অরাজ
আর্টওয়ার্ক: দ্য কিস শিল্পী: গুস্তাভ সূত্র: আর্টসি নেট
প্রচ্ছদ » এরিক হবসবম।। বিপ্লব ও যৌনতা

এরিক হবসবম।। বিপ্লব ও যৌনতা

অনুবাদ: হিয়া

বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক হিসেবে এরিক হবসবম গোটা দুনিয়ায় নন্দিত ছিলেন। এমনকী যারা মার্কসবাদের সমর্থক নন, তাঁরাও ইতিহাসে এই ব্রিটিশ মার্ক্সবাদীর অসামান্য অবদানকে স্বীকার করেন। হবসবম জন্মেছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের বছরে,১৯১৭ সালে। আজীবন কমিউনিস্ট এই ঐতিহাসিকের সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলো হলো এইজ অব রেভ্যুলুশন (১৭৮৯-১৮৪৮), এইজ অব ক্যাপিটাল (১৮৪৮-১৮৭৫), এইজ অব এম্পায়ার (১৮৭৫-১৯১৪), এইজ অব এক্সট্রিমস (১৯১৪-১৯৯১) প্রভৃতি।

এরিক হবসবম “বিপ্লব ও সেক্স” প্রবন্ধটি লিখেছেন ষাটের দশকের কাউন্টারকালচারের অস্থির সময়ে। ১৯৬৯ সালে। প্রবন্ধটি পরবর্তিতে সংকলিত হয়েছে লেখকের রেভ্যুলুশোনারিজ বইয়ে।

 

শিল্পী: পাবলো পিকাসো

মূলরচনা

প্রয়াত চে গুয়েভারা নিঃসন্দেহে আশ্চর্য ও অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হতেন, যদি তিনি জানতেন যে তার ছবি আজ এভারগ্রিন রিভিউ এর প্রচ্ছদে, তার ব্যক্তিত্ব ভ্যগ এর একটি প্রবন্ধের বিষয়বস্তু এবং তার নাম নিউ ইয়র্কের একটি থিয়েটারে সমকামী প্রদর্শনবাদীতার জন্য ব্যবহৃত লোকদেখানো অজুহাত। আমরা ভ্যগ -কে পাশে সরিয়ে রাখতে পারি। ভ্যগ এর কাজ নারীদের জানানো কোন পোশাক পরিধান করা, কী জানা ও কোন বিষয়ে আলাপ করা হাল ফ্যাশনের সাথে মানানসই; হু ইজ হু এর সম্পাদক সম্পর্কে তাদের কৌতুহলের রাজনৈতিক তাৎপর্য যতোটুকু, ঠিক ততোটুকুই চে গুয়েভারা সম্পর্কে তাদের আগ্রহের রাজনৈতিক তাৎপর্য। বাকি দুটি বিষয় অবশ্য বহুবিস্তৃত একটি ধারণাকেই প্রতিফলিত করে: বিপ্লবী সামাজিক আন্দোলনের সাথে জনগণের যৌন স্বাধীনতার কোন না কোন সম্পর্ক আছে। এই বিশ্বাসের পিছনে যে কোন ভালো ভিত্তি নেই, তা বলার জন্য এটাই যথার্থ সময়।

প্রথমত, এখন এটি পরিষ্কার হওয়া উচিত যে প্রকাশ্যে গ্রহণযোগ্য যৌন আচরণ বিষয়ক প্রচলিত রীতির সাথে কোন রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা বা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক শোষণ ব্যবস্থার নির্দিষ্ট কোন সম্পর্ক নেই। (এই নিয়মের একটি ব্যতিক্রম হলো সমাজে নারীর উপর পুরুষের অবস্থান এবং পুরুষদের দ্বারা নারীর শোষণ যা সচারচর শোষিত লিঙ্গের প্রকাশ্য ব্যবহারের উপর অল্পবিস্তর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।) যৌন ‘স্বাধীনতা’-র সাথে অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের স্বাধীনতার শুধু অপ্রত্যক্ষ সম্পর্কই রয়েছে। শ্রেণি শাসন ও শোষণের বিভিন্ন ব্যবস্থা প্রকাশ্য অথবা গোপন ব্যক্তিগত আচরণে কঠোর রীতিনীতি চাপিয়ে দিতে পারে, আবার নাও দিতে পারে। হিন্দু সমাজ মন্দিরকে বিভিন্ন ধরনের আবেদনময়ী যৌন ক্রিয়াকলপের জন্য ব্যবহার করতো এবং ওয়েলশ প্রথাবিরোধী সম্প্রদায় তার সদস্যদের উপর যৌন আচরণ সম্পর্কিত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, এ কারণে আমরা হিন্দু সমাজকে কোনোভাবেই ওয়েলশ প্রথাবিরোধী সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি স্বাধীন বা সমতাবাদী বলতে পারি না। এই বিশেষ সাংস্কৃতিক পার্থক্য থেকে আমরা কেবল যা অনুমান করতে পারি তা হলো: যেসব ধার্মিক হিন্দু তাদের যৌন কর্মে  বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছিল, তারা ধার্মিক ওয়েলশবাসীর চেয়ে খুব সহজেই তা শিখে নিতে পারতো।

আদতে, শ্রেণি শাসন এবং যৌন স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে যদি কোন সাধারণীকরণ করা সম্ভব হয়, তবে সেটা হবে- শাসকগোষ্ঠীর অধীন লোকদের প্রকাশ্য যৌন আচরণে স্বাধীনতা, অনুমতি ও বিমিশ্রতা উৎসাহিত করে, যদি তা শাসকগোষ্ঠীকে পরাধীনদের পরাধীনতাকে ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করে। দাসদের উপর কখনোই কেউ যৌন অতিনৈতিকতা (Sexual Puritanism) চাঁপিয়ে দেয়নি; বরং উল্টোটা ঘটেছে।. যে সব সমাজ দরিদ্রদের একটি নির্দিষ্ট স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, সেইসব সমাজ নিয়মিতভাবে  প্রাতিষ্ঠানিক মুক্ত যৌনাচারের (Free Sex) গণ স্ফুরণের সাথে যথেষ্ট পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে কার্নিভালের কথা বলা  যায়।  আসলে, যেহেতু যৌনতা বিনোদনের সবচেয়ে সস্তা এবং সবথেকে প্রবল রূপ, (যেমনটা নেপলসবাসী বলে থাকে, বিছানা হলো গরীব মানুষের ‘গ্রান্ড অপেরা’) সেকারণেই যদি অন্য  সব কিছু একই  রকম থাকে তবে  তাদেরকে (দরিদ্র শ্রেণি) যতো বেশী সম্ভব এই ‘বিনোদন’ এ যুক্ত রাখা শাসকগোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ সুবিধাজনক।

অন্য কথায়, সামাজিক বা রাজনৈতিক সেন্সরশিপ এবং নৈতিক সেন্সরশিপের মধ্যে কোনও অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, যদিও প্রায়ই অনুমান করা হয় যে এমন সম্পর্ক রয়েছে। যেকোনো আচরণের অগ্রহণযোগ্যতা থেকে প্রকাশ্য গ্রহণযোগ্যতায় রূপান্তরিত হওয়া, কেবল তখনই একটি রাজনৈতিক কর্মের রূপ গ্রহণ করবে, যখন এই কাজ কোন রাজনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন সূচিত করবে। জাতিগত আধিপত্যকে আক্রমণ করার কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা ও কালো বর্ণের মানুষের যৌনসহবাস করার অধিকার অর্জন একটি রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে, এ কারণে নয় যে এই কর্ম যৌনতা সম্পর্কে যা অনুমোদনযোগ্য তার পরিধি বাড়িয়েছে। লেডি চ্যাটারলি প্রকাশ করার বৈধতা অর্জনের এমন কোন রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই, যদিও এই ঘটনাকে অন্যান্য কারণে আমরা স্বাগত জানাতে পারি।

আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেই এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত। গত ক বছরেই বেশ কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রেই কী বলা যাবে, কী  শোনা যাবে, কী করা যাবে এবং কী ধরনের যৌনতা প্রকাশ্যে এমনকি গোপনে প্রদর্শন করা যাবে- এ সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত সকল নিষেধাজ্ঞা বস্তুত বিলুপ্ত হয়েছে। একটি সংকীর্ণ যৌন নৈতিকতা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আত্মরক্ষার অপরিহার্য প্রাচীর এই বিশ্বাস এখন আর সমর্থনযোগ্য নয়। এবং এই সংকীর্ণ নৈতিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা যে খুব জরুরি- এই ধারণাও এখন আর সমর্থনযোগ্য নয়। যদিও এখনো কিছু সেকেলে ক্রসেডার রয়েছে যারা ভাবছে তারা যৌন রক্ষণশীলতার এক অতিনৈতিক দুর্গে আঘাত হানছে, কিন্তু আদতে এর দেয়ালগুলি আসলে ভেঙে পড়েছে।

সন্দেহ নেই, এখনো অনেক কিছু আছে যা ছাপানো অথবা দেখানো যায় না, তবে বর্তমানে এই ধরনের বিষয় খুঁজে পাওয়া এবং এ ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হওয়া ক্রমাগত কঠিন হচ্ছে। নারীদের নেক্লাইন (Neckline) ও স্কার্ট আন্দোলনের মতোই সেন্সোরশিপের অবসান একটি একমাত্রিক ঘটনা এবং যদি এই আন্দোলন দীর্ঘ সময় জুড়ে চলে তবে যৌন রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা ক্রসেডারদের বৈপ্লবিক সন্তুষ্টি অনেকাংশেই কমে যাবে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও, মঞ্চে অভিনেতাদের যৌন সঙ্গমের অধিকার স্পষ্টত ভিক্টোরিয়ান নারীদের বাইসাইকেলে চড়া থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে বিবেচিত হচ্ছে। আজকের দিনে অশ্লীলতার মামলাগুলোও ঠিকমতো চলছে না, যাদের উপর প্রকাশক ও প্রযোজকরা দীর্ঘদিন বিনামূল্য প্রচারণার (Free Publicity) জন্য নির্ভর করেছে।

বাস্তবিক কারণেই প্রকাশ্য যৌন অভিব্যক্তির জন্য লড়াই সফল হয়েছে। এই সফলতা কি সামাজিক বিপ্লবকে কাছাকাছি এনেছে, অথবা বিছানা, ছাপানো পাতা এবং বিনোদন জগতের (তা কাম্য হোক, অথবা না হোক) বাইরে এই সেক্স রেভ্যুলুশন কি কোন প্রকৃত পরিবর্তন এনেছে? কাঠামোগত  পরিবর্তনের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই সেক্স রেভ্যুলুশন একটি অপরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোয় শুধুমাত্র প্রচুর প্রকাশ্য যৌনতাই (a lot more public sex) এনেছে।

আমি কিছুটা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করি, যৌন আচরণের উদারবাদী অবাধ অভিব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে কোন অন্তর্নিহিত সম্পর্ক না থাকলেও সামজিক বিপ্লবের অতিনৈতিকতাবাদ (Puritanism)- এর প্রতি একটা নিরন্তর ঝোঁক আছে। আমি এমন কোন সুপ্রতিষ্ঠিত সংগঠিত বৈপ্লবিক আন্দোলন বা শাসনের কথা বলতে পারি না, যারা লক্ষ্যনীয় অতিনৈতিকতাবাদী (Puritanical) প্রবণতা বিকশিত করেনি। এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মার্ক্সবাদী আন্দোলন ও শাসন-ব্যবস্থাগুলোও, যে তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতাদের যৌনতা সম্পর্কিত মতবাদ ছিল সম্পূর্ণ অ-রক্ষণশীল, [অথবা এঙ্গেলসের ক্ষেত্রে একেবারেই অতিনৈতিকতাবাদ বিরোধী (Anti-puritanical)]। কিউবার মতো দেশগুলোতেই এই অতিনৈতিকতাবাদী প্রবণতা রয়েছে, যৌনতা  সম্পর্কে যাদের স্থানীয় ঐতিহ্য সাধারণত গোঁড়ামিমুক্ত (Opposite of Puritans)। এটা এমনকি সত্য নৈরাজ্যবাদী-মুক্তিপরায়ণ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও। যারা বিশ্বাস করে যে পূর্বের নৈরাজ্যবাদী মিলিট্যান্টদের নৈতিকতা ছিল মুক্ত ও সহজ, তারা আসলে জানেই না তারা কি বলছে। “ফ্রি লাভ” (যাতে তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখত) এর অর্থ ছিল নো ড্রিংকস, নো ড্রাগস এবং আনুষ্ঠানিক বিবাহ ছাড়াই একগামিতা।

বৈপ্লবিক আন্দোলনের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী বা যথাযথভাবে বললে এন্টি নোমিয়ান উপাদান মাঝে মাঝে শক্তিশালী এবং  মুক্তির চূড়ান্ত মুহূর্তে  সবচেয়ে প্রভাবশালী থাকলেও কখনোই পিউরিটান প্রবণতাকে প্রতিহত করতে পারেনি।  দাঁতোনরা সবসময়ই রোবস্পিয়ারদের কাছে পরাজিত হয়। যেসব বিপ্লবীদের কাছে যৌন অথবা সাংস্কৃতিক মুক্তি সত্যিই বিপ্লবের কেন্দ্রীয় ইস্যু, তারা আগে বা পরে বিপ্লবের মূলধারা থেকে এর দ্বারা ছিটকে পড়বেই। যেমনটা নিউ লেফট আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অরগ্যাজমের দূত (লেখকের ভাষায় Apostle of Orgasm) উইলহেম রেইখ সত্যিকার অর্থেই একজন বিপ্লবী মার্ক্সবাদী-ফ্রয়েডিয়ান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং তার বই মাস সাইকোলোজি অব ফ্যাসিজম (যার সাবটাইটেল ছিলো দি সেক্সুয়াল ইকোনোমি অব পলিটিক্যাল রিয়েকশন অ্যান্ড প্রলেতারিয়ান সেক্সুয়াল পলিসি) বিচার করে বলা যায়, সে ছিল খুব সক্ষম একজন মার্ক্সবাদী ও ফ্রয়েডিয়ান। কিন্ত আমরা কি সত্যিই অবাক হতে পারি এটা জেনে যে এই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত সংগঠনের বদলে অর্গ্যাজমের উপর নিজের আগ্রহকে কেন্দ্রীভূত করেছে? স্ট্যালিনপন্থী ও ট্রটস্কিপন্থী- উভয়ের মধ্যে কোন পক্ষই বিপ্লবী স্যুররিয়ালিস্টদের প্রতি কোন প্রকার আগ্রহই দেখায়নি, যারা তাদের দলে যোগ দেয়ার জন্য সদা উদগ্রীব ছিল। যারা রাজনীতিতে টিকে থেকেছে, তারা কেউই স্যুররিয়ালিস্টদের মতো ছিলেন না।

কেন এরকম ঘটে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অস্পষ্ট প্রশ্ন, যার উত্তর এখানে দেয়া সম্ভব না। এমন ঘটা অপরিহার্য কিনা তা আরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন- অন্তত সেইসব বিপ্লবীদের জন্য যারা মনে করে বিপ্লবী শাসনব্যবস্থা গুলোর অফিশিয়াল অতিনৈতিকতাবাদ (Puritanism) বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে আমাদের শতকের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবগুলো যৌনতা সম্পর্কে যা অনুমোদনযোগ্য তারা পরিধি বাড়াতে উৎসাহী ছিলো না। গত শতকের মহান বিপ্লবগুলো যৌন নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটিয়ে যৌন স্বাধীনতার অগ্রগতি ঘটায়নি, বরং তারা যৌন স্বাধীনতাকে বিকশিত করেছিল সামাজিক মুক্তির একটি বড় কাজের  মাধ্যমে: অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শৃঙখল থেকে নারীদের মুক্ত করার মাধ্যমে। এবং বিপ্লবী আন্দোলনগুলো যে ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যবাদকে সবসময় একটি উপদ্রব মনে করেছে, তা বলাই বাহুল্য। যাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্পিরিট পুরাতন ঘরনার সামাজিক বিপ্লবের সবচেয়ে কাছাকাছি, সেই সব বিদ্রোহী তরুণরাও (মাওবাদী, ট্রটস্কিপন্থী ও কমিউনিস্ট) সাধারণত মাদকগ্রহণ, বাছবিছারহীন সেক্স এবং ব্যক্তিগত প্রথাবিরোধীতার (Personal Dissidence) বিভিন্ন ধরন ও প্রতীকের বিরোধী। এর সপক্ষে যে কারণগুলো দেখানো হয় তা হলো, শ্রমিকরা এই ধরনের আচরণ বুঝতে পারে না এবং এর প্রতি সহানুভূতিশীলও না। এই কারণগুলো সত্য হোক বা না হোক, এই ধরনের আচরণ যে সময় ও শক্তি নষ্ট করে এবং সংগঠন ও কার্যকারিতার সাথে একদম  অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তা অস্বীকার করা যাবে না।

আর্টওয়ার্ক: ক্রিস্টাল ডে
শিল্পী: এরিক হেকেল
সূত্র: আর্থস্টোরি

এই সমগ্র প্রক্রিয়াটা একটি বৃহত্তর  প্রশ্নের অংশ। সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, যা বর্তমানে ‘নিউ লেফট’ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশে আন্দোলনের প্রধান দিক তা বিপ্লব অথবা যেকোনো সামাজিক পরিবর্তনে কোন ভূমিকা পালন করে?  এমন কোন বড় সামাজিক বিপ্লব সংগঠিত হয়নি, যারা অন্তত প্রান্তিক পর্যায়ে এই ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহকে একত্রিত করেনি। সম্ভবত আজকের দিনে পশ্চিমা বিশ্বে, যেখানে দারিদ্র্যর বদলে বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) বিপ্লবের প্রধান চালিকাশক্তি, সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টিকে প্রশ্ন না করে কোন আন্দোলনই বৈপ্লবিক হতে পারে না। কিন্তু,আলাদাভাবে বিবেচনা করলে, সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ ও প্রথাবিরোধীতা কেবল বিপ্লবের লক্ষণ,বৈপ্লবিক শক্তি নয়। রাজনৈতিকভাবে সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

১৯১৭ এর রুশ বিপ্লব তৎকালীন আভা-গার্দ (avant-garde) ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহীদের তাদের যথার্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নামিয়ে আনে, যাদের মধ্যে অনেকেই রুশ বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৯৬৮ এর মে মাসে ফরাসিরা যখন সাধারণ ধর্মঘটে শুরু করে, তখন অডিওন থিয়েটারের ঘটনাবলি ও ঐ চমকপ্রদ গ্রাফিতিগুলো-কে (‘ইট ইজ ফরবিডেন টু ফরবিড’, ‘হোয়েন আই মেইক রেভ্যুলুশন আই ফিল লাইক মেকিং লাভ’ ইত্যাদি) কোন সাহিত্য বা নাটকের মূল ঘটনাবলীর প্রান্তিক উপাদান হিসেবে ধরা যায়। সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ ও প্রথাবিরোধিতা কোন আন্দোলনে যতো বেশি সামনে চলে আসে,তত বেশি করে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে মৌলিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন (লেখকের ভাষায় big things) ঘটছে না। হায়, বুর্জোয়াদের স্তম্ভিত করা বুর্জোয়াদের উৎখাত করার চেয়ে সহজ।

সূত্র

১. আমেরিকান মাসিক ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন
২. ৩৩০০০ বিখ্যাত মানুষের বায়োগ্রাফিকাল ডাটা সম্ভার, যারা, সম্পাদকদের মতে, ব্রিটিশ জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
৩.ডি. এইচ. লরেন্সের বিতর্কিত উপন্যাস, যা যুক্তরাজ্যে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।
৪.ভিক্টোরিয়ান ড্রেস রিফর্ম
৫. দাঁতোন ও রোবস্পিয়ার উভয়ই ফরাসি বিপ্লবের নেতা
৬.ষাট ও সত্তরের দশকে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণদের একটা বহু-বিস্তৃত রাজনৈতিক আন্দোলন। ১৯৬০ সাল থেকে নিউ লেফট রিভিউ নামে একটি দ্বি-মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অরাজ

অরাজ