Category: তত্ত্ব

  • মার্ক সীম।। অ্যান্টি ইডিপাস : ফ্যাসিবাদ ও সিজো-বিশ্লেষণ

    মার্ক সীম।। অ্যান্টি ইডিপাস : ফ্যাসিবাদ ও সিজো-বিশ্লেষণ

    অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [ ভূমিকা: জিল দেল্যুজ ও ফেলিক্স গুয়াত্তারির  অ্যান্টি-ইডিপাস বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক গ্রন্থ। পুঁজিবাদ, মনঃসমীক্ষণ, আকাঙ্ক্ষা, পরিবার, রাষ্ট্র, বিপ্লব এবং ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে এই গ্রন্থ এমন এক চিন্তার পরিসর তৈরি করে, যেখানে আকাঙ্ক্ষাকে আর ব্যক্তির অভাব, দমন কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ কোনো মানসিক প্রবণতা হিসেবে দেখা যায় না। আকাঙ্ক্ষা এখানে উৎপাদনশীল, সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। এই কারণেই অ্যান্টি-ইডিপাস কেবল মনঃসমীক্ষণের সমালোচনা নয়; এটি একই সঙ্গে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব।

    কিন্তু অ্যান্টি-ইডিপাস এমন একটি বই, যার ধারণা ও ভাষার জটিলতায় পাঠক খুব সহজেই এর ভেতরে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। ‘ইডিপাস’, ‘সিজোফ্রেনিয়া’, ‘আকাঙ্ক্ষা’, ‘উৎপাদন’, ‘দেহ’, ‘যন্ত্র’, ‘ক্ষেত্রসীমা’ ‘বিধি’ প্রভৃতির মতো ধারণা দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তায় প্রচলিত অর্থ থেকে সরে গিয়ে নতুন অর্থ ও সম্পর্ক তৈরি করে। ফলে বইটিতে প্রবেশে এমন একটি পাঠ প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে এর দার্শনিক প্রকল্প, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং এর ভাষার অন্তর্নিহিত গতি সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করে।

    মার্ক সীম অ্যান্টি ইডিপাসের অন্যতম ইংরেজি অনুবাদক এবং ভূমিকার রচয়িতা।  সীমের ভূমিকা শুধু গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর পরিচয় দেয় না; বরং দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তার কেন্দ্রে থাকা আকাঙ্ক্ষা, অহম, সিজোফ্রেনিয়া, বিপ্লব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক দমনের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি বিশেষ পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উন্মোচন করে। সীমের পাঠে অ্যান্টি-ইডিপাস নিছক একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ হিসেবে উপস্থিত হয় না। এটি হয়ে ওঠে প্রচলিত ব্যক্তিসত্তা, পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে চিন্তা করার একটি আহ্বান।

    বিশেষত সীমের লেখায় যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো ‘অহম’কে কেন্দ্র করে নির্মিত আধুনিক ব্যক্তিসত্তার সমালোচনা। মানুষকে একটি বিচ্ছিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজের ভেতরে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে বোঝার পরিবর্তে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি তাকে অসংখ্য সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক শক্তি ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সত্তা হিসেবে দেখতে চান। সীম এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পাঠককে নিয়ে যান। ফলে তাঁর ভূমিকা অ্যান্টি-ইডিপাস বোঝার জন্য কেবল একটি সহায়ক লেখা নয়, বরং গ্রন্থটির রাজনৈতিক ও দার্শনিক অভিঘাত উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

    মার্ক  সীমের ভূমিকাটি প্রবাহমান শিরোনাম অনুবাদকের প্রস্তাবনা। এর অনুবাদ সম্পাদনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেয়া হয়েছে। বিশেষত সরল বাক্য গঠন এবং পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রে। তবু জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা এড়ানো যায়নি। পরবর্তী সংস্করণে তার প্রয়াস থাকবে ] 

    দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি

    “আমাদের অবশ্যই অহমরূপে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আবার জন্ম নিতে হবে সমষ্টির মধ্যে। বিচ্ছিন্ন ও আত্মমোহে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র অথচ সংযুক্ত সত্তা হয়ে”

    — হেনরি মিলার,, সেক্সাস (more…)

  • অনেকান্তবাদ : ধারণা, সমকালীনতা ও প্রত্নতত্ত্বীয় প্রাসঙ্গিকতা

    অনেকান্তবাদ : ধারণা, সমকালীনতা ও প্রত্নতত্ত্বীয় প্রাসঙ্গিকতা

    স্বাধীন সেন

    পাঠ ও তথ্যসূত্র ব্যবহারের পদ্ধতি

    এই পর্যালোচনায় তিন ধরনের বক্তব্য পৃথক রাখা হয়েছে।

    প্রথমত, প্রাচীন জৈন সূত্র, গাথা, শ্লোক বা ভাষ্যে প্রত্যক্ষভাবে পাওয়া বক্তব্যকে প্রাথমিক পাঠভিত্তিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক বা সমকালীন গবেষকের নিজস্ব ব্যাখ্যাকে সংশ্লিষ্ট গবেষকের ভাষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, প্রাচীন পাঠ ও আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত কোনো শ্রেণিবিন্যাস, তুলনা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ বা সমকালীন বিশ্লেষণকে “এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ” অথবা “প্রয়োগভিত্তিক বিশ্লেষণ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি বিশ্লেষণী প্রস্তাবের সঙ্গে তার ভিত্তিস্বরূপ রেফারেন্স যুক্ত করা হয়েছে। লেখাটি গুঢ় তত্ত্বালোচনা নির্ভর নয়। বরং প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চিন্তা, ও নৈমিত্তিক জীবনে অনেকান্তবাদের যাপন কেমন হতে পারে সেসম্পর্কে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে এই লেখায়। (more…)

  • টেরি ইগলটন।। ফ্যাসিবাদ কী?

    টেরি ইগলটন।। ফ্যাসিবাদ কী?

    অনুবাদ: জাকির হোসেন

    মাত্র কয়েকবছর আগেও উল্লিখিত শিরোনামধারী কোনো প্রবন্ধকে মনে হতো স্রেফ ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকে লেখা কিংবা সম্ভবত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বা রোজা লুক্সেমবার্গের সামাজ্যব্যাদ সংক্রান্ত কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়াস। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আজ আর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয় বা তেমনটা কখনো ছিলও না। বৈশ্বিকভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সংকট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে অগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে ফ্যাসিবাদ আরো একবার সত্যিকারের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং তার মূলোৎপাটনের জন্য যে রাজনৈতিক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে তার জন্যে এর মৌলিক কাঠামোগুলোর বিষয়ে একধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে কাজটি খুব একটা সহজ হবে না। তার মধ্যে একটি হলো ফ্যাসিবাদ, একটি যথেষ্ট জটিল প্রপঞ্চ। বাদবাকি অন্য সব কারণের মধ্যে উক্ত কারণেই একটি প্রপঞ্চ হিসেবে ফ্যাসিবাদের একটি দূর্বল ব্যাখ্যার তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব সরাসরি রাজনৈতিক নপুংসকতার দিকে আমাদেরকে চালিত করে। তাছাড়া স্থানীয় নগর মিলনায়তনে যখন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (যুক্তরাজ্যে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি উগ্র ডানপন্থী, ফ্যাসিবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক দল— অনুবাদক) একত্র হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস ও তত্ত্ব সম্পর্কে সুলুক সন্ধানের মতো যথেষ্ট সময় সদাসর্বদা কারো হাতে নাও থাকতে পারে। একইভাবে ফ্যাসিবাদ মূলত কী তাৎপর্য বহন করে সে সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার যে জরুরি কাজ, তার পরিবর্তে উক্ত রাজনৈতিক দলের পেছনে লেগে থাকার ব্যাপারটি একটি লোভনীয় বিকল্পে পরিণত হতে পারে। আবার, এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে ফ্যাসিবাদকে আমরা কতটুকু গুরুত্বের সাথে নেব, সেটি জানা যেমন একটি সমস্যা, তেমনিভাবে যে পরিস্থিতির মধ্যে এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাকে খুব সুন্দরভাবে খারিজ করে দেওয়ার এবং বিপ্লবী সর্বহারা নেতৃত্ব গঠনের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংসসাধন করার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার জরুরি কার্যক্রমগুলো থেকে কারো রাজনৈতিক শক্তিকে একটি অধিকতর তাৎক্ষণিক কিন্তু বর্তমানে গঠনগত দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম নিয়ামক একটি বিষয়ের দিকে ধাবিত করার মাঝামাঝি একটি রাস্তা বের করাটাও একটি সমস্যা আকারে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই দিক থেকে ফ্যাসিবাদের বিষয়টি বরং যৌনতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের ক্ষেত্রেই মানসিক বিকার ও স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল।

    টেরি ইগলটন

    মোটাদাগে বলা যায়, একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনকে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ও অনায়াসে নিশ্চিত করার প্রয়াসই হলো ফ্যাসিবাদ। তবে এটা সত্য যে, একচেটিয়া পুঁজিবাদ এই ধরনে কাজ করতে চরমভাবে অনিচ্ছুক। বুর্জোয়া সমাজ তার উদার গণতন্ত্রবাদী মতাদর্শসমূহকে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঐতিহাসিক শক্তি খরচ করেছে। একই কারণে তারা স্বেচ্ছায় শ্রেণীসংগ্রামের এইসব বিস্তৃত মতাদর্শিক স্থিতাবস্থাকে ভেঙ্গে এমন একদল ছিন্নবস্ত্র সন্দেহবাতিকগ্রস্ত পাতিবুর্জোয়া ডাকাতদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে চাইবে না, যাদেরকে তারা এমনকি নিজেদের বাড়ির বসার ঘরেও সহ্য করতে রাজি নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্র শুধুমাত্র সর্বশেষ ও মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে তার ‘মুক্তি’ ও শ্রেণী-ক্ষমতার গঠন প্রক্রিয়ায় অশুভ আঁতাতের মতো সমৃদ্ধ মতাদর্শগুলোকে পরিত্যাগ করে ব্রেখটিয়ান ভাবমূর্তি ধারণ করে সকল গোমর ফাঁস করে দেয়। এটি অবশ্যই বিপ্লবীদের জন্য একটি সুখবর হিসেবে হাজির হয়, কারণ এর মাধ্যমে তারা একটু দম নেওয়ার ফুরসত পায়। একজন বিপ্লবীর শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি জিনিস নিয়েই শঙ্কিত হতে হয়। সেটি হলো সেনাবাহিনী। এছাড়া শেষের দিকে আর সবকিছুই গুরুত্বহীন। কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্র নিতান্ত বাধ্য না হলে একে ব্যবহার করে না। কারণ উক্ত কৌশল অবলম্বনের ফলে তার মতাদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে, তার লোকসান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক অর্জন দিয়ে পোষানো যায় না। (সেনাবাহিনীর ব্যবহার বলতে আমি স্বাভাবিকভাবেই বুঝিয়েছি পুঁজিবাদের নিজ আবাসভূমিগুলোতে তাদের ব্যবহারকে। মতাদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো স্থানে তাদের নিয়োগ- যেমন আইরিশদের মতো ভিনগ্রহবাসীদেরকে নির্যাতনের জন্য তাদের ব্যবহারকে বোঝানো হয়নি)। এর বদলে আমাদের জন্য আছে পুলিশ, যারা খুব বেশি সুখকর না হলেও অন্তত অস্ত্রবিহীন। কিন্তু যদি বুর্জোয়া রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে বাধ্য হয় তাহলে বিপ্লবীদের জন্য সেই দম নেওয়ার ফুরসতও থাকবে না। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করবে না। কেউ যদি এই বক্তব্যকে বামপন্থী সন্দেহবাতিক বলে উড়িয়ে দিতে চায় তবে তাকে বুকেনওয়াল্ডের (জার্মানিক ওয়েমার শহরের নিকটে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প (১৯৩৭-১৯৪৫)— অনুবাদক) ঘটনা স্মরণে রাখতে হবে।

    কোনো ঐতিহ্যবাহী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। এ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এর সাথে সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি করে এবং এক পর্যায়ে আবিষ্কার করে যে পাশার দান উল্টে গেছে। ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের সামাজিক গণতন্ত্রবাদী সুশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে রাষ্ট্রের সাথে প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীর মধ্যস্থতার হাতিয়ার হিসেবে আইনসভা ও রাজনৈতিক দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলক স্থূলভাবে ব্যবহার করতে থাকে, ফলে সম্পর্কটি প্রচন্ডভাবে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। বুর্জোয়া উদারবাদী শাসনের অধীনে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসন উপভোগকারী রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হিসেবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে খোদ রাষ্ট্রের সাথে কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এতকিছুর পরেও ফ্যাসিবাদ সামগ্রিকভাবে সমাজে পুঁজিবাদী কর্তৃত্ববাদের স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো জিনিস নয়। পুঁজিবাদের উদারনৈতিক ধরনটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসিতের সম্মতির সাহায্যে শাসন করে থাকে। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কার্যত একটি দাস সমাজ— যা আবার ধ্রুপদী দাস-সমাজ থেকেও পৃথক। অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়  আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজ কাঠামোর প্রত্যেকটি স্তরে এর শেকড় গভীরভাবে বিস্তৃত থাকে। এই দিক থেকে এটি মার্কসবাদে ‘বোনাপার্টবাদ’ (ফ্রান্সে প্রথম ও তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কালে চর্চিত রাজনৈতিক মতবাদ— অনুবাদক) বলে পরিচিত রাজনৈতিক মতবাদের চেয়ে ভিন্ন। ফ্যাসিবাদ মূলত ব্যাপক জনতুষ্টিবাদের সাথে পুশচিবাদের (আচানক সহিংতার উপর ভিত্তি করে সরকার পতনের পদ্ধতিমূলক মতবাদ— অনুবাদক) একটি প্রচন্ড সহিংস তাত্ত্বিক সংস্করণের সমন্বয়ে গঠিত মতবাদ। অন্যভাবে বললে, জার্মান রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য নাৎসিদের চর্চিত পদ্ধতি যদি কোনো এক বা একাধিক দিক থেকে জার্মান সাম্যবাদী দলের প্রচন্ড দুর্দিনেও তার উগ্র-বামপন্থী নীতিগুলোর সাথে মিলে যায়, তারপরও বিপরীতক্রমে সমগ্র জার্মান সমাজের চরমপন্থী সম্পৃক্ততা ছিল মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্লাব, সমিতি ও সংঘজুড়ে পুরো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে তৎকালীন জার্মান সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দলের বিস্তৃত ও শক্তভাবে প্রোথিত সামাজিক কর্পোরেটবাদের অনুরূপ।

    সুতরাং, ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনই যখন তার প্রয়োজন হয়। ১৯২৯ সালে জার্মান অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে নাৎসি পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৮শ শতাংশ। ১৯৩২ সালে ২ কোটি জার্মান খয়রাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে কিনা পুঁজিবাদের একটিমাত্র অর্থনৈতিক সংকটই কেবল ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সংকটের সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণীর পরাজয় এবং ভেঙ্গে পড়া মনোবল একত্র হয়ে ফ্যাসিবাদের উর্বর জমিন তৈরি করতে পারে। ১৯১৮-১৯১৯ সালে ক্ষণস্থায়ী জার্মান শ্রমিক প্রজাতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার মাধ্যমে জার্মান ফ্যাসিবাদের গল্প শুরু হয় এবং এই গল্প এগোতে থাকে এসপিডি (সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল) ও চুলচেরা কট্টর বামপন্থী ভাঁড়দের দল কেপিডি (সাম্যবাদী দল) কর্তৃক জার্মান সর্বহারাদের একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার মাধ্যমে। ১৯২০ সালে ইতালিতে সর্বহারা বিদ্রোহের ব্যর্থতা এবং তার ফলস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণীর প্রচন্ডভাবে ভেঙ্গে পড়া মনোবল শাসনকাঠামোর শূন্যতাকে ফ্যাসিবাদ দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়, যেটি কিনা পূর্বে ছোট্ট পরিসরে বিস্তৃত থাকলেও পরবর্তীকালে বিপুল বিক্রমে সামনে এগোতে থাকে। ফ্যাসিবাদ হলো বুর্জোয়াদের সর্বহারা বিদ্রোহকে দমন করার ভীতিজনিত বিপরীত প্রতিক্রিয়া থেকে পাওয়া একটি উপজাত— এটি হলো একটি বিপজ্জনক বামপন্থী কুসংস্কার। বিপরীতে, শ্রমিক শ্রেণী যখন একটি বিকল্প বিপ্লবী শক্তির অভাবে সংস্কারপন্থী কোনো নেতৃত্বের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে অসংগঠিত ও রক্ষণশীল অবস্থায় থাকে, ঠিক সে সময়ে একটি প্রচন্ড বুর্জোয়া আক্রমণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত আছে। সুতরাং ফ্যাসিবাদের উপাদান একাধিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, সর্বহারাদের পরাজয়, সমাজবাদী গণতন্ত্রের পরাজয়, বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব কিংবা অক্ষমতা।

    প্যান আমেরিক্যান ইউনিটি মুরাল
    শিল্পী: দিয়েগো রিভেরা

    রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ কোনো আলোচনা কক্ষ কিংবা কোনো কারখানার বারান্দায় উদ্ভাবিত হয় না। এটি উৎপন্ন হয় পাতিবুর্জোয়া কর্মচারীদের সারি থেকে। সর্বহারা শ্রেণীর সমপর্যায়ে কিংবা তারও নীচে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত এবং একইসাথে মাথার উপরে অবস্থিত নির্বিষ শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহরত স্বল্প পুঁজি ও বিনিয়োগের মালিকদের বিভিন্ন দল যারা তাদের সঞ্চয়কে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যেতে দেখে, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ফ্যাসিবাদ তাদেরই একটি রাজনৈতিক পণ্য। জাতীয়তাবাদ, কৌলিন্যবাদ, কঠোর পরিশ্রম, মেধাতন্ত্র, শ্রমিক বিদ্রোহের ভীতি, দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা, যুক্তিবাদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যাস রপ্ত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। বৃহৎ পুঁজির হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এই শ্রেণীটি বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের মাঝখানে নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে হাজির করে। বিক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কেন্দ্রীভূত স্বভাবের কারণে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজস্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করতে অক্ষম হয়ে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের মধ্যে সমস্ত শ্রেণীবিভাজনের উর্ধে রাখা একটি ‘নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

    অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং ‘বৃহৎ’ পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে নিয়তির ফেরে আটকে পড়ে এবং বুর্জোয়া কিংবা সামাজিক গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক যন্ত্র কোনো কিছুতেই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে না পেয়ে নিজেদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হওয়া পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ সংকটজাত  হলো ফ্যাসিবাদ। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সাথে ফ্যাসিবাদের গল্প মূলত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীকে একটি লম্বা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ভ্রমণ এবং অস্বস্তিকর ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া একচেটিয়া পুঁজিবাদের সমর্থনে পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অস্পষ্ট ও মিশ্র মতাদর্শকে কাজে লাগিয়ে সর্বহারাদের সংগঠনগুলোকে দমন করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীকে ব্যবহার করে। পাতিবুর্জোয়াদের সামনে ফ্যাসিবাদ নিজেকে জনপ্রিয় এবং ‘চরমপন্থী’ শক্তি হিসেবে হাজির করে যারা কিনা ‘অলস ধনী’ ও ‘সম্পদগর্বী’দের বিরুদ্ধে উক্ত শ্রেণীর বৈরিভাবাপন্নতার সাথে একাত্মতা পোষণ করে এবং সত্যিকারের ‘উৎপাদনশীল’ শ্রমিকদের (হোক তারা পুঁজিবাদী কিংবা সর্বহারা) গুণগ্রাহী হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইসাথে, ফ্যাসিবাদ নিজেকে শৃঙ্খলা, গৌরব, ধার্মিকতা ও জাতিগত স্বর্ণযুগকালীন দেশজ মূল্যবোধের রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদী আন্দোলন হিসেবেও তুলে ধরে।

    অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদের ‘চরমপন্থা’ পুরোপুরি ধাপ্পাবাজির বিষয় ছিল না। দলের মধ্যে যারা নেতাদের ধনীদেরকে আঘাত করা বিষয়ক বাগাড়ম্বরকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ফেলেছিল, তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য তথাকথিত ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস্’ জাতীয় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা নাৎসীদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের গতানুগতিক প্রক্রিয়া আরো জটিল। শাসক শ্রেণী শুরুর দিকে ফ্যাসিবাদকে ঘেন্না করে এবং খারিজ করে দেয়, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকটের সময় মাঝেমধ্যে একে ব্যবহার করে এবং পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সংকট যখন সমাধান হতে চায় না বরং বিপুলাকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক অনুদানরূপে বৃহৎ পুঁজির গোপন সমর্থন লাভ করতে থাকে। ফ্যাসিবাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নিজেকে একচেটিয়া পুঁজি ও পাতিবুর্জোয়াদের মধ্যবর্তী মৈত্রী হিসেবে হাজির করে, কিছুটা হলেও একটা চরমপন্থী চেহারা বানিয়ে, জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসসাধন করে সেগুলোর জায়গায় রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান বানানোর কর্মযজ্ঞে তখনো সামান্য কিছু ছাড় দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করা। পাতিবুর্জোয়ারা শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিজেদের লোকজন দিয়ে ভর্তি করতে থাকলেও একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রভাবশালী স্বার্থের ভিত্তিতেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার সাথে সাথে একদা পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর একগাদা অভাব অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীস্বার্থকেই বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। শেষপর্যন্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে থাকা ফ্যাসিবাদ যে শ্রেণীর কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করে, সে শ্রেণীস্বার্থকেই পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়।

    একচেটিয়া পুঁজিবাদের একটি তীব্র সাধারণ সংকট এবং সর্বহারা নেতৃত্বের দ্বৈত সংকটের মতো শাসকচক্রের নিজেদের মধ্যেই একটি বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক সংকট হলো ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনের ধ্রুপদী পূর্বশর্ত। শাসকচক্রের মধ্যে অবস্থানরত কোনো বিশেষ শ্রেণী কিংবা কোনো শ্রেণীর কোনো বিশেষ অংশই যখন একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, তখন এদের কোনো একটি পক্ষের একক আধিপত্য কায়েমের ভিত্তিতে এই পরষ্পরবিরোধী অংশগুলোকে একসূত্রে গাঁথার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তির প্রয়োজন হয় যার যোগান দিতে পারে ফ্যাসিবাদ। এমন একটি পরিস্থিতিতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। সমাজে প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে এদেরকে একতাবদ্ধ করাই হলো ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়। উদাহরণস্বরূপ, ১০২০ এর দশকের জার্মানিতে একচেটিয়া পুঁজিবাদের দ্রুততর বিকাশের ফলে শাসক শ্রেণীর এই অংশের সাথে বিপুলাকার কৃষি-পুঁজির বিভিন্নমুখী দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে। সেখানে ফ্যাসিবাদের কাজ ছিল একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে এইসমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা। ‘বৃহৎ’ ও ‘মাঝারি’ পুঁজির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব নিরসনেও ফ্যাসিবাদ পূর্বোক্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বাধ্যতামূলক চক্রায়ণ (কার্টেলাইজেশন), দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, গণকর্মসংস্থান, যুদ্ধ অর্থনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বাদবাকী অন্যসব অর্থনৈতিক কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে শাসক শ্রেণীর মধ্যে বিরাজমান অন্য সকল দল-উপদলের স্বার্থ-সুবিধা জলাঞ্জলি দেওয়ার বিনিময়ে লাভবান হয় বৃহৎ শিল্পপুঁজি। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন এসমস্ত পুনর্গঠনের একমাত্র মাধ্যম হওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত একচেটিয়া অর্থায়ননির্ভর পুঁজিবাদই মূলত প্রভাবশালী ‘উচ্চতা’য় উপনীত হয়। ইতালিতে ফ্যাসিবাদ কৃষিপুঁজির উপর শিল্পপুঁজির প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে কাজ করেছিল। ইতালির ফ্যাসিবাদী দল ছিল মূলত সে দেশের উন্নত উত্তরাঞ্চলের একটি পণ্য যেটি কিনা কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।

    জার্মানির মর্তাদর্শিক পরিস্থিতিগুলো ফ্যাসিবাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ছিল। বিসমার্কবাদী ‘উপর থেকে উপুড় করে দেওয়া বিপ্লব’ এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই তাদের নিজস্ব মতাদর্শ উৎপাদন করার মাধ্যমে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে পারেনি।  বুর্জোয়া উদারবাদী মতাদর্শের জায়গায় জার্মানরা ফ্যাসিবাদে রূপান্তরযোগ্য জঙ্গিবাদী উপাদানসমেত ঈষৎ পরিবর্তিত একটি সামন্তবাদী মতাদর্শ উৎপাদন করেছিল। জার্মান পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী মতাদর্শিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে কুলীন বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরশীল এই শ্রেণী তাদের ফরাসি সঙ্গীসাথীদের জ্যাকববাদের সাথে শক্তিসামর্থ্যের দিক থেকে তুলনীয় কোনো মতাদর্শের জন্ম দিতে পারেনি। তারপরও এইসব মতাদর্শের উপাদানসমূহ খুবই অদ্ভূতভাবে ফ্যাসিবাদের হাতের মুঠোয় চলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযোগী ছিল। রাষ্ট্রপূজা, ‘গুরু’ভক্তি, আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ, কৃর্তত্ববাদ এবং ‘যন্ত্রবাদী’ আদর্শবাদসমেত জার্মান পাতিবুর্জোয়া মতাদর্শ বহু দিক থেকেই ধ্রুপদী বুর্জোয়া উদারবাদের চেয়ে একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের মতাদর্শিক চাহিদা মেটানোর জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, শ্রেণীগত পরিভাষার বদলে বরং ‘দেশীয়’ পরিভাষায় পরিচিত হতে চাওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শিক অবস্থাগুলোর সাথে পরিবার বিষয়ক ফ্যাসিবাদী সংস্কার মিলে যায়। কিন্তু এসমস্ত মতাদর্শগুলো কর্পোরেটবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও মর্যাদাক্রমের যে প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিল, সেটি খুব পরিষ্কারভাবেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য উপযুক্ত ছিল। সুতরাং, এটা বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ মূলত নিম্ন মধ্যবিত্তের মতাদর্শের সাথে যূথবদ্ধ এবং সেটি দ্বারা প্রভাবিত একটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী মতাদর্শ।

    পুঁজিবাদ থেকে উত্তীর্ণ হওয়া ‘আমলাতান্ত্রিক যৌথতা’ই হলো ফ্যাসিবাদ— এই ধরনের রক্ষণশীল ও উদারবাদী কিংবদন্তীকে নাকচ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি ও ইতালীয় শিল্প-কারখানায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বর্তমানে পশ্চিমে যা হচ্ছে তার চেয়ে সম্ভবত ভিন্ন কিছু ছিল না। তৎকালীন জার্মানির বেশিরভাগ শিল্পকেই জাতীয়করণ করা থেকে বিরত ছিল নাৎসিরা। বেসরকারি খাতের তুলনায় তাদের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাবসা-বাণিজ্যের অবস্থারও ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। ফ্যাসিবাদ বিষয়ে ফ্রানজ্ ন্যুমান তার ধ্রুপদী গ্রন্থ বেহেমথ-এ লিখেছেন, ফ্যাসিবাদ হলো ‘একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বেসরকারি পুঁজিবাদী অর্থনীতি’। জার্মানিতে ওয়েমারের সময়কালে ক্রমবর্ধমান একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও চক্রায়ণকে (কার্টেলাইজেশন) যৌক্তিকভাবে অনুসরণকারী এবং সমসাময়িক পুঁজিবাদের পরিকল্পিত কর্পোরেট অর্থনীতির অগ্রদূত হিসেবে একে দেখা যেতে পারে। সমাজকে বিশ্ববাজার থেকে বিছিন্ন করে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ ও দাম নির্ধারণে রাষ্ট্রের একক আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে একটি বদ্ধ অর্থনীতি নির্মাণের মতলব নিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়মিত তত্ত্বাবধায়কে পরিণত হয়। এমন সুরক্ষা নীতি গ্রহণের অনিবার্য ফল হিসেবে একদা বিধ্বস্ত অর্থনীতি সেরে ওঠে এবং এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সেটি তার কঠোর জাতীয় সীমানায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এর ফলে ঘটে সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার। কিন্তু এইধরনের বিস্তার অবশ্যই স্রেফ ফ্যাসিবাদী ‘দুর্ঘটনা’ নয়। ফ্যাসিবাদ স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে সব জাতীয় বাহিনী, শ্রেণী ও সম্পদগুলোর জঙ্গিবাদী কেন্দ্রীভূতকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

    এই প্রস্তুতি গ্রহণের সাথে ইহুদিবিদ্বেষ ও জাতিবাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তনশীল। নাৎসিবাদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি সত্য ছিল। সেখানকার অভ্যন্তরীণ শ্রেণীসংগ্রাম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জাতীয় কর্পোরেটবাদ এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক আগ্রাসনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ইহুদি ও বিদেশীদেরকে নির্বাচন করা হয়েছিল। আদর্শিক পর্যায়ে সকল ফ্যাসিবাদেই শ্রেষ্ঠত্ববাদী কর্পোরেটবাদ হাজির থাকলেও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের দিক থেকে ‘ধ্রুপদী’ ফ্যাসিবাদের কাতারভুক্ত না হওয়া আইবেরীয় ফ্যাসিবাদসমূহের এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রকাশে জাতিবাদী পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে হয়নি (১৯৩২ সালে ইতালিতে প্রধান ইহুদী ধর্মগুরু ফ্যাসিবাদী দলের সদস্য ছিলেন)।

    তবে সকল ফ্যাসিবাদী গঠনই তার আদর্শিক স্তরে ব্যাপকভাবে ‘তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন’ বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানির যুদ্ধ-অর্থনীতিতে পোলিশ ধাতুশ্রমিকদের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে উপেক্ষা করে মতাদর্শিক কারণে তাদেরকে নির্মূল করা হয়েছিল। একইভাবে সেখানে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি যখন প্রচন্ড প্রয়োজন ছিল, সে সময়েও জার্মান গৃহিণীদের গৃহবন্দী রাখার সংস্কার মেনে তাদেরকে কারখানার বাইরে রাখা হয়েছিল। তার উপর ‘শেষ সমাধান’-এ আসার জন্য প্রয়োজনীয় জটিল ও ব্যয়বহুল কলকব্জার মধ্যে যানবাহন ও বিভিন্ন সম্পদ অন্তর্ভূক্ত ছিল, যেগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে যুদ্ধের কাজেও ব্যবহার করা যেত। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগুলোকে বৈধতা দেওয়া সংশ্লিষ্ট সকল মতাদর্শিক গঠনের মধ্যে কিছুমাত্রায় তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় রাখা হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি সত্য। একই কারণে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র যে শ্রেণীস্বার্থের মতব্বরি করে তার বিপরীতে এর মতাদর্শিক গঠনের তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন অনেক বেশি থাকে এবং সেটা দরকারও, কারণ এর কাজই হলো শাসকচক্রের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ‘শ্রেণীসমূহ’-কে পুনর্বিন্যস্ত করা। একচেটিয়া পুঁজিবাদের সরাসরি ‘প্রতিনিধি’ কিংবা স্রেফ একটি ‘হাতিয়ার’ হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। নাৎসিরা কেবল এসব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার ছিল না বরং এসকল স্বার্থের জন্য স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিকারণ বিভিন্ন নীতিও অনুসরণ করত। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যগুলোর সাথে একচেটিয়া পুঁজিবাজী মতলবের মধুর মিলন ঘটেছিল।

    নাৎসী পোস্টার

    ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে আমরা কোন রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করি? আমরা জানি যে, ফ্যাসিবাদের মৌলিক নীতিই হলো অনুকূল পরিবেশে এটি প্রচন্ড দ্রুততার সাথে বিকশিত হতে পারে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিগুলো হিটলারকে ক্ষমতায় এনেছিল সেটি আরো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুলভাবে আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে। কেউ যদি জার্মান ফ্যাসিবাদের উত্থান কেন ঘটেছিল তার উত্তর একশব্দে জানতে চায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ হবে এই উত্তর দেওয়া যে: স্ট্যালিন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের উদ্ভট ধরনপ ভুল ব্যাখ্যাই এর সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল। ‘কুলীন শ্রমিক শ্রেণী’র তুলনামূলক প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া এবং প্রগতিশীল পুঁজিবাদের পতনের সাথে সাথে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়া একগুচ্ছ দিবাস্বপ্ন বলে আখ্যা দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে কিভাবে কাজ করে, সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সেটি বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদ’ ও ‘আকস্মিকতাবাদ’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সরল মনের এই ‘তত্ত্ব’টি সামাজিক গণতন্ত্রবাদী দলগুলো (বুর্জোয়া রাজনীতিতে অভ্যস্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর সমর্থনপুষ্ট) যে রাষ্ট্র নামক দেহের স্রেফ মলমূত্র নয় বরং সর্বহারা শ্রেণীকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্যে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যকে অবহেলা করেছিল। ফ্যাসিবাদ ও সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনের স্রেফ দুটি ভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। ফ্যাসিবাদকে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে অন্তর্গত বিরোধসমূহের ফলেই তার পতন ঘটবে এবং ঘটনাক্রমে সেটি পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিরোধগুলোকেও শেষ সীমার দিকে ঠেলে দিবে। একইভাবে জার্মান ফ্যাসিবাদ সর্বহারা বিপ্লবকেও ত্বরান্বিত করবে। নাৎসিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা জার্মান সাম্যবাদীরা সত্যিকারের শত্রু সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদেরকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছিল। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে ‘সাংবিধানিক’ বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এবং জার্মান সাম্যবাদী দলকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদের সাথে কোনো জোটে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া জার্মান সর্বহারা শ্রেণী হিটলারের উত্থানের পূর্বে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক গণতন্ত্রবাদ বুর্জোয়াদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। পরবর্তীকালে সামাজিক গণতন্ত্রবাদের হাত থেকে বুর্জোয়াদেরকে রক্ষা করেছিল ফ্যাসিবাদ।

    এসব কিছু থেকে রাজনৈতিক শিক্ষাটা ছিল পরিষ্কার। শুধুমাত্র একটি সংগঠিত এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনই কেবল ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে পারে। তবুও আজকের পশ্চিমা সর্বহারা শ্রেণী অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় গভীরভাবে বুর্জোয়া মতাদর্শিক দূষণের শিকার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর শক্তির ব্যাপারে অবশ্য অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ না করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। পাতিবুর্জোয়া, কৃষক, বেকার এবং ছিন্নমূল গোষ্ঠী ও শ্রেণীর মতো যে-সকল শ্রেণী ও বর্গকে ফ্যাসিবাদ কাছে টানে, তাদেরকে সংগঠিত করা একটি প্রচন্ড দুঃসাধ্য কাজ। প্রথম পরাজয়েই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পতন ঘটার জন্য তারা প্রায়শই দায়ী থাকে। অন্যদিকে, কারখানার সুসংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ খুব কম সময়েই সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। নিজেদেরকে শ্রমিকদের দল বলে নাৎসিদের যে দাবি, সেটি কোনো নির্বাচনী পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসেনি। ১৯২৬ সালের সাধারণ ধর্মঘটে বিশাল বিপর্যয় এবং পরবর্তী বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় ভেঙ্গে পড়া মনোবল নিয়েও ১৯৩০ এর দশকে ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দারুণভাবে লড়ে গেছিল। (প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে ফ্যাসিবাদের আশ্রয় নিতে না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইংরেজ সর্বহারাদের এই ভেঙ্গে পড়া মনোবল। সর্বহারাদের রাজনৈতিক দূর্বলতাকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদেরকে অর্থনৈতিক শক্তি যুগিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাঙতে হয় ফ্যাসিবাদের। ব্রিটেনের বিপরীতে জার্মানিতে তখনো বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল)। ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো আজকের ব্রিটিশ ফ্যাসিবাদী দলগুলো এখনো প্রান্তিক, একদিকে কট্টর নাৎসিবাদ, অন্যদিকে নির্বাচনী মর্যাদা নিয়ে অর্ন্তদ্বন্দ্বে দ্বিধাবিভক্ত। এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কাজটি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট। ফ্যাসিবাদী সংগঠন, সমাবেশ ও প্রচারণাকে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের একটি বিষয়ে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি যেখানে জনপরিসরে খোলামেলা যাচ্ছেতাই বলার সুযোগ নাই। জনসম্মুখে কেউ জাতিগত ঘৃণা ছড়ালে সে অপরাধে তার শাস্তি হতে পারে- অন্তত এটি নিয়েও শুরু করা যায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একইসাথে এই মতাদর্শ উৎপাদনকারী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। বিপ্লবী নেতৃত্ব গঠনের সমস্যার সাথেও এই সংগ্রাম যুক্ত। ফ্যাসিবাদ যেমন প্রধান শত্রু নয়, একইসাথে এটি উপেক্ষণীয়ও নয়। বামপন্থীদের কিছু অংশের মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শব্দের আবেগমূলক এবং অসতর্ক ব্যবহার যদি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধোঁয়াশাও হয়ে থাকে, তবে এটি আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ফ্যাসিবাদ খুব বেশি অষ্পষ্ট নয়।

  • ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    • অনুবাদ: স্বাধীন সেন
    ডেভিড গ্রেয়বার ও ডেভিড ওয়েনগ্রো
                                                                                                             উৎস: দিজ টাইমস

    অ্যারন বাস্তানি (Aaron Bastani): ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে ইতিহাসের সেই অতি সুদূর অতীতকাল নিয়ে কাজ করছে যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। বইটা ওই সময়টাকে এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছে যেন সেখানে জ্যান্ত আর রক্তমাংসের মানুষ বাস করত। শুনতে হয়তো কথাটা খুব অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু সত্যি বলতে ইতিহাসচর্চায় এমনটা সচরাচর করা হয় না। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের আমাদের মতো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের সঙ্গেই বেশি তুলনা করা হয়। একবার ভেবে দেখুন তো, মানব ইতিহাস নিয়ে আমাদের জানা সবকিছুই যদি ভুল প্রমাণিত হয়? আমাদের যে প্রচলিত জ্ঞান (Received wisdom) মেনে নিতে শেখানো হয়েছে, তা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছরের; কিন্তু আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছি মাত্র গত ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে। মনে করা হয় যে, এই কৃষিকাজ শুরুর পরেই শহর, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যা আর আমাদের চেনা এই সভ্যতার জন্ম হয়েছে।

    কিন্তু ডেভিড ওয়েনগ্রো আর সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের বই বলছে যে, এই তথ্যটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁরা বলছেন, আমরা যাকে শহর বা ‘উন্নত মানব সংস্কৃতি’ বলে বিচার করি, তা আসলে কৃষিকাজ প্রবর্তনেরও আগের ঘটনা। প্রাগৈতিহাসিক এই আখ্যানটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং চমকপ্রদ—আর এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আপনাকে ‘ডাউনস্ট্রিম’-এ স্বাগত জানাই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো (David Wengrow): আমাকে ডাকার জন্য ধন্যবাদ।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) প্রত্নতত্ত্ব পড়াচ্ছেন। ছোটবেলায় কি আপনি এটাই হতে চেয়েছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই না। স্কুল ছাড়ার পর আমি আসলে থিয়েটার করতে চেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, তখন আমি বেশ খানিকটা অভিনয়ও করেছি। প্রায় ১৪ বছর বয়স থেকেই আমি মঞ্চ আর অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যাই। আমি ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ থিয়েটারে’ যোগ দিয়েছিলাম—সেটা ছিল একটা দারুণ সময়। কারণ লন্ডনের বাসিন্দা হিসেবে তখনই আমি প্রথম সারা দেশের, অর্থাৎ পুরো যুক্তরাজ্যের নানা প্রান্তের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ পাই। স্কুল শেষ করার পর একজন এজেন্টও জুটিয়ে ফেললাম এবং কিছুদিন ওটা নিয়ে মেতে থাকলাম। এরপর আরও নানা কাজ করেছি। বলতে পারেন, প্রত্নতত্ত্বের জগতে আমার পা রাখাটা ছিল অনেকটা দুর্ঘটনাবশত।

    অ্যারন বাস্তানি: বলেন কী! শিশু অভিনেতা থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদ—শুনতে তো দারুণ একটা গল্পের মতো লাগছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমি ঠিক শিশু অভিনেতা ছিলাম না, বলা যায় ‘ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যাক্টর’। আমি শিশু অভিনেতাদের দেখেছি, তারা অন্য ধাতুর মানুষ হয়—আমি ঠিক তেমন ছিলাম না। তো যা বলছিলাম, সাংবাদিকতার দিকেও সামান্য ঝোঁক ছিল—বিবিসি অ্যারাবিক সার্ভিসে কাজ করা বা এই জাতীয় কিছু নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু আসলে ঠিক কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্কুলে রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই ভাবলাম অক্সফোর্ডে আবেদন করব। আমার মাথায় তখন কেবল অক্সফোর্ড ঘোরপাক খাচ্ছিল। আমি অক্সফোর্ডের সব কলেজেই ইংরেজি সাহিত্যের জন্য চিঠি লিখলাম, কিন্তু কেউ পাত্তাই দিল না।

    তখন আমার এক বন্ধু বলল, “এই ধরণের জায়গায় ঢোকার সহজ উপায় হলো একটু ‘অপ্রচলিত’ কোনো বিষয় বেছে নেওয়া।” ওরা তখন মাত্র ‘প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান’ নামে একটা নতুন কোর্স চালু করেছে—মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে ইউসিএলে আমি এই বিভাগটাই সমন্বয় করি। তো, আমি হ্যারিস কলেজে ওই কোর্সের জন্য আবেদন করলাম এবং ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পেলাম। ইন্টারভিউ নিতে বসলেন বারবারা কেনেডি নামের এক দুর্ধর্ষ নারী। তিনি আসলে ভূগোলবিদ ছিলেন, কারণ ওই কলেজে তখন কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন না। তিনি আমাকে বেশ জেরা করলেন। আমিও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমার ‘বিশাল প্যাশন’ নিয়ে অনেক বড় বড় বুলি ঝাড়লাম। হুট করে তিনি তাঁর চেয়ারের নিচ থেকে একগাদা চিঠি বের করলেন—সেইসব চিঠি যা আমি অন্য কলেজগুলোতে ইংরেজি পড়ার জন্য লিখেছিলাম। আমি তো ভাবলাম, সব গুবলেট করে ফেলেছি! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে ভর্তি করে নিলেন।

    শুরুতে আমি একজন ‘ম্যাচিউর স্টুডেন্ট’ হিসেবে ভর্তি হলাম, যদিও মানসিকভাবে তখনো অতটা পরিণত ছিলাম না। শুরুতে সবকিছু প্রায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছিলাম এবং ছয় মাস পর আমার বের হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। কিন্তু তখনই একজনের সাথে দেখা হলো যিনি আমার পুরো চিন্তাটাই বদলে দিলেন। আসলে জীবনে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন হয় যিনি আপনাকে নেশা ধরিয়ে দেবেন এবং এই আত্মবিশ্বাস দেবেন যে—হ্যাঁ, এই বিষয়ে আপনারও কিছু দেওয়ার আছে। তিনি ছিলেন অ্যান্ড্রু শেরাড। খুব অল্প বয়সে—মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান, অনেকটা ডেভিডের (গ্রেবার) মতোই। অ্যান্ড্রুই আমাকে প্রত্নতত্ত্বের নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিলেন, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

    অ্যারন বাস্তানি: আসলে আমরা তো সবসময়ই শুনি যে, ছোটবেলায় কমবেশি সব শিশুই একসময় প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, মনের কোণে হয়তো কিছু একটা ছিলই। ওল্ড সেরামের একটা স্কুল ট্রিপের কথা আমার খুব মনে পড়ে—সেটা ছিল লৌহ যুগের এক বিশাল পাহাড়ি দুর্গ। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথা জুড়ে কেবল সেইসব ছবিই ঘুরছিল। আমি যেন চোখের সামনে সেই প্রাচীন অভিবাসন আর আক্রমণের দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কম্পিউটারের যুগ আসার অনেক আগের কথা বলছি; আমি একটা ক্যালিগ্রাফি পেন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতার একটা আস্ত খাতা বা পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলেছিলাম। মনে আছে, কাগজটাকে পুরনো লুক দেওয়ার জন্য আমার দাদি কফির গুঁড়ো দিয়ে কাগজটা হলদেটে করতে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কোনো একটা ঐতিহাসিক যুগ বা সময়ের প্রতি এমন একটা টান অনুভব করাটা আসলে পুরোপুরি যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আমার পারিবারিক কোনো শিকড় নেই, তাই এটা কোনো আঞ্চলিক টানও নয়। কিন্তু কেন জানি স্রেফ একটা বিশেষ সময় বা ইতিহাসের কোনো এক পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি আপনার মনে এক গভীর মায়ার তৈরি হয়। যারা প্রত্নতত্ত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাদের মধ্যে হয়তো এই ‘নেশা’র মাত্রাটা একটু বেশিই থাকে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বই ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ (The Dawn of Everything)-এর মূল প্রসঙ্গে আসি। প্রচলিত জ্ঞান হলো, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছর ধরে। আপনি উত্তরে সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলতে পারেন। তবে আমরা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছি মাত্র ১২ হাজার বছর—কিংবা ১১-১২ হাজার বছর আগে। বলা হয় যে, কৃষির আগমনের ফলেই নগর, সংখ্যা দিয়ে গণনা, লিখন পদ্ধতি, জ্যোতির্বিদ্যা আর আমাদের চেনা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আপনার এবং সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের যৌথভাবে লেখা বইটা বলছে যে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল অথবা অন্তত বড় রকমের ভুল আছে এতে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন অ্যারন, আপনি যা বললেন সেগুলোকে একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। জানেন তো, আপনি যখন বলছেন যে ১২ হাজার বছর আগে আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছিলাম, তখন আসলে পৃথিবীর খুব অল্প কিছু মানুষ সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সেটা শুরু করেছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East), যেটাকে অনেকে ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) বলেন। সেই সময়েও বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ছিল শিকারী ও সংগ্রাহক এবং মৎস্যজীবী। আসলে আপনি যেটা সংক্ষেপে বললেন, সেটা হলো আমাদের সেই চেনা ‘যুগবিভাজনের তত্ত্বর’ (Stage Theory) একটা ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে দেখানো হয় যে, দীর্ঘ সময় ধরে তেমন কিছুই ঘটছে না, তারপর হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল—কৃষি বিপ্লব হলো, জনসংখ্যা বাড়ল, তারপর নগর এলো এবং আবারও সব বদলে গেল। তারপর এলো সভ্যতা। আমরা বইটাতে এটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে এর চেয়ে অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। ইতিহাসের তথাকথিত ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় বা ধাপের মানুষগুলো আসলে একদম পাশাপাশি বসবাস করত। তারা একে অপরের থেকে রসদ নিত, একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাত এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সচেতনভাবে সমাজ গঠন ও নকশা করত। জানেন তো, সভ্যতা আর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের মনে এক ধরণের বদ্ধমূল ধারণা কাজ করে। আমরা ভাবি যে কেবল আমরা এই আধুনিকরা, বা তথাকথিত আধুনিকরা—মানে এই যে আলোকায়ন পরবর্তী মানুষ—তারাই কেবল সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই। তারপর সচেতনভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ঐতিহ্যে বামপন্থী বা ডানপন্থী—উভয় তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারাতেই এই ধারণাটা গভীরভাবে গেঁথে আছে। কিন্তু আমাদের মতে এটা ভুল। আপনি যেমনটা বললেন, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ বছর ধরে—যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা একদম আপনার আর আমার মতোই। তাদের মস্তিষ্ক আমাদের মতোই এবং তারা আমাদের মতোই কথোপকথন চালিয়ে যেতে পুরোপুরি সক্ষম ছিল। অথচ সেই সুদীর্ঘ সময়ের খুব সামান্য অংশ সম্পর্কেই আমরা জানি। একবার ভেবে দেখুন তো, এটা কত অসাধারণ একটা ব্যাপার! কত কিছু ঘটতে পারত সেই সময়ে, কত ধরণের কথোপকথন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারত! অথচ আমরা শুরুর সেই সময়গুলো নিয়ে লেখার সময় বা সেগুলোকে সংজ্ঞায়ন করার সময় ঠিক উল্টোটা করি। মনে হয় যেন মানুষ কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের (Haze) মধ্যে বাস করছিল, কেবল কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম বা রুটিন মেনে চলত—যতক্ষণ না একদিন কেউ কৃষিকাজ আবিষ্কার করল আর সব বদলে গেল। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের অতীতের প্রতি করা এক ধরণের ‘ধারণাগত ক্ষতি’ (Conceptual damage)। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে এই ভুলটাই ভাঙার চেষ্টা করছে। আমরা ইতিহাসের অতি সুদূর সেই সময়গুলো নিয়ে লিখতে চেয়েছি—যার সপক্ষে আমাদের কাছে প্রমাণ আছে—যেন সেখানে সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ ছিল। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও ইতিহাসচর্চায় এই কাজটা খুব কমই করা হয়। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের আমাদের মতো মানুষের সাথে তুলনা করার চেয়ে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের (Non-human primates) সাথেই বেশি তুলনা করা হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বইয়ের এই অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে—আগে কখনো এভাবে ভাবিনি। আমরা কি শিকারী ও সংগ্রাহকদের নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করতে পারি? তারা কি আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক কম ‘সংকীর্ণমনা’ ছিল? মানে ইন্টারনেটের এই যুগের কথা বলছি না, তবে তার আগের সময় পর্যন্ত কি তারা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল না? আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম বড় উদঘাটন (Revelation) হলো এই আলামতগুলো । আগে ভাবা হতো যে, কৃষির আগের মানুষগুলো ছোট ছোট দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করত। তারা যাযাবর ছিল, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত এবং একে অপরের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না—এই পুরো ধারণাটাই ভুল। আমরা এখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে দেখাতে পারি যে, কৃষিকাজ শুরুর কয়েক হাজার বছর আগেও, এমনকি বরফ যুগের (Ice Age) অনেক আগে থেকেই মানুষের সমাজ বিশাল এলাকা জুড়ে সুসংগঠিত ছিল। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখত এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র আদান-প্রদান করত। বর্তমানে আমাদের হাতে এমন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের খাদ্যভ্যাস পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তারা কি উপকূলীয় এলাকায় ছিল নাকি স্থলভাগে চলে এসেছিল, তা আমরা এখন বলতে পারি। এমনকি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং কাঁচামালের চলাচলও শনাক্ত করা যায়। আমাদের কাছে প্রাচীন ডিএনএ আছে। সুতরাং আদি মানব সমাজকে ব্যাখ্যা করার অনেক পদ্ধতি এখন আমাদের হাতে। আর তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সেই জগতটা ছিল ভীষণভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। একটু ভেবে দেখলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষের প্রথম কাজগুলোর একটি হলো স্থান পরিবর্তন করা। আমরা সাধারণত বলি যে মানুষ পুরো পৃথিবী ‘দখল’ বা ‘উপনিবেশায়ন’ করেছে—যদিও শব্দটা একটু অদ্ভুত কারণ তখন সেখানে দখল করার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু আমরা বিচরণ করেছিআফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত। এমনকি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছি। ফলে আমরা শুরুই করেছিলাম এক ধরণের সুসংহত এবং সংযুক্ত সামাজিক পরিমণ্ডল (Social Universe) দিয়ে। জনসংখ্যার দিক থেকে তারা হয়তো খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা অবিশ্বাস্য দূরত্বের মধ্যেও যোগাযোগ রক্ষা করত এবং ধ্যান-ধারণা বিনিময় করত। মধ্যযুগের ইউরোপের কথা ভাবুন। সেখানে পরিস্থিতি মোটেও এমন ছিল না। একজন সাধারণ গ্রাম্য কৃষক তার গ্রামের বাইরে খুব একটা যেত না। আর এই বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর মানে হলো আমাদের ইতিহাসের ব্যাপ্তি বা স্কেল (Scale) নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের মনে ইতিহাসের যে গতানুগতিক ছবিটা আছে তা আসলে উল্টো। মানুষ ভাবে যে আমরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী দিয়ে শুরু করেছি এবং শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বায়নের যুগে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু আসলে ঘটনাটা উল্টো। আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখেন, তবে দেখবেন যে আগে সেখানে বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থা ছিল। অথচ আজ যদি আপনি কায়রো থেকে দামেস্কে যেতে চান, তবে আপনাকে হয় সিআইএর জন্য কাজ করতে হবে, না হয় প্রায় ৫০টা বর্ডার চেকপয়েন্ট পার হতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, জাতিরাষ্ট্র আর কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে সময়ের সাথে সাথে আমরা আসলে অনেক বেশি রুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি: মেগালিথিক প্রত্নস্থান (Megalithic sites) নিয়ে একটা কথা—যেটা আমি গত কয়েক বছরেই আবিষ্কার করেছি এবং সেকথাগুলো আপনাদের বইয়েরও অংশ; সে বিষয়টি হলো জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) ভূমিকা। এখানে বিষুব (Equinoxes) আর অয়নান্তের (Solstices) [ক্রান্তিয়, কর্কট ক্রান্তি ও মকর ক্রান্তি] বিষয় তো আছেই, তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে। প্রায়ই দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রমণ্ডলকে (Constellations) সারিবদ্ধ করা হয়েছে বা শনাক্ত করা হয়েছে। তার মানে কি আমরা এমন অনেক সমাজকে দেখছি যারা তখনও কৃষিকাজ শুরু করেনি, অথচ অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল? কারণ এটাও এমন একটা বিষয় যা নিয়ে মানুষ সাধারণত তেমন ভাবে না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এবং নৌচালনবিদ্যা (Navigation) নিয়েও। আমরা এখানে এমন এক মানবগোষ্ঠীর কথা বলছি যারা আয়ারল্যান্ডের ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো পর্যন্ত যাতায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছিল। অবশ্যই এর জন্য ভূসংস্থান (Topography) এবং সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় দিক থেকেই তাদের অসাধারণ দখল থাকতে হয়েছিল। আর হ্যাঁ, আপনি প্রারম্ভিক যুগের বৃহদাকার স্থাপত্যগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এগুলো প্রায়ই খুব নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ করে সাজানো হতো—কখনও অন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভের সাপেক্ষে, আবার কখনও অয়নান্তের সাপেক্ষে। এখানে যুক্তরাজ্যে স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত। মানুষ যে অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক ও জ্যামিতিক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; যদিও তাদের পদ্ধতিগুলো আমাদের বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন ছিল। আমার মনে হয় ১৯৬০-এর দশকে ক্লদ লেভি-স্ট্রসের (Claude Levi-Strauss) বইতে এ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাটি হয়েছিল। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানের মূলত দুটি ভিন্ন রূপ আছে। একটা হলো বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের বর্তমান ধারণা যা ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়—যেখানে আপনি একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন এবং সাদা কোট পরা মানুষরা নতুন নতুন আইডিয়া বা থিওরি তৈরির চেষ্টা করেন, যা পরে বহির্বিশ্বে প্রয়োগ করা হয়। তিনি এর সাথে তুলনা করেছেন মানুষের ইতিহাসের সেই ধরণের আবিষ্কারের পদ্ধতির, যেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। সেখানে আবিষ্কার ছিল সামাজিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা ছিল মানুষের ল্যান্ডস্কেপ, গাছপালা এবং প্রাণীর সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফল—যা শুরু থেকেই সরাসরি প্রয়োগ করা হতো। সম্ভবত এভাবেই নৌচালনবিদ্যা, বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ বা ধাতুবিদ্যার মতো প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমাদের পরিচিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়েছিল—যা আসলে নিজের মধ্যেই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, স্টোনহেঞ্জ কি কৃষিজীবী মানুষেরাই তৈরি করেছিল? এটা কি আমরা নিশ্চিতভাবে জানি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: খুব সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এটাই ছিল সর্বজনসম্মত ধারণা। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা আসলে আরও অনেক বেশি চমকপ্রদ। প্রায় ৫০০০ বছর আগে যখন স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তৈরি হচ্ছে, তার আগেই ইউরোপীয় মহাদেশ থেকে আমদানিকৃত পদ্ধতি হিসেবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে চাষাবাদ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের আরও অনেক জায়গার মতো এখানেও একই ঘটনা ঘটেছিল—আবারও সেই আপনার শুরুর দিকে বলা মানব ইতিহাসের যুগবিভাজনের তত্ত্ব (Stage Theory)-এর প্রসঙ্গে আসি, যেখানে বলা হয় কৃষি এলো আর সবকিছু বদলে গেল। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আসলে এমন অনেক উদাহরণের একটি, যেখানে মানুষ কৃষিকাজ গ্রহণ করার পর মূলত তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) এবং আরও অনেক বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ যখন তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে এই দ্বীপের মানুষরা শস্য চাষের অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তারা প্রধান উদ্ভিদজাত খাদ্য হিসেবে আবারও বুনো বাদাম বা ওক ফল বা একর্ন (Acorns) জাতীয় খাবার সংগ্রহের দিকে ফিরে গিয়েছিল। তবে তারা সব কিছু ছাড়েনি; যেমন তারা শুকর আর গরু পালনের মতো পশুপালন চালিয়ে গিয়েছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge)-এর কাছে ডারিংটন ওয়ালস (Darrington Walls) নামে একটি প্রত্নস্থান আছে। সেখানে এমন এক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে মানুষ ঋতুভিত্তিক উৎসবের জন্য জড়ো হতো এবং প্রচুর পরিমাণে মাংস খেয়ে ভোজ করত। সেটা নিশ্চয়ই বিশাল কোনো আয়োজনের উৎসব ছিল। আর সম্ভবত সেই সময়েই তারা এই ধরণের বড় বড় সমন্বিত নির্মাণ কাজগুলো করত যা আমরা এখন দেখতে পাই। তাই এই পুরো চিত্রটা আসলে বেশ জটিল। তারা পুরোপুরি কৃষকও ছিল না, আবার শুধু শিকারী ও সংগ্রাহকও ছিল না; বরং তারা ছিল কৃষক, খাদ্য সংগ্রহকারী এবং পশুপালকের এক ধরণের সংকর (Hybrid) সমাজ।

    অ্যারন বাস্তানি: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, এটা মূলত একটা সামাজিক পছন্দ ছিল যা তারা নিজেরা নিয়েছিল।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই তাই ছিল। কারণ আমি আর কোনোভাবেই এটা কল্পনা করতে পারি না যে, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষ শস্য চাষের মতো একটা অনুশীলনের দিক থেকে হুট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। এটা তো অবচেতনভাবে ঘটা সম্ভব নয়। এখানে জলবায়ুগত কোনো বড় বিপর্যয় বা জনশূন্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রমাণও নেই। এর মানে দাঁড়ায় মানুষ স্রেফ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর কৃষিজীবী হয়ে থাকতে চায় না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো আসলেও অনন্য। মানুষ যে এই ধরণের নির্মাণ কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিল, তার পেছনে নিশ্চয়ই খুব অসাধারণ কিছু ঘটেছিল। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর তুলনা হতে পারে এমন যে—আমরা হুট করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে শিল্প বিপ্লব আসলে কোনো ভালো আইডিয়া ছিল না অথবা আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি  ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা অবশ্য এই পরিভাষায় ভাবছিল না। তবে এটা একটা প্রশ্ন তো তুলেই দেয়, তাই না? আমাদের শেখানো হয় যে সেই আদিম সমাজগুলো অত্যন্ত আদিম বা ‘প্রিমিটিভ’ ছিল; কিন্তু তারা যদি ওই মাপের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে আমরা এখন এই ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এত হিমশিম খাই কেন? আর এটাই আমাকে আমাদের দর্শকদের জন্য বইটির মূল প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যারা মূলত রাজনৈতিক সচেতন দর্শক। যদি ইতিহাসের এই জেনেরিক ‘যুগবিভাজনের তত্ত্ব’ ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কিন্তু বিশাল। কারণ এটিই হলো লক, রুসো বা হবসের মতো আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি। আবার বর্তমানে স্টিফেন পিঙ্কার বা ইউভাল হারারিদের মতো মানুষদেরও ভিত্তি এটি। কারণ তাদের মূল বক্তব্যই হলো—সমাজ যত জটিল হবে, সেখানে বৈষম্য আর অন্যায় তত বাড়বে। তবে যেহেতু এটা প্রাচুর্য তৈরি করে, তাই এর পেছনে এক ধরণের উপযোগবাদী যুক্তি (Utilitarian argument) দেওয়া হয়। আপনি এমন কিছু লেখক আর বইয়ের কথা বলছেন যারা কখনও কখনও সরাসরি দুই বা তিনশ বছর আগের সেই দার্শনিকদের মডেল অনুসরণ করেন। অনেকে তো সরাসরি বলেনও যে আমি একজন ‘নব্য-হবসিয়’ (Neo-Hobbesian) বা ‘নব্য-রুশোইও’ (Neo-Rousseauan)। এটা বেশ মজার। আমি আর ডেভিড যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম ভাবতে শুরু করি, তখন সময়টা ছিল ২০০৮-০৯ সালের সেই বড় আর্থিক ধ্বসের কাছাকাছি। সেসময় বৈষম্য এবং বৈষম্যের মূল শিকড় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল। হঠাৎ করেই সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পুরনো ধারণাগুলো খুব আগ্রাসীভাবে ফিরে এলো। মানুষ আবারও হবস বা রুসোর কাছে ফিরে যেতে চাইল। আপনি যেমনটা বললেন, আমরা আসলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠগুলো নিয়েই কথা বলছি। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে সেগুলো ছিল পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত বা অনুমিত (Speculative)। লক্ষ বছর আগের মানব সমাজের প্রকৃতি কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোনো বাস্তব তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সেই দার্শনিকরা স্রেফ নিজেদের কল্পনা থেকে সেগুলো তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ এগুলো হলো প্রাগৈতিহাসের এক কাল্পনিক জগত। একথা ভাবলে বেশ অবাক লাগে যে, আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা আসলে এমন কিছু কল্পনা থেকে এসেছে যার শিকড় প্রোথিত ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। যেমন, ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan) ১৬৫১ সালে লেখা হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মাঝখানে। সেখানে মূলত সরকারহীন সমাজের প্রকৃতি এবং সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। রুশো মারা গিয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ১০ বছর আগে। তিনি যখন বৈষম্যের উৎস কী—এই প্রশ্ন তুলছেন, তখন সেটা ছিল তাঁর সময়ের এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। তাই এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক কল্পনার চর্চা ছিল। সেই সময়ে এসব চিন্তা হয়তো বৈপ্লবিক ছিল। কিন্তু আমাদের হাতে যখন এখন এত নতুন তথ্য আর প্রমাণ আছে, তখন কেন আমরা ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে ১৭৫৪ সালের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো নিয়ে পড়ে থাকব? কেন আমরা এখনও এই স্থবির বা জড় পদ্ধতিতে একই প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছি? এই জিজ্ঞাসা নিজেই একটা বড় প্রশ্ন।

    অ্যারন বাস্তানি : আপনি একজন একাডেমিক, আপনি ইউসলে (UCL) আছেন। আমিও তো ইউসিএলে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের কিছু মডিউল পড়েছিলাম। আমাদের কী পড়ানো হয়? রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠ: হবস, লক, প্লেটো, রবার্ট নজিক এবং একটু সমসাময়িকদের মধ্যে জন রল্‌স। কিন্তু এরা সবাই তো কার্যকরভাবে লক আর হবসের সেই প্রারম্ভিক উদারতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের চিন্তা গড়ে তুলেছেন। সেখানে মূলত শেখানো হয় যে কেন আপনার রাষ্ট্রকে মেনে চলা উচিত। আর আপনি যেমনটা বলছেন, এগুলো কয়েকশ বছরের পুরনো কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই আধুনিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছি, যেখানে আমরা তথাকথিত প্রত্যক্ষণবাদের (Empiricism) উপর অগাধ আস্থা রাখি। অথচ আমাদের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার যে মূল ভিত্তি, তা আসলে পুরোপুরি ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো : এই প্রসঙ্গটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যার একটা ভালো উদাহরণ। কারণ আপনি যেখানে ওই বিষয়গুলো পড়ছিলেন, তার ঠিক পাশেই ছিল আমার কর্মস্থল। ২০০৩ সালের কথা বলছেন? তার মানে আপনি যেখানে লক বা রল্‌স সম্পর্কে শিখছিলেন, তার ঠিক কোণায় গেলেই ছিল ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি’। আমি সম্ভবত তখন থেকেই সেখানে পড়ানো শুরু করেছি। তার মানে খুব কাছেই একদল মানুষ আসলে মানুষের প্রাগিতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিই এমন যে, এগুলোকে আলাদা আলাদা বিভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। ফলে জ্ঞানের যে আদান-প্রদান খুব স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা আর হয় না। আমাদের হাতে এখন যা তথ্য আছে, তার আলোকে বিষয়গুলো এখন কেমন দেখায় এবং এর তাৎপর্য কী— সেই জিজ্ঞাসাগুলো নিয়ে আর আলাপ হয় না। প্রত্নতত্ত্বের ছাত্ররা সম্ভবত সেই দার্শনিকদের কথা ভাবত না, আবার যারা ওই দার্শনিকদের কথা পড়ত, তারা সম্ভবত মানুষের সুদূর অতীতের ইতিহাস আর প্রমাণগুলো নিয়ে ভাবত না। আমার মনে হয় এই বিষয়টি একটা বড় সমস্যা। এক কথায় বলতে গেলে আমরা শেখার এক বিশাল সুযোগ হারিয়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি : কিন্তু এই পরিস্থিতি কি একাডেমিকদেরও এক ধরণের ব্যর্থতা নয়? মানে, মেধাবী পেশাজীবীরা তরুণদেরকে এই ধরণের ভিত্তিহীন কথা বা ‘ননসেন্স’ শেখাচ্ছেন— এমন কাজকর্ম তো পুরোপুরি পাগলামি বলেই মনে হয়। অথচ বিষয় হিসেবে এই আলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, এটাকে কেবল ভিত্তিহীন কথা হিসেবে পড়ানোর দরকার নেই; আপনি এটাকে একটা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও দেখতে পারেন। এগুলো পাঠ করা জরুরি, তবে সেই পাঠ করতে হবে তার সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই। আসলে আপনি যদি এই টেক্সটগুলো খুঁটিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন সেগুলো যে স্রেফ কল্পনাপ্রসূত (speculative), তা লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন। যেমন রুশো যখন ওই যে আপনি শুরুতে যেটা বলছিলেন—মানে কৃষিকাজ আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবিষ্কার কীভাবে আমাদের নতুন ধরণের জীবনযাত্রায় আটকে ফেলেছে—সেই গল্পটা বলার সময় এক জায়গায় স্পষ্ট করেই বলেছেন: এই আলাপকে ইতিহাস হিসেবে নেবেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন ওই আলাপ মূলত একটা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই হয়েছিল যেন আপনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এই দুনিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। এই আলাপ কোনো ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আপনি যেসব আধুনিক লেখকের কথা বললেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব অদ্ভুতভাবে বদলে গিয়েছে। যা একসময় স্রেফ কল্পনাপ্রসূত আলোচনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, এখন সেই বয়ানগুলোকেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) বা ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিই আসলে আমাদের—মানে নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিড আর প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে আমাকে—এক ধরণের ধাক্কা দিয়েছিল। আমাদের মনে হয়েছিল, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না; আমাদের কিছু একটা করা দরকার। মূলত সেই তাড়না থেকেই আমরা আমাদের এই অসাধারণ জ্ঞানভাণ্ডারকে বর্তমানের এই সব বিচ্ছিন্ন পরিপ্রেক্ষিত (siloed contexts) থেকে মুক্ত করার কাজটা শুরু করি। পে-ওয়াল জার্নালের (paywall journals) দেয়াল ভেঙে আমরা মানব ইতিহাসের সেই রহস্যের জটগুলো খুলতে শুরু করি যা এখনও গ্রন্থিবদ্ধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্যগুলো আমাদের হাতে আছে, তা থেকেই বলা যায় যে—আলোকায়ন (Enlightenment) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা ইতিহাসের যে বয়ান পেয়েছি, বাস্তব ইতিহাস মোটেও তেমন নয়।

    অ্যারন বাস্তানি : চলুন আদিবাসী আমেরিকান সমাজ নিয়ে একটু আলাপ করি। এই বিষয়ে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে আপনারা বইটিতে যেসব সোর্স মেটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন, সেগুলো সত্যিই খুব প্রভাবশালী। গত কয়েক বছরে আমি নিজেও অনেক নতুন কিছু শিখেছি। চলুন আবারও সেই ধরাবাঁধা ধারণা (stereotypes) আর প্রচলিত জ্ঞান (received wisdom) নিয়ে একটু কথা বলি। প্রচলিত ধারণাটা হলো—ইউরোপীয়রা ১৪৯২ সালে পশ্চিম গোলার্ধ  আবিষ্কার করে। আমরা না হয় লেইফ এরিকসনকে আপাতত পাশে সরিয়েই রাখলাম—আমি আসলে মাত্রই সুইডেন থেকে ফিরেছি।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ওরা কিন্তু এরিকসনের কথা ভোলেনি।

    অ্যারন বাস্তানি: একদমই ভোলেনি! নর্ডিক (Nordic) দেশগুলো ওই বিষয়টা বেশ ফলাও করে প্রচার করে, তাই না? তো আমরা যে ধারণাটা নিয়ে চলি তা হলো—আমরা মূলত একটা অনগ্রসর সভ্যতাকে আবিষ্কার করেছিলাম এবং তারপর বন্দুক, জীবাণু আর ইস্পাত—অর্থাৎ ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ (Guns, Germs, and Steel) [ জারেড ডায়মন্ডের বিখ্যাত বই Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies দ্রষ্টব্য] সমন্বয়ে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই বয়ানটা তো পুরোপুরি সঠিক নয়, তাই না?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই নয়। অতিমারির পর যাতায়াত ব্যবস্থা যখন আবারও স্বাভাবিক হলো, তখন গত বছর আমি কানাডা আর আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আদিবাসী গবেষক আর ইতিহাসবিদদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ডেভিডের সাথে লেখা বইটিতে কলম্বাস-পূর্ব আমেরিকা এবং ইউরোপীয় উপনিবেশকারী ও আদিবাসীদের মধ্যকার প্রাথমিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু আছে। সত্যি বলতে, এই ক্ষেত্রটি আমাদের দুজনের কারোই মূল গবেষণার বিষয় ছিল না। নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিডের কাজের ক্ষেত্র ছিল মাদাগাস্কার, আর আমার পিএইচডি এবং বেশিরভাগ মাঠপর্যায়ের গবেষণা ছিল উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক নতুন কিছু শিখতে হয়েছে। তবে আমরা শুরুতে যে প্রশ্নটা নিয়ে কাজ করছিলাম—বিশেষ করে বৈষম্যের উৎস কী—তার উত্তর খুঁজতে এই পথেই হাঁটতে হয়েছে। আপনি যদি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের সাহিত্য বা রুসোর মতো চিন্তাবিদদের দিকে তাকান, তবে দেখবেন যে সেই সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে যেসব ধারণা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল, সেখানে আপনি আমেরিকাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার সেই অংশটি—যা বর্তমানে কানাডা এবং আপস্টেট নিউ ইয়র্কের মাঝে বিভক্ত; মূলত গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং যেটাকে অনেক সময় ইস্টার্ন উডল্যান্ডস বলা হয়। সেখানেই ইউরোপীয়রা এমন কিছু সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল যাদের জীবনযাত্রা ছিল আমূল ভিন্ন। তারা ছিল অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। বিশেষ করে নারীদের সেখানে যে ধরনের স্বাধীনতা ছিল, তা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে অকল্পনীয় ছিল। আর এসবের প্রভাবে ইউরোপীয়দের রাজনৈতিক কল্পনায় এক বিশাল প্রভাব পড়েছিল। আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে কয়েকশ বছরের পুরনো ওইসব গৎবাঁধা প্রশ্ন আর গল্পের ফাঁদে পা দেব না, তখন আমাদের বুঝতে হলো যে ওই ধারণাগুলো আদতে এলো কোথা থেকে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলেই আপনাকে আমেরিকার দিকে তাকাতে হবে। এ কারণেই বইটির একটা বড় অংশ জুড়ে আমেরিকা গুরুত্ব পেয়েছে।

    অ্যারন বাস্তানি: কোন্দিয়ারোঙ্ক নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। সম্ভবত আপনার ফ্রেঞ্চ উচ্চারণটা বেশ ভালো। আমি প্রস্তুতির জন্য এ বিষয়ক কিছু ভিডিও দেখেছি। তিনি তো আসলে বাস্তবের একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই। আপনি চাইলে গুগলে ‘গ্রেট পিস অব মন্ট্রিল’ নামের ১৭১১ সালের একটি চুক্তির ছবি দেখতে পারেন, যেখানে কোন্দিয়ারোঙ্কের স্বাক্ষর বা চিহ্ন আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: তো কোন্দিয়ারোঙ্কের গুরুত্বটা আসলে কোথায়? তিনি কে ছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: কোন্দিয়ারোঙ্ক ছিলেন হুরন-ওয়েনডাট নেশনের (Huron-Wendat Nation) একজন অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। এই জাতিসত্তাটি কিন্তু আজও টিকে আছে। কুইবেক সিটির উপকণ্ঠে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্রটি অবস্থিত। আমি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে ‘কোন্দিয়া’ নামে ছোট একটা রাস্তা আছে। আমরা মজা করে বলছিলাম যে রাস্তাটা হয়তো এখন আরও বড় করা উচিত কারণ আমাদের বইয়ে তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে আমরা বেশ কিছু স্বতন্ত্র বিবরণ পাই যা থেকে জানা যায় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি কূটনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং নিজের জাতির মানুষের জন্য এক উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফরাসি, ইংরেজ আর ওলন্দাজ উপনিবেশকারীদের সঙ্গে জটিল পরিস্থিতির মাঝেও তিনি যেভাবে দর কষাকষি করেছিলেন, তা এক কথায় অনন্য। তিনি বহুভাষী ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আর চমৎকার বক্তা। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন বিবরণ আমাদের এসব তথ্য দেয়। তবে ইতিহাসের কিছু কাকতালীয় কারণে কোন্দিয়ারোঙ্ক এবং তৎকালীন ইউরোপীয়দের মাঝে ঘটে যাওয়া সেইসব কথোপকথন আর চিন্তাভাবনাগুলো ইউরোপের বিশাল জনসমষ্টির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা জানতে পারি, সেই সময় ‘নিউ ফ্রান্স’ বা কলোনির সেই অংশের গভর্নর কোন্দিয়ারোঙ্ককে নিয়মিত নিজের টেবিলে দাওয়াত দিতেন কেবল বিতর্কের নেশায়। গভর্নর নিজেই বলেছিলেন, তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বিনোদনের জন্য এই কাজটা করতেন কারণ লোকটা ছিল ভীষণ রসিক আর উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন। তাঁরা এমন অনেক বিষয়ে বিতর্ক করতেন যা পরবর্তীতে আলোকায়নের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল; যেমন যুক্তি বনাম ধর্মবিশ্বাস, বিয়ের রীতি, স্বাধীনতার প্রশ্ন কিংবা সমাজে অর্থের ভূমিকা। সেইসব কথোপকথনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে একজন সামান্য ফরাসি উচ্চবিত্ত মানুষ ছিলেন যার নাম ছিল ব্যারন লাহোন্তাঁ। তিনি খুব অল্প বয়সে কলোনিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক দশক ছিলেন এবং অন্তত দুটি আদিবাসী ভাষা জানতেন। তিনি সেই উত্তাল সময়ের পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তবে তিনি কিছুটা গোলমেলে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলার কারণে তাঁকে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং এক সময় তিনি আমস্টারডামের রাস্তায় কপর্দকহীন অবস্থায় দিন কাটাতেন। তখন তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীমূলক বইগুলো লিখতে শুরু করেন এবং আবারও রাজদরবারের অনুগ্রহ পান। তাঁর সেই বইগুলোর একটির নাম ছিল কিউরিয়াস ডায়ালগস উইথ এ স্যাভেজ অব গুড সেন্স (Curious Dialogues with a Savage of Good Sense)। সেখানে লেখক নিজের চরিত্রের সাথে ‘আদারিও’ নামের এক চরিত্রের কথোপকথন তুলে ধরেছেন। আর সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই আদারিও চরিত্রটি আসলে কোন্দিয়ারোঙ্কের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। এই সংলাপে আদারিও বা কোন্দিয়ারোঙ্ক ইউরোপীয় সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ আর বিধ্বংসী বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। আর এই বইটিই তখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বইটি ছিল সেই সময়ের ‘বেস্টসেলার’। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় বইটির অনুবাদ হয় এবং বছরের পর বছর মঞ্চনাটক চলে। পরবর্তীতে প্রায় সব বড় আলোকায়নের চিন্তাবিদই এই ধরণের সংলাপ বা ‘ডায়ালগ’ লেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা তাঁদের মূল বক্তব্যগুলো কোনো এক কাল্পনিক বিদেশি চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিতেন; তিনি হতে পারেন তাহিতি বা চীনের কোনো নাগরিক। কিন্তু এইসব ঘটনার মূল প্রেক্ষাপটটি ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত আর বিনিময়ের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর আমরা বলতে চাইছি, ইউরোপীয় চিন্তাধারার ওপর এসব ঘটনার প্রভাব ছিল এক কথায় বিস্ফোরক।

    অ্যারন বাস্তানি : তার মানে ভলতেয়ার বা দিদেরোর মতো কোন্দিয়ারোঙ্ককেও আমাদের আলোকায়নের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুধু তাই নয়, তিনি তো তাঁদের সবার অন্তত কয়েক দশক আগের। তাই ইউরোপের সেই বিখ্যাত সব ‘স্যালঁ’ বা বৈঠকখানাগুলো গড়ে ওঠার আগেই সেখানে এক ধরণের প্রায়-আলোকায়িত (proto-Enlightenment) স্যালঁ তৈরি হয়েছিল। আপনি একে ‘আদিবাসীদের সমালোচনা’ বলতে পারেন। আসলে এখন এইসব পড়ার সময় মনে হয়, বিষয়টা তো বেশ স্পষ্ট। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর ধরে আমেরিকা আর ইউরোপের মাঝে সংস্কৃতির এক ব্যাপক আদান-প্রদান চলেছে। ফলে সেখানে এই ধরণের সংলাপ আর ইউরোপে সেই আইডিয়াগুলোর সঞ্চারিত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকার এই উপনিবেশায়ন আর শোষণের ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক বিনিময়ের বিষয়টা আমাদের ধারণায় তেমন একটা আসেই না। মনে করা হয় আইডিয়া, পুঁজি আর মানুষ — সবই কেবল একপাক্ষিকভাবে ইউরোপ থেকে এসেছে। কিন্তু আপনি যেটা বলছেন তা গ্লোবাল নর্থের  (global North) বাইরের দেশগুলোর জন্য বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই যে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এক ধরণের আদিবাসী চিন্তাধারা বা ঘরানা ইউরোপীয় আলোকায়নের ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছে — এটা আসলেও এক বিশাল ব্যাপার।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: তাই নয় কি? আসলে একথা যে আমাদের আলাদা করে প্রমাণ করতে হচ্ছে, সেটাই বেশ অদ্ভুত। নয়তো একথার মানে কী দাঁড়ায়? এই মানুষগুলো কি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো জগতে বাস করত? সেটা তো সম্ভব নয় কারণ আমরা বাণিজ্য আর সামরিক মিত্রতার এক নিবিড় সম্পর্কের সময়ের কথা বলছি। সেই সময় ইউরোপীয়রা যে আমেরিকার অনেক বস্তুগত অভ্যাস গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। এমনকি পাইপে তামাক খাওয়া বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করার মতো অভ্যাসগুলোও তো ছিল এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনারই অংশ। অথচ সেই বস্তুগত অভ্যাসের সাথে সাথে যে আইডিয়া বা চিন্তাভাবনাও আসতে পারে, তা মানতে কেন জানি এক ধরণের তীব্র অনীহা কাজ করে। বিষয়টি বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আমরা আসলে শুধু একথা বলতে চাইছি যে, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা নিয়ে যেসব আইডিয়া আলোকায়নের দার্শনিকরা খোদ আমেরিকার ওপর আরোপ করেছিলেন, সেগুলো আসলে ওখানকার আদিবাসীদেরই ছিল। স্বাধীনতার এই ধারণাগুলো শোষিত বা ঔপনিবেশিক মানুষের কাছ থেকে আসেনি, বরং প্রাচীন গ্রিস (Greece) বা ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের মাটি থেকে এসেছে, আমি মনে করি এভাবে চিন্তা করাটা শোষিত মানুষের জন্য অসম্মানজনক। যারা এখনও বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেননি, তাদের জন্য বলছি, শোষণের হাত থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেই আইডিয়াটা আসলে শোষিত মানুষের কাছ থেকেই আসে। আর এই উপলব্ধিটাই হলো আসল মুক্তি।

    অ্যারন বাস্তানি : আমেরিকার কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কথা বলা যাক। কাহোকিয়া (Cahokia) নামে একটা জায়গা আছে। খুব বেশিদিন আগে না, আমি প্রায় আট মাস আগে সেখানে গিয়েছিলাম। তো, প্রায় হাজার বছর আগে এই জায়গাটা আয়তনে লন্ডনের সমান ছিল। মানে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে কয়েক হাজার মানুষের বসতি ছিল; বড় অংকে বলতে গেলে এই বসতির স্বর্ণযুগে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজারের মতো। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের বড় কোনো নগরের সাথে বসতিটি তুলনা চলত। তো এই জায়গাটার আসলে কী হয়েছিল?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এটা অত্যন্ত চমৎকার এবং কিছুটা বিতর্কিত একটি বিষয়। তবে এটা পরিষ্কার যে জায়গাটা একসময় বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, যাদের মধ্যে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর জীবনের প্রায় ৩০ বছর ওখানে কাজ করেছেন। ওটা বেশ দারুণ ছিল কারণ আপনি যখন সেখানে যাবেন, আপনার সামনে দেখার মতো খুব বেশি কিছু নেই। সেখানে মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) নামে বিশাল এক ঢিবি আছে। এর বাইরে আরও অনেক ধরণের মাটির কাজ আর ঢিবি আছে এবং সেগুলো আকারে বিশাল। জায়গাটা এখন একটা ন্যাশনাল পার্কের মাঝখানে, যার ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত উত্তর আমেরিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী হেরিটেজ প্রত্নস্থানের (Heritage sites) কপালে এমনটাই ঘটেছে। রাস্তার ধারে বেশ ভালো মেক্সিকান খাবার পাওয়া যায়, ছোট ছোট রেস্তোরাঁ আছে। আসলে আপনি উত্তর আমেরিকার কলম্বাস-পূর্ব সময়ের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনপদ বা নগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক বছর ধরে সেখানে কাজ করেছেন। একসময় এই বসতি একটি পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল; হয়তো আমরা যেভাবে সাম্রাজ্য বুঝি ঠিক সেভাবে না। কিন্তু মিসিসিপি অববাহিকা জুড়ে কাহোকিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য। সেখানে যে একধরণের হায়ারার্কি বা উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর বৈষম্য ছিল, তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন একটি ঢিবি পাওয়া গিয়েছে যেটা তরুণীদের মৃতদেহের অবশেষে ভরা ছিল; মনে করা হয় কোনো এক ভয়ংকর আচারের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। আবার মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) থেকে পুরো জনপদের ওপর নজরদারি করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। আমরা জানি যে যখন এই জায়গাটি কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে, তখন আশেপাশের গ্রামাঞ্চলগুলো জনশূন্য হয়ে যায়। আপনি সেখান থেকে ঘরবাড়ির এলাকাগুলো দেখতে পেতেন; দুর্গের মতো দেয়ালও তৈরি হতে শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল সমাজটা ওই হায়ারার্কির দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু এরপরই সব বদলে যায়। এলাকাটি পরিত্যক্ত হয় এবং মানুষ সেখান থেকে চলে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কাহোকিয়ার চারপাশের পুরো অঞ্চলকে একধরণের ‘জনশূন্য অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জায়গাটা যেন একসময় পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল; এমনকি আমরা এই জায়গাটার আসল নামও জানি না। পরবর্তীকালের কথ্য ইতিহাসে এই বসতির তেমন কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার মানে মানুষ কোনো এক কারণে কাহোকিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে, যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়—যা আমার মতে খুব একটা জোরালো যুক্তি নয়। বর্তমানে মানুষ একে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পুয়েবলো (Pueblo) সভ্যতার মতোই দেখছে—যেখানে অনেক বড় বড় কেন্দ্রীভূত প্রত্নস্থান হুট করে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তো আমরা কেন অন্তত এই সম্ভাবনাটা বিবেচনা করব না যে—মানুষ আসলে সচেতনভাবেই ওই জায়গা থেকে চলে গিয়েছিল? তারা হয়তো এক নতুন ধরণের সামাজিক ব্যবস্থা আর নিয়মকানুন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনি যখন বিষয়টাকে এভাবে দেখবেন, তখন কয়েকশ বছর পর ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলে যে ধরণের সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল, সেগুলোর যোগসূত্র মেলাতে পারবেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও বেশ হায়ারার্কিকাল ছিল—যেন ছোট ছোট কাহোকিয়া। কিন্তু অন্যরা অত্যন্ত সাম্যবাদী (egalitarian) জীবনযাপন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল। ইউরোপীয়রা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিল যে তারা বোধহয় সবসময় এমনই ছিল। কিন্তু আমরা এখানে এমন মানুষদের কথা বলছি যাদের ইতিহাস সচেতনতা ছিল প্রখর; তাদের নিজেদের ইতিহাসে কাহোকিয়া আর তার বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থার কথা ছিল। ফলে সেখানে এক ধরণের হায়ারার্কিকাল অতীত ছিল যেখান থেকে মানুষ কোনো না কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং এক নতুন সমাজ গঠন করেছিল। বইটাতে আমরা এ নিয়ে বেশ বিশদ আলোচনা করেছি কারণ এটি ওই ধারণাকে ভেঙে দেয় যে—আদিবাসী মানুষরা কোনো একটা সাংস্কৃতিক ছাঁচে স্থির হয়ে আছে অথবা তাদের কোনো ইতিহাস নেই।

    অ্যারন বাস্তানি: তেওতিওয়াকান (Teotihuacan) নামে আরেকটা দারুণ উদাহরণ আছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: উচ্চারণটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে আমার মেক্সিকান সহকর্মী বলেন যে ওখানকার পণ্ডিতরাও সবসময় ‘তেওতিওয়াকান’ (Teotiwa-kan) উচ্চারণ করতে পারেন না। যাই হোক, আমরা সম্ভবত ওটা নিয়েই কথা বলছি। আকার, আয়তন আর জাঁকজমকের দিক থেকে এই নগরটি ছিল রোমের প্রতিদ্বন্দ্বী। এটি ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আর কর্তৃত্ববাদী। এরপর সেখানে কিছু একটা বদল আসে। আপনি বইতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি যেন পশ্চিম গোলার্ধের এক ‘প্যারিস কমিউন’। প্রত্নতাত্ত্বিক রেনে মিলনের (Rene Millon) কথা বলতে হয় যিনি এর এক অসাধারণ মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতে আমরা ওই ম্যাপটি ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছি। তিনি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি সারভে পরিচালনা করেছিলেন। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর স্বর্ণযুগে এখানে রক্ষণশীল হিসেবে ১ লাখ মানুষের বসতি ছিল, কেউ কেউ সংখ্যাটা এর দ্বিগুণ বলেন। মিলন এবং পরবর্তী গবেষকরা দাবি করেন যে সেখানে জনসংখ্যার ভাগ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। শুরুতে সমাজটি ছিল অত্যন্ত হায়ারার্কিকাল। আপনি যদি আজ সেখানে পর্যটক হিসেবে যান বা গুগলে ছবি দেখেন, তবে সূর্যের পিরামিড (Pyramid of the Sun) এবং চাঁদের পিরামিড (Pyramid of the Moon) নামে দুটি বিশাল স্থাপনা দেখতে পাবেন। এছাড়া টেম্পল অব দ্য ফেদারড সার্পেন্ট (Temple of The Feathered Serpent) নামে আরেকটি বড় স্থাপনা আছে। এগুলো অবশ্য পরবর্তীকালে অ্যাজটেকদের দেওয়া নাম; আমরা জানি না আদি নাম কী ছিল। তো শুরুটা ছিল হায়ারার্কিকাল এবং সেখানেও আচারগত নরবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরামিডের ভিত্তির নিচে বন্দিদের মৃতদেহ পুঁতে রাখা হতো; তাদের হাত পেছনে বাঁধা থাকত। কিন্তু ২৫০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছু একটা বদলে গেল। এরপর ওই বিশাল মাপে আর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা মন্দির তৈরি হয়নি। মন্দির আর পিরামিড তৈরির পেছনে যে শ্রম আর সম্পদ ব্যয় হতো, তা অন্য কাজে ব্যবহার শুরু হলো। আর সেই কাজটি ছিল আবাসন বা হাউজিং। তারা পুরো জনপদ জুড়ে গ্রিড পদ্ধতিতে চমৎকার সব অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড তৈরি করল। এগুলো খুব একটা উঁচু ছিল না; অনেকটা ভিলার মতো ছিল যেখানে কয়েকটি ছোট পরিবার একসাথে থাকতে পারত। মাঝখানে বিশাল উঠান, মেঝের নিচ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দেয়ালে চমৎকার সব ম্যুরাল চিত্র ছিল। শুরুতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন এগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তারা ভেবেছিলেন এগুলো বোধহয় রাজপ্রাসাদ। পরে তারা বুঝতে পারলেন যে ওই নগরের সবাই আসলে রাজপ্রাসাদেই বাস করত! এখন আমরা বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমাদের কাছে তখনকার কোনো লিখিত উৎস নেই। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে সেই সময় থেকে ওই নগরের মানুষের জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক উন্নত এবং তা নগরের পুরো জনসংখ্যার জন্যই সাধারণ ছিল। এটি সত্যিই অসাধারণ। আপনি যেমন ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ কথা বলছিলেন। আমরা যদি কয়েকশ বছর এগিয়ে ১৬শ শতাব্দীর সেই স্প্যানিশ দখলদারিত্বের বিজয়ের সময়ের কথা ভাবি তাহলে সেসময়ের বিবরণগুলোতেও নানা ধরণের নগরের কথা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত তেনোচতিৎলান (Tenochtitlan), মন্টেজুমা আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য নিয়ে ভাবি। এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল খুব উচ্চ-নীচ ভেদাভেদের শ্রেণিবিন্যস্ত/হায়ারার্কিকাল। কিন্তু হার্নান করতেস এবং তাঁর কনকুইস্তাদোররা (Conquistadors) যে নগরের সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তার নাম ছিল ত্লাসকালা (Tlaxcala)। তেনোচতিৎলান আর ত্লাসকালার সম্পর্ক ছিল অনেকটা এথেন্স আর স্পার্টার মতো। একটি ছিল ভীষণ হায়ারার্কিকাল, অন্যটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক। ত্লাসকালা ছিল একধরণের প্রজাতন্ত্র, যেখানে নিজস্ব পার্লামেন্ট ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় সেখানে হওয়া বিতর্কগুলোর রেকর্ডও পাওয়া যায়। অথচ আমাদের বিশ্ব ইতিহাসে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। আমাদের শেখানো হয় যে তেনোচতিৎলানের পতনই ছিল পশ্চিমা বিশ্ব-আধিপত্যের শুরু। কিন্তু আমাদের এটা শেখানো হয় না যে ওই পথের একটি ধাপ ছিল ইউরোপীয় বিজেতাদের সঙ্গে একটি আদিবাসী নগর গণতন্ত্রের এক অসাধারণ মোলাকাত। আমি ওই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলতে দ্বিধাবোধ করি না। কারণ সেই সময় ইউরোপেও এই ধরণের নগর খুব একটা দেখা যেত না। করতেস নিজেই স্পেনের রাজাকে চিঠি লিখেছিলেন যে, আমি এমন এক জায়গা খুঁজে পেয়েছি যেখানে কোনো রাজা নেই। এই রাজ্য অনেকটা আমাদের ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের মতো অন্য কোনো নীতিতে চলে। এসব তথ্য সামনেই আছে। কিন্তু ইতিহাসে এই তথ্যগুলোকে কখনোই সেই প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন এক আদিবাসী নগর ব্যবস্থা। তেওতিওয়াকানে (Teotihuacan) যা ঘটেছিল তা মূলত ছিল এক সামাজিক বিপ্লব।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, একদমই তাই। ওই প্রত্নস্থানের অনেক বিশেষজ্ঞও মনে করেন যে সেখানে এমন কিছু একটা ঘটেছিল। প্রত্নতত্ত্বে সাধারণত সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন। তবে সবাই এটুকু স্বীকার করেন যে সেখানে এক আমূল রূপান্তর ঘটেছিল। এমন আলামত অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ মানব ইতিহাসের প্রথাগত বয়ানে আমাদের শেখানো হয় যে, জনসংখ্যা যখন খুব ঘন হয় এবং একবার হায়ারার্কি বা ভেদাভেদ তৈরি হয়, তখন তা আর ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে আমরা উল্টোটা দেখছি।

    অ্যারন বাস্তানি: হ্যাঁ, আপনি যেমনটা বলেছেন যে পশ্চিমা রাজনৈতিক ইতিহাসে বলা হয় হাইতি বিপ্লবের আগে কোনো সফল দাস বিদ্রোহ ছিল না। আমাদের জানা মতে এই ধারণা মোটামুটি সঠিক হলেও আমেরিকায় হয়তো বিষয়টা অন্যরকম ছিল। আপনি বইতে একটা চমৎকার আলংকারিক প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা যখন দাসপ্রথা বিলোপ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা সিমন বলিভার বা তুসঁ লুভর্তুয়রের কথা বলি। কিন্তু সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথা আরও অনেকবার বিলুপ্ত হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই বয়ানগুলো আসলে এক ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিকতা। ভাবা হয় যে অন্য কোথাও হয়তো এসব ঘটেছে কিন্তু ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে না ঘটা পর্যন্ত তার যেন কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন চিন্তাভাবনা এক ধরণের ছাঁকুনি যা ইউরোপকে প্রগতিশীল রাজনীতির একচেটিয়া অধিকার দিয়ে দেয়। চরম পর্যায়ে গেলে এই চিন্তাভাবনাই আবার উপনিবেশায়ন আর গণহত্যার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বলা হয় যে আমরাই তো গণতন্ত্রের মতো সব প্রগতিশীল ধারণা নিয়ে এসেছি যা অন্য কোথাও ছিল না। ফলে তাদের জনপদ ধ্বংস করা বা মানুষ মারার দায়টা ঢাকা পড়ে যায়। তারা বলে যে, অন্তত আমরা তো তাদের একধরণের স্থবিরতা থেকে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছি। অথচ আমরা বইতে দেখিয়েছি যে ইউরোপের বাইরের জগতেও সচেতন রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক বিশাল জগৎ ছিল এবং তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার গবেষণার ক্ষেত্র হলো পশ্চিম এশিয়া আর উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা। যদিও আপনি আমেরিকার বিষয়েও খুব স্পষ্ট ধারণা রাখেন এই ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল বইয়ের জন্য আপনাকে গবেষণা করার কারণে। আমি যেটা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো, তুরস্কের গোবেকলি তেপে (Gobekli Tepe) কিংবা মাল্টার সেই মেগালিথিক প্রত্নস্থানগুলো প্রসঙ্গে। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু শহর বা নগর যদি কৃষির আগে থেকে থাকে—তবে কি এমনটা হওয়া সম্ভব যে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ (Homo sapiens) রা অন্য কোনো আদি মানবের (Archaic humans) সাথে একসাথে কোনো নগর পরিবেশে বাস করত? কারণ নিয়ানডার্থালরা তো ইউরোপে বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল। আপনার কি মনে হয় এমন কোনো স্থায়ী জনপদ থাকা সম্ভব যেখানে তাদের একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি ব্যক্তিগতভাবে গোবেকলি তেপেকে (Gobekli Tepe) এই আলোচনায় আনব না কারণ ওটা অনেক পরের ঘটনা; তখন নিয়ানডার্থালরা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা প্রায় ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কথা বলছি। আমি গোবেকলি তেপেকে নগর হিসেবেও সংজ্ঞায়ন করব না। আমি মনে করি গোবেকলি তেপে এমন এক প্রত্নস্থান যেখানে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল এবং এক নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল সংখ্যায় মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, আমি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। এখানে তো একটি স্থায়ী স্থাপনা ছিল। তো, এমন কোনো জায়গায় মানুষের সাথে অন্য কোনো আদি মানবের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা আছে কি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমরা যদি আরও অনেক পেছনে—ধরুন প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে ফিরে যাই—তবে আমরা জানি যে তখন পৃথিবীতে অন্তত চার বা পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতির মানুষ ছিল। আমরা ছিলাম, নিয়ানডার্থালরা ছিল, ডেনিসোভানরা (Denisovans) ছিল; ইন্দোনেশিয়ায় ছিল হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস (Homo floresiensis), যাদের ভালোবেসে ‘হবিট’ (Hobbits) বলা হয়। এছাড়া ফিলিপাইনের লুজান দ্বীপেও আরও কিছু সাম্প্রতিক আবিষ্কার হয়েছে। আধুনিক সময়ে এমন তুলনীয় পরিস্থিতি নাই যখন মানুষেরই বিভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করছে। আমরা জেনেটিক্যালি জানি যে তাদের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং আন্তঃপ্রজাতি প্রজননও হয়েছিল। আসলে আপনি যখন আমাদের প্রজাতির উৎসের আরও গভীরে যাবেন, তখন চিত্রটা এমনই দেখাবে। আমরা এখন আফ্রিকার কথা বলছি। এক সময় ধারণা করা হতো এক ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ (Mitochondrial Eve) বা কোনো এক আদি সাভানা (Savannah) পরিবেশ থেকে হুট করে আমরা মানুষ হয়ে উঠেছি। আধুনিক ফসিল এবং জেনেটিক প্রমাণ বলছে যে এই ধারণা ভুল। আমরা আফ্রিকাতেই বিবর্তিত হয়েছি, তবে সেটি ছিল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। সেটা প্রায় ৫ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগের কথা। উপকূলীয় অঞ্চল, বনজঙ্গল এবং সাভানা – এই সব জায়গায় আদি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কখনও বিচ্ছিন্নতা ছিল, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ছিল। ফলে শারীরিক গঠনেও বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল। শারীরিক বৈচিত্র্য যদি থেকে থাকে, তবে কল্পনা করুন ভাষা, শিশু লালন-পালন বা সামাজিক রীতিনীতিতে কত ধরণের বৈচিত্র্য ছিল! এসব উপাত্ত মানুষের আদি সমাজ কেমন ছিল তা পুনর্নির্মাণের গভীর প্রোথিত দার্শনিক অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট আদি সমাজ ছিল না; বরং সেখানে ছিল এক বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সামাজিক রূপের সমাহার। সেই দশাগুলো আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না। আসলে আমরা ওই বিভিন্ন উপপ্রজাতি আর বিভিন্ন ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ থেকেই এসেছি।


    অ্যারন বাস্তানি: চলুন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) নিয়ে কিছু আলাপ করি, যদি শব্দটা সঠিক হয়ে থাকে। ইদানীং ইন্টারনেট আর ইউটিউবের উত্থানের ফলে ছদ্মপ্রত্নতত্ত্ব সম্ভবত অনেকের জন্য প্রত্নতত্ত্বের জগতে ঢোকার একটা পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা হয়তো এখান থেকেই শুরু করে এবং পরে আপনার মতো কারও কাছে পৌঁছে আসল প্রত্নতত্ত্ব শিখতে আগ্রহী হয়।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, তা হতে পারে। আপনার কী মনে হয়? কেন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) দিন দিন এত জনপ্রিয় হচ্ছে? আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক কালচেতনার (Zeitgeist) মধ্যে নিশ্চয়ই এই ধরনের প্রত্নতত্ত্বের প্রতি এক ধরণের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তবে আমরা ঠিক কী নিয়ে কথা বলছি, সেটা আগে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ আমার মতো পেশাদাররা যা পড়ান বা করেন, তার সাথে ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের (Pseudo-archaeology) পার্থক্য কী—তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন মূলত এমন সব মানুষ, যারা জীবনে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ-গবেষণায় অংশ নেননি। আমরা এতক্ষণ যেসব প্রমাণ নিয়ে কথা বললাম, সেগুলো গবেষণার সঙ্গেও তারা যুক্ত নন। তারা মূলত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অতীতের এক ধরণের পুনর্নির্মাণ পেশ করেন। প্রায়ই এগুলোকে খুব রহস্যময় বা ষড়যন্ত্রমূলক (conspiratorial) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনে করা হয় যে, আমার মতো মানুষরা—যারা সারা জীবন এই দক্ষতাগুলো শিখতে আর শেখাতে ব্যয় করছি—তারা আসলে সত্য গোপন করতে চাইছি। আর সেই লুকানো সত্য নাকি কেবল তাঁদের কাছেই আছে যারা এই পেশার সাথে যুক্ত নন! আমি কোনো উন্নাসিকতা দেখাতে চাই না; মানুষের নিজস্ব কল্পনা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে ভুল কিছু নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যেগুলোকে বিশাল কোনো নতুন উদঘাটন হিসেবে তুলে ধরেন, সেগুলো আসলে অনেক পুরনো আর বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু তত্ত্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এগুলো মূলধারার প্রত্নতত্ত্বেরই অংশ ছিল; যেমন আটলান্টিসের হারানো নগরী (lost city of Atlantis)। এই ধরণের চিন্তাভাবনা মোটেও নতুন কিছু নয়। আমাদের বই আর আলাপচারিতা থেকে আমি আশা করি এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে আসল তথ্যপ্রমাণগুলো নিজেই যথেষ্ট বিস্ময়কর এবং রহস্যময়। বিষয়টাকে আকর্ষণীয় করার জন্য আপনাকে অতিরঞ্জিত কিছু কল্পনা করার প্রয়োজন নেই। আসল রহস্যগুলোর জট খোলার চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং আর উদ্দীপনামূলক। একে কৃত্রিম রহস্য দিয়ে ঘিরে রাখার কোনো দরকার পড়ে না।

    অ্যারন বাস্তানি: ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে সবসময়ই এমনটা ঘটে। আপনি কারও সঙ্গে কথা বললে তারা বলবে অমুক ব্যক্তি অমুক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে; এগুলো এক গোপন চক্রের কাজ। অথচ পৃথিবীতে প্রচুর শোষণ আর বঞ্চনা আছে এবং ক্ষমতাধরেরা আসলেও অসাধারণ সব উপায়ে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সেগুলো আসলে শনাক্ত করতে আর বুঝতে পারি। এমন বোঝাপড়ার জন্য বিল্ডারবার্গ গ্রুপ (Bilderberg Group) বা এই জাতীয় অবাস্তব কিছু নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় আমার অনেক সহকর্মী যেভাবে সাড়া দেন, তা আমাকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্ত করে। তাঁরা অনেকটা এমন ভাবে বলেন যে, আমরাই বিজ্ঞানী, আমরাই সব ভালো জানি এবং আপনি যদি ওসব বিশ্বাস করেন তবে আপনি পাগল। কথাটি এক অর্থে সত্য হলেও আমাদের নিজস্ব শাস্ত্রের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। ইতিহাসচর্চার এই পদ্ধতিগুলো মাঝেমধ্যে বেশ অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন তারা পুরো এক জনগোষ্ঠীর মানবিকতা আর চেতনাকে অস্বীকার করে। যখন ইউরোপীয়রা প্রথম কাহোকিয়ার মতো স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখেছিল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আদিবাসীরা ওগুলো তৈরি করেছে। তখন তারা সব উদ্ভট তত্ত্ব হাজির করল, যেমন লেইফ এরিকসন বা ভাইকিংরা এসেছিল, অথবা এটি ইসরায়েলের হারানো কোনো বংশের কাজ। সেই সময়কার মূলধারার ইউরোপীয় জ্ঞান থেকেই এই ধরণের ধারণাগুলো আসত। আমি মিশরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উৎস নিয়ে অনেক কাজ করেছি। পিরামিড বা মমীকরণের মতন বিখ্যাত জিনিসের আগের সময়টাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন প্রাক-রাজবংশীয় যুগ (Pre-dynastic)। নামটা এমন যে মানুষ যেন এতে আগ্রহী না হয়! আপনি যদি এই প্রাক-রাজবংশীয় যুগ নিয়ে কোনো কনফারেন্সে যান, তবে দেখবেন তাঁরা মাটির পাত্রের মাপজোখ নিয়ে পড়ে আছেন। যারা আসলে জানতে চায় ওখানে কী ঘটেছিল, তাদের জন্য বিষয়টি ভীষণ বিরক্তির। আপনি যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেই ইউসিএলে পেট্রি মিউজিয়াম আছে। সেই জাদুঘর এখন নিজেরই ইতিহাসের দিকে খুব খোলামেলাভাবে তাকাচ্ছে। যে প্রত্নতত্ত্ববিদের নামে এই মিউজিয়াম, সেই ফ্লিন্ডার্স পেট্রি ছিলেন একজন সুপ্রজননবাদী (eugenicist)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অ-ইউরোপীয়রা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিচু মানের। তিনি কপাল বা করোটির গঠনতত্ত্ব (Phrenology) দিয়ে মানুষের মেধা মাপার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে তাঁর একটা তত্ত্ব ছিল যে—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা আফ্রিকানদের দ্বারা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে সেখানে অন্য কোনো ‘নতুন নরগোষ্ঠী’ (new race) এসে আক্রমণ চালিয়ে এই সভ্যতা গড়েছিল। আমরা এখন নেটফ্লিক্সে যেসব উদ্ভট তত্ত্ব দেখি, এগুলোও ঠিক ততটাই ভিত্তিহীন ছিল; কিন্তু এগুলো আসত আমাদেরই বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্র থেকে। আটলান্টিসের হারানো জাতি নিয়ে ওই ধরণের তত্ত্বগুলো প্রত্যক্ষণলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করে দেওয়াটা খুব সহজ। কিন্তু লড়াইটা কেবল অর্ধেক। আমাদের নিজেদের ভেতরেও তাকাতে হবে এবং কঠিন প্রশ্নগুলো করতে হবে। এই ধরণের তত্ত্বগুলো জায়গা পায় কীভাবে? আমার মনে হয় জায়গা পাওয়ার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ। এই ধারণা যে—সুদূর অতীতে অন্য কোনো মহাদেশের মানুষ আমাদের মতোই বুদ্ধিমান আর সৃজনশীল হতে পারে, তা অনেকে মেনে নিতে পারেন না। যদি কারো মনে এই ধরনের বাধার দেয়াল থাকে, তবে তাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে যে কেন এমনটা হচ্ছে।

    অ্যারন বাস্তানি : তবে এর কিছু অস্পষ্ট উদাহরণও তো আছে। অনেকে বলেন যে স্ফিংস আসলে পিরামিডের চেয়েও অনেক বেশি পুরনো। এটা কোনো এলিয়েন নয় বরং মিশরের মানুষরাই তৈরি করেছে এবং আমাদের বর্তমান ধারণার চেয়ে এটি কয়েক হাজার বছর আগের। আপনি কি একেও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, এটি একটি পুরোপুরি বৈধ প্রশ্ন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এটি খুব একটা কৌতূহলোদ্দীপক কোনো দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এই ধরণের বিষয়গুলো তদন্ত করার পদ্ধতি আমাদের কাছে আছে। তবে পিরামিড আর স্ফিংস তৈরির আগের চতুর্থ রাজবংশের সময়ে কী ঘটছিল—সেই প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারাটাই বেশি জরুরি। আমি দক্ষিণ মিশরের উম্ম এল-কায়াব (Umm el-Qa’ab) নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে মিশরের প্রথম রাজবংশীয় যুগের আদি রাজকীয় কবরস্থান আছে এবং সেটি আসলেও বিস্ময়কর। সেখানে এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায় যা আমরা ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতেও আলোচনা করেছি। এই কবরস্থানে রয়েছে মিশরের আদি রাজা আর রানীদের সমাধি। মাটির নিচে বড় বড় গর্তের ভেতর সিঁড়ি আর আসবাবপত্রসহ সমাধিগুলো তৈরি করা হতো। আর তার চারপাশে শত শত ছোট ছোট কক্ষ থাকত যেখানে অন্য মানুষদের কবর দেওয়া হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, রাজকীয় কবরের পাশে সমাহিত করার জন্য ওইসব মানুষকে আচারগতভাবে হত্যা করা হতো। শুধু মানুষ নয়, মিশরের একজন আদি রাজা, আমরা প্রারম্ভিক হায়ারোগ্লিফে তার নাম পড়তে পারি – আহা (Aha)। তার সমাধির গর্তে মানুষের পাশাপাশি তিনটি সিংহকেও সমাহিত করা হয়েছিল। এগুলো কি যথেষ্ট চমকপ্রদ নয়? বইয়ের ১০ নম্বর অধ্যায়ে আমরা এগুলো নিয়েই আলাপ করেছি। তথাকথিত প্রাচীন রাষ্ট্রের শুরুতে কেন মানুষের বিরুদ্ধে এমন সুপরিকল্পিত সহিংসতার প্রয়োজন হলো, সেটা অনুসন্ধান করাটাই বেশি রোমাঞ্চকর। এই প্রেক্ষাপটে স্ফিংসের আলাদা কোনো জায়গা নেই। আমরা বরং যাকিছু ঘটেছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে পারি এবং সেগুলো তো নিজ-গুণেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

    অ্যারন বাস্তানি: কিন্তু একজন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ববিদ হয়তো আপনাকে বলবেন যে—এই সভ্যতা প্রথম রাজবংশীয় যুগের চেয়েও পুরনো এবং এটা একটি হারানো সভ্যতা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, তখনকার সময় নিয়ে আসলে আমরা অনেক কিছুই জানি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়ই ছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ; অর্থাৎ সেই দীর্ঘ সময় যাকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়। সেই সময়ে কী ঘটছিল তা আমরা বেশ ভালোভাবেই জানি। আপনি যেকোনো জাদুঘরে গেলেই তা দেখতে পাবেন। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম বা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অসাধারণ সব জিনিস আছে। আমরা সবাই বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ, স্ফিংস বা পিরামিড নিয়ে মেতে থাকি। কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষের দিকে এবং বিশেষ করে তাদের সমাধির দিকে নজর দেন, তবে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। মৃত্যুর পরের বিভিন্ন আচারের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হতো, সেগুলোর বিবর্তনটা কয়েক হাজার বছর ধরে মিশরে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথম রাজবংশীয় যুগ বা ফারাওদের উত্থানের আগে প্রায় যে কাউকেই রাজপুত্রের মতো জাঁকজমকভাবে সমাহিত করা যেত। সুন্দর কারুকাজ করা অলঙ্কার, ব্যক্তিগত নকশা করা মাটির পাত্র আর প্রসাধন সামগ্রী তাদের সাথে দেওয়া হতো। কিন্তু যখনই রাজতন্ত্র আর ফারাও শাসনের উত্থান ঘটল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের জীবনের এই নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তারা আর আগের মতো নিজেদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারছিল না। ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই যেকথা স্প্যানিশদের বিবরণ থেকে জানা যায়। সেখানে বিবাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো কোনো সামাজিক আচার পালনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের প্রয়োজন হতো; যেমন শস্য থেকে তৈরি ‘চিচা’ (Chicha) নামে পরিচিত পানীয়। কিন্তু সবাই তো সেই সম্পদ সমানভাবে পেত না। ঠিক একইভাবে মিশরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও এক পর্যায়ে শস্য আর বিয়ারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এসবকিছু ব্যবহারের জন্য আপনাকে সেই ভূসম্পত্তির ওপর অধিকার থাকতে হতো যেখানে চাষাবাদ হয়। ফলে যেসব মানুষ তাদের পরিবারের এই সামাজিক আচারগুলো পালন করতে পারত না তারা এক পর্যায়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত। আমি এখানে কেবল বেঁচে থাকার কথা বলছি না, বরং সামাজিক কর্তব্যের কথা বলছি। এই ঋণের সম্পর্ক থেকেই এক সময় উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর পরাধীনতার জন্ম হয়। মানুষ যখন তাদের জীবনের মৌলিক আচারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই এই ধরণের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাগুলো গড়ে ওঠে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার ভবিষ্যতের প্রজেক্টগুলো কী কী?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি এই মুহূর্তে বেশ কিছু সাইড প্রজেক্টের সাথে যুক্ত আছি। খুব গভীর গবেষণার জন্য এখন তেমন সময় পাচ্ছি না। তাই আমি এমন কিছু কাজ করছি যেগুলো কেবল লেখালেখি নয়, বরং নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা। গোল্ডস্মিথস কলেজের ফরেনসিক আর্কিটেকচার নামের একটি দলের সাথে আমি কাজ করছি। তারা মূলত মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। আমাজনের বন উজাড় থেকে শুরু করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড — নানা বিষয়ে তারা স্থাপত্যবিদ্যার মডেল ব্যবহার করে আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। ইয়াল ওয়াইজম্যান (Eyal Weizman) এবং তাঁর অসাধারণ দলের সাথে আমার এই কাজ চলছে। জার্মানিতে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নিয়ে তিন দিনের একটি বড় ইভেন্ট হয়েছিল যেখানে ইয়াল একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন এবং সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। লন্ডনে ফিরে আসার পর আমরা কফি খেতে গিয়েছিলাম এবং বইটির ওপর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের দারুণ আলাপ হয়। প্রথমে আমি আমাদের কাজের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাইনি কারণ সময়ের ব্যাপ্তিটা ছিল আমূল ভিন্ন। কিন্তু তিনি আমাদের বইটিকে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের একটি বিস্তৃত কেস স্টাডি হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এটি একটি রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যান। অনেক সময় আপনি হয়তো বিকল্প কোনো ঘটনার সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের ফুটোগুলো দেখিয়ে দিতে পারেন, তবেই সেটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আর যখনই প্রথাগত বয়ানটি নড়বড়ে হয়, তখনই নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। আমি দেখলাম বইটির ক্ষেত্রে আমরা ঠিক একই যুক্তি ব্যবহার করেছি। তাই আমরা ইউক্রেনের কিছু অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাক আর সিরিয়ার আদি নগরগুলোর সমসাময়িক কিছু নগর ইউক্রেনেও পাওয়া গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগের এই বিশাল নগরগুলোতে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভূত শাসনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ নিয়ে বিশাল বিতর্ক আছে যে এগুলোকে নগর বলা হবে নাকি ‘অতিকায় গ্রাম’ বা মেগা-সাইট (Mega sites) বলা হবে। এই বসতিগুলো মূলত আমাদের ভাবায় যে ‘নগর’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং আমাদের মনে আগে থেকেই কী ধরণের ধারণা গেঁথে আছে। আমরা একটি ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশন তৈরি করছি যা সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও দর্শকদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এটি একটি প্রজেক্ট। এর বাইরে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ প্রকাশের পর আমি সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি সৃজনশীল মানুষদের কাছ থেকে—যেমন সংগীতশিল্পী, শিল্পী আর চলচ্চিত্র নির্মাতা। গত সপ্তাহে প্যারিসের ইয়াসমিন ডিবোয়া নামের একজন চমৎকার গায়িকার সাথে দেখা হলো যাঁর স্টেজ নাম হলো ‘লাফান্ডা’ (Lafawndah)। তিনি ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নামে একটি গান লিখেছেন এবং কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনে সেটি পরিবেশন করেছেন। ইরানে মানবাধিকার আন্দোলন ‘উইমেন লাইফ ফ্রিডম’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি এটি গেয়েছেন। আমি শিকাগো থেকে ফেরার কারণে ক্লান্তিতে সেখানে উপস্থিত হতে পারিনি যা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। এই ধরণের সাড়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার মনে হয় এটি আমার সহ-লেখক প্রয়াত ডেভিডের  প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল কঠিন আর অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে এমনভাবে লিখে ফেলার যা মানুষের মন ছুঁয়ে যেত। মানুষ এতে নিজেকে যুক্ত করতে পারত এবং নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেত। আমি এগুলোকে তাঁর প্রতি এক সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবেই দেখি এবং আমি নিজেকে এই কর্মকাণ্ডে একজন ভাগ্যবান সহযাত্রী মনে করি।

    অ্যারন বাস্তানি: সম্ভব হলে ডেভিড সম্পর্কে একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। ডেভিড গ্রেবার আপনার এই বইয়ের সহ-লেখক ছিলেন। ২০২০ সালে সম্ভবত তিনি টুইট করেছিলেন যে পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তিনি জিম মরিসনের একটা ছদ্ম-উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন— ‘আমার মস্তিষ্ক যেন অসাড় বিস্ময়ে আহত, আমরা শেষ করেছি’— অথবা এই ধরণের কিছু একটা।

    অ্যারন বাস্তানি: আর এর এক মাস পরেই তিনি মারা গেলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, পাণ্ডুলিপি শেষ করার প্রায় তিন সপ্তাহ পর। মাত্র তিন সপ্তাহ।

    অ্যারন বাস্তানি: তো এমন একটা বই প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা কেমন— যা বিশ্বজুড়ে ‘বেস্টসেলার’ হয়েছে এবং অনেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে? একজনের সাথে দীর্ঘ এক দশক ধরে কাজ করার পর যখন বড় ধরনের সাফল্য এল, তখন তিনি তা ভাগ করে নেওয়ার জন্য আর পাশে নেই— বিষয়টা কেমন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমাকে দুইভাবে বিষয়টি অনুভব করতে হয়। একটা হলো ভালো অনুভূতি— বইটি যেভাবে সমাদৃত হয়েছে তা অসাধারণ। সম্প্রতি একজন আমাকে কিছু তথ্য দিলেন যে বিশ্বজুড়ে বইটির প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হতে চলেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। তবে অন্য অনুভূতিটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। অবিরামভাবে এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া যে ডেভিড এসবের সাক্ষী হওয়ার জন্য বেঁচে নেই। তিনি এই বইটির জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন; তাঁর তর সইছিল না বইটা মানুষের হাতে তুলে দিয়ে এই ধরণের আলোচনা করার জন্য। আসলে আপনার সাথে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া আর এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করার সময় আমাদের দুজনেরই থাকার কথা ছিল। তাই এই অনুভূতি একইসঙ্গে খুব যন্ত্রণাদায়ক এবং এক ধরণের প্যারাডক্স। এসবের মধ্যে আমি শুধু একটা বিশ্বাসই আঁকড়ে ধরি। তিনি অবশ্যই চাইতেন আমি যেন বাইরে বের হই, কঠোর পরিশ্রম করি এবং মানুষকে এই বই আর আমাদের কাজগুলো নিয়ে জানাই। আমি যথাসাধ্য সেটাই করার চেষ্টা করছি; বলতে পারেন কাজটা আমি খানিকটা তাঁর জন্যই করছি। যখন আমি একটু বাড়তি শ্রম দিই, তখন তাঁর কথাই মনে হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: একদম ঠিক। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমারও খুব ভালো লেগেছে, ধন্যবাদ।

    [সূত্র : Everything We Think We Know About Early Human History is Wrong | David Wengrow on Downstream); নোভারা মিডিয়া (Novara Media) | ৪ ডিসেম্বর, ২০২২

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; অরুণাপল্লী, সাভার, ঢাকা

  • হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

    [পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভির প্রবন্ধ The State in Post-Colonial Societies : Pakistan and Bangladesh১৯৭২ সালে New Left Review জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই লেখাটি আলাভির প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। প্রবন্ধটির শুরুতে আলাভি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যেখানে রাষ্ট্রকে কেবল বুর্জোয়া শ্রেণির একটি হাতিয়ার ভাবা হয়। এর বিপরীতে তিনি একটি অতি-বিকশিত রাষ্ট্রের তত্ত্বায়ন প্রদান করেন, যেখানে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়াদের থেকে আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। প্রবন্ধের শেষার্ধে তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে এর বাস্তবতা খতিয়ে দেখেন। প্রবন্ধটির দৈর্ঘ্য বিবেচনায় অনুবাদের জন্য এর প্রথমাংশকে নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে অতি-বিকশিত রাষ্ট্র ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির একটি সাধারণ তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান। নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের মুখে একুশ শতকে এসে রাষ্ট্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন আদৌ অক্ষত আছে কিনা তা প্রশ্নের দাবি রাখে; তবে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়মিত হস্তক্ষেপের বংশনামা বুঝতে হলে আলাভির এই লেখাটি এখনও অত্যাবশ্যক। – অনুবাদকের ভূমিকা]

    ছবি: হামজা আলাভি

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্রমবিকাশে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বিশেষ করে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বের নিরিখে। মিলিব্যান্ড১ যাকে রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রধান মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলছে তার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিতে :“আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার একটি কমিটি মাত্র,” এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো “মূলত এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে দমন করার জন্য একটি সংগঠিত শক্তি।“

    …উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে এই সনাতনী মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেবল একটি একক শাসক গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবেনা। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দিষ্ট কাঠামোগত বিন্যাস ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আমলে বিকশিত পুনর্বিন্যাস রাষ্ট্র ও সামাজিক শ্রেণিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জটিল করে তুলেছে। এ দুটি ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ধারা সম্পূর্ন ভিন্ন। পশ্চিমা সমাজে আমরা দেশীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা তাদের উদীয়মান ক্ষমতার প্রেক্ষিতে জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব হতে দেখি, যা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় আইনী কাঠামো ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে এই প্রক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা।

    উপনিবেশে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয় কেন্দ্রস্থ২ (Metropolitan) বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক শাসন আরোপের মাধ্যমে, যেখানে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও এর আনুষাঙ্গিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু উপনিবেশে এই বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করতে কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি বাড়তি লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। উপনিবেশে তাদের কাজ কেবল নিজ দেশে প্রতিষ্ঠিত উপরি-কাঠামোকে৩ নকল করা নয়। অধিকন্তু, তাদের এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করতে হয় যার মাধ্যমে তারা উপনিবেশের সকল স্থানীয় সামাজিক শ্রেণির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। সুতরাং, এই মর্মে উপনিবেশের (অব)কাঠামোর তুলনায় এর ‘উপরি-কাঠামো’কে ‘অতি-বিকশিত’(Over-developed) বলা যেতে পারে। কেননা, এর ভিত্তি খোদ কেন্দ্রের কাঠামোতেই নিহিত, যা থেকে পরবর্তীতে এটি স্বাধীনতার সময় আলাদা হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাই একটি শক্তিশালী সামরিক-আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র ও সরকারি কলকব্জা দ্বারা সজ্জিত, যা তাদের নিয়মমাফিক কার্যাবলির মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণিসমূহকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করতে সাহায্য করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজ এই অতি-বিকশিত রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর কার্যবিধির উত্তরাধিকার বহন করে, যার মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণি-সমূহকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা হতো। স্বাধীনতার সময়ে দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের এমন এক আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আবদ্ধ খুঁজে পায়, যার মাধ্যমে কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ায় থাকা ব্যক্তিরা সমাজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং এমনকি বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্রের আসল সমস্যা হলো যে এটি কোনো উদীয়মান দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় বরং একে প্রতিষ্ঠা করে একটি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি। স্বাধীনতার মাধ্যমে কাগজে কলমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে বিদেশি বুর্জোয়াদের হুকুম রদ হলেও এর ওপর তাদের প্রভাব কোনো অংশেই শেষ হয়ে যায় না। কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারা এখন নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের সাথে একাট্টা হয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে অবস্থান করে। একসাথে তারা সমাজগুলোর শ্রেণি কাঠামোতে একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে হাজির হয়। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্পষ্টতই ভিন্ন। ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শ্রেণি বৈশিষ্ট্য বেশ জটিল। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ও প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, একে ঠিক দেশীয় বুর্জোয়াদের অধীনস্থ বলা যাবেনা। আবার এটি এদের কারো কেবলমাত্র একটি হাতিয়ারও নয়, যার অর্থ দাঁড়াতো যে, স্বাধীনতা কেবলই একটি প্রহসন। উভয় বুর্জোয়া শ্রেণিই একে অপরের প্রভাব নাকচ করতে পারেনা এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। যে মূল প্রস্তাবনার উপর আমি গুরুত্বারোপ করতে চাই তা হলো যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র কোনো একক শ্রেণির হাতিয়ার নয়। এটি আপেক্ষিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত (relatively autonomous) এবং এটি তিনটি মালিক শ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে, অর্থাৎ কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া, দেশীয় বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণি। একইসাথে এটি সেই সামাজিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে তাদের সকলের হয়ে কাজ করে, যার মধ্যে তাদের স্বার্থ নিহিত আছে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থা ও প্রধান উৎপাদন প্রক্রিয়া হিসেবে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া।

    … এই পরিস্থিতিতে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি৪, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র ফলত একটি নতুন ও আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন অর্থনৈতিক ভূমিকা লাভ করে, যা ধ্রুপদি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নজিরবিহীন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ সরাসরি আত্মসাৎ করে এবং তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার নামে আমলাতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে। এসকল শর্তাবলি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বে বিশ্লেষিত রাষ্ট্র থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে।

    তবে, রাষ্ট্রযন্ত্র স্রেফ সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি দিয়েই গঠিত নয়। যেখানে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলসমূহও এর অংশ হিসেবে কাজ করে। যেখানে, রাজনৈতিক নেতারা আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব সহকারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং তাদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমাবদ্ধতাসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ব্যতীত সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির ভূমিকা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদেরা ও রাজনৈতিক দলসমূহ একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কীয় কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। একদিকে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে (আদর্শগতভাবে) তারা যাদের সমর্থন প্রত্যাশী, তাদের দাবিদাওয়াগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, যারা আসলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন, তাদের হয়ে জনমত প্রভাবিত করতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়; যাতে সেই নীতিগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। সেজন্য, তারা জনগণের ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে এমন এক ‘বোঝাপড়া’ তৈরি করতে চায়, যা সম্ভাব্য বিরোধিতাকে প্রশমিত করে ফেলবে। ফলে, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির সাথে তাদের সম্পর্ক দোদুল্যমান; এটি একই সাথে প্রতিযোগিতামূলক আবার পরিপূরক। এই দোদুল্যমানতা আরো গভীর যেখানে উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন রাজনীতিবিদেরা আমলাতন্ত্রের কিংবা সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যের ক্যারিয়ারের উপর প্রভাব রাখতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস ও ভাগ-বাটোয়ারার অনেক ধরণের রূপভেদ বিদ্যমান। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড হিসেবে রাজনৈতিক দলের উপর বৈধতার মোড়ক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জৌলুস অর্পিত হয়। তা সত্ত্বেও, বিপুল সংখ্যক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতার এক ক্রমবর্ধমান লঘুকরণ দেখা যাচ্ছে; এবং এর বিপরীতে, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ক্ষমতা বিস্তারলাভ করেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকাশ্য ‘দখল‘ সংঘটিত হয়েছে। তবুও, মোটা দাগে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে সমঝোতা ও একই সাথে টানাপোড়েন বিদ্যমান। পূর্বোক্ত পক্ষটি (রাজনৈতিক দল) পরোক্ত পক্ষটির (আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি) জন্য একটি কার্যকরী উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। তারা সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক দান করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নাটকের মাধ্যমে তারা জনঅসন্তোষ প্রশমিত করে এবং তাদের ক্ষোভ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। রাজনৈতিক দলের ভূমিকা থাকলেই তা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন নাকচ করে দেয় না। মূল বিষয়টি হলো সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন এবং তিনটি মালিক শ্রেণির মধ্যকার প্রতিযোগী স্বার্থের মধ্যে এর মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা, অর্থাৎ দেশীয় বুর্জোয়া, কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া এবং জমিদার শ্রেণি। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির স্বার্থ হাসিলে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তারা অলিগার্কির তৃতীয় অংশ হিসেবে শরিক হয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল সেই আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসনকে ও আমলতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কেবল তখনই তাদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, যেখানে এখন পর্যন্ত পরোক্ত পক্ষই জয়ী হয়েছে। কোনো পুঁজিবাদী উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট উদাহরণ আমরা আজ অবধি দেখতে পাইনি। ভারতের উদাহরণ এর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু এমনকি ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটি ঘোলাটে। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি কোনোভাবেই একটি একক শ্রেণির দল নয়; বরং এটি আমলাতন্ত্রের সাথে মিলিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগী মালিক শ্রেণির দাবিদাওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা করার কাজে অংশগ্রহণ করে। একইসঙ্গে, তাদের সমাজতান্ত্রিক বক্তৃতাবাজি সত্ত্বেও তারা আমলাতন্ত্রের সাথে মিলেমিশে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে সেই সামাজিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট, যা ওই মালিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখে। এমনকি বিদেশী পুঁজির ব্যাপারেও ভারত সরকারের প্রকৃত কর্মকাণ্ড কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতাবাজির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিশ্লেষণের জন্য যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যে, কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অন্তরালে ভারতীয় আমলাতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে বিশাল পরিধির স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে থাকে, যার ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো নতুন করে আলোকপাত করেছে।

    ভারত ও পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তন বুঝতে হলে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বিশেষ করে সুদূরপ্রসারী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক স্বায়ত্তশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার আগে, আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ার। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন স্থানীয় শ্রেণিকে অধীনস্থ রাখা এবং তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষ হয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা। মুক্তি সংগ্রামের সময়, তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে রাজনৈতিক ব্যারিকেডের উল্টো দিকে অবস্থান করেছিল। স্বাধীনতার পর, সেই একই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যাদের দমন করা ছিল তাদের কাজ, ক্ষমতার মসনদে আসীন হলেন এবং কাগজে কলমে তাদের (আমলা ও সামরিক বাহিনী) ওপর কর্তৃত্ব লাভ করলেন। ফলে, পারস্পরিক সমঝোতার একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে বিশ ও ত্রিশের দশকে পর্যায়ক্রমে আংশিক ক্ষমতা হস্তান্তরের৫ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিপূর্বেই এমন কিছু পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যার সাহায্যে আমলাতন্ত্র সেইসব রাজনৈতিক নেতাদের এড়িয়ে যেতে পারত, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতার ছাড়াই আমলাতন্ত্রের সাথে ব্যাপক হারে সরাসরি ও নিয়মিত লেনদেনের বাস্তবতার ফলে এসকল প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগুলো আরও প্রসারিত ও সুসংহত হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম কেবল তখনই ঘটে যখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনীতিবিদ তার সমর্থকদের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চান; যেক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার বদলে বরং আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদরা তখন সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দালালে পরিণত হন। জনগণের সাথে আমলাতন্ত্রের এই মধ্যস্থতা করা হলো, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তবে, রাজনীতিবিদরা কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তার সুনজর হারানোর ঝুঁকি নিতে পারেন না, যা তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। আমলাতন্ত্রের শক্তি মূলত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক বিস্তার এবং নানাবিধ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বিশাল সংখ্যক সরকারি সংস্থাসমূহের পরিচালনার ওপর নির্ভর করে।

    রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তনের প্রকৃত ধরণ ঐতিহাসিক পটভুমির বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বিবর্তনের ভিত্তিতে এক এক দেশে এক এক রকম। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে, সুকর্ণর উৎখাতের মধ্য দিয়ে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকাশ্য ক্ষমতার আবির্ভাব হতে হতে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এর পিছনে অন্তর্নিহিত কারণগুলো বেশ জটিল; তবে ইন্দোনেশিয়ায় আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী আপাদ-মস্তক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অলিগার্কি সুসংহতকরণে কিছুটা সময় লাগা নিশ্চই সেই কারণগুলোর একটি। এর বিপরীতে, ভারত ও পাকিস্তান শক্তিশালীভাবে সংগঠিত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো উত্তরাধিকারসুত্রে লাভ করে। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার সময়ে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী বেশ নাজুক অবস্থায় ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক দলসমূহের সংগঠন ও জনভিত্তি ছিল আরও বেশি নাজুক। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ, তাদের নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব ও কর্তৃত্বের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতো, যিনি স্বাধীনতার অল্প কিছুদিনের মাথায় মৃত্যবরণ করেন। ততক্ষণে মুসলিম লীগ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এর নেতৃত্ব তাদের জনভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

    পাকিস্তানের ২৫ বছরের ইতিহাসে দুটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রথমটি হলো আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যশীল অবস্থান। তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আসে, অক্টোবর ১৯৫৮ এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নয়, যেমনটা সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে; বরং নয়া রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রথম পর্যায়ে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থার লেবাস প্রদানকারী রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি হাতের পুতুল বানানো হয় এবং সেই অলিগার্কির সুবিধামতো তাদের ক্ষমতায় বসানো বা বহিষ্কার করা হতো। ১৯৫৮ সালে যখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যের জন্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল, তখন যারা ইতিমধ্যে ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছিল, তারা সংসদীয় সরকারব্যবস্থার যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জটি উত্থাপিত হচ্ছিল তা বিলুপ্ত করে দিয়ে ‘ক্ষমতা দখল’ করে। তবে তা সত্ত্বেও, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কিছু রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল যারা একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে; এবং ১৯৬২ সালের মধ্যে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’৬(Basic Democracy) ব্যবস্থার অধীনে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক প্যারোডির মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো হয়। ১৯৬৯ সালে একটি বিশাল জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তবুও ক্ষমতার লাগাম আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির হাতেই সুরক্ষিত ছিল। সরকারের ভেতরে পরিপূরক ভূমিকা পালনের জন্য তাদের তখনও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার নিজের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা বজায় রেখে ‘সাংবিধানিক সরকার’ পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা একটি রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এটি একটি জটিল ইতিহাস, যা আমি অন্যত্র বিস্তারিতভাবে নিরীক্ষা করেছি। এর প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘সংসদীয় সরকার’-এর আমলে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকৃত ভূমিকাটি একটি রাজনৈতিক কল্পকাহিনীর আড়ালে অস্পষ্ট ছিল, যার অধীনে এটি পরিচালিত হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধিপত্যশীল এবং নির্ণায়ক ভূমিকাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো পাকিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষিতে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি কিংবা এর বিভিন্ন অংশের সামাজিক চরিত্র, সম্পৃক্ততা এবং দায়িত্বসমূহ; যার মধ্যে সেই কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারাও অন্তর্ভুক্ত, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বহুবচনে পুনরায় হাজির হয়েছে।

    পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কর্তৃত্বের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জগুলো আসে প্রধানত সেইসকল রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে যেগুলো তাদের শক্তি জড়ো করে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোর মানুষদের থেকে; যেগুলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভৌত সম্পদের বণ্টন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই অঞ্চলগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিস্যার সপক্ষে সোচ্চার ছিল। কেবল পূর্ববঙ্গ থেকেই নয়, বরং সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং পাঠানদের দেশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (NWFP) থেকেও এই ধরণের চ্যালেঞ্জগুলো উত্থাপিত হয়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সমর্থন র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইমানের অংশ হয়ে ওঠে। সত্যিকার অর্থেই, তাদের অধিকাংশই আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলনগুলোতে গভীরভাবে জড়িত ছিল । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল যে, পাকিস্তানের র‍্যাডিকাল রাজনীতি আঞ্চলিক সীমানা ভেদকারী শ্রেণি সংহতির পরিবর্তে প্রধানত জাতিগত বা ভাষাগত সংহতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আসলে র‍্যাডিকাল চ্যালেঞ্জগুলো শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধেই পরিচালিত ছিল। কিন্তু এই সুবিধাগুলোকে তারা মূলত আঞ্চলিক মানদণ্ডেই চিহ্নিত করে। রাজনৈতিকভাবে, এই র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর দাবি ছিল একটি যুক্তরাষ্ট্ৰীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক (ও সামরিক) নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী পদগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পাকিস্তানের রাজনীতির এই দুটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্য এবং এর বিরুদ্ধে পরিচালিত চ্যালেঞ্জের আঞ্চলিক ভিত্তি, মূলত পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি একক বাস্তবতারই দুটি দিক, যা এই আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

    ১৯৫৮ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সরকার’ গঠন এবং পতন ঘটিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে তারা এমনকি ‘রিপাবলিকান পার্টি’৭ গঠনেও উস্কানি দেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ‘ক্ষমতা দখল’-এর পর ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান একটি নতুন ধরণের সংবিধান প্রণয়ন করেন। রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো শুরু হয়; আইয়ুব খানের আমলে তাদের ছলচাতুরি একটি নিখুঁত শিল্পে পরিণত হয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক সরকারের একটি বহিরাবরণ বজায় রাখার ব্যাপারেও সামরিক নেতাদের প্রবল উদ্বেগ দেখা দেয়। ফলে, ১৯৬৯ সালে পুনরায় সামরিক আইন জারি করার পর প্রেসিডেন্ট জেনারাল ইয়াহিয়া খান আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির অধীনে যত দ্রুত সম্ভব একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসাতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই লক্ষ্যে তিনি নির্বাচনের আশ্বাস দেন এবং তৎক্ষণাৎ একদল মনোনীত বেসামরিক ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় না থাকলে সামরিক বাহিনী সরাসরি জনঅসন্তোষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এটি তার রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক হারাবে এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি সংকটের মুহূর্তে তাদের হস্তক্ষেপ করার স্বঘোষিত অধিকার সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি সর্বদা সরাসরি নিজেদের নামেই শাসন করতে পছন্দ করে, এমনটি ধরে নেওয়া একটি অতিসরলীকরণ হবে। তারা প্রায়শই রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে শাসন করতে পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই রাজনীতিবিদরা তাদের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করে । কিন্তু পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল ছিল অস্বস্তিকর; এবং ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের সংকটের সূত্রপাত ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

    ১. র‍্যালফ মিলিব্যান্ড একজন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও তার আমলের অন্যতম প্রভাবশালী ইন্সট্রুমেন্টাল মার্ক্সবাদী চিন্তক।

    ২. কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া বলতে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমকারি দেশের পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায়।

    ৩. অবকাঠামো ও উপরি-কাঠামো মার্ক্সীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। অবকাঠামো বা বুনিয়াদ বলতে বোঝানো হয় একটি সমাজের উৎপাদিকা শক্তিসমূহ ও উৎপাদন সম্পর্কসমূহকে। আইন, রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ মিলে গঠিত হয় সমাজের উপরি-কাঠামো। ফরাসি চিন্তক লুই আলথুসের মতে উপরি-কাঠামোর আবার দুটি স্তর রয়েছে; রাষ্ট্র হলো প্রথম স্তর ও দ্বিতীয় স্তর হলো ভাবাদর্শ, যার অন্তর্ভুক্ত ধর্মীয়, নৈতিক, ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। তবে, আলাভি তার লেখায় উপরি-কাঠামো মূলত রাষ্ট্র অর্থেই ব্যবহার করেছেন।

    ৪. অলিগার্কি হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। পাকিস্তানে এই কেন্দ্রীভবন ঘটে আর্মি জেনারেল ও কিছু উচ্চপদস্থ আমলাদের ঘিরে।

    ৫. ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হলে ভাইসরয়ের অধীনে আমলাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ চালানো হয়। এই পর্যায়ে ক্ষমতা ছিল অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক ও এককেন্দ্রিক। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দাবির মুখে ১৯১৯ সালে ‘মর্লে-মিন্টো সংস্কার’-এর মাধ্যমে আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয় এবং এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। পুলিশ, অর্থ, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাইসরয় এবং তাঁর মনোনীত পরিষদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি বিষয় নির্বাচিত ভারতীয় মন্ত্রীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়তশাসন প্রদান করা হয়, ভাইস-রয়ের নির্বাহী কাউন্সিলের পরিবর্তে মন্ত্রীপরিষদ গঠন করা হয় এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার পারদ আমলাদের থেকে রাজনীতিবিদদের দিকে খানিকটা ঝোকে।

    ৬. আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরোক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তিনি তার সামরিক শাসনকে একটি বেসামরিক খোলস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারতেন না; তারা কেবল তৃণমূল পর্যায়ের ৮০,০০০ স্থানীয় প্রতিনিধি (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত করতেন, যারা পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি ইলেক্টোরাল কলেজ হিসেবে কাজ করত।

    ৭. ১৯৫৬ সালে ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’ অর্থাৎ, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে একত্র করে একক পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ করার দাবিতে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে পাকিস্তান রিপাবলিকান পার্টি গঠিত হয়। এর গঠনের পেছনে কলকাঠি নাড়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ডা. খান সাহিব। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করলে ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে দলটি বিলুপ্ত করা হয়। আলাভি মূলত ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে রিপাবলিকান পার্টির প্রসঙ্গ টানেন।

  • উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ বুবুন

    [বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্বেই বুদ্ধিত্তিক ও একাডেমিক অঙ্গনে ফরাসি উত্তর–আধুনিক বা আরও স্পষ্ট করে বললে উত্তর–কাঠামোবাদি চিন্তার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্যণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গোটা বিশ্ব দুটি সুপার পাওয়ারে ভাগ হয়ে যখন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তার প্রভাব পড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী শক্তি, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র। এই দুই শক্তিকে কেন্দ্র করেই সম্রাজ্যের প্রয়োজনেই বিকাশ লাভ করতে থাকে নানা বুদ্ধিবৃ্ত্তিক ও ভাবাদর্শিক চিন্তাধারা। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা দেখতে পাই ফরাসি বামপন্থী দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটা নতুন বাঁকবদলের। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীদের এখন প্রায়শই উত্তর–কাঠামোবাদী, উত্তর–আধুনিকতাবাদী নানা তকমায় চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা একদিকে যেমন দেখতে পাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি ভরসা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি, অন্যদিকে জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রতি অনাগ্রহ। বিপ্লবী রাজনীতির কৌশল, কর্মপন্থার বদলে তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে চলে আসে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, ভাষা ও সংস্কৃতি। এই দার্শনিক গোষ্ঠী এসে আধুনিকতাবাদের যাবতীয় মেটান্যারেটিভ বা মহাবয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মার্ক্সবাদকেও তারা দেখেন এক মহাবয়ান হিসেবে। ফলে স্বভাবতই মার্ক্সবাদের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তাদের ব্যবচ্ছেদের লক্ষ্য হয়ে উঠে। ১৯৮৫ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করে ফরাসি এই নতুন দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীদের নিয়ে। সিআইএর মূল্যায়নে এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বাঁকবদল একদিকে যেমন ফ্রান্সে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে সাহায্য করবে একই সাথে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও কাজ করবে। ২০১১ সালে সিআইএ এই প্রতিবেদনটির একটি সেন্সরড ভার্শন প্রকাশ করে তথ্য অধিকার আইনের আওতায়। মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন। ২০১৭ সালে ওপেন কালচার নামক একটি অনলাইন পোর্টাল সিআইএর এই প্রতিবেদনটির উপর একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করে। বর্তমান নিবন্ধটি সেই পর্যালোচনারই অনুবাদ। – সম্পাদক]


    ছবি: সিআইএর প্রতিবেদনের একটি পাতা

    দর্শনের মতো একটি শাস্ত্রের সরকারি নীতি–নির্ধারণ তথা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তেমন কোন প্রভাব থাকতে পারে, তা আমরা সাধারণত মনে করি না৷ কেননা, সরকারের কার্যক্রমকে সদা প্রভাবিত করা নির্ধারকগুলোর (মধ্যবিত্তের টিকে থাকার উদ্বিগ্নতা বা উচ্চবিত্তের স্টক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা কিংবা দারিদ্র‍্যের সদা উপস্থিতি) অবস্থান দর্শনের আলোচ্য বিষয় থেকে অনেক দূরে। তবে আমাদের এই অনুমান সবসময় সত্য নাও হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে যখন চিন্তাশীল ও পড়ুয়া ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী কিংবা সিনেটর হয়েছেন, তখন ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, লিও স্ট্রস, জার্গেন হাবারমাস কিংবা জন রলসের (যিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন) মতো দার্শনিকদের ধ্যানধারণা রাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে খুব কম দার্শনিকই জার্মান চিন্তক কার্ল স্মিটের মতো প্রভাবশালী ছিলেন; যদিও তার প্রভাবের স্বরূপ ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক৷ এছাড়া রয়েছে জন লক, জাঁ জ্যাক রুশো, থমাস হবস, অ্যারিস্টল এবং সক্রেটিস, যারা রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী প্রভাব রাখা দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    তবে যখন আমরা উত্তর–আধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের (যার কেন্দ্রে ছিলেন মিশেল ফুকো, রোলা বার্থ, জাক লাকাঁ, দেরিদাসহ আরও অনেকে) দিকে তাকাই, তখন রাষ্ট্রনীতিতে তাদের তেমন সরাসরি প্রভাব দেখা যায় না। অধিকাংশ সময়ই এইসব লেখকরা গুরুত্বহীন ও প্রভাবশূন্য বলে বিবেচিত হয়। দায়ী করা হয় তাদের ভাষাকে, যা বামঘেষা একটি অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। এই বক্তব্য সম্ভবত কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেখানে ক্ষমতাকে প্রায়শই তত্ত্বায়িত করা হলেও খুব কম সময়ই মূলধারার প্রকাশনায় ক্রিটিক করা হয়৷ তবে এই আলাপ ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সত্য নয়। অন্তত সিআইএ তা–ই মনে করে। কমিউনিজম ও অ্যান্টি–আমেরিকানিজমের বিরুদ্ধে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ফরাসি দর্শনের প্রভাবকে এই সংগঠনটি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধান নথিবদ্ধ করতে ১৯৮৫ সালে তারা একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে৷

    সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নথির একটি পরিশোধিত অনুলিপি “ফ্রান্স: ডিফেকশন অব লেফটিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল” নামে প্রকাশিত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে, এই নথি উত্তর–কাঠামোবাদী চিন্তকদের রাজনৈতিক অভিমুখকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। ইয়ানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রফেসর ও র‍্যাডিকেল হিস্ট্রি ও দি পলিটিক্স অব আর্ট–এর লেখক গ্যাব্রিয়েল রকহিল ফরাসি উত্তর–কাঠামোবাদ সম্পর্কিত সিআইএর মূল্যায়নকে এল এ রিভিউ অব বুকের জন্য সামারাইজ করেছেন এভাবে:

    “…গুপ্ত সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা (সিআইএ) মূলত প্রশংসা করেছে দুটি পরিবর্তনকে৷ এক, উত্তর–কাঠামোবাদী বাঁকবদলের মাধ্যমে ফরাসি বুদ্ধিজীবী মহলের সমালোচনার মূখ্য লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে চলে যায়। বৃহত্তর বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় ধীরে ধীরে স্ট্যালিনবাদ ও মার্ক্সবাদ নিয়ে অনাগ্রহ দেখা যায়; র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের বিতর্ক থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসে; এবং তাত্ত্বিক অবস্থানের জায়গা থেকে সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক দল থেকে দূরে সরে আসতে থাকে। অপরদিকে ডানপন্থীদের মধ্যে মতাদর্শগত সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত “নিউ ফিলসফারস” ও “নিউ রাইট” বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমে মার্ক্সবাদ বিরোধী একটি হাইপ্রোফাইল স্মিয়ার ক্যাম্পেইন শুরু করে।“

    সিআইএ এজেন্টরা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত বিরোধিতার এই উদ্দীপনা ফ্রান্সে কারও পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মার্কিন নীতির কোনো বিরোধিতা গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলবে।” ফরাসি সংস্কৃতি ও সরকারের ওপর “নিউ লেফট বুদ্ধিজীবীদের” প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা ধারণা করেছিল, “প্রেসিডেন্ট [ফ্রাঁসোয়া] মিতেরঁ সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর প্রতি যে তাৎপর্যপূর্ণ শীতলতা দেখিয়েছেন, তার পেছনে কিছুটা হলেও এই সর্বব্যাপী বৌদ্ধিক মনোভাব ভূমিকা রেখেছে।“

    ছবি: লিওতার, ফুকো ও দেরিদা

    রকহিল লিখেছেন, এই গবেষণায় ফ্রান্সের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রভাব সম্পর্কিত (সিআইএর অভিমত অনুযায়ী) যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আগের প্রজন্মের “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ের বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের” থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন“। ওই প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীরা “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতো” এবং আমেরিকান গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল। জঁ–পল সার্ত্রে এমনকি “প্যারিসে সিআইএ স্টেশন অফিসার এবং ডজনখানেক আন্ডারকভার এজেন্টের পরিচয় ফাঁস” করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলে এবং এই কারণে তিনি সিআইএ এর “নিবিড় নজরদারি“-তে ছিলেন। সার্ত্রে সিআইএর কাছে একটি গুরুতর সমস্যারূপে বিবেচিত ছিলেন। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একই সংস্থা বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করেছিল, “এখন আর কোনো সার্ত্রে নেই, নেই কোন গিদে।” তারা লিখেছিল, “কমিউনিস্ট পণ্ডিতদের সর্বশেষ গোষ্ঠী নিজেদের শিষ্যদের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কিন্তু তখন কারোরই আর মার্ক্সবাদের পক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল না।” এ কারণে স্নায়ু যুদ্ধের শেষ পর্বে “সব রাজনৈতিক ধারার বুদ্ধিজীবীদের মাঝেই মতাদর্শ থেকে সরে আসার একটি বড় প্রবণতা” লক্ষ করা যায়।

    “স্ট্যালিনবাদী কাল্ট”–এর একেবারেই অসমর্থনযোগ্য একনায়কতান্ত্রিক দমন–পীড়ন এবং ওয়াশিংটন কনসেনসাস ও তার দ্বারা সৃষ্ট বহুজাতিক কর্পোরেটবাদের অবশ্যম্ভাবী হিসেবে হাজির হওয়ার বাস্তবতা এক ধরনের ক্লান্তিতেই যেন আচ্ছাদিত করেছিল চারদিক। কমিউনিজমের পতনের সময়ে মার্কিন দার্শনিকরা প্রলয় তথা কিয়ামতের ভাষা ব্যবহার করছিল—এন্ড অব হিস্ট্রি। একইসাথে, তারা উদযাপন করছিলেন ওই যুগান্তকারী ঘটনাকে যাকে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আখ্যায়িত করেছিল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে “উদার গণতন্ত্রের” জয় হিসেবে। ফুকুয়ামার বই দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান শিরোনামের মাধ্যমেই এই বিস্ময়কর তত্ত্বকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। অর্থ্যাৎ, আর কোনো বিপ্লব হবে না। হার্ভার্ডের চিন্তক স্যামুয়েল হান্টিংটন এই সময়কে তাই “সমাপ্তির যুগ” বলে ঘোষণা করেছিলেন ঠিক যেই সময়ে “শিল্পের সমাপ্তি,” “প্রকৃতির সমাপ্তি,” ইত্যাদি নানা অতিরঞ্জিত তর্কের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। আর সিআইএ–র মতে, বার্লিন প্রাচীর পতনের ঠিক আগের কয়েক বছরে ফ্রান্সের অতীতে শক্তিশালী দার্শনিক বামপন্থীরা “এক ধরণের ঔদাসীন্যে আক্রান্ত” হয়েছিল৷

    এই প্রতিবেদনে সিআইএ উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের জনমতকে সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া এবং “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি জনসাধারণের মনোভাবকে কঠোরতর করে তোলার” জন্য কৃতিত্ব দেয়ার পাশাপাশি আরও লিখেছিল যে “উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বড় কোন প্রভাব রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।” তাদের এই বক্তব্য কি সঠিক ছিল? যদি আমরা বহু–কথিত “পরিচয়বাদী রাজনীতি”–র সমালোচকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখি, তবে এই প্রশ্নের উত্তর হবে: একেবারেই না। আবার, যারা উত্তর–আধুনিক দর্শন এবং সাম্প্রতিক কালের কয়েকটি প্রভাবশালী বামপন্থী চিন্তাধারা ও আন্দোলনকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তারা যুক্তি দিতে পারেন যে, সিআইএ তাদের সিদ্ধান্তে অদূরদর্শী ছিল। হয়তো স্নায়ু যুদ্ধের কয়েক দশকের কূটকৌশলে গড়ে ওঠা দ্বৈততাবাদী (Manichean) দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ থাকায় তারা এমন এক রাজনীতির কথা কল্পনা–ই করতে পারেননি, যা একইসঙ্গে আমেরিকান ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে পারে।

    শিল্পী: রিচার্ড প্রিন্স

    তবুও মতাদর্শ থেকে সরে আসার অর্থ মোটেও রাজনীতি থেকে সরে আসা নয়। বলা যেতে পারে, গোয়েন্দাদের মাঝে এই অদ্ভুত গবেষণা প্রবন্ধটি প্রচারিত হওয়ার তিরিশ বছর পর ফুকোর “বায়োপাওয়ার” কিংবা দেরিদার পরিচয় (আইডেন্টিটি)-কে প্রবলেম্যাটাইজ করা ধারণাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর (যদিও আমরা সবসময় তাদের কাজ পড়ি না বা পুরোপুরি বুঝি না)। তবে সংস্থাটি উত্তরাধুনিক চিন্তার সর্বব্যাপী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে না পারলেও তারা এই দার্শনিক ঐতিহ্যকে কখনোই অস্পষ্ট কিংবা তুচ্ছ জটিল বাক্যবিন্যাস হিসেবে বাতিল করে দেয়নি। রকহিল লিখেছেন, “যদি কেউ ধরে নেয় যে, বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাহীন কিংবা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তবে মনে রাখবেন, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ক্রীড়ানক আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নয়। এই সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতার একটি স্মারক হয়ে থাকবে।“

  • আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    আগামবেনের হোমো সাকের পাঠের নোক্তা

    • তৌহিদুল ইসলাম

    [ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life বইটি ইতোমধ্যেই আমাদের পাঠকের কাছে পরিচিত। বইটিতে আগামবেন তার হোমো সাকের ধারণার একটি বিস্তর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হাজির করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা কীভাবে আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো যেখানে জৈবক্ষমতার ধারণা হাজির করে আমাদের দেখান আধুনিক রাষ্ট্র জৈবক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের দ্বারা আমাদের কীভাবে আমাদের জীবন রক্ষা করে চলে, আগামবেন সেখানে সার্বভৌম ক্ষমতার একটা বিশেষ দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আগামবেন দেখান আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌম ক্ষমতা তার নিজের প্রয়োজনেই তার ব্যতিক্রমী অবস্থার তৈরি করে, যেই ব্যতিক্রমী অবস্থার মধ্য দিয়ে কাউকে ঠেলে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় ও আইনি সুরক্ষার বাইরে। পরিণত করা হয় হোমো স্যাকারে। আগামবেনের মতে হোমো স্যাকার হলো সেই জীবন যাকে যে কেউই হত্যা করতে পারে, এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কোনো বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন তাকে হতে হয় না। তৌহিদুল ইসলাম তার এই লেখায় আগামবেনের এই বইটির উপর কিছু নোক্তা হাজির করেন, যা আগামবেনের মূল ধারণার একটা সংক্ষিপ্ত টীকা আকারে দেখা যেতে পারে – সম্পাদক]

    দেয়ালচিত্রে আগামবেন

    ১.

    গ্রিক zoe এবং bios দুইটাই প্রাণ বা জীবন অর্থে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। প্রথমটা ব্যবহৃত হতো জীবের জীবন অর্থে। অর্থাৎ, যেখানে জীবন তার খুৎনিবৃত্তির স্তর অতিক্রম করে নাই। খাওয়া, পড়া, বেঁচে থাকার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, থাকে বায়োস। যার অর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন। বাংলার তন্ত্রে একটা কথা প্রচলিত আছে– “পাশবদ্ধ ভবেৎ জীব, পাশমুক্ত ভবেৎ শিব“। গ্রিক জো’কে আমরা বলতে পারি এই জীব। যে নানা পাশে বদ্ধ আছে বলে কল্পনা করা হয়। গ্রিক জো বা জীবের এই বায়োসে রূপান্তর তখনই সম্ভব যখন সে সমাজে প্রবেশ করে, রাজনৈতিকতায় অভিষিক্ত হয়। নিজের অধিকার, ভালো মন্দের নৈতিক ধারণা, আইন সম্পর্কে সচেতন না হয়ে জীবন ধারণ করতে পারে না। জো আর বায়োস জীবনের দুই প্রান্ত মনে হলেও এখানে একটা সরলরৈখিক রূপান্তরের ধারণা আছে। সেই রূপান্তর ঘটে জো বা জীবের। জীব থেকে সে নাগরিক হয়ে ওঠে।

    ২.

    এরিস্টটলের “Politics” থেকে জো এবং বায়োসের এই আলোচনায় আগামবেন মিশেল ফুকোর হিস্টরি অব সেক্সুয়ালিটিতে এ বিষয়ে একটা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেন, যেখানে ফুকো দেখান, আধুনিক সময়ে রাষ্ট্র কীভাবে তার যন্তরমন্তর আর হিসাবনিকাশের মাধ্যমে এই জো বা জীবের জীবন একটা কাঁচামাল হিসেবে হাজির হয় যার থেকে জন্ম আধুনিক বায়োপলিটিক্সের বা জৈবরাজনীতির। ফুকো বলেন, “For millennia man remained what he was for Aristotle: a living animal with the additional capacity for political existence; modern man is an animal whose politics calls his existence as a living being into question.”

    ৩.

    ফুকো এখানে চিহ্নিত করেন আধুনিক রাষ্ট্র তার নাগরিকদের যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে তার প্রক্রিয়াটিকে। যে প্রক্রিয়ার গোঁড়ায় আমরা দেখতে পাবো ইউরোপীয় জ্ঞানকাণ্ডের চালানো ভায়োলেন্স যা এই জীবের রক্তমাংসে নানাবিধ নামচিহ্নের টোকেন গেঁথে দিচ্ছে। তাকে নানা বর্গে ভাগ করে রেখে দেয়া হচ্ছে নানাবিধ খোপে, খাঁচায়। আর পুরো প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে এমন একটা সর্বব্যাপী আয়োজনের ভিতর দিয়ে যে মানুষ সজ্ঞানেই নিজেকে সঁপে দিচ্ছে সেই জ্ঞানের বেদিতলে। ফুকো এই প্রক্রিয়াকে বর্ণনা করেন ইউরোপীয় রাষ্ট্র কাঠামোর টেরিটরিয়াল স্টেট থেকে পপুলেশন স্টেটে রূপান্তর হিসেবে। আগে যেখানে রাষ্ট্র কিছু কাল্পনিক রেখার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং সার্বভৌমত্বকে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করতো টেরিটরি ধারণা, সেই রাষ্ট্রের নতুন কেন্দ্র হয়ে হাজির হলো জনগণ নামের নতুন বর্গ যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা চর্চার এবং ক্ষমতাকে পুনরুৎপাদন করার নতুন উপকরণ। এই ক্ষমতা ক্রমেই এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছালো যা একই সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্রের বিকাশের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলো, আবার একই সঙ্গে হলোকাস্টের মত নারকীয় ঘটনারও জন্ম দিলো।

    ৪.

    আগামবেন বলেন, এই জৈবক্ষমতার উদ্বোধনের মাধ্যমে মানুষের আচার–আচরণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ক্যাপিটালিজমের বিকাশও সম্ভবপর হতো না।

    আগামবেন হানা আরেণ্ডের হোমো লেবারানের উল্লেখ করে দেখান যে ফুকোর আগেই আরেন্ডের চিন্তায় বায়োপাওয়ারের ডিসিপ্লিনারি প্রক্রিয়া এবং আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর তার প্রভাবের নজির থাকলেও সেইটার সঙ্গে টোটালিটারিয়ান ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে আরেন্ড তেমন সচেতন ছিলেন না। আবার ফুকোও তার জৈবক্ষমতার বিশ্লেষণে তার সমসাময়িক সময়ের উদাহরণগুলি খুব বেশি টানেননি। এর মাধ্যমে আগামবেন দেখাতে চান যে জৈবক্ষমতা এবং বেয়ার লাইফের সম্পর্ক এতই আচ্ছাদিত যে পশ্চিমা চিন্তকরা খুব রেয়ারলি তার টিকি ধরে টান দিতে পেরেছেন।

    ৫.

    এই আচ্ছাদিত বিষয়টিকে নিরাবরণ করতে আগামবেন বলেন, হোমো সাকেরে তার কাজ হলো ক্ষমতার আইনি–প্রতিষ্ঠানগত এবং জৈবরাজনৈতিক মডেলের ছেদবিন্দুটির ব্যবচ্ছেদ। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতা গঠিতই হয় বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক জগতে অন্তর্ভূক্ত করার ভিতর দিয়ে। অথবা, সার্বভৌম ক্ষমতার আদি কাজটিই হলো এই জৈবরাজনৈতিক দেহের নির্মাণ। আগামবেনের মতে, এই অর্থে সার্বভৌম ব্যতিক্রম আর জৈবরাজনীতি সমান বয়সী। arcana imperii.

    তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন পশ্চিমা রাজনীতি নিজেকে গঠনই করে বেয়ার লাইফকে বর্জনের (যা একই সঙ্গে অন্তর্ভূক্তিকরণও বটে, বর্জনের অন্তর্ভূক্তিকরণ!) ভিতর দিয়ে।

    ৬.

    এরপর আগামবেন একটা দুর্দান্ত কাজ করেন। জো এবং বায়োসের দ্বৈততা থেকে তিনি পশ্চিমা চিন্তার একটা কেন্দ্রীয় অধিবিদ্যক প্রবণতার সঙ্গে একে মিলিয়ে দেখেন। এরিস্টটল যেইভাবে জো থেকে বায়োসে রূপান্তরকে জীবের রাজনৈতিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া হিসেবে হাজির করেন, একইভাবে আগামবেন দেখান, পশ্চিমা অধিবিদ্যার খুব কেন্দ্রীয় প্রবণতা হলো কণ্ঠস্বর থেকে ভাষায় পৌঁছানো। যেখানে ভাষা হলো সেই এলাকা যা মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষ একই সঙ্গে মানুষ হয়ে ওঠে ভাষা ও রাজনৈতিকতায়। আগামবেন বলেন: The question “In what way does the living being have language?” corresponds exactly to the question “In what way does bare life dwell in the polis?” তার মতে, পশ্চিমা অধিবিদ্যার সহি বড় আদি ও আসল সুরত হইলো রাজনীতি যার মারেফতে জীব ও ভাষার (logos) সম্পর্কে মুসাবিদা হয়। জীব বা বেয়ার লাইফের রাজনীতিকরণের মাধ্যমেই মানবের চূড়ান্ত অধিবিদ্যক গন্তব্য নিহিত। যেহেতু আধুনিক জমানায় ক্ষমতা নিজেকে জাহির করে বেয়ার লাইফকে রাজনৈতিক স্ফিয়ারে নিয়ে আসার মাধ্যমে, তাই এর মাধ্যমে আধুনিকতা পশ্চিমা অধিবিদ্যার গোপন পারপাসই সার্ভ করে। জার্মান জুরিস্ট কার্ল শ্মিটের বিপরীতে তিনি বলেন, পশ্চিমা রাজনীতির মৌলিক ক্যাটাগরি বন্ধু/শত্রু দ্বৈততা না, বরং বেয়ার লাইফ/ রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জো/বায়োস, এক্সক্লুশন/ইনক্লুশনের স্ট্রাকচারে নিহিত। আগামবেন বলেন, রাজনীতি আছে কারণ মানুষ হইলো সেই জীবিত জন্তু যে ভাষার ভিতরে ঢুকে নিজেকে তার বেয়ার লাইফ থেকে আলাদা করে, তার বিপরীতে দাঁড় করায় এবং একই সাথে, নিজেকে নির্ণয় করে সেই বেয়ার লাইফের সাপেক্ষে একটা অন্তর্ভূক্তিমূলক এক্সক্লুশনের মাধ্যমে।

    ৭.

    এই যে বেয়ার লাইফ, যারে নিয়ে এত কাহিনি, সেই হইলো আগামবেনের এই বইয়ের নায়ক। তথা প্রটাগনিস্ট। এই বেয়ার লাইফই হলো হোমো সাকের (পবিত্র মানব), যাকে হত্যা করা জায়েজ কিন্তু কুরবানি দেয়া জায়েজ না। আধুনিক রাজনীতিতে এই প্রটাগনিস্টকে কীভাবে ব্যবহার করা হয় সেটাই, আগামবেন বলেন, এই বইয়ের মূল কাজ। রাষ্ট্রে যেমন সব মানুষের একটা আইনি অস্তিত্ব থাকে যার ভিত্তিতে সে কিছু অধিকার ভোগ করে কিন্তু হোমো সাকেরের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হলো তাকে হত্যা করা জায়েজ।

    ৮.

    আগামবেনের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রে এই জৈবরাজনীতির ট্রান্সফর্মেশনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যে এখানে বেয়ার লাইফ বা হোমো সাকের আর কেবলমাত্র একটা ব্যতিক্রম হিসেবে থাকে না, বরং এটা নিজেই একটা নিয়ম হয়ে ওঠে। যেইটাকে আগামবেন বলেন, ইরিডিউসিবল ইনডিসটিঙ্কশন। অর্থাৎ, যে কারো যেকোনো সময়ে হোমো সাকের হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটা কেবলমাত্র আর প্রান্তের একটা বিষয় না, বরং আধুনিক রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বিষয়।

    ৯.

    আগামবেন আধুনিক গণতন্ত্রকে দেখেন এই বেয়ার লাইফকে তাঁর রাজনৈতিক বলয়ে ইন্টিগ্রেশনের দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামী প্রক্রিয়া হিসেবে। যার মাধ্যমে বেয়ার লাইফের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের পক্ষেও তার যে অন্তর্গত এপোরিয়া সেটাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয় না। বরং, বেয়ার লাইফ একটা বধযোগ্য ক্যাটাগরি হিসেবে বর্তমান থাকে। আধুনিক গণতন্ত্রের টোটালিটারিয়ানিজমের সঙ্গে সহবতে এটা প্রমাণিত হয়েছে নাজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের সময়ে, বিশেষ করে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, যেখানে মানুষকে তার সকল মানবিক মর্যাদা থেকে ছিন্ন করে একেবারে আক্ষরিক বেয়ার লাইফে পরিণত করা হয়েছিল।

    শিল্পী: তাদিউস সোবেস্তো (১৯৮৯)

    ১০.

    আগামবেনের মতে, গণতন্ত্র এবং টোটালিটারিয়ানিজমের মধ্যে একটা সলিডারিটি আছে, এই দুই ব্যবস্থার সকল ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পার্থক্যসমেতই। এই ব্যর্থতা আগামবেনের মতে পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসের ব্যর্থতা যেখানে জো আর বায়োস, কণ্ঠ এবং লোগোসের মধ্যে রূপান্তরের কোন সম্পর্ক তৈরি করতে পারেনি, যা এই ক্ষতকে নিরাময় করতে পারে। বেয়ার লাইফের এক্সক্লুশনারি ইনক্লুশনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি থেকে বের হতে না পারলে এর কোন সমাধান নেই।

    ১১.

    কার্ল শ্মিটের– সার্বভৌম হলো সেই যে ব্যতিক্রম কী হবে সেটাকে ঠিক করে–এই কথা, আগামবেনের মতে নতুন না। তার মতে, সার্বভৌম কে কিংবা কীভাবে সে সার্বভৌম হয়ে ওঠে এটা নিয়ে চিন্তা করা যথেষ্ট না, বরং পুরো রাজনৈতিক পরিসরের বিষয়টিকেই আমলে নিতে হবে। যা সার্বভৌমত্বের জুরিডিকাল, ইন্সটিটিউশনাল ধারার চিন্তায় করা হয় না।

    ১২.

    ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বুঝেছিলেন কীভাবে ব্যতিক্রম নিজেই নিয়ম হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি আমলে নিতে আগামবেন রাষ্ট্রের গঠনের আদি উৎপত্তির যে কাঠামো সেটার দিকে নতুনভাবে নজর দিতে বলেন। নৈরাজ্যবাদী ও মার্ক্সবাদীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা এই কাঠামোটিকে গুরুত্ব না দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার যে গোপন সূত্র (acranum iperiii) তাকে অবজ্ঞা করে, যেন সিমুলাক্‌রা এবং আইডিওলজির বাইরে রাষ্ট্রের আর কোন সাবসট্যান্স নাই। বরং, তারা এমন এক শত্রুকে সনাক্ত করে যার কাঠামো নিজেরাই বুঝতে পারে না, এবং তাদের রাষ্ট্রতত্ত্ব এমন একটা ডুবোচর যেখানে বিপ্লবের জাহাজডুবি ঘটে। এই ডুবোচরকে আগামবেন বলেন, যা মার্ক্সিস্ট রাষ্ট্রতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— দ্য স্টেট অব এক্সসেপশন বা প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র, যাকে দেখা হয় রাষ্ট্রহীন সমাজে অভিযাত্রার একটা ট্রান্সিশনাল পর্ব হিসেবে।

    শেষে এসে আগামবেন বলেন বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান কিংবা নৃবিজ্ঞানের যে সকল চিন্তার ক্যাটাগরি আছে সেগুলো নতুন ভাবে পর্যালোচনা ছাড়া, ক্ষমতার সঙ্গে বেয়ার লাইফের সম্পর্কের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে বোঝা আমাদের জন্য সম্ভব হবে না।

  • ব্যাঙ, রাজা এবং সার্বভৌমত্বের কৌতুক

    ব্যাঙ, রাজা এবং সার্বভৌমত্বের কৌতুক

    • লেখক: ইমরান কামাল

    অনেক অনেক দিন আগের কথা—এক পুকুরে বাস করতো অনেক ব্যাঙ। পুকুরটির পরিবেশ শান্ত, পানি স্থির ও স্নিগ্ধ। সারাদিন নিজেদের মধ্যে আনন্দ হুল্লোড় করে সেই জলাশয়ে ব্যাঙেদের দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। কিন্তু এই আনন্দময় স্ফূর্ত দিনযাপনের মধ্যেই একসময় তাদের মনে হলো—কোথায় যেনো একটা অপূর্ণতা আছে। সবকিছু থেকেও তাদের যেনো কিছু নেই। এই অভাববোধ থেকেই একসময় তারা ভাবলো, ‘সংখ্যায় তো আমরা অনেক। সবাই মিলে আনন্দেই আছি। কিন্তু আমাদের মাথার ওপর শাসন করার মতো কেউ যদি না থাকে তাহলে এই আমরা, আমাদের সামষ্টিক সত্তা—থেকেও নেই। যেই না এই কথা ভাবনায় এলো, অমনি ব্যাঙেরা ছুটলো দেবতার মন্দিরে। তারা প্রার্থনায় বসলো। তাদের একজন রাজা চাই। তাদের বিশ্বাস হয়েছিলো কেবল মাত্র একক এক মুকুটের অধীনস্ত হতে পারলেই তারা সত্যিকারের আদর্শ সমাজ হয়ে উঠতে পারবে।

    দেবতার দরবারে তাদের এই প্রার্থনা কবুল হলো। আসমান থেকে একটা কাঠের টুকরো ঝপ্ করে এসে পড়লো পুকুরের জলে। গোটা পুকুরটা যেনো তোলপাড় করে উঠলো। এই কাণ্ডে ব্যাঙেরা ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। তারা কখনো শাসক দেখেনি। কেবল শুনেছে শাসক নাকি সেই যাকে দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। ব্যাঙেরা প্রথমে দলেবলে পুকুরের জলের তলায় ডুব দিয়ে বসে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে তারা একে একে কাঠের টুকরোর কাছে জমায়েত হতে শুরু করলো। কেউ টুকরোটার সাথে কথা বলতে চাইলো। কিন্তু টুকরো নীরব। এই দেখে কেউ ভাবলো কাঠের গায়ে একটু টোকা মেরে দেখা যাক। টোকা দিতেই টুকরোটা আলতোভাবে নড়ে উঠলো, কিন্তু এ পর্যন্তই। এর বেশি সে আার কি করতে পারে, তা বোঝা গেলো না। এভাবে চললো কয়েকদিন। ব্যাঙেরা কাঠের টুকরোর কাছে নানা ফরিয়াদ জানায়। টুকরো কিছুই বলে না। তারা টুকরোকে খোঁচা-ধাক্কা দেয়, টুকরো ভেসে পুকুরের অন্যপ্রান্তে চলে যায়। এই কাণ্ড দেখে তাদের সাহস বাড়তে শুরু করলো। এক ব্যাঙ সাহস করে কাঠের টুকরোর উপরে চড়ে বসলো। বাকিরা দেখলো, এতো খুব মজা! রাজার কাধে চাপলেও রাজা কিছুই বলেন না। কোনো প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করেন না, কাউকে শাস্তি দেন না। এভাবে কেটে গেলো আরো কিছুদিন। ব্যাঙেরা এখন তাদের রাজার ওপর বিরক্ত হতে শুরু করেছে। তারা এই ভেবে বিরক্ত যে, ‘এহেন অপদার্থ রাজা নিয়ে আমরা কি করিবো’। ফলত, একসময় রব উঠতে শুরু করলো, ‘এ রাজা চলবে না, এ রাজা নকল, আমাদের আসল রাজা চাই’।

    দেবতার মন্দিরে তারা পুনরায় প্রার্থনায় বসলো। তাদের চাই সত্যিকারের রাজা। এবারও প্রার্থনা কবুল হলো। আসমান থেকে নেমে এলো এক সারস (মতান্তেরে হেরন পাখি অথবা সাপ)। ব্যাঙেদের মনে খুব ফুর্তি—অবশেষে তারা সত্যিকারের রাজা পেয়েছে। রাজাকে ঘিরে কয়েকদিন ধরে চললো উৎসব। কিন্তু তারপর, দেখা গেলো পুকুর থেকে একে একে ব্যাঙ গায়েব হতে শুরু করেছে। এইভাবে একসময় অনেক ব্যাঙ রাজার উদরে চালান হলো। যারা টিকে রইলো, তারাও বন্ধু হারানোর শোকে আহত, নিজেদের জীবন নিয়ে ভীত, আতঙ্কিত। এবার তারা বলতে শুরু করলো, ‘রাজা ছিলো মরা কাঠ, সেই ছিলো ভালো’, ‘এমন রাজার চাইতে রাজা, না থাকাই ভালো’। তারা যখন পুনরায় দেবতাদের মন্দিরে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রার্থনা শুরু করলো, দেবতা বললেন, ‘তোমরাতো সত্যি সত্যি শাসিত হতে চেয়েছিলে, তোমরা চেয়েছিলে একক মহান সার্বভৌম রূপ—যা তোমরা চেয়েছিলে তাই পেয়েছো।

    শিল্পী: ওয়াল্টার ক্রেইন (১৯০৮)

    দীর্ঘ পরিক্রমা

    এই গপ্পো, যার ইংরেজি নাম “The Frogs Who Desired a King” পৃথিবীর বহুদেশে, বহুভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলাতেও এর একাধিক অনুবাদ আছে। যুগে যুগে নানান দেশ, নানান ভাষায় গপ্পোটির রূপগত অল্পবিস্তর অদল-বদল হলেও, এর মধ্যে যে পরিহাসের বিষ—তা অক্ষতই থেকেছে।

    এই গল্পের আদিসূত্র গ্রিক কিস্সাখ্ওয়ান ঈশপ। বলা হয় তিনি খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মানুষ ছিলেন। তিনি লিখতে-পড়তে পারতেন, এমন কথা শোনা যায় না। তার গপ্পোগুলো লোকমুখেই প্রচলিত হয়েছিলো। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক এবং তারপর থেকে সংগ্রাহকেরা তাঁর গপ্পো লিখিত রূপ দিতে শুরু করেন। এই গপ্পোটির প্রথমদিকের যে সংস্করণগুলো পাওয়া যায় তাতে দেবতা চরিত্রে জিউসের দেখা মেলে। অর্থাৎ ব্যাঙেরা যে দেবতার কাছে প্রার্থনা করে, সেই সংস্করণগুলোতে তিনি জিউস। তিনিই প্রথম কাঠের টুকরোটিকে ব্যাঙেদের রাজা করে পাঠান। এ পর্যন্ত সেকালে সংস্করণগুলোতে কাহিনি একই। কিন্তু দ্বিতীয় রাজার ক্ষেত্রে দেখা যায় চরিত্র একেক সংস্করণে একেক রূপ নিয়েছে—কোথাও সারস, কোথাও সাপ আবার কোথাও হেরন পাখি।

    খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমানরা এই গপ্পো আপন করে নিয়েছিলো। ফায়েদ্রুস (Phaedrus) গপ্পোটি লাতিনে অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদে গপ্পের জিউস প্রতিস্থাপিত হন জুপিটারে আর সারস হয়ে ওঠে প্রজাগ্রাসী সামন্তপ্রভুর প্রতীক। ফায়েদ্রুসের রোমান সংস্করণটিই পরবর্তীতে ইউরোপীয় মধ্যযুগের পাণ্ডুলিপি ও স্কুলপাঠ্যে এই গপ্পের প্রধান সংস্করণ হয়েছিলো।

    মধ্যযুগের ইউরোপে এই গপ্পোর একটি নৈতিক দিক তৈরি হলো, যা সে সময়ের বিভিন্ন প্রাণীর গল্প নিয়ে লেখা বইগুলোতেও পাওয়া যায়। এ গপ্পের শেষে যেমন: আনুগত্যের কথা, শুধু শুধু পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বিপদ প্রভৃতি নীতিকথা জুড়ে দেওয়া হলো। এরপর, সপ্তদশ শতাব্দীতে, জ্যাঁ দ্য লা ফোঁতেন (Jean de La Fontaine) এটিকে এক সুন্দর ফরাসি রূপ দেন। তাঁর লেখায় ব্যাঙেরা আর নামহীন প্রাণী মাত্র হয়ে রইলো না; তারা হয়ে উঠলো ফ্রান্সের অস্থির প্রজাসাধারণ। কাঠের টুকরো হয়ে গেলো “অলস রাজা” (roi fainéant), আর সারস হলো স্বয়ং চতুর্দশ লুই, যার আমলে যুদ্ধ ও করের বোঝা টানতে টানতে ফ্রান্সের প্রজাসাধারণের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিলো।

    পরে, ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে গপ্পোটি শিশুদের সরলপাচ্যে পরিণত হয়। মুছে ফেলা হয় এর রাজনৈতিক দিকগুলো এবং নীতিকথাটি সহজ করে বলা হয়, “একজন নিষ্ঠুর রাজার চেয়ে, রাজা না থাকাই ভালো।” কিন্তু এই পরিবর্তিত রূপেও ব্যাঙদের অসন্তোষ এবং তাদের পরিণতি একই রকম থেকে গিয়েছিলো।

    গ্রিকদের লোককথা থেকে রোমানদের কবিতা, মধ্যযুগের ধর্মীয় উপদেশ থেকে ফরাসি রাজনৈতিক রূপক এবং সবশেষে ভিক্টোরীয় শিশুদের ঘর—অনেক পথ পাড়ি দিয়েছে গপ্পোটি। এর টিকে থাকা প্রমাণ করে যে, এতে শুধু শাসকের কারনামা নয়, বরঞ্চ মানুষের সামষ্টিক অস্তিদশা সম্পর্কেও গভীর ইশারা আছে।

    শিল্পী: চার্লস রবিনসন (১৮৯৫)

    জনগণত্বের সংকট

    এই ছোট্ট গপ্পোটি এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারলো কি করে? কারণ কি এই যে, এখানে জনমানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত সংকটকে ভীষণ ঠাট্টার ছলে তুলে ধরা হয়েছে?

    ব্যাঙেদের তো একটি সামষ্টিক অস্তিত্ব ছিলো। তারা একসঙ্গে বাস করত, একসঙ্গে ডাকত, আনন্দে ভরিয়ে রাখত তাদের পুকুর। কিন্তু তারপরও তাদের মনে হয়েছিল, এটা যথেষ্ট নয়। তাদের ধারণা ছিল যে কোনো সার্বভৌম শাসক ছাড়া, একজন যে তাদের ঐক্যের প্রতীক হবে—এমন কেউ ছাড়া, তারা অসম্পূর্ণ। তারা এমন একজনকে চেয়েছিল যে তাদের হয়ে তাদের (সকলের) প্রতিনিধিত্ব করবে।

    কিন্তু যেই মুহূর্তে তারা এটি চাইল, তখনই শুরু হলো সংকট। যে রাজা তারা প্রথমে পেলো, অর্থাৎ সেই কাঠের টুকরো, যে ছিলো অকেজো, যদিও সে ‘রাজা’ই। তারপর তারা যে রাজা চাইলো, অর্থাৎ সেই সারস, সে ছিল সক্রিয়, কার্যকর, কিন্তু করালগ্রাসী। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে ব্যাঙেদের সংকট। সমষ্টি হিসেবে তাদের অস্তিত্ব যেনো শূন্যতা এবং পীড়নের আজব গিটে আটকে গেলো—ফেঁসে গেলো অকেজো কাঠের টুকরো আর হিংস্র সারসের মধ্যে।

    এ কেবল একটি রাজনৈতিক সমস্যা নয়, একই সঙ্গে এটা সমষ্টির আস্তিত্বিক মৌলিক সংকটও। যেনো সমষ্টি হিসেবে অস্তিত্ব ধারণ করা মানে এই সন্দেহ নিয়ে জীবনযাপন করা যে, সার্বভৌমত্বের প্রতীক ছাড়া কোনো ঐক্যই বাস্তব নয়। আফসোসের কথা হলো, সার্বভৌমত্বের এই প্রতীক নিজেই বিভেদ তৈরি করে। যত না সে মেলায়, ভাঙে তার চাইতে বেশি। সার্বভৌম শাসক মানেই এমন কেউ যে অবস্থান করে জনগণের ওপরে, আর জনগণ যারা নিজেদের পূর্ণতা চেয়েছিল, তারা নিজেদেরকেই আবিষ্কার করে অধীনস্ত রূপে।

    কিছু না! আর ধ্বংসের সীমন্তরেখায়
    আমাদের গপ্পের কাঠের টুকরো আর সারস কেবল দুটি শব্দ নয়; তারা সার্বভৌমত্বের দুই রূপও।

    • কাঠের টুকরো: এমন এক সার্বভৌমত্ব যার কোনো ক্ষমতা নেই—এটা নামমাত্র প্রতীক, একটি শূন্য সিংহাসন, একতার এক এমন বিমূর্ত রূপ যা সমষ্টির জন্য কিছুই করতে পারে না। জনসমষ্টির কাছে এ হলো উপহাসের পাত্র, কিন্তু অন্তত এতটুকু ছাড়া তারা আবার একত্রে থাকতেও পারে না। সার্বভৌমত্ব নয়, এ যেন তার খোলস মাত্র।
    • সারস: এমন এক সার্বভৌমত্ব যার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই—যে সক্রিয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং কর্মঠ (হয়তো সৎ-ও), আবার একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী, বিধ্বংসী। জনগণ তার কর্মকাণ্ডকে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশংসা করে যতক্ষণ না তারা তার বিপদজনক রূপটি দেখতে পায়। এ হলো করালগ্রাসী সার্বভৌমত্ব।

    ব্যাঙেরা এই দুটি মেরুর মধ্যে অবিরাম দুলতে থাকে। যেনো এই দোল খাওয়াটাই মূল বিষয়। এই সংকট থেকে জনগণ কখনো বেরিয়ে আসতে পারে না, কারণ শাসনের প্রতি, শাসিত হওয়ার প্রতি—তাদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই এই দ্বন্দ্ব নিহিত।

    সার্বভৌমত্বের কৌতুক

    এই গপ্পোকে প্রায়শই একটি কৌতুক হিসেবে দেখা হয়—নির্বোধ ব্যাঙেরা রাজা চেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরই রাজার খাদ্য হতে হয়েছে। কিন্তু এই হাসি অস্বস্তিকর, কারণ সেই ব্যাঙগুলোতো আসলে আমরাই। আমরা জনগণ কাঠের টুকরোকে উপহাস করি, সারসের অধীনে কাঁদি, এবং তারপর আবার কাঠের টুকরোকে আকাঙ্ক্ষা করি। ব্যাপারটা দেখতে হাস্যকর হলেও, এটা আমাদের রাজনীতির ট্র্যাজেডি। এই অশ্রুমিশ্রিত কৌতুকের অন্ত নেই, সমাধানও নেই।

    জনগণ চাইলেই সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না, কারণ তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। আবার তারা এটিকে পুরোপুরি গ্রহণও করতে পারে না, কারণ তাতে তাদেরই নাই হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রাচীন পুকুর থেকে আধুনিক নেশন-স্টেট—এই চক্র চলেছে এবং চলছেই।

    শিল্পী: উইলিয়াম দে মরগান (১৮৭২)

    পরিত্রাণহীন শিক্ষা

    নীতিকথায় বলা রইলো, ‘একজন নিষ্ঠুর রাজার চেয়ে, রাজা না থাকাই ভালো।’ আবার এও বলা হলো, ‘তোমার কাঠের টুকরোটিকে মেনে নাও, কারণ অন্তত সে তোমাদের গিলে খাবে না।’ কিন্তু এই শিক্ষাগুলো বরাবরই আরো গভীর এক সত্যকে এড়িয়ে যায়। আসল সংকট, খোদ সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা—একজন রাজা, একজন নেতা, একটি ঐক্যবদ্ধ রূপ চাওয়ার—এই কাজটিই জনগণকে সংকটে ফেলে দেয়।

    ধারণায় জনগণ সার্বভৌম, কিন্তু বাস্তবে তাদের সার্বভৌমত্ব এমন কিছুতে রূপ নেয় যা তাদের বাইরে, যা তাদের শাসন করে। তারা একজন শাসক এবং তার অধীন শাসিত হতে চাওয়ার মধ্যদিয়ে যেমন নিজেদের গঠন করে, তেমন ধ্বংসও করে। ব্যাঙদের এই গল্পটি টিকে আছে কারণ তা এই অদ্ভুত স্ববিরোধিতার চরম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

    সামষ্টিক সত্তা (নেশন বা জাতি) কোনো স্থির বিষয় নয়, বরং এটি একটি অস্থির আকাঙ্ক্ষা: বহুর একসঙ্গে থাকা, তবুও একজন হয়ে ওঠা; সার্বভৌম হওয়া, তবুও বশ্যতা স্বীকার; কাঠের টুকরো প্রতি উপহাস, সারসের প্রতি ভয়…

    শিল্পী: জেরি পিংকনি

    যে ডাক থামে না

    ঈশপের গ্রিস থেকে ফায়েদ্রুসের রোম, লা ফোঁতেনের ফ্রান্স থেকে ভিক্টোরীয় শিশুদের মন—ব্যাঙদের সেই ডাক আজও শোনা যায়। এই ডাক যেনো মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের আওয়াজ, যে অস্তিত্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে সার্বভৌমত্ব ছাড়া তারা আদৌ আছে কি নেই! আবার সার্বভৌমত্বের অধীন সেই অস্তিত্ব হয়ে পড়ে হত্যাযোগ্য প্রাণ।

    আমরা দেখি, গপ্পের দেবতারা মানুষের সামষ্টিক অস্তিত্বের এই কৌতুক দেখে কখনো ক্লান্ত হন না। কাঠের টুকরো আর সারস সর্বদা প্রস্তুত থাকে, সর্বদা অপেক্ষায় থাকে। আর ব্যাঙেরা, চিরকাল অস্থির এবং অসন্তুষ্ট, ডেকে চলে, ডেকেই চলে।

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫

  • মিখাইল বাকুনিন ।। রুশোর রাষ্ট্রতত্ত্ব

    মিখাইল বাকুনিন ।। রুশোর রাষ্ট্রতত্ত্ব

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [মিখাইল বাকুনিন ১৯৬৭ সালে এই লেখাটি বক্তৃতা আকারে পেশ করেন জেনেভায়। পূর্ণাঙ্গ লেখাটির শিরোনাম Federalism, Socialism, Anti-Theologism, যার একটি অংশ অনূদিত লেখাটি। এখানে বাকুনিন রুশের রাষ্ট্রতত্ত্বের একটি সমালোচনা হাজির করেন। রুশের সামাজিক চুক্তি ধারণার বিশ্লেষণ করে বাকুনিন মানব মুক্তি ও মানব চরিত্র নিয়ে তার নিজস্ব ধারণা উপস্থাপন করেন। বাকুনিন তার বিশ্লেষণে রাষ্ট্র ও সমাজকে পৃথক করে দেখেন, যার ভিত্তিতে তিনি আলোচনা করেন ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের সম্পর্ক নিয়ে। অনূদিত অংশটির ইংরেজি সংস্করণ Rousseau’s Theory of the State নামে বিভিন্নস্থানে সংকলিত হয়েছে- সম্পাদক]

    • মিখাইল বাকুনিন (২০২০)
      শিল্পী: লতির

    আমরা বলেছি, মানুষ শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যক্তি–স্বাতন্ত্রিক প্রাণীই নয়—একই সঙ্গে সবচেয়ে সামাজিক প্রাণীও বটে। জাঁ–জাক রুশো ভেবেছিলেন যে, আদিম সমাজ গড়ে উঠেছিল অসভ্য মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছা–সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু এই ধারণা ছিল একটি মস্ত ভুল। তবে শুধু রুশো নন, অধিকাংশ আইনতত্ত্ববিদ ও আধুনিক চিন্তা–প্রচারকগণ অনেকেই এ ধরনের ধারণা পোষণ করেছেন।

    কান্টীয় ধারা হোক বা অন্য কোনো ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী ও উদারপন্থী ধারা, যাঁরা সমাজকে ধর্মতাত্ত্বিকদের মতো “ঐশি অধিকারের’ ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেন না, কিংবা হেগেলীয়দের মতো সমাজকে “বস্তুগত নৈতিকতার আধ্যাত্মিক উপলব্ধি” হিসেবে দেখেন না, কিংবা প্রকৃতিবাদীদের মতো সমাজকে কেবলমাত্র “প্রাণীবৎ জীবনের আদিম রূপ” বলে মনে করেন না, তাঁরা সকলেই চান বা না চান, অন্য কোনো ভিত্তি না পেয়ে, অলিখিত চুক্তি বা সমঝোতাকেই সমাজের সূচনা–বিন্দু হিসেবে ধরে নিয়েছেন।

    সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, আদিম মানুষ কেবলমাত্র একাকী অবস্থায়ই পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত, আর সেই অবস্থায় তার প্রকৃতি ছিল মূলত অসামাজিক। কিন্তু মানুষ যখন একত্র হতে বাধ্য হয়, তখন তারা একে অপরের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে। এই সংঘাত যদি নিয়ন্ত্রণহীন থেকে যায়, তবে তা পরস্পর বিনাশের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

    এই সর্বনাশ এড়াতে মানুষ এক ধরনের চুক্তিতে উপনীত হয়। কখনও তা আনুষ্ঠানিক, কখনও বা অনানুষ্ঠানিক। যেখানে তারা নিজেদের কিছু স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে, বাকিটা সুরক্ষিত রাখার জন্য। এই চুক্তিই সমাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে। অথবা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্রের ভিত্তি। কারণ এই তত্ত্বে “সমাজ” বলতে আলাদা কোনো সত্তার অস্তিত্ব ধরা হয়নি; এখানে কেবল রাষ্ট্রই বিদ্যমান। বরং বলা যায়, সমাজকে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের মধ্যেই বিলীন করে দেওয়া হয়েছে।

    সমাজ হলো মানব সামষ্টিকতার প্রাকৃতিক অস্তিত্ব রূপ, যা কোনো চুক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। সমাজ নিজেকে পরিচালিত করে প্রথাভিত্তিক বা ঐতিহ্যগত অভ্যাসের মাধ্যমে, কখনোই আইন দ্বারা নয়। এর অগ্রগতি ঘটে ধীরে ধীরে। আইনপ্রণেতার চিন্তা বা ইচ্ছার দ্বারা নয়, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে আসা প্রেরণার দ্বারা।

    সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে বহু আইন, যদিও সমাজ নিজে সেগুলোর বিষয়ে সচেতন নয়। কিন্তু এগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিক আইন। যেমন বস্তুর ভেতর ভৌতধর্মের আইন নিহিত থাকে, তেমনি সমাজদেহের ভেতরেও এ ধরনের আইন নিহিত থাকে। এইসব প্রাকৃতিক আইনের অধিকাংশই আজও আমাদের অজানা রয়ে গেছে। তবুও, মানবসমাজের জন্মলগ্ন থেকে এগুলো সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, সমাজের সদস্যদের চিন্তা ও ইচ্ছার বাইরে এবং স্বাধীনভাবে।

    সুতরাং এই প্রাকৃতিক আইনগুলোকে রাজনৈতিক বা আইনগত বিধানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়। রাজনৈতিক বা আইনগত বিধান হলো সেইসব নিয়ম, যেগুলো কোনো আইনসভা প্রণয়ন করে এবং যেগুলোকে মানবজাতির প্রথম সামাজিক চুক্তি থেকে যৌক্তিকভাবে উদ্ভূত বলে ধরা হয়।

    রাষ্ট্র কোনোভাবেই প্রকৃতির সরাসরি উৎপন্ন বস্তু নয়। সমাজের মতো রাষ্ট্র মানুষের মধ্যে যুক্তিবোধ জাগরণের পূর্বে বিদ্যমান ছিল না। উদারপন্থীদের মতে, প্রথম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল মানুষের স্বাধীন ও যুক্তিসম্মত অভিপ্রায় দ্বারা; আর দক্ষিণপন্থীদের মতে, রাষ্ট্র হলো ঈশ্বরের সৃষ্টি। কিন্তু যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, রাষ্ট্র সর্বদা সমাজের উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং ক্রমে তাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করার প্রবণতা প্রদর্শন করে।

    যে কেউ আপত্তি করতে পারেন যে, রাষ্ট্র যেহেতু জনকল্যাণ বা সবার সাধারণ স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে বলে বিবেচিত, তাই তা প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতার একটি অংশ সীমিত করে কেবল বাকি অংশটুকু নিশ্চিত করার জন্য। তবে এই অবশিষ্ট অংশটুকু একধরনের নিরাপত্তা হতে পারে, কিন্তু কখনোই তা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। কারণ স্বাধীনতা অবিভাজ্য; এর সামান্য অংশকেও সংকুচিত করা মানে আসলে সমগ্র স্বাধীনতাকেই হত্যা করা। যে সামান্য অংশ আপনি কেটে নেন, সেটিই আমার স্বাধীনতার মূল সারবস্তু— অর্থাৎ পুরো স্বাধীনতাই। প্রাকৃতিক অপরিহার্য এবং অনিবার্য এক প্রবণতায় আমার সমগ্র স্বাধীনতা ঠিক সেই ক্ষুদ্র অংশে এসে কেন্দ্রীভূত হয়, যেটুকু আপনি সংকুচিত করেন।

    এটি ব্লুবিয়ার্ডের স্ত্রীর গল্পের মতো: একটি প্রাসাদের সব কক্ষ ঘুরে দেখার পূর্ণ স্বাধীনতা তাকে দেওয়া হয়েছিল। সবকিছু দেখা ও স্পর্শ করার অনুমতি ছিল। শুধুমাত্র একটি ভয়ঙ্কর ছোট কক্ষ ছাড়া। তাঁর স্বামীর সর্বময় ইচ্ছা অনুযায়ী সেই দরজা খোলা ছিল নিষিদ্ধ, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য। ফলে তিনি প্রাসাদের সব জাঁকজমক থেকে বিমুখ হলেন, আর তাঁর সমগ্র মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো সেই নিষিদ্ধ ছোট ঘরটির দিকে। আর তিনি সেটি খুললেন, যথার্থ কারণেই। কারণ তাঁর স্বাধীনতা নির্ভর করছিল সেই দরজা খোলার উপর, আর প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তাঁর স্বাধীনতার সরাসরি লঙ্ঘন।

    এটি আদম ও ইভের পতনের কাহিনির মতোও বটে। জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। কোনো যৌক্তিক কারণে নয়, কেবল প্রভুর ইচ্ছা বলে। এটি তথাকথিত সদয় প্রভুর পক্ষ থেকে ছিল ভীষণ স্বৈরাচার। আমাদের আদিপিতা–আদিমাতা যদি সে নিষেধ মেনে নিতেন, তবে মানবজাতি চিরকালই সবচেয়ে লাঞ্ছনাকর দাসত্বে নিমজ্জিত থাকত। কিন্তু তাঁদের অবাধ্যতাই আমাদের মুক্তি দিয়েছে ও রক্ষা করেছে। পৌরাণিক ভাষায় বললে, তাঁদের এই অবাধ্যতাই ছিল মানব স্বাধীনতার প্রথম ঐতিহাসিক প্রকাশ।

    কেউ বলতে পারে: রাষ্ট্র বিশেষত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যা সমস্ত নাগরিকের মুক্ত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তা কি করে তাদের স্বাধীনতার নস্যাত করতে পারে? কেন নয়? এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে নাগরিকেরা রাষ্ট্রকে কোন দায়িত্ব ও কতখানি ক্ষমতা অর্পণ করছে তার উপর। একটি জনতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত হলেও, অত্যন্ত স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে, এমনকি রাজতন্ত্রের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী, যদি তা সবার অভিপ্রায়ের প্রতিনিধি হওয়ার অজুহাতে সামষ্টিক ক্ষমতার সমস্ত ভার প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বাধীন চলাচলের উপর চাপিয়ে দেয়।

    তবে ধরা যাক কেউ যুক্তি দেখাল যে, রাষ্ট্র তার সদস্যদের স্বাধীনতা কেবল তখনই সীমিত করে, যখন তারা অন্যায় বা মন্দের দিকে ঝুঁকে পড়ে। রাষ্ট্র মানুষকে একে অপরকে হত্যা, লুটপাট, অপমান করা কিংবা সাধারণভাবে একে অপরকে ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখে, অথচ তাদের ভালো কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা রেখে দেয়। কিন্তু এখানেই আবার ফিরে আসতে হয় ব্লুবিয়ার্ডের স্ত্রীর গল্পে, কিংবা নিষিদ্ধ ফলের কাহিনিতে: আসলে ‘শুভ’ কী? আর ‘মন্দ’ কী?

    আমরা যে তত্ত্বটি পর্যালোচনা করছি তার দৃষ্টিকোণ থেকে, শুভ ও মন্দের মধ্যে কোনো পার্থক্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে বিদ্যমান ছিল না। তখন প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব স্বাধীনতা বা পূর্ণ অধিকারের ভেতরে স্বতন্ত্র অবস্থান করত এবং সহজনদের প্রতি তার বিবেচনা ছিল সীমিত। ব্যতিক্রম শুধু তুলনামূলক নিজের দুর্বলতা বা সবলতা যা তাকে বাধ্য করতো। তার মানে, মামলা কেবল ব্যক্তিগত ঝুঁকিরোধ ও স্বার্থসিদ্ধির। সেই সময়, এই একই তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মকেন্দ্রিকতা ছিল সর্বোচ্চ আইন, একমাত্র অধিকার। তখন ‘শুভ’ নির্ধারিত হতো সাফল্যের মাধ্যমে, আর ব্যর্থতাই ছিল একমাত্র ‘মন্দ’। ন্যায়বিচার ছিল যাবতীয় অঘটনঘটনের পবিত্রীকরণ, তা যত ভয়াবহ, নিষ্ঠুর বা কুখ্যাত হোক না কেন। আজকের ইউরোপে যে রাজনৈতিক নৈতিকতা বিদ্যমান, সেখানের বাস্তবতাও প্রায় একই রকম।

    এই তত্ত্ব অনুযায়ী শুভ ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য কেবল সামাজিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই শুরু হয়। অতঃপর, যা গঠনকৃত সাধারণ স্বার্থের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়, তা ‘শুভ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, আর যা এর বিরোধী, তা ‘মন্দ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

    চুক্তিবদ্ধ সদস্যরা নাগরিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি আংশিক বা পূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করে: তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে সাধারণ শুভের চেয়ে এগিয়ে না রাখার, অর্থাৎ এমন একটি স্বার্থের প্রতি বাধ্যতা প্রদর্শন করার, যা সকলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তাঁদের নিজস্ব অধিকারগুলো আলাদা করা হয় জনসাধারণের অধিকার থেকে। আর সেই জনসাধারণের একমাত্র প্রতিনিধি রাষ্ট্র, পায় ক্ষমতা, যেকোনো ব্যক্তিগত অবৈধ বিদ্রোহ দমন করার। একই সঙ্গে, যেকোনো সদস্যর ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষার, যতদূর অবধি তা সাধরণ অধিকারেরর বরখেলাপ না করে।

    এখন আমরা পরীক্ষা করে দেখব, এইভাবে গঠিত রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত? একদিকে অপরাপর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, আরেকদিকে তার নিজস্ব জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এই পরীক্ষণ আমাদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়, কারণ এখানে যে রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে, সেটিই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক রাষ্ট্র— যতদূর পর্যন্ত সে ধর্মীয় ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে; অর্থাৎ আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তকদের ঘোষিত সর্বজাগতিক বা নাস্তিক রাষ্ট্র।

    তাহলে দেখা যাক, এর নৈতিকতা আসলে কী দিয়ে গঠিত? এটি সেই আধুনিক রাষ্ট্র, যে গির্জার জোয়াল থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে, এবং ফলত খৃষ্টধর্মীয় সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন নৈতিকতার জোয়াল থেকেও মুক্তি লাভ করেছে। একই সঙ্গে, এটি তখনও মানবতাবাদী নৈতিকতা বা ভাবনায় পরিপূর্ণ হয়নি, কেননা নিজের অস্তিত্ব নিজে ধ্বংস না করে উক্ত রাষ্ট্র কখনোই তা আত্মস্থ করতে পারে না। রাষ্ট্র তার পৃথক সত্তা ও বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীভবনে এতটাই সংকীর্ণ যে, সমগ্র মানবজাতির স্বার্থ ও সেই স্বার্থজাত নৈতিকতাকে ধারণ বা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

    ইতোমধ্যেই আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ ঠিক এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। খৃষ্টধর্ম তাদের কাছে কেবল অজুহাত, শ্লোগান কিংবা অলস জনতার পালকে প্রতারিত করার একটি হাতিয়ার মাত্র। কেননা কার্যত রাষ্ট্রের অনুসৃত লক্ষ্যসমূহের সাথে ধর্মীয় অনুভূতির কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের সময়ের প্রকাণ্ড রাষ্ট্রনেতা পালমারস্টন, মুরাভিয়েভ, কাভুর, বিসমার্ক কিংবা নেপোলিয়নদের ধর্মীয় ঘোষণাসমূহকে মানুষ যখন গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করত, তখন তারা মনে মনে পরিহাস করতেন। আর যখন মানবতাবাদী আবেগ, বিবেচনা বা উদ্দেশ্য সেসবের প্রতি আরোপ করা হতো, তখন তো তারা আরও প্রবলভাবে হাসতেন। তথাপি, এই ধারণাগুলোকে প্রকাশ্যে নিছক অর্থহীন বলে অস্বীকার করার মতো ভুল তারা কখনো করেননি।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে: তাদের নৈতিকতা আসলে কি দিয়ে গঠিত? উত্তর হলো— কেবলমাত্র রাষ্ট্রের স্বার্থ, আর কিছু নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, খুব সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, ইতিহাসের সব যুগের সব দেশের রাষ্ট্রনেতা তথা শক্তিমান ব্যক্তিদের নীতি ছিল—রাষ্ট্রের সংরক্ষণ, মহিমা ও শক্তিবৃদ্ধিতে যা কিছু অবদান রাখে, তা যতই ধর্মবিদ্বেষী বা নৈতিকভাবে ঘৃণ্য মনে হোক না কেন, সেটিই ‘সুন্দর’ বা ‘কল্যাণকর’। বিপরীতে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে যা কিছু ব্যাহত করে, তা যতই পবিত্র বা ন্যায়সঙ্গত হোক না কেন, সেটি ‘অসৎ’ বা ‘অকল্যাণকর’। এটাই প্রতিটি রাষ্ট্রের সর্বজাগতিক নৈতিকতা এবং চর্চার প্রকৃত রূপ।

    জ্যাঁ জ্যাক রুশোর পোর্ট্রেট
    শিল্পী:

    একই অবস্থা দেখা যায়, এমনসব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও, যা সামাজিক চুক্তির তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই নীতি অনুসারে, শুভ ও ন্যায় কেবলমাত্র চুক্তির মাধ্যমেই সূচিত হয়; প্রকৃতপক্ষে এগুলি বরং চুক্তির অন্তর্বস্তু ও উদ্দেশ্য বৈ কিছু নয়। অর্থাৎ সেই সাধারণ স্বার্থ ও সর্বজনীন অধিকার, যা পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ব্যক্তিসমষ্টি নিজেদের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, আর বাদ দিয়েছে তাদেরকে যারা এই চুক্তির বাইরে। অতএব, রাষ্ট্রটি মূলত সীমিত ও বিশেষ এক সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর সমষ্টিগত স্বার্থপরতার সর্বাধিক পরিতৃপ্তি ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা, এ রাষ্ট্র গঠিত হয় প্রত্যেক সদস্যের ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার আংশিক ত্যাগের ভিত্তিতে। ফলে এটি তার বৃত্তের বাইরে অবস্থানকারী, মানবজাতির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে “অপর” বা “প্রাকৃতিক শত্রু” হিসেবে বর্জন করে। তাতে তারা সংগঠিত হোক বা অনুরূপ অন্য কোনো সমিতির অন্তর্গত থাকুক না কেন।

    একটি সার্বভৌম ও বহির্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র অনিবার্যভাবে অন্য অনুরূপ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব এবং প্রয়োজনে সেগুলো গঠনের প্রক্রিয়াকেও উদ্দীপিত করে। কারণ, যে সকল ব্যক্তি উক্ত রাষ্ট্রের বাইরে অবস্থান করছে এবং তার দ্বারা নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতায় হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে, তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের রক্ষার্থে পাল্টা সংযুক্ত হওয়া আবশ্যক হয়ে ওঠে। এভাবে মানবজাতি অনির্দিষ্ট সংখ্যক ভিন্নতর রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেখানে প্রত্যেক রাষ্ট্রই অপর রাষ্ট্রের প্রতি বৈরী এবং পরস্পরের জন্য হুমকিস্বরূপ অবস্থায় থাকে। তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ অধিকার নেই, কোনো প্রকার সামাজিক চুক্তিও নেই; কেননা, যদি তা থাকত, তবে তারা আর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারত না, বরং এক বৃহৎরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত সংঘবদ্ধ সদস্যে পরিণত হত। কিন্তু, এই বৃহৎরাষ্ট্র যদি সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তার মুখোমুখি দাঁড়াবে অন্যান্য বৃহৎরাষ্ট্র, যেগুলো নিজের ভেতরে সংঘ গঠন করলেও একে অপরের প্রতি অনিবার্য শত্রুতার অবস্থান বজায় রাখবে। ফলে, যুদ্ধ মানব–অস্তিত্বের এক অবশ্যম্ভাবী শর্ত এবং ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবেই থেকে যাবে।

    অতএব, প্রত্যেক রাষ্ট্র, তা সংঘভুক্ত হোক বা না হোক, অপরিহার্যভাবে সর্বাধিক শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ, তাকে গ্রাস করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই গ্রাসে পরিণত হবে; তাকে জয় করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই পরাজিত হবে; তাকে প্রভুত্ব করতে হবে, নচেৎ সে নিজেই দাসে পরিণত হবে। কেননা, দুটি শক্তি প্রকৃতিগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়েও পরস্পরের কাছে ভিন্ন ও অপরিচিত হলে পারস্পরিক ধ্বংস ব্যতীত সহাবস্থান করতে পারে না।

    রাষ্ট্র তাই মানবতার সর্বাধিক গর্হিত, সর্বাধিক, বিদ্রুপাত্মক এবং সর্বাধিক পরিপূর্ণ অস্বীকৃতি। এটি পৃথিবীর সকল মানুষের সার্বজনীন সংহতিকে চূর্ণ করে, এবং কেবলমাত্র ধ্বংস, জয় ও দাস বানানোর উদ্দেশ্যে তাদের কতককে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। রাষ্ট্র কেবল তার নিজস্ব নাগরিকদেরই রক্ষা করে; মানবাধিকার, মানবতা ও সভ্যতাকে কেবল তার নিজস্ব সীমার মধ্যেই স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্র তার বাইরে যেহেতু কোনো অধিকারকে স্বীকার করে না, স্বভাবতই তা গাজোয়ারিতে সমস্ত ভীনদেশি জনগোষ্ঠীর প্রতি সর্বাধিক হিংস্র অমানবিকতার চর্চাকে নিজের অধিকার বলে প্রতিপন্ন করে, যাতে ইচ্ছামতো লুণ্ঠন, ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে কিংবা দাসে পরিণত করে পারে। রাষ্ট্র যদি কখনো তাদের প্রতি উদারতা বা মানবিকতা প্রদর্শন করে, তবে তা কোনো কর্তব্যবোধ থেকে নয়; কারণ রাষ্ট্রের একমাত্র কর্তব্য তার নিজের প্রতি এবং এরপর কেবল সেই সদস্যদের প্রতি, যারা স্বেচ্ছায় রাষ্ট্র গঠন করেছে, বা স্বেচ্ছায় তাকে টিকিয়ে রেখেছে, কিংবা এমনকি, যারা পরিণামে তার অনুগত ‘প্রজায়’ পরিণত হয়েছে। যেহেতু কোনো আন্তর্জাতিক আইন কার্যত বিদ্যমান নেই, এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকে গোড়া থেকে বিনষ্ট না করে থাকতেও পারে না, তাই বিদেশী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের কোনো কর্তব্য থাকতে পারে না। সুতরাং রাষ্ট্র যদি কোনো পরাজিত জনগোষ্ঠীকে মানবিকভাবে আচরণ করে, যদি তাদের আংশিকভাবে লুণ্ঠন বা ধ্বংস করে, অথবা তাদের সর্বনিম্ন মাত্রার দাসত্বে নামিয়ে না আনে, তবে তা রাজনৈতিক বিচক্ষণতা কিংবা নিছক মহানুভবতা থেকে অনুপ্রাণিত একটি পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু তা কখনোই কর্তব্যবোধ থেকে আসে না। কারণ রাষ্ট্র একটি পরাজিত জনগোষ্ঠীকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করার একচেটিয়া ও পূর্ণ অধিকার দাবি করে।

    রাষ্ট্র মূলত মানবতার প্রকাশ্য অস্বীকৃতি। অথচ রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই অস্বীকৃতিই সর্বোচ্চ কর্তব্য, আবার সেটাই তার শ্রেষ্ঠগুণ যা রাষ্ট্রের প্রকৃত সত্তা গঠন করে। রাষ্ট্র একে বলে ‘দেশপ্রেম’। এই দেশপ্রেমই রাষ্ট্রের সেই নৈতিকতা, যা সাধারণ মানবিক নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে যায়। আমরা একে বলি ‘অতীন্দ্রিয় নৈতিকতা’, কারণ এটি প্রায়ই ব্যক্তিগত বা সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। সাধারণভাবে অন্যকে অপমান করা, নিপীড়ন করা, লুণ্ঠন করা, হত্যা করা বা দাসে পরিণত করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু রাষ্ট্র যখন বলে, দেশপ্রেমের খাতিরে—রাষ্ট্রের মহিমা রক্ষার জন্য, তার শক্তি বজায় রাখার জন্য কিংবা তার ক্ষমতা বিস্তারের স্বার্থে—এসব কাজ অপরাধ নয়, বরং কর্তব্য ও গুণ, তখন সেগুলো নৈতিকতার আসনে বসে যায়। আর এই কর্তব্য, এই গুণ, প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন দাবি করে, তখন তাকে কেবল বিদেশিদের বিরুদ্ধেই নয়, প্রয়োজনে নিজের সহনাগরিকদের বিরুদ্ধেও, যারা তার মতোই রাষ্ট্রের সদস্য বা প্রজা।

    এ কারণেই রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত রাজনীতির মঞ্চ হয়ে উঠেছে সীমাহীন দুষ্কর্ম ও দস্যুবৃত্তির ক্ষেত্র। এই দস্যুবৃত্তি ও দুষ্কর্মকেই আবার উচ্চমর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কারণ তা দেশপ্রেম, অতিরাষ্ট্রীয় নীতি এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থের নামে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণেই প্রাচীন ও আধুনিক রাষ্ট্রের সমগ্র ইতিহাস আসলে জঘন্য অপরাধের ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাজা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, অতীত ও বর্তমানের রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক, আমলা ও যোদ্ধারা, যদি সরল নৈতিকতা ও মানবিক ন্যায়ের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, তবে তারা প্রত্যেকেই শতবার, হাজারবার কারাবাস বা ফাঁসির শাস্তির যোগ্য। এমন কোনো বিভীষিকা, নিষ্ঠুরতা, ধর্মদ্রোহ বা শপথভঙ্গ, প্রতারণা, কলঙ্কজন লেনদেন, নির্লজ্জ ডাকাতি, প্রকাশ্য লুণ্ঠন বা হীন বিশ্বাসঘাতকতা নেই যা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অতীতে ঘটায়নি, কিংবা প্রতিদিন ঘটাচ্ছে না। আর এর সবই সংঘটিত হয়েছে কেবলমাত্র সেই ভাসা–ভাসা অথচ গালভারী শব্দবন্ধের আড়ালে: “রাষ্ট্রীয় কারণে।”

    এ শব্দগুলো সত্যিই ভয়ঙ্কর। কারণ এগুলো রাষ্ট্রের পদস্থ ও সমাজের শাসকশ্রেণির মধ্যে বিপুলসংখ্যককে এতটাই কলুষিত ও কলঙ্কিত করেছে যতটা এমনকি খ্রিষ্টধর্মও কখনো করতে পারেনি। এই শব্দগুলো উচ্চারিত হতেই সঙ্গে সঙ্গে সব স্তব্ধ হয়ে যায়, সবকিছু থেমে যায়। সততা, মর্যাদা ন্যায় ও অধিকার লুপ্ত হয়। এমনকি করুণা পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়। আর তার সঙ্গেই হারিয়ে যায় যুক্তি ও সুস্থ চেতনা। কালো হয়ে ওঠে সাদা, আর সাদা হয়ে যায় কালো। মানুষের হীন কর্ম, ঘৃণ্যতম ও সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধও তখন রূপান্তরিত হয় প্রশংসার কৃত্যে।

    মহান ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক ম্যাকিয়াভেলি প্রথম ব্যক্তি যিনি এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন, অথবা অন্ততপক্ষে প্রথম ব্যক্তি যিনি একে প্রকৃতভাবে অর্থপূর্ণ ও জনপ্রিয় করেছিলেন, যাঁর ফল আজও আমাদের শাসকগোষ্ঠী সানন্দে ভোগ করছে। তিনি ছিলেন এক বাস্তববাদী ও দৃষ্টিবাদী চিন্তক; তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেন যে, মহান ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং টিকে থাকতে পারে কেবল অপরাধের দ্বারা। অসংখ্য গুরুতর অপরাধের দ্বারা এবং সততার নামে যা কিছু পরিচিত তার প্রতি মৌলিক অবজ্ঞার দ্বারা। তিনি এই সত্যগুলো ভয়ঙ্কর স্পষ্টতায় লিখেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন।

    তাঁর সময়ে মানবতার ধারণা ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। ‘ভ্রাতৃত্ব’ ছিল কেবল ধর্মীয়, মানবিক নয়, যা ক্যাথলিক গীর্জা প্রচার করত । কিন্তু সেই ভ্রাতৃত্ব সর্বদাই ছিল ভয়াবহ নিছক এক বিদ্রূপ। পদে পদে গীর্জার নিজস্ব কার্যকলাপ ভাতৃত্বের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। তাঁর সময়ে কেউ এমনকি কল্পনাও করেনি যে, ‘জন অধিকার’ বলে কোনো কিছু বিদ্যমান। বরং জনগণ সর্বদাই বিবেচিত হয়েছে এক নিষ্ক্রিয় ও অক্ষম জনসমষ্টি হিসেবে। যেন রাষ্ট্রের মাংস, যাকে শাসকের ইচ্ছামতো দলন ও শোষণ করা যায় এবং পদানত রাখা যায় চির আনুগত্যে।

    এই সমস্ত সত্য থেকে যুক্তিবিদ্যা ঘেঁটে ম্যাকিয়াভেলি উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে রাষ্ট্রই মানব অস্তিত্বের সর্বোচ্চ লক্ষ্য, রাষ্ট্রকেই যেকোনো মূল্যে সেবা করতে হবে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ যেহেতু সর্বকিছুর ঊর্ধ্বে, তাই এক সৎ দেশপ্রেমিকের, রাষ্ট্রের সেবায় কোনো অপরাধ করতেও পিছপা হওয়া উচিত নয়। তিনি অপরাধকে সমর্থন করেছেন, অপরাধে আহ্বান জানিয়েছেন, এবং সেটিকে রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার অনিবার্য শর্ত তথা প্রকৃত দেশপ্রেমের শর্তে পরিণত করেছেন। রাষ্ট্রের নাম রাজতন্ত্র হোক বা জনতন্ত্র, রাষ্ট্রের সংরক্ষণ ও বিজয়ের জন্য অপরাধ সর্বদাই প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র হয়তো তার লক্ষ্য ও দিক পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু তার স্বভাব ন্যায়, করুণা ও সততার নিরন্তর এবং সক্রিয় লঙ্ঘন অপরিবর্তিত থাকে। রাষ্ট্রেরই কল্যাণের নামে।

    .হ্যাঁ, ম্যাকিয়াভেলি সঠিক ছিলেন। সাড়ে তিন শতাধিক বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। এনিয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। ইতিহাসও একই সত্য আমাদের জানায়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো নৈতিক বলে মনে হয় কেবল তাদের দুর্বলতার কারণে; অথচ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকে কেবল অপরাধের দ্বারা।

    কিন্তু এখানেই আমাদের সিদ্ধান্ত তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণটি সহজ। আমরা বিপ্লবের সন্তান। সেই বিপ্লব থেকেই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি “মানবতার ধর্ম“। আর আমাদের তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে “দেবত্বের ধর্মের” ধ্বংসাবশেষের উপর।

    আমরা বিশ্বাস করি মানবাধিকারে। আমরা বিশ্বাস করি মানবজাতির মর্যাদা ও তার অপরিহার্য মুক্তিতে। আমরা বিশ্বাস করি ন্যায়ের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মানবিক স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বে। এক কথায়, আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবীতে মানবতার বিজয়ে।

    কিন্তু এই বিজয়ের জন্য আমাদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা নিবেদিত। এই বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিবিষ্ট। স্বভাবতই এই বিজয় অপরাধকে অস্বীকার করে, কারণ অপরাধ নিজেই মানবতার অস্বীকার। তাই বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণার দ্বারা চালিত জাতিগুলোর ক্ষেত্রে যতক্ষণ এই অপরাধ রাজনৈতিক অস্তিত্বের মৌলভিত্তি হিসেবে টিকে আছে, এই বিজয় সম্ভব নয়।

    আর এখন প্রমাণিত যে, কোনো রাষ্ট্র অপরাধ ব্যতিরেকে টিকে থাকতে পারে না। অন্তত অপরাধ সংকল্প ও পরিকল্পনা ব্যতিরেকে তো নয়ই। যদিও অনেক সময় তার অক্ষমতা তাকে অপরাধ বাস্তবায়নে বাধা দেয়। তাই আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত হল: রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা একেবারে অপরিহার্য।

    অথবা, যদি অন্যভাবে বলা হয়, রাষ্ট্রের আমূল ও পূর্ণ রূপান্তর প্রয়োজন। এমন এক রূপান্তর, যেখানে রাষ্ট্র আর কেন্দ্রীভূত ও ‘উপর থেকে নিচে’ চাপানো কোনো ক্ষমতা হবে না। প্রতিষ্ঠিত হবে না সহিংসতা বা কোনো কর্তৃত্ববাদী নীতির দ্বারা । বরং তা হবে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার ভিত্তিতে। প্রত্যক পক্ষের থাকবে যুক্ত হবার কিংবা না হবার স্বাধীনতা। এমনকি যুক্ত হলেও তা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা। এর বিন্যাস হবে ‘নিচ থেকে উপরে’। বাস্তব চাহিদা ও স্বাভাবিক প্রবণতার ভিত্তিতে, ব্যক্তি, সংঘ, কমিউন, জেলা, প্রদেশ এবং জাতির স্বাধীন সমিতি ও সংঘ, যা গড়ে উঠবে মানবতার বৃহত্তর পরিসরে।

    তথাকথিত মুক্ত রাষ্ট্রসমূহ যখন অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, সেই সম্পর্কের বাস্তবতা বিচার করলেই আমরা নিশ্চিতভাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। এবার দেখা যাক, রাষ্ট্র যদি নিজ নাগরিক বা প্রজাদের পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তার ভেতরে সম্পর্কগুলির প্রকৃতি কী দাঁড়ায়।

    আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখতে মানবসমাজের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বাইরে ঠেলে দেয়। তাদের বাদ দেয় পারস্পরিক ঐক্য এবং নৈতিকতা, ন্যায়, অধিকারের কর্তব্যের ক্ষেত্র থেকে। এর ফলে রাষ্ট্র আসলে মানবতাকেই অস্বীকার করে। আর “দেশপ্রেম” নামক সেই মোহনীয় শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ওপর অন্যায় ও নিষ্ঠুরতাকে সর্বোচ্চ কর্তব্য হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এতে মানুষের ভেতরের মানবতা সংকুচিত, বিকৃত ও ধ্বংস হয়। ফলে তারা মানুষ হিসেবে নয়, কেবলমাত্র নাগরিক হিসেবে থেকে যায়। ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে তারা যেন কখনো নাগরিক পরিচয়ের ঊর্ধে উঠে পূর্ণ মানুষে পরিণত না হতে পারে, রাষ্ট্র তা এভাবেই নিশ্চিত করে।

    আমরা আরও দেখেছি যে, প্রতিটি রাষ্ট্র, ধ্বংসের আশঙ্কায় এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রসনের ভয়ে, সর্বশক্তিমান হওয়ার পথে ধাবিত হয়। আর একবার শক্তিশালী হয়ে উঠলে, তাকে অবশ্যই যুদ্ধ জয়ে নামতে হয়। কিন্তু জয় মানেই অন্য জাতির পরাজয়, তাদের দমন এবং কোনো না কোনো রূপে দাসত্বে আবদ্ধ করা। সুতরাং, দাসত্ব রাষ্ট্রের অস্তিত্বেরই একটি অবশ্যম্ভাবী ফল।

    দাসত্ব তার রূপ বা নাম বদলাতে পারে, কিন্তু তার আসল স্বভাব একই থাকে। এর স্বরূপ হলো: দাস মানে অন্যের জন্য কাজ করতে বাধ্য হওয়া, আর প্রভু মানে অন্যের শ্রমের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা। প্রাচীন যুগে যেমন, আজও এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক জায়গায়, এমনকি আমেরিকার কিছু অংশেও, দাসদের সরাসরি দাসই বলা হয়েছে। মধ্যযুগে তাদের নাম হয়েছিল সার্ফ বা ভূমিদাস । আর আধুনিক যুগে তাদের বলা হয় ‘মজুরি উপার্জক’। এই শেষোক্ত অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা মর্যাদাপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে কম কঠোর। কিন্তু বাস্তবে তারা এখনও ক্ষুধা এবং রাজনৈতিক–সামাজিক কাঠামোর চাপে বাধ্য অন্যদের নিরঙ্কুশ বা আপেক্ষিক কুঁড়েমিকে নিজের কঠোর শ্রম দিয়ে টিকিয়ে রাখতে। তাই তারা দাসই থেকে যায়।

    সাধারণভাবে দেখা যায়, কোনো রাষ্ট্রই হোক তা প্রাচীন বা আধুনিক, কখনো এমনকি ভবিষ্যতেও, গণমানুষের জোরপূর্বক শ্রম ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। মজুর বা দাসের সেই শ্রমই হলো রাজনৈতিক শ্রেণি অর্থাৎ নাগরিকদের অবসর, স্বাধীনতা ও সভ্যতার প্রধান এবং অপরিহার্য ভিত্তি। এমনকি উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়।

    রাষ্ট্রের এই অন্তর্নিহিত শর্তগুলি অবশ্যম্ভাবীভাবে গড়ে ওঠে তার বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান থেকে। অর্থাৎ অন্য সব রাষ্ট্রের প্রতি তার স্বাভাবিক, স্থায়ী এবং অবশ্যম্ভাবী বৈরিতার ফলস্বরূপ। এখন আমরা লক্ষ করব, সেই তথাকথিত ‘মুক্ত চুক্তি’র ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপর সরাসরি কী কী শর্ত আরোপিত হয়েছে, যে চুক্তির ভিত্তিতে তারা নাকি নিজেদেরকে রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছে।

    রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা নয়; নিজস্ব সীমানার ভেতরও তাকে রক্ষা করতে হয় তার সদস্যদের। একদলকে অপর দলের হাত থেকে এমনকি প্রত্যেককে তার নিজের কাছ থেকেও। কারণ ধর্মতত্ত্বের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষকে স্বভাবতই মন্দ ও দুষ্ট ধরে নেওয়া।

    আমরা যে রাষ্ট্র পর্যালোচনা করছি, সেখানে শুভের শুরু হয় কেবল সামাজিক চুক্তি গঠনে মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, শুভ কোনো স্বাধীনতার ফল নয়; বরং তা পুরোপুরি ওই চুক্তির সৃষ্টি ও তারই অন্তর্বস্তু। বিপরীতে, মানুষ যখন নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভেতর একাকী অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক স্বাধীনতা উপভোগ করছিল, তখন তারা এর কোন সীমা টানেনি। কোনো আইন নয়, মেনে চলেছ ওই বাস্তবতার সীমা। অনুসরণ করেছ কেবল একটি বিধি: স্বভাবজাত আত্মকেন্দ্রিকতা। তখন তারা একে অপরের প্রতি আঘাত করে, শোষণ করে এবং লুটপাট চালায়। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে দমন ও ধ্বংস করে, যতটা তাদের বুদ্ধি, কৌশল ও শক্তিতে কুলায়। ঠিক যেমন রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে আচরণ করে থাকে।

    এই যুক্তিধারায়, মানব স্বাধীনতা শুভ নয়, বরং মন্দ উৎপন্ন করে; মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই মন্দ। মানুষ কীভাবে মন্দ? তার উত্তর আবার দেয় ধর্মতত্ত্ব। বাস্তবে দেখা যায়, জন্মের পর থেকেই গির্জা মানুষকে মন্দ রূপে গণ্য করে, আর তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে সৎ করে তোলা। অর্থাৎ প্রাকৃতিক মানুষকে রূপান্তরিত করে নাগরিকে পরিণত করা।

    কেউ বলতে পারে, যেহেতু রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীন চুক্তির ফল, আর শুভ রাষ্ট্র থেকেই জন্ম নেয়, তাই শুভও স্বাধীনতারই ফল। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। রাষ্ট্র মোটেও স্বাধীনতার ফল নয়; বরং এটি স্বাধীনতার স্বেচ্ছা–ত্যাগ ও অস্বীকারের ফল।

    প্রাকৃতিক মানুষ প্রথমে সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল, তবে ন্যায়ের কোনো ধারণা তার মধ্যে ছিল না। কিন্তু এই স্বাধীন মানুষ সর্বক্ষণ নানা বিপদের মুখোমুখি হতো, তার নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত। তাই নিরাপত্তা অর্জনের জন্য তারা নিজেদের স্বাধীনতার একটি অংশ ত্যাগ করল। স্বাধীনতার যতটুকু তারা ত্যাগ করল, ঠিক ততটুকুই তারা নাগরিক হলো, এবং একইসঙ্গে রাষ্ট্রের অধীনতা বা দাসত্বে আবদ্ধ হলো। সুতরাং রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে শুভর জন্ম স্বাধীনতা থেকে নয়; বরং স্বাধীনতার অস্বীকার থেকেই।

    একি বিস্ময়কর নয় যে, গীর্জার বিদ্যা হিসেবে ধর্মতত্ত্ব এবং রাষ্ট্রের বিদ্যা হিসেবে রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রের ভাবনা ও বাস্তবতা বাহ্যত ভিন্ন হলেও প্রায় একই বিশ্বাসে মিলিত হয়? উভয়েই মনে করে, মানুষকে নৈতিক হতে হলে, তাকে সাধু (গীর্জার দৃষ্টিতে) বা সুনাগরিকে (রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে) রূপান্তরিত করতে হলে, তার স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হবে।

    তবে এ অদ্ভুত সামঞ্জস্যে আমরা বিস্মিত হই না, কারণ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি (এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করব) যে রাজনীতি ও ধর্মতত্ত্ব একই উৎস থেকে উৎপন্ন দুই সহোদরা। যারা ভিন্ন নামে একই লক্ষ্য অনুসরণ করে। প্রত্যেক রাষ্ট্রই মূলত একটি পার্থিব গির্জা এবং প্রত্যেক গির্জা, যার নিজস্ব স্বর্গ রয়েছে, যেখানে পরমধন্য ও অমর ঈশ্বরের আবাস, আসলে এক একটি স্বর্গীয় রাষ্ট্র মাত্র।

    অতএব রাষ্ট্রও, গির্জার মতোই, এক মৌলিক ধারণা থেকে শুরু করে— মানুষ প্রকৃতিগতভাবে মন্দ। যদি তাদের প্রাকৃতিক স্বাধীনতার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা একে অপরকে ছিঁড়ে খাবে এবং ভয়াবহ নৈরাজ্য প্রদর্শন করবে, যেখানে সবল, দুর্বলকে শোষণ ও হত্যা করবে, যা অবশ্যই আজকের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতার বিপরীত!

    রাষ্ট্র এই নীতিই স্থাপন করে যে, জনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি উচ্চতর কর্তৃত্ব প্রয়োজন; আর মানুষের মন্দ প্রবৃত্তিকে দমন করতে হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও পথপ্রদর্শনের জন্য একজন অভিভাবক তথা নিয়ন্ত্রক প্রয়োজন।

    যে কোনো মানবসমাজে নীতিসমূহের পালন এবং আইনসমূহের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের শীর্ষে একটি সতর্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং প্রয়োজনে দমনমূলক ক্ষমতার অস্তিত্ব থাকা আবশ্যক। এখন আমাদের নির্ধারণ করতে হবে, এমন ক্ষমতা কার হাতে থাকা উচিত এবং কার দ্বারা তা কার্যকর হতে পারে।

    যে রাষ্ট্র কোনো ঐশী অধিকার ও ঈশ্বরের ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উত্তরটি তুলনামূলকভাবে সহজ। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করবে প্রধানত পুরোহিতেরা আর গৌণভাবে ধর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিষিক্ত রাজকীয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যে রাষ্ট্র স্বাধীন সামাজিক চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, একেবারে বিশুদ্ধ গণতন্ত্রে, যেখানে সবাই সমান সেখানেও প্রত্যেককেই সাধারণ কল্যাণের জন্য আত্মসংযমে অক্ষম বলে ধরা হয়। আর তাদের স্বাধীনতা স্বভাবতই অশুভের দিকে ঝুঁকে থাকে। ফলে কে হবে প্রকৃত অর্থে আইনসমূহের রক্ষক ও প্রশাসক? কে হবে ন্যায়বিচার ও জনশৃঙ্খলার রক্ষাকারী, যে সবার মন্দ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? সংক্ষেপে বললে, রাষ্ট্রের সেই কার্যাবলি পূর্ণ করবে কে?.

    এর উত্তর হতে পারতো, সর্বোত্তম নাগরিকেরা। যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং সবচেয়ে নৈতিক, যারা অন্যদের তুলনায় সমাজের সাধারণ স্বার্থ, প্রয়োজন ও কর্তব্য ভালোভাবে বোঝে এবং নিজের স্বার্থকে সাধারণ স্বার্থের অধীনস্ত করতে সক্ষম।

    প্রকৃতপক্ষে, এই মানুষদের জন্য বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা বুদ্ধিমান হন কিন্তু নৈতিক না হন, তবে সাধারণ কল্যাণকে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন। আর যদি তারা নৈতিক হন কিন্তু বুদ্ধিমত্তা কম থাকে, তবে তাদের সদিচ্ছা সাধারণ স্বার্থকে তাদের ভুল থেকে রক্ষা করতে যথেষ্ট হবে না।

    অতএব একটি জনতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে, সব সময় সেখানে এমন নাগরিকদের ধারাবাহিক প্রজন্ম থাকতে হবে, যারা একই সঙ্গে বুদ্ধিমান এবং নৈতিক।

    কিন্তু এই শর্তটি সহজে বা সর্বদা পূরণ করা যায় না। প্রতিটি দেশের ইতিহাসে সেই যুগগুলোই ব্যতিক্রমী, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশিষ্টজন উপস্থিতি থাকেন এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের খ্যাতি বহমান থাকে।

    সাধারণভাবে, ক্ষমতার পরিধিতে অনুজ্জল, মধ্যমানের ব্যক্তিরা আধিপত্য বিস্তার করে। আর প্রায়শ ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, অনাচারী এবং রক্তক্ষয়ী সংহিসতার বিজয়। তাই আমরা বলতে পারি, তথাকথিত যুক্তিবাদী বা উদারপন্থী রাষ্ট্রের তত্ত্ব যা বলছে তা যদি সত্যিও হয়, অর্থাৎ প্রতিটি রাজনৈতিক সমাজের টিকে থাকা নির্ভর করে এমন ব্যক্তিদের ধারাবাহিকতার উপর, যারা একইসাথে বুদ্ধিমান এবং নৈতিক; তাহলে এমন কোন সমাজের অতিত্বও আজ বিদ্যমান থাকতো না। বহুকাল পূর্বেই বিলুপ্ত হত।

    বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই সমস্যাটি আরও জটিল হয়, যদি আমরা ক্ষমতাশ্রয়ী ও এ থেকে উদ্ভূত নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাবগুলো বিবেচনা করি। যখন ক্ষমতা কারো করায়ত্ব হয়, সে ক্রমাগত বিচিত্র প্রলোভনের মুখে পড়ে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসা এবং প্রচণ্ড লালসা দিন–রাত আক্রান্ত করে পদস্থ শীর্ষ কর্তাদের। এই প্রলোভনগুলির বিরুদ্ধে কেবল বুদ্ধিমত্তা নয়, নৈতিকতাও ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে প্রবলভাবে অরক্ষিত কোনো বিচ্ছিন্ন মানুষের নৈতিকতা, যা সহজেই ভেঙে পড়ে। এই সব সত্ত্বেও এত সমাজ টিকে আছে, সেটাই আসলে বিস্ময়কর। তবে এ প্রসঙ্গ ছেড়ে আমরা এগোই।

    ধরা যাক, একটি আদর্শ সমাজে প্রতিটি সময়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষ পাওয়া যায়, যারা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের খুঁজে বের করবে কে, নির্বাচন করবে কে, এবং ক্ষমতার ভার তাদের হাতে তুলে দেবে কে? তারা কি নিজেরাই, নিজেদের বুদ্ধি ও নৈতিকতার প্রশ্নে সচেতন হয়ে, ক্ষমতা দখল করবে?

    প্রাচীন গ্রিসে দুই জ্ঞানী—ক্লেওবুলাস ও পেরিআন্ডার—এমনটি করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের কথিত প্রজ্ঞা সত্ত্বেও, গ্রিকরা তাঁদেরকে ‘স্বৈরাচারী’ নামেই ডাকত।

    এখন প্রশ্ন আসে—এই ধরনের মানুষরা কীভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করবে? প্ররোচনা দিয়ে, না কি শক্তি প্রয়োগ করে?

    যদি তারা প্ররোচনার পথ বেছে নেয়, তবে মনে রাখা দরকার যে, সবচেয়ে ভালো প্ররোচিত করতে পারে সেই ব্যক্তি, যে নিজেই নিজের যোগ্যতায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। অথচ প্রকৃত জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষ সাধারণত নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে অতটা দৃঢ় নন; এমনকি জানলেও তাঁরা সেটি অন্যদের সামনে জাহির করতে অস্বস্তি বোধ করেন। বিপরীতে, খারাপ ও মাঝারি মানের মানুষ সবসময় নিজেদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাই নিজেদের মহিমান্বিত করতে তাদের কোনো দ্বিধা থাকে না।

    তবুও যদি ধরা যাক, প্রকৃত যোগ্য ও সৎ মানুষরা দেশের সেবা করার আকাঙ্ক্ষায় নিজেদের স্বাভাবিক লজ্জা বা বিনয় কাটিয়ে উঠে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাহলে কি জনগণ অবশ্যই তাঁদেরকে বেছে নেবে? নাকি তারা চতুর, চতুরভাষী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতারকদের হাতেই বিভ্রান্ত হবে?

    অন্যদিকে, যদি তারা শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা নিতে চান, তবে তাদের প্রথমেই এমন এক বলশক্তি প্রয়োজন হবে, যা বিরোধী দলের প্রতিরোধকে পরাজিত করতে সক্ষম। এর ফলে গৃহযুদ্ধ বাধবে। শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় এলেও পরাজিত দল অসন্তুষ্ট থেকে যাবে এবং বিরোধিতা চালিয়ে যাবে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিজয়ীদের তখন ক্রমাগত শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

    এভাবে যে সমাজটি শুরুতে ছিল স্বাধীন, সেটি পরিণত হবে এক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে, যার ভিত্তি ও ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে কেবলমাত্র বলপ্রয়োগের ওপর। সেখানে হয়তো অনেক ভালো দিক পাওয়া যেতে পারে—কিন্তু কখনোই স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না।

    যদি আমরা সামাজিক চুক্তি থেকে উদ্ভূত এক স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণাকে টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে ধরে নিতে হবে যে অধিকাংশ নাগরিকের মধ্যে যথেষ্ট দূরদর্শিতা, বিবেচনাশক্তি এবং ন্যায়বোধ রয়েছে, যাতে তারা সবচেয়ে যোগ্য ও সক্ষম ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে রাষ্ট্রর শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

    কিন্তু যদি কোনো জনগোষ্ঠী কেবল একবার নয়, বরং তাদের সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে, প্রতিটি নির্বাচনে, সর্বদা এই গুণাবলি প্রদর্শন করে, তাহলে তার মানে কি দাঁড়ায়? তার মানে কি এই নয় যে, জনগণ সমষ্টিগতভাবে এমন উচ্চ নৈতিকতা ও সংস্কৃতির স্তরে পৌঁছে গেছে যে, আর তাদের রাষ্ট্র বা সরকারের প্রয়োজন নেই? এমন জনগণ অর্থহীন অস্তিত্বে ভেসে না গিয়ে বরং তারা নিজের সমস্ত প্রবৃত্তি পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রকাশ করবে এবং তাদের জীবন থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচার ও সামাজিক শৃঙ্খলা উদ্ভূত হবে। তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আর সমাজের অভিভাবক, শিক্ষক বা নিয়ন্ত্রক থাকবে না। রাষ্ট্র তার দমনমূলক ক্ষমতা ত্যাগ করবে এবং প্রুধোঁ যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন, সেই অধস্তন অবস্থানে নেমে আসবে। তখন রাষ্ট্র কেবল একটি কর্মবিভাগে পরিণত হবে, অনেকটা সমাজের সেবায় নিয়োজিত একপ্রকার কেন্দ্রীয় হিসাবরক্ষণ দপ্তর মাত্র।

    এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সামাজিক জীবনে স্বাধীনতার পক্ষে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্থা কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সীমিতকরণ সমাজের জন্য বড় উপকার বয়ে আনতে পারে। তবে এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থকদের সন্তুষ্ট করবে না। তাদের জন্য রাষ্ট্র হলো সমাজের অভিভাবক, ন্যায়বিচার প্রদানকারী, সামাজিক জীবনের নির্দেশক এবং শৃঙ্খলার রক্ষক—এক ধরনের অপরিহার্যতা। অন্য কথায়, তারা স্বীকার করুক বা না করুক, নিজেকে গণতান্ত্রিক, জনতান্ত্রিক এমনকি সমাজতান্ত্রিক যাই বলুক না কেন, তাদের সবসময় শাসনের জন্য দরকার পড়ে অজ্ঞ, অপূর্ণ, অযোগ্য বা অকপটে বলতে গেলে, একেবারে নিম্নশ্রেণীর মানুষ। কোন সহিংসতা ছাড়াই, এটি তাদেরকে, নিজেদের মহাননুভবতা ও বিনয়কে ক্ষুণ্ণ না করে, সর্বোচ্চ পদে থাকতে সক্ষম করে, যাতে তারা সর্বদা সাধারণ কল্যাণের প্রতি নিবেদিত থাকতে পারে। মানবগোষ্ঠীর সুবিধাপ্রাপ্ত রক্ষক হিসেবে নৈতিক অঙ্গীকার ও উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর করে তারা যখন জনগণকে তার নিজের কল্যাণ ও মঙ্গলার্থে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করে তখন তারা আসলে নিজেদের স্বার্থে জনগণের অগোচরে প্রতারণা করে সম্পদ হরণ করে।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাষ্ট্র সম্পর্কিত যে কোনো যৌক্তিক ও সরল তত্ত্ব মূলত কর্তৃত্বের নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। অর্থাৎ, এটি সেই ধর্মতাত্ত্বিক, অধিবিদ্যাগত রাজনৈতিক ধারণা যে, সাধারণ মানুষ সর্বদা আত্মশাসনে অক্ষম, তাই তাদেরকে সবসময়ই উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের কল্যাণকর শাসনের অধীনে থাকতে হবে।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কর্তৃত্ব কিসের নামে এবং কার দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া হয়? জনগণের চোখে কর্তৃত্বকে বৈধ ও সম্মানযোগ্য করে তোলার উৎস মাত্র তিনটি হতে পারে: বলপ্রয়োগ, ধর্ম, অথবা কোনো উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা।

    আমরা যেহেতু এখানে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করছি, তাই ধর্ম ও বলপ্রয়োগের দ্বৈত কর্তৃত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনাকে আপাতত স্থগিত রাখতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হবে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কর্তৃত্বের দিকে, যা সর্বদাই সংখ্যালঘিষ্ট (শাসক)গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

    অতীত ও বর্তমানের সমস্ত রাষ্ট্রে, এমনকি যেসব রাষ্ট্রকে সর্বাধিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসম্পন্ন বলা হয়, যেমন উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ড, আমরা আসলে কী দেখতে পাই? “জনগণের হাতে সব ক্ষমতা ন্যস্ত” এই ছদ্ম দাবি থাকলেও, বাস্তবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আত্মশাসন বেশিরভাগ কালজুড়েই কেবল গালগল্প হয়ে থেকে গেছে। সবসময়ই সত্যিকারের অর্থে শাসনক্ষমতা থাকে সংখ্যালঘিষ্টদের হাতে।

    যুক্তরাষ্ট্রে, সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত, এমনকি আংশিকভাবে এখনও, রাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রু জনসনের বর্তমান শাসকদলে এই সংখ্যালঘিষ্টরা ছিল তথাকথিত ডেমোক্র্যাট। তারা দাসপ্রথার সমর্থক এবং দক্ষিণী জমিদার শ্রেণির নিষ্ঠুর অলিগার্কির ধারক। এরা ছিল আস্থাহীন ও বিবেকবর্জিত জনমত্ততার নেতা, যারা নিজেদের লোভ ও বিদ্বেষপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল। তাদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ও প্রভাব, যা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলেছিল, উত্তর আমেরিকায় রাজনৈতিক নৈতিকতার গভীর অবক্ষয়ের জন্য বড় ধরনের অবদান রেখেছে।

    বর্তমানে, তাদের ক্ষতিকর নীতি সফলভাবে চ্যালেঞ্জ করছে রিপালিকান দল বাস্তবে যারা বুদ্ধিমান ও উদার সংখ্যালঘিষ্ট। আদতে এই সংখ্যালঘিষ্টতা সর্বদা বিদ্যমান। আশা করি এই দলের বিজয় সম্পূর্ণ হোক; মানবজাতির জন্য এটাই কাম্য। কিন্তু যতই উদার ও স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহী হোক এই দল, যতই মহান ও উদার তাদের নীতি হোক, আমরা আশা করতে পারি না যে, ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর তারা তাদের একচেটিয়া শাসনক্ষম সংখ্যালঘিষ্ট অবস্থান ত্যাগ করবে এবং সাধারণ জনগণের সঙ্গে মিশে যাবে, যাতে জনগণের আত্মশাসন অবশেষে বাস্তব হতে পারে। আদতে তা সম্ভব করতে হলে একটি বিপ্লবের প্রয়োজন, যা এর আগে প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্বের সব বিপ্লবের চেয়ে গভীর এবং মৌলিক হতে হবে।

    সুইজারল্যান্ডে, গণতান্ত্রিক বিপ্লব সত্ত্বেও সরকার এখনও সচ্ছল ও মধ্যবিত্তের হাতে। সেই অল্প সংখ্যক সুবিধাপ্রাপ্ত যারা ধনী, শ্রান্তিময় ও শিক্ষিত। প্রসঙ্গক্রমে “জনগণের সার্বভৌমত্ব” প্রত্যয়টি আমরা ঘৃণা করি। আমাদের কাছে সব ধরনের সার্বভৌমত্বই আসলে অগ্রহণযোগ্য। জনগণের দ্বারা জনগণের সরকার আদতে কথকতা মাত্র। আইনগতভাবে মানুষকে সার্বভৌম ধরা হলেও, বাস্তবে তা নয়। কারণ তারা দৈনন্দিন শ্রমে এতটা ক্লিষ্ট যে অবসর নেই। মুর্খ না হলেও শিক্ষায় সম্পদশালী মধ্যবিত্তের তুলনায় কম সক্ষম। তাই তাদের তথাকথিত সার্বভৌমত্ব বাস্তবে মধ্যবিত্তের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।

    সুইজারল্যান্ড হোক বা যুক্তরাষ্ট্র, এই পরিস্থিতির একমাত্র সুবিধা হলো, উচ্চাঙ্ক্ষী সংখ্যালঘিষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রার্থী নেতারা জনগণকে প্রলুব্ধ না করে, ক্ষমতায় আসীন হতে পারে না। তারা ক্ষমতা করায়ত্ত করেন, তাদের ক্ষণ–আবেগের প্রতি গদগদ হয়ে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছলনার মাধ্যমে, যা কখনও অশুভ হয়ে উঠতে পারে।

    কারো যেন ভুল ধারণা না হয় যে আমরা গণতান্ত্রিক সরকারের সমালোচনা করে রাজতন্ত্রের পক্ষ ধরেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সবচেয়ে অপূর্ণাঙ্গ জনতন্ত্রও সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান রাজতন্ত্রের চেয়ে হাজার গুণ ভালো। জনতন্ত্রে বারবার শোষিত হলেও অন্তত একটা পর্যায়ের জন্য মানুষ, অত্যাচারিত থাকে না। রাজতন্ত্রে যা একটি নিরবিচ্ছিন্ন বাস্তবতা। গণতান্ত্রিক শাসনও ধীরে ধীরে জনগণকে রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, যা রাজতন্ত্র কখনও দেয় না। তারপরও, আমরা জনতন্ত্রকে যতই অগ্রাধিকার দিই, এটা স্বীকার করতে হবে এবং ঘোষণা করতে হবে যে, শাসনরূপ যাই হোক না কেন, মানুষের সমাজ যদি বংশানুক্রমিকভাবে পেশা, সম্পদ, শিক্ষা এবং অধিকারের বৈষম্যের কারণে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত থাকে, তবে সর্বদা শ্রেণিভিত্তিক সরকার থাকবে। সংখ্যালঘিষ্টদের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের শোষণ চলবে।

    রাষ্ট্র আদতে এই আধিপত্য এবং শোষণ, ছাড়া আর কিছু নয়, যা সুনিয়ন্ত্রিত ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালিত। আমরা এটি প্রমাণ করবো জনগণের সরকারের পরিনাম পর্যালোচনার মাধ্যমে। আপনাদের আকাঙ্ক্ষা মতো, একটি আদর্শ রাষ্ট্রে, যা স্বাধীন চুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং সংখ্যালঘিষ্ট, প্রাজ্ঞ এবং কর্তব্যনিষ্ঠদের দ্বারা গঠিত।

    চুক্তির শর্তগুলো একবার গ্রহণ করা হলে, তখন কেবল সেগুলো কার্যকর করা বাকি থাকে। ধরা যাক, কোনো জাতি নিজেদের শাসন করার অক্ষমতা স্বীকার করল। তবুও তাদের যথেষ্ট বিচারবোধ রইল যাতে তারা জনসাধারণের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের সেরা নাগরিকদের হাতে সমর্পণ করতে পারে। প্রথম দিকে এই ব্যক্তিদের সম্মান করা হয় তাদের সরকারি পদমর্যাদার কারণে নয়, বরং তাদের উত্তম গুণাবলির জন্য। জনগণ তাদের নির্বাচন করেছে কারণ তারা ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সবচেয়ে সক্ষম, জ্ঞানী, সাহসী এবং নিবেদিতপ্রাণ। তারা এসেছে জনগণের ভেতর থেকে, যেখানে সবাইকে সমান ধরা হয়। তাই তারা তখনও কোনো আলাদা শ্রেণি গঠন করে না; তারা কেবল প্রকৃতিগত গুণের কারণে বিশেষ হয়ে ওঠে। আর সেই কারণেই জনগণ তাদের নির্বাচন করেছে। তাদের সংখ্যা অবশ্যই খুব সীমিত। কারণ সব যুগে এবং সব জাতির ইতিহাসে অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে, এমন অসাধারণ গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা, যারা একটি সমগ্র জাতির সর্বসম্মত শ্রদ্ধা আদায় করতে পারে, অত্যন্ত সামান্য। অতএব, ভুল নির্বাচনের ঝুঁকি এড়াতে জনগণ এই অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্য থেকেই শাসক নির্বাচন করতে বাধ্য হবে।

    এখানেই আমরা দেখি যে, সমাজ ইতিমধ্যেই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে, যদিও তা ঠিক দুই শ্রেণী নয়। এক ভাগ গঠিত বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের দ্বারা, যারা স্বাধীনভাবে নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে শাসন মেনে নেয়। অন্য ভাগ গঠিত অল্পসংখ্যক মানুষের দ্বারা, যাদের অসাধারণ গুণাবলি আছে এবং যাদের জনগণ সেই বিশেষ গুণের কারণে স্বীকৃতি দিয়েছে ও শাসনের দায়িত্ব তাদের হাতে অর্পণ করেছে। এই ব্যক্তিরা যদিও জননির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল, প্রথমে তারা সাধারণ নাগরিকদের থেকে ভিন্ন নয়। শুধুমাত্র সেই গুণাবলির মাধ্যমেই তারা আলাদা হয়ে ওঠে, যেগুলো তাদের নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য করে তুলেছে। প্রকৃতপক্ষে তারা সবচেয়ে কার্যকরী এবং সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক। এই সময়ে তারা কোনো বিশেষ অধিকার বা সুবিধা দাবি করে না। শুধু সেই দায়িত্ব পালন করে, যা জনগণ তাদের ওপর ন্যস্ত করেছে। তাদের জীবনযাপন বা জীবিকা নির্বাহের ধরনও অন্য নাগরিকদের থেকে ভিন্ন নয়। তাই তখনও সবার মধ্যে এক ধরনের পূর্ণ সমতা বজায় থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই সমতা কি দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে? আমাদের দাবি হলো, তা কখনোই সম্ভব নয়। আর এই দাবিকে প্রমাণ করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

    মানুষের ব্যক্তিগত নৈতিকতার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাস হলো অন্যকে আদেশ করার অভ্যাস। সবচেয়ে ভালো মানুষ—যারা বুদ্ধিমান, নিঃস্বার্থ, উদার ও নির্মল—তারাও এই অভ্যাসে লিপ্ত হলে অবধারিতভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ক্ষমতা প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত দুটি অনুভূতি সবসময় এই নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করে। প্রথমত, সাধারণ জনগণের প্রতি অবজ্ঞা। দ্বিতীয়ত, শাসনকর্তার নিজের মূল্য সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা।

    “জনগণ যখন নিজেরাই স্বীকার করে যে তারা নিজেদের শাসন করতে অক্ষম, তখন তারা আমাকে তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এভাবে তারাই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা আমার তুলনায় অধম এবং আমি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। মানুষের এই বিশাল ভিড়ে আমি খুব কম লোককেই আমার সমান বলে মনে করি। জনগণের কাজকর্ম পরিচালনা করতে সক্ষম একমাত্র আমিই। জনগণের আমার প্রয়োজন আছে; তারা আমার সেবা ছাড়া চলতে পারে না, অথচ আমি নিজের জন্য নিজেই যথেষ্ট। তাই তাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য আমাকে মানতে হবে। আর আমি যখন তাদের শাসন করতে রাজি হই, তখনই আমি তাদের সুখ ও কল্যাণ সৃষ্টি করি।’’

    এমন ধারণাই সহজে যে কারো মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে, হৃদয়কে কলুষিত করতে পারে এবং অহংকারে ভরিয়ে তুলতে পারে, তাই না? ঠিক এভাবেই ক্ষমতা এবং শাসনের অভ্যাস জ্ঞানী ও নৈতিক মানুষকেও ধীরে ধীরে বিকৃত করে ফেলে, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিমিং অব ফ্রিডম
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    মানবনৈতিকতার সমস্ত ভিত্তি মূলত মানবতার প্রতি সম্মানের উপর দাঁড়িয়ে আছে। মানবতার প্রতি সম্মান বলতে আমরা কী বুঝি? আমরা বুঝি, প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার এবং মর্যাদাকে স্বীকৃতি দেওয়া। সে যে জাতির হোক, যে রঙের হোক, তার বুদ্ধিবৃত্তির স্তর বা নৈতিক অবস্থাই যাই হোক না কেন। কিন্তু প্রশ্ন আসতে পারে, যদি কেউ নির্বোধ, দুষ্ট বা ঘৃণিত হয়, তবে কি আমি তাকে সম্মান করতে পারি? অবশ্যই নয়। আমি তার দুষ্টতা, নির্বুদ্ধিতা বা নৃশংসতাকে সম্মান করতে পারি না। বরং সেগুলো আমাকে ঘৃণায় ভরিয়ে তোলে এবং প্রতিবাদে উত্তেজিত করে। প্রয়োজনে আমি তার বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নেবো, এমনকি যদি আমার জীবন, অধিকার এবং মূল্যবান কিছু রক্ষার অন্য কোনো উপায় না থাকে, তবে আমি তাকে হত্যা করতেও বাধ্য হতে পারি। কিন্তু তবুও, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ও তীব্র, এমনকি প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যেও, আমাকে তার মানবীয় চরিত্রকে সম্মান জানাতে হবে। আমার নিজের মানবমর্যাদা এর উপরই নির্ভর করে। তবুও প্রশ্ন ওঠে, যদি সে নিজেই অন্যের মর্যাদাকে স্বীকার না করে, তবে কি আমরাও তার মর্যাদা স্বীকার করব? যদি সে কোনো হিংস্র পশুর মতো হয়ে যায়, কিংবা কখনও কখনও পশুর চেয়েও অধঃপতিত হয়, তবে কি আমরা তার মানবতাকে স্বীকার করে কেবলমাত্র এক কল্পকথার সমর্থন করছি না?

    উত্তর হলো—না। কারণ, তার বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক বা নৈতিক অধঃপতন যতই ভয়াবহ হোক না কেন, যদি সে জৈবিকভাবে কোনো মূর্খ বা পাগল না হয়, যদি সে স্বাভাবিক বোধশক্তি এবং প্রকৃতি প্রদত্ত সামান্য বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত ধরে রাখে, তবে তার মানবতা সত্যিই বিদ্যমান। আর মুর্খ বা পাগলকে অপরাধী নয়, বরং অসুস্থ হিসেবে দেখা উচিত। মানবতা একটি জীবনব্যাপী সম্ভাবনা, যে সম্ভাবনা তাকে নিজের মানবসত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি যে সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তার এই হাল সে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে, এমন সম্ভাবনা যত ক্ষীণই হোক।

    সবচেয়ে বুদ্ধিমান বানরকে নিন, যার স্বভাব সবচেয়ে শান্ত ও উন্নত। তাকে আপনি যতই উন্নত ও মানবিক পরিবেশে রাখুন না কেন, তাকে কখনও মানুষ বানানো যাবে না। অন্যদিকে, সবচেয়ে দাগি অপরাধীকে নিন, কিংবা সবচেয়ে দুর্বল মস্তিষ্কের মানুষকে নিন, যদি তাদের কারোরই কোনো জৈবিক অসুখ না থাকে যা তাদের নির্বোধ বা উন্মাদ করে তোলে, তাহলে একজনের অপরাধপ্রবণতা কিংবা অন্যজনের মানবতা ও মানবিক কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে ব্যর্থ হওয়া, এ দুটোর কোনোটাই তাদের ব্যক্তিগত দোষ নয়, আবার তাদের স্বভাবজাত প্রকৃতিও নয়। এর একমাত্র কারণ হলো সেই সামাজিক পরিবেশ, যেখানে তারা জন্মগ্রহণ করেছে এবং বেড়ে উঠেছে।

  • সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রের ধারণা একটি কর্তৃত্ববাদী ভাবাদর্শ ছাড়া কিছুই না

    সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রের ধারণা একটি কর্তৃত্ববাদী ভাবাদর্শ ছাড়া কিছুই না

    • আব্দুল্লাহ হেল বুবুন

    সভ্যতা কেন্দ্রিক বয়ান আবারো বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। চায়না, ভারত, রাশিয়া, তুরস্কসহ বেশ কিছু কর্তৃত্ববাদী দেশের সরকার নিজেদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পলিসিকে বৈধতা প্রদানে সভ্যতাবাদী পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসছে। যেমন, ২০১৯ সালে ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর এক বার্তায় এরদোগান জানায়, “ক্রুসেডারদের অবশিষ্ট অংশ তুরস্কের উত্থান থামাতে পারবে না। ইস্তাম্বুল কখনো কন্সটান্টিনোপল হবে না।” পুতিন কখনোই এটা জানাতে ভোলেন না যে, রাশিয়া একটি সভ্যতা, কোন জাতি রাষ্ট্র নয়। এই প্রবণতার বাইরে নয় উদারবাদী গণতন্ত্রের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যে সভ্যতা কেন্দ্রিক বয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মার্চ মাসের চার তারিখে কংগ্রেসে দেয়া একটি ভাষণে ট্রাম্প পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে শক্তিশালী “সভ্যতা” তৈরি করার ঘোষণা দেন। এতোসব সভ্যতা কেন্দ্রিক বাগড়ম্বরের মুখে অনেকেই ধারণা করছে, জাতি–রাষ্ট্র ভিত্তিক বিশ্ব ব্যাবস্থার দিন শেষ হয়ে আসছে, সভ্যতাগত রাষ্ট্রই ভবিষ্যত।

    আদতে সভ্যতাগত রাষ্ট্রের ধারণাটি যতোটা না বাস্তবতা, তার থেকে বড় মিথ। সভ্যতাবাদের রেটোরিক ব্যবহার করা চীন, রাশিয়া, ভার‍ত ও তুরস্কের ক্ষমতাসীনদের (এবং তাদের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের) জন্য সভ্যতাবাদ একটি ‘‘লেজিটিমাইজিং ডিস্কোর্স”, তার বেশি কিছু নয়।

    অবশ্য ওই আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক সভ্যতাগত রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যগুলো।

    An illustration from Le Cri Du Peuple by Jacques Tardi

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র কী?

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র মূলত এমন একটি দেশ, যা নির্দিষ্ট কোন ভূখণ্ড, ভাষা বা এথনিক গোষ্ঠীর বদলে একটি সামগ্রিক সভ্যতাকে প্রতিনিধিত্ব করার দাবি জানায়। সভ্যতাগত রাষ্ট্রের ধারণা কিছু পূর্বানুমানের উপর দাঁড়ানো।

    এক, পৃথিবীতে বিভিন্ন সভ্যতা রয়েছে। এবং বিভিন্ন সভ্যতার মূল্যবোধ র‍্যাডিকালি ভিন্ন ও বিপরীত।

    দুই, একটি দেশ তখনি সফল হতে পারে, যখন সেই দেশ নিজের সভ্যতাগত পরিচয়কে ধারণ করে।

    তিন, লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিরপেক্ষ কোন সর্বজনীন মূল্যবোধকে ধারণ করে না। নিজেদের সুবিধার্থে পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকার নানাবিধ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার (যেমনঃ আলোকায়ন) ফসল এসব মূল্যবোধকে “সর্বজনিনতা“-র নামে সারা দুনিয়ার উপর চাপিয়ে দিয়েছে পশ্চিমা এলিটরা।

    তুরস্ক, ইরান, ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র— কোন না কোন সময় এরা “সভ্যতাগত রাষ্ট্র” বলে চিহ্নিত হয়েছে৷ তবে, চীন–রাশিয়া–তুরস্ক–ভারত এর সভ্যতাগত পরিচয় অ্যাকাডেমিয়ায় বেশ আলোড়ন তুলেছে এবং আমার আলোচনা এদেরকে নিয়েই হবে। এই চারটি রাষ্ট্রের মাঝে কেবল রাশিয়াই ন্যাশন স্টেট পরিচয়কে অস্বীকার করে নিজেকে সভ্যতাগত রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ অন্যরা সভ্যতা ও রাষ্ট্র এর মাঝে ফারাক না টেনে—উভয় শব্দকে একটি অপরটির বদলে ব্যবহার করে।

    “সভ্যতাবাদ“: লেজিটিমাইজিং ডিস্কোর্স

    পৃথিবীকে যে বেশ কয়টি সভ্যতায় বিভক্ত করা যায় এবং এই সভ্যতাগুলো বহুবিধ অসংগতিপূর্ণ মূল্যবোধের কারণে একে অপরের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়—এই ধারণাটি চীন ও রাশিয়ার অ–গণতান্ত্রিক সরকার এবং তুরস্ক ও ভারতের নির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের বয়ানে বেশ জোড়ালোভাবে উপস্থিত৷ জনতুষ্টিবাদ ও কর্তৃত্ববাদ এই চার‍টি রাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এসব রাষ্ট্রে সভ্যতাবাদের বয়ান দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    প্রথমত, সভ্যতাবাদ কর্তৃত্ববাদী–জনতুষ্টিবাদী সরকারকে সহজেই “জনতা“, “অভিজাত” শত্রু এবং “বিপদজনক অপর” নির্মাণে সাহায্য করে। এই সভ্যতাবাদী পরিচয় নির্মাণে ধর্ম সর্বত্র একই প্রভাব না রাখলেও তার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্ক ও ভারতে ধর্ম কেবল ‘অপর‘ থেকে জনতাকে আলাদাই করে না; তা দেশীয় সেকুলার অভিজাতদেরও চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, যারা নিজেদের সভ্যতার পবিত্র ধর্মকে ত্যাগ করে বিদেশীদের সাথে আতাঁত করেছে। উভয় দেশেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আধুনিকতা ও সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করেছে জনতার প্রধান শত্রু হিসেবে। এছাড়া, রাশিয়া ও চীনে খ্রিস্টান অর্থোডক্সি ও কনফুসিয়ানিজম সভ্যতা পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

    সভ্যতাগত পরিচয়কে উদযাপন করা এই চারটি দেশের ক্ষমতাসীন সরকারই পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও এর সর্বজনীন মূল্যবোধগুলোকে (যেমন: মানবাধিকার) সাম্রাজ্যবাদের অভিব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে, তাদের বিভিন্ন সময়ে অস্বীকার করেছে। একইসাথে, এই বয়ানে দেশের বিভিন্ন সমস্যার (বর্তমান বা ঐতিহাসিক) জন্য দায়ী করা হচ্ছে আধুনিকতা প্রভাবিত পশ্চিমা এলিটদের।

    দ্বিতীয়ত, এসব দেশের কর্তৃত্ববাদী সরকার নিজেদের নিপীড়ন ও কর্তৃত্ববাদকে বৈধতা প্রদান করতে অনেক সময়ই সভ্যতাবাদী রেটোরিকের দারস্থ হন। মোদির ভারতে মুসলিমদের উপর সংঘটিত নিপীড়নকে ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক হেজেমোনি রক্ষার বয়ান দ্বারা বৈধতা প্রদান করা হয়৷ পুতিন লৈঙ্গিক সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন এবং ইউক্রেন আক্রমণকে উপস্থাপন করেছে পশ্চিম ও এর অবক্ষয়মূলক উদারবাদী ভাবাদর্শ থেকে রাশিয়াকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে৷ তুরস্কের ক্ষমতাসীন একেপি পার্টিবিরোধী ও গুলেন আন্দোলনের সাথে জড়িতদের দমন এবং অ–সুন্নি মুসলিম, সুন্নি মুসলিম ও কেমালপন্থী সেকুলারদের প্রান্তিকীকরণকে তুলে ধরছে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র থেকে তুরস্ককে মুক্ত করার উপায় হিসেবে (এরদোগানের ভাষ্য অনুযায়ী, যা তুরস্ককে তার অতীত সমৃদ্ধিতে পৌঁছাতে সাহায্য করবে)। উল্লেখ্য, সরকারের জনপ্রিয়তা কমলে কিংবা কোন অজনপ্রিয় পলিসির জাস্টিফিকেশনে প্রায়ই সভ্যতাবাদী বয়ানকে সামনে নিয়ে আসা হয়।

    উপরের আলোচনাটা থেকে এটা পরিষ্কার যে, উল্লিখিত চারটি দেশের সরকারের জন্য সভ্যতাবাদ রূপান্তরিত হয়েছে শক্তিশালী একটি ভাবাদর্শিক অস্ত্রে। তবে, ভাবাদর্শিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার মানে এই না যে, এইসব রাষ্ট্র বর্তমানে জাতি–রাষ্ট্র প্যারাডাইমের বাইরে অবস্থান করছে। কেননা, কোন সরকারই চিরস্থায়ী নয়; বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারগুলো বিভিন্নভাবে বিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং যারা বিরোধিতা করছে তারা অধিকাংশ সময়ই কোন সভ্যতাগত মূল্যবোধ ধারণ করে না। উদাহরণস্বরূপ, ভার‍তের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসের কথা বলা যেতে পারে। সুতরাং, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও ভারতকে সভ্যতাগত রাষ্ট্র না বলে সভ্যতাগত শাসন বা সরকার (রেজিম) বলাই বোধহয় বেশি যৌক্তিক হবে।

    নব্য উদারবাদ ও সভ্যতাবাদ: দি ‘আনহোলি অ্যালায়েন্স‘

    উপরে আলোচিত তথাকথিত সভ্যতাগত রাষ্ট্রের সরকার নিজেদেরকে জনতার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে (যারা বিদেশি অভিজাত ও বিদেশ প্রভাবিত দেশীয় অভিজাতদের বিপক্ষে জনতার হয়ে লড়াই করে) দাবি করলেও তাদের অর্থনৈতিক নীতিকে কোনভাবেই জনবান্ধব বলা যাবে না। চারটি দেশের সরকারই কম বেশি নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে, যা সবগুলো দেশেই অর্থনৈতিক অসমতার ট্রেন্ডকে বৃদ্ধি করেছে। প্রচুর মানুষকে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক অসমতার অবস্থা থেকে আমরা এ বিষয়ে ধারণা পেতে পারি। উল্লেখ্য, তুরস্কের সবথেকে ধনী ২০ শতাংশ ব্যক্তি তুরস্কের ৪৮ শতাংশ সম্পদের মালিক। ভারতের অবস্থা আরো খারাপ, সেখানকার সবথেকে ধনী ১ শতাংশ ধনী ভারতের ৪০ ভাগের বেশি সম্পদের মালিক, অন্যদিকে নিচের ৫০ শতাংশ ব্যক্তি কেবল ৩ ভাগ সম্পদের মালিক (ইনকাম অ্যান্ড ওয়েলথ ইনইকুয়ালিটি ইন ইন্ডিয়া, ২০২২–২৩: দি রাইজ অব বিলিওনেয়ার রাজ)। চীনের টপ ১০ শতাংশ ব্যক্তি সেখানকার ৬৮ ভাগ সম্পদের মালিক এবং ওয়ার্ল্ড ইকুইটি ডেটাবেজ অনুযায়ী বর্তমানে চীনে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিলিওনেয়ার রয়েছে।

    আশির দশকে খ্রিস্টান ডানপন্থা ও নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক ডানপন্থা রোনাল্ড রিগানের মধ্য দিয়ে মিলিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ডিল অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। জনবান্ধব ইমেজধারণকারী রিগানের হাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলফেয়ার অর্থনীতি পরাজিত হয়। ঠিক একইরূপে, অভিজাত শত্রুদের বিরুদ্ধে জনতার সরকার হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করা রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কের ডানপন্থী ‘সভ্যতাগত‘ সরকারও নব্য উদারবাদকে নিজ নিজ দেশে আরো শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি, ট্রাম্পের বিভিন্ন সংরক্ষণবাদী (প্রটেকশনিস্ট) অর্থনৈতিক পলিসির প্রতিক্রিয়ায় তারাও বেশ কিছু সমরূপ নীতি নির্ধারণ করেছে। আসলে, অর্থনীতির জায়গা থেকে চিন্তা করলে, তথাকথিত সভ্যতাগত রাষ্ট্রগুলো কোন নতুন কিছু প্রদান করছে না। তারা পুরনো অর্থনৈতিক ব্যাবস্থারই অংশ।

    সভ্যতাগত রাষ্ট্র ধারণাটির সাথে আমি সর্বপ্রথম পরিচিত হই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তার আরো ভিন্ন ভিন্ন পোস্টে সভ্যতাগত রূপান্তরের ব্যাপারটি এসেছে। সম্প্রতি করা একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, দুটি সভ্যতাগত রাষ্ট্রের (ভারত ও চীন) মাঝে টিকে থাকতে হলে সভ্যতাগত রাষ্ট্র নির্মাণ অপরিহার্য। নাহিদ ইসলামের মন্তব্যও এখানে প্রাসঙ্গিক: “‘আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, জাতীয়তাবাদের যুগ শেষ হয়ে আসছে। আমাদের জাতীয়তাবাদের নানা ধরনের সমালোচনা ও দুর্বলতা আছে।…গোটা পৃথিবীই এখন সভ্যতাগত রাজনীতির দিকে আগাচ্ছে। ভারত ও চীনও কিন্তু সভ্যতাগত পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পৃথিবীর বুকে দাঁড়াচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমাদেরও সভ্যতাগত পরিচয় অনুসন্ধান করা প্রয়োজন (সমকাল, ২০ আগস্ট ২০২৪)।”

    আমাদের উপরের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, “সভ্যতাগত রাষ্ট্র” এর ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত ও সর্বজন স্বীকৃত কোন বিষয় নয়। বরং, অনেক প্রভাবশালী পণ্ডিতদের মতে, বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী–জনতুষ্টিবাদী রাষ্ট্র সভ্যতাবাদের বয়ান তাদের শাসন ও নানাবিধ পলিসিকে বৈধতা প্রদানে ব্যবহার করছে।

    শিল্পী: মারিয়া ব্ল্যানকার্ড
    শিল্পী: মারিয়া ব্লানচার্ড

    যদি আমরা তর্কের সাপেক্ষে ধরেও নেই যে, চীন ও ভারত সভ্যতাগত রাষ্ট্র। তারপরও, পার্শবর্তী চীন ও ভারত বা তুরস্ক ও রাশিয়া বাংলাদেশের জন্য আদৌ কোন রোল মডেল হতে পারে? তথাকথিত এসব “সভ্যতাবাদী রাষ্ট্র”–এর মানবাধিকার রেকর্ড অত্যন্ত বাজে এবং সরকার অনেকটাই অগণতান্ত্রিক। সংখ্যালঘু নিপীড়ন এসব রাষ্ট্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

    দ্বিতীয়ত, মাহফুজ আলম ও নাহিদের সভ্যতাবাদী রাষ্ট্রপ্রকল্পের অর্থনৈতিক নীতি কী হবে? সেটা কি নব্যউদারবাদ থেকে ভিন্ন কিছু হবে?

    তৃতীয়ত, বহুত্ববাদ জুলাই ২৪–এর অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। মাহফুজ আলম একটি বহুত্ববাদী বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বারবার বলেছেনও। তবে, সভ্যতাবাদ কি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য একটি যথার্থ পন্থা হতে পারে? কেননা, আমাদের আলোচিত সকল তথাকথিত “সভ্যতাগত রাষ্ট্র”–ই এক্সক্লুশোনারি রাজনীতির ধারক।

    মাহফুজ আলম কিংবা নাহিদ, উভয়ই কখনো কখনো সভ্যতাগত রাষ্ট্রপ্রকল্পের কথা বললেও, তারা কোন বিশদ পরিকল্পনা ও এর তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেননি। তাদের যদি প্রকৃত অর্থেই সভ্যতাবাদী কোন রাষ্ট্রপ্রকল্প থেকে থাকে, তাহলেই অবশ্যই তাদেরক এই রাষ্ট্রের প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সংখ্যালঘু অধিকার কেমন হবে, তার রূপরেখা নিয়ে সামনে আসা উচিত।

  • বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়, এবং জার্মানিসহ অন্যান্য দেশেও এর প্রসার ঘটে। ইতালির স্বঘোষিত ফ্যাসিস্ট নেতা, বেনিতো মুসোলিনির শাসনামলে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করা হয়। তখনকার সাথে বর্তমান দুনিয়ায় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর একটি বড় তফাৎ হচ্ছে,  এখন আর কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিই নিজেকে ফ্যাসিবাদী বলে ঘোষণা করে না। বরং ফ্যাসিবাদ কথাটিকে বিরোধী শক্তিগুলোই ব্যবহার করে থাকে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসনকে বোঝানোর জন্য। আবার কেবল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসন হলেই তা ফ্যাসিবাদ নয়। গেল শতাব্দীর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, ফ্যাসিবাদকে ‘ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া একনায়কত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এথেকে ফ্যাসিবাদের চিন্তা-মতবাদের আকর ও পাটাতন বোঝা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশেও  ফ্যাসিবাদ কী সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট তাত্ত্বিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা সামান্যই হয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ চিহ্নিত করাও সবসময়ই সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সে উদ্দেশ্য নিয়েই অরাজ ফ্যাসিবাদের বোঝাপড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিলসমূহ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে মুসোলিনির ১৯৩২ সালে প্রকাশিত Doctrine Of Fascism রচনাটির অনুবাদ প্রকাশ করছে অরাজ। ইতালীয় ভাষায় এই রচনার শিরোনাম La dottrina del fascismo। কথিত আছে, পুরো রচনাটি মুসোলিনির নামে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম অংশটুকু Fundamental Ideas ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিল্লের লেখা। আর Political and social doctrine অংশটুকু মুসোলেনির, যা লিখিত হয় ১৯২৭ সালে। Doctrine Of Fascism রচনাটির ফ্যাসিবাদী সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রণীত ইংরেজি সংস্করণের অনুবাদক ব্রিটিশ লেখক জেন সোয়ামস। বর্তমান বাংলা অনুবাদে  ফ্যাসিবাদী প্রকাশনার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Ardita Publishers কর্তৃক  Fascism: Doctrine and Institutions সংকলনে প্রকাশিত সংস্করণকে (১৯৩৫) অনুসরণ করা হয়েছে। অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন আরিফ রেজা মাহমুদ। — সম্পাদক]

    বেনিতো মুসলেনি

    সকল সুস্থিত রাজনৈতিক ধারণার ন্যায়, ফ্যাসিবাদও কর্ম ও চিন্তার সমন্বিত রূপ, যার মধ্যে নিহিত আছে এমন এক মতবাদ, যা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শক্তিসমূহের অন্তর্গত বলয়ে উদ্ভূত এবং আভ্যন্তরীণভাবে কার্যকরী। সুতরাং, ফ্যাসিবাদের একটি রূপগত বিন্যাস রয়েছে যা কালিক ও স্থানিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ; তবে এর পাশাপাশি একটি আদর্শবাদী অন্তর্বস্তুও বর্তমান, যা একে চিন্তার ইতিহাসের উচ্চতর স্তরে সত্যরূপে ব্যক্ত করে।

    বিশ্বে আত্মিক প্রভাব বা প্রভুত্ব বিস্তার, অর্থাৎ একের ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বারা অপরের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন কর্মক্ষেত্রের স্বল্পস্থায়ী ও বিশেষ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়, এবং সেই স্বল্পস্থায়ী বাস্তবতার অন্তরে নিহিত চিরন্তন ও সার্বজনীন বাস্তবতার উপলব্ধি থাকে। মানুষকে জানার জন্য ‘মানবসত্তা‘কে জানতে হয় এবং মানবসত্তাকে জানার জন্য অপরিহার্য হলো বাস্তবতা ও তার বিধিবিধান সম্পর্কে গভীর বোধ।

    রাষ্ট্র বিষয়ক কোনো ধারণাই প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না, যদি তা মৌলিকভাবে জীবন–দর্শনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিফলিত না হয়। সেটা হতে পারে দার্শনিক প্রক্রিয়াজাত ধারণা কিংবা প্রত্যক্ষ অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে বিবর্তিত একটি ভাবতাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা বিশ্বাসভিত্তিক একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন্দ্রীভূত অভিজ্ঞান; কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই, অন্তত সম্ভাব্যভাবে, তা বিশ্বের প্রতি একটি সংহত জৈবিক ধারণার প্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদের বহু ব্যবহারিক রূপ—যেমন দলীয় সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও শৃঙ্খলার ধারণা—কে সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব কেবল তখনই, যখন সেগুলোকে জীবনের প্রতি এর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি আধ্যাত্মিক মনোভাব। ফ্যাসিবাদ পৃথিবীকে কেবল এমন কোন উপরিতলীয় ও বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না, যেখানে মানুষ একটি স্বতন্ত্র, স্ব–কেন্দ্রিক, প্রকৃতির বিধি–নির্ধারিত সত্তা হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং যা জীবনকে পরিচালিত করে ক্ষণস্থায়ী আত্মকেন্দ্রিক সুখের প্রবৃত্তি দ্বারা। ফ্যাসিবাদ কেবল ব্যক্তি নয়, বরং জাতি ও রাষ্ট্রকে দেখে; এমন এক বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে, যেখানে ব্যক্তি ও প্রজন্মসমূহ এক নৈতিক বিধানের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ; যাদের মধ্যে রয়েছে একটি অভিন্ন ঐতিহ্য এবং একটি নির্ধারিত ঐতিহাসিক মিশন।

    এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে এমন এক উচ্চতর জীবন নির্মাণ, যা বদ্ধ আত্ম–কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং কর্তব্যনিষ্ঠার ভিত্তিতে গঠন করে এমন এক জীবন যা কাল ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। এই জীবনেই ব্যক্তি আত্মত্যাগ, স্বার্থপরতা থেকে সরে আসা, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে এক নিখাদ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়, যেখানে তার ‘মানবিক‘ মূল্য নিহিত থাকে।

    অতএব, এই ধারণাটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রকাশ, যা উনবিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদী দৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে বিশ শতকের সাধারণ বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত। দৃষ্টিবাদবিরোধী হলেও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন; এটি সংশয়বাদী নয়, নাস্তিক্যবাদীও নয়; আবার তা নি:সঙ্গ নৈরাশ্যবাদী কিংবা নির্বিকার আশাবাদীও নয়—যেমনটি সাধারণত দেখা যায় সেই সকল মতবাদে, যেগুলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দুকে মানুষের বাইরে কোথাও স্থাপন করে, ফলে তার চরিত্র হয়ে পড়ে মূলত নেতিবাচক।

    ফ্যাসিবাদ বরং বিশ্বাস করে যে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ নিজেই তার বিশ্ব গঠনের সক্ষমতা ও কর্তব্য ধারণ করে। অর্থাৎ, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও নৈতিক সত্তার মধ্যেই নিহিত, বাইরের কোনো বহিরাঙ্গ বাস্তবতায় নয়।

    ফ্যাসিবাদ চায় মানুষ হোক সক্রিয় এবং সে যেন তার সমস্ত শক্তি ও সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়। এটি প্রত্যাশা করে, মানুষ যেন সাহসিকতার সঙ্গে তার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে উপলব্ধি করে এবং সেগুলোর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকে। ফ্যাসিবাদ জীবনকে একটি সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে—এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একজন মানুষের উচিত নিজেকে প্রকৃত অর্থে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের যোগ্য করে তোলা। আর তা সম্ভব প্রথমত তখনই, যখন সে নিজেকে শারীরিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়, যেন সে হয়ে উঠতে পারে সেই ‘উপকরণ‘—যার মাধ্যমে সে উক্ত মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

    যে নীতি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা–ই জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বিস্তৃত অর্থে সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেও। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ফ্যাসিবাদ সকল প্রকার সংস্কৃতিকে (শিল্প, ধর্ম, বিজ্ঞান) উচ্চরূপে মূল্যায়ন করে, এবং শিক্ষার ব্যতিক্রমী গুরুত্বকে স্বীকার করে।

    এই দর্শন অনুসারে, শ্রমেরও মৌলিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতিকে আয়ত্ত করে এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রায় মানবিক জগৎ গড়ে তোলে।

    এই ইতিবাচক জীবনচিন্তা মূলত একটি নৈতিক ধারণা। এটি বাস্তবতার সামগ্রিক ক্ষেত্রকেই পরিব্যাপ্ত করে, ঠিক যেমনটি করে সেই সকল মানবিক কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তবতাকে আয়ত্তে আনে। কোনো কার্যই নৈতিক বিচারের আওতার বাইরে নয়; কোনো কর্মপ্রচেষ্টাই এমন নয়, যাতে নৈতিক উদ্দেশ্য একটি অন্তর্নিহিত মূল্য সংযোজনে ব্যর্থ।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ–অনুসারী যে জীবনচিত্র আঁকে, তা গম্ভীর, সংযমপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিকতায় পরিপুষ্ট; জীবনের সকল প্রকাশ ও কর্মকাণ্ড এমন এক বিশ্ববোধের মধ্যে অবস্থিত, যা নৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ববোধের দ্বারা পরিচালিত।

    ফ্যাসিবাদ সেই জীবনধারার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যা কেবলমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ–বিলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ফ্যাসিবাদী জীবনচিন্তা একটি ধর্মীয় দর্শন, যেখানে মানুষকে দেখা হয় এমন এক উচ্চতর বিধানের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে, যা ব্যক্তিসীমার অতীত—একটি বস্তুগত ইচ্ছাশক্তিতে পরিপুষ্ট, যা ব্যক্তি–অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এবং তাকে একটি আধ্যাত্মিক সমাজের সচেতন সদস্যরূপে উন্নীত করে।

    যাঁরা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধর্মনীতিতে কেবল তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী কৌশল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পান না, তাঁরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে—ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং সর্বাগ্রে এটি একটি চিন্তাব্যবস্থা, একটি দার্শনিক বিন্যাস।

    ফ্যাসিবাদী ইতিহাসবোধে মানুষ কেবলমাত্র তখনই মানুষ, যখন সে একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে—একজন পরিবার সদস্য, সামাজিক গোষ্ঠী, জাতি, ও সমগ্র ইতিহাস–প্রবাহের একটি কার্যকর অংশগ্রহণকারী হিসেবে, যেখানে প্রতিটি জাতি নিজস্ব অবদান রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ভাষা, রীতি, সমাজজীবনের বিধিবিধান এবং ঐতিহাসিক দলিলপত্রে নিহিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের বাইরে মানুষ নিছক এক অস্তিত্বহীনতা।

    শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু

    এই কারণে, ফ্যাসিবাদ সমস্ত ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী বিমূর্ততা, যা উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিবাদনির্ভর বস্তুবাদ থেকে উদ্ভূত, তার বিরোধিতা করে। একইভাবে, এটি প্রত্যাখ্যান করে ফরাসি বিপ্লব–পরবর্তী জ্যাকোবিন ঘরানার কল্পনাপ্রসূত ইউটোপিয়া ও ছকবদ্ধ সমাজ–নবীকরণ প্রচেষ্টাকে। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে না ১৮শ শতাব্দীর অর্থনৈতিক সাহিত্যের সেইসব ভাবনাকে, যেখানে মানুষের ‘পৃথিবীতেই সুখলাভ’–এর সম্ভাবনাকে চিত্রিত করা হয়েছিল। একইসঙ্গে, এটি প্রত্যাখ্যান করে সেই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকেও, যেখানে ধারণা করা হয় যে, ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে মানবজাতি তার যাবতীয় সমস্যা ও সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছে যাবে।

    এই ভাবনা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয়—জীবন একটি অব্যাহত পরিবর্তন ও বিবর্তনের প্রক্রিয়া।

    রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ বাস্তববাদে বিশ্বাসী; তার নীতিগত অবস্থান হলো এই যে, কেবল সেই সমস্যাগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেগুলো ইতিহাস–প্রসূত বাস্তবতার স্বাভাবিক ফসল এবং যেগুলোর সমাধান সেই বাস্তবতার অভ্যন্তরেই নিহিত থাকে কিংবা নিজেই তার সমাধানের ইঙ্গিত প্রদান করে।

    মানুষ কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষ ও প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যখন সে নিজেকে এই বাস্তবতার প্রবাহে সম্পৃক্ত করে এবং এর অন্তর্নিহিত কার্যক্ষম শক্তিগুলোকে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়।

    ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিরোধিতা করে, ফ্যাসিবাদী জীবনদর্শন রাষ্ট্রের গুরুত্বকে সর্বোচ্চ মাত্রায় তুলে ধরে এবং ব্যক্তিকে কেবল তখনই স্বীকৃতি দেয়, যখন তার স্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে একীভূত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ রাষ্ট্রই হলো ইতিহাসবদ্ধ মানবসত্তার নৈতিক চেতনা ও সর্বজনীন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ।

    ফ্যাসিবাদ সেই ধ্রুপদী উদারতান্ত্রিকতার বিরোধিতা করে, যা এক সময় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং যার ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখনই, যখন রাষ্ট্র জনগণের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলনরূপে প্রতিষ্ঠা পায়।

    উদারতন্ত্র ব্যক্তি–অধিকারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে অস্বীকৃতি জানায়; পক্ষান্তরে, ফ্যাসিবাদ সেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আদর্শকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

    রাষ্ট্রের অধিকারকে ফ্যাসিবাদ এমন এক স্বরূপে বিবেচনা করে, যা ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত সারবস্তুকে প্রকাশ করে। আর যদি স্বাধীনতা বাস্তব জীবনে মানুষের একটি গুণ হয়ে থাকে— যা কেবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উদারতন্ত্র কর্তৃক কল্পিত বিমূর্ত মানবপ্রতিমাদের জন্য সংরক্ষিত নয় —তবে ফ্যাসিবাদ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়; এবং এমন একমাত্র স্বাধীনতার পক্ষেই যা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান: তা হলো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তির স্বাধীনতা।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রধারণা একটি সর্বাঙ্গীন দৃষ্টিভঙ্গি, যার বাইরে কোনো মানবিক কিংবা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব থাকতে পারে না, থাকলেও তা অর্থহীন। এই অর্থে, ফ্যাসিবাদ একটি সর্বাত্মকতাবাদী মতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি একীভূত ও সর্বসমন্বিত সংগঠন—যা সমস্ত মূল্যবোধকে ধারণ করে, ব্যাখ্যা করে, বিকশিত করে এবং জনগণের সামগ্রিক জীবনকে শক্তি ও দিশা প্রদান করে।

    রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর (রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, সমাজবর্গ) অস্তিত্ব নেই। ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে, কারণ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ধারণা অজ্ঞাত এবং যা ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেখে।

    রাষ্ট্রীয় ঐক্য মানে যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি একক অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতায় মিলিত হয়। একইভাবে, ফ্যাসিবাদ ট্রেড ইউনিয়নবাদকেও শ্রেণি–অস্ত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

    তবে যখন এই সংগঠনসমূহ রাষ্ট্রীয় পরিসরের আওতায় আসে, তখন ফ্যাসিবাদ স্বীকার করে যে সমাজতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নবাদের উত্থানের পেছনে বাস্তব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনগুলোর যথোচিত মূল্যায়ন করা হয় রাষ্ট্রের কর্পোরেত–কাঠামোর মধ্য দিয়ে, যেখানে বিভিন্ন স্বার্থসমূহকে সমন্বিত ও সঙ্গতিপূর্ণ করা হয় রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তিতে।

    নানাবিধ স্বার্থ অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যক্তি শ্রেণি গঠন করে; তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুযায়ী সংগঠিত হলে ট্রেড–ইউনিয়ন তৈরি করে; কিন্তু সর্বাগ্রে তারা রাষ্ট্র গঠন করে—রাষ্ট্র কোনো সংখ্যাগত বাস্তবতার সমষ্টি নয়, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তির যোগফল নয়। এই কারণে ফ্যাসিবাদ সেই ধরনের গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে, যা একটি জাতিকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সমতুল করে দেখে এবং একে বৃহত্তম সংখ্যার অধীনস্ত করে তোলে।

    বরং, যদি জাতিকে বিবেচনা করা হয় তার গুণগত দিক থেকে—পরিমাণগত নয়—তাহলে ফ্যাসিবাদই হয় ‘শুদ্ধতম গণতন্ত্র’; একটি ভাবধারা হিসেবে জাতি সবচেয়ে নৈতিক, সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সর্বাধিক সত্যরূপে পরিগণিত হয়, যা ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়—কখনো স্বল্পসংখ্যক, কখনো এমনকি এককের বিবেক ও ইচ্ছারূপে—এবং শেষে তা রূপ নেয় জনসাধারণের, একটি জাতির সমগ্র ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গঠনে গঠিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বিবেক ও ইচ্ছারূপে; যারা একক আত্মসচেতনতা ও অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মিক বিকাশ ও গঠনের পথে এগিয়ে চলে।

    জাতি এখানে কোনো বর্ণগোষ্ঠী নয়, নয় কোনো ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা নির্ধারিত অঞ্চল; বরং এটি হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখে—একটি ভাবনাতাড়িত ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণ, যাদের মাঝে জীবনের ইচ্ছা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মসচেতনতা ও ব্যক্তিত্বের উদ্ভব ঘটে।

    যতদূর পর্যন্ত এই উচ্চতর ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্ররূপে রূপায়িত হয়, ততদূর পর্যন্তই তা একটি জাতিতে পরিণত হয়। জাতিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে—এই ধারণা একটি পুরাতন, প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা উনবিংশ শতকে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচারণার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বরং, ফ্যাসিবাদী মতানুসারে, রাষ্ট্রই জাতিকে সৃষ্টি করে; রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে নৈতিক ঐক্য সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তোলে, তাদের ইচ্ছাশক্তি দান করে, এবং সেইসঙ্গে প্রকৃত জীবনের সূচনা ঘটায়।

    জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার কেবলমাত্র কোনো সাহিত্যিক কিংবা ভাববাদী আত্মসচেতনতা থেকে উদ্ভূত হয় না; বরং এর উৎস কোনো নিস্পৃহ ও অচেতন বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেও নিহিত নয়। বরং, এই অধিকার গড়ে ওঠে একটি সক্রিয়, আত্মসচেতন, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থেকে—যা কার্যকর কর্মকাণ্ডে নিজেকে প্রকাশ করে এবং সেই অধিকারকে প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। সংক্ষেপে, এই অধিকার উদ্ভব হয় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থেকে, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে হলেও। বস্তুত, রাষ্ট্রই হচ্ছে সেই সর্বজনীন নৈতিক ইচ্ছার অভিব্যক্তি, যা জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার সৃষ্টি করে।

    রাষ্ট্রে উদ্ভাসিত একটি জাতি কেবলমাত্র ততক্ষণই জীবন্ত ও নৈতিক সত্তা, যতক্ষণ পর্যন্ত তা প্রগতিশীল থাকে।

    নিষ্ক্রিয়তা মানেই মৃত্যু। অতএব, রাষ্ট্র কেবল কর্তৃত্ব নয়—যা শুধু শাসন করে আর ব্যক্তির ইচ্ছাসমূহের উপর আইনি রূপ ও আত্মিক মূল্য আরোপন করে, বরং রাষ্ট্র এক ধরনের ক্ষমতা যা সীমাহীনভাবে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিকে অনুভব করায় এবং মান্য করতে শেখায়। এইভাবে রাষ্ট্র তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য সিদ্ধান্তগুলোর সার্বজনীনতা কার্যত প্রমাণ করে। এই প্রক্রিয়া স্বয়ং সংগঠন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে—তা সম্ভাব্য হোক বা বাস্তব। এইভাবেই রাষ্ট্র মানব–ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিজেকে সমতুল্য করে তোলে, যার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা যায় না এবং যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তার অসীমতাকে প্রমাণ করে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল ব্যক্তিত্বের এক উচ্চতর ও অধিক শক্তিশালী প্রকাশ, তবে তা কেবল বাহ্যিক শক্তি নয়—বরং একটি আত্মিক শক্তি। এটি মানবের নৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের সকল রূপ ও প্রকাশের সমাহার।

    এই কারণে, রাষ্ট্রের কার্যপরিধিকে কেবল আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না—যেমনটি উদারনৈতিক মতবাদে প্রত্যাশিত। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, যা কেবল নাগরিকের তথাকথিত অধিকার চর্চার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

    বরং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি অন্তর্নিহিতভাবে গৃহীত নৈতিক মানদণ্ড ও আচরণবিধি—একটি শৃঙ্খলা, যা ব্যক্তিমানুষের সমগ্র সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে; এটি যেমন ইচ্ছাশক্তিকে প্রভাবিত করে, তেমনই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকেও অনুপ্রাণিত করে।

    এটি একধরনের কেন্দ্রীয় নৈতিক নীতি, যা সভ্য সমাজের নাগরিক হিসেবে মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয়; এটি তার আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে। এই নীতি কর্মনিষ্ঠ মানুষ ও চিন্তক, শিল্পী ও বিজ্ঞানী—সকলের হৃদয়জুড়ে বাস করে; এটি আত্মারও আত্মা।

    সংক্ষেপে, ফ্যাসিবাদ কেবল আইনপ্রণেতা বা প্রতিষ্ঠান–প্রতিষ্ঠাতা নয়, বরং তা একাধারে একজন শিক্ষাগুরু এবং আত্মিক জীবনের উন্নয়নকারী। এর লক্ষ্য কেবল জীবনযাপনের বাহ্যিক রূপকে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুকেও পুনর্গঠন করা—অর্থাৎ মানুষ, তার চারিত্রিক গঠন এবং তার বিশ্বাসকে পুনরায় নির্মাণ করা।

    এই লক্ষ্য পূরণের জন্য, ফ্যাসিবাদ শৃঙ্খলা আরোপ করে এবং কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে অবিসংবাদিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

    এই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ, ফ্যাসিবাদ “লিক্টর’স রডস”–কে তার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে—যা ঐক্য, শক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক।

    রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ

    ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে—যা আজ অনেক দূরবর্তী অতীত— মিলানে আমি Popolo d’Italia পত্রিকার পাতায় সেই বিপ্লবী হস্তক্ষেপবাদীদের যখন আহ্বান জানিয়েছিলাম— যারা ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদের কার্যক্রমের সূচনালগ্ন থেকেই আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছেন— তখন আমার মনে কোনো সুস্পষ্ট মতবাদগত কর্মসূচি ছিল না।

    আমি একমাত্র যে মতবাদকে ব্যবহারিক অর্থে চিনতাম, তা ছিল সমাজতন্ত্র—যার সঙ্গে আমি ১৯১৪ সালের শীতকাল পর্যন্ত, প্রায় এক দশকব্যাপী, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা ছিল একজন অনুসারী এবং পরবর্তীকালে একজন নেতা হিসেবে, কিন্তু তা মতবাদগত নয়—বরং ছিল কর্মনির্ভর অভিজ্ঞতা। সেই সময়ে আমার মতবাদ ছিল কর্মতৎপরতার মতবাদ।

    ১৯০৫ সালের পর থেকে সমাজতন্ত্রের কোনো একক, সর্বজনগ্রাহ্য মতবাদ বিদ্যমান ছিল না। যখন বার্নস্টাইনের নেতৃত্বে জার্মানিতে সংশোধনবাদী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত হয় এক বামপন্থী বিপ্লবী প্রবণতা, যা ইতালিতে কেবল প্রবচনের পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, অথচ রাশিয়ান সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে উঠেছিল বলশেভিকবাদের পূর্বভূমিকা।

    সংস্কারবাদ, বিপ্লববাদ, মধ্যপন্থা—এই পরিভাষাগুলোর প্রতিধ্বনিও আজ মৃতপ্রায়। অথচ ফ্যাসিবাদের বিশাল প্রবাহে এমন কিছু স্রোত খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলোর উৎস ছিল সোরেল, পেগি, লাগারদেলের মত গণসংগ্রামপন্থী সমাজবাদীদের চিন্তায়, এবং ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক পরিবেশে নতুন স্বরের প্রবর্তক ইতালীয় সিন্ডিক্যালিস্টদের কর্মধারায়।

    এই নতুন স্বরটি সেই সময়ের ইতালীয় সমাজতন্ত্রকে দুর্বল ও অচেতন করে দেওয়া জিওলিত্তির দলের সঙ্গে অশুভ মেলবন্ধনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছিল। এই স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় অলিভেত্তির

    Pagini Libere, ওরানোর Lupa, এবং এনরিকো লেওনের Divenirs Socials– এ।

    ১৯১৯ সালে যুদ্ধ–সমাপ্তির পর মতবাদ হিসেবে সমাজতন্ত্র মৃত হয়ে পড়ে। টিকে ছিল কেবল একটি প্রতিহিংসার অনুভূতি হিসেবে—বিশেষত ইতালিতে, যেখানে সমাজতন্ত্রের একমাত্র কৌশল ছিল যুদ্ধ–চাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগানো এবং তাদের সেই যুদ্ধের দায়ভার বহনের জন্য বাধ্য করা।

    The Popolo d’Italia পত্রিকাটি তার উপশিরোনামে নিজেকে ঘোষণা করেছিল “যোদ্ধা ও উৎপাদকদের দৈনিক মুখপত্র” হিসেবে। এখানে “উৎপাদক” শব্দটি তখনকার এক বিশেষ মানসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। ফ্যাসিবাদ কোনো পূর্বনির্ধারিত মতবাদ থেকে গড়ে ওঠেনি, টেবিলে বসে রচিত তাত্ত্বিক পরিকল্পনার ফল নয়; তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত এক কর্মচাঞ্চল্য—নিজেই ছিল কর্ম ও আন্দোলন। প্রাথমিক দুই বছর এটি কোনো দল ছিল না, বরং ছিল “দলবিরোধী” ও একটি আন্দোলন। আমি যে নাম দিয়েছিলাম আমাদের সংগঠনকে, তা–ই এর স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

    তবে, কেউ যদি ইচ্ছা করে সেদিনকার সেই ভাঁজপড়া কাগজগুলো আবার পড়ে দেখে—যেখানে Italian Fasci di combattimento গঠনের বৈঠকের বিবরণ রয়েছে—তাহলে তিনি তাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ মতবাদ খুঁজে পাবেন না। বরং তিনি দেখবেন একগুচ্ছ নির্দেশনা, পূর্বাভাস, ইঙ্গিত, যেগুলো সময়ের সাথে সাথে, তাৎক্ষণিক বাস্তবতার আবরণ সরিয়ে, কয়েক বছরের মধ্যেই পরিণত হয়েছিল পরিপূর্ণ মতবাদে—এমন এক রাজনৈতিক মতবাদ যা ফ্যাসিবাদকে অতীত ও সমসাময়িক অন্যান্য সব মতবাদ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

    যদি বুর্জোয়ারা—আমি তখন বলেছিলাম—ভাবেন যে তারা আমাদেরকে বজ্রনিরোধকের মতো ব্যবহার করতে পারবে, তবে তারা ভুল করছে। আমাদের জনগণের দিকে এগোতে হবে… আমরা চাই শ্রমিক শ্রেণি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে অভ্যস্ত হোক, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে যে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়… আমরা লড়ব প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে… এখন যেহেতু শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকারের পথ উন্মুক্ত, আমাদের সাহস হারালে চলবে না। আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে; যদি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করতে হয়, তবে সেই স্থান আমাদের নিতে হবে। উত্তরাধিকার লাভের অধিকার আমাদেরই, কারণ আমরাই জাতিকে যুদ্ধে প্রবেশ করতে বলেছিলাম এবং আমরাই তাকে বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম… প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না; আমরা চাই বিভিন্ন স্বার্থের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব… কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন যে এই কর্মসূচি গিল্ড ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ারই নামান্তর। তাতে কী! আমি চাই এই সমাবেশ জাতীয় সিন্ডিক্যালবাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অর্থনৈতিক দাবিসমূহকে গ্রহণ করুক…”

    এটা কি আশ্চর্যজনক নয় যে ঠিক প্রথম দিন থেকেই, Piazza San Sepolcro তে, “গিল্ড” শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল—একটি শব্দ যা, ফ্যাসিস্ট বিপ্লব বিকাশ লাভের সঙ্গে সঙ্গে, শাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক আইনগত ও সামাজিক সৃষ্টিকে প্রকাশ করতে শুরু করে?

    রোম অভিযানের পূর্ববর্তী কয়েক বছর এমন একটি সময়পর্বকে চিহ্নিত করে, যখন কর্মের প্রয়োজনে বিলম্ব ও সুচিন্তিত মতবাদ রচনার সুযোগ ছিল না। শহর ও গ্রামে চলছিল সংঘর্ষ। আলোচনা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এর থেকেও পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল—মৃত্যু। ফ্যাসিস্টরা জানতো কীভাবে মরতে হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ মতবাদ—যা অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত, টীকাসহ উপস্থাপিত—অনুপস্থিত ছিল বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে উপস্থিত ছিল আরও দৃঢ় কিছু—একটি বিশ্বাস।

    তবুও, যদি কেউ বইপত্র, প্রবন্ধ, কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাব, প্রধান ও গৌণ বক্তৃতার সাহায্যে সেই দিনগুলোর স্মৃতি পুনর্জীবিত করতে চায়, তবে সে দেখবে—যদি তার অনুসন্ধান ও নির্বাচনের যথাযথ দক্ষতা থাকে—যে যুদ্ধের মাঝখানেই মতবাদের ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছিল। বাস্তবেই, ওই সময়েই ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা অস্ত্রধারণ করেছিল, নিজেকে পরিশীলিত করেছিল, এবং সংগঠনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।

    ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সমস্যা, কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার সমস্যা কিম্বা রাজনৈতিক, সামাজিক, বিশেষত জাতীয় প্রশ্নগুলো তৎকালীন সময়ে আলোচিত হচ্ছিল। একইসঙ্গে, দণ্ডমূলক অভিয়ানের সময় উদারবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, মাসনিক মতবাদ এবং Partito Popolare এর সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। তথাপি, একটি প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদের অভাবকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কুপ্রবণ বিরোধীরা ফ্যাসিবাদকে মতবাদ গঠনে অক্ষম প্রমাণ করতে চেয়েছিল—ঠিক সেই সময়ে, যখন এই মতবাদই প্রবল উত্থানের সঙ্গে রচিত হচ্ছিল। শুরুতে, প্রতিটি নতুন মতবাদের মতোই, তা প্রকাশ পায় প্রচণ্ড নেতিবাচক ও মতবাদবিরোধী রূপে; পরে, গঠনমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক আকার গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ১৯২৬, ১৯২৭ এবং ১৯২৮ সালে ফ্যাসিস্ট শাসনের আইন ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সংযুক্ত হয়।

    ফ্যাসিবাদ এখন কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়, একটি মতবাদ হিসেবেও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। এর অর্থ হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ—নিজস্ব সমালোচনাশক্তিকে আত্মপর্যালোচনা ও অপরের বিশ্লেষণে প্রয়োগ করে—নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিশ্বের সকল জাতির জন্য দুশ্চিন্তার উৎস হয়ে ওঠা বস্তুগত ও বৌদ্ধিক স্বার্থ–সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ অধ্যয়ন করেছে এবং নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করেছে, এবং এখন এসব সমস্যার মোকাবিলায় নিজস্ব নীতির দ্বারা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

    প্রথমেই, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিকাশ–সংক্রান্ত বিষয়ে এবং বর্তমান সকল রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে ফ্যাসিবাদ মূলত অনন্ত শান্তির সম্ভাবনা বা কার্যকারিতায় বিশ্বাস করে না। সে কারণে ফ্যাসিবাদ আত্মোৎসর্গের বিপরীতে ভীরু ও আত্মসমর্পণমূলক নির্জীবতা ঢেকে রাখার মাধ্যম হিসেবে শান্তিবাদকে পরিত্যাগ করে। শুধু যুদ্ধই মানবিক শক্তিকে তার চূড়ান্ত উৎকটতায় পৌঁছে দিতে পারে এবং কেবল যুদ্ধই তাদের উপর মহত্ত্বের টীকা এঁকে দেয়, যারা সাহসের সঙ্গে এর মুখোমুখি হতে সক্ষম। অন্য সব পরীক্ষা অমূলক যা কখনোই একজন মানুষকে জীবন অথবা মৃত্যুর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে না। এই কারণে, যে সকল মতবাদ বলে ‘শান্তি যেকোনো মূল্যে’—তা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে অসঙ্গত।

    একইভাবে ফ্যাসিবাদের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—যদিও কখনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযোগী মনে হতে পারে—সেই সব আন্তর্জাতিকতাবাদী বা ‘লীগ–ভিত্তিক’ কাঠামো, যেগুলো ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের হৃদয় আবেগ, আদর্শবাদ বা বাস্তব বিবেচনায় গভীরভাবে আলোড়িত হলেই ভেঙে পড়ে।

    ফ্যাসিবাদ ব্যক্তি–জীবনেও এই যুদ্ধবাদী মানসিকতাকে বহন করে। “আমার কিছু যায় আসে না“—যেটি ছিল ফ্যাসিবাদী স্কোয়াড সদস্যদের অহংকারী মন্ত্র এবং আহত সৈনিকের ব্যান্ডেজে লিখিত—এটি কেবল দার্শনিক স্তোইকবাদের প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সংগ্রামী আত্মাকে প্রতিফলিত করে—যে আত্মা সকল ঝুঁকিকে গ্রহণ করে। এটি হলো ইতালীয় জীবনের এক নতুন রীতির প্রতীক।

    ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি জীবনকে গ্রহণ করে এবং ভালোবাসে; আত্মহত্যাকে সে ভীরুতার নিদর্শন হিসেবে প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণা করে। তার কাছে জীবন মানে দায়িত্ব, উৎকর্ষ, বিজয়; জীবন হতে হবে মহান এবং পরিপূর্ণ—এটি হবে নিজের জন্য, তবে সর্বাগ্রে হবে অপরের জন্য—নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য।

    এই সমস্ত পূর্বধারণার ফলস্বরূপই ফ্যাসিবাদী শাসনের জনসমাজ নীতি গঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ভালোবাসে, তবে ‘প্রতিবেশী‘ শব্দটি কোনো অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ধারণাকে নির্দেশ করে না। প্রতিবেশীকে ভালোবাসা মানেই এমন কোনো ভালোবাসা নয়, যা প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কঠোরতাকে বাদ দেয়; আর এর মানে এই নয় যে, তা শৃঙ্খলা ও মর্যাদাগত পার্থক্য অগ্রাহ্য করে । ফ্যাসিবাদ ‘সর্বজনীন আলিঙ্গন’ জাতীয় কোনো মানবতাবাদী বিভ্রমকে গ্রহণ করে না।

    জাতিসমূহের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ফ্যাসিবাদ অন্য জাতিকে চোখে চোখ রেখে সম্মুখীন হয়; সে সদা সতর্ক ও প্রহরায় নিয়োজিত; অন্যদের সমস্ত কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের স্বার্থের যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য রাখে; এবং সে কখনোই পরিবর্তনশীল ও প্রতারক বহিঃরূপের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় না।

    জীবন সম্পর্কে এই ধারণার জন্যই ফ্যাসিবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তিস্বরূপ যে মতবাদ, অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ—তাকে দৃঢ় ও সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মানবজাতির ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংঘর্ষ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদন–উপকরণের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করে, এবং অন্যান্য সকল সাংস্কৃতিক, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক উপাদানকে উপেক্ষা করে। ফ্যাসিবাদ এই একমাত্রিক ও অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে একটি বহুমাত্রিক, নৈতিক–আধ্যাত্মিকভাবে সংগঠিত জীবনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।

    অর্থনৈতিক জীবনের নানা উত্থান–পতন—যেমন কাঁচামাল আবিষ্কার, নতুন কারিগরি পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন—এসব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা কেউ অস্বীকার করে না; কিন্তু এসব উপাদান এককভাবে মানব ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে পারে—এই ধারণা নিছক অযৌক্তিক। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে—এখনও এবং সর্বদা—পবিত্রতা ও বীরত্বে; অর্থাৎ এমন সব কর্মে, যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রেরণা কাজ করে না।

    ফ্যাসিবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এই মতবাদ মানুষকে কেবলমাত্র ইতিহাসের উপরিতলের পাপেটরূপে বিবেচনা করে, যা ঢেউয়ের তোড়ে কখনো দেখা যায় ও আবার মিলিয়ে যায়। অথচ গভীরে গেলে নির্ধারক শক্তি হিসেবে মানুষই গতিময় ও ক্রীয়াশীল থাকে।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ শ্রেণিসংঘর্ষের সেই অপরিবর্তনীয় ও অনিবার্য চরিত্রকেও অস্বীকার করে, যা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি বলে বিবেচিত। এইভাবে ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের দুটো প্রধান মতাদর্শিক ভিত্তিতে আঘাত হানে।

    অবশিষ্ট থাকে কেবল মানবসভ্যতার প্রাচীনতম একটি আবেগ—সমাজে এমন এক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নীচু শ্রেণির দুঃখ–দুর্দশা লাঘব পাবে। কিন্তু এখানেও ফ্যাসিবাদ সমাজতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত অর্থনৈতিক বিবেচনাধর্মী সুখের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে—যা মনে করে, ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বজনের সর্বোচ্চ ভোগ–সুবিধা নিশ্চিত হবে।

    ফ্যাসিবাদ এই বস্তুবাদী সুখ–ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদদের উপর ছেড়ে দেয়। এর অর্থ, ফ্যাসিবাদ ‘সমৃদ্ধি = সুখ‘ এই সমীকরণকে অস্বীকার করে—যা মানুষকে কেবলমাত্র ভক্ষণে তৃপ্ত জন্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং জীবনকে নিছক এক প্রকার উদ্ভিদসুলভ অস্তিত্বে রূপান্তরিত করে।

    সমাজতন্ত্রের সমালোচনার পর, ফ্যাসিবাদ তার আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে নেয় গণতান্ত্রিক মতবাদসমূহের পুরো কাঠামোকে এবং তাদের মৌলিক ভিত্তি ও কার্যকর প্রয়োগ—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে। ফ্যাসিবাদ অস্বীকার করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বয়ং সমাজে নির্ধারক শক্তি হতে পারে; এটি প্রত্যাখ্যান করে সংখ্যার ভিত্তিতে শাসনের অধিকার, যা সাধারণত পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

    ফ্যাসিবাদ ঘোষণা করে, মানুষের মধ্যে এক অপরিবর্তনীয়, সৃজনক্ষম এবং কল্যাণকর বৈষম্য বিদ্যমান, যেটিকে “সার্বজনীন ভোটাধিকার” নামক যান্ত্রিক ও বাহ্যিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমতায় পরিণত করা সম্ভব নয়।

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে এমন এক পদ্ধতি, যেখানে জনগণকে নিয়মিতভাবে এই বিশ্বাসে ভুলিয়ে রাখা হয় যে, তারা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে; অথচ প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্ব অন্য শক্তির—প্রায়শই অদৃশ্য, জবাবদিহিহীন ও গোপন শক্তির—হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।

    গণতন্ত্র হলো এমন এক রাজাহীন শাসনব্যবস্থা, যেখানে একাধিক রাজা সক্রিয়, যারা অনেক সময় একক স্বৈরশাসকের চেয়েও বেশি একচেটিয়া, স্বেচ্ছাচারী এবং বিধ্বংসী।

    এই কারণেই ফ্যাসিবাদ—যদিও ১৯২২ সালের আগে তা প্রাসঙ্গিক কারণে প্রজাতন্ত্রপন্থী ছিল—‘রোম অভিযাত্রার আগেই সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে। কারণ, ফ্যাসিবাদ তখন বুঝতে শুরু করে যে শাসনব্যবস্থার গঠনমূলক রূপ (রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র) আর মুখ্য বিষয় নয়।

    এর কারণ, ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, অতীত ও বর্তমানের রাজতন্ত্র কিংবা প্রজাতন্ত্র—কোনোটিই “শাশ্বততার দৃষ্টিকোণ” থেকে বিচারযোগ্য নয়। বরং প্রতিটি শাসনব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির রাজনৈতিক বিবর্তন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদ রাজতন্ত্র বনাম প্রজাতন্ত্র—এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করেছে, যা নিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলি দীর্ঘকাল ধরে কালক্ষেপন করেছে। তারা প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য রাজতন্ত্রকে দায়ী করেছে এবং প্রজাতন্ত্রকে নিখুঁত শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করেছে।

    কিন্তু অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে, কিছু প্রজাতন্ত্র নিজস্ব কাঠামোতেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী, আবার কিছু রাজতন্ত্র সবচেয়ে সাহসী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষাকেও গ্রহণ করেছে।

    রেনান, যিনি ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাসপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন, তাঁর একটি দার্শনিক ধ্যান–চিন্তায় মন্তব্য করেন:

    “যুক্তি ও বিজ্ঞান মানবজাতির সৃষ্টি, তবে সরাসরি জনতার মাধ্যমে কিংবা জনতার জন্য যুক্তির সন্ধান করা কল্পনাবিলাস মাত্র। যুক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সকলের তা জানা অপরিহার্য নয়; আর যদি জানানো আবশ্যকই হয়, তবুও তা গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয় — কারণ গণতন্ত্র যেন নির্ধারিত হয়েছে সমস্ত পরিশ্রমসাধ্য সংস্কৃতি ও উচ্চতর জ্ঞানের রূপ বিলুপ্তির পথে নিয়ে যেতে।

    সমাজ কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্যই বিদ্যমান— এমন নীতিবাক্য প্রকৃতির পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কারণ প্রকৃতি কেবল প্রজাতির বিষয়ে চিন্তা করে এবং ব্যক্তিকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।

    তবে আশঙ্কাজনকভাবে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত অর্থ দাঁড়ায় (যদিও আমি তৎক্ষণাৎ স্বীকার করছি যে এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও সম্ভব) এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে অবক্ষয়গ্রস্ত এক জনসমষ্টি চিন্তা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই কেবল জড় প্রবৃত্তিনির্ভর অশ্লীল ভোগ–বিলাস ছাড়া।’’

    .

    গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক সমতার সেই অযৌক্তিক প্রচলিত মিথ্যাকে, যা প্রকৃতপক্ষে একটি সামষ্টিক দায়হীনতার অভ্যাস এবং সুখ–সমৃদ্ধি ও অনন্ত অগ্রগতির এক বিভ্রমময় কাহিনি।

    কিন্তু যদি গণতন্ত্র বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে জনগণকে রাষ্ট্রে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় না, তাহলে এই রচনার প্রণেতা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটি “সংগঠিত, কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র” হিসেবে।

    আর্লি ফিগার্স
    শিল্পী: অভিনাশ চন্দ্র
    সূত্র: ফ্রিজি

    ফ্যাসিবাদ নিঃসন্দেহে ও সম্পূর্ণভাবে উদারতন্ত্রের মতবাদগুলোর বিরোধী— রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে। উনবিংশ শতাব্দীতে উদারতন্ত্রের গুরুত্বকে যেমন সমকালীন বিতর্কের খাতিরে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়; তেমনি, সেই শতকে বিকাশ লাভকারী বহু মতবাদের মধ্যে একটিকে চিরকালের জন্য মানবজাতির ধর্মে পরিণত করাও সমীচীন নয়।

    বাস্তবে, উদারতন্ত্র প্রকৃত অর্থে মাত্র পনেরো বছরের জন্য বিকশিত হয়েছিল। এটি জন্ম নিয়েছিল ১৮৩০ সালে, Holy Alliance এর প্রতিক্রিয়ায়, যারা ইউরোপকে ১৭৮৯ সালের চেয়েও পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আর শিখর স্পর্শ করেছিল ১৮৪৮ সালে, এমনকি সেই সময়ে পোপ নবম পিয়াসও ছিলেন একজন উদারবাদী। কিন্তু সেই বছর থেকেই এর পতন শুরু হয়। যদি ১৮৪৮ হয় আলো ও কাব্যের বছর, তবে ১৮৪৯ ছিল অন্ধকার ও বেদনার বছর। রোমান প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল আরেকটি প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্সের হাতে। সেই একই বছরে কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে সমাজতন্ত্রের বাণী প্রচার করেন।

    ১৮৫১ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয় এক ‘অনুদারবাদী’’ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৮৭০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, যতক্ষণ না এক ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের পর দেশজুড়ে গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়। বিজয়ী ছিলেন বিসমার্ক, যিনি উদারবাদ এবং এর প্রচারকদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন না। এটি একটি লক্ষণীয় বিষয় যে, পুরো উনবিংশ শতকে এত উচ্চ সভ্যতাসম্পন্ন জাতি হওয়া সত্ত্বেও জার্মানদের কাছে উদারতন্ত্র একটি অজানা ধর্ম ছিল, শুধু একবারের ব্যতিক্রম—যেটি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টের হাস্যকর সংসদ’ নামে খ্যাত, যা মাত্র এক মৌসুম স্থায়ী হয়েছিল।

    জার্মানি তার জাতীয় ঐক্য অর্জন করে উদারবাদের বাইরে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। এই মতবাদ একেবারে সেই জার্মান স্বভাবের পরিপন্থী, যাদের রাজতান্ত্রিক মানসিকতা প্রবল, বিপরীতে উদারতন্ত্র ঐতিহাসিক ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নৈরাজ্যের আঁতুড়ঘরমাত্র। জার্মান জাতীয় ঐক্যের তিনটি ধাপ ছিল ১৮৬৪, ১৮৬৬ ও ১৮৭০ সালের তিনটি যুদ্ধ, যার নেতৃত্বে ছিলেন ‘মোল্টকে’ ও ‘বিসমার্ক’–এর মতো তথাকথিত ‘উদারবাদী’রা।

    ইতালীয় জাতীয় ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে উদারতন্ত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যা জুসেপ্পে ম্যাজিনি ও গারিবল্ডির অবদানের তুলনায় অনেকটাই কম, যাঁরা কেউই উদারবাদী ছিলেন না। যদি অনুদার নেপোলিয়ন তৃতীয় হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে আমরা লম্বার্ডি পেতাম না; এবং অনুদার বিসমার্ক যদি সদোয়া ও সেডানে হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে সম্ভবত ১৮৬৬ সালে ভেনিস বা ১৮৭০ সালে রোম দখল আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

    ১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি এমন এক পর্বকে নির্দেশ করে, যা এমনকি উদারতন্ত্রের নতুন ধর্মের পুরোহিতদের কাছেও ছিল এক ধসযাত্রার কাল—সাহিত্যে ‘দেকাদেন্তবাদ’ এবং বাস্তবতায় ‘সক্রিয়তাবাদ’–এর দ্বারা আক্রমণে পর্যুদস্ত । এই ‘সক্রিয়তাবাদ’ বলতে জাতীয়তাবাদ, ভবিষ্যতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদ।

    উনবিংশ শতকের উদারতাবাদ, বহু জটিল ও অবিভাজ্য সমস্যার সঞ্চয় ঘটিয়ে, সেগুলোর সমাধান হিসাবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পথকেই বেছে নেয়। কোনো ধর্মই এরূপ নিষ্ঠুর আত্মত্যাগ দাবি করেনি। তবে কি উদারতাবাদের দেবতাগণ রক্তের জন্যই এত উদগ্রীব ছিলেন?”

    এখন উদারতাবাদ তার মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—সেই মন্দির, যা জনগণের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছে। কারণ, জনগণ অনুধাবন করেছে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতাবাদের যে সংশয়বাদ এবং রাজনীতি এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রে এর যে উদাসীনতা—তা অতীতে যেমন বিশ্বকে বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনি সর্বনাশ ডেকে আনবে।

    এই ব্যাখ্যা থেকেই প্রতীয়মান হয় কেন আমাদের সমসাময়িক কালের সকল রাজনৈতিক অনুশীলন ও প্রয়োগসমূহ উদারবাদবিরোধী। আর এই কারণে তাদের ইতিহাসচ্যুত করার প্রয়াস চরম আজগুবি —যেন ইতিহাস কেবলমাত্র উদারতাবাদ ও তার অনুগতদের জন্য সংরক্ষিত কোনো সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র; যেন উদারতাবাদই সভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি, যার গণ্ডি অতিক্রম করার আর কোনো সম্ভাবনাই অবশিষ্ট নেই।

    সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং উদারবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী প্রত্যাখ্যানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা অনুচিত, যা ফ্যাসিবাদকে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক অবস্থানে বিশ্বকে পুনঃস্থাপনের সমর্থক বলে প্রতিভাত হয়—ঐ বছরটিকে সাধারণত গণতান্ত্রিক–উদারবাদী শতাব্দীর সূচনাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাস কখনও পশ্চাদগামী হয় না। ফ্যাসিবাদী মতবাদ দেমেস্ত্রকে তার পয়গম্বররূপে বিবেচনা করে না। রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র অতীতের বিষয়; তেমনি অন্ধচার্চপূজাও। মৃতপ্রায় এবং বিলুপ্ত হয়েছে সামন্তীয় বিশেষাধিকার ও সমাজের অন্তরীত, পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন বর্ণব্যবস্থার বিভাজন। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদের ধারণার মধ্যেও পুলিশের দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই।

    একটি দল যখন কোনও জাতিকে ‘সর্বাত্মকভাবে‘ শাসন করে, তা ইতিহাসে নতুন এক প্রবাহের সূচনা। পূর্বে এর কোনো তুলনামূলক উদাহরণ পাওয়া যায় না। উদারতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতবাদসমূহের ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে ফ্যাসিবাদ কেবলমাত্র সেই উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে, যেগুলো এখনো প্রাণবন্ত এবং কার্যকর।ইতিহাসের ‘অর্জিত বাস্তবতা’ হিসেবে যেটি টিকে আছে ফ্যাসিবাদ তাকে সংরক্ষণ করে; বাকি সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, এটি এমন কোনো মতবাদের ধারণাকে গ্রহণ করে না, যা সর্বকালীন এবং সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য। যদি মেনে নেওয়া হয় যে উনবিংশ শতাব্দী ছিল সমাজতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের শতাব্দী, তবু তা এই ধারণা দেয় না যে বিংশ শতাব্দীও সেই একই মতাদর্শ দ্বারা চিহ্নিত হবে। রাজনৈতিক মতবাদসমূহ ক্ষণস্থায়ী; জাতিসমূহ টিকে থাকে। এই বাস্তবতার আলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে এটি কর্তৃত্বের শতাব্দী, ডানপন্থিতার দিকে গমনরত একটি ফ্যাসিবাদী শতাব্দী। যদি উনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্যক্তির শতাব্দী (যেহেতু উদারতন্ত্র ব্যক্তিবাদকে অনুষঙ্গ করে), তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি এটি ‘সমষ্টির’ শতাব্দী—অতএব রাষ্ট্রের শতাব্দী।

    একটি নতুন মতবাদ তার নিজস্ব রচনায় পূর্ববর্তী মতবাদগুলির মধ্য থেকে এখনো কার্যকর উপাদানসমূহ গ্রহণ করাই যৌক্তিক। কোনো মতবাদ সম্পূর্ণ নতুন, দীপ্তিমান ও অভূতপূর্ব রূপে জন্মায় না। কোনো মতবাদই একেবারে মৌলিক বলে দাবি করতে পারে না। প্রতিটি মতবাদই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মতবাদের সঙ্গে ইতিহাসগতভাবে যুক্ত। যেমন, মার্ক্সীয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সংযুক্ত হয়ে আছে ফুরিয়ে, ওউয়ন এবং সাঁ–সিমঁ–র কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে; যেমন, উনবিংশ শতাব্দীর উদারতন্ত্রের উৎপত্তি নিহিত আছে অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন আন্দোলনে; আবার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ উদ্ভূত হয়েছে এনসাইক্লোপেডিস্টদের চিন্তাধারা থেকে। প্রতিটি মতবাদই মানব ক্রিয়াকলাপকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে চায়; কিন্তু এই কার্যকলাপসমূহ আবার বিপরীতমুখে মতবাদকে প্রভাবিত করে, নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রূপান্তরিত করে কিংবা তাকে অতিক্রম করে যায়। সুতরাং, একটি মতবাদ হতে হবে এক প্রকার ‘জীবন্ত কর্ম’, কেবল শব্দসমূহের প্রদর্শন নয়। এই কারণেই ফ্যাসিবাদে রয়েছে একটি প্রায়োগিক ধারা, রয়েছে তার ক্ষমতার ইচ্ছা, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, সহিংসতার প্রতি মনোভাব এবং তার নিজস্ব মূল্যবোধ।

    ফ্যাসিবাদী মতবাদের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো রাষ্ট্র সম্পর্কিত তার ধারণা—রাষ্ট্রের স্বরূপ, কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্যাসিবাদের কাছে রাষ্ট্র হল পরম; ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সত্তাগুলি আপেক্ষিক। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত অস্তিত্ব কেবল তখনই স্বীকৃত, যতক্ষণ তারা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল ফলাফল রেকর্ড করার সীমিত ভূমিকায় নিজেকে আবদ্ধ রাখে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সেখানে সমাজের বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতির খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সজাগ, সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন; এই কারণেই তাকে ‘নৈতিক রাষ্ট্র‘ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

    ১৯২৯ সালে শাসনব্যবস্থার প্রথম পঞ্চবার্ষিক সম্মেলনে আমি বলেছিলাম— “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো রাত্রি–প্রহরীর মতো নয়, যে কেবল নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; কিংবা এটি এমন কোনো কাঠামোও নয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ভৌত কল্যাণ ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান—এই কাজ তো পরিচালনা পর্ষদও করতে পারে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাজনৈতিক নয়, এমনকি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নাগরিক ও জাতির বহুবিধ কার্যক্রমের প্রতি নির্লিপ্তও নয়। ফ্যাসিবাদ যে রাষ্ট্র ধারণা লালন ও বাস্তবায়ন করে, তা একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তা, যার লক্ষ্য জাতির রাজনৈতিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক সংগঠনের রূপায়ন; আর এই সংগঠন আত্মারই প্রকাশ, যার উৎস ও বিকাশ একধরনের আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতিফলন।

    রাষ্ট্র কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয় না, বরং জাতির আত্মাও সংরক্ষণ করে ও উত্তরাধিকারসূত্রে তা হস্তান্তর করে—যা গঠিত হয় দীর্ঘ ইতিহাসে তার ভাষা, রীতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে। রাষ্ট্র কেবল বর্তমান নয়; এটি অতীত, এবং সর্বোপরি ভবিষ্যতেরও প্রতীক। ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্র জাতির অন্তর্নিহিত নৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্রের অভিব্যক্তির রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।

    রাষ্ট্র নাগরিকদের নাগরিকচেতনায় শিক্ষিত করে, তাদের মিশনের প্রতি সচেতন করে, ঐক্যের আহ্বান জানায়; রাষ্ট্রের বিচার তাদের পারস্পরিক স্বার্থকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে; রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের বিজয়—বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও মানবিক সংহতির ক্ষেত্রসমূহে—হস্তান্তর করে; রাষ্ট্র মানুষকে আদিম গোত্র–জীবন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ রূপ—সাম্রাজ্যিক শাসনের দিকে নিয়ে যায়।

    রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে তাদের স্মৃতি, যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা এর আইন মান্য করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন; রাষ্ট্র ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরে সেই সকল অধিনায়কের নাম, যারা এর ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করেছেন, এবং সেই প্রতিভাবানদের নাম, যারা একে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা যখন কমে যায়, আর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বিচ্ছিন্নতা ও কেন্দ্রবিমুখ প্রবণতা যখন আধিপত্য বিস্তার করে, তখন জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।”

    ১৯২৯ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সর্বত্র এই সত্যগুলোকেই তুলে ধরেছে ও জোরদার করেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাকথিত যে ‘সঙ্কট’ চলছে, তা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। কোথায় গেলেন সেই জুল সিমোঁর ছায়া, যিনি উদারবাদের সূচনালগ্নে ঘোষণা করেছিলেন— “রাষ্ট্রের উচিত নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং ইস্তফা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে”? কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাককালকরা, যারা বলেছিলেন যে ‘রাষ্ট্রের উচিত শাসন থেকে নিজেকে বিরত রাখা’?

    আর ইংরেজ দার্শনিক বেন্থাম, যিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের একমাত্র চাহিদা রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা; অথবা জার্মান চিন্তাবিদ হাম্বোল্ট, যিনি মনে করতেন ‘সেরা সরকার’ সেই যা ‘আলসে’? আজকের দিনে রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অবিরাম, অপরিহার্য এবং জোরালো হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাঁরা কী বলতেন?

    নিশ্চয়ই একথা সত্য যে দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থনীতিবিদগণ রাষ্ট্রহীনতার প্রশ্নে প্রথম প্রজন্মের মতো কঠোর ছিলেন না, এবং এমনকি অ্যাডাম স্মিথ–ও—যদিও অনেক সতর্কতার সঙ্গে—রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার একটি সামান্য পথ উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

    ডেমোক্রেসি;
    শিল্পী: আভো ঘারিবিয়ার
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    যেখানে উদারবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, ফ্যাসিবাদ সেখানে শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক সৃষ্টিরূপে চিহ্নিত; এটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং বিপ্লবাত্মক। কারণ এটি এমন কিছু সার্বজনীন সমস্যার সমাধান পূর্বাভাস দেয়, যেগুলো অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছে।

    উদাহারণ স্বরূপ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে—দলগুলোর বিভাজন, সংসদের ক্ষমতা দখল, আইনসভাগুলোর দায়িত্বহীনতা; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে—বাণিজ্য ইউনিয়ন ও পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যেগুলোর দ্বন্দ্ব ও সমঝোতা শ্রম ও পুঁজি—উভয় ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে; এবং নৈতিক ক্ষেত্রে— দেশবাদের নৈতিক আদেশ পালনে শৃঙ্খলা, কর্তব্যপরায়ণতা ও আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিপন্ন করে।

    ফ্যাসিবাদ চায় একটি শক্তিশালী ও জৈবিক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হবে জনগণের বিস্তৃত সমর্থনের ওপর। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শাসনের দাবি করে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই; এটি তার কর্পোরেত কাঠামো, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করে। জাতির সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি—যেগুলো নিজ নিজ সংগঠনে সংগঠিত—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রবাহিত হয়।

    একটি রাষ্ট্র, যা লাখো মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তার কার্যকলাপ অনুভব করে এবং তার লক্ষ্যসাধনে আত্মনিয়োগে প্রস্তুত—সে রাষ্ট্র কোনো মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসকের অত্যাচারী রাষ্ট্র নয়। এটির সাথে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মিল নেই। ব্যক্তি–মানুষকে চূর্ণ করার পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তার শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে; যেমন একটি রেজিমেন্টে একজন সৈনিক তার সহযোদ্ধাদের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে বরং বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জাতিকে সংগঠিত করে, তবে ব্যক্তি–মানুষের জন্য যথাযথ কর্মকাণ্ডের পরিসরও বজায় রাখে। এটি অনাবশ্যক বা ক্ষতিকর স্বাধীনতাকে হ্রাস করেছে, কিন্তু যে স্বাধীনতাসমূহ অপরিহার্য, সেগুলিকে সংরক্ষণ করেছে। এ বিষয়ে ব্যক্তি নিজে বিচারক হতে পারে না; কেবল রাষ্ট্রই এই বিচার করার অধিকার রাখে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সাধারণভাবে ধর্মীয় অভিব্যক্তিগুলোর প্রতি নিরাসক্ত নয়, এবং এটি ইতালীয়দের বিশেষ ও ইতিবাচক ধর্ম—রোমান ক্যাথলিক ধর্মের প্রতিও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে না। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব নেই, তবে একটি নৈতিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। ফ্যাসিবাদ ধর্মকে আত্মার গভীরতম প্রকাশগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এই কারণেই এটি কেবল ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, বরং তা রক্ষা করে ও সংরক্ষণ করে। ফরাসি বিপ্লবের চরম পর্যায়ে কনভেনশনের সময় রোবসপিয়ের যেভাবে নিজের মতো করে একটি “ঈশ্বর” দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তেমন কোনো প্রয়াস গ্রহণ করে না; আবার বলশেভিকপন্থীরা যেভাবে মানুষের আত্মা থেকে ঈশ্বরকে মুছে ফেলতে চায়, তেমন নিষ্ফল প্রচেষ্টাও এটি করে না। বরং ফ্যাসিবাদ আত্মসংযমী সাধক, সাধু এবং বীরদের ঈশ্বরকে যেমন শ্রদ্ধা করে, তেমনি সরল ও আদিম হৃদয়ের সাধারণ জনগণের ঈশ্বরকেও সম্মান জানায়—যাঁর উদ্দেশে তারা প্রার্থনা করে।

    শিল্পী: মিম্মো পালাদিনো

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র শাসন করার এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রোমান ঐতিহ্য এক শক্তিশালী চেতনারূপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা কেবল ভূখণ্ডগত, সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; বরং তা একাধিক মাত্রায় আত্মিক ও নৈতিকও বটে। একটি সাম্রাজ্যবাদী জাতি—অর্থাৎ যে জাতি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্য জাতিগুলোর নেতৃত্ব দেয়—সে এক বর্গমাইল ভূখণ্ড দখল না করেও অস্তিত্বশীল হতে পারে। ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চেতনার মধ্যে—অর্থাৎ জাতির সম্প্রসারণমূলক প্রবণতার মধ্যে—তাদের প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখতে পায়। বিপরীত প্রবণতা, যা জাতীয় স্বার্থকে কেবলমাত্র স্বদেশের সীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তাকে ফ্যাসিবাদ অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করে। যে জাতিগুলো পুনরুত্থিত হয়, তারা স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ধারণ করে; পক্ষান্তরে, যে জাতিগুলো পতনের পথে, তাদের বৈশিষ্ট্য হলো ত্যাগের মনোভাব। ফ্যাসিবাদী মতবাদই এমন একটি মতবাদ, যা এমন এক জাতির প্রবণতা ও অনুভূতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেমন ইতালীয় জাতি, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশি দাসত্বে নিষ্ক্রিয় থাকার পর এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠা করছে।

    কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মানেই শৃঙ্খলা, প্রচেষ্টার সমন্বয়, দায়িত্ববোধের গভীরতা এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে শাসনব্যবস্থার বহু ব্যবহারিক কার্যক্রম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তির গতিপথ এবং সেই কঠোরতাকেও, যা প্রয়োগ করতে হয় তাদের বিরুদ্ধে—যারা বিংশ শতকের ইতালির এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য অভিযাত্রাকে প্রতিহত করতে চায়, উনবিংশ শতকের পরিত্যক্ত মতাদর্শকে উসকে দিয়ে। এই মতাদর্শসমূহ আজ সর্বত্র বর্জিত, যেখানে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাহসী পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

    কোনো যুগেই মানুষ আজকের মতো কর্তৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলার জন্য এত গভীর তৃষ্ণা প্রকাশ করেনি। যদি প্রতিটি যুগেরই একটি নিজস্ব মতবাদ থাকে, তবে অসংখ্য লক্ষণ এটিই নির্দেশ করে যে আমাদের যুগের মতবাদ হলো ফ্যাসিবাদ। এর প্রাণশক্তির প্রমাণ হলো—এটি এক বিশ্বাসকে উদ্দীপিত করেছে; এবং সেই বিশ্বাস যে মানুষের আত্মাকে জয় করেছে, তার প্রমাণ হলো—ফ্যাসিবাদ আজ দেখাতে পারে তার আত্মোৎসর্গকারী বীর ও শহিদদের।

    ফ্যাসিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী সেই সর্বজনীনতা অর্জন করেছে, যা প্রতিটি মতবাদ লাভ করে, যখন তা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মানব চিন্তার ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

  • এম.এন রায়।। র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি (আমূল গণতন্ত্র বা মানবতন্ত্র )

    এম.এন রায়।। র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি (আমূল গণতন্ত্র বা মানবতন্ত্র )

    • অনুবাদ: স্বদেশ রঞ্জন দাস

    [মানবেন্দ্র নাথ রায় বা এম এন রায়, উপমহাদেশের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক। তার হাত ধরেই ম্যাক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই এম এন রায় প্রথাগত মার্ক্সবাদী চিন্তা থেকে বের হয়ে নতুন রাস্তা অনুসন্ধানের চেষ্টায় ব্রতী হন, যার নাম দেন তিনি নয়া মানবতাবাদ। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয় তার New Humanism: A Manifesto। বর্তমান লেখাটি এ বইয়েরই অনূদিত সংস্করণের একটি অধ্যায় থেকে নেয়া হয়েছে। পুরো বইটির অনুবাদ করেন স্বদেশরঞ্জন দাস, যেখানে Radical Democracy-এর বাংলা তিনি করেন আমূল গণতন্ত্র। বর্তমান লেখাটি বই থেকেই হুবহু তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এ যুগের মানুষকে যে-দর্শন নতুন আশা ও নতুন বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে সেই দর্শনকে অবশ্যই মুক্তির অর্থ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে; মুক্তিলাভ করলে, মানুষের দাবীর কতটা কী পূরণ হবে তা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করতে হবে। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যক্তি মানুষকে, তার ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে তুলতে কতখানি সাহায্য দেবে তার বিচার যদি বর্তমানের নানা পরস্পরবিরোধী মতবাদের গোঁড়ামি ও অন্ধ সংস্কার ও অনুশাসন দিয়ে করতে হয় তা হলে কেবল বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি করবে এবং ইতিহাসের বৃহত্তম এই সংকট থেকে মানুষকে উদ্ধার করে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাও সম্ভব হবে না এবং সংকট ত্রাণের আদর্শ আকাশকুসুমের মতই অলীক থেকে যাবে। সর্বজনকাম্য এক মুক্তির আদর্শের জন্যই এক সার্বজনীন প্রচেষ্টা সম্ভব হতে পারে।

    মানুষের মুক্তি আকাঙ্ক্ষার উদ্ভব হয়েছে তার জীবন সংগ্রাম থেকে। এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষাই তাকে জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটবার পরও প্রকৃতির ওপর নিজের আধিপত্য স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই চলেছে মানুষের নব নব জ্ঞানান্বেষণ প্রচেষ্টা। এর ফলেই সে প্রাকৃতিক ঘটনা, ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের অত্যাচার ও শাসন থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্তি পেতে পেতে এগিয়ে চলেছে। মানুষ তার জীবন সংগ্রাম চালাতে চালাতে যখন বিবর্তনের উন্নত স্তরে উঠেছে তখন সেই সংগ্রাম ক্রমে বুদ্ধি ও সুকুমার আবেগের স্তরে উন্নীত হয়েছে এবং সেটাই তখন উচ্চ মূল্যমানের পর্যায়ে এসে মানুষের এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি মানুষকে যদি মুক্ত জীবনযাপন করতে হয় তবে তার শুধু অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও নিরাপত্তা থাকলেই চলবে না, তার অন্তর্নিহিত সকল বৃত্তি ও শক্তি সমূহের বিকাশ সাধনের অনুকূল এক মানসিক পরিবেশ ও এক মুক্ত আবহাওয়ার প্রয়োজন হবে, যেখানে কোন প্রকার বাঁধাধরা মতবাদের অন্ধ অনুশাসন থাকবে না। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি মানুষ এই প্রকারের ব্যাপক অর্থে স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ কতটা অর্জন করেছে তাই দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে। “মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি” এই প্রাচীন ঋষি বাক্য অনুসরণ করে ভবিষ্যতের দর্শনকে ঘোষণা। করতে হবে, ব্যক্তি মানুষ কতখানি স্বাধীনতা পেল কিংবা পেল না, সেই মাপকাঠি দিয়েই কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে।

    জাতিই হোক আর শ্রেণীই হোক সব রকম সমষ্টি সত্তাই গড়ে ওঠে ব্যষ্টিরূপ ব্যক্তিকে নিয়ে। মানুষ[mfn] এখানে মানবেন্দ্রনাথ আদিম মানবকে “Man” এক বচনে ব্যবহার[/mfn] আরো অধিক মাত্রায় নিজ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও এ সবের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছিল সমাজ গড়েছিল। আদিম যুগে পারিবারিক মানুষ[mfn] যেহেতু মানুষ যুক্তিপরায়ণ জীবও বটে, সেইহেতু সে নিজ নিজ বুক্তি বুদ্ধি দিয়ে নিজের এবং নিজ পরিবার পরিজনের জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছে এবং প্রতিবেশীর ওপর কোন স্বাভাবিক আতের টান না থাকার জন্য সদব্যবহার না করলে সমাজবদ্ধতা থাকবে না সেইজন্য পরস্পরের বাঁধনের সিমেন্ট স্বরূপ সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন প্রবর্তন করেছে, দণ্ডবিধি রচনা ক’রে সমাজে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করেছে। “মানুষ”কে একবচনে ব্যবহার করলে পাছে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকে সেইজন্য আমি Man. এর স্থানে “পারিবারিক মানুষ” লিখেছি (অনুবাদক )।[/mfn] তার পারিবারি জীবন সংগ্রামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য নিয়েই অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সমাজ সম্পর্কের প্রবর্তন করে; এবং আদি মানুষের এই সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা সে ব্যক্তি মানুষ হিসাবেই শুরু করে। এই যে মানুষের জীবন সংগ্রামের বাধাবিপত্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তা কেবল তার জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের ইচ্ছ থেকেই উদ্ভূত। কাজেই দেখা যাচ্ছে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে মানব সমাজের গতি প্রগতির মূল প্রেরণা। মানুষের অন্তর্নিহিত যুক্তিশীলতা, নীতিবোধ ও অন্যান্য সৃজনশীল সম্ভাবনাগুলি বিকাশের পথে যে সব প্রাকৃতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা আছে তার ক্রমঃ করেছেন, কিন্তু তার অর্থ নয় যে আদিম মানব সমাজবদ্ধ হবার পূর্বে একা একাই থাকত। মানুষ কোনদিনই তা থাকত না। মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক। কারণ মানুষের জননীকে জীবিকার্জনের কষ্টকর দায়িত্ব থেকে অবসর দিতে হয় এবং মানব শিশুকে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত মাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, সেইজন্য মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক প্রাণী জগতকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যে-সব জীব একা একাই থাকে, কেবল বংশ রক্ষার সময় স্ত্রী পুরুষ ক্ষণিকের জন্য মিলিত হয়, স্ত্রী-প্রাণ সুবিধামত স্থানে ডিম পেডেই ছুটি নেয়-সন্তান পালনের দায়িত্ব থাকে না, আপনিই ডিম ফোটে – বাচ্ছারা নিজেরাই প্রকৃতি থেকে খাদ্য আহরণ করে বেঁচে থাকে; যেমন কীট পতঙ্গ জাতীয় প্রাণী। যে সব প্রাণী দল বেঁধে থাকে : যেমন পিঁপড়ে, মৌমাছি, উইপোকা।

    যে সব প্রাণী পারিবারিক, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে পরিবার বেঁধে বাস করে যেমন–সিম্পঞ্জি, ওরাং, গিবন ও মানুষ। মানুষ স্বভাবতঃ পারিবারিক জীব সেই হেতু সে পিঁপড়ে মৌমাছির মত সামাজিক মনোবৃত্তি সম্পন্ন জীব নয়। তাই আতের টান নিজ নিজ স্ত্রী ও সন্তানের ওপর প্রতিবেশীর প্রতি নয়। কিন্তু অপসরণই হচ্ছে মুক্তি। সমাজের নানা আইন কানুন ও বিধি নিষেধের দ্বারা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যক্তি মানুষের জন্য সর্বাধিক স্বাধীনতা লাভের ব্যবস্থা করা। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি যে পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করে তার সমষ্টি দিয়েই যে কোন সমাজ ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও প্রগতিমূলক মূল্যের বিচার করতে হবে। নতুবা সামাজিক অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তি ও উন্নতির আদর্শ মিথ্যা হয়েই থাকবে।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    কোন রাজনৈতিক দর্শন বা সামাজিক পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যক্তিব স্বাধীনতার আদর্শ যদি শূন্যগর্ভ অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে পরিত্যক্ত হয় তবে তার বৈপ্লবিক গুরুত্ব খুবই কম না হয়ে পারে না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় (রাষ্ট্রে) ও অর্থ নৈতিক প্রচেষ্টায় রক্ত-মাংসের ব্যক্তি মানুষকে কাল্পনিক সমষ্টি সত্তাব যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়, সম্ভবতঃ ত দিয়ে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি অর্জন করা যায় না। স্বাধীনতা কেড়ে নিলে অর্থাৎ একনায়কত্ব স্থাপন করলে মানুষ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলবে, এ কথা বলা অর্থহীন ৷ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল প্রচেষ্টার যুক্তিসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিক থেকে অধিকত মাত্রায় ব্যক্তির স্বাধীনতা লাভ। একমাত্র ব্যক্তির স্বাধীনতা রূপেই স্বাধীনতা বা মুক্তির আদর্শ বাস্তব হয়ে উঠতে পারে। 

    কেবলমাত্র অর্থনীতির পুনর্গঠন করলেই কোন সমাজ আপন থেকেই মুক্ত সমাজ হয়ে ওঠে না; অথবা শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দাবীদার কোন রাজনৈতিক পার্টি রাজনৈতিক ক্ষমত দখল করলেই যে সকল ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত সম্পত্তির লোপ, উৎপাদনের উপায় সমূহের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা, অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সাহায্যেই শ্রমিক শোষণের অবসান বা ধনের সমবণ্টন হয় না। যন্ত্র-বিজ্ঞানের পরিপূর্ণ সুযোগ নেওয়ার অজুহাতে কখনও বা কর্ম কুশলতা বাড়াবার জন্য সমষ্টিগত প্রচেষ্টার দোহাই দিয়ে ব্যক্তির ভাল-মন্দকে অস্বীকার করা হয়৷ এর ফলে অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার উদ্দেশ্য যে ব্যক্তির উন্নতি সেটাই ব্যর্থ হয়ে যায়। এই জোর করে ওপর থেকে চাপানে৷. অর্থ নৈতিক পরিকল্পনার দ্বার সামাজিক ন্যায়নীতি ও অর্থ নৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নততর গণতন্ত্রের পরিবর্তে একনায়কশাসিত রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়!  অর্থ নৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও হতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একেবারেই সম্ভব নয়! অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ধারা অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেন, এটা তাঁদের স্মরণ রাখা দরকার।

    সর্বপ্রধান প্রশ্ন হল: কী জন্য পরিকল্পনা? ধরে নেওয়া হয়, পরিকল্পিত অর্থনীতিব দ্বারা সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হবে। অন্য কথায়, এর দ্বারা ধনের সমবণ্টনের সাহায্যে সমাজে ন্যায়-নীতির প্রতিষ্ঠা হবে। তা যদি হয় তা হলে অবশ্য ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে পরিকল্পনার সামঞ্জস্য বিধান হতে পারে। আধুনিক যন্ত্র-বিজ্ঞান যে স্তরে এসে পৌঁছেছে তাতে ব্যক্তি স্বাধীনতার সম্যক স্ফূর্তির পক্ষে যদি তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে মানুষের কল্যাণের জন্য যন্ত্র-বিজ্ঞানের অধিক উন্নতি খর্ব করতে হবে। ডাঃ ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন সৃষ্ট রাক্ষস যেমন তার স্রষ্টাকেই হত্যা করেছিল, তেমন যন্ত্র যেন তার স্বষ্টা বর্তমান সভ্যতাকেই ধ্বংস না করে সেটা দেখতে হবে। যন্ত্র যখন মানুষই সৃষ্টি করেছে তখন সে মানুষেরই সেবা করবে—মানুষের মুক্তি লাভে, মনুষ্যত্বের বিকাশে সাহায্য করবে।[mfn] যন্ত্র ইতিমধ্যে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করতে শুরু করেছে। তারপর যন্ত্রের মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকায় এবং তা লাভ খাওয়ার উদ্দেশ্যে নিযুক্ত হওয়ায় ক্রমেই মানুষকে পুতুল-নাচের পুতুলে পরিণত করা হচ্ছে। আমেরিকার বর্তমান সমাজ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এবং পৃথিবীব্যাপী তারই অনুকরণ চলছে।। মানবেন্দ্রনাথ এখানে সেই বিপদের কথাই স্মরণ করিয়ে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করছেন বর্তমান নগরকে ও যন্ত্রশিল্পকে গ্রাম অঞ্চলেও বিকেন্দ্রিত করে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের পক্ষে যে পর্যন্ত সহায়ক হবে সে পর্যন্ত তা গ্রহণ-যোগ্য হবে, কিন্তু যখনই তা মনুষ্যত্বের পক্ষে হানিকর হয়ে উঠতে থাকবে তখনই সেখানে সীমারেখা টানতে হবে। আমূল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমবায়মূলক অর্থনীতির দ্বারা সেটা সম্ভব হবে। ( অনুবাদক)[/mfn]

    একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাব অজুহাত যেমনই কেন হোক না, সমাজ উন্নয়ণের ব্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্ট পরিকল্পনায় তার স্থান নেই। বাজনীতি থেকে যদি ন্যায়-নীতিকে বিসর্জন দেওয়া হয় তবে রাজনীতির উদ্দেশ্য যে সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষ। সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। এটা অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য যে, নীতিবিরুদ্ধ অসৎ উপায়ের দ্বারা সৎ উদ্দেশ্যে পৌঁছান যায় না, অসৎ উপায়ই সম্প্রসারিত হয়ে চলতে থাকে। এই সত্য অনুসারে সোভিয়েট ইউনিয়ানে মানুষের মুক্তি আনার উপায় স্বরূপ সর্বহারার একাধিপত্যই চিরস্থায়ী ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে। এই সর্বহারার একাধিপত্যই কমিউনিজমের সঙ্গে সমার্থক হয়েছে—উপায়ই লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের (মার্কসবাদ অনুসারে ) বিলুপ্ত হবার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।” সোভিয়েট ইউনিয়ানে যদি বাস্তবিকই সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে তবে এই পরিবর্তনের জন্য যে মধ্যবর্তীকালের প্রয়োজন ছিল তার নিশ্চয় অবসান ঘটেছে। এবং এতদিনে একাধিপত্যের শেষ হওয়া উচিত ছিল। যতদিন না রুশিয়াতে একাধিপত্য শাসনের অবসান হচ্ছে এবং অন্যান্য দল ও মতের অস্তিত্ব স্বীকার করা হচ্ছে, ততদিন সেখানে উচ্চ পর্যায়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলাও অর্থহীন।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের কাজ কর্মও তেমনি নৈরাশ্যজনক। সেই জন্য গতানুগতিক “গণতান্ত্রিক-সমাজতন্ত্রের” সাফল্য সম্পর্কেও ভরসা কর যায় না। গণতন্ত্রকে নব-রূপ গ্রহণ করতে হবে ৷ গণতন্ত্রকে মানবতাবাদী ঐতিহ্যে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানের মত গণতন্ত্রকে কেবল মাথাগুণতির হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠের মধে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বিশেষতঃ মানুষ যখন তাদের সার্বভৌম রাজক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত মর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার কোন সুযোগ পায় না ৷ প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দ্বারা বর্তমানের প্রতিনিধি মারফৎ পরোক্ষ শাসনতন্ত্রকে পরিবর্তিত করতে হবে। রাজনৈতিক পার্টির চরিত্র বিচার করতে হবে তার ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচী দিয়ে ভোট ধরবার ক্ষমতা দিয়ে নয়। শুধু মাত্র মুখের কথা বা প্রতিজ্ঞার দ্বারা জনগণের নিকট ভোট ভিক্ষা করলে চলবে না, সেই পার্টির বাষ্ট্র শাসনের পূর্বতন নজির দেখিয়েই তা করতে হবে ৷ পরিচালন ব্যাপারে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের বা মতামত জানাবার কোন ব্যবস্থা নেই, আছে কেবল ব্যালট বাক্সে মাথা গুণতির ব্যবস্থা। বিচার করে দেখলে দেখা যায় যে, ব্যক্তি সত্তার পরিবর্তে এও সমষ্টিসত্তার নিকট আত্মসমর্পণ। এই ব্যবস্থার ফলে ব্যক্তিব ইচ্ছা-অনিচ্ছা জানাবার বা বুদ্ধি-বিবেচনা প্রকাশের কোন সুযোগই থাকে না।[mfn] ফলে জনসাধারণের করার কিছু থাকে না বলে জনসাধারণের বুদ্ধি বৃত্তি অনুশীলনের অভাবে কোন দিনই বাড়তে পায় না। নেতাদের, পার্টির, ডেমাগগির যারাই চালিত হতে হয়। (অনুবাদক)[/mfn] পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে নীতিবোধ শুন্য বাক্যবীরেরা জনগণকে তাদের বাক্যজাল বিস্তারের দ্বারা অভিভূত করে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে বসতে পারে। প্রজ্ঞা, সততা, জ্ঞান, নীতি ইত্যাদির কোন মূল্যই সেখানে থাকে না ৷ অথচ মানব সভ্যতার এইসব মূল্যবান গুণাবলীর সাহায্যে সমাজের রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত শোধন করার ব্যবস্থা না করলে সমাজে গণতান্ত্রিক জীবন কোন দিনই গড়ে উঠতে পারে না।

    বর্তমান জগতে মানব সভ্যতার ঐ সব মূল্যবান গুণাবলীর ধারক ও বাহক নরনারীর অভাব নেই। কিন্তু যতদিন এই অবাঞ্ছিত বাক্যবীর ডেমাগগরা ক্ষমতায় বসে থাকবে ততদিন এইসব গুণীদের নেতৃত্ব লাভের কোন আশা নেই ৷ এই তো গেল পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের দিক ।

    অন্যদিকে, একাধিপত্যশাসিত রাষ্ট্রও যদি একবার জেঁকে বসে—তা সে যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের ঘোষণা করলেও—তবে সেও এইরূপ গুণ সম্পন্ন নাগরিকের উদ্ভবে বাধা দেবে৷ এইভাবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসিতেই হোক আর একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রেই হোক মানব সমাজ এই সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমোন্নতির পথে মুক্তির উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে পারে না।

    বর্তমানের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার তথাকথিত গণতন্ত্রে যদি এইসকল মূল্যবান গুণ-সমূহের দ্বারা রাজনীতিকে বিশুদ্ধ ও প্রভাবিত করার সুযোগ সুবিধা না থাকে, তাহলে একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্র এইসব মানবিক গুণসমূহ বিকাশে বাধা দেয় বলে তার নিন্দা করা এদের মুখে সাজে না। একাধিপত্যের দ্বারা সকল দুঃখের রাতারাতি সমাধানের আপাতঃ মধুর প্রলোভনের হাত থেকে জনসাধারণকে বাঁচাতে হলে গণতন্ত্রকে আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে যে মানবতাবাদী ঐতিহ্য ছিল তা পুনরাবিষ্কার করতে হবে।

    পুনরায় ব্যক্তি মানুষকেই সকল উন্নতি-অবনতির মাপকাঠি করতে হবে। প্রজ্ঞা, সততা, বুদ্ধি-বিবেচনা ও নীতিপরায়ণতার উৎকর্ষ দিয়েই নেতৃত্বের বিচার করতে হবে। একটা অন্তসারশূন্য আকার সর্বস্ব কাঠামোটা থাকলেই দেশে যে গণতন্ত্র আছে তা ধরে নেওয়া যাবে না। আজ প্রতিটি স্বাধীনতাকামী চিন্তাশীল ব্যক্তি এক কঠিন প্রশ্ন সমাধানের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন: গণতন্ত্র কী সম্ভব? পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় ধার। বিশ্বাসী, তারা একনায়কতন্ত্রকে পরিহার করেছেন বটে কিন্তু তাঁরাও আজ এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। গণতন্ত্রের মূলনীতি যে, সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধন, তা সম্ভব হতে পারে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মুক্তবুদ্ধি, বিবেকবান ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত হবে, কারণ এঁরাই নিজেদের বিবেকের নির্দেশকে সর্বাপেক্ষা বেশী মূল্য দিয়ে থাকেন।

    নৈতিক প্রেরণাই মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে যে সু-শাসন চলবে তার নিশ্চয়তা আইন দেয় না, দেয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নীতিজ্ঞান ও বিবেকবুদ্ধি। ভাল করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, একনায়কতন্ত্রও ঐ নৈতিক প্রেরণা থেকেই অনুপ্রাণিত। সেই জন্যেই তারা বলে, সমগ্র জনসাধারণের মঙ্গল সাধনের মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই একনায়কতন্ত্র উপায় মাত্র। কিন্তু ক্ষমতার লোভ থেকে উর্ধ্বে উঠে সমগ্র দলটাই যে নীতিপরায়ণ থাকবে এ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে। সৎ অসৎ মূল্যমানের প্রকাশ ব্যক্তির মাধ্যমেই ঘটে। সুতরাং একমাত্র মুক্তবুদ্ধি বিবেকবান ব্যক্তি পরিচালিত শাসন ব্যবস্থাতেই সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হতে পারে। কারণ সর্বাগ্রে তারা তাদের নিজ নিজ বিবেকের নিকট দায়ী থাকে। বর্তমান সংকট থেকে ত্রাণ পেতে গেলে ও একনায়কতন্ত্রের প্রবল আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রের এইরূপ দার্শনিক রূপায়ণই একান্ত প্রয়োজন।

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    যা বলা হ’ল তার অর্থ এই নয় যে, “জ্ঞাণী-গুণী”দের রাজ প্রতিষ্ঠিত হোক। এখানে মাত্র বলা হল যে, সমাজকে এমন ভাবে পুনর্গঠিত করা হোক যাতে প্রতিটি মানুষ তার অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তিকে বিকশিত করে তোলার অফুরন্ত সুযোগ পায়। এটি সম্ভব হয়ে উঠবে তখনই যখন মানুষ সর্বপ্রকার কায়েমী স্বার্থের প্রভাব মুক্ত হবে, যখন তার| আর লোক ক্ষ্যাপানে৷ ডেমাগগ নেতাদের জাতীয় স্বার্থ বা শ্রেণী স্বার্থের কাল্পনিক সত্তার দোহাই-পাড়া বক্তৃতায় পূর্বের মত সহজে মোহগ্রস্ত হবে না এবং এইসব মোহ-মুক্ত মানুষের হাতে বাষ্ট্রের শাসন পরিচালন ক্ষমতা ন্যস্ত হবে। কয়েক বছর অন্তর একদিন ভোটপত্র প্রদান মাত্রের মধ্যেই গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নির্বাচন যদি সার্বজনীন ভোটের দ্বারাও হয়, কিংবা নির্বাচিত সদস্যের মধ্য থেকেই মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, তথাপি গণতন্ত্র শূন্যগর্ভ আকার সর্বস্বই থেকে যায়। সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্ব ত্যাগ করে তা প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া, তা সে যত কম সময়ের জন্যই হোক, গণতন্ত্র বিরোধী এক বেকুবি ব্যবস্থা। এই হস্তান্তরিত সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্বে স্বত্ববান হয়ে, প্রতিনিধিরা যখন সরকার গঠন ক’রে বলে, ভ্রুন- সাধারণের “জন্য” সরকার গঠন করলাম, তখন যুক্তিসঙ্গত ভাবেই বলা চলে, যে-সরকার জনগণের “জন্য” ( for ) গঠিত হয়, সে-সরকারের “উপাদান” ( of ) জনগণ হতে পারে না৷ এবং তা জনগণের “দ্বারাও” ( by ) পরিচালিত হতে পারে না।

    গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত স্থানীয় গণ-সভা সমূহের ওপর ভিত্তি করে যদি এক পিরামিড আকারের রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয় একমাত্র তখনই রাষ্ট্র পরিচালন ব্যাপারে জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।[mfn] উলটো পিরামিড। কারণ এসব রাষ্ট্রে সব ক্ষমতা ওপরে, আর তলায় একেবারে শূন্য। মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রকে সে তুলনায় সিধা পিরামিড বলা হচ্ছে। কারণ এখানে সকল ক্ষমতা তলায়, মাথায় একেবারে শূন্য। এখানে সার্বভৌম ক্ষমতা লোক- সভায় কেন্দ্রীভূত থাকবে না, তা গ্রামে গ্রামে ও নগরের পাড়াতে পাড়াতে ছড়িয়ে থাকবে। অনধিক ১০০০ মানুষ বাস করেন এমন অঞ্চলকে নিয়ে এক একটি গণ-সভা গঠিত হবে এবং সকল পূর্ণবয়স্ক মানুষ সেই গণ-সভার সদস্য হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা এই সকল গণসভা সমুহের সকল গণ-সভা সমূহের দৈনন্দিন কার্য পরিচালনের (পঞ্চায়েত) থাকবে। তারা গণ-সভার দ্বারা দায়ী থাকবে ৷[/mfn]

    পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বা একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রকে বলা যেতে পারে, এইসব গণ-সভা সমূহের সর্বপ্রধান কাজ হবে জন-সাধারণকে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা এবং সুবিবেচনা ও বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী সে অধিকার ব্যবহার করতে শেখান। সমগ্র সমাজ জুড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই যে ব্যাপক ভিত্তি সেগুলি হবে জনগণকে হাতে-কলমে রাজনীতি শিক্ষা দেবার যেন এক একটি বিদ্যাপীঠ। আইনসভা সমূহের প্রতিনিধিরা অনাস্থা ভাজন হলে তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ও আইন-কানুন সমূহের ওপর মতামত দেবার ক্ষমতা থাকার ফলে এই সব গণ-সভাগুলি সমগ্র রাষ্ট্রের ওপরই প্রত্যক্ষ ও কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন করার অধিকার থাকবে একমাত্র এদেরই। এই ব্যবস্থার দ্বারা রাজনৈতিক পার্টি সমূহের দলাদলির উর্ধে গণতন্ত্রকে স্থাপন করা হবে। গুণী মানুষ তখন নিজ গুণেই জনগণের নিকট স্বীকৃতি লাভের সুযোগ পাবে। পার্টির স্বার্থরক্ষার জন্য বা পার্টির নিকট আনুগত্যের জন্য বা তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভের জন্য বা অন্য কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ পাবার প্রত্যাশায় তখন আর কাকেও চিন্তার স্বাধীনতা, নৈতিক নিষ্ঠা, নিরপেক্ষ জ্ঞানবুদ্ধিকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থা থাকবে না ।

    এই গণসভা সমূহের নিম্নলিখিত ক্ষমতা থাকবে : (১) লোকসভা ও রাজ্য বিধান সভার নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রার্থী মনোনয়ণ। (পল্লী অঞ্চলে নির্বাচনের সময় বা অন্য কোন কারণে মত বিরোধ দেখা দিলে সে মতবিরোধ মনোমালিন্যে দাঁড়ায় এবং বহুদিন ধরে চলতে থাকে। এই বিপদ এড়াবার জন্য বহু প্রার্থীর মধ্য থেকে ক্রমশঃ ছাঁটাই পদ্ধতিতে (process of elimination এই মনোনয়ন কার্য চলতে পারে। যথা, যিনি বা যাঁহারা শতকরা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম ভোট পাবেন এবং যিনি সবচেয়ে কম ভোট পাবেন তিনি বাদ পড়বেন। তার পরে যারা থাকবেন, তাঁদের নিয়ে পুনরায় ভোট হবে। এই ভাবে বাদ পড়তে পড়তে মাত্র দু’জনের মধ্যে যিনি সর্বাধিক ভোট পাবেন তিনিই সেই অঞ্চলের সকল গণ-সভার মনোনীত প্রার্থী হবেন এবং সার্বজনীন ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন।)

    (১) প্রতিনিধিগণ যাতে লোকসভায় ও রাজ্য বিধান সভায় জনগণের প্রক্ক” ইচ্ছা প্রকাশ করতে সক্ষম হয় সেই জন্য তাদের অনুক্ষণ সচেতন ও ওয়াকিবহাল রাখা;

    (৩) লোকসভায় ও রাজ্যবিধান সভায় আলোচ্য আইন-কানুন সম্বন্ধে আলোচনা ও সে সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;

    (৪) নির্বাচক মণ্ডলীর আদেশ অমান্যকারী প্রতিনিধিকে অপসারণ;

    (৫) লোকসভা বা বিধানসভায় আলোচনার জন্য যে কোন আইনে খসড়া রচনা ও প্রেরণ;

    (৬) লোকসভা, বিধানসভা বা শাসন পরিচালন বিভাগ কর্তৃক আ কোন কাজ সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;

    (৭) স্থানীয় জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা (মাধ্যমিক পর্যন্ত), পথ ঘাট, উৎপাদক ক্রেতা সমবায়, নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা, ছোটখাট অপরাধের বিচার প্রভৃতি।

    এই সকল গণ-সভা হবে জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সমন্বয় সাধনের জন্য এ দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ গণ-সভার ওপর থাকবে পিরামিডের চূড়ার মত লোকস বা পার্লামেন্ট ।

    গণতন্ত্রকে সম্ভব করে তোলার জন্য যে অবস্থা সৃষ্টি করা প্রয়োজন সে সম্বন্ধেই উপরি উক্ত কথাগুলি বলা হল। গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতন ও সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারা নিজ নিজ বৃত্তি ও সম্ভাবনা সমূহকে বিকশিত ও সম্ভোগ করার জন্য ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা; এবং সেই ইচ্ছা পূরণের পথে যে সব বাধা-বন্ধন দেখা দেবে সেই সব বাধা-বন্ধন মুক্তির জন্য মানুষকে উদগ্র করে তোলা; এই সকল বাধা-বন্ধন মুক্ত হতে মানুষ যে নিজের চেষ্টাতেই পারে, মানুষ নিজেই যে নিজের জীবন ইচ্ছামত গড়ে তুলতে পারে এই প্রত্যয় জাগিয়ে তোলা; সংস্কার মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তা করার জন্য মানুষের মনে সাহস ও শক্তি সঞ্চারিত করা; এবং নিজেদের স্বাধীনতা পরের হাতে তুলে দিয়ে (পার্টি বা ডিকটেটরের হাতে ) দাসত্বের নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবনের ওপর ঘৃণা জাগিয়ে তোলা। গণতন্ত্রকে যদি মানুষের জীবনে রূপায়িত করে তুলতে হয় এবং তা প্রতিরক্ষার জন্য সামর্থ্য লাভ করতে হয়, তা হলে যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন রেনেসাঁস আন্দোলন জাগিয়ে তুলতে হবে।[mfn] স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দু’দশখানি গ্রাম বা মহকুমা, এমনকি জেলা পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে হয়। সেইজন্য পরোক্ষ নির্বাচনের দ্বারা তিনটি স্তরে (অঞ্চল পঞ্চায়েত, ব্লক পঞ্চায়েত, জেলা পঞ্চায়েত) এই সংগঠনটি থাকবে। এইখানে উল্লেখযোগ্য যে বর্তমান পঞ্চায়েত-রাজ আইন মানবেন্দ্রনাথের গণ-সভার আদর্শেই রচিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা কেবলমাত্র স্বায়ত্ত শাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এর ফলে অতি সহজেই জনগণকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে রাষ্ট্রকে মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। (অনুবাদক) [/mfn]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এই রূপ পরিবেশ গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে যে স্বাধীন যুক্তিসঙ্গত চিন্তার স্ফুরণ হতে থাকবে তার ফলে মানুষের উচ্চতর গুণাবলীসমূহ সার্থকতার পথে পদক্ষেপ করবে। সভ্যতার আদিকাল থেকে মনুষ্য সমাজ যে সকল সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন অনুসরণ করে আসছে সেই সব নৈতিক অনুশাসন মেনে চললেই সমাজের সংহতি ও ভারসাম্য রক্ষিত হবে এবং মানুষও সুখ শান্তি প্রগতির পথে এগিয়ে চলতে পারবে। তখন এর জন্য আর শ্রেণী বা জাতির কল্যাণে ব্যক্তিকে আত্মত্যাগ করতে বাধ্য ক’রে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টার প্রয়োজন হবে না। যে সকল ব্যক্তি এইরূপ নৈতিক জীবন যাপনে উৎকর্ষ লাভ করতে পারবেন তাঁরাই চিন্তাশীল মানুষের নিকট সম্মানিত হতে থাকবেন এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় রূপে গণ্য হবেন। তখন লোক ক্ষ্যাপানো ডেমাগগদের দিন ফুরিয়ে যাবে। তখন কিছুদিন অন্তর নির্বাচনের সময় এক খণ্ড কাগজ ব্যালট বাক্সে ফেলেই গণতন্ত্রের সকল অধিকার ফুরিয়ে যাবে না—রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে অধিকারও থাকবে। তখন জনগণ আর কেবল মাত্র “জনতা” মাত্রই থাকবে না—সংহত হয়ে উঠবে।

    নবরূপায়িত গণতন্ত্র বাস্তবে রূপ নিয়ে গড়ে উঠতে অবশ্যই দেরী হবে। কিন্তু যতদিন না গণতন্ত্রের সে রূপায়ণ হচ্ছে ততদিন সেই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রেই এমন একটি সংবিধান রচনা করতে হবে যাতে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় দেশের সৃজনশীল প্রতিভা, মুক্ত বুদ্ধি এবং নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের স্থান হয়, যার ফলে তাঁরা মন্ত্রী প্রমুখ শাসনকার্য পরিচালকবর্গকে তাদের পরামর্শ ও প্রভাবের সাহায্যে পথ প্রদর্শন করতে পারেন। এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র একদিকে যেমন জনগণের দ্বারা নির্বাচন ভিত্তিক হবে, অন্য দিকে তেমনি উচ্চ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে বেছে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে স্থান দেবার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। যতদিন না সমগ্র সমাজের জ্ঞান-বুদ্ধি ও নৈতিক মান যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত হয়ে উঠছে ততদিন হয়তো কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই সমাজের গুণীজ্ঞানী ব্যক্তিদের আইন সভা সমূহের মধ্যে আনা সম্ভব হবে না। অথচ জনসাধারণের বর্তমান অনগ্রসর অবস্থায় রাষ্ট্রের ওপর এ সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান নীতি-নিষ্ঠ ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের ব্যবস্থা করতে না পারলে গণতন্ত্র সার্থক হয়ে উঠবে না ৷

    এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টে যে রাজ্য সভা (Council of State) থাকবে তা গঠিত হবে বৈজ্ঞানিক, ধীমান, চরিত্রবান, জ্ঞানী ও নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এবং এই রাজ্যসভাই মন্ত্রীবর্গকে জরুরি সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনকার্য পরিচালন ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে চলবে। খাদের নিয়ে এই রাজ্যসভা গঠিত হবে তাঁরা সাধারণত: দলগত রাজনীতির উর্ধে থাকতেই ভালবাসেন। তাই তাঁদের পেশাদার রাজনীতিকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। অতএব রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের মূল্যবান অবদান যদি পেতে হয় তা হলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে: এঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিক, বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ঐতিহাসিক এবং দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতি অন্যান্য সৃজনশীল কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সংঘ তাদের প্রতিনিধি স্বরূপ নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির নাম রাজ্যসভার সদস্যপদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তাঁদের রাজ্যসভায় মনোনয়ন করবেন। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে এই সকল সংঘের সহিত যুক্ত নন অথচ অনুরূপ গুণের অধিকারী এইরূপ কয়েকজনকেও মনোনীত করতে পারবেন। ধনী ও কায়েমী স্বার্থের প্রভাব এড়াবার জন্য বেতনভোগী কর্মচারী ছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদার হিসাবে বা অন্যভাবে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে স্বার্থজড়িত থাকবেন তাঁরা যেন এই রাজ্যসভার সদস্য হতে না পারেন, সেইরূপ ব্যবস্থা থাকবে। এই রাজ্য সভার ওপরই অর্থ নৈতিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনার ভার থাকবে এবং সেই পরিকল্পনা কার্যকরী করে তোলার জন্য কাজকর্ম তদারকী করার অধিকারও এদের থাকবে।

    প্রারম্ভেই সমাজের অর্থ নৈতিক জীবন যেন ধনীদের দুর্নীতিপূর্ণ ও সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্ত হয়ে উঠতে পারে সেই রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তার ফলে আরো বেশী সংখ্যক মানুষ স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়তঃ এই সব স্বাধীন- চিন্তাশীল ব্যক্তিদের তখন জন স্বার্থের বিশ্বস্ত রক্ষক রূপে পাওয়া সম্ভব হবে এবং তাঁরাও এই সব কায়েমী স্বার্থবানদের প্রভাবমুক্ত হয়ে জনকল্যাণকে বাস্তবে রূপায়িত করতে সক্ষম হবেন। গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশের পূর্বে এই মধ্যবর্তী সময়ে যদি মাথা-গুণতির দ্বারাই গণতন্ত্রের প্রতিনিধি নির্বাচন চলতে থাকে তা হলে সমাজ জ্ঞানী-গুণীর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অথচ এই সকল জ্ঞানী-গুণীরাই কেবল সমাজকে সত্যকার গণতান্ত্রিক মুক্তির দিকে পরিচালিত করে নিয়ে যেতে পারে।

    র‍্যাডিক্যাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের অর্থনীতিকে এরূপভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন যাতে মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণের সম্ভাবনা না থাকে। মানুষের মানসিক ও সুকুমার শক্তি ও বৃত্তি সমূহের বিকাশ নির্ভর করে ব্যক্তির জীবনধারণের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব পূরণের ওপর। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান মানের উদ্দেশ্যে রচিত পুনর্গঠিত অর্থনীতিই হবে আমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি (র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি)।

    এই নতুন সমাজের অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষের ব্যবহারের জন্য উৎপাদন ও প্রয়োজন অনুসারে তা বণ্টন৷[mfn]১৮শ সূত্র দ্রষ্টব্য। বর্তমানের মত কেবল বাজারে বিক্রী করে মাত্র লাভের উদ্দেশ্যেই উৎপাদন হবে না; অর্থাৎ প্রত্যেক কর্মক্ষম মানুষের জীবিকার্জনের জন্য কাজ দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটাবার উদ্দেশ্যে উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকবে। (অনুবাদক)[/mfn]

    এই সমাজের রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যক্তির সার্বভৌম ক্ষমতা- হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকবে না। কারণ তাতে জনগণকে সবপ্রকার কার্যকরী ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত কবা হয়। স্থানীয় গণ-সভা সমূহের নাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালন কার্যে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণেব ব্যবস্থাই হবে এই নতুন সমাজেব রাষ্ট্রীয় ভিত্তি।

    জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞান-বিদ্যা চর্চার ব্যাপক ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞান ও অন্যান্য সৃজনমূলক কাজে উৎসাহ দানই হবে এই নতুন সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

    যে হেতু এই নতুন সমাজ যুক্তিবাদ ও জ্ঞানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে সেই হেতু এই সমাজের সব কিছু সুপরিকল্পিতই হবে। কিন্তু এই পূর্ব-পরিকল্পনাতেও মানুষের স্বাধীনতা যাতে সম্পূর্ণরূপে বজায় থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এই নতুন সমাজ রাজনৈতিক, অর্থ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব দিক দিয়েই গণতান্ত্রিক হবে এই গণতন্ত্র প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যক্ষীভূত বাস্তব গণতন্ত্র হবে এবং স্বকীয় শাসনের মধুস্বাদ ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বারাই পেতে থাকবে সেই হেতু আপৎকালে প্রত্যেকটি মানুষই এই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়বে এবং রক্ষা করতেও সমর্থ হবে।[mfn]প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর ইউরোপে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র সমূহের দুর্বলতার জন্যই কমিউনিষ্ট ও ফ্যাসিষ্ট একনায়কতন্ত্রকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয় নি। এখানে সেই দুর্বলতা খণ্ডনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। (অনুবাদক)[/mfn]

    শিল্পী: গণেশ পাইন

    এই আমূল গণতন্ত্রের ( র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি ) আদর্শ বাস্তবে রূপায়িত হবে এক নতুন মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মুক্তবুদ্ধি নর-নারীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায়। তারা জনসাধারণের সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়ে নিয়ে তাদের ভাবী শাসক হবার উদ্দেশ্যে কাজ করবে না; তারা হবে তাদের বন্ধু, উপদেষ্টা ও পথ প্রদর্শক মাত্র। যে হেতু তাদের উদ্দেশ্য প্রত্যেকটি মানুষের মুক্তি আনা, সেই হেতু এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে তাদের আচরণ হবে যুক্তি ও নীতিসম্মত জনসাধারণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যতই বাড়বে তাদের প্রচেষ্টাও ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অবশেষে শিক্ষিত ও মার্জিত জনমতের সমর্থনে ও সুবিবেচনার সঙ্গে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের (action of the people) দ্বারা গড়ে উঠবে র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র। ক্ষমতা যদি কতিপয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় তা হলে জনসাধারণের মুক্তিও দূরে সরে যায়; র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্টদের এই বিশ্বাসের জন্য তারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে না।

    তারা স্থানীয় গণসভা সমূহে জনগণকে সংগঠিত করে তুলবে এবং কালক্রমে এইসব গণ-সভাই গণতান্ত্রিক সার্বভৌম ক্ষমতার এক একটি যন্ত্র হয়ে উঠবে। যেহেতু র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র সমাজের সকল মানুষের প্রত্যক্ষ সমবায়ে গড়ে উঠবে তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সমার্থক শব্দ হবে বা উভয়েই একাত্ম হয়ে যাবে, এবং যেহেতু তখন শাসিত জনগণ ও শাসক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন তফাৎ থাকবে না, সেই হেতু তখন বাষ্ট্র আর দমন-পীড়নের যন্ত্র থাকবে না। কেবল তখনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণের উপাদানে (of) গঠিত এবং জনগণের দ্বারাই (by) পরিচালিত হওয়া সম্ভব হবে।

    শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব ও খণ্ডিত না করে সমগ্র সমাজের প্রগতি ও প্রাচুর্যের জন্য সমাজকে পুনর্গঠিত করা একমাত্র গণশিক্ষার দ্বারাই সম্ভব। স্থানীয় গণসভাগুলি হবে জনগণের রাজনীতি ও সমাজনীতি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ। এই র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রের গঠন ও কার্যপ্রণালী এমনই হবে যে যার ফলে স্বার্থশূন্য অনাসক্ত মানুষদের সমাজের পুরোভাগে আনবার সুযোগ করে দেবে। এরূপ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র তখন আর বিশালকায় ভয়ঙ্কর জন্তু লেভিয়াথানের মত সন্দেহ ও ভয়ের বস্তু থাকবে না।[mfn] একনায়কতন্ত্রের দ্বারা জোর করে ওপর থেকে জনসাধারণের ওপর ভাল ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলেই ভাল হয় না, কারণ মূল্য-value জোর করে সৃষ্টি করা যায় না। তা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। (অনুবাদক)[/mfn]

    মানুষ চিন্তাশীল জীব; এই চিন্তাশীলতার জন্যই মানুষ এই পৃথিবীকে নিত্য নতুন ভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে, এবং এই চিন্তা কার্য মানুষ ব্যক্তিগত ভাবেই করতে পারে, সমষ্টিগত ভাবে পারে না। বৈপ্লবিক ও মুক্তিকামী সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের কর্তব্য হল, এই ঐতিহাসিক সত্যটির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেওয়া। মানুষের মস্তিষ্ক একটি উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ এবং তাতে উৎপন্ন হয় সব চেয়ে বড় বৈপ্লবিক জিনিষ। সকল বিপ্লবেরই মূলে আছে পুরাতনের পরিবর্তে নতুন গড়ে তোলার জন্য সৃজনাত্মক চিন্তা। নিজেদের সৃজনীশক্তি সম্বন্ধে সচেতন, নতুন সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দুঃসাহসিক ভাব ও ভাবনায় অনুপ্রাণিত এবং মুক্ত মানুষের সহযোগিতায় সৃষ্ট এক মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠবে এই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ। নিষ্কাম মুক্তবুদ্ধি মানুষরা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসন কার্যে ব্রতী হবেন একমাত্র তখনই মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল চূর্ণ হয়ে সকলের জন্য মুক্তি আসবে।