অরাজ
ফ্যামিলি স্টোরি শিল্পী: এডওয়ার্ড জেন্টসিক উৎস: সাৎসি আর্ট

ডেভিড ওয়েনগ্রোর সঙ্গে অ্যারন বাস্তোনির আলাপচারিতা ।। আদি মানব ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি বলে মনে করি, তার সবই ভুল

  • অনুবাদ: স্বাধীন সেন
ডেভিড গ্রেয়বার ও ডেভিড ওয়েনগ্রো
                                                                                                         উৎস: দিজ টাইমস

অ্যারন বাস্তানি (Aaron Bastani): ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে ইতিহাসের সেই অতি সুদূর অতীতকাল নিয়ে কাজ করছে যার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। বইটা ওই সময়টাকে এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছে যেন সেখানে জ্যান্ত আর রক্তমাংসের মানুষ বাস করত। শুনতে হয়তো কথাটা খুব অদ্ভুত শোনায়, কিন্তু সত্যি বলতে ইতিহাসচর্চায় এমনটা সচরাচর করা হয় না। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদের আমাদের মতো বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখার বদলে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের সঙ্গেই বেশি তুলনা করা হয়। একবার ভেবে দেখুন তো, মানব ইতিহাস নিয়ে আমাদের জানা সবকিছুই যদি ভুল প্রমাণিত হয়? আমাদের যে প্রচলিত জ্ঞান (Received wisdom) মেনে নিতে শেখানো হয়েছে, তা অনুযায়ী পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছরের; কিন্তু আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছি মাত্র গত ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে। মনে করা হয় যে, এই কৃষিকাজ শুরুর পরেই শহর, জ্যোতির্বিদ্যা, সংখ্যা আর আমাদের চেনা এই সভ্যতার জন্ম হয়েছে।

কিন্তু ডেভিড ওয়েনগ্রো আর সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের বই বলছে যে, এই তথ্যটা আসলে পুরোপুরি সঠিক নয়। তাঁরা বলছেন, আমরা যাকে শহর বা ‘উন্নত মানব সংস্কৃতি’ বলে বিচার করি, তা আসলে কৃষিকাজ প্রবর্তনেরও আগের ঘটনা। প্রাগৈতিহাসিক এই আখ্যানটি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং চমকপ্রদ—আর এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও কিন্তু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আপনাকে ‘ডাউনস্ট্রিম’-এ স্বাগত জানাই।

ডেভিড ওয়েনগ্রো (David Wengrow): আমাকে ডাকার জন্য ধন্যবাদ।

অ্যারন বাস্তানি: আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) প্রত্নতত্ত্ব পড়াচ্ছেন। ছোটবেলায় কি আপনি এটাই হতে চেয়েছিলেন?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই না। স্কুল ছাড়ার পর আমি আসলে থিয়েটার করতে চেয়েছিলাম। সত্যি বলতে, তখন আমি বেশ খানিকটা অভিনয়ও করেছি। প্রায় ১৪ বছর বয়স থেকেই আমি মঞ্চ আর অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যাই। আমি ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ থিয়েটারে’ যোগ দিয়েছিলাম—সেটা ছিল একটা দারুণ সময়। কারণ লন্ডনের বাসিন্দা হিসেবে তখনই আমি প্রথম সারা দেশের, অর্থাৎ পুরো যুক্তরাজ্যের নানা প্রান্তের মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ পাই। স্কুল শেষ করার পর একজন এজেন্টও জুটিয়ে ফেললাম এবং কিছুদিন ওটা নিয়ে মেতে থাকলাম। এরপর আরও নানা কাজ করেছি। বলতে পারেন, প্রত্নতত্ত্বের জগতে আমার পা রাখাটা ছিল অনেকটা দুর্ঘটনাবশত।

অ্যারন বাস্তানি: বলেন কী! শিশু অভিনেতা থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদ—শুনতে তো দারুণ একটা গল্পের মতো লাগছে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমি ঠিক শিশু অভিনেতা ছিলাম না, বলা যায় ‘ইয়াং অ্যাডাল্ট অ্যাক্টর’। আমি শিশু অভিনেতাদের দেখেছি, তারা অন্য ধাতুর মানুষ হয়—আমি ঠিক তেমন ছিলাম না। তো যা বলছিলাম, সাংবাদিকতার দিকেও সামান্য ঝোঁক ছিল—বিবিসি অ্যারাবিক সার্ভিসে কাজ করা বা এই জাতীয় কিছু নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু আসলে ঠিক কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্কুলে রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই ভাবলাম অক্সফোর্ডে আবেদন করব। আমার মাথায় তখন কেবল অক্সফোর্ড ঘোরপাক খাচ্ছিল। আমি অক্সফোর্ডের সব কলেজেই ইংরেজি সাহিত্যের জন্য চিঠি লিখলাম, কিন্তু কেউ পাত্তাই দিল না।

তখন আমার এক বন্ধু বলল, “এই ধরণের জায়গায় ঢোকার সহজ উপায় হলো একটু ‘অপ্রচলিত’ কোনো বিষয় বেছে নেওয়া।” ওরা তখন মাত্র ‘প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান’ নামে একটা নতুন কোর্স চালু করেছে—মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে ইউসিএলে আমি এই বিভাগটাই সমন্বয় করি। তো, আমি হ্যারিস কলেজে ওই কোর্সের জন্য আবেদন করলাম এবং ইন্টারভিউয়ের সুযোগ পেলাম। ইন্টারভিউ নিতে বসলেন বারবারা কেনেডি নামের এক দুর্ধর্ষ নারী। তিনি আসলে ভূগোলবিদ ছিলেন, কারণ ওই কলেজে তখন কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদ ছিলেন না। তিনি আমাকে বেশ জেরা করলেন। আমিও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে আমার ‘বিশাল প্যাশন’ নিয়ে অনেক বড় বড় বুলি ঝাড়লাম। হুট করে তিনি তাঁর চেয়ারের নিচ থেকে একগাদা চিঠি বের করলেন—সেইসব চিঠি যা আমি অন্য কলেজগুলোতে ইংরেজি পড়ার জন্য লিখেছিলাম। আমি তো ভাবলাম, সব গুবলেট করে ফেলেছি! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে ভর্তি করে নিলেন।

শুরুতে আমি একজন ‘ম্যাচিউর স্টুডেন্ট’ হিসেবে ভর্তি হলাম, যদিও মানসিকভাবে তখনো অতটা পরিণত ছিলাম না। শুরুতে সবকিছু প্রায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছিলাম এবং ছয় মাস পর আমার বের হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। কিন্তু তখনই একজনের সাথে দেখা হলো যিনি আমার পুরো চিন্তাটাই বদলে দিলেন। আসলে জীবনে এমন একজন মানুষের প্রয়োজন হয় যিনি আপনাকে নেশা ধরিয়ে দেবেন এবং এই আত্মবিশ্বাস দেবেন যে—হ্যাঁ, এই বিষয়ে আপনারও কিছু দেওয়ার আছে। তিনি ছিলেন অ্যান্ড্রু শেরাড। খুব অল্প বয়সে—মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান, অনেকটা ডেভিডের (গ্রেবার) মতোই। অ্যান্ড্রুই আমাকে প্রত্নতত্ত্বের নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিলেন, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

অ্যারন বাস্তানি: আসলে আমরা তো সবসময়ই শুনি যে, ছোটবেলায় কমবেশি সব শিশুই একসময় প্রত্নতত্ত্ববিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, মনের কোণে হয়তো কিছু একটা ছিলই। ওল্ড সেরামের একটা স্কুল ট্রিপের কথা আমার খুব মনে পড়ে—সেটা ছিল লৌহ যুগের এক বিশাল পাহাড়ি দুর্গ। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথা জুড়ে কেবল সেইসব ছবিই ঘুরছিল। আমি যেন চোখের সামনে সেই প্রাচীন অভিবাসন আর আক্রমণের দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কম্পিউটারের যুগ আসার অনেক আগের কথা বলছি; আমি একটা ক্যালিগ্রাফি পেন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতার একটা আস্ত খাতা বা পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলেছিলাম। মনে আছে, কাগজটাকে পুরনো লুক দেওয়ার জন্য আমার দাদি কফির গুঁড়ো দিয়ে কাগজটা হলদেটে করতে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কোনো একটা ঐতিহাসিক যুগ বা সময়ের প্রতি এমন একটা টান অনুভব করাটা আসলে পুরোপুরি যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আমার পারিবারিক কোনো শিকড় নেই, তাই এটা কোনো আঞ্চলিক টানও নয়। কিন্তু কেন জানি স্রেফ একটা বিশেষ সময় বা ইতিহাসের কোনো এক পরিপ্রেক্ষিতের প্রতি আপনার মনে এক গভীর মায়ার তৈরি হয়। যারা প্রত্নতত্ত্বকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাদের মধ্যে হয়তো এই ‘নেশা’র মাত্রাটা একটু বেশিই থাকে।

অ্যারন বাস্তানি: আপনার বই ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ (The Dawn of Everything)-এর মূল প্রসঙ্গে আসি। প্রচলিত জ্ঞান হলো, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই-তিন লক্ষ বছর ধরে। আপনি উত্তরে সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলতে পারেন। তবে আমরা কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছি মাত্র ১২ হাজার বছর—কিংবা ১১-১২ হাজার বছর আগে। বলা হয় যে, কৃষির আগমনের ফলেই নগর, সংখ্যা দিয়ে গণনা, লিখন পদ্ধতি, জ্যোতির্বিদ্যা আর আমাদের চেনা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। আপনার এবং সম্প্রতি প্রয়াত ডেভিড গ্রেবারের যৌথভাবে লেখা বইটা বলছে যে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল অথবা অন্তত বড় রকমের ভুল আছে এতে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন অ্যারন, আপনি যা বললেন সেগুলোকে একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। জানেন তো, আপনি যখন বলছেন যে ১২ হাজার বছর আগে আমরা কৃষিকাজ শুরু করেছিলাম, তখন আসলে পৃথিবীর খুব অল্প কিছু মানুষ সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় সেটা শুরু করেছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East), যেটাকে অনেকে ফারটাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) বলেন। সেই সময়েও বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ছিল শিকারী ও সংগ্রাহক এবং মৎস্যজীবী। আসলে আপনি যেটা সংক্ষেপে বললেন, সেটা হলো আমাদের সেই চেনা ‘যুগবিভাজনের তত্ত্বর’ (Stage Theory) একটা ধ্রুপদী উদাহরণ। এখানে দেখানো হয় যে, দীর্ঘ সময় ধরে তেমন কিছুই ঘটছে না, তারপর হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল—কৃষি বিপ্লব হলো, জনসংখ্যা বাড়ল, তারপর নগর এলো এবং আবারও সব বদলে গেল। তারপর এলো সভ্যতা। আমরা বইটাতে এটাই দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, এই পুরো প্রক্রিয়াটা আসলে এর চেয়ে অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। ইতিহাসের তথাকথিত ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় বা ধাপের মানুষগুলো আসলে একদম পাশাপাশি বসবাস করত। তারা একে অপরের থেকে রসদ নিত, একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাত এবং ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে সচেতনভাবে সমাজ গঠন ও নকশা করত। জানেন তো, সভ্যতা আর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনার সময় আমাদের মনে এক ধরণের বদ্ধমূল ধারণা কাজ করে। আমরা ভাবি যে কেবল আমরা এই আধুনিকরা, বা তথাকথিত আধুনিকরা—মানে এই যে আলোকায়ন পরবর্তী মানুষ—তারাই কেবল সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে আমরা কেমন সমাজে বাস করতে চাই। তারপর সচেতনভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করি। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ঐতিহ্যে বামপন্থী বা ডানপন্থী—উভয় তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক ধারাতেই এই ধারণাটা গভীরভাবে গেঁথে আছে। কিন্তু আমাদের মতে এটা ভুল। আপনি যেমনটা বললেন, মানুষ পৃথিবীতে আছে প্রায় দুই থেকে তিন লক্ষ বছর ধরে—যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা একদম আপনার আর আমার মতোই। তাদের মস্তিষ্ক আমাদের মতোই এবং তারা আমাদের মতোই কথোপকথন চালিয়ে যেতে পুরোপুরি সক্ষম ছিল। অথচ সেই সুদীর্ঘ সময়ের খুব সামান্য অংশ সম্পর্কেই আমরা জানি। একবার ভেবে দেখুন তো, এটা কত অসাধারণ একটা ব্যাপার! কত কিছু ঘটতে পারত সেই সময়ে, কত ধরণের কথোপকথন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে পারত! অথচ আমরা শুরুর সেই সময়গুলো নিয়ে লেখার সময় বা সেগুলোকে সংজ্ঞায়ন করার সময় ঠিক উল্টোটা করি। মনে হয় যেন মানুষ কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের (Haze) মধ্যে বাস করছিল, কেবল কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম বা রুটিন মেনে চলত—যতক্ষণ না একদিন কেউ কৃষিকাজ আবিষ্কার করল আর সব বদলে গেল। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের অতীতের প্রতি করা এক ধরণের ‘ধারণাগত ক্ষতি’ (Conceptual damage)। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ আসলে এই ভুলটাই ভাঙার চেষ্টা করছে। আমরা ইতিহাসের অতি সুদূর সেই সময়গুলো নিয়ে লিখতে চেয়েছি—যার সপক্ষে আমাদের কাছে প্রমাণ আছে—যেন সেখানে সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষ ছিল। শুনতে হাস্যকর মনে হলেও ইতিহাসচর্চায় এই কাজটা খুব কমই করা হয়। জানেন তো, প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের আমাদের মতো মানুষের সাথে তুলনা করার চেয়ে বরং মানবেতর প্রাইমেটদের (Non-human primates) সাথেই বেশি তুলনা করা হয়।

অ্যারন বাস্তানি: আপনার বইয়ের এই অংশটা আমার খুব ভালো লেগেছে—আগে কখনো এভাবে ভাবিনি। আমরা কি শিকারী ও সংগ্রাহকদের নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করতে পারি? তারা কি আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক কম ‘সংকীর্ণমনা’ ছিল? মানে ইন্টারনেটের এই যুগের কথা বলছি না, তবে তার আগের সময় পর্যন্ত কি তারা অনেক বেশি বিস্তৃত ছিল না? আপনি কি এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের অন্যতম বড় উদঘাটন (Revelation) হলো এই আলামতগুলো । আগে ভাবা হতো যে, কৃষির আগের মানুষগুলো ছোট ছোট দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করত। তারা যাযাবর ছিল, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াত এবং একে অপরের সাথে তেমন যোগাযোগ ছিল না—এই পুরো ধারণাটাই ভুল। আমরা এখন সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে দেখাতে পারি যে, কৃষিকাজ শুরুর কয়েক হাজার বছর আগেও, এমনকি বরফ যুগের (Ice Age) অনেক আগে থেকেই মানুষের সমাজ বিশাল এলাকা জুড়ে সুসংগঠিত ছিল। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখত এবং বিভিন্ন জিনিসপত্র আদান-প্রদান করত। বর্তমানে আমাদের হাতে এমন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে হাজার হাজার বছর আগের মানুষের খাদ্যভ্যাস পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তারা কি উপকূলীয় এলাকায় ছিল নাকি স্থলভাগে চলে এসেছিল, তা আমরা এখন বলতে পারি। এমনকি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং কাঁচামালের চলাচলও শনাক্ত করা যায়। আমাদের কাছে প্রাচীন ডিএনএ আছে। সুতরাং আদি মানব সমাজকে ব্যাখ্যা করার অনেক পদ্ধতি এখন আমাদের হাতে। আর তা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, সেই জগতটা ছিল ভীষণভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। একটু ভেবে দেখলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ মানুষের প্রথম কাজগুলোর একটি হলো স্থান পরিবর্তন করা। আমরা সাধারণত বলি যে মানুষ পুরো পৃথিবী ‘দখল’ বা ‘উপনিবেশায়ন’ করেছে—যদিও শব্দটা একটু অদ্ভুত কারণ তখন সেখানে দখল করার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু আমরা বিচরণ করেছিআফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত। এমনকি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াতেও পৌঁছে গিয়েছি। ফলে আমরা শুরুই করেছিলাম এক ধরণের সুসংহত এবং সংযুক্ত সামাজিক পরিমণ্ডল (Social Universe) দিয়ে। জনসংখ্যার দিক থেকে তারা হয়তো খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারা অবিশ্বাস্য দূরত্বের মধ্যেও যোগাযোগ রক্ষা করত এবং ধ্যান-ধারণা বিনিময় করত। মধ্যযুগের ইউরোপের কথা ভাবুন। সেখানে পরিস্থিতি মোটেও এমন ছিল না। একজন সাধারণ গ্রাম্য কৃষক তার গ্রামের বাইরে খুব একটা যেত না। আর এই বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ এর মানে হলো আমাদের ইতিহাসের ব্যাপ্তি বা স্কেল (Scale) নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষের মনে ইতিহাসের যে গতানুগতিক ছবিটা আছে তা আসলে উল্টো। মানুষ ভাবে যে আমরা ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী দিয়ে শুরু করেছি এবং শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বায়নের যুগে এসে পৌঁছেছি। কিন্তু আসলে ঘটনাটা উল্টো। আপনি যদি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখেন, তবে দেখবেন যে আগে সেখানে বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থা ছিল। অথচ আজ যদি আপনি কায়রো থেকে দামেস্কে যেতে চান, তবে আপনাকে হয় সিআইএর জন্য কাজ করতে হবে, না হয় প্রায় ৫০টা বর্ডার চেকপয়েন্ট পার হতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, জাতিরাষ্ট্র আর কঠোর সীমান্ত ব্যবস্থার কারণে সময়ের সাথে সাথে আমরা আসলে অনেক বেশি রুদ্ধ বা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি।

অ্যারন বাস্তানি: মেগালিথিক প্রত্নস্থান (Megalithic sites) নিয়ে একটা কথা—যেটা আমি গত কয়েক বছরেই আবিষ্কার করেছি এবং সেকথাগুলো আপনাদের বইয়েরও অংশ; সে বিষয়টি হলো জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) ভূমিকা। এখানে বিষুব (Equinoxes) আর অয়নান্তের (Solstices) [ক্রান্তিয়, কর্কট ক্রান্তি ও মকর ক্রান্তি] বিষয় তো আছেই, তবে এর বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে। প্রায়ই দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রমণ্ডলকে (Constellations) সারিবদ্ধ করা হয়েছে বা শনাক্ত করা হয়েছে। তার মানে কি আমরা এমন অনেক সমাজকে দেখছি যারা তখনও কৃষিকাজ শুরু করেনি, অথচ অত্যন্ত উন্নত জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল? কারণ এটাও এমন একটা বিষয় যা নিয়ে মানুষ সাধারণত তেমন ভাবে না।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: এবং নৌচালনবিদ্যা (Navigation) নিয়েও। আমরা এখানে এমন এক মানবগোষ্ঠীর কথা বলছি যারা আয়ারল্যান্ডের ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো পর্যন্ত যাতায়াতের পথ খুঁজে নিয়েছিল। অবশ্যই এর জন্য ভূসংস্থান (Topography) এবং সমুদ্রের আচরণ সম্পর্কে ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় দিক থেকেই তাদের অসাধারণ দখল থাকতে হয়েছিল। আর হ্যাঁ, আপনি প্রারম্ভিক যুগের বৃহদাকার স্থাপত্যগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এগুলো প্রায়ই খুব নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ করে সাজানো হতো—কখনও অন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভের সাপেক্ষে, আবার কখনও অয়নান্তের সাপেক্ষে। এখানে যুক্তরাজ্যে স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো এ বিষয়ে জগৎবিখ্যাত। মানুষ যে অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক ও জ্যামিতিক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; যদিও তাদের পদ্ধতিগুলো আমাদের বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন ছিল। আমার মনে হয় ১৯৬০-এর দশকে ক্লদ লেভি-স্ট্রসের (Claude Levi-Strauss) বইতে এ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাটি হয়েছিল। সেখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে বিজ্ঞানের মূলত দুটি ভিন্ন রূপ আছে। একটা হলো বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের বর্তমান ধারণা যা ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়—যেখানে আপনি একটা কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন এবং সাদা কোট পরা মানুষরা নতুন নতুন আইডিয়া বা থিওরি তৈরির চেষ্টা করেন, যা পরে বহির্বিশ্বে প্রয়োগ করা হয়। তিনি এর সাথে তুলনা করেছেন মানুষের ইতিহাসের সেই ধরণের আবিষ্কারের পদ্ধতির, যেখানে কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না। সেখানে আবিষ্কার ছিল সামাজিক জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা ছিল মানুষের ল্যান্ডস্কেপ, গাছপালা এবং প্রাণীর সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফল—যা শুরু থেকেই সরাসরি প্রয়োগ করা হতো। সম্ভবত এভাবেই নৌচালনবিদ্যা, বিশাল স্থাপত্য নির্মাণ বা ধাতুবিদ্যার মতো প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল। আমাদের পরিচিত জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বাইরে অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়েছিল—যা আসলে নিজের মধ্যেই বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, স্টোনহেঞ্জ কি কৃষিজীবী মানুষেরাই তৈরি করেছিল? এটা কি আমরা নিশ্চিতভাবে জানি?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: খুব সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এটাই ছিল সর্বজনসম্মত ধারণা। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা আসলে আরও অনেক বেশি চমকপ্রদ। প্রায় ৫০০০ বছর আগে যখন স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তৈরি হচ্ছে, তার আগেই ইউরোপীয় মহাদেশ থেকে আমদানিকৃত পদ্ধতি হিসেবে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে চাষাবাদ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বের আরও অনেক জায়গার মতো এখানেও একই ঘটনা ঘটেছিল—আবারও সেই আপনার শুরুর দিকে বলা মানব ইতিহাসের যুগবিভাজনের তত্ত্ব (Stage Theory)-এর প্রসঙ্গে আসি, যেখানে বলা হয় কৃষি এলো আর সবকিছু বদলে গেল। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আসলে এমন অনেক উদাহরণের একটি, যেখানে মানুষ কৃষিকাজ গ্রহণ করার পর মূলত তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) এবং আরও অনেক বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ যখন তৈরি হচ্ছে, সেই সময়ে এই দ্বীপের মানুষরা শস্য চাষের অভ্যাস প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তারা প্রধান উদ্ভিদজাত খাদ্য হিসেবে আবারও বুনো বাদাম বা ওক ফল বা একর্ন (Acorns) জাতীয় খাবার সংগ্রহের দিকে ফিরে গিয়েছিল। তবে তারা সব কিছু ছাড়েনি; যেমন তারা শুকর আর গরু পালনের মতো পশুপালন চালিয়ে গিয়েছিল। স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge)-এর কাছে ডারিংটন ওয়ালস (Darrington Walls) নামে একটি প্রত্নস্থান আছে। সেখানে এমন এক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে মানুষ ঋতুভিত্তিক উৎসবের জন্য জড়ো হতো এবং প্রচুর পরিমাণে মাংস খেয়ে ভোজ করত। সেটা নিশ্চয়ই বিশাল কোনো আয়োজনের উৎসব ছিল। আর সম্ভবত সেই সময়েই তারা এই ধরণের বড় বড় সমন্বিত নির্মাণ কাজগুলো করত যা আমরা এখন দেখতে পাই। তাই এই পুরো চিত্রটা আসলে বেশ জটিল। তারা পুরোপুরি কৃষকও ছিল না, আবার শুধু শিকারী ও সংগ্রাহকও ছিল না; বরং তারা ছিল কৃষক, খাদ্য সংগ্রহকারী এবং পশুপালকের এক ধরণের সংকর (Hybrid) সমাজ।

অ্যারন বাস্তানি: তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, এটা মূলত একটা সামাজিক পছন্দ ছিল যা তারা নিজেরা নিয়েছিল।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই তাই ছিল। কারণ আমি আর কোনোভাবেই এটা কল্পনা করতে পারি না যে, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষ শস্য চাষের মতো একটা অনুশীলনের দিক থেকে হুট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। এটা তো অবচেতনভাবে ঘটা সম্ভব নয়। এখানে জলবায়ুগত কোনো বড় বিপর্যয় বা জনশূন্য হয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রমাণও নেই। এর মানে দাঁড়ায় মানুষ স্রেফ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা আর কৃষিজীবী হয়ে থাকতে চায় না।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, স্টোনহেঞ্জ (Stonehenge) তো আসলেও অনন্য। মানুষ যে এই ধরণের নির্মাণ কাজ করতে আগ্রহী হয়েছিল, তার পেছনে নিশ্চয়ই খুব অসাধারণ কিছু ঘটেছিল। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর তুলনা হতে পারে এমন যে—আমরা হুট করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে শিল্প বিপ্লব আসলে কোনো ভালো আইডিয়া ছিল না অথবা আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি  ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারা অবশ্য এই পরিভাষায় ভাবছিল না। তবে এটা একটা প্রশ্ন তো তুলেই দেয়, তাই না? আমাদের শেখানো হয় যে সেই আদিম সমাজগুলো অত্যন্ত আদিম বা ‘প্রিমিটিভ’ ছিল; কিন্তু তারা যদি ওই মাপের বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে আমরা এখন এই ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এত হিমশিম খাই কেন? আর এটাই আমাকে আমাদের দর্শকদের জন্য বইটির মূল প্রশ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যারা মূলত রাজনৈতিক সচেতন দর্শক। যদি ইতিহাসের এই জেনেরিক ‘যুগবিভাজনের তত্ত্ব’ ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কিন্তু বিশাল। কারণ এটিই হলো লক, রুসো বা হবসের মতো আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি। আবার বর্তমানে স্টিফেন পিঙ্কার বা ইউভাল হারারিদের মতো মানুষদেরও ভিত্তি এটি। কারণ তাদের মূল বক্তব্যই হলো—সমাজ যত জটিল হবে, সেখানে বৈষম্য আর অন্যায় তত বাড়বে। তবে যেহেতু এটা প্রাচুর্য তৈরি করে, তাই এর পেছনে এক ধরণের উপযোগবাদী যুক্তি (Utilitarian argument) দেওয়া হয়। আপনি এমন কিছু লেখক আর বইয়ের কথা বলছেন যারা কখনও কখনও সরাসরি দুই বা তিনশ বছর আগের সেই দার্শনিকদের মডেল অনুসরণ করেন। অনেকে তো সরাসরি বলেনও যে আমি একজন ‘নব্য-হবসিয়’ (Neo-Hobbesian) বা ‘নব্য-রুশোইও’ (Neo-Rousseauan)। এটা বেশ মজার। আমি আর ডেভিড যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম ভাবতে শুরু করি, তখন সময়টা ছিল ২০০৮-০৯ সালের সেই বড় আর্থিক ধ্বসের কাছাকাছি। সেসময় বৈষম্য এবং বৈষম্যের মূল শিকড় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল। হঠাৎ করেই সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই পুরনো ধারণাগুলো খুব আগ্রাসীভাবে ফিরে এলো। মানুষ আবারও হবস বা রুসোর কাছে ফিরে যেতে চাইল। আপনি যেমনটা বললেন, আমরা আসলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠগুলো নিয়েই কথা বলছি। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে সেগুলো ছিল পুরোপুরি কল্পনাপ্রসূত বা অনুমিত (Speculative)। লক্ষ বছর আগের মানব সমাজের প্রকৃতি কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোনো বাস্তব তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সেই দার্শনিকরা স্রেফ নিজেদের কল্পনা থেকে সেগুলো তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ এগুলো হলো প্রাগৈতিহাসের এক কাল্পনিক জগত। একথা ভাবলে বেশ অবাক লাগে যে, আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা আসলে এমন কিছু কল্পনা থেকে এসেছে যার শিকড় প্রোথিত ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। যেমন, ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan) ১৬৫১ সালে লেখা হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের মাঝখানে। সেখানে মূলত সরকারহীন সমাজের প্রকৃতি এবং সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। রুশো মারা গিয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবের ১০ বছর আগে। তিনি যখন বৈষম্যের উৎস কী—এই প্রশ্ন তুলছেন, তখন সেটা ছিল তাঁর সময়ের এক জ্বলন্ত প্রশ্ন। তাই এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক কল্পনার চর্চা ছিল। সেই সময়ে এসব চিন্তা হয়তো বৈপ্লবিক ছিল। কিন্তু আমাদের হাতে যখন এখন এত নতুন তথ্য আর প্রমাণ আছে, তখন কেন আমরা ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে ১৭৫৪ সালের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো নিয়ে পড়ে থাকব? কেন আমরা এখনও এই স্থবির বা জড় পদ্ধতিতে একই প্রশ্নগুলো করে যাচ্ছি? এই জিজ্ঞাসা নিজেই একটা বড় প্রশ্ন।

অ্যারন বাস্তানি : আপনি একজন একাডেমিক, আপনি ইউসলে (UCL) আছেন। আমিও তো ইউসিএলে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছিলাম। আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের কিছু মডিউল পড়েছিলাম। আমাদের কী পড়ানো হয়? রাষ্ট্রবিজ্ঞান তত্ত্বের প্রারম্ভিক পাঠ: হবস, লক, প্লেটো, রবার্ট নজিক এবং একটু সমসাময়িকদের মধ্যে জন রল্‌স। কিন্তু এরা সবাই তো কার্যকরভাবে লক আর হবসের সেই প্রারম্ভিক উদারতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের চিন্তা গড়ে তুলেছেন। সেখানে মূলত শেখানো হয় যে কেন আপনার রাষ্ট্রকে মেনে চলা উচিত। আর আপনি যেমনটা বলছেন, এগুলো কয়েকশ বছরের পুরনো কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই আধুনিক পশ্চিমা পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছি, যেখানে আমরা তথাকথিত প্রত্যক্ষণবাদের (Empiricism) উপর অগাধ আস্থা রাখি। অথচ আমাদের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার যে মূল ভিত্তি, তা আসলে পুরোপুরি ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

ডেভিড ওয়েনগ্রো : এই প্রসঙ্গটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যার একটা ভালো উদাহরণ। কারণ আপনি যেখানে ওই বিষয়গুলো পড়ছিলেন, তার ঠিক পাশেই ছিল আমার কর্মস্থল। ২০০৩ সালের কথা বলছেন? তার মানে আপনি যেখানে লক বা রল্‌স সম্পর্কে শিখছিলেন, তার ঠিক কোণায় গেলেই ছিল ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি’। আমি সম্ভবত তখন থেকেই সেখানে পড়ানো শুরু করেছি। তার মানে খুব কাছেই একদল মানুষ আসলে মানুষের প্রাগিতিহাস নিয়ে গবেষণা করছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিই এমন যে, এগুলোকে আলাদা আলাদা বিভাগে ভাগ করে ফেলা হয়। ফলে জ্ঞানের যে আদান-প্রদান খুব স্বাভাবিকভাবে হওয়া উচিত ছিল, তা আর হয় না। আমাদের হাতে এখন যা তথ্য আছে, তার আলোকে বিষয়গুলো এখন কেমন দেখায় এবং এর তাৎপর্য কী— সেই জিজ্ঞাসাগুলো নিয়ে আর আলাপ হয় না। প্রত্নতত্ত্বের ছাত্ররা সম্ভবত সেই দার্শনিকদের কথা ভাবত না, আবার যারা ওই দার্শনিকদের কথা পড়ত, তারা সম্ভবত মানুষের সুদূর অতীতের ইতিহাস আর প্রমাণগুলো নিয়ে ভাবত না। আমার মনে হয় এই বিষয়টি একটা বড় সমস্যা। এক কথায় বলতে গেলে আমরা শেখার এক বিশাল সুযোগ হারিয়েছি।

অ্যারন বাস্তানি : কিন্তু এই পরিস্থিতি কি একাডেমিকদেরও এক ধরণের ব্যর্থতা নয়? মানে, মেধাবী পেশাজীবীরা তরুণদেরকে এই ধরণের ভিত্তিহীন কথা বা ‘ননসেন্স’ শেখাচ্ছেন— এমন কাজকর্ম তো পুরোপুরি পাগলামি বলেই মনে হয়। অথচ বিষয় হিসেবে এই আলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, এটাকে কেবল ভিত্তিহীন কথা হিসেবে পড়ানোর দরকার নেই; আপনি এটাকে একটা ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও দেখতে পারেন। এগুলো পাঠ করা জরুরি, তবে সেই পাঠ করতে হবে তার সীমাবদ্ধতার ভেতরে থেকেই। আসলে আপনি যদি এই টেক্সটগুলো খুঁটিয়ে দেখেন, তবে দেখবেন সেগুলো যে স্রেফ কল্পনাপ্রসূত (speculative), তা লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন। যেমন রুশো যখন ওই যে আপনি শুরুতে যেটা বলছিলেন—মানে কৃষিকাজ আর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবিষ্কার কীভাবে আমাদের নতুন ধরণের জীবনযাত্রায় আটকে ফেলেছে—সেই গল্পটা বলার সময় এক জায়গায় স্পষ্ট করেই বলেছেন: এই আলাপকে ইতিহাস হিসেবে নেবেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন ওই আলাপ মূলত একটা তাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই হয়েছিল যেন আপনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং এই দুনিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারেন। এই আলাপ কোনো ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আপনি যেসব আধুনিক লেখকের কথা বললেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব অদ্ভুতভাবে বদলে গিয়েছে। যা একসময় স্রেফ কল্পনাপ্রসূত আলোচনা হিসেবে শুরু হয়েছিল, এখন সেই বয়ানগুলোকেই বস্তুনিষ্ঠ সত্য (objective truth) বা ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিই আসলে আমাদের—মানে নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিড আর প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে আমাকে—এক ধরণের ধাক্কা দিয়েছিল। আমাদের মনে হয়েছিল, এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না; আমাদের কিছু একটা করা দরকার। মূলত সেই তাড়না থেকেই আমরা আমাদের এই অসাধারণ জ্ঞানভাণ্ডারকে বর্তমানের এই সব বিচ্ছিন্ন পরিপ্রেক্ষিত (siloed contexts) থেকে মুক্ত করার কাজটা শুরু করি। পে-ওয়াল জার্নালের (paywall journals) দেয়াল ভেঙে আমরা মানব ইতিহাসের সেই রহস্যের জটগুলো খুলতে শুরু করি যা এখনও গ্রন্থিবদ্ধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে তথ্যগুলো আমাদের হাতে আছে, তা থেকেই বলা যায় যে—আলোকায়ন (Enlightenment) থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা ইতিহাসের যে বয়ান পেয়েছি, বাস্তব ইতিহাস মোটেও তেমন নয়।

অ্যারন বাস্তানি : চলুন আদিবাসী আমেরিকান সমাজ নিয়ে একটু আলাপ করি। এই বিষয়ে আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে আপনারা বইটিতে যেসব সোর্স মেটেরিয়াল ব্যবহার করেছেন, সেগুলো সত্যিই খুব প্রভাবশালী। গত কয়েক বছরে আমি নিজেও অনেক নতুন কিছু শিখেছি। চলুন আবারও সেই ধরাবাঁধা ধারণা (stereotypes) আর প্রচলিত জ্ঞান (received wisdom) নিয়ে একটু কথা বলি। প্রচলিত ধারণাটা হলো—ইউরোপীয়রা ১৪৯২ সালে পশ্চিম গোলার্ধ  আবিষ্কার করে। আমরা না হয় লেইফ এরিকসনকে আপাতত পাশে সরিয়েই রাখলাম—আমি আসলে মাত্রই সুইডেন থেকে ফিরেছি।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ওরা কিন্তু এরিকসনের কথা ভোলেনি।

অ্যারন বাস্তানি: একদমই ভোলেনি! নর্ডিক (Nordic) দেশগুলো ওই বিষয়টা বেশ ফলাও করে প্রচার করে, তাই না? তো আমরা যে ধারণাটা নিয়ে চলি তা হলো—আমরা মূলত একটা অনগ্রসর সভ্যতাকে আবিষ্কার করেছিলাম এবং তারপর বন্দুক, জীবাণু আর ইস্পাত—অর্থাৎ ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ (Guns, Germs, and Steel) [ জারেড ডায়মন্ডের বিখ্যাত বই Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies দ্রষ্টব্য] সমন্বয়ে তাদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এই বয়ানটা তো পুরোপুরি সঠিক নয়, তাই না?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, একদমই নয়। অতিমারির পর যাতায়াত ব্যবস্থা যখন আবারও স্বাভাবিক হলো, তখন গত বছর আমি কানাডা আর আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আদিবাসী গবেষক আর ইতিহাসবিদদের সাথে কথা বলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ডেভিডের সাথে লেখা বইটিতে কলম্বাস-পূর্ব আমেরিকা এবং ইউরোপীয় উপনিবেশকারী ও আদিবাসীদের মধ্যকার প্রাথমিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক কিছু আছে। সত্যি বলতে, এই ক্ষেত্রটি আমাদের দুজনের কারোই মূল গবেষণার বিষয় ছিল না। নৃতাত্ত্বিক হিসেবে ডেভিডের কাজের ক্ষেত্র ছিল মাদাগাস্কার, আর আমার পিএইচডি এবং বেশিরভাগ মাঠপর্যায়ের গবেষণা ছিল উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। ফলে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের অনেক নতুন কিছু শিখতে হয়েছে। তবে আমরা শুরুতে যে প্রশ্নটা নিয়ে কাজ করছিলাম—বিশেষ করে বৈষম্যের উৎস কী—তার উত্তর খুঁজতে এই পথেই হাঁটতে হয়েছে। আপনি যদি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের সাহিত্য বা রুসোর মতো চিন্তাবিদদের দিকে তাকান, তবে দেখবেন যে সেই সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে যেসব ধারণা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছিল, সেখানে আপনি আমেরিকাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার সেই অংশটি—যা বর্তমানে কানাডা এবং আপস্টেট নিউ ইয়র্কের মাঝে বিভক্ত; মূলত গ্রেট লেকস অঞ্চল এবং যেটাকে অনেক সময় ইস্টার্ন উডল্যান্ডস বলা হয়। সেখানেই ইউরোপীয়রা এমন কিছু সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল যাদের জীবনযাত্রা ছিল আমূল ভিন্ন। তারা ছিল অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। বিশেষ করে নারীদের সেখানে যে ধরনের স্বাধীনতা ছিল, তা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে অকল্পনীয় ছিল। আর এসবের প্রভাবে ইউরোপীয়দের রাজনৈতিক কল্পনায় এক বিশাল প্রভাব পড়েছিল। আমরা যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে কয়েকশ বছরের পুরনো ওইসব গৎবাঁধা প্রশ্ন আর গল্পের ফাঁদে পা দেব না, তখন আমাদের বুঝতে হলো যে ওই ধারণাগুলো আদতে এলো কোথা থেকে। আর সেই উত্তর খুঁজতে গেলেই আপনাকে আমেরিকার দিকে তাকাতে হবে। এ কারণেই বইটির একটা বড় অংশ জুড়ে আমেরিকা গুরুত্ব পেয়েছে।

অ্যারন বাস্তানি: কোন্দিয়ারোঙ্ক নিয়ে একটু আলাপ করা যাক। সম্ভবত আপনার ফ্রেঞ্চ উচ্চারণটা বেশ ভালো। আমি প্রস্তুতির জন্য এ বিষয়ক কিছু ভিডিও দেখেছি। তিনি তো আসলে বাস্তবের একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: অবশ্যই। আপনি চাইলে গুগলে ‘গ্রেট পিস অব মন্ট্রিল’ নামের ১৭১১ সালের একটি চুক্তির ছবি দেখতে পারেন, যেখানে কোন্দিয়ারোঙ্কের স্বাক্ষর বা চিহ্ন আছে।

অ্যারন বাস্তানি: তো কোন্দিয়ারোঙ্কের গুরুত্বটা আসলে কোথায়? তিনি কে ছিলেন?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: কোন্দিয়ারোঙ্ক ছিলেন হুরন-ওয়েনডাট নেশনের (Huron-Wendat Nation) একজন অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। এই জাতিসত্তাটি কিন্তু আজও টিকে আছে। কুইবেক সিটির উপকণ্ঠে তাদের প্রশাসনিক কেন্দ্রটি অবস্থিত। আমি সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে ‘কোন্দিয়া’ নামে ছোট একটা রাস্তা আছে। আমরা মজা করে বলছিলাম যে রাস্তাটা হয়তো এখন আরও বড় করা উচিত কারণ আমাদের বইয়ে তিনি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে আমরা বেশ কিছু স্বতন্ত্র বিবরণ পাই যা থেকে জানা যায় যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি কূটনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং নিজের জাতির মানুষের জন্য এক উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফরাসি, ইংরেজ আর ওলন্দাজ উপনিবেশকারীদের সঙ্গে জটিল পরিস্থিতির মাঝেও তিনি যেভাবে দর কষাকষি করেছিলেন, তা এক কথায় অনন্য। তিনি বহুভাষী ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ আর চমৎকার বক্তা। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন বিবরণ আমাদের এসব তথ্য দেয়। তবে ইতিহাসের কিছু কাকতালীয় কারণে কোন্দিয়ারোঙ্ক এবং তৎকালীন ইউরোপীয়দের মাঝে ঘটে যাওয়া সেইসব কথোপকথন আর চিন্তাভাবনাগুলো ইউরোপের বিশাল জনসমষ্টির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা জানতে পারি, সেই সময় ‘নিউ ফ্রান্স’ বা কলোনির সেই অংশের গভর্নর কোন্দিয়ারোঙ্ককে নিয়মিত নিজের টেবিলে দাওয়াত দিতেন কেবল বিতর্কের নেশায়। গভর্নর নিজেই বলেছিলেন, তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বিনোদনের জন্য এই কাজটা করতেন কারণ লোকটা ছিল ভীষণ রসিক আর উপস্থিত বুদ্ধি সম্পন্ন। তাঁরা এমন অনেক বিষয়ে বিতর্ক করতেন যা পরবর্তীতে আলোকায়নের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল; যেমন যুক্তি বনাম ধর্মবিশ্বাস, বিয়ের রীতি, স্বাধীনতার প্রশ্ন কিংবা সমাজে অর্থের ভূমিকা। সেইসব কথোপকথনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে একজন সামান্য ফরাসি উচ্চবিত্ত মানুষ ছিলেন যার নাম ছিল ব্যারন লাহোন্তাঁ। তিনি খুব অল্প বয়সে কলোনিতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক দশক ছিলেন এবং অন্তত দুটি আদিবাসী ভাষা জানতেন। তিনি সেই উত্তাল সময়ের পরিস্থিতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তবে তিনি কিছুটা গোলমেলে স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলার কারণে তাঁকে কলোনি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং এক সময় তিনি আমস্টারডামের রাস্তায় কপর্দকহীন অবস্থায় দিন কাটাতেন। তখন তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীমূলক বইগুলো লিখতে শুরু করেন এবং আবারও রাজদরবারের অনুগ্রহ পান। তাঁর সেই বইগুলোর একটির নাম ছিল কিউরিয়াস ডায়ালগস উইথ এ স্যাভেজ অব গুড সেন্স (Curious Dialogues with a Savage of Good Sense)। সেখানে লেখক নিজের চরিত্রের সাথে ‘আদারিও’ নামের এক চরিত্রের কথোপকথন তুলে ধরেছেন। আর সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে এই আদারিও চরিত্রটি আসলে কোন্দিয়ারোঙ্কের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি। এই সংলাপে আদারিও বা কোন্দিয়ারোঙ্ক ইউরোপীয় সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ আর বিধ্বংসী বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। আর এই বইটিই তখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। বইটি ছিল সেই সময়ের ‘বেস্টসেলার’। বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় বইটির অনুবাদ হয় এবং বছরের পর বছর মঞ্চনাটক চলে। পরবর্তীতে প্রায় সব বড় আলোকায়নের চিন্তাবিদই এই ধরণের সংলাপ বা ‘ডায়ালগ’ লেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা তাঁদের মূল বক্তব্যগুলো কোনো এক কাল্পনিক বিদেশি চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিতেন; তিনি হতে পারেন তাহিতি বা চীনের কোনো নাগরিক। কিন্তু এইসব ঘটনার মূল প্রেক্ষাপটটি ছিল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত আর বিনিময়ের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর আমরা বলতে চাইছি, ইউরোপীয় চিন্তাধারার ওপর এসব ঘটনার প্রভাব ছিল এক কথায় বিস্ফোরক।

অ্যারন বাস্তানি : তার মানে ভলতেয়ার বা দিদেরোর মতো কোন্দিয়ারোঙ্ককেও আমাদের আলোকায়নের ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুধু তাই নয়, তিনি তো তাঁদের সবার অন্তত কয়েক দশক আগের। তাই ইউরোপের সেই বিখ্যাত সব ‘স্যালঁ’ বা বৈঠকখানাগুলো গড়ে ওঠার আগেই সেখানে এক ধরণের প্রায়-আলোকায়িত (proto-Enlightenment) স্যালঁ তৈরি হয়েছিল। আপনি একে ‘আদিবাসীদের সমালোচনা’ বলতে পারেন। আসলে এখন এইসব পড়ার সময় মনে হয়, বিষয়টা তো বেশ স্পষ্ট। ১৫০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর ধরে আমেরিকা আর ইউরোপের মাঝে সংস্কৃতির এক ব্যাপক আদান-প্রদান চলেছে। ফলে সেখানে এই ধরণের সংলাপ আর ইউরোপে সেই আইডিয়াগুলোর সঞ্চারিত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকার এই উপনিবেশায়ন আর শোষণের ইতিহাসে এই তাত্ত্বিক বিনিময়ের বিষয়টা আমাদের ধারণায় তেমন একটা আসেই না। মনে করা হয় আইডিয়া, পুঁজি আর মানুষ — সবই কেবল একপাক্ষিকভাবে ইউরোপ থেকে এসেছে। কিন্তু আপনি যেটা বলছেন তা গ্লোবাল নর্থের  (global North) বাইরের দেশগুলোর জন্য বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই যে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এক ধরণের আদিবাসী চিন্তাধারা বা ঘরানা ইউরোপীয় আলোকায়নের ভেতরেই জায়গা করে নিয়েছে — এটা আসলেও এক বিশাল ব্যাপার।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: তাই নয় কি? আসলে একথা যে আমাদের আলাদা করে প্রমাণ করতে হচ্ছে, সেটাই বেশ অদ্ভুত। নয়তো একথার মানে কী দাঁড়ায়? এই মানুষগুলো কি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোনো জগতে বাস করত? সেটা তো সম্ভব নয় কারণ আমরা বাণিজ্য আর সামরিক মিত্রতার এক নিবিড় সম্পর্কের সময়ের কথা বলছি। সেই সময় ইউরোপীয়রা যে আমেরিকার অনেক বস্তুগত অভ্যাস গ্রহণ করেছিল তা নিয়ে তো কোনো বিতর্ক নেই। এমনকি পাইপে তামাক খাওয়া বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করার মতো অভ্যাসগুলোও তো ছিল এই ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনারই অংশ। অথচ সেই বস্তুগত অভ্যাসের সাথে সাথে যে আইডিয়া বা চিন্তাভাবনাও আসতে পারে, তা মানতে কেন জানি এক ধরণের তীব্র অনীহা কাজ করে। বিষয়টি বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আমরা আসলে শুধু একথা বলতে চাইছি যে, গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা নিয়ে যেসব আইডিয়া আলোকায়নের দার্শনিকরা খোদ আমেরিকার ওপর আরোপ করেছিলেন, সেগুলো আসলে ওখানকার আদিবাসীদেরই ছিল। স্বাধীনতার এই ধারণাগুলো শোষিত বা ঔপনিবেশিক মানুষের কাছ থেকে আসেনি, বরং প্রাচীন গ্রিস (Greece) বা ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের মাটি থেকে এসেছে, আমি মনে করি এভাবে চিন্তা করাটা শোষিত মানুষের জন্য অসম্মানজনক। যারা এখনও বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেননি, তাদের জন্য বলছি, শোষণের হাত থেকে নিজেকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, সেই আইডিয়াটা আসলে শোষিত মানুষের কাছ থেকেই আসে। আর এই উপলব্ধিটাই হলো আসল মুক্তি।

অ্যারন বাস্তানি : আমেরিকার কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গা নিয়ে কথা বলা যাক। কাহোকিয়া (Cahokia) নামে একটা জায়গা আছে। খুব বেশিদিন আগে না, আমি প্রায় আট মাস আগে সেখানে গিয়েছিলাম। তো, প্রায় হাজার বছর আগে এই জায়গাটা আয়তনে লন্ডনের সমান ছিল। মানে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এখানে কয়েক হাজার মানুষের বসতি ছিল; বড় অংকে বলতে গেলে এই বসতির স্বর্ণযুগে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজারের মতো। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের বড় কোনো নগরের সাথে বসতিটি তুলনা চলত। তো এই জায়গাটার আসলে কী হয়েছিল?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: এটা অত্যন্ত চমৎকার এবং কিছুটা বিতর্কিত একটি বিষয়। তবে এটা পরিষ্কার যে জায়গাটা একসময় বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, যাদের মধ্যে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ তাঁর জীবনের প্রায় ৩০ বছর ওখানে কাজ করেছেন। ওটা বেশ দারুণ ছিল কারণ আপনি যখন সেখানে যাবেন, আপনার সামনে দেখার মতো খুব বেশি কিছু নেই। সেখানে মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) নামে বিশাল এক ঢিবি আছে। এর বাইরে আরও অনেক ধরণের মাটির কাজ আর ঢিবি আছে এবং সেগুলো আকারে বিশাল। জায়গাটা এখন একটা ন্যাশনাল পার্কের মাঝখানে, যার ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত উত্তর আমেরিকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী হেরিটেজ প্রত্নস্থানের (Heritage sites) কপালে এমনটাই ঘটেছে। রাস্তার ধারে বেশ ভালো মেক্সিকান খাবার পাওয়া যায়, ছোট ছোট রেস্তোরাঁ আছে। আসলে আপনি উত্তর আমেরিকার কলম্বাস-পূর্ব সময়ের সবচেয়ে বড় আদিবাসী জনপদ বা নগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনেক বছর ধরে সেখানে কাজ করেছেন। একসময় এই বসতি একটি পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল; হয়তো আমরা যেভাবে সাম্রাজ্য বুঝি ঠিক সেভাবে না। কিন্তু মিসিসিপি অববাহিকা জুড়ে কাহোকিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য। সেখানে যে একধরণের হায়ারার্কি বা উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর বৈষম্য ছিল, তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন একটি ঢিবি পাওয়া গিয়েছে যেটা তরুণীদের মৃতদেহের অবশেষে ভরা ছিল; মনে করা হয় কোনো এক ভয়ংকর আচারের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। আবার মঙ্কস মাউন্ড (Monk’s Mound) থেকে পুরো জনপদের ওপর নজরদারি করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। আমরা জানি যে যখন এই জায়গাটি কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে, তখন আশেপাশের গ্রামাঞ্চলগুলো জনশূন্য হয়ে যায়। আপনি সেখান থেকে ঘরবাড়ির এলাকাগুলো দেখতে পেতেন; দুর্গের মতো দেয়ালও তৈরি হতে শুরু করেছিল। মনে হচ্ছিল সমাজটা ওই হায়ারার্কির দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু এরপরই সব বদলে যায়। এলাকাটি পরিত্যক্ত হয় এবং মানুষ সেখান থেকে চলে যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকরা কাহোকিয়ার চারপাশের পুরো অঞ্চলকে একধরণের ‘জনশূন্য অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। জায়গাটা যেন একসময় পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল; এমনকি আমরা এই জায়গাটার আসল নামও জানি না। পরবর্তীকালের কথ্য ইতিহাসে এই বসতির তেমন কোনো স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তার মানে মানুষ কোনো এক কারণে কাহোকিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে, যেমন পরিবেশগত বিপর্যয়—যা আমার মতে খুব একটা জোরালো যুক্তি নয়। বর্তমানে মানুষ একে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পুয়েবলো (Pueblo) সভ্যতার মতোই দেখছে—যেখানে অনেক বড় বড় কেন্দ্রীভূত প্রত্নস্থান হুট করে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তো আমরা কেন অন্তত এই সম্ভাবনাটা বিবেচনা করব না যে—মানুষ আসলে সচেতনভাবেই ওই জায়গা থেকে চলে গিয়েছিল? তারা হয়তো এক নতুন ধরণের সামাজিক ব্যবস্থা আর নিয়মকানুন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনি যখন বিষয়টাকে এভাবে দেখবেন, তখন কয়েকশ বছর পর ইউরোপীয়রা ওই অঞ্চলে যে ধরণের সমাজের মুখোমুখি হয়েছিল, সেগুলোর যোগসূত্র মেলাতে পারবেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও বেশ হায়ারার্কিকাল ছিল—যেন ছোট ছোট কাহোকিয়া। কিন্তু অন্যরা অত্যন্ত সাম্যবাদী (egalitarian) জীবনযাপন পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল। ইউরোপীয়রা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছিল যে তারা বোধহয় সবসময় এমনই ছিল। কিন্তু আমরা এখানে এমন মানুষদের কথা বলছি যাদের ইতিহাস সচেতনতা ছিল প্রখর; তাদের নিজেদের ইতিহাসে কাহোকিয়া আর তার বিশাল আঞ্চলিক ব্যবস্থার কথা ছিল। ফলে সেখানে এক ধরণের হায়ারার্কিকাল অতীত ছিল যেখান থেকে মানুষ কোনো না কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং এক নতুন সমাজ গঠন করেছিল। বইটাতে আমরা এ নিয়ে বেশ বিশদ আলোচনা করেছি কারণ এটি ওই ধারণাকে ভেঙে দেয় যে—আদিবাসী মানুষরা কোনো একটা সাংস্কৃতিক ছাঁচে স্থির হয়ে আছে অথবা তাদের কোনো ইতিহাস নেই।

অ্যারন বাস্তানি: তেওতিওয়াকান (Teotihuacan) নামে আরেকটা দারুণ উদাহরণ আছে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: উচ্চারণটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে আমার মেক্সিকান সহকর্মী বলেন যে ওখানকার পণ্ডিতরাও সবসময় ‘তেওতিওয়াকান’ (Teotiwa-kan) উচ্চারণ করতে পারেন না। যাই হোক, আমরা সম্ভবত ওটা নিয়েই কথা বলছি। আকার, আয়তন আর জাঁকজমকের দিক থেকে এই নগরটি ছিল রোমের প্রতিদ্বন্দ্বী। এটি ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আর কর্তৃত্ববাদী। এরপর সেখানে কিছু একটা বদল আসে। আপনি বইতে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি যেন পশ্চিম গোলার্ধের এক ‘প্যারিস কমিউন’। প্রত্নতাত্ত্বিক রেনে মিলনের (Rene Millon) কথা বলতে হয় যিনি এর এক অসাধারণ মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতে আমরা ওই ম্যাপটি ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছি। তিনি প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি সারভে পরিচালনা করেছিলেন। ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এর স্বর্ণযুগে এখানে রক্ষণশীল হিসেবে ১ লাখ মানুষের বসতি ছিল, কেউ কেউ সংখ্যাটা এর দ্বিগুণ বলেন। মিলন এবং পরবর্তী গবেষকরা দাবি করেন যে সেখানে জনসংখ্যার ভাগ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। শুরুতে সমাজটি ছিল অত্যন্ত হায়ারার্কিকাল। আপনি যদি আজ সেখানে পর্যটক হিসেবে যান বা গুগলে ছবি দেখেন, তবে সূর্যের পিরামিড (Pyramid of the Sun) এবং চাঁদের পিরামিড (Pyramid of the Moon) নামে দুটি বিশাল স্থাপনা দেখতে পাবেন। এছাড়া টেম্পল অব দ্য ফেদারড সার্পেন্ট (Temple of The Feathered Serpent) নামে আরেকটি বড় স্থাপনা আছে। এগুলো অবশ্য পরবর্তীকালে অ্যাজটেকদের দেওয়া নাম; আমরা জানি না আদি নাম কী ছিল। তো শুরুটা ছিল হায়ারার্কিকাল এবং সেখানেও আচারগত নরবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। পিরামিডের ভিত্তির নিচে বন্দিদের মৃতদেহ পুঁতে রাখা হতো; তাদের হাত পেছনে বাঁধা থাকত। কিন্তু ২৫০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কিছু একটা বদলে গেল। এরপর ওই বিশাল মাপে আর কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা মন্দির তৈরি হয়নি। মন্দির আর পিরামিড তৈরির পেছনে যে শ্রম আর সম্পদ ব্যয় হতো, তা অন্য কাজে ব্যবহার শুরু হলো। আর সেই কাজটি ছিল আবাসন বা হাউজিং। তারা পুরো জনপদ জুড়ে গ্রিড পদ্ধতিতে চমৎকার সব অ্যাপার্টমেন্ট কম্পাউন্ড তৈরি করল। এগুলো খুব একটা উঁচু ছিল না; অনেকটা ভিলার মতো ছিল যেখানে কয়েকটি ছোট পরিবার একসাথে থাকতে পারত। মাঝখানে বিশাল উঠান, মেঝের নিচ দিয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দেয়ালে চমৎকার সব ম্যুরাল চিত্র ছিল। শুরুতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন এগুলো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তারা ভেবেছিলেন এগুলো বোধহয় রাজপ্রাসাদ। পরে তারা বুঝতে পারলেন যে ওই নগরের সবাই আসলে রাজপ্রাসাদেই বাস করত! এখন আমরা বিষয়টাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমাদের কাছে তখনকার কোনো লিখিত উৎস নেই। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে সেই সময় থেকে ওই নগরের মানুষের জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক উন্নত এবং তা নগরের পুরো জনসংখ্যার জন্যই সাধারণ ছিল। এটি সত্যিই অসাধারণ। আপনি যেমন ‘গানস, জার্মস অ্যান্ড স্টিলের’ কথা বলছিলেন। আমরা যদি কয়েকশ বছর এগিয়ে ১৬শ শতাব্দীর সেই স্প্যানিশ দখলদারিত্বের বিজয়ের সময়ের কথা ভাবি তাহলে সেসময়ের বিবরণগুলোতেও নানা ধরণের নগরের কথা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত তেনোচতিৎলান (Tenochtitlan), মন্টেজুমা আর অ্যাজটেক সাম্রাজ্য নিয়ে ভাবি। এই সাম্রাজ্যগুলো ছিল খুব উচ্চ-নীচ ভেদাভেদের শ্রেণিবিন্যস্ত/হায়ারার্কিকাল। কিন্তু হার্নান করতেস এবং তাঁর কনকুইস্তাদোররা (Conquistadors) যে নগরের সাথে হাত মিলিয়ে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তার নাম ছিল ত্লাসকালা (Tlaxcala)। তেনোচতিৎলান আর ত্লাসকালার সম্পর্ক ছিল অনেকটা এথেন্স আর স্পার্টার মতো। একটি ছিল ভীষণ হায়ারার্কিকাল, অন্যটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক। ত্লাসকালা ছিল একধরণের প্রজাতন্ত্র, যেখানে নিজস্ব পার্লামেন্ট ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় সেখানে হওয়া বিতর্কগুলোর রেকর্ডও পাওয়া যায়। অথচ আমাদের বিশ্ব ইতিহাসে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। আমাদের শেখানো হয় যে তেনোচতিৎলানের পতনই ছিল পশ্চিমা বিশ্ব-আধিপত্যের শুরু। কিন্তু আমাদের এটা শেখানো হয় না যে ওই পথের একটি ধাপ ছিল ইউরোপীয় বিজেতাদের সঙ্গে একটি আদিবাসী নগর গণতন্ত্রের এক অসাধারণ মোলাকাত। আমি ওই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলতে দ্বিধাবোধ করি না। কারণ সেই সময় ইউরোপেও এই ধরণের নগর খুব একটা দেখা যেত না। করতেস নিজেই স্পেনের রাজাকে চিঠি লিখেছিলেন যে, আমি এমন এক জায়গা খুঁজে পেয়েছি যেখানে কোনো রাজা নেই। এই রাজ্য অনেকটা আমাদের ফ্লোরেন্স বা ভেনিসের মতো অন্য কোনো নীতিতে চলে। এসব তথ্য সামনেই আছে। কিন্তু ইতিহাসে এই তথ্যগুলোকে কখনোই সেই প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এগুলো ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, প্রাচীন গ্রিস বা রোমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কহীন এক আদিবাসী নগর ব্যবস্থা। তেওতিওয়াকানে (Teotihuacan) যা ঘটেছিল তা মূলত ছিল এক সামাজিক বিপ্লব।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, একদমই তাই। ওই প্রত্নস্থানের অনেক বিশেষজ্ঞও মনে করেন যে সেখানে এমন কিছু একটা ঘটেছিল। প্রত্নতত্ত্বে সাধারণত সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন। তবে সবাই এটুকু স্বীকার করেন যে সেখানে এক আমূল রূপান্তর ঘটেছিল। এমন আলামত অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কারণ মানব ইতিহাসের প্রথাগত বয়ানে আমাদের শেখানো হয় যে, জনসংখ্যা যখন খুব ঘন হয় এবং একবার হায়ারার্কি বা ভেদাভেদ তৈরি হয়, তখন তা আর ফেরানো সম্ভব নয়। কিন্তু এখানে আমরা উল্টোটা দেখছি।

অ্যারন বাস্তানি: হ্যাঁ, আপনি যেমনটা বলেছেন যে পশ্চিমা রাজনৈতিক ইতিহাসে বলা হয় হাইতি বিপ্লবের আগে কোনো সফল দাস বিদ্রোহ ছিল না। আমাদের জানা মতে এই ধারণা মোটামুটি সঠিক হলেও আমেরিকায় হয়তো বিষয়টা অন্যরকম ছিল। আপনি বইতে একটা চমৎকার আলংকারিক প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা যখন দাসপ্রথা বিলোপ নিয়ে কথা বলি, তখন আমরা সিমন বলিভার বা তুসঁ লুভর্তুয়রের কথা বলি। কিন্তু সম্ভবত ইতিহাসে এই প্রথা আরও অনেকবার বিলুপ্ত হয়েছে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই বয়ানগুলো আসলে এক ধ্রুপদী ইউরোপকেন্দ্রিকতা। ভাবা হয় যে অন্য কোথাও হয়তো এসব ঘটেছে কিন্তু ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটে না ঘটা পর্যন্ত তার যেন কোনো স্বীকৃতি নেই। এমন চিন্তাভাবনা এক ধরণের ছাঁকুনি যা ইউরোপকে প্রগতিশীল রাজনীতির একচেটিয়া অধিকার দিয়ে দেয়। চরম পর্যায়ে গেলে এই চিন্তাভাবনাই আবার উপনিবেশায়ন আর গণহত্যার যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বলা হয় যে আমরাই তো গণতন্ত্রের মতো সব প্রগতিশীল ধারণা নিয়ে এসেছি যা অন্য কোথাও ছিল না। ফলে তাদের জনপদ ধ্বংস করা বা মানুষ মারার দায়টা ঢাকা পড়ে যায়। তারা বলে যে, অন্তত আমরা তো তাদের একধরণের স্থবিরতা থেকে বের করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে এসেছি। অথচ আমরা বইতে দেখিয়েছি যে ইউরোপের বাইরের জগতেও সচেতন রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক বিশাল জগৎ ছিল এবং তার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।

অ্যারন বাস্তানি: আপনার গবেষণার ক্ষেত্র হলো পশ্চিম এশিয়া আর উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা। যদিও আপনি আমেরিকার বিষয়েও খুব স্পষ্ট ধারণা রাখেন এই ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল বইয়ের জন্য আপনাকে গবেষণা করার কারণে। আমি যেটা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো, তুরস্কের গোবেকলি তেপে (Gobekli Tepe) কিংবা মাল্টার সেই মেগালিথিক প্রত্নস্থানগুলো প্রসঙ্গে। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু শহর বা নগর যদি কৃষির আগে থেকে থাকে—তবে কি এমনটা হওয়া সম্ভব যে ‘হোমো সেপিয়েন্স’ (Homo sapiens) রা অন্য কোনো আদি মানবের (Archaic humans) সাথে একসাথে কোনো নগর পরিবেশে বাস করত? কারণ নিয়ানডার্থালরা তো ইউরোপে বেশ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল। আপনার কি মনে হয় এমন কোনো স্থায়ী জনপদ থাকা সম্ভব যেখানে তাদের একই সঙ্গে দেখা গিয়েছে?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি ব্যক্তিগতভাবে গোবেকলি তেপেকে (Gobekli Tepe) এই আলোচনায় আনব না কারণ ওটা অনেক পরের ঘটনা; তখন নিয়ানডার্থালরা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা প্রায় ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কথা বলছি। আমি গোবেকলি তেপেকে নগর হিসেবেও সংজ্ঞায়ন করব না। আমি মনে করি গোবেকলি তেপে এমন এক প্রত্নস্থান যেখানে মানুষ স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল এবং এক নির্দিষ্ট সময়ে বিশাল সংখ্যায় মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত।

অ্যারন বাস্তানি: আচ্ছা, আমি প্রশ্নটা অন্যভাবে করি। এখানে তো একটি স্থায়ী স্থাপনা ছিল। তো, এমন কোনো জায়গায় মানুষের সাথে অন্য কোনো আদি মানবের একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা আছে কি?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমরা যদি আরও অনেক পেছনে—ধরুন প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে ফিরে যাই—তবে আমরা জানি যে তখন পৃথিবীতে অন্তত চার বা পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতির মানুষ ছিল। আমরা ছিলাম, নিয়ানডার্থালরা ছিল, ডেনিসোভানরা (Denisovans) ছিল; ইন্দোনেশিয়ায় ছিল হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস (Homo floresiensis), যাদের ভালোবেসে ‘হবিট’ (Hobbits) বলা হয়। এছাড়া ফিলিপাইনের লুজান দ্বীপেও আরও কিছু সাম্প্রতিক আবিষ্কার হয়েছে। আধুনিক সময়ে এমন তুলনীয় পরিস্থিতি নাই যখন মানুষেরই বিভিন্ন প্রজাতি একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করছে। আমরা জেনেটিক্যালি জানি যে তাদের মাঝে নিবিড় সম্পর্ক ছিল এবং আন্তঃপ্রজাতি প্রজননও হয়েছিল। আসলে আপনি যখন আমাদের প্রজাতির উৎসের আরও গভীরে যাবেন, তখন চিত্রটা এমনই দেখাবে। আমরা এখন আফ্রিকার কথা বলছি। এক সময় ধারণা করা হতো এক ‘মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ’ (Mitochondrial Eve) বা কোনো এক আদি সাভানা (Savannah) পরিবেশ থেকে হুট করে আমরা মানুষ হয়ে উঠেছি। আধুনিক ফসিল এবং জেনেটিক প্রমাণ বলছে যে এই ধারণা ভুল। আমরা আফ্রিকাতেই বিবর্তিত হয়েছি, তবে সেটি ছিল একাধিক ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। সেটা প্রায় ৫ লাখ থেকে ২ লাখ বছর আগের কথা। উপকূলীয় অঞ্চল, বনজঙ্গল এবং সাভানা – এই সব জায়গায় আদি মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কখনও বিচ্ছিন্নতা ছিল, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ছিল। ফলে শারীরিক গঠনেও বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছিল। শারীরিক বৈচিত্র্য যদি থেকে থাকে, তবে কল্পনা করুন ভাষা, শিশু লালন-পালন বা সামাজিক রীতিনীতিতে কত ধরণের বৈচিত্র্য ছিল! এসব উপাত্ত মানুষের আদি সমাজ কেমন ছিল তা পুনর্নির্মাণের গভীর প্রোথিত দার্শনিক অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট আদি সমাজ ছিল না; বরং সেখানে ছিল এক বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সামাজিক রূপের সমাহার। সেই দশাগুলো আমরা এখন কল্পনাও করতে পারি না। আসলে আমরা ওই বিভিন্ন উপপ্রজাতি আর বিভিন্ন ঐতিহ্যের এক সংমিশ্রণ থেকেই এসেছি।


অ্যারন বাস্তানি: চলুন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) নিয়ে কিছু আলাপ করি, যদি শব্দটা সঠিক হয়ে থাকে। ইদানীং ইন্টারনেট আর ইউটিউবের উত্থানের ফলে ছদ্মপ্রত্নতত্ত্ব সম্ভবত অনেকের জন্য প্রত্নতত্ত্বের জগতে ঢোকার একটা পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা হয়তো এখান থেকেই শুরু করে এবং পরে আপনার মতো কারও কাছে পৌঁছে আসল প্রত্নতত্ত্ব শিখতে আগ্রহী হয়।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, তা হতে পারে। আপনার কী মনে হয়? কেন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব (Pseudo-archaeology) দিন দিন এত জনপ্রিয় হচ্ছে? আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক কালচেতনার (Zeitgeist) মধ্যে নিশ্চয়ই এই ধরনের প্রত্নতত্ত্বের প্রতি এক ধরণের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তবে আমরা ঠিক কী নিয়ে কথা বলছি, সেটা আগে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ আমার মতো পেশাদাররা যা পড়ান বা করেন, তার সাথে ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের (Pseudo-archaeology) পার্থক্য কী—তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন মূলত এমন সব মানুষ, যারা জীবনে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক মাঠ-গবেষণায় অংশ নেননি। আমরা এতক্ষণ যেসব প্রমাণ নিয়ে কথা বললাম, সেগুলো গবেষণার সঙ্গেও তারা যুক্ত নন। তারা মূলত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অতীতের এক ধরণের পুনর্নির্মাণ পেশ করেন। প্রায়ই এগুলোকে খুব রহস্যময় বা ষড়যন্ত্রমূলক (conspiratorial) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনে করা হয় যে, আমার মতো মানুষরা—যারা সারা জীবন এই দক্ষতাগুলো শিখতে আর শেখাতে ব্যয় করছি—তারা আসলে সত্য গোপন করতে চাইছি। আর সেই লুকানো সত্য নাকি কেবল তাঁদের কাছেই আছে যারা এই পেশার সাথে যুক্ত নন! আমি কোনো উন্নাসিকতা দেখাতে চাই না; মানুষের নিজস্ব কল্পনা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মধ্যে ভুল কিছু নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা যেগুলোকে বিশাল কোনো নতুন উদঘাটন হিসেবে তুলে ধরেন, সেগুলো আসলে অনেক পুরনো আর বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু তত্ত্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এগুলো মূলধারার প্রত্নতত্ত্বেরই অংশ ছিল; যেমন আটলান্টিসের হারানো নগরী (lost city of Atlantis)। এই ধরণের চিন্তাভাবনা মোটেও নতুন কিছু নয়। আমাদের বই আর আলাপচারিতা থেকে আমি আশা করি এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে আসল তথ্যপ্রমাণগুলো নিজেই যথেষ্ট বিস্ময়কর এবং রহস্যময়। বিষয়টাকে আকর্ষণীয় করার জন্য আপনাকে অতিরঞ্জিত কিছু কল্পনা করার প্রয়োজন নেই। আসল রহস্যগুলোর জট খোলার চেষ্টা করাটাই যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং আর উদ্দীপনামূলক। একে কৃত্রিম রহস্য দিয়ে ঘিরে রাখার কোনো দরকার পড়ে না।

অ্যারন বাস্তানি: ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ক্ষেত্রে সবসময়ই এমনটা ঘটে। আপনি কারও সঙ্গে কথা বললে তারা বলবে অমুক ব্যক্তি অমুক কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে; এগুলো এক গোপন চক্রের কাজ। অথচ পৃথিবীতে প্রচুর শোষণ আর বঞ্চনা আছে এবং ক্ষমতাধরেরা আসলেও অসাধারণ সব উপায়ে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা সেগুলো আসলে শনাক্ত করতে আর বুঝতে পারি। এমন বোঝাপড়ার জন্য বিল্ডারবার্গ গ্রুপ (Bilderberg Group) বা এই জাতীয় অবাস্তব কিছু নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, তবে একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায় আমার অনেক সহকর্মী যেভাবে সাড়া দেন, তা আমাকে মাঝে মাঝে কিছুটা বিরক্ত করে। তাঁরা অনেকটা এমন ভাবে বলেন যে, আমরাই বিজ্ঞানী, আমরাই সব ভালো জানি এবং আপনি যদি ওসব বিশ্বাস করেন তবে আপনি পাগল। কথাটি এক অর্থে সত্য হলেও আমাদের নিজস্ব শাস্ত্রের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। ইতিহাসচর্চার এই পদ্ধতিগুলো মাঝেমধ্যে বেশ অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন তারা পুরো এক জনগোষ্ঠীর মানবিকতা আর চেতনাকে অস্বীকার করে। যখন ইউরোপীয়রা প্রথম কাহোকিয়ার মতো স্মৃতিস্তম্ভগুলো দেখেছিল, তারা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আদিবাসীরা ওগুলো তৈরি করেছে। তখন তারা সব উদ্ভট তত্ত্ব হাজির করল, যেমন লেইফ এরিকসন বা ভাইকিংরা এসেছিল, অথবা এটি ইসরায়েলের হারানো কোনো বংশের কাজ। সেই সময়কার মূলধারার ইউরোপীয় জ্ঞান থেকেই এই ধরণের ধারণাগুলো আসত। আমি মিশরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার উৎস নিয়ে অনেক কাজ করেছি। পিরামিড বা মমীকরণের মতন বিখ্যাত জিনিসের আগের সময়টাকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন প্রাক-রাজবংশীয় যুগ (Pre-dynastic)। নামটা এমন যে মানুষ যেন এতে আগ্রহী না হয়! আপনি যদি এই প্রাক-রাজবংশীয় যুগ নিয়ে কোনো কনফারেন্সে যান, তবে দেখবেন তাঁরা মাটির পাত্রের মাপজোখ নিয়ে পড়ে আছেন। যারা আসলে জানতে চায় ওখানে কী ঘটেছিল, তাদের জন্য বিষয়টি ভীষণ বিরক্তির। আপনি যেখানে পড়াশোনা করেছেন সেই ইউসিএলে পেট্রি মিউজিয়াম আছে। সেই জাদুঘর এখন নিজেরই ইতিহাসের দিকে খুব খোলামেলাভাবে তাকাচ্ছে। যে প্রত্নতত্ত্ববিদের নামে এই মিউজিয়াম, সেই ফ্লিন্ডার্স পেট্রি ছিলেন একজন সুপ্রজননবাদী (eugenicist)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অ-ইউরোপীয়রা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিচু মানের। তিনি কপাল বা করোটির গঠনতত্ত্ব (Phrenology) দিয়ে মানুষের মেধা মাপার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে তাঁর একটা তত্ত্ব ছিল যে—প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা আফ্রিকানদের দ্বারা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে সেখানে অন্য কোনো ‘নতুন নরগোষ্ঠী’ (new race) এসে আক্রমণ চালিয়ে এই সভ্যতা গড়েছিল। আমরা এখন নেটফ্লিক্সে যেসব উদ্ভট তত্ত্ব দেখি, এগুলোও ঠিক ততটাই ভিত্তিহীন ছিল; কিন্তু এগুলো আসত আমাদেরই বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্র থেকে। আটলান্টিসের হারানো জাতি নিয়ে ওই ধরণের তত্ত্বগুলো প্রত্যক্ষণলব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে নাকচ করে দেওয়াটা খুব সহজ। কিন্তু লড়াইটা কেবল অর্ধেক। আমাদের নিজেদের ভেতরেও তাকাতে হবে এবং কঠিন প্রশ্নগুলো করতে হবে। এই ধরণের তত্ত্বগুলো জায়গা পায় কীভাবে? আমার মনে হয় জায়গা পাওয়ার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ। এই ধারণা যে—সুদূর অতীতে অন্য কোনো মহাদেশের মানুষ আমাদের মতোই বুদ্ধিমান আর সৃজনশীল হতে পারে, তা অনেকে মেনে নিতে পারেন না। যদি কারো মনে এই ধরনের বাধার দেয়াল থাকে, তবে তাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে যে কেন এমনটা হচ্ছে।

অ্যারন বাস্তানি : তবে এর কিছু অস্পষ্ট উদাহরণও তো আছে। অনেকে বলেন যে স্ফিংস আসলে পিরামিডের চেয়েও অনেক বেশি পুরনো। এটা কোনো এলিয়েন নয় বরং মিশরের মানুষরাই তৈরি করেছে এবং আমাদের বর্তমান ধারণার চেয়ে এটি কয়েক হাজার বছর আগের। আপনি কি একেও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলবেন?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: না, এটি একটি পুরোপুরি বৈধ প্রশ্ন হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এটি খুব একটা কৌতূহলোদ্দীপক কোনো দিকে আমাদের নিয়ে যায়। এই ধরণের বিষয়গুলো তদন্ত করার পদ্ধতি আমাদের কাছে আছে। তবে পিরামিড আর স্ফিংস তৈরির আগের চতুর্থ রাজবংশের সময়ে কী ঘটছিল—সেই প্রেক্ষাপটটা বুঝতে পারাটাই বেশি জরুরি। আমি দক্ষিণ মিশরের উম্ম এল-কায়াব (Umm el-Qa’ab) নামে একটি জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে মিশরের প্রথম রাজবংশীয় যুগের আদি রাজকীয় কবরস্থান আছে এবং সেটি আসলেও বিস্ময়কর। সেখানে এক ভয়ংকর চিত্র দেখা যায় যা আমরা ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ বইতেও আলোচনা করেছি। এই কবরস্থানে রয়েছে মিশরের আদি রাজা আর রানীদের সমাধি। মাটির নিচে বড় বড় গর্তের ভেতর সিঁড়ি আর আসবাবপত্রসহ সমাধিগুলো তৈরি করা হতো। আর তার চারপাশে শত শত ছোট ছোট কক্ষ থাকত যেখানে অন্য মানুষদের কবর দেওয়া হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, রাজকীয় কবরের পাশে সমাহিত করার জন্য ওইসব মানুষকে আচারগতভাবে হত্যা করা হতো। শুধু মানুষ নয়, মিশরের একজন আদি রাজা, আমরা প্রারম্ভিক হায়ারোগ্লিফে তার নাম পড়তে পারি – আহা (Aha)। তার সমাধির গর্তে মানুষের পাশাপাশি তিনটি সিংহকেও সমাহিত করা হয়েছিল। এগুলো কি যথেষ্ট চমকপ্রদ নয়? বইয়ের ১০ নম্বর অধ্যায়ে আমরা এগুলো নিয়েই আলাপ করেছি। তথাকথিত প্রাচীন রাষ্ট্রের শুরুতে কেন মানুষের বিরুদ্ধে এমন সুপরিকল্পিত সহিংসতার প্রয়োজন হলো, সেটা অনুসন্ধান করাটাই বেশি রোমাঞ্চকর। এই প্রেক্ষাপটে স্ফিংসের আলাদা কোনো জায়গা নেই। আমরা বরং যাকিছু ঘটেছিল তা পুনর্নির্মাণ করতে পারি এবং সেগুলো তো নিজ-গুণেই অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

অ্যারন বাস্তানি: কিন্তু একজন ছদ্ম-প্রত্নতত্ত্ববিদ হয়তো আপনাকে বলবেন যে—এই সভ্যতা প্রথম রাজবংশীয় যুগের চেয়েও পুরনো এবং এটা একটি হারানো সভ্যতা।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: দেখুন, তখনকার সময় নিয়ে আসলে আমরা অনেক কিছুই জানি। আমার পিএইচডি গবেষণার বিষয়ই ছিল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দ; অর্থাৎ সেই দীর্ঘ সময় যাকে প্রাক-রাজবংশীয় যুগ বলা হয়। সেই সময়ে কী ঘটছিল তা আমরা বেশ ভালোভাবেই জানি। আপনি যেকোনো জাদুঘরে গেলেই তা দেখতে পাবেন। অক্সফোর্ডের অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম বা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অসাধারণ সব জিনিস আছে। আমরা সবাই বড় বড় স্মৃতিস্তম্ভ, স্ফিংস বা পিরামিড নিয়ে মেতে থাকি। কিন্তু আপনি যদি সাধারণ মানুষের দিকে এবং বিশেষ করে তাদের সমাধির দিকে নজর দেন, তবে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। মৃত্যুর পরের বিভিন্ন আচারের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হতো, সেগুলোর বিবর্তনটা কয়েক হাজার বছর ধরে মিশরে খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথম রাজবংশীয় যুগ বা ফারাওদের উত্থানের আগে প্রায় যে কাউকেই রাজপুত্রের মতো জাঁকজমকভাবে সমাহিত করা যেত। সুন্দর কারুকাজ করা অলঙ্কার, ব্যক্তিগত নকশা করা মাটির পাত্র আর প্রসাধন সামগ্রী তাদের সাথে দেওয়া হতো। কিন্তু যখনই রাজতন্ত্র আর ফারাও শাসনের উত্থান ঘটল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের জীবনের এই নান্দনিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তারা আর আগের মতো নিজেদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনা করতে পারছিল না। ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থানের সময়ও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই যেকথা স্প্যানিশদের বিবরণ থেকে জানা যায়। সেখানে বিবাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো কোনো সামাজিক আচার পালনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সম্পদের প্রয়োজন হতো; যেমন শস্য থেকে তৈরি ‘চিচা’ (Chicha) নামে পরিচিত পানীয়। কিন্তু সবাই তো সেই সম্পদ সমানভাবে পেত না। ঠিক একইভাবে মিশরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও এক পর্যায়ে শস্য আর বিয়ারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এসবকিছু ব্যবহারের জন্য আপনাকে সেই ভূসম্পত্তির ওপর অধিকার থাকতে হতো যেখানে চাষাবাদ হয়। ফলে যেসব মানুষ তাদের পরিবারের এই সামাজিক আচারগুলো পালন করতে পারত না তারা এক পর্যায়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত। আমি এখানে কেবল বেঁচে থাকার কথা বলছি না, বরং সামাজিক কর্তব্যের কথা বলছি। এই ঋণের সম্পর্ক থেকেই এক সময় উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ আর পরাধীনতার জন্ম হয়। মানুষ যখন তাদের জীবনের মৌলিক আচারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখনই এই ধরণের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাগুলো গড়ে ওঠে।

অ্যারন বাস্তানি: আপনার ভবিষ্যতের প্রজেক্টগুলো কী কী?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমি এই মুহূর্তে বেশ কিছু সাইড প্রজেক্টের সাথে যুক্ত আছি। খুব গভীর গবেষণার জন্য এখন তেমন সময় পাচ্ছি না। তাই আমি এমন কিছু কাজ করছি যেগুলো কেবল লেখালেখি নয়, বরং নিজেকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা। গোল্ডস্মিথস কলেজের ফরেনসিক আর্কিটেকচার নামের একটি দলের সাথে আমি কাজ করছি। তারা মূলত মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। আমাজনের বন উজাড় থেকে শুরু করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড — নানা বিষয়ে তারা স্থাপত্যবিদ্যার মডেল ব্যবহার করে আদালতে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে। ইয়াল ওয়াইজম্যান (Eyal Weizman) এবং তাঁর অসাধারণ দলের সাথে আমার এই কাজ চলছে। জার্মানিতে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নিয়ে তিন দিনের একটি বড় ইভেন্ট হয়েছিল যেখানে ইয়াল একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলেন এবং সেটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। লন্ডনে ফিরে আসার পর আমরা কফি খেতে গিয়েছিলাম এবং বইটির ওপর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের দারুণ আলাপ হয়। প্রথমে আমি আমাদের কাজের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাইনি কারণ সময়ের ব্যাপ্তিটা ছিল আমূল ভিন্ন। কিন্তু তিনি আমাদের বইটিকে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের একটি বিস্তৃত কেস স্টাডি হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ এটি একটি রাষ্ট্র-বিরোধী আখ্যান। অনেক সময় আপনি হয়তো বিকল্প কোনো ঘটনার সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের ফুটোগুলো দেখিয়ে দিতে পারেন, তবেই সেটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আর যখনই প্রথাগত বয়ানটি নড়বড়ে হয়, তখনই নতুন কোনো সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। আমি দেখলাম বইটির ক্ষেত্রে আমরা ঠিক একই যুক্তি ব্যবহার করেছি। তাই আমরা ইউক্রেনের কিছু অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মেসোপটেমিয়া বা বর্তমান ইরাক আর সিরিয়ার আদি নগরগুলোর সমসাময়িক কিছু নগর ইউক্রেনেও পাওয়া গিয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগের এই বিশাল নগরগুলোতে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কেন্দ্রীভূত শাসনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ নিয়ে বিশাল বিতর্ক আছে যে এগুলোকে নগর বলা হবে নাকি ‘অতিকায় গ্রাম’ বা মেগা-সাইট (Mega sites) বলা হবে। এই বসতিগুলো মূলত আমাদের ভাবায় যে ‘নগর’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি এবং আমাদের মনে আগে থেকেই কী ধরণের ধারণা গেঁথে আছে। আমরা একটি ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশন তৈরি করছি যা সরাসরি কোনো উত্তর না দিলেও দর্শকদের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। এটি একটি প্রজেক্ট। এর বাইরে ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ প্রকাশের পর আমি সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি সৃজনশীল মানুষদের কাছ থেকে—যেমন সংগীতশিল্পী, শিল্পী আর চলচ্চিত্র নির্মাতা। গত সপ্তাহে প্যারিসের ইয়াসমিন ডিবোয়া নামের একজন চমৎকার গায়িকার সাথে দেখা হলো যাঁর স্টেজ নাম হলো ‘লাফান্ডা’ (Lafawndah)। তিনি ‘দ্য ডন অব এভরিথিং’ নামে একটি গান লিখেছেন এবং কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনে সেটি পরিবেশন করেছেন। ইরানে মানবাধিকার আন্দোলন ‘উইমেন লাইফ ফ্রিডম’-এর একটি অনুষ্ঠানে তিনি এটি গেয়েছেন। আমি শিকাগো থেকে ফেরার কারণে ক্লান্তিতে সেখানে উপস্থিত হতে পারিনি যা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। এই ধরণের সাড়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার মনে হয় এটি আমার সহ-লেখক প্রয়াত ডেভিডের  প্রতি এক বিশাল শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল কঠিন আর অস্পষ্ট বিষয়গুলোকে এমনভাবে লিখে ফেলার যা মানুষের মন ছুঁয়ে যেত। মানুষ এতে নিজেকে যুক্ত করতে পারত এবং নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেত। আমি এগুলোকে তাঁর প্রতি এক সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবেই দেখি এবং আমি নিজেকে এই কর্মকাণ্ডে একজন ভাগ্যবান সহযাত্রী মনে করি।

অ্যারন বাস্তানি: সম্ভব হলে ডেভিড সম্পর্কে একটা শেষ প্রশ্ন করতে চাই। ডেভিড গ্রেবার আপনার এই বইয়ের সহ-লেখক ছিলেন। ২০২০ সালে সম্ভবত তিনি টুইট করেছিলেন যে পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ হয়েছে।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, ঠিক তাই। তিনি জিম মরিসনের একটা ছদ্ম-উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছিলেন— ‘আমার মস্তিষ্ক যেন অসাড় বিস্ময়ে আহত, আমরা শেষ করেছি’— অথবা এই ধরণের কিছু একটা।

অ্যারন বাস্তানি: আর এর এক মাস পরেই তিনি মারা গেলেন।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: হ্যাঁ, পাণ্ডুলিপি শেষ করার প্রায় তিন সপ্তাহ পর। মাত্র তিন সপ্তাহ।

অ্যারন বাস্তানি: তো এমন একটা বই প্রকাশ করার অভিজ্ঞতা কেমন— যা বিশ্বজুড়ে ‘বেস্টসেলার’ হয়েছে এবং অনেক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে? একজনের সাথে দীর্ঘ এক দশক ধরে কাজ করার পর যখন বড় ধরনের সাফল্য এল, তখন তিনি তা ভাগ করে নেওয়ার জন্য আর পাশে নেই— বিষয়টা কেমন?

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আসলে আমাকে দুইভাবে বিষয়টি অনুভব করতে হয়। একটা হলো ভালো অনুভূতি— বইটি যেভাবে সমাদৃত হয়েছে তা অসাধারণ। সম্প্রতি একজন আমাকে কিছু তথ্য দিলেন যে বিশ্বজুড়ে বইটির প্রায় ১০ লাখ কপি বিক্রি হতে চলেছে; ভাবতেই অবাক লাগে। তবে অন্য অনুভূতিটা খুব যন্ত্রণাদায়ক। অবিরামভাবে এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া যে ডেভিড এসবের সাক্ষী হওয়ার জন্য বেঁচে নেই। তিনি এই বইটির জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন; তাঁর তর সইছিল না বইটা মানুষের হাতে তুলে দিয়ে এই ধরণের আলোচনা করার জন্য। আসলে আপনার সাথে এখানে বসে আড্ডা দেওয়া আর এসব বিষয় নিয়ে আলাপ করার সময় আমাদের দুজনেরই থাকার কথা ছিল। তাই এই অনুভূতি একইসঙ্গে খুব যন্ত্রণাদায়ক এবং এক ধরণের প্যারাডক্স। এসবের মধ্যে আমি শুধু একটা বিশ্বাসই আঁকড়ে ধরি। তিনি অবশ্যই চাইতেন আমি যেন বাইরে বের হই, কঠোর পরিশ্রম করি এবং মানুষকে এই বই আর আমাদের কাজগুলো নিয়ে জানাই। আমি যথাসাধ্য সেটাই করার চেষ্টা করছি; বলতে পারেন কাজটা আমি খানিকটা তাঁর জন্যই করছি। যখন আমি একটু বাড়তি শ্রম দিই, তখন তাঁর কথাই মনে হয়।

অ্যারন বাস্তানি: একদম ঠিক। ডেভিড ওয়েনগ্রো, আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ডেভিড ওয়েনগ্রো: আমারও খুব ভালো লেগেছে, ধন্যবাদ।

[সূত্র : Everything We Think We Know About Early Human History is Wrong | David Wengrow on Downstream); নোভারা মিডিয়া (Novara Media) | ৪ ডিসেম্বর, ২০২২

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬; অরুণাপল্লী, সাভার, ঢাকা

স্বাধীন সেন

স্বাধীন সেন

স্বাধীন সেন প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক। সমসাময়িক যাপনে অততের বহুবিধ লিপ্তি ( ও বিচ্ছেদ) নিয়ে বিভিন্ন জিজ্ঞাসা ও বোঝাপড়া করতে চেষ্টা করেন। নদী-পানি-বৃষ্টি -জীবন নিয়ে চিন্তা এবং অনুভূতির দুনিয়া নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী।