অরাজ
শিল্পী: গণেশ পাইন

ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় || ভারতবর্ষের ধারণার বহুবিধ ইতিহাসতাত্ত্বিক দ্যোতনা

অনুবাদ : স্বাধীন সেন

[অনুবাদকের টিকা : অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাববিস্তারী চিন্তক হিসেবে বিবেচিত হন। যদিও বাংলাদেশের বিদ্যায়তনের ইতিহাস চর্চায় ও চিন্তায় অন্যান্য অনেক প্রভাবশালী চিন্তকের মতন উনার চিন্তাভাবনা আর বইপত্রের সঙ্গেও আমাদের পরিচিতি খুবই অল্প। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে দীর্ঘদিন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। আদিমধ্যযুগ আর আদি পর্বের ইতিহাসের বিভিন্ন চিন্তা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে উনার অবদান বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। ইতিহাস চিন্তায় ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ও লেখালেখির গুরুত্ব এবং প্রভাব ধারণাগত ক্ষেত্রে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনই উপাত্ত ও সূত্র ব্যবহার ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। এই প্রবন্ধটি উনার চিন্তা ও পর্যালোচনার পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রেই কেবল গুরুত্বপূর্ণ না। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস চর্চা ও ইতিহাস জ্ঞানকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী বয়ান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার হালের বহুবিধ তৎপরতাকে পর্যালোচনা করার গভীর ও নিবিড় পদ্ধতি আমলে আনার জন্য উনার লেখালেখি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধের বাংলা তর্জমা। প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড আদার এসেস’ (২০১৮, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস) বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী প্রবল ইতিহাসের বয়ানে আর বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপচারিতায় ‘অখণ্ড ভারত’ এবং অনন্ত কাল ধরে অস্তিত্ত্বশীল একটি স্থির, অনড় আর বাস্তব ভূখণ্ডগত পরিচিতি হিসেবে ভারতের পরিচয়কে নির্মাণ করার আধিপত্যশীল তৎপরতাকে ইতিহাসতাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধটি একটি অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে। আধিপত্যশীল ও সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও আলামতের উদ্দেশ্যমূলক, বাছাইকৃত ও পর্যালোচনাবিহিন ব্যবহার প্রবল হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রণালিবদ্ধ প্রচারণা এই প্রাবাল্যকে বাড়িয়েছে। আবার এই অতীতের উপরে দখলদারিত্ব করে ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্বের বয়ান উৎপাদনের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একইরকম বিপজ্জনক তৎপরতাও লক্ষ্যণীয় ভাবে বেড়ে গেছে। নিবিড়, পদ্ধতিগত আর ধারণাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বয়ানের বিরুদ্ধে যারা পাল্টা বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন তারাও আবার পাল্টা পরিচয়বাদের খপ্পরে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিবাদমান ইতিহাসের বয়ানগুলো পরস্পর পরস্পরের বুনিয়াদী রূপরেখা পুনরুৎপাদন করছে। কেবল জাতি, সম্প্রদায়, জাতিবর্ণ বা আঞ্চলিক পরিচয়গত পদটি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে মাত্র। হিন্দুত্ববাদী বয়ানের ‘নিজ’ ও ‘অপর’ পাল্টা বয়ানে কেবল উল্টে যাচ্ছে। অথচ হিন্দুত্ববাদী বা কট্টর বিভিন্ন পরিচয়বাদী ইতিহাসের আখ্যানগত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ইতিহাস বোঝার ও ব্যাখ্যা করার ধারণা ও পদ্ধতিগত প্রসঙ্গগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে পরিচয়বাদী অতীত দখলের যুদ্ধে মত্ত পক্ষগুলোর আপাত পরস্পর বিরোধী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করা দরকার। ইতিহাস শাস্ত্রটির মধ্যকার বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যেমন ইতিহাসবিদগণ ও প্রত্নতত্ত্ববিদগণের দায় তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস লিখনের ধারণা, পদ্ধতি আর উৎসের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে শেখাটাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন উৎস ও আলামতকে পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তিকে ধারণা ও পদ্ধতিগতভাবে ক্রটিপূর্ণ প্রমাণ করা সম্ভব। আধিপত্যশীল ও জনতুষ্টিবাদী ইতিহাসের পরিচয়বাদী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করার জন্য বিশদ, নিষ্ঠ ও নিবিড় বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োজন। এই প্রবন্ধটি তেমন বিশ্লেষণ পদ্ধতির একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হতে পারে। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের অনন্যসাধারণ চিন্তা পদ্ধতি এবং গভীর উপলব্ধিগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা একঅর্থে পরিশ্রমসাধ্য আর অন্তদৃষ্টি অর্জনের সাধনার কাজ। সেই সাধনা ও অনুধ্যানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও এই প্রবন্ধটি কার্যকর হতে পারে। এই অনুবাদটি এবছরের সিল্করুট ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আমি সিল্করুট এবং সিল্করুট ঈদসংখ্যার সম্পাদক শানজিদ অর্ণবের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।]

এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাকে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা যে দেশে বাস করি তা হলো ভারতবর্ষ, আর এই ভারতবর্ষই হলো ‘ইন্ডিয়া’, শৈশব থেকেই আমরা এই ধারণাটি নিয়ে বেড়ে উঠেছি। আমাদের ধারণা ছিল ভারতবর্ষ এমন একটি মানচিত্র যার সুনির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে এবং অনুরূপ মানচিত্র দ্বারা চিহ্নিত অন্যান্য দেশ থেকে এটা আলাদা। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ মানচিত্রটিকে বদলে দিয়েছিল। কিন্তু ‘ভারতবর্ষর’ ধারণা এবং নামটি রয়ে গেছে। আমাদের পূর্বসূরিদের কাছে মনে হতো, ভারতবর্ষ এমন একটি দেশের ছবি বহন করে চলেছে যে দেশ চিরকাল ছিল এবং মানচিত্রের পরিবর্তন সত্ত্বেও যে দেশ চিরকাল থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া আর আজকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত ভারত বা ভারতবর্ষের ধারণার ইতিহাসের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নিরিখে পর্যালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা বাকি রয়ে গেছে। অন্য কথায় স্থানিক পরিসরের ধারণা বা অর্থ, সেই ধারণার দ্বারা নির্দেশিত প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর, এবং আমাদের ইতিহাসের আধার (locus) হিসেবে সেই স্থানিক পরিসরের  মধ্যকার সম্পর্কের প্রসঙ্গটি নতুন করে উন্মোচন করা প্রয়োজন। কারণ এখন আমরা যে বিষয়গুলোকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নিচ্ছি, সেগুলো আসলে বেশ কিছু পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ইতিহাস উৎসগুলোতে নিহিত বহুবিধ অর্থকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায়, এই পূর্বানুমানগুলো বিশেষ করে আদি পর্বের ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের সাধারণীকরণগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।

উদাহরণস্বরূপ, একটি বুনিয়াদী পূর্বানুমান হলো যে ‘ইন্ডিয়ার’ এবং ‘ভারতবর্ষর’  ধারণা অভিন্ন বা একই। ঠিক কোন উপায়ে এই ধারণা দুটির বিভিন্ন অর্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল সেকথা এই প্রবন্ধে ঐতিহাসিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে একথা স্পষ্ট যে ঊনিশ শতকের মধ্যে ইতিহাস লিখনে এবং সাধারণের চিন্তাভাবনায়ও উভয় ধারণার অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যারা ইন্ডিয়া অথবা তার ধারণা নিয়ে লেখেন, তারা ধরেই নেন যে তারা যেকথা বোঝাতে চাইছেন সেকথা ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি দিয়েও ব্যক্ত করা যায়। এই দুটি শব্দ একইভাবে আমাদের অতীত বা ইতিহাসের বোধ বহন করে। এমনকি ঔপনিবেশিক ইতিহাস-লিখনের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতেও ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ বা ভারতের ইতিহাস কল্পনা করা সহজ ছিল। সেই একই ধাঁচে কোনো দেশীয় উদ্যোগ যদি নেওয়া হতো, তবে বাংলা ভাষায় তার শিরোনাম হতো ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’।[১] ভারতবর্ষকে ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক করে দেখার একটি একাডেমিক উদাহরণ হলো পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্বীয়-রূপরেখার (cosmography) সূত্রে একজন নামকরা গবেষকের এই বিবৃতিটি:[২]

‘হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সর্বদক্ষিণের বর্ষ, অর্থাৎ ভারতই ইন্ডিয়া। (নজরটান সংযোজিত)’

ইন্ডিয়া এবং ভারতবর্ষের অভিন্নতার এই বোঝাপড়া এবং বিনা দ্বিধায় গ্রহণযোগ্যতা আমাদের সংবিধানের এই গাম্ভীর্যপূর্ণ ঘোষণায় আরও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে: ইন্ডিয়া যা ভারত হবে রাজ্যসমূহের একটি সমষ্টি (Union of States)।’[৩] এই ঘোষণাটি আমাদের দেশ এবং জাতীয়তার পরিচয়ের ওপর একটি ঐতিহাসিক সিলমোহরের ছাপ দিয়ে দেয়। কিন্তু অপরিহার্যভাবে আমাদের ইতিহাসের ওপর সেই সিলমোহর কাজ করে না। মনে রাখা প্রয়োজন, শব্দ দুটির উৎপত্তি ভিন্ন। একটি শব্দ (ইন্ডিয়া) দেশটিকে দেখছে ভৌগোলিকভাবে বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং এই শব্দটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে। অন্য শব্দটি, ‘ভারতবর্ষ’, ধারাবাহিকভাবে (যদিও অনন্তকাল ধরে নয়) ভিন্ন ভিন্ন অর্থে বিভিন্ন ধরণের প্রাচীন টেক্সটে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিশ্বতাত্ত্বিক-রূপরেখার মধ্যে স্থিত রয়েছে। সুতরাং ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটির ব্যঞ্জনাগুলো একেবারেই আলাদা। ‘ভারতবর্ষের‘ বিভিন্ন খণ্ডাংশকে কীভাবে কল্পনা করা হয়েছে সেই প্রসঙ্গে লিখিত উৎস/টেক্সটগুলোতে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং সম্ভাব্য আধুনিক সংহতিগত পরিচয়গুলো থেকে দুরে থেকে স্বাধীনভাবে এ-শব্দটির আদি ইতিহাসের অনুসন্ধান করা এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেসব অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই প্রসঙ্গ স্পষ্ট করা ফলপ্রসূ হতে পারে।

এই আলাপচারিতার সঙ্গে ইতিহাসতত্ত্বের প্রকৃতিও জড়িত। ভারতের ধারণার ইতিহাস অন্বেষণ করার কিছু সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, আমরা দীর্ঘকাল যাবত ধরেই নিয়েছি যে, আমরা যে দেশে বাস করি তার অর্থের ব্যঞ্জনা বরাবরই একই রকম ছিল। আরো মনে করি, বর্তমানে আমরা দেশ সম্পর্কে যা ভাবি, অতীতেও ঠিক তাই ভাবা হতো। তবে নিতান্ত কান্ডজ্ঞানের কথা বিবেচনায় নিলেও অনুভব করার কথা যে, ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলো সংজ্ঞায়িত এবং পুনঃসংজ্ঞায়িত হয়েছে। কোনো একটি স্থানিক পরিসর আর সেখানকার মানুষজনের ইতিহাস বুঝতে হলে সংজ্ঞা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সাধারণত জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত কোনো একটি নির্দিষ্ট যৌথ সংবেদনের সঙ্গে কোনো স্থানিক পরিসরকে একাকার করে দেখাটা সেই স্থানিক পরিসর অথবা সেখানে বসবাসকারী যৌথ মানবসত্তার কোনো ‘পূর্ব-প্রদত্ত গুণ’ নয়। জাতীয়তাবাদের মতন সামষ্টিক সংবেদনশীলতা ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত হয়। এই সংবেদনশীলতার রূপান্তর/মিউটেশন ঘটতে পারে। একটি দেশ বা সেই দেশ সম্পর্কে ধারণাগুলো ওই যৌথ সংবেদনশীলতা থেকে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকতে পারে ততক্ষণই যতক্ষণ না পর্যন্ত এই ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত চেতনা অভিব্যক্তির বিভিন্ন রূপায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

আজ যখন আমরা মেনে নিয়েছি যে একটি ভৌগোলিক গণ্ডীবদ্ধ (তা যেভাবেই হোক-না-কেন) এবং সাংবিধানিকভাবে সংজ্ঞায়িত দেশই হলো আমাদের আপন, তখন অতীতে সেই দেশটির অর্থ কী ছিল তা খতিয়ে দেখা আমার কাছে বিভিন্ন কারণেই জরুরি মনে হয়। ইতিহাসতাত্ত্বিকভাবে, সেই অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আমরা একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বিশেষভাবে কারণ হলো ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবষের’ ধারণা সম্পর্কে বর্তমানে পুরোপুরি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে এই প্রসঙ্গে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থানকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

একটি অবস্থানের যাত্রা মূলত ঔপনিবেশিকরা ইন্ডিয়াকে যেভাবে একটি প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক একক হিসেবে তৈরি করেছিল সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। এই অবস্থানগত চিন্তাভাবনা সুদূর অতীতেও ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবর্ষ’ ধারণাটি আধুনিক জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল এমন বিবেচনাকে গুরুত্ব দেয়। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়ার’ (The Fundamental Unity of India) [৪] মতো মনোগ্রাফ বা গবেষণাপত্রগুলো এই ঐক্যের ধারণাকে জোরালোভাবে প্রক্ষেপ করেছিল; এই ধারণায় ‘ঐক্য’ হলো দেশটির একটি মৌলিক গুণ। ভারতীয় ভূগোলের বিভিন্ন ধারণা, তীর্থস্থানগুলোর নেটওয়ার্ক এবং যুদ্ধজয় বা উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের বাসনাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই মৌলিক গুণের প্রমাণ খুঁজে বের করা হতো । আমাদের অখণ্ড দেশের অস্তিত্বের এই ধারণাটি ভারতের ইতিহাসের উপর লেখালেখিগুলোতে ভূখণ্ডগতভাবে একটি প্রশ্নাতীত একক সত্তা হিসেবে ঢুকে গেছে। অথচ এই ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলগুলোর আলাদা আলাদা প্রাণশক্তি ছিল । ভারতবর্ষের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ‘ভারতীয় জাতিকে’ অতীতে এমনভাবে প্রক্ষেপণ একটি ধ্রুব দশা হিসেবে আজও অব্যাহত রয়েছে। ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’-তে ভারতবর্ষ বা ইন্ডিয়াকে একটি প্রাচীন জাতির পরিসরগত আধার হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এমন অর্থের চিহ্নিতকরণ ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’ (The Concept of India)[৫] শীর্ষক একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থেও উপস্থিত। এই বইয়ে বলা হয়েছে:

স্পষ্টতই উপমহাদেশের [উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে সমুদ্রের মধ্যবর্তী দেশটির] অধিবাসীদের পৌরাণিক লেখকরা একটি জাতি (nation) হিসেবে বিবেচনা করতেন, অন্তত ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে। অন্তত জনসাধারণের একটি অংশের মধ্যে এমন অনুভূতি ছিল যে পুরো উপমহাদেশটি (বা এর সিংহভাগ) এমন এক বা একাধিক জনগোষ্ঠী দ্বারা অধ্যুষিত যারা একটি সংযোগকারী সংস্কৃতি বা একটি ‘ছাতার মতন’ সংস্কৃতির (umbrella culture) কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য এমন গভীরভাবে ভাগ করে নিত যে তাদের ‘ভারতী’ হিসেবে একটি সাধারণ নামে ডাকা যেত। সুতরাং রাজনৈতিক বা জাতিগতভাবে না হলেও, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে, ভারতীয়রা ছিল একটি জাতি।

ঠিক বিপরীত একটি অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ সিরিজের একটি খণ্ডে প্রকাশিত ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (The Imaginary Institution of India) শীর্ষক প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি বেশ বলিষ্ঠভাবে শুরুতেই নিচের বিবৃতিটি দেয়  : [৬]

যা আজকের ইতিহাসের এক নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা, যার বস্তুনিষ্ঠতা মানুষ সংরক্ষণ করতে পারে, ধ্বংস করতে পারে, তুলে ধরতে পারে, নির্মাণ বা ব্যবচ্ছেদ করতে পারে; এবং যার পক্ষে বা বিপক্ষের সমস্ত প্রচেষ্টায় এই বাস্তবতাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সেই ইন্ডিয়া কোনো আবিষ্কারের (discovery) বস্তু নয়, বরং একটি উদ্ভাবন (invention)। এমন বস্তুনিষ্ঠতা ঐতিহাসিকভাবে ঊনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী কল্পনার দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত হয়েছিল। (নজরটান সংযোজিত)

এই বিবৃতির পটভূমির বিশ্লেষণগত চর্চা কোনো প্রমাণযোগ্য সারবত্তাসম্পন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে নাই। সেকথা বাদেও প্রবন্ধটির দৃষ্টিভঙ্গিতেই কিছু প্রচ্ছন্ন পূর্বানুমান রয়েছে যেগুলো প্রশ্নের উদ্রেক করে: (১) ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতা’ হিসেবে জাতীয়তাবাদ এবং ‘ইন্ডিয়ার ধারণা’ – এমন দুটো বিষয়ের মধ্যে মধ্যে প্রবন্ধটি যে অপরিহার্য সমীকরণ টানে; (২) শূন্য থেকে ‘উদ্ভাবনের’ আলাপ যা কোনো পূর্ব-বিদ্যমান ধারণা ছাড়াই ইন্ডিয়ার ধারণা বিকশিত হওয়ার কথা বলে অথচ এই ধারণা হয়তো ভিন্ন ধরনের ‘নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’ হতে পারত (অনিবার্যভাবে ‘জাতীয়তা’ না বুঝিয়েও); এবং (৩) একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ও তার ইতিহাসের নির্মাণের সঙ্গে আধুনিক ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণার একটি ঔপনিবেশিক পরিসর উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে এবং পুরো ‘উদ্ভাবনটিকেই’ জাতীয়তাবাদী কল্পনার ওপর আরোপ করে। আসলে ‘প্রতিষ্ঠান’বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত না করেই স্থানিক পরিসর হিসেবে ইন্ডিয়ার প্রাক-জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মাধ্যমে প্রবন্ধটি মনে হয় ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণাকেই অস্বীকার করছে। কারণ প্রবন্ধটি ‘ইন্ডিয়ার নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’কে আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বাস্তবতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছে।

এ-ধরনের অস্বীকৃতি সি.এ. বেইলির ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন’ [৭] বইতেও উপস্থিত বলে মনে হয়, যেখানে ইন্ডিয়ার ধারণাকে ‘উদীয়মান জাতীয় চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগোলকে একটি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে ‘ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক তথ্য সংগ্রহের হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। বেইলি ইউরোপীয় এবং তাঁর ভাষায় ‘ভূগোলের হিন্দু ধারণায়নের’ মধ্যে পার্থক্যকে চিহ্নিত করেন। এই বৈপরীত্যের আলোকে ভারতবর্ষকে হিন্দু ‘পবিত্র’ স্থানিক-পরিসরের সমতূল্য হিসেবে চিত্রিত করেন। ম্যাথু এডনির মতে, ইন্ডিয়ার মানচিত্রায়ন ছিল প্রথমবারের মতো ‘একটি অবোধ্য দৃশ্যপটের [৮] দেশকে জ্ঞানের সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করার একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান… ভূগোলবিদরা কোম্পানির সাম্রাজ্যের স্থানিক চিত্র এবং সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও মৌলিক অস্তিত্ব তৈরি এবং সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।’ এডনি অবশ্য স্পষ্ট করে দেন, এই স্থান কোনো বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পরিসর ছিল না; ব্রিটিশরা যেভাবে ‘ইন্ডিয়াকে পরিবেশন’ করেছিল, তাতে করে এই ভূখণ্ডকে তাদের ‘ইন্ডিয়াতে’ পরিণত করেছিল। এই ভূখণ্ড কেবল তাদের প্রত্যক্ষ এবং শাসিত অংশটিকেই অন্তর্ভুক্ত করা ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ ছিল। [৯]

তাহলে, প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ের কী হবে? দৃশ্যত এই অবস্থানগুলোর মাঝামাঝি কোথাও অন্য অবস্থানও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরফান হাবিব জোরালোভাবে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, কেবল ভৌগোলিক একক হিসেবেই নয়, বরং এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ‘ভারতের’ ধারণাটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের দিকেই বিদ্যমান ছিল। সেক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উপস্থিত থেকে দেশটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করত। হাবিবের যুক্তিতে, ভারতের এই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই ছিল আল-বিরুনির কাছে ভারতকে একটি ‘সাংস্কৃতিক ঐক্য’ হিসেবে বোঝার ভিত্তি; এবং দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়া ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জোরদার হয়ে ‘১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বিজয় শুরু হওয়ার আগেই… জাতিসত্তার কিছু পূর্বশর্ত দৃশ্যত অর্জিত হয়েছিল… ভারত কেবল একটি ভৌগোলিক অভিব্যক্তি ছিল না। এই ভূখণ্ডকে একটি সাংস্কৃতিক সত্তা এবং রাজনৈতিক একক হিসেবেও দেখা হতো।’[১০]

হাবিবের অবস্থান অনুসরণ করলে প্রশ্ন জাগে, এমন একটি অতি-পরিনত ধারণা-ক্ষেত্রকে কেন পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের জন্য ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করতে হলো? এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করার জন্য বিরত না হয়েও যেকথা তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় সেকথা হলো: ইন্ডিয়া বা ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে সব আলোচনায় না হলেও অধিকাংশ আলোচনাতেই কোনো-না-কোনোভাবে ‘জাতি’ এবং ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রসঙ্গটি ঢুকে পড়ে। এই জট পাকানোটা হয়তো বোধগম্য, কিন্তু অনিবার্য নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় হিসেবে ‘ভারতবর্ষকে’ বেঁছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্য হলো ভারতবর্ষকে একটি ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত ধারণা হিসেবে বোঝা; বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে যারা ‘ভারতবর্ষের’ উল্লেখ করেছেন তারা কোন অর্থে ধারণাটিকে প্রকাশ করেছেন সেই প্রশ্ন ধরে তদন্ত করা; এবং এই তদন্তের ভিত্তিতে আদি ভারতের ইতিহাসতত্ত্বের জন্য ধারণাটির সম্ভাব্য তাৎপর্যময় প্রভাবের গভীরে পর্যালোচনা করা।

   

১. ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’

বিচিত্র সব উৎসে ভারতবর্ষের ধারণাটি খুঁজতে গিয়ে মনে রাখতে হবে যে আদি ভারতে এমন একটি লিখিতসূত্রভিত্তিক কালপর্ব ছিল যখন ভৌগোলিক অর্থেও ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি আদৌ উপস্থিত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, আদি টেক্সটগুলোতে উল্লেখ থাকত ‘জন’, অর্থাৎ মানুষ বা সম্প্রদায়ের। প্রাকৃতিক ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য, যেমন নদনদীর দ্বারা ‘জনদের’ অবস্থান সংজ্ঞায়িত হতো। এভাবে ঋগবেদে[১১] অন্যান্য জনদের পাশাপাশি ভরতদের উল্লেখ আছে। কিন্তু অন্যদের মতোই তারা কোনো সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থিতি হাজির করেনা। বৈদিক সাহিত্যের ‘ব্রাহ্মণ’ শ্রেণির টেক্সটগুলোতেই প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সাপেক্ষে বিভিন্ন স্থানিক দিক বা দিশার উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি অধ্যুষিত দেশ বা সেই স্থান যেখানে ‘জন’ বাস করে এমন পরিসর হিসেবে ‘জনপদ’ শব্দটিও প্রথমবারের মতো তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, শতপথ ব্রাহ্মণ ইত্যাদির মতো ব্রাহ্মণ টেক্সটগুলোতে আত্মপ্রকাশ করে। ‘দিশ’ বা দিকের তাৎপর্য, যা আমি পরে উল্লেখ করব, তা জনপদগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত; কারণ ‘দিশ’ সংজ্ঞায়িত করত জনপদগুলো কীভাবে অবস্থিত হবে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ এভাবেই বিভিন্ন অঞ্চল এবং যারা ওই অঞ্চলগুলোতে বাস করত ও শাসন করত তাদের নির্দিষ্ট করেছে; ইন্দ্রের ‘মহাভিষেক’-এর প্রেক্ষাপটে এই আবাহনটি এসেছে:

‘…এই পূর্ব দিকে (প্রাচ্যানাং দিশি), প্রাচ্যের মানুষদের (প্রাচ্যানাং রাজানঃ) যত রাজা আছেন, তাঁরা আধিপত্যের জন্য অভিষিক্ত হন; …অতএব, এই দক্ষিণ দিকে (দক্ষিণস্যাম দিশি), সাত্বতদের যত রাজা আছেন, তাঁরা সর্বপ্রধান শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন; …পশ্চিম দিকে (প্রতীচ্যাম দিশি), দাক্ষিণাত্য ও প্রতীচ্যের মানুষদের যত রাজা আছেন, তাঁরা স্ব-শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন… এই উত্তর দিকে (উদীচ্যাম দিশি), হিমবতের ওপারে উত্তর-কুরু ও উত্তর-মদ্রদের যে ভূমি (জনপদাঃ), তাদের রাজারা সার্বভৌমত্বের জন্য অভিষিক্ত হন… এই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য দিকের (ধ্রুবায়াং মধ্যমায়াং প্রতিষ্ঠায়াং দিশি), কুরু-পাঞ্চাল এবং বশ ও উশীনরদের যত রাজা আছেন, তাঁরা রাজত্বের জন্য অভিষিক্ত হন.. ’’[১২]

স্পষ্টতই, দেবতা ইন্দ্রের মহাভিষেকের পরিপ্রেক্ষিতে পার্থিব রাজাদের দিকগুলোর গণনায় ব্রাহ্মণ রচয়িতা অন্য দিকগুলোর তুলনায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য অঞ্চলের (মধ্যমা দিশ) জনপদগুলোর সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিতির পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনপদ অঞ্চলের বিন্যাস নিয়ে যে ব্রাক্ষণ্যবাদী বয়ানগুলোতে এই মধ্য অঞ্চলটিকেই কেন্দ্র (core) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখানে থেকে অন্য দিক বা দিশাগুলো (দিশ) ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হতো।

একটি দেশ, অথবা বরং বলা যেতে পারে, পার্থিব স্থানিক পরিসরে বিভিন্ন দিকে অবস্থিত জনপদগুলোকে ধারণ কারী একটি খণ্ডের ধারণা প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয় আদি বৌদ্ধ গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত ‘জম্বুদ্বীপের’ প্রসঙ্গে।[১৩] চারটি মহাদ্বীপের অন্যতম এই দ্বীপটি সুমেরু বা সিনরু পর্বতকে ঘিরে বিস্তৃত ছিল এবং একজন ‘চক্রবর্ত্তী’ বা সার্বভৌম শাসক দ্বারা শাসিত হতো। প্রকৃতপক্ষে, টেক্সটগুলো অনুযায়ী, কেবল জম্বুদ্বীপেই বুদ্ধ এবং চক্কবত্তীদের (চক্রবর্ত্তীদের) জন্ম হতো। মেত্তেয় বুদ্ধ (মৈত্রেয় বুদ্ধ) যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, তখন এই দ্বীপটি জনাকীর্ণ ছিল এবং এখানে চুরাশি হাজার নগর ছিল। ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’-এর লেখক মালালাসেকেরার মতে, যখন সিংহলদ্বীপ বা তাম্রপর্ণীদ্বীপ থেকে আলাদা করে দেখা হয়, তখন জম্বুদ্বীপ ভারত মহাদেশকে নির্দেশ করে। তবে, প্রতিটি চক্রবাল বা দিগন্তে একটি করে জম্বুদ্বীপ রয়েছে বলে অঙ্গুত্তরা-নিকায়ে উল্লেখ রয়েছে। ফলে জম্বুদ্বীপকে ভারতের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের ভূগোলের সঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এমন দ্ব্যর্থকতা সত্ত্বেও জম্বুদ্বীপের ধারণাটি টিকে ছিল এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারণার অংশে পরিণত হয়েছিল। কখনো এই স্থানিক পরিসর ভারতবর্ষের সমার্থক, আবার কখনো ভারতবর্ষ এই স্থানিক পরিসরের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসরের একটি স্থানিক বিবরণগত চিহ্ন হিসেবে হিসেবে যে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল, তা দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ের একটি সূত্রে । এই সূত্রে জম্বুদ্বীপকে এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে মানুষের সঙ্গে একসময় মেলামেশা না করা দেবতারা, এখন মানষের সঙ্গে মেলামেশা করেন।[১৪] অশোকের শাসিত জম্বুদ্বীপকে যদি বাস্তব ভৌগোলিক স্থানের সঙ্গে মেলানো হয়, তবে সেই স্থান আফগানিস্তান থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পরিসরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং উপমহাদেশের দক্ষিণাংশ বাদ পড়েছিল। জম্বুদ্বীপ এমন একটি বিশদ বিশ্বতত্ত্বীয় নকশার (cosmography) অংশ যেখানে পৃথিবী বিভিন্ন দ্বীপে বিভক্ত ছিল। আবার এই পরিসরে এক অর্থে একটি বাস্তব দেশের ধারণাও ছিল কারণ পরিচিত জনপদের নাম ও স্থানগুলো এর মধ্যে চিহ্নিত করা যেত।

ভারতবর্ষও একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের (schema) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু আমরা যখন এই ছকের একটি রূপরেখা তুলে ধরব তখন স্পষ্ট হবে যে, সেই রূপরেখাকেও একটি ভৌগোলিক স্থানিক কাঠামো হিসেবে ধরা যেতে পারে। এই কাঠামোর মধ্যে সময়ের পরিক্রমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গাঠনিক অঞ্চলকে (constituent regions) জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। শব্দটি প্রয়োগের প্রাথমিক পর্যায়ে মনে হয় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি সেসব অর্থ বহন করত না যেগুলো পরবর্তীতে এই শব্দগত ধারণার সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হয়েছিল। তখন এই শব্দ অস্পষ্টভাবে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করতে পারত। তবে স্থানিক পরিসরগত অর্থগুলোর ক্রম প্রসারণের ঐতিহাসিক পর্যায়গুলো স্পষ্ট নয়। কলিঙ্গ বা উপকূলীয় ওড়িশার রাজা খারবেল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে তাঁর শিলালিপিতে দাবি করেছিলেন [১৫] যে, তিনি তাঁর দশম রাজত্ববর্ষে ‘ভরদবস’ (ভারতবর্ষ) জয়ের জন্য বের হয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের মধ্যে একটি ছিল এই যুদ্ধযাত্রা। স্পষ্টতই, তিনি যখন শাসন করছিলেন তখন কলিঙ্গকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে দেখা হতো না। প্রকৃতপক্ষে, পুরাণগুলো যখন সংকলিত হচ্ছিল, তখনই কেবল ভারতবর্ষ একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক নকশার প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেক্ষেত্রে শব্দটি স্থানিক পরিসর ও সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর যে কাঠামোগত রূপরেখাকে বোঝাত সেটা বুঝতে হলে আমাদের এই ধরণের লিখিত/টেক্সচুয়াল প্রমাণের দিকেই ফিরতে হবে। যে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার একটি অংশ ছিল ভারতবর্ষ, সেই রূপরেখা কমবেশি একই চেহারায় বেশ কয়েকটি পুরাণে পাওয়া যায়।[১৬] মহাভারতের [১৭] দিগ্বিজয় আখ্যানের মতনই কিছু ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই পৌরাণিক নকশাগুলোতেই আমরা প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষ এবং সেটার বিভিন্ন স্থানিক খণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ বিকশিত ধারণার সাক্ষাৎ পাই। পৌরাণিক টেক্সটগুলোর সংখ্যা বিপুল আর স্বতন্ত্রভাবে প্রতিটি পুরাণ ধরে ধরে সেগুলোর উপাদানের নতুন করে তুলনা করার চেষ্টা করাও হবে অর্থহীন। তাই আমি নিজেকে ইতোমধ্যে বহুল-ব্যবহৃত বিষ্ণু-পুরাণের[১৮] টেক্সট উল্লেখ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানের সাপেক্ষে ভারতবর্ষ ধারণাটির ধারাবাহিকতা এবং বিস্তৃতকরণ উভয়কেই তুলনামূলকভাবে যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে আমি অন্য দুটি লিখিত উৎসের দিকেও নজর দেব: কালিদাসের রঘুবংশম্, বিশেষ করে রঘুর দিগ্বিজয় অংশটি;[১৯] এবং দশম শতকের টেক্সট রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা।[২০] লিখিত উৎসগুলো যথেষ্ট বিস্তৃত কালিক ব্যপ্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এই পর্যালোচনা কীভাবে পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা এবং সেগুলোর বিবরণগুলো কমবেশি প্রথাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই বিবরণীই দেয় না। বরং কীভাবে একই বিবরণের অর্থ হয়তো কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে সেই প্রসঙ্গেও আলোকপাত করে।

২. পুরাণে ভারতবর্ষ

বিষ্ণু-পুরাণের উপাদানগুলো নিয়ে আলাপের আগে পৌরাণিক প্রমাণের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। পৌরাণিক বিবরণগুলোকে ‘ভৌগোলিক বিবরণ’[২১] হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এগুলো ভারতের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পুরাণের সংশ্লিষ্ট অংশের একটি সেকশনকে ‘ভারতবর্ষ-বর্ণনম্’ বলা হয় ঠিকই। কিন্তু সেই বর্ণনা মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে জগতের একটি বিস্তৃত নকশার ভেতরেই থাকে। এই বর্ণনার মধ্যে মিশে থাকে সৃষ্টির গল্প, বংশলতিকা এবং স্থানিক পরিসরের অনিবার্য পারস্পরিক যুক্ততা উপস্থাপন করার জন্য বিশদ বংশবৃত্তান্ত, জগতের বৃহত্তর স্থানিক বিভাজনগুলোর গণনা এবং সেই স্থানিক বিভাজনে ভারতবর্ষের অবস্থান আর ভারতবর্ষের ভেতরের সমস্ত বিভাগের গণনা ইত্যাদি। সুতরাং ভারতবর্ষকে একটি ভৌগোলিক বর্গ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সেই বর্গের নির্দিষ্ট অবস্থানের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে রেখে বোঝপড়া করা  প্রয়োজন। সেটা না করে কেবল আগে থেকে ঠিক করা ভৌগোলিক নাম নির্বাচনের জন্য উপাদানটি অন্বেষণ করলে শব্দটির বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ গুলিয়ে যাবে। বিভিন্ন পুরাণের বিবরণে ভিন্নতা আছে এবং স্বতন্ত্র পুরাণের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা রয়েছে। সব পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা পরস্পরের সঙ্গে খাপ খায় না। তাসত্ত্বেও মহাকাব্য মহাভারত[২২] ছাড়া পুরাণগুলোই প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে ভারতবর্ষের গাঠনিক রূপ সম্পর্কে একটি উপলব্ধি তুলে ধরে। তাই যারা ভারতবর্ষের ধারণা এবং ভারতীয় ইতিহাসের জন্য এই ধারণার তাৎপর্য খুঁজছেন, তাদের জন্য পৌরাণিক উৎসগুলো অনুসরণ করা নিশ্চিতভাবেই সার্থক।

বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায় দ্বিতীয় অংশের প্রথম অধ্যায়ে, যার শিরোনাম জগৎ-সৃষ্টি-সম্বদ্ধ-ভারত-বংশ-কথনম’ (মহাবিশ্বের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ভরত বংশের বর্ণনা)। এখানে ‘ভরত-বংশ’ এবং ‘স্বয়ম্ভূ-বংশ’ ভিন্ন ভিন্ন নাম হলেও আসলে নামান্তরযোগ্য কারণ বংশলতিকাটি স্বয়ম্ভূ মনু থেকে শুরু হয়েছে। এই বংশলতিকায় মনুর সাত পুত্রকে সাতটি দ্বীপের (জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলী, ক্রৌঞ্চ, কুশ, শাক, পুষ্কর) দায়িত্বে রাখা হয়েছিল। এই সাতটি দ্বীপ মিলে একত্রে পৃথিবী (বসুন্ধরা) গঠিত হয়েছিল। বিষ্ণু-পুরাণের ‘ভারত-বংশ-কথনম’-এর পরে আসে ‘জম্বুদ্বীপ-বর্ণনম’ (জম্বুদ্বীপের বর্ণনা), তারপর ‘ভারত-বর্ষ-বর্ণনম’ (ভারতবর্ষের বর্ণনা), এবং তার পরে আসে ‘ষড়-দ্বীপ-বর্ণনম’ (ছয়টি দ্বীপের বর্ণনা)।

প্রিয়ব্রতের পুত্র আগ্নীধ্র শাসিত জম্বুদ্বীপ আবার নয়টি ভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘হিমবর্ষ’ আর পরে এই ভাগ ‘ভারত-বর্ষ’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে আর এর শাসনভার ন্যস্ত হয় নাভির ওপর। ঋষভের পুত্র ভরত এই বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং দেশটিকে ভারত নামে অভিহিত করা হয় সেই সময় থেকে যখন তাঁর পিতা এই অংশটি ভরতের হাতে অর্পণ করেন…’। ভরতের পরেও বংশলতিকা চলতে থাকে এবং ভারতবর্ষ নয়টি ভাগে (ভেদাঃ) বিভক্ত হয়। যখন তিনি প্রথম মন্বন্তরে সভাপতিত্ব করেছিলেন তখন যে স্থানের মাধ্যমে পৃথিবী জনাকীর্ণ হয়েছিল সেই স্থানটি ছিল স্বয়ম্ভূব মনুর সৃষ্টি।” [২৩]

বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার বিবরণী চলতে থাকে। তৃতীয় অধ্যায়টি শুরু হয় নিচের শ্লোকটি দিয়ে:

উত্তরম্ যৎ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্

বর্ষম্ তদ্ ভারতম্ নাম ভারতী যত্র সন্ততিঃ

শ্লোকটির একটি আক্ষরিক অনুবাদ হবে:

যে [বর্ষ] সমুদ্রের উত্তরে এবং তুষারাবৃত পর্বতের (হিমালয়) দক্ষিণে অবস্থিত, তাকে বলা হয় ভারত, যেখানে সন্ততিরা ভারতী নামে পরিচিত।

উপরে উদ্ধৃত শ্লোকটিতে নির্দেশিত ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের সম্ভাব্য অর্থ বিবেচনা করার সময় একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই বর্ণনা এমন একটি পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বুঝতে হবে যেখানে এই বর্ণনা কঠোরভাবে এবং সঠিকভাবে ভৌগোলিক নয়, বরং বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার। বিভিন্ন পর্বতমালার সঙ্গে যুক্ত পর্বত ও নদীর মতো প্রাকৃতিক স্থানিক বৈশিষ্ট্যবলি ভারতবর্ষকে অন্যান্য বর্ষ ও দ্বীপ থেকে আলাদা করায় এখানে এক ধরনের ভৌগোলিক অর্থ সঞ্চারিত হলেও। পর্বতমালাগুলোর প্রতিটি একেকটি ‘কুল-পর্বত’ (family mountain)। সেগুলো হলো—মহেন্দ্র, মলয়, সহ্য, শুক্তিমৎ, ঋক্ষ, বিন্ধ্য এবং পারিপাত্র; এবং এগুলো থেকে উৎপন্ন নদীগুলো বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়।

আবারও সেই ‘দিক’ নির্দেশনা মধ্যভাগ বা মধ্যদেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের কাঠামো গঠন করে। সুতরাং, যদিও ভারতবর্ষকে নয়টি বিভাগে বিভক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলোর সবকটি তাদের স্বতন্ত্র নামে নির্দিষ্ট, তবুও ‘দিক’ বা দিশাই নির্দেশ করে যে কীভাবে বিভিন্ন জনপদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বিন্যস্ত ছিল। বিষ্ণু-পুরাণ থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক:

ভারতের পূর্বে (পূর্বে) বাস করে কিরাতরা… পশ্চিমে (পশ্চিমে) যবনেরা; কেন্দ্রে (মধ্যে ভাগশঃ) বাস করে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্ররা, যারা যথাক্রমে যজ্ঞ, অস্ত্র, বাণিজ্য এবং সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত।

এখানে ‘দিক’ বা দিশা কেবল ভৌগোলিক অর্থে মধ্য অঞ্চলের কেন্দ্রিকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। বরং বিষ্ণু-পুরাণ (এবং অন্যান্য পুরাণও) যে সামাজিক ব্যবস্থাকে একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করত, সেটার সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রান্তীয় এলাকায় প্রচলিত ব্যবস্থার বৈপরীত্য বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। জনপদ সম্প্রদায়গুলোকে ভৌগোলিকভাবে স্থাপন করার প্রেক্ষাপটে মধ্য অঞ্চলের একই ধরনের কেন্দ্রিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এভাবেই, কুরু এবং পাঞ্চালদের মধ্য অঞ্চলে (মধ্যদেশ) বরাদ্দ করা হয়েছে; কামরূপদের পূর্বে (পূর্ব-দেশাদিক); সৌরাষ্ট্র এবং আভীরদের অপরান্তে (পশ্চিমে)  আর এভাবেই বাকিদেরও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের পরপর চারটি অধ্যায়ে (অথবা অন্যান্য প্রধান পুরাণে কখনো কখনো আরও বিশদভাবে) যেভাবে ভারতবর্ষকে একটি বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই ভঙ্গি থেকে এই উপস্থাপনার প্রকৃতি সম্পর্কে বেশ কিছু প্রসঙ্গ চিহ্নিত করা যেতে পারে।

প্রথমত, যেহেতু ভারতবর্ষ খুব স্পষ্টভাবে একটি অনেক বড় নকশার অংশ, সেহেতু পদ্ধতিগতভাবে এই ভূখণ্ডগত উপাদানকে একটি বাস্তব ভূখণ্ডগত একক হিসেবে চিহ্নিত করা এবং একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেওয়া অনুপযুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, ভারতবর্ষের কাঠামো নির্মাণে পুরাণ সংকলকরা সমসাময়িক ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সেই কাঠামোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সুতরাং ভারতবর্ষের নকশা করার সময় একটি স্থানিক পরিসরকে প্রথমে চারটি প্রধান দিকে ভাগ করে মধ্যখানে একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল রাখা আর তারপরে আরও সাত বা নয়টি ভূখণ্ডগত উপ-বিভাগ তৈরি করার মৌলিক মানচিত্রীয় রীতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছিল। এই রীতি অনুসরণ করে এই আদর্শায়িত স্থানিক পরিসরের অধিবাসীদের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে থাকা নিজ নিজ অঞ্চলে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। আদি লিখিত সূত্রগুলোর এই ভৌগোলিক জ্ঞান সবক্ষেত্রে অন্যান্য উৎস এবং বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের অবস্থান সম্পর্কে সমসাময়িক তথ্যের সঙ্গে মেলে না। যেমন বিষ্ণু-পুরাণেই পুণ্ড্র, কলিঙ্গ এবং মগধের সকলকে দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণের মানুষদের সঙ্গে একাকার করে ফেলা হয়েছে। পশ্চিম অঞ্চলের (অপরান্তাঃ) জন্য যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তাতে উত্তরাঞ্চলের কোনো উল্লেখ ছাড়াই শাকলবাসিন, সাল্ব, মদ্র, হূণ, সৈন্ধব এবং আরও অনেক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেভাবে বিবেচনা করলে এদের উত্তর অঞ্চলেই স্থাপন করা শ্রেয় হতো।[২৪] আদি লিখিত উৎসগুলোতে বিবৃত  ভারতবর্ষের বর্ণনাকে ভারতীয় ইতিহাসের ভূগোলের অনুরূপ বলে ধরে নেওয়ার আগে একথা মনে রাখা দরকার যে, এই টেক্সটগুলোর সংকলকদের কাছে হয়তো খুঁটিনাটি নির্ভুলতা নয়, বরং ভারতবর্ষের সামগ্রিক কাঠামো কল্পনা করা এবং সেই কাঠামোকে একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখায় খাপ খাওয়ানোই অধিকতর প্রাসঙ্গিক ছিল।

দ্বিতীয়ত, পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনাটি বংশলতিকার বিবরণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই বংশবিবরণী মহাবিশ্বের নকশার বিভিন্ন স্তরকে আবৃত করে রাখে আর এই বংশানুক্রমের শুরু হয় মনুর পুত্রদের দিয়ে এবং পৈতৃক সম্পত্তি সাত পুত্রের মধ্যে আদি ভাগাভাগির মাধ্যমে। বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনায় ‘ভারতী সন্ততিঃ’ অভিব্যক্তিটিকে তাই ‘ভরতের সন্তানের’ মতন অতিরঞ্জিত অর্থে গ্রহণ করা উচিত না। বরং সহজভাবে ‘ভরতের বংশে জন্ম নেওয়া সন্তান’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। বায়ু-পুরাণে একটি একই ধরনের অভিব্যক্তিতে এমন অর্থ স্পষ্ট করা হয়েছে:[২৫]

তৈর=ইদম্ ভারতম্ বর্ষম্ নব-ভাগৈর-অলংকৃতম্

তেষাং বংশ-প্রসূতৈশ=চ ভুক্তেয়ং ভারতী পুরা

এই ভারতবর্ষ, যেটা তার নয়টি অংশ দ্বারা অলংকৃত, অতীতে তাদের বংশে জাত এবং ভারতী নামে পরিচিতদের দ্বারা ভোগ করা হতো।

তৃতীয়ত, এই পৌরাণিক ভারতবর্ষের অর্থ যে ভৌগোলিক অর্থের বাইরেও বিস্তৃত ছিল, সে বিষয়টি জম্বুদ্বীপের অন্যান্য বর্ষ থেকে পরিসরকে আলাদা করার ধরনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন, অন্যান্য বর্ষে কোনো বিপর্যয় ছিল না, বার্ধক্য বা মৃত্যুর ভয় ছিল না, ধর্ম বা অধর্মের কোনো বোধ ছিল না, অথবা উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ বা যুগের বিভাজন ছিল না; কেবল ভারতবর্ষই বিভিন্ন যুগের অনুক্রমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। এই অঞ্চলেই কেবল ‘কর্ম’ সচল ছিল এবং এই কর্ম চারটি বর্ণের অস্তিত্ব দ্বারা চিহ্নিত হতো। অন্যান্য বর্ষগুলো ছিল ‘ভোগ-ভূমি’। কিন্তু ‘কর্ম-ভূমি’ হওয়ার কারণে ভারতবর্ষকে অন্য সব বর্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হিসেবে প্রক্ষেপ করা হয়েছে।

যেহেতু পুরাণের বর্ষ-প্রক্ষেপণ শাসকদের বংশলতিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল সেহেতু স্থানিক-পরিসরের আরেকটি প্রসঙ্গ বিবেচনা করা যেতে পারে। একজন সার্বভৌম শাসকের বা সার্বভৌম হতে ইচ্ছুক শাসকের কর্তৃত্ব বিস্তারের প্রসঙ্গে ‘দিগ্বিজয়’ বা ‘চক্রবাল জয়ের’ ধারণার ভিত্তিতে এমন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আমরা এখন অন্বেষণ করব কীভাবে এই পর্যালোচনা ভারতবর্ষের অর্থ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ায় আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে। বিশেষ করে কালিদাসের বংশলতিকামূলক কাব্য রঘুবংশমে চিত্রিত ইক্ষ্বাকু শাসক রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ বা ‘দিকজয়ের অভিপ্রায়ের’[২৬] উল্লেখ করে এই পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

৩. দিগ্‌বিজয় (দিগ্‌জিগীষা) বা চর্তুদিক জয়

কালিদাস যেভাবে রঘুর বিজয় অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে রঘুর যাত্রা শুরু হয় প্রথমে উল্লেখ করার রীতি অনুসারে পূর্ব (প্রাচী) দিক দিয়ে এবং তারপরে তাকে নিয়ে আসা হয় তাল গাছের কুঞ্জবন দিয়ে ঘেরা অন্ধকার সমুদ্রের তীরে। এই অঞ্চলে তিনি সুহ্মদের,[২৭] এবং নৌবহরসহ বঙ্গ রাজপুত্রদের মুখোমুখি হন;[২৮] এবং তারপর কপিশা নদী পার হয়ে[২৯] তিনি উৎকলের দিকে অগ্রসর হন।[৩০] আরও এগিয়ে, মহেন্দ্র পর্বতের চূড়া ছাড়িয়ে,[৩১] তিনি কলিঙ্গদের বশীভূত করেন।[৩২] এরপর সমুদ্রতট ধরে সেনাবাহিনী ঋষি অগস্ত্যের নেওয়া পথের দিকে (অর্থাৎ দক্ষিণে) যাত্রা করে। পরে তাদের কাবেরী নদী এবং মলয় পর্বতের উপত্যকায় নিয়ে যায়।[৩৩] এই অঞ্চলের অন্য যে ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো তাম্রপর্ণী নদী ও সমুদ্রের সঙ্গমস্থল,[৩৪] এবং ‘সেই অঞ্চলের স্তনযুগলের মতো’ (দিশস্তস্যাঃ) মলয় ও দরদুর পর্বত। সেখান থেকে আরও এগিয়ে রঘু সহ্য পর্বত অতিক্রম করেন। অপরান্ত[৩৫] এবং কেরালাকে বশীভূত করার পর রঘু ত্রিকূটের[৩৬] দিকে ধাবিত হন, যেখান থেকে স্থলপথে (স্থল-বর্ত্মনা) পারসিকদের দিকে যাত্রা করা হয়। একই প্রসঙ্গে যবনদেরও উল্লেখ করা হয়েছে।[৩৭] অশ্বারোহী হিসেবে পারদর্শী পশ্চিমা মানুষদের (পাশ্চাতৈঃ অশ্ব-সাধনৈঃ) সঙ্গে রঘুর প্রচণ্ড লড়াইয়ের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:[৩৮]

মৌচাক যেমন মৌমাছি দিয়ে ঢাকা থাকে, তেমনি তিনি তাঁর (ভল্ল) তীরের আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা দাড়িওয়ালা মাথা দিয়ে পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলেছিলেন। অবশিষ্টরা তাদের শিরস্ত্রাণ খুলে তাঁর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে।

যে দিকের অধিষ্ঠাতা কুবের রঘুর সেই উত্তর (উদীচ্য) দিকের যাত্রা তাকে হূণ[৩৯] এবং কম্বোজদের[৪০] বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরে আরও গমন তাকে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা এবং গঙ্গা নদীর উজান অংশে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি কিরাত এবং অন্যান্য পার্বত্য উপজাতির (পার্বতীয় গণ) মুখোমুখি হন। কৈলাস পর্বতের ওপারে এবং লৌহিত্য নদী পার হয়ে রঘু প্রাগজ্যোতিষ এবং কামরূপ রাজ্যে পৌঁছান; এবং তাদের বশীভূত করার মাধ্যমেই রঘুর দিগ্বিজয় সম্পন্ন হয়। চার দিকের এই বিজয় ছিল ‘বিশ্বজিৎ’ (বিশ্বজয়) যজ্ঞ করার পূর্বপ্রস্তুতি। দিক বা ‘দিশ’ জয় এবং যজ্ঞ সম্পাদনের মাধ্যমে রঘুর সার্বভৌম শাসকের মর্যাদা অর্জন সম্পন্ন হয়। এই মর্যাদা সকল ‘জিগীষু’ শাসকের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা।

রঘুবংশমের উপাদানগুলো সংক্ষেপিত করার আমার এই চেষ্টার প্রধান প্রাসঙ্গিকতা হলো চারটি ‘দিশ’ বা দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ভূগোল এবং সেই স্থানিক পরিসরের সম্মিলন যেটির উপর একজন আদি ভারতীয় সম্রাট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের বাসনা করতেন। এই ধারণাটি ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ নামের আরেকটি অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে, বিশুদ্ধ ‘ভৌগোলিক’ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের যা আকর্ষণ করে তা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রাকৃতিক বিভিন্ন চিহ্ন এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের উল্লেখ। এগুলো প্রতিটি ‘দিশ’-এর সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত। সুবিধার জন্য, এই চিহ্নগুলো ও উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের বিবরণ একটি সারণি আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে।[৪১]

রঘুবংশমের এই বিবরনীগুলো ভারতবর্ষের ভূখণ্ডের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যাবলিকে উপস্থাপন করার দাবি করে না। তবে এখানেও একই মূখ্য-ধারণা হিসেবে ‘দিশ’ বা দিক ব্যবহার করা হয়েছে। কালিদাসের উদ্দেশ্য কঠোরভাবে ভৌগোলিক নির্ভুল বর্ণনা প্রদান করা ছিল না। বরং একজন সার্বভৌম-পদপ্রার্থী শাসককে যে স্থানিক পরিসরটি অতিক্রম করতে হতো তার রূপরেখা উপস্থাপন করা ছিল তার লক্ষ্য। কিছু কিছু স্থানের অবস্থানগত স্বেচ্ছাচারিতা সহজেই শনাক্ত করা যায়। যেমন, কলিঙ্গের পরেই কেবল দক্ষিণ অঞ্চলের ইঙ্গিত দেওয়া; মলয়ের সঙ্গে নয় বরং সহ্য বা পশ্চিমঘাটের পরেই কেবল কেরালার উল্লেখ; প্রাগজ্যোতিষ থেকে কামরূপকে আলাদা করা এবং রঘুর ‘উদীচ্য’ বা উত্তরের বিস্তৃত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান নির্দেশ করা। পুনরায় বলা যেতে পারে যে, কালিদাস ভৌগোলিক নির্ভুলতার চেয়ে রঘুর ভ্রমণসূচিকে চার দিকের মূল ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, পূর্ব দিক দিয়ে শুরু করে ‘দিশ’-এর ধারণা ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে প্রাগজ্যোতিষ ও কামরূপে (যাদের সঠিকভাবেই প্রাচ্য বা পূর্বে স্থাপন করা উচিত) এই ভ্রমণসূচি শেষ করে কালিদাস কৌতূহলদ্দীপকভাবে চার দিকের ধারণাকে একজন সার্বভৌম শাসকের কর্তৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় স্থানিক পরিসর ঘিরে একটি বৃত্তাকার যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একথাও বলা যেতে পারে যে, চারটি প্রধান দিকের বিদ্যমান ভৌগোলিক জ্ঞান, এই দিকগুলোর সাপেক্ষে প্রধান ভৌত ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যাবলি (সমুদ্র, পর্বত, নদী) এবং সেগুলোর সাপেক্ষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবস্থানকে রঘুবংশম পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করেছে। রঘুবংশমের বর্ণনার অতিরিক্ত তাৎপর্য রয়েছে। এই বিবরণী বিভিন্ন স্থানিক অবস্থানের স্বতন্ত্র ধরণের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে এক ধরণের পরিচিতি প্রদর্শন করে। কালিদাসের উপাদানের [কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য] আবারও বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে যখন আমরা ভারতবর্ষের ধারণা সংক্রান্ত আমাদের অনুসন্ধানগুলোর সারসংক্ষেপ করব।

এখন আমরা পরবর্তী সময়ের একটি লিখিত সূত্রের দিকে নজর দিতে পারি। এই গ্রন্থ নবম-দশম শতাব্দীর দিকে রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থটির উপজীব্য ও উদ্বেগের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের হলেও, এখানেও ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্রের’ (অর্থাৎ ‘যিনি বাধাহীনভাবে চলাচল করেন তাঁর ক্ষেত্র’) সঙ্গে সম্পর্কের নিরিখে ভারতবর্ষের সেই আদি ধারণাটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং একভাবে পুনর্ব্যক্তও করে।

৪. একটি সমন্বয়ী প্রচেষ্টার অনুশীলন? রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা

পুরাণগুলিতে বর্ণিত ভারতবর্ষের ধারণাটি ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং ‘জনপদ’ নিয়ে গঠিত। আবার কালিদাসের দিগ্বিজয় সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত অথচ চিত্তাকর্ষক বর্ণনায় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার না করেই সেই একই ভূখণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই ধারণাটি ধীরে ধীরে কমবেশি একটি প্রথাবদ্ধ রূপ ধারণ করছিল, যদিও স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলিতে এর কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লক্ষ্য করা যায়। রাজশেখরের ‘কাব্যমীমাংসা’ (কাব্যের আলোচনা) গ্রন্থে ‘দেশ-বিভাগের’ প্রসঙ্গটি এসেছে ‘জগৎ’ এবং ‘ভুবন’ শব্দ দুটির অর্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরেই। এর কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন: (১) সমগ্র জগৎ বা ভুবন, কিংবা তার একটি অংশবিশেষও ‘দেশ’ বোঝাতে পারে; এবং (২) দেশ ও কাল নিয়ে কারবার করার সময় একজন কবির ‘অর্থদরিদ্রতা’ (বোঝাপড়ার দৈন্য) থাকা উচিত নয়।

‘দেশ’ নিয়ে এই আলোচনার প্রেক্ষাপটেই রাজশেখর ভারতবর্ষের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বহু ভুবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা থাকলেও, ‘ভূলোক’ বলতে পৃথিবীকেই (পৃথ্বী) বোঝায়, যা সাতটি দ্বীপে বিভক্ত। রাজশেখর যদিও বহু মতামতের উল্লেখ করার রীতি মেনে চলেছেন, তবু তিনি মূলত ভারতবর্ষের পৌরাণিক কাঠামোটিই অনুসরণ করেছেন। বিশেষত বায়ু-পুরাণের বিশদ বর্ণনাকে। তিনিও ভারতবর্ষকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ‘জনপদ’ বা এলাকাগুলিকে বিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি দিক-নির্দেশনাকারী প্রথার ওপরই নির্ভর করেছেন। রাজশেখরের রূপরেখায় একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে অভিনব। এক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দু নির্দেশ করেছেন যে-বিন্দু থেকে বিভিন্ন দিকের শুরু হয়। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় বা মূল অঞ্চলটি হলো সুসংজ্ঞায়িত ‘আর্যাবর্ত’, যে-জায়গাটি আবার ‘মধ্যদেশের’ সমতুল্য। ভৌগোলিকভাবে তিনি এই স্থানিক পরিসরের সীমানা নির্ধারণ করেছেন পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের মধ্যবর্তী এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে।

প্রতিটি দিকের (দিশ) সূচনা ঠিক কোথায় সেটা আর্যাবর্তের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট করতে গিয়ে রাজশেখর যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তাতে স্পষ্টতই কিছু স্থানিক পরিসরের একের অপরের উপরে উঠে পড়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।   বিশেষত যখন রাজশেখর মত দেন যে, কারো কারো কাছে দিক-বিভাগ পরিবর্তনশীল মনে হলেও, ‘অন্তর্বেদী’ থেকে এবং কান্যকুব্জকে (কনৌজ) অনেকটা মধ্যরেখা (meridian) হিসেবে ধরে এই ভৌগোলিক বিভাজন করা সম্ভব।[৪২] যেহেতু আর্যাবর্ত এবং অন্তর্বেদী (যমুনা ও গঙ্গার মধ্যবর্তী অঞ্চল) উভয়কেই দিক নির্ণয়ের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে সকল দিক-নির্দেশনা কেন্দ্রের সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে মিশে যাচ্ছে বা ওভারল্যাপ করছে।

উদাহরণস্বরূপ, যদিও আর্যাবর্তকে পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্র এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, রাজশেখরের মতে ‘পূর্বদেশ’ শুরু হচ্ছে বারাণসীর পূর্ব দিক থেকে; ‘পশ্চাদ্দেশ’ (পশ্চিম অঞ্চল) শুরু হচ্ছে দেবসভা থেকে; ‘দক্ষিণাপথ’ (দক্ষিণ অঞ্চল) মাহিষ্মতী থেকে এবং উত্তর অঞ্চল শুরু হচ্ছে ‘পৃথুদক’ থেকে।[৪৩] এই অসংগতি সত্ত্বেও, একটি বাস্তব ভৌগোলিক বিন্দুর (যেমন বারাণসী, মাহিষ্মতী, পৃথুদক ইত্যাদি) সাপেক্ষে একটি দিকের (দিশ বা দিক) কাঠামোর বিশদ বিবরণ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি দিকের সূচনা নির্দিষ্ট করতে এবং সেই দিকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক স্থাপনে এই বিন্দুগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হতো।

স্বতন্ত্র দিকগুলোর কাঠামো নিয়ে রাজশেখরের বিস্তারিত আলোচনায় তিনটি প্রধান পৌরাণিক উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়: জনপদগুলোর তালিকাভুক্তিকরণ, ওই দিকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পর্বতমালা এবং সেখান থেকে প্রবাহিত নদীসমূহের উল্লেখ। প্রত্যাশিত কিছু ভিন্নতা থাকলেও, সমস্ত দিকের বর্ণনায় এই ছকটি উপস্থিত। তবে রাজশেখর এগুলোর সঙ্গে বাড়তি যা যোগ করেছেন, তা হলো কালিদাসের ঢঙে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত প্রাকৃতিক পণ্যের তালিকা। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক : উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল)-এর বর্ণনায় সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সেখানে উৎপাদিত পণ্যগুলোর (উৎপাদিতঃ) কথাও বলা হয়েছে: যেমন সরল ও দেবদারু গাছ, দ্রাক্ষা (আঙ্গুর), কুঙ্কুম (জাফরান), চামর, মৃগ-চর্ম (হরিণের চামড়া), সৈন্ধব-লবণ (খনিজ লবণ), সৌবীর (?), স্রোতোঞ্জন (?), বৈদুর্য (মনিবিশেষ) এবং তুরঙ্গ (ঘোড়া)। এই তালিকাটি যে সর্বাঙ্গীন বা এমনকি নির্ভুল হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে অন্য অঞ্চলের থেকে ওই অঞ্চলকে আলাদা করার জন্য তা যথেষ্ট।

রাজশেখর জম্বুদ্বীপ, ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের নয়টি ভাগের উল্লেখ প্রসঙ্গে ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’[৪৪] (সার্বভৌম শাসকের ক্ষেত্র বা স্থান) ধারণাটির অবতারণা করেছেন। রাজশেখরের মতে, কুমারীপুরা থেকে বিন্দুসরোবর পর্যন্ত হাজার যোজন বিস্তৃত এই ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ হয়তো নিখুঁত ভৌগোলিক মাপে পরিমাপযোগ্য নয়; কিন্তু ভারতবর্ষের ধারণার মধ্যে এই ধারণাটির তাৎপর্য হলো ওই নির্দিষ্ট স্থানিক পরিসরের সঙ্গে ভারতবর্ষের সংযোগ স্থাপন। দিক-বিভাগের বিষয়ে রাজশেখরের ধারণার আরও অনেক মাত্রা আছে, যেগুলো বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার প্রয়োজন নেই। পৌরাণিক উপাদানের পুনরাবৃত্তি এবং তার সঙ্গে নতুন সংযোজনের মাধ্যমে রাজশেখর মূলত পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যেই ভারতবর্ষের একটি নকশাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর উপস্থাপনায় এই ধারণা বংশলতিকার সঙ্গে যুক্ততা থেকে মুক্ত। ভবিষ্যৎ রচয়িতাদের কাছে হয়তো তাদের নিজস্ব প্রসঙ্গগুলোকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই ধরণের নকশা বেশ উপযোগী বলে মনে হয়েছিল।

 

৫. ভারতবর্ষের অর্থের ব্যঞ্জনা

কালানুক্রমিকভাবে ভিন্ন তিন ধরনের লিখিত সূত্রে ভারতবর্ষ এবং এর ধারণার সঙ্গে যুক্ত বৈশিষ্ট্যের যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে দুটি বিষয় সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব: প্রথমত, যারা এ বিষয়ে লিখেছিলেন তারা ভারতবর্ষকে কীভাবে দেখতেন; এবং দ্বিতীয়ত, তাদের সেই উপলব্ধির বিবর্তন কীভাবে ঘটেছিল। একথা স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষকে নিজে থেকেই একটি সুসংজ্ঞায়িত ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে দেখা হতো না। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আদিতম উল্লেখ থেকে যেকথা বোঝা যায় তা হলো পরবর্তীকালে যে স্থানিক-পরিসর ও ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে ভারতবর্ষ শুরুতে সেই ধারণার অংশমাত্র ছিল। সম্ভবত এই স্থানিক ধারণা ভরতদের ‘জনপদের’ সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যেমনটা ছিল কুরু, কোশল, মগধ, বৎস এবং আরও অনেকগুলো জনপদের ক্ষেত্রে।

প্রকৃতপক্ষে, ‘ভারতবর্ষ‘  নয় বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসতি বা বাসস্থানকে সংজ্ঞায়িত করত ‘জনপদ’ শব্দটি। ভারতবর্ষের অর্থের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র জনপদগুলি এসব অর্থেরই বিভিন্ন ‘স্থানিক-সামাজিক’ উপাদানে পরিণত হয়। এই বর্ধিত কাঠামোতে সেই সব জনপদের অবস্থান নির্দিষ্ট করা হতো মধ্যদেশের সাপেক্ষে সেগুলোর ‘দিশ’ বা দিকের ভিত্তিতে।

‘দিশের’ এই মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ভারতবর্ষের বিকশিত ধারণাটি একটি দেশের (দেশ) রূপ লাভ করে, যা আদতে ‘দিশ’ শব্দ থেকেই উদ্ভূত। তবে, এই দেশটি ছিল উন্মুক্ত-প্রান্তবিশিষ্ট, ভৌগোলিকভাবে আবদ্ধ বা ঘেরা নয়। যদিও পুরাণগুলোতে হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষকে ভৌগোলিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও বিভিন্ন দিকের জনপদ এবং জাতিগত সম্প্রদায়গুলো কখনোই এই ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মিলেমিশে যায় নাই।

উদাহরণস্বরূপ, রাজশেখরের সাক্ষ্য অনুযায়ী, উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল) শুরু হচ্ছে পৃথুদকের (বর্তমান হরিয়ানা) ওপার থেকে। সেখানে শক, কেকয়, ভোক্কান, হূণ, বাণায়ুজ, কম্বোজ, লিম্পক, তঙ্গণ, তুরুস্ক, তুষার এবং আরও অনেক সম্প্রদায়ের বাস। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ‘দিশ’ বা দিক ছিল একটি স্থিতিস্থাপক ধারণা। কোনো অনমনীয় ভৌগোলিক সীমানা নয়। যদিও জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে আবদ্ধ স্থানের (সীমানা বোঝাতে ‘মর্যাদা’ বা ‘সীমা’) ধারণাটি বেশ প্রচলিত ছিল। একইভাবে, রাজশেখর এবং অন্যান্য অনেক সূত্রে সিংহল বা শ্রীলঙ্কাকে দক্ষিণ অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য লিখিত উৎস [৪৫] থেকেও এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেগুলো একথা স্পষ্ট করে দেয় যে, এমনকি এর বিবর্তিত অর্থেও অতীতে ভারতবর্ষকে কখনো এমন কোনো সংহত ও জমাটবদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হয়নি, যে দেশের ভিত্তিতে এখানকার অধিবাসীদের চিহ্নিত করা হবে, অথবা তারা নিজেরা সেই পরিচয়ে পরিচিত হবে।

সুতরাং, একটি উন্মুক্ত পরিসরের দ্যোতক হিসেবে ভারতবর্ষ ছিল একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার অংশ। অন্তত পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্ব এবং পৌরাণিক বিশ্বচিত্রের (যদি এই শব্দটি ব্যবহার করা যায়) ক্ষেত্রে সৃষ্টির আখ্যান এবং রাজকীয় বংশলতিকা (যার একটি অংশ হলো ভরত বংশ) ছিল এই ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে, ভারতবর্ষের ধারণাটি স্থবির ছিল না। পুরাণগুলি যেখানে কেবল বিস্তৃতি, পর্বত এবং নদনদী দিয়ে ভারতবর্ষের পরিসরের কাঠামো ব্যাখ্যা করেছে, সেখানে কালিদাসের লেখায় স্থানীয় বিচিত্র সম্পদের সঙ্গে পরিচয়ের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাজশেখর তাঁর ‘দেশ-পরিচয়’ অধ্যায়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন দিকের বর্ণনায় যে স্থানীয় পণ্যের উল্লেখ করেছেন, সেটাও এই ধারারই অংশ। বসতি অঞ্চল, পর্বত ও নদীর অবস্থান সংক্রান্ত ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এবং সেই জ্ঞান ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, কালানুক্রমিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণগুলো বিচার করলে দেখা যায় ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’, সেটা থেকে ‘বর্ষ’ এবং শেষে ‘দেশ’-এর ধারণায় পৌঁছানের একটি ক্রমরূপান্তর লক্ষ্য করা সম্ভব।

তাই ভারতবর্ষ কোনো ‘পবিত্র স্থান’ ছিল না। আবার এডনি যেমনটা বলেছিলেন, এই পরিসর কোনো ‘অবোধ্য দৃশ্যপটও’  ছিল না। জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত একটি ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষের আরেকটি অর্থ খোঁজা যেতে পারে। এই ভূখণ্ড এমন একটি স্থান যেটা ‘কর্মের’ নীতি দ্বারা শাসিত। আর এই পরিসর সেই স্থান যেখানে অধিবাসীরা চার বর্ণে বিভক্ত ছিল।[৪৬] এখানেও ‘দিশ’ বা দিকের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ‘মধ্যদেশ’ বা ‘আর্যাবর্ত’ ছিল সেই কেন্দ্রীয় অঞ্চল যেটা একটি আদর্শ হিসেবে বিরাজ করত। রাজশেখরের ভাষায়: ‘এখানে চারটি বর্ণ এবং চারটি আশ্রমের বিধান প্রচলিত। এটাই সদাচারের মূল।’ আর্যাবর্ত থেকে নৈকট্য বা দূরত্ব নির্দেশ করত ওই আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা; যেমন মনু আর্যাবর্তের বাইরের জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ পর্যায়ে ফেলেছিলেন।[৪৭]

ভারতবর্ষকে যেহেতু একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং চারটি প্রধান দিকের (যা আরও প্রসারিত হয়ে সাত বা নয়ে দাঁড়াতে পারে) সমষ্টি হিসেবে এবং সেগুলোতে অবস্থিত বিভিন্ন জনপদের সমাহার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, সেহেতু বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর আত্ম-পরিচয় (এবং অন্যদের দ্বারা তাদের পরিচিতি) নির্ধারিত হতো তাদের নিজ নিজ জনপদের ভিত্তিতে। ভারতবর্ষের ভিত্তিতে নয়। একজন ব্যক্তি নিজেকে মগধ, কোশল, দ্রাবিড়, কোঙ্কণ বা অবন্তীর অধিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে পারতেন; অথবা গান্ধার, কুরু বা মদ্র থেকে আগত হিসেবে তাকে সম্বোধন করা হতো। কিন্তু কখনোই ‘ভারতবর্ষ থেকে আগত’ হিসেবে নয়।[৪৮] সুতরাং, জনপদগুলোকে বাদ দিলে ভারতবর্ষের অর্থ খুব একটা দাঁড়াত না। সেকারণেই পূর্ণ বিকশিতই হোক বা অঙ্কুরোদগমশীল হোক, ভারতবর্ষ আমাদের আদি জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কি না সেই প্রশ্নটি তোলা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক।[৪৯] ভারতবর্ষের ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বদেশ’ (নিজের দেশ) বা ‘বিদেশ’ (ভিন দেশ) শব্দগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই ভারতবর্ষের আদি অর্থ আলোচনা ও বোঝা সম্ভব। ভারতবর্ষের ব্যঞ্জনায় ‘সীমানা’ (border), ‘সীমান্ত’ (frontier) বা ‘বিদেশির’ ধারণা অনুপস্থিত ছিল। তাই মনে হয় প্রাথমিক উৎসগুলোতে ঘন ঘন হানা ও আক্রমণের উল্লেখ এবং সেগুলোর নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের কথা থাকা সত্ত্বেও ‘আক্রমণের জুজু’ এবং ভারতীয় সমাজে গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অনুঘটক হিসেবে ‘বিদেশিদের’ উপস্থিতির বয়ান আদি ভারতীয়দের ভারতবর্ষ ও সমাজকে দেখার অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আক্রমণ ‘নিজ/আত্ম’ এবং ‘অপরের’ মধ্যে বিভাজন তৈরি করেনি। ভারতীয় সমাজের প্রধান বিভাজন রেখাটি দেখা হতো ‘বর্ণের’ দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বিভাজন ভেতরে থাকা এবং বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে সর্বপ্রধান পার্থক্যটি তৈরি করে দিত।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন যেভাবে ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলোকে ব্যবহার করেছিল সেটা এই স্থানিক ধারনার আদি অর্থ থেকে একটি নিশ্চিত বিচ্যুতি চিহ্নিত করে। একটি মানচিত্রায়নযোগ্য, সংহত, অনড় আঞ্চলিক সত্তা হিসেবে পরিচয়কে জমাট বাঁধিয়ে সেটিকে অতীতের ওপর ছুড়ে দেওয়া হলো। যেটি ছিল উন্মুক্ত, সেটি এখন হয়ে উঠল প্রশাসনিকভাবে সংজ্ঞায়িত একটি আবদ্ধ দেশ।[৫০] এই স্থানিক এককটি একটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত দেশের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এমনভাবে যেভাবে আগে কখনো ছিল না। এবং এই বদলের পেছনে লুকিয়ে আছে অতীতের বিশাল পরিসর জুড়ে ‘বিদেশি’, ‘বিদেশি আক্রমণ’, ‘অন্ধকার যুগ’ এবং অনুরূপ অশনিসংকেতের ধারণাগুলোর অনুপ্রবেশ। ভারতবর্ষের এই নবনির্মিত গণ্ডীবন্ধ সত্তাটি কেবল একটি সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই ক্ষান্ত হলো না; কালবিভ্রান্তিদোষের/অ্যানাক্রোনিজম’ বিপদ সম্পর্কে অসচেতন অনেক উৎসাহী হাতের ছোঁয়ায় এই ভূখণ্ড একটি ‘ইন্ডিয়া নেশন স্টেট’ বা ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের আসন হয়ে উঠল। আমাদের ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলোতে রাজনৈতিক একীকরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ ও অনৈক্যের ভীতির ওপর যে জোর দেওয়া হয়, তার কারণ এভাবেই বোঝা সম্ভব।

ভারতবর্ষের প্রাক-ঔপনিবেশিক অতীতকে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলিম’—এই দুই ভাগে তীক্ষ্ণভাবে ভাগ করার যে কালানুক্রমিক বিভাজন আমাদের ইতিহাসচর্চায় গভীরভাবে গেঁথে আছে (যা আজও কার্যকরভাবে নির্মূল করা যায়নি), সেই বিভাজন অতীতের একটি নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছে। এই বিভাজন আগে ভারতীয় চিন্তায় উপস্থিত ছিল না। এমন বিভাজন ‘হিন্দু শাসন’ এবং ‘মুসলিম শাসনের’ প্রক্ষেপণের জন্য দশা তৈরি করে দিয়েছে, যেন রাজনৈতিক আধিপত্য এক জাতি থেকে অন্য জাতির কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব বয়ান ‘ইন্ডিয়া’ এবং বিশেষত ‘ভারতবর্ষ’, উভয় ধারণারই একটি অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পৈশাচিক অপব্যাখ্যা (diabolical misconstruction)। অতীতের ভারতবর্ষ এমন একটি ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল যা একটি কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন স্থানিক পরিসর এবং সেগুলোর সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করতে পারত; যে কাঠামোতে আদর্শ (ideal) এবং সেই আদর্শ থেকে ভিন্নতা (variants), উভয়ই জায়গা করে নিতে পারত। ঔপনিবেশিক যুগে সৃষ্ট ভারতবর্ষের সঙ্গে একীকৃত ‘ইন্ডিয়া’র ধারণাটি একটি বোঝা হিসেবে আমাদের বইতে হচ্ছে। সম্ভবত আমাদের ক্রমবর্ধমান নব্য-জাতীয়তাবাদী যুগে এই বোঝাকে আরও অলংকৃত করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।

 

৬. আলাপের সংক্ষিপ্তসার

ইতিহাসবিদরা দীর্ঘকাল ধরে শিলালিপিকে অতীত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন; তাই এই ধরনের প্রমাণের দিকে সংক্ষেপে দৃষ্টিপাত করে আমি ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে আমার শেষ বক্তব্যটি উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। এই শেষ অংশের জন্য নির্বাচিত শিলালিপিগুলো মোটামুটি দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যেকার। এই কালানুক্রমিক ব্যাপ্তিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কালপর্বকে ক্রমবর্ধমানভাবে সেই সময়কাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে যেটাকে ভারতের আঞ্চলিক বিভাজনগুলো দানা বাঁধার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।[৫১] দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে  নির্বাচিত এই শিলালিপিগুলো ইঙ্গিত দেয় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন জনবসতি কেন্দ্র ও অন্যান্য ভূসংস্থানিক চিহ্ন নিয়ে গঠিত একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় পরিসর বা অঞ্চল ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করত।

 

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: উত্তর কর্ণাটক থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রকূট আমলের দশম শতাব্দীর (৯২৯-৩০ খ্রিষ্টাব্দ) একটি শিলালিপি,[৫২] যেখানে ‘পুরিকর’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ করে সেই পরিসরকে ‘ভারতমহীমণ্ডলের’ ‘আভরণ’ (অলংকার) হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি ছোট লোকালয় বা স্থানের জন্যেও ‘ভারতমহীমণ্ডল’ ছিল একটি স্থানিক উল্লেখযোগ্য চিহ্ন। কোনো স্থানিক পরিসরের এমন কোনো চিহ্ন সাপেক্ষে উল্লেখ বিভিন্ন উৎসে অপরিহার্য নিয়মিততাকেই প্রকাশ করে। কর্ণাটকের বেলারী জেলা থেকে প্রাপ্ত দ্বাদশ শতাব্দীর (১১৮১ খ্রিষ্টাব্দ) কুর্গোদ শিলালিপি[৫৩] ‘কুন্তল’ দেশকে ‘ভারতক্ষেত্রে’ অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছে, যে ক্ষেত্র আবার গভীর সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত জম্বুদ্বীপের একটি অংশ।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের অন্ধ্র থেকে প্রাপ্ত কিছু শিলালিপিতে এই বিষয়বস্তুটি আরও বিশদভাবে ব্যক্ত হয়েছে। সেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে উল্লেখ করার পর, তার স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এবং পবিত্র স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার জন্য সেই বর্ণনাকে আরও ভেঙ্গে ভেঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরী জেলার পিঠাপুরম এলাকা থেকে প্রাপ্ত চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের এক গুচ্ছ তাম্রশাসনে [৫৪] দক্ষিণ সমুদ্র থেকে ‘পর্বতরাজ’ (হিমালয়) পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমিকে ‘ভারতবর্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরো যোগ করা হয়েছে: ‘তার মধ্যেই অবস্থিত অন্ধ্রদের ভূমি, যা তিনটি বিখ্যাত মন্দিরের (লিঙ্গ) সঙ্গে যুক্ত থাকায় ‘ত্রিলিঙ্গ-ভূমি’ নামেও পরিচিত; যথা—শ্রীশৈল, কালেশ্বর এবং দ্রাক্ষারাম… সেখানেই রয়েছে দক্ষ, অমর, ক্ষীর, কুমার এবং প্রাচ্য নামক পাঁচটি উদ্যান, শিবের ক্রীড়াভূমি এবং গৌতমী, কৃষ্ণবেণী, মালপ্রভা, ভীমরথী ও তুঙ্গভদ্রার মতো পবিত্র নদীসমূহ। রয়েছে কৃষ্ণা নদীর তীরে অবস্থিত শ্রীকাকুল, যে স্থান তিন ভুবন রক্ষার জন্য বিষ্ণুর (শ্রীবল্লভ) আবাসস্থল।’

মনে হয়, স্থানীয়ভাবে বা অঞ্চলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা জনবসতি বা ধর্মীয় ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সেই মহাকাব্যিক-পৌরাণিক ধারণার আবাহন ছিল মূলত ‘মূল্য-আরোপণ’ বা গরিমান্বিত করার একটি কৌশল। অর্থাৎ, একটি সর্বজনস্বীকৃত মহাজাগতিক পরিসরগত চিহ্নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো; ঠিক যেভাবে একটি নতুন রাজবংশ কোনো মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বংশলতিকার সঙ্গে নিজেদের জুড়ে দিয়ে নিজেদের মর্যাদার বৈধতা খুঁজত।[৫৫] একই অঞ্চলের চতুর্দশ শতাব্দীর আরেকটি শিলালিপির জম্বুদ্বীপ, নয়টি খণ্ড (বিভাগ) এবং হিমালয়ের দক্ষিণে ও সমুদ্রের উত্তরে অবস্থিত ভারতবর্ষের বর্ণনায় একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় : ‘এই স্থান (ভারতবর্ষ) হলো সেই স্থান যেখানে কর্ম ফলদায়ক হতো, যেখানে বিভিন্ন ভাষা ও প্রথা প্রচলিত ছিল[৫৬] এবং যে পরিসর বহু দেশে বিভক্ত ছিল। সেগুলোর মধ্যে একটির নাম তিলিঙ্গ, যেখান দিয়ে বহু পবিত্র নদী প্রবাহিত, যেখানে ছিল বহু সমৃদ্ধ নগরী, সুন্দর পর্বতমালা, দুর্ভেদ্য অরণ্য, গভীর জলাশয় এবং অজেয় দুর্গসমূহ।’ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এই কালপর্বের মধ্যে মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বিশাল ও বিস্তৃত পরিসরের কল্পচিত্রসমেত ভারতবর্ষ যেকোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ স্থানিক পরিসর অথবা অঞ্চলের জন্য একটি অপরিহার্য উল্লেখযোগ্য চিহ্ন হিসেবে স্বীকৃত হয়ে উঠেছিল। অবশ্যই যদি কোনো লিখিত নথিতে ওই স্থানিক পরিসরটির ঠাঁই পাওয়ার সুযোগ ঘটত তবেই।

তথ্যসূত্র:

১. দেখুন: পার্থ চ্যাটার্জি, ‘ক্লেইমস অন দ্য পাস্ট: দ্য জিনিয়ালজি অফ মডার্ন হিস্টোরিওগ্রাফি ইন বেঙ্গল’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ: এসেজ ইন অনার অফ রণজিৎ গুহ (সম্পা. ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান), দিল্লি, ১৯৯৫, পৃ. ১-৪৯।

২. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, ‘স্টাডিজ ইন ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুইটিজ’, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৫৮। দেখুন অধ্যায় সাত: ‘পুরাণিক কসমোগ্রাফি’, পৃ. ৭৫।

৩. ‘দ্য কনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (১ এপ্রিল ১৯৮৬ পর্যন্ত সংশোধিত), নয়াদিল্লি, ১৯৮৬, পার্ট ১, আর্টিকেল ১।

৪. আর. কে. মুখার্জি, ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’, ক্রনিকল ক্লাসিকস সিরিজ, নয়াদিল্লি, ২০০৩ (মূল প্রকাশ ১৯১৩)।

যদিও সম্প্রতি মন্তব্য করা হয়েছে যে ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা প্রাক-ব্রিটিশ ভারতে ঐক্যের অনুপস্থিতির ওপর জোর দিয়েছিলেন (এস. ভট্টাচার্য, ‘ইন্ট্রোডাকশন’, কালচারাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, কলকাতা, ২০১৩, পৃ. xii), তবুও দেশীয় ভাষায় ইতিহাস লেখার চর্চা মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনকেই মডেল বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

৫. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৯৮।

৬. সুদীপ্ত কবিরাজ, ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ, ভলিউম ৭ (সম্পা. পার্থ চ্যাটার্জি ও জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে), নয়াদিল্লি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ৫ম মুদ্রণ, ১৯৯৯, পৃ. ১-৩৯।

৭. সি. এ. বেইলি, ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন: ইন্টেলিজেন্স-গ্যাদারিং অ্যান্ড সোশ্যাল কমিউনিকেশন ইন ইন্ডিয়া, ১৭৮০-১৮৭০’, ফার্স্ট সাউথ এশিয়ান এডিশন, দিল্লি, ১৯৯৯, পৃ. ২৬১ এবং পরবর্তী।

৮. ম্যাথু এইচ. এডনি, ‘ম্যাপিং অ্যান এম্পায়ার: দ্য জিওগ্রাফিক্যাল কনস্ট্রাকশন অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, ১৭৬৫-১৮৪৩’, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো প্রেস, শিকাগো-লন্ডন, ১৯৯৭, পৃ. ১।

৯. এডনি বিশদভাবে বলেন (ওই, পৃ. ৩৩৩): ‘ব্রিটিশ মানচিত্রের যৌক্তিক, অভিন্ন স্থান বা স্পেস (uniform space) কোনো মানসিক মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ স্থান ছিল না। বরং এটি ছিল ক্ষমতার সম্পর্কে জারিত একটি স্থান—যেখানে ব্রিটিশরা চিত্রিত জমিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত (বা করার ক্ষমতা রাখত)… সাম্রাজ্যিক স্থান বা ইম্পেরিয়াল স্পেস ছিল সীমানার স্থান… ইম্পেরিয়াল স্পেস সীমানাকে একটি পদ্ধতি (mechanism) হিসেবে ব্যবহার করত বিমূর্ত স্থানকে (abstract space) ভূখণ্ডের বাস্তবতার (concrete reality) সঙ্গে সমান করে তোলার জন্য।’

১০. ইরফান হাবিব, ‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, সংখ্যা ৭-৮ (১৯৯৭), পৃ. ৮। আরও দেখুন তাঁর ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন: আ ডিফেন্স অফ দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, ভলিউম ২৭ (সংখ্যা ৯-১৯), ১৯৯৯, পৃ. ১৮-২৮; এবং ওই লেখকের ‘ইন্ট্রোডাকশন’, ইন্ডিয়া—স্টাডিজ ইন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া, দিল্লি, ২০০৫, পৃ. ১-১৭। ইরফান হাবিবের বিবৃতি (‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’)—যে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ফারসি ভাষায় দেশ হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা হচ্ছিল—তা এই ক্ষেত্রের অন্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সমর্থিত হওয়া প্রয়োজন।

১১. দেখুন: এ. এ. ম্যাকডোনেল এবং এ. বি. কিথ, ‘ভেদিক ইনডেক্স অফ নেমস অ্যান্ড সাবজেক্টস’, ভলিউম ২, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৬৭, পৃ. ৯৪-৭। কিছু ভরতদের সঙ্গে মধ্যদেশের সম্পৃক্ততা হয়তো এই অঞ্চলের দ্যোতনার (connotation) প্রসারণ বা স্ফীতি ঘটিয়েছিল।

১২. এ. বি. কিথ, ‘ঋগ্বেদ ব্রাহ্মণস: দ্য ঐতরেয় অ্যান্ড কৌষীতকি ব্রাহ্মণস অফ ঋগ্বেদ’, মূল সংস্কৃত থেকে অনূদিত, হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ, মতিলাল বানারসিদাস দ্বারা পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি-পাটনা-বারাণসী, ১৯৭১, পৃ. ৩৩০-১। বন্ধনীর ভেতরের সংস্কৃত অভিব্যক্তিগুলো ঐতরেয় ব্রাহ্মণ টেক্সট (৮.১৪.৩) থেকে নেওয়া।

১৩. জি. পি. মালালাসেকেরা, ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’, লন্ডন, ১৯৩৭, ভলিউম ১, পৃ. ৯৪১-২।

১৪. শিলালিপির পাঠ্যের জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘সিলেক্ট ইনসক্রিপশনস বিয়ারিং অন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’, ভলিউম ১ (সংশোধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, কলকাতা, ১৯৬৫), পৃ. ৪৮-৯ (মাইনর রক এডিক্ট: রূপনাথ ভার্সন)।

১৫. ওই, পৃ. ২১৬ (খারবেলের হাতিগুফ্ফা শিলালিপি, লাইন ১০)।

১৬. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)। অনেক পুরাণের ‘ভুবন-বিন্যাস’ বা ‘ভুবন-কোষ’ অংশে যে পৌরাণিক উপাদান পাওয়া যায়, তা অনেক গ্রন্থে সংগৃহীত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটির উল্লেখ করা যেতে পারে: এস. বি. চৌধুরী, ‘এথনিক সেটেলমেন্টস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (কলকাতা, ১৯৫৫) এবং এম. আর. সিং, ‘আ ক্রিটিক্যাল স্টাডি অফ দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডেটা ইন আর্লি পুরাণস’ (কলকাতা, ১৯৭২)।

১৭. মহাভারত, সভাপর্ব, দিগ্বিজয়-পর্বাধ্যায় (২.৬)।

১৮. বিষ্ণু-পুরাণের নিম্নলিখিত সংস্করণ ও অনুবাদগুলো ব্যবহার করা হয়েছে: এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, এন. এস. সিং কর্তৃক পরিবর্ধিত ও বিন্যস্ত, দুই খণ্ডে, দিল্লি, ১৯৮৯; এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, আর. সি. হাজরা লিখিত ভূমিকাসহ, পুনর্মুদ্রণ, কলকাতা, ১৯৬১; বিষ্ণু-পুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক সম্পাদিত ও বাংলায় অনূদিত, পুনর্মুদ্রণ (কলকাতা, ১৯৭৩)।

১৯. রঘুবংশম্-এর জন্য আমরা ব্যবহার করেছি: সি. কে. দেবধর, ‘ওয়ার্কস অফ কালিদাস’, ভলিউম ২ (কবিতা), পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ২০০২।

২০. কাব্যমীমাংসার জন্য ব্যবহৃত সংস্করণ: এন. এন. চক্রবর্তী, ‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’ (বাংলায়), শান্তিনিকেতন, ১৯৬০।

২১. ভীষ্ম পর্ব, II: ৩৪২।

২২. এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ’, পৃ. ১৩৩-৪।

২৩. বিষ্ণু-পুরাণ, ২.২.১৫-১৮।

২৪. বায়ু-পুরাণ, অধ্যায় ৩৩। প্রকৃতপক্ষে মনুর বংশধররাই ঋষি, দেব, পিতৃ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, যক্ষ, ভূত, মনুষ্য, মৃগ এবং পক্ষী দিয়ে পৃথিবী পূর্ণ করেছিলেন।

২৫. সি. আর. দেবধর (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৬৩) যেমনটা প্রস্তাব করেছেন, ‘জিগীষা’র অর্থ ‘বিশ্ব-জয়’ না হয়ে আক্ষরিক অর্থ (জয়ের ইচ্ছা) হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

২৬. রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ ৪র্থ সর্গের ২৬-৮৫ শ্লোকে আলোচিত হয়েছে।

২৭. ‘সুহ্ম’ মোটামুটিভাবে আধুনিক পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাংলার উপকূলীয় বালেশ্বর জেলা এবং ওড়িশার সঙ্গে মিলে যায়।

২৮. ‘বঙ্গ’-এর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র হবে পরবর্তীকালের বিক্রমপুর বা বাংলাদেশের ঢাকার আশেপাশের এলাকা। কালিদাস কেবল ভূখণ্ডের নদীমাতৃক চরিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচিতিই দেখাননি, বরং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের নৌকা চালনায় দক্ষতার বিষয়েও সচেতন ছিলেন।

২৯. ‘কপিশা’ আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কংসাবতী বা কাঁসাই নদীর সঙ্গে মিলে যায়। দেখুন: এন. এল. দে, ‘দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, প্রথম প্রকাশ ১৯২৭, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৯০, পৃ. ৯২।

৩০. দে (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ২১৩) ওড়িশার বৈতরণী নদীর উত্তরে এটিকে নির্দেশ করেছেন। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’, প্যারিস, ১৯৫৪, পৃ. ১৯৭।

৩১. দে-র মতে: ‘ওড়িশা থেকে মাদুরা জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো পর্বতমালা মহেন্দ্র-পর্বত নামে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং দক্ষিণের সারকারস (circars) থেকে গন্ডোয়ানা পর্যন্ত বিস্তৃত রেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার গঞ্জাম-এর কাছের একটি অংশ এখনো মহেন্দ্র মালেই বা মহেন্দ্রের পাহাড় নামে পরিচিত’, পৃ. ১১৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৭২।

৩২. দে কলিঙ্গদের বৈতরণী নদীর দক্ষিণে স্থাপন করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৮৫। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৫৬-৮। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাসপেক্টস অফ কালিদাস’স ওয়ার্কস’, কলকাতা, ১৯৫৪, বিভিন্ন স্থানে (passim)।

৩৩. ‘কাবেরী নদীর দক্ষিণে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণাংশ, যাকে ত্রিবাঙ্কুর পাহাড় বলা হয়’; এর মধ্যে কার্ডামম পর্বতমালাও অন্তর্ভুক্ত, যা কোয়েম্বাটুর গ্যাপ থেকে কেপ কমোরিন বা কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত; দে, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ.১২২। দে নীলগিরি পাহাড়কে দরদুর-এর সঙ্গে শনাক্ত করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৫৩।

৩৪. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৪৭৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৯২।

৩৫. ‘অপরান্ত’ বা পশ্চিম প্রান্তকে সাধারণত সংকীর্ণ অর্থে উত্তর কোঙ্কন অঞ্চলের সঙ্গে মেলানো হয়। দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১২-১৩।

৩৬. অপরান্তে অবস্থিত।

৩৭. যদিও আদি ঐতিহাসিক যুগে ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে যবনদের উল্লেখ পাওয়া যায়, কালিদাস পশ্চিমের সঙ্গে এবং সম্ভবত যবনদের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের উল্লেখ করেছেন।

৩৮. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৭১।

৩৯. এই টেবিল বা ছকটি কালিদাসের ভৌগোলিক জ্ঞান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়—যদিও প্রদত্ত তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক এবং অপর্যাপ্ত; বরং এর উদ্দেশ্য হলো: (১) চারটি দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ধারণার বিবর্তনের একটি পর্যায় নির্দেশ করা, এবং (২) প্রাকৃতিক ল্যান্ডমার্ক এবং জনপদ ছাড়াও বিভিন্ন ‘দিক’ বা কোয়ার্টার-এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য কালিদাস কীভাবে বিভিন্ন অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য বেছে নিয়েছিলেন তা দেখানো।

৪০. কাব্যমীমাংসা-য় মূল অভিব্যক্তিটি হলো: ‘তত্র = অপি মহোদয়ম্ মূলমবধি-কৃত্য ইতি’, XVII।

৪১. বর্তমান হরিয়ানার কার্নালের কাছে পেহোয়া (Pehoa)।

৪২. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ ধারণার বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’, স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া (দিল্লি, ১৯৭১), অধ্যায় ১। সরকার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র উদ্ধৃত করে দেখান যে হিমালয় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে হাজার যোজন বিস্তৃত ভূমিই হলো ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’। রাজশেখরও এই সংজ্ঞাই দিয়েছেন। তবে, সরকারের এই দাবি যে ‘একজন ভারতীয় সাম্রাজ্যিক শাসকের প্রভাব-বলয়’ ভারতের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা হতো—তা গ্রহণযোগ্য বা টেকসই (tenable) নয়। রঘুর পারসিক ও যবনদের দেশে অভিযান, একজন আদি মধ্যযুগীয় রাজার বংক্ষু (অক্সাস) নদীর তীরে তুরুস্কদের পরাজিত করার দাবি (সরকার, পৃ. ৭) এবং চোলদের দ্বারা শ্রীলঙ্কা দখল—এমন সব প্রমাণের সেট তৈরি করে যা এই ধরণের দাবির বিপক্ষে যায়।

৪৩. কাব্যমীমাংসা, ১৭শ অধ্যায়। তালিকাভুক্ত অনেক সম্প্রদায় ছিল মধ্য এশিয়ার।

৪৪. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’-এর জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, দিল্লি, ১৯৭১, অধ্যায় ১। এন. এন. চক্রবর্তী (‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’, পৃ. ১১১-১২) ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’কে ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে এক করে দেখেছেন বলে মনে হয়, যা একইভাবে অযৌক্তিক (unwarranted)।

৪৫. কাব্যমীমাংসা, অধ্যায় ১৭; মনু, II, ২৫-৯।

৪৬. দেখুন আমার প্রবন্ধ: ‘অ্যাকোমোডেশন অ্যান্ড নেগোসিয়েশন ইন আ কালচার অফ এক্সক্লুসিভিজম: সাম আর্লি ইন্ডিয়ান পারসপেক্টিভস’, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)।

৪৭. মনু, II, ২৫-৯।

৪৮. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, পূর্বে উদ্ধৃত।

৪৯. ইরফান হাবিব, ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন’, পূর্বে উদ্ধৃত।

৫০. ম্যাথু এডনি, পূর্বে উদ্ধৃত।

৫১. সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য দেখুন: বি. ডি. চট্টোপাধ্যায়, ‘দ্য মেকিং অফ আর্লি মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, ইন্ট্রোডাকশন, ২য় সংস্করণ, নয়াদিল্লি, ২০১২।

৫২. এল. ডি. বার্নেট, ‘কালাস ইনসক্রিপশন অফ দ্য রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ IV, শক ৮৫১’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৩ (১৯১৫-১৬), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ৩৩১।

৫৩. এল. ডি. বার্নেট, ‘টু ইনসক্রিপশনস ফ্রম কুর্গোদ’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৪ (১৯১৭-১৮), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ২৮২।

৫৪. কে. এইচ. ভি. শর্মা এবং টি. কৃষ্ণমূর্তি, ‘অন্নবরপদু প্লেটস অফ কাটায়া ভেমা রেড্ডি’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩৬ (দিল্লি, ১৯৬৫), পৃ. ১৬৭-৯০।

৫৫. এন. ভেঙ্কটারমনিয়া এবং এম. সোমশেখর শর্মা, ‘বিলাস গ্রান্ট অফ প্রলয় নায়ক’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩২ (দিল্লি, ১৯৫৯), পৃ. ২৩৯-৬৮, বিশেষ করে পৃ. ২৬০।

৫৬. এই নথিতে ভারতবর্ষকে নিম্নলিখিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে:

ভাষা-সমাচার-ভিদা বিভিন্নৈঃ = দেশৈর-অনেকৈর্-বিভক্তে…

স্বাধীন সেন

স্বাধীন সেন

স্বাধীন সেন প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক। সমসাময়িক যাপনে অততের বহুবিধ লিপ্তি ( ও বিচ্ছেদ) নিয়ে বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও বোঝাপড়া করতে চেষ্টা করেন। নদী-পানি-বৃষ্টি -জীবন নিয়ে চিন্তা এবং অনুভূতির দুনিয়া নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী।