অনুবাদ: জাকির হোসেন
মাত্র কয়েকবছর আগেও উল্লিখিত শিরোনামধারী কোনো প্রবন্ধকে মনে হতো স্রেফ ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকে লেখা কিংবা সম্ভবত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বা রোজা লুক্সেমবার্গের সামাজ্যব্যাদ সংক্রান্ত কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়াস। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আজ আর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয় বা তেমনটা কখনো ছিলও না। বৈশ্বিকভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সংকট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে অগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে ফ্যাসিবাদ আরো একবার সত্যিকারের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং তার মূলোৎপাটনের জন্য যে রাজনৈতিক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে তার জন্যে এর মৌলিক কাঠামোগুলোর বিষয়ে একধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে কাজটি খুব একটা সহজ হবে না। তার মধ্যে একটি হলো ফ্যাসিবাদ, একটি যথেষ্ট জটিল প্রপঞ্চ। বাদবাকি অন্য সব কারণের মধ্যে উক্ত কারণেই একটি প্রপঞ্চ হিসেবে ফ্যাসিবাদের একটি দূর্বল ব্যাখ্যার তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব সরাসরি রাজনৈতিক নপুংসকতার দিকে আমাদেরকে চালিত করে। তাছাড়া স্থানীয় নগর মিলনায়তনে যখন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (যুক্তরাজ্যে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি উগ্র ডানপন্থী, ফ্যাসিবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক দল—অনুবাদক) একত্র হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস ও তত্ত্ব সম্পর্কে সুলুক সন্ধানের মতো যথেষ্ট সময় সদাসর্বদা কারো হাতে না-ও থাকতে পারে। একইভাবে ফ্যাসিবাদ মূলত কী তাৎপর্য বহন করে সে সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার যে জরুরি কাজ, তার পরিবর্তে উক্ত রাজনৈতিক দলের পেছনে লেগে থাকার ব্যাপারটি একটি লোভনীয় বিকল্পে পরিণত হতে পারে। আবার, এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে ফ্যাসিবাদকে আমরা কতটুকু গুরুত্বের সাথে নেব, সেটি জানা যেমন একটি সমস্যা, তেমনিভাবে যে পরিস্থিতির মধ্যে এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাকে খুব সুন্দরভাবে খারিজ করে দেওয়ার এবং বিপ্লবী সর্বহারা নেতৃত্ব গঠনের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংসসাধন করার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার জরুরি কার্যক্রমগুলো থেকে কারো রাজনৈতিক শক্তিকে একটি অধিকতর তাৎক্ষণিক কিন্তু বর্তমানে গঠনগত দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম নিয়ামক একটি বিষয়ের দিকে ধাবিত করার মাঝামাঝি একটি রাস্তা বের করাটাও একটি সমস্যা আকারে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই দিক থেকে ফ্যাসিবাদের বিষয়টি বরং যৌনতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের ক্ষেত্রেই মানসিক বিকার ও স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল।

মোটাদাগে বলা যায়, একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনকে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ও অনায়াসে নিশ্চিত করার প্রয়াসই হলো ফ্যাসিবাদ। তবে এটা সত্য যে, একচেটিয়া পুঁজিবাদ এই ধরণের কাজ করতে চরমভাবে অচিচ্ছুক। বুর্জোয়া সমাজ তার উদার গণতন্ত্রবাদী মতাদর্শসমূহকে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঐতিহাসিক শক্তি খরচ করেছে। একই কারণে তারা স্বেচ্ছায় শ্রেণীসংগ্রামের এইসব বিস্তৃত মতাদর্শিক স্থিতাবস্থাকে ভেঙ্গে এমন একদল ছিন্নবস্ত্র সন্দেহবাতিকগ্রস্ত পুঁচকে-বুর্জোয়া ডাকাতদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে চাইবে না, যাদেরকে তারা এমনকি নিজেদের বাড়ির বসার ঘরেও সহ্য করতে রাজি নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্র শুধুমাত্র সর্বশেষ ও মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে তার ‘মুক্তি’ ও শ্রেণী-ক্ষমতার গঠন প্রক্রিয়ায় অশুভ আঁতাতের মতো সমৃদ্ধ মতাদর্শগুলোকে পরিত্যাগ করে ব্রেখটিয়ান ভাবমূর্তি ধারণ করে সকল গোমর ফাঁস করে দেয়। এটি অবশ্যই বিপ্লবীদের জন্য একটি সুখবর হিসেবে হাজির হয়, কারণ এর মাধ্যমে তারা একটু দম নেওয়ার ফুরসত পায়। একজন বিপ্লবীর শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি জিনিস নিয়েই শঙ্কিত হতে হয়। সেটি হলো সেনাবাহিনী। এছাড়া শেষের দিকে আর সবকিছুই গুরুত্বহীন। কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্র নিতান্ত বাধ্য না হলে একে ব্যবহার করে না। কারণ উক্ত কৌশল অবলম্বনের ফলে তার মতাদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে, তার লোকসান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক অর্জন দিয়ে পোষানো যায় না। (সেনাবাহিনীর ব্যবহার বলতে আমি স্বাভাবিকভাবেই বুঝিয়েছি পুঁজিবাদের নিজ আবাসভূমিগুলোতে তাদের ব্যবহারকে। মতাদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো স্থানে তাদের নিয়োগ- যেমন আইরিশদের মতো ভিনগ্রহবাসীদেরকে নির্যাতনের জন্য তাদের ব্যবহারকে বোঝানো হয় নি)। এর বদলে আমাদের জন্য আছে পুলিশ, যারা খুব বেশি সুখকর না হলেও অন্তত অস্ত্রবিহীন। কিন্তু যদি বুর্জোয়া রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে বাধ্য হয় তাহলে বিপ্লবীদের জন্য সেই দম নেওয়ার ফুরসতও থাকবে না। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করবে না। কেউ যদি এই বক্তব্যকে বামপন্থী সন্দেহবাতিক বলে উড়িয়ে দিতে চায় তবে তাকে বুকেনওয়াল্ডের (জার্মানিক ওয়েমার শহরের নিকটে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প (1937-1945)- অনুবাদক) ঘটনা স্মরণে রাখতে হবে।
কোনো ঐতিহ্যবাহী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি গ্রহণ করে নি। এ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এর সাথে সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি করে এবং এক পর্যায়ে আবিষ্কার করে যে পাশার দান উল্টে গেছে। ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের সামাজিক গণতন্ত্রবাদী সুশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে রাষ্ট্রের সাথে প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীর মধ্যস্থতার হাতিয়ার হিসেবে আইনসভা ও রাজনৈতিক দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলক স্থূলভাবে ব্যবহার করতে থাকে, ফলে সম্পর্কটি প্রচন্ডভাবে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। বুর্জোয়া উদারবাদী শাসনের অধীনে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসন উপভোগকারী রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হিসেবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে খোদ রাষ্ট্রের সাথে কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এতকিছুর পরেও ফ্যাসিবাদ সামগ্রিকভাবে সমাজে পুঁজিবাদী কর্তৃত্ববাদের স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো জিনিস নয়। পুঁজিবাদের উদারনৈতিক ধরণটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসিতের সম্মতির সাহায্যে শাসন করে থাকে। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কার্যত একটি দাস সমাজ- যা আবার ধ্রুপদী দাস-সমাজ থেকেও পৃথক। অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজ কাঠামোর প্রত্যেকটি স্তরে এর শেকড় গভীরভাবে বিস্তৃত থাকে। এই দিক থেকে এটি মার্কসবাদে ‘বোনাপার্টবাদ’ (ফ্রান্সে প্রথম ও তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কালে চর্চিত রাজনৈতিক মতবাদ- অনুবাদক) বলে পরিচিত রাজনৈতিক মতবাদের চেয়ে ভিন্ন। ফ্যাসিবাদ মূলত ব্যাপক জনতুষ্টিবাদের সাথে পুশচিবাদের (আচানক সহিংতার উপর ভিত্তি করে সরকার পতনের পদ্ধতিমূলক মতবাদ-অনুবাদক) একটি প্রচন্ড সহিংস তাত্ত্বিক সংস্করণের সমন্বয়ে গঠিত মতবাদ। অন্যভাবে বললে, জার্মান রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য নাৎসিদের চর্চিত পদ্ধতি যদি কোনো এক বা একাধিক দিক থেকে জার্মান সাম্যবাদী দলের প্রচন্ড দুর্দিনেও তার উগ্র-বামপন্থী নীতিগুলোর সাথে মিলে যায়, তারপরও বিপরীতক্রমে সমগ্র জার্মান সমাজের চরমপন্থী সম্পৃক্ততা ছিল মূলত বিভিন্ন ধরণের ক্লাব, সমিতি ও সংঘজুড়ে পুরো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে তৎকালীন জার্মান সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দলের বিস্তৃত ও শক্তভাবে প্রোথিত সামাজিক কর্পোরেটবাদের অনুরূপ।
সুতরাং, ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনই যখন তার প্রয়োজন হয়। 1929 সালে জার্মান অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। 1930 সালে নাৎসি পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় 800%। 1932 সালে 2 কোটি জার্মান খয়রাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে কিনা পুঁজিবাদের একটিমাত্র অর্থনৈতিক সংকটই কেবল ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সংকটের সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণীর পরাজয় এবং ভেঙ্গে পড়া মনোবল একত্র হয়ে ফ্যাসিবাদের উর্বর জমিন তৈরি করতে পারে। 1918-19 সালে ক্ষণস্থায়ী জার্মান শ্রমিক প্রজাতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার মাধ্যমে জার্মান ফ্যাসিবাদের গল্প শুরু হয় এবং এই গল্প এগোতে থাকে এসপিডি (সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল) ও চুলচেরা কট্টর বামপন্থী ভাঁড়দের দল কেপিডি (সাম্যবাদী দল) কর্তৃক জার্মান সর্বহারাদের একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার মাধ্যমে। 1920 সালে ইতালিতে সর্বহারা বিদ্রোহের ব্যর্থতা এবং তার ফলস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণীর প্রচন্ডভাবে ভেঙ্গে পড়া মনোবল শাসনকাঠামোর শূন্যতাকে ফ্যাসিবাদ দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়, যেটি কিনা পূর্বে ছোট্ট পরিসরে বিস্তৃত থাকলেও পরবর্তীকালে বিপুল বিক্রমে সামনে এগোতে থাকে। ফ্যাসিবাদ হলো বুর্জোয়াদের সর্বহারা বিদ্রোহকে দমন করার ভীতিজনিত বিপরীত প্রতিক্রিয়া থেকে পাওয়া একটি উপজাত দ্রব্য – এটি হলো একটি বিপজ্জনক বামপন্থী কুসংস্কার। বিপরীতে, শ্রমিক শ্রেণী যখন একটি বিকল্প বিপ্লবী শক্তির অভাবে সংস্কারপন্থী কোনো নেতৃত্বের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে অসংগঠিত ও রক্ষণশীল অবস্থায় থাকে, ঠিক সে সময়ে একটি প্রচন্ড বুর্জোয়া আক্রমণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত আছে। সুতরাং ফ্যাসিবাদের উপাদান একাধিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, সর্বহারাদের পরাজয়, সমাজবাদী গণতন্ত্রের পরাজয়, বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব কিংবা বীর্যহীনতা।

শিল্পী: দিয়েগো রিভেরা
রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ কোনো আলোচনা কক্ষ কিংবা কোনো কারখানার বারান্দায় উদ্ভাবিত হয় না। এটি উৎপন্ন হয় পুঁচকে বুর্জোয়া কর্মচারীদের সারি থেকে। সর্বহারা শ্রেণীর সমপর্যায়ে কিংবা তারও নীচে নিক্ষিপ্ত হওয়ার হয়ে ভীত এবং একইসাথে মাথার উপরে অবস্থিত নির্বিষ শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহরত স্বল্প পুঁজি ও বিনিয়োগের মালিকদের বিভিন্ন দল যারা তাদের সঞ্চয়কে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যেতে দেখে, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ফ্যাসিবাদ তাদেরই একটি রাজনৈতিক পণ্য। জাতীয়তাবাদ, কৌলিন্যবাদ, কঠোর পরিশ্রম, মেধাতন্ত্র, শ্রমিক বিদ্রোহের ভীতি, দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা, যুক্তিবাদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যাস রপ্ত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণী ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। বৃহৎ পুঁজির হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এই শ্রেণীটি বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের মাঝখানে নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে হাজির করে। বিক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কেন্দ্রিভূত স্বভাবের কারণে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজস্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করতে অক্ষম হয়ে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের মধ্যে সমস্ত শ্রেণীবিভাজনের ঊর্দ্ধে রাখা একটি ‘নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং ‘বৃহৎ’ পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে নিয়তির ফেরে আটকে পড়ে এবং বুর্জোয়া কিংবা সামাজিক গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক যন্ত্র কোনো কিছুতেই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে না পেয়ে নিজেদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হওয়া পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ সংকটজাত দ্রব্য হলো ফ্যাসিবাদ। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সাথে ফ্যাসিবাদের গল্প মূলত পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীকে একটি লম্বা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ভ্রমণ এবং অস্বস্তিকর ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া একচেটিয়া পুঁজিবাদের সমর্থনে পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীর অস্পষ্ট ও মিশ্র মতাদর্শকে কাজে লাগিয়ে সর্বহারাদের সংগঠনগুলোকে দমন করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীকে ব্যবহার করে। পুঁচকে বুর্জোয়াদের সামনে ফ্যাসিবাদ নিজেকে জনপ্রিয় এবং ‘চরমপন্থী’ শক্তি হিসেবে হাজির করে যারা কিনা ‘অলস ধনী’ ও ‘সম্পদগর্বী’দের বিরুদ্ধে উক্ত শ্রেণীর বৈরিভাবাপন্নতার সাথে একাত্মতা পোষণ করে এবং সত্যিকারের ‘উৎপাদনশীল’ শ্রমিকদের (হোক তারা পুঁজিবাদী কিংবা সর্বহারা) গুণগ্রাহী হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইসাথে, ফ্যাসিবাদ নিজেকে শৃঙ্খলা, গৌরব, ধার্মিকতা ও জাতিগত স্বর্ণযুগকালীন দেশজ মূল্যবোধের রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদী আন্দোলন হিসেবেও তুলে ধরে।
অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদের ‘চরমপন্থা’ পুরোপুরি ধাপ্পাবাজির বিষয় ছিল না। দলের মধ্যে যারা নেতাদের ধনীদেরকে আঘাত করা বিষয়ক বাগাড়ম্বরকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ফেলেছিল, তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য তথাকথিত ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস্’ জাতীয় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা নাৎসীদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। তবে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের গতানুগতিক প্রক্রিয়া আরো জটিল। শাসক শ্রেণী শুরুর দিকে ফ্যাসিবাদকে ঘেন্না করে এবং খারিজ করে দেয়, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকটের সময় মাঝেমধ্যে একে ব্যবহার করে এবং পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সংকট যখন সমাধান হতে চায় না বরং বিপুলাকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক অনুদানরূপে বৃহৎ পুঁজির গোপন সমর্থন লাভ করতে থাকে। ফ্যাসিবাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নিজেকে একচেটিয়া পুঁজি ও পুঁচকে বুর্জোয়াদের মধ্যবর্তী মৈত্রী হিসেবে হাজির করে, কিছুটা হলেও একটা চরমপন্থী চেহারা বানিয়ে, জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসসাধন করে সেগুলোর জায়গায় রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান বানানোর কর্মযজ্ঞে তখনো সামান্য কিছু ছাড় দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করা। পুঁচকে বুর্জোয়ারা শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিজেদের লোকজন দিয়ে ভর্তি করতে থাকলেও একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রভাবশালী স্বার্থের ভিত্তিতেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার সাথে সাথে একদা পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীর একগাদা অভাব অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীস্বার্থকেই বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। শেষপর্যন্ত পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে থাকা ফ্যাসিবাদ যে শ্রেণীর কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করে, সে শ্রেণীস্বার্থকেই পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়।
একচেটিয়া পুঁজিবাদের একটি তীব্র সাধারণ সংকট এবং সর্বহারা নেতৃত্বের দ্বৈত সংকটের মতো শাসকচক্রের নিজেদের মধ্যেই একটি বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক সংকট হলো ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনের ধ্রুপদী পূর্বশর্ত। শাসকচক্রের মধ্যে অবস্থানরত কোনো বিশেষ শ্রেণী কিংবা কোনো শ্রেণীর কোনো বিশেষ অংশই যখন একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, তখন এদের কোনো একটি পক্ষের একক আধিপত্য কায়েমের ভিত্তিতে এই পরষ্পরবিরোধী অংশগুলোকে একসূত্রে গাঁথার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তির প্রয়োজন হয় যার যোগান দিতে পারে ফ্যাসিবাদ। এমন একটি পরিস্থিতিতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। সমাজে প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে একটি বিশেষ ধরণের পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে এদেরকে একতাবদ্ধ করাই হলো ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়। উদাহরণস্বরূপ, 1920 এর দশকের জার্মানিতে একচেটিয়া পুঁজিবাদের দ্রুততর বিকাশের ফলে শাসক শ্রেণীর এই অংশের সাথে বিপুলাকার কৃষি-পুঁজির বিভিন্নমুখী দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে। সেখানে ফ্যাসিবাদের কাজ ছিল একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে এইসমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা। ‘বৃহৎ’ ও ‘মাঝারি’ পুঁজির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব নিরসনেও ফ্যাসিবাদ পূর্বোক্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বাধ্যতামূলক চক্রায়ণ (কার্টেলাইজেশন), দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, গণকর্মসংস্থান, যুদ্ধ অর্থনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বাদবাকী অন্যসব অর্থনৈতিক কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে শাসক শ্রেণীর মধ্যে বিরাজমান অন্য সকল দল-উপদলের স্বার্থ-সুবিধা জলাঞ্জলী দেওয়ার বিনিময়ে লাভবান হয় বৃহৎ শিল্পপুঁজি। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন এসমস্ত পুনর্গঠনের একমাত্র মাধ্যম হওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত একচেটিয়া অর্থায়ননির্ভর পুঁজিবাদই মূলত প্রভাবশালী ‘উচ্চতা’য় উপনীত হয়। ইতালিতে ফ্যাসিবাদ কৃষিপুঁজির উপর শিল্পপুঁজির প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে কাজ করেছিল। ইতালির ফ্যাসিবাদী দল ছিল মূলত সে দেশের উন্নত উত্তরাঞ্চলের একটি পণ্য যেটি কিনা কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।
জার্মানির মর্তাদর্শিক পরিস্থিতিগুলো ফ্যাসিবাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ছিল। বিসমার্কবাদী ‘উপর থেকে উপুড় করে দেওয়া বিপ্লব’ এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই তাদের নিজস্ব মতাদর্শ উৎপাদন করার মাধ্যমে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে পারে নি। বুর্জোয়া উদারবাদী মতাদর্শের জায়গায় জার্মানরা ফ্যাসিবাদে রূপান্তরযোগ্য জঙ্গিবাদী উপাদানসমেত ঈষৎ পরিবর্তিত একটি সামন্তবাদী মতাদর্শ উৎপাদন করেছিল। জার্মান পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণী মতাদর্শিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে কুলীন বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরশীল এই শ্রেণী তাদের ফরাসি সঙ্গীসাথীদের জ্যাকববাদের সাথে শক্তিসামর্থ্যের দিক থেকে তুলনীয় কোনো মতাদর্শের জন্ম দিতে পারে নি। তারপরও এইসব মতাদর্শের উপাদানসমূহ খুবই অদ্ভূতভাবে ফ্যাসিবাদের হাতের মুঠোয় চলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযোগী ছিল। রাষ্ট্রপূজা, ‘গুরু’ভক্তি, আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ, কৃর্তত্ববাদ এবং ‘যন্ত্রবাদী’ আদর্শবাদসমেত জার্মান পুঁচকে বুর্জোয়া মতাদর্শ বহু দিক থেকেই ধ্রুপদী বুর্জোয়া উদারবাদের চেয়ে একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের মতাদর্শিক চাহিদা মেটানোর জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, শ্রেণীগত পরিভাষার বদলে বরং ‘দেশীয়’ পরিভাষায় পরিচিত হতে চাওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পুঁচকে বুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শিক অবস্থাগুলোর সাথে পরিবার বিষয়ক ফ্যাসিবাদী সংস্কার মিলে যায়। কিন্তু এসমস্ত মতাদর্শগুলো কর্পোরেটবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও মর্যাদাক্রমের যে প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিল, সেটি খুব পরিষ্কারভাবেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য উপযুক্ত ছিল। সুতরাং, এটা বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ মূলত নিম্ন মধ্যবিত্তের মতাদর্শের সাথে যূথবদ্ধ এবং সেটি দ্বারা প্রভাবিত একটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী মতাদর্শ।
পুঁজিবাদ থেকে উত্তীর্ণ হওয়া ‘আমলাতান্ত্রিক যৌথতা’ই হলো ফ্যাসিবাদ- এই ধরণের রক্ষণশীল ও উদারবাদী কিংবদন্তীকে নাকচ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি ও ইতালীয় শিল্প-কারখানায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বর্তমানে পশ্চিমে যা হচ্ছে তার চেয়ে সম্ভবত ভিন্ন কিছু ছিল না। তৎকালীন জার্মানির বেশিরভাগ শিল্পকেই জাতীয়করণ করা থেকে বিরত ছিল নাৎসিরা। বেসরকারি খাতের তুলনায় তাদের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাবসা-বাণিজ্যের অবস্থারও ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। ফ্যাসিবাদ বিষয়ে ফ্রানজ্ ন্যুমান তার ধ্রুপদী গ্রন্থ বেহেমথ-এ লিখেছেন, ফ্যাসিবাদ হলো ‘একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বেসরকারী পুঁজিবাদী অর্থনীতি’। জার্মানিতে ওয়েমারের সময়কালে ক্রমবর্ধমান একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও চক্রায়ণকে (কার্টেলাইজেশন) যৌক্তিকভাবে অনুসরণকারী এবং সমসাময়িক পুঁজিবাদের পরিকল্পিত কর্পোরেট অর্থনীতির অগ্রদূত হিসেবে একে দেখা যেতে পারে। সমাজকে বিশ্ববাজার থেকে বিছিন্ন করে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ ও দাম নির্ধারণে রাষ্ট্রের একক আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে একটি বদ্ধ অর্থনীতি নির্মাণের মতলব নিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়মিত তত্ত্বাবধায়কে পরিণত হয়। এমন সুরক্ষা নীতি গ্রহণের অনিবার্য ফল হিসেবে একদা বিধ্বস্ত অর্থনীতি সেরে ওঠে এবং এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সেটি তার কঠোর জাতীয় সীমানায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এর ফলে ঘটে সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার। কিন্তু এইধরণের বিস্তার অবশ্যই স্রেফ ফ্যাসিবাদী ‘দুর্ঘটনা’ নয়। ফ্যাসিবাদ স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে সব জাতীয় বাহিনী, শ্রেণী ও সম্পদগুলোর জঙ্গিবাদী কেন্দ্রীভূতকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই প্রস্তুতি গ্রহণের সাথে ইহুদিবিদ্বেষ ও জাতিবাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তনশীল। নাৎসিবাদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি সত্য ছিল। সেখানকার অভ্যন্তরীণ শ্রেণীসংগ্রাম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জাতীয় কর্পোরেটবাদ এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক আগ্রাসনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ইহুদি ও বিদেশীদেরকে নির্বাচন করা হয়েছিল। আদর্শিক পর্যায়ে সকল ফ্যাসিবাদেই শ্রেষ্ঠত্ববাদী কর্পোরেটবাদ হাজির থাকলেও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের দিক থেকে ‘ধ্রুপদী’ ফ্যাসিবাদের কাতারভুক্ত না হওয়া আইবেরীয় ফ্যাসিবাদসমূহের এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রকাশে জাতিবাদী পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে হয় নি (1932 সালে ইতালিতে প্রধান ইহুদী ধর্মগুরু ফ্যাসিবাদী দলের সদস্য ছিলেন)।
তবে সকল ফ্যাসিবাদী গঠনই তার আদর্শিক স্তরে ব্যাপকভাবে ‘তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন’ বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানির যুদ্ধ-অর্থনীতিতে পোলিশ ধাতুশ্রমিকদের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে উপেক্ষা করে মতাদর্শিক কারণে তাদেরকে নির্মূল করা হয়েছিল। একইভাবে সেখানে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি যখন প্রচন্ড প্রয়োজন ছিল, সে সময়েও জার্মান গৃহিণীদের গৃহবন্দী রাখার সংস্কার মেনে তাদেরকে কারখানার বাইরে রাখা হয়েছিল। তার উপর ‘শেষ সমাধান’-এ আসার জন্য প্রয়োজনীয় জটিল ও ব্যয়বহুল কলকব্জার মধ্যে যানবাহন ও বিভিন্ন সম্পদ অন্তর্ভূক্ত ছিল, যেগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে যুদ্ধের কাজেও ব্যবহার করা যেত। বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগুলোকে বৈধতা দেওয়া সংশ্লিষ্ট সকল মতাদর্শিক গঠনের মধ্যে কিছুমাত্রায় তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় রাখা হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি সত্য। একই কারণে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র যে শ্রেণীস্বার্থের মতব্বরি করে তার বিপরীতে এর মতাদর্শিক গঠনের তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন অনেক বেশি থাকে এবং সেটা দরকারও, কারণ এর কাজই হলো শাসকচক্রের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ‘শ্রেণীসমূহ’-কে পুনর্বিন্যস্ত করা। একচেটিয়া পুঁজিবাদের সরাসরি ‘প্রতিনিধি’ কিংবা স্রেফ একটি ‘হাতিয়ার’ হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। নাৎসিরা কেবল এসব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার ছিল না বরং এসকল স্বার্থের জন্য স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিকারণ বিভিন্ন নীতিও অনুসরণ করত। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যগুলোর সাথে একচেটিয়া পুঁজিবাজী মতলবের মধুর মিলন ঘটেছিল।

ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে আমরা কোন রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করি? আমরা জানি যে, ফ্যাসিবাদের মৌলিক নীতিই হলো অনুকূল পরিবেশে এটি প্রচন্ড দ্রুততার সাথে বিকশিত হতে পারে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিগুলো হিটলারকে ক্ষমতায় এনেছিল সেটি আরো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুলভাবে আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে। কেউ যদি জার্মান ফ্যাসিবাদের উত্থান কেন ঘটেছিল তার উত্তর একশব্দে জানতে চায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ হবে এই উত্তর দেওয়া যে: স্ট্যালিন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের উদ্ভট ধরণের ভুল ব্যাখ্যাই এর সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল। ‘কুলীন শ্রমিক শ্রেণী’র তুলনামূলক প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া এবং প্রগতিশীল পুঁজিবাদের পতনের সাথে সাথে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়া একগুচ্ছ দিবাস্বপ্ন বলে আখ্যা দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে কিভাবে কাজ করে, সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সেটি বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদ’ ও ‘আকস্মিকতাবাদ’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সরল মনের এই ‘তত্ত্ব’টি সামাজিক গণতন্ত্রবাদী দলগুলো (বুর্জোয়া রাজনীতিতে অভ্যস্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর সমর্থনপুষ্ট) যে রাষ্ট্র নামক দেহের স্রেফ মলমূত্র নয় বরং সর্বহারা শ্রেণীকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্যে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ- এই সত্যকে অবহেলা করেছিল। ফ্যাসিবাদ ও সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনের স্রেফ দুটি ভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। ফ্যাসিবাদকে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে অন্তর্গত বিরোধসমূহের ফলেই তার পতন ঘটবে এবং ঘটনাক্রমে সেটি পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিরোধগুলোকেও শেষ সীমার দিকে ঠেলে দিবে। একইভাবে জার্মান ফ্যাসিবাদ সর্বহারা বিপ্লবকেও ত্বরান্বিত করবে। নাৎসিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা জার্মান সাম্যবাদীরা সত্যিকারের শত্রু সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদেরকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছিল। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে ‘সাংবিধানিক’ বিরোধীতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এবং জার্মান সাম্যবাদী দলকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদের সাথে কোনো জোটে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া জার্মান সর্বহারা শ্রেণী হিটলারের উত্থানের পূর্বে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক গণতন্ত্রবাদ বুর্জোয়াদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। পরবর্তীকালে সামাজিক গণতন্ত্রবাদের হাত থেকে বুর্জোয়াদেরকে রক্ষা করেছিল ফ্যাসিবাদ।
এসব কিছু থেকে রাজনৈতিক শিক্ষাটা ছিল পরিষ্কার। শুধুমাত্র একটি সংগঠিত এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনই কেবল ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে পারে। তবুও আজকের পশ্চিমা সর্বহারা শ্রেণী অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় গভীরভাবে বুর্জোয়া মতাদর্শিক দূষণের শিকার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর শক্তির ব্যাপারে অবশ্য অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ না করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। পুঁচকে বুর্জোয়া, কৃষক, বেকার এবং ছিন্নমূল গোষ্ঠী ও শ্রেণীর মতো যে-সকল শ্রেণী ও বর্গকে ফ্যাসিবাদ কাছে টানে, তাদেরকে সংগঠিত করা একটি প্রচন্ড দুঃসাধ্য কাজ। প্রথম পরাজয়েই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পতন ঘটার জন্য তারা প্রায়শই দায়ী থাকে। অন্যদিকে, কারখানার সুসংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ খুব কম সময়েই সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। নিজেদেরকে শ্রমিকদের দল বলে নাৎসিদের যে দাবি, সেটি কোনো নির্বাচনী পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসে নি। 1926 সালের সাধারণ ধর্মঘটে বিশাল বিপর্যয় এবং পরবর্তী বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় ভেঙ্গে পড়া মনোবল নিয়েও 1930 এর দশকে ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দারুণভাবে লড়ে গেছিল। (প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে ফ্যাসিবাদের আশ্রয় নিতে না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইংরেজ সর্বহারাদের এই ভেঙ্গে পড়া মনোবল। সর্বহারাদের রাজনৈতিক দূর্বলতাকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদেরকে অর্থনৈতিক শক্তি যুগিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাঙতে হয় ফ্যাসিবাদের। ব্রিটেনের বিপরীতে জার্মানিতে তখনো বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল)। ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো আজকের ব্রিটিশ ফ্যাসিবাদী দলগুলো এখনো প্রান্তিক, একদিকে কট্টর নাৎসিবাদ, অন্যদিকে নির্বাচনী মর্যাদা নিয়ে অর্ন্তদ্বন্দ্বে দ্বিধাবিভক্ত। এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কাজটি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট। ফ্যাসিবাদী সংগঠন, সমাবেশ ও প্রচারণাকে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের একটি বিষয়ে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি যেখানে জনপরিসরে খোলামেলা যাচ্ছেতাই বলার সুযোগ নাই। জনসম্মুখে কেউ জাতিগত ঘৃণা ছড়ালে সে অপরাধে তার শাস্তি হতে পারে- অন্তত এটি নিয়েও শুরু করা যায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একইসাথে এই মতাদর্শ উৎপাদনকারী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। বিপ্লবী নেতৃত্ব গঠনের সমস্যার সাথেও এই সংগ্রাম যুক্ত। ফ্যাসিবাদ যেমন প্রধান শত্রু নয়, একইসাথে এটি উপেক্ষণীয়ও নয়। বামপন্থীদের কিছু অংশের মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শব্দের আবেগমূলক এবং অসতর্ক ব্যবহার যদি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধোঁয়াশাও হয়ে থাকে, তবে এটি আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ফ্যাসিবাদ খুব বেশি অষ্পষ্ট নয়।



