স্বাধীন সেন
পাঠ ও তথ্যসূত্র ব্যবহারের পদ্ধতি
এই পর্যালোচনায় তিন ধরনের বক্তব্য পৃথক রাখা হয়েছে।
প্রথমত, প্রাচীন জৈন সূত্র, গাথা, শ্লোক বা ভাষ্যে প্রত্যক্ষভাবে পাওয়া বক্তব্যকে প্রাথমিক পাঠভিত্তিক বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক বা সমকালীন গবেষকের নিজস্ব ব্যাখ্যাকে সংশ্লিষ্ট গবেষকের ভাষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, প্রাচীন পাঠ ও আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত কোনো শ্রেণিবিন্যাস, তুলনা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ বা সমকালীন বিশ্লেষণকে “এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ” অথবা “প্রয়োগভিত্তিক বিশ্লেষণ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি বিশ্লেষণী প্রস্তাবের সঙ্গে তার ভিত্তিস্বরূপ রেফারেন্স যুক্ত করা হয়েছে। লেখাটি গুঢ় তত্ত্বালোচনা নির্ভর নয়। বরং প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস চিন্তা, ও নৈমিত্তিক জীবনে অনেকান্তবাদের যাপন কেমন হতে পারে সেসম্পর্কে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে এই লেখায়।
প্রাচীন গ্রন্থের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে গ্রন্থ, সূত্র বা গাথাসংখ্যা এবং ব্যবহৃত সংস্করণের পৃষ্ঠা—উভয়ই দেওয়া হয়েছে। কোনো অনলাইন নিবন্ধের স্থিতিশীল মুদ্রিত পৃষ্ঠাসংখ্যা না থাকলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা উদ্ধৃত মূলপাঠের অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো অনিরীক্ষিত বা অনুমাননির্ভর পৃষ্ঠাসংখ্যা ব্যবহার করা হয়নি। লেখাটির রেফারেন্স সংগ্রহ ও যাচাই, বিভিন্ন পরিভাষা ও নামের সঠিক বানান ও অর্থ নির্ধারণ ও যাচাই, প্রতিবর্ণীকরণ, রূপরেখা তৈরি করার ক্ষেত্রে আমি এআই টুল হিসেবে সাই-স্পেস, চ্যাট-জিপিটি, জিমিনি ও গ্রামারলি ব্যবহার করেছি। রেফারেন্সের পৃষ্ঠা নম্বরে কোনো ভুল থাকতে পারে। সেজন্য মার্জনা করবেন।
প্রথম পর্ব
ধারণা, পরিভাষা ও বিশ্লেষণী পরিসর
১. অনেকান্তবাদকে কীভাবে বোঝা উচিত?
অনেকান্তবাদ (anekāntavāda) জৈন দর্শনে বাস্তবতা, জ্ঞান ও ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যার একটি বহুমাত্রিক তত্ত্ব। সাধারণ আলোচনায় একে প্রায়ই “বহু দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতি,” “সব সত্যই আপেক্ষিক,” “প্রত্যেকের নিজস্ব সত্য আছে,” অথবা “সব মতের মধ্যে কিছু না কিছু সত্য রয়েছে”—এই ধরনের বাক্যে ব্যাখ্যা করা হয়। এসব বক্তব্য ধারণাটির কিছু দিক স্পর্শ করলেও অনেকান্তবাদের সত্তাতাত্ত্বিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক জটিলতা সম্পূর্ণভাবে ধারণ করে না।
বিশেষত “সব মতই কোনো-না-কোনোভাবে সত্য”—এই সরলীকরণ যথার্থ ও অযথার্থ বক্তব্য, প্রমাণ ও অপ্রমাণ, বৈধ দৃষ্টিনয় ও দুর্নয়, এবং বাস্তবভিত্তিক শর্ত ও স্বেচ্ছাকল্পিত অজুহাতের পার্থক্য মুছে দিতে পারে। অকলঙ্কের তত্ত্বায়ন নিয়ে শ্রী নাহাটার বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে কোনো বক্তব্যের সঙ্গে শুধু syāt যুক্ত করলেই বক্তব্যটি সত্য হয় না; বক্তব্যের শর্তকে প্রমাণসিদ্ধ বা সুপ্রতিষ্ঠিত বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হয়। [৫, “Limits to the Applicability of Syādvāda” বিভাগ]
অনেকান্তবাদের মৌলিক বক্তব্য “প্রত্যেকের নিজের সত্য আছে” নয়। অধিকতর যথার্থভাবে বলা যায়:
বাস্তব বস্তু বহুধর্মাত্মক বা বহুগুণবিশিষ্ট; কিন্তু কোনো একটি বাক্য, ধারণা, শ্রেণিবিন্যাস, প্রমাণপদ্ধতি বা দৃষ্টিকোণ সাধারণত সেই বস্তুর সব গুণ, পর্যায় ও সম্পর্ককে একই সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না।
এখানে “ধর্ম” বলতে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস বোঝানো হচ্ছে না। সংস্কৃত dharma শব্দটি এই প্রসঙ্গে কোনো বস্তুর গুণ, বৈশিষ্ট্য বা বিধেয়যোগ্য ধর্ম (property/attribute) বোঝায়।
অনেকান্তবাদ তাই সংশয়বাদ নয়; কারণ যথার্থ জ্ঞানের সম্ভাবনা অস্বীকার করা হয় না। অনেকান্তবাদ সত্তাশ্রয়বাদও নয়; কারণ বাস্তবতা কেবল জ্ঞাতার অনুভূতি বা ইচ্ছার দ্বারা নির্মিত বলে ধরা হয় না। বরং বাস্তবতার বহুধর্মাত্মক গঠন এবং সসীম জ্ঞানের নির্বাচনমূলক চরিত্রের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। [১, সূত্র ১.৬, ৫.৩০, ৫.৩২ ও ৫.৩৮; ৫; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
২. শব্দের ব্যুৎপত্তি: একান্ত ও অনেকান্ত
সংস্কৃত anekāntavāda শব্দটি কয়েকটি অংশে বিশ্লেষণ করা যায়:
- an-—না বা নয়;
- eka—এক;
- anta—প্রান্ত, সীমা, নির্দিষ্ট দিক বা চূড়ান্ত অবস্থান;
- vāda—মতবাদ, তত্ত্ব বা যুক্তিসংগত প্রতিপাদন।
শব্দটির আক্ষরিক অর্থ তাই অ-একপাক্ষিকতার তত্ত্ব, একান্ত নয় এমন মতবাদ, অথবা একটি মাত্র দিককে চূড়ান্ত সত্যে পরিণত না করার পদ্ধতি। বিমলকৃষ্ণ মতিলাল একে non-one-sidedness বা “অ-একপাক্ষিকতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। [৬, পৃ. ১–২]
একান্ত (ekānta) বলতে কেবল একটি স্বতন্ত্র মত বোঝায় না। কোনো দাবি একান্ত হয়ে ওঠে যখন দাবি—
- বস্তুর একটি নির্বাচিত গুণকে তার সমগ্র পরিচয় বলে ঘোষণা করে;
- নির্দিষ্ট কাল, স্থান বা সম্পর্কের সত্যকে সর্বকালীন ও সর্বব্যাপী সত্যে পরিণত করে;
- অন্য বাস্তব গুণ, পর্যায় বা সম্পর্কের সম্ভাবনা অস্বীকার করে;
- নিজের প্রমাণের পরিসর অতিক্রম করে;
- সংশোধনের সম্ভাবনা বন্ধ করে দেয়।
অকলঙ্কের তত্ত্বায়নে সীমিত ও শর্তনির্ভর যথার্থ বক্তব্য এবং অন্য দৃষ্টিনয়কে অস্বীকারকারী একপাক্ষিক বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। নাহাটার বিশ্লেষণে প্রথমটিকে samyag-ekānta—যথার্থভাবে সীমায়িত একপাক্ষিক বর্ণনা—এবং দ্বিতীয়টিকে mithyā-ekānta বা বিভ্রান্ত একান্ত হিসেবে বোঝানো হয়েছে। [৫, “Genuine Viewpoints and Pseudo-viewpoints” বিভাগ]
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ
“বস্তু স্থায়ী” এবং “বস্তু পরিবর্তনশীল”—দুটি বাক্যের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া অথবা দুটির মাঝামাঝি একটি অস্পষ্ট আপস তৈরি করা অনেকান্তবাদ নয়। অনেকান্তমূলক প্রশ্ন হবে: বস্তুটি কোন অর্থে, কোন পর্যায়ে, কোন কালে এবং কোন সম্পর্কের অধীনে স্থায়ী বা পরিবর্তনশীল? এই ব্যাখ্যা তত্ত্বার্থসূত্র-এর উৎপাদ–ব্যয়–ধ্রৌব্য তত্ত্ব এবং মতিলালের শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়ন-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [১, সূত্র ৫.৩০–৫.৩২, পৃ. ২১৩–২১৬; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
৩. চারটি বিশ্লেষণী স্তর
নিচের চারস্তরীয় বিন্যাসটি কোনো একক প্রাচীন জৈন গ্রন্থের হুবহু শ্রেণিবিন্যাস নয়। উমাস্বাতি/উমাস্বামীর দ্রব্য–গুণ–পর্যায় ও প্রমাণ–নয়সংক্রান্ত সূত্র, পূজ্যপাদের ভাষ্য, অকলঙ্কের শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়ন এবং বিমলকৃষ্ণ মতিলাল, জোনার্ডন গণেরি ও শ্রী নাহাটার আধুনিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় বিন্যাসটি নির্মিত হয়েছে। [১; ৫–৭]
৩.১ সত্তাতাত্ত্বিক স্তর (*ontological level*)
বাস্তব বস্তু গুণ ও পর্যায়যুক্ত এবং উৎপাদ, ব্যয় ও ধ্রৌব্যের সমন্বয়ে গঠিত; ফলে বাস্তবতা নিজেই বহুগুণবিশিষ্ট ও বহুপর্যায়সম্পন্ন। [১, সূত্র ৫.৩০, ৫.৩২ ও ৫.৩৮]
৩.২ জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তর (*epistemological level*)
প্রমাণ ও নয়ের মাধ্যমে বস্তু জানা হয়। কোনো একটি নয় সাধারণত বস্তুর নির্বাচিত গুণ, পর্যায় বা সম্পর্ককে ধারণ করে; বস্তুর সব সম্ভাব্য গুণ ও সম্পর্ককে নয়। [১, সূত্র ১.৬; ৭, পৃ. ২৬৭–২৬৯]
৩.৩ ভাষাতাত্ত্বিক ও অর্থতাত্ত্বিক স্তর (*linguistic and semantic level*)
একটি বাক্য নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বস্তুর একটি গুণকে প্রধান করে। Syāt সেই বিধেয়ের প্রযোজ্য শর্ত বা দৃষ্টিকোণ প্রকাশ করে এবং অন্য সম্ভাব্য বিধেয়গুলোকে নিঃশর্তভাবে অস্বীকার করতে বাধা দেয়। [১, সূত্র ৫.৩২; ৫, Laghīyastraya ৬২-সংক্রান্ত আলোচনা; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
৩.৪ পর্যালোচনামূলক স্তর (*methodological-critical level*)
পূর্ববর্তী তিনটি মাত্রার ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় প্রস্তাব করা হচ্ছে যে কোনো দাবির যথার্থতা বিচার করতে হলে তার কাল, স্থান, সম্পর্ক, উদ্দেশ্য, প্রমাণ, বিশ্লেষণী পরিসর ও সীমা শনাক্ত করা প্রয়োজন। এই স্তরটি প্রাচীন কোনো স্বতন্ত্র জৈন শ্রেণি নয়; নয়তত্ত্ব, স্যাদবাদ এবং আধুনিক দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে উদ্ভূত একটি প্রয়োগমূলক প্রস্তাব। [৫–৭]
দ্বিতীয় পর্ব
বহুধর্মাত্মক বাস্তবতার সত্তাতাত্ত্বিক ভিত্তি
৪. দ্রব্য, গুণ ও পর্যায়
জৈন সত্তাতত্ত্বে বাস্তব সত্তাকে বোঝার জন্য তিনটি মৌলিক প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়:
- দ্রব্য (dravya; substance)—পরিবর্তনের মধ্যেও কোনো অস্তিত্বগত বা পরিচয়গত ধারাবাহিকতা বজায় রাখে;
- গুণ (guṇa; quality)—দ্রব্যের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য;
- পর্যায় (paryāya; mode/modification)—দ্রব্যের পরিবর্তনশীল অবস্থা বা রূপ।
উমাস্বাতি বা উমাস্বামী—উমাস্বাতি/উমাস্বামী (Umāsvāti/Umāsvāmin)—রচিত তত্ত্বার্থসূত্র (Tattvārthasūtra)-এ বলা হয়েছে:
guṇaparyāyavad dravyam
গুণ ও পর্যায়যুক্ত যা, সেটিই দ্রব্য।
—তত্ত্বার্থসূত্র, ৫.৩৮ [১, সূত্র ৫.৩৮, পৃ. ২২২]।
বাস্তবতার কালগত গঠন সম্পর্কে একই গ্রন্থে বলা হয়েছে:
utpāda-vyaya-dhrauvya-yuktaṃ sat
উৎপাদ, ব্যয় এবং ধ্রৌব্যযুক্ত যা, সেটিই সৎ বা বাস্তব।
—তত্ত্বার্থসূত্র, ৫.৩০ [১, সূত্র ৫.৩০, পৃ. ২১৩–২১৪]।
এখানে—
- উৎপাদ (utpāda; origination) হলো নতুন পর্যায়ের উদ্ভব;
- ব্যয় (vyaya; cessation/decay) হলো পূর্ববর্তী পর্যায়ের অবসান;
- ধ্রৌব্য (dhrauvya; persistence) হলো পরিবর্তনের মধ্যেও ধারাবাহিকতা।
বাস্তব বস্তুতে নতুন অবস্থার উদ্ভব, পুরোনো অবস্থার অবসান এবং কোনো ধরনের অস্তিত্বগত ধারাবাহিকতা একই সঙ্গে থাকতে পারে। জৈন দর্শনে এই তিনটি পরস্পর-বিচ্ছিন্ন বিকল্প নয়; একই বাস্তবতার পরস্পর-সম্পর্কিত মাত্রা। [১, সূত্র ৫.৩০ ও ৫.৩৮]
এই পর্যালোচনার ব্যাখ্যা
“একই বস্তু স্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল”—বাক্যটি শর্তহীনভাবে উচ্চারিত হলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। অধিকতর যথার্থভাবে বলা যায়:
বস্তুটি দ্রব্যগত ধারাবাহিকতার বিচারে স্থায়ী, কিন্তু পর্যায়গত অবস্থার বিচারে পরিবর্তনশীল।
এই ভাষা প্রাচীন সূত্রের হুবহু অনুবাদ নয়; সূত্র ও ভাষ্যের একটি বিশ্লেষণাত্মক পুনর্বিন্যাস। [১, সূত্র ৫.৩০–৫.৩২; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
৫. মাটির দলা, পাত্র ও ভগ্ন মৃৎখণ্ড
পূজ্যপাদ দেবনন্দী—পূজ্যপাদ দেবনন্দী (Pūjyapāda Devanandin)—তাঁর সর্বার্থসিদ্ধি (Sarvārthasiddhi) ভাষ্যে মাটির দলা, পাত্র এবং ভগ্ন মৃৎখণ্ডের উদাহরণ ব্যবহার করেছেন।
মাটির দলা থেকে পাত্র নির্মিত হলে—
- মাটির দলার নির্দিষ্ট আকৃতি বিলুপ্ত হয়;
- পাত্ররূপ উৎপন্ন হয়;
- মাটির উপাদানগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
পাত্র ভেঙে গেলে—
- অক্ষত পাত্রের পর্যায় বিলুপ্ত হয়;
- ভগ্ন মৃৎখণ্ডের নতুন পর্যায় উৎপন্ন হয়;
- মৃৎপদার্থের উপাদানগত ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে।
পাত্র নির্দিষ্ট পাত্ররূপের বিচারে নতুন, কিন্তু মাটির উপাদান হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন নয়। ভাঙার পরে অক্ষত পাত্র অনুপস্থিত, অথচ মৃৎপদার্থ বা ভগ্ন মৃৎখণ্ড উপস্থিত। [১, তত্ত্বার্থসূত্র ৫.৩০-এর সর্বার্থসিদ্ধি ভাষ্য, পৃ. ২১৩–২১৪]
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ
একটি ভগ্ন মৃৎপাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে আর ব্যবহারযোগ্য পাত্র নয়; তবে বস্তুটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তও হয়নি। পাত্রটি পর্যায়ক্রমে নির্মিত সামগ্রী, ব্যবহৃত বস্তু, ভগ্ন ও পরিত্যক্ত নিদর্শন, স্তরে সঞ্চিত প্রত্নবস্তু, গবেষণাগারে শ্রেণিবিন্যাসযোগ্য নমুনা এবং জাদুঘরীয় বস্তুতে পরিণত হতে পারে।
এই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ প্রাচীন ভাষ্যের অংশ নয়। পূজ্যপাদের দ্রব্য–পর্যায় বিশ্লেষণ, ইগর কপিটফের বস্তুজীবনী এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সঞ্চয়ন-প্রেক্ষিতের আলোচনার ভিত্তিতে উদাহরণটি নির্মিত। [১; ১৭, পৃ. ৬৪–৯১; ১৮, পৃ. ১২৪–১২৭]
৬. একই ব্যক্তি: পিতা, পুত্র, ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্র
পূজ্যপাদের ভাষ্যে দেবদত্তের একটি সম্পর্কগত উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। একই ব্যক্তি—
- তাঁর সন্তানের পিতা;
- নিজের পিতার পুত্র;
- সহোদরের ভাই;
- পিতৃব্য বা মাতুলের ভ্রাতুষ্পুত্র।
ব্যক্তি একই, কিন্তু সম্পর্ক ভিন্ন। দেবদত্ত একই ব্যক্তির সঙ্গে একই সম্পর্কে একযোগে পিতা ও পুত্র নন। ভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে ভিন্ন সম্পর্কের অধীনে উভয় বিধেয়ই সত্য। [১, তত্ত্বার্থসূত্র ৫.৩২-এর সর্বার্থসিদ্ধি ভাষ্য, পৃ. ২১৫–২১৬]
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ
দেবদত্তের উদাহরণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য নির্ণয় করা যায়:
সম্পর্কনির্ভরতা (relationality) এবং সত্তাশ্রয়িতা (subjectivity/subject-dependence) এক বিষয় নয়।
“দেবদত্ত অমুকের পিতা”—বাক্যটি সম্পর্কনির্ভর, কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতি বা পছন্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। সম্পর্কটি যাচাইযোগ্য। অতএব একাধিক সম্পর্কগত বিধেয়ের সত্যতা স্বীকার করা বস্তুনিষ্ঠতা পরিত্যাগ করা নয়। এই উপসংহার পূজ্যপাদের উদাহরণ ও মতিলালের শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়ন-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [১, পৃ. ২১৫–২১৬; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
৭. শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্য
সিদ্ধসেন দিবাকর—সিদ্ধসেন দিবাকর (Siddhasena Divākara)—এর সন্মতিতর্ক (Sanmati-Tarka/Saṃmatitarkaprakaraṇa)-এ শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের মধ্য দিয়ে একই মানুষের পরিবর্তনের উদাহরণ পাওয়া যায়।
একজন যুবক—
- তাঁর শৈশবের শরীর, জ্ঞান ও সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন নন;
- আবার শৈশবের মানুষটির সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন অন্য ব্যক্তিও নন;
- অতীতের ভুল স্মরণ করে লজ্জিত হতে পারেন;
- পূর্ববর্তী কাজের ফল বহন করেন;
- ভবিষ্যৎ বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেন।
সিদ্ধসেনের ব্যাখ্যায় পরিচয়গত ধারাবাহিকতার বিচারে মানুষটি একই; শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের পরিবর্তনশীল পর্যায়ের বিচারে ভিন্ন। [২, প্রথম অধ্যায়, গাথা ৪৪–৪৬, পৃ. ৪৯–৫১]
এই পর্যালোচনার ব্যাখ্যা
এখানে “অভিন্ন” ও “ভিন্ন”—দুটি বিধেয়কে অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ করা হচ্ছে না। পরিচয়গত ধারাবাহিকতা এবং পর্যায়গত পরিবর্তনের নির্ধারক পৃথক করা হচ্ছে। এই ব্যাখ্যা সিদ্ধসেনের গাথা এবং তত্ত্বার্থসূত্র-এর উৎপাদ–ব্যয়–ধ্রৌব্য কাঠামোর ভিত্তিতে নির্মিত। [১, সূত্র ৫.৩০; ২, প্রথম অধ্যায়, গাথা ৪৪–৪৬]
তৃতীয় পর্ব
প্রমাণ, নয় এবং আংশিক জ্ঞান
৮. প্রমাণ ও নয়
তত্ত্বার্থসূত্র ১.৬-এ বলা হয়েছে:
pramāṇa-nayair adhigamaḥ
প্রমাণ ও নয় দ্বারা তত্ত্বের অধিগম ঘটে।
[১, সূত্র ১.৬, পৃ. ১১]
এখানে—
- প্রমাণ (pramāṇa; means of valid knowledge) যথার্থ জ্ঞানের মাধ্যম;
- নয় (naya; standpoint/partial analytical perspective) বস্তুর কোনো নির্বাচিত গুণ, পর্যায়, সম্পর্ক বা উদ্দেশ্যনির্ভর বিশ্লেষণী অবস্থান।
নয়কে সাধারণ ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বোঝা ঠিক নয়। বৈধ নয় বস্তুর কোনো বাস্তব দিক ধারণ করে; তবে বস্তুর সব সম্ভাব্য গুণ ও সম্পর্কের পূর্ণ বিবরণ প্রদান করে না। অকলঙ্কের তত্ত্বায়ন নিয়ে নাহাটার বিশ্লেষণে একটি পৃথক শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়কে বৈধ নয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [৫, “Genuine Viewpoints and Pseudo-viewpoints” বিভাগ]
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োগ
একটি প্রত্নস্থলকে দেখা যেতে পারে—
- স্তরবিন্যাসগত দৃষ্টিনয় (stratigraphic standpoint) থেকে;
- মৃৎপাত্র-প্রযুক্তিগত দৃষ্টিনয় (ceramic-technological standpoint) থেকে;
- ভূমিরূপবিদ্যাগত দৃষ্টিনয় (geomorphological standpoint) থেকে;
- স্থাপত্যগত দৃষ্টিনয় (architectural standpoint) থেকে;
- স্থানিক দৃষ্টিনয় (spatial standpoint) থেকে;
- লোকস্মৃতিভিত্তিক দৃষ্টিনয় (local-memory standpoint) থেকে;
- ঐতিহ্য-আইনগত দৃষ্টিনয় (heritage-legal standpoint) থেকে।
এই তালিকা প্রাচীন জৈন গ্রন্থে পাওয়া যায় না। নয়তত্ত্বের নির্বাচনমূলক ও সীমিত জ্ঞানের ধারণাকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণক্ষেত্রে প্রয়োগ করে শ্রেণিবিন্যাসটি নির্মিত হয়েছে। স্তরবিন্যাস, বস্তুপ্রযুক্তি, সঞ্চয়ন-প্রক্রিয়া ও ভূমিরূপের পরিবর্তন ভিন্ন ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়; কোনো একটি পদ্ধতি এককভাবে স্থানের পূর্ণ ইতিহাস প্রকাশ করে না। [১, সূত্র ১.৬; ৭, পৃ. ২৬৭–২৬৯; ১৮; ১৯]
৯. নয় কখন দুর্নয় হয়ে ওঠে?
জৈন পরিভাষায় বৈধ দৃষ্টিনয় (naya) এবং দুর্নয় (durnaya; fallacious or absolutised standpoint) পৃথক। অকলঙ্কের ব্যাখ্যায় কোনো দৃষ্টিনয় অন্য বৈধ দৃষ্টিনয়ের ওপর নিজের নির্ভরতা ও সীমা স্বীকার করলে যথার্থ থাকতে পারে; অন্য সব দিক অস্বীকার করে পূর্ণ সত্যের দাবি তুললে সেই দৃষ্টিনয় দুর্নয়ে পরিণত হয়। [৫, “Genuine Viewpoints and Pseudo-viewpoints” বিভাগ]
একটি দৃষ্টিনয় বৈধ থাকতে পারে, যদি—
- বস্তুর বাস্তব কোনো গুণ বা সম্পর্ক প্রকাশ করে;
- নিজের প্রযোজ্যতার সীমা অতিক্রম না করে;
- অন্য বাস্তব গুণগুলোর সম্ভাবনা অস্বীকার না করে;
- প্রমাণের তুলনায় অতিবিস্তৃত সিদ্ধান্ত না দেয়;
- নতুন প্রমাণে সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
শেষ দুটি মানদণ্ড প্রাচীন অকলঙ্কীয় পরিভাষার হুবহু অনুবাদ নয়; অকলঙ্কের প্রমাণসিদ্ধ বিষয়সংক্রান্ত শর্ত এবং আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সংশোধনযোগ্যতার নীতিকে একত্র করে বর্তমান পর্যালোচনায় প্রস্তাব করা হয়েছে। [৫; ৬, পৃ. ৫৯–৬১]
প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণ
একটি প্রত্নস্তর থেকে একশটি মৃৎখণ্ড পাওয়া গেল। পাঁচটি বিশেষভাবে অলংকৃত; বাকি পঁচানব্বইটি সাধারণ ব্যবহার্য মৃৎখণ্ড। পাঁচটি অলংকৃত খণ্ডের উপস্থিতি সত্য। কিন্তু “এই বসতির সমগ্র মৃৎপাত্র-সংস্কৃতি অলংকৃত ছিল”—এমন সিদ্ধান্ত বিরল নিদর্শনকে পুরো সমাহারের প্রতিনিধি করে তোলে।
এই উদাহরণ কোনো জৈন মূলপাঠ থেকে নেওয়া নয়। নয়কে প্রমাণগত পরিসরের মধ্যে সীমিত রাখা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সমাহারের অনুপাত বিবেচনার ভিত্তিতে উদাহরণটি নির্মিত। [৫; ৬; ১৮]
১০. বিচ্ছিন্ন রত্ন ও গাঁথা রত্নহার
সন্মতিতর্ক-এ বিভিন্ন নয়কে বিচ্ছিন্ন মূল্যবান রত্ন এবং তাদের যথাযথ সম্পর্ককে গাঁথা রত্নহারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন রত্নগুলো মূল্যবান হলেও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত রত্নহার গঠন করে না। একইভাবে পৃথক নয় নিজের সীমিত পরিসরে যথার্থ হলেও অন্য নয়কে অস্বীকার করলে পূর্ণতর উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারে না। [২, প্রথম অধ্যায়, গাথা ২২–২৫, পৃ. ২৬–২৮]
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ
সিদ্ধসেনের উপমা থেকে “যত বেশি মত, তত বেশি সত্য”—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। রত্নগুলোকে নির্বিচারে স্তূপ করলেই রত্নহার তৈরি হয় না। প্রয়োজন—
- প্রতিটি দৃষ্টিনয়ের স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়;
- তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পরীক্ষা;
- প্রকৃত বিরোধ ও পরিসরভিত্তিক পার্থক্য পৃথক করা;
- প্রমাণমূল্য তুলনা;
- কোন দৃষ্টিনয় কোন প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক, তা নির্ধারণ।
এই পদ্ধতিগত বিন্যাস সিদ্ধসেনের উপমা এবং গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক আধুনিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [২; ৭, পৃ. ২৬৭–২৮১]
চতুর্থ পর্ব
ভাষা, স্যাৎ ও শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়ন
১১. ভাষা কেন নির্বাচনমূলক?
কোনো বাক্য যখন বলে, “পাত্রটি লাল,” তখন পাত্রের রং প্রধান হয়ে ওঠে; উপাদান, ওজন, বয়স, ব্যবহার, আকার ও সঞ্চয়ন-প্রেক্ষিত সাময়িকভাবে গৌণ থাকে। গৌণ রাখার অর্থ অন্য গুণগুলো অস্বীকার করা নয়। একটি বাক্য নির্দিষ্ট অনুসন্ধানগত উদ্দেশ্যে বাস্তবতার একটি দিককে সামনে আনে।
তত্ত্বার্থসূত্র ৫.৩২-এর পূজ্যপাদীয় ভাষ্যে প্রধান ও গৌণ নির্ধারকের ভিত্তিতে একই সত্তায় আপাতবিরোধী ধর্মের প্রয়োগ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। [১, সূত্র ৫.৩২ ও ভাষ্য, পৃ. ২১৫–২১৬]
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণ
জৈন ভাষাতত্ত্বের এই দিককে নির্বাচনমূলক কিন্তু বাস্তবভিত্তিক ভাষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ভাষা বস্তুর সব গুণ একসঙ্গে প্রকাশ করে না; তবু প্রকাশিত গুণের বাস্তব ভিত্তি থাকতে হয়। এই ভাষা কোনো প্রাচীন কারিগরি পরিভাষার অনুবাদ নয়; পূজ্যপাদের প্রধান–গৌণ বিশ্লেষণ এবং অকলঙ্কের শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়নের ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ৫]
১২. স্যাৎ: “হয়তো” নয়, “নির্দিষ্ট অর্থে”
সংস্কৃত স্যাৎ (syāt) শব্দটিকে কেবল “হয়তো,” “সম্ভবত” বা “বোধ হয়” হিসেবে অনুবাদ করলে স্যাদবাদকে সংশয়বাদে পরিণত করার ঝুঁকি থাকে। অকলঙ্কের ব্যাখ্যায় syāt অর্থ kathañcit—কোনো নির্দিষ্টভাবে, কোনো বিশেষ দিক থেকে অথবা কোনো বিশেষ শর্তে।
নাহাটার বিশ্লেষণে অকলঙ্কীয় শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- নিজ দ্রব্য (svadravya);
- নিজ স্থান (svakṣetra);
- নিজ কাল (svakāla);
- নিজ অবস্থা বা ভাব (svabhāva)।
[৫, Laghīyastraya ৬২-সংক্রান্ত আলোচনা]
অতএব—
- syād asti—কোনো নির্দিষ্ট অর্থে আছে;
- syān nāsti—কোনো নির্দিষ্ট অর্থে নেই।
বক্তা নিজের বক্তব্য নিয়ে অনিশ্চিত নন; বক্তব্যটির প্রযোজ্যতার শর্ত প্রকাশ করছেন।
১৩. শর্ত যুক্ত করলেই কি সব বক্তব্য সত্য হয়ে যায়?
শর্ত যুক্ত করলেই কোনো বক্তব্য সত্য হয় না। অকলঙ্ক ও পরবর্তী ভাষ্যকারদের আলোচনার ভিত্তিতে নাহাটা আঙুলের ডগায় অসংখ্য হাতি অবস্থান করার উদাহরণ বিশ্লেষণ করেছেন। বাক্যের আগে syāt যুক্ত করলেও দাবি সত্য হয় না, কারণ কোনো প্রমাণসিদ্ধ শর্তের অধীনে বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠিত নয়। স্যাদবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত বা প্রমাণসিদ্ধ বিষয় সম্পর্কে প্রয়োগযোগ্য। [৫, “Limits to the Applicability of Syādvāda” বিভাগ]
এই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত
অনেকান্তবাদ—
- মিথ্যা বক্তব্যকে “আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি” বলে সত্য করে না;
- স্বেচ্ছাকল্পনাকে প্রমাণের সমান মর্যাদা দেয় না;
- শুধু শর্ত উচ্চারণে সন্তুষ্ট থাকে না;
- ঘোষিত শর্ত বাস্তব ও প্রমাণসমর্থিত কি না, সেই প্রশ্নও উত্থাপন করে।
এই সিদ্ধান্ত অকলঙ্কের প্রমাণসিদ্ধতা-সংক্রান্ত শর্ত এবং বৈধ নয়–দুর্নয়ের পার্থক্যের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫]
১৪. সমন্তভদ্র: বিধান ও নিষেধ
সমন্তভদ্র—সমন্তভদ্র (Samantabhadra)—এর আপ্তমীমাংসা (Āptamīmāṃsā)-য় অস্তিত্ব–অনস্তিত্ব, নিত্যতা–অনিত্যতা এবং একত্ব–বহুত্বের মতো আপাতবিরোধী বিধেয়ের শর্তনির্দিষ্ট প্রয়োগ আলোচিত হয়েছে।
শ্লোক ১০৫-এ স্যাদবাদ ও কেবলজ্ঞানের সম্পর্ক, শ্লোক ১১০-এ বিধান ও নিষেধের পারস্পরিকতা এবং শ্লোক ১১৩-এ পরস্পরকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে বিধান–নিষেধের যথাযথ প্রয়োগের প্রসঙ্গ রয়েছে। [৩, শ্লোক ১০৫, ১১০ ও ১১৩]
এই পর্যালোচনার ব্যাখ্যা
সমন্তভদ্রের অবস্থানকে “বিপরীত দুটি মতই একইভাবে সত্য” বলা যথার্থ নয়। তাঁর তত্ত্বায়নের বিশ্লেষণী তাৎপর্য হলো: বিপরীত বলে মনে হওয়া বিধেয়গুলোর আলাদা প্রযোজ্যতার নির্ধারক শনাক্ত করা। এই বাক্যটি শ্লোকগুলোর হুবহু অনুবাদ নয়; প্রাচীন পাঠের একটি আধুনিক বিশ্লেষণাত্মক পুনর্গঠন। [৩; ৬]
পঞ্চম পর্ব
ঐতিহাসিক বিকাশ ও ব্যাখ্যাপরম্পরা
১৫. ধারণার পূর্বসূত্র ও পরিভাষার ব্যবহার
অনেকান্তবাদের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে কয়েকটি বিষয় পৃথক রাখতে হয়:
- বহুমাত্রিক বাস্তবতার ধারণা;
- দ্রব্য ও পর্যায়ের পার্থক্য;
- নয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ;
- শর্তসূচক বিধেয়ন;
- anekānta শব্দটির সুস্পষ্ট কারিগরি প্রয়োগ;
- অনেকান্তবাদ, নয়বাদ ও স্যাদবাদের পদ্ধতিগত সংহতি।
জয়েন্দ্র সোনির বিশ্লেষণ অনুসারে কুন্দকুন্দ ও উমাস্বাতির পাঠে অনেকান্তমূলক কাঠামো উপস্থিত থাকলেও anekānta শব্দটি পরবর্তী সুস্পষ্ট কারিগরি অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। ধারণাগত কাঠামোর উপস্থিতি এবং নির্দিষ্ট পরিভাষার প্রণালীবদ্ধ ব্যবহার তাই একই ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। [৪, পৃ. ২৫–৩৫]
১৬. কুন্দকুন্দ
কুন্দকুন্দ—কুন্দকুন্দ (Kundakunda)—নামাঙ্কিত প্রবচনসার (Pravacanasāra) ২.২২–২৩ এবং পঞ্চাস্তিকায়সার (Pañcāstikāyasāra) ১৪-তে দ্রব্যগত অভিন্নতা ও পর্যায়গত পরিবর্তনের এমন কাঠামো পাওয়া যায়, যা পরবর্তী অনেকান্তবাদী বিশ্লেষণের পূর্বসূত্র হিসেবে পাঠ করা হয়েছে। [৪, পৃ. ২৭–২৯; ৯, “Anekāntavāda as a Resolution of the Paradox of Causality” বিভাগ]
কুন্দকুন্দের নির্দিষ্ট সময়কাল, তাঁর নামে প্রচলিত সব রচনার একক লেখকত্ব এবং পাঠগুলোর স্তরায়ন নিয়ে গবেষণায় মতভেদ রয়েছে। ফলে তাঁকে নিঃসংশয়ে একটি নির্দিষ্ট শতাব্দীতে স্থাপন করে অনেকান্তবাদের একক উদ্ভাবক হিসেবে উপস্থাপন করা নিরাপদ নয়।
১৭. উমাস্বাতি/উমাস্বামী
তত্ত্বার্থসূত্র-এ “অনেকান্তবাদ” শব্দটি পদ্ধতিগত শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত না হলেও পরবর্তী তত্ত্বটির কয়েকটি মৌলিক ভিত্তি পাওয়া যায়:
- প্রমাণ ও নয় দ্বারা জ্ঞান—১.৬;
- উৎপাদ, ব্যয় ও ধ্রৌব্যসহ বাস্তবতা—৫.৩০;
- প্রধান ও গৌণ নির্ধারকের অধীনে আপাতবিরোধী গুণ—৫.৩২;
- গুণ ও পর্যায়যুক্ত দ্রব্য—৫.৩৮।
উমাস্বাতি/উমাস্বামীকে তাই শব্দটির উদ্ভাবক না বলে অনেকান্ত সত্তাতত্ত্ব ও জ্ঞানতত্ত্বের প্রণালীবদ্ধ ভিত্তি নির্মাতাদের একজন বলা অধিকতর সতর্ক। [১; ৪, পৃ. ২৮–৩৩]
১৮. পূজ্যপাদ দেবনন্দী
সোনির পাঠ অনুসারে, বর্তমানে টিকে থাকা জৈন দার্শনিক রচনাগুলোর মধ্যে পূজ্যপাদের সর্বার্থসিদ্ধি-তে anekānta শব্দটির প্রাচীনতম সুস্পষ্ট কারিগরি প্রয়োগগুলোর একটি দেখা যায়। সোনি নিঃশর্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে সম্ভাবনাসূচক ভাষা ব্যবহার করেছেন। [৪, পৃ. ৩৩–৩৪]
অতএব, “পূজ্যপাদই ইতিহাসে প্রথম শব্দটি ব্যবহার করেন”—এই দাবি পরিহার করা প্রয়োজন। অধিকতর সতর্ক ভাষা হবে:
টিকে থাকা পাঠ এবং বর্তমান পাঠসমালোচনামূলক গবেষণার ভিত্তিতে পূজ্যপাদের ভাষ্য anekānta শব্দটির প্রাচীনতম সুস্পষ্ট জৈন কারিগরি প্রয়োগগুলোর একটি।
১৯. সিদ্ধসেন দিবাকর
সিদ্ধসেনের সময়কাল, পরিচয় এবং একই নামে প্রচলিত গ্রন্থগুলোর লেখকত্ব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সন্মতিতর্ক-এর ১৯৩৯ সালের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকাতেও তাঁর সময়কাল ও রচনাস্বত্বসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো আলোচনা করা হয়েছে। [২, ভূমিকা]
সিদ্ধসেনের তত্ত্বায়নের প্রধান তাৎপর্য—
- দ্রব্যকেন্দ্রিক ও পর্যায়কেন্দ্রিক নয় পৃথক করা;
- কোনো একটি নয়কে পূর্ণ সত্যে উন্নীত করার সমস্যা দেখানো;
- নয়সমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়;
- অভিন্নতা ও পরিবর্তনের ভিন্ন নির্ধারক শনাক্ত করা।
[২, প্রথম অধ্যায়, গাথা ২২–২৫ ও ৪৪–৪৬]
২০. অকলঙ্ক ভট্ট
সাধারণভাবে অষ্টম শতকে স্থাপিত অকলঙ্ক ভট্ট—অকলঙ্ক ভট্ট (Akalaṅka Bhaṭṭa)—অনেকান্তবাদ, নয়বাদ, স্যাদবাদ এবং প্রমাণতত্ত্বকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেন। নাহাটার বিশ্লেষণ অনুসারে—
- একটি পৃথক শর্তনির্দিষ্ট বিধেয় একটি বৈধ নয়;
- সাতটি শর্তনির্দিষ্ট বিধেয় সম্মিলিতভাবে বহুধর্মী বাস্তবতার ভাষিক রূপায়ণে অংশ নেয়;
- স্যাদবাদ প্রমাণসিদ্ধ বস্তুর শর্তনির্দিষ্ট ভাষিক জ্ঞান;
- অন্য দৃষ্টিনয়ের ওপর নির্ভরতা স্বীকার বা অস্বীকারের সঙ্গে নয় ও দুর্নয়ের পার্থক্য সম্পর্কিত।
[৫, “Genuine Viewpoints and Pseudo-viewpoints,” “Syādvāda as a Source of Knowledge” এবং “Conclusion” বিভাগ]
২১. অনেকান্তবাদের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার বহুত্ব
অনেকান্তবাদের ইতিহাসকে একটি অপরিবর্তিত, একরৈখিক অর্থের ইতিহাস হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্টের পর্যালোচনায় ধারণাটির অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রয়োগ চিহ্নিত হয়েছে: কার্যকারণের আপাত সমস্যা ব্যাখ্যা এবং অজৈন দর্শনগুলোর শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্যায়ন। [৯, সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগ]
অকলঙ্কের রচনা নিয়ে নাহাটার বিশ্লেষণে স্যাদবাদ অনেকান্ত সত্তাতত্ত্ব ও নয়সমূহের ভাষিক–জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশ্লেষ। কর্ট জৈন বিতর্কে অন্য মতের সীমিত যথার্থতা স্বীকারের পাশাপাশি জৈন জ্ঞানের পূর্ণতর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকটি সামনে এনেছেন। বারবাতো অনেকান্তবাদকে সংলাপনির্ভর পরিচয় নির্মাণের একটি পদ্ধতি হিসেবে পাঠ করেছেন। [৫; ৮; ১১]
এই পর্যালোচনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
অনেকান্তবাদের অতীতে একটিমাত্র ব্যাখ্যা ছিল এবং কেবল সমকালীন পর্বে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সৃষ্টি হয়েছে—এমন দ্বিবিভাজন গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জৈন পণ্ডিতেরা ভিন্ন দার্শনিক সমস্যা, বিতর্ক ও ভাষ্যপরম্পরায় ধারণাটিকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। আধুনিক ও সমকালীন গবেষকেরাও নিজস্ব প্রশ্ন, ধারণাগত পরিসর এবং নৈতিক–রাজনৈতিক উদ্বেগের ভিত্তিতে নতুন ভাষ্য নির্মাণ করেছেন।
অতএব আধুনিক বা সমকালীন ব্যাখ্যাকেও অনেকান্তবাদের চূড়ান্ত অর্থ হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত ভাষ্য ও ব্যাখ্যামূলক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই সিদ্ধান্ত ব্রঙ্কহর্স্ট, নাহাটা, কর্ট এবং বারবাতোর ভিন্ন পাঠের তুলনামূলক পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ৮–৯; ১১]
ষষ্ঠ পর্ব
সমকালীন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
২২. বিমলকৃষ্ণ মতিলাল
বিমলকৃষ্ণ মতিলাল—বিমলকৃষ্ণ মতিলাল (Bimal Krishna Matilal)—অনেকান্তবাদকে আধুনিক দার্শনিক ভাষায় পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক।
মতিলালের বিশ্লেষণে কোনো সত্তাতাত্ত্বিক প্রস্তাব প্রযোজ্যতার নির্ধারক ছাড়া নিঃশর্তভাবে উচ্চারিত হলে একপাক্ষিক হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। তাঁর পাঠে syāt বক্তব্যকে কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিনয় বা শর্তের সঙ্গে যুক্ত করে। “বস্তু স্থায়ী” এবং “বস্তু পরিবর্তনশীল”—দুটি বাক্যকেই যথাযথ নির্ধারকের অধীনে স্থাপন করতে হয়। [৬, পৃ. ৫৯–৬১]
মতিলালের কাছে অনেকান্তবাদ—
- বিরোধী মতের গাণিতিক গড় নয়;
- দুটি দাবির অস্পষ্ট আপস নয়;
- সব মতকে সমান সত্য ঘোষণা নয়;
- প্রতিটি দাবির যথার্থতার পরিসর পুনর্গঠনের পদ্ধতি।
প্রয়োগভিত্তিক উদাহরণ
একজন গবেষক কোনো প্রত্নঢিবিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থানিক ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দিলেন। অন্য একজন বন্যা, পরিত্যাগ ও পুনর্বসতির বিভিন্ন পর্যায় শনাক্ত করলেন। অনেকান্তমূলক বিশ্লেষণ “অর্ধেক ধারাবাহিক, অর্ধেক বিচ্ছিন্ন”—এমন অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নির্মাণ করবে না। বরং পরীক্ষা করবে—
- প্রথম বক্তব্য কোন স্থানিক স্কেলে যথার্থ;
- দ্বিতীয় বক্তব্য কোন কালগত পর্যায়ে প্রযোজ্য;
- উভয় গবেষক একই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন কি না;
- বিরোধটি প্রকৃত, নাকি বিশ্লেষণী স্কেলভেদের ফল;
- কোন অতিরিক্ত প্রমাণে সিদ্ধান্ত সংশোধিত হতে পারে।
এই পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ মতিলালের শর্তনির্দিষ্টতা, গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক যুক্তি এবং হ্যারিসের স্তরবিন্যাস–কালানুক্রম আলোচনার ভিত্তিতে নির্মিত। [৬–৭; ১৮]
২৩. জোনার্ডন গণেরি
জোনার্ডন গণেরি—জোনার্ডন গণেরি (Jonardon Ganeri)—জৈন যুক্তিকে সমকালীন দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বহুত্ববাদের একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে পুনর্গঠন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ ধ্রুপদি জৈন চিন্তার আধুনিক formal reconstruction; কোনো প্রাচীন জৈন গ্রন্থের সরাসরি অনুবাদ নয়।
গণেরি এমন বক্তব্যসমষ্টি বিশ্লেষণ করেন, যা সামগ্রিকভাবে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও পৃথক দৃষ্টিনয়ের অভ্যন্তরে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে। তাঁর ভাষায় একটি দৃষ্টিনয় হলো সামগ্রিকভাবে অসংগত আলোচনার মধ্যে পারস্পরিকভাবে সমর্থনকারী একটি অভ্যন্তরীণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্যসমষ্টি। [৭, পৃ. ২৬৭–২৬৯]
আদালতের সাক্ষীর উদাহরণ
গণেরি আদালত বা জুরিবোর্ডের একটি উদাহরণ ব্যবহার করেন। কয়েকজন সাক্ষী একই ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন বিবরণ দিয়েছেন। প্রত্যেকের অবস্থান, দৃশ্যমানতা, সময় এবং তথ্যপ্রাপ্তির পরিসর ভিন্ন হতে পারে। [৭, পৃ. ২৬৭, ২৭৪]
দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রশ্ন করবে—
- সাক্ষী কোথায় ছিলেন;
- কী দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন;
- কোন অংশ প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং কোন অংশ অনুমান;
- কোন তথ্য বিভিন্ন সাক্ষ্যে মিলে যায়;
- কোন বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে পরস্পরবিরোধী।
গণেরির মডেল নিজে থেকে অপরাধী নির্ধারণ করে না। বিভিন্ন সাক্ষ্য ও প্রমাণের পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট করে, যাতে পরবর্তী বিচার অধিকতর যুক্তিসংগতভাবে করা যায়।
এই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত
গণেরির মডেল থেকে “সব সাক্ষ্য আংশিকভাবে সত্য”—এমন সিদ্ধান্ত টানা ভুল। অধিকতর যথার্থ সিদ্ধান্ত হলো:
বিভিন্ন সাক্ষ্যের প্রেক্ষিত ও অভ্যন্তরীণ সঙ্গতি বোঝা সত্যনির্ণয়ের প্রস্তুতি; সত্যনির্ণয়ের বিকল্প নয়।
এই উপসংহার গণেরির আদালত-উদাহরণ এবং প্রবন্ধের শেষাংশে বিভিন্ন দৃষ্টিনয়ের শর্ত প্রকাশের আলোচনার ভিত্তিতে নির্মিত। [৭, পৃ. ২৭৪, ২৭৮–২৭৯]
২৪. কর্ট, ব্রঙ্কহর্স্ট, কোলার ও বারবাতো
জন ই. কর্ট—জন ই. কর্ট (John E. Cort)—অনেকান্তবাদকে সরলভাবে পরমতসহিষ্ণুতার মতবাদ হিসেবে পাঠ করার সীমা নির্দেশ করেছেন। তাঁর পর্যালোচনায় জৈন পণ্ডিতেরা অজৈন মতের সীমিত যথার্থতা স্বীকার করলেও জিনের কেবলজ্ঞানের ভিত্তিতে জৈন সত্তাতত্ত্বকে পূর্ণতর সত্যের ধারক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। [৮, পৃ. ৩২৪–৩৪৭]
ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট—ইয়োহানেস ব্রঙ্কহর্স্ট (Johannes Bronkhorst)—অনেকান্তবাদের ঐতিহাসিক ব্যবহারকে কার্যকারণের সমস্যা এবং অজৈন মতের শ্রেণিবিন্যাস—এই দুই প্রধান দিক থেকে পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ ধারণাটির ঐতিহাসিক ভূমিকার বহুমাত্রিকতা দেখায়। [৯]
জন এম. কোলার—জন এম. কোলার (John M. Koller)—স্যাদবাদকে অনেকান্তবাদের “মধ্যপন্থী” সত্তাতত্ত্বের জ্ঞানতাত্ত্বিক চাবিকাঠি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। [১০, পৃ. ৪০০–৪০৭]
মেলানি বারবাতো—মেলানি বারবাতো (Melanie Barbato)—অনেকান্তবাদকে সংলাপনির্ভর পরিচয় নির্মাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, অপরের অবস্থানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া এবং নিজস্ব জৈন পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা পরস্পরবিরোধী নয়। এই পাঠ আপেক্ষিকতাবাদ থেকে আলাদা, কারণ জৈনরা নিজেদের নর্মেটিভ বাস্তবতা সম্পর্কে শর্তহীন দাবিও বজায় রাখতে পারেন। [১১]
এই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত
মতিলাল, গণেরি, কর্ট, ব্রঙ্কহর্স্ট, কোলার ও বারবাতোর পাঠের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি পাঠ অনেকান্তবাদের একটি নির্দিষ্ট দিক সামনে আনে:
- শর্তনির্দিষ্ট সত্য;
- দৃষ্টিনয়ভিত্তিক যুক্তি;
- বিতর্কমূলক শ্রেণিবিন্যাস;
- কার্যকারণের সমস্যা;
- জ্ঞানতাত্ত্বিক মধ্যপন্থা;
- সংলাপনির্ভর পরিচয়।
কোনো একটি আধুনিক ব্যাখ্যাকে অনেকান্তবাদের একমাত্র চূড়ান্ত অর্থে পরিণত করা এই ধারণার ঐতিহাসিক বহুত্বকেই সংকুচিত করবে।
সপ্তম পর্ব
বস্তুনিষ্ঠ সত্য, সত্তাশ্রয়ী অভিজ্ঞতা ও আপেক্ষিকতাবাদ
২৫. অনেকান্তবাদ কি বস্তুনিষ্ঠ সত্য অস্বীকার করে?
অনেকান্তবাদ বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) অস্বীকার করে না। অকলঙ্কের কাঠামোয় স্যাদবাদের প্রয়োগ প্রমাণসিদ্ধ বাস্তব সত্তা ও অবস্থার দ্বারা সীমিত। বক্তা বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা কোনো অবাস্তব বিষয়কে সত্যে পরিণত করতে পারে না। [৫, “Limits to the Applicability of Syādvāda” বিভাগ]
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী সংশ্লেষ
অনেকান্তবাদে বস্তুনিষ্ঠতাকে শর্তনির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠতা (condition-qualified objectivity) হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এই পরিভাষাটি প্রাচীন জৈন কারিগরি শব্দ নয়; তত্ত্বার্থসূত্র-এর প্রধান–গৌণ নির্ধারক, অকলঙ্কের শর্ত এবং মতিলালের শর্তনির্দিষ্ট বক্তব্য-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [১, সূত্র ৫.৩২; ৫–৬]
শর্তনির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠতার অর্থ—
- সত্য কেবল বক্তার অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল নয়;
- সত্যবাক্যের প্রযোজ্য কাল, স্থান, সম্পর্ক ও বিধেয় থাকতে পারে;
- প্রযোজ্যতার শর্ত প্রকাশ করা সত্যকে দুর্বল না করে অধিক নির্ভুল করে।
২৬. সত্তাশ্রয়ী অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কনির্ভর সত্য
সত্তাশ্রয়ী (subjective) বক্তব্য ব্যক্তির অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, রুচি বা মানসিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
“আমার কাছে পাত্রটির নকশা সুন্দর।”
এই বাক্যটি সত্তাশ্রয়ী নান্দনিক প্রতিক্রিয়া।
“পাত্রটির উচ্চতা ২২ সেন্টিমিটার।”
এই বাক্যটি পরিমাপযোগ্য ও আন্তর্ব্যক্তিকভাবে পরীক্ষাযোগ্য।
“এই পাত্রটি অন্য পাত্রটির তুলনায় ভারী।”
বক্তব্যটি সম্পর্কনির্ভর হলেও সত্তাশ্রয়ী নয়।
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী ত্রিভাগ
অনেকান্তবাদ ব্যাখ্যায় তিনটি ক্ষেত্র পৃথক রাখা সহায়ক:
১. সত্তাশ্রয়ী অভিজ্ঞতা (subjective experience);
২. সম্পর্কনির্ভর বস্তুনিষ্ঠ সত্য (relationally conditioned objective truth);
৩. বস্তুগত গুণসংক্রান্ত দাবি (object-property claim)।
এই ত্রিভাগ কোনো প্রাচীন জৈন শ্রেণিবিন্যাস নয়। পূজ্যপাদের দেবদত্ত-উদাহরণ, অকলঙ্কের শর্তনির্দিষ্টতা এবং মতিলালের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় গঠিত। [১, পৃ. ২১৫–২১৬; ৫–৬]
২৭. অনেকান্তবাদ ও আপেক্ষিকতাবাদ
অনেকান্তবাদ ও আপেক্ষিকতাবাদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে:
- প্রসঙ্গ ও নির্ধারকের গুরুত্ব;
- একক দৃষ্টিকোণের সীমা;
- শর্তহীন সর্বজনীনীকরণের সমালোচনা;
- একই বস্তু সম্পর্কে একাধিক যথার্থ বর্ণনার সম্ভাবনা।
তবে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অনেকান্তবাদে বর্ণনার বহুত্বের ভিত্তি বাস্তব বস্তুর বহুগুণবিশিষ্টতা। বক্তার ইচ্ছা, পরিচয় বা সংস্কৃতি কোনো অবাস্তব দাবিকে সত্যে পরিণত করে না। বৈধ নয়, দুর্নয় এবং প্রমাণসিদ্ধতার পার্থক্য বজায় থাকে। [৫–৬]
এই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত
অনেকান্তবাদকে সত্তাশ্রয়ী আপেক্ষিকতাবাদ না বলে শর্তনির্দিষ্ট বাস্তববাদ (condition-qualified realism) হিসেবে পাঠ করা অধিকতর উপযুক্ত। এই অভিব্যক্তি কোনো প্রাচীন জৈন পরিভাষা নয়; তত্ত্বার্থসূত্র-এর সত্তাতত্ত্ব, অকলঙ্কের শর্ত এবং মতিলালের অ-একপাক্ষিকতার ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ৫–৬]
অষ্টম পর্ব
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয়, পরমতসহিষ্ণুতা ও সংলাপ
২৮. জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয়
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয় (epistemic humility) ধ্রুপদি জৈন কারিগরি পরিভাষা নয়। বর্তমান পর্যালোচনায় শব্দবন্ধটি নিম্নলিখিত পদ্ধতিগত অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে:
- আমি কী জানি, তা স্পষ্টভাবে বলা;
- কীভাবে জানি, তা দেখানো;
- প্রমাণের সীমা স্বীকার করা;
- অনিশ্চয়তার মাত্রা প্রকাশ করা;
- কোন নতুন প্রমাণে সিদ্ধান্ত সংশোধিত হবে, তা জানানো;
- নিজের দৃষ্টিনয়কে পূর্ণ ও চূড়ান্ত সত্যে পরিণত না করা।
এই সংজ্ঞা অকলঙ্কের দৃষ্টিনয় ও প্রমাণের সীমা, মতিলালের শর্তনির্দিষ্টতা এবং গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫–৭]
সিদ্ধান্তের শক্তি যেন প্রমাণের শক্তিকে অতিক্রম না করে—এই বাক্যটি বর্তমান পর্যালোচনার সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিগত সূত্র; কোনো প্রাচীন জৈন উদ্ধৃতি নয়।
২৯. জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয় ও পরমতসহিষ্ণুতার ব্যাখ্যা
জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয়, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধার মানদণ্ডে অনেকান্তবাদকে পাঠ করা আধুনিক ও সমকালীন ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এই পাঠে নিজের জ্ঞানের সীমা স্বীকার, প্রতিপক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে অনুধাবন এবং কোনো একটি দৃষ্টিনয়কে চূড়ান্ত সত্যে পরিণত না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মতিলাল ও কোলারের বিশ্লেষণ এই পাঠের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। [৬, পৃ. ৫৯–৬১; ১০, পৃ. ৪০০–৪০৭]
তবে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয় বা পরমতসহিষ্ণুতাকেই অনেকান্তবাদের একমাত্র ঐতিহাসিক অর্থ বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। অতীতেও বিভিন্ন দার্শনিক সমস্যা ও বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকান্তবাদ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত ও প্রযুক্ত হয়েছে। কখনো কার্যকারণ ও পরিবর্তনের সমস্যা ব্যাখ্যায়, কখনো নয়সমূহের সম্পর্ক নির্ণয়ে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী দার্শনিক অবস্থানের সীমা চিহ্নিত করতে এবং কখনো জৈন জ্ঞানের পূর্ণতর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ধারণাটি ব্যবহৃত হয়েছে। [৫; ৮–৯]
অতএব, অনেকান্তবাদকে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিনয় ও পরমতসহিষ্ণুতার ভিত্তি হিসেবে পাঠ করা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যামূলক সম্ভাবনা। একই সঙ্গে এই পাঠকে আধুনিক সহিষ্ণুতা, সংলাপ ও অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধার মানদণ্ডে নির্মিত একটি ভাষ্য হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। আধুনিক বা সমকালীন ব্যাখ্যাও ব্যাখ্যা ও ভাষ্যের পরিসরের বাইরে নয়। [৬; ৮–১১]
৩০. বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ
অনেকান্তমূলক সংলাপের অর্থ প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা নয়। কোনো অবস্থান যথাযথভাবে অনুধাবন করার আগেই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য, খারিজ বা অসংগত বলে ঘোষণা না করাই এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
প্রথমে নির্ণয় করতে হবে—
- বক্তব্যটি কোন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে;
- কোন প্রমাণ ও পূর্বধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত;
- কোন পরিসরে বক্তব্যটি যথার্থ;
- কোথায় বক্তব্যটি নিজের প্রমাণের সীমা অতিক্রম করছে;
- কোন বিকল্প প্রমাণ বা দৃষ্টিনয় তার সীমা প্রকাশ করছে।
প্রতিপক্ষের বক্তব্য বোঝা এবং তার সমালোচনা করা পরস্পরবিরোধী কাজ নয়। যথাযথ অনুধাবনই নির্ভুল সমালোচনার পূর্বশর্ত। এই ব্যাখ্যার ভিত্তি অকলঙ্কের নয়–দুর্নয় পার্থক্য, মতিলালের শর্তনির্দিষ্টতা এবং গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ। [৫–৭]
৩১. সহিষ্ণুতা মানে সব বক্তব্যের সমমর্যাদা নয়
একজন মানুষের নৈতিক মর্যাদা স্বীকার করা এবং তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে সত্য বলে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।
পরমতসহিষ্ণুতার মধ্যে থাকতে পারে—
- বক্তাকে কথা বলার ন্যায্য সুযোগ দেওয়া;
- বক্তব্য বিকৃত না করা;
- অভিজ্ঞতা ও অবস্থান বোঝা;
- প্রমাণবিরোধী দাবিকে প্রমাণবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা;
- বিদ্বেষ, হুমকি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নৈতিক ও আইনি সীমা নির্ধারণ।
এই পর্যালোচনার নৈতিক–জ্ঞানতাত্ত্বিক সংশ্লেষ
মানুষের নৈতিক মর্যাদা সমান হতে পারে; কিন্তু বক্তব্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক মর্যাদা প্রমাণ, যুক্তি ও পরীক্ষাযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এই পার্থক্য অকলঙ্কের প্রমাণশর্ত, গণেরির প্রমাণবিন্যাস, কর্টের ঐতিহাসিক সতর্কতা এবং রলসের যুক্তিসংগত বহুত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ৭–৮; ১৩]
নবম পর্ব
রাজনৈতিক ও মূল্যগত বহুত্বের সঙ্গে সম্পর্ক
৩২. রাজনৈতিক বহুত্ববাদ
রাজনৈতিক বহুত্ববাদ (political pluralism) সাধারণত বিভিন্ন নাগরিক পরিচয়, ধর্ম, জীবনদর্শন ও সংগঠনের সহাবস্থান, সমান নাগরিক অধিকার এবং ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জন রলস—জন রলস (John Rawls)—এর যুক্তিসংগত বহুত্ব (reasonable pluralism) ধারণায় মুক্ত সমাজে একাধিক যুক্তিসংগত জীবনদর্শনের স্থায়ী উপস্থিতি প্রত্যাশিত। তবে “যুক্তিসংগত” মতকে অন্য নাগরিকের সমান স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার মৌলনীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়। [১৩, পৃ. ৩৬–৩৭]
এই পর্যালোচনার তুলনামূলক সিদ্ধান্ত
অনেকান্তবাদ ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ অভিন্ন নয়।
- অনেকান্তবাদ বাস্তবতা, জ্ঞান ও ভাষার শর্তনির্দিষ্টতা ব্যাখ্যা করে;
- রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নাগরিক অধিকার, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতা-বণ্টন নিয়ে কাজ করে।
তবে রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে অনেকান্তবাদ একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সতর্কতা দিতে পারে: কোনো একটি নাগরিক পরিচয়কে ব্যক্তির পূর্ণ ও একমাত্র পরিচয় হিসেবে গ্রহণ না করা। এই প্রয়োগ পূজ্যপাদের সম্পর্কগত উদাহরণ এবং রলসের রাজনৈতিক বহুত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ১৩]
৩৩. মূল্য-বহুত্ববাদ
মূল্য-বহুত্ববাদ (value pluralism) অনুসারে স্বাধীনতা, সমতা, ন্যায়, নিরাপত্তা, আনুগত্য ও সহমর্মিতার মতো একাধিক প্রকৃত মূল্য থাকতে পারে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এসব মূল্য পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে এবং সব মূল্যকে একটি মাত্র সর্বোচ্চ সূত্রে সম্পূর্ণভাবে ক্রমান্বিত করা নাও যেতে পারে।
আইজায়া বার্লিন—আইজায়া বার্লিন (Isaiah Berlin)—মানবিক মূল্যসমূহের এই বহুত্ব ও সম্ভাব্য সংঘর্ষের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। [১৪, পৃ. ১–১৯]
এই পর্যালোচনার তুলনামূলক সিদ্ধান্ত
মূল্য-বহুত্ববাদ ও অনেকান্তবাদের সাদৃশ্য হলো—একটি একক সূত্রের মধ্যে সব বহুত্বকে বিলীন না করা। পার্থক্য হলো—
- মূল্য-বহুত্ববাদ প্রধানত নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে;
- অনেকান্তবাদ বাস্তবতা, জ্ঞান, ভাষা ও বিধেয়নের ব্যাপকতর তত্ত্ব।
এই তুলনা আধুনিক প্রয়োগমূলক বিশ্লেষণ; প্রাচীন জৈন পণ্ডিতেরা বার্লিনীয় মূল্য-বহুত্ববাদ আলোচনা করেননি।
দশম পর্ব
জ্ঞানতাত্ত্বিক সুবিধাবাদ ও পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া
৩৪. জ্ঞানতাত্ত্বিক সুবিধাবাদ
জ্ঞানতাত্ত্বিক সুবিধাবাদ (epistemic opportunism) জৈন দর্শনের প্রাচীন কারিগরি পরিভাষা নয়। বর্তমান পর্যালোচনায় এমন বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ বোঝাতে শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী—
- নিজের পক্ষে তথ্য এলে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের দাবি করে;
- বিপক্ষে তথ্য এলে সব সত্যকে সত্তাশ্রয়ী বা আপেক্ষিক বলে;
- নিজের ঐতিহ্যের মৌখিক স্মৃতিকে প্রামাণ্য মনে করে;
- অন্যের মৌখিক স্মৃতিকে অপ্রামাণ্য বলে;
- ফলাফল অনুযায়ী প্রমাণের মানদণ্ড পরিবর্তন করে।
এখানে সমস্যা শর্তের বহুত্ব নয়; ফলাফল বা পরিচয়গত সুবিধার ভিত্তিতে বিচারমান পরিবর্তন।
৩৫. পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া
ড্যান এম. কাহান—ড্যান এম. কাহান (Dan M. Kahan)—পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া (identity-protective cognition) বলতে এমন প্রবণতা বোঝান, যেখানে মানুষ নিজের গোষ্ঠী-পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রমাণ গ্রহণ এবং বিরোধী প্রমাণ নির্বাচনমূলকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। উচ্চতর বিশ্লেষণী দক্ষতাও সবসময় এই প্রবণতা কমায় না; কখনো সেই দক্ষতা পরিচয়সমর্থক সিদ্ধান্ত রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। [১২, পৃ. ১–২, ৬]
এই পর্যালোচনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
অনেকান্তবাদ ও পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়ার পার্থক্য:
- অনেকান্তবাদ নিজের দৃষ্টিনয় প্রকাশ করতে বলে;
- পরিচয়-রক্ষাকারী যুক্তি পক্ষপাতকে অদৃশ্য রাখে;
- অনেকান্তবাদ শর্তকে প্রমাণসিদ্ধ রাখে;
- সুবিধাবাদ প্রত্যাশিত ফল অনুসারে শর্ত বদলায়;
- অনেকান্তবাদ সংশোধনযোগ্যতা দাবি করে;
- পরিচয়-রক্ষাকারী যুক্তি কেন্দ্রীয় বিশ্বাসকে খণ্ডন-অযোগ্য করে।
এই বিন্যাস অকলঙ্ক, মতিলাল এবং কাহানের আলোচনার তুলনামূলক সংশ্লেষ। [৫–৬; ১২]
একাদশ পর্ব
বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা ও ঘটনাগত সত্য
৩৬. ঘটনাগত সত্যকে মতামতে রূপান্তর
হান্না আরেন্ট—হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt)—দেখিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর ঘটনাগত সত্য (factual truth) প্রায়ই “আরেকটি মতামত” হিসেবে পুনর্নির্মিত হয়। কোনো ঘটনার নথিভুক্ত বাস্তবতা এবং ঘটনার ব্যাখ্যা এক বিষয় নয়। [২০, পৃ. ২২৩–২৫৯]
প্রয়োগভিত্তিক উদাহরণ
সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াল যে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কোনো ধর্মীয় স্থান অপবিত্র করেছে। একটি ভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া হতে পারে:
“দুই পক্ষেরই নিজস্ব সত্য আছে।”
অনেকান্তমূলক কিন্তু প্রমাণনিষ্ঠ অনুসন্ধান প্রশ্ন করবে—
- ভিডিওটি কোথায় এবং কখন ধারণ করা;
- দৃশ্যটি সম্পাদিত কি না;
- প্রত্যক্ষদর্শী কী দেখেছেন এবং কোন অংশ অনুমান করেছেন;
- স্বাধীন শারীরিক বা ডিজিটাল প্রমাণ কী;
- কোন দাবি প্রথম ছড়ানো হয়েছিল;
- কোনো বক্তব্য ইতিমধ্যে খণ্ডিত হয়েছে কি না।
এই উদাহরণ প্রাচীন জৈন পাঠের অংশ নয়। অকলঙ্কের প্রমাণশর্ত, গণেরির সাক্ষ্য-বিন্যাস, কাহানের পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া এবং আরেন্টের ঘটনাগত সত্যের আলোচনার ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ৭; ১২; ২০]
৩৭. দুই-পক্ষ-সমীকরণ
দুই-পক্ষ-সমীকরণ (both-sidesism/false equivalence) এমন একটি উপস্থাপনরীতি, যেখানে অসম প্রমাণ, অসম ক্ষমতা বা অসম দায়কে “দুই পক্ষের মত” হিসেবে সমানভাবে উপস্থাপন করা হয়।
কোনো সহিংস ঘটনায়—
- কে আক্রমণ শুরু করেছে;
- কার হাতে অস্ত্র ছিল;
- কে আহত বা নিহত হয়েছেন;
- কার সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে;
- কোন দলিল বা দৃশ্য প্রমাণিত;
- কে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচার করেছে—
এসব প্রমাণনির্ভর প্রশ্ন।
এই পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত
বয়ানের বহুত্ব থেকে নৈতিক বা কার্যকারণগত সমতা আসে না। অনেকান্তবাদ বিভিন্ন বয়ানের শর্ত, অবস্থান ও সীমা বিশ্লেষণ করতে পারে; কিন্তু অসম প্রমাণ ও দায়কে সমান করে না। এই সিদ্ধান্ত গণেরির সাক্ষ্য-বিন্যাস, অকলঙ্কের প্রমাণশর্ত এবং আরেন্টের ঘটনাগত সত্যের পার্থক্যের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ৭; ২০]
৩৮. কারণের বহুত্ব ও নৈতিক দায়
কোনো সহিংসতার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে:
- দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য;
- রাজনৈতিক উসকানি;
- গুজব;
- সাংগঠনিক প্রস্তুতি;
- প্রশাসনিক ব্যর্থতা;
- দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি;
- নির্দিষ্ট ব্যক্তির সিদ্ধান্ত।
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণ
বহুকারণীয় ব্যাখ্যা অপরাধের দায় অস্বীকার করে না। “ঘটনা কেন ঘটেছে” এবং “কে কী করেছে”—দুটি পৃথক কিন্তু সম্পর্কিত প্রশ্ন। অনেকান্তমূলক পদ্ধতি কার্যকারণের বিভিন্ন স্তর পৃথক করতে পারে; অপরাধী ও ভুক্তভোগীকে নৈতিকভাবে সমান করে না।
এই সিদ্ধান্ত কোনো প্রাচীন জৈন বিধানের সরাসরি অনুবাদ নয়; গণেরির প্রমাণবিন্যাস, আরেন্টের ঘটনাগত সত্য এবং সমান মানবিক মর্যাদার আধুনিক নীতির ভিত্তিতে নির্মিত। [৭; ১৩; ২০]
দ্বাদশ পর্ব
বহুমাত্রিক পরিচয়, জাতীয়তাবাদ ও কৌশলগত বহুত্ব
৩৯. একটি পরিচয় কি মানুষের পূর্ণ সত্তা?
একজন মানুষ একই সঙ্গে হতে পারেন—
- নাগরিক;
- ভাষিক সম্প্রদায়ের সদস্য;
- শিক্ষক;
- পিতা বা মাতা;
- পেশাজীবী;
- আঞ্চলিক অধিবাসী;
- কোনো ধর্মীয় বা অধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ।
সব পরিচয় সব পরিস্থিতিতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-পরিচয়, পরিবারে পিতা বা মাতার পরিচয় এবং নির্বাচনে নাগরিক পরিচয় প্রধান হতে পারে।
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণ
একটি পরিচয়কে মানুষের পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় সত্তায় পরিণত করা পূজ্যপাদের দেবদত্ত-উদাহরণের আধুনিক সামাজিক বিপরীতরূপ হিসেবে দেখা যায়। দেবদত্তের একাধিক সম্পর্ক যেমন বাস্তব, তেমনি ব্যক্তির একাধিক সামাজিক সম্পর্কও বাস্তব।
তবে আধুনিক পরিচয়গুলো ক্ষমতা, আইন, আরোপ এবং বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত—যেসব প্রশ্ন পূজ্যপাদের মূল উদাহরণে আলোচিত হয়নি। এই প্রয়োগ পূজ্যপাদের সম্পর্কগত বিশ্লেষণ এবং আধুনিক রাজনৈতিক বহুত্বের ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ১৩]
৪০. হিন্দুত্ব ও হিন্দু ঐতিহ্যের পার্থক্য
হিন্দুত্ব (Hindutva) একটি আধুনিক রাজনৈতিক–জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ; হিন্দু ধর্মীয়, আচারিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের সমগ্র বহুত্বের সমার্থক নয়।
হিন্দু ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে রয়েছে—
- বিভিন্ন দেবতা ও উপাসনাপদ্ধতি;
- আঞ্চলিক রীতি;
- ভিন্ন দার্শনিক অবস্থান;
- ভাষাগত বৈচিত্র্য;
- শাস্ত্রীয় ও লোকায়ত অনুশীলন;
- পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক ও ধর্মীয় ধারা।
ব্রায়ান গারভিন—ব্রায়ান গারভিন (Brian Girvin)—ভারতে সমন্বয়মূলক নাগরিক বহুত্ব থেকে অধিকতর এককেন্দ্রিক, আত্মসাৎমূলক ও ধর্মীয়–জাতিগত সংখ্যাগুরুবাদের দিকে পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় সাধারণ সংস্কৃতি, অভিন্ন পরিচয় ও একক ঐতিহাসিক অতীত নির্মাণ সংখ্যাগুরুবাদী জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। [১৫, পৃ. ২৭–৪৫]
প্রতাপ ভানু মেহতা—প্রতাপ ভানু মেহতা (Pratap Bhanu Mehta)—বিশ্লেষণ করেছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভ্যন্তর থেকে শক্তি অর্জন করেও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক রীতির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষয় করতে পারে এবং জটিল সাংস্কৃতিক সূত্রগুলোকে সংগঠিত রাজনৈতিক ঐক্যে বিন্যস্ত করতে পারে। [১৬, পৃ. ৩১–৪৭]
৪১. শ্রেণিবদ্ধ বহুত্ব ও সমরূপীকরণ
কোনো সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ বলতে পারে:
“আমাদের সভ্যতা সব সম্প্রদায় ও বিশ্বাসকে ধারণ করে।”
বাক্যটি বহুত্ববাদী মনে হতে পারে। কিন্তু কয়েকটি প্রশ্ন প্রয়োজন:
- বিভিন্ন পরিচয় কি সমান নাগরিক মর্যাদায় স্বীকৃত?
- নাকি অন্য পরিচয়গুলোকে প্রধান পরিচয়ের উপশাখা হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে?
- গোষ্ঠীগুলো কি নিজেদের ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ভাষা ব্যবহার করতে পারে?
- অন্তর্ভুক্তির শর্ত কি প্রধান পরিচয়ের অধীনতা?
- ভিন্নমত কি বৈধ, নাকি “জাতিবিরোধী” হিসেবে চিহ্নিত?
এই পর্যালোচনার বিশ্লেষণী পরিভাষা
বৈচিত্র্যকে একটি প্রধান পরিচয়ের অধীন রাখা হলে সেই ব্যবস্থাকে—
- শ্রেণিবদ্ধ বহুত্ব (hierarchical pluralism);
- আত্মসাৎমূলক অন্তর্ভুক্তি (assimilationist inclusion);
- সমরূপীকরণ (homogenisation)
হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে।
এই শব্দবন্ধগুলো জৈন কারিগরি পরিভাষা নয়। অনেকান্তবাদের অ-একপাক্ষিকতার নীতি এবং গারভিন ও মেহতার সংখ্যাগুরুবাদ-বিশ্লেষণ একত্র করে তুলনাটি নির্মিত। [৬; ১৫–১৬]
৪২. কৌশলগত বহুত্ব
কৌশলগত বহুত্ব (strategic pluralism) বর্তমান পর্যালোচনায় ব্যবহৃত একটি বিশ্লেষণী পরিভাষা। এমন রাজনৈতিক আচরণ বোঝানো হচ্ছে, যেখানে কোনো শক্তি—
- উদারনৈতিক বা আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুত্বের ভাষা ব্যবহার করে;
- অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমরূপীকরণ চাপায়;
- প্রয়োজন অনুযায়ী বহুত্ব স্বীকার বা অস্বীকার করে;
- প্রধান ও অধস্তন গোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করে।
অনেকান্তবাদের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য:
- অনেকান্তবাদে শর্ত প্রমাণনির্ভর ও প্রকাশ্য;
- কৌশলগত বহুত্বে মানদণ্ড ক্ষমতাগত সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়;
- অনেকান্তবাদে নিজের ও অন্যের দাবির জন্য সঙ্গতিপূর্ণ বিচারমান প্রয়োজন;
- কৌশলগত বহুত্বে পক্ষভেদে বিচারমান বদলে যায়।
এই তুলনা অকলঙ্কের শর্তসঙ্গতি, কাহানের পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া এবং গারভিন–মেহতার সংখ্যাগুরুবাদ-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ১২; ১৫–১৬]
ত্রয়োদশ পর্ব
প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু ও প্রেক্ষিতে অনেকান্তমূলক প্রয়োগ
৪৩. উদাহরণগুলোর উৎসগত মর্যাদা
নদী, মুদ্রা, পুনর্ব্যবহৃত ভাস্কর্য এবং বহুপর্যায়সম্পন্ন প্রত্নস্থলের নিচের উদাহরণগুলো প্রাচীন জৈন গ্রন্থে ব্যবহৃত হয়নি। এগুলো অনেকান্তবাদের প্রত্নতাত্ত্বিক ও বস্তুগত প্রয়োগভিত্তিক উদাহরণ।
দার্শনিক ভিত্তি—
- দ্রব্য–গুণ–পর্যায়;
- নয়;
- শর্তনির্দিষ্ট বিধেয়ন।
প্রত্নতাত্ত্বিক ভিত্তি—
- স্তরবিন্যাস;
- সঞ্চয়ন-প্রেক্ষিত;
- বস্তুজীবনী;
- ভূমিরূপবিদ্যাগত পরিবর্তন।
[১; ৬; ১৭–১৯]
৪৪. নদী: ধারাবাহিক সত্তা ও পরিবর্তনশীল প্রবাহ
একটি নদীকে একই নাম দিয়ে দীর্ঘকাল শনাক্ত করা যায়। কিন্তু নদীর—
- জল;
- পলি;
- চ্যানেল;
- তীররেখা;
- প্রবাহের অবস্থান
ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়।
মাইকেল চার্চের নদী-ভূমিরূপবিদ্যাগত বিশ্লেষণে পললবাহী নদীর চ্যানেলকে নদীর বহন ও সঞ্চিত পলির মধ্যেই গঠিত স্বনির্মিত ভূমিরূপ হিসেবে দেখা হয়েছে। পলি পরিবহন, ক্ষয় ও সঞ্চয়ন নদীখাতের রূপকে পরিবর্তিত করে। [১৯, পৃ. ৩২৫–৩২৬]
অনেকান্তমূলক প্রয়োগ
একটি নদী—
- অববাহিকা ও ঐতিহাসিক নামের ধারাবাহিকতায় একই;
- জলকণা ও নির্দিষ্ট প্রবাহপর্যায়ে পরিবর্তনশীল;
- পুরোনো খাতে অনুপস্থিত;
- নতুন খাতে উপস্থিত;
- মানচিত্রে একটি রেখা;
- ভূমিরূপবিদ্যাগত বিশ্লেষণে (geomorphological analysis) ক্ষয়, সঞ্চয়ন, চ্যানেল-পরিবর্তন ও ভূমিরূপ-গঠনের প্রক্রিয়া;
- স্থানীয় সমাজে জীবিকা, বিপদ ও স্মৃতির ক্ষেত্র।
এসব আলাদা সত্তাশ্রয়ী সত্য নয়; নদীর বিভিন্ন স্কেল, পর্যায় ও সম্পর্কের বর্ণনা। এই ব্যাখ্যা জৈন দ্রব্য–পর্যায় কাঠামো এবং নদীর পলি–চ্যানেল গতিশীলতার গবেষণার ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ১৯]
৪৫. মুদ্রা: মুদ্রণকাল, প্রচলনকাল ও সঞ্চয়নকাল
এডওয়ার্ড হ্যারিস—এডওয়ার্ড হ্যারিস (Edward C. Harris)—প্রত্নতাত্ত্বিক স্তরে পাওয়া নিদর্শনের কাল এবং স্তরের গঠনকাল পৃথক করে দেখিয়েছেন। কোনো নিদর্শন স্তরে সমকালীনভাবে সঞ্চিত, পূর্ববর্তী পর্যায় থেকে পুনঃসঞ্চিত অথবা পরবর্তী অনুপ্রবেশের ফল হতে পারে। [১৮, “Dating of Artefacts and Strata,” পৃ. ১২৪–১২৭]
একটি মুদ্রার অন্তত তিনটি কালগত পরিচয় রয়েছে:
- মুদ্রণকাল (date of minting);
- প্রচলনকাল (period of circulation);
- সঞ্চয়নকাল (date of deposition)।
পুরোনো মুদ্রা দীর্ঘকাল প্রচলিত থাকার পরে কোনো পরবর্তী প্রত্নস্তরে সঞ্চিত হতে পারে। উত্তরাধিকার, সঞ্চয়, পুনঃপ্রচলন বা প্রাচীন বস্তু সংগ্রহের মাধ্যমেও মুদ্রা পরবর্তী প্রেক্ষিতে পৌঁছাতে পারে।
অনেকান্তমূলক প্রয়োগ
“মুদ্রাটি যে সময়ে নির্মিত, স্তরটিও ঠিক সেই সময়ের”—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে বৈধ নয়। অনেকান্তমূলক বিশ্লেষণ কল্পিত সব সম্ভাবনাকে সমান সত্য ঘোষণা করে না। একটি বস্তুর ভিন্ন কালগত পর্যায় পৃথক করে এবং প্রতিটির পক্ষে প্রমাণ পরীক্ষা করে।
এই প্রয়োগ তত্ত্বার্থসূত্র-এর পর্যায়তত্ত্ব এবং হ্যারিসের নিদর্শন–স্তর সম্পর্কের আলোচনার ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ১৮]
৪৬. পুনর্ব্যবহৃত ভাস্কর্য ও বস্তুজীবনী
ইগর কপিটফ—ইগর কপিটফ (Igor Kopytoff)—বস্তুর সাংস্কৃতিক জীবনী (cultural biography) বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, কোনো বস্তুর শ্রেণি, মূল্য, ব্যবহার ও সামাজিক সম্পর্ক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হতে পারে। [১৭, পৃ. ৬৪–৯১]
একটি পাথরের ভাস্কর্য পর্যায়ক্রমে—
- উপাস্য প্রতিমা;
- ভগ্ন নিদর্শন;
- নির্মাণসামগ্রী;
- প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার;
- জাদুঘরীয় শিল্পবস্তু;
- পুনরায় পবিত্র নিদর্শন
হতে পারে।
পাথরের উপাদানগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে; কার্য, স্থান, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানগত শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তিত হয়। “প্রতিমা,” “নির্মাণসামগ্রী” ও “প্রত্নবস্তু” স্বেচ্ছাকল্পিত আলাদা সত্য নয়; বস্তুর ভিন্ন পর্যায় ও সম্পর্কগত পরিচয়।
এই বিশ্লেষণ জৈন দ্রব্য–পর্যায় তত্ত্ব এবং কপিটফের বস্তুজীবনী ধারণার সংযোজিত প্রয়োগ। কপিটফ নিজে অনেকান্তবাদ আলোচনা করেননি। [১; ১৭]
৪৭. বহুপর্যায়সম্পন্ন প্রত্নস্থল
একটি প্রত্নস্থলে দেখা যেতে পারে—
- পুনঃপুন বসতি;
- বন্যা বা পলি সঞ্চয়ন;
- পরিত্যাগ;
- পুনর্বসতি;
- পুরোনো স্থাপনার ওপর নতুন নির্মাণ;
- উপকরণের পুনর্ব্যবহার;
- কার্যগত রূপান্তর।
“স্থানটিতে দীর্ঘস্থায়ী বসতির ধারাবাহিকতা ছিল” এবং “এখানে বারবার পরিত্যাগ ও পুনর্বসতি ঘটেছে”—দুটি বক্তব্য ভিন্ন নির্ধারকে যথার্থ হতে পারে। স্থানিক কেন্দ্রের ধারাবাহিকতা এবং বসবাসের কালগত বিচ্ছিন্নতা এক বিষয় নয়।
পরীক্ষা করতে হবে—
- স্থানিক কেন্দ্র একই ছিল কি না;
- বসবাসের পর্যায়গুলোর মধ্যে বিরতি ছিল কি না;
- একই জনসমষ্টি ফিরে এসেছিল কি না;
- স্থাপত্য ও কার্য বদলেছে কি না;
- প্রাকৃতিক সঞ্চয়নের পরে পুনর্বসতি ঘটেছে কি না।
এই কাঠামো জৈন দ্রব্য–পর্যায় তত্ত্ব, গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং হ্যারিসের স্তরবিন্যাসগত ধারাক্রমের ভিত্তিতে নির্মিত। [১; ৭; ১৮]
৪৮. উৎসের দৃষ্টিনয়
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎসের প্রমাণক্ষমতা এক নয়।
শিলালিপি
দান, কর্তৃত্ব ও আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অনুশীলনের পূর্ণ চিত্র নয়।
সাহিত্যিক পাঠ
বিধান, আদর্শ, কল্পনা ও বৌদ্ধিক বিতর্ক প্রকাশ করতে পারে; সরাসরি সামাজিক পরিসংখ্যান নয়।
প্রত্নবস্তু
উৎপাদন, ব্যবহার, বিনিময় ও সঞ্চয়নের সাক্ষ্য দিতে পারে; ব্যবহারকারীর আত্মপরিচয় সবসময় সরাসরি প্রকাশ করে না।
লোকস্মৃতি
স্থান-সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়ের রাজনীতি বুঝতে সাহায্য করে; নিজে থেকে নির্ভুল প্রাচীন তারিখ দেয় না।
ভূমিরূপবিদ্যাগত প্রমাণ
প্রাচীন নদীখাত, ক্ষয়, পলি সঞ্চয়ন, বন্যা-সমভূমি এবং ভূমিরূপের পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারে; মানুষের সাংস্কৃতিক অর্থবোধের পূর্ণ বিবরণ নয়।
এই পর্যালোচনার পদ্ধতিগত প্রস্তাব
প্রতিটি উৎসকে তার নিজস্ব প্রমাণক্ষমতা ও সীমার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। এই শ্রেণিবিন্যাস কোনো প্রাচীন জৈন নয়তালিকা নয়; নয়তত্ত্বকে বহুবিধ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎসে প্রয়োগ করে নির্মিত। [১; ৭; ১৮–১৯]
৪৯. অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা
কোনো প্রত্নস্থলে একটি বিশেষ ধরনের বস্তু না পাওয়ার অর্থ হতে পারে—
- বস্তুটি ছিল না;
- সংরক্ষিত হয়নি;
- অন্যত্র সরানো হয়েছে;
- পুনর্ব্যবহৃত হয়েছে;
- উৎখনিত অংশে উপস্থিত নয়;
- সংশ্লিষ্ট অনুশীলন বস্তুটির ওপর নির্ভরশীল ছিল না;
- ব্যবহৃত অনুসন্ধানপদ্ধতি বস্তুটি শনাক্ত করার উপযোগী ছিল না।
সম্ভাবনাগুলো তালিকাভুক্ত করাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কোন ব্যাখ্যা প্রমাণে অধিক সমর্থিত, তা নির্ধারণ করতে হবে।
এই পর্যালোচনার সতর্কতা
অনেকান্তবাদ সম্ভাবনার সংখ্যা বাড়িয়ে সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতি নয়; সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলোর প্রমাণগত পরিসর ও ওজন তুলনা করার পদ্ধতি হিসেবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই প্রস্তাব অকলঙ্কের প্রমাণসিদ্ধতার শর্ত, গণেরির প্রমাণবিন্যাস এবং হ্যারিসের স্তর–নিদর্শন সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্মিত। [৫; ৭; ১৮]
৫০. অনেকান্তমূলক গবেষণা-প্রশ্নমালা
যেকোনো ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক দাবির ক্ষেত্রে নিচের প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা যেতে পারে:
কোন বস্তু?
কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্য?
কোন কাল?
কোন স্থান?
কোন সম্পর্ক?
কোন বিশ্লেষণী স্কেল?
কোন প্রমাণ?
কোন পদ্ধতি?
কোন ব্যতিক্রম?
কোন অনিশ্চয়তা?
কোন নতুন প্রমাণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হবে?
এই প্রশ্নমালা কোনো প্রাচীন জৈন সূত্র নয়। অকলঙ্কের দ্রব্য–স্থান–কাল–ভাবসংক্রান্ত শর্ত, মতিলালের শর্তনির্দিষ্ট বক্তব্য, গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সঞ্চয়ন–স্তরবিন্যাসের নীতিকে সমন্বিত করে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত। [৫–৭; ১৮]
চতুর্দশ পর্ব
সীমা ও আত্মসমালোচনা
৫১. অসংখ্য গুণ ও সসীম জ্ঞাতা
একটি বস্তুর গুণ, পর্যায় ও সম্পর্ক অসংখ্য হলে কোনো সসীম জ্ঞাতা কি সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারেন?
ধ্রুপদি জৈন দর্শনে কেবলজ্ঞান (kevalajñāna) পূর্ণতার আদর্শ। সাধারণ জ্ঞান আংশিক ও মাধ্যমনির্ভর; সর্বজ্ঞানের মর্যাদা ভিন্ন। সমন্তভদ্র ও অকলঙ্কের তত্ত্বায়নে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। [৩; ৫]
এই পর্যালোচনার আধুনিক পদ্ধতিগত সিদ্ধান্ত
সমকালীন গবেষণায় সর্বজ্ঞানের দাবি না করে নতুন প্রমাণ ও দৃষ্টিনয়ের জন্য পদ্ধতিগত উন্মুক্ততা বজায় রাখা অধিকতর গ্রহণযোগ্য। এই সিদ্ধান্ত ধ্রুপদি মুক্তিতাত্ত্বিক দাবির সরাসরি অনুবাদ নয়; একটি আধুনিক গবেষণানৈতিক ব্যাখ্যা। [৬–৭]
৫২. বৈধ নয় নির্ধারণ করবে কে?
কোন দৃষ্টিনয় বৈধ, তা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়—
- প্রমাণের সংজ্ঞা;
- যুক্তির নিয়ম;
- গবেষণাপদ্ধতি;
- প্রতিষ্ঠানগত কর্তৃত্ব;
- ভাষা ও শ্রেণিবিন্যাস;
- গ্রহণযোগ্যতার সামাজিক মানদণ্ড।
এই পর্যালোচনার আত্মসমালোচনামূলক প্রস্তাব
অনেকান্তমূলক পর্যালোচনা শুধু অন্যের দৃষ্টিনয় নয়, নিজের বিচারমানদণ্ডও দৃশ্যমান করবে। নিজের মানদণ্ডকে প্রশ্নাতীত রেখে অন্য সব অবস্থানকে “আংশিক” ঘোষণা করলে অনেকান্তবাদ শ্রেণিবদ্ধ অন্তর্ভুক্তির কৌশলে পরিণত হতে পারে।
এই প্রস্তাব কর্টের ঐতিহাসিক সমালোচনা, গণেরির দৃষ্টিনয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং মতিলালের অ-একপাক্ষিকতার ভিত্তিতে নির্মিত। [৬–৮]
৫৩. আর্কাইভের নীরবতা ও অসম ক্ষমতা
ঐতিহাসিক উৎসে রাজা, প্রতিষ্ঠান, ভূমিধারী ও শিক্ষিত অভিজাতের বক্তব্য তুলনামূলকভাবে বেশি সংরক্ষিত হতে পারে। টিকে থাকা উৎসের বহুত্ব অতীতের সব মানুষের দৃষ্টিনয়ের বহুত্বের সমার্থক নয়।
প্রশ্ন করতে হবে—
- কার বক্তব্য সংরক্ষিত;
- কার বক্তব্য হারিয়েছে;
- কে লিখতে পারেনি;
- কোন বস্তুগত চিহ্ন লিখিত নথির বিকল্প সাক্ষ্য;
- আর্কাইভের নীরবতা কীভাবে তৈরি হয়েছে।
এই পর্যালোচনার পদ্ধতিগত সম্প্রসারণ
এই প্রশ্নগুলো ধ্রুপদি জৈন নয়তত্ত্বের সরাসরি অংশ নয়। নয়তত্ত্বের সীমিত জ্ঞান এবং আধুনিক ঐতিহাসিক–প্রত্নতাত্ত্বিক উৎসসমালোচনার প্রয়োগমূলক সম্প্রসারণ হিসেবে প্রশ্নগুলো নির্মিত। [১; ৭; ১৮]
৫৪. অন্তর্ভুক্তি নাকি অধীনস্থকরণ?
অন্য একটি অবস্থানকে বলা হলো:
“আপনি আংশিকভাবে যথার্থ; কিন্তু আপনার যথার্থ স্থান আমার ব্যবস্থাই নির্ধারণ করবে।”
এই অবস্থান স্বীকৃতির ভাষা ব্যবহার করলেও জ্ঞানতাত্ত্বিক অধীনস্থকরণ ঘটাতে পারে। কর্টের গবেষণা দেখায়, ঐতিহাসিক জৈন পণ্ডিতেরা অন্য মতের সীমিত যথার্থতা স্বীকার করেও জৈন সর্বজ্ঞানের ভিত্তিতে নিজেদের পূর্ণতর অবস্থান দাবি করেছেন। [৮]
এই পর্যালোচনার আত্মপ্রয়োগমূলক প্রশ্ন
- আমার সমন্বয় কি বহুত্ব রক্ষা করছে?
- নাকি সব অবস্থানকে আমার কাঠামোর অধস্তন অংশে পরিণত করছে?
- নিজের অবস্থানকে কি সমালোচনার বাইরে রাখা হয়েছে?
- অন্যের দৃষ্টিনয় স্বীকার করা হচ্ছে, নাকি আত্মসাৎ করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলো কর্ট, মতিলাল এবং গণেরির পাঠের ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত। [৬–৮]
উপসংহার
সমাপনী মূল্যায়ন
৫৫. অনেকান্তবাদের মৌলিক তাৎপর্য
এই পর্যালোচনার সমাপনী বিশ্লেষণী সংশ্লেষ
অনেকান্তবাদকে বলা যেতে পারে:
বহুধর্মাত্মক বাস্তবতার শর্তনির্দিষ্ট বাস্তববাদ
(condition-qualified realism of a many-featured reality)।
এই পরিভাষা কোনো প্রাচীন জৈন আচার্যের সরাসরি ব্যবহৃত শব্দবন্ধ নয়। তত্ত্বার্থসূত্র-এর দ্রব্য–গুণ–পর্যায়, পূজ্যপাদের প্রধান–গৌণ সম্পর্ক, অকলঙ্কের শর্তনির্দিষ্ট স্যাদবাদ এবং মতিলালের অ-একপাক্ষিক বক্তব্য-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সংজ্ঞাটি নির্মিত। [১; ৫–৬]
অনেকান্তবাদের প্রধান অবস্থানগুলো হলো—
- বাস্তবতা মানুষের মতামতের বাইরে অস্তিত্বশীল;
- বাস্তব বস্তু বহু গুণ, পর্যায় ও সম্পর্কের অধিকারী;
- সসীম জ্ঞান নির্বাচনমূলক;
- ভাষা কোনো একটি গুণকে প্রধান করে;
- একটি আংশিক বক্তব্য যথার্থ হতে পারে;
- আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্যে উন্নীত করলে বক্তব্য দুর্নয়ে পরিণত হতে পারে;
- সব মত, সাক্ষ্য বা ব্যাখ্যা সমান নয়;
- শর্ত প্রকাশ সত্যকে দুর্বল না করে অধিক নির্ভুল করে;
- বহুত্ব বোঝা ঘটনাগত সত্য বা নৈতিক দায় বিলোপ করে না;
- সংলাপ সমালোচনার বিকল্প নয়;
- পরমতসহিষ্ণুতা মিথ্যা, বিদ্বেষ বা হিংসাকে বৈধতা দেয় না।
এই সারসংক্ষেপ কোনো একক উৎসের সরাসরি তালিকা নয়; [১], [৫]–[৯] এবং [২০]-এর ভিত্তিতে বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত।
৫৬. সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তাৎপর্য
সুবিধাবাদী “আমার সত্য–তোমার সত্য” কথন পরিচয় ও স্বার্থ অনুযায়ী সত্যের মানদণ্ড বদলায়। অনেকান্তবাদ তার বিপরীতে দাবি করে—
- বক্তব্যের শর্ত প্রকাশ করতে;
- প্রমাণ দেখাতে;
- নিজের ও অন্যের ক্ষেত্রে সঙ্গতিপূর্ণ বিচারমান ব্যবহার করতে;
- সম্পর্কনির্ভর সত্যকে সত্তাশ্রয়ী মত বলে বাতিল না করতে;
- নিজের দৃষ্টিনয়ের সীমা স্বীকার করতে;
- নতুন প্রমাণে সিদ্ধান্ত সংশোধন করতে।
এই তুলনা অকলঙ্ক, মতিলাল, গণেরি এবং কাহানের আলোচনার সংশ্লেষ। [৫–৭; ১২]
একইভাবে, কোনো প্রধান পরিচয় যদি বলে, “সব বৈচিত্র্য আমারই রূপ,” তবে বহুত্বের উপস্থিতি স্বীকৃত হলেও তার স্বাতন্ত্র্য ও সমমর্যাদা রক্ষিত হয় না। অনেকান্তবাদ বস্তুর সমগ্র পরিচয়কে একটি মাত্র বিধেয়ের অধীন করার বিরোধিতা করে; কট্টর পরিচয়বাদ একটি বিধেয়কেই ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাসের পূর্ণ পরিচয়ে পরিণত করে। এই তুলনা অনেকান্তবাদের অ-একপাক্ষিকতা এবং গারভিন–মেহতার সংখ্যাগুরুবাদ-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত। [৬; ১৫–১৬]
৫৭. বর্তমান সময়ের জন্য পদ্ধতিগত আহ্বান
অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ, হিংসা, পরিচয়গত মেরুকরণ এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক সুবিধাবাদের সময়ে অনেকান্তবাদকে শুধু “সব দিক দেখুন” ধরনের নরম নৈতিক বাণীতে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। অধিকতর কঠোর প্রয়োগ হতে পারে:
বক্তব্যের শর্ত প্রকাশ করুন।
প্রমাণের সীমা অতিক্রম করবেন না।
সম্পর্কনির্ভর সত্যকে সত্তাশ্রয়ী মত বলে বাতিল করবেন না।
নিজের আংশিক অবস্থানকে পূর্ণ সত্যে উন্নীত করবেন না।
প্রতিপক্ষের বক্তব্য যথাযথভাবে অনুধাবন করুন; তবে মিথ্যা ও হিংসাকে বহুত্বের নামে বৈধতা দেবেন না।
কারণের বহুত্ব ব্যাখ্যা করুন; কিন্তু নৈতিক ও রাজনৈতিক দায় মুছে ফেলবেন না।
যে বহুত্বের কথা বলা হচ্ছে, তা সমমর্যাদার বহুত্ব, নাকি কোনো প্রধান পরিচয়ের অধীন শ্রেণিবদ্ধ বৈচিত্র্য—সেই প্রশ্ন উত্থাপন করুন।
এই অনুচ্ছেদ কোনো প্রাচীন জৈন উদ্ধৃতি নয়। অকলঙ্কের প্রমাণশর্ত, মতিলালের বুদ্ধিবৃত্তিক অহিংসা, গণেরির প্রমাণবিন্যাস, কর্টের ঐতিহাসিক সতর্কতা, কাহানের পরিচয়-রক্ষাকারী জ্ঞানপ্রক্রিয়া, আরেন্টের ঘটনাগত সত্য এবং গারভিন–মেহতার সংখ্যাগুরুবাদ-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্মিত সমকালীন পদ্ধতিগত প্রস্তাব। [৫–৮; ১২; ১৫–১৬; ২০]
অনেকান্তবাদের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা “সব মতই সত্য” নয়। বরং—
সত্য সম্পর্কে প্রতিটি দাবি কোন বস্তু, কোন গুণ, কোন কাল, কোন স্থান, কোন সম্পর্ক, কোন প্রমাণ এবং কোন অনুসন্ধানগত উদ্দেশ্যের অধীনে যথার্থ—সেই শর্তগুলো প্রকাশ করার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব।
এই সমাপনী সূত্রও বর্তমান পর্যালোচনায় নির্মিত; তত্ত্বার্থসূত্র, অকলঙ্ক, মতিলাল এবং গণেরির আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত। [১; ৫–৭]
নম্বরভিত্তিক রেফারেন্স
[১] Umāsvāti/Umāsvāmin and Pūjyapāda Devanandin (2018), Tattvārthasūtra, with Explanation from Sarvārthasiddhi, trans. Vijay K. Jain, Dehradun: Vikalp Printers. প্রাসঙ্গিক স্থান: সূত্র ১.৬, পৃ. ১১; সূত্র ৫.৩০ ও ভাষ্য, পৃ. ২১৩–২১৪; সূত্র ৫.৩২ ও ভাষ্য, পৃ. ২১৫–২১৬; সূত্র ৫.৩৮, পৃ. ২২২। অনলাইন উৎস
[২] Siddhasena Divākara (1939), Sanmati-Tarka, critical introduction and commentary by Sukhlalji Sanghavi and Bechardasji Doshi, trans. A. B. Athavle and A. S. Gopani, ed. Dalsukh Malvania, Bombay: Shri Jain Shwetambar Education Board. প্রাসঙ্গিক স্থান: প্রথম অধ্যায়, গাথা ২২–২৫, পৃ. ২৬–২৮; গাথা ৪৪–৪৬, পৃ. ৪৯–৫১। অনলাইন উৎস
[৩] Samantabhadra (2016), Ācārya Samantabhadra’s Aptamimamsa (Devāgamastotra): Deep Reflection on the Omniscient Lord, ed. and trans. Vijay K. Jain, Dehradun: Vikalp Printers. প্রাসঙ্গিক স্থান: শ্লোক ১০৫, ১১০ ও ১১৩। অনলাইন উৎস
[৪] Soni, J. (2003), ‘Kundakunda and Umāsvāti on Anekāntavāda’, in P. Balcerowicz and M. Mejor (eds), Essays in Jaina Philosophy and Religion, Delhi: Motilal Banarsidass, pp. 25–35. অনলাইন উৎস
[৫] Nahata, S. (2024), ‘In Some Ways: Syādvāda as the Synthesis of Anekāntavāda and Nayavāda in Akalaṅka’s Philosophical Treatises’, Journal of Indian Philosophy. DOI: 10.1007/s10781-024-09575-7. অনলাইন উৎস
[৬] Matilal, B. K. (1981), The Central Philosophy of Jainism: Anekānta-vāda, Ahmedabad: L. D. Institute of Indology. প্রাসঙ্গিক স্থান: পৃ. ১–২ ও ৫৯–৬১। অনলাইন উৎস
[৭] Ganeri, J. (2002), ‘Jaina Logic and the Philosophical Basis of Pluralism’, History and Philosophy of Logic, 23(4), pp. 267–281. প্রাসঙ্গিক স্থান: পৃ. ২৬৭–২৬৯, ২৭৪ এবং ২৭৮–২৭৯। অনলাইন উৎস
[৮] Cort, J. E. (2000), ‘“Intellectual Ahiṃsā” Revisited: Jain Tolerance and Intolerance of Others’, Philosophy East and West, 50(3), pp. 324–347. অনলাইন উৎস
[৯] Bronkhorst, J. (2024), ‘Two Uses of Anekāntavāda’, Journal of Indian Philosophy. DOI: 10.1007/s10781-024-09577-5. অনলাইন উৎস
[১০] Koller, J. M. (2000), ‘Syādvāda as the Epistemological Key to the Jaina Middle Way Metaphysics of Anekāntavāda’, Philosophy East and West, 50(3), pp. 400–407. অনলাইন উৎস
[১১] Barbato, M. (2019), ‘Anekāntavāda and Dialogic Identity Construction’, Religions, 10(12), article 642. DOI: 10.3390/rel10120642. অনলাইন উৎস
[১২] Kahan, D. M. (2017), ‘Misconceptions, Misinformation, and the Logic of Identity-Protective Cognition’, Cultural Cognition Project Working Paper Series, Working Paper No. 164. প্রাসঙ্গিক স্থান: পৃ. ১–২ ও ৬। অনলাইন উৎস
[১৩] Rawls, J. (2005), Political Liberalism, expanded edn, New York: Columbia University Press. প্রাসঙ্গিক স্থান: পৃ. ৩৬–৩৭।
[১৪] Berlin, I. (1990), ‘The Pursuit of the Ideal’, in The Crooked Timber of Humanity, London: John Murray, pp. 1–19.
[১৫] Girvin, B. (2020), ‘From Civic Pluralism to Ethnoreligious Majoritarianism: Majority Nationalism in India’, Nationalism and Ethnic Politics, 26, pp. 27–45. DOI: 10.1080/13537113.2020.1716437.
[১৬] Mehta, P. B. (2022), ‘Hindu Nationalism: From Ethnic Identity to Authoritarian Repression’, Studies in Indian Politics, 10(1), pp. 31–47. DOI: 10.1177/23210230221082828.
[১৭] Kopytoff, I. (1986), ‘The Cultural Biography of Things: Commoditization as Process’, in A. Appadurai (ed.), The Social Life of Things: Commodities in Cultural Perspective, Cambridge: Cambridge University Press, pp. 64–91. অনলাইন উৎস
[১৮] Harris, E. C. (1989), Principles of Archaeological Stratigraphy, 2nd edn, London and San Diego: Academic Press. প্রাসঙ্গিক স্থান: ‘Dating of Artefacts and Strata’, পৃ. ১২৪–১২৭। অনলাইন উৎস
[১৯] Church, M. (2006), ‘Bed Material Transport and the Morphology of Alluvial River Channels’, Annual Review of Earth and Planetary Sciences, 34, pp. 325–354. অনলাইন উৎস
[২০] Arendt, H. (2006 [1967]), ‘Truth and Politics’, in Between Past and Future: Eight Exercises in Political Thought, New York: Penguin, pp. 223–259. অনলাইন উৎস















