Category: ইতিহাস

  • কল্পনা চাকমা অপরহণ তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু কথা

    কল্পনা চাকমা অপরহণ তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে কিছু কথা

    • শ্রীমানী চাকমা

    এই লেখাটি সিএইটি নিউজ ব্লগে প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি। কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনায় গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। বিচারপতি আবদুল জলিল নেতৃত্বাধীন কমিটির প্রতিবেদনের অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে লেখাটিতে। কল্পনা চাকমা অপহরণের দুই যুগ পূর্তিতে অরাজ এটি পুনপ্রকাশ করছে। 

    কল্পনা চাকমা

    সম্প্রতি সিআইডি কল্পনা চাকমার অপহরণ বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করলে পাহাড়ি সংগঠনসমূহ তা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বিভিন্ন সভা সমাবেশের মাধ্যমে পুনঃতদন্তসহ চিহ্নিত অপহরণকারী লেঃ ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। এর ফলে কল্পনা চাকমার অপহরণ ইস্যুটি আবার সামনে চলে এসেছে।

    কল্পনা চাকমা অপহৃত হন আজ থেকে সাড়ে ষোল বছর আগে ১৯৯৬ সালের ১১ জুন রাতে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি থানার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে। কল্পনা চাকমার ভাই লাল বিহারী চাকমা অপহরণকারীদের তিন জন লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে চিনতে পেরেছিলেন। এই ঘটনা দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় তোলে এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক ড. অনুপম সেন ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন। এই কমিটি তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী রিপোর্ট পেশ করে বলে জানা গেলেও সরকার তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে রাঙামাটির আদালত থেকে তদন্ত রিপোর্টটি পাওয়া যাচ্ছে এবং পুলিশ ও সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারাও এই রিপোর্টের সাহায্য নিয়েছেন। এই নিবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশন রিপোর্ট (এর পর তদন্ত কমিশন বলে উল্লেখিত হবে) ও সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট (এরপর কেবল চূড়ান্ত রিপোর্ট বলে উল্লেখিত হবে) সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

    তদন্ত রিপোর্ট

    বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং স্বঃ মঃ (রাজ -২) পার্বত্য ৩/৯৫(অংশ) / ৯৬৫ তারিখ ৭/৯/৯৬ ইং মোতাবেক দি কমিশন অফ ইনকোয়ারী এক্ট, ১৯৫৬ (১৯৫৬ সালে ৬ নং আইন) এর ৩ নং পারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের কার্যপরিধি ও দায়িত্ব হলো (১) উন্মুক্ত তদন্তের মাধ্যমে কল্পনা চাকমা অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম (? এই দুটো শব্দ অস্পষ্ট, লেখক) পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনবোধে এর জন্য দায়ী কর্মকর্তা / কর্মচারী ও ব্যক্তিগণকে সনাক্ত করণ। (২) উপরোক্ত সনাক্তকৃত কর্মকর্তা / কর্মচারী ও ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ করণ। এবং (৩) ভবিষ্যতে এ এলাকায় এ ধরনের অপহরণের প্রতিরোধ করণ ও এই লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে অনুসরণীয় পদ্ধতি/কার্যক্রম সনাক্ত ও সুপারিশ করণ। (৪) এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়।

    যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় সেখানে ৭ নং প্যারায় বলা হয়েছে: ‘এই প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং: স্বঃ মঃ (রাজ-২) পার্বত্য-৩/৯৫ (অংশ) /৬৬৭ তারিখ: ১৪-৮-৯৬ ইং) বাতিল করা হইল।’ অর্থাৎ আবদুল জলিলকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিশনের আগে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে একই বিষয়ে অন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কি কারণে সেই কমিটি বাতিল করা হয়েছে, কারা সেই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ও টার্মস অফ রেফারেন্স কি ছিল তা পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে বলা হয়নি।

    ৪০-পৃষ্ঠার এই তদন্ত রিপোর্টে বলা হয় কমিশন ২৬ অক্টোবর ১৯৯৬ থেকে ৩১ অক্টোবর ১৯৯৬ পর্যন্ত রাঙামাটি সার্কিট হাউজে ৮৬ জন এবং ২৬ ও ২৭ নভেম্বর ১৯৯৬ ঢাকায় সেন্ট্রাল সার্কিট হাউজের স্থায়ী কার্যালয়ে আরও ৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণে করে।

    কিন্তু কমিশন তাদের তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। রিপোর্টের শেষে সিদ্ধান্ত টেনে কমিশন লিখেছে: “উপরোক্ত কারণাদিতে অপহরণ সংশ্লিষ্ট ঘটনাক্রম ও স্যা প্রমাণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে কল্পনা চাকমা ইচ্ছায় হউক বা অনিচ্ছায় হউক অপহৃত হয়েছে কিন্তু কার দ্বারা অপহৃত হয়েছে তা উপযুক্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং কারো বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করবার কোন কারণ নেই।”

    কমিশন কেন অপহরণকারীদের সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে তার কারণ তদন্ত কমিশনের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার মধ্যেই পাওয়া যাবে। নিচে এ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

    ১। পদ্ধতিগত দুর্বলতা:

    তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পড়লেই বোঝা যায় তদন্তের ব্যাপারে এর সদস্যের মধ্যে কোন seriousness বা আন্তরিকতা ছিল না। তারা ঢাকা ও রাঙামাটি শহরে বসেই তাদের পুরো তদন্ত কার্যক্রম চালান। আর এই তদন্ত কার্যক্রম ব্যক্তি বিশেষের সাক্ষাতকার গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কমিশনের সদস্যরা কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি এবং অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করে দেখেননি। অথচ যে কোন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ট তদন্তের জন্য, সংঘটিত অপরাধটির একটি সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামতের পরীক্ষা একান্ত অপরিহার্য।

    ২। সাক্ষ্য গ্রহণে দুর্বলতা

    কমিশন ৯৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করলেও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তির সাক্ষাতকার নেয়নি। এদের মধ্যে একজন হলেন বাঘাইছড়ি থানার তৎকালীন টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম, যিনি ঘটনার পরদিন কল্পনা চাকমার ভাই কালিন্দ কুমার চাকমার জবানবন্দী লিখেছিলেন। যখন কালিন্দ কুমার তার ঐ জবানবন্দীতে লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও অন্যান্যদের নাম বলেছেন নাকি বলেননি এ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তখন এ বিষয়ে হাসান জাহাঙ্গীর আলম সাহেবের জবানবন্দী গ্রহণ সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিশন তার বক্তব্য নেয়ার কোন প্রয়োজন মনে করেনি। ফলে কমিশন কালিন্দ কুমার চাকমার বক্তব্যের সত্যাসত্যতা অন্যান্য সাক্ষীদের জবানবন্দীর আলোকে যাচাই করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

    কমিশন এছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ দু’জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাতকার নেয়নি। এরা হলেন কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমা ও কালিন্দ কুমার চাকমার স্ত্রী চারুবালা চাকমা। কমিশন বলেছে ‘বাধুনী চাকমার পক্ষে তার পুত্র ১ নং সাক্ষী কালিন্দ কুমার চাকমা সময় প্রার্থনা করে এ কমিশনের বরাবর এক আবেদন করে এবং সে প্রেক্ষিতে তাদেরকে ৩১/১০/৯৬ ইং তারিখ পর্যন্ত সময় দেয়া হয় কিন্তু ঐদিনও তিনি উপস্থিত হননি।’ এ প্রসঙ্গে কালিন্দ কুমার চাকমা এই নিবন্ধকারকে জানান তদন্ত কমিশন থেকে কেবল তাদের দুই ভাইকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য লিখিতভাবে আহ্বান করা হয়েছিল। বাধুনী চাকমা বার্ধক্যজনিত রোগে ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর মারা যান। (স্বাধিকার, বুলেটিন নং ১৫, ১৮ জুন ২০০০) অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাক্ষ্য দেয়া সম্ভব হওয়ার কথা নয়। তবে যেই হোক, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বাধুনী চাকমা ও কালিন্দ কুমারের স্ত্রী চারুবালা চাকমাকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য কমিশনের আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। এটা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর কমিশন যদি বাঘাইছড়ির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতেন এবং সেখানেই একদিন সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করতেন তাহলে উক্ত দুই প্রত্যক্ষদর্শী ও তাদের প্রতিবেশীসহ অনেকে তাদের জবানবন্দী দেয়ার সুযোগ পেতেন। এতে বর্তমান তদন্ত রিপোর্টের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা বহুলাংশে কাটানো সম্ভব হতো। তাই প্রশ্ন জাগে, তদন্ত কমিশন কি ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটনাস্থলে যায়নি, যাতে অনেকে তাদের জবানবন্দী দেয়া থেকে বঞ্চিত হয়?

    ৩। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যকে গুরুত্ব না দেয়া

    সাধারণত সবার সাক্ষ্য সমান গুরুত্ব পায় না। যে কোন অপরাধের ঘটনা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। অথচ তদন্ত কমিটি আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দ কুমার ও লাল বিহারী চাকমার সাক্ষ্যকে কোন গুরুত্ব দেয়নি, বরং নানা কূট যুক্তি দিয়ে খারিজ করে দেয়। অপরদিকে, সেনাবাহিনী কল্পনা চাকমার অপহরণকে ঘিরে যে মিথ্যা প্রচারণা চালায় তাকেই তারা প্রামাণিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করে।

    লাল বিহারী চাকমা (তদন্ত রিপোর্টে ২ নং সাক্ষী) অপহরণকারীদের তিন জনকে চিনতে সক্ষম হন। এরা হলেন কজইছড়ি আর্মি ক্যাম্পের অফিসার লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদ। ঘটনার পরদিন সকালে লাল বিহারী কল্পনা চাকমার খোঁজে অনিল বিহারী কার্বারী ও পূণ্য রঞ্জন মেম্বারকে নিয়ে ওই আর্মি ক্যাম্পে যান এবং ফেরদৌসের সাথে দেখা করেন। অপরদিকে কালিন্দ কুমার চাকমা সম্রাটসুর চাকমাকে নিয়ে টিএনওর কাছে যান। তিনি টিএনওর কাছে ঘটনা বর্ণনা করার সময় চিহ্নিত অপহরণকারী তিন জনের নাম উল্লেখ করেন। কিন্তু পুলিশের এফআইআর-এ এদের নাম না লিখে অজ্ঞাতনামা লেখা হয়। এখানে তদন্ত কমিশনের জন্য প্রমাণের বিষয় হলো কালিন্দ কুমার চাকমা টিএনও’র কাছে অপহরণকারীদের নাম বলেছেন কিনা। এক্ষেত্রে তিনি সত্যতা যাচাইয়ের জন্য (corroboration) যার উপর ও যে সব evidence এর উপর নির্ভর করতে পারতেন তা হলো তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম ও সে সময় প্রকাশিত পত্রপত্রিকার রিপোর্ট ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন। কিন্তু তদন্ত কমিশন সেটা করেনি। কমিশন প্রকাশিত অপ্রকাশিত অনেক গুজবকে গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কিন্তু টিএনও কর্তৃক লেখা কালিন্দ কুমার চাকমার জবানবন্দী বিষয়ে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পত্র পত্রিকায় ও মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে যা লেখা হয় তা আদৌ আমলে নেয়নি। এখানে এ বিষয়ে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে:

    ক. বাঘাইছড়ি ঘুরে এসে প্রিসিলা রাজ “কল্পনা চাকমা গেলো কোথায়?” শিরোনামে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকার ১৭ জুলাই ১৯৯৬ সংখ্যায় লেখেন: “কল্পনা অপহরণ মামলার এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) নিয়েও ঘনিয়ে উঠেছে রহস্য। মামলার বাদি কালিন্দী কুমার জানিয়েছেন, এফআইআর তাকে পড়ে শোনানো হয়নি। তিনি জানান টিএনওর কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন এফআইআর-এ তার পুরোপুরি উল্লেখ নেই। এফআইআর কে লিখেছেন তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। রাঙ্গামাটি ডিসি, এসপি ও বাঘাইছড়ি থানার ওসি এলাকা সফরকারী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীসহ অন্যান্যদের জানিয়েছেন, বাঘাইছড়ি থানার টিএনও তা লিখেছিলেন। কিন্তু টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছেন তিনি কালিন্দী কুমারের অভিযোগ রেকর্ড করে তাকে থানায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সাংবাদিকসহ অন্যান্যদেরকে টিএনও জবানবন্দির কপিটি দেখিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই জবানবন্দিতে আততায়ীদের ‘হাতে বন্দুক ও টর্চের’ উল্লেখ থাকলেও এফআইআরএ তা নেই। এছাড়া কালিন্দী কুমার চাকমা’র জবানবন্দি নেওয়ার পর এফআইআর পড়ে শোনানো হয়নি বলে যে অভিযোগ আছে সে বিষয়ে ওসি শহীদুল্লাহ বলেন, টিএনও কালিন্দী কুমারের জবানবন্দি নিয়েছেন, এবং তাকে পড়ে শুনিয়েছেন।

    “কিন্তু টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলম তা অস্বীকার করে বলেছেন, কালিন্দী কুমার তার কাছে এসেই প্রথম জবানবন্দি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা এফআইআর হিসেবে রেকর্ড হয়নি। কালিন্দী কুমারের জবানবন্দী লেখার পর তিনি তাকে তা পড়ে শোনাননি স্বীকার করেছেন টিএনও জাহাঙ্গীর আলম।”

    খ. ডেইলী স্টারের সাংবাদিক মোর্শেদ আলী খানও ঘটনার পর রাঙামাটি ও বাঘাইছড়ি সফর করেন। তিনি লেখেন: ÒThe OC of Baghaichari Shahidullah, also the Investigative Officer (IO) of the case confirmed taking Khudiram statement as identifying the abductors, but said that despite his best efforts to rescue Kalpana, his investigation was hampered due to various reasons. …. During the investigation it was found out that the First Information Report (FIR), written by the OC from Khudiram’s description, did not match the one recorded by the TNO of Baghaichari. The statement given to the TNO by Kalicharan was recorded with clear facts and figures while the FIR written by the OC lacked clarity. No one read out the FIR to Kalicharan before accepting it, it was alleged.” [Focus: A Month After Abduction, Kalpana Chakma Yet to be Rescued: Dhaka Saturday, 13 July 1996]

    ৩. আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিনিধিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন মহলের সাথে কথা বলেন। ৬ জুলাই ১৯৯৬ Draft Field Report এ সংগঠনটি লিখেছে: “TNO said he did not write the FIR. Rather, he said that he handwrote a statement on blank white paper for his own records. He then told Kalpana’s older brother to go to the police. The TNO’s notes are with him. He would not agree to let us copy it, but we did read it. It was far more thorough and specifc (eg how many men came, what time, name of Lt. Ferdous) than the FIR. We advised him to keep it in a safe place. He said he would produce it if ordered by the court.” [হিল উইমেন্স ফেডারেশন সম্পাদিত ‘কল্পনা চাকমার ডায়েরী’তে সংকলিত, প্রথম প্রকাশ ১২ জুন ২০০১: পৃ: ১৮৩]

    তদন্ত কমিশনের উচিত ছিল তৎকালীন টিএনও হাসান জাহাঙ্গীর আলমের জবানবন্দী নেয়া ও তিনি কালিন্দী কুমার চাকমার যে জবানবন্দী রেকর্ড করেছিলেন তা উপস্থাপন করতে বলা। কিন্তু কমিশন কেন সেটা করেনি তা রহস্যজনক।

    উপরোক্ত তিনটি উদ্ধৃতি থেকে যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয় তা হলো: ক. কালিন্দী কুমার চাকমা লেফটেন্যান্ট ফেরদৌসসহ তিন জন অপহরণকারীর নাম টিএনও ও পরে থানায় ওসির কাছে বলেছিলেন। খ. টিএনও সেটা হুবহু রেডর্ক করলেও ওসি তা করেননি। গ. টিএনওর লেখা জবানবন্দীটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি। ঘ. টিএনও এবং ওসি কেউ লেখার পর জবানবন্দীটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করার আগে কালিন্দী কুমারকে পড়ে শোনাননি।

    এত সাক্ষ্য প্রমাণ থাকা সত্বেও তদন্ত কমিশন এ প্রসঙ্গে তার রিপোর্টে লিখেছে: “অথচ তিনি (কালিন্দ কুমার চাকমা) এ কমিশনে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন উহাতে বলেননি যে তাকে পড়ে শোনানো হয়নি। তিনি বলেছেন ‘আমি ঘটনার কথা টি,এন,ও সাহেবকে বললে তিনি লেখেন এবং আমি উহাতে দস্তখত দেই’। কাজেই তাকে পড়ে শুনানো হয়নি ইহা ঠিক নয়।” তদন্ত কমিশনের এ কথার প্রেক্ষিতে প্রথমে যা বলা দরকার তা হলো, কালিন্দ কুমার চাকমা তাকে তার জবানবন্দী পড়ে শোনানো হয়নি বলে শুরু থেকেই সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীসহ সবার কাছে বলে আসছেন, অথচ তিনি তা তদন্ত কমিশনকে বলবেন না তা বিশ্বাস করা যায় না। দ্বিতীয়ত, তদন্ত কমিশনের কথা যদি আমরা সত্য বলে ধরেও নিই এবং বিশ্বাস করি যে, ঘটনার কথা বললে টিএনও সাহেব লেখেন এবং উহাতে কালিন্দ দস্তখত দেন, তাহলেও কমিশনের কথা থেকে এটা কোন মতেই প্রমাণ হয় না যে, কালিন্দ কুমারকে এফআইআর পড়ে শোনানো হয়েছে।

    ৪। বিশেষ গোষ্ঠীর অপপ্রচারণায় প্রভাবিত হওয়া

    কমিশন সদস্যরা যে সেনাবাহিনীর অপপ্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন অথবা বলা যায় ফরমায়েশ মোতাবেক একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে প্রমাণ করতে শুরু থেকেই তৎপর ছিলেন, তা তাদের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ঘটনার পর সেনাবাহিনী ও তাদের ভাড়াটে এজেন্টরা যে সব অপপ্রচারণা ও গুজব ছড়িয়েছিলেন সেগুলোর প্রতি কমিশন অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে, এমনকি রিপোর্টে সেগুলো থেকে বেছে বেছে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়। যেমন একটা গুজব হলো এ রকম: কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আছেন। কমিশন তাদের রিপোর্টের ৩৫ ও ৩৬ পৃষ্ঠায় ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ দৈনিক সংবাদে “কল্পনা চাকমাকে নিয়ে ত্রিপুরাতেও নানা বিভ্রান্তি” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়। এই উদ্ধৃতির কয়েক লাইন এ রকম: “কল্পনা চাকমা ত্রিপুরাতে আছেন কেউ কেউ এ রকম মতও প্রকাশ করেন এবং সে সূত্রের দেয়া তথ্যের অনুযায়ী কল্পনা এখন দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার আন্দারছড়া গ্রামে তার মাসীর বাড়ীতে আছেন। প্রথমে তাকে রাখা হয় দক্ষিণ ত্রিপুরার বারমাভেলি [সংবাদের মূল রিপোর্টে রাইমা ভেলি] সাবডিভিশনে শুক্রাই গ্রামে।”

    প্রথমত, ত্রিপুরার আগরতলা থেকে ঘুরে এসে সংবাদের উক্ত প্রতিবেদন লেখা হয়েছে বলে তদন্ত রিপোর্টে দাবি করা হলেও প্রতিবেদকের নাম নেই। সাধারণত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শুরুতে প্রতিবেদকের নাম দেয়া না হলে “নিজস্ব প্রতিবেদক” অথবা “নিজস্ব বার্তা পরিবেশক” লেখা হয়। সংবাদের উক্ত প্রতিবেদনে এই কথাও লেখা নেই। দ্বিতীয়ত, সংবাদের উক্ত রিপোর্টটি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং এতে কোথাও লেখা নেই যে প্রতিবেদক নিজে ত্রিপুরা সফর করেছেন। এমনকি তার পরিবেশিত তথ্যের সূত্র এবং প্রতিবেদন তৈরির জন্য কার কার সাথে কথা বলেছেন তার বিন্দু বিসর্গও উল্লেখ নেই।

    তৃতীয়ত, কল্পনা চাকমা ত্রিপুরাতে আছেন এমন গুজব প্রচারিত হলে সে সময় বিবিসির উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবাদদাতা সুবীর ভৌমিক জানান যে, তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তিনি জেনেছেন কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন এমন গুজব ভিত্তিহীন। তার ওই রিপোর্ট বিবিসিতে প্রচারিত হয়েছিল।

    চতুর্থত, সংবাদের ওই কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যমূলক রিপোটের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিশনের উচিত ছিল বস্তুনিষ্ঠতার স্বার্থে ওই সংবাদদাতাকে তলব করা। এমনকি কমিশন বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে ভারত সরকারকে অনুরোধ করতে পারতো যাতে ভারত সরকার সংবাদে উল্লেখিত স্থানে কল্পনা চাকমার সন্ধান কাজে সহায়তা দেয়। কিন্তু কমিশন সে সব কিছুই করেনি, লিখেছে: “অনেকে অনেক কথা বললেও তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি।”

    তদন্ত কমিশন তাদের পূর্ব নির্দিষ্ট বিষয় প্রমাণের জন্য যে কেবল তাদের পছন্দের মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টকে গুরুত্ব দিয়েছে ও পত্রিকা থেকে বেছে বেছে উদ্ধৃতি দিয়েছে তা আরো স্পষ্ট হয়েছে কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে। কমিশন ৩৯ পৃষ্ঠায় লিখেছে:

    “মানবাধিকার কমিশন কর্তৃক একটি তদন্ত করা হয় এবং অন্যান্যরা সহ কল্পনার মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এবং তা ভিডিও করা হয়। উহার এক কপি সেনাবাহিনীর একজন সাক্ষী কর্তৃক আমাদের নিকট উপস্থিত করা হয়। উহাতে কল্পনা চাকমার মা বাধনী চাকমা বলেছেন যে তিনি তার মেয়ের খোঁজ খবর পান এবং সে ভালো আছে। আমরা ঐ ভিডিও রেকর্ড শুনেছি ও দেখেছি। কল্পনা চাকমার মা এর বিভিন্ন কাগজে যে ছবি ছাপা হয়েছে উক্ত ছবির সহিত ভিডিওতে ধারণকৃত ছবির হুবহু মিল রয়েছে।”

    তদন্ত কমিশন তথাকথিত বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (সরকার কর্তৃক গঠিত বর্তমানের বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নয়) তদন্ত ও ভিডিওর কথা সোৎসাহে উল্লেখ করলেও, কল্পনা চাকমার মা বাধুনী চাকমার বক্তব্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। বাধুনী চাকমা উক্ত তথাকথিত মানবাধিকার কমিশনের বক্তব্য সত্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। ১৯ আগষ্ট ১৯৯৬ “কল্পনার মা বলেন মানবাধিকার কমিশন মিথ্যাচার করেছে, আমি মেয়েকে ফেরত চাই” শিরোনামে দৈনিক সংবাদ ওই সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রকাশ করে। সংবাদ জানায়:

    “সাংবাদিক সম্মেলনে কল্পনার মা বাঁধুনী চাকমা বলেন, গত ৪ঠা আগষ্ট বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের একটি দল হেলিকপ্টারে করে প্রথমে সেনাবাহিনীর জোনে যায়। সেখান থেকে বিকেলে তারা কয়েকজন বিডিআর সদস্য ও স্থানীয় বাঙালিদের নিয়ে তাদের (কল্পনার) বাড়িতে যায়। মানবাধিকার কমিশনের দলটি তার (কল্পনার মায়ের) কাছে শুধুমাত্র অপহরণের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি অপহরণের ঘটনা বর্ণনা করেন। বাঁধুনী আরো জানান যে, তিনি মানবাধিকার কমিশনের দলের কাছে এমন কোন কথা বলেননি যে কল্পনা অপহরণের পরেও দুবার তার সঙ্গে দেখা করেছে। এটি ডাহা মিথ্যা, মানবাধিকার কমিশন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাকে বিকৃতভাবে উদ্ধৃত করেছে।

    “বাঁধুনী চাকমা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তথ্য বিকৃত করে পরিবেশনের দায়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান।”

    বাঁধুনী চাকমার উক্ত সংবাদ সম্মেলনের খবর দেশের অন্যান্য জাতীয় দৈনিকেও প্রকাশিত হয়। অথচ তদন্ত কমিশন সে সম্পর্কে তাদের রিপোর্টে বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেনি। কমিশন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রর রিপোর্ট এবং অনেক নিরপেক্ষ রিপোর্টার ও ব্যক্তি বিশেষ কর্তৃক ঘটনাস্থল ঘুরে এসে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করা প্রতিবেদন ও মন্তব্যগুলোকে কোন গুরুত্ব দেয়নি, তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ পর্যন্ত করেনি।

    মন্তব্য

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্ত্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট একপেশে, পক্ষপাতদুষ্ট ও অসঙ্গতিপূর্ণ। অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও তার সহযোগীদের রক্ষার জন্যই উক্ত রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। কেবল সেনাবাহিনীর দেয়া অসংলগ্ন বক্তব্যকেই সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। অপরদিকে যারা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাদের বক্তব্যকে কথার মারপ্যাচে খারিজ করে দেয়া হয়েছে। কমিশন লিখেছে: “২ নং সাক্ষী (কল্পনার ভাই লাল বিহারী চাকমা) কোন সময় থানায় গিয়েছে উহার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। অতএব, ১ ও ২ নং সাক্ষী অত্র কমিশন সমীপে যে জবানবন্দী দিয়েছে তা অসত্য এবং ভিত্তিহীন। উপরোক্ত কারণাদিতে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে কল্পনা চাকমার কথিত অপহরণের ব্যাপারে লেঃ ফেরদৌস ও ২ জন ভিডিপি সদস্য বা সেনাবাহিনী বা ভিডিপি জড়িত নয়।”

    জোর যার মুল্লুক তার। অপহরণকারীদের চিহ্নিত করতে না পারলেও, কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রমাণ করেছে যে, কখনো কখনো গায়ের জোরে সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করা যায়। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় উপনের মতো এভাবে আক্ষেপ করা ছাড়া কালিন্দ কুমার ও লাল বিহারী চাকমার আর কী আছে: “তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে”।

    সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট

    অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্ত্বাধীন তদন্ত কমিশন অপহরণকারীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলেও, “দায়েরকৃত এফ,আই,আর এর ভিত্তিতে (বাঘাইছড়ি থানার মামলা নং ২ তাং ১২/৬/৯৬) তদন্ত চালিয়ে অপহৃত মিস কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করত ও অপরাধীদের চিহ্নিত করত যথারীতি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া যেতে পারে” বলে সুপারিশ করেছিলেন। তাদের সেই সুপারিশের ভিত্তিতে বাঘাইছড়ি থানার এস আই ফারুক আহম্মদ তদন্ত চালান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া সাক্ষ্যে উল্লেখিত অপহরণকারীদের নাম বাদ দিয়ে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেন। বাদী কালিন্দ কুমার চাকমা উক্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে নারাজী আবেদন জানালে আদালত সিআইডির মাধ্যমে তদন্ত করানোর নির্দেশ দেন। এরপর সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা শহীদুল্লাহ গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ সিআইডি চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন।

    উক্ত দুই চূড়ান্ত রিপোর্টের মূল সুর ও লক্ষ্য একই — অপহরণকারীদের রক্ষা করা। সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে,

    “বাদীর ভাই লাল বিহারী চাকমা @ ক্ষুদিরাম চাকমাই একমাত্র সাক্ষী যিনি লেঃ ফেরদৌস সাহেব, ভিডিপি নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে চিনিতে পারিয়াছেন বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। বাদী তাহার পরিবারের লোকজন ও এলাকার গণ্যমান্য লোকদের সাথে আলোচনা করিয়া এজাহার দেন। কিন্তু তিনি তাহার লিখিত এজাহারে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করেন নাই। তাই লাল বিহারী চাকমা @ ক্ষুদিরাম চাকমার প্রদত্ত বক্তব্যটি রহস্যপূর্ণ। তবুও তাহার দেওয়া তথ্য তদন্তকালে যাচাই করা হয়। কিন্তু সমর্থনে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় নাই।”

    এজাহারে কেন অপহরণকারীদের নাম নেই সে ব্যাপারে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। মূলতঃ শুরু থেকেই অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য সরকার ও সেনাবাহিনীর মরিয়া প্রচেষ্টা ল্যণীয়। ঘটনার পর এফআইআর-এ লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস ও দুই ভিডিপি সদস্যের নাম না লিখে অজ্ঞাতনামা লেখা, বাদী কালিন্দ কুমার চাকমাকে এফআইআর পড়ে না শোনানো, তদন্ত কমিটির সদস্যদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে না যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দী না নেয়া, দায় এড়ানোর জন্য তদন্তের নামে eyewash — ইত্যাদি সবই একই ল্য বাস্তবায়নের জন্য করা হয়েছে। আর এখন সিআইডি ঘটনার আলামত নষ্ট করার জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল্লাহ তার চূড়ান্ত রিপোর্টে একদিকে বলেছেন ‘ভবিষ্যতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে বা উদ্ধার করা সম্ভব হইলে যথানিয়মে মামলাটির পুনরায় তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’, অন্যদিকে ১ নং ও ২ নং আলামত (‘একটি রশি যাহার দ্বারা ঘরের দরজা বাধা ছিল এবং ঐ রাতে আগত অজ্ঞাত লোকেরা কাটিয়াছে বলিয়া কথিত’ এবং ‘একটি খয়েরী রং এর পলিষ্টার কাপড়ের তৈরী গুলি রাখার তোজধানী’) ধ্বংস করার আদেশ প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো আলামত নষ্ট করে ফেলা হলে ভবিষ্যতে কিভাবে তদন্ত করা সম্ভব হবে? এ বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্টে তার বক্তব্য পুরোপুরি স্ববিরোধী। আসলে ভবিষ্যতে অপহরণের সাথে লেঃ ফেরদৌস এবং সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা যাতে কোনভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব না হয় তার জন্যই সকল আলামত নষ্ট করার এই ষড়যন্ত্র।

    মোট কথা, পুলিশ ও সিআইডির তদন্ত অত্যন্ত দায়সারাভাবে করা হয়েছে। তদন্তের নামে এ ছিল এক মহা কেলেংকারী। তদন্ত কর্মকর্তারা কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি এবং সংশ্লিষ্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যেমন বাঘাইছড়ির তৎকালীন টিএনওর সাক্ষাতকার নেননি। কালিন্দ কুমার চাকমা নিবন্ধকারকে জানান, “আমার ভাই লাল বিহারী চাকমা ঘটনার সাথে জড়িতদের মধ্যে যাদের চিনতে পেরেছেন তাদের নাম বলেন, আমিও বলি। কিন্তু তারপরও তিনি লেঃ ফেরদৌস, নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে আসামী করেননি।” তার বক্তব্য থেকে আরো জানা যায়, এসআই ফারুক তদন্তে গিয়ে তাকে বলেন সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্যই কল্পনা চাকমা অপহরণ সাজানো হয়েছে। তার এই কথায় কালিন্দ কুমার দৃঢ় প্রতিবাদ জানান। এইআই ফারুকের উক্ত মন্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, তিনি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কাজ সম্পাদন করেননি, শুরু থেকেই বাদী সম্পর্কে বিরূপ ধারণা গঠন করে তদন্তে অগ্রসর হয়েছিলেন।

    উপসংহার:

    অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলের তদন্ত রিপোর্ট এবং পুলিশ ও সিআইডির চূড়ান্ত রিপোর্ট চিহ্নিত অপহরণকারীদের রক্ষার জন্য বিধায় তা কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইউনাইটেড পিপলস্‌ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতির উভয় গ্রুপ ও বিভিন্ন সংগঠন উক্ত তদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশ-সিআইডির রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। ন্যায় বিচারের স্বার্থে সরকারের উচিত হবে অপহরণকারী লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদকে গ্রেফতার পূর্বক পুনঃতদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

  • জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

    জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

    • অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

    সম্পাদকীয় নোট: আমেরিকায় সম্প্রতি চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভকালে বিভিন্ন বড়ো বড়ো কর্পোরেট শো-রুম, দোকানপাট ভাঙ্গচুর হয়েছে, অনেক স্থানে বিক্ষোভকারীরা জিনিসপত্রও নিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলও এই সব দৃশ্য দেখিয়ে বারবার ‘লুটিং’ ‘লুটারস’ ইত্যাকার শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রচারণার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্ণবাদ বিরোধী এই আন্দোলন এবং এই আন্দোলনকারীদের নৈতিকভাবে খাটো করা। এই ধরনের ‘লুট’ বা ‘সহিংস’ কর্মকাণ্ড কতটা দিনের পর দিন থেকে নিপীড়ত ও বিক্ষুব্ধ  মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ, আর কতটা ‘লুট’ তা নিয়ে জসুয়া ফ্রাঙ্ক জুনের ১ তারিখ কাউন্টারপাঞ্চে নিবন্ধ লিখেছেন। এতে খুব সংক্ষেপে এই আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচিত হয়েছে। উক্ত নিবন্ধের ভাবানুবাদ হাজির করেছেন ইফতেখার রুমি।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েডের ম্যুরাল
    শিল্পী: জনাথন ফ্রো পেরি
    সূত্র: কিটস্যাপ সান

    মূল প্রবন্ধ

    লস এঞ্জেলসের এর অন্যতম নামীদামী শপিং জেলা হিসেবে পরিচিত মেলরুজ এভেনিউ বরাবর যে দৃশ্য  দেখা যাচ্ছে তাকে এক রকমের প্রতিশোধের দৃশ্য বলা যায়। গ্লাসের টুকরা বিক্ষিপ্ত আকারে ফুটপাতে পড়ে আছে, দোকানপাটগুলোর সম্মুখভাগ গ্রাফিতিতে ভরা। ভোরের বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ এখনো তাজা রয়েছে। মেয়র এরিক গ্রাসেত্তি কর্তৃক শহরময় জরুরী অবস্থা ও  কারফিউ ঘোষণার কিছু আগে শনিবার রাতে যে লুটপাট ঘটে গেল তার কেন্দ্রস্থল ছিল এই জায়গাটা– মেলরুজ এভেনিউ। গ্রাসেত্তি এরপর গভর্নর নিওসোমকে ফোন করেছিলেন ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ডেকে আনার জন্য। এর ফলে ১৯৯২ সালের পর প্রথম বারের মত  লস এঙ্গেলেসের রাস্তায় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা চক্কর দিল। শেষ বার ন্যাশনাল গার্ড রাস্তায়ে নেমেছিল যখন ’৯২ সালে রডণী কিং এর রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। ছুটির দিনের গনরোষ আর যন্ত্রণার প্রদর্শন শেষে যা অবশিষ্ট থাকল তা রক্ষা করতে রোববার সামরিক যান আর সেনা রাস্তায় নামল।

    জনভীতি উষ্কিয়ে দিতেই কিনা ফক্স নিউজ শনিবারের প্রতিবাদী সমাবেশ পরবর্তী ধ্বংসকরনকে নাম দিল ‘সহিংস দাঙ্গা’। আঞ্চলিক পত্রিকা এল এ টাইমস প্রথমে দেখাতে চাইলো ‘আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভাজন ছিল’, এবং এরপরে লুটপাটকারিদেরকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে উঠেপড়ে লাগলো। এরই মধ্যে রোববার সকালে ট্রাম্প ঘোষণা দিল যে, তার সরকার এন্টিফাকে সন্ত্রাসী সংঘটন হিসেবে আখ্যায়িত করতে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে যে আন্দোলনকারীরা নিজেদের সম্মিলিত ক্রোধকে কণ্ঠ দিবেন বলে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, তারা ছিলেন অনেকটা লস এঞ্জেলসের চরিত্রের মতনই: নানা উদ্দেশ্যের একটা বিচিত্র ভিড়।

    সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর যারা রয়ে গিয়েছিল তাদেরই একটা অংশকে এখন লুটপাটকারি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। রোববার সন্ধ্যানাগাদ সান্তামনিকা ও লঙ বিচ জুড়ে যে হতাশা স্পষ্টত অনুভব করা যাচ্ছিল তা আমলে না নিয়েই তাদেরকে খুব সাবলিলভাবে ‘দুর্বৃত্ত’ ও ‘চোর’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটা আমলে না নেয়ার মাধ্যমে তারা কেবল আমেরিকার পদ্ধতিগত বর্ণবাদকে উপেক্ষাই করছে না, বরঞ্চ আমাদের শোচনীয় সামাজিক স্তরবিন্যাসকেও দেখেও না দেখার ভান করছে। গেল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লস এঞ্জেলসের রাস্তায় ও দেশের অন্যান্য জায়গায়, যে বিক্ষোভ-জাগরণ দেখা যাচ্ছে তা যতটুকু জাতিগত বর্ণবাদ ও পুলিশি বর্বরতা নিয়ে ততটুকুই শ্রেণিগত।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য বাঙ্কার হেড
    শিল্পী: গ্রেগরি দাসি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই ঘটনার ফলাফলরুপে ট্রাম্প তার নিজস্ব দাম্ভিক কায়দায় যে আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন,  তিনি ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ হতে চান, তার সে মনোবাসনা পূর্ণ হল। অফিসের দায়িত্ব গ্রহন করার পর থেকে ট্রাম্প যে অগ্নিশিখাকে বাতাস দিয়ে যাচ্ছিলেন তা শেযপর্যন্ত আমারিকায় বিস্ফোরিত হলো এবং সে আগুন এখন তার দোরগোড়ায় জ্বলছে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা আসলে পুরাদস্তুর একটা শ্রেণি-সংগ্রাম। কোনো সন্দেহ নেই যে অনেকগুলো ঘটনার ঝড় বয়ে চলছে; কভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বৃহৎ আকারের বেকারত্ব (সংখ্যায়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন), ভাইরাস জনিত মৃত্যু বৈষম্য, পুলিশ বাহিনী কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের ধারাবাহিক নিপীড়ন, এবং এসবের পাশাপাশি এমন এক কর্পোরেট-সরকার যারা ঝুঁকির মধ্যে থাকা নাগরিকদেরকে রক্ষা করতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

    দোকান লুটপাট স্বভাবতই একটি শ্রেণি প্রসঙ্গ, তা আপনার পছন্দ হোক বা না হোক (ব্যতিক্রম কিছু তো সর্বদাই থাকে)। মূলত আফ্রিকান দাসত্ববন্ধন ও স্থানীয়দের জমি ছিনতাই করার সময় থেকেই লুন্টন করা আমেরিকার দীর্ঘকালস্থায়ী একটা ঐতিহ্য। এবং এই জমানায় এসে, ধনী লোকেরা শপিংমলগুলো লুট করে না, বরং তারা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কয়েলাখনি থেকে শুরু করে জেফ বাজেসের আমাজন গুদাম পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রম লুট করতে খুবই পারদর্শী। এইসময়ে গরীবরা তাদের নামমাত্র ক্ষমতাকে যেভবে জাহির করছে, ধ্বংসাত্মক ও সহিংস আকারে হলেও, তা ক্রমাগত ক্ষমতাহীন অবস্থায় থাকার বিলকুল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাদের জন্য লুটপাট  হচ্ছে সাহায্যের জন্য চিৎকার, হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

    আমরা সবাই বীভৎস ভিডিওটা দেখেছি। জর্জ ফ্লোয়েডকে মিনেপলিস পুলিশ অফিসার ডেরেক চৌভিন প্রকাশ্য দিবালোকে যখন হত্যা করছিল, শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে ফ্লয়েড তখন মায়ের সাহায্যের জন্য কাঁদছিল। আমরা সবাই দেখেছি কিভাবে শ্বেতাঙ্গ নির্মম প্রহরীরা, যাদের মধ্যে একজন সাবেক গোয়েন্দা, পথচারী আহমদ আরবেরিকে হত্যার পূর্বে পিকআপ ট্রাকে তুলে নিয়েছিল। যে বিস্ময়কর হারে কালো মানুষদের পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে সে দীর্ঘ তালিকার সাথে আমরা সবাই পরিচিত – শ্বেতাঙ্গের তুলনায়ে ২.৫ গুন বেশি। আমরা এও জানি যে কোভিড সংকটের আগেও পুরো কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যার ২০% মানুষ অতি-দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, সংখ্যায়ে প্রায় ৯ মিলিয়নের মতো। বর্তমানে দেশজুড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ,  এবং এর ফলশ্রুতিতে সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েড ডেথ
    শিল্পী: এমাদ হাজ্জাজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অবশ্যই, আমাদের দেশের গরীব মানুষের মধ্যে ফেনাইয়া উঠা অসন্তোষ এবং সরকার সমর্থিত গুণ্ডাদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের উপর যে বর্বরতা উভয়ই ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ব থেকেই ছিল। কর্নেল ওয়েস্ট এক প্রোগ্রামে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

    ‘আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি নিঊলিবারেল উইং পেয়েছেন যা এখন চালকের আসনে রয়েছে …তারা সত্যিই জানে না কি করতে হবে কারণ তারা যা আসলে করতে চায় তা হল আরও বেশি কালো মুখ দেখাতে চায়। তবে প্রায়শই এই কালো মুখগুলো বৈধতা হারাচ্ছে, কারণ ‘ব্ল্যাক লাইভস মেটার’ আন্দোলন একজন কালো রাষ্ট্রপতি, একজন কালো অ্যাটের্নি জেনারেল এবং একজন কালো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনেই গড়ে উঠেছিল। এবং তারা আন্দোলনের দাবি মেটাতে পারেননি।’

    আপনি কি মনে করেন গত সপ্তাহান্ত ভয়ংকর ছিল? তাহলে অপেক্ষা করুন। যদি ডেরেক চৌভিনকে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয় তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপনার কাছে গৌণ বলে মনে হবে। নিশ্চিতভাবেই, ছোটখাটো ব্যাবসাপাতি লুটের মতো কিছু সংহতিনাশক ঘটনা হিতে বিপরীত ফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে; এই কারণেই প্রকৃত অপরাধী, পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের সহায়ক গোষ্ঠীর প্রতি এই ক্রোধকে সংঘটিত ও পরিচালনা করার একটা বাধ্যবাধকতা বামপন্থীদের রয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: আই কান্ট ব্রেথ
    শিল্পী: লাউলি শেনবানজো
    সূত্র: সিএনএন

    আমেরিকাতে অর্থনৈতিক ও জাতিগত নিপীড়ন অবশেষে এক উত্তেজনাকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পদ্ধতিগত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি পদ্ধতিগত পুনর্নির্মাণের রূপ নিবে। জানালা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত কিছু কিছু ক্রিয়াকলাপ হতাশা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। তবুও, এটি হচ্ছে অন্তর্নিহিত জাতিগত এবং শ্রেণিগত দিক যা এই বিদ্রোহকে আরও জাগিয়ে তুলবে। কোনো সিটি মেয়রের কাছ থেকে চাপিয়ে দেয়া কার্ফিউ এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত বিদ্রোহ বা জাগরণের রাশ লম্বা সময়ের জন্য টেনে ধরতে সক্ষম হবে না।

  • এনিমেল ফার্মের ‘ভূমিকা’ ও বাক স্বাধীনতার প্রসঙ্গ

    এনিমেল ফার্মের ‘ভূমিকা’ ও বাক স্বাধীনতার প্রসঙ্গ

    • সহুল আহমদ

    এনিমেল ফার্ম অরওয়েলের শৈল্পিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে একীভূত করার প্রথম সচেতন প্রয়াস; কথাটা আমার নয়, খোদ জর্জ অরওয়েলই বলেছেন। এই উপন্যাস লেখার চিন্তা তার মাথায় এসেছিল ১৯৩৭ সালের দিকে, এবং ৪৩ এর আগ পর্যন্ত এটা লিখতে পারেন নি। এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের বাহিনীকে পরাস্ত করতে ব্রিটিশ শক্তি ও সোভিয়েত শক্তি হাতে হাত মিলিয়ে একত্রে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল। ব্রিটিশদের সাথে সোভিয়েতের এই ক্ষণিকের ‘প্রেম’ অরওয়েলের এই ‘সচেতন প্রয়াস’ প্রকাশে নানারূপী বাধা হাজির করেছিল। এনিমেল ফার্ম প্রকাশে তাকে যে ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল এবং এমন ঝুটঝামেলা আসলে কোন প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তার এক প্রস্থ বিবরণ তিনি বইয়ের ‘ভূমিকা’য় উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে এই ভূমিকা ছাড়াই এনিমেল ফার্ম প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, এবং ১৯৭১ এর আগ পর্যন্ত এই ভূমিকার হদিস পাওয়া যায় নি। একাত্তরে মূল পাণ্ডুলিপির সাথে ‘দি ফ্রিডম অব প্রেস’ শিরোনামে এই ভূমিকা পাওয়া যায়, এবং বাহাত্তরে সেটা আলোর মুখ দেখে।

    জর্জ অরওয়েল
    (১৯০৩-১৯৫০)
    পোট্রেট: প্যাট্রিক হার্ডজেইজ
    সূত্র: মিসটক

    এনিমেল ফার্মের যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন এর কাহিনীর আদল রুশ বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত আমল (বিশেষত স্ট্যালিনের আমল)। কিন্তু, কৌতূহল জাগানিয়া প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাদী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কেনো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবির সম্পর্কে ‘সমালোচনামূলক’ গ্রন্থ প্রকাশে বাধা দিবে? পাশাপাশি, গ্রন্থ প্রকাশে এই কাঠখড় পোহানো কীভাবে প্রেসের স্বাধীনতা তথা বাক স্বাধীনতাকে মূল প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে? আর, দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে পড়ে থাকা এই ‘ভূমিকা’য় আসলে কি বিষয়ে আলাপ রয়েছে? এই বিষয়াদি হালকা বাৎচিত করাটাই আপাতত উদ্দেশ্য। অরওয়েল যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন তখন তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে উপন্যাসের স্ট্যালিন-বিরোধিতা এটা প্রকাশে ঝট পাকাতে পারে; অন্তত তার কিছু চিঠিপত্রে এমন আলামতই পাওয়া যায়। তবে, ইতিহাসের প্রহসন হচ্ছে এই, স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনামলকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্য যে গ্রন্থকে এতো বাধা দেয়া হয়েছিল, কয়েকবছর পর স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনকে আক্রমণ করার জন্য সেই গ্রন্থকেই ব্যবহার করা হয়।

    এনিমেল ফার্ম প্রকাশের জন্য অরওয়েল বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তারা বিভিন্ন ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেন। একজন রাজি হলেও প্রকাশ করবে কি না তা পরামর্শ করার জন্য তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মোটাদাগে দুটো আপত্তির কথা জানানো হয়। এক, এনিমেল ফার্ম স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা ও স্বৈরাচারদের নিয়ে লিখিত হলেও সোভিয়েত ও স্ট্যালিনের দিকে ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট। তাই, ‘বর্তমান সময়ে’ এটা প্রকাশ করা অনুচিত। দুই, উপন্যাসে কর্তৃত্বপরায়ণ গোষ্ঠী হিসেবে শুয়োরদের দেখানো হয়েছে, এতে অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হবেন, বিশেষ করে সোভিয়েতের শাসক সমাজ।

    এই পুরো বিষয়টাকে অরওয়েল একটা খারাপ আলামত হিসেবে দেখছেন। তিনি যুদ্ধাবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে সিকিউরিটি সেন্সরশিপ পর্যন্ত মেনে নেন, কিন্তু বইপত্র-লেখালেখির উপর সরকারের কোনো ধরনের সেন্সরশিপ থাকবে সেটা তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তার কাছে এর চেয়েও বড়ো বিপদ আসলে অন্যটা। সেই সময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ তার কাছে যতটা ভয়ের তার চেয়ে বড়ো ভয় হচ্ছে, প্রকাশক-সম্পাদকরা যেন একধরনের সম্মতিতে পৌঁছে গিয়েছেন কোনটা প্রকাশ করবেন, কোনটা প্রকাশ করবেন না। তারা কি তাহলে শাস্তির ভয়ে আছেন? অরওয়েলের জবাব হচ্ছে, না। তাদের ভয় শাস্তি নয়, তাদের ভয় জনমত। তার কাছে মনে হয়েছে, ব্রিটেনে একজন লেখক বা সাংবাদিককে যত ধরনের শত্রুকে মোকাবিলা করতে হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা হচ্ছে সবচাইতে খারাপ শত্রু। এই ‘শত্রু’কে নিয়ে যতটা আলাপ-আলোচনা করা দরকার সেটাও করা হয় না।

    এনিমাল ফার্ম

    অরওয়েল যখন লিখছেন তখন তিনি সরকারি সেন্সরশিপ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়, বরঞ্চ মিডিয়াপাড়া ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোন লেখা প্রকাশযোগ্য ও কোন লেখা প্রকাশযোগ্য না তা নিয়ে যে একধরনের নীরব সম্মতি তৈরি হয় সেটা নিয়ে বেশি চিন্তিত। অ-জনপ্রিয় চিন্তাকে দমিয়ে রাখা হয়, অস্বস্তিকর তথ্যকে লুকিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এসব করতে কোনো ধরনের সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না। উপরোক্ত ‘নীরব সম্মতি’ ঠিক করে দেয়, কোন ঘটনা লুকানো হবে আর কোন ঘটনা প্রকাশিত হবে। প্রতিটি সময়ে কিছু প্রচলিত ধ্যান-ধারণা-চিন্তা-ভাবনা বিরাজ করে, সাধারণত এর বাইরে তারা যেতে চান না।

    নোম চমস্কি এই জমানায় সম্মতি উৎপাদনে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ও বিস্তৃত আলাপ করেছেন; বিশেষ করে কীভাবে হাল জমানার রাষ্ট্র ও  কর্পোরেশন নিজেদের ফায়দার জন্য মিডিয়া ব্যবহার করে তা দেখিয়েছেন। অরওয়েল চল্লিশ দশকে লেখা তার ‘ভূমিকা’তে এই সংক্রান্ত ইশারা-ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ প্রেস প্রচণ্ড কেন্দ্রীভূত; অল্পকিছু সম্পদশালী ব্যক্তির হাতে সমগ্র সংবাদমাধ্যম বন্দি। সংবাদ মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার তাদের ইচ্ছানুযায়ী ঘটে। অবশ্য, নিও-লিবারেল জমানার বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন (বা, সম্পদশালী ব্যক্তি) নিজেদের মধ্যে প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মিডিয়ার উপর কর্তৃত্ব বিরাজ করে- অরওয়েল এই ভয়াবহ বাস্তবতা দেখে যেতে পারেন নি, কিন্তু কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন। অবশ্য, একটা বিষয় অরওয়েলের চোখ এড়ায়নি: সংবাদ মাধ্যমে বা প্রেসের স্বাধীনতার সাথে বন্ধু/শত্রু রাষ্ট্রের সম্পর্ক। কোনো রাষ্ট্র যদি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, তাহলে তার কোনো দোষত্রুটি প্রচার করা যাবে না, আর শত্রুরাষ্ট্রের ভালো খবরও প্রকাশিত হবে না। বর্তমান একবাল আহমেদ, চমস্কি এ বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি ও সাক্ষী-সাবুদ হাজির করেছেন আমাদের সামনে, কীভাবে রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র গড়ে উঠার সাথে সংবাদ মাধ্যমের আচার-আচরণ পাল্টে যায়। অরওয়েলও অনেকটা একইভাবে তার সময়ের এমন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।

    আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তো, অরওয়েল যখন এনিমেল ফার্ম  লিখছেন তখন মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী পাড়ায় কোনটা প্রচলিত বা অর্থোডক্সি ছিল? উত্তর হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রায় সবাই এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের দিলখোলা প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরনের সমালোচনা-পর্যালোচনা করা যাবে না। কোনো তথ্য যদি সোভিয়েত শাসনামল চায় প্রকাশিত না হোক, তাহলে সেটা প্রকাশিত হবে না। অবস্থাটা এমন, সাময়িকী বা বই-পুস্তকে চার্চিলের সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু স্ট্যালিনের সমালোচনা করা যাবে না। সোভিয়েত প্রসঙ্গ ছাড়া বাদবাকি সব বিষয়ে ছিল অফুরন্ত বাকস্বাধীনতা। এটা যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। এমন আরো অনেক ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় আছে, অরওয়েল সঙ্গত কারণেই এই ভূমিকায় গুরুত্বারোপ করেছেন কেবল সোভিয়েতের প্রতি এমন দিলখোলা মনোভাবের প্রতি। তার কাছে এটা গুরুতর আলামত।

    ১৯৪১ সালের পর থেকে তৎকালীন বিদ্বৎসমাজ গোগ্রাসে রাশিয়ান প্রোপাগান্ডা গিলেছে। এমনকি রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কোনো কথাই বলা হয়নি। অরওয়েল অনেকগুলো উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন বিবিসি রেড-আর্মির ২৫ বছর উদযাপনে ট্রটস্কির নাম পর্যন্ত মুখেই নেয়নি। অরওয়েল বলছেন, কখনো কখনো ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা নিজেরাই সেন্সরশিপ আরোপ করেন, কখনো কখনো বাইরের বিভিন্ন চাপের কারণে করেন। তিনি এই দুটোর মধ্যে ফারাক করেন। তার মতে, সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের প্রায় জাতীয়তাবাদী মনোভাব ছিল। অরওয়েলের লেখালেখির সাথে যাদের হালকা-পাতলা পরিচিত আছেন তারা জানেন যে, তিনি বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ডকে প্রচণ্ড সমালোচনামূলকভাবে বা ক্রিটিক্যালি দেখতেন। একের অধিক জায়গাতে বুদ্ধিজীবীদের বিবিধ সমস্যামূলক প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন। ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে তিনি কোনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের অন্ধ-আনুগত্যকে জাতীয়তাবাদী মনোভাব বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই ছোট ভূমিকাতেও সে ধরনের ইঙ্গিত দেন। কেবল এই ভূমিকা পড়লে মনে হতে পারে, অরওয়েল বুঝি শুধু সোভিয়েত প্রেমিকদের মধ্যেই এমন প্রবণতা খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু, ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে এমন অনেকগুলো গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলোর প্রতি বুদ্ধিজীবীদের এমন অন্ধ-আনুগত্য বিরাজ করতো।

    তাহলে অরওয়েলের প্রশ্ন হচ্ছে, তার বই প্রকাশে বাধা কোথায়? কেউ হয়তো বলবেন, লেখা হয়নি, বাজে লেখা। কিন্তু অরওয়েলের কথা হচ্ছে, প্রতিবছর যেখানে হাজার হাজার পৃষ্ঠার আজে-বাজে বই প্রকাশিত হয়, সেখানে এটা কি আদৌ কোনো যুক্তি? বরং, তিনি নিশ্চিত, স্ট্যালিনকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্যই তার উপর এমন খড়গ নেমে এসেছে। ইংরেজ বুদ্ধিজীবীদের মতে এটা তাদের প্রগতিতে বাধা দিবে।

    আর্টওয়ার্ক: অক্টোপাস
    শিল্পী: অলেক্সি কুস্তভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    তো, এই জায়গায় এসে অরওয়েল মূল যে প্রশ্নটা উত্থাপন করেন সেটা হচ্ছে, কোনো মতামত তা যতই অ-জনপ্রিয় হোক, যতই বোকামি হোক, তা কি প্রকাশের অধিকার রাখে কি না? তিনি বলছেন যে, এই প্রশ্নের উত্তরে ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা ইতিবাচক উত্তর দিলেও কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে নেতিবাচক উত্তর দিবেন। অরওয়েলের মতে, যেহেতু একটা সংগঠিত সমাজে আমরা বসবাস করি, বাক স্বাধীনতার কিছু না কিছু সাধারণ সীমানা থাকে। কিন্তু অরওয়েল যেহেতু পশ্চিমা জগতের মানুষ, তিনি উল্লেখ করতে ভুলেন না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম উপাদান। এই স্বাধীনতা না থাকলে পশ্চিমা সংস্কৃতি আদৌ টিকত কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তিনি রোজা লুক্সেমবার্গকে স্মরণ করেন, স্বাধীনতা মানে ভিন্নমতের স্বাধীনতা। ভলতেয়ারকেও স্মরণ করেন, তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার সে মত প্রকাশের জন্য জান দিতে রাজি আছি। অরওয়েল বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা লিবারেল চিন্তকদের সাথে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ (বলা যায়, আমজনতা) অস্পষ্টভাবে হলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে নেন। অথচ, যাদের স্বাধীনতার রক্ষক হওয়ার কথা ছিল সেই বুদ্ধিজীবীরা তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জায়গাতে সেটা তুচ্ছ ভাবা শুরু করেছেন।

    এগুলো তার কাছে কর্তৃত্বপরায়ণতার নমুনা। যারা কিছুটা ভালোর জন্য কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থা বা পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলেন অরওয়েল তাদের সমালোচনা করেন। তারা বুঝেন না, যে কর্তৃত্বপরায়ণ পদ্ধতির পক্ষে আজকে তারা ওকালতি করছেন কাল সেগুলো তাদের দিকেই ফিরে আসবে। তিনি মনে করেন, সহনশীলতা ও পরিমিতিবোধ ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথিত, কিন্তু তাই বলে এগুলো অবিনাশী নয়। সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এগুলোকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ণ মতাদর্শ সেই সহজাত প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে ফেলে যেগুলোর মাধ্যমে মুক্ত মানুষ কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সে সিদ্ধান্ত নেয়। ভূমিকার বিভিন্ন জায়গায় এই বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক বহু উদাহরণ দিয়েছেন।

    বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সাথে অরওয়েল পরিচিত। বাক বা চিন্তার স্বাধীনতা সম্ভব না, বা দেয়া উচিৎ নয় – এমন দাবি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং তিনি মনে করেন গত কয়েকশত বছরের পশ্চিমা সভ্যতার সংগ্রাম আসলে বিপরীত ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৎকালীন যুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া তাদের মিত্রপক্ষ এবং তিনিও মনে প্রাণে চান সে যুদ্ধে তারা জয়ী হোন, তবু তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বিদ্যমান সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা একটা শয়তানি ব্যবস্থা, এবং আমি এটা বলার অধিকার রাখি।’ তার মতে, কোনো অবস্থাতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। স্বাধীনতা শব্দ যদি কিছু বুঝিয়ে থাকে, তাহলে সেটা হচ্ছে লোক যা শুনতে চায় না তা বলার অধিকার। তিনি বলেন, [তৎকালীন ব্রিটেনে] ইংরেজ স্বাধীনতাকামীরা বা লিবারেলরাই স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন, এবং বুদ্ধিজীবীরাই বুদ্ধিজীবীতায় সবচেয়ে বেশি ময়লা ফেলছেন। এই অনালোচিত প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার ‘ভূমিকা’ লেখার মূল উদ্দেশ্য, একেবারে শেষে অরওয়েল এই ঘোষণা দেন।

    আর্টওয়ার্ক: মোয়িং টাইম
    শিল্পী: তীর্থ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    অরওয়েলের প্রবন্ধ বা উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সাথে নিজেদের ডিস্টোপিয়ান পরিস্থিতিকে মেলাতে মোটেও কাঠখড় পোহাতে হয় না। এনিমেল ফার্ম  যতই স্ট্যালিন-বিরোধিতায় ভরপুর থাকুক না কেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না অরওয়েল সেখানে আসলে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থার গলদকেই তুলে ধরেছেন। কীভাবে একটা বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে, কীভাবে কর্তৃত্বপরায়ণতার সূচনা ঘটতে পারে তা যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন। বহু দিন আগে [স্থান, কাল, পাত্র মনে পড়ছে না] একটা প্রতিবেদনে পড়েছিলাম, বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে অরওয়েল নাকি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। আমাদের এখানেও কি তাই? আমার এই অরওয়েল নিয়ে লেখাটা কি এই কারণেই? উপরওয়ালা ভালো জানেন। তবে, এটা নিশ্চিত যে, অরওয়েল বাক স্বাধীনতা নিয়ে যে আলাপ করেছেন তা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বেশ খানিকটা মিলে যায়। আমাদের বিদ্বৎসমাজে কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে যে অদ্ভুত নীরবতা লক্ষ্য করা যায় তা কে না জানে? তার কিছুটা সরাসরি রাষ্ট্র/সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে, আর কিছুটা বিষয়ের প্রতি জাতীয়তাবাদী আনুগত্যের ফলে। এই জাতীয়তাবাদী আনুগত্য বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতায় বাধা প্রদান করে। সেই ‘আনুগত্য’ ও ‘নির্বাচিত আবেগ’ দিয়ে ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’র নির্মাণ করতে চায়। কোনটা আলাপযোগ্য বা প্রকাশযোগ্য বিষয় তা নিয়ে একধরণের ঐক্যমত্য তৈরি হয়ে আছে। এই বাস্তবতার বাসিন্দারা ঠিকই এমন ‘নীরবতা’র গন্ধ পেয়ে যান।

    আজকাল স্বপ্নেও অরওয়েলের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। এগুলো কিসের আলামত?

  • আদিত্য নিগাম।। করোনা জৈবরাজনীতি এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন

    আদিত্য নিগাম।। করোনা জৈবরাজনীতি এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন

    অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    অনুবাদকের ভূমিকা: বাঙ্গালি বংশোদ্ভূত ইণ্ডিয়ান চিন্তক ও Centre for the Study of Developing Societies (CSDS) এর সম্মানিত ফেলো আদিত্য নিগাম গত ২৬ মার্চ, ২০২০ এ Kaflia.online এ Corona Biopolitcs and Life After Capitalism-A Manifesto of Hope (করোনা জৈব-রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার) শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধে তিনি বিশ্বপরিসরে করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক উঠেছে, সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করার মাধ্যমে পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজের সম্ভাব্য রূপরেখার ইঙ্গিত করার চেষ্টা করেছেন। ভারত, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বাস্তবতায় আদিত্য নিগামের প্রবন্ধটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

    আদিত্য নিগম

    আদিত্য নিগাম মূলত সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্বের বিউপনিবেশায়নে (decolonization) বিশেষভাবে আগ্রহী। এই প্রবন্ধেও আমরা দেখব তিনি পুঁজির ধারণার পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। পুঁজি বিশ্লেষণের সনাতনি ঐতিহাসিক ভ্রান্তিই যে বিগত শতকগুলোর সমস্ত সামাজিক বিপ্লবকে মহাদানবীয় সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রীয় গাড্ডায় নিক্ষেপ করেছে আদিত্য নিগাম তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

    পশ্চিমের বাস্তবতায় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জনবান্ধব প্রকল্পগুলোর দাবিকে পশ্চিমের বাইরের বিশাল দুনিয়ার (অরিয়েন্টালি ‘তৃতীয় বিশ্ব’) আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় পরখ করছেন এবং সঙ্গত প্রশ্ন তুলছেন।

    এই প্রবন্ধে তিনি একাধিকবার ফ্যাশন তাত্ত্বিক লি এডেলকুর্টের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। ‘ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস’ ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডের একজন ইনসাইডার হিশেবে এডেলকুর্টের ‘slow life’ এর উপলব্ধি তাৎপর্যপুর্ণ তো বটেই! কিন্তু এই ‘slow life’ এর অর্থ কোনভাবেই প্রাচিন যুগে ফিরে যাওয়া কিংবা কৃচ্ছতাবাদী জীবনের বাসনা নয়। বরং, পণ্য ভোগের নামে ক্রমাগত পুঁজির ধর্ষণ ‘উপভোগ’ করার যে জীবন; যা মানুষকে পরিণত করে ভোক্তায়, সমাজকে পরিণত করে বাজারে, সেই নিওলিবারেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যক্তি ও সমাজের আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্রিয়তাই  এডেলকুর্ট কথিত ‘slow‘life’। জীবনানন্দ দাশ সেই কবেই লিখে গেছেন:

    আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাইনা;
    আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
    পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।

    জীবনানন্দ দাশের আকুতিকে ‘কবির ভাবালুতা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু এডেলকুর্টের মতো কর্পোরেট দুনিয়ার আইকনদের একই আকুতিকে অস্বীকার করাটা বোধহয় আর সহজ হবে না।

    করোনা মহামারির ফলে একটা ভিন্ন সমাজের বিমূর্ত স্বপ্ন আরো প্রবলভাবে মূর্ত হয়ে উঠছে বলে মনে করেন আদিত্য নিগাম। এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ইতিহাসচেতনা-চিন্তাচর্চা ও সক্রিয়তাই কেবল পারে পৃথিবীতে মানুষের সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে।

    এই ধরনের ইতিহাস ও চিন্তা চর্চা পৃথিবীর উপর মানুষের সার্বভৌমত্ব /উপনিবেশ নাকচ করে দিয়ে মানুষকে বায়োলজিকাল/জিওলজিকাল এজেন্ট হিসেবে প্রপোজ করে। মানুষও আর দশটা স্পিসিসের মত স্পিসিস। অধীশ্বর নয়। মানুষের ইতিহাস মানে মানুষের ‘নায়ক’ হবার ইতিহাস না, অন্তত ‘recorded history’ যেভাবে দেখাতে চায়; বরং ‘deep history’ অনুযায়ী মানুষের ইতিহাস আসলে ‘জীবনের ইতিহাস’ এর অংশ, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি পরস্পরের সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা, দুই সম্পর্কেই আবদ্ধ। (দীপেশ / ২০১৬)

    এরকম একটা সামাজিক রূপান্তর সম্ভব বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রূপান্তরের মাধ্যমেই। আদিত্য নিগামের প্রকাশিতব্য দ্বিতীয় প্রবন্ধে তিনি পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজব্যবস্থার অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন। আমরা সেই প্রবন্ধটিরও অনুবাদ হাজির করার চেষ্টা করব।

    করোনা জৈব-রাজনীতি ও পুঁজিবাদের পরের জীবন: আশার ইশতেহার

    মনে হচ্ছে যেন আমরা ব্যাপকভাবে ভোগের কোয়ারেন্টিনে ঢুকে পড়েছি যেখানে জীবনকে সুন্দর করার জন্য আমরা খুব অল্পেই তুষ্ট থাকব— একটি অতি সাধারণ জামা, নিজেদের পুরোনো পছন্দের বিষয়গুলো পুনরায় আবিষ্কার করা, বিস্মৃত কোন বই পড়া এবং তুমুল আড্ডাবাজিতে লিপ্ত হওয়া। একটা বিকল্প ও গভীরভাবে ভিন্ন দুনিয়া গড়ে তুলতে ভাইরাসের প্রভাব হবে সাংস্কৃতিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

    – লি এডেলকুর্ট, ট্রেন্ডফোর কাস্টার এবং ফ্যাশন উপদেষ্টা 

    যখন বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলের মানুষ লকডাউনের পাঁকচক্রে পড়ে বিশ শতকের গোড়ার দিককার স্প্যানিশ ফ্লু, এমনকি চতুর্দশ শতাব্দীর প্লেগের স্মৃতি স্মরণ করছে; আমার চিন্তাভাবনা তখন আসলে অন্যখাতে প্রবাহিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিমান চলাচল সর্বনিম্নতম পর্যায়ে নেমে যাওয়ার সাথে সাথে, স্পষ্টতই ব্যয়বহুল খরচাদি বন্ধ হয়ে যাওয়া, রাস্তাগুলোতে লক্ষ লক্ষ গাড়ি এবং নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় আমি আচমকাই এক অতিসাধারণ চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম: এরকম একটা লকডাউন জনগোষ্ঠীর সবচাইতে দরিদ্র অংশের জন্য আবশ্যিকভাবে যে দুঃখকষ্ট বয়ে আনে, তার দুর্ভোগের মেঘের আড়ালে সম্ভাবনার সূর্য উঁকিও দিতে পারে। আমরা যখন এই সংকটটি কাটিয়ে উঠব, খুব সম্ভবত তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি নেমে আসবে এবং এর চেয়েও বেশি যা হতে পারে, সম্ভবত পৃথিবীতে অস্তিত্বের এক ভিন্ন রূপের সূচনা হতে পারে। এটি বিশ্বকে সেটাই দেখার সুযোগ করে দিতে পারে যা এ যাবৎকাল জলবায়ু সংকট অস্বীকারকারীরা প্রত্যাখান করে এসেছিল (নাওমি ক্লেইন যেমনটি দেখিয়েছেন, জলবায়ুকে অস্বীকার করার এই রাজনীতি মার্কিন ডানপন্থি ফাউন্ডেশন এবং কর্পোরেশনগুলোর বিশাল তহবিল দ্বারা সমর্থিত)। এটা হয়তো আমরা যা পেছনে ফেলে এসেছি এবং আমরা গভীরভাবে যার প্রতীক্ষায় আছি— জীবনের এক ভিন্ন গতি (ধীরতা যেখানে সুন্দর)— তার সাথে আমাদের বিচ্ছিন্ন সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।

    আর্টওয়ার্ক: কোয়ারেন্টাইন
    শিল্পী: হিলাল জেক্যান
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সে যাই হোক, কর্পোরেট সেক্টরে ছিলেন এমন অনেককেই আমি জানি, যারা নিওলিবারেল কালপর্বে জটিল জীবনযাপনের সমস্ত কিছুই নিলামে তোলার ইঁদুরদৌড় খাপ খাওয়াতে না পেরে কর্পোরেট দুনিয়া থেকে বের হয়ে এসেছেন। তারাই একসময় ‘সাহসী ও সুন্দর’ এর এই জীবন বিপুল উৎসাহে বেছে নিয়েছিলেন— যেখানে আপনি কোনও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটেই থাকুন আর অবকাশ যাপনের জন্য সমুদ্রবিলাসেই থাকুন না কেন, আপনাকে অবশ্যই নিজের ল্যাপটপে মনোযোগ রাখতে হবে। আমি এমন অনেক লোককে জানি যারা জীবনকে পুনরায় খুঁজে পেতে গত কয়েক দশকে তাদের নিশ্চিত স্বাচ্ছন্দ্যের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নিওলিবারেল যুগ আমাদেরকে অতিক্রম করে যাওয়ার সাথে সাথে, গতির সাথে আধুনিকতার দহরমমহরমও দ্রুত শেষ হতে চলেছে। করোনা ভাইরাস কেবল সেই পরিণতিই আমাদের সামনে মঞ্চস্থ করে চলেছে। এই লেখার শুরুতেই ‘ভোগের কোয়ারেন্টিন’ এবং এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলোকে নির্দেশ করা উদ্ধৃতিটি কৃচ্ছতাবাদী কোনও গান্ধীবাদী তপস্বী কিংবা পুনরায় প্রাণ ফিরে পাওয়া কোন বামপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট-বুদ্ধিজীবীর নয়; বরং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে বেঁচে থাকা এবং কাজ করা কারোর উদ্ধৃতি।

    জৈব রাজনৈতিক [১] কলকব্জা

    ‘পুঁজিবাদের পরের জীবন’ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, এই বিষয়ে জোর দেয়া জরুরি যে, জৈবরাজনৈতিক কল্পনা থেকে আমরা যদি মুক্ত হতে না পারি তাহলে খুব সম্ভবত করোনা ভাইরাস মোকাবেলার নামে আমরা এক ভয়ঙ্ককর পরিস্থিতিতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি। নতুন প্রযুক্তির জৈবরাজনৈতিক বিভীষিকার যে উন্মোচন মিশেল ফুকোর মারাত্মক দুঃস্বপ্ন ছিল, সেই বিভীষিকারই আরো বিস্তৃত রূপ সঙ্গতকারণেই আমাদেরকে আতঙ্কিত করা উচিত। এর কিছু কিছু সম্প্রতি ইজরায়েলের ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি তুলে ধরেছেন।

    মিশেল ফুকো

    ফুকোর বায়োপলিটিকস হলো খোদ জীবনকেই সরকারি ক্ষমতার বস্তুতে পরিণত করা। মৃত্যুহার হ্রাস, প্রত্যাশিত আয়ু বাড়ানোসহ এমন মেলা অপেক্ষাকৃত ‘মঙ্গলজনক’ কর্মসূচির মাধ্যমে এর শুরু হয়। এই প্রাথমিক ‘মঙ্গলজনক’ নাক গলানোই অবশেষে মানুষের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে আধুনিক সরকারি হস্তক্ষেপের অনুমোদন এবং নৈতিক ন্যায্যতা দিয়েছে। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র মানুষের জীবনের এত গভীরে পৌঁছাতে পারে যা পুরোনা সাম্রাজ্য ও সার্বভৌম রাজাদের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। সর্বাত্মক নজরদারি রাষ্ট্রগুলো কর্তৃক ক্ষমতাকে ক্রমাগত কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা তখন থেকেই ভয়াবহভাবে বেড়েছে এবং আমরা ভারতেও সেই হতবুদ্ধিকর নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবৃদ্ধির ট্র্যাজি-কমিক ( নাকি পরাবাস্তব?) সংস্করণ প্রত্যক্ষ করছি। ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত হারারির উল্লেখিত প্রবন্ধে তিনি যেমনটি বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারি মোকাবেলার ক্ষেত্রে চীনের মতো অনেক রাষ্ট্রের সরকারই নজরদারির নিত্যনতুন প্রযুক্তি নজিরবিহীন কায়দায় ব্যবহার করছে:

    জনসাধারণের স্মার্টফোনগুলোকে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আওতায় এনে, লক্ষ লক্ষ চেহারা-শনাক্তকরণ ক্যামেরা ব্যবহার করে, এবং জনসাধারণকে তাদের দৈহিক তাপমাত্রা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চেক করতে এবং এই বিষয়ক প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য করে, চীনা কর্তৃপক্ষ শুধু যে দ্রুততার সাথে সন্দেহভাজন করোনাভাইরাস বাহকদেরকে শনাক্ত করতে পেরেছে তাই নয়, তাদের গতিবিধিও ট্র্যাক করতে পেরেছে, এবং তাদের সংস্পর্শে আসা যে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। নাগরিকদেরকে সংক্রমিত রোগীদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে একগুচ্ছ মোবাইল অ্যাপস সতর্ক করে দেয়।

    অনুবাদ ইরফানুর রহমান রাফিন

    আমি এখানে এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে তুলে ধরতে চাই কারণ আধুনিক রাষ্ট্র এবং শাসনপ্রণালী নিজেই জৈবরাজনৈতিক কলকব্জা গঠন করে; এই গঠনপ্রক্রিয়া কেবলই মূলধন আর পুঁজিবাদের একচেটিয়া মামলা নয়। একটা রাষ্ট্র প্রবণতার দিক থেকে বামপন্থি বা সমাজতান্ত্রিক কিনা এতে আদৌ কিছু এসে যায় না এবং বিশ শতকের সমাজতান্ত্রিক রেজিমগুলো সর্বাত্মকবাদী (নাগরিকদের জীবন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে) হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই রেজিমগুলো বাছবিচার ছাড়াই জৈবরাজনৈতিক কলকব্জায় পরিণত হয়েছিল। আমি এখানে এই বিষয়টি ঊর্ধে তুলে ধরতে চাই কারণ আমাদের সমসাময়িক অনেক চিন্তাভাবনাই রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে চিন্তা করতে অপারগ বলে মনে হচ্ছে এবং পুঁজিবাদের পরের জীবন সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে গেলে আমাদের অবশ্যই রাষ্ট্রকাঠামোর বাইরে ভাবতে পারতে হবে।

    যাইহোক, এই মুহুর্তে, এই লেখাটিতে আমার ঝোঁক শেষপরিণতির চিত্র ভাবার দিকে নয় কারণ আজকাল এ নিয়ে মেলা ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। কোভিড-১৯ এর এই কালে হতাশার অনুভূতি সর্বজনীন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। আর ইতোমধ্যেই বিরাজমান হতাশাজনক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ভারতে এই প্রবণতা আরো তীব্র হয়েছে। একটা বৈশ্বিক মহামারির মোকাবেলা অপরাপর যে সকল দুর্যোগের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেই সকল দুর্যোগের আলামতও ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: হেড ইন ক্লাউডস
    শিল্পী: ইমানুয়েল দেল রসো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এর মধ্যে আরও আছে নাওমি ক্লেইনের পূর্বাভাস, ট্রাম্প ও তার মোসাহেবগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মূলত দায়ী কর্পোরেশনগুলোকেই বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ক্লেইন পুঁজিবাদ, বিশেষত ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ কীভাবে প্রতিটি শক (Shock), প্রতিটি বিপর্যয়কে আরও বেশি অর্থোপার্জন ও মুনাফা কামানোর সুযোগে রূপান্তরিত করে সে সম্পর্কে তাঁর যুক্তি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। [হতাশাজনক পরিস্থিতি সম্পর্কে The Intercept এ প্রকাশিত ক্লেইনের ভিডিও বার্তার শ্রুতিলিখনের অনুবাদ ও একই বিষয়ে The Vice এ প্রকাশিত ক্লেইনের একটি সাক্ষাতকারের অনুবাদ  এখানে হাজির করা হলো— অনুবাদক]

    রূপান্তরশীল পুঁজিবাদ

    আমি অবশ্যই হারারি এবং ক্লেইন উভয়ের সাথেই একমত। যদিও ক্লেইনের ভিডিওর দ্বিতীয় অংশটি প্রকৃতপক্ষে আশার কথা বলেছে যেহেতু তিনি সঙ্কটটিকে স্বাস্থ্যসেবা বহুমুখিকরণের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখতে চাইছেন। আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ‘গ্রিন নিউ ডিল’[২] এর দাবিকে জোরালো করতে এই সংকটের পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর গুরুত্বের কথাও বলছেন— আসলে একই কথা অন্য আরো অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বলে যাচ্ছেন। সংকটের প্রতিক্রিয়ায় সরকারগুলো যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, অনেক পণ্ডিত ও বিশ্লেষকই ভাবতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন যে এর ফলে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনায় একটি পরিবর্তন ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দ্য গার্ডিয়ান– এ লিখিত প্রবন্ধে পণ্ডিত এবং বিশ্লেষক উইলিয়াম ডেভিস পরামর্শ দিয়েছেন যে এটি সম্ভবত ‘বিশ্বজগতের ঘটনা’ হয়ে উঠবে যা ‘নতুন অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সূচনা’র দ্বার উন্মোচন করবে।’ ডেভিস এখনও এই নতুন সূচনাটিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের মধ্যে এক ধরনের রূপান্তরের আগাম ঘোষণা হিসেবে দেখেন। তবে, এখানে আমার মনোযোগ অন্যদিকে কারণ স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে সিস্টেমের কাছ থেকে আমরা যা কিছু আদায় করতে পারি পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তাকে ছাপিয়ে আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে, আমাদের অবশ্যই সাধ্যের সবটুকু অর্জন করতে হবে— গ্রিন নিউ ডিল, সাময়িক সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (Universal basic income-UBI), এবং স্পেনের মতো স্বাস্থ্যসেবার সাময়িক জাতীয়করণও হতে পারে। আসল ব্যাপার হলো অনেক সরকার— এমনকি ইংল্যান্ডের বরিস জনসনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের মতো ডানপন্থি সরকারগুলোকেও সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে কোম্পানিগুলোর বেতনভুক্ত শ্রমিকদের ৮০ শতাংশকেই সরকার বেতনভর্তুকির আওতাভুক্ত করবে (উপরের লিঙ্কে ডেভিসের নিবন্ধটি দেখুন) ।কিছুদিন আগ পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এমন কোন সিদ্ধান্তের ঘোষণা অভূতপূর্ব ও কল্পনাতীত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার নীচে অবস্থিত সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ন্যূনতম আয় গোছের নগদ অর্থ বিতরণের বিষয়টি গুরুতর আলোচনার মধ্যে রয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনে অ্যাবি ভ্যাসলিসের টাইম ম্যাগাজিনে অ্যাবি ভ্যাসলিসের ( Abby Vesoulis) পর্যবেক্ষণ :

    স্যান ডিয়েগো’র সেন্টার ফর এথিক্স, ইকোনমিক্স এবং পাবলিক পলিসির পরিচালক ম্যাট যোলিন্সকি (Matt Zwolinski) বলেছেন, ‘একজন রিপাবলিকানের ২০২০ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের আহবান জানানো এই ইঙ্গিত দেয় যে ইউবিআই(UBI) জনপ্রিয় হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘ডানপন্থি কোন রাজনীতিবিদের এরকম কিছু সমর্থন করাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ; একটি নির্দিষ্ট বলয়ে, যারা অন্যসময়ে এই দাবি ও উদ্যোগকে এক ধরনের ‘সমাজতন্ত্র’ হিশেবে দেখতেন, তাদের মধ্যে এই প্রকল্পের ন্যায্যতা সৃষ্টি করতে এটি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

    আমার মতে, এই জাতীয় নীতিমালা ও ব্যবস্থাকে, (যদিও তারা স্বল্প-মেয়াদী ব্যবস্থা হতে পারে), অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার সাথে নতুন প্রবণতা হিশেবে গাঁটছড়া বাঁধার সম্ভাবনা আছে। সর্বজনীন ন্যূনতম আয় এমন একটি উদাহরণ। এইসব নীতিমালা মধ্যমেয়াদে অধিকতর মৌলিক পুনর্বিবেচনার দিকে ধাবিত করতে পারার মত প্রশ্ন হাজির করতে পারে, যেমনটি এতদিন ধরে করে এসেছে পরিবেশবাদী অর্থনীতির বিভিন্ন ঘরানা এবং আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে প্রবৃদ্ধি-বিরোধি/ প্রবৃদ্ধি-উত্তর আন্দোলন (এ সম্পর্কে Kafila তে আমরা আগেও লিখেছি)। এই সমস্ত কর্মপরিকল্পনা পুঁজিবাদের রূপান্তর না ঘটিয়ে পারেই না— এমন রূপান্তর যা পুঁজিবাদী শোষণের পাটাতনকে অক্ষত রেখে টুকিটাকি পরিবর্তনের চর্চাকে বহুদূর পর্যন্ত ছাপিয়ে যাবে।

    পুঁজিবাদের পরের জীবন

    আমি এখানে যে পরিবর্তনগুলোর কথা বলছি তার মধ্যে অন্য কিছু ব্যাপার আছে যা আমলে নেয়া দরকার। এটি দীর্ঘকালীন দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন যা বেশ কিছুকাল ধরেই ঘটে চলেছে তবে বর্তমান সংকটের প্রবল ঝাঁকুনি এই পরিবর্তনগুলোকে আরো তীব্রতার সাথে অবশ্যসম্ভাবী করে তুলছে। মার্কসবাদীরা এখনও মনে করেন ‘বৈপ্লবিক’ উপায়ে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমেই কেবল পুঁজিবাদের চূড়ান্ত রূপান্তর সম্ভব। এবং কোন না কোনভাবে ভোগকে ছেঁটে ফেলে বা প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করে এমন যেকোনও পরিবর্তনকে তারা ‘পশ্চাৎগামিতা’ মনে করে। তাদের ‘ধর্মীয়’ শাস্ত্র অনুযায়ী পুঁজিবাদকে কেবল ‘আরও অগ্রসর’ (আজকের দুনিয়ায় এর যা যা মানে হওয়া সম্ভব) কোনকিছু দ্বারাই ছাপিয়ে যাওয়া সম্ভব। একটি সাদামাটা নজির হিশেবে, আমি আরও একবার এই লেখার শুরুতে উদ্ধৃত লি এডেলকুর্টের সাক্ষাতকারটির প্রসঙ্গ টানতে চাই। আমি যখন প্রথমে আমার মার্ক্সবাদী বন্ধুদের সাথে এডেলকুর্টের সাক্ষাতকারটি শেয়ার করলাম, তারা তার সমস্ত কথাকেই ‘ভোগের কোয়ারেন্টিন’, ‘পিছিয়ে পড়া’ হিশেবে বিবেচনা করে এক কথায় বাতিলই করে দিল। তারা ধরেই নিয়েছিল কোন গান্ধীবাদী মেজাজের তপস্বীর কাছ থেকে কথাগুলো আসছে। আমার ঘোরতর সন্দেহ এডেলকুর্ট ব্যক্তি হিশেবে কে এটা খুঁজে বার করার মত ধৈর্যও আমার এই মার্ক্সবাদী বন্ধুদের ছিল না। তার ব্যাপারে আমার কাছে সবচেয়ে যেটা চমকপ্রদ লেগেছে সেটি হলো তিনি কর্পোরেট দুনিয়া— আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে ফ্যাশন ও ডিজাইন জগতের প্রাণকেন্দ্রের মানুষ—ফলে তার বক্তব্য কোন ক্ষ্যাপাটে গান্ধীবাদী কিংবা ‘বিকারগ্রস্ত পরিবেশবাদী’র বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আমার বদ্ধমূল ধারণা, তার এই অবস্থান আমার পূর্বেই উল্লেখিত প্রবণতার সাথে জড়িত, কর্পোরেট দুনিয়ার বহু মানুষ সেই দুনিয়া থেকে বের হয়ে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চাইছে স্কুল চালানো থেকে শুরু করে জৈব কৃষি সহ অন্য অনেক কাজের মাধ্যমে।

    আর্টওয়ার্ক: কোভিড
    শিল্পী: মেনেকসে কাম
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এই প্রবণতা আমাদেরকে কোন পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে কি যাবেনা, তা অন্য অনেক কিছুর সাথে নির্ভর করছে আমাদের ভিশন ও পুঁজিবাদ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া পুনর্বিবেচনার মধ্যে।

    প্রথমত, রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের পতনের কারণ অন্বেষণের কোন গভীর বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যার অনুপস্থিতিতে, ‘বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতার দখল’ সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত করবে বা পুঁজিবাদের রূপান্তর ঘটাবে এমনটা বিশ্বাস করার কোন কারণই নেই। অন্যদিকে, যদি কেউ যুক্তি দেয় যে নানাবিধ কারণে পুঁজিবাদ আগাগোড়া (যেমন সভ্যতার পূর্বশর্ত হিশেবে ‘সম্পদ তৈরি’-করের মাধ্যমে রাজস্ব উৎপাদন যা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি তৈরির মাধ্যমেই সম্ভব), পূর্বেও এবং এখনো, আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকল্প; তাহলে আমাদের কাছে পরিস্কার হয় কেন বিপ্লব পরবর্তী প্রতিটি রাষ্ট্রই পুঁজিবাদে পর্যবসিত হয় কিংবা সংকটে পতিত হয়। অবশ্য, পণ্য উৎপাদন, বাজার সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং শিল্পোদ্যোগ মাত্রই তা পুঁজিবাদের লক্ষণ বা অনিবার্যভাবে পুঁজিবাদের দিকে পরিচালিত করে এমন বিভ্রান্তিকর ধারণাও পুঁজিবাদের রূপান্তর কিংবা পুঁজিবাদ-উত্তর সমাজ গঠনের এক বড় অন্তরায়। এগুলো শত শত বছর ধরে পুঁজিবাদের দিকে যাওয়া ব্যতিরেকেই মান্ধাতার আমল থেকে বিরাজমান ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের মতো দেশগুলোতে এগুলো এখনও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে যা পুঁজিবাদী নিয়মে চলে না। (বিস্তারিত বোঝার জন্য কল্যাণ স্যানালের ‘প্রয়োজনের অর্থনীতি‘র ধারণার সাথে ‘পুঞ্জিভবনের অর্থনীতি’র পার্থক্য খেয়াল করতে পারেন।) প্রকৃতপক্ষে, উপরের প্রথম বন্ধনীতে নির্দেশিত পার্থক্য যদি কেউ গভীরভাবে লক্ষ্য করে থাকেন, তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন ভারত এবং দক্ষিণ বিশ্বের বিরাট অংশে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় (UBI) একটি নির্মম ধারণা কারণ তা আগেই সম্পূর্ণ সর্বহারাকরণকে (proletarianization) মেনে নেয়। যেসব সমাজে সম্পত্তির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিকনা আছে, সেখানে ইউবিআই (UBI) তাদেরকে কেবলমাত্র রাষ্ট্রের জৈবরাজনৈতিক কলকব্জায় পরিণত করবে। নিজেদের জীবনের উপর তাদের যে ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসন ও নিয়ন্ত্রণ আছে, সেটিকে ধ্বংস করবে।

    দ্বিতীয়ত, প্রায় ক্ষয়িষ্ণু প্রকৃতির সংকটের মুখে নিরবিচ্ছিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাদকে রূপান্তরে বাধ্য করা সম্ভব নয়— এমনটা মনে করার কোন কারণই নেই। পুঁজিবাদ যেমন সামন্ততন্ত্রের মতো পুরানো অর্থনীতির রূপান্তর ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল ঠিক তেমনই । তবে আমার মাথায় ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’ গোছের এমন কোন ‘বিপ্লব’ নেই যা সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পুঁজিবাদ নিশ্চিত করেছিল। পল ম্যাসন খুব সম্প্রতি তাঁর PostCapitalism-A Guide to Our Future বইতে পুঁজিবাদের ‘মিউটেশন’ ও একটি পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যত সমাজের কথা বলেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হ’লো তিনি দেখান যে, পূর্ববর্তী সমস্ত সংকটগুলোর যাবতীয় পরিবর্তন পুঁজিবাদকে পুঁজিবাদেই অপরিবর্তিত রাখে। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ মৌলিকভাবে উৎপাদন ও শ্রমের শর্তকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে যে, পুঁজিবাদের এখন আর পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে না। এটিকে এখন পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যতকে জায়গা করে দিতে হবে। যদিও হুবুহু পশ্চিমের বাস্তবতায় তার যুক্তির প্রাসঙ্গিকতা আছে, কিন্তু তিনি প্রযুক্তিতে মুগ্ধ এবং ইউবিআই (UBI) এর পক্ষে ওকালতি করা অনেকও আজকাল পূর্ণ অটোমেশন এবং শ্রমকে সম্পূর্ণ অবসর দেয়ার পক্ষে। (আমার এমনই মনে হয়েছে।) এ বিষয়ে এখানে আমি বিস্তারিত যেতে চাইনা কারণ এই লেখায় আমার মূল মনোযোগ পুঁজিবাদের রূপান্তর। এমন মনে করার সত্যিই কোন কারণ নেই যে পুঁজিবাদ-উত্তর ভবিষ্যত পুঁজিবাদের ভিতর থেকেই ছোট ছোট রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আসবে না বা আসতে পারে না। তবে সেই উত্তর-পুঁজিবাদ কেমন হবে? উপরের আমার বক্তব্যটি যদি সঠিক হয় তবে এর অর্থ সব রকমের পণ্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলোপ হতে পারে না; এর অর্থ সর্বজনীন, সমষ্টিগত সম্পত্তি, সমবায় ও বাজারের সম্পর্কের (এমনকি টাকাও; পল পটের কাম্বোডিয়ায় যেমনটি হয়েছিল) বিলুপ্তি হতে পারে না। এর অর্থ পণ্য উৎপাদন, যাবতীয় সম্পত্তি, বাজার সম্পর্কের রাষ্ট্রীয় প্রতিস্থাপন নয় এবং বাজারের যা করার কথা তাই করার মত কোনও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা সংস্থার আবির্ভাবও না। প্রকৃতপক্ষে, এই জাতীয় কল্পনা চোখ বন্ধ করে ইংল্যাণ্ডকে পুঁজিবাদের ‘ধ্রুপদী রূপ’ হিশেবে ধরে নেয়ার (এমনকি খোদ মার্ক্স পর্যন্ত তাই করেছিলেন) ‘যৌক্তিক’ পরিণতি। সাধারণ সম্পত্তির বেসরকারিকরণ, কৃষক সম্পত্তিসহ সব কিছুর বুর্জোয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর এবং কেবলমাত্র বুর্জোয়া ব্যতীত বাদবাকি সবাইকে সম্পত্তিহীন ‘সর্বহারা’য় পরিণত করা। এই বোঝাপড়াই সমস্ত রকমের সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ‘আত্মসাৎকারীদের আত্মসাৎ’ (expropriation of the expropriator) মার্কা সমাজতন্ত্রের কল্পনা হাজির করেছিল। তাত্ত্বিকভাবে, হয় সব সম্পত্তি ইতোমধ্যেই বুর্জোয়া সম্পত্তি ছিল অথবা আরো করুণ অবস্থা, কমিউনিস্টদের দ্বারা ‘বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন’ করার মাধ্যমে সব সম্পত্তিকে আগে বুর্জোয়া সম্পত্তিতে পরিণত করতে হবে।

    আর্টওয়ার্ক: সামিট
    শিল্পী: ফাদিটুন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন প্রচুর কাজ বর্তমানে বিদ্যমান যেগুলো দেখাচ্ছে যে, বিংশ শতাব্দীতে ভোগের উল্লম্ফন আবশ্যিকভাবেই ‘পুঁজিবাদের অমোঘ বিধান’ ছিল না, বরং মানুষকে কীভাবে ভোগের বস্তুতে পরিণত করা যায় সেই দুরভিসন্ধি দ্বারা তাড়িত ছিল। পুরোনা শহরগুলোকে ধ্বংস করা থেকে শুরু করে এবং তাদেরকে পরে এমনভাবে ঢেলে সাজানো যেন মনে হয় অটোমোবাইল ছাড়া শহরগুলো অচল; ভোগের ক্ষেত্রে বিরাজমান রীতিনীতিকে পরিকল্পিত উপায়ে অকার্যকর করে তোলা পর্যন্ত পুরোটাই ছিল ব্যবয়াসিক ধান্দা। পুঁজিবাদী উপায়ে ফাংশন করার স্বার্থে অর্থনীতিকে ক্রমাগত ভোক্তা উৎপাদন করতে হয়েছিল এবং এই ‘দুশ্চিন্তা’ ছিলই যে, মানুষজন যদি ভোগ বন্ধ কিংবা কমিয়ে দেয় তাহলে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। এবং এই প্রক্রিয়াগুলো জারি রাখার জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দোহাই ছিল। আমরা সবসময়ই ভেবে এসেছি যে, কেবলমাত্র অবৈতনিক শ্রমই ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ উৎপাদন করে এবং কখনোই এই বাস্তবতা আমলে নেইনি যে (উৎপাদন-ভোগ-প্রবৃদ্ধির) পরিবেশগত মাশুল অপরিশোধিতই থেকে যাচ্ছে। কেবল ‘প্রাকৃতিক কাঁচামাল’ এর ব্যবহারের মূল্য চুকানো অর্থে নয়; বরং বাস্তুসংস্থানের ধ্বংসযজ্ঞ, বায়ু দূষণ করা, পানি দূষণ, নদী শুকিয়ে মারা এবং বর্তমানে সারা বিশ্ব যে বিপর্যয়ের কবলে পড়েছে তার মাশুল চুকানো অর্থে বলা হচ্ছে। এই লেখাটিতে আমরা রবার্ট ওয়ালেসের ২০১৬ সালে লিখিত বই-Big Farms Make Big Flu‘র উপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক প্রকাশিত, চীনের অণুজীববিজ্ঞান সংক্রান্ত শ্রেণীযুদ্ধ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে গ্রাফ সহকারে যা বর্ণিত হয়েছে, সেই প্রসঙ্গটি আলোচনা করিনি। প্রবন্ধটি ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করে থাকতে পারে তা প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞানীরা আরও আশঙ্কা করছেন যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গলতে থাকা হিমবাহগুলো বরফের একেবারে নিচে চাপা থাকা সুপ্ত ভাইরাসগুলোকেও উন্মুক্ত করবে। আমরা যদি অপরিশোধিত শ্রমের সাথে পুঁজিসৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির মূল্য বিচার করি তাহলে ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বলে আর কিছুই বাকি নেই। ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ -এর কল্পকাহিনী কেবল ততক্ষণই বজায় রাখা যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম অপচয়কে আমলে না নিয়ে সম্পদসৃষ্টির হিসাব একদিক বিবেচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শেষ পর্যন্ত, এটি কেবল শূন্য সমষ্টির গেইম (zero sum game) কিংবা আরো খারাপ পরিস্থিতিতে নেতিবাচক সমষ্টির গেইম ( negative sum game) এ পরিণত হতে পারে। পুঁজিবাদের পরের জীবন নিশ্চিতভাবেই চিন্তনীয় যদি আমরা পুঁজিবাদকে ভিন্নিভাবে চিন্তা করতে শিখি। পুঁজিবাদকে কেবল আর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শ্রমিক শ্রেণীর এন্টি-থিসিস (anti-thesis) হিশেবে ভাবাই যথেষ্ট নয়, পুঁজিবাদ আজকে সমগ্র মানব অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অর্থাৎ ৯৯ ভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত মালিকানা বনাম রাষ্ট্রীয় মালিকানা কিংবা বাজার বনাম রাষ্ট্রের অত্যন্ত ক্লিশে তর্ককে ছাপিয়ে প্রথমবারের মতো পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে এমন জীবনের সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অনুবাদকের টীকা
    ১. এই প্রবন্ধটিতে প্রবেশ করার একটি অন্যতম চাবিশব্দ হচ্ছে ‘বায়োপলিটিকস’ তথা ‘জৈব রাজনীতি’। বায়োপলিটিকস শব্দটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকলেও এই প্রবন্ধে এটি মূলত ফুকোডিয়ান বায়োপলিটিকস হিশেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ফরাসি তাত্ত্বিক ও দার্শনিক মিশেল ফুকো যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার করতেন সেই অর্থে। জৈবরাজনীতির ফুকোডিয়ান তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষের জীবন সার্বভৌম রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হওয়া। এটি আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের এমন এক প্রকৌশল যা জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলিত করে।

    প্রাচীন বা মধ্যযুগের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন রাজা। তিনিই সব ক্ষমতার উৎস ছিলেন। তাঁকে অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান ছিল এবং সেটা প্রয়োগ করা হতো প্রকাশ্যে, সর্ব সম্মুখে। যাতে করে প্রজাগণ বুঝতে পারে সার্বভৌম ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করলে কী ভয়াবহ শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতনের সাথে সাথে পাল্টাতে থাকে শাস্তির ধারণা ও প্রকৌশল। আঠারো শতকে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর ইউরোপের সর্বত্রই এই শাস্তি প্রদানের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ শুরু হয়। ফলে আবিষ্কৃত হয় ‘শাস্তির নম্র উপায়’। মধ্যযুগে প্রজার প্রাণ হরণের মধ্যে নিহিত ছিল সার্বভৌম শাসকের চূড়ান্ত ক্ষমতা। আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলিত করা ও অনুশাসনের ছকে আবদ্ধ করার মত শাসনপ্রণালী গড়ে উঠেছে।

    তারপরেও মানুষকে বধযোগ্য প্রাণে পরিণত করার মত মধ্যযুগীয় চর্চাও আধুনিক রাষ্ট্রের জৈবরাজনীতির অংশ। রিমান্ডে টর্চার থেকে শুরু করে এনকাউন্টার-ক্রসফায়ার এর অংশ। পার্থক্য শুধু এই যে আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার এমন সব কলাকৌশল রপ্ত করেছে যা রাজতন্ত্রের সার্বভৌম রাজার পক্ষে অকল্পনীয় ছিল।

    ফুকো মনে করতেন, আধুনিক ক্ষমতাকে কেবল কেতাবী সংজ্ঞায় বোঝা সম্ভব নয়। ক্ষমতাকে বুঝতে হবে তার কার্যকলাপ, প্রয়োগ ও বিস্তারের মাধ্যমে। এই আধুনিক ক্ষমতার একটা জৈবিক অস্তিত্ব রয়েছে। এটি হচ্ছে ক্ষমতার সেই প্রকৌশল যা দিয়ে রাষ্ট্র নাগরিক জনগোষ্ঠীকে শাসনের অনুকূল বশ্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত করে। তাদের জীবন-মৃত্যুর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মহামারি নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিজের শরীরও হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র। জৈব রাজনীতির মাধ্যমে আধুনিক শাসনপ্রণালী নাগরিকের জীবনের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। জীবন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগের অবজেক্ট। পুলিশ, আইন-আদালত, ক্লিনিক, কারাগার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও আপাত অর্থে রাষ্ট্র নয় এমন সব প্রতিষ্ঠান এবং মাইক্রো থেকে ম্যাক্রো লেভেল পর্যন্ত জীবনকে কেন্দ্র করে জৈব রাজনীতির চর্চাই ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র-শাসনপ্রণালীর অন্যতম প্রধান চিহ্ন। তবে এই জৈবরাজনীতি এতদিন পর্যন্ত ছিল রাজনৈতিক লক্ষ্য, করোনা মহামারির কালে তা নতুন সম্পর্কপ্রণালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে-শরীর মাত্রই ‘সন্দেহজনক’, আচরণ মাত্রই ‘বিশেষ সতর্কতা’। আদিত্য নিগাম এই ভয়াবহতাকেও খেয়াল রাখা কথা বলছেন।

    [২] গ্রীন নিউ ডিল (জিএনডি) হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিপুল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত আইনের প্যাকেজ। গ্রীন নিউ ডিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ পরিণতি এড়াতে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের মাত্রা ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং জাতিগত বর্ণবাদের রাষ্ট্রীয় সমস্যাকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করা। ২০১৮ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের রিপোর্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিজ্ঞানীদের দুটি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই মূলত গ্রিন নিউ ডিলের পক্ষের রাজনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা তাঁদের যাবতীয় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। রিপোর্টগুলোতে বলা হয়েছে, যদি তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে তাহলে তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং খরা দুনিয়ার পরিবেশ-প্রতিবেশকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করবে। আরো বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখোমুখি হবে। গ্রিন নিউ ডিলের সমর্থকরা মনে করেন, কেবলমাত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক-রাষ্ট্রিক সকল প্রকারের বৈষম্য, নিপীড়নের অবসানের মধ্যেই মানবসভ্যতার ভবিষ্যত নিহিত।

    তথ্যপঞ্জি
    দীপেশ চক্রবর্তী ( ২০১৬) ‘আরেক টোয়েন্টি টোয়েন্টি: পৃথিবীর উষ্ণতা-বৃদ্ধি ও মানুষের ইতিহাস’; ইতিহাসের জনজীবন ও অন্যান্য প্রবন্ধ ; আনন্দ পাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, কলকাতা

  • কর্নেল তাহের রূপকথার ৩৭ বছর: কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা

    কর্নেল তাহের রূপকথার ৩৭ বছর: কর্তৃত্বপরায়ণ সমাজতন্ত্রের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: বর্তমান রচনাটি জাসদ-ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কর্তৃক ২২শে জুলাই ২০১১ তারিখে আয়োজিত তাহের-দিবসের আলোচনার পরিমার্জিত ও পুনর্লিখিত অডিও-অনুলিপি। অডিও ইউটিউবে: কর্নেল-তাহের-রূপকথার ৩৭ বছর

    অডিও অনুলিপির পরিমার্জনা শেষ হয় ২০১৩ সালে। এরপর দৈনিক বণিক বার্তা: ২৩শে নভেম্বর ২০১৩, ২১শে ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮শে ডিসেম্বর ২০১৩, দৈনিক সোনার দেশ: ৭ই নভেম্বর ২০১৩, ২৩শে নভেম্বর ২০১৩, ৭ই ডিসেম্বর ২০১৩, ১৪ই ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮শে ডিসেম্বর ২০১৩ রচনাটি প্রকাশিত হয়।

    বর্তমান সংস্করণটি লেখকের অচেনা দাগ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। (more…)

  • ধীমান দাশগুপ্ত।। আফগানিস্তানই কি ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট?

    ধীমান দাশগুপ্ত।। আফগানিস্তানই কি ‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট?

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    আজ আমরা ‘মানবিক অনুষদ’-এর বিষয় বলে যেসব বিষয় পড়ছি, এই গোটা অনুষদেরই মূল বা আদিতম বিষয় নাকি ছিল ইতিহাস। এমনটা সম্ভবত একারণেই বলা হয়ে থাকে যে, জ্ঞান প্রপঞ্চে প্রতিটি শাখারই একটি ইতিহাস থাকে— এমনকি গণিত অথবা জ্যোতির্বিদ্যার মত বিমূর্ত বিষয়গুলোতেও—আর ইতিহাসের প্রতিটি টুকরোরই রয়েছে একটি ভূ-প্রাকৃতিক প্রেক্ষিত বা পরিসর। (more…)

  • মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নৈরাজ্য

    মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নৈরাজ্য

    • সেলিম রেজা নিউটন
    আর্টওয়ার্ক: সত্যাগ্রহ
    শিল্পী: পরেশ মৈত্র
    সূত্র: টুইটার

    সহিংসতার ঘনীভূত ও সুসংহত রূপের প্রতিনিধিত্ব করে রাষ্ট্র। ব্যক্তির আত্মা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু আত্মাবিহীন একটা মেশিন, সেহেতু তা কখনোই সহিংসতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না— কেননা এর খোদ অস্তিত্বটাই তো সহিংসতার কাছে ঋণী। (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, ১৯৩৪-ক: ৩১৮)

    (more…)

  • অক্টোবর-মহাসংকট: মাৎস্যন্যায়-পর্ব

    অক্টোবর-মহাসংকট: মাৎস্যন্যায়-পর্ব

    • সেলিম রেজা নিউটন

    সম্পাদকীয় নোট: আগস্ট বিদ্রোহের এক যুগ। ২০০৭ সালে সেনাকর্তৃত্বের জরুরি শাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। যে অল্প  ক‘জন শিক্ষক সেই জরুরি শাসনকে ক্রিটিক্যালি  দেখতে পেরেছিলেন  সেলিম রেজা নিউটন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না’- এই উচ্চারণকে ধারণ করে প্ররতিবাদী মৌন মিছিল করার দায়ে তিনিসহ তাঁর সহকর্মিদের আটক করা হয়। জরুরি আইন ভঙ্গের দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁদের। অতঃপর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তাঁদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। কারামুক্তির পর ক্ষমতা-কর্তৃত্ব- রাষ্ট্র-সমাজ-কারাগার-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নিয়ে বিপুল পরিসরে রচনা শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন, যা এখনও চলমান। তাঁর অচেনা দাগ গ্রন্থের তৃতীয় দাগে জরুরি শাসন সংক্রান্ত রচনা সংকলিত হয়েছে। আগস্ট বিদ্রোহের যুগপূর্তিতে অরাজ ধারাবাহিতভাবে তা প্রকাশ করছে। (more…)

  • ‘নেতা হতে আসি নাই’: নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও প্রতিরোধের নতুন ভাষা

    ‘নেতা হতে আসি নাই’: নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও প্রতিরোধের নতুন ভাষা

    • সহুল আহমদ

    ২০১৮ সালে আমরা অদ্ভুত দুইটা আন্দোলন প্রত্যক্ষ করলাম; এক কোটা সংস্কার আন্দোলন, দুই নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন। দুইটার ধরণ দুই রকম, অংশগ্রহণকারীদের বয়সও দুইরকম, তবে, একটা বিষয়ে মিল হচ্ছে তারা সকলেই শিক্ষার্থী। কোটা সংস্কার নিয়ে আলাপ আলোচনা অনেকদিন যাবত বিভিন্ন মহলে, ছাত্রসমাজ এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ, দুই মহলেই চলছিল। তাই এ আন্দোলন যতটা না আকস্মিক ছিল তাঁর চেয়ে বেশি আকস্মিক ও (more…)

  • সবুজের অভিযান

    সবুজের অভিযান

    পার্থ প্রতীম দাস

    আর্টওয়ার্ক: নিরাপদ সড়ক চাই
    শিল্পী: মিনার
    সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

    এসো নিজে করি: রাস্তার পাঠশালায় ক্লাশ      বড়রা অংশ নেবে কি? 

    স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েদের পাঠ্যবইয়ে এসো নিজে করি টাইপের অংশ থাকে। প্র্যাকটিক্যাল। সেটা তারা করে থাকে। না কি করে না, জানি না। এখন রাস্তায় নেমে সেই টাইপের একটা এসো নিজে করি জিনিসই স্কুলেজের শিক্ষার্থীরা করছে বলে মনে হচ্ছে।

    দেশ নামের একটা ক্লাস তারা নিজেরাই খুলে নিয়েছে। হাতেকলমে সব কিছু করার এই ব্যবহারিক ক্লাসের সময়সূচি নির্ধারণ করছে তারা। কোন দিন হবে, কয়টা থেকে কয়টা পর্যন্ত- সেটা তারাই ঠিক করছে। এই জিনিস অভূতপূর্ব। কোথাও দেখা যায়নি এখনো দুনিয়াতে।
    কেন হঠাৎ বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ছেড়ে এই রাস্তার ক্লাস চালু করতে হলো শিক্ষার্থীদের? কারণ যাদের হাতে রাস্তা চালানোর, দেশ চালানোর, সমাজ চালানোর দায়িত্ব তারা দিয়ে রেখেছিল, ভেবেছিল যে, এরাই তো আমাদের গুরুজন- সম্মানিয়—সেই বড়-বুড়ো মানুষরা তাদেরকে বারবার শুধু যন্ত্রণায় বিদ্ধ করেছে। শৈশব কেড়ে নিয়েছে, কৈশরের অ্যাডভেঞ্চার ভুলিয়ে দিয়েছে। খেলার মাঠ নাই, জিরোনোর সময় নাই, মনে শান্তি নাই। তারা ত্যক্ত-বিরক্ত।
    ছোটবেলা থেকে তাদের ওপর যে জুলুম চাপায়ে দেওয়া হয়, চারদিকে তারা যে অন্যায়-অনিয়মগুলো দেখে, একের পর এক ইস্যু আসছে-যাচ্ছে আর সেগুলো নিয়েরাজনীতিবিদদের উদ্ভট সব মন্তব্য, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, বানোয়াট কথাবার্তা – ইত্যাদি রাবিশ শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে তারা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেছে।
    সেই সাথে তাদের নিজেদের বঞ্চনাগুলো তো আছেই। তাদের খেলার মাঠ নাই। সব সময় একটা প্রতিযোগিতা- পাল্লাপাল্লির মধ্যে তাদের থাকতে হয়। তাদের শিক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। তাদের বিকাশ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এই সব জীবনযুদ্ধের মধ্যে শেষপর্যন্ত নিজের জান বাঁচানোটাও কঠিন হয়ে পড়ছে এই কিশোর-কিশোরীদের।
    চোখের সামনে তারা দেখছে সহপাঠীরা পিষে-থেঁতলে যাচ্ছে ঘাতক বাসের পাল্লাপাল্লির রেষারেষিতে। এই দৃশ্য তারা মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে শঙ্কা জেগেছে, ‘আগামীকাল আমি-ই সুস্থভাবে ঘরেফিরতে পারব তো?’ আমাকেই লাশ হয়ে যেতে হবে না তো? একেবারে প্রাণের তাগিদে এই স্কুলেজ (স্কুল+কলেজ) পড়ুয়া ছেলেমেয়েগুলো ঘটিয়ে দিয়েছে অভূতপূর্ব এই ক্লাস কর্মসূচির ঘটনা।
    তারা বলছে, থামো। অনেক হয়েছে। অনেক দেশ চালিয়েছ তোমরা। এমন দেশ চালাইছ যে, আমাদের বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে গেছে। আমাদের প্রাণের মূল্য শুধু কয়েক লাখ টাকা বানিয়ে দিয়েছ তোমরা। বন্ধ করো এগুলো। আমরাই এখন ক্লাস করে তোমাদের দেখায়ে দিচ্ছি দেশ কিভাবে চালাইতে হয়।
    আর্টওয়ার্ক: হোক প্রতিবাদ
    শিল্পী: তন্ময়
    সূত্র: তন্ময়’জ কার্টুন 

    তারা শুরু করেছে রাস্তায় লাইসেন্স চেকিং। ‘বাদ যাবে না একটি শিশু’ নীতিতে বিশ্বাসী মনে হয় তারা। কাউকেই বাদ দিচ্ছে না। মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী-আমলা-পুলিশ-র্যাব-সেনাবাহিনী-আমলা-উকিল-মোক্তার-সাংবাদিক-চিকিৎসক-শিক্ষক, এমনকি বাপমা পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না। সবার চলছে লাইসেন্স চেকিং। “আছে? লাইসেন্স আছে?” বলে ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছে কিশোর বিদ্রোহীরা। এই ক্লাসে তারা শিক্ষক হিসেবেও গ্রহণ করছে অনেককে। একটা ভিডিওতে দেখা গেল, এক পুলিশ কর্মকর্তা কিভাবে লাইসেন্স চেক করতে হয় শিখিয়ে দিচ্ছেন। এক জায়গায় এক পুলিশ সদস্য বলছেন কিভাবে দেশ গড়তে হবে। কথা পছন্দ হওয়াতে হ্যা, স্যার, ঠিক স্যার বলে হাততালি দিয়ে মেনে নিচ্ছে এই শিক্ষার্থীরা। এমন কত কত মানুষকে যে তারা শিক্ষক হিসেবে মেনে নিচ্ছে— হিসেব নেই।

    আবার যে শিক্ষক পছন্দ হচ্ছে না, তাকে বলে দিচ্ছে রাস্তা মাপো। বিদেয় হয়ে যাও। অনেক ফেসবুক সেলিব্রেটি, তারকারা পড়েছেন এই তালিকায়— দেখা গেল।

    আর নিজেরা এই ‘এসো নিজে করি’ ক্লাসটা করার মধ্য দিয়ে যে অন্যদের, বড়দের কত কিছু শেখাচ্ছে- তা ভাবনার বাইরে। অকল্পনীয় সব কাজ করছে তারা। কমবেশি দেখেছি আমরা সবাই। নতুন করে বলতে গিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন দেখছি না। ক্লাসটা নির্বিঘ্নে চলতে পারলে মনে হয় মন্দ হতো না— এমন কথা বলার মুখ মনে হয় কম নাই।
    কিন্তু আফসোসের বিষয় নজির সৃষ্টিকারী এই রাস্তার পাঠশালা বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। হীরক রাজারা কেঁপে কেঁপে উঠছেন। ধামাধারীদের ঘাম ছুটে যাচ্ছে— কিভাবে বাগে আনা যায় বিচ্ছুগুলাকে? চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। নানাবিধ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ফাঁদছেন। বিভ্রান্তির জাল বিছাচ্ছেন। কিন্তু বাগে আনা যাচ্ছে না যে এখনো।
    তাহলে? সর্বশেষ উপায় হিসেবে তারা সবসময়ই যেটা করেন— সেটাই করছেন। সিপাহী-প্রহরী পাঠাচ্ছেন। সরকারী-বেসরকারী সব ধরণেরই। রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনীর যৌথ ফোর্স পাঠাচ্ছেন তারা ক্লাস ভেঙে দেওয়ার জন্য। পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। ধামাধামীরা বলে বেড়াচ্ছেন, ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’।
    সবাই ছেলেমেয়েগুলোদের পারফরম্যান্সও কিন্তু দেখছে। ব্যবহার-শান্তি-শৃঙ্খলায়? হু, মোটামুটি। ভাষায়? ওরে বাবা! ফাটাফাটি! – ইত্যাদি প্রভৃতি জিনিস এভাবে কিন্তু টুকছে বড়রা-অভিভাবকরা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কিছুটা শিক্ষা নিয়ে এই এসো নিজে করি ক্লাসে যোগদান করছে কী? ছোটরা যেভাবে রাস্তায় লাইসেন্স চেক করছে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, সবাইকে লাইনে আনার জন্য; সেভাবে বড়টাও কী পারে না এভাবে নিজেদের, বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা নিজেদের হাতে নিয়ে নিতে?
    রাস্তার এই পাঠশালায় শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি যা শিখিয়েছে, তা হলো ভালোবাসা। বন্ধুর রক্ত দেখে টগবগে মাথায় শ্লোগান দিয়েছে প্রবল পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। পরম যত্নে তারা অসুস্থ-দুর্বলদের সেবা দিয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়া রিকশাচালককে নিজেরা রিকশা চালিয়ে নিয়ে গেছে। রাস্তায় কাগজ টুকিয়ে বেড়ানো পাগলটাকে ধরে এনে জামা-কাপড় পড়িয়েছে। তারপর তাকে একটা গাড়ির উপর তুলে দিয়ে বলছে, ‘এটা তোমার, তোমার’। সত্যি, কান্না চলে আসে এদের ভালোবাসা বিলানোর তরিকা দেখলে।
    তো, বড়দের হৃদয় কী একটুও গলছে না এগুলো দেখে? জানি যে, ‘বড়দের বুড়ো দুনিয়া’টা বড়ই নির্দয়-নিষ্ঠুর। কিন্তু তাই বলে কী এতই পাষাণ হয়ে গেছি আমরা? নিজেদের শিশুদের স্বার্থে বাসযোগ্য একটা পৃথিবী বানানোর জন্য আমরা কিছুই করতে পারি না? তারা এতো কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে— তারপরও না?
    না চাইলে আর আলাপ নাই। আর যদি চাই, তাহলে আসেন পথ খুঁজি। কী করা যায় ভাবি। আমার ভাবনা হলো: শিক্ষার্থীরা যেভাবে সব কিছু নিজেরা করা শুরু করেছে, তেমনি বড়রাও কিছু কিছু জিনিস নিজেরা করতে শুরু করি। ট্রাফিক পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে পারেনি বলে ছোটরা নিজেরাই লাইসেন্স চেক করতে শুরু করেছে। আমরা বড়রাও তো আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভরসা রাখতে পারছি না। আমরা কেন তাহলে পুলিশ-র্যাবের দায়িত্বটা নেব না? প্যারালাল একটা নিরাপত্তা সিস্টেম গড়ে তুলব না? এটা করার উপায়ও খুব সহজ। পাড়ায় পাড়ায়, ওয়ার্ড ধরে ধরে অভিভাবক-নাগরিকদের কমিটি গঠন করা যায়। নিরাপত্তা কমিটি। সবার কথাবার্তা-মতামতের ভিত্তিতে যেগুলো পরিচালিত হবে। পুলিশের যেরকম মোড়ে মোড়ে বক্স থাকে, সেরকম অভিভাবকরাও নিরাপত্তা চৌকি গড়ে তুলতে পারে। এলাকার নানাবিধ সমস্যা-সংকটগুলো কিভাবে দ্রুত সমাধান করা যায়, মিমাংসা করা যায়— সে বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে।
    মানুষের আসলে বাঁচার পথ এটাই। এতে করে একটা সামাজিক বন্ধনও গড়ে উঠবে। রাষ্ট্রের নির্মম নিষ্পেষণে যে বন্ধন ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। দুই তলার মানুষ, তিন তলারে চেনে না। রাস্তার একটা মানুষের কথা তো বাদই দিলাম। এমনটা হলে ষড়যন্ত্রের যাতনাও অনেকখানি কমে আসবে।
    মানুষ যখন বিচ্ছিন্ন থাকে— তখনই সেই ঘোলাজলে মাছ শিকার করতে পারে ষড়যন্ত্রকারীরা। চক্রান্তকারীরা। সেই সুযোগ আমরা দিনের পর দিন দিয়ে এসেছি রাজনীতিবিদদের। ফলে এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, যে কোনো কিছুতেই তারা একটা না একটা ষড়যন্ত্র খুঁজে পান। এবং জল ঘোলা করে দিয়ে মাছ শিকার করতে থাকেন আরামসে। দেখা হয়নি এখনো এই জিনিস? নাকি আরও বাকি আছে? বাকি থাকলে আরও ভাগান্তিও আছে।
    আর যদি বাকি না থাকে, স্কুলেজের পোলাপাইনগুলার মতো আপনিও বুঝে থাকেন যে, মাথার ওপর ডাণ্ডা হাতে দাঁড়ানো কর্তৃপক্ষের হাতে সব কিছু ছেড়ে দিলে এমনটাই হতে থাকবে; সোনা-কয়লা গায়েব, কোটি কোটি টাকা পাচার-লুট-খুন-ধর্ষণ-লুটপাট-স্বেচ্ছাচার-স্বৈরাচার চলতেই থাকবে; তাহলে আসেন, আমরাও যোগ দেই এই এসো নিজে করি ক্লাসে।
    আমরা এবার একটু খতিয়ে দেখি থানা-পুলিশ-অফিস-আদালতগুলোর কী অবস্থা। কেন আমাদের শিক্ষার্থীরা বারবার মাইর খাচ্ছে রাস্তায়। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় এতো অব্যবস্থাপনা কেন? খোদ ঢাকা শহরটাকেই আরও বাসযোগ্য করা যায় কিভাবে? আমরা তো টাকা দিচ্ছি দেশ চালানোর জন্য। তাহলে এরকম হজবরল অবস্থা কেন? কিভাবে? এগুলো সব কিছু একদম নিজেদের দেখতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাস্তায় গাড়ির লাইসেন্স দেখছে, সেভাবে।
    এগুলো একবার করতে শুরু করলে প্রশাসন এমনিতেই হালকা হয়ে যাবে। সরকার গদিতে আছে না নাই— সেটার দিকে তাকানোরই দরকার পড়বে না। এক বিচ্ছু দেখলাম পুলিশের গাড়ির সঙ্গে কাগজে লিখে রেখেছে, ‘প্রশাসন তুই দূরে সর, হালকা মুতে শুয়ে পড়’! দেশের মানুষ পাবলিকই যদি এগুলো দেখতে শুরু করে, তাহলে প্রশাসনের সত্যিই এটা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।
    বাংলাদেশ ভাষা আন্দোলনের দেশ। ৫২ সালের সেই গৌরবজ্জল ঘটনা এখন পুরো বিশ্বের গর্ব। পুরো দুনিয়ার মানুষ পালন করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই ২০১৮ সালের কিশোর বিদ্রোহের জন্যও বাংলাদেশের নাম একদিন গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে বিশ্বজুড়ে।
    বাংলাদেশের এই কিশোররা তাই এই এসো নিজে করি ক্লাসটা চালু করে দুর্দান্ত একটা কাজ করে দিয়েছে। এটাই হতে পারে না? মুক্তির পথ। ভেবে দেখা দরকার কিন্তু খুব ভালোমতো। এভাবে আমরা সত্যিই প্রকৃত অর্থে দেশের মালিক হয়ে উঠতে পারব। বিশ্ববাসীও হয়তো এমন একটা মডেলের দিকেই চেয়ে আছে? হয়তো!
    এগুলো সব কিছু ভাবতে আমরাও অংশ নেই না কেন রাজপথের পাঠশালায়? ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই হয়তো এখান থেকে শিখছেন। তবে মাঝেমধ্যে পড়া ভালোমতো করার জন্য গ্রুপ স্টাডি খুবই জরুরি। শিক্ষার্থীদের, ছোট ভাই-বোন, ছেলে-মেয়েদের বলি যে, তোমরা আমাদের একটু জায়গা করে দাও না! আমরা একটু গ্রুপ স্টাডি করি?
    আর্টওয়ার্ক: নিরাপদ সড়ক চাই
    শিল্পী: মিতা মেহেদী
    সূত্র: ফেসবুক

    সবুজের অভিযান: সকল ক্ষমতা শিশুদের কল্পনার হাতে 

    আপনার বাচ্চাটার মুখে যখন আধো আধো বোল ফোটে, তখন কী আপনি বুঝতে চেষ্টা করেন না যে, সে কী বলতে চাচ্ছে? কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? We Want Justice বলে তারা গলা ফাটাচ্ছে। মার খাচ্ছে। মাথা ফাটাচ্ছে। কী তাদের জাস্টিস? বুঝতে চান না কেন আপনারা?রাজপথে-রাজনীতির ময়দানে তারা তো সেই আধো আধো বোল ফোটা শিশুর মতোই। আপনারা তো অনেক বয়স্ক। অনেক পরিপক্ক। আপনাদের কত কত বছরের সব গৌরব আছে। রাজপথ-রাজনীতির দাবায় চাল কী আপনারা কম দিন ধরে দিচ্ছেন! কত কত সব মহান অর্জন-অভিজ্ঞতা আপনাদের! সেই তুলনায় এরা তো একেবারেই ছোট্ট শিশু। তো, তাদের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করছেন না কেন? কী বলতে চাইছে তারা প্ল্যাকার্ডগুলো দিয়ে? কী চাইছে? কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?বোঝার চেষ্টা আমরা করছি না। কারণ আমরা পরিবারে একটা শিশুর সঙ্গে যা করি, এই রাস্তাতেও ঠিক তা-ই করছি। শাসাচ্ছি। ভয় দেখাচ্ছি। জোর করছি। নানাবিধ জুজুর আতঙ্ক ঢুকিয়ে দিচ্ছি তাদের মনে। মাঝেমধ্যে আদরও করছি। চকলেট দিচ্ছি। এটা-ওটা কিনে দেওয়ার, করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। ভুলাচ্ছি। ছেলেভোলানো!ব্যক্তিগত জীবনেও এই জিনিসই করি না আমরা? নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, চাওয়া-পাওয়া অনুযায়ী চালাই না বাচ্চাদের? চাই না আমরা, আমাদের ছেলে-মেয়েরা এটা করুক, ওটা করুক! এটা হোক-সেটা হোক! সেটা কতটুকু তার জন্য? আর কতটুকু আমাদের নিজেদের জন্য? আমরা চাই ওরা এটা-ওটা হোক, অনেক সাফল্য পাক যেন আমাদের নিজেদের মুখ উজ্জল হয়। সোসাইটিতে গর্ব করতে পারি। এজন্যই তো, নাকি? পাশের বাসার ছেলেটা বা মেয়েটা আমারটার চেয়ে ভালো কিছু করে ফেললে মুখ দেখাবো কী করে? ভাবি না, আমরা? আমরা কখনো ভাবি যে, আমাদের সন্তানেরা কী চায়? ওর সেটা ভালো লাগছে কিনা? ও আনন্দে আছে কিনা? ভাবি? ভাবি না। তো, সেই এক জিনিসই তো ঘটে চলেছে রাস্তায় এখন। রাজনীতির মাঠের জাঁদরেল-পাকা-ঝুনাদের কাছে নাজেহাল হচ্ছে বাচ্চারা। নোংরা-ঘিনঘিনে সব প্যাঁক কাদার মধ্যে পড়ছে তারা। মার খাচ্ছে, হেনস্তা হচ্ছে, কটু বিতর্কে জড়াচ্ছে। কেউ তাদের কথাটা কিন্তু বুঝতে চাইছে না। শুনতে চাইছে না। বাড়িতেও যা করা হয়, এখানেও তা-ই করা হচ্ছে। বাপমা বলে, আমি চাই তুমি এটা হবে। আমি চাই তুমি এটা করবে।

    রাস্তাতেও একই ব্যাপার। ছেলেমেয়েদের নসিহতে ব্যস্ত সব্বাই। এটা করো, ওটা করো। পড়তে বসো, হাগতে যাও। ওটা করেছ কেন? সেটা করোনি কেন? অস্থির! এখন কেউ কী বলবেন যে, বাড়ির সঙ্গে এই রাজনীতি-রাস্তা মেলানো ঠিক হচ্ছে না? বইলেন না প্লিজ। দুইটা একই ব্যাপার। বাচ্চাদের আমরা এতদিন ঘরে যেভাবে ট্রিট করেছি এখন রাস্তাতেও সেভাবে করছি।
    একটা ছোট্ট সিম্পল উদাহরণ দেই। অনেকেই ছোট-‘গুলগুলে’, ‘কিউট’ বাচ্চা দেখলেই গাল টিপতে লেগে যান। কখনো ভাবেন যে, এটা বাচ্চারা পছন্দ করছে কিনা? রাস্তায় আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ বন্ধুর সঙ্গে আসা অপরিচিত কেউ আপনাকে ‘ওল্লে কিউট’ বলে গাল টিপতে লেগে গেল। কেমন লাগবে আপনার ভাবেন তো? আপনি বড়- সেজন্য আপনাকে করা যাবে না? ওরা ছোট- তাই করা যাবে? ওদের ভালো লাগে না এটা। খুব ব্যক্তিগত শিক্ষার মধ্য দিয়ে জানি। সুযোগ পেলে তারা বলেও দেয়, “গালে হাত দিও না! ও মাই গড!” দুই-আড়াই বছরের শিশু বলে এটা। নিজের চোখে দেখা-কানে শোনা।
    বাচ্চাদের আসলে আমরা মানুষ ভাবি না। বাচ্চা ভাবি। আমরা সব কিছুই ক্ষমতা-কর্তৃপক্ষের চোখে দেখি তো, ফলে তাদের পড়ানো শিক্ষায় আমরা বাচ্চাদের দুর্বল ভাবি। ছোট ভাবি। যাদের মাইর দিয়ে সাইজ করতে হয়। চকলেট দিয়ে ভোলাতে হয়। রাস্তাতেও তা-ই হচ্ছে। চকলেট দিয়ে ভোলানো হচ্ছে। এটা-ওটা দেখিয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। মাইর দিয়ে সাইজ করা হচ্ছে। নানা রকম ষড়যন্ত্র-গুজব-গজবের ফাঁদ বিছানো হচ্ছে তাদের সামনে।
    মানুষ তা-ই দেখে, যা সে দেখতে চায়। আগে ঠিক করেন যে, কী দেখবেন। ষড়যন্ত্র-গুজবতন্ত্রের ছবি-ভিডিও দেখবেন? নাকি বাচ্চাদের প্রেম-ভালোবাসা, তাদের সৃজনশীলতা, তাদের কল্পনাশক্তি, তাদের ক্ষোভ-বিদ্রোহ, তাদের ফেটে পড়া, তাদের রক্তাক্ত হওয়া দেখবেন? এই স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা কী চায়, কী বলতে চায়—সেটা শুনবেন না? তাদের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করবেন না?
    সিন্ধু নদীর তীরে এই উপমহাদেশের আদিতম বসতি হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর খোঁজ যখন পাওয়া গিয়েছিল- তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন প্রত্নতাত্তিকরা। রাস্তাঘাটে, ঘরে-বাজারে; সব জায়গাতেই তারা পেয়েছিলেন মাটির বানানো বাঁশি। ছোট ছোট সব খেলনা। তারা বলেছিলেন, মনে হচ্ছে এটা যেন একটা শিশুদের নগরী। সব জায়গায় তারা খেলে বেড়ায়।
    হাজার হাজার বছর আগেকার সেই সিন্ধু সভ্যতারই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি কিন্তু আমরা। যতই ইতিহাস ভুলে যাই না কেন- সেগুলোর বীজ মনে হয় থেকে যায়। মানুষ যেভাবে বাপ-মায়ের জীন বহন করে ঠিক তেমনই হয়তো। বংশগতিবিদ্যায় বলা হয় যে, কয়েক প্রজন্ম আগের কারো কোনো বৈশিষ্ট্যও অনেক সময় ঢুকে যায় বংশ পরাম্পরায়। সেগুলো প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে। আর হুট করে সেটা প্রকটিত হতে পারে।

    ইতিহাসের তেমনই কোনো সুপ্ত জীন কী এখন দেখা যাচ্ছে এই কিশোর বিদ্রোহে? এরা কী আবার সেই শিশুদের নগরী বানানোর ডাক দিচ্ছে? সেই হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো? তাদের কথামতো, চাওয়া মতো সব কিছু চললে তো খারাপ কিছু হয় না। দুর্দান্ত দুর্দান্ত সব ব্যাপারই ঘটে। দেখলাম আমরা এই কয় দিনে। বুঝতে পারছি কী তাদের চাওয়াগুলো? ইশারা-ইঙ্গিতগুলো?

    একেবারে ছোট বয়সের স্মৃতি আমাদের মনে থাকে না। কিন্তু সেই সময়েও তো মাথায় নানান চিন্তা খেলা করে। নানান কল্পনায় আচ্ছন্ন থাকে তারা। কী চিন্তা করে এক-দেড় বছরের আধো আধো বোল ফোটা শিশুরা? সেই সময়টায় তারা কত কিছু কল্পনা করে- আমরা জানি? জানার ইচ্ছা হয় না আমাদের? বুঝতে চান না কেউ? না। কিছুই জানতে-বুঝতে চাই না আমরা। শুধু বুঝি নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ। নিজেদের আরাম। নিজেদের ভালো-মন্দ। নিজেদের চাওয়া-পাওয়া। আর সেগুলোই চাপাতে থাকি বাচ্চাদের ওপর।
    ৫০ বছর আগে, ১৯৬৮ সালের প্যারিস বসন্তের একটা কাব্যিক শ্লোগান ছিল, “সকল ক্ষমতা চাই কল্পনার হাতে”। ২০১৮ সালের কিশোর বিদ্রোহ সেই কথাটা বলে নি শুধু। কাজে-কর্মে বুঝিয়ে দিয়েছে। এদের অসাধারণ সৃজনশীল সব প্ল্যাকার্ড দেখে চোখ কপালে উঠে যাচ্ছে। এরা কল্পনার শক্তি দিয়ে চলছে। সৃজনশীলতার শক্তি দিয়ে চলছে।
    আর্টওয়ার্ক: ভিক্টরি ফিঙ্গার
    শিল্পী: মেহেদী
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট
    আর এদের প্রতিপক্ষ কারা? যারা জীবনে মিথ্যাচার, দুর্নীতি-লুটপাট, লাঠিসোটা, গুলি-বন্দুক, ইভটিজিং-ধর্ষণ ছাড়া কিছুই বোঝেনি। একটা মোড়ে দাঁড়ায়ে জমা হয়ে, ‘উত্তর যুবলীগ, উত্তর যুবলীগ’ শ্লোগান দেয় ১৫-২০ মিনিট ধরে। নিজের চোখে দেখা। একজন বলছে উত্তর, ভেড়ার পাল চিল্লাচ্ছে, যুবলীগ। ১৫-২০ মিনিট ধরে চলছে এই একই জিনিস। আর কোনো কথা নাই। তো, এরা কী বুঝবে ওদের শ্লোগানের ভাষা-প্ল্যাকার্ডের ভাষা?
    বুঝবে না। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যরা কী বুঝবে না? বুঝতে চেষ্টা করবে না? এই স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েগুলোর ভাষা? অনেক তো দেখলাম শাসক-শোষক। স্বৈরাচার, তত্ত্বাবধায়ক, সেনাবাহিনী, ভোটে নির্বাচিত সরকার, জোর করে নির্বাচিত হওয়া সরকার। সবই তো দেখলাম। কিছু তো বদলাইতে দেখলাম না। মানুষ যেরকম দুরাবস্থায় থাকে, তেমনই থেকে গেল। বরং অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপই হয়েছে।
    সেই জায়গায় এই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। পথ দেখিয়েছে। কিভাবে সব কিছু লাইনে আনতে হয় দেখিয়েছে। আর এজন্য তাদের মার খেতে হয়েছে। তারা আর মারটা না খাক। এটা চাই প্রথমে। এই গত কয়েকদিনে রাস্তার পাঠশালায় তারা যে, শিক্ষাটা নিয়েছে- এটা তো থাকবে তাদের মগজে। স্বাধীনতা-সংহতি-সৃজনশীলতার এই পাঠ তো সঞ্চয় করেছে তারা অভিজ্ঞতার ঝুলিতে।
    এর ধাক্কা শুধু সরকার কেন, বাপ-মা-রাও সামলাইতে পারে কিনা, দেখার বিষয়। ঘরেও তারা যদি বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়- অভিভাবকদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে, তাহলে কিন্তু মুশকিল আছে। বাপ-মারা কুল পাবেন না। সত্যিকার অর্থে, একদম আক্ষরিক অর্থে “গৃহযুদ্ধ” শুরু হয়ে যেতে পারে।
    রচনাকাল: ৩–৫ আগস্ট, ২০১৮
  • কিশোর বিদ্রোহ: কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব-অরাজ

    কিশোর বিদ্রোহ: কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব-অরাজ

    • খোইরোম রুধির

    কোন আন্দোলন শুরু হবার পর সবারই কতগুলো প্রশ্ন মাথায় আসে। আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? কে বা কারা করছে? নেতা কে? তারা কি বামপন্থী নাকি ডানপন্থী, সরকারপন্থী নাকি সরকার বিরোধী? কোন আন্দোলন শুরু হবার পর পরই রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীরা চোখ-কান খুলে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। আন্দোলন সংগ্রাম হলেই দল থাকবে, নেতা থাকবে, নাম সম্বলিত ব্যানার-ফেস্টুন, পোস্টার-প্ল্যাকার্ড থাকবে, ‘মঞ্চ-মাইক-মুখপাত্র-মুরুব্বি-কমিটি’১ থাকবে এইসব চিন্তা আমাদের মস্তিষ্কে প্রোথিত হয়ে গেছে। হাস্যকর হচ্ছে, আমরা নিয়মের বেড়া জালে আবদ্ধ হতে হতে এমন অবস্থা হয়ে গেছে যে আমরা আন্দোলন-সংগ্রামকেও ছকে ফেলে চিন্তা করতে শুরু করেছি। আন্দোলন সংগ্রামের গতি-প্রকৃতি আমাদের পরিচিত কাঠামোর বাইরে গেলেই ভ্রু কুঁচকে ফেলছি। এমনকি আমরা চাই ‘আন্দোলন-সংগ্রাম হোক নিয়মমাফিক’! যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি তার কাছে অনুমতি নিয়ে আন্দোলন করতেও দ্বিধা বোধ করি না। যেকোন প্রকার আন্দোলন-সংগ্রামকেই রাষ্ট্র নিজের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করে। অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ যতই সংকুচিত হবে রাষ্ট্রের জন্য ততই মঙ্গল হবে। কারণ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমেই জনগণ রাষ্ট্রের সাথে দর কষাকষি করে ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায় করে নেয়। সুতরাং জনগণকে যতই ভয়-ভীতি দেখিয়ে, উন্নয়নের আফিম খাইয়ে এই পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যাবে রাষ্ট্র ততই নিরাপদে শাসন-শোষণ কায়েম করতে পারবে। তাই রাষ্ট্রযন্ত্র চায় জনগণ আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দূরে সরে গিয়ে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত, রাষ্ট্র নির্দেশিত নিয়মনীতি অনুযায়ী জীবনযাপন করুক, বিনা বাদ-প্রতিবাদে, ঘাত-প্রতিঘাতে, রোধ-প্রতিরোধে মেশিনের মত আদেশ পালন করুক।

    আর্টওয়ার্ক: স্টুডেন্ট স্টান্ড ইউনাইটেড
    শিল্পী: আশিফুর রহমান
    ষূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আন্দোলন হলেই নেতার আবির্ভাব হয়। রাষ্ট্রীয় মোড়ল-মুরুব্বিরা আন্দোলনকারীদের পরামর্শ উপদেশ দিতে লাইন ধরেন। এমনকি কী কী কর্মসূচি হতে পারে, কী করা উচিত আর কী করা অনুচিত সেইসব নিয়েও জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে শুরু করেন। তবে আদৌ ‘মঞ্চ-মাইক-মুখপাত্র-মুরুব্বি’র দরকার আছে কি? সম্প্রতি সংঘটিত ‘কিশোর বিদ্রোহ’র দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক কালে ন্যায্য অধিকার ও ন্যায় বিচারের দাবিতে সংঘটিত সবচেয়ে যৌক্তিক, বৃহৎ ও শক্তিশালী আন্দোলন ছিল এটি। যা আমাদের সবাইকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার খুঁতগুলো চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের দাসত্ব ও শৃঙ্খলে আটকা পড়া মনোজগতকে মুক্ত করার চালিকাশক্তি দিয়েছে। স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে শিখিয়ে গেছে কীভাবে ন্যায্য অধিকার দাবি করতে হয়। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট কোন নেতা ছিল না, মুখপাত্র ছিল না, মঞ্চ ছিল না। তারা সারা ঢাকা এমনকি সারা বাংলাদেশ জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল। সারা দেশের রাস্তা-ঘাট, সড়ক-মহাসড়কই তাদের অঘোষিত মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। স্কুল কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছে, আন্দোলন করেছে কিন্তু কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা নেই, কোন ভাঙচুর নেই। উল্টো দেখা গেল চোখ জুড়ানো ‘শৃঙ্খলিত যান চলাচল’, ‘শৃঙ্খলিত ট্রাফিক’। কেউ লাইন ছেড়ে বেলাইনে যাচ্ছে  না, কেউ কাউকে ওভারটেক করছে না, কেউ লাইসেন্স ছাড়া বের হচ্ছে না, কেউ লক্কর-ঝক্কর ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে না, কেউ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের সাহস পাচ্ছে না। যানবাহনে যানবাহনে গতির প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হায়ার্কি, শ্রেণিগত বিভেদ্-বৈষম্য, লৈঙ্গিক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে না, সবাই একত্রিত হয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আদতে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে ছাত্রসমাজের যে আদৌ কোন বিভেদ নেই, সব বিভেদ-বৈষম্য যে রাষ্ট্র নির্মিত সেইটাও স্পষ্ট প্রতীয়মান তাদের পারস্পরিক ‘সহাবস্থান-সাহচর্য-সহযোগিতায়’।

    বাস চাপায় সহপাঠী হত্যার ন্যায় বিচারের দাবিতে ‘We Want Justice’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে তারা রাস্তায় নেমেছিল কিন্তু সেই আন্দোলন শুধু খুনী চালকের বিচারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কারা দায়ি সেইটা তারা অনুধাবন করতে পেরেছিল। শুধু যে বাস চালকের শাস্তি হলেই সব চুকে যাবে না, রাঘব-বোয়ালরা সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে তা তারা বুঝতে পেরেছিল। তাই তারা ভাঙাচুরা রাষ্ট্র সংস্কারের কাজেও হাত দিয়েছিল। পোস্টার-প্ল্যাকার্ডে লেখা স্লোগানগুলোর কথাই ভাবুন- ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’। এই কিশোর-কিশোরীরা রাষ্ট্র কাঠামোর খুঁতগুলো  ধরতে পেরেছিল। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী চরিত্রকেও বুঝতে পেরেছিল। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র যে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে হরণ করবে, দমন-নিপীড়ন চালাবে, এইটাই স্বাভাবিক। যেকোন প্রকার ন্যায্য দাবি-দাওয়া কেন্দ্রিক আন্দোলনকে দমন করতে ‘পুলিশ-প্রশাসন-পেটোয়া বাহিনী’ তৈরি থাকে। রাষ্ট্রযন্ত্র তার পেটোয়া বাহিনী ব্যবহার করে তাদেরকে তুলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু সকল প্রকার ভয়ডর তুচ্ছ করে তারা ক্রমেই সংখ্যায় বাড়ছিল। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের হুশিয়ারিকে তোয়াক্কা করেনি, পুলিশবাহিনী কে ভয় পায়নি। রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনীর সামনে বুক টান করে দাঁড়িয়েছে, উচ্চারণ করেছে- ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ/যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ’। বলতে গেলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারালো নখরকেও তারা কয়েকদিনের জন্য ভোঁতা করে দিয়েছিল। সর্বাত্মক অহিংস অরাজপন্থায় নজরদারি-খবরদারি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সাময়িকভাবে বিকলই করে দিয়েছিল। তাদের সামগ্রিক অহিংস প্রতিরোধ এতই শক্তিশালী ছিল যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভাবতে হয়েছে নতুন দমন কৌশল। তাদের এই সামগ্রিক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কৌশল রাষ্ট্রযন্ত্র তার চিরায়ত দমন কৌশলের ব্যকরণ দিয়ে ধরতে পারেনি সহজে। তারা নিপীড়ক ‘পুলিশ-প্রশাসন’কেও খারিজ করে দিয়েছে, ক্ষোভ নিয়ে স্লোগান দিয়েছে- ‘পুলিশ কোন চ্যাটের বাল?’, ‘পুলিশ চোদার টাইম নাই বলে’। এই আক্রমণাত্মক স্লোগানগুলো দিয়ে তারা আদতে রাষ্ট্রের নিপীড়ক ও কর্তৃত্ববাদী চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা ‘পুলিশ-প্রশাসন’ নামক নিপীড়ক, জনস্বার্থবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে বৃহৎ অর্থে নিপীড়ক রাষ্ট্রকে খবরদারি করেছে। জনগণের টাকা দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী ‘পেটোয়া বাহিনী’ পোষার তো কোন মানে হয় না। তারা ‘পুলিশ-প্রশাসন’কে ফুল, যুক্তি, ভালোবাসা, আইন দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছে তাদের আসল চরিত্র আসলে কী হওয়া উচিত। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যে পারস্পরিক সহাবস্থান-সহযোগিতা-সহমর্মিতা চর্চার মধ্য দিয়ে কোন প্রকার ‘কড়া আইনের শাসন’, ‘কর্তার চোখ রাঙানি’, ‘শাসকের বিদ্বেষ-বাণী, শাসনপ্রণালী’ ছাড়াও যে ‘সুস্থ-স্বাভাবিক-সামাজিক’ সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ঐকতান বজায় রেখে চলতে পারে সেই চিরায়ত সত্য তারা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে।

    ‘নেতা’ থাকলে প্রকৃতপক্ষে কার সুবিধা? আন্দোলনকারীদের নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের? সুবিধা আদতে রাষ্ট্রযন্ত্রেরই। কারণ আন্দোলন দমন করতে সহজ হয়। নেতৃত্বদানকারী নেতাদের ধরে বেঁধে ‘দমন-নিপীড়ন-হয়রানি-জেল-জুলুম’ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করে দেয়া সহজ হয়ে যায়। কিন্তু নেতাবিহীন আন্দোলন দমন করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হয়। ‘কিশোর বিদ্রোহ’র কোন নির্দিষ্ট মঞ্চ ছিল না, মুখপাত্র ছিল না, নেতা ছিল না, মুরুব্বি ছিল না,  মাতব্বরও ছিল না। তারা স্লোগানে স্লোগানে বলছে- ‘নেতা হতে আসি নাই, ভাই হত্যার বিচার চাই’। সুতরাং তাদেরকে কীভাবে দমন করা যায়? সেই দমন প্রক্রিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে হাজির(আমদানি করা) হল ‘গুজবতত্ত্ব’। আর এই ‘গুজব’ই ‘গজব’ এ রূপ নিল। আন্দোকারীদের যখন ‘জামাত-শিবির-বিএনপি-রাজাকার’, ‘সরকার বিরোধী-রাষ্ট্র বিরোধী’ ট্যাগে ভূষিত করে নেতিবাচকভাবে চিত্রায়ন করা যাচ্ছিল না তখন এই গুজবতত্ত্বের আগমন নিপীড়ক রাষ্ট্রের হালে পানি এনে দিল। অতঃপর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রোপাগান্ডা মেশিন থেকে ক্রমাগত ছুঁড়ে মারা গুজব শেলে বিদ্ধ হয়ে, দলীয় পেটোয়া বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর যৌথ বর্বর আক্রমণে রক্তাক্ত হয়ে, লাঞ্চিত হয়ে আন্দোলনাকারীরা রাস্তা ছাড়লেন। কর্পোরেট মিডিয়ার এই যুগে রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক ‘সিটিজেন’ যখন ‘নেটিজেন’ হয়ে উঠছেন, তখন প্রত্যেকেই নিজ নিজ মিডিয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। সহজলভ্য সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা এবং বিস্তৃতির দরুণ সত্য আর চাপা থাকছে না। রাষ্ট্রযন্ত্র পড়েছে মহা ফ্যাসাদে, একদিকে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাচ্ছে না অকারণ অন্যদিকে অবাধ প্রচার রোধও করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় গুজবতত্ত্বের আগমন, প্রচার ও প্রসার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যক্তিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও মিডিয়া সেন্সরশিপকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছে। এইভাবে বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে বিরোধী মতকে দমন করছে।

    আর্টওয়ার্ক: মোয়িং টাইম
    শিল্পী: তীর্থ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    কিশোর বিদ্রোহ আমাদেরকে আরেকটি বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে। ‘কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা’ই যে সকল সমস্যার মূল কারণ সেইটা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। একমাত্র ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ’ ই পরিবহন মাফিয়াদের হাত থেকে বৃহৎ অর্থে ক্ষমতাবানদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। প্রখ্যাত কানাডিয়ান সাংবাদিক, লেখক ও এক্টিভিস্ট নাওমি ক্লেইনের থেকে ধার নিয়ে বলছি- ‘পুঁজিবাদের বিকল্প কম্যুনিজম নয়, সেই বিকল্প হচ্ছে বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা’২। যতদিন কতিপয় ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত থাকবে ততদিন ক্ষমতার অপব্যবহার হবে। যার ক্ষমতা আছে সে ক্ষমতাহীনদের নির্যাতন করবে, নিপীড়ন করবে, শোষণ করবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দমন করবে। কিন্তু কোন গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ৩; পুলিশ-প্রশাসন, সরকার কিংবা রাষ্ট্র নয়। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সাময়িক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছিল কিশোর বিদ্রোহে। রাষ্ট্রীয় মোড়লদের নজরদারি-খবরদারির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তারা যখন ক্রমাগত সর্বাত্মক সামাজিক নজরদারি-খবরদারির মাধ্যমে জবাবদিহিতা চেয়ে স্বাধীন-সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করল তখনই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটতে শুরু করল অন্তত সাময়িকভাবে। পরিবহন মাফিয়াদের মাফিয়াগিরি হ্রাস পেল, পুলিশ-প্রশাসনের অনর্থক-অনৈতিক চোখ রাঙানি-মাস্তানি কমে গেল। র‍্যাব-পুলিশ-বিজিবি এমনকি সেনাবাহিনীও ক্ষমতার দৌরাত্ম্য প্রদর্শন করল না। আইন যে সবার জন্য সমান সেই হারিয়ে যাওয়া সাংবিধানিক সত্যকে তারা সড়ক-মহাসড়কে মঞ্চায়ন করে দেখিয়ে দিল। পুলিশ ভ্যান থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিদের গাড়ি এমনকি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গাড়ি পর্যন্ত আটকে দিল লাইসেন্স না থাকার কারণে। রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ যখন নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য বুঝে নিয়ে রাষ্ট্রের চালককে খবরদারি করা শুরু করবে ‘লাইসেন্স কই?’ বলে তখনই ‘কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বরফ পাহাড়’ গলতে শুরু করবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলে কেউ আর লঙ্কাপতি রাবণ হয়ে উঠবে না। চাইলেই যথেচ্ছা দমন-নিপীড়ন, ধর-পাকড়াও, শোষণ-নির্যাতন করতে পারবে না।

    কিশোররা কী চায়? তারা রাজা হতে চায় না, নেতা হতে চায় না, তারা শুধু তাদের সুপ্ত অস্তিত্বটাই প্রকাশ করতে চায়, তাদের সহজাত কর্তাসত্তার কথা জানান দিতে চায়। তারা ন্যায় বিচার চায়, তারা নিরাপদ সড়ক চায়, তারা নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায়, তারা নিপীড়নমুক্ত দেশ চায়, তারা ভাঙাচুরা রাষ্ট্রের সংস্কার চায়। তারা চায় সর্বাত্মক সামাজিক সহাবস্থান-সহযোগিতা-সহমর্মিতা। তারা কোন ‘তৃতীয় পক্ষের’ কান পড়ায় বিভ্রান্ত নয়, বিচ্যুত নয়, পক্ষপাতদুষ্ট নয়। তারা ‘সেলফ ম্যানেজমেন্টে’ দীক্ষিত। তাদের এই অহিংস অভিনব প্রতিবাদ-প্রতিরোধেই আমাদের ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিহিত। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের এই অভিনব পন্থা কে আমাদের নিজেদের করে নিতে হবে। নিপীড়ক এই রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর সর্বাত্মক সামাজিক নজরদারি-খবরদারি বাড়াতে হবে তাহলেই এই ‘বেপরোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র’ কে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

    তথ্যপঞ্জি

    ১ ‘মঞ্চ-মাইক-মুখপাত্র-মুরুব্বি-কমিটি’ শব্দগুলো সেলিম রেজা নিউটনের ‘অচেনা দাগ’ বইয়ের ‘শাহবাগের স্বাধীনতাই শাহবাগের পথ’ (সেলিম রেজা নিউটন, ২০১৫: ৪৫৩) অংশ থেকে নেয়া হয়েছে।

    ২ নাওমি ক্লেইন পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন বিরোধী লেখালেখির জন্য সর্বজন প্রশংসিত। পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম সংক্রান্ত লেখাপত্র ও বক্তৃতা সংকলন ‘Fences and Windows’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের ‘প্রাগ’ শিরোনামের প্রবন্ধের উপশিরোনাম ছিল উদ্ধৃতিটি। মূল উদ্ধৃতি- ‘The alternative to capitalism isn’t communism, it’s decentralized power’।

    ৩ রাষ্ট্রনৈতিক জার্নাল ‘রাষ্ট্রচিন্তা’র ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যায় সংকলিত হাসনাত কাইয়ূমের ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি খসড়া নোট’ শিরোনামের প্রবন্ধে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলতে আমরা কি বোঝাতে চাইছি?’ অংশ থেকে- “আমরা জানি রাজতন্ত্র মানে রাজার তন্ত্র, এ তন্ত্রে রাজাই সব। তিনি দেশের মালিক, আইনের মালিক, রাষ্ট্রের মালিক। তার মালিকানা সুসংহত করার জন্যই আইন-কানুন, বিচার-আচার ইত্যাদি। এসব আইন-কানুন বাস্তবায়নের জন্যই গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে গণতন্ত্র মানে ‘গণ’দের তন্ত্র। যেখানে দেশের মালিক, রাষ্ট্রের মালিক, ক্ষমতার মালিক সবই জনগণ। সেখানকার আইন, বিচার, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি সবই এমনভাবে প্রণয়ন করার কথা যাতে জনগণের মালিকানা, মর্যাদা, অধিকার ইত্যাদি কেউ খর্ব করতে না পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গড়ে তোলা হয় তেমনভাবে যাতে জনগণের ক্ষমতা চর্চার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, তা সে যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন, বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

    ধর্মতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব ঈশ্বর বা স্রষ্টার, রাজতন্ত্রে রাজার, কিন্তু গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব ব্যক্তির, নাগরিকের।”

    সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

    ১। সেলিম রেজা নিউটন, অচেনা দাগঃ সম্পর্ক স্বাধীনতা সংগঠন, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ২০১৫।

    ২। Naomi Klein, Fences and Windows: Dispatches from the Front Lines of the Globalization Debate, Vintage Canada, 2002.

    ৩। রাষ্ট্রচিন্তা, বর্ষ ২, সংখ্যা ১, অক্টোবর ২০১৭।

     

    রচনাকাল: ৫-৯ সেপ্টম্বর, ২০১৮

  • পিটার ই. নিউয়েল ।। আলেকজান্ডার বার্কম্যান: জীবন ও কর্ম

    পিটার ই. নিউয়েল ।। আলেকজান্ডার বার্কম্যান: জীবন ও কর্ম

    • অনুবাদ: আসিফ আযহার

    ভূমিকা: আলেকজান্ডার বার্কম্যানের এই জীবনীটি লিখেছেন পিটার ই. নিউয়েল। জীবনীটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে। ১৯৭১ সালে আলেকজান্ডার বার্কম্যানের একটি বিখ্যাত বইয়ের পুনর্মুদ্রণের সময় এই জীবনীটি জুড়ে দেওয়া হয়। বইটির নাম ‘অ্যানার্কিজমের অ আ ক খ’। প্রকাশক- ফ্রিডম প্রেস। (more…)