- অনুবাদ: তন্বী তরুনীমা চৈতী
[অনূদিত প্রবন্ধটি এমা গোল্ডম্যানের Anarchism and Other Essays গ্রন্থটি থেকে নেয়া হয়েছে। এটিই এমা গোল্পম্যানের প্রথম প্রকাশিত বই। বইয়ের প্রবন্ধগুলো প্রথমে বক্তৃতা আকারে দেয়া হয়, Mother Earth নামক জার্নালের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। মূল ইংরেজি লেখাটি “The Tragedy of Woman’s Emancipation” শিরোনামে। অরাজের জন লেখাটি অনুবাদ করেছেন তন্বী তরুণীমা চৈতী। – সম্পাদক]

(১৮৬৯-১৯৪০)
আর্টওয়ার্ক: এলিয়া-ইলাস্ট্রেশন
সূত্র: ডিভিয়ান্ট আর্ট
একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে আমি আলোচনা শুরু করছি—আমার মতে শ্রেণী, জাতি কিংবা নারী এবং পুরুষ অধিকারের নামে কৃত্রিম বিভক্তি রেখা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো মানবজাতির পুর্ণাঙ্গ গল্পটি বলে না। এসব বিভাজনের ঊর্ধ্বে আছে এক অভিন্ন ভিত্তি, যা আমাদের সকলকে একীভূত করে—এমনটাই আমার বিশ্বাস।
এই বিশ্বাসের মাধ্যমে কোনোপ্রকার শান্তিচুক্তির প্রস্তাব উত্থাপনের অভিপ্রায় আমার নেই। আজকের সমাজ স্বার্থের সংঘাত আর বৈষম্যের বেড়াজালে জর্জরিত। তবে এই বৈরিতা চিরস্থায়ী নয়। অর্থনৈতিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্মিত নতুন সমাজব্যবস্থায় এসব বিভেদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত মানুষের উপরিগত অভিন্নতা কিংবা ব্যক্তির স্বকীয়তা মুছে ফেলা (superficial equalization of human beings) নয়। নিজস্বতা না খুইয়ে সকলের সাথে একাত্বতাবোধ করা, সবার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিড়ম্বনার মোকাবেলা দ্রুততার সাথে করা প্রয়োজন। কেননা এই জটিলতার সমাধা হলেই সমাজ এবং ব্যক্তি, নারী এবং পুরুষ, গণতন্ত্রবাদী এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা বা true individuality-র চর্চাকারীরা একত্রিত হতে পারবে। উপরিউক্ত সমস্যার সমাধানেই বিরোধ আর বিবাদের নিষ্পত্তি নিহিত। আমাদের লক্ষ্য সকলকে ক্ষমা করা নয়; আমাদের লক্ষ্য একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাদাম দে স্তালের (Madame de Staël) উদ্ধৃতি ‘সবকিছু বোঝার অর্থ সবকিছু ক্ষমা করা’–এর সাথে একমত নই। উদ্ধৃতিটি আমার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক শোনায়। পুরো বিষয়টির ভেতর একপ্রকার কপট অহমিকা প্রকাশ পায়—ক্ষমাকারী যেনো নিজের আত্মম্ভরিতা জাহির করতে ইচ্ছুক। প্রকৃতপক্ষে, আরেকজন ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থে বোঝাটাই যথেষ্ট। আমার এই বিশ্বাস নারী মুক্তি এবং সকল নারীর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির আংশিক প্রতিনিধিত্ব করে।
মুক্তি নারীকে মানুষ হিসেবে যথার্থ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। নারীরা যা বলতে এবং করতে চায়—তার সবটাই সে করতে পারবে। বাঁধার সকলপ্রকার কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে পরবে; শতাব্দীপ্রাচীন বশ্যতা আর দাস্যত্বের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে উন্মুক্ত হবে স্বাধীনতার পথ। বস্তুত তাঁর পূর্ণ স্বাধিকার নিশ্চিত হবে।
আর এটিই ছিলো নারীমুক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। তবে এই আন্দোলনের বাস্তবিক অর্জন (এখন পর্যন্ত) নারীর বিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এসব আন্দোলন নারীর সব আনন্দ এবং পরিপূর্ণতার উৎস কেড়ে নিয়েছে। নামেমাত্র অধিকার প্রাপ্তি আধুনিক নারীকে পরিণত করেছে কৃত্রিম সত্ত্বায়। তাদের দেখলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরাসি আর্বোরিকালচার (arboriculture) চর্চা; প্রত্যেকে যেনো পরিশীলিত উদ্যানের অদ্ভুত কায়দায় প্যাঁচানো পিরামিড বা চাকা আকৃতির গাছ। কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা পরে যায় স্বকীয়তা। আমাদের চারপাশে কৃত্রিমতার ধারক ও বাহক এমন নারীর অভাব নেই। কথাটি তথাকথিত বৌদ্ধিক পরিধির ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।
নারীর মুক্তি আর সমতা। আহা! সেসময়ের মহৎ ও সাহসী কিছু ব্যক্তির মুখে উচ্চারিত এসব কথা আমাদের মনে কী আশাই না জাগিয়েছিলো! নারী স্বাধিকারের সূর্যের পূর্ণ গৌরবে উদিত হওয়ার কথা ছিল, আমাদের উদ্ভাসিত করার কথা ছিলো। নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারপ্রাপ্তির এই লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বহু নারীপুরুষ তাদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলো। অজ্ঞতা আর কুসংস্কারকে তারা মোকাবেলা করেছিলো দৃঢ়তা আর সাহসের সাথে।
স্বাধীনতার এই লক্ষ্যে আমিও বিশ্বাস রাখি। কিন্তু আজকের দিনের নারী মুক্তি সম্পর্কিত বোঝাপড়া এবং এর চর্চা সেই মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সময়ের নারীরা এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে—প্রকৃত অর্থে স্বাধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত স্বাধীনতার আধুনিক ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত করা। পুরো বিষয়টি আপাতবিরোধী শোনালেও এটাই বাস্তবতা।
তথাকথিত এই মুক্তি থেকে নারীর অর্জন কী? গুটিকয়েক রাজ্যে ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ। কিন্তু তাতে কি হিতাকাঙ্ক্ষীদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের একাংশও বাস্তবায়িত হয়েছে? মোটেই না। অনেকের কথা শুনলে মনে হয় সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতির প্রাদুর্ভাবকে স্বীকার করতে তারা অপারগ। বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই যথাযথ সময়। দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদের নৈতিকতার অভাবের (laxity of morals) ফলাফল নয়; সমস্যাটির একটি বস্তুগত ভিত্তি রয়েছে। রাজনীতি মূলত ব্যবসা এবং শিল্প (industrial) জগতের প্রতিচ্ছবি। আর এই জগত তার কার্যক্রম চালায় ‘যত দেবে তার চেয়ে বেশি নাও’, ‘ব্যয়কৃত অর্থের সর্বোচ্চ ভোগ করো’, ‘এক অপরাধীই অন্য অপরাধীর দোষ আড়াল করতে পারে’ – এর মতো মন্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। শুধুমাত্র ভোটাধিকার দিয়েই নারী রাজনীতির এই কলুষতা দূর করতে পারবে—এমন ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।

সূত্র: জ্যাঁ কুইক
নারীর স্বাধিকার পুরুষের সাথে তার অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ নারী তার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পেশা ও কর্মজীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে নারীর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার প্রতিপালন (upbringing)। বেড়ে ওঠার সময় শারীরিক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির শিক্ষা তোলা থাকে ছেলেদের জন্য। মেয়েরা এই শিক্ষা বঞ্চিত। ফলত কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নারীরা প্রায়শই হিমশিম খায়। পুরুষ অধ্যুষিত কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপ হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। খুব অল্পসংখ্যক নারীই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলী—যত বর্ণাঢ্য পেশা হোক না কেন, একজন নারী কখনোই তার পুরুষ সহকর্মীর সমান মর্যাদা বা পারিশ্রমিক পান না। আর যে গুটিকয়েক নারীর কাছে সেই পরম আরাধ্য সাফল্য ধরা দেয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কিছুই আর তাদের জীবনে অবশিষ্ট থাকে না। বিপুলসংখ্যক এসব কর্মজীবী নারীদের কাছে আমার প্রশ্ন—ঘরের বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে এসে কারখানা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আপনাদের ঠিক কতটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে? সারাদিন নিদারুণ পরিশ্রমের পর অধিকাংশ নারীর কাঁধে এসে পরে ঘর সামলানোর দায়িত্ব। দিনশেষে ঘর নারীর জন্য আর সুখের আলোয় থাকে না, পরিণত হয় শীতল, অগোছালো, আর বিষণ্ণ এক অঙ্গনে। মহান স্বাধীনতা, আহা! কাউন্টারের পেছনে কিংবা সেলাই মেশিন বা টাইপরাইটারে সামনে কাজ করতে করতে শ্রান্ত নারী বিয়ের প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বাবা মায়ের আগল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী যতটা উন্মুখ, ঠিক ততটাই উন্মুখ কারখানার যাঁতাকলে পিষ্ট একজন যুবতী। জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু অর্থ ব্যতীত তথাকথিত স্বাধীনতা এমন কোনো প্রণোদনা সরবরাহ করে না যে একজন নারী এর জন্য সবকিছু ত্যাগ করবে। সর্বোপরি, অতি সমাদৃত এই স্বাধীনতা নারীর নিজের, প্রেমের এবং মাতৃত্বের সত্ত্বা বিলীন করে ফেলার এক ধীর প্রক্রিয়া।
তথাপি একজন কায়িক নারী শ্রমিকের জীবন পেশাগতভাবে যেকোনো ‘সম্ভ্রান্ত’ শিক্ষিকা কিংবা নারী চিকিৎসক, আইনজীবী আর প্রকৌশলীর চাইতে অনেক বেশি মানবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। বাইরে পরিশীলিত জীবন বজায় রাখলেও রিক্ততা আর শীতলতা এসব অভিজাত নারীর দৈনন্দিন সঙ্গী।
স্বাধীনতার আধুনিক ধারণাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ; প্রকৃতপক্ষে এগুলো নারীদের বেঁধে ফেলার ফাঁদ ছাড়া কিছুই না। অনেক পেশাজীবী নারীরা মনে করেন নিজের চেয়ে নিচু সামাজিক মর্যাদার কাউকে বিয়ে করা, প্রেম কিংবা মাতৃত্বের ‘বাঁধনে’ জড়ানো তাদের স্বাধীনতা এবং পেশাজীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সার্বক্ষণিক এই ভীতি আধুনিক স্বাধীন নারীদের একপ্রকার ব্রহ্মচর্য/ কুমারীত্ব পালনে বাধ্য করে। জীবনের অনেক গভীর অভিজ্ঞতা, হৃদয়ভাঙ্গন, আর অনিন্দ্য সুখের দর্শক হয়েই তার জীবন পার হয়ে যায়; সেগুলো উপভোগ করার সুযোগ আর তার হয়ে ওঠে না।
নারীমুক্তির বর্তমান ধারক ও বাহকেরা স্বাধীনতার মর্মার্থ সম্পূর্ণরূপে অনুধাবনে ব্যর্থ। নারীর জন্য উপলব্ধ সীমাহীন ভালোবাসা আর তীব্র আনন্দের স্থান সমসাময়িক নারীমুক্তির ধারণায় অনুপস্থিত।
স্বনির্ভর বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীদের জীবন ঘটনাবহুল নয়; এই জীবন আবর্তিত হয় একটি ছোটো পরিধিকে কেন্দ্র করে। আর এটাই তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি। সমকালীন নারীরা বিশ্বসংসার এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন—এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই সচেতনতার দরুন এসময়ের নারীরা জীবনের নির্যাস খুঁজে পেতে আকুল। প্রাণশক্তি জাগিয়ে তোলা এবং জীবনের সাথে গভীরতর সংযোগ স্থাপনকারী এই নির্যাসের ধরা পাওয়ার মতো আধ্যাত্মিক গভীরতা তার নেই; সে একজন পেশাজীবী কলের পুতুল (professional automatons) মাত্র।
এরূপ পরিস্থিতিই যে এসময়ের বাস্তবতা হবে—এমনটা অনুধাবন করা কঠিন কিছু না। বিশেষত ‘নারী পুরুষের অধস্তন’ –এর মতো মান্ধাতার ধারণা দ্বারা রূপায়িত আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে বিষয়টি বোঝা খুবই সহজ। পুরোনো হলেও সমাজ এরকম নারীবিদ্বেষী ধারণা সযত্নে ধারণ করে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক স্বাধীন, আধুনিক নারীও এসব বস্তাপচা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা প্রতিটি আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয় র্যাডিকাল ধারণায় বিশ্বাসী/দীক্ষিত কিছু মানুষ। রাজপথের পরিবর্তনকামী এসব ব্যক্তিরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এতটা র্যাডিকাল না। যেকোনো সাধারণ সংকীর্ণমনা মানুষের (average Philistine) মতোই তারা সম্ভ্রান্ত হওয়ার ভনিতা করে দিনাতিপাত করে। বিরোধী পক্ষের অনুমোদন তাদের পরম আরাধ্য। এমন অনেক সমাজতন্ত্রী আর নৈরাজ্যবাদীদের কথা আমরা জানি যারা ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণকে চুরি মানলেও নিজেদের হিস্যার এক পয়সাও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন।
এই একই সংকীর্ণমনা মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে নারীমুক্তির আন্দোলনে। ট্যাবলয়েড সাংবাদিক আর দুর্বলচিত্তের লেখকেরা স্বাধীনচেতা নারীর এমন এক চরিত্র রচনা করেছেন যা ছাপোষা ব্যক্তি আর তাদের সঙ্গীদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নারীদের বিতর্কিত বিদ্রোহী হিসেবে উপস্থাপন করতো গণমাধ্যমগুলো; আন্দোলনরত প্রত্যেক নারীই যেনো আলোচিত/সমালোচিত লেখিকা জর্জ সান্ড (George Sand)। কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি ভীত হতেন না। নারীপুরুষের মধ্যকার ‘আদর্শ’ সম্পর্কের ধারণাকেও খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না তিনি। মোটকথা, নারীর স্বাধীনতা চিত্রায়িত হয় কাম আর পাপে পূর্ণ সমাজ বিচ্ছিন্ন বেপরোয়া জীবনের কামনা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই এরকম উপস্থাপন আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। গম্ভীর আর রসবোধহীন এই নেতারা এসব ভ্রান্ত দাবিগুলো উপেক্ষা না করে আলিঙ্গন করেন; তাদের সংগ্রাম যে উল্লিখিত চিত্রায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত—সকল বিষয়টি বোঝাতে তারা উঠেপড়ে লাগেন।
‘পুরুষের হুকুমের দাস হয়ে থাকা নারী সত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে’—এই যুক্তিকে কেন্দ্র করে নারী আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। তবে বর্তমানের কথা ভিন্ন। নারীরা এখন অনেকটাই মুক্ত এবং স্বাধীন (অন্তত আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন)। সমাজ থেকে কলুষতা দূর করায় নারীর সক্ষমতা প্রমাণ করা সমসাময়িক নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে, নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল ভেঙে ফেললেও নতুন নতুন আগল সৃষ্টি করেছে। স্বাধিকারের এই সংগ্রাম এমন কোনো শক্তিশালী নারীর প্রজন্ম তৈরি করতে পারেনি যারা প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতা সামাল দিতে পারবে। সঙ্কীর্ণ ও গোঁড়া (Puritanical) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত স্বাধীনতাকামী নারীদের অনুভূতির জগতে পুরুষের কোনো স্থান নেই। তাদের এই বিশ্বদর্শন পুরুষকে দেখে অপ্রয়োজনীয় এবং অসহনীয় সত্তা হিসেবে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো কেবল বাবা হিসেবে পুরুষের ভূমিকা। সেটাও সম্পূর্ণ জৈবিক কারণে। আশার কথা এই যে, অতি কঠোর বিশুদ্ধতাবাদীরাও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। নারী স্বাধীনতার সাথে পুরুষের স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মুক্ত নতুন বিশ্বে ভূমিষ্ঠ শিশুর মায়ের ভালবাসা আর যত্নের যতখানি প্রয়োজন, ঠিক ততটাই দরকার বাবার উপস্থিতি। বিষয়টি মুক্তিকামী নারীরা অনেকসময় অগ্রাহ্য করেন। আধুনিক নারীপুরুষের জীবনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মানব সম্পর্কের এই সংকীর্ণ ধারণা।

শিল্পী: পাবলো পিকাসো
সূত্র: আর্টসি
প্রায় পনেরো বছর আগে নরওয়েজীয় লেখিকা লরা মার্হোম (Laura Marholm) Woman, a Character Study নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তিনি নারী অধিকারের প্রচলিত ধারণার অগভীরতা ও সঙ্কীর্ণতা চিহ্নিত করা অগ্রদূতদের একজন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার প্রথাগত ধারণার সীমাবদ্ধতা নারীর অন্তর্জগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মার্হোমের লেখায় উঠে আসে অভিনেত্রী এলিওনোরা ডুসে (Eleonora Duse), গণিতবিদ সোনিয়া কোভালেভস্কি (Sonya Kovalevskaia), অকালে প্রাণ হারানো শিল্পী এবং কবি মারি বাশকির্টসেফের (Marie Bashkirtseff) মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ও প্রতিভাবান নারীর জীবন পর্যালোচনা। সাফল্যের জন্য তাদের সকলকেই বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো। অসাধারণ মেধাবী এবং সফল হলেও ব্যক্তিজীবনে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন নিসঙ্গ। জীবনরস এবং ব্যক্তিগত পূর্ণতা তাদের হাতে ধরা দেয়নি। একাকীত্ব আর অস্থিরতা ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। এই অসাধারণ চারিত্রিক পর্যালোচনাটি আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে—নারীর মেধা ও মননের বিকাশের সাথে তাঁর সংবেদনশীল জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যস্তানুপাতিক। পুরুষেরা নারীকে একজন সঙ্গী, কমরেড ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেনা; নারীর জৈবিক পরিচিতিই তাদের কাছে মুখ্য।
নিজেকে নারীর চেয়ে ঊর্ধ্বতন মনে করা দাম্ভিক পুরুষের পক্ষে লরা মার্হোমের বর্ণিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীদের বরদাস্ত করা অসম্ভব। ঠিক একইভাবে, নারী ব্যক্তিসত্ত্বাকে উপেক্ষা করে কেবল তার বিচক্ষণতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে—এমন পুরুষকে একজন নারীর পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
সাধারণত প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গভীর সংবেদনশীলতাকে প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তথাপি আধুনিক নারীর বাস্তবতা ভিন্ন—বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক গভীরতা জীবনকে উদ্ভাসিত করার বদলে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষ প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। আমৃত্যু একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞার (till death doth part) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় বিবাহব্যবস্থা নারীর উপর পুরুষ কর্তৃত্বকে সমর্থন করে। নিজের পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে স্বামীর আজ্ঞাবহ হয়ে নারী জীবন কাটাবে—এমনটাই আশা করা হয়। এটি বারংবার প্রমাণিত হয় যে, দাম্পত্যের চিরাচরিত সম্পর্কে নারীর ভূমিকা স্বামীর দাস এবং তাঁর সন্তানের ধারক হওয়াতেই সীমাবদ্ধ। এতো ত্রুটি আর অন্যায্যতা সত্ত্বেও বহু মুক্তমনা নারী অবিবাহিত থাকার চাইতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বেশি আগ্রহী; কেননা সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার বেড়াজালে একজন অবিবাহিত নারীর জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের বোঝা বহন করা সহজ নয়।
আধুনিক নারীদের আচরণের এমন অসঙ্গতির একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—স্বাধীনতার মর্মার্থ তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারেনি। অফিসের বস কিংবা স্বামীর মতো বাহ্যিক নিপীড়কের আগল ভেঙে ফেললেই মুক্তি অর্জিত হবে—এমনটাই তাদের ধারণা ছিলো। নিপীড়নের এই দেয়াল ভাঙতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবন এবং মননে সামাজিক ও নৈতিক রীতিনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করে। বহিস্থ নিপীড়কের সাথে সমঝোতা হলেও নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদাকে তারা ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়। ফলত তারা যেমন নারীমুক্তি আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে, ঠিক তেমনি প্রৌঢ়া এবং বৃদ্ধ নারীদের সাথে কোনোপ্রকার বাকবিতণ্ডা ছাড়াই সময় কাটাতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ নিপীড়কেরা একজন নারীর চারপাশের মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি—মা, বাবা, ভাই বা আত্মীয়রা কী বলবে? পাড়া প্রতিবেশী বা সমাজ কী বলবে? নৈতিকতার ঝান্ডাধারী, মানবীয় সত্ত্বাকে অবরুদ্ধকারীদের মতামতই বা কেমন হবে? অন্তরস্থ এসব কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সাথে নিজের অবস্থান জানান দিতে না পারলে একজন নারী নিজেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বলতে পারেনা। জীবনসঙ্গী নির্বাচন, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে ব্যক্তিগত অভিরুচি অনুসারে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভেতরই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত। নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা ভালোবাসার তীব্র দাবীকে গ্রাহ্য করার সাহস কতজন নারী দেখাতে পারে?
ফরাসি লেখন জঁ রিব্র্যাক (Jean Reibrach) তাঁর লেখা New Beauty গ্রন্থে একজন আদর্শ মুক্তিকামী নারীর বর্ণনা দেন। এই আদর্শ রূপটি একজন সদয় ও মেধাবী তরুণী চিকিৎসকের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে শিশুযত্ন এবং পুষ্টি বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন; দরিদ্র মায়েদের বিনামূল্যে ওষুধ দেন তিনি। প্রায়শই তিনি পরিচিত এক যুবকের সাথে উন্নত ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের বিষয়ে আলোচনা করেন। সামনের দিনগুলোতে পর্দা আর শতরঞ্জির পরিবর্তে পাথরের মেঝে আর দেয়ালের ব্যবহার কীভাবে জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখবে—সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি। তাঁর পোশাক অত্যন্ত সাদামাটা এবং পেশাদার; বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি কালো কাপড় পরিধান করেন। তরুণীর মুক্তমনা স্বভাব আর বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী যুবকের মনে প্রথমে ধাক্কা দেয়। তবে ধীরে ধীরে চিকিৎসক তরুণীকে বুঝতে শেখেন তিনি। তারপর আচমকা একদিন যুবক বুঝতে পারেন তিনি সেই তরুণী চিকিৎসকের প্রেমে পরেছেন। তারা দুজনেই তরুণ। পোশাকে কাঠিন্য ধরে রাখলেও তরুণীর কালো পোশাকের কলার আর আস্তিনে জায়গা করে নেয় ধবধবে সাদা রঙ। সবাই হয়তো আশা করবেন যে যুবকটি প্রেম নিবেদন করছিলো। কিন্তু প্রেমের বশবর্তী হয়ে নাটকীয় কিছু করার মতো মানুষ সে নয়। নিখুঁত মাধুর্যের অধিকারী তরুণীর সামনে কবিতাপাঠের মাধ্যমে প্রেম নিবেদন সামঞ্জস্যহীন। হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রেমকে যুবক অগ্রাহ্য করে এবং নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে। তরুণীও আত্মসংযমী ও যৌক্তিক; নিজের মনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সে। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় যে, যদি তারা কখনো একে অন্যকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো, তবে যুবকটির জীবন কাটতো কঠিন শীতলতায়। পুরো সম্পর্কটাই হতো শীতল ও নিষ্প্রাণ। স্বাধীনতার নতুন ধারণার ভেতর আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু যে আমি দেখতে বা কল্পনা করতে পারছি না—এটা স্বীকার করতে আমার কুণ্ঠা নেই। আধুনিক শীতল যথার্থতার (correctness) চাইতে পুরনো উন্মত্ত ভালোবাসা আমার বেশি প্রিয়; আমি ভালবাসি প্রেমের গান; আমার ভালো লাগে ডন হুয়ান (Don Juan) আর মাদাম ভেনাসের প্রেমের আখ্যান; আধুনিক ভালবাসার কাঠিন্যের চাইতে জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে পরিবারের অস্বীকার, তা প্রতিবেশীদের রটনা আমার কাছে শ্রেয়। নিঃস্বার্থ আদানপ্রদান না হলে তাকে ভালোবাসা বলা যায়না ; তা কেবল পারস্পরিক লেনদেনের হিসাব রাখার খাতা।

আজকের দিনের নারী স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর কৃত্রিম অটলতা ও সংকীর্ণতা। পেশাদারিত্ব আর কঠোর সামাজিক নিয়মনীতি মেনে চলতে গিয়ে নারীদের মন থেকে জীবনরস শুকিয়ে যায়, বিরাজ করে খাঁ খাঁ শূন্যতা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, সন্তানদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজের সত্তার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা সাবেকি মায়েরা হাল ফ্যাশনের মুক্ত নারীদের চাইতে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। মুক্তির সাধকেরা আমাকে মোটেই পছন্দ করেন না। তাদের বিশ্বাসের সাথে একমত না হওয়ার দরুন তারা আমার শাস্তি কামনা করতেন। অগ্রগতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপকারী এসব সমালোচকেরা আমার যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেন। অতীত নিখুঁত—এমনটা আমি কখনোই বলিনি। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে আমাদের দিদিমা ঠাকুমারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি জীবনীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তারা ছিলেন অনুরাগী, তীব্র রসবোধসম্পন্ন। সহজ সুন্দরের প্রতি তারা ছিলেন সহানুভূতিশীল। পেশাদারিত্ব আর কঠোরতা কলেজ আর অফিসগামী আধুনিক নারীদের মন থেকে স্ফূর্ততা শুষে নিয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমি চাই নারীরা তাদের আগের জীবনে ফিরে যাক, নিজেদের জীবনকে রান্নাঘর আর বাগানের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলুক।
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে উদ্যমী অগ্রযাত্রায় আমাদের মুক্তি নিহিত। আমাদের প্রয়োজন পুরনো ঐতিহ্য আর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে অবাধ বিকাশের প্রতি মনোনিবেশ করা। নারীর স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্য অর্জনে নারীমুক্তি আন্দোলনের এখন পর্যন্ত অর্জন অতি সামান্য। তবে এই অর্জন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই আশা করি। ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যালট বক্স কিংবা কোর্টরুম থেকে সত্যিকারের স্বাধীনতা আদায় হয় না; মুক্তির অর্জন শুরু হয় নারীর নিজের সত্তা থেকে। নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ স্বীয় প্রচেষ্টা। ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নারীদের অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতা কেউ কারো হাতে তুলে দেয় না; এর জন্য কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। একজন যতটা শক্তি আর উদ্যমের সাথে লড়াই করবে, সে ঠিক ততটাই স্বাধীনতা পাবে। সুতরাং, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন আবশ্যকীয়। রীতিনীতি, প্রথা আর সংস্কৃতির বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা নারীর অবশ্যকর্তব্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবী তোলা যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। তবে ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালবাসতে পারার অধিকার বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রেয়সী বা মায়ের ভূমিকা নারীকে পুরুষের অধস্তন করে’—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে নারীরা তাদের আংশিক স্বাধীনতায় পূর্ণতা খুঁজে পাবে। স্বাতন্ত্র্য অর্জনের জন্য নারী—পুরুষের দ্বৈততার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।
সংকীর্ণতা বিভক্ত করে, উদারতা ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা একত্রিত হই। তুচ্ছ বিষয়ের ভিড়ে আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যগুলো যেনো হারিয়ে না যায়। মানবসম্পর্কের সম্যক ধারণা লাভ করলে নারী পুরুষের ভেতর ‘কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করলো’ আর ‘কে নিয়ন্ত্রিত হলো’—এই প্রশ্নগুলো আমাদের আর বিচলিত করবে না। একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টার পরিবর্তে আমাদের উচিত সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। ভালবাসার ভেতরেই আমরা খুঁজে পাবো পরিপূর্ণতা। এই পূর্ণতাই আমাদের শূন্যতার অনুভূতি দূর করবে; নারীমুক্তির ট্রাজেডিকে পরিণত করবে অসীম সুখের উৎসে।



