অরাজ

গাজা প্রসঙ্গে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-রাজনীতির ‘ভন্ডামি’ ও আসেফ বায়াতের চিঠি

  • নাজমুল আরেফিন

আজকে আমরা ‘ক্রিটিকাল থিওরি’ বলতে যা বুঝি তার আধুনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। ‘নয়া বামধারার পিতা’ নামে পরিচিত হার্বাট মারকুস (১৮৯৮-১৯৭৯) এই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন। মারকুসের ‘ওয়ান ডাইমেনশনাল ম্যান’(১৯৬৪) আমার জীবনে পড়া গুরুত্বপূর্ণ ফরমেটিভ টেক্সটের একটা। আমাদের বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন সময়ে মারকুস এক সপ্তাহের জন্য ইসরায়েলে যান। মারকুসের বয়স তখন ৭২। তিনি ফিরে এসে ৪ পাতার একটা বিবৃতি লিখলেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের মিলিটারি অকুপেশনকে যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে বললেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলকে একটি ‘দখলদার শক্তি’ এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ হিসেবে দেখিয়ে ইসরায়েলকে সতর্ক করলেন যে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারী নীতি তাদের নাৎসি ঘটনার পুনরাবৃত্তির দিকে পরিচালিত করতে পারে।[1] তিনি ইহুদিদের অস্তিত্বের অধিকারের স্বার্থে ইসরায়েল রাষ্ট্র চেয়েছিলেন বটে কিন্তু স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতি ঘোর সমর্থন জানিয়েছিলেন। একজন ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ গালি খেতে হয়েছে বহুবার। তাকে মুন্নী সাহা কায়দায় একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘Jewishness’ নিয়ে আপনার নিজের অনুভূতি কি? তিনি বলেছিলেন, ইহুদিরা যতদিন আন্ডারডগ ছিল ততদিন আমি এই পরিচয়ের সাথে একত্বতা ঘোষণা করতাম। কিন্তু এখন ইহুদিরা এমন জাতিতে পরিণত হয়েছে যারা নিজেরাই অন্য আন্ডারডগদের উপর চড়াও। তাই আমার জন্য নিজেকে এই পরিচয়ে পরিচিত করা আরও কঠিন।[2]

হেবারমাস, এআই জেনারেটেড

সেই হার্বাট মারকুসের পিএইচডি ছাত্রী ছিলেন আমেরিকান বামপন্থী নারীবাদের পোস্টার গার্ল, রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট, দার্শনিক অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। আমেরিকার আধুনিক বর্ণবাদের একজন জলজ্যান্ত স্বাক্ষী এই অ্যাঞ্জেলা ডেভিস। ডেভিস সম্প্রতি আলজাজিরার আপফ্রন্টে বলেছেন ব্ল্যাকদের মুক্তি আন্দোলন আর ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রাম একই সূত্রে গাঁথা। আমেরিকায় ব্ল্যাকদের প্রতি যে বর্ণবাদ, দক্ষিণ আফ্রিকায় যে বর্ণবাদ, আর ইসরায়েলি বর্ণবাদ তা নানানভাবে সংযুক্ত। তাই “প্যালেস্টাইন বিশ্বের জন্য একটি নৈতিক লিটমাস টেস্ট”।

অ্যাঞ্জেলা ডেভিসের সাথে আমি পুরোপুরি একমত। এই লিটমাস টেস্ট দিয়ে আমরা এখন পশ্চিমা চিন্তাবিদদের হিপোক্রেসি বা ভন্ডামিগুলো আরও স্পষ্ট ভাবে দেখতে পারি। যাচাই করতে পারি। আজকের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের রাজনীতি-চিন্তার ভন্ডামি ঠিক যেমনটি যাচাই করেছেন প্রফেসর আসেফ বায়াত। আসেফ বায়াত সম্পর্কে হয়তো অনেকের ধারণা নাও থাকতে পারে। তাই উনার সম্পর্কে দুলাইন খরচ করি। আসেফ বায়াত ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, আরবানা-শ্যাম্পেইনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গ্লোবাল এবং ট্রান্সন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি “post-Islamism” তত্ত্বের প্রবক্তা। ২০০৯ সালে প্রকাশিত “Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East” (Stanford University Press), এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত “Post-Islamism: The Changing Faces of Political Islam” (Oxford University Press) বই দুটি তাকে একাডেমিক দুনিয়ায় স্বনামে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ‘আরব বসন্ত’কে ক্রিটিকাল ডিল করে তাত্ত্বিক রুপ দিতেও তিনি প্রচুর কাজ করেছেন।

ছবি: টুরিং অব গোয়ের্নিকা গাজা উৎস: আরব কালচারাল ফান্ড

গত ১৩ নভেম্বর, ২০২৩, Goethe University Frankfurt-এর “Normative Orders” গবেষণা সেন্টার থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মহারথী দার্শনিক য়ুর্গেন হ্যাবারমাসের একটি বিবৃতি ছাপানো হয়। যার জার্মান শিরোনাম “Grundsätze der Solidarität. Eine Stellungnahme”। ইংরেজিতে মানে দাঁড়ায় “Principles of solidarity. A statement”। হ্যাবারমাসের সাথে ফ্রাঙ্কফুর্ট ভিত্তিক আরও তিনজন প্রথিতযশা একাডেমিক এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। নিকোল ডাইটেলহফ, রেইনার ফার্স্ট, এবং ক্লাউস গুন্টার। সন্দেহ নাই যে হ্যাবারমাসের নাম থাকাতেই এই বিবৃতি পুরো ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্ব জুড়ে ভাইরাল হয়। কি আছে এই বিবৃতিতে? যদি সংক্ষেপে বলতে হয় এর মূল কথা হল, ৭ই অক্টোবরের হামাসের সন্ত্রাসী হামলা ইহুদি জীবনকে নির্মূল করার ঘোষিত অভিপ্রায় নিয়েই করা হয়েছে। এই ঘটনাই মূলত ইসরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছে। এবং ইসরায়েলের এই রিটালিয়েশন বা পাল্টা আক্রমণ ন্যায়সঙ্গত (“justified in principle”)। বেসামরিক মানুষ যাতে না মরে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে—এই মুখস্থ সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দেবার পর হ্যাবারমাসরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানিতে ইসরায়েলের এই কর্মকান্ড কোনওভাবেই এন্টি-সেমেটিক প্রতিক্রিয়ার ন্যায্যতা দেয় না। বিশেষ করে জার্মানিতে তা সহ্য করা হবে না। হ্যাবারমাস গং জার্মানবাসীকে আরও মনে করিয়ে দেন যে ফেডারেল রিপাবলিক অফ জার্মানির গণতান্ত্রিক নৈতিকতা হলো “মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা”। কিন্তু এখানে হ্যাবারমাসদের কাছে মানুষ মানে শুধু হলো ‘ইহুদি’ পরিচয়। জীবন মানে শুধু হলো ‘ইহুদি জীবন’। ৭০ দশকের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি মানুষের অমানবিক মর্যাদাহীনতা, কিংবা হাজারো লাশ উনাদের কাছে ম্যাটার করে না। তাই এই বিবৃতিতে উনারা জার্মানবাসীদের নাৎসি হলোকাস্টকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন—ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত রাখার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম মৌলিক নৈতিকতা।

আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের অনেক তাত্ত্বিক চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। হ্যাবারমাসের “পাবলিক স্ফিয়ার” ধারণাকে ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য প্রেক্ষিতে নানানভাবে কাজে লাগিয়ে ছিলেন। এই বিবৃতি আসেফকে স্বাভাবিকভাবেই খুবই আহত করে। গত ডিসেম্বরের ৮ তারিখ তিনি সেই ক্ষোভ থেকে হ্যাবারমাসকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি লেখেন। চিঠিটা শুধু হ্যাবারমাসদের ভন্ডামিকে বুঝতেই সাহায্য করেনা বরং ইউরোপের ক্রিটিকাল চিন্তার রাজনীতি বোঝার জন্য নানান দিক থেকে এটি তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের ফিলিস্তিনি গণহত্যা শুধু আজকের ক্রাইসিস না। শুধু ‘পোস্ট-অক্টোবর ৭’ সিজন থেকে এই ক্রাইসিস বোঝার কোন সুযোগ নেই। পঞ্চাশের দশক থেকে যে সেটলার কলোনিয়াল ড্রামা দিনে দিনে এতদূর এসেছে তা বোঝার জন্য আগের প্রতিটি সিজন, প্রতিটি এপিসোড গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এবং তা দেখা শুরু করলেই বোঝা যায় ইউরোপের কতখানি হাত এই ক্রাইসিসের মূলে। গ্রীসের ক্রিটিকাল অর্থনীতিবিদ ইয়ানিস ভারোফাকিসের তাই সরল স্বীকারোক্তি“আমাদের ইউরোপীয়ানদের লজ্জায় মাথা নিচু করে হাটা উচিতআমরা ইউরোপীয়রা এটি (আজকের ক্রাইসিস) তৈরি করেছি[প্রথমে] আমরা শত বছর ধরে ইহুদি-বিদ্বেষি প্রোগ্রাম বানিয়েছি, তারপর ইহুদিদের হলোকাস্টে ঢুকিয়েছিআবার তারপর আ ল্যান্ড উইদাউট আ পিপল ফর আ পিপল উইদআউট আ ল্যান্ড এর মত জঘন্য একটা মতবাদ বা নীতিকে সাপোর্ট করেছি। মনে হয় যেন প্যালেস্টাইন জনমানব শূন্য ছিল। মূলত এটি দখলদার হোয়াইট সুপ্রেমেসিস্ট ভাষা যা ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের গণহত্যার ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে একটি জনশুন্য খালি জমি হিসাবে ঘোষণা করতে ব্যবহার করেছিল।[3]

উৎস: ফ্রিপিকস

হ্যাবারমাসরা এই পুরো ইতিহাসকে মুছে ফেলে জার্মান নাৎসিদের করা অন্যায়ের খেসারত দিতে সবাইকে চুপ থাকতে বলছেন। যারা কথা বলছেন, সমালোচনা করছেন তাদেরকে ঢালাওভাবে ইহুদি-বিদ্বেষি ট্যাগ দিচ্ছেন। এই ইন্টেলেকচুয়াল হিপোক্রেটিক পজিশন হ্যাবারমাসের নিজের দেওয়া বড় বড় তত্ত্বের সাথে কতখানি সাংঘর্ষিক তা আসেফ বায়াত তার চিঠিতে দারুণভাবে দেখিয়েছেন। জার্মানিতে গাজা নিয়ে কথা বললে কিভাবে ‘এন্টিসেমেটিক’ তকমা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের মত শহরে যা কিনা ক্রিটিকাল চিন্তার সূতিকাঘর হিসেবে পরিচিত সেখানেও ফিলিস্তিনিদের পুরস্কার-সম্মাননা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে সেসব ব্যাপারে হ্যাবারমাসদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বায়াত।

হ্যাবারমাস “public sphere,” “rational dialogue”, “deliberative democracy” ইত্যাদি ধারণাগুলোর আধুনিক প্রবক্তা। অথচ বর্তমান জার্মানিতে (পড়ুন ‘পোস্ট-সেক্যুলার’ ইউরোপে) এই ধারণাগুলোর কি করুণ অবস্থা; এবং খোদ হ্যাবারমাস এই ধারণাগুলোর প্র্যাক্টিসের সময় কতখানি বিপরীতে অবস্থান করেন তা গাজা ‘লিটমাস টেস্ট’ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কি? আসেফ বায়াত হ্যাবারমাসের মত রকস্টার তাত্ত্বিকদের স্ববিরোধিতা সম্পর্কে সেই উদ্বেগ বার বার প্রকাশ করেছেন তার চিঠিতে। চলুন একটু ধৈর্য নিয়ে উনার পুরো চিঠিটা পড়া যাক (চিঠিটা খুবই অল্প সময়ে যতটা সম্ভব মূলের সাথে মিল রেখে প্রফেসর বায়াতের কাছে অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। ভুল ত্রুটি মার্জনীয়):

প্রিয় অধ্যাপক হ্যাবারমাস,

আপনি হয়তো আমাকে মনে করতে পারবেন না, কিন্তু ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসে মিশরে আমাদের দেখা হয়েছিল। আপনি কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে distinguished Visiting Professor হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাবলিকের সাথে সংযুক্ত হতে এসেছিলেন। সবাই আপনাকে শোনার জন্য উৎসুক ছিল। যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থী এবং স্বৈরাচারীরা “ইসলামকে রক্ষা করার” ছদ্মবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছিল, সেই দমবন্ধ সময়ে “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং গণতান্ত্রিক জীবন সম্পর্কে আপনার [তাত্ত্বিক] চিন্তাগুলি তাজা বাতাসের মত হাজির হলো। এক সহকর্মীর বাড়িতে রাতের খাবারের সময় ইরান ও ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আমাদের মধ্যে যে দারুণ কথোপকথন হয়েছিল তা আমার এখনও মনে আছে। আমি আপনাকে ইরানে “ইসলাম-পরবর্তী” (post-Islamist)  সমাজের উত্থান সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম, সেটা আপনি ২০০২ সালে যখন আবার তেহরান ভ্রমণে আসেন অনুভবও করেছিলেন বলে মনে হয়। তখনও আপনি ইউরোপের “ধর্মনিরপেক্ষ-পরবর্তী” (post-secular) সমাজ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন নি। আমরা আপনার মূল তাত্ত্বিক ধারণাগুলির মাধ্যমে কায়রোতে একটি আন্তঃদেশীয় পাবলিক স্ফিয়ার এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ গড়ে তোলার এক বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলাম। মুক্ত বিতর্কের মাধ্যমে কীভাবে ঐক্যমতের-সত্যে পৌঁছানো যায় সে সম্পর্কে ধারণা পেতে আপনার কমিউনিকেটিভ ফিলোসফির মূল বিষয়বস্তুকে আমরা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম।

আর এখন, প্রায় ২৫ বছর পর, বার্লিনে বসে গাজা যুদ্ধের উপর আপনার যৌথ-লিখিত “Principles of Solidarity”  বিবৃতিটি যথেষ্ট উদ্বেগ এবং শংকা নিয়ে পড়লাম। বিবৃতিটি মূলত জার্মানিতে যারা ৭ই অক্টোবর হামাসের ভয়ঙ্কর হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরায়েলের নিরলস বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে বিবৃতি বা প্রতিবাদের মাধ্যমে স্বরব তাদেরকে তিরস্কার করার জন্যই লেখা। এর থেকে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের এই সমালোচনাগুলি [আপনাদের কাছে] অসহনীয়। কারণ ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন জার্মান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক—“যার মূল আলাপ হলো ইহুদি জীবন এবং ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার বিশেষ সুরক্ষার দাবিদার”। এই “বিশেষ সুরক্ষা” নীতির যে বয়ান তার বীজ মূলত জার্মানির ব্যতিক্রমী ইতিহাসের “নাৎসি যুগের গণ-অপরাধের” মধ্যে নিহিত।

এটা প্রশংসনীয় যে আপনি এবং আপনার দেশের রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী শ্রেণী সেই ঐতিহাসিক ভয়াবহতার স্মৃতি ধরে রাখতে অনড়, যাতে ইহুদিদের (এবং আমি অনুমান ও আশা করি অন্যান্য মানুষদের) উপর একই ধরনের ভয়াবহতার প্রভাব না পড়ে। কিন্তু আপনার জার্মান ব্যতিক্রমবাদের উপর ভিত্তি করে বানানো ফর্মুলা এবং অনড়তা ইসরায়েলের নীতি এবং ফিলিস্তিনি অধিকার সম্পর্কে আলাপের জন্য কার্যত কোন পথই খোলা রাখেনা। আপনি যখন “ইসরায়েলের কর্মকান্ডের” সমালোচনাকে “ইহুদি বিরোধী প্রতিক্রিয়া” বলে বানচাল করছেন, তখন আপনি [আসলে] চুপ থাকতে এবং বিতর্ককে দমন করতে উৎসাহিত করছেন।

একজন একাডেমিক হিসেবে আমি এটা জেনে হতভম্ব হয়েছি যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে-এমনকি শ্রেণিকক্ষের মধ্যেও, যা কিনা আলোচনা ও অনুসন্ধানের জন্য মুক্ত স্থান হওয়া উচিত-সেখানে প্যালেস্টাইনের বিষয়টি সামনে এলে প্রায় সবাই চুপ থাকে। সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন এই বিষয়ে খোলামেলা এবং অর্থপূর্ণ বিতর্ক থেকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো ইহুদি সহ বহু লোককে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের অনুষ্ঠান এবং পুরষ্কার বাতিল করা হয়েছে এবং “ইহুদি বিদ্বেষের” অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে কথা বলতে না দিলে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল সে বিষয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করে কীভাবে? “পাবলিক স্ফিয়ার”, “যুক্তিসঙ্গত সংলাপ” এবং “সুচিন্তিত গণতন্ত্র” (deliberative democracy) আপনার এইসব বিখ্যাত [তাত্ত্বিক] ধারণাগুলো এখন তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?বাস্তবতা হলো, আপনি যে সমালোচক ও প্রতিবাদগুলোকে তিরস্কার করছেন, তাদের অধিকাংশই কখনোই ইহুদিদের জীবন রক্ষার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে নি। এবং দয়া করে ইসরায়েলি সরকারের এই যুক্তিসঙ্গত সমালোচকদের সাথে ফালতু চরম-ডানপন্থী নব্য-নাৎসি বা অন্যান্য ইহুদি বিরোধীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না, তাদের জন্য অবশ্যই [আলাদাভাবে] তীব্র নিন্দা ও মোকাবিলা জারি রাখতে হবে।

আমার পড়া প্রায় প্রতিটি বিবৃতিই ইসরায়েলে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামাসের নৃশংসতা এবং ইহুদি বিদ্বেষ উভয়কেই নিন্দা করেছে। এই সমালোচকরা ইহুদিদের জীবন রক্ষা বা ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে মোটেও কোন বিতর্ক করছেন না। তারা ফিলিস্তিনিদের জীবন এবং প্যালেস্টাইনের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে যে ডিনায়াল তা নিয়ে বিতর্ক করছেন। অথচ (ডিনায়ালের) এই দিকটা নিয়ে আপনাদের দেওয়া বিবৃতি দুঃখজনকভাবে নীরব।

(আপনাদের) বিবৃতিতে এক বারের জন্যেও ইসরায়েলকে একটি দখলদার শক্তি বা গাজাকে একটি উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। না আছে (ইসরায়েলের) বিকৃত বৈষম্য সম্পর্কে কোন কথা। এটি দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি জীবনের দৈনন্দিন ধ্বংসের কথা বলার জন্য লেখা হয়নি। “ইসরায়েলের কর্মকান্ড”—যা আপনি “নীতিগতভাবে ন্যায়সঙ্গত” বলে মনে করেন—একটি প্রতিরক্ষাহীন জনসংখ্যার উপর ছয় দিনের মধ্যে ৬০০০ বোমা ফেলেছে; ১৫০০০ এরও বেশি মানুষ মেরেছে (তাদের মধ্যে ৭০% মহিলা ও শিশু), ৩৫০০০ আহত করেছে; ৭০০০ মানুষকে নিখোঁজ বানিয়েছে; এবং ১.৭ মিলিয়নকে করেছে বাস্তুচ্যুত। পুরো একটা জনসংখ্যাকে খাদ্য, জল, আবাসন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার নিষ্ঠুরতার কথা তো বাদই থাকলো। (গোটা ফিলিস্তিনি) জীবনের মূল পরিকাঠামোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

যেখানে আপনার বিবৃতিতে আপনি বোঝাচ্ছেন যে, এগুলি প্রযুক্তিগতভাবে “গণহত্যার অভিপ্রায়” নাও হতে পারে, জাতিসংঘের কর্মকর্তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে এগুলিকে “যুদ্ধাপরাধ”, “জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি” এবং “জাতিগত নির্মূলকরণ” নামে অভিহিত করেছেন। এখানে আমার উদ্বেগ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে “ইসরায়েলের কর্মকান্ড” কীভাবে বিচার করা যায় তা নিয়ে নয়, বরং এই ধরনের বিস্ময়কর ধ্বংসযজ্ঞের মুখে আপনি যে নৈতিক শীতলতা এবং উদাসীনতা দেখাচ্ছেন তার গভীরতা কীভাবে নির্ণয় করবো তা নিয়ে। (আপনার) মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য হওয়ার জন্য আর কত কত জীবন বিলীন হতে হবে? আপনার বিবৃতির শেষে জোরালোভাবে আন্ডারলাইন করা মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করার বাধ্যবাধকতা কথাটার কি মানে দাঁড়ায় আসলে? এটা এমন যেন আপনি আশঙ্কা করছেন যে, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বললে ইহুদি জীবনের প্রতি আপনার নৈতিক অঙ্গীকার হ্রাস পাবে। যদি তা-ই হয়, অতীতে করা এক বিশাল অন্যায়ের সংশোধনকে বর্তমানের আরেকটা ভয়ানক অন্যায়কে পাকাপোক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ত্যানা প্যাঁচানো কতই না দুঃখজনক!

আমি আশঙ্কা করি যে এই প্যাঁচানো নৈতিক কম্পাস জার্মান ব্যতিক্রমীতার যুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যার আপনি ধারক-বাহক। সংজ্ঞানুসারে, ব্যতিক্রমীতা কোন সর্বজনীন মান নয় বরং ইহা বিশেষ কোন মানকে মানিয়া লয়। (ব্যতিক্রমবাদের নিক্তিতে) কিছু লোক অধিকতর যোগ্য মানুষ হয়ে ওঠে, অন্যরা কম যোগ্য, এবং আর বাকীরা অযোগ্য। এই [বিশেষ] যুক্তি যৌক্তিক সংলাপকে রুদ্ধ করে এবং নৈতিক চেতনাকে অসংবেদনশীল করে তোলে। এমন এক কগনিটিভ ব্লক নির্মান করে যা আমাদের অন্যের দুর্দশা-আহাজারি দেখতে দেয় না, সহানুভূতিকে আটকে দেয়।

কিন্তু সবাই এই কগনিটিভ ব্লক এবং নৈতিক অসাড়তার কাছে নতিস্বীকার করে না। আমি বুঝতে পারি যে অনেক তরুণ জার্মান তাদের ব্যক্তিগত দুনিয়ায় ইসরায়েলি-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক শ্রেণীর থেকে একদম ভিন্ন মতামত প্রকাশ করে। এমনকি কেউ কেউ জনসাধারণের বিক্ষোভেও অংশ নেয়। তরুণ প্রজন্ম এখন বিকল্প মিডিয়া এবং জ্ঞানের উৎসের সংস্পর্শে থাকে এবং তাদের কগনিটিভ প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা পুরানো প্রজন্মের থেকে আলাদা। কিন্তু বেশিরভাগই [রাষ্ট্রীয়] প্রতিহিংসার ভয়ে পাবলিক দুনিয়াতে নীরবতা বজায় রাখে।

পরিহাসমূলকভাবে গণতান্ত্রিক জার্মানিতে, প্রাক-১৯৮৯ ইউরোপের মতো বা হাল মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনস্থতার মত, এক ধরনের “হিডেন স্ফিয়ার” আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে হয়। যখন ভীতি-ত্রাস জনসাধারণের অভিব্যক্তি বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষ পাবলিকলি সরকার অনুমোদিত বয়ানের সাথে তাল মেলালেও, গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়-আষয়ে ব্যক্তিগত [গোপন] দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করার প্রবণতা দেখায়। সুযোগ এলে এসব হিডেন স্ফিয়ার বিস্ফোরিত হতে পারে।

এটা খুবই অস্থির সময়, অধ্যাপক হ্যাবারমাস। এটা ঠিক সেই সময় যখন আপনার মতো চিন্তাবিদদের প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সর্বোপরি নৈতিক সাহস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সত্য ও সংযোগমূলক পদক্ষেপ, বিশ্বজনীনতা, নাগরিকত্ব-সমতা, সুচিন্তিত গণতন্ত্র এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে আপনার মৌলিক ধারণাগুলি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও আপনার ইউরোসেন্ট্রিজম, জার্মান এক্সেপশনালিজম এবং ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আপনার তর্ক-বন্ধ-করা তৎপরতার সঙ্গে এই ধারণাগুলি সাংঘর্ষিক হিসেবে প্রতীয়মান হবে।

আমি আশঙ্কা করি যে নিছক জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সচেতনতা বোধহয় যথেষ্ট না। আন্তোনিও গ্রামসি যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন, একজন বুদ্ধিজীবী কীভাবে “না বুঝেই” “জানতে” এবং “অনুভূতি” ছাড়া বুঝতে পারেন? যখন আমরা সহানুভূতির মাধ্যমে একে অপরের দুর্দশা-আহাজারি “অনুভব” করি, কেবলমাত্র তখনই আমাদের এই অশান্ত পৃথিবীর জন্য আশা থাকতে পারে।

চলেন আমরা ত্রয়োদশ শতাব্দীর ফার্সি কবি সাদি শিরাজির আভাসকে স্মরণ করিঃ

পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ আদতে পরস্পর একাকার,
এক নির্যাসে তৈরি সবাই আত্মীয় আত্মার।
একজন যখন ব্যথায় কাতর, অস্বস্তিতে রয় সকল অন্তর।
যদি অপরের ব্যথা তোমার মনে আদৌ দাগ না কাটে,
মানুষের নাম পরিচয় তবে রাখো কোন অজুহাতে!

সম্মানের সঙ্গে,
আসেফ বায়াত
ডিসেম্বর ৮, ২০২৩

ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠাবাদী দর্শনকে একটি মুক্ত সমাজ নির্মানের ক্ষেত্রে বাধা হিসাবে বিবেচনা করত। সেটা যে হ্যাবারমাস ভুলে গেছেন বায়াতের এই চিঠি আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দেয় বৈকি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, গাজা নিয়ে হ্যাবারমাসদের চিন্তা-বিবৃতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এই বিবৃতিগুলো প্রকাশ করে পশ্চিমা ক্রিটিকাল চিন্তাবিদরা কি নিয়ে টেনশন করছে। আর কি তাদের চিন্তাতে নেই।  ইউনিভার্সিটিতে কাগজসর্বস্ব জ্ঞান উৎপাদনের বাইরেও একটা দুনিয়া আছে। বাস্তব দুনিয়া। ক্রিটিকাল চিন্তা এবং জ্ঞানকে যখন সেই বাস্তব দুনিয়ায় অনুশীলন করার সময় আসে তাদের মোরাল কম্পাস তখন কোন দিকে ঝুলে থাকে? আসেফ বায়াত যাকে ‘জার্মান এক্সেপশনালিজম’ বা ‘জার্মান ব্যতিক্রমীতা’ বলছেন তাকি আসলেই শুধু জার্মান চিন্তা, নাকি গোটা ইউরোপের বা পশ্চিমা দুনিয়ার? মরোক্কোর নৃতত্ত্ববিদ এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ আল-মাজোজে মনে করেন হ্যাবারমাসদের এই অবস্থানকে মূলত পশ্চিমা চিন্তাবিদদের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।[4] আমার বর্তমান পশ্চিমা পিএইচডি জীবনের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা এবং অব্জার্ভেশনও সেটাই বলে। কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দুনিয়ায় একাডেমিক ফ্রিডম চর্চায় সবচেয়ে অগ্রগণ্য হিসেবে সুনাম থাকা সত্ত্বেও গাজা গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হতে কিংবা কথা বলতে যাদের দেখেছি তাদের সংখ্যা একদম হাতে গোণা যায়। আর আমেরিকার কথা নাই বা বললাম। প্যালেস্টাইন ‘লিটমাস টেস্ট’ হার্ভাড কিংবা অন্যান্য আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়সহ নর্থ আমেরিকান একাডেমিয়ার মোরাল পজিশনের ভিতরের চেহারাটাকে খুব ভালভাবেই উন্মুক্ত করেছে।

থিয়েটার গাজা ২০২৪
শিল্পী: ওসামা দিয়াব
উৎস: আর্টসি

তাহলে কি ব্যতিক্রম নাই? সেটাও অনেক আছে। গাজা নিয়ে যারা একাডেমিক দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের মধ্যে পশ্চিমা ইহুদিদের কাজ এবং সোচ্চারতা অগ্রগণ্য। কিন্তু তাদেরকেও নানাভাবে ‘ইহুদি-বিদ্বেষি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করেছে এবং করছে পশ্চিমা একাডেমিয়া। একটা উদাহরণ দেওয়া জরুরি। জুডিথ বাটলারকে বাংলাদেশে অনেকে প্যাথেটিকভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে ‘রেইনবো স্কলার’ হিসেবে পরিচিত করান। উনার সমকামী ব্যক্তিগত জীবনকে সামনে এনেও অনেকে অনেক কিছু উস্কে দিতে চান। এই জুডিথ বাটলার গতমাসের ৩ তারিখ (মার্চ, ২০২৪) প্যারিসে এক প্যানেল ডিসকাশনে হামাসের ৭ই অক্টোবরের হামলাকে “আপরাইজিং” এবং “সশস্ত্র প্রতিরোধ” (armed resistance) বলেছেন।[5] বাটলারের বক্তব্যের মূল কথা হলো—”রাজনৈতিক দল হিসেবে হামাস সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এটা বলা অনেক বেশি সততার এবং ঐতিহাসিকভাবে সঠিক যে ৭ই অক্টোবরের আপরাইজিং একটা সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল। এটি কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা নয় এবং এটি কোনও ইহুদি বিরোধী হামলাও নয়। এটি ছিল ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ।”[6] বাংলাদেশ কিংবা মুসলিম বিশ্বের কয়জন স্কলার পাবলিকলি এটা বলতে পেরেছেন?

এবারই প্রথম না। ২০০৬ সালেও তিনি হামাস ও হিজবুল্লাহকে “গ্লোবাল লেফট” হিসেবে চিহ্নিত বা বর্গীকরণ করেছিলেন। অক্টোবর, ২০২৩-এও যখন হ্যাবারমাসরা ইসরায়েলের ক্রমাগত বোমাহামলাকে ন্যায্যতা দেবার জন্য কলম ধরছেন তখন বাটলার এই কর্মকান্ডকে “বারবারিক” ও “জেনোসাইড” হিসেবে  ঘোর নিন্দা জানিয়েছেন, আমেরিকান সরকার এবং মিডিয়া কিভাবে এই জেনোসাইডকে মদদ দিচ্ছে সে ব্যাপারে সবাই মিলে কথা বলার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।[7] তখনই তাকে শুনতে হয়েছে—বাটলারের কাছে হামাসের হামলা ‘বারবারিক’ না অথচ ইসরায়েলিরা সাদা বলে তাদের হামলাকে ‘বারবারিক’, কারণ ইহুদি হলেও বাটলারকে ইসরায়েলে থাকতে হয় না, তাই সে জানেনা হামাস একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যা ইহুদিত্বের কারণে ইসরায়েলিদের পৃথিবীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়।[8] অবিরত সমালোচনা, ফ্রেমিং তাকে তাকে সত্য প্রকাশ থেকে দমাতে পারেনি। প্যারিসে মার্চের ৩ তারিখের উপর্যুক্ত বক্তব্যের পর ফরাসি তথা পশ্চিমা একাডেমিয়া আরও কঠোরভাবে তার সমালোচনা করতে থাকে। এখনও তাকে মিডিয়ায় খোলা চিঠিসহ বিভিন্নভাবে ভৎসনা করা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের নানান পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন বাটলার। কিন্তু নিজের মোরাল পজিশন থেকে সরে আসেন নি।

উৎস: পিলগ্রিমেজ আর্ট, পিন্টারেস্ট

হার্বাট মারকুস এবং তার ছাত্রীকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। মারকুসের শিক্ষক সম্পর্কে আলাপ করেই না হয় শেষ করি। তার শিক্ষক ছিলেন ২০ শতকের প্রধানতম মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার। হাইডেগারের সাথে মারকুসের গুরুশিষ্য সম্পর্ক অসাধারণ ছিল। কিন্তু ১৯৩২ সালে মারকুস হাইডেগারের সান্নিধ্য পরিত্যাগ করেন। এর কারণ হাইডেগার নাজি পার্টির দিকে ঝুঁকে যান। ১৯৩৩ সালে হাইডেগারকে ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নাৎসি রেক্টর বানানো হয়।[9] হাইডেগার যত বড় দার্শনিকই হোক না কেন, নাৎসিদের নৈতিক সমর্থন দেবার জন্য একাডেমিক দুনিয়া আজও তাকে ক্ষমা করে নি। ইউরোপীয় দর্শনের গভীর বর্ণবাদ, চুপ থাকা ও ফ্যাসিস্ট শেকড় বোঝার জন্য হাইডেগারকে আজও অনেকে একটি প্রবেশদ্বার হিসাবে ব্যবহার করতে চায়।[10] ঠিক একই ভাবে হ্যাবারমাসদের দর্শন, তত্ত্বচিন্তা তাদের বর্ণবাদী কারণে চুপ থাকা, ইসরায়েলের সেটলার কলোনিয়াল চরিত্রকে প্রশ্ন করতে না পারা এবং গাজায় চলমান গণহত্যাকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য দিনকে দিন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাদের ক্রিটিকাল চিন্তাগুলি আরও বেশি হিপোক্রেটিকালি অগুরুত্বপূর্ণ বলে গণ্য হবে। আসেফ বায়াত বোধহয় তার চিঠিতে সেই সিগনালই দিয়েছেন।

 

তথ্যনির্দেশ: 

[1] Jack Jacobs. (2014). The Frankfurt School, Jewish Lives, and Antisemitism.

Cambridge University Press. P. 121. pp.119-122

[2] Marcuse’s View of Israel is That She Lacks Eros and Civilization. (1972). Jewish Telegraphic Agency. https://www.jta.org/archive/marcuses-view-of-israel-is-that-she-lacks-eros-and-civilization

[3] Yanis Varoufakis on Israel-Gaza: ‘We Europeans have created this’ | UpFront. (2023, Nov 14). Al Jazeera English. https://www.youtube.com/watch?v=_OAniUDMA1Y

[4] Alieddien Hilal. (2014, Jan 09). Challenging Habermas on Israel. Ahram Online. https://english.ahram.org.eg/NewsContent/50/1204/515359/AlAhram-Weekly/Opinion/Challenging-Habermas-on-Israel-.aspx

[5] Michael Starr. (2014, March 14). Judith Butler defends calling October 7 Massacre ‘armed resistance’. The Jerusalem Post. https://www.jpost.com/diaspora/antisemitism/article-791928

[6] Laurel Duggan. (2024, March 5). Judith Butler: 7 October was armed resistance, not terrorism. Unherd. https://unherd.com/newsroom/judith-butler-7-october-was-armed-resistance-not-a-terrorist-attack/

[7] Palestinian Lives Matter Too: Jewish Scholar Judith Butler Condemns Israel’s “Genocide” in Gaza. (2023, Oct 26). Democracy Now. https://www.youtube.com/watch?v=CAbzV40T6yk

[8] Hamutal Gouri. (2023, Nov 03). An Open Letter to Prof. Judith Butler. The Times of Israel. https://blogs.timesofisrael.com/an-open-letter-to-prof-judith-butler/

[9] See: Andrew Feenberg. (2005). Heidegger and Marcuse: The Catastrophe and Redemption of History. Routledge.

[10] See: Adam Knowles. (2019). Heidegger’s Fascist Affinities: A Politics of Silence. Stanford University Press.

নাজমুল আরেফিন

নাজমুল আরেফিন