অরাজ
প্রচ্ছদ » সান্দ্রা ব্লাডওর্থ।। যৌন নির্যাতনের শেকড়ে

সান্দ্রা ব্লাডওর্থ।। যৌন নির্যাতনের শেকড়ে

 

আধুনিক জীবনের সবচেয়ে গভীর সমস্যাগুলো প্রবাহিত হয় সমাজের সার্বভৌম শক্তি, ঐতিহাসিক উত্তারাধিকারের ভার এবং জীবনের বহির্মুখ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির অস্তিত্বের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র‍্য রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে।
— জর্জ সিমেল, “দ্যা মেট্রোপোলিস অব লাইফ”

ব্যাক্তি তার সৃষ্টি এবং সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত একটা সমান্তরাল ধারা বজায় রাখে। তাই সৃষ্টির ক্রিয়াকর্মের উপর ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি নিহিত থাকে।

মানুষ কি বলে, কল্পনা করে, অনুধাবন করে অথবা মানুষকে নিয়ে কি বলা হয়, চিন্তা করা হয়, কল্পনা করা হয়, ধারণা করা হয় তা দিয়ে মানুষের গঠনে আসা যায় না; তথাপি বাস্তব সক্রিয় মানুষ হতে এবং তার বাস্তব জীবন প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে তার আদর্শিক প্রতিক্রিয়া এবং তার জীবন প্রক্রিয়ার অনুরণনের গঠন প্রদর্শন করি।”
— মার্ক্স ও এঙ্গেলস, দি জার্মান আইডোলোজি

সান্দ্রা ব্লাডওর্থ

পঁচিশ বছর আগে “যৌন সহিংসতা নিয়ে নীরবতা ভঙ্গ কর” স্লোগানটি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ও রাস্তায় রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হয়। ১৯৯১ সালের মধ্যে সরকার বাধ্য হয় নারীর প্রতি সহিংসতার ইস্যুকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে। পারিবারিক বা গৃহ সহিংসতা সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার লক্ষ্যে ভিক্টোরিয়ান (অস্ট্রেলিয়ার একটা প্রদেশ) সরকার টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি ও প্রচার করে। আশির দশকে সরকার, পুলিশ বাহিনী ও অফিশিয়াল সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে অভূতপূর্ব সংখ্যক তদন্ত ও কনফারেন্স আয়োজন করেছে, যেখানে ক্রমবর্ধমানভাবে পারিবারিক সহিংসতার উপর বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়। সব ধরনের টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হয়েছিল রাজ্য পুলিশ বাহিনী গুলোতে। এমনকি ফেডারেল অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ প্রকাশ করে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স: নোটস ফর দ্যা গাইডেন্স অব পুলিশ অফিসারস! ১৯৯৩ সালে মিডিয়ার আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয় ডমেস্টিক ভায়োলেন্স। ৩ জুন দ্যা এইজ “ওয়ার অন ওমেন” এবং “এপিডেমিক অব ভায়োলেন্স” আর্টিকেল দু’টি শিরোনাম আকারে প্রকাশ করে।

মধ্যবর্তী দুই দশকে নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতার বিষয়ে পাব্লিক ডিস্কোর্সে গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল ঘটেছে। ২০১৪ সালে গার্ডিয়ানের একটা জরিপ অনুযায়ী সকল রাজ্য পুলিশ প্রধানের গৃহ বা পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে গৃহীত কর্মসূচীর প্রতি সমর্থন রয়েছে এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে পূর্বে নিজেদের কর্মকান্ডের অপর্যাপ্ততা স্বীকার করার প্রতিও তারা আগ্রহ দেখিয়েছে। তখনকার ভিক্টোরিয়ান পুলিশ কমিশনার কেন লে পারিবারিক সহিংসতার জন্য দায়ী করছে “একটা বিস্তৃত সংস্কৃতিকে যেখানে নারীর প্রতি অভদ্র ও সহিংস আচরণ সর্বজনিন।” রাজ্য পুলিশ প্রধানদের অধিকাংশই পারিবারিক সহিংসতার ভিক্টিমদের জন্য সহায়তা সিস্টেম ও সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কেউই নারীদের রাতে হাঁটা (নাইট ওয়াক) বা তাদের পোষাক সম্পর্কে বলেননি- যা নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে প্রচলিত সম্পূর্ণ নিরবতা আর প্রাচীন অনুমিতি গুলো থেকে একেবারে আলাদা। টনি অ্যাবোট যিনি নারী অধিকারের সমর্থক হিসেবে নয় বরং পুরুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতবাদের জন্য বেশী পরিচিত, তিনিও পারিবারিক সহিংসতাকে ২০১৫ এর এপ্রিলে কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ান গভার্নমেন্টে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং কেন লে ও ওই বছরের সেরা অস্ট্রেলিয়ান নির্বাচিত হওয়া রোজি বেটিকে নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে তৈরি একটা উপদেষ্টা মন্ডলীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছেন।

তারপর থেকে পারিবারিক সহিংসতা এবং এ বিষয়টিকে আমলে নেয়ার ব্যপারে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলেছে। অনেকদিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক হলেও পারিবারিক সহিংসতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়াটা গোটা সমাজে ঘটমান আরো বিভিন্ন প্রকার যৌন সহিংসতার বিষয়গুলোতে একধরনের বিকৃত প্রভাব সৃষ্টি করে, যা আমাদের এই সম্পূর্ণ সমস্যাটিকে বুঝতে এবং সঠিকভাবে তুলে ধরতে বাধা দেয়। সমাজে বহুল বিস্তৃত এবং নানান ধরনের এই সহিংসতার নজিরও অকাট্য, যেমনঃ এলজিবিটিয়াই সঙ্গীদের মধ্যে যৌন সহিংসতা; শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা, চার্চ বিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বয়োজ্যেষ্ঠ ও মানসিক রোগীদের তত্ত্বাবধানেরর প্রতি আসা অসংখ্য অভিযোগ; পুরুষ-ধর্ষণ; সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে পুরুষ কতৃক নারীদের প্রতি হওয়া সহিংসতা; এবং যুদ্ধ ও নিপীড়নে ত্রাস সৃষ্টিতে যৌন সহিংসতার ব্যবহার। এই প্রবন্ধে আমি প্রমাণ করবো যে নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা যাবে একমাত্র এই বহুল বিস্তৃত যৌন সহিংসতাগুলোর প্রসঙ্গে সঠিক ধারণার মাধ্যেম। আমি মূলত এ বিষয়ে অস্ট্রেলীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরবো কিছু পাকাপোক্ত তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে, তবে তারমধ্যে কিছু আমেরিকারও কিছু থাকবে যেহেতু এ দুই দেশের জীবনযাপনের মান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেকটাই উপমেয়। এ ঘটনা বিবরণে বলা যায়, যেখানে অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকা উভয় জায়গাতেই নারীদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা অরোধ্য, সেখানে যেসব জায়গায় নারী-অধিকার আরো কম স্বীকৃত এবং কম সমর্থিত ওসব জায়গায় এই সহিংসতার মাত্রা চরম পর্যায়ে। আলাদা সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যকার এই পার্থক্য এবং অভিন্নতাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে গেলে একটি পর্যবেক্ষনশীল তুলনামূলক বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে।

আমি এই প্রবন্ধে প্রমাণ করবো যে যৌন সহিংসতার বীজ গভীরভাবে গেঁথে আছে পুঁজিবাদী কাঠামোতে। পুঁজিবাদ পণ্য উৎপাদন ও সম্পদ সৃষ্টির এমন একটি পদ্ধতি যা গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এবং আমাদের চাহিদার কথা চিন্তা না করে সাধারণ মানুষকে শাসন করে, তাদের উপর আধিপত্য স্থাপন করে। এই সামাজিক কনটেক্সটেই যৌন সহিংসতার অস্তিত্ব এবং এর প্রসারকে বুঝতে হবে। এই প্রসঙ্গেই আমি ব্যাখ্যা করবো কেন কতৃত্বের শ্রেণিবিন্যাসের সব কিছুই একপ্রকার সহিংসতা এবং পুঁজিবাদের অধীনে এইধরনের সহিংসতার বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমি বলবো কেন এর বিশাল একটি অংশ যৌন সহিংসতা। আবার, পুঁজিবাদ লাগাতার সঙ্কটের একটি সিস্টেম, যে কারণে আমি গত তিন দশকে নব্যউদারবাদের প্রভাবের দিকে তাকিয়েছি, যার মাধ্যমে পুঁজিবাদী শ্রেণি দীর্ঘ পোস্ট-ওয়ার বুম (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি) সমাপ্তির সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। এ বিষয়টি সরকারের অপর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া এবং যৌন সহিংসতার মাত্রা কমাতে কেন তারা কোন উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি তা ব্যাখ্যা করতে আমাদের সাহায্য করবে।

মার্ক্সবাদীরা সর্বদা যা মেনে এসেছে, এই বিশ্লেষণ সেদিকেই নির্দেশ করবে, যে নারীদের প্রতি সহিংসতা প্রশমিত করা সম্ভবপর মনে হলেও পুঁজিবাদী শাসনে তা কখনোই গোড়া থেকে নির্মূল হবেনা। যৌন সহিংসতামুক্ত সমাজ যেখানে নারীরা সামগ্রিকভাবে মুক্ত এবং সমান (equal), তখনই সম্ভব হবে যখন পুঁজিবাদের সকল শিকল এবং শাখা-প্রশাখা ধ্বংস করা হবে। যৌন সহিংসতাকে দূর করতে পরিকল্পিত কার্যক্রম, প্রচারণা এবং পদক্ষেপ সম্পূর্ণ সার্থক এবং কার্যোপযোগী হবে যখন তা প্রয়োজনীয় শ্রেণিসচেনতা, সংহতি এবং সমষ্টিগত সংগঠন তৈরীতে সাহায্য করবে, যা যৌন সহিংসতাকে সম্পূর্ণভাবে দূরীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কেন সরকার প্রকৃতপক্ষে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ করবে না

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হবে যৌন সহিংসতা ও নির্যাতন সমাজে বিশেষ করে চার্চ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে প্রথাগতভাবে নীরবতায় গৃহীত হওয়ায় সমাজে এটা এতো গভীরভাবে প্রোথিত। তবে নীরবতা ভাঙনও খুব কম প্রভাবই ফেলেছে।  প্রত্যহের গণমাধ্যম শিরোনাম ও প্রবন্ধ এখন ও প্রচার করে পারিবারিক সহিংসতার ‘মহামারী’ এবং অধিকাংশই ইঙ্গিত দেয় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। নারীর প্রতি ব্যাপক যৌন সহিংসতার একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া খুব কঠিন। কারণ পুলিশ এখন অধিকাংশ নারীদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে তাদের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা হবে; রিপোর্টিং এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু রিপোর্টিং বৃদ্ধির অর্থ  অপরিহার্যভাবে প্রকৃত সহিংসতা ও নির্যাতন বৃদ্ধিকে নির্দেশ করেনা। প্রকৃত সংখ্যা ও তাদের অনুবর্তি প্রবণতাগুলো পরিমাপ করা একটা খুব কঠিন কাজ। কিছু পরিসংখ্যান এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেখানে যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য ধরনের সহিংসতার মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয় না। এবং গবেষকদের মতে একান্ত সাক্ষাতকারেও অধিকাংশ ভিক্টিম নির্যাতিত হওয়ার কথা স্বীকার করে না কারণ স্বীকার করা তাদের লজ্জিত করবে। আর অন্যদের জন্য এই ধরনের সহিংসতা এখনো একটা ব্যক্তিগত বিষয়, যে বিষয়ে আলোচনা করা তাদের জন্য কঠিন। যার প্রমাণ হলো সহিংসতার হার বৃদ্ধির ব্যাপারে প্রত্যক্ষ পাব্লিক স্টেটমেন্ট ও জনপ্রিয় দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে উল্লেখিত গার্ডিয়ান জরিপ অনুযায়ী, গতবছরে তাসমানিয়া, নর্দান টেরিটোরি ও কুইন্সল্যান্ডে পারিবারিক সহিংসতার পরিমান কমেছে। অন্তর্নিহিত প্রবণতা যাইহোক না কেন খুব কম তথ্যই আছে যা প্রমাণ করতে পারে গত চার দশকে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী সহিংসতা (ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স) উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যদিও কিছু সংখ্যক সংস্কার কার্যক্রম নারীর অবস্থানের উন্নতি ঘটিয়েছে।

বিবাহিত নারীরা ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পাব্লিক সার্ভিসে কাজ করতে পারতো না।  সত্তরের দশকের আগে নারীরা জুরির সদস্য হতে পারতো না এবং একই কাজ করার পর ও নারীরা পুরুষদের থেকে কম juror pay পেত; বিবাহ বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া অনেক কঠিন ছিল; চাইল্ড কেয়ার ছিলোনা বল্লেই চলে; একক মায়েরা (সিঙ্গেল মাদার) উপহাসের পাত্র ছিলেন  এবং একক মা-দের সহায়তাকারী বেনিফিট ১৯৭৩ এর আগে সহজলভ্য ছিলো না। নারীরা পরিষ্কারভাবেই ইকুয়াল নাগরিক ছিলেন না। এলসা নামের অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বিপদকালীন নারী আশ্রয়স্থল (Refuge) খোলা হয় মাত্র ১৯৭৪ এ সিডনিতে। নারীদের জন্য একজন জবরদস্ত হিংস্র পুরুষকে ছেড়ে দেয়া এখনও কঠিন, কিন্তু তিন দশক আগে এটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। পেইড শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ১৯৯২ সালের ৪৮ শতাংশ থেকে ধীর-স্থিরভাবে বর্তমানে মাত্র ৫৯.১ শতাংশে এসে পৌছিয়েছে, যা নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। এটা নির্দেশ করে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে প্রোপাগান্ডা, নারীদের কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক সমতা অর্জন ও সহিংস সম্পর্ক থেকে নারীদের প্রস্থান সহজ করতে কিছু মৌলিক সেবা সৃষ্টির কম্বিনেশন- যা যৌন সহিংসতা কমাতে প্রয়োজন বলে মার্ক্সিস্ট আর ফেমিনিস্টরা দাবি করে আসছে- তাও নারীদের অবস্থা পরিবর্তনে খুব কম পার্থক্যই তৈরি করতে পেরেছে ।

ষাটের ও সত্তরের দশকের র‍্যাডিকালিজম আশাবাদ দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল; এটা প্রতীয়মান হয়েছিল যে সংস্কার অনিবার্য, এবং শোষিতের সংগ্রাম একটা সামান্য উন্মুক্ত দরজায় ঠেলা দিচ্ছে যা সহজেই খুলে যেতে পারে, যদিও প্রয়োজন হয়েছিল একটা বড় ধাক্কার। তবে পচাত্তর থেকে মন্দা শুরু হয়– শাসক শ্রেণির আক্রমণ এবং ইউনিয়ন লিডার ও লেবার পার্টির নেতাদের থেকে একেবারেই অপর্যাপ্ত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফলে ইউনিয়ন মেম্বারশিপ ভয়াবহভাবে হ্রাস পায়– ১৯৭৫ এ যেখানে ইউনিয়ানাইজড শ্রমিক ছিল মোট শ্রমিকের ৫৪ শতাংশ, বর্তমানে তা কমে দাড়িয়েছে ১৭ শতাংশে। এই রাজনৈতিক অফেন্সিভের ফলে সৃষ্টি হয়েছে একটি ক্রমবর্ধমান রাজনীতিবিমুখ  ডানপন্থী পরিবেশ। এই ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশই শাসক শ্রেণির নিও-লিবারেল এজেন্ডার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যা আরো বিস্তারিতভাবে সমাজে ডানপন্থী ভাবাদর্শ চাপিয়ে দিতে, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারকে আক্রমণ করতে ও ব্যবসায়ীদের কর কমাতে সাহায্য করে। ওয়েলফেয়ার কার্যক্রম, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় হ্রাসের ফলে অনেক পরিবার ও ব্যক্তি ক্রমবর্ধমান চাপের শিকার হচ্ছে। নারীর নিপীড়ন যে এই সিস্টেমে কাঠামোদ্ধ তা শাসক শ্রেণির আক্রমণগুলো আরো স্পষ্ট করে তোলে। জেন্ডার পে গ্যাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এই প্রক্রিয়াকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এই তথ্যটা দ্বারা যে ৪৬.৬ ভাগ নারী শুধুই পার্ট টাইম কাজ করে এবং অস্ট্রেলিয়ার পার্ট টাইম শ্রমিকদের ৭০ ভাগই নারী। আবার যে সকল শিল্পে নারীরা সংখ্যায় বেশী সে সকল শিল্পের শ্রমিকদের থেকে পুরুষ ডমিন্যান্ট শিল্পের শ্রমিকরা বেশী বেতন পায়। শাসক শ্রেণির এই সকল কার্য়ক্রমের ফলশ্রুতি হলো গত চার দশকে সম্পদের পুৃনর্বন্টন: শ্রমিক শ্রেণির সম্পদ লুট করে পুঁজিবাদী শ্রেণিকে আরো ধনী করে তোলা। তবে এটাও শাসক শ্রেণির আরো চাওয়ার তৃষ্ণাকে প্রশমিত করে না। ২০১৪ সালে অ্যাবোট সরকারের ‘ক্লাস ওয়ার’ বাজেট এই প্রক্রিয়া বৃদ্ধি করারই একটা ধাপ।

একদিকে সরকার যখন পারিবারিক সহিংসতা মোকাবেলার কথা বলছে, হোয়াইট রিবন দিবসে ছবি তুলতে লাইন দিচ্ছে এবং এ বিষয়ক রাজকীয় কমিশন, তদন্ত ও আন্তঃসরকারী সম্মেলনের মহড়া বসাচ্ছে, অন্যদিকে তারাই সামাজিক নিরপত্তা ও সুরক্ষা প্রকল্পগুলোতে চাতুরতার সঙ্গে বরাদ্দ বাতিল ও কর্তনের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার সংস্কৃতিকে দীর্ঘমেয়াদে লালন করছে। একদিকে ক্ষমতাসীন দলগুলোর নিজ স্বার্থে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সুবিধাবাদী প্রচার চালানো, অন্যদিকে বেসরকারীকরণ ও প্রয়োজনীয় সামাজিক প্রকল্পগুলোতে সরকারী অর্থায়ন কমানোর নিও-লিবারেল নীতি-ই  এই দ্বিচারিতার মূল কারণ।

এই ক্যাম্পেইনগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্র সমাজের নৈতিক একাগ্রতার রক্ষক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারে এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে দমনমূলক ব্যবস্থা বৃদ্ধি করতে পারে যেমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরো কঠিন আইন প্রয়োগ ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত  অপরাধীদের জন্য কারাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি। নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলা করতে এই পদক্ষেপগুলো সাধারণ ‘ল অ্যান্ড অর্ডার’ ক্যাম্পেইনের সাথে বেশী  সামঞ্জস্যপূর্ণ যা সত্তরের দশকে সম্ভবপর প্রকৃত সামাজিক প্রতিরোধের অনুপস্থিতে ডানপন্থী পথকে প্রতিফলিত এবং আরো বৃদ্ধি করে। তবে তার চেয়েও গুরুতর ব্যাপার হলো শাসক শ্রেণির এই ধরনের ‘উদ্বেগ’ দেখানো ও নারীদের অধিকারের প্রতি সমর্থন সমাজে পুলিশের অবস্থানকে বাড়িয়ে দেয়। সরকার মনে করে এই ধরনের পিআর স্ট্যান্স তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে যা অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল নীতি বাস্তবায়নে তাদের  সাহায্য করবে। নারীবাদের অভ্যন্তরে ডানপন্থী প্রবণতা ও বামদের দুর্বলতার কারণে, সরকারের উপর এমন কোন চাপ নেই যা তাদের নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় কোন প্রকৃত পার্থক্য সৃষ্টিকারী নীতি গ্রহণে বাধ্য করতে পারে।

এবং এই নীতি সরকারী পদক্ষেপের তালিকাগুলোতে প্রতিফলিত হয় যা নারীদের মুক্তি এবং অবমাননাকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে। অ্যাবট সরকার ২০১৫ সালের বাজেটে নারী এবং তাদের সন্তানদের প্রতি সহিংসতা হ্রাস করতে গৃহীত একটি জাতীয় সচেতনতা কর্মসূচীতে তিন বছরের জন্য মাত্র ১৬.৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। হাস্যকরভাবে অপ্রতুল ২৫৫.৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে গৃহহীনতা এবং আদিবাসী আইনী পরিষেবার জন্য, যা এই কর্মসূচির জন্য দু’বছরের বেশি সুরক্ষা দেয় না। পারিবারিক সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা নারীদের সহায়তাকারী সেবা থেকে যে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ কর্তন করেছে তা সরকারের এই নতুন নীতিকে বৈধতা দেয় না।

নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে কার্যকরী পরিষেবায় সরকারি তহবিল কর্তন এবং অবহেলার পরিণতির সংক্ষিপ্তসার এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দেয়। অস্ট্রেলিয়া জুড়ে বিপদকালীন আশ্রয়স্থলে (Refuge) জায়গা খোঁজা অর্ধেক নারীদেরই মোটেলে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়। কোনও আশ্রয়স্থলে প্রবেশের জন্য অপেক্ষার সময় সর্বদা বাড়তে থাকে কারণ আশ্রয়স্থলগুলো এমন  নারীদেরদের দ্বারা পূর্ণ থাকে যারা সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন খুঁজে পায় না এবং তাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই। পাঁচ বছর আগে আশ্রয়স্থলে প্রবেশের জন্য ভিক্টোরিয়ার নারীদের কেবল একটি রাত মোটেলে অপেক্ষা করতে হয়েছিল; এখন তারা গড়ে পাঁচ রাত অপেক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে মোটেলে অপেক্ষা করা নারীদের মধ্যে ৫০ শতাংশই আগের দিন তারা যে ঘর থেকে পালিয়ে এসেছিলেন সে ঘরে ফিরে গিয়েছেন, কারণ মোটেলে থাকা তাদের জন্য ছিল ‘টু ডিফিকাল্ট’।  ১০০টি দুই বেডরুমের ভাড়া বাসার মধ্যে মাত্র তিনটি ২০১৪ সালে সিঙ্গেল প্যারেন্টদের জন্য সাশ্রয়ী ছিল। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কোন কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়নি, যদিও এটা সর্বজনবিদিত যে আবাসনের সঙ্কট  নারীদের আপত্তিজনক সম্পর্ক ত্যাগ করতে না পারার অন্যতম প্রধান কারণ। তবুও অ্যাবট সরকার ‘ন্যাশনাল পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট অন হোম্লেস্নেস’ কর্মসূচী থেকে ৪৪ মিলিয়ন ডলার তহবিল কর্তন করেছে, ২০১৫ পরবর্তি সময়ের জন্য কোন তহবিলও বরাদ্দ করা হয়নি। যদি এই অংশীদারিত্ব বাতিল হয়ে যায়,তবে, অনেকে যেমন অনুমান করেছেন, কমপক্ষে কিছু গৃহহীনদের সহায়তাকারী পরিষেবা বন্ধ হতে বাধ্য হবে।

নিউ সাউথ ওয়েলসের নারীবিষয়ক মন্ত্রী প্রু গওয়ার্ড ২০১৫ এর শুরুতে দাবি করেন তার সরকার পারিবারিক সহিংসতা রোধে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ তাদের “ঐতিহাসিক” পদক্ষেপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল এ খাতে বছরে মাত্র ৩.২৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ এবং তাও শুধু তিন বছর মেয়াদী। শুধু তাই নয়, তাদের সত্যিকারের “ঐতিহাসিক” পদক্ষেপ ছিল ২০১৪ অর্থবছরের বাজেটে নারী শরণার্থী, পারিবারিক সহিংসতা শিকার ও গৃহহীনদের বিশেষায়িত সেবাসমূহের জন্য বরাদ্দ নাটকীয়ভাবে হ্রাস করা ও নীতিতে পরিবর্তন আনা।

এর মাধ্যমে অসংখ্য  জটিল ও সূক্ষ্ম নারী স্বার্থ বিরোধী পরিবর্তনের জাল তৈরি করা হয়েছে, কিন্ত এর ফলাফল খুবই স্পষ্ট। পরবর্তীকালে সিডনির অন্তত ২০টি নারী শরণার্থীকেন্দ্র, যার কোনটি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে এসেছে, বন্ধ হয়ে যায় এবং আরো অসংখ্য গৃহহীন নারীদের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে এই পরিবর্তন গুলো স্রেফ সর্বশেষ ,গত দুই বছর ধরে ৮০টি সেবা হারিয়ে গেছে, গৃহহীন ও সহিংসতার শিকার নারীদের সেবা দেবার বিশেষায়িত কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৭০ এ নেমে এসেছে।

এই পুনর্গঠনের ফলাফল ছিল সত্যিকার অর্থেই বেদনাদায়ক। ২০টি নারী আশ্রয়স্থল বাদে অন্য সব আশ্রয়স্থলগুলোকে বিশ্বাস-ভিত্তিক চ্যারিটি সংগঠগুলোর  হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এমনকি নিউ সাউথ ওয়েলসের সহকারী পুলিশ কমিশনার মার্ক মারডোক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন: “আমরা পূর্বে ওই আশ্রয়স্থলগুলোর উপযুক্ত ব্যবহার করছিলাম, এখন মনে হচ্ছে আমাদের ভুক্তভোগী নারীদের পুনর্বাসনের জন্য অন্য কোন স্থান খুঁজে পেতে হবে।”

এখন নির্যাতিত নারীদেরকে একটি আশ্রয়স্থল খোঁজার জন্য গৃহহীনদের সাথে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে। প্রায়শই দুর্বল কাঠামোর, মানসিক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত  নারীরা এবং মানসিক রোগী এমনকি অত্যাচারী পুরুষরাও একসাথে সেখানে “আশ্রয়প্রাপ্ত” হন। মাইটল্যান্ডে ৩৫ বছর ধরে একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ‘ক্যারিজ প্লেস’-এর  সিইও জ্যান ম্যাকডোনাল্ড ‘মাইটল্যান্ড মার্কারি’-কে কেবলমাত্র নারীদের জন্য আলাদা আশ্রয়স্থল না থাকার পরিণতি সম্পর্কে বলেছেন। একই পরিবারের নারী-পুরুষদেরও একই আশ্রয়সস্থলে রাখতে তারা বাধ্য। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এমন একটা  পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে একজন পুরুষ ঘুরে দাঁড়ায় এবং মহিলার কাছে আত্মতৃপ্তি সহকারে বলে, ‘হা হা, তারা আমাকেও সহায়তা করছে।’

আমরা আরও অনেক উদাহরণ যুক্ত করতে পারি। আপাতদৃষ্টিতে সরাসরি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে না এমন যে কোনও সংখ্যক পরিষেবায় বরাদ্দ কমানোরও একটি ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। অ্যাবট সরকার কর্তৃক মেডিকেয়ার লোকালসের “পুনর্গঠন” (পড়ুন তহবিল কর্তন) অস্ট্রেলিয়া জুড়ে এগুলির সংখ্যা ৬১ থেকে ৩১-এ নেমে এসেছে়। অনেকগুলি মেডিকেয়ার লোকালস “সুপার অঞ্চল”-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে , আবার অনেক সুপার অঞ্চল দূরে অবস্থিত হওয়ায় তা বেশীরভাগ মানুষের জন্য সেবা নিশ্চিতকরণ কঠিন করে তোলে। অধিকাংশ মেডিকেয়ার লোকালস তৃণমূল কেন্দ্রগুলিকে তহবিল সরবরাহ করতো যারা “পুরুষদের ক্রোধ নিয়ন্ত্রন”(Anger Management) এবং  তরুনদের যৌন সহিংসতা এবং যৌন শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলির বোঝাপড়ার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করে। যখন এই সমস্ত তহবিল কর্তন আরোপ করা হচ্ছে “ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট”-এর নামে, তখন লিবারেল এবং লেবার সরকার উভয়ই বিদ্যালয়ে কুখ্যাত ডানপন্থী ধর্মযাজক কর্মসূচির জন্য ২৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার ক্ষেত্রে স্থিরপ্রতিজ্ঞ সমর্থন বজায় রেখেছে, এটা এমন একটি কর্মসূচী যা সেক্সিস্ট গোঁড়ামি, হোমোফোবিয়া এবং যৌনতা বিষয়ে সেকেলে মনোভাবকে উত্সাহিত করে, যা কেবলমাত্র নারীই নয়, অন্যান্য অরক্ষিত জনগোষ্ঠী যেমন  এলজিবিটিআই, শিশু এবং দুর্বল সম্প্রদায়ের প্রতি যৌন সহিংসতাকে ইন্ধন যোগায়।

সরকার বিষয়গুলোকে কেবল ভুল বোঝাবুঝি দাবি করতে পারে না।  উত্পাদনশীলতা কমিশন রাষ্ট্র, টেরিটরি এবং ফেডারেল সরকারগুলিকে আইনীতেপরিষেবাদিগুলির তহবিলে 200 মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করার আহ্বান জানিয়েছে এবং অ্যাবট সরকার দ্বারা কমিশনপ্রাপ্ত অ্যালেন কনসাল্টিংয়ের প্রতিবেদনে অনুযায়ী আইনী সহায়তার জন্য সরকারি বরাদ্দ অ্যাবোট সরকারের নিজেদের এজেন্ডা মেটাতেই অপ্রতুল ছিল। তবুও ভিক্টোরিয়ার ইস্টার্ন কমিউনিটি লিগাল সেন্টারের সিইও মাইকেল স্মিথ ফেয়ারফ্যাক্স মিডিয়াকে বলেন: “পারিবারিক সহিংসতা সারা দেশে আইন কেন্দ্রগুলি যে সমস্ত কাজ করছে তার প্রায় এক তৃতীয়াংশ, তাই পারিবারিক সহিংসতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার বলা  ফাঁকা বুলি হয়ে যায় যখন আপনি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকারী পরিষেবাগুলোর বরাদ্দ কমিয়ে দেন।  অ্যাবট সরকার কমিউনিটি আইনকেন্দ্রগুলি থেকে 20 মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ কেটে নেয়ার সাথে সাথেই ভিক্টোরিয়ার চৌদ্দটি কেন্দ্র ফেডারেল তহবিল হারিয়েছে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আদিবাসী/ন্যাটিভ সম্প্রদায়গুলোর জন্য নির্ধারিত সেবাগুলোর থেকে সরকারি বরাদ্দ কর্তন ইতিমধ্যে একটা করুন পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলেছে। উল্লেখ্য আদিবাসী নারীরা অ-আদিবাসী নারীদের তুলনায় ৩১ গুন বেশী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়। আদিবাসী ও টরেন্ট স্ট্রেইট দ্বীপের পারিবারিক সহিংসতার ভুক্তভোগী নারীদের জন্য গৃহীত একমাত্র কর্মসূচী ‘ফ্যামিলি ভায়োলেন্স প্রিভেন্টেশন লিগ্যাল সার্ভিসেস’ও ৩.৬ মিলিয়ন ডলার হারিয়েছে অ্যাবোট সরকারের ২০১৪ বাজেটে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এফভিপিএলএস (FVPLS) যখন প্রধানমনন্ত্রী অ্যাবোটের দায়িত্বে পরলো তখন এই কর্মসূচীকে কার্যকরভাবে তহবিল বঞ্চিত করা হয় এবং ভবিষ্যতেও  তহবিল সংগ্রহের কোন নিশ্চয়তা নেই।

এই সিস্টেমের অগ্রাধিকার নিপীড়িত মানুষের প্রয়োজনীয়তা নয় এবং শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি বা জনগনকে নিজেদের জীবনের উপর আরো নিয়ন্ত্রন দেয়ার জন্য এই সিস্টেম পরিচালিতও হয় না। এই সিস্টেমের অগ্রাধিকার দেয় মুনাফা ও শাসক শ্রেণির সর্বগ্রাসী শক্তিকে; আজকের দিনে যার অর্থ হলো সরকারি খাতে বরাদ্দ কমানো, কম অধিকার এবং শ্রমিক ও নির্যাতিত মানুষদের তাদের জীবনের উপর আরো কম নিয়ন্ত্রন। নারী নির্যাতন এই সিস্টেমের অস্ত্রাগারের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা সিস্টেমকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করে। এবং পূঁজিবাদের গঠন, চাহিদা ও অগ্রাধিকার নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা; আমার নিচে দেখব যৌন সহিংসতার অন্যান্য প্রকাশও এই যুক্তি থেকে প্রবাহিত হয়।

যৌন নির্যাতনের সদা বিকাশমান বোঝপড়া

সত্তরের দশকের নারীবাদী আন্দোলনের পূর্বে বেশিরভাগ তাত্ত্বিকরা ধর্ষণকে একটি বিকৃতি বলে চিহ্নিত করতেন, তারা মনে করতেন ধর্ষকরা মানসিকভাবে অসুস্থ , আবার কারো কারো মতে ধর্ষকদের আচরণ ছিল কতৃত্বপরায়ন মা বা দুর্বল পিতা দ্বারা সামাজিকীকরণের ফল; সকলেই এমন একটি চিত্র এঁকেছিলেন যেখানে ধর্ষকরা তাদের যৌন এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতাগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম বা ধর্ষকদের খোঁজাকরণের ভয় ও সমকামী প্রবণতা রয়েছে। ডোনাট এবং ডি’মিলিও যেমন বলেন: “তখন ধর্ষণ বিষয়ক আলোচোনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুরুষের দুর্দশা উপলব্ধি করা … [নারীর] নিগ্রহ ছিল কেবলমাত্র এই রোগবিদ্যার একটি উপজাত।”

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে নারীবাদী, মার্ক্সবাদী  এবং অন্যান্য তাত্ত্বিকদের মতামত ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টদের প্রাথমিক লেখাগুলি কোনো নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মোকাবিলা করেনি। সিমোন ডি বোভায়া তার ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ -এ  যুক্তি দিয়েছিল পুরুষ ও নারীর মধ্যে কার্যত সমস্ত যৌন সম্পর্ক গঠিত হয় সহিংসতার মাধ্যমে। দ্বিতীয় লিঙ্গ ছিল নারী সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণার বিরুদ্ধে একটা চ্যালেঞ্জ। তবে বোভোয়া লিঙ্গ স্টেরিওটাইপের সকল ভাষাই ব্যাবহার করেন। পুরুষ শক্তিশালী ও কতৃত্বপরায়ন সঙ্গী, নারী নিষ্ক্রিয়, অধীন ও বিনত। বোভোয়ার মতে,”নারীরা প্রজাতির শিকার।”

র‍্যাডিকাল নারীবাদী সুজান ব্রাউনমিলার ১৯৭৫ -এ প্রকাশিত তার বই ‘অ্যাগেইনসট দ্যা উইল’-এ ধর্ষণ সম্পর্কে নীরবতা ভঙ্গ করেন। ব্রাউনমিলার বলেন ১৯৭০ সালে ধর্ষণ সম্পর্কিত একটি আলোচনা সভায় যোগদানের আগে তিনি ভাবতেন “ধর্ষণ কোনও নারীবাদী বিষয় নয়”, এবং  “ধর্ষণের শিকার নারী ও নারীবাদী আন্দোলনের মধ্যে কোনও কমন গ্রাউন্ড নাই।” ডায়ানা রাসেল লিখেছেন যে এমননকি আশির দশকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীবাদীরা বৈবাহিক ধর্ষণের প্রশ্নটি তুলতে অনিচ্ছুক ছিলেন। অবশেষে যখন তিনি বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা করেন, তখন ব্রাউনমিলার  একটি অপরিণত খন্ডতাবাদী (Reductionist) যুক্তি তুলে ধরেন। ব্রাউনমিলারের মতে নারীরা মানসিকভাবে যৌন আক্রমণের মুখে অরক্ষিত এবং একবার যখন “পুরুষরা এই বিষয়টা আবিষ্কার করে যে তারা ধর্ষণ করতে পারে, তারা তা চালিয়ে যায়”। ব্রাউনমিলারের গুরুতর তাত্ত্বিক ত্রুটি  এবং ঐতিহাসিকভাবে ভুল দাবীগুলো  ছাড়াও তিনি তার যুক্তিগুলোকে পুলিশ রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিলেন, স্ট্রেঞ্জার ডেইঞ্জারে গুরুত্ব আরোপ করে। তবে শীঘ্রই গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে নারীরা সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হয় পরিচিত পুরুষদের দ্বারা – পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও প্রতিবেশী এবং নারীরা সবচেয়ে বেশী সহিংসতার শিকার হয় নিজের বাসা ও পরিবারের অভ্যন্তরে।

তবুও একটি ধীর শুরু এবং তাত্ত্বিক দুর্বলতা সত্ত্বেও, নারী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিতর্কগুলো ধর্ষণকে সেক্সিস্ট সংস্কৃতির একটা ফলাফল হিসেবে স্থাপন করেছে। কিছু মার্কসবাদী আরও এগিয়ে গিয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে এটি পুঁজিবাদী কাঠামো এবং বিচ্ছিন্নতবোধের পরিণতি (Alienation),  যেখানে সেক্সিজম পূজিবাদ ও অ্যালিয়েনেশনের উভয়েরই ভাবাদর্শগত প্রতিচ্ছবি।

যৌন সহিংসতার বাস্তবতা

বর্তমানে গীর্জা এবং ঝুঁকিপূর্নদের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধান এক কঠিন সত্য প্রকাশ করেছে যে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের, এবং প্রবীণ, বিকলাঙ্গ ও মানসিক অসুস্থতার রোগীদের প্রতি যৌন নির্যাতন এক বহুল প্রচলিত ঘটনা। লিঙ্গভিত্তিক যৌন নির্যাতন বোঝা এবং তা মোকাবিলার কৌশল তৈরি করার জন্য এই ব্যাপক প্রচলিত যৌন নির্যাতনের একটি পরিষ্কার পর্যবেক্ষণ আবশ্যক। আমি যখন এ লেখাটি লিখছি, দ্যা রয়েল কমিশন অন ইনস্টিটিউশনাল চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউজ ভিক্টোরিয়ার ব্যালারাটে অবস্থিত ক্যাথলিক যাজকদের পরিচালিত যৌন নিপীড়নকারী এক চক্রের বিরুদ্ধে ভয়ংকর তথ্য প্রমাণ শুনছে।

সম্ভবত ১৯৪০ এর দশক থেকে, ১৯৬০, ১৯৭০ এবং ১৯৮০র দশকে নিশ্চিতভাবে জেসুইটস, ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদারস, নান এবং ক্যাথলিক প্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব পদে থাকা অন্যান্যরা বিপুল সংখ্যক শিশুদের নির্যাতিত ও মানসিকভাবে আহত করে আসছে গীর্জার স্কুল এবং প্যারিশগুলোতে। ঘটনার একটি সাক্ষীশ্রেণির এক তৃতীয়াংশ আত্মহত্যা করেছে, এটি এক বিস্তৃত প্যাটার্নের অংশ যা অজানা সংখ্যক অল্প বয়সী ছেলে এবং মেয়েদের উপর ঘটিত স্থানীয় যৌন নির্যাতনের প্রতি জোর দেয়।

নিজস্ব স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গীর্জাটি ১৯৯৬ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ৪৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণ করেছে। গড় ক্ষতিপূরণ পরিশোধের পরিমাণ (ভিক্টোরিয়ান পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে) প্রায় ৩৬,০০০ ডলার ধরে এটি কার্যত এক হাজারেরও বেশি যৌন নির্যাতনের ঘটনার স্বীকারোক্তি। ২০১৫ এর মাঝামাঝি নাগাদ ২,২০০ জনেরও বেশি ক্ষতিপূরণের জন্য প্রোগ্রামটিতে পৌঁছেছিল। গীর্জার দ্বারা অস্বীকৃতি এবং চেপে যাওয়া, কার্ডিনাল জর্জ পেলের মত নির্যাতনকারীদের প্রতিরক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্থদের হুমকি দেয়ার মাঝে কেই বা বলতে পারবে এটা শেষ হয়েছে? অনুসন্ধানের মাধ্যমে একই প্যাটার্ন প্রকাশ পেয়েছে প্রটেস্ট্যান্ট গীর্জা, ইহুদি বিদ্যালয় এবং স্যালভেশন আর্মির প্রতিষ্ঠানগুলোয়। শিশুদের এখনো ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়া পরিবার থেকে সরিয়ে সরকার কর্তৃক এমন পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হয় যেখানে, সকল তদন্তের সাক্ষ্য প্রমাণ দেয়, তারা খুব সম্ভবত যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়।

২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় শিশু নির্যাতনের উপর বেশ কয়েকটি গবেষণার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তৈরি করেছে অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অভ ফ্যামিলি স্টাডিজ (এআইএসএস)। এগুলো ১৮-৫৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। গবেষকেরা অ-অনুপ্রবেশকারী এবং অনুপ্রবেশকারী যৌন নির্যাতনের বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। অ-অনুপ্রবেশকারী নির্যাতনের হার মেয়েদের ক্ষেত্রে ২০.৬ থেকে ৩৩.৬ শতাংশ,   ছেলেদের ক্ষেত্রে ১০.৫ থেকে ১৫.৯ শতাংশ। নারীরা ৭.৯ থেকে ১২ শতাংশ এবং পুরুষরা ৪.০ থেকে ৭.৫ শতাংশ হারে অনুপ্রবেশের কথা জানিয়েছেন। ২০০১ সালের আরেকটি জরিপে একইরকম প্যাটার্ন পাওয়া গেছে নারীদের সাথে পুরুষের তুলনা করলেঃ “অ-অনুপ্রবেশকারী শিশু যৌন নির্যাতন নারীর মধ্যে দ্বিগুণ (৩৩.৬%) ছিল পুরুষদের তুলনায় (১৫.৯%)। প্রায় ১২% নারী এবং ৪% পুরুষ অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশকারী অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।” তবে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে বয়ষ্ক পুরুষদের তরুণদের চেয়ে, এবং ১৬ বছরের আগে সহবাস করেছেন এমন নারীদের মধ্যে এটি অসম্মতিযুক্ত ছিল বলার সম্ভাবনা বয়ষ্কদের বেশি তরুণদের চেয়ে। এটি দিয়ে ইংগিত পাওয়া যাচ্ছিল যে শিশু যৌন নির্যাতনের হার হয়ত হ্রাস পাচ্ছিল, কিন্তু তা সম্ভবত একটু বেশি অনুমানমূলক হয়ে গেছিল, বিশেষত যেখানে পরবর্তী কোন জরিপ দ্বারা এই আবিষ্কার প্রমাণিত হয় নি। গবেষণার আরেকটি দূর্বলতা যা এআইএফএস রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় নি তা হলো অপরাধীদের লিঙ্গ অথবা শিশুটির সাথে সম্পর্ক ( পরিবারের সদস্যা, শিক্ষক, যাজক ইত্যাদি) তালিকাভুক্ত ছিল না। কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও এই অনুসন্ধানগুলো, যা রয়্যাল কমিশনের অকল্পনীয় প্রমাণের চেয়ে বেশি ক্লিনিক্যাল, ইঙ্গিত দেয় যে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন মোটেই কোন তুচ্ছ ব্যাপার নয় এবং পরিসংখ্যান থেকে প্রাপ্ত ধারণার চেয়ে ব্যাপক পরিমাণে বেশি প্রচলিত থাকতে পারে।

এলজিবিটিআই ওয়েবসাইটটি ও একই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে:

স্পষ্টতই এটি বিবেচনা করা হয় যে এলজিবিটিআই কমিউনিটি স্ট্রেইট কমিউনিটির সমপরিমাণে ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হয়। এইডস কাউন্সিল অভ এনএসডব্লিউ (এসিওএন) এর তথ্য মোতাবেক ৪১ শতাংশ সমকামী নারী এবং ২৮ শতাংশ সমকামী পুরুষের সম্পর্কে কোন একপ্রকার নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়েছে, এটি ৬১.৮ শতাংশ ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ এবং ৪২.৯ শতাংশ ইন্টারসেক্স নারীদের সাথে সংযুক্ত।

২০০৮ সালের ভিক্টোরিয়ান এক সমীক্ষায় দেখা গেছে এলজিবিটিআই উত্তরদাতার মধ্যে ২৬ শতাংশের এরকম নির্যাতনের অভিজ্ঞতা আছে। অন্যান্য গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে জেন্ডার স্টেরিওটাইপস, হোমোফোবিয়া এবং ট্রান্সফোবিয়া সবগুলোই এমন চাপ সৃষ্টি করে যা নির্যাতনের মাত্রা এবং তা বন্ধ করায় অসুবিধা তৈরিতে অবদান রাখে। নারীরা অন্তরঙ্গ সঙ্গী কর্তৃক সহিংসতা বেশি রিপোর্ট করে সমকামী পুরুষদের চেয়ে। যদিও পুরুষত্বের স্টেরিওটাইপ সম্পর্কিত কারণে পুরুষদের জন্য নির্যাতন স্বীকার করা বেশি কঠিন হতে পারে, যেটা সমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য:

সমকামী পুরুষদের মাঝে যৌন বলপ্রয়োগ কার্যত বৈপরিত্যমূলক মনে করা হয়। পুরুষত্ব ও পুরুষ যৌনতার অধিকাংশ আলোচনা যৌনসংগম যে পুরুষদের জন্যেও অকাম্য হতে পারে এই সম্ভাবনাকে প্রায় একটি অকল্পনীয় প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করে।

এআইএফএস এর একজন গবেষক, বিয়াংকা ফাইলবর্ন মন্তব্য করেছেন:

কিছু লেখক যুক্তি দিয়েছেন যে… হেটারোসেক্সুয়াল এবং এলজিবিটিকিউআই সম্পর্কে সহিংসতার মধ্যে মূল পার্থক্যকারী কারণ হোমোফোবিয়া এবং হেটারোসেক্সিজম, অপরাধীদের এইসব নিজেদের সুবিধায় ব্যাবহার করার ক্ষমতা এবং এলজিবিটিকিউআই সম্পর্কের সহিংসতা চিহ্নিত ও রিপোর্ট করায় অতুলনীয় বাধা তৈরি করার দিক বিবেচনা করে।

তিনি শেষ করেছেন:

যৌন নির্যাতনের উপর নারীবাদী থিওরিতে মোটামুটি সমকামী সম্পর্কের মধ্যে যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনা বাদ দেয়া হয়েছে (এবং বিশেষত লেসবিয়ান সম্পর্ক, যা কখনো কখনো নারীদের জন্য “ইউটোপিয়া” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে) কেবলমাত্র পুরুষ দ্বারা নারীর উপর সংঘটিত যৌন নির্যাতনের উপর জোর দিয়ে।  এটি কিছুটা হলেও, যদিও আবশ্যকভাবে উদ্দেশ্যমূলক নয়, এলজিবিটিকিউআই ব্যক্তিদের দ্বারা অথবা প্রতি যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা প্রকাশের অবরোধে অবদান রেখেছে।

আমরা আরো বলতে পারি এটি পুরুষ ধর্ষণ নিয়ে মারাত্মকভাবে কম গবেষণায় অবদান রেখেছে।  এটি আরো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে পুরুষেরা যে হারে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় তা পূর্বে স্বীকৃত হারের চেয়ে যথেষ্ট বেশি। আরেকটি দিক, গবেষকরা জিজ্ঞাসাবাদ ও পুলিশের কাছে কম রিপোর্টিং এর ক্ষেত্রে যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা পুরুষদের মধ্যে বেশি সুস্পষ্ট। কিন্তু গবেষকেরা পুরুষদের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার সম্ভাবনায় খুব কম মনোযোগ দিয়েছেন। এটি আংশিকভাবে ধর্ষণ সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞানের ফলাফল। নারীবাদীদের মধ্যে বিতর্কে “ধর্ষণ” শব্দটি প্রায় সবাই খুব সংকীর্ণ অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন, যেমন ধর্ষণ বলতেঃ পুরুষাঙ্গ দ্বারা যোনিতে অনুপ্রবেশ করা। এটি একাধিক ধরণের ধর্ষণ এবং ধর্ষণের আলাদা আলাদা পরিস্থিতির সুনির্দিষ্টতা উপেক্ষা করে। লিন সিগেল যেভাবে সুজান গ্রিফিন এবং ব্রাউন মিলারের মত নারীবাদীদের, যারা বিশ্বাস করে পুরুষেরা ধর্ষিত হয় না, বিপক্ষে যুক্তি দেয় যে পুরুষদের যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষন কর‍তে নারীরা সক্ষম এবং পুরুষেরা অন্য পুরুষ কর্তৃক ধর্ষিত হয়। ২০১২ সাল পর্যন্ত এফবিআই ধর্ষণকে শুধুমাত্র নারীদের বিরুদ্ধে ঘটিত অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করত। এটি এই সম্ভাবনাটি উত্থাপন করে যে  পুরুষদের ধর্ষণ চিন্তার চেয়ে অনেক বেশি প্রচলিত, অন্তত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে এই সংজ্ঞা গবেষণাকে অবগত করে। প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষ গোষ্টীর এই বিষয়ে অতি উৎসাহের কারণে বামপন্থী গবেষকেরা স্বীকার করতে নিরুৎসাহিত হয় যে পুরুষেরা নির্যাতিত হয় এবং কিছু নারী নির্যাতন করে। তবুও আক্রমণাত্মক, জাঁহাবাজ পুরুষের প্রভাবশালী জেন্ডার স্টেরিওটাইপ আমাদের পুরুষদেরকে নির্যাতিত হিসেবে দেখতে অনুৎসাহিত করে, যা “আজ্ঞাবহ” নারীদের মত নয়। এমনকি বেশিরভাগ নারীবাদী গবেষণাও এই অনুমানগুলোর ভিত্তিতে প্রভাবিত হয়েছিল এবং লিন সিগেল ও লিন্ডা গর্ডনের মত সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা, যারা স্বীকৃতি দিয়েছিল যে পুরুষেরা ধর্ষিত হয় এবং নারীরা যৌন নিপিড়ক হতে পারে, বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন।

২০০৮ সালের এক প্রবন্ধে সিগেল গত কয়েক দশক ধরে ২০০ টির মত গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন যা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে “নারীরা পুরুষদের সমান অথবা বেশি আক্রমনাত্মক তাদের স্বামী/স্ত্রী অথবা পুরুষ সঙ্গীদের সাথে।” ২০ বছর আগে লিন্ডা গর্ডন লিখেছিলেন “কিছু পরিস্থিতিতে মহিলাদের সঙ্গী অথবা শিশুদের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন করার সম্ভাবনা পুরুষদের সমান।” আরো অপ্রিয় ছিল তার জোর দেয়া যে “দারিদ্র্য, অন্যান্য প্রকারের বিষয় বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি” ঘরোয়া সহিংসতায় অবদান রাখতে পারে। এটিকে পুরুষ আধিপত্য বোঝার থেকে বিভ্রান্তিকর মনে করা হতো। এবং এটা বহু দশক ধরেই চলে আসছে যে বেশিরভাগ তাত্ত্বিকরা নিঃসন্দেহে ধারণা করে এসেছে যৌন নির্যাতন নারীদের উপর পুরুষ আধিপত্যের একটি হাতিয়ার। কিন্তু এই সংজ্ঞা আমাদের ‘আবু গরাইব’ কারাগারে অত্যাচারে নারীদের ভূমিকা বুঝতে সাহায্য করে না, যা ঘটেছিল জেনারেল জ্যানিস কার্পিনষ্কি অধিনায়ক থাকাকালীন। মার্কিন সৈন্য, যাদের প্রায় অর্ধেক নারী, এমন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল যাতে নারী-পুরুষ উভয়েরই ধর্ষণসহ আরো যৌন নির্যাতনের পদ্ধতিগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুরুষ বন্দীদের জোর করে এমনভাবে পোজ দেওয়ানো হয়েছিল যার ছবি তুলে ওরাল সেক্সের অনুকরণ করা যাবে। অবমাননার মধ্যে মহিলাদের অন্তর্বাস পরতে বাধ্য করা অথবা অঅত্যাচারকারীদের সম্মুখে হস্তমৈথুন করতে বাধ্য করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। লিন্ডি ইংল্যান্ড, এই যৌন নির্যাতনের মাঝে যার হাস্যোজ্জ্বল পোজ মার্কিন সেনাদের অপরাধ উদঘাটনের কেন্দ্রিয় চিত্র হয়ে পড়ে, পরে আদালতে বলেছিল এই ভঙ্গি ও কাজগুলো সব সেনাদের মজার জন্য ছিল এবং তার কাছে এটাকে ভুল মনে হয় নি। সৈন্যরা যে এই অত্যাচারের ছবিগুলো ইন্টারনেটে আপলোড দিয়েছিল তা তার বক্তব্যে ওজন দেয়, যদিও পুনর্বিচারে তিনি বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন।

রিচার্ড গেলসের মতো গবেষকরা- যারা ওই পুরুষদের  দ্বারা উদ্ধৃত হন যারা মনে করে যে ঘরোয়া সহিংসতার ঘটনা পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে সমান, তারা প্রদর্শন করেছেন যে পুরুষদের দ্বারা আক্রান্তদের ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ, যা নারীদের অত্যন্ত গুরুতর আহত করে রাখে। হত্যাকান্ড যদিও চলমান নির্যাতনের মাত্রার নির্দেশক নয়, তবে হত্যাকান্ডের পরিসংখ্যান গেলসের যুক্তি সমর্থন করে। ১০ বছর ধরে ২০১০ সাল পর্যন্ত এনএসডব্লিউতে রিপোর্ট করা ৮৭৭ টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১০৮ জন ছিলেন মহিলা যারা তাদের অন্তরঙ্গ সঙ্গী দ্বারা খুন হয়েছিলেন। পুরো ১০ বছরের মধ্যে “একটিও কেইস ছিল না যেখানে একজন ঘরোয়া সহিংস নির্যাতনকারী মহিলা একজন পুরুষকে মেরেছেন যিনি ঘরোয়া সহিংসতার শিকার ছিলেন।” তবুও সিগেল যেমন তার সমালোচকদের বিরুদ্ধে তর্ক করেছেন:

বিষয়টি হলো যে নারীদের আগ্রাসন মেনে নেওয়া কোনভাবেই এই সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে বিরোধিতা করে না যে “পুরুষত্ব” শারিরীক শক্তি, দৃঢ়তা এবং নারীদের উপর আধিপত্য দ্বারা চিহ্নিত হয়।

২০১২-১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাতীয় অপরাধ নিগ্রহের সমীক্ষায় পাওয়া গেছে যে ৪০,০০০ পরিবারে যৌন নির্যাতনের শিকার পুরুষের হার ৩৮ শতাংশ এবং এর মধ্যে ৪৬ শতাংশ দাবি করেছে অপরাধী ছিল একজন নারী। সত্যকে গোপন রাখা নারীদের অধিকারে সাহায্য করে না, বা যে পুরুষেরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদেরকে সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা, যার একমাত্র কারণ এই আবিষ্কারগুলো নির্যাতনের সাধারণ রূপ বা প্রত্যাশার সাথে সাংঘর্ষিক। এই পরিসংখ্যানের প্রকাশে পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত নারীদের জন্য প্রচারে কর্মরতদের থেকে এক ক্ষোভের ঝড় শুরু হয়। যাই হোক, যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত ধারণা বহু দশক ধরে বিকশিত হয়েছে যখন গবেষণা পূর্ব নির্ধারিত ধারণাকে বদলে দিয়েছে মানুষের জীবনের অন্ধকার কোণে আলোকপাত করে। নারীবাদী আইনি স্কলার লারা স্টেম্পল এনসিভিএস এর প্রতিবেদনটি পড়ে তাদের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করেন। হয়ত তারা একটি ভুল করেছে? এখন আমাদের কাছে আমেরিকান জার্নাল অব পাবলিক হেলথে প্রকাশিত তার এবং ইলান মায়ারের দুই বছরের সম্পূর্ণ সমীক্ষা ও গবেষণার ফলাফল আছে যা “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষদের মাঝে ব্যাপক যৌন নিগ্রহের প্রচলন রয়েছে।”

এটি সুপরিচিত নারীবাদ বিরোধী “পুরুষের অধিকার” প্রোপাগান্ডা নয়। পক্ষান্তরে, তাদের যুগান্তকারী গবেষণা তাদের দ্বারা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে “নারীবাদী নীতিমালা যা সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ইন্টারসেকশনাল পন্থার উপর জোড় দেয়; ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার গুরুত্ব; এবং লিঙ্গভিত্তিক ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করার অত্যাবশ্যকতা”র উপর ভিত্তি করে। তারা যুক্তি দেয়:

আমরা পুরুষ যৌন নিগ্রহের উপর সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানে দৃষ্টিপাত করছি, এর সম্পর্কে অবিরত ভুল ধারণার ব্যাখ্যাগুলো বিশ্লেষণ করে।

তারা শেষ করেছে:

যৌন নিগ্রহের চিত্রাঙ্কন স্টেরিওটিপিক্যাল যৌন নিগ্রহের প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালী করে, যেখানে পুরুষরা অপরাধী ও নারীরা ক্ষতিগ্রস্থ। আমরা যেমনটি দেখিয়েছি, যৌন নিগ্রহ এবং লিঙ্গ সম্পর্কিত বাস্তবতা আরো অনেক বেশি জটিল।

কারাগারে পুরুষদের প্রতি যৌন নির্যাতন এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার বিষয়, যেখানে এত বিশাল সংখ্যক পুরুষরা কারাগারে বন্দি যে এটি আর উপেক্ষা করা যায় না। দ্যা গার্ডিয়ানে জিল ফিলিপভিচের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী একমাত্র দেশ যেখানে নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি ধর্ষিত হয়?”, যা প্রাথমিক গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টির উপর আলোকপাতের বিশালতা প্রকাশ পায়। আংশিকভাবে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে পুরুষদের ভয়ানক সংখ্যার প্রতিফলন করে। অস্ট্রেলিয়ার কারাগারে যৌন নিপিড়নের বিষয়টি নিয়ে গবেষণার পরিমাণ খুবই স্বল্প। আমি একমাত্র ডেভিড হেইলপার্নকেই কারাগারে পুরুষ ধর্ষণ নিয়ে গুরুতর গবেষণা করতে দেখেছি। তিনি বের করেন যে তার জিজ্ঞাসাবাদ করা লোকের এক-চতুর্থাংশের বেশি লোকই যৌন নিপিড়নের শিকার হয়েছেন। অর্ধেকেরও বেশি বলেছিলেন তারা যৌন নিপিড়নের হুমকি পেয়েছেন।

যৌন নির্যাতনের ব্যাপক বিস্তারই এখন শুধুমাত্র প্রকাশ হয়নি, বরং সব তথ্য প্রমাণ এটিই দেখায় যে আপাতদৃষ্টিতে সম্মানিত প্রতিষ্ঠানসমূহ, যাদের সভ্য সমাজের স্তম্ভ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তারা নির্যাতিতদের চুপ করানোর উদ্দেশ্যে  হুমকি, চালবাজি, আইনি লড়াইয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ঢালা অথবা প্রস্তাব বা ঘুষ দেয়ার মত অসাধারণ ব্যবস্থা গ্রহন করে। দুইশো বছরের বেশি সময় ধরে শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষ অগ্রাহ্য করেছে- তাও যদি তারা নিজেরাই অপরাধে জড়িত না থাকত। যৌন সহিংসতা- শুধুমাত্র অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে নয়, শুধুমাত্র নারী বা প্রাপ্তবয়স্কদের উদ্দেশ্যেই নয় বরং প্রতিটি অরক্ষিত বা নিপিড়ীত গোষ্ঠীর প্রতি – এই সমাজে স্থান পেয়েছে।

নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা এই ব্যাপক উদাহরণগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এটি মৌলিক কিছু বিষয় উত্থাপন করেঃ কেন মানুষ তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা লোকদের যৌন নির্যাতন করে এবং সম্মানিত প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এদিকে দৃষ্টিপাত করে না? এগুলোর উত্তর খুঁজতে আমাদের পুজিঁবাদী ব্যবস্থার সামগ্রিকতা এবং তা কীভাবে সংগঠিত হয়েছে তার পরিণতির দিকে তাকাতে হবে।

পুঁজিবাদ, শোষণ, নিপীড়ন ও বিচ্ছিন্নতাবোধ

ওরা জন্ম থেকেই ক্ষণে ক্ষণে করে তোমারে ক্ষয়
এক মুহুর্ত দেয় না পেতে যদিও জীবন মানেই সময়
ব্যথা বড় হওয়ার আগে কোন কিছুই অনুভূত হয় না
ওরা তোমাকে বাড়িতে যন্ত্রণা দেয় এবং স্কলে ব্যাথা দেয়
তুমি চালাক হলে ওরা তোমাকে ঘৃণা করে এবং বোকাদের ওরা অবজ্ঞা করে
তুমি পাগল না হওয়া পর্যন্ত ওদের নিয়ম অনুসরণ করতে পারো না
বিশটা বছর ধরে তোমাকে অত্যাচার ও ভয় দেখানোর পর
ওরা তোমাকে একটা ক্যারিয়ার বেছে নিতে বলে
যখন তুমি স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে পারো না, তখন তোমার অনেক ভয় হয়
ওরা তোমাকে ধর্ম, সেক্স ও টিভির দ্বারা আচ্ছন্ন করে রাখে
তুমি নিজকে মনে কর খুব চালাক, উদ্বেগহীন ও মুক্ত
কিন্তু আমি যতটুকু দেখি সে অনুযায়ী তুমি এখনো কৃষকই রয়ে গেসো
ওরা এখনো তোমাকে বলসে উপরে জায়গা আছে
তবে হত্যা করার সময় কিভাবে হাসতে এটা তোমাকে প্রথমে জানতে হবে
যদি তুমি হতে চাও পাহাড়ের মানুষদের মতো

— জন লেনন, ওয়ার্কিং ক্লাস হিরো

মার্ক্সের মতে উৎপাদনের সাথে শ্রমিকের সম্পর্কের সঙ্গে মানুষের দাসত্বের সামগ্রিক ধারণাটি জড়ির এবং এই দাসত্ব বা অধীনতা এই সম্পর্কেরই সামান্য অদলবদল ও চূড়ান্ত পরিণতি। আমরা আমাদের চারপাশে যে শোষণ-নিপীড়ন দেখি তার উদ্ভব পুঁজির দ্বারা শ্রমিক শ্রেণির শোষণে এবং যে বিশেষ পথে এই শোষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিচ্ছিন্নভাবে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা বিশ্লেষণগুলো আংশিক ব্যাখ্যা দেয়, কারণ তারা আর্থ-সামাজিক কাঠামো থেকে আলাদা করে এক “মোহিত, বিকৃত, উথালপাতাল বিশ্ব”-এর বর্ণনা দেয়। আমরা যদি যৌন সহিংসতাকে বুঝতে চাই তাহলে আমাদের পুঁজিবাদের বেসিক থেকে শুরু করতে হবে এবং সামাজিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, ভাবাদর্শ ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের একটি চিত্র তুলে ধরতে হবে, যা এই বহুবিস্তৃত সহিংসতাকে সম্ভব করে তোলে।

যে শোষণ পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখে তা শ্রমিক শ্রেণির উপর নিপীড়নের সৃষ্টি করে। যেহেতু এই নিপীড়ন অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে বিদ্যমান, তাই এই নিপীড়ন অন্যান্য গোষ্ঠীর যারা কোন সুনির্দিষ্ট অত্যাচারের শিকার হয় তাদের প্রতি করা বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে অপ্রচ্ছন্ন। তবে সংখ্যালঘু শাসনের অর্থই হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণিকে কাঠামোগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা। জন লেননের লিরিক্স তুলে ধরে এই বিষয়টি শ্রমজীবী মানু্ষের অভিজ্ঞতায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিভাবে একটা ছোট সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে শোষণ করে টিকে থাকে যদি যারা সম্পদ উৎপাদন করে তারা আত্মবিশ্বাসী হয় ও নিজেদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। আমেরিকান লেখক লিলিয়ান রুবিন তার বই ‘লাইফ ইন দি ওয়ার্কিং ক্লাস ফ্যামিলি’-তে এই শোষণের অভিজ্ঞতার সারাংশ ও চূড়ান্ত পরিণতি তুলে ধরেন:

শিশুরা জানে। তারা জানে তাদের শিক্ষকরা তাদের পরিবারকে অবজ্ঞা করে। তারা জানে তারা যে টেলিভিশন শো গুলো দেখে সেখানে এমন কোন নায়ক নেই যে একজন ট্রাক চালক, যে একজন ফ্যাক্টোরি শ্রমিক, যে একজন ভবন নির্মাতা। তারা জানে তারা এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না যারা ‘প্রভাব’ রাখে। এবং সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো তারা জানে যে তাদের পিতামাতারাও এই বিষয়গুলো জানে।- নতুবা কেন তারা নিজেদের মধ্যে এতো ক্রোধ বহন করে- যে ক্রোধ প্রকাশ পায় অযৌক্তিকভাবে পরিবারে- বাইরের দুনিয়ায় যে ক্রোধ প্রকাশিত হয় না, যেখানে সে ক্রোধের অভিব্যক্তি বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়?

পুঁজিবাদী সমাজে নারী, আদিবাসী, অভিবাসী, এলজিবিটিয়াই পিপলস, ধর্মীয় সসংখ্যালঘু, শিশু, বৃদ্ধ ও অক্ষম প্রভৃতি বিশেষ জনগোষ্ঠী নির্দিষ্ট ধরনের  নিপীড়নের শিকার হয়, যা শ্রমিকদের বিভিন্ন পথে বিভক্ত করে, আবার কেউ কেউ একের অধিক নিপীড়নের শিকার হয়।

দ্বিতীয়ত, পণ্যের সর্বজনীন উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যবস্থা মানবিক মিথস্ক্রিয়া আর সামাজিক সংঠনের ওপর ফেলেছে গভীর প্রভাব। উৎপাদকদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে; শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা নিজেই হয়ে গেহে একটা পণ্য; এর দাম নির্ধারিত হচ্ছে ঘণ্টাদরে বাজারে। শ্রমিকেরা কাজ করছে তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনের জন্য নয়, মজুরি পেতে। এই কার্যক্রম, যা হবার কথা ছিল সৃজনশীল আর জীবনঘনিষ্ট, তা হয়ে গেছে একটি বোঝা, যার মাধ্যমে যারা আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সম্পদ আরো বাড়ছে, ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়ছে। শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য হয়ে গেছে তার কাছে দুর্লভ, যার সাথে তার সম্পর্ক বিপরীতমুখী। এই দুর্লভতা শ্রমিকের জীবনকে করে তুলেছে তাদের উৎপাদিত পণ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমাদের জীবনটাই যেন আমাদের বোধগম্যতার বাইরের কিছু অনিয়ন্ত্রিত শব্দ- অর্থনীতি, বাজার ইত্যাদি্র অধীনে চলে গেছে। মার্ক্সের ভাষায় বলতে গেলে, “মানুষের মূল্য যে হারে কমে, ঠিক সেই হারে বাড়ে পণ্যের মূল্য। শ্রম কেবল পণ্যই উৎপাদন করে না, এটা নিজেকে এবং শ্রমিকদেরও একটা পণ্য হিসেবে উৎপাদন করে।”

কোনোকিছুর বিনিময় যে এর উৎপাদকদের মধ্যে নয়, বরং নৈর্ব্যক্তিক বাজারে হয় তা পুঁজিবাদের কার্যপদ্ধতিকে অস্পষ্ট করে দেয়। কোনো বাজারের জন্য পণ্য তৈরির কাজ উৎপাদক ও ভোক্তাদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ককে অস্পষ্ট করে। কী উৎপাদিত হবে সে ব্যাপারে শ্রমিকশ্রেণির কোনো মতামতের সুযোগ খুব কম এবং তারা কী উৎপাদন করবে সে ব্যাপারেও তাদের মতামতের সুযোগ নেই। তাদের কাছে সাধারণত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এমন বিলাসিতা থাকে না যে তারা অস্ত্রের বদলে সোলার প্যানেলের মতো দরকারী কিছু বানাতে চাইবে। এবং তাই “শ্রমিকের শ্রমের সামাজিক চরিত্রটি তাদের কাছে তাদের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যে স্ট্যাম্প করা একটি বস্তুগত বৈশিষ্ট্য হিসাবে উপস্থিত হয়… মানু্ষের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক … তাদের দৃষ্টিতে, বিষয়গুলোর  মধ্যে সম্পর্কের এক চমৎকার রূপ হিসেবে মনে করা হয়।” যেমন মার্ক্স ‘ক্যাপিটাল’ এর প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করেছিলেন, তেমনি তিনি তৃতীয় খণ্ডের শেষের দিকে এভাবে সমাপ্তি টানেন যে, “’ক্যাপিটালে … সামাজিক সম্পর্ককে বস্তুর মাঝে সম্পর্ক রুপান্তরের মাধ্যমে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা নিজেকে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট করে তোলে। ”

মার্ক্স পুঁজিবাদী সিস্টেম সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে “যার অন্তর্নিহিত আইন নিজেকে প্রকাশ করে কিছু পরস্পরবিরোধী নিয়মের সমষ্টি হিসেবে।” কোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের প্রকৃত সামাজিক মূল্য তার বাজার মূল্যের অনুরূপ কি না, সে ব্যাপারে কে-ই বা আলোকপাত করতে পারবে? পারার কথা না, কারণ গতানুগতিক দরদাম তরিকার মত এটি অতটা সহজবোধ্য বা অনুমানযোগ্য নয়। একারণেই মার্ক্স বলেন, “দাম এখন আর মূল্য প্রকাশ করে না। যেসব বস্তু কোন পণ্যই  না যেমন বিবেক কিংবা সম্ভ্রম, তাও চাইলে এখন বিক্রিযোগ্য ।” আর ঠিক একারণেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সঠিক মূল্যের বিনিময়ে আলস্য, যৌনতৃপ্তির আহবান বা প্রকৃত তৃপ্তি থেকে শুরু করে সবকিছুই পণ্য হিসেবে বেচাকেনা করা যেতে পারে, এমনকি সম্মান আর পদমর্যাদাও। দুর্বলের সহায়তাও এখন ততটুকুই বিক্রয়যোগ্য এবং লাভজনক, যতটা কিনা প্রথমত তাদেরকে প্রতি করা অত্যাচার-নিপীড়ন ছিল ।

অনেকেই মনে করে এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ সবার উপরে প্রভাব ফেলে এবং এই কারণে যৌন নিপীড়নকে বিচ্ছিন্নতাবোধের ধারণা দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। বিচ্ছিন্নতাবোধ কোন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটা পুঁজিবাদের নাগালছাড়ানো ও পপরিব্যাপক একটি অবস্থা। এই সুনির্দিষ্ট কারণেই বিচ্ছিন্নতাবোধ আমাদের আলোচনার আদ্যস্থল। এ কারণে নয় যে বিচ্ছিন্নতাবোধের কন্সেপ্ট দ্বারা প্রত্যেক ব্যক্তিকে একটি খন্ডিতবাদী ও যান্ত্রিক উপায়ে বিশ্লেষণ করা যায়, বরং কেনই বা  যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটে ও কেন নিপীড়ন শুধু একটা লৈঙ্গিক বিষয় না– নিপীড়ন আরো বিভিন্ন আকার গ্রহণ করতে পারে– এই বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাবোধের কন্সেপ্টটা বেসিক হিসেবে কাজ করে। মার্ক্সের মেথোডটা হলো বিমূর্ত ধারণা থেকে মূর্ত ধারণায় পৌছানো। পুঁজিবাদে সামাজিক কাঠামো এতোই অস্পষ্ট যে কংক্রিট বা মূর্ত ধারণাকে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কে বোঝা সম্ভব। যৌন নিপীড়নকে বুঝতে হলে কিভাবে মধ্যস্থতাকারী ফ্যাক্টরগুলো বিচ্ছিন্নতাবোধের অভিব্যক্তি ও অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে জানতে হবে। যৌন সহিংসতাকে বুঝতে আমাদের এই বিষয়গুলোকেও বিশ্লেষণ করতে হবে: পুরুষের আকাঙ্ক্ষা পুরণে সেক্স অব্জেক্ট হিসেবে নারীর স্টেরিওটাইপ, অন্যের উপর কতৃত্বস্থাপনকারী হিসেবে পুরুষের সামাজিকীকরণ, কতৃত্বপূর্ণ অবস্থানে এইসব ব্যক্তিদের পদোন্নতি, হোমোফোবিয়া-ট্রান্সফোবিয়ার প্রভাব, সেক্সের ব্যাপারে কামুক মনোভাব, অক্ষমদের প্রতি বৈষম্য প্রভৃতি, পরিবারের ভূমিকা, অরক্ষিতের উপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রন থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, ওই সকল ভাবাদর্শের ভূমিকা যা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতাকে বৈধতা দেয় (সমাজ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হয়), সমাজের আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্য, শ্রেণি সংগ্রামের অবস্থা, শ্রেণি সচেতনতার পর্যায়। কোন ফ্যাক্টর বা কারণ-ই অপরিবর্তনশীল বা টাইম্লেস নয়।

জর্জ লুকাস, তাঁর হিস্ট্রি অ্যাণ্ড ক্লাস কনশাসনেস-এ বিচ্ছিন্নতাবোধের মার্কসবাদী ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন।তারই অংশ হিসাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে কীভাবে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র এবং শ্রেণিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলি সমস্ত মানবিক সম্পর্ককে নিষ্প্রভ করে তোলে এবং মানুষের সহানুভূতিকে ধ্বংস করে । সামগ্রিকভাবে সিস্টেমকে গণনা এবং অজুহাতের উপর নির্ভর করতে হয়- শ্রমিকরা সময়ের পরিমাপের চেয়ে খুব বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায় না- স্থায়ী শ্রমিক, অস্থায়ী শ্রমিক। উদাহরণস্বরূপ, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় লিপ্ত থাকা রয়েল কমিশন মানসিক অসুস্থতায় ভোগা শিশুদের পরিচয় মুছে ফেলে এবং অপরাধীদের ও যারা ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে “অংশীদার ” হিসাবে মিলিত থাকে, তাদের অপরাধ গোপন করে। নিপীড়নের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিক্রিয়া তার অমানবিকতার জন্য উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, ক্যাথলিক চার্চ, যা নিজেকে তার অনুসারীদের আধ্যাত্মিক এবং সমসাময়িক কল্যাণে সচেতন হিসাবে প্রচার করে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতি কোন ধরনের মানবিক, যত্নশীল উপায়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না, যারা শিশুকামী পুরোহিতদের বর্বরতায় স্পষ্টভাবে আঘাত পেয়েছে। ব্রোকন রাইটস এর মতে, “নিরাময় কর্মসূচির প্রতি” এর লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া নয়, কেননা এটি একটি ব্যবসায়ের কৌশল, যা পরিকল্পিতভাবে গির্জার সম্পদ এবং এর কর্পোরেট চিত্র রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

কর্তা শ্রেণি আদেশপালন ও নিয়ন্ত্রণের দাবি করে যাতে তারা কিছু লোককে অন্যের শৃঙ্খলা রক্ষা ও শাসনের দায়িত্ব দিয়ে দায়বদ্ধ করে দেয়, যারা সহজে তাদের কর্তৃত্বের কাছে ধরা দেয় না ।তবে বাজার সম্পর্ক, পণ্য উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা অস্থির, পরস্পরবিরোধী এবং নিয়মিত সংকট দ্বারা মোড়ানো। প্রতিটি জীবনের অভিব্যক্তি দ্বারা অবশ্যই এই সত্যটি প্রকাশ করা প্রয়োজন যে ব্যক্তিরা পুঁজির অধীনস্থ; এবং এটি তারা এমন ব্যবস্থার অংশ যা কেবল পুঁজিপতির। এই সেলফ অবজেক্টিফিকেশন, মানুষকে পণ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার সর্বান্তকরণের মধ্যে দিয়ে অমানবিক এবং পণ্য সম্পর্কের অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা এই সমাজের শ্রমিকদের ভাগ্য।

কর্তৃপক্ষ পারম্পরিক ভাবেই চায়, কিছু মানুষকে তারা ব্যবহার করবে যারা বাকি মানুষের উপর খবরদারি করবে,কতৃপক্ষের আদেশ পালন করবে এবং যারা কতৃপক্ষের সামনে নত হয় না তাদের দমন করবে। কিন্তু বাজার সম্পর্ক, পণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও প্রতিযোগীতা নিয়মিত সংকটের কারনেই পরিবর্তনশীল, পরস্পরবিরোধী এবং ধ্বংসাত্মক। এই “সকল চাহিদার প্রকাশ” অবশ্যই এই সত্য সামনে নিয়ে আসে যে, ব্যাক্তি পূজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটা হচ্ছে যে, “তারা এমন একটি পদ্ধতির অংশ যার নিয়ন্ত্রক পূজিবাদী গোষ্ঠী”। “শ্রমিকের ভাগ্য এরকমই,এভাবেই চলবে” এই চিন্তা মূলত তাদেরকে পণ্যে পরিনত করে, মানুষ থেকে পণ্যে রূপান্তরিত হওয়া ব্যাপারটা, অমানবিকতা ও অমানবিক করার পণ্য সম্পর্ককেই সম্পূর্ণ রূপে ফুটিয়ে তোলে।

এই বিষাক্ত মিশ্রনের প্রসঙ্গে আমাদের বিবেচনা করতে হবে, এই নিরাপত্তাহীন এবং সহিংসতার শিকার মানুষগুলো কারও না কারও অধীনে এবং নিয়ন্ত্রনে থাকার পরও সহিংসতা,দমন পীড়ন ও স্বেচ্ছাচারী আচরনের শিকার হচ্ছে। এই অত্যাচার বা অন্যায় শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক অস্বাভাবিকতার ফল না। কোন সিস্টেম বা পরিবেশ কাউকে যখন নীপিড়নের ভূমিকা পালন করায়, তখন সে ব্যক্তি আক্রমনাত্মক,অত্যাচারী হয়ে উঠে। আমলাতন্ত্রকে জোড় করে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই ব্যাক্তিরা অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে,তাদের কর্মকান্ডকে অপরাধ ভাবা হয় না,ভাবা হয় “প্রয়োজনীয়”। অভিবাসন মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কথাই ভাবা যাক; তাদের কাছে অভিবাসীরা শুধুই বস্তু, যাদের নিয়ন্ত্রন করতে হবে এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যেমন চার্চ বা বিদ্যালয় বা জেলখানা তৈরিই করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোন যৌক্তিকতা এবং বৈধতা তৈরি করতে। এই ব্যপারে ফুকো তার বই  ডিসিপ্লিন ও পানিশ-এ বলেন: “তারা উন্নতি সাধনের নামে ঐ জীবনগুলোকে বন্দি বা শৃঙ্খলাধীন করে যারা তাদের কতৃত্বের আওতাধীন বা তাদের কতৃত্ব মানতে বাধ্য ।”

তথাপি, একটি প্রকল্প আছে যার মতে  মানুষ একটি যুক্তিবাদী যন্ত্র, স্পষ্টতই মানুষ তা নয়। এইকারণেই এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কেউ কেউ কিছুটা বিরক্ত এবং কোন কোন সময় তারা প্রতিবাদও করে। এ প্রেক্ষিতে নির্দেশকরা  অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে আসে এবং তাদেরকে ডিহিউমানাইজ করে। আবার, আম্লাতন্ত্রের উপরের স্তরের ব্যক্তিদের নিজেদেরকে আলোকিত যৌক্তিকতা ও শৃঙখলার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপনা করতে হয়। এর অর্থ ক্ষমতা ও কতৃত্ব বহনকারী ব্যক্তিরা কতৃত্বাধীন ব্যক্তিদের মতোই সমান ভাবে Reified (লুকাসের টার্ম)-গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটা হচ্ছে তাদের জীবীকা ও সামাজিক মর্যাদা তাদের এই Reification এর সাথে জড়িত।

যৌন নিপীড়নের কারণ কি?

যৌনতা নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং যৌন নিপীড়ন এতো ব্যাপকভাবে ঘটে কেন?

বিচ্ছিন্নতাবোধ সকল শ্রেণি সমাজে বিভিন্ন পরিসরে বিদ্যমান ছিল কারণ শ্রেণি সমাজে উৎপাদনকারীরা তাদের উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রন করে না। পুঁজিবাদী সমাজে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ চরমে পৌছায়। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বিভিন্নভাবে অনুভব ও প্রকাশিত হয়। মার্ক্স ও এঙ্গেলস শ্রমের সাথে মানুষের সক্ষমতাকে শনাক্ত করেন। যন্ত্র বা উৎপাদনের উপকরণ ব্যবহার করে নিজেদের পরিবর্তনের পাশাপাশি আমরা আমাদের চারপাশের পৃথিবী পরিবর্তন করি, যা জীবজন্তুর দুনিয়া থেকে মানুষকে আলাদা করে, একই সাথে আমরা প্রাকৃতিক দুনিয়ার একটি অংশ হয়ে থাকি। যৌনতা মানব প্রকৃতির একটি অংশ। মানুষ যখন বানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে, যন্ত্র বা উৎপাদনের উপকরণ তৈরি বানরকে গুণগতভাবে পৃথক প্রাণীতে পরিবর্তন করেছিল। সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষের বিকাশ ও মানুষের যৌন অভিজ্ঞতার বিবর্তন একই সাথে চলেছে। মানুষের যৌনতা এমন ভাবে বিকাশিত হয়েছিল যে বানর থাকা কালীন আমরা যে পরিমান যৌন তৃপ্তি লাভ করতাম, এখন বিবর্তিত মানুষ তার থেকে বেশ করি। যৌনতাকে মানব প্রকৃতির অংশ হিসাবে দেখার মানে এই নয় যে মানুষ যেভাবে যৌন সঙ্গম (সেক্স) করে, আমরা যেভাবে যৌনতা অনুভব করি বা শ্রমের জন্য আমাদের দক্ষতার প্রয়োগ করি তা কোনও অভ্যন্তরীণ, অপরিবর্তনীয় সত্ত্বার সাথে সম্পর্কিত। শ্রমের সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা যেমন সমাজ নির্ধারণ করে দেয় তেমনি উৎপাদন ও প্রজনন সংগঠনের উপর ভিত্তি করে ইতিহাসের প্রত্যেক শ্রেণি সমাজ-ই আমরা কিভাবে যৌনতাকে উপলব্ধি ও অনুভব করব তা নির্ধারণ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সমকামিতা পুরো মানব ইতিহাসে জুড়েই বিদ্যমান ছিল, তবে একে বিভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং কেবলমাত্র পুঁজিবাদের উত্থানের সাথেই, যে মোড অব প্রোডাকশনের ভাবাদর্শে ‘ব্যক্তি’ একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, “সমকামী ব্যক্তি” ধারণার উত্থান ঘটে। কারণ যৌনতা, মানব অভিজ্ঞতার সব দিকের  মতোই সামাজিকভাবে নির্মিত। যেমন জন ডি এমিলিও বলেছেন,

কিছু ঐতিহাসিক এই ধারণাটা প্রত্যাখ্যান করেছেন যে যৌনতা মূলত একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, একটি জন্মগত, অপরিবর্তনীয় “ড্রাইভ” যা সামাজিক সংগঠনের বিভিন্ন দিকের পরিবর্তন থেকে আলাদা। বেশ কয়েকজন লেখকের মতে, এরোটিসিজমকে (Eroticism) ব্যাখ্যার সময় সংস্কৃতির উপাদানগুলোকে আমলে নিতে হবে। মানুষ শিক্ষা লাভ করে সে যেভাবে নিজেকে সেক্সুয়ালি প্রকাশ করতে পারে এই সম্পর্কে এবং সেই শিক্ষার বিষয়বস্তু নারী ও পুরুষ যুগ যুগ ধরে যে সমাজগুলো গঠন করেছে তার মতোই বিচিত্র।

মিশেল ফুকো অনুসারীরা সাধারণত মানব প্রকৃতি ও সামাজিক বিনির্মাণ (Social Construction) এই দু’টি ধারণাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। কিন্তু জীবনের শেষ দিকে ফুকো মানব প্রকৃতির ধারণাটি বুঝতে চেষ্টা করেছিলেন, যা তিনি তাঁর দর্শনে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মনে করতেন না এই নতুন অন্তর্ভুক্তিকরণ তাঁর এই থিসিসকে অস্বীকার করে যে যৌনতা সামাজিকভাবে নির্মিত। বরং এই নতুন অন্তর্ভুক্তি যৌনতা সম্পর্কে তার চিন্তা ও দর্শনকে সম্পূর্ণ করে।

ফুকো, যার সাথে আমি ক্ষমতা এবং তার বেশীরভাগ কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যান্টি-হিউমানিজম সম্পর্কে একমত নই, পুঁজিবাদী সমাজে যৌনতা বোঝার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করেছেন। হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি বইয়ের প্রথম খন্ডে তিনি বুর্জোয়াদের অধীনে যৌনতার সুনির্দিষ্টতার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন, এই ধারণাগুলি কীভাবে প্রভাবশালী হয়েছিল তার ঐতিহাসিক বিবরণের মাধ্যমে। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন বুর্জোয়া শ্রেণী ব্লাড লাইন ও উত্তরাধিকার সূত্রে শাসন করতে পারে না। একারণেই তারা তাদের শ্রেণীর সুস্থ রিজেনারেশনের বা পুনুরুৎপাদনের ধারণা দ্বারা আচ্ছন হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ, প্রাথমিক পুঁজিবাদের  উদীয়মান বুর্জোয়ারা সেক্সকে “একটি রহস্যময় এবং অনির্ধারিত শক্তি” দান করেছিল; সেক্সকে তার ভবিষ্যত কল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করত; বুর্জোয়ারা তাদের আত্মাকে সেক্সের অধস্তন করে। বুর্জোয়া যৌনতার বিকাশের সাথে সেক্স নিয়ে অন্তহীন আলোচনা, তথাকথিত বিকৃতিগুলির প্যাথোলোজাইজিং এবং মনোচিকিৎসার ব্যাখ্যা জড়িত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো “চরম যৌন সম্পৃক্তি বর্ণনা করেছেন”। এবং ” পরিবার ছিল… যৌনতার দুর্ভাগ্য”। অন্তহীন আলোচনা  “হিস্টেরিয়াগ্রস্ত নারী”, “মালথুসিয়ান দম্পতি” এবং ‘পারভার্স অ্যাডাল্ট’-এর চিত্র অঙ্কন করেছে। শিশুর যৌনতাকে অপ্রাকৃতিক ও বিপদজনক মনে করা অনেক তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে।

প্রথমে তারা শোষিত শ্রমিক শ্রেণিকে নিয়ে খুব একটা চিন্তাভাবনা করেনি; তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বসবাস অযোগ্য পরিবেশে শ্রমিকদের দূর্বলীকরণ শ্রম ও শ্রমিক পুনরুত্পাদনকে হুমকির মুখে ফেলে, যা পুঁজিবাদী সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। এবং শ্রমিক শ্রেণি তাদের পুঁজিবাদী শাসকদের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে শুরু করে। সুতরাং সেক্স এবং যৌনতা বিষয়ক বুর্জোয়া ধারণাগুলি প্রয়োগ করা হয়েছিল “পুরো জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করার ক্রমবর্ধমানভাবে বিস্তৃত উপায় হিসেবে”। ফুকোর তর্কগুলো উনবিংশ শতকে শ্রমিক শ্রেণির পরিবার পুনর্গঠনের ব্যাপারে মার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যার অনুরূপ, যদিও ভিন্ন টার্মে প্রকাশ করা হয়। এবং ব্যক্তির জন্য এর পরিণতির ব্যাপারে ফুকোর বর্ণনা মার্ক্সবাদী  ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’-এর ধারণাকেই তুলে ধরে:

এই ইন্টারপ্লে থেকে বিকশিত হয়েছে … যৌনতা বিষয়ের একটি জ্ঞান; যে জ্ঞান তার রূপের যতটুকু নয়, তার চেয়ে বেশী যা তাকে বিভক্ত করে তার, সম্ভবত যা তাকে নির্ধারণ করে দেয়, তবে সর্বোপরি তাকে নিজের সম্পর্কে অজ্ঞ হতে বাধ্য করে তোলে।

কাজ যখন গোলামি, বেকার শ্রমিকরা নিজেদের মূল্যহীন এবং অবজ্ঞার শিকার মনে করে, তাদের জীবনশক্তি ক্ষয়ে যায় এবং তারা যন্ত্রণায় ভোগে। তবে যৌনতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। যৌনতাকে শারীরিক সম্পর্ক থেকে ভিন্নভাবেও অনুভব ও চর্চা করা সম্ভব। অন্যান্য সমস্ত বিষয়ের মতোই একটি পণ্যে পরিণত হওয়া সেক্স এবং আমাদের যৌনতা বেচাকেনা হয়, যা মানব প্রকৃতির এই দিকের বিচ্ছিন্নতাবোধকে তুলে ধরে। এটি আমাদের দেহকে একটি বস্তুতে পরিণত করে, যৌনতাকে অবজেক্টিফাই করা হয় এবং যৌন পরিতৃপ্তিকে মানব মিথস্ক্রিয়া থেকে আলাদা করে দেয়। বিয়ে ও পরিবারের সাথে সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নিয়মকানুন যা যৌন আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণে প্রণয়ন করা হয় তা যৌনতার উপর মানুষের নিয়ন্ত্রন আরো বাধাগ্রস্ত করে।

ফুকো সেক্স ও নির্যাতনকে কেন পরস্পর সম্পর্কিত সে সম্পর্কে জানান়: “What is peculiar to modern societies, in fact, is not that they consigned sex to a shadow existence, but that they dedicated themselves to speaking of it ad infinitum, while exploiting it as the secret.” And “The power which thus took charge of sexuality set about contacting bodies, caressing them with its eyes, intensifying areas, electrifying surfaces, dramatizing troubled moments… These attractions, these evasions, these circular incitements have traced around bodies and sexes…perpetual spirals of power and pleasure.”

বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয় যা প্রাতিষ্ঠানিক যৌন নিপীড়কদের জন্য একটা অজুহাত হিসেবে কাজ করে তাদের অধীনদের প্রতি নিপীড়নমূলক আচরণ করার ক্ষেত্রে। সমাজ যদিও প্রকাশ্যে এরকম আচরণের অনুমোদন দেয় না যা বেশিরভাগ যৌন কর্মকাণ্ডের উপর একটি গোপনীয়তার আবেষ্টন তৈরি করে এবং এভাবে ক্ষমতার চর্চাকে কামদ হিসেবে উপস্থাপন করে। আমি মনে করি ফুকোর অনুভবক্ষম মন্তব্য নির্দেশ করে কেন মানুষ মনে করে যৌন সহিংসতা প্রহার বা অন্য যেকোন ধরনের নিয়ন্ত্রন থেকে বেশি অপমানজনক:” যৌনতা হল সেই মাধ্যম যা দৃশ্যত আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই গোপন বিষয় যা আমাদের অস্তিত্বের মূলে রয়েছে”।

শিশু অবস্থায় বা কোনো সম্পর্কে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের যন্ত্রনা স্পষ্টতই দৃশ্যমান, যেমন দৃশ্যমান নিপীড়ন ও অত্যাচারের ক্ষেত্রে সেক্সুয়াল এবিউজের ভয়াবহতা; যদিও এটা এখনও  ওই পর্যায়ে পৌছায়নি যখন শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ হওয়ার আগে বিদ্যালয়ে ছেলেদের প্রায়শই মারাত্মক মারধরের শিকার হতে হতো বা পুরুষরা মাতাল হয়ে ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি করতো। ধর্ষণের ভয়ই জেলে (jail) পুরুষের চিন্তাকে ঘিরে রাখে- যা পুরুষের প্রতি ঘটতে পারে এমন বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বলে বিবেচিত হয়। এই মানসিকতা একইসাথে হোমোফোবিয়া ও নারীর সমস্থানে নেমে যাওয়ার ভয়কে ইঙ্গিত করে। সুতরাং যৌন নির্যাতন বা এমনকি এর হুমকিও অন্য যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিবিধানের চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে ক্ষমতাকে আরো কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়ার, ভুক্তভোগীর প্রতিরোধের ইচ্ছাকে ধ্বংস করে দেওয়ার বা কোন সম্পর্কে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রন জাহির করার জন্য।

ব্যক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা এবং আম্লাতন্ত্রের অমানবীকরণের প্রতি গতিশীলতা সত্ত্বেও, এটা মানবতার জন্য আশাবাদের বিষয় যে সবাই আইন ও শৃঙখলা রক্ষার নামে তাদের নিয়ন্ত্রনে থাকা মানুষদের নির্যাতন করছে না। এবং যারা কতৃত্বপূর্ণ পদে তারা প্রত্যেকেই হায়ারারকিকাল সমাজের রোবোটিক সৃষ্টি না। আমরা সামাজিক কাঠামোর কোন বস্তু না; আমাদের আত্মপ্রকাশক কাজ ও চিন্তার সক্ষমতা আছে। কোন কোন কতৃপক্ষ এখনো নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের নিপীড়ন থেকে রক্ষার ব্যাপারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে।

রাষ্ট্র ও যৌন সহিংসতা

নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের হেয় ও অবমাননা করা, ধীরে ধীরে ভয়ের সঞ্চারণ করা এবং কতৃত্ব স্থাপনের জন্য রাষ্ট্র খোলাখুলি এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যৌন সহিংসতার নানাবিধ ব্যবহার করে। যথার্থ কারণেই পুলিশ সেলে নারীদের ধর্ষণকে  ভয় করা হয়ে থাকে। এঞ্জেলা ডেভিস বলেন, “পৃথিবীব্যপী নারী কয়েদীদের স্ট্রিপ সার্চের সময় করা যৌন হয়রানিকে অজান্তেই একটি স্বাভাবিক দৃশ্য হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে।” সিস্টার ইনসাইড নামের অস্ট্রেলীয় নন প্রফিট অরগানাইজেশানের কর্মী এমেন্ডা জর্জ এবং ডেবি কিলরয় এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন:

বাধ্যতামূলক স্ট্রিপ সার্চিং নারী কয়েদিরা  বৈষম্যমূলকভাবে অনুভব করে। যেখানে নারী কয়েদীদের সাথে পূর্বে যৌন হয়রানি হয়ে থাকার ঘটনা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে স্ট্রিপ সার্চিং এর সময় নতুন করে তাদের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। কোন প্রমাণ নেই যে স্ট্রিপ সার্চিং প্রকৃতপক্ষেই নিষিদ্ধ পণ্য বা মাদকের বহনকে প্রতিরোধ করে, যা স্ট্রিপ সার্চিং-এর ‘প্রধান উদ্দেশ্য’। যেকোন স্ট্রিপ সার্চ নিঃসন্দেহে নারীর উপর রাষ্ট্রের অন্যায় নির্যাতন।

অত্যাচারের শাসনে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা হরহামেশাই ঘটে, তেমন  হরহামেশাই ঘটা অন্য একটি ঘটনা হলো নির্যাতিতদের পরিবারের প্রতি একই ধরনের সহিংসতার হুমকি। যৌনাঙ্গে স্পর্শ করা, বন্দুক এবং অন্যান্য অস্ত্রের ব্যবহার করে ধর্ষণ, তথা কথিত মলদ্বার দ্বারা খাদ্য প্রবেশ করানো (রেক্টাল ফিডিং) যা পায়ুপথ দিয়ে ধর্ষণ ব্যতীত কিছুই না- এসব কিছুই নথিভুক্ত হয়েছে। কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারে এমন অনেক দিক একসাথে দেখা গিয়েছে৷ ভয় সঞ্চার, অবমাননা এবং মনোবল ভাঙন পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমেরিকার পুরুষ সৈন্যরা তরুণ ছেলেদের তাদের মায়ের সামনে ধর্ষণ করে এবং নারী সৈন্যরা তার চিত্র ধারণ করে৷ যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও নাবালক মেয়েদের ধর্ষণ যুগ যুগ ধরে চলে আসছে – ১৯৬০ সালের দিকে আমেরিকা ভিয়েতনামে যা করেছিলো তা থেকে শুরু করে বসনিয়া হার্জেগোভেনিয়া যেখানে ধর্ষণ সংখ্যালঘু হত্যার (ethnic cleansing) অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, পেরু, রুয়ান্ডা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, সাইপ্রাস, হাইতি, লাইবেরিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা এবং কাশ্মিরেও যা প্রতিনিয়ত হচ্ছে ভারতের দ্বারা। জাতিসংঘ এবং মনস্তাত্বিকরা নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতাকে ‘সবচেয়ে আঘাতদায়ক অনধিকারপ্রবেশমূলক ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যা ‘একটি সম্প্রদায়ের কাঠামোকে এমনভাবে ক্ষয় করে যে কাজ খুব কম অস্ত্রের দ্বারাই সম্ভব।’

এইভাবেই রাষ্ট্র যৌন সহিংসতাকে কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি মাধ্যম হিসেবে বৈধতা দেয়, স্বাভাবিক করে তোলে এবং এমনকি এর প্রসার ঘটায়৷ উদাহরণস্বরূপ, নাওরুতে এক শরণার্থী বন্দীশালায় যখন আশ্রয়প্রার্থীদের উপর যৌন নিপীড়নের বিষয়টি প্রকাশিত হয় তখন ইমিগ্রেশন মন্ত্রী সামান্য সমালোচনা করেই তার দায়িত্ব শেষ করেন; একইভাবে সরকার অনুগতের মতো চার্চগুলোর উন্নয়ন করে যারা যৌন নিপীড়কদের আশ্রয় দেয়ার জন্য দায়ী; যে সরকারগুলো দরিদ্র এবং শোষিত শ্রেনীর বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে কঠোর শাস্তিমূলক মনোভাবের জন্য পরিচিত, তারাই আবার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে  ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনাগুলোর বিচার এড়িয়ে যায়; মূলকথা তারা যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করে এমন পরিষেবাগুলোর ভিত্তি দূর্বল করে দেয়। এইসব উদাহরণ এবং আরও বিস্তারিত বিষয়গুলো আমাদের এটাই ইঙ্গিত দেয় যে যৌন হয়রানি কোন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না যতক্ষণ না পর্যন্ত মুসলিম বা আদিবাসীদের মতো কোন নিপীড়িত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কারো দ্বারা যৌন নির্যাতন ঘটে।

যৌন নিপীড়ন ও নিপীড়িতরা

রাষ্ট্র-অনুমোদিত সহিংসতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেপে যাওয়া এবং জড়িতদের ক্ষমতাধর শ্রেণীর দ্বারা রক্ষা করা থেকে বোঝা যায় যে, নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর যৌন নির্যাতন ব্যতিক্রম বা যুক্তিহীন ব্যক্তিদের কোন কাজ নয়। অন্তর্নিহিত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো এমন ভাবাদর্শ দ্বারা সমর্থিত যা নিপীড়ন এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে বিভাজনকে ন্যায়সঙ্গত বলে তুলে ধরে যা এমন মনোভাবকে বাড়িয়ে দেয় এবং যৌন নির্যাতনকে প্ররোচিত করে।

অবজ্ঞা, নিয়ন্ত্রন আর নির্যাতনের মাধ্যম ধর্ষণ, যা বরাবর ই ছিল বর্ণবাদের পরিণতি। বিদ্যমান বর্ণবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য জাতিগতভাবে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীদের ধর্ষিত হওয়ার বা ধর্ষণ এর জন্য ভুলভাবে অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।  ধর্ষণ বর্ণবাদী নিপীড়ন এর যে কতটা অবিচ্ছেদ্য অংশ তা এঞ্জেলা ড্যাভিস তার ‘উইমেন, রেইস অ্যান্ড ক্লাস’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবেঃ “আধিপত্যের একটি অস্ত্র, দমন করার একটি অস্ত্র, যার গোপন উদ্দেশ্য ছিল দাস নারীদের প্রতিরোধ করার ইচ্ছাকে দমিয়ে ফেলা এবং এর ই মাধ্যমে তাদের পুরুষদের হতাশাগ্রস্থ করা।“ ড্যানিয়েল ম্যাকগুয়ারের আরও সাম্প্রতিক একটি বই সাদা বর্ণবাদীদের ভন্ডামিকে দেখায় যারা একদিকে নিয়মিত তাদের সাদা মহিলাদের রক্ষার নামে দক্ষিণে কালো পুরুষদের বিচারবহির্ভুতভাবে হত্যা করতো, অন্যদিকে আবার কালো মহিলাদের উপর যৌন নির্যাতন করতো। ম্যাকগুয়ারের বইয়ের বিষয়বস্তুর সাথে তার বইয়ের নামকরণ সার্থক: অ্যাট দি ডার্ক এন্ড অব দি স্ট্রিট।

১৯৬৫ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের ফ্রিডম রাইডারদের মাঝেও একইরকম বর্ণবাদী দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যায়। এমি ম্যাকোয়ারের মতে সাদা পুরুষদের নারীর প্রতি নির্যাতন কেন্দ্রিক একটি নৈতিকতার ভার চাপিয়ে দেয়া হচ্ছিলো গোটা জাতির ওপর যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল বর্ণবাদী NT Intervention এর বৈধতা অর্জন। এবং সমস্ত ছোটখাট কমিউনিটিকে তাদের স্বীয় ভূমি থেকে উৎখাত করা। আবার ভিন্ন এক দিকে, ২০০০ সালে সিডনিতে লেবানিজ পুরুষদের দ্বারা ঘটা গ্যাং-রেপের ব্যপারে অত্যাধিক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, যা  নিউ সাউথ ওয়েলসে মুস্লিম ও লেবানন বিরোধী মনোভাব সৃষ্টিতে বর্ণবাদী কার (Carr) লেবার সরকারের জন্য একটি অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। ডানপন্থী কলামিস্ট মিরান্ডা ডিভাইন এই ধর্ষণগুলোকে সাদাদের বিরুদ্ধে হেইট ক্রাইম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যারা আদিবাসীদের সেই গুম হয়ে যাওয়া প্রজন্মের ব্যাপারে জানেন তারা নিশ্চয়ই এও জানেন যে সেই গুম হয়ে যাওয়া মেয়েদের পাঠানো হতো মধ্যবিত্ত সেটলারদের ঘরে। যেখানে তারা হতো নির্যাতিত। কিন্তু এখন এ ব্যাপারটি মোটেও অজানা নয় যে শুধু মেয়েরাই নয়, ছেলেরাও সেই পাশবিকতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

নিগ্রো পুরুষদের অনিয়ন্ত্রিত যৌন আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কিত বর্ণবাদী আখ্যান ও স্ট্রেঞ্জার ডেঞ্জার সম্পর্কিত ভয়-এর সাথে স্কুল, মিডিয়া ও পপ কালচারে প্রচারিত পুরুষত্ব সম্পর্কিত স্টেরিওটাইপের একটা বিকৃত মিল আছে। অন্তরীন হোমোফোবিয়া ও একই সাথে সম সেক্স আকর্ষণের কারণে একজন পুরুষ (পুরুষ) সমকামীদের ধর্ষণ করতে পারে যা একদিকে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে, আবার অন্যদিকে স্বাভাবিক ‘পুরুষত্ব’ বজায় রাখবে। এই বিচ্ছিন্নপথে ধর্ষক প্রমাণ করে সে ‘স্বাভাবিক’। কিছু পুরুষ ধর্ষণকে বিবেচনা করা যায় অপমান হিসেবে, ধর্ষণের মাধ্যমে পুরুষকে নারীর স্থানে নিয়ে আসতে।

সেগেল যেমন লিখেছেন, “পুরুষত্ব নিশ্চিত করার জন্য অন্যের দেহ ‘বেধ করা’ বা যে কোনও উপায়েই সক্রিয় যৌন পরিতোষ এবং অন্যদের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা”  আমাদের সংস্কৃতিতে গভীরভাবে জড়িত। দুর্বল শিশুদের উপর ক্ষমতাবান পুরোহিত হোক বা তরুণদের প্রতি আকাঙ্ক্ষিত শিক্ষক হোক, পুরুষদের দ্বারা যৌন নির্যাতন প্রচলিত পুরুষত্বের সাথে জড়িত যা অনুসরনে শিশুদের উত্সাহিত করা হয়। যৌন নিপীড়নের বিভিন্ন ধরনকে বুঝতে হলে পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতে নারী ও পুরুষ সম্পর্কিত বিভিন্ন স্টেরিওটাইপ উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের কাঠামো লিঙ্গ-ভিত্তিক গতানুগতিক ধারণাগুলোকে সমর্থন করে, তাই নারীদের লোলুপদৃষ্টির শিকার হওয়া থেকে শুরু করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শোনা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, অচেনা মানুষ দ্বারা অনুসরিত হওয়া, অযাচিত যৌন-বিষয়ক অনুরোধ পাওয়া ইত্যাদি বহু ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়।

পরিবার থেকে উদ্ভূত গতানুগতিক ধারণাগুলির কারণে এলজিবিটিআই পরিচিতি বড়জোর “সহ্য করার যোগ্য” হয় বা অবহেলিত হয়, উভয়ক্ষেত্রই এটা নির্দেশ করে যে এই পরিচিতি একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই পরিচিতিকে ধর্মীয় অনুশাসন হেয় করে এবং অবৈধ ঘোষণা করে, যার উদাহরণ পাওয়া যায় সামাজিক অনুষ্ঠানে সমকামী মানুষের উপস্থিতির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যে। ২০১৫ সালে মানবাধিকার কমিশনের একটি তদন্ত প্রকাশ করে যে সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করা এলজিবিটিআই সদস্যদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি সদস্য সহিংসতা, হয়রানি বা অপমানসূচক আচরণের শিকার হয়েছে তাদের ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে।

সমাজে যতোই প্রোথিত হোক না কেন যৌনতা এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পরিবার কাঠামো যুগের পরিবর্তনের সাথে বদলানো সম্ভব হয়েছে। যা নিয়ে নারীবাদিতা আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী এবং বিশ্লেষকরা লড়ে গেছেন, তা হল পরিবারকে যৌনতার নতুন সাংঘর্ষিক পুনপ্রকাশের ফলে সৃষ্ট একরাশ বিভ্রান্তির সাগর থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় এর নতুন সংজ্ঞায়ন । সিঙ্গেল প্যারেন্ট কিংবা সমকামী পিতামাতা – কারোরই শ্রম বা উৎপাদনশীলতা নিয়ে পুঁজিবাদী শ্রেণি কিংবা রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই যতক্ষণ পর্যন্ত সে শ্রম বেসরকারিভাবে

স্বল্পমূল্যে অথবা প্রায় বিনামূল্যে আদায় করা যায়। এই পুঁজিবাদী সিস্টেম যা যৌনতা বিষয়ে নিয়মিত দমনশীল মনোভাব প্রদর্শন সত্ত্বেও কিছু উপরিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সত্তরের দশকের নারী মুক্তি ও যৌন স্বাধীনতা অর্জনের প্রেরণা নিজের মধ্যে আত্মীয়করণ করতে সক্ষম হয়েছে। আর এত পরিবর্তন সত্ত্বেও আমাদের ভাবাদর্শের ভিত্তি এখনো যে পুরোনো গতানুগতিকতা তা বোঝার জন্য কেবল সমকামি বিবাহের বিরুদ্ধে তোলা বর্তমান যুক্তিগুলোর দিকে তাকানোই যথেষ্ট।

নারী সম্পর্কে গতানুগতিক মতামতেরও পরিবর্তন হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগেও একজন আদর্শ গৃহিনী ও মা -এর স্টেরিওটাইপ্স নারীর জন্য ছিল বোঝা; বৈবাহিক ধর্ষণ একটি অপরাধ বলে বিবেচিত হতো না। ১৯৯২ সালে করা বৈবাহিক ধর্ষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা অনুযায়ী, অধিকাংশ নারীর জন্যই স্বামীর সাথে করা অনিচ্ছুক সহবাসকে ধর্ষণ বলা কঠিন। বর্তমানে আমরা বাস করি এমন আধা-পর্ণোগ্রাফিক একটা সমাজে যেখানে নারীদের অসংখ্য উপায়ে অব্জেক্টিফাই করা হয়। সেক্স থেকে শুরু করে পেডোফিলিয়া, সবকিছুই এখন সবার জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত।

পুঁজিবাদী সমাজে সেক্সুয়াল ‘ফ্রিডম’ বলতে বোঝায় একটা মাল্টি বিলিয়ন ডলার সেক্স ইন্ডাস্ট্রি। তরুণরা বড় হয় এসব পর্ণ ছবিকে সেক্স সম্পর্কে জানার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম মনে করে। কারণ যখন সমাজ সবসময় এটা নিয়ে কথা বলে, এবং পপ কালচার প্রকাশ্যে এটা নিয়ে কাজ করে, এমনকি সেক্সিস্ট এবং অপমানজনক উপায়ে, তবুও স্কুলগুলোতে খুব অল্প যৌন শিক্ষা বা যৌনতা নিয়ে মুক্ত  আলোচনার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান কালের নোংরা সংস্কৃতিতে সেক্সের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত পণ্যায়ন নারীদের যৌন পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে, যা এখন পঞ্চাশের দশকের চেয়েও বেশী দৃশ্যমান।  সিনেমাতে এমন সেক্স সিন বা সহবাসের দৃশ্য খুব কম-ই আছে যেখানে নারীর বাসনাই কেন্দ্রিয়। নারীদের এমনভাবে দেখানো হয় যেন তারা যৌনকর্মে নয় বরং পুরুষের ইচ্ছা পূরণ করে আনন্দিত, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের অধীনস্থতা প্রকাশ করে। একজন ব্রিটিশ মার্ক্সবাদী লিখেছেন:

বিষয়টি ভয়ঙ্করভাবে হাস্যকর যে নব্য নারীবাদ নিয়ে প্রকাশিত নতুন দুটি বই ( ফুল ফ্রন্টাল ফেমিনিজম ও দি নিউ সেক্সিজম) নারীদের উলঙ্গ দেহ প্রকাশ করেছে তাদের কভারে। যদিও লেখকদের কভার ডিজাইনে হাত নেই তবুও বোঝা যায় যে নারীদের প্রতি হীনকর আচরণ নিয়ে প্রকাশিত বইয়েওও বিক্রি নিশ্চিতকরণের জন্য নারীর দেহ থাকা প্রয়োজনীয়।

নারীবাদী ডবরাহ টোলমান এবং আনাস্তাসিয়া পাওয়েল তরুণদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা, রাসেল এর বিবাহিত নারীদের উপর চালানো সমীক্ষা, এবং ১৯৯২ সালের আমার যুক্তি-তর্ক এর উপর ভিত্তি করে খুব স্প্টভাবে নিশ্চিত করেছিল যে ধর্ষণকে এখনো অনেকে মোহাচ্ছন্ন হওয়া বলেই মনে করে।এমনকি পুরুষ যদি শিকার ও করে নেয় যে সে মেয়েটির উপর জবরদস্তি করেছিল,তখনো ও অনেকেই এটিকে ধর্ষণ বলতে নারাজ। পাওয়েল এর ভাষ্যমতে- পর্নো তারকাদের এখন স্বাধীন ও ক্ষমতায়িত নারীদের প্রতিচ্ছবি বানানো হচ্ছে।

যুবতী নারীদের এখন উৎসাহিত, এমনকি তাদের কাছ থেকে এটা আশা করা হয় যে তারা তাদের আচার আচরণে ও পোশাক পরিচ্ছদের মাধ্যমে বহির্মুখী ও সক্রিয় যৌনতা প্রকাশ করবে। কিন্তু এরই মধ্যে এক অতি সূক্ষ্ম মাপকাঠি দ্বারা তাদের চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করা হয়। বেশি হয়ে গেলে ‘ নোংরা মেয়ে ‘ আর কম হয়ে গেলে অথবা নিজেদের এই নতুন পাওয়া তথাকথিত ‘ যৌন স্বাধীনতা ‘ কে আপন করে না নিলে রক্ষণশীল অপবাদ শুনতে হয়।

পাওয়েল ও টোলমান দুজনের মতেই এখনকার নারীরা মনে করে তারা যদি কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারে, এর অর্থ তারা কোনো ভাবে ব্যার্থ হয়েছে। এই ভাবনা তাদের মনের মধ্যে চাপ, জবরদস্তি ও ধর্ষণ এর মধ্যের পার্থক্যকে ঘোলাটে করে ফেলে, কারণ তাদের স্বভাবতই মনে হয় যদি তারা পুরুষের পছন্দ মতো কিছু না করে তাহলে পুরুষরা তাদেরকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। এই ভাবনা শুধু তরুণ আর হেটেরোসেক্সুয়ালদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। সব বয়সের লোকেরাই একটা সুস্থ,স্বাভাবিক সম্পর্ক চায়, এই পাশবিক জগতে একখন্ড শান্তি চায়। এবং যদি তা না পায় তবে তারা মনে করে যে তারা ব্যার্থ হয়েছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে এর দিন হাস্যরত তরুণ- তরুণী  কিংবা সমকামী যুগলদের ছবি, তাদের মধ্যেকার কলহের বিবৃতি অনেকখানিই প্রকাশ করে দেয়।

পাওয়েল আরো বলেছেন: “এই উত্তর- নারীবাদী কন্টেক্সটে অ্যান্টি-চয়েস, অ্যান্টি-সেক্স আখ্যায়িত হওয়া ছাড়া যৌন রীতিনীতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে সমালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে (এমনকি যেগুলো সম্মতি এবং যৌন সহিংসতা সম্পর্কিত) এবং এই ধরনের যৌক্তিক সমালোচনাকারীকেও এমনভাবে দেখা হয় যেন তারা যৌন-স্বাধীনতাকেই অগ্রাহ্য করছে যা অর্জনের জন্য নারীবাদ লড়াই করে।”

কিন্তু এটা শুধু যৌনতা সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা এবং একটি স্থায়ী সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা থেকেই সৃষ্টি নয়, আরো অনেক বিষয় জড়িত। কাজের গোলামি, দীর্ঘ কর্মঘন্টা, কম বেতন, ব্যবস্থাপকদের দ্বারা অপদস্থ হওয়া, নিজের জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ  না থাকার অনুভূতি, অনাকাঙ্ক্ষিত ছাটাই, বেতন কেটে নেয়া বা কাজের বেগ বাড়িয়ে দেয়া। অন্যদিকে, আমাদের প্রত্যাশা যে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো একমাত্র জায়গা যার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কিন্তু এই বিশ্বাস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভ্রম। জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় দ্যা চকোলেট বক্স ইমেজ, স্থিতিশীলতার স্বপ্ন এবং (সাধারণত হেট্রোসেক্সুয়াল) ভালবাসা উপলব্ধি করা অত্যন্ত কষ্টকর বেশিরভাগ দম্পতিদের। এটি সমস্ত সম্পর্কগুলোকে ব্যর্থ আশার সম্ভাব্য বিপজ্জনক ঘরে পরিণত করে। কোথায় গিয়ে একজন নিরাশা এবং বিরক্তি প্রকাশ করতে পারে যা বৃহৎভাবে সমাজের দ্বারা সৃষ্ট? -প্রিয় মানুষদের ওপর যাদের সে জানে যে ইচ্ছে করলেও চলে যাবেনা বা যেতে পারবে না। মানুষ অনেক কিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিবে ঐ স্বপ্নপূরণের আশাটি বাঁচিয়ে রাখতে। যেকোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা বা দুর্বলতা – যেমন কর্মক্ষেত্রে নিজের যৌনতা গোপন রাখা বা রূপান্তরলিঙ্গের কেউ, অক্ষমতায় ভোগা বা কোনো অসুস্থতা, বাসস্থানের অভাব, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব – এসব আরো কঠিন করে ফেলে একজনের স্বাতন্ত্র্য জাহির করাকে। অন্যদিকে, একজন সঙ্গী হয়ত জীবনের এই অংশটির স্থিতিশীলতা বোধকে দুর্বল ভেবে আরেকটি সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে, পরবর্তীতে নিজের নিয়ন্ত্রণ রক্ষার করার ক্ষিপ্র প্রয়াস চালাবে এবং শেষমেশ স্টকিং ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণসুলভ আচরণের আশ্রয় নিবে।

আর বিভিন্ন কারণে সম্পর্কের এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ সীমা অতিক্রম করে নির্যাতন কিংবা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। যে কোন ধরনের নির্যাতনই সম্পর্ককে একটি নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসমর্পণের চক্রের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় যেটি ভেঙে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন। এবং যেমনটা লিলিয়ান রুবিন বলেন, জনসম্মুখে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো ততটা সহজ না যতটা না পরিবার কিংবা সম্পর্কের গোপনীয়তার সুযোগ নিয়ে ঘটানো যায়।

শিশুদের কথা ধরা যাক – তাদের কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। তারা মূলত বাবা মায়ের অধীনস্ত থাকে এবং নিজেদের জীবন সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগই তাদের নেই। যদি রাষ্ট্রের মনে হয় শিশুর অভিভাবক অযোগ্য, তবে নিজের অনিচ্ছা থাকলেও তাদেরকে রাষ্ট্র আলাদা করে ফেলতে পারবে, এবং “কেয়ার” হাউজে রাখতে পারবে প্যারাডক্সিকালি যেখানে নির্যাতন হলো সর্দি-কাশির মতো স্বাভাবিক। পরিবারে, যেসব টানাপোড়েনের কথা বললাম, সেসবে শিশুরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল, তা বাবার সামনেই হোক কিংবা মা। বড়রা কেন ছোটদের উপর চড়াও হবে না? তারা তাদের পিতামাতার ‘সম্পত্তি’, বাবা মা সন্তান জন্ম দেন গর্ব করার জন্য, দায়িত্ব হিসাবে না। নিয়ন্ত্রণ, আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশার উদ্গীরণের জন্য কোন দুর্বল ব্যক্তির অস্তিত্ব – এই তিনটি বিষয়ের সমাবেশ নির্যাতনের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। Australian Institute of Criminology এর ২০১৫ সালের এক রিপোর্টে দেখা যায়, পরিবারের কারো দ্বারা ঘটা ১০৮৮টি হত্যাকান্ডের মধ্যে ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে কোন শিশুর মৃত্যু হয়েছে যেখানে খুনী হিসাবে বাবার চেয়ে মায়েরা সংখ্যা বেশী। শিশুদের স্বাধীনতাহীনতার পাশাপাশি তাদের অনভিজ্ঞতা এবং শক্তিতে পার্থক্য নিজের বাসা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান উভয় স্থানেই তাদেরকে অরক্ষিত করে তোলে । যৌনতার প্রতি সংকীর্ণ মনোভাব, বাচ্চাদের যৌনতা সম্পর্কে ভয় এবং শ্রদ্ধার বাহ্যাবরণ বজায় রাখার আবেশ নিশ্চিত করে যে  শিশুরা নির্যাতন বিষয়ে যদি রিপোর্টও করে তবে তাদেরকে বিশ্বাস করার সম্ভাবনা খুব কম থাকে এবং তাদের বিপদ থেকে অপসারণের জন্য আরো কম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

যদিও বেশিরভাগ যৌন নির্যাতন পুরুষরাই  করে থাকে, তবুও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে নারীরাও অন্য কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুদের উপর নির্যাতন করে থাকে। পরকীয়া, পর্নোগ্রাফি, পতিতাবৃত্তি, আপত্তিকর দেহভঙ্গি অর্থাৎ যৌনতাকে ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে মুল্যায়ণ করার করার মতো আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটই মুলত এর জন্য দায়ি। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গুলো নিয়ন্ত্রণে থাকা নারীরাও ঠিক পুরুষদের মতোই তথাকিত দুর্বলদের উপর অমানবিক নির্যাতনের কারণ হয়ে ওঠে। সমাজে পুরুষদের ঊর্ধ দৃষ্টিতে দেখা হয়l সামাজিকভাবে নারীরা নিজেদের ‘জন্মগত’ অধিকার নিয়ে জন্মায় না তবে বর্তমান সংশোধিত পরিস্থিতিতে তারা কিছুটা হলেও অপরের প্রতি কর্তৃত্ত ফলানোর সুযোগ পায়। যৌন নির্যাতন বলতে আমরা যা বুঝি তার মতো না হলেও নারীরাও মাঝে মাঝে যৌন নির্যাতনকে নানাভাবে গতিময় করে রাখে l পুঁজিবাদী সমাজের পরিবাররে যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের আদর্শ পরিবারের ভাবাদর্শ থেকে একেবারে আলাদা, সার্বভৌমত্বহীন নারীরা শিশু এমনকি নিজের সঙ্গীর উপর তাদের হতাশা ঝাড়তে পারে। লিঙ্গ সম্পর্কিত স্টেরিওটাইপ এটা নিশ্চিত করতে চায় যে নির্যাতন শুধুই নারীর প্রতি সহিংসতা (পুরুষ কতৃক)। কিন্তু এটা কোনভাবে যৌন সহিংসতার একমাত্র ধরণ না। সব পুরুষ-ই কতৃত্বপরায়ন, আগ্রাসী ও অতি-আত্মবিশ্বাসী না, যা প্রচলিত ভাবাদর্শ তাদেরকে হতে বলে; আবার সব নারী-ই নিষ্ক্রিয় না। যদি তা-ই হতো, তাহলে এটা ধরে নেয়া হয় যে, ব্যক্তি মানুষ কেবল ভাবাদর্শ বা Ideology দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়।

কি করতে হবে

পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং শিশু ও অন্যান্য পোষ্যদের উপর নির্যাতনের অনুসন্ধান বিষয়ে গণমাধ্যমের অব্যহত প্রচারণার মধ্যে সমাজতন্ত্রীরা যেন নিজের কর্মপন্থা নির্ধারণে শুধু পপুলিস্ট ধারণাগুলোর পেছনে না ছোটেন এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দৃশ্যত যৌন সহিংসতা বন্ধে যেকোন সরকারি পদক্ষেপের দাবি আইনশৃঙ্খলার আলোচনাকে উস্কে দেয়। ভিক্টোরিয়ান লেবার সরকার ২০১৫ সালে গড়ে ওঠা পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক রয়্যাল কমিশনের কাছে জমা দেয়া প্রস্তাবনায় শুধু সহিংসতার সাথে যুক্ত অপরাধীদেরকেই শাস্তি দেয়ার জন্য নতুন আইন প্রণয়নের মত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব দেয়। বিরোধীদলীয় কোয়ালিশনও খুব স্বাভাবিকভাবেই ন্যূনতম বাধ্যতামূলক বিচারের প্রস্তাব রাখে। কিন্তু দু’টো প্রস্তাবনার কোনটিতেই দলগুলো সহিংসতা কমিয়ে আনার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেবে তার ব্যাখা ছিল না। কোন পক্ষই সহিংসতা থেকে মুক্ত হতে চাওয়া নির্যাতিতদের জন্য কোন আবাসনের ব্যবস্থা কিংবা বেঁচে থাকার জন্য কোন বিশেষ ভাতার কথাও উল্লেখ করেনি।

জনসমাগমস্থলে বেশি বেশি সিসিটিভি, জামিনের সুযোগ কমানো, কারাদণ্ডের সময় বাড়ানো, কারাগারের ভিতরে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া,  – এগুলোই ছিল পুলিশ, গণমাধ্যমও, রাজনীতিবিদ এবং অধিকাংশ সমাজকর্মীর দেয়া “সমাধান”। কিন্তু যৌন সহিংসতা কমানোর ব্যাপারে এগুলো কখনই কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। একের পর এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কোন সহিংসতা ঘটার পরেই শুধু কারাদণ্ড দেয়া যায় যা অপরাধীর অপরাধ প্রবণতা কমাতে কোন ভূমিকা রাখে না, বরং কারাগারে যতবেশি সময় পার করে ততই সে আগ্রাসী হয়ে ওঠে। যখন মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকার সবক্ষেত্রেই হুমকির মুখে আছে, তখন এই পদক্ষেপগুলো শুধু সবার নাগরিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করার সম্ভাবনা বাড়াবে। ভিক্টোরিয়াতে, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে মেলবোর্নের শহরতলী এলাকায় জিল মেঘারের ধর্ষণ ও হত্যার পর, সমাজকর্মীদের চাপে সাজা স্থগিতের বিধান বাতিল করা হয় আদালতগুলোতে। জেসুইট সোশ্যাল সার্ভিসের প্রধান নির্বাহী জুলি এডওয়ার্ড বলেন, “অপেক্ষাকৃত ছোট অপরাধীদেরের জন্য সাজা স্থগিতের বিধান বাতিল করা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকাগুলোর জন্য সুফল বয়ে আনবে না।”

নারীবাদী ও ক্রিমিনোলোজিস্টদের দ্বারা অসংখ্য লেখনী সৃষ্টি হয়েছে, যেগুলো নারীদের প্রতি সহিংসতাকে ফোকাস করা রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর সমস্যামূলক দিকগুলো তুলে ধরে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে এসব প্রচার প্রচারণা চলছে যার পরিণতি বহুবছর আগেই দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক নারীবাদী বলেছেন সামাজিক কাঠামো নিরপেক্ষ নারীর প্রতি সহিংসতাকে কেন্দ্র করে চলা আন্দোলনের ফলে নারী আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে এবং নারীদেরকে চিরস্থায়ী ভিক্টিম হিসেবে প্রোমোট করা হচ্ছে।এই বিষয়টিকে এখন গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করা জরুরি শুধু  তাদের সেই দাবিসমূহের  জন্যই না পাশাপাশি সেইসব প্রচার প্রচারণাগুলোর জন্য যা নিওলিবারেলিজম বা শোষণ মূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকশিত হওয়ার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এজেন্ডাকে প্রাণ দেয়।

২০০৯ সালে গ্রুবার সমস্যাটিকে এভাবে শনাক্ত করেন ঃ “[বেশ কয়েক বছর ধরে] নারীবাদ অপরাধ দমন ও যারা নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের বিচারের সাথে ক্রমশ চিহ্নিত হয়েছে”। কিছু নারীবাদী স্কলার “দণ্ডমূলক, প্রতিশোধ-পরায়ন এজেন্ডা” -র সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। তিনি উপসংহারে পৌছেছেন যে নারীবাদীদের উচিত যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এই আম্লাতান্ত্রিক সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অক্ষম ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে ফেলা।

লেখক ক্রিস্টিন বিউমিলার তার In an Abusive State: How Neoliberalism Appropriated the Feminist Movement Against Sexual Violence বইয়ে তুলে ধরেছেন,

“সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিবেশ যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রতি রাষ্ট্রের দমনমূলক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি অসাধারণ বিকাশ ঘটেছে যার সাথে মামলা-সংক্রান্ত ক্ষমতা, বাধ্যতামূলক শাস্তিসমূহ এবং কারাবাসীর সংখ্যায় অভূতপূর্ব  বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। একই সময়ে, যৌন সহিংসতা “থেরাপিউয়েটিক স্টেট” এর এজেন্ডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যা পেশাদার, সমাজকর্মী এবং সরকারি প্রতিনিধিদের সহায়তায় দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের পরিষেবা সরবরাহকারী সরকারী একটি নেটওয়ার্ক। কল্যাণরাষ্ট্রের এই ক্লায়েন্টরা প্রধানত নারী এবং তাদের শিশু…ফলস্বরূপ, নারীবাদী আন্দোলন একটি অপরাধপ্রবণ সমাজের অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধিতে অংশীদার হয়ে উঠেসে, যা শুধু সংখ্যালঘু এবং অভিবাসী পুরুষদের জন্যই নয়, যেসব নারী কল্যাণরাষ্ট্রের তদন্তের অধীনে তাদের জন্যও নেতিবাচক।

তিনি দেখিয়েছেন যে কেবলই কঠোর সাজা এবং উচ্চতর কারারোধের হারের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না, এই পদক্ষেপের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত পন্থা – আরো পারিবারিক সহিংসতা আশ্রয়স্থল,ক্ষতিগ্রস্তদের পরিষেবা এবং ধর্ষণ সংকট কেন্দ্রও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এটি আরেকটি পথ তৈরি করেছে যা দ্বারা পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের অধিকার ক্ষুন্ন  হয়। যেসব নারী আশ্রয় কেন্দ্র যান তাদের থেকে এটা প্রত্যাশা করা হয় যে নির্যাতনকরীর বিরুদ্ধে তারা আইনি পদক্ষেপ নিবেন। অশ্রয়াস্থানগুলো ওইসব নারীদের ক্রমশ প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না যারা নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধ আইনি পদক্ষেপ নেয় না কারণ এইসকল নারীদের জন্য (যারা আইনী পদক্ষেপ নেয় না) কোন সরকারি বরাদ্দ নেই।

রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে পরিষেবা বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করা (প্রায়ই তহবিলের সংকোচনের মাধ্যমে) হল আরো একটি উপায় যা দ্বারা নারী এবং পুরুষরাও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের শিকার হতে পারেন।সম্প্রতি নিউ সাউথ ওয়েলসে পাশ হওয়া একটি আইন এখন পুলিশকে ঐসকল নারীর তথ্য সংগ্রহের প্রবেশাধিকার দিয়ে থাকে যারা এই ধরনের সহায়তা সেবা ভোগ করে থাকেন। শুধু তাদের তথ্যেরই নয়, তাদের পুরুষ সঙ্গীর যাবতীয় সকল ধরনের তথ্য, মাদকদ্রব্য সেবনের অভ্যাস আছে কিনা এবং আরো ব্যক্তিগত তথ্যেও তাদের প্রবেশাধিকার থাকে। আর এক্ষেত্রে সেই নারী বা পুরুষের অনুমতিরও পরোয়া করা হয় না। যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দোহাই দিয়ে ব্যক্তির অধিকারের ওপর এরকম অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে কোনোভাবেই সে সহিংসতাকে আটকানোর উদ্দেশ্য পূরণ করেনা। বরং এটা রাষ্ট্রকে বা সরকারকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনে নেতিবাচকভাবে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতে সাহায্য করে। আর এর পাশাপাশি এতে করে এটাও স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় যে আসলে নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণকে সরাসরি থামাতে পারে এমন কোনো দাবি তুলে ধরা কঠিন যেটা ত্রুটিহীন বা সমস্যাহীন। বামিলার যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন-

রাষ্ট্রের সাথে নারীবাদী ঐক্য এড়িয়ে যাওয়া অনেকাংশে সম্ভব নয়। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের ক্ষেত্রে এমন কোনো নীতিনির্ধারণ কল্পনা করা কঠিন যেটা রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে না। স্পষ্টত এমন অনেক চরম ক্ষতি হওয়ার উদাহরণ রয়েছে যেখানে সমাজের স্বার্থে সমাজকে রক্ষা করার জন্য সহিংসকারীকে সমাজ থেকে পৃথক করার প্রয়োজন ছিল। তবুও যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশেরও জাতীয় প্রেক্ষাপটে নারীদের স্বার্থকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা উভয় নিয়েই সচেতন থাকতে হয়। নব্য উদারপন্থী রাজনীতির বিকাশ এক্ষেত্রে আরো সংশয় প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে যেহেতু নারীবাদীরা তাদের নতুন উদ্ভাবন বা পদক্ষেপগুলোকে নিয়ন্ত্রক এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে দেখছে।

তিনি যে উপসংহারে পৌছেছেন তা হল নারী নির্যাতন প্রতিরোধকে নীতি প্রণয়নের জন্য আলাদা বিষয় রূপে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই কারন এ বিষয়টিকে নারীদের কার্যকারী নাগরিক হিসেবে সক্ষম করার অংশরূপে দেখলে অধিক সুবিধা পাওয়া যায়। অন্য কথায় নারীরা যে কাঠামোগত নিপীড়নের শিকার হয় তা প্রতিরোধই যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়।

২০১২ সালে জিল মিঘারের মৃত্যুতে সৃষ্ট আতঙ্ক তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। যার বিষয় ছিল যে, বামপন্থীদের কি পুলিশ কর্মকর্তা(দের), উদারপন্থী নেতা ও মেলবোর্নের মেয়র রবার্ট ডয়েলের নেতৃত্বে পদযাত্রায় যোগদান করা উচিত নাকি, যে সময় আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য আহ্বান আসছিল। ডয়েল, লিবারেল পার্টির সাবেক নেতা, সপ্তাহ আগে ‘ওকুপাই মেলবোর্ন’ আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারীদের জোরপূর্বক ও লাঠিসোঁটার মাধ্যমে সিটি স্কয়ার হতে সরিয়ে দেয়ার আদেশ দেন। জনগনের সামনে নিজের ভাবমূর্তি ভালো করতে তিনি পাতি উদারপন্থীদের সাথে এই যাত্রাপালায় যোগ দেন যার উৎস ছিল উপরোক্ত ঘটনার ফলে জন্মানো ভয়। ভিক্টোরিয়া ইভানোভা ১৮ মাস পরে বুঝতে পারেন যে এ কর্মসূচির ফল ঠিক তাই হয়েছিল যা এর বিরোধীরা পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং এটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে নিম্নে:

ভিক্টোরিয়ায় হয়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে জেলবন্দি সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেড়ে যায়- যা দেশে সর্বোচ্চ। এবিসি নিউজ সাংবাদিক শন রুবিনযটেইন ডানলোপ বলেন “ভিক্টোরিয়ান সরকারের নীতি পরিবর্তনের উৎস ২০১২ সালে জিল মিগারের নির্দয় হত্যা সময় তৈরি পাব্লিক প্রতিরোধ, যার ফলস্বরূপ প্যারোল, দন্ডাদেশ ও জামিন সম্পর্কিত আইন  কঠিন হয়।”

লুইস ও’শিয়া তখন এই মন্তব্য করেছিলেন  যে, “ব্যক্তিবিশেষে অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ে যে নৈতিক উদ্বেগ, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ নারী ও শিশুদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার যে প্রয়োজনীয়তা, তা প্রায় সর্বদাই প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা হতে উদ্ভুত এবং তা নাগরিক অধিকারের ওপর আক্রমণকে বৈধতা দেয়।” দুর্ভাগ্যবশত,   তার মন্তব্য প্রমাণিত হয়েছে। হাস্যকর কিন্তু করুণভাবে নারীরা, বিশেষ করে আদিবাসী নারীরা- এখন অস্ট্রেলিয়ায় সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল কয়েদি গোষ্ঠী। কিন্তু তৎকালীন সময়ে তার অবস্থান তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিলো, বিশেষ করে বামপন্থীদের মাঝে। কেউ কেউ বলেছিলো ফলাফল নিজেদের আয়ত্তে রাখার জন্যে বামপন্থীদের উচিত এমন সব ইভেন্টে যোগ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে বামপন্থীরা সমাজে এতই নগণ্য ও কর্তৃত্বহীন যে তাদের পক্ষে এত বৃহৎ একটি ঘটনায় প্রভাব বিস্তার করা প্রায় অসম্ভব যা শাসক শ্রেণি ও মধ্যবিত্তদের দ্বারা পরিচালিত হয়। যদিও বা বামপন্থীদের জনগনের মাঝে প্রভাব থাকে, তবুও রাষ্ট্র বা সিভিল সোসাইটি কর্তৃক তৈরি করা প্রোগ্রামে প্রভাব ফেলতে বা নিজেদের এজেন্ডাকে জয়যুক্ত করতে দরকার হবে প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারী নয়  প্রতিপক্ষ হিসেবে বিশাল জনসমর্থন ও সংহতি।

ক্ষুদ্র পরিসরে বলা যায়, ২০০৫ সালের ক্রনুলা দাঙ্গার সময়ে লেবার প্রধানমন্ত্রী বব কারের বর্ণবিদ্বেষমূলক “লেবানিজ পুরুষেরা শ্বেতাঙ্গ নারীদের সতীত্বের প্রতি হুমকিস্বরুপ” এরূপ বক্তব্যে অনেক বামপন্থীই দিশেহারা হয়ে পড়ে। এক সপ্তাহ পরে বর্ণবাদ বিরোধী এক মিছিলে যারা যোগ দেয় তারা এই বিষয়ে জোর দেয় যে প্রতিপক্ষের বর্ণবাদের কারণে যে দাঙ্গা হয়েছে তার  বিপক্ষে শুধু একটি সাধারণ বিবৃতি দেয়ার বদলে আমাদের লেবানিজ পুরুষদের সেক্সিজমের ব্যাপারটাকেও মেনে নিতে হবে।

এর কোন সহজ সমাধান নেই কিন্তু সমাজতন্ত্রীদের বাস্তবতা দিয়েই শুরু করতে হবে হবে এবং যাদের অব্যাবস্থাপনার কারণে যৌন নিপীড়ণের ঘটনা বৃদ্ধি পায় সেসকল  ক্ষমতাশীলদের মিথ্যা অপপ্রচারের ফাঁদে না পড়ে  বুঝতে হবে কিসের মাঝে প্রগতিশীল ফলাফল বিদ্যমান। একাকীত্বের অনুভূতি, আমরা সকলেই আলাদা ব্যক্তি এবং সবকিছুই আমাদের ক্ষমতার বাইরে- এমন অনুভূতিই পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করে তোলে এবং শ্রমিক শ্রেণিকে অথর্ব করে ফেলে।

এই স্বাতন্ত্র্যীকরণ শ্রমিকদের  চারপাশে চাপ দিতে বাধ্য করে, যা স্বতন্ত্র হুমকির বিরুদ্ধে কিছু সুরক্ষা দিতে পারে।  যেহেতু বর্তমানে এমন কোনও সংগঠিত শ্রমিকশ্রেনী শক্তি নেই যা বাস্তবিকভাবে অসামাজিক আচরণ রোধ করতে পারে, তাই সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ কার্যত অনিবার্যভাবে কর্তৃত্বের সাথে বৃহত্তর সনাক্তকরণের দিকে পরিচালিত করে।  সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী, জোহানা ব্রেনার মন্তব্য করেছেন আন্দোলনের মাধ্যমে সংস্কারের সম্ভাবনায়় বিশ্বাস যেমন হ্রাস পেয়েছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদীদের “রাষ্ট্রের দমনকারী শক্তির উপর নির্ভরশীলতা ” বৃদ্ধি পেয়েছে।  ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সর্বোপরি রাষ্ট্রই সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান। রাষ্ট্র ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে ‘দূর্বলকে রক্ষার নামে’ অনেক সময় ব্যয় করে।

বড় কারাগার এবং আরও দমনমূলক আইন শ্রমিক শ্রেণির আত্মবিশ্বাস এবং সংহতির ঐতিহ্য পুনর্নির্মাণের জন্য কিছুই করে না – যে বিষয়গুলি সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে আসে। এমনকি পুঁজিবাদের আওতাধীন থেকেও ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে যৌন সহিংসতা কমানো সম্ভব যদি একটি শক্তিশালী শ্রমিক ​​আন্দোলন বিদ্যমান থাকে যা কর্মীদের অবস্থা উন্নতিকরণের জন্য লড়াই করতে সক্ষম- যে অবস্থা শ্রমিকদের মর্যাদা এবং স্ব-মূল্যবোধ প্রদান করবে, এবং এমন কর্মসূচিতে সমর্থন দেবে যা সচেতনতা বাড়াতে এবং কূপমণ্ডূক পরিবেশের দ্বারা সৃষ্ট কুসংস্কারকে হ্রাস করতে পারে।

এখানে কাজ করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা এই পূর্ণনির্মানে অবদান রাখতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে লিবারেল ও লেবার গভর্নমেন্ট এর বাজেট সংকোচনের বিরুদ্ধে লড়াই যা শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান হ্রাস করে ও ব্যক্তিগত সম্পর্কে টানাপোড়েন বৃদ্ধি করে; বাসযোগ্য ও সাশ্রয়ী নিবসনের জন্য আন্দোলন; ভাতা বৃদ্ধি; শিশুদের বড় না হওয়া পর্যন্ত প্যারেন্টস পেমেন্ট চালু রাখা। আরো গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পেইনগুলো হলো; বিয়ের সম অধিকার, সমকামীতা ও রুপান্তরিত লিঙ্গভীতি এর বিরুদ্ধে প্রচার করা শিক্ষার্থীদের সমর্থন, শিশুদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো যাতে তারা নিজেদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব , শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা সহজলভ্যকরণ- যখন তারা পরিবারিক নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসতে চায় ,  সমান বেতনাধিকার নিয়ে কাজ করা ইত্যাদি ও গুরুত্বপূর্ণ । এবং ইউনিয়ন গুলিতে মালিককে অজুহাত প্রদানের মাধ্যমে হস্তক্ষেপের সুযোগ না দিয়ে সম্মিলিত উপায়ে কার্যকরভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য অফিসার প্রদানের দাবি করা প্রয়োজন।

একমাত্র এই সকল বিষয়ই একজন ব্যক্তিকে- হোক সে একজন শিশু, নারী অথবা পুরুষ, স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ দিতে পারে। যাদের কারণে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের বা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে- সেসকল জঘন্য অপরাধীকে যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা আমলার হয়ে কাজ করে, তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস যোগাতে পারে। সংগ্রাম করার আরো দিক আছে যা রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী দিকগুলোকে শক্তিশালী করবেনা। এমন আন্দোলনের উদাহরণও রয়েছে যেগুলো শ্রমিকদের শ্রেণীগতভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যা আরো শক্তিশালী ইউনিয়নের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি করে এবং আরো দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী তৈরি করে। এইসব পদক্ষেপের সবকিছুই তাৎক্ষণিক সমাধান বয়ে আনবে না বা এতে নেহাৎ যৌন নিপীড়নই একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু থাকবে না। কিন্তু যে পদ্ধতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার জনগণের জীবন, পেশা ও যৌন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করে এবং যেভাবে একই সিস্টেম এমন অবস্থা তৈরি করে যা যৌন সহিংসতাকে উৎসাহ যোগায়- এই দু’য়ের মধ্যকার কানেকশন এই পদক্ষেপগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এটাই একমাত্র পন্থা যৌন সহিংসতার সামাজিক শেকড় কে দূর্বল করতে পারে।

উপসংহার

হেলেন রেজার তার বই ‘ফিউরি: উইমেন রাইট অ্যাবাউট সেক্স, পাওয়ার অ্যান্ড ভায়োলেন্স’-এ তুলে ধরেন যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রচুর আলোচনা পৃথক ব্যক্তির অভিজ্ঞতার দিকে মনোনিবেশ করে, এই বিষয়টিকে জোর দিয়ে যে একটি সেক্সিস্ট বা যৌনতাবাদী সমাজ নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সৃষ্টি করে। এর অর্থ হতে পারে,

সামাজিক কাঠামো যে লিঙ্গগত পার্থক্যের চেয়ে আরো মৌলিক পর্যায়ে  সহিংসতার জন্ম দিতে পারে এই সম্ভাবনাটিকে আমরা অগ্রাহ্য করি…

শ্রম, নজরদারি, মনোরোগ, পরিবেশের অবক্ষয় এবং অন্যান্য সংস্থাগুলি আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে দাবি করে…

স্পষ্টতই, যৌন নির্যাতন, অনুপযুক্ত স্থানে স্পর্শ থেকে শুরু করে জোর-জবরদস্তি বা ধর্ষণ পর্যন্ত এই সমাজে একটি বেদনাদায়ক এবং বহু বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। সহিংসতার কারণ একাধিক ও জটিল এবং কেবল অনুধাবন করা সম্ভব একটি শ্রেণি সমাজ (ক্লাস সোসাইটি) দ্বারা যা বিচ্ছিন্নতাবোধকে চরমে নিয়ে গেছে, যে শ্রেণি সমাজের ভিত্তি পূ্ঁজিবাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো।

যৌনতার পণ্যায়ন এবং আমাদের দেহের অব্জেক্টিফিকেশন, যৌনতাবাদী স্টেরিওটাইপস এবং আগ্রাসী পুরুষত্বের  আদর্শ এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে যা নিপীড়নের পক্ষে সহায়ক। যদি যৌনতা বিক্রি হতে পারে়, তবে নিজের সন্তুষ্টির জন্য দেহ, যা বস্তুর চেয়ে বেশি নয়, কেন ব্যবহার করবে না? কেন ধর্ষকামী আকাঙ্ক্ষা গুলো পূরণ করবেন না যখন অন্য অনেকে আপনার চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় নিচু স্থানে আছে বা আপনার নিয়ন্ত্রনে রয়েছ্র? প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রও যৌন সহিংসতাকে তার কর্তৃত্ব আরোপের জন্য, ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করার জন্য ব্যবহার করে এবং নিজের প্রতিনিধিদের জনগনকে অপমানিত ও নিপীড়িত করার নতুন নতুন উপায় আবিষ্কারে উৎসাহ যোগায়। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তির অধিকারের চেয়ে ব্যবস্থাপনাকে সমস্যাহীন করার প্রতি অগ্রাধিকার দান যৌন সহিংসতাকে কতৃত্ব রক্ষা ও আরোপ করার একটা উপায় হিসেবে স্বাভাবিক করে তোলে।

যৌন সহিংসতা ত্রাস (Terror) আরোপের একটা সচেতন পন্থা বা অধীনস্থ করার একটা ইচ্ছা হতে পারে। এটি এই সমাজে জীবনের চাপযুক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ব্যক্তির ল্যাশিং আউট বা হতাশার ফলাফল হতে পারে। যৌন সহিংসতা উভয়ের ফলাফল হতে পারে। নারী থেকে শুরু করে শিশু অথবা বৃদ্ধ ও এলজিবিটিয়াই জনতা, নিপীড়িতরা যৌন সহিংসতার সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য কারণ  প্রভাবশালী ভাবাদর্শগুলো সমাজে এদের কম মর্যাদা দেয় এবং বস্তুগত বৈষম্য ও অসুবিধা তাদের স্বায়াত্বশাসন জাহির করার ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। বিচ্ছিন্নতাবোধ, রাষ্ট্রের শক্তি ও আমলাতন্ত্র ব্যক্তিকে নিষ্ঠুরতা ও ঊষরতার চাকার দন্তে (Cogs in a Wheel) পরিণত করে। পাব্লিক এরেনার এই গতিশীলতাই জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত দিকগুলোয় নিপীড়নকে বৈধতা দেয়।

সেক্স ট্রাফিকিং-এর মতো শিল্পের ব্যাপক বিকাশ, যা সম্ভবত উভয় লিঙ্গের মহিলা এবং শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে, এবং শিশু পর্নোগ্রাফিকে কোনভাবেই কেবল একটা ভয়ংকর বিকৃতি রূপে দেখা যাবে না যেখানে কয়েক মাস বয়সী শিশুদের নির্যাতন এমনকি মৃত্যুর শিকারও হতে হয় ; সেক্স ট্রাফিকিং ও শিশু পর্নোগ্রাফি মুনাফা-চালিত পুঁজিবাদের বিকৃত সিস্টেম থেকে উঠে এসেছে। এই শিল্প দরিদ্রতম দেশগুলিতে বেশী সফল হয় যেখানে মরিয়া বাবা-মা সন্তানদের বিক্রি করে এবং মহিলারা আরও বেশি সমৃদ্ধ দেশে আসার জন্য বাজি ধরেন। ধনী দেশগুলিতে এর পণ্যগুলি কনজিউম করা হয়, সেক্স ইন্ডাস্ট্রিকে সংগঠিত করা পুরুষ ও নারীরা লাভবান হয় এবং নির্লজ্জ  অমানবিকতা ও ভ্রষ্টাচার যা পুঁজিবাদ জন্ম দেয় তার স্বরূপ তুলে ধরে। এই চরম অবস্থাগুলো অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অসম্পৃক্ত মনে হতে পারে, তত্ত্বাবধান দরকার হয় এমন মানুষদের জন্য বা যারা কোন কতৃপক্ষের নিয়ন্ত্রনে থাকে তাদের জন্য। কিন্তু এই অবস্থাগুলো একই স্ট্রাকচার থেকে উঠে আসে এবং একই সমাজ দ্বারাই উত্পাদিত হচ্ছে।

লুকাস যেমন লিখেছেন, পুঁজিবাদ “কোন সীমানা মানে না এবং ঘৃণা করে প্রত্যেক মানবীয় মর্যাদাকে।”

উল্লিখিত কারণ গুলোই আমাদের সমাজের যৌন সহিংসতার উৎস।

সম্পাদনা নোট: The roots of sexual violence রচনাটি Marxist Left Review এ প্রকাশিত হয়  ২০১৫ সালের উইন্টার সংখ্যায়। রচনাটি বাংলা অনুবাদ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের অনুবাদ কক্ষ । প্রথম অনুবাদ রচনাটি কয়েক কিস্তিতে Decolonize নীলক্ষেত ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়। বর্তমান সংস্করণটি অরাজের পক্ষ থেকে নতুন করে সম্পাদনা করা হয়নি। ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত প্রকাশ করা হয়েছে। তবে অনুবাদ কক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মুদ্রণ সংস্করণ প্রকাশের আগে সম্পাদনা করা হবে।

অরাজ

অরাজ

অরাজ

অরাজ