অরাজ

উত্থান ও উধাও : ছাত্রলীগের ‘উধাও’ নারীকুল, পৌরুষ-সংহতি এবং ২০২৪ উত্থানের ভ্রান্তপাঠ

মানস চৌধুরী

পরিপ্রেক্ষিত

এই রচনাটির পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়েছে সাধারণভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতি আমার বিরক্তি থেকে। এমন নয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ সমরূপ বা অখণ্ড বৈশিষ্ট্যের ধারক। এমনও নয় যে আমার বিরক্তিটাও সমরূপ বা অটুট। কিন্তু মোটের উপর, টিভি-পত্রিকাতে যেসব বিশ্লেষণ অন্তত আমার চোখে পড়েছে। আর আমি পর্যাপ্ত পরিমাণে বিরক্ত হতে থেকেছি। বিশ্লেষকদের সিংহভাগের উপর আমার এই বিরক্তি অবশ্য আগস্ট-২৪ পরবর্তীকালেরই নয়। এটা কমবেশি বহুকাল আগে থেকেই বিকশিত রয়েছে। যাহোক, এখানে রচনা লিখবার ক্ষেত্রে যে বিষয়টা না বললেই নয় তা হচ্ছে, বিদ্যাজগতে আর যাই হোক বিরক্তি থেকে রচনা লিখতে উৎসাহ দেয়া হয় না। তেমন কোনো পণ্ডিতই পাওয়া যাবে না যাঁরা অনুমোদন করবেন পেটভর্তি বিরক্তির কারণে কোনো রচনায় ব্রতী হতে। সাধারণত, জ্ঞানতৃষ্ণা ও জ্ঞানসাধনার জগতেই বিদ্বারচনার জন্মলাভ করাতে সুপারিশ করা হয়ে থাকে। হিসেবটা বেশ জটিল। কার যে জ্ঞানতৃষ্ণা আর কার জ্ঞানসাধনা তা আমার প্রায়শই গুলিয়ে যায়। অনেক হিসেব কষে দেখলে আন্দাজ করা যায় যে, লেখকের থাকবে জ্ঞানসাধনা আর পাঠকের থাকবার কথা জ্ঞানতৃষ্ণা। তবে পণ্ডিতেরা প্রায়শই বলেন যে লেখকের জ্ঞানতৃষ্ণাও অত্যন্ত জরুরি। যেসব লেখক কম পড়ালেখা করেন তাঁদেরকে ব্যাপক নিন্দা করা হয়। সেসব চিন্তা করলে লেখায় হাত দিতে ভয় হবার কথা আমার। খুব হয়ও বটে। সব মিলে খুবই পিচ্ছিল-বিপজ্জনক এক জগত এই বিদ্যাজগতের লেখালেখি। কিছুতেই বিতৃষ্ণা থেকে অন্তত লিখবার সুপারিশ নেই। অথচ আমার ক্ষেত্রে, অন্তত এই রচনাটি, বিশুদ্ধ বিতৃষ্ণাতেই জন্মলাভ করতে যাচ্ছে। 

মানস চৌধুরী

আমার জিজ্ঞাসাও খুব সাধারণ ও স্পষ্ট। ছাত্রলীগে যোগ-দেওয়া বিপুল পরিমাণ নারীরা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক ভাষামালাতে হারিয়ে গেলেন কেন? ২৪-এর উত্থানের অন্যতম কারিগর যে আমি তাঁদের দেখতে পাই সেই অতি-সাধারণ দেখাদেখিটা গড়ে ওঠেনি কেন বিশ্লেষকদের মাঝে? যদি গড়ে উঠে থাকে, তাহলে তাঁরা সেই প্রসঙ্গসূত্র যুক্তি-আকারে হাজির করতে থাকেননি কেন? আর যদি দেখাটা গড়ে না-উঠেই থাকে, তাহলে এই কাঠামোগত আহাম্মুকির কারণ বা হেতু কী? ইত্যাদি।

ঘটনাসূত্র

বলা বাহুল্য হতে পারে, তবে সূত্রের অভাব নেই। কিন্তু একটা ঘটনাপঞ্জি হিসেবে সাজিয়ে ইতিহাস-রচনার দায় আমি নিচ্ছি না। আমার যুক্তিকে গেঁথে-সাজানোর স্বার্থে আমি ৩টি ঘটনাকে সূত্রবদ্ধ করছি এখানে। ঘটনা তিনটা ঘটেছে কমবেশি দেড় বছরের মধ্যেই। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত। এগুলোকে প্রামাণ্য বা দালিলিক হিসেবে উপস্থাপন করছি না আমি। আমার আগ্রহ উপসর্গের চিহ্ন হিসেবে দেখানো। দালিলিক বা প্রামাণিক হিসেবে হাজির করবার জন্য আরও কিছু বিন্দুকে জোড়া দিতে হবে। তার জন্য বাড়তি আরও কিছু কাজ করা লাগবে। তাছাড়া, আমার তরফে এটা কোনো ইতিহাস রচনা-প্রচেষ্টা নয়। বড়জোর ইতিহাসের দিকে তাকানোতে নানান পক্ষের অপ্রস্তুতিতে বিরক্তির বোধ। বড়জোর একটা তাকানোর পদ্ধতি প্রস্তাব। উপরন্তু, পত্রিকাকে আমি আদালত ভ্রম করতে রাজি নই কিংবা পাঠককে বিচারকের জায়গা দিতেও নই। ঘটনা তিনটিকে অতীতকাল থেকে বর্তমানের দিকে না সাজিয়ে উল্টোটা করছি। 

২৮ জুলাই ২০২৪: প্রধানমন্ত্রীর দরবারে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের হাজিরা ও পতনোন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ে বিলাপ।[১] যে তিনটা ঘটনার কথা উল্লেখ করছি তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি ‘মিডিয়া-কভার্ড’ ইস্যু। মানে অন্তত ওই সময়ে সাইবার পোর্টালের কথা বিবেচনা করলে তা বলা চলে। কারণ নিশ্চয়ই আন্দোলনের বেগ। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যেহেতু আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল, ১৮ জুলাই থেকেই যেহেতু সড়কে শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালানো হয়েছে তাই পত্রপত্রিকা কিছুটা অধিক মূল্য দিয়ে থাকতে পারে। সরকারের নিন্দামন্দ হয় এমন পরিস্থিতিতে মিডিয়া-হাউজগুলো দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে থাকে তা আপনারা জানেন। বহুকাল ধরেই এই প্রবণতা। এর মধ্যে টিভিমাধ্যম সংবাদ-উৎস হিসেবে কাগজ-মাধ্যমের তুলনায় স্পষ্টত শ্লথগতিসম্পন্ন। মুদ্রণমাধ্যমে পর্যাপ্ত হৈচৈ শুরু হলেও টিভিমাধ্যমগুলো নিরোর-বাঁশিবাজানো মুডেই থাকে। একটা বিকল্প হিসেবেই সম্ভবত টিভিমাধ্যম কিছু লোককে টকশোতে বসিয়ে থাকে। আমি যে অঞ্চলটাকে বিশ্লেষক-অধ্যুষিত হিসেবে দেখছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছিলেন নারীপুরুষ উভয় ধরনের নেতাই। কিন্তু পত্রিকার (ওয়েবমাধ্যমে) খবর, বিশ্লেষণ করলে আপনাদের মনে হতে পারে যে কেবল বোধহয় নারীরাই গেছিলেন। তা নয়। বরং, উত্থিত আন্দোলনের মুখে পড়ে নিগৃহীত হবার অভিজ্ঞতা বর্ণনাতে ছাত্রলীগের নারীবৃন্দ অগ্রগামী ছিলেন। 

এক্ষেত্রে বিশেষভাবে আগের সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে এবং ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের উপর ‘সাধারণ’ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া ও ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ থেকে হঠিয়ে দেবার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে পেশ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী নেতৃবৃন্দ তা করেছেন, সঙ্গে থাকা ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দও বিষয়টাকে সেভাবে সাজানোতে কোনো ওজর-আপত্তি করেননি; এবং সর্বোপরি, পত্রিকাগুলোও সেই ফর্মুলাতেই আগিয়েছে। এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। পাঠককে নিম্নরেখা দিয়ে পাঠ করতে সুপারিশ করি। যে ছাত্রলীগ এমনকি একটা ছাত্রী হলের কমিটি গঠনের সভার ‘প্রেস-আইটেম’ বানানোর বেলাতেও কেন্দ্রীয় সিংহপুরুষদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ ছাড়া অনুমোদন করেনি, তাঁরা ‘নিগৃহীত’ হবার পরিস্থিতিতে ছাত্রীদেরকেই সম্মুখে রাখবার কারণ খুঁজে পেয়েছেন। এমনকি সফরকারী দলে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুরুষ ছাত্রলীগ নেতা থাকবার পরও, বিভিন্ন জায়গা থেকে সমরূপ ধাওয়ার অভিজ্ঞতা আগের সপ্তাহে তাঁদেরও ঘটবার পরও। প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের দুর্গতি বলবার পাশাপাশি তাঁরা অনুরোধ করছিলেন যেন বাহিনিগুলোকে ছাত্রলীগের নিরাপত্তার জন্য হুকুম দেওয়া হয়। (এই অশনিসংকেত থেকে প্রধানমন্ত্রী কী পাঠ করেছিলেন আর তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন তা সম্পূর্ণ আরেকটা জিজ্ঞাসা। এই রচনা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা বিষয়ে নয়।)               

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ০৩ ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত গণধর্ষণের ঘটনায় i¨v‡ei প্রেস কনফারেন্স।[২] আমার হিসেবে এই ঘটনাটি তিনটির মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ‘মিডিয়া-কভার্ড’ প্রসঙ্গ। কিন্তু সেটা হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনাটি। প্রেস কনফারেন্সটি নয়। এর আগে মানানসই মাপের একটা প্রেস কনফারেন্স আশুলিয়া থানার পুলিশও করেছিলেন, ফেব্রুয়ারির ৪ তারিখেই, সম্ভাব্য/উল্লিখিত আসামীদের একাংশকে ধরবার পরপরই। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা পর্যাপ্তহারে ঘটতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঘটে না এরকমও কেউ মনে করেন না। তবে জাহাঙ্গীরনগরের এই ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে এখানে ভুক্তভোগী থানা পর্যন্ত গেছিলেন, এবং থানাতে এক বা একাধিক সংবেদনশীল পুলিশ তিনি পেয়েছিলেন। তাতেও থানার পুলিশদের সংবাদ-সম্মেলনের ৪দিন i¨v‡ei পর পক্ষ থেকে প্রায় ৩০ মিনিটের একটা সম্মেলনকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা প্রয়োজন। তবে যেমনটা বলছিলাম, পত্রিকা তরফে, কিংবা বিশ্লেষক তরফে, এই সংবাদ-সম্মেলনটির গুরুত্বটা যথেষ্ট বিবেচনা করা হয়নি। সমরূপ ক্ষেত্রে প্রায়শই যেমনটা ঘটে থাকে, i¨ve যে পুলিশের থেকে অধিক কার্যকর ও দক্ষ সেই ভঙ্গিগ্রহণ, এই সম্মেলনে সেটাও ঘটেনি। বরং, i¨ve পরিমিতভাবেই পুলিশের তারিফ করছিলেন।

এই সংবাদ-সম্মেলনটি চোখে পড়বার সাথে সাথেই আমি ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম। যদিও পরে সার্ফিংয়ে খুঁজবার অনিশ্চয়তার কারণেই আমি ডাউনলোড করেছিলাম, তবে পরে ভিডিওটা ডিলিটেড হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কা আমার যে ছিল তা স্বীকার করি। এমনও নয় যে এর আগে বাংলাদেশের কোনো বাহিনির কোনো সংবাদ-সম্মেলনের ভিডিও আমি ডাউনলোড করে রেখেছি। কোনো না কোনোভাবে ৩০ মিনিটের দৈর্ঘ্যই আমাকে প্রাথমিক কৌতূহলী করেছিল। সেই সময়ে আমি ভিডিওটা দুবার দেখি। এখন এই রচনাকালেও একাধিকবার দেখি। (এই অংশটিকে গবেষণামনস্ক, গবেষণা-কাতর, গবেষণা-উদ্বিগ্ন, গবেষণা-উল্লসিত এবং গবেষণা-গৌরবান্বিত লোকজন মেথডোলজি হিসেবে যেন পাঠ করেন। বলা বাহুল্য, কী নামে সেইভ করেছিলাম তা ভুলে যাওয়াতে কম্প্যুটারে খুঁজতে আমার সার্ফিংয়ের চেয়ে কম কষ্ট হয়নি। আমি অনুচ্চারিত কথা, যদি থেকে থাকে, বুঝবার জন্য বারবার দেখেছি।) এটা ঠিকই যে, i¨ve কর্মকর্তাবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা সরকার কাউকেই দায়ী করেননি। এমনকি ছাত্রলীগকে দায় দিতেও কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং, একাধিকবার বলেছিলেন যে প্রধান আসামীর কোনো ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’র কথা জানা যায় না, যাকে পড়তে হবে তিনি ছাত্রলীগ করেন না এই দায়মুক্তি হিসেবে। কিন্তু সম্মেলনটিতে একটা প্রচেষ্টা ছিল যাতে মাদক ব্যবসার সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের অন্তত একটা খণ্ডচিত্র প্রকাশ পায়। সেই নেটওয়ার্কের কারক কারা হতে পারেন তা সম্মেলকরা উচ্চারণ করেননি, কিন্তু শ্রোতার অনুমানের কোনো সমস্যা হবার কথা নয়। এমনকি ‘অনৈতিক’ বা ‘এই ধরনের’ কাজ ‘হয়ে থাকে’ উল্লেখ করে সম্মেলকেরা ইশারা করছিলেন যৌননিগ্রহ একটা নৈমিত্তিক বিষয় ক্যাম্পাসগুলোতে। এগুলো বলবার সময় ‘আমার কথা নয়, আসামীর কথা’ হিসেবেও একাধিকবার ডিসক্লেইমার দেবার সতর্কতা প্রধান সম্মেলকের ছিল। কোন বর্গ নিগৃহীত হয়ে থাকেন সে বিষয়ে কোনোরকম দিকনির্দেশনা তাঁরা এড়িয়ে গেছেন। আর আশা করেছেন ‘নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন’ নিজের মতো সব বের করবে। বোঝাই যাচ্ছে, এই সম্মেলনটি প্রধান আসামীকে একদফা জিজ্ঞাসাবাদের পরের। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ধরনের কিছু ‘বের’ করেনি। ভীষণ রকমের নার্ভাস আমসত্ত্ব মুখে কদিন কাটিয়েছিলেন তাঁরা। একেবারেই ‘পার্টিসিপ্যান্ট ওবসার্ভেশন’ থেকে বলছি। এর দিন ১২ পরে, বের করেছিলেন আন্দোলনকারী দুই শিক্ষার্থীনেতাকে, বঙ্গবন্ধুর ছবি মোছার অভিযোগে।[৩] এই দুজন বামপন্থী ছাত্রনেতা আন্দোলনের মুখ্য চালিকাশক্তির অংশ ছিলেন। যা বলেনি, এমনকি বলবার ইশারাও করেনি, সেগুলোকে ‘রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনস’ করবার সামর্থ্য পাঠকের/শ্রোতার থাকলে ভাল হয়। তবে আমার মতো নিশ্চয়ই কেউ কেউ আছেন যাঁদের এসব প্রেস-কনফারেন্সের আবশ্যকতা নেই। ক্যাম্পাসগুলোতে কী চলে আসছিল, জাহাঙ্গীরনগরে কী চলছিল, তার একটা আন্দাজ করবার মতো ধীশক্তি, পর্যবেক্ষণগুণ এবং সরকার ও ছাত্রলীগের প্রতি আনুগত্যহীনতা সবই মজুত আছে (এবং ছিল)। 

০৬ ডিসেম্বর ২০২২: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনে ওবায়দুল কাদেরের ‘বড়ভাই মেইনটেইন’ করবার বিষয়ে উষ্মাপ্রকাশ।[৪] এই তারিখটার একটা নির্দিষ্ট পূর্বসূত্রও আছে। ১৮ নভেম্বর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিলের একটা দপ্তর উপ-কমিটির সভায় তিনি এই কথাটা আরেকবার বলেছিলেন। সেবার বরং আরেকটু খোলাসা করেই তিনি লিঙ্গ-মাত্রাটি হাজির করেছিলেন। সেখানে ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় নারীরা যে বড় গলায় বলেন ‘আমি অমুক ভাইকে মেইনটেইন করি’ সেটাই তাঁর উষ্মার ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বিশেষভাবে ইডেন কলেজের ছাত্রলীগের মেয়েদের ইঙ্গিত করছিলেন। হয়তো পার্টি অফিসের মধ্যে বলে অধিক খোলতাই করেছেন। ফলে ০৬ ডিসেম্বরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সট্যুটের সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যটিকে দেখতে হবে আগের দিনের বলা বিষয়বস্তুর পুনরুচ্চারণ হিসেবে। কিন্তু তারও আগে, সেপ্টেম্বর মাসে, ইডেন কলেজের খোদ ছাত্রলীগেরই কিছু নেতা কলেজ ছাত্রলী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটা অভিযোগ আনেন–সিটবাণিজ্য, চাঁদাবাজি, এবং সাধারণ ছাত্রীদের চাপ দিয়ে ‘অনৈতিক’ কাজে বাধ্য করা।[৫] পাঠকমাত্রই জানেন এখানে ‘অনৈতিক’ শব্দটাকে পাঠ করতে হবে যৌনকাজ হিসেবে। ইডেন কলেজের প্রশাসন, ক্রমাগত আন্দোলনের চাপের মুখে, একটা তদন্ত কমিটি করতেও বাধ্য হন। তাঁরা ‘তদন্ত’ করে জানান যে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার ‘সত্যতা’ পাওয়া যায়নি।[৬] ২০২২ সালের ইডেন কলেজ প্রশাসন যে এই সিদ্ধান্তে আসবেন তা তদন্তের আগেই সকলের আন্দাজ করতে পারার কথা। ইডেন কলেজে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেও ইডেন কলেজকে একমাত্র উৎপত্তিস্থল হিসেবে না দেখে দেখা দরকার অন্যতম উপসর্গস্থল হিসেবে। ফলত, ওবায়দুল কাদেরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মন্তব্য কমবেশি আগের মাসগুলোতে বেনাকাব কিছু ঘটনার উপর ‘দায়িত্বপালনসুলভ আলোকপাত’ হিসেবে।

‘মিডিয়া-কভার’ হিসেবে দেখলে, আমার মূল্যায়নটি হয়তো বিশেষ দুর্বল ঠেকবে যে এটা তিনটার মধ্যে সবচেয়ে কম চর্চিত হয়েছে। কারণ, পাঠক এখন গুগল করেও অনেকগুলো সংবাদ বের করে ফেলতে পারবেন। বেশি পারবেন ০৬ ডিসেম্বরের কাদের মন্তব্য নিয়ে। অনেকগুলো পত্রিকাই তাঁর বক্তব্যের ‘মেইনটেইন’ অংশটাকেই শিরোনাম বানিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত কম পাবেন ১৮ নভেম্বরের পার্টি অফিসে করা মন্তব্যের সংবাদ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে কম চর্চিত হয়েছে বলতে আমি বোঝাচ্ছি জনাব কাদেরের এই বাক্যমালা বলবার অন্তর্নিহিত অর্থকে যেভাবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় খোলাসা করবার দরকার ছিল তা সংবাদমাধ্যম তরফে করা হয়নি। যে চাপেই হোক, ওবায়দুল কাদের যতটুকু বলেছেন ততটুকুকে ‘প্যানডোরার বাক্স’ হিসেবে না-দেখার সুযোগ ছিল না। তার আগের মাসগুলোতে ইডেন কলেজের প্রকাশ্য অভিযোগ, এবং সেইসূত্রে জন-আলাপে গুজগুজ ধরনের চাপা-অভিযোগ বাতাসে ঘুরছিল। ফলে সংবাদমাধ্যমের খোলাসা করবার পর্যাপ্ত কারণ ও পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সংবাদমাধ্যমগুলোর উপর বেশুমার চাপ ছিল তা অবশ্যই মনে রাখছি। কিন্তু এই আলোচনাটার উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যমকে অভিযোগ করা বা দায়মোচন দেয়া কোনোটাই নয়। একটা পরিস্থিতির পর্যালোচনা হিসেবে অবশ্যই দাবি করছি আমি যে, কাদেরের সম্মেলনে উল্লেখের পর একটা সেল্ফ-সেন্সরশিপ সংবাদমাধ্যম পালন করেছে। বরং, যে হৈচৈ দানা বেঁধে উঠছিল আগের মাসগুলোতে, সেটার সমাধি দিয়ে দেওয়া হয় খোদ কাদেরের বক্তব্যটির একটা লঘু পরিবেশনার মাধ্যমে। সেখানে এমনকি ‘মেইনটেইন’ কথাটার লিঙ্গমাত্রাকে বিচার করবার দায়িত্বও নেওয়া হয়নি। এটা উভপক্ষেই একটা উইন-উইন ব্যবস্থাপনা। আওয়ামী সরকার আগের বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান লৈঙ্গিক নিগ্রহের চাপা-গুঞ্জন এবং , বিশেষত আগের মাসগুলোতে প্রকাশ্য লিঙ্গনিগ্রহের অভিযোগকে পার্টির সেক্রেটারির মুখে-বলিয়ে একটা মৃদু কবুলিয়তনামা বানাল। আর সংবাদমাধ্যম সেটাকে নিছক শিরোনামেই যথাসম্ভব ধ্যাবসা আকারে হাজির করে গভীর অনুসন্ধানের রাস্তা পরিত্যাগ করবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপ্রদান করল। রাজনীতি-বিশ্লেষকরাও কমবেশি নিজ-নিজ কাজে ফেরৎ গেছেন। তাঁদের মুখস্ত বিশ্লেষকের চাকরিতে।

ভুক্তভোগী নারী, উত্থানপর্বের নারী

২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনেও ব্যাপকহারে ছাত্রলীগের কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। আরও বিশেষে, ব্যাপকহারে নারী ছাত্রলীগ কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। উপরন্তু, কোটা আন্দোলনে নিছক কোটাসংক্রান্ত সংক্ষোভই পুঞ্জীভূত হয়নি। সেখানে নানান ধরনের নিগ্রহ থেকে জন্মানো সংক্ষোভ জড়ো হয়েছিল। সেটা আর কেউ না জানলেও আওয়ামী হেডকোয়ার্টার স্পষ্টভাবে জানত। কিন্তু এগুলো এমন প্রসঙ্গ যে প্রমাণ করা যাবে না। ফলে ধরে নেওয়া যায়, আমার বলতে ইচ্ছা করল বলে বললাম। হাউশ মেটানো আরকি! এই প্রসঙ্গে বিশদে যাবার আগে আমি আরও একটা বিষয়ে, একাধিক জায়গায় বলা সত্ত্বেও, আপনাদের চোখে বা মনে না-পড়তে পারে এই আশঙ্কায়, আবারও বলতে ইচ্ছুক। আওয়ামী লীগের হেড কোয়ার্টার চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাতে আন্দোলনকারীদের আপত্তি যেভাবেই হাজির/পরিবেশন করে থাকুক না কেন, আন্দোলনকারীরা যতটা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন যা করেননি তা সত্ত্বেও, আন্দোলনকারীদের যতটা আপত্তি ছিল ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে, তার থেকে অনেক বেশি সমস্যা হচ্ছিল এই ৩০ শতাংশের স্থানীয় অনুবাদ নিয়ে। আপনাদের কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ বা ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেটর হতে হবে না এটা জানতে যে এই ৩০ শতাংশ সোজাসাপ্টা বেচাবাট্টা হচ্ছিল।[৭] এই বেচাবাট্টা ননক্যাডার সরকারী চাকরিতে চরম আকার ধারণ করেছিল। আর বলা বাহুল্য যে, বেচাবাট্টার এই নেক্সাসটা স্থানীয় আওয়ামী ক্যাডারদের (এটা একটা যন্ত্রণা যে ক্যাডার মানে সম্পূর্ণ দুইটা জিনিস) সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ছিল।

ছাত্রলীগের নারী কর্মীদের বড় অংশের রাজনৈতিক জীবনযাপন নিয়ে আমি আকস্মিকভাবে ভাবতে বসিনি। এটার একটা ধারাবাহিকতা আছে। গবেষণা-কাতর সহকর্মী বন্ধুদের জন্য জানাতে চাই যে, গবেষণা পদ্ধতিতে আমি ফেইল করতে পারি। তবে তাঁরা যদি আমাকে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করেন তাহলে আমিও কুঁতেমুতে বলব যে আমার পদ্ধতি গুণগত দীর্ঘমেয়াদী বা কোয়ালিটেটিভ লংগিচুডিনাল; কিংবা আমার পদ্ধতিকে আমি ঠেলেঠুলে উপাত্ত ত্রিভূজীকরণ বা ডেটা ট্রায়াংগুলেশন নামে চালাব। এমনকি সবচেয়ে আরামে বলব সোশ্যাল বা রিচুয়্যাল ড্রামা পদ্ধতি হিসেবে। ২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আমার প্রচুর সংলাপ হয় ছাত্রলীগের নারীদের অনেকের সাথে। প্রধান মাধ্যম হিসেবে সাইবার যোগাযোগই ছিল অবলম্বন। কিন্তু আজকের রচনায় তাঁদেরকে ‘উত্তরদাতা’ বা রেস্পন্ডেন্ট মর্যাদায় পর্যবসন করব না; এমনকি ছদ্মনামেও। সেটা নিছক এই কারণে নয় যে, আমি অনুমতি নিইনি। মুখ্য কারণ, আমার পদ্ধতিতে এটা একটা টাইমবাউন্ড গবেষণাই নয় যেখানে প্রচলিত বিধিমালা বা মানদণ্ড কাজ করতে পারে। ফলে ওটা আমার রাস্তা হবে না। তবে এই বিষয়বস্তুতে আমার কৌতূহলের আকস্মিকতা নেই দাবি করেছি যেহেতু, আমি অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের দুইটা তৎপরতার বিষয়ে পাঠককে জানান দেব। প্রথমটা হলো, ২০১৪ নির্বাচনের পরপরই ছাত্রলীগে নারী কর্মী বাড়ানোর জন্য জোর-তৎপরতা। বিপণনের দুনিয়ায় এর নাম ‘এগ্রেসিভ মার্কেটিং’ বা ‘এগ্রেসিভ ক্যাম্পেইন’। বিপুল হারে নারী দলে সংযোজন একটা কেন্দ্রীয় উদ্যোগ হিসেবে পাঠ করবার কারণ পাই আমি। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, ২০১৩ সাল থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (NSI: National Security Intelligence) বাহিনিতে বিপুল পরিমাণে নিয়োগদান। আগ্রহীরা জানেন যে এই দপ্তরটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পরিচালিত হয়। ২০১৩ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নবায়ন করা হয় যাতে আরও শিথিলশর্তে বা শিথিলবিধিতে এই নিয়োগগুলো দেয়া যায়।[৮] অন্যান্য পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় নারীদের নিযুক্তি লক্ষ্য করবার মতো বেশি ছিল। অবশ্যই নির্ভর করে যে কে কে লক্ষ্য করছেন। আমার উত্থাপিত দুইটা তৎপরতা যা আমাকে কৌতূহলী করেছে তার প্রথমটা কালের বিচারে ঘটেছে পরে, আর দ্বিতীয়টা ঘটেছে আগে। তবে আমি কাল উল্টে লিখবার কিছু সুবিধা পেয়েছি। এর মধ্যে একটা সংসদ নির্বাচন ঘটে গেছে বলে। অধিকন্তু, ম্যানিপ্যুলেটিভ নির্বাচন ঘটেছে সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে; এবং অতি-অবশ্যই ২০১৩ সালে শাহবাগ উত্থানের বিষয়টাকে আওয়ামী হেডকোয়ার্টার নারীকর্মী রিক্রুটের সময়ে বিবেচনায় রেখেছে চিন্তা করে। আজকে সাংস্কৃতিক-রাজনীতিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর কিছু পক্ষ যতই ‘শাহবাগী’ পদটিকে জেনেরিক এবং অটুট-আওয়ামীমনস্ক পক্ষ হিসেবে দেখান না কেন, আওয়ামী হেডকোয়ার্টার এবং রাষ্ট্রপরিচালনার অক্ষশক্তি/নেক্সাস[৯] শাহবাগের জমায়েতকে যথেষ্ট অনুগত ভেবে কর্মপরিকল্পনা শুরু করেনি। এই দুটো তৎপরতা ঘটেছে যথেষ্ট আগে; দুটো ঘটনাকেই দেখা চলে পর্যাপ্ত লিঙ্গসচেতনতা হিসেবে; দুটোই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রীর তখনকার নারীকেন্দ্রিক ঢাকঢোলের সাথে মানানসই ছিল–এসব সত্ত্বেও আমি দেখতে শুরু করি রাজনীতিতে লিঙ্গ-ম্যানেজমেন্ট কৌশল হিসেবে। সেটা আমার জন্য একটা অনায়াস কৌতূহল সৃষ্টি করতে পেরেছিল। ফলে উত্তরকালে আমি ম্যানেজমেন্টের পরিধি বুঝতে গিয়েই সেসব নিগ্রহ আন্দাজ (ও পাঠ) করতে শুরু যা নিয়ে এই অংশটি ব্যাপৃত। বলা বাহুল্য যে, ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসবার ঢের আগেই আমার এই উপলব্ধি তৈরি হয়।

২০২২ সালে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের একাংশের পক্ষ থেকে অভিযোগ উত্থাপন সকল অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অবশ্যই চমকে যাবার মতো ছিল। তবে এটাকে আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখার ভুল করা যাবে না। এই অভিযোগ বহুদিনের প্রস্তুতির একটা বহিঃপ্রকাশ। আমার প্রস্তাব হবে, এটাকে নিছক ইডেন কলেজের বিষয় হিসেবে দেখাও ত্রুটিপূর্ণ। ইডেন কলেজ তামাম বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন ছাত্রলীগের কমিটির মধ্যকার কিংবা সমর্থক পর্যায়ের ‘একদা-এম্বিশাস’ নারীদের বড় একটা অংশের স্মারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইডেনের সেই ছাত্রলীগের নেত্রীবৃন্দ নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে, নিজেদের নিরাপত্তাকে বাজি রেখেছিলেন। আর তার প্রস্তুতি তাঁরাও নিচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। যাঁরা আরও গভীরে এসব অনুসন্ধান চালাবেন, তাঁরা অন্তত ২০১৮ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের কাল পর্যন্ত এই মানসিক প্রস্তুতির সূচনাবিন্দু খুঁজে পেতে পারবেন। ভোঁতামাথার পাঠক যাতে এরকম একটা অংক কষতে না বসেন যে ২০১৮র ইডেন ছাত্রীরা তো ২০২২-এ আর কলেজে নেই, সেই সতর্কতাতে বলি যে, ক্যাম্পাসগুলোর সামাজিক অভিব্যক্তি বা প্রক্রিয়া এরকম সরল সেশন-মেপে হয় না। এটা একটা নিরন্তর প্রবহমান এলাকা। অন্য যে অভিযোগগুলো তোলা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। সংশ্লিষ্ট বলতে আপাতত পত্রিকামাধ্যমের পাঠক এবং বহুমুখী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী বোঝাচ্ছি। পণ্ডিত ও পাণ্ডিত্যসেবনকারীদের কথা আলাপে আনছি না আপাতত। সিটবাণিজ্য, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি বিষয়ে কমবেশি সকলেরই প্রস্তুতি ছিল। কিছুক্ষণ আগে চমকে-যাবার-মতো বলছিলাম এই অভিযোগ-উত্থাপনকে। ‘অনৈতিক কাজে বাধ্য করা’ তথা যৌননিগ্রহের অভিযোগটাকেও ঠিক ‘কেউ জানত না’ হিসেবে দেখা চলবে না। বরং, একটা কানাঘুষা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং আরও বিশেষে ছাত্রলীগের ছাত্রীকর্মীদের মধ্যে চলছিল অনেকদিন ধরেই। তারপরও, এই ধরনের প্রায় প্রশ্নাতীত ক্ষমতাকাঠামোর সামনে মারাত্মক রাজনৈতিক ও জীবন ঝুঁকি নিয়ে হাজির করবার একটা নাটকীয় নিস্তব্ধতা তৈরি হয়েছিল। আমার বিবেচনায়, উত্থাপনকারীদের দিক থেকে এটা ছিল এস্পার-ওস্পার একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ‘চাল’ পদটা ব্যবহার করলাম না এর সাথে অবধারিত নেতিবাচক দ্যোতনা সম্পর্কিত থাকবার কারণে। তবে দীর্ঘমেয়াদী, অন্তত কয়েক বছরের–যেমনটা বলছিলাম অন্তত ২০১৮ পর্যন্ত ছাত্রলীগের ছাত্রীদের এই প্রস্তুতিকে শনাক্ত করা যাবে–রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রদবদলের একটা আকাঙ্ক্ষাকে পাঠ করতে চাইলে একে ‘চাল’ বলা সম্ভব। খুবই উচ্চমূল্য চাল। টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট পরিভাষাতে যেটাকে বলা হয় ‘হাই রিস্ক হাই রিওয়ার্ডিং’। 

সম্ভবত, উত্থাপনকারীদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না। তাঁরা আর কোনো উপায়ে তাঁদের আপত্তি প্রকাশ করতে পারছিলেন না। সম্ভবত, তাঁরা ভাবছিলেন যদি এই হাইভোল্টেজ অভিযোগ চারপাশ নাড়া দিয়ে ফেলে তাহলে এভাবেই কেবল একটা বিহিত হতে পারে। মাত্র মাস দেড়েক পরেই, কাউন্সিলে ওবায়দুল কাদেরের একটা মাত্র ধমকভঙ্গির উচ্চারণের মধ্যেই সমস্ত যৌননিগ্রহ প্রসঙ্গের নিষ্পত্তি ও যবনিকাপাত হবার মাধ্যমে উত্থাপনকারী ছাত্রলীগের ছাত্রীদের সেই সম্ভাব্য আশঙ্কা অমূলক ছিল না যে সেটাই প্রমাণ হলো। ফলে, আমাদের অনুমান করে নিতে পারলে ভাল, যাঁরা বুঝবার চেষ্টা করেছেন বা করবেন তাঁরা তো অনুমানের বেশিই পারবেন যে, কোটাবিরোধী আন্দোলন আবার দানা বাঁধবার পরেই বিপুল সংখ্যক ছাত্রলীগের ছাত্রীরা হলে হলে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, কলেজে কলেজে দ্রুততার সাথে প্রতিরোধী স্রোতে শামিল হয়েছিলেন। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ঘটেছে সেরকমই। এই পর্যালোচনায় লিঙ্গপ্রশ্নে ওবায়দুল কাদেরকে কীভাবে বিবেচনা করা দরকার তা নিয়ে আমি একেবারেই ভাবনা দিইনি। মনে হয়নি যে আমার ভাবতে বসার কিছু আছে। পাঠকদের কেউ অতি-উৎসুক হয়ে পড়লে, নিজ পছন্দের নিষ্ঠাবান কোনো আওয়ামী কর্মীর সাথেই বরং আলোচনা করে নেবেন।                  

পৌরুষ-সংহতি বা নারীবিদ্বেষী মহাঐক্য

২০২৪ আগস্টের পর সাইবার আওয়ামী লীগ কর্মী/নেতাদের বিলাপ আর হুংকার আজকের আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক। আবার পুরোটা নয়, দুইটা দিক থেকে সম্পর্কিত। প্রথমটা হলো, ‘বিদেশী শক্তির ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বটা প্রধানত এঁদের সাফল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো উত্থানকেই তাদের কৃতকর্ম ও প্রজেক্ট হিসেবে দেখানোর বাহাদুরি এই থিসিসটাতে মদদ দিয়েছে মাত্র। এখন আওয়ামী অনুসারী নয় এমন বহু মানুষেই এই থিসিসের অনুসারী। কোনো একটা উত্থানে নানান পক্ষ নানান স্বার্থ নিয়ে থাকেন, এবং মওকামতো বিকশিত হন এই সাধারণ জ্ঞানের থেকে এই ইঞ্জিনিয়ারিং তত্ত্বটা ভিন্ন। এই তত্ত্বে উত্থানটাকে একটা গাণিতিক ফর্মুলার মতো কল্পনা করা হয়। পাঠকের মনে পড়বে, ০৫ আগস্টের পর জয় প্রথম সাইবার-আত্মপ্রকাশেই জনগণের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের ভুল শুধরে তাঁরা রাজনীতি করবেন এরকম অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন। প্রথম সপ্তাহে ওটাকেই আওয়ামী লীগের স্বর ধরে নিতে হবে। তবে খুব দ্রুত, মোটামুটি ১৫ আগস্টের মধ্যেই, এই স্বর পরিহার করে ‘১০০-ভাগ ইঞ্জিনিয়ারিং’ তত্ত্বে আওয়ামী লীগ বা এর হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ প্রবেশ করে।[১০] এবং, এরপর আর কখনো স্বরবদল করে না। দ্বিতীয় যেভাবে এই নেতৃ-কর্মীবৃন্দের হুংকার সম্পর্কিত তা পৌরুষ বা ম্যাস্কুলিনিটির, নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনির পাটাতনের অটুট-অখণ্ড সৈনিক হিসেবে। এখানে অটুট-অখণ্ড বলবার মাধ্যমে কেবল তাঁদের নিজেদের পৌরুষসংহতিই বোঝাইনি, বরং ২০২৪ উত্থানপর্বের বিজয়ী কয়েকটা পক্ষের সাথেও এই প্রশ্নে তাঁদের সংহত-অটুটভাব বোঝাচ্ছি। সিপিগ্যাংয়ের উদ্ভব ও বিকাশে মনোযোগ দিলে এই সংহতির জমিন বিষয়ে আমার বক্তব্য অনুধাবন সহজ হবে। বুঝবার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত আর নারীদের মধ্যে সিপিগ্যাংয়ের টার্গেটকরণ কৌশলের তুলনা যদি করেন তাহলে সহজেই সম্ভব। নারী বলতে এমনকি নন-আওয়ামী সেক্যুলার নারীও।

জন-আলাপে অনেককেই বিস্মিত হতে দেখেছি, এখনও দেখি। তাঁরা বুঝে পান না যে শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভাতে বিশেষ কিছু মন্ত্রীর সংযোজন হয়েছিল কেন। আমি আবার বুঝে পাই না, বিজ্ঞ মানুষজনও অবুঝ হন কীভাবে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে নানাবিধ কম্বিনেশনের মন্ত্রীসভা হয়েছিল তা তো সকলেই জানেন। যদি সেগুলোতে মনোযোগ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যায় যে একটা পর্যায়ে, বিশেষত ২০১৮ নির্বাচনের পর থেকে, সেখানে দুইটা কেন্দ্রীয় পলিসি কাজ করেছে। বণিক-সমরতন্ত্রের অলিগ্যার্কি থেকে নিয়োগদান এবং সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের ‘বন্ধু’ তালিকা থেকে নিয়োগদান। এখানে প্রথমটা এতটাই সাধারণ বোধবুদ্ধির বিষয় যে তা নিয়ে বিশদে আলোচনা না করলেও চলে। কেবল, যদি কেউ আপত্তি করে আমলাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অংশটাকে বিবেচনা করিনি ধরে নেন, তাঁকে বলবার আছে যে অলিগ্যার্কি শব্দটা ব্যবহার করেছি সকলের অংশগ্রহণে কোর নিউক্লিয়াসটাই বোঝাতে। বণিক-সমরতন্ত্র খোদ একটা যথাসম্ভব জাঁদরেল বর্গ বটে। দ্বিতীয় প্রবণতাটিও লক্ষ্য করবার মত। করেছেনও লোকজন। হয়তো বলবার সময় ঠিক ওভাবেই যুক্তিসজ্জা করেন না। অনেক লক্ষণ আছে যার থেকে মনে করা যেতে পারে যে শেখ হাসিনা নিজক্ষমতাবলয় প্রায় আমৃত্যু সুরক্ষিত মনে করবার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জয়ের জন্য অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক একটা মন্ত্রীসভার দিকে ধীরে ধীরে রওনা হচ্ছিলেন। এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অবধারিতভাবে উপেক্ষিত হতে থাকেন বর্ষীয়ান নিবেদিতপ্রাণ পাকাপোক্ত সাংসদ/পার্লামেন্টারিয়ান ও ঘাঘু নেতৃবৃন্দ। একদমই ধারাবাহিকভাবে। এর অন্যদিকটা আরও সূক্ষ্ম। ধারাবাহিকভাবেই পৌরুষভারাক্রান্ত গাদাগাদা মন্ত্রী হতে থাকেন। তবে তাঁদের অফিসিয়াল ক্যাটেগরি দাঁড়ায় ‘তরুণ নেতৃবৃন্দ’। এঁদের সামগ্রিক লিঙ্গদর্শন বা যৌনজীবনের খোঁজ নেবার জন্য আমরা অতি সাধারণ মানুষ। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের কীর্তি জনদরবারে হাজির হবার কারণে তাঁর নামটা সকলের মনে থাকতে পারে, কিন্তু শান্ত মাথার কোনো বিশ্লেষক নিশ্চয়ই সংখ্যাটা একেই সীমিত রেখে ভাবেন না। 

ছাত্রলীগের, আওয়ামী লীগের নারীদের বড় বড় অংশ বিভিন্ন কলেজে-ক্যাম্পাসে ২০২৪-এর জুলাইয়েই পার্টি-আনুগত্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এখানে পার্টি-আনুগত্যকে দেখতে হবে স্ট্যাটাস-কো’র মধ্যকার পুরুষ নেতাদের চক্রের প্রতি নিরুপায় আনুগত্য হিসেবে। এই প্রত্যাহার বুঝবার জন্য সার্ভে করে আগাতে পারবেন না। এটা উপলব্ধির জন্য খুবই শান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদী নানাবিধ লক্ষণকে পুনর্তদন্ত করতে হবে আপনাদের। এমনকি অনেক বছর ধরে মনোযোগ অতীতে না দিয়ে থাকলে আজকে আমার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেও বুঝে উঠতে না পারেন। সাধারণ ছাত্রীরা, মফস্বলের সাধারণ নারীরা, কিংবা কলেজে-ক্যাম্পাসে বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ করতে-থাকা নারীদের ভূমিকা তৈরির ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ‘বিদ্রোহী’ সাধারণ ছাত্রী ও নেতৃবৃন্দের অবস্থানবদল বিশাল অনুঘটকের কাজ করেছে। কোনোরকম সন্দেহ ছাড়াই মীমাংসায় আসতে পারেন যে, নারীদের এই ঐক্য আপৎকালীন যেমন, শক্তিশালী লিঙ্গবন্ধনও বটে। 

সমাপনী অনুচ্ছেদে আমি যা বলব তা বিদ্যাজগতে স্পেকুলেটিভ (বা আন্দাজে বলা) হিসেবে মহানিন্দিত। বিদ্যাজগত থেকে ডিডাক্টিভ-হারমিউনেটিক ধারাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিতে বিশাল কারখানা প্রস্তুত। আমার সহকর্মীরাও মানানসইভাবে প্রস্তুত। তা থাকুন। আমার আগের অনুচ্ছেদগুলোকেও এই গম্ভীরমুখো গবেষকবৃন্দ বিশেষ পাশ করতে দিতে না চাইতে পারেন। তাই আলাদা করে দুশ্চিন্তা করছি না। আমার বক্তব্য এই নয় যে, ০৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর পৌরুষসংহতির পুনর্জাগরণের জন্য এসব নারীরা প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন অন্তত এই কারণেও যে আগের ১০-১২ বছর ধরে দফায় দফায় নাগরিক পরিমণ্ডলে তাঁরা পাল্টা-প্রতিরোধ করেছিলেন, এবং বানানো-জমিন হারিয়েছেন। বড় মাপে এই অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়েছে ২০১৩’র শাহবাগ উত্থানোত্তর কালে, ২০১৮’র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরের কালে। কিন্তু তারপরও উত্থানপর্বের অধিনায়কদের কাছ থেকে এত দ্রুত লিঙ্গপ্রশ্নের প্রতি অবজ্ঞার জন্য নারীরা প্রস্তুত ছিলেন বলে আমি মনে করি না। কীভাবে ২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি লিঙ্গপ্রশ্নে আকাট-সাবেক মডেল অনুসরণ করেছে, এমনকি ক্ষেত্রে বিশেষে থিওক্রেটিক শাসনশক্তির সাথে আপোষের মাধ্যমে আরও কঠোর মডেল অনুসরণ করেছে তা সম্পূর্ণ আরেকটা স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয় হতে হবে। যাঁরা ভাবছেন, এনসিপির অগ্রগামী নারীরা জিনিসটা আগেভাগে বোঝেননি, তাঁদের সাথেও সহমত হবার সম্ভাবনা আমার কম। তাঁরা ন্যূনতম আলামতেই বুঝেছিলেন; তবে একটা সদ্যবদলকৃত পরিস্থিতিতে নিজেদের লিঙ্গরাজনীতির লেভারেজ খুঁজতে তাঁদের মনোযোগী হতে হয়েছিল। চতুষ্পার্শ্বে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার বিস্তর নজিরের মধ্যে সতর্কতামূলক কৈফিয়ৎ দেয়াই ভাল যে, যৌননিগ্রহ আর লিঙ্গবৈষম্যকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা চলবে না। একথা ঠিকই যে, আজকের আলোচনায় ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মধ্যকার উত্থাপিত যৌননিগ্রহের অভিযোগটিকে কেন্দ্রে রেখেছিলাম। সেটা বৃহত্তর লিঙ্গবৈষম্যের একটা উৎকট অংশ মাত্র। পক্ষান্তরে, শেষের অনুচ্ছেদে বলেছি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে লিঙ্গবৈষম্যের কোনো অবসান তো হয়ই নাই, বরং ক্ষেত্রেবিশেষে থিওক্রেটিক ইনডক্ট্রিনেশন কঠোর হয়েছে। আমার সাধারণ প্রতিপাদ্যটি হচ্ছে, ছাত্রলীগের অগণিত নারীকর্মীদের প্রারম্ভিক বিদ্রোহকে উধাও করে দেবার মাধ্যমেই এই পৌরুষসংহতির সূচনা ঘটেছিল।   

টীকা:

১। এই ঘটনার সাইবার পদচিহ্ন খুব কম। সম্ভবত, কিছু পত্রিকা আন্দোলনের ওই পর্যায়ে কার্যত একটা ‘মিডিয়া-কভারেজ’মূলক সংবাদ এড়িয়ে গেছে। কিছু ‘মুখ্য’ পত্রিকা হয়তো ২০২৪-আগস্টের পরে নানাবিধ চাপে অনলাইন থেকে এরকম ছাত্রলীগের প্রমোশনাল খবর সরিয়ে থাকতে পারে। মানে সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছি না। ছাত্রলীগের পুরুষ নেতৃবৃন্দ যে উপস্থিত ছিলেন, অন্তত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সেই তথ্য দিচ্ছে আরও কম সংবাদমাধ্যম। সব মিলে দুটো অন্তত খবরের লিংক দিচ্ছি:

https://khaborerkagoj.com/politics/822913

https://www.dhakatimes24.com/2024/07/29/360532 

২। এটার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনেক সুলভ, এখনও। তাও অন্তত দুই দফার খবর। ০৪ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার আসামী ধরবার পর। দ্বিতীবার র‍্যাবকর্তৃক অপর দুজন আসামী ধরা পড়বার পর, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। এই দিনেরই কার্যক্রম অসরাচর দৈর্ঘ্যের ও রিডিং-বিটুইন-দ্য-লাইনের র‍্যাব সংবাদ সম্মেলন। একটা দৈবচয়নকৃত খবর:

https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/iraei0ts5l

৩। এই বিষয়ে বিবিসির খবর: 

https://www.bbc.com/bengali/articles/c72gp6gem50o

৪। এই খবরের ফুটপ্রিন্টই বরং এখন সুলভ। একটা প্রতিনিধিত্বশীল সংযোজন মাত্র:

https://www.banglatribune.com/politics/awami-league/775959/

৫। মনে হয় না যা ও যতটুকু খবর আছে সাইবারে তা কেউ ডিলিট করবেন আর। প্রথম আলোর খবর:
https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/bgeqzrghzm 

৬। বাংলা ডেইলি স্টারের খবর: 

https://bangla.thedailystar.net/youth/education/campus/news-401471 

৭। আকালের মধ্যেও একটা দুটো খবর পাওয়া যায়:

https://samakal.com/international/article/2309196014 

৮। যা বুঝলাম ২০১৩-তে প্রথমবারের মতো “জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা ২০১৩” নামে একটা সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধিমালা প্রণীত হয়, এনএসআইয়ের জন্য। এর আগে ১৯৭৯ সালের “বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পরামর্শকরণ) প্রবিধিমালা, ১৯৭৯,” “প্রেষণ প্রবিধান ও সার্ভিস রুলস,” এবং ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্রপতির বিশেষ নির্বাহী আদেশের আওতাভুক্ত “বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ ও অ্যাডহক নিয়োগ বিধি” দিয়ে নিয়োগগুলো পরিচালিত হতো। ২০১৩র বিধানে সুস্পষ্টভাবে এটাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আওতাভুক্ত করা হয়; মোটামুটি ৪৫টা বর্গে নিয়োগের বিধান রাখা হয়, একদম ক্লিনার সুইপারের মতো নিম্নস্তরের চাকরিগুলো সমেত। এর মধ্যে আমার আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক হচ্ছে ৬ষ্ঠ ক্রমে থাকা সহকারী পরিচালক পদটি। এখানে শতকরা ২৫ ভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে, এবং বাকি ৭৫ ভাগ সরাসরি নিয়োগের বন্দোবস্ত রাখা হয়। এই বদলটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩তে প্রণীত হবার সাথে সাথেই প্রায় ২০১৪তে একটা সংশোধনী আসে। আপাত অগুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই সংশোধনীতেই আওয়ামী শাসনযন্ত্রের তদানীন্তন কোটানীতির সাথে মানানসই করে গড়ে তোলা হয়। নারীদের সম্পৃক্তি বাড়ানোর জন্যও কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইত্যাদি। ২০২২-এ আরেকটা সংশোধনী আসে যাতে সম্ভবত প্রযুক্তিতে কিছু গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আমার আন্দাজ হলো, এটুআই ইত্যাদির সাথে পেঁচায়ে-পুঁচায়ে কিছু করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এগুলোতে সময় দিলেই আরও বোঝা সম্ভব। আপাতত কারো কৌতূহল থাকলে, জ্যান্ত আছে বিধায়, ২০১৩র গেজেটখানা দেখে নিতে পারেন। 

https://objectstorage.ap-dcc-gazipur-1.oraclecloud15.com/n/axvjbnqprylg/b/V2Ministry/o/office-legislativediv/2024/12/ad73a141ae5344deb0a78f41a44a235b.pdf 

৯। অধুনা, মুখ্যত সাইবারালোচনা থেকে উদ্ভূত ও বিকশিত, ‘ডিপস্টেট’ পদটা দিয়ে যা বোঝানো হয় তাও বলতে পারতাম, তবে অধুনা এই শব্দটা প্রায় মিলিটারির সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাতে আমার অশান্তিই কেবল যে হয় তা নয়, চরম আপত্তি আছে, আমার জন্য ‘ডিপস্টেট’ বরং অক্ষশক্তি/নেক্সাসের দ্যোতনা বেশি বহন করে। মিলিটারির দায়মোচন ঘটিয়ে একটা ৯০-দশকের সিভিলসমাজের ভার সিন্দাবাদের ভূতের মতো বহন করলাম বৃদ্ধ বয়সাবধি। এখন আবার ‘মিলিটারি মিলিটারি’ জিকির তুলে অবধারিত ‘সিভিল’ মার্কা মানুষদের সাথে এদের অলিগ্যার্কের অর্থহ্রাস করবার বৌদ্ধিক অপরাধ করতে আমি রাজি নই। 

১০। আওয়ামী লীগে হেডকোয়ার্টার বা এর সাইবার-পরিচালক অংশ ইত্যাদি এখন কমবেশি একাকার, অটুট, অভিন্ন। তৃণমূল আওয়ামী লীগকর্মী কিংবা নিষ্ঠাবান আওয়ামী কর্মীদের কণ্ঠস্বর শ্রুত নয় একটুও। তাঁদের বিদঘুটে রকমের জীবনলড়াইও আলোচিত নয়, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের হেডকোয়ার্টারের কাছেও উপেক্ষিত বটে। অন্তত আমি তাই উপলব্ধি করি। একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় বলি বরং। যদিও সজীব জয়ের নিজের দিক থেকে প্রয়োজন ছিল না হয়তো, বা তিনি প্রয়োজন অনুভব করেননি, তবুও তিনি প্রথম ‘হুংকার’ মুড গ্রহণ করলে, তাঁর ইউট্যুব লিংকে আমি তাঁদেরকে রাজনৈতিক পরামর্শ দেবার প্রস্তাব করেছিলাম। সেটা আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে, ২০২৪ সালে। আমার তরফে এটা বিনামজুরির প্রস্তাবই ছিল, কিন্তু তিনি হয়তো দেখেননি।    

আদাবর, ঢাকা। ২২ মে – ০৩ জুন, ২০২৬

মানস চৌধুরী

মানস চৌধুরী

মানস চৌধুরী নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিদ্যাগত-তর্কাতর্কিমূলক রচনা ছাড়াও যাকে 'সৃজনশীল' বলা হয়। সবই লেখেন। যখন যা কিছুতে ইচ্ছা। তাঁর সাম্প্রতিক বইগুলো হচ্ছে : গুমের কিংবা ঘুমের রাজ্যে (গল্প, ২০২৩), রাষ্ট্রমেশিনের কোলে পাতা, তুলতুলে লিবেরেল মাথা (তর্ক/প্রবন্ধ, ২০২৩), সংগঠন প্রসঙ্গে (তর্কালোচনা, ২০২৩), শান্তিবুড়ির ধবলগাই মধ্যরাতে শহর সফরে এসে থাকতে পারে (উপন্যাস, ২০২৩)। এছাড়া তার প্রকাশিত অন্যান্য বইগুলো হল: জনসংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত (২০২১); দৃশ্যগত নৃবিজ্ঞান (২০২০); নৃবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ (রেহনুমা আহমেদ-এর সঙ্গে যৌথ বিরচিত) ২০০৩; কর্তার সংসার (সায়দিয়া গুলরুখ-এর সঙ্গে যৌথ সম্পাদিত) ২০০০; জলপরী আর জলাতঙ্ক (২০২০); কাকগৃহ (২০০৮) ইত্যাদি।