অরাজ
আর্টওয়ার্ক: স্কুল অব এথেন্স শিল্পী: রাফায়েল সূত্র: উইকিমিডিয়া
প্রচ্ছদ » পিতর ক্রপোৎকিন।। রাষ্ট্র এবং এর ঐতিহাসিক ভূমিকা

পিতর ক্রপোৎকিন।। রাষ্ট্র এবং এর ঐতিহাসিক ভূমিকা

অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

রুশ চিন্তক ও বিপ্লবী পিতর ক্রপোৎকিনের  বহুল  আলোচিত রচনা রাষ্ট্র ও এর  ঐতিহাসিক ভূমিকা । ১৮৯৬ সালে Les Temps Nouveaux পত্রিকার সম্পাদকের আমন্ত্রণে প্যারিসে ধারাবাহিক বক্তৃতার জন্য ক্রপোৎকিন দুটো বিষয় নির্বাচন করেন। এর মধ্যে প্রথমটি হল, রাষ্ট্র: এর ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং অপরটি হল নৈরাজ্যবাদ: এর দর্শন ও আদর্শ। কিন্তু এই বক্তৃতা আর কখনোই দেয়া হয়নি। রুশ-ফ্রান্স সামরিক মৈত্রীর প্রেক্ষাপটে প্যারিসে বড় ধরনের কোন বিরোধী-সমাবেশের বিষয়ে ভীত ছিল প্রান্স সরকার। ফলে ক্রপোৎকিনকে আর প্যারিসে ঢুকতে দেয়া হয়নি।

পরবর্তীতে জেমস গিয়মকে লেখা চিঠিতে এবিষয়ে বিস্তারিত জানান ক্রপোৎকিন।১৯০৮ সালে ফ্রিডম প্রেস, লন্ডন থেকে The State: Its Historic Roal এর প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ভ্যারন রিচার্ডস এর অনুবাদ করেন। বর্তমান সংস্করণটি ভ্যারন রিচার্ডের ১৯৮৬ সালের সংস্করণ থেকে গৃহীত। আজ প্রকাশিত হল প্রথম অধ্যায়। -সম্পাদক

পিতর ক্রপোৎকিন

প্রথম অধ্যায়

আমার মনে হয়, এসময় খুব বেশি করে কথা হওয়া উচিৎ এমন একটা বিষয়ই আমি তুলে ধরতে যাচ্ছি। তা হলো: রাষ্ট্র ও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা। এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা রাষ্ট্রের ধারণার গভীরে যাব। এর নির্যাস, অতীত ভূমিকা আর ভবিষ্যতে এটিকে কেমন চেহারায় দেখা যেতে পারে ইত্যাদি পর্যালোচনা করব।

অন্য সব কিছুর ওপরে, এই রাষ্ট্রের প্রশ্নেই বিভক্ত হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। এই বিভক্তিতে দুইটি প্রধান ধারা চিহ্নিত করা যায়, যার ওপর ভিত্তি করে চিন্তাপদ্ধতি ও মেজাজে পার্থক্য গড়ে ওঠে। আসন্ন বিপ্লবের ওপর বিশ্বাস গড়ে উঠবে কিনা, তাও নির্ভর করে এই বিভক্তির ওপর।

এই বিভাজনের একদিকে থাকেন তারা, যারা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রেখে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করার আশা করেন এবং বিপ্লবের জন্য এটির সার্বিক ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এমনকি ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়িয়ে নিয়ে। অন্যদিকে আছে আমাদের মতো মানুষেরা, যারা বর্তমান কাঠামো, মূলগত অবস্থান ইত্যাদির বিবেচনায় রাষ্ট্রকে দেখে সামাজিক বিপ্লবের পথে বাধা হিসেবে। যে ছদ্মবেশ নিয়েই হাজির হোক না কেন, রাষ্ট্র সব সময়ই সাম্য ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে সমাজ গড়ার পথে একটি বড় বাধা। ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রকে গড়েই তোলা হয়েছে এই স্বাধীন সমাজের অঙ্কুরোদগম ঠেকানোর জন্য। ফলে এই ধারার কর্মীরা কাজ করেন রাষ্ট্রের বিলুপ্তির জন্য। এটিকে সংস্কারের জন্য নয়।

স্পষ্টই বোঝা যায়, এই বিভাজন খুবই গভীর। এর ফলে দুইটি ভিন্নমুখী ধারা তৈরি হয়েছে, যা আমাদের সময়ের সব দার্শনিক ভাবনা, সাহিত্য ও কর্মতৎপরতায় প্রতিফলিত হয়েছে। এবং রাষ্ট্র নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি যদি এখনকার মতোই অস্পষ্ট থেকে যায় তাহলে কোনো সন্দেহ নেই যে, যখন (আশা করি দ্রুতই) কমিউনিস্ট ধারণাগুলো কমিউনিটির প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবিক প্রয়োগের দিকে যাবে, তখন এই রাষ্ট্র প্রশ্নেই সবচে একগুঁয়ে লড়াইটি শুরু হবে।

আজকাল যেভাবে রাষ্ট্রের সমালোচনা করা হয় তাতে কেউ এর উদ্ভবতত্ত্বের খোঁজ করতেই পারেন। গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে পারেন রাষ্ট্রের অতীত ভূমিকা নিয়ে আর সেইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করতে পারেন যেগুলোকে রাষ্ট্র প্রতিস্থাপন করেছে।

প্রথমেই আমাদের একমত হওয়া যাক: ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটি দিয়ে আমরা কী বোঝাতে চাচ্ছি।

জার্মান স্কুলের চিন্তাধারায় রাষ্ট্রকে সমাজের সাথে গুলিয়ে ফেলে তৃপ্তি নেওয়া হয়। এই বিভ্রান্তিটা শ্রেষ্ঠ জার্মান চিন্তকদের মধ্যেও দেখা যায়। অনেক ফরাসির মধ্যেও দেখা যায়, যারা রাষ্ট্র ছাড়া সমাজ কল্পনাই করতে পারেন না। যার ফলে তাদের দৃষ্টিতে, নৈরাজ্যবাদীরা সমাজকে ধ্বংস করতে চায় এবং এমন অবস্থায় যাওয়ার কথা বলে যেখানে “সবাই সবার বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধে” লিপ্ত আছে।

যদিও এই ধরণের যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে, গত ৩০ বছরের মতো সময়ে ইতিহাসে যে অগ্রগতি হয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে সমাজবদ্ধভাবে বাস করছে, যখন রাষ্ট্র নামক জিনিসটার কথা কেউ শোনেও নি। এটা এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, ইউরোপের বিচারে রাষ্ট্র-ধারণার ইতিহাস খুবই কম সময়ের— টেনেটুনে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত যাবে। আর শেষ পর্যন্ত, এটাও এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, সেগুলোই মানুষের ইতিহাসের সবচে গৌরবজ্জ্বল সময়, যেখানে মানুষের সামাজিক জীবন ও স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হাতে ধ্বংস হয়নি। যেখানে অনেক মানুষ কমিউনের ভিত্তিতে, স্বাধীন ফেডারেশনের ভিত্তিতে বাস করত।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সমাজে নানাবিধ কাঠামো গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্র সেরকম একটি কাঠামো মাত্র। তাহলে যেটা স্থায়ী আর যেটা ঘটনাবশত— এই দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হবে না কেন?

আরেক দিকে, রাষ্ট্রকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয় সরকারের সাথে। যেহেতু কোনো রাষ্ট্রই সরকার ছাড়া থাকতে পারে না, ফলে কখনো কখনো এমনটা বলা হয় যে, লক্ষ্য স্থির করতে হবে সরকারের অনুপস্থিতির জন্য, রাষ্ট্রের বিলুপ্তির জন্য নয়।

যদিও, আমার মনে হয় রাষ্ট্র ও সরকার দুইটি ভিন্ন প্রকৃতির ধারনা। রাষ্ট্রের ধারনা দিয়ে যা বোঝানো হয়, তা সরকারের ধারনার চাইতে বেশ খানিকটা আলাদা। রাষ্ট্রের ধারনার সঙ্গে জুড়ে আছে ক্ষমতার অস্তিত্ব, যেটার অবস্থান সমাজের ওপরে। একই সঙ্গে এখানে যুক্ত আছে ভূখণ্ডগত কেন্দ্রীভবন। সেই সঙ্গে যুক্ত আছে সামাজিক জীবনের অনেক অনেক কর্মকাণ্ড সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার মতো ব্যাপার। সমাজের সদস্যদের ওপর নতুন কিছু সম্পর্ক চাপিয়ে দেয় রাষ্ট্র, যেগুলোর অস্তিত্ব রাষ্ট্রগঠনের আগে ছিল না। কিছু শ্রেণীর মানুষকে বাধ্য করে অন্য শ্রেণীর উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে। আইনকানুন-পুলিশিংয়ের পুরো একটা ব্যবস্থা তৈরি হয় রাষ্ট্রপদ্ধতিতে।

এই পার্থক্যটি প্রথম দৃষ্টিতে স্পষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হয় রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত অধ্যয়ন শুরু করলে।

বস্তুত, সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রকে বোঝার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে এর ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে অধ্যয়ন করা। এখানে আমরা সেটাই করার চেষ্টা করব।

রাষ্ট্র শব্দটির সত্যিকার নির্যাস অনুযায়ী রোমান সাম্রাজ্য একটি রাষ্ট্র ছিল। আজকের দিন পর্যন্ত, রোমান সাম্রাজ্য যে কোনো আইনজ্ঞের আদর্শ। এই রাষ্ট্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে ছিল একটি বিস্তৃত জায়গা জুড়ে, খুবই শক্ত নেটওয়ার্ক নিয়ে। সব কিছুরই কেন্দ্র ছিল রোম। অর্থনৈতিক ও সামরিক জীবন, ধনসম্পদ, শিক্ষা, এমনকি ধর্মও নিয়ন্ত্রিত হতো রোম থেকে। সেখান থেকে আসত আইন, ম্যাজিস্ট্রেট, সৈন্য, পুলিশ এবং ঈশ্বর। এই পুরো সাম্রাজ্যের মানুষের জীবনসুতো বাঁধা ছিল প্রথমে সিনেটে, তারপর সিজারের হাতে। সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সাম্রাজ্যের ঈশ্বর। প্রতিটা প্রদেশ, প্রতিটা জেলার ছিল একটি ছোট আকারের নিজস্ব ক্যাপিটল। রোমান সার্বভৌমত্বের অংশ, যা দিয়ে তারা প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটা বিষয় শাসন করত। রোম থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটি একক আইন পুরো সাম্রাজ্যে আধিপত্য করত। যে আইন সেখানকার নাগরিকদের কোনো কনফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করত না। নাগরিকদের বিবেচনা করা হতো শুধুই প্রজার দল হিসেবে।

এমনকি এখনও, আইনজ্ঞ আর কর্তৃত্ববাদীরা শ্রদ্ধা করেন এই সাম্রাজ্যের একতাকে। এর আইনকানুনের একতাবাদী চেতনাকে। তাঁদের ভাষায়, এই সংগঠনের সৌন্দর্য্য ও ঐক্যতানকে।

আর্টওয়ার্ক: দ্য ট্রায়াম্ফ অব ডেথ
শিল্পী: পিটার ব্রুজেলস
সূত্র: উইকিমিডিয়া

কিন্তু রোমান সাম্রাজ্য ভিতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এবং বাইরে থেকে বারবারিয়ানদের আগ্রাসী আক্রমণ সেটিকে ত্বরান্বিত করে। আঞ্চলিক সব সামাজিক জীবনের বিলুপ্তি ঘটেছিল। ফলে বাইরে থেকে আসা আক্রমণও তারা ঠেকাতে পারছিল না, আবার কেন্দ্র থেকে যে কুপ্রভাব ছড়ানো হচ্ছিল সেগুলোও মোকাবিলা করতে পারছিল না। জমি দখলে রাখা ধনীদের আধিপত্য, আর সেসব জমি চাষ করা কৃষকদের দুর্দশা— এই সব কিছু মিলিয়ে রোমান সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যায়। আর সেই ধ্বংসাবশেষ থেকে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা। আমাদের সভ্যতা।

এখন, যদি আমরা প্রাচীনযুগের সভ্যতাগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু আমাদের এই তরুণ, বারবারিয়ান সভ্যতার জন্ম ও বিকাশের দিকে দৃষ্টি দেই এবং ঠিক সেই সময়টা পর্যন্ত খেয়াল করি যখন এটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, তাহলে আমরা এই আধুনিক রাষ্ট্রের স্বরূপ অনেক ভালোমতো বুঝতে পারব। রোমান সাম্রাজ্য বা মেসোডোনিয়ার আলেকজান্ডার বা প্রাচ্যের কোনো রাজ্যের দিকে মনোযোগ দিলে যা অত ভালোভাবে নাও বোঝা যেতে পারে।

শক্তিশালী বারবারিয়ান গোষ্ঠীগুলো রোমান সাম্রাজ্যকে উৎখাত করছে— ইতিহাসের এই জায়গাটিকে আমরা আমাদের যাত্রার উৎসবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করছি। যার ফলে আমরা আমাদের পুরো সভ্যতার বিবর্তন অনুসন্ধান করতে পারব। এর শুরু থেকে এখনকার রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত।

(চলবে)

পার্থ প্রতীম দাস

পার্থ প্রতীম দাস

পার্থ প্রতীম দাস লেখক, অনুবাদক ও অরাজপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট। সম্পাদনা করছেন অরাজ গ্রন্থগুচ্ছ সিরিজ। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ সম্পাদনার সঙ্গে। ২০০৭ সালের আগস্ট বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন সক্রিয়ভাবে। পরবর্তীতে কারাবন্দী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষে যুক্ত হন সাংবাদিকতা পেশায়। বর্তমানে সাংবাদিকতা বিষয়ক গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছেন। যোগাযোগ: ইমেল: [email protected]