অরাজ
Guston, Philip
প্রচ্ছদ » ডেভিড গ্রেইবার।। ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলন পুনরাবিষ্কার করছে মৌলিক পরিবর্তনমুখী কল্পনাপ্রতিভাকে

ডেভিড গ্রেইবার।। ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলন পুনরাবিষ্কার করছে মৌলিক পরিবর্তনমুখী কল্পনাপ্রতিভাকে

  • অনুবাদ: সেলিম রেজা নিউটন

আকস্মিকই তাঁর চলে যাওয়া। মৃত্যুর আগের দিনও টুইটারে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। নৈরাজ্যের নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্রেইবার আর নেই। গ্রেইবার ছিলেন সেইসব চিন্তকদের একজন যাঁরা ক্ষমতার প্রতিবয়ানে মানুষ, সমাজ, সম্পর্ক ও স্বাধীন-আনুভূমিক সংগঠনপ্রণালীর ইতিহাস ও ন্যায্যতা তুলে ধরেছেন। নৃতত্ত্ব এবং অর্থনীতি দুই ক্ষেত্রেই তাঁর কাজকে বৈপ্লবিকই বলা চলে৷

গবেষক এবং লেখক হিসেবে অবদানের বাইরেও পুঁজিবাদ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদেও সক্রিয় ছিলেন ডেভিড গ্রেইবার। ২০০২ সালে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট  আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও সংগঠক হিশেবেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আমরাই ৯৯% এই বিখ্যাত শ্লোগানটির প্রণেতা হিসেবে তিনিই সর্বজন বিদিত।  এছাড়া রোজাভার মুক্তিপরায়ণ সমাজ তৈরির লড়াইয়ে সশরীরের উপস্থিত হয়ে সংহতি জানিয়েছেন গ্রেইবার। গ্রেইবার রেখে গেছেন তাঁর অসংখ্য গুরুত্বপূর্ কাজ: Fragments of an Anarchist Anthropology, Debt: The First 5000 Years,  Direct Action: An Ethnography, Bullshit Jobs: A Theory

রচনাটি প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে। ২০১১ সালে সেলিম রেজা নিউটন এটি অনুবাদ করেন। প্রকাশিত হয় সমকালে। বর্তমান অনুবাদ-সংস্করণটি তাঁর ফেসবুক নোট থেকে নেয়া।
ডেভিড গ্রেইবার
(১৯৬১-২০২০)

মূল রচনা

ওয়াল স্ট্রিটে এবং অন্যত্র প্রতিবাদকারী তরুণ-যুবারা বিদ্যমান অর্থহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের মালিকানাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এসেছেন তাঁরা।

কেন মানুষজন দখল করছেন ওয়াল স্ট্রিট? সর্বশেষ পুলিশী ক্র্যাকডাউন সত্ত্বেও কেন এই দখল মাত্র কয়েক দিনের সারা আমেরিকা জুড়ে বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে? শত শত মানুষকে কেন তা অনুপ্রাণিত করছে পিৎজা, টাকাপয়সা, যন্ত্রপাতি পাঠাতে? আর এখন, কেন তা মানুষজনকে অনুপ্রাণিত করছে শিকাগো-দখল-করো ফ্লোরিডা-দখল-করো ডেনভার-দখল-করো বা লসঅ্যাঞ্জেলেস-দখল-করো নামে তাঁদের নিজেদের আন্দোলন শুরু করতে?

স্বতঃস্পষ্ট কারণ আছে এসবের। নতুন প্রজন্মের মার্কিনীদের অবাধ্য আত্মনির্ভরতার শুরুটা দেখছি আমরা। এটা এমন একটা প্রজন্ম যাঁরা তাঁদের লেখাপড়া শেষ করতে চলেছেন কোনো চাকরি, কোনো ভবিষ্যতের আশা ছাড়াই। উপরন্তু, তাঁরা জর্জরিত হয়ে আছেন বিপুল পরিমাণ ঋণে— ক্ষমার অযোগ্য যে ঋণ। এঁদের বেশিরভাগই শ্রমজীবী শ্রেণী থেকে বা অন্যবিধ গরিবি হালের পারিবারিক পটভূমি থেকে আসা। যা যা তাঁদের করা উচিৎ বলে বলা হয়েছিল ঠিক তাই তাই করেছিলেন এ তরুণরা। তাঁরা লেখাপড়া করেছিলেন, কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, আর এখন সেসব করার জন্য তাঁরা স্রেফ শাস্তি তো পাচ্ছেনই, আরো পাচ্ছেন অবজ্ঞা-অপমান। এমন এক জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা, যে জীবনকে মনে করা হয় অলস, হতাশ ঋণখেলাপির জীবন; হাস্যকর নীতিহীনের জীবন।

এটা কি তবে অবাক করার মতো ব্যাপার যে এবার তাঁরা কথাবার্তা বলতে চাইবেন অর্থকড়ির সেইসব রাঘববোয়ালদের সম্পর্কে, যারা চুরি করে নিয়ে গেছে তাঁদের ভবিষ্যত?

ঠিক ইউরোপের মতোনই, প্রকাণ্ড সামাজিক ব্যর্থতার পরিণাম দেখছি আমরা। দখল-আন্দোলনকারীরা ঠিক সেই পদের মানুষ যাঁরা ভাবনা-কল্পনায় ভরপুর। যেকোনো সুস্থ সমাজ তার প্রত্যেকটা মানুষের জীবন উন্নত করে তোলার ক্ষেত্রে এঁদের শক্তিসামর্থ্যকে কাজে লাগাতে চাইবে। অথচ, এটাকে তাঁরা ব্যবহার করছেন পুরো সিস্টেমটার পতন ঘটানোর উপায় উদ্ভাবনের কাজে।

কিন্তু, চূড়ান্ত ব্যর্থতাটা এখানে কল্পনাপ্রতিভার ব্যর্থতা। যা আমরা আজ নিজের চোখে দেখছি, তাকে একটা দাবি হিসেবেও দেখা যেতে পারে: শেষ পর্যন্ত একটা আলাপ-আলোচনায় বসার দাবি। এই আলাপ-আলোচনায় আমাদের সকলের বসার কথা ছিল সেই ২০০৮ সালে। পৃথিবীর অর্থকড়ি সংক্রান্ত স্থাপত্য-কাঠামো প্রায়-ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরের সেই মুহূর্তটা ছিল এমন একটা মুহূর্ত যখন যেকোনো কিছুই সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল।

বিগত দশক জুড়ে যা যা আমাদেরকে বলা হয়েছে তার সমস্তটাই মিথ্যাকথা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাজার নিজে নিজেকে চালায় নি। অর্থকড়ি বিষয়ক পদ্ধতি-প্রণালীগুলোর স্রষ্টাগণ অভ্রান্ত মহাপণ্ডিত ছিলেন না। এবং ঋণ আসলে পরিশোধ করা লাগে নি। প্রকৃতপক্ষে, টাকাপয়সা নিজেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেখা গেছে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার এক রাতে অস্তিত্বমান হয়ে উঠতে পারে বা হাওয়া হয়ে যেতে পারে, যদি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সেরকমটা চায়। এমনকি ইকনোমিস্ট পত্রিকাও এরকম শিরোনাম দিচ্ছিল— “পুঁজিবাদ: এটা কি কোনো ভালো আইডিয়া?”।

মনে হচ্ছিল যেন সময় এসেছে সব কিছু নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার— বাজার, অর্থকড়ি, ঋণ সব কিছু নিয়ে। মনে হচ্ছিল সময় এসেছে এই প্রশ্ন তোলার যে, একটা ‘অর্থনীতি’ আসলে কীসের জন্য? এই অবস্থাটা টিকে ছিল সম্ভবত দুই সপ্তাহ। তারপর, ইতিহাসের বৃহত্তম স্নায়ু-বিপর্যয়ের মধ্যে সমবেতভাবে আমরা আমাদের হাত দিয়ে ঠেসে ধরলাম আমাদের কান, আর চেষ্টা করলাম যেন আগে যা কিছু যেমন ছিল যতটা সম্ভব সেরকম জায়গায় সেগুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

সম্ভবত এটা অবাক করার মতো কিছু নয়। ক্রমবর্ধমানভাবে এটা স্বতঃস্পষ্ট হয়ে উঠছে যে গত কয়েক দশক ধরে যাঁরা দুনিয়া চালাচ্ছেন, পুঁজিবাদের একটা টেকসই রূপকাঠামো সৃজন করা তাঁদের আসল অগ্রাধিকার নয়। বরং তাঁদের অগ্রাধিকার হলো আমাদেরকে এ কথা বোঝানো যে পুঁজিবাদের চলতি আদলটাই একমাত্র বোধগম্য ব্যবস্থা; কাজেই এর কী সমস্যা আছে না আছে তা প্রাসঙ্গিক নয়। ফলে, বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমরা সবাই ঘিরে বসে আছি, আর পুরো ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ছে।

এখন আমরা যা জেনেছি তা হলো ১৯৭০ দশকের অর্থনৈতিক সংকট আসলে কখনোই চলে যায় নি। দেশের ভেতরে সস্তা ধারদেনা (ক্রেডিট) আর দেশের বাইরে ব্যাপক লুটতরাজ দিয়ে সংকটটাকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। আর, এই লুটতরাজ চালানো হয়েছিল “তৃতীয় বিশ্বের ঋণ-সংকট” এর নামে। কিন্তু বিশ্বের দক্ষিণ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। “বিকল্প-বিশ্বায়ন আন্দোলন” শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে সফল হয়েছে। পূর্ব এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আইএমএফ বিতাড়িত হয়েছে, ঠিক এখন যেমন তা বিতাড়িত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পরিণামে, ঋণ-সংকট এখন তার নিজের ঘরে, মানে ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকায়, ফিরে এসেছে। আর, তা পরিপূর্ণ হয়ে আছে ঠিক সেই একই মনোভঙ্গিতে: একটা অর্থকড়ি-সংকট ঘোষণা করো; এটাকে সামলানোর জন্য আপাত-নিরপেক্ষ টেকনোক্র্যাটদেরকে নিয়োগ করো; আর তারপর ‘কৃচ্ছ্রতার’ নামে মেতে ওঠো লুণ্ঠনের লাগামহীন আনন্দোৎসবে।

অকুপাই ফটো

প্রতিরোধের যে আদল জেগে উঠেছে তার সাথে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার আন্দোলনেরও উল্লেখযোগ্য রকমের মিল আছে। আমরা দেখছি পুরোনো ধাঁচের পার্টি-রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। আমরা দেখছি মৌলিক পরিবর্তনমুখী বৈচিত্র্যকে সেই একইভাবে আলিঙ্গন করা হচ্ছে। আর, আমরা দেখছি নিচের থেকে গড়ে ওঠা গণতন্ত্রের নতুন নতুন কাঠামো উদ্ভাবনের ওপর সেই একই রকম গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। যেটুকু আলাদা সেটা প্রধানত লক্ষ্যবস্তুতে। ২০০০ সালে এ আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে গোটা গ্রহজুড়ে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন আমলাতন্ত্রসমূহের বিরুদ্ধে (ডব্লিউটিও, আইএমএফ, নাফটা)। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা ছিল না। স্রেফ ট্রান্সন্যাশনাল পুঁজির দাসত্ব করাই ছিল এগুলোর অস্তিত্বের কারণ। আর, ঠিক সেই একই কারণে এবারের এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে গ্রিস, স্পেন, এবং এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরো রাজনৈতিক শ্রেণীটারই বিরুদ্ধে। এই হলো সেই কারণ যেজন্য বিক্ষোভকারীরা এমনকি আনুষ্ঠানিক দাবিদাওয়া পেশ করতে পর্যন্ত প্রায়শই ইতস্তত করছেন, পাছে তা রাজনীতিবিদদের বৈধতার স্বীকৃতি বলে গণ্য হয়— যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করেছেন।

শেষ পর্যন্ত যখন ইতিহাস লিখিত হবে, তখন যদিও এমন হবার সম্ভাবনাই বেশি যে এই যাবতীয় হৈ-হট্টগোলকে (আরব বসন্ত থেকে শুরু করে) স্মরণ করা হবে মার্কিন সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা-তরঙ্গমালার প্রথম পর্ব হিসেবে। তিরিশ বছর ধরে লাগাতারভাবে সারবস্তুর তুলনায় প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে চলাটা এবং ভিন্নমতের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে এমন যেকোনো কিছুকেই শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলাটা অবশ্য প্রতিবাদী তরুণদের ভবিষ্যত-প্রত্যাশাকে বিবর্ণ করে তুলতে পারে। আর, এটা পরিষ্কার যে তরুণ-যুবাদের পুরো একটা প্রজন্মকে দরকার হলে নেকড়ের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হলেও উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশের বেশিরভাগটা (যত বেশি সম্ভব) কেড়ে নিতে ধনীরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু ইতিহাস তাঁদের পক্ষে নয়।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাকে বিবেচনা করে দেখলে আমাদের ভালো হবে। এই বিলুপ্তির ফলে ধনীদের পক্ষে বিস্কুট-চানাচুরের সমস্তটাই হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে তা নয়, কিন্তু সম্ভব হয়েছে আধুনিক কল্যাণ-রাষ্ট্র সৃষ্টি করাটা। এবারের পালা থেকে কী বেরিয়ে আসবে আমরা তা সুনির্দিষ্টভাবে জানি না। কিন্তু, মানবীয় কল্পনাপ্রতিভার ওপর শ্বাসরোধী যে ফাঁস গত ৩০ বছর ধরে চেপে বসে আসে, দখল-আন্দোলনকারীরা যদি শেষ পর্যন্ত তা ছিঁড়তে পারেন, যেমনটা তাঁরা পেরেছিলেন ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর-পরবর্তী প্রথম সপ্তাহগুলিতে, সবকিছুই তাহলে আবার আলোচনার টেবিলে উঠে আসবে। এবং সেটা হবে ওয়াল স্ট্রিটের এবং সারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরের দখল-আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে আমাদের প্রতি দেখানো মহত্তম অনুগ্রহ— এতটা অনুগ্রহ আমাদেরকে আর কেউ করতে পারতেন না।

১১ই নভেম্বর ২০১১
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সেলিম রেজা নিউটন

সেলিম রেজা নিউটন

লেখক

সেলিম রেজা নিউটন

সেলিম রেজা নিউটন