অরাজ
আর্টওয়ার্ক: দ্য ইনসারেকশন শিল্পী: অনার দাউমিয়ার সূত্র: ফেসবুক পেজ
প্রচ্ছদ » আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

আগস্ট বিদ্রোহ।। মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব

  • আরিফ রেজা মাহমুদ
    পার্থ প্রতীম দাস

ভূমিকা: আগস্ট বিদ্রোহ। আদতে শরতে অসুর বধ। অন্যায্য অগণতান্ত্রিক ‘জরুরী আইনের’ বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধের নতুন পর্ব। এই আন্দোলনের খুবই নতুন এবং ভিন্ন স্বর শোনা গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মতিহারের আঙ্গিনায় ‘অহিংস অসহযোগ’ নামে রচিত হয়েছিল কর্তৃত্ব অমান্য করার দৃষ্টান্ত। এ রিয়েল সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্স । রাষ্ট্রের কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাকে পঙ্গু করে বিশ্বিবদ্যালয়ে মুক্তাঞ্চল কায়েমের দৃষ্টিকল্পই ছিল আন্দোলনের মূলমন্ত্র। কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন জরুরি অবস্থায় সংগঠিত হলেও, আদতে এটা শিক্ষার্থী সমাজের জন্য সবসময়ই একটি দিশা। আগস্ট বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭/০৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ব বিরোধী আন্দোলন, তার দৃষ্টিকল্প, সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক আরিফ রেজা মাহমুদ ও পার্থ প্রতীম দাসের এই আলাপচারিতাটি ছাপা হয়, ওঙ্কারের  মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব সংখ্যায়।

আর্টওয়ার্ক: পোরিশ স্টেট
শিল্পী: আলেন ব্রেটম্যান
সূত্র: পিনটারেস্ট

প্রশ্ন: সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সংগঠিত হলো, তাকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্ব  নামে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

উত্তর: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন বলতে আমি বুঝি, বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করার আন্দোলন, মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের আন্দোলন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা মাফিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, তা প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনও মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, বিশ্বজনীন জ্ঞান সৃজন ও চর্চার ক্ষেত্র। মনুষ্য জীবনের উৎকর্ষ সাধন কিংবা মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য জ্ঞান উৎপাদন ও তার চর্চা সমাজে প্রবাহমান রাখার উদ্দেশ্য, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার অংশ। কিন্তু সৃজনের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ছাড়া কোনো সৃজন হতে পারে না। স্বাধীনতাহীনতায় চর্চিত জ্ঞান বড়জোর ‘দক্ষ’ উৎপাদন করতে পারে, জ্ঞানী নয়। যে সমাজে সৃজন রুদ্ধ, সে সমাজে জ্ঞানও রুদ্ধ। ফলে স্বাধীনতাহীন বিশ্ববিদ্যালয় মূলত নিশ্চল বিশ্ববিদ্যালয়। সুতরাং স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণ, বিশ্ববিদ্যালয় ধারণারই অংশ। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা রক্ষা করতে একে রাষ্ট্র-কর্পোরেট-সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত রাখা এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলনই মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন।

মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অবারিত। কোনো সীমারেখা দ্বারা একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। কাজেই মুক্তি মানেই তা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তির ক্ষেত্রেও একে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব না। সুতরাং মুক্তির জন্য আন্দোলন একটি চলমার প্রক্রিয়। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি-কাল-পর্বকে চিহ্নিত করা সম্ভব। কখনো কখনো প্রয়োজনীয়ও হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে বর্তমানে একটি বিশেষ পরিস্থিতি জারি আছে। সরকারি ভাষায় একে ‘জরুরী অবস্থা’ নামে ডাকা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এই ‘জরুরী অবস্থা’ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় শাসন-যন্ত্রকে কর্পোরেট বিকাশের অনুকূল করে তোলার প্রচেষ্টা। কর্পোরেট বিকাশের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি প্রয়োজন, তা নির্মাণ করা। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটা গণজনতন্ত্র [People’s Republic] প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছিলাম। এই গণজনতন্ত্রের মাধ্যমে আমরা একটা নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন রাষ্ট্রের মধ্যে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রটা ছিলো উপনিবেশের গর্ভে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রযন্ত্ররই তদ্ভব রূপ মাত্র। ফলে তার পক্ষে ঐ সামাজিক চুক্তিকে ধারণ করা সম্ভব ছিল না। আবার পরবর্তীতে পনের বছরের সামরিকায়নে রাষ্ট্রযন্ত্র আরো কর্তৃত্বশীল, আরো গণবিচ্ছিন্ন হয়েছে। ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পরেও এর কতৃত্বশীলচেহারা খুব একটা পাল্টায়নি। সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র রূপে তা বহাল থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক কায়দায় গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পারিক কর্তৃত্ব পরম্পরার যে ছেদ সৃষ্টি হয় তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘কর্তৃত্বের লড়াই’ হিসেবে মূর্ত হয়ে ওঠে। এই ‘জরুরী অবস্থা’ মূলত উপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় খোল-নলচেগুলোকে পাল্টে কর্পোরেট স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ঢেলে সাজানো’র জন্যই হাজির হয়েছে। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসে সুবিধাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দল-গোষ্ঠী-পক্ষগুলোকে সাইজ করতে এবং কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র-বিরোধী গণমুখী আন্দোলনকে দমন করতে  রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক সংস্থাগুলোর বিশেষভাবে তৎপর হয়ে পড়া এই ‘জরুরী অবস্থা’র অবধারিত অনুসঙ্গ। আবার কপোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের মতাদর্শিক হাতল হিসেবে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিক ‘জরুরী অবস্থা’র পক্ষে প্রচার-প্রচারণা উৎপাদন জারি রেখেছে। ফলে সামগ্রিক সমাজটাই চিন্তাভাবনার দিক থেকে অনুর্বর ও কর্পোরেট কর্তৃত্ব-অনুগামী হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের সামনে দৃশ্যমান।

এই পরিস্থিতিতে সমাজের অন্যান্য অংশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়কেও নিপাট ভাষাহীন, প্রতিবাদরুদ্ধ করে ফেলার প্রয়োজন পড়েছে। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বাগে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাক্যাম্প পর্যন্ত স্থাপন করেছে, যা অতীতে কখনোই সংঘটিত হয়নি। ফলে ‘জরুরী অবস্থা’য় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিস্থিতি কায়েম হয় তার মাত্রাগুলো স্পষ্টভাবে চেনা সম্ভব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে এই ‘জরুরী অবস্থা’য় অত্যন্ত জরুরিভাবে প্রতিবাদের-প্রতিরোধের কর্তব্য এসে হাজির হয়। এই কর্তব্য আন্দোলনের রূপ নেয় এবং এই আন্দোলনই জরুরি পর্বের আন্দোলন বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: ৭৩এর অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করে কেমন করে?

উত্তর: আচ্ছা। ৭৩’এর অধ্যাদেশে স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ এমনি এমনি হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমাজে গণমুখী বিনির্মাণের যে স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা এদেশের মানুষ লালন করেছিল তারই জোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনেও লেগেছিল। আর এই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দৃঢ় জনমতের সামনে স্বায়ত্তশাসন কথাটা উচ্চারণ না করে ৭৩’এর অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। আর এই স্বায়ত্তশাসন কথাটার উচ্চারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কয়েকটা জায়গায় স্বাধীনতাও এনে দিয়েছিল বটে। ৭৩’এর যে স্বায়ত্তশাসন, তা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার জন্য অধস্তন আইন  [বিধিবিধান] প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। আবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা আলোচনা-সমালোচনারও সুযোগ দিয়েছে। এসনকি রাষ্ট্র সম্পর্কেও অনুরূপ একটা অবস্থান নেবার স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আছে। কিন্তু গত চৌত্রিশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-স্বীকৃত এই স্বায়ত্তশাসনটুকুও রক্ষিত হয়নি। রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। স্বায়ত্তশাসন পরিণত হয়েছে আয়ত্তশাসনে। কিন্তু আপনার প্রশ্নের আগে, রাষ্ট্র-রাজনীতির শুঁড় কিংবা রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে কায়েম হয় কেন—এই জবাব দেয়া জরুরি।

প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র হচ্ছে ক্ষমতা সংস্থাপনের যন্ত্র। এই সংস্থাপিত ক্ষমতা কীভাবে এবং কতোটা প্রয়োগ করা যাবে—তা লেখা থাকে সংবিধানে। কিন্তু বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির সংবিধান কোনো গ্রাম-সমবায় তথা পিপলস ফেডারেশনের সমন্বয়ের মাধ্যমে, তাদের জনমতের ভিত্তিতে রচিত হয়নি। এই সংবিধান রচিত হয়েছে উকিলদের দ্বারা। সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংসদের হাতে। কিন্তু সংসদ মানেই তো সংবিধান মোতাবেক পার্টিজান ‘জনপ্রতিনিধি’। ফলে সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রটাই পার্টি-কর্তৃত্বের অধীন। রাষ্ট্রের চরিত্র পার্টিক্র্যাটিক। ফলে এটাকে পার্টিস্টেট বলাটা ভুল হবে না। পার্টিমাত্রই তার ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণি-গোষ্ঠী-দল থাকে। ফলে তাকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতাই জেতার জন্য-ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করবার জন্য দরকার হয় সমাজের অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্টি-কর্তৃত্বের আওতায় আনা। চলতি ভাষায় একেই বলে দলীয়করণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ থেকে রেহায় পায় না। আবার ক্ষমতা মতাদর্শিক স্তম্ভ রচনার জন্যও প্রয়োজন হয় বিশ্ববিদ্যালকে ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত করা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণায় যতোই স্বাধীনতা শব্দটা থাক না কেন, তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর তাই ৭৩’এর অধ্যাদেশেও ফাঁকফোকর থাকে। আর তা দিয়ে ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের শুঁড়। এ থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে, রাষ্ট্রের কাঠামোতে পার্টি-কর্তৃত্ব ছাড়া কোন অংশীদারিত্বমূলক পদ্ধতি নাই। আর এটাই হলো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অঙ্গে পরিণত হওয়ার বর্তমানের বাস্তবিক কারণ।

এখন আপনার প্রশ্নে আসি। কীভাবে রাষ্ট্র-রাজনীতির আয়ত্তশাসন কায়েম হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের যেতে হবে ৭৩’এর অধ্যাদেশে। এই অধ্যাদেশের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যমূলক দিক উল্লেখ করা যাক।

এক. বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ হয় রাষ্ট্রপতি দ্বারা।
দুই. বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে  ক্রমকর্তৃতন্ত্র।
তিন. সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ না থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহিতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকা। এখন এই বিষয়গুলোকে সূত্রবদ্ধ করলেই উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন জনের প্যানেল থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। বলাই বাহুল্য, রাষ্ট্রপতির এই নিয়োগও হয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মানেই তো একজন পার্টিজান। আর তাই উপাচার্য হতে গেলে পার্টিজান হতে হবে। এ কারণেই দেখা যায় যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় পার্টি বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বদলে যায়। আবার উপাচার্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কী দৃশ্যমান, কী অদৃশ্যমান, কী চিন্তনীয়, কী অচিন্তনীয় তাবৎ কিছুর মালিক তিনি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট-একাডেমিক কাউন্সিল সকল কিছুতেই তার আধিপত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের তাবৎ নিয়োগ কমিটি, পদোন্নতি-কমিটির মালিক তিনি। এমনকি নিয়োগ কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরর তিনিই নির্ধারণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোষাধ‌্যক্ষ-রেজিস্ট্রার-প্রক্টর-প্রভোস্ট- ছাত্র উপদেষ্টা ইত্যাদি প্রশাসনিক পদে তিনিই শিক্ষকদের নিয়োগ দেন। ফলে উপাচার্যের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা-বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক। সুতরাং উপাচার্য ‘কট’ হলেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ‘কট’। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের শুঁড় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করে না, শুঁড়ের পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্ষমতার হালুয়া-রুটিও পাস হয়’ অর্থাৎ বরাদ্দ, ফান্ড, মালপানির মামলা আর কি। ফলে প্রশাসনের যে কোনো গদিতে বসতে পারলে ঐ মালপানির হিস্যা পাওয়া যায়। আর এ কারণেই গদিতে বসার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। উপাচার্যের নেক নজরে পড়লেই যেহেতু তা নিশ্চিত হবে সুতরাং উপাচার্যের মতোই অন্য শিক্ষকরাও শুরু করে দলবাজি। ‘বেনীআসহকলা’ নামের দলগুলি আসলে এক একটা পার্টির লেজমাত্র এবং এই দলগুলোর নামে চলতে থাকে শিক্ষক সমিতির ভোটাভুটি। কার কত শক্তি, কার কত ভোট, কে কত ইমপর্টেন্ট ইত্যাদির হিসাব নিকাশ। উপাচার্য এখান থেকেই তার অনুগত ভৃত্যদের বাছাই করেন। নিয়োগ, পদোন্নতি প্রভৃতির জন্যও শিক্ষকরা তার মুখাপেক্ষী। শিক্ষক সমিতি মানে শিক্ষকদের অধিকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিন্তার কোনো সংগঠন নয়। এটা পরিণত হয়েছে দলবাজির কারখানায়। এখানকার কর্মকর্তারা হচ্ছেন আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদের ক্যান্ডিডেট। শিক্ষক সমিতির কর্মকর্তারা নিজেরাই এর মাধ্যমে নিজেদেরক পদপার্থী তথা পদলেহী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করেন। এ তো গেলো শিক্ষক রাজনীতির কথা। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি? ছাত্রদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সবই কোনো না কোনো পার্টির লেজ। লেজুড়বৃত্তির সূত্রে তারা কোনো না কোনো পার্টির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বড়জোর নিজ নিজ পার্টি এজেন্ডা বা মতাদর্শ বাস্তবায়ন করতে চাইতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত বা ইচ্ছার সাথে এগুলোর সম্পর্ক নাই। উপরন্তু দাপুটে ক্ষমতার মাৎসন্যায় নীতির ধারকবাহক ছাত্র সংগঠনগুলো হল দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, নিজেদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই ইত্যাদিতেই ব্যস্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ত্তশাসন কায়েমের ক্ষেত্রে তারা হচ্ছে প্রধান ক্ষত্রশক্তি। উপাচার্য যে দলের, ক্যাম্পাসে সেই দলের ছাত্র সংগঠনেরই কর্তৃত্ব। কেননা প্রশাসন হচ্ছে সেই ছাত্র সংগঠনের পাহারাদার। আর এই ছাত্র সংগঠনগুলো হচ্ছে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রের লাঠি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র-রাজনীতির কর্তৃত্ব বলবৎ হয় মূলত উপাচার্যের চরম ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার অনুসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি দ্বারা।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্পোরেট ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথাও বলেছেন আপনি। এটা কিভাবে কায়েম হয়?

উত্তর: মুক্তবাজার অর্থনীতি বলে যে প্রত্যয়টি চালু আছে তার প্রকৃত মানে হচ্ছে বাজারের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। জগতের সবকিছুকেই বাজারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বাজার কর্তৃত্বের  বর্তমান রূপটি হচ্ছে কর্পোরেট একচেটিয়া। কর্পোরটের স্বার্থে সমাজকে একটি উন্নতমানের ভোক্তা শ্রেণীতে রূপান্তর করা এই বাজার যুগের প্রধান সাংস্কৃতিক প্রবণতা। ফলে বাজারের চিন্তা-বাজারের মতাদর্শ-বাজারের সংস্কৃতি উৎপাদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে হাতল হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সিলেবাসের মধ্যে ক্লাসিক্যাল যুগের জ্ঞানকাণ্ড চর্চার যে আবহ তৈরি হয়ে আছে তা প্রতিস্থাপন করে একেবারে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে উন্নতমানের এক্সিকিউটিভ উৎপাদনের জন্য যে ধরনের জ্ঞানকাণ্ডের প্রয়োজন সেই ধরনের জ্ঞান চর্চার প্রবাহ তৈরির তৎপরতা চলছে। আবার মুনাফামুখিন কর্পোরেট মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ছাঁচে গড়া সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রচার-প্রচারণা নেহাত কম নয়। ফলে পুঁজিবাদ যা শিল্পমূল্যকে বাজারমূল্যে রূপান্তর করতে চায়- মানবিক রুচিশীলতাকে বাজার রুচিশীলতায় রূপান্তর করতে চায়, তার বিশেষ তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে। ক্রমাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সমাজ ‘খাদক সমাজে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন ধরে চর্চিত মুক্তিমুখিন সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক একুশ-পহেলা বৈশাখ-স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয়ের চেতনা- এ সবকিছু ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কর্পোরেট বিজ্ঞাপন-স্পন্সরশিপ আর তার লোভ দেখানো সুযোগ-সুবিধার তোড়ে এসব সংস্কৃতি ও আকাঙ্ক্ষার খুবই ভিন্ন মানে উৎপাদন করা হচ্ছে। যেমন স্বাধীনতা বলতে আপনি কত কম খরচে এবং কত বেশি দিনের ব্যবধানে বাংলালিংক কর্পোরেট মোবাইল কোম্পানির সিমটি রিচার্জ করতে পারবেন, তা বোঝানো হচ্ছে। ভাষার স্বাধীনতা বলতে সিটিসেল ফোনে পারস্পরিক, আগের থেকে বেশি এসএমএসপাঠানোর সুবিধাকে বোঝানো হচ্ছে। ফলে স্বাধীনতা সংজ্ঞায়িত হচ্ছে কর্পোরেট দ্বারা, কর্পোরেট স্বার্থানুসারে। কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্র একচেটিয়া অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠান-জনসংযোগ ইন্ডাস্ট্রি ও বাজার সম্পর্ক কায়েম ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য-আগ্রাসন চালাচ্ছে।

রশ্ন: রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কেও জায়গা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাঠামো দাঁড়িয়েছে তার সাথে আগস্ট বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক আছে কী?

উত্তর: হ্যাঁ, তা তো আছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোটি চরমভাবে সেন্ট্রালাইজড এবং ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক । এটা আমি আগেই বলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটাও সেই আদলেই তৈরি হয়েছে। গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে কাঠামোগতভাবে যুক্ত থাকতে পারেন। কিন্তু তারাও রাষ্ট্র-রাজনীতি কর্তৃক নিযুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত উপাচার্যের তল্পিবাহক। আবার সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান যেমন সিনেট, সিন্ডিকেট,  কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ছাত্র সংসদ), বিভাগীয় সমিতি ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু কিছু পরিমাণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে এর একটিতেও শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নেই, এগুলো নিস্ক্রিয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারেই স্থগিত। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোনো প্রকার সুযোগ অনুপস্থিত, প্রশাসনের গুটিকয়েক আমলাশিক্ষক তাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, যে সিদ্ধান্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৈরি করেন সেটাই যেন সকলের ভাগ্য। আরও লক্ষ্যণীয় ঘটনা হল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এত কেন্দ্রীভূত হওয়া সত্ত্বেও এর জবাবদিহিতার জন্য কোনো কাঠামো নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্র নিরঙ্কুশভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল। এই পরিস্থিতিতে যদি রাষ্ট্রীয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর আন্দোলন মানেই সংগঠিত হওয়া। কিন্তু ‘জরুরী অবস্থা’য় অধ্যাদেশ জারি করে এই সংগঠিত হওয়া, সংগঠন করা তথা মিছিল-সমাবেশ-প্রতিবাদ ইত্যাদিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত একদিকে রাষ্ট্রের অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বৈরতন্ত্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় আরো তীব্র মাত্রা যোগ করে। সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় যেন নিপাট ভাষাহীন-প্রতিবাদহীন, রাষ্ট্রের অনুগত-গৃহপালিত একটা জিনিস হিসেবে হাজির থাকে তার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। দু-একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ‘জরুরী অবস্থার’ সুযোগ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন সেশন চার্জ ৫৬১ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ৩৪০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। ‘জরুরী অবস্থার’ দোহাই দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য সভা, সংস্কৃতি সভা, গান-নাটক, এমনকি দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা সভা, সেমিনার বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৭-এর ভয়াবহ বন্যার সময় প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাণ সংগ্রহ তৎপরতা বন্ধ করে দেয়। এসব নিয়ে শিক্ষার্থীরা পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে, উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের অবহিত করেও কোনো প্রতিকার পায়নি। অথচ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রশাসনের পাহারায় হলে হলে ‘শিবিরের আইন’ মানতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেছে। এই চিত্র কমবেশি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের। আবার অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি ও তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছিল। ছাত্র-ছাত্রীদের অবাধ মেলামেশা, পোশাক পরিচ্ছেদ ইত্যাদি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপ, কটূক্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন দাপুটে ক্ষমতার নগ্ন রূপকেই প্রতিপন্ন করে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুমোটের মধ্যে গুমরে মরছিল। ফলে তাদের মনে ক্রমাগত ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সমাজের অন্যান্য অংশ, যারা আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার চরম নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার, তাদের মনেও দানা বেঁধেছিল। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, বস্তি উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদ এগুলো হচ্ছে এই নির্যাতন-নিপীড়নের নমুনা। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়ামে যখন সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং সেনাসদস্য কর্তৃক বিশ্ববিদ্যায়ের মধ্যে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তখন শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা থাকে না। স্ফূলিঙ্গ থেকে নিমিশেই তখন দাবানল তৈরি হয়। এই বিক্ষোভ যেহেতু আধিপত্যশীল দাপুটে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, কাজেই সমাজের অন্যান্য নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত অংশও এতে যোগ দেয়। ফলে মোট কথা হচ্ছে যে: ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠলে, সর্বাত্মক-স্বৈরতন্ত্রী হয়ে উঠলে মানুষ তার অস্তিত্ব তথা স্বাধীনতা রক্ষার্থেই প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে প্রতিরোধের আকর হিসেবে প্রথমত কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

প্রশ্ন : আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভের পরে প্রতিবাদ কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরে আবার এত বড় একটি ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়ে গেল। এর শুরুটা কেমন ছিল?

উত্তর: আগস্টের ছাত্র বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফুর্ত এবং এর কোনো সাংগঠনিক কাঠামো ছিল না। ফলে ২২ শে আগস্ট বিক্ষোভ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভিত কেঁপে যায়। ফলে রাষ্ট্র আরও সহিংস ও নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেট্রোপলিটন শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। কারফিউ জারি করে দেশটাকে একটা জেলখানা বানিয়ে ফেলা হয়। সেই সময় বিশেষভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে পেলে তাদের উপর নির্বিচারে সেনাবাহিনী-পুলিশ-বিডিআর-র‌্যাব প্রভৃতি ‘আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী’র অমানুষিক-বিভৎস নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসে। এমনকি রাষ্ট্র তার অনুগামী বন্ধুত্বপরায়ণ মিডিয়াকেও চরম কর্তৃত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। টিভি চ্যানেলগুলোর সকল প্রকার টক্-শো বন্ধ করে দেয়া হয়। সেল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে সামগ্রিক নাগরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাস্তায় সেনাবাহিনীর যুদ্ধংদেহী তৎপরতা দেখা যায়। পরিস্থিতিটা একেবারেই রুদ্ধশ্বাসের। আর এরকম একটি পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কাঠামোহীন স্বতঃস্ফুর্ত বিক্ষোভ চলতে পারা প্রায় অসম্ভব। আবার দু-তিন দিন পর এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি অল্পবিস্তর শিথিল হলেও শুধুমাত্র সাংগঠনিক কাঠামোর অভাবে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরাও পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই তীব্রমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যায়নি। আপনার বক্তব্য সঠিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়সহ অপরাপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা শুরু হলে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। পরিস্থিতি বদলে কেমন করে পরবর্তী সময়ে এত বড় একটা ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হলো তা আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা বলতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর পর শিক্ষার্থীদের মনে এক ধরনের ভয়, আশঙ্কা এবং ক্ষোভ মিশ্রিত একটা অবস্থা দেখা যাচ্ছিল। শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে অন্যায়ভাবে আটককৃত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষমতাতাড়িত মিডিয়ার নিরন্তর প্রচারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ…ই মুক্তি পাচ্ছেন- শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের জন্য সংগঠিত হওয়াকে অনেকটাই বিলম্বিত করে ফেলে। কিন্তু এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিম্ন আদালতের রায়ে দণ্ড দেয়া হয়। রায়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর কিংবা সহিংসতায় মদদ প্রদানের অভিযোগ মিথ্যা বলে স্বীকার করা হয়। শুধুমাত্র মৌন মিছিল করে ‘জরুরী বিধিমালা’ ভঙ্গ করার ‘অপরাধে’ তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের এমন অবস্থায় দেখে আবেগী হয়ে ওঠে। তাদের মূল্যবোধ, বিবেক তাদেরকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। যে শিক্ষকদের শাস্তি দেয়া হয় তারা শিক্ষার্থীদের কাছে পূর্ব থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ফলে ঐ শিক্ষকদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মুক্তির জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। বিপুল পরিমানে গোয়েন্দা নজরদারি ও পুলিশি চাপের মধ্যেও তারা স্বাক্ষর সংগ্রহ, স্মারকলিপি প্রদান, সংবাদ সম্মেলন প্রভৃতি তৎপরতা চালাতে থাকে। এসব তৎপরতার  সময় তারা কৌশলগত কারণে এমন ধরনের কর্মসূচিগুলোই হাতে নেয় যা ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের তৎপরতার মাত্রাটাও বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মুক্ত চিন্তা ও চর্চার একটা প্রবাহের সাথে আগে থেকেই যুক্ত। ক্ষমতা-রাষ্ট্র-রাজনীতি-মতাদর্শ-কর্পোরেট মিডিয়া প্রভৃতি বিষয়ে চিন্তা ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এই বিভাগে গড়ে উঠেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের তৎপরতার মাত্রাটা ছিল বেশি। শিক্ষকদের মুক্তি দাবি করে একসাথে ৮০/৯০ জন শিক্ষার্থী উপাচার্যের কাছে বিভাগের প্রায় সকল শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সস্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই একসাথে হেঁটে উপাচার্যের কাছে যাওয়া প্রকৃতপক্ষে একটি প্রতিকী মৌন মিছিল রচনা করে। যা ঐ সময়ে ছিল খুবই সাহসী পদক্ষেপ। আবার এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা অঘোষিতভাবে স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে ক্লাস বর্জন করে। এভাবে ক্লাস বর্জন সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এই আশঙ্কায় রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্বিগ্ন হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ক্লাস বর্জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযাগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগেও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তারা আল্টিমেটাম দিয়ে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ও কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট শিক্ষার্থীদের মাঝে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবেগ অনুভূতি ও তৎপরতা এবং শিক্ষকদের উচ্চ নৈতিকতার প্রতি সারাদেশের মানুষের সমর্থন ও মানসিক লিপ্ততা তীব্রভাবে যুক্ত ছিল। ফলে এই পরিস্থিতিতে সরকার বেশ চাপের মুখে পড়ে এবং গণদাবির মুখে ২০০৭ এর ১০ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তি দেয়। গণদাবির সামনে নতজানু হয়ে রাষ্ট্র শিক্ষকদের মুক্তি দিলেও তাদের মুক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ‘সাধারণ ক্ষমা’র আশ্রয় নেয়। রাষ্ট্রের এই ‘সাধারণ ক্ষমা’ অনেকটা ‘রেললাইনে বডি দেব, মাথা দেব না’ নীতির পরিচায়ক। রাষ্ট্রের এই নীতি স্পষ্টভাবে তাকে উলঙ্গ করেছে, রাষ্ট্র যে ঘায়েল হয়েছে, তার শরীরেই ঘা খেয়েছে, তা প্রমাণিত। শিক্ষকদের মুক্তি পর্যন্ত এই আন্দোলনই পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বৃহৎ আন্দোলনের পাটাতন হিসেবে কাজ করে।

প্রশ্ন: আপনি আন্দোলনের এই পর্যায়ে শুধু বিভাগীয় শিক্ষার্থীদের কথাই বললেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র সংগঠনগুলো আছে তাদের কি কোনো তৎপরতা ছিল না?

উত্তর: না, তাদের কোনো তৎপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান হয়নি। আর আমার মনে হয় ‘জরুরী অবস্থা’ জারি হওয়ার পর মাৎস্যন্যায় নীতিতে বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর মতো নৈতিকশক্তি ছিল না। অপরদিকে এই ‘জরুরী অবস্থাতেই’ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো সাংগঠনিক দিক থেকে মুমূর্ষু হয়ে পড়ে। এছাড়া চিন্তা ও চর্চার অর্থাৎ পরিস্থিতি বোঝার স্বকীয় কোনো দৃষ্টিভঙ্গি এখানকার বর্তমান বাম নেতৃত্বের নেই বললেই চলে। কিন্তু একেবারে ভেতরে ভেতরে কিংবা খুবই ঘরোয়াভাবে কোনো তৎপরতা ছিল কিনা তা ঐ ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন। আমার জানা নেই।

প্রশ্ন: শিক্ষকদের মুক্তির এই আন্দোলনের পরে ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আহ্বানে অনেক বেশি সংগঠিত ও তীব্র একটা আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখলাম আমরা। এই মঞ্চটা গড়ে উঠল কেমন করে?

উত্তর: আচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কিছুদিনের মধ্যেই মামলার শিকার শিক্ষার্থীরা আদালতে ‘আত্মসমর্পণ’ করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্তির পর শিক্ষার্থীদের মুক্তির প্রশ্নটি মুখ্য হয়ে ওঠে। এই সময়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট, একাউন্টিং ইত্যাদি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে একমত হয়। এইসব বিভাগের সচেতন শিক্ষার্থীরা এক বৈঠকে এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করে। বৈঠকে প্ল্যাটফর্মের নামের বিষয়ে কথা উঠলে বিভিন্ন নাম প্রস্তাবিত হয়। নামগুলো কোনোটি বিমূর্ত, কোনোটি রাজনৈতিক দলীয় লেজুড়বৃত্তির অসচেতন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বাতিল হয়ে যায়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছোট কাগজ কর্মী বাধন অধিকারীর প্রস্তাবনা ঈষৎ সংশোধন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ নামটি গৃহীত হয়। অতঃপর সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলা পার করে এর একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করা হয়। সমন্বয় পরিষদ ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ১৯ সদস্য বিশিষ্ট। পরে তা বর্ধিত হয়ে ২৬ সদস্য বিশিষ্ট হয়। এই সমন্বয় পরিষদ গঠনের পরে সংবাদ সম্মেলন করে ১০ই জানুয়ারী সংগঠনের আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করা হয়। বলে রাখা ভালো, সমন্বয় পরিষদ গঠনের একটা অন্যতম কারণ ছিল নিজেদের দ্বারা সংগঠিত কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব গ্রহণ করা। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ২০০৭ এর ২১ শে আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কিছু মুক্তিমুখীন সক্রিয়ক-মত সংগঠক-বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী-সাংস্কৃতিক কর্মী স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রতিবাদে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের উপর হামলা রুখে দাঁড়াও/ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ চলবে না” উচ্চারণকে ব্যানারে লিখে মৌন মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে। এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চিন্তাসমৃদ্ধ এবং লক্ষ্য অভিমুখী। কিন্তু ২২ শে আগস্টে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরোষের কারণে বিপুল পরিমাণ সহিংসতা ঘটে। এটা চিন্তা সমৃদ্ধ ও লক্ষ্য অভিমুখী সংগঠিত প্রতিবাদ ছিল না। কিন্তু ২২ তারিখে সহিংসতায় অংশ না নিলেও ২১ তারিখের প্রতিবাদে অংশ নেয়া ৪ শিক্ষক ও বেশ কিছু শিক্ষার্থীর ঘাড়ে এই সহিংসতার দায়ভার চাপানো হয়। তাই এখান থেকে আমাদের এটাই শিক্ষা হয় যে, আমরা যা করব তা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব নিয়েই করব। অন্যদের কার্যক্রমের দায়দায়িত্ব আমরা নেব না। ফলে এরকম পরিস্থিতিতে সেই দায়দায়িত্ব গ্রহণের অবস্থান থেকেই সমন্বয় পরিষদ তৈরি হয়।

প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদ গঠনে সামান্য কিছু ঝক্কি-ঝামেলার কথা বললেন। সেটা কী?

উত্তর: প্রশ্নটি খুব স্পর্শকাতর। কেননা এই প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বলব তা সংকীর্ণ মনোভাবাপন্নদের খোঁচা মারামারির মতো কোনো ঘটনা হয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে আমি শঙ্কিত। উত্তরটিকে আমি যথা সম্ভব এ থেকে দূরবর্তী কোনো অবস্থানে নিয়ে দিতে চাই। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট এবং প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো কিছু একটা করতে চায়- আমাদের এমনটা মনে হয়েছিল। আবার সাংস্কৃতিক জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানের জোট সভাপতি নোবেল ভাই এ বিষয়ে বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছিলেন। ফলে আমাদের মঞ্চ গঠনের সভায় আমরা তাকে আমন্ত্রণ জানাই। সভায় তিনি এবং উদিচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্র ইউনিয়ন রাবি শাখার সদ্য বিদায়ী কার্যকরী সভাপতি প্রশান্ত কুমার মন্ডল আসছেন বলে আমরা জানতে পারি। সভা শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যে তারা সভায় যোগ দেন। ছাত্র ইউনিয়নের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক প্রমথেশ শীল সভাস্থলের পাশে থাকায় তাকেও আমরা সভায় যোগ দেবার কথা বলি। তার কাজ আছে বলে তিনি সভায় বসেননি। এরপরে সভায় মঞ্চের নাম ঠিক করা হয় এবং বন্দী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা, যে সংবাদ সম্মেলন করবেন তা তদারকির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার দায়িত্ব প্রশান্ত গ্রহণ করেন। আর অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মার্কেটিং বিভাগের ছাত্র অসীম। সংবাদ সম্মেলনের জন্য মনোনীত স্থান হিসেবে রাজশাহী প্রেস ক্লাবকে নির্ধারণ করার কারণে আমি প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব গ্রহণ করি। সভায় সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য লেখার সময় শিক্ষার্থীদের সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাগুলো উচ্চারণ  যেন কোনোমতেই না করা হয় সে বিষয়ে প্রশান্তকে সভা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। কেননা সাধারণ ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফ কথাটার স্বেচ্ছা উচ্চারণ সামগ্রিক ছাত্র আন্দোলনের বুকে ছুরি মারার শামিল। কিন্তু প্রশান্ত এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকেননি। সংবাদ সম্মেলনে কারাবন্দী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। অভিভাবকরা সন্তানের মুক্তির জন্য খুবই আবেগী ছিলেন। এই আবেগঘন অবস্থায় তাদের সামনে যে বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা তারা ঐ সময়ে নিঃশঙ্কচে পাঠ করে ফেলেন। দণ্ড মওকুফ তথা সাধারণ ক্ষমার জন্য আবেদন, ছাত্র আন্দোলনের ন্যায্যতার পরিপন্থী। আবার মঞ্চের সিদ্ধান্তকে সবগুলো পক্ষের সাথে আলোচনা না করে ‘এডভোকেট বলেছেন’ উছিলায় পাল্টে ফেলা স্বেচ্ছাচারের শামিল এবং তা মঞ্চের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে যায়। অঙ্কুরেই যে মঞ্চের কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়েছে তা কি আদৌ কোনোভাবে আগামীতে কার্যকর হতে পারবে?-এমন একটা শঙ্কা আমাদের অনেকের মনেই জেগেছিল। এমন সময় প্রমথেশ শীল আমাদের মঞ্চের দু-এক জন কর্মীর সামনেই বেশ দাম্ভিকভাবেই ঘোষণা করেন “আমি ঢাকা থেকে যে মিশন নিয়ে এসেছি, তাতে সফল হয়েছি।” মিশনের অর্থ বুঝতে আমাদেরও বাকি থাকে না। ফলে আমরা আরো দৃঢ় ও সতর্ক হয়ে উঠি এবং একেবারেই কাছাকাছি থাকা আন্তরিক কর্মীদের সমন্বয়ে একটি সমন্বয় পরিষদ গঠন করে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেই। ঘোষণায় মঞ্চের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অবস্থান খুবই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়।

প্রশ্ন: তাহলে এটা কী একটা ষড়যন্ত্র?

উত্তর: না, বিষয়টিকে আমি একজন ব্যক্তির কিংবা ব্যক্তি যে সংগঠনের সাথে যুক্ত তাদের সংগঠিত একটা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে পছন্দ করব না। বরং এটা হচ্ছে পার্টি ঘরানায় চর্চিত সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। সেখানে যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে এটা মূলত তারই সংকট। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের দোষ না। এ ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চায় আন্দোলনকে ‘নিয়ন্ত্রণের’ একটা ইচ্ছা ও আচরণ গড়ে ওঠে। এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিজ হাতে রাখার জন্য অন্যান্য পক্ষগুলোর সাথে কখনও কখনও বিবাদে জড়িয়ে পড়া, নির্বিচার প্রচারণা চালান পার্টি ঘরানায় সাধারণ একটা ব্যাপার। ফলে এটাকে ষড়যন্ত্র নয় বরং পার্টি সংস্কৃতি বলেই চিহ্নিত করা যায়।

প্রশ্ন: আপনাদের এই মঞ্চটার নাম কর্তৃত্ব -বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  দিলেন কেন? কর্তৃত্ব বিরোধিতা বলতে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর: সমাজ একটা শব্দের বিভিন্ন অর্থ চর্চা করে থাকে। ফলে কখনো কখনো শুধুমাত্র অর্থ চর্চার ভিন্নতার কারণেই শব্দ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আবার একই ধারণা বা অর্থকে ভিন্ন নামে বা প্রতীকে চিহ্নিত করার কারণে বিতর্ক থাকে। কর্তৃত্ব শব্দটিকে নিয়ে এমন ধরনের বিতর্ক অনেকের মধ্যেই আছে। তাই যে ধারণাটিকে আমরা কর্তৃত্ব শব্দ দ্বারা মূর্ত করতে  চেয়েছি সেই ধারণাটিকে প্রকাশ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কর্তৃত্ব মানে কর্তাগিরি। কর্তৃত্ব হচ্ছে সহজ কথায় শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম সাধিত হওয়া। অর্থাৎ যখন কর্তার খেয়াল খুশি মোতাবেক কাজ করা হয়- যাতে অন্য কারো কিছু বলার বা করার থাকে না তখন তাকে কর্তৃত্ব বলা হয়। সুতরাং কর্তা হওয়া এবং অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর বা সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা দেয়াই হচ্ছে কর্তৃত্ব। কিন্তু এই মাফিক কর্তা কে? কোনো ব্যক্তির বাইরের শক্তি যা ঐ ব্যক্তির ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই ব্যক্তির উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। সুতরাং কর্তৃত্ব হচ্ছে একটা সম্পর্ক যেখানে কর্তা ও উদ্দিষ্ট থাকে এবং কর্তা উদ্দিষ্টের উপর বল বা শক্তি প্রয়োগ করে। কর্তৃত্ব বলতে আমি শক্তিমানের বলপ্রয়োগ কেই বুঝি। আবার কর্তৃত্বের সাথে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক আছে। কর্তৃত্ব যদি ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ সাপেক্ষ হয় অর্থাৎ চুক্তির বাঁধনে বাঁধা পড়ে এবং চুক্তির উপর ছদ্ম-সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই আমরা তাকে ক্ষমতা বলতে পারি। সুতরাং ক্ষমতা নিজেও হচ্ছে এক ধরনের সম্পর্ক। ক্ষমতা সম্পর্ক হচ্ছে ‘বল প্রয়োগের স্বীকৃত’ ‘শর্ত’ বা ‘সূত্র’ যা ছদ্ম-সম্মতির দ্বারা ‘বৈধ’ বলে বিবেচিত হয় এবং সামাজিক সম্পর্কের যুথবদ্ধতার সূত্রকে ভেঙ্গে কর্তৃত্ব কায়েম করে। এই কর্তৃত্ব আরোপন যখন একমুখী হয়ে পড়ে তখন তাকে বলা হয় অসম ক্ষমতা সম্পর্ক। এই অসম ক্ষমতা সম্পর্ক মূর্ত হয়ে ওঠে প্রধানত চারটি বিষয়ের মাধ্যমে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে

১. ভূমির অসম মালিকানা,
২. শ্রমের উদ্বৃত্ত শোষণ,
৩.  দেহগত বা লেঙ্গিক আধিপত্য,
৪. ভাষা-সংস্কৃতি-জ্ঞানগত আধিপত্য।

কর্তৃত্বের এই প্রধন চতুর্মূর্তিই সকল প্রকার শোষণশাসন ও আধিপত্যের জড়। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতা বলতে আমি এই  শোষণশাসন ও আধিপত্যের বিরোধিতা এবং এগুলোকে সমাজ থেকে চিরতরে উচ্ছেদের জন্য তৎপরতা চালানকেই বুঝি। ফলে কর্তৃত্ব-বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়। এই চিন্তা ও ধারণাকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মঞ্চের নাম দিই কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ।

প্রশ্ন: আপনি অসম ক্ষমতা সম্পর্কের যে চারটি দিকের কথা বললেন, তা টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র তো একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তাহলে আপনি কি রাষ্ট্রেরও বিরোধী?

উত্তর: এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে ভুল বোঝার অবকাশ থাকবে। তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য আমাকে আগে দেশ ও রাষ্ট্র এ দুটো ধারণাকে আলাদা করে নিতে হবে। কেননা আমাদের এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও দেশ ও রাষ্ট্র বলতে একই জিনিস বোঝেন। প্রকৃতপক্ষে দেশ ও রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। দেশ বলতে আমি চিরচেনা প্রতিবেশের মধ্যে স্বাধীনতা ও সংহতি চর্চার  যে বৃহত্তর ক্ষেত্র গড়ে ওঠে, তাকে বুঝি। লোপামুদ্রার গানে “আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক” কিংবা “মন যতদূর চাইছে যেতে ঠিক ততদূর আমার দেশ”-এই উচ্চারণ আমার বক্তব্যের পক্ষে সমর্থন যোগায়। অপরদিকে রাষ্ট্র হচ্ছে শাসনের তথা ক্ষমতা-কর্তৃত্ব-আধিপত্যের একটা সংস্থা-কেন্দ্রীয় সংস্থা। সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া, সিদ্ধান্ত দেয়া অর্থাৎ সকল বিষয়ে নাক গলানোর এবং মাতবরির ক্ষমতাধারী একটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তির ধারণায় রাষ্ট্রকে একটা ক্ষমতা কাঠামো হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতার অস্তিত্বের শর্ত হচ্ছে জনগণের অধিকার সংরক্ষণ। ফলে অধিকার সংরক্ষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কী পরিমান ক্ষমতা, কখন, কেন এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে তা চুক্তি তথা সংবিধানে লিখিত থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোটি চরমভাবে ক্রমকর্তৃত্বতান্ত্রিক এবং এটি বিশাল আমলাতান্ত্রিক বপুসমৃদ্ধে জিনিস। ফলে এটি খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক সুরতালছন্দে নড়াচড়া করে। এ কারণে সংবিধান বা চুক্তিপত্রের সৃজনশীল প্রয়োগ তার পক্ষে সম্ভব হয় না। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। কোনো এক আইনে লেখা ছিল: ঘোড়া চুরি করলে শাস্তি  ভোগ করতে হবে। কিন্তু কোনো চোর ঘোড়া নয়, ঘোড়ার বাচ্চা চুরি করলে তাকে বেকসুরখালাস দেয়া হয়। কেননা আইন ও তার ভাষার পাঠ উদ্ধার এবং সেই মাফিক তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা সৃজনশীল থাকতে পারেন না। আবার রাষ্ট্র যখন নিজকে পিপলস রিপাবলিক  বলে পরিচয় দেয় তখন রাষ্ট্রক্ষমতা চালনার জন্য জনগণের প্রতিনিধি দরকার হয়ে পড়ে। এই প্রতিনিধিদের ঐক্যের জন্য মতাদর্শও দরকারি হয়ে পড়ে। আর মতাদর্শের চর্চার জন্য প্রয়োজন হয় পার্টির। এই পার্টি হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের মধ্যে হাইফেন। কিন্তু রাষ্ট্রের কেন্দ্র-কর্তৃত্ব এবং তার কাঠামোগত সেটিং এর কারণেই জনপ্রতিনিধিরা হয়ে পড়েন ‘ব্লাঙ্ক চেক প্রাপ্ত’। সিদ্ধান্ত গ্রহণ  প্রক্রিয়ায় জনগণের সম্মতি বলতে স্রেফ ঐ মতাদর্শ। ফলে প্রকৃত অর্থে তার কাজ ঘলো সিদ্ধান্তকে ‘ইয়েস’ অথবা ‘নো’ বলা। কখনও কখনও সেটার সুযোগও থাকে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রকে আমি কোনোভাবেই জনগণের প্রতিষ্ঠান বলতে পারি না। তার ক্ষমতাকেও আমার জন্য বৈধতা দেয়ার কোনো কারণ নাই। আমার কোনো একটা লেখায় আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সেলিমঃরেজা নিউটনকে আমি উদ্ধৃত করেছিলাম। রাষ্ট্র সম্পর্কে আমার বিচার ঐ উদ্ধৃতিরই অনুগামী। সেই মাফিক রাষ্ট্রের যে ধারণা আমার কাছে দাঁড়িয়েছে: আধুনিক কালে রাষ্ট্র হচ্ছে এলিটদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ম্যানেজারিয়াল সিস্টেম। এলিটদের স্বার্থরক্ষাকারী সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার কমিটি হচ্ছে এই রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নামক এই কমিটির কাজ এলিটদের নিজেদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা, ছোটলোকদের শোষণ করে বড়লোকদের ধনসম্পদ পাহারা দেয়া, মৌলিক অর্থে ‘প্রতিপক্ষ’ শ্রেণী-গোষ্ঠী-দল-শক্তিকে ধ্বংস করা ইত্যাদি। এলিটদের-শাসকশোষকদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ‘সমন্বয়’ সাধন করা এই কমিটির আরেকটা কাজ।‌‌‌‌‌‌ এই সব ফরজ কর্ম সম্পাদনের জন্য এই কমিটির হাতে থাকে আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিচার বিভাগ বা আইনগত প্রতিষ্ঠানসমূহ, উর্দি বিভাগ বা পুলিশ-সেনা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ মিডিয়া বা মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠানসমূহ। সুতরাং সমাজ পরিচালনার জন্য এইরকম গণবিরোধী একটা প্রতিষ্ঠানের স্থলে রুডলফ রকারের মত আমি চাই ‘স্বাধীন সম্প্রদায়সমূহের একটি ফেডারেশন’। রকারের মতে, এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো পরস্পরের সাথে সাধারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থের সূত্রে সম্পর্কিত থাকবে। নিজেদের কর্মকাণ্ডের বন্দোবস্ত করবে পারস্পরিক সম্মতি আর স্বাধীন চুক্তির মাধ্যমে। এই স্বাধীন সম্প্রদায়গুলো প্রত্যেকেই স্ব-ব্যবস্থাপনা ও অংশীদারিত্বমূলক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার নীতিতে বিশ্বাসী হবে। আর যার চিন্তাভাবনা বিচার-আচার এমন, আকাঙ্ক্ষা এমন, সে রাষ্ট্রবিরোধী না হয়ে পারে না। আমি কর্তৃত্ব-বিরোধিতার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্র বিরোধী।

প্রশ্ন: এই আন্দোলনে যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে, কাছাকাছি একইরকম কর্মসূচি দিয়ে আগেও অনেক আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। তাহলে এই আন্দোলনকে বিশেষভাবে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণ কী?

উত্তর: হ্যাঁ, কাছাকাছি কিন্তু হুবহু একই রকম কর্মসূচি এই আন্দোলনে পালিত হয়নি। মূলত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের যে সেন্টিমেন্ট সেই মাফিকই কর্মসূচিগুলা এক্ষেত্রে ঘোষিত ও পালিত হয়েছে। এখন প্রশ্নটা দাঁড়ায় কেন এটাকে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন বলা হল। রাষ্ট্র-রাজনীতির দমনপীড়ণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। যেমন, ২০০৪ সালের ৩০ শে অক্টোবর, ২০০৭ এর ২২ শে আগস্ট’র মতো আরো কিছু ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হয়,যেখানে খুব বিশেষ মাত্রায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ দেখা যায়। এই ভাংচুর-অগ্নিসংযোগে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে অংশ নিতে দেখা যায়। প্রতিরোধের এই ভাষা সংগঠিত নয় এবং স্রেফ বিশুদ্ধ গণরোষে ভরা। আবার অসংগঠিত বলেই পরবর্তী সময়ে তা প্রয়োজনমত প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়। এছাড়া ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণেই গণরোষের আসল কারণটা চাপা পড়ে যায়। ফলে তা সমর্থনও হারায়। আমরা এই সবকিছু থেকে সতর্ক থাকতে চেয়েছিলাম। সাধারণ শিক্ষার্থীপদর স্বতঃস্ফুর্ত ও বিপুল অংশগ্রহণ হলে সেখানে কোনো ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী যেন হঠাৎ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা ইত্যাকার সহিংসতার হুজুগ তুলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে এইজন্যই আমরা এই আন্দোলনকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন হিসবে সবার সামনে হাজির করি। যেন আন্দোলনের সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে পারে। এই আন্দোলনের এরকম নামকরণের আরো একটি কারণ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী যেন স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নিতে পারে, দ্বিধাগ্রস্থ না হয়। কেননা বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এধরনের কর্মসূচিতে আপামর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দেখিনি। আর যে প্রক্রিয়ায় এগুলো হয়ে থাকে তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত হবার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তাই আমরা অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের  সময় এমন কর্মসূচিই ঠিক করেছিলাম যেন সবাই অংশ নিতে পারে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল, জন-সম্পৃক্ততা। এজন্যই আমরা মানববন্ধন, গণর‌্যালি, দুই ঘন্টা স্বতঃস্ফুর্ত ক্লাস বর্জন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গণসংযোগে প্রচারপত্র ব্যবহার, আন্দোলনের চিন্তাধারা বোঝার জন্য মুক্ত আলোচনা ও গণসংলাপ  ইত্যাদি ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। এমনকি এবারের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক দিকটিও আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। র‌্যালি, মানববন্ধন, সমাবেশ প্রভৃতি কর্মসূচিতে নতুন ধারার গণসঙ্গীত ছাড়াও প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন, ব্যানার, ব্যঙ্গচিত্রসহ নানান ধরনের ডেমোনেস্রট্রশনে সৃজনশীলতার ছাপ দেখা যায়। পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোতে আমি এমনটা দেখিনি। ফলে এবারের এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন  সবকিছু মিলিয়ে একটি নতুন রূপ ধারণ করেছিল।

প্রশ্ন: আন্দোলনে সাংগঠনিক কাঠামোটা কেমন ছিল, সিদ্ধন্তগ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল, কোনো সমস্যার জায়গা ছিল কিনা, থাকলে  সেটা কেমন?

উত্তর: সংগঠন বলতে আমি বুঝি, একটি বিশেষ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তা বাস্তবায়নের জন্য কিছু মানুষের মধ্যে চিন্তা, সৃজন ও তৎপরতার সংহতি। পারস্পারিক যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতাই এই সংহতির প্রধান ভিত্তি। ফলে আমার ধারণায় এবং আমার মতো অনেকেরই ধারণামতে সংগঠন মানে তা ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্রমুক্ত একটা জিনিস। এই ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। সাধারণত পলিটিক্যাল পার্টি কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কাজের দায়িত্ব ভাগ করার নামে নানান ধরনের পদ তৈরি করা হয়। এই পদগুলোকে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতাও দেয়া হয়। ফলে ক্ষমতার নির্দিষ্টতা অনুসারে উপরতলা-নিচতলা তৈরি হয়। সাধারণত উপরতলার প্রধান ব্যক্তিটি হন সভাপতি আর তারপর ক্রমঅনুসারে সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক প্রভৃতি পদ বিন্যস্ত থাকে। এখানকার সাধারণ সংস্কৃতি হচ্ছে: উপরতলার লোক নিচতলার লোককে হুকুম বা নির্দেশ দেবেন এবং নিচতলার লোক বিনা বাক্যব্যায়ে তা পালন করবেন। আর এটা করতে পারলেই নিচতলার লোক একদিন উপরতলায় যেতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে মূলত ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠানের গুটিকয়েক লোকের হাতে ন্যাস্ত হয়ে পড়ে। এবং এই গুটিকয়েক লোক সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যবিধাতা হয়ে ওঠেন। ফলে ক্রমকর্তৃত্বতন্ত্র ক্ষমতার কেন্দ্রানুগতাকেই ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্র-কর্তৃত্বকে জায়েজ করার জন্য নানান ধরনের পলিটিক্যাল পার্টি ঘরানা থেকে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র আওয়াজ শোনা যায়। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ জিনিসটি একটি মিথ। গণতন্ত্র বলতে প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতা-সাম্য-সংহতি’র নিশ্চয়তাকে বোঝায়। কিন্তু কেন্দ্র মানেই অসম ক্ষমতা- অপরের উপর কর্তৃত্ব। আর সম্পর্ক যখন কর্তৃত্বমূলক তখন সেখানে সংহতি থাকতে পারে না। সংহতির নামে খুবই নিস্প্রাণ যান্ত্রিক একটা সম্পর্ক টিকে থাকে। ফলে গণতন্ত্র ও কেন্দ্র সমার্থক হতে পারে না। আর এসব চিন্তাকে মাথায় রেখেই আমরা কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ এই মঞ্চটিকে সম্পূর্ণরূপে ক্রমকর্তৃকতন্ত্রমুক্ত রাখতে চেয়েছি। এই জন্যই সমন্বয় পরিষদে কোনো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক- আহ্বায়ক ছিল না, প্রত্যেকেই সমান অধিকারসম্পন্ন সদস্য ছিলেন।

প্রশ্ন: এই সমন্বয় পরিষদেরও তো তাহলে একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল…

উত্তর: এই বিশেষ মন্তব্যটি করার আগে মঞ্চের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি বিবেচনায় রাখার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাব। সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের নানান ধরনের মতামত ও প্রস্তাব সংগ্রহ করা। অতঃপর সেই মতামত ও প্রস্তাবগুলোকে পর্যালোচনা করা, সাথে সাথে নিজেদের চিন্তা-মতামত প্রভৃতি উপস্থাপন করে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। এই কর্মপরিকল্পনা কোনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়- প্রস্তাব মাত্র। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সক্রিয়-আন্তরিক ও মত-সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাদের নিয়ে একটি সাধারণ বৈঠকে বসে প্রস্তাব আকারে এগুলো হাজির করা হত। সেখানে বিষয়টি সমর্থিত হলেই কেবল কর্মসূচি হিসেবে বৃহত্তর শিক্ষার্থীসমাজের উদ্দেশ্যে সেটা হাজির করা হত। সকল কর্মসূচির ভিত্তিই ছিল স্বতঃস্ফুর্ততা। বলপ্রয়োগমূলকভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করা হত না। যেমন আন্দোলনের সময় দুই ঘন্টা ক্লাস বর্জন। আমরা এই কর্মসূচি পালনের জন্য শুধু প্রচার চালিয়েছি। কোনো ক্লাসরুমে উপস্থিত হয়ে ক্লাস বন্ধ করতে বলিনি। তবে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে চাইছেন না কিন্তু শিক্ষক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ক্লাস করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন, শুধু এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে আমরা প্রতিরোধ গড়ব- এমন পরিকল্পনা আমাদের ছিল। কিন্তু তা প্রয়োগের প্রয়োজনই পড়েনি। ফলে সামগ্রিক সিদ্ধন্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কোনো কেন্দ্রের হাতে বন্দী ছিল না। এটা একটা প্রবাহের মতো বিষয় হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সমন্বয় পরিষদ আলাদা কোনো বিশেষ ক্ষমতা ভোগ করার মতো কাঠামোই ছিল না।

প্রশ্ন: কিছু কিছু সময়ে দেখা যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবেও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়ে। সেক্ষেত্রে কী হতো?

উত্তর: তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কী হবে সেইটা নিয়ে আমি নিজেই শঙ্কিত ছিলাম। কেননা হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা তো খুবই কঠিন। যদি সমন্বয় পরিষদ ছোট ছোট কিছু একটিভিস্ট গ্রুপের কিংবা ক্যাটালিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হতো এবং এদের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সমন্বয় পরিষদ গড়ে উঠত তাহলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কঠিন হত না। আর যেহেতু সাধারণ সভায় বেঁধে দেয়া গাইডলাইনের বাইরে সমন্বয় পরিষদের প্রতিনিধিরা কোনো বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত নিতে পারতো না সেহেতু প্রতিনিধিরা ‘ব্ল্যাংক চেক প্রাপ্ত’ বা স্বৈচ্ছাচারী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো না। কিন্তু মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে এরকম একটিভিস্ট গ্রুপ না থাকলেও কতকগুলো পক্ষ ছিল। এই পক্ষগুলোর মধ্যে যারা সমন্বয় পরিষদে ছিলেন তাদের মধ্যে থেকে বিশেষ দু-একজন করে মত-সংগঠকরা কোনো তাৎক্ষণিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলে অন্য পক্ষের মত-সংগঠকদের সাথে আলোচনা করে নিজ নিজ পক্ষগুলোর সাথে কথা বলে নিতেন। তবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটা কেমন হবে- এ বিষয়ে কোনো জমাট ধারণা আমার কিংবা মঞ্চের অন্য অনেক সদস্যেরই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এটা নির্ধারিত হবে এমন একটা ভাবনাই আমার ছিল এবং বর্তমানে আমার উপলব্ধি হচ্ছে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন (সমন্বয় পরিষদকে কতকগুলো একটিভিস্ট গ্রুপের একটা ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তোলা) আনলেই এই ধরনের সমস্যাগুলো আমরা উত্তরণ করতে পারি।

প্রশ্ন: সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে তখন কী ভোটাভুটি হত?

উত্তর: আমাদের আশপাশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলতে সংখ্যাগরিষ্ঠের হ্যাঁ অথবা না মতকে বোঝার সংস্কৃতি দাঁড় হয়েছে। আপনি যেটাকে ভোটাভুটি বললেন। এ ধরনের পদ্ধতির একটা বড় দুর্বলতা হলো, এটা বিতর্ককে এড়িয়ে যেতে চায়। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের সাথে একমত না হলেও সংখ্যালঘিষ্ঠকে অনুগত’র মতো তা বাস্তবায়ন করতে হয়। ঐ মতামত নিয়ে জনসংযোগের সময়ে যদি কোনো ব্যক্তি সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামতটির সাথে ঐক্যমত্য হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের সাথে দ্বিমত পোষণ করে আর জনসংযোগকারী যদি হন সংখ্যালঘিষ্ঠ তবে তিনি খুব বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন। এছাড়া যে মতের সাথে একজন একমত নয়, সেই মত বাস্তবায়ন করা তার জন্য মানসিক চাপ। এটা প্রায় একটা স্বাধীনতা হরণকারী প্রক্রিয়া। এজন্য মঞ্চের সমন্বয় পরিষদে কোনো বিষয়ে একাধিক মত থাকলে তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে তা ফয়সালা করার চেষ্টা হতো। একটা বিষয়ের উপর ঘন্টা দুই-তিনেক আলাপ-আলোচনার নজির এই সমন্বয় পরিষদের ছিল। তীব্র তর্ক-বিতর্ক এখানে সংঘটিত হয়েছে। এর পরেও একমত না হতে পারলে উদ্ভুত সকল মতামত আন্দোলনকারীদের সাধারণ বৈঠকে উপস্থাপন করা হত। সাধারণ বৈঠকের মধ্যেও তর্ক-বিতর্ক-আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এর পরেও কোন কারণে ঐক্যমত্য না হলে ঐ বিশেষ ইস্যু বা কর্মসূচি পর্যন্ত যে কোনো সদস্য নিজের নাম প্রত্যাহার করতে পারতেন। এমনকি জনসম্মুখে ইস্যু বা কর্মসূচির ক্ষেত্রে ভিন্নমত প্রচারের ও সেই মাফিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ ছিল। এ প্রক্রিয়ায় এখানে সংগঠক-সক্রিয়কের স্বাধীনতা সংরক্ষিত ছিল। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে, যেমন, ক্লাস আওয়ারে মাইক ব্যবহার কিংবা স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট (এই কর্মসূচি পালনের প্রয়োজন পড়ে নি, তার আগেই শিক্ষার্থীরা মুক্তি পেয়ে যায়।) এইসব সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি বিষয়ে দ্বিমত ছিল। কিন্তু ক্লাস বর্জন কর্মসূচি শুরু হলে এবং বৃহৎ সমাবেশে বক্তব্য পৌঁছোনোর জন্য মাইক ব্যবহার বিষয়ে দ্বিমতটি আর ছিল না। আর স্বতঃস্ফুর্তভাবে সকল একাডেমিক কার্যক্রম বয়কট কর্মসূচিটিতে দুই-তিন জন সমন্বয় পরিষদ সদস্য দ্বিমত  পোষণ করেছিলেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলেও জানিয়েছিলেন। সমন্বয় পরিষদের অন্য সদস্যরা তাদের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

প্রশ্ন: কিন্তু কোনো ইস্যু বা কর্মসূচি নিয়ে দুই তিনটা মত প্রচার ও সেই মাফিক তৎপরতা চালালে মঞ্চের ভেতরে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না? আবার যখন মানুষ দেখবে যে একই ব্যানার নিয়ে দুই-তিন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে তখন কী বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে না?

উত্তর: না, বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় না। কেননা বৃহত্তর মূলনীতিতে লড়াইটা অনায্য কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। ফলে একাধিক ধরনের কর্মসূচি শেষ বিচারে সমান্তরাল চাপই তৈরি করে। ফলে  সেখানেও একটি ঐক্য তৈরি হয়। প্রকৃতপক্ষে একই নামের কিন্তু আলাদা মতের একাধিক ব্যানার থাকলে জনগণ যে মতটি সমর্থন করে সে তাতেই অংশ নেয়।

ফলে নামের অন্ধ অনুসরণ নয় বরং মতামত ও বক্তব্যের ভিত্তিতে সমর্থন ও অংশগ্রহণ- এই বিষয়টিই এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু একটা নামকে-একটা ব্যানারকে অন্ধ অনুসরণ- মূলত এরকম কোনো অবস্থান থেকে বিভ্রান্তির সমস্যাটা দেখা দিতে পারে। একজন যদি এটা ঠিক করে ফেলে যে, তিনি সবসময়ই এই নামটাকে-এই ব্যানারটাকেই সমর্থন করবেন, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রথমত নাম-ব্যানারের অন্ধ প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং যাচাই বাছাই ছাড়াই নির্বিচারে ব্যানারের সিদ্ধান্ত মানতে থাকেন। ফলে তিনি বিভ্রান্ত হন। কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চ এরকম সমস্যার মধ্যে পড়েনি। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি অভিজ্ঞতার অবস্থান থেকে দিতে পারছি না। সাধারণ যুক্তি চর্চার অবস্থান থেকেই আমি এরকমভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করছি।

প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর কয়েক দিন পরেই আমরা দেখলাম যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ঘোষণাকারী নির্যাতন বিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ নামে আরেকটি ব্যানার থেকে আন্দোলন শুরু করা হয়। আন্দোলনের সময় এই দুই মঞ্চের সম্পর্ক কেমন ছিল?

উত্তর: প্রকৃতপক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো ২০০২ সালে শিবির-বিরোধী আন্দোলনের সময় নির্যাতনবিরোধী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ এই মঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করে। ঐ একই সময়ে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রী নির্যাতন, বুয়েটে সনি হত্যাকান্ড এসব কিছু মিলিয়ে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মঞ্চটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই আত্মপ্রকাশ করে। এই মঞ্চটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংগঠিত কোনো মঞ্চ নয়। মূলত বাম ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বারা সংগঠিত এবং কিছু সচেতন সাধারণ শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় ঐ সময়ে এ মঞ্চটি গড়ে উঠেছিল। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আন্দোলন সংগঠিত হলেও কখনোই এ মঞ্চের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় নি। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময়ে এই মঞ্চটি আবার দেখা যায়। এবার এই মঞ্চটি গঠন প্রক্রিয়ায় প্রধানত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন যুক্ত ছিল। তাদের দিক থেকে এরকম একটা মঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আমি কিছুটা অনুমান করতে পারি। ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করতে করতে শিক্ষার্থীদের থেকে অনেকখানি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবার রাজনৈতিক দলের অংশ হিসেবে দলের মতাদর্শকে তারা ধারণ করে। এই মতাদর্শ একজন সাধারণ শিক্ষার্থী নাও ধারণ করতে পারে। তখন ঐ সাধারণ শিক্ষার্থী সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত হলেও স্রেফ ঐ মতাদর্শের কারণেই ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে একাত্মতা বোধ করে না। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে কলস পাল্টাতে হয়। ছাত্র সংগঠনগুলো কলস পাল্টে এরকম মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে। এসব মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পেছনে সত্যিকারই আন্দোলনের স্পিরিটের চেয়ে, কিংবা কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ, পরবর্তীতে সংগঠন করান ইত্যাদি বিষয়ই মুখ্য হয়ে পড়ে। ফলে একটা সত্যিকারের আন্দোলন গড়ে ওঠা এবং তা থেকে প্রগতিশীল অর্জনগুলো সংঘটিত হয় না। আবার ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন বলেই এই মঞ্চগুলোরও কাজের ধাঁচ অনেকটা ছাত্র সংগঠনগুলোর মতোই কেন্দ্রমুখাপেক্ষী। সেজন্যই এখানকার বাস্তব অবস্থা বিচারের চোখ কিংবা বলতে পারি, যে ধরনের চিন্তা ও যুক্তি চর্চার মধ্যে থাকলে বাস্তব অবস্থা বিচার করা যায় তা তাদের ছিল না। এখানে এই মঞ্চটি সংগঠিত করার পেছনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামানোর একটা প্রচেষ্টা ছিল। আর অপরদিকে আমাদের মূলনীতির জায়গাটি ছিল: নিয়ন্ত্রণ নয়, শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। ফলে দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান এবং সাংগঠনিক সেটিং-এর কারণেই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এই মঞ্চটি গঠন করে। কিন্তু ততদিনে আন্দোলনের প্রধান ধারা হিসেবে কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ  মঞ্চটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই আন্দোলনের প্রধান ধারার কর্মসূচির সাথে তারা একাত্মতা ঘোষণা করে এবং নিজেরা ছোটখাট দু-তিনটি কর্মসূচি পালন করে। তাদের এই কর্মসূচিগুলোতে আমরা সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে পারেনি। বরং সামগ্রিক আন্দোলনে কিছু অবদান রেখেছে। আবার ঐ মঞ্চটি দাঁড় হওয়ায় আন্দোলনের কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারার আলাদা পরিচয় স্পষ্ট হয়েছ।

প্রশ্ন: আন্দোলনের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনাকে দেখা গেছে সমাবেশে, র‌্যালিতে বক্তব্য রাখতে, কর্মসূচি ঘোষণা করতে। এ থেকে অনেক শিক্ষার্থীরই হয়তো এমন ধারণা জন্মেছে যে, আপনি এই আন্দোলনের নেতা। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী? আন্দোলনের নেতৃত্বে বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আপনি?

উত্তর: হ্যাঁ, এটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি সমাবেশে, র‌্যালিতে কিংবা মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতাম। এবং পরবর্তী দিনের কর্মসূচীও ঘোষণা করতাম। প্রচলিত সংস্কৃতিতে এরকম একটা ধারণা আছে যে, যিনি সমাবেশে বক্তৃতা করেন তিনিই নেতা এবং নেতাই সামগ্রিক আন্দোলনের ভাগ্য বিধাতা। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থীরই মনে হয়েছে যে, আমি এই আন্দোলনের নেতা। এই বিষয়টি আমাকেই সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত করে তোলে। আমি আন্দোলনের সময়ই এ বিষয়ে সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। এবং অন্যদেরকে ক্রমানুসারে এই কাজটির দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাবও রাখি। সেই মাফিক অন্যদের অনুরোধে দু-একজন সেই চেষ্টাটা করেন। কিন্তু মঞ্চের সামগ্রিক বক্তব্য ও ধারণা স্পষ্ট করে বলতে পারার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে-এ কথা বলে তারা পরবর্তীতে সেই দায়িত্ব নিতে চাননি এবং তারপরে কেউই স্বতঃস্ফুর্তভাবে এই কাজটির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার বিশেষ দু-একজনের ক্ষেত্রে অন্যদের তীব্রতর আপত্তি ছিল এবং তাদের আপত্তির যুক্তি সমন্বয় পরিষদে সমর্থিত হয়। তখন আমার প্রস্তাব ছিল যে, যেমনই হোক না কেন মঞ্চের অনান্য সদস্যরা বক্তব্য রাখবেন, কোনো সংশোধন বা সংযোজন থাকলে আমি তা পরে যুক্ত করব। কিন্তু এই কাজের জন্যও লোক পাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মঞ্চের সিদ্ধান্তে কর্মসূচিগুলোত আমি বক্তব্য রাখি। তবে নিজের মনগড়া এবং সমন্বয় পরিষদের অনান্য সদস্যদের দ্বিমত আছে এমন কোনো বক্তব্য দেয়ার এখতিয়ার আমার ছিল না। মঞ্চের লিফলেট, সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য, বিভিন্ন সভায় সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের দ্বারা সমর্থিত চিন্তা-ধ্যানধারণা অনুযায়ী বা একই ধ্যানধারণাই কিন্তু ভিন্ন ভাষায় আমি বক্তব্য উপস্থপন করতাম। ফলে আমার কাজটা ছিল অনেকটা মুখপাত্রের মতো। দুতিনবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে আমি মঞ্চের গাইডলাইনের বাইরে চলে যাই। মঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা এ বিষয়ে আমাকে সতর্ক করে দেন। আমি আমার ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। সুতরাং আমি খুবই স্পষ্টভাবে বলতেই যে, আমি কোনোভাবেই এই আন্দোলনের ভাগ্যবিধাতা- নেতা নই। আন্দোলন চলাকালে মিডিয়ার সামনেও আমি এই বক্তব্যই দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বিবেকই ছিল এই আন্দোলনের নের্তৃত্ব। একটি আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে থাকে বহুদিনের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন। বহুদিন ধরে এই চিন্তাভাবনা ও অনুশীলনগুলোর সারাংশ করা, ব্যাখ্যা প্রদান করা, প্রচার করা এবং জনগণের মধ্যে আন্দোলনের নায্যতার পক্ষে হরহামেশা বক্তব্য উপস্থাপন করার কাজগুলো কোনো না চিন্তাধারায় মত-সংগঠকরাই করে থাকে। এই মত-সংগঠকরা কখনো খুবই সুসংগঠিত, কখনো আবার স্রেফ একটা নেটওয়ার্কের মধ্যে বিস্তৃত থাকে। আর তাদের চিন্তাভাবনা ও অনুশীলন যদি জনগণের কাছে ন্যায্য বলে মনে হয়, তখনই কেবল তাতে জনসম্পৃক্ততা তৈরি হয়। ফলে কোনো আন্দোলন শুধু এই মত-সংগঠকদের উপর নির্ভরশীল বিষয় নয়। এর প্রধান বিষয়টিই হচ্ছে জনসম্পৃক্ততা। কোনো একটি গোষ্ঠীর কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলা, আন্দোলন সৃষ্টি করে না। আন্দোলন তখনই সৃষ্টি হয় যখন তাতে জনসম্পৃক্ততা ঘটে। ফলে নেতৃত্ব বিষয়টিকে আমি ব্যাখ্যা করি মত-সংগঠক ও জনসম্পৃক্ততা- এই দুইটি বিষয়ের একটি যুগপৎ সম্পর্ক হিসেবে। কিন্তু মিডিয়া এবং ইতিহাস লেখার যে ছক আছে তাতে প্রায়ই নেতৃত্ব বলতে মত-সংগঠকদের মধ্য থেকে হাতে গোনা এবং জনস্রোতের মধ্যে ভেসে থাকা দু-চার জন লোককে বোঝানো হয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় নের্তৃত্বের যে ধারণা নির্মাণ করা হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে গণমুখী অর্থ ধারণ করে না।

প্রশ্ন: যে কোনো কাজ সম্পন্ন করার পরেই তো সেটা নিয়ে আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়। আমরা সেখান থেকে কিছু শিখতে পারি। এবারের আন্দোলনের পর আপনার অভিজ্ঞতা কী? কী শিখলেন আপনি?

উত্তর: আন্দোলন হচ্ছে জীবন শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠশালা। ফলে এবারের আন্দোলনেরও কিছু শিক্ষা আছে। আমি এই আন্দেলন থেকে বেশ কয়েকটি বিষয় শিখেছি। আমি প্রথমত শিখেছি জনসম্পৃক্ততাই একটি আন্দোলনের প্রধান বিষয়। ফলে তাই ঘটে যা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণ চায়। দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা শুধু অর্জন করলেই চলে না, তা পাহারা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। তৃতীয়ত, বিবেক যখন আন্দোলনের নের্তৃত্ব তখন রাষ্ট্র ও অনান্য ক্ষমতাশক্তির প্রচার-প্রচারণা ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তি ছাড়া এই আন্দোলনে এমন কী অর্জিত হয়েছিল যার কারণে এই আন্দোলনকে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরী পর্ব নামে আখ্যায়িত করলেন?

উত্তর: সাম্প্রতিক আন্দোলন শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির আন্দোলন না। এই আন্দোলন রাষ্ট্র ও অনান্য দাপুটে আধিপত্যশীল ক্ষমতার বিরুদ্ধে তথা বৃহত্তর অর্থে অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলন। তাই রাষ্ট্রের ‘জরুরী আইন’ ভঙ্গ করে জরুরি প্রতিবাদ, জরুরি প্রতিরোধ এই আন্দোলনের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়েছে।

‘জরুরী আইনের’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কর্তৃত্বের শুঁড় ঢুকেছিল, তা থেঁতলে দেয়া রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জরুরী অবস্থা’ শিথিল হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ধরনের তৎপরতা প্রকাশ্যে সংগঠিত হতে পারছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্বপরায়ণ প্রক্টরিয়াল আইনের বিধিনিষেধগুলো দূর্বল হয়ে গেছে, যার কারণে আন্দোলনের এই মঞ্চ থেকে যখন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার উপর, যে নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল তা অমান্য করার ঘোষণা দেয়া হয়, তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ আলোচনা সভা, সেমিনার, পাঠচক্র, প্রদর্শনী, উৎসব প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের অনুমোদন দেয়া শুরু করে। ‘জরুরী অবস্থার’ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রধান ক্ষেত্র কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালাতে পারছিল না, তৎপরতাহীনতার কারণে ক্রমেই সদস্যহীন হয়ে পড়ছিল। আন্দোলনের পরে সেই সংগঠনগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট ঐক্যের শক্তি, রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সবসময় চাপের মুখে রাখছে। এতে ‘জরুরী অবস্থার’ মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার সীমা প্রসারিত হয়েছে। এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই আন্দোলন আত্মপরিচয় নির্মাণের আন্দোলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয় নির্মিত হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মানেই মৌলবাদী, প্রতিবাদহীন, সহিংস কিংবা অনাধুনিক-খ্যাত ইত্যাদি। এখানকার তাবৎ প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড মানেই তার স্থান সংবাদপত্রের ‘১৭ নম্বর পাতা’। কিন্তু যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের জঠর থেকে জন্ম নিয়েছে সে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষাহীন নয়। এখানে  যেমন শিবির আছে তেমনি মুক্তিকামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীরাও আছেন। ৬০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উত্তরাধিকার এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিচয়ের বিরুদ্ধে সত্যিকারের আত্মপরিচয় পুনঃনির্মাণের সূচনা ছিল এই আন্দোলন। এই আন্দোলন যে, শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মুক্তির আন্দোলন ছিল না, মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বানও এই আন্দোলনের মধ্যে ছিল তা আন্দোলনের সময়ের প্রচারপত্র-প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-ব্যানার কিংবা আন্দোলনকারীদের লেখাপত্রের মধ্যে খুবই স্পষ্ট। অনায্য-অগণতান্ত্রিক কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাশক্তি, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা-অধিকারকে সংকুচিত করে ফেলে। আর বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে যখন এই ঘটনা ঘটে তখন সামগ্রিক চিন্তা ও সৃজন রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে মুক্তচিন্তা ও বিবেকের অধিকার সমুন্নত রাখার শ্লোগান,  এই অর্থে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার আকাংক্ষাকেও ব্যক্ত করে। আবার এই শ্লোগানের মাধ্যমে ‘জরুরী আইনে’র বিরুদ্ধে জরুরি প্রতিরোধের ন্যায্যতাকেও তুলে ধরা হয়। এই আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যম বিশেষত গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। খুব বিচ্ছিন্নভাবে এবং ব্যক্তিগত বা বন্ধু পরিমণ্ডলে নতুন ধারার গণসঙ্গীত বা জীবন ঘনিষ্ঠ গানের চর্চা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে তা প্রকাশিত ছিল না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আন্দোলনের সময়ে র‌্যালি, সমাবেশ, মানববন্ধন প্রভৃতিতে যে গণসঙ্গীতগুলো উচ্চারিত হয়েছে তা ধ্রুপদী গণসঙ্গীতের ধারা যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সংগঠনগুলো চর্চা করে তার থেকে আলাদা। তারুণ্য-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ কিন্তু তার মাঝেও ঘুড়ে দাঁড়ানোর কথা এই গানগুলোতে ছিল। সংগ্রাম-সংহতি-ভালেবাসা মিলেমিশে একাকার হয়েছে এই গানগুলোতে। এটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট বাঁক।

আর্টওয়ার্ক: রাইট টু প্রটেস্ট
শিল্পী: ভ্লাদিমির খাখানভ
সূত্র: কার্টুন মুভমেন্ট

প্রশ্ন: কর্তৃত্ব-বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ মঞ্চের পক্ষ থেকে একুশ আমার বর্ণমালা শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসূচি কতোটা সফল ছিল? মঞ্চের ভবিষ্যৎ কতোটুকু সম্ভবনাময়?

উত্তর: হ্যাঁ, আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর মঞ্চের ব্যানারে একুশ আমার বর্ণমালা  শীর্ষক একুশের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষিত হয়। বৃহত্তর একটি আন্দোলনের পর সেই আন্দোলনের পর্যালোচনা আগে জরুরি ছিল। কোথায় দুর্বলতা ছিল, কীভাবে আগামী দিনে মঞ্চের সাংগঠনিক কর্মকান্ডর পরিধি বিস্তৃততে করা যায়, মঞ্চ পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও  ভালো কি কি পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, সেসব বিষয়ে আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুক্তির পর একুশের কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে মঞ্চের কিছু সদস্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে আগে মঞ্চর সাংগঠনিক বিষয়টি ফয়সালা করার অনুরোধ জানাই। কিন্তু তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। ফলে একুশের কর্মসূচির একটা প্রস্তাবনা তৈরি করে তারা বৈঠক ডাকে। কয়েকবার বৈঠক ডাকার পরেও সাড়া পাওয়া যায় নি। পরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে বৈঠকে সমন্বয় পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতি আশানুরূপ ছিল না। আমি নিজেও বৈঠকে উপস্থিত হতে পারিনি। হতে যে পারব না তা আগে থেকেই জানিয়েছিলাম। সেই বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সামনে একটি প্যাকেজ প্রস্তাব আকারে একুশের কর্মসূচি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবনার প্রতিটি বিষয়ের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বৈঠকে বিশদভাবে আলোচিত হয়নি বলে উপস্থিত অনেক সদস্যই আমাকে জানিয়েছেন। আবার দীর্ঘ আন্দোলনের সময়ে মঞ্চের সংগঠকদের ক্লাস-পরীক্ষা বা একাডেমিক কার্যক্রমে যতটুকু ফাঁক তৈরি হয়েছিল তা পুষিয়ে নেবার জন্য আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তাদের একটি বিশেষ ব্যস্ততাও তৈরি হয়। সেই ব্যস্ততার মাঝে কে কতখানি সময় দিতে পারবে তা বৈঠকে পূর্ণাঙ্গরূপে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ফলে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার বিষয়টি সুচারু ছিল না। সামগ্রিকভাবে কর্মসূচি গ্রহণ প্রক্রিয়াটাতেই অংশিদারিত্বের অভাব ছিল। ফলে মঞ্চের খুবই হাতে গোনা, বলতে গেলে ৫/৭ জন সদস্য এতে সময় দেয়। কিন্তু এই ৫/৭ জনের মধ্যেও সমন্বয় ও সহনশীলতার অভাব ছিল। এতে করে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে একুশের কর্মসূচির প্রস্তাবনা হাজির হয়েছিল তাতে সফলতার পরিমাণ খুব বেশি বলে দাবি করা যাবে না। মাসব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হলেও পরের দিকের কিছু কর্মসূচি পালিত হয় নি। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে আলোচনা সভাগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। আবার অংশগ্রহণ কম হওয়ায় প্রশাসনের চাপও বাড়তে থাকে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে মঞ্চের জন্য সময়টা খুব খারাপ ছিল। তবে প্রশাসনকে স্রেফ অবহিত করে মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করায় প্রশাসন অন্য অনেক সংগঠনকে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়। মঞ্চের একুশের কর্মসূচির প্রচারপত্র এবং তার আবেদন অন্য অনেক সংগঠনকেই কর্মসূচি গ্রহণের ব্যাপারে উজ্জ্বীবিত করে। একারণেই সারা দেশের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এদিক থেকে এটা একটা বড় অর্জন। মঞ্চের ভবিষ্যত কতটুকু সম্ভবনাময় এবং কতটুকু নয় তা নির্ভর করছে প্রধানত মঞ্চের কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের উপর। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ তখনই সম্ভব হবে, যখন মঞ্চের মত-সংগঠকরা মঞ্চের মৌলিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে জনমত গঠনে সফল হতে পারবেন এবং মঞ্চের চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের আশা আকাঙ্ক্ষা ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে। বর্তমানে মঞ্চের মত-সংগঠকদের মধ্যেই কাজের একটা সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে। আবার তা কাটিয়ে ওঠার কিছু প্রচেষ্টাও আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে আশার কথা হলো এই যে, কর্তৃত্ব-বিরোধী তৎপরতা থেমে নেই। মঞ্চের মত সংগঠকদের মধ্যে অনেকেই কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় ছোট ছোট একটিভিস্ট গ্রুপ,ক্যাটালিস্ট গ্রুপ কিংবা কনসেটে অরগানাইজিং গ্রুপ গড়ে তুলছেন। এদের মধ্যে কেউ ক্ষমতা-মিডিয়া-সক্রিয়তা বিষয়ে, কেউ কর্পোরেট একচেটিয়া ও অসম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে, কেউ ভাষা-সংস্কৃতি-আধিপত্য বিষয়ে, কেউ কর্তৃত্ব-আইন-মানবাধিকার বিষয়ে আবার কেউ প্রকৃতি-বিজ্ঞান ও বিবর্তন বিষয়ে কর্তৃত্ব-বিরোধী ধারায় চিন্তা ও চর্চার জন্য নানান ধরণের তৎপরতার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলে এই সংগঠন-প্রচেষ্টাগুলো মোটামুটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় হতে পারলেই কর্তৃত্ব-বিরোধী মঞ্চ’র ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি সংশয় প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়বে না।

প্রশ্ন: মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন: জরুরি পর্বে, ঠিক এই সময়ের করনীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: ইতিমধ্যে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে তার একটি বিশেষ উচ্চারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক কী হওয়া দরকার সে বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ফলে এই সময়ে আন্দোলনের প্রধান এলাকাটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রীয়-কর্তৃত্বকে খর্ব করে বিভাগগুলোতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। সেই সাথে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা। বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একটা সংস্কারের প্রস্তাব মঞ্জুরি কমিশন তৈরি করেছে। এই সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃতপক্ষে কর্পোরেট কর্তৃত্বতন্ত্রের উপযোগী মতাদর্শিক এবং একই সাথে ঐ কর্পোরেটের উৎপাদন কাঠামোতে উন্নতমানের আমলা- কামলা সরবরাহের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাওয়া হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়র ধারণা বিরোধী এই কর্পোরেট কর্তৃত্ব তাড়িত সংস্কারকে প্রতিরোধ করা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে  জরুরি কর্তব্য বলে আমি মনে করি।

০৭ মার্চ-২৮ মার্চ, ০৮
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পার্থ প্রতিম দাস

পার্থ প্রতিম দাস

লেখক

পার্থ প্রতিম দাস

পার্থ প্রতিম দাস