অরাজ
আর্টওয়ার্ক: ব্ল্যাকম্যান শিল্পী: শেলি ব্রান্টলি সূত্র: ফাইনআর্ট আমেরিকা
প্রচ্ছদ » জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

জসুয়া ফ্রাঙ্ক।। এটা এখন শ্রেণি যুদ্ধও বটে

  • অনুবাদ: ইফতেখার রুমি

সম্পাদকীয় নোট: আমেরিকায় সম্প্রতি চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভকালে বিভিন্ন বড়ো বড়ো কর্পোরেট শো-রুম, দোকানপাট ভাঙ্গচুর হয়েছে, অনেক স্থানে বিক্ষোভকারীরা জিনিসপত্রও নিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলও এই সব দৃশ্য দেখিয়ে বারবার ‘লুটিং’ ‘লুটারস’ ইত্যাকার শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রচারণার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্ণবাদ বিরোধী এই আন্দোলন এবং এই আন্দোলনকারীদের নৈতিকভাবে খাটো করা। এই ধরনের ‘লুট’ বা ‘সহিংস’ কর্মকাণ্ড কতটা দিনের পর দিন থেকে নিপীড়ত ও বিক্ষুব্ধ  মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ, আর কতটা ‘লুট’ তা নিয়ে জসুয়া ফ্রাঙ্ক জুনের ১ তারিখ কাউন্টারপাঞ্চে নিবন্ধ লিখেছেন। এতে খুব সংক্ষেপে এই আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলোচিত হয়েছে। উক্ত নিবন্ধের ভাবানুবাদ হাজির করেছেন ইফতেখার রুমি।

আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েডের ম্যুরাল
শিল্পী: জনাথন ফ্রো পেরি
সূত্র: কিটস্যাপ সান

মূল প্রবন্ধ

লস এঞ্জেলসের এর অন্যতম নামীদামী শপিং জেলা হিসেবে পরিচিত মেলরুজ এভেনিউ বরাবর যে দৃশ্য  দেখা যাচ্ছে তাকে এক রকমের প্রতিশোধের দৃশ্য বলা যায়। গ্লাসের টুকরা বিক্ষিপ্ত আকারে ফুটপাতে পড়ে আছে, দোকানপাটগুলোর সম্মুখভাগ গ্রাফিতিতে ভরা। ভোরের বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ এখনো তাজা রয়েছে। মেয়র এরিক গ্রাসেত্তি কর্তৃক শহরময় জরুরী অবস্থা ও  কারফিউ ঘোষণার কিছু আগে শনিবার রাতে যে লুটপাট ঘটে গেল তার কেন্দ্রস্থল ছিল এই জায়গাটা– মেলরুজ এভেনিউ। গ্রাসেত্তি এরপর গভর্নর নিওসোমকে ফোন করেছিলেন ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ডেকে আনার জন্য। এর ফলে ১৯৯২ সালের পর প্রথম বারের মত  লস এঙ্গেলেসের রাস্তায় ন্যাশনাল গার্ড সদস্যরা চক্কর দিল। শেষ বার ন্যাশনাল গার্ড রাস্তায়ে নেমেছিল যখন ’৯২ সালে রডণী কিং এর রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। ছুটির দিনের গনরোষ আর যন্ত্রণার প্রদর্শন শেষে যা অবশিষ্ট থাকল তা রক্ষা করতে রোববার সামরিক যান আর সেনা রাস্তায় নামল।

জনভীতি উষ্কিয়ে দিতেই কিনা ফক্স নিউজ শনিবারের প্রতিবাদী সমাবেশ পরবর্তী ধ্বংসকরনকে নাম দিল ‘সহিংস দাঙ্গা’। আঞ্চলিক পত্রিকা এল এ টাইমস প্রথমে দেখাতে চাইলো ‘আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভাজন ছিল’, এবং এরপরে লুটপাটকারিদেরকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে উঠেপড়ে লাগলো। এরই মধ্যে রোববার সকালে ট্রাম্প ঘোষণা দিল যে, তার সরকার এন্টিফাকে সন্ত্রাসী সংঘটন হিসেবে আখ্যায়িত করতে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে যে আন্দোলনকারীরা নিজেদের সম্মিলিত ক্রোধকে কণ্ঠ দিবেন বলে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, তারা ছিলেন অনেকটা লস এঞ্জেলসের চরিত্রের মতনই: নানা উদ্দেশ্যের একটা বিচিত্র ভিড়।

সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর যারা রয়ে গিয়েছিল তাদেরই একটা অংশকে এখন লুটপাটকারি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। রোববার সন্ধ্যানাগাদ সান্তামনিকা ও লঙ বিচ জুড়ে যে হতাশা স্পষ্টত অনুভব করা যাচ্ছিল তা আমলে না নিয়েই তাদেরকে খুব সাবলিলভাবে ‘দুর্বৃত্ত’ ও ‘চোর’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটা আমলে না নেয়ার মাধ্যমে তারা কেবল আমেরিকার পদ্ধতিগত বর্ণবাদকে উপেক্ষাই করছে না, বরঞ্চ আমাদের শোচনীয় সামাজিক স্তরবিন্যাসকেও দেখেও না দেখার ভান করছে। গেল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লস এঞ্জেলসের রাস্তায় ও দেশের অন্যান্য জায়গায়, যে বিক্ষোভ-জাগরণ দেখা যাচ্ছে তা যতটুকু জাতিগত বর্ণবাদ ও পুলিশি বর্বরতা নিয়ে ততটুকুই শ্রেণিগত।

আর্টওয়ার্ক: দ্য বাঙ্কার হেড
শিল্পী: গ্রেগরি দাসি
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

এই ঘটনার ফলাফলরুপে ট্রাম্প তার নিজস্ব দাম্ভিক কায়দায় যে আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন,  তিনি ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ হতে চান, তার সে মনোবাসনা পূর্ণ হল। অফিসের দায়িত্ব গ্রহন করার পর থেকে ট্রাম্প যে অগ্নিশিখাকে বাতাস দিয়ে যাচ্ছিলেন তা শেযপর্যন্ত আমারিকায় বিস্ফোরিত হলো এবং সে আগুন এখন তার দোরগোড়ায় জ্বলছে। আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা আসলে পুরাদস্তুর একটা শ্রেণি-সংগ্রাম। কোনো সন্দেহ নেই যে অনেকগুলো ঘটনার ঝড় বয়ে চলছে; কভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বৃহৎ আকারের বেকারত্ব (সংখ্যায়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন), ভাইরাস জনিত মৃত্যু বৈষম্য, পুলিশ বাহিনী কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের ধারাবাহিক নিপীড়ন, এবং এসবের পাশাপাশি এমন এক কর্পোরেট-সরকার যারা ঝুঁকির মধ্যে থাকা নাগরিকদেরকে রক্ষা করতে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

দোকান লুটপাট স্বভাবতই একটি শ্রেণি প্রসঙ্গ, তা আপনার পছন্দ হোক বা না হোক (ব্যতিক্রম কিছু তো সর্বদাই থাকে)। মূলত আফ্রিকান দাসত্ববন্ধন ও স্থানীয়দের জমি ছিনতাই করার সময় থেকেই লুন্টন করা আমেরিকার দীর্ঘকালস্থায়ী একটা ঐতিহ্য। এবং এই জমানায় এসে, ধনী লোকেরা শপিংমলগুলো লুট করে না, বরং তারা ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কয়েলাখনি থেকে শুরু করে জেফ বাজেসের আমাজন গুদাম পর্যন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ ও শ্রম লুট করতে খুবই পারদর্শী। এইসময়ে গরীবরা তাদের নামমাত্র ক্ষমতাকে যেভবে জাহির করছে, ধ্বংসাত্মক ও সহিংস আকারে হলেও, তা ক্রমাগত ক্ষমতাহীন অবস্থায় থাকার বিলকুল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাদের জন্য লুটপাট  হচ্ছে সাহায্যের জন্য চিৎকার, হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

আমরা সবাই বীভৎস ভিডিওটা দেখেছি। জর্জ ফ্লোয়েডকে মিনেপলিস পুলিশ অফিসার ডেরেক চৌভিন প্রকাশ্য দিবালোকে যখন হত্যা করছিল, শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে ফ্লয়েড তখন মায়ের সাহায্যের জন্য কাঁদছিল। আমরা সবাই দেখেছি কিভাবে শ্বেতাঙ্গ নির্মম প্রহরীরা, যাদের মধ্যে একজন সাবেক গোয়েন্দা, পথচারী আহমদ আরবেরিকে হত্যার পূর্বে পিকআপ ট্রাকে তুলে নিয়েছিল। যে বিস্ময়কর হারে কালো মানুষদের পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে সে দীর্ঘ তালিকার সাথে আমরা সবাই পরিচিত – শ্বেতাঙ্গের তুলনায়ে ২.৫ গুন বেশি। আমরা এও জানি যে কোভিড সংকটের আগেও পুরো কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যার ২০% মানুষ অতি-দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে, সংখ্যায়ে প্রায় ৯ মিলিয়নের মতো। বর্তমানে দেশজুড়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ,  এবং এর ফলশ্রুতিতে সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।

আর্টওয়ার্ক: জর্জ ফ্লায়েড ডেথ
শিল্পী: এমাদ হাজ্জাজ
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

অবশ্যই, আমাদের দেশের গরীব মানুষের মধ্যে ফেনাইয়া উঠা অসন্তোষ এবং সরকার সমর্থিত গুণ্ডাদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের উপর যে বর্বরতা উভয়ই ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ব থেকেই ছিল। কর্নেল ওয়েস্ট এক প্রোগ্রামে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

‘আপনি ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি নিঊলিবারেল উইং পেয়েছেন যা এখন চালকের আসনে রয়েছে …তারা সত্যিই জানে না কি করতে হবে কারণ তারা যা আসলে করতে চায় তা হল আরও বেশি কালো মুখ দেখাতে চায়। তবে প্রায়শই এই কালো মুখগুলো বৈধতা হারাচ্ছে, কারণ ‘ব্ল্যাক লাইভস মেটার’ আন্দোলন একজন কালো রাষ্ট্রপতি, একজন কালো অ্যাটের্নি জেনারেল এবং একজন কালো হোমল্যান্ড সিকিউরিটির অধীনেই গড়ে উঠেছিল। এবং তারা আন্দোলনের দাবি মেটাতে পারেননি।’

আপনি কি মনে করেন গত সপ্তাহান্ত ভয়ংকর ছিল? তাহলে অপেক্ষা করুন। যদি ডেরেক চৌভিনকে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয় তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আপনার কাছে গৌণ বলে মনে হবে। নিশ্চিতভাবেই, ছোটখাটো ব্যাবসাপাতি লুটের মতো কিছু সংহতিনাশক ঘটনা হিতে বিপরীত ফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে; এই কারণেই প্রকৃত অপরাধী, পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের সহায়ক গোষ্ঠীর প্রতি এই ক্রোধকে সংঘটিত ও পরিচালনা করার একটা বাধ্যবাধকতা বামপন্থীদের রয়েছে।

আর্টওয়ার্ক: আই কান্ট ব্রেথ
শিল্পী: লাউলি শেনবানজো
সূত্র: সিএনএন

আমেরিকাতে অর্থনৈতিক ও জাতিগত নিপীড়ন অবশেষে এক উত্তেজনাকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। পদ্ধতিগত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর একটি পদ্ধতিগত পুনর্নির্মাণের রূপ নিবে। জানালা ভাঙ্গা থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত কিছু কিছু ক্রিয়াকলাপ হতাশা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। তবুও, এটি হচ্ছে অন্তর্নিহিত জাতিগত এবং শ্রেণিগত দিক যা এই বিদ্রোহকে আরও জাগিয়ে তুলবে। কোনো সিটি মেয়রের কাছ থেকে চাপিয়ে দেয়া কার্ফিউ এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তৃত বিদ্রোহ বা জাগরণের রাশ লম্বা সময়ের জন্য টেনে ধরতে সক্ষম হবে না।

ইফতেখার রুমি

ইফতেখার রুমি

ইফতেখার রুমি লেখক ও অনুবাদক। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ উইন্ডসরে অর্থনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। এর আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ের ছাত্র ছিলেন। ইমেইল: [email protected]

ইফতেখার রুমি

ইফতেখার রুমি