Category: তত্ত্ব

  • জঁ-লুক ন্যান্সি।। কম্যুনোভাইরাস

    জঁ-লুক ন্যান্সি।। কম্যুনোভাইরাস

    অনুবাদ: শাহারিয়ার জিম

    ভূমিকা:
    জঁ-লুক ন্যান্সি প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত La Communauté désœuvrée (The Inoperative Community) ন্যান্সির অন্যতম সুপরিচিত কাজ। গোষ্ঠী বা কম্যুনিটি’র প্রশ্ন তাঁর এই কাজের বিষয়বস্তু। করোনা মহামারি ও এর সাপেক্ষে জরুরী অবস্থার প্রসঙ্গে জর্জিও আগামবেন ও রবার্তো এসপজিতো’র সাথে বিতর্কে জড়িয়ে ইতোমধ্যেই Viral Exception ও A Much Too Human Virus শিরোনামের লেখা লিখেছেন। করোনা ভাইরাস মহামারী প্রসঙ্গে ন্যান্সি’র তৃতীয় রচনা Communovirus , ২৪শে মার্চ, ২০২০ তে প্রকাশিত হয়েছে Libération–এ। ২৭শে মার্চে ডেভিড ফেয়ার্নবাখকৃত ইংরেজি অনুবাদ verso-তে প্রকাশিত হয়েছে।করোনা ভাইরাস আমাদের কম্যুনাইজ বা গোষ্টীবদ্ধ করছে, কেননা আমাদেরকে এজমালি বা যৌথভাবে একে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এতে আমাদের কম্যুনিটি’র সত্যিকারের অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ রয়েছে বলে ন্যান্সি মনে করেছেন। ন্যান্সি’র এই Communovirus রচনাটি অনুবাদ করেছেন শাহারিয়ার জিম। বোধিচিত্তের সৌজন্যে রচনাটি প্রকাশিত হল।

    জঁ-লুক ন্যান্সি

    মূল রচনা
    আমার এক ইন্ডিয়ান বন্ধুর মুখে শুনলাম তাদের ওইখানে ভাইরাসটাকে ‘কম্যুনোভাইরাস’ (Communovirus) নামে ডাকে। এই বিষয়টা কিভাবে ইতোমধ্যে আমাদের মাথায় নাড়া দেয়নাই? এটাতো বেশ সহজেই ধরা যায়! কী একটা অদ্ভুত এবং সম্পূর্ণ দ্ব্যর্থব্যঞ্জক ঘটনাঃ কম্যুনিজম থেকে আবির্ভাব ঘটা এক ভাইরাসের, যে ভাইরাস আমাদেরকে কম্যুনাইজ (গোষ্ঠীবদ্ধ) করে। করোনা(Corona)‘র মত একটা বিদ্রুপাত্মক নাম যা ইতিহাসের পুরানা রাজতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদী গন্ধ ছড়ায়, সেটার তুলনায় কম্যুনো(Communo) নামটা বেশ ফলপ্রসূ। নিদেনপক্ষে এটা ভাল দিক যে, কম্যুনো নামটা করোনা‘র মুন্ডুপাত না করতে পারলেও এটিকে সিংহাসনচ্যুত করতে পারে বটে।

    প্রথম নজরে বিষয়টির অর্থ অনেকটা এরকমই মনে হয়, যেহেতু এই ভাইরাসের আবির্ভাব এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে ঘটেছে যারা নিজেদেরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কম্যুনিস্ট বলেই দাবী করে বর্তমান সময়ে। তবে শুধু প্রাতিষ্ঠানিকতাই নয়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ভাষ্যমতেঃ এই ভাইরাল এপিডেমিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমাদের যে সাফল্য, সেটি মূলত “চীনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা”রই সাফল্য। যদিও ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ ঘটানো কম্যুনিজমের একটি মূল বৈশিষ্ট্য, তবে চীনা কম্যুনিজমের ক্ষেত্রে আমরা সামষ্টিক(বা রাষ্ট্রীয়) সম্পত্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি(জমির মালিকানা বাদে)– এই দুইয়ের এক মিশ্রণ লক্ষ্য করছি অনেক বছর ধরেই।

    আর্টওয়ার্ক: চাইনা
    শিল্পী: দানিয়েল মারফি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই বিকল্প ব্যবস্থা চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার কতটা উন্নতিসাধন ঘটিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী এর যে ভূমিকা সেটি আমাদের সবারই জানা আছে। এই বিকল্প ব্যবস্থার সমাজকে ঠিক কী নামে অভিহিত করা যায় সেটি এখনই বলা যাচ্ছে নাঃ কারণ ঠিক কোন অর্থে এটি কম্যুনিস্ট এবং একইসাথে আবার ব্যক্তি প্রতিযোগিতার বিষ ছড়াতেও সক্ষম, যা উদারনীতিবাদের চূড়ান্ত রূপ বা আলট্রালিবারেল এক্সট্রিম পর্যায় ধারণ করে এমন প্রশ্ন থেকে যায়। তবে আপাতত কোভিড-১৯ ভাইরাস ঠেকাতে চীনের যে সাফল্য সেটি তার সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিফলন। এই সাফল্য এতটাই প্রমাণিত যে, চীন এখন ইতালি এবং ফ্রান্সের জন্যও নতুন একটি সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

    বর্তমান সময়ে চীনা রাষ্ট্র যে কর্তৃত্বপরায়ণ প্রবল ক্ষমতা উপভোগ করছে সেটি নিয়েও বিতর্কের কমতি নেই অবশ্য। এমনকি এখন বিষয়টা এমন মনে হচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক চীনা কম্যুনিজমের ঝান্ডাকে উদীয়মান করতে একেবারে ঠিক সময়েই এই ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে এর ফলে ‘কম্যুনিজম’ ধারনাটির অর্থ নিয়ে আরও যে ধোঁয়াটে পরিবেশ তৈরী হবে সেটি কপালে ভাঁজ ফেলার মত বিষয় বটে।

    মার্ক্সের লেখায় এই বিষয়টা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাবে সামষ্টিক সম্পত্তির উচ্ছেদ ঘটে এবং এই দুই ধরনের সম্পত্তিই একটা সময় গিয়ে ‘স্বীয় সম্পত্তি’(individual property) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। এই ‘স্বীয় সম্পত্তি’ দ্বারা এখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যক্তি কত সম্পত্তির মালিক সেটা বুঝানো হয়না। বরং ব্যক্তির যথাযথভাবে সামগ্রিক বিকাশের সম্ভাবনাকে বুঝানো হয়। এই ধারণাটি আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপায় বা সময় হয়তো ছিল না মার্ক্সের হাতে। তবে কম্যুনিস্ট প্রস্তাবনার এই দিকটি বর্তমানে আমাদের কাছে প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ধরা দিয়েছে। ‘আত্ম উপলব্ধি’ ধারনাটির অর্থ বস্তুগত কিংবা প্রতীকি সম্পত্তি অর্জন করা নয়, বরং স্বতন্ত্র পন্থায় বাস্তবিক, কার্যকরী এবং অস্তিত্ববান হয়ে ওঠা।

    এবার কম্যুনোভাইরাস শব্দটির দ্বিতীয় অর্থটির দিকে একটু নজর দেয়া প্রয়োজন। ভাইরাসটি মূলত আমাদেরকে কম্যুনাইজ(গোষ্ঠীবদ্ধ) করে। ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে গিয়ে আমরা সর্বজনীনভাবে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে আমরা সবাই একত্রে সমানভাবে হুমকির মুখে। আমরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও আপাতবিরোধী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধতার এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। শুধুমাত্র গোষ্ঠীবদ্ধতার মাধ্যমেই আমরা স্বতন্ত্র একক হয়ে উঠতে পারি। এই স্বাতন্ত্র্যবোধের অংশীদারীত্বই সর্বাধিক একতাবদ্ধ গোষ্ঠী তৈরীর প্রণালী।

    একতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সংহতির কথা আজকে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রত্যেকভাবেই। এগুলোর যে প্রয়োজনীয়তা, তার প্রমাণ ও উদ্যোগ আমরা সবদিক থেকেই অনুভব করছি। এর সাথে যদি আমরা যানবাহন এবং কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বায়ু দূষণের হার কমে যাওয়ার ব্যাপারটিও যোগ করি, তাহলে এই ব্যাপারটির ফলে ইতোমধ্যে অনেকেই টেকনো-ক্যাপিটালিজমের পতনের কথা ভেবে খুশীতে গদগদ হচ্ছে। তবে এসব ব্যাপার নিয়ে এত গদগদ হওয়ার কিছু নেই আমাদের, বরং আমরা আমাদের গোষ্ঠী’র প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কীভাবে আরও ভালো বোঝাপড়া তৈরী করতে পারি, এই প্রশ্নটি করা উচিত নিজেদেরকে।

    আর্টওয়ার্ক: র‌্যাপেনজেল কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: ক্যামেডেলাফু
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সংহতি’র সক্রিয়তা এবং আমন্ত্রণ দেখতে পাচ্ছি আমরা বহুলাংশেই, কিন্তু সামগ্রিক গণমাধ্যম মূলত রাষ্ট্রের নিজস্ব কল্যাণেই ব্যবহৃত হচ্ছে- যার সুবর্ণ সুযোগ এমানুয়েল ম্যাকরনকে ব্যবহার করতে দেখি আমরা। আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে কোয়ারেন্টাইনে না রেখে বরং জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বন্দী অবস্থায় রয়েছি, যদিওবা সেটা আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই। বিচ্ছিন্নতার এই অভিজ্ঞতাটি আমরা বঞ্চনাবোধ হিসেবে অনুভব করছি, এমনকি যখন সেটি আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে তখনও।

    একদিক থেকে এই সময়টি নিজেদেরকে আবিষ্কার করারও একটা সুযোগঃ এটা সত্য যে আমরা অসামাজিক জীব না। আমাদেরকে পরস্পরের সাথে মিশতে হয়, দেখা করতে হয়, একসাথে বসে আড্ডা মারতে হয় এবং ঘোরাঘুরি করতে হয় এসবও সত্য। এছাড়াও, ফোনে কথা বলা, ই-মেইল এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে আমাদের আকস্মাৎ এত সক্রিয়তা আরও একটি ব্যাপারের দিকে ইঙ্গিত করে, সেটি হচ্ছে যোগাযোগহীন হয়ে পড়ার ভীতি।

    তার মানে কি এরকম যে, এই গোষ্ঠী নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার জন্য আমরা একটা উত্তম অবস্থানে আছি? সমস্যাটা হচ্ছে, ভাইরাসটি এখনও প্রধান প্রতিনিধি(representative) হিসেবে কাজ করছে; হোক সেটি নজরদারিমূলক কোনও ব্যবস্থা অথবা কল্যাণমূলক কোনও ব্যবস্থা, ভাইরাসটিই এখন একমাত্র সাধারণ বৈশিষ্ট্য উভয় ব্যবস্থাতেই।

    আর্টওয়ার্ক: মার্ক্স এনিভার্সারি
    শিল্পী:িএলান ম্যাক ডোনাল্ড
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    যদি ব্যাপারটা এমনই হয়ে থাকে, তাহলে সামষ্টিক এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া বলতে কী বুঝানো হয় সেই ব্যাপারটি নিয়ে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনও অগ্রগতি ঘটবে না। সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া বলতে এখানে দুইটা অর্থ রয়েছে। একটি হচ্ছে সাধারণ অর্থে সম্পত্তিকে অতিক্রম করে যাওয়া, আরেকটা হচ্ছে সাবজেক্টের দ্বারা দখলকৃত যে অবজেক্ট, সেই দখলের ব্যাপারটিকে অতিক্রম করা (Transcending)। মার্ক্সের ভাষায় বলতে গেলে, ব্যক্তি’র প্রকৃত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে অতুলনীয়, অদ্বিতীয় এবং অকৃত্রিম হয়ে উঠবে এমনকি তার নিজের সাথেও। বস্তু বা সম্পত্তি অর্জন করা ব্যক্তি’র প্রকৃতি নয়। ব্যক্তি হবে স্বতন্ত্র। নিজেকে উপলব্ধি করার স্বতন্ত্র সম্ভাবনা থাকবে তার মধ্যে, এবং এই স্বাতন্ত্র্য আবার সামগ্রিকতার মধ্যেই ক্রিয়ারত থাকে সামগ্রিকতার বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও। সামগ্রিকতা ও স্বাতন্ত্র্যের এই পরস্পর দ্বান্দিক ব্যবস্থাটি বজায় থাকে উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক ও বিনিময় স্থাপিত হওয়ার মাধ্যমে(ন্যান্সির ভাষায়, যোগাযোগ)। এটা এমন এক ধরনের ‘মূল্য’ যা টাকাপয়সা কিংবা শোষণকৃত উদ্ধৃত্ত কোনওটা দিয়েই ক্রয়যোগ্য নয়, এমন ‘মূল্য’ যা কোনওভাবে পরিমাপও করা যায়না।

    প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এরকম দুঃসাধ্য এবং ধোয়াঁটে কায়দায় ভাবতে সক্ষম? এটা একটা ভাল দিক যে ‘কম্যুনোভাইরাস’ আমাদের নিজেদেরকে এইসব প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে। তাই সময় থাকতে থাকতেই এই প্রশ্নগুলোর সমাধান আমাদের ভাবা উচিত। নয়তো আমরা আবার আগের পরিস্থিতিতেই পতিত হব। হয়তো আমরা এই বৈশ্বিক মহামারী থেকে বেঁচেও যাবো, কিন্তু অন্যান্য মহামারীর জন্যও আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিৎ।
  • স্লাভয় জিজেক।। সবাই শান্ত থাকুন এবং আতঙ্কিত হোন!

    স্লাভয় জিজেক।। সবাই শান্ত থাকুন এবং আতঙ্কিত হোন!

    অনুবাদ: সাজিয়া শারমীন

    সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের অনবরত বলেই চলেছে ,‘আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না’, অথচ আসল খবর পাওয়ার পর আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকছে না। অবস্থা দেখে আমার কমিউনিস্ট দেশে বেড়ে ওঠার স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জনগণকে বিভিন্ন প্রসঙ্গে প্রায়ই বোঝাতেন: আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আসলে তারা নিজেরাই যে যথেষ্ট আতঙ্কিত, এ ধরনের আশ্বাসকে আমরা তার লক্ষণ হিসেবেই বিবেচনা করতাম।

    আর্টওয়ার্ক: লেটস প্লে বোলিং বল
    শিল্পী: মির সুহাইল
    সিূত্র: র্কাুন মুভমেন্ট

    আতঙ্কের কিছু নিজস্ব নিয়ম আছে। এই যে যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে দোকান থেকে টয়লেট পেপার উধাও হয়ে গেল, তাতে আমার কৈশোরের সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ার একটা অদ্ভুত ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল।একবার হঠাৎ এ রকম একটা গুজব রটল যে দেশে যথেষ্ট পরিমাণে টয়লেট পেপার মজুত নেই। সরকার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্বাস দিল যে তাদের কাছে স্বাভাবিক চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট টয়লেট পেপার অবশ্যই মজুত আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সেই একবারই তাদের দাবি যেমন সত্য ছিল, আর মানুষও মোটের ওপর সেটা বিশ্বাসও করেছিল। তারপরও সাধারণ ক্রেতারা ঠিকই এ রকম একটা হিসাব কষেছিল যে ‘টয়লেট পেপারের কোনো সংকট নেই জানি এবং এটা মিথ্যা রটনা। কিন্তু তারপরও যদি কিছু লোক গুজবটিকে সত্যি ধরে নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে দরকারের বেশি টয়লেট পেপার কিনে মজুত করতে থাকে, তাহলে তো সত্যি সত্যিই সংকট তৈরি হয়ে যাবে! তার চেয়ে বরং আমি নিজেই কিছু টয়লেট পেপার মজুত করে ফেলি না কেন!’ আমরা নিজেরা হয়তো কেউ এমনটা বিশ্বাস করতাম না যে কেউ এমন কিছু করতে পারে, আমরা হয়তো নিছক ধরে নিয়েছিলাম যে এ রকম কিছু অন্য ধরনের মানুষ তো আছেই, যারা এটা বিশ্বাস করে যে কিছু লোক ঠিকই গুজবে কান দেবে। কিন্তু কার্যত এ দুটির মধ্যে কোনো পার্থক্য ঘটেনি, কারণ ফলাফল হয়েছিল একই—বাজার থেকে টয়লেট পেপার উধাও। এখন ক্যালিফোর্নিয়া বা যুক্তরাজ্যে কি এমন কিছুই ঘটছে?

    এই প্রতিক্রিয়ার আরেকটা রূপ হলো পরিস্থিতি যখন প্রকৃতপক্ষেই আতঙ্কজনক, তখন আতঙ্কের অনুপস্থিতি। গত কয়েক বছরে সার্স ও ইবোলা মহামারির পর আমাদের বারবার বলা হয়েছে যে ধেয়ে আসছে এর চেয়েও ভয়ংকর নতুন মহামারি। সেটা যে আসছেই তা ছিল প্রশ্নাতীত, শুধু প্রশ্ন ছিল, কবে আসবে? আমরা এই অশনিসংকেত সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও কেন যেন গুরুত্ব দিইনি, কোনো প্রস্তুতি নিতেও নিরুৎসুক ছিলাম—আমরা একে ঠিকমতো মোকাবিলা করেছি কেবল ‘কনটাজিওন’ জাতীয় চলচ্চিত্রে।

    এই দুই বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া থেকে আমরা বুঝতে পারি যে প্রকৃত বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার বেলায় আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কোনো মানে নেই। আমরা যখন বিপদে আতঙ্কগ্রস্ত হই, পরিস্থিতিকে তখন যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে বরং একে খেলোই করে ফেলি। ভেবে দেখুন যে একটা প্রাণঘাতী মহামারির মধ্যে টয়লেট পেপার নিয়ে মাথা ঘামানো কতটা হাস্যকর!

    তাহলে এই করোনাভাইরাস মহামারির যথাযথ প্রতিক্রিয়া আসলে কী হতে পারে? আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত? কীভাবে এই সংকটকে মোকাবিলা করা উচিত?

    আর্টওয়ার্ক: উহান ইন কোয়ারেন্টনি
    শিল্পী: আরর্কাডো এস্কুইভেল
    সিূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আমি যখন বলেছিলাম যে এই মহামারি সাম্যবাদকে একটা নতুন জীবন দিতে পারে, আমার কথাটাকে প্রত্যাশিতভাবেই কটাক্ষ করা হয়েছে। অথচ আমরা দেখছি সংকট নিরসনে চীনের কঠোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অন্তত ইতালিতে এখন যা চলছে তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। তবে অন্যদিকে ক্ষমতায় আসীন কমিউনিস্টদের সনাতন কর্তৃত্ববাদিতার সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। এর একটা উদাহরণ হলো যে ক্ষমতাধরদের (সেই সঙ্গে জনসাধারণকে) দুঃসংবাদ দেওয়ার বিষয়ে শঙ্কা এতটাই প্রবল ছিল যে শুরুর দিকে এই ভাইরাস নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। এখন সংক্রমণ যখন কমে আসছে, আবারও এ রকম ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে।

    ‘করোভাইরাস সৃষ্ট অচলাবস্থা থেকে চীনকে আবার কর্মমুখর করে তুলতে গিয়ে একটি পুরোনো অভিলাষ মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে: উপাত্ত এদিক-ওদিক করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যা দেখতে চান, তা-ই দেখিয়ে দেওয়া। চীনের পূর্ব উপকূলীয় শিল্পপ্রধান ঝেইজিয়াং প্রদেশে বিদ্যুতের ব্যবহার এর উদাহরণ। অন্তত তিনটি শহরে স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অভিজ্ঞরা বলছেন, এর উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা যে উৎপাদন আবার শুরু হয়ে গেছে। এর কারণে কিছু কারখানা খালি প্ল্যান্টে অকারণ যন্ত্রপাতি চালাতে বাধ্য হয়েছে।’

    এই প্রতারণা যখন ক্ষমতাধরদের কাছে স্পষ্ট হবে, তখন কী ঘটবে আমরা আন্দাজ করতে পারি: স্থানীয় ব্যবস্থাপকেরা অন্তর্ঘাতমূলক কাজের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কঠোর সাজা পাবেন, আর সেই সঙ্গে সচল হবে অবিশ্বাসের দুষ্ট চক্র। করোনাভাইরাসকে যুঝতে গিয়ে চীন যে ঠিক কী কী গোপন করেছে, তা কেবল একজন চীনা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে পেলেই জানা যাবে। কিন্তু এই আমি, যদি এই কমিউনিজমের কথাই না বলে থাকি, তাহলে আমি আসলে কোন সমাজতন্ত্র কথা বলতে চেয়েছি? সেটা বুঝতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু বিজ্ঞপ্তি পড়তে হবে, যেমন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রোয়াসুস গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে গণস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এই ভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলা করতে সক্ষম হলেও কিছু কিছু দেশের ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছার সামঞ্জস্য নেই। আমরা আর কোনো মহড়া দিচ্ছি না। এখন হাল ছাড়ার সময় নয়, অজুহাত দেওয়ার সময় নয়। এখন সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে প্রস্তুত থাকার সময়। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রগুলো কয়েক দশক ধরে পরিকল্পনার সুযোগ পেয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়।’ তিনি আরও রোগ করেন, ‘এই মহামারিকে পিছু হটানো সম্ভব, কিন্তু সে জন্য প্রয়োজন সরকারযন্ত্রগুলোর যাবতীয় কলকবজার সমবেত, সমন্বিত এবং সামগ্রিক প্রয়াস।’

    তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে আরও যোগ করা যায়, এই কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় সরকার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেই শুধু চলবে না, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে মানুষের স্থানীয় উদ্যোগ এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। যদি হাজার হাজার মানুষ শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের জন্য বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র যেভাবে অসংখ্য অস্ত্র জোগাড় করে ফেলে, ঠিক সেই একইভাবে এসব সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য অবশ্যই প্রয়োজন হবে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। সামরিক তৎপরতার মতোই এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রগুলোকে তথ্য বিনিময় করতে হবে, সব পরিকল্পনা হতে হবে সমন্বিত। এ রকম ‘কমিউনিজম/সাম্যবাদ’ই এখন সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি। যেমন উইল হাটন বলেছেন, ‘একধরনের সংকট এবং মহামারিপ্রবণ অনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার বিশ্বায়নের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু জন্ম হচ্ছে নতুন একধরনের বিশ্বায়নের, যা পারস্পরিক নির্ভরতা এবং প্রমাণভিত্তিক সামষ্টিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়।  কিন্তু এখন পর্যন্ত ‘প্রতিটি দেশ যার যার তার তার’(এভরি কান্ট্রি ফর ইটসেলফ) ধরনের চিন্তারই দাপট বেশি: ‘জাতীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানির ওপর বিভিন্ন দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, স্থানীয় ঘাটতি আর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিশৃঙ্খল সেকেলে সব ব্যবস্থার মধ্যে ডুবে থেকে, সংকটের আঞ্চলিক বোঝাপড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে তারা।

    আর্টওয়ার্ক: হেলথ সিস্টেম
    শিল্পী: ভাস্কো গারগ্যালো
    সিূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    করোনাভাইরাস মহামারি কেবল বাজারভিত্তিক বিশ্বায়নের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে না, আরও দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতার ক্ষতিকর দিক। এই সার্বভৌমত্ব জাতীয়তাবাদী লোকরঞ্জনের একটি দাবি। কিন্তু স্পষ্টতই ‘সবার আগে আমেরিকা (বা যেকোনো দেশ)’ জাতীয় স্লোগানের দিন এখন শেষ, কেননা আমেরিকাকে বাঁচাতে পারে শুধু বৈশ্বিক সহযোগিতা। আমি কোনো কল্পরাজ্যের আলাপ করছি না, মানুষে মানুষে মহান সংহতির আদর্শের কথা বলছি না, বরং বিদ্যমান সংকট আমাদের চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের সবার টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন বিশ্বজনীন সংহতি এবং সহযোগিতা। পরার্থপরতাই আমাদের নিজ নিজ স্বার্থরক্ষার একমাত্র যুক্তিসম্মত উপায়। আর এ কথা শুধু করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়: কয়েক মাস আগেও চীন বিরাট একটা সোয়াইন ফ্লু সংক্রমণে ভুগেছে এবং অদূর ভবিষ্যতে পঙ্গপাল দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে বলে খবর আছে। লক্ষণীয়, পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের প্রাণনাশ করছে জলবায়ু সংকট, অথচ সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই—এ কথা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন ওয়েন জোনস।

    আর্টওয়ার্ক: নো পাসারান
    শিল্পী: হালিত কুরতুল
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কঠোর প্রাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করোনাভাইরাসকে একটা হিতকর সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এর মাধ্যমে মানবসমাজ থেকে বৃদ্ধ আর দুর্বলদেরকে আধমরা আগাছার মতো উপড়ে ফেলা যাবে, যাতে নতুন সতেজ চারারা বেড়ে উঠতে পারে। সামগ্রিকভাবে তাতে বিশ্বে স্বাস্থ্যের উন্নতিই ঘটবে। আমি যে বৃহত্তর সাম্যবাদী নীতির কথা বলছি, একমাত্র তার মাধ্যমেই এই ধরনের প্রাগৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটতে পারে। ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির চাপে সংহতির আদর্শ জলাঞ্জলি দেওয়ার আলামত স্পষ্ট। যুক্তরাজ্যে মহামারি যদি আরও ভয়ানক আকার ধারণ করে, হাসপাতালগুলো ‘তিন জ্ঞানী ব্যক্তি’ বিধির দ্বারস্থ হবে: ‘অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন যে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটগুলো রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে শুরু করলে রোগীরা জীবনদায়ক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তথাকথিত ‘তিন জ্ঞানী ব্যক্তি’ বিধি অনুযায়ী এ রকম ক্রান্তিকালে প্রতিটি হাসপাতালের তিনজন জ্যেষ্ঠতম পরামর্শক কোন কোন রোগী শয্যা বা শ্বাসপ্রশ্বাস সহায়ক ভেন্টিলেটর পাবে, তা ঠিক করে দেবেন।’ এই তিন পণ্ডিত কোন নীতির ভিত্তিতে তা ঠিক করবেন? বৃহত্তর স্বার্থে বৃদ্ধ এবং নাজুকদের উৎসর্গ? এ রকম পরিস্থিতি কি সীমাহীন দুর্নীতির পথ খুলে দেয় না? এই সব পন্থা কি এটাই প্রমাণ করে না, যে আমরা শেষ পর্যন্ত সবলের টিকে থাকার নির্মম নীতিই আঁকড়ে ধরতে প্রস্তুত? অতএব আবারও দেখছি যে আমাদের সামনে বিকল্প দুটি: বর্বরতা অথবা একধরনের পুনরাবিষ্কৃত সাম্যবাদ।

    নোট: স্লাভয় জিজেক এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দার্শনিক। স্লোভেনিয়ায় জন্ম নেওয়া অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা এ দার্শনিক যুক্ত রয়েছেন বিশ্বের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। এখানে অনূদিত লেখাটি এপ্রিল মাসে প্রকাশিতব্য তার ‘প্যানডেমিক’ বই থেকে নেওয়া। গত ২৮ মার্চ,২০২০ তারিখে রচনাটি প্রকাশ করে প্রথম আলো ।

  • ইউভাল নোয়াহ হারারি।। করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী

    ইউভাল নোয়াহ হারারি।। করোনাভাইরাসের পরের পৃথিবী

    • অনুবাদ: ইরফানুর রহমান রাফিন

    মানবজাতি এখন একটা বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এটা সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশে দেশে সরকার ও জনসাধারণ যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, সেগুলো সম্ভবত আসন্ন বছরগুলোর জন্য দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি ঠিক করে দেবে। এগুলো যে শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার রূপটাই নির্ধারণ করে দেবে তা নয়, নির্ধারণ করে দেবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির রূপটাও। যা করার, কোনো ধরণের সংশয়ের বশবর্তী না হয়ে, আমাদেরকে দ্রুত করে ফেলতে হবে। যেসব পদক্ষেপ আমরা নেবো, সেসবের দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে, সেটাও আমাদেরকে আমলে নিতে হবে। একাধিক বিকল্পের ভেতর থেকে একটাকে বেছে নেওয়ার সময় আমাদের, শুধু এই নিয়ে ভাবলেই চলবে না যে আশু হুমকি মোকাবেলা করার জন্য কী করার আছে আমাদের, এটাও ভাবতে হবে যে, ঝড় কেটে যাওয়ার পর কোন ধরণের পৃথিবীতে থাকতে চাই আমরা। হ্যাঁ, ঝড়টা কেটে যাবে, মানবজাতি টিকে থাকবে, আমাদের অধিকাংশই বেঁচে থাকবে—কিন্তু আমরা একটি ভিন্ন দুনিয়ায় বাস করবো।

    জরুরি অবস্থার কারণে নেওয়া বহু স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপই জীবনের একটা বাস্তবতায় পরিণত হবে। এটা জরুরী অবস্থার প্রকৃতি। তারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলোকে ত্বরান্বিত করে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে আলোচনা করা লাগে, সেগুলো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেওয়া হয়ে যায়। অবিকশিত, এবং এমনকি বিপজ্জনক প্রযুক্তিও কাজে লাগানো হয়, কারণ কিছুই না-করার ঝুঁকিটা তারচেয়েও অনেক বেশি। বৃহদায়তন সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পুরো দেশটাকেই গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সবাই যখন ঘরে বসে কাজ করে আর দূরত্ব বজায় রেখে যোগাযোগ করে, তখন কী ঘটে? যখন গোটা স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনলাইনে চলে যায়, তখন কী ঘটে? স্বাভাবিক সময়ে, সরকার, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, আর শিক্ষাবোর্ডগুলো এই ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে কখনোই রাজি হতো না। কিন্তু এগুলো তো স্বাভাবিক সময় নয়।

    এই সংকটের সময়ে, আমাদের সামনে সুনির্দিষ্ট দুইটা বাছবিচার আছে। প্রথমটা সর্বাত্মক স্বৈরাতান্ত্রিক নজরদারি আর নাগরিক ক্ষমতায়নের মধ্যে। দ্বিতীয়টা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে।

    নজরদারিকে চামড়ার নিচে নিয়ে যাওয়া

    মহামারিঠেকাতে গোটা জনগোষ্ঠীকেই কিছু দিক-নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এটা অর্জন করার দুটি প্রধান তরিকা আছে। একটা হচ্ছে, সরকার জনগণকে তত্ত্বাবধানে রাখবে, এবং যারা নিয়ম ভাঙে তাদেরকে শাস্তি দেবে। আজকে মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি সবাইকে তত্ত্বাবধানে আনাটা সম্ভবপর করে তুলেছে। পঞ্চাশ বছর আগে ২৪ কোটি সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করা কেজিবির পক্ষে সম্ভব ছিলো না, জড়ো করা সব তথ্যকে কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাত করার আশাও রাখতে পারতো না তারা। কেজিবি নির্ভর করতো মানব এজেন্ট আর বিশ্লেষকদের ওপরে, এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের পেছনে একজন এজেন্টকে লেলিয়ে দেওয়াটা স্রেফ অসম্ভব ছিলো। কিন্তু এখন সরকারগুলো সর্বব্যাপী সেন্সর আর ক্ষমতাশালী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করতে পারে, রক্তমাংসের টিকটিকির আর কোনো প্রয়োজন নেই।

    একাধিক সরকার ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে তাদের সমরে নতুন নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে চীন। জনসাধারণের স্মার্টফোনগুলোকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় এনে, লক্ষ লক্ষ চেহারা-শনাক্তকরণ ক্যামেরা ব্যবহার করে, এবং জনসাধারণকে তাদের দৈহিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চেক করতে এবং এই বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য করে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস বাহকদেরকে শনাক্ত করতে পেরেছে তাই নয়, তাদের গতিবিধিও ট্র্যাক করতে পেরেছে, এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। নাগরিকদেরকে সংক্রমিত রোগীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপস সতর্ক করে দেয়।

    এই ধরণের প্রযুক্তি স্রেফ পূর্ব-এশিয়ায় সীমিত নয়। করোনাভাইরাস রোগীদেরকে চিহ্নিত করতে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ইজরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থাকে সেইসব নজরদারি প্রযুক্তি বহাল করার অনুমতি দিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে যেগুলো সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। যখন সম্পৃক্ত সংসদীয় উপকমিটি এই পদক্ষেপে সায় দিতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখন নেতানিয়াহু এটাকে একটা ‘জরুরী অবস্থাকালীন ডিক্রির’ জোরে পাশ করিয়ে নেন।

    আপনি বলতে পারেন এতে নতুন কী আছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসাধারণকে ট্র্যাক, তত্ত্বাবধান, আর নিজেদেরকে স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য সরকার আর কর্পোরেশন উভয়েই অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর নমনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তথাপি, আমরা যদি সাবধান না থাকি, এই মহামারীটি নজরদারির ইতিহাসে একটা সন্ধিক্ষণ হিসেবে হাজির হতে পারে। শুধুমাত্র এই কারণেই নয় যে, এখন পর্যন্ত যেসব দেশ গণ নজরদারির যন্ত্রপাতি বহাল করার প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করে আসছিলো, সেসব দেশে তা বহাল করাটা স্বাভাবিক করে তোলা হবে। বরং এই কারণেও যে, একটা নাটকীয় রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এটা নজরদারিকে ‘চামড়ার ওপর’ থেকে ‘চামড়ার নিচে’ নিয়ে যাবে।

    আজকের আগ পর্যন্ত, আপনার আঙুল যখন আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্পর্শ করেছিলো এবং একটা লিংকে ক্লিক করেছিলো, সরকার জানতে চেয়েছিলো আপনার আঙুল ঠিক কী ক্লিক করেছিলো? কিন্তু করোনাভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেটের ফোকাস বদলে গেছে। এখন সরকার জানতে চায় আপনার আঙুলের তাপমাত্রা কতো এবং এর ত্বকের নিচের রক্তচাপ কতো।

    জরুরি অবস্থার পুডিং

    নজরদারির ব্যাপারে আমরা এখন কোন দশায় আছি, সেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে আমরা যে-সমস্যাটার সম্মুখীন হই, সেটা হচ্ছে, আমরা কেউই জানি না ঠিক কীভাবে আমাদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, এবং আসন্ন দিনগুলোতে কেমন হবে। নজরদারি প্রযুক্তি বিপজ্জনক গতিতে বিকশিত হচ্ছে, এবং আজ থেকে মাত্র ১০ বছর আগে যেটাকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলে মনে হতো, সেটা এখন বাসি খবর। একটা চিন্তা পরীক্ষা হিসেবে, এমন একটি কাল্পনিক সরকারের কথা ভাবুন, যে দাবি করে প্রতিটি নাগরিককে একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হবে, যা দিনের ২৪ ঘণ্টাই দৈহিক তাপমাত্রা আর হৃৎস্পন্দনের হার তত্ত্বাবধান করবে। এর ফলে যে ডাটা পাওয়া যাবে, তা সরকারি অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। আপনি যে অসুস্থ, এটা আপনি নিজে টের পাওয়ার আগেই, অ্যালগরিদম টের পেয়ে যাবে। আপনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সব অ্যালগরিদমের নখদর্পণে থাকবে। সংক্রমণের শেকলটাকে ব্যাপকভাবে ছোট করে আনা যাবে, এমনকি সেটাকে একেবারে কেটেও ফেলা যাবে। তর্কসাপেক্ষে বলা চলে, এরকম একটি ব্যবস্থা মহামারীটাকে এর যাত্রাপথে কয়েকদিনের মধ্যেই থামিয়ে দিতে পারবে। চমৎকার শোনাচ্ছে, তাই না?

    বিপদের দিকটা হচ্ছে, অবশ্যই, এটা একটা ভয়ানক রকমের নতুন নজরদারি ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে বসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি যদি জানেন আমি একটা সিএনএন লিংকের বদলে একটা ফক্স নিউজের লিংকে ক্লিক করেছিলাম, এটা থেকে আপনি আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং খানিকটা আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও আভাস পেয়ে যাবেন। কিন্তু একটা ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় আমাদের দৈহিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, ও হৃৎস্পন্দনের হার কতো থাকে, সেটাও যদি আপনি তত্ত্বাবধান করতে পারেন, তাহলে কী আমাকে হাসায়, কী আমাকে কাঁদায়, এবং কী আমাকে প্রকৃতই, ক্ষুব্ধ করে তোলে আপনি সেটাও জানতে পারবেন।

    এটা মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সর্দি-কাশির মতো আনন্দ-বেদনা-বিরক্তিবোধ-ভালোবাসাও জৈবিক ব্যাপার। যেই প্রযুক্তি কাশি চিহ্নিত করতে পারে, সেই প্রযুক্তি হাসিও চিহ্নিত করতে পারে। যদি সরকার আর কর্পোরেশনসমূহ আমাদের বায়োমেট্রিক ডাটা গণহারে জড়ো করা শুরু করে, আমরা নিজেদেরকে যতটা জানি, তারা আমাদেরকে তারচেয়ে ঢের বেশি ভালো জানতে পারবে। তারা যে শুধু আমাদের অনুভূতিই অনুমান করবে তাই নয়, সেই অনুভূতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে, এবং তাদের যা মন চায় তাই বিক্রি করবে আমাদের কাছে। তা সে একটা পণ্যই হোক, আর একজন রাজনীতিবিদই হোক। বায়োমেট্রিক তত্ত্বাবধান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ডাটা হ্যাক করার পদ্ধতিগুলোকে প্রস্তর যুগের জিনিসে পরিণত করতে পারে। ২০৩০-এর উত্তর কোরিয়ার কথা কল্পনা করুন, যেখানে প্রতিটি নাগরিককে দিনে ২৪ ঘণ্টাই একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হয়। মহান নেতার একটা ভাষণ শুনছেন, আর বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট সুস্পষ্টভাবেই আপনার রাগের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে, তো আপনি গেছেন।

    একটা জরুরি অবস্থার সময়ে সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে অবশ্যই আপনি বায়োমেট্রিক নজরদারির পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন। জরুরি অবস্থা কেটে গেলেই পদক্ষেপটা বাতিল করা হবে। কিন্তু সাময়িক পদক্ষেপগুলোর একটা নোংরা অভ্যাস আছে। সেটা হলো, এগুলো সাধারণত সাময়িক থাকে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমার দেশ ইজরায়েল ১৯৪৮-এ তার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জরুরি অবস্থা জারি করেছিলো। সংবাদপত্র সেন্সরশীপ ও ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে পুডিং বানানোর বিশেষ বিধিবিধান (আমি ঠাট্টা করছি না) পর্যন্ত অনেক ব্যাপারে একগুচ্ছ সাময়িক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বহুদিন আগে জেতা হয়ে গেছে, কিন্তু ইজরায়েল আজও আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থার অবসান ঘোষণা করেনি, এবং ১৯৪৮-এর অনেক ‘সাময়িক’ পদক্ষেপ বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে (ঈশ্বর করুণাময়, জরুরি অবস্থাকালীন পুডিং ডিক্রিটা ২০১১’য় বাতিল করা হয়েছে)।

    করোনাভাইরাস সংক্রমণ যদি কমতে কমতে শূন্যেও নেমে আসে, এমনকি তখনো কিছু ডাটা-ক্ষুধার্ত সরকার দাবি করবে, বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে তাদের, কারণ করোনাভাইরাসের একটা দ্বিতীয় ঢেউ উঠতে পারে, অথবা কেন্দ্রীয় আফ্রিকায় নতুন ইবোলার জীবাণু দেখা দিচ্ছে, অথবা…বোঝেনই তো। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের গোপনীয়তাকে কেন্দ্র করে একটা বিশাল লড়াই চলছে। করোনাভাইরাস সংকট এই লড়াইটার শীর্ষবিন্দু হয়ে উঠতে পারে। কারণ জনসাধারণকে যখন গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের মধ্য থেকে যেকোনো একটা বেছে নিতে বলা হবে, জনসাধারণ স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে।

    সাবান পুলিশ

    আসলে জনসাধারণকে গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের ভেতর যে-কোনো একটিকে বেছে নিতে বলাটাই সমস্যার একেবারে গোড়ার কথা। কারণ এটা একটা ভুল বাছ-বিচার। আমরা দুটোই বেছে নিতে পারি, এবং আমাদের দুটোই উপভোগ করার অধিকার আছে। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারি, এবং করোনাভাইরাস মহামারি ঠেকাতে পারি, সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী নজরদারি ব্যবস্থাকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মাধ্যমে নয়, বরং, নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, করোনাভাইরাস মহামারিপ্রতিরোধ করার সবচেয়ে সফল কিছু প্রচেষ্টা দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ও সিঙ্গাপুরে। এই দেশগুলো ট্র্যাকিং অ্যাপ যে একেবারেই ব্যবহার করেনি তা নয়, তবে তারা অনেক বেশি জোর দিয়েছে ব্যাপকভাবে রোগ পরীক্ষণ, সততার সঙ্গে তার প্রতিবেদন দাখিল করা, এবং ওয়াকেফহাল নাগরিকদের আন্তরিক সহযোগিতার ওপরে।

    জনসাধারণ কার্যকর দিকনির্দেশনা মেনে চলবে, সেটা নিশ্চিত করতে, কেন্দ্রীভূত তত্ত্বাবধান আর কঠিন শাস্তি প্রদানই একমাত্র পথ নয়। যখন জনসাধারণের সামনে বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো তুলে ধরা হবে, এবং জনসাধারণ এই তথ্যাবলীর ব্যাপারে গণকর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রাখতে সমর্থ হবে, তখন ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলা কোনো বড় ভাই ছাড়াই নাগরিকরা সঠিক কাজটা করতে পারবে। স্বপ্রণোদিত ও ওয়াকেফহাল জনগোষ্ঠীগুলো সাধারণত পুলিশি নজরদারিতে থাকা অজ্ঞ জনগোষ্ঠীগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্যকর।
    সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যাপারটি বিবেচনা করুন। মানুষের স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম অসাধারণ অর্জনগুলোর একটি এটি। এই ছোট্টো কাজটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচায়। আজকে আমরা এটাকে মামুলি ব্যাপার ধরে নিয়েছি, অথচ সাবান দিয়ে হাত ধোয়াটা যে গুরুত্বপূর্ণ, এটা কেবলমাত্র উনিশ শতকে এসে আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর আগ পর্যন্ত এমনকি চিকিৎসক আর সেবিকারা পর্যন্ত হাত না ধুয়েই, একটার পর একটা সার্জিক্যাল অপারেশন করে গেছেন। আজকে কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিনভাবে তাদের হাত পরিষ্কার করেন, এই কারণে না যে তারা কোনো সাবান পুলিশের ভয়ে ভীত, এই কারণে যে তারা তথ্যগুলো জানেন। আমি সাবান দিয়ে হাত ধুই কারণ আমি ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানি। আমি এটা বুঝি যে, এই ছোট ছোট প্রাণকণাগুলো অসুখ বাঁধাতে পারে। আর আমি এটাও জানি না, সাবান দিয়ে আমি এগুলোকে ধুয়ে দিতে পারি।
    কিন্তু এই মাপের মান্যতা আর সহযোগিতা অর্জন করার জন্য আস্থার প্রয়োজন পড়বে। জনসাধারণকে বিজ্ঞানের ওপর, গণকর্তৃপক্ষের ওপর, ও গণমাধ্যমের ওপর আস্থা রাখতে হবে। বিগত কয়েক বছরে, দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমের ওপর জনসাধারণের আস্থা কমিয়ে আনতে ভূমিকা রেখেছে। আজকে এই একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা কর্তৃত্ববাদের মহাসড়কে উঠতে প্রলুব্ধ হতে পারে, এই যুক্তি নিয়ে হাজির হতে পারে যে সঠিক কাজটি করার ব্যাপারে জনসাধারণের ওপর আস্থা রাখা যাবে না।
    সাধারণত, বছরের পর বছর ধরে যে আস্থা ভঙ্গ করা হয়েছে, সেটা রাতারাতি ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু এটা কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। সংকটের সময়ে, মানুষের মনও খুব দ্রুত বদলায়। বছরের পর বছর ধরে আপনার ভাইবোনদের সঙ্গে তিক্ত বিবাদের সম্পর্ক থাকতে পারে আপনার। কিন্তু জরুরি অবস্থার কালে আস্থা আর বন্ধুত্বের একটা গোপন কুয়ার সন্ধান আপনি পেয়ে যাবেন, এবং একজন আরেকজনকে সাহায্য করতে ছুটে যাবেন। একটা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিজ্ঞান, গণকর্তৃপক্ষ, আর গণমাধ্যমে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য এখনো খুব বেশি দেরী হয়ে যায়নি। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু সেটা নাগরিকদেরকে ক্ষমতায়িত করার জন্য। আমি নিশ্চয়ই আমার দৈহিক তাপমাত্রা আর রক্তচাপ তত্ত্বাবধান করার পক্ষে, কিন্তু সেটা কোনো সর্বশক্তিমান সরকার তৈরি করার জন্য নয়। বরঞ্চ, সেই ডাটার কাজ হবে ব্যক্তিগত বাছবিচারের ক্ষেত্রে আমাকে অধিকতর ওয়াকেফহাল করে তোলা, এবং সরকারকেও এর সিদ্ধান্তগুলোর জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।
    যদি আমি দিনের ২৪ ঘণ্টাই আমার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ট্র্যাক করতে পারি, তাহলে আমি অন্য মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছি কিনা শুধু সেটাই যে জানতে পারবো তাই নয়, কোন অভ্যাসগুলো আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো সেটাও জানতে পারবো। আর করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে যদি আমার প্রবেশাধিকার থাকে, এবং যদি আমি সেগুলো বিশ্লেষণ করতে পারি, তাহলে সরকার এ-ব্যাপারে আমাকে সত্য বলছে কিনা এবং মহামারিপ্রতিরোধে সঠিক নীতি অনুসরণ করছে কিনা সেটা আমি যাচাই করতে পারবো। যখন লোকে নজরদারির কথা বলে, মনে রাখবেন প্রযুক্তি শুধু যে সরকারই নাগরিকদেরকে তত্ত্বাবধানে রাখতে ব্যবহার করতে পারে তাই নয়—নাগরিকরা সেই একই প্রযুক্তি সরকারকে তত্ত্বাবধানে রাখতেও ব্যবহার করতে পারে।

    করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবটা তাই নাগরিকত্বের একটি প্রধান পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে, আমাদের প্রত্যেককে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখতে হবে, ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক আর স্বার্থপর রাজনীতিবিদদের ওপর নয়। আমরা যদি সঠিকটা বেছে নিতে ব্যর্থ হই, তবে দেখা যাবে নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান স্বাধীনতাগুলোই ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি আমরা, আর ভাবছি এটাই স্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র উপায়।

    আমাদের একটা বৈশ্বিক পরিকল্পনা দরকার

    আমরা দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বাছ-বিচারের সম্মুখীন, সেটা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা আর বৈশ্বিক সংহতির মধ্যে। খোদ মহামারিটা, এবং এর ফলে দেখা দিতে যাওয়া অর্থনৈতিক সংকটটা, দুটোই বৈশ্বিক সমস্যা। কেবলমাত্র বৈশ্বিক সহযোগিতার ভেতর দিয়েই কার্যকররূপে এগুলোর সমাধা করা সম্ভব।

    সবার আগে ভাইরাসটাকে হারিয়ে দেয়ার জন্য, আমাদেরকে বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। ভাইরাসের ওপর মানুষের একটা বড় সুবিধার জায়গা এটা। চীনে থাকা একটা করোনাভাইরাস আর আমেরিকায় থাকা একটা করোনাভাইরাস কীভাবে মানুষকে সংক্রমিত করতে হবে সেই বিষয়ে তথ্য বিনিময় করতে পারে না। কিন্তু কীভাবে করোনাভাইরাসের মোকাবেলা করতে হবে, সে-ব্যাপারে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করতে পারে। ভোরবেলা একজন ইতালিয়ান চিকিৎসক মিলানে যা আবিষ্কার করেন তা বিকেল নাগাদ তেহরানে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। কয়েকটি নীতির মধ্য থেকে কোনটা অনুসরণ করা হবে, সে-ব্যাপারে যুক্তরাজ্য সরকার যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, তখন দেশটি কয়েকমাস আগে একই ধরণের সংকটের সম্মুখীন হয়েছে যে কোরিয়ানরা, তাদের পরামর্শ নিতে পারে। কিন্তু এটা যাতে সম্ভবপর হয়ে ওঠে, সে-জন্য আমাদের একটা বৈশ্বিক সহযোগিতা ও আস্থার প্রয়োজন পড়বে।

    দেশগুলোর উচিত হবে নিজেদের মধ্যে মুক্তভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা এবং বিনয়ের সঙ্গে পরস্পরের পরামর্শ চাওয়া। যে ডাটা আর ইনসাইট তারা পাচ্ছে সেটার ওপর আস্থা রাখতেও সমর্থ হতে হবে তাদেরকে। মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো টেস্টিং কিট আর শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র, উৎপাদন ও বিতরণের জন্য আমাদের একটি বৈশ্বিক প্রয়াসের প্রয়োজন পড়বে। প্রতিটা দেশ স্থানীয়ভাবে এটা করার চেষ্টা চালাচ্ছে, এবং হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই মজুদ করছে, এরকম করার চেয়ে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রয়াসই বরং উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করতে পারবে এবং জীবন-বাঁচানো যন্ত্রপাতি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে পারবে। যুদ্ধের সময় দেশগুলো যেভাবে প্রধান প্রধান শিল্পখাতগুলোকে জাতীয়করণ করে, তেমনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন লাইনগুলোকে ‘মানবিকীকৃত’ করার প্রয়োজন হতে পারে। করোনাভাইরাসের স্বল্পসংখ্যক কেস ধরা পড়েছে এমন ধনী দেশগুলোর অনেক বেশি কেস ধরা পড়েছে এমন গরিব দেশগুলোতে তারা মূল্যবান যন্ত্রপাতি পাঠাতে সম্মত থাকা উচিত। তাদেরকে এই ব্যাপারে আস্থা রাখতে হবে, পরবর্তী যদি ও যখন তাদের নিজেদের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে, অন্য দেশগুলো সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

    মেডিক্যাল পার্সোনেলের ক্ষেত্রেও আমরা একই ধরণের বৈশ্বিক প্রয়াস বিবেচনায় আনতে পারি। যেসব দেশ এখনো ততোটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সবচেয়ে খারাপ দশায় থাকা অঞ্চলগুলোতে সেসব দেশ তার মেডিক্যাল স্টাফ পাঠাতে পারে। বিপদে পাশে দাঁড়ানোও হলো, আবার মূল্যবান অভিজ্ঞতাও অর্জন করা হলো। পরবর্তীতে মহামারির ফোকাসটা যদি ঘুরে যায়, সাহায্য বিপরীত দিকেও বইতে পারে।

    অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও বৈশ্বিক সহায়তাটাও ব্যাপকভাবেই জরুরি। অর্থনীতি ও সরবরাহ শেকলের বৈশ্বিক চরিত্রটার কারণে, প্রতিটি সরকার যদি অন্য সবার কথা ভুলে গিয়ে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফলটা দাঁড়াবে বিশৃঙ্খলা আর সংকটের গভীরতর হওয়া। আমাদের একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা দরকার, তাড়াতাড়ি দরকার।

    আরেকটা প্রয়োজনীয়তা : ভ্রমণের ব্যাপারে একটা বৈশ্বিক বন্দোবস্তে পৌঁছানো। মাসের পর মাস ধরে সর্বপ্রকার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ রাখা ব্যাপক ভোগান্তির জন্ম দেবে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অন্তত কিছু মানুষের জন্য ভ্রমণ করাটা জরুরি, যাদেরকে সীমান্ত পেরোনোর ব্যাপারে দেশগুলোকে পরস্পরের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। এদের মধ্যে আছেন : বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ও ব্যবসায়ীগণ। ভ্রমণকারীদেরকে তাদের স্ব-স্ব দেশ আগেভাগেই স্ক্রিনিং করবে, এ-ব্যাপারে একটি বৈশ্বিক বোঝাপড়ায় সম্মত হতে পারলে কাজটা করা সম্ভব হবে। আপনি যদি জানেন শুধু সতর্কভাবে স্ক্যান করা যাত্রীদেরকেই একটা উড়োজাহাজে চড়ে বসতে দেয়া হয়েছে, নিজের দেশে তাদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে আপনি অধিকতর সম্মত থাকবেন।

    দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে দেশগুলো এসব থোড়াই কেয়ার করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর একটি সামষ্টিক পক্ষাঘাত চেপে বসেছে। মনে হচ্ছে ঘরে কোনো মুরুব্বি নাই। এই প্রত্যাশা করাটা কারো জন্য অস্বাভাবিক ছিলো না যে, হপ্তাখানেক আগেই বিশ্ব নেতারা একটি সাধারণত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জরুরি সভায় বসেছেন। অথচ জি৭-ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা মোটে এই সপ্তাহে একটা ভিডিও সংবাদ-সম্মেলন করতে পেরেছেন, এবং তাতে এমন কোনো কর্মপরিকল্পনা উঠে আসেনি।

    পূর্ববর্তী বৈশ্বিক সংকটগুলোতে—যেমন ২০০৮’র আর্থিক সংকট বা ২০১৪’র এবোলা মহামারী— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বনেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই নেতৃত্বমূলক অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা তাদের অবস্থান পুরোপুরি পরিষ্কার করেছে : মানবজাতির ভবিষ্যতের চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহত্ত্ব নিয়ে তাদের মাথাব্যথা অনেক বেশি।

    এই প্রশাসন এমনকি তার নিকটতম মিত্রদেরকেও পরিত্যাগ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে আমেরিকায় সব ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার সময়, এটা ইইউকে একটা অগ্রিম নোটিশ দেয়ার গরজটা পর্যন্ত বোধ করেনি—এই মারাত্মক পদক্ষেপটা নিয়ে ইইউ-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা তো দূরের কথা। একটা নতুন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের একচেটিয়া সত্ব কিনে নিতে একটি জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে ১ বিলিয়ন ডলার অফার করার মাধ্যমে এটি জার্মানিকে একটা কলঙ্কজনক দশায় ফেলেছে। বর্তমান প্রশাসন যদি হাওয়া বুঝে ঘোড়া বদলও করে, এবং একটা বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়েও আসে, এমনকি তখনও খুব কম লোকই এমন একজন নেতাকে অনুসরণ করবে, যিনি কোনোদিন দায়িত্ব নেন না, ভুল স্বীকার করেন না, এবং সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে শুধু বাহবা কুড়ানোর তালে থাকেন।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেলে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে অন্য দেশগুলো যদি এগিয়ে না আসে, তাহলে বর্তমান মহামারিঠেকানোটাই যে কেবল কঠিন হয়ে উঠে তাই নয়, আগামী বছরগুলোতে এর উত্তরাধিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলাটা অব্যাহত রাখবে। তবু সব সংকটই একইসঙ্গে একটা সম্ভাবনাও বটে। আমরা আশা করতে পারি, বৈশ্বিক অনৈক্য যে তীব্র বিপদ ঘনিয়ে আনে, সেই উপলব্ধি করতে বর্তমান মহামারিটা মানবজাতিকে সহায়তা করবে।

    মানবজাতির সামনে একটা বাছবিচার করার সময় এসেছে। আমরা কি অনৈক্যের পথ ধরে নিচের দিকে নেমে যাবো, নাকি বেছে নেবো বৈশ্বিক সংহতির পথ? যদি আমরা অনৈক্যকে বেছে নেই, এটা যে শুধু সংকটটাকেই ঘনীভূত করবে তাই নয়, ভবিষ্যতে এরচেয়েও মারাত্মক সব ধবংসযজ্ঞের পথ খুলে দেবে। আর আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতিকে বেছে নেই, শুধু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, ভবিষ্যৎ সব মহামারিআর একুশ শতকে মানবজাতি অন্য যেসব সংকটের সম্মুখীন হতে পারে তার বিরুদ্ধেও এটা একটা বিজয় হয়ে থাকবে।

    প্রখম প্রকাশ: বাংলা ট্রিবিউন
    shorturl.at/nuQX5

    (more…)

  • করোনা, কোয়ারেন্টাইন ও কর্তৃত্ববাদ

    করোনা, কোয়ারেন্টাইন ও কর্তৃত্ববাদ

    • আরিফ রেজা মাহমুদ

    এক.
    লাগাম ছাড়া লগ্নিপুঁজি এবং তার মুনাফার নেশা এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করে যার ভেতরে নিহিত থাকে প্রকৃতি এবং তার শৃঙ্খল বিনাসী তৎপরতা। ফলশ্রুতিতে এমনসব জৈব-জৈবনিক উপাদান তথা বীজানু উন্মুক্ত হয়ে পড়ে যা ছিল এতদিন সুপ্ত।

    আর্টওয়ার্ক: ডলার সাইন
    শিল্পী: এলিহু দুয়ায়ের
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অতি উৎপাদন, কাঁচামালের যোগান, শিল্পোৎপাদনের জন্য বন উজাড়, জলাশয় বিনাস, কার্বন নিঃসরণে বায়ু দূষণ ও বায়ুমন্ডলে প্রভাব, ওজন স্তর ফুটো করে ফেলা এবং মহাকাশের নানা রশ্মির প্রভাব, সাগরের পানি উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা সৃষ্টি ইত্যাদি পুঁজিবাদী শিল্পোৎপাদনেরই ফল। মুনাফার লোভ প্রাণ-প্রকৃতিকে শুধু ধ্বংসই করে না, তৈরি করে এমন একটা ব্যবস্থা যার উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে পুরো সামাজিক জীবন।

    পুঁজিবাদ আর এই সামাজিক জীবনের রক্ষণভাগই হল আধুনিক রাষ্ট্র– একটা সার্বভৌম ক্ষমতা যা পুরো সিস্টেমটাকে অভিভাবকের মতো দেখভাল করে আর কোথাও কোন বিচ্যুতি ঘটলে তাকে ঠিকঠাক করতে আরও দক্ষভাবে প্রয়োগ করে তার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতা। বলাই বাহুল্য এই নিয়ন্ত্রণ শুধু বল প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তৈরি করা হয় তার শর্ত এবং প্রতিনিয়ত স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে বহাল থাকে জীবন্ত কর্তৃত্ব।

    স্বাস্থ্য বলতে পুঁজিবাদ বোঝে না তার নাগরিকের জীবনের সুস্থতা। স্বাস্থ্য তার কাছে একটি মুনাফামুখিন খাত। বৈষম্য টিকিয়ে রেখে তার ভেতরেই রোগনিরাময়কে একটি অর্থনৈতিক চাহিদা হিসাবে গঠন করে পুঁজিবাদ। আর তাই মহামারি এবং আক্রান্ত তার কাছে নতুন ভোক্তার আবির্ভাব। এটা ততটুকুই বিপজ্জনক যতটুকু তা শ্রেণী সংহত একটা ব্যবস্থায় এলিট শাসক গোষ্ঠী ও তার দুর্ভেদ্য প্রাচীরকে আক্রান্ত করে।

    তাই মহামারী হয়ে ওঠে রাষ্ট্রর ম্যানেজমেন্টের বিষয়। একদিকে যেমন মহামারী মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, অন্যদিকে মহামারি ম্যানেজমেন্ট রাষ্ট্রকে এনে দেয় নাগরিকের উপর যাবতীয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপের শর্ত। একটা কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ক্ষমতা চর্চা।

    দুই.
    করোনা শুধু একটি সংক্রমণী ভাইরাস নয়। একই সঙ্গে ভয়– নিরেট ভয়ের সংস্কৃতি। একটি গণআতঙ্ক। এই আতঙ্ক বিস্তৃত হয় মন থেকে সমাজশরীরে। পুরো সমাজের সংবহনতন্ত্রকেই আক্রান্ত করে ভয়। এই ভয়ই দাবি করে শাসকীয় একশন। একেবারে বিদ্যুতবৎ একশন। ভয়কে ভিত্তি করেই সমাজের চিরায়ত এলাকায় ঢুকে পড়ে রাষ্ট্র কর্তৃত্বর শুঁড়।

    ভয়ের সমানুভূতির উপরেই দণ্ডায়মান হয় রাষ্ট্র। ভীত জনগণের সামনে এবার নির্মিত হয় এক ‘জাতীয় শত্রু’– করোনা।

    আর্টওয়ার্ক: করোনা প্যানিক
    শিল্পী: পেড্রো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই ‘জাতীয় শত্রু’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পার্টনার মিডিয়া। রাষ্ট্র- মিডিয়া মিথোজীবী সম্পর্ক গড়ে তোলে। মিথোজীবিতার ভিত্তি ‘জাতীয় শত্রু’ নিধন নয়– জাতীয় শত্রুর ভীতি এবং রাষ্ট্রর সর্বশক্তিমান রূপকে কাঙ্খিত করে তোলা। বল প্রয়োগ ও নিবর্তনমূলক ব্যবস্থাকে পাবলিক স্মৃতিতে সর্বাত্মক করে তোলা।

    ভয় উৎপাদন,  সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক করে তোলে।

    তিন.
    রাষ্ট্র স্বয়ং প্রপাগান্ডা– কর্তৃত্ববাদেরই অমোঘ পরিণতি। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে এক ও অদ্বিতীয় তথ্যকেন্দ্র। তথ্য তা-ই যা রাষ্ট্র সার্টিফাই করে। মিডিয়া আর সমগ্র প্রচার মাধ্যম তার বাহনমাত্র।

    আর্টওয়ার্ক: সেল্ফ এক্লোজার
    শিল্পী: এলিনা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    রাষ্ট্র শুধু ফরমান বা ঘোষণায় হাজির করে না। পটু হয়ে ওঠে মিথ্যাকে অবলীলায় কার্যকরী করে তুলতে। গুজবের জুজু রচনা করে রাষ্ট্র। আর একইসঙ্গে পরিণত হয় সকল ‘সত্য’র রচনাকারী নিউস্পিকে।

    রাষ্ট্র হাজির করে সংখ্যা ব্যবস্থাপনার রাজনীতি। যেখানে অধিকাংশ সময় থাকে ধাঁধা। এই ধাঁধা তৈরি হয় সবসময় খারাপ কোন উদাহরণকে বেছে নিয়ে এবং তারপর মহান নেতা নেত্রীকে প্রতীক বানিয়ে তার সাফল্য ও স্তুতি রচনা করে রাষ্ট্র। প্রতীকস্বয়ং রাষ্ট্রপ্রসূত!!

    শুধু প্রতীক পূজা নয়, প্রতিটি নিউস্পিকের
    পক্ষ- বিপক্ষ দ্বিত্ব নির্মাণ করে রাষ্ট্র। আর বহুবর্ণিল মতের ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করে এই দ্বিত্বতে আটকে।

    চার.
    নতুন ধরনের সভেরিন পাওয়ার তৈরি হচ্ছে, যেটা ‘সচেতনতা’র উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ‘সচেতনতা’ নিয়ন্ত্রণ কৃৎ-কৌশলের আরও আরও প্রকরণকে অবিসম্ভাবী করে তোলে। নজরদারি যা এতদিন ছিল একটা রাজনৈতিক লক্ষ্য তা এখন নিপাট জীবন ও আচরণকে নতুন মূল্যবোধে আটক করছে আর এটাই হয়ে উঠছে নিয়মিত!

    সচেতনতাকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করে পুরো পাবলিক পরিসরই, অ-সচেতনতাকে শুধু দোষারোপই করে না, অ-সচেতনতা হয়ে ওঠে সরাসরি সেনা- পুলিশ- রাষ্ট্রর চিরুনি অভিযানের লক্ষ্য।

    প্রতিটি শরীর একদিকে যেমন সন্দেহভাজন, অন্যদিকে প্রতিটি আচরণই তৈরি করে একটি ‘সতর্ক’ অবস্থা।

    প্রধানমন্ত্রী-সরকার ও বিরোধীদলসমূহ- আইন ও সুরক্ষা কাঠামো সমগ্র রাষ্ট্রপ্রণালীই কোয়ারেন্টাইনকে উপর্যুপরি ব্রিডিং করছে আর তার নতুন নতুন সংস্করণ হাজির হচ্ছে। শরীর থেকে ব্যক্তি, ব্যক্তি থেকে সমাজ সংবহনতন্ত্র কোয়ারেন্টাইনড। কোয়ারেন্টাইন এখন সামাজিক চুক্তি!

    আর্টওয়ার্ক: কোয়ারেন্টিনা
    শিল্পী: বেকস
    সূত্র কার্টুন মুভমেন্ট

    আমরা এখন এমন এক বিন্দুতে যেখান থেকে ক্ষমতাকে চিনে নেয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

    কর্তৃত্ববাদী একটা ব্যবস্থায় সচেনতা অপরিহার্য করে তোলে যাবতীয় নিবর্তনমূলকপন্থাকে। সমাজ ও কমিউনিটির আত্ম উপলব্ধির উত্থান ছাড়া আত্মশক্তি গড়ে ওঠে না।

    সচেতনতা মনে সমাজ অবরুদ্ধকরণ নয়। সচেতনতা মানে সামজিক উত্থানের পরিসরকে প্রশস্তকরণ। সমাজ ছাড়া শরীর বা ব্যক্তি বাঁচে না। পরিণত হয় অর্থহীন জিন্দা লাশে।

  • সাউল নিউম্যান ।। মার্ক্সবাদ ও ক্ষমতা প্রশ্ন

    সাউল নিউম্যান ।। মার্ক্সবাদ ও ক্ষমতা প্রশ্ন

    অনুবাদ: তৌকির হোসেন

    (প্রথম অংশ)
    মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার যে বিতর্ক, তা ঊনবিংশ শতাব্দীর র‍্যাডিকাল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এনার্কিস্ট মিখাইল বাকুনিন ছিলেন মার্ক্সের অন্যতম দুর্দান্ত সমালোচক, যার বিরুদ্ধ মত প্রথম আন্তর্জাতিকে বিভক্তি পর্যন্ত টেনেছিল। এই দুই বিপ্লবী শক্তির মধ্যকার যে বিতর্ক তা আজকের দিনেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই আলোচনা মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার সকল তর্ক-বিতর্ক নিয়ে না বরং আধিপত্য, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব— সংক্রান্ত বিতর্কের সাহায্যে বর্তমান রাজনৈতিক তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি মোকাবেলা করবে। বিভিন্ন ঘরানার তাত্ত্বিক, এক্টিভিস্টগণ প্রায় সময়ই নিজেদের মধ্যে আলোচনায় থাকেন কিভাবে এমন একটা বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন অর্জন করা যাবে, যেই বিপ্লবের ধারণার সাথে কর্তৃত্ব কিংবা শাসনের ইঙ্গিত যুক্ত থাকবে না। সাম্প্রতিক কম্যুনিজমের ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্ট অন্তত আর কিছু না হলেও, বিপ্লবের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চর্চার পথ যে আরও সুগম করা যায় সেই বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে দেয়। ইতিহাসের অন্যতম মুক্তিকামী আন্দোলনটিও দিনশেষে যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলো সেইগুলোকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। মিশেল ফুকোর মতে এক অর্থে যা ছিলো কেবল গার্ডের পরিবর্তন।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    যদিও রাশিয়ার বিপ্লব পুরোপুরি মার্ক্সের তত্ত্বকে প্রতিনিধিত্ব করে না। যারা বলে থাকেন— বলশেভিক বিপ্লব কোন সত্যিকার মার্ক্সিস্ট বিপ্লব না, তাদের অভিযোগও আমাদের আমলে নিতে হবে। এবং মার্ক্স নিজেও সম্ভবত কবরের মধ্যে নড়াচড়া করে উঠেছিলেন এই বিপ্লবের ধরনধারণ দেখে। মার্ক্সিজম এবং এনার্কিস্ট ক্রিটিকগুলো আমরা তাদের মতো করেই তত্ত্বের আতশীতে বিচার করব। মার্ক্স, এঙ্গেলস কিংবা ক্লাসিকাল মার্ক্সিস্টদের আলাপ আলোচনাতেই আমরা আটকে থাকব না, বর্তমান সময়ের মার্ক্সিস্ট/এনার্কিস্ট চিন্তকদের নিয়েও আমরা কথা বলব। মার্ক্সিজম এবং এনার্কিজমের মধ্যকার বিতর্ক ক্ষমতা, আধিপত্য এবং কর্তৃত্বের ধারণা ঘিরে আবর্তিত হয়। এর সাথে অবধারিতভাবে চলে আসে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার ব্যাপারটি। মার্ক্সিস্ট এবং এনার্কিস্ট  উভয়ের কাছেই রাষ্ট্র— ব্যক্তি স্বাধীনতার পরম শত্রু । মার্ক্স এবং এঙ্গেলস উভয়েই রাষ্ট্রকে বিচার করেছেন একটি অস্ত্র হিসাবে যার মাধ্যমে এক অর্থনৈতিক শ্রেণি অন্য শ্রেণির উপর প্রভাব খাটায়, আধিপত্য বিস্তার করে। তাহলে রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে এমন একটা জিনিস যা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গায় মার্ক্স খুব সোজাসাপ্টা না। তিনি সব জায়গায় খাটে— এরকম আলাদা কোন রাষ্ট্রের ধারণা দিয়ে যান নাই। তিনি কিছু কিছু সময় রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক, শ্রেণি শাসনের অস্ত্র হিসাবে দেখেছেন আবার কিছু সময় একে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিধি কতটুকু তা মার্ক্স-এনার্কিস্ট বিতর্কের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং তা নিয়ে আরও বিশদভাবে আমরা আগাব।

    ফ্রেডরিখ হেগেল
    ১৭৭০–১৮৩১
    পোট্রেট: স্কলেসিঙ্গার
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    মার্ক্সের রাষ্ট্র বিষয়ে আলাদা হওয়ার জায়গাটি হচ্ছে হেগেল। হেগেলের মতে লিবারেল বা উদারনৈতিক রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক নীতিবান মুরুব্বি যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব, সংঘাত আমরা প্রতিহত করতে পারি। ফিলোসফি অফ রাইট বইয়ে হেগেল দাবি তুলেন, নাগরিক সমাজ প্রচন্ড অহংকারে জর্জরিত এবং নিজের নিজের স্বার্থের জন্যে ক্রমাগতই নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। নাগরিক সমাজের শরীর এক সর্বজনীন স্বার্থপরতা দিয়ে গঠিত। এবং এ থেকে মুক্তির জন্যে হেগেলের মতে আধুনিক রাষ্ট্রকে এমন একটি ইউনিভার্সাল বা বিশ্বজনীন আইনি ব্যবস্থা, সামষ্টিক চেতনার উৎপাদন ঘটাতে হবে যাতে করে এই স্বার্থপরতাকে রাজনৈতিক খেলার মাঠ থেকে দূরে রাখা যায়। সোজা করে বললে, এমন একটা রাষ্ট্র যা সমাজের কতিপয়ের স্বার্থের জন্যে কাজ না করে, সর্বজনীন হয়ে উঠবে। এবং এই রাষ্ট্র সর্বসাধারণের ভালোই চায় এবং ভালোই করে। হেগেলের কাছে আধুনিক উদারনৈতিক রাষ্ট্র সমাজের দ্বন্দ্ব-বিভক্তির সমাধান। এটি নৈতিক এবং যৌক্তিক জ্ঞানের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। এই যে রাষ্ট্র সর্বসাধারণের ভালো চায় কিংবা সমাজের ভালো চায়, অথবা করতে পারে— মার্ক্স এই বক্তব্য মানতে পারলেন না। মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রই যেটা নিজেকে সর্বজনীন দেখাতে চায়। এর বিশ্বধার্মিক ভাবসাব কতিপয় অর্থনৈতিক স্বার্থ (যেমন— ব্যক্তিগত সম্পদ) ঢাকার একটা মুখোশ। এই জায়গা থেকেই মার্ক্স পরবর্তীতে দাবি করেন, রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শ্রেণি— বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিত্ব করে। হেগেলের বিপরীতে গিয়ে মার্ক্স প্রশ্ন তুলেন, রাষ্ট্র আদৌ নাগরিক সমাজের মধ্যকার সমস্যা, দ্বন্দ্বগুলোকে হটাতে পারে কিনা এবং যেহেতু পারে না, তাই রাষ্ট্রকেই সরাতে হবে। এইভাবে মার্ক্স নাগরিক সমাজের সর্বজনীন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে বু্র্জোয়া রাষ্ট্রের বিলোপের কথা বলেন।  যারা মার্ক্সের অরাজ কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তাভাবনার আলাপ তুলেন, তারা মূলত এই পয়েন্টকেই নানাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেন। তবে মজার ব্যাপার, মার্ক্স যতই হেগেলের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বের ধারণার বিরোধিতা করেন না কেন তিনি এই তাত্ত্বিক কাঠামোর বাইরে যেতে পারেন নাই। এর প্রমাণ আমরা পাই, মার্ক্স বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যে ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রের ধারণা দেন তাতে, যেখানে মার্ক্স বলেন রাষ্ট্র সকল কর্তৃত্বকে কেন্দ্রীভূত করবে একক শক্তি/পার্টির হাতে। মার্ক্সের তাই এখানের চিন্তাভাবনা যতই কর্তৃত্ববিরোধিতাকে ফুটায়ে তুলুক না কেন, তিনি যে এখানে কর্তৃত্বের সমস্যার সাথে— আধিপত্য এবং উঁচু-থেকে-নিচু এইরকম শ্রেণিকাঠামোর (যা পার্টিযন্ত্রের মধ্যে থাকে, কলকারখানা এবং প্রযুক্তির মাঝে বিরাজ করে) সাথে বোঝাপড়ায় যাননি— তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, যারা মার্ক্সের কর্তৃত্ববিরোধী চিন্তার বৈশিষ্ট্যকে বারবার উল্লেখ করেন, তারাও দিনশেষে এটা মানতে বাধ্য হবেন, মার্ক্স ক্ষমতার বিস্তৃত সমস্যার জায়গাগুলোর সাথে বোঝাপড়ায় যথেষ্ট উপকারি নন। যে ক্ষমতার সমস্যা শ্রেণিদ্বন্দ্বের বাইরে অবস্থান করে এবং যাকে অর্থনৈতিক মাপকাঠির ছাঁচে ফেলা যায় না।

     

    মার্ক্সের রাষ্ট্র-ধারণা

    বাউয়ারের ক্রিটিক

    মার্ক্সের বিভিন্ন ধারার মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হচ্ছে, অর্থনৈতিক এবং শ্রেণি শক্তি রাজনৈতিক বিষয়াদি নির্ধারণ করে থাকে। এমনকি মার্ক্সের নিজের কাছেও সমাজের অর্থনৈতিক শক্তিই সমস্ত ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংষ্কৃতিক, সামাজিক ঘটনাবলীর নিয়ামক। আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থাই সমাজে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে; বাস্তবে— উৎপাদন ব্যবস্থা যে ধরনের সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণ করে তার ভিত্তিতেই রাজনীতি নির্ধারিত হয়। মার্ক্সের এই বক্তব্যের হদিশ আমরা পাই তার অন দ্য জুইশ কোশ্চেন প্রবন্ধে। এটি আসলে ব্রুনো বাউয়ারের এক প্রবন্ধের প্রতি মার্ক্সের সমালোচনা ছিলো, যেখানে বাউয়ার অভিমত দেন, ধর্মীয় যে সকল ব্যাপারস্যাপার মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে তা থেকে মুক্তির জন্যে রাষ্ট্রকে সেকুলার হয়ে উঠতে হবে। মার্ক্স অন্যদিকে বলেন, রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে উঠলে ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে উঠবে, ব্যক্তিগত চর্চার জায়গা হয়ে উঠবে; যার অর্থ এটা না— রাষ্ট্র ধর্ম থেকে মুক্তি পাচ্ছে। ধর্ম তখনও নানাভাবে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা অন্যান্যভাবে প্রভাবিত করে যাবে: “ধর্ম থেকে রাজনৈতিক মুক্তি মানুষের সর্বশেষ কিংবা সর্বোচ্চ মুক্তি না।” বাউয়ারের যে রাজনৈতিক মুক্তি তা বরং সমাজে ধর্মকে আরও সুসহংত করবে এবং সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত বিভাজনের জায়গা প্রশস্ত করবে। বরং মার্ক্স রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার এই বিভাজনগুলো মুছবার চেষ্টা করেছেন। ওই রাজনৈতিক মুক্তি ধর্মের খপ্পর থেকে উদ্ধারের কোন সুবিধাই তৈরি করবে না। বাউয়ার রাষ্ট্রের ধার্মিক বৈশিষ্ট্য এবং ধর্ম থেকে সমাজকে মুক্ত করার যে ক্ষমতা এর রয়েছে তার উপর জোর দেন। আর মার্ক্সের জোর এখানে নাগরিক সমাজের উপর। সমাজে ধর্ম বা অর্থনীতির কারণে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তা থেকে রাষ্ট্র মুক্তি দিতে পারে না; কারণ, রাষ্ট্র নিজেই এই বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন। মার্ক্সের জন্যে এইখানে আসল ক্ষমতা নিহিত রয়েছে নাগরিক সমাজ এবং ধর্মীয়/ব্যক্তিগত সম্পত্তির যে প্রভাব তার ভিতর।

    ব্রুনো বাউয়ের
    (১৮০৯- ১৮৮২)

    রাজনৈতিক শক্তি নয় বরং অর্থনৈতিক শক্তিই সমাজকে চালনা করে, শাসন করে। একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ— বাউয়ারের মতই মার্ক্স রাজনৈতিক মুক্তির সুরাহা খুঁজতে চেয়েছেন। তিনি দেখলেন এই মুক্তি আসতে পারে যদি রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যকার যে ফারাক রয়েছে তা আরও বিস্তৃত হয়। এবং যে সকল অব্যক্তিগত অর্থনৈতিক শক্তি রয়েছে (সামষ্টিক উৎপাদন, ব্যক্তিগত ফায়দা বাদে) তাকে আরও বলবৎ করা যায় (তাদের উপর রাজনৈতিক প্রভাবগুলোকে ধীরে ধীরে হ্রাস করার মাধ্যমে)। কম কম রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অর্থই হলো একক মালিকানার নিয়ন্ত্রণ কমানো।

    এইখানে অন দ্য জুইশ কোশ্চেন প্রবন্ধের আলোচনার উদ্দেশ্য মার্ক্স এবং বাউয়ারের ফারাক দেখানো। মার্ক্স যেখানে সমাজ তথা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রের দিকে কথা তুলেন, সেখানে বাউয়ার রাষ্ট্র থেকে সমাজের দিকে ফেরত আসেন। বাউয়ার বিশ্বাস করতেন, সমাজকে ঠিকঠাক রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতেই নিহিত, তাই রাষ্ট্র যদি ধর্ম থেকে মুক্ত হতে পারে তাহলে সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্ম তার গুরুত্ব এমনিতেই হারাবে। মার্ক্স অন্যদিকে বিশ্বাস করতেন, আসল আধিপত্য, আসল ক্ষমতা নিহিত রয়েছে নাগরিক সমাজের ভিতর: “রাজনৈতিক না, বরং নাগরিকের জীবনই তাদের পরস্পরের মধ্যকার আসল বন্ধন।” মার্ক্সের মতে, বাউয়ার রাষ্ট্রকে একটা স্বাধীন সত্তা হিসেবে ধরে নিয়েছেন যা একটি মারাত্মক ভুল। রাষ্ট্র একক নির্ধারক এবং স্বায়ত্তশাসিত হয়ে কাজ করতে পারে না। রাষ্ট্র বরং অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার কাজকর্ম পরিচালনা করে।

    যদিও বাউয়ার কোনভাবেই এনার্কিস্ট ছিলেন না, কিন্তু তার বিশ্বাসের একটা জায়গায় নৈরাজ্যবাদী ধারণার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র নিজেই একটি নির্ধারক, স্বায়ত্তশাসিত শক্তি যার আলাদা অস্তিত্ব রয়েছে, আলাদা ক্ষমতা রয়েছে সমাজের উপর। বাউয়ার যেখানে এই ক্ষমতাকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন, নৈরাজ্যবাদীরা একে নেতিবাচক এবং ধ্বংসাত্মক হিসেবে দেখেন। অবশ্য চিন্তার এই ধারা এও বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক ক্ষমতাই সমাজের প্রধান নির্ধারকরূপে কাজ করে থাকে (যা মার্ক্স সমালোচনা করেন)। মার্ক্স এইজন্যে পিয়েরে জোসেফ প্রুঁধোর বক্তব্য খারিজ করেন যার বক্তব্য ছিলো— রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নানাভাবে তৈরি করতে পারে। মার্ক্সের মতে, রাষ্ট্রের কাছে এইরকম কোন ক্ষমতা থাকতে পারে না, কেননা এটি তো কেবল অর্থনৈতিক শক্তিসমূহেরই এক প্রতিফলন যার পরিবর্তন ঘটানো উচিত। বাউয়ার বিশ্বাস করতেন, মার্ক্স রাষ্ট্রের ব্যাপারে এক প্রকার অন্ধবিশ্বাস পোষণ করেন৷ রাষ্ট্র তার কাছে অর্থনৈতিক শক্তির এক রকম ফলাফল: ” তিনি (মার্ক্স) বলেন, ‘দারিদ্র্য রাজনৈতিক দাসত্ব সৃষ্টি করে থাকে— যা রাষ্ট্র।’ কিন্তু তার এই বক্তব্যকে যদি একটু ঘুরায়ে বলা হয়— ‘রাজনৈতিক দাসত্বের প্রতিরূপ রাষ্ট্র নিজে টিকে থাকার জন্যে সবসময়ই দারিদ্র্যকে হাজির রাখে; যার অর্থ— দারিদ্র্য মুছতে চাইলে রাষ্ট্রকেই মুছে ফেলা প্রয়োজন’— এই বক্তব্য মার্ক্স মানতে পারেন না।

    বোনাপার্টিজমের প্রশ্ন

     যদিও এটা সত্য, মার্ক্স রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক শক্তি এবং শ্রেণিস্বার্থের উৎপাদন হিসেবেই দেখেছেন, কিন্তু কিছু কিছু সময়ে তিনি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হিসাবেও চিন্তা করেছেন। তার দ্য এইটিন্থ ব্রুমাইর অফ লুই বোনাপার্ট গ্রন্থে ১৮৫১ সালের ফ্রান্সে সংঘটিত একটি অভ্যুত্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে লুই বোনাপার্টের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় শক্তি সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখল করে। রাষ্ট্রীয় শক্তি বুর্জোয়াদের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবে কাজই করেনি, কিছু ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের স্বার্থের বিরুদ্ধেও কাজ করেছে। এইজন্যে মার্ক্স বলেন, “কেবল দ্বিতীয় বোনাপার্টের সময়েই রাষ্ট্র নিজেকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন করে রাখতে পেরেছিলো।” যদিও এই রাষ্ট্রের ধারণা রাজনৈতিকভাবে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করলেও, এর সীমানা বা পরিধি ওই বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক স্বার্থের বাইরে যেতে পারে নাই। বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র পুঁজিবাদী শ্রেণিরই সন্তান, ক্রমশ তা দৈত্যাকার রূপ ধারণ করেছিলো। বু্র্জোয়ারা বোনাপার্টকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠ করেছিলো যেন তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সে ঠিক রাখতে পারে এবং শ্রমিকদের ঠান্ডা করে রাখতে পারে। কিন্তু, বু্র্জোয়া পার্লামেন্টের বিরুদ্ধেই এক সময় বোনাপার্ট খেপে উঠে। মার্ক্সের মতে, বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র বু্র্জোয়া ক্ষমতারই একটি বিকৃত, সহিংস রূপ— যা নিজেই একটি বু্র্জোয়া দৈত্য হয়ে উঠে বু্র্জোয়াদের বিরুদ্ধাচারণ করতে শুরু করে। এটি বুর্জোয়া স্বার্থ বাঁচাবার জন্যে বু্র্জোয়াদের আত্মহত্যার একটি অন্যতম উদাহরণ। অন্যভাবে, অর্থনৈতিক স্বার্থের গতি ঠিক রাখার জন্যে এই দৈত্যের প্রয়োজন ছিলো: “যদি অর্থসম্পত্তি রক্ষা করতে হয়, তাহলে রাজার মুকুট মাটিতে নামাতে হবে।” এবং বু্র্জোয়ারাও একপ্রকার নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলো, যদি এর অর্থনৈতিক ক্ষমতা টিকায়ে রাখতে হয়। আর বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র এই বিসর্জনেরই ফলাফল।

    লুই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
    ১৮০৮- ১৮৭৩
    শিল্পী: জেভিয়ার উইন্টারহল্ট

    তাহলে, মার্ক্সিস্ট তত্ত্বে বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা তাকে আসলে কতখানি স্বাধীন বলা যাবে? এ নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। ডেভিড হেল্ড এবং জোল ক্রিগারের মতে, মার্ক্সিস্ট তত্ত্বে রাষ্ট্র এবং শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্কে দুটো ধারা আছে। প্রথমটি, আমরা একে যদি ধরি ১(ক)— যা বোনাপার্টিজমের খোদ মার্ক্সের ব্যাখা দ্বারা প্রভাবিত— রাষ্ট্রের তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসনের ধারণার উপর জোর দেয়। এই ধারা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ ও আমলাতন্ত্র যে সমাজে আলাদা বলয়জুড়ে রয়েছে, সেই ধারণার উপর জোর দেয়। এর কাঠামো যে অর্থনৈতিক শ্রেণি দিয়ে পুরোপুরি নির্ধারিত হয়ে আছে এরকমও নয়, কিন্তু তাদের এই আলাদা বলয় সমাজের কেন্দ্রীয় একটি বিষয়। আর দ্বিতীয় ধারা, ২(ক), যা হেল্ড এবং ক্রিগারের মতে মার্ক্সিস্ট চিন্তায় সবচেয়ে প্রভাবশালী, রাষ্ট্রকে দেখে শ্রেণি আধিপত্য জারি রাখার একটি অস্ত্র হিসেবে। শ্রেণিস্বার্থ রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

    হেল্ড এবং ক্রিগারের মতে, এই দুই  বিপরীতধর্মী ধারা আলাদা আলাদা বিপ্লবী কৌশলের জন্ম দেয়। কারণ, প্রত্যেকের রাষ্ট্রকে দেখার চোখ ভিন্ন। প্রথমটির সাপেক্ষে বিপ্লবী কৌশল হবে ১(খ)— রাষ্ট্র যেখানে বিপ্লবী কৌশল এবং মুক্তির একটি অস্ত্রবিশেষ। কারণ, রাষ্ট্রকে এখানে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানরূপে দেখা হচ্ছে এই অর্থে রাষ্ট্র শ্রেণিস্বার্থের সাথে এসেনশিয়ালভাবে যুক্ত নয়। একে পুঁজিবাদ এবং বুর্জোয়া শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। দ্বিতীয়টির সাপেক্ষে বিপ্লবী কৌশল হবে ২(খ)— সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রাষ্ট্রের ধ্বংসই কাম্য। কারণ, রাষ্ট্র এখানে এসেনশিয়ালি বুর্জোয়া রাষ্ট্র, শ্রেণি শোষণের অস্ত্র। লেনিন এই ধারার খুব ভালো উদাহরণ।

    রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসনের এই প্রশ্ন এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে এর ভূমিকার পৃথক পৃথক ব্যাখা এই ছকের মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে:

    মার্কিস্ট  প্রস্তাবনা

    ১(ক) স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র ———-> ১(খ) রাষ্ট্র বিপ্লবের একটি অস্ত্র

    ২(ক) নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ———–> ২(খ) বিপ্লবে রাষ্ট্র ধ্বংস করতে হবে

    এই রাষ্ট্রের তত্ত্ব এবং এদের সাথে সংযুক্ত বিপ্লবী ধারণার ডাইকোটমির বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশ্ন তোলা যায়। কেউ কেউ বলতে পারেন, ২(ক) থেকেও তো ১(খ) তে যাওয়া যায়। অর্থাৎ, যদি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সবকিছুই শ্রেণির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় ২(ক) তাহলে এই রাষ্ট্রকেও তো আমরা বিপ্লবের একটি অস্ত্র হিসাবে দেখাতে পারি। আবার, রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা শ্রেণি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়, কেবল স্বায়ত্তশাসিত বা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে কাজ করতে থাকে ১(ক) তাহলে এই রাষ্ট্রকেও তো বিপ্লবের মাধ্যমে ধ্বংস করা যায়।

    একটি এনার্কিস্ট প্রস্তাবনা

    ১(ক) স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র ———-> ২(খ) বিপ্লবে রাষ্ট্র ধ্বংস করতে হবে

    ২(ক) নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ———–> ১(খ) রাষ্ট্র বিপ্লবের একটি অস্ত্র

    এই দুই আর্গুমেন্টের র‍্যাডিকালি দুই জায়গায় বসানোর পিছনে এই যুক্তিটিই রয়েছে। এবং এই যুক্তি এক ধরণের এনার্কিস্ট রাষ্ট্রের ধারণার কাছাকাছি বসবাস করে। এনার্কিজম রাষ্ট্রকে দেখে স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার আধিপত্য বিস্তারের নিজস্ব কৌশল রয়েছে। এই কারণে রাষ্ট্রকে বিপ্লবের নিরপেক্ষ অস্ত্র হিসেবে দেখাটা ভুল যেমনটা মার্কিস্ট ১(খ) প্রস্তাবনায় আমরা দেখি। বিপ্লবের সময়ে, পরিবর্তনের সময়ে রাষ্ট্র নিজস্ব কৌশলের বদৌলতে ঠিকই আধিপত্য, শোষণ কায়েমের পথে টিকে থাকতে পারে। এই বিপ্লব যদি প্রলেতারিয়েতদের হাত ধরেও হয় (মার্ক্সের প্রস্তাব যা), এই রাষ্ট্রকে তখনও বিশ্বাস করা যায় না কারণ এর নিজের টিকে থাকার আলাদা কৌশল আছে যা বিপ্লব নিরপেক্ষ। তাই রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে নিরপেক্ষ ধরে বিপ্লবের সহায়ক অস্ত্র হিসাবে বিবেচনা করা আদতে খুব যুক্তিসঙ্গত কিছু না। এইজন্যে রাষ্ট্রকেই এখানে বিপ্লবী কৌশলে ধ্বংস করতে হবে। আবার এনার্কিস্ট যুক্তি অনুসারে, ২(ক) থেকে আমরা দেখি, রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের একটা যন্ত্র— যা আরও ক্ষতিকর; কারণ রাষ্ট্র এখানে এমন একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান যা সবসময়ই বুর্জোয়া শ্রেণির আজ্ঞাধীন। বু্র্জোয়া শ্রেণি যেমন খুশি তেমনভাবে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে পারে স্বার্থরক্ষার জন্যে। এইখান থেকে এনার্কিস্ট প্রস্তাবনা ২(খ) অনুসারে, বিপ্লবী কৌশলে রাষ্ট্রের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কখন করতে হবে? যখন এই রাষ্ট্র বিপ্লবী গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, যখন তারা একে নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এই নিরপেক্ষ শব্দের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক আছে। মার্ক্সিস্ট যুক্তি অনুসারে, নিরপেক্ষতা হচ্ছে শ্রেণিস্বার্থ থেকে মুক্ত হয়ে স্বায়ত্তশাসন, যেখানে এনার্কিস্টদের কাছে নিরপেক্ষতা ঠিক তার বিপরীত জিনিস বোঝায়— শ্রেণিস্বার্থের অধীনে থাকা। কারণ, রাষ্ট্র যখন শ্রেণিস্বার্থের অধীনে থাকে তখন রাষ্ট্রেরও যে টিকে থাকার নিজস্ব কৌশল আছে তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না; তখন এটি শ্রেণিস্বার্থের আজ্ঞাবহ দাস হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মার্ক্সের বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্র যা তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র সেখানেও রাষ্ট্রের নিজস্ব কলাকৌশল চিন্তাভাবনার বাইরে রাখা হয়। এনার্কিস্টরা ঠিক এই কারণে, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেন, কারণ রাষ্ট্র স্বায়ত্তশাসিত একটি ব্যাপার যার নিজস্ব কৌশল রয়েছে অর্থনৈতিক/শ্রেণি-স্বার্থের বাইরে; তাই রাষ্ট্রকে বিপ্লবের নিরপেক্ষ অস্ত্র ভাবা ভুল। এনার্কিস্টদের কাছে নিরপেক্ষতা এইক্ষেত্রে সন্দেহপূর্ণ একটি ধারণা।

    মার্ক্স যতটা না এই বোনাপার্টিজমের প্রশ্ন নিয়ে ভাবান্বিত ছিলেন তার থেকে বেশি এনার্কিস্টরা এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তিত। কেননা বোনাপার্টিজমের প্রশ্নের আলোকে মার্ক্সের রাষ্ট্র, বিপ্লবের ধারণার বিভিন্ন আঙ্গিক প্রকাশ পায়। নিঃসন্দেহে মার্ক্স এইক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছেন কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তিনি কিভাবে এই বিরোধিতা করেছেন— একটা স্বায়ত্তশাসিত বোনাপার্টিস্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে না বুর্জোয়া আধিপত্যেরই এক ভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং এর বিপ্লবী কৌশলে কিরকম ভূমিকা থাকতে পারে সেই আঙ্গিকে—যা আমাদের বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে বিবেচিত হবে।

    নিকোস পুলাঁতজাস যিনি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের তুলনামূলক স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দিয়েছিলেন, বলেন— মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের কাছে বোনাপার্টিজম ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের একটা ব্যতিক্রমী ধরন না বরং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বেশভূষা এই বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের পরতে পরতেই আছে। এই চিন্তা মার্ক্সের রাষ্ট্র-ব্যাখাকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করে। রালফ মিলিব্যান্ড অন্যদিকে বলেন, মার্ক্স এবং এঙ্গেলসের কাছে এই রাষ্ট্র সমানভাবেই শ্রেণি শাসনের একই অস্ত্র। আমরা এইখান থেকে কী বুঝতে পারি? মার্ক্স নিজে কখনো রাষ্ট্রের তত্ত্ব দিয়ে যাননি, অন্তত যদি একটা সঙ্গতিপূর্ণ তত্ত্বের আশা করি, মার্ক্স তাও দিয়ে যাননি। রাষ্ট্রের ব্যাপারে কখনো কখনো তাকে খুব একপেশে বা ‘একটা অস্ত্র’— এইরকম দৃষ্টিভঙ্গির জায়গাতে পাওয়া যায়। জার্মান ইডিয়োলজিতে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র হচ্ছে সেইটাই যাতে শাসকশ্রেণির ব্যক্তিবর্গরা নিজেদের সাধারণ স্বার্থ জাহির করতে পারে।” আবার কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলতে দেখা যায়, “আধুনিক রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহী পরিষদ বেসিকালি বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষার জন্যে একটি কমিটি।” কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো যেহেতু একটা রাজনৈতিক প্যাম্ফলেট তাই এর উপর বিশেষ জোর দেওয়া উচিত হবে না; কারণ আমরা তাত্ত্বিক জায়গাতে মার্ক্সকে দেখার চেষ্টা করছি। তবুও এটি মার্ক্সের রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তাভাবনার কিছু দিকনির্দেশনা আমাদের দিতে পারে।

    সুতরাং, রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে আমরা কিভাবে দেখতে পারি? এর কোন পরিষ্কার উত্তর আসলে নাই। তাই এই প্রসঙ্গে মার্ক্সের অবস্থান কী ছিলো (যদিও মার্ক্সের এই বিষয়ে সচেতন কোন অবস্থান সম্ভবত ছিলোও না) তা এভাবে দাঁড় করাতে পারি: রাষ্ট্রের ফাংশনালিস্ট জায়গাগুলো বাদ দিয়েই হোক কিংবা রাষ্ট্রকে কিছু পরিমাণে স্বায়ত্তশাসন দিয়েই হোক, মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শ্রেণি আধিপত্যের মাঝেই। এই কথার অর্থ, রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক অস্ত্রই হোক কি  বুর্জোয়াদের পক্ষে বা কোন কোন সময় বিপক্ষে কাজ করুক না কেন, মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র একটা প্রতিষ্ঠান যা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণিটিকে (যারা উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে) অন্য শ্রেণিদের শোষণ করতে সাহায্য করে। অন্যভাবে, রাষ্ট্রই বুর্জোয়াদের প্রলেতারিয়েতের উপর আধিপত্য এবং শোষণ তরান্বিত করতে ভূমিকা রাখে। এই ব্যাখা কিন্তু রাষ্ট্রকে তুলনামূলক রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনও দেয়: রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে কিন্তু তখনও একে বুর্জোয়াদের বৃহৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে চলতে হয়।

    আর্ট্ওয়ার্ক: দ্য পা্ওয়ার অব ট্রুথ সিরিজ
    সূত্র: চাইনা ডেইলি

    মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের অস্ত্র। আরও ভালো করে বললে— রাষ্ট্র বুর্জোয়া শ্রেণি আধিপত্য জারি রাখার একটা প্রতিরূপ বা রিফ্লেকশান; একটা প্রতিষ্ঠান যার কাঠামো পুঁজিবাদী সম্পর্ক দ্বারা নির্ধারিত। হ্যাল ড্রেপারের মতে, রাষ্ট্র “শ্রেণি-বিকৃতকরণ”-এর মাধ্যমে কাজ চালাতে থাকে। কী কাজ? এমন একটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বজায় রাখা যার মাধ্যমে বু্র্জোয়াদের প্রলেতারিয়েত শোষণ করাটা সহজ হয়। সাধারণের ভালো চাওয়ার বুলি আউড়িয়ে যেন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা যায়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আমরা দেখি বু্র্জোয়াদের স্বার্থের জন্যে নিবেদিত প্রাণ। মার্ক্স ‘সমাজের কতিপয় শ্রেণিস্বার্থের ফলাফল রাষ্ট্র’ বলতে এটিই বুঝিয়েছেন।

    মার্ক্সের রাষ্ট্র-ধারণার মধ্যে এইটাও দেখা সম্ভব— মার্ক্স পক্ষপাতিত্বমূলক রাষ্ট্রের একরকম হেগেলিয়ান ক্রিটিকই চালু রেখে গেছেন। যে রাষ্ট্র এক পক্ষের জন্যে কাজ করে; সমাজের, সবার জন্যে কাজ করে না। মার্ক্সের কাছে রাষ্ট্র তো এক ছদ্মবেশি চরিত্র। এটি একটি ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক কম্যুনিটি আকারে নিজেকে হাজির করে অথচ কাজ করে কিছু নির্দিষ্ট পক্ষীয় স্বার্থের বরাতে। এই ছদ্মবেশের আড়ালে অর্থনৈতিক শ্রেণির আসল সংগ্রাম, সাধারণ মানুষের দৈন্যদশা ও বিচ্ছিন্নতা চাপা পড়ে যায়। হেগেলের মতই মার্ক্স একটি ন্যায়সঙ্গত এজেন্সি খুঁজতে চেয়েছিলেন— এক ধরনের গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার বৈধ ফর্ম আকারে, যার আবির্ভাব ঘটবে সবার স্বার্থরক্ষার্থে, ব্যক্তিগত/অব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, বৈপরীত্য ছাপিয়ে। মার্ক্স পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে দেখেছেন নাগরিক সমাজের বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ হিসেবে এবং এই বিচ্ছিন্নতা তখনই অতিক্রম করা সম্ভব যখন কোন মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট সমাজে চলমান অর্থনৈতিক/সম্পত্তির এই বিভেদপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করবে না। তবে মার্ক্স হেগেলের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন এই জায়গাতে— এজেন্ট কে হতে পারে? মার্ক্স আধুনিক রাষ্ট্র যে এজেন্ট হতে পারে তা একেবারেই নাকচ করে দেন। কারণ, এই রাষ্ট্র বুর্জোয়া সম্পর্কের রাষ্ট্র। হেগেল যখন মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট হিসেবে আধুনিক রাষ্ট্রকে বেছে নেন, অন্যদিকে মার্ক্স প্রলেতারিয়েতের মাঝেই ওই এজেন্টকে খুঁজে পান।

    প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র

    প্রলেতারিয়েত হচ্ছে মার্ক্সের সেই ইউনিভার্সাল এজেন্ট যেই এজেন্ট সমাজের সকল দ্বৈততা থেকে মুক্তি দিবে; অন্তত এমনটাই মার্ক্স তার হেগেলিয়ান ট্র্যাডিশন থেকে খুঁজে পেয়েছেন। প্রলেতারিয়েতের মুক্তি এক অর্থে পরিপূর্ণভাবে সমাজের মুক্তিরই সমার্থক। মার্ক্সের তত্ত্বে আমরা এক সম্ভাবনার খোঁজ পাই। সমাজের উপর ন্যায়সঙ্গত কর্তৃত্বচর্চার সম্ভাবনা। এইখানে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের চর্চা, জনগণ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা কর্তৃত্বের সাথে জনগণের যে বিচ্ছিন্নতা এই সমস্ত দোষে দুষ্ট। কম্যুনিজমের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে মার্ক্সের মতে সর্বসাধারণের এই সামাজিক ক্ষমতার চর্চার এই ধাপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

    কিন্তু এই সামাজিক ক্ষমতা কিভাবে সংগঠিত হবে? মার্ক্সের মতে, কিছু সময়ের জন্যে হলেও, এই ক্ষমতা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে সংগঠিত হতে হবে। পুঁজিবাদী ও কম্যুনিস্ট সমাজের মধ্যবর্তী এই ক্রান্তিকালীন সময়ে প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়েই রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা ঘটাবে: “এই ক্রান্তিকালীন সময় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ইঙ্গিত করে যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রলেতারিয়েতের হাতে সোপর্দ হবে।” মার্ক্স তার অ্যাড্রেস অফ দ্য সেন্ট্রাল কমিটি টু দ্য কম্যুনিস্ট লিগ এ আরও জোর দেন, “শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে যেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্রীভূতিকরণ করা যায়” সেজন্যে লড়াই করে যেতে হবে। প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী ক্ষমতা শ্রেণিশত্রু  নির্মূল করার কাজে এবং পুরোনো বুর্জোয়া সংষ্কৃতি সরানোর কাজে ব্যবহার করতে পারে। এই কারণে মার্ক্স কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো তে বলেন: “প্রলেতারিয়েত তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য কাজে লাগিয়ে বুর্জোয়াদের হাত থেকে সকল প্রকার পুঁজি ও উৎপাদন যন্ত্র ছিনিয়ে এনে রাষ্ট্রের হাতে জড়ো করবে।” সুতরাং মার্ক্সের কাছে প্রলেতারিয়েতের নিয়ন্ত্রণাধীন এই রাষ্ট্র, সাময়িক হলেও, পুরো সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি মাধ্যম। যে মাধ্যম সমাজকে বুর্জোয়া আধিপত্য থেকে মুক্তিদান করবে। মার্ক্সের কাছে এই বিপ্লব তাই রাষ্ট্র ক্ষমতা ধ্বংস করা না বরং এর লাগাম অন্য কারো হাতে আনা এবং “ক্রান্তিকালীন সময়ে” এই ক্ষমতার প্রয়োজনমাফিক সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, মার্ক্সের কাছে এই প্রলেতারিয়ান রাষ্ট্র একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এঙ্গেলস দাবি করেন, এই রাষ্ট্র যখন আর প্রয়োজন হবে না তখন এমনিতেই “ভেঙ্গে যাবে”। এনার্কিস্টরা এই প্রসঙ্গে মনে করেন, রাষ্ট্র এমনি এমনি ভেঙ্গে যাবে এইরকম আশা করা শিশুতোষ। এর কারণ পরবর্তীতে আরও পরিষ্কার হবে।

    মিখাইল বাকুনিন
    (১৯১৪-১৮৭৬)

    সুতরাং, মার্ক্সের “ক্রান্তিকালীন সময়ের” বিপ্লবী-কৌশল মোতাবেক, বৃহৎভাবে ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। যদিও মার্ক্স সবসময় রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির “অস্ত্র” হিসেবে কিংবা শ্রেণি আধিপত্যের রিফ্লেকশান আকারে দেখেছেন; তাহলে এই জায়গায় তিনি কিভাবে ভাবেন এই “ক্রান্তিকালীন” রাষ্ট্র সমাজের সবার হয়ে কথা বলবে? এটা কি মার্ক্সের রাষ্ট্র-বিরোধিতা এবং তার হেগেল থেকে ব্যতিক্রমী হওয়ার অবস্থানটিকেই প্রশ্ন করে না? এনার্কিস্টরা এই জায়গায় মার্ক্সের চিন্তাভাবনায় অন্যতম বড় একটা গলদ খুঁজে পান। যদিও মার্ক্স এইখানে কোন সমস্যা দেখেন না। কারণ, ক্রান্তিকালীন রাষ্ট্র এখানে প্রলেতারিয়েতের হাতে তথা “সর্বজনীন শ্রেণি”-র হাতে রয়েছে যা পুরো সমাজকেই প্রতিনিধিত্ব করবে। মার্ক্স এই রাষ্ট্রকে কোন একপক্ষীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন না যেমনটা তিনি বুর্জোয়া সমাজে দেখতেন। এখন এটা দাঁড়িয়ে গেছে বিশ্বরাষ্ট্র বা ইউনিভার্সাল রাষ্ট্র হিসেবে। এমনকি মার্ক্সের ভাষ্যমতে, এই রাষ্ট্রের কোন রাজনৈতিক ক্ষমতাও নাই। কারণ, রাজনৈতিক ক্ষমতা সবসময়ই একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হতো। এখন যেহেতু সমাজে কোন শ্রেণি-বিভাজন বসবাস করে না, আবার বুর্জোয়াদেরও অর্থনৈতিক উচ্চ আসন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই রাজনৈতিক আধিপত্যও আর বিরাজ করে না। এই কারণে, রাজনৈতিক ক্ষমতা বলেও আর কিছু থাকছে না: “যখন ক্রমান্বয়ে শ্রেণি-বিভাজন উধাও হয়ে যাবে, সমস্ত উৎপাদন ব্যবস্থা সমগ্র জাতির হাতে সংঘের মাধ্যমে কেন্দ্রীভূত হবে তখন সাধারণের ক্ষমতা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চরিত্র হারাবে।” তিনি বাকুনিনের এই ক্রান্তিকালীন রাষ্ট্রের সমালোচনার উত্তরও দিয়েছেন: “যখন শ্রেণি আধিপত্যের পতন ঘটবে, তখন বর্তমান রাজনৈতিক সেন্সে আসলে কোন রাষ্ট্র থাকবে না।” মার্ক্সের জন্যে রাজনৈতিক আধিপত্য এবং দ্বন্দ্ব আসলে শ্রেণি আধিপত্যেরই একরকম প্রকাশ। একবার শ্রেণি আধিপত্যকে মুছে দেওয়া গেলে, রাজনৈতিক আধিপত্যও মুছে দেওয়া কঠিন কিছু হবে না: রাষ্ট্র প্রলেতারিয়েতের দ্বারা পরিচালিত একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যতক্ষণ না এটা “মিলিয়ে যায়”।

    আমরা মার্ক্সের যুক্তিই যদি অনুসরণ করি: যেহেতু শ্রেণি ও পুঁজিবাদী সম্পর্কের ফলাফলই হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা, তাই এইসবকে হটানো গেলে, একদম সরাসরি বললে— রাজনৈতিক ক্ষমতাই আর থাকবে না। যদিও তখন মার্ক্সিস্ট বিপ্লবী প্রোগ্রামের এই রাষ্ট্র যেকোন বু্র্জোয়া সমাজের কিংবা যেকোন ধরনের রাষ্ট্র থেকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত এবং শক্তিশালী। ক্রমান্বয়ে এই “ক্রান্তিকালীন” রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হলে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা আর প্র্যাকটিস করবে না— এনার্কিস্টরা এই বক্তব্যকে খুবই খোঁড়া মানেন। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতার এই সাধারণ ধর্ম (একই সাথে যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ধর্ম) অস্বীকার করেন; যে ধর্ম মানে— ক্ষমতা অর্থনৈতিক শক্তি থেকে স্বাধীন এবং যার নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং যা নিজেই নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। এখন এটি সত্য যে মার্ক্স বোনাপার্টিস্ট রাষ্ট্রের বেলায় রাষ্ট্রকে শ্রেণি থেকে কিছুটা হলেও আলাদা করে দেখেছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো তা যথেষ্ট কিনা। এনার্কিস্টদের মতে, তা যথেষ্ট না; কারণ, মার্ক্স পরবর্তীতে বিপ্লবের জন্যে রাষ্ট্রকেই ব্যবহার্য বিষয় হিসেবে মেনেছেন। রাষ্ট্র, প্রাকৃতিক সত্তা  হিসেবে বিচার করলে, অর্থনৈতিক শক্তি থেকে এটি স্বাধীন। এই কারণে রাষ্ট্রকে ধার করে বিপ্লব পরিচালিত করার যে প্রকল্প (যে শ্রেণিই তা নিয়ন্ত্রণ করুক না কেন) তা বিশ্বাস করা যায় না। বোনাপার্টিজমের যে সম্ভাবনা, এক অর্থে বলা যায়, এনার্কিজম তা আরও বড় পরিসরে চিন্তা করতে সাহায্য করে।

    মার্ক্সের চিন্তার তাৎপর্য কোন জায়গায়? রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারণায়। রাষ্ট্রযন্ত্র যে শ্রেণির স্বার্থ ফুটায়ে তুলে এবং ক্ষেত্রবিশেষে সমাজের উপকারও করতে পারে তা মার্ক্স আমাদের দেখান। যদিও মার্ক্সের মতে এই উপকারের ঘটনা যখন প্রলেতারিয়েত বা “বিশ্বজনীন শ্রেণি” রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে তখনকার ব্যাপার এবং এই যন্ত্র আদতে আধিপত্যকারী শ্রেণিরই আজ্ঞাবহ যন্ত্র। এবং আমরা এও দেখিয়েছি, মার্ক্সের এই চিন্তায় স্থূল সরলীকরণের অস্তিত্ব দৃশ্যমান। রবার্ট সল্টম্যানের মতে মার্ক্সিস্ট তত্ত্ব আপাতদৃষ্টিতে যে কাজের কাজটি করে তা হলো রাজনৈতিক শোষণ কিভাবে সংঘটিত হয় তা দেখিয়ে দেয়। এই কিভাবে— রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণের মধ্যে দিয়ে না; বরং এই কিভাবে— একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থরক্ষার জন্যে, আজ্ঞাবহ হয়ে বা ওই শ্রেণির দাস হয়ে, শোষণের কার্যক্রম তরান্বিত করার মাধ্যমে।

  • আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

    আইনের শাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: আগস্ট বিদ্রোহের এক যুগ। ২০০৭ সালে সেনাকর্তৃত্বের জরুরি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যে অল্প  ক‘জন শিক্ষক সেই জরুরি শাসনকে ক্রিটিক্যালি  দেখতে পেরেছিলেন  সেলিম রেজা নিউটন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’- এই উচ্চারণকে ধারণ করে প্ররতিবাদী মৌন মিছিল করার দায়ে তিনিসহ তাঁর সহকর্মিদের আটক করা হয়। জরুরি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁদের। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। কারামুক্তির পর ক্ষমতা-কর্তৃত্ব- রাষ্ট্র-সমাজ-কারাগার-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিয়ে বিপুল পরিসরে রচনা শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন, যা এখনও চলমান। তাঁর অচেনা দাগ গ্রন্থের তৃতীয় দাগে জরুরি শাসন সংক্রান্ত রচনা সংকলিত হয়েছে। আগস্ট বিদ্রোহের যুগপুর্তিতে অরাজ ধারাবাহিতভাবে তা প্রকাশ করছে। (more…)

  • সাউল নিউম্যান।। ক্ষমতা: বারে বারে ফিরে আসে

    সাউল নিউম্যান।। ক্ষমতা: বারে বারে ফিরে আসে

    অনুবাদ: তৌকির হোসেন

    আমরা সবসময়ই শুনে থাকি বর্তমানে আমরা এক ড্রামাটিক, ট্রমাটিক রাজনৈতিক, সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে বসবাস করছি। এক অর্থে এটা সত্য। পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়ার কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা ধসে পড়েছে, নতুন এক ঘরানার ইউরোপিয়ান রাজনৈতিক পরিচয়ের আবির্ভাব ঘটেছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমনের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। সেই সাথে জাতীয়, জাতিসত্তার পরিচয়গুলো সারা পৃথিবীজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে— যার ফলাফল যুদ্ধ, গণহত্যা। এইসবই ইঙ্গিত দেয় আমাদের সময় আসলে একটা র‍্যাডিকেল পরিবর্তনের সময়। (more…)

  • পিওতর ক্রপোৎকিন।। কারাগার কি দরকারি?

    পিওতর ক্রপোৎকিন।। কারাগার কি দরকারি?

    অনুবাদ: সেলিম রেজা নিউটন

    আর্ট্ওয়ার্ক: আবুগারিব
    শিল্পী: ফার্নান্ডো বোটেরো
    সূত্র: মালবোরো গ্যালারি

    ভূমিকা: এই রচনাটি উনিশ শতকের আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব পিওতর ক্রপোৎকিনের রুশী ও ফরাসি কারাগারে (ইন রাশান অ্যান্ড ফ্রেঞ্চ প্রিজনস) গ্রন্থের শেষ অধ্যায়। ১৮৮৭ সালে লন্ডন থেকে ‘ওয়ার্ড অ্যন্ড ডাউনি’ নামের প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত এই গ্রন্থটি কারাগার সম্পর্কে ক্রপোৎকিনের নিজের অধ্যয়ন। নিজের জীবন তাঁর এই অধ্যয়নের অংশ বটে, কিন্তু কোনোক্রমেই এটি তাঁর কারাস্মৃতি নয়। (আলাদা জীবনস্মৃতি তাঁর আছে: মেমোয়ার্স অফ এ রেভোল্যুশনিস্ট।) (more…)

  • পিওতর ক্রপোৎকিন।। কারাগার: অপরাধের বিশ্ববিদ্যালয়

    পিওতর ক্রপোৎকিন।। কারাগার: অপরাধের বিশ্ববিদ্যালয়

    • অনুবাদ: তানভীর আকন্দ

    বহু বিশিষ্ট আইনজীবী ও সামাজতাত্ত্বিকদের ‘অপরাধ ও শাস্তি’ বিষয়ক যে বিরাট প্রশ্নটি বর্তমানে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, সেই প্রশ্নটি দূরে সরিয়ে রেখেই আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখতে চাই এই প্রশ্নের মধ্যে, ‘কারাগারগুলো কি মূল উদ্দেশ্য সাধনে সফলকাম হচ্ছে? অর্থাৎ অসামাজিক কাজকর্ম কমিয়ে আনতে পারছে?’ (more…)

  • টোটালিটারিয়ান পদ্ধতি : রাখাল বালকদের ভেড়া পালার রাজনীতি

    টোটালিটারিয়ান পদ্ধতি : রাখাল বালকদের ভেড়া পালার রাজনীতি

    • ইরফানুর রহমান রাফিন

    আমরা একটা পারফেক্ট দুনিয়ায় বাস করি না। আমাদের পৃথিবীতে প্রচুর ইনজাস্টিস আছে, ইনইকুয়ালিটি আছে। এটা একটা ফ্যাক্ট।

    এই ইনজাস্টিস আর ইনইকুয়ালিটি আমরা কীভাবে ডিল করবো– এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একটা টোটালিটারিয়ান পদ্ধতি উনিশ শতক থেকে তৈরি করা হয়েছে। (more…)

  • জাস্টিন নেভিল কৌশাল ।। এডর্নো পুনর্পঠন : আর্ট কি ফ্যাশিজম রুখতে পারে?

    জাস্টিন নেভিল কৌশাল ।। এডর্নো পুনর্পঠন : আর্ট কি ফ্যাশিজম রুখতে পারে?

    অনুবাদ: শাহারিয়ার জিম

    মূল প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিলো Philosophy Now নামক অনলাইন ম্যাগাজিনে, মূল লেখক Justin Neville Kaushall, University of Warwick এ নন্দনতত্ত্বে গবেষণারত। (more…)

  • বাকস্বাধীনতা : রাজনৈতিক নয়— মানবীয়তা

    বাকস্বাধীনতা : রাজনৈতিক নয়— মানবীয়তা

    • সারোয়ার তুষার

    স্বাধীনতা ছাড়া মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রিত। আর সমস্বর ছাড়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা শ্রেণী- প্রপাগান্ডা।
    – দেয়ালচিত্র

    (more…)