অরাজ
আর্টওয়ার্ক: মেড ইন বাংলাদেশ শিল্পী: ফারহানা সূত্র: ফেসবুক
প্রচ্ছদ » ম্যানুফ্যাকচারিং ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি

ম্যানুফ্যাকচারিং ‘স্টে হোম’ রিয়ালিটি

  • বাধন অধিকারী ও মোকাররম রানা

যখন এই নিবন্ধ লিখতে বসেছি, ততক্ষণে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশে। এই ভাইরাস সীমানা আর কাঁটাতারে ঘেরা জাতিরাষ্ট্র মানেনি। কল্পিত চাকচিক্যের ম্যারিকা-ব্রিটেন মানেনি। পবিত্রভূমি মক্কা-মদিনা মানেনি। হিন্দু-মুসলমান-মুসলিম-খ্রিস্টান-সেমিটিক-অ্যান্টিসেমিটিক মানেনি। এই ভাইরাস সাদা-কালোও মানেনি। মানেনি ধনী-গরীব। ব্রিটিশ প্রধামন্ত্রী বরিস জনসন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী, বাংলাদেশের দুদক পরিচালক কিংবা গার্মেন্টস মালিক কিচ্ছু মানেনি। এই ভাইরাস আঘাত করেছে নির্বিশেষে, প্রজাতি হিসেবে মানুষকে।

আর্টওয়ার্ক: করোনা ফোবিয়া
শিল্পী: মাহমুদ আব্বাস
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

এই প্রবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে, ততক্ষণে করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ। বিশ্বব্যপী আক্রান্ত করেছে ২০ লক্ষাধিক মানুষকে। বাঁচাতে পারছে না কেউ। জনগণকে ধোঁকা দিতে গরুর মূত্র খেয়ে ও খাইয়ে একাকার করেছে ভারতের গেরুয়াধারীরা। লাভ হয়নি। কাজে আসেনি ধর্মব্যবসায়ী ওয়াজকারীদের দেওয়া সমাধানবটিকায়। বিজ্ঞান/চিকিৎসা বিজ্ঞানও কোনও ইমিডিয়েট সমাধান হাজির করতে পারেনি। অর্ধশতাব্দী আগে চাঁদে পা দেওয়া মানুষ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করা মানুষ, তথা ২১ শতকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল পৃথিবীর মানুষকে স্তব্ধ-স্থির-হতভম্ব করে দিতে সমর্থ হয়েছে এই অদৃশ্য অণুজীব।  

আসুন তো বন্ধুরা, প্রশ্ন করি ক্ষমতাশালীদের। কীসের এতো গর্ব তাদের? কীসের এত অহঙ্কার। কোথায় গ্লোবাল ভিলেজ আর কোথায় মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন? কোথায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর কোথায় জ্ঞানের উৎকর্ষ? মহাকাশ জুড়ে যে মানুষের সৃজন-সম্ভাবনা; সেই মানুষ চোখে দেখা যায় না- এমন একটা ভাইরাসের কাছে এভাবে আত্মসমর্পিত বাস্তবতা উদযাপন করছে! কোথায় গেল সব অহম?  

ঠিক কোথায় থেকে ভাইরাসটি উহানে এলো, তা এখনও সুনিশ্চিত নয়। তবে একটি বন্যপ্রাণীকে এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। এটি হলো প্যাঙ্গোলিন। বাংলাদেশে একে সম্ভবত বনরুই নামে ডাকা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চীনের বাজারে চোরাই পথে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা এই প্রাণীটির দেহে এমন একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে যা কোভিড নাইনটিনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।তারা মনে করছেন, বাদুড়ের শরীর থেকে প্যাঙ্গোলিনই মানুষের দেহে করোনা এনেছে।

বিজ্ঞানীদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে নিছক প্রাকৃতিক ব্যাপার হিসেবে চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। বলতে হয়, একটি অবৈধ বন্যপ্রাণীর মাংসের বাজার সিন্ডিকেট এই ভাইরাসকে আমাদের পরিসরে মহামারী আকারে হাজির করেছে।

বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যাঙ্গোলিন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চোরাই পথে পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটা খাদ্য হিসেবে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি ব্যবহৃত হয় ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির জন্য। ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে প্যাঙ্গোলিনের গায়ের আঁশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং এর মাংসও চীনে একটি উপাদেয় খাবার বলে গণ্য করা হয়।

খবরে দেখেছি, বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, বন্যপ্রাণীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আমাদের শরীরে ভর করার চরম ঝুঁকি থাকে। প্রাণসংরক্ষণবাদীরা বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা বন্ধ করতে বলছেন।  তবে বাজার তো থামবে না। কেনা-বেচাই তার টিকে থাকার শর্ত। টেকার স্বার্থেই সে এইসব জীবাণুবাহী প্রাণীর মাংস বিক্রির বৈধ/অবৈধ নেটওয়ার্ক নিরন্তর রাখে। আর বাজার ব্যবস্থার দায় এসে পরে সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতির ওপর। 

নব্য উদারবাদী উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা কী করে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্য ভূমিকা পালন করে, তা নিয়ে জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস বলেন, মহামারীর সময় সবচেয়ে বিপদজনক জিনিসটা হল ব্যর্থতাবা বলা বাহুল্যএটি অস্বীকার করা যে প্রত্যেক নতুন কোভিড-১৯ আসলে অভিন্ন ঘটনা। ভাইরাসগুলোর ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর মুনাফামুখিতা। যদি কেউ গবেষণা করতে চান যে ইদানিং সব ভাইরাস কেন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে তাহলে তাকে অবশ্যই কৃষির শিল্প-মডেল ও পশুসম্পদের উৎপাদন সম্পর্কে গভীর ভাবে জানতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে খুব কম সংখ্যক রাষ্ট্র ও কম সংখ্যক বিজ্ঞানীই এটি করতে ইচ্ছুক। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক প্রতিবেশকে প্রতিস্থাপনকারী পুঁজির নেতৃত্বাধীন কৃষি এমন সব পদ্ধতিতে তার কাজকর্ম চালায় যা ভাইরাসগুলোকে মারাত্মক ক্ষতিকারক ও সংক্রামক ফিনোটাইপ এ বিবর্ধিত করে। বলতে গেলে আপনি কোন মারাত্মক রোগ তৈরি করতে চাইলে এর চেয়ে ভালো  সিস্টেম আশাই করতে পারবেন না।

তো যে সংখ্যালঘু অংশ রাষ্ট্র ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, তারা সবসময় অন্যের ওপর দুর্যোগ চাপিয়ে দিয়ে ফায়দা তুলতে চায়। নিজেরা থাকতে চায় সুরক্ষিত। এবার তা হয়নি। করোনা ক্ষমতাধরদের সুরক্ষাবলয় ভেদ করে ঢুকে পড়েছে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফখণ্ড গলে মাটির নিচ থেকে বহু অজানা ভাইরাস বের হয়ে আসছে বলেও খবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা  তারমানে করোনাই শেষ কথা নয়। আরও বড় বড় বিপদ সামনে। সে কথা আপাতত থাক। আমরা বরং বুঝতে চেষ্টা করি, কেন ছড়িয়ে পড়তে পারলো করোনা? কেন আমাদের একুশ শতকের জ্ঞান-বিজ্ঞান-অগ্রগতি-ক্ষমতা-দম্ভ সব পরাস্ত হলো?

নন্দিত মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি বলছেন, করোনা ভাইরাসের এই বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধ করা যেত, তথ্যউপাত্ত হাতের কাছেই ছিল, এমনকি মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আগেই ২০১৯-এর অক্টোরবরেও এটা বেশ পরিচিত ছিল। এধরনের সম্ভাব্য বৈশ্বিক মহামারির দুনিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্টে লেভেল সিমুলেশানের মাধ্যমে করা একটি বড় মাত্রার সিমুলেশান আমাদের হাতে ছিল। কিন্তু কিছুই করা হয়নি, এখন এই সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। যে সমস্ত তথ্যউপাত্ত নিয়ে তারা (যারা লেভেল সিমুলেশন করেছিলেন) সচেতন ছিলেন সেগুলোর দিকে আমরা মনোযোগ দেইনি, ৩১ শে ডিসেম্বর চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অজানা কারণে ঘটা নিউমোনিয়ার মতো লক্ষণগুলো নিয়ে সচেতন করে। এক সপ্তাহ পরে, কিছু চীনা বিজ্ঞানী একে করোনা ভাইরাস বলে শনাক্ত করেন, এছাড়াও তারা এর অণুক্রম তৈরি করে সারা দুনিয়াকেই জানান, ততক্ষণে ভাইরোলজিস্ট ও অন্যান্যরা যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টটি পড়েছে, তারা জেনে গেছে যে এটা করোনা ভাইরাস এবং একে মোকাবিলা করতে হবে কীভাবে।

চমস্কি বলছেন, আমাদের পৃথিবীটা ক্ষমতাশালীরা যেভাবে পরিচালনা করছে, এর যে পরিচালনাকাঠামো, সমস্যাটা সেখানেই। মানে সমস্যাটা গণতন্ত্রহীনতার। আমিও তাই মনে করি। নয়া উদারনীতিক বাজারব্যবস্থা ও তার পাহারাদার জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার এই বিশ্বকাঠামোই পৃথিবীর ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে মানুষের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে।

নব্য উদারবাদী পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে দুনিয়াজুড়েই উন্নয়নতত্ত্ব আর মানুষের বিপন্নতার বাস্তবতা যেন সমান্তরাল। অন্ধ বাজার মুনাফা ছাড়া আর কিছুই দেখতে সক্ষম নয়। সে কারণেই এই যুগেসোশ্যাল ডারউইনিজমর রমরমা; যোগ্য হলে টিকে থাক, নয়তো ধ্বংস হও। বাজার অর্থনীতি সবকিছুকে ব্যবসায়ের উপজীব্য করতে করতে এখন এসে আঘাত তীব্র করেছে প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের ওপর। অসংখ্য-অগণন প্রাণের আধার জল-জঙ্গলকেও মুনাফার উপজীব্য করে তারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিয়েছেন হুমকির দিকে। মাতৃদুনিয়াকে (মাদার আর্থ) কার্বন মচ্ছবে আচ্ছাদিত করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত  দুর্যোগকেও তারা হাতিয়ার করেছেন মুনাফার। নওমি ক্লেইন নামের একজন কানাডিয়ান লেখক এই পরিস্থিতিকে বেশকিছুদিন আগেই তার এক বইতেডিজাস্টার ক্যাপিটালিজমর যুগ আখ্যা দিয়েছেন। 

আর্টওয়ার্ক: উইদাউট একসেপশন
শিল্পী: মাজেগ
সূত্র: কার্টুন নেটওয়ার্ক

বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণাও আছে, তারাই জানেন, অন্যসব প্রজাতি আর প্রতিবেশকে ধ্বংস করে মানুষ পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের এই পৃথিবী হলো এমন এক স্থান, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়েই জৈব, অজৈব পদার্থ ও বিভিন্ন জীবসমন্বিত এমন প্রাকৃতিক একক যেখানে বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের সঙ্গে এবং তাদের পারিপার্শ্বিক জৈব ও অজৈব উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে একটি জীবনধারা গড়ে তোলে। তাই জল-জঙ্গলকে দখলে নিয়ে বাস্তু প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে টিকে থাকার প্রচেষ্টা একটা উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে অন্ধ বাজার এসব বোঝে না। বোঝে না মুনাফাবাজ করপোরেশন আর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। বাজার কেবল মুনাফাই বোঝে। মুনাফার লোভে পৃথিবী ধ্বংসে তার কোনও আপত্তি নেই। মুনাফার লোভে যেমন বন্যপ্রাণীর ভেতর দিয়ে ভয়াবহ সব রোগ  আসার আশঙ্কা জেনেও তার বাজার বন্ধ হয় না। এভাবেই তো করোনারা আসে। মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষমতাশালী মানুষের এই অপকর্মের দায় নিতে হয়, সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতিকে, এমনকী অপরাপর প্রাণ ও প্রকৃতিকেও।

করোনার বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রেও আমরা উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে বাজার রক্ষার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি শুরুর দিকে। বিরল ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে ভয়াবহ আক্রান্ত দেশগুলোর সবাই মানুষের জীবনকে গুরুত্ব না দিয়ে, তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনারই অংশ হিসেবে টেস্ট-লকডাউন-কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গেছে। কারণ লকডাউন-কোয়ারেন্টিন মানেই বাজার ব্যবস্থার অচলতা। এই বিশ্বব্যবস্থা মানুষের চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আর তাই বাজারের অবাধ সরবরাহ ব্যবস্থা অটুট রাখতে সে জীবাণুকে ছড়িয়ে পড়তে দেয় অনায়াসেই।

তবে একসময় তো থামতে হয়। থামতে হয়েছে সবাইকেই। যখন ক্ষমতাশালীরা দেখতে শুরু করেছে, কেবল গরীব মানুষ নয়; এভাবে তাদের নিজেদের তৈরি করা রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য সবকিছু ভেঙে পড়তে পারে। এখন তাই সব ক্ষমতাশালীরা লকডাউন আর কোয়ারেন্টিন প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মতি আদায় ও বলপ্রয়োগ করছে। মানুষকে ঘরে রাখতে প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি চলছে র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় দমন প্রক্রিয়া। করোনা মহামারিকে অনিবার্য করে তোলার মধ্য দিয়ে এই জাতিরাষ্ট্র আর বাজারব্যবস্থা মানুষকে নির্ভরশীল করে তুলতে চাইছেঘরে থাকার জীবনব্যবস্থায়। একেই আমরা নাম দিয়েছিম্যানুফ্যাকচারিং স্টে হোমরিয়ালিটি।  বিশ্ববাস্তবতাকে সরিয়ে রেখে আমি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এইরিয়ালিটিপ্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে হাজির করার চেষ্টা করব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরপর তিন মেয়াদ শাসনক্ষমতায় থাকা এই সরকারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদে ক্রমাগত রাষ্ট্র সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করেছে। নির্বাচনতন্ত্রের নিয়মটুকুও না মেনে জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকারটুকুও হরণ করে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে এই সরকার ক্রমাগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও বিরোধী দমনের পথ বেছে নিয়েছে। এই সরকারমুক্তিযুদ্ধের চেতনার নিজস্ব সংজ্ঞা নির্মাণ করে, ইতিহাসের একমুখী কট্টর জাতীয়তাবাদী ইতিহাস নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ সংক্রান্ত বাদবাকী ভাষ্যকে অস্বীকার করতে চায়। আর তাদের কথিত সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাদবাকি চিন্তাধারার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে বিরোধী মত দমনের চূড়ান্ত বাস্তবতা সৃষ্টি করা হয়। শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় যাবতীয় ভিন্নমত। সে কারণেইমুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতকমা জুটে যায় যে কারও, কেউ প্রকৃতি বিনাশী উন্নয়নের সমালোচনা করুক, কেউ সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্র সরকারকাঠামোর সমালোচনা করুন, আর সরকারের নির্বিচারি গুম-খুন-ক্রসফায়ার-আটক-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলুক; সবাইমুক্তিযুদ্ধবিরোধীআখ্যা নিয়ে দমনপীড়নের শিকার হবে। 

বস্তুত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারের এ সংক্রান্ত কোনও প্রস্তুতিই বলতে গেলে ছিল না। তারা ব্যস্ত ছিলমুজিববর্ষউদযাপনে। বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তবে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতায় আমরা কেউ প্রশ্ন করতে পারিনি, এই ভূখণ্ডের মানুষের সাম্য-মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের যে সাধারণ সংকল্পের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে যে শেখ মুজিব অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন, সেই বাংলাদেশের পক্ষে এই উৎসবের ভূমিকা কী ছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সম্মিলিত সংকল্প ভাষা পেয়েছিল শেখ মুজিবের কণ্ঠে, নিঃসন্দেহে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক, এই জনগোষ্ঠীর নিরন্তর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তিনি এক অপরিহার্য নাম; তবে এই সরকার তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তর করে; ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন এক প্রতীকে রূপান্তর করে তার স্তুতি/মাহাত্ম্যের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। 

আর্টওয়ার্ক: আতশবাজি
শিল্পী: তীর্থ
সূত্র: তীর্থ

অনেকেই মনে করেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার নেপথ্যে মুজিববর্ষই মূল কারণ। তবে তা যথাযথ নয়। সরকারের ব্যর্থতায় মুজিববর্ষের ভূমিকা থাকতেই পারে, তবে এমন নয় মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রশ্ন না থাকলে আমরা করোনা-মোকাবিলায় খুব সফল হয়ে যেতাম। বস্তুত আমাদের ব্যর্থ হওয়ার সব ধরনের শর্ত হাজির রয়েছে আমাদের রাষ্ট্র ও শাসনকাঠামোর মধ্যে।

সরকারের আত্মপ্রচারের আরেক প্রপঞ্চ উন্নয়ন। উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প দিয়েই আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির বারোটা বাজানো হচ্ছে প্রতিদিন। প্রধানমন্ত্রী একদিকে কৃষি জমি রক্ষার কথা বলছেন, আরেকদিকে সেইসব জমি নষ্ট করে তোলা হচ্ছে উন্নয়নের ঢেউ। নিজেদের কথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে অবস্থান নির্মাণ, স্বাধীনতাবিরোধী উন্নয়নবিরোধী পক্ষ নির্ধারণ করে বাকিদের আলাদা করা, তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত কিছুর দায় চাপানো আর তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের বলপ্রয়োগ ও সম্মতি উৎপাদনের মেশিনগুলো নিয়ে নেমে পড়ে বিরোধী দমনকে দিনকে দিন নিরঙ্কুশ করে যাচ্ছে এই সরকার। এক ব্যক্তির নামে চলছে দেশ। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিতে গিয়ে প্রায়শই ভুল করে বলেন, ‘আমরা এটা করে দিয়েছি, ওটা করে দিয়েছি। এটা দিচ্ছি ওটা দিচ্ছি।’  তিনি ভুলে যান, তার সরকার ব্যবস্থাপনা করেছে মাত্র। যা করেছেন, যা দিয়েছেন; তার সবটাই হয়েছে জনগণের টাকায়, যাদের প্রজাতন্ত্রের মালিক হওয়ার কথা ছিল! তবে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্র সে কথা মনে রাখে না। সে কারণেই ত্রাণের বস্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার লিখে দিতে একটুও  দ্বিধা করে না তাদের সামন্ত মনন। 

আমাদের বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনায় বাংলাদেশে করোনাকে নিরঙ্কুশভাবে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে তিন ধাপে। প্রথমত, বিমানবন্দর অরক্ষিত রাখা ও দেশে ফেরা প্রবাসীদের যথাযথ কোয়ারেন্টিন না করা। দ্বিতীয় ধাপে গণপরিবহন বন্ধ না করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে করোনাকে ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া। এবং তৃতীয়ত, গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকেরদাসযুগের আচরণর বিরুদ্ধে কোনও অবস্থান না নেওয়া। 

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, “সবাইকে কেয়ারফুল থাকতে হবে। বিশেষ করে এয়ারপোর্ট এবং পোর্টে স্পেশাল কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে আমাদের মধ্যে বিস্তার না ঘটতে পারে। চীন বা হংকং থেকে যেসব প্লেন আসবে সেগুলোতে বিশেষ নজর রাখতে হবে। চীনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয় এমন পোর্টে বিশেষ নজর রাখতে হবে।সচিব জানান, কোনোভাবেই যেন করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে আসতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে করোনাভাইরাস নিয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভা কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। জানান, চীন থেকে আসা বাংলাদেশিদের আশকোনা হজ ক্যাম্পেকোয়ারেনটাইনকরে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের থাকা-খাওয়াসহ সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে যারা বাংলাদেশে যারা আসছেন, তাদেরও যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।’ 

কেমন ছিল চীনফেরতদের সেই কোয়ারেন্টিন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল একটি কামরার মেঝেতে সারি সারি বিছানা পাতা। এই বিছানাগুলোই ছিল চীন ফেরতদের কোয়ারেনটিনে থাকার ব্যবস্থা। এদের একজন ছিলেন ফারজানা ইয়াসমীন। পিএইচডি করতে  স্বামী সন্তানসহ চীনে গিয়েছিলেন। ফারজানা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “চীন থেকে আসার জন্য উদগ্রীব ছিলাম আমাদের বাচ্চাদের জন্য। কিন্তু এখানে এসে দেখি বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। বড়রা সারাক্ষণ মাস্ক পড়ে থাকতে পারে কিন্তু বাচ্চারা তো পারে না,” ইয়াসমিন বলছেন, “কোয়ারেন্টাইন তো করা হয় আলাদা আলাদাভাবে। এখন লোকের সংস্পর্শে এসেই যদি এরা কোয়ারেন্টাইন করে তাহলে এটা কি হলো ?একই রুমের মধ্যে আমরা গ্যাদারিং করে পড়ে আছি। আমাদের রুমেই ৪০ থেকে ৫০ জন হব। এই রুমেই আছে ৮টা পরিবার। এদের মধ্যে বাচ্চারাও আছে। আবার ব্যাচেলর আছে,” ফারজানার মতে, এর চেয়ে তো চীনে থাকাটাই ভাল ছিল।

চীনের উহান থেকে ফেরা আরেকজন শামীমা সুলতানা জানান,কোয়ারেন্টাইন বলতে যা বোঝায় সেটা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন রাখা। তো সেটাতো এখানে দেখছি না,” “কালকে থেকে এ পর্যন্ত যেটা দেখলাম তাতে আমার মনে হচ্ছে যে অব্যবস্থাপনার একটা বিষয় আছে। কাল থেকে যে খাবারগুলো আসছে সে খাবারগুলোর প্যাকেটও এখনো পড়ে আছেরাকিবুল তুর্য নামের একজন জানান, এক রুমে এক সাথে ৫১ জন রয়েছেন তারা। হজ ক্যাম্পের মোট তিনটি ফ্লোরে রাখা হয়েছে চীন ফেরত বাংলাদেশিদের। এরমধ্যে তিনি যে ফ্লোরে রয়েছেন সেখানে তিন রুম রয়েছে। তিনি জানান, তিন রুমের জন্য দুটি টয়লেট আর দুটি ওয়াশরুম। রয়েছে পানির সংকটও। তবে তুর্য বলেন, একই রুমে যদি গণরুমের মতো ৫০ জন করে থাকতে হয় তাহলে বাংলাদেশে এসে লাভটা কী হলো।কারো মধ্যে যদি করোনাভাইরাস থেকে থাকে তাহলে সেটা সবার মধ্যেই সংক্রমিত হবে। কারণ সবাই এক সাথে আছে। এটারই ভয় পাচ্ছি,” তিনি বলেন। 

এদের মধ্যে কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে দেশে ফেরার পর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয় নি। ভেতর থেকে কয়েকজন টেলিফোনে জানান, দেশে তাদের কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। এমনকি মেডিকেল টিমও কাছে যেতে চায় না। তাদের মধ্যে যারা ডাক্তার আছে তাদের দিয়েই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন শেষে চীন ফেরত এই প্রবাসীরা যার যার বাড়িতে ফিরে যান। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল করোনা ঠেকাতে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের এই তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশফেরত সব যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ২১ জানুয়ারি থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। এদিকে, ১০ মার্চ  দেশের একটি সংবাদমাধ্যম  জানাচ্ছে,শাহজালাল বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের পরীক্ষার জন্য সচল থাকা সর্বশেষ স্ক্যানারটিও অচল হয়ে পড়েছে । শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিআইপি যাত্রীদের জন্য বসানো স্ক্যানারটি সচল থাকলেও বিদেশফেরত সাধারণ যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে  হ্যান্ডহেল্ড থার্মোমিটার দিয়ে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন,আগের স্ক্যানারগুলোই তো নষ্ট। শাহজালাল বিমানবন্দরে তিনটি থার্মাল স্ক্যানার রয়েছে। এর মধ্যে দুটি নষ্ট।তিনি বলেন, ‘নতুন থার্মাল স্ক্যানার বসানোর কথা বলা হলেও আমরা সেগুলো পাইনি। তা ছাড়া সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানারগুলো আগে থেকেই নষ্ট হয়ে আছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।

পাঠক, খেয়াল করে দেখুন, বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীদের দেশে ফেরার স্রোতের  মধ্যেই কয়েক দিন ধরে  প্রধান বিমানবন্দরটির তিনটি স্ক্যানার মেশিনের মধ্যে দুটিই অচল হয়ে পড়েছিল। যদিও স্ক্যানার নষ্ট থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ার দিন, ১০ মার্চেই বিমানবন্দরগুলোতে নতুন স্ক্যানার বসানোর খবর প্রকাশিত হয়। একই খবরে জানানো হচ্ছে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের স্ক্যানারগুলো ২১ জানুয়ারি থেকে জারি করা বিশেষ সতর্কতার আগেই নষ্ট ছিল।

অভিযোগ উঠেছে, বিদেশফেরত বিপুল পরিমাণ যাত্রীকে কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে ছাড়া হয়েছে। এদের মধ্যে যাদেরহোম কোয়ারেন্টিনেথাকার কথা ছিল তাও যথাযথভাবে হয় নি। ১২ মার্চ বিবিসি তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে বিদেশ থাকা আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশটির ২০টি জেলায় প্রায় দুইশো জনকে নিজ নিজ বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় হোম কোয়ারিন্টিনে রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, গত প্রায় দুই মাসে চীন-ইতালিসহ ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সাড়ে পাঁচ লাখের মতো বাংলাদেশি দেশে এসেছেন। তাদের বেশিরভাগই কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ঢাকায় বিমানবন্দর পার হয়ে গেছেন।” 

বিবিসির ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়,ইতালি থেকে একজন প্রবাসী ঢাকায় আসেন ১২দিন আগে, গত ২৯শে ফেব্রুয়ারি। তিনি ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে আসেন। তিনি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি শরিয়তপুর জেলায় তার গ্রামের বাড়িতে যান। এই প্রবাসী বলছিলেন, যদিও তিনি সুস্থ রয়েছেন, কিন্তু কোনো পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের মধ্যে না পড়ায় তার নিজের মাঝেই এক ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।২৯শে ফেব্রুয়ারি রাত ২টায় আমি ঢাকায় বিমানবন্দরে নেমেছি। এখানে আসার পর একটা ফরম দিছে। সেটা পূরণ করে জমা দেয়ার পর আর কিছুই আমাকে বলেনি। শুধু ইমিগ্রেশন যখন পার হই, তখন পাসপোর্ট দেখে বললো, আপনার কি পরীক্ষা হয়েছে? আমি বললাম না। তখন ইমিগ্রশনে বললো, পরীক্ষাটা হলে ভাল হতো। এই বললো। আর কিছুই না। তারপর পাসপোর্টে সিল মেরে দিলো। আমি এসে পড়লাম।তিনি আরও জানিয়েছেন, তিনি যে ফরমটা পূরণ করেছেন, তাতে কোন দেশ থেকে এসেছেন, সেই দেশের নাম এবং পাসপোর্ট নম্বর-এসব লিখতে হয়েছে।এই প্রবাসী বাংলাদেশি বলছিলেন, ১২ দিন ধরে দেশে এসে তাকে কেউ পর্যবেক্ষণ করেনি বা সরকারের কোনো বিভাগ থেকে তাকে কোনো পরামর্শও দেয়া হয়নি।

এর পরে, ১৪ মার্চ ১৪২ জন ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশে আসেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোয়ারেন্টিন করার জন্য আশকোনা হজ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাভাবিক ভাবেই, চীন থেকে ফেরাদের অভিজ্ঞতার পর ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে এই প্রবাসীরা  হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টিনে থাকতে অস্বীকৃতি জানান। তারা হজ ক্যাম্পের ভিতরে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে থাকেন। 

ইতালিফেরত এক ব্যক্তি ক্যাম্পের গেটে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের রোমে পরীক্ষা করা হয়েছে,দুবাইয়ে আরেক দফায় পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে করোনাভাইরাসের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশে আসার পর এখন এখানে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। তিনি বলেন, এখানে তাঁরা অমানবিক অবস্থার মধ্যে আছেন। শিশুরা আছে। কিন্তু কোনো খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁরা অভিযোগ করেন, হজ ক্যাম্পে আনার পর তাঁদের নিয়ে কর্তৃপক্ষ কী করতে চায়, তা বলছে না। শুধু পানি ছাড়া তাঁরা কোনো খাবার পাচ্ছেন না। তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, তাঁরা বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকতে চান।

কোয়ারেন্টিনের দুরাবস্থা দেখে প্রবাসীরা যখন বিক্ষোভ করলেন,হজ ক্যাম্পে অবস্থান করতে অস্বীকৃতি জানালেন তখন  আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত আপত্তিকর ভঙ্গিতে  উলটো দোষারোপ করলেন সেই প্রবাসী নাগরিকদেরকেই। এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের সামনে তিনি বললেন,প্রবাসীরা দেশে এলেই নবাবজাদা হয়ে যান। তারা কোয়ারেনটাইনে যাওয়ার বিষয়ে খুব অসন্তুষ্ট হন। ফাইভ স্টার হোটেল না হলে তারা অপছন্দ করেন।প্রবাসীরা কি আসলেই ফাইভ স্টার হোটেল চেয়েছিলেন? দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে আসার পর সম্মান জনক কোয়ারেন্টিন চাওয়াটা কি খুব বেশি কিছু ছিল? শেষমেশ এই প্রবাসীরা নিজেদের বাড়িতেহোম কোয়ারেন্টনেথাকবেন এই শর্তে তাদের ছাড়া হয়। 

আসলে সরকারের কোনও যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি ছিল না কোয়ারেন্টিন করার। বিমানবন্দর অরক্ষিত রেখে এবং বিদেশফেরত নাগরিকদের জন্য যথাযথ কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা না করে এভাবেই করোনাকে দেশে ঢোকানো হয়।  

৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরেও ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নি। স্কুল-কলেজ বন্ধের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা স্কুলে থাকলেই বরং ভালো। স্কুলে হাত ধুতে হয়, কীভাবে পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকা যায়, করোনাভাইরাস প্রতিরোধের উপায় শিখছে। বাড়িতে গেলে তারা ঘুমাবে এবং খারাপ কাজ হবে।এ কে মোমেন বলেন, ‘তবে এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সতর্ক। প্রতিনিয়ত নজর রাখা হচ্ছে। যখন প্রয়োজন হবে এবং কোনোইন্ডিকেশনপাওয়া যাবে, তখন অবশ্যই স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হবে।১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জনগণকে দায়ী করেন। বলেন, আমাদের দেশের মানুষ খুব অসচেতন। তারা যেখানে সেখানে থুতু ফেলছে। টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করে যেখানে সেখানে ছুড়ে ফেলছে। বাইরে থেকে ঘরে এসে হাত না ধুয়ে ছেলেমেয়েকে স্পর্শ করছে, বিভিন্ন কিছু করছে।তিনি বলেন, ‘যে যে কাজগুলো করলে তার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় সে কাজগুলো করবেন না। যেখানে সেখানে কফ, থুতু ফেলবেন না। হাঁচিকাশি দিলে রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করবেন। নিজে ভালো থাকবেন, অপরকে ভালো রাখবেন।

অনেকে ধারণা করছিলেন যে ১৭ মার্চ মুজিব বর্ষের মূল অনুষ্ঠান পালনের জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দেয়া হচ্ছে না। শেষমেশ, ১৬ তারিখে এসে ১৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে থাকা সাধারণ ছুটির দিনে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হতে হয়নি। প্রথম জন শনাক্ত হওয়ার ১০ দিন পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামাঞ্চলমুখী শিক্ষার্থীদের স্রোত ভাইরাসটির কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটানোর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন হলো, দেশে করোনা আক্রান্ত প্রথম জন  শনাক্ত হওয়ার পরেই  যেখানে মার্চের  ৯ তারিখেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন সীমিত করা হলো সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি  বন্ধ ঘোষণা করতে ১৮ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হল কেনএই অপেক্ষা কি  বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী-অভিভাবক-সাধারণ মানুষের জীবনকে  হুমকির মুখে ফেলে দেয়নি? এরপর ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং ওইদিন থেকে গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে ছুটির আগে গণপরিবহন সচল পেয়ে মানুষ সড়ক-রেল-নদীপথে ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। দেশছুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। 

৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরেই সবেতন কারখানা ছুটির দাবি তুলেছিল গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এ নিয়ে শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান বিজিএমইএ-বিকেএমইএর মুখপাত্র হয়ে হাজির হয়ে এক বৈঠকে শ্রমপ্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান বলেন,  মিল-কারখানা বন্ধ করতে হবে এই চিন্তা যেন কারও মাথায় না আসে।

এরই মধ্যে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক কাতরভাবে বিদেশী বায়ারদের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও বার্তা দেন, যেন তারা তাদের অর্ডার বাতিল না করে, এবং যা উৎপাদন করা হয়েছে তা যেন তারা নিয়ে নেয়। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস বিস্তারের কারণে বাংলাদেশের ১০৮৯ গার্মেন্টের ১.৪ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে, এর ফলে এই ফ্যাক্টরীগুলোতে ১২ লাখ শ্রমিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। রুবানা হক তার ভিডিও বার্তায় বারে বারে পুরো গার্মেন্ট সেক্টরের ৪১ লক্ষ শ্রমিকের কাজ হারানো, না খেয়ে থাকা, এমনকি  সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন।

শ্রমিকদের অসন্তোষ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সমালোচনায় এক পর্যায়ে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত আসে। তবে শ্রমিকদের ঢাকায় থাকার কোনও উপায় বর্তে দেওয়া হয়নি। স্বভাবতই তারা লাখে লাখে গ্রামে ফিরতে বাধ্য হয়। 

আর্টওয়ার্ক: আয়সোলোট
শিল্পী: তন্ময়
সূত্র: ফেসবুক

সরকারঘোষিত প্রথম দফার সাধারণ ছুটি ছিল ২৬ মার্চ থেক ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। সেই ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল  পর্যন্ত করতে বাধ্য হয় সরকার, সেটা পরিস্থিতিগত ভয়াবহতার কারণেই। তবে ৪ এপ্রিল গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তির ও শ্রমিকদের অনিচ্ছার মুখেও কারখানা খোলার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি কঠোর অবস্থান নেন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। রুবানা হক অত্যন্ত দম্ভভরে বলেন, শ্রমিকরা যেভাবে গ্রামে গেছে, সেভাবেই তাদের ফিরে আসতে হবে। কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার দায় বিজিএমইএ নেবে না। রুবানা বলেন, ‘আমরা কারখানা বন্ধ দিলাম লকডাউনের পর। এরপর শ্রমিকরা কীভাবে গ্রামে গেল? যারা যে প্রক্রিয়ায় বাড়িতে গেছে সেই প্রক্রিয়ায় আসবে। কাজ করবে না, আবার হাজিরাও উঠবে এটা তো হতে পারে না। দেশে আইনকানুন তো কিছু আছে।’ 

জীবিকা বাঁচানোর  তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আবার ঢাকায় ফিরতে শুরু করে।রাস্তায় কোন যানবাহন না পেয়ে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে তারা  ঢাকায় ফিরতে শুরু করেন।দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পায়ে হেঁটে,পণ্যবাহী ফাঁকা ট্রাকে করে,পিক আপ ভ্যানের ফাঁকা তেলের ড্রামের ভিতর লুকিয়ে ফেরি পার হয়ে,ইজিবাইকে চড়ে নৌকায় করে নদী পার হয়ে  কয়েক হাজার শ্রমিক ঢাকায় পৌঁছেন।

সরকারি নির্দেশনা ভেঙে শ্রমিকদের ভাবে ঢাকায় ফেরত আনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে কারাখানা খোলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয় একইদিনে। তবে ততক্ষণে ঢাকায় পৌঁছা শ্রমিকেরা আবার এক বিপন্নতার মুখে পড়তে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রের পুলিশ-সেনাবাহিনী মাঠে নামে তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে। 

এদিকে, বিজিএমইএর ফেসবুক পেজ থেকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে শ্রমিকদের ঢাকা ফেরত আনার দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়। 

এভাবেই কাঠামোগত হত্যার সম্ভাব্য শিকার এই প্রত্যেকটা মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নকে একইদিনে দুইবার হুমকিতে ফেলা হলো। প্রথমবার তাদের প্রত্যেককে সম্ভাব্য এক একজনসোর্স অফ ইনফেকশনবানিয়ে ঢাকায় আসতে বাধ্য করা হলো। দ্বিতীয় ধাপে তীব্র সমালোচনার মুখে তাদেরকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে এবার রাষ্ট্রের লাঠিয়াল বাহিনী নামছে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে ওরা ছুটে আসতে চাইছিলো কারণ না এলে এমনিই মরতে হবে না খেয়ে। অস্তিত্বের নিয়ম মেনে ওরা জীবিকা বাঁচিয়ে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে আসছিলো। 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে শ্রমিকদের জীবনকে এভাবে বিপন্ন করার নেপথ্য কারণ। কারণটা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত পোশাকখাতের প্রণোদনা। গার্মেন্টস মালিকরা সরকারের কাছে চেয়েছিল প্রণোদনা, কিন্তু তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে ঋণ। তাও আবার সেই ঋণের টাকায় শ্রমিকের বেতন দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও সৃষ্টি করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে, যা তারা দিতে অভ্যস্ত নয়। এই ঋণের টাকা গার্মেন্টস মালিকদের শোধ দিতে হবে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জসহ। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিলেন না গার্মেন্টস মালিকরা। তাই সরকারের কাছ থেকে ফের প্রণোদনা নেওয়ার কৌশল হিসেবে সাধারণ ছুটির মধ্যেও গার্মেন্টস কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গার্মেন্টস মালিকরা। নিঃসন্দেহে এই সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসের সবথেকে শক্তিশালী-কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার। তাদের সেই ক্ষমতা-শক্তি-কর্তৃত্বের সবটাই বিরোধী দমন, খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালা, শ্রমিক কিংবা দিন এনে দিন খাওয়া নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের ওপর নৃশংস ও গণবিরোধী কায়দায় প্রয়োগ হয়। তবে সরকারের কোলে বসে থাকা এই গার্মেন্টস মালিকদের নেতা, কিংবা সরকারকে উপদেশ দেওয়ার ভূমিকায় থাকা শেয়ার বাজারের চোর-বাটপার কিংবা ঋণখেলাপীদের বেলায়

এই ভয়াবহ করোনা বাস্তবতাতেও তাদের দিকে একটুও মানবিক দৃষ্টিতে তাকায়নি আধুনিক দাসমালিক রুবানা হকরা। তাইতো ১৬ এপ্রিল যখন সারাদেশকে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে, তখনও তাদের পাওনা বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করতে হয়েছে বুধবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে কমপক্ষে ৪০টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন৷ তারা করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই বিক্ষোভ করায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়৷ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা স্লোগান দেন, ‘‘পেটে মোদের ভাত নাই, করোনায় ভয় নাই৷’’ 

১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ২০১৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৪১ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে  আরও ১০ জনের। এ নিয়ে দেশে আক্রান্তে সংখ্যা ১৫৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ৬০ জনে। এদিকে দেশের বহু স্থানে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সারাদেশকে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। 

বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ছে না, আমরা কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই অনুধাবন করতে পারছি পরিস্তিতি কতো ভয়াবহ। আমাদের দুই লেখকের একজন পেশাগতভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদ তত্ত্বাবধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে নিজ অভিজ্ঞতায় দেখতে বাধ্য হয়েছি, বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতিকে অগ্রাহ্য করা দেশগুলোরই ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রক্ষমতা তার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে করোনা পরিস্থিতি আড়াল করার কাজে। অথচ আমাদের ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার পথটাই হলো স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি উন্মোচনের কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করা।

বিশ্বব্যাপী করোনা মোকাবিলার স্বীকৃত পথ যেখানে সম্ভাব্য আক্রান্তদের শনাক্ত করে বেশি বেশি টেস্ট করা, আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেখানে শুরু থেকে  ‘পরীক্ষা পরীক্ষা পরীক্ষার পথে না হেঁটে নাটুকে হেল্পলাইন সাজিয়ে রেখে করোনা হয়নি, করোনা হয়নি, করোনা হয়নিকরেছে সারাদিন। মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত তারা মোটে ২/৪ হাজার কীট নিয়ে বসে বসে তাঁ দিচ্ছিল। এদিকে ততদিনে আমাদের কারও বুঝতে বাকি নেই, এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে রাষ্ট্রীয় ছুটির আওতায় করোনা বাস-ট্রেন-লঞ্চে করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাস্তবায়নে নিয়োজিত। পরিস্থিতি আড়াল করতে গিয়ে তারা করোনাকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার স্পেস তৈরি করে দিয়েছে এভাবেই।

আর্টওয়ার্ক: ট্রখ
সূত্র: দিহাজ লিমাজ

আইসিডিডিআর হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের নিউস্পিক। তার সঙ্গে বেসরকারি মিডিয়াগুলো যুক্ত হয়ে সরকারের ট্রুথ মিনিস্ট্রির দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের সংবাদ রচনার পদ্ধতি আর ভাষাও তাদের প্রচারণা কৌশলকে বৈধতা দেয়। আমরা কেন লিখি বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত জন, মৃত্যু …জনের। কার ভরসায় লিখি? আইসিডিডিআর কিংবা সরকার? যারা এখনও পর্যন্ত ২০০০০ মানুষের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেনি? আমরা কেন অন্তত বলি না, ‘সরকারের টেস্টকৃত টি নমুনা থেকে জনের করোনা শনাক্ত’? কেন রাষ্ট্রের দেওয়া পরিসংখ্যানকেই আমরা চূড়ান্ত জ্ঞান করি? আমরা ব্রিফ্রিং শুনি। শুনে এসে নিজ নিজ হাউসে বসে তাদের জনসংযোগের কাজ করি। প্রশ্ন করি না। প্রশ্ন তুলি না। ক্ষমতাকে প্রশ্ন না করলে কীসের সাংবাদিকতা

রাষ্ট্রের ম্যানেজারদের কথা-কাজে টের পাওয়া গেছে, তারা করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর। মানুষ তাদের প্রতিটি ভূমিকার মধ্য দিয়ে টের পাইয়ে দিচ্ছে, এই রাত্রিকালিন ভোটের সরকারকে তারা একবিন্দুও বিশ্বাস করে না। এক ফোঁটা আস্থাও তাদের নেই সরকারের প্রতি। রাষ্ট্র আড়ালের পথ নিয়েছে। তবে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের বদান্যতায় বাড়ি বসে অফিস করতে পারা আমার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত সৌভাগ্যবানরা খুব দরকারে রাস্তায় বের হলেই দেখতে বাধ্য হচ্ছে, উৎকণ্ঠা আর মলিন মুখ নিয়ে খালি রিকশা নিয়ে ঘুরছে রিকশাওয়ালা, চোখে অসীম হতাশা নিয়ে ফেরিওয়ালা মৃদু গলায় গাইছে পণ্যের বিজ্ঞাপন। জেনেভা ক্যাম্প থেকে বিহারীরা আজ কাজী নজরুল ইসলাম রোডের উঁচু উঁচু দালান বাড়িগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে সাহায্য চেয়ে গেছে, আমাদের একজন তার প্রত্যক্ষদর্শী। কেবল করোনার বিস্তারকে অবিরত থাকতে দিয়েই নয়, সমাজের প্রিভিলেজড অংশকে ঘরে রেখে; দিনমজুর-বস্তিবাসী-শ্রমিকদের বিপন্নতা রুখতে কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীন এই সরকার গোপনে একটি গণমৃত্যুর মিছিল আয়োজন করছে। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই যে প্রান্তিক মানুষ হবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পেয়েও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সরকার সার্বিক পরিস্থিতিকে আজকের অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। ভয়াবহভাবে বিশ্বের আর সব আক্রান্ত দেশের মতো করে আক্রান্তের সংখ্যা গুনিতক হারে বাড়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। স্পষ্টত পদক্ষেপ ও প্রস্তুতির অভাবের কারণে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এখনও সরকার বলে যাচ্ছে তাদের হাতে পর্যাপ্ত পরীক্ষা কিট রয়েছে। সব রকম প্রস্তুতি রয়েছে। চিকিৎসাকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় পিপিই আছে। অথচ চিকিৎসাকর্মীরাও ক্রমাগত আক্রান্ত হতে শুরু করেছেন। ১৫ এপ্রিল সিলেটের ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ডাক্তারকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

ডা. মঈন উদ্দিন কোভিড পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন গত ৫ এপ্রিল। পরের দিনই তাকে সিলেটের শহীদ সামসুদ্দীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু, সেখানে ভেন্টিলেটরসহ আনুষাঙ্গিক সুবিধা না থাকায় স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রতিবাদ, এই চিকিৎসকের আকুতি ও তার পরিবারের  দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৮ এপ্রিল তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরদিনই তাকে নিয়ে আসা হয় সিলেট থেকে ঢাকাতে। ৯ এপ্রিল থেকে প্রথমে আইসিইউ ও পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাকে। আজ ভোরে তিনি মারা যান। তবুও বলা হবে, ডাক্তারদের সবরকম সুরক্ষার ব্যবস্থা করা আছে। তারা সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে কর্তব্য পালনে ভয় পেলে তাদেরকে দাঁড় করানো হবে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায়। কর্তব্যে অবহেলার দায়ে তাদেরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এলিট মধ্যবিত্ত শ্রেণী সরকারি প্রচারণার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ডাক্তারদের গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকবে। তবে আমাদের তো ভাবতে হবে, সুরক্ষা উপকরণ ছাড়া মারণ ভাইরাসের মুখে আপনাকে ঠেলে দিতে চাওয়া হলে আপনি কি যাবেন? যদি না যান, তাহলে ডাক্তারকে কেন যেতে বলবেন? তারা মানুষ নয়? তাদের মৃত্যু নেই?

ডাক্তারদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা হয়েছে জোরেশোরেই। দাম্ভিকতা প্রকাশ করে বিদেশ থেকে ডাক্তার আনতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজকে এসে সরকার যখন মৃত্যুর শিকার হওয়া ডাক্তারের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে; তখন  করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের ২৭ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন। এদের মধ্যে একটি হাসপাতালেই সংক্রমিত হয়েছেন ১৬ জন।

তবুও সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলতেই থাকবে, তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল তাই ডা. মঈনের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘একটা মানুষ একদিন মারা যাবে এটা জেনেই সে বেঁচে থাকে, মানুষ মারা যাবে, যাবেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন অক্ষম হাহাকার আমাদের সবকিছু চুরমার করে দেয়। একজন ডা. মঈন প্রথমে নিজ শহরে একটা ভেন্টিলেটর চেয়েছিলেন, তারপর এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছিলেন, তারপর চেয়েছিলেন নিদেনপক্ষে একটা আইইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। আর আমরাসম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলামতার এই চাওয়াগুলোকে অগ্রাহ্য করবার জন্য।’’

আর্টওয়ার্ক: রেসপন্ডার
শিল্পী: খালিদ আলবাহ
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

এইযে দেশজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব, সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকায় থাকা মানুষদের কোনও রকমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করা; সেই বাস্তবতা যখন প্রতিদিনের দৃশ্যমান বাস্তব; তখন ১৭ এপ্রিল ভিডিও কনফারেন্সে একজন ডাক্তার নারায়ণগঞ্জ জেলার জন্য করোনা পরীক্ষার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পিসিআর ল্যাব ও এন-৯৫ মাস্ক চাইলে প্রধানমন্ত্রী অবাক হয়ে যান! তবে তার এই অবাক হয়ে যাওয়া আমাদের অবাক করে না। 

কেবল সুরক্ষা সামগ্রী না দেওয়াই নয়, অগণতান্ত্রিক এই সরকার করোনা মোকাবিলায় জটিল আমলাতান্ত্রিক পথ-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে। যে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করবে, তাদেরকে করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপ নির্ধারণে যুক্তই করা হয়নি। কে না জানে, স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সুরক্ষিত না হয়, তাহলে তাদের জনস্বাস্থ্য গুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। আমরা বিপর্যয়ের চূড়ান্ত বাস্তবতায় গিয়ে হাজির হব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যেমন মানুষের মৃত্যুর দায় চীনের ওপরে চাপানোর সুযোগ আছে, আমাদের সরকারেরও সুযোগ আছে দায়টা ডাক্তারদের ওপর চাপানোর। 

কেবল ডাক্তার নয়, জনগণকে তারা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নিজেদের করোনা মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতির বিপরীত প্রান্তে। এখন সব দায় তাদের। বলা হচ্ছে ঘরে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। এভাবেই করোনাভাইরাসজনিত নতুন পরিস্থিতি আর এ সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাস্টে হোমর পক্ষে বলপ্রয়োগ সম্মতি আদায়ের প্রচেষ্টা চলছে জোরেশোরে। রাষ্ট্র তার চিরাচারিত নিয়মে এখানে ভাইরাসকে জাতীয় শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। আর ব্লেম গেইমের জন্য রেখেছে দেশের আপামর মানুষকে। রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় প্রচারণা যন্ত্রকে ব্যবহার করছে এটা বোঝাতে যে আমাদের বাঁচবার একমাত্র রাস্তা ঘরে থাকা। যারা মানছে না, মানতে চাইছে না তারা জাতীয় শত্রু করোনার দোসর।

স্টে হোমরিয়ালিটি বাস্তবায়নে সরকারের পুলিশ-সেনাবাহিনী কেবল বলপ্রয়োগ আর পেটাপিটিই করছে না। কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার তাদের ফেসবুক পাতায় ঘোষণা দিয়েছেন, কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন, তাহলে তাদেরকে আট ঘণ্টা পুলিশের সাথে বাজারে ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সিলেটের ছাতক উপজেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাউকে যদি কোন কারণ ছাড়াই কাউকে ঘরের বাইরে পাওয়া যায় তাহলে তাকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সেবা এবং এই রোগে মৃত ব্যক্তির দাফন কাজে নিয়োজিত করা হবে। গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লায় কার্যত লকডাউনের এই সময় মানুষকে বাড়িতে থাকার আর্জি জানাতে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ দলবদ্ধ হয়ে গান গেয়ে গেয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

‘‘হোম স্টেরিয়ালিটি বাস্তবায়নের আরেক পার্টনার করপোরেট মিডিয়া। কোথায় কে কোয়ারেন্টিন ভাঙল, কোথায় মানুষ একটু জটলা করলো, কোথায়হোম স্টেসফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তা দেখভাল করার দায়িত্ব নিয়েছে তারাও। ভূমিকা পালন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর আইসিডিডিআর-এর সহযোগী হিসেবে। সংবাদকর্মী স্বয়ং পোস্টার সাটিয়ে ফেসবুকে প্রোফাইল পিক দিচ্ছেআমরা আপনার জন্য সংবাদ পৌঁছে দেব, আপনারা আমার জন্য ঘরে থাকুনরয়েছেন সেলিব্রিটিরিাও। অভিনেত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিচ্ছেন, স্টে হোম। কাউকে ফোন করলেইদায়িত্বশীলআচরণ করার,ঘরে থাকার বার্তা দিচ্ছে গ্রামীন ফোন। বিচ্ছিন্নতার বার্তা প্রচারিত হচ্ছে সর্বত্র। বুদ্ধিজীবী বার্তা দিচ্ছেন, হোম কোয়ারেন্টিন, ‘সামাজিক দূরত্বরক্ষা করার। রাষ্ট্রের গণবিরোধী অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের দায় নিয়ে ঘরে থাকা এখন জনগণের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এখন যারা এসব বার্তা দিচ্ছেন, সমাজের সেই সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের জন্যস্টে হোমরিয়ালিটি সংকটের না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে ঘরে থাকারকর্তব্য’  পালন সম্ভব হয়ে উঠছে না কোনমতেই। রাষ্ট্র আদতে বড়লোকের বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে লকডাউন/কোয়ারেন্টিন বাস্তবায়ন করে। তারহোম স্টেরিয়ালিটিতে দেখেন; ফুডপান্ডা ঠিকই খবার সরবরাহ করে বাড়িতে। মধ্যবিত্ত ঠিকই গ্যাস-বিদ্যুতের বিল দেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়। জরুরি সরবরাহ ব্যবস্থা মানে যা জারি থাকে, সেটা মধ্যবিত্তের রিয়ালিটি। এই রিয়ালিটিতে ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা নেই, রাস্তায় বসা মুড়ি বিক্রেতা নেই।লকডাউনে ঢাকায় আটকে পড়া  বস্তিতে থাকা মানুষের ঘর ভাড়া জুটবে কী করে সে আলাপ নেই।  স্মার্টফোন কিংবা ইন্টারনেটবিহীন বিপুল সংখ্যক মানুষ কী করে সরকারি-বেসরকারি ডিজিটাল সেবা নেবে সেই প্রশ্ন নাই। ওদের যদি কেউ অসুস্থ হয়; কী করে খাবার কিনে খাবে নিজে রান্না না করে? ওদের যখন সব্জির দরকার হয় তখন কতোদূর যেতে হয়, সুপারশপে যাওয়ার সামর্থ যাদের নাই।

আর্টওয়ার্ক: হাঙ্গার
শিল্পী: তন্ময়
সূত্র: ফেসবুক

ক্ষুধার যন্ত্রণাভিক্ষার অভাবপর্যায়ের মতোও দাঁড়িয়েছে কোনকোন ক্ষেত্রে। নওগাঁ শহরে ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবন নির্বাহ করা সাবিয়া বেগমের একটি ছবি ও ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছেবিধবা সাবিয়া একসময় মানুষের বাড়িতে কাজ করে খেলেও এই ৭০ বছর বয়সে এসে আর পারেন না। তাই ভিক্ষা করে খান। তবে ভিক্ষারও আকাল পড়েছে। বিহারি কলোনির বাসিন্দা সাবিয়া তাই কলোনির মাঠে একটি টিনের ওপর নষ্ট ভাত শুকাচ্ছেন; সেটা চাল হয়ে গেলে আবার রান্না করে খাবেন।  সংবাদ প্রতিবেদন বলছে, শুধু সাবিয়া বেগম নন, ওই কলোনির প্রায় ২০-২৫টি পরিবারের একই অবস্থায় দিন কাটছে। করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের জীবন ধারণ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

এরইমধ্যে ব্রাকের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে,   করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে চরম দারিদ্র্য অবস্থা আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে, আর খাবার নেই প্রায় ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে। করোনা জরিপের তথ্য তুলে ধরে ব্র্যাক বলছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণাই নেই জরিপে অংশ নেয়া ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতার।

ব্র্যাক জানায়, করোনা মহামারিতে সরকারি ছুটি বা সামাজিক দূরত্বের কারণে ৭২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন অথবা তাদের কাজ কমে গেছে। আর ৮ শতাংশ মানুষের কাজ থাকলেও এখনও বেতন পাননি। অন্যদিকে মানুষের পারিবারিক আয় ৭৫ শতাংশের মতো কমে এসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ৮৪ শতাংশ, রংপুর ৮১ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগের ৮০ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে সবচেয়ে বেশি। আর করোনা প্রাদুর্ভাবে ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনও খাবারই নেই এবং ২৯ শতাংশের ঘরে আছে ১ থেকে ৩ দিনের খাবার।

আসলে কোনও গবেষণার দরকার হয় না। আপাত সুরক্ষিত বাসায় অফিস করার সুযোগ সম্বলিতহোম স্টেবাস্তবতা হঠাৎই নড়ে ওঠে সিগারেট বা নিত্য প্রয়োজনীয় কোনও জিনিস কিনতে খুব হঠাৎ বের হতে গেলে। মলিন মুখে খালি রিকশা নিয়ে ভয়ে ভয়ে ঘুরছে রিকশাওয়ালা, কখন আবার পুলিশের বাড়ি পড়ে পিঠে। সব্জির ভ্যান নিয়ে ক্লান্ত বিক্রেতা সস্তায় কেনার জন্য উচুঁ তলার মানুষের জন্য ডাক হাঁকছে। এরইমধ্যে কয়েকজন আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে মৃত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে অঙ্কে। প্রবল সব খবরের ভীড়ে তারা হারিয়ে গেছে অগুরুত্বপূর্ণ খবর হিসেবে। ক্ষুধার্ত মানুষ এক একজন সম্ভাব্য জীবাণু বাহক কিংবা আক্রান্ত হতে দ্বিধা না করে রাস্তায় নেমেছে মিছিল নিয়ে। রাষ্ট্রের সহযোগী শক্তি হয়েও সংবাদমাধ্যম ক্ষুধার খবর দিতে বাধ্য হচ্ছে।  

করোনাকালে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁতশ্রমিক আলম শেখের কারখানা। ক্ষুধায় কাতর শিশু বারবার খাবার চাইছিল তার কাছে। জোটাতে পারেননি বাবা আলম। খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকা সন্তানকে এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ধমক দেন । শিশুটি আত্মহত্যা করে  কেবল শিশু নয় আত্মহত্যা করেছেন এক বৃদ্ধও। 

রামপুরার একটি বস্তি এলাকার বাসিন্দা মাহমুদা আক্তার বাসাবাড়ির কাজ হারিয়েছেন, পরিবহন শ্রমিক স্বামীও বেকার। খাবারই জুটতে চাইছে না। শিশু সন্তানের দুধ কী করে জোটাবেন, তা নিয়ে শঙ্কিত। বিবিসিকে ওই নারী বলেন, “আমরা তো কারো কাছে হাত পাততে পারি না। স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই এখন ঘরে বসা। কাজ নাই। আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। সরকার যদি সাহায্য না করে তাহলে বাঁচার কোন কায়দা নাই। আমরা খুবই কষ্টে আছি।তিনি বলছেন, এখন প্রতিদিন ডাল-ভাতই তাদের প্রধান খাবার। সেটাও দুইবেলা জোটে না।বাচ্চারা আর ডাইল-ভাত খাইতে চায় না। ছোট বাচ্চাটার দুধের টাকা নাই। এইজন্যে ডাবল করে পানি মিশায় খাওয়াইতেছি। আমি তো মা। এই দুঃখ কই রাখি!

বিবিসি তাদের ওই প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঢাকা শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে এরকম অভাবী মানুষের ভীড় ।এইভাবে আর কতদিন চলবো, কতদিন থাকবে, আগের মতোন কবে হবে সেইটাই এখন টেনশন। টিভিতে দেখাইতেছে সরকারিভাবে নাকি বাসায় বাসায় দিয়া যায় চাউল-ডাল, আমাদের এইখানে তো কিছুই দিয়া যায় নাই।মানিক মিয়া এভিনিউতে রিকশাচালক মোকসেদুল ইসলাম বলছিলেন, ঘরে খাবার না থাকায় পাঁচ দিন পর রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তিনি।যেইখানে যাই সেইখানেই পুলিশের দৌড়ানি। ধানমন্ডি ২৭ রোডে গেছি, মাইরও খাইছি। পরে আইসা পড়লাম। কি করমু? পেটে ভাত নাই। রিকশা চালায়া তো ভাত খাই। সংসার চালাইতে হইবো না?” বিবিসিকে এটুকু বলার পরই ফুপিয়ে কেঁদে উঠেন মোকসেদুল।

সেই কান্না আর্তনাদ হয়ে আকাশে মিলিয়ে যায়। নিষ্প্রাণ রাষ্ট্রযন্ত্র ওই কান্না শুনতে পায় না।হোম স্টেনিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলা হয়েছে খেদিয়ে মানুষকে ঘরে পাঠাতে। কে খেতে পেল, কার ঘরে চাল নাই শোনার কিংবা চিন্তা করার সময়তো তাকে দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র এমনই গণবিরোধী। তার বিরোধিতা, তার বৈরিতা সবথেকে বেশি প্রান্তিকের প্রতি। যার অর্থনৈতিক অবস্থান যত বেশি নিচে, রাষ্ট্র তাকে তত বেশি নিপীড়ন করে।  তবে নিপীড়ন সবসময় প্রতিরোধহীন হয় না। মানুষ তাই প্রতিবাদী হয়। 

আর্টওয়ার্ক: করোনা শাসকতা
শিল্পী: সারশু
সূত্র: অরাজ

যারা আরও বেশি প্রান্তিক, তাদের পরিস্থিতি নিশ্চয় আরও ভয়াবহ।  ডেইলি স্টার খবর দেয়,  ‘বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম কাপ্রু পাড়ার পেক্রু ম্রো ও তার পরিবার গত কিছুদিন ধরে বাড়িতে খাবার না থাকায় বুনো আলু খেয়ে বেঁচে আছেন। কেবল পেক্রুর পরিবারই নয়, কাপ্রু পাড়ার ৫০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩০টি পরিবারের ঘরে খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক সঙ্কটের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন বলে জানান, কাপ্রু পাড়া প্রধান (স্থানীয় ভাষায় কারবারি) ইন চং ম্রো। সমকাল পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফুলবাড়িয়ার তিনশ কোচ-বর্মণ পরিবারের খাদ্য সংকটের কথা। একজন বলেন, জীবনে কোনোদিন এমন দিন দেহি নাই দাদা। বিলের মাছ বাজারে বেচতে না পাইরা চালে হুকনা দিছি। ঘরে চাইল নাই, মেয়ারে এক মাস হইলো হুদা সুজি খাওয়াই পালতাছি। নিজেরা এক-আধবেলা না খায়া থাকতে পারি, কিন্তু বাচ্চাটার এই কষ্ট কত সহ্য করন যায়। মেয়ের বাপ সারাদিন কাম খোঁজে। অহন কিয়ের করুনা নাকি, হেইডার লাইগা কেউ কাজ দেয় না। কষ্টে আছে হিজড়া সম্প্রদায়তাদের আর্তনাদ ‘‘আমাদের কেউ খোঁজ নেয়নি। একটা দোকান করে দিয়েছিলেন ডিআইজি হাবিবুর রহমান। সেটিও বন্ধ রয়েছে। কবে খুলবো, তাও কেউ কিছু বলছে না। বাসায় যে সদাই ছিল তাও শেষ। আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে একজন নারী অল্প কিছু চাল দিয়ে গেছেন। সেটাই রান্না করে খাবো। আমাদের দেখার কেউ নেই।

আমরা যতটুকু বললাম, সেটা নিশ্চয় একটা বড় সামগ্রিকতার এক ক্ষুদ্রাংশ। বেশিরভাগ ক্ষুধাই নিশ্চয় খবর হয় না। আর এখানে তো মাত্র কয়েকটা খবর আলাপে এসেছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার অপরিহার্যতা উপেক্ষা করে মানুষ তাই ক্ষুধামুক্ত হতে রাস্তায় নামে। রাস্তায় নামে স্রেফ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। বিবিসি খবর লেখে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে অভাবী মানুষের ভীড়। ঢাকা শহরে কিছুক্ষণ ঘুরলেই মোড়ে মোড়ে কিংবা রাস্তার ধারে অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে, যারা মূলতঃ খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে এসেছেন পথে। লাজ-লজ্জা, করোনা আতংক সবকিছু ছাপিয়ে ক্ষুধা নিবারণই এখন তাদের কাছে মূখ্য বিষয়। ত্রাণের গাড়ি দেখলেই তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্ষুধার্ত মানুষ। মিরপুর এলাকায় এরকমই একজন বলছিলেন, “পরপর তিনদিন রাস্তায় দাঁড়াইলাম, কেউতো দেয় না। বাড়িতেও দেয় না, রাস্তাতেও পাই না। তাইলে চলমু ক্যামনে? যারা ভোট দিছে, মিছিল করছে তারাই পাইতেছে। আমরা এইখানকার ভোটার না। আমার নামও নাই লিস্টে। কিছুই পাই নাই।” 

আমরা নিশ্চয় খেয়াল করলেই টের পাই, যাদের শ্রমের বড় অংশটা শোষণ করে বিত্তবৈভব, তাদেরকে শোষিত সেই শ্রমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার ভান করে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে ত্রাণ দেওয়া বলে। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রাণ বণ্টনের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। তাই লকডাউন উপেক্ষা করে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে নারায়ণগঞ্জেও। আমাগো কাছ থাইকা ভোটার কার্ডেও ফটোকপি নিছে, কিন্তু আমাগো এহন পর্যন্ত কোনো খাওন দেয় নাই। চাইতে গেছি কয় নাই শেষ হইয়া গেছে। আমরা এহন কই যামু। আমাগো সরকারের কাছে প্রার্থনা আমরা বাঁচার মতন বাঁচতে চাই। নেতাকর্মীরা সব খাইয়া লায়। খাওন না দিলে আমরা এ লকডাউন মানি না”- লকডাউন নারায়ণগঞ্জে ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভে যোগ দিয়ে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন এক নারী।  কাশিপুর এলাকার দিনমজুর বাসেদ মোল্লা বলেন, “কাজ না থাকায় কোনো আয় নেই, ঘরে খাবারও নেই। সরকার তো বলছে আমাগো ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছায় দিব। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা ভোটার লিস্টও নিয়া গেছে কিন্তু আমাগো কাছে তো খাবার পৌঁছায় দেয় নাই। এমনকি একটা খবর নেয় নাই যে আমরা বাঁইচা আছি নাকি মইরা গেছি। আবার আমাগো বাসায় আটকাইয়া রাখছে।

ঢাকা আর তার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের মতো স্থানের ক্ষুধার খবর তাও খানিকটা পাওয়া যায়। গ্রামের খবর, এমনকী জেলাশহরগুলোর খবরও তেমন করে সংবাদ হয় না। কেননা তাদের জন্য বরাদ্দমফস্বল ডেস্ককিংবান্যাশনাল নিউজনামের কম প্রায়োরিটির প্লেস। তো যে অর্থনীতি আর উন্নয়নের গল্প শুনিয়েভোট চুরির বাস্তবতা আড়াল করা হয়, যেজিডিপিনিয়ে গর্ব করা হয়; তার চেহারাটা এমন ক্যান হয়? এক মাসেরও কম সময়ের অচলাবস্থা সামাল দিতে পারে না? মানুষের পক্ষের অর্থনীতিবিদরা তাই যথার্থই এই জিডিপিকে ভুয়া বলেন। এই জিডিপির নেপথ্য কারিগর হিসেবে বিদেশি শ্রমিকরা মানবিক কোয়ারেন্টিনের সুযোগ পাননি, তাই তারা পালিয়েছে, ক্ষুব্ধ হয়েছে। এই জিডিপির নেপথ্য কারিগর গার্মেন্টের লাখ লাখ শ্রমিক ভয়াবহ ভঙ্গুর অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। সৃষ্টি হয় বেশকিছু বিলিওনারই। সেই চাকচিক্য এখন কোথায়? কোনটা তবে গুজব? দৃশ্যমান ক্ষুধা নাকি প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গালগল্প?

আর্টওয়ার্ক: স্টে হোম
শিল্পী: আদনান
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প দিয়েই আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির বারোটা বাজানো হচ্ছে প্রতিদিন। প্রধানমন্ত্রী একদিকে কৃষি জমি রক্ষার কথা বলছেন, আরেকদিকে সেইসব জমি নষ্ট করে তোলা হচ্ছে উন্নয়নের ঢেউ। কথিত উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির আলাপকে  ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তার সহযোগী জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের ক্ষমতাপক্ষীয় বুদ্ধিজীবীরাভারি আলাপও সাধারণের বোধগম্যতার বাইরের জিনিস হিসেবে হাজির রাখতে চাইলেও আজকে এসে কি তা আর সম্ভব হচ্ছে? যখন উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির পোশাকের আড়াল থেকে বের হয়ে এসেছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা? যখন কিনা দৃশ্যমান বাস্তব: রাজা তুমি ল্যাংটা?

আমরা অর্থনীতির ছাত্র নই। তবে সাধারণভাবে মানুষের ওপর অর্থনীতির অভিঘাত বোঝার জন্য বিশেষায়িত জ্ঞানকে আমি অপরিহার্য মনে করি না। তাই এটা টের পেতে কোনও সমস্যা হয় না, নব্য উদারবাদী অর্থনীতির প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের যে কথিত উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গালগল্প এতোদিন ধরে চালিয়ে আসা হচ্ছে, অর্থশাস্ত্রে তার গুরুত্ব থাকলেও (আছে কিনা, আমার ঠিকঠাক জানা নেই) সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে তা নেই। এই অর্থনীতির শেকড় কি? নদী বিলীন করে, বন উজাড় করে, বাতাস দূষিত করে যে উন্নয়ন আমরা কিনছি প্রতিদিন রাষ্ট্রকে দেওয়া আমাদের ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকার বিনিময়ে? সরকারের মেগা মেগা সব সব প্রজেক্টের জন্য বিদেশি ঋণের প্রবাহ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তোয়াক্কা না করে বিলিওনার তৈরি, গার্মেন্টস এর লাখ লাখ কর্মীর সীমাহীন দুর্ভোগের জীবনের বিপরীতে ফুলেফেপে ওঠা মালিকদের দিয়ে বানানো প্রবৃদ্ধি দিয়ে আমরা কী করব; যখন সংখ্যাগিরিষ্ঠ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন কয়েকটা দিনের ধকল নিতে সমর্থ নয়? বহিরাঙ্গে চাকচিক্যে ভরা এই অর্থনীতির আড়ালে চাপা পড়ে ছিল স্রেফ মাটির সঙ্গে সংলগ্নতার কারণে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখা কৃষক, গার্মেন্টস-এর শ্রমিক, হকারসহ ও ভাসমান জীবিকার নিম্ন আয়ের মানুষেরা। কয়েকদিনের অচলাবস্থায় আড়াল ভেঙে তারা বের হয়ে এসেছে। প্রান্তিক এলাকায় পরিস্থিতি নিশ্চয় আরও ভয়াবহ। তার খোঁজখবর মেলা বেশ কঠিনই। কারণ সংবাদমাধ্যমের আলো প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছায় না সচারাচর। 

গার্মেন্টস শ্রমিক ছাড়া সমাজের নিচুতলার আর কারও জন্য সরকারের কোনও প্রণোদনা নেই। কৃষকদের জন্য যে ঋণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে; তা কাজে আসবে বলে বিশ্বাস করার মতো কোনও বাস্তব পরিস্থিতি নাই। তাদের জন্য আছে কেবলস্টে হোমরিয়ালিটি। এই রিয়ালিটির মধ্যে সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের পাণ্ডারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে জনগণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারের কম মূল্যের চাল নিয়ে। চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে সব। সরকার এতোদিন ক্ষমতায়, বড় নেতারা কত কত খায়, তাদেরতো বেশি খাওয়ার সুযোগ নাই। তাই তারা চাল খায়। চাল চুরির অভিনব সব ঘটনা নিত্যদিন খবর হচ্ছে। ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার কেড়ে খাওয়া রাজনীতিকরা নাকি জনপ্রতিনিধি!!!  তবে এদের বিরুদ্ধে দ্রুততর পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা করোনা মোকাবিলার পদক্ষেপের বদলে আইনপ্রণেতারা তাদের জামিন করানোর চেষ্টা করছে সঙ্গত কারণেই। আর সরকারের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে কথিতগুজবঠ্যাকানোর পদক্ষেপ। 

করোনা নামের মহামারি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেহোম স্টে রিয়ালিটিরপক্ষে সম্মতির পাশাপাশি র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়ে রাস্তায় বের হতে বাধ্য হওয়া মানুষকে সাইজ করার দমনমূলক পদ্ধতি জারি করেছে সরকার‍। দমনের বিরুদ্ধে ভিন্নমতকে রুখে দিতে নেওয়া হয়েছে কথিতগুজব ঠেকানোর পদক্ষেপকরোনার ছড়িয়ে পড়া নিয়ে, মানুষের ক্ষুধা নিয়ে ততোটা চিন্তিত নয় সরকার, যতোটা চিন্তিত গুজব ঠেকানো নিয়ে।

আর্টওয়ার্ক: ভাত দিবার পারে না, কিল মারা যম
শিল্পী: হেলাল সম্রাট
সূত্র: ফেসবুক

রাষ্ট্রের ভীতি ছড়ানোর হাতিয়ার ও সহযোগী হিসেবে মিডিয়া এরইমধ্যে খবর দিয়েছেকরোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে অকারণে ঘোরা-ফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও র‍্যাব রাজধানী জুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আরো জোরদার করেছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে যেকোনো ধরনের গুজব প্রতিরোধে আরো কঠোর হচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য সঠিক কিনা তা যাচাই না করে অর্থাৎ না বুঝে লাইক শেয়ার দিলে তাকে গ্রেপ্তার করবে র‍্যাব ও পুলিশের সাইবার ইউনিট।

সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল অভিযোগ করেছেন, যে তার লেখালেখির কারণে বাংলাদেশে একটি গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শনকরেছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর তিনজন সদস্য বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটে তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে তাকে নানা বিষয়ে বিশেষ করে তার লেখালেখির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।প্রথমে তারা আমার মায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং পরে সাংবাদিক হিসেবে আমার কাজকর্ম সম্পর্কেও জানতে চান। তারা তাকে বলেন আমি যা করছি সেটা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১০ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা সংক্রান্ত গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দুই সপ্তাহে প্রায় ৫০ জন আটক হয়েছে। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই অভিযানের সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়। এই সংগঠনের একজন মুখপাত্র মিনাক্ষী গাঙ্গুলী মনে করেন, গুজব বিরোধী অভিযানের নামে করোনা পরিস্থি নিয়ে সরকারের সমালোচকদেরই বেশি আটক করা হচ্ছে।ভুয়া তথ্য যেনো না ছড়ানো হয়, সেটা সরকার ঠিকই বলেছে। কিন্তু আমরা দেখছি, যারা সরকারের নিন্দা করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ফেক নিউজ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাদেরকেই টার্গেট করা হচ্ছে।মিনাক্ষী গাঙ্গুলী তার বক্তব্যে সমর্থনে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক তাসনীম খলিলী যেহেতু সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমারোচনা করেন, সেজন্য বাংলাদেশে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন গিয়ে শাসিয়েছে। এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমালোচনা করেন, এমন দুজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তাদের ইতিমধ্যেই সতর্ক করা হয়েছে।

এভাবেই এককটি সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতার মধ্যে নির্মিত হচ্ছে আমাদের ভয়াবহ ভবিষ্যত। যেখানে আমাদের গন্তব্য অজানা। মহামারির সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গণবিরোধিতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে মানুষকে; এটা অবাক করার মতো বিষয় নয়, বরং এটাই রাষ্ট্র আর মানুষের সম্পর্কসূত্র। এই সম্পর্কে একের অবস্থান অন্যের বিপরীতে। আসলে অখণ্ড মানুষকে কাঁটাতারে আটকে রাখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়পত্রে আপাতত পৃথক করা যায়। তবে তার অখণ্ড সত্তা বিলীন করা যায় না। স্বাস্থ্য প্রশ্নও তাই রাষ্ট্রের বেধে দেওয়াসামাজিক দূরত্বেরছকে ফেলে বিবেচনা করা যায় না। আপাত শারীরিকে দূরত্বের প্রশ্ন হলেও আমাদের প্রত্যেকের সুরক্ষা প্রত্যেকের ওপর নির্ভর করে। আর আমাদের সবার সুরক্ষা নির্ভর করে প্রকৃতির ভারসাম্যের ওপর। আমাদের বাস্তুপ্রক্রিয়া আর জলবায়ুর ওপর। মানুষকে পারা গেলেও এইসব জিনিসকে কাটাতার আর জাতিরাষ্ট্রের সীমানায় ভাগ করা যায়নি। পাহাড়-পর্বত-বাতাস-নদী-আকাশকে জাতিরাষ্ট্র সীমানাভূক্ত করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। স্রোতস্বী এক দেশ পেরিয়ে আরেক দেশে গেছে। পাহাড় ছাড়িয়েছে সীমানা। বাতাস মিশছে পূব থেকে পশ্চিমে। নির্বিশেষ আক্রমণের মধ্য দিয়ে করোনা এসেছে সমগ্র মানুষের প্রতি আঘাত হয়ে। আর সামগ্রিক মানুষের প্রশ্ন বিবেচনায় নিতে গেলে আমাদের প্রকৃতির কথা না ভেবে উপায়ই নেই। প্রকৃতিকে উত্তেজিত করে আমরা বাঁচতে পারব না।  

এই লেখা চলমান থাকা অবস্থাতেই অ্যামাজনের আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে করোনা সংক্রমণের খবর পড়তে হলো । প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে সংলগ্নতার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা এই আদিবাসীরাই পৃথিবীটাকে কোনও রকমে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই জনগোষ্ঠীর প্রতি একজন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পৃথিবীর আয়ু এক হাজার বছর করে কমে যায় বলে আমার ধারণা। ঐতিহাসিকভাবেইজার্ম থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছে ওরা। তাই সভ্যদের মতো করে জীবাণু প্রতিরোধের সক্ষমতাও গড়ে ওঠেনি তাদের। এখন নির্বিচারে ওরা মরতে থাকলে তো পৃথিবীটা ধ্বংস হতে ৫০ বছরও লাগবে না! আমি বিশ্বাস করতে চাই,তা হবে না। পরিস্থিতি যতোই অপরিচিত হোক, লোকায়ত বিজ্ঞানের বোঝাপড়ায় ওরা মৃত্যু প্রতিরোধে সক্ষম হবে। তবে বিশ্বাস সব সময় বাস্তব হয় না।

সভ্য দুনিয়ার কোনও সভ্য মানুষ পবিত্রভূমি জঙ্গলে ওই ভাইরাস বয়ে নিয়ে গেছে! বনখেকো কোনও সভ্য ক্ষমতাশালী?? [কারা নিয়ে গেছে করোনা] আমাজনে খনিজের জন্য অনুসন্ধান চালানো খনি শ্রমিক হয়তো মুনাফা আর ভোগ লালসার আগুনের উত্তাপে গলতে থাকা বরফের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে এই ভাইরাস; যা গলে যাওয়ার পেছনে ওদের কোনও ভূমিকা নাই। ওরা বরং সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য লড়াই করে, শহীদও হয়। সোসিও এনভায়রনমেন্টাল ইনস্টিটিউট (আইএসএ) আন্দাজ করছে, খনি শ্রমিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশের মাধ্যমে অরণ্যের ভিতরে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস। নৃবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ব্রাজিলের সাড়ে আট লাখ আদিবাসী মানুষের জীবন সংশয় ঘটাতে পারে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। 

সুতরাং ভাবুন এবার, করোনাকে কী করে নিছক একটা প্রাকৃতিক রোগবালাই হিসেবে দেখবেন? কেমন করে আড়াল করবেন, এটা রাষ্ট্রযন্ত্র, এর স্বৈরতন্ত্রী সরকার আর পুঁজিবাদী বাজার-ব্যবস্থার যৌথ উদ্যোগে ডেকে আনা এক গণ-হন্তারক, যা তাদেরকেও ছাড়ছে না!

আর্টওয়ার্ক: করোনা শাসকতা-২
শিল্পী: সারশু
সূত্র: অরাজ

শুরুতে বলেছিলাম, এই ভাইরাস আক্রমণ করেছে মনুষ্যপ্রজাতিকে। ভাইরাস মোকাবিলার প্রশ্নটা তাই কোনভাবেই বাংলাদেশের আর আমেরিকার আলাদা করে মোকাবিলার প্রশ্ন নয়। এটা ধনী-গরীব, হিন্দু মুসলমান কিংবা পাহাড়ি বাঙালি আকারে বোঝার প্রশ্ন নয়। এতো এত বিপর্যয়ের আলাপ করলাম; এর বাইরে এসে দেখতে পাই; চেনাজানা ইতিহাসের দুর্লভ ঘটনা হিসেবে এই ভাইরাস আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট করে সামনে এনেছে আমাদের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে। হিমবাহের বরফ একটু একটু গলছে আর আমাদের প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্ন মীমাংসার সুযোগ ফুরিয়ে আসছে। তবে সেটার ধীর গতি, দূরবর্তী বাস্তবতা তাকে এখনকার মতো করে সামনে আনতে পারে না, করোনাভাইরস যেভাবে পেরেছে। প্রজাতিগত সুরক্ষার প্রশ্নকে প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান বাস্তবতায় হাজির করেছে এই ভাইরাস। করোনা সমগ্র মনুষ্যপ্রজাতির প্রতি আঘাত হয়ে বিশ্বমানুষকে প্রকৃতি সংলগ্লতার বার্তা দিতে এসেছে যেন। আবার ঘরে থাকো কিংবা হোম কোয়ারেন্টিন জাতীয় প্রপঞ্চের সাপেক্ষে বাড়তে পারে সর্বাত্মক নজরদারির পরিসর। রাশিয়া এরইমধ্যে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতে প্রাযুক্তিক নজরদারিকে সর্বাত্মক করেছে। অ্যাপল-গুগলরা করোনা রোগীর অবস্থান শনাক্তের প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত। সবমিলে করোনা সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রী বাস্তবতাকে নিরঙ্কুশ করার শর্তও হাজির করেছে শাসকদের জন্য। 

আমাদের বাংলাদেশের পরিসরে নিজেদের অস্বিত্ব রক্ষার স্বার্থেই আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শনে সুন্দরবনের ক্ষতির কথা গুরুত্ব পায় না, সেই রাষ্ট্র আর তার উন্নয়নবাদকে আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেব কিনা। প্ল্যাস্টিক-কোক বোতল-উচু দালানের মতো মৃত বুড়িগঙ্গার বিনিময়ে আমরা উন্নয়ন গিলব কিনা। আমাদের ভাবতে হবে, যে প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় অচলাবস্থার সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ১ মাসের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়নের গালগল্প আমরা জীবনভর শুনে যেতে রাজি কিনা। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, যে সরকারকাঠামো আর রাষ্ট্রব্যবস্থা মুষ্টিমেয়ের স্বার্থ রক্ষিত হয়, বাদবাকী মানুষের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তা আমরা সারাজীবন বহন করতে চাই কিনা। আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে, যে রাষ্ট্রকাঠামো সর্বাত্মক নজরদারি ও দমনমূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাবতীয় ভিন্নমতকে দমনের ক্ষেত্রভূমি, আমরা তাকে অবিরত থাকতে দেব কিনা। এইসব প্রশ্ন না তুলতে পারলে আগামীর পৃথিবী ভয়াবহ হতে পারে।

বাধন অধিকারী

বাধন অধিকারী

বাধন অধিকারী

বাধন অধিকারী