অরাজ

হামজা আলাভি ।। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র

[পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী হামজা আলাভির প্রবন্ধ The State in Post-Colonial Societies : Pakistan and Bangladesh১৯৭২ সালে New Left Review জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই লেখাটি আলাভির প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। প্রবন্ধটির শুরুতে আলাভি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যেখানে রাষ্ট্রকে কেবল বুর্জোয়া শ্রেণির একটি হাতিয়ার ভাবা হয়। এর বিপরীতে তিনি একটি অতি-বিকশিত রাষ্ট্রের তত্ত্বায়ন প্রদান করেন, যেখানে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়াদের থেকে আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। প্রবন্ধের শেষার্ধে তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে এর বাস্তবতা খতিয়ে দেখেন। প্রবন্ধটির দৈর্ঘ্য বিবেচনায় অনুবাদের জন্য এর প্রথমাংশকে নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে অতি-বিকশিত রাষ্ট্র ও সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির একটি সাধারণ তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করান। নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের মুখে একুশ শতকে এসে রাষ্ট্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন আদৌ অক্ষত আছে কিনা তা প্রশ্নের দাবি রাখে; তবে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর নিয়মিত হস্তক্ষেপের বংশনামা বুঝতে হলে আলাভির এই লেখাটি এখনও অত্যাবশ্যক। – অনুবাদকের ভূমিকা]
ছবি: হামজা আলাভি

উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোর সরকারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্রমবিকাশে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় ভূমিকার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, বিশেষ করে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বের নিরিখে। মিলিব্যান্ড যাকে রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রধান মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলছে তার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিতে :আধুনিক রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ হলো সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার একটি কমিটি মাত্র,” এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো মূলত এক শ্রেণি কর্তৃক অন্য শ্রেণিকে দমন করার জন্য একটি সংগঠিত শক্তি।

…উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে এই সনাতনী মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেবল একটি একক শাসক গোষ্ঠীর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবেনা। ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্ট নির্দিষ্ট কাঠামোগত বিন্যাস ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আমলে বিকশিত পুনর্বিন্যাস রাষ্ট্র ও সামাজিক শ্রেণিসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জটিল করে তুলেছে। এ দুটি ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের ধারা সম্পূর্ন ভিন্ন। পশ্চিমা সমাজে আমরা দেশীয় বুর্জোয়াদের দ্বারা তাদের উদীয়মান ক্ষমতার প্রেক্ষিতে জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব হতে দেখি, যা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় আইনী কাঠামো ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে এই প্রক্রিয়া তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলাদা।

উপনিবেশে বুর্জোয়া বিপ্লব সংগঠিত হয় কেন্দ্রস্থ (Metropolitan) বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক শাসন আরোপের মাধ্যমে, যেখানে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ও এর আনুষাঙ্গিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু উপনিবেশে এই বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন করতে কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়াদের ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি বাড়তি লক্ষ্য অর্জন করতে হয়। উপনিবেশে তাদের কাজ কেবল নিজ দেশে প্রতিষ্ঠিত উপরি-কাঠামোকে নকল করা নয়। অধিকন্তু, তাদের এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করতে হয় যার মাধ্যমে তারা উপনিবেশের সকল স্থানীয় সামাজিক শ্রেণির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে। সুতরাং, এই মর্মে উপনিবেশের (অব)কাঠামোর তুলনায় এর ‘উপরি-কাঠামো’কে ‘অতি-বিকশিত’(Over-developed) বলা যেতে পারে। কেননা, এর ভিত্তি খোদ কেন্দ্রের কাঠামোতেই নিহিত, যা থেকে পরবর্তীতে এটি স্বাধীনতার সময় আলাদা হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাই একটি শক্তিশালী সামরিক-আমলাতান্ত্রিক যন্ত্র ও সরকারি কলকব্জা দ্বারা সজ্জিত, যা তাদের নিয়মমাফিক কার্যাবলির মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণিসমূহকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ করতে সাহায্য করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজ এই অতি-বিকশিত রাষ্ট্রযন্ত্র ও এর কার্যবিধির উত্তরাধিকার বহন করে, যার মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক শ্রেণি-সমূহকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা হতো। স্বাধীনতার সময়ে দুর্বল দেশীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের এমন এক আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আবদ্ধ খুঁজে পায়, যার মাধ্যমে কেন্দ্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ায় থাকা ব্যক্তিরা সমাজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং এমনকি বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্রের আসল সমস্যা হলো যে এটি কোনো উদীয়মান দেশীয় বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় বরং একে প্রতিষ্ঠা করে একটি বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি। স্বাধীনতার মাধ্যমে কাগজে কলমে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে বিদেশি বুর্জোয়াদের হুকুম রদ হলেও এর ওপর তাদের প্রভাব কোনো অংশেই শেষ হয়ে যায় না। কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারা এখন নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের সাথে একাট্টা হয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে অবস্থান করে। একসাথে তারা সমাজগুলোর শ্রেণি কাঠামোতে একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে হাজির হয়। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সাম্রাজ্যবাদী বুর্জোয়া শ্রেণি ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্পষ্টতই ভিন্ন। ফলে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের শ্রেণি বৈশিষ্ট্য বেশ জটিল। নব্য-উপনিবেশবাদী বুর্জোয়াদের ক্ষমতা ও প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে, একে ঠিক দেশীয় বুর্জোয়াদের অধীনস্থ বলা যাবেনা। আবার এটি এদের কারো কেবলমাত্র একটি হাতিয়ারও নয়, যার অর্থ দাঁড়াতো যে, স্বাধীনতা কেবলই একটি প্রহসন। উভয় বুর্জোয়া শ্রেণিই একে অপরের প্রভাব নাকচ করতে পারেনা এবং তাদের মধ্যে স্বার্থের প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। যে মূল প্রস্তাবনার উপর আমি গুরুত্বারোপ করতে চাই তা হলো যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র কোনো একক শ্রেণির হাতিয়ার নয়। এটি আপেক্ষিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত (relatively autonomous) এবং এটি তিনটি মালিক শ্রেণির প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বার্থের মধ্যে মধ্যস্থতা করে, অর্থাৎ কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া, দেশীয় বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণি। একইসাথে এটি সেই সামাজিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখতে তাদের সকলের হয়ে কাজ করে, যার মধ্যে তাদের স্বার্থ নিহিত আছে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থা ও প্রধান উৎপাদন প্রক্রিয়া হিসেবে পুঁজিবাদী প্রক্রিয়া।

… এই পরিস্থিতিতে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র ফলত একটি নতুন ও আপেক্ষিকভাবে স্বাধীন অর্থনৈতিক ভূমিকা লাভ করে, যা ধ্রুপদি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নজিরবিহীন। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ সরাসরি আত্মসাৎ করে এবং তা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার নামে আমলাতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করে। এসকল শর্তাবলি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে সনাতনী মার্ক্সীয় তত্ত্বে বিশ্লেষিত রাষ্ট্র থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে।

তবে, রাষ্ট্রযন্ত্র স্রেফ সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কি দিয়েই গঠিত নয়। যেখানে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলসমূহও এর অংশ হিসেবে কাজ করে। যেখানে, রাজনৈতিক নেতারা আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব সহকারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এবং তাদের ক্ষমতার ব্যাপ্তি ও সীমাবদ্ধতাসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ব্যতীত সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির ভূমিকা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদেরা ও রাজনৈতিক দলসমূহ একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কীয় কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। একদিকে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয় যে (আদর্শগতভাবে) তারা যাদের সমর্থন প্রত্যাশী, তাদের দাবিদাওয়াগুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবে এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। অন্যদিকে, যারা আসলে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন, তাদের হয়ে জনমত প্রভাবিত করতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়; যাতে সেই নীতিগুলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। সেজন্য, তারা জনগণের ক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে এমন এক ‘বোঝাপড়া’ তৈরি করতে চায়, যা সম্ভাব্য বিরোধিতাকে প্রশমিত করে ফেলবে। ফলে, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক অলিগার্কির সাথে তাদের সম্পর্ক দোদুল্যমান; এটি একই সাথে প্রতিযোগিতামূলক আবার পরিপূরক। এই দোদুল্যমানতা আরো গভীর যেখানে উচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে আসীন রাজনীতিবিদেরা আমলাতন্ত্রের কিংবা সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যের ক্যারিয়ারের উপর প্রভাব রাখতে পারে।

আর্টওয়ার্ক: কলোনিয়ালিজম

উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে ক্ষমতার বিন্যাস ও ভাগ-বাটোয়ারার অনেক ধরণের রূপভেদ বিদ্যমান। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্যানগার্ড হিসেবে রাজনৈতিক দলের উপর বৈধতার মোড়ক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জৌলুস অর্পিত হয়। তা সত্ত্বেও, বিপুল সংখ্যক উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতার এক ক্রমবর্ধমান লঘুকরণ দেখা যাচ্ছে; এবং এর বিপরীতে, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ক্ষমতা বিস্তারলাভ করেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকাশ্য ‘দখল সংঘটিত হয়েছে। তবুও, মোটা দাগে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যে সমঝোতা ও একই সাথে টানাপোড়েন বিদ্যমান। পূর্বোক্ত পক্ষটি (রাজনৈতিক দল) পরোক্ত পক্ষটির (আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি) জন্য একটি কার্যকরী উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। তারা সরকারকে রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক দান করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নাটকের মাধ্যমে তারা জনঅসন্তোষ প্রশমিত করে এবং তাদের ক্ষোভ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। রাজনৈতিক দলের ভূমিকা থাকলেই তা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন নাকচ করে দেয় না। মূল বিষয়টি হলো সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন এবং তিনটি মালিক শ্রেণির মধ্যকার প্রতিযোগী স্বার্থের মধ্যে এর মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা, অর্থাৎ দেশীয় বুর্জোয়া, কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া এবং জমিদার শ্রেণি। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির স্বার্থ হাসিলে মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তারা অলিগার্কির তৃতীয় অংশ হিসেবে শরিক হয়। যখন কোনো রাজনৈতিক দল সেই আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসনকে ও আমলতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কেবল তখনই তাদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, যেখানে এখন পর্যন্ত পরোক্ত পক্ষই জয়ী হয়েছে। কোনো পুঁজিবাদী উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কোনো স্পষ্ট উদাহরণ আমরা আজ অবধি দেখতে পাইনি। ভারতের উদাহরণ এর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু এমনকি ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটি ঘোলাটে। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস পার্টি কোনোভাবেই একটি একক শ্রেণির দল নয়; বরং এটি আমলাতন্ত্রের সাথে মিলিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগী মালিক শ্রেণির দাবিদাওয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা করার কাজে অংশগ্রহণ করে। একইসঙ্গে, তাদের সমাজতান্ত্রিক বক্তৃতাবাজি সত্ত্বেও তারা আমলাতন্ত্রের সাথে মিলেমিশে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে সেই সামাজিক বন্দোবস্তকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট, যা ওই মালিক শ্রেণিগুলোর অস্তিত্ব বজায় রাখে। এমনকি বিদেশী পুঁজির ব্যাপারেও ভারত সরকারের প্রকৃত কর্মকাণ্ড কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের বক্তৃতাবাজির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিশ্লেষণের জন্য যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো যে, কংগ্রেসের রাজনীতিবিদদের আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান ক্ষমতার অন্তরালে ভারতীয় আমলাতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে বিশাল পরিধির স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে থাকে, যার ওপর সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো নতুন করে আলোকপাত করেছে।

ভারত ও পাকিস্তানে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তন বুঝতে হলে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বিশেষ করে সুদূরপ্রসারী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক স্বায়ত্তশাসনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের দিকে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার আগে, আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ার। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন স্থানীয় শ্রেণিকে অধীনস্থ রাখা এবং তাদের ঔপনিবেশিক প্রভুদের পক্ষ হয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করা। মুক্তি সংগ্রামের সময়, তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিপরীতে রাজনৈতিক ব্যারিকেডের উল্টো দিকে অবস্থান করেছিল। স্বাধীনতার পর, সেই একই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, যাদের দমন করা ছিল তাদের কাজ, ক্ষমতার মসনদে আসীন হলেন এবং কাগজে কলমে তাদের (আমলা ও সামরিক বাহিনী) ওপর কর্তৃত্ব লাভ করলেন। ফলে, পারস্পরিক সমঝোতার একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে বিশ ও ত্রিশের দশকে পর্যায়ক্রমে আংশিক ক্ষমতা হস্তান্তরের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ইতিপূর্বেই এমন কিছু পদ্ধতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, যার সাহায্যে আমলাতন্ত্র সেইসব রাজনৈতিক নেতাদের এড়িয়ে যেতে পারত, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতার ছাড়াই আমলাতন্ত্রের সাথে ব্যাপক হারে সরাসরি ও নিয়মিত লেনদেনের বাস্তবতার ফলে এসকল প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিগুলো আরও প্রসারিত ও সুসংহত হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম কেবল তখনই ঘটে যখন ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনীতিবিদ তার সমর্থকদের জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চান; যেক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার বদলে বরং আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদরা তখন সরকারি সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দালালে পরিণত হন। জনগণের সাথে আমলাতন্ত্রের এই মধ্যস্থতা করা হলো, অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। তবে, রাজনীতিবিদরা কোনোভাবেই সরকারি কর্মকর্তার সুনজর হারানোর ঝুঁকি নিতে পারেন না, যা তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে। আমলাতন্ত্রের শক্তি মূলত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক বিস্তার এবং নানাবিধ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বিশাল সংখ্যক সরকারি সংস্থাসমূহের পরিচালনার ওপর নির্ভর করে।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির মধ্যকার সম্পর্কের বিবর্তনের প্রকৃত ধরণ ঐতিহাসিক পটভুমির বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহের বিবর্তনের ভিত্তিতে এক এক দেশে এক এক রকম। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে, সুকর্ণর উৎখাতের মধ্য দিয়ে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকাশ্য ক্ষমতার আবির্ভাব হতে হতে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এর পিছনে অন্তর্নিহিত কারণগুলো বেশ জটিল; তবে ইন্দোনেশিয়ায় আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনী আপাদ-মস্তক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও অলিগার্কি সুসংহতকরণে কিছুটা সময় লাগা নিশ্চই সেই কারণগুলোর একটি। এর বিপরীতে, ভারত ও পাকিস্তান শক্তিশালীভাবে সংগঠিত আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক কাঠামো উত্তরাধিকারসুত্রে লাভ করে। এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার সময়ে, পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী বেশ নাজুক অবস্থায় ছিল; কিন্তু রাজনৈতিক দলসমূহের সংগঠন ও জনভিত্তি ছিল আরও বেশি নাজুক। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ, তাদের নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিত্ব ও কর্তৃত্বের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতো, যিনি স্বাধীনতার অল্প কিছুদিনের মাথায় মৃত্যবরণ করেন। ততক্ষণে মুসলিম লীগ ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং এর নেতৃত্ব তাদের জনভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পাকিস্তানের ২৫ বছরের ইতিহাসে দুটি বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রথমটি হলো আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যশীল অবস্থান। তাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতার কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আসে, অক্টোবর ১৯৫৮ এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে নয়, যেমনটা সাধারণত ভাবা হয়ে থাকে; বরং নয়া রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই। প্রথম পর্যায়ে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থার লেবাস প্রদানকারী রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি হাতের পুতুল বানানো হয় এবং সেই অলিগার্কির সুবিধামতো তাদের ক্ষমতায় বসানো বা বহিষ্কার করা হতো। ১৯৫৮ সালে যখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্যের জন্যে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিল, তখন যারা ইতিমধ্যে ক্ষমতার লাগাম ধরে রেখেছিল, তারা সংসদীয় সরকারব্যবস্থার যে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জটি উত্থাপিত হচ্ছিল তা বিলুপ্ত করে দিয়ে ‘ক্ষমতা দখল’ করে। তবে তা সত্ত্বেও, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কিছু রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল যারা একটি পরিপূরক ভূমিকা পালন করবে; এবং ১৯৬২ সালের মধ্যে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’(Basic Democracy) ব্যবস্থার অধীনে গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক প্যারোডির মধ্য দিয়ে রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো হয়। ১৯৬৯ সালে একটি বিশাল জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইয়ুব খানের পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তবুও ক্ষমতার লাগাম আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির হাতেই সুরক্ষিত ছিল। সরকারের ভেতরে পরিপূরক ভূমিকা পালনের জন্য তাদের তখনও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজন ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার নিজের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা বজায় রেখে ‘সাংবিধানিক সরকার’ পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যা একটি রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এটি একটি জটিল ইতিহাস, যা আমি অন্যত্র বিস্তারিতভাবে নিরীক্ষা করেছি। এর প্রথম পর্যায়ে, অর্থাৎ ‘সংসদীয় সরকার’-এর আমলে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির প্রকৃত ভূমিকাটি একটি রাজনৈতিক কল্পকাহিনীর আড়ালে অস্পষ্ট ছিল, যার অধীনে এটি পরিচালিত হতো। ১৯৫৮ সালের পর এর আধিপত্যশীল এবং নির্ণায়ক ভূমিকাটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে তা হলো পাকিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি এবং এর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষিতে আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি কিংবা এর বিভিন্ন অংশের সামাজিক চরিত্র, সম্পৃক্ততা এবং দায়িত্বসমূহ; যার মধ্যে সেই কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়ারাও অন্তর্ভুক্ত, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর বহুবচনে পুনরায় হাজির হয়েছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের দ্বিতীয় প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির কর্তৃত্বের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জগুলো আসে প্রধানত সেইসকল রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে যেগুলো তাদের শক্তি জড়ো করে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোর মানুষদের থেকে; যেগুলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং ভৌত সম্পদের বণ্টন ও রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই অঞ্চলগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিস্যার সপক্ষে সোচ্চার ছিল। কেবল পূর্ববঙ্গ থেকেই নয়, বরং সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং পাঠানদের দেশ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (NWFP) থেকেও এই ধরণের চ্যালেঞ্জগুলো উত্থাপিত হয়। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সমর্থন র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইমানের অংশ হয়ে ওঠে। সত্যিকার অর্থেই, তাদের অধিকাংশই আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলনগুলোতে গভীরভাবে জড়িত ছিল । আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল যে, পাকিস্তানের র‍্যাডিকাল রাজনীতি আঞ্চলিক সীমানা ভেদকারী শ্রেণি সংহতির পরিবর্তে প্রধানত জাতিগত বা ভাষাগত সংহতির দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আসলে র‍্যাডিকাল চ্যালেঞ্জগুলো শ্রেণিগত সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধেই পরিচালিত ছিল। কিন্তু এই সুবিধাগুলোকে তারা মূলত আঞ্চলিক মানদণ্ডেই চিহ্নিত করে। রাজনৈতিকভাবে, এই র‍্যাডিকাল এবং বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর দাবি ছিল একটি যুক্তরাষ্ট্ৰীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং আমলাতান্ত্রিক (ও সামরিক) নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণী পদগুলোতে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। পাকিস্তানের রাজনীতির এই দুটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির আধিপত্য এবং এর বিরুদ্ধে পরিচালিত চ্যালেঞ্জের আঞ্চলিক ভিত্তি, মূলত পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি একক বাস্তবতারই দুটি দিক, যা এই আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির ভূমিকাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

১৯৫৮ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘সরকার’ গঠন এবং পতন ঘটিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে তারা এমনকি ‘রিপাবলিকান পার্টি’ গঠনেও উস্কানি দেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ‘ক্ষমতা দখল’-এর পর ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান একটি নতুন ধরণের সংবিধান প্রণয়ন করেন। রাজনীতিবিদদের পুনরায় কাজে লাগানো শুরু হয়; আইয়ুব খানের আমলে তাদের ছলচাতুরি একটি নিখুঁত শিল্পে পরিণত হয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক সরকারের একটি বহিরাবরণ বজায় রাখার ব্যাপারেও সামরিক নেতাদের প্রবল উদ্বেগ দেখা দেয়। ফলে, ১৯৬৯ সালে পুনরায় সামরিক আইন জারি করার পর প্রেসিডেন্ট জেনারাল ইয়াহিয়া খান আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির অধীনে যত দ্রুত সম্ভব একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসাতে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সেই লক্ষ্যে তিনি নির্বাচনের আশ্বাস দেন এবং তৎক্ষণাৎ একদল মনোনীত বেসামরিক ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় না থাকলে সামরিক বাহিনী সরাসরি জনঅসন্তোষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এটি তার রাজনৈতিক বৈধতার মোড়ক হারাবে এবং ফলস্বরূপ প্রতিটি সংকটের মুহূর্তে তাদের হস্তক্ষেপ করার স্বঘোষিত অধিকার সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। সুতরাং, আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কি সর্বদা সরাসরি নিজেদের নামেই শাসন করতে পছন্দ করে, এমনটি ধরে নেওয়া একটি অতিসরলীকরণ হবে। তারা প্রায়শই রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে শাসন করতে পছন্দ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই রাজনীতিবিদরা তাদের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ণ করে । কিন্তু পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক-সামরিক অলিগার্কির জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল ছিল অস্বস্তিকর; এবং ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের সংকটের সূত্রপাত ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

১. র‍্যালফ মিলিব্যান্ড একজন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ও তার আমলের অন্যতম প্রভাবশালী ইন্সট্রুমেন্টাল মার্ক্সবাদী চিন্তক।

২. কেন্দ্রস্থ বুর্জোয়া বলতে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েমকারি দেশের পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায়।

৩. অবকাঠামো ও উপরি-কাঠামো মার্ক্সীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। অবকাঠামো বা বুনিয়াদ বলতে বোঝানো হয় একটি সমাজের উৎপাদিকা শক্তিসমূহ ও উৎপাদন সম্পর্কসমূহকে। আইন, রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ মিলে গঠিত হয় সমাজের উপরি-কাঠামো। ফরাসি চিন্তক লুই আলথুসের মতে উপরি-কাঠামোর আবার দুটি স্তর রয়েছে; রাষ্ট্র হলো প্রথম স্তর ও দ্বিতীয় স্তর হলো ভাবাদর্শ, যার অন্তর্ভুক্ত ধর্মীয়, নৈতিক, ও রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। তবে, আলাভি তার লেখায় উপরি-কাঠামো মূলত রাষ্ট্র অর্থেই ব্যবহার করেছেন।

৪. অলিগার্কি হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। পাকিস্তানে এই কেন্দ্রীভবন ঘটে আর্মি জেনারেল ও কিছু উচ্চপদস্থ আমলাদের ঘিরে।

৫. ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হলে ভাইসরয়ের অধীনে আমলাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজ চালানো হয়। এই পর্যায়ে ক্ষমতা ছিল অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক ও এককেন্দ্রিক। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দাবির মুখে ১৯১৯ সালে ‘মর্লে-মিন্টো সংস্কার’-এর মাধ্যমে আইনসভার সদস্য সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয় এবং এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়। পুলিশ, অর্থ, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাইসরয় এবং তাঁর মনোনীত পরিষদ সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি বিষয় নির্বাচিত ভারতীয় মন্ত্রীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে প্রাদেশিক স্বায়তশাসন প্রদান করা হয়, ভাইস-রয়ের নির্বাহী কাউন্সিলের পরিবর্তে মন্ত্রীপরিষদ গঠন করা হয় এবং ভোটাধিকার সম্প্রসারণ করা হয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার পারদ আমলাদের থেকে রাজনীতিবিদদের দিকে খানিকটা ঝোকে।

৬. আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরোক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তিনি তার সামরিক শাসনকে একটি বেসামরিক খোলস দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এই পদ্ধতিতে সাধারণ ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারতেন না; তারা কেবল তৃণমূল পর্যায়ের ৮০,০০০ স্থানীয় প্রতিনিধি (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত করতেন, যারা পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি ইলেক্টোরাল কলেজ হিসেবে কাজ করত।

৭. ১৯৫৬ সালে ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’ অর্থাৎ, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোকে একত্র করে একক পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ করার দাবিতে মুসলিম লীগ ভেঙ্গে পাকিস্তান রিপাবলিকান পার্টি গঠিত হয়। এর গঠনের পেছনে কলকাঠি নাড়ে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জা ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ডা. খান সাহিব। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করলে ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে দলটি বিলুপ্ত করা হয়। আলাভি মূলত ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার উদাহরণ হিসেবে রিপাবলিকান পার্টির প্রসঙ্গ টানেন।

আজমাঈন ফারহিন

আজমাঈন ফারহিন

আজমাঈন ফারহিন একজন প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। বর্তমানে তিনি পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে।