অরাজ

মার্ক সীম ।। অ্যান্টি ইডিপাস: ফ্যাসিবাদ ও সিজো-বিশ্লেষণ

অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

[ ভূমিকা: জিল দেল্যুজ ও ফেলিক্স গুয়াত্তারির  অ্যান্টি-ইডিপাস বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম আলোচিত দার্শনিক গ্রন্থ। পুঁজিবাদ, মনঃসমীক্ষণ, আকাঙ্ক্ষা, পরিবার, রাষ্ট্র, বিপ্লব এবং ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে এই গ্রন্থ এমন এক চিন্তার পরিসর তৈরি করে, যেখানে আকাঙ্ক্ষাকে আর ব্যক্তির অভাব, দমন কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ কোনো মানসিক প্রবণতা হিসেবে দেখা যায় না। আকাঙ্ক্ষা এখানে উৎপাদনশীল, সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি। এই কারণেই অ্যান্টি-ইডিপাস কেবল মনঃসমীক্ষণের সমালোচনা নয়; এটি একই সঙ্গে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বোঝার একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব।

কিন্তু অ্যান্টি-ইডিপাস এমন একটি বই, যার ধারণা ও ভাষার জটিলতায় পাঠক খুব সহজেই এর ভেতরে পথ হারিয়ে ফেলতে পারেন। ‘ইডিপাস’, ‘সিজোফ্রেনিয়া’, ‘আকাঙ্ক্ষা’, ‘উৎপাদন’, ‘দেহ’, ‘যন্ত্র’, ‘ক্ষেত্রসীমা’ ‘বিধি’ প্রভৃতির মতো ধারণা দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তায় প্রচলিত অর্থ থেকে সরে গিয়ে নতুন অর্থ ও সম্পর্ক তৈরি করে। ফলে বইটিতে প্রবেশে এমন একটি পাঠ প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে এর দার্শনিক প্রকল্প, রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং এর ভাষার অন্তর্নিহিত গতি সম্পর্কে পাঠককে সতর্ক করে।

মার্ক সীম অ্যান্টি ইডিপাসের অন্যতম ইংরেজি অনুবাদক এবং ভূমিকার রচয়িতা।  সীমের ভূমিকা শুধু গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর পরিচয় দেয় না; বরং দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির চিন্তার কেন্দ্রে থাকা আকাঙ্ক্ষা, অহম, সিজোফ্রেনিয়া, বিপ্লব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক দমনের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি বিশেষ পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উন্মোচন করে। সীমের পাঠে অ্যান্টি-ইডিপাস নিছক একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ হিসেবে উপস্থিত হয় না। এটি হয়ে ওঠে প্রচলিত ব্যক্তিসত্তা, পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে চিন্তা করার একটি আহ্বান।

বিশেষত সীমের লেখায় যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো ‘অহম’কে কেন্দ্র করে নির্মিত আধুনিক ব্যক্তিসত্তার সমালোচনা। মানুষকে একটি বিচ্ছিন্ন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিজের ভেতরে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে বোঝার পরিবর্তে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি তাকে অসংখ্য সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক শক্তি ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সত্তা হিসেবে দেখতে চান। সীম এই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গির দিকে পাঠককে নিয়ে যান। ফলে তাঁর ভূমিকা অ্যান্টি-ইডিপাস বোঝার জন্য কেবল একটি সহায়ক লেখা নয়, বরং গ্রন্থটির রাজনৈতিক ও দার্শনিক অভিঘাত উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ]

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি

“আমাদের অবশ্যই অহমরূপে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আবার জন্ম নিতে হবে সমষ্টির মধ্যে। বিচ্ছিন্ন ও আত্মমোহে আবদ্ধ সত্তা হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র অথচ সংযুক্ত সত্তা হয়ে”

— হেনরি মিলার,, সেক্সাস

প্রতি-অহম 

তাহলে শুয়ে পড়ুন সেই নরম সোফাটিতে, যা বিশ্লেষক আপনার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। তারপর চেষ্টা করুন ভিন্ন কিছু ভাবতে। বিশ্লেষকের হাতে অফুরন্ত সময় ও ধৈর্য। আপনি যত মিনিট তাকে আটকে রাখবেন, ততই তার পকেটে টাকা জমবে। … আপনি কাতরান, চিৎকার করুন, অনুনয় করুন, কাঁদুন, তোষামোদ করুন, প্রার্থনা করুন কিংবা অভিশাপ দিন, তিনি শুধু শুনেই যাবেন। তিনি যেন এক বিশাল কান, যার কোনো সহানুভূতিশীল স্নায়ুতন্ত্র নেই। সত্য ছাড়া আর কিছুই তাকে স্পর্শ করে না। যদি মনে করেন তাকে বোকা বানিয়ে লাভ হবে, তবে তাই করুন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে কে? যদি বিশ্বাস করেন যে আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন তিনি, আপনি নিজে নন, তাহলে তার সঙ্গেই লেগে থাকুন, যতক্ষণ না আপনি সম্পূর্ণ ক্ষয় হয়ে যান।”¹

সেক্সাস (Sexus) গ্রন্থের সমাপ্তিতে হেনরি মিলার এই আহ্বানই উচ্চারণ করেন। সেই আহ্বানের প্রতিধ্বনি যেন শোনা যায় জিল দেল্যুজ ও ফেলিক্স গুয়াত্তারির লেখায়ও। তাঁরাও মনঃসমীক্ষণের ইডিপাস কমপ্লেক্স, অর্থাৎ তথাকথিত ‘পবিত্র পরিবার’—‘বাবা-মা-আমি’—ধারণার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান।

এই আক্রমণ কখনো নির্মম ও নির্দয়, কখনো সহানুভূতিশীল এবং জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আবার অনেক সময়ই তা তীক্ষ্ণ রসবোধে ভরপুর।

এটি অহমের বিরুদ্ধে আক্রমণ। মানুষের মধ্যে যে “অতিমাত্রায় মানবিক” দিকটি গড়ে তোলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আক্রমণ। এটি ইডিপাসীকৃত  ও ইডিপাসীকরণকারী বিশ্লেষণ-পদ্ধতির বিরুদ্ধে, এবং স্নায়বিক  জীবনযাপনের ধরনগুলোর বিরুদ্ধেও এক ধারালো আক্রমণ।

মানুষ যে ইডিপাসীয় শিলাখণ্ডের ওপর নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছে, অ্যান্টি-ইডিপাস সেই ভিত্তির মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই অর্থে বইটি আরেকটি অনুরূপ উদ্যোগের উত্তরসূরি। সেটি হলো ফ্রিডরিখ নীটশের দ্য অ্যান্টি-ক্রাইস্ট (The Antichrist), যেখানে খ্রিস্ট, খ্রিস্টধর্ম এবং ‘পালের মানসিকতা’র বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালানো হয়েছে।

অ্যান্টি-ইডিপাস শুরুই করে একটি প্রশ্ন দিয়ে: মনঃসমীক্ষণ কি শুরু থেকেই, এখনও, এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও, একটি সুসংগঠিত গির্জার মতো প্রতিষ্ঠান নয়? এটি কি এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি নয়, যা দাঁড়িয়ে আছে সেইসব  বিশ্বাসের ওপর, যেগুলোতে কেবল অন্ধ বিশ্বাসীরাই আস্থা রাখতে পারে?

অর্থাৎ, যারা এমন এক নিরাপত্তায় বিশ্বাস করে, যার প্রকৃত অর্থ পালের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া এবং অভিন্ন ও  বাইরে থেকে আরোপিত লক্ষ্য দিয়েই নিজের পরিচয় নির্ধারণ করা। 

কিন্তু এই বিশ্বাসগুলোর উৎস কোথায়? এগুলোর ভিত্তিই বা কী?

সেক্সাস (Sexus) গ্রন্থে হেনরি মিলার যেমন বলেছেন, নিরাপত্তার ধারণাকে ভিত্তি করে জীবনকে বোঝার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষ্ফল:

“নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। যে ব্যক্তি নিরাপত্তার সন্ধান করে, এমনকি নিজের মনেও, সে যেন এমন একজন মানুষ, যে যন্ত্রণা বা ঝামেলা এড়াতে নিজের হাত-পা কেটে তার বদলে কৃত্রিম অঙ্গ লাগাতে চায়।” 

যন্ত্রণাহীন, ঝামেলাহীন জীবন। এটাই স্নায়বিক মানুষের স্বপ্ন। এমন এক অস্তিত্বের স্বপ্ন, যা নিসাড়  এবং সংঘাতহীন।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি দেখান যে, এ ধরনের বিশ্বাসব্যবস্থা, এই ‘পালের প্রবৃত্তি’ মূলত পরিচালিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি এমন এক আকাঙ্ক্ষা, যা চায় অন্য কেউ তার জীবনের বিধান নির্ধারণ করুক। ইউরোপে হিটলার, মুসোলিনি এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানের সময় যে আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, সেই একই আকাঙ্ক্ষা আজও সক্রিয় রয়েছে এবং আমাদের সবাইকে অসুস্থ করে তুলছে।

অ্যান্টি-ইডিপাস শুরু হয় ফ্যাসিবাদের উত্থান প্রসঙ্গে ভিলহেল্ম রাইখের সেই গভীর ও গুরুতর প্রশ্নকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে:

“জনগণকে কীভাবে এমনভাবে তৈরি করা হলো যে তারা নিজেদেরই দমনের আকাঙ্ক্ষা করতে শুরু করল?”

ইংরেজ ও আমেরিকানরা প্রায়ই এই প্রশ্নটির সরাসরি মোকাবিলা করতে অনিচ্ছুক। তারা অনেক সময় এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়:

“ফ্যাসিবাদ এমন একটি ঘটনা, যা অন্য কোথাও ঘটেছিল। এমন কিছু, যা কেবল অন্যদের সঙ্গেই ঘটতে পারে, আমাদের সঙ্গে নয়। এটি তাদের সমস্যা।”

কিন্তু সত্যিই কি তাই? ফ্যাসিবাদ কি কেবল অন্যদের মোকাবিলা করার মতো একটি সমস্যা?

এমনকি বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোও আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে গভীরভাবে থাকা ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতাগুলোর মুখোমুখি হতে সতর্ক থাকে। অথচ তাদের মধ্যেও প্রায়ই কাজ করে এমন এক শক্তিশালী, কিন্তু খুব কম বিশ্লেষিত, গোষ্ঠীগত ‘অতি-অহম’। এই অতি-অহম তাদের অনেকটা নীটশের  অবদমিত-ক্ষুব্ধ মানুষের মতো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে যে, ‘অন্য’ হলো মন্দ— ফ্যাসিস্ট! পুঁজিবাদী! কমিউনিস্ট!। আর তাই ‘আমরা’ হলাম ভালো।’

এই সিদ্ধান্ত অবশ্য পরে তৈরি করা একটি যুক্তি ও আত্মপক্ষসমর্থন মাত্র। এটি নিজেকে ন্যায়ের একমাত্র ধারক মনে করা যুক্তিপ্রবণতা,  যা এমন এক রাজনীতিকে বৈধতা দেয়, যে রাজনীতি জীবনের দিকে কেবল তির্যক দৃষ্টিতে তাকাতে পারে। এমন এক রাজনীতি, যা গোপন বৈঠকের কক্ষ ও ‘নিরাপত্তা পরিষদ’-এর মতো জায়গায় জমে থাকা দুর্গন্ধময় বাতাসে আচ্ছন্ন।

নীটশে যেমন ব্যাখ্যা করেন, অবদমিত ক্ষুব্ধ মানুষ:

“লুকানোর জায়গা, গোপন পথ এবং পেছনের দরজা ভালোবাসে। যা কিছু গোপন, তা-ই তাকে আকর্ষণ করে, কারণ সেখানেই তার জগৎ, তার নিরাপত্তা এবং তার স্বস্তি। সে জানে কীভাবে নীরব থাকতে হয়, কীভাবে ভুলে না যেতে হয়, কীভাবে অপেক্ষা করতে হয়, এবং কীভাবে সাময়িকভাবে নিজেকে অবমূল্যায়িত ও বিনয়ী হিসেবে ধরে রাখতে হয়।”²

ফ্রেডরিখ নীটশে

নীটশের মতে, এমন মানুষের জন্য কোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ‘বিষয়ী’, অর্থাৎ অহম এর ধারণায় বিশ্বাস করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কারণ সে পরিচালিত হয় আত্ম-প্রত্যায়ন  এবং আত্ম-সংরক্ষণের  এমন এক প্রবৃত্তি দ্বারা, যা প্রকৃত অর্থে জীবনকে সংরক্ষণ বা তার স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী নয়। বরং এটি এমন এক প্রবৃত্তি,

“যার মধ্যে প্রতিটি মিথ্যাই পবিত্র হয়ে ওঠে।”³

এটাই হলো ‘নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের’ জগৎ।

আর দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি প্রবেশ করেন ঠিক সেইসব অন্তরালের ঘরে। মনোবিশ্লেষকের কক্ষের বন্ধ দরজার পেছনে, ইডিপাসীয় নাট্যমঞ্চের নেপথ্যে। সেখানে গিয়ে তারা নীটশের মতোই ঘোষণা করেন: এখানে দুর্গন্ধ রয়েছে। আর প্রয়োজন হলো—

“এক ঝলক নির্মল বাতাস, বহির্জগতের সঙ্গে একটি সম্পর্ক।”

বিষয়ীর সমস্যা, অর্থাৎ নেপথ্যে থাকা সেই প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিক্রিয়ামূলক মানুষের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অ্যান্টি- ইডিপাস এমন একটি পদ্ধতি গড়ে তোলে, যা একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে রোগনির্ণয়মূলক  এবং গভীরভাবে আরোগ্যদায়ী। এর প্রশ্ন হলো: “আজ আমাদের অসুস্থতার প্রকৃতি কী?”

কিন্তু যে বিষয় থেকে এটি আমাদের নিরাময় করতে চায়, তা হলো স্বয়ং ‘আরোগ্য’র ধারণা। অর্থাৎ, প্রচলিত চিকিৎসা-পদ্ধতি যে নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, অ্যান্টি-ইডিপাস সেই নিরাময়ের ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি তাঁদের এই পদ্ধতির নাম দেন সিজোবিশ্লেষণ। তাঁরা এটিকে প্রতিটি দিক থেকেই মনঃসমীক্ষণের বিপরীতে স্থাপন করেন।

মনঃসমীক্ষণ যেখানে সবকিছুকে নিউরোসিস এবং খোজাকরণের মানদণ্ডে বিচার করে, সেখানে সিজোবিশ্লেষণ শুরু করে সিজোফ্রেনিক ব্যক্তিকে দিয়ে, তার ভাঙন এবং তার অতিক্রম এর মধ্য দিয়ে।

কারণ, তাঁদের ভাষায়:

বিশ্লেষকের সোফায় শুয়ে থাকা একজন নিউরোটিকের চেয়ে হাঁটতে বের হওয়া একজন সিজোফ্রেনিকই উত্তম মডেল। …”

ইডিপাসীয় এবং ইডিপাসীকৃত ক্ষেত্র —যেমন পরিবার, গির্জা, বিদ্যালয়, জাতি, রাজনৈতিক দল—এবং বিশেষত ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষেত্রায়নের বিরুদ্ধে, অ্যান্টি-ইডিপাস অনুসন্ধান করে আকাঙ্ক্ষার সেই ক্ষেত্রমুক্ত  প্রবাহগুলোকে, যেগুলোকে ইডিপাসীয় বিধিব্যবস্থা এবং স্নায়বিক ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে আটকে রাখা হয়নি।

এটি অনুসন্ধান করে সেই আকাঙ্ক্ষা-যন্ত্রগুলোকে, যেগুলো এই বিধিব্যবস্থার বাইরে চলে যায় এবং উত্তরণরেখা তৈরি করে। এই উত্তরণরেখা আকাঙ্ক্ষাকে অন্যত্র, নতুন সম্ভাবনার দিকে প্রবাহিত হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।

আর. ডি. লেইংয়ের মতোই, দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির লক্ষ্য হলো মনোরোগবিদ্যা যাদের ‘সিজোফ্রেনিক’ বলে চিহ্নিত করে, তাদের মধ্যে দেখা দেওয়া ‘ভাঙন’  এবং ‘অতিক্রমের’ একটি বস্তুবাদী ও অভিজ্ঞতানির্ভর বিশ্লেষণ গড়ে তোলা।

আকাঙ্ক্ষার সমস্ত সৃষ্টি ও উৎপাদন, অর্থাৎ সমগ্র আকাঙ্ক্ষা-উৎপাদনকে প্রচলিত মানদণ্ড বা ‘স্বাভাবিকতা’র দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার পরিবর্তে, তাঁরা তাঁদের বিশ্লেষণকে নিয়ে যান চরম অবস্থার ক্ষেত্রে।

প্যারানয়া থেকে সিজোফ্রেনিয়া, ফ্যাসিবাদ  থেকে বিপ্লব,  ভাঙন থেকে অতিক্রম —তাঁদের অনুসন্ধানের বিষয় হলো জীবনপ্রবাহের  সেই প্রক্রিয়া, যা এক চরম অবস্থা থেকে অন্য চরম অবস্থার দিকে দোলায়িত হয়। 

এই দোলায়ন ঘটে তীব্রতার একটি মাত্রায়, যার এক প্রান্তে রয়েছে শূন্য (০):

“আমি কখনো জন্ম নিতে চাইনি… আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও।”

এটি হলো অঙ্গহীন দেহ (body without organs)।

আর অপর প্রান্তে রয়েছে n-তম ঘাত (the nth power):

“যা কিছু অস্তিত্বমান তা আমিই, ইতিহাসের সমস্ত নামই আমি।” এটি হলো আকাঙ্ক্ষার সিজোফ্রেনিক প্রক্রিয়া। 

প্রলাপের অভিজ্ঞতা 

এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অ্যান্টি-ইডিপাস বহু লেখক ও চিন্তাবিদের ধারণাকে এক আনন্দময় অথচ প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ব্যবহার করে। তাঁদের ধারণাগুলো বইটির অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় ও প্রবাহিত হয়, যা এক অর্থে একটি সুপরিকল্পিত এবং সুচারুভাবে সম্পাদিত প্রলাপের পরীক্ষা  হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড

যদিও দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি প্রায়ই মার্কস  ও ফ্রয়েডের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেন, তবু অ্যান্টি-ইডিপাসকে ফ্রয়েড-মার্কসের তত্ত্বের আরেকটি সমন্বয়  হিসেবে দেখা ভুল হবে।

কারণ, এ ধরনের সমন্বয়ের প্রচেষ্টা সবসময় রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থাৎ পুঁজি ও স্বার্থের প্রবাহ এবং লিবিডোর অর্থনীতি অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষার প্রবাহকে, দুটি পৃথক অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করে। এমনকি ভিলহেল্ম রাইখের কাজেও, যিনি এই দিকটিতে যতদূর সম্ভব অগ্রসর হয়েছিলেন, এই পৃথকীকরণ বজায় ছিল।

অন্যদিকে, দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি মনে করেন, এখানে আসলে দুটি পৃথক অর্থনীতি নেই; বরং রয়েছে একই অর্থনীতি— প্রবাহের অর্থনীতি । তাঁদের মতে, আকাঙ্ক্ষার প্রবাহ ও উৎপাদনকে সামাজিক উৎপাদনের অবচেতন  হিসেবে দেখা উচিত।

অর্থাৎ, সময়, স্বার্থ ও পুঁজির প্রতিটি বিনিয়োগের পেছনেই রয়েছে আকাঙ্ক্ষার একটি বিনিয়োগ; এবং এর বিপরীতটিও সত্য— আকাঙ্ক্ষার প্রতিটি বিনিয়োগের সঙ্গেই যুক্ত থাকে সময়, স্বার্থ ও পুঁজির বিনিয়োগ।

এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য একটি নতুন ধরনের মুখোমুখি অবস্থান  অপরিহার্য ছিল। এটি সেই প্রচলিত মুখোমুখি অবস্থান নয়, যেখানে একদিকে ‘বুর্জোয়া’ ফ্রয়েড এবং অন্যদিকে ‘বিপ্লবী’ মার্কসকে দাঁড় করানো হয়, এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন ফ্রয়েড। বরং এটি আরও মৌলিক এক মুখোমুখি অবস্থান: বিপ্লবী মার্কস এবং ‘উন্মাদ’ নীটশের মধ্যে সংঘটিত এক বৌদ্ধিক সম্মুখসমর।

লেখকদ্বয় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেখান যে, এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলাফল হলো ফ্রয়েড ও মনঃসমীক্ষণ এবং সম্ভবত লাকাঁও— যদিও এ বিষয়ে তাঁরা কিছুটা দ্ব্যর্থক অবস্থান বজায় রেখেছেন— শেষ পর্যন্ত ‘অসম্ভব’ হয়ে পড়ে।

“মার্কস এবং নীটশে কেন? এখন তো সত্যিই সবকিছু গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে!”—এই পর্যায়ে কেউ এমন আপত্তি তুলতে পারেন। কিন্তু এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কার্ল মার্কস

মার্কসের পাঠকরা জেনে খুশি হবেন যে, এই মুখোমুখি অবস্থানে মার্কস বেশ ভালোভাবেই টিকে যান। এমনকি বলা যায়, এখানে মার্কসকে তাঁর অপরিহার্য উপাদানগুলোতে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও কার্যকর করে তোলা হয়েছে।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির দৃষ্টিতে, এই মুখোমুখি অবস্থান ছিল অনিবার্য। সমাজে যে অর্থ ও পুঁজির প্রবাহ  চলমান, তার বিশ্লেষণ করতে চাইলে মার্কস এবং অর্থ সম্পর্কে মার্কসবাদী তত্ত্বের চেয়ে কার্যকর আর কিছু নেই।

কিন্তু একই সঙ্গে যদি বিশ্লেষণ করতে হয় আকাঙ্ক্ষার প্রবাহকে অর্থাৎ সেই প্রবাহগুলোকে, যা সামাজিক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ তীব্রতায় সূক্ষ্ম কম্পনের মতো  অতিক্রম করে; যাকে বলা যায় লিবিডোর অর্থনীতি— তাহলে অন্যত্র তাকাতে হবে।

কারণ মনঃসমীক্ষণ এখানে কোনো সহায়তা দিতে পারে না। এটি আকাঙ্ক্ষার প্রতিটি সামাজিক প্রকাশকে পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তাহলে কোথায় যেতে হবে?

অ্যান্টি-ইডিপাসের উত্তর হলো: নীটশের কাছে, এবং নীটশের প্রভাবণী ও তীব্রতার তত্ত্বের কাছে।

কারণ এখানে, বিশেষত অন জিনিওলজি অব মরালস গ্রন্থে, আমরা আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা, সচেতন ও অবচেতন শক্তির এমন এক তত্ত্ব পাই, যা আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি সামাজিক ক্ষেত্র এবং মুনাফাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।

মার্কসের বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বর পরিপূরক হিসেবে নীটশে যা দেখান, তা হলো: মানবজাতির ইতিহাস মূলত প্রতিক্রিয়াপ্রবণ হয়ে ওঠার  ইতিহাস।

আর দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি জোর দিয়ে বলেন, মানবতার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ নীটশের চিন্তাতে আগে থেকেই নির্দেশিত ছিল। অন্যদিকে, মার্কস ও ফ্রয়েড যে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন, তাঁরা নিজেরাও সেই সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত ছিলেন।.

তবে অ্যান্টি-ইডিপাস কে নিছক একটি নীটশীয় প্রকল্প হিসেবে দেখা যায় না। কারণ, এই গ্রন্থের প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে নীটশে ও মার্কসের মধ্যকার টানাপোড়েনে, দর্শন ও রাজনীতির মধ্যকার উত্তেজনায়, এবং চিন্তা ও বিপ্লবের মধ্যকার দ্বন্দ্বে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি হলো দেল্যুজের দার্শনিক চিন্তা ও গুয়াত্তারির রাজনৈতিক সক্রিয়তার মধ্যকার এক সৃজনশীল টানাপোড়েন।

এই টানাপোড়েন এক সম্পূর্ণ নতুন ধরনের সমন্বয়ের জন্ম দেয়: শৈল্পিক ‘যন্ত্র’  বিপ্লবী ‘যন্ত্র’ এবং বিশ্লেষণাত্মক ‘যন্ত্র’র সমন্বয়।

এটি একই সঙ্গে জ্ঞানের তিনটি পদ্ধতিকে একত্রিত করে—অন্তর্দৃষ্টিমূলক, ব্যবহারিক  এবং প্রতিফলনমূলক। শেষ পর্যন্ত এগুলো এক ও অভিন্ন কৌশলগত যন্ত্রের  বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে যুক্ত হয়ে যায়। আর এই কৌশলগত যন্ত্রের লক্ষ্য হলো আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে থাকা অহম এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতা।

চিন্তাকে উন্মাদনার সীমা পর্যন্ত এবং কর্মকে বিপ্লবের সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করে, তাঁদের প্রকল্প সত্যিকার অর্থেই হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতার রাজনীতি। তবে এই অভিজ্ঞতা আর মানুষের প্রচলিত অভিজ্ঞতা নয়; বরং মানুষের মধ্যে যা অমানবিক— অর্থাৎ তার আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিসমূহ— তারই অভিজ্ঞতা। এটি এমন এক আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি, যা মানুষের ভেতরের সেই সব প্রবণতার বিরুদ্ধে পরিচালিত, যা অহমকেন্দ্রিক এবং বীরত্ববাদী।

নীটশের পাশাপাশি, তাঁদের আরও অনেকের কথাই শুনতে হয়েছিল: মিলার, লরেন্স, কাফকা ও বেকট, প্রুস্ত, রাইখ ও ফুকো,  বারোজ ও গিন্সবার্গ  প্রমুখ।তাঁদের প্রত্যেকেরই উন্মাদনা ও ভিন্নমত, রাজনীতি ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ছিল নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি। তাঁদের প্রয়োজন ছিল যতটা সম্ভব উপাদান সংগ্রহ করা; আর যা কিছু তাঁরা পেয়েছেন, সবই গ্রহণ করেছেন এক সংমিশ্রণধর্মী ভঙ্গিতে। এই পদ্ধতি মার্কস বা ফ্রয়েডের চেয়ে বরং হেনরি মিলারের কাছাকাছি নিঃসন্দেহে এটি আরও বেশি কাব্যিক; কিন্তু একই সঙ্গে আরও বেশি আনন্দময়ও।

জিল দেল্যুজ

যদিও দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি বহু রচয়িতা ও ধারণাকে ব্যবহার করেন, তবে তা কখনোই পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে রাজি করানোর জন্য প্রচলিত একাডেমিক পদ্ধতিতে নয়। বরং তাঁরা এসব নাম ও ধারণাকে এমন এক ধরনের প্রভাবণী  হিসেবে ব্যবহার করেন, যা তাঁদের বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং ক্রমাগত নতুন নতুন অর্থ ও সম্ভাবনা তৈরি করে। এসব ধারণা একদিকে তাঁদের চিন্তার নির্দেশক-বিন্দু অন্যদিকে এগুলো তীব্রতার কেন্দ্র এবং এমন সব সংকেত, যা অন্য এক পথের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ, এগুলো এমন সংকেত-বিন্দু যা নতুন ধরনের রাজনীতির জন্য একাধিক সম্ভাবনা ও নানা দিক উন্মুক্ত করে।

এই ধরনের পদ্ধতি তার প্রবাহের পথে অনেক কিছু সঙ্গে নিয়ে যায়, আবার অনেক কিছু পেছনে ফেলে যায়। মার্কস ও ফ্রয়েডের চিন্তার যেসব অংশ এই দ্রুত প্রবাহের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, সেগুলো পিছনে পড়ে থাকে—সমাহিত হয় অথবা বিস্মৃত হয়ে যায়। কিন্তু মার্কস ও ফ্রয়েডের চিন্তার মধ্যে যা কিছু বস্তু, মানুষ এবং আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা টিকে থাকে এবং আগেই উল্লেখ করা সেই নারকীয় যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আকাঙ্ক্ষার এই রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অর্থাৎ সিজোবিশ্লেষণ এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। এখানে সিজোফ্রেনিয়া একটি প্রক্রিয়া হিসেবে—সংক্ষেপে সিজ —একই সঙ্গে যাত্রার শুরু এবং গন্তব্যের বিন্দু। আর. ডি. লেইংয়ের মতোই, তাঁরা মানুষকে এক যাত্রায় আহ্বান জানান— অহমের ক্ষয় বা বিলোপের মধ্য দিয়ে এক যাত্রা।

তবে এই বিষয়ে তাঁরা লেইংয়ের চেয়েও অনেক দূর এগিয়ে যান। তাঁরা আহ্বান জানান মানুষ যেন নিজের ওপর চাপানো সমস্ত মানবকেন্দ্রিক ও নৃতাত্ত্বিক আবরণ, সমস্ত মিথ, ট্র্যাজেডি এবং অস্তিত্ববাদের কাঠামো ঝেড়ে ফেলে; যাতে মানুষের মধ্যে যা অমানবিক, তা উপলব্ধি করা যায়—তার ইচ্ছা ও শক্তি, তার রূপান্তর ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা।

মানব ও সামাজিক বিজ্ঞান আমাদের এমনভাবে অভ্যস্ত করেছে যে, প্রতিটি সামাজিক ঘটনার পেছনে আমরা ‘মানুষ’-এর একটি নির্দিষ্ট অবয়ব খুঁজে দেখি। ঠিক যেমন খ্রিস্টধর্ম আমাদের শিখিয়েছে, যেন সর্বক্ষণ আমাদের ওপর ‘প্রভুর চোখ’ নিবদ্ধ রয়েছে। জ্ঞানের এই ধরনের পদ্ধতি বাস্তবতাকে দেখার বদলে বাস্তবতার একটি প্রতিরূপ নির্মাণ করে। তারা অবয়ব, প্রতীক ও চিহ্ন নিয়ে কথা বলে, কিন্তু শক্তি ও প্রবাহকে দেখতে ব্যর্থ হয়।

তারা আমাদের অন্য বাস্তবতা থেকে, বিশেষত ক্ষমতার সেই বাস্তবতা থেকে, অন্ধ করে রাখে— যে ক্ষমতা আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও অধীনস্থ করে। তাদের কাজ হলো মানুষকে বশীভূত করা; আর এর ফল হলো: নমনীয় ও অনুগত বিষয়ীর নির্মাণ। 

কারণ আমরা অসুস্থ— আমাদের নিজেদের নিয়েই আমরা অত্যন্ত অসুস্থ!

সিজো-বিশ্লেষণ ও সামষ্টিকতা

অ্যান্টি-ইডিপাসীয় হওয়া মানে একই সঙ্গে প্রতি-অহম  এবং প্রতি-মানব হওয়া। এর অর্থ হলো, সেই সমস্ত সংকোচনমূলক মনোবিশ্লেষণাত্মক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে আক্রমণ পরিচালনা করা, যেগুলো এখনও সমগ্রতা ও ঐক্যের পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ। এর উদ্দেশ্য হলো আকাঙ্ক্ষার বহুত্বকে সেই প্রাণঘাতী স্নায়বিক ও ইডিপাসীয় বন্ধন  থেকে মুক্ত করা।

কারণ, দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি ব্যাখ্যা করেন, ইডিপাস কোনো নিছক মনোবিশ্লেষণাত্মক নির্মাণ নয়। ইডিপাস হলো সাম্রাজ্যবাদের প্রতীকী প্রতিনিধি:

“অন্য উপায়ে পরিচালিত উপনিবেশায়ন; এটি হলো অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ, এবং আমরা দেখব যে এখানেও, এমনকি আমাদের নিজেদের ঘরের মধ্যেই… এটি আমাদের অন্তরঙ্গ ঔপনিবেশিক শিক্ষা।”

মানুষের দ্বারা মানুষের এই অভ্যন্তরীণ উপনিবেশায়ন, এই ইডিপাসীকরণ কষ্টের জন্য একটি নতুন অর্থ তৈরি করে—অভ্যন্তরীণ কষ্টের অর্থ; এবং জীবনের জন্য সৃষ্টি করে এক নতুন সুর: বিষণ্ণতার সুর।

সিজোফ্রেনিয়া

কিন্তু অ্যান্টি-ইডিপাস আরও বলে, বিষণ্ণতা এমন নয় যে, কোনো এক সুন্দর দিনে হঠাৎ করে উপস্থিত হয়; কিংবা ইডিপাসও এমন নয় যে একদিন পরিবারে আবির্ভূত হয়ে সেখানে নিরাপদে অবস্থান করতে শুরু করে।

বিষণ্ণতা এবং ইডিপাস হলো রাষ্ট্রের স্বীয়মত্তা, স্প্যারানয়ার স্বয়ং এবং ক্ষমতার কর্তাসত্তা,  পরিবারের কাছে অর্পিত হওয়ার বহু আগেই।

ইডিপাস হলো ক্ষমতা নিজে যেভাবে কাজ করে তার প্রতিমূর্তি; যেমন ব্যক্তির ওপর ক্ষমতার প্রভাবণীর ফল হলো নিউরোসিস।

ইডিপাস সর্বত্র উপস্থিত।

অ্যান্টি-ইডিপাসীয়দের কাছে অহমও, ইডিপাসের মতোই, “সেইসব জিনিসের অংশ, যেগুলোকে বিশ্লেষণাত্মক ও রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে আমাদের ভেঙে ফেলতে হবে।”⁴

ইডিপাস হলো অবচেতনের মধ্যে প্রবেশ করানো এক ধরনের বিশ্বাস। এটি আমাদের শক্তি কেড়ে নিয়ে আমাদের বিশ্বাস করতে শেখায়; এটি আমাদের শেখায় কীভাবে আমরা নিজেদের দমনকেই আকাঙ্ক্ষা করতে পারি।

বাড়িতে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে—সবখানেই মানুষকে ইডিপাসীকৃত এবং নিউরোটিক করে তোলা হয়েছে।

প্রত্যেকেই ফ্যাসিস্ট হতে চায়।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি জানতে চান, কীভাবে এই বিশ্বাসগুলো একজনের ওপর এমনভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে যে, তা লিবিডোর উৎপাদনশীল যন্ত্রগুলোকে  নীরব করে দিতে পারে।

একই সঙ্গে তাঁরা জানতে চান, বিপরীত পরিস্থিতিটি কীভাবে সম্ভব হয়— যেখানে একজন সফলভাবে ক্ষমতার প্রভাব প্রতিরোধ করতে পারে।

নিউরোসিস ও সাইকোসিসের মধ্যে ফ্রয়েডীয় পার্থক্যকে উল্টে দিয়ে— যেখানে সবকিছুকে নিউরোসিসের মানদণ্ডে বিচার করা হয়— অ্যান্টি-ইডিপাস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়:

নিউরোটিক হলো সেই ব্যক্তি, যার ওপর ইডিপাসীয় ছাপ কার্যকর হয়; আর সাইকোটিক হলো সেই ব্যক্তি, যাকে ইডিপাসীকৃত করা সম্ভব হয় না। এমনকি, এবং বিশেষত, মনোবিশ্লেষণের দ্বারাও নয়।

বিপ্লবীর প্রথম কাজ হলো, তাঁরা বলেন, সাইকোটিকের কাছ থেকে শেখা— কীভাবে ইডিপাসীয় বন্ধন এবং ক্ষমতার প্রভাব ঝেড়ে ফেলা যায়; যাতে সমস্ত বিশ্বাস থেকে মুক্ত এক মৌলিক আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি  সূচনা করা যায়।

এই ধরনের রাজনীতি ক্ষমতার রহস্যময়তা ও মিথ্যাভ্রম বিলুপ্ত করে, সমস্ত স্তরে অ্যান্টি-ইডিপাসীয় শক্তির প্রজ্বলনের মাধ্যমে— অর্থাৎ সিজো-প্রবাহের মাধ্যমে।

এগুলো এমন শক্তি, যা বিধিবদ্ধকরণ থেকে উত্তরণ ঘটায়, বিধিকে বিশৃঙ্খল করে এবং সবদিকে প্রবাহিত হয়:

এতিম (orphans) — কোনো পরিবার (বাবা-মা-আমি)  নয়

নাস্তিক (atheists) — কোনো বিশ্বাস নয়;

যাযাবর (nomads) — কোনো অভ্যাস নয়, কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র নয়।

একটি সিজো-বিশ্লেষণ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার জন্য সিজোফ্রেনায়ন  করে এবং একটি নতুন সমষ্টিগত বিষয়ীতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনুসন্ধান শুরু করে; একই সঙ্গে মানবজাতির এক বিপ্লবী আরোগ্যের পথ উন্মুক্ত করে।

কারণ আমরা অসুস্থ—আমাদের নিজেদের নিয়েই আমরা অত্যন্ত অসুস্থ!

বাস্তবে বলা ঠিক হবে না যে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি সিজো-বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতির উদ্ভাবন বা বিকাশ ঘটান। কারণ, তাঁদের দেখানো মতে, এই পদ্ধতি এর আগেও সক্রিয় ছিল মিলার, নীটশে  কিংবা আর্তোর মতো লেখকদের চিন্তার মধ্যে।

তীব্রভাবে যাপন করা অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক ধরনের ‘মত্ত চিন্তা’: এটাই হলো পপ দর্শন।

সহজভাবে বলতে গেলে, মিলারের ভাষায়:

“যে মুহূর্তে মানুষ নিজের কথা ভুলে যায়, সেই মুহূর্তেই প্রত্যেকেই একজন আরোগ্যদাতা  হয়ে ওঠে।”

মিলার আরও বলেন:

“বাস্তবতা এখানে এবং এখন, সর্বত্র উপস্থিত; চোখের সামনে আসা প্রতিটি প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে তা দীপ্ত হয়ে ওঠে। … শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক নারী ও পুরুষই নিউরোটিক। আরোগ্যদাতা, কিংবা আপনি চাইলে বিশ্লেষক, কেবল একজন অতিমাত্রায় নিউরোটিক ব্যক্তি। … আরোগ্য লাভের জন্য আমাদের অবশ্যই নিজেদের কবর থেকে উঠে দাঁড়াতে হবে এবং মৃতদের কাফনের আবরণ ঝেড়ে ফেলতে হবে। একজন মানুষ অন্য কারও জন্য এটি করতে পারে না। এটি একটি ব্যক্তিগত বিষয়, যা সবচেয়ে ভালোভাবে সম্পন্ন হয় সমষ্টিগতভাবে।”⁵

যখন আমরা আমাদের অহমকে আঁকড়ে থাকা থেকে মুক্ত হতে পারি, তখন এক ধরনের অ-নিউরোটিক রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি হয়। এমন এক রাজনীতি, যেখানে একবাচনিতা ও সামষ্টিকতা আর পরস্পরের বিরোধী থাকে না; বরং আকাঙ্ক্ষার সামষ্টিক প্রকাশের পথ উন্মুক্ত হয়।

এই রাজনীতি কোনো সর্বাত্মকতাবাদী  মানদণ্ড-ব্যবস্থার অধীনে ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ বা এক ছাঁচে গড়ে তুলতে চায় না। বরং ক্ষমতার বিরুদ্ধে নতুন নতুন বহুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বিন্যাস তৈরি করে স্বাভাবিকীকরণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণের প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে চায়।

এর লক্ষ্য হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মানবিক সম্পর্কের রূপান্তর ঘটানো।

এবং এটি সক্রিয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী  ও একক ব্যক্তিদের উভয়কেই আহ্বান জানায়—তাদের ওপর ক্ষমতার যে প্রভাবগুলো আধিপত্য বিস্তার করে, সেগুলো বিশ্লেষণ ও প্রতিরোধ করার জন্য:

কারণ অবচেতন-পূর্ব স্তরে থাকা একটি বিপ্লবী গোষ্ঠীও একটি অধীনস্থ গোষ্ঠী হিসেবেই থেকে যায়, এমনকি ক্ষমতা দখলের পরও, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ক্ষমতা নিজেই এমন এক শক্তির রূপের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা আকাঙ্ক্ষা-উৎপাদনকে দাসত্বে আবদ্ধ করে এবং তাকে ধ্বংস করে। …

অন্যদিকে, একটি বিষয়ী-গোষ্ঠী হলো এমন একটি গোষ্ঠী, যার লিবিডো-নিবেশ  নিজের মধ্যেই বিপ্লবী। এটি আকাঙ্ক্ষাকে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রবেশ করায় এবং সমাজব্যবস্থা বা ক্ষমতার রূপগুলোকে আকাঙ্ক্ষা উৎপাদনের অধীনস্থ করে।

আকাঙ্ক্ষা নিজেই যে উৎপাদনশীল এবং যে আকাঙ্ক্ষা উৎপাদন করে, সেই বিষয়ী-গোষ্ঠী সবসময় এমন প্রাণঘাতী বিন্যাস সৃষ্টি করে, যা তার ভেতরে মৃত্যুমুখিন প্রবাহকে প্রতিরোধ করে। এটি অধীনতার প্রতীকী নির্ধারণগুলোর বিপরীতে বাস্তব আন্তঃপ্রবাহিতার সহগ স্থাপন করে— যেখানে কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই, কোনো গোষ্ঠীগত অতিঅহম  নেই।”

অ্যান্টি-ইডিপাস  উপসংহারে বলে, যেখানে মানুষ ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বর্জন ও পৃথকীকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেখানে কোনো বিপ্লবী কর্ম সম্ভব নয়।

গোষ্ঠীগুলোকে অবশ্যই বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে হবে এবং নতুন নতুন উপায়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে; যাতে নতুন সামাজিক বিন্যাস নির্মাণের জন্য ক্ষেত্রগুলো মুক্ত করা যায়।

সিজোফ্রেনিয়া

অতএব, তত্ত্বকে একটি হাতিয়ারসমষ্টি  হিসেবে ভাবতে হবে, যা বাস্তবে কাজ করতে পারে এমন হাতিয়ার তৈরি করে। অথবা ইভান ইলিচের ভাষায়, প্রতিপক্ষীয় গবেষণার মাধ্যমে আমাদের এমন হাতিয়ার নির্মাণ শিখতে হবে, যা সহাবস্থানের উপযোগী

ইলিচ যখন “সহাবস্থানমূলক পুনর্গঠন”এর কথা বলেন, তখন তিনি দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির “আকাঙ্ক্ষার বিপ্লব” ধারণার খুব কাছাকাছি চলে আসেন।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির মতোই, ইলিচও ব্যক্তি ও হাতিয়ার বা যন্ত্রের মধ্যকার সম্পর্ককে আমূল উল্টে দেওয়ার আহ্বান জানান:

“এই উল্টে দেওয়া এমন এক জীবনধারা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব করবে, যেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে সেই একমাত্র সম্পদের সুরক্ষা, সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং উপভোগকে, যা প্রায় সমানভাবে সকল মানুষের মধ্যে বণ্টিত: ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তিগত শক্তি।”⁷

তিন লেখকই একমত যে, এই রূপান্তর কোনো পেশাজীবী বা বিশেষজ্ঞের নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং একটি সামষ্টিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হতে হবে।

পেশাজীবীদের ওপর নিউরোটিক নির্ভরতার চূড়ান্ত উত্তর হলো: ‘’পারস্পরিক আত্ম-যত্ন’’ 

মনোবিশ্লেষণাত্মক কাঠামো থেকে মুক্ত হওয়ার পরও রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সমষ্টি  আকাঙ্ক্ষার  প্রশ্নকে এড়িয়ে যেতে পারে না। একইভাবে, আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিকে নতুন কোনো বিশেষজ্ঞের হাতে তুলে দেওয়াও সম্ভব নয়।

তাদের নিজেদেরই আকাঙ্ক্ষার কার্যকারিতা জজঝজজজজঝজজজঝ বিশ্লেষণ করতে হবে—আকাঙ্ক্ষা নিজে কীভাবে কাজ করে এবং যেসব গোষ্ঠীর সঙ্গে তা যুক্ত, সেসব গোষ্ঠীর মধ্যেও কীভাবে কাজ করে।

অ্যান্টি-ইডিপাস  প্রশ্ন তোলে: সংযোগ তৈরি করা ছাড়া আকাঙ্ক্ষার আর কী-ই বা কাজ থাকতে পারে?

কারণ, যেসব বিন্যাস থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসবের মধ্যেই আটকে থাকা হলো নিউরোটিক অবস্থায় থাকা। অর্থাৎ, যেখানে বাস্তবে বিকল্পের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে একটি অমীমাংসিত সংকট দেখতে থাকা। আর দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি মন্তব্য করেন:

“সম্ভবত শেষ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হবে যে একমাত্র আরোগ্য-অযোগ্য হলো নিউরোটিক।”

দ্য পলিটিক্স অব এক্সপেরিয়েন্স গ্রন্থে লেইং বলেন, আমরা আমাদের অহমের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতাগুলোকে রক্ষা করতে এত বেশি সচেষ্ট থাকি যে, মাদক বা সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অহম-ক্ষয়ের (ego-loss) ধারণার মুখোমুখি হলেই মানুষ আত্মরক্ষামূলক হয়ে পড়ে এবং আতঙ্কিত হয়।

কিন্তু লেইং-এর মতে, অহম-ক্ষয়ের মধ্যে কোনো রোগগত বিষয় নেই; বরং এটি মানুষের এক মৌলিক অভিজ্ঞতা। অহম-ক্ষয় হলো সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতা—“আদি মানুষের, আদমের, এবং সম্ভবত আরও গভীরে প্রাণী, উদ্ভিদ ও খনিজ সত্তার অস্তিত্বের দিকে এক যাত্রার অভিজ্ঞতা।”⁹

লেইং বলেন, আমাদের মতো আর কোনো যুগ এই আরোগ্যদায়ী প্রক্রিয়া থেকে এত দূরে সরে যায়নি।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির স্কিজো-বিশ্লেষণ  এই আরোগ্য প্রক্রিয়ারই সূচনা করতে চায়। এর প্রধান লক্ষ্য হলো ইডিপাসীকরণ  ও স্নায়বিককীকরনের মাধ্যমে তৈরি ব্যক্তিগত নির্ভরতাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং সমষ্টিগত বিষয়ীতার মাধ্যমে এক অ-ফ্যাসিস্ট বিষয়ী  তৈরি করা—অর্থাৎ অ্যান্টি-ইডিপাস।

অ্যান্টি-ইডিপাস এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যারা আর পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসের কাঠামো দ্বারা পরিচালিত হয় না। নীটশের ভাষায়, এটি এমন এক শক্তি, যা মানুষকে সেইসব আদর্শের ভার থেকে মুক্ত করতে চায়, যেগুলো তাকে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করেছে; একই সঙ্গে মুক্ত করতে চায় সেই পরিণতি থেকেও, যা এসব আদর্শ থেকে জন্ম নিয়েছে:

*“মহা বিতৃষ্ণা, শূন্যতার ইচ্ছা, নিহিলিজম; মধ্যাহ্নের সেই ঘণ্টাধ্বনি এবং সেই মহান সিদ্ধান্ত, যা ইচ্ছাকে আবার মুক্ত করে এবং পৃথিবীর কাছে তার লক্ষ্য এবং মানুষের কাছে তার আশা ফিরিয়ে দেয়; এই অ্যান্টিক্রাইস্ট এবং অ্যান্টিনি‌হিলিস্ট… তাকে একদিন আসতেই হবে।”*⁰

তবে নীটশের অ্যান্টিনি‌হিলিস্টের মতো দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির অ্যান্টি-ইডিপাস একা নয়। এটি কোনো অতিমানব নয়, কোনো অতি-ইন্দ্রিয় সত্তাও নয়।

যেখানে নীটশে ক্রমশ একাকীত্বের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি উন্মাদনার সীমা পর্যন্ত, সেখানে দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি আহ্বান জানান এখানে এবং এখন সমষ্টিগত কর্ম ও আবেগের দিকে।

উন্মাদনা হলো বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা থেকে এক মৌলিক বিচ্ছেদ। কিন্তু দেল্যুজ ও গুয়াত্তারির কাছে রাজনৈতিক সক্রিয়তা  শুধু উন্মাদনার জায়গায় থেমে থাকে না। এটি উন্মাদনা থেকে শিক্ষা নেয়, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষেত্রসীমায়ন অতিক্রম করে এগিয়ে যায় নতুন নতুন সংযোগের দিকে।

আকাঙ্ক্ষার রাজনীতি প্রথমেই দূর করতে চায় নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতাকে।

এটাই অ্যান্টি-ইডিপাল কৌশল:

যদি মানুষ মহাবিশ্বের যন্ত্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকে, যদি সে নিজের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে পারে, যদি সে জীবনের প্রবাহে “নোঙর করা” থাকে, তবে—

সে আর বিষয়গুলোর যথার্থতা, অন্য মানুষের আচরণ, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবে না। যদি তার শিকড় জীবনের প্রবাহে প্রোথিত থাকে, তবে সে পদ্মের মতো ভেসে থাকবে, বিকশিত হবে এবং ফল দেবে…। তার ভেতরের জীবন নিজেকে বিকাশের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করবে; আর বিকাশ হলো এক অন্তহীন, চিরন্তন প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটিই সবকিছু।’¹¹

এই প্রক্রিয়াই হলো আকাঙ্ক্ষা-উৎপাদনের  প্রক্রিয়া। আর অ্যান্টি ইডিপাস শুরু করে এই প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ দিয়ে।

কারণ দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি বলেন, যদি কোনো সমাজে আকাঙ্ক্ষা  দমন করা হয়, তবে তার কারণ এই নয় যে “এটি মায়ের প্রতি আকাঙ্ক্ষা অথবা পিতার মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা।” বরং এর বিপরীতটাই সত্য: আকাঙ্ক্ষা কেবল তখনই এমন রূপ ধারণ করে, কারণ তাকে দমন করা হয়েছে। দমনের শাসন তার জন্য যে মুখোশ তৈরি করে এবং মুখের ওপর এঁটে দেয়, আকাঙ্ক্ষা সেই মুখোশই ধারণ করে। প্রকৃত বিপদ অন্যত্র।

যদি আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা হয়, তবে তার কারণ হলো— আকাঙ্ক্ষার প্রতিটি অবস্থান যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, সমাজের প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাকে  প্রশ্নবিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে।

এর অর্থ এই নয় যে আকাঙ্ক্ষা সমাজবিচ্ছিন্ন; বরং ঠিক তার বিপরীত।

কিন্তু আকাঙ্ক্ষার শক্তি বিস্ফোরক। এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা-যন্ত্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়, যা সমগ্র সামাজিক ক্ষেত্রের কোনো অংশকে ভেঙে না দিয়ে বা রূপান্তরিত না করে টিকে থাকতে পারে।

দেল্যুজ ও গুয়াত্তারি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আকাঙ্ক্ষা— যে কোনো আকাঙ্ক্ষা-যন্ত্র— সবসময়ই বিভিন্ন ধরনের উপাদান ও শক্তির এক সমন্বয়। তাই কেবল বিপ্লবীদের কথাই নয়, বরং তাদের কথাও শোনা প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থে বস্তুনিষ্ঠ  হতে জানেন:

বিপ্লবীরা, শিল্পীরা এবং দ্রষ্টারা কেবল বস্তুনিষ্ঠ, নিছক বস্তুনিষ্ঠ থাকতে সন্তুষ্ট: তারা জানেন যে, আকাঙ্ক্ষা তার শক্তিশালী উৎপাদনশীল আলিঙ্গনের মধ্যে জীবনকে ধারণ করে এবং তাকে এমন এক অধিকতর তীব্রতায় পুনরুৎপাদন করে, যার কারণ হলো তার প্রয়োজন খুবই অল্প। আর যারা মনে করেন যে এই কথা বলা খুব সহজ, অথবা এটি কেবল বইয়ে পাওয়া যায় এমন এক ধরনের ধারণা—তাদের কথা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।”

আরিফ রেজা মাহমুদ

আরিফ রেজা মাহমুদ

লেখক