অরাজ
প্রচ্ছদ » পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

  • অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

সম্পাদকের নোট: রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদী পিতর ক্রপোৎকিনের এই লেখাটি লা রিভোল্ট পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮০ সালে, ফরাসি ভাষায়। প্যারি কমিউনের প্রায় ১০ বছর পর। ১৮৯৫ সালে লেখাটির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ফ্রিডম প্যামফ্লেটে। অনুবাদটি সেই ইংরেজি সংস্করণ অবলম্বনে করা হয়েছে। মূল লেখাটি পাবেন এখানে। 

পিতর ক্রপোৎকিন (১৮৪২-১৯২১)

১. সাম্যবাদী বিবর্তনে কমিউনের স্থান

১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ। প্যারিসের জনসাধারণ বিদ্রোহ করে ঘৃণিত ও নিন্দিত সরকারের বিরুদ্ধে। শহরটিকে ঘোষণা দেয় মুক্ত ও নিজেদের বলে।

বিপ্লবের সময় সাধারণত যেসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেগুলো ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে। এজন্য কোনো বন্দুকের গুলির প্রয়োজন হয়নি, ব্যারিকেডের সামনে রক্ত ঝরাতে হয়নি। মানুষ যখন নিজেদের সশস্ত্র করে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, তখন [ভয়েই] শাসকরা পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের সৈন্য-সামন্তরা শহর ছেড়েছিল, বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মানুষজন হাতের কাছে যা কিছু পেয়েছে, তাই নিয়েই রওনা দিয়েছে ভার্সাইয়ের দিকে। সরকার ঠিক যেন উবে গিয়েছিল, যেভাবে গ্রীষ্মে বাষ্প হয়ে উবে যায় পুকুরের পানি। ১৯ মে, প্যারিস শহর নিজেকে আবিস্কার করে সেসব অপবিত্রতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত অবস্থায়, যেগুলো দিনের পর দিন তাকে কলুষিত করেছে। আর এজন্য তার সন্তানদের এক ফোঁটা রক্তও ঝরাতে হয়নি।

এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বিপ্লবের দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। যেখানে মানুষ দাসত্বের শেকল ভেঙে হাঁটতে শুরু করেছিল মুক্তির পথে। “প্যারিস কমিউন”-এর নামে জন্ম হয়েছিল নতুন একটি ভাবনার। যেটি ভবিষ্যতের আরো অনেক বিপ্লবের জন্য কাজ করছে সূচনাবিন্দু হিসেবে। 

সব সময়ের মতো, এই ভাবনাটিও কোনো একক ব্যক্তির মাথা থেকে বা কোনো দার্শনিকের চিন্তা থেকে আসেনি; এটির জন্ম হয়েছিল একটি সম্মিলিত চেতনা থেকে, পুরো কমিউনিটির হৃদয় ও মস্তিস্ক থেকে। প্রথম দিকে অনেক কিছুই অবশ্য অস্পষ্ট ছিল। বিপ্লব-বিদ্রোহে অংশ নেওয়া অনেকেই হয়তো তাদের জীবনও দিয়েছেন, কিন্তু ঘটনাবলীর তাৎপর্য বুঝতে উঠতে পারেননি; যেভাবে এখন আমরা বুঝছি। তাদের অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেননি যে, কী ধরনের নতুন নীতি-নৈতিকতা তারা সামনে আনার চেষ্টা করছেন। সত্যিই বিষয়গুলো বাস্তবে চর্চা শুরুর পর তারা ধীরে ধীরে এগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। নতুন সেসব নীতি যখন সতর্কতার সাথে ও পর্যাপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে শুরু করা হয়, তখন এগুলো আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে থাকে। এগুলোকে তাদের পূর্ণ সৌন্দর্য্য ও স্বচ্ছতায় দেখতে পাওয়া যায়। বুঝতে পারা যায় এর ন্যায়-নীতি ও তার ফলাফলের গুরুত্ব। 

কমিউনের আগের পাঁচ-ছয় বছরে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পেয়েছিল ইন্টারন্যাশন্যাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তৃতিতে। স্থানীয় শাখা পর্যায়ের বৈঠক ও সাধারণ সম্মেলনগুলোতে ইউরোপের শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং নানাবিধ সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ করতেন। এমনটা তারা আগে কখনো করেননি। তাদের মধ্যে যারা সামাজিক বিপ্লবকে প্রায় আসন্ন মনে করতেন এবং সেই পাটাতন তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তারা সব কিছুর ওপরে একটি বিষয়ে সমাধানের ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। “শিল্পকারখানার বর্তমান এই অগ্রগতি, আমাদের সমাজকে একটি মহান অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করবে; এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত হবে; আগের প্রজন্মগুলোর মাধ্যমে যেসব পুঁজি সঞ্চিত হয়েছে, তাতে সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে; কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এসব পরিবর্তন আনার জন্য কোন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন/জোট সবচে যথার্থ হবে?” 

ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের উত্তর ছিল, “এই জোট কোনোভাবেই ক্ষুদ্র জাতীয়তার মধ্যে বন্দী থাকা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কৃত্রিম সব সীমান্ত ও সীমারেখার বাধা পেরিয়ে যেতে হবে।” দ্রুতই এই মহান ধারণাটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তাদের মস্তিস্কে স্থায়ী বসতি গড়ে। যদিও তারপর থেকে পৃথিবীর সব প্রজাতির প্রতিক্রিয়াশীলদের যৌথ উদ্যোগ এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টায় নিয়োজিত আছে, কিন্তু তবুও এটিকে মেরে ফেলা যায় নি। এটি জীবিত আছে, এবং যখনই বিদ্রোহ-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর সামনে থাকা বাধাগুলো সরে যায়, তখনই আবার এটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে সামনে আসে। 

কিন্তু এই ধরনের বিস্তৃত একটি অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠার উপাদানগুলো কী ধরনের হবে, তা এখনো খুঁজে দেখা বাকি। 

প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

এখন পর্যন্ত, দুইভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। দুই ধরনের উত্তর থেকে তৈরি হয়েছে দুটি আলাদা চিন্তাধারা। যার একদিকে আছে জনপ্রিয় রাষ্ট্র; এবং অন্যদিকে নৈরাজ্য।

জার্মান সমাজতন্ত্রীরা বলেছেন যে, রাষ্ট্রই এসব পুঞ্জিভূত সম্পদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং সেগুলো শ্রমিকদের অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে বিতরণ করবে। এছাড়াও রাষ্ট্রই উৎপাদন ও বিনিময়ের ব্যবস্থাগুলো পরিচালনা করবে, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখবে। 

এর জবাবে, অনেক বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, ল্যাটিন জাতির সমাজতন্ত্রীরা বললেন, সত্যিই যদি এমন কোনো রাষ্ট্র কখনো থেকে থাকে, তাহলে তা হবে একটি অলৌকিক ঘটনা। আর সত্যিই যদি এমন কিছু দেখা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা হবে সবচে বাজে ধরনের স্বৈরশাসন। এই সমাজতন্ত্রীরা বলেছিলেন: সর্বক্ষমতাময় ও কল্যানমূলক একটি রাষ্ট্রের ধারণা শুধুই অতীত থেকে ধার করে আনা হচ্ছে। এবং এটি মোকাবিলার জন্য তারা সামনে এনেছেন একটি নতুন আদর্শ: নৈরাজ্য। যেখানে রাষ্ট্রের পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে হবে এবং সহজ-সাধারণ থেকে শুরু করে জটিল; সব ধরনের সামাজিক সংগঠনই গড়ে তুলতে হবে উৎপাদক ও ভোক্তার জনপ্রিয় সব গ্রুপগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে।

দ্রুতই এটি মেনে নেওয়া হয় যে, জনপ্রিয় রাষ্ট্রের বদলে নৈরাজ্যের মাধ্যমেই সমাজকে আরো ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব। এমনকি উদার মানসিকতার রাষ্ট্রপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও এটি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কথা হলো: নৈরাজ্যবাদী আদর্শ এতোই ‍দূরের ব্যাপার যে আমরা এখনই এ নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। 

একই সঙ্গে, এটিও সত্য যে, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বগুলোর কিছু মাত্রায় স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। এমন কিছু সূত্রের প্রয়োজন ছিল যা একই সঙ্গে সহজ-সাধারণ এবং বাস্তবসম্মত। কোন সময় থেকে এটি পুরোনো সমাজের সঙ্গ ছেড়ে নতুন পথে যাত্রা করবে, এবং কিভাবে মানুষের সত্যিকারের ঝোঁক-প্রবণতাগুলো থেকে এটি সমর্থন পাবে; ইত্যাদি বিষয় আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। জাতি-সীমানা নির্বিশেষে শ্রমিক ইউনিয়ন ও ভোক্তাদের গ্রুপগুলোর ফেডারেশন, যেটি কিনা স্বাধীনভাবে কাজ করবে– ধারণাটিকে খুব অস্পষ্ট বলে মনে হয়েছিল। এবং, তারচেয়েও বড় কথা, খুব সহজেই দেখা যাচ্ছিল যে, এটি মানুষের অসীম চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি মেটাতে পারবে না। ফলে একটি স্পষ্ট ও পরিস্কার সূত্র প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, যা থেকে বিষয়গুলো সহজেই বোঝা যাবে। এবং যেটি সত্যিকারের জীবন-বাস্তবতার ভিত্তিতে শক্তভাবে গড়ে উঠবে।

একটি তত্ত্বকে কোন উপায়ে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়- প্রশ্নটি যদি শুধু এটিই হতো, তাহলে আমরা হয়তো বলতাম, শুধু তত্ত্বের কোনো বিশেষ গুরুত্ব নেই। কিন্তু নতুন কোনো ধ্যানধারণার যদি একটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না থাকে; সেটি যদি স্বাভাবিক সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে থেকে গড়ে না ওঠে, তাহলে সেটি কখনোই মানুষের মস্তিস্কে জায়গা করে নিতে পারে না। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে না একটি প্রাণপন লড়াইয়ে যোগ দিতে। সামনে কোনো ইতিবাচক ও স্পষ্ট চিন্তা না থাকলে মানুষ নিজেকে অজানা-অচেনা পরিস্থিতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে না। পরিবর্তনের শুরুর জায়গাটিতে পৌঁছানোর পর এটি কাজ করে একটি স্প্রিংবোটের মতো।  

শুরুর জায়গাটির ক্ষেত্রে বলতে হয়, বাস্তব জীবনের নানা ঘটনাবলী-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এটিকে এই অবস্থায় আসতে হবে। 

পুরো পাঁচ মাস প্যারিসকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল জার্মান অবরোধকারীরা। এই পাঁচ মাসে প্যারিসকে নিজেই নিজের গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্সগুলো সরবরাহ করতে হয়েছে। এবং সে জেনেছে কী বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শক্তি তার আছে। সে তার নিজের নতুন নতুন সব উদ্যোগের দিকে এক নজর তাকিয়েই সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করেছে। একই সময়ে, সে এটিও দেখছিল যে, ক্ষমতা দখল করা নির্বোধ মানুষদের কোনো ধারণা নেই কিভাবে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় বা এর অভ্যন্তরীন বিষয়াবলী পরিচালনা করা যায়। সে দেখছিল যে, শহরের প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায় বা দ্বিধা-সংশয় তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার। এবং শেষপর্যন্ত, সে বুঝতে পেরেছিল যে, বড় কোনো বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার জন্য বা দ্রুত বিবর্তনের পথ নির্বিঘ্ন করার জন্য যে কোনো ধরনের সরকারকে অবশ্যই নিস্ক্রিয় করে রাখতে হবে। প্যারিসের সেই অবরোধের মধ্যে, তার রক্ষাকারী, তার শ্রমিকরাই সবচে দুর্দশার মধ্যে পড়েছিল। অন্যদিকে, তার নিস্ক্রিয় নাগরিকরা উপভোগ করছিল উদ্ধত আভিজাত্য। এবং প্যারিস দেখেছে: কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে এসব কেলেঙ্কারির অবসান টানা যায় নি। প্রতিটা সময়, যখনই প্যারিসের সাধারণ মানুষ নতুন কোনো মুক্ত আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেছে, তখনই সরকার সেগুলোর ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণার জন্ম নেয় যে, প্যারিসকে অবশ্যই একটি স্বাধীন কমিউন হতে হবে। এবং এর দেয়ালের মধ্যে থাকা নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে হবে। 

১৮৭১ সালের কমিউন একটি প্রথম পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই না। এটি শুরু হয়েছিল একটি যুদ্ধের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী জনতার এই বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিল। এসব পরিস্থিতির মুখে তারা নিঃসংশয়ভাবে অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথে হাঁটতে পারেনি; এটি নিজেকে সাম্যবাদী বলেও দৃঢ় ঘোষণা দিতে পারেনি; পুঁজি বিলুপ্ত বা শ্রম সংগঠনের দিকেও এটি যেতে পারেনি; এটি এমনকি শহরের সাধারণ সব মালসামানকেও বিবেচনায় নেয়নি। 

রাষ্ট্র, বা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অতীত ঐতিহ্যও এটি ছিন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতা ও কমিউনগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের ঘোষণা না দিয়েই কমিউন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরের সহজ থেকে জটিল- সব ধরনের সংগঠনের ক্ষেত্রেই তারা এই নীতির প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। 

তারপরও, এটি নিশ্চিত যে, প্যারিস কমিউন আর কয়েক মাস স্থায়ী হলে, এটি নিশ্চিতভাবে এসব অন্যান্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দিকেও ধাবিত হতো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সীমিত রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে চার বছর (১৭৮৯-১৭৯৩) নানাবিধ বিপ্লবী তৎপরতার মধ্যে পার করেছিল ফরাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তাহলে, প্যারিসের মানুষজন যে এতো অল্প সময়ের মধ্যে বিধ্বংসী সরকারের ধারণা থেকে নৈরাজ্যবাদী কমিউনের ধারনায় আসতে পারবে না; তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? আবার আমরা এটিও মাথায় রাখতে চাই যে, পরবর্তী বিপ্লবে (অন্তত ফ্রান্স ও স্পেনে যেটি কমিউনাল ধরনের হওয়ার কথা) মানুষ এই প্যারিস কমিউনের অসমাপ্ত কাজ আবার নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। ভার্সেই সৈন্যদের নির্বিচার হত্যার মুখে যে কাজটি বাধাগ্রস্থ হয়েছিল। 

প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

কমিউনের পতন হয়েছিল। আর আমরা খুব ভালো করেই জানি, শাসকদের ভীত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিভাবে প্রতিশোধ নিয়েছিল প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের আধুনিক সমাজে সত্যিই মাত্র দুইটি শ্রেণী আছে। একদিকে, সেসব মানুষেরা, যারা উৎপাদন করে ও সেই উৎপাদনের অর্ধেকই তুলে দেয় সম্পদের একচেটিয়া মালিকদের হাতে। এবং তারপরও হালকাভাবে এড়িয়ে যায় শাসকদের করা অন্যায়গুলো। অন্যদিকে আছে নিস্ক্রিয় পরজীবীরা। সব কিছু নষ্টকারী এই মানুষগুলো তাদের দাসদের ঘৃণা করে; খেলার মতো করে তাদের হত্যা করতে প্রস্তুত থাকে, নিজের সম্পদ-সম্পত্তির দখল হুমকির মুখে দেখলে সে চূড়ান্ত বর্বর আচরণও করতে পারে। 

প্যারিসের মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলার পর এবং বেরোনোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর, ভার্সেই সরকার তাদের ওপর সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেয়। মদ ও সেনাজীবনের বর্বরতায় প্ররোচিত হওয়া সৈন্যদের বলা হয়েছিল “নেকড়ে ও তার শাবকদের” মতো কাজ করে দেখাতে। প্যারিসের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল: 

তুমি যে-ই হও, তোমার মৃত্যু অবধারিত! যদি তুমি হাতে অস্ত্র তুলে নাও, মৃত্যু! যদি সেগুলোর ব্যবহার করো, মৃত্যু! যদি ক্ষমা ভিক্ষা করো, মৃত্যু! যেদিকেই যাও, ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পিছে, উপরে, নিচে; মৃত্যু! তোমরা শুধু আইনেরই বাইরে নয়, মানবতারই বাইরে। বয়স বা লিঙ্গ; কোনো কিছুই তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। তোমরা মরবে। তবে তার আগে দেখবে তোমাদের স্ত্রী, বোন, মা, ছেলে-মেয়ে, এমনকি দোলনায় থাকা শিশুদেরও আর্তচিৎকার! তোমার চোখের সামনে আহত মানুষকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে তার বুকে বেয়োনেট চালিয়ে দেওয়া হবে বা রাইফেলের বাঁট দিয়ে মাথায় মারা হবে। জীবন্ত অবস্থাতেই তার ভাঙা পা বা রক্ত ঝরতে থাকা হাত ছিঁড়ে ফেলা হবে, ছুঁড়ে ফেলা হবে নর্দমায়। মৃত্যু! মৃত্যু! মৃত্যু!

এই উন্মক্ত-বর্বর আহ্বানের পর, প্যারিসে রাস্তায় জমে লাশের সারি। এবং এই নিধনযজ্ঞ চালানোর পর আসে পেটি প্রতিশোধ। জেলারদের চাবুক-লাঠির ঘা, অপমান, অনাহার ইত্যাদি যত ধরনের নিষ্ঠুরতা আছে; সব কিছু দিয়ে নেওয়া হতে থাকে প্রতিশোধ। মানুষ কী এসব ভুলে যেতে পারে? 

প্যারিস কমিউনকে উচ্ছেদ করা গেছে, কিন্তু পরাজিত করা যায়নি। আমাদের সময়ে কমিউন আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছে। এটি শুধু একটি লুপ্ত হয়ে যাওয়া স্বপ্ন নয়, শুধুই একটি সুন্দর আশা-আলেয়ার কল্পনা নয়। না! আজকের “কমিউন” হয়ে উঠছে আরো দৃশ্যমান। বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আমাদের পায়ের নিচে গর্জে উঠছে। সাধারণ মানুষের এই স্রোতধারার গভীরে যাওয়া এবং তাদেরকে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করাই এখন কাজ। আমরা বর্তমান এই প্রজন্মের ওপরই ভরসা রাখছি যে, তারা কমিউনের মধ্যে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে; মধ্যবিত্তের শোষণ-শাসনের এই হীন ব্যবস্থাটির অবসান ঘটাবে; রাষ্ট্রের রক্ষায় নিযুক্ত থাকা মানুষদের থেকে মুক্তি দেবে; এবং মনুষ্যজাতির বিবর্তনে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

২. কিভাবে প্যারি কমিউন নিজের সত্যিকারের লক্ষ্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তবে তারপরও সেই লক্ষ্যটি তুলে ধরেছিল বিশ্বের সামনে

ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উচ্ছেদ করেছিল প্যারিসের মানুষ। সেই ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনো সভ্য সমাজের নিপীড়িত জনতা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয় ১৮৭১ সালের সেই আন্দোলনের দিকে। কেন প্যারিস কমিউনের ধারনাটি বিশ্বের প্রতিটি জায়গার, প্রতিটি জাতির শ্রমিকের কাছে এতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে? 

উত্তরটা সহজ। ১৮৭১ সালের বিপ্লব, সব কিছুর ওপরে ছিল খুবই জনপ্রিয় একটি তৎপরতা। সাধারণ মানুষ নিজেরাই এটি তৈরি করেছিল। জনসমুদ্রের ভেতর থেকে এটি গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এবং এই মহান জনসমুদ্রের ভেতর থেকেই প্যারিস কমিউন খুঁজে পেয়েছিল তার রক্ষক, নায়ক ও শহীদদের। এটি এতোটাই “নিচু” শ্রেণীর মানুষদের বিষয় ছিল যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী কখনোই এটিকে ক্ষমা করতে পারে না। এবং একই সময়ে, এটি পরিচালিত হচ্ছিল একটি সামাজিক বিপ্লবের ধারণা নিয়ে। সেটি নিশ্চিতভাবেই অনেক অস্পষ্ট ছিল। হয়তো অবচেতনে ছিল। কিন্তু, তারপরও এটি সব মানুষের জন্য সত্যিকারের মুক্তি, সত্যিকারের সাম্য অর্জনের কথা বলেছিল। এটি ছিল এমন এক বিপ্লব, যেখানে সমাজের নিচের স্তরের মানুষেরা তাদের অধিকার আদায়ের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। 

বিপ্লবের এই অর্থ ও তাৎপর্য বদলে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে এটিকে দেখানো হয় শুধুই প্যারিসের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয় হিসেবে। যেন এটি ফ্রান্সের মধ্যেই আরেকটি ছোট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কিন্তু এর চেয়ে অসত্য আর কিছুই হতে পারে না। প্যারিস কখনোই পুরো ফ্রান্স থেকে নিজেকে আলাদা করতে চায়নি। অস্ত্রের জোরে এটি দখলও করতে চায়নি; প্যারিস নিজেকে নিজের দেয়ালের মধ্যে বন্দীও করে ফেলতে চায়নি, যেমনটি একজন নান করেন নিজেকে কনভেন্টের মধ্যে বন্দী করে ফেলার মাধ্যমে; প্যারিস নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেনি দেয়ালঘেরা সুন্দর এলাকা তৈরির মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। প্যারিস যদি নিজের স্বাধীনতা দাবি করে থাকে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তক্ষেপ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সে এটি করেছে কারণ এই ধরনের স্বাধীনতার মধ্যেই প্যারিস দেখেছিল ভবিষ্যতের নানাবিধ সংগঠনের ভীত এবং এগুলো ঘিরে সে পরিচালনার চেষ্টা করেছিল একটি সামাজিক বিপ্লব। যে বিপ্লবটি হয়তো পুরোপুরি বদলে দিত উৎপাদন ও বণ্টনের পুরো ব্যবস্থাটিকে। সেটিকে প্রতিষ্ঠা করত ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে। যেগুলো পুরোপুরি বদলে দিত নানাবিধ মনুষ্য সম্পর্ককেও। তাদের চালিত করত সাম্যের পথে। যেটি শেষপর্যন্ত তৈরি করত নতুন ধরনের সামাজিক নীতি-নৈতিকতা। যার ভিত্তি হতো সাম্য ও সংহতি। প্যারিসের মানুষের জন্য তখন কমিউনের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল একটি উপায় মাত্র। তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছিল: সামাজিক বিপ্লব। 

এই লক্ষ্য হয়তো অর্জন করাও সম্ভব হতো যদি ১৮ মার্চের সেই বিপ্লবকে তার স্বাভাবিক পথে পরিচালিত হতে দেওয়া হতো। যদি ভার্সেইয়ের আততায়ীরা প্যারিসের মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে না ফেলত। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কী করতে চাওয়া হচ্ছে, তা কিভাবে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে, সহজ কথায় ব্যাখ্যা করা যায়, যা পুরো বিশ্বের মানুষের জন্যেই বোধগম্য হবে- তা ছিল বিপ্লবের শুরুর সময় থেকে প্যারিসের মানুষের একটি অন্যতম প্রধান ভাবনা। কিন্তু এ ধরনের মহান কোনো ধারণা একদিনে তৈরি হয়ে যায় না। বিপ্লবের সময় সেগুলো যত দ্রুতই ছড়ানো বা ব্যাখ্যা-বিস্তার করা হোক না কেন। সব সময়ই এগুলো গড়ে উঠতে, জনসাধারণের মধ্যে সেসব ধ্যানধারণা ছড়াতে ও সেগুলোর ভিত্তিতে কর্মতৎপরতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এবং এই জায়গাতেই প্যারিস কমিউন ব্যর্থ হয়েছিল। এটির ব্যর্থতার একটি অন্যতম কারণ, যেমনটি আমরা আগে দেখেছি: ১০ বছর আগে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পার করছিল একটি রূপান্তরের পর্যায়। ১৮৪৮ সালের কর্তৃত্বপরায়ন, আধা-ধর্মীয় সমাজতন্ত্র; আমাদের সময়ের বাস্তববাদী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের কাছে আর আবেদন জাগাতে পারছে না। মজুরি ব্যবস্থা ও যৌথ সম্পত্তিকে এক জোয়ালে জুড়ে দিতে চাওয়া কালেক্টিভিজম ছিল দুর্বোধ্য, অনাকর্ষণীয়, এবং এটি বাস্তব প্রয়োগের পথে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। মুক্ত সমাজতন্ত্র বা নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের ধ্যানধারণা তখন কেবল শ্রমিকদের মাথায় আসতে শুরু করেছে। এবং তারা তখনও এমন সব কর্মকাণ্ড শুরু করেনি, যা থেকে সরকার-পূজারীরা তাদের আক্রমণ করা শুরু করবে। তখনও মানুষ কোনো স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপকল্প না থাকায়, সমাজতন্ত্রীরা নিজেরাও ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদের দিকে হাত দিতে পারেনি। তারাও এমন সব যুক্তি দিয়ে নিজেদের বিভ্রান্ত করেছেন যা অনেক বছর ধরে হয়ে আসছে। তা হলো: “আমাদের প্রথমে বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তারপর আমরা দেখব কী করা যায়।”

বিজয় নিশ্চিত করা! যেন ব্যক্তি মালিকানার ওপর হাত না দিয়ে মুক্ত কমিউন গঠনের অন্য কোনো উপায় আছে! বিপ্লবের বিজয়ে সাধারণ জনগণ সরাসরি আগ্রহী না হলে, অংশগ্রহণ না করলে শত্রুদের পরাজিত করার অন্য কোনো রাস্তা নেই। এবং এটি তারা করবে না যদি তারা সেখানে সবার বস্তুগত, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ দেখতে না পায়। 

সরকারের প্রশ্নে, নীতি-নির্ধারনের প্রসঙ্গেও একই জিনিস দেখা যায়। মুক্ত কমিউনের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে, প্যারিসের মানুষ একটি মৌলিক নৈরাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেছিল। তা হলো: রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।  

যদি আমরা মেনে নিই যে, কমিউনগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন নেই; তাহলে আমরা কেন মানব যে, প্রতিটি কমিউনের ভেতরে সবার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এমন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন আছে? আমরা আগামী দিনের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডকে যদি এমনভাবে কল্পনা করি, যেখানে বেশ কয়েকটি শহরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে মুক্তভাবে কোনো উদ্যোগ নেবে তাদের নিজ নিজ কমিউনিটির জন্য। তাহলে কেন আমরা একটি কমিউনের ক্ষেত্রেও কল্পনা করছি না যে, এখানেও এই একই ধরনের মুক্ত উদ্যোগের মাধ্যমেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে? কমিউনের বাইরে যদি কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা না থাকে, তাহলে কমিউনের ভেতরেও তা থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। 

প্যারিসের মানুষ আগেও অনেক সরকারকে উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু ১৮৭১ সালে, তারা এই সরকারতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করার প্রথম নজির দেখিয়েছিল। শেষপর্যন্ত অবশ্য তারা সরকারের অলৌকিক ক্ষমতার পূজায় ভেসে যায় এবং নিজেদেরও একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে বসে। তার পরিণাম কী হয়েছিল- সেই সাক্ষ্য ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। প্যারিস, তার সবচে নিবেদিতপ্রাণ সন্তানদের এই সরকার পরিচালনার জন্য পাঠিয়েছিল টাউন হলে। সেখানে, তারা ডুবে গিয়েছিল গাদা গাদা পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে। সহজাত বোধ-বুদ্ধি, তাদেরকে মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করতে বললেও, তারা বাধ্য হয়েছিল শাসন করতে। তারা আলোচনা করতে বাধ্য হয়েছিল যে, কখন কী পদক্ষেপ নিতে হবে; কখন সমঝোতা করতে হবে, যেখানে কোনো ধরনের সমঝোতাই ভালো কোনো নীতি হতে পারে না। এবং শেষপর্যন্ত, সব সময় জনসাধারণের মধ্যে থাকলে যে ধরনের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, সেগুলো তারা হারিয়ে ফেলছিল। এভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের করে তুলেছিল অক্ষম। জনমানুষের কাছ থেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সরকার পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। এবং বিপ্লবী শক্তির কেন্দ্র হওয়ায়, এটি জনপ্রিয় সব মুক্ত উদ্যোগকেও করে তুলছিল পক্ষাঘাতগ্রস্থ। ফলে, এসব কারণে প্রুশিয়ার বন্দুকের নিচ থেকে জন্ম নেওয়া, প্যারিস কমিউনের পতন নিশ্চিত ছিল। তবে, খুবই জনপ্রিয় রূপ ধারণ করায় এটি আরো অনেক বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করেছে। চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটি ছিল সামাজিক বিপ্লবের অগ্রদূত। প্যারিস কমিউনের শিক্ষা অবশ্য পাওয়া গেছে। এবং ফ্রান্স আবার যখন এ ধরনের বিদ্রোহী সব কমিউন দিয়ে গর্জে উঠবে, তখন মানুষ হয়তো আর সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে না, এবং আশা করবে না যে, সরকারই সব বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেবে। বরং, তারা যখন সত্যিই এসব পরজীবীদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করবে; সব সামাজিক সম্পত্তির দখল নেবে এবং সেগুলো নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের নীতিতে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সরকার, ও রাষ্ট্র থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলার পর, মানুষ নিজেদের মতো করে মুক্তভাবে সমাজ গঠন করবে, জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে। বিগত দিনের শৃঙ্খল ছিন্ন করে, মূর্তি-বিগ্রহ গুঁড়িয়ে দিয়ে, মানুষ যাত্রা করবে সুন্দর এক ভবিষ্যতের পথে। তারা জানবে যে, সেখানে কেউ কারো প্রভু বা দাস হবে না। সেখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে সেসব মহান শহীদদের, যারা মুক্তির পথে প্রথম পা বাড়িয়ে তাদের রক্ত ঝরিয়েছেন। এবং আমাদের উদ্বুদ্ধ ও আলোকিত করেছেন স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরুর জন্য। 

প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

৩. আধুনিক সমাজতন্ত্রে প্যারি কমিউনের শিক্ষা

সোশ্যালিস্ট কিছু গ্রুপ আছে, এমন প্রায় প্রতিটি শহরে ১৮ মার্চ, প্যারি কমিউনের স্মরণে সমবেত হয়েছিল সাধারণ মানুষ। ১৮ মার্চের এই সমাবেশগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শুধু এ কারণে না যে, এগুলো থেকে শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায়। বরং এজন্য যে, এগুলো দুই ধারার সমাজতন্ত্রীদেরই মনোভাব প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে। যে কোনো ধরনের ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে “ভোট নেওয়ার” চেয়ে এই সমাবেশগুলো অনেক ভালো সুযোগ নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো উপস্থাপন করার। এখানে নির্বাচন-কেন্দ্রিক পার্টি কৌশলের কোনো প্রভাব থাকে না। শ্রমিকরা শুধু প্যারিসের প্রলেতারিয়েতদের সাহসীকতাকে প্রশংসা করা বা মে গণহত্যার প্রতিশোধ চাওয়ার জন্যই সমবেত হয়নি। হ্যাঁ, প্যারিসের সেই সাহসী সংগ্রামের স্মৃতি অবশ্যই তাদের উজ্জীবিত করে। কিন্তু তারা শুধু এটুকুতেই আটকে না থেকে, আরো অনেক আলাপ তুলেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে যে, ১৮৭১ সালের কমিউন থেকে আমরা আগামী দিনের বিপ্লব সম্পর্কে কী শিক্ষা পেতে পারি। তারা জানতে চেয়েছে: কমিউনের ভুলভ্রান্তিগুলো কী ছিল। তারা শুধু এর জন্য দায়ী মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের সমালোচনা করতে চায়নি। বরং খুবই স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে যে, কিভাবে সম্পত্তি ও কর্তৃত্ব নিয়ে বাঁধাধরা সব ধারণা তাদের পিছু টেনে ধরেছে। বিপ্লবী চিন্তাধারার বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করেছে, এবং পরিণামে এটি বিশ্বের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেনি।  

১৮৭১ সালের এসব শিক্ষা পুরো বিশ্বের শ্রমিকদের কাজে লেগেছে। তারা পুরোনো সব ধ্যানধারণা ও চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলেছে। সহজ ও স্পষ্টভাবে বোঝাপড়া তৈরি করেছে যে, তাদের আগামী বিপ্লবটা কেমন হতে যাচ্ছে। 

আগামী দিনে কমিউনের উত্থান শুধুই একটি “কমিউনাল” আন্দোলন হবে না। যারা এখনো মনে করেন যে বিপ্লবের শুরুতেই স্বাধীন, স্থানীয় স্বশাসিত সংগঠন/সংস্থা গড়ে তুলতে হবে, তারা শুধু নিজেদের এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার ঘটিয়েই থেমে যাবেন না। জনপ্রিয় চেতনাকে ধারন করে আরো অনেক কিছুর বিকাশ ঘটাবেন। অন্তত ফ্রান্সে এমনটিই দেখা যাবে। আগামী বিপ্লবের কমিউনগুলো তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠা করবে সরাসরি সব সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তারা বিলুপ্ত করবেন ব্যক্তিগত মালিকানা। যখন এমন বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করবে, এবং জনতার বিপ্লবী স্রোতে সরকার ভেসে যাবে; রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর নির্ভর করা মধ্যবিত্ত শ্রেণী যখন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে; তখন এই বিপ্লবী জনতা নতুন কোনো সরকারি ডিক্রি জারির অপেক্ষা করবে না। যেটি কিনা তার দুর্দান্ত জ্ঞান দিয়ে অল্প কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আসবে মাত্র!

তারা এমন কোনো ডিক্রির জন্য অপেক্ষা করবে না যেটির পর সামাজিক পুঁজির দখল রাখা মানুষদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে। আসলে এমন একটি ডিক্রি কার্যত অকার্যকরই থাকবে যদি শ্রমিক-জনতা নিজে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়। বিপ্লবের পর তাই কোনো দেরি না করে, সাধারণ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় সব সম্পদের দখল নেবেন এবং সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। তারা কলকারখানায় নিজেদের এমনভাবে সংগঠিত করবেন যেন সব কর্মকাণ্ড চালু থাকে। কিন্তু এখন থেকে তারা উৎপাদন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন সাধারণ মানুষের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী। তারা নিজেদের বস্তি-কলোনি ছেড়ে বিত্তবানদের মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন; শহরে জমা হয়ে থাকা সম্পদ কিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেভাবে নিজেদের সংগঠিত করবেন। তারা এই সঞ্চিত সম্পদকে নিজেদের বলেই বিবেচনা করবেন এবং দাবি করবেন যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এগুলো তাদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। 

যে শিল্পকারখানার মালিকরা এতোদিন শ্রমিকদের ব্ল্যাকমেইল করে ফায়দা লুটেছে, সেই মালিকদের উচ্ছেদ করা মাত্র আবার উৎপাদন শুরু হবে। সেসব বাধা-নিষেধাজ্ঞা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, যেগুলো উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। সেই ধরনের সব সংশয়-সন্দেহের অবসান ঘটাতে হবে, যেগুলো উৎপাদন থামিয়ে দিতে পারে বা এটিকে বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটির রূপান্তর ঘটাতে হবে বিপ্লবী পরিস্থিতি-তৎপরতার আকাঙ্ক্ষা অনুসারে, এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে। “ফ্রান্সের মানুষ কখনোই এতোটা উৎসাহ নিয়ে কাজ করেনি, যতটা করেছিল ১৭৯৩ সালে, অভিজাতদের হাত থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে সেটিতে কাজ করার সময়,” বলেছেন ইতিহাসবিদ মিশলে। মানুষ তখনও এমন উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে, যেদিন থেকে শ্রম মুক্ত হয়ে যাবে এবং শ্রমিকের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পুরো সমাজের কল্যানের স্বার্থে কাজ করবে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পদের মধ্যে পার্থক্য টানার একটি চেষ্টা পরবর্তীতে হয়েছে। এবং সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলো এই প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে আছে। বর্তমানের কালেক্টিভিস্ট স্কুল, পুরোনো আন্তর্জাতিকের কালেক্টিভিজমকে (যেটি নিছকই একটি কর্তৃত্ববিরোধী কমিউনিজমের ধারনা) প্রতিস্থাপন করেছে নতুন এক ধরনের কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব দিয়ে। যেখানে দুই ধরনের পুঁজির মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করা হয়েছে। এক দিকে থাকবে এমন পুঁজি যেটি উৎপাদন ও সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে কাজে লাগানো হবে। এগুলোর মধ্যে থাকবে যন্ত্রপাতি, কল-কারখানা, কাঁচামাল, যোগাযোগের উপায় ও ভূমি। এবং অন্য ধরনের পুঁজিতে থাকবে আবাসন, বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য, জামাকাপড়, ইত্যদি। প্রথম ধরনের পুঁজিতে থাকবে কালেক্টিভ মালিকানা। এবং দ্বিতীয় ধরনের পুঁজি থাকবে ব্যক্তিমালিকানায়। এভাবেই ভেবেছেন এই সমাজতান্ত্রিক স্কুলের অধ্যাপকরা!

এরকম একটি পার্থক্য টানার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বোধশক্তি সেটি হতে দেয়নি। তাদের কাছে এটিকে মনে হয়েছে অবাস্তব এবং এটি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এটি তাত্ত্বিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। শ্রমিকরা বুঝতে পেরেছিল: যে বাড়িতে তারা থাকেন, যে কয়লা-গ্যাস জ্বালান, মানবশরীর চালাতে যে জ্বালানি খরচ হয়, জীবনধারনের জন্য যে জামাকাপড় প্রয়োজন হয়, যে বই আমরা পড়ি জানার জন্য, এমনকি যে আনন্দ-উৎসবের ব্যবস্থা থাকে; সব কিছুই আমাদের অস্তিত্বের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সব কিছুই কার্যকরীভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ও সামগ্রিকভাবে মনুষ্য সভ্যতার প্রগতিশীল বিকাশের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কলকারখানা, কাঁচামাল ও উৎপাদন সংক্রান্ত অন্যান্য উপাদান। শ্রমিকরা ক্রমেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন যে, যদি কিছু কিছু ধনসম্পদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার চল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি বৈষম্য, নিপীড়ন, শোষণ জারি রাখবে। কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব তাদের চিন্তার সামনে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, সেটিকে শ্রমিকরা পেরিয়ে যাচ্ছেন। তারা হাঁটছেন সবচে সহজ-সাধারণ এবং সবচে বাস্তবসম্মত কাঠামোর কর্তৃত্ববিরোধী সমাজতন্ত্রের দিকে। 

এখনকার সমাবেশগুলোতে বিপ্লবী শ্রমিকরা খুব স্পষ্টভাবে বলছে সব ধরনের সামাজিক সম্পদের ওপর তাদের অধিকারের কথা, এবং ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্তির কথা। সেটি সব ক্ষেত্রেই: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে বিলাসী পণ্য পর্যন্ত। তারা বলছেন, “বিপ্লবের দিন, শহরে জমা হয়ে থাকা সব সম্পদ আমরা বাজেয়াপ্ত করব এবং সেগুলো সর্বসাধারণের ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজে লাগাব।” সমাবেশগুলোতে তাদের এই ঘোষণাকে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে সম্মিলিতভাবে হাততালি দিয়ে। বিপ্লবী এই শ্রমিকরা আরো বলছেন, “নতুন করে মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন শুরুর আগে সবাই যেন তার প্রয়োজনীয়তা অনুসারে পর্যাপ্ত রসদ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত পোশাক আছে সবাইকে দেওয়ার মতো। সেগুলো দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর বাইরে মানুষ দারিদ্রতার মধ্যে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি সেখানে এতো পোশাক আছে যে সবাই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী অভিজাত সব পোষাকও বেছে নিতে পারবে।”

ফ্রান্স ও অন্যান্য আরো অনেক জায়গায় প্যারি কমিউনের স্মরণে যেসব সভা-সমাবেশগুলো হচ্ছে, এবং সেসব জায়গায় যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, তাতে করে এটি স্পষ্টই বোঝা যায়: শ্রমিকরা আগামী দিনের বিপ্লবের ব্যাপারে তাদের মনস্থির করে ফেলেছেন। তারা আগামী বিপ্লবে হাঁটবেন নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন পুনর্গঠনের দিকে। এই দুইটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত হয়েছেন এবং এই দিক থেকে চিন্তা করলে, আগামী দিনের বিপ্লবগুলোতে আর পূর্বসূরীদের সেই একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না। যে পূর্বসূরীরা ভবিষ্যত অগ্রগতির জন্য নিঃশঙ্ক চিত্তে রক্ত ঝরিয়েছেন। 

ল্যঁ সিয়েজ দে প্যারি || জঁ লুই আরনেস্ত মিসোনিয়ে

তবে, তৃতীয় আরেকটি বিষয় আছে, যা নিয়ে এখনো কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানো যায় নি। এটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেই ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর সময়টিও হয়তো খুব বেশি দূরে নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে সরকার গঠন নিয়ে। 

খুব ভালোমতোই জানা আছে যে, সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলো এই প্রশ্নে দুটি অংশে পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে যায়। একপক্ষ থেকে বলা হয়, “বিপ্লবের দিনই, আমাদের এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে যা সব ক্ষমতার দখল নিয়ে নেবে। শক্তিশালী, ক্ষমতাবান, ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সরকার এরপর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এটা-সেটা ডিক্রি জারি করে এবং সবাইকে বাধ্য করবে সেসব নির্দেশ মানতে।”

“কী করুণ ভ্রান্তি!” বলে আরেক পক্ষ, “যে কোনো ধরনের কেন্দ্রীয় সরকার যদি কোনো দেশের ওপর নিজের শাসন চালাতে আসে, তাহলে এটি অবশ্যই বিপ্লবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটি সব সময়ই গড়ে উঠবে এর অন্যতম প্রধান নির্যাস, সংরক্ষণবাদ এবং সবচে বিসদৃশ সব উপাদন দিয়ে। কমিউনগুলোতে গর্জে উঠতে থাকা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডগুলোর রাশ টেনে ধরা ছাড়া এটি আর কিছুই করবে না। ফলে পিছিয়ে পড়ে থাকা কমিউনগুলোকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার কাজটিও তারা করতে পারবে না। একই ঘটনা ঘটে বিক্ষুব্ধ, বিপ্লবী হয়ে ওঠা কোনো কমিউনের মধ্যেও। হয় কমিউনাল এই সরকার এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়া কিছু জিনিসের অনুমোদন দেবে, এবং তারপর এটি একটি অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক একটি যন্ত্র হয়ে থেকে যাবে; অথবা এটি বিপ্লবের নেতৃত্ব নিজের হাতে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখাবে এবং সেসব বিষয়ে নিয়মনীতি তৈরি করার চেষ্টা করবে যেগুলো তখনও শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারেনি। টিকে থাকার জন্য এগুলো করা ছাড়া তার আর কোনো পথ থাকে না। এটি তখন বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করবে, যেখানে পুরো সমাজ চেষ্টা করছে নতুন ধরনের সামাজিক জীবন গড়ে তুলতে। সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার পর মানুষের সামনে নতুন ও বিস্তৃত দিগন্ত খুলে যাবে এবং এগুলোর মধ্যে থেকে গড়ে ওঠা সম্মিলিত সৃজনশীল শক্তি দিয়েই সামাজিক কর্মকাণ্ডের নতুন সব সংগঠন তারা গড়ে তুলবে। ক্ষমতায় থাকা মানুষরা এই বিপ্লবী স্ফূরণকে শুধু বাধাগ্রস্থ করবে। সেসব কিছুই তারা করবে না, যেগুলো তারা করত; যদি তারা সাধারণ মানুষের ভেতরে থাকত। তা না করে তারা নিজেদের বন্দী করে ফেলেছে প্রশাসনিক সব দপ্তরের মধ্যে এবং নিজেদের ছুঁড়ে দিচ্ছে অলস সব তর্ক-বিতর্কের মধ্যে। ফলে বিপ্লবী সরকার সব সময়ই থাকবে একটি বিঘ্ন ও বিপদের প্রতীক হয়ে। ভালো অবস্থায় সেটি থাকবে ক্ষমতাহীন হয়ে, আর খারাপ অবস্থায় এটি হয়ে উঠবে দুর্দমনীয়। ফলে এরকম একটি জিনিস থাকার ফায়দা কী?”

ন্যায্য ও স্বাভাবিক মনে হলেও, এই যুক্তিগুলোকে লড়তে হচ্ছে আগেকার অনেক গোঁড়া চিন্তাধারার বিরুদ্ধে। এবং এমন মানুষদের বিরুদ্ধে, যারা সরকারের পূজনীয় ভাব বজায় রাখার স্বার্থে কাজ করে। একই সাথে সম্পত্তি ও ধর্মের যৌক্তিকতা ও বিশ্বাস তুলে ধরা ভাবধারার সঙ্গেও তাদের লড়তে হচ্ছে। 

তিনটি গোঁড়া পূর্ব সংস্কারের মধ্যে এই শেষটিই এখনো টিকে আছে এবং এটি আগামী বিপ্লবগুলোতে একটি বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। যদিও এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ারও অনেক লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকরা বলতে শুরু করেছে, “সরকারের কোনো নির্দেশ ছাড়াই আমরা নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিজেরাই ব্যবস্থাপনা করা শুরু করব। কেউ যদি নিজেদের যাজক, ভূস্বামী বা শাসক বলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আসে, তাহলে তাদেরকে আমরা পদদলিত করব।” আমাদের এখন এমন আশা করতে হবে যে, নৈরাজ্যবাদী শক্তি যেন কঠোরভাবে এই সরকার-পূজারীদের মোকাবিলা করতে থাকেন; এবং কখনো নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত না করেন। আমাদের আশা করতে হবে যে, বিপ্লবের আগের সময়গুলোতে সরকারপন্থী এসব ভাবধারাকে এমনভাবে নাড়া দিতে হবে যেন বিপ্লবের সময় এটি মানুষকে অন্য কোনো ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিই অর্জন করতে না পারে।  

পরবর্তী বিপ্লবের সময় কমিউনগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং সংসদীয় শাসনের পরিবর্তে মুক্ত ফেডারেশন গড়ে তুলবে। তারা নিজ নিজ কমিউনিটির মধ্যেও সংসদীয় শাসনের প্রথা বিলুপ্ত করে ফেলবে। খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য তারা ভরসা করবে শ্রমিকদের মুক্তভাবে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর সংগঠনের ওপর। যেগুলো অন্য শহর ও গ্রামের সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে ফেডারেশনের মাধ্যমে। তারা কোনো কমিউনাল সংসদের মাধ্যমে এই যোগাযোগ করবে না। বরং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে সরাসরি।   

তারা কমিউনের ভেতরেও যেমন নৈরাজ্যবাদী হবে, তেমনি কমিউনের বাইরেও নৈরাজ্যবাদী হবে। এভাবেই তারা বাঁচতে পারে পরাজয়ের দুঃস্বপ্ন থেকে, প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিশোধ থেকে।

———————-

১. Arthur Arnould, Historie populaire et parlementaire de la Commune de Paris, Bruxelles: H. Kistemaeckers, 1878, 2 tomes en 1 vol.

২. জুলস মিশলে (১৭৯৮-১৮৭৪) একজন ফরাসী ইতিহাসবিদ। তিনিই ফ্রান্সের ইতিহাস বিষয়ক বইয়ে ইউরোপের পুনর্জাগরনের বিষয়টিকে রেঁনেসা নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলেন।

পার্থ প্রতীম দাস

পার্থ প্রতীম দাস লেখক, অনুবাদক ও অরাজপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট। সম্পাদনা করছেন অরাজ গ্রন্থগুচ্ছ সিরিজ। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। যুক্ত ছিলেন ছোটকাগজ সম্পাদনার সঙ্গে। ২০০৭ সালের আগস্ট বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন সক্রিয়ভাবে। পরবর্তীতে কারাবন্দী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষে যুক্ত হন সাংবাদিকতা পেশায়। বর্তমানে সাংবাদিকতা বিষয়ক গবেষণা প্রকল্পে কাজ করছেন। যোগাযোগ: ইমেল: [email protected]