে একটি স্থানে পরিবর্তন আনা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারায় তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির মহাপরিচালকের অনুমোদন নেওয়ার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পুলিশের আপত্তির মুখে মাত্র এক দিনের মধ্যেই অনুমোদনের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। অর্থাৎ তারা কারো কোনো অনুমতি ছাড়াই তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করতে পারবে।

    আর্টওয়ার্ক: ওপেন মাইন্ড
    শিল্পী: ব্রাডি রড্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বস্তুত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পূর্বেকার ৫৭ ধারার ব্যাপারগুলো ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে নির্বাচিত দু’টি ধারা (৩২ ও ৪৩) আলোচিত হলো। ৩২ ধারায় বলা আছে:

    (১)       যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923), এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করনে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডেদণ্ডিত হবেন।

    (২)    যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১) এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুনঃ সংঘটন করেন তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, বা অনধিক  ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    ৪৩ ধারায় বলা আছে, যদি কোনো পুলিশ অফিসারের মনে করেন যে এই আইনের (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, বা হচ্ছে বা হবার সম্ভাবনা আছে তবে ওই স্থানে প্রবেশ করে পুলিশ বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি করতে পারবে, ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করতে পারবে, দেহ তল্লাশি করতে পারবে এবং সন্দেহ হলে গ্রেফতার করতে পারবে।

    এটা বেশ কৌতুকপ্রদ ব্যাপার যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ১৯২৩ সালের আইনকে সাক্ষী মানা হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত এই আইনটি তৎকালীন সরকারের জবাবদিহিতা এড়ানোর জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল যাতে নিঃসন্দেহে একটি অগণতান্ত্রিক আকাঙ্খা ছিল। অর্থাৎ সরকার যা প্রকাশ করবে না বা করতে চায় না, তাই ওই আইনের সুরক্ষায় অধরা থেকে যাবে। তাহলে সাংবাদিকরা করবেটা কী? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ লোপাট হয়ে গেলে, সেসংক্রান্ত কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে, সেই তথ্য যদি ডিজিটাল ফরম্যাটে থাকে, তবে তা সংগ্রহ করা অপরাধ হবে? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হলে তদন্ত করা যাবে না, যেক্ষেত্রে আজকার অনেক তথ্যই ডিজিটাল ফরম্যাটে রক্ষিত থাকে? অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে যত অঘটন, অনিয়ম, কেলেঙ্কারি হোক, অনুসন্ধানের সুযোগ থাকবে না? অনুসন্ধানের চেষ্টা করলে বা তথ্য সংগ্রহ করলে ১৪ বছরের জেল হবে? একদিকে তথ্য অধিকার আইন বলবৎ আছে, অন্যদিকে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট বরাত দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দূর্গ গড়ে তোলা হচ্ছে। আইনী তামাশা বলা যেতে পাওে একে।

    অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধারা হলো ৪৩ ধারা। পুলিশকে কী অপরিসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে! পুলিশ যদি নেহায়েৎ মনে করে কোনো অপরাধ ‘সংঘটিত হতে পারে’তবেই তল্লাশি-জব্দ-গ্রেফতার করতে পারবে, কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই। পুলিশের ‘মনে হওয়া’ই যথেষ্ট কাউকে শাস্তি দেবার জন্য, হয়রানি করার জন্য! পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে এরকম আইনই বোধহয় প্রয়োজন পড়ে, যেখানে নাগরিকের বা অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৩টি ধারা জামিন-অযোগ্য। প্যারিসভিত্তিক আরএসফ, নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে), ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম অব জার্নালিস্টস – মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতা পরিবীক্ষণকারী সব আন্তর্জাতিক সংস্থাই এই আইনটির বিরুদ্ধে উদ্বেগ জানিয়েছে।

    সম্পাদক পরিষদ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে কয়েকটি পত্রিকায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে তাদের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের শুরুতে তারা তাদের বিশ্লেষণের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।

    জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে:

    ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

    ২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

    ৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    ৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে।

    (প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)

    কিন্তু সরকার কারো কোনে ওজর, কোনো প্রতিবাদ আমলে নেয় নি। একতরফা সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে কোনো তর্কবিতর্ক করতে হয় নি। বস্তুত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পেছনে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সরকার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। সফলভাবে এর প্রয়োগও আমরা দেখেছি। যেমন সরকারপ্রধান বা কোনো মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতার নামে অনলাইনে কেউ প্রতিবাদমূলক কিছু লিখলে দেখা গেছে ওই নেতার নির্দেশে বা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ৫৭ ধারায় দ্রুত মামলা করছে কোনো ছাত্রনেতা বা চাটুকার কর্মী। এভাবে আইসিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়। ২৪ জুলাই, ২০১৮ তারিখে প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান জানান, ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে৪। বস্তুত আইসিটি আইন প্রবর্তনের পর সনাতনী মানহানিবিষয়ক আইন ব্যবহার হয়নি বললেই চলে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে:

    বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের মামলা হু হু করে বাড়ছে। অঙ্কের হিসেবে ৩ বছরে মামলা বেড়েছে প্রায় ২০০০ গুণ। আর এসব মামলার প্রায় সবই করা হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারায়। ধারাটি অজামিনযোগ্য (আসাদুজ্জামান, ২০১৬)৫।

    এই হিসেব প্রতিবেদক সাইবার ক্রাইম ট্রাইবুনালের মামলার সংখ্যা হিসেব করেই বলেছেন। এমন নয় যে, অনলাইনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে সত্যি সত্যি অত্যন্ত মানহানিকর কেউ কিছু লেখে না। কিন্তু মামলার হারের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে, স্বাভাবিক সমালোচনা, যা গণতান্ত্রিক দেশে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার, সেটা হরণ করার জন্যই এই আইনের প্রবর্তন করা হয়েছে। শহিদুল আলমকেও আইসিটি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আবার অরাজনৈতিক কারণেও, ব্যক্তিগত-পেশাগত দ্বেষ-বিদ্বেষ থেকেও অন্যকে হয়রানি করার জন্য এই আইনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এই লেখকের বিরুদ্ধেও ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী, অসহিষ্ণু ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে এই আইন খুব অবদান রেখেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই প্রবণতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে গণমাধ্যমকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।

    মূলধারার গণমাধ্যম
    আইসিটি আইন পরোক্ষভাবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রত্যক্ষভাবে মূলধারার সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনকি চলতি সংবাদ বা হার্ড নিউজ পরিবেশনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও আইনমন্ত্রী ডয়েচে ভেলে বাংলাকে বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকরা চিন্তা করবেন না, ৩২ ধারা আপনাদের বিরুদ্ধে নয়’৬, কিন্তু এই আশ্বাসসবাণী বলবৎ থাকে নি। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে খুলনার দু’জন সাংবাদিক রিপোর্ট করেন যে খুলনা-১ আসনে ভোটারের সংখ্যার চাইতে ভোটপ্রদানের সংখ্যা বেশি হয়েছে। ওই দু’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় এবং একজন গ্রেফতার হন। গ্রেফতারকৃত সাংবাদিককে শারীরিকভাবে হেনস্থা করার অভিযোগও পাওয়া যায় ৭। পরে অবশ্য তিনি জামিন পান। জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি ওই রিপোর্ট করেন এবং ভুলটা নির্বাচন কমিশনের লোকজনের।

    আর্টওয়ার্ক: ট্রিকল ডাউন
    শিল্পী: অরনাল্ডো কুলার
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিন্তু এই আইনী বাধার বাইরেও একটা চিত্র আছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়াই মোটের ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আগেই বলা হয়েছে লাইসেন্স প্রদানের নীতি অনুযায়ী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো খুব একটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। অনলাইন পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দক্ষিণপন্থী সংগ্রাম, দিনকাল, ইনকিলাব ইত্যাদি পত্রিকার প্রভাব তেমন নেই পাঠকমহলে। তবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বণিকবার্তা বা নিউ এইজ পত্রিকা কিছুটা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার শীর্ষস্থানীয় দু’টি পত্রিকা এবং সমাজে তাদের প্রভাব রয়েছে। এই দুটো পত্রিকা নিয়ে আমাদের পুরনো অভিযোগ রয়েছে – নব্বই দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসারের জন্য জনমনে ভোক্তামনষ্কতা তৈরি করতে (দেখুন হক, ২০১১) এবং রাজনীতিবিদদের পরিবর্তে সুশীল সমাজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনা করতে (দেখুন নিউটন, ২০১৩) পত্রিকা দু’টি ভূমিকা রাখতে চেয়েছে। প্রথমটিতে সফল হলেও তারা দ্বিতীয়টিতে ব্যর্থ হয়েছে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ বা রাজনীতিবিদরা পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পরে। তবে গত এক দশকে পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে অন্য সব পত্রিকা-মিডিয়া যেমন গাঁটছড়া বেঁধেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই দুই পত্রিকা স্বাধীনভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছে। ফলে তাদের ওপরে চাপ এসেছে। ‘সরকারের ইমেজ ক্ষুণ করার চেষ্টা’র অভিযোগে ২০১৫ সালে শীর্ষস্থানীয় টেলিকম কোম্পানিগুলোকে বিজ্ঞাপন না দিতে সরকারের দিক থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে৮। বস্তুত, প্রচুর সংবাদপত্র, প্রচুর টেলিভিশন ও বেতার চ্যানেল থাকার পরেও সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচারমাধ্যমগুলোতে কমই দেখা যায়। সংবাদপত্রের কলামে বা টেলিভিশন চ্যানেলে সরকারপন্থী সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিও প্রবল, যাদের দাপটে ভিন্নমত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কেবল বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের রুটিন কর্মসূচি নয়, জনগণের স্বার্থে যে আন্দোলনগুলো হয়ে থাকে, সেগুলোর খবরাখবর এসব মিডিয়ায় সামান্যই পরিবেশিত হয়। পরিবেশবাদী ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার উদ্দেশে যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন, তার সীমিত ও খণ্ডিত কাভারেজ হতে দেখি আমরা। উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পক্ষের মত সবলভাবে উপস্থিত হয়ে থাকে। এরকম পরিস্থিতি তৈরী হয় বলেই ড্যানি শেকটার  (১৯৯৮) বলেছিলেন, “দ্যা মোর ইউ সি, দ্য লেস ইউ নো”। শেকটার অবশ্য কথা বলেছিলেন ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

    গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন মতপ্রকাশে যেমন বাধা আছে, বা ভয়ের পরিবেশ তৈরী হয়ে আছে এবং গণমাধ্যমগুলো স্বনিয়ন্ত্রণ করছে৯, কিন্তু সরকারকে বাড়তি সেবা দেবার জন্য বেশ কিছু গণমাধ্যম মাঠে সরব থাকে। যখন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধে (ধরা যাক, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন), কিছু টেলিভিশন চ্যানেল চেষ্টা করে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে টক-শোতে ডেকে নিয়ে, সহযোগী সাংবাদিকদের সহায়তায়, আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কলঙ্ক আরোপ করতে, এভাবে পুরো আন্দোলনকে অপশক্তির আন্দোলন বলে প্রমাণ করতে। একদিকে রয়েছে সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতি – গুম-নিখোঁজ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার; অন্যদিকে রয়েছে পোষ্য মিডিয়া, যারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার কাজটি করে থাকে। তারই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে একাত্তর টিভি ও সময় টিভিতে নির্বাচনকালীন বিরোধী জোট নাগরিক ঐক্য ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের বেশ কিছু ফোনালাপ ফাঁস করা হয়। এতে তাদের নির্বাচনকালীন পরিকল্পনা, যাতে কিছু সহিংস ঘটনার পরিকল্পনাও রয়েছে, সেগুলোকে বারবার প্রচার করা হয়। আমরা জানি, সূত্র ছাড়া কোনো সংবাদ হয় না, কিন্তু এগুলো প্রাইম টাইম নিউজ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ফোনে আড়ি পাতা এমনিতেই নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী, সেই অনৈতিক কাজটিকে তারা সংবাদ উপাদান হিসেবে প্রচার করেছে। এসব ফোনালাপকে ‘নাশকতার পরিকল্পনা’র ট্রিটমেন্ট দিয়ে, অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য প্রচার ছাড়াই একতরফা প্রচারকে অনৈতিক ও দালালীর সাংবাদিকতা বলতে হবে। কারণ এই আলাপগুলো সবই একপাক্ষিক, এগুলোর সব সুবিধা সরকারই পেয়েছে। এসব ‘দালাল মিডিয়া’র ক্ষমতা ছিল না নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের নেতৃবৃন্দ কী পরিকল্পনা করছে, তা জানানোর – কীভাবে ভোট কারচুপি হবে, কীভাবে নির্বাচনের আগে বিরোধী কর্মীদের গ্রেফতার করা হবে বা হুমকি দিয়ে নিজ নিজ গৃহে অন্তরীণ থাকতে বাধ্য করা হবে?

    হুমকি ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বনিয়ন্ত্রণ ও দালালীর বাইরে অবশ্যই আরেকটি বিষয় হলো সাংবাদিকদের ওপর প্রত্যক্ষ বা শারীরিক হামলা। দেশীয় বেসরকার মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে দেশে ১২২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা বা হুমকি-হয়রানির শিকার হয়েছেন।… আর ২০১৮ সালে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা হয়েছে ২০৭টি। এর মধ্যে খুন হয়েছেন ৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১১৭টি (সুলতান, ২০১৯: ২)। ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় কর্মরত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিকদের সরাসরি আঘাত করে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যরা এবং এতে অন্তঃত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন১০।

    সামাজিক মাধ্যম
    ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো এমন পাটাতন যাতে সাধারণ মানুষ যুক্ত এবং এখানে সরাসরি তারা তাদের মত প্রকাশ করে থাকেন। ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস (২০০৫) বর্ণিত ‘নেটওয়ার্ক সমাজ’-এর সার্থক উদাহরণ হলো এই সামাজিক মাধ্যম। এর সদস্যরা ‘আনুভূমিক যোগাযোগ’-এর মাধ্যমে একটি ‘প্রতি-ক্ষমতা’র (ক্যাস্টেলস, ২০০৭) জন্ম দেয় এবং এর মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আর উত্তর আফ্রিকায় এরকম কয়েকটি সরকারের পতন হয়েছিল ২০১০-১১ সালে। এই ঘটনা সব দেশের সরকারকে সতর্ক করে তোলে এবং সরকারগুলোর প্রণোদনায় নজরদারির এমন যন্ত্র তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে অনলাইন ব্যবহারকারীদের নজরদারি করা যায়, অফিসে বসেই। কোনো সরকার এগুলো তৈরি করেছে, আর কোনো সরকার জনগণের করের টাকা দিয়ে বেশি দামে এগুলো কিনেছে এবং এরপর জনগণকেই নজরদারি করা শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়১১। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইসিটি আইন বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। গত নির্বাচনের আগে এই নজরদারি আরও বৃদ্ধি পায়১২। বোঝাই যায়, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের নজরদারিতে রেখে নির্বাচনে সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নজরদারি, কঠোর আইন প্রণয়ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকারকে সরকার অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ইন রেপ্রিসিভ রেজিম
    শিল্পী: ফাদি আবু হাসান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এধরনের নজরদারি ও শাস্তি প্রদানের পেছনে সরকারপক্ষ এবং তার পক্ষে সাফাই প্রদানকারী টকশোকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও অনলাইন পণ্ডিতেরা যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ভুয়া সংবাদ ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টাকে। একথা সত্যি ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম হলো ভুয়া সংবাদ ও গুজবের উর্বর ক্ষেত্র। ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা রংপুরে সাম্প্রদায়িক হামলাও করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় এক পর্যায়ে টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলে, সেই সুযোগে হত্যা-ধর্ষণের গুজব ডালপালা মেলে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে অভিনেত্রী নওশাবা গ্রেফতার হন। তখন আন্দোলনকারীরা গুজবনির্ভর আন্দোলন করছে এবং তারা ‘অপশক্তি’দের দ্বারা চালিত বলে নিন্দা জানায় সরকারের ঘনিষ্ঠ মিডিয়া এবং অনলাইন যোদ্ধারা। কিন্তু অচিরেই জানা যায়, গুজব ও মিথ্যা সংবাদ ছড়াতে সরকারপক্ষীয়রা কম যান না। নির্বাচনের ১০ দিন আগে, সরকারের বিভিন্ন পদে থাকা কিছু লোক দ্বারা পরিচালিত একাউন্ট ও পেজ ফেসবুক বন্ধ করে দেয়১৩। এছাড়া ব্লগ-জমানা (২০০৭ পরবর্তী সময়ে) থেকেই কিছু গ্রুপ (যেমন ‘এ-টিম’) অনলাইনে লড়াই-আক্রমণ-গালাগালিতে পরিচিত হয়ে ওঠে যার কিছু নিম্নমানের সংস্করণ (যেমন ‘সিপি গ্যাং’) ফেসবুকে সন্ত্রাস কায়েম করে এবং শেষপর্যন্ত এরা ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই তাদের ‘লাঠিয়ালগিরি’কে উৎসর্গ করে। এই অনলাইন যোদ্ধারাও অনলাইনে স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য বাধা। এদের আক্রমণের লক্ষ্য সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারী স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থী জামাতগোষ্ঠী কেবল নয়, প্রগতিশীল, বাম, কিংবা স্বাধীনচিন্তার মানুষদেরও এরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করতে সক্ষম। উল্টো সমালোচনামুখর প্রগতিশীলদেরও তারা ছদ্ম জামাতি বা ‘বামাতি’ উপাধি দেয় এবং প্রয়োজনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এরা সরকারকে ক্রিটিক করছেন এরকম যেকোনো ব্যক্তি, তিনি যদি সম্মানীয় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিও হন, তাদের বিরুদ্ধে এদের কেউ একজন মিথ্যা বা বানোয়াট কথা লেখে এবং বাকিরা তা শেয়ার করে করে প্রায় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলে১৪।

    একটি কারচুপির নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে সরকার কিছু ‘কল্যাণমুখী’পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে তারা বহু পর্নোগ্রাফির সাইট বন্ধ করে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় অশ্লীলতা ও জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করতে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজিগুলোকে ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে একটি তালিকা পাঠায় বিটিআরসি। সেই তালিকায় সামহোয়ারইন… ব্লগের নাম ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে সামহোয়ারইন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। এই লেখা পর্যন্ত সামহোয়ারইন সব নেটওয়ার্ক থেকে দেখা যাচ্ছে না, অর্থাৎ আংশিক নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান আছে। বাংলা ভাষার প্রথম কমিউনিটি ব্লগ, যেটা ২০০৬ সালের শেষে চালু হয়, যেখানে অনেক লেখকের জন্ম হয়েছে এবং অনলাইনে বাংলা ভাষায় লেখালেখি চর্চায় যে সাইটটির অবদান পথিকৃতের, সেই সাইটটির বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ অত্যন্ত আপত্তিজনক১৫।

    মতপ্রকাশের অন্যান্য উপায়
    এতদিন কেবল চলচ্চিত্র সেন্সরবিধির আওতায় ছিল। কিন্তু আজকাল সাহিত্যচর্চা বা বইপুস্তকের মাধ্যমে মতপ্রকাশের বিষয়টিও পরোক্ষ সেন্সরশিপের মধ্যে পড়ে গেছে। একসময় লেখালেখির কারণে তসলিমা নাসরীনকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, কিন্তু এখন লেখালেখি করে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশ দুই দিক থেকে আক্রান্ত – একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন, আরেকদিকে জঙ্গির চাপাতির ঝিলিক। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই সবচেয়ে আলোচিত (অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য তার প্রকাশক দীপনকেও হত্যা করা হয় এবং আরে প্রকাশক টুটুলকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে আক্রমন করা হয়), কিন্তু একের পর এক যখন ব্লগার খুন হচ্ছিল, তখন খুনিদের গ্রেফতার করতে সরকার কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেয়নি। বরং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে  লিখলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে মধ্যে বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেন১৬। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীও সেই ধারায় বক্তব্য দেন। নিজেকে জাহির করার জন্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বেষমূলক লেখালেখি নিশ্চয়ই দায়িত্ববোধের পরিচয় নয়, কিন্তু সেকারণে কাউকে হত্যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এবং সেই হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করে, ঘটনার শিকার নিহত ব্লগারদের দায়ী করা হলে মূলত হত্যাকারীদেরই উৎসাহিত করা হয়। আস্কারাপ্রাপ্ত বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠী ব্লগারদের পরে, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান পাদ্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রমুখকে একের পর এক হত্যা করতে থাকে। এই ধারাবাহিক জঙ্গি কার্যক্রম থামাতে সরকার লক্ষ্যযোগ্য কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে নি, হোলি আর্টিজেনে মর্মান্তিক হামলার আগ পর্যন্ত। হোলি আর্টিজেনের হামলার পর সরকারের টনক নড়ে এবং তারা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুরু করে। এক পর্যায়ে বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে সরকার জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত নেতা ও কর্মীদের হত্যার মাধ্যমে জঙ্গি কার্যক্রমকে সাময়িকভাবে দমন করে।

    কিন্তু এর মধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নেমে আসে নানান অবাঞ্ছিত পদক্ষেপ। বইমেলা থেকে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০১৫ সালে রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ করে দেয় বাংলা একাডেমি। ২০১৬ সালে ব-দ্বীপ প্রকাশনীকে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেফতার করা হয়। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার, বইমেলার নতুন বই-পুস্তক পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এর চেয়ে হানিকর আর কী হতে পারে! আর এও বড় খেদের বিষয় যে, যে শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হেফাজতে ইসলামের উত্থান, যে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল ‘নাস্তিকদের কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে’১৭, সেই হেফাজতের তালিকা মোতাবেক সরকার পাঠ্যপুস্তক থেকে রচনা সরিয়েছে, হাইকোর্টের সামনে থেকে থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণ করেছে এবং তাদেরই দেয়া ‘কওমী জননী’১৮ উপাধি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। অথচ এই সরকারকেই ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বলেছিল নাস্তিকদের সরকার১৯। ঢাকা দখল করলে এই সরকারই হেফাজতে ইসলামকে নির্মমভাবে শাপলা চত্বর থেকে সরিয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ই মে। যে দল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দল পরিচালিত বর্তমান সরকার একদিকে আচরণে অসহিষ্ণু-ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে ধর্মীয় শক্তির কাছে নতজানু হয়ে পড়েছে। মতপ্রকাশ স্বাধীনতা পরিস্থিতি শোচনীয় হবার জন্য গুরুতর কারণগুলো আমাদের সামনে এভাবে হাজির হয়ে পড়েছে। হোলি আর্টিজেনের ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকেল’ যে সেন্সরবোর্ডে আটকা পড়বে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। তেমনি বিস্ময়কর নয় ৫ই মার্চ, ২০১৯ তারিখে এশিয়ার বৃহত্তম আলোকচিত্র মেলা ‘ছবিমেলা’উপলক্ষ্যে শহিদুল আলমের সঞ্চালনায় বিশ্বখ্যাত প্রতিবাদী লেখক অরুন্ধতী রায়ের জনগণের জন্য উন্মুক্ত বক্তৃতাটি নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে২০।

    আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
    শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপসংহার
    একটি বদ্ধ পরিস্থিতিতে সরাসরি বক্তব্যপ্রদান কঠিন হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি আসলেই অনেকখানি পাল্টে গেছে। নির্বাচনের পরে খুলনা-১ আসনসংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন করায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিবেদন দ্বারা যদি কেউ আক্রান্ত বোধ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে পত্রিকায় একটি প্রতিবাদলিপি পাঠাতে পারেন, পত্রিকা সেটা ছাপবে প্রতিবেদকের ব্যাখ্যাসহ। কিন্তু সেসব চর্চার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি সাংবাদিককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় বোঝা যায়, পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। সাংবাদিক-লেখক-অনলাইন ব্যবহারকারীর জন্য স্বাধীনতার পরিধি খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্যাটায়ার-সাহিত্য কিছুটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় সরকার টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে যদি আরেকটু সহনশীল হয়, ভিন্নমতের জন্য কিছুটা পরিসর ছেড়ে দেয়। সরকারের মনে রাখা উচিত যারা সারাক্ষণ তার প্রশংসা করছে, তাদের মধ্যেই স্তাবকের সংখ্যাই বেশি। আর যারা সমালোচনা করেন, তাদের মধ্যে কিছু বন্ধুও হয়তো আছে। তারা হয়তো সমালোচনার মধ্য দিয়ে তাকে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করছে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সরকারের যথেষ্ট দুর্নাম ইতোমধ্যে জুটেছে, তার অন্যতম একটি কারণ হলো মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা সবাই জানেন ও মানেন। কিন্তু জিডিপিভিত্তিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আজকাল আর কেউ উন্নয়ন বলে না, উন্নয়নের জন্য সঙ্গে চাই সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন এবং অবশ্যই নাগরিকের চিন্তার স্বাধীনতা।

    অন্তঃটীকা

    ১ rsf.org/en/ranking_table| ০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ২ rsf.org/en/detailed-methodology|  ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৩ ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ২৬শে জুলাই ২০১৮ তারিখে গণমাধ্যমকে জানান, ৫৭ ধারা বস্তুতপক্ষে ডেড। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার পরে ৫৭ ধারা নামক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকবে না। সুতরাং এটা নিয়ে টেনশনেরও কোনো কারণ নেই। দেখুন: :www.priyo.com/articles/201807261740|০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৪www.dhakatimes24.com/2017/07/24/41575।০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৫www.prothomalo.com/bangladesh/article/983584।০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৬ www.dw.com/bn/সাংবাদকিরা-চন্তিা-করবনে-না-৩২-ধারা-আপনাদের বিরুদ্ধে নয়/a-42630246। ০২ মার্চ ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৭ bonikbarta.net/bangla/news/2019-01-02/182318/২০১৯-০১-০২/১৮২৩১৮।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৮ www.dw.com/bn/বিজ্ঞাপন-বন্ধেরনির্দেশে-সরকাররে-ইমজে-ক্ষ্ণ্ণু-করার-চেষ্টা/a-18780505। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ৯ বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও টেলিভিশনের ৩২ জন সাংবাদিক ও সম্পাদকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে এক খবরে জানিয়েছে, এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর গণমাধ্যম আইনের কারণে তাঁরা একটি ভয়ের পরিবেশের মধ্যে আছেন। এ জন্য অনেকে ‘স্ব–আরোপিত’নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করছেন। দেখুন, election.prothomalo.com/news/1570056?suggestion=। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১০ www.jugantor.com/national/77480/সাংবাদকিদরে-ওপর-ছাত্রলীগরে-র্ববর-হামলা-আহত-১০। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১১ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ৯ মে, ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সিস্টেম (এসএমএমএস) নামের উন্নত প্রযুক্তি খুব শিগগিরই যুক্ত হচ্ছে এলিট ফোর্স র্যা বের বলয়ে। বিশেষায়িত এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নজরদারির মধ্যে রাখবে ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ইনস্টগ্রামসহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বাদ থাকছে না বিভিন্ন ওয়েবপোর্টালও। প্রযুক্তির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ২০ জন র‌্যাব সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র (কাওসার, ২০১৬)। দেখুন: www.bd-pratidin.com/first-page/2016/05/09/143555। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১২ ২৫ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে দৈনিক সমকাল-এ প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক তথ্য প্রচার প্রতিরোধে উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব। এ লক্ষ্যে আগামী চার মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির দুই হাজার ৫০ জন অভিজ্ঞ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ২৪ ঘণ্টা উল্লিখিত মাধ্যমগুলো নজরদারিতে রাখবেন। তারা রাষ্ট্রবিরোধী গুজব, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তিমূলক পোস্টের জবাব দেবেন। একই সঙ্গে এসব কাজে যারা যুক্ত থাকবেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে র‌্যাবকে সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া এসব মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের সঠিক তথ্য প্রচারেও দায়িত্ব পালন করবেন প্রযুক্তিবিদরা (সাইফুদ্দিন, ২০১৮)। দেখুন: samakal.com/bangladesh/article/18101517।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৩ বিবিসি বাংলা ২০শে ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের এক প্রতিবেদনে বলছে, সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট ফেসবুক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ভুয়া খবর প্রচারের জন্য তারা বাংলাদেশে তাদের প্ল্যাটফর্মে ৬টি একাউন্ট এবং ৯টি পেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফেসবুক বলছে, এগুলোতে ‘বাংলাদেশের সরকারের সমর্থনে বিভিন্ন কনটেন্ট পোস্ট করা হচ্ছিল’, এবং ‘এর সাথে সরকার-সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের সম্পর্ক আছে’। দেখুন: www.bbc.com/bengali/news-46636943। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৪  এসংক্রান্ত আলোচনার জন্য দেখুন (সুলতানা, ২০১৫)।

    ১৫ দেখুন:  www.prothomalo.com/bangladesh/article/1580737। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৬ দেখুন:  www.channelionline.com/ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত-দ-ি২/। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৭www.prothomalo.com/bangladesh/article/196120/নাস্তিকদের-কতল-করা-ওয়াজিব হয়ে গেছে।  ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৮www.banglatribune.com/national/news/382643/এবার-‘কওমি-জননী’-উপাধি পেলেন শেখ হাসিনা। ০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ১৯ www.youtube.com/watch?v=0HKZCkvGOlw।০২ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    ২০ দশম ছবিমেলা উপলক্ষ্যে আমন্ত্রিত অরুন্ধতী রায়ের বক্তৃতাটি ৫ই মার্চ ২০১৯ তারিখে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন কমপ্লেক্স মিলনায়তনে বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। কিন্তু আগের রাতে আয়োজকরা জানতে পারেন, ‘অনিবার্য কারণে’বক্তৃতাটির অনুমতি বাতিল করেছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। আয়োজকরা ওইদিনই বিকল্প ভেন্যু হিসেবে ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে সন্ধ্যা ৬টায় আলোচনার ব্যবস্থা করে ফেলেন। কিন্তু শ্রোতা হিসেবে লেখক অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে জানতে পারেন এখানেও অনুষ্ঠানটি করতে নিষেধ করেছে পুলিশ। এক পর্যায়ে অনুমতি মেলে এবং সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় বক্তৃতা শুরু হয়। উল্লেখ্য অরুন্ধতি রায় শহিদুল আলমের মুক্তির জন্যও কলম ধরেছিলেন। দেখুন www.prothomalo.com/bangladesh/article/1581975। ০৭ মার্চ, ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    তথ্যসূত্র

    ড্যানেসি, মার্সেল (২০০৯)। ডিকশনারি অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স। নিউ ইয়র্ক: এম. ই. শার্প ইনক.।

    ক্যাস্টেলস, ম্যানুয়েল (২০০৭)। কমিউনিকেশন, পাওয়ার অ্যান্ড কাউন্টার-পাওয়ার ইন দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কমিউনিকেশন ১।

    ক্যাস্টেলস, ম্যানুয়েল (২০০৫)। দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি: ফ্রম নলেজ টু পলিসি। ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলস ও গুস্তাভো কারদোসো (সম্পা.), দ্য নেটওয়ার্ক সোসাইটি: ফ্রম নলেজ টু পলিসি। ওয়াশিংটন ডিসি: জন হপকিনস সেন্টার ফর ট্রানস্যাটল্যান্টিক রিলেশনস।

    শেকটার, ড্যানি (১৯৯৮)। দ্য মোর ইউ সি দ্য লেস ইউ নো: নিউজ ওয়ারস। নিউ ইয়র্ক: সেভেন স্টোরিস প্রেস।

    হক, ফাহমিদুল (২০১১)। অসম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যমবিষয়ক প্রতিভাবনা। ঢাকা: সংহতি।

    নিউটন, সেলিম রেজা (২০১৩)। বাজারের যুগে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আম্মু-আব্বু সমাচার অথবা বাংলাদেশে বিদ্যমান মহাজনি মুদ্রণের পলিটিাল ইকোনমি। ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন (সম্পা.), মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি। ঢাকা: আগামী।

    সুলতান, টিপু (২০১৯)। মতপ্রকাশে বাধা আইন, ভয় ও চাপ। প্রথম আলো। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।

    সুলতানা, আইরিন (২০১৫)। সাইবার সন্ত্রাস ও ‘সিপি গ্যাং’সমাচার। opinion.bdnews24.com/bangla/archives/28999|০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে সংগৃহীত।

    আসাদুজ্জামান (২০১৬)। সাইবার অপরাধের মামলা হু হু করে বাড়ছে। | www.prothomalo.com/bangladesh/article/983584//

    প্রথম প্রকাশ: অগ্রায়ন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রকাশনা), এপ্রিল ২০১৯, ঢাকা।

  • স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    অনুবাদকের ভূমিকা

    হাওয়ার্ড জিন প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী। প্রায় বিশের অধিক বই-পুস্তক লিখেছেন, পাশাপাশি নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আলাপ-আলোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ও প্রভাবশালী A People’s History of the United States গ্রন্থ সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানেন, সিনেমা থেকে শুরু করে বিদ্বৎসমাজ সবখানেই এই গ্রন্থ বহুরূপে উল্লেখিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন এয়ারফোর্সে যোগদান করেছিলেন, এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সাধারণ জনগণের ত্যাগ-তিতীক্ষাকে ব্যবহার করে গুটিকয়েক ফায়দা হাসিল করেন। আজীবন বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গিয়েছেন।

    হাওয়ার্ড জিন এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল Counter Punch এ ২০০৮, ১২ মে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জিগা ভদোভনিক।  তিনি স্লোভেনিয়ার University of Ljubljana এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক; কাজ করেন আমেরিকার সামাজিক আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব ও সমসাময়িক রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে।

    জিগা ভদোভনিকের সাথে কথোপকথনে হাওয়ার্ড জিন নিজেকে অ্যানার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী হিসেবে অভিহিত করেই কথা বলা শুরু করেন। তারপর কথা বলেছেন নৈরাজ্যবাদী বিভিন্ন ধারণা, মানুষের স্বাধীনতা, সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব, নির্বাচনী ও ভোটের রাজনীতি বনাম সামাজিক আন্দোলন, কর্তৃত্বপরায়ন আন্দোলন বনাম মুক্তিমুখীন আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদের ইতিহাস, উপায় ও উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে।

    বর্তমানে anarchism এর ভাষান্তর ‘নৈরাজ্যবাদ’ না করে অরাজ/ অরাজপন্থা ইত্যাদিও করা হয়, বা অনেকেই ‘অ্যানার্কিজম’ই রেখে দেন, কেননা প্রচলিত অর্থে ‘নৈরাজ্য’ শব্দ নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয় (যেমন, বিশৃঙ্খলা)। এই সাক্ষৎকারে হাওয়ার্ড জিন অ্যানার্কি শব্দকে chaos বা বিশৃঙ্খলা অর্থে ব্যবহার করার রাজনীতি নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাই, অ্যানার্কিজমের বাংলা রূপান্তর হিসেবে নৈরাজ্যবাদই রাখা হয়েছে।

    হাওয়ার্ড জিন

    ১৯৮০’র দশক থেকে আমরা দেখছি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াটি দিনে দিনে শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক বামপন্থীরা এখন একটা ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বে’র মধ্যে পড়ে গিয়েছেন: বিদেশি ও বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরির লক্ষ্যে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের হাতের শক্তি বাড়াতে কাজ করবেন, নাকি বিদ্যমান বিশ্বায়নের একধরনের অ–জাতীয় বিকল্পের দিকে ঝুঁকবেন, যা সমানভাবে বৈশ্বিক। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

    আমি একজন নৈরাজ্যবাদী, এবং নৈরাজ্যবাদী নীতি অনুসারে জাতিরাষ্ট্র সত্যিকারের মানবিক বিশ্বায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক অর্থে বিশ্বায়নের দিকে এই আন্দোলন, যেখানে পুঁজিবাদীরা জাতিরাষ্ট্রের সীমানা ডিঙানোর চেষ্টা করছেন, সেখানে আন্দোলনের জন্য জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করার একধরনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; যা বৈশ্বিক পুঁজির বিরুদ্ধে মানুষকে একত্রে নিয়ে আসতে পারে, বিশ্বায়নের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে জনগণের বিশ্বায়ন সৃষ্টি করতে পারে। অন্য ভাবে বললে, বিশ্বায়নকে এমন ভাবে ব্যবহার করা (বিশ্বায়ন ধারণার সাথে কিন্তু কোনো ঝামেলা নেই) যেন, এটি জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করবে এবং অবশ্যই দুনিয়ার মানুষ সম্পর্কে যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তাতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

    পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ একদা লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতাই হলো জননী, হুকুমের সন্তান নয়’। জাতিরাষ্ট্রের পরে বা বাইরে জীবনকে আপনি কোন জায়গায় দেখেন?

    জাতিরাষ্ট্রের বাইরে? (হাসি) আমি মনে করি, জাতিরাষ্ট্রের বাইরে যা আছে সেটা হচ্ছে জাতীয় সীমানা ব্যতীত এক জগত, কিন্তু সংগঠিত জনসাধারণ নিয়েই। কিন্তু জাতি হিসেবে সংগঠিত না হয়ে বরঞ্চ দল হিসেবে, সমষ্টি হিসেবে জনসাধারণ সংগঠিত হবে; জাতীয় বা এই ধরনের কোনো সীমানা ছাড়াই। কোনো ধরনেরই সীমানা, পাসপোর্ট, ভিসা থাকবে না। এসবের একটাও না। বিভিন্ন আকারের সমষ্টি যৌথ বা সমবেত কাজের উপর ভিত্তি করে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোট ছোট গোষ্ঠী খুঁজে পাবেন না, কারণ তাদের কাছে কাছে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসপাতি থাকবে। এটা এমন কিছু যা নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব এখনো তৈরি করেনি, এবং হয়তোবা আগাম করা সম্ভবও না, কারণ চর্চার মাধ্যমেই একে কার্যে পরিণত করতে হবে।

    পিয়েরে যোসেফ প্রুধোঁ

    আপনি কি মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক পার্টি রাজনীতির মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব? নাকি অসহযোগ আন্দোলন, সমান্তরাল কাঠামো তৈরি, বিকল্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির মতো বিকল্প মাধ্যমেই কেবল করতে হবে? 

    আপনি যদি বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করেন আপনি দূষিত হবেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবেশকে বিষাক্ত করে, এমনকি প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকেও। আপনি দেখবেন আমেরিকাতেও, ‘বাম’ধারার লোকেরা নির্বাচনী প্রচারণায় ধরা পড়েছেন এবং কোন তৃতীয় শক্তিকে সমর্থন দেয়া যায় তা নিয়ে যুক্তি-তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। এটা খুব ছোট একটা নমুনা যে, আপনি যদি নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ করতে শুরু করেন তাহলে আপনি আপনার আদর্শকে দূষিত করা শুরু করেছেন। সুতরাং আমি মনে করি, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, ভোট, নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ না করে, কর্মস্থলে, পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আন্দোলন ও সমষ্টি গড়ার চিন্তা করতে হবে, যেন এগুলোই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণের মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে: প্রথমত, কর্তৃত্ব তাদের সাথে যা করছে তা প্রতিরোধ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা এবং দ্বিতীয়ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা।

    একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। আপনি কি নির্বাচনে যান? ভোট দেন?

    যাই, কখনো সখনো, সবসময় না। এটা নির্ভর করে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে কখনো কখনো এক প্রার্থীর বদলে আরেক প্রার্থীকে পাওয়া হয়তো জুতসই, যদিও আপনি মানেন এটাই সমাধান নয়। কখনো কখনো কম মন্দটিও তত কম মন্দ হয় না, তাই আপনি এটা উপেক্ষা করতে চান, এবং হয় আপনি ভোট দিবেন আর না হয় পার্টি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে আপনি তৃতীয় পার্টিকে ভোট দিবেন। কখনো কখনো দুই প্রার্থীর মধ্যকার পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ এবং যিনি একটু ভালো, একটু কম বিপজ্জনক তাকে দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টাটাও বোধগম্য। কিন্তু কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না যে কে পদের দায়িত্ব নিচ্ছেন এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়, বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কোন ধরনের সামাজিক আন্দোলন রয়েছে। কারণ আমরা ঐতিহাসিকভাবে দেখেছি, যদি আপনার কোনো শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে তাহলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটা অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। দায়িত্বে যেই থাকুক না কেন, রিপাবলিক বা ডেমোক্রেট যেই হোক না কেন, যদি আপনার শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে, তাহলে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে সমর্পণ করতেই হবে, কোনো না কোনোভাবে সামাজিক আন্দোলনের শক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেই হবে।

    ষাটের দশকে আমরা এটি দেখেছি, রিচার্ড নিক্সন মোটেও কম শয়তান ছিলেন না, বরঞ্চ তিনি অধিকতর শয়তান ছিলেন। কিন্তু তার আমলেই অবশেষে যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল, কারণ তাকে যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলনের শক্তি মোকাবিলার পাশাপাশি ভিয়েতনামি আন্দোলনের শক্তিকেও মোকাবিলা করতে হয়েছিল। আমি ভোট দেব, কিন্তু সর্বদা এই সতর্কতার সাথে যে ভোটদান চূড়ান্ত নয়, এবং সংগঠিত করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    যখন কেউ ভোটদানের বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, তারা জিজ্ঞেস করে আপনি কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিবেন? একে নাকি ওকে? আমি বলি: ‘আমি যখন বুথে ভোট দেব কেবল তখনই মাত্র এক মিনিটের জন্য কোনো এক প্রার্থীকে সমর্থন করব, কেবল সেই মুহূর্তে আমি ক বনাম খ-কে সমর্থন দেব। কিন্তু ভোটিং বুথে যাওয়ার পূর্বে এবং বুথ থেকে বের হওয়ার পরও আমি আসলে মনোযোগ দেব মানুষকে সংগঠিত করার দিকে এবং কোনো নির্বাচনী প্রচারণা সংগঠনের দিকে নয়।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    এই ক্ষেত্রে নৈরাজ্যবাদ যথাযথভাবেই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বিরোধিতা করছে, কারণ এটাও একধরনের স্বৈরশাসনের রূপ—সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের এই ধারণাতে আপত্তি জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সবসময় নৈতিকভাবে সহি মতের সাথে মিলে না। থোরিও একদা বলেছিলেন, বিবেকের হুকুমে কাজ করার প্রতি আমাদের একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমনকি সেটা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বা সমাজের আইনকানুনের বিরুদ্ধেও যায়। আপনি কি এর সাথে একমত?

    একদম। রুশো একবার বলেছিলেন, যদি আমি একশ জনের দলে একাও হয়ে থাকি, বাকি ৯৯ জন কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার রাখে? না। সংখ্যাগরিষ্ঠরাও ভুল করতে পারেন, তারা সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করতে পারেন। যদি সংখ্যাগুরুরাই শাসন করতো তবে এখনো দাসপ্রথা বহাল থাকত। জনসংখ্যার ৮০% একদা ক্রীতদাস বানিয়েছিল ২০% লোককে। সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়মানুযায়ী এটা ঠিক ছিল। এটা আসলে গণতন্ত্রের খুব ত্রুটিযুক্ত ধারণা। গণতন্ত্রকে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে— জনগণের আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তা; কেবল সংখ্যাগুরুদের চাহিদাই নয়, সংখ্যালঘুদের চাহিদাকেও আমলে নিতে হবে। এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, যে সমাজে মিডিয়া জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত বা অশুভ হতে পারে। সুতরাং হ্যাঁ, জনগণকে বিবেক অনুসারেই কাজ করতে হবে, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট দিয়ে নয়।

    যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের ঐতিহাসিক উৎস কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

    নৈরাজ্যবাদ নিয়ে কাজ করার একটা মুশকিল হচ্ছে এখানে আপনি অনেক লোক পাবেন যাদের ধারণাগুলো নৈরাজ্যবাদী, কিন্তু নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেন না। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে প্রুধোঁ এটা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেন, কিন্তু তার পূর্বে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বহু নৈরাজ্যবাদী ধারণা চালু ছিল।উদাহরণস্বরূপ থমাস পেইনের কিছু ধারণার কথা বলা যায়, তিনি নৈরাজ্যবাদী ছিলেন না, নিজেকে এই নামে অভিহিতও করতেন না, কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। আরো আছেন হেনরি ডেভিড থোরিও। তিনি নৈরাজ্যবাদ শব্দটাও জানতেন না এবং শব্দটা কখনো ব্যবহারও করেন নি। কিন্তু তার চিন্তা নৈরাজ্যবাদের খুব কাছাকাছি। তিনি যে কোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। যদি আমরা যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের  উৎস সন্ধান করি, তাহলে সম্ভবত থোরিও প্রথম আমেরিকান নৈরাজ্যবাদী হওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন। সিভিল ওয়ার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসলে নৈরাজ্যবাদের সাথে আপনার মোলাকাত হয়নি, যখন ইউরোপীয় নৈরাজ্যবাদী, বিশেষত জার্মান নৈরাজ্যবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করেন। তারাই আসলে সংগঠিত করা শুরু করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদ প্রথমবারের মতো সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং সর্বজনীন পরিচিত লাভ করেছিল শিকাগোতে, হেমার্কেট ঘটনার সময়ে।

    যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক নৈরাজ্যবাদের মূল অনুপ্রেরণা আপনি কোথায় দেখেন? ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম সম্পর্কে আপনার মতামত কি? মানে, এই ক্ষেত্রে হেনরি ডি থোরিও, রালফ ডব্লিউ এমারসন, ওয়াল্ট হুইটম্যান, মার্গারেট ফুলারদেরকে অনুপ্রেরণা হিসেবে?

    আচ্ছা, ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজমকে আমরা বলতে পারি নৈরাজ্যবাদের একেবারে গোড়ার দিকের এক রূপ। তারাও নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেননি, কিন্তু তাদের চিন্তা ও সাহিত্যে নৈরাজ্যবাদী ধ্যানধারণা ছিল। হারমেন মেলভিলে বিভিন্ন ভাবে এমন কিছু নৈরাজ্যবাদী ধারণা প্রকাশ করে। তারা সকলেই কর্তৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আমরা বলতে পারি যে, কর্তৃত্ব ও সরকারব্যবস্থার প্রতি একধরনের সন্দেহের পরিবেশ তৈরিতে ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম একটা ভূমিকা রেখেছিল।

    দুর্ভাগ্যক্রমে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে কোনো প্রকৃত সংগঠিত নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন নেই। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দল বা গোষ্ঠী রয়েছে যারা নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করে, কিন্তু এগুলো ক্ষুদ্র। আমার মনে আছে ১৯৬০’র দশকে এখানে বোস্টনে একটা নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী ছিল যারা সংখ্যায় প্রায় পনের জনের মতো, কিন্তু তারা তখন বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ষাটের দশকের অন্যান্য আন্দোলনের সাথে মিলে ষাটের দশকে নৈরাজ্যবাদ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

    এনার্কিস্ট পোস্টার

    আজকাল র‌্যাডিকাল রাজনীতির বেশিরভাগ সৃজনশীল শক্তি নৈরাজ্যবাদ থেকে উঠে আসছে, কিন্তু এই আন্দোলনে জড়িত খুব কম লোকই নিজেকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করেন। আপনার মতে এর মূল কারণ কি? রাজনৈতিক কর্মীরা (অ্যাক্টিভিস্ট) কি এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে চিহ্নিত করতে লজ্জা পাচ্ছেন? নাকি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, সত্যিকারের মুক্তির জন্য যে কোনো ধরনের লেবেল থেকেও মুক্তি প্রয়োজন?

    নৈরাজ্যবাদ শব্দটি এমন দুটো প্রপঞ্চের সাথে জড়িয়ে পড়েছে যেগুলোর সাথে প্রকৃত নৈরাজ্যবাদীরা যুক্ত হতে চান না। একটা হচ্ছে সহিংসতা এবং অন্যটা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। নৈরাজ্যবাদের জনপ্রিয় ধারণাগুলোর একদিকে রয়েছে বোমা-নিক্ষেপ ও সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যদিকে রয়েছে কোনো বিধি-বিধান, শৃঙ্খলার অভাব, যা ইচ্ছা তাই করতে পারা, বিভ্রান্তি ইত্যাদি। এই কারণে এই শব্দ ব্যবহারে একরকম অনিচ্ছা আছে। কিন্তু ১৯৬০ এর দশকের আন্দোলনগুলো যেভাবে ভাবতে শুরু করেছিল তাতে নৈরাজ্যবাদের প্রকৃত ধারণা মিশে গিয়েছে।

    আমার মনে হয় এর সর্বোত্তম প্রকাশটি ঘটেছিল সম্ভবত এসএনসিসি (Student Nonviolent Coordinating Committee) এর সাথে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে। এসএনসিসি দর্শন হিসেবে নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে না জেনেই এর বৈশিষ্ট্যগুলোকে মূর্ত করে তুলেছিল। তারা বিকেন্দ্রীভূত ছিল। অন্যান্য নাগরিক অধিকারের সংগঠনগুলো, যেমন সেভেন খ্রিষ্টান লিডারশিপ কনফারেন্স, একজন নেতা (মার্টিন লুথার কিং) সমেত কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। এনএএসিপি (National Association for the Advancement of Colored People) নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক একধরনের কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। অপরদিকে, এসএনসিসি ছিল পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত। তাদের ফিল্ড সেক্রেটারি ছিল, যারা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ছোট শহরে স্বায়ত্তশাসনের সহিত কাজ করত। জর্জিয়ার আটলান্টায় তাদের একটা অফিস ছিল, কিন্তু অফিসের কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব ছিল না। আলবামা, জর্জিয়া, লুসিয়ানা এবং মিসিসিপির বিভিন্ন মাঠে যারা কাজ করতেন তারা নিজেদের ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। তারা স্থানীয় ও তৃণমূল জনগণের সাথে কাজ করতেন। এবং তাই এসএনসিসির কোনো এক নেতা ছিল না, এবং সরকারের প্রতি সন্দিহান ছিল।

    তারা সাহায্য-সমর্থনের জন্য সরকারের উপর নির্ভর করতো না, যদিও ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকে সরকারকে প্রগতিশীল লিবারেল বলে ভাবা হতো। বিশেষ করে জন এফ কেনেডিকে। কিন্তু তারা তার আচরণ প্রত্যক্ষ করেছিল। কেনেডি কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকারের জন্য দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠা আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করেননি। যারা পৃথকীকরণে বিশ্বাস করে (segregationists) এমন বিচারকদের তিনি দক্ষিণে পাঠানো শুরু করলেন এবং তাদেরকে যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি দিলেন। সুতরাং এসএনসিসি ছিল বিকেন্দ্রীভূত, সরকার-বিরোধী, নেতৃত্বহীন। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতো ভবিষ্যতের সমাজ নিয়ে তাদের কোনো ভিশন ছিল না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ছিল না, ভবিষ্যতে আমাদের কি ধরনের সমাজ হবে তা নিয়ে তাদের কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। তারা আসলেই জাতিগত পৃথকীকরণের তাৎক্ষণিক সমস্যায় মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু তাদের মনোভঙ্গি, তার যেভাবে কাজ করছিল, যেভাবে সংগঠিত হচ্ছিল তা বলা যায় নৈরাজ্যবাদী ধারায় ছিল।

    আপনার কি মনে হয় যে, মানুষ মুক্ত হতে পারবে ধারণাটি ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর হওয়ার কারণেই নৈরাজ্যবাদ শব্দের নিন্দাসূচক (অপ)ব্যবহার করা হয়? 

    কোনো সন্দেহ নেই। নিঃসন্দেহে, নৈরাজ্যবাদী ধারণা ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর। ক্ষমতাসীনেরা লিবারেল ধারণাগুলোকে সহ্য করতে পারেন। যে ধারণাগুলো সংস্কারের ডাক দেয় সেগুলোকে তারা সহ্য করতে পারেন, কিন্তু কোনো রাষ্ট্র থাকবে না, কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব থাকবে না— এমন ধারণা তারা সহ্য করতে পারেন না। সুতরাং নৈরাজ্যবাদের ধারণাটিকে বিদ্রূপ করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেন সহিংস ও বিশৃঙ্খলা হিসেবে নৈরাজ্যবাদের একটা ছাপ তৈরি হয়। হ্যাঁ, তাদের জন্য এটা দরকারি।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    তত্ত্বীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আমরা বিশ্লেষণাত্মকভাবে অ্যানার্কিজমের দুটো ধারণা শনাক্ত করতে পারি, একদিকে ইউরোপের মধ্যে তথাকথিত যৌথতাবাদী নৈরাজ্যবাদ (collectivist anarchism), এবং অন্যদিকে আমেরিকার মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদ (individualist anarchism)। বিশ্লেষণাত্মক এমন পৃথকীকরণের সাথে আপনি কি একমত?    

    আমার কাছে এটি একটি কৃত্রিম পৃথকীকরণ। বিশ্লেষকরা প্রায়শই বিষয়গুলো নিজেদের জন্য সহজ করে তুলতে বিভিন্ন বর্গ তৈরি করেন এবং আন্দোলনগুলোকে সেই বর্গে পছন্দসই বসিয়ে দেন। কিন্তু আমি মনে করিনা আপনি এটি করতে পারেন। এখানে যুক্তরাষ্ট্রে নিশ্চয়ই অনেকেই আছেন যারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদে বিশ্বাস করেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেই আবার ১৮৮০ সালে শিকাগো অথবা এসএনসিসিতে সংগঠিত নৈরাজ্যবাদীদের পাওয়া যায়। আমার মনে হয় উভয় নজিরই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাবেন, তবে ইউরোপে অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ধারণাটা আমেরিকার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যদিও, যুক্তরাষ্ট্রে আপনার কাছে আইডব্লিউডব্লিউ (IWW) এর মতো অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিস্ট সংগঠন এবং নিশ্চিতভাবেই এটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদের সাথে মিলে না।

    বিপ্লব বনাম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন— উপায়ের এই ‘উভয়সঙ্কট’ বিষয়ে আপনি কি অভিমত? 

    আমি মনে করি এখানে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার বিষয়, এবং এখানে নৈরাজ্যবাদীরাই দ্বিমত পোষণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আপনি মতবিরোধটি খুঁজে পাবেন, এবং আপনি একক ব্যক্তির মধ্যেই এই মতবিরোধটি পেতে পারেন। আপনি বলতে পারেন এমা গোল্ডম্যান, তার মৃত্যুর পর, ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদকে সামনে নিয়ে আসেন। তখন তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। কিন্তু এমা গোল্ডম্যান হেনরি ক্লে ফ্রিকের হত্যার পক্ষে ছিলেন, আবার তিনিই পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এটা ঠিক পথ নয়। তার বন্ধু ও কমরেড অ্যালেক্সান্ডার বার্কম্যান সহিংসতার ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি। অন্যদিকে আপনি টলস্টয় এবং এমনকি গান্ধীরও মতো অ্যানার্কিস্ট পাবেন যারা অহিংসতায় বিশ্বাস করতেন।

    উপায়ের বিষয়ে নৈরাজ্যবাদের একটি কেন্দ্রীয় নীতি আছে, এবং সেই নীতি হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামের (ডিরেক্ট একশন) নীতি— প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারব্যবস্থা, ভোটদান, আইন প্রণয়নের মতন সমাজ কর্তৃক প্রস্তাবিত রূপগুলোর মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ। ট্রেড ইউনিয়ন, অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ক্ষেত্রে এর অর্থটা কেবল শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়াই নয়, বরঞ্চ তারা যে কারখানায় কাজ করেন সেগুলো দখল করা এবং পরিচালনা করা। প্রত্যক্ষ সংগ্রামটা কি? দক্ষিণে যখন কৃষ্ণাঙ্গরা জাতিগত পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিল, তারা তখন সরকারের সংকেতের জন্য অপেক্ষা করেনি, আদালতের মাধ্যমে যায়নি, মামলা দায়ের করেনি, কংগ্রেসে আইন পাস করার অপেক্ষা করেনি। তারা সরাসরি একশনে চলে গিয়েছিল, তারা রেস্টুরেন্টে গিয়েছে, বসে পড়েছে এবং নড়েনি। তারা বাসে উঠে পড়েছে এবং যে পরিস্থিতিকে হাজির করতে চায় সেটাই বাস্তবায়ন করেছে।

    অবশ্য, ধর্মঘট-হরতাল সর্বদাই একধরনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। ধর্মঘটের মাধ্যমে আপনি কেবল আইন পাস করে বিষয়গুলো সহজ করার জন্য সরকারকে বলছেন না, বরঞ্চ আপনি মালিকের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামেই নেমেছেন। আমি বলব, উপায় বিষয়ে যতদূর যাওয়া হোক না কেন, আপনি যে অশুভ শক্তিকে সরাতে চান তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ধারণাই নৈরাজ্যবাদী চিন্তা ও আন্দোলনের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমি এখনও মনে করি, নৈরাজ্যবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে, আপনি উপায় ও উদ্দেশ্যকে পৃথক করতে পারবেন না। যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে সমতাবাদী (egalitarian) সমাজ, তাহলে আপনাকে সমতাবাদী উপায় ব্যবহার করতে হবে, আপনার যদি উদ্দেশ্য হয় যুদ্ধবিহীন অহিংস সমাজ, তাহলে সেটা আপনি কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে হাসিল করতে পারবেন না। আমি মনে করি নৈরাজ্যবাদের চাওয়া হচ্ছে উপায় ও উদ্দেশ্যকে সামঞ্জস্য রেখে চলা। আমি মনে করি এটা আসলে নৈরাজ্যবাদের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

    নোয়াম চমস্কিকে তার নৈরাজ্যবাদী সমাজের ভিশনের ব্যাপারে এবং সেখানে পৌঁছানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি যদি এগুলো নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা না করেন তাহলে কোন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে তার সুরাহা করতে পারবেন না’। আপনার কি এমন মনে হয় যে, অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা চর্চার ক্ষেত্রে ‘পরীক্ষা–নিরীক্ষা’ শুরু করতেই সহি উপায় ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে প্রচুর শক্তি হারাচ্ছেন?

    আমি মনে করি নমনীয়তা বজায় রেখে বিভিন্ন আইডিয়া বা ধারণা পেশ করা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন উদারহরণস্বরূপ মাইকেল অ্যালবার্টের ParEcon (Participatory economics, often abbreviated ParEcon) কথা বলা যায়। আমরা ভবিষ্যৎ সমাজের ব্লুপ্রিন্ট এখন তৈরি করতে পারবো না, কিন্তু আমি মনে করি এটা নিয়ে চিন্তা করা ভালো। মনের মধ্যে একটা লক্ষ্য রাখা ভালো। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তা করাটা গঠনমূলক, সহায়ক এবং স্বাস্থ্যকর, কারণ তখন আপনি আজকে যা করছেন তা খানিকটা পথপ্রদর্শন করবে, কিন্তু সেটা কেবল ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ভবিষ্যতের দিকে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। অন্যথায়, আপনি এই ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা বনাম ঐ ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্কেই সময় খোয়াবেন, এবং এই সময়ে সেটার কাছাকাছি যাওয়ার মতো কাজও করছেন না।

    সূত্র: অ্যানার্কিস্ট আর্ট এন্ড প্রপাগান্ডা

    Peoples History of United States গ্রন্থে আপনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের স্বাধীনতা, অধীকার, পরিবেশগত মান ইত্যাদি গুটিকয়েক ধনী ও প্রভাবশালীরা কখনো দিয়ে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বদা লড়াই করেই সেটা আদায় করেছে। এই ক্ষেত্রে আরেকটি ভালো দুনিয়ার দিকে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিৎ?

    আমি মনে করি আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নিজেদের সংগঠিত করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা— যুদ্ধের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক ও যৌন শোষণের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ইত্যাদি। কিন্তু এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন উপায়ের সাথে উদ্দেশ্যের সামঞ্জস্য থাকে, এবং এমন এক মানবিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন সে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ সমাজে বিদ্যমান থাকতে পারে। এর মানে হলো কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছাড়াই এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন তা ভবিষ্যতের সমতাবাদী সমাজের আদর্শের একটি ছোটখাটো চিত্র হাজির করে। ফলে, আপনি যদি আগামীকাল অথবা পরের বছর যদি কিছু নাও জিতেন, তবু এর মাঝেই কিন্তু আপনি একটা মডেল দাড় করিয়ে ফেলেছেন। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হওয়া উচিৎ তা আপনি বের করে ফেলেছেন এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না করতে পারলেও আপনি একটা তাৎক্ষনিক পরিতৃপ্তি তৈরি করে ফেলেছেন।

    মানুষের ‘স্বাধীনতার প্রবৃত্তি’ রয়েছে, কেবল ইচ্ছাই নয় জৈবিক প্রয়োজনও আছে, বাকুনিনের এই অন্টোলজিক্যাল অনুমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?

    আমি আসলে এই ধারণায় বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি মনে করি এর স্বপক্ষে আপনি বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক প্রমাণ পাবেন না। স্বাধীনতার জন্য কি আপনাকে জিন খুঁজে পেতে হবে? না। আমি মনে করি আরেকটা উপায় হচ্ছে মানব আচরণের ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া। মানব আচরণের ইতিহাস স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষাই প্রমাণ করে। ইতিহাস এটা প্রমাণ করে যে, জনগণ যখনই স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করেছে, এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।