Category: ইতিহাস

  • রুহুলানুর দপ্তর: উপক্রমণিকা

    রুহুলানুর দপ্তর: উপক্রমণিকা

    শহিদুল ইসলাম

    কমলাকান্তকে চেনেন না, বঙ্গভাষায় শিক্ষিত এমন কোন মানুষ আছেন কিনা আমার জানা নেই। তার জন্মের সোয়াশ’ বছর পার হয়ে গেলেও সে রক্তমাংসের শরীর নিয়ে আজও আমাদের মাঝে জীবিত। স্বতন্ত্র পুস্তকাকারে কমলাকান্তের দপ্তর  প্রকাশিত হয় ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে। শিল্পাচার্য অবনীনাথ ঠাকুর কমলাকান্ত সম্পর্কে বলেছিলেন,‘বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত যদি একটি মানুষ হত, তাহলে এতকাল সে বেঁচে থাকতেই পারতো না—কিন্তু সে নাকি একটা ধূমকেতুর মতো, তাই থেকে থেকে আসে আর চলে যায় পৃথিবীর গায়ে আলোর ঝাঁটা বুলিয়ে দিয়ে। বঙ্কিমের যুগে এই ঝাঁটা একবার দেশের গায়ে পড়েছিল।’ (ভারতী; ফাল্গুন, ১৩৩৩, পৃষ্ঠা-১০৭৯)। শিল্পাচার্যের কলম দিয়ে আলোর ‘ছটা’ না বেরিয়ে, বেরিয়েছে ‘ঝাঁটা’। আমরা জানি অন্ধকার দূর করার জন্য আলোর ছটার প্রয়োজন হয়। যেমন রাতের অন্ধকার দূর করতে সূর্যদেব প্রত্যুষে আলোর ছটা নিয়ে পূর্ব দিগন্ত আলো করে উদিত হন।’( বঙ্কিম রচনাবলী ২য় খণ্ড, সাহিত্য সংসদ সংশোধিত দ্বাদশ মুদ্রণ, ১৪০১; সাহিত্য-প্রসঙ্গ সতের/আঠার)। ঝাঁটা দিয়ে কি কাজ হয়, আশা করি পাঠক সমাজকে তা বলে দিতে হবে না। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস ‘কমলাকান্তের জন্মের ইতিহাস ‘আমাদের জানিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁরা মনে করেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্রের স্বভাবত রহস্যপ্রিয় মন প্রথমটা ‘লোকরহস্য’র সহজ পথে একটা মুক্তির উপায় আবিষ্কার করিয়া কতক সান্ত্বনা লাভ করিয়াছিল। কিন্তু মাসের পর মাস নিছক রহস্য সৃষ্টি করিয়া তৃপ্ত থাকিবার মত পল্লবগ্রাহী মন বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল না। প্রবহমান সংসারস্রোতের উপরিভাগে আপাত মনোহর তরঙ্গভঙ্গে ভাসিতে ভাসিতে তীক্ষ্ণধী বঙ্কিমচন্দ্র কখনও গভীর রহস্যগহনে তলাইয়া যাইতেন, এবং মরণশীল মানবের, এবং বিশেষ করিয়া যে সকল হতভাগ্য জীব তাঁহার আশেপাশে চিন্তাহীন নিঃশঙ্কতায় ভাসমান, তাহাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা আপন অন্তরে অনুভব করিয়া হাল্কা হাসির বুদ্বুদ-বিলাসে তাঁহার মন সায় দিত না। অর্ধোন্মাদ নেশাখোর কমলাকান্তের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া তখন তাঁহার উপায় ছিল না। সোজাসুজি সজ্ঞানে যে সকল কথা বলিতে তিনি সঙ্কোচ বোধ করিতেন, কমলাকান্তের মুখ দিয়া সেই সকল কথা তিনি অসঙ্কোচে বলিতে পারিতেন এবং এই রহস্যময় পাগলকে কেন্দ্র করিয়া মাসের পর মাস পাঠক ভুলাইতে তাঁহাকে বেগ পাইতে হইত না। এক আধারে ব্যঙ্গেরশর্করামণ্ডিত কাব্য, পলিটিক্স, সমাজবিজ্ঞান এবং দর্শন পরিবেশনের উপায় সৃষ্টি করিয়া সম্পাদক এবং প্রচারক বঙ্কিমচন্দ্র নিজের কাজ অনেকটা সহজ করিয়া লইলেন। কমলাকান্তের জন্মের ইহাই ইতিহাস।” ( কমলাকান্ত—বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-সংস্করণ, ভূমিকা) । শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার দাশগুপ্তের মতে ‘কমলাকান্ত একাধারে কবি, দার্শনিক, সমাজশিক্ষক, রাজনীতিজ্ঞ ও স্বদেশপ্রেমিক, অথচ তাহাতে কবির অভিমান, দার্শনিকের আড়ম্বর, সমাজশিক্ষকের অরসজ্ঞতা, রাজনৈতিক কল্পনাহীনতা, স্বদেশপ্রেমিকের গোঁড়ামি নাই।’(বঙ্কিমচন্দ্র’ ১৩২৭, পৃষ্ঠা-১৯৭; রচনাবলী ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৭)। তাই তো পাগল হোক আর যাই হোক কমলাকান্ত আজও বাঙালির হ্রদয়ে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবেই বেঁচে আছে।

    কমলাকান্তের চরিত্রাবিষ্কার নিয়ে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের মৌলিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ‘De Quiencey’s Confession Of an Opium Eater কিংবা Pickwick Papers-এর Sam-এর সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও অক্ষয়বাবুর বিশ্বাস ‘উহাতে কমলাকান্তের মৌলিকতা নষ্ট হয় নাই।’ (রচনাবলী, পৃষ্ঠা-১৭)। আমি সাহিত্য সম্রাট নই, একজন সাহিত্যিক পদবাচ্য ব্যক্তিও নই। তাই কেউ প্রশ্ন তোলার আগেই আমার স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে ‘রুহুলানুর দপ্তর’ কমলাকান্তের আদর্শেই রচিত হয়েছে। শিল্পাচার্য তো বলেইছিলেন যে কমলাকান্ত “ধুমকেতুর মত থেকে থেকে আসে আর চলে যায় পৃথিবীর গায়ে আলোর ঝাঁটা বুলিয়ে দিয়ে।” কথাটা সত্যি। রুহলানুর জন্মের ইতিহাস জানলে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।

    বঙ্কিমচন্দ্র কমলাকান্তের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেন এভাবে, ‘‘অনেকে কমলাকান্তকে পাগল বলিত। সে কখন কি বলিত, কি করিত, তাঁহার স্হিরতা ছিল না। লেখাপডা না জানিত, এমন নহে। কিছু ইংরেজি, কিছু সংস্কৃত জানিত। কিন্তু যে বিদ্যায় অর্থোপার্জন হইল না, সে বিদ্যা কি বিদ্যা? আসল কথা এই, সাহেব সুবোর কাছে যাওয়া আসা চাই। কত বড় বড় মুর্খ, কেবল নাম দস্তখত করিতে পারে—  তাহারা তালুক মুলুক করিল—আমার মতে তাঁহারই পণ্ডিত। আর কমলাকান্তের মত বিদ্বান, যাহারা কেবল কতকগুলি বহি পডিয়াছে, তাহারা আমার মতে গণ্ডমুর্খ।” কথাটা রুহুলানুর ক্ষেত্রে অন্যভাবে প্রযোজ্য। রুহুলানুর নামের পিছনে এমএ, বিএ, পিএইচডি, ইঞ্জিনিয়ারিং  কিংবা ডাক্তারির কোন লাঙ্গুল নাই। টেনেটুনে অনেক কষ্টে আইএ টা পাশ করেছিলেন। যখন তার স্কুলের সহপাঠী বন্ধুরা তাদের নামের পিছনে বড় বড় লাঙ্গুল জুডে নিয়েছে, তখন বলতেই হয় যে রুহুলানু তাদের তুলনায় মুর্খ। কিন্তু যারা তার সহপাঠী বন্ধু এবং যারা গত প্রায় সত্তর বছর তার সাহচর্যে এসেছেন তারা স্বীকার করবেন রুহুলানু একজন স্বশিক্ষিত ব্যতিক্রমি মানুষ। শম্ভুমিত্র ম্যাট্রিক পাশ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল তা’ও নন কিন্তু জ্ঞানতৃষা সারা জীবন তাঁদের তাড়া ক’রে নিয়ে বেরিয়েছে। ম্যাট্রিক পাশ করেও শম্ভু মিত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আর নন-ম্যাট্রিক রবীন্দ্র-নজরুলের ওপর গবেষণা ক’রে কত বিশ্ববিদ্যালয়ের কত শিক্ষক পেটের অন্ন সংস্হান করছেন তার কোন ইয়ত্তা নেই। না পাঠকবৃন্দ, আমি ওইসব ক্ষণজন্মা মানুষের সঙ্গে রুহুলানুর তুলনা করে তাঁদের ছোট করতে চাই না। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি তার ভিতর থেকে কিছু একটা বের হয়ে আসার জন্যে আঁকুবাঁকু করছে। তার কথাবার্তা ছিল অদ্ভুত, রহস্যময়, মোহনীয়—  মনে হত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপার থেকে তিনি যেন কিছু বলতে চাইতেন। আমরা সবাই তাকে পাগল বলতাম। শুনে তিনি প্রাণখোলা হাসি হাসতেন। রুহুলানুর চালচলন, শংকাহীন জীবন-যাপন সবার মতে ‘বাবুয়ানা।’

    কমলাকান্তের জ্ঞানবুদ্ধি দেখে কোন এক সাহেব তাকে তার কেরানীর কাজ দিয়েছিল। সেখানে সে বিভিন্ন ফাইল পত্রে তার পাণ্ডিত্য প্রকাশ করার ফলে তাকে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হয়েছিল। রুহুলানুও কমলাকান্তের মত সুন্দর ইংরাজি বলতেন। ইংরেজ আমল তো আর নাই। ইংরেজ সাহেব না থাকলে কি হবে ইংরেজির সে কদর কমেনি। পাকিস্তানের উঠতি জনৈক বাঙালি শিল্পপতি রুহুলানুর ইংরেজি জ্ঞানের জন্যে নিজের পিএ করে নেন। ব্যবসায়ের স্বার্থে তাকে নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতেন ইংরাজিতে কথা বলার জন্য। কিন্তু পাণ্ডিত্যের সে কদর দেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। পাকিস্তান হয়েছে-শিক্ষিত হিন্দুদের তাড়িয়ে দিয়ে অশিক্ষিত ও শিক্ষিত নামধারী অশিক্ষিত আমরা, মুর্খরা রাষ্ট্রের সব চাকরি দখল করে নিয়েছি। দস্তখত করতে পারে না, এমনসব মানুষ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদগুলি দখল করে নিয়েছি। সে যুগ নেই— সে সময়ও নেই যে ম্যাট্রিক পাশ শম্ভুমিত্রের মত একজন নাটুকে-অভিনেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন। তাছাড়া রুহুলানুর ওসবের প্রতি কোন আগ্রহও ছিল না কোনদিন। কমলাকান্তের মত তারও অর্থের কোন প্রয়োজন ছিল না বলে আমাদের মনে হয়েছে। যেটুকুনই প্রয়োজন হত, সেটুকুনই বা কোথা থেকে আসতো, তাই নিয়ে সবাই জল্পনা-কল্পনা করতো। তবে কমলাকান্তের সঙ্গে তার বড় এক পার্থক্য ছিল দারপরিগ্রহ করার ক্ষেত্রে। ইসলাম সংসার ধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগ্যসাধন সমর্থন করে না। তাই যৌবনে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মানুসারে তিনি দারপরিগ্রহ করেছিলেন। সেখানেও ব্যতিক্রম। একটি সুন্দরি হিন্দু ললনাকে বিয়ে করে জেল-হাজতে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তার বন্ধুরা যখন তাদের দু’জনকে নিয়ে আসন্ন বিপদাশঙ্কয় কাতর, তখনও তিনি নির্লিপ্ত-ভাবলেশহীন, কৌতুকময়। সেই হিন্দু ললনা ১৯৬০ সালে ঢাকায় ‘রাজা এল শহরে’ ছবির জন্য মনোনীত হয়েছেন। চিত্রালী পত্রিকাসহ সমস্ত পত্র পত্রিকায় তার রঙিন ছবি দেশের যুব সমাজের ঘুম হারাম করে দেয়। কিন্তু মেয়েটি তার সম্ভাবনাময় জীবন ত্যাগ করে রুহুলানুর গলায় মালা দিয়ে এক অজানা ভবিষ্যতের মধ্যে ঝাঁপ দেয় এবং সারা জীবন বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংসার ধর্ম পালন করেন। বঙ্কিমচন্দ্র কমলাকান্তকে পরিচয় করিয়ে দিতে মাত্র কুড়িটি লাইন খরচ করেছিলেন। কারণ কমলাকান্ত ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। রুহুলানু তার তুলনায় অতি নগণ্য এক ব্যক্তি। তার ভিতরে যে সম্ভাবনা ছিল, তা তার পরিচিত সীমানার বাইরে ছডিয়ে পড়েনি। তার ঘনিষ্ঠ বা পরিচিতজনের মাঝেই রুহুলানুর অনন্যতা-অসাধারণতা সীমাবদ্ধ। তার সেই ক্ষুদ্র পরিচিত গণ্ডির বাইরে তাকে টেনে আনার এক দুরূহ কাজ আমি হাতে নিয়েছি। বন্ধু হাসান আজিজুল হক বা আখতারুজ্জামানের হাতে পড়লে আমার দৃঢ বিশ্বাস রুহুলানুও কমলাকান্তের মত অমরত্ব লাভ করতেন। আমার সে সাধ্য কোথায়? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছু রঙ্, কিছু রস যুক্ত করার ক্ষমতা কোথায়?  যা বঙ্কিমবাবুর ছিল। তাই তো বঙ্কিমবাবুর মত কমলাকান্ত অমর হয়ে আছেন।

    রেল কোম্পানির চাকুরে এক রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত ঘরের জৈষ্ঠ সন্তান রুহুলানু। আমাদের দেশে বড় ছেলের কাছে মা-বাবা-সমাজের একটা চাহিদা থাকে। রুহুলানু সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। বিএ, এমএ পাশ দিয়ে মধ্যবিত্ত রেলের চাকুরে বাবা-মা’য়ের ডজনখানেক ছেলেমেয়েকে মানুষ করার দায়-দায়িত্ব কিছুটা হলেও নিজের কাঁধে তুলে নেবেন, রুহুলানুর মনে এমন কোন চিন্তার উদ্রেক হয়েছে, এমন কোন প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। যতদিন বাবার হোটেলে ছিলেন, ততদিন তার বাবুয়ানি ও বই-সিগারেট-প্রসাধনীর খরচ চুপিসারে তার মা’কেই সরবরাহ করতে হত। বাবার পকেট কখনও কাটতে হয়নি, একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। কিন্তু হিন্দু অভিনেত্রীর পাণিগ্রহণের পর বাবার হোটেলের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে, কিভাবে তিনি সংসারধর্ম পালন করার সাথে তার ঠাঁটবাট, জীবনধারণের সুপরিচিত ধরনটা বজায় রেখেছিলেন, তা আজও সবার কাছে দুরহ গবেষণার বিষয়। কখন কিভাবে টাকা রোজগার করতেন, সেটা যেমন মহারহস্যে ঘেরা, তিনি সারা জীবন বাবুগিরি করে কিভাবে কাটিয়ে দিলেন, সেটাও তাই।

    আমরা একই স্কুলে পড়তাম। তিনি আমার তিন বছর আগে ম্যাট্রিক পাশ করেন (১৯৫৪)। তার দৈনন্দিন রুটিনের জন্য তিনি প্রায় শাস্তি ভোগ করতেন। দেরি করে স্কুলে আসার জন্য তাকে বহুদিন স্কুলের তিন বাহুর মাঝের মাঠে দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। শীত গরম কোন কিছুই তাকে স্বভাবসিদ্ধ হাঁসি-ঠাট্টা-মশকরা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। আমরা জানলা দিয়ে তার সেসব কৌতুক উপভোগ করতাম। তার দৈনন্দিন রুটিনের কথা যখন উঠলই, তখন বলি আমাদের দিন রাত্রি, সকাল-দুপুর-সন্ধা নির্ধারিত হয় সূর্যের দ্বারা। কিন্তু রুহুলানুর কাছে সূর্যের অবস্হান ছিল গৌণ। তার কাছে ঘড়িই ছিল সর্বেসর্বা। ঘড়ির কাঁটা ধরে তার জীবনযাত্রার কাঁটা ঘুরতো। এক্ষেত্রে Around The World In Eighty Days-এর ফগের কথা মনে পড়ে। ফগের মত রুহুলানুর অঢেল টাকাপয়সা ছিল না সত্যি কিন্তু ফগের মত তার জীবনযাত্রা চলতো ঘড়ির কাঁটা ধরে। শুনি, আজ এত বছর পরও তার সামান্য রদবদল হয়নি। বেলা এগারটায় যখন সূর্যদেব পূর্ব দিগন্ত ছেডে অনেক ওপরে উঠে এসেছে, তখন রুহুলানুর সুবেহ সাদেক, শরীরের আড়মোড়া ভেঙ্গে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তার জন্য পিড়ে পেতে বসতেন। সকাল দশটা থেকে আমাদের স্কুল শুরু। আমরা স্নান- খাওয়া সেরে যখন স্কুলমুখো, তখন রুহুলানু মশারির ভিতর নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন। তার মা যেদিন ঠেলেঠুলে তাকে তুলে দিতে পারতেন, সেদিন সঠিক সময়ে তাকে স্কুলের চারদেয়ালের মাঝে দেখা যেত। তা নাহলে স্কুলের রুটিন মেনে ক্লাসে উপস্হিত হওয়া ছিল তার পক্ষে অসম্ভব। সম্ভবত আইএ পাশ করার পর তার পক্ষে আর অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। যেদিন স্কুলে যেতেন না, সেদিন তার ঘরের মধ্যে দিব্বি মনের সুখে সপ্তাহের News Week, Times, Reader’s Digest এর পাতাগুলির মধ্যে মুখগুঁজে আনন্দের সাথে সময় অতিবাহিত করতেন। ছুটির দিনগুলিতে আড্ডার জন্য আমরা প্রায় তার ঘরে যেতাম। কিন্তু কোনদিনই সাড়ে এগার/বারটার আগে যেতাম না। কারণ তার সময়ের হিসেবটা সবারই জানা। অনিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা করলেও প্রতিটি পরীক্ষায় সে বেশ ভালভাবেই উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী শ্রেণীতে উন্নীত হতেন। তাই শিক্ষকরা বলতেন, ’ছেলেটির মাথা ভাল।’ ইংরাজীতে ভাল করলেও অঙ্কে সে ভীষণ কাঁচা। অঙ্ককে তার ভীষণ ভয়। মাঝে মাঝে তিনি হেসে বলতেন, ’অঙ্কের মত বিশ্রী বিষয় আর নাই।’ সত্যিই তো, আমাদের হিসেবমত যার জীবনের চাকা ঘুরতো না, অঙ্ক তার ভাল লাগতে পারে না।

    তার মুখেই শুনেছি যখন তিনি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়েন তখন বিড়ি দিয়ে তার নেশা শুরু। সে বিড়ি আজকের সিগারেট-মার্কা বিড়ি নয়—  রীতিমত তন্ডু পাতার বিড়ি। ধীরে ধীরে তার নেশার মান বিড়ি ছেড়ে উন্নতমানের বিদেশী সিগারেট হয়ে আধুনিকতম নেশার রাস্তা ধরে। ছোটবেলায় লুকিয়ে-সুকিয়ে নেশা করলেও বড় হয়ে প্রকাশ্যেই সিগারেট টানতেন। তবে বাবা-চাচাদের সমীহ করতেন। তাঁদের দেখে হাতটা লুকোতেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ দেবার পর Broun রঙের Passing Show সিগারেটের গোল টিনন, একটা সিগারেট লাইটার, Time, News Week ও Reader’s Digest ও পার্স হাতে সদ্য ভাঁজভাঙ্গা পাঞ্জাবি-পায়জামা গায়ে দিয়ে বাবু রুহুলানু সন্ধার পর সুগন্ধি ছড়াতে ছড়াতে ঈশ্বরদীর ওভার ব্রিজ পার হয়ে যখন রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের দিকে আসতেন, তখন তাকে দেখে মনে হত এমন সুখি মানুষ বোধহয় পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর একজন নাই। সঙ্গে থাকতেন অপুভাই। হরিহর আত্মা। সত্যি তার মত সুখি মানুষ আজ পৃথিবীতে আছে কিনা সন্দেহ হয়।

    ও হ্যা, তার দৈনন্দিন রুটিনের কথা থেকে দূরে সরে এসেছি। আগেই জেনেছেন বেলা এগারটায় তার দিনের শুরু। সন্ধ্যা আটটার মধ্যে ‘লাঞ্চ’ খেয়ে, গায়ে প্রচুর পরিমানে বিদেশী সুগন্ধি মেখে তিনি ক্লাবের দিকে রওনা দিতেন। সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী অপু ভাই থাকতেন। ক্লাবে আড্ডা চলতো বেশ রাত পর্যন্ত। বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তার মা’কেই দরজা খুলে দেবার জন্য রাত জেগে বসে থাকতে হত। তার রাশভারী বাবা মা’কে বকাবকি করতেন, ’তোমার জন্যেই ছেলেটি গোল্লায় গেল।’ বিয়ের পর সে কাজটির দায়িত্ব স্ত্রী তুলে নেয়। দরজা খুলে দিয়ে মা বা স্ত্রী’র আর কোন কাজ থাকতো না। বিছানায় গিয়ে তারা তন্দ্রার কোলে আশ্রয় নেন। রুহুলানু তখন জমিদার পুত্রের মত আরাম-আয়েশে, ধীরে-সুস্হে তার কাজে লিপ্ত হয়ে পরতেন। ঋতুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঘড়ির কাঁটা ধরে শেভ করবেন। স্নান সমাপনান্তে রাত দু’টো থেকে তিনটের মধ্যে সন্ধ্যার ‘ডিনার’ পর্ব সমাপ্ত করে বিছানার কোলে নিজেকে সমর্পন করবেন। পরদিন এগারোটার আগে তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুও তার সাক্ষাত পেতেন না।

    আমার একান্ত ঘনিষ্ঠ রুহুলানুর জীবনযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ, তার প্রতিটি কথা আমি গভীর মনোযোগের সাথে দেখতাম, শুনতাম। তিনি আমার তিন ক্লাস এবং অপু ভাই চার ক্লাস ওপরে পড়তেন। কিন্তু তারা উভয়েই আমাদের সহপাঠী সমবয়সী বন্ধুর মতই ব্যবহার করতেন। তিনি ছিলেন নাটক পাগল। নায়ক, ভিলেন কিংবা জোকার, সব চরিত্রেই তার দক্ষতা তাকে এ অঞ্চলের শীর্ষ স্হানে পৌঁছে দিয়েছিল। তার অভিনয় গুণই হিন্দু ললনাকে তার হাত ধরে নিজের বাড়ি ছেড়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু তিনি কখনও পরিচালকের দায়িত্ব নেন নি। পরিচালক ছিলেন অপু ভাই। এই দু’জন আমাদের মত নিচু ক্লাসের সংস্কৃতিমনা ছাত্রদের একত্র করে ঈশ্বরদীর সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এভারেষ্ট শৃঙ্গে তুলেছিলেন। ছোটদের যার মধ্যে যে গুণ ছিল, তারা বাতাস দিয়ে তার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

    কমলাকান্তের মত রুহুলানুও কিছু লিখতেন। ডায়েরি বলতে যা বোঝায়, ঠিকক সে ধরনের লেখা নয়। তার মনে যে বিষয়টা দাগ কাটতো, তাই নিয়েই লিখতেন। নিজে থাকতেন এত গুছিয়ে-বাবুয়ানা জীবনযাপন করতেন। কিন্তু তার ঘরটা ছিল সাংঘাতিক অগোছাল। মশারির দড়িগুলি না খুলে পা দু’টি বের করে দিয়ে তারপর সমস্ত শরীরটা গলিয়ে বেরিয়ে আসতেন। দিনের পর দিন মশারি এভাবে পাতাই থাকতো। ঢোকার সময় সামান্য একটু উঁচু করে ঢুকে পরতেন। কোনদিন যদি আমরা গিয়ে উপস্হিত হতাম, তখন তাড়াতাড়ি সামনের দু’পাশের দড়ি খুলে মশারিটা দেয়ালের দিকে ঠেলে দিতেন। বিছানার চাদর দিয়ে তোষকটা ঢাকার চেষ্টা করতেন। আমরা ‘থাক’ ‘থাক’ বলে ওই বিছানায় বসে পরতাম। কারণ তার পড়ার টেবিলের সামনে একখানা হাতলওয়ালা চেয়ার ছাড়া দ্বিতীয় আর কোন বসার কিছু ছিল না। টেবিলটা তথৈবচ। বই, পত্রিকা, কাগজপত্র এমনভাবে ছডিয়ে থাকতো যে তার মধ্যে থেকে কোন লেখা খুঁজে বের করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। দু’চারটা লেখা আমাদের পডিয়ে শুনিয়েছেন। লেখার কনটেন্টের চাইতে তার পড়ার ঢংটা ছিল মজার। আমরা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেতাম। বলতাম,’একটা বাঁধানো খাতায় লিখলেই তো পারেন? লেখাগুলি হারাবে না।’ হেঁসে বলতেন,’ হু! এগুলো কি হবে? অন্যে পড়ার জন্য লিখি না। ইচ্ছা হল লিখি। তার আবার যত্ন!’ আমরা কিছু লেখা চুরি করে এনেছি। সেগুলি সযত্নে দীর্ঘদিন কাছে রেখেছি। স্বাধীনতার পর তিনি নিয়মিত লেখেন। লেখার বিষয়-আশয় কোন ঠিকঠাক  ছিল না। রাজনীতি, সমাজনীতি, বুদ্ধিজীবী, লেখাপড়া, রাষ্ট্র-এহেন বিষয় নেই, তিনি লেখেন না। স্বাধীনতার পর ঢাকায় তার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল। ঢাকার ক’টি ছবিতে তিনি মৃত সৈনিকের অভিনয় করেছিলেন। ১৯৯৭ সালে ভেড়ামারা কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগ কমিটির সদস্য হিসেবে যেতে হয়েছিল। ভেড়ামারার প্রাসাদসম গেস্ট হাউজে আমার থাকার ব্যবস্হা হয়েছিল। সেটা তৈরি হয়েছিল আইয়ুব খানের জন্য। তিনি ষাটের দশকে গঙ্গা কপোতাক্ষ প্রকল্প ভিজিটে গিয়ে ক’ঘন্টা সেখানে ছিলেন। আমি সেই খাটে একটা রাত কাটিয়েছলাম। রুহুলানু স্হানীয় শিল্পীদের নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত গানবাজনার আয়োজন করেছিলেন। আমরা আবার ১৯৫০ এর দশকে ফিরে গিয়েছিলাম। তিনি গাইলেন বৈজু বাওরার দরবারি কানাড়া রাগে ‘ও দুনিয়া কো রাখওয়ালে।’ দরবারি কানাড়া তার প্রিয় রাগ। ১৯৫৬ সালে ইনস্টিটিউটে বৈজু বাওরার সব গান নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন।

    আমার দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে তিনি মাত্র দু’বার রাজশাহী এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি যে কাজ নিয়ে এসেছিলেন, সহজেই সকালের ট্রেনে এসে দুপুরের ট্রেনে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনের কথা আপনারা শুনেছেন। বেলা এগারটার আগে তার সকাল হয় না। তাই দুপুরের ট্রেনে এসে শহরে কোন হোটেলে উঠে আমাকে একটা ফোন করেন। পরদিনের আমার প্রোগ্রাম জেনে নিয়ে সময় মত আসেন। আসার উদ্দেশ্য মোটামুটি দু’বারই এক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে, যার কোন শত্রু থাকতে পারে কেউ ভাবতেই পারে না, তাকেও পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। স্ত্রী হিন্দু, এক সময় ডাকসাইটে অভিনেত্রী ছিলেন এবং রুহুলানু নিজেও নাটকের লোক, এ সবই ইসলাম বিরোধী কাজ। রাজনৈতিক ইসলামপন্হীরা ছিল তার ওপর ভীষণ চটা। বিশেষ করে পরহেজগার মা-বাবার জৈষ্ঠ সন্তান।’ ধম্মো-কম্মো করবে না তো সারাদিন-রাত কেবল নাটক নাটক করে বেড়াবে?’ ‘খাঁটি’ মুসলমানের রাগ তো হবারই কথা। তাই মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি পুরিয়ে দিয়েছিল। রুহুলানুর পর্ণকুটিরও ভস্মিভূত হয়। সেইসঙ্গে তাবৎ অস্থাবর শখের দ্রব্যাদি আগুনের গহ্বরে চলে যায়। পাকিস্তান আমলে তিনি গৌতম বুদ্ধের একটি পাথরের মুর্তি কিনেছিলেন সাত শ’ টাকায়। অসাধারণ সৌন্দর্যমণ্ডিত সে মুর্তি। আমরা চেয়ে দেখতাম আর মনে মনে তার অসাধারণ উঁচু রুচির তারিফ করতাম। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম মুর্তিটি কিনতে সাতশ’ টাকা তিনি কোথায় পেলেন? ‘ও জোগার হয়ে গেল’ স্বভাবগত হাসি হেসে বললেন। পরে বৌদির মুখে শুনেছিলাম তার ভরি চারেক সোনার গহনা বিক্রি করে তিনি ওটা কিনেছিলেন। ’তুমি দিলে?’-জিজ্ঞেস করলে হেসে বলেন, ’কি করবো ভাই! ওটা পছন্দ হবার পর প্রতিদিন অন্তত দশবার সেটা না-পাওয়ার দুঃখ প্রকাশ করতেন। একেবারেই ছেলেমানুষের মত।’ সেটাও একাত্তরে হারিয়ে যায়। এমনি আরো কত কি? কিন্তু সব কিছু হারাবার ব্যথা এক সময় ভুলে গেলেও যে জিনিসটি হারানোর শোক তাঁকে স্বধীনতার পর থেকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরাচ্ছে, তাহল তার ‘এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা’। আজও তিনি তার জন্য হা-পিত্যেশ করছেন। সেই মহামূল্যবান জিনিসটি পুনরায় পাবার জন্য গত পঁচিশ-ত্রিশ বছর চেষ্টা-চরিত্রির পর আমার পরামর্শের জন্য তার আসা।
    ‘ তুমি তো কাগজে লেখ-টেখ। আমাকে একট এনসাইক্লোপেডিয়া জোগাড করে দিতে পারবে না? ‘
    কিছুক্ষণ হা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলি,’আমি?’
    ‘হ্যা, তুমি।’
    ‘ কিভাবে?’-জিজ্ঞেস করি।
    ‘তোমার লেখার মাধ্যমে ধনী দেশগুলোর সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পার। তাদের জানাতে পার জিনিসটা খোয়া যাওয়ায় বাংলাদেশের একজন অখ্যাত লোক মৃত্যুর মুখামুখি।’
    আমি অবাক হয় বলি,’ কিন্তু আমি তো বাংলায় লিখি।’
    ‘আমি ইংরাজিতে অনুবাদ করবো।’ সহাস্যে বললেন।
    কথায় কথায় জানা গেল দেশ স্বাধীন হবার পর ইউরোপের অনেক দেশের সরকার প্রধান, আমেরিকার প্রেসিডন্ট ও মধ্যপ্রাচ্যের শেখদের চিঠি দিয়েছেন। অনুরোধ করেছেন তারা ইচ্ছা করলে এই গরীবের জন্য এক সেট encyclopaedia কিনে দিতে পারেন সহজেই। কুয়েতসহ ইউরোপের দু’একটি দেশ থেকে তিনি চিঠিও পেয়েছেন। সবার এক কথা কোন ব্যক্তিকে ওটা তারা দেয় না। কোন সংগঠনের মাধ্যমে দরখাস্ত পাঠাতে বলেছে। সে চেষ্টাও করেছেন রুহুলানু। পাবলিক লাইব্রেরির নামে প্যাড ছাপিয়ে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত সাড়া দেয় নি। তিনি সেসব দেশ থেকে আসা চিঠিগুলি দেখালেন।
    ‘আর ক’দিন বাঁচবো! মৃত্যুর আগে যদি একসেট encyclopaedia পেতাম,তাহলে শান্তিতে মরতে পারতাম।’ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন রুহুলানু। আমি অবাক হয়ে পাগলের মুখের দিকে চেয়ে রই। হাসবো না কাঁদবো? সেটা ১৯৯৭ সালের কথা।

    দু’বছর পর তিনি দ্বিতীয়বার এলেন ওই একই কাজে। তার চরিত্র মাফিক কোন হোটেলে উঠে ফোনে জেনে নিলেন কখন আসবেন। পরদিন সময় মত এলেন। বসলেন। পাশের টেবিলের ওপর তার News Week ও সিগারেট লাইটার রাখলেন।
    আমি জিজ্ঞেস করি ‘আপনার পার্স?’
    হেসে বলে উঠলেন,’ ওটা গাড়িতে ফেলে এসেছি।’ যেন কিছুই হয়নি।
    ‘কত ছিল?’
    ‘ সামান্যই। একরাত ও একদিনে যা খরচ হয়।’
    ‘আপনি হোটেলে উঠলেন; ভাড়া দিতে হবে না?’
    কোন কথা না বলে তিনি আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলেন। একরাত ও একদিনের হোটেলের বিল। সেইসঙ্গে আমার কাছে এক বিনম্র অনুরোধ ৩২০ টাকা আমি তাকে ধার দিতে পারবো কিনা! ফিরে গিয়েই মানি অর্ডারযোগে পাঠিয়ে দেবেন। আমি তাকে ৫০০ টাকার একটি নোট এগিয়ে দিলে তিনি বলে উঠলেন,’ এতো কি হবে?’
    ‘আপনি রাখেন’ আমি বলি।

    আর কোন কথা নয়। সুন্দর করে ভাঁজ করে পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে দিলেন। তারপর encyclopaedia’র কথা।
    আমি বলি,’ দেখুন,আমার পক্ষে তো তা সম্ভব নয়। আমিও আপনার মতই একজন ছাপোষা মানুষ। আমারও সেই স্কুল জীবন থেকেই encyclopaedia কেনার ইচ্ছা ছিল। মানুষের সব ইচ্ছা কি পূরণ হয়? আপনি নিজেই তো আর একসেট কিনতে পারেন।’
    ‘আমি?’ হো হো করে হেসে উঠলেন,’ তুমি হাঁসালে! পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে আমি কিনবো encyclopaedia ?’ বলে ক্যালিফোর্নিয়ার থেকে জনৈক মহিলার চিঠি বের করে দিলেন। দেখি তিনি ক্যাবিনেটসহ  encyclopaedia’র জন্য একশ’ ডলার দাম চেয়েছেন।

    তখন আমি বলি, ‘ভাই, প্রযুক্তির উন্নয়নে অনেক জিনিস উধাও হয়ে গেছে। কম্পিউটারের যুগে encyclopaedia ‘র আর সে মূল্য নাই। আপনি encyclopaedia’র থেকে অনেক বেশি তথ্য পাচ্ছেন।’
    ‘তুমি যা-ই বল, encyclopaedia’র কোন বিকল্প হয় না।’ বললেন রুহুলানু।
    আমি বলি ’আপনার অনেক বন্ধু বাংলাদেশ হবার পর কোটিপতি হয়েছে। তারা কেউ আপনার এই দুঃখ দূর করতে পারেন না?’
    ‘তারা যদি নিজে কিনে আমাকে উপহার দেয়, আমার বলার কিছু নাই। কিন্তু আমি চাইতে জানি না। তাছাড়া, তারা encyclopaedia’র কী বোঝে? তারা আছে তাদের সম্পদ বৃদ্ধির ধান্দায়। আচ্ছা বলতে পার, মানুষের কত টাকার দরকার?’
    বলি,’ তার জবাব তো টলস্টয় দিয়ে গেছেন।’
    ‘ ও, হ্যা, হ্যা, তাঁর সেই বিখ্যাত গল্পটির কথা বলছো? How Much Land a Man Required? দারুণ গল্প, তাই না?’ তিনি বলে চলেন, ‘সোভিয়েত বিপ্লবের পর মস্কো থেকে ৯০ খণ্ডে তাঁর সম্পূর্ণ রচনা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মুদ্রিত বই-এর সংখ্যা দশ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন জাতির ৮২টি ভাষা ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়েছে। এমনি একজন লেখক নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রদানকারীদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেল কি করে, বুঝি না। এমনি একজন লেখক এক অখ্যাত রেলওয়ে স্টেশনে মরে পড়ে থাকলেন, কেউ দেখার নাই, ভাবা যায়? যাই বল, আমরা যতই গর্ব করি লেখাপডা, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শনের, পৃথিবী কখনই এঁদের দ্বারা শাসিত হয়নি। প্লেটো স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন দার্শনিকরা পৃথিবী শাসন করবে। তাঁর সে স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেছে।’

    রুহুলানু যখন এ রকম কথা বলে, তখন তাঁর চেহারায় দার্শনিকের গাম্ভীর্য, বিজ্ঞানীর অনুসন্ধিৎসা, আর সাহিত্যিকের সৃজনশীলতার এক মোহময় স্বপ্নীল আলো ফুটে ওঠে। তখন তাকে প্রশ্ন করে বাধা না দিয়ে পরবর্তী কথার জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয়। তিনি বলে চলেন, ‘‘তুমি তো সক্রেটিসের জবানবন্দি পডেছো। সমগ্র এথেন্সে একজন জ্ঞানীলোকের খোঁজে দীর্ঘ অভিযানের শেষে সারমেয়রের নামে শপথ করেই বলেছিলেন ’আমার এই অভিযানের ফল এই যে আমি দেখলাম যারা জ্ঞানী বলে খ্যাত, তাঁরাই সবচেয়ে অজ্ঞ বই আর কিছু নয়। অন্যদিকে, যারা কম জ্ঞানী বলে পরিচিত, তাঁরাই বরং অনেক উত্তম এবং সত্যিকারভাবে জ্ঞানী। আমার মনে হয় সক্রেটিস শেষ সত্য কথাটিই বলে গেছেন। কই, আজও স্থায়ীভাবে কোন জ্ঞানীলোকের শাসন কায়েম হল না। এই সত্য উচ্চারণের জন্যই সেদিন এথেন্সের শাসক ও অন্তঃসারশুন্য জ্ঞানপাপীদের বিচারে তাঁর প্রাণদণ্ড
    হয়েছিল। তাঁর কাছে জিজ্ঞাসাশুন্য জীবন অর্থহীন বৈ কিছু নয়।’ তাইতো তাঁর আসন্ন মৃত্যুশোকাচ্ছন্ন কাতর বন্ধুদের প্রতি সহাস্যে বলতে পেরেছিলেন, ‘তোমরা কাঁদছো কেন? আমি এমন এক রাজ্যে যাচ্ছি, মৃত্যুর রাজ্য, যেখানে প্রশ্ন করার অপরাধে কেউ কাউকে হত্যা করে না।’ বলেছিলেন,’মৃত্যুর পরে তো মরণ নেই। মৃত্যুকে পার হয়ে আমি অমর হয়ে যাব।’
    কী অসাধারণ ভবিষ্যতদ্রষ্টা? তাই না? ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৃত্যুর পর থেকে তিনি আজও আমাদের কাছে কেবল জীবন্তই নন, তাঁকে ভাঙ্গিয়ে আমরা আজও জ্ঞানী-পণ্ডিত বলে পরিচিত হচ্ছি।
    সত্যি কথা বলতে কি ১৯৫০ দশকে আমি প্লেটোর ডায়ালগ পড়েছিলাম। তেমন কিছু মনে থাকার কথা নয়।’’

    কিন্ত রুহুলানু কথা প্রসঙ্গে স্বচ্ছতার সাথে সক্রেটিসের জবানবন্দি সম্পর্কে টানা বলে গেলেন। এই হচ্ছে রুহুলানু। কেউ তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা বললে তিনি আড়ষ্ট হয়ে পড়েন, সংকুচিত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেন। বলেন,’ না না, আমি তো একজন মুর্খ মানুষ।

    সেদিন রুহুলানু তার encyclopaedia ফিরে পাবার কোন আশা নিয়ে যেতে পারেননি। ফিরে গিয়েই ফেরত ডাকে ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর বেশ কিছুদিন তার কোন খোঁজখবর পাইনি। নানা কাজে আমিও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। ছোট্ট এক মফস্বল শহরে তিনি থাকেন। স্হানীয় সবাই তাকে চেনেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বাজারের প্রত্যেক দোকানদার, প্রতিটি রিক্সাওয়ালা, পোস্ট-অফিসের পিওন তো বটেই। তাই তার নাম ও শহরের নাম লিখে দিলে চিঠিটা ঠিক তার বাড়িতে পৌঁছুবে। সেখানে গিয়ে যেকোন রিক্সায় উঠে তার নাম বললেই সোজা নিয়ে যাবে। চিঠি লিখবো ভেবেছি। হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে একদিন সন্ধায় আবার ফোনে ভেসে এল রুহুলানুর কন্ঠ। প্রথামত appointment করে বাসায় হাজির। হাতে পলিথিন ব্যাগ। একটু অবাকই হলাম। এভাবে আসা তার স্বভাব দুরস্ত নয়। ঘেমে গেছেন। জোরে ফ্যানটা চালিয়ে দিলাম। আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে বসে যেন হাঁফ ছেডে বাঁচলেন। ক্লান্ত দেখলাম তাকে।
    জিজ্ঞেস করি,’শরীর ভাল তো?’ ঘাড় নেডে জানাল সুস্হ।
    আবার জিজ্ঞেস করি’ পার্স ট্রেনে ফেলে আসেন নি তো?’

    হো, হো করে হেঁসে উঠলেন। দেখি হাতে Time, Gold Flake সিগারেট, সিগারেট লাইটার ও পার্স। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। মনে হল নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছু সময় নিলেন। বৌদি ও ছেলেমেয়ের খবরাখবর নেবার পর তিনি পলিথিন ব্যাগ থেকে একটা সীলগালা করা প্যাকেট বের করলেন এবং বললেন, ’কিছু মনে করো না, তোমার জন্য আমার সারা জীবনের সন্চয় নিয়ে এলাম।’ আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
    বললেন,’ দেখ, বয়স তো হয়ে গেল। বন্ধুরা সব একে একে এ জগতের পালা শেষ করে বিদায় নিতে শুরু করেছে। আমি পাইপ-লাইনে আছি। তাই ভাবলাম এগুলো কাকে দেয়া যায় যে এর মর্যাদা বুঝবে। সবদিক চিন্তা করে তোমাকে দেব বলে নিয়ে এলাম।’
    আমি অবাক হলাম; সেইসাথে গর্বিত।

    তিনি বললেন, ‘একাত্তরে এগুলো বুকে করেই পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এখন দুঃখ হয় encyclopaedia টাও যদি নিয়ে যেতাম।’
    আমি বলি, ’ওগুলো তো অনেক ভারি হত।’
    ‘তাই ওগুলো চলে গেছে। এগুলো হারাতে দি নি। বুকের সঙ্গে আঁকডে রেখেছিলাম। তুমি এগুলো রাখ। ঠিক ডায়েরি নয়। আমার চিন্তার এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিছু হয়নি। তবু নিয়ে এলাম। তোমার ভাষা দিয়ে যদি পার শুদ্ধ করে নিও। তবে একটা কথা আমার মৃত্যুর পর এগুলো বের করবে।’ বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
    ‘আমি আজ যাই। বাস ধরবো।’
    আমি বলি, ’তা কি করে হয়? খাওয়া-দাওয়া করে যাবেন।’
    ‘না, না, তুমি তো জান আমি এ সময় কিছু খাই না।’

    ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বেলা বারটা। মানে তিনি হোটেল থেকে এগারোটায় নাস্তা করেই বেরিয়েছেন। এখন তারে কিছুই খাওয়ানো যাবে না। তিনি চলে গেলেন। দরজার কাছে আমার হাতটা ধরে বললেন ’কিছু মনে করো না। আবার দেখা হবে।’ উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তার মধ্যেও তার গলাটা যেন জডিয়ে এলো। তিনি নেমে গেলেন। তারজন্য নিচে দণ্ডায়মান রিক্সায় উঠে হাত নেড়ে বিদায় জানালেন। আমি তার অপসৃয়মান রিক্সার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।

    রিক্সা চোখের আড়ালে চলে গেল। আমি সিলগালা করা প্যাকেটটার দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। মনে অন্তহীন প্রশ্ন আর অনুসন্ধিৎসা।” কী আছে এর ভিতর?”

    রুহুলানু ৮৪ বছরে আজও বেঁচে আছেন। অতি যত্নে প্যাকেটটা রেখেছি।

  • আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

    আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

    • আরিফ রেজা মাহমুদ
      পার্থ প্রতীম দাস

    ভূমিকা: আগস্ট বিদ্রোহ। আদতে শরতে অসুর বধ। অন্যায্য অগণতান্ত্রিক ‘জরুরী আইনের’ বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধের নতুন পর্ব। এই আন্দোলনের খুবই নতুন এবং ভিন্ন স্বর শোনা গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মতিহারের আঙ্গিনায় ‘অহিংস অসহযোগ’ নামে রচিত হয়েছিল কর্তৃত্ব অমান্য করার দৃষ্টান্ত। এ রিয়েল সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স । রাষ্ট্রের কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাকে পঙ্গু করে বিশ্বিবদ্যালয়ে মুক্তাঞ্চল কায়েমের দৃষ্টিকল্পই ছিল আন্দোলনের মূলমন্ত্র। কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন জরুরি অবস্থায় সংগঠিত হলেও, আদতে এটা শিক্ষার্থী সমাজের জন্য সবসময়ই একটি দিশা। আগস্ট বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭/০৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন, তার দৃষ্টিকল্প, সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক আরিফ রেজা মাহমুদ ও পার্থ প্রতীম দাসের এই আলাপচারিতাটি ছাপা হয়, ওঙ্কারের  মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব সংখ্যায়।

    আর্টওয়ার্ক: পোরিশ স্টেট
    শিল্পী: আলেন ব্রেটম্যান
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    প্রশ্ন: সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সংগঠিত হলো, তাকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব  নামে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

    উত্তর: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন বলতে আমি বুঝি, বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করার আন্দোলন, মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের আন্দোলন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা মাফিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, তা প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনও মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, বিশ্বজনীন জ্ঞান সৃজন ও চর্চার ক্ষেত্র। মনুষ্য জীবনের উৎকর্ষ সাধন কিংবা মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য জ্ঞান উৎপাদন ও তার চর্চা সমাজে প্রবাহমান রাখার উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার অংশ। কিন্তু সৃজনের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সৃজন হতে পারে না। স্বাধীনতাহীনতায় চর্চিত জ্ঞান বড়জোর ‘দক্ষ’ উৎপাদন করতে পারে, জ্ঞানী নয়। যে সমাজে সৃজন রুদ্ধ, সে সমাজে জ্ঞানও রুদ্ধ। ফলে স্বাধীনতাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত নিশ্চল বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণ, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণারই অংশ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করতে একে রাষ্ট্র-কর্পোরেট-সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত রাখা এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলনই মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন।

    মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অবারিত। কোনো সীমারেখা দ্বারা একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। কাজেই মুক্তি মানেই তা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তির ক্ষেত্রেও একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব না। সুতরাং মুক্তির জন্য আন্দোলন একটি চলমার প্রক্রিয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি-কাল-পর্বকে চিহ্নিত করা সম্ভব। কখনো কখনো প্রয়োজনীয়ও হয়ে পড়ে।

    বাংলাদেশে বর্তমানে একটি বিশেষ পরিস্থিতি জারি আছে। সরকারি ভাষায় একে ‘জরুরী অবস্থা’ নামে ডাকা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই ‘জরুরী অবস্থা’ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শাসন-যন্ত্রকে কর্পোরেট বিকাশের অনুকূল করে তোলার প্রচেষ্টা। কর্পোরেট বিকাশের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি প্রয়োজন, তা নির্মাণ করা। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটা গণজনতন্ত্র [People’s Republic] প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছিলাম। এই গণজনতন্ত্রের মাধ্যমে আমরা একটা নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন রাষ্ট্রের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রটা ছিলো উপনিবেশের গর্ভে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রযন্ত্ররই তদ্ভব রূপ মাত্র। ফলে তার পক্ষে ঐ সামাজিক চুক্তিকে ধারণ করা সম্ভব ছিল না। আবার পরবর্তীতে পনের বছরের সামরিকায়নে রাষ্ট্রযন্ত্র আরো কর্তৃত্বশীল, আরো গণবিচ্ছিন্ন হয়েছে। ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরেও এর কতৃত্বশীলচেহারা খুব একটা পাল্টায়নি। সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র রূপে তা বহাল থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক কায়দায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পারিক কর্তৃত্ব পরম্পরার যে ছেদ সৃষ্টি হয় তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘কর্তৃত্বের লড়াই’ হিসেবে মূর্ত হয়ে ওঠে। এই ‘জরুরী অবস্থা’ মূলত উপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় খোল-নলচেগুলোকে পাল্টে কর্পোরেট স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ঢেলে সাজানো’র জন্যই হাজির হয়েছে। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসে সুবিধাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল-গোষ্ঠী-পক্ষগুলোকে সাইজ করতে এবং কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র-বিরোধী গণমুখী আন্দোলনকে দমন করতে  রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সংস্থাগুলোর বিশেষভাবে তৎপর হয়ে পড়া এই ‘জরুরী অবস্থা’র অবধারিত অনুসঙ্গ। আবার কপোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের মতাদর্শিক হাতল হিসেবে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিক ‘জরুরী অবস্থা’র পক্ষে প্রচার-প্রচারণা উৎপাদন জারি রেখেছে। ফলে সামগ্রিক সমাজটাই চিন্তাভাবনার দিক থেকে অনুর্বর ও কর্পোরেট কর্তৃত্ব-অনুগামী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের সামনে দৃশ্যমান।

    এই পরিস্থিতিতে সমাজের অন্যান্য অংশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়কেও নিপাট ভাষাহীন, প্রতিবাদরুদ্ধ করে ফেলার প্রয়োজন পড়েছে। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বাগে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাক্যাম্প পর্যন্ত স্থাপন করেছে, যা অতীতে কখনোই সংঘটিত হয়নি। ফলে ‘জরুরী অবস্থা’য় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিস্থিতি কায়েম হয় তার মাত্রাগুলো স্পষ্টভাবে চেনা সম্ভব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে এই ‘জরুরী অবস্থা’য় অত্যন্ত জরুরিভাবে প্রতিবাদের-প্রতিরোধের কর্তব্য এসে হাজির হয়। এই কর্তব্য আন্দোলনের রূপ নেয় এবং এই আন্দোলনই জরুরি পর্বের আন্দোলন বলে আমি মনে করি।

    প্রশ্ন: ৭৩’এর অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করে কেমন করে?

    উত্তর: আচ্ছা। ৭৩’এর অধ্যাদেশে স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ এমনি এমনি হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমাজে গণমুখী বিনির্মাণের যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এদেশের মানুষ লালন করেছিল তারই জোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনেও লেগেছিল। আর এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৃঢ় জনমতের সামনে স্বায়ত্তশাসন কথাটা উচ্চারণ না করে ৭৩’এর অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। আর এই স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কয়েকটা জায়গায় স্বাধীনতাও এনে দিয়েছিল বটে। ৭৩’এর যে স্বায়ত্তশাসন, তা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার জন্য অধস্তন আইন  [বিধিবিধান] প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। আবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা আলোচনা-সমালোচনারও সুযোগ দিয়েছে। এসনকি রাষ্ট্র সম্পর্কেও অনুরূপ একটা অবস্থান নেবার স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আছে। কিন্তু গত চৌত্রিশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-স্বীকৃত এই স্বায়ত্তশাসনটুকুও রক্ষিত হয়নি। রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। স্বায়ত্তশাসন পরিণত হয়েছে আয়ত্তশাসনে। কিন্তু আপনার প্রশ্নের আগে, রাষ্ট্র-রাজনীতির শুঁড় কিংবা রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে কায়েম হয় কেন—এই জবাব দেয়া জরুরি।

    প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র হচ্ছে ক্ষমতা সংস্থাপনের যন্ত্র। এই সংস্থাপিত ক্ষমতা কীভাবে এবং কতোটা প্রয়োগ করা যাবে—তা লেখা থাকে সংবিধানে। কিন্তু বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির সংবিধান কোনো গ্রাম-সমবায় তথা পিপলস ফেডারেশনের সমন্বয়ের মাধ্যমে, তাদের জনমতের ভিত্তিতে রচিত হয়নি। এই সংবিধান রচিত হয়েছে উকিলদের দ্বারা। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংসদের হাতে। কিন্তু সংসদ মানেই তো সংবিধান মোতাবেক পার্টিজান ‘জনপ্রতিনিধি’। ফলে সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রটাই পার্টি-কর্তৃত্বের অধীন। রাষ্ট্রের চরিত্র পার্টিক্র্যাটিক। ফলে এটাকে পার্টিস্টেট বলাটা ভুল হবে না। পার্টিমাত্রই তার ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণি-গোষ্ঠী-দল থাকে। ফলে তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতাই জেতার জন্য-ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করবার জন্য দরকার হয় সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্টি-কর্তৃত্বের আওতায় আনা। চলতি ভাষায় একেই বলে দলীয়করণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ থেকে রেহায় পায় না। আবার ক্ষমতা মতাদর্শিক স্তম্ভ রচনার জন্যও প্রয়োজন হয় বিশ্ববিদ্যালকে ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত করা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় যতোই স্বাধীনতা শব্দটা থাক না কেন, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর তাই ৭৩’এর অধ্যাদেশেও ফাঁকফোকর থাকে। আর তা দিয়ে ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের শুঁড়। এ থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে, রাষ্ট্রের কাঠামোতে পার্টি-কর্তৃত্ব ছাড়া কোন অংশীদারিত্বমূলক পদ্ধতি নাই। আর এটাই হলো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত হওয়ার বর্তমানের বাস্তবিক কারণ।

    এখন আপনার প্রশ্নে আসি। কীভাবে রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন কায়েম হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের যেতে হবে ৭৩’এর অধ্যাদেশে। এই অধ্যাদেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যমূলক দিক উল্লেখ করা যাক।

    এক. বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ হয় রাষ্ট্রপতি দ্বারা।
    দুই. বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে  ক্রমকর্তৃতন্ত্র।
    তিন. সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকা। এখন এই বিষয়গুলোকে সূত্রবদ্ধ করলেই উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। বলাই বাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এই নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই তো একজন পার্টিজান। আর তাই উপাচার্য হতে গেলে পার্টিজান হতে হবে। এ কারণেই দেখা যায় যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বদলে যায়। আবার উপাচার্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কী দৃশ্যমান, কী অদৃশ্যমান, কী চিন্তনীয়, কী অচিন্তনীয় তাবৎ কিছুর মালিক তিনি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট-একাডেমিক কাউন্সিল সকল কিছুতেই তার আধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবৎ নিয়োগ কমিটি, পদোন্নতি-কমিটির মালিক তিনি। এমনকি নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরর তিনিই নির্ধারণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোষাধ‌্যক্ষ-রেজিস্ট্রার-প্রক্টর-প্রভোস্ট- ছাত্র উপদেষ্টা ইত্যাদি প্রশাসনিক পদে তিনিই শিক্ষকদের নিয়োগ দেন। ফলে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা-বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক। সুতরাং উপাচার্য ‘কট’ হলেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ‘কট’। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের শুঁড় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করে না, শুঁড়ের পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্ষমতার হালুয়া-রুটিও পাস হয়’ অর্থাৎ বরাদ্দ, ফান্ড, মালপানির মামলা আর কি। ফলে প্রশাসনের যে কোনো গদিতে বসতে পারলে ঐ মালপানির হিস্যা পাওয়া যায়। আর এ কারণেই গদিতে বসার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। উপাচার্যের নেক নজরে পড়লেই যেহেতু তা নিশ্চিত হবে সুতরাং উপাচার্যের মতোই অন্য শিক্ষকরাও শুরু করে দলবাজি। ‘বেনীআসহকলা’ নামের দলগুলি আসলে এক একটা পার্টির লেজমাত্র এবং এই দলগুলোর নামে চলতে থাকে শিক্ষক সমিতির ভোটাভুটি। কার কত শক্তি, কার কত ভোট, কে কত ইমপর্টেন্ট ইত্যাদির হিসাব নিকাশ। উপাচার্য এখান থেকেই তার অনুগত ভৃত্যদের বাছাই করেন। নিয়োগ, পদোন্নতি প্রভৃতির জন্যও শিক্ষকরা তার মুখাপেক্ষী। শিক্ষক সমিতি মানে শিক্ষকদের অধিকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিন্তার কোনো সংগঠন নয়। এটা পরিণত হয়েছে দলবাজির কারখানায়। এখানকার কর্মকর্তারা হচ্ছেন আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদের ক্যান্ডিডেট। শিক্ষক সমিতির কর্মকর্তারা নিজেরাই এর মাধ্যমে নিজেদেরক পদপার্থী তথা পদলেহী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করেন। এ তো গেলো শিক্ষক রাজনীতির কথা। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি? ছাত্রদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সবই কোনো না কোনো পার্টির লেজ। লেজুড়বৃত্তির সূত্রে তারা কোনো না কোনো পার্টির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বড়জোর নিজ নিজ পার্টি এজেন্ডা বা মতাদর্শ বাস্তবায়ন করতে চাইতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত বা ইচ্ছার সাথে এগুলোর সম্পর্ক নাই। উপরন্তু দাপুটে ক্ষমতার মাৎসন্যায় নীতির ধারকবাহক ছাত্র সংগঠনগুলো হল দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই ইত্যাদিতেই ব্যস্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ত্তশাসন কায়েমের ক্ষেত্রে তারা হচ্ছে প্রধান ক্ষত্রশক্তি। উপাচার্য যে দলের, ক্যাম্পাসে সেই দলের ছাত্র সংগঠনেরই কর্তৃত্ব। কেননা প্রশাসন হচ্ছে সেই ছাত্র সংগঠনের পাহারাদার। আর এই ছাত্র সংগঠনগুলো হচ্ছে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের লাঠি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্ব বলবৎ হয় মূলত উপাচার্যের চরম ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার অনুসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি দ্বারা।

    প্রশ্ন: রাষ্ট্রের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্পোরেট ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথাও বলেছেন আপনি। এটা কিভাবে কায়েম হয়?

    উত্তর: মুক্তবাজার অর্থনীতি বলে যে প্রত্যয়টি চালু আছে তার প্রকৃত মানে হচ্ছে বাজারের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। জগতের সবকিছুকেই বাজারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বাজার কর্তৃত্বের  বর্তমান রূপটি হচ্ছে কর্পোরেট একচেটিয়া। কর্পোরটের স্বার্থে সমাজকে একটি উন্নতমানের ভোক্তা শ্রেণীতে রূপান্তর করা এই বাজার যুগের প্রধান সাংস্কৃতিক প্রবণতা। ফলে বাজারের চিন্তা-বাজারের মতাদর্শ-বাজারের সংস্কৃতি উৎপাদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে হাতল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সিলেবাসের মধ্যে ক্লাসিক্যাল যুগের জ্ঞানকাণ্ড চর্চার যে আবহ তৈরি হয়ে আছে তা প্রতিস্থাপন করে একেবারে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে উন্নতমানের এক্সিকিউটিভ উৎপাদনের জন্য যে ধরনের জ্ঞানকাণ্ডের প্রয়োজন সেই ধরনের জ্ঞান চর্চার প্রবাহ তৈরির তৎপরতা চলছে। আবার মুনাফামুখিন কর্পোরেট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ছাঁচে গড়া সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রচার-প্রচারণা নেহাত কম নয়। ফলে পুঁজিবাদ যা শিল্পমূল্যকে বাজারমূল্যে রূপান্তর করতে চায়- মানবিক রুচিশীলতাকে বাজার রুচিশীলতায় রূপান্তর করতে চায়, তার বিশেষ তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সমাজ ‘খাদক সমাজে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন ধরে চর্চিত মুক্তিমুখিন সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক একুশ-পহেলা বৈশাখ-স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয়ের চেতনা- এ সবকিছু ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কর্পোরেট বিজ্ঞাপন-স্পন্সরশিপ আর তার লোভ দেখানো সুযোগ-সুবিধার তোড়ে এসব সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার খুবই ভিন্ন মানে উৎপাদন করা হচ্ছে। যেমন স্বাধীনতা বলতে আপনি কত কম খরচে এবং কত বেশি দিনের ব্যবধানে বাংলালিংক কর্পোরেট মোবাইল কোম্পানির সিমটি রিচার্জ করতে পারবেন, তা বোঝানো হচ্ছে। ভাষার স্বাধীনতা বলতে সিটিসেল ফোনে পারস্পরিক, আগের থেকে বেশি এসএমএসপাঠানোর সুবিধাকে বোঝানো হচ্ছে। ফলে স্বাধীনতা সংজ্ঞায়িত হচ্ছে কর্পোরেট দ্বারা, কর্পোরেট স্বার্থানুসারে। কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র একচেটিয়া অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠান-জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রি ও বাজার সম্পর্ক কায়েম ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য-আগ্রাসন চালাচ্ছে।

    রশ্ন: রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কেও জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাঠামো দাঁড়িয়েছে তার সাথে আগস্ট বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক আছে কী?

    উত্তর: হ্যাঁ, তা তো আছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক । এটা আমি আগেই বলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটাও সেই আদলেই তৈরি হয়েছে। গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে কাঠামোগতভাবে যুক্ত থাকতে পারেন। কিন্তু তারাও রাষ্ট্র-রাজনীতি কর্তৃক নিযুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত উপাচার্যের তল্পিবাহক। আবার সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান যেমন সিনেট, সিন্ডিকেট,  কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ছাত্র সংসদ), বিভাগীয় সমিতি ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু কিছু পরিমাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে এর একটিতেও শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নেই, এগুলো নিস্ক্রিয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই স্থগিত। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোনো প্রকার সুযোগ অনুপস্থিত, প্রশাসনের গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক তাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, যে সিদ্ধান্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৈরি করেন সেটাই যেন সকলের ভাগ্য। আরও লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এত কেন্দ্রীভূত হওয়া সত্ত্বেও এর জবাবদিহিতার জন্য কোনো কাঠামো নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র নিরঙ্কুশভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল। এই পরিস্থিতিতে যদি রাষ্ট্রীয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর আন্দোলন মানেই সংগঠিত হওয়া। কিন্তু ‘জরুরী অবস্থা’য় অধ্যাদেশ জারি করে এই সংগঠিত হওয়া, সংগঠন করা তথা মিছিল-সমাবেশ-প্রতিবাদ ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত একদিকে রাষ্ট্রের অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় আরো তীব্র মাত্রা যোগ করে। সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় যেন নিপাট ভাষাহীন-প্রতিবাদহীন, রাষ্ট্রের অনুগত-গৃহপালিত একটা জিনিস হিসেবে হাজির থাকে তার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। দু-একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ‘জরুরী অবস্থার’ সুযোগ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন সেশন চার্জ ৫৬১ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৩৪০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। ‘জরুরী অবস্থার’ দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য সভা, সংস্কৃতি সভা, গান-নাটক, এমনকি দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা সভা, সেমিনার বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৭-এর ভয়াবহ বন্যার সময় প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাণ সংগ্রহ তৎপরতা বন্ধ করে দেয়। এসব নিয়ে শিক্ষার্থীরা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে, উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের অবহিত করেও কোনো প্রতিকার পায়নি। অথচ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রশাসনের পাহারায় হলে হলে ‘শিবিরের আইন’ মানতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেছে। এই চিত্র কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। আবার অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি ও তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের অবাধ মেলামেশা, পোশাক পরিচ্ছেদ ইত্যাদি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ, কটূক্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন দাপুটে ক্ষমতার নগ্ন রূপকেই প্রতিপন্ন করে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুমোটের মধ্যে গুমরে মরছিল। ফলে তাদের মনে ক্রমাগত ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সমাজের অন্যান্য অংশ, যারা আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার চরম নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার, তাদের মনেও দানা বেঁধেছিল। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, বস্তি উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদ এগুলো হচ্ছে এই নির্যাতন-নিপীড়নের নমুনা। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে যখন সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং সেনাসদস্য কর্তৃক বিশ্ববিদ্যায়ের মধ্যে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তখন শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা থাকে না। স্ফূলিঙ্গ থেকে নিমিশেই তখন দাবানল তৈরি হয়। এই বিক্ষোভ যেহেতু আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, কাজেই সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত অংশও এতে যোগ দেয়। ফলে মোট কথা হচ্ছে যে: ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে, সর্বাত্মক-স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলে মানুষ তার অস্তিত্ব তথা স্বাধীনতা রক্ষার্থেই প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে প্রতিরোধের আকর হিসেবে প্রথমত কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

    প্রশ্ন : আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভের পরে প্রতিবাদ কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরে আবার এত বড় একটি ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়ে গেল। এর শুরুটা কেমন ছিল?

    উত্তর: আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফুর্ত এবং এর কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। ফলে ২২ শে আগস্ট বিক্ষোভ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত কেঁপে যায়। ফলে রাষ্ট্র আরও সহিংস ও নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেট্রোপলিটন শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। কারফিউ জারি করে দেশটাকে একটা জেলখানা বানিয়ে ফেলা হয়। সেই সময় বিশেষভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে পেলে তাদের উপর নির্বিচারে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআর-র‌্যাব প্রভৃতি ‘আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী’র অমানুষিক-বিভৎস নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসে। এমনকি রাষ্ট্র তার অনুগামী বন্ধুত্বপরায়ণ মিডিয়াকেও চরম কর্তৃত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। টিভি চ্যানেলগুলোর সকল প্রকার টক্-শো বন্ধ করে দেয়া হয়। সেল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে সামগ্রিক নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাস্তায় সেনাবাহিনীর যুদ্ধংদেহী তৎপরতা দেখা যায়। পরিস্থিতিটা একেবারেই রুদ্ধশ্বাসের। আর এরকম একটি পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কাঠামোহীন স্বতঃস্ফুর্ত বিক্ষোভ চলতে পারা প্রায় অসম্ভব। আবার দু-তিন দিন পর এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি অল্পবিস্তর শিথিল হলেও শুধুমাত্র সাংগঠনিক কাঠামোর অভাবে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই তীব্রমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যায়নি। আপনার বক্তব্য সঠিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়সহ অপরাপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা শুরু হলে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। পরিস্থিতি বদলে কেমন করে পরবর্তী সময়ে এত বড় একটা ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হলো তা আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা বলতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর পর শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের ভয়, আশঙ্কা এবং ক্ষোভ মিশ্রিত একটা অবস্থা দেখা যাচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে অন্যায়ভাবে আটককৃত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষমতাতাড়িত মিডিয়ার নিরন্তর প্রচারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ…ই মুক্তি পাচ্ছেন- শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হওয়াকে অনেকটাই বিলম্বিত করে ফেলে। কিন্তু এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিম্ন আদালতের রায়ে দণ্ড দেয়া হয়। রায়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর কিংবা সহিংসতায় মদদ প্রদানের অভিযোগ মিথ্যা বলে স্বীকার করা হয়। শুধুমাত্র মৌন মিছিল করে ‘জরুরী বিধিমালা’ ভঙ্গ করার ‘অপরাধে’ তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের এমন অবস্থায় দেখে আবেগী হয়ে ওঠে। তাদের মূল্যবোধ, বিবেক তাদেরকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। যে শিক্ষকদের শাস্তি দেয়া হয় তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পূর্ব থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ফলে ঐ শিক্ষকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মুক্তির জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। বিপুল পরিমানে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি চাপের মধ্যেও তারা স্বাক্ষর সংগ্রহ, স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন প্রভৃতি তৎপরতা চালাতে থাকে। এসব তৎপরতার  সময় তারা কৌশলগত কারণে এমন ধরনের কর্মসূচিগুলোই হাতে নেয় যা ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের তৎপরতার মাত্রাটাও বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মুক্ত চিন্তা ও চর্চার একটা প্রবাহের সাথে আগে থেকেই যুক্ত। ক্ষমতা-রাষ্ট্র-রাজনীতি-মতাদর্শ-কর্পোরেট মিডিয়া প্রভৃতি বিষয়ে চিন্তা ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এই বিভাগে গড়ে উঠেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের তৎপরতার মাত্রাটা ছিল বেশি। শিক্ষকদের মুক্তি দাবি করে একসাথে ৮০/৯০ জন শিক্ষার্থী উপাচার্যের কাছে বিভাগের প্রায় সকল শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সস্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই একসাথে হেঁটে উপাচার্যের কাছে যাওয়া প্রকৃতপক্ষে একটি প্রতিকী মৌন মিছিল রচনা করে। যা ঐ সময়ে ছিল খুবই সাহসী পদক্ষেপ। আবার এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা অঘোষিতভাবে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে ক্লাস বর্জন করে। এভাবে ক্লাস বর্জন সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এই আশঙ্কায় রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্বিগ্ন হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ক্লাস বর্জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযাগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তারা আল্টিমেটাম দিয়ে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট শিক্ষার্থীদের মাঝে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেগ অনুভূতি ও তৎপরতা এবং শিক্ষকদের উচ্চ নৈতিকতার প্রতি সারাদেশের মানুষের সমর্থন ও মানসিক লিপ্ততা তীব্রভাবে যুক্ত ছিল। ফলে এই পরিস্থিতিতে সরকার বেশ চাপের মুখে পড়ে এবং গণদাবির মুখে ২০০৭ এর ১০ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তি দেয়। গণদাবির সামনে নতজানু হয়ে রাষ্ট্র শিক্ষকদের মুক্তি দিলেও তাদের মুক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ‘সাধারণ ক্ষমা’র আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রের এই ‘সাধারণ ক্ষমা’ অনেকটা ‘রেললাইনে বডি দেব, মাথা দেব না’ নীতির পরিচায়ক। রাষ্ট্রের এই নীতি স্পষ্টভাবে তাকে উলঙ্গ করেছে, রাষ্ট্র যে ঘায়েল হয়েছে, তার শরীরেই ঘা খেয়েছে, তা প্রমাণিত। শিক্ষকদের মুক্তি পর্যন্ত এই আন্দোলনই পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বৃহৎ আন্দোলনের পাটাতন হিসেবে কাজ করে।

    প্রশ্ন: আপনি আন্দোলনের এই পর্যায়ে শুধু বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের কথাই বললেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র সংগঠনগুলো আছে তাদের কি কোনো তৎপরতা ছিল না?

    উত্তর: না, তাদের কোনো তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান হয়নি। আর আমার মনে হয় ‘জরুরী অবস্থা’ জারি হওয়ার পর মাৎস্যন্যায় নীতিতে বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর মতো নৈতিকশক্তি ছিল না। অপরদিকে এই ‘জরুরী অবস্থাতেই’ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো সাংগঠনিক দিক থেকে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। এছাড়া চিন্তা ও চর্চার অর্থাৎ পরিস্থিতি বোঝার স্বকীয় কোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখানকার বর্তমান বাম নেতৃত্বের নেই বললেই চলে। কিন্তু একেবারে ভেতরে ভেতরে কিংবা খুবই ঘরোয়াভাবে কোনো তৎপরতা ছিল কিনা তা ঐ ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন। আমার জানা নেই।

    প্রশ্ন: শিক্ষকদের মুক্তির এই আন্দোলনের পরে ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আহ্বানে অনেক বেশি সংগঠিত ও তীব্র একটা আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখলাম আমরা। এই মঞ্চটা গড়ে উঠল কেমন করে?

    উত্তর: আচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কিছুদিনের মধ্যেই মামলার শিকার শিক্ষার্থীরা আদালতে ‘আত্মসমর্পণ’ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তির পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির প্রশ্নটি মুখ্য হয়ে ওঠে। এই সময়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট, একাউন্টিং ইত্যাদি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে একমত হয়। এইসব বিভাগের সচেতন শিক্ষার্থীরা এক বৈঠকে এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে। বৈঠকে প্ল্যাটফর্মের নামের বিষয়ে কথা উঠলে বিভিন্ন নাম প্রস্তাবিত হয়। নামগুলো কোনোটি বিমূর্ত, কোনোটি রাজনৈতিক দলীয় লেজুড়বৃত্তির অসচেতন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বাতিল হয়ে যায়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছোট কাগজ কর্মী বাধন অধিকারীর প্রস্তাবনা ঈষৎ সংশোধন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ নামটি গৃহীত হয়। অতঃপর সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলা পার করে এর একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করা হয়। সমন্বয় পরিষদ ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ১৯ সদস্য বিশিষ্ট। পরে তা বর্ধিত হয়ে ২৬ সদস্য বিশিষ্ট হয়। এই সমন্বয় পরিষদ গঠনের পরে সংবাদ সম্মেলন করে ১০ই জানুয়ারী সংগঠনের আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করা হয়। বলে রাখা ভালো, সমন্বয় পরিষদ গঠনের একটা অন্যতম কারণ ছিল নিজেদের দ্বারা সংগঠিত কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করা। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ২০০৭ এর ২১ শে আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কিছু মুক্তিমুখীন সক্রিয়ক-মত সংগঠক-বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী-সাংস্কৃতিক কর্মী স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রতিবাদে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের উপর হামলা রুখে দাঁড়াও/ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না” উচ্চারণকে ব্যানারে লিখে মৌন মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে। এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চিন্তাসমৃদ্ধ এবং লক্ষ্য অভিমুখী। কিন্তু ২২ শে আগস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরোষের কারণে বিপুল পরিমাণ সহিংসতা ঘটে। এটা চিন্তা সমৃদ্ধ ও লক্ষ্য অভিমুখী সংগঠিত প্রতিবাদ ছিল না। কিন্তু ২২ তারিখে সহিংসতায় অংশ না নিলেও ২১ তারিখের প্রতিবাদে অংশ নেয়া ৪ শিক্ষক ও বেশ কিছু শিক্ষার্থীর ঘাড়ে এই সহিংসতার দায়ভার চাপানো হয়। তাই এখান থেকে আমাদের এটাই শিক্ষা হয় যে, আমরা যা করব তা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব নিয়েই করব। অন্যদের কার্যক্রমের দায়দায়িত্ব আমরা নেব না। ফলে এরকম পরিস্থিতিতে সেই দায়দায়িত্ব গ্রহণের অবস্থান থেকেই সমন্বয় পরিষদ তৈরি হয়।

    প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদ গঠনে সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলার কথা বললেন। সেটা কী?

    উত্তর: প্রশ্নটি খুব স্পর্শকাতর। কেননা এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলব তা সংকীর্ণ মনোভাবাপন্নদের খোঁচা মারামারির মতো কোনো ঘটনা হয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। উত্তরটিকে আমি যথা সম্ভব এ থেকে দূরবর্তী কোনো অবস্থানে নিয়ে দিতে চাই। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো কিছু একটা করতে চায়- আমাদের এমনটা মনে হয়েছিল। আবার সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানের জোট সভাপতি নোবেল ভাই এ বিষয়ে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন। ফলে আমাদের মঞ্চ গঠনের সভায় আমরা তাকে আমন্ত্রণ জানাই। সভায় তিনি এবং উদিচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্র ইউনিয়ন রাবি শাখার সদ্য বিদায়ী কার্যকরী সভাপতি প্রশান্ত কুমার মন্ডল আসছেন বলে আমরা জানতে পারি। সভা শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যে তারা সভায় যোগ দেন। ছাত্র ইউনিয়নের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক প্রমথেশ শীল সভাস্থলের পাশে থাকায় তাকেও আমরা সভায় যোগ দেবার কথা বলি। তার কাজ আছে বলে তিনি সভায় বসেননি। এরপরে সভায় মঞ্চের নাম ঠিক করা হয় এবং বন্দী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা, যে সংবাদ সম্মেলন করবেন তা তদারকির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার দায়িত্ব প্রশান্ত গ্রহণ করেন। আর অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র অসীম। সংবাদ সম্মেলনের জন্য মনোনীত স্থান হিসেবে রাজশাহী প্রেস ক্লাবকে নির্ধারণ করার কারণে আমি প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সভায় সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার সময় শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাগুলো উচ্চারণ  যেন কোনোমতেই না করা হয় সে বিষয়ে প্রশান্তকে সভা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। কেননা সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাটার স্বেচ্ছা উচ্চারণ সামগ্রিক ছাত্র আন্দোলনের বুকে ছুরি মারার শামিল। কিন্তু প্রশান্ত এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেননি। সংবাদ সম্মেলনে কারাবন্দী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। অভিভাবকরা সন্তানের মুক্তির জন্য খুবই আবেগী ছিলেন। এই আবেগঘন অবস্থায় তাদের সামনে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা তারা ঐ সময়ে নিঃশঙ্কচে পাঠ করে ফেলেন। দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন, ছাত্র আন্দোলনের ন্যায্যতার পরিপন্থী। আবার মঞ্চের সিদ্ধান্তকে সবগুলো পক্ষের সাথে আলোচনা না করে ‘এডভোকেট বলেছেন’ উছিলায় পাল্টে ফেলা স্বেচ্ছাচারের শামিল এবং তা মঞ্চের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে যায়। অঙ্কুরেই যে মঞ্চের কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়েছে তা কি আদৌ কোনোভাবে আগামীতে কার্যকর হতে পারবে?-এমন একটা শঙ্কা আমাদের অনেকের মনেই জেগেছিল। এমন সময় প্রমথেশ শীল আমাদের মঞ্চের দু-এক জন কর্মীর সামনেই বেশ দাম্ভিকভাবেই ঘোষণা করেন “আমি ঢাকা থেকে যে মিশন নিয়ে এসেছি, তাতে সফল হয়েছি।” মিশনের অর্থ বুঝতে আমাদেরও বাকি থাকে না। ফলে আমরা আরো দৃঢ় ও সতর্ক হয়ে উঠি এবং একেবারেই কাছাকাছি থাকা আন্তরিক কর্মীদের সমন্বয়ে একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেই। ঘোষণায় মঞ্চের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অবস্থান খুবই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়।

    প্রশ্ন: তাহলে এটা কী একটা ষড়যন্ত্র?

    উত্তর: না, বিষয়টিকে আমি একজন ব্যক্তির কিংবা ব্যক্তি যে সংগঠনের সাথে যুক্ত তাদের সংগঠিত একটা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে পছন্দ করব না। বরং এটা হচ্ছে পার্টি ঘরানায় চর্চিত সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। সেখানে যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে এটা মূলত তারই সংকট। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের দোষ না। এ ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চায় আন্দোলনকে ‘নিয়ন্ত্রণের’ একটা ইচ্ছা ও আচরণ গড়ে ওঠে। এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিজ হাতে রাখার জন্য অন্যান্য পক্ষগুলোর সাথে কখনও কখনও বিবাদে জড়িয়ে পড়া, নির্বিচার প্রচারণা চালান পার্টি ঘরানায় সাধারণ একটা ব্যাপার। ফলে এটাকে ষড়যন্ত্র নয় বরং পার্টি সংস্কৃতি বলেই চিহ্নিত করা যায়।

    প্রশ্ন: আপনাদের এই মঞ্চটার নাম কর্তৃত্ব -বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  দিলেন কেন? কর্তৃত্ব বিরোধিতা বলতে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন?

    উত্তর: সমাজ একটা শব্দের বিভিন্ন অর্থ চর্চা করে থাকে। ফলে কখনো কখনো শুধুমাত্র অর্থ চর্চার ভিন্নতার কারণেই শব্দ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আবার একই ধারণা বা অর্থকে ভিন্ন নামে বা প্রতীকে চিহ্নিত করার কারণে বিতর্ক থাকে। কর্তৃত্ব শব্দটিকে নিয়ে এমন ধরনের বিতর্ক অনেকের মধ্যেই আছে। তাই যে ধারণাটিকে আমরা কর্তৃত্ব শব্দ দ্বারা মূর্ত করতে  চেয়েছি সেই ধারণাটিকে প্রকাশ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কর্তৃত্ব মানে কর্তাগিরি। কর্তৃত্ব হচ্ছে সহজ কথায় শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সাধিত হওয়া। অর্থাৎ যখন কর্তার খেয়াল খুশি মোতাবেক কাজ করা হয়- যাতে অন্য কারো কিছু বলার বা করার থাকে না তখন তাকে কর্তৃত্ব বলা হয়। সুতরাং কর্তা হওয়া এবং অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর বা সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা দেয়াই হচ্ছে কর্তৃত্ব। কিন্তু এই মাফিক কর্তা কে? কোনো ব্যক্তির বাইরের শক্তি যা ঐ ব্যক্তির ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই ব্যক্তির উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। সুতরাং কর্তৃত্ব হচ্ছে একটা সম্পর্ক যেখানে কর্তা ও উদ্দিষ্ট থাকে এবং কর্তা উদ্দিষ্টের উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। কর্তৃত্ব বলতে আমি শক্তিমানের বলপ্রয়োগ কেই বুঝি। আবার কর্তৃত্বের সাথে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক আছে। কর্তৃত্ব যদি ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ সাপেক্ষ হয় অর্থাৎ চুক্তির বাঁধনে বাঁধা পড়ে এবং চুক্তির উপর ছদ্ম-সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই আমরা তাকে ক্ষমতা বলতে পারি। সুতরাং ক্ষমতা নিজেও হচ্ছে এক ধরনের সম্পর্ক। ক্ষমতা সম্পর্ক হচ্ছে ‘বল প্রয়োগের স্বীকৃত’ ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ যা ছদ্ম-সম্মতির দ্বারা ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হয় এবং সামাজিক সম্পর্কের যুথবদ্ধতার সূত্রকে ভেঙ্গে কর্তৃত্ব কায়েম করে। এই কর্তৃত্ব আরোপন যখন একমুখী হয়ে পড়ে তখন তাকে বলা হয় অসম ক্ষমতা সম্পর্ক। এই অসম ক্ষমতা সম্পর্ক মূর্ত হয়ে ওঠে প্রধানত চারটি বিষয়ের মাধ্যমে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে

    ১. ভূমির অসম মালিকানা,
    ২. শ্রমের উদ্বৃত্ত শোষণ,
    ৩.  দেহগত বা লেঙ্গিক আধিপত্য,
    ৪. ভাষা-সংস্কৃতি-জ্ঞানগত আধিপত্য।

    কর্তৃত্বের এই প্রধন চতুর্মূর্তিই সকল প্রকার শোষণশাসন ও আধিপত্যের জড়। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতা বলতে আমি এই  শোষণশাসন ও আধিপত্যের বিরোধিতা এবং এগুলোকে সমাজ থেকে চিরতরে উচ্ছেদের জন্য তৎপরতা চালানকেই বুঝি। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়। এই চিন্তা ও ধারণাকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মঞ্চের নাম দিই কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ।

    প্রশ্ন: আপনি অসম ক্ষমতা সম্পর্কের যে চারটি দিকের কথা বললেন, তা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র তো একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তাহলে আপনি কি রাষ্ট্রেরও বিরোধী?

    উত্তর: এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে ভুল বোঝার অবকাশ থাকবে। তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য আমাকে আগে দেশ ও রাষ্ট্র এ দুটো ধারণাকে আলাদা করে নিতে হবে। কেননা আমাদের এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও দেশ ও রাষ্ট্র বলতে একই জিনিস বোঝেন। প্রকৃতপক্ষে দেশ ও রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। দেশ বলতে আমি চিরচেনা প্রতিবেশের মধ্যে স্বাধীনতা ও সংহতি চর্চার  যে বৃহত্তর ক্ষেত্র গড়ে ওঠে, তাকে বুঝি। লোপামুদ্রার গানে “আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক” কিংবা “মন যতদূর চাইছে যেতে ঠিক ততদূর আমার দেশ”-এই উচ্চারণ আমার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন যোগায়। অপরদিকে রাষ্ট্র হচ্ছে শাসনের তথা ক্ষমতা-কর্তৃত্ব-আধিপত্যের একটা সংস্থা-কেন্দ্রীয় সংস্থা। সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া, সিদ্ধান্ত দেয়া অর্থাৎ সকল বিষয়ে নাক গলানোর এবং মাতবরির ক্ষমতাধারী একটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রকে একটা ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতার অস্তিত্বের শর্ত হচ্ছে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ। ফলে অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কী পরিমান ক্ষমতা, কখন, কেন এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে তা চুক্তি তথা সংবিধানে লিখিত থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোটি চরমভাবে ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক এবং এটি বিশাল আমলাতান্ত্রিক বপুসমৃদ্ধে জিনিস। ফলে এটি খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক সুরতালছন্দে নড়াচড়া করে। এ কারণে সংবিধান বা চুক্তিপত্রের সৃজনশীল প্রয়োগ তার পক্ষে সম্ভব হয় না। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। কোনো এক আইনে লেখা ছিল: ঘোড়া চুরি করলে শাস্তি  ভোগ করতে হবে। কিন্তু কোনো চোর ঘোড়া নয়, ঘোড়ার বাচ্চা চুরি করলে তাকে বেকসুরখালাস দেয়া হয়। কেননা আইন ও তার ভাষার পাঠ উদ্ধার এবং সেই মাফিক তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা সৃজনশীল থাকতে পারেন না। আবার রাষ্ট্র যখন নিজকে পিপলস রিপাবলিক  বলে পরিচয় দেয় তখন রাষ্ট্রক্ষমতা চালনার জন্য জনগণের প্রতিনিধি দরকার হয়ে পড়ে। এই প্রতিনিধিদের ঐক্যের জন্য মতাদর্শও দরকারি হয়ে পড়ে। আর মতাদর্শের চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় পার্টির। এই পার্টি হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে হাইফেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কেন্দ্র-কর্তৃত্ব এবং তার কাঠামোগত সেটিং এর কারণেই জনপ্রতিনিধিরা হয়ে পড়েন ‘ব্লাঙ্ক চেক প্রাপ্ত’। সিদ্ধান্ত গ্রহণ  প্রক্রিয়ায় জনগণের সম্মতি বলতে স্রেফ ঐ মতাদর্শ। ফলে প্রকৃত অর্থে তার কাজ ঘলো সিদ্ধান্তকে ‘ইয়েস’ অথবা ‘নো’ বলা। কখনও কখনও সেটার সুযোগও থাকে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রকে আমি কোনোভাবেই জনগণের প্রতিষ্ঠান বলতে পারি না। তার ক্ষমতাকেও আমার জন্য বৈধতা দেয়ার কোনো কারণ নাই। আমার কোনো একটা লেখায় আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সেলিমঃরেজা নিউটনকে আমি উদ্ধৃত করেছিলাম। রাষ্ট্র সম্পর্কে আমার বিচার ঐ উদ্ধৃতিরই অনুগামী। সেই মাফিক রাষ্ট্রের যে ধারণা আমার কাছে দাঁড়িয়েছে: আধুনিক কালে রাষ্ট্র হচ্ছে এলিটদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ম্যানেজারিয়াল সিস্টেম। এলিটদের স্বার্থরক্ষাকারী সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার কমিটি হচ্ছে এই রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নামক এই কমিটির কাজ এলিটদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা, ছোটলোকদের শোষণ করে বড়লোকদের ধনসম্পদ পাহারা দেয়া, মৌলিক অর্থে ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণী-গোষ্ঠী-দল-শক্তিকে ধ্বংস করা ইত্যাদি। এলিটদের-শাসকশোষকদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ‘সমন্বয়’ সাধন করা এই কমিটির আরেকটা কাজ।‌‌‌‌‌‌ এই সব ফরজ কর্ম সম্পাদনের জন্য এই কমিটির হাতে থাকে আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিচার বিভাগ বা আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহ, উর্দি বিভাগ বা পুলিশ-সেনা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ মিডিয়া বা মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। সুতরাং সমাজ পরিচালনার জন্য এইরকম গণবিরোধী একটা প্রতিষ্ঠানের স্থলে রুডলফ রকারের মত আমি চাই ‘স্বাধীন সম্প্রদায়সমূহের একটি ফেডারেশন’। রকারের মতে, এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো পরস্পরের সাথে সাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের সূত্রে সম্পর্কিত থাকবে। নিজেদের কর্মকাণ্ডের বন্দোবস্ত করবে পারস্পরিক সম্মতি আর স্বাধীন চুক্তির মাধ্যমে। এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো প্রত্যেকেই স্ব-ব্যবস্থাপনা ও অংশীদারিত্বমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার নীতিতে বিশ্বাসী হবে। আর যার চিন্তাভাবনা বিচার-আচার এমন, আকাঙ্ক্ষা এমন, সে রাষ্ট্রবিরোধী না হয়ে পারে না। আমি কর্তৃত্ব-বিরোধিতার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্র বিরোধী।

    প্রশ্ন: এই আন্দোলনে যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে, কাছাকাছি একইরকম কর্মসূচি দিয়ে আগেও অনেক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। তাহলে এই আন্দোলনকে বিশেষভাবে ‘অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

    উত্তর: হ্যাঁ, কাছাকাছি কিন্তু হুবহু একই রকম কর্মসূচি এই আন্দোলনে পালিত হয়নি। মূলত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের যে সেন্টিমেন্ট সেই মাফিকই কর্মসূচিগুলা এক্ষেত্রে ঘোষিত ও পালিত হয়েছে। এখন প্রশ্নটা দাঁড়ায় কেন এটাকে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন বলা হল। রাষ্ট্র-রাজনীতির দমনপীড়ণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। যেমন, ২০০৪ সালের ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ এর ২২ শে আগস্ট’র মতো আরো কিছু ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়,যেখানে খুব বিশেষ মাত্রায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ দেখা যায়। এই ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে অংশ নিতে দেখা যায়। প্রতিরোধের এই ভাষা সংগঠিত নয় এবং স্রেফ বিশুদ্ধ গণরোষে ভরা। আবার অসংগঠিত বলেই পরবর্তী সময়ে তা প্রয়োজনমত প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণেই গণরোষের আসল কারণটা চাপা পড়ে যায়। ফলে তা সমর্থনও হারায়। আমরা এই সবকিছু থেকে সতর্ক থাকতে চেয়েছিলাম। সাধারণ শিক্ষার্থীপদর স্বতঃস্ফুর্ত ও বিপুল অংশগ্রহণ হলে সেখানে কোনো ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী যেন হঠাৎ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা ইত্যাকার সহিংসতার হুজুগ তুলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে এইজন্যই আমরা এই আন্দোলনকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন হিসবে সবার সামনে হাজির করি। যেন আন্দোলনের সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে পারে। এই আন্দোলনের এরকম নামকরণের আরো একটি কারণ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী যেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নিতে পারে, দ্বিধাগ্রস্থ না হয়। কেননা বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এধরনের কর্মসূচিতে আপামর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দেখিনি। আর যে প্রক্রিয়ায় এগুলো হয়ে থাকে তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত হবার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তাই আমরা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের  সময় এমন কর্মসূচিই ঠিক করেছিলাম যেন সবাই অংশ নিতে পারে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, জন-সম্পৃক্ততা। এজন্যই আমরা মানববন্ধন, গণর‌্যালি, দুই ঘন্টা স্বতঃস্ফুর্ত ক্লাস বর্জন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গণসংযোগে প্রচারপত্র ব্যবহার, আন্দোলনের চিন্তাধারা বোঝার জন্য মুক্ত আলোচনা ও গণসংলাপ  ইত্যাদি ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। এমনকি এবারের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক দিকটিও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। র‌্যালি, মানববন্ধন, সমাবেশ প্রভৃতি কর্মসূচিতে নতুন ধারার গণসঙ্গীত ছাড়াও প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার, ব্যঙ্গচিত্রসহ নানান ধরনের ডেমোনেস্রট্রশনে সৃজনশীলতার ছাপ দেখা যায়। পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোতে আমি এমনটা দেখিনি। ফলে এবারের এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন  সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন রূপ ধারণ করেছিল।

    প্রশ্ন: আন্দোলনে সাংগঠনিক কাঠামোটা কেমন ছিল, সিদ্ধন্তগ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল, কোনো সমস্যার জায়গা ছিল কিনা, থাকলে  সেটা কেমন?

    উত্তর: সংগঠন বলতে আমি বুঝি, একটি বিশেষ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তা বাস্তবায়নের জন্য কিছু মানুষের মধ্যে চিন্তা, সৃজন ও তৎপরতার সংহতি। পারস্পারিক যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতাই এই সংহতির প্রধান ভিত্তি। ফলে আমার ধারণায় এবং আমার মতো অনেকেরই ধারণামতে সংগঠন মানে তা ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্রমুক্ত একটা জিনিস। এই ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। সাধারণত পলিটিক্যাল পার্টি কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজের দায়িত্ব ভাগ করার নামে নানান ধরনের পদ তৈরি করা হয়। এই পদগুলোকে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাও দেয়া হয়। ফলে ক্ষমতার নির্দিষ্টতা অনুসারে উপরতলা-নিচতলা তৈরি হয়। সাধারণত উপরতলার প্রধান ব্যক্তিটি হন সভাপতি আর তারপর ক্রমঅনুসারে সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক প্রভৃতি পদ বিন্যস্ত থাকে। এখানকার সাধারণ সংস্কৃতি হচ্ছে: উপরতলার লোক নিচতলার লোককে হুকুম বা নির্দেশ দেবেন এবং নিচতলার লোক বিনা বাক্যব্যায়ে তা পালন করবেন। আর এটা করতে পারলেই নিচতলার লোক একদিন উপরতলায় যেতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে মূলত ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠানের গুটিকয়েক লোকের হাতে ন্যাস্ত হয়ে পড়ে। এবং এই গুটিকয়েক লোক সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন। ফলে ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র ক্ষমতার কেন্দ্রানুগতাকেই ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্র-কর্তৃত্বকে জায়েজ করার জন্য নানান ধরনের পলিটিক্যাল পার্টি ঘরানা থেকে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র আওয়াজ শোনা যায়। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ জিনিসটি একটি মিথ। গণতন্ত্র বলতে প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতি’র নিশ্চয়তাকে বোঝায়। কিন্তু কেন্দ্র মানেই অসম ক্ষমতা- অপরের উপর কর্তৃত্ব। আর সম্পর্ক যখন কর্তৃত্বমূলক তখন সেখানে সংহতি থাকতে পারে না। সংহতির নামে খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক একটা সম্পর্ক টিকে থাকে। ফলে গণতন্ত্র ও কেন্দ্র সমার্থক হতে পারে না। আর এসব চিন্তাকে মাথায় রেখেই আমরা কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ এই মঞ্চটিকে সম্পূর্ণরূপে ক্রমকর্তৃকতন্ত্রমুক্ত রাখতে চেয়েছি। এই জন্যই সমন্বয় পরিষদে কোনো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক- আহ্বায়ক ছিল না, প্রত্যেকেই সমান অধিকারসম্পন্ন সদস্য ছিলেন।

    প্রশ্ন: এই সমন্বয় পরিষদেরও তো তাহলে একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল…

    উত্তর: এই বিশেষ মন্তব্যটি করার আগে মঞ্চের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি বিবেচনায় রাখার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাব। সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের নানান ধরনের মতামত ও প্রস্তাব সংগ্রহ করা। অতঃপর সেই মতামত ও প্রস্তাবগুলোকে পর্যালোচনা করা, সাথে সাথে নিজেদের চিন্তা-মতামত প্রভৃতি উপস্থাপন করে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। এই কর্মপরিকল্পনা কোনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়- প্রস্তাব মাত্র। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সক্রিয়-আন্তরিক ও মত-সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের নিয়ে একটি সাধারণ বৈঠকে বসে প্রস্তাব আকারে এগুলো হাজির করা হত। সেখানে বিষয়টি সমর্থিত হলেই কেবল কর্মসূচি হিসেবে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের উদ্দেশ্যে সেটা হাজির করা হত। সকল কর্মসূচির ভিত্তিই ছিল স্বতঃস্ফুর্ততা। বলপ্রয়োগমূলকভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করা হত না। যেমন আন্দোলনের সময় দুই ঘন্টা ক্লাস বর্জন। আমরা এই কর্মসূচি পালনের জন্য শুধু প্রচার চালিয়েছি। কোনো ক্লাসরুমে উপস্থিত হয়ে ক্লাস বন্ধ করতে বলিনি। তবে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চাইছেন না কিন্তু শিক্ষক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ক্লাস করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন, শুধু এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে আমরা প্রতিরোধ গড়ব- এমন পরিকল্পনা আমাদের ছিল। কিন্তু তা প্রয়োগের প্রয়োজনই পড়েনি। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধন্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কোনো কেন্দ্রের হাতে বন্দী ছিল না। এটা একটা প্রবাহের মতো বিষয় হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সমন্বয় পরিষদ আলাদা কোনো বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করার মতো কাঠামোই ছিল না।

    প্রশ্ন: কিছু কিছু সময়ে দেখা যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবেও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়ে। সেক্ষেত্রে কী হতো?

    উত্তর: তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কী হবে সেইটা নিয়ে আমি নিজেই শঙ্কিত ছিলাম। কেননা হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা তো খুবই কঠিন। যদি সমন্বয় পরিষদ ছোট ছোট কিছু একটিভিস্ট গ্রুপের কিংবা ক্যাটালিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হতো এবং এদের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সমন্বয় পরিষদ গড়ে উঠত তাহলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কঠিন হত না। আর যেহেতু সাধারণ সভায় বেঁধে দেয়া গাইডলাইনের বাইরে সমন্বয় পরিষদের প্রতিনিধিরা কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না সেহেতু প্রতিনিধিরা ‘ব্ল্যাংক চেক প্রাপ্ত’ বা স্বৈচ্ছাচারী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো না। কিন্তু মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে এরকম একটিভিস্ট গ্রুপ না থাকলেও কতকগুলো পক্ষ ছিল। এই পক্ষগুলোর মধ্যে যারা সমন্বয় পরিষদে ছিলেন তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ দু-একজন করে মত-সংগঠকরা কোনো তাৎক্ষণিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে অন্য পক্ষের মত-সংগঠকদের সাথে আলোচনা করে নিজ নিজ পক্ষগুলোর সাথে কথা বলে নিতেন। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন হবে- এ বিষয়ে কোনো জমাট ধারণা আমার কিংবা মঞ্চের অন্য অনেক সদস্যেরই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এটা নির্ধারিত হবে এমন একটা ভাবনাই আমার ছিল এবং বর্তমানে আমার উপলব্ধি হচ্ছে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন (সমন্বয় পরিষদকে কতকগুলো একটিভিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তোলা) আনলেই এই ধরনের সমস্যাগুলো আমরা উত্তরণ করতে পারি।

    প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে তখন কী ভোটাভুটি হত?

    উত্তর: আমাদের আশপাশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হ্যাঁ অথবা না মতকে বোঝার সংস্কৃতি দাঁড় হয়েছে। আপনি যেটাকে ভোটাভুটি বললেন। এ ধরনের পদ্ধতির একটা বড় দুর্বলতা হলো, এটা বিতর্ককে এড়িয়ে যেতে চায়। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের সাথে একমত না হলেও সংখ্যালঘিষ্ঠকে অনুগত’র মতো তা বাস্তবায়ন করতে হয়। ঐ মতামত নিয়ে জনসংযোগের সময়ে যদি কোনো ব্যক্তি সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামতটির সাথে ঐক্যমত্য হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আর জনসংযোগকারী যদি হন সংখ্যালঘিষ্ঠ তবে তিনি খুব বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। এছাড়া যে মতের সাথে একজন একমত নয়, সেই মত বাস্তবায়ন করা তার জন্য মানসিক চাপ। এটা প্রায় একটা স্বাধীনতা হরণকারী প্রক্রিয়া। এজন্য মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে কোনো বিষয়ে একাধিক মত থাকলে তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে তা ফয়সালা করার চেষ্টা হতো। একটা বিষয়ের উপর ঘন্টা দুই-তিনেক আলাপ-আলোচনার নজির এই সমন্বয় পরিষদের ছিল। তীব্র তর্ক-বিতর্ক এখানে সংঘটিত হয়েছে। এর পরেও একমত না হতে পারলে উদ্ভুত সকল মতামত আন্দোলনকারীদের সাধারণ বৈঠকে উপস্থাপন করা হত। সাধারণ বৈঠকের মধ্যেও তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এর পরেও কোন কারণে ঐক্যমত্য না হলে ঐ বিশেষ ইস্যু বা কর্মসূচি পর্যন্ত যে কোনো সদস্য নিজের নাম প্রত্যাহার করতে পারতেন। এমনকি জনসম্মুখে ইস্যু বা কর্মসূচির ক্ষেত্রে ভিন্নমত প্রচারের ও সেই মাফিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ ছিল। এ প্রক্রিয়ায় এখানে সংগঠক-সক্রিয়কের স্বাধীনতা সংরক্ষিত ছিল। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে, যেমন, ক্লাস আওয়ারে মাইক ব্যবহার কিংবা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট (এই কর্মসূচি পালনের প্রয়োজন পড়ে নি, তার আগেই শিক্ষার্থীরা মুক্তি পেয়ে যায়।) এইসব সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি বিষয়ে দ্বিমত ছিল। কিন্তু ক্লাস বর্জন কর্মসূচি শুরু হলে এবং বৃহৎ সমাবেশে বক্তব্য পৌঁছোনোর জন্য মাইক ব্যবহার বিষয়ে দ্বিমতটি আর ছিল না। আর স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট কর্মসূচিটিতে দুই-তিন জন সমন্বয় পরিষদ সদস্য দ্বিমত  পোষণ করেছিলেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। সমন্বয় পরিষদের অন্য সদস্যরা তাদের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

    প্রশ্ন: কিন্তু কোনো ইস্যু বা কর্মসূচি নিয়ে দুই তিনটা মত প্রচার ও সেই মাফিক তৎপরতা চালালে মঞ্চের ভেতরে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না? আবার যখন মানুষ দেখবে যে একই ব্যানার নিয়ে দুই-তিন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে তখন কী বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে না?

    উত্তর: না, বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না। কেননা বৃহত্তর মূলনীতিতে লড়াইটা অনায্য কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ফলে একাধিক ধরনের কর্মসূচি শেষ বিচারে সমান্তরাল চাপই তৈরি করে। ফলে  সেখানেও একটি ঐক্য তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে একই নামের কিন্তু আলাদা মতের একাধিক ব্যানার থাকলে জনগণ যে মতটি সমর্থন করে সে তাতেই অংশ নেয়।

    ফলে নামের অন্ধ অনুসরণ নয় বরং মতামত ও বক্তব্যের ভিত্তিতে সমর্থন ও অংশগ্রহণ- এই বিষয়টিই এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু একটা নামকে-একটা ব্যানারকে অন্ধ অনুসরণ- মূলত এরকম কোনো অবস্থান থেকে বিভ্রান্তির সমস্যাটা দেখা দিতে পারে। একজন যদি এটা ঠিক করে ফেলে যে, তিনি সবসময়ই এই নামটাকে-এই ব্যানারটাকেই সমর্থন করবেন, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রথমত নাম-ব্যানারের অন্ধ প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং যাচাই বাছাই ছাড়াই নির্বিচারে ব্যানারের সিদ্ধান্ত মানতে থাকেন। ফলে তিনি বিভ্রান্ত হন। কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চ এরকম সমস্যার মধ্যে পড়েনি। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি অভিজ্ঞতার অবস্থান থেকে দিতে পারছি না। সাধারণ যুক্তি চর্চার অবস্থান থেকেই আমি এরকমভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করছি।

    প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর কয়েক দিন পরেই আমরা দেখলাম যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘোষণাকারী নির্যাতন বিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ নামে আরেকটি ব্যানার থেকে আন্দোলন শুরু করা হয়। আন্দোলনের সময় এই দুই মঞ্চের সম্পর্ক কেমন ছিল?

    উত্তর: প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো ২০০২ সালে শিবির-বিরোধী আন্দোলনের সময় নির্যাতনবিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করে। ঐ একই সময়ে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রী নির্যাতন, বুয়েটে সনি হত্যাকান্ড এসব কিছু মিলিয়ে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মঞ্চটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই আত্মপ্রকাশ করে। এই মঞ্চটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংগঠিত কোনো মঞ্চ নয়। মূলত বাম ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বারা সংগঠিত এবং কিছু সচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় ঐ সময়ে এ মঞ্চটি গড়ে উঠেছিল। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আন্দোলন সংগঠিত হলেও কখনোই এ মঞ্চের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় নি। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময়ে এই মঞ্চটি আবার দেখা যায়। এবার এই মঞ্চটি গঠন প্রক্রিয়ায় প্রধানত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন যুক্ত ছিল। তাদের দিক থেকে এরকম একটা মঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আমি কিছুটা অনুমান করতে পারি। ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করতে করতে শিক্ষার্থীদের থেকে অনেকখানি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবার রাজনৈতিক দলের অংশ হিসেবে দলের মতাদর্শকে তারা ধারণ করে। এই মতাদর্শ একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নাও ধারণ করতে পারে। তখন ঐ সাধারণ শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত হলেও স্রেফ ঐ মতাদর্শের কারণেই ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে একাত্মতা বোধ করে না। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে কলস পাল্টাতে হয়। ছাত্র সংগঠনগুলো কলস পাল্টে এরকম মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে। এসব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পেছনে সত্যিকারই আন্দোলনের স্পিরিটের চেয়ে, কিংবা কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ, পরবর্তীতে সংগঠন করান ইত্যাদি বিষয়ই মুখ্য হয়ে পড়ে। ফলে একটা সত্যিকারের আন্দোলন গড়ে ওঠা এবং তা থেকে প্রগতিশীল অর্জনগুলো সংঘটিত হয় না। আবার ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন বলেই এই মঞ্চগুলোরও কাজের ধাঁচ অনেকটা ছাত্র সংগঠনগুলোর মতোই কেন্দ্রমুখাপেক্ষী। সেজন্যই এখানকার বাস্তব অবস্থা বিচারের চোখ কিংবা বলতে পারি, যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার মধ্যে থাকলে বাস্তব অবস্থা বিচার করা যায় তা তাদের ছিল না। এখানে এই মঞ্চটি সংগঠিত করার পেছনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামানোর একটা প্রচেষ্টা ছিল। আর অপরদিকে আমাদের মূলনীতির জায়গাটি ছিল: নিয়ন্ত্রণ নয়, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। ফলে দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান এবং সাংগঠনিক সেটিং-এর কারণেই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এই মঞ্চটি গঠন করে। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের প্রধান ধারা হিসেবে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই আন্দোলনের প্রধান ধারার কর্মসূচির সাথে তারা একাত্মতা ঘোষণা করে এবং নিজেরা ছোটখাট দু-তিনটি কর্মসূচি পালন করে। তাদের এই কর্মসূচিগুলোতে আমরা সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে পারেনি। বরং সামগ্রিক আন্দোলনে কিছু অবদান রেখেছে। আবার ঐ মঞ্চটি দাঁড় হওয়ায় আন্দোলনের কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারার আলাদা পরিচয় স্পষ্ট হয়েছ।

    প্রশ্ন: আন্দোলনের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনাকে দেখা গেছে সমাবেশে, র‌্যালিতে বক্তব্য রাখতে, কর্মসূচি ঘোষণা করতে। এ থেকে অনেক শিক্ষার্থীরই হয়তো এমন ধারণা জন্মেছে যে, আপনি এই আন্দোলনের নেতা। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী? আন্দোলনের নেতৃত্বে বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আপনি?

    উত্তর: হ্যাঁ, এটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি সমাবেশে, র‌্যালিতে কিংবা মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতাম। এবং পরবর্তী দিনের কর্মসূচীও ঘোষণা করতাম। প্রচলিত সংস্কৃতিতে এরকম একটা ধারণা আছে যে, যিনি সমাবেশে বক্তৃতা করেন তিনিই নেতা এবং নেতাই সামগ্রিক আন্দোলনের ভাগ্য বিধাতা। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থীরই মনে হয়েছে যে, আমি এই আন্দোলনের নেতা। এই বিষয়টি আমাকেই সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত করে তোলে। আমি আন্দোলনের সময়ই এ বিষয়ে সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এবং অন্যদেরকে ক্রমানুসারে এই কাজটির দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাবও রাখি। সেই মাফিক অন্যদের অনুরোধে দু-একজন সেই চেষ্টাটা করেন। কিন্তু মঞ্চের সামগ্রিক বক্তব্য ও ধারণা স্পষ্ট করে বলতে পারার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে-এ কথা বলে তারা পরবর্তীতে সেই দায়িত্ব নিতে চাননি এবং তারপরে কেউই স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই কাজটির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার বিশেষ দু-একজনের ক্ষেত্রে অন্যদের তীব্রতর আপত্তি ছিল এবং তাদের আপত্তির যুক্তি সমন্বয় পরিষদে সমর্থিত হয়। তখন আমার প্রস্তাব ছিল যে, যেমনই হোক না কেন মঞ্চের অনান্য সদস্যরা বক্তব্য রাখবেন, কোনো সংশোধন বা সংযোজন থাকলে আমি তা পরে যুক্ত করব। কিন্তু এই কাজের জন্যও লোক পাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মঞ্চের সিদ্ধান্তে কর্মসূচিগুলোত আমি বক্তব্য রাখি। তবে নিজের মনগড়া এবং সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দ্বিমত আছে এমন কোনো বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার আমার ছিল না। মঞ্চের লিফলেট, সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য, বিভিন্ন সভায় সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের দ্বারা সমর্থিত চিন্তা-ধ্যানধারণা অনুযায়ী বা একই ধ্যানধারণাই কিন্তু ভিন্ন ভাষায় আমি বক্তব্য উপস্থপন করতাম। ফলে আমার কাজটা ছিল অনেকটা মুখপাত্রের মতো। দুতিনবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমি মঞ্চের গাইডলাইনের বাইরে চলে যাই। মঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা এ বিষয়ে আমাকে সতর্ক করে দেন। আমি আমার ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। সুতরাং আমি খুবই স্পষ্টভাবে বলতেই যে, আমি কোনোভাবেই এই আন্দোলনের ভাগ্যবিধাতা- নেতা নই। আন্দোলন চলাকালে মিডিয়ার সামনেও আমি এই বক্তব্যই দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বিবেকই ছিল এই আন্দোলনের নের্তৃত্ব। একটি আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে থাকে বহুদিনের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন। বহুদিন ধরে এই চিন্তাভাবনা ও অনুশীলনগুলোর সারাংশ করা, ব্যাখ্যা প্রদান করা, প্রচার করা এবং জনগণের মধ্যে আন্দোলনের নায্যতার পক্ষে হরহামেশা বক্তব্য উপস্থাপন করার কাজগুলো কোনো না চিন্তাধারায় মত-সংগঠকরাই করে থাকে। এই মত-সংগঠকরা কখনো খুবই সুসংগঠিত, কখনো আবার স্রেফ একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে বিস্তৃত থাকে। আর তাদের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন যদি জনগণের কাছে ন্যায্য বলে মনে হয়, তখনই কেবল তাতে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়। ফলে কোনো আন্দোলন শুধু এই মত-সংগঠকদের উপর নির্ভরশীল বিষয় নয়। এর প্রধান বিষয়টিই হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা। কোনো একটি গোষ্ঠীর কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলা, আন্দোলন সৃষ্টি করে না। আন্দোলন তখনই সৃষ্টি হয় যখন তাতে জনসম্পৃক্ততা ঘটে। ফলে নেতৃত্ব বিষয়টিকে আমি ব্যাখ্যা করি মত-সংগঠক ও জনসম্পৃক্ততা- এই দুইটি বিষয়ের একটি যুগপৎ সম্পর্ক হিসেবে। কিন্তু মিডিয়া এবং ইতিহাস লেখার যে ছক আছে তাতে প্রায়ই নেতৃত্ব বলতে মত-সংগঠকদের মধ্য থেকে হাতে গোনা এবং জনস্রোতের মধ্যে ভেসে থাকা দু-চার জন লোককে বোঝানো হয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় নের্তৃত্বের যে ধারণা নির্মাণ করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে গণমুখী অর্থ ধারণ করে না।

    প্রশ্ন: যে কোনো কাজ সম্পন্ন করার পরেই তো সেটা নিয়ে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়। আমরা সেখান থেকে কিছু শিখতে পারি। এবারের আন্দোলনের পর আপনার অভিজ্ঞতা কী? কী শিখলেন আপনি?

    উত্তর: আন্দোলন হচ্ছে জীবন শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠশালা। ফলে এবারের আন্দোলনেরও কিছু শিক্ষা আছে। আমি এই আন্দেলন থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় শিখেছি। আমি প্রথমত শিখেছি জনসম্পৃক্ততাই একটি আন্দোলনের প্রধান বিষয়। ফলে তাই ঘটে যা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ চায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই চলে না, তা পাহারা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। তৃতীয়ত, বিবেক যখন আন্দোলনের নের্তৃত্ব তখন রাষ্ট্র ও অনান্য ক্ষমতাশক্তির প্রচার-প্রচারণা ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়ে।

    প্রশ্ন: শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তি ছাড়া এই আন্দোলনে এমন কী অর্জিত হয়েছিল যার কারণে এই আন্দোলনকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরী পর্ব নামে আখ্যায়িত করলেন?

    উত্তর: সাম্প্রতিক আন্দোলন শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির আন্দোলন না। এই আন্দোলন রাষ্ট্র ও অনান্য দাপুটে আধিপত্যশীল ক্ষমতার বিরুদ্ধে তথা বৃহত্তর অর্থে অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন। তাই রাষ্ট্রের ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে জরুরি প্রতিবাদ, জরুরি প্রতিরোধ এই আন্দোলনের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়েছে।

    ‘জরুরী আইনের’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকেছিল, তা থেঁতলে দেয়া রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জরুরী অবস্থা’ শিথিল হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ধরনের তৎপরতা প্রকাশ্যে সংগঠিত হতে পারছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রক্টরিয়াল আইনের বিধিনিষেধগুলো দূর্বল হয়ে গেছে, যার কারণে আন্দোলনের এই মঞ্চ থেকে যখন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার উপর, যে নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল তা অমান্য করার ঘোষণা দেয়া হয়, তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ আলোচনা সভা, সেমিনার, পাঠচক্র, প্রদর্শনী, উৎসব প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের অনুমোদন দেয়া শুরু করে। ‘জরুরী অবস্থার’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রধান ক্ষেত্র কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালাতে পারছিল না, তৎপরতাহীনতার কারণে ক্রমেই সদস্যহীন হয়ে পড়ছিল। আন্দোলনের পরে সেই সংগঠনগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ঐক্যের শক্তি, রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সবসময় চাপের মুখে রাখছে। এতে ‘জরুরী অবস্থার’ মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার সীমা প্রসারিত হয়েছে। এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই আন্দোলন আত্মপরিচয় নির্মাণের আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয় নির্মিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মানেই মৌলবাদী, প্রতিবাদহীন, সহিংস কিংবা অনাধুনিক-খ্যাত ইত্যাদি। এখানকার তাবৎ প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড মানেই তার স্থান সংবাদপত্রের ‘১৭ নম্বর পাতা’। কিন্তু যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নিয়েছে সে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাহীন নয়। এখানে  যেমন শিবির আছে তেমনি মুক্তিকামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীরাও আছেন। ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উত্তরাধিকার এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয়ের বিরুদ্ধে সত্যিকারের আত্মপরিচয় পুনঃনির্মাণের সূচনা ছিল এই আন্দোলন। এই আন্দোলন যে, শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির আন্দোলন ছিল না, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বানও এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল তা আন্দোলনের সময়ের প্রচারপত্র-প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-ব্যানার কিংবা আন্দোলনকারীদের লেখাপত্রের মধ্যে খুবই স্পষ্ট। অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাশক্তি, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা-অধিকারকে সংকুচিত করে ফেলে। আর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে যখন এই ঘটনা ঘটে তখন সামগ্রিক চিন্তা ও সৃজন রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার শ্লোগান,  এই অর্থে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার আকাংক্ষাকেও ব্যক্ত করে। আবার এই শ্লোগানের মাধ্যমে ‘জরুরী আইনে’র বিরুদ্ধে জরুরি প্রতিরোধের ন্যায্যতাকেও তুলে ধরা হয়। এই আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যম বিশেষত গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। খুব বিচ্ছিন্নভাবে এবং ব্যক্তিগত বা বন্ধু পরিমণ্ডলে নতুন ধারার গণসঙ্গীত বা জীবন ঘনিষ্ঠ গানের চর্চা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তা প্রকাশিত ছিল না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের সময়ে র‌্যালি, সমাবেশ, মানববন্ধন প্রভৃতিতে যে গণসঙ্গীতগুলো উচ্চারিত হয়েছে তা ধ্রুপদী গণসঙ্গীতের ধারা যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো চর্চা করে তার থেকে আলাদা। তারুণ্য-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ কিন্তু তার মাঝেও ঘুড়ে দাঁড়ানোর কথা এই গানগুলোতে ছিল। সংগ্রাম-সংহতি-ভালেবাসা মিলেমিশে একাকার হয়েছে এই গানগুলোতে। এটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বাঁক।

    আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
    শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের পক্ষ থেকে “একুশ আমার বর্ণমালা” শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসূচি কতোটা সফল ছিল? মঞ্চের ভবিষ্যৎ কতোটুকু সম্ভবনাময়?

    উত্তর: হ্যাঁ, আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর মঞ্চের ব্যানারে একুশ আমার বর্ণমালা  শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষিত হয়। বৃহত্তর একটি আন্দোলনের পর সেই আন্দোলনের পর্যালোচনা আগে জরুরি ছিল। কোথায় দুর্বলতা ছিল, কীভাবে আগামী দিনে মঞ্চের সাংগঠনিক কর্মকান্ডর পরিধি বিস্তৃততে করা যায়, মঞ্চ পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও  ভালো কি কি পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, সেসব বিষয়ে আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর একুশের কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে মঞ্চের কিছু সদস্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে আগে মঞ্চর সাংগঠনিক বিষয়টি ফয়সালা করার অনুরোধ জানাই। কিন্তু তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। ফলে একুশের কর্মসূচির একটা প্রস্তাবনা তৈরি করে তারা বৈঠক ডাকে। কয়েকবার বৈঠক ডাকার পরেও সাড়া পাওয়া যায় নি। পরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে বৈঠকে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতি আশানুরূপ ছিল না। আমি নিজেও বৈঠকে উপস্থিত হতে পারিনি। হতে যে পারব না তা আগে থেকেই জানিয়েছিলাম। সেই বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সামনে একটি প্যাকেজ প্রস্তাব আকারে একুশের কর্মসূচি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবনার প্রতিটি বিষয়ের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বৈঠকে বিশদভাবে আলোচিত হয়নি বলে উপস্থিত অনেক সদস্যই আমাকে জানিয়েছেন। আবার দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে মঞ্চের সংগঠকদের ক্লাস-পরীক্ষা বা একাডেমিক কার্যক্রমে যতটুকু ফাঁক তৈরি হয়েছিল তা পুষিয়ে নেবার জন্য আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তাদের একটি বিশেষ ব্যস্ততাও তৈরি হয়। সেই ব্যস্ততার মাঝে কে কতখানি সময় দিতে পারবে তা বৈঠকে পূর্ণাঙ্গরূপে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার বিষয়টি সুচারু ছিল না। সামগ্রিকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ প্রক্রিয়াটাতেই অংশিদারিত্বের অভাব ছিল। ফলে মঞ্চের খুবই হাতে গোনা, বলতে গেলে ৫/৭ জন সদস্য এতে সময় দেয়। কিন্তু এই ৫/৭ জনের মধ্যেও সমন্বয় ও সহনশীলতার অভাব ছিল। এতে করে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একুশের কর্মসূচির প্রস্তাবনা হাজির হয়েছিল তাতে সফলতার পরিমাণ খুব বেশি বলে দাবি করা যাবে না। মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হলেও পরের দিকের কিছু কর্মসূচি পালিত হয় নি। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আলোচনা সভাগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। আবার অংশগ্রহণ কম হওয়ায় প্রশাসনের চাপও বাড়তে থাকে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে মঞ্চের জন্য সময়টা খুব খারাপ ছিল। তবে প্রশাসনকে স্রেফ অবহিত করে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করায় প্রশাসন অন্য অনেক সংগঠনকে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়। মঞ্চের একুশের কর্মসূচির প্রচারপত্র এবং তার আবেদন অন্য অনেক সংগঠনকেই কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে উজ্জ্বীবিত করে। একারণেই সারা দেশের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এদিক থেকে এটা একটা বড় অর্জন। মঞ্চের ভবিষ্যত কতটুকু সম্ভবনাময় এবং কতটুকু নয় তা নির্ভর করছে প্রধানত মঞ্চের কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের উপর। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তখনই সম্ভব হবে, যখন মঞ্চের মত-সংগঠকরা মঞ্চের মৌলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জনমত গঠনে সফল হতে পারবেন এবং মঞ্চের চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষা ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে। বর্তমানে মঞ্চের মত-সংগঠকদের মধ্যেই কাজের একটা সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। আবার তা কাটিয়ে ওঠার কিছু প্রচেষ্টাও আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে আশার কথা হলো এই যে, কর্তৃত্ব-বিরোধী তৎপরতা থেমে নেই। মঞ্চের মত সংগঠকদের মধ্যে অনেকেই কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় ছোট ছোট একটিভিস্ট গ্রুপ,ক্যাটালিস্ট গ্রুপ কিংবা কনসেটে অরগানাইজিং গ্রুপ গড়ে তুলছেন। এদের মধ্যে কেউ ক্ষমতা-মিডিয়া-সক্রিয়তা বিষয়ে, কেউ কর্পোরেট একচেটিয়া ও অসম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, কেউ ভাষা-সংস্কৃতি-আধিপত্য বিষয়ে, কেউ কর্তৃত্ব-আইন-মানবাধিকার বিষয়ে আবার কেউ প্রকৃতি-বিজ্ঞান ও বিবর্তন বিষয়ে কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় চিন্তা ও চর্চার জন্য নানান ধরণের তৎপরতার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলে এই সংগঠন-প্রচেষ্টাগুলো মোটামুটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় হতে পারলেই কর্তৃত্ব-বিরোধী মঞ্চ’র ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি সংশয় প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়বে না।

    প্রশ্ন: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্বে, ঠিক এই সময়ের করনীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

    উত্তর: ইতিমধ্যে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে তার একটি বিশেষ উচ্চারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক কী হওয়া দরকার সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ফলে এই সময়ে আন্দোলনের প্রধান এলাকাটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয়-কর্তৃত্বকে খর্ব করে বিভাগগুলোতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। সেই সাথে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একটা সংস্কারের প্রস্তাব মঞ্জুরি কমিশন তৈরি করেছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃতপক্ষে কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের উপযোগী মতাদর্শিক এবং একই সাথে ঐ কর্পোরেটের উৎপাদন কাঠামোতে উন্নতমানের আমলা- কামলা সরবরাহের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাওয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়র ধারণা বিরোধী এই কর্পোরেট কর্তৃত্ব তাড়িত সংস্কারকে প্রতিরোধ করা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে  জরুরি কর্তব্য বলে আমি মনে করি।

    ০৭ মার্চ-২৮ মার্চ, ০৮
    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    সেক্যুলারিজম, উপনিবেশ ও রাষ্ট্র

    • জাহিদুল ইসলাম

    প্রখ্যাত তাত্ত্বিক তালাল আসাদের মতে সেক্যুলারিজম শব্দটি উনিশ শতকের মধ্যভাগে পশ্চিমা মুক্তচিন্তরকরা ব্যবহার করেন। এ শব্দটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিলো তাদের যেন নাস্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা না হয় এবং সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সমাজের সাথে একধরনের স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় থাকে। এ কৌশলটি তাঁরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার খাতিরে নয় বরং তাদের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেন।১ সেক্যুলার সমাজ বিভিন্ন সময় তার নিজস্ব ধর্ম থেকে বিভিন্ন উপাদান নিয়েছে। লকের প্রাকৃতিক আইনের ধারণাও ধর্মতত্ত্ব থেকে এসেছে। লক মনে করতেন জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি এই তিনটি প্রাকৃতিক অধিকার নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। যে অধিকার আদম পেয়েছিলেন ঈশ্বরের কাছ থেকে। আমেরিকার সংবিধানে লকের এ ধারণাটি গ্রহণ করা হয়। দার্শনিক জার্গেন হেবারমাসের মতে ‘মানবাধিকার’ ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ ‘গণতন্ত্রের’ মতো বিষয়গুলো সরাসরি ইহুদি ও খ্রিস্টান মূল্যবোধ থেকে নেওয়া হয়েছে।২ এক্ষেত্রে ধর্মের সাথে সেক্যুলারিজমের একদম বিপরীতধর্মী (বাইনারি অপজিশন) সম্পর্ক নেই। সেক্যুলারিজম যৌক্তিক, ধর্ম অযৌক্তক, সেক্যুলারিজম উদার, ধর্ম অনুদার এভাবে দুটি বাইনারিতে ভাগ করাই হচ্ছে বিপজ্জনক কাজ। যে কাজটি পশ্চিমা আলোকায়নের সময় হেগেল বা কান্টের মতো দার্শনিকরা করে গিয়েছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে। এবং এ নির্মাণের মাধ্যমে প্রাচ্যের উপর তাদের আধিপত্য যৌক্তিক করে তোলেন। পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ড ধর্মকে যেভাবে নির্মাণ করে তা হচ্ছে ধর্ম একটি প্রাচীন ধারণা। ধর্মের তুলনায় সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি অত্যন্ত প্রগতিশীল। ধর্মের সাথে সেক্যুলার সমাজের বাইনারি সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা আধিপত্যের বিস্তার ঘটে।

    লেভিয়ান্থ

    আধুনিক সার্বভৌমত্বের ধারণা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব চর্চার মধ্য থেকে এসেছে। কার্ল স্মিট রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে দুই ধরনের রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের কথা বলেছেন: প্রাচীন ও আধুনিক ধর্মতত্ত্ব। প্রাচীন রাষ্ট্রতত্ত্বে ঈশ্বরের হাতে যে সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের ধারণায় সেটি রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বকে ‘সেক্যুলারাইজড থিওলজিকাল কনসেপ্ট’ অভিহিত করেন।৩ পূর্বে যেখানে ঈশ্বর ছিলেন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বর্তমানে রাষ্ট্র সে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। এ সার্বভৌম ক্ষমতার বলে রাষ্ট্র তার নিজের জনগণের উপর ক্ষমতার চর্চার করে,আবার অন্য রাষ্ট্রর সার্বভৌমত্বও বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

    সেক্যুলার সমাজ ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময় ভৌগলিকভাবে অপরের নির্মাণ করেছে। মধ্যযুগে আরব স্পেনকে ইউরোপের বাহিরে হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আধুনিক স্পেনকে ইউরোপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেহেতু এটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত সেক্যুলার রাষ্ট্র।৪ আধুনিক যুগে বসনিয়া এবং চেচনিয়া নামক দুটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা পশ্চিমা মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত। তারা আবার বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণহত্যার শিকার হয়েছেন। আজফার হোসেন তাঁর দর্শনাখ্যান বইতে গ্রিসকে প্রাচ্যের অংশ হিসেবে দাবি করেন। এটি পরবর্তীতে পাশ্চাত্যের অংশ হিসেবেই তাদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

    সেক্যুলার সমাজ মিথকে বাতিল করতে চেয়েছিলো। বিপরীতে মিথকে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে যে জ্ঞান, বিশ্বাস ও চেতনার জন্ম দিয়েছে তালাল আসাদের মতে তাই হচ্ছে সেক্যুলার। সেক্যুলার যুগে মিথকে আধুনিক ফিকশনে টি এস ইলিয়ট, জেমস জয়েস, কোলরিজের মতো সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে পার্সি বিশি শেলি একজন নাস্তিক হয়েও গ্রীক মিথের উপর ভিত্তি করে নাটক লিখেছেন। আধুনিক যুগে সেক্যুলার মানসিকতার সাথে মিথ মিশে আছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক এডর্নো এবং হরখেইমার আধুনিকতার প্রকল্প হিসেবে এনলাইটেনমেন্টকে মিথ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

    ইউরোপীয় সমাজে সেক্যুলারিজম ধারণা বিকাশের পাশাপাশি এন্টি-সেমেটিজমের উপাদানসমূহকে লালন করে। যার ফলে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইহুদিদের উপর ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদিরা ইউরোপে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। এনলাইটেনমেন্টের বিকাশও তাদের সেই অবস্থান থেকে মুক্তির পথ দেখাতে পারেনি। বরং এনলাইটেনমেন্ট নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কিছু কল্পিত ধারণার নির্মাণ করে। এই নির্মাণই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপক গণহত্যা ঘটায়। এনলাইটেনমেন্ট তার যে যৌক্তিক বা সার্বভৌম চিন্তা চর্চা করত সেই যৌক্তিক চিন্তাই ইউরোপের কর্তৃত্ববাদী শাসন ও এন্টি-সেমেটিজমের জন্ম দেয়। এনলাইটেনমেন্ট তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে চাপা দেওয়ার জন্যেই গণহত্যায় মেতে উঠে। হিটলারের জার্মানি ইহুদিদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনে তার মধ্যে ছিলো,ইহুদিরা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের প্ররোচক। যারা একটি সমসত্ত্ব সমাজ ব্যবস্থায় চায়। এছাড়া হিটলার তাঁর বর্ণের ভিত্তিতে ইউরোপে আর্যদের অন্যদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান করতেন। ইহুদিদের তিনি ইউরোপীয়দের জন্য অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ মনে করতেন। এটি আত্নরক্ষার ধারণাকে আরো বেশি প্রতিষ্ঠিত করে।

    এডর্নো ও হরখেইমারের মতে ইউরোপীয় বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় এন্টি-সেমেটিজমির অর্থনৈতিক কারণ ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার উপর তাদের আধিপত্যকে ধামাচাপা দেওয়া।৫ ধামাচাপা দেওয়ার স্বার্থেই তারা ইহুদিদেরকে নিজেদের প্রধান শক্র হিসেবে উপস্থাপন করে। ইহুদিদের ভাবা হতো পুঁজিবাদের বিকাশ অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রগতির অন্তরায় হিসেবে।

    সেক্যুলার রাষ্ট্রে সহিষ্ণুতার তত্ত্বটির ভিত গড়ে উঠেছে পরস্পর বিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে। উদারবাদী এলিটরা ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংখ্যালগিষ্ঠদের উপর আধিপত্যের বৈধতা দেয়। সেক্যুলারিজমের প্যারাডক্স হচ্ছে এটি ব্যক্তির ধর্মীয় আচরণকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আসে, আবার রাষ্ট্র নিজেই সেই ব্যক্তিগত আচরণকে হস্তক্ষেপ করে। সুইজারল্যান্ডের কাছে হিজাব হচ্ছে বহিরাগত সংস্কৃতি ও লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতীক।৬ এ প্রতীকগুলোকে দমিয়ে রাখার জন্য ফ্রান্সে আইন করে পাবলিক স্কুলগুলোতে হিজাব বা অন্যান্য ধর্মীয় পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। সেক্যুলার সমাজে সংখ্যালঘুদের অবস্থান অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে বিবেচনা করা থেকেই তাদের উপর নির্যাতন বা প্রান্তিকীকরণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এটি কখনোই বহুত্ববাদী সমাজ তৈরিতে সহায়ক নয়। পশ্চিমা সেক্যুলার সমাজের নিকট একসময় ইহুদিদের হুমকিস্বরূপ মনে করা হতো, যার ফলে এন্টি সেমেটিজমের বিকাশ ঘটে। এখন ইহুদিদের ইউরোপীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের তাদের সাংস্কৃতিক হুমকিস্বরূপ মনে করা হয়।

    ইসলামি ধর্মতত্ত্বের মধ্যে মৌলবাদের বীজ নিহিত এ মতটিই বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত। পশ্চিমা বিশ্ব স্বাধীনতা ব্যবসার নামে এ মতটি ভালোভাবেই প্রচার করেছে। তালাল আসাদের মতে খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে যেমন গণতন্ত্র, উদারতাবাদ ইত্যাদি ধারণা বিকাশ ঘটেছে ইসলাম বা  অ-ইউরোপীয় অন্যান্য ধর্মতত্ত্বেও এসব উপাদান রয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ বা নব্য-সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শিক আধিপত্যের কারণে তার বিস্তার ঘটেনি।৭

    কোন রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী যখন মানসিক, সাংস্কৃতিক বা আর্থ-রাজনৈতিকভাবে পরাধীন তখন সেসব লোকদের আত্মগ্লানি কাজ করে। তারা তখন তাদের অতীতে ফিরে যেতে যায়। অতীতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদের সৃষ্টি হয়। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী,ইজরাইলি জায়নবাদী,বিন লাদেন বা ওমর আল-বাগদাদীর উদ্দেশ্য ও একইরকম ছিল। লাদেনের উগ্রতার বিকাশ ঘটে সৌদি আরবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকায়নের প্রেক্ষিতে। বাগগাদী প্রেরণা ছিলো নিজেকে মাসিহা হিসেবে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থাপন করা এবং দুনিয়ার অত্যাচার থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া। এজন্য তিনি সিরিয়া এবং ইরাকের কিছু অংশ দখল করে নিজেকে খলিফা ঘোষণা করলেন। একইসাথে ধর্মকে ব্যবহার করে সহিংসতার জন্ম দেন। তারা যে সত্তাকে নির্মাণ করে সেটি আত্মকেন্দ্রিক। এর বাইরে যারা আছে সবাইকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অধীনতার গ্লানি ও সার্বভৌম ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি তার নির্মিত ‘অপরের’বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে সহিংসতা ঘটায়। অন্যদিকে সেক্যুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় সহিংসতার রুখতে ধর্মকেই ব্যবহার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজেকে মনে করতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ঈশ্বরের নির্দেশেই তিনি আফগানিস্তান এবং ইরাকে হামলা চালান।৮

    অলিভার রয় সেক্যুলারিজম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পশ্চিমা সেক্যুলারিজম নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদারপন্থী সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলোতে ধর্মকে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত ফ্রান্সে অভিবাসী মুসলমান সম্প্রদায়ের সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রান্তিকীকরণ করা হচ্ছে। অলিভার রয়ের মতে যখন কোন সম্প্রদায়কে তাঁর ধর্ম এবং সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং তার মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করে তখনই উগ্রবাদের জন্ম দেয়।৯ সেক্যুলার সমাজের সম্যাটি হচ্ছে এটি নিরপেক্ষতার কথা বলে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করে। একটি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে নিরপেক্ষতার মাত্রায় ফেলে এমনভাবে নির্মাণ করে যেন অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটিকে সচেতন বা অবচেতনভাবে গ্রহণ করে। এর ফলে ধর্মীয় চর্চার সমতা বা স্বাধীনতা সার্বজনীনভাবে কাজ করতে পারেনা।২

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রিসারেকশন অব ক্রাইস্ট
    শিল্পী: জিওভান্নি এন্টনিও
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    পাশ্চাত্য সমাজে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তারা তাদের ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার চালায়। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনামলে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতা দখলের পর উইলিয়াম কেরি এবং টমাস নামে দুজন ব্যক্তি ধর্মপ্রচারের জন্য কলকাতায় আসেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বিরোধের ফলে তারা ১৮০০ সালে কলকাতা থেকে অদূরে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা। ভারতবর্ষে বা আফ্রিকার উপনিবেশিত দেশগুলোর প্রতিটি অঞ্চলের ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করা হয়। ভারতবর্ষে শ্রীরামপুর মিশন থেকে উইলিয়াম কেরি,জন মার্শম্যান এদের নেতৃত্বে বাইবেল বাংলাসহ বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। ১৮০৯ সালে শ্রীরামপুর মিশনের নেতৃত্বে সমগ্র বাইবেল ‘ধর্মপুস্তক’ নামে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়।

    ১৯৩০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষের ব্যাপক জনসংখ্যার দুই শতাংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এসব ধর্মপ্রচারকরা ভারতীয় সমাজে ‘পশ্চিমায়ন’ ও ‘আধুনিকায়নে’ ভূমিকা রাখেন। প্রাচ্যতাত্ত্বিকরা ভারতবর্ষের হিন্দুদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন। হেগেল মনে করতেন হিন্দুদের কোন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই,এবং তাঁদের ইতিহাস রচনার সামর্থ্য নেই। এক্ষেত্রে তাদের নিয়তি হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনকে মেনে নেওয়া।১০
    উপনিবেশিত কলকাতায় উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রাহ্মধর্মের প্রসার ঘটে। এ ধর্ম ছিল ভারতীয় ধর্মের সাথে খ্রিস্টান ধর্মের একপ্রকার সেতুবন্ধন।

    তখনকার সময়ে বাঙালি রেনেসাঁসের বিকাশ যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে তা হচ্ছে সতীদাহ প্রথা নিবারণ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলন। রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন এসব সংস্কারের জন্য তর্ক বির্তকে লিপ্ত হন, তখন তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যের ভিতর থেকেই এ কাজটি করেন। এ সংস্কারের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য তারা ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকেই যুক্তি প্রদর্শন করেন। সতীদাহ নিয়ে কাজ করা লতা মনি তাঁর Contentious traditions বইতে দেখান যে সতীদাহ প্রথাটি যে হিন্দুদের ধর্মীয় প্রথা এটি ব্রিটিশ শাসনামলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এ প্রথাটির সাথে ব্রাহ্মণ সমাজের স্বার্থ জড়িত ছিল।

    স্বপন বসু তাঁর ‘বাংলায় নবচেতনার ইতিহাস’ বইতে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। কোন স্বামী মারা গেলে তার সাথে তার স্ত্রীকে যখন দাহ করা হতো তখন ধনীদের পরিবার থেকে দুইশত টাকা পর্যন্ত বখশিশ পাওয়া যেত। এই অর্থের লোভে ব্রাহ্মণরা মেয়েদেরকে সতী হতে উৎসাহ দিত। আর সতীদাহপ্রথা ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকার তুলনায় কলকাতায় বেশি প্রচলিত ছিলো। ব্রিটিশ শাসকরা যেহেতু ভারতবর্ষ সম্পর্কে পূর্বানুমান ছিলো যে তারা ধর্মান্ধ, তাই তারা এটিকে প্রথম দিকে ধর্মীয় প্রথা হিসেবে মেনে নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের নারীমুক্তির চেয়ে স্থানীয় হিন্দুদের বিরাগভাজন হওয়া নিয়ে উদ্বেগ ছিলো। এর সাথে তাদের ভারতবর্ষকে পাকাপোক্তভাবে শাসন করার বিষয়টি জড়িত ছিলো। এজন্য তারা ধর্মগুরুদের কাছ থেকে সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে মতামত নেয়। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে সতী বা নারীর বিষয়টি গুরুত্ব ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসকরা শাসনের বৈধতার জন্য সভ্যকরণ,মানবমুক্তি বিষয়টি উপস্থাপন করে, সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ এটি আধুনিকতা নামক ডিসকোর্সের সাথে সম্পর্কিত নয়।

    উপনিবেশ স্থাপনের পরবর্তীতে ভারতবর্ষ শাসনের সুবিধার্তে ব্রিটিশরা বিভিন্ন আইন চালু করে। ভারববর্ষে ধর্মীয় আইনের বিধিবদ্ধকরণের কাজটি ব্রিটিশরাই প্রথমে করে। ১৭৭২ সালে হেস্টিংসের নেতৃত্বে কোরআন থেকে মোহামেডান আইন এবং ব্রাহ্মণ শাস্ত্র থেকে হিন্দু আইনের বিধিবদ্ধকরণ করা হয়।১১ ব্রিটিশ শাসকরা তাদের পূর্বানুমান থেকে এই কাজটি করে। তাদের ধারণা ছিলো ভারতবর্ষের লোকেরা অন্ধবিশ্বাসী,তাদের কাজকর্ম,চিন্তাভাবনা শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্রিটিশদের নিকট ধর্ম বলতেই ছিলো ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এন্ডারসনের মতে মুঘল শাসনামলে বিচারব্যবস্থা ও আইনের ক্ষেত্রে কাজীর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা ছিলো। কাজী তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় কার্যক্রম চালিয়ে যেতেন।১২

    ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্বে মুসলমানদের জন্য ছিল মাদ্রাসা এবং হিন্দুদের জন্য ছিল টোল ও পাঠশালাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব ধর্ম এবং সেক্যুলার উভয় বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিলো। মাদ্রাসায় যেসব প্রধান বিষয় পড়াশোনার অন্তর্ভুক্ত ছিলো এগুলো হলো ১.ব্যাকরণ ২. সাহিত্য, ৩. যুক্তিবিদ্যা, ৪.ইসলামিক আইন এবং এর মূলনীতিসমূহ ৫. কোরআনের ব্যাখ্যা ৬. হাদিস ৭. অতীন্দ্রিয়বাদ, ৮. স্কলাস্টিসিজম (ধর্মীয় দর্শন) ইত্যাদি । হিন্দুদের টোলে ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আর পাঠশালাতে ছিলো সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। পাঠশালাতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ছিলো ভাষা, মৌলিক গণিত, কৃষি ও নৌকা নির্মাণ দক্ষতা ইত্যাদি। মোঘল শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্রাট শাহজাহান তাঁর শাসনামলে দিল্লিতে ইম্পেরিয়াল কলেজ স্থাপন করেন।১৩ কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে এসে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার স্থলে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে তা একদম স্থবির হয়ে যায়নি।

    ঔপনিবেশিক শাসনামলের শুরুতে ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাব্যবস্থাকে সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেনি। এসময় খ্রিস্টান মিশনারীরা বিভিন্ন মিশনারি বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতেন। ১৮১৩ সাল চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে শাসকদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়। ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দুটিভাগে করেন। সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার ফলে মাদ্রাসা এবং টোল ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রান্তিকীকরণ ঘটে। অন্যদিকে মিশনারি বিদ্যালয়গুলো তখনও ব্রিটিশদের নিকট থেকে অনুদান পেত।১৪

    বাংলায় যখন উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন বাংলার মুসলমানরা বিভিন্ন কারণে এ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো। মুসলমানদের প্রশাসনিক কাজের সংযুক্তের জন্য ব্রিটিশরা সরকার নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৮০ সালে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে তখন সেখানে কোন বাঙ্গালী মুসলমান শিক্ষক ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন বাংলার বাইরে থেকে আসা উর্দুভাষী।১৫

    ব্রিটিশরা মুসলমানদের নিকট থেকে ভারতবর্ষে ক্ষমতা দখলের পর তাদের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতি চালু করে। মুসলমানদের নিকট থেকে ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকে তারা একটি সাম্প্রদায়িক মাত্রায় রূপ দেয়। দার্শনিক জেমস মিল তাঁর ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকতার সূচনা করেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের ইতিহাসকে তিনটি যুগ বা সভ্যতায় ভাগ করেন। এ তিনটি যুগ হচ্ছে যথাক্রমে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ যুগ৷ মিলের এ লেখাটি তৎকালীন সময়ে অসাধারণ স্বীকৃতি লাভ করে ও প্রভাব বিস্তার করে৷ মিলে পরবর্তী অনেক ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে ইতিহাস রচনায় তার যুগ বিভাজন দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হন।

    ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে অধ্যায়কে মিল হিন্দু যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে তখন উপমহাদেশের সব শাসক-বংশগুলি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিলো এমন নয়। রাজবংশের হিন্দু ধর্মের প্রাধান্যের ভিত্তিতে এ যুগকে হিন্দুযুগ মনে করা ভ্রান্ত,কারণ মৌর্য,ইন্দো-গ্রীক,শক,কুষাণ প্রভৃতি বহু প্রধান রাজবংশই অহিন্দু ছিলো। অনেক প্রভাবশালী বৌদ্ধ রাজারাও তখন শাসন করেন। লানন্দা, তক্ষশীলার মত বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বৌদ্ধ শাসনামলে সর্বাধিক প্রচার ঘটে। মিল তার যুগ বিভাজনের দ্বিতীয় পর্বে আরব, তুর্কি এবং পারসিক সকলকেই একসঙ্গে “মুসলমান” বলে অভিহিত করেন। মিল পূর্ব ঐতিহাসিকরা এদের ভিন্ন ভিন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত করতেন। এককভাবে মুসলমান শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে এদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহার করা হয় যা তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলে। তুর্কী, পার্সী এবং আরবরা ধর্মের দিক থেকে এক হলেও রাজনৈতিক ও জাতিগত অবস্থানের ক্ষেত্রে তৎকালীন সময় তারা ছিল ভিন্ন। এ ভিন্ন ভিন্ন জাতি দ্বারা ভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান হয়।

    আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

    মিল তার তৃতীয় যুগবিভাজনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভিত্তিক যুগবিভাজন থেকে সরে আসেন। তিনি একে খ্রিস্টান যুগ না বলে ব্রিটিশ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যেন এযুগের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ সুশৃঙ্খল,সভ্য,ধর্মনিরপেক্ষ যুগে প্রবেশ করে। এ তিনটি যুগের দ্বারা মিল বুঝিয়েছেন প্রথম যুগ ছিলো হিন্দুদের জন্য গৌরবময় যুগ,দ্বিতীয় যুগ ছিল ‘মুসলিম স্বৈরশাসনের’, তৃতীয় যুগ হচ্ছে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার যুগ। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধুনিকায়নের পাশাপাশি মুসলমানদের অপর হিসেবে নির্মাণের কাজটিও একসাথে চলে। ঐতিহাসিকভাবেই ভারতবর্ষের ধর্ম ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিলো। এটি শুধু হিন্দু মুসলিম বাইনারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুসলমান ধর্মের মধ্যে তখন বিভিন্ন বৈচিত্র্য ধারা (শিয়া, সুন্নি, হমেদিয়া)ছিলো। হিন্দুদের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ এবং এ বর্ণের বাইরেরও ছিলো প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠী। বৌদ্ধ, জৈনসহ ভারতবর্ষে তখন বহুবিধ ধর্ম ও বর্ণের লোক বাস করত। ঔপনিবেশিক শাসকরা ভারতবর্ষে মধ্যযুগ সম্পর্কে যে ইতিহাস নির্মাণ করে রোমেলা থাপার একে মিথ বলে অভিহিত করেন।১৬ আরসি মজুমদার থেকে যদুনাথ সরকার পর্যন্ত সকলেই এই মিথকে অনুসরণ করেছেন।

    ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে যে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের নির্মাণ করে সে নির্মাণের ভিত্তিতেই ব্রিটিশরা তাদের সাম্রাজ্য হারায়। ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে তখন দুটি সম্প্রদায় জন্য দুটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়।

    ব্রিটিশ ভারতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে গুরুতর ছিলো সেটি হচ্ছে হরিজন বা দলিত সমস্যা৷ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতারা এবং শাসক গোষ্ঠীরা নিজেদের স্বার্থে সম্যাটিকে ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করেছেন। যার ফলে এ সমস্যাটি এখনও ভারতে রয়ে গেছে। তাদেরকে এমনভাবে বিমানবীকরণ করা হয় যে তাঁরা ভারতবর্ষকে নিজেদের জন্মভূমি হিসেবে মনে করতেন না। ১৯৩১ সালে আম্বেদকরের সাথে মহাত্মা গান্ধীর যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি বলেছিলেন ‘গান্ধীজি, আমার কোন মাতৃভূমি নেই। আপনি এমন কোন অস্পৃশ্যকে পাবেন না যে এই ভূখণ্ডের জন্য কোনরকম গর্ববোধ করে।’১৭ ১৯১৯ সালে আম্বেদকর ব্রিটিশদের নিকট দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনের প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি দলিত সম্প্রদায়কে পৃথক সামাজিক বর্গ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ব্রিটিশ শাসকরা কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে এ বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যায়।

    ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের ডাকা লন্ডন সম্মেলনে আম্বেদকর অংশগ্রহণ করেন। তিনি দলিতদের প্রধান হিসেবে এ সম্মেলন কমিটির নিকট তাঁর প্রস্তাব পেশ করেন। তাঁর প্রস্তাব ছিলো দলিতদের অন্যায়ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তাদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ব্রিটিশরা তাঁর এ দাবি মেনে নেয়। কিন্তু গান্ধী নিজেকে অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বলে দাবী করেন এবং এর বিরোধিতা করেন। গান্ধীর আমরণ অনশনের প্রতিজ্ঞা ও জাতিয়তাবাদী নেতাদের চাপের ফলে আম্বেদকর তাঁর দাবী প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। দলিতদের সমস্যাকে প্রান্তে রেখে ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করল। কিন্তু আম্বেদকর বা যোগেন মন্ডলের মতো দলিতদের প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ হলো না। হতাশার একপর্যায়ে স্বাধীন ভারতে আম্বেদকর তার অনুসারীদের নিয়ে স্বধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষও পরবর্তী সময় সেক্যুলার ভারতে সংখ্যালঘু প্রশ্নে দলিত সমস্যার মীমাংসা না করে বরং এটিকে আরো সমস্যা সংকুল করা হয়েছে।৩

    বাঙালিরা একসময় ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছে আবার বাঙালি জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করেছে। এ দুটি রাষ্ট্র গঠনের মূলে যে প্রেরণাটি কাজ করে তা হল, দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যবোধ। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরির পিছনে যে কারণটির কথা বলতেন সেটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানদের উপস্থাপনের বিষয়টির কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যে তখন মুসলমান চরিত্র অর্থাৎ মুসলমানদের উপস্থানের অবস্থান ছিলো সীমিত। তাদের প্রান্তিকীকরণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল। এ সাংস্কৃতিক বৈষম্যবোধ যোগেল মন্ডলের মতো দলিতদেরও ছিলো। তাই তিনি দলিতদের নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে এ বৈষম্যব্যবস্থা আরো জেঁকে বসে। সাংস্কৃতিক বৈষম্যের তুলনায় তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তখন অধ্যাপক রেহমান সোবহান,অধ্যাপক আনিসুল হক,অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকরা দুই অর্থনীতি তত্ত্বকে তোলে ধরেন। যার উপর ভিত্তি করে ছয় দফা দাবি পেশ করেন।

    পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আন্দোলনের সাথে বৈষম্যের বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ বৈষম্যের বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না করে অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ আন্দোলনকে প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করেন৷ তাদের বক্তব্য হচ্ছে মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্য বাঙালি নামক জাতি প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে প্রগতিশীল হয়ে উঠে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলে। শোষণ,বৈষম্যবোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিষয়টি আড়াল রেখে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিশীলতার বাইনারি হাজির করার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সে প্রক্রিয়া বহাল রাখা।

    আর্টোয়ার্ক: স্বাধীনতা তুমি
    সূত্র: অন্য আলো

    ১৯৭১ হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পর সেই রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এ রাষ্ট্রের মধ্যে ন্যায়বিচারের অভাব। দীপন হত্যার পর তার পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি। কারণ তিনি নিশ্চিত আমাদের রা্ষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই। আরেকটি কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের জনগণ ফলস কনসাসনেসের মধ্যে বাস করছে। অপরের মুক্তির মধ্যেই যে তার নিজের মুক্তির এটি সে কল্পনাই করতে পারে না। যার ফলে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় সহিংসতার জন্ম দেয়।

    প্রাচ্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ সবসময়ই তার সমাজ কাঠামোর উপর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ধর্ম অথবা সেক্যুলারিজম দু’টির একটিকেই চূড়ান্ত ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ধর্ম এবং সেক্যুলারিজমের মধ্যে পরস্পর বিরোধী অবস্থান নির্মাণের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে এধরনের কৌশল স্পষ্টভাবে কাজ করে। আমাদের দেশে ‘আস্তিক’ ‘নাস্তিক’ ‘প্রগতিশীল’ ‘প্রক্রিয়াশীল’ ‘হেফাজতি’ ‘শাহবাগী’ এরকম বর্গ রয়েছে। এ বর্গকরণের মধ্যে দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। তারা এসব দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে কৌশলে নিজেদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

    আমাদের দেশে প্রগতিশীল চিন্তকরা প্রগতিশীলতা চর্চার বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতা নামক ডিসকোর্সটি তৈরি করেছেন তা অত্যন্ত কৌশলী। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামক ডিসকোর্সটি মূলত ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাণ্ড থেকে পাওয়া। আমাদের দেশে সম্প্রদায়িকতা শব্দটি দ্বারা শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিম বিদ্বেষকেই বোঝায়। আমাদের দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা এটিকে শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলিম সমস্যার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে থাকেন। এর ফলে আমাদের দেশের আদিবাসীদের সমস্যা ব্যাপকভাবে প্রান্তিকীকরণ করা হয়;বিশেষত আদিবাসীদের ভাষা এবং জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা দিকটি।

    বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, যাদেরকে প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের অধিকাংশই সমাজে বিশেষ সুযোগ গ্রহণকারী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন শ্রেণির লোকেদেকে তাদের সৃজনীশলতা বা জ্ঞানচর্চা দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে থাকে। বিভিন্ন ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে সত্য হলেও রাজনৈতিকীকরণের স্বার্থে তারা তাকে চেপে রাখেন। প্রগতিশীলতা চর্চার বিষয়টি পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় আধিপত্য বিস্তারের কৌশলে। রাষ্ট্র তার জনগণের উপর ক্ষমতা চর্চার সম্মতি উৎপাদানের কাজটিই তারা বিশেষভাবে করে থাকেন। এখানকার প্রগতিশীলরা চিন্তকরা সমাজ বিকাশের খাতিরে পশ্চিমা আলোকায়িত জ্ঞানের চর্বিতচর্বন দ্বারা আমাদেরকে আলোকিত করতে চান। কিন্তু একটি সমাজ প্রগতির জন্য শুধু ধার করা জ্ঞান দিয়ে চলে না। সমাজের ভিতর থেকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয়। যে সমাজ সৃষ্টিহীন সে সমাজ বন্ধ্যা এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়।

    এদেশে হিন্দু মুসলমানরা নৃ-তাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হলে আদিবাসীরা তা নয়। তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি আমাদের থেকে ভিন্ন। এ অর্থে তারাই প্রকৃত সংখ্যালঘু। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমরা হচ্ছি বাঙালি জাতি। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতরে অন্যান্য জাতিও রয়েছে। ধর্মীয় রাষ্ট্র যদি সাম্প্রদায়িক হয় তাহলে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র কতটুকু অসাম্প্রদায়িক তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

    বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি হয়ে যায়। তখন থেকেই সমস্যার সূচনা। মানবেন্দ্র লারমা সংবিধান প্রণয়নের সময় তীব্রভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন। ১৯৭২ সালের ২৫ ও ৩১ অক্টোবর গণপরিষদের খসড়া সংবিধানের উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে তর্ক বিতর্কের কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত দেওয়া হলো-

    মানবেন্দ্র লারমা: আমরা করুণার পাত্র হিসেবে আসিনি। আমরা এসেছি মানুষ হিসেবে। তাই মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আমাদের আছে।
    মিসেস সাজেদা চৌধুরী: বৈধতার প্রশ্ন, জনাব স্পিকার, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলতে চেয়েছেন যে এই সংবিধানে তাঁদের উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমি বলব, তাঁরাও আজকে স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সঙ্গে তাঁদেরও একটা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
    একটি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেয়ে একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিক মর্যাদাজনক নয়?

    মানবেন্দ্র লারমা: আমি একজন মানুষ, যেখানে জন্মগ্রহণ করেছি, যে জন্মভূমিতে আজন্ম লালিত-পালিত হয়েছি, সেই জন্মভূমির জন্য আমার যে কথা বলার রয়েছে, সে কথা যদি প্রকাশ করতে না পারি, যদি এই সংবিধানে তার কোনো ব্যবস্থাই দেখতে না পাই, তাহলে আমাকে বলতে হবে যে বঞ্চিত মানুষের জন্য সংবিধানে কিছুই রাখা হয়নি।

    আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া: মাননীয় স্পিকার, আমি প্রস্তাব করছি যে সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক।
    ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’

    মানবেন্দ্র লারমা: আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা চৌদ্দ পুরুষ—কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি। আমি জানি না, এই সংবিধানে আমাদের কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়।

    স্পিকার: আপনি কি বাঙালি হতে চান না?

    মানবেন্দ্র লারমা: মাননীয় স্পিকার, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় না। আমরা কোনো দিনই নিজেদের বাঙালি মনে করি না। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।

    আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: মাননীয় স্পিকার, মাননীয় সদস্য আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তির প্রতি, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবৈধ ভাষায় বক্তৃতা করেন।… ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির বদলে যে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তারই প্রতি ষড়যন্ত্রমূলক এ বক্তব্য।”১৮

    পাকিস্তান শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা বাঙ্গালীদের উপর সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদি বিষয় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো। বাঙ্গালী জাতি তার জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য তা মেনে নেয়নি। তাঁরা নিজেদের বাঙ্গালী পরিচয়কে রক্ষার খাতিরেই দেশকে স্বাধীন করে।সেই বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ হিসেবে ব্যবহার করে অন্যের উপর তা চাপিয়ে দেওয়ায় বাঙালি জাতিসত্তার চেতনা বিরোধী।

    অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন ‘পাহাড়িরা তাদের দাবীগুলোকে গৃহীত ও বাঙলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ক’রে নিতে চান,যা সংবিধানের মূল চেতনার বিরোধী।’১৯ অধ্যাপক আজাদ হয়ত এ বিষয়টি লক্ষ করেননি যে স্বয়ং বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার উপর গুরুত্বারোপ দেওয়া হয়নি। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রে সংবিধানে প্রণয়নে গণপরিষদকে কিছু ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। বাংলাদেশের গণপরিষদ একত্রে নিষ্ক্রিয় ছিল,তাঁর হাতে কোন নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। নির্বাহী ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রেপতি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিকট। গণপরিষদ তার কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। এজন্য দেখা যায় গণপরিষদে সংবিধান বিল আকারে উত্তাপিত হওয়ার পর যেসব সংশোধনী প্রস্তাব আছে তার অধিকাংশই বাতিল হয়ে যায়। আর এই বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক চেতনা বিরোধী।

    আর্টওয়ার্ক: ইনডিজিনার পিপল

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারাকাত আদিবাসীদের উপর কাজ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে কিভাবে আদিবাসীদের উপর বৈষম্যমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদেরকে বিমানবিকীকরণ করা হয়। আদিবাসীদের ক্রমাগতভাবে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। গারো, হাজং, ওরাও, রাখাইন, খাসিয়া ও সাঁওতালদের মধ্যে গড়ে ৬৮.৮ ভাগ লোকের নিজস্ব জমি নেই।২০

    অধ্যাপক আবুল বারাকাতের ভাষায় ‘আদিবাসী মানুষের ভূমির অধিকার স্বীকৃত নয় অথবা যতটুকু আছে তাও সহজে হরণযোগ্য।…. সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ এখন ভূমিহীন।….পঞ্চাশ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষের আনুপাতিক হার ছিলো ৭৫ শতাংশ,আর এখন তা ৪৭ শতাংশ’।২১ আদিবাসীদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্যা নিয়ে ভাবতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, সমাধান আরো বহুদূরের বিষয়।

    বাংলাদেশে আদিবাসীদের উপর বিভিন্ন সময় যে শারিরীক বা সাংস্কৃতিক সহিংসতা ঘটানো হয় এসব বিষয়কে মুছে ফেলার জন্য তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

    আমাদের দেশের শিল্প সাহিত্যে তাদের সমস্যা খুব একটা ফুটে উঠে না। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর ‘The Ugly Asian’ উপন্যাসে যেভাবে আদিবাসীদের জীবনের রাজনৈতিক জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন আমাদের দেশে তা খুবই বিরল। আলজেরিয়ায় জন্ম নেওয়া নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত ফরাসি উপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামু তাঁর সাহিত্যিক নীরবতার জন্য বিশেষভাবে সমালোচিত। তাঁর উপন্যাসের অধিকাংশ ঘটনা ঘটে আলেজেরিয়াকে কেন্দ্র করে। আর আলজেরিয়া তখন ফ্রান্সের উপনিবেশ। কিন্তু তাঁর গল্পে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলিত স্থানীয়দের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা অনুপস্থিত। অথচ ক্যামু একই সময়ে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা,লেখক ও রাজনীতির মধ্যে সম্পর্ক, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরব। ক্যামুর লেখায় স্থানীয়দের সমস্যার বিষয়টি পুরোপুরিভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। আমাদের দেশে শিল্প, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও আদিবাসীদের উপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একই কাজ করে থাকেন।

    সত্যিকার অর্থকে বাংলাদেশেকে অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বাইনারি ডিসকোর্স থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সহনশীলতার ভিত্তিতে একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলতে। যে সমাজে মুক্তি ঘটবে আপামর জনসাধারণের ।

    তথ্যসূত্র
    ১)Talal Asad, Formation of The Secularism: Christianity Islam Modernity, California 2003, page 23
    ২) Saba Mahmood,Religious Difference in a Secular Age: A Minority Report,Princeton University Press, page 8
    ৩)Carl Schmitt, Political Theology, Four Chapter on The Sovereignty, Chicago 2005, page 36
    ৪)Talal Asad, Ibd, page 168
    ৫) Max Horkheimer and Theodor W. Adorno,Dialectic of Enlightenment,Philosophical Fragment, California, 2002 page 142
    ৬)Saba Mahmood, Ibd, page 170
    ৭)Talal Asad, Modern power and the reconfiguration of religious tradition interview with Saba Mahmood (1996)
    ৮) Ewen MacAskill,
    George Bush: ‘God told me to end the tyranny in Iraq,The gurdian
    ৯)Olivier Roy, Secularism Confronts Islam,Colombia University Press, 2007
    page 74-75
    ১০)Theshale Tibebu,Hegel and the Third World : The Making of Eurocentrism in World History, Syracuse University Press page 256-57
    ১১)Michael R Anderson,Islamic Law and the Colonial Encounter in British India WLUML occasional paper no.7 – June 1996 page 5
    ১২) Ibd page 11
    ১৩)আলী রিয়াজ, দক্ষিণ এশিয়ায় মাদ্রাসাশিক্ষা: প্রাক-ঔপনিবেশিক এবং ঔপনিবেশিক আমল,প্রতিচিন্তা, প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৭(ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)
    ১৪)প্রাগুক্ত
    ১৫)আহমদ শরীফ,বাঙলা বাঙালী ও বাঙালীত্ব,১৯৯২, পৃষ্ঠা ১৭৪
    ১৬)Romila Thapar,What Secularism is and Where It Needs to Be Headed,The Wire,
    Oct 18, 2015
    ১৭) Arundhati Roy,The Doctor and the Saint,2014 page 43
    ১৮)মহিউদ্দিন আহমদ, বাঙালি-আদিবাসী জাতীয়তাবাদ বিতর্ক,প্রথম আলো, ১৯-০৮-২০১১
    ১৯) উদ্ধৃতিটি হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা’ বইয়ের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।
    ২০) Abul Barakat, Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh, page 27
    https://bea-bd.org › site › pdfPDF
    Political Economy of Unpeopling of Indigenous Peoples: The Case of Bangladesh/Abul Barkat
    ২১)আবুল বারাকাত, বাংলাদেশ কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি, পৃষ্ঠা ৩৬-৩৭।

  • মাধব চক্রবর্ত্তী।। প্রাচীন ভারতে গো মাংস ভক্ষণ

    মাধব চক্রবর্ত্তী।। প্রাচীন ভারতে গো মাংস ভক্ষণ

    • অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    শুধু পশ্চিমের দেশগুলোয় নয়, বৈদিক যুগের ভারতীয়দের ভেতরেও গো মাংস ভক্ষণ প্রচলিত ছিল। বৈদিক ভারতীয়রা যজ্ঞে কি কি বলি দিত সেটা থেকেই বোঝা যায় তারা কি খেত। কারণ মানুষ তার দেবতা বা ঈশ্বরের কাছে সেটাই তর্পণ করে যা সে নিজে খায়। সত্যি কথা বলতে বৈদিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠান এবং যজ্ঞেই ষাঁঢ় ও গরু বলি হতো। গোমেধ এবং অশ্বমেধ নামে প্রচলিত দুই পশু বলির কথা এপ্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সুলগাভা বলিতে ষাঁড় বলি দেয়া হতো। এই বলিতে ষাঁড়টিকে একটি বর্শা বা গজাল দিয়ে বিদ্ধ করা হতো। দেবতা রুদ্রকে খুশি করতে এই বলি দেয়া হতো। গ্রহসূত্রতে তেমনটাই বলা হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: চেয়ারিং বুল
    শিল্পী: ধীঙ্কর যাদব
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    বৈদিক সাহিত্যে গোমাংস বিষয়ক উদ্ধৃতি 

    ঋগ্বেদের একটি স্তবে বলা হয়েছে,‘‘ইন্দ্র তোমার ষাঁড় আহার করবেন।” ঋগ্বেদের আর একটি স্তবে অগ্নিকে ‘উকসন্ন’ এবং ‘বসন্ন’ বলা হয়েছে  যার অর্থ ‘ষাঁড় ও বন্ধ্যা গাভীর খাদক।’ শুধু যজ্ঞের জন্যই নয়, খাবারের জন্যও গবাদি পশুসমূহ নিয়মিত কসাইখানায় নেয়া হতো যা ঋগ্বেদের আরও একটি স্তবে স্পষ্ট। আবার, ঋগ্বেদে এটিও সুপারিশ করা হয়েছে যে গরু যেন তরবারি বা কুঠারে কাটা হয়। এটা লক্ষ্যনীয় যে বর্তমানের হিন্দু বলি প্রথায় যে ‘ঝটকা বলি’ বা এক কোপে প্রাণির মস্তক বিচ্ছিন্ন করার কথা আছে, সেটা তখনো চালু হয়নি। সত্যি বলতে ঋগ্বেদের যুগে প্রচুর মানুষ যে বরং গোমাংসের ভক্ত ছিল তার প্রচুর সাক্ষ্য-প্রমাণ আজো ছড়িয়ে আছে। এমনকি শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানেও গোমাংস ভক্ষণ ছিল অনুষ্ঠানের একটি আবশ্যিক অংশ।

    তবে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো যে এই একই ঋগ্বেদে মাঝে মাঝে গরুকে আবার ‘অঘ্ন (যাকে বলি দেয়া যায় না)’ হিসেবে ‘অলঙ্ঘ্যনীয়’ মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং গোটা ঋগ্বেদের এমনটি ষোল বার বলা হয়েছে, তবে তিন ক্ষেত্রে ‘অঘ্ন’ (যদি পুং বা ষাঁড় হয়) বলি দেয়া যেতে পারে। তবে এটা থেকে এমনটি ভাবা যাবে না যে সেই সময়ে গো ভক্ষণ কোন নিন্দিত কাজ ছিল। এই প্রসঙ্গে এটা বরং বলা যেতে পারে যে সংস্কৃতে বলির গরু বোঝাতে ‘বস (যার অর্থ বন্ধ্যা গাভী)’ শব্দটি ব্যবহার করা হত তবে দুধেল গরু কালে-ভদ্রে বলি দেয়া হতো। একমাত্র এবিষয়গুলো খেয়াল রাখলেই বোঝা বা ব্যখ্যা করা সম্ভব যে কিভাবে বেদে গাভীকে নানা প্রশংসা বাক্যে ভূষিত করা হয়েছে এবং অসংখ্য বৈদিক স্তোত্রে তাকে ‘রুদ্রগণের মাতা, বসুদের কন্যা, আদিত্যগণের ভগিনী এবং অমৃতের কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

    যদিও ঋগ্বেদের ‘অঘ্ন’ কথাটি তিনবার বলা হয়েছে,তবুও দুধেল গাভীকে হত্যা করা যেমন পুরো নিষিদ্ধ, তেমন কোন নিষেধাজ্ঞা ষাঁড় হত্যার ক্ষেত্রে নেই। তবে এমনটা হতে পারে যে বেদের কিছু স্তোত্রের রচয়িতারা যদি প্রাগার্য (অনার্য) ভারতীয়দের কেউ হয়ে থাকেন (যারা কিনা গোমাংস ভক্ষণ অপছন্দ করতেন)তারাই কালক্রমে অসুর এবং ব্রাত্যদের মত আর্যায়িত হয়ে গেলে বা আর্য সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত হয়ে গেলে তারাই গোটা গোপ্রজাতিকে অলঙ্ঘ্যনীয় হিসেবে তকমাভুক্ত করতে পারেন। যেহেতু ভারতের বাইরে গরুর এই অলঙ্ঘ্যনীয়তা কারোর জানা ছিল না বা জানা থাকার কথাও নয়।

    অথর্ব বেদের সময় আসা পর্যন্ত ভারতে গোমাংস ভক্ষণের রীতি অপরিবর্তিত ছিল। তবু ঋগ্বেদের নানা জায়গায় কালক্রমে গোমাংস ভক্ষণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হতে শুরু করে।

    আর্টওয়ার্ক: টয় ‍সেলর
    শিল্পী: সিদ্ধার্থ সিংগাড়ে
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    ব্রাহ্মণ যুগে গোমাংস ভক্ষণের অভ্যাস আরো বেড়ে যায়। ‘তৈতিরীয় ব্রাহ্মণ’ ‘কাম ইস্টি’ বা ছোটখাট যজ্ঞগুলোয় নানা দেবতার কাছে গোপ্রজাতির কাকে কাকে বলি দেয়া যেতে পারে তা বলা হয়েছে। যেমন,দেবতা বিষ্ণর কাছে দেয়া যেতে পারে একটি বামুন ষাঁড়।ঝুঁকে পড়া দুই শিঙ বিশিষ্ট আর কপালে একটি দাগবিশিষ্ট ষাঁড়কে রুদ্রের কাছে আর একটি সাদা ও বন্ধ্যা গাভীকে দিতে হবে সূর্য দেবতার কাছে। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’-এ ষাঁড়কে অন্যতম যজ্ঞ বা বলির পশু হিসেবে বলা হয়েছে। তৈত্তিরীয় এবং পঞ্চবিশ্ব ব্রাহ্মণ থেকে আমরা জানতে পারি যে  অগস্ত্য মুনী একটি যজ্ঞে একসাথে একশোটি ষাঁড় বলি দিয়েছেন। ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের অত্যাধিক গোমাংস প্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন ‘আমি এটা খাই তবে মাংস নরম (আঁশলা)’ হতে হবে। তবে বেশ অবাক করা বিষয় হলো যে, এই একই ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’ই গোমাংস খাবার বিরুদ্ধে দু’টো উপদেশ বা অনুরোধ রয়েছে।

    সূত্রসমূহের ভেতরে,কল্পসূত্র এবং গ্রহসূত্র-এ অল্পকথার ভেতরেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে জীবনের নানা ক্ষেত্রেই গোমাংস ছিল খাদ্যতালিকার একটি অংশ। সাংখ্যায়ণ সূত্রে বলা হচ্ছে যে, বিয়ের দিনে কনের বাবার বাড়িতে একটি ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দেয়া হবে এবং বিয়ের পর কনে যখন বরের বাড়িতে বর সমেত আসে,তখন বরের বাড়িতেও আর একটি ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দেয়া উচিত। এমনকি শ্রাদ্ধ বা পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে নানা তর্পণের ক্ষেত্রেও একটি ষাঁড় বা গরু বলি দেয়ার উপদেশ অপস্তম্ব এবং পরষ্কর গৃহসূত্র-এ বলা হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য এমনকি এমনও বলছেন যে গোমাংসের সুঘ্রাণে আত্মাসূহের আরোগ্য হয়। বশিষ্ঠ সূত্রে বলা হচ্ছে ‘যজ্ঞে নিমন্ত্রিত কোন সন্ন্যাসী যদি মাংস খেতে অস্বীকৃতি জানান…তবে তিনি নরকে তত বছর থাকবেন যতটা চুল সেই বলিকৃত পশুর ছিল বা আছে।’ খাদিরা এবং গভীলা-সূত্রে নতুন ঘর তোলার সময় বসতবাড়ির অধিষ্ঠাতা দেবতা বা অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উদ্দেশ্যে একটি কাল গরু বলি দেবার কথা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

    ঘরে সম্মানিত অতিথিবর্গ যেমন শিক্ষক, পুরোহিত, রাজণ্যবর্গ, বর বা গুরুগৃহে শিক্ষা শেষে ফিরে আসা বৈদিক ছাত্রের আগমন উপলক্ষ্যে ষাঁড় বা বন্ধ্যা গাভী বলি দিয়ে সম্মান জানানোর প্রথা চালু ছিল এবং একারণেই বৈদিক সাহিত্যে ঘরে আগত কোন অতিথিকে বলা হতো ‘গোঘ্ন’ বা ‘গোহত্যাকারী’ বা যার জন্য গরু হত্যা করতে হয়। ‘মধুপর্কে’র অনুষ্ঠান এপ্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। মধুপর্ক অনুষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে খুব প্রাচীন হয়ে থাকবে যেহেতু কোন সম্মানিত অতিথিকে গোমাংস সহযোগে আপ্যায়ন করার বিষয়টি ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ এবং ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’ উভয় গ্রন্থেই আছে। আর এসবকিছুই মোটামুটি ঋগ্বেদের যুগে ঘটে থাকবে।

    নৈতিক বিধিবিধান এবং গো–ভক্ষণ

    আমরা এখন স্মৃতি সাহিত্যের দিকে ফিরব। মনু, বশিষ্ঠের মতই, মাত্র এক পাটি দাঁত উঠেছে এমন যাবতীয় গবাদি পশুর মাংস ভক্ষণকে অনুমোদন দিয়েছেন। সেই হিসেবে তাহলে অবশ্যই গরুও এসব ভক্ষ্য প্রাণির তালিকায় আসবে এবং সেটা মেধাতিথি এবং রাঘবানন্দের মত পণ্ডিতদের মন্তব্য থেকেও পরিষ্কার। মনু রাজাদের আপ্যায়নেও মধুপর্ক সহযোগে গোমাংস দেবার সুপারিশ করেছেন। যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি সুনির্দিষ্ট ভাবে বলে যে ‘মাহ-ওক্ষ’ বা ‘বড় ষাঁড়’ এমন সব আয়োজনে (যেমন, রাজন্যবর্গের আপ্যায়নে) বলি দিতে হবে। সত্যি বলতে মনু এবং যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি উভয়েই বিশেষ বিশেষ আয়োজন যেমন যজ্ঞ বা পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণে গবাদি পশুর বলি দেবার সুপারিশ  করেছেন। বিশেষ দিনগুলো ছাড়া গোহত্যা ‘উপপাতক’ বা ‘ছোট পাপ/অন্যায়’ হলেও ‘মহাপাতক’ বা ‘বড় পাপ/অন্যায়’ ছিল না।  যদিও মনু-স্মৃতির লেখক ব্যক্তিগত ভাবে ‘অহিংসা’ নীতির নিশ্ছিদ্র সমর্থক ছিলেন এবং যিনি কিনা এমনটাও বলেছিলেন যেহেতু কোন জীবন্ত প্রাণিকে হত্যা না করে কোন মাংস পাওয়া সম্ভব নয়,আর জীব হত্যা করে স্বর্গে যাওয়া সম্ভব নয়, সুতরাং মাংস খাওয়া বাদ দেওয়া উচিত, তবে সেই যুগে তখনো মাংস খাওয়ার চল ছিল আর তাই মনুর এই মতামত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে আরো কয়েকশ বছর লেগে গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: বুল আন্ডার মুনলাইট
    শিল্পী: ধীঙ্কর যাদব
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    প্রাচীন বিজ্ঞান এবং সাহিত্য থেকে 

    ভারতের প্রাচীন ব্যাধি ও আরোগ্য সংক্রান্ত কাজগুলোর ভেতর ‘চরক সংহিতা’য় গর্ভবতী মেয়েদের গোমাংস খেতে বলা হলেও প্রতিদিন সবাইকে খেতে মানা করা হয়েছে। আর. এল. মিত্র আমাদের আরো জানান যে মধ্যযুগের ভারতীয় কিছু ব্যাধি ও আরোগ্য শাস্ত্রে মূর্চ্ছা যাওয়া রোগীদের জন্য গোমাংসের স্যূপ পথ্য হিসেবে নির্দেশিত হয়েছিল।

    মহাকাব্যগুলোয় ‘গোমেধ’ যজ্ঞের কথা সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘মহাভারত’-এর ‘বনপর্বে’ একথাও বলা হয়েছে যে বৈদিক মন্ত্রের উচ্চারণের সাথে সাথে বলিকৃত পশুরা স্বর্গ পাবে এবং বনপর্বে রাজা রন্তিদেবের কথাও বলা হয়েছে যার যজ্ঞ আয়োজনে প্রতিদিন গরুসহ দু’হাজার প্রাণি বলি হতো। আবার ‘মহাভারত’-এর ‘উদ্যোগপর্বে’ রাজা নহুষ মহামুনী অগস্ত্যের অভিশাপে স্বর্গ খেকে নিচে নিক্ষিপ্ত হন যেহেতু তিনি গরু হত্যা বিষয়ে বেদের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং একজন ব্রাহ্মণকে অপমান করেন।

    ভবভূতি তাঁর ‘উত্তর রাম-চরিত’-এ (৪র্থ দৃশ্য) বর্ণনা করেছেন যে কিভাবে মহাকবি বাল্মীকি মহামুনী বশিষ্ঠকে আমন্ত্রণ জানাবেন বলে বেশ কিছু বাছুর বলি দেন। একই লেখকের ‘মহাবীরচরিত্র’ গ্রন্থ থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে কিভাবে বশিষ্ঠ নিজে বিশ্বামিত্র, জনক, সতানন্দ এবং অন্যান্য মুনীদের ‘হৃষ্টপুষ্ট বাছুর’ দিয়ে আপ্যায়ণ করেছেন ও জমদগ্নকে এই বলে প্রলুব্ধ করেছেন,‘বকনা-বাছুর বলির জন্য প্রস্তুত এবং ঘৃতে পলান্ন প্রস্তুত করা হয়েছে।’

    কৌটিল্যর ‘অর্থশাস্ত্রে’ গবাদিপশুরা শ্রেণিবদ্ধ, যেখানে ষাঁড়সমূহকে কসাইখানায় পাঠানোর অভিপ্রায় মনোগত তবে দুধেল গাভি এবং বাছুর যজ্ঞের জন্য মনোনীত হলেও কসাইয়ের তাঁবুতে নিষিদ্ধ। অশোক তাঁর শিলালিপি ১-এ এবং স্তম্ভ লিপি–১-এ উল্লেখ করেছেন যে শুরুতে হাজার হাজার পশু রাজকীয় রান্নাঘরে বলি দেয়া হতো। প্রজাদের ভেতর গোমাংসের বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে ‘অহিংসা’র প্রবল প্রচারক অশোক বছরের মাত্র কয়েকটি দিন প্রাণি হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। যেমন, প্রজননক্ষম ষাঁড় বধ্য তালিকায় থাকলেও গাভী হত্যা করা যাবে না।

  • একটি আষাঢ়ে গল্প

    একটি আষাঢ়ে গল্প

    • শহিদুল ইসলাম

    এক.
    ১৯৮১ সালে লিখেছিলাম ‘সাম্প্রতিক আবিষ্কারের আলোকে মানুষের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশ’ নামে একটি প্রবন্ধ। সেটি ছাপা হয়েছিল মফিদুল হক সম্পাদিত গণসাহিত্য পত্রিকার নবম বর্ষ: চতুর্থ-দশম সংখ্যা; আশ্বিন ১৩৮৮, অক্টোবর ১৯৮১ সংখ্যায়। মানুষের জন্ম কবে? মানুষ এলো কোথা থেকে? আজ যে চেহারা নিয়ে আমরা পৃথিবীতে বিচরণ করছি, এই চেহারা নিয়েই কি আমরা পৃথিবীতে এসেছি? এসব প্রশ্ন মানুষকে যুগে যুগে ভাবিয়েছে। জন্ম নিয়েছে হাজারো মিথ ও ধর্মের। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম এসব প্রশ্নের একটা সমাধান দেবার চেষ্টা করে এসেছে। বহুকাল পর্যন্ত মানুষ বিশ্বাস করে এসেছে, সৃষ্টির প্রথম দিনটি থেকে মানুষ এই পৃথিবীতে বাস করছে মানুষ হিসাবেই। ধর্মীয় প্রভাবের আওতায় মানুষ কোনদিন ভাবতেই পারেনি যে নিম্নতর প্রাণিজগতের সঙ্গে রয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন।

    শহিদুল ইসলাম

    ১৯৯১ সালে নরওয়ে ভাষায় প্রকাশিত জাস্টিন গার্ডারের সফির জগত বইতে দু’টি প্রশ্ন উত্থাপন করে ১৪ বছরের সফিকে দর্শনের ক্রমইতিহাস শিখিয়ে ছিলেন। সে প্রশ্ন দু’টি হল: ‘তুমি কে?’ এবং ‘পৃথিবী কোথা থেকে এল?’ আদি গ্রিক দর্শন থেকে তিনি সাম্প্রতিককালের দর্শনের ইতিহাস উপন্যাসের মত তুলে ধরেছেন।

    ২০০৪ সালে রোনাল্ড রাইট তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করে মানুষের ভবিষ্যত কি তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সে তিনটি প্রশ্ন হল: এক. আমরা কোথা থেকে এলাম? দুই. আমরা কে? ও তিন. আমরা কোথায় চলেছি? রাইট বলছেন যে, মনে হতে পারে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে মানুষের কি হবে, তা কি আগে থেকে বলা যায়? কিন্তু রাইট মনে করেন, তা সম্ভব যদি আমরা প্রথম দু’টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। সে ইতিহাস তো আমাদের সামনেই আছে। তিনি আমাদের সভ্যতাকে একটি জাহাজ মনে করেন। প্রকৃতির সব আত্মীয়-স্বজনকে সে জাহাজে তুলে আমরা ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছি। সে জাহাজের গতিবেগ ক্রমাগত বাডছে। অতীতের চাইতে সে জাহাজ আজ অনেক বড়। আরো বেশি ভারাক্রান্ত। যে জাহাজে আজ আমরা চলেছি, সে জাহাজ কেবল সর্বকালের সর্ববৃহৎ জাহাজ নয়, সেটাই একমাত্র জাহাজ। অতীতে একটি জাহাজ ডুবলে আমাদের রক্ষার্থে আর একটি জাহাজে ওঠার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আজ আর কোনো জাহাজ নেই। আজকের জাহাজ ডুবলে আর কোনো জাহাজ আমাদের উদ্ধার করতে আসবে না। তার অর্থ নির্ঘাত মৃত্যু। অন্যান্য প্রাণীর মত আমরাও ভুল করি। তারপর শিখি। এভাবেই আমরা এতদূর এসেছি। কিন্তু আজ ভুল করা বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়।

    আমরা অধিকাংশ আজও ভিক্টোরিয়ো যুগের উন্নয়ন দর্শনে বিশ্বাসী। সে দর্শনের মূল কথা উন্নয়ন সবসময় উন্নয়নমুখি। তার গতি একমুখি। কেবল সামনের দিকে এগিয়ে চলে। সমাজ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সে পরিবর্তন কেবল উন্নয়নমুখি। এটাই হল ভিক্টোরিয়ো যুগের দর্শনের আসল কথা। উন্নয়ন কি কেবল প্রকৃতিক? স্তন্যপায়ী জীব সরীসৃপ থেকে দ্রুতগামী, উল্লুক ষাঁড়ের চেয়ে চালাক, মানুষ সবার চেয়ে চালাক। কিন্তু আমাদের প্রাযুক্তিক সংস্কৃতি প্রযুক্তির উন্নয়ন দিয়ে বিচার করা হয়। ঘুষির চাইতে মুগুর অনেক বেশি উন্নত, তীর-ধনুক মুগুরের চেয়ে ভাল এবং বুলেট তীর-ধনুকের চাইতে অনেক বেশি উন্নত।

    আজ বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনবরত সাবধানবাণী উচ্চারণ করে চলেছেন। সুইডেনের ১৬ বছরের স্কুল ছাত্রী গ্রেটা থানবার্গ তো বলেইছে, আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে। সে আগুন নেভানোর জন্য বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এখুনি তৎপর হতে আহবান জানিয়েছে। তার সে ডাক পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে গেছে। তা এক বিরাট আন্দোলনের সূচনা করেছে। কিন্তু কোন দিক থেকে কোনো শুভ সংবাদ আসছে না। কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের ফল আমরা ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছি। সমগ্র পৃথিবী আজ অগ্নিদগ্ধ। জলবায়ু দূষণ চরম পর্যায়ে চলে গেছে। মানুষের তৈরি প্লাস্টিক মাত্র একশ’ বছরের মধ্যে আমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁডিয়েছে। আজ প্লাস্টিকমুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য সারা বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থা গড়ে উঠেছে।

    আর্টওয়ার্ক: সামিট
    শিল্পী: ফাদিটুন
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    আজ পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭.৭ বিলিয়ন। আগামী ২০৫০ সালে তা ৯.৭ বিলিয়নে পৌঁছাবে এবং ২১০০ সালে ১১ বিলিয়নে। অর্থাৎ আর মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে আমাদের আরো দুই বিলিয়ন মানুষের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়বে। এখুনি আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ শোনা যাচ্ছে, তাতে লক্ষ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী নিশ্চিহ্ন হবার পথে। ১৯৭০ সালের পর আমাদের বৈষয়িক উন্নয়নের ফলে ৬০ ভাগ প্রাণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শাসকশ্রেণীর কানে সেসব সাবধানবাণী প্রবেশ করছে না। প্রাযুক্তিক উন্নয়ন চোখে দেখা যায়। তাই প্রাযুক্তিক উন্নয়নের প্রতি পৃথিবীর সমস্ত সরকার একাট্টা। বুলেট ট্রেন, নয়নাভিরাম নগর- বন্দর-শহর, আকাশছোঁয়া ভবন, রিসোর্ট, পাঁচতারা হোটেল তৈরির দিকেই সবার মনোযোগ। জলবায়ুর ক্ষতি হোক কোন ক্ষতি নেই। লক্ষ কোটি গাছ কেটে, নদীনালা ভরাট করে সেখানে হাই রাইজ ভবনসহ ইকোপার্ক ইত্যাদি তৈরি করলে মানুষ একদিন সেই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের কথা ভুলে যাবে। যেমন আমরা জঙ্গলাকীর্ণ গুলশান বনানীর কথা ভুলে গেছি। পৃথিবীর উন্নতদেশের আলোকোজ্জ্বল শহরগুলি দেখে আমরা অবাক হয় ভাবি দেশটি কত উন্নত। কিন্তু যে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে সেইসব শহর গড়ে উঠেছে, আমরা তা ভুলে যাই।

    তাই জন রাইটের জাহাজটি ডুবেছ। ষষ্ঠবারের মত পৃথিবী প্রাণ শুন্য হতে চলেছে। টাইটানিক জাহাজের মত আমাদের মানব-সৃষ্ট সভ্যতার জাহাজটি ডুবছে। আমরা ছুটাছুটি করছি। উদ্ধার করার কেউ নাই। অবশেষে সত্যিই একদিন জাহাজটি ডুবলো। পৃথিবী পৃষ্ঠ সবরকম প্রাণচাঞ্চল্য, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, পানি দূষণের জন্য আর কোন প্রাণী রইলো না। প্রাণশূন্য পৃথিবী মহাশূন্যে তার দৈনন্দিন ঘুর্ণনে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রইলো।

    দুই.
    বহু বছর নিঃসঙ্গ, প্রাণহীন পৃথিবী কক্ষপথে ঘুরেছে। নিঝুম, উদ্ভিদ, প্রাণীর নেই কোন কোলাহল। নেই মানুষের অত্যাচার। কত বছর কেটে গেছে কেউ জানে না। কবে যে সেখানে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার হল, তা’ও কেউ বলতে পারে না। তারপর বছরের পর বছর ঘুরে আসে। পৃথিবী আবার ফুলে ফলে ভরে ওঠে। নতুন নতুন গাছগাছড়া, নতুন নতুন প্রাণীর কোলাহলে আবার পৃথিবী নতুনভাবে জেগে ওঠে।

    দশ হাজার পর সেখানে উদ্ভব ঘটে এক নতুন বুদ্ধিমান প্রাণী। তখনও তার নাম ছিল না। কে দেবে তাদের নাম। মানুষের মত দেখতে কিন্তু মানুষ নয়। সবই মানুষের মত কেবল তাদের কপালের ওপর একটিমাত্র চোখ। আমরা দু’চোখ দিয়ে যা দেখতে পাই না। তারা একচোখ দিয়ে অনেক বেশি দেখতে পায়। ক্রমে তারা পৃথিবী দখল করে। হিংস্র প্রাণীগুলি তাদের বুদ্ধির কাছে হার মেনে তাদের শাসন মেনে নেয়।

    আর্টওয়ার্ক: ডেট্রোয়েট ম্যুরাল

    সময় গড়িয়ে চলে। তাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাডতে থাকে। তারা সমাজ, সভ্যতা, বড় বড় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সৃষ্টি হয় সামাজিক বিভাজন। অধিকাংশ মানুষ উৎপাদনে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও দু’বেলা দু’মুঠো খাবার পায় না। আর মুষ্টিমেয় শাসকশ্রেণী বিলাস-ব্যাসনে সমাজের মাথায় বসে থাকে। তাদের খেদমত করার জন্য একদল মধ্যবর্তী মানুষের সৃষ্টি হয়। তারা শাসক শ্রেণীর সেবা করে বেশ ভালভাবে জীবন যাপন করে। গড়ে ওঠে শিল্প কলকারখানা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণাগার, বাজার, যাতায়াত ব্যবস্থা। যা প্রয়োজন তার সব কিছু গড়ে তোলে নতুন পৃথিবীর নতুন শাসকশ্রেণী। মাঠে-ঘাটে-কলকারখানায় হাড্ডিসার মানুষ পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়েও শাসকশ্রেণীর মন ভেজাতে পারে না।

    জ্ঞানে বিজ্ঞানে তারা বহু কিছু আবিষ্কার করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ দূর হয় না। গতরখাটা মানুষগুলো ভিতরে ভিতরে ফুঁসতে থাকে। মাঝে মাঝে অসন্তোষের আগুন জ্বলে ওঠে। তখন শাসকশ্রেণী অনন্ত অসীম আকাশে এক বিরাট উপগ্রহ স্হাপন করল। তার এমন শক্তি যে কেবল কোন বহিঃশক্তি নয়, দেশের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টিকারীদের মুহুর্ত নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। শত শত বছর পার হয়ে গেল। মানুষের মনে সেই উপগ্রহটি ঈশ্বরের স্থান গ্রহণ করল। সবাই তাকে স্রষ্টার আসনে বসিয়ে তার পূজোঅর্চনা করতে শুরু করে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল সমাজ ও নৃবিজ্ঞানী এবং পুরাতত্ববিদ পৃথিবীর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল।

    তিন.
    একদল সমাজ বিজ্ঞানী ও পুরাতত্ত্ববিদ পাঁচ বছর গবেষণা পরিচালনার পর একটি পুরানো সভ্যতার সন্ধান পায় যার বয়স দশ হাজার বছর। তারা আবিষ্কার করে যে, তখন অনেক ধরনের প্রাণীর সাথে ‘মানুষ’ নামের এক বুদ্ধিমান প্রাণী বাস করতো। তারাও আজকের মত বিশ্বময় নানা ধরনের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। যারা সবচে’ উন্নত মারণাস্ত্র তৈরি করেছে, তারা অন্যসব জাতি, রাষ্ট্র, সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য স্থাপন করেছে এবং নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এখনকার মত তখনও সমাজ ছিল ধনী ও দরিদ্রে বিভাজিত। এখনকার মত তখনও মুষ্টিমেয় শাসক শ্রেণী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে শাসন ও শোষণ করতো। যারা সম্পদ উৎপাদন করতো, তাঁরাই অর্ধভুক্ত থাকতো। তাদের কোন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ছিল না। শাসকশ্রেণী তাদের সুবিধার্তে আইন তৈরি করতো এবং সবাইকে তা মানতে বাধ্য করা হত। সেসব আইন প্রয়োগের জন্য আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল।

    আর্ট্ওয়ার্ক: আইডেনটিটি
    শিল্পী: ভ্লাদিমির কাজানভস্কি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    সেইসাথে তারা ‘ঈশ্বর’ নামে এক শক্তিশালী আন্তঃবিষয়ী সত্তার ধারণা প্রচার করে, যিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী। তার খেদমত করার জন্য সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ উপাসনালয় গড়ে তোলে এবং সেগুলি দেখভালের জন্য লক্ষ লক্ষ খেদমতগার নিয়োগ করে। তারা সেই  ‘আন্তঃবিষয়ী’ সত্তার প্রতি সমস্ত মানুষের বিশ্বাস ও সভয় শ্রদ্ধা আদায়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকতো। শাসক শ্রেণী তাদের সর্বোতভাবে সাহায্য করে। তাদেরও কোন অভাব থাকে না। তারা ‘স্বর্গ-নরকের’ ধারণার সৃষ্টি করে। যারা ঈশ্বরের আদেশ মত চলবে, তাদের জন্য এক অনন্ত আনন্দ-সুখের স্বর্গে যাবে আর যারা বেয়াদবি করবে তারা নরকের অনন্ত লেলিহান আগুনে পুডবে। শাসক শ্রেণীর শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারা। তাছাড়া উচ্চ শিক্ষিত একদল মানুষের সৃষ্টি হয়। তাদের বলা হত ‘বুদ্ধিজীবী’। তারা নিত্য নতুন দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সৃষ্টি ক’রে সমাজ-সভ্যতার প্রভূত উন্নতি সাধন করে। তখনকার শাসকশ্রেণী তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করে। তাদের বড় বড় পুরস্কার, খেতাবে ভূষিত করে। তারা শাসকশ্রেণীর শাসন টিকিয়ে রাখতে বড় বড় গবেষণা করে, বই-পুস্তক লেখে। এতে শাসকশ্রেণী খুশি হয়। আর যে দু’চার জন বুদ্ধিজীবী বেয়াদবি করে, সত্য প্রকাশ করে, তাদের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করে। এ রকম বেয়াদব বুদ্ধিজীবীর নামও তারা খুঁজে পেয়েছে। আবিষ্কারের পর গবেষকদল সিদ্ধান্ত নিল যে তারা তাদের গবেষণাপত্রটি প্রধান শাসকের হাতে তুলে দেবেন।

    তারা তার সাক্ষাতকারের জন্য আবেদন করল। রাজা মাত্র প্রধান গবেষকের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিল। সঠিক সময়ে প্রধান গবেষক রাজার দরবারে গেল। তিনি সহাস্যে তাকে আহবান করলেন। তিনি তার গবেষণার বিষয় জানতে চান। গবেষক সব কিছু খুলে বলে। শোনার পর রাজা সহাস্যে তার গবেষণালব্ধ ফলের জন্য বাহবা দিলেন। গবেষকের চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল। তখন রাজা বলেন, ‘দেখ, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ মহাশূন্যে ঐ সর্বশক্তিমান মহাকাশযানটি প্রতিস্থাপন করে গেছেন এবং তিন হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সব মানুষ তা সাগ্রহে বিশ্বাস ক’রে গ্রহণ করেছে। তোমাদের এই গবেষণালব্ধ ফলাফল যদি প্রকাশ করো, তাহলে তার পরিণাম কী হতে পারে?’ গবেষকের প্রশ্নবোধক চেহারার দিকে চেয়ে রাজা বলেন, ‘তোমার এই সত্য কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। বরং তারা মিছিল ক’রে আমার কাছে আসবে তোমার বিচারের জন্য। তখন আমি কী করবো? শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আমাকে তো কিছু করতেই হবে। জনগণ তোমাদের মৃত্যুদণ্ড চাইতে পারে। তাদের চাপের মুখে আমাকে কিছু করতেই হবে।’ গবেষক বলে, ‘তাহলে কি সত্য প্রকাশ করা যাবে না?’ রাজা বলেন, ‘তোমার ইচ্ছা হলে তুমি তা প্রকাশ করতে পার। কিন্তু তার দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে। তুমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আমাকে তোমার বিচার করতে হবে। আদালত কী রায় দেয়, তা তো আমি জানি না। আমাকে সেইমত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

    আর্টওয়ার্ক: সেল্ফ এক্লোজার
    শিল্পী: এলিনা
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    একথা শুনে গবেষক নীরব হয়ে যান। কিছুক্ষণ নীরবতার পর রাজা বললেন, ‘দেখ, তোমাকে আমি ভালবাসি। তাই তোমার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুবিধার্তে আমি দু’টি বিকল্প রাস্তার কথা বলবো। যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করার তোমার পূর্ণ অধিকার আছে।’ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে গবেষক রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রাজা বললেন, ‘এক, তুমি সত্য প্রকাশ করো এবং তার পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকো এবং দুই, তুমি ফাইলটি আমাকে দাও। বদলে তুমি গবেষণার জন্য যত টাকা প্রয়োজন তুমি পাবে। লক্ষ-কোটি যত চাও, তোমার সহকর্মীদের নিয়ে আরো উন্নত গবেষণা পরিচালনা করো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কারে তোমাকে ভূষিত করা হবে। সমগ্র পৃথিবী তোমার জয়গান করবে। তুমি ঠিক করো তুমি কোনটা গ্রহণ করবে।’ গবেষক কিছু সময় নিস্তব্ধ থেকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলেন। ঘড়ির কাঁটার শব্দ যেন গর্জন করছে। রাজা ঠোঁটের কোনায় এক টুকরো মৃদু হাসি ধরে রেখে তার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তারপর গবেষক নিরবে ফাইলটি রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা সহাস্যে সেটি নিয়ে বললেন, ‘এই তো তুমি সুন্দর সিদ্ধান্ত নিলে। তুমি তো জান যে দশ হাজার বছর আগে সত্য কথা বলে কতজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমি চাইনি তুমি তাদের পথ বেছে নাও।’ একথা বলে রাজা দশ কোটি টাকার একটি সিলমোহর গবেষকের হাতে তুলে দিলেন।

    গবেষক সেটি নিয়ে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে এল। সত্যি কিছুদিনের মধ্যে তার খ্যাতি সমগ্র বিশ্ব ছডিয়ে পড়ল। একদিন রাজা এক বিরাট সম্বর্ধনার মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানটি তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

  • লরা স্পিনি।। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো ১৯১৮’র স্প্যানিশ মহামারী

    লরা স্পিনি।। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো ১৯১৮’র স্প্যানিশ মহামারী

    • নাঈমা নুসরাত যূথীকা

    মূল রচনাটির লেখক  লরা স্পিনি, তিনি একজন বৃটিশ বিজ্ঞান বিষয়ক সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “পেল রাইডার” ১৯১৮ সালের মহামারী অবলম্বনে লেখা। এই প্রবন্ধটি তিনি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রচনা করেন।  অনুবাদটি  প্রথমে নয়া দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়। 

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ইনটেরিয়র অব হসপিটাল টেন্ট
    শিল্পী: জন সিঙ্গার
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    মূল রচনা
    প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯১৮ সালে, সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে বা পুরো মানব ইতিহাসে, ব্ল্যাক ডেথের পর মৃত্যুর জোয়ার নেমেছিল। আমরা সেই জোয়ারকে স্প্যানিশ ফ্লু বলি এবং এর ফলে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য খাতেও সর্বাধিক বিপ্লব ঘটে তখনই।

    বিশ শতকের প্রথম দশকে পৃথিবী অন্যরকম ছিল। বিশেষত, স্বাস্থ্যসেবার সম্পর্কে তখনও কোন নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা ছিল না। শিল্পোন্নত বিশ্বে বেশিরভাগ ডাক্তার হয় স্বাধীনভাবে কাজ করতেন নয় বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দ্বারা অনুদান পেতেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের আওতার বাইরে থাকত তারা।

    জনস্বাস্থ্য নীতি যেমন অভিবাসন নীতিগুলি ধার্য করত ইউজেনিক্সরা। সুবিধাপ্রাপ্ত এলিটরা কর্মীদের এবং গরিবদেরকে নিম্নমানের মানুষ হিসেবে গণ্য করত। তারা মনে করত, প্রাকৃতিক অবক্ষয়ের ফলে গরিবদের মধ্যে রোগব্যাধি লেগে থাকে। এলিটরা এটা বুঝত না যে দরিদ্রদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, অত্যাধিক শ্রম এবং নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের কারণে তাদের অসুস্থতা দেখা দিত। কলেরা বা টাইফয়েড অথবা অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগে নিম্ন শ্রেণির মানুষদের মৃত্যু ঘটলে ইউজেনিসিস্টরা দায়ী করতো তাদেরই কারণ দরিদ্র মানুষের মধ্যে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল না। মহামারীর সময়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বোঝাতে অভিজাতদের জীবন রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপকে বোঝান হত।

    স্প্যানিশ ফ্লু এর প্রথম তরঙ্গটির উদ্ভব হয়েছিল ১৯১৮ সালের বসন্তে যদিও এর সাথে স্পেনের কোন সম্পর্ক ছিল না। একে স্প্যানিশ ফ্লু বলা হয় কারণ অন্যান্য যুদ্ধরত দেশগুলির পক্ষপাত যুক্ত সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে স্পেনের নিরপেক্ষ সংবাদপত্রগুলি এই রোগের গতিবিধি সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ফ্লুটি অন্যান্য সংক্রামক জ্বরের মত কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে ছড়ায়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে যখন অনেক মানুষ এক জায়গায় একত্রিত হয়, উদাহরণস্বরূপ বস্তি অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে। অতএব এই রোগকে ভিড়ের অসুখ (ক্রাউড ডিজিজ) বলেও উল্লেখ করা হয়।

    ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুয়ের প্রথম তরঙ্গটি তুলনামূলকভাবে হালকা ছিল, মৌসুমী সংক্রামক জ্বরের মতই প্রায়। কিন্তু  যখন মহামারীটির দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায় ১৯১৮ সালের শরৎকালে শুরু হল তখন জনগণ বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এটি একই রোগ। উদ্বেগজনকভাবে এর আগের মহামারী সংক্রামক জ্বরের চেয়ে এই সময় ২৫ গুণ বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। যদিও প্রাথমিকভাবে তারা সংক্রামক জ্বর, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথাকেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু শীঘ্রই আক্রান্ত ব্যক্তিদের মুখ নীল হয়ে উঠছিল, শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল, এমনকি তাদের নাক এবং মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল। মুখ নীল থেকে কালো হয়ে গেলে তাদের আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকত না। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্কুচিত ফুসফুসগুলোতে এত বেশি পানি জমেছিল যে তারা শ্বাস নিতে পারত না এবং কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতো। ঐ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তে এসে দ্বিতীয় তরঙ্গটি দেখা দিয়েছিল, তবে ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে তৃতীয় এবং চূড়ান্ত তরঙ্গ দেখা দেয় যেটি অন্য দুটোর চেয়েও অত্যাধিক তীব্র ছিল।

    আর্টওয়ার্ক: ডেথ অ্যান্ড দ্য মেইডেন
    শিল্পী: এগন শেইলি
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    সংক্রামক জ্বরটি একটি ভাইরাসের কারণে হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ চিকিৎসকই ধরে নিয়েছিলেন যে তারা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নিয়ে কাজ করছেন। অর্থাৎ সকলে স্প্যানিশ ফ্লুর বিরুদ্ধে প্রায় সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ছিল। তাদের কাছে কোনও সংক্রামক জ্বরের ভ্যাকসিন বা  অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ছিল না, এমনকি কোনও অ্যান্টিবায়োটিকও ছিল না যেটি সেকেন্ডারি ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণের বিরূদ্ধে কার্যকর হতে পারে। ফলে বেশিরভাগ আক্রান্ত মানুষই মারা যায় (নিউমোনিয়ার মত)। জনস্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণ যেমন- আক্রান্তদের পৃথকীকরণ বা জনসভার স্থানগুলি বন্ধ কার্যকর করা হয়েছিল কিন্তু অনেকটা দেরিতে, যেহেতু ১৯১৮ সালের এই ইনফ্লুয়েঞ্জা কোন নির্ণয়যোগ্য রোগ ছিল না। এর অর্থ হল চিকিৎসকরা কর্তৃপক্ষের কাছে কেসগুলি রিপোর্ট করতে বাধ্য ছিলেন না, যার ফলস্বরূপ কর্তৃপক্ষ এই মহামারীটির প্রাদুর্ভাব আন্দাজ করতে ব্যর্থ হয়।

    বর্তমান অনুমান অনুযায়ী এই রোগটি ৫০ থেকে ১০০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২.৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ছড়িয়েছিল। এই সংখ্যাগুলির সাথে বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি মানুষ। এরপর বিশ্বজুড়ে অসুস্থতা এবং মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বহুবিধ কারণে, মহামারীবিদরা তখন থেকেই সেগুলো নিয়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন মহামারীতে ব্যাপকভাবে দরিদ্র মানুষেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সবচেয়ে বেশি তবে অভিজাতরাও কোনভাবে রেহাই পায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ এই বিপর্যয় থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, সেটা হল সংক্রামক রোগের জন্য কোনও ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত না বা তাকে একঘরে করে রাখাও উচিৎ না।

    ১৯০০ শতকের বিশের দশকে বহু সরকার সামাজিক চিকিৎসার ধারণাকে গ্রহণ করেছিল- সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় স্থানে বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান করা হত। রাশিয়াই প্রথম দেশ যেখানে একটি কেন্দ্রীভূত জনস্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা রাষ্ট্রায়ত্ত বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে কার্যকর করা হয় এবং পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্যরাও এটা অনুসরণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়োগকর্তা-ভিত্তিক বীমা স্কিমগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা পথ গ্রহণ করে, তবে সেখানেও সংক্রামক জ্বর মহামারী পরবর্তী বছরগুলিতে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

    ১৯২৪ সালে সোভিয়েত সরকার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এর মাধ্যমে তারা পেশাগত এবং সামাজিক অবস্থা যা রোগ সৃষ্টি করে তা নিয়ে গবেষণা করার সামর্থ্য অর্জন করে এবং শুধুমাত্র রোগ নিরাময় নয় তারা রোগ প্রতিরোধের উপায়গুলোও জানতে পারে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে এই নীতিই গৃহীত হয়েছিল। নতুন এই চিকিৎসা পদ্ধতি কেবল জৈবিক এবং পরীক্ষামূলক নয়, সমাজবিদ্যাগতও। জনস্বাস্থ্য এখন প্রায় এরকম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

    সোভিয়েত পোস্টার

    জনস্বাস্থ্যবিদ্যার মূল ভিত্তি হল মহামারী সম্পর্কে অধ্যায়ন। যেখানে রোগের ধরণ, কারণ এবং রোগের প্রভাবগুলির অধ্যায়ন যা এখন পুরোপুরি বিজ্ঞান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মহামারী সংক্রান্ত বিদ্যার জন্য তথ্য প্রয়োজন। ফলে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ আরও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত রাজ্য একটি জাতীয় রোগ প্রতিবেদন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। ১৯১৮ সাল থেকে যে সকল প্রাথমিক সতর্কতা নির্ণয় যন্ত্রের অভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিয়েছিল সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু হয়। দশ বছর পরে, জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যের প্রতি কর্তৃপক্ষ নজর দেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রথম জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ করা হয়।

    ১৯২০ এর দশকে অনেক দেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তৈরি বা সংস্কার করেছিল এই মহামারীর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসাবে। এ সময় জনস্বাস্থ্য নেতারা হয় পুরোপুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বাদ পড়েছিলেন অথবা শুধুমাত্র অন্যান্য বিভাগের তহবিল এবং ক্ষমতাগুলির জন্য অবেদন করতে পারতেন। তবে আন্তর্জাতিক স্তরে জনস্বাস্থ্যের সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতিও ছিল, কারণ স্পষ্টতই সংক্রামক রোগগুলি কোন দেশের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ১৯১৯ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় মহামারী নিয়ে লড়াইয়ের জন্য একটি আন্তর্জাতিক ব্যুরোর উদ্বোধন করা হয়েছিল, একে আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক কাঠামো বলা চলে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গড়ে তোলার আগে ইউজানিকদের নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল এবং নতুন সংগঠনটির সংবিধান স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এতে বলা হয় ‘জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে’। যদিও এই দর্শন সংক্রামক জ্বরের মত মহামারীগুলির হুমকিকে দূর করতে পারেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গড়ে ওঠার পর এরকম তিনটি মহামারী এসেছে এবং ভবিষ্যতে নিশ্চয় আরও আসবে, তবে মানুষ আগে যেভাবে এর মোকাবেলা করত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আসার পর এগুলোর মোকাবেলায় অনেকগুলো বদল এসেছে। এর দ্বারা এটা বোঝা গেছে যে, মহামারী কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয় বরং সামষ্টিক কেন্দ্রিক।

     

  • হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    হাক্কি ওজদাল।। জুলাই ১৫ থেকে আয়া সোফিয়া: পুঁজিবাদের পথে তুরষ্ক

    অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

    আর্টওয়ার্ক: হাগিয়া সাফিয়া
    শিল্পী: রাফায়ে জাফের
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    গেল ১৫ই জুলাই ছিল ২০১৬ সালে তুরষ্কে যে ক্যু বা সামরিক অভ্যুত্থানটি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল তার চতুর্থ বছর। ঐ দিনটি তুরষ্কের নিওলিবারেল রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনের বেদিতে বলীকৃত অপরিহার্য সমাপ্তি হিসেবেই গণ্য স্মরিত হবে। তুরষ্কের এই নব্যগঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালের ক্যু-এর সাথে যা ১৯৯০ সালে আরো কিছুটা ভিত্তি পায়, এবং প্রক্রিয়াটি অবশেষে বড় পরিসরে হলেও শেষ হয় ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি)’র মাধ্যমে।

    তুরষ্কের বুর্জোয়া ও অভিজাত শ্রেণি যারা রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রাথমিক ভাবে সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব বা প্রভাব বিস্তার করেছিল, তাদের ভেতর ১৯৮০’র দশকে একটি আমূল রূপান্তর ঘটে যা আন্তর্জাতিক পুঁজির সাথে সঙ্গতি রেখেই সাধিত হয়েছিল। এই রূপান্তর একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পতন ঘটায় যা কিনা লাঠির গায়ে লাগানো ললিপপের মতই ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। চার বছর আগের ঐ দিনটি সেদিন ঘটে থাকা নানা ঘটনার ঘটনা শৃঙ্খলের থেকেও বেশি কিছু, যার অনেকটাই দ্ব্যর্থবোধক থেকে যাবে।

    এটা সেই সব ঘটনাবলীর একটি যা কিনা জোরালোভাবেই প্রতীকী এবং তুরষ্কের গত ৪০ বছরের অতীতকে প্রতিফলিত করে। অপরাধের দায়ে অভিযুক্তরা দাবি করছেন যে তারা ভুক্তভোগী। তারপর আছেন তাঁরাও যারা নিজেদের ঘটনাপ্রবাহের ধারায় নিজেদের জয়ী হিসেবে দেখাচ্ছেন। এই উভয়পক্ষেরই আছে সমাজে ধর্মকে উত্তরণের কাজের সাথে প্রত্যক্ষ সংযুক্তি- গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান ও সুস্পষ্ট ঘটনা।

    তবু জুলাই ১৫ নিছকই একটা দিন নয় যা মিল্লি গোরাস-ভিত্তিক নব্য-ইসলামী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) এবং গুলেন আন্দোলনের ভেতরকার উত্তেজনার সমন্বিত রূপ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। সমাজে ধর্মের বৃদ্ধি গত ৪০ বছরের অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কৌশলগত প্রপঞ্চগুলোর একটি। ধর্মের এই প্রসার অনেক ধ্বংস ডেকে এনেছে এবং বিদ্যমান, অন্ধকার পরিস্থিতির পরিসর বাড়িয়েছে। তবে ধর্ম শুধুই একটি ভাবাদর্শগত খোলস নয়, বরং গত ৪০বছর ধরে তুরষ্কের যে পুঁজিবাদী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তারই এক সতীর্থ যাত্রী হলো এই ধর্ম।

    আর্টওয়ার্ক: নুসায়বিন
    শিল্পী: জেহরা দোগান
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    কেনান এভরেন, ১৯৮০ সালের ক্যু’য়ের নেতা, ক্যু-উত্তর সংবিধানের অনুসমর্থন লাভের আশায় সংগঠিত র‌্যালিগুলোয় কোরান হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন ও জনতার কাছে ভোট চেয়েছেন। ২০১৫ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি রিসেপ তায়িপ এরদোগান নির্বাচন এবং সাংবিধানিক গণভোট আদায়ের লক্ষ্যে কোরান হাতে বড় বড় র‌্যালিতে অংশ নিয়েছেন। এভরেন এবং এরদোগান তুরষ্কের অর্থনৈতিক কর্মসূচীর উত্তরণে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটা সেই অর্থনৈতিক কর্মসূচী যা একই কাঠামোর ভেতরে একজন জান্তা সামরিক নেতা ও একজন নির্বাচিত নব্য-ইসলামী নেতার যুগলবন্দী উপস্থাপন করে। এই অর্থনৈতিক কর্মসূচীই একইসাথে নির্বাচিত, অনির্বাচিত এবং বলবৎকৃত অনুশীলনসমূহ একত্রিত করার সুযোগ দিয়েছে।

    বস্তুত, ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি তার নিজস্ব যাত্রাপথই অনুসরণ করেছে, মধ্যখানে ২০১৬-এর জুলাই ১৫-ও ছিল একটি আত্তীকৃত যাত্রাবিরতি মাত্র। এক নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে একটি সামরিক উত্থানকে সুকৌশলে একটি পরিপূর্ণ গণতন্ত্র-বিরোধী পাল্টা অভ্যুত্থানের চেহারা দেয়া হয়। তবু গোটা ঘটনার পরবর্তী অভিঘাতকে শুধুই নিও লিবারেল যুগের ইসলামপন্থীদের প্রবণতার মাপে মিলিায়ে নেওয়াটাও ভুল হবে।

    ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই তুরষ্কে যা ঘটেছিল তা’ সেইসব রাজনীতিবিদের ঐতিহাসিক ও ভাবাদর্শগত প্রবণতাসমূহের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ যারা এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ‘ঈশ্বরের আশীর্ব্বাদ’ বলেছিলেন। যাহোক, এই সঙ্গতি বা একতা কোন একতরফা প্রবণতার বিষয় নয়। তথাকথিত ‘তুর্কী-পদ্ধতির রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা’ই এই ১৯৮০ সালের ক্যু-উত্তর শাসনামলেরও জন্ম দিয়েছিল। ইতিহাসের সেসব পর্বের রাজনৈতিক অনুঘটকদের ব্যক্তিগত চারিত্র্যও এই ঘটনাবলী বিশ্লেষণে যথেষ্ট নয়।

    ১৯৮০-র দশক থেকে শাসক শ্রেণি যারা এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চেয়েছে এবং তুরষ্কের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বা বহি:স্থ পুঁজিবাদের ভেতরে মাঝে মাঝে বিবাদ-বিসম্বাদ দেখা দিয়েছে। তবে এটা বিভ্রান্তিকরও বটে। ভেহবি কোচের মুখে কেনান এভরেনের প্রশংসা থেকে তুরষ্ক ইউএসএইডের আজকের নৈ:শব্দ্য একাধারে যেমন পুরণো কাঠামোর ধীর পতনের ইঙ্গিতবাহী, একইসাথে তুরষ্কের মূল ক্ষমতাকাঠামো বা প্রতিষ্ঠানগুলো একই রয়েছে।

    ১৯৮০-এর সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী শাসনামল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ‘সন্ত্রাস দমন’ নাম্নী ডিসকোর্সের মাধ্যমে পরিচালিত করেছে। ‘পাল্টা-অভ্যুত্থান’-এর ডিসকোর্স আজকের শাসনামলকে বৈধতার পাটাতন দিয়েছে। তবু এই শাসনামল আইন ও গণতন্ত্রের একটি সত্যিকারের শুদ্ধি অভিযান চালাতে অক্ষম যা বরং প্রকৃত ক্যু-এর পরিকল্পনাকারীদের ঈর্ষান্বিত করতে পারে।

    শুধুমাত্র একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তুরষ্কের পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থা ও অন্তর্গত অসঙ্গতির সাথে যুঝতে পারে। তবে রাষ্ট্রযন্ত্র শুধুই বর্তমানের বদলগুলোর পেছনের মৌন অপরাধী নয়, অনেকসময় এটি সহায়কের কাজও করে। অতীতেও যেমন করেছে।

    আর্টওয়ার্ক: এরদোগানিজম
    শিল্পী: অ্যান্তোনিও রদ্রিগেজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    বর্তমানের মূল সমস্যা হলো যে তুরষ্কে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সঙ্ঘাতগুলো নানা ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে যেখানে আমাদের ‘সীমিত/নিয়ন্ত্রিত’ বুর্জোয়া গণতন্ত্র এমনকি এই পুঁজিবাদকে পরিচালনা করারও ক্ষমতা রাখে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের উদাহরণের থেকে একদম উল্টো মুখে দাঁড়িয়ে, তুরষ্কে বরং পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র পরষ্পরের সহযোগী না হয়ে বরং একে অপরের সাথে বেমানান ও বৈরী ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। এরদোগান-বাহচেলী কোয়ালিশনকে সমর্থনের বদলে, তুরষ্কের পুঁজি কাঠামো তাই এই দুই নেতাকে তাদের বিদ্যমান মেরু দূরত্বে ঠেলে নিয়ে গেছে।

    মুদ্রাস্ফীতির হার গণনার ক্ষেত্রে এরদোগান সরকারের নয়া উদ্ভাবন এবং সরকারের প্রচারিত নানা অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত এমন এক স্তরে গেছে যা এই সরকারের নিজস্ব সমর্থক গোষ্ঠির বড় অংশটিই আর বিশ্বাস করেনা। তার সাথে চাড়া দিয়ে উঠছে প্রবল বেকারত্ব ও সর্বনাশা নানা অর্থনৈতিক নীতিমালা যা তুরষ্কের সাম্প্রতিক অতীতের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শর্তমালার অধীনে সম্ভব হতো না।

    তুরষ্কের লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্র একটি শুণ্যতা রেখে যায় যা ১৯৮০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে। একেপি এই শুণ্যতাকে ‘দাতব্য’-এর মোড়কে ভরাট করতে থাকে যা সাধারণত: ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী বিভায় আচ্ছাদিত থাকে এবং আত্ম-স্বীকৃত রাজনৈতিক বিষয়ের ক্রমাগত বেড়ে চলা ব্যক্তিগত অভয়দানের ভিত্তিতে টিঁকে থাকে। এই অনুরোধ/যোগান গতিশীলতা যা কিনা সমাজের দরিদ্রতম অংশের ভিত্তি গঠন করেছিল, বর্তমানে এর অতীত সম্ভাব্যতা এবং সক্রিয়তা থেকে বহু দূরে সরে গেছে এবং আজ এত দশক পর একেপি-র সদস্যরা নিজেরাই বুর্জোয়া হয়ে গেছে।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    অর্থনৈতিক ধসের ভেতরে সামনে তুর্কী সমাজের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করার মত যা যা আসছে, তাতে দরিদ্রদের জন্য দাতব্য সহায়তার মাধ্যমে একেপি’র অতীত গতিশীলতা অর্জনের বিষয়টি আর কাজে আসবে না।

    জনতার অধিকতর অংশকে কাজে লাগানো একেপির পক্ষে দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তাদের ‘ভোট কমে আসা’ বা ‘ভোট ক্ষয়ে’র বিষয়টি এই আলোকেই বিচার করতে হবে।

    এই প্রেক্ষিতে, সরকার তার মূল সমর্থক গোষ্ঠির জন্য কোন পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেবার মত খরুচে ও কল্পনাবিলাসী কাজে সময়ের বদলে, সম্ভাব্য সব সমালোচকের উপর খড়গ হস্তে দমন-পীড়ন শুরু করেছে। এর একটি উদাহরণ হলো দেশের আইন সমিতিগুলো বিকেন্দ্রীভূত করার একটি বিল আনা যা সম্প্রতি তুর্কী সংসদে পাশ হয়েছে। অন্য পেশাজীবী পরিষদগুলো যারা প্রস্তুত হচ্ছেন তাদের আর একটি আঘাত করার জন্য প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর একটি নিয়ন্ত্রণমূলক বিল এরডোগান সরকারের এজেন্ডায় রয়েছে। এভাবেই নিয়োজিত অছি সরকার লাগামহীন ভাবে দেশ চালাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আইন ও নির্বাচন সংস্কারের পরিকল্পনাও চলছে।

    সামাজিক রণাঙ্গনে, সরকার কিছু নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছে যার মাধ্যমে সে তার সমর্থক ভিত্তির সবচেয়ে সক্রিয় উপাদানসমূহকে নিরাপদ রাখতে পারে। এই সক্রিয় সমর্থকরা ‘রাস্তার কাজের’ ডাকে সবচেয়ে দরকারি।  সরকারের ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ এই পরিসরের ভেতরেই মূল্যায়িত হতে পারে, একটি পদক্ষেপ যা কিনা একটি বয়সের উপরে ডানপন্থী মানসের সবার কাছে একটি ‘বিশাল অর্থ’ বহন করে এবং এই ‘আয়া সোফিয়া’ পদক্ষেপ সমাজের আরো জঙ্গি অংশের চোখ ভিজিয়ে দেবে। এবং সরকারের ‘পরিবার’ নীতিকে ‘উন্নততর’ করতে সরকার ইস্তাম্বুল চুক্তি বাতিল করার অভিপ্রায় পোষন রাখছে যার মাধ্যমে নারীকে পুরুষের একটি হাতের ক্রীড়নক ছাড়া আর কিছুই মনে হবার অবকাশ থাকবে না।

    এই সরকার আরো দাবি করতে থাকবে যে এটি সব নিয়মকানুন ও শর্তাদি বাতিল করছে যেন বর্তমান যে কঠিন সময় আমরা পার করছি সেটা ঠিক মত পার হতে পারি।

    আর্টওয়ার্ক: শিরোনামহীন
    শিল্পী: ভাব হাকোবিয়ান
    সূত্র: গ্যালারি ৭৭

    মূলত, এই প্রবণতা থেকেই এই সরকার সময়ে সময়ে নিল্লর্জ্জ আচরণ করে এবং ‘আয়া সোফিয়া’র মত তাসগুলো পকেট থেকে বের করে। অন্য সময়ে, তারা মানুষকে ভয় দেখানো জুয়াড়ির মত ‘খিলাফত’ শব্দটি নিয়ে পড়ে থাকে। লিবারেল বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে সরিয়ে ফেলার ঐতিহাসিক পথ- ইতোমধ্যেই এর সঙ্কুচিত আয়তন সত্ত্বেও- মূলত প্রশস্ত করা হয়েছিল ১৫ই জুলাইয়ের পর। ১৫ই জুলাইয়ে প্রদত্ত সব বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা যা কিনা ‘গণতন্ত্র এবং জাতীয় অভিপ্রায়’কে উদযাপন করেছে- সেই যাবতীয় বক্তৃতার আড়ালে ছিল বর্তমান তুরষ্কের রাষ্ট্রচালকদের রাষ্ট্রচালনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ সঙ্কট। আর এটি এখন এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।

    তুরষ্কের বিদ্যমান ইসলামি-জাতীয়তাবাদী জোট বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হুট করে ঘাড়ের উপর এসে বসা কোন রাজনৈতিক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নয়। বরঞ্চ এটা গত ৪০ বছর ধরে তুরষ্কের পুঁজিবাদের একটি জৈব ফসলই বলা যায়। একটি কার্যকারণমূলক সম্বন্ধ যা থেকে এই ইসলামী-জাতীয়তাবাদী জোট অনেক সুবিধা এবং তার জনসমর্থনের বিপুল অংশটি লাভ করে, একইসাথে এর ‘একিলিসের গোড়ালি’ও বটে।

    মূল লেখা দেখুন এখানে

  • পার্ল বাকের নোবেল বক্তৃতা।। চীনের উপন্যাস

    পার্ল বাকের নোবেল বক্তৃতা।। চীনের উপন্যাস

    • অনুবাদ: বখতিয়ার আহমেদ

    আজকের এই বক্তৃতায় কি বলব ভাবতে গিয়ে মনে হল চীনের কথা না বলাটা অন্যায় হয়ে যাবে। জন্ম ও পৈত্রিক সূত্রে আমি একজন আমেরিকান নাগরিক এবং বাকি জীবনটুকু নিজের এই দেশেই অতিবাহিত করতে চাই। কিন্তু আমার লেখালেখির যাত্রা আমেরিকান উপন্যাসকে উপজীব্য করে শুরু হয়নি বরং চীনের উপন্যাসই আমার লেখার আঙ্গিক গড়ে দিয়েছে। গল্পের সাথে প্রথম পরিচয়, গল্প বলা ও লিখতে শেখা ইত্যাদি সব বিষয়েই চীনই আমার মহান গুরু। কাজেই আজকের এই দিনে চীনের কথা উল্লেখ না করাটা হবে কৃতঘ্নতার সামিল। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটি কারণে এই আলোচনা আমি সীমাবদ্ধ রাখব চীনের উপন্যাস প্রসঙ্গে। এই একান্ত সিদ্ধান্তটির পেছনে অন্য কারণটি হচ্ছে আমি বিশ্বাস করি চীনের উপন্যাস, পশ্চিমা উপন্যাস আর উপন্যাসিকদের জন্য যে অনন্য দ্যূতি বহন করে তা আমি সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারব, নিজের উপর এই আস্থা নিয়েই শুরু করছি।

    পার্ল বাক

    আমি যখন বলি চীনের উপন্যাস, তখন আমি চীনের সম্পূর্ণ নিজস্ব উপাদান নির্ভর উপন্যাসগুলোকেই বোঝাই, সংকরগুলোকে নয়। এই সংকর উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে বিদেশী ধারায় প্রভাবিত চীনের আধুনিক লেখকদের আত্ম-বিস্মৃত উপন্যাসগুলো।

    উপন্যাস কখনই চীনে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচিত হয়নি, চীনা উপন্যাসিকেরাও কখনো নিজেদের শিল্পী হিসেবে দেখেননি। চীনা উপন্যাস, এর ইতিহাস, পরিধি আর মানুষের হৃদয়ে এর অবস্থান, সবকিছুকেই বিবেচনা করতে হবে এই সত্যটির আলোকে। নিঃসন্দেহে এই সত্য আপনাদের কাছে অভিনব, পাশ্চাত্যের যে আধুনিক পণ্ডিতেরা উপন্যাসকে একটি উদার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন তাদের জন্য তো বটেই।

    চীনে সবসময়ই শিল্প আর উপন্যাস দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সেখানে শিল্প হিসেবে সাহিত্য চর্চার ব্যাপারটি ছিল ক্ষমতাবান বিদ্বানদের একচ্ছত্র দখলে। তারা একে অপরের জন্য শিল্প সৃষ্টি করতো নিজস্ব নিয়মে এবং উপন্যাসের কোন জায়গা সেখানে ছিল না। কিছু সনাতন স্বেচ্ছাচারী আইন দিয়ে তারা দখল করে রেখেছিল দর্শন, ধর্ম আর সাহিত্যের সবকিছু, শিক্ষার সব উপকরণই ছিল তাদের একচ্ছত্র দখলে। ফলে লেখাপড়াও জানতো শুধু তারাই। এই ক্ষমতাবান বিদ্বানদের কোন কোন ক্ষেত্রে সম্রাট পর্যন্ত ভয় পেতেন আর একারণেই তাদের নিজেদের কাজে নিজেদের পাকবদ্ধ রাখবার একটি পথও তিনি বের করে ফেলেন, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জনের একমাত্র পথ হিসেবে কিছু ভয়াবহ কঠিন পরীক্ষার প্রবর্তন করেন। এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির কাজটি একজন মানুষের সমস্ত জীবন আর চিন্তা নিঃশেষ করবার জন্য যথেষ্ট ছিল। ফলে সে সময় চীনের এই পণ্ডিতদের দেখা গেল বর্তমান সময় আর তার গতি প্রকৃতি বুঝবার জন্য দিন রাত্রি নাক ডুবিয়ে মুখস্থ করছে সনাতন আর মৃত অতীত। আর সেই অতীত ঘেটেই তারা তৈয়ার করছে তাদের শিল্পের নিয়মগুলো যেখানে উপন্যাসের কোন জায়গা নেই। ফলে চোখের সামনে প্রাকৃতজনদের মাঝে উপন্যাসের জন্মটি এই বিদ্বানেরা দেখতে পেল না, সাহিত্যকে এক বায়বীয় শিল্প জ্ঞান করে তারা সব বসে রইল নির্জীব অতীতেই। মানুষদের প্রতি পণ্ডিতদের এই অবজ্ঞার প্রত্যুত্তরে মানুষের মাঝ থেকে এসেছে এই পণ্ডিতদের নিয়ে অসংখ্য রঙ্গ-কৌতুক, তার একটির উদাহারণ দেয়া যাক— একদিন জঙ্গলের পশুদের একটি দল শিকারে যাওয়ার আগে একটি পাহাড়ের পাদদেশে মিলিত হল। সেখানে সিদ্ধান্ত হল যে দিন শেষে যে যা শিকার পাবে তা নিয়ে এই স্থানটিতে এসে মিলিত হবে এবং শিকার সকলে মিলে ভাগ করে নেবে। দিন শেষে দেখা গেল একমাত্র বাঘই কোন শিকার ছাড়া ফিরে এসেছে। সবাই অবাক হয়ে তার কাছে কারণ জানতে চাইলে সে বিমর্ষভাবে জানাল “ভোর বেলায় আমি এক স্কুল বালকের দেখা পেয়েছিলাম কিন্তু মনে হল তার কচি মাংস তোমাদের মুখে ঠিক রুচবে না। দুপুর নাগাদ ঘোরাঘুরি করে দেখা পেলাম এক যাজকের, কিন্তু তাকেও আমি ছেড়ে দিলাম কারণ তোমরা তো জান বাতাস ছাড়া আর তাদের মধ্যে সারবস্তু কিছু থাকে না। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর সারাদিন আর কারো দেখা মেলেনি। যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে তখন দেখলাম এক বিদ্বান এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে। তাকে দেখে আমি পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়লাম কারণ এই বিদ্বানদের শুকনো জিরজিরে হাড় চিবুতে গিয়ে আবারো নিজের দাঁতগুলো ভাঙ্গার কোন মানে হয় না”।

    আর্টওয়ার্ক: থ্রি হোয়াইট ওল্ডম্যান
    শিল্পী: হুয়াং ইউমিং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    বিদ্বানেরা শ্রেণী হিসেবে চীনের মানুষদের কাছে এরকমই হাস্যরসের পাত্র ছিল। তাদের লেখা উপন্যাসগুলোতে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে সর্বদা একই রূপে, যেমনটি এদের বাস্তব জীবনে দেখা যায়। একই বিষয়ের বারংবার চর্বণ এবং চর্চা এদের যেমন চেহারায় একরকম করে দিয়েছিল তেমনি এক রকম করে দিয়েছে চিন্তার ক্ষেত্রেও। পশ্চিমে এধরনের কিছু ব্যক্তি মানুষ দেখা গেলেও একটি বিশেষ সামাজিক শ্রেণী হিসেবে এদের পাওয়া যাবে না যেরকমটি চীনের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। এখানকার সব জায়গাতেই তাদের উপস্থিতি একই রকম— ক্ষীণ একটি শরীরের উপর বিশাল একটি মাথা, ঝুলে পড়া মুখ, মোটা চশমার আড়ালে ছোট সরল চোখ, উচুঁ কন্ঠস্বর যা দিয়ে অনর্গল শাস্ত্রকথা বের হচ্ছে যেগুলোর কোন আবেদন তার নিজের কাছে ছাড়া অন্যত্র নেই। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জায়গা ছাড়া এদের সাধারণত অন্য কোথায় দেখা যেত না, বেশিরভাগ সময়ই তারা কাটাত কিছু মৃত সাহিত্য পড়ে আর তার মতই কিছু লিখবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে। অভিনব ও মৌলিক সব কিছুকেই তারা ঘৃণা করত কারণ এগুলো তাদের মুখস্থ ছকের কোনটির সাথেই মিলত না। আর না মিললেই তারা নিশ্চিতভাবে ধরে নিত এগুলো ভাল কিছু নয়। যখন তারা কোন কিছু দেখিয়ে বলত “এই হচ্ছে শিল্প” তখন তারা মনে করত এই বস্তুটি এখানে ছাড়া আর কোথাও নেই, তাদের স্বীকৃতি ছাড়া কোথাও কোন শিল্প থাকতে পারে না। আর যেহেতু তাদের এই ছকের সাথে কোন ভাবেই উপন্যাসকে মেলানো যায় না কাজেই তাদের সাহিত্যে উপন্যাস বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না।

    চীনের খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক ইয়াও হাই ১৭৭৬ সালে বিদ্যমান সাহিত্যিক প্রকরণগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করেন যার মধ্যে ছিল প্রবন্ধ, সরকারি নথিপত্র, জীবনী, সমাধিফলক, কবিতা, শোকগাঁথা এবং ইতিহাস। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই তালিকায় উপন্যাস অনুপস্থিত যদিও এই সময়ের আগেই চীনের উপন্যাস গণমানুষের মাঝে জন্ম নিয়ে, প্রাকৃত জীবনের রূপ-রসে পরিপুষ্ট হয়ে এক অনন্য মহিমায় উদ্ভাসিত। ইয়াও হাইয়ের আগে ১৭৭২ সালে প্রতাপশালী সম্রাট চাই এন লুং এর নির্দেশে আরেকটি সাহিত্য কোষ তৈরী করেন সেসময়ের আরেক খ্যাতিমান বিদ্বান সু কু চুয়েন সু। উপন্যাসের কোন উল্লেখ সেখানেও যথারীতি নেই।

    উপন্যাসকে বিদ্বানদের সাহিত্য জ্ঞান না করা চীনের উপন্যাস আর উপন্যাসিকদের জন্য আর্শীবাদই বয়ে এনেছিল। এর ফলে উপন্যাস সবসময় তাদের সাহিত্য দর্শন, সমালোচনা, চাপিয়ে দেয়া শিল্প সংজ্ঞা, প্রকাশের প্রথাগত ভঙ্গিমা ও কৌশল, কোনটি শিল্প আর কোনটি নয় এই কূটতর্ক ইত্যাকার বেড়াজালের বাইরে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে থাকল নিজ চারণ ক্ষেত্র প্রাকৃতজনদের নিয়ে। এই উপন্যাস পরিপুষ্ট হতে থাকল নিজ মাটির সোঁদা গন্ধে, সাধারণ মানুষের প্রাকৃত জীবনে, তাঁদের জীবনের অন্তর্গত আলোকচ্ছটায় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তার মাঝে। রক্ষা পেল পণ্ডিতদের শিল্প চর্চার হিম-কুহেলিকার হাত থেকে। প্রসঙ্গত মনে পড়ে যায় আমেরিকান কবি এমিলি ডিকিনসন একবার লিখেছিলেন “প্রকৃতি এক রহস্যের আধার, আর শিল্প হচ্ছে সেই আধার যা রহস্যময় হতে চায়”। তিনি লিখেছিলেন,

    “প্রকৃতি হল তাই যা আমরা দেখতে পাই
    প্রকৃতি হল তাই যা আমরা শুনতে পাই
    হায়! আমাদের প্রকাশের কোন শিল্প নেই
    তার সারল্যের সামনে এতই তুচ্ছ
    আমাদের অভিজ্ঞান।”

    চীনের সাহিত্য পণ্ডিতেরা যদি উপন্যাসের এই জন্ম আখ্যান জানতেন আরও বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন একে সাহিত্য হিসেবে চোখ বন্ধ করে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মাঝে মাঝে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তরুণ সম্রাটদের কেউ কেউ উপন্যাস পড়ে আনন্দ পাওয়ায় এটি আর হল না, রাজ আগ্রহের চাপে পড়ে তাদের কখনও কখনও চোখ মেলে তাকাতে হল অন্ত্যজদের এই সৃষ্টিগুলোর দিকে। একারণেই বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন উপন্যাসের প্রশ্নে এবার পণ্ডিতেরা একেবারে খড়গহস্ত হয়ে উঠলেন এবং নিজেদের প্রথম খড়গ হিসেবে আমদানি করলেন একটি প্রত্যয় “সামাজিক তাৎপর্য”। লম্বা লম্বা প্রবন্ধ লিখে তারা জানালেন  উপন্যাস শিল্প নয় কারণ এর কোন সামাজিক তাৎপর্য নেই। আধুনিক কালের সাহিত্য পাড়ার মানুষেরা সামাজিক তাৎপর্য কথাটি সম্প্রতি শিখলেও চীনের পণ্ডিতেরা এটির ব্যবহার করে আসছেন এক হাজার বছর আগে থেকেই। আজকের আধুনিকদের মতই তারা সেসময় বলেছেন উপন্যাসকে শিল্প হয়ে উঠতে হলে আগে তাকে যেটি অর্জন করতে হবে তা হল সামাজিক তাৎপর্য।

    এই যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রাচীন চীনের এই বিদ্বানেরা উপন্যাস সম্পর্কে যে উপসংহারে পৌঁছুলেন সেটি হচ্ছে:

    সাহিত্য হচ্ছে শিল্প
    সব শিল্পেরই সামাজিক তাৎপর্য আছে
    এই বইগুলোর কোন সামাজিক তাৎপর্য নেই
    কাজেই এগুলো সাহিত্য হতে পারে না

    এভাবেই উপন্যাস চীনে সাহিত্য হয়ে উঠেনি দীর্ঘদিন।

    এরকম একটি ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছি আমি নিজেও। আমিও বিশ্বাস করতাম প্রকৃত সাহিত্যের সাথে উপন্যাসের কোন যোগ নেই। বিদ্বানেরা এই রকমটিই শিখিয়েছিলেন আমাদের। আমাকে আরো শিখানো হয়েছিল সাহিত্যে নান্দনিকতা যুক্ত করতে পারেন শুধুমাত্র বিদগ্ধ মানুষেরাই। জীবনের গভীরতর উৎস থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝর্ণাধারার মতো প্রতিভাগুলোকে ঠেকিয়ে রাখতেই যেন বিদ্বানদের মস্তিষ্ক এইসব আইন-কানুনের জন্ম দিত। প্রতিভা, তা সে যে মাপেরই হোক না কেন, তার ভূমিকা সবসময় স্রোতস্বিনীর মত, অন্যদিকে শিল্প, আধুনিক বা ধ্রুপদী যাই হোক না কেন, তার ভূমিকা ক্ষুধিত অবয়বের যার উপর স্রোতস্বিনীর জল নেমে আসে অঝোর ধারায়। চীনের উপন্যাসও সেই স্রোতস্বিনী নদীর মতই যার নেমে আসাকে স্বাগত জানায় প্রকৃতির পাথর আর বৃক্ষেরা, প্রাকৃত মানুষেরা তার জল পানে শীতল হয়, ছায়া আর বিশ্রাম পায় তার আশ্রয়ে।

    চীনে তাই উপন্যাস মাত্রই ছিল সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে উঠে আসা এক অদ্ভুত সৃষ্টি, এ ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। এই উপন্যাসের ভাষাও ছিল তাদের নিজস্ব রীতির, সাহিত্য বা পণ্ডিতদের ভাষা ওয়েন লি নয়। সনাতন এই ওয়েন লি ভাষাটি হচ্ছে আজকের ইংরেজদের জন্য যেমন চসারের ধ্রুপদী ইংরেজি তেমনি এক ভাষা যদিও প্রহসন হচ্ছে এই যে ওয়েন লিও একসময় প্রাকৃত ভাষা হিসেবেই চালু ছিল। কিন্তু পণ্ডিতেরা এ ভাষা গ্রহণ করবার পর আর প্রাকৃত ভাষার প্রাণময় গতি প্রবাহের সাথে কোন যোগ রক্ষা করেননি। একটা প্রাকৃত ভাষাকে সাহিত্যের সাঁড়াশিতে চেপে তারা বসে রইলেন, অন্য দিকে সাধারণ মানুষের ভাষা নিজস্ব প্রাণময়তার জোরে তাদের ছাড়িয়ে গেল বহু যোজন দুরে। কাজেই চীনা উপন্যাস হয়ে দাঁড়াল পেই হুয়া বা সাধারণ মানুষের সরল কথকতা। সহজ পাঠ্য এই উপন্যাসগুলোর সহজ গতিময়তা দেখে পণ্ডিতেরা মুখ বাঁকিয়ে বললেন, ওতে প্রকাশের কোন কারুকাজ নেই।

    ডানহাঙের গুহাচিত্র

    মুখ বাঁকানো এইসব পণ্ডিতদের বিপরীতে আমি এখন বলতে চাই কিছু ব্যতিক্রমী বিদ্বানদের কথা যারা ভারতবর্ষ থেকে মহান বুদ্ধের বাণী বয়ে এনেছিলেন চীনে। পশ্চিমে দীর্ঘদিন পিউরিটানিজম ছিল উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শত্রু। সে তুলনায় প্রাচ্যের বুদ্ধ অনুসারীরা ছিলেন অনেক বেশি প্রজ্ঞাবান। ঐতিহাসিক কাল বিচারে চীনের ষষ্ঠ রাজবংশের সময়ে তারা চীনে এসে দেখলেন সাহিত্য এখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বহু দুরে আটকে আছে প্রথাবাদিতার বেড়াজালে। চীনের সনাতন সাহিত্যিকেরা তখন নিজেদের রচনাগুলোকে ঘষে মেজে আরো বেশি রীতিসিদ্ধ করে তুলবার কাজে ব্যতিব্যস্ত, যে কোন সৃজনশীল প্রয়াসকে অসাহিত্য আখ্যা দিয়ে খারিজ করে রক্ষা করছেন সাহিত্যের সতীত্ব। এরকম একটি শুচিবাদী সময়েই হৃদয়ে অহিংসার বাণী নিয়ে এগিয়ে এলেন বৌদ্ধ পণ্ডিতেরা যাদের অনেকেই এসেছেন ভারত থেকে, কেউ কেউ চীনেরই মানুষ। তারা সনাতন শুদ্ধবাদীদের খোলাখুলি জানালেন প্রচলিত সাহিত্যের নিয়ম কানুন ভাঙ্গা তাদের উদ্দেশ্য নয়, তারা শুধু নিজেদের আত্মিক অর্জনটুকু খুব সাধারণ ভাষায় গণমানুষের সামনে তুলে ধরতে চান। ধর্ম প্রচারের জন্য তারা বেছে নিলেন সাধারণ ভাষা, যে ভাষায় লেখা হয় উপন্যাস। অন্যদিকে গল্পের প্রতি এই মানুষদের অমোঘ আকর্ষণ লক্ষ্য করে বাণী প্রচারের জন্য তারা গল্পের আদলটিকেই বেছে নিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে চীনে সবচেয়ে বেশি খ্যাত বই ফাহ সু চিং এর ভূমিকায় লেখা আছে “যখন আমরা ঈশ্বরের কথা বলি, সবচেয়ে সহজ শব্দগুলি বেছে নিই বাহক হিসেবে”। এই কথাটিকেই আমরা চীনা উপন্যাসিকদের মৌল নীতি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি যাদের কাছে ঈশ্বর মাত্রই মানুষ আর সব মানুষেরাই ঈশ্বর।

    চীনের উপন্যাসগুলো লেখা হতো প্রথমত গণমানুষের বিনোদনের জন্য। এখানে বিনোদন বলতে আমি শুধুমাত্র হাস্যরসের কথা বলছি না যদিও চীনের উপন্যাসগুলোতে এ জিনিসেরও সাক্ষাৎ মেলে অজস্র পরিমাণে। আমি বিনোদন বলছি এই অর্থে যে তা মানুষের সামগ্রিক মনযোগ আকর্ষণ করতে পারত। এই বিনোদন তাদের কাছে জীবনের ছবি তুলে ধরে আমন্ত্রণ জানাত তার অর্থ অনুসন্ধানে। নিজেদের জীবনেরই সহজ সরল প্রকাশের মধ্য দিয়ে তারা শিল্পের দুর্বোধ্য নিয়মের বাইরে এসে আলোকময় প্রাণ সঞ্চার ঘটাত হৃদয়ে। বৌদ্ধরাও এই সব মানুষদের ঈশ্বরের সন্ধান জানাতে এসে দেখল এই মানুষেরা নিজেদের আটপৌরে জীবনেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে ভালবাসে।

    কিন্তু তারপরও চীনের উপন্যাস প্রাকৃত ভাষায় লেখা হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে যাদের জন্য এই উপন্যাস লেখা তাদের বেশির ভাগেরই কোন অক্ষর জ্ঞান না থাকা। কথ্য ভাষায় লেখা এই উপন্যাসগুলো কেউ একজন পড়ে শোনালেই সবাই তা বুঝতে পারত সহজেই। দেখা যেত যে প্রায় দুই শত মানুষের কোন গ্রামে একজন মাত্র মানুষ আছে যে পড়তে পারে। ছুটির দিনগুলোতে বা সন্ধ্যার অবসরে পিদিমের আলোয় তাকে ঘিরে বসত অসংখ্য মানুষ আর সে পড়ে শোনাতো উপন্যাস। কখনো কখনো একজনের টুপিতে সবাই সাধ্য অনুযায়ী পয়সা ফেলত পাঠকের জন্য যাতে এই মোহনীয় কাহিনীগুলো নিরন্তর পড়ে যায় পাঠক। একসময় দেখা যেত শুধু এই গল্প পড়ে শোনানই কারো কারো পেশা হয়ে যেত। এই গল্প পাঠকদের আবার শ্রোতা ধরে রাখবার প্রয়োজনেই নিত্য নতুন গল্পের দরকার পড়ত। কিন্তু তখনও এত বেশি সংখ্যক গল্প লেখা হয়ে উঠেনি। কাজেই এই পেশাদার গল্প পাঠকদেরই একসময় দায়িত্ব নিতে হলো নতুন গল্প জন্ম দেওয়ার। গল্পের উপাদান হিসেবে তারা বেছে নিল পণ্ডিতদের লেখা ইতিহাসকেই কিন্তু তার সাথে যোগ হলো নিজেদের উর্বর কল্পনা শক্তি। এই অশিক্ষিত গল্পকারদের হাতেই সাহিত্যের শুকনো নদী যেন প্রাণ ফিরে পেল। ইতিহাসের মৃত চরিত্রগুলোকে কল্পনার রক্তে মাংশে সাজিয়ে তারা হাজির করল সাধারণ মানুষের সামনে। ইতিহাস ছাড়াও তাদের গল্পে স্থান পেল নিজেদের প্রতিবেশীদের অভিনব অভিজ্ঞতাগুলো। কিন্তু সবসময়ই এইসব গল্প লেখা হয়েছে শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে। এভাবেই এক সরল প্রক্রিয়ায় উত্থান ঘটেছে চীনা উপন্যাসের।

    আবার আমি যখন বলছি গল্প, তখন আমি কোন লক্ষ্যহীন খসড়া কর্মকাণ্ডের কথা বলছি না। চীনারা এক্ষেত্রে অনেক বেশি পরিপক্ক। তারা গল্প লিখবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এর চরিত্রগুলোকে। শুই হু চুয়ান, যাকে চীনারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ তিনটি উপন্যাসের একটি বলে মনে করে, তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণও বিদ্যুৎ বা অগ্নিময় কর্মকাণ্ড নয় বরং এর মধ্যে অঙ্কিত একশত আটটি চরিত্র যাদের প্রত্যেককে উপন্যাসটিতে হাজির করা হয়েছে স্বতন্ত্র মহিমায়। এই স্বাতন্ত্র্যের মাত্রা এরকম যে আমি অনেককে বলতে শুনেছি এই একশত আটটি চরিত্রের যে কোনটি কথা বলতে শুরু করলেই আমরা বুঝে যাই সেটি কে, আমাদের নাম বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, চরিত্রের কথা বলার ধরন দেখেই অবলীলায় বলে দেওয়া যায় সেটি কে। চরিত্রসমূহের এই বিশাল বিস্তৃত ছিল উপন্যাসের কাছে চীনের মানুষের প্রথম চাহিদা আর এরপরের বিবেচ্য বিষয়- প্রতিটি চরিত্র দাঁড়াবে নিজস্ব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, উপন্যাসিকের বর্ণনায় নয়।

    আর্টওয়ার্ক: ব্যাংক অ্যালোং দ্য ইয়োলো রিভার
    শিল্পী: ফাং ঝাউলিং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    এভাবে যখন চীনের গ্রামে-গঞ্জে, চায়ের দোকানে, জনজীবনের সরু অলিগলিতে নিজেদের মাঝ থেকে প্রায় অশিক্ষিত কাউকে ঘিরে উপন্যাসের বিনম্র উত্থান ঘটছে, কৌতুহলের বিষয় হচ্ছে তখন চীনের রাজকীয় প্রাসাদগুলোতেও উপন্যাস জন্ম নিচ্ছে প্রায় একই প্রক্রিয়ায়। চীনের সম্রাটদের একটি প্রথা ছিল, বিশেষত বিদেশি রাজবংশগুলোর মধ্যে যে সম্রাটের বেতনভোগী কিছু লোক রাখা হতো যাদের বলা হতো “সম্রাটের কান”। এই রাজকীয় কানদের কাজ ছিল ছদ্মবেশে রাজ্যের আনাচে কানাচে ঘুরে সবার কথা শোনা এবং তা সম্রাটকে অবহিত করা। এই প্রথার আসল উদ্দেশ্য ছিল নিঃসন্দেহে সম্রাট সম্পর্কে প্রজাদের মনোভাব জানা এবং সম্ভাব্য বিদ্রোহ সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখা।

    কিন্তু সম্রাটদের মাঝেও মানব সত্তা কাজ করত এবং এদের বেশির ভাগই শিক্ষিত বা পণ্ডিত ছিলেন না। রাজকীয় কানদের সুযোগ ছিল চীনের প্রাকৃত জীবনের এই সব আশ্চর্য কথকতা শুনবার এবং একসময় তারা আবিস্কার করলো তাদের প্রভূ সম্রাটেরা বিদ্রোহের খবরের চেয়ে এই সব গল্পই শুনতে বেশি পছন্দ করে। ফলে তাদের অনেকেই সম্রাটের সন্তুষ্টি লাভের আশায় আরো বেশি করে এই সব গল্প প্রতিদিন ফিরে এসে শোনাতে লাগল এবং অনেক ক্ষেত্রেই কিছুটা নিজস্ব কল্পনার রঙ মিশিয়ে। কেউ কেউ সম্রাটকে শোনানোর জন্য লিখেও রাখা শুরু করল পাছে এত সুন্দর গল্পগুলো ভুলে যায়। এই রাজকীয় কানদের আরো একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে তারা শুধু প্রজাদের কথা সম্রাটকে জানাতো না, সেই সাথে সম্রাটের অনেক কথাও প্রজাদের জানাত, বিশেষত তিনি কি বলতেন বা করতেন, তাকে সন্তান দানে অক্ষম বেগমের সাথে তিনি কিভাবে ঝগড়া করতেন, কিভাবে সেই বেগম সম্রাটের মন্ত্রণাদাতাদের সাথে ষড়যন্ত্র করে সম্রাটের অপর বেগমকে বিষপান করিয়েছেন ইত্যাদি। সম্রাট সম্পর্কে এই সব গল্প প্রজাদের আনন্দ দিত, তারা ভাবতে পারত স্বর্গপুত্র হওয়া সত্ত্বেও সম্রাটেরও একজন সাধারণ মানুষের মতই জীবনের আটপৌরে ঝামেলাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। আর এভাবেই উপন্যাস সৃষ্টির আরেকটি উৎস বিকশিত হল চীনে যদিও এর অস্তিত্ব তবু কোন স্বীকৃতি পেল না বিদ্বানদের কাছ থেকে।

    তবু এই নিদারুণ তাচ্ছিল্যের মাঝেও এক বিক্ষিপ্ত বিনম্র সুচনায়, চীনের উপন্যাস প্রাকৃত ভাষার নদীতে পাল উড়িয়ে নিজ শরীরে ক্রমাগত গেঁথে নিতে থাকল জনজীবনের উঁচু নিচু সব স্তরের মিথ আর কিংবদন্তী, ভালবাসা আর প্রতারণা, সংঘাত আর সম্মিলনের গল্প।

    পশ্চিমের মত চীনা উপন্যাসের ধারা অল্প কজন উপন্যাসিকের হাতে গড়ে উঠেনি। এখানে সবসময়ই উপন্যাসিকের চেয়ে উপন্যাস অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চীনে কখনোই কোন ড্যানিয়েল ডিফো জন্ম নেননি, এখানে আমরা ফিল্ডিং, স্মলেট, ডিকেন্স, অস্টিন, থ্যাকারে, ব্রন্টি, মেরেডিথ, হারডি, ফ্লবার্ট বা বালজাকের মত উপন্যাসিকের প্রবল উপস্থিতি কখনই খুঁজে পাই না। কিন্তু চীনে আমরা যে উপন্যাসগুলো দেখতে পাই তা সর্বার্থেই পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের চেয়ে সমৃদ্ধ যেগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বোদ্ধাদের বিস্মিত মনে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক যে এই সব উপন্যাসের লেখক কারা?

    আজকে কয়েক শতক পরে এসে চীনের আধুনিক সাহিত্য বোদ্ধারা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসে গত বছর পঁচিশেক ধরে চীনের সাহিত্য সমালোচকেরা নিজেদের এই অবহেলিত উপন্যাসগুলোই খুঁজে পেতে পড়ছে। কিন্তু তারপরও বেশির ভাগের ক্ষেত্রে লেখকের পরিচয় শেষ পর্যন্ত একটি অমিমাংসিত বিষয় হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বহুল পঠিত উপন্যাসগুলোর একটি শুই হু চুয়ান কার বা কাদের লেখা, কোথায় তার জন্ম, কোন সময়কালে এটি লেখা ইত্যাদি জানবার জন্যেই এখন গবেষকদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এদের পরিচয় যাই হয়ে থাকুক এটি নিশ্চিত যে তাদের কেউই আর বেঁচে নেই। ইতিহাসের কোন একসময় বেঁচে থাকা এই মানুষেরা নিজেদের জীবনে যা দেখেছে এবং শুনেছে তাই লিখে রেখে গেছে এই উপন্যাসগুলোতে। এরকমই একটি উপন্যাস রেড চেম্বারের ভূমিকায় অজানা লেখক লিখে গিয়েছিলেন “হান বা তুং এর সময় নয়, আমার নিজের সময়ের গল্প বলাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি”।

    কাজেই এই উপন্যাসিকেরা নিজেদের সময়ের গল্পই বলেছেন তাদের উপন্যাসে, বেঁচে থেকেছেন অন্ধকার আশীর্বাদে। নিজেদের উপন্যাসের কোন পর্যালোচনা তাদের কখনও পড়তে হয়নি,পুরস্কার বা তিরস্কারের ধার ধারতে হয়নি কোন প্রথাজীবী প্রতিষ্ঠানের। বিদ্বানদের মত কোন পাতলা বাতাসে শ্বাস নিতে হয়নি তাদের, মুখাপেক্ষি হতে হয়নি কোন পণ্ডিতের স্বীকৃতির। নিজের লিখবার সামর্থ্য নিঙড়ে তারা সাহিত্য রচনার তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ভাল-খারাপ যাই লিখুন প্রত্যেকে মারা গেছেন এই তৃপ্তিটুকু সাথে নিয়ে এবং আজকে চীনের সমস্ত পণ্ডিতদের সম্মিলিত স্বীকৃতিও তাদের কাউকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে না। তারা আজ কোন সাহিত্যিক ময়নাতদন্তেরও উর্দ্ধে। কিন্তু তারপরও তাদের সৃষ্টি বেঁচে থাকবে চীনের গণমানুষের মুখে মুখে, নিরক্ষরদের প্রাকৃত জবানে।

    সুই হু চুয়ানের একটি অধুনাতর সংস্করণের ভূমিকায় উপন্যাসটির অজ্ঞাত সংখ্যক লেখকের অন্যতম একজন শিহ নাই এন লিখেছেন- “এই বইটি লিখবার সময় আমার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার লোকেরা যেন এটি সহজে বুঝতে পারে। সৎ বা শয়তান, শিক্ষিত বা মুর্খ যাই হোক না কেন সবাই যেন এটি পড়তে পারে। আমার গল্পের মান কি হল এটা মোটেও আমাকে ভাবায় না। হায়! আমি যে জন্মেছি একদিন মরে যাব বলে। আমি কি করে জানব আমার পরের মানুষেরা এটি পড়ে কি চিন্তা করবে? আমি নিজেও আরেক জন্মে ফিরে এসে এটি পড়ে কি চিন্তা করব? হয়তো সে জন্মে আমি পড়তেও জানব না। তবে কি হবে আজ এত কথা ভেবে?”

    আশ্চর্যের বিষয় বিদ্বানদের অনেকে এক সময় এই একই দৈন্যতায় মুক্তির স্বাদ পেতে চাইলেন। এদের কারো কারো হৃদয়ে ছিল একান্ত গোপন কষ্টের বোঝা, যা কাউকে বলবার নয়। কেউ কেউ নিজেদের তৈরি জগদ্দল শিল্প কাঠামোর কাছ থেকে মুক্তি চাইছিলেন। তারাও দৈন্যতার এই সুরকে বেছে নিলেন উপন্যাস লিখবার জন্য। বিনম্র নামের এই উপন্যাসগুলোও নিজস্ব সহজ সরল কথকতা নিয়ে স্বতন্ত্র রুপে দাঁড়াল পাঠকের  সামনে।

    এই উপন্যাসিকেরা বিশ্বাস করতেন লিখবার ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি সচেতন হওয়ার কোন দরকার নেই। উপন্যাসের বিষয়বস্তুর দাবিই তার লেখার পদ্ধতি তৈরি করে দেবে। একজন উপন্যাসিক যখন একটি সুনির্দিষ্ট ঢংয়ের জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেন, একজন উপন্যাসিকের পরিবর্তে তখন তিনি হয়ে যান একজন সাহিত্যওয়ালা।

    অন্তত, চীন আমাকে যা শিখিয়েছে সে হিসেবে, একজন ভাল উপন্যাসিক হবেন অকৃত্রিম, নমনীয় এবং তার মাধ্যমে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর প্রতি নিবেদিত, সম্পূর্ণ তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তার দায়িত্ব নিজের মধ্যে বহতা জীবনকে ফুটিয়ে তোলা, স্থান আর কালের বহুধা বিভাজনে জীবনের অনিবার্য, অন্তর্লীন আঙ্গিক আর ছন্দ আবিস্কার করা। এই উপন্যাসিকদের বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে আমরা কখনই বুঝতে পারব না এটি কার লেখা। একজন লেখকের লেখার ধাঁচ যখন নির্দিষ্ট হয়ে যায়, এই নির্দিষ্টতা কারাগার হয়ে তাকে বেঁধে রাখে। বৈচিত্র আর সৃজনশীলতার পথ ছেড়ে চীনের উপন্যাসিকেরা তাই কখনই সে পথে পা বাড়াননি।

    পশ্চিমের স্কেলে মাপলে চীনের উপন্যাসের অবশ্যই হাজারো খুঁত বের করা সম্ভব। এগুলোতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট প্লট নেই, বাস্তব জীবনের মতই তাদের কোন বাঁধা ছক নেই। প্রায়শই এগুলো অতি দীর্ঘ, হাজারো ঘটনায় ঠাসা, হাজারো চরিত্রে পরিপূর্ণ। বিষয় বস্তুতে এরা বাস্তব আর কল্পনার,পদ্ধতিতে রোমান্টিকতা আর বাস্তবতার সংমিশ্রণ। ফলে যাদু বা স্বপ্ন হিসেবে এখানে যে অসম্ভব ঘটনাগুলো নিয়ে আসা হয় বর্ণনার কারুকার্যের জোরে সব যুক্তির বাইরে গিয়ে পাঠক সেগুলোও অবলীলায় বিশ্বাস করে ফেলেন। এর মধ্যে প্রথম দিকের উপন্যাসগুলো লোকগাঁথায় ভরপুর যেমনটি ছিল সেকালের মানুষের চিন্তা আর কল্পনার জগত। এই উপন্যাসগুলো না পড়ে আজকের দিনেও কারো পক্ষে চীনের মনোজগত বোঝা সম্ভব নয় কারণ এই মনোজগতও এই উপন্যাসগুলোরই নির্মাণ। এই লোকগাঁথা আজও চীনের রাজন্যবর্গ আর পশ্চিমে প্রশিক্ষিত বিদ্বানদের বিরুদ্ধ প্রচারের মুখে টিকে আছে। চীনের এই মনোজগতের তুলনা মেলে জর্জ রাসেলের বর্ণিত আইরিশ মনোজগতের সাথে- “এই মনগুলো লোকজ কল্পনায় সবকিছুই বিশ্বাস করে নিতে অভ্যস্ত। সেখানে অবলীলায় রূপার থাম দিয়ে সোনার জাহাজ তৈরি হয়, সমুদ্র ভেদ করে জেগে উঠে শহর। এই সুবিশাল লোকজ মন যখন রাজনীতির দিকে চোখ ফেরায় তখন সে সবকিছুই বিশ্বাস করতে প্রস্তুত।”

    আর্টওয়ার্ক: ইয়াং লিন
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    চীনের এই লোকজ মনই হাজার বছর ধরে মানব জীবন ঘেটে জন্ম দিয়েছে চীনের উপন্যাসের। প্রতিটি উপন্যাস এখানে বেড়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে। আমি আগেই বলেছি এই উপন্যাসগুলোর কোনটিই একক কোন লেখকের সৃষ্টি নয়, কারণ এর কোনটিই সেভাবে কখনো হাতে লেখা হয়নি। একটি ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অসংখ্য মানুষের কল্পনা শক্তি মিলিয়ে একটি উপন্যাসের কাঠামো গড়ে উঠে। একটি সুপরিচিত গল্পেরই উদাহারণ দেয়া যাক- শাদা সাপ বা পেই শে চুয়ান গল্পটি প্রথম লেখা হয়েছিল সম্রাট তং এর রাজত্বকালে, লেখকের নাম অজ্ঞাত। এটা তখন ছিল সাদা মাটা একটি অতি প্রাকৃত ঘটনার গল্প যার নায়ক একটি শাদা সাপ। একই গল্পের পরবর্তী শতাব্দীর সংস্করণে দেখা যায় নায়ক শাদা সাপ এক মহিলা ভ্যাম্পায়ারের রূপ ধরেছে এবং অশুভ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছে। তৃতীয় সংস্করণে আবার এই মহিলা ভ্যাম্পায়ারকে আবার শুভ শক্তির প্রতিরুপ হিসেবে পাওয়া যায় যে এক বিশ্বস্ত স্ত্রী হিসেবে নিজের স্বামীকে একটি সন্তান উপহার দেয়। এভাবেই প্রতিটি ধাপে নতুন চরিত্র যোগ হয়ে একটি অতিপ্রাকৃত গল্প হিসেবে শুরু হওয়া একটি গল্প শেষ হয় মানবিক পরিণতি পেয়ে।

    কাজেই চীনের ইতিহাসের উষালগ্নের এই সৃষ্টিগুলোকে আমাদের উপন্যাসের চেয়ে উপন্যাসের আকর বলে বিবেচনা করাটাই সমীচিন যে রকম আকর দুহাতে ছেনে শেক্সপিয়ার তার ক্লাসিকগুলো লিখেছেন। এই বইগুলোর অনেকগুলোই এখন হারিয়ে গেছে অধিকারী মানুষদের মর্ম-জ্ঞানহীনতার কারণে। তারপরও রয়ে গেছে হ্যানের গল্পের মত অসংখ্য গল্প যে কাহিনীগুলোর উপস্থাপনে রয়েছে তেজী ঘোড়ার স্বতস্ফূর্ততা, রয়েছে রাজ-পরিবারের উত্থান-পতন নিয়ে অসংখ্য গল্প। মিং রাজ বংশের রাজত্বকালে এগুলোর বেশির ভাগই ধর্ম বা সংস্কারের গল্প হিসেবে, স্বপ্ন আর অলৌকিকতার গল্প হিসেবে, কর্মফলের গল্প হিসেবে, ড্রাগন, ঈশ্বর বা পুরোহিতের গল্প হিসেবে, বাঘ বা শেয়ালের, মৃত্যুর পরের জীবন বা পূনর্জন্মের গল্প হিসেবে কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ হয়। বৌদ্ধ দর্শনের ধারায় প্রভাবিত প্রথম দিকের এই গল্পগুলোর বেশির ভাগই অতিপ্রাকৃত কাহিনী নিয়ে যার কোনটিতে নায়ক কুমারী মাতার গর্ভে জন্ম নেওয়া দেবতারা, কোন কোনটিতে মানুষের বেশে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়ানো দেবতারা। সবগুলো কাহিনী চমকপ্রদ অলৌকিকতায় ভরপুর। কোথাও কোথাও বিদ্বানের কলম নিমিষেই ফুল হয়ে যায়, কোথাও এক নারী ও পুরুষ স্বপ্ন নির্দেশিত পথ ধরে হাজির হয়ে যায় গালিভারদের দেশে, কোথাও বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় লোহার খণ্ডও অনায়াসে ভেসে থাকে পানিতে। কিন্তু এই অলৌকিকতা স্বত্ত্বেও প্রতিটি গল্প সাফল্যের সাথে প্রতিফলিত করেছে কোন না কোন যুগকে। হ্যানের স্বতস্ফূর্ত গল্পগুলোর উপজীব্য ছিল প্রচ্ছন্ন জাতীয়তাবাদ যা সবসময়ই কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র বা মহানায়কের বন্দনা করেছে। চীনের সুবর্ণ যুগের এই উপন্যাসগুলোর আরেকটি সমৃদ্ধ দিক হচ্ছে এদের রসবোধ যার একটি অনন্য উদাহারণ হ্যান তং সুয়ানের সংগৃহিত গল্প সংকলন সিও লিং। কিন্তু এই সুবর্ণ যুগ নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে এই গল্পগুলো মানুষ ভুলে না গেলেও নতুনগুলোতে আর এই রসবোধ খুঁজে পাওয়া গেল না। পরের জরাজীর্ণ শতাব্দীগুলোতে এজন্য চীনের অনেক মানুষই নিজেদের হ্যানের পুত্র হিসেবে পরিচয় দিতে ভালবাসত। তারা বলতো “এই ষষ্ঠ রাজ বংশের সময় তারা শুধু ছোট ছোট বিষয় নিয়ে লিখেছে যেমন,নারী,জলপ্রপাত বা পাখি ইত্যাদি”।

    হ্যান রাজবংশের সময়কালকে আমরা এই সুবর্ণ যুগ বিবেচনা করলে পরবর্তী তং রাজবংশের সময়টি ছিল রৌপ্য যুগ আর এই রৌপ্য যুগ উপন্যাসের ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল প্রেমের যুগ। সম্রাটের হে বঞ্চিত সুন্দরী রাজকুমারী কুই ফেই এর প্রেম নিয়েই রয়েছে হাজারের উপরে গল্প। কাহিনীর বুননে, বিস্তারে তা পশ্চিমা উপন্যাসের মাপকাঠিতেও মাপা চলে অনায়াসে। একারণেই চীনারা এসময়ের উপন্যাসের মুল্যায়নে আরো যোগ করতো “তারপরেও আমাদের এই ছোট বিষয়গুলোই পড়তে হয় কারণ তা আজও অশ্রু নামায় আমাদের চোখে”।

    কাজেই এটা আশ্চর্যের বিষয় নয় যে এই প্রেম কাহিনীগুলো সেই প্রেম নিয়ে কথা বলত না যা একমাত্র বিয়েতে পর্যবসিত হয়ে পরিণতি পায়। বরং বিবাহ প্রথার বাইরের প্রেম নিয়েই এদের কাহিনী বিন্যাস। কোন কোনটির ক্ষেত্রে বিয়ে কাহিনীর ঈপ্সিত পরিণতি হয়ে গেলে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তা ট্রাজেডিতে গড়াতো। এর মধ্যে দুটি বিখ্যাত গল্প পেই লি শি এবং চিয়াও ফ্যাং চি- তে দেখা যায় পরকীয়া প্রেমের কাহিনী যেখানে কার্তেজান রমনীদের গুণকীর্তন করা হয়েছে। তারা লেখাপড়া জানা, অনিন্দ্য সুন্দরী, বুদ্ধিমতি এবং সুগায়িকা। অন্যদিকে সাধারণ স্ত্রীদের বলা হয়েছে “হলুদমুখি” স্বভাবতই তারা নিরক্ষরও।

    কিন্তু উপন্যাসের এই প্রথা বিরোধী অভিযাত্রা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তার জনপ্রিয়তা স্বভাবতই ভাবিয়ে তোলে চীনের সামাজিক কর্তৃত্বের কেন্দ্রগুলোকে। কেননা এই বিপ্লবাত্মক এবং বিপদজনক প্রবণতা চীনা সমাজের মৌলিক ভিত্তি পরিবার ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিচ্ছিল। এর বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতারও অভাব ছিল না। উদাহারণ হিসেবে আসতে পারে হুই চেন চি’র একটি গল্পের কথা যেখানে কাহিনীর নায়ক এক তরুণ পণ্ডিতকে নিজের সুন্দরী প্রেয়সী ইং ইং’কে বলতে শোনা যায় “অনন্যা নারীরা সবসময়ই বিপজ্জনক যারা নিজের সাথে অন্যদেরও ধ্বংস ডেকে আনে। এমনকি অনেক সম্রাটকেও তারা ধ্বংস করেছে এবং যেহেতু আমি কোন সম্রাট নই, সযতনে তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলতে চাই”। এবং আরো অনেক মহাজ্ঞানী মহাজনের পথ ধরে চ্যাং নামের এই তরুণ বিদ্বানও তাই করে। তার কথার উত্তরে সুন্দরী ইং ইং জানায় “আমাকে ছেড়ে যাওয়ার অধিকার তোমার সবসময়ই আছে এবং আমি তোমাকে পিছু ডাকব না”। কিন্তু এই উপন্যাস প্রথম লেখা হওয়ার পাঁচশত বছর পরে তাদের প্রেমের সহায়তায় এগিয়ে আসে চীনের উপন্যাসপ্রিয় মানুষদের প্রেমিক হৃদয়। যে কারণে একই কাহিনীর এই সময়ের সংস্করণে আমরা ইং ইং এবং চ্যাং’কে দেখতে পাই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। উপন্যাসের নতুন পাদটিকায় বলা হয় “আমরা প্রার্থনা করি জগতের তাবৎ প্রেম যেন মিলিত হয় সুখী দাম্পত্য জীবনে”। চীনে সময়ের যে গতিধারা তাতে একটি সুখময় পরিসমাপ্তির জন্য পাঁচশত বছরের প্রতীক্ষা একেবারেই মামুলি ব্যাপার।

    কথা প্রসঙ্গে বলা যায় এই উপন্যাসটি চীনের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর একটি। সুং রাজত্বের সময় এটি কাব্য রূপে আবার লেখেন চাও তে লিয়াং, অবসন্ন প্রজাপতি নামে। ইয়ুয়ান রাজ বংশের রাজত্বকালে এটি পুনরায় গীতিনাট্যের আঙ্গিকে লেখেন চাই উয়েন, শুহ সি জিয়াং নামে। মিংদের রাজত্বকালে আমরা পাশাপাশি এর আরেকটি সংস্করণ দেখতে পাই- লি রেহ হুয়ার দক্ষিণের ছন্দময় ঢং তজি ’র আঙ্গিকে লেখা নান সি জিয়াং চি নামে যেটি আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমনকি আজকের চীনের শিশুদের কাছেও চ্যাং সেন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র।

    তং যুগের রোমান্সের প্রতি আমি বেশি জোর দিচ্ছি কারণ নর-নারীর প্রেমই চীনের উপন্যাসের ক্ষেত্রে এযুগের সবচেয়ে বড় অবদান। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এযুগে অন্য কোন উপন্যাস লেখা হয়নি। এসময়ে আমরা অসংখ্য রসবোধ সম্পন্ন ব্যাঙ্গাত্মক উপন্যাস পেয়েছি। এর বেশির ভাগই সেময়ের রাজদরবারের নানা কৌতুককর ঘটনা নিয়ে লেখা। এগুলোর মধ্যে সেরা একটি গল্প চেন হুং’এর লেখা তুং চেং লাও ফু চুয়ান’এ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চরিত্র হিসেবে চিয়া চ্যাং নামে এক মোরগযোদ্ধাকে দেখতে পাই যে নিজের কৌতুককর কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে সম্রাটেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে।

    এভাবেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সুং রাজত্বকালে এসে চীনের উপন্যাস একটি সুস্পষ্ট অবয়ব পায়। ইউয়ান রাজত্বের সময় এসে তা পৌঁছে যায় বিকাশের সর্বোচ্চ শিখরে যার কাছাকাছি পরবর্তী যুগের কোন উপন্যাসই পৌঁছুতে পারেনি তুং যুগের হুং লাও মেং বা লাল প্রকোষ্ঠের স্বপ্ন’র মত দু’একটি উপন্যাস ছাড়া। কয়েক শতক ধরে সবার অলক্ষ্যে, প্রাকৃত জীবনে শেকড় গেড়ে ডাল, কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়ে যে উপন্যাস ফুল পাতা মেলে দিল তুং রাজত্বে এসে, তার প্রকৃত রাজকীয় মূল্যায়ন হয়েছিল মোঙ্গলদের সময়। তারা এই প্রাচীন দেশটি দখল করার পর তাদের যাযাবর হৃদয়ে প্রথাগত সাহিত্য কোন আবেদনই সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হল। বরং তারা উৎসাহ নিয়ে ঝুঁকে পড়ল নাটক আর উপন্যাসের দিকে। সাহিত্য জগতের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মাঝেও এই রাজ আনূকুল্য পেয়ে চীনের উপন্যাস যেন সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হল। এসময়েই একে একে লেখা হয় চীনের ইতিহাসের সেরা তিনটি উপন্যাস শুই হু চুয়ান, স্যান কুও এবং সর্বশেষ হুং লাও মেং।

    চীনের মানুষের কাছে এই তিনটি মহান উপন্যাস কি গভীর বার্তা বহন করত তা আপনাদের সামনে তুলে ধরবার সুযোগ আজকের আয়োজনের পরিসরে নেই। কিন্তু আমি পুরো পশ্চিমা সাহিত্যে এদের কোন জুড়ি খুঁজে পাইনি। আমাদের উপন্যাসের ইতিহাসে এমন কোন মুহূর্ত আসেনি যাকে দেখিয়ে আমরা বলতে পারি “এটাই আমাদের উপন্যাসের বিকাশের সর্বোচ্চ চূড়া”। চীনের এই উপন্যাস তিনটি গণমানুষের সাহিত্যের অমিত স্বাক্ষর। বিদ্যাজীবীদের না হলেও এগুলো গণ-সাহিত্যের পরিণত স্তম্ভ। আর সব গণ-সাহিত্যের মত এগুলোকেও পড়তে হয়েছে সমসাময়িক বিদ্যাজীবীদের কোপানলে। বিপজ্জনক, বিদ্রোহী, উদ্ধত ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে দাঁড়াতে হয়েছে রাজরোষের কাঠগড়ায়। কিন্তু তারপরও চীনের সাধারণ মানুষ গল্প হিসেবে পড়ে, বলে, গান হিসেবে গেয়ে, নাটক হিসেবে অভিনয় করে এদের বাঁচিয়ে রেখেছে কয়েক শতাব্দী ধরে। যার ফলে বিদ্যাজীবীরাও একসময় বাধ্য হয়েছে এগুলোকে আমলে আনতে। তাদের সংকীর্ণ স্বর এরপর এগুলোকে আখ্যা দিয়েছে ‘লোককথা’, সেই সাথে পাদটিকায় তত্ত্ব দিয়েছে এগুলোকে সাহিত্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু চীনের সাধারণ মানুষ এসব তত্ত্ব বা তার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য লেখা ভুরি ভুরি নিবন্ধে কর্ণপাত করেনি বিন্দুমাত্র। তারা নিজেদের সৃষ্ট উপন্যাসে মগ্ন থেকেছে, নিপাট আনন্দ ছাড়া যার আর কোন লক্ষ্য নেই, নিজেদের জীবনের প্রকাশ ছাড়া যার আর কোন বাড়তি উদ্দেশ্য নেই।

    চীনের উপন্যাস প্রকৃত অর্থেই সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। শুই হু চুয়ানের লেখক হিসেবে আধুনিক সংস্করণগুলোতে শি নাই এন’ র নাম ছাপলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একক কোন ব্যক্তির লেখা নয়। অনেকগুলো প্রচলিত গল্পের সমন্বয়ে সুং রাজত্বে এক দস্যুদল নিয়ে দাঁড়িয়েছে এই উপন্যাসের বিশাল কাঠামো। এর সুচনা নিহিত ছিল ইতিহাসে। এই দস্যুদের সত্যিকার আখড়াটি এখনও বিরাজমান শানতুং প্রদেশে। সময়ের পশ্চিমা হিসাবে ত্রয়োদশ শতাব্দীর এসময়টি চীনের ইতিহাসের এক দুঃখময় অধ্যায় যখন সম্রাট হুই চুংয়ের রাজত্ব জুড়ে চলছে অরাজকতা। প্রতিদিন ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবেরা আরো গরিব। যখন অনাচার রুখে দাঁড়ানোর মত আর কেউ নেই তখন শোষিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল এই দস্যুদল।

    আর্টওয়ার্ক: লু জিসেন
    সূত্র: উইকিপিডিয়া

    চীনের এই উপন্যাসটির সুদীর্ঘ রচনাকালের পুরো ইতিহাস বা প্রতিটি পর্যায়ে এর বাঁকগুলো পুরোপুরি আপনাদের সামনে তুলে ধরবার সুযোগ নেই। বলা হয়ে থাকে শি নাই এন এর আদি রূপটি খুঁজে পেয়েছিলেন একটি পুরনো বইয়ের দোকানে যেখান থেকে নিয়ে গিয়ে তিনি এটি আবার পরিশুদ্ধরূপে লেখেন। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই গল্প চীনের ঘরে ঘরে প্রচলিত। আজকে প্রচলিত এর পাঁচ বা ছয়টি সংস্করণ পর্যালোচনার দাবি রাখে। চুং ই শুই হু নামের একটি সংস্করণে রয়েছে একশতটি অধ্যায়, অন্য আরেকটিতে রয়েছে একশত সাতাশটি অধ্যায়, অন্য আরেকটিতে একশতটি। শি নাই এন এর সম্পাদিত সংস্করণটিতে অধ্যায় ছিল একশত বিশটি। কিন্তু আজকের দিনে সবচেয়ে প্রচলিত সংস্করণটিতে রয়েছে মাত্র সত্তুরটি অধ্যায়। এই সংস্করণটি মিং রাজত্বকালে চিং সেন তন লিখেছিলেন যার পেছনে রয়েছে একটি মজার ইতিহাস। চিং জানতেন তার পুত্রও চীনের আর দশজন কিশোরের মত এ উপন্যাস না পড়ে পারবে না। এই বিশাল পরিসরের উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে যাতে পুত্রের বেশি সময় না লাগে এজন্য তিনি নিজেই এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ লিখে ফেলেন। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই উপন্যাসের একটি সরকারি সংস্করণও পাওয়া যায়। চীনের তৎকালীন কর্তৃপক্ষ যখন বুঝতে পারলেন জনগণকে কিছুতেই তাদের জন্য অস্বস্তিকর এই উপন্যাস পাঠ থেকে নিবৃত্ত করা যাবেনা, নিজেরাই সরকারি আয়োজনে এর একটি সংস্করণ লিখলেন যাতে কাহিনী উল্টে গিয়ে উপন্যাস শেষ হয় রাজকীয় বাহিনীর হাতে দস্যুদলের শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে। কিন্তু চীনের সাধারণ মানুষ মোটেও নেয়নি এই চাপানো গল্প, বরং প্রতিদিনের চর্চায় বাঁচিয়ে রেখেছে এই মহান দস্যুদলকে যাদের মধ্যে তারা জরাজীর্ণ রাজনীতির বিরুদ্ধে গণমানুষের নিরন্তর সংগ্রামের অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়।

    শুই হু চুয়ান আংশিক অনূদিত হয়েছে ফরাসি ভাষায়, লা শেভালিয়ারস্ চিনইস নামে। সত্তুরটি অধ্যায় নিয়ে যে শুই হু চুয়ান তার পুরোটাই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছি আমি নিজে, নাম অল মেন আর ব্রাদার্স। বইটির মূল নামের কোন অর্থ ইংরেজিতে দাঁড় করানো যায় না। চীনা ভাষায় কোন বড় লেকের প্রান্তিক জলাভূমি বোঝানো হয় এই শব্দগুলো দিয়ে যেখানে এই দস্যুদের আস্তানা ছিল। এই নাম মুহুর্তেই শতাব্দী প্রাচীন যে স্মৃতি অনুভব চীনাদের মনে নিয়ে আসে, আমাদের পশ্চিমা মনোগড়নে সেই অনুভব কখনই সম্ভব নয়।

    প্রাচীন এই উপন্যাসটি চীনে শুধু টিকেই নেই, সেই সাথে সম্প্রতি ভিন্নতর এক তাৎপর্যও লাভ করেছে। চীনের কমিউনিস্টরা এই উপন্যাসের আরেকটি সংস্করণ প্রকাশ করেছে যার ভূমিকা লিখেছেন সেখানকার এক প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা যাতে তিনি একে উপস্থাপন করেছেন চীনের প্রথম সাম্যবাদী সাহিত্য হিসেবে। উপন্যাসটির মাহাত্ম তার অন্তর্গত আবেদনের এই কাল নিরপেক্ষতার মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই। সাম্রাজ্যের কালে যে সত্যের দ্যূতি এটি ছড়িয়ে ছিল, আজকের সময়েও তা নিষ্প্রভ হয়নি এতটুকু। আজও এর পাঠকের সারিতে আমরা পেয়ে যাই পুরোহিত, আমলা, বণিক, বিদ্বান, নানা পদের, বয়সের নারী এমনকি দুষ্ট কিশোরদেরও। এই সারিতে নেই শুধু পশ্চিমা পি এইচ ডি ধারী আধুনিক বিদ্বানেরা। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে এই বিদ্বানেরা যদি উপন্যাসটিতে শেষ যার কলমের আঁচড় পড়েছে সেই গল্পকারের সময়েও জন্ম নিতেন, তাদের নিয়েও মানুষের মুখে মুখে চালু হয়ে যেত হাজারো মজাক।

    চীনারা বলে কিশোরদের পড়া উচিত না শুই হু আর বুড়োদের স্যান কু। কারণ শুই হু পড়ে তাদের ডাকাত হওয়ার শখ জাগতে পারে আর স্যান কু পড়ে বুড়োদের বল প্রদর্শনের ভীমরতি পেয়ে বসতে পারে। শুই হু চুয়ান যদি চীনের সমাজের প্রামাণ্যরূপ হয়, স্যান কু হচ্ছে চীনের যুদ্ধ আর রাজনৈতিক জীবনের প্রামাণ্যরূপ আর হুং লাও মেং তার পারিবারিক জীবন, মানবিক প্রেমের অনুসন্ধানী কথকতা।

    স্যান কু বা তিন রাজ্য উপন্যাসটির ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় কাঠামোগত বুনন আর লেখক পরিচয়ের সংশয়ের প্রশ্নে এটিও শুই হু চুয়ানের মতই। গল্পটি শুরু হয় হ্যান রাজত্বের সময়ে পরস্পর ভাতৃত্বের শপথে আবদ্ধ তিন বন্ধুর জীবন নিয়ে এবং শেষ হয় সাতানব্বই বছর পরে ষষ্ঠ রাজবংশের সময়কালে এসে। আজকের পরিচিত সংস্করণটির লেখক হিসেবে জানা যায় লো কুয়ান চুং এর নাম যাকে অনেক গবেষকই শিহ নাই এন এর শিষ্য বলে মনে করেন। সম্ভবত শুই হু চুয়ান লিখবার ক্ষেত্রেও তার কিছু অবদান আছে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কটি অনেকটাই বেকোনান্দ-শেক্সপিয়ার সম্পর্কের মত নানা পরস্পর বিরোধী তথ্যে পরিপূর্ণ।

    ইউয়ান রাজত্বের শেষ ভাগে জন্ম নেয়া লো কিয়ান চুং বেঁচে ছিলেন মিং রাজত্বের সময় পর্যন্ত। তার লেখালিখির তালিকায় অনেকগুলো নাটক থাকলেও তিনি বিখ্যাত হন রচিত উপন্যাসগুলোর জন্য, যার মধ্যে সেরা স্যান কু। আজকের চীনে সবচেয়ে প্রচলিত সংস্করণটি সম্রাট কং সি’র সময়ে পরিমার্জন, পরিবর্ধন করেছিলেন মাও চেন কান। এই পরিমার্জনে যেমন অনেক কিছু বাদ পড়েছে তেমনি যুক্ত হয়েছে আরো অনেকটা। যেমন উপন্যাসের অন্যতম প্রধান সুয়ান ফু রেন চরিত্রটি তিনি যোগ করেছিলেন মূল কাহিনীর সাথে। একই সাথে তিনি বদলে ফেলেন কাহিনীর কথকতার ভঙ্গিমাও। শুই হু চুয়ান যেখানে চীনের মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে বুঝবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, স্যান কু সেখানে চীনের একেবারে নিজস্ব সমর-কলা আর সমর-দর্শনকে বিশদভাবে তুলে ধরে। জাপানের সাথে যুদ্ধের সময় চীনের হাজার হাজার কৃষক গেরিলাদের প্রত্যেকেরই পড়া ছিল স্যান কু, নিজে না পড়লেও অন্তত অলস শীতের দিনে বা কোন প্রলম্বিত গ্রীষ্মে ঘরোয়া আসরে অন্যের মুখে শোনা ছিল এই উপন্যাসের কাহিনীগুলো। কোন না কোন গল্প বলিয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমায় তাদের শুনিয়েছে তিন রাজ্যের যুদ্ধের কথা, যুদ্ধের প্রাচীন কলা-কৌশলের কথা যেগুলোর অনেকগুলোরই বাস্তব প্রয়োগ হয়েছে জাপানিদের বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধের সময়। এই উপন্যাসের পাঠক হিসেবে চীনের আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই জানে একজন যোদ্ধা হতে হলে কি প্রয়োজন, কিভাবে শত্রু আক্রমণের মুখে পিছু হটতে হয় বা কিভাবে পশ্চাৎধাবন করতে হয় পলায়নপর শত্রুর।

    আর্টওয়ার্ক: শুই ইং ইং
    সূত্র: পিনটারেস্ট

    চীনের শ্রেষ্ঠ তিন উপন্যাসের মধ্যে অধুনাতমটি হুং লাও মেং বা লাল প্রকোষ্ঠের স্বপ্ন। মানচু সাম্রাজ্যের এক প্রভাবশালী রাজকর্মচারী জাও যু চিং আত্মজীবনী আকারে লিখেছিলেন এই উপন্যাসটি। রাজ পরিবারসহ তৎকালীন মানচু সাম্রাজ্যের আট বাহিনীর প্রতিটির সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু তিনি এই উপন্যাসটি একা শেষ করেননি, শেষ চল্লিশটি অধ্যায় লিখেছিলেন আরেকজন যার নাম সম্ভবত কাও ও। এছাড়াও জাও যু চিং এর এই আত্মজীবনীও ঐতিহ্যের ধারায় পড়ে পরিবর্তিত-পরিমার্জিত হয়েছে প্রথমে ইউয়ান মেই’র হাতে, পরে হু শিহ’র হাতে। স্বভাবতই এর নামও পরিবর্তন হয়েছে, জাও যু চিং এর নাম দিয়েছিলেন শিহ তো চি যা পরবর্তীতে এসে হয়ে গেছে হুং লাও মেং। ১৭৬৫ সালের দিকে এই উপন্যাসটি পিকিং এসে পৌছায় এবং মাত্র পাঁচ ছয় বছরের মধ্যে চলে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। মুদ্রিত বইয়ের দাম তখনও চীনে আকাশচুম্বী, ফলে বইটির প্রতিটি কপি ঘুরেছে হাজারো হাতে।

    বিষয় বিচারে উপন্যাসটি সরল হলেও রস বিচারে, চরিত্রের গভীরতা, মানবিক আবেগের প্রকাশের প্রশ্নে মোটেও তা নয়। কাহিনীর শুরু এক রাজকর্মচারীর ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের গভীর বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনা দিয়ে যার মূল উৎস জাও যু চিং এর যাপিত জীবন, যেখানে দীর্ঘদিনের লালিত আভিজাত্যে ক্রমশ চিড় ধরছে। সঞ্চিত সম্পদের উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র চিয়াও পাও ইউ পরিবারের ভিতর থেকে পাওয়া ইন্ধনে দুহাতে টাকা ওড়াচ্ছে যদিও সে জন্ম নিয়েছে মুখে সৌভাগ্যতিলক নিয়ে। কাহিনীর শুরুতেই তার পরিচয় দেয়া হয়েছে “স্বর্গ ভেঙ্গে যাওয়ার পরে যখন  আবার নির্মিত হল, ছোট্ট একটি টুকরো বাদ পড়ে গিয়েছিল সে নির্মাণে,ঈশ্বর সেটিকে তিল বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন চিয়াও পাও’র মুখে… …”। অতি-প্রাকৃতিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী এই চীনা ঐতিহ্য আজও আমরা চীনা জীবনে খুঁজে পাই।

    এই উপন্যাস অনায়াসে চীনের পাঠকদের ধরে রাখতে পেরেছিল কারণ এর উপজীব্য বিষয় ছিল তাদের নিজস্ব পরিবার ব্যবস্থার সমস্যাগুলো, বাড়িতে নারীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, মাতৃতান্ত্রিকতার একচ্ছত্র আধিপত্য। চীনের পরিবারে নানী, মা এমনকি কখনও কখনও বাড়ির দাসী পর্যন্ত পারিবারিক ক্ষমতার একক অধিকারী হয়ে যেত। অভিজাত পরিবারের সুন্দরী যুবতী দাসীরা প্রায়শই মালিক পুত্রের ক্রীড়ানকে পরিণত হতো বা নিজেরাই নাচিয়ে বেড়াতো তাদের। চার দেয়ালে আবদ্ধ এই নারীরা, যাদের বেশির ভাগই চিরকাল নিরক্ষর থেকে যেত, প্রাণ দিয়ে আগলে রাখতো বাড়ির পুরুষদের। এমনি এক আগলে রাখা পুরুষ হিসেবে আমরা লাল দেয়ালের প্রকোষ্ঠে চিয়া পাও ইউকে দেখতে পাই।

    এই উপন্যাসের খ্যাতি যখন সাধারণ মানুষের গন্ডি পেরিয়ে সমাজের উঁচু স্তরে পৌঁছে গেল, স্বয়ং সম্রাটকেও দেখা গেল এতে নাক ডুবিয়ে নিমগ্ন থাকতে, বিদ্বানরা ব্যস্ততার সাথে কয়েকশত মাইল সমালোচনা লিখে ফেললো এটাকে খারিজ করে। আমার কোন সন্দেহ নেই যে এই বিদ্বানদেরও অনেকে উপন্যাসটি গোপনে হলেও পড়ে ফেলেছিল।  পণ্ডিতদের এই গোপনে উপন্যাস পাঠ এবং প্রকাশ্যে অস্বীকার নিয়েও চীনাদের মাঝে নানা কৌতুক প্রচলিত আছে। যা হোক, তাদের অনেকে নিবন্ধ লিখে এই অভিযোগও করলো যে হুং লাও মেং আদৌ কোন উপন্যাস নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারণা যা বিদেশি মানচুদের হাতে চীনের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত। উপন্যাসের নামে লাল শব্দটি মানচুদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং পাও ইউ’র বাগদত্তা লিং তাই ইউ, যে কাহিনীর এক পর্যায়ে মৃত্যূবরণ করে, প্রতিনিধিত্ব করে চীনের। অন্যদিকে তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী পাও জাই, যার সাথে শেষ পর্যন্ত পাও ইউ’র মিলন হয়, প্রতিনিধিত্ব করে বিদেশি শক্তির। এরকম বহু যুক্তি খাড়া করে তারা এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এগুলো ছিল উপন্যাসটির বিকৃত বিশ্লেষণ। এই প্রতিবন্ধকতাও পেরিয়ে উপন্যাসটি চীনা ঐতিহ্যে বাস্তবতা আর রোমান্সের শৈল্পিক সংমিশ্রণের আরেকটি শক্তিশালী উদাহারণ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। একই ছাদের তলায় কয়েক প্রজন্মের নারী-পুরুষের সুদীর্ঘ  জীবন যাপনের যে চৈনিক প্রথা, এক ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাবান পরিবারের প্রেক্ষাপটে তারই নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায় এই উপন্যাসের পাঠকেরা।

    এই তিনটি উপন্যাসকে যে আলাদা গুরুত্ব আমি দিয়েছি, চীনের মানুষেরাও তাই দিয়ে থাকে। উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলে গড়পড়তা চীনের মানুষেরা একনাগাড়ে বলে যাবে “শুই হু, স্যান কু, হুং লাও মেং”। কিন্তু তারপরও সত্য যে এর বাইরেও শত শত উপন্যাস রয়ে গেছে চীনে। এর মধ্যে বলতে হয় জি ইউ চি’র নাম যার খ্যাতি এই তিনটির কাছাকাছিই। বলতে হয় এক দেবর্ষি যোদ্ধার কাহিনী ফেং সেন চুয়ান’র কথা যার লেখক অজ্ঞাত হলেও ধারণা করা হয় এটি মিং আমলে লেখা। এছাড়াও আছে তুং রাজত্বে রাজকর্মচারী আর বিদ্বানদের অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে লেখা রু লিং ওয়ে শি, বিদ্রুপাত্মক এই উপন্যাসটিতে রয়েছে দ্ব্যর্থক সংলাপের ছড়াছড়ি যা একাধারে করুণ এবং হাস্যরসাত্মক ঘটনার পরম্পরায় সাজানো। প্রাত্যহিক জীবনের প্রায়োগিকতা বিচ্ছিন্ন, সৃজনশীলতায় অক্ষম বিদ্বানদের নিয়ে এ উপন্যাসে রয়েছে অসংখ্য কৌতুক। দীর্ঘ এই উপন্যাসের কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। প্রতিটি চরিত্র আরেকটির সাথে ঘটনা পরম্পরায় সম্পর্কিত যাকে খ্যাতিমান আধুনিক লেখক লু জুন বলেছেন “একসাথে জড়ানো সিল্ক আর সাটিনের সমাহার”।

    আর আছে কর্তৃত্ব বিরোধী উপন্যাস ইয়ে শো পেই ইন যার অর্থ সূর্যের মাঝে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের কন্ঠস্বর, লিখেছেন কিয়াং ইনের এক খ্যাতিমান ব্যক্তি- শিয়া। ব্যতিক্রমী কাহিনীর উপন্যাস চিং হুয়া ইয়েন যার বিষয় কল্পিত এক নারী সাম্রাজ্য যেখানে সম্রাজ্ঞীর অধীনে জ্ঞানচর্চা করে নারী বিদ্বানেরা। কাহিনীর একটি সুপ্ত লক্ষ্য ছিল জ্ঞানের প্রশ্নে নারী-পুরষের সমতার প্রশ্নটি উত্থাপন যদিও উপন্যাসটি শেষ হয় নারী পুরুষের এক যুদ্ধ দিয়ে যেখানে নারী রাজ্যের সম্রাজ্ঞী পরাজিত হন একজন সম্রাটের কাছে।

    তারপরও এগুলো চীনের গণমানুষকে উজ্জীবিত করা উপন্যাস সম্ভারের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ। তারা যদি আজকের এই আলোচনায় থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই বলত “এসব বাদে আসল তিনটির কথাই বলুন, শুই হু চুয়ান, স্যান কু আর হুং লাও মেং”। যেগুলো ধারণ করে হাজার বছর ধরে চীনের মানুষেরা যে জীবন যাপন করছে সেই জীবনের প্রাঞ্জল বর্ণনা, সেই গানের সুর যা তারা গেয়েছে এতদিন। আছে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের রঙ্গরস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের মানস গড়ে উঠেছে এগুলোকে ঘিরে, তারা ফিরে ফিরে এসেছে এই কাহিনীগুলোর কাছে। পরিবর্তিত জীবনের নতুন গান, গীতিকা আর উপন্যাসও সৃষ্টি হয়েছে এখান থেকেই। এগুলোর কোন কোনটি আসলটির মতই খ্যাতি লাভ করেছে, যেমন শুই হু চুয়ানের একটি একক ঘটনাকে ঘিরে লেখা শরীরি প্রেমের গল্প চিং পিং মেই।

    আর্টওয়ার্ক: ফেস্টিভাল
    শিল্পী: ঝাউ লি
    সূত্র: চাইনিজ টাইমস

    কিন্তু আজ আমার উদ্দেশ্য চীনের উপন্যাসের তালিকা প্রণয়ন নয়। যে দিকটির প্রতি আমি জোর দিতে চাই তা প্রোথিত আছে বিশ্ব সাহিত্য ইতিহাসে বিরল এই গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠির কল্পনার প্রাণময় বিকাশে। চীনে বহুল প্রচলিত গল্প’র একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে জিয়াও শু ও যার মানে দাঁড়ায় অর্থহীন, বায়বীয় কোন কিছু। এমনকি উপন্যাসের প্রচলিত প্রতিশব্দ জং পিয়েন জিয়াও শু ও’র মানে দীর্ঘ অথচ অর্থহীন ও বায়বীয়। চীনের মানুষেরা অক্ষরের বেড়াজাল থেকে উপন্যাসকে ক্রমাগত মুক্তি দিয়ে গেছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি কাহিনীকে জীবন্ত রেখে। আজকে আমরা এর যে রুপটি পাই তা বর্তমান তো বটেই, আসছে দিন সম্পর্কেও অনেকখানি ইঙ্গিত বহন করে। বিপরীতে শিল্প নামে যে প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের সতীত্ব রক্ষার প্রাণান্তকর চেষ্টা পণ্ডিতরা কয়েক শতাব্দী জুড়ে করেছেন, প্রকৃত প্রস্তাবে আজ তা মৃত। প্রাণবান উপন্যাসগুলোর বাঁধা কোন প্লট নেই, কাহিনীর মাঝে নেই পরিণতি পাওয়ার আরোপিত প্রয়াস, নায়িকারা যেমন এগুলোতে সবসময় সুন্দরী নয়, সব নায়কই তেমন অদম্য সাহসের অধিকারী নয়। কোন কোনটি আবার ঠিক জীবনের মতই মাঝ পথে এসে থেমে যায়, যেভাবে মৃত্যু আকস্মিকভাবে থামিয়ে দেয় জীবনের স্রোতধারা।

    উপন্যাসের এরকম একটি ঐতিহ্যেই আমি জন্ম নিয়েছি, একজন লেখক হিসেবে অনুসরণ করেছি। শিল্প সৃষ্টি বা আরোপিত নান্দনিকতা তাই কখনই আমার লক্ষ্য ছিল না। চীন থেকে এই একটি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার প্রয়োজন আছে পশ্চিমা উপন্যাসের। শিল্প-কলার পুরোহিতদের মোকাবিলা করবার জন্য চীনের উপন্যাসিকদের এই দৈন্যপন্থী প্রতিরোধ আখ্যানটি আমি নিজের কথায় বললাম যেহেতু তারা কেউ বিষয়টি লিখে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি।

    মানুষের যে প্রবৃত্তিটি শিল্প ‘সৃষ্টি’ করে তা শিল্প ‘তৈরি’র প্রণোদনার চেয়ে ভিন্নতর। চূড়ান্ত বিচারে এবং সহজতম কথায় সৃজনশীল প্রবৃত্তি হচ্ছে একটি বিস্তৃত প্রাণময়তা, এক অমোঘ শক্তি যা ব্যক্তি এককের মাঝে অতিযৌক্তিকভাবেই জন্ম নেয়, নিজের জীবনের সমস্ত প্রয়োজনকে ছাপিয়ে যায় সে তাগিদ, কোন একক জীবন সৃষ্টির সেই শক্তিকে ধারণ করতে পারে না। ফলে এই শক্তি ছড়িয়ে পড়ে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে, কখনও সুর, কখনও ছবি, কখনও সাহিত্য বা প্রকাশের অন্য কোন মাধ্যমকে আধার করে। ব্যক্তি চাইলেও তখন আর একে অগ্রাহ্য করতে পারে না কারণ এই প্রকাশের মাঝেই সে তখন স্বস্তি পায়, এই অদ্ভূত বাড়তি শক্তি ক্ষয় করবার স্বস্তি। এই শক্তি যখন কারো শরীর-মনে ভর করে, তার ইন্দ্রিয় গড়পড়তা মানুষের চেয়ে আরো প্রখর এবং সংবেদনশীল হয়ে যায়, আরো গভীরতর হয় সমস্ত অনুভব। এই সংবেদনশীলতা মস্তিষ্কে যে চাপ সৃষ্টি করে তা বস্তু জগতের সীমানা ছাড়িয়ে তাকে নিয়ে যায় কল্পনার জগতে। এটি এক অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া যা ক্রমশ তার অস্তিত্বের প্রতি বিন্দুতে ভাগ বসায়। এই প্রক্রিয়া শুধু তাকেই ভাসিয়ে নেয়না, সাথে নেয় তার কল্পনার এবং সক্রিয়তার পরিবৃত্তকেও।

    কখনও কখনও ব্যক্তি না চাইলেও এই সক্রিয়তার ফলাফল থেকে বাদ পড়ে যায় শিল্প। শিল্প সৃজনের প্রক্রিয়া আর শিল্পের আঙ্গিক নির্ধারণের প্রক্রিয়া এক জিনিস নয়। কাজেই শিল্পের সংজ্ঞা নিরূপণ মুখ্য নয় বরং গৌণ একটি প্রক্রিয়া। কাজই কেউ যখন মুখ্য কর্মকাণ্ডের জন্য জন্ম নিয়ে গৌণ কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে যায়, তার সক্রিয়তার কোন অর্থ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। সে যখন আঙ্গিক, রূপ, কৌশল আর নতুন ধারা প্রবর্তনকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে, তখন তার অবস্থা হয় অগভীর খাড়িতে আটকা পড়া জাহাজের মত, শত চেষ্টাতেও আর এগিয়ে যেতে পারে না সমুদ্রের বিশালতার দিকে।

    একজন সত্যিকারের উপন্যাসিকের জন্য রচনার একমাত্র উপাদান তার নিজের ভিতরের ও বাইরের মানব জীবন। তার কাজকে মাপার একমাত্র মাপকাঠি হচ্ছে তার সৃজনীশক্তি নিজ জীবন ছাড়িয়ে কতটা উপচে পড়ল সেই পরিমাপ। তার সৃষ্টি কি বেঁচে আছে? এই হওয়া উচিত তার নিরন্তর প্রশ্ন। আর এ প্রশ্নের উত্তর এক গণমানুষ ছাড়া তাকে আর কে দিতে পারে? শিল্প কি বা এটি কিভাবে তৈরি হয় এই জাতীয় কূটতর্কে এ মানুষরা ডুবে নেই। বরং তারা ডুবে আছে প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুধা, হতাশা, আনন্দ-বেদনা আর সর্বোপরি স্বপ্নের মাঝে। একমাত্র এরাই আসলে একটি উপন্যাসের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারে, কারণ তাদের মূল্যায়ন সব সময়ই হয় বাস্তবতার মাপকাঠিতে। শিল্পের মূল্যায়ন কখনই শিল্পের মাপকাঠিতে হয় না, হয় পাঠকের জীবন বাস্তবতার সাথে সরলতর তুলনার মাধ্যমে।

    একজন উপন্যাসিক শিল্পকে নিখুঁত অবয়ব হিসেবে বিবেচনা করতে পারে, মার্বেল পাথরের অধিষ্ঠিত দেবতা হিসেবে পূজা করতে পারে দুর থেকে, কিন্তু তার নিজের অবস্থান কখনই তাদের সাথে নয়। তার জায়গা পথে, সেখানেই সে সবচেয়ে সুখী। পথ কখনও নিশ্চল নয়, পথিকদের প্রকাশ ভঙ্গি কখনও পাথরের মূর্তির মত নিখুঁত নয়। তারা কদাকার, খুঁতসম্পন্ন এমনকি মানুষ হিসেবেও অসম্পূর্ণ। তারা কোথা থেকে আসে আর কোথায় যায় তাও বোধগম্য কিছু নয়। কিন্তু তারপরও তারাই গণমানুষ এবং শিল্পের বিষয় হিসেবে তারাই নমশ্য, শিল্পের পাদদেশে দাঁড়ানো প্রতিটি প্রকৃত শিল্পীর কাছে।

    আর চীনের এই উপন্যাসিকদের মত,আমিও এই গণদের জন্য লিখতে শিখেছি। কতিপয়ের পত্রিকার চেয়ে আমি সবসময়ই আমার লেখা ছাপতে চেয়েছি এই গণদের পত্রিকায়। আমি বিশ্বাস করি গল্প তাদের জন্যই। তারা আর যে কারো চাইতে গল্পের ভাল সমঝদার। তাদের বোধ দূষিত নয়, তাদের আবেগ মুক্ত। একজন উপন্যাসিক কখনও খাঁটি সাহিত্য তৈরিকে নিজের লক্ষ্য বানাতে পারেন না। এমনকি তার এই বিষয়টি খুব বেশি বুঝবারও দরকার নেই। কারণ তার লেখার উপাদান যে মানুষেরা, তাদের সাথে এই খাঁটি (?) সাহিত্যের সে সে রকম কোন যোগ নেই। তার ভূমিকা মূলত গ্রামের তাঁবুতে বসা গল্প বলিয়ের যে গল্প দিয়ে জয় করবার চেষ্টা করে তার শ্রোতাদের মন। এক বিদ্বান যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যায় তখন তার কণ্ঠ উঁচু করবার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার ড্রামটি যেন সজোরে বেজে উঠে একদল সমর্পিত অসহায় মানুষ যখন পর্বতের দিকে রওনা হয় ঈশ্বরের খোঁজে। সে যেন চিৎকার করে তাদের বলে “আমিও ঈশ্বরের কথাই বলি”।  সে যেন কৃষকের কাছে জমি আর শস্যের কথা জানতে চায়, বৃদ্ধদের কাছে সে যেন শান্তির কথা বলে, বৃদ্ধাদের কাছে যেন সন্তানদের কথা বলে, তরুণ-তরুণীদের যেন বলে পারস্পরিক সংবাদ। সাধারণ মানুষদের আনন্দিত মুখ যেন তাকে তৃপ্ত করে। একজন উপন্যাসিক হিসেবে মহান চীনের কাছে এই শিক্ষাই আমি পেয়েছি।

    সম্পাদনা নোট: বক্তৃতাটি ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে অনুবাদ করা। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তা ছাপাও হয়। বর্মান সংস্করণটি অনুবাদকের কাছে থেকে প্রাপ্ত।

  • কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    কেভিন ডয়েল।। আইনসভা নাকি গণতন্ত্র?  

    অনুবাদ: জাকির হোসেন

    প্রথম কিস্তি

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বতন্ত্র ও বিকশিত শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    আর্টওয়ার্ক: লিবার্টি লিডিং দ্য পিপিল
    শিল্পী: ইউজিন ডেলাক্রইক্স
    সূত্র: উইকিআর্ট

    গণতন্ত্রের সমস্যা    

    ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে কিছু মানুষ যে শাসন করার জন্যই জন্মায় এমনতর  ধারণাটির বিলোপ সাধিত হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন এবং শক্তিশালী রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তার জায়গা দখল করে ‘মানুষ এবং নাগরিকের অধিকারসমূহের ঘোষণা’য় বর্ণিত আইনগত  সাম্য এবং ব্যক্তি মানুষের কতিপয় অধিকার।

    নতুন এই অধিকারগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল একটি বৃহৎ সামাজিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। গ্রহণযোগ্যতা পাবার পর এই অধিকারগুলোই ছিল ফরাসি বিপ্লবের সত্যিকারের ছাপ। সে সময় থেকে উক্ত আইনসমূহ এবং আইন তৈরির প্রক্রিয়ার পুরোটাই ছিল সেই ‘সাধারণ ইচ্ছা’র বহিঃপ্রকাশ। বিষয়টি এমন যেন, কথিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ মাফিক সেই আইনগুলো অনুমোদিত বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। সে সময়ের এই বৈশিষ্ট্যটিই তাকে অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে আলাদা করে ফেলে।

    ফরাসি বিপ্লবের সময়েও ‘সাধারণ ইচ্ছার’ ধারণাটি রাজনীতিতে নতুন ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারপরেও ভবিষ্যতের জন্য এর প্রভাব নির্ণয় করা মোটেই কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। ষাট বছর পূর্বের ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ঠিক এই বিতর্কগুলোই সামনে এসেছিল। রাজতন্ত্রকে যদি বিদায় দেওয়া হয়, তবে কোন ধরণের সমাজ এর জায়গা দখল করবে? ঠিক কোন উপাদানগুলো নিয়ে ‘সাধারণ ইচ্ছা’ গঠিত হয়? এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কে বা কারা ‘সাধারণ ইচ্ছা’র আইন প্রয়োগ করবে?

    পুৎনি বিতর্কের সময় রাজা দ্বিতীয় চার্লসকে সিংহাসনচ্যুত করতে লড়াই করা শক্তিগুলোর মধ্যে ঠিক এই বিষয়গুলো নিয়েই তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা অলিভার ক্রমওয়েল এবং অন্যান্যরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, রাজাদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটানো উচিত। কিন্তু তারা একইসাথে এটিও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, সমাজ পরিচালনার ভার কোনো একজন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। একজন রাজার ক্ষমতা তার জন্মগত অধিকার বলে মনে করা হতো। কিন্তু রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় তারা একটি নতুন কাঠামোগত উপাধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন; পাছে সমাজের শাসমক্ষমতা সাধারণ মানুষের হস্তগত হয়ে যায়। সম্পদকেই হতে হতো সেই নতুন কাঠামোগত ‍উপাধির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ক্রমওয়েলের সেনাপ্রধান (হেনরি আইরিটন – অনুবাদক) যেমনটা লিখেছেন:

    আমার মতে, সাম্রাজ্যের স্থায়ী কোনো স্বার্থ জড়িত নেই এমন বিষয়গুলোতে কোনো ব্যক্তির সাম্রাজ্যের কোনো স্বার্থ ও সুবিধাদির ব্যাপারে মীমাংসা করার কোনো অধিকার নেই। ১

    তবে রাজার বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্যান্য দলগুলো এই চিন্তাকে সমর্থন করে নি। গৃহযুদ্ধের ফলে অনেকগুলো দল-উপদলের সৃষ্টি হয়। লেভেলারদের মতো কিছু দল সে সময়ের বিদ্যমান সামাজিক শর্তসমূহ সম্পর্কে সচেতন ছিল। ডিগারদের মতো অন্য কিছু দল পতিত জমিগুলো দখল করে নেয় এবং সেগুলোতে গাছ রোপন করার পর সেই গাছগুলোর জন্য এবং সেখানে তাদের নিয়োগকৃত শ্রমশক্তির জন্য সেগুলোকে নিজেদের বলে দাবি করে। রাজা দ্বিতীয় চার্লসের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংগ্রাম এই দলাদলিকে ভেতর থেকে উসকিয়ে দেয়। সে দলগুলো ছিল কর্তৃত্ববাদবিরোধী এবং তারা বেশ কিছু বিষয়ে ক্রমওয়েল এবং তার অনুগামীদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করত। প্রখ্যাত লেভেলার থমাস রেইনসবোরঘ আইরিটনের বক্তব্য খন্ডন করেন এভাবে:

    আমার মতে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে দরিদ্রতম ব্যক্তিরটিরও সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তির মতো যাপনযোগ্য একটি জীবন রয়েছে। এবং সে কারণে কোনো একটি সরকারের অধীনে বসবাস করতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তির সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো নিজেকেই সে সরকারের অধীনে পেশ করা। ২

    কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই নিজস্ব মতামত দেওয়ার অধিকার থাকবে, এমন একটি ধারণার কিছু বিপজ্জনক প্রভাব ছিল। এর ফলে ‘সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গ’ এবং ধনীদের স্বার্থ সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। আইরিটন আবারো বলেন:

    কোনো একজন ব্যক্তির নিজস্ব সরকার নিজেই নির্ধারণ করার যে প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন, সে অধিকার বলেই তার চোখের সামনে দৃশ্যমান যে-কোনো দ্রব্যসামগ্রীর উপর তার অধিকার বর্তায়। ৩

    কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ছিল ‘দ্রব্যসামগ্রী’। গৃহযুদ্ধকালীন ইংরেজ সমাজ ছিল বর্তমান সমাজের তুলনায় ‍অনেক বেশি দরিদ্র। তবে সে সময়ের জনসংখ্যার অনুপাতে সেখানে তারপরেও প্রচুর পরিমাণে সম্পদ মজুত ছিল। সম্পদগুলো সমানভাবে বন্টিত হয় নি। কে কোন সম্পদের মালিকানা ভোগ করছে সে বিষয়ে বিরাট অসমতা বিরাজ করছিল। উইন্সট্যানলির মতো ডিগারদের জন্য এটিই ছিল বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি লিখেন:

    … এবং গরীব মানুষেরা এই দাসত্ববন্ধনের ব্যাপারটিতেই অভিযোগ করে থাকে। তাদের ধনী ভ্রাতৃবৃন্দেরা সে সব জমি নিয়ে তাদেরকে দরিদ্র করে রেখেছে যেখানে সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত রয়েছে। ৪

    সুতরাং, ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধে রাজার শাসন বাতিল হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই অপর একটি অধিকতর একগুঁয়ে সমস্যার উৎপত্তি ঘটে। পুরোপুরি সমানাধিকার-কে স্বীকার করে নেওয়া হলে কি বিত্তবানদের সুবিধাভোগের অবসান ঘটবে না? যাইহোক, হাজার বছর আগে অ্যারিষ্টটল একটি জাজ্বল্যমান সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, “বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ।” যে-কোনো সরাসরি গণনা কিংবা গণভোটে অসংখ্য দরিদ্রের অগ্রাধিকারের সামনে কতিপয় বিত্তবানের স্বার্থ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে। ঠিক এভাবেই জন্ম নেয় ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’।

    এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে বিত্তবানেরা স্বাভাবিকভাবেই পেশিশক্তির ব্যবহার করেছিল। ডিগার এবং লেভেলারদের মতো গণতন্ত্রবাদীরা এই নিয়তি বরণ করেছিল যখন তাদেরকে সামরিক কায়দায় বিক্ষিপ্ত করে ফেলা হয়েছিল। ক্রমওয়েল এবং আইরিটনের মতো ‘বিত্তায়িত’ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল। তারা একটি নতুন আইনসভার মাধ্যমে শাসনকাজ পরিচালনা করেছিল এবং বিপুল পরিমাণে ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিল। একই সময়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল দরিদ্ররা। ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডে ভ্রমণকালে একজন পর্যবেক্ষক লিখেছেন:

    এই দ্বীপটি শাসিত হয় এমন সকল ব্যক্তির প্রভাবের ছায়ায়, যারা বাস করে প্রাচুর্যের মধ্যে। তাদের ভাড়াটিয়া এবং পরিচারকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিশোধ করা ভাড়ার উপর তারা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করে। প্রত্যেকেই নিজেদের ভূ-সম্পদের সীমানার মধ্যে রাজপুত্রের মতো আচরণ করে। তারা সকলেই সেখানে পুরোপুরি সার্বভৌম। তাদের সেবায় নিয়োজিত পরিচারক এবং শ্রমিকেরা ছিল ক্রীতদাসের সমজাতীয়। তাদের ভাড়াটিয়ারা মূলত স্বাধীন হলেও তারা প্রজা শ্রেণির মধ্যে পড়ে। ৫

    ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মতো ফরাসি বিপ্লবও স্বল্প মেয়াদে সামাজিক গঠন প্রক্রিয়ার উপর সীমিত আকারের প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফরাসি রাজতন্ত্র মারাত্মকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল উঠতি বুর্জোয়া শ্রেণি। বণিক এবং ব্যাংকারেরা ছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তারা বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় বেশকিছু ধারণা এবং বুদ্ধিবৃত্তির যোগান দিয়েছিল। বহুদিন ধরে তারা দুর্নীতিবাজ রাজার চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য করের বোঝা বহন করে যাচ্ছিল। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল হিসেবে তাদের হাতে ক্ষমতার লাগাম চলে আসে। তারা আইনকে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থানুযায়ী পরিবর্তিত করে ফেলে।

    আর্টওয়ার্ক: স্টর্মিং দ্য বাস্তিল
    শিল্পী: জ্যা পিয়েরে হোউয়েল
    সূত্র: উইকিআর্ট

    তবে ফরাসি বিপ্লব চূড়ান্তভাবে অন্যান্য বিপ্লব হতে আলাদাও ছিল। একটি দিক দিয়ে এর সামগ্রিক কিছু ফলাফল রয়েছে। প্রথমত, ‘এটিই হলো একমাত্র বিপ্লব যার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে একটি করে সামাজিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল।’ ৬ জনগণই ছিল এই বিপ্লবের সফলতার প্রাথমিক চালিকাশক্তি। ক্ষমতার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপস্থিত থেকে তারা একে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এটি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিপীড়িতদেরকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছিল। তবে এই বিপ্লব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দিয়েছিল। সেটি হলো, যখন উপরমহল থেকে সংস্কারকার্য ব্যর্থ হয়, তখন নিচে থেকে বিপ্লব উপকারী বলে বিবেচিত হতে পারে। অংশত এই বিপ্লবের ফল হিসেবে পুরো ইউরোপ জুড়ে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

    ফরাসি বিপ্লব নির্দিষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় আরেকটি কারণে। এটি সংঘটিত হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। সার্বিকভাবে সমাজে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আঠারো শতকের ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে আনুমানিকভাবে সম্পদের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। যন্ত্রপাতি এবং শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে সম্পদের বৃদ্ধি খুব দ্রুতগতিতে ত্বরান্বিত হয়।

    ইংল্যান্ডের উপযুক্ত পরিবেশে শিল্পবিপ্লব সূচিত হয়ে ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলক দ্রুততার সাথে তা ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ‘ইউরোপের অ-ইংরেজভাষী অঞ্চলগুলোতে প্রকৃতঅর্থে শিল্প-কারখানার রূপান্তরের পরিমাণ ছিল অল্প। স্পেন, পর্তুগাল, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং পুরো বলকান ‍উপদ্বীপজুড়ে একশ মাইলের কিছু বেশি রেললাইন দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছিল…।৭ কিন্তু ‘তারপরেও প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।’৮

    এর অর্থ দাঁড়ায় ‘বিত্তবান এবং সুবিধাভোগীদের’ সম্পদ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। বৃদ্ধির পরিমাণ কেমন ছিল তা প্রায়ই সঠিকভাবে বোঝা যায় না। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম সেই সময়ের ব্রিটেনে রেলপথ নির্মাণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমাদের সে সংক্রান্ত একটি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। দুই দশকের ব্যবধানে কয়েক মাইল হতে (১৮২০ সালে) ৪,৫০০ মাইল (১৮৪০ সালে) এবং পরবর্তী সময়ে ২৩,৫৫০ মাইল (১৮৫০ সালে) রেলপথ নির্মিত হয়। তিনি এই বিশালাকার উদ্যোগের পেছনে লগ্নি করা অর্থের উৎসের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ’‘ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব চলাকালীন প্রথম কয়েকটি প্রজন্ম সম্পর্কে সবচেয়ে মৌলিক সত্যটি হলো তারা খুব দ্রুততার সাথে এতো বিপুল পরিমাণে অর্থ উপার্জন করেছিল যে সেগুলো ব্যয় এবং লগ্নি করার ক্ষেত্রে তা সম্ভাব্য সবধরণের অনুমানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।৯  তারপর যখন ১৮৩৫-৩৭ সালে এবং ১৮৪৪-৪৭ সালে দুই দফায় কথিত ‘উন্মক্ত রেলশিল্প’ ইংল্যান্ডে আঘাত হানে, তখন ‘কল্পনাবিলাসী উন্মাদেরা’ রেলশিল্পের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগে মনোনিবেশ করে ।

    উক্ত বাঞ্চনীয় পরিস্থিতি অসংখ্য শ্রমিক জনতার অবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। তাদের কাজ ছিল মূলত এই ধরণের ‍উদ্যোগের পেছনে শ্রম ব্যয় করা। তাদের জন্য ‘অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নতুন রূপান্তর দুর্ভোগ এবং অসন্তোষের সৃষ্টি করে।’১০ বিত্তহীনেরা তাদের অবস্থার কারণে প্রলেতারিয়েত হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রলেতারিয়েতরা তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে নি। ‘শ্রমিকদেরকে কারখানার উপযোগী পন্থায় কাজ করা শিখতে হয়েছিল। তাদেরকে অর্থনৈতিক প্ররোচনার প্রতি সংবেদনশীল হতেও শিখতে হয়েছিল।১১  শুরুর কয়েকটি প্রজন্মের শ্রমিকদেরকে নতুন ব্যবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তারা এই ব্যবস্থা পছন্দও করে নি। শ্রমিকদের পক্ষ ‍থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রতিরোধের খবর পাওয়া যায়।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য রেভ্যুলিউশন অব ১৮৪৮
    সূত্র: প্রিজমা আর্কাইভ

    হবসবম উল্লেখ করেন, ‘এই পরিস্থিতির সমাধান খোঁজা হয় শ্রমিকদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালনের মধ্যে। সর্বোপরি এমন একটি চর্চা শুরু হয় যেখানে শ্রমিকদের এতোই স্বল্প পরিমাণে মজুরি দেওয়া হয় যে তাদের কোনোমতে টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম উপার্জন নিশ্চিত করতে ক্রমান্বয়ে পুরো সপ্তাহজুড়ে পরিশ্রম করতে হয়।’১২  তাতে করে কোনো একজন শ্রমিকের পুরো পরিবারকেই কাজ করতে হয়। ১৮৩৪-৩৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের তুলা কারখানাগুলোতে সবগুলো শ্রমিকের মধ্যে ‘চারভাগের একভাগ ছিল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, অর্ধেকই ছিল নারী, বালিকা এবং আঠারো বছরের নীচে থাকা বালকেরা’১৩ ১৮৪০ সালের পশ্চিম ইউরোপে‘শিল্পায়নের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সামাজিক সমস্যাসমূহ এবং বিপদজনক নগরায়নের দুঃস্বপ্নগুলো উপস্থিত ছিল ভয়াবহ মাত্রায়। সেগুলো মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।’ ১৪

    একটু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে সময়ের ইউরোপ ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের দ্বারা প্রকম্পিত হয়েছিল। ইতালি, ফ্রান্স এবং হাঙ্গেরিতে উদারনীতিবাদীরা নিজেদের দেশের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। ‘প্যারিস ও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের শ্রমিক’দের পক্ষ থেকে গুরুতর প্রকৃতির স্বাধীন দাবি-দাওয়া ‍উঠতে থাকে। ‘সামাজিক বিপ্লব’ এবং ‘লাল প্রজাতন্ত্র’ এর জন্য তীব্র দাবি ‍উঠতে থাকে। ‘তাদের এ জাতীয় দাবিগুলো সম্পত্তি এবং বাজারের নিয়মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে
    থাকে।’
    ১৫

    একটি উপযুক্ত সমাধান

    আদতে ১৮৫০ এর পর থেকেই সমাজে পুঞ্জিভূত হতে থাকে বিপুল সম্পদ। উত্থান ঘটে তুলনামূলক স্বাধীন ও বিকশিত  শ্রমিক শ্রেণির। এমন প্রেক্ষাপটেই ধনী ও ক্ষমতাবানদের জন্য ‘গণতন্ত্রের সমস্যা’ খুব জরুরি হিসেবে দেখা দেয়। সাধারণভাবে পুরো সমাজ জুড়েই সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং একইসাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিল নতুন কারখানা, খনি এবং জমির মালিকদের লোভ। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় থেকে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিরামহীন বিক্ষোভ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। প্রশ্নটি হলো, এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায়?

    ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তাদের সুবিধা এবং সম্পদ অব্যাহত রেখে সাধারণভাবে গণতন্ত্রের এক ধরনের আভাসকে স্বীকার করে নেওয়া। আইনসভা হলো গণতন্ত্রকে বানচাল করা এবং সত্যিকারের সংগ্রামগুলোকে একটি নিরাপদ অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রত্যেকবারেই এটি শ্রমিক আন্দোলনের গোরস্থান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    উক্ত বিষয়টি নিয়ে সে সময় থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগীদের’ কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়। একদিকে ওজোন সম্প্রদায়, যাদের মুখপাত্র থমাস বেবিংটন ম্যাকৌলি বিশ্বাস করতেন, ‘মানবসম্প্রদায়ের মধ্যে উঁচু ও মধ্যম সারির লোকেরা প্রাকৃতিকভাবেই পুরো মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।১৬ তিনি দরিদ্র ও বিত্তহীনদেরকে ভোটাধিকার প্রদানের বিষয়টি নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। ১৮৩০ এর দশকে চার্টিস্ট আন্দোলনের উত্থানের সাথে সাথে ব্রিটেনে এই বিতর্কটি ইতিমধ্যেই সামনে চলে আসে। এই আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব কোবেট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তার মতে, মানুষ ভোটাধিকার চেয়েছিল ‘যাতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়, যাতে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়। এবং তা কোনো বিমূর্ত খেয়ালের পরিতৃপ্তি সাধনের জন্য নয়।১৭  ম্যাকৌলি এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক ভোটাধিকারের ধারণাকে আক্রমণ করেছেন। তার মতে, এর ফলস্বরূপ ‘বিত্তবানেরা ‘লুন্ঠিত’ হতে পারে… তাতে করে সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং মানুষ বর্বরতার দিকে ফিরে যেতে পারে।’১৮

    অন্যেরা অবশ্য এতোটা অনুভূতিহীন ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক জে. এস. মিল ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। সময় যে পাল্টে গেছে, তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। তিনি লিখেন, ‘অশিক্ষিতেরা শিক্ষিতদের উপর আস্থা রাখে।১৯ এমন একটি সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। তার পরিবর্তে এমন একটি সময় এসেছে যখন ‘জনগণ দিশাহীন অবস্থায় রয়েছে এবং সমাজ সবরকমের ভূল-ত্রুটি এবং সমূহ বিপদের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।২০ আলোচ্য বিপদসমূহের মধ্যে একটি ছিল সামাজিক বিপ্লব। মিল ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে কিছু একটা করার দরকার। তবে তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে ঘড়ির কাঁটা পেছনের দিকে ঘুরে যাবে না।

    জেমস স্টুয়ার্ট মিল

    তিনি নিজে কোনো বিভ্রমের মধ্যেও ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের অজ্ঞতা বিশেষত তাদের স্বার্থপরতা এবং বর্বরতার ব্যাপারে আতঙ্কিত।২১ তার চোখে নিম্নবর্গ ছিল ‘নির্বোধ অজ্ঞ জনসমষ্টি’, ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ অথবা ‘অসভ্যের দল’।২২ বিপরীতে তিনি নিজেকে এবং তার অনুসারীদেরকে ভাবতেন ‘বুদ্ধিমান শ্রেণি যারা শিক্ষার চর্চা করবে এবং তার সুফল ছড়িয়ে দেবে পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে।২৩ এই ধরণের সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। তিনি বলেন: ‘তুলনামূলক ‍উচ্চশিক্ষিত একজন বা কতিপয় ব্যক্তির প্রভাব এবং পরামর্শ সভা ব্যতীত গড়পড়তাদের মধ্যে থেকে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হতে পারে না।২৪  বিকল্প হিসেবে তিনি ‘গড়পড়তা জনতার পাল’ সম্পর্কে যে অর্থপূর্ণ বয়ান দেন তা বোধগম্য ছিল না। তার মতে: ‘দেশের সংবিধান যদি অজ্ঞতাকে সচেতনতার মতো রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তা উপকারী নয় বরং ক্ষতিকর।২৫ মিলের মতে এমনতর সমস্যার একটি ‍উপযুক্ত সমাধান হলো: ‘বুদ্ধিজীবী শ্রেণিগুলোর উচিত সরকারকে পরিচালিত করা ‍এবং সরকারের উচিত বেকুব শ্রেণিগুলোকে পরিচালিত করা।২৬

    সময়ের সাথে সাথে সবখানেই যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কার্যপ্রণালিতে পরিণত হবে, ১৮৫০ এর দশকে তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকরী ছিল না। ‘উঁচু এবং মধ্যম সারির লোকেরা’ প্রাকৃতিকভাবেই সংখ্যার লড়াইয়ে (“বিত্তবানেরা সংখ্যালঘু এবং দরিদ্ররা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ”) ‘বর্বর জনতার’ তুলনায় অসুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। উক্ত পরিস্থিতি আলোচ্য সমস্যার একটি অংশ ছিল। সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি ছিল ভোটাধিকার এবং এ সংক্রান্ত আরো বেশ কিছু বিষয়ে ধনী এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যাশার ভিন্নতা।

    এ সংক্রান্ত আলাপে মিল আরো একবার পরিষ্কার ছিলেন। তার মতে, গণতন্ত্র এমন নয় যে ‘জনগণ নিজেরাই নিজেদের শাসন করে। বরং তারা একটি ভাল সরকারের নিশ্চয়তা পায়।’ তার চোখে সেই ‘ভাল সরকার’ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। আইনসভা ছিল সেই ‘ভাল সরকার’ এর নমুনা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইউরোপের অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে হবসবম লিপিবদ্ধ করেছেন:

    রাশিয়া ব্যতীত গুণগতভাবে ইউরোপের সবগুলো দেশেই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহ্য কায়েম হয়ে গিয়েছিল। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ঐতিহ্যগতভাবে সম্ভ্রান্ত শ্রেণির ক্ষমতা পুরোপুরি অবিতর্কিত না হলেও নিরাপদেই ছিল। কারণ নির্বাহী বিভাগের উপর আইনসভার ক্ষমতা ছিল নামেমাত্র। তাতে করে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে আইনসভার দূর্বল প্রভাব বিদ্যমান ছিল।’২৭ 

    আইনসভা সম্পর্কে এসব খোলাখুলি সত্য ঘটনা এবং তার অসঙ্গতি সে সময়ের মানুষজনের নিকট পরিষ্কার ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনসভায় যারা যোগ দিতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন ইউরোপজুড়ে ক্ষমতাসীন সম্ভ্রান্ত শ্রেণির নিয়োগপ্রাপ্ত লোকজন। তারা ছিলেন বিত্তবান শ্রেণিগুলোর বিভিন্ন কিসিমের ওয়ারিশ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং আরো বিভিন্ন পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন। এমনতর গণতন্ত্রের চিন্তা অন্তত ‘বেকুব শ্রেণির’ মানুষদের মাথায় ছিল না। বিপরীতে ‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে উপরোক্ত পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা-ই বুঝতে হবে, এমন চিন্তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ঠিক সে কারণেই ইতিহাসের সে নির্দিষ্ট সময়জুড়ে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির এমনতর বিপজ্জনক সংজ্ঞায়ন চালু ছিল।

    মিল এবং অন্যান্যরা ধনী ও গরীবদের মাঝে গণতন্ত্র সম্পর্কে ‘বোঝাপড়ার’ যে পার্থক্য রয়েছে, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। এটি ছিল একটি প্রধান সমস্যা। এক অর্থে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ বা ‘শাসক এবং শাসিতের বোঝাপড়ার সাধারণ ক্ষেত্র’ বলে কিছু ছিল না যেখানে দুই পক্ষই তাদের নিজেদের অবস্থান এবং নিয়তি সম্পর্কে অবগত থাকবে। এই ধরণের ঐতিহ্য চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ভোটাভুটির প্রক্রিয়াটি ঠেকিয়ে রাখা বা তাকে অকার্যকর করে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।

    ‘গুণসম্পন্ন ভোটের’ মাধ্যমে উক্ত উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছিল। যদিও তার পূর্বেই ‘ভরযুক্ত ভোটের’ ধারণা দিয়ে তারা হাত মশকো করেছিল। মিলের ‍উদ্ভাবিত এই ধারণাটি ছিল অভিনব।

    যদি কোনো সাধারণ অদক্ষ শ্রমিক একটি ভোট দিতে পায়, তাহলে একজন দক্ষ শ্রমিকের দুইটি ভোট থাকা উচিত। স্থানীয় কোনো মোড়ল-মাতবরের থাকা উচিত তিনটি ভোট। কারণ হিসেবে বলা যায়, তার পেশা তার কাছে থেকে সাধারণ সংস্কৃতির চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। এছাড়াও তার কিছু নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ থাকার প্রয়োজন হয়। একজন কৃষক, নির্মাণকর্মী অথবা ব্যবসায়ীর তিনটি বা চারটি করে ভোট থাকা উচিত। নিয়মতান্ত্রিক মানসিক সংস্কৃতির প্রয়োজন হয় এমন যে-কোনো পেশার ব্যক্তির জন্য পাঁচটি বা ছয়টি করে ভোট বরাদ্দ থাকা উচিত। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের জন্যেও কমপক্ষে একই পরিমাণে ভোট বরাদ্দ থাকতে
    হবে।
    ২৮

    উক্ত ‍উপায়ে বিত্তবানদের সংখ্যাবাচক অসুবিধার নিরসন করা যায়; অন্তত যতদিন পর্যন্ত না দরিদ্রেরা তাদের নিয়তিকে স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াল অব স্ট্রাফোর্ড
    শিল্পী: থমাস আলফ্রেড উলনথ
    সূত্র: ইউকে পার্লামেন্ট

    কিন্তু এমনটা হওয়ার ছিল না। ‘গুণসম্পন্ন ভোট’ ছিল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। শিক্ষাগত যোগ্যতা, সম্পদের পরিমাণ, ধর্ম, জাতি, চামড়ার রঙ, লিঙ্গ, বয়স ইত্যাদি মনগড়া পার্থক্যের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকারকে সংকুচিত করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া চলেছিল যতদিন পর্যন্ত না জনগণ যথাযথভাবে ‘পরিপক্বতা’ অর্জন করেছিল। ১৮৬৪ সালে ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% ভোটাধিকার ভোগ করত। সে সময়ে ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকের হার ৪% থেকে ৮% এ নিয়ে যাওয়া যায় কিনা এমন একটি বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোন ‘পরিপক্কতা’ বলতে কী বোঝানো হয় তার বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। গ্ল্যাডস্টোনের মতে, ভোটারকে হতে হবে এমন একজন ব্যক্তি যার থাকবে ‘আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, সংযম, শৃঙ্খলার প্রতি সম্মান, দুর্ভোগের মধ্যে সহনশীলতা, আইনের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং ঊর্দ্ধতনের প্রতি সমীহ।’২৯

    ১৮৫০ থেকে ১৯৫০ সালের এক শতাব্দীর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে মূলধারার আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। পূর্বে এইসব দেশগুলোতে মোট জনসংখ্যার ১-৫% পূর্ণবয়ষ্ক ব্যক্তির ভোটে নির্বাচিত সংসদ বা আইনসভা থেকে পরবর্তী সময়ে প্রায় ১০০% পূর্ণবয়ষ্ক জনগণের অংশগ্রহণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং চলমান তীব্র অসাম্যকে আমলে নিয়েও পরিবর্তনের এই ধীর গতি মূলত শাসকশ্রেণি (‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণি) এবং শাসিতশ্রেণির (শ্রমিকশ্রেণি) মধ্যে ‘শাসনের ঐতিহ্য’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সার্বিক সমস্যাগুলোকেই তুলে ধরে। দমন-পীড়নের গতানুগতিক তরিকা বাদ দিয়েও এবং ধীরগতিসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে সফল এই প্রক্রিয়াটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নির্ভর করেছিল:

    ১) একটি অনুবর্তী সংসদীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ‍উত্থান।
    ২) শুরু থেকেই ‘ধনী ও সুবিধাভোগী’ শ্রেণির সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থের সেবক হিসেবে গণমাধ্যমের বিকাশ ও প্রভাব।

    (চলবে)                     

    তথ্যপঞ্জি   

    ১ S. Bowles and H. Gintis, Democracy and Capitalism (Routledge Keegan Paul, 1986), p28.

    ২ ibid., p28.

    ৩ibid., p28.

    ৪ A. Arblaster, The Rise And Decline Of Western Liberalism (Basil Blackwell, 1984), p160.

    ৫ ibid., p160.

    ৬ E. Hobsbawm, The Age Of Revolution (Mentor, 1962), p54.

    ৭ ibid., p168.

    ৮ ibid., p42.

    ৯ ibid., p45.

    ১০ ibid., p38.

    ১১ ibid., p49.

    ১২ ibid., p49.

    ১৩ ibid., p49.

    ১৪ ibid., p173

    ১৫ A. Arblaster, op. cit., p267.

    ১৬ ibid., p265.

    ১৭ ibid., p264.

    ১৮ ibid., p265.

    ১৯ ibid., p278.

    ২০ ibid., p278.

    ২১ ibid., p279.

    ২২ ibid., p280.

    ২৩ ibid., p279.

    ২৪ ibid., p279.

    ২৫ ibid., p280.

    ২৬ ibid., p278.

    ২৭ E. Hobsbawm, The Age of Capital (Mentor, 1975), p102.

    ২৮ Norman Wintrop ed., Liberal Democratic Theory and Its Critics, (Croom Helm, 1983) p33.

    ২৯ A. Arblaster, op. cit., p273.

     

  • সম্পাদক পরিষদ।। কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছি

    সম্পাদক পরিষদ।। কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছি

    চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানবীয় সামগ্রিক  স্বাধীনতার পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী শাসন এই স্বাধীনতা হরণের মাধ্যমে শুধু সমাজকে নিশ্চলই করে না, তার বিমানবিকীকরণ ঘটায়। বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে প্রবাহমান শাসনপ্রণালীর গঠন কাঠামো ও চর্চা তাকে পরিণত করেছে সর্বস্বৈরতন্ত্রে। এই সর্বস্বৈরতন্ত্রের সাম্প্রতিক সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অরাজ এই আইনকে সর্বস্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রবাদের অন্যতম নিয়ন্ত্রণমূলক শুঁড় মনে করে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দেশের স্বনামধন্য জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকগণের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন সম্পাদক পরিষদ  ডিজিটাল

    নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পেশ করে। এই আইনটি শুধু চিন্তা ও মতপ্রকাশই নয়, একই সঙ্গে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেও হরণ করে। সম্পাদক পরিষদের  পর্যালোচনাটি ঐতিহাসিক এবং আজও সমভাবেই প্রাসঙ্গিক। — সম্পাদক

    আর্টওয়ার্ক: দ্য প্রেস ফ্রিডম ডে
    শিল্পী: ফেবিয়ান সটোলনগো
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    জাতীয় সংসদে সদ্য পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিচের মৌলিক ত্রুটিগুলো রয়েছে:

    ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

    ২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহ তল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার ক্ষেত্রে সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেওয়া ক্ষমতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

    ৩. এই আইনে অস্পষ্টতা আছে এবং এতে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে এবং সহজেই সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    ৫. এই আইন সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাড়াও কম্পিউটার ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ইত্যাদি ব্যবহারকারী সব ব্যক্তির মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করবে।

    ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ, আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে। বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকসহ অন্য যাঁরা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তাঁরা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে যে সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি, কিন্তু আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে যে এই আইনেও সাংবাদিকেরা আবার একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হবেন। আইনটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এ আইনের উদ্দেশ্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার’ করা। তাই এ আইন নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তার সংজ্ঞায়িত পরিধি অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার পরিধির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রকৃতির পরিপন্থী এবং তা অনুশীলনের প্রতিকূল, যে সাংবাদিকতা জনগণের জানার অধিকার সুরক্ষা করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি জনসমক্ষে উন্মোচন করে।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কাজ ডিজিটাল প্রযুক্তির জগৎ নিয়ে, যে জগৎ অবিরাম বিকশিত হয়ে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি জীবনের সর্বস্তরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন পর্যন্ত সর্বত্রই ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমও এর বাইরে নেই।

    অন্য ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজন ‘নিয়ন্ত্রণ’, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন ‘স্বাধীনতা’। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কেন্দ্রীয় বিষয় কেবলই ‘নিয়ন্ত্রণ’, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা এতে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি, এর ফলে এ আইন সংবাদমাধ্যমের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটা ভীতিকর দিক হলো, এতে পুলিশকে এমন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার বলে একজন সাংবাদিক ভবিষ্যতে তথাকথিত কোনো অপরাধ করতে পারেন কেবল এই সন্দেহে পুলিশ তাঁকে প্রেপ্তার করতে পারবে। পুলিশকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এগুলো জামিন অযোগ্য। এর ফলে সাংবাদিকতা বাস্তবত পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে।

    উদ্বেগের আরও একটি বিষয় হলো, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি–সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, ৫টি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। ন্যূনতম শাস্তির মেয়াদ করা হয়েছে ১ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ ৪ থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন অসম্ভব না হলেও হয়ে উঠবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

    আইনটি তার উদ্দেশ্যের সীমানা অনেক দূর পর্যন্ত কেবল লঙ্ঘনই করেনি, এটি অস্পষ্টতায়ও পরিপূর্ণ। অস্পষ্টতার কারণে এ আইন অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশ–বিদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব আইনের শব্দচয়ন সুস্পষ্ট, যেখানে অপরাধগুলো সুনির্দিষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে শাস্তির মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসবের মাধ্যমে ‘আইনের শাসন’ ভালোভাবে অর্জিত হয়। আইনের ভাষাগত অস্পষ্টতা থেকে অপরাধ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা এবং আইনের অপব্যবহারের সুযোগ ঘটে থাকে। যখন আইনের অপব্যবহার ঘটে, তখন স্বাধীনতা খর্বিত হয়।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেক ত্রুটি হলো ‘অপরাধীদের’ শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে একই সময়ে পাস করা সড়ক নিরাপত্তা আইনের কথা বলা যায়। এ আইনে দুর্ঘটনায় মানুষ মেরে ফেলার সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ বছরের কারাদণ্ড। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিধান করা হয়েছে, ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (১৯২৩) লঙ্ঘনের জন্য সাংবাদিকদের যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কোনো সাংবাদিক তাঁর মোবাইল ফোনে অপ্রকাশিত কোনো সরকারি নথির ছবি তুললে অপরাধী বলে গণ্য হবেন, অথচ এটি আজকাল খুবই সাধারণ একটি চর্চা।

    বিশদ ব্যাখ্যা

    সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মুক্ত সংবাদমাধ্যমের পরিপন্থী, বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে বিরোধাত্মক। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যেসব ধারাকে আমরা সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করছি, নিচে তা হুবহু তুলে ধরলাম। একই সঙ্গে সেসব নিয়ে আমাদের অবস্থানের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।

    আর্টওয়ার্ক: স্টপ পোলিস
    গ্রাফিতি
    সূত্র: কোপওয়াচ

    ধারা ৮

    ৮। কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা।—

    (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত, ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতঃপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত, অনুরোধ করিতে পারিবেন।

    (২) যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট প্রতীয়মান হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে, বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহা হইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে, বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন।

    (৩) উপ-ধারা (১) ও (২)–এর অধীন কোনো অনুরোধ প্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে, তাৎক্ষণিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমতো, ব্লক করিবে।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এখানে দুটি উদ্বেগের বিষয় রয়েছে। একটি মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা, অন্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ক্ষমতা। প্রকাশের বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা মুদ্রিত বা অনলাইন যেকোনো প্রকাশনার অন্তরাত্মাকে আঘাত করবে। কোনো সংবাদমাধ্যমের যেকোনো প্রতিবেদন ব্লক করা যাবে, যেকোনো আলোকচিত্র জব্দ করা যাবে—এভাবে সংবাদমাধ্যমটির স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নিত হবে।

    প্রকাশিত বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যুক্তি আইনটিতে এত অস্পষ্ট যে তা নানা ব্যক্তি নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এতে আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোনো প্রকল্পে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার ফলে যদি সেটার অর্থায়নকারী বা কোনো বিনিয়োগকারী অর্থায়ন বন্ধ করে দেন, তাহলে এ আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন সৃষ্টি করা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন এবং তা ওই খবর ব্লক বা অপসারণ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

    ধারা ২১

    ২১। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং ‘অপরাধগুলো’কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এই আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর শাস্তি হিসেবে রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং/অথবা ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান।

    আমরা আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংক্ষরণ করতে চাই। তবে আইন প্রণয়নের সময় আমাদের তা খুব স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এখন যে অবস্থায় আছে, তা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই ভোগান্তিমূলক হবে না, ইতিহাসবিদ, গবেষক, এমনকি কথাসাহিত্যিকদের মতো সৃজনশীল লেখকদেরও দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এমনকি ভুল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য শাস্তির ভয়ে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি লেখালেখিও করতে চাইবেন না।

    ধারা ২৫

    ২৫। আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি।—(১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে।—

    (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিযোগে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা

    (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন,

    তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এই ধারা সংবাদমাধ্যমে সব ধরনের অনুসন্ধানী রিপোর্টিংকে সরাসরি বিরূপভাবে প্রভাবিত করবে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম–সংক্রান্ত ঘটনা নিয়েই এ ধরনের প্রতিবেদন করা হয়ে থাকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সাংবাদিক ও সংবাদপ্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখাতে এই আইন ব্যবহার করতে পারেন। তাঁরা এই অজুহাত দেখিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন যে ওই প্রতিবেদনে তাঁদের আক্রমণ করা বা হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের সব প্রতিবেদনই উল্লিখিত এক বা একাধিক বিধানের আওতায় পড়ে বলে মন্তব্য করা হতে পারে এবং সংবাদমাধ্যমকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উন্মোচন করে, এমন যেকোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘বিরক্তিকর’, ‘বিব্রতকর’ বা ‘অপমানজনক’ হতে পারে। এই বিধান কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ অসম্ভব করে তুলবে।

    এটি সংবাদপত্রকে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পর্যবসিত করবে। এমনকি সাংবাদিকতার সাধারণ অনুসন্ধানও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

    দ্বিতীয় ধারায় ‘বিভ্রান্তি ছড়ানো’র কথা বলা হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা না হলে এই ধারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হবে। একজনের কাছে যা বিভ্রান্তিমূলক, আরেকজনের কাছে তা না–ও হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই নতুন একটি পথ তৈরি করবে।

    রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি ও সুনাম’ ক্ষুণ্ন করা বলতে কী বোঝায়? সম্প্রতি আমরা ব্যাংক খাতে বিভিন্ন বিবেকহীন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দুর্নীতির খবর পরিবেশন করেছি। সেসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জনগণকে জানিয়েছি যে ব্যাংক খাত গুরুতর সংকটে পড়েছে। এতে কি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি নিয়ে আমরা সংবাদ পরিবেশন করেছি। আমরা ‘হেফাজতে মৃত্যু’, ‘গুম’ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছি। কেউ যদি ব্যাখ্যা করেন যে এসব প্রতিবেদন রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন করেছে, তাহলে এই আইন এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রগুলোকে শাস্তি দেওয়ার বৈধতা দেয়। কারণ, প্রায় সব সংবাদপত্রেরই নিজস্ব ওয়েবসাইট ও অনলাইন পোর্টাল রয়েছে।

    ধারা ২৮

    ২৮। ওয়েবসাইট বা কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যাহা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ একটি অস্পষ্ট পরিভাষা। একজন সাংবাদিক কীভাবে জানবেন কখন ও কীভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ আহত হয়েছে? এই পরিভাষা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কোনো সাংবাদিকই এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে স্বস্তিবোধ করবেন না। এটি সমাজের বড় একটি অংশে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিরীক্ষণ বাধাগ্রস্ত করবে। বহির্বিশ্বে ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হতো না, যদি ওই সব দেশে ধর্মীয় অনুভূতিতে ‘আঘাত’ করে, এমন সংবাদ প্রকাশ রুখতে আইন থাকত। বেআইনি ফতোয়া ও সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করাও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এই ধারা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের হয়রানি করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

    ধারা ২৯

    ২৯। মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার, ইত্যাদি।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860)-এর section 499-এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    মানহানির অভিযোগ বিচার করার জন্য ইতিমধ্যেই একটি আইন থাকায় ডিজিটাল মাধ্যমে মানহানি নিয়ে আলাদা কোনো আইন নিষ্প্রয়োজন। উপরন্তু একই অপরাধে পত্রিকার চেয়ে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে অতিরিক্ত শাস্তির যুক্তি থাকতে পারে না।

    ধারা ৩১

    ৩১। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    দলিত বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো শোষণ সম্পর্কে পরিবেশিত একটি সংবাদ–প্রতিবেদনের এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে যে সেটি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের দুঃখকষ্ট তুলে ধরে লেখা প্রতিবেদন এভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে যে তাতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একইভাবে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষ, আসন্ন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ নিয়ে পরিবেশিত সংবাদ ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকারী’ প্রতিবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এই আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এমন খবর পরিবেশিত হতে পারে যে কোনো বিক্ষোভের সময় এক ব্যক্তি মারা গেছেন, পরে জানা যেতে পারে যে খবরটি সত্য নয়। তাহলে কি সংবাদমাধ্যম ‘গুজব ছড়ানো’র অপরাধ করবে? সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এ রকম ভুল হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ভুলের সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, এমনকি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যায় হেরফের হয়। সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সব সময়ই বেসরকারিভাবে সংগৃহীত তথ্যের অমিল থাকে। এ ধরনের ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। কখনো কখনো আমরা কিছু পূর্বাভাসমূলক খবরও পরিবেশন করতে পারি, যা পরে ঠিক সেভাবেই না–ও ঘটতে পারে। এ ধরনের প্রতিবেদনও ‘গুজব ছড়ানো’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এভাবে দেখতে পাচ্ছি, এই ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য গুরুতর ঝুঁকির সৃষ্টি করবে।

    আর্টওয়ার্ক: কন্ট্রোল
    শিল্পী: লরা বারবোসা
    সূত্র: ফাইন আর্ট আমেরিকা

    ধারা ৩২

    ৩২। সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দণ্ড।—

    (১) যদি কোনো ব্যক্তি Official Secrets Act, 1923 (Act No. XIX of 1923)-এর আওতাভুক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক ২৫ (পঁচিশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    (২) যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা (১)–এ উল্লেখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে সব ধরনের জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল। আমরা মর্মাহত হয়ে সেটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টেনে আনতে দেখলাম। সরকার যা প্রকাশ করে না, তা-ই ‘সরকারি গোপন তথ্য’ বলে বিবেচিত হতে পারে। একটি উদাহরণ দিই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংক খাতের অনিয়ম সম্পর্কে কয়েক ডজন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। বলা হতে পারে, এ ধরনের সব প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। প্রকাশ করা হয়নি, এমন সব সরকারি প্রতিবেদনই অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় পড়ে, এমনকি পরিবেশদূষণ বা শিশুপুষ্টি নিয়ে সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদিও। এ ধরনের কোনো তথ্য ছাড়া কি অর্থপূর্ণ সাংবাদিকতা সম্ভব? আর যেখানে তথ্য অধিকার আইনের বলে জনগণের ‘জানার অধিকার’ রয়েছে—বিশেষত যখন এ ধরনের সব প্রতিবেদন তৈরি করা হয় জনগণের অর্থ ব্যয় করে—সেখানে এসব প্রতিবেদন সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করা কেন ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হবে?

    বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি দপ্তরের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন ছাড়া ফারমার্স বা বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বা ব্যাপক অনিয়ম নিয়ে কি আমরা কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতাম? আমাদের প্রতিবেদকের হরহামেশাই মোবাইল ফোনে এ ধরনের দলিলের ছবি তুলতে হয়। কাজেই তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে, তাই তো?

    এ আইনের প্রবক্তাদের কাছে আমাদের উদাহরণগুলো ‘হাস্যকর’ ঠেকতে পারে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বাস্তব নজির সাংবাদিকদের কোনো স্বস্তির কারণ জোগায়নি।

    ধারা ৪৩

    ৪৩। পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার।—

    (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন,—

    (ক) উক্ত স্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশ বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ;

    (খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ;

    (গ) উক্ত স্থানে উপস্থাপিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি;

    (ঘ) উক্ত স্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার।

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিধান এটি।

    এতে পুলিশকে যেকোনো জায়গায় প্রবেশ, যেকোনো কম্পিউটার ব্যবস্থায় তল্লাশি চালানো, যেকোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও সার্ভার জব্দ করা, যেকোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি এবং শুধু সন্দেহবশত যে কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

    প্রথমত, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের হুমকি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধার সৃষ্টি করবে। পুলিশ যখন স্রেফ সন্দেহবশত ও পরোয়ানা ছাড়াই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পাবে, তখন এই আইনের ছায়াতলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কবর রচিত হবে। আইনটির ২০টি শাস্তির বিধানের মধ্যে যখন ১৪টিই জামিন অযোগ্য, তখন গ্রেপ্তারের ঝুঁকি প্রত্যেক সাংবাদিকের মাথার ওপর ডেমোক্লেসের খড়্গের মতো সব সময় ঝুলতে থাকবে, মানসিক চাপ সৃষ্টি করে রাখবে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকতার সব পন্থা বাধাগ্রস্ত হবে। আমাদের সংবাদমাধ্যম নিছকই জনসংযোগ কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

    এমনকি সাংবাদিকদের ওপর এ আইনের প্রয়োগ না হলেও (আইন থাকলে প্রয়োগ হবেই না বা কেন?) ভীতির পরিবেশে তাঁরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা অনুভব করবেন। গ্রেপ্তার–আতঙ্ক তাঁদের ‘মানসিক পরিবেশের’ এক প্রাত্যহিক অংশ হয়ে উঠবে। প্রতিবেদন তৈরির কাজে তাঁরা নিয়মিত যেসব সংগত ঝুঁকি নিয়ে থাকেন, এই ভীতির কারণে সেসব ঝুঁকি নিতে তাঁরা আর সাহস পাবেন না। এই বিধানের ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে, তা খাটো করে দেখা ঠিক নয়। খুব সহজেই ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এ আইনের অপব্যবহার করবেন। ধনী ও ক্ষমতাসীনেরা গোপন রাখতে চান, এমন বিষয়ে যেকোনো সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে হুমকি দিতে, এমনকি গ্রেপ্তার করতে তাঁরা আইন প্রয়োগকারীদের প্ররোচিত বা ‘হাত করতে’ পারেন।

    এ আইনের আরও বিপজ্জনক দিক হলো, সব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন স্টেশনই এখন ডিজিটাল ব্যবস্থায় কাজ করে বলে কম্পিউটার, সার্ভারসহ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক জব্দ করার ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তাদের যেকোনো সংবাদপত্র, টিভি স্টেশন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের কাজ বন্ধ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করলে তার কার্যক্রম থেমে যেতে পারে। এভাবে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না করেই আইনের এই ধারায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে সংবাদপত্রের প্রকাশনা বা কোনো টিভি স্টেশনের কার্যক্রম রুদ্ধ করে দেওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

    ধারা ৫৩

    ৫৩। অপরাধের আমলযোগ্যতা ও জামিনযোগ্যতা।—এই আইনের—

    (ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪-এ উল্লেখিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং

    (খ) ধারা-১৮-এর উপধারা (১) এর দফা (খ) ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৮-এর উপধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;

    সম্পাদক পরিষদের মন্তব্য

    এই আইনের প্রায় ২০টি ধারার ১৪টির ক্ষেত্রেই অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন–অযোগ্য। পুলিশকে নিছক সন্দেহের কারণে এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়ায় এবং এতগুলো অপরাধের অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য করায় আইনটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি এক বাস্তব হুমকি।

    আর্টওয়ার্ক: ড্রিমিং অব ফ্রিডম
    শিল্পী: মোহাম্মদ সাবানেহ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    উপসংহার

    ১. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাগরিকদের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, যা যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে আমাদের সংবিধানে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে;

    ২. এ আইন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যেসব মহান আদর্শ ও মুক্তির জন্য আমাদের শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেসব লঙ্ঘন করে;

    ৩. গণতন্ত্রের মূলনীতি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও ১৯৭১ সালের পরবর্তী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে যেসব গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আমাদের জনগণ বারবার লড়াই করেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সেসবের পরিপন্থী;

    ৪. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নৈতিক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সব মূল্যবোধের পরিপন্থী।

    ৫. এ আইন তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

    ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কেন আমাদের সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী, তা আমরা ওপরে বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে বিশদভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করেছি।

    এসব কারণে সম্পাদক পরিষদ এই আইন প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে।

    এই আইন আমাদের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং ৩৯(২) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘যুক্তিসংগত বাধানিষেধ–সাপেক্ষে’ (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্‌ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার, এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা খর্ব করে।

    পরিশেষে আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু কথা উদ্ধৃত করতে চাই। ১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদে সংবিধান প্রণয়ন–সম্পর্কিত এক বিতর্কে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছিলেন:

    ‘আপনারা বলে থাকেন যে বাক্‌স্বাধীনতা মানেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

    ‘আপনি কি জানেন যে পূর্ববঙ্গে সম্পাদকদের ডেকে বলা হয়, আপনারা এটা ছাপাতে পারবেন না, আপনারা ওটা ছাপাতে পারবেন না। স্যার, তাঁরা সত্য কথা পর্যন্ত লিখে ছাপাতে পারেন না এবং আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি।…নির্দেশটা যায় সচিবালয় থেকে…। সরকারের তরফ থেকে একজন ইন্সপেক্টর গিয়ে নির্দেশনা দেন যে, আপনি একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে পারবেন না।…

    ‘এটা পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকবে, তাঁরা তাঁদের ইচ্ছামতো বক্তব্য লিপিবদ্ধ করতে পারবেন এবং জনমত গড়ে তুলতে পারবেন।’

  • নোম চমস্কি।। ৪০০ বছরের পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ

    নোম চমস্কি।। ৪০০ বছরের পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদ

    • তানভীর আকন্দ

    পুলিশ সদস্য কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আমেরিকায় বর্তমানে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে চমস্কির সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ভ্যালেন্টিনা নিকোলাই। গত ২রা জুন, ইতালিয়ান দৈনিক ‘ইল মেনিফেস্তো’তে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। ৩রা জুন পত্রিকাটির আন্তর্জাতিক সংস্করণে ইংরেজিতে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। বর্তমান অনুবাদটি সেই ইংরেজি সংস্করণ থেকেই করা হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারে চমস্কি যুক্তি দেখান যে এই বিক্ষোভ সাময়িক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয় বরং ৪০০ বছর ধরে চলতে থাকা আমেরিকান সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদেই এই
    বিক্ষোভ । – অনুবাদ

    নোম চমস্কি

    সাক্ষাতকার

    যুক্তরাষ্ট্র জ্বলছে। কালো ও সাদারা একযোগে রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করছে, থামবার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।  সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। একাধিক শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

    করোনা সংকট, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে ইতোমধ্যেই ক্ষুব্ধ হয়ে থাকা জনগণের সাথে কোনোরকম আপোষে যাওয়ার তেমন একটা আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না মার্কিন সরকার, বিশেষ করে ট্রাম্পের কথা ও কাজে ( “আইন ও শাসন“ নিয়ে তার সর্বশেষ বক্তব্য একটি টেলিভিশন নাটকের কথা মনে করিয়ে দেয়)।

    দাঙ্গার ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণ বোঝার জন্য আমরা প্রফেসর নোম চমস্কিকে কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম। দুনিয়াজুড়ে আমেরিকার রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ে প্রসিদ্ধ পণ্ডিতদের মধ্যে একজন তিনি।

    জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে দাঙ্গায়, যা মিনেপোলিশ শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে পেন্টাগন সামরিক পুলিশকে মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছে।  প্রফেসর চমস্কি, যুক্তরাষ্ট্রে আসলে কী ঘটছে? বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্যের দ্বারা ক্ষমতার অপব্যবহারের বাইরে আরও গভীর কিছু কি রয়েছে এই বিক্ষোভের পেছনে?

    গভীরে যা আছে তা হলো ৪০০ বছরের নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস: প্রথমত, মানব ইতিহাসে দাসত্বের সবচেয়ে জঘন্যতম ব্যবস্থা, যা কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (এবং যুক্তরাষ্ট্রেরও) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এরপর ১০ বছরের জন্য আসে স্বাধীনতা, যেখানে কালোরা সমাজে প্রবেশ করার অধিকার পায়, অসাধারণ সাফল্যের সাথে তারা সেটা করেছিলও। তারপর উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে চুক্তি যার ফলে সাবেক দাস রাষ্ট্রগুলো নিজের মতো করে চলার অনুমতি পায়। কালো মানুষদের অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে তারা যা করেছিল তা হলো “ভিন্ন নামে দাসপ্রথা“ প্রতিষ্ঠা করা। এ বিষয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটির শিরোনাম এটি।১

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েড ডেথ
    শিল্পী: এমাদ হাজ্জাজ
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    প্রকৃতপক্ষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত কার্যকর ছিল এটা, যখন দরকার ছিল শ্রমের। তারপর আপেক্ষিক স্বাধীনতার যুগ আসে। বর্ণবাদী আইনের দ্বারা এর পথ রুদ্ধ করা হয়। এতটাই চরমপন্থী আইন ছিল এটা যে নাৎসিরা পর্যন্ত একে খারিজ করে এবং ফেডারেল আইনের দ্বারা যুদ্ধের পর সরকারি অর্থায়নে তৈরি আবাসনে কালোদের পৃথকীকরণ২ করে দেয়া হয়। যুদ্ধফেরতদের বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার কর্মসূচি থেকেও কালোদের (এবং নারীদের) বাদ দেয়া হয়। আর তারপর আসে কালোদের অপরাধীকরণের আরও একটা ধাপ।

    এর ফলাফল সহজেই অনুমান করা যায়। বর্ণবাদ বহাল থাকে, যদিও আগের থেকে এর তীব্রতা কিছুটা  কম। আর যখনই ফ্লয়েড হত্যার মাধ্যমে এই বর্ণবাদের প্রকাশ ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিস্ফোরণ ঘটে। শ্বেতাঙ্গদের একটা বড় অংশ এতে অংশগ্রহণ করে, যা জনগণের অন্তত কিছু অংশ যে এই জঘন্য অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে তারই প্রতিফলন।

    আপনার কি মনে হয় সাম্প্রতিক কালে ফুঁসে উঠা এ বিক্ষোভে বৈশ্বিক মহামারির কোনো ভূমিকা আছে? এটা কি দেশের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর সংকটকেই সামনে তুলে আনছে? নাকি এটা কিছুদিন ধরে জমতে থাকা বারুদে আগুনের স্ফূলিঙ্গ ছুড়ে দিয়েছে মাত্র?

    বৈশ্বিক মহামারি কিছু সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন, করোনা সংক্রমণে কালোদের মৃত্যুহার শ্বেতাঙ্গদের তিনগুণ। ট্রাম্পের বদমায়েশিরতো কোনো শেষ নেই, মহামারির সুযোগ নিয়ে সে বায়ুদূষণ সংক্রান্ত নীতিমালাগুলো তুলে দিয়েছে, যার বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে। বিজনেস প্রেসের হিসাব অনুযায়ী দশ হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু হতে পারে এর ফলে। এদের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যাই বেশি, যারা মূলত সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাস করে। এই তথ্য জনমতকে কীভাবে প্রভাবিত করবে সেটা নির্ভর করে তথ্যগুলো আসলে কতটুকু বর্ণবাদী যুক্তিতে আচ্ছন্ন।

    কোনো পরিস্থিতিতেই কি ক্ষুব্ধ জনতার এরকম সহিংস হয়ে উঠা ন্যায়সঙ্গত হয়?

    এর উত্তর বেশ সহজেই অনুধাবন করা যায়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। স্বাভাবিকভাবেই এটা আরও কঠোর নিপীড়নের প্রতি জনসমর্থন তৈরি করে দেয়।

    বিক্ষোভের জবাবে ডোনাল্ট ট্রাম্প টুইট করেন “লুটপাট শুরুতো, গুলিও শুরু“। পরে তিনি সেটা সরিয়ে ফেলেন, কিন্তু ততক্ষণে আগুনে যথেষ্ট পরিমাণ ঘি ঢালা হয়ে গেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উস্কানির কথা বাদ দিলে আর ঠিক কী কারণে এই উক্তি আমেরিকান সমাজকে এত প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে? সেটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন। আপনি কি মনে করেন সেই “আদি পাপ, আমাদের জাতিকে আজও যা কলঙ্কিত করে রেখেছে“ (জো বাইডেনের উক্তি) ট্রাম্পের উপস্থিতিতে তার ভার বেড়ে গেছে আরও অনেক বেশি? তার এই উত্তেজিত বাগাড়ম্বর কি তাকে পোলে এগিয়ে যেতেও সাহায্য করবে? এখন যেখানে বাইডেন এগিয়ে আছেন?

    ৫০ বছর আগে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জবাবে ফ্লোরিডার এক মেয়রের কথাকেই  পুনরাবৃত্তি করেছে ট্রাম্প।৩ এর মানে বেশ স্পষ্ট, যদিও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লে ট্রাম্প এ নিয়ে মিথ্যা সাফাই গাওয়া শুরু করে। দাবি করে যে সে আসলে বুঝাতে চেয়েছে লুটপাটকারিরাই গুলি ছুঁড়বে। ট্রাম্প আসলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে, শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিগুলো টেনে এনে ট্রাম্প এই ‘কলঙ্গের দাগ’ আরও বড় করছে, এটা তার নির্বাচনের ভিত্তি। তবে জনমতে এর প্রভাব অনুমান করা আসলে কঠিন।

    উদারনৈতিকদের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আপনার কী মত? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে উদারনৈতিক ও বাইডেনের শিক্ষা নেয়ার মতো কি কিছু আছে?

    শিক্ষা নেয়া উচিত। তবে নেবে কি নেবে না সেটা দেখার বিষয়।

    আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লয়েড লাইফ ম্যাটার
    শিল্পী: কিয়ানৌস রামজানি
    সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

    শেষ আরেকটি প্রশ্ন। আপনি “কালো মানুষদের অপরাধীকর’’-এর কথা বলেছেন, আপনার বইগুলোতে প্রায়ই এটা নিয়ে বলে থাকেন আপনি। সংক্ষেপে একটু ব্যাখ্যা করবেন কি, আমেরিকার সমাজ ও অর্থনীতিতে এটা কীভাবে কাজ করেছে এবং এখনো করছে?

    এই বাক্যাংশের কৃতিত্ব আমার নয়। আমেরিকার সমাজ নিয়ে আলোচনাগুলোতে এটা বেশ পরিচিত। ঊনিশ শতকের শেষাংশে সাবেক দাস রাজ্যগুলোতে৪ এটি বেশ সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ ছিল। কোনো কালো মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে, ভবঘুরে অভিযোগে তাকে বন্দি করা হতো, এমন একটা জরিমানা ধরিয়ে দেয়া হতো যা তার পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না। তাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হতো। যেখানে নানা কাজে তাকে শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো যাবে, এমন শ্রমিকের কোনো বিকল্প হয় না যে কিনা নিয়মনিষ্ঠ, কোনো প্রতিবাদ করবে না আর সস্তায় কাজ করানো যাবে। সে সময়ের বিপ্লব প্রতিষ্ঠা ও কৃষিব্যবসার পেছনে একটা বড় ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছিল এটা।

    অপরাধীকরণের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় রোনাল্ড রিগ্যানের আমলে। ১৯৮০ সালে, তার দায়িত্বগ্রহণের সময় কারারোধের পরিমাণ ইউরোপের সমান ছিল। এরপরই বিস্ফোরণ ঘটে, ইউরোপকে ছাড়িয়ে সংখ্যাটা অনেকদূর এগিয়ে যায়। কারারুদ্ধদের মধ্যে কালোদের সংখ্যাটা ছিল আনুপাতিক হারে অনেক বেশি । এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী ছিল মাদকযুদ্ধের প্রভাব, বাকিটাকে কালোদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার হার বেশি হওয়ার সাথে সম্পর্কিত করা যায়। দ্বিতীয় কারণটিকে প্রায়ই বর্ণবাদী যুক্তির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। কিন্তু কালোদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কেন বেশি এই প্রশ্নকে আড়াল করা হয়। এটাই নিপীড়িত সমাজের বৈশিষ্ট্য। আর কাৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে এটাতো আরও অনেক বেশি গুরুতর।

    অনুবাদকের টীকা

    ১. ভিন্ন নামে দাসপ্রথা- ডগলাস এ. ব্ল্যাকমন এর লেখা বই Slavery by Another Name: The Re-Enslavement of Black Americans from the Civil War to World War II এর কথা বলছেন চমস্কি। ২০০৮ সালে এনকর বুকস থেকে প্রকাশিত হয় বইটি।

    ২. পৃথকীকরণ (segregation/Racial segregation) – বলতে পদ্ধতিগতভাবে কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোকেদের সামাজিকভাবে আলাদা করে দেয়াকে বুঝায়। আইনের দ্বারা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থান যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, রেস্টুরেন্ট ইত্যাদিতে স্বাভাবিকভাবে  প্রবেশ ও চলাফেলার অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয় এর মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ফেডারেল হাউজিং এডমিনিস্ট্রেশান (FHA) ও ভেটারানস এডমিনিস্ট্রেশানের (VA)  মাধ্যমে নাগরিকদের স্বল্প সুদে আবাসন ব্যবস্থা প্রদান করে। এই প্রকল্প থেকে লিখিতভাবে সরাসরি কৃষ্ণাঙ্গদের বাদ দেয়া না হলেও, উদ্যোক্তারা কৌশলে সারা দেশজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিতএলাকাগুলোকে এই প্রকল্পের আওতা থেকে বাদ দিতে থাকে। যার ফলে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে স্পষ্ট বিভেদের সৃষ্টি হয়। নিচের লিংকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আছে-

    https://www.npr.org/2017/05/03/526655831/a-forgotten-history-of-how-the-u-s-government-segregated-america

    ৩. ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলন চলাকালীন সময়ে মায়ামি পুলিশ প্রধানের বক্তব্য। সে সময় কিশোর বয়েসিদের উপর লুটপাটের অভিযোগ এনে পুলিশকে সহিংস উপায়ে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন তিনি।

    https://www.washingtonpost.com/outlook/2020/06/01/police-chief-who-inspired-trumps-tweet-glorifying-violence/

    ৪. ১৮৬৫ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের যেসমস্ত রাজ্যগুলোতে দাস ব্যবসা বৈধ ছিল সেগুলোকে দাস রাজ্য বলা হতো। ১৮৬৫ সালে সংবিধানের তেরতম সংশোধনীর মাধ্যমে সমগ্র আমেরিকাজুড়ে দাসপ্রথার পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। এবং দাস রাজ্য ও স্বাধীন রাজ্য বলেও আলাদা কিছু আর থাকে না।

     

  • স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: নৈরাজ্যবাদ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড জিন  

    অনুবাদ: সহুল আহমদ

    অনুবাদকের ভূমিকা

    হাওয়ার্ড জিন প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ, চিন্তক ও বুদ্ধিজীবী। প্রায় বিশের অধিক বই-পুস্তক লিখেছেন, পাশাপাশি নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইতিহাস নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, আলাপ-আলোচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ও প্রভাবশালী A People’s History of the United States গ্রন্থ সম্পর্কে প্রায় সকলেই জানেন, সিনেমা থেকে শুরু করে বিদ্বৎসমাজ সবখানেই এই গ্রন্থ বহুরূপে উল্লেখিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন এয়ারফোর্সে যোগদান করেছিলেন, এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সাধারণ জনগণের ত্যাগ-তিতীক্ষাকে ব্যবহার করে গুটিকয়েক ফায়দা হাসিল করেন। আজীবন বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে গিয়েছেন।

    হাওয়ার্ড জিন এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল Counter Punch এ ২০০৮, ১২ মে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জিগা ভদোভনিক।  তিনি স্লোভেনিয়ার University of Ljubljana এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক; কাজ করেন আমেরিকার সামাজিক আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব ও সমসাময়িক রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে।

    জিগা ভদোভনিকের সাথে কথোপকথনে হাওয়ার্ড জিন নিজেকে অ্যানার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী হিসেবে অভিহিত করেই কথা বলা শুরু করেন। তারপর কথা বলেছেন নৈরাজ্যবাদী বিভিন্ন ধারণা, মানুষের স্বাধীনতা, সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্ব, নির্বাচনী ও ভোটের রাজনীতি বনাম সামাজিক আন্দোলন, কর্তৃত্বপরায়ন আন্দোলন বনাম মুক্তিমুখীন আন্দোলন, নৈরাজ্যবাদের ইতিহাস, উপায় ও উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে।

    বর্তমানে anarchism এর ভাষান্তর ‘নৈরাজ্যবাদ’ না করে অরাজ/ অরাজপন্থা ইত্যাদিও করা হয়, বা অনেকেই ‘অ্যানার্কিজম’ই রেখে দেন, কেননা প্রচলিত অর্থে ‘নৈরাজ্য’ শব্দ নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয় (যেমন, বিশৃঙ্খলা)। এই সাক্ষৎকারে হাওয়ার্ড জিন অ্যানার্কি শব্দকে chaos বা বিশৃঙ্খলা অর্থে ব্যবহার করার রাজনীতি নিয়েও আলোচনা করেছেন। তাই, অ্যানার্কিজমের বাংলা রূপান্তর হিসেবে নৈরাজ্যবাদই রাখা হয়েছে।

    হাওয়ার্ড জিন

    ১৯৮০’র দশক থেকে আমরা দেখছি অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াটি দিনে দিনে শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক বামপন্থীরা এখন একটা ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বে’র মধ্যে পড়ে গিয়েছেন: বিদেশি ও বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরির লক্ষ্যে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের হাতের শক্তি বাড়াতে কাজ করবেন, নাকি বিদ্যমান বিশ্বায়নের একধরনের অ–জাতীয় বিকল্পের দিকে ঝুঁকবেন, যা সমানভাবে বৈশ্বিক। এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

    আমি একজন নৈরাজ্যবাদী, এবং নৈরাজ্যবাদী নীতি অনুসারে জাতিরাষ্ট্র সত্যিকারের মানবিক বিশ্বায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক অর্থে বিশ্বায়নের দিকে এই আন্দোলন, যেখানে পুঁজিবাদীরা জাতিরাষ্ট্রের সীমানা ডিঙানোর চেষ্টা করছেন, সেখানে আন্দোলনের জন্য জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করার একধরনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; যা বৈশ্বিক পুঁজির বিরুদ্ধে মানুষকে একত্রে নিয়ে আসতে পারে, বিশ্বায়নের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে জনগণের বিশ্বায়ন সৃষ্টি করতে পারে। অন্য ভাবে বললে, বিশ্বায়নকে এমন ভাবে ব্যবহার করা (বিশ্বায়ন ধারণার সাথে কিন্তু কোনো ঝামেলা নেই) যেন, এটি জাতীয় সীমানা উপেক্ষা করবে এবং অবশ্যই দুনিয়ার মানুষ সম্পর্কে যে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তাতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

    পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ একদা লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতাই হলো জননী, হুকুমের সন্তান নয়’। জাতিরাষ্ট্রের পরে বা বাইরে জীবনকে আপনি কোন জায়গায় দেখেন?

    জাতিরাষ্ট্রের বাইরে? (হাসি) আমি মনে করি, জাতিরাষ্ট্রের বাইরে যা আছে সেটা হচ্ছে জাতীয় সীমানা ব্যতীত এক জগত, কিন্তু সংগঠিত জনসাধারণ নিয়েই। কিন্তু জাতি হিসেবে সংগঠিত না হয়ে বরঞ্চ দল হিসেবে, সমষ্টি হিসেবে জনসাধারণ সংগঠিত হবে; জাতীয় বা এই ধরনের কোনো সীমানা ছাড়াই। কোনো ধরনেরই সীমানা, পাসপোর্ট, ভিসা থাকবে না। এসবের একটাও না। বিভিন্ন আকারের সমষ্টি যৌথ বা সমবেত কাজের উপর ভিত্তি করে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে। আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোট ছোট গোষ্ঠী খুঁজে পাবেন না, কারণ তাদের কাছে কাছে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসপাতি থাকবে। এটা এমন কিছু যা নৈরাজ্যবাদী তত্ত্ব এখনো তৈরি করেনি, এবং হয়তোবা আগাম করা সম্ভবও না, কারণ চর্চার মাধ্যমেই একে কার্যে পরিণত করতে হবে।

    পিয়েরে যোসেফ প্রুধোঁ

    আপনি কি মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক পার্টি রাজনীতির মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব? নাকি অসহযোগ আন্দোলন, সমান্তরাল কাঠামো তৈরি, বিকল্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির মতো বিকল্প মাধ্যমেই কেবল করতে হবে? 

    আপনি যদি বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে কাজ করেন আপনি দূষিত হবেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবেশকে বিষাক্ত করে, এমনকি প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকেও। আপনি দেখবেন আমেরিকাতেও, ‘বাম’ধারার লোকেরা নির্বাচনী প্রচারণায় ধরা পড়েছেন এবং কোন তৃতীয় শক্তিকে সমর্থন দেয়া যায় তা নিয়ে যুক্তি-তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। এটা খুব ছোট একটা নমুনা যে, আপনি যদি নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ করতে শুরু করেন তাহলে আপনি আপনার আদর্শকে দূষিত করা শুরু করেছেন। সুতরাং আমি মনে করি, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, ভোট, নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে কাজ না করে, কর্মস্থলে, পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আন্দোলন ও সমষ্টি গড়ার চিন্তা করতে হবে, যেন এগুলোই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণের মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে: প্রথমত, কর্তৃত্ব তাদের সাথে যা করছে তা প্রতিরোধ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা এবং দ্বিতীয়ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠা।

    একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। আপনি কি নির্বাচনে যান? ভোট দেন?

    যাই, কখনো সখনো, সবসময় না। এটা নির্ভর করে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে কখনো কখনো এক প্রার্থীর বদলে আরেক প্রার্থীকে পাওয়া হয়তো জুতসই, যদিও আপনি মানেন এটাই সমাধান নয়। কখনো কখনো কম মন্দটিও তত কম মন্দ হয় না, তাই আপনি এটা উপেক্ষা করতে চান, এবং হয় আপনি ভোট দিবেন আর না হয় পার্টি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে আপনি তৃতীয় পার্টিকে ভোট দিবেন। কখনো কখনো দুই প্রার্থীর মধ্যকার পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ এবং যিনি একটু ভালো, একটু কম বিপজ্জনক তাকে দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টাটাও বোধগম্য। কিন্তু কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না যে কে পদের দায়িত্ব নিচ্ছেন এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়, বরঞ্চ প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কোন ধরনের সামাজিক আন্দোলন রয়েছে। কারণ আমরা ঐতিহাসিকভাবে দেখেছি, যদি আপনার কোনো শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে তাহলে পদের দায়িত্বে কে রয়েছেন সেটা অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। দায়িত্বে যেই থাকুক না কেন, রিপাবলিক বা ডেমোক্রেট যেই হোক না কেন, যদি আপনার শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন থাকে, তাহলে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে সমর্পণ করতেই হবে, কোনো না কোনোভাবে সামাজিক আন্দোলনের শক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেই হবে।

    ষাটের দশকে আমরা এটি দেখেছি, রিচার্ড নিক্সন মোটেও কম শয়তান ছিলেন না, বরঞ্চ তিনি অধিকতর শয়তান ছিলেন। কিন্তু তার আমলেই অবশেষে যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল, কারণ তাকে যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলনের শক্তি মোকাবিলার পাশাপাশি ভিয়েতনামি আন্দোলনের শক্তিকেও মোকাবিলা করতে হয়েছিল। আমি ভোট দেব, কিন্তু সর্বদা এই সতর্কতার সাথে যে ভোটদান চূড়ান্ত নয়, এবং সংগঠিত করাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    যখন কেউ ভোটদানের বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে, তারা জিজ্ঞেস করে আপনি কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিবেন? একে নাকি ওকে? আমি বলি: ‘আমি যখন বুথে ভোট দেব কেবল তখনই মাত্র এক মিনিটের জন্য কোনো এক প্রার্থীকে সমর্থন করব, কেবল সেই মুহূর্তে আমি ক বনাম খ-কে সমর্থন দেব। কিন্তু ভোটিং বুথে যাওয়ার পূর্বে এবং বুথ থেকে বের হওয়ার পরও আমি আসলে মনোযোগ দেব মানুষকে সংগঠিত করার দিকে এবং কোনো নির্বাচনী প্রচারণা সংগঠনের দিকে নয়।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    এই ক্ষেত্রে নৈরাজ্যবাদ যথাযথভাবেই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বিরোধিতা করছে, কারণ এটাও একধরনের স্বৈরশাসনের রূপ—সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরশাসন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের এই ধারণাতে আপত্তি জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সবসময় নৈতিকভাবে সহি মতের সাথে মিলে না। থোরিও একদা বলেছিলেন, বিবেকের হুকুমে কাজ করার প্রতি আমাদের একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমনকি সেটা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের মত বা সমাজের আইনকানুনের বিরুদ্ধেও যায়। আপনি কি এর সাথে একমত?

    একদম। রুশো একবার বলেছিলেন, যদি আমি একশ জনের দলে একাও হয়ে থাকি, বাকি ৯৯ জন কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার রাখে? না। সংখ্যাগরিষ্ঠরাও ভুল করতে পারেন, তারা সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করতে পারেন। যদি সংখ্যাগুরুরাই শাসন করতো তবে এখনো দাসপ্রথা বহাল থাকত। জনসংখ্যার ৮০% একদা ক্রীতদাস বানিয়েছিল ২০% লোককে। সংখ্যাগরিষ্ঠের নিয়মানুযায়ী এটা ঠিক ছিল। এটা আসলে গণতন্ত্রের খুব ত্রুটিযুক্ত ধারণা। গণতন্ত্রকে বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে— জনগণের আনুপাতিক প্রয়োজনীয়তা; কেবল সংখ্যাগুরুদের চাহিদাই নয়, সংখ্যালঘুদের চাহিদাকেও আমলে নিতে হবে। এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, যে সমাজে মিডিয়া জনমতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত বা অশুভ হতে পারে। সুতরাং হ্যাঁ, জনগণকে বিবেক অনুসারেই কাজ করতে হবে, কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট দিয়ে নয়।

    যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের ঐতিহাসিক উৎস কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

    নৈরাজ্যবাদ নিয়ে কাজ করার একটা মুশকিল হচ্ছে এখানে আপনি অনেক লোক পাবেন যাদের ধারণাগুলো নৈরাজ্যবাদী, কিন্তু নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেন না। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে প্রুধোঁ এটা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেন, কিন্তু তার পূর্বে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বহু নৈরাজ্যবাদী ধারণা চালু ছিল।উদাহরণস্বরূপ থমাস পেইনের কিছু ধারণার কথা বলা যায়, তিনি নৈরাজ্যবাদী ছিলেন না, নিজেকে এই নামে অভিহিতও করতেন না, কিন্তু সরকার ব্যবস্থা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। আরো আছেন হেনরি ডেভিড থোরিও। তিনি নৈরাজ্যবাদ শব্দটাও জানতেন না এবং শব্দটা কখনো ব্যবহারও করেন নি। কিন্তু তার চিন্তা নৈরাজ্যবাদের খুব কাছাকাছি। তিনি যে কোনো ধরনের সরকার ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। যদি আমরা যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদের  উৎস সন্ধান করি, তাহলে সম্ভবত থোরিও প্রথম আমেরিকান নৈরাজ্যবাদী হওয়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন। সিভিল ওয়ার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসলে নৈরাজ্যবাদের সাথে আপনার মোলাকাত হয়নি, যখন ইউরোপীয় নৈরাজ্যবাদী, বিশেষত জার্মান নৈরাজ্যবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করেন। তারাই আসলে সংগঠিত করা শুরু করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদ প্রথমবারের মতো সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং সর্বজনীন পরিচিত লাভ করেছিল শিকাগোতে, হেমার্কেট ঘটনার সময়ে।

    যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক নৈরাজ্যবাদের মূল অনুপ্রেরণা আপনি কোথায় দেখেন? ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম সম্পর্কে আপনার মতামত কি? মানে, এই ক্ষেত্রে হেনরি ডি থোরিও, রালফ ডব্লিউ এমারসন, ওয়াল্ট হুইটম্যান, মার্গারেট ফুলারদেরকে অনুপ্রেরণা হিসেবে?

    আচ্ছা, ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজমকে আমরা বলতে পারি নৈরাজ্যবাদের একেবারে গোড়ার দিকের এক রূপ। তারাও নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেননি, কিন্তু তাদের চিন্তা ও সাহিত্যে নৈরাজ্যবাদী ধ্যানধারণা ছিল। হারমেন মেলভিলে বিভিন্ন ভাবে এমন কিছু নৈরাজ্যবাদী ধারণা প্রকাশ করে। তারা সকলেই কর্তৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। আমরা বলতে পারি যে, কর্তৃত্ব ও সরকারব্যবস্থার প্রতি একধরনের সন্দেহের পরিবেশ তৈরিতে ট্রান্সসেন্ডেন্টালিজম একটা ভূমিকা রেখেছিল।

    দুর্ভাগ্যক্রমে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে কোনো প্রকৃত সংগঠিত নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন নেই। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দল বা গোষ্ঠী রয়েছে যারা নিজেদেরকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করে, কিন্তু এগুলো ক্ষুদ্র। আমার মনে আছে ১৯৬০’র দশকে এখানে বোস্টনে একটা নৈরাজ্যবাদী গোষ্ঠী ছিল যারা সংখ্যায় প্রায় পনের জনের মতো, কিন্তু তারা তখন বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ষাটের দশকের অন্যান্য আন্দোলনের সাথে মিলে ষাটের দশকে নৈরাজ্যবাদ আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

    এনার্কিস্ট পোস্টার

    আজকাল র‌্যাডিকাল রাজনীতির বেশিরভাগ সৃজনশীল শক্তি নৈরাজ্যবাদ থেকে উঠে আসছে, কিন্তু এই আন্দোলনে জড়িত খুব কম লোকই নিজেকে নৈরাজ্যবাদী দাবি করেন। আপনার মতে এর মূল কারণ কি? রাজনৈতিক কর্মীরা (অ্যাক্টিভিস্ট) কি এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সাথে নিজেকে চিহ্নিত করতে লজ্জা পাচ্ছেন? নাকি তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, সত্যিকারের মুক্তির জন্য যে কোনো ধরনের লেবেল থেকেও মুক্তি প্রয়োজন?

    নৈরাজ্যবাদ শব্দটি এমন দুটো প্রপঞ্চের সাথে জড়িয়ে পড়েছে যেগুলোর সাথে প্রকৃত নৈরাজ্যবাদীরা যুক্ত হতে চান না। একটা হচ্ছে সহিংসতা এবং অন্যটা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। নৈরাজ্যবাদের জনপ্রিয় ধারণাগুলোর একদিকে রয়েছে বোমা-নিক্ষেপ ও সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যদিকে রয়েছে কোনো বিধি-বিধান, শৃঙ্খলার অভাব, যা ইচ্ছা তাই করতে পারা, বিভ্রান্তি ইত্যাদি। এই কারণে এই শব্দ ব্যবহারে একরকম অনিচ্ছা আছে। কিন্তু ১৯৬০ এর দশকের আন্দোলনগুলো যেভাবে ভাবতে শুরু করেছিল তাতে নৈরাজ্যবাদের প্রকৃত ধারণা মিশে গিয়েছে।

    আমার মনে হয় এর সর্বোত্তম প্রকাশটি ঘটেছিল সম্ভবত এসএনসিসি (Student Nonviolent Coordinating Committee) এর সাথে নাগরিক অধিকার আন্দোলনে। এসএনসিসি দর্শন হিসেবে নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে না জেনেই এর বৈশিষ্ট্যগুলোকে মূর্ত করে তুলেছিল। তারা বিকেন্দ্রীভূত ছিল। অন্যান্য নাগরিক অধিকারের সংগঠনগুলো, যেমন সেভেন খ্রিষ্টান লিডারশিপ কনফারেন্স, একজন নেতা (মার্টিন লুথার কিং) সমেত কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। এনএএসিপি (National Association for the Advancement of Colored People) নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক একধরনের কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছিল। অপরদিকে, এসএনসিসি ছিল পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত। তাদের ফিল্ড সেক্রেটারি ছিল, যারা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ছোট ছোট শহরে স্বায়ত্তশাসনের সহিত কাজ করত। জর্জিয়ার আটলান্টায় তাদের একটা অফিস ছিল, কিন্তু অফিসের কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব ছিল না। আলবামা, জর্জিয়া, লুসিয়ানা এবং মিসিসিপির বিভিন্ন মাঠে যারা কাজ করতেন তারা নিজেদের ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। তারা স্থানীয় ও তৃণমূল জনগণের সাথে কাজ করতেন। এবং তাই এসএনসিসির কোনো এক নেতা ছিল না, এবং সরকারের প্রতি সন্দিহান ছিল।

    তারা সাহায্য-সমর্থনের জন্য সরকারের উপর নির্ভর করতো না, যদিও ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকে সরকারকে প্রগতিশীল লিবারেল বলে ভাবা হতো। বিশেষ করে জন এফ কেনেডিকে। কিন্তু তারা তার আচরণ প্রত্যক্ষ করেছিল। কেনেডি কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকারের জন্য দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠা আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করেননি। যারা পৃথকীকরণে বিশ্বাস করে (segregationists) এমন বিচারকদের তিনি দক্ষিণে পাঠানো শুরু করলেন এবং তাদেরকে যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি দিলেন। সুতরাং এসএনসিসি ছিল বিকেন্দ্রীভূত, সরকার-বিরোধী, নেতৃত্বহীন। কিন্তু নৈরাজ্যবাদীদের মতো ভবিষ্যতের সমাজ নিয়ে তাদের কোনো ভিশন ছিল না। তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ছিল না, ভবিষ্যতে আমাদের কি ধরনের সমাজ হবে তা নিয়ে তাদের কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না। তারা আসলেই জাতিগত পৃথকীকরণের তাৎক্ষণিক সমস্যায় মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু তাদের মনোভঙ্গি, তার যেভাবে কাজ করছিল, যেভাবে সংগঠিত হচ্ছিল তা বলা যায় নৈরাজ্যবাদী ধারায় ছিল।

    আপনার কি মনে হয় যে, মানুষ মুক্ত হতে পারবে ধারণাটি ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর হওয়ার কারণেই নৈরাজ্যবাদ শব্দের নিন্দাসূচক (অপ)ব্যবহার করা হয়? 

    কোনো সন্দেহ নেই। নিঃসন্দেহে, নৈরাজ্যবাদী ধারণা ক্ষমতাসীনদের জন্য ভয়ঙ্কর। ক্ষমতাসীনেরা লিবারেল ধারণাগুলোকে সহ্য করতে পারেন। যে ধারণাগুলো সংস্কারের ডাক দেয় সেগুলোকে তারা সহ্য করতে পারেন, কিন্তু কোনো রাষ্ট্র থাকবে না, কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব থাকবে না— এমন ধারণা তারা সহ্য করতে পারেন না। সুতরাং নৈরাজ্যবাদের ধারণাটিকে বিদ্রূপ করা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যেন সহিংস ও বিশৃঙ্খলা হিসেবে নৈরাজ্যবাদের একটা ছাপ তৈরি হয়। হ্যাঁ, তাদের জন্য এটা দরকারি।

    অ্যানার্কিস্ট পোস্টার

    তত্ত্বীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আমরা বিশ্লেষণাত্মকভাবে অ্যানার্কিজমের দুটো ধারণা শনাক্ত করতে পারি, একদিকে ইউরোপের মধ্যে তথাকথিত যৌথতাবাদী নৈরাজ্যবাদ (collectivist anarchism), এবং অন্যদিকে আমেরিকার মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদ (individualist anarchism)। বিশ্লেষণাত্মক এমন পৃথকীকরণের সাথে আপনি কি একমত?    

    আমার কাছে এটি একটি কৃত্রিম পৃথকীকরণ। বিশ্লেষকরা প্রায়শই বিষয়গুলো নিজেদের জন্য সহজ করে তুলতে বিভিন্ন বর্গ তৈরি করেন এবং আন্দোলনগুলোকে সেই বর্গে পছন্দসই বসিয়ে দেন। কিন্তু আমি মনে করিনা আপনি এটি করতে পারেন। এখানে যুক্তরাষ্ট্রে নিশ্চয়ই অনেকেই আছেন যারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদে বিশ্বাস করেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেই আবার ১৮৮০ সালে শিকাগো অথবা এসএনসিসিতে সংগঠিত নৈরাজ্যবাদীদের পাওয়া যায়। আমার মনে হয় উভয় নজিরই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাবেন, তবে ইউরোপে অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ধারণাটা আমেরিকার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যদিও, যুক্তরাষ্ট্রে আপনার কাছে আইডব্লিউডব্লিউ (IWW) এর মতো অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিস্ট সংগঠন এবং নিশ্চিতভাবেই এটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নৈরাজ্যবাদের সাথে মিলে না।

    বিপ্লব বনাম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন— উপায়ের এই ‘উভয়সঙ্কট’ বিষয়ে আপনি কি অভিমত? 

    আমি মনে করি এখানে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার বিষয়, এবং এখানে নৈরাজ্যবাদীরাই দ্বিমত পোষণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আপনি মতবিরোধটি খুঁজে পাবেন, এবং আপনি একক ব্যক্তির মধ্যেই এই মতবিরোধটি পেতে পারেন। আপনি বলতে পারেন এমা গোল্ডম্যান, তার মৃত্যুর পর, ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নৈরাজ্যবাদকে সামনে নিয়ে আসেন। তখন তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। কিন্তু এমা গোল্ডম্যান হেনরি ক্লে ফ্রিকের হত্যার পক্ষে ছিলেন, আবার তিনিই পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এটা ঠিক পথ নয়। তার বন্ধু ও কমরেড অ্যালেক্সান্ডার বার্কম্যান সহিংসতার ধারণাকে পুরোপুরি নাকচ করেননি। অন্যদিকে আপনি টলস্টয় এবং এমনকি গান্ধীরও মতো অ্যানার্কিস্ট পাবেন যারা অহিংসতায় বিশ্বাস করতেন।

    উপায়ের বিষয়ে নৈরাজ্যবাদের একটি কেন্দ্রীয় নীতি আছে, এবং সেই নীতি হলো প্রত্যক্ষ সংগ্রামের (ডিরেক্ট একশন) নীতি— প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারব্যবস্থা, ভোটদান, আইন প্রণয়নের মতন সমাজ কর্তৃক প্রস্তাবিত রূপগুলোর মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ। ট্রেড ইউনিয়ন, অ্যানার্কো-সিন্ডিকালিজমের ক্ষেত্রে এর অর্থটা কেবল শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়াই নয়, বরঞ্চ তারা যে কারখানায় কাজ করেন সেগুলো দখল করা এবং পরিচালনা করা। প্রত্যক্ষ সংগ্রামটা কি? দক্ষিণে যখন কৃষ্ণাঙ্গরা জাতিগত পৃথকীকরণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিল, তারা তখন সরকারের সংকেতের জন্য অপেক্ষা করেনি, আদালতের মাধ্যমে যায়নি, মামলা দায়ের করেনি, কংগ্রেসে আইন পাস করার অপেক্ষা করেনি। তারা সরাসরি একশনে চলে গিয়েছিল, তারা রেস্টুরেন্টে গিয়েছে, বসে পড়েছে এবং নড়েনি। তারা বাসে উঠে পড়েছে এবং যে পরিস্থিতিকে হাজির করতে চায় সেটাই বাস্তবায়ন করেছে।

    অবশ্য, ধর্মঘট-হরতাল সর্বদাই একধরনের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। ধর্মঘটের মাধ্যমে আপনি কেবল আইন পাস করে বিষয়গুলো সহজ করার জন্য সরকারকে বলছেন না, বরঞ্চ আপনি মালিকের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামেই নেমেছেন। আমি বলব, উপায় বিষয়ে যতদূর যাওয়া হোক না কেন, আপনি যে অশুভ শক্তিকে সরাতে চান তার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ধারণাই নৈরাজ্যবাদী চিন্তা ও আন্দোলনের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আমি এখনও মনে করি, নৈরাজ্যবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হচ্ছে, আপনি উপায় ও উদ্দেশ্যকে পৃথক করতে পারবেন না। যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে সমতাবাদী (egalitarian) সমাজ, তাহলে আপনাকে সমতাবাদী উপায় ব্যবহার করতে হবে, আপনার যদি উদ্দেশ্য হয় যুদ্ধবিহীন অহিংস সমাজ, তাহলে সেটা আপনি কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে হাসিল করতে পারবেন না। আমি মনে করি নৈরাজ্যবাদের চাওয়া হচ্ছে উপায় ও উদ্দেশ্যকে সামঞ্জস্য রেখে চলা। আমি মনে করি এটা আসলে নৈরাজ্যবাদের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

    নোয়াম চমস্কিকে তার নৈরাজ্যবাদী সমাজের ভিশনের ব্যাপারে এবং সেখানে পৌঁছানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি যদি এগুলো নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা না করেন তাহলে কোন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে তার সুরাহা করতে পারবেন না’। আপনার কি এমন মনে হয় যে, অনেক বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা চর্চার ক্ষেত্রে ‘পরীক্ষা–নিরীক্ষা’ শুরু করতেই সহি উপায় ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে প্রচুর শক্তি হারাচ্ছেন?

    আমি মনে করি নমনীয়তা বজায় রেখে বিভিন্ন আইডিয়া বা ধারণা পেশ করা গুরুত্বপূর্ণ, যেমন উদারহরণস্বরূপ মাইকেল অ্যালবার্টের ParEcon (Participatory economics, often abbreviated ParEcon) কথা বলা যায়। আমরা ভবিষ্যৎ সমাজের ব্লুপ্রিন্ট এখন তৈরি করতে পারবো না, কিন্তু আমি মনে করি এটা নিয়ে চিন্তা করা ভালো। মনের মধ্যে একটা লক্ষ্য রাখা ভালো। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে তা নিয়ে চিন্তা করাটা গঠনমূলক, সহায়ক এবং স্বাস্থ্যকর, কারণ তখন আপনি আজকে যা করছেন তা খানিকটা পথপ্রদর্শন করবে, কিন্তু সেটা কেবল ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ভবিষ্যৎ সমাজ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ভবিষ্যতের দিকে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। অন্যথায়, আপনি এই ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা বনাম ঐ ইউটোপিয়ান সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্কেই সময় খোয়াবেন, এবং এই সময়ে সেটার কাছাকাছি যাওয়ার মতো কাজও করছেন না।

    সূত্র: অ্যানার্কিস্ট আর্ট এন্ড প্রপাগান্ডা

    Peoples History of United States গ্রন্থে আপনি দেখিয়েছেন যে, আমাদের স্বাধীনতা, অধীকার, পরিবেশগত মান ইত্যাদি গুটিকয়েক ধনী ও প্রভাবশালীরা কখনো দিয়ে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বদা লড়াই করেই সেটা আদায় করেছে। এই ক্ষেত্রে আরেকটি ভালো দুনিয়ার দিকে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিৎ?

    আমি মনে করি আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নিজেদের সংগঠিত করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা— যুদ্ধের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক ও যৌন শোষণের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ইত্যাদি। কিন্তু এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন উপায়ের সাথে উদ্দেশ্যের সামঞ্জস্য থাকে, এবং এমন এক মানবিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন সে সম্পর্ক ভবিষ্যৎ সমাজে বিদ্যমান থাকতে পারে। এর মানে হলো কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছাড়াই এমনভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে হবে যেন তা ভবিষ্যতের সমতাবাদী সমাজের আদর্শের একটি ছোটখাটো চিত্র হাজির করে। ফলে, আপনি যদি আগামীকাল অথবা পরের বছর যদি কিছু নাও জিতেন, তবু এর মাঝেই কিন্তু আপনি একটা মডেল দাড় করিয়ে ফেলেছেন। ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হওয়া উচিৎ তা আপনি বের করে ফেলেছেন এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না করতে পারলেও আপনি একটা তাৎক্ষনিক পরিতৃপ্তি তৈরি করে ফেলেছেন।

    মানুষের ‘স্বাধীনতার প্রবৃত্তি’ রয়েছে, কেবল ইচ্ছাই নয় জৈবিক প্রয়োজনও আছে, বাকুনিনের এই অন্টোলজিক্যাল অনুমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?

    আমি আসলে এই ধারণায় বিশ্বাস করি, কিন্তু আমি মনে করি এর স্বপক্ষে আপনি বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক প্রমাণ পাবেন না। স্বাধীনতার জন্য কি আপনাকে জিন খুঁজে পেতে হবে? না। আমি মনে করি আরেকটা উপায় হচ্ছে মানব আচরণের ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া। মানব আচরণের ইতিহাস স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষাই প্রমাণ করে। ইতিহাস এটা প্রমাণ করে যে, জনগণ যখনই স্বৈরশাসনের অধীনে বসবাস করেছে, এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।