Category: ইতিহাস

  • ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় || ভারতবর্ষের ধারণার বহুবিধ ইতিহাসতাত্ত্বিক দ্যোতনা

    ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় || ভারতবর্ষের ধারণার বহুবিধ ইতিহাসতাত্ত্বিক দ্যোতনা

    অনুবাদ : স্বাধীন সেন

    [অনুবাদকের টিকা : অধ্যাপক ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাববিস্তারী চিন্তক হিসেবে বিবেচিত হন। যদিও বাংলাদেশের বিদ্যায়তনের ইতিহাস চর্চায় ও চিন্তায় অন্যান্য অনেক প্রভাবশালী চিন্তকের মতন উনার চিন্তাভাবনা আর বইপত্রের সঙ্গেও আমাদের পরিচিতি খুবই অল্প। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে দীর্ঘদিন জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। আদিমধ্যযুগ আর আদি পর্বের ইতিহাসের বিভিন্ন চিন্তা ও বিতর্কের ক্ষেত্রে উনার অবদান বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। ইতিহাস চিন্তায় ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ও লেখালেখির গুরুত্ব এবং প্রভাব ধারণাগত ক্ষেত্রে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনই উপাত্ত ও সূত্র ব্যবহার ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। এই প্রবন্ধটি উনার চিন্তা ও পর্যালোচনার পদ্ধতি বোঝার ক্ষেত্রেই কেবল গুরুত্বপূর্ণ না। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় ইতিহাস চর্চা ও ইতিহাস জ্ঞানকে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী বয়ান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করার হালের বহুবিধ তৎপরতাকে পর্যালোচনা করার গভীর ও নিবিড় পদ্ধতি আমলে আনার জন্য উনার লেখালেখি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড ইটস ইমপ্লিকেশনস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধের বাংলা তর্জমা। প্রবন্ধটি ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ভারতবর্ষ অ্যান্ড আদার এসেস’ (২০১৮, স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক প্রেস) বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

    সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী প্রবল ইতিহাসের বয়ানে আর বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপচারিতায় ‘অখণ্ড ভারত’ এবং অনন্ত কাল ধরে অস্তিত্ত্বশীল একটি স্থির, অনড় আর বাস্তব ভূখণ্ডগত পরিচিতি হিসেবে ভারতের পরিচয়কে নির্মাণ করার আধিপত্যশীল তৎপরতাকে ইতিহাসতাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে পর্যালোচনা করার জন্য ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধটি একটি অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে। আধিপত্যশীল ও সংখ্যাগড়িষ্ঠতাবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ানে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও আলামতের উদ্দেশ্যমূলক, বাছাইকৃত ও পর্যালোচনাবিহিন ব্যবহার প্রবল হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রণালিবদ্ধ প্রচারণা এই প্রাবাল্যকে বাড়িয়েছে। আবার এই অতীতের উপরে দখলদারিত্ব করে ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্বের বয়ান উৎপাদনের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে একইরকম বিপজ্জনক তৎপরতাও লক্ষ্যণীয় ভাবে বেড়ে গেছে। নিবিড়, পদ্ধতিগত আর ধারণাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বয়ানের বিরুদ্ধে যারা পাল্টা বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন তারাও আবার পাল্টা পরিচয়বাদের খপ্পরে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিবাদমান ইতিহাসের বয়ানগুলো পরস্পর পরস্পরের বুনিয়াদী রূপরেখা পুনরুৎপাদন করছে। কেবল জাতি, সম্প্রদায়, জাতিবর্ণ বা আঞ্চলিক পরিচয়গত পদটি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে মাত্র। হিন্দুত্ববাদী বয়ানের ‘নিজ’ ও ‘অপর’ পাল্টা বয়ানে কেবল উল্টে যাচ্ছে। অথচ হিন্দুত্ববাদী বা কট্টর বিভিন্ন পরিচয়বাদী ইতিহাসের আখ্যানগত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ইতিহাস বোঝার ও ব্যাখ্যা করার ধারণা ও পদ্ধতিগত প্রসঙ্গগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে পরিচয়বাদী অতীত দখলের যুদ্ধে মত্ত পক্ষগুলোর আপাত পরস্পর বিরোধী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করা দরকার। ইতিহাস শাস্ত্রটির মধ্যকার বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যেমন ইতিহাসবিদগণ ও প্রত্নতত্ত্ববিদগণের দায় তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস লিখনের ধারণা, পদ্ধতি আর উৎসের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে শেখাটাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। বিভিন্ন উৎস ও আলামতকে পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে ভূখণ্ডগত কালবিভ্রান্তিকে ধারণা ও পদ্ধতিগতভাবে ক্রটিপূর্ণ প্রমাণ করা সম্ভব। আধিপত্যশীল ও জনতুষ্টিবাদী ইতিহাসের পরিচয়বাদী বয়ানগুলোকে পর্যালোচনা করার জন্য বিশদ, নিষ্ঠ ও নিবিড় বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োজন। এই প্রবন্ধটি তেমন বিশ্লেষণ পদ্ধতির একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হতে পারে। ব্রজদুলাল চট্টোপাধ্যায়ের অনন্যসাধারণ চিন্তা পদ্ধতি এবং গভীর উপলব্ধিগত বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা একঅর্থে পরিশ্রমসাধ্য আর অন্তদৃষ্টি অর্জনের সাধনার কাজ। সেই সাধনা ও অনুধ্যানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও এই প্রবন্ধটি কার্যকর হতে পারে। এই অনুবাদটি এবছরের সিল্করুট ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আমি সিল্করুট এবং সিল্করুট ঈদসংখ্যার সম্পাদক শানজিদ অর্ণবের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।]

    এই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাকে বেছে নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা যে দেশে বাস করি তা হলো ভারতবর্ষ, আর এই ভারতবর্ষই হলো ‘ইন্ডিয়া’, শৈশব থেকেই আমরা এই ধারণাটি নিয়ে বেড়ে উঠেছি। আমাদের ধারণা ছিল ভারতবর্ষ এমন একটি মানচিত্র যার সুনির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে এবং অনুরূপ মানচিত্র দ্বারা চিহ্নিত অন্যান্য দেশ থেকে এটা আলাদা। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগ মানচিত্রটিকে বদলে দিয়েছিল। কিন্তু ‘ভারতবর্ষর’ ধারণা এবং নামটি রয়ে গেছে। আমাদের পূর্বসূরিদের কাছে মনে হতো, ভারতবর্ষ এমন একটি দেশের ছবি বহন করে চলেছে যে দেশ চিরকাল ছিল এবং মানচিত্রের পরিবর্তন সত্ত্বেও যে দেশ চিরকাল থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া আর আজকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত ভারত বা ভারতবর্ষের ধারণার ইতিহাসের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নিরিখে পর্যালোচনামূলকভাবে পরীক্ষা করা বাকি রয়ে গেছে। অন্য কথায় স্থানিক পরিসরের ধারণা বা অর্থ, সেই ধারণার দ্বারা নির্দেশিত প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর, এবং আমাদের ইতিহাসের আধার (locus) হিসেবে সেই স্থানিক পরিসরের  মধ্যকার সম্পর্কের প্রসঙ্গটি নতুন করে উন্মোচন করা প্রয়োজন। কারণ এখন আমরা যে বিষয়গুলোকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে মেনে নিচ্ছি, সেগুলো আসলে বেশ কিছু পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ইতিহাস উৎসগুলোতে নিহিত বহুবিধ অর্থকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায়, এই পূর্বানুমানগুলো বিশেষ করে আদি পর্বের ভারতীয় ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের সাধারণীকরণগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।

    উদাহরণস্বরূপ, একটি বুনিয়াদী পূর্বানুমান হলো যে ‘ইন্ডিয়ার’ এবং ‘ভারতবর্ষর’  ধারণা অভিন্ন বা একই। ঠিক কোন উপায়ে এই ধারণা দুটির বিভিন্ন অর্থ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল সেকথা এই প্রবন্ধে ঐতিহাসিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে একথা স্পষ্ট যে ঊনিশ শতকের মধ্যে ইতিহাস লিখনে এবং সাধারণের চিন্তাভাবনায়ও উভয় ধারণার অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। যারা ইন্ডিয়া অথবা তার ধারণা নিয়ে লেখেন, তারা ধরেই নেন যে তারা যেকথা বোঝাতে চাইছেন সেকথা ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি দিয়েও ব্যক্ত করা যায়। এই দুটি শব্দ একইভাবে আমাদের অতীত বা ইতিহাসের বোধ বহন করে। এমনকি ঔপনিবেশিক ইতিহাস-লিখনের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতেও ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া’ বা ভারতের ইতিহাস কল্পনা করা সহজ ছিল। সেই একই ধাঁচে কোনো দেশীয় উদ্যোগ যদি নেওয়া হতো, তবে বাংলা ভাষায় তার শিরোনাম হতো ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’।[১] ভারতবর্ষকে ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক করে দেখার একটি একাডেমিক উদাহরণ হলো পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্বীয়-রূপরেখার (cosmography) সূত্রে একজন নামকরা গবেষকের এই বিবৃতিটি:[২]

    ‘হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সর্বদক্ষিণের বর্ষ, অর্থাৎ ভারতই ইন্ডিয়া। (নজরটান সংযোজিত)’

    ইন্ডিয়া এবং ভারতবর্ষের অভিন্নতার এই বোঝাপড়া এবং বিনা দ্বিধায় গ্রহণযোগ্যতা আমাদের সংবিধানের এই গাম্ভীর্যপূর্ণ ঘোষণায় আরও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে: ‘ইন্ডিয়া যা ভারত হবে রাজ্যসমূহের একটি সমষ্টি (Union of States)।’[৩] এই ঘোষণাটি আমাদের দেশ এবং জাতীয়তার পরিচয়ের ওপর একটি ঐতিহাসিক সিলমোহরের ছাপ দিয়ে দেয়। কিন্তু অপরিহার্যভাবে আমাদের ইতিহাসের ওপর সেই সিলমোহর কাজ করে না। মনে রাখা প্রয়োজন, শব্দ দুটির উৎপত্তি ভিন্ন। একটি শব্দ (ইন্ডিয়া) দেশটিকে দেখছে ভৌগোলিকভাবে বাইরের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং এই শব্দটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে। অন্য শব্দটি, ‘ভারতবর্ষ’, ধারাবাহিকভাবে (যদিও অনন্তকাল ধরে নয়) ভিন্ন ভিন্ন অর্থে বিভিন্ন ধরণের প্রাচীন টেক্সটে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিশ্বতাত্ত্বিক-রূপরেখার মধ্যে স্থিত রয়েছে। সুতরাং ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটির ব্যঞ্জনাগুলো একেবারেই আলাদা। ‘ভারতবর্ষের‘ বিভিন্ন খণ্ডাংশকে কীভাবে কল্পনা করা হয়েছে সেই প্রসঙ্গে লিখিত উৎস/টেক্সটগুলোতে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং সম্ভাব্য আধুনিক সংহতিগত পরিচয়গুলো থেকে দুরে থেকে স্বাধীনভাবে এ-শব্দটির আদি ইতিহাসের অনুসন্ধান করা এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে যেসব অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই প্রসঙ্গ স্পষ্ট করা ফলপ্রসূ হতে পারে।

    এই আলাপচারিতার সঙ্গে ইতিহাসতত্ত্বের প্রকৃতিও জড়িত। ভারতের ধারণার ইতিহাস অন্বেষণ করার কিছু সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, আমরা দীর্ঘকাল যাবত ধরেই নিয়েছি যে, আমরা যে দেশে বাস করি তার অর্থের ব্যঞ্জনা বরাবরই একই রকম ছিল। আরো মনে করি, বর্তমানে আমরা দেশ সম্পর্কে যা ভাবি, অতীতেও ঠিক তাই ভাবা হতো। তবে নিতান্ত কান্ডজ্ঞানের কথা বিবেচনায় নিলেও অনুভব করার কথা যে, ভৌগোলিক স্থানিক পরিসর এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলো সংজ্ঞায়িত এবং পুনঃসংজ্ঞায়িত হয়েছে। কোনো একটি স্থানিক পরিসর আর সেখানকার মানুষজনের ইতিহাস বুঝতে হলে সংজ্ঞা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

    দ্বিতীয়ত, সাধারণত জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত কোনো একটি নির্দিষ্ট যৌথ সংবেদনের সঙ্গে কোনো স্থানিক পরিসরকে একাকার করে দেখাটা সেই স্থানিক পরিসর অথবা সেখানে বসবাসকারী যৌথ মানবসত্তার কোনো ‘পূর্ব-প্রদত্ত গুণ’ নয়। জাতীয়তাবাদের মতন সামষ্টিক সংবেদনশীলতা ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত হয়। এই সংবেদনশীলতার রূপান্তর/মিউটেশন ঘটতে পারে। একটি দেশ বা সেই দেশ সম্পর্কে ধারণাগুলো ওই যৌথ সংবেদনশীলতা থেকে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল থাকতে পারে ততক্ষণই যতক্ষণ না পর্যন্ত এই ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত চেতনা অভিব্যক্তির বিভিন্ন রূপায়নের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

    আজ যখন আমরা মেনে নিয়েছি যে একটি ভৌগোলিক গণ্ডীবদ্ধ (তা যেভাবেই হোক-না-কেন) এবং সাংবিধানিকভাবে সংজ্ঞায়িত দেশই হলো আমাদের আপন, তখন অতীতে সেই দেশটির অর্থ কী ছিল তা খতিয়ে দেখা আমার কাছে বিভিন্ন কারণেই জরুরি মনে হয়। ইতিহাসতাত্ত্বিকভাবে, সেই অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আমরা একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। বিশেষভাবে কারণ হলো ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবষের’ ধারণা সম্পর্কে বর্তমানে পুরোপুরি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়েও সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে এই প্রসঙ্গে তিনটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থানকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

    একটি অবস্থানের যাত্রা মূলত ঔপনিবেশিকরা ইন্ডিয়াকে যেভাবে একটি প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক একক হিসেবে তৈরি করেছিল সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বলে মনে হয়। এই অবস্থানগত চিন্তাভাবনা সুদূর অতীতেও ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবর্ষ’ ধারণাটি আধুনিক জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল এমন বিবেচনাকে গুরুত্ব দেয়। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়ার’ (The Fundamental Unity of India) [৪] মতো মনোগ্রাফ বা গবেষণাপত্রগুলো এই ঐক্যের ধারণাকে জোরালোভাবে প্রক্ষেপ করেছিল; এই ধারণায় ‘ঐক্য’ হলো দেশটির একটি মৌলিক গুণ। ভারতীয় ভূগোলের বিভিন্ন ধারণা, তীর্থস্থানগুলোর নেটওয়ার্ক এবং যুদ্ধজয় বা উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের বাসনাকে চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই মৌলিক গুণের প্রমাণ খুঁজে বের করা হতো । আমাদের অখণ্ড দেশের অস্তিত্বের এই ধারণাটি ভারতের ইতিহাসের উপর লেখালেখিগুলোতে ভূখণ্ডগতভাবে একটি প্রশ্নাতীত একক সত্তা হিসেবে ঢুকে গেছে। অথচ এই ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলগুলোর আলাদা আলাদা প্রাণশক্তি ছিল । ভারতবর্ষের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ‘ভারতীয় জাতিকে’ অতীতে এমনভাবে প্রক্ষেপণ একটি ধ্রুব দশা হিসেবে আজও অব্যাহত রয়েছে। ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’-তে ভারতবর্ষ বা ইন্ডিয়াকে একটি প্রাচীন জাতির পরিসরগত আধার হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। এমন অর্থের চিহ্নিতকরণ ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’ (The Concept of India)[৫] শীর্ষক একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থেও উপস্থিত। এই বইয়ে বলা হয়েছে:

    স্পষ্টতই উপমহাদেশের [উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে সমুদ্রের মধ্যবর্তী দেশটির] অধিবাসীদের পৌরাণিক লেখকরা একটি জাতি (nation) হিসেবে বিবেচনা করতেন, অন্তত ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে। অন্তত জনসাধারণের একটি অংশের মধ্যে এমন অনুভূতি ছিল যে পুরো উপমহাদেশটি (বা এর সিংহভাগ) এমন এক বা একাধিক জনগোষ্ঠী দ্বারা অধ্যুষিত যারা একটি সংযোগকারী সংস্কৃতি বা একটি ‘ছাতার মতন’ সংস্কৃতির (umbrella culture) কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য এমন গভীরভাবে ভাগ করে নিত যে তাদের ‘ভারতী’ হিসেবে একটি সাধারণ নামে ডাকা যেত। সুতরাং রাজনৈতিক বা জাতিগতভাবে না হলেও, ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে, ভারতীয়রা ছিল একটি জাতি।

    ঠিক বিপরীত একটি অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ সিরিজের একটি খণ্ডে প্রকাশিত ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (The Imaginary Institution of India) শীর্ষক প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি বেশ বলিষ্ঠভাবে শুরুতেই নিচের বিবৃতিটি দেয়  : [৬]

    যা আজকের ইতিহাসের এক নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা, যার বস্তুনিষ্ঠতা মানুষ সংরক্ষণ করতে পারে, ধ্বংস করতে পারে, তুলে ধরতে পারে, নির্মাণ বা ব্যবচ্ছেদ করতে পারে; এবং যার পক্ষে বা বিপক্ষের সমস্ত প্রচেষ্টায় এই বাস্তবতাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, সেই ইন্ডিয়া কোনো আবিষ্কারের (discovery) বস্তু নয়, বরং একটি উদ্ভাবন (invention)। এমন বস্তুনিষ্ঠতা ঐতিহাসিকভাবে ঊনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী কল্পনার দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত হয়েছিল। (নজরটান সংযোজিত)

    এই বিবৃতির পটভূমির বিশ্লেষণগত চর্চা কোনো প্রমাণযোগ্য সারবত্তাসম্পন্ন ঐতিহাসিক নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে নাই। সেকথা বাদেও প্রবন্ধটির দৃষ্টিভঙ্গিতেই কিছু প্রচ্ছন্ন পূর্বানুমান রয়েছে যেগুলো প্রশ্নের উদ্রেক করে: (১) ‘ঐতিহাসিক বাস্তবতা’ হিসেবে জাতীয়তাবাদ এবং ‘ইন্ডিয়ার ধারণা’ – এমন দুটো বিষয়ের মধ্যে মধ্যে প্রবন্ধটি যে অপরিহার্য সমীকরণ টানে; (২) শূন্য থেকে ‘উদ্ভাবনের’ আলাপ যা কোনো পূর্ব-বিদ্যমান ধারণা ছাড়াই ইন্ডিয়ার ধারণা বিকশিত হওয়ার কথা বলে অথচ এই ধারণা হয়তো ভিন্ন ধরনের ‘নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’ হতে পারত (অনিবার্যভাবে ‘জাতীয়তা’ না বুঝিয়েও); এবং (৩) একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র ও তার ইতিহাসের নির্মাণের সঙ্গে আধুনিক ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণার একটি ঔপনিবেশিক পরিসর উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে এবং পুরো ‘উদ্ভাবনটিকেই’ জাতীয়তাবাদী কল্পনার ওপর আরোপ করে। আসলে ‘প্রতিষ্ঠান’বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত না করেই স্থানিক পরিসর হিসেবে ইন্ডিয়ার প্রাক-জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মাধ্যমে প্রবন্ধটি মনে হয় ‘ইন্ডিয়ার’ ধারণাকেই অস্বীকার করছে। কারণ প্রবন্ধটি ‘ইন্ডিয়ার নৈর্ব্যক্তিক বাস্তবতা’কে আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বাস্তবতার সঙ্গে একাকার করে ফেলেছে।

    এ-ধরনের অস্বীকৃতি সি.এ. বেইলির ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন’ [৭] বইতেও উপস্থিত বলে মনে হয়, যেখানে ইন্ডিয়ার ধারণাকে ‘উদীয়মান জাতীয় চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগোলকে একটি সমাজবিজ্ঞান হিসেবে ‘ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক তথ্য সংগ্রহের হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। বেইলি ইউরোপীয় এবং তাঁর ভাষায় ‘ভূগোলের হিন্দু ধারণায়নের’ মধ্যে পার্থক্যকে চিহ্নিত করেন। এই বৈপরীত্যের আলোকে ভারতবর্ষকে হিন্দু ‘পবিত্র’ স্থানিক-পরিসরের সমতূল্য হিসেবে চিত্রিত করেন। ম্যাথু এডনির মতে, ইন্ডিয়ার মানচিত্রায়ন ছিল প্রথমবারের মতো ‘একটি অবোধ্য দৃশ্যপটের [৮] দেশকে জ্ঞানের সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করার একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান… ভূগোলবিদরা কোম্পানির সাম্রাজ্যের স্থানিক চিত্র এবং সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও মৌলিক অস্তিত্ব তৈরি এবং সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।’ এডনি অবশ্য স্পষ্ট করে দেন, এই স্থান কোনো বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ পরিসর ছিল না; ব্রিটিশরা যেভাবে ‘ইন্ডিয়াকে পরিবেশন’ করেছিল, তাতে করে এই ভূখণ্ডকে তাদের ‘ইন্ডিয়াতে’ পরিণত করেছিল। এই ভূখণ্ড কেবল তাদের প্রত্যক্ষ এবং শাসিত অংশটিকেই অন্তর্ভুক্ত করা ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ ছিল। [৯]

    তাহলে, প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ের কী হবে? দৃশ্যত এই অবস্থানগুলোর মাঝামাঝি কোথাও অন্য অবস্থানও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরফান হাবিব জোরালোভাবে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, কেবল ভৌগোলিক একক হিসেবেই নয়, বরং এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ‘ভারতের’ ধারণাটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের দিকেই বিদ্যমান ছিল। সেক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উপস্থিত থেকে দেশটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করত। হাবিবের যুক্তিতে, ভারতের এই ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই ছিল আল-বিরুনির কাছে ভারতকে একটি ‘সাংস্কৃতিক ঐক্য’ হিসেবে বোঝার ভিত্তি; এবং দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়া ও সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জোরদার হয়ে ‘১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বিজয় শুরু হওয়ার আগেই… জাতিসত্তার কিছু পূর্বশর্ত দৃশ্যত অর্জিত হয়েছিল… ভারত কেবল একটি ভৌগোলিক অভিব্যক্তি ছিল না। এই ভূখণ্ডকে একটি সাংস্কৃতিক সত্তা এবং রাজনৈতিক একক হিসেবেও দেখা হতো।’[১০]

    হাবিবের অবস্থান অনুসরণ করলে প্রশ্ন জাগে, এমন একটি অতি-পরিনত ধারণা-ক্ষেত্রকে কেন পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের জন্য ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করতে হলো? এই প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করার জন্য বিরত না হয়েও যেকথা তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয় সেকথা হলো: ইন্ডিয়া বা ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে সব আলোচনায় না হলেও অধিকাংশ আলোচনাতেই কোনো-না-কোনোভাবে ‘জাতি’ এবং ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রসঙ্গটি ঢুকে পড়ে। এই জট পাকানোটা হয়তো বোধগম্য, কিন্তু অনিবার্য নয়। এই প্রবন্ধের বিষয় হিসেবে ‘ভারতবর্ষকে’ বেঁছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার উদ্দেশ্য হলো ভারতবর্ষকে একটি ঐতিহাসিকভাবে বিবর্তিত ধারণা হিসেবে বোঝা; বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে যারা ‘ভারতবর্ষের’ উল্লেখ করেছেন তারা কোন অর্থে ধারণাটিকে প্রকাশ করেছেন সেই প্রশ্ন ধরে তদন্ত করা; এবং এই তদন্তের ভিত্তিতে আদি ভারতের ইতিহাসতত্ত্বের জন্য ধারণাটির সম্ভাব্য তাৎপর্যময় প্রভাবের গভীরে পর্যালোচনা করা।

       

    ১. ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’

    বিচিত্র সব উৎসে ভারতবর্ষের ধারণাটি খুঁজতে গিয়ে মনে রাখতে হবে যে আদি ভারতে এমন একটি লিখিতসূত্রভিত্তিক কালপর্ব ছিল যখন ভৌগোলিক অর্থেও ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি আদৌ উপস্থিত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, আদি টেক্সটগুলোতে উল্লেখ থাকত ‘জন’, অর্থাৎ মানুষ বা সম্প্রদায়ের। প্রাকৃতিক ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্য, যেমন নদনদীর দ্বারা ‘জনদের’ অবস্থান সংজ্ঞায়িত হতো। এভাবে ঋগবেদে[১১] অন্যান্য জনদের পাশাপাশি ভরতদের উল্লেখ আছে। কিন্তু অন্যদের মতোই তারা কোনো সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে উপস্থিতি হাজির করেনা। বৈদিক সাহিত্যের ‘ব্রাহ্মণ’ শ্রেণির টেক্সটগুলোতেই প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চলের সাপেক্ষে বিভিন্ন স্থানিক দিক বা দিশার উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি অধ্যুষিত দেশ বা সেই স্থান যেখানে ‘জন’ বাস করে এমন পরিসর হিসেবে ‘জনপদ’ শব্দটিও প্রথমবারের মতো তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, শতপথ ব্রাহ্মণ ইত্যাদির মতো ব্রাহ্মণ টেক্সটগুলোতে আত্মপ্রকাশ করে। ‘দিশ’ বা দিকের তাৎপর্য, যা আমি পরে উল্লেখ করব, তা জনপদগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত; কারণ ‘দিশ’ সংজ্ঞায়িত করত জনপদগুলো কীভাবে অবস্থিত হবে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ এভাবেই বিভিন্ন অঞ্চল এবং যারা ওই অঞ্চলগুলোতে বাস করত ও শাসন করত তাদের নির্দিষ্ট করেছে; ইন্দ্রের ‘মহাভিষেক’-এর প্রেক্ষাপটে এই আবাহনটি এসেছে:

    ‘…এই পূর্ব দিকে (প্রাচ্যানাং দিশি), প্রাচ্যের মানুষদের (প্রাচ্যানাং রাজানঃ) যত রাজা আছেন, তাঁরা আধিপত্যের জন্য অভিষিক্ত হন; …অতএব, এই দক্ষিণ দিকে (দক্ষিণস্যাম দিশি), সাত্বতদের যত রাজা আছেন, তাঁরা সর্বপ্রধান শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন; …পশ্চিম দিকে (প্রতীচ্যাম দিশি), দাক্ষিণাত্য ও প্রতীচ্যের মানুষদের যত রাজা আছেন, তাঁরা স্ব-শাসনের জন্য অভিষিক্ত হন… এই উত্তর দিকে (উদীচ্যাম দিশি), হিমবতের ওপারে উত্তর-কুরু ও উত্তর-মদ্রদের যে ভূমি (জনপদাঃ), তাদের রাজারা সার্বভৌমত্বের জন্য অভিষিক্ত হন… এই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য দিকের (ধ্রুবায়াং মধ্যমায়াং প্রতিষ্ঠায়াং দিশি), কুরু-পাঞ্চাল এবং বশ ও উশীনরদের যত রাজা আছেন, তাঁরা রাজত্বের জন্য অভিষিক্ত হন.. ’’[১২]

    স্পষ্টতই, দেবতা ইন্দ্রের মহাভিষেকের পরিপ্রেক্ষিতে পার্থিব রাজাদের দিকগুলোর গণনায় ব্রাহ্মণ রচয়িতা অন্য দিকগুলোর তুলনায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্য অঞ্চলের (মধ্যমা দিশ) জনপদগুলোর সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিতির পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনপদ অঞ্চলের বিন্যাস নিয়ে যে ব্রাক্ষণ্যবাদী বয়ানগুলোতে এই মধ্য অঞ্চলটিকেই কেন্দ্র (core) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখানে থেকে অন্য দিক বা দিশাগুলো (দিশ) ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হতো।

    একটি দেশ, অথবা বরং বলা যেতে পারে, পার্থিব স্থানিক পরিসরে বিভিন্ন দিকে অবস্থিত জনপদগুলোকে ধারণ কারী একটি খণ্ডের ধারণা প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয় আদি বৌদ্ধ গ্রন্থগুলোতে উল্লিখিত ‘জম্বুদ্বীপের’ প্রসঙ্গে।[১৩] চারটি মহাদ্বীপের অন্যতম এই দ্বীপটি সুমেরু বা সিনরু পর্বতকে ঘিরে বিস্তৃত ছিল এবং একজন ‘চক্রবর্ত্তী’ বা সার্বভৌম শাসক দ্বারা শাসিত হতো। প্রকৃতপক্ষে, টেক্সটগুলো অনুযায়ী, কেবল জম্বুদ্বীপেই বুদ্ধ এবং চক্কবত্তীদের (চক্রবর্ত্তীদের) জন্ম হতো। মেত্তেয় বুদ্ধ (মৈত্রেয় বুদ্ধ) যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, তখন এই দ্বীপটি জনাকীর্ণ ছিল এবং এখানে চুরাশি হাজার নগর ছিল। ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’-এর লেখক মালালাসেকেরার মতে, যখন সিংহলদ্বীপ বা তাম্রপর্ণীদ্বীপ থেকে আলাদা করে দেখা হয়, তখন ‘জম্বুদ্বীপ ভারত মহাদেশকে নির্দেশ করে’। তবে, প্রতিটি চক্রবাল বা দিগন্তে একটি করে জম্বুদ্বীপ রয়েছে বলে অঙ্গুত্তরা-নিকায়ে উল্লেখ রয়েছে। ফলে জম্বুদ্বীপকে ভারতের মতো কোনো সুনির্দিষ্ট দেশের ভূগোলের সঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

    এমন দ্ব্যর্থকতা সত্ত্বেও জম্বুদ্বীপের ধারণাটি টিকে ছিল এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারণার অংশে পরিণত হয়েছিল। কখনো এই স্থানিক পরিসর ভারতবর্ষের সমার্থক, আবার কখনো ভারতবর্ষ এই স্থানিক পরিসরের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানিক পরিসরের একটি স্থানিক বিবরণগত চিহ্ন হিসেবে হিসেবে যে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল, তা দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ের একটি সূত্রে । এই সূত্রে জম্বুদ্বীপকে এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে ‘মানুষের সঙ্গে একসময় মেলামেশা না করা দেবতারা, এখন মানষের সঙ্গে মেলামেশা করেন’।[১৪] অশোকের শাসিত জম্বুদ্বীপকে যদি বাস্তব ভৌগোলিক স্থানের সঙ্গে মেলানো হয়, তবে সেই স্থান আফগানিস্তান থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই পরিসরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরের এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং উপমহাদেশের দক্ষিণাংশ বাদ পড়েছিল। জম্বুদ্বীপ এমন একটি বিশদ বিশ্বতত্ত্বীয় নকশার (cosmography) অংশ যেখানে পৃথিবী বিভিন্ন দ্বীপে বিভক্ত ছিল। আবার এই পরিসরে এক অর্থে একটি বাস্তব দেশের ধারণাও ছিল কারণ পরিচিত জনপদের নাম ও স্থানগুলো এর মধ্যে চিহ্নিত করা যেত।

    ভারতবর্ষও একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের (schema) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু আমরা যখন এই ছকের একটি রূপরেখা তুলে ধরব তখন স্পষ্ট হবে যে, সেই রূপরেখাকেও একটি ভৌগোলিক স্থানিক কাঠামো হিসেবে ধরা যেতে পারে। এই কাঠামোর মধ্যে সময়ের পরিক্রমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গাঠনিক অঞ্চলকে (constituent regions) জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। শব্দটি প্রয়োগের প্রাথমিক পর্যায়ে মনে হয় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি সেসব অর্থ বহন করত না যেগুলো পরবর্তীতে এই শব্দগত ধারণার সঙ্গে ক্রমশ যুক্ত হয়েছিল। তখন এই শব্দ অস্পষ্টভাবে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করতে পারত। তবে স্থানিক পরিসরগত অর্থগুলোর ক্রম প্রসারণের ঐতিহাসিক পর্যায়গুলো স্পষ্ট নয়। কলিঙ্গ বা উপকূলীয় ওড়িশার রাজা খারবেল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে তাঁর শিলালিপিতে দাবি করেছিলেন [১৫] যে, তিনি তাঁর দশম রাজত্ববর্ষে ‘ভরদবস’ (ভারতবর্ষ) জয়ের জন্য বের হয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের মধ্যে একটি ছিল এই যুদ্ধযাত্রা। স্পষ্টতই, তিনি যখন শাসন করছিলেন তখন কলিঙ্গকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে দেখা হতো না। প্রকৃতপক্ষে, পুরাণগুলো যখন সংকলিত হচ্ছিল, তখনই কেবল ভারতবর্ষ একটি বিশদ বিশ্বতাত্ত্বিক নকশার প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেক্ষেত্রে শব্দটি স্থানিক পরিসর ও সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর যে কাঠামোগত রূপরেখাকে বোঝাত সেটা বুঝতে হলে আমাদের এই ধরণের লিখিত/টেক্সচুয়াল প্রমাণের দিকেই ফিরতে হবে। যে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার একটি অংশ ছিল ভারতবর্ষ, সেই রূপরেখা কমবেশি একই চেহারায় বেশ কয়েকটি পুরাণে পাওয়া যায়।[১৬] মহাভারতের [১৭] দিগ্বিজয় আখ্যানের মতনই কিছু ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এই পৌরাণিক নকশাগুলোতেই আমরা প্রথমবারের মতো ভারতবর্ষ এবং সেটার বিভিন্ন স্থানিক খণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ বিকশিত ধারণার সাক্ষাৎ পাই। পৌরাণিক টেক্সটগুলোর সংখ্যা বিপুল আর স্বতন্ত্রভাবে প্রতিটি পুরাণ ধরে ধরে সেগুলোর উপাদানের নতুন করে তুলনা করার চেষ্টা করাও হবে অর্থহীন। তাই আমি নিজেকে ইতোমধ্যে বহুল-ব্যবহৃত বিষ্ণু-পুরাণের[১৮] টেক্সট উল্লেখ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব। প্রকৃত ভৌগোলিক স্থানের সাপেক্ষে ভারতবর্ষ ধারণাটির ধারাবাহিকতা এবং বিস্তৃতকরণ উভয়কেই তুলনামূলকভাবে যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে আমি অন্য দুটি লিখিত উৎসের দিকেও নজর দেব: কালিদাসের রঘুবংশম্, বিশেষ করে রঘুর দিগ্বিজয় অংশটি;[১৯] এবং দশম শতকের টেক্সট রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা।[২০] লিখিত উৎসগুলো যথেষ্ট বিস্তৃত কালিক ব্যপ্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এই পর্যালোচনা কীভাবে পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা এবং সেগুলোর বিবরণগুলো কমবেশি প্রথাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল সেই বিবরণীই দেয় না। বরং কীভাবে একই বিবরণের অর্থ হয়তো কিছুটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে সেই প্রসঙ্গেও আলোকপাত করে।

    ২. পুরাণে ভারতবর্ষ

    বিষ্ণু-পুরাণের উপাদানগুলো নিয়ে আলাপের আগে পৌরাণিক প্রমাণের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। পৌরাণিক বিবরণগুলোকে ‘ভৌগোলিক বিবরণ’[২১] হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এগুলো ভারতের ভূগোলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। পুরাণের সংশ্লিষ্ট অংশের একটি সেকশনকে ‘ভারতবর্ষ-বর্ণনম্’ বলা হয় ঠিকই। কিন্তু সেই বর্ণনা মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে জগতের একটি বিস্তৃত নকশার ভেতরেই থাকে। এই বর্ণনার মধ্যে মিশে থাকে সৃষ্টির গল্প, বংশলতিকা এবং স্থানিক পরিসরের অনিবার্য পারস্পরিক যুক্ততা উপস্থাপন করার জন্য বিশদ বংশবৃত্তান্ত, জগতের বৃহত্তর স্থানিক বিভাজনগুলোর গণনা এবং সেই স্থানিক বিভাজনে ভারতবর্ষের অবস্থান আর ভারতবর্ষের ভেতরের সমস্ত বিভাগের গণনা ইত্যাদি। সুতরাং ভারতবর্ষকে একটি ভৌগোলিক বর্গ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সেই বর্গের নির্দিষ্ট অবস্থানের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে রেখে বোঝপড়া করা  প্রয়োজন। সেটা না করে কেবল আগে থেকে ঠিক করা ভৌগোলিক নাম নির্বাচনের জন্য উপাদানটি অন্বেষণ করলে শব্দটির বিভিন্ন সম্ভাব্য অর্থ গুলিয়ে যাবে। বিভিন্ন পুরাণের বিবরণে ভিন্নতা আছে এবং স্বতন্ত্র পুরাণের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা রয়েছে। সব পৌরাণিক স্থানিক রূপরেখা পরস্পরের সঙ্গে খাপ খায় না। তাসত্ত্বেও মহাকাব্য মহাভারত[২২] ছাড়া পুরাণগুলোই প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে ভারতবর্ষের গাঠনিক রূপ সম্পর্কে একটি উপলব্ধি তুলে ধরে। তাই যারা ভারতবর্ষের ধারণা এবং ভারতীয় ইতিহাসের জন্য এই ধারণার তাৎপর্য খুঁজছেন, তাদের জন্য পৌরাণিক উৎসগুলো অনুসরণ করা নিশ্চিতভাবেই সার্থক।

    বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায় দ্বিতীয় অংশের প্রথম অধ্যায়ে, যার শিরোনাম ‘জগৎ-সৃষ্টি-সম্বদ্ধ-ভারত-বংশ-কথনম’ (মহাবিশ্বের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ভরত বংশের বর্ণনা)। এখানে ‘ভরত-বংশ’ এবং ‘স্বয়ম্ভূ-বংশ’ ভিন্ন ভিন্ন নাম হলেও আসলে নামান্তরযোগ্য কারণ বংশলতিকাটি স্বয়ম্ভূ মনু থেকে শুরু হয়েছে। এই বংশলতিকায় মনুর সাত পুত্রকে সাতটি দ্বীপের (জম্বু, প্লক্ষ, শাল্মলী, ক্রৌঞ্চ, কুশ, শাক, পুষ্কর) দায়িত্বে রাখা হয়েছিল। এই সাতটি দ্বীপ মিলে একত্রে পৃথিবী (বসুন্ধরা) গঠিত হয়েছিল। বিষ্ণু-পুরাণের ‘ভারত-বংশ-কথনম’-এর পরে আসে ‘জম্বুদ্বীপ-বর্ণনম’ (জম্বুদ্বীপের বর্ণনা), তারপর ‘ভারত-বর্ষ-বর্ণনম’ (ভারতবর্ষের বর্ণনা), এবং তার পরে আসে ‘ষড়-দ্বীপ-বর্ণনম’ (ছয়টি দ্বীপের বর্ণনা)।

    প্রিয়ব্রতের পুত্র আগ্নীধ্র শাসিত জম্বুদ্বীপ আবার নয়টি ভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘হিমবর্ষ’ আর পরে এই ভাগ ‘ভারত-বর্ষ’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে আর এর শাসনভার ন্যস্ত হয় নাভির ওপর। ঋষভের পুত্র ভরত এই বংশেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ‘দেশটিকে ভারত নামে অভিহিত করা হয় সেই সময় থেকে যখন তাঁর পিতা এই অংশটি ভরতের হাতে অর্পণ করেন…’। ভরতের পরেও বংশলতিকা চলতে থাকে এবং ভারতবর্ষ নয়টি ভাগে (ভেদাঃ) বিভক্ত হয়। ‘যখন তিনি প্রথম মন্বন্তরে সভাপতিত্ব করেছিলেন তখন যে স্থানের মাধ্যমে পৃথিবী জনাকীর্ণ হয়েছিল সেই স্থানটি ছিল স্বয়ম্ভূব মনুর সৃষ্টি।” [২৩]

    বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে বিশ্বতাত্ত্বিক রূপরেখার বিবরণী চলতে থাকে। তৃতীয় অধ্যায়টি শুরু হয় নিচের শ্লোকটি দিয়ে:

    উত্তরম্ যৎ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্

    বর্ষম্ তদ্ ভারতম্ নাম ভারতী যত্র সন্ততিঃ

    শ্লোকটির একটি আক্ষরিক অনুবাদ হবে:

    যে [বর্ষ] সমুদ্রের উত্তরে এবং তুষারাবৃত পর্বতের (হিমালয়) দক্ষিণে অবস্থিত, তাকে বলা হয় ভারত, যেখানে সন্ততিরা ভারতী নামে পরিচিত।

    উপরে উদ্ধৃত শ্লোকটিতে নির্দেশিত ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের সম্ভাব্য অর্থ বিবেচনা করার সময় একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই বর্ণনা এমন একটি পরিপ্রেক্ষিতে রেখে বুঝতে হবে যেখানে এই বর্ণনা কঠোরভাবে এবং সঠিকভাবে ভৌগোলিক নয়, বরং বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার। বিভিন্ন পর্বতমালার সঙ্গে যুক্ত পর্বত ও নদীর মতো প্রাকৃতিক স্থানিক বৈশিষ্ট্যবলি ভারতবর্ষকে অন্যান্য বর্ষ ও দ্বীপ থেকে আলাদা করায় এখানে এক ধরনের ভৌগোলিক অর্থ সঞ্চারিত হলেও। পর্বতমালাগুলোর প্রতিটি একেকটি ‘কুল-পর্বত’ (family mountain)। সেগুলো হলো—মহেন্দ্র, মলয়, সহ্য, শুক্তিমৎ, ঋক্ষ, বিন্ধ্য এবং পারিপাত্র; এবং এগুলো থেকে উৎপন্ন নদীগুলো বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হয়।

    আবারও সেই ‘দিক’ নির্দেশনা মধ্যভাগ বা মধ্যদেশের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের কাঠামো গঠন করে। সুতরাং, যদিও ভারতবর্ষকে নয়টি বিভাগে বিভক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলোর সবকটি তাদের স্বতন্ত্র নামে নির্দিষ্ট, তবুও ‘দিক’ বা দিশাই নির্দেশ করে যে কীভাবে বিভিন্ন জনপদের বিভিন্ন সম্প্রদায় ভারতবর্ষের মধ্যে বিন্যস্ত ছিল। বিষ্ণু-পুরাণ থেকে একটি শ্লোক উদ্ধৃত করা যাক:

    ভারতের পূর্বে (পূর্বে) বাস করে কিরাতরা… পশ্চিমে (পশ্চিমে) যবনেরা; কেন্দ্রে (মধ্যে ভাগশঃ) বাস করে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্ররা, যারা যথাক্রমে যজ্ঞ, অস্ত্র, বাণিজ্য এবং সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত।

    এখানে ‘দিক’ বা দিশা কেবল ভৌগোলিক অর্থে মধ্য অঞ্চলের কেন্দ্রিকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। বরং বিষ্ণু-পুরাণ (এবং অন্যান্য পুরাণও) যে সামাজিক ব্যবস্থাকে একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করত, সেটার সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রান্তীয় এলাকায় প্রচলিত ব্যবস্থার বৈপরীত্য বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়েছে। জনপদ সম্প্রদায়গুলোকে ভৌগোলিকভাবে স্থাপন করার প্রেক্ষাপটে মধ্য অঞ্চলের একই ধরনের কেন্দ্রিকতা বজায় রাখা হয়েছে। এভাবেই, কুরু এবং পাঞ্চালদের মধ্য অঞ্চলে (মধ্যদেশ) বরাদ্দ করা হয়েছে; কামরূপদের পূর্বে (পূর্ব-দেশাদিক); সৌরাষ্ট্র এবং আভীরদের অপরান্তে (পশ্চিমে)  আর এভাবেই বাকিদেরও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

    বিষ্ণু-পুরাণের দ্বিতীয় অংশের পরপর চারটি অধ্যায়ে (অথবা অন্যান্য প্রধান পুরাণে কখনো কখনো আরও বিশদভাবে) যেভাবে ভারতবর্ষকে একটি বিশ্বতাত্ত্বিক ছকের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই ভঙ্গি থেকে এই উপস্থাপনার প্রকৃতি সম্পর্কে বেশ কিছু প্রসঙ্গ চিহ্নিত করা যেতে পারে।

    প্রথমত, যেহেতু ভারতবর্ষ খুব স্পষ্টভাবে একটি অনেক বড় নকশার অংশ, সেহেতু পদ্ধতিগতভাবে এই ভূখণ্ডগত উপাদানকে একটি বাস্তব ভূখণ্ডগত একক হিসেবে চিহ্নিত করা এবং একটি ভৌগোলিক বাস্তবতা হিসেবে ধরে নেওয়া অনুপযুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে, ভারতবর্ষের কাঠামো নির্মাণে পুরাণ সংকলকরা সমসাময়িক ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সেই কাঠামোর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বোঝাপড়াকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সুতরাং ভারতবর্ষের নকশা করার সময় একটি স্থানিক পরিসরকে প্রথমে চারটি প্রধান দিকে ভাগ করে মধ্যখানে একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল রাখা আর তারপরে আরও সাত বা নয়টি ভূখণ্ডগত উপ-বিভাগ তৈরি করার মৌলিক মানচিত্রীয় রীতি অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছিল। এই রীতি অনুসরণ করে এই আদর্শায়িত স্থানিক পরিসরের অধিবাসীদের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণে ছড়িয়ে থাকা নিজ নিজ অঞ্চলে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। আদি লিখিত সূত্রগুলোর এই ভৌগোলিক জ্ঞান সবক্ষেত্রে অন্যান্য উৎস এবং বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের অবস্থান সম্পর্কে সমসাময়িক তথ্যের সঙ্গে মেলে না। যেমন বিষ্ণু-পুরাণেই পুণ্ড্র, কলিঙ্গ এবং মগধের সকলকে দাক্ষিণাত্য বা দক্ষিণের মানুষদের সঙ্গে একাকার করে ফেলা হয়েছে। পশ্চিম অঞ্চলের (অপরান্তাঃ) জন্য যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তাতে উত্তরাঞ্চলের কোনো উল্লেখ ছাড়াই শাকলবাসিন, সাল্ব, মদ্র, হূণ, সৈন্ধব এবং আরও অনেক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেভাবে বিবেচনা করলে এদের উত্তর অঞ্চলেই স্থাপন করা শ্রেয় হতো।[২৪] আদি লিখিত উৎসগুলোতে বিবৃত  ভারতবর্ষের বর্ণনাকে ভারতীয় ইতিহাসের ভূগোলের অনুরূপ বলে ধরে নেওয়ার আগে একথা মনে রাখা দরকার যে, এই টেক্সটগুলোর সংকলকদের কাছে হয়তো খুঁটিনাটি নির্ভুলতা নয়, বরং ভারতবর্ষের সামগ্রিক কাঠামো কল্পনা করা এবং সেই কাঠামোকে একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখায় খাপ খাওয়ানোই অধিকতর প্রাসঙ্গিক ছিল।

    দ্বিতীয়ত, পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনাটি বংশলতিকার বিবরণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই বংশবিবরণী মহাবিশ্বের নকশার বিভিন্ন স্তরকে আবৃত করে রাখে আর এই বংশানুক্রমের শুরু হয় মনুর পুত্রদের দিয়ে এবং পৈতৃক সম্পত্তি সাত পুত্রের মধ্যে আদি ভাগাভাগির মাধ্যমে। বিষ্ণু-পুরাণে ভারতবর্ষের বর্ণনায় ‘ভারতী সন্ততিঃ’ অভিব্যক্তিটিকে তাই ‘ভরতের সন্তানের’ মতন অতিরঞ্জিত অর্থে গ্রহণ করা উচিত না। বরং সহজভাবে ‘ভরতের বংশে জন্ম নেওয়া সন্তান’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ। বায়ু-পুরাণে একটি একই ধরনের অভিব্যক্তিতে এমন অর্থ স্পষ্ট করা হয়েছে:[২৫]

    তৈর=ইদম্ ভারতম্ বর্ষম্ নব-ভাগৈর-অলংকৃতম্

    তেষাং বংশ-প্রসূতৈশ=চ ভুক্তেয়ং ভারতী পুরা

    এই ভারতবর্ষ, যেটা তার নয়টি অংশ দ্বারা অলংকৃত, অতীতে তাদের বংশে জাত এবং ভারতী নামে পরিচিতদের দ্বারা ভোগ করা হতো।

    তৃতীয়ত, এই পৌরাণিক ভারতবর্ষের অর্থ যে ভৌগোলিক অর্থের বাইরেও বিস্তৃত ছিল, সে বিষয়টি জম্বুদ্বীপের অন্যান্য বর্ষ থেকে পরিসরকে আলাদা করার ধরনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন, অন্যান্য বর্ষে কোনো বিপর্যয় ছিল না, বার্ধক্য বা মৃত্যুর ভয় ছিল না, ধর্ম বা অধর্মের কোনো বোধ ছিল না, অথবা উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ বা যুগের বিভাজন ছিল না; কেবল ভারতবর্ষই বিভিন্ন যুগের অনুক্রমের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করত। এই অঞ্চলেই কেবল ‘কর্ম’ সচল ছিল এবং এই কর্ম চারটি বর্ণের অস্তিত্ব দ্বারা চিহ্নিত হতো। অন্যান্য বর্ষগুলো ছিল ‘ভোগ-ভূমি’। কিন্তু ‘কর্ম-ভূমি’ হওয়ার কারণে ভারতবর্ষকে অন্য সব বর্ষের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হিসেবে প্রক্ষেপ করা হয়েছে।

    যেহেতু পুরাণের বর্ষ-প্রক্ষেপণ শাসকদের বংশলতিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল সেহেতু স্থানিক-পরিসরের আরেকটি প্রসঙ্গ বিবেচনা করা যেতে পারে। একজন সার্বভৌম শাসকের বা সার্বভৌম হতে ইচ্ছুক শাসকের কর্তৃত্ব বিস্তারের প্রসঙ্গে ‘দিগ্বিজয়’ বা ‘চক্রবাল জয়ের’ ধারণার ভিত্তিতে এমন পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আমরা এখন অন্বেষণ করব কীভাবে এই পর্যালোচনা ভারতবর্ষের অর্থ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়ায় আরও গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে। বিশেষ করে কালিদাসের বংশলতিকামূলক কাব্য রঘুবংশমে চিত্রিত ইক্ষ্বাকু শাসক রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ বা ‘দিকজয়ের অভিপ্রায়ের’[২৬] উল্লেখ করে এই পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

    ৩. দিগ্‌বিজয় (দিগ্‌জিগীষা) বা চর্তুদিক জয়

    কালিদাস যেভাবে রঘুর বিজয় অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে রঘুর যাত্রা শুরু হয় প্রথমে উল্লেখ করার রীতি অনুসারে পূর্ব (প্রাচী) দিক দিয়ে এবং তারপরে তাকে নিয়ে আসা হয় তাল গাছের কুঞ্জবন দিয়ে ঘেরা অন্ধকার সমুদ্রের তীরে। এই অঞ্চলে তিনি সুহ্মদের,[২৭] এবং নৌবহরসহ বঙ্গ রাজপুত্রদের মুখোমুখি হন;[২৮] এবং তারপর কপিশা নদী পার হয়ে[২৯] তিনি উৎকলের দিকে অগ্রসর হন।[৩০] আরও এগিয়ে, মহেন্দ্র পর্বতের চূড়া ছাড়িয়ে,[৩১] তিনি কলিঙ্গদের বশীভূত করেন।[৩২] এরপর সমুদ্রতট ধরে সেনাবাহিনী ঋষি অগস্ত্যের নেওয়া পথের দিকে (অর্থাৎ দক্ষিণে) যাত্রা করে। পরে তাদের কাবেরী নদী এবং মলয় পর্বতের উপত্যকায় নিয়ে যায়।[৩৩] এই অঞ্চলের অন্য যে ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো তাম্রপর্ণী নদী ও সমুদ্রের সঙ্গমস্থল,[৩৪] এবং ‘সেই অঞ্চলের স্তনযুগলের মতো’ (দিশস্তস্যাঃ) মলয় ও দরদুর পর্বত। সেখান থেকে আরও এগিয়ে রঘু সহ্য পর্বত অতিক্রম করেন। অপরান্ত[৩৫] এবং কেরালাকে বশীভূত করার পর রঘু ত্রিকূটের[৩৬] দিকে ধাবিত হন, যেখান থেকে স্থলপথে (স্থল-বর্ত্মনা) পারসিকদের দিকে যাত্রা করা হয়। একই প্রসঙ্গে যবনদেরও উল্লেখ করা হয়েছে।[৩৭] অশ্বারোহী হিসেবে পারদর্শী পশ্চিমা মানুষদের (পাশ্চাতৈঃ অশ্ব-সাধনৈঃ) সঙ্গে রঘুর প্রচণ্ড লড়াইয়ের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:[৩৮]

    মৌচাক যেমন মৌমাছি দিয়ে ঢাকা থাকে, তেমনি তিনি তাঁর (ভল্ল) তীরের আঘাতে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা দাড়িওয়ালা মাথা দিয়ে পৃথিবীকে আবৃত করে ফেলেছিলেন। অবশিষ্টরা তাদের শিরস্ত্রাণ খুলে তাঁর কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে।

    যে দিকের অধিষ্ঠাতা কুবের রঘুর সেই উত্তর (উদীচ্য) দিকের যাত্রা তাকে হূণ[৩৯] এবং কম্বোজদের[৪০] বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। উত্তরে আরও গমন তাকে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা এবং গঙ্গা নদীর উজান অংশে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি কিরাত এবং অন্যান্য পার্বত্য উপজাতির (পার্বতীয় গণ) মুখোমুখি হন। কৈলাস পর্বতের ওপারে এবং লৌহিত্য নদী পার হয়ে রঘু প্রাগজ্যোতিষ এবং কামরূপ রাজ্যে পৌঁছান; এবং তাদের বশীভূত করার মাধ্যমেই রঘুর দিগ্বিজয় সম্পন্ন হয়। চার দিকের এই বিজয় ছিল ‘বিশ্বজিৎ’ (বিশ্বজয়) যজ্ঞ করার পূর্বপ্রস্তুতি। দিক বা ‘দিশ’ জয় এবং যজ্ঞ সম্পাদনের মাধ্যমে রঘুর সার্বভৌম শাসকের মর্যাদা অর্জন সম্পন্ন হয়। এই মর্যাদা সকল ‘জিগীষু’ শাসকের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা।

    রঘুবংশমের উপাদানগুলো সংক্ষেপিত করার আমার এই চেষ্টার প্রধান প্রাসঙ্গিকতা হলো চারটি ‘দিশ’ বা দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ভূগোল এবং সেই স্থানিক পরিসরের সম্মিলন যেটির উপর একজন আদি ভারতীয় সম্রাট একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের বাসনা করতেন। এই ধারণাটি ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ নামের আরেকটি অভিব্যক্তিতেও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে, বিশুদ্ধ ‘ভৌগোলিক’ দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের যা আকর্ষণ করে তা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রাকৃতিক বিভিন্ন চিহ্ন এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের উল্লেখ। এগুলো প্রতিটি ‘দিশ’-এর সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্ত। সুবিধার জন্য, এই চিহ্নগুলো ও উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের বিবরণ একটি সারণি আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে।[৪১]

    রঘুবংশমের এই বিবরনীগুলো ভারতবর্ষের ভূখণ্ডের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যাবলিকে উপস্থাপন করার দাবি করে না। তবে এখানেও একই মূখ্য-ধারণা হিসেবে ‘দিশ’ বা দিক ব্যবহার করা হয়েছে। কালিদাসের উদ্দেশ্য কঠোরভাবে ভৌগোলিক নির্ভুল বর্ণনা প্রদান করা ছিল না। বরং একজন সার্বভৌম-পদপ্রার্থী শাসককে যে স্থানিক পরিসরটি অতিক্রম করতে হতো তার রূপরেখা উপস্থাপন করা ছিল তার লক্ষ্য। কিছু কিছু স্থানের অবস্থানগত স্বেচ্ছাচারিতা সহজেই শনাক্ত করা যায়। যেমন, কলিঙ্গের পরেই কেবল দক্ষিণ অঞ্চলের ইঙ্গিত দেওয়া; মলয়ের সঙ্গে নয় বরং সহ্য বা পশ্চিমঘাটের পরেই কেবল কেরালার উল্লেখ; প্রাগজ্যোতিষ থেকে কামরূপকে আলাদা করা এবং রঘুর ‘উদীচ্য’ বা উত্তরের বিস্তৃত অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান নির্দেশ করা। পুনরায় বলা যেতে পারে যে, কালিদাস ভৌগোলিক নির্ভুলতার চেয়ে রঘুর ভ্রমণসূচিকে চার দিকের মূল ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, পূর্ব দিক দিয়ে শুরু করে ‘দিশ’-এর ধারণা ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে প্রাগজ্যোতিষ ও কামরূপে (যাদের সঠিকভাবেই প্রাচ্য বা পূর্বে স্থাপন করা উচিত) এই ভ্রমণসূচি শেষ করে কালিদাস কৌতূহলদ্দীপকভাবে চার দিকের ধারণাকে একজন সার্বভৌম শাসকের কর্তৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় স্থানিক পরিসর ঘিরে একটি বৃত্তাকার যাত্রার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একথাও বলা যেতে পারে যে, চারটি প্রধান দিকের বিদ্যমান ভৌগোলিক জ্ঞান, এই দিকগুলোর সাপেক্ষে প্রধান ভৌত ভূসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যাবলি (সমুদ্র, পর্বত, নদী) এবং সেগুলোর সাপেক্ষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবস্থানকে রঘুবংশম পর্যাপ্তভাবে ব্যবহার করেছে। রঘুবংশমের বর্ণনার অতিরিক্ত তাৎপর্য রয়েছে। এই বিবরণী বিভিন্ন স্থানিক অবস্থানের স্বতন্ত্র ধরণের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে এক ধরণের পরিচিতি প্রদর্শন করে। কালিদাসের উপাদানের [কিছু তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য] আবারও বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে যখন আমরা ভারতবর্ষের ধারণা সংক্রান্ত আমাদের অনুসন্ধানগুলোর সারসংক্ষেপ করব।

    এখন আমরা পরবর্তী সময়ের একটি লিখিত সূত্রের দিকে নজর দিতে পারি। এই গ্রন্থ নবম-দশম শতাব্দীর দিকে রচিত হয়েছিল। এই গ্রন্থটির উপজীব্য ও উদ্বেগের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের হলেও, এখানেও ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্রের’ (অর্থাৎ ‘যিনি বাধাহীনভাবে চলাচল করেন তাঁর ক্ষেত্র’) সঙ্গে সম্পর্কের নিরিখে ভারতবর্ষের সেই আদি ধারণাটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং একভাবে পুনর্ব্যক্তও করে।

    ৪. একটি সমন্বয়ী প্রচেষ্টার অনুশীলন? রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা

    পুরাণগুলিতে বর্ণিত ভারতবর্ষের ধারণাটি ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং ‘জনপদ’ নিয়ে গঠিত। আবার কালিদাসের দিগ্বিজয় সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত অথচ চিত্তাকর্ষক বর্ণনায় ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার না করেই সেই একই ভূখণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই ধারণাটি ধীরে ধীরে কমবেশি একটি প্রথাবদ্ধ রূপ ধারণ করছিল, যদিও স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলিতে এর কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লক্ষ্য করা যায়। রাজশেখরের ‘কাব্যমীমাংসা’ (কাব্যের আলোচনা) গ্রন্থে ‘দেশ-বিভাগের’ প্রসঙ্গটি এসেছে ‘জগৎ’ এবং ‘ভুবন’ শব্দ দুটির অর্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরেই। এর কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন: (১) সমগ্র জগৎ বা ভুবন, কিংবা তার একটি অংশবিশেষও ‘দেশ’ বোঝাতে পারে; এবং (২) দেশ ও কাল নিয়ে কারবার করার সময় একজন কবির ‘অর্থদরিদ্রতা’ (বোঝাপড়ার দৈন্য) থাকা উচিত নয়।

    ‘দেশ’ নিয়ে এই আলোচনার প্রেক্ষাপটেই রাজশেখর ভারতবর্ষের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বহু ভুবনের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা থাকলেও, ‘ভূলোক’ বলতে পৃথিবীকেই (পৃথ্বী) বোঝায়, যা সাতটি দ্বীপে বিভক্ত। রাজশেখর যদিও বহু মতামতের উল্লেখ করার রীতি মেনে চলেছেন, তবু তিনি মূলত ভারতবর্ষের পৌরাণিক কাঠামোটিই অনুসরণ করেছেন। বিশেষত বায়ু-পুরাণের বিশদ বর্ণনাকে। তিনিও ভারতবর্ষকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ‘জনপদ’ বা এলাকাগুলিকে বিন্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি দিক-নির্দেশনাকারী প্রথার ওপরই নির্ভর করেছেন। রাজশেখরের রূপরেখায় একটি বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে অভিনব। এক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিন্দু নির্দেশ করেছেন যে-বিন্দু থেকে বিভিন্ন দিকের শুরু হয়। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় বা মূল অঞ্চলটি হলো সুসংজ্ঞায়িত ‘আর্যাবর্ত’, যে-জায়গাটি আবার ‘মধ্যদেশের’ সমতুল্য। ভৌগোলিকভাবে তিনি এই স্থানিক পরিসরের সীমানা নির্ধারণ করেছেন পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্রের মধ্যবর্তী এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে।

    প্রতিটি দিকের (দিশ) সূচনা ঠিক কোথায় সেটা আর্যাবর্তের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট করতে গিয়ে রাজশেখর যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তাতে স্পষ্টতই কিছু স্থানিক পরিসরের একের অপরের উপরে উঠে পড়াটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।   বিশেষত যখন রাজশেখর মত দেন যে, কারো কারো কাছে দিক-বিভাগ পরিবর্তনশীল মনে হলেও, ‘অন্তর্বেদী’ থেকে এবং কান্যকুব্জকে (কনৌজ) অনেকটা মধ্যরেখা (meridian) হিসেবে ধরে এই ভৌগোলিক বিভাজন করা সম্ভব।[৪২] যেহেতু আর্যাবর্ত এবং অন্তর্বেদী (যমুনা ও গঙ্গার মধ্যবর্তী অঞ্চল) উভয়কেই দিক নির্ণয়ের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হচ্ছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায় যে সকল দিক-নির্দেশনা কেন্দ্রের সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে মিশে যাচ্ছে বা ওভারল্যাপ করছে।

    উদাহরণস্বরূপ, যদিও আর্যাবর্তকে পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্র এবং হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, রাজশেখরের মতে ‘পূর্বদেশ’ শুরু হচ্ছে বারাণসীর পূর্ব দিক থেকে; ‘পশ্চাদ্দেশ’ (পশ্চিম অঞ্চল) শুরু হচ্ছে দেবসভা থেকে; ‘দক্ষিণাপথ’ (দক্ষিণ অঞ্চল) মাহিষ্মতী থেকে এবং উত্তর অঞ্চল শুরু হচ্ছে ‘পৃথুদক’ থেকে।[৪৩] এই অসংগতি সত্ত্বেও, একটি বাস্তব ভৌগোলিক বিন্দুর (যেমন বারাণসী, মাহিষ্মতী, পৃথুদক ইত্যাদি) সাপেক্ষে একটি দিকের (দিশ বা দিক) কাঠামোর বিশদ বিবরণ দেওয়ার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, প্রতিটি দিকের সূচনা নির্দিষ্ট করতে এবং সেই দিকের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক স্থাপনে এই বিন্দুগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হতো।

    স্বতন্ত্র দিকগুলোর কাঠামো নিয়ে রাজশেখরের বিস্তারিত আলোচনায় তিনটি প্রধান পৌরাণিক উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়: জনপদগুলোর তালিকাভুক্তিকরণ, ওই দিকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পর্বতমালা এবং সেখান থেকে প্রবাহিত নদীসমূহের উল্লেখ। প্রত্যাশিত কিছু ভিন্নতা থাকলেও, সমস্ত দিকের বর্ণনায় এই ছকটি উপস্থিত। তবে রাজশেখর এগুলোর সঙ্গে বাড়তি যা যোগ করেছেন, তা হলো কালিদাসের ঢঙে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত প্রাকৃতিক পণ্যের তালিকা। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক : উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল)-এর বর্ণনায় সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সেখানে উৎপাদিত পণ্যগুলোর (উৎপাদিতঃ) কথাও বলা হয়েছে: যেমন সরল ও দেবদারু গাছ, দ্রাক্ষা (আঙ্গুর), কুঙ্কুম (জাফরান), চামর, মৃগ-চর্ম (হরিণের চামড়া), সৈন্ধব-লবণ (খনিজ লবণ), সৌবীর (?), স্রোতোঞ্জন (?), বৈদুর্য (মনিবিশেষ) এবং তুরঙ্গ (ঘোড়া)। এই তালিকাটি যে সর্বাঙ্গীন বা এমনকি নির্ভুল হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে অন্য অঞ্চলের থেকে ওই অঞ্চলকে আলাদা করার জন্য তা যথেষ্ট।

    রাজশেখর জম্বুদ্বীপ, ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের নয়টি ভাগের উল্লেখ প্রসঙ্গে ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’[৪৪] (সার্বভৌম শাসকের ক্ষেত্র বা স্থান) ধারণাটির অবতারণা করেছেন। রাজশেখরের মতে, কুমারীপুরা থেকে বিন্দুসরোবর পর্যন্ত হাজার যোজন বিস্তৃত এই ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ হয়তো নিখুঁত ভৌগোলিক মাপে পরিমাপযোগ্য নয়; কিন্তু ভারতবর্ষের ধারণার মধ্যে এই ধারণাটির তাৎপর্য হলো ওই নির্দিষ্ট স্থানিক পরিসরের সঙ্গে ভারতবর্ষের সংযোগ স্থাপন। দিক-বিভাগের বিষয়ে রাজশেখরের ধারণার আরও অনেক মাত্রা আছে, যেগুলো বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার প্রয়োজন নেই। পৌরাণিক উপাদানের পুনরাবৃত্তি এবং তার সঙ্গে নতুন সংযোজনের মাধ্যমে রাজশেখর মূলত পৌরাণিক কাঠামোর মধ্যেই ভারতবর্ষের একটি নকশাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর উপস্থাপনায় এই ধারণা বংশলতিকার সঙ্গে যুক্ততা থেকে মুক্ত। ভবিষ্যৎ রচয়িতাদের কাছে হয়তো তাদের নিজস্ব প্রসঙ্গগুলোকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই ধরণের নকশা বেশ উপযোগী বলে মনে হয়েছিল।

     

    ৫. ভারতবর্ষের অর্থের ব্যঞ্জনা

    কালানুক্রমিকভাবে ভিন্ন তিন ধরনের লিখিত সূত্রে ভারতবর্ষ এবং এর ধারণার সঙ্গে যুক্ত বৈশিষ্ট্যের যে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে দুটি বিষয় সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব: প্রথমত, যারা এ বিষয়ে লিখেছিলেন তারা ভারতবর্ষকে কীভাবে দেখতেন; এবং দ্বিতীয়ত, তাদের সেই উপলব্ধির বিবর্তন কীভাবে ঘটেছিল। একথা স্পষ্ট যে, ভারতবর্ষকে নিজে থেকেই একটি সুসংজ্ঞায়িত ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে দেখা হতো না। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আদিতম উল্লেখ থেকে যেকথা বোঝা যায় তা হলো পরবর্তীকালে যে স্থানিক-পরিসর ও ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে ভারতবর্ষ শুরুতে সেই ধারণার অংশমাত্র ছিল। সম্ভবত এই স্থানিক ধারণা ভরতদের ‘জনপদের’ সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যেমনটা ছিল কুরু, কোশল, মগধ, বৎস এবং আরও অনেকগুলো জনপদের ক্ষেত্রে।

    প্রকৃতপক্ষে, ‘ভারতবর্ষ‘  নয় বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসতি বা বাসস্থানকে সংজ্ঞায়িত করত ‘জনপদ’ শব্দটি। ভারতবর্ষের অর্থের প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে স্বতন্ত্র জনপদগুলি এসব অর্থেরই বিভিন্ন ‘স্থানিক-সামাজিক’ উপাদানে পরিণত হয়। এই বর্ধিত কাঠামোতে সেই সব জনপদের অবস্থান নির্দিষ্ট করা হতো মধ্যদেশের সাপেক্ষে সেগুলোর ‘দিশ’ বা দিকের ভিত্তিতে।

    ‘দিশের’ এই মূল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ভারতবর্ষের বিকশিত ধারণাটি একটি দেশের (দেশ) রূপ লাভ করে, যা আদতে ‘দিশ’ শব্দ থেকেই উদ্ভূত। তবে, এই দেশটি ছিল উন্মুক্ত-প্রান্তবিশিষ্ট, ভৌগোলিকভাবে আবদ্ধ বা ঘেরা নয়। যদিও পুরাণগুলোতে হিমবৎ এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষকে ভৌগোলিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও বিভিন্ন দিকের জনপদ এবং জাতিগত সম্প্রদায়গুলো কখনোই এই ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মিলেমিশে যায় নাই।

    উদাহরণস্বরূপ, রাজশেখরের সাক্ষ্য অনুযায়ী, উত্তরাপথ (উত্তর অঞ্চল) শুরু হচ্ছে পৃথুদকের (বর্তমান হরিয়ানা) ওপার থেকে। সেখানে শক, কেকয়, ভোক্কান, হূণ, বাণায়ুজ, কম্বোজ, লিম্পক, তঙ্গণ, তুরুস্ক, তুষার এবং আরও অনেক সম্প্রদায়ের বাস। এতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ‘দিশ’ বা দিক ছিল একটি স্থিতিস্থাপক ধারণা। কোনো অনমনীয় ভৌগোলিক সীমানা নয়। যদিও জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে আবদ্ধ স্থানের (সীমানা বোঝাতে ‘মর্যাদা’ বা ‘সীমা’) ধারণাটি বেশ প্রচলিত ছিল। একইভাবে, রাজশেখর এবং অন্যান্য অনেক সূত্রে সিংহল বা শ্রীলঙ্কাকে দক্ষিণ অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য লিখিত উৎস [৪৫] থেকেও এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যেগুলো একথা স্পষ্ট করে দেয় যে, এমনকি এর বিবর্তিত অর্থেও অতীতে ভারতবর্ষকে কখনো এমন কোনো সংহত ও জমাটবদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হয়নি, যে দেশের ভিত্তিতে এখানকার অধিবাসীদের চিহ্নিত করা হবে, অথবা তারা নিজেরা সেই পরিচয়ে পরিচিত হবে।

    সুতরাং, একটি উন্মুক্ত পরিসরের দ্যোতক হিসেবে ভারতবর্ষ ছিল একটি বিশ্বতত্ত্বীয় রূপরেখার অংশ। অন্তত পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্ব এবং পৌরাণিক বিশ্বচিত্রের (যদি এই শব্দটি ব্যবহার করা যায়) ক্ষেত্রে সৃষ্টির আখ্যান এবং রাজকীয় বংশলতিকা (যার একটি অংশ হলো ভরত বংশ) ছিল এই ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইসঙ্গে, ভারতবর্ষের ধারণাটি স্থবির ছিল না। পুরাণগুলি যেখানে কেবল বিস্তৃতি, পর্বত এবং নদনদী দিয়ে ভারতবর্ষের পরিসরের কাঠামো ব্যাখ্যা করেছে, সেখানে কালিদাসের লেখায় স্থানীয় বিচিত্র সম্পদের সঙ্গে পরিচয়ের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাজশেখর তাঁর ‘দেশ-পরিচয়’ অধ্যায়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন দিকের বর্ণনায় যে স্থানীয় পণ্যের উল্লেখ করেছেন, সেটাও এই ধারারই অংশ। বসতি অঞ্চল, পর্বত ও নদীর অবস্থান সংক্রান্ত ভৌগোলিক জ্ঞানের ভাণ্ডার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এবং সেই জ্ঞান ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, কালানুক্রমিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণগুলো বিচার করলে দেখা যায় ‘জন’ থেকে ‘জনপদ’, সেটা থেকে ‘বর্ষ’ এবং শেষে ‘দেশ’-এর ধারণায় পৌঁছানের একটি ক্রমরূপান্তর লক্ষ্য করা সম্ভব।

    তাই ভারতবর্ষ কোনো ‘পবিত্র স্থান’ ছিল না। আবার এডনি যেমনটা বলেছিলেন, এই পরিসর কোনো ‘অবোধ্য দৃশ্যপটও’  ছিল না। জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত একটি ‘বর্ষ’ হিসেবে ভারতবর্ষের আরেকটি অর্থ খোঁজা যেতে পারে। এই ভূখণ্ড এমন একটি স্থান যেটা ‘কর্মের’ নীতি দ্বারা শাসিত। আর এই পরিসর সেই স্থান যেখানে অধিবাসীরা চার বর্ণে বিভক্ত ছিল।[৪৬] এখানেও ‘দিশ’ বা দিকের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ‘মধ্যদেশ’ বা ‘আর্যাবর্ত’ ছিল সেই কেন্দ্রীয় অঞ্চল যেটা একটি আদর্শ হিসেবে বিরাজ করত। রাজশেখরের ভাষায়: ‘এখানে চারটি বর্ণ এবং চারটি আশ্রমের বিধান প্রচলিত। এটাই সদাচারের মূল।’ আর্যাবর্ত থেকে নৈকট্য বা দূরত্ব নির্দেশ করত ওই আদর্শের প্রতি আনুগত্যের মাত্রা; যেমন মনু আর্যাবর্তের বাইরের জাতিগোষ্ঠীগুলোকে ‘ম্লেচ্ছ’ পর্যায়ে ফেলেছিলেন।[৪৭]

    ভারতবর্ষকে যেহেতু একটি কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং চারটি প্রধান দিকের (যা আরও প্রসারিত হয়ে সাত বা নয়ে দাঁড়াতে পারে) সমষ্টি হিসেবে এবং সেগুলোতে অবস্থিত বিভিন্ন জনপদের সমাহার হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, সেহেতু বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর আত্ম-পরিচয় (এবং অন্যদের দ্বারা তাদের পরিচিতি) নির্ধারিত হতো তাদের নিজ নিজ জনপদের ভিত্তিতে। ভারতবর্ষের ভিত্তিতে নয়। একজন ব্যক্তি নিজেকে মগধ, কোশল, দ্রাবিড়, কোঙ্কণ বা অবন্তীর অধিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে পারতেন; অথবা গান্ধার, কুরু বা মদ্র থেকে আগত হিসেবে তাকে সম্বোধন করা হতো। কিন্তু কখনোই ‘ভারতবর্ষ থেকে আগত’ হিসেবে নয়।[৪৮] সুতরাং, জনপদগুলোকে বাদ দিলে ভারতবর্ষের অর্থ খুব একটা দাঁড়াত না। সেকারণেই পূর্ণ বিকশিতই হোক বা অঙ্কুরোদগমশীল হোক, ভারতবর্ষ আমাদের আদি জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কি না সেই প্রশ্নটি তোলা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক।[৪৯] ভারতবর্ষের ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ‘স্বদেশ’ (নিজের দেশ) বা ‘বিদেশ’ (ভিন দেশ) শব্দগুলোর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না।

    ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই ভারতবর্ষের আদি অর্থ আলোচনা ও বোঝা সম্ভব। ভারতবর্ষের ব্যঞ্জনায় ‘সীমানা’ (border), ‘সীমান্ত’ (frontier) বা ‘বিদেশির’ ধারণা অনুপস্থিত ছিল। তাই মনে হয় প্রাথমিক উৎসগুলোতে ঘন ঘন হানা ও আক্রমণের উল্লেখ এবং সেগুলোর নেতিবাচক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের কথা থাকা সত্ত্বেও ‘আক্রমণের জুজু’ এবং ভারতীয় সমাজে গুরুতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অনুঘটক হিসেবে ‘বিদেশিদের’ উপস্থিতির বয়ান আদি ভারতীয়দের ভারতবর্ষ ও সমাজকে দেখার অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আক্রমণ ‘নিজ/আত্ম’ এবং ‘অপরের’ মধ্যে বিভাজন তৈরি করেনি। ভারতীয় সমাজের প্রধান বিভাজন রেখাটি দেখা হতো ‘বর্ণের’ দৃষ্টিকোণ থেকে। এই বিভাজন ভেতরে থাকা এবং বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে সর্বপ্রধান পার্থক্যটি তৈরি করে দিত।

    ঔপনিবেশিক প্রশাসন যেভাবে ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারতবর্ষের’ ধারণাগুলোকে ব্যবহার করেছিল সেটা এই স্থানিক ধারনার আদি অর্থ থেকে একটি নিশ্চিত বিচ্যুতি চিহ্নিত করে। একটি মানচিত্রায়নযোগ্য, সংহত, অনড় আঞ্চলিক সত্তা হিসেবে পরিচয়কে জমাট বাঁধিয়ে সেটিকে অতীতের ওপর ছুড়ে দেওয়া হলো। যেটি ছিল উন্মুক্ত, সেটি এখন হয়ে উঠল প্রশাসনিকভাবে সংজ্ঞায়িত একটি আবদ্ধ দেশ।[৫০] এই স্থানিক এককটি একটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত দেশের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল এমনভাবে যেভাবে আগে কখনো ছিল না। এবং এই বদলের পেছনে লুকিয়ে আছে অতীতের বিশাল পরিসর জুড়ে ‘বিদেশি’, ‘বিদেশি আক্রমণ’, ‘অন্ধকার যুগ’ এবং অনুরূপ অশনিসংকেতের ধারণাগুলোর অনুপ্রবেশ। ভারতবর্ষের এই নবনির্মিত গণ্ডীবন্ধ সত্তাটি কেবল একটি সমসত্ত্ব ঐতিহাসিক আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই ক্ষান্ত হলো না; কালবিভ্রান্তিদোষের/অ্যানাক্রোনিজম’ বিপদ সম্পর্কে অসচেতন অনেক উৎসাহী হাতের ছোঁয়ায় এই ভূখণ্ড একটি ‘ইন্ডিয়া নেশন স্টেট’ বা ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের আসন হয়ে উঠল। আমাদের ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলোতে রাজনৈতিক একীকরণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ ও অনৈক্যের ভীতির ওপর যে জোর দেওয়া হয়, তার কারণ এভাবেই বোঝা সম্ভব।

    ভারতবর্ষের প্রাক-ঔপনিবেশিক অতীতকে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলিম’—এই দুই ভাগে তীক্ষ্ণভাবে ভাগ করার যে কালানুক্রমিক বিভাজন আমাদের ইতিহাসচর্চায় গভীরভাবে গেঁথে আছে (যা আজও কার্যকরভাবে নির্মূল করা যায়নি), সেই বিভাজন অতীতের একটি নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করেছে। এই বিভাজন আগে ভারতীয় চিন্তায় উপস্থিত ছিল না। এমন বিভাজন ‘হিন্দু শাসন’ এবং ‘মুসলিম শাসনের’ প্রক্ষেপণের জন্য দশা তৈরি করে দিয়েছে, যেন রাজনৈতিক আধিপত্য এক জাতি থেকে অন্য জাতির কাছে হস্তান্তরিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব বয়ান ‘ইন্ডিয়া’ এবং বিশেষত ‘ভারতবর্ষ’, উভয় ধারণারই একটি অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পৈশাচিক অপব্যাখ্যা (diabolical misconstruction)। অতীতের ভারতবর্ষ এমন একটি ধারণা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল যা একটি কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন স্থানিক পরিসর এবং সেগুলোর সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করতে পারত; যে কাঠামোতে আদর্শ (ideal) এবং সেই আদর্শ থেকে ভিন্নতা (variants), উভয়ই জায়গা করে নিতে পারত। ঔপনিবেশিক যুগে সৃষ্ট ভারতবর্ষের সঙ্গে একীকৃত ‘ইন্ডিয়া’র ধারণাটি একটি বোঝা হিসেবে আমাদের বইতে হচ্ছে। সম্ভবত আমাদের ক্রমবর্ধমান নব্য-জাতীয়তাবাদী যুগে এই বোঝাকে আরও অলংকৃত করতে আমরা বাধ্য হচ্ছি।

     

    ৬. আলাপের সংক্ষিপ্তসার

    ইতিহাসবিদরা দীর্ঘকাল ধরে শিলালিপিকে অতীত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন; তাই এই ধরনের প্রমাণের দিকে সংক্ষেপে দৃষ্টিপাত করে আমি ভারতবর্ষের ধারণা নিয়ে আমার শেষ বক্তব্যটি উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। এই শেষ অংশের জন্য নির্বাচিত শিলালিপিগুলো মোটামুটি দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যেকার। এই কালানুক্রমিক ব্যাপ্তিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কালপর্বকে ক্রমবর্ধমানভাবে সেই সময়কাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে যেটাকে ভারতের আঞ্চলিক বিভাজনগুলো দানা বাঁধার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।[৫১] দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে  নির্বাচিত এই শিলালিপিগুলো ইঙ্গিত দেয় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন জনবসতি কেন্দ্র ও অন্যান্য ভূসংস্থানিক চিহ্ন নিয়ে গঠিত একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় পরিসর বা অঞ্চল ভারতবর্ষের ধারণার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করত।

     

    একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: উত্তর কর্ণাটক থেকে প্রাপ্ত রাষ্ট্রকূট আমলের দশম শতাব্দীর (৯২৯-৩০ খ্রিষ্টাব্দ) একটি শিলালিপি,[৫২] যেখানে ‘পুরিকর’ নামক একটি জনপদের উল্লেখ করে সেই পরিসরকে ‘ভারতমহীমণ্ডলের’ ‘আভরণ’ (অলংকার) হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, একটি ছোট লোকালয় বা স্থানের জন্যেও ‘ভারতমহীমণ্ডল’ ছিল একটি স্থানিক উল্লেখযোগ্য চিহ্ন। কোনো স্থানিক পরিসরের এমন কোনো চিহ্ন সাপেক্ষে উল্লেখ বিভিন্ন উৎসে অপরিহার্য নিয়মিততাকেই প্রকাশ করে। কর্ণাটকের বেলারী জেলা থেকে প্রাপ্ত দ্বাদশ শতাব্দীর (১১৮১ খ্রিষ্টাব্দ) কুর্গোদ শিলালিপি[৫৩] ‘কুন্তল’ দেশকে ‘ভারতক্ষেত্রে’ অবস্থিত বলে উল্লেখ করেছে, যে ক্ষেত্র আবার গভীর সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত জম্বুদ্বীপের একটি অংশ।

    ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের অন্ধ্র থেকে প্রাপ্ত কিছু শিলালিপিতে এই বিষয়বস্তুটি আরও বিশদভাবে ব্যক্ত হয়েছে। সেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে উল্লেখ করার পর, তার স্থানীয় ভূপ্রকৃতি এবং পবিত্র স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার জন্য সেই বর্ণনাকে আরও ভেঙ্গে ভেঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরী জেলার পিঠাপুরম এলাকা থেকে প্রাপ্ত চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের এক গুচ্ছ তাম্রশাসনে [৫৪] দক্ষিণ সমুদ্র থেকে ‘পর্বতরাজ’ (হিমালয়) পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমিকে ‘ভারতবর্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরো যোগ করা হয়েছে: ‘তার মধ্যেই অবস্থিত অন্ধ্রদের ভূমি, যা তিনটি বিখ্যাত মন্দিরের (লিঙ্গ) সঙ্গে যুক্ত থাকায় ‘ত্রিলিঙ্গ-ভূমি’ নামেও পরিচিত; যথা—শ্রীশৈল, কালেশ্বর এবং দ্রাক্ষারাম… সেখানেই রয়েছে দক্ষ, অমর, ক্ষীর, কুমার এবং প্রাচ্য নামক পাঁচটি উদ্যান, শিবের ক্রীড়াভূমি এবং গৌতমী, কৃষ্ণবেণী, মালপ্রভা, ভীমরথী ও তুঙ্গভদ্রার মতো পবিত্র নদীসমূহ। রয়েছে কৃষ্ণা নদীর তীরে অবস্থিত শ্রীকাকুল, যে স্থান তিন ভুবন রক্ষার জন্য বিষ্ণুর (শ্রীবল্লভ) আবাসস্থল।’

    মনে হয়, স্থানীয়ভাবে বা অঞ্চলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা জনবসতি বা ধর্মীয় ভূসংস্থানিক চিহ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সেই মহাকাব্যিক-পৌরাণিক ধারণার আবাহন ছিল মূলত ‘মূল্য-আরোপণ’ বা গরিমান্বিত করার একটি কৌশল। অর্থাৎ, একটি সর্বজনস্বীকৃত মহাজাগতিক পরিসরগত চিহ্নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো; ঠিক যেভাবে একটি নতুন রাজবংশ কোনো মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বংশলতিকার সঙ্গে নিজেদের জুড়ে দিয়ে নিজেদের মর্যাদার বৈধতা খুঁজত।[৫৫] একই অঞ্চলের চতুর্দশ শতাব্দীর আরেকটি শিলালিপির জম্বুদ্বীপ, নয়টি খণ্ড (বিভাগ) এবং হিমালয়ের দক্ষিণে ও সমুদ্রের উত্তরে অবস্থিত ভারতবর্ষের বর্ণনায় একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় : ‘এই স্থান (ভারতবর্ষ) হলো সেই স্থান যেখানে কর্ম ফলদায়ক হতো, যেখানে বিভিন্ন ভাষা ও প্রথা প্রচলিত ছিল[৫৬] এবং যে পরিসর বহু দেশে বিভক্ত ছিল। সেগুলোর মধ্যে একটির নাম তিলিঙ্গ, যেখান দিয়ে বহু পবিত্র নদী প্রবাহিত, যেখানে ছিল বহু সমৃদ্ধ নগরী, সুন্দর পর্বতমালা, দুর্ভেদ্য অরণ্য, গভীর জলাশয় এবং অজেয় দুর্গসমূহ।’ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এই কালপর্বের মধ্যে মহাকাব্যিক-পৌরাণিক বিশাল ও বিস্তৃত পরিসরের কল্পচিত্রসমেত ভারতবর্ষ যেকোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ স্থানিক পরিসর অথবা অঞ্চলের জন্য একটি অপরিহার্য উল্লেখযোগ্য চিহ্ন হিসেবে স্বীকৃত হয়ে উঠেছিল। অবশ্যই যদি কোনো লিখিত নথিতে ওই স্থানিক পরিসরটির ঠাঁই পাওয়ার সুযোগ ঘটত তবেই।

    তথ্যসূত্র:

    ১. দেখুন: পার্থ চ্যাটার্জি, ‘ক্লেইমস অন দ্য পাস্ট: দ্য জিনিয়ালজি অফ মডার্ন হিস্টোরিওগ্রাফি ইন বেঙ্গল’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ: এসেজ ইন অনার অফ রণজিৎ গুহ (সম্পা. ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান), দিল্লি, ১৯৯৫, পৃ. ১-৪৯।

    ২. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, ‘স্টাডিজ ইন ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুইটিজ’, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ১৯৫৮। দেখুন অধ্যায় সাত: ‘পুরাণিক কসমোগ্রাফি’, পৃ. ৭৫।

    ৩. ‘দ্য কনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’ (১ এপ্রিল ১৯৮৬ পর্যন্ত সংশোধিত), নয়াদিল্লি, ১৯৮৬, পার্ট ১, আর্টিকেল ১।

    ৪. আর. কে. মুখার্জি, ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া’, ক্রনিকল ক্লাসিকস সিরিজ, নয়াদিল্লি, ২০০৩ (মূল প্রকাশ ১৯১৩)।

    যদিও সম্প্রতি মন্তব্য করা হয়েছে যে ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা প্রাক-ব্রিটিশ ভারতে ঐক্যের অনুপস্থিতির ওপর জোর দিয়েছিলেন (এস. ভট্টাচার্য, ‘ইন্ট্রোডাকশন’, কালচারাল ইউনিটি অফ ইন্ডিয়া, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার, কলকাতা, ২০১৩, পৃ. xii), তবুও দেশীয় ভাষায় ইতিহাস লেখার চর্চা মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস লিখনকেই মডেল বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

    ৫. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া, কলকাতা, ১৯৯৮।

    ৬. সুদীপ্ত কবিরাজ, ‘দ্য ইমাজিনারি ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া’, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ, ভলিউম ৭ (সম্পা. পার্থ চ্যাটার্জি ও জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে), নয়াদিল্লি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ৫ম মুদ্রণ, ১৯৯৯, পৃ. ১-৩৯।

    ৭. সি. এ. বেইলি, ‘এম্পায়ার অ্যান্ড ইনফরমেশন: ইন্টেলিজেন্স-গ্যাদারিং অ্যান্ড সোশ্যাল কমিউনিকেশন ইন ইন্ডিয়া, ১৭৮০-১৮৭০’, ফার্স্ট সাউথ এশিয়ান এডিশন, দিল্লি, ১৯৯৯, পৃ. ২৬১ এবং পরবর্তী।

    ৮. ম্যাথু এইচ. এডনি, ‘ম্যাপিং অ্যান এম্পায়ার: দ্য জিওগ্রাফিক্যাল কনস্ট্রাকশন অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, ১৭৬৫-১৮৪৩’, ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো প্রেস, শিকাগো-লন্ডন, ১৯৯৭, পৃ. ১।

    ৯. এডনি বিশদভাবে বলেন (ওই, পৃ. ৩৩৩): ‘ব্রিটিশ মানচিত্রের যৌক্তিক, অভিন্ন স্থান বা স্পেস (uniform space) কোনো মানসিক মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ স্থান ছিল না। বরং এটি ছিল ক্ষমতার সম্পর্কে জারিত একটি স্থান—যেখানে ব্রিটিশরা চিত্রিত জমিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত (বা করার ক্ষমতা রাখত)… সাম্রাজ্যিক স্থান বা ইম্পেরিয়াল স্পেস ছিল সীমানার স্থান… ইম্পেরিয়াল স্পেস সীমানাকে একটি পদ্ধতি (mechanism) হিসেবে ব্যবহার করত বিমূর্ত স্থানকে (abstract space) ভূখণ্ডের বাস্তবতার (concrete reality) সঙ্গে সমান করে তোলার জন্য।’

    ১০. ইরফান হাবিব, ‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, সংখ্যা ৭-৮ (১৯৯৭), পৃ. ৮। আরও দেখুন তাঁর ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন: আ ডিফেন্স অফ দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’, সোশ্যাল সায়েন্টিস্ট, ভলিউম ২৭ (সংখ্যা ৯-১৯), ১৯৯৯, পৃ. ১৮-২৮; এবং ওই লেখকের ‘ইন্ট্রোডাকশন’, ইন্ডিয়া—স্টাডিজ ইন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া, দিল্লি, ২০০৫, পৃ. ১-১৭। ইরফান হাবিবের বিবৃতি (‘দ্য ফরমেশন অফ ইন্ডিয়া—নোটস অন দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যান আইডিয়া’)—যে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ফারসি ভাষায় দেশ হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা হচ্ছিল—তা এই ক্ষেত্রের অন্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা সমর্থিত হওয়া প্রয়োজন।

    ১১. দেখুন: এ. এ. ম্যাকডোনেল এবং এ. বি. কিথ, ‘ভেদিক ইনডেক্স অফ নেমস অ্যান্ড সাবজেক্টস’, ভলিউম ২, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৬৭, পৃ. ৯৪-৭। কিছু ভরতদের সঙ্গে মধ্যদেশের সম্পৃক্ততা হয়তো এই অঞ্চলের দ্যোতনার (connotation) প্রসারণ বা স্ফীতি ঘটিয়েছিল।

    ১২. এ. বি. কিথ, ‘ঋগ্বেদ ব্রাহ্মণস: দ্য ঐতরেয় অ্যান্ড কৌষীতকি ব্রাহ্মণস অফ ঋগ্বেদ’, মূল সংস্কৃত থেকে অনূদিত, হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজ, মতিলাল বানারসিদাস দ্বারা পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি-পাটনা-বারাণসী, ১৯৭১, পৃ. ৩৩০-১। বন্ধনীর ভেতরের সংস্কৃত অভিব্যক্তিগুলো ঐতরেয় ব্রাহ্মণ টেক্সট (৮.১৪.৩) থেকে নেওয়া।

    ১৩. জি. পি. মালালাসেকেরা, ‘ডিকশনারি অফ পালি প্রপার নেমস’, লন্ডন, ১৯৩৭, ভলিউম ১, পৃ. ৯৪১-২।

    ১৪. শিলালিপির পাঠ্যের জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘সিলেক্ট ইনসক্রিপশনস বিয়ারিং অন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’, ভলিউম ১ (সংশোধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি, কলকাতা, ১৯৬৫), পৃ. ৪৮-৯ (মাইনর রক এডিক্ট: রূপনাথ ভার্সন)।

    ১৫. ওই, পৃ. ২১৬ (খারবেলের হাতিগুফ্ফা শিলালিপি, লাইন ১০)।

    ১৬. এইচ. সি. রায়চৌধুরী, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)। অনেক পুরাণের ‘ভুবন-বিন্যাস’ বা ‘ভুবন-কোষ’ অংশে যে পৌরাণিক উপাদান পাওয়া যায়, তা অনেক গ্রন্থে সংগৃহীত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটির উল্লেখ করা যেতে পারে: এস. বি. চৌধুরী, ‘এথনিক সেটেলমেন্টস ইন অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ (কলকাতা, ১৯৫৫) এবং এম. আর. সিং, ‘আ ক্রিটিক্যাল স্টাডি অফ দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডেটা ইন আর্লি পুরাণস’ (কলকাতা, ১৯৭২)।

    ১৭. মহাভারত, সভাপর্ব, দিগ্বিজয়-পর্বাধ্যায় (২.৬)।

    ১৮. বিষ্ণু-পুরাণের নিম্নলিখিত সংস্করণ ও অনুবাদগুলো ব্যবহার করা হয়েছে: এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, এন. এস. সিং কর্তৃক পরিবর্ধিত ও বিন্যস্ত, দুই খণ্ডে, দিল্লি, ১৯৮৯; এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ: আ সিস্টেম অফ হিন্দু মিথোলজি অ্যান্ড ট্র্যাডিশন’, আর. সি. হাজরা লিখিত ভূমিকাসহ, পুনর্মুদ্রণ, কলকাতা, ১৯৬১; বিষ্ণু-পুরাণ, পঞ্চানন তর্করত্ন কর্তৃক সম্পাদিত ও বাংলায় অনূদিত, পুনর্মুদ্রণ (কলকাতা, ১৯৭৩)।

    ১৯. রঘুবংশম্-এর জন্য আমরা ব্যবহার করেছি: সি. কে. দেবধর, ‘ওয়ার্কস অফ কালিদাস’, ভলিউম ২ (কবিতা), পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ২০০২।

    ২০. কাব্যমীমাংসার জন্য ব্যবহৃত সংস্করণ: এন. এন. চক্রবর্তী, ‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’ (বাংলায়), শান্তিনিকেতন, ১৯৬০।

    ২১. ভীষ্ম পর্ব, II: ৩৪২।

    ২২. এইচ. এইচ. উইলসন, ‘দ্য বিষ্ণু-পুরাণ’, পৃ. ১৩৩-৪।

    ২৩. বিষ্ণু-পুরাণ, ২.২.১৫-১৮।

    ২৪. বায়ু-পুরাণ, অধ্যায় ৩৩। প্রকৃতপক্ষে মনুর বংশধররাই ঋষি, দেব, পিতৃ, গন্ধর্ব, রাক্ষস, যক্ষ, ভূত, মনুষ্য, মৃগ এবং পক্ষী দিয়ে পৃথিবী পূর্ণ করেছিলেন।

    ২৫. সি. আর. দেবধর (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৬৩) যেমনটা প্রস্তাব করেছেন, ‘জিগীষা’র অর্থ ‘বিশ্ব-জয়’ না হয়ে আক্ষরিক অর্থ (জয়ের ইচ্ছা) হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

    ২৬. রঘুর ‘দিগ্‌জিগীষা’ ৪র্থ সর্গের ২৬-৮৫ শ্লোকে আলোচিত হয়েছে।

    ২৭. ‘সুহ্ম’ মোটামুটিভাবে আধুনিক পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাংলার উপকূলীয় বালেশ্বর জেলা এবং ওড়িশার সঙ্গে মিলে যায়।

    ২৮. ‘বঙ্গ’-এর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্র হবে পরবর্তীকালের বিক্রমপুর বা বাংলাদেশের ঢাকার আশেপাশের এলাকা। কালিদাস কেবল ভূখণ্ডের নদীমাতৃক চরিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচিতিই দেখাননি, বরং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের নৌকা চালনায় দক্ষতার বিষয়েও সচেতন ছিলেন।

    ২৯. ‘কপিশা’ আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও মেদিনীপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কংসাবতী বা কাঁসাই নদীর সঙ্গে মিলে যায়। দেখুন: এন. এল. দে, ‘দ্য জিওগ্রাফিক্যাল ডিকশনারি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, প্রথম প্রকাশ ১৯২৭, পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৯০, পৃ. ৯২।

    ৩০. দে (পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ২১৩) ওড়িশার বৈতরণী নদীর উত্তরে এটিকে নির্দেশ করেছেন। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’, প্যারিস, ১৯৫৪, পৃ. ১৯৭।

    ৩১. দে-র মতে: ‘ওড়িশা থেকে মাদুরা জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত পুরো পর্বতমালা মহেন্দ্র-পর্বত নামে পরিচিত ছিল। এর মধ্যে পূর্বঘাট পর্বতমালা এবং দক্ষিণের সারকারস (circars) থেকে গন্ডোয়ানা পর্যন্ত বিস্তৃত রেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার গঞ্জাম-এর কাছের একটি অংশ এখনো মহেন্দ্র মালেই বা মহেন্দ্রের পাহাড় নামে পরিচিত’, পৃ. ১১৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৭২।

    ৩২. দে কলিঙ্গদের বৈতরণী নদীর দক্ষিণে স্থাপন করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৮৫। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৫৬-৮। আরও দেখুন: বি. সি. ল, ‘জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাসপেক্টস অফ কালিদাস’স ওয়ার্কস’, কলকাতা, ১৯৫৪, বিভিন্ন স্থানে (passim)।

    ৩৩. ‘কাবেরী নদীর দক্ষিণে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণাংশ, যাকে ত্রিবাঙ্কুর পাহাড় বলা হয়’; এর মধ্যে কার্ডামম পর্বতমালাও অন্তর্ভুক্ত, যা কোয়েম্বাটুর গ্যাপ থেকে কেপ কমোরিন বা কন্যাকুমারী পর্যন্ত বিস্তৃত; দে, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ.১২২। দে নীলগিরি পাহাড়কে দরদুর-এর সঙ্গে শনাক্ত করেছেন, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৫৩।

    ৩৪. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৪৭৯। আরও দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১৯২।

    ৩৫. ‘অপরান্ত’ বা পশ্চিম প্রান্তকে সাধারণত সংকীর্ণ অর্থে উত্তর কোঙ্কন অঞ্চলের সঙ্গে মেলানো হয়। দেখুন: ল, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ১২-১৩।

    ৩৬. অপরান্তে অবস্থিত।

    ৩৭. যদিও আদি ঐতিহাসিক যুগে ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে যবনদের উল্লেখ পাওয়া যায়, কালিদাস পশ্চিমের সঙ্গে এবং সম্ভবত যবনদের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের উল্লেখ করেছেন।

    ৩৮. সি. আর. দেবধর, পূর্বে উদ্ধৃত, পৃ. ৭১।

    ৩৯. এই টেবিল বা ছকটি কালিদাসের ভৌগোলিক জ্ঞান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়—যদিও প্রদত্ত তথ্যগুলো প্রাসঙ্গিক এবং অপর্যাপ্ত; বরং এর উদ্দেশ্য হলো: (১) চারটি দিক দ্বারা সংজ্ঞায়িত স্থানের ধারণার বিবর্তনের একটি পর্যায় নির্দেশ করা, এবং (২) প্রাকৃতিক ল্যান্ডমার্ক এবং জনপদ ছাড়াও বিভিন্ন ‘দিক’ বা কোয়ার্টার-এর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য কালিদাস কীভাবে বিভিন্ন অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য বেছে নিয়েছিলেন তা দেখানো।

    ৪০. কাব্যমীমাংসা-য় মূল অভিব্যক্তিটি হলো: ‘তত্র = অপি মহোদয়ম্ মূলমবধি-কৃত্য ইতি’, XVII।

    ৪১. বর্তমান হরিয়ানার কার্নালের কাছে পেহোয়া (Pehoa)।

    ৪২. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’ ধারণার বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’, স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া (দিল্লি, ১৯৭১), অধ্যায় ১। সরকার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র উদ্ধৃত করে দেখান যে হিমালয় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে হাজার যোজন বিস্তৃত ভূমিই হলো ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’। রাজশেখরও এই সংজ্ঞাই দিয়েছেন। তবে, সরকারের এই দাবি যে ‘একজন ভারতীয় সাম্রাজ্যিক শাসকের প্রভাব-বলয়’ ভারতের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আশা করা হতো—তা গ্রহণযোগ্য বা টেকসই (tenable) নয়। রঘুর পারসিক ও যবনদের দেশে অভিযান, একজন আদি মধ্যযুগীয় রাজার বংক্ষু (অক্সাস) নদীর তীরে তুরুস্কদের পরাজিত করার দাবি (সরকার, পৃ. ৭) এবং চোলদের দ্বারা শ্রীলঙ্কা দখল—এমন সব প্রমাণের সেট তৈরি করে যা এই ধরণের দাবির বিপক্ষে যায়।

    ৪৩. কাব্যমীমাংসা, ১৭শ অধ্যায়। তালিকাভুক্ত অনেক সম্প্রদায় ছিল মধ্য এশিয়ার।

    ৪৪. ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’-এর জন্য দেখুন: ডি. সি. সরকার, ‘স্টাডিজ ইন দ্য জিওগ্রাফি অফ অ্যানসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, দিল্লি, ১৯৭১, অধ্যায় ১। এন. এন. চক্রবর্তী (‘রাজশেখর ও কাব্যমীমাংসা’, পৃ. ১১১-১২) ‘চক্রবর্ত্তী-ক্ষেত্র’কে ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক সীমানার সঙ্গে এক করে দেখেছেন বলে মনে হয়, যা একইভাবে অযৌক্তিক (unwarranted)।

    ৪৫. কাব্যমীমাংসা, অধ্যায় ১৭; মনু, II, ২৫-৯।

    ৪৬. দেখুন আমার প্রবন্ধ: ‘অ্যাকোমোডেশন অ্যান্ড নেগোসিয়েশন ইন আ কালচার অফ এক্সক্লুসিভিজম: সাম আর্লি ইন্ডিয়ান পারসপেক্টিভস’, পূর্বে উদ্ধৃত (op. cit.)।

    ৪৭. মনু, II, ২৫-৯।

    ৪৮. বি. এন. মুখার্জি, ‘দ্য কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৪৯. ইরফান হাবিব, ‘দ্য এনভিশনিং অফ আ নেশন’, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৫০. ম্যাথু এডনি, পূর্বে উদ্ধৃত।

    ৫১. সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য দেখুন: বি. ডি. চট্টোপাধ্যায়, ‘দ্য মেকিং অফ আর্লি মেডিয়েভাল ইন্ডিয়া’, ইন্ট্রোডাকশন, ২য় সংস্করণ, নয়াদিল্লি, ২০১২।

    ৫২. এল. ডি. বার্নেট, ‘কালাস ইনসক্রিপশন অফ দ্য রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ IV, শক ৮৫১’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৩ (১৯১৫-১৬), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ৩৩১।

    ৫৩. এল. ডি. বার্নেট, ‘টু ইনসক্রিপশনস ফ্রম কুর্গোদ’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ১৪ (১৯১৭-১৮), পুনর্মুদ্রিত, দিল্লি, ১৯৮২, পৃ. ২৮২।

    ৫৪. কে. এইচ. ভি. শর্মা এবং টি. কৃষ্ণমূর্তি, ‘অন্নবরপদু প্লেটস অফ কাটায়া ভেমা রেড্ডি’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩৬ (দিল্লি, ১৯৬৫), পৃ. ১৬৭-৯০।

    ৫৫. এন. ভেঙ্কটারমনিয়া এবং এম. সোমশেখর শর্মা, ‘বিলাস গ্রান্ট অফ প্রলয় নায়ক’, এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, ৩২ (দিল্লি, ১৯৫৯), পৃ. ২৩৯-৬৮, বিশেষ করে পৃ. ২৬০।

    ৫৬. এই নথিতে ভারতবর্ষকে নিম্নলিখিত অভিব্যক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে:

    ভাষা-সমাচার-ভিদা বিভিন্নৈঃ = দেশৈর-অনেকৈর্-বিভক্তে…

  • ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

    • অনুবাদ: স্বাধীন সেন
    ডেভিড গ্রেয়বার ও ডেভিড ওয়েনগ্রো
                                                                                                             উৎস: দিজ টাইমস

    অ্যারন বাস্তানি (Aaron Bastani): ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে ইতিহাসের সেই অতি সুদূর অতীতকাল নিয়ে কাজ করছে যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। বইটা ওই সময়টাকে এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছে যেন সেখানে জ্যান্ত আর রক্তমাংসের মানুষ বাস করত। শুনতে হয়তো কথাটা খুব অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু সত্যি বলতে ইতিহাসচর্চায় এমনটা সচরাচর করা হয় না। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের আমাদের মতো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের সঙ্গেই বেশি তুলনা করা হয়। একবার ভেবে দেখুন তো, মানব ইতিহাস নিয়ে আমাদের জানা সবকিছুই যদি ভুল প্রমাণিত হয়? আমাদের যে প্রচলিত জ্ঞান (Received wisdom) মেনে নিতে শেখানো হয়েছে, তা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছরের; কিন্তু আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছি মাত্র গত ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে। মনে করা হয় যে, এই কৃষিকাজ শুরুর পরেই শহর, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যা আর আমাদের চেনা এই সভ্যতার জন্ম হয়েছে।

    কিন্তু ডেভিড ওয়েনগ্রো আর সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের বই বলছে যে, এই তথ্যটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁরা বলছেন, আমরা যাকে শহর বা ‘উন্নত মানব সংস্কৃতি’ বলে বিচার করি, তা আসলে কৃষিকাজ প্রবর্তনেরও আগের ঘটনা। প্রাগৈতিহাসিক এই আখ্যানটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং চমকপ্রদ—আর এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আপনাকে ‘ডাউনস্ট্রিম’-এ স্বাগত জানাই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো (David Wengrow): আমাকে ডাকার জন্য ধন্যবাদ।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) প্রত্নতত্ত্ব পড়াচ্ছেন। ছোটবেলায় কি আপনি এটাই হতে চেয়েছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই না। স্কুল ছাড়ার পর আমি আসলে থিয়েটার করতে চেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, তখন আমি বেশ খানিকটা অভিনয়ও করেছি। প্রায় ১৪ বছর বয়স থেকেই আমি মঞ্চ আর অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যাই। আমি ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ থিয়েটারে’ যোগ দিয়েছিলাম—সেটা ছিল একটা দারুণ সময়। কারণ লন্ডনের বাসিন্দা হিসেবে তখনই আমি প্রথম সারা দেশের, অর্থাৎ পুরো যুক্তরাজ্যের নানা প্রান্তের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ পাই। স্কুল শেষ করার পর একজন এজেন্টও জুটিয়ে ফেললাম এবং কিছুদিন ওটা নিয়ে মেতে থাকলাম। এরপর আরও নানা কাজ করেছি। বলতে পারেন, প্রত্নতত্ত্বের জগতে আমার পা রাখাটা ছিল অনেকটা দুর্ঘটনাবশত।

    অ্যারন বাস্তানি: বলেন কী! শিশু অভিনেতা থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদ—শুনতে তো দারুণ একটা গল্পের মতো লাগছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমি ঠিক শিশু অভিনেতা ছিলাম না, বলা যায় ‘ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যাক্টর’। আমি শিশু অভিনেতাদের দেখেছি, তারা অন্য ধাতুর মানুষ হয়—আমি ঠিক তেমন ছিলাম না। তো যা বলছিলাম, সাংবাদিকতার দিকেও সামান্য ঝোঁক ছিল—বিবিসি অ্যারাবিক সার্ভিসে কাজ করা বা এই জাতীয় কিছু নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু আসলে ঠিক কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্কুলে রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই ভাবলাম অক্সফোর্ডে আবেদন করব। আমার মাথায় তখন কেবল অক্সফোর্ড ঘোরপাক খাচ্ছিল। আমি অক্সফোর্ডের সব কলেজেই ইংরেজি সাহিত্যের জন্য চিঠি লিখলাম, কিন্তু কেউ পাত্তাই দিল না।

    তখন আমার এক বন্ধু বলল, “এই ধরণের জায়গায় ঢোকার সহজ উপায় হলো একটু ‘অপ্রচলিত’ কোনো বিষয় বেছে নেওয়া।” ওরা তখন মাত্র ‘প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান’ নামে একটা নতুন কোর্স চালু করেছে—মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে ইউসিএলে আমি এই বিভাগটাই সমন্বয় করি। তো, আমি হ্যারিস কলেজে ওই কোর্সের জন্য আবেদন করলাম এবং ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পেলাম। ইন্টারভিউ নিতে বসলেন বারবারা কেনেডি নামের এক দুর্ধর্ষ নারী। তিনি আসলে ভূগোলবিদ ছিলেন, কারণ ওই কলেজে তখন কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন না। তিনি আমাকে বেশ জেরা করলেন। আমিও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমার ‘বিশাল প্যাশন’ নিয়ে অনেক বড় বড় বুলি ঝাড়লাম। হুট করে তিনি তাঁর চেয়ারের নিচ থেকে একগাদা চিঠি বের করলেন—সেইসব চিঠি যা আমি অন্য কলেজগুলোতে ইংরেজি পড়ার জন্য লিখেছিলাম। আমি তো ভাবলাম, সব গুবলেট করে ফেলেছি! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে ভর্তি করে নিলেন।

    শুরুতে আমি একজন ‘ম্যাচিউর স্টুডেন্ট’ হিসেবে ভর্তি হলাম, যদিও মানসিকভাবে তখনো অতটা পরিণত ছিলাম না। শুরুতে সবকিছু প্রায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছিলাম এবং ছয় মাস পর আমার বের হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। কিন্তু তখনই একজনের সাথে দেখা হলো যিনি আমার পুরো চিন্তাটাই বদলে দিলেন। আসলে জীবনে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন হয় যিনি আপনাকে নেশা ধরিয়ে দেবেন এবং এই আত্মবিশ্বাস দেবেন যে—হ্যাঁ, এই বিষয়ে আপনারও কিছু দেওয়ার আছে। তিনি ছিলেন অ্যান্ড্রু শেরাড। খুব অল্প বয়সে—মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান, অনেকটা ডেভিডের (গ্রেবার) মতোই। অ্যান্ড্রুই আমাকে প্রত্নতত্ত্বের নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিলেন, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

    অ্যারন বাস্তানি: আসলে আমরা তো সবসময়ই শুনি যে, ছোটবেলায় কমবেশি সব শিশুই একসময় প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, মনের কোণে হয়তো কিছু একটা ছিলই। ওল্ড সেরামের একটা স্কুল ট্রিপের কথা আমার খুব মনে পড়ে—সেটা ছিল লৌহ যুগের এক বিশাল পাহাড়ি দুর্গ। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথা জুড়ে কেবল সেইসব ছবিই ঘুরছিল। আমি যেন চোখের সামনে সেই প্রাচীন অভিবাসন আর আক্রমণের দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কম্পিউটারের যুগ আসার অনেক আগের কথা বলছি; আমি একটা ক্যালিগ্রাফি পেন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতার একটা আস্ত খাতা বা পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলেছিলাম। মনে আছে, কাগজটাকে পুরনো লুক দেওয়ার জন্য আমার দাদি কফির গুঁড়ো দিয়ে কাগজটা হলদেটে করতে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কোনো একটা ঐতিহাসিক যুগ বা সময়ের প্রতি এমন একটা টান অনুভব করাটা আসলে পুরোপুরি যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আমার পারিবারিক কোনো শিকড় নেই, তাই এটা কোনো আঞ্চলিক টানও নয়। কিন্তু কেন জানি স্রেফ একটা বিশেষ সময় বা ইতিহাসের কোনো এক পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি আপনার মনে এক গভীর মায়ার তৈরি হয়। যারা প্রত্নতত্ত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাদের মধ্যে হয়তো এই ‘নেশা’র মাত্রাটা একটু বেশিই থাকে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বই ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ (The Dawn of Everything)-এর মূল প্রসঙ্গে আসি। প্রচলিত জ্ঞান হলো, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছর ধরে। আপনি উত্তরে সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলতে পারেন। তবে আমরা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছি মাত্র ১২ হাজার বছর—কিংবা ১১-১২ হাজার বছর আগে। বলা হয় যে, কৃষির আগমনের ফলেই নগর, সংখ্যা দিয়ে গণনা, লিখন পদ্ধতি, জ্যোতির্বিদ্যা আর আমাদের চেনা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আপনার এবং সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের যৌথভাবে লেখা বইটা বলছে যে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল অথবা অন্তত বড় রকমের ভুল আছে এতে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন অ্যারন, আপনি যা বললেন সেগুলোকে একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। জানেন তো, আপনি যখন বলছেন যে ১২ হাজার বছর আগে আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছিলাম, তখন আসলে পৃথিবীর খুব অল্প কিছু মানুষ সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সেটা শুরু করেছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East), যেটাকে অনেকে ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) বলেন। সেই সময়েও বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ছিল শিকারী ও সংগ্রাহক এবং মৎস্যজীবী। আসলে আপনি যেটা সংক্ষেপে বললেন, সেটা হলো আমাদের সেই চেনা ‘যুগবিভাজনের তত্ত্বর’ (Stage Theory) একটা ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে দেখানো হয় যে, দীর্ঘ সময় ধরে তেমন কিছুই ঘটছে না, তারপর হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল—কৃষি বিপ্লব হলো, জনসংখ্যা বাড়ল, তারপর নগর এলো এবং আবারও সব বদলে গেল। তারপর এলো সভ্যতা। আমরা বইটাতে এটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে এর চেয়ে অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। ইতিহাসের তথাকথিত ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় বা ধাপের মানুষগুলো আসলে একদম পাশাপাশি বসবাস করত। তারা একে অপরের থেকে রসদ নিত, একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাত এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সচেতনভাবে সমাজ গঠন ও নকশা করত। জানেন তো, সভ্যতা আর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের মনে এক ধরণের বদ্ধমূল ধারণা কাজ করে। আমরা ভাবি যে কেবল আমরা এই আধুনিকরা, বা তথাকথিত আধুনিকরা—মানে এই যে আলোকায়ন পরবর্তী মানুষ—তারাই কেবল সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই। তারপর সচেতনভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ঐতিহ্যে বামপন্থী বা ডানপন্থী—উভয় তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারাতেই এই ধারণাটা গভীরভাবে গেঁথে আছে। কিন্তু আমাদের মতে এটা ভুল। আপনি যেমনটা বললেন, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ বছর ধরে—যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা একদম আপনার আর আমার মতোই। তাদের মস্তিষ্ক আমাদের মতোই এবং তারা আমাদের মতোই কথোপকথন চালিয়ে যেতে পুরোপুরি সক্ষম ছিল। অথচ সেই সুদীর্ঘ সময়ের খুব সামান্য অংশ সম্পর্কেই আমরা জানি। একবার ভেবে দেখুন তো, এটা কত অসাধারণ একটা ব্যাপার! কত কিছু ঘটতে পারত সেই সময়ে, কত ধরণের কথোপকথন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারত! অথচ আমরা শুরুর সেই সময়গুলো নিয়ে লেখার সময় বা সেগুলোকে সংজ্ঞায়ন করার সময় ঠিক উল্টোটা করি। মনে হয় যেন মানুষ কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের (Haze) মধ্যে বাস করছিল, কেবল কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম বা রুটিন মেনে চলত—যতক্ষণ না একদিন কেউ কৃষিকাজ আবিষ্কার করল আর সব বদলে গেল। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের অতীতের প্রতি করা এক ধরণের ‘ধারণাগত ক্ষতি’ (Conceptual damage)। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে এই ভুলটাই ভাঙার চেষ্টা করছে। আমরা ইতিহাসের অতি সুদূর সেই সময়গুলো নিয়ে লিখতে চেয়েছি—যার সপক্ষে আমাদের কাছে প্রমাণ আছে—যেন সেখানে সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ ছিল। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও ইতিহাসচর্চায় এই কাজটা খুব কমই করা হয়। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের আমাদের মতো মানুষের সাথে তুলনা করার চেয়ে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের (Non-human primates) সাথেই বেশি তুলনা করা হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার বইয়ের এই অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে—আগে কখনো এভাবে ভাবিনি। আমরা কি শিকারী ও সংগ্রাহকদের নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করতে পারি? তারা কি আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক কম ‘সংকীর্ণমনা’ ছিল? মানে ইন্টারনেটের এই যুগের কথা বলছি না, তবে তার আগের সময় পর্যন্ত কি তারা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল না? আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম বড় উদঘাটন (Revelation) হলো এই আলামতগুলো । আগে ভাবা হতো যে, কৃষির আগের মানুষগুলো ছোট ছোট দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করত। তারা যাযাবর ছিল, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত এবং একে অপরের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না—এই পুরো ধারণাটাই ভুল। আমরা এখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে দেখাতে পারি যে, কৃষিকাজ শুরুর কয়েক হাজার বছর আগেও, এমনকি বরফ যুগের (Ice Age) অনেক আগে থেকেই মানুষের সমাজ বিশাল এলাকা জুড়ে সুসংগঠিত ছিল। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখত এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র আদান-প্রদান করত। বর্তমানে আমাদের হাতে এমন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের খাদ্যভ্যাস পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তারা কি উপকূলীয় এলাকায় ছিল নাকি স্থলভাগে চলে এসেছিল, তা আমরা এখন বলতে পারি। এমনকি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং কাঁচামালের চলাচলও শনাক্ত করা যায়। আমাদের কাছে প্রাচীন ডিএনএ আছে। সুতরাং আদি মানব সমাজকে ব্যাখ্যা করার অনেক পদ্ধতি এখন আমাদের হাতে। আর তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সেই জগতটা ছিল ভীষণভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। একটু ভেবে দেখলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষের প্রথম কাজগুলোর একটি হলো স্থান পরিবর্তন করা। আমরা সাধারণত বলি যে মানুষ পুরো পৃথিবী ‘দখল’ বা ‘উপনিবেশায়ন’ করেছে—যদিও শব্দটা একটু অদ্ভুত কারণ তখন সেখানে দখল করার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু আমরা বিচরণ করেছিআফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত। এমনকি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছি। ফলে আমরা শুরুই করেছিলাম এক ধরণের সুসংহত এবং সংযুক্ত সামাজিক পরিমণ্ডল (Social Universe) দিয়ে। জনসংখ্যার দিক থেকে তারা হয়তো খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা অবিশ্বাস্য দূরত্বের মধ্যেও যোগাযোগ রক্ষা করত এবং ধ্যান-ধারণা বিনিময় করত। মধ্যযুগের ইউরোপের কথা ভাবুন। সেখানে পরিস্থিতি মোটেও এমন ছিল না। একজন সাধারণ গ্রাম্য কৃষক তার গ্রামের বাইরে খুব একটা যেত না। আর এই বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর মানে হলো আমাদের ইতিহাসের ব্যাপ্তি বা স্কেল (Scale) নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের মনে ইতিহাসের যে গতানুগতিক ছবিটা আছে তা আসলে উল্টো। মানুষ ভাবে যে আমরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী দিয়ে শুরু করেছি এবং শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বায়নের যুগে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু আসলে ঘটনাটা উল্টো। আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখেন, তবে দেখবেন যে আগে সেখানে বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থা ছিল। অথচ আজ যদি আপনি কায়রো থেকে দামেস্কে যেতে চান, তবে আপনাকে হয় সিআইএর জন্য কাজ করতে হবে, না হয় প্রায় ৫০টা বর্ডার চেকপয়েন্ট পার হতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, জাতিরাষ্ট্র আর কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে সময়ের সাথে সাথে আমরা আসলে অনেক বেশি রুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি: মেগালিথিক প্রত্নস্থান (Megalithic sites) নিয়ে একটা কথা—যেটা আমি গত কয়েক বছরেই আবিষ্কার করেছি এবং সেকথাগুলো আপনাদের বইয়েরও অংশ; সে বিষয়টি হলো জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) ভূমিকা। এখানে বিষুব (Equinoxes) আর অয়নান্তের (Solstices) [ক্রান্তিয়, কর্কট ক্রান্তি ও মকর ক্রান্তি] বিষয় তো আছেই, তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে। প্রায়ই দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রমণ্ডলকে (Constellations) সারিবদ্ধ করা হয়েছে বা শনাক্ত করা হয়েছে। তার মানে কি আমরা এমন অনেক সমাজকে দেখছি যারা তখনও কৃষিকাজ শুরু করেনি, অথচ অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল? কারণ এটাও এমন একটা বিষয় যা নিয়ে মানুষ সাধারণত তেমন ভাবে না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এবং নৌচালনবিদ্যা (Navigation) নিয়েও। আমরা এখানে এমন এক মানবগোষ্ঠীর কথা বলছি যারা আয়ারল্যান্ডের ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো পর্যন্ত যাতায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছিল। অবশ্যই এর জন্য ভূসংস্থান (Topography) এবং সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় দিক থেকেই তাদের অসাধারণ দখল থাকতে হয়েছিল। আর হ্যাঁ, আপনি প্রারম্ভিক যুগের বৃহদাকার স্থাপত্যগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এগুলো প্রায়ই খুব নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ করে সাজানো হতো—কখনও অন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভের সাপেক্ষে, আবার কখনও অয়নান্তের সাপেক্ষে। এখানে যুক্তরাজ্যে স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত। মানুষ যে অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক ও জ্যামিতিক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; যদিও তাদের পদ্ধতিগুলো আমাদের বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন ছিল। আমার মনে হয় ১৯৬০-এর দশকে ক্লদ লেভি-স্ট্রসের (Claude Levi-Strauss) বইতে এ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাটি হয়েছিল। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানের মূলত দুটি ভিন্ন রূপ আছে। একটা হলো বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের বর্তমান ধারণা যা ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়—যেখানে আপনি একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন এবং সাদা কোট পরা মানুষরা নতুন নতুন আইডিয়া বা থিওরি তৈরির চেষ্টা করেন, যা পরে বহির্বিশ্বে প্রয়োগ করা হয়। তিনি এর সাথে তুলনা করেছেন মানুষের ইতিহাসের সেই ধরণের আবিষ্কারের পদ্ধতির, যেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। সেখানে আবিষ্কার ছিল সামাজিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা ছিল মানুষের ল্যান্ডস্কেপ, গাছপালা এবং প্রাণীর সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফল—যা শুরু থেকেই সরাসরি প্রয়োগ করা হতো। সম্ভবত এভাবেই নৌচালনবিদ্যা, বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ বা ধাতুবিদ্যার মতো প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমাদের পরিচিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়েছিল—যা আসলে নিজের মধ্যেই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, স্টোনহেঞ্জ কি কৃষিজীবী মানুষেরাই তৈরি করেছিল? এটা কি আমরা নিশ্চিতভাবে জানি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: খুব সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এটাই ছিল সর্বজনসম্মত ধারণা। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা আসলে আরও অনেক বেশি চমকপ্রদ। প্রায় ৫০০০ বছর আগে যখন স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তৈরি হচ্ছে, তার আগেই ইউরোপীয় মহাদেশ থেকে আমদানিকৃত পদ্ধতি হিসেবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে চাষাবাদ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের আরও অনেক জায়গার মতো এখানেও একই ঘটনা ঘটেছিল—আবারও সেই আপনার শুরুর দিকে বলা মানব ইতিহাসের যুগবিভাজনের তত্ত্ব (Stage Theory)-এর প্রসঙ্গে আসি, যেখানে বলা হয় কৃষি এলো আর সবকিছু বদলে গেল। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আসলে এমন অনেক উদাহরণের একটি, যেখানে মানুষ কৃষিকাজ গ্রহণ করার পর মূলত তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) এবং আরও অনেক বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ যখন তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে এই দ্বীপের মানুষরা শস্য চাষের অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তারা প্রধান উদ্ভিদজাত খাদ্য হিসেবে আবারও বুনো বাদাম বা ওক ফল বা একর্ন (Acorns) জাতীয় খাবার সংগ্রহের দিকে ফিরে গিয়েছিল। তবে তারা সব কিছু ছাড়েনি; যেমন তারা শুকর আর গরু পালনের মতো পশুপালন চালিয়ে গিয়েছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge)-এর কাছে ডারিংটন ওয়ালস (Darrington Walls) নামে একটি প্রত্নস্থান আছে। সেখানে এমন এক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে মানুষ ঋতুভিত্তিক উৎসবের জন্য জড়ো হতো এবং প্রচুর পরিমাণে মাংস খেয়ে ভোজ করত। সেটা নিশ্চয়ই বিশাল কোনো আয়োজনের উৎসব ছিল। আর সম্ভবত সেই সময়েই তারা এই ধরণের বড় বড় সমন্বিত নির্মাণ কাজগুলো করত যা আমরা এখন দেখতে পাই। তাই এই পুরো চিত্রটা আসলে বেশ জটিল। তারা পুরোপুরি কৃষকও ছিল না, আবার শুধু শিকারী ও সংগ্রাহকও ছিল না; বরং তারা ছিল কৃষক, খাদ্য সংগ্রহকারী এবং পশুপালকের এক ধরণের সংকর (Hybrid) সমাজ।

    অ্যারন বাস্তানি: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, এটা মূলত একটা সামাজিক পছন্দ ছিল যা তারা নিজেরা নিয়েছিল।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই তাই ছিল। কারণ আমি আর কোনোভাবেই এটা কল্পনা করতে পারি না যে, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষ শস্য চাষের মতো একটা অনুশীলনের দিক থেকে হুট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। এটা তো অবচেতনভাবে ঘটা সম্ভব নয়। এখানে জলবায়ুগত কোনো বড় বিপর্যয় বা জনশূন্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রমাণও নেই। এর মানে দাঁড়ায় মানুষ স্রেফ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর কৃষিজীবী হয়ে থাকতে চায় না।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো আসলেও অনন্য। মানুষ যে এই ধরণের নির্মাণ কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিল, তার পেছনে নিশ্চয়ই খুব অসাধারণ কিছু ঘটেছিল। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর তুলনা হতে পারে এমন যে—আমরা হুট করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে শিল্প বিপ্লব আসলে কোনো ভালো আইডিয়া ছিল না অথবা আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি  ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা অবশ্য এই পরিভাষায় ভাবছিল না। তবে এটা একটা প্রশ্ন তো তুলেই দেয়, তাই না? আমাদের শেখানো হয় যে সেই আদিম সমাজগুলো অত্যন্ত আদিম বা ‘প্রিমিটিভ’ ছিল; কিন্তু তারা যদি ওই মাপের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে আমরা এখন এই ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এত হিমশিম খাই কেন? আর এটাই আমাকে আমাদের দর্শকদের জন্য বইটির মূল প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যারা মূলত রাজনৈতিক সচেতন দর্শক। যদি ইতিহাসের এই জেনেরিক ‘যুগবিভাজনের তত্ত্ব’ ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কিন্তু বিশাল। কারণ এটিই হলো লক, রুসো বা হবসের মতো আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি। আবার বর্তমানে স্টিফেন পিঙ্কার বা ইউভাল হারারিদের মতো মানুষদেরও ভিত্তি এটি। কারণ তাদের মূল বক্তব্যই হলো—সমাজ যত জটিল হবে, সেখানে বৈষম্য আর অন্যায় তত বাড়বে। তবে যেহেতু এটা প্রাচুর্য তৈরি করে, তাই এর পেছনে এক ধরণের উপযোগবাদী যুক্তি (Utilitarian argument) দেওয়া হয়। আপনি এমন কিছু লেখক আর বইয়ের কথা বলছেন যারা কখনও কখনও সরাসরি দুই বা তিনশ বছর আগের সেই দার্শনিকদের মডেল অনুসরণ করেন। অনেকে তো সরাসরি বলেনও যে আমি একজন ‘নব্য-হবসিয়’ (Neo-Hobbesian) বা ‘নব্য-রুশোইও’ (Neo-Rousseauan)। এটা বেশ মজার। আমি আর ডেভিড যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম ভাবতে শুরু করি, তখন সময়টা ছিল ২০০৮-০৯ সালের সেই বড় আর্থিক ধ্বসের কাছাকাছি। সেসময় বৈষম্য এবং বৈষম্যের মূল শিকড় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল। হঠাৎ করেই সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পুরনো ধারণাগুলো খুব আগ্রাসীভাবে ফিরে এলো। মানুষ আবারও হবস বা রুসোর কাছে ফিরে যেতে চাইল। আপনি যেমনটা বললেন, আমরা আসলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠগুলো নিয়েই কথা বলছি। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে সেগুলো ছিল পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত বা অনুমিত (Speculative)। লক্ষ বছর আগের মানব সমাজের প্রকৃতি কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোনো বাস্তব তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সেই দার্শনিকরা স্রেফ নিজেদের কল্পনা থেকে সেগুলো তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ এগুলো হলো প্রাগৈতিহাসের এক কাল্পনিক জগত। একথা ভাবলে বেশ অবাক লাগে যে, আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা আসলে এমন কিছু কল্পনা থেকে এসেছে যার শিকড় প্রোথিত ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। যেমন, ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan) ১৬৫১ সালে লেখা হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মাঝখানে। সেখানে মূলত সরকারহীন সমাজের প্রকৃতি এবং সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। রুশো মারা গিয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ১০ বছর আগে। তিনি যখন বৈষম্যের উৎস কী—এই প্রশ্ন তুলছেন, তখন সেটা ছিল তাঁর সময়ের এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। তাই এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক কল্পনার চর্চা ছিল। সেই সময়ে এসব চিন্তা হয়তো বৈপ্লবিক ছিল। কিন্তু আমাদের হাতে যখন এখন এত নতুন তথ্য আর প্রমাণ আছে, তখন কেন আমরা ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে ১৭৫৪ সালের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো নিয়ে পড়ে থাকব? কেন আমরা এখনও এই স্থবির বা জড় পদ্ধতিতে একই প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছি? এই জিজ্ঞাসা নিজেই একটা বড় প্রশ্ন।

    অ্যারন বাস্তানি : আপনি একজন একাডেমিক, আপনি ইউসলে (UCL) আছেন। আমিও তো ইউসিএলে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের কিছু মডিউল পড়েছিলাম। আমাদের কী পড়ানো হয়? রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠ: হবস, লক, প্লেটো, রবার্ট নজিক এবং একটু সমসাময়িকদের মধ্যে জন রল্‌স। কিন্তু এরা সবাই তো কার্যকরভাবে লক আর হবসের সেই প্রারম্ভিক উদারতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের চিন্তা গড়ে তুলেছেন। সেখানে মূলত শেখানো হয় যে কেন আপনার রাষ্ট্রকে মেনে চলা উচিত। আর আপনি যেমনটা বলছেন, এগুলো কয়েকশ বছরের পুরনো কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই আধুনিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছি, যেখানে আমরা তথাকথিত প্রত্যক্ষণবাদের (Empiricism) উপর অগাধ আস্থা রাখি। অথচ আমাদের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার যে মূল ভিত্তি, তা আসলে পুরোপুরি ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো : এই প্রসঙ্গটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যার একটা ভালো উদাহরণ। কারণ আপনি যেখানে ওই বিষয়গুলো পড়ছিলেন, তার ঠিক পাশেই ছিল আমার কর্মস্থল। ২০০৩ সালের কথা বলছেন? তার মানে আপনি যেখানে লক বা রল্‌স সম্পর্কে শিখছিলেন, তার ঠিক কোণায় গেলেই ছিল ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি’। আমি সম্ভবত তখন থেকেই সেখানে পড়ানো শুরু করেছি। তার মানে খুব কাছেই একদল মানুষ আসলে মানুষের প্রাগিতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিই এমন যে, এগুলোকে আলাদা আলাদা বিভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। ফলে জ্ঞানের যে আদান-প্রদান খুব স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা আর হয় না। আমাদের হাতে এখন যা তথ্য আছে, তার আলোকে বিষয়গুলো এখন কেমন দেখায় এবং এর তাৎপর্য কী— সেই জিজ্ঞাসাগুলো নিয়ে আর আলাপ হয় না। প্রত্নতত্ত্বের ছাত্ররা সম্ভবত সেই দার্শনিকদের কথা ভাবত না, আবার যারা ওই দার্শনিকদের কথা পড়ত, তারা সম্ভবত মানুষের সুদূর অতীতের ইতিহাস আর প্রমাণগুলো নিয়ে ভাবত না। আমার মনে হয় এই বিষয়টি একটা বড় সমস্যা। এক কথায় বলতে গেলে আমরা শেখার এক বিশাল সুযোগ হারিয়েছি।

    অ্যারন বাস্তানি : কিন্তু এই পরিস্থিতি কি একাডেমিকদেরও এক ধরণের ব্যর্থতা নয়? মানে, মেধাবী পেশাজীবীরা তরুণদেরকে এই ধরণের ভিত্তিহীন কথা বা ‘ননসেন্স’ শেখাচ্ছেন— এমন কাজকর্ম তো পুরোপুরি পাগলামি বলেই মনে হয়। অথচ বিষয় হিসেবে এই আলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, এটাকে কেবল ভিত্তিহীন কথা হিসেবে পড়ানোর দরকার নেই; আপনি এটাকে একটা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও দেখতে পারেন। এগুলো পাঠ করা জরুরি, তবে সেই পাঠ করতে হবে তার সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই। আসলে আপনি যদি এই টেক্সটগুলো খুঁটিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন সেগুলো যে স্রেফ কল্পনাপ্রসূত (speculative), তা লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন। যেমন রুশো যখন ওই যে আপনি শুরুতে যেটা বলছিলেন—মানে কৃষিকাজ আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবিষ্কার কীভাবে আমাদের নতুন ধরণের জীবনযাত্রায় আটকে ফেলেছে—সেই গল্পটা বলার সময় এক জায়গায় স্পষ্ট করেই বলেছেন: এই আলাপকে ইতিহাস হিসেবে নেবেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন ওই আলাপ মূলত একটা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই হয়েছিল যেন আপনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এই দুনিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। এই আলাপ কোনো ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আপনি যেসব আধুনিক লেখকের কথা বললেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব অদ্ভুতভাবে বদলে গিয়েছে। যা একসময় স্রেফ কল্পনাপ্রসূত আলোচনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, এখন সেই বয়ানগুলোকেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) বা ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিই আসলে আমাদের—মানে নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিড আর প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে আমাকে—এক ধরণের ধাক্কা দিয়েছিল। আমাদের মনে হয়েছিল, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না; আমাদের কিছু একটা করা দরকার। মূলত সেই তাড়না থেকেই আমরা আমাদের এই অসাধারণ জ্ঞানভাণ্ডারকে বর্তমানের এই সব বিচ্ছিন্ন পরিপ্রেক্ষিত (siloed contexts) থেকে মুক্ত করার কাজটা শুরু করি। পে-ওয়াল জার্নালের (paywall journals) দেয়াল ভেঙে আমরা মানব ইতিহাসের সেই রহস্যের জটগুলো খুলতে শুরু করি যা এখনও গ্রন্থিবদ্ধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্যগুলো আমাদের হাতে আছে, তা থেকেই বলা যায় যে—আলোকায়ন (Enlightenment) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা ইতিহাসের যে বয়ান পেয়েছি, বাস্তব ইতিহাস মোটেও তেমন নয়।

    অ্যারন বাস্তানি : চলুন আদিবাসী আমেরিকান সমাজ নিয়ে একটু আলাপ করি। এই বিষয়ে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে আপনারা বইটিতে যেসব সোর্স মেটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন, সেগুলো সত্যিই খুব প্রভাবশালী। গত কয়েক বছরে আমি নিজেও অনেক নতুন কিছু শিখেছি। চলুন আবারও সেই ধরাবাঁধা ধারণা (stereotypes) আর প্রচলিত জ্ঞান (received wisdom) নিয়ে একটু কথা বলি। প্রচলিত ধারণাটা হলো—ইউরোপীয়রা ১৪৯২ সালে পশ্চিম গোলার্ধ  আবিষ্কার করে। আমরা না হয় লেইফ এরিকসনকে আপাতত পাশে সরিয়েই রাখলাম—আমি আসলে মাত্রই সুইডেন থেকে ফিরেছি।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ওরা কিন্তু এরিকসনের কথা ভোলেনি।

    অ্যারন বাস্তানি: একদমই ভোলেনি! নর্ডিক (Nordic) দেশগুলো ওই বিষয়টা বেশ ফলাও করে প্রচার করে, তাই না? তো আমরা যে ধারণাটা নিয়ে চলি তা হলো—আমরা মূলত একটা অনগ্রসর সভ্যতাকে আবিষ্কার করেছিলাম এবং তারপর বন্দুক, জীবাণু আর ইস্পাত—অর্থাৎ ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ (Guns, Germs, and Steel) [ জারেড ডায়মন্ডের বিখ্যাত বই Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies দ্রষ্টব্য] সমন্বয়ে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই বয়ানটা তো পুরোপুরি সঠিক নয়, তাই না?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই নয়। অতিমারির পর যাতায়াত ব্যবস্থা যখন আবারও স্বাভাবিক হলো, তখন গত বছর আমি কানাডা আর আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আদিবাসী গবেষক আর ইতিহাসবিদদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ডেভিডের সাথে লেখা বইটিতে কলম্বাস-পূর্ব আমেরিকা এবং ইউরোপীয় উপনিবেশকারী ও আদিবাসীদের মধ্যকার প্রাথমিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু আছে। সত্যি বলতে, এই ক্ষেত্রটি আমাদের দুজনের কারোই মূল গবেষণার বিষয় ছিল না। নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিডের কাজের ক্ষেত্র ছিল মাদাগাস্কার, আর আমার পিএইচডি এবং বেশিরভাগ মাঠপর্যায়ের গবেষণা ছিল উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক নতুন কিছু শিখতে হয়েছে। তবে আমরা শুরুতে যে প্রশ্নটা নিয়ে কাজ করছিলাম—বিশেষ করে বৈষম্যের উৎস কী—তার উত্তর খুঁজতে এই পথেই হাঁটতে হয়েছে। আপনি যদি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের সাহিত্য বা রুসোর মতো চিন্তাবিদদের দিকে তাকান, তবে দেখবেন যে সেই সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে যেসব ধারণা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল, সেখানে আপনি আমেরিকাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার সেই অংশটি—যা বর্তমানে কানাডা এবং আপস্টেট নিউ ইয়র্কের মাঝে বিভক্ত; মূলত গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং যেটাকে অনেক সময় ইস্টার্ন উডল্যান্ডস বলা হয়। সেখানেই ইউরোপীয়রা এমন কিছু সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল যাদের জীবনযাত্রা ছিল আমূল ভিন্ন। তারা ছিল অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। বিশেষ করে নারীদের সেখানে যে ধরনের স্বাধীনতা ছিল, তা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে অকল্পনীয় ছিল। আর এসবের প্রভাবে ইউরোপীয়দের রাজনৈতিক কল্পনায় এক বিশাল প্রভাব পড়েছিল। আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে কয়েকশ বছরের পুরনো ওইসব গৎবাঁধা প্রশ্ন আর গল্পের ফাঁদে পা দেব না, তখন আমাদের বুঝতে হলো যে ওই ধারণাগুলো আদতে এলো কোথা থেকে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলেই আপনাকে আমেরিকার দিকে তাকাতে হবে। এ কারণেই বইটির একটা বড় অংশ জুড়ে আমেরিকা গুরুত্ব পেয়েছে।

    অ্যারন বাস্তানি: কোন্দিয়ারোঙ্ক নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। সম্ভবত আপনার ফ্রেঞ্চ উচ্চারণটা বেশ ভালো। আমি প্রস্তুতির জন্য এ বিষয়ক কিছু ভিডিও দেখেছি। তিনি তো আসলে বাস্তবের একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই। আপনি চাইলে গুগলে ‘গ্রেট পিস অব মন্ট্রিল’ নামের ১৭১১ সালের একটি চুক্তির ছবি দেখতে পারেন, যেখানে কোন্দিয়ারোঙ্কের স্বাক্ষর বা চিহ্ন আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: তো কোন্দিয়ারোঙ্কের গুরুত্বটা আসলে কোথায়? তিনি কে ছিলেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: কোন্দিয়ারোঙ্ক ছিলেন হুরন-ওয়েনডাট নেশনের (Huron-Wendat Nation) একজন অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। এই জাতিসত্তাটি কিন্তু আজও টিকে আছে। কুইবেক সিটির উপকণ্ঠে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্রটি অবস্থিত। আমি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে ‘কোন্দিয়া’ নামে ছোট একটা রাস্তা আছে। আমরা মজা করে বলছিলাম যে রাস্তাটা হয়তো এখন আরও বড় করা উচিত কারণ আমাদের বইয়ে তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে আমরা বেশ কিছু স্বতন্ত্র বিবরণ পাই যা থেকে জানা যায় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি কূটনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং নিজের জাতির মানুষের জন্য এক উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফরাসি, ইংরেজ আর ওলন্দাজ উপনিবেশকারীদের সঙ্গে জটিল পরিস্থিতির মাঝেও তিনি যেভাবে দর কষাকষি করেছিলেন, তা এক কথায় অনন্য। তিনি বহুভাষী ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আর চমৎকার বক্তা। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন বিবরণ আমাদের এসব তথ্য দেয়। তবে ইতিহাসের কিছু কাকতালীয় কারণে কোন্দিয়ারোঙ্ক এবং তৎকালীন ইউরোপীয়দের মাঝে ঘটে যাওয়া সেইসব কথোপকথন আর চিন্তাভাবনাগুলো ইউরোপের বিশাল জনসমষ্টির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা জানতে পারি, সেই সময় ‘নিউ ফ্রান্স’ বা কলোনির সেই অংশের গভর্নর কোন্দিয়ারোঙ্ককে নিয়মিত নিজের টেবিলে দাওয়াত দিতেন কেবল বিতর্কের নেশায়। গভর্নর নিজেই বলেছিলেন, তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বিনোদনের জন্য এই কাজটা করতেন কারণ লোকটা ছিল ভীষণ রসিক আর উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন। তাঁরা এমন অনেক বিষয়ে বিতর্ক করতেন যা পরবর্তীতে আলোকায়নের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল; যেমন যুক্তি বনাম ধর্মবিশ্বাস, বিয়ের রীতি, স্বাধীনতার প্রশ্ন কিংবা সমাজে অর্থের ভূমিকা। সেইসব কথোপকথনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে একজন সামান্য ফরাসি উচ্চবিত্ত মানুষ ছিলেন যার নাম ছিল ব্যারন লাহোন্তাঁ। তিনি খুব অল্প বয়সে কলোনিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক দশক ছিলেন এবং অন্তত দুটি আদিবাসী ভাষা জানতেন। তিনি সেই উত্তাল সময়ের পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তবে তিনি কিছুটা গোলমেলে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলার কারণে তাঁকে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং এক সময় তিনি আমস্টারডামের রাস্তায় কপর্দকহীন অবস্থায় দিন কাটাতেন। তখন তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীমূলক বইগুলো লিখতে শুরু করেন এবং আবারও রাজদরবারের অনুগ্রহ পান। তাঁর সেই বইগুলোর একটির নাম ছিল কিউরিয়াস ডায়ালগস উইথ এ স্যাভেজ অব গুড সেন্স (Curious Dialogues with a Savage of Good Sense)। সেখানে লেখক নিজের চরিত্রের সাথে ‘আদারিও’ নামের এক চরিত্রের কথোপকথন তুলে ধরেছেন। আর সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই আদারিও চরিত্রটি আসলে কোন্দিয়ারোঙ্কের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। এই সংলাপে আদারিও বা কোন্দিয়ারোঙ্ক ইউরোপীয় সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ আর বিধ্বংসী বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। আর এই বইটিই তখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বইটি ছিল সেই সময়ের ‘বেস্টসেলার’। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় বইটির অনুবাদ হয় এবং বছরের পর বছর মঞ্চনাটক চলে। পরবর্তীতে প্রায় সব বড় আলোকায়নের চিন্তাবিদই এই ধরণের সংলাপ বা ‘ডায়ালগ’ লেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা তাঁদের মূল বক্তব্যগুলো কোনো এক কাল্পনিক বিদেশি চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিতেন; তিনি হতে পারেন তাহিতি বা চীনের কোনো নাগরিক। কিন্তু এইসব ঘটনার মূল প্রেক্ষাপটটি ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত আর বিনিময়ের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর আমরা বলতে চাইছি, ইউরোপীয় চিন্তাধারার ওপর এসব ঘটনার প্রভাব ছিল এক কথায় বিস্ফোরক।

    অ্যারন বাস্তানি : তার মানে ভলতেয়ার বা দিদেরোর মতো কোন্দিয়ারোঙ্ককেও আমাদের আলোকায়নের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুধু তাই নয়, তিনি তো তাঁদের সবার অন্তত কয়েক দশক আগের। তাই ইউরোপের সেই বিখ্যাত সব ‘স্যালঁ’ বা বৈঠকখানাগুলো গড়ে ওঠার আগেই সেখানে এক ধরণের প্রায়-আলোকায়িত (proto-Enlightenment) স্যালঁ তৈরি হয়েছিল। আপনি একে ‘আদিবাসীদের সমালোচনা’ বলতে পারেন। আসলে এখন এইসব পড়ার সময় মনে হয়, বিষয়টা তো বেশ স্পষ্ট। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর ধরে আমেরিকা আর ইউরোপের মাঝে সংস্কৃতির এক ব্যাপক আদান-প্রদান চলেছে। ফলে সেখানে এই ধরণের সংলাপ আর ইউরোপে সেই আইডিয়াগুলোর সঞ্চারিত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকার এই উপনিবেশায়ন আর শোষণের ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক বিনিময়ের বিষয়টা আমাদের ধারণায় তেমন একটা আসেই না। মনে করা হয় আইডিয়া, পুঁজি আর মানুষ — সবই কেবল একপাক্ষিকভাবে ইউরোপ থেকে এসেছে। কিন্তু আপনি যেটা বলছেন তা গ্লোবাল নর্থের  (global North) বাইরের দেশগুলোর জন্য বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই যে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এক ধরণের আদিবাসী চিন্তাধারা বা ঘরানা ইউরোপীয় আলোকায়নের ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছে — এটা আসলেও এক বিশাল ব্যাপার।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: তাই নয় কি? আসলে একথা যে আমাদের আলাদা করে প্রমাণ করতে হচ্ছে, সেটাই বেশ অদ্ভুত। নয়তো একথার মানে কী দাঁড়ায়? এই মানুষগুলো কি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো জগতে বাস করত? সেটা তো সম্ভব নয় কারণ আমরা বাণিজ্য আর সামরিক মিত্রতার এক নিবিড় সম্পর্কের সময়ের কথা বলছি। সেই সময় ইউরোপীয়রা যে আমেরিকার অনেক বস্তুগত অভ্যাস গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। এমনকি পাইপে তামাক খাওয়া বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করার মতো অভ্যাসগুলোও তো ছিল এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনারই অংশ। অথচ সেই বস্তুগত অভ্যাসের সাথে সাথে যে আইডিয়া বা চিন্তাভাবনাও আসতে পারে, তা মানতে কেন জানি এক ধরণের তীব্র অনীহা কাজ করে। বিষয়টি বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আমরা আসলে শুধু একথা বলতে চাইছি যে, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা নিয়ে যেসব আইডিয়া আলোকায়নের দার্শনিকরা খোদ আমেরিকার ওপর আরোপ করেছিলেন, সেগুলো আসলে ওখানকার আদিবাসীদেরই ছিল। স্বাধীনতার এই ধারণাগুলো শোষিত বা ঔপনিবেশিক মানুষের কাছ থেকে আসেনি, বরং প্রাচীন গ্রিস (Greece) বা ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের মাটি থেকে এসেছে, আমি মনে করি এভাবে চিন্তা করাটা শোষিত মানুষের জন্য অসম্মানজনক। যারা এখনও বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেননি, তাদের জন্য বলছি, শোষণের হাত থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেই আইডিয়াটা আসলে শোষিত মানুষের কাছ থেকেই আসে। আর এই উপলব্ধিটাই হলো আসল মুক্তি।

    অ্যারন বাস্তানি : আমেরিকার কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কথা বলা যাক। কাহোকিয়া (Cahokia) নামে একটা জায়গা আছে। খুব বেশিদিন আগে না, আমি প্রায় আট মাস আগে সেখানে গিয়েছিলাম। তো, প্রায় হাজার বছর আগে এই জায়গাটা আয়তনে লন্ডনের সমান ছিল। মানে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে কয়েক হাজার মানুষের বসতি ছিল; বড় অংকে বলতে গেলে এই বসতির স্বর্ণযুগে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজারের মতো। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের বড় কোনো নগরের সাথে বসতিটি তুলনা চলত। তো এই জায়গাটার আসলে কী হয়েছিল?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: এটা অত্যন্ত চমৎকার এবং কিছুটা বিতর্কিত একটি বিষয়। তবে এটা পরিষ্কার যে জায়গাটা একসময় বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, যাদের মধ্যে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর জীবনের প্রায় ৩০ বছর ওখানে কাজ করেছেন। ওটা বেশ দারুণ ছিল কারণ আপনি যখন সেখানে যাবেন, আপনার সামনে দেখার মতো খুব বেশি কিছু নেই। সেখানে মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) নামে বিশাল এক ঢিবি আছে। এর বাইরে আরও অনেক ধরণের মাটির কাজ আর ঢিবি আছে এবং সেগুলো আকারে বিশাল। জায়গাটা এখন একটা ন্যাশনাল পার্কের মাঝখানে, যার ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত উত্তর আমেরিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী হেরিটেজ প্রত্নস্থানের (Heritage sites) কপালে এমনটাই ঘটেছে। রাস্তার ধারে বেশ ভালো মেক্সিকান খাবার পাওয়া যায়, ছোট ছোট রেস্তোরাঁ আছে। আসলে আপনি উত্তর আমেরিকার কলম্বাস-পূর্ব সময়ের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনপদ বা নগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক বছর ধরে সেখানে কাজ করেছেন। একসময় এই বসতি একটি পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল; হয়তো আমরা যেভাবে সাম্রাজ্য বুঝি ঠিক সেভাবে না। কিন্তু মিসিসিপি অববাহিকা জুড়ে কাহোকিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য। সেখানে যে একধরণের হায়ারার্কি বা উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর বৈষম্য ছিল, তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন একটি ঢিবি পাওয়া গিয়েছে যেটা তরুণীদের মৃতদেহের অবশেষে ভরা ছিল; মনে করা হয় কোনো এক ভয়ংকর আচারের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। আবার মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) থেকে পুরো জনপদের ওপর নজরদারি করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। আমরা জানি যে যখন এই জায়গাটি কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে, তখন আশেপাশের গ্রামাঞ্চলগুলো জনশূন্য হয়ে যায়। আপনি সেখান থেকে ঘরবাড়ির এলাকাগুলো দেখতে পেতেন; দুর্গের মতো দেয়ালও তৈরি হতে শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল সমাজটা ওই হায়ারার্কির দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু এরপরই সব বদলে যায়। এলাকাটি পরিত্যক্ত হয় এবং মানুষ সেখান থেকে চলে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কাহোকিয়ার চারপাশের পুরো অঞ্চলকে একধরণের ‘জনশূন্য অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জায়গাটা যেন একসময় পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল; এমনকি আমরা এই জায়গাটার আসল নামও জানি না। পরবর্তীকালের কথ্য ইতিহাসে এই বসতির তেমন কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার মানে মানুষ কোনো এক কারণে কাহোকিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে, যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়—যা আমার মতে খুব একটা জোরালো যুক্তি নয়। বর্তমানে মানুষ একে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পুয়েবলো (Pueblo) সভ্যতার মতোই দেখছে—যেখানে অনেক বড় বড় কেন্দ্রীভূত প্রত্নস্থান হুট করে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তো আমরা কেন অন্তত এই সম্ভাবনাটা বিবেচনা করব না যে—মানুষ আসলে সচেতনভাবেই ওই জায়গা থেকে চলে গিয়েছিল? তারা হয়তো এক নতুন ধরণের সামাজিক ব্যবস্থা আর নিয়মকানুন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনি যখন বিষয়টাকে এভাবে দেখবেন, তখন কয়েকশ বছর পর ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলে যে ধরণের সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল, সেগুলোর যোগসূত্র মেলাতে পারবেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও বেশ হায়ারার্কিকাল ছিল—যেন ছোট ছোট কাহোকিয়া। কিন্তু অন্যরা অত্যন্ত সাম্যবাদী (egalitarian) জীবনযাপন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল। ইউরোপীয়রা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিল যে তারা বোধহয় সবসময় এমনই ছিল। কিন্তু আমরা এখানে এমন মানুষদের কথা বলছি যাদের ইতিহাস সচেতনতা ছিল প্রখর; তাদের নিজেদের ইতিহাসে কাহোকিয়া আর তার বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থার কথা ছিল। ফলে সেখানে এক ধরণের হায়ারার্কিকাল অতীত ছিল যেখান থেকে মানুষ কোনো না কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং এক নতুন সমাজ গঠন করেছিল। বইটাতে আমরা এ নিয়ে বেশ বিশদ আলোচনা করেছি কারণ এটি ওই ধারণাকে ভেঙে দেয় যে—আদিবাসী মানুষরা কোনো একটা সাংস্কৃতিক ছাঁচে স্থির হয়ে আছে অথবা তাদের কোনো ইতিহাস নেই।

    অ্যারন বাস্তানি: তেওতিওয়াকান (Teotihuacan) নামে আরেকটা দারুণ উদাহরণ আছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: উচ্চারণটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে আমার মেক্সিকান সহকর্মী বলেন যে ওখানকার পণ্ডিতরাও সবসময় ‘তেওতিওয়াকান’ (Teotiwa-kan) উচ্চারণ করতে পারেন না। যাই হোক, আমরা সম্ভবত ওটা নিয়েই কথা বলছি। আকার, আয়তন আর জাঁকজমকের দিক থেকে এই নগরটি ছিল রোমের প্রতিদ্বন্দ্বী। এটি ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আর কর্তৃত্ববাদী। এরপর সেখানে কিছু একটা বদল আসে। আপনি বইতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি যেন পশ্চিম গোলার্ধের এক ‘প্যারিস কমিউন’। প্রত্নতাত্ত্বিক রেনে মিলনের (Rene Millon) কথা বলতে হয় যিনি এর এক অসাধারণ মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতে আমরা ওই ম্যাপটি ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছি। তিনি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি সারভে পরিচালনা করেছিলেন। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর স্বর্ণযুগে এখানে রক্ষণশীল হিসেবে ১ লাখ মানুষের বসতি ছিল, কেউ কেউ সংখ্যাটা এর দ্বিগুণ বলেন। মিলন এবং পরবর্তী গবেষকরা দাবি করেন যে সেখানে জনসংখ্যার ভাগ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। শুরুতে সমাজটি ছিল অত্যন্ত হায়ারার্কিকাল। আপনি যদি আজ সেখানে পর্যটক হিসেবে যান বা গুগলে ছবি দেখেন, তবে সূর্যের পিরামিড (Pyramid of the Sun) এবং চাঁদের পিরামিড (Pyramid of the Moon) নামে দুটি বিশাল স্থাপনা দেখতে পাবেন। এছাড়া টেম্পল অব দ্য ফেদারড সার্পেন্ট (Temple of The Feathered Serpent) নামে আরেকটি বড় স্থাপনা আছে। এগুলো অবশ্য পরবর্তীকালে অ্যাজটেকদের দেওয়া নাম; আমরা জানি না আদি নাম কী ছিল। তো শুরুটা ছিল হায়ারার্কিকাল এবং সেখানেও আচারগত নরবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরামিডের ভিত্তির নিচে বন্দিদের মৃতদেহ পুঁতে রাখা হতো; তাদের হাত পেছনে বাঁধা থাকত। কিন্তু ২৫০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছু একটা বদলে গেল। এরপর ওই বিশাল মাপে আর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা মন্দির তৈরি হয়নি। মন্দির আর পিরামিড তৈরির পেছনে যে শ্রম আর সম্পদ ব্যয় হতো, তা অন্য কাজে ব্যবহার শুরু হলো। আর সেই কাজটি ছিল আবাসন বা হাউজিং। তারা পুরো জনপদ জুড়ে গ্রিড পদ্ধতিতে চমৎকার সব অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড তৈরি করল। এগুলো খুব একটা উঁচু ছিল না; অনেকটা ভিলার মতো ছিল যেখানে কয়েকটি ছোট পরিবার একসাথে থাকতে পারত। মাঝখানে বিশাল উঠান, মেঝের নিচ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দেয়ালে চমৎকার সব ম্যুরাল চিত্র ছিল। শুরুতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন এগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তারা ভেবেছিলেন এগুলো বোধহয় রাজপ্রাসাদ। পরে তারা বুঝতে পারলেন যে ওই নগরের সবাই আসলে রাজপ্রাসাদেই বাস করত! এখন আমরা বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমাদের কাছে তখনকার কোনো লিখিত উৎস নেই। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে সেই সময় থেকে ওই নগরের মানুষের জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক উন্নত এবং তা নগরের পুরো জনসংখ্যার জন্যই সাধারণ ছিল। এটি সত্যিই অসাধারণ। আপনি যেমন ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ কথা বলছিলেন। আমরা যদি কয়েকশ বছর এগিয়ে ১৬শ শতাব্দীর সেই স্প্যানিশ দখলদারিত্বের বিজয়ের সময়ের কথা ভাবি তাহলে সেসময়ের বিবরণগুলোতেও নানা ধরণের নগরের কথা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত তেনোচতিৎলান (Tenochtitlan), মন্টেজুমা আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য নিয়ে ভাবি। এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল খুব উচ্চ-নীচ ভেদাভেদের শ্রেণিবিন্যস্ত/হায়ারার্কিকাল। কিন্তু হার্নান করতেস এবং তাঁর কনকুইস্তাদোররা (Conquistadors) যে নগরের সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তার নাম ছিল ত্লাসকালা (Tlaxcala)। তেনোচতিৎলান আর ত্লাসকালার সম্পর্ক ছিল অনেকটা এথেন্স আর স্পার্টার মতো। একটি ছিল ভীষণ হায়ারার্কিকাল, অন্যটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক। ত্লাসকালা ছিল একধরণের প্রজাতন্ত্র, যেখানে নিজস্ব পার্লামেন্ট ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় সেখানে হওয়া বিতর্কগুলোর রেকর্ডও পাওয়া যায়। অথচ আমাদের বিশ্ব ইতিহাসে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। আমাদের শেখানো হয় যে তেনোচতিৎলানের পতনই ছিল পশ্চিমা বিশ্ব-আধিপত্যের শুরু। কিন্তু আমাদের এটা শেখানো হয় না যে ওই পথের একটি ধাপ ছিল ইউরোপীয় বিজেতাদের সঙ্গে একটি আদিবাসী নগর গণতন্ত্রের এক অসাধারণ মোলাকাত। আমি ওই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলতে দ্বিধাবোধ করি না। কারণ সেই সময় ইউরোপেও এই ধরণের নগর খুব একটা দেখা যেত না। করতেস নিজেই স্পেনের রাজাকে চিঠি লিখেছিলেন যে, আমি এমন এক জায়গা খুঁজে পেয়েছি যেখানে কোনো রাজা নেই। এই রাজ্য অনেকটা আমাদের ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের মতো অন্য কোনো নীতিতে চলে। এসব তথ্য সামনেই আছে। কিন্তু ইতিহাসে এই তথ্যগুলোকে কখনোই সেই প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন এক আদিবাসী নগর ব্যবস্থা। তেওতিওয়াকানে (Teotihuacan) যা ঘটেছিল তা মূলত ছিল এক সামাজিক বিপ্লব।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, একদমই তাই। ওই প্রত্নস্থানের অনেক বিশেষজ্ঞও মনে করেন যে সেখানে এমন কিছু একটা ঘটেছিল। প্রত্নতত্ত্বে সাধারণত সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন। তবে সবাই এটুকু স্বীকার করেন যে সেখানে এক আমূল রূপান্তর ঘটেছিল। এমন আলামত অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ মানব ইতিহাসের প্রথাগত বয়ানে আমাদের শেখানো হয় যে, জনসংখ্যা যখন খুব ঘন হয় এবং একবার হায়ারার্কি বা ভেদাভেদ তৈরি হয়, তখন তা আর ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে আমরা উল্টোটা দেখছি।

    অ্যারন বাস্তানি: হ্যাঁ, আপনি যেমনটা বলেছেন যে পশ্চিমা রাজনৈতিক ইতিহাসে বলা হয় হাইতি বিপ্লবের আগে কোনো সফল দাস বিদ্রোহ ছিল না। আমাদের জানা মতে এই ধারণা মোটামুটি সঠিক হলেও আমেরিকায় হয়তো বিষয়টা অন্যরকম ছিল। আপনি বইতে একটা চমৎকার আলংকারিক প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা যখন দাসপ্রথা বিলোপ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা সিমন বলিভার বা তুসঁ লুভর্তুয়রের কথা বলি। কিন্তু সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথা আরও অনেকবার বিলুপ্ত হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই বয়ানগুলো আসলে এক ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিকতা। ভাবা হয় যে অন্য কোথাও হয়তো এসব ঘটেছে কিন্তু ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে না ঘটা পর্যন্ত তার যেন কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন চিন্তাভাবনা এক ধরণের ছাঁকুনি যা ইউরোপকে প্রগতিশীল রাজনীতির একচেটিয়া অধিকার দিয়ে দেয়। চরম পর্যায়ে গেলে এই চিন্তাভাবনাই আবার উপনিবেশায়ন আর গণহত্যার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বলা হয় যে আমরাই তো গণতন্ত্রের মতো সব প্রগতিশীল ধারণা নিয়ে এসেছি যা অন্য কোথাও ছিল না। ফলে তাদের জনপদ ধ্বংস করা বা মানুষ মারার দায়টা ঢাকা পড়ে যায়। তারা বলে যে, অন্তত আমরা তো তাদের একধরণের স্থবিরতা থেকে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছি। অথচ আমরা বইতে দেখিয়েছি যে ইউরোপের বাইরের জগতেও সচেতন রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক বিশাল জগৎ ছিল এবং তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার গবেষণার ক্ষেত্র হলো পশ্চিম এশিয়া আর উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা। যদিও আপনি আমেরিকার বিষয়েও খুব স্পষ্ট ধারণা রাখেন এই ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল বইয়ের জন্য আপনাকে গবেষণা করার কারণে। আমি যেটা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো, তুরস্কের গোবেকলি তেপে (Gobekli Tepe) কিংবা মাল্টার সেই মেগালিথিক প্রত্নস্থানগুলো প্রসঙ্গে। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু শহর বা নগর যদি কৃষির আগে থেকে থাকে—তবে কি এমনটা হওয়া সম্ভব যে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ (Homo sapiens) রা অন্য কোনো আদি মানবের (Archaic humans) সাথে একসাথে কোনো নগর পরিবেশে বাস করত? কারণ নিয়ানডার্থালরা তো ইউরোপে বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল। আপনার কি মনে হয় এমন কোনো স্থায়ী জনপদ থাকা সম্ভব যেখানে তাদের একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি ব্যক্তিগতভাবে গোবেকলি তেপেকে (Gobekli Tepe) এই আলোচনায় আনব না কারণ ওটা অনেক পরের ঘটনা; তখন নিয়ানডার্থালরা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা প্রায় ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কথা বলছি। আমি গোবেকলি তেপেকে নগর হিসেবেও সংজ্ঞায়ন করব না। আমি মনে করি গোবেকলি তেপে এমন এক প্রত্নস্থান যেখানে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল এবং এক নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল সংখ্যায় মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত।

    অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, আমি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। এখানে তো একটি স্থায়ী স্থাপনা ছিল। তো, এমন কোনো জায়গায় মানুষের সাথে অন্য কোনো আদি মানবের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা আছে কি?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমরা যদি আরও অনেক পেছনে—ধরুন প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে ফিরে যাই—তবে আমরা জানি যে তখন পৃথিবীতে অন্তত চার বা পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতির মানুষ ছিল। আমরা ছিলাম, নিয়ানডার্থালরা ছিল, ডেনিসোভানরা (Denisovans) ছিল; ইন্দোনেশিয়ায় ছিল হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস (Homo floresiensis), যাদের ভালোবেসে ‘হবিট’ (Hobbits) বলা হয়। এছাড়া ফিলিপাইনের লুজান দ্বীপেও আরও কিছু সাম্প্রতিক আবিষ্কার হয়েছে। আধুনিক সময়ে এমন তুলনীয় পরিস্থিতি নাই যখন মানুষেরই বিভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করছে। আমরা জেনেটিক্যালি জানি যে তাদের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং আন্তঃপ্রজাতি প্রজননও হয়েছিল। আসলে আপনি যখন আমাদের প্রজাতির উৎসের আরও গভীরে যাবেন, তখন চিত্রটা এমনই দেখাবে। আমরা এখন আফ্রিকার কথা বলছি। এক সময় ধারণা করা হতো এক ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ (Mitochondrial Eve) বা কোনো এক আদি সাভানা (Savannah) পরিবেশ থেকে হুট করে আমরা মানুষ হয়ে উঠেছি। আধুনিক ফসিল এবং জেনেটিক প্রমাণ বলছে যে এই ধারণা ভুল। আমরা আফ্রিকাতেই বিবর্তিত হয়েছি, তবে সেটি ছিল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। সেটা প্রায় ৫ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগের কথা। উপকূলীয় অঞ্চল, বনজঙ্গল এবং সাভানা – এই সব জায়গায় আদি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কখনও বিচ্ছিন্নতা ছিল, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ছিল। ফলে শারীরিক গঠনেও বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল। শারীরিক বৈচিত্র্য যদি থেকে থাকে, তবে কল্পনা করুন ভাষা, শিশু লালন-পালন বা সামাজিক রীতিনীতিতে কত ধরণের বৈচিত্র্য ছিল! এসব উপাত্ত মানুষের আদি সমাজ কেমন ছিল তা পুনর্নির্মাণের গভীর প্রোথিত দার্শনিক অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট আদি সমাজ ছিল না; বরং সেখানে ছিল এক বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সামাজিক রূপের সমাহার। সেই দশাগুলো আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না। আসলে আমরা ওই বিভিন্ন উপপ্রজাতি আর বিভিন্ন ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ থেকেই এসেছি।


    অ্যারন বাস্তানি: চলুন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) নিয়ে কিছু আলাপ করি, যদি শব্দটা সঠিক হয়ে থাকে। ইদানীং ইন্টারনেট আর ইউটিউবের উত্থানের ফলে ছদ্মপ্রত্নতত্ত্ব সম্ভবত অনেকের জন্য প্রত্নতত্ত্বের জগতে ঢোকার একটা পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা হয়তো এখান থেকেই শুরু করে এবং পরে আপনার মতো কারও কাছে পৌঁছে আসল প্রত্নতত্ত্ব শিখতে আগ্রহী হয়।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, তা হতে পারে। আপনার কী মনে হয়? কেন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) দিন দিন এত জনপ্রিয় হচ্ছে? আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক কালচেতনার (Zeitgeist) মধ্যে নিশ্চয়ই এই ধরনের প্রত্নতত্ত্বের প্রতি এক ধরণের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তবে আমরা ঠিক কী নিয়ে কথা বলছি, সেটা আগে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ আমার মতো পেশাদাররা যা পড়ান বা করেন, তার সাথে ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের (Pseudo-archaeology) পার্থক্য কী—তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন মূলত এমন সব মানুষ, যারা জীবনে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ-গবেষণায় অংশ নেননি। আমরা এতক্ষণ যেসব প্রমাণ নিয়ে কথা বললাম, সেগুলো গবেষণার সঙ্গেও তারা যুক্ত নন। তারা মূলত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অতীতের এক ধরণের পুনর্নির্মাণ পেশ করেন। প্রায়ই এগুলোকে খুব রহস্যময় বা ষড়যন্ত্রমূলক (conspiratorial) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনে করা হয় যে, আমার মতো মানুষরা—যারা সারা জীবন এই দক্ষতাগুলো শিখতে আর শেখাতে ব্যয় করছি—তারা আসলে সত্য গোপন করতে চাইছি। আর সেই লুকানো সত্য নাকি কেবল তাঁদের কাছেই আছে যারা এই পেশার সাথে যুক্ত নন! আমি কোনো উন্নাসিকতা দেখাতে চাই না; মানুষের নিজস্ব কল্পনা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে ভুল কিছু নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যেগুলোকে বিশাল কোনো নতুন উদঘাটন হিসেবে তুলে ধরেন, সেগুলো আসলে অনেক পুরনো আর বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু তত্ত্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এগুলো মূলধারার প্রত্নতত্ত্বেরই অংশ ছিল; যেমন আটলান্টিসের হারানো নগরী (lost city of Atlantis)। এই ধরণের চিন্তাভাবনা মোটেও নতুন কিছু নয়। আমাদের বই আর আলাপচারিতা থেকে আমি আশা করি এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে আসল তথ্যপ্রমাণগুলো নিজেই যথেষ্ট বিস্ময়কর এবং রহস্যময়। বিষয়টাকে আকর্ষণীয় করার জন্য আপনাকে অতিরঞ্জিত কিছু কল্পনা করার প্রয়োজন নেই। আসল রহস্যগুলোর জট খোলার চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং আর উদ্দীপনামূলক। একে কৃত্রিম রহস্য দিয়ে ঘিরে রাখার কোনো দরকার পড়ে না।

    অ্যারন বাস্তানি: ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে সবসময়ই এমনটা ঘটে। আপনি কারও সঙ্গে কথা বললে তারা বলবে অমুক ব্যক্তি অমুক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে; এগুলো এক গোপন চক্রের কাজ। অথচ পৃথিবীতে প্রচুর শোষণ আর বঞ্চনা আছে এবং ক্ষমতাধরেরা আসলেও অসাধারণ সব উপায়ে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সেগুলো আসলে শনাক্ত করতে আর বুঝতে পারি। এমন বোঝাপড়ার জন্য বিল্ডারবার্গ গ্রুপ (Bilderberg Group) বা এই জাতীয় অবাস্তব কিছু নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় আমার অনেক সহকর্মী যেভাবে সাড়া দেন, তা আমাকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্ত করে। তাঁরা অনেকটা এমন ভাবে বলেন যে, আমরাই বিজ্ঞানী, আমরাই সব ভালো জানি এবং আপনি যদি ওসব বিশ্বাস করেন তবে আপনি পাগল। কথাটি এক অর্থে সত্য হলেও আমাদের নিজস্ব শাস্ত্রের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। ইতিহাসচর্চার এই পদ্ধতিগুলো মাঝেমধ্যে বেশ অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন তারা পুরো এক জনগোষ্ঠীর মানবিকতা আর চেতনাকে অস্বীকার করে। যখন ইউরোপীয়রা প্রথম কাহোকিয়ার মতো স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখেছিল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আদিবাসীরা ওগুলো তৈরি করেছে। তখন তারা সব উদ্ভট তত্ত্ব হাজির করল, যেমন লেইফ এরিকসন বা ভাইকিংরা এসেছিল, অথবা এটি ইসরায়েলের হারানো কোনো বংশের কাজ। সেই সময়কার মূলধারার ইউরোপীয় জ্ঞান থেকেই এই ধরণের ধারণাগুলো আসত। আমি মিশরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উৎস নিয়ে অনেক কাজ করেছি। পিরামিড বা মমীকরণের মতন বিখ্যাত জিনিসের আগের সময়টাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন প্রাক-রাজবংশীয় যুগ (Pre-dynastic)। নামটা এমন যে মানুষ যেন এতে আগ্রহী না হয়! আপনি যদি এই প্রাক-রাজবংশীয় যুগ নিয়ে কোনো কনফারেন্সে যান, তবে দেখবেন তাঁরা মাটির পাত্রের মাপজোখ নিয়ে পড়ে আছেন। যারা আসলে জানতে চায় ওখানে কী ঘটেছিল, তাদের জন্য বিষয়টি ভীষণ বিরক্তির। আপনি যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেই ইউসিএলে পেট্রি মিউজিয়াম আছে। সেই জাদুঘর এখন নিজেরই ইতিহাসের দিকে খুব খোলামেলাভাবে তাকাচ্ছে। যে প্রত্নতত্ত্ববিদের নামে এই মিউজিয়াম, সেই ফ্লিন্ডার্স পেট্রি ছিলেন একজন সুপ্রজননবাদী (eugenicist)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অ-ইউরোপীয়রা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিচু মানের। তিনি কপাল বা করোটির গঠনতত্ত্ব (Phrenology) দিয়ে মানুষের মেধা মাপার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে তাঁর একটা তত্ত্ব ছিল যে—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা আফ্রিকানদের দ্বারা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে সেখানে অন্য কোনো ‘নতুন নরগোষ্ঠী’ (new race) এসে আক্রমণ চালিয়ে এই সভ্যতা গড়েছিল। আমরা এখন নেটফ্লিক্সে যেসব উদ্ভট তত্ত্ব দেখি, এগুলোও ঠিক ততটাই ভিত্তিহীন ছিল; কিন্তু এগুলো আসত আমাদেরই বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্র থেকে। আটলান্টিসের হারানো জাতি নিয়ে ওই ধরণের তত্ত্বগুলো প্রত্যক্ষণলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করে দেওয়াটা খুব সহজ। কিন্তু লড়াইটা কেবল অর্ধেক। আমাদের নিজেদের ভেতরেও তাকাতে হবে এবং কঠিন প্রশ্নগুলো করতে হবে। এই ধরণের তত্ত্বগুলো জায়গা পায় কীভাবে? আমার মনে হয় জায়গা পাওয়ার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ। এই ধারণা যে—সুদূর অতীতে অন্য কোনো মহাদেশের মানুষ আমাদের মতোই বুদ্ধিমান আর সৃজনশীল হতে পারে, তা অনেকে মেনে নিতে পারেন না। যদি কারো মনে এই ধরনের বাধার দেয়াল থাকে, তবে তাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে যে কেন এমনটা হচ্ছে।

    অ্যারন বাস্তানি : তবে এর কিছু অস্পষ্ট উদাহরণও তো আছে। অনেকে বলেন যে স্ফিংস আসলে পিরামিডের চেয়েও অনেক বেশি পুরনো। এটা কোনো এলিয়েন নয় বরং মিশরের মানুষরাই তৈরি করেছে এবং আমাদের বর্তমান ধারণার চেয়ে এটি কয়েক হাজার বছর আগের। আপনি কি একেও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলবেন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, এটি একটি পুরোপুরি বৈধ প্রশ্ন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এটি খুব একটা কৌতূহলোদ্দীপক কোনো দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এই ধরণের বিষয়গুলো তদন্ত করার পদ্ধতি আমাদের কাছে আছে। তবে পিরামিড আর স্ফিংস তৈরির আগের চতুর্থ রাজবংশের সময়ে কী ঘটছিল—সেই প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারাটাই বেশি জরুরি। আমি দক্ষিণ মিশরের উম্ম এল-কায়াব (Umm el-Qa’ab) নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে মিশরের প্রথম রাজবংশীয় যুগের আদি রাজকীয় কবরস্থান আছে এবং সেটি আসলেও বিস্ময়কর। সেখানে এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায় যা আমরা ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতেও আলোচনা করেছি। এই কবরস্থানে রয়েছে মিশরের আদি রাজা আর রানীদের সমাধি। মাটির নিচে বড় বড় গর্তের ভেতর সিঁড়ি আর আসবাবপত্রসহ সমাধিগুলো তৈরি করা হতো। আর তার চারপাশে শত শত ছোট ছোট কক্ষ থাকত যেখানে অন্য মানুষদের কবর দেওয়া হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, রাজকীয় কবরের পাশে সমাহিত করার জন্য ওইসব মানুষকে আচারগতভাবে হত্যা করা হতো। শুধু মানুষ নয়, মিশরের একজন আদি রাজা, আমরা প্রারম্ভিক হায়ারোগ্লিফে তার নাম পড়তে পারি – আহা (Aha)। তার সমাধির গর্তে মানুষের পাশাপাশি তিনটি সিংহকেও সমাহিত করা হয়েছিল। এগুলো কি যথেষ্ট চমকপ্রদ নয়? বইয়ের ১০ নম্বর অধ্যায়ে আমরা এগুলো নিয়েই আলাপ করেছি। তথাকথিত প্রাচীন রাষ্ট্রের শুরুতে কেন মানুষের বিরুদ্ধে এমন সুপরিকল্পিত সহিংসতার প্রয়োজন হলো, সেটা অনুসন্ধান করাটাই বেশি রোমাঞ্চকর। এই প্রেক্ষাপটে স্ফিংসের আলাদা কোনো জায়গা নেই। আমরা বরং যাকিছু ঘটেছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে পারি এবং সেগুলো তো নিজ-গুণেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

    অ্যারন বাস্তানি: কিন্তু একজন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ববিদ হয়তো আপনাকে বলবেন যে—এই সভ্যতা প্রথম রাজবংশীয় যুগের চেয়েও পুরনো এবং এটা একটি হারানো সভ্যতা।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, তখনকার সময় নিয়ে আসলে আমরা অনেক কিছুই জানি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়ই ছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ; অর্থাৎ সেই দীর্ঘ সময় যাকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়। সেই সময়ে কী ঘটছিল তা আমরা বেশ ভালোভাবেই জানি। আপনি যেকোনো জাদুঘরে গেলেই তা দেখতে পাবেন। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম বা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অসাধারণ সব জিনিস আছে। আমরা সবাই বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ, স্ফিংস বা পিরামিড নিয়ে মেতে থাকি। কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষের দিকে এবং বিশেষ করে তাদের সমাধির দিকে নজর দেন, তবে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। মৃত্যুর পরের বিভিন্ন আচারের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হতো, সেগুলোর বিবর্তনটা কয়েক হাজার বছর ধরে মিশরে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথম রাজবংশীয় যুগ বা ফারাওদের উত্থানের আগে প্রায় যে কাউকেই রাজপুত্রের মতো জাঁকজমকভাবে সমাহিত করা যেত। সুন্দর কারুকাজ করা অলঙ্কার, ব্যক্তিগত নকশা করা মাটির পাত্র আর প্রসাধন সামগ্রী তাদের সাথে দেওয়া হতো। কিন্তু যখনই রাজতন্ত্র আর ফারাও শাসনের উত্থান ঘটল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের জীবনের এই নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তারা আর আগের মতো নিজেদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারছিল না। ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই যেকথা স্প্যানিশদের বিবরণ থেকে জানা যায়। সেখানে বিবাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো কোনো সামাজিক আচার পালনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের প্রয়োজন হতো; যেমন শস্য থেকে তৈরি ‘চিচা’ (Chicha) নামে পরিচিত পানীয়। কিন্তু সবাই তো সেই সম্পদ সমানভাবে পেত না। ঠিক একইভাবে মিশরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও এক পর্যায়ে শস্য আর বিয়ারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এসবকিছু ব্যবহারের জন্য আপনাকে সেই ভূসম্পত্তির ওপর অধিকার থাকতে হতো যেখানে চাষাবাদ হয়। ফলে যেসব মানুষ তাদের পরিবারের এই সামাজিক আচারগুলো পালন করতে পারত না তারা এক পর্যায়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত। আমি এখানে কেবল বেঁচে থাকার কথা বলছি না, বরং সামাজিক কর্তব্যের কথা বলছি। এই ঋণের সম্পর্ক থেকেই এক সময় উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর পরাধীনতার জন্ম হয়। মানুষ যখন তাদের জীবনের মৌলিক আচারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই এই ধরণের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাগুলো গড়ে ওঠে।

    অ্যারন বাস্তানি: আপনার ভবিষ্যতের প্রজেক্টগুলো কী কী?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি এই মুহূর্তে বেশ কিছু সাইড প্রজেক্টের সাথে যুক্ত আছি। খুব গভীর গবেষণার জন্য এখন তেমন সময় পাচ্ছি না। তাই আমি এমন কিছু কাজ করছি যেগুলো কেবল লেখালেখি নয়, বরং নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা। গোল্ডস্মিথস কলেজের ফরেনসিক আর্কিটেকচার নামের একটি দলের সাথে আমি কাজ করছি। তারা মূলত মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। আমাজনের বন উজাড় থেকে শুরু করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড — নানা বিষয়ে তারা স্থাপত্যবিদ্যার মডেল ব্যবহার করে আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। ইয়াল ওয়াইজম্যান (Eyal Weizman) এবং তাঁর অসাধারণ দলের সাথে আমার এই কাজ চলছে। জার্মানিতে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নিয়ে তিন দিনের একটি বড় ইভেন্ট হয়েছিল যেখানে ইয়াল একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন এবং সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। লন্ডনে ফিরে আসার পর আমরা কফি খেতে গিয়েছিলাম এবং বইটির ওপর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের দারুণ আলাপ হয়। প্রথমে আমি আমাদের কাজের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাইনি কারণ সময়ের ব্যাপ্তিটা ছিল আমূল ভিন্ন। কিন্তু তিনি আমাদের বইটিকে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের একটি বিস্তৃত কেস স্টাডি হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এটি একটি রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যান। অনেক সময় আপনি হয়তো বিকল্প কোনো ঘটনার সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের ফুটোগুলো দেখিয়ে দিতে পারেন, তবেই সেটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আর যখনই প্রথাগত বয়ানটি নড়বড়ে হয়, তখনই নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। আমি দেখলাম বইটির ক্ষেত্রে আমরা ঠিক একই যুক্তি ব্যবহার করেছি। তাই আমরা ইউক্রেনের কিছু অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাক আর সিরিয়ার আদি নগরগুলোর সমসাময়িক কিছু নগর ইউক্রেনেও পাওয়া গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগের এই বিশাল নগরগুলোতে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভূত শাসনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ নিয়ে বিশাল বিতর্ক আছে যে এগুলোকে নগর বলা হবে নাকি ‘অতিকায় গ্রাম’ বা মেগা-সাইট (Mega sites) বলা হবে। এই বসতিগুলো মূলত আমাদের ভাবায় যে ‘নগর’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং আমাদের মনে আগে থেকেই কী ধরণের ধারণা গেঁথে আছে। আমরা একটি ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশন তৈরি করছি যা সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও দর্শকদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এটি একটি প্রজেক্ট। এর বাইরে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ প্রকাশের পর আমি সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি সৃজনশীল মানুষদের কাছ থেকে—যেমন সংগীতশিল্পী, শিল্পী আর চলচ্চিত্র নির্মাতা। গত সপ্তাহে প্যারিসের ইয়াসমিন ডিবোয়া নামের একজন চমৎকার গায়িকার সাথে দেখা হলো যাঁর স্টেজ নাম হলো ‘লাফান্ডা’ (Lafawndah)। তিনি ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নামে একটি গান লিখেছেন এবং কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনে সেটি পরিবেশন করেছেন। ইরানে মানবাধিকার আন্দোলন ‘উইমেন লাইফ ফ্রিডম’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি এটি গেয়েছেন। আমি শিকাগো থেকে ফেরার কারণে ক্লান্তিতে সেখানে উপস্থিত হতে পারিনি যা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। এই ধরণের সাড়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার মনে হয় এটি আমার সহ-লেখক প্রয়াত ডেভিডের  প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল কঠিন আর অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে এমনভাবে লিখে ফেলার যা মানুষের মন ছুঁয়ে যেত। মানুষ এতে নিজেকে যুক্ত করতে পারত এবং নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেত। আমি এগুলোকে তাঁর প্রতি এক সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবেই দেখি এবং আমি নিজেকে এই কর্মকাণ্ডে একজন ভাগ্যবান সহযাত্রী মনে করি।

    অ্যারন বাস্তানি: সম্ভব হলে ডেভিড সম্পর্কে একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। ডেভিড গ্রেবার আপনার এই বইয়ের সহ-লেখক ছিলেন। ২০২০ সালে সম্ভবত তিনি টুইট করেছিলেন যে পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তিনি জিম মরিসনের একটা ছদ্ম-উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন— ‘আমার মস্তিষ্ক যেন অসাড় বিস্ময়ে আহত, আমরা শেষ করেছি’— অথবা এই ধরণের কিছু একটা।

    অ্যারন বাস্তানি: আর এর এক মাস পরেই তিনি মারা গেলেন।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, পাণ্ডুলিপি শেষ করার প্রায় তিন সপ্তাহ পর। মাত্র তিন সপ্তাহ।

    অ্যারন বাস্তানি: তো এমন একটা বই প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা কেমন— যা বিশ্বজুড়ে ‘বেস্টসেলার’ হয়েছে এবং অনেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে? একজনের সাথে দীর্ঘ এক দশক ধরে কাজ করার পর যখন বড় ধরনের সাফল্য এল, তখন তিনি তা ভাগ করে নেওয়ার জন্য আর পাশে নেই— বিষয়টা কেমন?

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমাকে দুইভাবে বিষয়টি অনুভব করতে হয়। একটা হলো ভালো অনুভূতি— বইটি যেভাবে সমাদৃত হয়েছে তা অসাধারণ। সম্প্রতি একজন আমাকে কিছু তথ্য দিলেন যে বিশ্বজুড়ে বইটির প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হতে চলেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। তবে অন্য অনুভূতিটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। অবিরামভাবে এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া যে ডেভিড এসবের সাক্ষী হওয়ার জন্য বেঁচে নেই। তিনি এই বইটির জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন; তাঁর তর সইছিল না বইটা মানুষের হাতে তুলে দিয়ে এই ধরণের আলোচনা করার জন্য। আসলে আপনার সাথে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া আর এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করার সময় আমাদের দুজনেরই থাকার কথা ছিল। তাই এই অনুভূতি একইসঙ্গে খুব যন্ত্রণাদায়ক এবং এক ধরণের প্যারাডক্স। এসবের মধ্যে আমি শুধু একটা বিশ্বাসই আঁকড়ে ধরি। তিনি অবশ্যই চাইতেন আমি যেন বাইরে বের হই, কঠোর পরিশ্রম করি এবং মানুষকে এই বই আর আমাদের কাজগুলো নিয়ে জানাই। আমি যথাসাধ্য সেটাই করার চেষ্টা করছি; বলতে পারেন কাজটা আমি খানিকটা তাঁর জন্যই করছি। যখন আমি একটু বাড়তি শ্রম দিই, তখন তাঁর কথাই মনে হয়।

    অ্যারন বাস্তানি: একদম ঠিক। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমারও খুব ভালো লেগেছে, ধন্যবাদ।

    [সূত্র : Everything We Think We Know About Early Human History is Wrong | David Wengrow on Downstream); নোভারা মিডিয়া (Novara Media) | ৪ ডিসেম্বর, ২০২২

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; অরুণাপল্লী, সাভার, ঢাকা

  • গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

    • নাজমুল আরেফিন

    আজকে আমরা ‘ক্রিটিকাল থিওরি’ বলতে যা বুঝি তার আধুনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। ‘নয়া বামধারার পিতা’ নামে পরিচিত হার্বাট মারকুস (১৮৯৮-১৯৭৯) এই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন। মারকুসের ‘ওয়ান ডাইমেনশনাল ম্যান’(১৯৬৪) আমার জীবনে পড়া গুরুত্বপূর্ণ ফরমেটিভ টেক্সটের একটা। আমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সময়ে মারকুস এক সপ্তাহের জন্য ইসরায়েলে যান। মারকুসের বয়স তখন ৭২। তিনি ফিরে এসে ৪ পাতার একটা বিবৃতি লিখলেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের মিলিটারি অকুপেশনকে যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে বললেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে দেখিয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করলেন যে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারী নীতি তাদের নাৎসি ঘটনার পুনরাবৃত্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।[1] তিনি ইহুদিদের অস্তিত্বের অধিকারের স্বার্থে ইসরায়েল রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বটে কিন্তু স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতি ঘোর সমর্থন জানিয়েছিলেন। একজন ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ গালি খেতে হয়েছে বহুবার। তাকে মুন্নী সাহা কায়দায় একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘Jewishness’ নিয়ে আপনার নিজের অনুভূতি কি? তিনি বলেছিলেন, ইহুদিরা যতদিন আন্ডারডগ ছিল ততদিন আমি এই পরিচয়ের সাথে একত্বতা ঘোষণা করতাম। কিন্তু এখন ইহুদিরা এমন জাতিতে পরিণত হয়েছে যারা নিজেরাই অন্য আন্ডারডগদের উপর চড়াও। তাই আমার জন্য নিজেকে এই পরিচয়ে পরিচিত করা আরও কঠিন।[2]

    হেবারমাস, এআই জেনারেটেড

    সেই হার্বাট মারকুসের পিএইচডি ছাত্রী ছিলেন আমেরিকান বামপন্থী নারীবাদের পোস্টার গার্ল, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, দার্শনিক অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। আমেরিকার আধুনিক বর্ণবাদের একজন জলজ্যান্ত স্বাক্ষী এই অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। ডেভিস সম্প্রতি আলজাজিরার আপফ্রন্টে বলেছেন ব্ল্যাকদের মুক্তি আন্দোলন আর ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। আমেরিকায় ব্ল্যাকদের প্রতি যে বর্ণবাদ, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে বর্ণবাদ, আর ইসরায়েলি বর্ণবাদ তা নানানভাবে সংযুক্ত। তাই “প্যালেস্টাইন বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক লিটমাস টেস্ট”।

    অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে আমি পুরোপুরি একমত। এই লিটমাস টেস্ট দিয়ে আমরা এখন পশ্চিমা চিন্তাবিদদের হিপোক্রেসি বা ভন্ডামিগুলো আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারি। যাচাই করতে পারি। আজকের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের রাজনীতি-চিন্তার ভন্ডামি ঠিক যেমনটি যাচাই করেছেন প্রফেসর আসেফ বায়াত। আসেফ বায়াত সম্পর্কে হয়তো অনেকের ধারণা নাও থাকতে পারে। তাই উনার সম্পর্কে দুলাইন খরচ করি। আসেফ বায়াত ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরবানা-শ্যাম্পেইনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গ্লোবাল এবং ট্রান্সন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি “post-Islamism” তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৯ সালে প্রকাশিত “Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East” (Stanford University Press), এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত “Post-Islamism: The Changing Faces of Political Islam” (Oxford University Press) বই দুটি তাকে একাডেমিক দুনিয়ায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘আরব বসন্ত’কে ক্রিটিকাল ডিল করে তাত্ত্বিক রুপ দিতেও তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।

    ছবি: টুরিং অব গোয়ের্নিকা গাজা উৎস: আরব কালচারাল ফান্ড

    গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩, Goethe University Frankfurt-এর “Normative Orders” গবেষণা সেন্টার থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মহারথী দার্শনিক য়ুর্গেন হ্যাবারমাসের একটি বিবৃতি ছাপানো হয়। যার জার্মান শিরোনাম “Grundsätze der Solidarität. Eine Stellungnahme”। ইংরেজিতে মানে দাঁড়ায় “Principles of solidarity. A statement”। হ্যাবারমাসের সাথে ফ্রাঙ্কফুর্ট ভিত্তিক আরও তিনজন প্রথিতযশা একাডেমিক এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। নিকোল ডাইটেলহফ, রেইনার ফার্স্ট, এবং ক্লাউস গুন্টার। সন্দেহ নাই যে হ্যাবারমাসের নাম থাকাতেই এই বিবৃতি পুরো ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হয়। কি আছে এই বিবৃতিতে? যদি সংক্ষেপে বলতে হয় এর মূল কথা হল, ৭ই অক্টোবরের হামাসের সন্ত্রাসী হামলা ইহুদি জীবনকে নির্মূল করার ঘোষিত অভিপ্রায় নিয়েই করা হয়েছে। এই ঘটনাই মূলত ইসরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছে। এবং ইসরায়েলের এই রিটালিয়েশন বা পাল্টা আক্রমণ ন্যায়সঙ্গত (“justified in principle”)। বেসামরিক মানুষ যাতে না মরে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে—এই মুখস্থ সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দেবার পর হ্যাবারমাসরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানিতে ইসরায়েলের এই কর্মকান্ড কোনওভাবেই এন্টি-সেমেটিক প্রতিক্রিয়ার ন্যায্যতা দেয় না। বিশেষ করে জার্মানিতে তা সহ্য করা হবে না। হ্যাবারমাস গং জার্মানবাসীকে আরও মনে করিয়ে দেন যে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানির গণতান্ত্রিক নৈতিকতা হলো “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা”। কিন্তু এখানে হ্যাবারমাসদের কাছে মানুষ মানে শুধু হলো ‘ইহুদি’ পরিচয়। জীবন মানে শুধু হলো ‘ইহুদি জীবন’। ৭০ দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি মানুষের অমানবিক মর্যাদাহীনতা, কিংবা হাজারো লাশ উনাদের কাছে ম্যাটার করে না। তাই এই বিবৃতিতে উনারা জার্মানবাসীদের নাৎসি হলোকাস্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত রাখার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম মৌলিক নৈতিকতা।

    আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের অনেক তাত্ত্বিক চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। হ্যাবারমাসের “পাবলিক স্ফিয়ার” ধারণাকে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য প্রেক্ষিতে নানানভাবে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। এই বিবৃতি আসেফকে স্বাভাবিকভাবেই খুবই আহত করে। গত ডিসেম্বরের ৮ তারিখ তিনি সেই ক্ষোভ থেকে হ্যাবারমাসকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিটা শুধু হ্যাবারমাসদের ভন্ডামিকে বুঝতেই সাহায্য করেনা বরং ইউরোপের ক্রিটিকাল চিন্তার রাজনীতি বোঝার জন্য নানান দিক থেকে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের ফিলিস্তিনি গণহত্যা শুধু আজকের ক্রাইসিস না। শুধু ‘পোস্ট-অক্টোবর ৭’ সিজন থেকে এই ক্রাইসিস বোঝার কোন সুযোগ নেই। পঞ্চাশের দশক থেকে যে সেটলার কলোনিয়াল ড্রামা দিনে দিনে এতদূর এসেছে তা বোঝার জন্য আগের প্রতিটি সিজন, প্রতিটি এপিসোড গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এবং তা দেখা শুরু করলেই বোঝা যায় ইউরোপের কতখানি হাত এই ক্রাইসিসের মূলে। গ্রীসের ক্রিটিকাল অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারোফাকিসের তাই সরল স্বীকারোক্তি—“আমাদের ইউরোপীয়ানদের লজ্জায় মাথা নিচু করে হাটা উচিত…আমরা ইউরোপীয়রা এটি (আজকের ক্রাইসিস) তৈরি করেছি…[প্রথমে] আমরা শত বছর ধরে ইহুদি-বিদ্বেষি প্রোগ্রাম বানিয়েছি, তারপর ইহুদিদের হলোকাস্টে ঢুকিয়েছি…আবার তারপর ‘আ ল্যান্ড উইদাউট আ পিপল ফর আ পিপল উইদআউট আ ল্যান্ড’ এর মত জঘন্য একটা মতবাদ বা নীতিকে সাপোর্ট করেছি। মনে হয় যেন প্যালেস্টাইন জনমানব শূন্য ছিল। মূলত এটি দখলদার হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্ট ভাষা যা ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের গণহত্যার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে একটি ‘জনশুন্য খালি জমি’ হিসাবে ঘোষণা করতে ব্যবহার করেছিল।”[3]

    উৎস: ফ্রিপিকস

    হ্যাবারমাসরা এই পুরো ইতিহাসকে মুছে ফেলে জার্মান নাৎসিদের করা অন্যায়ের খেসারত দিতে সবাইকে চুপ থাকতে বলছেন। যারা কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন তাদেরকে ঢালাওভাবে ইহুদি-বিদ্বেষি ট্যাগ দিচ্ছেন। এই ইন্টেলেকচুয়াল হিপোক্রেটিক পজিশন হ্যাবারমাসের নিজের দেওয়া বড় বড় তত্ত্বের সাথে কতখানি সাংঘর্ষিক তা আসেফ বায়াত তার চিঠিতে দারুণভাবে দেখিয়েছেন। জার্মানিতে গাজা নিয়ে কথা বললে কিভাবে ‘এন্টিসেমেটিক’ তকমা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের মত শহরে যা কিনা ক্রিটিকাল চিন্তার সূতিকাঘর হিসেবে পরিচিত সেখানেও ফিলিস্তিনিদের পুরস্কার-সম্মাননা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সেসব ব্যাপারে হ্যাবারমাসদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বায়াত।

    হ্যাবারমাস “public sphere,” “rational dialogue”, “deliberative democracy” ইত্যাদি ধারণাগুলোর আধুনিক প্রবক্তা। অথচ বর্তমান জার্মানিতে (পড়ুন ‘পোস্ট-সেক্যুলার’ ইউরোপে) এই ধারণাগুলোর কি করুণ অবস্থা; এবং খোদ হ্যাবারমাস এই ধারণাগুলোর প্র্যাক্টিসের সময় কতখানি বিপরীতে অবস্থান করেন তা গাজা ‘লিটমাস টেস্ট’ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কি? আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের মত রকস্টার তাত্ত্বিকদের স্ববিরোধিতা সম্পর্কে সেই উদ্বেগ বার বার প্রকাশ করেছেন তার চিঠিতে। চলুন একটু ধৈর্য নিয়ে উনার পুরো চিঠিটা পড়া যাক (চিঠিটা খুবই অল্প সময়ে যতটা সম্ভব মূলের সাথে মিল রেখে প্রফেসর বায়াতের কাছে অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়):

    প্রিয় অধ্যাপক হ্যাবারমাস,

    আপনি হয়তো আমাকে মনে করতে পারবেন না, কিন্তু ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে মিশরে আমাদের দেখা হয়েছিল। আপনি কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে distinguished Visiting Professor হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাবলিকের সাথে সংযুক্ত হতে এসেছিলেন। সবাই আপনাকে শোনার জন্য উৎসুক ছিল। যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থী এবং স্বৈরাচারীরা “ইসলামকে রক্ষা করার” ছদ্মবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছিল, সেই দমবন্ধ সময়ে “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং গণতান্ত্রিক জীবন সম্পর্কে আপনার [তাত্ত্বিক] চিন্তাগুলি তাজা বাতাসের মত হাজির হলো। এক সহকর্মীর বাড়িতে রাতের খাবারের সময় ইরান ও ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে যে দারুণ কথোপকথন হয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে। আমি আপনাকে ইরানে “ইসলাম-পরবর্তী” (post-Islamist)  সমাজের উত্থান সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেটা আপনি ২০০২ সালে যখন আবার তেহরান ভ্রমণে আসেন অনুভবও করেছিলেন বলে মনে হয়। তখনও আপনি ইউরোপের “ধর্মনিরপেক্ষ-পরবর্তী” (post-secular) সমাজ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন নি। আমরা আপনার মূল তাত্ত্বিক ধারণাগুলির মাধ্যমে কায়রোতে একটি আন্তঃদেশীয় পাবলিক স্ফিয়ার এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তোলার এক বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে কীভাবে ঐক্যমতের-সত্যে পৌঁছানো যায় সে সম্পর্কে ধারণা পেতে আপনার কমিউনিকেটিভ ফিলোসফির মূল বিষয়বস্তুকে আমরা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম।

    আর এখন, প্রায় ২৫ বছর পর, বার্লিনে বসে গাজা যুদ্ধের উপর আপনার যৌথ-লিখিত “Principles of Solidarity”  বিবৃতিটি যথেষ্ট উদ্বেগ এবং শংকা নিয়ে পড়লাম। বিবৃতিটি মূলত জার্মানিতে যারা ৭ই অক্টোবর হামাসের ভয়ঙ্কর হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরায়েলের নিরলস বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে বিবৃতি বা প্রতিবাদের মাধ্যমে স্বরব তাদেরকে তিরস্কার করার জন্যই লেখা। এর থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের এই সমালোচনাগুলি [আপনাদের কাছে] অসহনীয়। কারণ ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক—“যার মূল আলাপ হলো ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার”। এই “বিশেষ সুরক্ষা” নীতির যে বয়ান তার বীজ মূলত জার্মানির ব্যতিক্রমী ইতিহাসের “নাৎসি যুগের গণ-অপরাধের” মধ্যে নিহিত।

    এটা প্রশংসনীয় যে আপনি এবং আপনার দেশের রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সেই ঐতিহাসিক ভয়াবহতার স্মৃতি ধরে রাখতে অনড়, যাতে ইহুদিদের (এবং আমি অনুমান ও আশা করি অন্যান্য মানুষদের) উপর একই ধরনের ভয়াবহতার প্রভাব না পড়ে। কিন্তু আপনার জার্মান ব্যতিক্রমবাদের উপর ভিত্তি করে বানানো ফর্মুলা এবং অনড়তা ইসরায়েলের নীতি এবং ফিলিস্তিনি অধিকার সম্পর্কে আলাপের জন্য কার্যত কোন পথই খোলা রাখেনা। আপনি যখন “ইসরায়েলের কর্মকান্ডের” সমালোচনাকে “ইহুদি বিরোধী প্রতিক্রিয়া” বলে বানচাল করছেন, তখন আপনি [আসলে] চুপ থাকতে এবং বিতর্ককে দমন করতে উৎসাহিত করছেন।

    একজন একাডেমিক হিসেবে আমি এটা জেনে হতভম্ব হয়েছি যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে-এমনকি শ্রেণিকক্ষের মধ্যেও, যা কিনা আলোচনা ও অনুসন্ধানের জন্য মুক্ত স্থান হওয়া উচিত-সেখানে প্যালেস্টাইনের বিষয়টি সামনে এলে প্রায় সবাই চুপ থাকে। সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন এই বিষয়ে খোলামেলা এবং অর্থপূর্ণ বিতর্ক থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো ইহুদি সহ বহু লোককে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের অনুষ্ঠান এবং পুরষ্কার বাতিল করা হয়েছে এবং “ইহুদি বিদ্বেষের” অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে কথা বলতে না দিলে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল সে বিষয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করে কীভাবে? “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং “সুচিন্তিত গণতন্ত্র” (deliberative democracy) আপনার এইসব বিখ্যাত [তাত্ত্বিক] ধারণাগুলো এখন তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?বাস্তবতা হলো, আপনি যে সমালোচক ও প্রতিবাদগুলোকে তিরস্কার করছেন, তাদের অধিকাংশই কখনোই ইহুদিদের জীবন রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। এবং দয়া করে ইসরায়েলি সরকারের এই যুক্তিসঙ্গত সমালোচকদের সাথে ফালতু চরম-ডানপন্থী নব্য-নাৎসি বা অন্যান্য ইহুদি বিরোধীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না, তাদের জন্য অবশ্যই [আলাদাভাবে] তীব্র নিন্দা ও মোকাবিলা জারি রাখতে হবে।

    আমার পড়া প্রায় প্রতিটি বিবৃতিই ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামাসের নৃশংসতা এবং ইহুদি বিদ্বেষ উভয়কেই নিন্দা করেছে। এই সমালোচকরা ইহুদিদের জীবন রক্ষা বা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে মোটেও কোন বিতর্ক করছেন না। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবন এবং প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে যে ডিনায়াল তা নিয়ে বিতর্ক করছেন। অথচ (ডিনায়ালের) এই দিকটা নিয়ে আপনাদের দেওয়া বিবৃতি দুঃখজনকভাবে নীরব।

    (আপনাদের) বিবৃতিতে এক বারের জন্যেও ইসরায়েলকে একটি দখলদার শক্তি বা গাজাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। না আছে (ইসরায়েলের) বিকৃত বৈষম্য সম্পর্কে কোন কথা। এটি দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি জীবনের দৈনন্দিন ধ্বংসের কথা বলার জন্য লেখা হয়নি। “ইসরায়েলের কর্মকান্ড”—যা আপনি “নীতিগতভাবে ন্যায়সঙ্গত” বলে মনে করেন—একটি প্রতিরক্ষাহীন জনসংখ্যার উপর ছয় দিনের মধ্যে ৬০০০ বোমা ফেলেছে; ১৫০০০ এরও বেশি মানুষ মেরেছে (তাদের মধ্যে ৭০% মহিলা ও শিশু), ৩৫০০০ আহত করেছে; ৭০০০ মানুষকে নিখোঁজ বানিয়েছে; এবং ১.৭ মিলিয়নকে করেছে বাস্তুচ্যুত। পুরো একটা জনসংখ্যাকে খাদ্য, জল, আবাসন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার নিষ্ঠুরতার কথা তো বাদই থাকলো। (গোটা ফিলিস্তিনি) জীবনের মূল পরিকাঠামোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

    যেখানে আপনার বিবৃতিতে আপনি বোঝাচ্ছেন যে, এগুলি প্রযুক্তিগতভাবে “গণহত্যার অভিপ্রায়” নাও হতে পারে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে এগুলিকে “যুদ্ধাপরাধ”, “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি” এবং “জাতিগত নির্মূলকরণ” নামে অভিহিত করেছেন। এখানে আমার উদ্বেগ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে “ইসরায়েলের কর্মকান্ড” কীভাবে বিচার করা যায় তা নিয়ে নয়, বরং এই ধরনের বিস্ময়কর ধ্বংসযজ্ঞের মুখে আপনি যে নৈতিক শীতলতা এবং উদাসীনতা দেখাচ্ছেন তার গভীরতা কীভাবে নির্ণয় করবো তা নিয়ে। (আপনার) মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য আর কত কত জীবন বিলীন হতে হবে? আপনার বিবৃতির শেষে জোরালোভাবে আন্ডারলাইন করা “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা” কথাটার কি মানে দাঁড়ায় আসলে? এটা এমন যেন আপনি আশঙ্কা করছেন যে, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বললে ইহুদি জীবনের প্রতি আপনার নৈতিক অঙ্গীকার হ্রাস পাবে। যদি তা-ই হয়, অতীতে করা এক বিশাল অন্যায়ের সংশোধনকে বর্তমানের আরেকটা ভয়ানক অন্যায়কে পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্যানা প্যাঁচানো কতই না দুঃখজনক!

    আমি আশঙ্কা করি যে এই প্যাঁচানো নৈতিক কম্পাস জার্মান ব্যতিক্রমীতার যুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যার আপনি ধারক-বাহক। সংজ্ঞানুসারে, ব্যতিক্রমীতা কোন সর্বজনীন মান নয় বরং ইহা বিশেষ কোন মানকে মানিয়া লয়। (ব্যতিক্রমবাদের নিক্তিতে) কিছু লোক অধিকতর যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে, অন্যরা কম যোগ্য, এবং আর বাকীরা অযোগ্য। এই [বিশেষ] যুক্তি যৌক্তিক সংলাপকে রুদ্ধ করে এবং নৈতিক চেতনাকে অসংবেদনশীল করে তোলে। এমন এক কগনিটিভ ব্লক নির্মান করে যা আমাদের অন্যের দুর্দশা-আহাজারি দেখতে দেয় না, সহানুভূতিকে আটকে দেয়।

    কিন্তু সবাই এই কগনিটিভ ব্লক এবং নৈতিক অসাড়তার কাছে নতিস্বীকার করে না। আমি বুঝতে পারি যে অনেক তরুণ জার্মান তাদের ব্যক্তিগত দুনিয়ায় ইসরায়েলি-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণীর থেকে একদম ভিন্ন মতামত প্রকাশ করে। এমনকি কেউ কেউ জনসাধারণের বিক্ষোভেও অংশ নেয়। তরুণ প্রজন্ম এখন বিকল্প মিডিয়া এবং জ্ঞানের উৎসের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের কগনিটিভ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা পুরানো প্রজন্মের থেকে আলাদা। কিন্তু বেশিরভাগই [রাষ্ট্রীয়] প্রতিহিংসার ভয়ে পাবলিক দুনিয়াতে নীরবতা বজায় রাখে।

    পরিহাসমূলকভাবে গণতান্ত্রিক জার্মানিতে, প্রাক-১৯৮৯ ইউরোপের মতো বা হাল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনস্থতার মত, এক ধরনের “হিডেন স্ফিয়ার” আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে হয়। যখন ভীতি-ত্রাস জনসাধারণের অভিব্যক্তি বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষ পাবলিকলি সরকার অনুমোদিত বয়ানের সাথে তাল মেলালেও, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়-আষয়ে ব্যক্তিগত [গোপন] দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করার প্রবণতা দেখায়। সুযোগ এলে এসব হিডেন স্ফিয়ার বিস্ফোরিত হতে পারে।

    এটা খুবই অস্থির সময়, অধ্যাপক হ্যাবারমাস। এটা ঠিক সেই সময় যখন আপনার মতো চিন্তাবিদদের প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সর্বোপরি নৈতিক সাহস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সত্য ও সংযোগমূলক পদক্ষেপ, বিশ্বজনীনতা, নাগরিকত্ব-সমতা, সুচিন্তিত গণতন্ত্র এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে আপনার মৌলিক ধারণাগুলি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও আপনার ইউরোসেন্ট্রিজম, জার্মান এক্সেপশনালিজম এবং ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আপনার তর্ক-বন্ধ-করা তৎপরতার সঙ্গে এই ধারণাগুলি সাংঘর্ষিক হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

    আমি আশঙ্কা করি যে নিছক জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সচেতনতা বোধহয় যথেষ্ট না। আন্তোনিও গ্রামসি যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন, একজন বুদ্ধিজীবী কীভাবে “না বুঝেই” “জানতে” এবং “অনুভূতি” ছাড়া বুঝতে পারেন? যখন আমরা সহানুভূতির মাধ্যমে একে অপরের দুর্দশা-আহাজারি “অনুভব” করি, কেবলমাত্র তখনই আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর জন্য আশা থাকতে পারে।

    চলেন আমরা ত্রয়োদশ শতাব্দীর ফার্সি কবি সাদি শিরাজির আভাসকে স্মরণ করিঃ

    পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ আদতে পরস্পর একাকার,
    এক নির্যাসে তৈরি সবাই আত্মীয় আত্মার।
    একজন যখন ব্যথায় কাতর, অস্বস্তিতে রয় সকল অন্তর।
    যদি অপরের ব্যথা তোমার মনে আদৌ দাগ না কাটে,
    মানুষের নাম পরিচয় তবে রাখো কোন অজুহাতে!

    সম্মানের সঙ্গে,
    আসেফ বায়াত
    ডিসেম্বর ৮, ২০২৩

    ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠাবাদী দর্শনকে একটি মুক্ত সমাজ নির্মানের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে বিবেচনা করত। সেটা যে হ্যাবারমাস ভুলে গেছেন বায়াতের এই চিঠি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয় বৈকি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, গাজা নিয়ে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-বিবৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এই বিবৃতিগুলো প্রকাশ করে পশ্চিমা ক্রিটিকাল চিন্তাবিদরা কি নিয়ে টেনশন করছে। আর কি তাদের চিন্তাতে নেই।  ইউনিভার্সিটিতে কাগজসর্বস্ব জ্ঞান উৎপাদনের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে। বাস্তব দুনিয়া। ক্রিটিকাল চিন্তা এবং জ্ঞানকে যখন সেই বাস্তব দুনিয়ায় অনুশীলন করার সময় আসে তাদের মোরাল কম্পাস তখন কোন দিকে ঝুলে থাকে? আসেফ বায়াত যাকে ‘জার্মান এক্সেপশনালিজম’ বা ‘জার্মান ব্যতিক্রমীতা’ বলছেন তাকি আসলেই শুধু জার্মান চিন্তা, নাকি গোটা ইউরোপের বা পশ্চিমা দুনিয়ার? মরোক্কোর নৃতত্ত্ববিদ এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আল-মাজোজে মনে করেন হ্যাবারমাসদের এই অবস্থানকে মূলত পশ্চিমা চিন্তাবিদদের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।[4] আমার বর্তমান পশ্চিমা পিএইচডি জীবনের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা এবং অব্জার্ভেশনও সেটাই বলে। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দুনিয়ায় একাডেমিক ফ্রিডম চর্চায় সবচেয়ে অগ্রগণ্য হিসেবে সুনাম থাকা সত্ত্বেও গাজা গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হতে কিংবা কথা বলতে যাদের দেখেছি তাদের সংখ্যা একদম হাতে গোণা যায়। আর আমেরিকার কথা নাই বা বললাম। প্যালেস্টাইন ‘লিটমাস টেস্ট’ হার্ভাড কিংবা অন্যান্য আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নর্থ আমেরিকান একাডেমিয়ার মোরাল পজিশনের ভিতরের চেহারাটাকে খুব ভালভাবেই উন্মুক্ত করেছে।

    থিয়েটার গাজা ২০২৪
    শিল্পী: ওসামা দিয়াব
    উৎস: আর্টসি

    তাহলে কি ব্যতিক্রম নাই? সেটাও অনেক আছে। গাজা নিয়ে যারা একাডেমিক দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের মধ্যে পশ্চিমা ইহুদিদের কাজ এবং সোচ্চারতা অগ্রগণ্য। কিন্তু তাদেরকেও নানাভাবে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করেছে এবং করছে পশ্চিমা একাডেমিয়া। একটা উদাহরণ দেওয়া জরুরি। জুডিথ বাটলারকে বাংলাদেশে অনেকে প্যাথেটিকভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে ‘রেইনবো স্কলার’ হিসেবে পরিচিত করান। উনার সমকামী ব্যক্তিগত জীবনকে সামনে এনেও অনেকে অনেক কিছু উস্কে দিতে চান। এই জুডিথ বাটলার গতমাসের ৩ তারিখ (মার্চ, ২০২৪) প্যারিসে এক প্যানেল ডিসকাশনে হামাসের ৭ই অক্টোবরের হামলাকে “আপরাইজিং” এবং “সশস্ত্র প্রতিরোধ” (armed resistance) বলেছেন।[5] বাটলারের বক্তব্যের মূল কথা হলো—”রাজনৈতিক দল হিসেবে হামাস সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এটা বলা অনেক বেশি সততার এবং ঐতিহাসিকভাবে সঠিক যে ৭ই অক্টোবরের আপরাইজিং একটা সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল। এটি কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা নয় এবং এটি কোনও ইহুদি বিরোধী হামলাও নয়। এটি ছিল ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ।”[6] বাংলাদেশ কিংবা মুসলিম বিশ্বের কয়জন স্কলার পাবলিকলি এটা বলতে পেরেছেন?

    এবারই প্রথম না। ২০০৬ সালেও তিনি হামাস ও হিজবুল্লাহকে “গ্লোবাল লেফট” হিসেবে চিহ্নিত বা বর্গীকরণ করেছিলেন। অক্টোবর, ২০২৩-এও যখন হ্যাবারমাসরা ইসরায়েলের ক্রমাগত বোমাহামলাকে ন্যায্যতা দেবার জন্য কলম ধরছেন তখন বাটলার এই কর্মকান্ডকে “বারবারিক” ও “জেনোসাইড” হিসেবে  ঘোর নিন্দা জানিয়েছেন, আমেরিকান সরকার এবং মিডিয়া কিভাবে এই জেনোসাইডকে মদদ দিচ্ছে সে ব্যাপারে সবাই মিলে কথা বলার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।[7] তখনই তাকে শুনতে হয়েছে—বাটলারের কাছে হামাসের হামলা ‘বারবারিক’ না অথচ ইসরায়েলিরা সাদা বলে তাদের হামলাকে ‘বারবারিক’, কারণ ইহুদি হলেও বাটলারকে ইসরায়েলে থাকতে হয় না, তাই সে জানেনা হামাস একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যা ইহুদিত্বের কারণে ইসরায়েলিদের পৃথিবীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।[8] অবিরত সমালোচনা, ফ্রেমিং তাকে তাকে সত্য প্রকাশ থেকে দমাতে পারেনি। প্যারিসে মার্চের ৩ তারিখের উপর্যুক্ত বক্তব্যের পর ফরাসি তথা পশ্চিমা একাডেমিয়া আরও কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতে থাকে। এখনও তাকে মিডিয়ায় খোলা চিঠিসহ বিভিন্নভাবে ভৎসনা করা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের নানান পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন বাটলার। কিন্তু নিজের মোরাল পজিশন থেকে সরে আসেন নি।

    উৎস: পিলগ্রিমেজ আর্ট, পিন্টারেস্ট

    হার্বাট মারকুস এবং তার ছাত্রীকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। মারকুসের শিক্ষক সম্পর্কে আলাপ করেই না হয় শেষ করি। তার শিক্ষক ছিলেন ২০ শতকের প্রধানতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার। হাইডেগারের সাথে মারকুসের গুরুশিষ্য সম্পর্ক অসাধারণ ছিল। কিন্তু ১৯৩২ সালে মারকুস হাইডেগারের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করেন। এর কারণ হাইডেগার নাজি পার্টির দিকে ঝুঁকে যান। ১৯৩৩ সালে হাইডেগারকে ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাৎসি রেক্টর বানানো হয়।[9] হাইডেগার যত বড় দার্শনিকই হোক না কেন, নাৎসিদের নৈতিক সমর্থন দেবার জন্য একাডেমিক দুনিয়া আজও তাকে ক্ষমা করে নি। ইউরোপীয় দর্শনের গভীর বর্ণবাদ, চুপ থাকা ও ফ্যাসিস্ট শেকড় বোঝার জন্য হাইডেগারকে আজও অনেকে একটি প্রবেশদ্বার হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।[10] ঠিক একই ভাবে হ্যাবারমাসদের দর্শন, তত্ত্বচিন্তা তাদের বর্ণবাদী কারণে চুপ থাকা, ইসরায়েলের সেটলার কলোনিয়াল চরিত্রকে প্রশ্ন করতে না পারা এবং গাজায় চলমান গণহত্যাকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য দিনকে দিন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাদের ক্রিটিকাল চিন্তাগুলি আরও বেশি হিপোক্রেটিকালি অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে। আসেফ বায়াত বোধহয় তার চিঠিতে সেই সিগনালই দিয়েছেন।

     

    তথ্যনির্দেশ: 

    [1] Jack Jacobs. (2014). The Frankfurt School, Jewish Lives, and Antisemitism.

    Cambridge University Press. P. 121. pp.119-122

    [2] Marcuse’s View of Israel is That She Lacks Eros and Civilization. (1972). Jewish Telegraphic Agency. https://www.jta.org/archive/marcuses-view-of-israel-is-that-she-lacks-eros-and-civilization

    [3] Yanis Varoufakis on Israel-Gaza: ‘We Europeans have created this’ | UpFront. (2023, Nov 14). Al Jazeera English. https://www.youtube.com/watch?v=_OAniUDMA1Y

    [4] Alieddien Hilal. (2014, Jan 09). Challenging Habermas on Israel. Ahram Online. https://english.ahram.org.eg/NewsContent/50/1204/515359/AlAhram-Weekly/Opinion/Challenging-Habermas-on-Israel-.aspx

    [5] Michael Starr. (2014, March 14). Judith Butler defends calling October 7 Massacre ‘armed resistance’. The Jerusalem Post. https://www.jpost.com/diaspora/antisemitism/article-791928

    [6] Laurel Duggan. (2024, March 5). Judith Butler: 7 October was armed resistance, not terrorism. Unherd. https://unherd.com/newsroom/judith-butler-7-october-was-armed-resistance-not-a-terrorist-attack/

    [7] Palestinian Lives Matter Too: Jewish Scholar Judith Butler Condemns Israel’s “Genocide” in Gaza. (2023, Oct 26). Democracy Now. https://www.youtube.com/watch?v=CAbzV40T6yk

    [8] Hamutal Gouri. (2023, Nov 03). An Open Letter to Prof. Judith Butler. The Times of Israel. https://blogs.timesofisrael.com/an-open-letter-to-prof-judith-butler/

    [9] See: Andrew Feenberg. (2005). Heidegger and Marcuse: The Catastrophe and Redemption of History. Routledge.

    [10] See: Adam Knowles. (2019). Heidegger’s Fascist Affinities: A Politics of Silence. Stanford University Press.

  • উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে সিআইএর মূল্যায়ন

    • অনুবাদ: আবদুল্লাহ বুবুন

    [বর্তমান সময়ে গোটা বিশ্বেই বুদ্ধিত্তিক ও একাডেমিক অঙ্গনে ফরাসি উত্তর–আধুনিক বা আরও স্পষ্ট করে বললে উত্তর–কাঠামোবাদি চিন্তার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্যণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গোটা বিশ্ব দুটি সুপার পাওয়ারে ভাগ হয়ে যখন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, তার প্রভাব পড়ে বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী শক্তি, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র। এই দুই শক্তিকে কেন্দ্র করেই সম্রাজ্যের প্রয়োজনেই বিকাশ লাভ করতে থাকে নানা বুদ্ধিবৃ্ত্তিক ও ভাবাদর্শিক চিন্তাধারা। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা দেখতে পাই ফরাসি বামপন্থী দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটা নতুন বাঁকবদলের। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীদের এখন প্রায়শই উত্তর–কাঠামোবাদী, উত্তর–আধুনিকতাবাদী নানা তকমায় চিহ্নিত করা হয়। এই নতুন দার্শনিক গোষ্ঠীর মধ্যে আমরা একদিকে যেমন দেখতে পাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি ভরসা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি, অন্যদিকে জনপরিসরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রতি অনাগ্রহ। বিপ্লবী রাজনীতির কৌশল, কর্মপন্থার বদলে তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে চলে আসে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, ভাষা ও সংস্কৃতি। এই দার্শনিক গোষ্ঠী এসে আধুনিকতাবাদের যাবতীয় মেটান্যারেটিভ বা মহাবয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। মার্ক্সবাদকেও তারা দেখেন এক মহাবয়ান হিসেবে। ফলে স্বভাবতই মার্ক্সবাদের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তাদের ব্যবচ্ছেদের লক্ষ্য হয়ে উঠে। ১৯৮৫ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করে ফরাসি এই নতুন দার্শনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠীদের নিয়ে। সিআইএর মূল্যায়নে এই নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বাঁকবদল একদিকে যেমন ফ্রান্সে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত প্রভাব খর্ব করতে সাহায্য করবে একই সাথে মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিবন্ধকতা হিসেবেও কাজ করবে। ২০১১ সালে সিআইএ এই প্রতিবেদনটির একটি সেন্সরড ভার্শন প্রকাশ করে তথ্য অধিকার আইনের আওতায়। মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন। ২০১৭ সালে ওপেন কালচার নামক একটি অনলাইন পোর্টাল সিআইএর এই প্রতিবেদনটির উপর একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করে। বর্তমান নিবন্ধটি সেই পর্যালোচনারই অনুবাদ। – সম্পাদক]


    ছবি: সিআইএর প্রতিবেদনের একটি পাতা

    দর্শনের মতো একটি শাস্ত্রের সরকারি নীতি–নির্ধারণ তথা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে তেমন কোন প্রভাব থাকতে পারে, তা আমরা সাধারণত মনে করি না৷ কেননা, সরকারের কার্যক্রমকে সদা প্রভাবিত করা নির্ধারকগুলোর (মধ্যবিত্তের টিকে থাকার উদ্বিগ্নতা বা উচ্চবিত্তের স্টক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা কিংবা দারিদ্র‍্যের সদা উপস্থিতি) অবস্থান দর্শনের আলোচ্য বিষয় থেকে অনেক দূরে। তবে আমাদের এই অনুমান সবসময় সত্য নাও হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে যখন চিন্তাশীল ও পড়ুয়া ব্যক্তিরা রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী কিংবা সিনেটর হয়েছেন, তখন ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, লিও স্ট্রস, জার্গেন হাবারমাস কিংবা জন রলসের (যিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন) মতো দার্শনিকদের ধ্যানধারণা রাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে খুব কম দার্শনিকই জার্মান চিন্তক কার্ল স্মিটের মতো প্রভাবশালী ছিলেন; যদিও তার প্রভাবের স্বরূপ ছিল সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক৷ এছাড়া রয়েছে জন লক, জাঁ জ্যাক রুশো, থমাস হবস, অ্যারিস্টল এবং সক্রেটিস, যারা রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বহুমুখী প্রভাব রাখা দার্শনিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

    তবে যখন আমরা উত্তর–আধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের (যার কেন্দ্রে ছিলেন মিশেল ফুকো, রোলা বার্থ, জাক লাকাঁ, দেরিদাসহ আরও অনেকে) দিকে তাকাই, তখন রাষ্ট্রনীতিতে তাদের তেমন সরাসরি প্রভাব দেখা যায় না। অধিকাংশ সময়ই এইসব লেখকরা গুরুত্বহীন ও প্রভাবশূন্য বলে বিবেচিত হয়। দায়ী করা হয় তাদের ভাষাকে, যা বামঘেষা একটি অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। এই বক্তব্য সম্ভবত কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেখানে ক্ষমতাকে প্রায়শই তত্ত্বায়িত করা হলেও খুব কম সময়ই মূলধারার প্রকাশনায় ক্রিটিক করা হয়৷ তবে এই আলাপ ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সত্য নয়। অন্তত সিআইএ তা–ই মনে করে। কমিউনিজম ও অ্যান্টি–আমেরিকানিজমের বিরুদ্ধে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ফরাসি দর্শনের প্রভাবকে এই সংগঠনটি খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের এই দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধান নথিবদ্ধ করতে ১৯৮৫ সালে তারা একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করে৷

    সম্প্রতি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নথির একটি পরিশোধিত অনুলিপি “ফ্রান্স: ডিফেকশন অব লেফটিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল” নামে প্রকাশিত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে, এই নথি উত্তর–কাঠামোবাদী চিন্তকদের রাজনৈতিক অভিমুখকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। ইয়ানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রফেসর ও র‍্যাডিকেল হিস্ট্রি ও দি পলিটিক্স অব আর্ট–এর লেখক গ্যাব্রিয়েল রকহিল ফরাসি উত্তর–কাঠামোবাদ সম্পর্কিত সিআইএর মূল্যায়নকে এল এ রিভিউ অব বুকের জন্য সামারাইজ করেছেন এভাবে:

    “…গুপ্ত সাংস্কৃতিক যোদ্ধারা (সিআইএ) মূলত প্রশংসা করেছে দুটি পরিবর্তনকে৷ এক, উত্তর–কাঠামোবাদী বাঁকবদলের মাধ্যমে ফরাসি বুদ্ধিজীবী মহলের সমালোচনার মূখ্য লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে চলে যায়। বৃহত্তর বামপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতায় ধীরে ধীরে স্ট্যালিনবাদ ও মার্ক্সবাদ নিয়ে অনাগ্রহ দেখা যায়; র‍্যাডিক্যাল বুদ্ধিজীবীরা জনপরিসরের বিতর্ক থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসে; এবং তাত্ত্বিক অবস্থানের জায়গা থেকে সমাজতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক দল থেকে দূরে সরে আসতে থাকে। অপরদিকে ডানপন্থীদের মধ্যে মতাদর্শগত সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত “নিউ ফিলসফারস” ও “নিউ রাইট” বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমে মার্ক্সবাদ বিরোধী একটি হাইপ্রোফাইল স্মিয়ার ক্যাম্পেইন শুরু করে।“

    সিআইএ এজেন্টরা তাদের প্রতিবেদনে লিখেছেন, “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত বিরোধিতার এই উদ্দীপনা ফ্রান্সে কারও পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মার্কিন নীতির কোনো বিরোধিতা গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলবে।” ফরাসি সংস্কৃতি ও সরকারের ওপর “নিউ লেফট বুদ্ধিজীবীদের” প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তারা ধারণা করেছিল, “প্রেসিডেন্ট [ফ্রাঁসোয়া] মিতেরঁ সাম্প্রতিক সময়ে মস্কোর প্রতি যে তাৎপর্যপূর্ণ শীতলতা দেখিয়েছেন, তার পেছনে কিছুটা হলেও এই সর্বব্যাপী বৌদ্ধিক মনোভাব ভূমিকা রেখেছে।“

    ছবি: লিওতার, ফুকো ও দেরিদা

    রকহিল লিখেছেন, এই গবেষণায় ফ্রান্সের নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের প্রভাব সম্পর্কিত (সিআইএর অভিমত অনুযায়ী) যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আগের প্রজন্মের “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর সময়ের বামঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদের” থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন“। ওই প্রজন্মের বুদ্ধিজীবীরা “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতো” এবং আমেরিকান গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিল। জঁ–পল সার্ত্রে এমনকি “প্যারিসে সিআইএ স্টেশন অফিসার এবং ডজনখানেক আন্ডারকভার এজেন্টের পরিচয় ফাঁস” করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলে এবং এই কারণে তিনি সিআইএ এর “নিবিড় নজরদারি“-তে ছিলেন। সার্ত্রে সিআইএর কাছে একটি গুরুতর সমস্যারূপে বিবেচিত ছিলেন। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে একই সংস্থা বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করেছিল, “এখন আর কোনো সার্ত্রে নেই, নেই কোন গিদে।” তারা লিখেছিল, “কমিউনিস্ট পণ্ডিতদের সর্বশেষ গোষ্ঠী নিজেদের শিষ্যদের তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিল, কিন্তু তখন কারোরই আর মার্ক্সবাদের পক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতা ছিল না।” এ কারণে স্নায়ু যুদ্ধের শেষ পর্বে “সব রাজনৈতিক ধারার বুদ্ধিজীবীদের মাঝেই মতাদর্শ থেকে সরে আসার একটি বড় প্রবণতা” লক্ষ করা যায়।

    “স্ট্যালিনবাদী কাল্ট”–এর একেবারেই অসমর্থনযোগ্য একনায়কতান্ত্রিক দমন–পীড়ন এবং ওয়াশিংটন কনসেনসাস ও তার দ্বারা সৃষ্ট বহুজাতিক কর্পোরেটবাদের অবশ্যম্ভাবী হিসেবে হাজির হওয়ার বাস্তবতা এক ধরনের ক্লান্তিতেই যেন আচ্ছাদিত করেছিল চারদিক। কমিউনিজমের পতনের সময়ে মার্কিন দার্শনিকরা প্রলয় তথা কিয়ামতের ভাষা ব্যবহার করছিল—এন্ড অব হিস্ট্রি। একইসাথে, তারা উদযাপন করছিলেন ওই যুগান্তকারী ঘটনাকে যাকে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা আখ্যায়িত করেছিল সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে “উদার গণতন্ত্রের” জয় হিসেবে। ফুকুয়ামার বই দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান শিরোনামের মাধ্যমেই এই বিস্ময়কর তত্ত্বকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। অর্থ্যাৎ, আর কোনো বিপ্লব হবে না। হার্ভার্ডের চিন্তক স্যামুয়েল হান্টিংটন এই সময়কে তাই “সমাপ্তির যুগ” বলে ঘোষণা করেছিলেন ঠিক যেই সময়ে “শিল্পের সমাপ্তি,” “প্রকৃতির সমাপ্তি,” ইত্যাদি নানা অতিরঞ্জিত তর্কের বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। আর সিআইএ–র মতে, বার্লিন প্রাচীর পতনের ঠিক আগের কয়েক বছরে ফ্রান্সের অতীতে শক্তিশালী দার্শনিক বামপন্থীরা “এক ধরণের ঔদাসীন্যে আক্রান্ত” হয়েছিল৷

    এই প্রতিবেদনে সিআইএ উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের জনমতকে সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া এবং “মার্ক্সবাদ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি জনসাধারণের মনোভাবকে কঠোরতর করে তোলার” জন্য কৃতিত্ব দেয়ার পাশাপাশি আরও লিখেছিল যে “উত্তর–কাঠামোবাদী দার্শনিকদের প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং তারা শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বড় কোন প্রভাব রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।” তাদের এই বক্তব্য কি সঠিক ছিল? যদি আমরা বহু–কথিত “পরিচয়বাদী রাজনীতি”–র সমালোচকদের গুরুত্ব দিয়ে দেখি, তবে এই প্রশ্নের উত্তর হবে: একেবারেই না। আবার, যারা উত্তর–আধুনিক দর্শন এবং সাম্প্রতিক কালের কয়েকটি প্রভাবশালী বামপন্থী চিন্তাধারা ও আন্দোলনকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তারা যুক্তি দিতে পারেন যে, সিআইএ তাদের সিদ্ধান্তে অদূরদর্শী ছিল। হয়তো স্নায়ু যুদ্ধের কয়েক দশকের কূটকৌশলে গড়ে ওঠা দ্বৈততাবাদী (Manichean) দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ থাকায় তারা এমন এক রাজনীতির কথা কল্পনা–ই করতে পারেননি, যা একইসঙ্গে আমেরিকান ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে পারে।

    শিল্পী: রিচার্ড প্রিন্স

    তবুও মতাদর্শ থেকে সরে আসার অর্থ মোটেও রাজনীতি থেকে সরে আসা নয়। বলা যেতে পারে, গোয়েন্দাদের মাঝে এই অদ্ভুত গবেষণা প্রবন্ধটি প্রচারিত হওয়ার তিরিশ বছর পর ফুকোর “বায়োপাওয়ার” কিংবা দেরিদার পরিচয় (আইডেন্টিটি)-কে প্রবলেম্যাটাইজ করা ধারণাগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর (যদিও আমরা সবসময় তাদের কাজ পড়ি না বা পুরোপুরি বুঝি না)। তবে সংস্থাটি উত্তরাধুনিক চিন্তার সর্বব্যাপী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে না পারলেও তারা এই দার্শনিক ঐতিহ্যকে কখনোই অস্পষ্ট কিংবা তুচ্ছ জটিল বাক্যবিন্যাস হিসেবে বাতিল করে দেয়নি। রকহিল লিখেছেন, “যদি কেউ ধরে নেয় যে, বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতাহীন কিংবা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কোনো গুরুত্ব বহন করে না, তবে মনে রাখবেন, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ক্রীড়ানক আপনার ধারণার সঙ্গে একমত নয়। এই সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতার একটি স্মারক হয়ে থাকবে।“

  • বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    বেনিতো মুসোলিনি ।। ফ্যাসিবাদের স্বকল্প

    • অনুবাদ: আরিফ রেজা মাহমুদ

    [রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়, এবং জার্মানিসহ অন্যান্য দেশেও এর প্রসার ঘটে। ইতালির স্বঘোষিত ফ্যাসিস্ট নেতা, বেনিতো মুসোলিনির শাসনামলে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করা হয়। তখনকার সাথে বর্তমান দুনিয়ায় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর একটি বড় তফাৎ হচ্ছে,  এখন আর কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিই নিজেকে ফ্যাসিবাদী বলে ঘোষণা করে না। বরং ফ্যাসিবাদ কথাটিকে বিরোধী শক্তিগুলোই ব্যবহার করে থাকে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসনকে বোঝানোর জন্য। আবার কেবল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসন হলেই তা ফ্যাসিবাদ নয়। গেল শতাব্দীর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, ফ্যাসিবাদকে ‘ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া একনায়কত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এথেকে ফ্যাসিবাদের চিন্তা-মতবাদের আকর ও পাটাতন বোঝা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশেও  ফ্যাসিবাদ কী সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট তাত্ত্বিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা সামান্যই হয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ চিহ্নিত করাও সবসময়ই সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সে উদ্দেশ্য নিয়েই অরাজ ফ্যাসিবাদের বোঝাপড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিলসমূহ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে মুসোলিনির ১৯৩২ সালে প্রকাশিত Doctrine Of Fascism রচনাটির অনুবাদ প্রকাশ করছে অরাজ। ইতালীয় ভাষায় এই রচনার শিরোনাম La dottrina del fascismo। কথিত আছে, পুরো রচনাটি মুসোলিনির নামে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম অংশটুকু Fundamental Ideas ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিল্লের লেখা। আর Political and social doctrine অংশটুকু মুসোলেনির, যা লিখিত হয় ১৯২৭ সালে। Doctrine Of Fascism রচনাটির ফ্যাসিবাদী সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রণীত ইংরেজি সংস্করণের অনুবাদক ব্রিটিশ লেখক জেন সোয়ামস। বর্তমান বাংলা অনুবাদে  ফ্যাসিবাদী প্রকাশনার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Ardita Publishers কর্তৃক  Fascism: Doctrine and Institutions সংকলনে প্রকাশিত সংস্করণকে (১৯৩৫) অনুসরণ করা হয়েছে। অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন আরিফ রেজা মাহমুদ। — সম্পাদক]

    বেনিতো মুসলেনি

    সকল সুস্থিত রাজনৈতিক ধারণার ন্যায়, ফ্যাসিবাদও কর্ম ও চিন্তার সমন্বিত রূপ, যার মধ্যে নিহিত আছে এমন এক মতবাদ, যা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শক্তিসমূহের অন্তর্গত বলয়ে উদ্ভূত এবং আভ্যন্তরীণভাবে কার্যকরী। সুতরাং, ফ্যাসিবাদের একটি রূপগত বিন্যাস রয়েছে যা কালিক ও স্থানিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ; তবে এর পাশাপাশি একটি আদর্শবাদী অন্তর্বস্তুও বর্তমান, যা একে চিন্তার ইতিহাসের উচ্চতর স্তরে সত্যরূপে ব্যক্ত করে।

    বিশ্বে আত্মিক প্রভাব বা প্রভুত্ব বিস্তার, অর্থাৎ একের ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বারা অপরের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন কর্মক্ষেত্রের স্বল্পস্থায়ী ও বিশেষ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়, এবং সেই স্বল্পস্থায়ী বাস্তবতার অন্তরে নিহিত চিরন্তন ও সার্বজনীন বাস্তবতার উপলব্ধি থাকে। মানুষকে জানার জন্য ‘মানবসত্তা‘কে জানতে হয় এবং মানবসত্তাকে জানার জন্য অপরিহার্য হলো বাস্তবতা ও তার বিধিবিধান সম্পর্কে গভীর বোধ।

    রাষ্ট্র বিষয়ক কোনো ধারণাই প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না, যদি তা মৌলিকভাবে জীবন–দর্শনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিফলিত না হয়। সেটা হতে পারে দার্শনিক প্রক্রিয়াজাত ধারণা কিংবা প্রত্যক্ষ অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে বিবর্তিত একটি ভাবতাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা বিশ্বাসভিত্তিক একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন্দ্রীভূত অভিজ্ঞান; কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই, অন্তত সম্ভাব্যভাবে, তা বিশ্বের প্রতি একটি সংহত জৈবিক ধারণার প্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদের বহু ব্যবহারিক রূপ—যেমন দলীয় সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও শৃঙ্খলার ধারণা—কে সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব কেবল তখনই, যখন সেগুলোকে জীবনের প্রতি এর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি আধ্যাত্মিক মনোভাব। ফ্যাসিবাদ পৃথিবীকে কেবল এমন কোন উপরিতলীয় ও বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না, যেখানে মানুষ একটি স্বতন্ত্র, স্ব–কেন্দ্রিক, প্রকৃতির বিধি–নির্ধারিত সত্তা হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং যা জীবনকে পরিচালিত করে ক্ষণস্থায়ী আত্মকেন্দ্রিক সুখের প্রবৃত্তি দ্বারা। ফ্যাসিবাদ কেবল ব্যক্তি নয়, বরং জাতি ও রাষ্ট্রকে দেখে; এমন এক বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে, যেখানে ব্যক্তি ও প্রজন্মসমূহ এক নৈতিক বিধানের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ; যাদের মধ্যে রয়েছে একটি অভিন্ন ঐতিহ্য এবং একটি নির্ধারিত ঐতিহাসিক মিশন।

    এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে এমন এক উচ্চতর জীবন নির্মাণ, যা বদ্ধ আত্ম–কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং কর্তব্যনিষ্ঠার ভিত্তিতে গঠন করে এমন এক জীবন যা কাল ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। এই জীবনেই ব্যক্তি আত্মত্যাগ, স্বার্থপরতা থেকে সরে আসা, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে এক নিখাদ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়, যেখানে তার ‘মানবিক‘ মূল্য নিহিত থাকে।

    অতএব, এই ধারণাটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রকাশ, যা উনবিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদী দৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে বিশ শতকের সাধারণ বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত। দৃষ্টিবাদবিরোধী হলেও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন; এটি সংশয়বাদী নয়, নাস্তিক্যবাদীও নয়; আবার তা নি:সঙ্গ নৈরাশ্যবাদী কিংবা নির্বিকার আশাবাদীও নয়—যেমনটি সাধারণত দেখা যায় সেই সকল মতবাদে, যেগুলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দুকে মানুষের বাইরে কোথাও স্থাপন করে, ফলে তার চরিত্র হয়ে পড়ে মূলত নেতিবাচক।

    ফ্যাসিবাদ বরং বিশ্বাস করে যে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ নিজেই তার বিশ্ব গঠনের সক্ষমতা ও কর্তব্য ধারণ করে। অর্থাৎ, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও নৈতিক সত্তার মধ্যেই নিহিত, বাইরের কোনো বহিরাঙ্গ বাস্তবতায় নয়।

    ফ্যাসিবাদ চায় মানুষ হোক সক্রিয় এবং সে যেন তার সমস্ত শক্তি ও সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়। এটি প্রত্যাশা করে, মানুষ যেন সাহসিকতার সঙ্গে তার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে উপলব্ধি করে এবং সেগুলোর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকে। ফ্যাসিবাদ জীবনকে একটি সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে—এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একজন মানুষের উচিত নিজেকে প্রকৃত অর্থে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের যোগ্য করে তোলা। আর তা সম্ভব প্রথমত তখনই, যখন সে নিজেকে শারীরিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়, যেন সে হয়ে উঠতে পারে সেই ‘উপকরণ‘—যার মাধ্যমে সে উক্ত মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

    যে নীতি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা–ই জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বিস্তৃত অর্থে সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেও। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ফ্যাসিবাদ সকল প্রকার সংস্কৃতিকে (শিল্প, ধর্ম, বিজ্ঞান) উচ্চরূপে মূল্যায়ন করে, এবং শিক্ষার ব্যতিক্রমী গুরুত্বকে স্বীকার করে।

    এই দর্শন অনুসারে, শ্রমেরও মৌলিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতিকে আয়ত্ত করে এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রায় মানবিক জগৎ গড়ে তোলে।

    এই ইতিবাচক জীবনচিন্তা মূলত একটি নৈতিক ধারণা। এটি বাস্তবতার সামগ্রিক ক্ষেত্রকেই পরিব্যাপ্ত করে, ঠিক যেমনটি করে সেই সকল মানবিক কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তবতাকে আয়ত্তে আনে। কোনো কার্যই নৈতিক বিচারের আওতার বাইরে নয়; কোনো কর্মপ্রচেষ্টাই এমন নয়, যাতে নৈতিক উদ্দেশ্য একটি অন্তর্নিহিত মূল্য সংযোজনে ব্যর্থ।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ–অনুসারী যে জীবনচিত্র আঁকে, তা গম্ভীর, সংযমপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিকতায় পরিপুষ্ট; জীবনের সকল প্রকাশ ও কর্মকাণ্ড এমন এক বিশ্ববোধের মধ্যে অবস্থিত, যা নৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ববোধের দ্বারা পরিচালিত।

    ফ্যাসিবাদ সেই জীবনধারার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যা কেবলমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ–বিলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ফ্যাসিবাদী জীবনচিন্তা একটি ধর্মীয় দর্শন, যেখানে মানুষকে দেখা হয় এমন এক উচ্চতর বিধানের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে, যা ব্যক্তিসীমার অতীত—একটি বস্তুগত ইচ্ছাশক্তিতে পরিপুষ্ট, যা ব্যক্তি–অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এবং তাকে একটি আধ্যাত্মিক সমাজের সচেতন সদস্যরূপে উন্নীত করে।

    যাঁরা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধর্মনীতিতে কেবল তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী কৌশল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পান না, তাঁরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে—ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং সর্বাগ্রে এটি একটি চিন্তাব্যবস্থা, একটি দার্শনিক বিন্যাস।

    ফ্যাসিবাদী ইতিহাসবোধে মানুষ কেবলমাত্র তখনই মানুষ, যখন সে একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে—একজন পরিবার সদস্য, সামাজিক গোষ্ঠী, জাতি, ও সমগ্র ইতিহাস–প্রবাহের একটি কার্যকর অংশগ্রহণকারী হিসেবে, যেখানে প্রতিটি জাতি নিজস্ব অবদান রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ভাষা, রীতি, সমাজজীবনের বিধিবিধান এবং ঐতিহাসিক দলিলপত্রে নিহিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের বাইরে মানুষ নিছক এক অস্তিত্বহীনতা।

    শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু

    এই কারণে, ফ্যাসিবাদ সমস্ত ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী বিমূর্ততা, যা উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিবাদনির্ভর বস্তুবাদ থেকে উদ্ভূত, তার বিরোধিতা করে। একইভাবে, এটি প্রত্যাখ্যান করে ফরাসি বিপ্লব–পরবর্তী জ্যাকোবিন ঘরানার কল্পনাপ্রসূত ইউটোপিয়া ও ছকবদ্ধ সমাজ–নবীকরণ প্রচেষ্টাকে। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে না ১৮শ শতাব্দীর অর্থনৈতিক সাহিত্যের সেইসব ভাবনাকে, যেখানে মানুষের ‘পৃথিবীতেই সুখলাভ’–এর সম্ভাবনাকে চিত্রিত করা হয়েছিল। একইসঙ্গে, এটি প্রত্যাখ্যান করে সেই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকেও, যেখানে ধারণা করা হয় যে, ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে মানবজাতি তার যাবতীয় সমস্যা ও সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছে যাবে।

    এই ভাবনা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয়—জীবন একটি অব্যাহত পরিবর্তন ও বিবর্তনের প্রক্রিয়া।

    রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ বাস্তববাদে বিশ্বাসী; তার নীতিগত অবস্থান হলো এই যে, কেবল সেই সমস্যাগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেগুলো ইতিহাস–প্রসূত বাস্তবতার স্বাভাবিক ফসল এবং যেগুলোর সমাধান সেই বাস্তবতার অভ্যন্তরেই নিহিত থাকে কিংবা নিজেই তার সমাধানের ইঙ্গিত প্রদান করে।

    মানুষ কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষ ও প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যখন সে নিজেকে এই বাস্তবতার প্রবাহে সম্পৃক্ত করে এবং এর অন্তর্নিহিত কার্যক্ষম শক্তিগুলোকে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়।

    ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিরোধিতা করে, ফ্যাসিবাদী জীবনদর্শন রাষ্ট্রের গুরুত্বকে সর্বোচ্চ মাত্রায় তুলে ধরে এবং ব্যক্তিকে কেবল তখনই স্বীকৃতি দেয়, যখন তার স্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে একীভূত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ রাষ্ট্রই হলো ইতিহাসবদ্ধ মানবসত্তার নৈতিক চেতনা ও সর্বজনীন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ।

    ফ্যাসিবাদ সেই ধ্রুপদী উদারতান্ত্রিকতার বিরোধিতা করে, যা এক সময় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং যার ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখনই, যখন রাষ্ট্র জনগণের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলনরূপে প্রতিষ্ঠা পায়।

    উদারতন্ত্র ব্যক্তি–অধিকারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে অস্বীকৃতি জানায়; পক্ষান্তরে, ফ্যাসিবাদ সেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আদর্শকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

    রাষ্ট্রের অধিকারকে ফ্যাসিবাদ এমন এক স্বরূপে বিবেচনা করে, যা ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত সারবস্তুকে প্রকাশ করে। আর যদি স্বাধীনতা বাস্তব জীবনে মানুষের একটি গুণ হয়ে থাকে— যা কেবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উদারতন্ত্র কর্তৃক কল্পিত বিমূর্ত মানবপ্রতিমাদের জন্য সংরক্ষিত নয় —তবে ফ্যাসিবাদ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়; এবং এমন একমাত্র স্বাধীনতার পক্ষেই যা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান: তা হলো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তির স্বাধীনতা।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রধারণা একটি সর্বাঙ্গীন দৃষ্টিভঙ্গি, যার বাইরে কোনো মানবিক কিংবা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব থাকতে পারে না, থাকলেও তা অর্থহীন। এই অর্থে, ফ্যাসিবাদ একটি সর্বাত্মকতাবাদী মতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি একীভূত ও সর্বসমন্বিত সংগঠন—যা সমস্ত মূল্যবোধকে ধারণ করে, ব্যাখ্যা করে, বিকশিত করে এবং জনগণের সামগ্রিক জীবনকে শক্তি ও দিশা প্রদান করে।

    রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর (রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, সমাজবর্গ) অস্তিত্ব নেই। ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে, কারণ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ধারণা অজ্ঞাত এবং যা ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেখে।

    রাষ্ট্রীয় ঐক্য মানে যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি একক অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতায় মিলিত হয়। একইভাবে, ফ্যাসিবাদ ট্রেড ইউনিয়নবাদকেও শ্রেণি–অস্ত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

    তবে যখন এই সংগঠনসমূহ রাষ্ট্রীয় পরিসরের আওতায় আসে, তখন ফ্যাসিবাদ স্বীকার করে যে সমাজতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নবাদের উত্থানের পেছনে বাস্তব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনগুলোর যথোচিত মূল্যায়ন করা হয় রাষ্ট্রের কর্পোরেত–কাঠামোর মধ্য দিয়ে, যেখানে বিভিন্ন স্বার্থসমূহকে সমন্বিত ও সঙ্গতিপূর্ণ করা হয় রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তিতে।

    নানাবিধ স্বার্থ অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যক্তি শ্রেণি গঠন করে; তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুযায়ী সংগঠিত হলে ট্রেড–ইউনিয়ন তৈরি করে; কিন্তু সর্বাগ্রে তারা রাষ্ট্র গঠন করে—রাষ্ট্র কোনো সংখ্যাগত বাস্তবতার সমষ্টি নয়, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তির যোগফল নয়। এই কারণে ফ্যাসিবাদ সেই ধরনের গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে, যা একটি জাতিকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সমতুল করে দেখে এবং একে বৃহত্তম সংখ্যার অধীনস্ত করে তোলে।

    বরং, যদি জাতিকে বিবেচনা করা হয় তার গুণগত দিক থেকে—পরিমাণগত নয়—তাহলে ফ্যাসিবাদই হয় ‘শুদ্ধতম গণতন্ত্র’; একটি ভাবধারা হিসেবে জাতি সবচেয়ে নৈতিক, সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সর্বাধিক সত্যরূপে পরিগণিত হয়, যা ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়—কখনো স্বল্পসংখ্যক, কখনো এমনকি এককের বিবেক ও ইচ্ছারূপে—এবং শেষে তা রূপ নেয় জনসাধারণের, একটি জাতির সমগ্র ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গঠনে গঠিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বিবেক ও ইচ্ছারূপে; যারা একক আত্মসচেতনতা ও অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মিক বিকাশ ও গঠনের পথে এগিয়ে চলে।

    জাতি এখানে কোনো বর্ণগোষ্ঠী নয়, নয় কোনো ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা নির্ধারিত অঞ্চল; বরং এটি হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখে—একটি ভাবনাতাড়িত ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণ, যাদের মাঝে জীবনের ইচ্ছা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মসচেতনতা ও ব্যক্তিত্বের উদ্ভব ঘটে।

    যতদূর পর্যন্ত এই উচ্চতর ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্ররূপে রূপায়িত হয়, ততদূর পর্যন্তই তা একটি জাতিতে পরিণত হয়। জাতিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে—এই ধারণা একটি পুরাতন, প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা উনবিংশ শতকে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচারণার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বরং, ফ্যাসিবাদী মতানুসারে, রাষ্ট্রই জাতিকে সৃষ্টি করে; রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে নৈতিক ঐক্য সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তোলে, তাদের ইচ্ছাশক্তি দান করে, এবং সেইসঙ্গে প্রকৃত জীবনের সূচনা ঘটায়।

    জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার কেবলমাত্র কোনো সাহিত্যিক কিংবা ভাববাদী আত্মসচেতনতা থেকে উদ্ভূত হয় না; বরং এর উৎস কোনো নিস্পৃহ ও অচেতন বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেও নিহিত নয়। বরং, এই অধিকার গড়ে ওঠে একটি সক্রিয়, আত্মসচেতন, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থেকে—যা কার্যকর কর্মকাণ্ডে নিজেকে প্রকাশ করে এবং সেই অধিকারকে প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। সংক্ষেপে, এই অধিকার উদ্ভব হয় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থেকে, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে হলেও। বস্তুত, রাষ্ট্রই হচ্ছে সেই সর্বজনীন নৈতিক ইচ্ছার অভিব্যক্তি, যা জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার সৃষ্টি করে।

    রাষ্ট্রে উদ্ভাসিত একটি জাতি কেবলমাত্র ততক্ষণই জীবন্ত ও নৈতিক সত্তা, যতক্ষণ পর্যন্ত তা প্রগতিশীল থাকে।

    নিষ্ক্রিয়তা মানেই মৃত্যু। অতএব, রাষ্ট্র কেবল কর্তৃত্ব নয়—যা শুধু শাসন করে আর ব্যক্তির ইচ্ছাসমূহের উপর আইনি রূপ ও আত্মিক মূল্য আরোপন করে, বরং রাষ্ট্র এক ধরনের ক্ষমতা যা সীমাহীনভাবে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিকে অনুভব করায় এবং মান্য করতে শেখায়। এইভাবে রাষ্ট্র তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য সিদ্ধান্তগুলোর সার্বজনীনতা কার্যত প্রমাণ করে। এই প্রক্রিয়া স্বয়ং সংগঠন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে—তা সম্ভাব্য হোক বা বাস্তব। এইভাবেই রাষ্ট্র মানব–ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিজেকে সমতুল্য করে তোলে, যার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা যায় না এবং যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তার অসীমতাকে প্রমাণ করে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল ব্যক্তিত্বের এক উচ্চতর ও অধিক শক্তিশালী প্রকাশ, তবে তা কেবল বাহ্যিক শক্তি নয়—বরং একটি আত্মিক শক্তি। এটি মানবের নৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের সকল রূপ ও প্রকাশের সমাহার।

    এই কারণে, রাষ্ট্রের কার্যপরিধিকে কেবল আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না—যেমনটি উদারনৈতিক মতবাদে প্রত্যাশিত। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, যা কেবল নাগরিকের তথাকথিত অধিকার চর্চার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

    বরং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি অন্তর্নিহিতভাবে গৃহীত নৈতিক মানদণ্ড ও আচরণবিধি—একটি শৃঙ্খলা, যা ব্যক্তিমানুষের সমগ্র সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে; এটি যেমন ইচ্ছাশক্তিকে প্রভাবিত করে, তেমনই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকেও অনুপ্রাণিত করে।

    এটি একধরনের কেন্দ্রীয় নৈতিক নীতি, যা সভ্য সমাজের নাগরিক হিসেবে মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয়; এটি তার আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে। এই নীতি কর্মনিষ্ঠ মানুষ ও চিন্তক, শিল্পী ও বিজ্ঞানী—সকলের হৃদয়জুড়ে বাস করে; এটি আত্মারও আত্মা।

    সংক্ষেপে, ফ্যাসিবাদ কেবল আইনপ্রণেতা বা প্রতিষ্ঠান–প্রতিষ্ঠাতা নয়, বরং তা একাধারে একজন শিক্ষাগুরু এবং আত্মিক জীবনের উন্নয়নকারী। এর লক্ষ্য কেবল জীবনযাপনের বাহ্যিক রূপকে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুকেও পুনর্গঠন করা—অর্থাৎ মানুষ, তার চারিত্রিক গঠন এবং তার বিশ্বাসকে পুনরায় নির্মাণ করা।

    এই লক্ষ্য পূরণের জন্য, ফ্যাসিবাদ শৃঙ্খলা আরোপ করে এবং কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে অবিসংবাদিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

    এই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ, ফ্যাসিবাদ “লিক্টর’স রডস”–কে তার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে—যা ঐক্য, শক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক।

    রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ

    ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে—যা আজ অনেক দূরবর্তী অতীত— মিলানে আমি Popolo d’Italia পত্রিকার পাতায় সেই বিপ্লবী হস্তক্ষেপবাদীদের যখন আহ্বান জানিয়েছিলাম— যারা ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদের কার্যক্রমের সূচনালগ্ন থেকেই আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছেন— তখন আমার মনে কোনো সুস্পষ্ট মতবাদগত কর্মসূচি ছিল না।

    আমি একমাত্র যে মতবাদকে ব্যবহারিক অর্থে চিনতাম, তা ছিল সমাজতন্ত্র—যার সঙ্গে আমি ১৯১৪ সালের শীতকাল পর্যন্ত, প্রায় এক দশকব্যাপী, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা ছিল একজন অনুসারী এবং পরবর্তীকালে একজন নেতা হিসেবে, কিন্তু তা মতবাদগত নয়—বরং ছিল কর্মনির্ভর অভিজ্ঞতা। সেই সময়ে আমার মতবাদ ছিল কর্মতৎপরতার মতবাদ।

    ১৯০৫ সালের পর থেকে সমাজতন্ত্রের কোনো একক, সর্বজনগ্রাহ্য মতবাদ বিদ্যমান ছিল না। যখন বার্নস্টাইনের নেতৃত্বে জার্মানিতে সংশোধনবাদী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত হয় এক বামপন্থী বিপ্লবী প্রবণতা, যা ইতালিতে কেবল প্রবচনের পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, অথচ রাশিয়ান সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে উঠেছিল বলশেভিকবাদের পূর্বভূমিকা।

    সংস্কারবাদ, বিপ্লববাদ, মধ্যপন্থা—এই পরিভাষাগুলোর প্রতিধ্বনিও আজ মৃতপ্রায়। অথচ ফ্যাসিবাদের বিশাল প্রবাহে এমন কিছু স্রোত খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলোর উৎস ছিল সোরেল, পেগি, লাগারদেলের মত গণসংগ্রামপন্থী সমাজবাদীদের চিন্তায়, এবং ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক পরিবেশে নতুন স্বরের প্রবর্তক ইতালীয় সিন্ডিক্যালিস্টদের কর্মধারায়।

    এই নতুন স্বরটি সেই সময়ের ইতালীয় সমাজতন্ত্রকে দুর্বল ও অচেতন করে দেওয়া জিওলিত্তির দলের সঙ্গে অশুভ মেলবন্ধনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছিল। এই স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় অলিভেত্তির

    Pagini Libere, ওরানোর Lupa, এবং এনরিকো লেওনের Divenirs Socials– এ।

    ১৯১৯ সালে যুদ্ধ–সমাপ্তির পর মতবাদ হিসেবে সমাজতন্ত্র মৃত হয়ে পড়ে। টিকে ছিল কেবল একটি প্রতিহিংসার অনুভূতি হিসেবে—বিশেষত ইতালিতে, যেখানে সমাজতন্ত্রের একমাত্র কৌশল ছিল যুদ্ধ–চাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগানো এবং তাদের সেই যুদ্ধের দায়ভার বহনের জন্য বাধ্য করা।

    The Popolo d’Italia পত্রিকাটি তার উপশিরোনামে নিজেকে ঘোষণা করেছিল “যোদ্ধা ও উৎপাদকদের দৈনিক মুখপত্র” হিসেবে। এখানে “উৎপাদক” শব্দটি তখনকার এক বিশেষ মানসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। ফ্যাসিবাদ কোনো পূর্বনির্ধারিত মতবাদ থেকে গড়ে ওঠেনি, টেবিলে বসে রচিত তাত্ত্বিক পরিকল্পনার ফল নয়; তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত এক কর্মচাঞ্চল্য—নিজেই ছিল কর্ম ও আন্দোলন। প্রাথমিক দুই বছর এটি কোনো দল ছিল না, বরং ছিল “দলবিরোধী” ও একটি আন্দোলন। আমি যে নাম দিয়েছিলাম আমাদের সংগঠনকে, তা–ই এর স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

    তবে, কেউ যদি ইচ্ছা করে সেদিনকার সেই ভাঁজপড়া কাগজগুলো আবার পড়ে দেখে—যেখানে Italian Fasci di combattimento গঠনের বৈঠকের বিবরণ রয়েছে—তাহলে তিনি তাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ মতবাদ খুঁজে পাবেন না। বরং তিনি দেখবেন একগুচ্ছ নির্দেশনা, পূর্বাভাস, ইঙ্গিত, যেগুলো সময়ের সাথে সাথে, তাৎক্ষণিক বাস্তবতার আবরণ সরিয়ে, কয়েক বছরের মধ্যেই পরিণত হয়েছিল পরিপূর্ণ মতবাদে—এমন এক রাজনৈতিক মতবাদ যা ফ্যাসিবাদকে অতীত ও সমসাময়িক অন্যান্য সব মতবাদ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিল।

    যদি বুর্জোয়ারা—আমি তখন বলেছিলাম—ভাবেন যে তারা আমাদেরকে বজ্রনিরোধকের মতো ব্যবহার করতে পারবে, তবে তারা ভুল করছে। আমাদের জনগণের দিকে এগোতে হবে… আমরা চাই শ্রমিক শ্রেণি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে অভ্যস্ত হোক, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে যে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়… আমরা লড়ব প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে… এখন যেহেতু শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকারের পথ উন্মুক্ত, আমাদের সাহস হারালে চলবে না। আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে; যদি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করতে হয়, তবে সেই স্থান আমাদের নিতে হবে। উত্তরাধিকার লাভের অধিকার আমাদেরই, কারণ আমরাই জাতিকে যুদ্ধে প্রবেশ করতে বলেছিলাম এবং আমরাই তাকে বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম… প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না; আমরা চাই বিভিন্ন স্বার্থের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব… কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন যে এই কর্মসূচি গিল্ড ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ারই নামান্তর। তাতে কী! আমি চাই এই সমাবেশ জাতীয় সিন্ডিক্যালবাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অর্থনৈতিক দাবিসমূহকে গ্রহণ করুক…”

    এটা কি আশ্চর্যজনক নয় যে ঠিক প্রথম দিন থেকেই, Piazza San Sepolcro তে, “গিল্ড” শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল—একটি শব্দ যা, ফ্যাসিস্ট বিপ্লব বিকাশ লাভের সঙ্গে সঙ্গে, শাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক আইনগত ও সামাজিক সৃষ্টিকে প্রকাশ করতে শুরু করে?

    রোম অভিযানের পূর্ববর্তী কয়েক বছর এমন একটি সময়পর্বকে চিহ্নিত করে, যখন কর্মের প্রয়োজনে বিলম্ব ও সুচিন্তিত মতবাদ রচনার সুযোগ ছিল না। শহর ও গ্রামে চলছিল সংঘর্ষ। আলোচনা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এর থেকেও পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল—মৃত্যু। ফ্যাসিস্টরা জানতো কীভাবে মরতে হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ মতবাদ—যা অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত, টীকাসহ উপস্থাপিত—অনুপস্থিত ছিল বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে উপস্থিত ছিল আরও দৃঢ় কিছু—একটি বিশ্বাস।

    তবুও, যদি কেউ বইপত্র, প্রবন্ধ, কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাব, প্রধান ও গৌণ বক্তৃতার সাহায্যে সেই দিনগুলোর স্মৃতি পুনর্জীবিত করতে চায়, তবে সে দেখবে—যদি তার অনুসন্ধান ও নির্বাচনের যথাযথ দক্ষতা থাকে—যে যুদ্ধের মাঝখানেই মতবাদের ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছিল। বাস্তবেই, ওই সময়েই ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা অস্ত্রধারণ করেছিল, নিজেকে পরিশীলিত করেছিল, এবং সংগঠনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।

    ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সমস্যা, কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার সমস্যা কিম্বা রাজনৈতিক, সামাজিক, বিশেষত জাতীয় প্রশ্নগুলো তৎকালীন সময়ে আলোচিত হচ্ছিল। একইসঙ্গে, দণ্ডমূলক অভিয়ানের সময় উদারবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, মাসনিক মতবাদ এবং Partito Popolare এর সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। তথাপি, একটি প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদের অভাবকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কুপ্রবণ বিরোধীরা ফ্যাসিবাদকে মতবাদ গঠনে অক্ষম প্রমাণ করতে চেয়েছিল—ঠিক সেই সময়ে, যখন এই মতবাদই প্রবল উত্থানের সঙ্গে রচিত হচ্ছিল। শুরুতে, প্রতিটি নতুন মতবাদের মতোই, তা প্রকাশ পায় প্রচণ্ড নেতিবাচক ও মতবাদবিরোধী রূপে; পরে, গঠনমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক আকার গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ১৯২৬, ১৯২৭ এবং ১৯২৮ সালে ফ্যাসিস্ট শাসনের আইন ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সংযুক্ত হয়।

    ফ্যাসিবাদ এখন কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়, একটি মতবাদ হিসেবেও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। এর অর্থ হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ—নিজস্ব সমালোচনাশক্তিকে আত্মপর্যালোচনা ও অপরের বিশ্লেষণে প্রয়োগ করে—নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিশ্বের সকল জাতির জন্য দুশ্চিন্তার উৎস হয়ে ওঠা বস্তুগত ও বৌদ্ধিক স্বার্থ–সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ অধ্যয়ন করেছে এবং নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করেছে, এবং এখন এসব সমস্যার মোকাবিলায় নিজস্ব নীতির দ্বারা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

    প্রথমেই, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিকাশ–সংক্রান্ত বিষয়ে এবং বর্তমান সকল রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে ফ্যাসিবাদ মূলত অনন্ত শান্তির সম্ভাবনা বা কার্যকারিতায় বিশ্বাস করে না। সে কারণে ফ্যাসিবাদ আত্মোৎসর্গের বিপরীতে ভীরু ও আত্মসমর্পণমূলক নির্জীবতা ঢেকে রাখার মাধ্যম হিসেবে শান্তিবাদকে পরিত্যাগ করে। শুধু যুদ্ধই মানবিক শক্তিকে তার চূড়ান্ত উৎকটতায় পৌঁছে দিতে পারে এবং কেবল যুদ্ধই তাদের উপর মহত্ত্বের টীকা এঁকে দেয়, যারা সাহসের সঙ্গে এর মুখোমুখি হতে সক্ষম। অন্য সব পরীক্ষা অমূলক যা কখনোই একজন মানুষকে জীবন অথবা মৃত্যুর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে না। এই কারণে, যে সকল মতবাদ বলে ‘শান্তি যেকোনো মূল্যে’—তা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে অসঙ্গত।

    একইভাবে ফ্যাসিবাদের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—যদিও কখনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযোগী মনে হতে পারে—সেই সব আন্তর্জাতিকতাবাদী বা ‘লীগ–ভিত্তিক’ কাঠামো, যেগুলো ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের হৃদয় আবেগ, আদর্শবাদ বা বাস্তব বিবেচনায় গভীরভাবে আলোড়িত হলেই ভেঙে পড়ে।

    ফ্যাসিবাদ ব্যক্তি–জীবনেও এই যুদ্ধবাদী মানসিকতাকে বহন করে। “আমার কিছু যায় আসে না“—যেটি ছিল ফ্যাসিবাদী স্কোয়াড সদস্যদের অহংকারী মন্ত্র এবং আহত সৈনিকের ব্যান্ডেজে লিখিত—এটি কেবল দার্শনিক স্তোইকবাদের প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সংগ্রামী আত্মাকে প্রতিফলিত করে—যে আত্মা সকল ঝুঁকিকে গ্রহণ করে। এটি হলো ইতালীয় জীবনের এক নতুন রীতির প্রতীক।

    ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি জীবনকে গ্রহণ করে এবং ভালোবাসে; আত্মহত্যাকে সে ভীরুতার নিদর্শন হিসেবে প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণা করে। তার কাছে জীবন মানে দায়িত্ব, উৎকর্ষ, বিজয়; জীবন হতে হবে মহান এবং পরিপূর্ণ—এটি হবে নিজের জন্য, তবে সর্বাগ্রে হবে অপরের জন্য—নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য।

    এই সমস্ত পূর্বধারণার ফলস্বরূপই ফ্যাসিবাদী শাসনের জনসমাজ নীতি গঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ভালোবাসে, তবে ‘প্রতিবেশী‘ শব্দটি কোনো অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ধারণাকে নির্দেশ করে না। প্রতিবেশীকে ভালোবাসা মানেই এমন কোনো ভালোবাসা নয়, যা প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কঠোরতাকে বাদ দেয়; আর এর মানে এই নয় যে, তা শৃঙ্খলা ও মর্যাদাগত পার্থক্য অগ্রাহ্য করে । ফ্যাসিবাদ ‘সর্বজনীন আলিঙ্গন’ জাতীয় কোনো মানবতাবাদী বিভ্রমকে গ্রহণ করে না।

    জাতিসমূহের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ফ্যাসিবাদ অন্য জাতিকে চোখে চোখ রেখে সম্মুখীন হয়; সে সদা সতর্ক ও প্রহরায় নিয়োজিত; অন্যদের সমস্ত কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের স্বার্থের যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য রাখে; এবং সে কখনোই পরিবর্তনশীল ও প্রতারক বহিঃরূপের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় না।

    জীবন সম্পর্কে এই ধারণার জন্যই ফ্যাসিবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তিস্বরূপ যে মতবাদ, অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ—তাকে দৃঢ় ও সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মানবজাতির ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংঘর্ষ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদন–উপকরণের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করে, এবং অন্যান্য সকল সাংস্কৃতিক, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক উপাদানকে উপেক্ষা করে। ফ্যাসিবাদ এই একমাত্রিক ও অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে একটি বহুমাত্রিক, নৈতিক–আধ্যাত্মিকভাবে সংগঠিত জীবনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।

    অর্থনৈতিক জীবনের নানা উত্থান–পতন—যেমন কাঁচামাল আবিষ্কার, নতুন কারিগরি পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন—এসব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা কেউ অস্বীকার করে না; কিন্তু এসব উপাদান এককভাবে মানব ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে পারে—এই ধারণা নিছক অযৌক্তিক। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে—এখনও এবং সর্বদা—পবিত্রতা ও বীরত্বে; অর্থাৎ এমন সব কর্মে, যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রেরণা কাজ করে না।

    ফ্যাসিবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এই মতবাদ মানুষকে কেবলমাত্র ইতিহাসের উপরিতলের পাপেটরূপে বিবেচনা করে, যা ঢেউয়ের তোড়ে কখনো দেখা যায় ও আবার মিলিয়ে যায়। অথচ গভীরে গেলে নির্ধারক শক্তি হিসেবে মানুষই গতিময় ও ক্রীয়াশীল থাকে।

    ফলে, ফ্যাসিবাদ শ্রেণিসংঘর্ষের সেই অপরিবর্তনীয় ও অনিবার্য চরিত্রকেও অস্বীকার করে, যা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি বলে বিবেচিত। এইভাবে ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের দুটো প্রধান মতাদর্শিক ভিত্তিতে আঘাত হানে।

    অবশিষ্ট থাকে কেবল মানবসভ্যতার প্রাচীনতম একটি আবেগ—সমাজে এমন এক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নীচু শ্রেণির দুঃখ–দুর্দশা লাঘব পাবে। কিন্তু এখানেও ফ্যাসিবাদ সমাজতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত অর্থনৈতিক বিবেচনাধর্মী সুখের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে—যা মনে করে, ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বজনের সর্বোচ্চ ভোগ–সুবিধা নিশ্চিত হবে।

    ফ্যাসিবাদ এই বস্তুবাদী সুখ–ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদদের উপর ছেড়ে দেয়। এর অর্থ, ফ্যাসিবাদ ‘সমৃদ্ধি = সুখ‘ এই সমীকরণকে অস্বীকার করে—যা মানুষকে কেবলমাত্র ভক্ষণে তৃপ্ত জন্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং জীবনকে নিছক এক প্রকার উদ্ভিদসুলভ অস্তিত্বে রূপান্তরিত করে।

    সমাজতন্ত্রের সমালোচনার পর, ফ্যাসিবাদ তার আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে নেয় গণতান্ত্রিক মতবাদসমূহের পুরো কাঠামোকে এবং তাদের মৌলিক ভিত্তি ও কার্যকর প্রয়োগ—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে। ফ্যাসিবাদ অস্বীকার করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বয়ং সমাজে নির্ধারক শক্তি হতে পারে; এটি প্রত্যাখ্যান করে সংখ্যার ভিত্তিতে শাসনের অধিকার, যা সাধারণত পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।

    ফ্যাসিবাদ ঘোষণা করে, মানুষের মধ্যে এক অপরিবর্তনীয়, সৃজনক্ষম এবং কল্যাণকর বৈষম্য বিদ্যমান, যেটিকে “সার্বজনীন ভোটাধিকার” নামক যান্ত্রিক ও বাহ্যিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমতায় পরিণত করা সম্ভব নয়।

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে এমন এক পদ্ধতি, যেখানে জনগণকে নিয়মিতভাবে এই বিশ্বাসে ভুলিয়ে রাখা হয় যে, তারা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে; অথচ প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্ব অন্য শক্তির—প্রায়শই অদৃশ্য, জবাবদিহিহীন ও গোপন শক্তির—হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।

    গণতন্ত্র হলো এমন এক রাজাহীন শাসনব্যবস্থা, যেখানে একাধিক রাজা সক্রিয়, যারা অনেক সময় একক স্বৈরশাসকের চেয়েও বেশি একচেটিয়া, স্বেচ্ছাচারী এবং বিধ্বংসী।

    এই কারণেই ফ্যাসিবাদ—যদিও ১৯২২ সালের আগে তা প্রাসঙ্গিক কারণে প্রজাতন্ত্রপন্থী ছিল—‘রোম অভিযাত্রার আগেই সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে। কারণ, ফ্যাসিবাদ তখন বুঝতে শুরু করে যে শাসনব্যবস্থার গঠনমূলক রূপ (রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র) আর মুখ্য বিষয় নয়।

    এর কারণ, ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, অতীত ও বর্তমানের রাজতন্ত্র কিংবা প্রজাতন্ত্র—কোনোটিই “শাশ্বততার দৃষ্টিকোণ” থেকে বিচারযোগ্য নয়। বরং প্রতিটি শাসনব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির রাজনৈতিক বিবর্তন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশমাত্র।

    ফ্যাসিবাদ রাজতন্ত্র বনাম প্রজাতন্ত্র—এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করেছে, যা নিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলি দীর্ঘকাল ধরে কালক্ষেপন করেছে। তারা প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য রাজতন্ত্রকে দায়ী করেছে এবং প্রজাতন্ত্রকে নিখুঁত শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করেছে।

    কিন্তু অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে, কিছু প্রজাতন্ত্র নিজস্ব কাঠামোতেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী, আবার কিছু রাজতন্ত্র সবচেয়ে সাহসী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষাকেও গ্রহণ করেছে।

    রেনান, যিনি ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাসপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন, তাঁর একটি দার্শনিক ধ্যান–চিন্তায় মন্তব্য করেন:

    “যুক্তি ও বিজ্ঞান মানবজাতির সৃষ্টি, তবে সরাসরি জনতার মাধ্যমে কিংবা জনতার জন্য যুক্তির সন্ধান করা কল্পনাবিলাস মাত্র। যুক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সকলের তা জানা অপরিহার্য নয়; আর যদি জানানো আবশ্যকই হয়, তবুও তা গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয় — কারণ গণতন্ত্র যেন নির্ধারিত হয়েছে সমস্ত পরিশ্রমসাধ্য সংস্কৃতি ও উচ্চতর জ্ঞানের রূপ বিলুপ্তির পথে নিয়ে যেতে।

    সমাজ কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্যই বিদ্যমান— এমন নীতিবাক্য প্রকৃতির পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কারণ প্রকৃতি কেবল প্রজাতির বিষয়ে চিন্তা করে এবং ব্যক্তিকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।

    তবে আশঙ্কাজনকভাবে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত অর্থ দাঁড়ায় (যদিও আমি তৎক্ষণাৎ স্বীকার করছি যে এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও সম্ভব) এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে অবক্ষয়গ্রস্ত এক জনসমষ্টি চিন্তা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই কেবল জড় প্রবৃত্তিনির্ভর অশ্লীল ভোগ–বিলাস ছাড়া।’’

    .

    গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক সমতার সেই অযৌক্তিক প্রচলিত মিথ্যাকে, যা প্রকৃতপক্ষে একটি সামষ্টিক দায়হীনতার অভ্যাস এবং সুখ–সমৃদ্ধি ও অনন্ত অগ্রগতির এক বিভ্রমময় কাহিনি।

    কিন্তু যদি গণতন্ত্র বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে জনগণকে রাষ্ট্রে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় না, তাহলে এই রচনার প্রণেতা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটি “সংগঠিত, কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র” হিসেবে।

    আর্লি ফিগার্স
    শিল্পী: অভিনাশ চন্দ্র
    সূত্র: ফ্রিজি

    ফ্যাসিবাদ নিঃসন্দেহে ও সম্পূর্ণভাবে উদারতন্ত্রের মতবাদগুলোর বিরোধী— রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে। উনবিংশ শতাব্দীতে উদারতন্ত্রের গুরুত্বকে যেমন সমকালীন বিতর্কের খাতিরে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়; তেমনি, সেই শতকে বিকাশ লাভকারী বহু মতবাদের মধ্যে একটিকে চিরকালের জন্য মানবজাতির ধর্মে পরিণত করাও সমীচীন নয়।

    বাস্তবে, উদারতন্ত্র প্রকৃত অর্থে মাত্র পনেরো বছরের জন্য বিকশিত হয়েছিল। এটি জন্ম নিয়েছিল ১৮৩০ সালে, Holy Alliance এর প্রতিক্রিয়ায়, যারা ইউরোপকে ১৭৮৯ সালের চেয়েও পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আর শিখর স্পর্শ করেছিল ১৮৪৮ সালে, এমনকি সেই সময়ে পোপ নবম পিয়াসও ছিলেন একজন উদারবাদী। কিন্তু সেই বছর থেকেই এর পতন শুরু হয়। যদি ১৮৪৮ হয় আলো ও কাব্যের বছর, তবে ১৮৪৯ ছিল অন্ধকার ও বেদনার বছর। রোমান প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল আরেকটি প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্সের হাতে। সেই একই বছরে কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে সমাজতন্ত্রের বাণী প্রচার করেন।

    ১৮৫১ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয় এক ‘অনুদারবাদী’’ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৮৭০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, যতক্ষণ না এক ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের পর দেশজুড়ে গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়। বিজয়ী ছিলেন বিসমার্ক, যিনি উদারবাদ এবং এর প্রচারকদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন না। এটি একটি লক্ষণীয় বিষয় যে, পুরো উনবিংশ শতকে এত উচ্চ সভ্যতাসম্পন্ন জাতি হওয়া সত্ত্বেও জার্মানদের কাছে উদারতন্ত্র একটি অজানা ধর্ম ছিল, শুধু একবারের ব্যতিক্রম—যেটি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টের হাস্যকর সংসদ’ নামে খ্যাত, যা মাত্র এক মৌসুম স্থায়ী হয়েছিল।

    জার্মানি তার জাতীয় ঐক্য অর্জন করে উদারবাদের বাইরে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। এই মতবাদ একেবারে সেই জার্মান স্বভাবের পরিপন্থী, যাদের রাজতান্ত্রিক মানসিকতা প্রবল, বিপরীতে উদারতন্ত্র ঐতিহাসিক ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নৈরাজ্যের আঁতুড়ঘরমাত্র। জার্মান জাতীয় ঐক্যের তিনটি ধাপ ছিল ১৮৬৪, ১৮৬৬ ও ১৮৭০ সালের তিনটি যুদ্ধ, যার নেতৃত্বে ছিলেন ‘মোল্টকে’ ও ‘বিসমার্ক’–এর মতো তথাকথিত ‘উদারবাদী’রা।

    ইতালীয় জাতীয় ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে উদারতন্ত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যা জুসেপ্পে ম্যাজিনি ও গারিবল্ডির অবদানের তুলনায় অনেকটাই কম, যাঁরা কেউই উদারবাদী ছিলেন না। যদি অনুদার নেপোলিয়ন তৃতীয় হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে আমরা লম্বার্ডি পেতাম না; এবং অনুদার বিসমার্ক যদি সদোয়া ও সেডানে হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে সম্ভবত ১৮৬৬ সালে ভেনিস বা ১৮৭০ সালে রোম দখল আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

    ১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি এমন এক পর্বকে নির্দেশ করে, যা এমনকি উদারতন্ত্রের নতুন ধর্মের পুরোহিতদের কাছেও ছিল এক ধসযাত্রার কাল—সাহিত্যে ‘দেকাদেন্তবাদ’ এবং বাস্তবতায় ‘সক্রিয়তাবাদ’–এর দ্বারা আক্রমণে পর্যুদস্ত । এই ‘সক্রিয়তাবাদ’ বলতে জাতীয়তাবাদ, ভবিষ্যতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদ।

    উনবিংশ শতকের উদারতাবাদ, বহু জটিল ও অবিভাজ্য সমস্যার সঞ্চয় ঘটিয়ে, সেগুলোর সমাধান হিসাবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পথকেই বেছে নেয়। কোনো ধর্মই এরূপ নিষ্ঠুর আত্মত্যাগ দাবি করেনি। তবে কি উদারতাবাদের দেবতাগণ রক্তের জন্যই এত উদগ্রীব ছিলেন?”

    এখন উদারতাবাদ তার মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—সেই মন্দির, যা জনগণের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছে। কারণ, জনগণ অনুধাবন করেছে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতাবাদের যে সংশয়বাদ এবং রাজনীতি এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রে এর যে উদাসীনতা—তা অতীতে যেমন বিশ্বকে বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনি সর্বনাশ ডেকে আনবে।

    এই ব্যাখ্যা থেকেই প্রতীয়মান হয় কেন আমাদের সমসাময়িক কালের সকল রাজনৈতিক অনুশীলন ও প্রয়োগসমূহ উদারবাদবিরোধী। আর এই কারণে তাদের ইতিহাসচ্যুত করার প্রয়াস চরম আজগুবি —যেন ইতিহাস কেবলমাত্র উদারতাবাদ ও তার অনুগতদের জন্য সংরক্ষিত কোনো সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র; যেন উদারতাবাদই সভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি, যার গণ্ডি অতিক্রম করার আর কোনো সম্ভাবনাই অবশিষ্ট নেই।

    সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং উদারবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী প্রত্যাখ্যানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা অনুচিত, যা ফ্যাসিবাদকে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক অবস্থানে বিশ্বকে পুনঃস্থাপনের সমর্থক বলে প্রতিভাত হয়—ঐ বছরটিকে সাধারণত গণতান্ত্রিক–উদারবাদী শতাব্দীর সূচনাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাস কখনও পশ্চাদগামী হয় না। ফ্যাসিবাদী মতবাদ দেমেস্ত্রকে তার পয়গম্বররূপে বিবেচনা করে না। রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র অতীতের বিষয়; তেমনি অন্ধচার্চপূজাও। মৃতপ্রায় এবং বিলুপ্ত হয়েছে সামন্তীয় বিশেষাধিকার ও সমাজের অন্তরীত, পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন বর্ণব্যবস্থার বিভাজন। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদের ধারণার মধ্যেও পুলিশের দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই।

    একটি দল যখন কোনও জাতিকে ‘সর্বাত্মকভাবে‘ শাসন করে, তা ইতিহাসে নতুন এক প্রবাহের সূচনা। পূর্বে এর কোনো তুলনামূলক উদাহরণ পাওয়া যায় না। উদারতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতবাদসমূহের ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে ফ্যাসিবাদ কেবলমাত্র সেই উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে, যেগুলো এখনো প্রাণবন্ত এবং কার্যকর।ইতিহাসের ‘অর্জিত বাস্তবতা’ হিসেবে যেটি টিকে আছে ফ্যাসিবাদ তাকে সংরক্ষণ করে; বাকি সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, এটি এমন কোনো মতবাদের ধারণাকে গ্রহণ করে না, যা সর্বকালীন এবং সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য। যদি মেনে নেওয়া হয় যে উনবিংশ শতাব্দী ছিল সমাজতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের শতাব্দী, তবু তা এই ধারণা দেয় না যে বিংশ শতাব্দীও সেই একই মতাদর্শ দ্বারা চিহ্নিত হবে। রাজনৈতিক মতবাদসমূহ ক্ষণস্থায়ী; জাতিসমূহ টিকে থাকে। এই বাস্তবতার আলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে এটি কর্তৃত্বের শতাব্দী, ডানপন্থিতার দিকে গমনরত একটি ফ্যাসিবাদী শতাব্দী। যদি উনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্যক্তির শতাব্দী (যেহেতু উদারতন্ত্র ব্যক্তিবাদকে অনুষঙ্গ করে), তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি এটি ‘সমষ্টির’ শতাব্দী—অতএব রাষ্ট্রের শতাব্দী।

    একটি নতুন মতবাদ তার নিজস্ব রচনায় পূর্ববর্তী মতবাদগুলির মধ্য থেকে এখনো কার্যকর উপাদানসমূহ গ্রহণ করাই যৌক্তিক। কোনো মতবাদ সম্পূর্ণ নতুন, দীপ্তিমান ও অভূতপূর্ব রূপে জন্মায় না। কোনো মতবাদই একেবারে মৌলিক বলে দাবি করতে পারে না। প্রতিটি মতবাদই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মতবাদের সঙ্গে ইতিহাসগতভাবে যুক্ত। যেমন, মার্ক্সীয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সংযুক্ত হয়ে আছে ফুরিয়ে, ওউয়ন এবং সাঁ–সিমঁ–র কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে; যেমন, উনবিংশ শতাব্দীর উদারতন্ত্রের উৎপত্তি নিহিত আছে অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন আন্দোলনে; আবার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ উদ্ভূত হয়েছে এনসাইক্লোপেডিস্টদের চিন্তাধারা থেকে। প্রতিটি মতবাদই মানব ক্রিয়াকলাপকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে চায়; কিন্তু এই কার্যকলাপসমূহ আবার বিপরীতমুখে মতবাদকে প্রভাবিত করে, নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রূপান্তরিত করে কিংবা তাকে অতিক্রম করে যায়। সুতরাং, একটি মতবাদ হতে হবে এক প্রকার ‘জীবন্ত কর্ম’, কেবল শব্দসমূহের প্রদর্শন নয়। এই কারণেই ফ্যাসিবাদে রয়েছে একটি প্রায়োগিক ধারা, রয়েছে তার ক্ষমতার ইচ্ছা, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, সহিংসতার প্রতি মনোভাব এবং তার নিজস্ব মূল্যবোধ।

    ফ্যাসিবাদী মতবাদের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো রাষ্ট্র সম্পর্কিত তার ধারণা—রাষ্ট্রের স্বরূপ, কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্যাসিবাদের কাছে রাষ্ট্র হল পরম; ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সত্তাগুলি আপেক্ষিক। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত অস্তিত্ব কেবল তখনই স্বীকৃত, যতক্ষণ তারা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল ফলাফল রেকর্ড করার সীমিত ভূমিকায় নিজেকে আবদ্ধ রাখে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সেখানে সমাজের বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতির খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সজাগ, সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন; এই কারণেই তাকে ‘নৈতিক রাষ্ট্র‘ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

    ১৯২৯ সালে শাসনব্যবস্থার প্রথম পঞ্চবার্ষিক সম্মেলনে আমি বলেছিলাম— “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো রাত্রি–প্রহরীর মতো নয়, যে কেবল নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; কিংবা এটি এমন কোনো কাঠামোও নয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ভৌত কল্যাণ ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান—এই কাজ তো পরিচালনা পর্ষদও করতে পারে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাজনৈতিক নয়, এমনকি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নাগরিক ও জাতির বহুবিধ কার্যক্রমের প্রতি নির্লিপ্তও নয়। ফ্যাসিবাদ যে রাষ্ট্র ধারণা লালন ও বাস্তবায়ন করে, তা একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তা, যার লক্ষ্য জাতির রাজনৈতিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক সংগঠনের রূপায়ন; আর এই সংগঠন আত্মারই প্রকাশ, যার উৎস ও বিকাশ একধরনের আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতিফলন।

    রাষ্ট্র কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয় না, বরং জাতির আত্মাও সংরক্ষণ করে ও উত্তরাধিকারসূত্রে তা হস্তান্তর করে—যা গঠিত হয় দীর্ঘ ইতিহাসে তার ভাষা, রীতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে। রাষ্ট্র কেবল বর্তমান নয়; এটি অতীত, এবং সর্বোপরি ভবিষ্যতেরও প্রতীক। ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্র জাতির অন্তর্নিহিত নৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্রের অভিব্যক্তির রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।

    রাষ্ট্র নাগরিকদের নাগরিকচেতনায় শিক্ষিত করে, তাদের মিশনের প্রতি সচেতন করে, ঐক্যের আহ্বান জানায়; রাষ্ট্রের বিচার তাদের পারস্পরিক স্বার্থকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে; রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের বিজয়—বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও মানবিক সংহতির ক্ষেত্রসমূহে—হস্তান্তর করে; রাষ্ট্র মানুষকে আদিম গোত্র–জীবন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ রূপ—সাম্রাজ্যিক শাসনের দিকে নিয়ে যায়।

    রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে তাদের স্মৃতি, যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা এর আইন মান্য করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন; রাষ্ট্র ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরে সেই সকল অধিনায়কের নাম, যারা এর ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করেছেন, এবং সেই প্রতিভাবানদের নাম, যারা একে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা যখন কমে যায়, আর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বিচ্ছিন্নতা ও কেন্দ্রবিমুখ প্রবণতা যখন আধিপত্য বিস্তার করে, তখন জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।”

    ১৯২৯ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সর্বত্র এই সত্যগুলোকেই তুলে ধরেছে ও জোরদার করেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাকথিত যে ‘সঙ্কট’ চলছে, তা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। কোথায় গেলেন সেই জুল সিমোঁর ছায়া, যিনি উদারবাদের সূচনালগ্নে ঘোষণা করেছিলেন— “রাষ্ট্রের উচিত নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং ইস্তফা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে”? কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাককালকরা, যারা বলেছিলেন যে ‘রাষ্ট্রের উচিত শাসন থেকে নিজেকে বিরত রাখা’?

    আর ইংরেজ দার্শনিক বেন্থাম, যিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের একমাত্র চাহিদা রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা; অথবা জার্মান চিন্তাবিদ হাম্বোল্ট, যিনি মনে করতেন ‘সেরা সরকার’ সেই যা ‘আলসে’? আজকের দিনে রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অবিরাম, অপরিহার্য এবং জোরালো হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাঁরা কী বলতেন?

    নিশ্চয়ই একথা সত্য যে দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থনীতিবিদগণ রাষ্ট্রহীনতার প্রশ্নে প্রথম প্রজন্মের মতো কঠোর ছিলেন না, এবং এমনকি অ্যাডাম স্মিথ–ও—যদিও অনেক সতর্কতার সঙ্গে—রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার একটি সামান্য পথ উন্মুক্ত রেখেছিলেন।

    ডেমোক্রেসি;
    শিল্পী: আভো ঘারিবিয়ার
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    যেখানে উদারবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, ফ্যাসিবাদ সেখানে শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক সৃষ্টিরূপে চিহ্নিত; এটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং বিপ্লবাত্মক। কারণ এটি এমন কিছু সার্বজনীন সমস্যার সমাধান পূর্বাভাস দেয়, যেগুলো অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছে।

    উদাহারণ স্বরূপ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে—দলগুলোর বিভাজন, সংসদের ক্ষমতা দখল, আইনসভাগুলোর দায়িত্বহীনতা; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে—বাণিজ্য ইউনিয়ন ও পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যেগুলোর দ্বন্দ্ব ও সমঝোতা শ্রম ও পুঁজি—উভয় ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে; এবং নৈতিক ক্ষেত্রে— দেশবাদের নৈতিক আদেশ পালনে শৃঙ্খলা, কর্তব্যপরায়ণতা ও আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিপন্ন করে।

    ফ্যাসিবাদ চায় একটি শক্তিশালী ও জৈবিক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হবে জনগণের বিস্তৃত সমর্থনের ওপর। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শাসনের দাবি করে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই; এটি তার কর্পোরেত কাঠামো, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করে। জাতির সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি—যেগুলো নিজ নিজ সংগঠনে সংগঠিত—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রবাহিত হয়।

    একটি রাষ্ট্র, যা লাখো মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তার কার্যকলাপ অনুভব করে এবং তার লক্ষ্যসাধনে আত্মনিয়োগে প্রস্তুত—সে রাষ্ট্র কোনো মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসকের অত্যাচারী রাষ্ট্র নয়। এটির সাথে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মিল নেই। ব্যক্তি–মানুষকে চূর্ণ করার পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তার শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে; যেমন একটি রেজিমেন্টে একজন সৈনিক তার সহযোদ্ধাদের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে বরং বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জাতিকে সংগঠিত করে, তবে ব্যক্তি–মানুষের জন্য যথাযথ কর্মকাণ্ডের পরিসরও বজায় রাখে। এটি অনাবশ্যক বা ক্ষতিকর স্বাধীনতাকে হ্রাস করেছে, কিন্তু যে স্বাধীনতাসমূহ অপরিহার্য, সেগুলিকে সংরক্ষণ করেছে। এ বিষয়ে ব্যক্তি নিজে বিচারক হতে পারে না; কেবল রাষ্ট্রই এই বিচার করার অধিকার রাখে।

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সাধারণভাবে ধর্মীয় অভিব্যক্তিগুলোর প্রতি নিরাসক্ত নয়, এবং এটি ইতালীয়দের বিশেষ ও ইতিবাচক ধর্ম—রোমান ক্যাথলিক ধর্মের প্রতিও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে না। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব নেই, তবে একটি নৈতিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। ফ্যাসিবাদ ধর্মকে আত্মার গভীরতম প্রকাশগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এই কারণেই এটি কেবল ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, বরং তা রক্ষা করে ও সংরক্ষণ করে। ফরাসি বিপ্লবের চরম পর্যায়ে কনভেনশনের সময় রোবসপিয়ের যেভাবে নিজের মতো করে একটি “ঈশ্বর” দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তেমন কোনো প্রয়াস গ্রহণ করে না; আবার বলশেভিকপন্থীরা যেভাবে মানুষের আত্মা থেকে ঈশ্বরকে মুছে ফেলতে চায়, তেমন নিষ্ফল প্রচেষ্টাও এটি করে না। বরং ফ্যাসিবাদ আত্মসংযমী সাধক, সাধু এবং বীরদের ঈশ্বরকে যেমন শ্রদ্ধা করে, তেমনি সরল ও আদিম হৃদয়ের সাধারণ জনগণের ঈশ্বরকেও সম্মান জানায়—যাঁর উদ্দেশে তারা প্রার্থনা করে।

    শিল্পী: মিম্মো পালাদিনো

    ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র শাসন করার এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রোমান ঐতিহ্য এক শক্তিশালী চেতনারূপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা কেবল ভূখণ্ডগত, সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; বরং তা একাধিক মাত্রায় আত্মিক ও নৈতিকও বটে। একটি সাম্রাজ্যবাদী জাতি—অর্থাৎ যে জাতি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্য জাতিগুলোর নেতৃত্ব দেয়—সে এক বর্গমাইল ভূখণ্ড দখল না করেও অস্তিত্বশীল হতে পারে। ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চেতনার মধ্যে—অর্থাৎ জাতির সম্প্রসারণমূলক প্রবণতার মধ্যে—তাদের প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখতে পায়। বিপরীত প্রবণতা, যা জাতীয় স্বার্থকে কেবলমাত্র স্বদেশের সীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তাকে ফ্যাসিবাদ অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করে। যে জাতিগুলো পুনরুত্থিত হয়, তারা স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ধারণ করে; পক্ষান্তরে, যে জাতিগুলো পতনের পথে, তাদের বৈশিষ্ট্য হলো ত্যাগের মনোভাব। ফ্যাসিবাদী মতবাদই এমন একটি মতবাদ, যা এমন এক জাতির প্রবণতা ও অনুভূতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেমন ইতালীয় জাতি, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশি দাসত্বে নিষ্ক্রিয় থাকার পর এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠা করছে।

    কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মানেই শৃঙ্খলা, প্রচেষ্টার সমন্বয়, দায়িত্ববোধের গভীরতা এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে শাসনব্যবস্থার বহু ব্যবহারিক কার্যক্রম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তির গতিপথ এবং সেই কঠোরতাকেও, যা প্রয়োগ করতে হয় তাদের বিরুদ্ধে—যারা বিংশ শতকের ইতালির এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য অভিযাত্রাকে প্রতিহত করতে চায়, উনবিংশ শতকের পরিত্যক্ত মতাদর্শকে উসকে দিয়ে। এই মতাদর্শসমূহ আজ সর্বত্র বর্জিত, যেখানে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাহসী পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

    কোনো যুগেই মানুষ আজকের মতো কর্তৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলার জন্য এত গভীর তৃষ্ণা প্রকাশ করেনি। যদি প্রতিটি যুগেরই একটি নিজস্ব মতবাদ থাকে, তবে অসংখ্য লক্ষণ এটিই নির্দেশ করে যে আমাদের যুগের মতবাদ হলো ফ্যাসিবাদ। এর প্রাণশক্তির প্রমাণ হলো—এটি এক বিশ্বাসকে উদ্দীপিত করেছে; এবং সেই বিশ্বাস যে মানুষের আত্মাকে জয় করেছে, তার প্রমাণ হলো—ফ্যাসিবাদ আজ দেখাতে পারে তার আত্মোৎসর্গকারী বীর ও শহিদদের।

    ফ্যাসিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী সেই সর্বজনীনতা অর্জন করেছে, যা প্রতিটি মতবাদ লাভ করে, যখন তা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মানব চিন্তার ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

  • জর্জিও আগামবেন ।। ইতি ইহুদিবাদ

    জর্জিও আগামবেন ।। ইতি ইহুদিবাদ

    • অনুবাদ: ইমরান কামাল

    [ইজারায়েলি জায়নবাদের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আগামবেন বেশ চমকপ্রদ একটা ধারণা হাজির করছেন। জায়নবাদের আবির্ভাবের পেছনে তিনি নেতির ধারণা নিয়ে আসছেন আমাদের সামনে। লেখাটি প্রকাশিত হয় গত বছরের (২০২৪) এর ৩০ সেপ্টেম্বরে, Quodlibet নামক অনলাইন পত্রিকায়। এখানে আগামবেন দাবি করছেন একদিকে খ্রিস্টীয় জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোতে ইজরায়েলে ইহুদিদের আত্তীকরণ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যেমন ইহুদি পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে আবার আরেকদিকে ইহুদি পরিচয়ের অন্তঃসার যেই নির্বাসনের ধারণা তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এই দুই নেতির মাধ্যমেই ইহুদি পরিচয়ের ইতি ঘটছে, আবির্ভাব হচ্ছে জায়নবাদ নামক এক নতুন বস্তুর। আগামবেনের মতে জায়নবাদ মূলত ইহুদি পরিচয়ের মৌলিক ধারণার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে, এবং সেই পরিচয়কে অস্বীকার করে, ফলে আজকের জায়নবাদকে বুঝতে হলে এই নেতির ধারণা থেকেই বুঝতে হবে বলে দাবি করছেন আগামবেন। লেখাটির বাংলায় তর্জমা করা হয়েছে মূল ইতালিয়ান প্রবন্ধটির ইংরেজি সংস্করণ থেকে—সম্পাদক]

    জর্জিও আগামবেন
    দেয়ালচিত্র

    হালের হকিকত

    জায়নবাদ ইহুদিবাদের ঐতিহাসিক বাস্তবতার দ্বৈতনেতি, এ কথা না বুঝলে হালের ইসরায়েলে যা ঘটছে তা বোঝাও অসম্ভব। প্রথমত, ইহুদিদের খৃষ্টীয় জাতি-রাষ্ট্রে চালান করার মধ্যদিয়ে এক নেতিকরণ হয়েছে, তাদের পরিচয়কে করা হয়েছে অস্বীকার। এই নেতিকরণের চূড়ান্ত পরিণতিই জায়নবাদ, যা আঠারো শতকের শেষ থেকে ধীরে ধীরে ইহুদি রূপকেই বিলুপ্ত করে দিয়েছে।

    অ্যামনন রাজ-ক্রাকোৎসকিন (Amnon Raz-Krakotzkin) তাঁর একটি গবেষণায় চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন—জায়নীয় চৈতন্যের গভীরে আছে আরেক নেতি—গালুতের (Galut) নেতি, অর্থাৎ নির্বাসন, যা কিনা দুনিয়াব্যাপী যতরকম ইহুদিবাদ আছে তার সরল বৈশিষ্ট্য। এই নির্বাসন-ধারণার ভিত্তি দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসের আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাইবেলীয় সাহিত্যেও এর উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়।

    ইহুদি ঐতিহ্যে নির্বাসন–ধারণা

    দুনিয়াতে ইহুদি অস্তিত্বের অপর নাম নির্বাসন। গোটা ইহুদি ঐতিহ্য—মিশনা (Mishnah) থেকে তালমুদ (Talmud), সিনাগগ-স্থাপত্য থেকে বাইবেলীয় নানান ঘটনার স্মৃতি—সবই গড়ে উঠেছে এবং এখনো দাঁড়িয়ে আছে নির্বাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে। একজন অর্থডক্স ইহুদির কাছে, যে ইহুদিরা ইসরায়েল রাষ্ট্রে বাস করছে—তারাও নির্বাসিতই। আর তোরাহে যে রাষ্ট্রের কথা আছে, একজন মসিহা আসবেন এবং সেই রাষ্ট্র গঠন করবেন বলে যে খোয়াব তারা দেখে—তা আর যাই হোক, আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র না। সেই রাষ্ট্রকল্পের মূলবাণী—মন্দির পুনর্প্রতিষ্ঠা আর যা কিছু কোরবানি হয়েছে তার পুনর্স্থাপন। কিন্তু ইসরায়েল রাষ্ট্র এসব কথা শুনতেই চায় না। এও মনে রাখা উচিত যে, ইহুদিবাদে, নির্বাসন কেবল ইহুদিদের বিষয় না, এ দিয়ে বোঝানো হয়—গোটা দুনিয়াই একটা আস্ত ব্যর্থগল্প। ইসহাক লুরিয়ার (Isaac Luria) মতো কাব্বালাবাদীদের মতে, নির্বাসন দিয়েই আরাধ্যের প্রকটদশা ব্যাখ্যা করা যায়। তারা মনে করতেন খোদা দুনিয়া পয়দাই করেছেন আত্মনির্বাসনের মধ্যদিয়ে। আর তার সেই নির্বাসন চলবে টিক্কুন (Tiqqun) পর্যন্ত। ইহুদি কল্পনায়, টিক্কুন হলো—অদ্যশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

    শিল্পী: জেমস তিশত

    উচ্চমনা অবস্থানের ভিত্তি

    নির্বাসনের প্রতি এই নিঃশর্ত সম্মতি, যার জোরে ইহুদিরা হালের সকল প্রকার রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই অস্বীকার করতে পারে। একেই তারা উচ্চমনস্কতা বলে বোঝে, আর এ কারণে, যারা, যেসব ধর্ম ও জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে, আপস করেছে, তাদের চাইতে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে। জিপসিদের মতো জনগোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিরাও রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কখনো যুদ্ধ করেনি এবং অন্য জনগোষ্ঠীকে বধযোগ্য বানিয়ে নিজেদের কলঙ্কিত করেনি।

    জায়নবাদের প্রতারণা

    জাতি-রাষ্ট্রের নামে নির্বাসন আর দেশহীনতার আকর ধারণাকে অস্বীকার করে জায়নবাদ খোদ ইহুদিবাদের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গেই প্রতারণা করেছে। যার ফলে, রাষ্ট্র ইসরায়েল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের চরম নিষ্ঠুর রূপে পরিণত হয়েছে। ফলত, এই অস্বীকার যে—ফিলিস্তিন—নামে আরেক নির্বাসনের স্রষ্টা হয়েছে, আর ইসরায়েল রাষ্ট্রকে বানিয়েছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের নিকৃষ্টতম উদাহরণ, তা দেখে আমরা আর আচম্বিত না হই। জায়নবাদীদের মতে, দেশান্তর আর দেশহীনতা পৃথিবী থেকে ইহুদিদের মুছেই ফেলতে পারতো। ইতিহাসের কি নির্মম পরিহাস! যারা এককালে এই মত প্রচার করেছিলো, তারাই আজ দুনিয়া থেকে অপর কারো নাম মুছে ফেলতে উদ্ধত। এ কথাকে আমরা অবশ্য অন্যভাবেও পাঠ করতে পারি, আমরা বলতেই পারি, যে ইহুদিবাদকে আউশভিৎস খুন করতে পারেনি, সেই ইহুদিবাদ সম্ভবত আজ জানে—কীভাবে তাকে খতম করা হবে।

    সংযুক্তি
    ১. অ্যামনন রাজ-ক্রাকোৎসকিন: একজন ইসরায়েলি অধ্যাপক, বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি ইতিহাস পড়ান।
    ২. আইজাক লুরিয়া: ষোড়শ শতাব্দীর একজন কাব্বালবাদী রাব্বি।
    ৩. টিক্কুন ওলাম: একটি ইহুদি ধারণা, যা পৃথিবীকে মেরামত ও উন্নত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিকে নির্দেশ করে।

  • জাতির কী রূপ?

    জাতির কী রূপ?

    • সারোয়ার তুষার

    শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ‘জাতির পিতা’ কিনা, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত সম্প্রতি জমে উঠেছে। এ বিতর্ক করার জন্য উপযুক্ত সময় এখন কিনা– সে প্রশ্নও কেউ কেউ তুলেছেন। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, এ বিতর্ক উঠতই। বিমূর্ত স্তরে ‘জাতির পিতা’ ধারণার পিতৃতান্ত্রিকতা উপেক্ষা করার উপায় নাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রের অবদান অস্বীকার করে বিশেষ একজন ব্যক্তিকে ‘জাতির পিতা’ বানানোর ভাবাদর্শিক তাৎপর্যও উপেক্ষা করা যায় না।

    পূর্ব বাংলা থেকে ক্রমে বাংলাদেশ নামে আবির্ভূত এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র। তাঁর ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার বা খাটো করার সুযোগ নাই। স্বাধীন বাংলাদেশে মুজিব শাসনামল সম্পর্কে ঐতিহাসিক মূল্যায়নেরও বিকল্প নাই।

    আসলে কোনো ‘জাতি’র একক ‘পিতা’ থাকতে পারে কি? সাম্প্রতিক বিতর্কে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাউন্ডিং ফাদারস’ ধারণার নজির টেনেছেন। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে যদি স্বীকার করতেই হয়, ফাউন্ডার্স তথা স্থপতি ধারণার শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন নয়, কয়েকজন স্থপতির কথা ভাবতে হবে।

    ‘জাতির পিতা’ ধারণার সমস্যা উপলব্ধির আগে খোদ ‘জাতি’ ধারণার সংকট উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ইংরেজি ‘নেশন’ শব্দের বাংলা হিসেবে আমরা ‘জাতি’ শব্দটি গ্রহণ করেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করেন ‘নেশন’ শব্দের বাংলা হওয়া উচিত নয়; কারণ আমাদের সামষ্টিক জীবন নেশনকেন্দ্রিক নয়, সমাজভিত্তিক। বাংলায় ভাষায় ‘জাতি’ বা ‘জাত’ শব্দের অর্থও অনেক রকম– ঠিক রাষ্ট্রবাদী নয়; বাঙালি জাতি, নারী জাতি, পশু জাতি ইত্যাদি। তবু নেশন-স্টেটের বাংলা জাতিরাষ্ট্র, আর নেশনের বাংলা হিসেবে জাতি টিকে গেছে। রবীন্দ্রনাথের নোক্তা পাত্তা পায় নাই। পেলে ভালো হতো। তাঁর অবস্থানটাই সঠিক ছিল।

    নেশন-স্টেট ইউরোপের বিশেষ ইতিহাসের ফসল। নিজেদের মধ্যে অনেক মারামারি-কাটাকাটি করে পাশ্চাত্য উপলব্ধি করে, এবার ‘সভ্য’ হওয়া দরকার। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিটি নেশনের একটা স্টেট থাকতে থাকবে। খ্রিষ্টানদের অন্তঃধর্মীয় বিবাদে ১৭ শতকের ইউরোপ টালমাটাল ছিল। ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্টরা পরস্পরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ৩০ বছরের (১৬১৮-৪৮) ধর্মযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাব্যস্ত হয়– ‘রাজার ধর্মই হবে প্রজার ধর্ম’। ক্যাথলিক রাজত্বে প্রজার ধর্ম ক্যাথলিক; আর প্রটেস্টান্ট রাজত্বে প্রজার ধর্মমত প্রটেস্টান্ট। এই দফারফা ইতিহাসে ‘ওয়েস্টফালিয়ার সন্ধি’ হিসেবে পরিচিত। এর ফলে ধর্মের দিক থেকে রাজত্বগুলো একবাদী হয়ে উঠেছিল। ধর্মযুদ্ধে বিধর্মীনাশের মাধ্যমে ইউরোপে এক অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক ‘শুদ্ধতা’ অর্জিত হয়েছিল। আশ্চর্য নয়; পরবর্তীকালের ইউরোপে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাধিকার চেতনা যত বেড়েছে, এই একবাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বহুত্ববাদী ধ্যান-ধারণার সংঘাত তীব্রতর হয়েছে।

    এক অর্থে, আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস ‘এক জাতি এক ধর্ম এক ভাষা এক রক্ত’ কিসিমের বর্ণবাদী ধারণার সঙ্গে বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনার সংগ্রামেরই ইতিহাস। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুদীপ্ত কবিরাজ মন্তব্য করেছেন: ‘দেখানো হয় যে ইয়োরোপীয় মানব ক্রমশই একটা থেকে আরেকটা মুক্তির দিকে লম্ফ দিয়ে বাকি পৃথিবীকে পথ দেখাচ্ছে। একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যায় সেই ইতিহাস যে কেবল শ্রেণিবিদ্বেষের এবং শোষণের ওপরে প্রতিষ্ঠিত তাই নয়, নিজের অস্মিতা ছাড়া সে অন্য সব অস্মিতাকেই অবমাননা এবং হিংসা করে এসেছে। এবং তাই পাশ্চাত্যের আধুনিক ইতিহাস মানবিক ভ্রাতৃত্বের ইতিবৃত্ত নয়, প্রত্যেক জাতির অন্য জাতির বিরুদ্ধে হিংসার ও যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস।’[mfn]সুদীপ্ত কবিরাজ, ‘অ-জাতীয়’, রাষ্ট্রচিন্তা জার্নাল, ত্রয়োদশ সংখ্যা, ২০২৪ [/mfn]

    প্রচলিত কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী ‘জাতি’ ধারণা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ইউরোপ তার ধর্ম প্রশ্নের মীমাংসা করেছে বলে মনে করা হয়। আসলে ব্যাপার হচ্ছে, ইউরোপের ‘জাতি ধারণা’র সঙ্গে (খ্রিষ্ট) ধর্মের যোগাযোগ ও আঁতাত গভীর। কারা এক ও অভিন্ন ‘জাতি’– এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে আধুনিক ইউরোপ সাব্যস্ত করেছে যে, যারা ভাষা, ধর্ম ও রক্তের দিক থেকে ‘এক ও অভিন্ন’, তারাই একীভূত জাতি। অর্থাৎ ইউরোপের জাতি ধারণা ‘মধ্যযুগীয়’ ধর্মের প্রতিবিধান তো নয়ই; বরং ধর্ম, ভাষা ও তথাকথিত অমিশ্রিত রক্তই ইউরোপের আধুনিক জাতিবাদী ধ্যান-ধারণার গাঠনিক উপাদান হিসেবে রয়ে গেছে। একই রক্তের অধিকারী অভিন্ন ভাষিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ভূমিতে ‘জাতিরাষ্ট্র’ কায়েম করবে– এমন ধ্যান-ধারণা উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়েও স্বাভাবিক মডেল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এই কাণ্ডজ্ঞান অনুযায়ী রাষ্ট্র মানেই জাতিরাষ্ট্র। বলা বাহুল্য, সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী এই (জাতি) রাষ্ট্রতত্ত্ব আধুনিক জমানার সব সংকটের মূলে। আধুনিক জাতিবাদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর।

    ‘জাতি’ ধারণার বলেই ইউরোপ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। অভিন্ন ধর্ম-ভাষা-রক্তের বলে বলীয়ান কোনো ‘জাতি’ তথা সংগঠিত ইউরোপীয় লোকশক্তি পরদেশ আক্রমণ ও দখল করেছে। উপনিবেশিত অঞ্চল আকারে ও জনসংখ্যায় অনেক ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তুলনায় বড় হলেও, তারা শুরুর দিকে উপনিবেশের যৌক্তিক বিরোধিতা করতে পারে নাই জাতি বা জনগণ ধারণার অভাবে।

    উপনিবেশিত অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীরা শুরুর দিকে ঠিক এ কারণেই উপনিবেশের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। এমন নয় যে, তারা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। কিন্তু কেন স্বাধীনতা? কার জন্য স্বাধীনতা? আমরা কি স্বাধীনতার উপযুক্ত হয়ে উঠেছি?– এই ছিল প্রধান তর্ক। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, কেবল স্বাধীনতা চাইলেই হবে না। চাওয়ার আগে ‘জাতি/জনগণ’ হয়ে উঠতে হবে। আবার ইউরোপীয় জাতিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পদানত অঞ্চলে ক্রমশ জাতীয় মুক্তির চেতনা তৈরি হওয়াতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সূচিত হয়েছে।

    যে যুক্তিতে ইউরোপ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলকে দখলে নিয়েছে, সেই একই যুক্তিতে উপনিবেশিত অঞ্চলের মানুষ বিংশ শতাব্দীতে উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে তথা নিজেদের জাতি/জনগণ ঘোষণা করেছে। একই রক্তের অধিকারী জনগোষ্ঠী একটি ‘নেশন’ এবং তারাই একটি রাষ্ট্র গঠনের অধিকারী– এটাই আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের গোড়ার অনুমান।

    ‘নেশন’ শব্দ এসেছে লাতিন ‘নেশিও’ শব্দ থেকে; অর্থ জন্মসূত্রে একই সম্প্রদায়। অর্থাৎ জাতিরাষ্ট্রের সদস্যরা জন্মের সূত্রে সম্বন্ধিত, এ-ই হচ্ছে অনুমান। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সব বর্ণবাদ ও অপরায়নের শিকড় এর মধ্যে নিহিত।

    ইউরোপের অতীত দেখে আমাদের ভবিষ্যৎ চিনতে হবে– এ কথা আজকাল পাঁড় প্রাচ্যবাদীরাও বলার স্পর্ধা দেখান না। পার্টিশনের কালে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘সর্বজনীন’ ভেবে বহু ধর্ম বহু জাতি বহু ভাষার ভারতবর্ষকে দুই জাতিতে বিভক্ত করেছি আমরা। ধরে নেওয়া হয়েছিল, রাষ্ট্র মানেই জাতিরাষ্ট্র।

    আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ইতিহাসে বিঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রাচ্য থেকেই উঠতে থাকবে। অধুনা দার্শনিক ও রাষ্ট্রতাত্ত্বিকরা বলছেন– তন্মধ্যে ওয়াল্টার মিনালু, মাহমুদ মামদানি, সুদীপ্ত কবিরাজ, ফরহাদ মজহার উল্লেখযোগ্য– রাষ্ট্র মানেই জাতির রাষ্ট্র হতে হবে, এমন কোনো দিব্যি নাই। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে জাতি ও রাষ্ট্রের আবশ্যিক যোগসাজশ অপ্রয়োজনীয়। এ কারণেই ফরহাদ মজহারের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী, মাহমুদ মামদানির বিউপনিবেশিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়, সুদীপ্ত কবিরাজের অ-জাতিবাদী রাষ্ট্র ধারণা ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রস্তাব হিসেবে হাজির আছে। কোনো রক্তবাদী ও জাতিবাদী রাষ্ট্রকল্পকে সমর্থন করার সুযোগ নাই।

    গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য সুসংহত রাষ্ট্র গড়ে তুলবে, এটাই আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকল্প। এ ধরনের রাষ্ট্রে ‘মেজরিটি’ হবে অস্থায়ী ও রাজনৈতিক মেজরিটি তথা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফলাফল; স্থায়ী, অনড় কোনো সূচনাবিন্দু নয়। জাতিরাষ্ট্রে মেজরিটি ও মাইনরিটি উভয়ই স্থায়ী, অনড় এবং ধর্ম বা ভাষার দিক থেকে ধাতবাদী। অ-জাতিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেজরিটি ও মাইনরিটি উভয়ই অস্থায়ী, পরিবর্তনশীল ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফসল। কাজেই ‘জাতি’ ধারণার বিপরীতে ‘রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’ বর্গটির চর্চা ও প্রয়োগ অধিকতর গণতান্ত্রিক।

    প্রথম প্রকাশ : সমকাল  ২৪ অক্টোবর ২০২৪ 

  • গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    গণ-আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসা

    • সহুল আহমদ

    সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী-জনতা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও জুলুমবাজ স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। সহিংসতার মাত্রাকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের ইতিহাস, এমনকি তামাম দুনিয়ায় ইতিহাসে এত রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ঘটনা খুব কমই আছে। যেকোনো আন্দোলন, সংগ্রাম ও অভ্যুত্থানে স্লোগান, পোস্টার, গ্রাফিতি ও গান জনগণের বাসনাকে ব্যক্ত করতে দারুণ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এগুলোর ভাষিক কথকতার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আর আশা-আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট ও জোরালো চেহারায় ধরা দেয়।

    বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এর প্রায় প্রতিটি সংগ্রাম ও আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬—১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) গান ও কবিতা বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সেটি ১৯৬০–এর দশক হোক, ১৯৯০–এর দশক হোক বা হোক এই ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব সময় নজরুল যেন নিত্যনতুন চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    সব শাসকগোষ্ঠীই কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিবাদী কবিতা ও গানকে নিজেদের মনমর্জিমতো নিস্তেজ করে রাখার নানা কূটকৌশল করেছে। কিন্তু জনতা যখনই তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন এই বিদ্রোহী কবির গান–কবিতাই হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়া জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রে দেখা যায়, স্বৈরশাসকের কারাগারে আটক রাজনৈতিক বন্দীরা সমস্বরে গেয়ে উঠছেন, ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট/ ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/ রক্ত-জমাট শিকল–পূজার পাষাণ-বেদী’।

    একই গানের লাইনগুলোকে এবারের রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের দেয়াললিখনেও হাজির হতে দেখা গেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে অন্যান্য জেলা শহরের দেয়ালে–দেয়ালে শিক্ষার্থীদের তুলির আঁচড়ে লেখা হয়েছে, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ কিংবা ‘বল বীর—/ বল উন্নত মম শির!’। কেবল দেয়াললিখনেই নয়, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে যোগাযোগের যত নিত্যনতুন তরিকা যুক্ত হয়েছে, সবখানেই ছিল নজরুলের সৃষ্টির সরব উপস্থিতি। যেমন ধরা যাক, ১৯৭১ সালে নজরুলের গানের এস্তেমাল দেখেছি সিনেমার জগতে, ১৯৯০ সালে দেখেছি গানের আসর বা দেয়াললিখনে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে রাজপথের দেয়ালের বাইরে ‘জেন–জি’ প্রজন্মের নতুন মাধ্যমগুলোও ছিল বহুল আলোচিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    টিকটক, ফেসবুক, রিলস, এক্স (সাবেক টুইটার) ইত্যাদির আবির্ভাবের পর গণপরিসরের বৈপ্লবিক গণতন্ত্রায়ন ঘটেছে। সমাজের বিপুল শ্রেণির মানুষের এমন অভাবিত অংশগ্রহণ মতামত উৎপাদনকারী ও ভোক্তা এই দুই বর্গের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে দিন দিন। সংস্কৃতিচর্চার যে গতি এ যাবৎ ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হতো, হালফিল জমানার ঘটনাবলি সেই গতির উল্টো যাত্রারও সাক্ষ্য দিচ্ছে। মূলধারার গণমাধ্যম যেখানে প্রায়ই শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে গিয়েছে, সেখানে নতুন এই পরিসর প্রতিবয়ান তৈরিতে মারাত্মক কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। শাসকগোষ্ঠীর চাপে মূলধারায় উপেক্ষিত ঘটনা বা বয়ান নতুন গণপরিসরগুলো তুলনামূলকভাবে ‘অসম্পাদিত’ কায়দায় তুলে এনেছে। এহেন ‘অসম্পাদিত’ জনপরিসরের বিপজ্জনক কিছু দিক নিয়েও আলোচনা চলছে। তবু মেনে নিতেই হবে যে এবারের আন্দোলনে এর বৈপ্লবিক প্রভাব ঠাহর করা গিয়েছে। দেয়াললিখনের মতো সাবেকি কায়দার চেয়ে আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দিতে দশ-বিশ সেকেন্ডের রিলস, ফেসবুক বা এক্সের পোস্টার অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই নতুন ‘সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রসারিত’ সিনেজগতেও নজরুলের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ ছিল সরব। শুধু সরবই নয়, এগুলোর অনেকাংশই ছিল নজরুলের এই গানকে কেন্দ্র করে।

    স্বাধীনতার আগে–পরের গণ–আন্দোলনে—যেখানে জনতা তাদের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, সেখানে সমসাময়িক ও সাবেকি সব কায়দা-কানুনের ভেতরে নজরুল কেন বারবার হাজির হন? এবার আমরা দেখেছি, প্রথাগত গণসংগীতের স্থান দখল করে নিয়েছে র‍্যাপ গান। তারপরেও, আমরা দেখছি, বিভিন্ন ব্যান্ড দলের মাধ্যমে নজরুল দিন দিন আরও বেশি ‘মেটালিক’ চেহারা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কিন্তু কেন?

    নজরুলের এই হাজিরানার কারণ নজরুলের সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে যেমন পাওয়া যাবে, তেমনই পাওয়া যাবে গণ–আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি থেকেও।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুল–সাহিত্যের বিচারকালে কবি ও সমালোচক হুমায়ূন কবির তাঁর যে কয়টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছিলেন, তার মধ্যে আমাদের জন্য দুটি প্রসঙ্গ খুব জরুরি বলে মনে হয়। প্রথমত, নজরুল ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের কবি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বাংলার কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর কুটুম্বিতা। অসহযোগ আন্দোলনের কালে যে তাঁর ব্রিটিশবিরোধী তথা উপনিবেশবিরোধী চেতনার স্ফূরণ ঘটেছিল, সেটির ভাষিক সাক্ষ্য যেমন দিয়েছিল নজরুলের কবিতা, তেমনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম—যেমন লাঙ্গল—দেখলে কৃষকসমাজের সঙ্গে তাঁর সহজাত সম্পর্ক ও রাজনীতি ধরা পড়ে। এমনকি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান বাসিন্দাদের সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এবং কৃষকের আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও ধরা পড়ে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা থেকে।

    এই দুটি বৈশিষ্ট্য নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ অনুসন্ধানে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। অসহযোগ আন্দোলনে, যেখানে জনগণ আনুভূমিক কায়দায় রাজপথে অংশগ্রহণ করে, সেটি যদি হয়ে থাকে নজরুলের সাহিত্যের অন্যতম প্রেক্ষাপট, তাহলে যখনই জনতা নিজেদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা নিয়ে হাজির হওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন অবধারিতভাবে নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন।

    অন্যদিকে, কমিউনিজম বা সাম্যবাদের প্রসঙ্গ তাঁর পত্রিকা ও কবিতায় বারবার এলেও সেটি কোনো জমাটবদ্ধ তত্ত্বের আদলে আসেনি, বরং এসেছে কৃষক–শ্রমিকসহ সব অবহেলিত ও নিম্নশ্রেণির মানুষের মুক্তির প্রতি কবির গভীর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এ কারণে নজরুলের কবিতা কেবল শ্রেণি-রাজনীতির স্লোগানে পর্যবসিত না হয়ে বরং হয়ে উঠেছে যেকোনো মুক্তিমুখী রাজনৈতিক সক্রিয়তায় উচ্চারিত।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    নজরুলের সৈনিক জীবন—যাপন বা তাঁর জীবনের ‘সৈনিক’ পর্যায় তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে গভীর প্রভাব রেখেছে বলে সাহিত্য–সমালোচকেরা দেখিয়েছেন। ইনসাফের প্রশ্নে সদা অকুতোভয় এবং পুরোনোকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে বন্দী মানুষকে মুক্ত করে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ মেতে ওঠার বাসনার যে তীব্র প্রকাশ একের পর এক কবিতায় তিনি করে গিয়েছেন, তাতে তাঁর সৈনিকতার দিকটি স্পষ্ট। তিনি যে নেতা না হয়ে রাজপথের সৈনিক হতে চেয়েছেন, তাতে কোনো রাখঢাক ছিল না। তিনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আমি সেবার নই, আমি যুদ্ধের। আমি সেবক নই, আমি সৈনিক।’

    নজরুলের এই সৈনিকতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই সৈনিকতা—যাকে আমরা তাঁর সাহিত্যে বিদ্রোহ বা বিপ্লব আকারে দেখি—তার মানে হচ্ছে, জনতার নিত্য সক্রিয়তা। তাঁর কবিতায় উপমার এস্তেমাল এবং একের পর এক যুদ্ধংদেহী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুনের দিকে অগ্রসর হওয়ার কাহিনি। তবে এই ‘ব্যক্তি’দের উপমা থেকে মনে হতে পারে, নজরুল তেমন কোনো মহান পুরুষ বা উদ্ধারকর্তার অপেক্ষায় আছেন! আদতে নজরুল কোনো ‘উদ্ধারকর্তা’য় আস্থা রাখেন না, বরং তাঁর সৈনিকতা জনতার প্রাত্যহিক ও স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয়তাকেই ইঙ্গিত করে।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    অর্থাৎ নজরুল ইসলামের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সাহিত্যের ভেতরকার মসলায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা জনতার সক্রিয়তাকে কালের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বদা ধারণ করতে সক্ষম। নজরুল যে জনগণের কথা বলেন, তাকে কোনোভাবেই জাতীয়তার পরিচয়ে আবদ্ধ রাখা যায় না। মনে হতে পারে, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। পাকিস্তান আমলে তাঁকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী আকারে হাজির করার কোশেশও করা হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদও তাঁকে নিজের আদলেই গড়ে তোলার চেষ্টাচরিত্র করেছে। কিন্তু মজলুম ও মেহনতি জনতা যখন রাজপথে নেমেছে, তখন নজরুলকে নিয়ে নির্মিত নানাবিধ ‘সুরত’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আন্দোলনের মুহূর্তে নজরুলের ‘জনগণ’–এর পরিচয় ফুটে ওঠে কেবল তাদের সক্রিয়তার ভিত্তিতেই।

    নজরুলের ফিরে আসার কারণ যেমন তাঁর সাহিত্যের মধ্যে তালাশ করতে হয়, তেমনি যে পরিস্থিতিতে তিনি ফিরে আসেন, সেই পরিস্থিতির মধ্যেও তালাশ করতে হয়। পাকিস্তান আমলে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দারা যে পরাধীন জীবন যাপন করেছিলেন, তাতে নজরুলের কবিতা তার মুক্তির ভাষা দিয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও আমরা ভিন্ন বাস্তবতায় পরাধীন পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছিলাম। এক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা যাবতীয় রাজনৈতিক দল ও কর্মযজ্ঞকে গায়েব করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিকতা নির্দিষ্ট দল ও মতের বাইরেই আশ্রয় নিয়েছিল। এর ফলে জনতা যখন নেমে এল রাস্তায়, নজরুলের সৈনিকতার বেশে দাঁড়িয়ে গেল সশস্ত্র রাষ্ট্রের সামনে, তখন তাকে কোনো নির্দিষ্ট ‘রাজনৈতিক দল’ বা ‘মতবাদ’ দিয়ে চেনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। নিকট ইতিহাসে এমন আনুভূমিক আন্দোলনের নজির আমরা দেখতে পাই না। এই অবস্থার বহিঃপ্রকাশে নজরুল–সাহিত্য যে আমাদের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে?

    গ্রাফিতি, খুলনা

    ‘গাজনের বাজনা বাজা!/ কে মালিক? কে সে রাজা?/ কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’ বলার মধ্য দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম যে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতার কথা বলেন, তার বাস্তবায়ন দূরে থাক, রাজনৈতিক কল্পনাও আমরা দেখতে পাইনি। কিন্তু জনতা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের গঠন করতে থাকে, তখন তারা নজরুলের এই ‘কল্পনা’র মধ্যেই নিজেদেরই আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। যেমন, হাসিনার পতনের পর প্রশাসন ও পুলিশবিহীন অবস্থায় জনগণ যেভাবে নিজেদের হেফাজত করতে সংগঠিত হয়ে উঠল, তার মধ্যে দিয়ে নজরুলের উপরোক্ত ‘কল্পনা’র এক বাস্তব রূপই যেন আমাদের সামনে ধরা দিল।

    গ্রাফিতি, খুলনা

    গণ–আন্দোলনে নজরুলের বারবার ফিরে আসার কারণ নজরুল–সাহিত্যে হাজির থাকা ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের সক্রিয়তা ও গণক্ষমতার বৈপ্লবিক সম্ভাবনার মধ্যেই নিহিত। এর প্রেক্ষাপট হিসেবে রয়েছে তৎকালের অসহযোগ আন্দোলন, নজরুলের সৈনিক জীবন এবং সমাজের নানা শ্রেণির সঙ্গে তাঁর বা তাঁর সাহিত্যের সম্পৃক্ততা। নজরুলের জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতা ও পত্রিকা ঘন ঘন শাসকগোষ্ঠীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়েছে। ফলে যখনই ক্ষমতাকে ‘ত্যক্ত-বিরক্ত’ করার সুযোগ আসবে, গণক্ষমতার সম্ভাবনা দেখা দেবে এবং যে পরিসর যত বেশি শ্রেণি বা বর্গকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হবে, তখনই এবং সে পরিসরেই নজরুল প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।

  • অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতা : অতীত সংলগ্ন ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর’ বর্তমান

    অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতা : অতীত সংলগ্ন ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর’ বর্তমান

    • স্বাধীন সেন

    ১.

    জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জনপরিসরে (বাস্তব ও অপরবাস্তব/ভারচুয়াল) অসংখ্য আলাপ ও স্বরের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রগড়ার বাসনা উচ্চারিত হচ্ছে প্রবলভাবেই। আমি এই বহুস্বরের উচ্চারণের প্রতি অনুরাগ ও সহমত ব্যক্ত করি। গণঅভূত্থানের একজন অনুসারী ও সমর্থক হিসেবে। জনপরিসরে বহু শব্দ/প্রত্যয় এখন অনেক জোরেশোরে উচ্চারিত ও ব্যক্ত হচ্ছে (আবার বহু শব্দ/প্রত্যয় ব্যক্ত হচ্ছেও না)। যেকোনো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বদলের আকাঙ্খা ব্যক্ত করায় বিভিন্ন পক্ষ যখন তৎপর থাকে, তখন সকল উচ্চারণ-স্বর-অভিব্যক্তি সমান ভাবে ব্যক্ত ও শ্রুত হয় না। বলা ও শোনার মিথষ্ক্রিয়ার সঙ্গে অসমতা (অথবা বৈষম্যের) ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকে। ক্ষমতার সম্পর্ক (যা সকল ক্ষেত্রে ও সকল পরিসরেই অসম) এই মিথষ্ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। হালের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অপরবাস্তব পরিসর আমার অভিব্যক্তি-উচ্চারণ-ভাষা-অনুভূতিকে যেভাবে প্রবলভাবে গঠন করে চলেছে সেখানে এই মিথষ্ক্রিয়ার জটিলতা আরো বেড়েছে।

    ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট শব্দদুটোকে যদি আমি ঐতিহাসিক ও জেনেরিকভাবে পাঠ না করি তাহলে স্পষ্টতই এই অভ্যূত্থানের সঙ্গে একটি বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ব নিশ্চিতকারী রাষ্ট্রব্যবস্থার বাসনা লেপেটে রয়েছে। বৈষম্য যেমন নানাবিধ পরিসরে ক্রিয়াশীল, তেমনিই বহুত্বকেও বহুবিধভাবে উপলব্ধি করার বিষয় থাকে। বিংশ শতকে নাৎসী মতবাদের পাশাপাশি ফ্যাসিজম যেভাবে ইটালিতে বিকশিত হয়েছিল, সেই ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য, প্রয়োগ আর সহিংসতার সঙ্গে অবশ্যই হালে ফ্যাসিবাদ বা ফ্যাসিস্ট শব্দের ব্যঞ্জনার সম্পর্ক থাকলেও ফারাকও রয়েছে। থাকা স্বাভাবিকও। তবে বুনিয়াদীভাবে একটি কতৃত্ববাদী, বলপ্রয়োগবাদী, সহিংস, অলিগার্কিকাল, স্বৈরাচারী, স্বাধীনতাবিদ্বেষী এবং প্রকট অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামজিক, সাংস্কৃতিক অসমতা একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিরাজমান রয়েছে। মানুষ ও না-মানুষের হক্ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধউত্তরকালে তৈরি হওয়া বহু বাহাছ, ও নতুন নীতি ও কনভেনশন তৈরি হওয়া, তারও পরে কোল্ড ওয়ার পরবর্তী পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা, নতুন নতুন সংঘাত ও সহিংসতার দিগন্ত বিস্তৃত হওয়া, ৯/১১ পরবর্তীকালে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের নামে বৈশ্বিক মার্কিন-ইউরোপীয় আগ্রাসনসহ অন্যান্য বহুবিধ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শাসনের প্রকল্প ও তৎপরতার মধ্যে ফ্যাসিজমের প্রকাশ ও বৈশিষ্ট্যাবলি বিস্তৃত হয়েছে। তবে আমার আলাপ ফ্যাসিবাদের নানাবিধ প্রকাশ, বিবিধতা আর রূপান্তর নিয়ে নয়। এই ছোট লেখায় আমি বরং আমাদের জনপরিসরে বহুল উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ ও বাসনাকে বিবেচনা করতে আগ্রহী।

    Avinash Chandra, Early Figures, 1961. Courtesy: Osborne Samuel Ltd. and Leicestershire County Council Artworks Collection

    ২.

    ফ্যাসিবাদী ইতিহাস চিন্তা ও চর্চার প্রসঙ্গ দিয়ে আমি শুরু করতে চাই। আপাত দৃষ্টিতে ফ্যাসিবাদ ও ইতিহাস চর্চার অন্তরঙ্গতা নিয়ে আলাপচারিতা হালের বাংলাদেশের জনপরিসরের উত্তুঙ্গ ও বিস্ফোরিত আলাপচারিতায় অত্যন্ত গৌণ একটি বিষয়। তবে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে অন্যদিকে আমার জিজ্ঞাসার একটি অন্যতম প্রসঙ্গ এই অন্তরঙ্গতা। কেবল আমার আগ্রহের বা মনোযোগের প্রসঙ্গ বলেই না। বাংলাদেশে প্রবল ইতিহাস ও অতীত বোঝাপড়ার ধরন এবং সেসম্পর্কিত পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিভিন্ন বয়ানে যেভাবে ইতিহাস ও অতীতের প্রসঙ্গ অবিচ্ছেদ্য হিসেবে হাজির থাকে, সেখানে এসব বয়ানের ধারণা ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা, ভ্রান্তি ও যার যার প্রয়োজনমাফিক উপাত্ত বাছাই করে, পরিবর্তন করে আর রাষ্ট্র-রাজনৈতিক-ক্ষমতাগত স্বার্থ অনুসারে ব্যাখ্যা করাকে বুঝতে গেলেও এই আলাপ অত্যন্ত জরুরি। আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে, ইতিহাস-প্রত্নতত্ত্ব চর্চায় ফ্যাসিবাদী চৈতণ্য, চর্চা ও ধারণার অন্যতম বুনিয়াদ হলো জাতীয়তাবাদ এবং পরিচয়বাদ। উল্টোটাও সত্যি। জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়বাদী ধারণা, বাসনা, সংবেদন অতীতের ব্যাখ্যা, উৎপাদন আর পরিবেশনের মাধ্যমে কেবল ডিসকার্সিভ পরিসরেই নয়, পাশাপাশি সংবেদন ও চৈতণ্যের গভীরে ফ্যাসীবাদী অভ্যাস-আকাঙ্খা-আবেগ-অনুভূতি-মনোভঙ্গির ক্রমাগত পরিবর্তনশীল গঠনে তৎপর ভূমিকা রাখতে থাকে। ডিসকার্সিভ পরিসরে আমরা ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের মতন শাস্ত্রগুলোর নিজেদের মতন বাছাই করা, সেন্সর করা, অতিরঞ্জিত করা, বাসনাতাড়িত কল্পনাজারিত আলাপ করতেই আরাম পাই। এই আলাপের বিভ্রান্তি, সঙ্কট, সমস্যাগুলো নিয়ে কথাবার্তা ও বাহাস একদমই লঘু ও অনুচ্চারিত। আর হালের জনপরিসরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব এবং জনসংস্কৃতি সম্পর্কিত জনপ্রিয় বয়ানগুলোতে ডিসকার্সিভ দশার বাইরের অথচ ওই দশার সঙ্গে সম্পর্কিত সংবেদ ও চৈতন্যগত প্রসঙ্গগুলো ‍পুরোপুরিই অগ্রাহ্য করা হয়।

    আমার প্রস্তাব হলো, ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অতীতের আখ্যান উৎপাদন ও সঞ্চালনের প্রবল ঐতিহ্য ও তৎপরতা ( যেমন: ডিসকোর্স খাড়া করা, খারিজ করা, সরল করা, রদ করা, অতিরঞ্জিত করা, আড়াল করা, সহজবোধ্য করার নামে জটিলতা ও একই সময়ে চলমান ভিন্নতা-দ্বিমত-বিতর্ক-সংঘাতকে লুকানো, বিভিন্ন ঘটনা কেন ও কীভাবে একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ও কুশীলবদের সক্রিয়তায় ঘটেছে সেই জিজ্ঞাসা, এবং সর্বোপরি, প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা, সত্তাশ্রয়ীতা, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ঐতিহ্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা) ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে। কেবল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে সরল সওয়াল-জবাবের মাধ্যমে অতীতের বয়ানগুলো কেন ও কীভাবে তৈরি হয়েছে, বা হচ্ছে, কোন বয়ান কেন ও কীভাবে প্রবল হয়ে উঠছে বা দুর্বল ও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে সেই প্রশ্ন একেবারেই অনুচ্চারিত। মোটিভ বা অতীত বিষয়ক জ্ঞান উৎপাদনের কুশীলবদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার একটা তৎপরতা হিসেবে অতীতের জ্ঞান বর্তমানে পরিবেশন ও সঞ্চালনের প্রক্রিয়াকে সংকীর্ন করে তোলারও বহুবিধ বিপদ রয়েছে। এক্ষেত্রে কুশীলবদের ইতিহাস ও পরিপ্রেক্ষিতগত বিবিধ ও পরিবর্তনশীল শর্তগুলোর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হিসেবে ধরে-নেয়া হয়। অনুমান করা হয় যে, যারা অতীত নিয়ে বয়ান নির্মাণের চর্চা করছেন, কোনো বয়ানকে সত্য বা কোনো বয়ানকে বিকৃত বা মিথ্যা হিসেব তকমা দিচ্ছেন, তারা (কুশীলব ও সক্রিয়তা বলতে এখানে আমি কেবল মানুষ ও মানবীয়কে বোঝাচ্ছি না। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্যকেও বোঝাচ্ছি) বিচ্ছিন্নভাবে, স্বয়ংশাসিত হয়ে, সার্বভৌম সত্তা হিসেকে কাজ করার সামর্থ্য ও ক্ষমতা রাখেন।

    পরিচয়বাদী শর্ত, প্রভাব, সক্রিয়তা এবং ঐতিহ্যবোধ নিয়েই আমি যদি আলাপ করি, তাহলেও বোঝা যাবে যে, পরিচয়বাদ আর অতীত বিষয়ক জ্ঞান ও জ্ঞান উৎপাদনের বিচিত্র প্রক্রিয়কা ও কারণ একে অপরকে গঠন করে, প্রভাবিত করে, এবং শর্তাধীন হবে। জাতীয়তাবাদ যেমন ইতিহাসের বা প্রত্নতত্ত্বের চর্চা ও বয়ানকে আর চৈতণ্যকে ফ্যাসিস্ট, একমুখী, সমসত্ত্ব, একমাত্র, বিকল্পহীন, কর্তৃত্ববাদী হিসেবে জাহির করতে ভূমিকা রাখে ঠিক তেমনই ওই চর্চা ও বয়ান এবং বিশেষভাবে গঠনরত চৈতণ্যও বিশেষ, একমুখী ও চিরন্তন একটি বা একাধিক পরিচয়কে বা আত্মসত্তার রূপকে ( এবং জাতির ধারণা, বৈশিষ্ট, মানদণ্ড, ও অভিব্যক্তিকে) তৈরি করতে, সঞ্চলিত হতে, প্রবল হয়ে উঠতে, একমাত্র বৈধ পরিচয় হয়ে উঠতে ভূমিকা রাখতে থাকে। ১৯৬০-৭০ এর দশকে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অধিকারবাদী আন্দোলনে পরিচয়ের রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সেই সময়ের স্থানিক ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে। এই সক্রিয়তার মাধ্যমে উপনিবেশ পরবর্তী স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন জাতিগত, অঞ্চলগত, ধর্মীয় পরিচয়গত, নরবর্ণ/রেইস ভিত্তিক, জাতিবর্ণ ভিত্তিক, লিঙ্গীয়, ভাষিকসহ বহুবিধ ও একে অন্যের সঙ্গে লেপ্টে থাকা পরিচয় কেন্দ্রীক আধিপত্যবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নানামুখী চিন্তা- বোঝাপড়া-আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে, বৈপ্লবিক আকাঙখার অবিসংবাদিত অভিব্যক্তিতে পরিনত হয়। কিন্তু সময়ের কালক্রমে এই অবিসংবাদিত দশা প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হয় যখন এই পরিচয়ের রাজনীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক বিভিন্ন বাস্তব লক্ষণা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে। উপনিবেশ বিরোধী, বর্ণবাদবিরোধী, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র বিরোধী চেতনাই নিজেকে টিকিয়ে রাখা ও জায়েজ করার জন্য আবার কর্তৃত্ববাদী ও আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে। উপনিবেশ, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের আতঙ্ক তৈরি করে, মুক্তির যুদ্ধ, বিপ্লবের সক্রিয়তার গৌরব, বীরত্ব, মহত্ত্বর বয়ানের পৌনপুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে। এসময়েই দেখা গেল যে, দুনিয়ায় নানা জায়গায় প্রবল ও প্রান্তিক পরিচয়ের পরস্পর সংঘাতে আগেকার ফয়সালা চূড়ান্ত বা শেষ হিসেবে দাবি করা হতে থাকলেও, সেই ফয়সালার কল্পনা ও বাসনা ভ্রান্তিবিলাস ও ক্ষমতাতাড়িত হিসেবে অচিরেই ব্যক্ত হতে থাকে। দেখা গেল যেভাবে দাবি করা হয়েছিল সেভাবে আসালে ইতিহাসের পরিসমান্তি ঘটে নাই। যে পরিচয়কে মুক্ত করার জন্য লড়াই করা হয়েছিল, সেই পরিচয়ই মুক্তির একটি পর্যায়ে অপরাপর পরিচয়গুলোকে অবৈধ ও ম্লান করে তোলার তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।

    গত এক দশকে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচয়বাদী সংঘাতের প্রকট উত্থান ঘটেছে। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের অন্তরঙ্গ পরিচয়ের গোষ্ঠীগুলোও প্রকৃত অর্থে পরস্পরের সঙ্গে সহিংস ও অহিংস পরিচয়ের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। আরো দেখা যাচ্ছে, প্রবল ও অধিপতিশীল পরিচয়বাদীরাও পরিচয়বাদী ও উত্তর-উপনেবিশক বিভিন্ন চিন্তা-তত্ত্ব-তৎপরতা দিয়ে নিজেদের বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে। উত্তর-উপনিবেশবাদী এবং বিউপনিবেশিকীকরণের যেসব চিন্তা একটা সময় নতুন স্বপ্ন-চেতনা-সম্ভাবনার রাস্তা তৈরি করেছিল সেসব চিন্তাই স্বৈরাচারীরা ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেটগণ আত্মসাৎ করে নিচ্ছে। যে কারণেই পরিচয়ের রাজনীতি একটা সময়ে যেভাবে ইতিবাচক বা সদর্থক হিসেবে পরিগণিত হতো জনপরিসরে ও রাষ্ট্রনৈতিক বিভিন্ন আলাপে বা বিধিবিধানে, এখনকার দুনিয়ায়ে ইতিবাচকতার সেই একক, মঙ্গলময় ও মুক্তিদায়ী রূপটা ভেঙ্গেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। পরিচয়ের সংঘাত ও সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক বিবাদ নতুনতর বিদ্বেষ-বিচ্ছিন্নতা-ঈর্ষা-প্রতিযোগিতা-বাসনার এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করছে।

    আমাদের দেশে চিন্তাশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে প্রভাবশালী একটি চিন্তাধারা যেমন উত্তর-উপনিবেশবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদী চিন্তার প্রভাবে, স্থানীক পরিপ্রেক্ষিত আমল করার দাবি করে, ক্রিটিকাল চিন্তাচর্চার তৎপরতায় চিন্তা ও চর্চায় (বা পরিচয়বাদী নানা বয়ানে) বাইনারি বা যুগ্মবৈপরীত্যর ভিত্তিতে গড়ে ওঠার প্রতিষ্ঠিত বয়ানগুলোর সমালোচনা করেন। উপনিবেশিক আধুনিকতা এবং পশ্চিমকেন্দ্রীক জ্ঞানকাণ্ডের বুনিয়াদী বিভিন্ন বাইনারিগুলো ( যেমন : প্রগতিশীল/প্রতিক্রিয়াশীল, সেক্যুলার/নন-সেক্যুলার, যুক্তি/ধর্ম, সভ্য/অসভ্য, প্রগতিশীল/মৌলবাদী ইত্যাদি) ভেঙ্গে বাইনারির বাইরে সীমানাভাঙ্গা চিন্তা করার আহ্বান রাখেন। এই আহ্বান অত্যন্ত জরুরী এবং বাইনারির গণ্ডিগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার জরুরত অস্বীকার করার উপায়ও নাই। তবে, সমস্যা তখনই হয় যখন চিন্তার দুনিয়ার বা আকাঙ্খিত এই বাইনারি ভাঙ্গা বয়ান বাস্তব-যাপিত-নৈমিত্তিক জীবনে সতত উপস্থিত হিসেবে ধরে-নেয়া হয়। অতীতের জ্ঞান ও বয়ানগুলোকে বদলে দেবার বাসনা আমাদের অনেকেরই তৎপরতার অবিচ্ছেদ্য দশা। কিন্তু সেই দশা নৈমিত্তিক যাপিত জীবন ও জগতে, প্রবল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সমঝোতার প্রক্রিয়া ও শর্তগুলোতে এখনও অত্যন্ত দুর্বল, অস্থিতিশীল এবং নড়বড়ে। আমাদের নিত্যকার যাপন, ভাষা ও সংবেদনে এখনো অব্দি বহুবিধ বাইনারি বা যুগ্মবৈপরীত্যকেন্দ্রীকা প্রবলভাবেই জীবন্ত-সক্রিয়-বেগবান। যাপিত নৈমিত্তিক বাস্তবতা যেমন সত্যি, তেমনই বাইনারি ভাঙ্গার তাগিদ-আকাঙ্খা-সক্রিয়তাও সত্যি। ইতিহাসের বয়ান নির্মাণে তাই নৈমিত্তিক এই বাস্তবতা ও জীবন্ত বিরোধাভাস ও বৈপরীত্যগুলোকে খারিজ করে দিলে ফ্যাসিস্ট অতীত চেতনাকে মোকবিলা করা, স্থানচ্যূত করা, আর নড়বড়ে করে দেয়া সম্ভব না। এক্ষেত্রে, প্রবল বাইনারির উপস্থিতিসমেত কোনো অভিব্যক্তি-ভাষাব্যবস্থা-তৎপরতা-চিন্তাভাবনাকেও বাইনারি-অতিক্রমী বলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা ও চেতনার অস্তিত্ব ও অভ্যাস, অভিব্যক্তি ও কাঠামোকেও বদলে যাওয়া, নন-বাইনারির প্রকাশ হিসেবে মনে হতে পারে। প্রবল পরিচয়বাদী অতীত বয়ানগুলোকে বা নিপীড়ক ও কর্তৃত্ববাদী অতীত সম্পর্কিত বয়ান গঠিত হওয়ার একই পরিকাঠামোর মধ্য দিয়ে বিকশিত আপাত পাল্টা বা কাউন্টার বয়ানগুলোর অন্তর্নিহিত ও গুঢ় বাইনারিগুলো শনাক্ত করায় আমাদের ভুল হতে পারে। বর্তমানের ফ্যাসিস্ট-উত্তর দশা আবার ভিন্ন পরিসরে, যাপিত জীবনে আর চৈতণ্যের দৈনন্দিন অভিব্যক্তি ও নীতিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও উপাদানগুলোকেই বহালতবিয়তে অস্তিত্বশীল করে রাখতে পারে। ইতিহাসের উৎপাদনে, পর্যালোচনায় ও পুনর্পাঠে তাই বাইনারি বিকাশী ও বাইনারি বিনাশী বয়ান ও নৈমিত্তিকার মধ্যকার জটিল মিথষ্ক্রিয়াকে আমাদের মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। নতুবা সভা, সেমিনার, পাঠচক্র, লিখিত নানা ভাষ্যে বা কোনো বিদ্যায়তনিক পরিসরে যখন আমরা বাইনারির অনুপস্থিতি ঠাহর করতে থাকবো, বাইনারি ভেঙ্গে দেয়ার সাফল্য উচ্চারণ করতে থাকবো, তখন নৈমিত্তিক জীবনে ভিন্নতাকে খারিজকারী, আর বৈচিত্র্যকে নাকচকারী বাইনারিগুলো অন্যরূপে ও উদ্ভাসে প্রবল ও আধিপত্যশীল হয়ে উঠবে। আমরা বাইনারিগুলো নস্যাৎ ও অকার্যকর করে দেয়ার বিভ্রমের মধ্যেই যাপন করতে থাকবো। ইতিহাস ও ফ্যাসিবাদী চৈতন্যের অপর এক প্রকাশ ঘটবে আরো নৃশংসভাবে, আরো সহিংসভাবে, আরো বিপজ্জনকভাবে।

    Affandi, Mexico, Mother and Child, 1962. Courtesy: Collection of Museum Lippo

    ৩.

    জাতীয়তাবাদ যেভাবে একসময় শাসন ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির চিন্তা হিসেবে বিবেচিত হতো, পরবর্তীতে সেই বিবেচনা অবিসংবাদিত ছিল না। জাতীয়তাবাদের বিভিন্নধরনের কর্তৃত্ববাদী ও অধিপতিশীলতা আগে দৃশ্যমান ও আলোচিত হলেও, ভালো জাতীয়তাবাদ ও মন্দ জাতীয়তাবাদের মধ্যে অনেকে ফারাক করতেন। তবে এখন আর নিখুঁত ও বিশুদ্ধ ভালো জাতীয়তাবাদ যে সোনার পাথরবাটি সেবিষয়ে বহু চিন্তকই একমত। একটি জনগোষ্ঠীর জন্য যা ভালো, একই স্থানিক পরিসরে বা ভূখণ্ডে বসবাসকারী আরেকটি জনগোষ্ঠীর জন্য তাই মন্দ হতে পারে। আমাকে যে জিজ্ঞাসাটা ভীষন ভোগায় সেটা হলো: জাতীয়তাবাদী হয়ে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায় কী? কোনো রাষ্ট্রের বা একটি ভূখণ্ডে বসবাসরত বিভিন্ন পরিচয়ের মানুষজনকে একটা কালে অতীতে কোনো মুহূর্তে কোনো প্রবল ও অধিপতিশীল রাষ্ট্র বা সত্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদ ঐক্যবদ্ধ করতে পারলেও সেই ঐক্য চিরন্তন কী? কোনো পরিচয়বাদ বা পরিচয় কি সার্বক্ষণিক প্রবল ও নিপীড়ক? আর কোনো পরিচয় কি সার্বক্ষণিক প্রান্তিক ও নিপীড়িত?

    ইতিহাসের ধারণা ও পদ্ধতিগত বিবেচনা কিন্তু এই চিরন্তনতা বা সার্বক্ষণিকতাকে ভ্রান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। ইতিহাস পাঠ ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ছয়টি সি (C) – কে বিবেচনা করাকে জরুরি বিবেচনা করা হয়। এক. সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তন/চেইঞ্জ ওভার টাইম; দুই. পরিপ্রেক্ষিত/কনটেক্সট; তিন. কারণবাচকতা বা কার্যকারণসম্বন্ধ [ কেন বা কোন কোন কারণে ইতিহাসে কোন কোন পরিবর্তন ঘটছে বা ঘটছে না? কারণ কি আকষ্মিক, নাকি পরিকল্পিত? কারণ কি এক নাকি বহু? বহু কারণের প্রভাব ইতিহাসের ঘটনা ঘটায় কি একই মাত্রায় নির্ধারক হয়ে ওঠে? পরিনতি বা ফলাফলের ভিত্তিতে কারণকে মূল্যায়ন করা কি যৌক্তিক? উদ্দীষ্ট কারণ বা কজ কি আকাঙ্খিত ফল নিয়ে এসেছে নাকি অন্য কোনো ফলাফল (যা আবার পরবর্তী ঘটনা/পরিনতি/ফলাফলের কারণ হয়ে ওঠে) তৈরি করেছে? ব্যক্তির বা সমষ্টির সক্রিয়তা নাকি বিভিন্ন শর্ত নাতি উভয়ই কারণ গঠনে ভূমিকা রেখেছিল? – ইত্যাদি অসংখ্য প্রসঙ্গ কজালিটি ও কজেশনের দর্শন চিন্তায় আলোচিত হয়েছে। কজালিটি সেক্ষেত্রে কেবল ইতিহাসের একটি বুনিয়াদি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রসঙ্গ না। বৃহদার্থে চিন্তার প্রণালি ও জ্ঞানে প্রকৃতি সম্পর্কিত, ধর্মতাত্ত্বিক প্রসঙ্গও]। চার. অনিশ্চিত ব্যত্যয় বা পূর্বনির্ধারণ-অযোগ্যতা/কনটিনজেন্সি (অর্থাৎ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার কারণ হিসেবে আগে থেকেই কিছু প্রভাবক বা শর্ত বিবেচনা করার প্রসঙ্গ। এসব প্রভাবক বা শর্ত কোনোটি ওই ঘটনা বা ফলাফলকে প্রভাবিত করতেও পারে, নাও পারে। প্রভাবিত করলেও নানা মাত্রায় করে। দেশ ও কালভেদে। আবার কোনো ঘটনা বা ঘটনাবলির সংঘঠনে বা কোনো ফলাফলের পিছনের প্রভাবকগুলো আবার তারও আগের বিভিন্ন প্রভাবক বা শর্ত বা দশার প্রভাবের ফলাফল হিসেবে কাজ করতে পারে। পরমকারণবাদী/সরলরৈখিক ভাবে ইতিহাসে বিভিন্ন ঘটনা, প্রভাবক ও শর্তকে বোঝাপড়া করার প্রবল প্রবণতার পরিবর্তে কনটিনজেনসিকে আমলে নেয়া বেশ কঠিন কাজ। পাঁচ. জটিলতা/কমপ্লেক্সিটি। ইতিহাসের বিভিন্ন উৎস, উপাদান চিহ্নিত করা, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করা, বর্তমানে বসে অতীত ব্যাখ্যা করার জটিল প্রণালি নিরিখ করে করে লিখন ও কথন, ক্রিয়া হিসেবে ইতিহাসের নিরিখে চিন্তা করার জটিলতা হিসেবে নেয়া। ছয়. ধারাবাহিকতা/কনটিনিউটি [ইতিহাসের ঘটনা, শর্ত আর বিভিন্ন দশার বদল বিবেচনার পাশাপাশি ধারবাহিকতা বিবেচনা করা]।

    উপর্যুক্ত ছয়টি সি- এর বিবেচনায় আমাদের অঞ্চল/ভূখণ্ড/রাষ্ট্র/সমাজ/সংস্কৃতি/রাজনীতির যে ইতিহাস আমরা লিখতে, বলতে ও পড়তে অভ্যস্ত সেই ইতিহাসগুলো কেমন? আমার বিবেচনায় এই ছয়টি সি কে বিবেচনায় নিয়ে যদি ইতিহাস বোঝাপড়ার দিকে আমরা মনোযোগী হই তাহলে সেই ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে ফ্যাসিবাদ-উত্তর ইতিহাস। ফ্যাসিবাদ-উত্তর বা পোস্ট-ফ্যাসিস্ট শব্দটিই একদিকে কালনির্দেশক (ফ্যাসিবাদের সময়ের পরের), একই সঙ্গে সেই শব্দটি বিশেষ একধরনের কর্তৃত্ববাদী ও অধিপতিশীল ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার স্মারকও)।

    কোনো ধরনের পরিচয়বাদী এবং জাতীয়তাবাদী ইতিহাস বা অন্যভাবে বললে, কোনো পরিচয়কে (জাতিগত, সভ্যতাগত, অঞ্চলগত, রাষ্ট্রগত ইত্যাদি) কেন্দ্র করে বা কোনো পরিচয়ের প্রকট বা প্রচ্ছন্ন প্রভাবে উৎপাদিত ইতিহাস (লিখিত বা কথ্য বয়ান হিসেবে) ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবেই।

    Charles Hossein Zenderoudi, Sun and Lion, 1960. Courtesy: Grey Art Gallery and New York University Art Collection. Gift of Abby Weed Grey

    ৪.

    যদি আমরা বহুল উচ্চারিত অন্তর্ভুক্তির ধারণা বা বয়ানকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বা ইতিহাস চিন্তার উপর্যুক্ত বুনিয়াদি শর্তগুলোর সাপেক্ষে পর্যালোচনা করি তাহলে কয়েকটি নোকতা এখানে উল্লেখ করাই যায়। আমাদের ইতিহাসের বয়ানে সমন্বয়বাদ/সিনক্রেটিজম একটি জনপ্রিয় ধারণা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত, ধর্মমত, ধর্মাচার, চর্চার সংমিশ্রণ, সংশ্লেষ, সম্মিলনকে সিনক্রেটিক বা সমন্বয়বাদী হিসেবে পরিবেশন করতে ভালোবাসেন সেক্যুলার বা নন-সেক্যুলার চিন্তার চিন্তকগণ। জনপরিসরেও এই ধারণাটি বহুল আলাপিত ও জনপ্রিয় উচ্চারণের অনুষঙ্গও বটে।

    সমন্বয় এক ধরনের ঐক্যের দশা যেখানে কমপক্ষে দুই বা ততোধিক সাবজেক্ট বা বিষয়বস্তু থাকবে। সেটা দৈনন্দিন ও নৈমিত্তিক খাবারাদাওয়ার খাওয়ার একাধিক ধরন হতে পারে, দুই বা ততোধিক ধর্মাচারের সংশ্লেষ বা সম্মিলন হতে পারে, দুই বা ততোধিত আচার ও রীতি ও ঐতিহ্যের সম্মিলনও হতে পারে। সমস্যা হলো, সমন্বিত হওয়া, বা সমন্বিত হতে চাওয়া একটি বিষয়বস্তু বা আচার বা চিন্তা বা চর্চার সঙ্গে অন্যটি বা অন্য অনেকগুলো একই পরিপ্রেক্ষিত ও ক্ষমতাগত দশায় অবস্থান করে না। একটি আচার বা চিন্তার সঙ্গে অন্য আরেকটির বা অন্যগুলোর সমন্বয় প্রক্রিয়া হিসেবে সবসময়েই পারস্পরিক সংলাপ-আদানপ্রদান-টানাপড়েনের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়। সমন্বিত হতে চাওয়া না না-চাওয়াও এখানে ক্ষমতাধর বা প্রবল বিষয়বস্তুটির কর্তৃত্বাধীন থাকে। বিবাদমান বা সংঘাতময় বা সংলাপমুখর বিভিন্ন প্রপঞ্চগুলোর মধ্যে যোগাযোগ-যুক্ততা-সমন্বয় যে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিলে পরিচালিত হয় সেই প্রক্রিয়ায় একটি পক্ষ সবসময়ই অন্য পক্ষ, একটি প্রপঞ্চের বর্গ অপর প্রপঞ্চগুলোর চেয়ে প্রবল কিংবা দুর্বল হবে। পরিনতিতে, সমন্বয় বা সম্মিলন অর্জনের পরে নতুন যে বর্গ বা আচার বা পরিচয় তৈরি হয় সেখানে প্রবলটিও প্রকট থাকে। দুটো বা ততোধিক ঐতিহ্য বা চিন্তাধারা বা পরিচয় বা মতামত যখন ঐক্যমত্যে পৌঁছায় তখন কাউকে বেশি ছাড় দিতে হয়, কাউকে কম। যখনই এমন অসমতা একটি প্রক্রিয়া ও তার ফলাফলে ঘটে বা ঘটতে থাকে তখন সেই প্রক্রিয়াটি ফ্যাসিবাদী একটি প্রক্রিয়ায় পর্যবশিত হয়। ফলাফলটিও ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার উৎপাদ হয়ে ওঠে।

    অন্তভুক্তিতা/ইনক্লুসিবনেসের শর্ত ও প্রক্রিয়াকে উপরিল্লিখিত সমন্বয়ের শর্ত ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন বা বহু মত-পথ-চিন্তা-পরিচয়কে ইনক্লুড বা অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রকল্প হিসেবে, বাসনা হিসেবে, অভীষ্ঠ দশা হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। এখানে সাম্যাবস্থা বা বিভিন্ন মত-পথ-পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতগত, পরিস্পরের সঙ্গে নেগোশিয়েট করার, যুক্ত হওয়ার, শুদ্ধ বা খাটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার (বা ভেজাল বা বিকৃত হিসেবে খারিজ হওয়ার) তৎপরতায় বিভিন্ন পক্ষ বা প্রপঞ্চের মধ্যে ক্ষমতাগত সম্পর্ক কেমন? অন্তর্ভুক্তি ও সংহতিকে যদি পরস্পরের পরিপুরক দুটো দশা হিসেবে আমরা বিবেচনা করতে চাই তাহলে অসম ক্ষমতা সম্পর্কের পাটাতনে বিভিন্ন কুশীলব/কারকের তৎপরতা অসম ও বিষম হয়ে উঠবে। সেই সংহতির শর্ত ও প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে প্রবল ও অধিপতিশীল পক্ষ, কুশীলব বা দশার মাধ্যমে। এই পক্ষ বা দশা বা শর্ত বাছাই করবে, নির্বাচন করবে, কোনটা অনুর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য, কোনটা অন্তভুক্ত হওয়ার যোগ্য না সেই নির্ধারণের অধিকার কেবল এই পক্ষের বা চিন্তাধারার বা কুশীলবদেরই থাকবে।

    অন্তর্ভুক্তির আলাপ সুতরাং ক্ষমতা সম্পর্কের আলাপ, পরিপ্রেক্ষিত ও কনটিনজেনসির আলাপ, বহুবিধ দশার আলাপ, পরিচয়বাদকে নাকচ করতে করতে তৎপর থাকা ছাড়া সম্ভব কীনা সে বিষয়ে আমার সংশয় রয়েছে। প্রবল ও প্রান্তিক -সকল পরিচয়বাদী (ও জাতীয়তাবাদী) বয়ান ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে করতে, দুর্বল করতে করতে, নাকচ করতে করতেই কেবল অন্তর্ভুক্তিতামুখী তৎপরতা জারি রাখা সম্ভব। তবে সেই তৎপরতার ফলাফল চিরন্তন ও স্থির না। অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া ধারাবাহিক। কোনো চূড়ান্ত দশা নাই। ফ্যাসিবাদী ইতিহাস ও বোঝাপড়ার সঙ্গে যুযুধান থাকাটাই ফ্যাসিবাদ-উত্তর যাপনের ও নৈমিত্তিক তৎপরতার দশা এবং শর্ত।

    ….

    ০২ অক্টোবর, ২০২৪ অরুণাপল্লী, সাভার।

    প্রথম প্রকাশ : আফটার ফ্যাসিস্ট, ৮ অক্টোবর ২০২৪

  • ইসলাম ও গণতন্ত্র : একটি বাহাসের সন্ধানে

    ইসলাম ও গণতন্ত্র : একটি বাহাসের সন্ধানে

    • সহুল আহমদ

    খালেদ আবু এল ফাদল ইসলামি আইনশাস্ত্রের নামজাদা আলেম। ইসলামি আইন, শরিয়া সহ ইসলামের নানা শাখা নিয়ে অজস্র কিতাবাদি রচনা করেছেন। ২০০৩ সালে তিনি ‘ইসলাম এন্ড চ্যালেঞ্জ অফ ডেমোক্রেসি’ নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে বেশ বড়সড় বাহাস তৈরি হয়, যেখানে নাদের হাশমি, জেরেমি ওয়াল্ড্রন, সাবা মাহমুদ, মোহাম্মদ ফাদেল সহ প্রায় এগারজন স্কলার অংশ নেন। কেউ কেউ ফাদলের অবস্থানের প্রশংসা করেন, কেউ কেউ ক্রিটিক করেন। ফাদল পরে আবার সেগুলোর সম্মিলিত জবাব দেন। এই পুরো বাহাসই পরে কিতাব আকারে প্রকাশিত হয়েছিল।

    যে বাস্তবতার মধ্যে প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল ও সকলে বাহাসে লিপ্ত হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে দুটো নোক্তা দেওয়া প্রয়োজন। কেননা, পুরো বাহাসজুড়ে সেই বাস্তবতা এতো প্রবল কিন্তু উহ্য ছিল যে, তা পাঠকমাত্রই নজরে পড়বে। ২০০১ এর পর দুনিয়াজুড়ে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের হালচাল নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা শুরু হয়। এই কথাবার্তা একেবারে এতদূর পর্যন্ত ঠেকে যে, ইসলাম আদতে কোনোভাবেই গণতন্ত্রকে সমর্থন করে না। বরঞ্চ, ইসলামি ধর্মতত্ত্বেই লুকিয়ে আছে স্বৈরতন্ত্রের ভূত। অন্যদিকে, যে সকল রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলমান, সেখানে কায়েম ছিল স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ফাদল যখন প্রবন্ধ লিখেন এবং তার জবাবে বাকিরা বাহাসে লিপ্ত হন, তখন সবার মধ্যে আসলে কোন না কোনোভাবে এই সঙ্কটকে মোকাবিলা করার কোশেশ ছিল।

    ফাদল গণতন্ত্রের পক্ষেই ওকালিত করেন। কিন্তু ইসলামের মধ্যে (অথবা ইতিহাসে) গণতন্ত্র ছিল, বা গণতন্ত্রের আদিরূপ ইসলামে ছিল – এমন কোনো দাবি থেকে খুব সচেতনভাবে তিনি নিজেকে বিরত রাখেন। ঐতিহাসিক দুয়েকটা নজির দিয়ে গণতন্ত্রের উপস্থিতি প্রমাণের কোশেশও তিনি করেন না। গণতন্ত্র যে হালজমানার রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল এবং এর উৎস যে ইউরোপে হয়েছে সেটাকে কবুল করে তিনি দাবি করেন, গণতন্ত্রের যে অন্তর্নিহিত বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো রয়েছে সেগুলো কেবল ইউরোপের একার সম্পত্তি নয়। বরঞ্চ ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ওই সবের বিকাশে ইসলামি দর্শন ও মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আসলে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের জায়গা থেকে গণতন্ত্রের সাথে ইসলামের সমন্বয়ের কোশেশ করেন। যেমন, গণতন্ত্রে যে জনগণের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়, তার সাথে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ঘোষিত আল্লার সার্বভৌমত্ব কী সাংঘর্ষিক? ফাদলের উত্তর হচ্ছে, না।

    তিনি কেন ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন থেকে এর ব্যাখ্যা করতে গেলেন? কেননা, তিনি মানেন, ধর্ম এখনো গভীরভাবে মানুষের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে। অনেকেই মুসলমানদের জীবনে ধর্মের ভূমিকাকে খাটো করে দেখেন বলে সিদ্ধান্ত নেন যে, ধর্মতত্ত্বীয় বাহাসের প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ফাদলের মতে, অজস্র লোকের জীবনে, এমনকি তার কাছেও, খোদা এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা। ধর্ম এখনো তাদের কাছে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যতম নিয়ামক। ফলে, ধর্মের ময়দান থেকে এই বোঝাপড়াকে তিনি জরুরি বলে মান্য করেন। কোরান শরীফ কোনো নির্দিষ্ট ধরনের শাসনব্যবস্থাকে নির্ধারণ করে না দিলেও, ফাদল মনে করেন, কোরান এমন কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের কথা বলে যেগুলো শাসনব্যবস্থার জন্য একেবারে কেন্দ্রীয় বলে বিবেচিত হবে। সামাজিক সহযোগিতা ও পারষ্পরিকতার মাধ্যমে ইনসাফ অনুসন্ধান; অ-স্বৈরাচারী ও পরামর্শমূলক শাসনব্যবস্থা পত্তন; এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতে রহম ও দয়াকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। এই মূল্যবোধগুলোকে প্রমোট করতে সহায়তা করবে এমন যে কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার পক্ষে মুসলমানদের থাকা উচিত বলে মনে করেন ফাদল। এবং, অবশ্যই তার কাছে বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই হচ্ছে তেমন উপযোগী শাসনব্যবস্থা।

    ফাদলের কাছে গণতন্ত্রের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং মৌলিক মানবাধিকারসমূহের হেফাজত। বাদবাকি অধিকারগুলো – যেমন, সমাবেশের অধিকার, বিরোধী দলের উপস্থিতি ইত্যাদি – সব আসলে এই কেন্দ্রীয় বিষোয়গুলোর উপজাত। যখন কেন্দ্রীয় বিষয়গুলোর সাথে বোঝাপড়া হয়ে যাবে, তখন বাকিগুলোর প্রায়োগিতা সহজেই সমাধান করা যাবে। তবে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা যে সহজকম্ম নয়, এবং অন্যের অভিজ্ঞতা হুবুহু কপি-কাট করার মামলা নয় সেটাও তিনি বলেন। তিনি বরঞ্চ তার কাজকে কেবল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ বলেই মান্য করেন।

    তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি মৌলিক ধারণার উপরে। এক, মানুষ হচ্ছে দুনিয়ার বুকে খোদাতা’লার খলিফা; দুই, খোদার সাথে এই সম্পর্কটাই ব্যক্তিক দায়িত্বের ভিত্তি; তিন, খলিফা হিসাবে এই দায়িত্ব পালন মানবাধিকার ও সমতার ভিত্তি প্রদান করে; চার, ইনসাফ প্রদান ও খোদার সৃষ্টিকে দেখভাল করার মৌলিক বাধ্যবাধকতা মানবজাতি, বিশেষত মুসলমানদের রয়েছে; পাঁচ, খোদাবি আইন ও মানুষের করা (ভুল হওয়ার সম্ভাবনাসহ) তাফসিরের মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে; ছয়, রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই খোদার সার্বভৌমত্ব ও মহিমাকে মূর্ত করে তোলার করার ভান করা উচিত নয়। গণতন্ত্রের পক্ষে হাজির তাঁর সকল যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে এই পাটাতনের ওপর।

    অনেকেই রাশিদ আল ঘানুচ্চি, ইউসুফ আর কারজাভিদের মতো পণ্ডিতদের সাথে ফাদলের আলাপকে তুলনা করলে ফাদল সচেতনভাবে তাদের অবস্থানের চেয়ে নিজের অবস্থানের ফারাক পষ্ট করেন। তিনি বলেন, বাকিদের মতো তিনি মনে করেন না যে, ইসলামই গণতন্ত্র সবার আগে প্রতিষ্ঠা করেছে, এবং প্রথম যুগের কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গণতন্ত্রের একরৈখিক কোনো আখ্যানে তাঁর আস্থা নেই। গণতন্ত্র ইসলামের ট্র্যাডিশনাল বোঝাপড়ার প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, তাকে মোকাবিলা করার সিরিয়াস কোনো কোশেশও তাদের নেই বলে মনে করেন। বাকিরা যেখানে ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে ওকালতি করেন, খোদার নামে শরিয়া আইন প্রয়োগের কথা বলেন, ফাদল উলটো মনে করেন এমন কোনো ধরনের রাষ্ট্র আদতে মূর্তিপূজার সামিল (form of idolatry)। তারা ব্যক্তির অধিকারের পক্ষে অতোটা সোচ্চারও নয়, যতটা ফাদল গুরুত্ব দেন।

    আগেই বলেছি, ফাদলের প্রবন্ধের ওপর বেশ সিরিয়াস বাৎচিত ও বাহাস শুরু হয়। আমি দুজনের কথা আপাতত বলবো। তাঁর আলাপের ভূয়সী প্রশংসা করেন নাদের হাশমি। নাদের হাশমি কেন প্রশংসা করলেন, এটা তাঁর কাজ থেকেই আন্দাজ করা যায়। তিনি উদার গণতন্ত্রের সাথে ধর্মের বিশেষত ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। ধর্মীয় রাজনীতির সাথে উদার-গণতান্ত্রিক বিকাশের জলঅচল সম্পর্ককেই প্রশ্নবিদ্ধ করার কোশেশ করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রশ্নই ছিল, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উদার গণতন্ত্র কীভাবে ফাংশন করবে, যে গণতন্ত্রের জন্য কিনা একরনের সেকুলারিজমের জরুরত রয়েছে। তাঁর তিনটা প্রধান যুক্তি ছিল। প্রথমত, ধর্ম যে সমাজে পরিচয়ের অন্যতম প্রধান নির্ধারক, সেখানে সেকুলারিজমের একধরনের ধর্মভিত্তিক তত্ত্ব গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় রাজনীতির দরজা বাদ দিয়ে উদার গণতন্ত্রের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে, সরকারব্যবস্থার ধর্মের নরম্যাটিভ ভূমিকা নিয়ে দরকষাকষি ও মুলামুলি এই বিকাশের অন্তর্নিহিত অংশ। তৃতীয়ত, গণতান্ত্রীকরণ ও লিবারেলাইজেশনের জন্য ধর্মকে একেবারে খারিজ না করে ধর্মীয় ধারনাগুলোর নানাবিধ ব্যাখ্যা ও তাফসির করা জরুরি। নাদের হাশমি যে ধরনের বোঝাপড়া তৈরির কথা তাঁর কাজে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ফাদলের প্রবন্ধ যেন তারই এক নজির। ফলে তিনি এর প্রশংসা করেন।

    অন্যদিকে, বেশ কড়া সমালোচনা আসে সাবা মাহমুদের কাছ থেকে। সাবা মাহমুদ প্রশ্ন করেন, লিবারেলিজমই কী ইসলামের একমাত্র দিশা/পন্থা? ইউরোপীয় মূল্যবোধের সাথে খাপ খাচ্ছে কিনা – ইসলামকেই কেন নিজেকে সেটা প্রমাণ করার বার্ডেন নিতে হবে? তিনি ইন্ডিভিজুয়ালিজমের বাইরে ইসলামের ইতিহাসে থাকা সামষ্টিক অধিকার নিয়ে কথা বলেন। পাশাপাশি, লিবারেলিজমে ভেতরে থাকা সহনশীলতারও একটি সহিংস ইতিহাস ও যাত্রার দিকে ইঙ্গিত করেন। ফাদলের প্রবন্ধ দার্শনিক চর্চা থেকে গুরুত্বপূর্ণ মান্য করেই সাবা মাহমুদ আরেকটি সমালোচনা করেন, ফাদল মুসলমান দুনিয়ার আরেকটি বাস্তবতাকে আমলে নেননি। মুসলমান দুনিয়ার যে সকল দেশে প্রবল স্বৈরাচারী শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তারা কোনো না কোনোভাবে লিবারেল মার্কিন সরকারের মদদপ্রাপ্ত।

    পশ্চিমা মূল্যবোধের সার্বজনীনতাকে ক্রিটিক করতে গিয়ে ইসলামী মূল্যবোধকে প্রান্তিক হিসাবে তুলে ধরাকে ফাদল বিপজ্জনক বলে মনে করেন। ইসলামের স্বতন্ত্রকে অতিরিক্ত জোরারোপ করতে গিয়ে খোদ ইসলামের অভিজ্ঞতার যে সার্বজনীনতা রয়েছে সেটা উপেক্ষিত হয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে ইসলামকে দাঁড় করিয়ে দেওয়াটাকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন না। সেখানে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের বিপদও দেখেন। ফাদল উলটো অভিযোগ করেন, সাবা মাহমুদ ও অন্যান্যদের খেয়াল থাকে না যে, মুসলিম দুনিয়ার শাসকরা সামষ্টিক অধিকারের ধুয়ো তুলেই নাগরিকদের ক্রমাগত নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ব্যক্তিকে হেফাজত করাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

    বইয়ের হদিস :

    Khaled Abou El Fadl, Islam and the Challenge of Democracy, Princeton University Press, 2004

    Nader Hashemi, Islam, Secularism, and Liberal Democracy: Toward a Democratic Theory for Muslim Societies, Oxford University Press, 2009

  • নান কার আজাদি: ভাত কাজ আর জীবনের সংগ্রাম

    নান কার আজাদি: ভাত কাজ আর জীবনের সংগ্রাম

    • জান্নাতুল মাওয়া আইনান

    পঞ্চাশের দশকে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া কলোনি এবং ব্রিটিশ সূর্য যেসব কলোনিতে অস্ত যাবে যাবে করছে সেই সময়ে ওই অঞ্চলগুলোতে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে কলোনির নির্মমতার শিকার মানুষগুলো নিজ নিজ অস্তিত্ব নির্মাণ করছিলো। এইসময়ে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের জাতিগত দাঙ্গাসহ নতুন নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে চোখ রাখলেই আমরা এই প্রবণতা দেখতে (more…)

  • ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকে যে চোখে দেখতেন গান্ধী

    ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনকে যে চোখে দেখতেন গান্ধী

    [ভারত–ইসরায়েল পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে। আড়াই দশকের ব্যবধানে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েল সফর করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ২৫ বছরে ইসরায়েল ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্রে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মোট রফতানিকৃত অস্ত্রের ৪১ শতাংশ ক্রয়ের মধ্য দিয়ে ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এই ২৫ বছরের কথা বাদ দিলে বিগত ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে ভিন্ন এক মাত্রা নিয়ে। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ভারতের প্রায় সাড়ে চার দশক সময় লেগেছিল দিল্লিতে ইসরায়েলি দূতাবাস স্থাপন (১৯৯২ সাল) করতে। এর প্রধানতম কারণ, ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী জনতার প্রতি ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন, যার প্রেরণায় ছিলেন ভারতের জাতিগত মুক্তি আন্দোলনের প্রবাদ–ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী। ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর জার্মান বিদ্বেষের সূচনার দিনগুলোতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গান্ধী ‘দ্য জিউস’ শিরোনামে এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য ১৯৩৮ সালে রচিত সেই নিবন্ধের ভাষান্তর হাজির করেছেন। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায়, ২০১৮ সালে। অরাজের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা পুনরায় অরাজে তুলে দেয়া হলো।– সারোয়ার তুষার]

    আর্টওয়ার্ক: মেনি সেন্সশিপ
    শিল্পী: রামিরো জারদোয়া
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    এমন অনেক চিঠি আমার হাতে এসেছে যেগুলোতে ফিলিস্তিনের আরব–ইহুদি প্রশ্ন আর জার্মানিতে ইহুদি নিপীড়ন সম্পর্কে আমার মতামত প্রত্যাশা করা হয়েছে। খুবই জটিল এই প্রসঙ্গকে ঘিরে আমার নিজের মতামত অস্বস্তিহীন নয়, যা আপনাদের সামনে হাজির করার ঝুঁকি নিচ্ছি।

    ইহুদিদের প্রতি আমার পরিপূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে আমি তাদের ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছি। কেউ কেউ আমার সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছেন। সেই বান্ধবদের কাছ থেকে আমি তাদের ওপর বহু বছর ধরে চলতে থাকা নিপীড়নের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছি। খ্রিস্ট ধর্মবিশ্বাসীদের কাছে তারা অস্পৃশ্য। ইহুদিদের প্রতি খ্রিস্টানদের আচরণ আর নমশূদ্রদের প্রতি হিন্দুদের আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই অমানবিক আচরণের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় দোহাই তোলা হয়েছে ধর্মীয় অনুমোদনের। সুতরাং বন্ধুত্বের বাইরেও ইহুদিদের প্রতি আমার সমবেদনার একটা সাধারণ সর্বজনীন পাটাতন রয়েছে। তবে সমবেদনার সেই প্রশ্নটি আমাকে ন্যায়বিচারের অপরিহার্যতার প্রশ্নে অন্ধ রাখতে পারেনি। কেবল ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্রের আকুতি আমার মনে তেমন কোনও আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। এর পক্ষে যুক্তি খোঁজা হয় বাইবেল আর সেই গ্রোথিত বিশ্বাসের মধ্যে যে, ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের জন্য আকুল।

    কিন্তু কেন ইহুদিরা দুনিয়ার আর সবার মতো জন্ম নেওয়া আর জীবিকা যাপন করার দেশকে জন্মভূমি ভাবতে পারে না ? ফিলিস্তিন আরব জনগণের, ঠিক যে অর্থে ইংল্যান্ড ইংরেজদের অথবা ফ্রান্স ফরাসিদের। ইহুদি জনগোষ্ঠীকে আরবদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একইসঙ্গে ভুল আর অমানবিক। ফিলিস্তিনে বর্তমানে যা ঘটে চলেছে তাকে নৈতিকতার কোনও মানদণ্ডেই ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। চলমান বাস্তবতার তাৎপর্য একটাই, বিগত যুদ্ধের বৈধতা প্রতিষ্ঠা। আরবদের অপদস্থ করে ফিলিস্তিন অংশত কিংবা পুরোপুরি ইহুদিদের জাতীয় আবাস হিসেবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলে নিঃসন্দেহে তা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের শামিল হবে। এর চেয়ে বরং যেখানে ইহুদিদের জন্ম ও রুটি–রুজি সেখানেই তাদের সাথে ন্যায্য আচরণের দাবির প্রতি জোর দেয়া উচিত। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা একজন ইহুদি ততটাই ফরাসি, যতটা ফরাসি সেখানে জন্ম নেওয়া একজন খ্রিস্টান।

    ইহুদিদের যদি ফিলিস্তিন ছাড়া আর কোনও আবাস না থাকে, তাহলে কি তারা পৃথিবীর অন্য যেসব প্রান্তে এতকাল ধরে বসতি স্থাপন করে আছে, সে সবের বেলায় কী হবে? সেই সব স্থান থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে চাওয়া হলে তারা কি তা সহজভাবে নেবে? নাকি তারা কোনও দ্বৈত আবাসভূমি চায়, যেখানে তারা খেয়ালখুশি মতো থাকতে পারবে? জাতীয় আবাসভূমির জন্য এই তোড়জোড় জার্মানির ইহুদি বিতাড়নকেই কৃত্রিম বৈধতা দেয়। তবে ইতিহাসে জার্মানির ইহুদি নিপীড়নের সমতুল্য কোনও নজির নেই। প্রাচীনকালের নিপীড়কেরাও হিটলারের সমান উন্মাদ হতে পারেনি। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হিটলার এটা করছেন। একচেটিয়া ও জঙ্গি জাতীয়তাবাদ হলো হিটলারের সেই ধর্মীয় মতবাদ, যার মাধ্যমে যেকোনও অমানবিক কাজকেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য মানবিক বলে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত করা যায়।

    একজন নির্দয় উন্মাদ তরুণের অপরাধ তার গোটা জাতিকে অবিশ্বাস্যরকমের হিংস্রতা সমেত তাড়া করে ফিরছে। সমগ্র জাতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত নিপীড়ন প্রতিরোধ করতে জার্মানির বিরুদ্ধে মানবতার নামে ও মানবতার স্বার্থে একটা ন্যায়যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাহলে সেটা সম্পূর্ণ ন্যায্য হবে। কিন্তু যুদ্ধে আমার কোনও আস্থা নেই। এমন একটি যুদ্ধের ইতি–নেতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করা তাই আমার মনোগত অবস্থান ও নীতির বাইরে। ইহুদিদের সাথে এমন অপরাধ সংঘটিত করার পরেও জার্মানির বিরুদ্ধে কোনও ন্যাযুদ্ধ নাই হতে পারে। তবে কোনোভাবেই জার্মানির কোনও মিত্র থাকতে পারে না। যে জাতি (যুক্তরাজ্য) নিজেদের ন্যায় ও গণতন্ত্রের পক্ষের বলে দাবি করে তার সাথে কী করে ওই দুই নীতির ঘোষিত শত্রুর মৈত্রী হয়? ইংল্যান্ড কি তাহলে সশস্ত্র একনায়কতন্ত্র বলতে যা বোঝায় সেই পথে যাত্রা শুরু করেছে?

    গোটা দুনিয়াকে জার্মানি দেখাচ্ছে, মানবতার মুখোশে হাজির হওয়া সহিংসতাকে কী নিপুণভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ভণ্ডামি আর ভানগুলোকে তখন দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। জার্মানি আরও দেখাচ্ছে, চূড়ান্ত নগ্নতায় হাজির হওয়া সহিংসতা কতটা কুৎসিত, ভয়ঙ্কর ও বিভীষিকাময় হতে পারে। ইহুদিরা কি এই সংগঠিত ও নির্লজ্জ নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে? নিজেদের আত্মমর্যাদা সংরক্ষণ করা ও নিজেদের অসহায়, ঘৃণিত, অচ্ছুত না ভাবার কি কোন উপায় তাদের আছে? আমি মনে করি আছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনও ব্যক্তিই নিজেকে নিঃসহায় কিংবা অচ্ছুত ভাবতে পারে না।

    শিল্পী: ভাসিলি কান্ডিনস্কি

    মূলগতভাবে ঈশ্বর সর্বজনীন–অদ্বিতীয় ও বর্ণনাতীত। তবে খ্রিস্টান, মুসলমান ও হিন্দুদের স্রষ্টার চেয়ে ইহুদিদের ঈশ্বর Jehovah আরও বেশি করে তাদের একান্ত। যেহেতু ইহুদিরা তাদের সেই ঈশ্বরের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যশীল এবং তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ডকেই ইশ্বর–নিয়ন্ত্রিত মনে করেন; সুতরাং তাদের নিজেদের অসহায় মনে করার কোনও কারণ নেই। আমি যদি জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এবং সেখানে জীবনযাপন করা একজন ইহুদি হতাম, তাহলে আমি জার্মানিকে আমার মাতৃভূমি মনে করতাম এবং সর্বোচ্চ অ–ইহুদি জার্মান শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে বুক পাতিয়ে আমাকে গুলি করার চ্যালেঞ্জ জানাতাম। অথবা আমাকে ভূগর্ভস্থ কারাগারে নিক্ষেপ করতে বলতাম। আমি বিতাড়নকে প্রত্যাখ্যান করতাম, বৈষম্যপূর্ণ আচরণের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতাম না। আমার ইহুদি সতীর্থরা গণপ্রতিরোধে আমার সাথে যোগ দিবে এই অপেক্ষা করতাম না। কারণ, আমার পূর্ণ আত্মবিশ্বাস থাকতো যে শেষমেশ অন্য ইহুদিরা আমার পথেই হাঁটতে শুরু করবে।

    এখন ফিলিস্তিনি ইহুদিদের উদ্দেশে কিছু কথা। আমার কোনও সন্দেহ নেই যে তারা ভুলপথে অগ্রসর হচ্ছে। বাইবেলের ধারণায় বর্ণিত ফিলিস্তিন কোনও ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়। এটি ইহুদিদের আধ্যাত্মভূমি। তারপরও তারা যদি ফিলিস্তিনি ভূমিকে তাদের জাতীয় আবাস মনে করে, তাহলেও ব্রিটিশ বন্দুকের ছত্রছায়ায় সেখানে প্রবেশ করা ঠিক নয়। কারণ, বেয়নেট কিংবা বোমার সাহায্য নিয়ে কোন ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা উচিত নয়। একমাত্র আরবদের সদ্দিচ্ছায় তারা ফিলিস্তিনে থিতু হতে পারে। তাদের উচিত আরবদের হৃদয় জয় করার উপায় খোঁজা।

    আরবদের মনোভূতিতে যে ঈশ্বরের আবাস, একই সেই ঈশ্বর রয়েছেন ইহুদিদের হৃদয়ভূমিতেও। তাদের ধর্মীয় প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে তারা বিশ্ব–জনমতকে তাদের অনুকূলে পাবে। ব্রিটিশ বেয়নেটের সহায়তা পরিত্যাগ করলেই কেবল আরবদের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানোর ভিন্ন–বিভিন্ন পথ বের হবে। কিন্তু ব্রিটিশদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা এমন একটা জনগোষ্ঠীকে সর্বস্বান্ত করছে, যারা (ফিলিস্তিনি) তাদের কোনও ক্ষতি করেনি। আমার এই অবস্থান আরবদের প্রতি আমার মাত্রাতিরিক্ত পক্ষপাত নয়। আমি শুধু চাইছি, যাকে তারা [আরবদের দখলকৃত ভূমিতে] অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা অনিবার্য আঘাত হিসেবে দেখছেন তা প্রতিরোধে তারা অহিংসার নীতি অবলম্বন করুক। কিন্তু অভূতপূর্ব প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও, ন্যায় অন্যায়ের সর্বজনীন বিধিবিধানের কারণেই আরবদের প্রতিরোধকে নাকচ করা যায় না।

    তাহলে যে ইহুদিরা নিজেদের (ঈশ্বর কর্তৃক) নির্বাচিত জাতি মনে করে, তারা পৃথিবীতে তাদের যথার্থতা প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে অহিংস নীতি অবলম্বন করে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করুক। ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর সব দেশই তাদের দেশ, কিন্তু সেটা আগ্রাসনের মাধ্যমে [দখল] নয়, ভালোবাসার মাধ্যমে জয় করুক তারা। আমার এক ইহুদি বন্ধু আমাকে সেসিল রথের ‘সভ্যতায় ইহুদিদের অবদান‘ বইটি পাঠিয়েছেন। এতে পৃথিবীর শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষির সমৃদ্ধিতে ইহুদিদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিজেদের ইচ্ছাশক্তির বলেই ইহুদিরা পশ্চিম কর্তৃক উচ্ছিষ্ট, উপেক্ষিত কিংবা পৃষ্ঠপোষিত হওয়ার বাস্তবতা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তারা ঈশ্বর কর্তৃক বর্জিত নিষ্ঠুর হওয়ার পরিবর্তে ঈশ্বরের নির্বাচিত সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীর মনোযোগ ও শ্রদ্ধার দাবিদার হতে পারে। তারা তাদের অজস্র অবদানের বাস্তবতায় অহিংস নীতির ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অতুলনীয় বিষয়টিকে যুক্ত করতে পারে।